Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Prataswaraniyo Charitmala
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
প্রাতঃস্মরণীয়
চরিতমালা।
শ্ৰীযােগেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় বিদভুলগ
2.
এম্ এ প্রণীত
LIVES OF PATRIOTS & PHILANTHROPISTS
BY
JOGINDRA NATH BANDYOPADHYAYA
VIDYABHUSHAN. M. A.
LIVES OF GREAT MEN ALL REMIND TY,
VW CAN MAKE OUR LIVES SUBLIME.”
Longfollow.'
কলিকাতা সংস্কৃত প্রস
সংস্কৃত প্রেস ডিপজিটরি
দ্বারা প্রকাশূিক্ত:
চন্দনন
ব্যাসযন্ত্রে
ঐতিনকড়ি চক্রবর্তী কর্তৃক
মুদ্রিত।
১৮৮৩।
No text on this page.
বিজ্ঞাপন।
স্কুলসমূহের সুবিখ্যাত ইনেস্পেক্টর পূজ্যপাদ শ্ৰীযুক্ত
ভূদেব মুখােপাধ্যায় মহাশয়ের কথামত আমি এই
জীবনী-মালা লিখিতে আরম্ভ করি। ইহা স্কুল সমুহেব
পাঠ্য পুস্তক রূপে নির্দিষ্ট হইবে এই আশা পাইয়া
আমি এই জীবনীগুলি কিঞ্চিৎ সংক্ষিপ্ত করিয়া লিখি।
এই সকল মহাপুরুষগণের বিস্তৃত জীবনী স্বতন্ত্র পুস্তকা-
কারে বাহির করিতেছি বলিয়া এই সংক্ষেপ-ভাবে
আমার ক্ষোভ জন্মে নাই। বিশেষতঃ সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম ঘটনা-
রশিতে বালকের অপরিপক্ক স্মৃতিশক্তিকে ভারগ্রস্ত
করা অবিধেয় মনে করিয়া এই সকল জীবনীতে কেবল
সূল স্থূল ঘটনার চিত্র প্রদান করিয়াছি। যে যে মহা-
ত্মার চরিত্রের যে যে অংশ পাঠ করিলে “আত্মােৎসর্গ”
শিক্ষা হয়, সেই সেই অংশ উজ্জ্বল বর্ণে চিত্রিত করি-
য়াছি। উপযুক্ত পুস্তকাভাবে আরও কয়েকটা মহা-
পুরুষের চিত্র অঙ্কিত করিতে পারি নাই। দ্বিতীয় বারে
সেগুলি অঙ্কিত করি ইচ্ছা রহিল।
এক্ষণে শিক্ষাসমিতি, শিক্ষাবিভাগের কর্তৃপক্ষগণ, ও
সাধারণে আমার এই উদ্যমের উৎসাহ বর্ধন করিলে
আমি আপনাকে কৃতার্থ মনে করি।
যােগেন্দ্র নাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
গ্রন্থকার।
দ্বিতীয়বারের বিজ্ঞাপন। ‘আত্মােৎসর্গের’ যে অংশটুকু বালকদিগের পাঠনার যােগ্য নয় বলিয়া পুস্তক সমিতির কোন কোন সত্য আপত্তি তুলিয়াছেন, তাহা পরিত্যাগ করিয়া বালক- গণের জন্য শুদ্ধ প্রাতঃস্মরণীয় চরিতমালা নাম দিয়া এই স্বতন্ত্র পুস্তক প্রকাশ করা গেল। কোন কোন ইনস্পেক্টরের উপদেশানুসারে আত্মােৎসর্গের উদ্দীপনা অংশগুলিরও কিছু কিছু পরিত্যাগ করা গেল। দুইখানি বইই স্বতন্ত্র প্রচারিত হইবে। সাধারণের অসুবিধা নিবা- রণের জন্য উভয় গ্রন্থের স্বতন্ত্র নামকরণ ও স্বতন্ত্র মূল্য নির্ধারণ করা হইল। প্রাতঃস্মরণীয় চরিতমালায় মহা দেব ও খ্রীষ্ট ভিন্ন আত্মােৎসর্গের আর সমস্ত মহাত্মারই নাম সঙ্কীৰ্ত্তন করা হইয়াছে। তাহাদিগের নামের তা- লিকা নিম্নে প্রদত্ত হইল। ১। বিশ্বামিত্র। ৫। ওয়ালেস। ৯। হাউয়ার্ড। ২। শাক্যসিংহ। ৬। টেল। ১০। রােমিলী। ৩। গুরুগগাবিন্দ। ৭। হ্যামডেন। ১১। গ্যারিবী। ৪। চৈতন্য। ৮। উইলবাকো। ১২। ম্যাটসিনি। ১৩। ওয়াসিংটন। চুচুড়া। ৩০ আশ্বিন ১৮৮৩। গ্রন্থকার।
মুখবন্ধ। আত্মােৎসর্গের লীলাস্থলী ভারতে আজ,আত্মােৎ- সর্গ” নূতন কথা বলিয়া বােধ হইবে। যে ভারতে এক- দিন আবালবৃদ্ধ-বণিতা আত্মােৎসর্গের দীক্ষাগুরু ছিলেন, আজ সেই ভারতে আত্মােৎসর্গ শিক্ষা দিবার জন্য বৈদে- শিক মহাপুরুষগণের উজ্জ্বল চরিত্র পতিত ভারতবাসি- গণের সম্মুখে ধরিতে হইল—ইহা অপেক্ষা ক্ষোভের বিষয় আর কি হইতে পারে ? পুরাকালীন স্বজাতি- প্রেমিক বা বিশ্বপ্রেমিক মহাপুরুষগণের জীবনী-বঙ্গ অতল কাল-সাগরে নিমগ্ন। সেই রত্নরাজির কিরণমালা কাল সাগরের গভীরতা ভেদ করিয়াও তলদর্শী দর্শকের নয়ন কথঞ্চিৎ পরিতৃপ্ত করে সত্য, কিন্তু দর্শন-পিপাসা তাহাতে আরও উদ্দীপিত হয়। দর্শকের ইচ্ছা কাল- সাগরের সেই গভীরতম প্রদেশে যাইয়া সেই রত্নরাজির সমুদ্ধার করেন। অনেক ডুবুরি সেই ঘনীভূত অনন্ত জলরাশি ভেদ করিয়া রত্ন লাভ করিতে চেষ্টা করিতে- ছেন বটে, কিন্তু তাহাদিগের চেষ্টা বালকের আকাশের চাদ ধরার উদ্যমের ন্যায় ব্যর্থ হইয়া যাইতেছে। যি আমাদের পূর্ব পুরুষগণ যত্ন করিয়া রাখিতে জানিতেন, তাহা হইলে আজ সেই অনন্ত রত্নরাজি কালসাগরের অতল জলে ডুবিত না। আজ তাহা হইলে আমাদিগকে দুরবগাহ কালসাগরের অতল জলে নামিবার বৃথা চেষ্টায় অমূল্য জীবন নষ্ট করিতে হইত না। পুরাকালে এই ভারতে কত কোটী মহাত্মা স্বদেশানুরাগ, স্বজাতিপ্রেম বা বিশ্বপ্রেমানলে আত্ম-আহুতি প্রদান করিয়াছিলেন, তাহার ইয়ত্তা করা যায় না। কিন্তু তাহাদিগের প্রকৃত . জীবনী পাইবার কোন আশা নাই, তাহার আভাসমাত্র স্থানে স্থানে পাওয়া যায়।...সেই আভাসমাত্র লইয়া আমি সেই সময়ের দুই একটী চরিত্র অঙ্কিত করিয়াছি। ঐতিহা সাধারণের ঐতিকর হয়, তাহা হইলে ভবি- ষ্যতে আরও অনেকগুলি চরিত্র অঙ্কিত করিব ইচ্ছা আছে। হিন্দু-যবন-সংঘর্ষকালে আত্মােৎসর্গের অনেকগুলি জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। সে চরিত্রগুলি স্বতন্ত্র অঙ্কিত করিব মানস আছে। এই জন্য সে সকল চরিত্র এখানে অঙ্কিত করিলাম না। ইউরােপ ও আমেরিকা হইতে যে কয়েকটী চরিত্র-রত্ন আহরণ করিয়াছি, তাদৃশ উজ্জল রত্ন আধুনিক সময়ে দুষ্প্রাপা। মহাভারত ও রামায়ণ পাঠে যে ফল এই মহাত্মাগণের চরিত্রপাঠেও সেই ফল । এই সকল চরিত্রের অনুকরণে মানুষ দেবতা হয়। জাতীয় চরিত্র গঠনের এমন উপাদান-সামগ্রী আর দেখিতে পাওয়া যায় না। বিশেষতঃ সুকুমার-মতি বালকগণের কোমল অন্তঃকরণে স্বর্গীয় ভাব চির-অঙ্কিত করিবার এমন উপকরণ আর নাই। চরিত্র-সংগঠন যদি শিক্ষার প্রধান উদ্দেশ্য হয়, তাহা হইলে প্রত্যেক বাল- ককে এই প্রাতঃস্মরণীয় মহাপুরুষগণের চরিতমঞ্জরী পড়িতে দেওয়া প্রত্যেক অভিভাবক ও প্রত্যেক শিক্ষ- কের একান্ত কর্ত্তব্য। কিমধিকমিতি--- সংবং ১৯৪০.৪১ ভাদ্র, চু চুড়া। গ্রন্থকারস্য। L
নষয়ে কবি
প্রা
ণীয় চরিতমালা,
,
T
দারিদ্র্য-মাহাত্ম্য।
জগতে অবিমিশ্র সুখ দুঃখ দেখতে পাওয়া যায় না।
সুখের সঙ্গে দুঃখ, দুঃখের সঙ্গে সুখ নিরন্তর মিশাইয়া
আছে। দরিদ্রের কুটীরে ও রাজার অট্টালিকায় * জিলে
এই দুইই মিলিবে। তবে অবস্থাভেদে বেশী কম মাত্র।
অনেকের সংস্কার আছে, দারিদ্র্য-দুঃখ অপেক্ষা অধিকতর
ক্লেশকর বিষয় আর নাই। কিন্তু তাহা ভ্রম। চিন্তাশী-
ল তা,পরদুঃখানুভাবকতা, সহিষ্ণুতা, দয়া, মমতা প্রভৃতি যে
সকল গুণে মানব-মন ও মানবহৃদয় স্বর্গীয় ভাব ধারণ
করে, তাহা রাজার অট্টালিকা অপেক্ষা দরিদ্রের কুটীবেই
অধিকতর বিকাশমান । যে নৃত্যগীত ও আমােদ প্রমােদ
লইয়াই সতত ব্যস্ত, তাহার ভাবিবার অবকাশ কই ? যে
অভাব কাহাকে বলে, কখন অনুভব করে নাই, সে পরের
দুঃখে কাতর কিরূপে হইবে ? মনে উদিত হইবামাত্র
যাহার ইচ্ছা পূরণ হইয়াছে, সহিষ্ণুতাগুণ তাহার পরিপুষ্ট
হইবে কি রূপে? দয়ার শান্তিজলে যাহার হৃদয় কখন
বিধৌত হয় নাই, সে দয়া প্রকাশ করিতে জানিবে কি
ৰূপে? যে নিরন্তর তােষামােদকারিগণে পরিবেষ্টিত, সে
কৃত্রিম স্নেহ মমতা কথন পায় নাই, সুতরাং স্নেহ মমতা
দেখাইবে কিরূপে?
প্রাতঃস্মরন্থীয় চরিমালা। • স্বায়ত্ত সুখের প্রাধান্য। যাহাদিগের সুখ দুঃখবাহ বস্তুর উপরে নির্ভর করে কখনই প্রকৃত সুখী নহে। রাজসিংহাসনে বসিয়া ও রাজকুট পরিয়াও তাহাদিগেয় হৃদয় সতত কম্পমান। এই জন্যই ভারতীয় নীতি বাহ্য বস্তুতে অনাস্থা শিক্ষা দিয়া- ছিল। এই জন্যই গ্রীকৃ-নীতি-প্ৰবৰ্ত্তয়িতা সক্রেটিস উপদেশ দিয়াছিলেন যে যে পরিমাণে অভাব সঙ্কোচ করিতে পারিবে, সে সেই পরিমাণে ঈশ্বরত্ব লাভ করিবে। প্রকৃতির উপরে জয়লাভ করাই প্রকৃত রাজত্ব। রাজত্ব রাজার অদৃষ্টে ঘটে না। কারণ, রাজার অভাব অনন্ত। যে মহাত্মা অভাব সঙ্কোচ করিয়া প্রকৃতির দাসত্ব হইতে উন্মুক্ত হইতে পারেন, তিনিই প্রকৃত রাজা। রাজত্বের গৌরব ভারতীয় আৰ্যেরাই বিশেষ বুঝিয়াছি- লেন। এই জন্যই আৰ্য স্থাপসেরা সংসার ছাড়ি মা নিবিড় অরণ্যমধ্যে গিয়া যােগসাধনা করিতেন। তাহাদিগের আত্মসংযমে মুগ্ধ হইয়া অনেক নরপতি তাঁহাদিগের চরণে লুষ্ঠিত-শির হইতেন। আমরা বলিয়াছি, মানুষের সকল অবস্থাই সুখ-দুঃখ- মিশ্রিত। নিরবচ্ছিন্ন সুখ মানুষের অদৃষ্টে নাই। সেইরূপ নিরবচ্ছিন্ন দুঃখও মানুষকে কখন ভােগ করিতে হয় না। যাহারা অভাবের প্রসর সঙ্কোচ না করিয়া বরং বাড়াইয়া থাকেন, তাহারা যে নিরবচ্ছিন্ন দুঃখ ভােগ করেন, একথা আমরা বলি না। অভাবের প্রসরবৃদ্ধিই বর্তমান ইউরােপীয় * “অনাস্থা বাহবস্তু।” কুমারসম্ভব। , ন স্বায়ত্ত সুখের প্রাধান্য। • সভ্যতার ভিত্তিভূমি। প্রাকৃতিক অভাব-মােচনের চেষ্টাতেই শিল্প বিজ্ঞানের আবির্ভাব। বিজ্ঞানবলে মানুষ প্রকৃতির উপরে অন্য প্রকার প্রভুতা লাভ করিয়া থাকেন। বিজ্ঞান মানুষকে অনৈক পরিমাণে ঐশী-শক্তিসম্পন্ন করে। ভার- তীর আৰ্যেরা প্রকৃতির আধিপত্য সহিতে না পারিয়া ক্রোধে প্রকৃতিকে সম্পূর্ণ দমিত বা নির্মূল করিয়াছিলেন । আধুনিক ইউরােপীয়রা প্রকৃতিকে দমিত না করিয়া তাহাকে আজ্ঞাধীন দাসী করিয়া রাখিয়াছেন। ভারতীয় আৰ্যেরা প্রকৃতিকে তাহাদিগের উন্নতি-পথে কোন অভাব- কণ্টক রােপিত করিতেদিতেন না;আধুনিক ইউরােপীয়েরা তাহাতে আপত্তি না করিয়া প্রকৃতি দ্বারাই সেই কন্টক উত্তোলিত করিয়া লইতেছেন। দুই অবস্থাতেই সুখ আছে বটে; কিন্তু একে সুখ নিজায়ত্ত--অপরে সুখ প্রকৃতি- সাপেক্ষ। যে সুখ নিজসাপেক্ষ, তাহাই অমুল্য ; তাহাই অধিকতর প্রার্থনীয়। সে সুখে ধনীরা সাধারণতঃ বঞ্চিত। ; দরিদ্র স্বভাব-সন্ন্যাসী। সৌভাগ্যে মানুষের অন্তর এত শিথিলিত হয়, যে তাহা কঠোৰ ধৰ্ম্ম-পালনে অক্ষম হইয়া পড়ে। একটু সংযম অভ্যাস হইলেই, সৌভাগ্যবান্ ব্যক্তির যশ দেশ বিদেশে ব্যাপ্ত হইয়া পড়ে। কিন্তু দরিদ্রের সাধনা অতি কঠোর । দরিদ্রের পদে পদে বিপদ, সুতরাং দরিদ্রের অবিচলিত সহিষ্ণুতা প্রয়ােজনীয়। দরিদ্রের সকল বিষয়েই অভাব, সুতরাং অনিবাৰ্য অভাবে উপেক্ষা একান্তু শিক্ষণীয়।
৪ প্রাতঃস্মরণীয় চরিতমালা। দরিদ্র নিজের অভাব বুঝে, সুতরাং পরের দুঃখে তাহার হৃদয় কাঁদিয়া উঠে। দরিদ্র জগতে ভালবাসা পায় না, ভাল- বাসার অভাবের মর্মন্তুদ ৰাতনা সে বুঝে, এই জন্য পরকে ভালবাসিতে শিখে। দরিদ্রকে লােকে ঘৃণা করে, ঘৃণার মর্মন্তুদ প্রহারে তাহার অস্থি চৰ্ম্ম জর্জরিত ; তাই তাহার হৃদয় দুঃখী দেখিলেই কঁদিয়া উঠে, সহানুভূতির বেগে তাহার অশ্রু মুছাইতে যায়, নিজের অশ্রুজলে তাহার হৃদয়ের যাতনা ক্ষালিত করিতে চেষ্টা করে। দরিদ্রে ও সন্ন্যাসীতে প্রভেদ অল্প। পর্ণকুটীর বা তরুতল উভয়েরই আবাসস্থল। কৌপীন বা জীর্ণ বসন উভয়েরই পরিধান। স্বচ্ছন্দ-বনজাত শাকাদিই উভয়ের ভক্ষ্য। অনা- ছাদিত ভূমিতলই উভয়ের শয্যা। ধুলি ৰা ভস্ম উভয়ের অঙ্গাভরণ। তবে প্রভেদ এই যে, সন্ন্যাসীর এই অবস্থা । স্বেচ্ছাকৃত, দরিদ্রের অবস্থা ‘দৈৰনির্দিষ্ট। সন্ন্যাসী ভােগ্য বস্তুর অসারতা ও অনিত্যতা দেখিয়া ভােগাসক্তিতে জলা- জলি দিয়া অতি কঠোর দারিদ্র্যব্রত গ্রহণ করিয়া থাকেন। কিন্তু দরিদ্রের দারিদ্র্যব্রতে দীক্ষা স্বেচ্ছাধীন নহে। দীক্ষা স্বেচ্ছাকৃত হউক বা না হউক, ব্রত পালনের ফল উভয়েতে একইরূপ। সহিষ্ণুতা, সংযম, আত্মত্যাগ ও পরদুঃখানু- ভাবকতা প্রভৃতি যে সকল গুণে মানুষ দেবতা হয়--এই ব্ৰপরিপালনে সেই সকল গুণ , স্বতঃই দরিদ্রের অভ্যস্ত হয়। সুতরাং দরিদ্র সঙ্কল্প বিনাও সন্ন্যাসী, দীক্ষা ব্যতীতও যােগী। যে দরিদ্র সাধনায় সিল্ক, অন্তরের মাহাত্মে সে জগতের পুজনীয়। 1 দারিদ্রে ঘৃণা জাতীয় পতনের মূল। ৫ দারিদ্র্যে ঘৃণা জাতীয় পতনের মূল। যে জাতি দরিদ্র দেখিলেই ঘৃণা করে, ধনী দেখিলেই তাহার নিকটে নতশির হয়, সে জাতির অধঃপতন নিশ্চয় আরম্ভ হইয়াছে। যখন রােমের বিজয়দর্পে জগৎ কঁপিয়া- ছিল, তখন রােমের ডিকটেটরগণ রাজমুকুট, রাজপরিচ্ছদ তুচ্ছ করিয়া সামান্য কৃষিকাৰ্য্য দ্বারা জীবিকা নির্বাহ করিতেন। যত দিন রােম সংযমী ছিল, যত দিন রােম নিজের দারিদ্র্যে কুণ্ঠিত হইত না, প্রত্যুত গরিমা প্রকাশ করিত, তত দিন বােমের বীরত্বে, রােমের মাহাত্মে জগৎ ঝলসিত হইত। কিন্তু যে বধি নােম পরের সুবর্ণ মণ্ডিত হইলেন, দারিদ্র্যে লজ্জা বােধ করিলেন, সেই অবধি রােমের বীরত্ব, রােমের মাহাত্ম্য বিলুপ্ত হইল। অমনি রােম দাসত্বশৃঙ্খলে আবদ্ধ হইলেন আবার বিংশতি পুরু-পরম্পরার দাসত্বে যখন ইতালী জর্জরিত হইল, তখন জাতীয় ভ্রম বুঝিতে পারিয়া গারি- বল্ডী, ম্যাটসিনি-প্রমুখ ঋষিপ্রবরগণ দারিদ্র-ব্ৰত গ্রহণ করিলেন। নিজ নিজ বাসনার জলাঞ্জলি দিয়া তাহারা স্বদেশ-উদ্ধার-ব্রতে জীবন উৎসর্গ করিলেন। ছদ্মবেশে, গুপ্ৰৱেশে, অনাহারে, দেশে দেশে ভ্রমণ করিয়া এই সন্ন্যা- সীর দল জাতীয় উদ্ধারের উপকরণ-সামী সংগ্রহ করিতে লাগিলেন। জননীর অশ্রুজল, প্রিয়তমার কাতরবচন, শিশুগণের ক্রন্দনও ইহাদিগের স্থির-সঙ্কল্প চিত্তকে জাতীয় ব্রত হইতে বিচলিত করিতে পারিল না। যাহার দুগ্ম- ফেননিত শয্যায় শয়ন কুরিয়া, সুৰৰ্ণে মণ্ডিত হইয়া, প্রাতঃস্মরণীয় চরিতমালা। বিলাসিতার ক্রোড়ে লালিত হইয়া, স্বদেশের দুঃখ ভাবিবার অবসর পান নাই; এবং যাঁহারা, যে সকল সন্ন্যাসী স্বদে- শের উদ্ধারব্রতে জীবন উৎসর্গ করিয়াছিলেন, তাঁহাদিগকে ‘কপর্দকসম্বলী’ ‘উন্মাদগ্রস্ত' বলিয়া পরিহাস করিতেন, ইতালীর উদ্ধার তাহাদিগের দ্বারা সংসাধিত হয় নাই। যাহারা বেতনের লােভে বিদেশীয় গবর্ণমেন্টের নিকটে আত্মবিক্রীত হইয়াছিল, যাহারা প্রভুকে সন্তুষ্ট করিবার নিমিত্ত স্বদেশের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করিতেও কুণ্ঠিত হয় নাই, এবং যাহারা ছদ্মবেশী আশ্রিত বৈপ্লবিক স্বজাতীয় ভ্রাতৃবৃন্দের রুধিরেও প্রভুর চরণ বিধৌতৃ করিতেও লজ্জা বােস করে নাই, সেই জাতিকলঙ্ক কুলাঙ্গারগণ দ্বারা ইতা- লীর অনিষ্ট, বই আর ইষ্ট হয় নাই। তাহাদিগ দ্বারা বরং ইতালীর সৌভাগ্যের দিন, স্বাধীনতার দিন দুরবিপ্রকৃষ্ট হইয়াছিল মাত্র। কিন্তু ফেচীরধর কপর্দকসম্বলী মনীষিগণ স্বজাতির উদ্ধারব্ৰতে জীবন উৎসর্গ করিয়াছিলেন, তাহা- দিগের অর্ধ শতাব্দীর নিরন্তর যত্নে—অজস্র রক্তমোেক্ষণে ইতালীর অভাবনীয় স্বাধীনতা, বৈপ্লবিকগণের স্বপ্নরাজ্য হইতে প্রকৃত ঘটণায় পরিণত হইল। বীরবর গ্যারিবী ইতালীর বৈপ্লবিক সেনার অধি- নায়ক হইয়া অষ্ট্রিয়গণকে ইতালী ক্ষেত্র হইতে বিদূরিত করিলেন, কিন্তু স্বহস্তে রাজ্যভার না লইয়া রাজর্ষি ভিক্টর ইমানুয়েলের হস্তে রাজ্য সমর্পণ পূৰ্ব্বক আপনি নিজ আবাসে গিয়া আবার স্বহস্তে হলচালন আরম্ভ করিলেন । ইচ্ছা হইলে, যিনি স্বয়ং সম্রাট হইতেও পারিতেন, তিনি জাতীয় পেনশন্ পৰ্যন্ত ও প্রত্যাখ্যান করিলেন। এই মহর্ষি- a ভারতে দারিদ্র্য-ব্রত গ্রহণের আবশ্যকতা। ৭ প্রবর এখন ক্যারাে দ্বীপের কুটীৱাবাসে স্বহ স্বহস্তকৃষ্ট কৃষি দ্বারা জীবিকা নির্বাহ করিতেছেন। বােধ হয়, যেন বিধাতা ইতালীর রক্ষার জন্য তাঁহাতক প্রহরী নিযুক্ত করি- যাছেন। তিনি সেই দ্বীপ কুটীরাবাসে থাকিয়াও ইতা- লীর চিন্তায় নিরন্তর নিমগ্ন! একদিন ইতালীর সৌভাগ্য- সূর্যের মধ্যোয় কালে—ইতালীর ভিটেটরগণও এইরূপ মাহাত্ম্য ও আত্মত্যাগ দেখাইয়াছিলেন। দারিদ্র্যব্রত উদযা- পনেই ইতালী তিন বার জগতে রাজত্ব করিলেন। ভারতে দারিদ্র্য-ব্ৰত-গ্রহণের আবশ্যকতা। যদি কোন দেশে এখন পরিদ্ৰব্ৰত-গ্রহণের প্রয়ােজন হইয়া থাকে, তাহা এই ভারতে। ভারতে সৌভাগ্য-দিনে পারলৌকিক সন্ন্যাসিগণের প্রােজ্জ্বল চরিত্র-গৌররে ভারত উদ্ভাসিত হইয়াছিল ; তঁহাদিগের আত্মত্যাগের মােহিনী শক্তি বলে ভারতীয় রাজবৃন্দও আত্মস্বার্থ জাতীয় স্বার্থে বলি দিতে শিখিতেন। বলা বাহুল্য যে, তখনকার ব্রাহ্মণের অনেকেই এই সন্ন্যাসব্রত গ্রহণ করিতেন। কৃষকদিগের ধান কাটিয়া লইয়া যাইবার সময়ে যে সকল পৰু ধান্য স্তম্ভ হইতে ভূতলে খসিয়া পড়িত, তাহারা,খুটিয়া খুটিয়া সেই সকন্তু ধান্য আহরণ করিতেন। গৃহপালিত হরিণদিগকে খাওয়াইয়া সেই ধান্যের যাহা অবশিষ্ট থাকিত, তাহাই সিদ্ধ করিয়া তাহারা উদর পূরণ করিতেন। ইহারই নাম উবৃত্তি। স্বচ্ছন্দ-বনজাত ফলমূল ও শাকাদিও তঁহা- * এ প্রস্তাবের এ অংশটুকু অনেক দিন পূর্বে লেখা হয়। গ্যারিবী জীবিত ছিলেন। } প্রাতঃস্মরণীয় চরিতমালা। দিগের খাদ্যের উপকরণ-সামগ্রী ছিল। তাঁহাদিগের প্রেম সৰ্ব্বজীবে পরিব্যাপ্ত ছিল। সিংহ, ব্যাস্ত্র, ভল্লুকাদি হিংস্র জন্তুরাও সেই প্রেমে মন্ত্রমুগ্ধ হইয়া থাকিত। তাহাদিগের নিঃস্বার্থ বিশ্বপ্রেমের মােহিনী শক্তিবলে তাহারা আপন আপন হিংস্র প্রকৃতি ভুলিয়া যাইত। ঋষিগণের আশ্রমে ব্যাঘ্র হরিণে, ও ভেক সর্পে একত্র জলপান করিত। গল্প নয়, কবিকল্পনা নয়, প্রকৃত ইতিহাস। চরিত্র- গৌরবে ও আত্মত্যাগের মােহিনী শক্তিবলে জগৎ করতলস্থ করা যাইতে পারে। যে যােগী এ সাধনায় সিদ্ধ, তাঁহার অসাধ্য কিছুই নাই। ঋষিগণ এই সাধনায় সিদ্ধ ছিলেন ধলিয়াই, প্রবল পরাক্রান্ত নরপতিগণও তাহাদিগের আদেশ শিরােধার্য্য করিতেন। আত্মােৎসর্গই নেতৃত্বের অদ্বিতীয় উপাদান। ঋষ্যশৃঙ্গের আশ্রম হইতে ঋষিপ্রবর বশিষ্ঠদেব মহাবাদ রামচন্দ্রকে বলিয়া পাঠাইলেন, “মহারাজ আপনি নূতন সিংহাসনে আসীন হইয়াছেন। আপনাকে একটা উপদেশ দিই। সেই উপদেশের অনুবর্তন করিলেই আপনি আদশ রাজা হইতে পারিবেন। আপনি কদাচ প্রজাদিগের মতের বিদ্ধ আচরণ করিবেন না।” মহর্ষির এই গভীর উপ- দেশ রাম ভক্তিভাবে শিরােধার্য করিলেন, এবং প্রতিজ্ঞা করিলেন যে, মহর্ষির এই উপদেশ-পালনে যদি আমাকে প্রাণাপেক্ষা প্রিয়তবা সীতাকেও পরিত্যাগ করিতে হয়, আমি তাহাতেও পরাজুখ হইব না। অনতিবিলম্বেই দুখ আসিয়া সংবাদ দিল-লােকে রাৰণগৃহে বসতি জন্য সীতাদেবীর চরিত্রসম্বন্ধে সন্দিহান ; লঙ্কায় অগ্নিপরীক্ষা বিশ্বামিত্র। তাহারা বিশ্বাস করে না। এই সংবাদ শুনিয়া রামচন্দ্র প্রথমে বিদ্যুৎস্পৃষ্টের ন্যায় হচেতন হইয়া পড়িলেন। অচিরকাল মধ্যে সেই রাজসন্ন্যাসীর সুদৃঢ় চিত্ত প্রাকৃতিক বল ধাবণ করিল। তিনি এই মাত্র ঋষি বাক্যের উত্তরে প্রতিজ্ঞা করিয়াছেন, প্রজাগণের মনস্তুষ্টি বিধানানলে প্রাণাপেক্ষা প্রিয়তরা সীতাকেও আহুতি দিবেন। সে প্রতিজ্ঞা ও সে ঋষিবাক্য কখনই লঙ্ঘন করা হইবে না । ইহাতে হৃতপিণ্ড দেহ হইতে উৎপাটিত হয় হউক, রামের প্রাণ বিয়ােগ হয় হউক-তাহাতেও রাম বিচলিত হই- বার নহেন। কর্তব্য স্থির হইল। অমনি লক্ষ্মণকে ডাকিয়া আদেশ দিলেন, ‘পূর্ণগর্ভা সীতাদেবীকে গঙ্গাতীরে গরি- ত্যাগ করিয়া আইস। মনীষীর সে সুদৃঢ় তীব্র আদেশ লড়যন করিতে লক্ষ্মণেরও সাহস হইল না। সেই ভীষণ ও লােমহর্ষণ আদেশ তৎক্ষণাৎ অনুষ্ঠিত হইল। ঋষির উপ- দেশ প্রতিপালিত হইল। উপদেশক ও উপদিষ্টের মহিমা জগতে উদেঘাষিত হইল। এমপি উপদেশ ও এরূপ প্রজা- স্বার্থে রাজস্বার্থের বলির উদাহরণ আর কোথায় ? বিশ্বামিত্র। দারিদ্ৰব্ৰত বা সন্ন্যাসের মহিমা বুঝিতে পারিয়াছি- লেন বলিয়াই প্রবল পরাক্রান্ত নরপতি বিশ্বামিত্র রাজসিং- হসন ও রাজকীয় ঐশ্বৰ্য্য পরিত্যাগ পূৰ্ব্বক সন্ন্যাস অবলম্বন করিয়াছিলেন। তিনি দেখিলেন যে, যিনি উপদেষ্টা হইতে চান, যিনি মানবজাতির পরিচালক হইতে চান । প্রাতঃস্মরণীয় চরিতমালা। তাহাকে সর্বাগ্রে নিজস্বার্থ পরস্বার্থে বলি দিতে হইবে, নিজের ঐশ্বৰ্য পরহিতে ব্যায়িত করিয়া সন্ন্যাসী হইতে হইবে। তাই তিনি নিজের রাজ্য ও রাজসিংহাসন জ্ঞাতি- হস্তে সমর্পণ করিয়া আপনি ঋষিব্রত গ্রহণ করিয়াছিলেন। ঘােরতর তপস্যায় তিনি জগৎ কাপাইয়া ছিলেন। তপাে- বলে তিনি নূতন জগৎ সৃষ্টি করিয়াছিলেন। রাজা বিশ্ব- মিত্রকে কে চিনিত ? কিন্তু রাজর্ষি বিশ্বামিত্র জগতে বিদিত, জগতে পূজিত। শাক্যসিংহ। দারিদ্ৰব্ৰত বা সন্ন্যাসের মুহিমা বুঝিয়াছিলেন বলিয়াই মহর্ষি শাক্যসিংহ রাজসিংহাসন পরিত্যাগ করিয়া ভিখা- রীর বেশ ধারণ কবিয়াছিলেন। লক্ষ্মীরূপিণী প্রেমমী তাৰ্যা ও শশাঙ্কপ্রতিম পুত্রের দিকে না তাকাইয়া জগতের দুঃখ মােচনাৰ্থ তিনি গৃহীতব্রত হইয়াছিলেন। তিনি দেখিলেন, সুখভােগ করিতে হইলে, তাহার অনুরূপ দুঃখ ভােগ করিতে হইবে। দুঃখ বাদ দিয়া নিরবচ্ছিন্ন সুখ- ভােগ করা কাহারই ভাগ্যে ঘটে নাই, এবং প্রকৃতির শৃঙ্খলানুসারে কখন কাহারও ভাগ্যে ঘটিতে পারে না। জন্মের সঙ্গে মৃত্যু, উদয়ের সঙ্গে অস্ত, ভােগের সঙ্গে পীড়া, প্রণয়ের সঙ্গে বিচ্ছেদ, মৎস্যের সঙ্গে কণ্টকের ন্যায় সুখের সঙ্গে দুঃখ দুষ্পরিহার্যরূপে মিশাইয়া আছে। এই জন্য সেই ঘাের যােগী সঙ্কল্প করিলেন সুখ ও দুঃখ উভয়েরই হন্ত হইতে মুক্তিলাভ করিতে হইবে। তঁাহার কঠোর সাধনায় মানবজাতি দুপরিহার্য্য প্রাকৃতিক দুঃখ সকল হইতে মুক্তি গুরুগগাবিন্দ। লাভ করিল না বটে, কিন্তু কতকগুলি পরিহাৰ্য্য আত্মকৃত দুঃখের হস্ত হইতে পরিত্রাণ পাইল। মৃত্যু জগৎ হইতে নিরাকৃত হইল না বটে, কিন্তু আত্মসংযম বলে বিদূরে বিক্ষিপ্ত হইল। জগৎ হইতে অকালমৃত্যু উঠিয়া গেল। বৌদ্ধজগতে সকলেই ভাই ভাই, সুতরাং বিষাক্ত শ্রেণী- বিভাগ-জনিত দুঃখ জগৎ হইতে উঠিয়া গেল। কেহ কাহাকে ঘৃণা করে না, কেহ কাহারও বিদ্বেষী নয়, সুতরাং বৌদ্ধজগৎ হইতে বিবাদ বিসংবাদ বিগ্রহাদি উঠিয়া যাইতে লাগিল। শাক্যসিংহের বিশাল হৃদয়ক্ষেত্রের পবিত্র ছবি সমস্ত বৌদ্ধজগতে প্রতিবিম্বিত হইল। তাহার চরিত্রের উজ্জ্বল দৃষ্টান্তে সহস্র সহস্র আশ্রমী সংসার ছাড়িয়া আত্ম- সুখ পরসূখে বলি দিয়া বৌদ্ধধর্মের প্রচারকপছে ব্রতী হইলেন। তাঁহাদিগের পবিত্র চরিত্রের দৃষ্টান্তে ও জ্বলন্ত ধৰ্ম্ম-প্রচারে পৃথিবীর এক তৃতীয়াংশ বৌদ্ধধর্মে দীক্ষিত হইল। সেই কপর্দকশূন্য সন্ন্যাসীর দল জগতের মৃত দেহে নবজীবন সঞ্চারিত করিলেন। সে গারিদ্র্য ও সন্ন্যাসে জগৎ মুগ্ধ হইল। .এখন বৌদ্ধপ্রচারকগণে সে দারিদ্র্যব্রত ও সন্ন্যাসের অভাব হইতেছে, সেই সঙ্গে সঙ্গে তাহাদিগের প্রভাব ও কমিতে আরম্ভ হইয়াছে। গুরুগগাবিন্দ। ভারতের এই দুর্ভেদ্য সমস্যার প্রকৃত মীমাংসা আধুনিক ময়ে আর এক যযাগী করিতে চেষ্টা করিয়াছিলেন, এবং আত্মত্যাগ-বলে অনেক পরিমাণেকৃতকাৰ্য্যও হইয়াছিলেন। ঐ যে শিখজাতি দেখিতেছরণে অজেয়, দৃঢ়তায় অবি- ১২ প্রাতঃস্মরণীয় চরিতমালা। চলিত, ভ্রাতৃপ্রেমে বিগলিত কৃতজ্ঞতাধর্মে বিসৃষ্টপ্রাণ- ঐ ভারতগৌরব, ভারতপ্রাণ শিখজাতি সেই যােগিরের আত্মত্যাগের ও স্বদেশানুাগের জীবন্ত কীৰ্ত্তিস্তম্ভ। চিলেন- ওয়াল সমরক্ষেত্রে যে শিখজাতির অমিততেজে ইংরাজ- বীর্যবহি নিষ্প্রভ হইয়া গিয়াছিল, সিপাহি-বিদ্রোহে যে শিখজাতির অপ্রমেয় বীরত্ব বলে ইংরাজজাতি কথঞ্চিং প্রাণ রক্ষা করিয়াছিলেন, আফগাযুদ্ধে যে শিখজাতির অদ্ভুত রণনৈপুণ্যে ব্রিটনজাতির মানরক্ষা হইয়াছিল, আর সেদিন যে শিখসেনার অতুল বিক্রমে : ইংরাজ-কীৰ্ত্তিস্তম্ভ মিশর-রণক্ষেত্রে নিখত হইয়াছিল, সেই প্রকাণ্ড অজেয় শিখসেন, শিখগুরু গুরুগােবিন্দের গভীর সাধনার ফল - যখন যবন-অত্যাচারে ভারতবর্গ ক্ষতবিক্ষত হইতেছিল, সেই সময়ে গুরুগােবিন্দের প্রাণ কঁদিয়া উঠিল। তিনি দেখিলেন, এই হিন্দু-যবন-বিদ্বেষ প্রদমিত না হইলে, উভয় জাহির ধ্বংস অনিবার্য। সে চিন্তা তঁাহার হৃদয়কে আলােড়িত করিল। সেই ঋষি সমাধিবলে দেখিলেন, এই অবশ্যম্ভাবী অনিষ্ট নিবারণের একমাত্র উপায় উভয় জাতির মধ্যে অভেদ্য ভ্রাতৃত্ব-বন্ধন সংস্থাপন। এই সিদ্ধান্তে উপনীত হইয়া তিনি শিখধৰ্ম্মকে এক নূতন আকার দিলেন। নানকের.শিখধৰ্ম্ম একেশ্বরবাদ ও পরকাল লইয়াই থাকিত, ইহলোকের সহিত তাহার বড় সংশ্রব ছিল না। কিন্তু গুরুগােবিন্দ তাঁহার শিখধর্মকে ঐহিক ইষ্টসাধনেই অধিক তর নিয়ােজিত করিলেন। তিনি ঘােষণা করলেন যে, এ ধর্মে হিন্দু যবন, ব্রাহ্মণ শূদ্র ভেদ নাই। এ ধর্মে দীক্ষিত হইবামাত্ৰ সকলেই ভাই ভাই হইবে, সকলেই এক পরিবার T, গুরুগগাবিন্দ । হইবে। গুরুগগাবিন্দ এই নপ্রতিষ্ঠিত ধৰ্ম্মে সর্বাগ্রে দীক্ষিত হইলেন। দলে দলে হিন্দু যবন তাঁহার মন্ত্রশিষ্য হইতে লাগিল। তিনি দীক্ষিতগণকে আলিঙ্গন করিয়া ভ্রাতৃ প্রেমে গ্রহণ করিতে লাগিলেন। নবদীক্ষিতের অন্ন সকলকেই গ্রহণ করিতে হইত। তাহাতে পাছে কাহারও কোন প্রকার অশ্রদ্ধা হয়, এই জন্য তিনি দীক্ষা দিনে প্রত্যেক নবদীক্ষিতকে অন্ন ব্যঞ্জন রাধিয়া তাহাকে দিতে বলিতেন। শিষ্য ভক্তিভাবে গুরুকে অন্ন ব্যঞ্জন রাধিয়া দিত। গুরু তাহা শ্রদ্ধা পূৰ্ব্বক ভােজন করিতেন। সুতরাং তাহার অন্নজলগ্রহণে আর কাহারও কোন আপত্তি থাকিত না। শিখজাতির উন্নতি, শিখজাতির সুখ ভিন্ন গুরুগােবিন্দের আর কোন চিন্তা ছিল না। তিনি স্বয়ং নিষ্কাম যােগী ছিলেন। নিজের সুখ, নিজের সম্পত্তি, নিজের সৌভাগ্য কখন তঁাহার চিন্তাকে আবদ্ধ করিয়া রাখিতে পারিত না। তিনি শিখজাতির হিতানলে আত্ম- হিতের পূর্ণ আহুতি দিয়াছিলেন। এই জন্যই শিখজাতি তঁাহার নামে আজও মন্ত্রমুগ্ধ। এইজন্যই তাহার শিষ্যের। কোন বিষয়ে তাহার অভিপ্রায় কি, জানিতে পারিলেই তৎসাধনে প্রাণ বিসর্জন করিতে কৃতসঙ্কল্প হইত। রণ- স্থলে গুরুগােবিদের নামােচ্চারণে তাহাদিগের ধমনীতে সহস্রগুণ বলােপচয় হইত। গুরুগােবিন্দের অপূৰ্ব আত্ম- ত্যাগ ও অপূৰ্ব্ব ভ্রাতৃ-প্রেমে মুগ্ধ হইয়া অসংখ্য হিন্দু যবন চিরবিদ্বেষ ভুলিয়া এক ভ্রাতৃত্ববন্ধনে আবদ্ধ হইতে লাগিল। যে হিন্দু যবন পরস্পরকে দেখিলেই পরম্পর খড়গহস্ত হইত আজ তাহারা স্পর্শমণির স্পর্শে ভ্রাতৃ-প্রেমে গদ গদ হইয়া ; ১৪ প্রাতঃস্মরণীয় চরিতমালা। পরস্পরকে আলিঙ্গন করুিতে লাগিল; আজ তাহাদিগের প্রেমপূর্ণ ভাই তাই গানে জগৎ মুগ্ধ, আজ সেই সমবেত সেনার বিজয়দর্পে দিল্লীর সিংহাসন টলটলায়মান। আজ এই সমবেত নারায়ণী সেনার নিকটে যবনসেনা প্রতিপদে পরাজিত। ভারতে যবনসাম্রাজ্য যায় যায়, এমন সময় এক ঘাতকহন্তে সেই পরম যােগীর মৃত্যু হইল। গুরুগো বিনের সমস্ত সঙ্কল্প বৃথা হইল। ভারতে এতদিনে হিন্দু যবন মিশিয়া একটী অরিদুর্দম বিশাল জাতির উৎপত্তি হইত। ভারতের অদৃষ্টে এত দুঃখ ছিল বলিয়াই, অসময়ে গুরুগােবিন্দের মৃত্যু হইল। গুরুগগাবিন! আর এক- বার ভারতে আসিয়া তােমার অনন্ত প্রেমস্রোতে ব্রাহ্মণ- শূদ্র ও হিন্দু-ঘবন ভেদ ভাসাইয়া দেও। প্রত্যেক ভারত- বাসীর শিরায় শিরায় তােমার প্রগাঢ় ভ্রাতৃপ্রেম সঞ্চারিত দেব! আর একবার স্বর্গ ছাড়িয়া ভূতলে অবতীর্ণ হইয়া সােণার ভারতকে নরক হইতে স্বর্গে লইয়া যাও ; আর একবার তােমার আত্মত্যাগের উজ্জ্বল দৃষ্টান্তে মরণাে- মুখ ভারতকে সঞ্জীবিত কর। বীর সন্ন্যাসীর মুক্তিতে আর একবার ধরায় অবতীর্ণ হইয়া বীরত্ব ও সন্ন্যাস ধর্মের মাহাত্ম্য প্রচার কর। সব যায়, রসাতলে যায়, একবার দেখা দাও। তােমার অতিমানুষ শবসাধনার ফলস্বরূপ সেই নারায়ণীসেনা এখনও বিদ্যমান প্রহিয়াছে, কিন্তু তাহাতে তুমি যে ভ্রাতৃপ্রেম ও স্বদেশানুরাগের ভাব সং- ক্রামিত করিয়াছিলে, তােমার সঙ্গে সঙ্গে তাহা চলিয়া গিয়াছে। তাহাদিগকে যে বীরত্ব সংক্রামিত করিয়া গি- আছে, সে বীরত্ব এখনও অটুট রহিয়াছে, কিন্তু সে সন্ন্যাস
চৈতন্য।
১৫
ও সে আত্মত্যাগ তােমার কিবােধানে বিলুপ্ত হইয়াছে।
আত্মত্যাগ ও সন্ন্যাসের কি অদ্ভুত মহিমা !
সন্ন্যাসীর আত্মত্যাগে লক্ষ লক্ষ লােক
মন্ত্রমুগ্ধ হইয়া
প্রত্যেকে এক এক জন সন্ন্যাসী হইয়াছিল। সে পবিত্র
আলােকে এক দিন প্রত্যেক শিখ এক একটী ক্ষুদ্র গুরু-
গােবিন্দ সিংহ হইয়াছিল। কিন্তু আজ সে আলােকের
প্রতিফলন অভাবে সে সকল গ্রহ উপগ্রহ অনন্ত তিমিরে
বিলীন হইয়া গিয়াছে !!
০
চৈতন্য ।
আমরা আর এক জন সন্ন্যাসীর নাম উল্লেখ না করিয়া
থাকিতে পারি না। সে পবিত্র নাম এখনও বঙ্গের প্রতি
নগরে সঙ্কীৰ্তিত হইয়া থাকে। ব্রাহ্মণ্য ধৰ্ম্মের ভীষণ বৈষম্য
ভাবে যখন জগৎ দগ্ধ হইতেছিল, যখন নীচ জাতি সকল
কুকুর বা শৃগালের ন্যায় ব্রাহ্মণদিগের পরিত্যজ্য হইয়াছিল,
যখন সমাজের কঠিন শাসনে সমাজবন্ধন কেবল যন্ত্রণার
কারণ হইয়া উঠিয়াছিল, যখন স্খলিতপদ রমণীরা বাতাহত
নিরাশ্রয়া লতার ন্যায় ভূমিবিলুষ্ঠিত ও পদদলিত হইতে-
ছিল, যখন শুষ্ক তার্কিকতায় স্নেহ, প্রেম ও ভক্তি প্রভৃতি
হৃদয়ের কোমলতর বৃত্তি সকল বিলুপ্ত হইবার উপক্রম
হইয়াছিল, সেই সময় চৈতন্য দেবের আবির্ভাব। চৈতন্য
দেৰ স্বয়ং অদ্বিতীয় পণ্ডিত ছিলেন। কিন্তু তাহার
পাণ্ডিত্য নীরস ও হৃদয়ের পরিপুষ্ট-বিরহিত ছিল না।
স্বদেশের শশাচনীয় অবস্থা দেখিয়া তাহার হৃদয় কাদিয়া
প্রাতঃস্মরণীয় চরিতমালা। উঠিল। তিনি দেখিলেন, মানবজাতিগত অস্তিত্বানলে পূর্ণ ব্যক্তিগত অস্তিত্ব আহতি না দিলে, দেশের মঙ্গল নাই। তিনি দেখিলেন, সেই লক্ষ্য-সাধনের একমাত্র উপায় সন্ন্যাস ও আত্মত্যাগ। আপনাকে ভুলিয়া পরের জন্য ভাবিতে শিখাইতে হইলে, স্বয়ং আত্মবিস্মৃত হইতে হয়। আপনার সুখ আপনার সম্পত্তি জাতীয় সুখ ও জাতীয় সম্পত্তিতে বিলীন করিতে হয়। চৈতন্যের যে চিন্তা, সেই কাৰ্য। তিনি মানব সাধারণের সুখ-পুঞ্জ পরিবর্ধনাৰ্থ পারিবারিক আত্মসুখে জলাঞ্জলি দিলেন। লক্ষ লক্ষ অনাথ অনাথিনীর অশ্রুজল মুছাইবার জন্য প্রাণাপেক্ষা প্রিয়তরা ভাৰ্যাকে কাঁদাইলেন। বিশ্বপ্রেমে জগৎ মাতাইবার জন্য স্বয়ং মাতৃপ্রেম-সুধায় বঞ্চিত হই- লেন! সেই সন্ন্যাসীর প্রেম-সংকীৰ্ত্তনে জগৎ মুগ্ধ হইল ৮ নিদাঘের রবিকিরণ-প্রতপ্ত মৃত্তিকায় যেন বাবিধারা পতিত হইল। তিনি গাইয়া গাইয়া বেড়াইতে লাগিলেন, ‘আমরা সব ভাই ভাই, আমরা সব ভাই বােন্। সেই আহ্বানে-সেই প্রেমসংকীর্তনে হিন্দু মুসলমান ও ব্রাহ্মণ শূদ্র একই সাম্যক্ষেত্রে আসিয়া . একই গুরুর মন্ত্রশিষ্য হইতে লাগিলেন। খােল করতালের ঝঙ্কারে সমস্ত ভারতবর্ষ আলােড়িত হইল। গ্রামে গ্রামে, নগরে নগবে, সংকীৰ্ত্তন হইতে লাগিল, “আমরা সব এপিতার সন্তান, আমরা সব ভাই ভাই, আমরা সব ভাই বােন্। প্রেম ৪. ভক্তিস্রোতে ভারত প্লাবিত হইল। সেই পরম যােগীর অদ্ভুত আত্মত্যাগের মহিমায় অসংখ্য বৈষ্ণব বৈরাগ্যশ্রম গ্রহণ করিলেন। প্রচারকের দলে ক্রমে ভারত ভাসিয়া ওয়ালে। ১৭ 'গেল। কি আশ্চর্য! আজ যে কোন বিষয়ের প্রচা- রের জন্য দশ জন লােক জুটা, কাহার সাধ্য ? কিন্তু সেই সময়ে চৈতন্যের চরিত্র-মহিমায় সহস্র সহস্র লােক সংসার-সুখে জলাঞ্জলি দিয়া আপনা হইতে প্রচারকার্যে ব্রতী হইতে লাগিলেন। আত্মত্যাগের দৃষ্টান্তের কি অদ্ভুত মহিমা! চৈতন্যের প্রেমসঙ্গীত আজও গ্রামে গ্রামে নগরে নগয়ে সংকীৰ্তিত হইতেছে। আজও বৈষ্ণব সম্প্র- দায়ে প্রচারকের সংখ্যার অপ্রতুল নাই বটে, কিন্তু তাহারা চৈতন্যের মহৎ লক্ষ্য হারাইয়া এখন কেবল প্রচারকের পরিচ্ছদ পরিয়া বেড়াইতেছে মাত্র। তাহারা এখনও মহৎ জাব:ব্যঞ্জক প্রেমগান সকল গাইয়া বেড়াইতেছে বটে, কিন্তু তাহা নিজের স্বার্থ সাধনের জন্য, বিশ্ব-প্রেমের প্রচারের জন্য নহে। এখনও তাহারা প্রেমগান গাইতে গাইতে নৃত্য করিয়া থাকে সত্য, কিন্তু তাহা অনিবার্য হৃদয়ােচ্ছ সে নহে, দানের পরিমাণ বাড়াইবার জন্য ইদােচ্ছাসের অভিনয়ে। চৈতন্যের বৈরাগ্য আত্মসুখে ও আত্মস্বার্থে বলি দিয়াছিল, কিন্তু আধুনিক বৈষ্ণৰপ্ৰচা- রকগণের বৈরাগ্য আত্মসুখ ও আত্মস্বার্থ সিদ্ধির অদ্বিতীয় সাধন-স্বরূপ হইয়াছে। সেই জন্যই পূৰ্বে বৈরাগীর এত সম্মান ছিল; কিন্তু বৈরাগীরা সেই মহৎ ব্রত হইতে স্মলিত হইয়াছে বলিয়াই আজ লােকের এত ঘৃণাপত্র হইয়াছে। ওয়ালেস। চল একবার ইউরােপখণ্ডে যাই। সেখানে অনেকগুলি সন্ন্যালীকে দেখিতে পাই। একবার সেই পৰিত্ৰমূৰ্ত্তি-গুলি ১৮ প্রাতঃস্মরণীয় চরিতমালা । দেখিয়া আসি। কল্পনাকে চল, একবার এয়ােদশ শতা- দীর স্কট লণ্ডে যাই। ঐ দেখ দ্বাদশ জন রাজা স্কটলণ্ডের মুকুট লইয়া পরস্পর-আত্মঘাতী হইতেছেন। ইংলণ্ডেশ্বর প্রথম এডওয়ার্ড : মীমাংসকরূপে আহুত হইয়া তথায় কৌশলে আপনার আধিপত্য স্থাপন করিতেছেন। ঐ দেখ, ওয়ালেস প্রভৃতি কতিপয় যুবক ইংলণ্ডের আধিপত্যের প্রতিবাদ করিতে বদ্ধপরিকর হইয়াছেন। সেই বীরমণ্ডলী মহানভাবে উদ্দীপিত হইয়া আপনাদিগের ধনসম্পত্তি ও পদমর্ষাদা বিসর্জন দিয়া বনে বনে, পৰ্বতে পর্বতে, লুকা ইয়া বেড়াইতে লাগিলেন। অনাহারে, অনিদ্রায়—দিন, মাস, বৎসর কাটিয়া যাইতে লাগিল, তথাপি সে তেজ, দমিত হইল না, সে প্রতিজ্ঞা বিচলিত হইল না। প্রতিজ্ঞ। —যে হয় স্কটলণ্ডের স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার করিবেন, নয় সে যজ্ঞে আত্মবলি প্রদান করিবেন। ওয়ালে, বয়ড় গ্ৰেহাণ, কলাইল প্রভৃতি সন্ন্যালিগণের অদ্ভুত আত্মত্যাগে ও অলৌকিক স্বদেশানুরাগে মুগ্ধ হইয়া ক্রমে অসংখ্য স্বচ, ওয়ালেসের পতাকামুলে আসিয়া দাঁড়াইল। এ দিকে ইংৰাজ-সেনার অত্যাচারে টলও বক্ষ ক্ষত বিক্ষত হইতে লাগিল। লুণ্ঠন ও সতীত্বনাশের সংবাদে চতুর্দিকে হাহা- কা, রৰ উঠিল। দুৰ্বত্ত সৈনিকগণের নামে নালিশ কবিতে গেলে, সেনাপতি বাদীকে ফাঁসিষ্ঠে লটকাইয়া দেন। সুতরাং কেহ নালিশ করে না, মরমে মরিয়া সমস্তু সহ্ন করে। চতুর্দিক অন্ধকার, অকারণ হজ-পতি-বিয়োগ- বিধুর নববিধবার ক্রন্দন, অপহৃত-সতীত্ব সতীর আর্তনাদ লুন্ঠিত-সৰ্বস্ব কৃষকের দীর্ঘশ্বাসে স্কটলণ্ডের আকাশ বিদীর্ণ ওয়ালেস। হইতে লাশ্বিল। কৃষকে আর ঈষ করিতে চায় না, কারণ তাহার বিশ্বাস নাই যে তাহার পরিপক শস্য ইংরাজ সৈনিক বলপূৰ্ব্বক লইয়া যাইবে না। গৃহিণীরা আর কাটনা কাটে না, কারণ তাহারা জানিত যে তাহাদিগের যত্নে কাটা সুতা ইংরাজ লুটেরারা আসিয়া লুট করিয়া লইয়া যাইবে। স্কটলণ্ডের প্রশস্ত গভীর ও সুন্দর হ্রদে রজত মীন ধরিবার জন্য জেলেরা আর জাল ফেলিতে চাহে , কাবণ তাহারা জানিত ইংরাজ দ্য কোথায় লুকাইয়া অাছে, শিকার হস্তগত হইবামাত্র তাহাব আসিয়া কাড়িয়া লইবে। ‘ভগবন্! স্কটলণ্ডের অদৃষ্টে এরূপ দুঃখ আর ক- কাল বাখিবে? স্কটলবে সৌভাগ্যরবি চিরদিনের জন্য ৰি অস্তমিত হইল? আর কি ই কখন স্কটিশগগণে উদিত হইবে না? স্কটলণ্ডের উজ্জ্বল আশাতাবা কি অনও কালসাগবে চিবদিনের মত বিলীন হইল। স্কটলণ্ডের স্বাধীনতা-কমলিনী মৃত কি নিদ্রিত? না মরেন নাই- ঐ দেখ তিনি নিমীলিত নেত্রে নিদ্রা যাইতেছেন। আবাব দেখ--ঐ নীল কমল দুটী সৌভাগ্যস্থাৰ্যের পুনরু- দয়ে একটু করিয়া প্রস্ফুটিত হইতেছে। ঐ দেখ কম- লিনী পূর্ণ প্রস্ফুটিত নেত্রে উঠিলেন। একি স্বপ্ন না মায়া ? এত যে ইংরাজ সৈন্য ছিল কোথায় গেল ? ঐ যে তাহারা স্কটিশ বর্ষাধারিগণের সম্মুখে বায়ুর সম্মুখে তুষের ন্যায় উড়িয়া যাইতেছে।'—স্কটিশবীর সন্ন্যাসিগণ কল্পনা-বলে ভাবী সময়ের এইরূপ উজ্জল ছবি দেখিতে পাইলেন।
প্রাতঃস্মরণীয় চরিতমালা। প্রাতঃসূর্যের সুবর্ণময় করণমালায় সমুদ্ভাসিত আয়ার নদীর তীরে চিন্তামগ্ন ভাবে পাচার করিয়া বেড়াইতে ছেন উনি কে? বিধাতা যাহাকে সুন্দর বুদ্ধিশালী পদ্ম- পত্রনিভ মুখকান্তি দিয়াছেন উনি কে?.যাহার চক্ষু হইতে প্রতিভা ও অগ্নি বাহির হইতেছে উনি কে ? ক্রোধে বাহার ওষ্ঠাধর বিকম্পিত হইতেছে উনি কে? ঐ অজানু- লম্বুিবাহু ৰিশালবঙ্গ বৃষস্কন্ধ মহাপুরুষ কে ? বিলম্বিনী অরাল কেশরাজি যাঁহার গ্রীবার উপর গৌরবে ক্রীড়া করিতেছে উনি কে? যাঁহার কটিবদ্ধ অসি ঝম করিয়া বার বার ধরাতল চুম্বন করিতেছে ঐ বীরপুরুষ কে? যিনি সম্পত্তি থাকিতেও সৰ্ব্বত্যাগী, স্বদেশের উদ্ধারসাধনরূপ এক মহামন্ত্রে দীক্ষিত, ঐ বীর সন্ন্যাসী কে ? ইনিই সেই পৃক্ষটলণ্ডের উদ্ধার-কর্তা ওয়ালেস্। যাহার প্রচণ্ড ঋড়া- ঘাতে অসংখ্য ইংরাজ বীরপুরুষ শমন-সদনে প্রেরিত হই- ছিলেন, ইনিই সেই স্কটলগু-ববি ওয়ালেস্। যাঁহার উদ্দী- পনাপূর্ণ বাক্যে অসংখ্য মবদানপরম্পরা অনুষ্টিত হইয়াছিল, ইনিই সেই স্কট-সঞ্জীবন ওয়ালেস্। যাহার প্রতাপে ইংলণ্ডেশ্বর দৃপ্ত এডওয়ার্ড কম্পিত-কলেবর হইয়াছিলেন, ইনিই সেই স্কটিশ-সিংহ ওয়ালেস্। যাহার বিজয়িনী সেন ইংলণ্ড-ভূমিকে অগ্নিময় করিয়া তুলিয়াছিল, ইনিই সেই স্কটবীরকেশরী ওয়ালে। যাহার চরণতলে পড়িয়া একদিন ইংলণ্ডেশ্বর-এডওয়ার্ডের মহিষীও সন্ধি ভিক্ষা করিয়াছিলেন, ইনিই সেই স্কটল-গৌরব ওয়ালেস। বলিয়া দিতে হইবে না যে, ইনি চিন্তামগ্ন মনে মাতৃভূমির বমান দু •• গ ও অতীত গৌরবের বিষয় ভাবিতেছিলেন।
ওয়ালে। এই স্বাধীনতা-সমরে ওয়ালে পিতা, মাতা, ভ্রাতা অৰ- শেষে প্রাণাপেক্ষাও প্রিয়তরা ভাৰ্যা, একে একে সমস্ত হারাইয়াছিলেন। তথাপি সে সন্ন্যাসীর অন্তরের আগুণ না নিভিয়া বরং অধিকতর উদ্দীপিত হইয়াছিল। ইংরাজ- দদিগকে বিদূরিত করিয়া স্কটলকে স্বাধীন করিবেন--- এই সৰ্ব্বগ্রাসিনী চিন্তা তাহার একমাত্র সহচরী ছিল। শয়নে স্বপনে, অশুনে উপবেশনে—এ চিন্তা একবারও তাঁহাকে পরিত্যাগ করিত না, ভঁহার কপর্দক মা সম্বল ছিল না, অথচ তিনি না ডাকিতেও কত সহস্র লােক আসিয়া তাহার পতাকামূলে দাড়াইত। তিনি দৈবশক্তি সম্পন্ন ছিলেন, এবং সেই শক্তি নিজ সৈতে সংক্রামিত করিতে পারিতেন। এইজন্য তাহার সৈন্যেরা বার বার বগুণ ইংরাজসৈন্যের সহিত যুদ্ধ করিয়া বিজয় লাভ করিয়াছিল। এই জন্যই অসংখ্য দুর্গ সহজেই তাহার করতলস্থ হইয়াছিল। ষ্টার্লিং সমরক্ষেত্র তাহার অতি- মানুষ বীরত্বের পরিচয়-স্থল। এই যুদ্ধে তিনি দশমাংশ সৈন্য লইয়া দশগুণ ইংরাজসৈন্তের সম্মুখীন হন। কথিত আছে, এই যুদ্ধে চল্লিশ সহস্র ইংরাজ হত হন, এবং বিজয়- লক্ষ্মী সম্পূর্ণরূপে ওয়ালেসের করতলস্থ হন। স্কটিশদুর্গে জাতীয় পতাকা উড্ডীন করিয়া ওয়ালেসেই বিজয়িনী সেনা লইরা মত হস্তীর ন্যায় ইংলণ্ড আলােড়িত করিয়া কিন্তু ভাগ্যলক্ষ্মী অধিক দিন তাহার প্রতি প্রসন্ন ছিলেন না। এই অপমানের প্রতিশােধ লইবার । জন্য এওয়ার্ড অগণ্য সৈন্থ সহ অচিরকালমধ্যে স্কটলরে সিংহদ্বারে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। এওয়ার্ড জানি- ২২ প্রাতঃস্মরণীয় চরিতমালা। তেন, ওয়ালেসের সেনা ঢুরণে অজেয়। এইজন্য তিনি স্কটিশ শিবিরে ভেদ উৎপাদন করিয়া দিলেন। দলপতি গণের মধ্যে সৈনাপত্য লইয়। ঘােরতর বিবাদ বাধিয়া উঠিল। •অন্তবিচ্ছেদের বিষময় ফল ফলিল। ফার্ক- কুরুক্ষেত্রে স্কটিশ পৃথুরাজ ইংরাজদিগের হস্তে পতিত হই- লেন। স্কটলণ্ডের স্বাধীনতাসূৰ্য্য আর অস্তমিত হইল। নিষ্ঠুর ইংরাজ সেই দেবদুল্লভ দেহ খণ্ড খণ্ড করিয়া চতু ব্দিকে বিক্ষিপ্ত করিল। তাহার মস্তক লইয়া ইংরাজের লণ্ডন সেতুর উপর বসাইয়া রাখিল। এইবার ওয়ালেস্ মাতৃভূমির চরণে পূর্ণ আত্মবলি দিলেন। যেমন যােগিবর খ্রীষ্ট মানবজাতির পাপের প্রায়শ্চিত্ত করিবার জন্য নিজ দেহ বলি দিয়াছিলেন, সেইরূপ ঔয়ালে, স্কটিশ-জাতীয় পাপের প্রায়শ্চিত্ত করিবার জন্য নিজ দেহ উৎসর্গ করিলে অমনি স্বর্গ হইতে পুষ্পবৃষ্টি হইল। অমনি দেব যক্ষ কিন্নর সমস্বরে গাইয়া উঠিলেন, ‘ধন্য ওয়ালেস্ ! ধন্য স্কটলণ্ড— ওয়ালেস-জননী ! জগতে প্রতিধ্বনি উঠিল—ধন্য ওয়া- 'লেস্ ! ধন্য স্কটলণ্ড—ওয়ালেস্-জননী!' সে রক্তে ইংল- ঙের বক্ষ পুড়িয়া ছারখার হইল। এই বীরহত্যা মহা- পাতকের প্রায়শ্চিত্ত ইংরাজকে ব্যান্কবর সমরক্ষেত্রে করিতে হইল। সংবাদ দিবার জন্য সেই একলক্ষ সেনার অল্পই স্বদেশে ফিরিয়া আসিল। ধন্য ওয়ালে! তােমার স্বদেশানুরাগ! তুমি মরিয়াও স্বদেশের উদ্ধার সাধন করিলে! তুমি অমর ; তাহা না হইলে এতদিন পরে সুদূর অনুগাঙ্গ প্রদেশে আৰ্য-যুৰক আজ তােমার মুম সঙ্কীৰ্ত্তন করে কেন? তা না হইলে আজ তােমার
উইলিয়ম টেল। '
নাম মাত্র উচ্চারণে আৰ্যযুবকর শিরায় শিরায় তাড়িত
বেগে শােণিতস্রোত প্রবাহিত হয় কেন?
উইলিয়ম টেল।
যে সময়ে স্কটলণ্ডে ওয়ালে জাতীয় স্বাধীনতা রক্ষার
জন্য প্রাণপণে চেষ্টা করিতেছিলেন, সেই সময় সুইজর্লণ্ড
আর একজন রাজনৈতিক সন্ন্যাসী অষ্ট্রিয়ার সহিত স্বাধী-
নতা-সমরে নিযুক্ত হন। সকলেই জানেন ইহার নাম টেল।
ইহার অদ্ভুত কাৰ্যকলাপ পৰ্যালােচনা করিলে, ইহাকে
বাস্তব মনুষ্য বলিয়া বােধ হয় না; যেন কবির কল্পনা-
বিজঙিত বলিয়া প্রতীতি জন্মে। কিন্তু তিনি ৰাস্তবিকই
মানব—অথবা মানব-রূপী দেবতা ছিলেন। বস্তুতঃ হৃদয়ের
বিশালতা, ইচ্ছার অলঙ্ঘ্যতা, লক্ষ্যের অচঞ্চলতা, এবং
স্বজাতি-প্রেম ও স্বদেশানুরাগের গভীরতায় তিনি দেবােপম
ছিলেন। তিনি স্বদেশের মঙ্গলসাধনের জন্য মৃত্যুতে—অথবা
তদপেক্ষায় ভয়ানক যদি কিছু থাকে তাহাতেও-ঝাঁপ
দিতে একবারও ভাবিতেন না। তাঁহার হৃদয়ে ভয় ছিল
না। তিনি ৰিক্ৰমে কেশরী ছিলেন।
যখন চতুর্দিকে অন্ধকার, যখন চতুর্দিকে অত্যাচার,
যখন সমস্ত সুইজর্লণ্ড অষ্ট্রিয়ার শৃঙ্খলভরে বসিয়া পড়িতে-
ছিল, সেই সময় এই রণবীর সুইসক্ষেত্রে জাতীয় অধি-
নায়ক-রূপে আবির্ভূত হন। তঁাহার দেহ হইতে তেজঃপুঞ্জ
নির্গত হইত দেখিয়া লােকে মনে করিত যে, বিজয়-লক্ষ্মী
* ওয়ালেসের বিস্তৃত জীবনী স্বতন্ত্র পুকাকানে মুদ্রিত হইতেছে।
।
২৪ প্রাতঃস্মরণীয় চরিতমালা।
তেজঃপুচ্ছলে, যেন তাহাকে ক°ক বেষ্টিত করিয়া রাখিয়া-
তাহাকে
এই রণবীর যদিও সামান্য কৃষকের গৃহে জন্মগ্রহণ
করিয়াছিলেন, তথাপি তাহার আত্মা অতি মহান্ ছিল।
তিনি শহন্তে আত্মসমর্পণ করা অপেক্ষা মৃত্যু শ্রেয় মনে
করিতেন। একদিন এক কৃষক লাঙল চষিতে ছিল। এমন
সময়ে অষ্ট্রিয়রাজ-প্রতিনিধির ভৃত্য অকারণে আসিয়া সেই
হলবাহী বলদদ্বয়কে খুলিয়া লইল, বলিল ‘এ কাজের জন্য
দুইজন সুইস নিযুক্ত করিলে ভাল হয়, কারণ তাহারা
ভারবহন করিবার জন্যই জন্মিয়াছে। কৃষকের ইহা দুর্বিষহ
হইল, সে তৎক্ষণাৎ তাহার হস্ত-স্থিত লগুড় দ্বারা তাহাকে
ভূপাতিত করিল। মারিয়াই, সৈ ভবিষ্যৎ ভাবিয়া তৎক্ষণাৎ
পলায়ন করিল। ক্রোধোন্মত্ত অষ্ট্রিয়গণ তাহাকে না পাইয়া
তাহার বৃদ্ধ পিতাকে গিয়া ধরিল। বৃদ্ধের যাহা কিছু ছিল
সমস্ত রাজকোভুক্ত করিয়া অবশেষে পিশাচের তাহার
চক্ষু দুটী উৎপাটিত করিল। যষ্টি হস্তে দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা
করা ভিন্ন অন্ধের আর কোন উপায় রহিল না। এই প্রকার
অসহ্য অত্যাচারে সমস্ত সুইজর্লণ্ডবাসী ক্ষেপিয়া উঠিলেন।
তাহারা দলে দলে আসিয়া এক জায়গায় জমা হইতে
লাগিলেন। সকলেই একবাক্যে বীরকেশরী উইলিয়ম্
টেলকে জাতীয় সেনার অধিনায়ক নিযুক্ত করিলেন।
জাতীয় দলের অনেকগুলি গুপ্ত অধিবেশন হইল। পরস্পরের
প্রতি বিশ্বাস-রক্ষা ও মন্ত্রগুপ্তির জন্য পরস্পরের সমীপে
পরস্পর শপথ গ্রহণ পূর্বক প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হইলেন। সাধারণ
"সত্যুত্থানের জন্য একটা দিন স্থির হইল। সকলেই উৎসুক
উইলিয়ম টেল। মনে সেই দিনের প্রতীক্ষা করিতেছেন, এমন সময় একন দুর্ঘটনায় সব উলটাইয়া গেল | গবর্নর আলট নগরের বাজারে একটা গাছের উপর তাহার টুপি রাখিয়া ঘােষণা করিয়া দিলেন যে, ‘সুইজর্লণ্ডের সমস্ত লােককে এই টুপির নিকট নতজানু ও অনাবৃত-মস্তক হতে হইবে। গবর্ণরের প্রতি তাহারা যে সম্মান করিতে বাধ্য, তাহাদিগকে ঐ টুপির প্রতিও সেই সম্মান প্রদর্শন করিতে হইবে। উই- লিয়ম টেল এই আদেশ প্রতিপালনে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকৃত হইলেন। অষ্ট্রিয় পুলিশ তাঁহাকে ধরিয়া গবর্ণরের নিকট লইয়া গেল। গবর্নর স্বাভাবিক নিষ্ঠ তার বশবর্তী হইয়া আদেশ করিলেন যে, টেলকে নিজ পুত্রের মস্তকে একটা আপল ফল রাখিয়া শরবিদ্ধ করিতে হইবে। ধনুর্বিদ্যায় টেলের সবিশেষ পারদর্শিতা ছিল, সুতরাং তিনি নির্ভয়ে শরসন্ধান করিলেন। আপল বিদ্ধ হইল, কিন্তু পুত্রের মস্তকে বিন্দুমাত্রও আঘাত লাগিল না। সকলেই মন্ত্রমুগ্ধ হইয়া এই অদ্ভুত ঘটনা দেখিল। সুইজর্লণ্ডর লােকে এই ঘটনার স্মরণার্থ যে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মিত করে, অদ্যাপি তাহা বিদ্যমান রহিয়াছে। আপল বিদ্ধ হইলে টেল আর একটী শর লুকাইলেন। গবর্ণর তাহা দেখিতে পাইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন “তুমি কি জন্য ঐ দ্বিতীয় শর আনিয়াছিলে?” টেল উত্তর করিলেন যে, “যদি প্রথম শর আপল ভেদ না করিয়া পুত্রের মস্তক স্পর্শ করিত, তাহা হইলে ঐ দ্বিতীয় শরে তোমায় শমন- সদনে প্রেরণ করিতাম”। এই বাক্যে গৰণর ক্রোধে অধীর ইয়া টেলকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করিয়া নিজের নৌকায় লইয়া প্রাতঃস্ময়শীয় চরিতমালা। যাইতে আদেশ করিলেন, এবং নিজেও তাহাতে আরােহণ করিলেন। ইচ্ছা ছিল, কুচলাচ দুর্গের কারাগারে তাহাকে ফেলিয়া আসিবেন; কিন্তু তাহা ঘটিল না। জলপথে হঠাৎ ঝড় উঠিল। গবর্ণর জানিতেন, টেল, নৌচালনে বিশেষ দক্ষ, এই জন্য তাহাকে শৃঙ্খলমুক্ত করিতে আদেশ দিলেন।” টের শৃঙ্খলমুক্ত হইয়া অতিবেগে ঈড় ফেলিয়া তরঙ্গমালা কাটিতে কাটিতে উপকূলাভিমুখে উপস্থিত হইলেন। দুর হইতেই সেই বিরাট পুরুষ এক লম্ফে তীরে পতিত হইলেন। গবর্ণর, তদীয় অষ্ট্রিয় অনুচরগণ সহ অতল জলে নিমগ্ন হইলেন। এদিকে সেই মহাপুরুষের পুনরাবির্ভাবে সকল ক্যান্টনই কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বিদ্রোহী হইয়া উঠিল। অষ্টিয় সেনা পরাস্ত হইল, এরং সুইস দুগোপরি আয় জাতীয় পতাকা সগর্বে উড্ডীন হইল। উইলিয়ম্ টেলের অদ্ভুত অবদানপরম্পরা জানেন না বােধ হয় এমন ইতিহাস- পাঠক কেহ নাই। সুইজর্লণ্ডের প্রতি ক্যান্টনে উইলিয়ম্ টেলের কীর্তিস্তম্ভ নিখাত আছে; এবং সেই পার্বত্য প্রদেশ শের প্রতি অধিবাসীর হৃদয়মন্দিরে তাহার স্মৃতি অদ্যাপি অতি যত্নে ও ভক্তিভাবে পরিলক্ষিত ও পরিপূজিত হইয়া থাকে। ধন্য বীর ! ধন্য তোমার স্বদেশানুরাগ! জন্ হাড়ে। পাঠক, চল একবার শ্বেতদ্বীপে যাই। স্বাধীনতার আবাসভূমি ইংলণ্ডে কোন বীর সন্ন্যাসী জন্মিয়াছিলেন কি না, চল গিয়া সংবাদ লই। এই যে সম্মুখে এক পাষাণময়ী প্রতিমা রহিয়াছে, এ কোন্ দৈবতার প্রতিকৃতি? কে যেন জন্হ্যামৃড়ে। উত্তর দিল “এ দেবমূর্তি নয়,নরাপী দেবতা জন্ হাম্ডেনের প্রস্তরময়ী প্রতিমূর্তি। ঐ দেখ পাদপীঠ-বক্ষে কি খােদিত রহিয়াছে।” একবার পড়িয়া দেখি। ইহা তাঁহার জীবনের ইতিহাস। যাহা লিখিত আছে তাহার মর্ম ,ও তৎসমা- লােচনা নিম্নে প্রদত্ত হইলঃ- ১৫৯৭ খ্রীষ্টাব্দে এই মহাপুরুষ লণ্ডন নগরীতে জন্ম গ্রহণ করেন। যখন প্রথম চার্লসের দুর্বিষহ অত্যাচারে গ্রেট ব্রিটন আলােড়িত হইতেছিল, যখন কেহই সাহস করিয়া তাহার কার্যের প্রতিবাদ করিতে সাহসী হন নাই, সেই সময় এই রাজনৈতিক সন্ন্যাসী জাতীয় স্বাধীনতা রক্ষার জন্য বদ্ধপরিকর হইলেন। চার্লস অবৈধরূপে সকলের নিকট হইতে টাকা ধার করিতে লাগিলেন। সকলেই অবনত মস্তকে তাহা প্রদান করিতে লাগিল। কিন্তু হ্যাম- ডেন্ প্রতিজ্ঞা করিলেন যে, তিনি প্রাণ থাকিতে টাকা ধার দিবেন না। ইনি তৎকালে হাউস্ অব কমন্সের একজন প্রতিভাশালী মেম্বর ছিলেন। ইনি চার্লসকে দেখাইয়া দিলেন যে, প্রজার নিকট ঐরূপে টাকা ধার করা ম্যানা চার্টার বিরুদ্ধ। ইহাতে চালসের রাগের আর সীমা রহিল না। ‘এত বড় স্পর্ধা যে, সামান্য প্রজা হইয়া রাজার কার্যের প্রতিবাদ করে। রাজার সম্মুখে ম্যাগনাকার্টা আনিয়া তঁাহার গতিরােধ করিতে চেষ্টা করে। এরূপ দুরাচারের-তাদৃশ পাপের-প্রায়- চিত্তের একমাত্র স্থান কারাগার। এই বলিয়া তিনি হ্যান্ডকে কারাগারে নিক্ষিপ্ত করিলেন। হ্যাডেন কিছুকাল কারাগারে রহিলেন। কিন্তু তাহার বিরুদ্ধে প্রাতঃস্মরণীয় চরিতমালা। কোন প্রমাণ না থাকায়, অগত্যা তাহাকে ছাড়িয়া দিতে হইল। ন স্বাধীনতা !–এ শব্দ হ্যাডেনের শ্রবণে অতি মধুর। বহুমূল্য হীরক অপেক্ষা ইহা তাহার নিকট অধিকতর মূল্য- বান্। কিন্তু তিনি নিজের ব্যক্তিগত স্বাধীনতার জন্য তত ব্যাকুল ছিলেন না। জাতীয় স্বাধীনতা-ধৰ্ম্ম, নীতি, রাজ- নীতি, সমাজ বিষয়ে জাতীয় মত-স্বাতন্ত্র—ইহারই জন্য তাঁহার হৃদয়ের অনিয়ন্ত্রিত আকাঙ্ক্ষা। তিনি ইহারই রক্ষার জন্য যুদ্ধ করিতে, এবং প্রয়ােজন হইলে সে যুদ্ধে প্রাণ বিসৰ্জন করিতেও প্রস্তুত ছিলেন। দুর্ভাগ্য ঢালস এ অন্তর্নিহিত বিশ্বব্যাপী জাতীয় ভাব বুঝিতে পারিলেন না; না বুঝিয়া অন্ধের ন্যায় সেই জাতীয় ভাবস্রোতের প্রতিকূলে দাড়াইলেন ; ভাবিলের যে, এক শতাব্দী পূৰ্বে অষ্টম হেন্রী যাহা করিতে পারিয়াছিলেন, এক শতাব্দী পরে এখন পরে এখন তিনি তাহা করিতে গেলে বিফলপ্ৰযুত্ব হইবেন; ভাবিলেন না যে, রাজ্যসাগরে তরঙ্গ উঠিলে, রাজকীয় তরি তরঙ্গের প্রতি- কুলে চালাইলে তাহা নিশ্চয় ডুবিবে; ভাবিলেন না যে, এ সময় কমন্সগণের সঙ্গে মিট না করিলে, তঁাহার আর রাজ্যরক্ষার উপায়ান্তর নাই। এই সকল অগ্রপশ্চাৎ না ভাবিয়া চার্লস উন্মত্তের ন্যায় নিজ পথে চলিলেন। এই সময় তাহার সম্মুখীন হইয়া একথা বলে, হ্যাডেন ভিন্ন, “এমন বীরসন্ন্যাসী ইংলণ্ডে আর ছিলেন না'। . হ্যাডেনের চক্ষু দিয়া যেন রক্ত বাহির হইতে লাগিল। তাহার ললাট চিন্তায় আকুঞ্চিত হইল। তাহার অপ্রতিহত দৃষ্টি ভবিষ্য হ্যান্ড। ২৯ গগনে একখানি কাল মেঘ দেখিতে পাইল। তিনি দেখি- লেন চার্লস এই উন্মত্ত-গতি হইতে যদি নিবৃত্ত না হন, গ্রজার সহিত তাহার সংঘর্ষ অনিবার্য ; দেখিয়া তিনি স্পষ্টাক্ষরে চার্লসকে তাহার কার্যের দায়িত্ব বুঝাইয়া দিলেন ; বলিলেন, চার্লস যেরূপ কাৰ্য্য করিতেছেন তাহা ম্যাগনাকার্টার সম্পূর্ণ প্রতিকূলে। যদিও হ্যাভেন্ জাতীর স্বাধীনতা রক্ষার জন্য রাজশরীরে অস্ত্র প্রহার করিতেও সঙ্কুচিত ছিলেন না, তথাপি সেই ভাবী অমঙ্গল ভাবিয়া তাঁহার হৃদয় কাঁদিয়া উঠিল। উভয়দিক যাহাতে রক্ষা হয় সেই জন্য সেই যােগী ঈশ্বরের নিকট এই বলিয়া প্রার্থনা করিলেন “ঈশ্বর ! তুমি আমার জন্মভূমিকে রক্ত- পাত হইতে রক্ষা কর ; অামাদের রাজাকে সঁহার ভ্রম দেখাইয়া দেও; তাহাব মন্ত্রিগণের হৃদয়কে সেই ভ্রান্ত পথ হইতে ফিরাইয়া আন।” তাহার এই প্রার্থনা ঈশ্বর পূর্ণ করিলেন না। কিন্তু এই প্রার্থনায় তঁাহার চরিত্রের পবিত্রতা ও লক্ষ্যের নির্মলতা সুস্পষ্টরূপে পরিব্যক্ত হইল। বস্তুতঃ রাজতান্ত্রিকদলও তাহার বিরুদ্ধে কোন কথা বলিতে সাহস করেন নাই। বিনীত, সদান, সাহসী, একাগ্রচিত্ত, বাগ্মী, ও উদার-চরিত হ্যাডেন্ সকল দলেরই পূজিত ছিলেন। রাজার বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করিতে হইবে ভাবিয়া, হ্যায়- ডেন নিরতিশয় কাতর হইলেন। কিন্তু তিনি তাহার সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে দেখলেন, ইহা অনিবার্য। তিনি দেখিলেন, জাতীয় স্বাধীনতা অক্ষত রাখিতে হইলে, রাজবলি অপরি হার্য। ০ প্রাতঃস্মরণীয় চরিতমালা। এদিকে রাজার টাকা একান্ত অভাব হইয়া পড়িল । ধনাগার শূন্য, অথচ পার্লেমেন্ট টাকা দিতে অস্বীকৃত। ইহাতে রাজা ক্রোধে উন্মত্ত হইয়া উঠিলেন। পূৰ্ব্বকালে যখন দিনেমারেরা ইংলণ্ডের উপকূলে আসিয়া লুটপাট করিয়া লইয়া যাইত, সেই সময় ইংলণ্ডেশ্বর উপকূলবাসী প্রজাবৃন্দকে কয়েকখানি রণতরি সুসজ্জিত করিয়া দিতে বাধ্য করিতেন। তাহারা রণতরির বিনিময়ে কিছু কিছু করিয়া কর দিত। ইহাকে “সিমনি” বা জাহাজ-কর বলিত। যতদিন দিনেমারদিগের উৎপাত থাকিত, তত- দিনই এই কর আদায় করা হইত। এ নৈমিত্তিক করে রাজার সর্বতােমুখী প্রভূত ছিল। তিনি পার্লেমেন্টের অনুমতি না লইয়া এই কর স্থাপন করিতে পারিতেন, এবং আপন ইচ্ছামত সে টাকা ব্যয় করিতেন। তাহাকে এ টাকার জন্য কাহারও নিকট জবাবদিহি করিতে হইত না। ১৬২৪ খ্রীষ্টাব্দের ২০ এ অক্টোবর ল গুনের অধিবাসিবৃন্দের উপর হঠাৎ রাজনামাঙ্কিত এক পরওয়ানা বাহির হইল যে, ১লা নবেম্বরের মধ্যে তাহাদিগকে সর্বোপকরণ-সম্পন্ন সাত খানি য়ণতরি, লােকজনের ছয়মাসের বেতন সহ রাজার হস্তে সমৰ্পণ করিতে হইবে। নগরবাসিরা একবাক্যে ইহার প্রতিবাদ করিলেন। ৮িন্তু কে সে প্রতিবাদ শুনে ? রাজা বধিরের ন্যায় এই জাতীয় আপত্তি ও জাতীয় প্রতিবাদ কর্ণেও স্থান দিলেন না। নির্দিষ্ট সময়ে জাহাজ ও টাকা উঁহার চাই-ই। এইরূপ পরওয়ানা উপকূলবাসী ও মধ্য প্রদেশবাসী সকল প্রজাগণের উপরই জারি হইল। আবার.. অাদেশ প্রচারিত হইল যে, জাহাজের পরিবর্তে টাকা দিতে ৩১ ) হ্যাভেন্। হইবে। প্রতি জাহাজের জন্য ৩৩০০ পাউণ্ড করিয়া দিতে হইবে। চতুর্দিকে উপদেশ পাঠান হইল যে, যাহারা টাকা দিবে, তাহাদের যেন সম্পত্তি ক্রো হয়। এই বিশ্বজনীন বিপত্তিকালে হাডেন্ করদানে অস্বী- কৃত হইলেন। যিনি স্বজাতির ও স্বদেশের মঙ্গলকামী, কারাগার তাহার সুখশয্যা, মৃত্যু তাঁহার স্বর্গদ্বার। হাডে কারাগার ও মৃত্যু উপেক্ষা করিয়া রাজাজ্ঞার প্রতিবাদ করিলেন। ১০ টাকা মাত্র কর তাহার উপর ধার্য হইয়া-. ছিল, ইহার জন্য তিনি দেহ, প্রাণ, সম্পত্তি সমস্ত বিসর্জন দিতে প্রস্তুত হইলেন। কেন ? অ্যাডেনের বিপুল সম্পত্তি থাকিতে যে কারণে তিনি পূর্বে রাজাকে টাকা ধার দিতে অস্বীকৃত হন, সেই একই কারণে আজ ১০ টাকা মাত্র লিপমনি কর দিতে অস্বীকৃত হইলেন। “রাজার এই টাকা ধার চাওয়া, ও এই কর-সংগ্রহ করায় জাতীয় স্বাধীনতার ভিত্তিভূমি ‘ম্যানা চার্টার প্রতিকূলাচরণ করা হইয়াছে” —এই বলিয়াই তিনি বীরের ন্যায় তাহার বিরুদ্ধে দণ্ডায়- মান হন। তিনি রাজার কার্যের অনুমােদন করিলে হয়ত ইংলণ্ডের প্রধানমন্ত্রিত্ব পদে অভিষিক্ত হইতে পারিতেন, কিন্তু জাতীয় স্বাধীনতার নিকট সে পদ তিনি তুচ্ছ মনে করিতেন। তিনি নিজ ব্যক্তিগত মঙ্গল, জাতীয় মঙ্গলে পূর্ণ আহুতি দিয়াছিলেন বলিয়াই, আজ সে প্রলােভনে আকৃষ্ট হইলেন না। তিনি জাতীয় ' স্বাধীনতা-রক্ষার জন্য রাজ- প্রাসাদ অপেক্ষা কারাগার সুখসেব্য মনে করিলেন। গ্রেট কিম্বল প্রদেশের ত্রিশজন নিরভােগ তাহার উজ্জ্বল দৃষ্টা- ৪
প্রাতঃস্মরণীয় চরিতমালা।
ন্তের অনুবর্তন করিল। সুতরাং সন্ন্যাসীর দল সংখ্যায়
বাড়িয়া গেল।
এক্সচেকর কোর্টে হাড়েনের বিরুদ্ধে রাজপক্ষ হইতে
নালিস রুজু হইল। বার জন জজে বার দিন বসিয়া বিচার
করিলেন। যাহার অতুল সম্পত্তি সে বিশ সিলিঙ দিতে এত
কাতর, ইহা অপেক্ষা অধিকতর লজ্জাকর আর কি হইতে
পাবে ? হাডেনের উপর ২০ পাউণ্ড কর ধার্য করা উচিত
ছিল’-রাজার উকিল হ্যাডেনের প্রতি ইত্যাকার অনেক
বাক্যবাণ প্রয়ােগ করিতে লাগিলেন। কিন্তু সে বীরের হৃদয়
বিচলিত হইবার নহে। কারণ টাকার পরিমাণ লইয়া তাহার
আপত্তি নহে—এরূপ কাৰ্য ইংলণ্ডের মূল বিধির বিরুদ্ধ
বলিয়াই তাহার আপত্তি। সে অলঘ্য বিধির নিকট রাজা-
রও মস্তক অবনত হওয়া চাই—ইহাই হ্যাডেনের সঙ্কুল।
দেহসংশ্লিষ্ট মস্তক যদি অবনত না হয়, দেহ-বিচ্ছিন্ন মস্তক
তথায় বিলুষ্ঠিত হইবে—ইহাই হ্যাডেনের স্থির সিদ্ধান্ত।
জজেরা অধিকাংশই রাজার পক্ষ অবলম্বন করিলেন।
জষ্টিস ক্রাউলে বলিলেন “রাজা রাখিতে হইলেই তাহাকে
আপন ইচ্ছামত কর আদায়ের ক্ষমতা দিতে হইবে।
প্রভুশক্তিৰৰ্জিত রাজা হইতে পারে না, কারণ, তিনি
সর্বোপরি প্রভুশক্তি।” অন্যতর জজ জষ্টিস বাক্লেবলি-
লেন যে ‘আইনে রাজাকে আবদ্ধ করতে পারে না।
আইন রাজার চিরবিশ্বাসিনী দাসী। প্রজা:শাসন
করিবার জন্য ইহা রাজার প্রধান শাসন-যন্ত্র। আইন
রাজা-এ কথা আমি কখন শুনি নাই-কিন্তু রাজাজ্ঞাই
আইন-এই কথাই বরাবর শুনিয়া আসিতেছি—এৰং
।
*
; হাডেন। ইহাই সত্য।” জষ্টিস ফিন্স কলিলেন, “পার্লেমেন্টীয় বিধি রাজার উপর খাটে না; যদিও প্রজার ধন প্রাণ ও দেহের উপর ইহার সর্বতােমুখী প্রভু• আছে।” এইরূপে বার জনের মধ্যে সাত জন জজ রাজার অনিয়ন্ত্রিত প্রভুতার স্বপক্ষে মত প্রদান করিলেন। এইরূপে তাঁহারা বিচার- স্বাধীনতা রাজপ্রসাদের নিকট বলি দিলেন। সামান্য চাকরির অনুরােধে তঁাহারা সত্যের অপলাপ করিলেন। পাঁচ জন জজ হাম্ডেনের অনুকূলে মত ব্যক্ত করিলেন। রাজা যে আইনের উপরি—এ কথা তাহারা স্বীকার করি- লেন না। প্রজার ধন সম্পত্তির উপরি যে তাহার সর্বতাে- মুখী প্রভুত, এবং তাহার কার্যের ও ইচ্ছার নিয়ামক যে কিছুই নাই-এ মত তাঁহারা অশ্রদ্ধেয় বলিয়া প্রত্যাখ্যান করিলেন। কিন্তু হাডেনের প্রতিকুলে সংখ্যার বলতা ছিল বলিয়া, তঁাহাকে হারিতে হইল। কিন্তু এ হার হার পক্ষে প্রকৃত বিজয়। এ পরাজয়ে তিনি স্বজাতির হৃদয়- মন্দিরে অতি উচ্চ আসন পাইলেন। সিমনি-ঘটিত ব্যাপারের পূর্বে অতি অল্প লােকেই হামডেনের মাহাত্ম্য জানিত। কিন্তু আজ ব্রিটনের এক প্রান্ত হইতে অপর প্রান্ত পর্যন্ত তাহার নাম প্রতিধ্বনিত হইতে লাগিল। তাহার যশ প্রতি গৃহে কীৰ্তিত হইতে লাগিল। প্রতি জিহ্বা তাহার আন্দোলনে ব্যাপৃত হইল। যাহারা জানিত না, তাহারা অনুসন্ধান করিতে লাগিল, এ মহাপুরুষ কে ? যিনি এরূপ নিজের দায়িত্বে স্বজাতির স্বাধীনতা ও ধন সম্পত্তি রক্ষা করিতে উদ্যত হইয়াছেন, এবং এরূপ অমিতসাহসে স্বদেশকে বাজার করাল গ্রাস হইতে মুক্ত ৩৪ প্রাতঃস্মরণীয় চরিতমালা। করিতে কৃতসঙ্কল্প হইয়াছেন সে দেবতা কে ?' এইরূপ প্রশ্ন ও প্রশ্নের উপরি উত্তর হইতে হইতেই সকলেই হাডেনকে চিনিল। তখন ব্রিটনের আবাল বৃদ্ধ বনিতা উৎসুক নয়নে ইহার দিকে তাকাইয়া রহিল। ইহাকে স্বদেশের উদ্ধার কৰ্ত্তা জানিয়া সকলেই ইহার উপরি আত্মসমর্পণ করিল। পরীক্ষার দিন ক্রমে নিকট হইয়া আসিল। হাডে প্রভৃতি পাঁচ জন হাউস্ অব কমন্সের সত্যকে চার্লস অভি- যুক্ত করিলেন। কমন্সস বিচারের জন্য তঁাহাদিগকে রাজার হস্তে সমৰ্পণ করিতে অস্বীকৃত হইলেন। চার্লস প্রতিজ্ঞা করিলেন যে, সশস্ত্র পুরুষ দ্বারা তাহাদিগকে বল পূৰ্ব্বক হাউস অব কমন্স হইতে গ্রেপ্তার করিয়া আনাই- বেন! তিনি স্বয়ং শতাধিক সশস্ত্র পুরুষ লইয়া হাউস্ অব কমন্সের অভিমুখে ধাবিত হইলেন। এ দিকে তিনি আসি- বার পূর্বেই অভিযুক্ত ব্যক্তিরা, সরিয়া পড়িয়াছিলেন । সুতরাং পার্লেমেন্টে গিয়া তিনি নিতান্ত ক্ষুব্ধচি হইলেন। তিনি উপস্থিত সভ্যগণকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন—“আমি দেখিতেছি পিঞ্জরস্থ পক্ষিগণ উড়িয়া গিয়াছে। এক্ষণে আশা করি, পাখিগুলি ফিরিয়া আসিলে, আপনারা তাহা- দিগকে আমার নিকটে পাঠাইয়া দিবেন।” পালেমেন্ট সভা নীরবে রাজার এই উন্মত্ত- প্রলাপ শুনিলেন, কোন উত্তর দিলেন না। তাহারা অন্তঃসঙ্কুক্ষিত ক্রোধানল অতি কষ্টে সংযমিত করিলেন। কিন্তু যখন চার্লস গৃহ-বহিভূত ইলেন, তখন তাহাদিগের হৃদয় ভেদ করিয় শব্দ উঠিল, অধিকারে হস্তক্ষেপ !–অধিকারে হস্তক্ষেপ! এই ঘটনার পরে তাহারা সভাভঙ্গ করিয়া চলিয়া গেলেন। আর সে এ ৪ হ্যাডে। পুরাতন সভাগৃহে তাহারা বসিলেন না। এখন হইতে রাজ- ধানীর অভ্যন্তরে একটী বাটীতে সভার অধিবেশন হইতে লাগিল। চার্লস নিরস্ত হইবার নহেন। তিনি রাজধানীর ভিতর দিয়া সেই পঞ্চ সভ্যের গ্রেপ্তারের জন্য কমন্স সভার অভিমুখে ধাবিত হইলেন! পথে প্রজারা সমস্বরে বলিতে লাগিল ‘ধিক্ সে রাজায় ! যে প্রজার স্বত্বে হস্তক্ষেপ করে। দশ দিকে প্রতিধ্বনি উঠিল, ‘ধিকু সে রাজায়! যে প্রজার স্বত্বে হস্তক্ষেপ করে। সকলেই একবাক্যে উচ্চৈঃস্বরে বলিতে লাগিল—‘ঘাতক-হস্তে কারাগারের ভারার্পণ, দুগের সুদৃঢ়ীকরণ এ সকল দেখিয়া আমাদের মনে ভয়ের সঞ্চার হইতেছে।' রাজা প্রজাদিগের এই সকল ধিক্কারে ও ক্রন্দনে কর্ণপাত না করিয়া, অভীষ্টপ্রদেশে গমন 'করিতে লাগিলেন। এই উপেক্ষায় প্রজাদিগের অন্তর্নিগ্- হিত বিদ্রোহানল প্রজ্বলিত হইয়া উঠিল। নাবিক, দোকান দার, ভদ্রলােক—সমস্ত নগরবাসী রাজবিরুদ্ধে অভর্থিত হইল ; সকলেই ঐ পঞ্চ সভ্যকে, ঘিরিয়া দাড়াইল। সক- লেই রাজার সম্মুখেই উচ্চৈঃস্বরে হামডেনের যশােগান করিতে লাগিল। ক্রোধে ও অভিমানে চার্লস ফিরিয়া গেলেন; কিন্তু প্রতিজ্ঞা করিলেন যে, যদি তাহার সাধ্যা- তীত, না হয়, তাহা হইলে হাউস অব কমন্স সভাকে তিনি পদদলিত করিবেন। চার্লসের এ প্রতিজ্ঞা পূর্ণ হইল না। ইহার পরিবর্তে তাঁহাকে অবনত মস্তকে পঞ্চ সভ্যের বিরুদ্ধে অভিযােগ তুলিয়া লইতে হইল ; •এবু রাজবেশে তাঁহাকে আর লণ্ডনে ফিরিয়া আসিতে হইল । তিনি আর এক দিন লণ্ডনে প্রবেশ করিয়াছিলেন প্রাতঃস্মরণীয় চরিতমালা। বটে, কিন্তু সে রাজবেশে নহে, কারাবাসীর বেশে। কম সভার সহিত রাজার বিবাদ শীঘ্র মিটির নহে। এক্ষণে উভয় পক্ষ হইতে বৃথা বাক্যব্যয় পরিত্যক্ত হইল। উভয় পক্ষ বুঝিলেন যে, আর এক সঙ্গে রাজত্ব করা সম্ভব। নহে। রাজা ও পার্লেমেন্ট মিলিত হইয়া আর ইংলণ্ডের শাসন করিতে সক্ষম নহেন। এক্ষণে অন্যতরের কাহার রাজত্ব থাকিবে, প্রবলতরের শক্তি তাহার মীমাংসা করিবে। কম সভা সুতরাং সৈন্য সংগ্রহ আরম্ভ করিলেম । হ্যাডেন্ সর্বাগ্রে সৈনিক-পদে ব্ৰতী হইলেন। তিনি পদাতিক সেনাদলের কর্ণেল পদে অভিষিক্ত হইতে স্বীকৃত হইলেন, এবং যুদ্ধের ব্যয় নির্বাহার্থে স্বয়ং ২৪,০০০ টাকা প্রদান করিলেন। ধন্য হ্যামূডেন্! ধন্য তােমার আত্ম ত্যাগ! ধন্য তােমার স্বদেশানুরাগ! ১৬৪৩ খ্রীষ্টাব্দে জুন মাসে হ্যাম্ডেন্ এক দল ভলন্টি- অর সৈন্য লইয়া কুমার রুপার্টের অনুসরণে যাত্রা করিলেন। ম্যালগ্ৰেত রণক্ষেত্রে তিনি সসৈন্ত কুমারের সম্মুখীন হই- লেন। উভয়ের মধ্যে তুমুল সংগ্রাম বাধিল। যুদ্ধের প্রারম্ভেই একটা গুলি আসিয়া হ্যাডেকে আহত করিল। তাহার সেন এই ঘটনায় ভগ্নহৃদয় হইয়া রণে ভঙ্গ দিয়া পলায়ন করিল। কুমার তাহাদিগের অনুসরণে কিয়দ্র গি। বিফলপ্রযত্ন হইলেন এবং সেতু পার হইয়া অক্সফোর্ডে প্রত্যাবৃত্ত হইলেন। এ দিকে বীরবর হ্যাডে অশ্বপৃষ্ঠে ধীরে ধীরে যুদ্ধ- ক্ষেত্র হইতে অপহৃত হইলেন। তাঁহাৰ হস্ত ক্রমে অংশ ।
হ্যামডেন্। ৩৭ হইয়া অশ্বপৃষ্ঠে লুষ্ঠিত হইতে লাগিল, দেহ ক্ৰমে ক্ষীণ হইতেও ক্ষীণতর হইতে লাগিল। যে অট্টালিকায় তাহার শশুর বাস করিতেন, যে অট্টা- লিকা হইতে তিনি প্রিয়ঙ্গমা ভাৰ্য্যা এলিজেবেথকে বিবাহ করিয়া আনিয়াছিলেন, অদূরে সেই অট্টালিকা দেখা যাই- তেছিল। বড় সাধ, তথায় গিয়া জীবনের শেষ দিন অতিবাহিত করেন, কিন্তু সে সাধ পূরিল না—শত্রুসৈন্ত সেই পথ অবরুদ্ধ করিয়া রাখিয়াছে। তিনি দে অভি- মুখে অশ্ব ফিরাইলেন, তথায় আসিয়া যখন পঁহুছিলেন- তখন তিনি যাতনায় প্রায় বাজ্ঞান:রহিত। দেশের উদ্ধার সাধন করিতে পারিলাম না ভাবিয়া, তঁাহার হৃদয় ফাটিয়া যাইতে লাগিল। কিন্তু সেই মুম্ষু অবস্থাতেও আশা তাঁহাকে পরিত্যাগ করে নাই। তিনি ভাবিলেন-“আমি মরিলাম, তাহাতে দুঃখ কি ? সহস্র সহস্র হ্যান্ডডন্ জীবিত রহিলেন--মায়ের কাৰ্য তাহারাই উদ্ধার করিবেন।” এই আশায় প্রােৎসাহিত হইয়া হ্যামুডেন্ সেই মৃত্যুশয্যায় পত্র লিথিয় বৈপ্লবিক অধিনায়কদিগের নিকটে বিদায় চাহি- লেন ও কিরূপে জাতীয় সমর চালাইতে হইবে, তদ্বিষয়ে তাহাদিগকে উপদেশ দিলেন। পত্র লেখা সমাপ্ত হইল— আর সেই হস্ত নিস্পন্দ হইল! সে দেহে আর চৈতন্য রহিল না। যেন জীবনের কাৰ্য্য সমাপ্ত হওয়ায়, সেই চৈতন্য মূৰ্ত্তি এ পাপ পৃথিবী পরিত্যাগ করিয়া বৈকুণ্ঠধামে গমন করিলেন। চতুর্দিকে গগন বিদারিয়া হাহকার ধ্বনি উঠিল। ইংলণ্ডর আবাল বৃদ্ধ বণিতা হ্যাভেনের শশাকে অভিভূত হইয়া পড়িল।
প্রাতঃস্মরণীয় চরিতমালা।
ইংলণ্ডের অধিবাসিগণ হ্যান্ডকে বীরােচিত সমাধি
প্রদান করিলেন। জাতীয় সৈন্যদল বেয়নেট অবনত
করিয়া তাহার মৃতদেহ সমাধি-নিহিত করিল। প্রত্যেক
সৈনিক পুরুষ হ্যাডেনের উজ্জ্বল দৃষ্টান্তে উদ্দীপিত হইয়া
প্রত্যেকে হ্যাডেনের আত্মাকে সাক্ষী করিয়া মাতৃভূমির
চরণে আত্মসমর্পণ করিল। তাহার পরে, তাহারা ঈশ্বরের
মহিমা ও হ্যামড়েনের যশােগান কীৰ্ত্তন করিতে করিতে
সমাধিস্থল হইতে ফিরিয়া আসিল। ধন্য বীর, ধন্য ! তুমি
মরিয়াও তামরত্ব লাভ করিলে। তুমি মরিলে বটে, কিন্তু
তােমার দৃষ্টান্তে ইংলণ্ডে সহস্র সহস্র হ্যামূডে আবিভূত
হইল। তুমি ভগ্নহৃদয়ে গমন করিলে বটে, কিন্তু তােমার
আরব্ধ কাৰ্য তােমার শিষ্যেরা সম্পন্ন করিল। তুমি এ
যজ্ঞে আত্মবলি না দিলে, কথন এ যজ্ঞ সমাপ্ত হইত না।
যে দুৰ্ম্মদ চাস তােমার কেশম্পৰ্শ করিতে গিয়াছিল, ঐ
দেখ, তাহার কাটামুণ্ড ভূমিতে গড়াগড়ি যাইতেছে। যে
ইংলণ্ডের স্বাধীনতার জন্য তুমি প্রাণ দিয়াছিলে, ঐ দেখ
সেই ইংলণ্ড আজ স্বাধীন, উন্মুক্ত, এবং উজ্জ্বল ও নবাসে
বিভূষিত। আজ সাধারণতন্ত্রী ইংলণ্ডের প্রতাপে মেদিনী
কম্পমান। যে মূর্খ, সেই বলে—মহাপুরুষের মৃত্যু হয় ;
—মহাপুরুষের মৃত্যু নাই। তিনি অমর, তাহার কীর্তি
অনন্তকালস্থায়িনী।
বিশ্বপ্রেমিক উইলবার ফোর্স,
হাউয়ার্ড ও রমিলী।
যে দেশে স্বজাতি-প্রেম ও স্বদেশানুরাগের, কাৰ্য্য পরি-
বিশ্বপ্রেমিক। ৩৯ সমাপ্ত হয়, সেখানে বিশ্বপ্রেম ও বিশ্বনাগরিকতার কাৰ্য আরম্ভ হয়। উন্নতিশীল মন গতিপ্রবণ। সে কোন স্থানেই স্থির হইয়া থাকিতে পারে না। ক্রমেই অগ্রসর হইতে থাকে, এবং অগ্রসর হইতে হইতে ক্রমে কার্যপরিধি বাড়া- ‘ইয়া লয়। আপনা হইতে পরিবার, পরিবার হইতে আত্মীয় স্বজন, আত্মীয় স্বজন হইতে স্বদেশ ও স্বজাতি, স্বদেশ ও স্বজাতি হইতে সমস্ত পৃথিবী ও মানবজাতি, মানবজাতি হইতে প্রাণিজগৎ-ক্রমেই প্রেমের বিষয় হইয়া ভার। হৃদয় প্রশস্ত হইতে ক্রমেই প্রশস্ততর হইয়া এই ক্রম অবল- স্বন করে। প্রাণিজগৎ পর্যন্ত কেবল শাক্যসিংহ প্রভৃতি কতিপয় আর্য ঋষি উঠিয়াছিলেন।-মা হিংসা সৰ্ব্বা ভূতানি।” “সৰ্ব্বভূতেষু সমদর্শী”—ভারত ভিন্ন এ প্রকাণ্ড নীতি আর কোন দেশ শিক্ষা দিতে পারে নাই। কিন্তু মানবজাতির প্রতি প্রেম অনেক দেশ শিক্ষা দিয়াছে। মানবজাতির জন্য অধুনাতন সকল অপেক্ষা ইংলও অধিক করিয়াছেন ও অধিক ভাবিয়াছেন। কারণ, ইংলণ্ডে স্বদেশানুরাগ ও স্বজাতিপ্রেমের প্রধান প্রধান কাৰ্য্য অনেক দিন পরিসমাপ্ত হইয়াছে। ব্যক্তিগত ও জাতিগত স্বাধীনতার পূর্ণতায় ইংলণ্ড জগতের আদর্শ। ইংলণ্ড——ইউরােপ ও আমেরিকার রাজনৈতিক শিক্ষাগুরু। ইংলণ্ড ছাড়িয়া যাইবার পূর্বে তথায় মানবপ্রেম ও জগদমু- রাগের কি কি কাৰ্য্য হইয়াছে, কোন্ কোন্ সন্ন্যাসী সেই মহৎ যজ্ঞে আত্মাহুতি প্রদান করিয়াছেন—এই সকল বিষয়ে কিছু আলােচনা করি। আমরা তিন জন মাত্র সন্ন্যাসীর জীবনী অঙ্কিত করিব। বিশ্বপ্রেমিকের জীবন প্রাতঃস্মরণীয় চরিতমালা। অতি মহৎ। বিশ্বপ্রেমিকের জীবনের ব্রত দেবতার অনু- কবণীয় । যাহাকে সকলে অশ্রদ্ধা বা অবহেলা করে, তাহার জন্য ভাবিব ; যে উৎপীড়িত বুক দিয়া তাহাকে রক্ষা করিব; যাহাকে সকলে নির্যাতন করিতেছে, তাহাকে আশ্রয় দিব । যে কষ্ট পাইতেছে তাহার কষ্ট নিবারণ করিব; যে শােক পাইয়াছে, তাহাকে সান্ত্বনা দিব, তাহার অশ্রুজল মুছাইৰ । যে অসহায়, তাহার সহায় হইব ; যে পড়িয়া যাইতেছে, তাহাকে ধরিয়া তুলিব ; যে দুৰ্বল, তাহার বলবৃদ্ধি করিব : যে জাতি পদদলিত, তাহার পক্ষ সমর্থন করিব -যে মহা- পুরুষ দেশ, জাতি, বর্ণ, ধৰ্ম প্রভৃতি প্রভেদ ভুলিয়া সকলের প্রতি সমভাবে এই সকল কার্য করিতে পারেন, তিনি দেবতার দেবতা। কারণ, স্বজাতিপ্রেমিক আমাদের উপাস্য দেবতা। বিশ্বপ্রেমিক সে দেবতারও দেবতা। যেমন পারি বারিক প্রেম স্বজাতিপ্রেমের একটা ক্ষুদ্র অংশমাত্র, সেইরূপ স্বজাতিপ্রেমও বিশ্বপ্রেমের একটী সামান্য ভগ্নাংশ মাত্র। মানবহৃদয়ের উঠিবার এই তিনটী ক্রম। এক একটীতে সিদ্ধ না হইলে, অপরটীতে উঠিবার অধিকার জন্মে না। ইংলণ্ড স্বজাতিপ্রেমের উৎকর্ষ দেখাইয়াছেন বলিয়াই, তা- হার সেই সর্বোচ্চ ক্ৰমে যাইবার অধিকার জন্মিয়াছে। এই জন্যই ইংলণ্ডকে জগতের শিক্ষা-গুরু বলিয়া মনে করি। এই জন্যই ইংলণ্ডে অনেক বিশ্বপ্রেমিকের আবির্ভাব দেখিতে পাওয়া যায়। আমরা এখানে কেবল তিন জনমাত্র বিশ্ব- প্রেমিকের চরিত্র চিত্রিত করিব-উইলফোর্স, হাউ- য়ার্ড, ও রােমিলী। } উইলবারুফোস। ৪১ উইদারফোস। বহুকাল হইতে জগতে দাসত্বপ্রথা চলিয়া আসিতেছে। সকল দেশেই কোন না কোন প্রকারে এই প্রথার অস্তিত্ব দেখিতে পাওয়া যায়। ইহা লইয়া মধ্যে মধ্যে অনেক আন্দোলন হইয়া গিয়াছে সত্য, কিন্তু প্রকৃত প্রস্তাবে ইহা, তুলিয়া দিবার চেষ্টা কেবল ইংলণ্ড ও আমেরিকাতেই হই- আছে। স্পার্টার হেলট, বােমের গ্লাডিটর, ও আধুনিক নিগ্রো দাসদিগের অবস্থা পর্যালোচনা করিলে, পাষাণও বিগলিত হয়। মানুষ স্বার্থে অন্ধ হইলে, কি পৈশাচী মুর্তি ধারণ করিতে পারে এই দাস-প্রভুগণ তাহার নিদর্শন। ১৪৪০ খ্রীষ্টাব্দে এনথনী গালেজ নামক একজন পর্ট, গিজ কাপ্তেন আফ্রিকার উপকূলে বাণিজ্যার্থ যাইয়া সাহারার প্রবেশপথ হইতে কয়েক জন মূরকে ধরিয়া আনিয়া দাস- রূপে পরিণত করেন। দুই বৎসর পরে যুবরাজ হেী এই সংবাদ শুনিতে পান। তিনি পূর্বোক্ত কাপ্তেকে তৎক্ষণাৎ আদেশ করেন, “উহাদিগকে যথাস্থানে রাখিয়া আইস। কাপ্তেন তাহাদিগকে ফিরিয়া লইয়া যাওয়ায় মূরেরা তাঁহার প্রতি সন্তুষ্ট হইয়া তাহাকে সুবর্ণচূর্ণ ও দশ জন নিগ্রো উপহার দেয়। তিনি তাহাদিগকে লইয়া আসিয়া দাসরূপে পরিণত করেন। এইরূপে নিগ্রো দাসত্বের উৎপত্তি হয়। যখন স্পেনীয়ের প্রতীচ্য দ্বীপ দখল করে, তখন খনি খনন ও কৃষিকাৰ্য করণাদির জন্য তাহাদিগের শ্রমজীবীর প্রয়ােজন হইয়া উঠে। তাহারা দেখিল, আফ্রিকা উপকূল্প, হইতে দাস আনিয়া এই কাৰ্য্য সম্পন্ন করা সৰ্ব্বাপেক্ষা সহজ ও সুলভ। ১৫০০ খ্রীষ্টাব্দে পটু গীজের স্পেনীয় উপনিবেশ ৪২ প্রাতঃস্মরণীয় চরিতমালা। সকলে দাস বিক্রয় করিয়া আইসে। তৎপশ্চাৎ স্পেনীয় বণিকেরা অধিকতর লাভজনক দেখিয়া স্বয়ং এই দাস-ব্যৰ- সায়ে প্রবৃত্ত হয়। সুবর্ণচূর্ণ আনিতে তাহারা পূর্ব হইতেই গিনি উপকূলে যাইত, কিন্তু এক্ষণে সুবর্ণচূর্ণ-ব্যাবসায় তত দূর লাভজনক নহে দেখিয়া, তাহারা অধিকতর লাভকর দাস-ব্যবসায় আরম্ভ করিল। ক্রমে গবর্ণমেন্ট ও আইন দ্বারা ইহার বৈধতা সম্পাদন করিলেন। অনবরত জাহাজে করিয়া বােঝাই হইয়া নিগ্রো দাস সকল আমেরিকায় চালিত হইতে লাগিল। হতভাগ্যগণের অশ্রুজলে অ্যাটলা- ণ্টিক-বক্ষ ভাসিয়া গেল। ১৫১৭ খ্রীষ্টাব্দে সম্রাট, পঞ্চম চার্লস এক ব্যক্তিকে বৎসরে বৎসরে৪ ০ ০ ০ করিয়া নিগ্রো দাস হিস্পানিওয়ালা, কিউবা ও জামেকা, এবং পাের্টরিকোতে লইয়া যাইবার জন্য একচেটিয়া পাট্টা দিলেন। তাহাকে ইহার জন্য পরে অনুতাপানলে দগ্ধ হইতে হইয়াছিল, কিন্তু তাহাতে কিছু ফল ফলে নাই। বীজ বপন করা যত সহজ, সেই বীজ দূরপ্রােথিতমুল বৃক্ষরূপে পরিণত হইলে, তাহা ছেদন করা তত সহজ নহে। ফরাসিরাজ ত্রয়ােদশ লুই ও “ঈশ্বরের মহিমা বিস্তার ও নিগ্রোদিগের মঙ্গলের জন্য দাসত্ব-ব্যবসায় বিধিবদ্ধ করিয়াছিলেন। রাজ্ঞী এলিজে- বেথের সময় ইংরাজেরা সৰ্ব্ব প্রথমে এই ব্যবসায়ে প্রবৃত্ত হন। সাজ হাকিংস সর্ব প্রথম দাসব্যবসায়ী। তিনি এলিজেবেথের নিকটে প্রতিশ্রুত হন যে, যে ব্যক্তি নিগ্রো ট্রাসহইতে আপত্তি করিবে, তিনি তাহার পাত্রস্পর্শ করি- বেন না। কিন্তু তিনি সে প্রতিজ্ঞা রক্ষা করেন নাই। চিরকাল-মধ্যে তিনি অসংখ্য নিগ্রোকে বলপূর্বক জাহাজে দাস-ব্যবসায়ের উৎপত্তি। ৪৩ প্রেরণ করিতে লাগিলেন। অন্যান্য জাতি অর্থ দ্বারা রাজি করিয়া নিগ্রোকে দাস করিয়া লইয়া যাইত, কিন্তু ইংরা- জেরাই সর্ব প্রথমে দস্যুবৃত্তি আরম্ভ করিলেন। বলপূর্বক নিগ্রোদিগকে ধৰিয়া লইয়া যাইবার প্রথায় তাঁহারাই পথ- দর্শক হইলেন। এই প্রথা ক্রমেই অতি ভীষণ আকার ধারণ করিল। ইয়াৰ্টৰংশের রাজ্যকালে প্রতীচ্য দ্বীপপুঞ্জের প্রত্যেক হাটে নিগ্রো দাস পণ্য দ্রব্যের ন্যায় বিক্রীত হইত। শুনিয়া পাঠকগণ বিস্মিত হইবেন যে, ১৭০০ হইতে ১৭৮৬ খ্রীষ্টাব্দের মধ্যে ব্রিটেন্ শুদ্ধ জামেকাদ্বীপ ৬,১০,০০০ দাস প্রেরণ করেন। ১৬৮০ হইতে ১৭৮৬ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত ব্রিটিশ উপনিবেশ সকলে ২১,৩০,০০০ দাস প্রেরিত হয়। ১৭৭১ খ্রীষ্টাব্দে যখন এই জঘন্য ব্যবসায় ইহার চরম সীমায় উপুনীত হয়, সেই বৎসরেই ১৯২ খানি ইংরাজ বাণিজ্যতরি ৪৭,১৪৬ জন নিগ্রো দাস লইয়া আমেরিকায় গমন করে। ১৭৯৩ খ্রীষ্টাব্দের তালিকা গ্রহণ করিয়া দেখিতে পাই, সমস্ত ইউরােপ বৎসরে ৭৪,০০০ হাজার করিয়া নিগ্রোকে দাসত্ব শৃঙ্খলে আবদ্ধ করেন ; তাহার মধ্যে একা ইংরাজ বাহাদুরই ৩৮,০০০ হাজার করিয়া আমদানি করিতেন। যাঁহার হৃদয়ে বিন্দুমাত্র দয়া আছে, যাহার কণামাত্র মনুষত্ব আছে, এমন কোন্ ব্যক্তি এই কথা শুনিয়া লজ্জায় মুখ না লুকাইবেন ? মানবকুলে এমন কোন্ ব্যক্তি আছেন, যাঁহার এই কথা শুনি রা আপনাকে মানুষ বলিয়া পরিচয় দিতে মাথা কাটা পড়িবে ? উপরে যে সংখ্যাবলী প্রদান করিলাম, তা কাহারও কল্পনা নহে, সাম্যবাদিগণের অতিরঞ্জিত চিত্র নহে; দাস-প্রভুগণের প্রদত্ত তালিকা মানবজাতির অক্ষাল-
৪৪
প্রাতঃস্মরণীয় চরিতমালা।
নীয় কলঙ্কের অসন্দিগ্ধ কীর্তিধ্বজা ! ধিক মানব! তােমার
অসাধ্য কিছুই নাই। ধিক ইউরােপ !! শত ধিক তােমায়
ইংলণ্ড !!
ইংলণ্ডের পাপের ভরা পূর্ণ হইল দেখিয়া, কয়েক জুন,
মনীষীর হৃদয় কঁদিয়া উঠিল। শার্প, উইলবার ফোর্স, ব্রঘা
বকষ্ট প্রভৃতি মনীষিগণ স্বদেশের ও স্বজাতির এই গুরুতর
পাপের প্রায়শ্চিত্ত করিবার জন্য কৃতসঙ্কল্প হইলেন। ইহার।
প্রতিজ্ঞা করিলেন যে, যে কোন প্রকারে ইংলণ্ড হইতে
দাসত্বব্যবসায় উঠাইয়া দিয়া ইংলণ্ডকৃত পাপের কথঞ্চিৎ
প্রায়শ্চিত্ত করিবেন। উইলবার ফোর্স এই মনীষিগণের
অধিনায়ক মনােনীত হইলেন। এই কাৰ্য্য সিদ্ধ করিতে এই
মহাপুরুষ আপনার সমস্ত জীবন ব্যয় করিয়াছিলেন। এই
স্থানে আমরা সেই ঋষি-প্রবরের জীবনের গুটি কত ঘটনা
উল্লেখ করিব।
এই মহাত্মা ১৭৫৯ খৃষ্টাব্দে শরৎকালে ইংলণ্ডের অন্তু-
গত হল নগরে জন্মগ্রহণ করেন। দশম বৎসরে পদার্পণ না
করিতেই তাঁহার পিতার পরলােক-প্রাপ্তি হয়।
মৃত্যুর পর তিনি পিতৃব্যের যত্নে লালিত ও পালিত হন।
তিনি কলেজ ছাড়িয়াই একবিংশতি বৎসর বয়সের সময়
হল নগরের প্রতিনিধিরূপে পালেমেণ্টে প্রবিষ্ট হন।
কেন্থি জ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন কালে মন্ত্রিপ্রবর পিটের
সহিত তাহার সখ্য সংস্কাপন হয়। পালেমেণ্ট-কাৰ্য-ক্ষেত্রে
‘আসিয়া তাহাদেব সেই সখ্য দৃঢ়ীভূত হয়।“উইলবাফোর্সের
স্বাভাবিক প্রতিভা নিরন্তর পরিমার্জনে অধিকতর পরিপুষ্ট
ও পরিবর্ধিত হইয়াছিল। তিনি বাগিক বলিয়া বিশেষ
U
ষ্টয়ার্টবংশের রাজত্বকালে ইহার অতৃিবৃদ্ধি। ৪৫ প্রতিপত্তি লাভ করিয়াছিলেন। সুতরাং হাউস্ অব কমন্সে তাহার প্রতিষ্ঠা দিন দিন বাড়িতে লাগিল। তিনি বৈধিক স স্কারকার্যে মন্ত্রিপ্রবর পিটের প্রধান হাবলম্বন হইয়া- ছিলেন। ১৭৮৭ খ্রীষ্টাব্দে দাসব্যবসায়-সম্বন্ধে তাহার চিত্ত আকৃষ্ট হয়। এই সময় হইতে মৃত্যুকাল পর্যন্ত তিনি সন্ন্যাসী। নিজের সুখ, দুঃখ ও সৌভাগ্যে তিনি পূর্ণ উদাসীন ছিলেন। কি নিদ্রায়, কি জাগরণে, কি গৃহে, কি বাহিরে—তাহার মনে এই একই সর্বগ্রাসিনী চিন্তা—কেমন করিয়া ইংল: ণ্ডের অক্ষালনীয় কলঙ্কের অপনয়ন করিবেন, কেমন করিয়া দাস-ব্যবসায় উঠাইয়া দিবেন। তিনি দেখিলেন, দাস-ব্যব- সায় ইংলণ্ডের অমল ধবল যশে গভীর কলঙ্ক-রেখা। তিনি দেখিলেন, এই প্রথা থাকিতে ইংলণ্ডের স্বাধীনতাপ্রিয়তা জগতের পরিহাসােদ্দীপক। অসংখ্য দাসপতি অগণ্য মুদ্রা দিয়া লক্ষ লক্ষ দাস ক্রয় করিয়াছেন, তাহাদের পরিশ্রমে অতুল সম্পত্তির ঈশ্বর হইয়াছেন—এক্ষণে কেমন করিয়া তাহাদিগকে এ লাভকর বাণিজ্য হইতে নিরস্ত করেন। ভাবিয়া ভাবিয়া—নিরন্তর ভাবিয়া, তঁাহার তনু ক্ষীণ হইল। তথাপি তাহার একই সঙ্কল্প। কিরূপে ইহা সংসিদ্ধ করিবেন —তাহা জানেন না, অথচ এই লক্ষ্য সংসাধনৈ তিনি নিজ জীবন উৎসর্গ করিলেন। অবিচলিত, সুদৃঢ় ও একাগ্র চিত্তে তিনি এই কঠোর তপস্যায় নিমগ্ন হইলেন। সেই বহুকাল- ব্যাপী তপস্যায় তিনি যে ধৈৰ্য্য, সূক্ষ্মদর্শিতা ও সৎসাহস; প্রকটিত করিয়াছিলেন, তাহাতে ইংলণ্ড বিস্মিত ও মুগ্ধ হইয়াছিলেন। ১৭৮৯ খৃষ্টাব্দে তিনি সর্বপ্রথমে পার্লেমেন্টে ৪৬ প্রাতঃস্মরণীয় চরিতমালা। এই প্রস্তাব অবতারণ করেন। তিনি প্রতিবার প্রস্তাব করিতেছেন, প্রতিবার তাঁহার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হইতেছে। কিন্তু সেই নিঃস্বার্থ বিশ্বপ্রেমিক কিছুতেই ভীত বা বিচলিত হইবার নহেন। প্রােত্যুঙ্গ হিমাচলের ন্যায় তিনি অটলভাবে সমস্ত আপত্তি-ঝটিকা সহিতে লাগিলেন। বৎসর বৎসর তাঁহার প্রস্তাব উন্মত্ত-প্রলাপ বলিয়া প্রত্যাখ্যাত হইতে লাগিল। অথচ সে যােগীর ধ্যানভঙ্গ হইল না। সাগর- গামিনী স্রোতস্বিনী গতির ন্যায় অভিলষিত বিষয়ে কৃত সঙ্কল্প মনের গতিকে কে বােধ করিতে পারে ? এক এক করিয়া ক্রমে বিশ বৎসর অতীত হইল। এ ঘোর তপস্যা পার্লেমেন্ট আর সহিতে পারিলেন না। এই তপসানলে ক্রমে পাষাণ গলিয়া জল হইল। যে নয়ন এত দিন শুষ্ক ছিল,আজ তাহা হইতে অবিরল বারিধারা পড়িতে লাগিল। উইলবারফোর্স কঁদিয়া কাদিয়া—অবিরাম কাদিয়া-শেষে পালামেন্টকেও কাদাইলেন। এতদিনে পালমেন্টের চৈতন্য হইল, তঁাহারা কি কুকাজ করিয়া আসিয়াছেন। দাস-ব্যব- সায়ের অনুমােদন করিয়া তাহারা কি দুরপনেয় কলঙ্কের অংশভাগী হইয়া আসিয়াছেন। আজ তাঁহাদের পাপ তাহারা বুঝিতে পারিয়াছিলেন, বুঝিয়া তাহার উপযুক্ত প্রায়শ্চিত্ত করিতেকৃতসঙ্কল্প হইলেন। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে যত দাস ছিল, পার্লেমেন্ট দাসপ্রভুদিগের নিকটে সমস্ত কিনিয়া লইয়া, তাহাদিগকে পূর্ণ মুক্তি দিলেন , আর ভবিষ্যতের জন্য বিধান করিলেন, যে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে আর কেহ কখন দাস ক্রয় করিতে পারিবে না। যেমন পাপ, তেমনই প্রায়শ্চিত্ত! প্রায়শ্চিত্ত জগৎ বিমুগ্ধ হইল। জাতীয় আত্ম- জন হাউয়ার্ড। ৪৭ ত্যাগের এরূপ দৃষ্টান্ত জগতে আর কখন দেখা যায় নাই। এক উইলবাফোর্সের আত্মত্যাগের দৃষ্টান্তে সমস্ত ইংলও আত্ম-বিসর্জন শিথিল। একজনের কঠোর তপস্যায় সমস্ত পার্লেমেন্ট সভা সন্ন্যাসি-সমিতিতে পরিণত হইল। যে জাতি এক টাকা ছাড়িতে কাতর ছিলেন, সে জাতি আজ কোটা কোটী টাকা অকাতরে বিসৰ্জন করিলেন ; কোটী কোটা টাকা দিয়া দাসপ্রভুগণের নিকট দাসগণের স্বাধীনতা ক্রর করিলেন। যে জাতি একদিন ঈশ্বরের মূর্তিমতী প্রকৃতি মানব আকৃতি লইয়া বাণিজ্যধ্বজা উড়াইয়াছিলেন, এই মহাপুরুষের চরিত্র-গৌরবে সেই জাতির রণতরী সকল পৃখিবী হইতে দাস-ব্যবসায় উঠাইবার জন্য আজও সপ সমুদ্র আলােড়ন করিয়া বেড়াইতেছে। ধন্য উইলবারূফোর্স। ধন্য তােমার জীবন! কত দিন হইল তুমি পৃথিবী ত্যাগ করিয়া * বৈকুণ্ঠ ধামে গমন করিয়াছ, কিন্তু তােমার জীবন্ত বিশ্বপ্রেম আজও প্রতি ইংরাজকে দেবতা করিয়া রাখিয়াছে। D জন্ হাউয়ার্ড। আর একজন সন্ন্যাসীর জীবনী ধরি। চল, একবার অষ্টাদশ শতাব্দীর ইউরােপীয় কারাগারের অভ্যন্তরে যাই- যথায় যমসদৃশ,জেলারের কশা হন্তে হতভাগা এবং হত- ভাগিনীর দলকে তাড়াইয়া লইয়া বেড়াইতেছে, কোন কাজ করিতে একটু বিলম্ব হইলে তৎক্ষণাৎ কশাঘাতে তাহাদিগের পৃষ্ঠদেশ ক্ষতবিক্ষত করিতেছে, সমস্ত দিন কঠিন পরিশ্রম * ১৮৩৩ খ্রীষ্টাব্দের ২৭শে জুলাই এই মহাপুরুষের মৃত্যু হয়।
৪৮ প্রাতঃস্মরণীয় চরিতমালা। করাইয়া অনশনে বা অর্ধাশন তাহাদিগকে পশুপালের ন্যায় পবনদেবসম্পর্ক-বিরহিত ভীষণ অন্ধকারাগারে পূরিয়া চাবি দিতেছে। তথায় দাড়াইল্লা হতভাগা ও হতভাগিনীদিগের দুঃখে যিনি নীরবে অশ্রুবিসর্জন করিতেছেন ঐ মহাপুরুষ কে? যিনি কুষ্ঠরােগাক্রান্ত রােগীদিগের রুগ্নশষ্যার পার্শে দাড়াইয়া অম্লানবদনে তাহাদিগের শুশ্রুষা করিতেছেন, ঐ দেবতা কে ? উনিই প্রাতস্মরণীয়-চরিত জন্ হাউয়ার্ড। সেই অভাগা ও অভাগিনীগণের দুঃখ-কাহিনী ইনিই মুক্ত- কণ্ঠে জগতে প্রচার করেন। যখন সমস্ত পৃথিবী অপরাধী ও অপরাধিনীগণের দুঃখ-যন্ত্রণায় সম্পূর্ণ উদাসীন ছিল; সেই সময়ে তাহাদের অবস্থা ভাবিয়া হাউয়ার্ডের প্রাণ দিল। যাহাদিগকে পৃথিবী পরিত্যাগ করিয়াছে, বিস্মৃতিজলে বিস ৰ্জন দিয়াছে, সেই অভাগা ও আগিনীগণের প্রতি হাউ , য়ার্ডের হৃদয় প্রেমবিগলিত ভাব ধারণ করিল। কারাবাসীকে দেখিলে লােকের মনে ঘৃণার উদ্রেক হইত, কিন্তু তাহাদের দুঃখে তাহাদের হতাশাপীড়িত অবস্থায়,তাহার হৃদয় নিদারুণ ব্যথিত হইত। তিনি প্রতি কারাগারে তাহাদিগের অবস্থা দেখিয়া বেড়াইতেন। শুদ্ধ ইংলণ্ড নয়, সমস্ত ইউরােপ তঁাহার কার্যক্ষেত্র ছিল। তিনি ইউরােপের সমস্ত কারা- গার পরিদর্শন করিয়া বিভিন্ন দেশের কারাবাসীদিগের অবস্থা তুলনায় সমালােচনা করিতেন। কারাগারের প্রস্তর- ময় প্রাচীর ভেদ করিয়া যে দুঃখের কাহিনী বাহিরে যাইত না, হাউয়ার্ড আজ সেই দুঃখের কাহিনী জগতে গাইয়া বেড়াইতে লাগিলেন। অনাহারে, কশাঘাতে, কত শত নর নারী, কারাগারের অভ্যন্তরে সমাধিনিহিত হইত, পৃথিবী
কারা-সংশােধন।
৪
তাহার সংবাদ রাখিত না ; আজ হাউয়ার্ড সে সকল গুপ্ত
হত্যার সংবাদ জগতে প্রচার করিয়া বেড়াইতে লাগিলেন।
কারাগারের তমােময় নিভৃত নিশ্বাসে কত লোেক মলমূত্রে
পচিয়া মরিয়া থাকিত, জগৎ তাহার সন্ধান রাখিত না
জাজ হাউয়ার্ড সেই সকল শশাচনীয় ঘটনা জগতে প্রচার
করিয়া বেড়াইতে লাগিলেন। কালে তাহার প্রচারের ফল
সকল দেশেই ফলিতে লাগিল। ইউরােপের সকল কারা-
বাসীই তাঁহার পরিশ্রমের উপকার কিছু কিছু পরিমাণে
পাইতে লাগিল। এখন যে ইউরােপের সর্বত্র বায়ু-সঞ্চা-
লিত, সুপ্রশস্ত, সুপরিস্কৃত, সুসজ্জিত, বিলাসদ্রব্যপূর্ণ কারা-
গার সকল দেখিতে পাওয়া যায়, তাহা এই মহাপুরুষের
কীর্তির জ্বলন্ত প্রমাণ।
১৭২৬ খ্রীষ্টাব্দে জন্ হাউয়ার্ড ইংলণ্ডের অন্তর্গত হানে
নগরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁহার পিতা এক জন ব্যবসায়ী
লােক ছিলেন, এবং ব্যবসায় দ্বারা যথেষ্ট সম্পত্তি করিয়া-
ছিলেন। তিনি পুত্রকেও ব্যবসায় শিখাইবার জন্য এক
কারখানায় শিক্ষানবীশ রাখিলেন। সেই সময়েই তাঁহার
মৃত্যু হইল। মৃত্যুকালে তাহার বিপুল সম্পত্তি তিনি উইল
দ্বারা আপনার পুত্র ও কন্যাকে দিয়া গেলেন; কিন্তু বন্দো-
বস্ত করিয়া গেলেন যে, পুত্রের ২৫ বৎসর বয়স না হইলে,
তিনি প্রাপ্তবয়স্ক বলিয়া বিবেচিত হইবেন না। পিতার,
মৃত্যুর পরে হাউয়ার্ড শিক্ষা-নবীশি ছাড়িয়া দিলেন। কারণ,
ব্যবসায় তাহার ভাল লাগিল না। ছাড়িয়া দিয়া তিনি
ষ্টোক নিউইংটন নগৱের ক্রাইষ্ট স্ট্রীটে একটা বাসা লইলেন
তাহার শরীর এ সময়ে বড় অসুস্থ ছিল। সারা লাভে
প্রাতঃস্মরণীয় চরিতমালা। নামক এক প্রবীণ বিধবা রমণী সেই বাসাবাড়ীর অধি- স্বামিনী ছিলেন। স্তিনি প্রাণপণে হাউয়ার্ডের শুশ্রষা ক রিতে লাগিলেন। হাউয়ার্ড অচিরকাল মধ্যে নিরাময় হইয়া উঠিলেন। তিনি কৃতজ্ঞতার চিহ্নস্বরূপ তাহার পাণিগ্রহণে ইচ্ছুক হইলেন। বিধবা রমণী তাহা অপেক্ষা প্রায় ২৪ | ২৫ বৎসরের বড়। এই জন্য তিনি অনেক আপত্তি করিলেন। কিন্তু হাউয়ার্ড সে আপত্তি গ্ৰাহ করিলেন না। প্রবীণ রমণী তাহার আগ্রহাতিশয়ে শেষে অগত্যা সম্মত হইলেন। হাউ- য়ার্ড লােকের নির্যাতন ভয়ে গােপনে তাঁহাকে বিবাহ করিলেন : ১৭৫২ খৃষ্টাব্দে এই বিবাহ হয়। কিন্তু তিনি অধিক দিন এই পতিপরায়ণা রমণীর গু শ্রুষা ভােগ করিতে পারেন নাই। কারণ, তিন বত্সরের মধ্যেই তিনি বিপত্নীক হন। ১৭৫৫ খ্রীষ্টাব্দের ১০ই নবেম্বর চুয়ান্ন বৎসর বয়সে, তাঁহার পত্নীর মৃত্যু হয়। তাঁহারা এই তিন বৎসর অতি সুখে কাটাইয়াছিলেন। পত্নীর মৃত্যুতে হাউয়ার্ড অতিশয় শােকাকুল হইলেন। পর বৎসরে (১৭৫৬ খ্রঃ) তিনি এক খানি পর্ট গীজ জাহাজে করিয়া লিসবনে যাইতেছিলেন। এক খান ফরাসি জাহাজ পথিমধ্যে তাহাদিগকে গ্রেপ্তার করিল। ফরাসি কারাগারের দুর্বিষহ যন্ত্রণা নিজে অনুভব করিয়া তিনি কারাগার-সংস্কারে জীবন উৎসর্গ করিতে কৃতসঙ্কল্প হইলেন। দুই দিন নিরন্থ উপবাসী অবস্থায় তাহারা ফ্রান্সের অন্যতম বন্দর ব্রেষ্ট নগরের দুর্গে নীত হইলেন। সেখানে তিনি ছয় রাত্রি শুদ্ধ খড়ের উপরে পড়িয়া রহিলেন। তথাকার মর্টে- কল, কার্টেস, ব্রেন্ট, মালেক্স ও ডুইনাইন প্রভৃতি নগরের ১
হাউয়ার্ড ফুলে বন্দী।
কারাগারে অনেক ইংরাজ বনী ছিল। তাহাদিগের সহিত
তাঁহার লেখালিখি চলিতে লাগিল। তিনি বিবিধ প্রমাণ
পাইলেন যে, ইংরাজ বন্দীদিগের প্রতি ফরাসীরা অতি
নৃশংস ব্যবহার করিয়া থাকেন। এই নৃশংস ব্যবহারে কত
শত ইংরাজ বন্দী শমন-সদনে প্রেরিত হইয়াছে। পাঠক।
এই বলিলেই মৃত্যুসংখ্যা অনুমান করিতে পারিবেন যে,
ডুইনানে একটী গর্তে এক দিনে ছত্রিশ জন ইংরাজ বন্দীকে
জীবন্ত প্রােথিত করা হয়। হাউয়াডের কোমল হৃদয়
ইহাতে বিগলিত হইল। তিনি ইংলণ্ডে আসিয়া এই সকল
কথা জানাইলে, ব্রিটিশ গবর্ণমেন্ট ফরাসী গবর্ণমেন্টকে
ভৎসনা করিয়া চিঠি লিখিলেন। তাহাতে ফরাসী গবর্ণমেন্ট
লজ্জিত হইয়া অবশিষ্ট ইংরা বন্দীদিগকে ছাড়িয়া দিলেন।
তাহার পরে তিনি ইতালীর কারাগার সকল পরিদর্শন
করিতে ইতালী যাত্রা করিলেন। ইতালী হইতে প্রত্যাগত
হইয়া তিনি আবার বিবাহ করিলেন। এই রমণী একটি পুত্র
সন্তান প্রসব করিয়া সূতিকাগারেই প্রাণত্যাগ করিলেন।
সন্তানটাও কালে উন্মাদ-রােগগ্রস্ত হইল। হাউয়ার্ড ভগ্নমনে
ইংলণ্ডের অন্তঃপাতী বেডফোর্ড নগরের অদূরবর্তী নিজ
জমীদারীতে গমন করিলেন। এইখানেই হার জীবনের
মাহাত্ম্য বিশেষরূপে প্রচারিত হয়।
১৭৭৩ খৃষ্টাব্দে তিনি বেডফোর্ড কাউন্টির সেরিফপদে
অভিষিক্ত হন। বেডফোর্ডের কারাগার সকল ও কারাবাসি-
গণের অবস্থা তাহার চিত্তকে আকৃষ্ট করে। তাহার প্রথমে
বােধ হইয়াছিল যে, বেডফোর্ডের কারাগার সকলের মত
জঘন্য ও নৃশংসতার আবাসভূমি কারাগার বুঝি ব্রিটনে আর
০ ৫২ প্রাতঃস্মরণীয় চরিতমালা। কুত্রাপি নাই। এই বিষয়ে নিঃসন্দিগ্ধ হইবার জন্য তিনি ইংলণ্ড, স্কটলগু ও আয়লণ্ডের কারাগার সকল পরিদর্শন করিয়া বেড়াইলেন। যতই অনুসন্ধান করিতে লাগিলেন, ততই মৰ্ম্মভেদী ঘটনা সকল বিদিত হইতে লাগিলেন। তিনি স্বচক্ষে দেখিলেন,সুতরাং তাহার প্রতীতি জন্মিল যে, ব্রিটনের কারাগার সকল নিলজ্জতার গহ্বর ও পাপের অগ্নিকুণ্ড। যাহারা কারাগারে যায়, শুদ্ধ তাহাদিগেরই শরীর ও নীতি সে কলুষিত হয়, এরূপ মহে; কিন্তু তাহারা বাহির হইয়া আসিয়া সমাজমধ্যে সেই শারীরিক ও নৈতিক পীড়া সংক্রামিত করে। হাউয়ার্ড পালে মেন্টকে এই বিষয় বি- দিত করিলেন। পার্লেমেন্ট তাঁহার স্বাক্ষ্য গ্রহণ করিয়া, 'তাহাকে ধন্যবাদ দিলেন। এই সকল কারাগারে তৎকালে একপ্রকার সংক্রামক জ্বরের অতিশয় প্রাদুর্ভাব ছিল। ইহাকে কারা-জ্বর বলিত। ঘাতকের হস্তে যত কারাবাসী না মরিত, এই জ্বরের হস্তে তাহা অপেক্ষাও অনেক অধিক কারাবাসী মরিত। শুদ্ধ কারাবাসী নয়—জজ, মাজিষ্ট্রেট, জুরী, স্বাক্ষী ও জেল- জানােগা—যাহারা কাৰ্য্যগতিকে কারাবাসীর নিকটবর্তী হইতেন, তাঁহারাও এই সংক্রামক জ্বরে আক্রান্ত হইয়া অকালে কালকবলে পতিত হইতেন। তিনি আরও 'দেখি- লেন—দাওয়ানী ও ফৌজদারী জেল একত্র মিশিয়া আছে। অপরাধী ও ঋণী একপ্রকার শাসনের অধীনে রহিয়াছে ; দেখিলেন, যাহারা আপীলে খালাস পাইয়াছে,তাহারা ফিজ “দিতে না পারায়, এখনও কারাগারে রহিয়াছে। এই সমস্ত দেখিয়া তাহার দৃঢ় বিশ্বাস জন্মিল যে,-“এই কারাগার
কারা-সংস্কার।
সকল সংশােধনাগার’ না হইয়া পাপাগার হইয়া পড়িয়াছে;
এই সকল হইতে সমাজের যেরূপ ভীষণ অনিষ্ট হইতেছে,
এমন আর কিছু হইতেই নয় ; একজন লােক কারাগারে
যাইবার সময়ে যে পরিমিত পাপ লইয়া যায় ফিরিয়া আসি-
বার সময়ে তাহার শতগুণ পাপ লইয়া
ইয়া আইসে ; সুতরাং
বর্তমান কারাগার সকল হইতে সমাজের যে পরিমাণে ইষ্ট
হইতেছে,তাহার শত গুণ অনিষ্ট হইতেছে।”
এই হতভাগ্যগণের দুঃখে হাউয়ার্ডের হৃদয় ফাটিয়া
গেল। তাহার সমস্ত মানসিক শক্তি, তাহার সমস্ত সম্পত্তি,
এবং তাঁহার পদের সমস্ত প্রভাব, তিনি এই হতভাগ্য,
দিগের দুঃগাপনােদনে ব্যয়িত করিতে একান্ত কৃতসঙ্কল্প
হইলেন। আহার নাই, নিদ্রা নাই, বিশ্রাম নাই—যােগী
হাউয়াড নিরন্তর এই কার্যে নিযুক্ত। তাহার উদ্দীপনায়
গৰৰ্ণমেন্টও উত্তেজিত হইলেন। তাহার হন্তে গবর্ণমেন্ট
কারা-সংস্কারের ভার অর্পণ করিলেন। তাহার অভীষ্ট
কিয়ৎপরিমাণে সুসিদ্ধ হইল। তাহার তত্ত্বাবধানে অনেক
গুলি কারাগার ভাঙ্গিয়া মূতন প্রণালীতে গঠিত হইল।
অনেকগুলিতে কাবাবাসিগণের আহারের সুব্যবস্থা করা
হইল। প্রত্যেক ক্ষুদ্র কুঠরীতে বাইবেল রাখা হইল। কারা-
বাসিগণের ধর্মবুদ্ধি পরিপুষ্ট করিবার জন্য প্রতি কারাগারে
এক এক জন করিয়া ধৰ্ম্মাজক নিযুক্ত করা হইল।
দেশে কৃতকাৰ্যতা লাভ করিয়া উৎসাহিত হইয়া হাউ
য়াডসমস্ত ইউরােপের কারাগার পরিদর্শন করিতে কৃত
সংকল্প হইলেন। এই উদ্দেশে হাউয়াড ফ্রান্স, ফুণ্ডার্স,
হলাণ্ড, জার্মণী, সুইজলও, সিয়া, অষ্টিয়া, ডেনমার্ক,
৫৪ প্রাতঃস্মরণীয় চরিতমালা। সুইডেন, রুসিয়া, পােণ্ড, স্পেন ও পটুগেল—ক্রমে এই সমস্ত দেশ প্রদক্ষিণ করিলেন। পূৰ্ব্বে ইতালী দেখিয়া আসিয়াছিলেন,সুতরাং এবার আর ইতালীতে যাইলেন না। পাঠক!আজ কাল ইউরােপের চতুর্দিকে যেরূপ লৌহ- বত্ম নির্মিত হইয়াছে, ভাবিবেন না যে, তখনও সেইরূপ ছিল। ইউরােপের এ সকল উন্নতি বর্তমান শতাব্দীতে ঘটিয়াছে মাত্র। সুতরাং সেই ঘাের যােগী হাউয়াড়কে পাদনে বা নৌযানে এই প্রকাণ্ড ইউরােপ ভূমি প্রদক্ষিণ করিতে হইয়াছিল। ইহাতে তিনি ধনে প্রাণে গিয়াছিলেন বলিলেও অত্যুক্তি হয় না ! প্রকৃতির শােভা বৈচিত্র্য দর্শন বা রাজপ্রাসাদের প্রসাদভােগকরিতে তিনি যান নাই যে, তাহার দেহ ও মন পুলকিত হইবে। কারাগারের পূতিগন্ধ-- বিশিষ্ট দুপ্রেবেশ্য স্থান সকল তাহার একমাত্র তীর্থস্থল ছিল। সেই সকল তীর্থস্থলে চোর, ডাকাত, বদমায়েস তাহার একমাত্র সতীর্থ ছিল। তিনি তাহাদিগকে কখন অর্থ দিয়া, কখন উপদেশ দিয়া, কখন বা শুদ্ধ মিষ্ট কথা বলিয়া তাহাদিগের কষ্ট কথঞ্চিৎ দূর করিতে চেষ্টা করি- তেন। এই অনন্ত বিশ্ব সেই বিশ্বপ্রেমিকের গৃহ ছিল। তিনি সকল স্থলেই আত্মনির্বিশেষে সকলকে ভাল বাসিতে পারিতেন। বিশেষতঃ যে সকল কারাবাসিগণের দুঃখ কেহ জানিত না, কেহ শুনি না, তিনি পুত্রনির্বিশেষে তাহাদিগকে ভালবাসিতেন। তার সময় ও সম্পত্তি তিনি তাহাদিগের কাৰ্য্যে উৎসর্গ করিয়া দিয়াছিলেন। তাঁহার অতুল সম্পত্তি এই কার্যে ব্যয় করিয়া তিনি ভিখারী হইয়া- ছিলেন, তথাপি এক দিনও ধ্বলিত হন নাই। ।
হাউয়ার্ড ফ্রান্সে বন্দী।
তাঁহার হৃদয় ইহাতেও পরিতৃপ্ত হইল না তিনি দেখি-
লেন, কারাবাসিগণের ন্যায় গতি-কুষ্টয়ােগাক্রান্ত ব্যক্তি-
গণের সংবাদ পৃথিবী লয় না। তাহারা চিকিৎসালয়ের
দূষিত বায়ুতে যে জীবন্ত সমাধিনিহিত হইতেছে, পৃথিবী
সে দিকে হৃক্ষেপও করে না। কিন্তু যাহাদিগের দিকে
তাকাইবার কেহ নাই, যাহাদিগের দুঃখকাহিনী শুনিবাব
কেহ নাই, হাউয়ার্ডের দৃষ্টি ও শ্রুতি তাহাদিগের দিকেই
ধাবিত হইত। তিনি ইংলণ্ড, ফ্রান্স, ইতালী—অধিক কি
সুদূর স্মার্ণা ও কনেষ্টান্টিনােপল-পৰ্য্যন্ত এই উদ্দেশে
ভ্ৰমণ করিয়া বেড়াইলেন। কুষ্ঠরােগের অব্যর্থ ঔষধ সঙ্গে
লইয়া দিজে রােগীদিগকে খাওয়াইতে লাগিলেন; রােগীর
রুগ্নশষ্যার পার্শ্বে বসিয়া তাহার শুশ্রুষা ও সান্তনা করিতে
লাগিলেন। কুষ্ঠরােগীর রুগ্নাশয়ের দূষিত বায়ুর অবিরাম
অনুসেবনে তিনি কনেষ্টান্টিনোেপলে সংক্রামক জরাক্রান্ত
হইলেন। এবার অতি কষ্টে তাহার প্রাণরক্ষা হইল। তিনি
অনেক দিন পরে ইংলণ্ডে প্রত্যাগম্ভ হইয়া, দেখিয়া আহলা-
দিত হইলেন যে, তঁাহার কারাগার-সংস্কার-বিষয়ক প্রস্তাব
সকল প্রায়ই কার্যে পরিণত হইয়াছে। তিনি ইংলণ্ডে
আসিয়া আপনার পরিদর্শনের ফল পুস্তকারে মুদ্রিত করি-
লেন। তাহা পাঠ করিয়া পাষাণও বিগলিত হইল।
কুষ্ঠরােগের দূষিত বায়ুর অনুসেবনে একবার প্রাণ
হাসাইতে হারাইতে রহিয়া গিয়াও হাউয়ার্ডের চৈতন্য,
হইল না, অথবা কেন হইবে? পরহিতব্রতে উৎসগীকৃত
প্রাণ কোন্ মহাপুরুষ কবে মৃত্যুতয়ে কর্তব্যের অনুষ্ঠান
হইতে পরখ হইয়াছেন ? হাউয়ার্ড ১৭৮৯ খ্ৰীষ্টাব্দে
প্রাতঃস্মরণীয় চরিতমালা। আবার ইংলণ্ড পরিত্যাগ করিয়া প্রাচ্য দেশাভিমুখে গমন করিলেন। সন্ন্যাসী কৃষ্ণসাগরতীরবর্তী জসীয় নগরী আসনে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। কিন্তু এবার তাহার জীবনের দিন সংক্ষিপ্ত হইয়া আসিয়াছিল। অর্ধাশনে বা অনিয়মি- তাশনে নিরন্তর পর্যটনে তাহার শরীর ভগ্নপ্রায় হইয়া গিয়াছিল ; সুতরাং এখানকার কুষ্ঠাশ্ৰয় সকল পরিদর্শন করিতে করিতে তিনি সহসা জ্বরাক্রান্ত হইলেন। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সেই দুরন্ত ব্যাধি তাহাকে এ পৃথিবী হইতে লইয়া গেল। তথায় একজন ফরাসী ভদ্রলােক তাহার অতিশয় যত্ন করিয়াছিলেন। হাউয়ার্ডের ইচ্ছানুসারে সেই ফরাসী ভদ্রলােকের উদ্যানে তাহার দেহ সমাধিনিহিত করা হইল। নরদেহ মাটীর জিনিষ ; মাটীতে মিশিয়া গেল। কিন্তু কীর্তি অমর, সুতরাং হাউয়ার্ডের কীর্তি অনন্তকাল রহিয়া গেল। কে জানিত যে, আজ এই সুদুর অনুগাঙ্গ প্রদেশের নির্জন কুটীরে বসিয়া এই ভারত-যুবক সেই মহাপুরুষের যশােগান করিবে ? কে জানিত—আজ সেই দেব হাউয়ার্ডের প্রেতদেহের উদ্দেশে এই ভারত-যুবকের নয়ন বহিয়া অশ্রুধারা পতিত হইবে? কোথায় তিনি, আর কোথায় আমি ? তথাপি কেন আজ আমি তাহাকে সম্মুখে দেখিতেছি ? কে বলে, হাউয়ার্ড মরিয়াছেন ? না—তিনি মরেন নাই। যিনি অসংখ্য প্রাণের রক্ষার জন্য নিজের প্রাণ- বলি দেন, তিনি কখনই মরেন না। সা সামুয়েল রােমিলীল আমরা এখানে ইংলণ্ডের আর এক জন মহাপুরুষের নাম উল্লেখ করিব। তাহার নাম সার, সামুয়েল, রােমিলী।
সার সামুয়েল, রােমিলী। ৫৭
যে ইংরাজ জাতি আজ জগতের সভ্যতম জাতি বলিয়া
অভিমান করিয়া থাকেন, উনবিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভ পৰ্য্যন্ত
তাঁহাদিগের দণ্ডবিধি এরূপ নৃশংস ছিল যে, তাহাদিগকে
যে ভারতবাসীরা রাক্ষস বলিত, তাহা নিতান্ত ' নিরর্থক
বলিয়া প্রতীত হয় না। ভারতবর্ষে তাহাদিগে। সেই
রাক্ষসাচারের জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত মহারাজ নন্দকুমারের ফশি।
তৎকালিক ব্রিটিশ দণ্ডবিধির সাদ্ধ’শত ধারায় প্রাণদণ্ডের
ব্যবস্থা ছিল। দুগ্ধপােষ্য শিশুও এই ভীষণ দণ্ডবিধির হস্ত
হইতে মুক্ত হইতে পারিত না। চঞ্চলমতি বালক কাহারও
একটা ফুল ছিড়িলেও,কারাগারে প্রেরিত হইত। ফাশিকাছ
সৰ্ব্বদাই সজ্জিত থাকিত। রবিবার ভিন্ন এমন বার ছিল না,
যে বারে কোন না কোন লােকের ফঁশি না হইত।
সােমবার অতি প্রশস্ত বলিয়া বিবেচিত হইত। কারণ,
খাহার প্রাণদণ্ডাজ্ঞা হইত, দয়া করিয়া তাহাকে মৃত্যুর জন্য
প্রস্তুত হইবার নিমিত্ত এক দিন সময় দেওয়া হইত। শুক্র
বারে বিচাব হইয়া তাহার প্রাণদণ্ডাজ্ঞা হইলে, অভাগা শনি
রবি দুই দিনের সময় পাইত। কারণ, রবিবার নিষিদ্ধ দিন।
এই জন্য সাধারণতঃ শুক্রবার বিচার ও সােমবার ফাঁশি
ইংরাজ জজ কেবল ফশিতেই সন্তুষ্ট হইতেন, এরূপ
নহে। কখন কখন দণ্ডিতকে অশ্বপদে বাঁধিয়া অশ্ব ছাড়িয়া
দিতে বলিতেন। অশ্ব ক্রমাগত দৌড়িতে থাকিত,এবং সেই
সঙ্গে সঙ্গে দণ্ডিতের দেহ ছিন্ন ভিন্ন হইয়া যাইত। কখন
কখন তাহার শিরচ্ছেদনের আদেশ হইত। কখন বা তাহার
প্রত্যঙ্গ সকল কাটিয়া দিবার,এবং কন বা তাহাকে জীবিত
প্রাতঃস্মরণীয় চরিতমালা। দগ্ধ-করণের আদেশ প্রদান করা হইত। তাহা অপেক্ষাও ভয়ঙ্কর শাস্তি ছিল—জীবিত মনুষ্যের পেট চিরিয়া নাড়ী ভুড়ি বাহির করিয়া লওয়া হইত। কখন বা তাহাকে টি- টিকিতে চড়াইয়া পাথর ছুড়তে ছুড়িতে তাহার প্রাণ, বাহির করিয়া ফেলা হইত। কখন বা তাহাকে বেহ মারিতে মারিতে “নিউগেট” হইতে “টাইবরণে” লইয়া যাওয়া হইত, এবং “টাইবরণ” হইতে “নিউগেটে ফিরা- ইয়া আনা হইত। ফিকি দিয়া রক্ত ছিটিয়া পড়িয়া সকলের গা ভাসিয়া যাইত, তথাপি বিচারকদিগের মনে দয়ার উদ্রেক হইত না। এই যাতায়াতেই অনেক দণ্ডিতের প্রাণ- বিয়ােগ হইত। রাক্ষস রাজার রাক্ষস বিচারক, এব রাক্ষস বিচারকের রাক্ষসী শাস্তি! ইংরাজ যে আজ কাল কথঞ্চিৎ সভ্য হইয়াছেন, সে সার সামুয়েল রােমিলীর প্রাণোৎসর্গে। পূৰ্ব্ব অসভ্যতার চিহ্ন স্বরূপ ফঁশি ও বেত্রাঘাত ইংরাজ দণ্ডবিধিকে আজও দূষিত করিয়া রাখিয়াছে। ইংরাজ দণ্ডবিধির এই ঘাের নৃশংসতা- কলঙ্ক আপনােদন করিবার জন্যই যেন সা সামুয়েল রােমি লীর জন্ম হয়। তিনি তাঁহার অতি পরিমার্জিত মন ও অত্যুদার হৃদয়কে এই মহৎব্রত সাধনে আজীবন নিযুক্ত রাখিয়াছিলেন। বাল্যকাল হইতেই তাহার অন্তরে নিষ্ঠুর তার প্রতি বলবতী ঘৃণা পরিদৃষ্ট হইয়াছিল। তঁাহার নিজের কথায় আমরা তাঁহার মনের ভাব ব্যক্ত করিব। “নরহত্যা বা অন্য কোন নৃশংস কার্যের বিবরণ পাঠ করিলে আমার হৃদয়ে ভয়ানক ভাবের আবির্ভাব হইত। নিউগেট কারা- গারে যে সকল উৎসৃষ্টপ্রাণ ব্যক্তিগণকে জীবন্ত দগ্ধ করা Martyrs. - সার সামুয়েল্ রােমিলী।. ইত, তাহাদিগের বিবরণ পাঠ করিয়া ব্যক্তিগণকে জীবন্ত দগ্ধ করা হইত, তাহাদিগের বিবরণ পাঠ করিয়া আমি কত রাত্রি ভয়ে নিদ্রা যাইতে পারি নাই, নিদ্রা যাইলেও, স্বপ্ন তাহার ব্যাঘাত সম্পাদন করিত। স্বপ্নে সেই সকল অর্ধদগ্ধ বিকট মূর্তি আমার সম্মুখে উপস্থিত হইত, অমনি নিদ্রা ভাঙ্গিয়া যাইত। কল্পনা আমার সম্মুখে সতত ফঁাশি, নর- হত্যা ও শােণিতপাতের দৃশ্য অবতারিত করিত। আমি সেই সকল দেখিয়া ভয়ে অভিভূত হইয়া শয্যায় দেহ লুকা- ইবার চেষ্টা করিতাম । রজনীর গাঢ় অন্ধকারে আমি জা- গিয়া থাকিতে ভয় করিতাম, কিন্তু ভীষণ উপদ্রবে নিদ্রা যাইতে পারিতাম না। এই জন্য আমি সান্ধ্য উপাসনার সময়ে প্রতিদিন ঈশ্বরের নিকটে প্রার্থনা করিতাম, যেন চিনি সে রাত্রি বিনা ভীষণ স্বপ্নদর্শনে আমাকে নিদ্রা যাইতে দেন।” নৃশংসতাবিদ্বেষের কি অপূর্ব চিত্র। এই সুযােগে আমরা রােমিলীর জীবনচরিত-সম্বন্ধে কিছু বলিব। রােমিলীর পিতা এক জন ফরাসি প্রােটে- ৪ান্ট ছিলেন। তিনি ক্যাথলিক গবর্ণমেন্টের নির্যাতনে দেশ ছাড়িয়া লণ্ডনে আসিয়া বাস করিয়াছিলেন। লণ্ডনবাসিনী একটি ফরাসি রমণীর সহিত তাহার বিবাহ হয়। এই বিবাহে অনেকগুলি সন্তান জন্মিয়াছিল, কিন্তু তিনটী বই দীর্ঘজীবী হয় নাই। সামুয়েল, তাহার মধ্যে সৰ্ব্ব কনিষ্ঠ। এক জন সুশিক্ষিত ফরাসি রমণী বাল্যে ইহার শিক্ষাকাৰ্যে নিযুক্ত ছিলেন। ইনিও ক্যাথলিক নির্যাতনে স্বদেশ পরিত্যাগ করিতে বাধ্য হইয়াছিলেন। তাঁহার স্নেহ-প্রবৃত্তির তীক্ষ্ণতা ও সবিষাদ ভাবুকতার মূল এই ধৰ্ম্মপরায়ণা বিদুষী ফরাসী রমণী।
প্রাতঃস্মরণীয় চরিতমালা। বােমিলী কিছু বড় হইলে, তাহাকে একটা স্কুলে দেওয়া হয়। এই স্কুলের শিক্ষক, পড়াইতে যত পারুন্ আর নাই পারুন্ বেত্রপ্রহারে বিশেষ পারদর্শী ছিলেন। তিনি নব নব শাস্তির উদ্ভাবন করিয়া বিদ্যার অভাব পরিপূরণ করু- তেন। শিক্ষকের এই নিষ্ঠুরতায় রােমিলী নৃশংসতাৰিদ্বেবী হইয়া উঠিলেন। যাহা হউক, এই শিক্ষকের নিকট কিঞ্চিৎ ইংরাজী শিখিয়া তিনি স্কুল ছাড়িলেন। তাঁহার পিতার জহরতের ব্যবসায় ছিল। তিনি স্কুল ছাড়িয়া সেই ব্যব- সায়ের হিসাব পত্রাদি-বিষয়ে পিতার সাহায্য করিতে লাগি লেন। হিসাবপত্র রাখিয়া তিনি অনেক অবসর পাইতেন, সেই অবসরকালে তিনি আপন চেষ্টায় গ্রীক ও লাটিন শিখিলেন। এইরূপে দুই তিন বৎসর যায়, এমন সময়ে কোন আত্মীয় মৃত্যুকালে উইল দ্বারা তাহাদিগকে দেড় লক্ষ টাকা দিয়া যান। এই অভাবনীয় ধনাগমে উৎসাহিত হইয়া রােমিলীর পিতা তঁহাকে ব্যবহারাজীবের ব্যবসায়ে দীক্ষিত করিবার সঙ্কল্প করেন। তদনুসারে ১৮৭৮ খৃষ্টাব্দে রােমিলী ‘গ্রেজ ইনে’ প্রবিষ্ট হন এবং যথাসময়ে ব্যারিষ্টার ' হইয়া ব্যবহারাজীবের ব্যবসায়ে প্রবৃত্ত হন। ‘বারে প্রাধান্য লাভ করিতে রােমিলীর অনেক দিন লাগিল। দণ্ডবিধির সংস্কার-সাধনে তিনি যে কৃতসঙ্কল্প ছি: লেন, এ কথা তিনি এক দিনও গােপন রাখেন নাই। দেও- যানী ও ফৌজদারী আদালতে আইনের দোহাই দিয়া প্রতি দিন যে সকল নীতিবিগর্হিত কাৰ্য অনুষ্ঠিত হইত, তিনি মুক্তকণ্ঠে সে সকলের প্রতিবাদ করিতে কখনই ভীত হইতেন না। যদিও ইহাতে আপাততঃ তাহার পশারের কিছু ক্ষতি
সার সামুয়েল্ রােমিলী।
হইল—যদিও আপাততঃ বড়,বড় জমীদার ও ধনী চটিয়া
যাইতে লাগিলেন, তথাপি তাহার প্রতিভা কালে এত দূর্তি
পাইল যে, সকল দুর্ল বিঘ্ন সত্বেও তাহার পশার অতিশয়
বাড়িয়া গেল। ক্রমে তাহার নাম দিগন্তব্যাপী হইয়া উঠিল।
এই উন্নতিমুখে ১৭৯৮ খৃষ্টাব্দে তিনি ইংলণ্ডের অন্তঃপাতী
হার্টফোর্ট শায়ারের মিস্ গাৰ্ব্বেট নাম্নী এক যুবতীকে বিবাহ
করিলেন।
১৮০৬ খৃষ্টাব্দে রােমিলী সলিসিটর জেনারেলের পদে
অভিষিক্ত হইলেন। সেই সময়েই তিনি ‘কুইন্সরার প্রতি
নিধি-রূপে হাউস অব কমন্সে প্রবিষ্ট হন, এবং সার সামু-
য়েল হন। এই সময় হইতেই তাহার জাতীয় জীবন আরম্ভ
হয়। সাধারণ জীবনের ক্রমানুবর্তী শান্তি ও তরঙ্গের মধ্যেও
তিনি আপনার জীবনের লক্ষ্য হইতে বিচ্যুত হন নাই।
পার্লেমেন্টের প্রতি সেশনেই তিনি ফৌজদারী আইনের
সংশােধনের জন্য প্রাণপণে চেষ্টা করিতেন। তাহার বাগ্মি
কা—সত্য, ন্যায় ও মনুষ্যত্বের সমর্থনেই সতত ব্যয়িত
হইত। আত্মীয় স্বজনের আদরে সুখী, পতিপ্রাণ ভাৰ্যার
প্রেমে সুখী, সন্তান সন্ততিদিগের প্রতি বাৎসল্যে সুখী,
এবং সাধু ও মহৎ লােকের শ্রদ্ধা ভক্তিতে সুখী হইয়াও
সার সামুয়েল, দুঃখীদিগকে ভুলেন নাই। নিজের সৌভাগ্য
সূর্যের আলোকে সমাসীন হইয়াও, দুর্ভাগ্যের অন্ধতমসে
যাহারা বসিয়া আছে, তাহাদিগকে ভুলেন নাই। তিনি
জানিতেন যে, তিনি যে সময়ে সুখে কাল কাটাইতেছ,
তখন কত শত লােক দুঃখ যন্ত্রণায় মরিয়া যাইতেছে। এই
জন্য তাহার মনে সর্বদাই হর্ষে বিষাদ উপস্থিত হইত। এই
=
প্রাতঃস্মরণীয় চরিতমালা। জন্য তিনি তাহাদিগের দুঃখমােচনে নিজের ধন প্রাণ উৎ- সর্গ করিয়াছিলেন। যদিও তিনি নিজের জীবদ্দশায় আপ- নার অজস্র চেষ্টার বিশেষ ফল দেখিয়া যাইতে পারেন নাই, তথাপি ইহা মুক্তকণ্ঠে স্বীকার করিতে হইবে যে, তাহার অক্লান্ত চেষ্টা নিষ্ফলা হয় নাই। তাহার সেই জ্বালা- ময়ী বক্তৃতায় পাষাণও বিগলিত হইতে লাগিল। সেই বক্ততার মোহিনী-শক্তিবলে ইংরাজ জাতির অয়ােময় হৃদয় বিগলিত হইল। ইংলণ্ডের পালেমেন্টে এই বিষয় লইয়া ঘােতর আন্দোলন উপস্থিত হইল। এই সময়ে (১৮১৮ খৃষ্টাব্দে) সহসা তাহার প্রণয়িনীর সাংঘাতিক পীড়া উপস্থিত হইল। উভয়ের জীবন যে এক- ভারে কেমন গ্রথিত ছিল, রােমিলীর দৈনন্দিন আত্মবিবরণী হইতে এক ছত্র তুলিয়া পাঠককে উপহার দিয়া তাহা বুক্কা- ইতেছি। “ ৯ই অক্টোবর—আজ স্ত্রী একটু ভাল ছিলেন বলিয়া কত দিন পরে ঘুমাইয়া বাচিয়াছি।” কিন্তু বিধাতা তাহার অদৃষ্টে অধিক দিনঘুম লিখেন নাই। তাহার স্ত্রীর পীড়া তাহার পরেই আবার বাড়িয়া উঠিল। ২৭ অক্টো- বরে তাহার স্ত্রী মানবলীলা সংবরণ করিলেন। শােকে রােমিলী ক্ষিপ্ত হইয়া গেলেন। যে আঘাত তাঁহার মস্তিষ্কের সূক্ষ্ম ধমনীমণ্ডলকে ছিন্ন ভিন্ন করিয়া ফেলিল। যে জীবন নিরন্তর মানবজাতির দুঃখপনােদনে ব্যয়িত হইত, আজ সাম্ সামুয়েল মনের অসহ বেদনায় নিজ হস্তে সেই জীব- ওন, উপসংহার করিলেন। ধন্য রােমিলি।ধন্য বীর! ধন্য তােমার মানবপ্রেম! ধন্য ভােব পত্নীপ্রেম! পুরুষ হইয়া সহমরণে যায়, কে কোথায় শুনিয়াছে ? আজ পুরুষজাতির । !
গ্যারিবীর প্রতিমা-প্রতিষ্ঠা। ৬৩ সেই ঘাের কলঙ্ক তুমি অপনােদন করিলে। তুমি আজীবন যে ব্রতে জীবন উৎসর্গ করিয়াছিলে, তাহার উদঘাপনা করিয়া যাইতে পারিলে না, এইক্ষোত রহিয়া গেল। কিন্তু, তােমার তপস্যার ফলে আজ ইংরাজ-জাতি ঘােরতম পাপ হইতে নিৰ্ম্মক্ত। তােমার পুণ্যবলে আজ ইংরাজজাতি সভ্য- পদবাচ্য। তােমার মৃত্যুর পরে তােমার তপস্যার ফল ফলিল। ইংরাজ-দণ্ডবিধির সার্ধশত সংখ্যক ধারায় প্রাণ- দণ্ডের ব্যবস্থা ছিল। তােমার মৃত্যুর পরে সে ধারাগুপি দণ্ডবিধি হইতে একে একে অপসারিত হইল। দুই একটা আজও আছে বটে, কিন্তু তােমার অতীত তপােমাহাত্মে তাহাও এক দিন অপসারিত হইবে। তুমি যে লক্ষ্য সংসা- ধনের জন্য ধন প্রাণ উৎসর্গ করিয়াছিলে, আসিয়া দেব। একবার দেখ, তাহা প্রায় সম্পন্ন হইয়াছে। আসিয়া আর এক বার পালেমেন্টের আসনে আসীন হইয়া তােমার হৃদয়ভেদকারিণী বক্তৃতায় পাষাণ গলাইয়া ইংরাজ দণ্ড- বিধির এখনও যে দুই একটা কলঙ্ক আছে, শীঘ্র তাহার ক্ষালন কর। দেব! এই শেষ মিনতি ও পদে। গারিবল্ডীর প্রতিমা-প্রতিষ্ঠা। পাঠক! ইংলণ্ড হইতে আমেরিকায় যাইব, মনে সঙ্কল্প ছিল। কিন্তু এক বার ফিরিতে হইল। এক বার প্রাণােৎ- সর্গের জীবন্ত ও জ্বলন্ত ক্ষেত্র ইতালীতে যাইতে হইল। এই তীর্থযাত্রার প্রান্তে যে মহাপুরুষকে ইতালীর প্রহরী বলিয়া উল্লেখ করিয়া আসিয়াছিলাম, যিনি সেই বৃদ্ধাবস্থায় ক্যা প্রেরা দ্বীপে ইতালীর মঙ্গলার্থে শবসাধনা করিতেছিলেন- ৬৪ প্রাতঃস্মরণীয় চরিতমালা । সেই মহাপুরুষ—সেই ইতালীর প্রাণের প্রাণ গ্যারিবী গত (১৮৮২ খৃঃ ৩রা জুন) মানবলীলা সংবরণ করিয়াছেন। জগৎকে কঁদাইয়া, ইতালীকে আঁধার করিরা,সেই ইতালী- গতপ্রাণ মহাপ্রাণ বীর, ইহলোেক পরিত্যাগ করিয়া পিয়া- ছেন। সমস্ত ইতালী স্তব্ধ ও হতজ্ঞান হইয়া পড়িয়াছে। যে ইতালীকে তিনি এক দিন নবজীবনে অনুপ্রাণিত করিয়াছিলেন, আজ তাহার বিরহে সেই ইতালী প্রাণহা। হইয়া পড়িয়া রহিয়াছে। যে দেহের অমিত বলে এক দিন প্রকাণ্ড অষ্ট্ৰীয় জাতি ধূলির ন্যায় ইতালীক্ষেত্র হইতে উৎ- ক্ষিপ্ত হইয়াছিল, সেই অমিত-বল বীরদেহ, ৩রা জুন ক্যারো দ্বীপের মৃত্তিকায় সম্মাধিনিহিত হইয়াছে। এস, এক বার ইতালীর অধিবাসিবৃন্দের সহিত প্রাণ ভরিয়া কাদি। সমস্ত ভারতবাসী এস, একবার ক্রন্দনরােলে গগন বিদারিয়া সেই স্বজাতিপ্রেমিকের জন্য কঁদি। ভারতের অশ্রুজল ইতালীর অশ্রুজলে মিশিয়া অপূৰ্ব্ব শান্তিবারির সৃষ্টি করুক। সমস্ত ভারতবাসী সেই শান্তি-জলে উক্ষিত হইয়া নব জীবন প্রাপ্ত হউক। ঐ যে অষ্ট কৃষ্ণ তুরঙ্গে পরিচালিত কৃষ্ণবস্ত্রে সমাচ্ছাদিত রথখানি শােক-দুভর গতিতে ধীরে ধীরে পােটাডেল, পােপােলাে’ হইতে ক্যাপিটলাভিমুখে যাত্রা করিতেছে, আর সঙ্গে সঙ্গে অসংখ্য সৈনিকপুরুষ কৃষ্ণপতাকা উড্ডীন করিয়া অবনত মস্তকে, ও অগণ্য ইতালীয় লোেক কৃষ্ণ পরিচ্ছদ পরিয়া সালােচনে স্থলিপদে 'চলিতেছে, ও কোন্ দেবতার রথ? দোকানদার দোকান ফেলিয়া, শিল্পী যন্ত্র ছাড়িয়া, লেখক কলম ফেলিয়া, রাজনৈতিক রাজ্যচিত। |
গ্যারিবীর প্রতিমা-প্রতিষ্ঠা।
পরিত্যাগ করিয়া এবং রমণীরা বিলাস ত্যজিয়া যে রথযাত্রার
যােগ দিবার জন্য দ্রুতগতিতে পশ্চাৎ পশ্চাৎ দুটিতেছে, ও
কোন্ দেবতার রথ ? ঐ যে অসংখ্য লােকে রথ হইতে শ্বেত
প্রস্তুরময় অর্ধ-মূর্তি ক্যাপিটলের চাপের নিম্নে সংস্থাপিত
করিল, উনি কোন্ দেবতা ?
আর ঐ যে তাহার পশ্চাতে
দাড়াইয়া পূর্ণ শ্বেতপ্রস্তরময়ী দেবী দক্ষিণ হন্তে বিজয়-
মুকুট লইয়া প্রথম দেবতার মস্তকে পরাইয়া দিতেছেন এবং
বামহন্তে দণ্ড ধারণ করিয়া রহিয়াছেন, ইনিই বা কোন
দেবতা? ঐ যে অৰ্দ্ধমূৰ্ত্তি দেথিতেছ, উহা ইতালীর উদ্ধার
কৰ্তা গ্যারিবী; আর ঐ যে দেবীমূৰ্ত্তি দেখিতেছ, উহা
স্বয়ং ইতালীদেবী। গত ১৮৮২ সালের ১১ই জুন গ্যারি-
বম্ভীর স্মরণার্থ সমস্ত ইতালীবাসী মিলিয়া এই প্রতিমা
প্রতিষ্ঠা করিয়াছেন। যেমন প্রাণােৎসর্গ, তেমনি প্রতিষ্ঠা।
এই প্রাণােৎসর্গের প্রতিষ্ঠা করিতে গিয়াই ভারতবাসীরা
এক দিন চৌষট্টী কোটী দেবতার উপাসক হইয়াছিলেন।
ঐ যে জগন্নাথদেবকে দেখিতেছ, যার রথের রঞ্জুস্পর্শ
করিতে পারিলেও, ভারতবাসী যেন আপনাকে স্বর্গের
অধিকারী বলিয়া বিবেচনা করেন; যাহার রথচক্রে নিষ্পে-
ষিত হইলেও ভারতবাসী যেন স্বশরীরে স্বর্গে যান, সে
জগন্নাথদেব দেবতা নহেন-একজন প্রসিদ্ধ বৌদ্ধ প্রচারক।
আর ঐ যে বৌদ্ধ মন্দিরে প্রশান্ত মুক্তিকামী শ্বেতপ্রস্তরময়
মুক্তি দেখিতেছ, উনি দেবতা নন-কপিলবাস্তু নগরের
অধীশ্বর জগদারধ্য মহাপ্রাণ শাক্যসিংহ। যে নিরীশ্নর
বৌদ্ধজগৎ স্বর্গ ভুলিয়াছেন, ঈশ্বরও ভুলিতে পারিয়াছেন,
সে বৌদ্ধজগৎও বুদ্ধের পূজা ভুলিতে পারেন নাই।
. প্রাতঃস্মরণীয় চরিতমালা। খ্ৰীষ্টমণ্ডলী দেবতা পূজা অতিশয় ঘৃণা করেন, তাঁহারাও বেথেলহেমে সেই পরমযােগী দীনবন্ধু খ্রীষ্টের পূজা ভুলিতে পারেন নাই। যে মুখে যত বলুক, বাহার হৃদয়ে ভক্তি, প্রেম ও কৃতজ্ঞতা আছে সে পৌত্তলিক না হইয়া থাকিতে পারে না। তাহার আদর্শ-পুরুষ ও আদর্শ-রমণীর নিকটে তাকে অবনত-মস্তক হইতেই হইবে। যতকাল নিঃস্বার্থ প্রেম ও নিরভিসন্ধি ধর্মের প্রতি মানুষের ভক্তি অচল। থাকিবে, ততদিন এ পূজা, এ পৌত্তলিকতা নিবারণ করে কাহার সাধ্য ? এই মহাপ্রাণ-পূজা কেবল কট প্রকাশ্য- রূপে স্বীকার করিয়াছিলেন। ভারতীয় প্রাচীন আর্যেরা ও এক দিন এই মহাপ্রাণ-পূজা করিয়াছিলেন; কিন্তু তাহারা মানুষকে ঈশ্বরের অবতার কল্পনা না করিয়া, তাহা করিতে পারেন নাই। তাহারা মানুষে অতিমানুষ গুণ দেখিলেই, তাহাকে ঈশ্বর বলিয়া মনে করিতেন। কিন্তু আমাদের মতেঈশ্বর মানুষরূপে জন্ম গ্রহণ করেন না, মানুষ যোগ- বলে ঈশ্বরত্ব লাভ করে। এই যােগ নিঃস্বার্থ প্রেম ও নিরভিসন্ধি ধৰ্ম্মের সাধনা। বুদ্ধ, খ্রীষ্ট, চৈতন্য প্রভৃতি সেই সাধনায় সিদ্ধ হইয়াছিলেন বলিয়াই, লােকে তাহাদিগকে দেবতা বলে এবং তাহাদিগের পূজা করে। গারিবীও সেই সাধনায় সিদ্ধ হইয়াছিলেন বলিয়া, আজ ইতালী- বাসীরা তঁাহার ঈশ্বরত্ব স্বীকার করিয়াছেন,-তাই আজ তাহার পবিত্র প্রস্তরময়ী মূৰ্ত্তি পবিত্র রাজধানী রােমে প্রতিষ্ঠাপিত করিলেন। ইতালী গ্যারিবীর কিরূপ উপাসক,তাহার আর একটা নিদর্শন না দিয়া থাকিতে পারিলাম না! গত ১৮৮২ সালের
গ্যারিবী।
৩রা জুন গ্যারিবীর মৃত্যু হয় এই সমাচার রজনীতে যখন
ইতালীর রাঙ্খধানীতে পৌছিল; তখন নাট্যশালায় নৃত্য,
গীত ও অভিনয়াদি হইতেছিল।'এই সংবাদ শ্রবণে বজা-
হতের ন্যায় সকলে যে যেমন অবস্থায় ছিল, নির্বাক হইয়া
সেই অবস্থায় রহিল। রঙ্গালয়ের অধ্যক্ষ মাননীয় ডেলি
অভিনয়াদি বন্ধ করিবার প্রস্তাব করিতে গেলেন, কিন্তু
বাক্য ও কণ্ঠ রুদ্ধ হইয়া গেল। মিউনিসিপাল সভার অধি-
বেশন হইতেছিল, এই সংবাদ আসিবা-মাত্র সভ্যেরা
সকলেই উঠিয়া দাড়াইলেন। তৎক্ষণাৎ রাজপ্রাসাদের
পতাকাগুলি নিম্ন ও শিথিল করা হইল। গ্যারিবীর
সংকার-কার্যের ব্যয়-নিৰ্বাহাৰ্থ তৎক্ষণাৎ সাধারণ রাজস্ব
হইতে পর্যাপ্ত অর্থ প্রেরণ করা হইল।
গ্যারিবীর জীবদ্দশায় তাহার জীবনী লিখিব না,সঙ্কল্প
ছিল---এই জন্য প্রস্তাবের প্রারম্ভে তাহা লেখা হয় নাই।
কিন্তু এখন গ্যারিবী অতীত ঘটনা, সুতরাং এখন আর
সে আপত্তি হইতে পারে না। গ্যারিবীর বিস্তৃত জীবনী
লিখিবাব বলবতী ইচ্ছা সত্ত্বেও, এখানে তাহার জীবনের
গুটকত সৃল ঘটনার উল্লেখ না করিয়া থাকিতে পারিলাম
না। সেই স্কুল ঘটনা গুলি নিম্নে প্রদত্ত হইল।
গ্যারিবল্ডী।
গ্যারিবী ১৮০৭ খ্রীষ্টাব্দের ২২ এ জুলাই ইতালীর
অন্তর্গ নাইস্ নামক নগরে জন্মগ্রহণ করেন। যে সকল
মহাত্মা ইতালীকে দুরন্ত অষ্ট্ৰীয় জাতির শৃঙ্খল হইতে মুক্ত
করিয়াছিলেন, গ্যারিবী তাহাদিগের শীর্ষস্থানীয়। তাহা
প্রাতঃস্মরণীয় চরিতমালা। জনক জননী অতি দরিদ্র ছিলেন, এই জন্য পুত্রের সুশিক্ষার সুব্যবস্থা করিতে পারেন নাই। সুতরাং তিনি অতি অল্প বয়সেই সার্ডিনীয় নৌসেনার অন্তর্নিবিষ্ট হন,এবং সেই অল্প বয়সেই সাহস ও ধৈর্যের জন্য খ্যাতি লাভ করেন। তাঁহার মন সেই নবীন বয়স হইতেই উন্নতিশীল ছিল, সেই অস্ত্র তিমি দেশের তাদৃশ দুর্গতি দেখিয়া স্থির থাকিতে পারিলেন না। এই সময়ে ইতালীতে অষ্ট্ৰীয়ার বিরুদ্ধে একটী জাতীয় অভ্যুত্থান হয়। জেলােয়া নগরে বৈপ্লবিকদিগের যে ষড়যন্ত্র হয়, তিনি তাহাতে লিপ্ত ছিলেন বলিয়া, নিৰ্বাসনদণ্ডে দণ্ডিত হয়েন। সেই সময়ে তিনি পলাইয়া ফ্রান্সে আশর গ্রহণ করেন। এই সময়ে তাহার জীবন, উপন্যাসের নায়কের জীবনের ন্যায় অদ্ভুত ঘটনাপূর্ণ হইয়াছিল। তাঁহাকে প্রয়ােজন মত নানা মূর্তি ধারণ করিতে হইয়াছিল। অবশেষে অজ্ঞাত- বাসে ছদ্মবেশে পৰ্যটন করিয়া তিনি মার্শেলিসে একটা নিরাপদ আশ্রয় গ্রহণ করিলেন। এই মার্শেলিসেই ম্যাট সিনির সহিত তাঁহার প্রথম আলাপ হয়। তখন তিনি ম্যাটসিনির নিকটে মন্ত্র গ্রহণ পূৰ্ব্বক নব্য ইলীয় সমা- জের অন্তভূক্ত হন। সেই সময় হইতে তাহার জীবন ইতা- লীর উদ্ধারসাধনে উৎসর্গীকৃত হয়। এই স্থানে তিনি দুই বৎসর কাল থাকিয়া গণিত বিজ্ঞানে বিশেষ পারদর্শিতা লাভ করিলেন। তিনি কার্যক্ষেত্রে অবতীর্ণ হইবার জন্য নিতান্ত ব্যগ্র হইয়া এক খানি মিশরদেশীয় জাহাজে কর্ম লইয়া মার্শেলিস, হইতে টিউনিস, যাত্রা করিলেন, এবং টিউনিসে যাইয়া তথাকার নৌসেনার অনিবিষ্ট হইলেন;
গ্যারিবী। কিন্তু তার কাৰ্যপ্রবণ মন যে কাৰ্য্যক্ষেত্র খুঁজিয়া বেড়া- ইতেছিল, সেখানে তাহার কোন আশা নাই দেখিয়া, তিনি কয়েক মাসের মধ্যেই টিউনিস্ পরিত্যাগ পূৰ্ব্বক আমেরি- কার অন্তর্গত রাইওজেনিরােতে প্রস্থান করিলেন। রাইওজেনিরাে ডেল, সল, এই সময়ে সাধারণতন্ত্ররূপে পরিণত হইয়াছিল। প্যারিবল্ডী এই নবাধিষ্ঠিত সাধারণ- তন্ত্রের অধীনে কাৰ্য্য গ্রহণ করিতে স্বীকৃত হইলেন। সেই সময়ে বুয়েনস্ এয়ারেস্ নামক জাতির সহিত এই সাধারণ তন্ত্রের যুদ্ধ বাধিয়াছিল। উক্ত সাধারণতন্ত্র গ্যারিবল্ডীকে অভিযানােদ্যত নৌসেনার অধিনায়ক করিয়া পাঠাইলেন। সকলেই সতৃষ্ণ নয়নে এই ইউরােপীয় আগন্তুকের কৃত কাৰ্য্যতার দিকে লক্ষ্য করিয়া রহিলেন। তাহার পারগতা, তাঁহার বিচক্ষণতা, অধিক কি—তাহার সাহসিকতার বিষয়ে সন্দিহান লােকেরও অপ্রতুল ছিল না। এই রণবীর কি ধাতুর পােক, তাহার পরিচয় পাইতে লােকের অধিক দিন বিলম্ব সহিতে হয় নাই। তাহার,অতিমানুষ অবদানপরম্পরা কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সর্বত্র পরিব্যাপ্ত হইল। অনেকেই জল্পনা করিতে লাগিল-এ মানুষ নয়, নররূপী দৈত্য। রণ স্থলে তিনি নির্ভীক চিত্তে মৃত্যুর সম্মুখীন হইতে লাগিলেন, অথচ তাহার শরীর একটীও ব্রণ-চিহ্ন ধারণ করিল না দেখিয়া, অনেকেই তাঁহাকে মন্ত্ররক্ষিত বলিয়া মনে করিতে লাগিল। তিনি কতিপয় মাত্র সহচর-সমভিব্যাহারে গভীর- তম রণক্ষেত্রে তীরবেগে ছুটিয়া অক্ষতশরীরে মুহূ-মধ্য আপন সৈন্যমধ্যে পুনরায় আবির্ভূত হইতেন। জলন্ত গােল। গুলি সকল ঝাঁকে ঝাঁকে তাঁহার গাত্রের নিকট দিয়া ছুটি- প্রাতঃস্মরণীয় চরিতমালা। তেছে, অথচ তাঁহাকে স্পর্শ করিতেছে না। দেখিলে আপ- তত বােধ হয়,গােলাগুলি যেন লৌহপ্রাকারে প্রতিহত হইয়া বেগে ফিরিয়া আসিতেছে। তিনি শৌর্য্যে ও বীর্যে যেমন লোকের বিস্ময়জনক হইয়াছিলেন, দয়াতেও ঠিক সেইরূপ বিস্ময় উদ্দীপন করিয়াঞ্ছিলেন। তিনি বিজয়ের পূর্বে বা পরে কোন সময়েই অকারণে শরক্তপাত করিয়া বীরধৰ্ম্ম কল, ঙ্কিত করিতেন না। তাহার বিচিত্র রণযেশ, হাকুলীয়, আকৃতি ও তেজোময় মুখশ্রী-তাহার অলৌকিক গুণগ্রামের সহিত মিশ্রিত হইয়া অপূৰ্ব্ব শাের্ভ ধারণ করিয়াছিল। বাহ ও আভ্যন্তরীণ শােভায় তিনি জগন্মনােমােহন হইয়া- ছিলেন। তাঁহার সেন। মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় তাহার আদেশের অনুবর্তী হইত। রাইও জেনিরাের সাধারণতন্ত্র গ্যারিবীর নিকটে চিরকৃতজ্ঞতা-পাশে আবদ্ধ হইলেন; এবং কৃত- জ্ঞতার চিহ্নস্বরূপ এই আদেশ প্রচার করিলেন যে, এখন হইতে সকল যুদ্ধেই গ্যারিবীর সেনা গৌরব-সূচক দক্ষিণ পার্শ্ব অধিকার করিবে। তদীয় সেনা যুদ্ধস্থলে থাকিতে জাতীয় সেনাও এ গৌরব পাইবে না। অজ্ঞাতকুলশীল আগন্তুক বৈদেশিকের পক্ষে এ সম্মান বড় উপেক্ষণীয় নহে। এ দিকে গ্যারিবীর অদ্ভুত বিজয়পরম্পরার সংবাদ স্বদেশে প্রস্ত হইল। সমস্ত ইতালী এই সমাচারে আনন্দে ও উৎসাহে উন্মত্ত হইয়া উঠিল। ফুরেন্স র্তাহার সম্মানার্থ তাঁহাকে এক খানি তরবারী উপঢৌকন দিবেন বলিয়া, প্রকাশ্যরূপে ঘােষণা করিলেন। কিন্তু এ সম্মানসূচক উপ- হার গ্রহণ করিবার পূর্বেই ইতালীর উদ্ধারসাধনের জন্য তদীয় প্রবলতর ভুবলের প্রয়ােজন হইয়া উঠিল। ১৮৪৮ = গ্যারিবী। ৭১ খ্রীষ্টাব্দের বৈপ্লবিক অভ্যুত্থান প্যারিবীকে বহু দিনের নির্বাসনের পরে স্বদেশ আনয়ন করিল। তিনি অবিলম্বেই দক্ষিণ টাইরলাভিমুখে অষ্ট্ৰীয় সেনার বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করি- লেন। তঁাহার রাইফল, বন্দুক সকল অবিরাম অগ্নি উদগীরণ করিয়া শত্রুসেনাকে ব্র্যস্ত ব্যস্ত করিয়া তুলিল। গ্যারিবী পীডমন্টরাজ চান্স আলবার্টের নিকটে কাৰ্য্য করিতে চাহিলেন। কিন্তু সেই ভীরু নরপতি তাহাতে সহজে সম্মত হইলেন না। তিনি কেবল অনুগ্রহ করিয়া গ্যারিবীকে অস্থায়ী অবৈতনিক সেনাদলের (ভলান্টীয়া) সৈন্য সংগ্রহ কৰিবার অনুমতি প্রদান করিলেন। এই আদেশ প্রচার হইবামাত্র দলেদলে স্বজাতি-প্রেমিক রণাে- ন্মত্ত অসংখ্য ইতালীয় যুবক তাঁহার পাতাকামুলে আসিয়া 'দাড়াইলেন। এই জাতীয় সেনা লইয়া তিনি অস্ট্রীয়গণের উপরি ক্রমাগত কয়েকটী যুদ্ধে জয় লাভ করিলেন। তিনি যে অবশেষে পরাজিত হইলেন, সে তঁাহার দোষ নয়। জাতীয় বিশ্বাসঘাতকতা ও জাতৃীয় সাহায্যের অভাবই তাহার মুল। তঁাহার ও তদীয় সেনার শৌর্য-বীর্যে ও দয়াদাক্ষিণ্যে রণবীর অষ্ট্ৰীয় সেনানায়কেরাও মুগ্ধ হইয়াছিলেন। তাঁহার। বিজয় লাভ করিয়াও, বিজিত গ্যারিবীর সেনার ভূয়সী প্রশংসা করিয়াছিলেন। তিনি অকৃতকার্য হইয়া সৈন্য- সকলকে বিদায় দিয়া বিষন্ন মনে ইউনাইটেড, ষ্টেটসে যাত্রা করিলেন এবং তথায় বাণিজ্যনীয়ী হইয়া শুভ দিনের প্রতীক্ষায় বসিয়া রহিলেন। এমন সময়ে পেরুদেশে যুদ্ধ বাধিয়া উঠিল। পেরুর
৭২ প্রাতঃস্মরণীয় চরিতমালা।
সৈনাপত্য তাহার হস্তে সমর্পিত হইল। তাহাতে তাহার
যশঃসৌরজ সমস্ত পৃথিবীতে পরিব্যাপ্ত হইল।
পেরুদেশের যুদ্ধের অবসানে গ্যারিবী স্বদেশে
আবার প্রত্যাগত হইলেন; এবং পুত্রগণ সহ ক্যাপ্রেকা
দ্বীপে পাঁচ বৎসর কশল অজ্ঞাতবাসে অবস্থিতি করিতে
লাশিলেন; কিন্তু তাহার কার্যকরী মানসিক বৃত্তি স্থির
থাকিবার নহে। তিনি এই দ্বীপে বিস্তৃত কৃষিকাৰ্য্য আরম্ভ
করিয়া দিলেন, অনেক পতিত জমির আবাদ আরম্ভ করি-
লেন, এবং প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড গােলাবাড়ী সকল প্রস্তুত করি-
লেন। অচিরকাল মধ্যে তাহার গৃহে ধন-ধান্যে পরিপূর্ণ
হইল। তিনি কৃষিজাত পণ্যসকল নানা স্থানে বিক্রয়ার্থ
প্রেরণ কবিধার জন্য একখানি সমুদ্রযান প্রস্তুত করাইলেন।
সময়ে সময়ে তাহাতে চড়িয়া তিনি স্বয়ং বাণিজ্যার্থ ইতালীর ।
অন্তর্গত নাই নগরে গমন করিতেন। তাহার আদর্শ জীবন,
তঁাহার প্রফুল্ল শ্রমপ্রবণতা, তঁাহার হৃদয়ের ও মনের রমণীয়
গুণাবলী—অচিরকাল মধ্যে তাহাকে পরিচিত ব্যক্তি মা-
রেই ভক্তি ও প্রীতির পাত্র করিয়া তুলিল। ভারতীয়
যুবক! চাকরী হইল না বলি, হতাশ হইও না। জননী
ভারতভূমি রত্নগর্ভা। গ্যারিবীর ন্যায়, জননীর আরাধনা
করিতে শিখ। তিনি বক্ষঃ চিরিয়া শরীরের রুধির দিয়া
তােমাদিগকে খাওয়াইবেন। ভারতীয় সন হইয়া তােমা-
দিগকে পরের দাসত্ব করিতে হইবে না।
দাসত্বের মঞ্চ-সাবাতে জর্জরিত ইতালী আবার
মাথা তুলিল। ইতালী দীর্ঘজীবী হউক!’ ‘ইতালীর জয়!
ইত্যাদি শব্দে আবার গগন উঘােষিত হইল। এই শেষ
গ্যারিবী।
স্বাধীনতা-সমরে জাতীয় নয়ন আর প্যারিবীর দিকে
পতিত হইল। সেই জাতীয় অধ্যানে গ্যাবিল্ডীর আসন
টলিল। তাঁহার হৃদয়স্থিত প্রমিত বীর্যবহ্নি জ্বলিয়া উঠিল।
স্বজাতির উদ্ধার-সাধন-রূপ ব্রতের উদ্যাপনার দিন উপস্থিত
দেখিয়া তিনি আর আপন আশ্রমে-স্থির থাকিতে পারিলেন
। স্বদেশের স্বাধীনত-মন্দিরে বলি দিতে তাহার কিছুই
অদেয় ছিল না। ইতালীর স্বাধীনতা উদ্ধারের জন্য তিনি
নিজের প্রাণ—অধিক কি, প্রাণাধিক স্ক্রীপুত্ৰ পৰ্য্যন্তও বলি
দিতে প্রস্তুত ছিলেন। তিনি বৈপ্লবিক দসু ছিলেন না,
বিপ্লবকালীন অরাজকতার সুবিধা লইয়া পরস্ব লুণ্ঠন করা
তাঁহার উদ্দেশ্য ছিল না। তিনি লক্ষ্মীকামী সৈনিক পুরুষ
ছিলেন না—আপনার অদ্ভুত বীরত্ব দেখাইয়া লােককে
মুগ্ধ করিয়া রাজসিংহাসন অধিকার করা তাহার লক্ষ্য ছিল
না ৮তিনি রঙ্গালয়ের নায়কে ন্যায় মৌখিক অভিনয়
করিয়া স্বজাতিপ্রেমের পরাকাষ্ঠা দেখাইতে প্রস্তুত ছিলেন
। তিনি প্রকৃতির সন্তান ছিলেন, তাহার হৃদয়ে কপটত।
ছিল না। তিনি ইতালীকে প্রাণাপেক্ষা ভালবাসিতেন,
তাই ইতালীর জন্য প্রাণ দিতে প্রস্তুত ছিলেন। ইালীর
উদ্ধারের জন্য প্রকৃতি তাঁহাকে জাতীয় অধিনেতা করিয়া
পাঠাইয়াছিলেন, তাই আজ জাতীয় স্বাধীনতাসময়ে সমস্ত
ইতালী এক বাক্যে তাঁহাকে সৈনাপত্যে বরণ করিলেন।
তিনি প্রাচীন রােমীয় ডিক্টেটরের ন্যায় হলকর্ষণ পরিত্যাগ
করিয়া জাতীয় অধিনেতৃত্বে অভিহিত হইলেন।এ জাতীয়
বিশ্বাসের অপব্যবহার তিনি কখনই করেন নাই। নেপাে-
লিয়নের ন্যায় তিনি এই মহতী জাতীয় সেনা লইয়া ইতা-
৭৪ প্রাতঃস্মরণীয় চরিতমালা। লীর সম্রাট হইতে পারিতেন। কিন্তু সেই স্বজাতি-প্রেমি- কের হৃদয় নিজের পার্থিব উমতির জন্য ব্যাকুল ছিল না। শত্ৰুদিগকে ইতালী-ক্ষেত্র হইতে বিদূরিত করিয়া তিনি ভিক্টর ইমানুয়েলের হন্তে ইতালীর অপ্রতিদ্বন্দ্বী সাম্রাজ্য ন্যস্ত করিয়া আবার দীনবেশে নিজ দ্বীপাবাসে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। ভিক্টর ইমানুয়েলের তাহাকে অদেয় কিছুই ছিল না। উচ্চ পদ, পেন্সন ও জাইগির—একে একে তিনি সমস্তই গ্যারিশম্ভীকে দিতে চাহিলেন। কিন্তু তিনি সমস্তই প্রত্যাখ্যান করিলেন। তিনি স্বদেশের স্বাধী- নতা, উদ্ধারের জন্য অসি নিষ্কোষিত করিয়াছিলেন, আজ সে ব্রতের উদ্যাপনা হইল ; অমনি অসি কোষসাৎ করিয়া সেই দ্বীপ পর্ণকুটীরে গমন করিলেন; আবার হলচালনা দ্বারা জীবিকা নির্বাহ করিতে আরম্ভ করিলেন। তিনি যেখানে যাইতেন, সেই খানেই লােক তাহার জয়ধ্বনি করিত দেখিয়া, তিনি ক্রমে লােকালয় পরিত গি করিয়া নির্জন স্থানে বাস আরম্ভ করিয়াছিলেন। জগতের ভাগ্যে এরূপ লােক সচরাচর ঘটে না। ভারতে এরূপ এক জন লােক জন্মিলে, ভারতের এ দুর্দশা কয় দিন থাকে ? তিনি জাতীয় সেনার অধিনায়ক হইয়া লম্বাড়ীতে গিয়া লম্বার্ডগণকে উল্লেখ করিয়া যে ঘােষণাপত্র প্রচার করেন, তাহাতে তঁাহার হৃদয়ের ভাব অক্ষরে অক্ষরেলখিত আছে। সে ঘােষণাপত্র এই—“লর্ডগণ ! আপনারা নব জীবন লাভের জন্য আহত হইছন। আশা করি পন্সিডীয়া ও লেগনানাে সমরে আপনাদিগের পিতৃপুরুষগণের ন্যায় আপ- নারাও এই যুদ্ধে অগ্রসর হইবেন। এবারও সেই শক্ত, ভীষণ
গ্যারিবী
৭৫
ঘাতক, নির্মম ও লুণ্ঠনশীল সেই অস্ত্রীয়গণ! ইতালীর অন্যান্য
প্রদেশস্থ ত্বদীয় ভ্রাতৃগণ একবাকে শপথ গ্রহণ করিয়াছেন
যে, তাহারা যুদ্ধে হয় জয় লাভ করিবেন, নয় প্রাণ পরি-
ত্যাগ করিবেন। আসুন্! আপনারাও সেই শপথে আবদ্ধ
হউন। আমাদিগকে বিংশতি পুরুষব্যাপী দাসত্ব, অত্যাচার
ও অপমানের প্রতিশোেধ লইতে হইতেছে। জাতীয় সম্রা-
জ্যকে বৈদেশিক দাসত্বের কলঙ্ক হইতে বিধৌত করিয়া নিক।
লঙ্ক ও পবিত্র অবস্থায় ভবিষ্য পুরুষের হস্তে সমর্পণ করিতে
হইবে। সমস্ত ইতালীয় জাতি একবাক্যে যে ভিক্টর ইমানু-
য়েলের হস্তে জাতীয় নেতৃত্ব প্রদান করিয়াছেন, তিনিই
আমাকে আপনাদিগের নিকট পাঠাইলেন। তাহার ইচ্ছ।
আপনারা এই জাতীয় স্বাধীনতা-সমরের নিমিত্ত দলবন্ধ ও
বদ্ধপরিকর হউন। সে পবিত্র কার্যের ভার আমার হস্তে
ন্যস্ত হইয়াছে, আমি কায়মনােবাক্যে তাহার সিদ্ধি কামনা
করিতেছি। আমি যে জাতীয় সৈনাপত্যে বৃত হইয়াছি,
তজ্জন্য আমি আপনাকে বিশেষ গৌরবান্বিত মনে করি।
ভ্রাতৃগণ! আর কেন ? অস্ত্র গ্রহণ করুন। ইতালীর স্বাধী-
নতা-সূৰ্য্য দাসত্বমেঘে আচ্ছন্ন হইয়া আছে। আপনাদের বা-
অব্য অস্ত্রে তাহা অবিলম্বে অপসাবিত করুন। যে যে ব্যক্তি
অস্ত্র-গ্রহণক্ষম হইয়াও অস্ত্ৰগ্ৰহণ করিতে বিরত থাকিবে, সেই
সেই ব্যক্তি জাতীয় বিশ্বাসহন্তা বলিয়া দণ্ডিত হইবে। যে
দিন ইতালীর বিচ্ছিন্ন পুত্র কন্যাগণ একত্র মিলিত হইবে,যে
দিন অধীনতার হর্ভর শৃঙ্খল তাহাদিগের চাইতে স্মৃতি
হইবে, সেই দিন ইতালী আবার পূৰ্বগৌরবে প্রতিষ্ঠাপিত
হইবে। ইউরােপীয় জাতিনিচয়ের মব্যৈ ইতালী এক দিন
প্রাতঃস্মরণীয় চরিতমালা। যে উচ্চতম আসন গ্রহণ করিয়াছিলেন, সেই দিন ইতাল সেই উচ্চতম আসন পুনরধিকার করিবে।” এই রূপ উদ্দীপনা-বাক্যে কাহার হৃদয় না অগ্নিময়ী হইয়া উঠে। গ্যারিবীর এইরূপ উদ্দীপনা-বাক্যে ইতালীর সমস্ত প্রদেশই অষ্টিয়গণের বিরুদ্ধে অখিত হইল। তাহার লোহিত কধুক চতুর্দিকে বিদ্রোহানল সঙ্কুক্ষিত করিতে লাগিল। দলে দলে ইতালীর যুবকসম্প্রদায় গৃহের মায়ায় প্রাণের আশায় জলাঞ্জলি দিয়া তাঁহার অদৃষ্টানুসারী হইল। সমস্ত ইতালী যেন রণে মাতিয়া উঠিল! ঝড়ের সম্মুখে তুলারাশির ন্যায়, এই প্রচণ্ড জাতীয় বলের সম্মুখে অষ্ট্ৰীয় সেনা উড়িয়া গেল। ইতালীগগনে বহুদিনের পরে সৌভাগ্য-তপন পুনরায় উদিত হইল। ধন্য গ্যারিবী। ধন্য তােমার কীৰ্ত্তি! তুমি স্বদেশের জন্য—স্বাধীনতার জন্য যাহা করিলে, ইতিহাসের প্রতি পত্রে জলদক্ষরে তাহা লি- খিত থাকিবে। তােমায় আদর্শ-পুরুষ করিবার জন্য বিধাতা ৰীরােচিত দেহ, প্রশস্ত ললাট, প্রফুল্ল মূখকান্তি, সুবর্ণ বর্ণ, লােহিত ধূসর সুচিকণ আকুঞ্চিত কেশরাজি, উজ্জ্বল ঈষৎ- ধূসর নয়নদ্বয়,সুপরিস্ফুট বীণাবিনিন্দিত মধূর স্বর,অনিয়ন্ত্রিত বিনয়ন গতি—প্রভৃতি যে সকল বাহ সৌন্দর্য্যে তােমায় বিভুষিত করিয়াছেন, সে গুলি কালে সকলই লয় প্রাপ্ত হইবে; কিন্তু তােমার অক্ষয় কীৰ্ত্তি অনন্তকাল বিরাজমান থাকিবে।
ম্যাসিনি। ৭৭ ম্যাসিনি।* পাঠক! ঐ যে নিভৃত প্রদেশে একটা সামান্য ও মলিন দেবমন্দির দেখিতেছ, উহার অভ্যন্তরে ইতালী মুহাপ্রাণ নিহিত আছেন। যাহার মন্ত্রবলে ইতালী-শ্মশানক্ষেত্রে শত শত গ্যারিবী সৃষ্ট হইয়াছিলেন; যাহার সঞ্জীবন ঔষধে ইতালী মৃতােখিত হইয়াছেন; যাহার উদ্দীপনায় লক্ষ লক্ষ ইতালীয়ের রুদ্ধ রক্তস্রোত তাহাদিগের ধমনীতে বৈদ্যুতিক বেগে প্রবাহিত হইয়াছিল ; যাহার প্রদীপ্ত জীবনের অদ্ভুত আত্মত্যাগেয় দৃষ্টান্তে সহস্র সহস্র ইতালীয় যুবক, জনক জননী ও দারা সুত পরিত্যাগ করিয়া সন্ন্যাসশ্রম গ্রহণ করিয়াছিলেন ; যাহার মন্ত্রের মােহিনী শক্তিবলে অশিক্ষিত বা অর্ধশিক্ষিত সামান্য পদাতিক সৈন্যও স্বজাতিপ্রেমে আয়-বিসৰ্জন করিতে শিথিয়াছিল ; যাহার দীক্ষাবলে দীক্ষিত যুবক বীরের ন্যায় দাড়াইয়া বক্ষ পাতিয়া গুলিধারণ করিয়াছিলেন, তথাপি দীক্ষামন্ত্র ও দীক্ষিত ভ্রাতৃগণের নাম প্রকাশ কবেন নাই ; যাহার চরিত্রগৌরবে মুগ্ধ হইয়া ইতা- লীয় যুবকগণ দলে দলে জন্মভূমি পরিত্যাগ পূৰ্ব্বক তদীয় মার্শেলিস্থিত আশ্রমে আসিয়া উপস্থিত হইয়াছিলেন; শুদ্ধ ইতালীয় যুবক কেন, যাহার বিশ্বপ্রেমের মন্ত্রে দীক্ষিত হই- বার জন্য পােলয়, রুষীয়, জৰ্মাণীয়, সুইজলীয় ও ফরা- সীয় বৈপ্লবিকগণও দলে দলে আসিয়া তদীয় আশ্রমে উপ- # ইহার জীবনীর প্রথম খণ্ড মুদ্রিত ও প্রকাশিত হইয়াছে। দ্বিতীয় খণ্ডও স্বতন্ত্র বিস্তৃত ভাবে আৰ্য্যদর্শনে বাহির হইতেছে।
ম্যাসিনি। স্থিত হইয়াছিলেন ও তাহার নিকটে মন্ত্র গ্রহণ করিয়া- ছিলেন ;-সেই জগদ্গুরু ইতালী-সঞ্জীবক মহাপ্রাণ ম্যাট- সিনি এইখানে মহানিদ্রায় অভিভূত রহিয়াছেন—অকৃতজ্ঞ ইতালী একবার সে দিকে তাকাইয়া দেখিতেছে না। যিনি গ্যারিবীর দীক্ষাগুর ; যিনি গ্যারিবীর সহ সমর- গণেব ও মন্ত্র গুরু; যিনি ইতালীর জন্য—ইতালীর উদ্ধার কামনায়-আজীবন নৈষ্ঠিক ব্রহ্মচর্য ব্রত গ্রহণ করিয়া- ছিলেন ; যিনি ইতালীর শােকে আশৈশব কৃষ্ণ পৰিচ্ছদ পরিধান করিয়াছিলেন; যিনি বিদ্যালয়ের কাষ্টমঞ্চকে বসিয়া করতলে কপােল বিন্যস্ত করিয়া বিষন্ন মনে ইতালীব বর্তমান অবস্থা ভাবিয়া অশ্রুজল ফেলিয়াছিলেন ও ইতালীর উদ্ধারের উপায় চিন্তা করিয়াছিলেন ; ও যিনি ব্যবহালা জীবের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইয়াও, ইতালীর উদ্ধার কামনায় নিজের আর্থিক উন্নতির দিকেও দৃষ্টিপাত করেন নাই ; যিনি পিতাব অতুল সম্পত্তির একমাত্র উত্তরাধিকারী হইয়াও ইতালীর উদ্ধার-কামনায় দারিদ্র-ব্ৰহ গ্রহণ করিয়াছিলেন ; যিনি সেই সুমহৎব্রতের উদযাপনার জন্য কারাগারে কম্বল শষ্যাকে সুকোমল পুষ্পশয্যা এবং নিৰ্বাসনকে মুক্তির অবস্থা বলিয়া মনে করিতেন; যিনি নির্বাসন অবস্থায় ফরাসী গবর্ণমেন্টের নির্যাতনে দিবসে বিলমধ্যে লুকায়িত থাকিয়া রজনীতে উঠিয়া নিজ মনের ভাৰ লিপিবদ্ধ করিয়া অপূৰ্ব উদ্দীপনাপূর্ণ প্রবন্ধ সকল নব্য ইতালী” নামক পত্রিকায় প্রকাশিত করিয়া অসংখ্য শিষ্য পর্গ দ্বারা পরদিনে সমস্যাইতালীতে প্রচারিত করিতেন- যে, পত্রিকাপ্রচার, দুর্দান্ত অষ্ট্ৰীয়ার সমস্ত নিবারণ-চেষ্টা ;
ম্যাটসিনি বিফল করিয়াছিল—ফান্সের নির্যাতনও মিল করিয়াছিল, যাহার প্রদীপ্ত উদ্দীপনাপূর্ণ বচন সকল ইতালীকে মতবি- প্লব উপস্থিত না করিলে----ইতালীকে পূৰ্ব্ব হইতে অগ্নিময় করি যা না বাধিলে,-বোধ হয়, সহস্র গ্যাবিবী অস্ত্রে ও ইতালীর উদ্ধার সাধন হইত না; যিনি শয়নে স্বপনে, তাশন বলনে, নির্বাসনে নির্যাতনে, ধনে জ্ঞানে ইতালী বই জা- নিতেন না। যিনি বিশ্বপ্রেমিক ও বিগনগৰিক হইয়াও, - বিস্য বিজন সাধারণতন্ত্রের নেতৃত্ব ও ৰেত্বে ইতালীতে অভিষিক্ত করার সল্প পরিত্যাগ করিতে পারেন নাই; সংক্ষে- সতঃ যিনি 'তালার জন্য পদে পদে মৃত্যুকে আলিঙ্গন কবি- য়ছিগেন;--প্রাণােৎসর্গে রসেই পুর্ব দৃষ্টান্তস্থল, ইতালী- সুমন জীবিত, মহাপ্রাণ ম্যাটসিনি এখানে অনন্ত নিদ্রায় অভিভূত বহিয়াছেন, অন্ধ ইতালী তাহা দেখে না। দাস ক ইতালী—সেই পুর্ণ লোকতান্ত্রি + ম্যাটগিনির মহাগ্ন জও বুঝি না উঠিতে পারে নাই, তাই সেই বিশ্বপ্রাণ মহাপুরুষের পূজা করে না। অবােধ ইল: এক দিন তোমাকে ইহার জন্য গুরতর অশোচনা করিতে হইবে, এক দিন তোমাকে এই ঘােরতর পাপর ঘোরতর প্রায়- কি করিমে হইবে। ম্যাটসিনি তোমাকে যে উচ্চ আদর্শে লইয়া যাইতে চাহিয়াছিলেন, তুমি আজ সেখানে যাইতে চাহিলে না; কিন্তু কাল হউক, পবশ্ব হউক, এক দিন তোমায় সে স্থানের অভিলাষিণী হইতেই হইবে, তখন তোমার বক্ষ স্বাবার রুবির-কমি হবার প্রণী- বৈদেশি কগণের রক্তে তােমার বা কনি। মা- ছিল, সুতরাং তত মনােবেদনা পাও নাই। কিন্তু আগামী রাজ- প্রাতঃস্মরণীয় চরিতমালা। বারে উভয়পক্ষেই তেমার পুত্রগণ থাকিবে; সেই রাজতন্ত্র ও সাধারণতন্ত্রের বিবাদে তােমার বক্ষঃ ক্ষত বিক্ষত হইবে। যদি সাধরণতন্ত্রের জয় হয়, তখন তুমি ম্যাটসিনির পূজা আরম্ভ করিবে। গ্যারিবী ও প্রথমে সাধারণতন্ত্রবাদী ছিলেন, কিন্তু ভিক্টর ইমানুইলের গুণে মুগ্ধ হইয়া বা উপ- য়ান্তর না দেখিয়া রে রাজতান্ত্রিক হইয়াছিলেন। কিন্তু ম্যাটসিনির চিত্তশলাকা চুম্বকশলাকার ন্যার সকল অবস্থা- তেই সেই এক দি লক্ষ্য করিয়াছিল। এই দিকদর্শনের উপদেশ উল্লঙ্ঘন করিয়া বিপক্ষগামী হওয়ার ফল ইতালী- কে ভােগ করিতেই হইবে। ভগবন! অকৃতজ্ঞ ইতালী তােমার পূজা না করুক, পবিত্ৰ-জাহ্নবী-সলিল বিধৌত ভারতে তােমার পূজা আরব্ধ ইয়াছে। যে শাক্যসিংহের মহিমা ভারত বুঝিতে পারে নাই বলিয়া, তাহার তানাদর কয়িয়াছিলেন, সেই শাক্যসিংহই আজ জগতের এক তৃতীয়াংশের ঈশ্বর। সেইরূপ, তুমি ইছালীতে অনাদৃত হইয়াও, ভারতে পূজিত।' দেব ! তাই আজ ভারতযুবক তােমার সমাধিমন্দিরের দ্বারে উপস্থিত। চীন পরিব্রাজক যেমন বুদ্ধ গয়ায় আসিয়া তীর্থ পর্যটনের চরম ফল লাভ করে, “আজ ভারতযুবক তোমার সমাধি দর্শন করিয়া সেই ফল লাভ করিল। জর্জ ওয়াসিংটন্। পাঠক! এখন ইউরােপ ছাড়িয়া একবার আমেরিকায় চল। ঐ দেখ ! দুইজন মহাপুরুষ-ওয়াসিংটন ও পার্কার জর্জ ওয়াসিংটন্। ---মার্কিন ভূমির মুখ উজ্জ্বল করিয়া রাখিয়াছেন। প্রথমে যে মহাত্মার নাম উল্লেখ করলাম, ইনিই আমেরিকার দাসত্ববিমােন করেন। ইহার জীবনী পাঠ করিলে, হৃদয় ভাক্তরসে আপ্লুত হয়। আমরা ইহারই জীবনী আলােচনা করিয়া আপাততঃ নিবৃত্ত হইব। যে সকল ইংরাজ-পরিবার, ব্রিটিশ সিংহের অত্যাচারে জর্জরিত হইয়া স্বদেশের মমতায় জলাঞ্জলি দিয়া আট- লান্টিক মহাসাগরের পাশ্চাত্য উপকূলে আশ্রয় গ্রহণ করেন, ওয়াসিংটনের পূর্বপুরুষ তাহাদিগের অন্যতম। ওয়াসিংটন-বংশ ১৬৫৭ খৃঃ ভার্জিনীয়ায় আসিয়া বসতি করেন। ওয়াসিংটনের পিতা মেরিল্যাণ্ডে যথেষ্ট বিষয়াদি করিয়াছিলেন, এবং মৃত্যুকালে সেই সমস্ত বিষয় তাহার ছয় পুত্রকে বিভাগ করিয়া দেন। ওয়াসিংটন্ তাহার তৃতীয় পুত্র। ১৭৩২ খৃষ্টাব্দে ২২শে ফেব্রয়ারী তারিখে এই মহাত্মা জন্মগ্রহণ করেন। পিতার মৃত্যুকালে তাহার বয়স একাদশ বৎসর মাত্র হইয়াছিল। তিনি মেরিল্যাণ্ডের কোন সামান্য বিদ্যালয়ে বিদ্যা শিক্ষা করিয়াছিলেন। তথাপি তিনি ত্রিকোণমিতি ও জরিপ বিষয়ে বিশেষ পারদর্শিতা লাভ করিয়াছিলেন। বিদ্যালয় ছাড়িয়া তিনি একান্তমনে কেবল গণিত-বিজ্ঞানের আলাে- চনায় নিযুক্ত হইলেন। তিনি লরেন্স নামক ভ্রাতার ভার্ণ গিরিস্থিত আবাসে শীতকাল যাপন করিতেছিলেন, এমন সময়ে লর্ড ফেয়ারফ্যাক্সের চিত্তষ্ট করিলেন। লন্ড ফেয়ারফ্যাক্স গণিতবিজ্ঞানে ও জরিপ কাৰ্য্যে তাহার সবি- শেষ অভিজ্ঞতা দেখিয়া পটোমাকনদীতীরস্থিত সুবিশাল প্রাতঃস্মরণীয় চরিতমালা। ভূমিখণ্ডের জরিপ কাৰ্য্যে তাঁহাকে নিযুক্ত করিলেন। তিনি এই কাৰ্য্য এরূপ সুচারুরূপে সম্পন্ন করিলেন যে অচিরকাল মধ্যে গৰমেটের সর্ভেয়াবের পদে নিযুক্ত হইলেন। এই কার্যে থাকিয়া তাঁহাকে ক্রমাগত তিন বৎসর আলিঘানি পব্বতের নিবিড় তার মধ্যে বিচরণ করিয়া বেড়াইতে হইছিল। সেই সময়ে আমেরিকার প্রায় সকলেই রাজ- তান্ত্রিক ছিলেন। ওয়াসিংটনেরও রাজভক্তি এই সময় অচল ছিল। যথন ইউনাইটেড, ষ্টেটসেব প্রান্তসীমা আদিম অধি- বাসিগণ কক অাগু হই বর সনা উপস্থিত হ,এবং ফ্রান্সের সহিত ইণ্ডের যুদ্ধ ৰাধিবার উপক্রম হয়, তখন ভাজিনীয়া ভাবী বিপদের আশঙ্কায় সামরিক প্রদেশ না বিভক্ত হয়। এই সময়ে ওয়াসিংটন্ মেজরের পদে প্রতি- ষিক্ত হইয়া একটী প্রাদেশিক সেনার অধিনায়কত্ব প্রাপ্ত হন। ১৭৫৪ খ্রীষ্টাব্দে তিনি ভার্জিনীয় উপসেনার * দ্বিতীয় অধিনায়কত্ব প্রাপ্ত হন। এই বৎসরেই গ্রীষ্মের রক্তে ফ্রান্সের সহিত যুদ্ধ বাধিয়া উঠে। এই সমরে ফরাসি সেনা- পতি কর্ণেল জুমোভিলের অধীনস্থ ফরাসি সেনার ১হিত ঊহার প্রথম সম্মুখ যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধে ফরাসি সেন। পরাজিত হয় ও ফরাসি সেনাপতি হত হয়েন। এই বিজ- য়ের জন্য তিনি ভার্জিনীয় ব্যবস্থাপক সভা হইতে ধন্যবাদ প্রাপ্ত হন 'ও ভার্জিনীয় উপসেনার প্রধান নেতৃত্ব পদে ভিষিক্ত হন। হিসিনাপতি পদে বৃত হইয়া এরূপ কৌশল ও দক্ষতার সহিত পশ্চাৎপদ হইয়া মহতী ফরাসি Militia নাগরিক সৈন্য-বাহা কেবল যুদ্ধকালে আহূত হয়। --- জর্জ ওয়াসিংটন্। সেনার করাল গ্রাস হইতে আত্মরক্ষা করিয়াছিলেন যে, ব্যবস্থাপকসমাজ তাহাকে ধন্যবাদ না দিয়া থাকিতে পারেন নাই। ১৭৫৫ খৃষ্টাব্দে ওয়াসিংটন্ সেনাপতি ব্রাডকের সহযােগী হইয়া যুদ্ধে গমন করেন। এই যুদ্ধে তাহাদিগের পরাজয় ও মৃত্যু হয়। এই দুর্ঘটনার পরে তিনি ভার্ণস্থ গৈরিক আবাসে প্রত্যাগত হন। তঁাহাব ভ্রাতা লরেন্সের মৃত্যুতে ভাণগিৰিস্থ তাহার যাবায় বিষয় উত্তরাধিকারসূত্রে ওয়াসিংটনেস হস্তগত হয়। এই সম্পত্তি হস্তে পাইয়া তিনি বিস্তৃত আকারে আতিথ্য ক্রিয়া আরম্ভ করিলেন। আমে- রিকার আদি ইংরাজ ঔপনিবেশিকরা অতিথি-সৎকার- কার্যে বিপণ আস্থাবা ছিলেন বলি : প্রসিদ্ধি ছিল ওয়াসিংটন পৰ্বপুরুষগণের সেই ৰীৰ্ত্তি বজায় ক রিলেন। এই সময়ে ১৭৫১ খৃঃ তিনি কষ্টস্ নামক কোন ব ক্তির বিধবা রমণকে বিবাহ করেন। এই সময়ে তিনি বিপুল সম্পত্তির অধীশ্বর ও সবিশেষ মান্য গণ্য হইয়া উঠিলেন। এরূপে সুখে ও স্বচ্ছন্দে তাঁহার বহুদিন অতীত হইল। যে সকল অমানুষ গুণে তিনি পরে জগতে উজ্জ্বল ও অক্ষয় কীৰ্ত্তি লাভ করেন, এখনও সে সকলের তাদৃশ কোন আভাস পাও যায় নাই। নি জাতীয় স্বাধীনতা-মর উপলক্ষে তঁাহার সেই সবল গুণ বিকাশ প্রাপ্ত হয়, যে সকল কারণে সেই সমরের উৎপত্তি, আমরা এক্ষণে তদ্বিষয়ে কিঞ্চিৎ বলিব । আদিম অধিবাসী ও ফরাশিদিগের সহিত “সমরেট- নাইটেড, ষ্টেটসের সমূহ ক্ষতি হয়। বিখ্যাতনামা সেনাপতি
৮৪ প্রাতঃস্মরণীয় চরিতমালা।
উলফ এই সমর হত হন। খ্রীড়ায় ও শক্রর অস্ত্রাঘাতে প্রায়
এিশ সহস্র জাতীয় সৈন্তের প্রাণ বিনষ্ট হয়। জাতীয় ঋণ
চল্লিশ কোটী টাকার পরিণ হয়। এই সময়ের আংশিক
ব্যয় নির্বাহাৰ্থ ইংলণ্ডকেও চতুর্দশ কোট টাকা ঋণগ্রস্ত
হইতে হইয়াছিল, এবং বিজয়লব্ধ রাজ্য সকল সুপ্রতিষ্ঠিত
রাখিবার জন্য উপনিবেশে স্থায়ী সেনা রাখিতে হইয়াছিল।
যখন সময়ের কোলাহল তিরােহিত হইল, যখন শেষ
কামানের শব্দ শূন্যে মিশাইয়া গেল,যখন সমরে হত বীরবৃন্দ
আপন আপন সমাধি শয্যায় শয়ন হইয়া চির-মিদ্রায়
আচ্ছন্ন হইলেন, যখন আহত সৈন্য সকল আপন আপন
গৃহে আসিয়া পরিবারবর্গকে আনন্দাশ্রুতে ভাসাইল, যখন
মহাতেজা পাৰ্বতীয় সেনা আদিম অধিবাসিগণের নিভৃত
স্থান সকলের আলোড়নে বিবত হইয়া আপন আপন
সৈন্সাসে আশ্রয় গ্রহণ করিল, সংক্ষেপঃ যখন সমস্ত
আমেরিকায় শান্তি বিরাজিত হইল, তখন ইংলণ্ড ও আমে-
রিকা ভাবিবার সময় পাইয়া বিগত যুদ্ধে ক্ষতিলাভ গণনা
আরম্ভ করিলেন। তাহারা দেখিলেন, যদি ও বিজয়লক্ষ্মী
তাহাদিগের করতলস্থ হইয়াছে, যদিও তাহাদিগের বিজয়-
গৌরবে জগৎ ঝলসিত হইতেছে, তথাপি তাহার বিশেষ
লাভবান্ হইতে পারেন নাই, বরং প্রভূত পরিমাণে জাতীয়
রুধির ও জাতীয় অর্থ ব্যয়িত হওয়ায় তঁাহারু দুর্বল হইয়া
পড়িয়াছেন। এ দিকে ইংলণ্ড এই সুযােগে জাতীয় ঋণ
পরিশােধস্থলে আমেরিকার নিকটে
নিকটে সাহায্য প্রার্থনা
কারলেন।
এ দিকে বিগত সময়ে আমেরিকাও সৰ্ব্বস্বান্ত হইয়া
.
জর্জ ওয়াসিংটন্ । পড়িয়াছিলেন। সুতরাং তাহায় এরূপ প্রার্থনায় বড় সন্তুষ্ট হইতে পারিলেন না। তাহারা দেখিলেন যে, জাতীয় রুধিরে ও জাতীয় অর্থে তাহারাই এই বিজয় লাভ করি- লেন। কিন্তু ইংলণ্ড আংশিকমাত্র এই ব্যয়ভার বহন করিয়া এই বিজয়ের পূর্ণ ফলভােগী হইতেছন। তথাপি তাঁহার দুরাকাঙ্ক মন পরিতৃপ্ত হইতেছে না। তিনি আমেরিকার উপরে কর ধার্য্য করিয়া সেই আংশিক ক্ষতি পূরণ করিবার চেষ্টা করিতেছেন। আমেরিকা এত দিন আপনাকে দুর্বল বলিয়া জানিতেন, সুতরাং ইংলণ্ডের সমস্ত অত্যাচার মুখ বুজিয়া সহিয়াছিলেন। কিন্তু আজ আমেরিকা আপনার বল জানিতে পারিয়াছেন। সুতরাং ইংলণ্ডের অত্যাচার এখন তাহার দুর্বিষহ বলিয়ন বােধ হইল। বিগত সমরে ঔপনিবেশিকেরা বিশেষ বীরত্ব দেখাইয়াছিলেন। তাহারা স্বচক্ষে দেখিয়াছিলেন যে, বন্দুকধারণে ও কামান চালনে ইংলীয় সেনা অপেক্ষা তাহার কিছুতেই ন্ন নহেন। বিশেষতঃ তাঁহার রণে এরূপ অভ্যস্ত হইয়া পড়িয়াছিলেন যে, সমর-নিবৃত্ত থাকা যেন তাহাদিগের পক্ষে কিছু ক্লেশ- কর হইয়া উঠিয়াছিল। আজ রণক্ষেত্র আমেরিকাবাসি- গণের নিকট ক্রীড়াপ্রাঙ্গণস্বরূপ অনুমিত হইতেছে। এই আভ্যন্তরীণ বল বুঝিতে পারিমাই আজ অামেরিকা ইংল- ণ্ডের সৰ্ব্বতােমুখ প্রভুতায় আপত্তি করিলেন। ঔপনিবেশিকেরা দেখিলেন—ইংলণ্ড আমেরিকাকে সামরিক বিদ্যালয়ে পরিণত করিয়াছেন। সীমান্ত প্রদেশের রাজ্য সকলের সহিত অকারণে যুদ্ধ বাধাইয়া আমেরিকার ব্যয়ে ও আমেরিকার বক্ষে কতকগুলি ইংরাজসৈন্য ও কতি- প্রাতঃস্মরণীয় চরিতমালা। পয় ইংরাজ সৈনাপতিকে রণদীক্ষিত করিয়া লইতেছেন। আজ আমেরিকা অাপনার ল বুঝিতে পারিয়াছেন, তাই ইহা তাঁহার অসহ্য হইয়া উঠিল। ইংলণ্ডের মনে মনে অভিমান ছিল, আমেরিক উপ- নিবেশিকরা তাহার সন্ততি, তাহার যঃ প্রতিষ্ঠাপ্তি, তাঁহার আদরে পরিবর্ধ্বি ,এবং তাহাব বাহুবলে পরিরতি। ইউনাইটেড স্টেটসে কোষাধ্যক্ষ এই চির লালিত অভি- মানের প্রত্যুত্তরে লিখিয়াছেন—“ইংলও তুমি বলিয়া থাক যে, আমরা তোমার যত্নে আমেরিকায় স্থাপিত ! না, এ কথা সত্য হে—বরং তোমারই দোরায়ে আমরা আমে- রিকায় অধিবা-িত। তুমি বল, আমি তোমার মেহে লালিত ! না, বরং তোমারই ভবহেলার পরিপুষ্ট। তুমি শ্লাঘা করিয়া থাক--আমরা তােম। বই বাহুবলে পরিক্ষিত । না ইংলণ্ড! বরং তোমারেই গৌরব রক্ষা করিতে আশা- দিগকে জাতীয় বধির ও ভাতীয় অর্থ ব্যয় করিতে হয় !” এইরূপ ভাব এই সময় আমেরিকাবাসী সাধারণের অন্তুরে প্রবল হইয়া উঠিয়াছিল। আমেরিকার আদিম ঔপনিবেশিকগণ সকলেই সাধারণতান্ত্রিক ছিলেন । রাজা দেবানুহীত, তিনি মানব নিয়মের অধীন নহেন---ইত্যাদি রজতান্ত্রিক ম স কল তাহাদিগের হৃদয়ে স্থান পায় নাই। তাহারা সংখ্যায় দুর্বল বলিয়াই অগত্যা ইংলণ্ডের আধিপত্য র্শ্বীকার করিয়াছিলেন, কিন্তু তাহাদিগের সন্তত্তিগণ এখন আত্মবল বুঝিনা সে অর্ধনশৃঙ্খল ভেদ করতে কৃতসঙ্কল্প হইলেন। এদিকে ইংলণ্ডের লােকে, ভাবিতে লাগিলেন, আমে- ; জর্জ ওয়াসিংটন। রিকা ইংলণ্ডের উপনিবেশমাত্র; সকল বিষয়েই মাতৃরাজ্যের মুখাপেক্ষী; তবে তাহার আদেশ মাথা পাতিয়া পালন না করিবে কেন ? এই ভাবিয়া তাহারা আইনের উপর আইন জারি করিয়া অনেরিকাকে অষ্টপৃষ্ঠে বাঁধিবার চেষ্টা করিতে লাগিলেন। একটা আইন জারি হল যে, হে ইংলীয় জাহাজ ব্যতীত অন্য জাহাজে করিয়া উপনিবেশ হইতে ইংলণ্ডে মাল আমদানি কলিতে অথবা ইংলও হইতে উপ- নিবেশসমূহে মাল রপ্তানি করিতে পারিবে না। ইহাতে ইংল ওীয় বাণিজ্যপোতের অধ্যক্ষগণ অতিশয় ধনবান হইয়া উঠিতে লাগিলেন। কতকগুলি দুতিকর নিষেধ আইন জারি হইল সে, যে সকল গাছের তক্তায় জাহাজ নিশ্মিত হয়, আপন আপন সীমার বহির্ভূত এমন গাই কেহ কাটিতে পাইবে না; কেহ লোহার কারখানা করিতে পারিবে না; কেহ ইস্পাত প্রস্তুত করিতে পারিবে না; যে দেশ বাববে পরিপূর্ণ, সে দেশের কেহ ধীবরের টুপি তৈয়ার করিতে পারিবে না ; কোন কারবারী এক সময়ে দুই জনের অধিক শিক্ষানবিশ রাখিতে পাইবে না ইত্যাদি। এদিকে বিলাতী মদ ও চিনি প্রকৃতির অমদা বাড়াই- বার জন্য দেশীর চিনি, গুড় ও মদ প্রভৃতির উপর বেজায় শুল্ক নির্দিষ্ট করা হইল। এই সকল অাইন অকেজো হইয়া পড়িয়া না থাকে, এই জন্য সন্দিগ্ধ ব্যক্তি মায়ের ঘরে খানা তল্লাসী আরম্ভ হইল। এই সকল দুর্বিষহ অত্যা- চারে লােকে জৰ্জরীভূত-এমন সময় ১৭৬৪ খ্রীষ্টাব্দে ষ্ট্যাম্প আইন প্রস্তাবিত হইল। পূৰ্বে দলিল পত্র ও অাদালতের দরখাস্তাদি, সাদা কাগজে লিখিলেই হইত; কিন্তু এই ৮৮ প্রাতঃস্মরণীয় চরিতমালা । আইন অনুসারে সকলকেই সাদা কাগজের পরিবর্তে ষ্ট্যাম্প যুক্ত কাগজ ব্যবহার করিতে হইবে। সংবাদ পত্র, সামরিক পত্রিকা, পঞ্জিকা প্রভৃতিরও উপরে শুক নির্ধারিত হইল। এই আইনের পাণ্ডুলিপি ব্রিটিশ পালেমেন্টে অবতারিত হইয়া আমেরিকাবাসিগণের ক্ৰোধানলে ঘৃতাহুতি প্রদান করিল। আমেরিকা এক্ষণে একবাক্যে ও মুক্তকণ্ঠে ব্রিটিশ পালেমেন্টের এ অধিকার অস্বীকার করিলেন, কিন্তু ইংল: শ্বের জর্জ কিছুতেই বিচলিত হইবার লােক ছিলেন না। তঁাহার প্রভাবে ষ্ট্যাম্প আইন ছাউস অব কমন্স ও হাউস অব লর্ডস উভয়ই অবিসংবাদিত ভাবে পাশ হইল। ভবিষ্য অত্যুত্থানের সম্ভাবনায় ইহার সঙ্গে সঙ্গে একটা বিদ্রোহ-আইনও পাশ হইয়া গেল। যদি আমেরিকার কোন অংশে বিদ্রোহ উপস্থিত হয়, তাহা নিবারণ করিবার জন্য ইংলণ্ড তথায় যত সৈন্য প্রেরণ করিবেন, এই আই- নের বিধানানুসারে তথাকার অধিবাসিগণকে তাহাদিগের জন্য উপযুক্ত বাসস্থান, সুকোমল শয্যা, সুমধুর পানীয়, শুষ্ক কাষ্ঠ, সুগন্ধি সাবান ও সুনির্মল বাতি প্রদান করিতে হইবে। এই কঠোর আইন জারি হওয়ায় বেঞ্জামিন্ ফ্রাঙ্ক- লিন্ প্রভৃতি মনীষীর হৃদয় বি কম্পিত হইল। তিনি কোন প্রিয় বন্ধুর নিকটে লিখিয়া পাঠাইলেন, “আমেরিকার স্বাধীনতাসূৰ্য্য অনন্তকালের জন্য অস্তমিত হইল! এক্ষণে আমাদিগের শ্রমশীলতাও মিতব্যয়িতার.বাতি জ্বালিয়া কথঞ্চিৎ জীবন ধারণ করা ভিন্ন আর কোন আশা নাই।” সাহসিকতর প্রিয়বন্ধু 'প্রত্যুত্তর লিখিয়া পাঠান—তাই !
জর্জ ওয়াসিংট।
এক্ষণে আমাদিগকে অন্য প্রকার বাতি জ্বলিতে হইবে।”
প্রত্যুত এই ঘটনার পরেই আমেরিকার সর্বত্র বিদ্রোহানল
জ্বলিয়া উঠিল।
এই সময়ে ক্যাড় ওয়ালার কোন্ডে নামক এক জন
অশীতিবর্ষবয়স্ক ইংরেজ নিউইয়র্কের গবর্নর ছিলেন। অতি
পবিত্ৰচরিত ও উদারপ্রকৃতি বলিয়া ইহাকে সকলেই শ্রদ্ধা
করিত। ইহব সমিতির সভ্যগণও অতি উচ্চমনাঃ ছিলেন।
এরূপ মন্ত্রিগণ-পরিবেষ্টিত হইয়াও এবং এরূপ মহাশয়
হইয়া ও এই প্রবীণ শাসনকর্তাকে রাজশাসনের অনুরােধে
লােক-সাধারণের অভ্যুত্থানের প্রতিকূলে দণ্ডায়মান হইতে
হইয়াছিল। ইতিহাসে এই জন্য তাহার নাম স্বাধীনতার
শত্রু বলিয়া কলঙ্কিত হইয়াছে। তিনি স্বাধীনতার প্রতিকূলে
দণ্ডায়মান হইলেন বটে, কিন্তু সে গতিরােধ করা তাহার
সাধ্যাতীত হইয়া পড়িল। স্বাধীনতার সম্প্রদায় চতুর্দিকে
দলবদ্ধ হইতে লাগিলেন। সংবাদপত্র সকল নির্মোক পরি-
ত্যাগ পূৰ্ব্বক অকুতােভয়ে আনেকিকার স্বাধীনতা ঘােষণা
করিতে লাগিল। ইংলণ্ডের সহিত বিচ্ছেদ অপরিহার্য
হইয়া উঠিয়াছে, এই কথা তাহারা মুক্তকণ্ঠে বলিতে লাগি-
• লেন। ১লা নবেম্বর ষ্ট্যাম্প আইন প্রচারের দিন স্থির ছিল।
সেই দিন যত নিকটবর্তী হইতে লাগিল, ততই আমেরিকার
অধিবাসিগণ অধীর হইয়া উঠিতে লাগিলেন। চতুর্দিকে
সভা বসিতে লাগিল, পথ ঘাট লােকে পরিপূর্ণ হইল।
আবাল বৃদ্ধ বনিতা দেশের জন্য, স্বাধীনতার জন=প্রায়
বিসৰ্জন কবিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হইল। ধন্য স্বজাতিপ্রেম।
ধন্য স্বদেশানুরাগ।
প্রাতঃস্মরণীয় চরিতমালা। ০১৭ অক্টোবর একটী মহতী জাতীয় সংস্থার অধিবেশন হই। এই সভায় স্ট্যাম্প লাইনের বিরুদ্ধে ব্রিটিশ পালে- মেটের নিকটে এক খান আবেদন পত্র পাঠান স্থির হইল। দেশের সমস্ত বড় লােক ইহাতে স্বাক্ষর করিলেন। জেমস ই ভারস নামক এক ব্যক্তি ষ্ট্যাম্প বিলি করিবাব ভার প্রাপ্ত হইরা ইংলও হইতে আসিয়াছিলেন। তঁহাকে অগত্যা কন্স পদত্যাগ পূর্বক দেশে ফিরিয়া যাইতে হইল। নিউইয়র্কের দুরে নাম ফোট সেন্ট জর্জ। ২৩ অক্টো- বর ইংলণ্ড হইতে নুতন ষ্ট্যাম্প সকল আসিয়া এই দুগো সংরক্ষিত হইলে, এই দুর্গের উপর আক্রমণ সম্ভাবনা করিয়া ইংরাজেরা ইহার রীতিমত জীসংস্কার করিলেন, এবং ইহাকে পূৰ্ব্বাপেক্ষা অধিকতর সুসংবক্ষিত করিয়া লই- লেন। দুগের কমানগুলির মুখ নগরাভিমুখে সংস্থাপিত হইল,এব’ ইংলঙীয় বণতরি সকল রণসজ্জায় সজ্জিত হই। নগরে বন্দরে আসিয়া লাগিল। নিউইয়র্ক অবরুদ্ধ নগরীর অকার ধারণ করিল। কিন্তু আমেরিকাবাসীরা ইহাতে ভীহ না হইয়া দলে দলে নগরে আসিয়া জুটিতে লাগিলেন। ধিনি---যে অস্ত্র পাইলেন, ইয়া নগরাভিমুখে ধাবিত হই লেন। ব্রিটিশ কামান রাজি যেন মন্ত্রৌষধরুদ্ধবীৰ্য্য সর্পের ন্যায় অকৰ্ম্মণ্য হইয়া রহিল। কেন না শত্রু হইলেও ই: রাজসেনাপতির এত লোকের উপরে গােল চালন করিতে হৃদয় ব্যথিত হইল। ক্রমে জনতা এই বাড়িয়া উঠিল ম ইংরাজের। বিদ্রোহীদিগের হস্তে সমস্ত ষ্ট্যাম্প অৰ্পণ করিতে বাধ্য হইলেন। অশেষ ইংলিশ পালে, মেটকে ষ্ট্যাম্প আইন অগত্যা রহিত করিতে হইল।
জর্জ ওয়াসিংটন্।
কিন্তু অবিলম্বে আর একটা আইন জারি হইল ; তাহা
তুল্যরূপ দূষিত ও তুল্যরূপ আপত্তিকর। এই আইন কাচ,
কাগজ ও প্রধানতঃ ‘চা’র উপরে কর ধার্য্য করিয়া দিল। ইষ্ট
ইণ্ডিয়া কোম্পানিকে অনুমতি দেওয়া হইল-ইংলণ্ডের যে
চা তাহারা আমেরিকায় পাঠাইতেন,আমেরিকাবাসীদিগকে
সেই ‘চার উপরে প্রতি পাউণ্ডে তিন পেন্স করিয়া শুষ্ক
দিতে হইবে। কিন্তু আমেৰিকাবাসীরাও প্রতিজ্ঞা করি-
লেন যে, ঐ চা কখনই আমেরিকায় নামাইতে দিবেন না।
প্রভিডেন্স প্রদেশের অধিবাসীরাই সর্বপ্রথমে এই
চার আমদানির বিরুদ্ধে অথিত হইল। একদিন নগরের
মধ্যে ঘােষণা হইল—যিনি, যে চা কিনিয়াছেন, লইয়া
বাজারে আসিবেন ; আর রাত্রি দশটার সময়ে সেখানে
এক অদ্ভুত অগ্নিকাণ্ড উপস্থিত হইবে। অধিবাসীরা সঙ্কেত
বুঝিতে পারিয়া সকলে যথাসময়ে যথাস্থানে আসিয়া চা
সমৰ্পণ করিল। রাত্রি দশটার সময় চা-স্তুপে অগ্নিপ্রদান
করা হইল। বিশ্বাবসুর প্রচণ্ড শিখার দশদিক আলােকিত
হইল । ললাকে সঙ্কল্প করিল, কিছুতেই বাজারে চা আনিতে
দিবে না। যদি কোন ইংরাজ বণিক সশস্ত্র পুৰুষ-পরিরক্ষিত
অবস্থায় চা আনিয়া বাজারের গুদামে রাখিত, অমনি
রাত্রিতে গুদামে আগুন লাগিত। ফিলাডেলফিয়া নগরে
চার জাহাজগুলি নদীমুখেও প্রবেশ করিতে সাহস করিল
যেমন অবস্থায় আসিয়াছিল, সেই অবস্থায় ইংলণ্ডে
ফিরিয়া গেল। নিউইয়র্কে সেনার সাহায্যে চা নামান
হইল বটে, কিন্তু কেহ চা কিনিল না। কারণ, ঘােষণা
হইয়াছিল, যে চা কিনিবে, তাহার মস্তক যাইবে। চার্লস
৯২ প্রাতঃস্মরণীয় চরিতমালা। টাউনেও ঐরূপে চা নামান হইল, কিন্তু ক্রেতা না জুটায়, চা গুদামে পড়িয়া পচিতে লাগিল, এবং অবশেষে অগ্নিদগ্ধ হইল। বােষ্টনেই সর্বাপেক্ষা অধিক গােলযোগ উপস্থিত হয়। এখানে গবর্ণর ও তাহার বন্ধুবর্গের উদ্দেশে চা পাঠান হয়। সুতরাং ইহা নামাইবার জন্য বিশেষ উদ্যোগ হইৰে ভাঘিয়া, লােকে বিশেষ প্রতিবিধানের চেষ্টা করে। সুবিমল প্রশান্ত রজনীতে ‘চার’ জাহাজগুলি বােষ্টনের বন্দরে আসিয়া লাগিল। যেমন লাগিল, অমনি তিনশত বােষ্টনবাসী বালক ছদ্মবেশে সেই সকল জাহাজের উপরে গিয়া পড়িয়া চার বাক্সগুলি ভাঙ্গিয়া চুরিয়া সব ঝুপঝাপ করিয়া জলে ফেলিয়া দিল। রক্ষকেরা প্রথমে বাধা দিয়া- ছিল, কিন্তু সে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ ‘গুলির নিকট পরাস্ত হইয়া শেষে চিত্রাপিতের ন্যায় দাঁড়াইয়া দেখিতে লাগিল। এই- রূপে তিনশত বত্রিশটী বাস ভগ্ন ও জলে প্রক্ষিপ্ত হইল'। এই বার ইংলণ্ড গর্জিয়া উঠিল। এই সংবাদ ইংলণ্ডে পোছিমাত্র স্থির হইল যে কোন রকমে হউক উপ- নিবেশগুলিতে ইংরাজ-প্রভুতা ও আইনের মর্যাদা পুনঃ- স্থাপিত করিতেই ইবে। বােষ্টনের ধ্বংশ স্থিরীকৃত হইল। বোষ্টনের উপরে হুকুম জারি করা হইল যে, যত চা নষ্ট করা হইয়াছে, সমস্তের মুল্য দিতে হইবে। বােষ্টনের সহিত সর্ববিধ বাণিজ্য নিষিদ্ধ হইল। কষ্ট হাউস প্রভৃতি সালেমে লইয়া যাওয়া হইল। কিন্তু সে বাণিজ্যে সালেমের ল্লোকে বােষ্টনের প্রতিদ্বশী হইতে চাহিল না। আমেরিকা বােষ্টনের সহিত সহানুভূতি দেখাইতে লাগিল। চতুদ্ধিকে 'লােক সকল এ নগর হইতে ৩ নগরে যাইতে সমg জর্জ ওয়াশিংট। লাগিল । সৰ্ব্বত্র বিশ্বব্যাপী অসন্তোষ ও বিরাগের ভাব পরিলক্ষিত হইতে লাগিল। হুনি-সংরুদ্ধ ক্রোধ, স্বজাতি- প্রেম, স্বাধীনতা-স্পৃহা যুগপৎ উদ্দীপিত হইয়া সমস্ত জাতিকে যেন একশরীরী করিয়া ইংরাজদিগের বিরুদ্ধে অখিত করিল। বােষ্টনে আর একটা ঘটনায় সঙ্কুক্ষিত বিদ্রোহামল আয়ও প্রবলিত হইয়া উঠিল। একদিন ইংরাজ সৈনিক- গণের সহিত নগরবাসীদিগের হাতাহাতি বাধিল, তাহাতে জাতীয় রক্ত পতিত হইল। শীতল ধবল বরফের উপরে সেই লােহিত রক্ত পতিত হইয়া যেন ইংলও ধবলযশে কলঙ্কারােপ করিল। এই ঘটনায় সমস্ত আমেরিকা অগ্নিময় হইয়া উঠিল। ইংলণ্ডের ন্যায়পরতা, জাতীয় গৌরব, মনুষ্যত্ব সমস্ত যেন আটলান্টিক গর্ভে নিমজ্জিত হইল। সমস্ত আমাবিকা সমস্বরে এই ঘটনার প্রতিবাদ করিলেন। সে স্বর আটলান্টিক বক্ষ বিদারিয়া ইংলণ্ডে গমন করিল। কিন্তু ইংলণ্ডের হৃদয় গলিত হইল না। ইংলণ্ড আমেরিকার- স্বাধীনতার ধ্বংস সাধনে কৃতসঙ্কল্প হইলেন। উভয় পার্সে- মেন্টই ইংলণ্ডেশ্বর তৃতীয় জর্জকে বুঝাইলেন যে,আমেরিকা অনেক দিন হইতে স্বাধীনতার জন্য স্থির-সঙ্কল্প হইয়াছিল; কেবল সাম্যৰ্থ ও সুবিধার জন্য অপেক্ষা করিতেছিল। এক্ষণে সেই রাক্ষসী স্বাধীনতাহাকে সূতিকাগারেই বিনাশ করা প্রত্যেক ইংরাজেরই অবশ্য কর্তব্য কয়; সুতরাং যে কোন মূল্যে ও যে কোন বিপদে হউক ইহা প্রত্যেক ইংরাজেরই সাধনীয়। এদিকে আমেৰিকাৰাগীরাও আত্মরক্ষার জন্য প্রস্তুত
-
৯৪ প্রাতঃস্মরণীয় চরিতমালা।
হইতে লাগিলেন। প্রাচ্য গগনে ভীষণ মেঘ উঠিয়াছে,
দেখিয়াই তঁাহারা স্থির করিলেন যে পশ্চিমাভিমুখে প্রবল
ঝটিকা বহিবে। নানা স্থানে জাতীয় সভার অধিবেশন
হইতে লাগিল। সকলেই মুক্ত হস্তে চাদা দিতে লাগিলেন।
দলে দলে সৈঙ্গ সংগৃহীত হইতে লাগিল। কর্মচারিগণ
মনােনীত হইতে লাগিলেন। আমাদের প্রবন্ধের অধিনা-
যক জর্জ ওয়াসিংটন সেনাপতির পদে অভিষিক্ত হইলেন।
আমেরিকা এতদিন অনেক কোমল উপায় অবলম্বন করিয়া
ব্যর্থ হইয়া এক্ষণে শাণিত অলি দ্বারা অদৃষ্ট পরীক্ষা করিতে
বদ্ধপরিকর হইলেন।
ফিলাডেলফিয়া নগরে একটা জাতীয় মহতী সভার
অধিবেশন হইল। আমেরিকাবাসীরা এখনও প্রকাশ্যরূপে
ইংলণ্ডের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘােষণা করিলেন না বটে, কিন্তু
তাঁহারা জাতীয় দায়িত্বে ঋণ সংগ্রহ ও অতি ত্বরা সহকারে
যুদ্ধের আয়োজন করিতে আরম্ভ করিলেন
তখন ব্রিটিশ সেনাপতি গেজ সাহেব বােষ্টন নগরে
অবস্থিতি করিতেছিলেন। পাছে তিনি সসৈন্য আমেরি-
কার অভ্যন্তরে প্রবেশ করেন, এই ভয়ে আমেরিকাবাসীরা
তাহাকে বােষ্টন নগরে অবরুদ্ধ করিতে কৃতসংকল্প হইলেন।
জর্জ ওয়াশিংটনের হস্তেই এই গুরু ভার পড়িল ।
আমেরিকানের বােষ্টন অবরুদ্ধ করিৰে, এই সংবাদ যখন
বােষ্টনে উপস্থিত হইল, তখন ইংরাজরা কিঞ্চিৎ বিস্মিত
হইলেন। তাঁহারা এ কথা কিছুতেই বিশ্বাস করিতে
পারিলেন না। তাহারা ভাবিলেন, যখন তঁহাদিগের
পুঞ্জীকৃত খাদ্যসামগ্রী রহিয়াছে, ও নগর দুর্গমংরক্ষিত বহি
। একটী দৃশ্যে জর্জ ওয়াসিংট। য়াছে, তখন বিদ্রোহিদিগের নিকট হইতে তাহাদিগের কোন জয়ের আশঙ্কা নাই। অপর ব্রিটিশ সেনাপতি হাউএরই এই বিশ্বাস ছিল। সুতরাং নির্বাণােন্মুখী দীপ- শিখার ন্যায় তাহাদিগের প্রমদ-প্রিয়তা এই ' মুম্ষুকালে অতিশয় প্রদীপ্ত হইয়া উঠিল। এই সময় একটী রঙ্গালর নির্মিত হইল; বলের* ধূমপড়িয়া গেল! প্রহসন, বকে, মাসকুইরেড় প্রভৃিতির জন্য ধধড় চাদা উঠিতে লাগিল। উক্ত রঙ্গালয়ে এক রজনীতে ‘বেষ্টন-অবরুদ্ধ' নামক এক- খানি প্রহসন প্রীত ও অভিমিত হইতেছিল। তাহাতে সেনাপতি ওয়লিংটনকে বিকলাঙ্গ অব- স্থায় একটা প্রকাণ্ড পরচুলা মাথায় নিয়া একখানি মচে ধরা তরবার হস্তে একজন মাত্র পুরাতন বন্দুকধারী ভৃত্য সমভিব্যাহারে রঙ্গমধ্যে অবতারিত করা হইয়াছিল। এই অংশটুকুর অভিনয়ু হইতেছে এমন সময় একজন সার্জন সহসা রঙ্গস্থলে আসিয়া উচ্চৈঃস্বরে জানাইল যে, আমেরি কানেয়া আসিতেছে। দর্শকমণ্ডলী প্রথমে ইহা অভিনয়ের অংশ মনে করিয়া অসম্ভব হাসিয়া উঠিল। কিন্তু অচিরকাল মধ্যেই তাহাদিগের সে ভ্রম দূরীকৃত হইল। সেনাপতি হাউ মুহূৰ্ত মধ্যে আসিয়া সুদৃঢ় ও গম্ভীর স্বরে আদেশ করিলেন“কর্মচারিগণ! অবিলম্বে সশস্ত্র আপন আপন স্থানে গনন কর।” সই হর্ষ, সেই প্রমােদ, সহসা বিষাদে পরিণত হইল (Jest became earnest.) যথার্থই বােষ্টন অবরুদ্ধ হইয়াছিল, যথার্থই ওয়াসিটন সসৈন্ত ব্রিটনদিগকে আসিয়া ঘিরিয়াছিলেন। বোষ্টনের অবরােধ কয়েক মাস * Balls, প্রমােদ নৃত্য।
প্রাতঃস্মরণীয় চরিতমালা। ধরিয়া রহিল।'বঙ্কার্স পাহাড়ে ইংরাজদিগের সহিত আমে- রিকানদিগের একটী যুদ্ধ হও তাহাতে বিজয়-লক্ষ্মী আমে- রিকানদিগে “য়িনী হন। ইংরাজেরা ওয়াসিংটনের নিকট প্রস্তাব করিলেন যে, যদি তাহাদিগকে অক্ষত শরীরে নগর ছাড়িয়া যাইতে দেন, ৬াহা হইলে তঁাহারা নগরের কোন ক্ষতি না করিয়া নগর ছাড়িয়া চলিয়া যাইতে প্রস্তুত আছেন। ওয়াসিংটন এ প্রস্তাবে সম্মত হইলেন। তদনু- সারে ইংরাজের। ১৭৭৬ খৃষ্টাব্দের ১৭ই মার্চ নগর পরিত্যাগ পূৰ্ব্বক হ্যালিফ্যাক্স যাত্রা করিলেন। এই স্বাধীনতাসমরে ওয়াসিংটন যে অদ্ভুত অবমান- পরস্পর • ম্পাদন করিয়াছিলেন, বীরত্বের ও আত্মত্যাগের যে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত সকল রাখিয়া গিয়াছেন, সে সকল আনু- পূৰ্ব্বিক বর্ণনা ক'। এ প্রবন্ধে সম্ভব নহে। আমরা কেবল প্রধান প্রধান দুই চারিটী ঘটনা উল্লেখ করিয়া এই জীবী সমাপ্ত করিব। ইউনাইটেড, ষ্টেটসে নিউইয়র্ক একটী প্রধান নগর। ইংরাজেরা তাহার উপর আক্রমণ করিবেন শুনিয়া তাহার রক্ষাৰ্থ ওয়াসিংটন । থায় গমন করিলেন। তাহার সহিত ১৭০০০ মাত্র ৪ ছিল। ২২এ আগষ্ট ইংরাজ সৈন্য নিউ ইয়র্কের অনতিদূরবর্তী লং আইল্যাণ্ড নামক দ্বীপের উপ- কূলে নানিয়াই আমেরিক শিবিরাভিমুখে অভিযান করিল। ইংরাজসৈন্য আসিতেছে দেখিয়া আমেরিকানেরা দুৰ্ব্বদ্ধি ক্রমে শিবির পৱিত্যাগ পূৰ্বৰু তাহাদিগের দিকে অগ্রসর হইল। এই সময় সেনাপতি কি ন দ্য দিক হইতে আর এক দল ইংরাজসৈন্য ল:-য়া আমেরিকান্দিগকে আক্রমণ জর্জ ওয়াসিংটন্। করিলেন। সুতরাং তাহাদিগের পলায়নের আশা পৰ্য্যন্ত রহিল না। দুই সেনার মধ্যে পদিয়া সেই আমেরিক সৈন্য ভস্মীভূত হইয়া গেল। সহস্র সৈন্য রণবন্দী হইল। অল্প- সংখ্যক মাত্র রক্ষা পাইয়া পরাজবাৰ্তা গৃহে লইয়া গেল। আমেরিক সৈন্য যুদ্ধে পরাস্ত হইল বটে, কিন্তু নিউইয়র্ক এখনও ওয়াসিংটনের হস্তে বহির। ইংরাজের। এই নগর অধিকার করিবার জন্য কৃতসংঙ্কল্প হইলেন। ওয়াশিংটন উপকূলে সৈন্য রাখিলেন—উদ্দেশ্য ইংরাজ সৈন্যকে জাহাজ হইতে নামিতে দিবেন না। তিনি স্বয়ংও দুই রেজিমেন্ট সৈন্য লইয়া দূর হইতে ঘটনা পর্যবেক্ষণ করিতেছিলেন। ইংরাজসৈন্য আবির্ভূত হইবামাত্র আমেরিকানো ভয়ে পলায়ন করিল—একটা মাত্র বন্দুকে আওয়াজ হইল না। বন্দুকের গুলি বন্দুকেই রহিয়া গেল। ওয়াসিংটন অল্পমাত্র আযাত্রিক সহ রণস্থলে পড়িয়া রহিলেন। তিনি নিজ সৈন্যগণের কাপুরুষতায় এত দূর বিরক্ত, দুঃখিত ও হতাশ হইয়াছিলেন যে, কাতরস্বরে বলিয়াছিলেন যে, এই সকল লােক দ্বারা কেমন করিয়া আমেরিকা রক্ষা হইবে ? যে সময় তিনি অশ্বপৃষ্ঠে আসীন হইয়া এই কথা ভাবতে- ছিলেন, সে সময় তিনি শত্রুসৈন্য হইতে অশীতি-পদ-পরি- মিত দূরে অবস্থিত ছিলেন। ওয়াসিংটনের রণস্থল পরিত্যাগ ৰুরিয়া যাইতে যৈন কষ্ট হইতেছিল। কিন্তু তাহার অনু- যাত্রিকেরা বিপদের আশঙ্কা করিয়া তাহার অশ্বের মুখ ফিরাইয়া দিল, এবং অশ্বের বল্পা ধরিয়া টানিয়া হাতে সবেগে রণস্থল হইতে লইয়া গেল। পরদিন ইংরাজদিগের সহিত একটা সামান্য যুদ্ধ হয়, তাহাতে আমেরিকানের প্রাতঃস্মরণীয় চরিতমালা। জয়লাভ করেন। ইহাতে তাহাদিগের বিলুপ্ত গৌরব কথ- ঞ্চিৎ পুনরুদ্ধত হয়। রাজিত হইও ইংরাজসৈন্য সংখ্যার আধিক্যবশতঃ আমেরিক সৈন্য ভৈদ করিয়া নগর মধ্যে প্রবেশ করিল। নিউইয়র্কের রাজতান্তিক দল মহাে- ব্লাসে ইংরাজসৈন্যগণকে গ্রহণ করিলেন। কয় রাত্রি নগরে অগ্নি লাগিয়া নগরের তৃতীয়াংশ ভস্মরাশিতে পরিণত হইল। ওয়াসিংটন নিউইয়র্ক পরিত্যাগ করিয়া হালেম নগরে শিবির সন্নিবেশিত করিলেন। তাহার সৈন্যমধ্যে গভীর হতাশতার ভাব দেদীপ্যমান হইল। ইংরাজসৈন্য হাখিগের অনুসরণ করিল। তঁাহারা পদে পদে পরাজিত হইয়া অব- শেষে নর্থ কাস পাহাড়ের থিরে আশ্রয় গ্রহণ করিলেন। বিজয়লক্ষ্মী এক্ষণে সম্পূর্ণরূপে ইংরাজদিপের করতলস্থ হইল। ইংরাজেরা ঘােষণা করিলেন যে, যে সকল বিদ্রোহী ৬০ দিনের মধ্যে অস্ত্র পরিত্যাগ করিবে, তাহাদিগকে সম্পূর্ণ- রূপে ক্ষমা করা যাইবে। এই হতাশ তার সময় ওয়াসিংটন আমেরিকার একমাত্র আশা ছিলেন। আমেরিকান মহাসভা তাহাকে ডিক্টেটরপদে অভিষিক্ত করিবার সঙ্কল্প করিলেন, তিনি তাহা স্বীকার করিলেন। কিন্তু সে অবস্থায় কিছু করিয়া উঠিতে পারিবেন এরূপ সাহল তিনি ভিন্ন আর কেহ করিতে পারি কি না সন্দেহ। ওয়াসিংটনের সৈন্যের দুরবস্থার ইয়ত্তা ছিল না। তাহা- দিগের পায় জুতা ছিল না, গায় ভাল বস্ত্র ছিল না; সুতরাং নগ্ন পদে, নগ্ন দেহে তাহাদিগকে হিমানীসমাচ্ছাদিত গিরি পথে, ও গিরিশৃঙ্গে পলাইয়া বেড়াইতে হইয়াছে। অনাহারে জর্জ ওয়াসিংট। ও অনিদ্রার তাহাদিগকে কতদিন যাপন করিতে হইয়াছে। স্বয়ং সেনাপতি অতুক্ত ও নিনি থাকিতেন বলিয়া তাহারা সে ক্লেশ সহিতে পারিত। ভাল শিক্ষা ছিল না, ভাল অস্ত্র শস্ত্র ছিল না বলিয়া ওয়াসিংটন নি সেনাকে সমতল ক্ষেত্রে শত্রুগণের সম্মুখীন করিতেন না। দিবসে পৰ্বত- গুহায় লুক্কায়িত থাকিয়া রজনীতে অতর্কিতভাৰে ইংরাজ- শিবিরে পড়িয়া তাহাদিগকে মারিয়া তাহাদের খাদ্যসামগ্রী অস্ত্রশস্ত্র ও পরিচ্ছদাদি লইয়া পলায়ন করিতেন। মহাসভা তাঁহাকে অস্ত্রশস্ত্র অর্থ বা খাদ্য সামগ্রী দিয়া সহায়তা করিতে পারিতেন না। সুতরা এ সমস্ত তাঁহাকে নিজেই সংগ্রহ করিয়া লইতে হইত। কোন দেশের কোন সেনাপতিকে এরূপ অসুবিধা ভােগ করিতে হইয়াছিল কি না সন্দেহ। কিন্তু তাহার অতিমানুষশক্তি-বলে তিনি ক্রমে ক্রমে এ সমস্ত বাধা বিপত্তি কাটাইয়া উঠিলেন। তাঁহার সৈন্তের ক্রমেই রণদীক্ষিত হইয়া উঠিল, হতশত্রুর অস্ত্র শস্ত্র ও পরি- ছদে ক্রমেই তাহারা সুসজ্জিত, হইয়া উঠিল। বীরত্বে ও স্বজাতিপ্রেমের ভাৰে তাহারা ক্রমেই রণােন্মত্ত হnt উঠিল। এতদিনের কষ্ট যন্ত্রণায় ওয়াশিংটনের সৈন্যগণ পদেশের মঙ্গলার্থ আত্মবলি দিতে প্রস্তুত হইল। শব-সাধনায় সিদ্ধ হইয়া ওয়াসিংটনের সৈন্যগণ এখন শত্রুসৈন্যের সম্মুখীন হইল। জলে স্থলে একেবারে তুমুল সংগ্রাম বাধিয়া গেল। চল পাঠক একবার কল্পনা-বলে বব্যামযানে উঠিয়া সেই সময়ের ইউনাইটেড ষ্টেটসের অবস্থা দেখি। ঐ দেখ সমস্ত আমেরিকা জলে স্থলে যেন একটা প্রকাণ্ড যুদ্ধক্ষেত্র বলিয়া প্রাতঃস্মরণীয় চরিতমালা। বােধ হইতেছে। ঐ দেখ ! ইংরাজ রণতরি বক্ষঃ শীত করিয়া পতাকা উড্ডীন ককিয়া আমেরিকাদিগের বিরুদ্ধে ধাবিত হইয়াছে, আর আমেরিকানেরা ভীষণ তােপধ্বনি করিয়া তাহাকে গ্রাস করিতে উদ্যত হইয়াছে। ঐ দেখ। আর একখানি ইংরাজ জাহাজ শ্বেতপালজি বিস্তার কম্বিয়া নিউইয়র্কের বন্দর হইতে তাজিনীয়াভিমুখে ধাবিত হই- আছে। ঐ দেখ! ইহার সৈনিকেরা উপকূল ৰিভাগ বিধ্বস্ত করিয়া লুণ্ঠনার্থ দেশমধ্যে প্রবেশ করিল। ঐ শুন! পীড়িত ও মুমুর্ষ, ইংরাজ সেনগণের আর্তনাদে গগন বিদীর্ণ হই তেছে। ঐ দেখ। জ্বর-রােগে আক্রান্ত হইয়া ইংরাজ-সৈন্য দলে দলে মরিতেছে, তথাপি লুণ্ঠন হইতে নিবৃত্ত হইতেছে আবার দেখ! আমেরিকানেরা কোথা হইতে হঠাৎ আসিয়া ব্রিটিশ শিবিরে পড়িয়া তাহাদের কামান, বন্দুক, তরবারি ও দ্রব্যসামগ্রী কাড়িয়া লইয়া যাইতেছে। ঐ দেখ! আর এক দল আমেরিকা তিমি-বোটে ও ঘােট ছোট ঈমারে করিয়া আসিয়া ইংরাজাধিকৃত উপকূল বিভাগে পড়িয়া ইংরাজেরও দ্রব্য-সামগ্রী লুট করিয়া লইয়া , যাইতেছে। যে সেন্ট… দুর্গের লােহিত ক্রসের নিকট একদিন প্রত্যেক আমেরিকান্ নতশির হইতেন, আজ সেই সেন্ট জর্জের দিকে কেহ ক্ষেপও করিতেছি না। ঐ যে সহস্র-বঞ্জ-নাদী কর্ণভেদী শব্দ নিলে, উহা একটী দুর্গ উড়িয়া যাইবার শব্দ। আমেরিকানেরা ডল কাটিয়া ইংরাজ-দুর্গের নিয়ে গিয়া বারুদে গর্ত পূরিত করিয়া তাকে অগ্নি প্রদান করায় ঐ দুর্গ উড়িয়া গেল। ঐ , ! জর্জ ওয়াসিংটন্। দেখ! আমেরিকানের আর একটা ইংরাজাধিকৃত নগরের উপর গােলাবর্ষণ করিতেছে।আবার আর এক দিকে দেখ! ঐ একটা শস্যক্ষেত্র দেখিতে দেখিতে রক্তক্ষেত্রে পরিণত হইল। ঐ দেখ ! দুই সেনা কি সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে পর- পরের গতি পর্যবেক্ষণ করিতেছে, এবং ভীষণ লক্ষে পর- স্পরের উপর পড়িয়া পরস্পরকে ছিন্ন ভিন্ন করিবার জন্য কি একাগ্রতার সহিত অবসর প্রতীক্ষা করিতেছে। উভয়ের ৰণৰিষয়িণী প্রতিভার পরীক্ষা দিবার এই একটা প্রকা বঙ্গস্থল। ঐ শুন। একেবারে শত শত কামান গণিরা উঠিয়াছে! সহস্র সহস্র বন্দুক পরক্ষণেই তীব্র শব্দে তাহার উত্তর দিতেছে। চতুর্দিকে ঘন মেঘ উঠিতেছে। ধুমপুরে হষ্টি আবরিত হইতেছে, এবং উভর সৈন্যের পরস্পর-সংহারী গুলিগােলার শব্দে 'কাণ ফাটিয়া যাইতেছে। ইংরাজসৈন্য পরাস্ত হইয়া পশ্চাদগামী হইল। ওয়াসিং টনের জয়, জয় আমেরিকার জয়’ শব্দেগগণ বিদীর্ণ হইল। এতদিনে স্বাধীনতা রাজতন্ত্রকে পরাস্ত করিল। এতদিনে জাতীয় দুগে জতীয় পতাকা উড্ডীন হইল। এই স্বাধীনতা সময়ের প্রধান নেতা ও প্রাণভূত ওয়াসিংটনের মশঃ আজ সমস্ত আমেরিকায় উদ্যোষিত হইতে লাগিল। न অধীন আমেরিকা, বিজয়ী আমেরিকা, নির্দিষ্ট নিয়মে ইংলণ্ডের সহিত সন্ধি করিতে প্রস্তুত আছেন-জানাই। জন্য ইংলণ্ডে কতিপয় ব্যক্তিকে দৌত্য কাৰ্যে পাঠাইলেন। যে আমেরিকা ইংলণ্ডের রাশি রাশি ষ্ট্যাম্প ভস্ম পরি- ণত করিয়াছে, ইংলণ্ডের জাহাজ জাহাজ চা সাগরগর্জে এক্ষেপ করিয়াছে, ইংরাজের ভর প্রদর্শনে পরিহাস ঐ দেখ !
১০২ প্রাতঃস্মরণীয় চরিতমালা। করিয়াছে, ইংরাজের অভয়প্রদানে তুচ্ছ করিয়াছে যে আমেরিকা ইংরাজ-সেনাকে পদদলিত ও ইংরাজ- পতাকাকে অবমানিত করিয়াছে, এবং ইংরাজ-প্রতাকে রিদিনের জন্য বিসর্জন দিয়াছে, আজ সেই আমেরিক জাতিকে একটী স্বাধীনজাতি বলিয়া ইংলণ্ডের স্বীকার করিতে হইবে। তাহার সহিত সমান ক্ষেত্রে সন্ধিসূত্রে আবদ্ধ হইতে হইবে, এবং সন্ধিপত্রে স্বাধীন নাগরিকগণের , স্বাক্ষর যেন রাজস্বাক্ষর বলিয়া গ্রহণ করিক্তে হইবে—সন্ত- তির এ প্রস্তাবে জননী ব্রিটানীয়াকে সম্মত হইতে হইল। ইংলণ্ডের সহিত সন্ধি হইয়া গেল। কিন্তু ওয়াসিং- টনের জীবনের কর্তব্য এখনও শেষ হয় নাই। তিনি আজ পদদলিত আমেরিকাকে স্বাধীন জাতিতে পরিণত করিয়া, রণপাণ্ডিত্যে জগৎকে মুগ্ধ করিয়া, জগতের শিক্ষার জন্য আত্মত্যাগের পরাকাষ্ঠা দেখাইতে চলিলেন। তাহার যে সেনা অঙ্গেয় ইংরাজসেনাকে রণে পরাস্ত করিয়াছে, সেই সেনার বলে আজ তিনি আমেরিকার সম্রাট হইতে পারি- তেন। কিন্তু সেই যােগীর অন্তরে সে নীচভাৰ লব্ধ-প্রবেশ হইল না। তাহার উদার অন্তরে বরং ইহার ঠিক বিপরীত ভাবের উদয় হইল। জাতীয় স্বাধীনতার জন্য তিনি অনিয়- খ্রিহ জাতীয় সৈনাপত্য স্বীকার করিয়াছিলেন । কিন্তু আজ সে কাৰ্য্য সম্পন্ন হইয়াছে, সুতরাং তিনি এক্ষণে সে সৈনাপত্য পরিত্যাগ করিতে কৃতসঙ্কল্প হইলেন। কিন্তু সে পুল পরিত্যাগ করিবার পূর্বে একবার সূসৈন্য নিউইয়র্ক নগরে প্রবেশ করিবেন, স্থির করিলেন। নিউইয়র্কের আমহাদিন। নিউইয়র্ক ইংরাজসৈন্তে জর্জ ওয়াসিংট। সেনানিবাস ছিল। আজ সে ইংরাজসৈন্য স্থলে স্থল না পাইয়া পয়ােনিধির আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছে। ঐ দেখ অদূরে ইংরাজ-রণতরি তাহাদিগকে বক্ষে ধারণ করিয়া রহিয়াছে। আজ সেদিকে কেহ দৃপতিও করিতেছে না। ওয়াসিং- টবিজয়ী ওয়াসিংটন্-আমেরিকার প্রাণের প্রাণ ওয়াসিংটন--আজ সসৈন্য নগর মধ্যে প্রবেশ করিবেন, তাই আমেরিকাবাসিরা আবাল-বৃদ্ধবনিতা সৰ্ব্ব কৰ্ম্ম পরিত্যাগ করিয়া নগরাভিমুখে ছুটিতেছে। দেখিতে দেখিতে সমস্ত রাজপথ জনাকীর্ণ হইয়া উঠিল—যেন রাজপথে জীবন-প্রবাহ প্রবাহিত হইল—যেন শির-সমুদ্রে সমস্ত নগর প্লাবিত হইল-যেন তরঙ্গেরউপর তরঙ্গ পড়িতে লাগিল নবেম্বরের মৃদু মধুর সূৰ্য্যবাশ্ম তাহাতে পতিত হইয়া জল তরঙ্গের অপূৰ্ব শােভা বিধান করিল। এমত সময় সহসা জয় ওয়াসিংটনের জয়, জয় আমেরিকার জয়’ ধ্বনি উত্থিত হইল। ধ্বনির উপর ধ্বনি, তাহার উপর ধ্বনিতে অাকাশ কাটিয়া যাইতে লাগিল। সেই জয়ধ্বনি সঙ্গে করিয়া অ- সেনা পরিবেষ্টিত, সুসজ্জিত অশ্বপৃষ্ঠে সমাসীন, রণজিৎ, লােক-প্রাণ ওয়াসিংটন নগরে প্রবেশ করিলেন। জয়ধ্বনি ও মঙ্গলধ্বনিতে নগর পরিপূরিত হইল। রাজপথের উভয় পার্শ্ব প্রাসাদাবলীর পক্ষমালা হইতে অনবরত পুষ্পবৃষ্টি হইতে লাগিল। এত দিন আমেরিকার জাতীয় জীবন ছিল না, সুতরাং জাতীয় পতাকাও ছিল না। কিন্তু আজ আমেরিকা বিশাল ও প্রবল-পরাক্রান্ত ব্রিটিশ সাম্রামের প্রতিদন্দী অনন্তবলশালী প্রকাণ্ড সাম্রাজ্য। সুতরাং আল আমেরিকার নৰসৌভাগ্যদ্যোতক পতাকা চাই। যে শুয়ে
!
১০৪ প্রাতঃস্মরণীয় চরিতমালা।
উপর ব্রিটিশ পতাকা উড্ডীন হইত, ব্রিটনেরা নগর পরি-
ভ্যাগ কালে তাহা ভাঙ্গিয়া রাখিয়া দিয়াছে। ঐ দেখ !
আমেরিক বীরনাগরিকের অমিত বলে ও মহােৎসাহে আজ
জাতীয় পতাকার স্তম্ভ গাঁথিতেছে। ঐ দেখ ! তাহাদিগের
ক্ষিপ্রহস্ততায় নিমেষমধ্যে স্তম্ভ নির্মিত হইল। ঐ দেব
আজ আমেরিক জাতীয় পতাকা সগর্বে ও সহর্ধে গগনে
নৃত্য করিতেছে—যেন নৃত্যচ্ছলে সমর বিজয়ী ওয়াসিংটনকে
আশীৰ্বাদ করিতেছে। ঐ দেখ! বীরচূড়ামণি ওয়াশিংটন
শিরস্ত্রাণ খুলিয়া নগ্ন শিরে নগর-মধ্যে প্রবেশ করিতেছেন
ও অবনত মস্তকে জাতীয়গণকে নমস্কার করিতেছেন।
অনেকে আজও তাহাকে দেখে নাই, অথবা দেখিয়াও তত
আকৃষ্টচিত্ত হয় নাই। অনেকে আজ ও ওয়াসিংটনের নামও
শুনে নাই। কোন্ দেবতা ছদ্মবেশে তাহাদিগের মধ্যে এত
দিন বাস করিতেছিলেন, 'দেখিবর নিমিত্ত আজ সমস্ত
আমেরিকা প্রায় সেখানে উপস্থিত। আমেরিকাবাসিগণের
সমস্ত ইন্দ্রিয় যেন আজ ভাহাদিগের নয়নে সংক্রামিত
হইয়াছে। তাহারা আজ প্রাণ ভরিয়া উপচিত শক্তিতে
তাহাদিগের উদ্ধারকর্তাকে দেখিতে লাগিল। আজ ওয়া-
সিংটন প্রত্যেক আমেরিকাবাসীর হৃদয়ের অধিষ্ঠাত্রী
দেবতা। আজ তিনি প্রত্যেক আমেরিকাবাসীর নয়নের
অঞ্জন। তাঁহাকে বারবার প্রণাম করিয়া ও অনবরত
দেখিয়ও আজ তাহাদিগের তৃপ্তি হইতেছে না।
ওয়াসিংটন ! ধন্য তােমার জীবন! অনাহারে অনিদ্রা তুমি
যে এতদিন ঘাের শবসাধানা করিয়াছিলে, আজ তাহার
সিদ্ধি দেখা না জানিতোমার মনে কি সুখসাগর উথ
ধ
জর্জ ওয়াসিংটন্। লিয়া উঠিয়াছে! তুমি আমেরিকার যে কাজ করিলে,যতকাল আমেরিকা থাকিবে কখনই সে উপকার ভুলিতে পারিখে না। আমেরিকায় কখনই জাতীয় জীবন ছিল না, সুতরাং তুমি আজ একটী নূতন জাতি সৃষ্টি কৰিলে। তােমার তপৰলে ও চরিত্রমাহাত্মে সেই জাতি একদিন জগতের তীর্থস্থল হইবে। ধন্য তােমার বীরত্ব! তুমি বিনা শিক্ষায়, বিনা অস্ত্রবলে যুদ্ধক্ষেত্রে অবতীর্ণ হইয়াও একটা বিশ্ব- জিয়িনী জাতিকে পরাস্ত করিলে। তােমার অসাধ্য কিছুই নাই। ১৭৭৫ খ্রীষ্টাব্দে ওয়াসিংটন আমেরিকার সৈনাপত্য গ্রহণ করেন। তাঁহার অতিমানুষ বীরত্বে আমেরিকার চরণ হইতে ব্রিটিশ শৃঙ্খল স্খলিত হইল। তাহার যত্নে আমেরিকাবাসিগণ পৃথিবীর একটা জাতিমধ্যে পরিগণিত হইলেন। তঁাহার জীবনব্রতের পূর্ণ উদযাপনা হইলে তিনি ১৭৮৩ খ্রীঃ অব্দে জাতীয় সৈনাপত্যের পদ পরিত্যেগ পূৰ্ব্বক আপন গ্রাম্য আবাসে গমন করিয়া সাধারণ লোকের চায় সংসারযাত্রা নিৰ্বাহ করিতে লাগিলেন। কিন্তু অধিক দিন তিনি বিশ্রাম-সুখ ভোগ করিতে পারিলেন না। অচিরকাল মধ্যেই আমেরিকা আর তঁাহার শরণাপন্ন হইল। তিনি যে শুদ্ধ বীরত্বে অধিতীয় ছিলেন, এপ নহে। তিনি অসাধারণ-ধীশক্তিসম্পন্ন ও প্রগাঢ় রাজনীতি ছিলেন। বিশেষতঃ নিষ্কাম দেশহিতৈ- ষণার জন্য তিনি আমেরিকাৱাসীমাত্রেরই উপাস্য দেবতা ছিলেন। যখন প্রেসিডেন্টের পদ সৃষ্ট হয়, তখন সকলে একবাক্যে তাহাকেই ঐ পদে বরণ করিল। তাহাকে গ্রাম্য প্রাতঃস্মরণীয় চরিতমালা। আবাস পরিত্যাগ করিয়া অগত্যা ঐ জাতীয় অধিনায়কত্ব পদ গ্রহণ করিতে হইল। পাঁচ বৎসরের অধিক এই পদে থাকার কাহার অধিকার নাই। কিন্তু ওয়াসিংটন তিনবার এই পদে মনােনীত হন। অবশেষে ১৭৯৯ খৃষ্টা- ব্দের ১৪ই ডিসেম্বের তিনি মানবলীলা সম্বরণ করেন। জাতীয় মাসতার সভ্যেরা ও দেশের সমস্ত লােক এই শোচনীয় ঘটনায় একমাস কাল শােকচিহ্ন ধারণ করেন। এই মহাপুরুষের মৃত্যুতে জাতীয় হৃদয়ে শােক উদ্দীপিত করিবার জয় কোন জাতীয় বিধি-ব্যবস্থার প্রয়াে- জন হয় নাই। যে মহাপুরুষের প্রাণোংসর্গের ফলে আজ আমেরিকা অনন্তসৌভাগ্যশালিনী ও অনন্ত সুখৰতী; যাহারা বীরত্বে ও ধর্মবলে একদিন আমেরিকা অগণ্য বিপদপরস্পর হইতে উদ্ধার লাভ করিয়াছিল; যাহাকে আমেরিকাবাসীরা এতদিন পিতার ন্যায় ভক্তি করি। আসিতেছিল,—সেই পবিত্ৰহৃদয় মহাপুরুষ আজ ইহ- লােক পরিত্যেগ করিয়া গিয়াছেন—বলিয়া আজ আমে- রিকার আবাল বৃদ্ধ-বনিতা শশাকে অভিভূত। সে গভীর শােক ব্যক্ত করা অসম্ভব। তথাপি যাহার যেরূপ সাধ্য, আমেরিকাৰসীমাত্রেই সেইরূপে তাহা ব্যক্ত করিবার চেষ্টা করিয়াছিল। বাগ্মী সভাগৃহে বক্তৃতা করিয়া, জাক ভজনালয়ে সম্মান (ধর্মনীতিবিয়য়ক বক্ত দিয়া, সম্পা- দক সম্বাদপত্রের স্তম্ভে লিখিয়া, জাতিসাধারণ নীরবে অশ্রুজল ফেলিয়া-এই মহাপুরুষের মৃত্যুজনিত শােকপ্রকাশ করিয়াছিলেন। ওয়াশিংটন যে অামেরিকগণের আস্তৰ পিন্থা .
জর্জ ওয়াসিংটন। ছিলেন, তদ্বিষয়ে আর সন্দেহ নাই। বিপুলের জিনে যখন আমেৰিকাৰসিগণ কিংকৰ্যবিমুঢ় হইয়া পড়িয়া- ছিলেন, তখন তিনি তাঁহাদিগের একমাত্র বন্ধু ও এক মাত্র সহায় ছিলেন। অস্ত্র শস্ত্র নাই, শিক্ষা নাই, ধন নাই, অঙীত জাতীয় গৌরবের উদ্দীপনা নাই—এরূপ অব জাষ্ঠীৰ গৌৰৰে তাৰে সৈন্যগণকে উদ্দীপিত করা অসাধ্য- সাধন বলিলেও অত্যুক্তি হয় না। ওয়াশিংটন সেই নিরস্ত্র, বিবস্ত্র অশিক্ষিত সেনাকে আপনার প্রাণােৎসর্গের মােহিনী মন্ত্রবলে অচিরকাল মধ্যে অজেয় করিয়া তুলিয়াছিলেন। এ স্বাধীনতাসমরে জাঙিসাধারণ তাহাকে অনিয়ন্ত্রিত প্রভুতা দিয়াছিল মাত্র, কিন্তু তঁাহাকে আর কোন প্রকারে সহয়তা করে নাই । তিনি স্বজাতির ধন লুণ্ঠন করিয়া অাপনার ও সেনার ঈদবপূৰণ করিতে ইচ্চা করেন নাই । এই জন্য তিনি ও তঁাহার সেনা পাৰ্ব্বীয় বৃক্ষ- লদিব ফলমূল ভক্ষণ করিয়া এই শব-সাধনা করিয়াছিলেন। সেই যােগবলেই এরূপ মহতী সিদ্ধি লাভ করিয়াছিলেন। তিনি আমেরিকাকে পূগোৱৰে প্ৰতিষ্ঠাপিত করেন নাই, কারণ আমেরিকায় পূর্মগৌৰ ছিল না। তিনি আমেরিক জাতির সৃষ্টিকর্তা, আমেরিকার জাতীয় গৌৰ- বের ও জাতীয় স্বাধীনতার প্রতিষ্ঠাতা, এবং আমেরিকার জাষ্ট্রীয় জীবন ও জাতীয় ইতিহাসের প্রবর্তয়িতা। এরূপ মহাপুরুষের এ শোকচিহ্ন শোকচিহ্ন ধারণ করিয়া ও এরূপ মহাপুরুষের নামে তঁাহাদিগের নামে তাহাদিগের রাজধানীর মকরণ করিয়া তঁাহারা প্রকৃত সহুগতার পরিচয় দিয়াছে'। এই মহাপুরুষের মৃত্যু হলি ও ইংলও শোক,
=
প্রাতঃস্মরণীয় চরিতমালা।
চিহ্ন ধারণ করিয়াছিল। ৯ই ফেব্রুয়ারি এই সংবাদ প্রথমে
ফ্রান্সে
উপস্থিত হয়। তখন সুপ্রসিদ্ধ নেপােলিয়ন
বোনাপার্ট সাধারণতমী ঐন্সের প্রথম কন্সলের পদে
অতিষিক্ত ছিলেন; তিনি নিজ সৈন্যগণের প্রতি এই আদেশ
প্রচার করেন :-
সৈন্যগণ! ওয়াসিংটনের মৃত্যু হইয়াছে! এই মহা-
পুরুষ বথেচ্ছারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিয়াছিলেন। তিনি
দেশের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠু করিয়াছিলেন। ফরাসী জাতি
ও পৃথিবীর স্বাধীন জাতিমাত্রেরই নিকট তাহার স্মৃতি
অতি প্রিয়। বিশেষত ফরাসি সৈন্যগণের নিকট ইহা
প্রিয়তব; কারণ, ফার্সীসৈন্য তাহার ন্যায় ও তাহার
সৈন্যগণের স্যার স্বাধীনতা ও সাম্যের জন্ধ যুদ্ধ করিয়াছিল,
অতএব তােমরা সকলেই তাহার জন্য শােকচিহ্ন ধারণ
করিবে।” তিনি আরও আদেশ করলেন যে ফরাসি
সাধারণতন্ত্রের সমস্ত পশুকায় ও পশুকান্তে
কাল কৃষ্ণ ক্রেপ সংলগ্ন রাখিতে হইবে। পারিস নগৰীৰ
এক হােটেলে (hotel des Invalides) ওয়াসিংটনের
স্মৃতিসন্মানার্থ একটা আন্ত্যেষ্টিক বক্তৃতা কবা হইল। সেই
সেই ৰক্ত তালে নেপোলিয়ন ও সমস্ত সিৰিল ও মিলি-
টারী কর্মচারীরা উপস্থিত ছিলেন। ফাঙ্গ কোন বৈদেশিকের
হয় আর কখন এরূপ শােক প্রকাশ করেন নাই।
যখন ইংলণ্ডের রণতরী সকল টোবে বন্দয়ে নোঙ্গর
করিয়া ছিল, সেই সময় পােতাধ্যক্ষ লর্ড ব্রেষোটের
নিকট এইসংবাদ আসিল। এই শোচনীয় সংবাদে শত্রুর
মন বিগলিত হইল। তার আদেশে তদীর পােত
দশ দিন
2
উপসংহার। হক। অৰ্দ্ধনমিত করা হইল। অবশিষ্ট উনবাইট খানি রণতরী মূহূৰ্ত মধ্যে তাহার দৃষ্টান্তের অনুবর্তন করিল। ধন্য ওয়াশিংটন ! তুমি চরিত্ৰগৌরবে আজ শহর ও বিগলিত করিয়া তাহার নিকট পূজা গ্রহণ করে। তােমার নিফাম স্বদেশহিতৈষণা তোমাকে অনন্ত কাল এইরূপে শত্রু মিত্র উভয়েরই পূজা করিয়া রাখিৰে। দেব । আমার হদর আসনে একবার চাবিভূত হইয়া আমাকে এইরূপ নিষ্কাম ধর্ম শিক্ষা স্যা। একবার আবির্ভূত হইয়া ভারতের দারিদ্র্য-ব্রতের ও নিস্কাম আহু মহিমা প্রচার কর। দেব! একবার দেখা জঙিকে জাঙিপ্রেম ও স্বদেশানুরাগ শিখা মি উপসংহার। আমার এই প্রবন্ধে * বশিষ্ঠ, বিশ্বমি চৈতন্য, গুরুগােবিন্দ, ওয়ালেস্, টেল, হাডেন, উইলবারফোর্স রমিলি, ম্যাটসিনি, গ্যারিবী, ওয়াসিস্ট প্রভৃতি যে সকল * * মহাপুরুষগণের নাম সঙ্কীত্তন করি- লাম,তাহারা প্রত্যেকেই আত্মোৎসর্গের এক একটা জলন্ত দৃষ্টান্ত। এই জন্যই এ প্রবন্ধের নাম প্রাতঃস্মরণীয় চরিত- মালা রাখিলাম। কারণ প্র&িদিন প্রাতে উঠিয়া ইহাদিগের নাম স্মরণ করিলে মন স্বর্গীয়ভাৰ ধারণ করে। এজন্য আবাল বৃদ্ধ বনিতা, সকলেরই প্রান্তে উঠিয়া ইহাদিগের নাম স্মরণ করা উচিত। ইহারা প্রত্যেকেই এক একটা গুরুত্ব ব্ৰত গ্ৰহণ করিয়াছিলেন। প্রত্যেকেই সেই সেই ৰন্ধের উদযাপনায় নিজ নিজ জীবন উৎসর্গীকৃত করি- প্রাতঃস্মরণীয় চরিতমালা । * লিন।প্রত্যেকেই নিজ নিত্ত সম্পত্তিতে জলাঞ্জলি দিয়া ৰিদ্ৰা-ব্রহ গ্রহণ করিয়াছিলেন। প্রতেকেই নিজ নিজ জীবনে প্রত্যক্ষ দেখাইয়া গিয়াছেন যে, বনস্পৃহা আত্ম- ক্ত্যাগের প্রতিকূল। যিনি পরদুংখ-কাত, তিনি পয়দুঃখ দেখিয়া কখন ধন পুৰ্মীকৃত করিয়া রাখিতে পারেন না। -বনের প্রথম কাব্য--নােৎসর্গ, দ্বিতীয় কার্য- এগোৎসর্গ। বুদ্ধ নােসর্গের প্রধুনীর। তিনি রাজপুত্র হইয়াও ভাবী যজসিংহাসনের আশায় লাঞ্জলি দিয়া মানব- হিত্ৰত্রে জীবন উৎসর্গ কবিৰাঞ্ছিলেন। এই জন্য আজ ও পৃথিবীর এক-তৃতীয়াংশ অধিবাসী বুদ্ধ পাকাসিংহের উপা সক। হিন্দু যবন মিশাইতে পি গুগোবিন্দ ও বাহন্তে প্রাণ হারাইয়াছিলেন। ওয়ালে দ বঙ্গাভির #দ্ধাৰ সাধন করিতে গিয়া ইংৰা ঘাতকের হতে প্রাণ বিসর্জন করিয়ান্ধিলেন। তঁাহার অঙ্গ প্রত্যঙ্গ সকল সীর অঙ্গের ন্যায় স্থানে স্থানে প্রক্ষিপ্ত হইয়াছিল। হ্যামডেন ও জাতীয় স্বাধীনতা রক্ষা করিতে গিয়া প্রাণ হারাইয়াঙ্কিলেন। ম্যাট সিনি ও গ্যারিবল্ডী দিন দিন একটু একটু করিয়া শরীৰ গলার স্বজাহিউদারানলে আছঠি গিয়াছিলেন। ওমা- সি’ইন ও টেস্ জীবনের মমতায় জলাঞ্জলি দিয়া দেশের উদ্ধারানলে ঝাঁপ দিয়াচ্ছিলেন। তাহাদিগের সৌভাগ্যক্রমে তাঁহার সে অগ্নিপরীক্ষায় উতীর্ণ হইয়াছিলেন। হাইয়া, উইলবারফোর্স রােমিলী ইহারা মানবপ্রেমে উন্মাদিত ইয়া মানবজাতির দুঃখমােচনে ধন ও প্রাণ উৎসর্গ করিয়াছিলেন। এই যোগিদের প্রত্যেকের জীবনেই w উপসংহার। ধনেৎসর্গ ও প্রাণাংসর্গের বহুল দৃষ্টান্ত উপলক্ষিত হয়। কেহ পূর্ণ যোগী, কেহ বা অর্ধ-সংসারী ও অর্ধযােগ এইমাত্র ভেদ। সকলেরই জীবনের একই লক্ষ্য—মানবদুঃখ-নিবৃত্তি মানৰ-সুখবৃদ্ধি। দারিদ্র্য এই শব-সাধনার প্রধান উপ- কর-সামগ্ৰী ৰলিয়া ইহা সকলেই দারিদ্র্যকে মিত্রভাবে আলিঙ্গন করিয়াছিলেন। ক্যাপেরার, মরু- ভূমিতে গ্যারিবী, মার্সেলিসের-মধু-গহ্বরে ম্যাট সিনি, স্কটলণ্ডের পর্বতগুহায় ওয়ালেস, কারাগারের অন্ধকারে ও কুষ্ঠরােগাক্রান্তদিগের চিকিৎসালয়ে হউয়ার্ড, দাসদিগের কুটীরে উইলবাবফোস, অলিঘানী পৰ্ব্বতের নীহারিণী অধিত্যকায় ওয়াসিংষ্ট, সুইজলণ্ডের পাষাণে টেল, তপো- বনে পর্ণকুটীরে বশিষ্ঠ, বিগামিত্র ; রােগীর রুশয্যায় বা মৃত্যুশয্যায় বুদ্ধ ; বৈরাগীর স্থণ্ডিল অসনে চৈতন্য, কারাগারের তমোময় গর্তে হ্যাডেন, ও অপরাধীর রুধির-কৰ্দমিত বধ্যভূমিতে রমিলী এবং পিতৃশবােপর গুরু- গোবিন্দ শবসাধন করিয়াছিলেন। রাজপ্রাসাদ শৰসাধনার উপযােগী স্থল নহে। ঐশ্বর্য শবসাধনার অনুকূল-সাধন- সামগ্রী নহে। পর্ণকুটীর, গৈরিক বসন, কমণ্ডলু, উঞ্ছবৃত্তি প্রভৃতিই শবসাধনার অনুকূল স্থান ও সাধন-সামগ্রী। আবার ভারতের এই সকলের অাবশ্যকতা হইয়াছে। কিন্তু এবার আমাদের শবসাধন লক্ষ্য পরকাল নহে, ইহকাল। এবার আমরা পরের দুঃখে উদাসীন হইয়া সংসার ছাড়ি নির্জন কুটীবে বসিয়া কেবল নিজের পার- লৌকিক বিশ্বে চিন্তায় নিমগ্ন থাকিব না। এবার আমরা সেস্বার্থপরতা পরিত্যাগ করিয়া স্বদেশের মঙ্গলার্থ শৰ, .
প্রাতঃরীয় চরিতমালা।
সাধনা করব। এবার আমরা নিজের স্বর্গ নরক লইয়া
ব্যতিব্যস্ত থাকিৰ না। আমি নবকে যাই তাহাতে আমার
দুশ নাই, কিন্তু আমার দেশ, যেন আমার শশাধনার বলে
নরক হইতে উত্থিত হয়। আমি স্বর্গে যাইতে না পারি,
তাহাতেও আমার দুঃখ নাই, কিন্তু আমি যেন অন্ততঃমৃত্যু-
কালেও দেখিয়া যাই যে, আমার দেশ অপূৰ্ব্ব স্বর্গরাজ্যে
পরিণত হইয়াছে, অশাতি, দেববাচিত সৌভাগ্য ভোগ
করিতেছে। না জানি সে সৌভাগ্যের দিন কতদিনে
আসিৰে! কে বলতে পারে, কতদিনে আসিবে ?
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.