Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Kabi Shekh Sadi
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
কবি শেখ সাদী
( জীবন, যুগ ও কাব্যালােচনা)।
যারা পৃথিবীতে কোনাে একটা বড় সৃষ্টির কাজ করেছেন, কোনাে সৌন্দর্যকে
আকার দিয়েছেন, কোনাে মহৎ ভাৰকে প্রকাশ করেছেন, জীবনে বা সাহিত্যে
বা কোন রকম ললিত কলায় সত্যকে সুন্দরকে কল্যাণকে বড় করে দেখিয়েছেন,
তারা কোন বিশেষ দেশের অধিবাসী নন কিন্তু সকল দেশের অধিবাসী ও সকল
কালের লােক। একথা যদি স্বীকার না করি, তাহলে সমস্ত মনুষ্য সমাজের মধ্যে
আমাদের মে স্থান আছে, সেই স্থানকেই অস্বীকার করা হবে। রবীন্দ্রনাথ।
শ্ৰসুরেশ চন্দ্র নন্দী
প্রণীত
শামস-উল-উলমা, খান বাহাদুম
অধ্যাপক ডাক্তার হেদায়েত হােসেন পি-এ-ডি,
লিখিত ভূমিকা।
বেঙ্গল পাবলিশিং হােম
কলিকাতা
মূল্য পাঁচ সিকা।
প্রকাশক
শ্ৰীগিরীন্দ্রকৃষ্ণ মিত্র
বেঙ্গল পলিশিং হােম,
কলিকাতা।
কবি-জ্যোতির্বিদ
ওমর খৈয়াম
যন্ত্রস্থ
৫নং সুর মহম্মদ লেন
এলবিয়ন প্রেসে
এইমাম উদ্দিন হাওলাদার দ্বারা
মুদ্রিত।
পরমারাধ্য স্বর্গীয়
অধর চন্দ্র নন্দী
পিতৃদেবের
শ্রীচরণেদ্দেশে।
No text on this page.
Bu thon ware where Sadi dwells ;
Wisdom of the gods is lie
Entertain it reverently,
Gladly round that golden lamp
Sylvan deities encainp,
And simple maids and noble youth
Are welcome to the man of truth.
Most welcome they who need him most,
They feed the spring which they exhaust;
For greater need.
Draws better deed :
But, critic, spare thy vanity,
Nor show thy poinpous parts,
To vex odious subtlety
The cheerer of men's hearts.
Emersou.
No text on this page.
প্রকাশকের নিবেদন। বঙ্গভাষায় পারস্যের কবি শেখ সাদীর জীবনী এই প্রথম। এই পুস্তকের অন্তর্গত প্রস্তাব কতিপয় যখন সাময়িক পত্রে প্রকাশিত হয়, তখন হইতেই সাহিত্য-সমাজে বেশ একটু সাড়া জাগাইয়াছে। মুসলমান সাহিত্য-সমাজের মুখপত্র “সহচর” লিখিয়াছেন, বঙ্গভাষায় ফার্সী সাহিত্যের কোন প্রকার আলােচনা ছিলনা। পূৰ্ব্বে পারস্য ভাষা ও সাহিত্যে যথেষ্ট হিন্দু ও মােসলমান পণ্ডিত থাকা সত্ত্বেও কেহ এবিষয়ে হস্তক্ষেপ করিতেন না। ইংরাজ, ফরাসী, জৰ্ম্মণ প্রভৃতি পণ্ডিতগণই বিরাট ফার্সী সাহিত্যের আলােচনা করিয়া নিজ মাতৃভাষাকে সমৃদ্ধ ও নিজেকে গৌরবান্বিত করিয়াছেন। বড়ই সুখের বিষয় এতদিন যে কাজ য়ুরােপীয় পণ্ডিতগণের গবেষণার বিষয়ীভূত ছিল, বাঙ্গালার হিন্দু ও মুসলমান বঙ্গভাষায় সেই কাজ—ফার্সী সাহিত্যের আলােচনায় মনােনিবেশ করিয়াছেন। এ বিষয়ে শামস-উল-উলমা, খান বাহাদুর, অধ্যাপক ডাক্তার হেদায়েত হােসেন, ডি-লিট, পি-এ-ডি, খান বাহাদুর আবদুল মুক্তাদির প্রভৃতি ও শ্রীযুক্ত সুরেশ চন্দ্র নন্দী মহাশয় অগ্রণী। মৌলভী হােসেন সাহেব ও মৌলভী মক্তাদির সাহেব সরকার কর্তৃক নিয়ােজিত হইয়া একাৰ্য্যে হস্তক্ষেপ করিয়াছেন। আর শ্রীযুক্ত সুরেশ চন্দ্র নন্দী মহাশয় নিজ কর্তব্যজ্ঞানপ্রণােদিত হইয়া ফার্সী সাহিত্যের আলােচনায় আত্মনিয়ােগ করিয়াছেন।তিনি মাসিক সাহিত্যে জগদ্বিখ্যাত কবি শেখ সাদীর সম্বন্ধে যে আলােচনা জাগাইতেছেন, তাহা বস্তুতই মূল্যবান ও গবেষণাপূর্ণ।
সুবিখ্যাত মাসিক “সাহিত্য” লিখিয়াছেন, ফার্সী কবির জীবন-কথা, কাব্য-পরিচয় বঙ্গসাহিত্যে অপূর্ব, সুচিন্তিত, পাণ্ডিত্যপূর্ণ ও গবেষণামূলক। প্রত্যেক সন্দ’তে লেখকের পরিশ্রম, তথ্য সংগ্রহ, ও দক্ষতার প্রচুর পরিচয় পাওয়া যায় । দেশ প্রসিদ্ধ বসুমতী লিখিয়াছেন, এ যাবৎ ফার্সী কাব্য- সাহিত্য এ দেশ বাসীর পক্ষে চীনা জাপানীর মত দুর্বোধ্য ছিল, সম্প্রতি শ্ৰীযুক্ত সুরেশ চন্দ্র নন্দী মহাশয় বাঙ্গালা ভাষায় ফাসী কবি শেখ সাদীর জীবন- কথা ও কাব্যালােচনা করিতেছেন। অমর কবি শেখ সাদীর কাব্য কি মধুর, কি প্রাণ মনােহর, কি স্বর্গীয় সুধারসে পূর্ণ, তাহা ফাসী কাব্যামােদী মাত্রেই জানেন। সুরেশ বাবু বাঙ্গালা ভাষায় বাঙ্গালীকে এই উপহার দিয়া নিশ্চিতই বাঙ্গালীর ধন্যবাদ ভাজন হইয়াছেন। সুপ্রসিদ্ধ আনন্দবাজার পত্রিকা লিখিয়াছেন, বিশ্বভারতীর অন্যতম কবি শেখ সাদীর জীবনী ও কাব্যালােচনা পৃথিবীর নানাভাষায় আলােচিত হইয়াছে। বঙ্গদেশে শেখ সাদী সুপরিচিত হইলেও বঙ্গভাষায় পারস্য সাহিত্যের কবিগণের জীবনী বা কাব্যালােচনার যথেষ্ট অভাব আছে। পারস্যের কাব্য-সাহিত্যের আলােচনার অধিকার হিন্দু ও মুসলমান উভয়েরই আছে। কিন্তু বড়ই দুঃখের বিষয় এ যাবৎ কেহই এ বিষয়ে মনােযােগ দেন নাই। সুখের বিষয় বাঙ্গালী লেখকগণের মধ্যে শ্ৰীযুক্ত সুরেশ চন্দ্র নন্দী মহাশয় পারস্যের কাব্য-সাহিত্য আলােচনায় প্রবৃত্ত হইয়া এ অভাব দূর করিয়াছেন ও উভয় সম্প্রদায়ের ধন্যবাদভাজন হইয়াছেন। বস্তুতঃ সুরেশবাবুর এই শাচনা দ্বারা বঙ্গসাহিত্যের সম্পদ বৃদ্ধি হইতেছে।
•
এই পুস্তকখানি বঙ্গসাহিত্যের সম্পদ বৃদ্ধি করিবে সকলেই এই
প্রকার মন্তব্য প্রকাশ করিয়াছেন। আমরাও এই আশায় ইহা প্রকাশ
করলাম। দ্বিতীয় সংস্করণে ইহার অধিকতর উন্নতি সাধনে যত্নবান
হইব। ইতি-
বিনীত—
গিরীন্দ্রকৃষ্ণ মিত্র।
No text on this page.
নিবেদন। দ্রাক্ষা-খঞ্জুর-হেনা-গুলাব-কুঞ্জ-শশাভিত বুলবুল-ঝক্ত পারস্য দেশও বঙ্গদেশের ন্যায় এক সময়ে কবি-বুলবুলের অবিশ্রান্ত ঝারে ঝঙ্কৃত হইয়াছিল। বঙ্গদেশের ন্যায় পারস্য দেশেও এত অধিক সংখ্যক কবির আবির্ভাব হইয়াছিল যে তাহার কবি-তালিকা প্রস্তুত করা একরূপ অসম্ভব বলিলে অত্যুক্তি হয় না। পণ্ডিতেরা বলিয়াছেন, “কবিত্ব নরের দুলভ বস্তু।” যেখানে কবির সংখ্যা অধিক, সেখানে নরের দুলভ “কবি-যশঃ ” লাভ করা আরও কঠিন। পাঠান শাসন কালের বঙ্গসাহিত্যের ইতিহাস আলােচনা করিলে এ কথার যাথার্থ্য উপলব্ধি হইবে। এই সময়ে বঙ্গদেশের সাহিত্য-প্রতিভার জাগরণ হয়। এ জাগরণের শুভ মুহূর্তে জয়দেব, চণ্ডিদাস, বিদ্যাপতি প্রভৃতি অসংখ্য কবির বীণার ঝঙ্কারে বঙ্গদেশ মুখরিত হয়। কবি-প্রতি- যােগীতা-ক্ষেত্রে বহু কবির অদৃষ্টে “নর-দুল’ভ কবি-যশঃ” অর্জন ঘটে নাই। পারস্য দেশের সাহিত্যের ইতিহাস আলােচনা করিলে জানা যায় যে, বঙ্গদেশের মত পারস্য দেশের কবিগণেরও ঠিক সেই অবস্থা বটিয়াছিল। কবি-প্রতিদ্বন্দ্বীতা-ক্ষেত্রে পারস্যের যে সকল ভাগ্যবান কবি কবি-যশ অর্জন করিয়া চিরস্মরণীয় হইয়াছেন, তাহাদিগকে দুই দলে বিভাগ করিতে পারা যায়। যথা—(১) যাঁহাদিগের কবিতা ভাষান্তরিত হইয়া পৃথিবীর মধ্যে বিস্তৃতি লাভ করিয়াছে; (২) যাহাদিগের কবিতা কেবলমাত্র স্বদেশেই আবদ্ধ। প্রথম দলের কবিগণের মধ্যে শেখ সাদী, হাফিজ, ফিৰ্দৌসী, ওমর খৈয়াম প্রভৃতির নাম উল্লেখ যােগ্য। ইহাদের lpo কবিতা পৃথিবীময় প্রসিদ্ধিলাভ করিয়াছে। এই কবিগণের মধ্যে কবি শ্রেষ্ঠ শেখ সাদী সর্বাপেক্ষা ভাগ্যবান। তঁাহার কাব্য যেরূপ বহুলপ্রচারিত, অধীত, ও পৃথিবীর অধিকাংশ ভাষায় অনুদিত ; পূর্বোক্ত প্রথম দলের কবিগণের কবিতা সেরূপ নহে। পারস্যের কোন কবিই আজ পর্যন্ত শেখ সাদীর মত লব্ধপ্রতিষ্ঠ ও প্রথিতযশা হইতে পারেন নাই। পৃথিবীর নানা ভাষায় যেমন তাহার কাব্যাদির অনুবাদ প্রচারিত হইয়াছে, সেইরূপ তাহার জীবন-কথারও আলােচনা হইয়াছে। প্রাচ্যভাষাবিৎ ফরাসীপণ্ডিত Garcin de Tassy প্রণীত ফরাসী ভাষায় লিখিত হিন্দি-সাহিত্যের ইতিহাস পাঠে জানা যায় যে, হিন্দি ভাষায় মহাকবি শেখ সাদীর জীবনী প্রচারিত হইয়াছে। কবি শেখ সাদী বিশ্ববাসীর হৃদয় জয় করিয়াছেন; বিশ্বের নানা জাতি-নানা সম্প্রদায় তাহার উদ্দেশে নিজ নিজ হৃদয়ের শ্রদ্ধা নিবেদন করিয়াছেন। আমি বিরাট বিশ্বের ক্ষুদ্র মানব ; আমারও বিশ্ব-কবির প্রতি শ্রদ্ধা-অর্ঘ্য নিবেদন করিবার অধিকার আছে, এই ভরসায় আজ শ্রদ্ধা-পুস্পাঞ্জলী হন্তে বঙ্গ ভারতীর দ্বারে উপস্থিত হইতেছি। নিজেকে সম্পূর্ণ অযােগ্য জানিয়াও বিশ্ববরেণ্য কবির জীবনী বঙ্গভাষায় রচনা করলাম। নানা কারণে জীবনী খানিকে সর্বাঙ্গ- সুন্দর করিতে পারি নাই; যদি দ্বিতীয়বার মুদ্রাঙ্কণের আবশ্যক হয়, সেই সময় ইহাকে সমস্ত দোষ মুক্ত করিব। এই পুস্তকের অন্তর্গত প্রস্তাব সমূহ সাহিত্য, প্রবাসী, বসুমতী, সহচর, অলকা, প্রতিভা প্রভৃতি মাসিক পত্রে প্রকাশিত হইয়াছিল, সেই সকল প্রবন্ধই এক্ষণে পরিবর্তন, পরিবর্জন, ও পরিবর্ধন করিয়া পুস্তকাকারে প্রকাশ করিলাম। এই জীবনী রচনা করিতে যে সমস্ত পারস্য, উর্দ ও ইংরাজী প্রামান্য এহের সাহায্য গ্রহণ করিয়াছি, পুস্তকের পাদটীকায় সেই সমস্ত পুস্তকের নামােল্লেখ করিয়াছি, এবং এই সকল গ্রন্থকারের নিকট কৃতজ্ঞতার সহিত ঋণ স্বীকার করিতেছি। জীবনী-রচনা-কাৰ্যে মৌলভী বন্ধুগণ নানাদিক দিয়া আমাকে সাহায্য করিয়া কৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ করিয়াছেন। তন্মধ্যে পারস্যের কাব্য-সাহিত্যে বিশেষজ্ঞ (Authority) বাকীপুর খুদাবক্স লাইব্রেরির (Oriental Public Library) আরব্য ও পারস্য ভাষার পাণ্ডুলিপির তালিকাকার (Catologuer) ও সম্পাদক শ্রদ্ধাস্পদ মৌলভী খান বাহাদুর আবদুল মক্তাদির সাহেব ও প্রেসিডেন্সি কলেজের আরব্য ও পারস্য ভাষার অধ্যাপক শামস-উল-উলমা, খান বাহাদুর, ডাক্তার হেদায়েত হােসেন ডি-লিট, পি-এচ-ডি সাহেবের নাম সসম্মানে উল্লেখ যােগ্য। সুলেখক বন্ধুবর শ্ৰীযুক্ত বিজয়কৃষ্ণ ধােষ নানাবিধ সাহায্য ও মূল্যবান পরামর্শ দিয়া আমাকে অনুগৃহীত করিয়াছেন। বন্ধুবর শ্রীযুক্ত শিবকৃষ্ণ দত্তের নামও উল্লেখ যােগ্য। ইহাদের নিকট আমি কৃতজ্ঞ। শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক ডাক্তার হােসেন সাহেব আমার এই যৎসামান্য গ্রন্থের মূল্যবাৰ ভূমিকা লিখিয়া দিয়া আমাকে গৌরবান্বিত ও আমার প্রন্থের মূল্য বৃদ্ধি করিয়া দিয়াছেন। এজন্য তাহার নিকট কৃতজ্ঞ রহিলাম । নায়ক-সম্পাদক শ্রীযুক্ত পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়, বসুমতীসম্পাদক শ্রীযুক্ত হেমেন্দ্রপ্রসাদ ঘােষ, বহুভাষাবিৎ পণ্ডিত শ্ৰীযুক্ত সুরেন্দ্র নাথ কুমার, বসুমতীর সহযােগী সম্পাদক, শ্রীযুক্ত সত্যেন্দ্র কুমার বসু প্রভৃতি শাস্পদ সুখী ও সাহিত্যিকগণ জীবনী রচনা বিষয়ে আমাকে উৎসাহিত করিয়াছেন। এই অবসরে তাহাদিগকে আমার কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করিতেছি। পারস্যের কাব্য-সাহিত্যালােচনা বিষয়ক সন্দত গুলি যখন সাময়িক পত্রে প্রকাশিত হইতেছিল, সেই সময় অনেক গুলি উদারচেতা সম্পাদক এই আলােচনার সম্পর্কে অনুগ্রহপূর্বক মন্তব্য প্রকাশ করিয়া আমাকে গৌরবান্বিত ও উৎসাহিত করিয়াছেন; আর যে সকল সম্পাদক অনুগ্রহ করিয়া পারস্য-সাহিত্য-বিষয়ক প্রস্তাব সমূহ নিজ নিজ পত্রে প্রকাশিত করিয়া এই আলােচনার প্রসার বৃদ্ধি করিয়া আমাকে উৎসাহিত করিয়াছেন, আজ এই অবসরে তাহাদিগকেও আমার কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করিতেছি। পারস্য সাহিত্যের সুপ্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক অধ্যাপক শ্রীযুক্ত ব্রাউন সাহেব প্রার্থনারত শেখ সাদীর ছবি খানি আমার পুস্তকে ব্যবহার করিবার অনুমতি দিয়া আমাকে অনুগৃহীত করিয়াছেন। শেখ সাদী ও রবীন্দ্রনাথের তুলনামূলক অংশ টুকু পাঠ করিয়া বিশ্ববরেণ্য কবি রবীন্দ্রনাথ যে ছত্র কতিপয়ে আমাকে উৎসাহিত ও গৌরবান্বিত করিয়াছেন, তাহাও এইস্থানে উদ্ধৃত করিতেছি-“শেখ সাদীর সহিত আমার তুলনা করিয়া আপনি যে প্রবন্ধ লিখিয়াছেন, তাহা পাঠ করিয়া আনন্দ লাভ করিলাম। এজন্য আপনি আমার সকৃতজ্ঞ অভিবাদন গ্রহণ করিবেন।” অনেক চেষ্টা করিয়াও পুস্তকখানিকে নিভুল করিতে পারিলাম না। স্থানে স্থানে কয়েকটা ছাপার ভুল রহিয়া গেল। শুদ্ধিপত্র না দিয়া এই স্থানেই ইহাদের শুদ্ধ পাঠ লিখিয়া দিলাম; খুসবিসায়েৎ স্থলে খাবিসাৎ, বদ্যা স্থলে বদেয়া, বােস্ত স্থলে বুস্তা, নেগারি স্থলে নগারি, বেহারিস্ত। স্থলে বহারিস্ত, রাশাল্লা স্থলে বিশালা, তােয়াবাৎ স্থলে তৈয়েবাৎ, হাতিফা স্থলে হতিফি, রাজকুমারীর স্থলে রাজকুমারী, ফরিউদ্দিন আটার স্থলে ফরিদউদ্দিন আত্তার, ধৰ্ম্মসম্বন্ধীয় স্থলে ক্ষুদ্র, প্রসায় স্থলে প্রসার, নির্জনতা-প্রিয় স্থলে নির্জন প্রিয়, -হৎ-উল-আনাস নাফ-উল-আনাস হইবে। ।
তৃতীয় পরিচ্ছেদ ছাপা হইবার পর অনুসন্ধানে জানিতে পারি যে গুলিস্তার রুষ ভাষায় দু’খানি, পােল ভাষায় একখানি, হিন্দী ভাষায় দু’থানি ও বাঙ্গালা ভাষায় দু’খানি অনুবাদ প্রচারিত। আমার শেষ কথা এই যে সৎসাহিত্যের প্রচারক, সাহিত্য-রসিক বন্ধু ডাক্তার শ্রীযুক্ত গিরীন্দ্রকৃষ্ণ মিত্র মহাশয় এই পুস্তক প্রকাশের ভার গ্রহণ করিয়া আমার ধন্যবাদ ভাজন হইয়াছেন। ইতি বিনীত- কলিকাতা, ২২নং দুতারপাড়া লেন ১ই শ্রাবণ, ১৩৩০ । y esam
No text on this page.
ভূমিকা। (শামস-উল-উলমা ডাক্তার হেদায়েৎ হােসেন, ডি-লিট, পি-এচ-ডি লিখিত)। পারস্য চিরদিনই কবিতার দেশ,-গীতি-প্রবণতাও ইহার অধিবাসী বৃন্দের মধ্যে অল্প নহে। যে সকল খ্যাতনামা কবি পারস্যে জন্মগ্রহণ করেন, শেখ সাদী তাহাদের মধ্যে একজন সর্বপ্রধান। তিনি একজন অনুপ্রাণিত (Inspired) কবি। যখন কলা ও বিজ্ঞান শাস্ত্রে বিশেষজ্ঞ একদল পণ্ডিত আতাবকের সিংহাসন ঘেরিয়া বিরাজমান, সেই সময় তাহারই রাজত্বকালে সিরাজ নগরে সাদীর জন্ম হয়। সাদীর প্রতিতা তদীয় পৃষ্ঠপােষক সাদ-বিন-জঙ্গির আশ্রয়ে সর্বপ্রথম সিরাজেই বিকাশ প্রাপ্ত হয় ( ৫৯৯-৬২৩ হিঃ অঃ) এবং ঐ নামের প্রতি সম্মান- বশতঃই তিনি সাদী' নাম পরিগ্রহ করেন। সাদীর প্রতিভা অল্প বয়সেই পুষ্টিলাভ করে এবং নানাদেশ ঘুরিয়া তিনি তাহার শিক্ষা ও জ্ঞানভাণ্ডার এতই পরিপুর্ণ করিয়া তােলেন, যে ছাত্র-জীবন ও ভ্রমণের সাহায্যে যে গ্রন্থরাজি তিনি রাখিয়া গিয়াছেন, তাহার বৈচিত্র্য ও প্রাচুর্যকে অতিক্রম করা দূরে থাক, সম-অবস্থায় বন্ধিত অপর কোনো লেখক তাহার সমকক্ষতাও লাভ করিতে পারেন নাই। গুলিস্তান ও বুস্তান, যাহার রচনা সাদীকে অমরতা দান করিয়াছে, যথাক্রমে ৬৫৬ ও ৬৫৭ হিজরাব্দে রচিত হয়। তাহার জীবনের শ্রেষ্ঠ সাহিত্য-সম্পদগুলি সমস্তই শেষ বয়সের রচনা। তায়, রচনাবলী বিশ্ববাসীর আদরের বস্তু। ইহার একটী কারণ এই যে, নানাদেশের আবহাওয়ায় দীর্ঘকাল ভ্রমণের ফলে তিনি ব্যক্তিগতভাবে তঁাহার সমসাময়িক প্রধান সাহিত্যিক ও সাহিত্য-রসিক সম্প্রদায়ের সান্নিধ্য লাভে সক্ষম হইয়াছিলেন। কিন্তু তাহার রচনাবলীর একটা নিজস্ব বিশেষ গুণও আছে। যদিও জীবনের শেষভাগেই লেখনী ধারণ করিয়াছিলেন, তথাপি তিনি বহুবিধ ছন্দ ও রচনা-রীতি অবলম্বন করিতে প্রয়াস পাইয়াছেন; এবং আজ জগৎ-সমক্ষে তঁাহার কবিতা- বলীর প্রায় ২০,০০০ কবিতা বিদ্যমান। এশিয়ায় সাদী ও হাফিজ এতই শ্রদ্ধার পাত্র যে তাহাদের রচনা যাহারা পড়ে নাই অথবা তাহাদের জ্ঞানগর্ভ বাণীসমূহ যাহাদের জীবনের নীতিতে পরিণত হয় নাই, তাহাদিগকে শিক্ষিত বলিয়াই মনে করা হয় না। সাদীর রচনাবলীর অপর নাম “ নিমকদান” কবিতার “লবণ-ভাণ্ডার”; এবং বিশ্বের বিচারালয়ে শেখ সাদী পারস্য ভাষার একজন সর্বপ্রধান নিয়ামক বলিয়া সর্বসম্মতিক্রমে গ্রাহ। মৌলানা হতিফি ইহাও বলিয়াছেন যে তাহার রচনার মূলে দৈবী- প্রেরণা বিদ্যমান। সাদী পারস্যের শ্রেষ্ঠ মরমী কবি এবং এই জাতীয় কবিতার জনপ্রিয় সুলেখক। তাঁহার খ্যাতি প্রথম হইতেই। হাফিজের সময় তাহার গীতি-কবিতা এতই বিখ্যাত হইয়াছিল যে হাফিজও আপন অজ্ঞাতসারে হার কতকগুলি ছন্দ ও উক্তি স্বীয় রচনায় আত্মসাৎ না করিয়া থাকিতে পারেন নাই। স্বভাবতঃই সাদীর রচনা নীতি-নিষ্ঠ। তাহার প্রতিভার এই বিশেষত্ব তাহার যাবতীয় রচনাতেই অত। তাহার বুস্তান ও গুলিস্তানের বুনা-রীতি সম্পূর্ণ হৃদয়-রস-মধুর, অসংখ্য নীতি-গর্ভ বাণী দ্বারা উজ্জ্বল এবং জীবন্ত আখ্যায়িকায় এমন সুসজ্জিত যে তাহা অতীব সুখপাঠ্য।
• সাদীর প্রকৃত সৌন্দৰ্য্য যুক্তি বা উক্তি পারম্পর্য রক্ষায় নহে, পরন্তু তাহার মতামতের ঔদার্যে। তাহার বসভাণ্ডার সর্বপ্রকার রুচিরই মালমসলায় পূর্ণ; অত্যুৎকৃষ্ট ও নিকৃষ্ট, সুরুচির-সুন্দর ও কুরুচি- পরিম্নান সবই সেখানে বর্তমান। তাহার রচনাবলী হইতে এমন মতামতও উদ্ধার করা যায় যাহা একপক্ষে 'একহার্ডথ' বা টমাস ‘কেম্পিসেরই যােগ্য; আবার চাপরপক্ষে সিজার বােগিয়া’র’ ও ‘হেলিওগেবালুসেরই কাছাকাছি। তাহার রচনাবলী উত্তম হইতে অধমতম স্তর-ভেদে প্রাচ্য ভাবধারারই ঘনীভূত সংগ্রহ, এবং ইহা নিতান্ত অযৌক্তিকও নহে যে, যেখানেই পারস্য ভাষার চর্চা হইয়াছে সেই- খানেই তাহার রচনাবলী সাড়ে ছয় শতাব্দী ধরিয়া শিক্ষার্থীদের হস্তে প্রাথমিক শিক্ষা লাভের জন্য প্রদত্ত হইয়া আসিয়াছে। সাদীর রসিকতা যেমন মৌলিক তেমনি অপূৰ্ব ; গুলিস্তান ও বুস্তানের সর্বাঙ্গ এইরূপ রসিকতার চমৎকার নিদর্শনসমূহে সমুজ্জ্বল। একদিকে যেমন মহাকবি বলিয়া প্রসিদ্ধ, অপরদিকে নীতির সুমহান প্রচারক বলিয়াও সাদী অল্প বিখ্যাত মহেন। সাদীর নৈতিক উপদেশ- সমূহের মহামূল্যতা ইহাতেই সপ্রমাণ হয় যে তাহার নীতি-বিজ্ঞান- প্রণালী বহুদুর ব্যাপিয়া অনুসৃত হয়। সাদীর প্রতি কল্পলৌকিক (Mystical) নয়, বা স্পষ্টতঃ গীতি- প্রবণও নহে। তিনি ছিলেন একজন সাংসারিক হিসাবে আনীলােক, ভুয়ােদর্শন-সম্পন্ন একজন দার্শনিক; আর এইজন্যই, এমন কি তাহার গজলগুলিতে পৰ্য্যন্ত, নীতিবিষয়ক ও রুচি-সম্পৰ্কীত যুক্তি ও উক্তি বারংবার আসিয়া পড়িয়াছে। তাহার গজলগুলিও, গজলের পােষাকে ঢাকা নীতি-বিজ্ঞানমূলক কবিতা।
৫ সাদী একদিকে ছিলেন একনিষ্ঠ সুফী, অপরদিকে সম্পূর্ণ জগৎ- ব্ৰহ্মবাদী। তিনি বলেন যে মূৰ্ত্তি-মন্দিরে অনুষ্ঠিত হইলেও পূজা চিরকালই পূজা, এবং বাহ অবস্থা বা আবেষ্টনী এক্ষেত্রে বিশেষ, উল্লেখযােগ্য ব্যাপার নহে। সুফী অজ্ঞেয়বাদ মুসলমানের জীবন ও চিন্তার উপর প্রবল প্রভাব বিস্তার করিয়াছে। কবিত্বই এই অজ্ঞেয়- বাদের মূল উপাদান এবং পারস্যের প্রধান কবি মাত্রেই সুফী। এই অজ্ঞেয়বাদের বিশিষ্ট প্রণালীর সহিত সুপরিচিত না হইলে পারসী কবিতার মর্মকোষে প্রবেশ করা অসম্ভব। সাদীর গীতিকবিতার মূল কল্পনাগুলিও ঐ সুফীধৰ্ম্ম অধ্যয়ন ও সুফী-ভাবে অনুপ্রেরণারই ফল,- যদিও অধ্যাপক ব্রাউনের মতে, ইহা ঐ কাল-ধৰ্ম্মেরই প্রভাবে । জালালউদ্দিন শেখ সাদীর সমসাময়িক এবং ফরিদউদ্দিন আত্তার তাহার কিছু পূৰ্ববর্তী। সুফী মতবাদে পৃথিবী এতই ভরিয়া গিয়াছিল যে, অধ্যাপক ব্রাউন বলেন, সাদী সুফী প্রবচনের পপৗনপুনিক ব্যবহার কোনােমতেই পরিহার করিতে পারেন নাই । মােটর উপর শেখ সাদী একজন মহাত্মা ও মহাকবি। তিনি যে মহাত্মা ছিলেন তাহার প্রমাণ, জীবিতাবস্থাতেই তাহাকে লােকে ঋষি হিসাবে দেখিত, এবং তাহার মৃত্যুর পর হইতে নানা দিক-দেশের তীর্থযাত্রীরা তাঁহার সমাধি দেখিতে ও তদুপরি তাহাদের শ্রদ্ধার পুস্পাঞ্জলি দিবার জন্য সমবেত হইয়া থাকে। লেখক হিসাবে তাঁহার নৈপুণ্য সম্বন্ধে ইহাই যথেষ্ট যে তাহার শ্রেষ্ঠ রচনাগুলি শিল্পকলার আধুনিক যুগেও জীবিত আছে এবং সুসভ্য ও সুপণ্ডিত সমালােচক সম্প্রদায় কর্তৃক পরীক্ষিত হইয়াও সর্বপ্রকার প্রতিকুল মন্তব্য এড়াইয়া গিয়াছে। বস্তুতঃ তাহার অনেক ভাবরাজি একালের বহু উদারচেতা মনীষীর সম্পূণ্য যােগ্য, এবং যখন আমরা তাঁহার সমসাময়িক বিদ্বজ্জন- মণ্ডলী বা তদ্দেশবাসী বহুকাল পরবর্তী পণ্ডিতগণের সহিত তাঁহার সাধন সম্পদের তুলনা করি, তখন আমাদের শ্রদ্ধা যেন আরও বহুগুণে বাড়িয়া যায়। এই গ্রন্থের রচয়িতা শ্ৰীযুক্ত সুরেশ চন্দ্র নন্দী মহাশয়, বঙ্গসাহিত্যে পারস্যের এই মহাকবিজীবনীর অভাব দূর করিতে যে প্রভূত শ্রম স্বীকার করিয়াছেন, ইহাতে আমি আনন্দিত। বিশেষ আনন্দের বিষয় এই যে একজন হিন্দু ইহা রচনা করিয়াছেন। গ্রন্থকার অভিজ্ঞ ও তাহার সংগ্রহও যথেষ্ট। তিনি পারস্য ভাষায় এবং ভারতীয় ও ইংরাজী ভাষায় এ সম্বন্ধে লিখিত অধিকাংশ প্রামাণ্য গ্রন্থই আলােচনা করিয়াছেন। তাঁহার গ্রন্থে পারস্যের মহাকবিকে সুচিত্ৰিত দেখিয়া আমি পরিতৃপ্ত। ‘পারস্যের গজল-রচয়িতাদের ইতিহাস, সাদী-প্রতিভার তুলনায় বিচার, সুফী-অজ্ঞেয়বাদের ইতিহাস ’ নিপুণভাবে লিখিত এবং প্রচুর তথ্য ও গবেষণায় পরিপূর্ণ। গুলিস্তান ও বুস্তানের সুন্দর ভাবধারা সংক্ষিপ্ত আখ্যায়িকার সাহায্যে যেভাবে প্রকাশ করা হইয়াছে তাহা পড়িতে বড়ই সুখপাঠ্য। শেখ সাদী ও ডাক্তার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মানসিক ও প্রতিভার তুলনায় বিচার অতি চমৎকার; এই পরিচ্ছেদ গ্রন্থখানির মূল্য বহুল পরিমাণে বৃদ্ধি করিয়াছে। সুন্দর ভাষায় ও ভঙ্গীতে অতি যত্নের সহিত গ্রন্থখানি পাণ্ডিত্যপূর্ণ করিয়া লিখিত। ইহা যে বাঙালী পাঠকের নিকট আদর পাইবে ও বঙ্গসাহিত্যকে অলঙ্কত করিবে, তাহাতে আমার সন্দেহ নাই। যদি এই গ্রন্থ তরুণদিগের পাঠ্যপুস্তকরূপে নির্বাচিত হয়, তাহা হইলে আমি আনন্দ লাভ করিব। আমি গ্রন্থকারের সাহিত্য-ক্ষেত্রে সাফল্য ও এই গ্রন্থখানির বহুল প্রচার কামনা করি।
No text on this page.
ফুচীপত্র। প্রথম পরিচ্ছেদ। বিষয় বস্তু। ১-১৩ পৃষ্ঠা। জন্ম ও বংশ-পিতৃ-মাতৃ পরিচয়—কবির নাম— সাদী' উপাধি গ্রহণ কবির জীবনের পাঁচটা শুর-বাল্যকথা-সাদীর পিতৃ-প্রকৃতি বিদ্যার—পিতৃ-বিয়ােগ—বাগদাদের নিজামিয়া মাদ্রাসা-জন্মভূমির নিকুট বিদায় গ্রহণ ও বাগদাদ যাত্রা-সাধনায় সিদ্ধিলাভ—উচ্চ- সম্মান লাত—প্রথম রচনা শিক্ষা গুরুর স্নেহ ও সাহায্য লাত-- শেখ সাহবুদ্দিন সুরওয়ার্দি-বাদশাহের অনুগ্রহ-দৃষ্টিলাভ-আবদুল কাদের গিলানীর সহিত মক্কা যাত্রা—কবিত্বের উন্মেষ ও স্ফুর্তিত কবির কবিত্বের উন্মেষ সম্বন্ধে একটী গল্প—পৰ্যটন—ভাষাশিক্ষা- ভাষা জ্ঞানে পারদর্শিতা-পৰ্যটন সময়ে কষ্টের কাহিনী ও জুতার খেদ-বন্দীদাসরূপে বিক্রীত-উদ্ধার লাভ–বিবাহ—দাম্পত্য- জীবনে অশান্তি-পত্নীবিয়ােগ—স্বদেশ প্রত্যাবর্তন।
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ বিষয় বস্তু। ১৩-৩৪ পৃষ্ঠা। পরিহাস রসিকতা - বক্তৃতা – উদারতা - আত্মসম্মানজ্ঞান --ভারতে আগমন-সােমনাথের মন্দির দর্শন-প্রকৃতি—চরিত্র-বেশবিন্যাসে নিষ্প হতা-কবি হামামউদ্দিন ও শেখ সাদী-কাজী ও শেখ সাদী কবি সাদী ও কবি নেজারী-সাদীর চটুল জবাব-কবিতার পাদ পূরণ কবিত্বের প্রসার - আকৃতি-সংসার-নির্জনপ্রিয়তা কবির ঈশ্বর-সমাধির পূর্বরাগ-দরবেশের স্বপ্ন-কাঠুরিয়া বেশী চোর ও শেখ সাদী । তৃতীয় পরিচ্ছেদ। বিষয় বস্তু। ৩৫-৭৩ পৃষ্ঠা। বিশ্ব-সাহিত্যে গুলিস্তা ও বুস্তা-গুলিস্ত। ও বুস্ত'। রচনার কারণ— গুলিস্তার অষ্টম অধ্যায়—প্রথম অধ্যায়ের গল্প-চিত্র—দ্বিতীয় অধ্যায়ের গল্প-চিত্র তৃতীয় অধ্যায়ের গল্প-চিত্ৰ-চতুর্থ অধ্যায়ের গল্প-চিত্র-পঞ্চম অধ্যায়ের গল্প-চিত্র-ষষ্ঠ অধ্যায়ের গল্প-চিত্র- সপ্তম অধ্যায়ের গল্প-চিত্র-অষ্টম অধ্যায়ের নীতি-কথা গুলিস্তার বর্ণিত বিষয়-উদ্দেশ্য-গুলিস্তার ভাব-ধারা-গুলিস্তা, বহারি- ৬ নগারিস্ত।কবির আশা-রচনা সমাপ্তির কাল-উৎসর্গ পত্র।
পঞ্চম পরিচ্ছেদ। বিষয় বস্তু। = ৮৫-৯৭ পৃষ্ঠা। শেখ সাদীর গজলের মর্মানুবাদ—পারস্যের কবি-পয়গম্বর-হাজার গানের বুলবুলি—নিমকদান-প্ৰয়ােদশ শতাব্দীর য়ুরােপীয় সাহিত্য ও শেখ সাদীর সময়ের পারস্য সাহিত্য-শেখ সাদীর পূর্ববর্তী ও প্রতীচ্য কবিগণ-শেখ সাদীর প্রভাব-ইমামী ও শেখ সাদী-শেখ সাদীর প্রতি সাহিত্য-সমাজের মনােভাব—ফিৰ্দোসী ও শেখ সাদী জালালউদ্দিন রুমি, ওমর খৈয়াম ও শেখ সাদী-কবি-প্রকৃতির পার্থক্য শেখ সাদীর কাব্যে বিশেষ ভাব ও সৌন্দৰ্য্য। - পরিচ্ছেদ বিষয় বস্তু। ৯৭-১১১ পৃষ্ঠা। শেখ সাদী ও রবীন্দ্রনাথের মানসিকতার সাদৃশ্য -শেখ সাদী ও রবীন্দ্র- নাথের মানস-প্রতিমা-রবীন্দ্রনাথ ও শেখ সাদীর ভগবৎ-বিরহ- শেখ সাদী ও রবীন্দ্রনাথের নীতি-বাদ-সুফীর সংজ্ঞা-সাদীর সুফী- চরিত্র-শেখ সাদী ও অন্যান্য সুফী কবিগণমানব-বন্ধু ও উপদেষ্টা শেখ সাদী--সুফী ধর্ম ও সুফী সাধক-সুফী-সাহিত্যপ্রেমই সুফীদের ধৰ্ম্ম-সুফীর প্রেম-ধর্ম ও বৈষ্ণবের মধুর রস।
No text on this page.
১৯/
সপ্তম পরিচ্ছেদ
বিষয় বস্তু।
১১২-১২২ পৃষ্ঠা।
সুফী কাব্যের আধ্যাত্মিকতা ও সাঙ্কেতিক চিহ্ন—অতীন্দ্রিয়তার জন্ম
বৈদিক ঋষিগণ ও সুফী কৰি-নীতি-শিক্ষক শেখ সাদী-শেখ
সালীর নীতি-বিজ্ঞান—শেখ সাদীর বাণী।
অষ্টম পরিচ্ছেদ।
-
১২৩-১৩০ পৃষ্ঠা।
শেখ সাদীর মহা প্রস্থান-কবির মৃত্যু-তারিখ-কবির সমাধি মন্দির
সাদীয়া—পৰ্যটকগণের সমাধি মন্দির পরিদর্শন ও তাহাদের মন্তব্য
শ্রদ্ধা—অর্থ-নিবেদন।
No text on this page.
No text on this page.
শেখ সাদীপৰ্যটক বেশে শেখ মসলেউদ্দিন সাকি জীবন-কথা । ১১৭৫ খ্ৰীষ্টাব্দে পারস্যের পূর্ধ্বতন রাজধানী সিরাজনগরে শেখ সাদি জন্ম গ্রহণ করেন। দৌলত সাহ বলেন, ইহার প্রকৃত নাম মসলেউদ্দিন অর্থাৎ সত্যধর্মের বিচারক ( umpire of the truth). মহম্মদের জামাতা আলি ইহাদের বংশের আদি পুরুষ। কবি জামি তৎপ্রণীত সুফিগণের জীবন-কথা-গ্রন্থ অর্থাৎ নাফ-উল-আনাস্ গ্রন্থে লিখিয়াছেন, সাদি “শরিফ,” অর্থাৎ অতি সম্ভ্রান্ত বংশে জন্ম গ্রহণ করেন। সাদির পিতার নাম শেখ আবদুল্লা। (১) সিরাজনগর বিদ্বান ও দার্শনিকের জন্মভূমি বলিয়া বিখ্যাত। সিরাজ এত স্বাস্থ্যপ্রদ যে সিরাজে বাসকালে দিবারাত্র পাঠ বা চিন্তা করিলেও মস্তিষ্ক অবসন্ন হয় । সিরাজের একজন প্রসিদ্ধ কবি বলিয়াছেন “ জিন্নতেও (স্বর্গেও) রুকুনাবাদ নদীর তটভূমি ও মুসল্লার পুষ্পোদ্যান পাইবিনা।” মস্তিষ্কের এই অসাধারণ স্বাস্থ্যের ফলে সিরাজ প্রদেশে এত বিদ্বান দার্শনিক ও কবি উৎপন্ন হইয়াছেন যে ততগুলি বােধ হয় সমস্ত ইরাণের অন্য অংশে উৎপন্ন হন নাই। (২) এই সময় পারস্যে আতাব তলা বংশীয় রাজন্যবর্গ রাজত্ব করিতেন। সাদির পিতা শেখ আবদুল্লা মহ জন্মও বংশ। (১) ঈশ্বরের দাস। (২) মানসী ও মর্মবানী ১ম খণ্ড ১৩২৫-২৬।
[ ২ ] এই রাজ পরিবারের একজন কর্মচারী ছিলেন। (১) তিনি অতিশয় বিচক্ষণ কর্তব্যানুরাগী, ধর্মভীরু, সৎসাহসী ও ঈশ্বরপরায়ণ ছিলেন। সাদির মাতার সম্বন্ধে বিশেষ কিছুই জানা যায় না। বােস্তা পাঠে পিতৃ-মাতৃ পরিচয়। জানা যায় যে, সাদির মাতা পুত্রকে কঠোর শাসনের আবরণে রাখিতেন। মাতার শাসনের কথা সাদি গুলিস্তায় লিখিয়াছেন। ডাক্তার জেমস র বলেন, সাদির মাতুল বংশ পণ্ডিতের বংশ। পাণ্ডিত্যের জন্য প্রখ্যাত। বিখ্যাত বিদ্বান সুপ্রসিদ্ধ মােল্লা কুতব অলেমা সাদির মাতুল ছিলেন। অনেক পণ্ডিত বংশের সহিত ইহারা কুটুম্ব সুত্রে আবদ্ধ ছিলেন। (২) কবি জামি বলেন, কবির পিতৃ-প্রদত্ত নাম শেখ শফ উদ্দিন; উপাধি মহ। কিন্তু তিনি সাধারণের নিকট শেখ মসলেউদ্দিন সাদি সিরাজী কবির নাম ও ‘সাদি’ নামেই পরিচিত। কথিত আছে যে, ইহা ছাড়া উপাধি গ্রহণ। কবির আরও দুটী নাম ছিল, যথা,-সাদি তাখাল্লাস, মসলেল কব, । (১) সাদির অন্যতম জীবনী-লেখক হাজি লতিফ, আলি বলেন—সাদির পিতা শেখ আবদুল্লা দৈব দুর্বিপাকে অর্থকষ্ট ভােগ করিতেছিলেন, এক দল ব্যক্তি তাহাকে এই রাজপরিবারের কর্মে নিযুক্ত করিয়া দেন। আবদুল্লা দেওয়ানের অধীনে কৰ্ম্ম করিতেন। এই কৰ্ম্ম ‘তনি এরূপ বিশ্বস্ততা ও পরিশ্রমের সহিত করিতেন যে দয়ালু পৃষ্ঠপােষক কর্মের প্রশংসা শুনিয়া আনন্দের সহিত আবদুল্লার পদোন্নতি করিয়া দেন। দৌলত সাহ, উহার তুজ-খিরহ-অ-আ-হারা অর্থাৎ পারস্য কলিগণের জীবনচরিত গ্রন্থে লিখিয়াছেন,—সাদির পিতা আবদুল্ল। সিরাজ রাজববারে প্রধান মন্ত্রীর অধীনে কর্ম করিতেন। কবির রচনা হইতেও ইহার প্রমাণ পাওয়া যায়। (২) আশিকাদা নামক গ্রন্থে লিখিত আছে যে, এক উদারহৃদয় ব্যক্তির অনুগ্রহে আবদুল্লা রজদরবারে কৰ্ম্ম প্রাপ্ত হয়েন ও সেই ব্যক্তির কন্যার সহিত আবদুল্লার বিবাহ হয়। পরে সাদির জন্ম হয়।
[ ৩ ] সাবংশীয় রাজন্যবর্গের নাম চিরস্মরণীয় করিবার জন্য কবি সাদি’ উপাধি গ্রহণ করেন। শেখ সাদির জীবন আলােচনা করিলে দেখিতে পাই যে কবির জীবন পাঁচটীস্তরে বিভক্ত। প্রথম স্তরে কবি ধ্যানরত তপস্বীর মত সুদীর্ঘ ত্রিশ বৎসর কাল কঠোর সাধনার দ্বারা বিদ্যার্জন করেন । দ্বিতীয় স্তরে ভক্তপ্রেমিক কবি ভিস্তিরূপে মক্কাতীর্থে অবস্থান করেন । কবির ভিস্তি-মূর্তি দেখিলে মনে হয় যেন প্রেমপিপাসী কবি বাঞ্ছিত সন্ধানে মক্কাতীর্থে আসিয়া তাহারি প্রীতির জন্য ভিস্তি হইয়া তৃষ্ণাতুর পথিককে শীতলজলদান করিতেছেন; জলদেবতা খি-অর ভক্ত-কবির সাধুকার্যে সন্তুষ্ট হইয়া তাহাকে “ আবেহায়াৎ ” অর্থাৎ স্বর্গমন্দাকিনীর পবিত্র বারি কবির জীবনের পাঁচটি স্তর। দিতেছেন, কবি অঞ্জলি পুরিয়া প্রাণ ভরিয়া সেই পবিত্র বারি পান করিতেছেন। তৃতীয় স্তরে পৰ্যটকরূপে কবি জগতের জ্ঞান-ভাণ্ডার হইতে অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান সঞ্চয় করিতেছেন। চতুর্থ স্তরে তাহার কবি-প্রতিভার পূর্ণ বিকাশ হয়; এই স্তরই কবির জীবনের শ্রেষ্ঠ স্তর ; এই স্তরেই পারস্যের জাতীয় প্রতিভার মূৰ্ত্ত অবতাররূপে কবি সাদি জগতের সম্মুখে দণ্ডায়মান। পঞ্চম স্তরে কবি ঐশী-শক্তিসম্পন্ন ধৰ্ম্মসাধকরূপে সর্বশ্রেণীর মানবের শ্রদ্ধাভক্তি আকর্ষণ করিতেছেন। বাল্যকাল হইতেই সাদি অতিশয় পাঠানুরাগী ছিলেন। তাহার বাল্য-জীবন পিতৃ-সংসর্গেই অতিবাহিত হয়। সাদি অতিশয় পিতৃভক্ত ছিলেন। বাল্যকালেই সাদির তরুণ হৃদয়-ক্ষেত্রে যে ঈশ্বরপরায়ণতা, সত্যবাদিতা, ধৰ্ম্মে ঐকান্তিকী নিষ্ঠার বীজ অঙ্কুরিত হয়, ভবিষ জীবনে তাহা মহান মহীরুহে পরিণত হয়। সাদি বাল্যকাল হইতেই নমাজ উপাসনাদি ক্রিয়াকর্মে অনুরাগী ছিলেন। বাল্যকাল হইতেই ব্রত, উপবাস ও রাত্র জাগরণ করিয়া হদিশ ও তফশির বাল্য-কথা। . হদিশ, অর্থাৎ মুসলমান স্মৃতিশাস্ত্র, তপশির অর্থাৎ কোরান।
[ ৪ ] অনুযায়ী ক্রিয়াকৰ্ম্মাদি অভ্যাস করিয়াছিলেন। পিতার ধর্মে ঐকার্ষিকী নিষ্ঠা, সাধু-প্রকৃতি, বালক সাদির তরুণ হৃদয়কে ধর্মকর্মের দিকে অগ্রসর হইতে উৎসাহিত করিয়াছিল। একদিন সাদি অধিক রাত্র পৰ্যন্ত তাঁহার পিতার সহিত বসিয়া ধৰ্ম্মকথা শ্রবণ করিতেছেন। রাত্র অধিক হওয়ায় অধিকাংশ শ্রোতৃমণ্ডলী নিদ্রায় অভিভূত হই- য়াছে। সাদি ক্ষণকালের জন্য চক্ষু মুদ্রিত করেন নাই, অনন্যমনা হইয়া ধৰ্ম্মকথা শ্রবণ করিতেছেন। ক্রোড়ের উপর ধর্মপুস্তকখানি রহিয়াছে। ধর্ম- প্রসঙ্গ শেষ হইবার কিছু পূৰ্বে সাদি দেখিলেন যে সকলেই ঘাের নিদ্রায় অভিভূত; ইহা দেখিয়া সাদি তাহার পিতাকে বলিলেন, “ দেখ, বাবা, ইহার কেহই প্রার্থনার জন্য মাথা তুলিল না ; ইহারা যেরূপ ভাবে ঘুমাইতেছে, ইহাদিগকে মৃতও মনে করিতে সাদির পিতৃ:প্রকৃতি। পারা যায়।” পিতা পুত্রের কথা শুনিয়া, পুত্রকে বলিলেন, “ প্রিয় পুত্র! পরােক্ষে নিন্দা করা অপেক্ষা তােমার নিদ্রিত থাকাই ধৰ্ম্মজনক।” ইহা হইতে সাদির পিতৃ প্রকৃতি কিরূপ ছিল, বেশ অনুমান করিতে পারা যায়। সাদির বাল্যকালে বিদ্বান ও সাধু এই দুই দলে ঘােরতর বাকবিতণ্ডা চলিতে- ছিল। কবির পিতা বিদ্বান অপেক্ষা সাধুর দলের পক্ষপাতী ছিলেন। কবি প্রথম জীবনে পিতার উপদেশ মত সাধুরদলের পক্ষপাতী হন। পরে যখন বিদ্যার্জন করেন, তখন বিদ্বানগণের পক্ষপাতী হইয়া পড়েন। সাদি বাল্যকালে পাঠাবস্থা হইতেই সুফির দলে যাতায়াত করিতেন। কবি জামি তাহার নাফত-উল-আনাস” (১) গ্রন্থে বলিয়াছেন, সাদি উত্তর জীবনে সুফীদলভুক্ত হইয়া পড়েন ও নিজে সুফিগনাগ্রগণ্য হয়েন। (১) অফিগণের জীবন-কথা পুস্তক। + সুফীধৰ্ম্ম মুসলমান ধর্মের অন্তরঙ্গ সাধনা ও রহস্যমুলক। খ্রীষ্টিয় অষ্টম শতাব্দীতে এই মত প্রথম প্রচারিত হয়। আরবী ভাষায় সুফী শব্দের অর্থ পশম। এই ধৰ্মমতাবলম্বী MY Frs [ ৫ ] সারি প্রাথমিকশিক্ষা সিরাজ নগরেই হয়। সাদি তাহার মাতুল বিদ্বান- শ্রেষ্ঠ স্বনাম-প্রসিদ্ধ মােল্লা কুতব অলেমার নিকট প্রাথমিক শিক্ষার পাঠ গ্রহণ করেন, তাহার মাতুলই বিজ্ঞানশাস্ত্রে সাদির প্রথম শিক্ষাগুরু ছিলেন। বােস্ত। পাঠে অবগত হওয়া যায় যে কিশাের বয়সে কবির পিতৃ-বিয়ােগ হয়। সাদির পিতা মধ্যবিত্ত গৃহস্থ ছিলেন। রাজবাটী বিদ্যারম্ভ, পিতৃ-বিয়ােগ। হইতে উপার্জিত অর্থ দ্বারা নিজ পরিবার প্রতিপালন করিয়া অতি সামান্য অর্থ যাহা কিছু উদ্বৃত্ত হইত, তৎ- সমুদায়ই সাধুসেবায় ব্যয় করিতেন। সুতরাং মৃত্যুকালে তিনি সঞ্চিত অর্থ কিছুই রাখিয়া যাইতে পারেন নাই। সাংসারিক এরূপ অবস্থায় কবির পিতৃ-বিয়ােগ হওয়ায় সাদিকে বড়ই অর্থ কষ্টে পড়িতে হয়। ১০৬৬ খ্রীষ্টাব্দে অল্প-অর্সলার মন্ত্রী খাজা নিজাম-উল-মুলুকৃ তুসীর, কর্তৃক হিরাট নয়শাপুর, ইস্পাহান, বসােনা ও বাগদাদে পাঁচটী দরবেশগণ পশমের পােষাক পরিধান করিতেন বলিয়াই ইহাদিগকে সুফী বলা হইয়া থাকে, অনেকে এরূপ অনুমান করেন। আবার অনেকের মতে গ্রীক সফো (Sophos অর্থাৎ জ্ঞান) শব্দ হইতে সুফী শব্দ উৎপন্ন হইয়াছে। সুফীধৰ্ম্মানুসারে ঈশ্বরই একমাত্র সৎস্বরূপ। তিনি অনন্ত সৌন্দর্য কল্যাণগুণের সমায়। ভগবানের জীবের সহিত প্রেম-মিলন এবং পরমাত্মাতে জীবাত্মার লয় ইত্যাদি বিষয় সুফী ধর্মের অঙ্গীভূত। সুফীসাধকগণ ঈশ্বর প্রেমে উন্মাদ। সাদি, হাফেজ, জালালুদ্দিন রুমি, ফরিউদ্দিন আটার প্রভৃতি পারস্য কবিগণের রচনা পাঠ করিলেই সহজেই অনুমিত হইবে। সুফীমতবাদির বলেন, এই পরিদৃশ্যমান জগৎ অবাঙ, মনস গােচর শ্রীভগবানের বহিঃ প্রকাশমাত্র; সর্ববস্তুতেই তিনি বিদ্যমান আছেন, সুফিমত বাহ ক্রিয়াকাণ্ড এবং আচার অনুষ্ঠানের সম্পূর্ণ বিরােধী। শ্রীভগবানের সহিত অন্তরঙ্গতা স্থাপনই এই ধর্মের প্রধান লক্ষ্য। সুফীধর্মাবলম্বীগণ আমাদের দেশের বৈষ্ণব সাধকগণের মত শ্রীভগবানকে প্রিয়জন, প্রেমাস্পদ, বা প্রেমপাত্রীরূপে কল্পনা করিয়া থাকেন। আমাদের উপনিষদের ঋষি, কবীর, রামানন্দ, তুকারাম, তুলসী- দাস, মীরাবাই প্রভৃতি মরমীসাধক (mystic) ও বৈষ্ণব কবিগণের সহিত পারস্যের f [ ৬ ] মদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয়। তদানীন্তনকালে এই পাঁচটি মদ্রাসা বিদ্যাপীস্থান- বাগদাদের নিজামিয়া রূপে প্রসিদ্ধিলাভ করিয়াছিল। ইহাদের মধ্যে মদ্রাসা। বাগদাদের মদ্রাসাই সর্বাপেক্ষা সর্বোচ্চ সম্মানলাভ করিয়াছিল। এই পাঁচটী মদ্রাসার ছাত্রগণ মধ্যে অনেকে বিদ্বান, দার্শনিক, জ্যোতির্বিদ ও কবি রূপে জগতে সবিশেষ প্রসিদ্ধিলাভ করিয়া চিরস্মরণীয় হইয়াছেন। বাগদাদের নিজামিয়া মদ্রাসা হইতেই সাদির উচ্চ বিদ্যারম্ভ হয়। সাদির জ্ঞান পিপাসা এতই বলবতী ছিল যে, তিনি দুঃখকষ্টের মধ্যে পড়িয়াও মুহূর্তের জন্য কখনাে জ্ঞানার্জনের কথা ভুলেন নাই। পিতৃবিয়ােগের পরও কবি কিছুকাল সিরাজে থাকিয়া পাঠ অভ্যাস করিয়াছিলেন, পরে জন্মভূমির নিকট বিদায় গ্রহণ ও জ্ঞানান্বেষণের জন্যই প্রিয় জন্মভূমির বাগদাদ যাত্রা। নিকট বিদায় লইয়া বাগদাদ যাত্রা করেন। এই সময় বাগদাদ প্রসিদ্ধ বিদ্বান পণ্ডিতগণের মিলন-মন্দির-রূপে পরিণত হইয়াছিল। সুদীর্ঘ ত্রিশবৎসরকাল ধ্যানরত তপস্বীর মত কঠোর সাধনার দ্বারা কবি বিদ্যার্জন করেন। এই কঠোর সাধনায় সাদির সিদ্ধি লাভ ঘটিয়াছিল। সাধনায় সিদ্ধি ও উচ্চ সম্মানলাভ। মদ্রাসার অধ্যক্ষ ও অধ্যাপকগণ সাদিকে ‘ইরার”* রূপে নির্বাচিত করিয়া সম্মানিত করেন। বাগদাদে আসিয়া সাদি বড়ই অথ কষ্টে পড়েন। নিজামিয়া মদ্রাসার সুবিখ্যাত অল্লামা আবুল-ফারাজ-আবদুল রহমন শ্যামসুদ্দিন- বিন-জৌজি (১) সাদির তীক্ষ্ণ মেধাবুদ্ধি, স্মৃতিশক্তি, পাঠানুরাগ ও বিনয়-নম্র ব্যবহারে সাতিশয় মুগ্ধ হন। বৎসর বয়সে সাদি একটী প্রবন্ধ রচনা দ্বারা শিক্ষাগুরু শ্যামসুদ্দিনকে সমধিক চমৎকৃত করেন। এই রচনাই কবির সাহিত্য-জীবন- প্রথম রচনা। * ইরায় অর্থাৎ সভ্য, Fellow. (১) ইনি জমালুদ্দিন নামে প্রসিদ্ধ ছিলেন।
[ ৩ ] যাত্রার পাথেয় স্বরূপ। সাদির আশ্চৰ্য্য রচনাশক্তি দেখিয়া শিক্ষাগুরু শিখ গুরুর স্নেহ ও জৌজি সাদিকে পুত্রবৎ স্নেহ করিতে থাকেন। সাহায্যলাভ। সাদির পিতৃবয়ােগ হওয়ায় তাহার সাংসারিক অবস্থা অত্যন্ত হীন হইয়াছে দেখিয়া তিনি সাদির জন্য একটী বৃত্তির ব্যবস্থা করিয়া দেন। ইহাতে সাদির দুরবস্থা অপনীত হয়। সাদি তাহার শিক্ষাগুরু আবুল ফারাজ আবদুল রহমন শ্যামসুদ্দিন-বিন-জৌজির নিকট সাহিত্য-দর্শন- বিজ্ঞান শিক্ষা করেন। গুলিস্তর উনবিংশ উপাখ্যানে গুরুভক্তির নিদর্শন স্বরূপ সাদি শিক্ষাগুরু আবুল ফারাজ আবদুল রহমন শ্যামসুদ্দিন- বিন-জৌজির উদ্দেশ্যে ভক্তি-শ্রদ্ধার পুস্পাঞ্জলী প্রদান করিয়াছেন। যৌবন প্রারম্ভ হইতে জ্ঞানান্বেষী সাদি বিদ্বান মণ্ডলীর মধ্যে অবস্থান করিতেন। মহাকবি জামি বলেন, সাদি ছাত্রজীবনেই বিখ্যাত বিদ্বান সুফীগণাগ্রগণ্য শেখ সাহাবুদ্দিন আবু হাফস উমর বি মহম্মদ অল শেখ সাহাবুদ্দিন সুরওয়ারদ্দিন। বরি অস সুরওয়ার্দির (১) সহিত সুফি মতবাদ ও ধর্মতত্ত্ব সম্বন্ধে তর্ক ও বিচারে প্রবৃত্ত হন। সুফিশ্রেষ্ঠ সাহাবুদ্দিনের নিকট সাদি সুফি-ধর্মে দীক্ষা গ্রহণ করেন। তিনি শুধু শেখ সাহদ্দিনের ধর্মশিষ্য ছিলেন না, সাহিত্য-শিষ্যও ছিলেন। কবি সাদির জীবনের উপর সাহাবুদ্দিনের প্রভাব সর্বাপেক্ষা অধিকতর লক্ষিত হয়। কবি বোস্তায় ছাত্রগণের প্রতি সুরওয়ার্দির অনাবিল প্রেম ও নিঃস্বার্থ ভালবাসার কথা পরম শ্রদ্ধা ভরে বর্ণনা করিয়াছেন। (১) ইনি একজন প্রসিদ্ধ বিদ্বান, সাহিত্য-সেবী ও ভাববাদী (mystic). রাজার দেশে ১১৪৫ খ্রীষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন ও ১২৩৪ খ্রীষ্টাব্দে পরলােক গমন করেন। শেখ সাহাবুদ্দিন সুরওয়ার্দি তাঁহার পিতৃব্য আব-উন-নাজিব-এস-মুরওয়ার্দির কর্তৃক মরমীপন্থাবলম্বন করেন ( mysticism). ইহার রচিত আউ-আ-ই-ফুল-মথা--ইফ, (স্বর্ণের দান ) নাম পুস্তক সবিশেষ প্রসিদ্ধ। শেখ সাহাবুদ্দিন বাগদাদের সুফি ও শেখগণের প্রধান আচাৰ্য ছিলেন।
[ ৮ ] বোস্তার সপ্তম পরিচ্ছদে কবি ছাত্রজীবনের স্মৃতিকথা লিবিদ্ধ বাদশাহের অনুগ্রহ করিয়াছেন। সিরাজের বাদশা আতাব ?বু বকর দৃষ্টিলাভ। বিসাদ বিনজঙ্গীর * নামে আপনার তখলুস (১) সানি’ রাখেন। কবি গুলিস্তর উপক্রমনিকাতে আবুবকর বিনসাদ বিনজঙ্গীর সবিশেষ গুণকীর্তন করিয়াছেন। কবির কোন নিকট আত্মীয় বাদশাহের উচ্চ রাজকর্মচারী ছিলেন। তাহার চেষ্টায় কবি বাদশাহের অনুগ্রহ-দৃষ্টিলাভ করেন। দৌলত সাহ বলেন, কবি ত্রিশ বৎসরকাল মদ্রাসায় সাহিত্য- বিজ্ঞান-দর্শন প্রভৃতি নানা শাস্ত্র অধ্যয়ন করিয়া চল্লিশ বৎসর বয়সে বাগদাদ ত্যাগ করিয়া জগতের জ্ঞান-ভাণ্ডার হইতে জ্ঞানসঞ্চয় ও পৰ্যটন সূচনা। অভিজ্ঞতা লাভের জন্য দেশ ভ্রমণে বহির্গত হন। সাদি হজ করিতে চৌদ্দ বার মক্কাতীর্থে গমন করেন; তন্মধ্যে দ্বাদশবার আবদুল কাদের গিলানির পদব্রজে গমন করেন। গিলান দেশস্থ সহিত মক্কা যাত্রা। মহাজ্ঞানী পীর শ্রেষ্ঠ আবদুল কাদেরের সহিত কবি প্রথম বার মক্কা যাত্রা করেন। (২) পীরশ্রেষ্ঠ কাদের গিলানীর নিকট সাদি ঈশ্বরতত্ত্ব বিষয়ে জ্ঞানলাভ করেন। মক্কাতীর্থ বাসকালীন সাদি কিছুকাল ভিত্তি হইয়া পবিত্র স্থান ধৌত করিয়া দিতেন ও তৃষ্ণার্তকে জল দান করিতেন। প্রেমিক সাদির এই সাধুকার্যে সন্তুষ্ট হইয়া জলদেবতা খেজ-অর্ আবেহায়াৎ অর্থাৎ স্বর্গ-মন্দাকিনীর পবিত্র বারি পান করিতে দেন এবং প্রত্যাদেশ করেন, কাব্যশাস্ত্রের সকল বিভাগে তুমি অপূৰ্ব্ব পারদর্শিতালাভ * বি=Son of, বিনসাদ=সাদের পুত্র। (১) কবিতাতে ভনিতা দিবার জন্য সংক্ষিপ্ত নাম। (২) পারস্যের অন্তর্গত গিলান প্রদেশে জন্ম বলিয়া, ইনি গিলানি নামে বিখ্যাত। ইনি ১১৬৬ খ্রীষ্টাব্দে দেহত্যাগ করেন।
[ ৯ ] এই স্থানে কবে ও তােমার সমকক্ষ কেহ থাকিবে না। ইহার পর হইতে কবির উন্মেষ ও স্ফুৰ্তিলাভ। সাদির কবিত্বের উন্মেষ ও স্ফুর্তিলাভ সাদির কবিত্বের উন্মেষ ও স্ফুর্তিলাভ সম্বন্ধে আর একটা কৌতুককর ঘটনা এই স্থানে লিপিবদ্ধ করিলাম। একবার সাদি আমিনিয়া দেশে তাহার কোন বন্ধুর বাটীতে দীর্ঘকাল বাস করেন। তৎকালে আরমিনিয়ার লােকেরা মৃত্যুর পূর্বে বানপ্রস্থ অবলম্বন করিত; আমিনিয়া হইতে দূরবর্তী কোন স্থানে বৎসরের মধ্যে একবার কোন নির্দিষ্ট দিনে তাহারা প্রান্তরে আসিয়া জড় হইত। তাহারা নৃত্য-গীতবাদ্য আমােদ-প্রমােদে প্রমত্ত হইত। প্রমােদকারীগণ বয়সের তারতম্যানুসারে স্থির হইয়া পরস্পরের কোমরবন্ধ ধরিয়া পশ্চিম দিকে মুখ ফিরাইয়া নমস্কার পূর্বক মরুভূমির দিকে ছুটিত ; কোথায় যে তাহারা যাইত, তাহার কোন সংবাদ কেহ বলিতে পারিত । সাদির নিকট এ সমস্ত ঘটনা যেন প্রহেলিকার মত বােধ হইত ; দু'একজনকে জিজ্ঞাসা করিয়াও তিনি কোন প্রকার সদুত্তর প্রাপ্ত হন নাই; প্রায়ই কবি এ রহস্যের কথা চিন্তা করিতেন, একদিন স্থির করিলেন, তিনি নিজেই রহস্যোদঘাটন করিবেন। সুযােগ ও ঘটিল। পরবর্তী বৎসরে এই উৎসবের সময় সাদি দেখিলেন, তাহার এক প্রিয় বন্ধু বানপ্রস্থের জন্য প্রস্তুত হইয়াছে; সাদি ঠিক সেই সময়ে তাহার বন্ধুর কোমরবন্ধ ধরিয়া কহিলেন, বন্ধু, তােমার চির-বিদায়-রহস্যের কথা যদি আমাকে বুঝাইয়া দাও, তবে তােমাকে ছাড়িব। বন্ধু, গম্ভীর- ভাবে সাদিকে কোমর বন্ধ ছাড়িবার জন্য অনুরােধ করিয়া বলিল, ম্যালিক-আল-ম-অত্ মৃত্যুদূত (Angel of Death) আমার অপেক্ষা করিতেছে; বন্ধু, আমাকে আর ধরিয়া রাখিও না, ছাড়িয়া দাও। কবির কবিত্বের উন্মেষ সম্বন্ধে একটী গল্প । সাদির বন্ধু এই কথা বলিয়া সবেগে ছুটিল। সাদি পূৰ্ব্ববৎ তাহার বন্ধুর কোমরবন্ধ ধরিয়াছিল, তিনিও পশ্চাৎ পশ্চাৎ [ ১ ] सभित्र ছুটিলেন। বন্ধু এরূপ তীরবেগে সাদিকে লইয়া ছুটিতেছিল যে সদর ভয় হইল, যদি দৈবক্রমে একবার হাত ফসকাইয়া যায় তাহা হইলে মৃত্যু ত হইবেই, পরন্তু রহস্যোদঘাটনও হইবে না। অবশষে তাহারা মরুভূমির মধ্যস্থলে একটী শস্যশ্যামল প্রান্তরে আসিয়া উপস্থিত হইল। যুবকটী সাদির হাত ছিনাইয়া মাটির উপর বসিয়া পড়িল ও একটী ঘাসের চাপড়া তুলিল। চাপড়া তুলিতেই একটী কবরের দ্বার বাহির হইল। সাদির বন্ধু ক্ষিপ্রতার সহিত সেই কবরের মধ্যে প্রবেশ করিল। বন্ধুর কবরের চারি ধারে মাটি ছড়াইয়া দিয়া কবরের শিয়রে বসিয়া কয়েক দিন ধরিয়া বিলাপ করিতে করিতে হঠাৎ একটী কবিতা সাদির মুখ হইতে বাহির হয়। ইহার পর হইতে সাদির কবিত্বের উন্মেষ ও স্কুত্তি লাভ ঘটে। (১) কবিজামি বলেন, সাদি খেজ-অরের প্রত্যাদেশ প্রাপ্ত হইয়া শুধু যে কাব্যশাস্ত্রের সকল বিভাগেই অপূৰ্ব্ব প্রতিভার পরিচয় দিয়াছিলেন তাহা নহে, বিজ্ঞানশাস্ত্রেও তিন অপূৰ্ব পারদর্শিতা দেখাইয়াছিলেন। আবার তিনি গৃহস্থের কল্যাণের জন্য অনেক অলৌকিক ক্রিয়াকাণ্ডও করতেন। কবির অমানুষিক ক্রিয়া- কাণ্ডের সম্বন্ধে দৌলত সাহ বলেন যে, কবি শেষ জীবন সন্ন্যাসীর জীবন যাপন করিতেন সেই সময় তিনি গৃহস্থের কল্যাণের জন্য অনেক প্রকার অলৌকিক ক্রিয়া কৰ্ম্ম করিতেন। কবি এশিয়া মাইনর, বারবরা, আবিসিনিয়া, মিশর, ত্রিপলী, সিরিয়া, প্যালেষ্টাইন. আরমিনিয়া, পৰ্যটন। আরবের নানা প্রদেশ, সমগ্র পারস্য, তুরাণের অনেক নগর, সমরখণ্ড, কাশগর, ভারতবর্ষ, ইয়ােররাপের ইটালি, রােম প্রভৃতি নগর ভ্রমণ করিয়াছিলেন। তিনি যে যে দেশের মধ্যদিয়া গিয়াছিলেন, সেই (১) প্রথম ঘটনার সহিত দেবী সরস্বতীর নিকট হইতে কবি কালিদাসের বরল ঘটনার সাদৃশ্য আছে। দ্বিতীয় ঘটনার সহিত কবিগুরু বালিকীর কবিত্বের উন্মেষ ও ঋত্তিলাভ ঘটনার সাদৃশ্য আছে।
[ ১১ ] সেই দেশের ভাষা শিক্ষা করিয়া, সেই সকল ভাষায় কবিতা রচনা করেন। ভাষা শিক্ষা; ভাষা জ্ঞানে পারদর্শিতা। কথিত আছে, সাদি সৰ্বশুদ্ধ আঠারটী ভাষায় পারদর্শী ছিদ্মন ও এই আঠারটী ভাষায় কবিতা রচনা করিয়া প্রভূত যশ লাভ করেন। ইউরোপীয় ভাষার মধ্যে লাটিন ভাষায় কবি বিশেষ পারদর্শী ছিলেন। বিশেষতঃ রােমক অধ্যাত্মতত্ত্ববিৎ Senecaর গ্রন্থাবলী বিশেষ পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ের সহিত অধ্যয়ন করিয়াছিলেন।* তিনি একাদিক্রমে সুদীর্ঘ চল্লিশবৎসরকাল ভ্রমণ করেন। ইব্রাহিম খ। বলেন, এই সুদীর্ঘ ভ্রমণের ফলস্বরূপ সাদি নানা বিষয়ক জ্ঞানলাভ করেন, ও তাহার পর্যটক-জীবনের মধ্যে যে সমস্ত ঘটনা ঘটে তন্মধ্যে পৰ্যটনের ফল। কতকগুলি উল্লেখযোেগ্য; যথা,- আশ্চৰ্য্য আশ্চৰ্য্য দেশ ও রাজ্য দর্শন ও তৎ অধিবাসীগণের আচার ব্যবহার সম্বন্ধে অভিজ্ঞতালাত, অবস্থার পরিবর্তন, ভাগ্য-বিপর্যয়, সুপ্রসিদ্ধ বিদ্বানগণের সহিত আলাপ- আলােচনা, বিজ্ঞানশাস্ত্রে জ্ঞান অর্জন, সর্বোপরি খিজ অরের প্রদত্ত আবেহায়াৎ পান ও জলদেবতার প্রত্যাদেশে কাব্য ও বিজ্ঞানশাস্ত্রে অপূৰ্ব জ্ঞানলাভ। কবির জাগতিক ব্যাপারের জ্ঞানলাভের নিদর্শন স্বরূপ আমরা পাঠক পাঠিকাগণকে গুলিস্তর তৃতীয় অধ্যায়ের চতুবিংশ উপাখ্যানটী পাঠ করিতে অনুরােধ করি। এই সময় তাহাকে কখনাে স্বচ্ছল অবস্থায়, কখনাে বা অতি কষ্টে দিনপাত করিতে হইয়াছিল। এই সুদীর্ঘ পৰ্যটন কাহিনী সাদি তাহার গ্রন্থমধ্যে লিপিবদ্ধ করিয়াছেন ; ইহাকে কবির আত্মজীবনী বলিতে পারা যায়। এই পর্যটন কাহিনী তাহার কঠোর পরিশ্রম, অর্থাভাক:'কষ্ট ও ধৈৰ্যশীলতার পরিচয় * "That Videt Egyptiam et Italiam ; and that he was much skilled in the oriental languages ; nay, that he had studied the Latin tongue, and had deligently perused the works of Seneca." E. Kompher, [ ১২ ] দেয়। এই সময়কার একটী মাত্র কাহিনী আমরা এইস্থানে নিবন্ধ করিলাম। একবার সাদি পদব্রজে মিসরের মধ্য দিয়া যাইতেছিলেন। অর্থাভাব পৰ্যটন সময়ে কষ্টের প্রযুক্ত জুতা কিনিতে পারেন নাই; নগ্নপদেই কাহিনী ও জুতার খেদ। চলিয়াছেন। পথশ্রমে ক্লান্ত হইয়া নিকটস্থ এক মসজিদে আশ্রয় লইতে বাধ্য হন। এইস্থানে বসিয়া তিনি জুতার অভাবের কথাই চিন্তা করিতেছিলেন। তিনি বারবার বলিতেছিলেন, আর নগ্নপদে মিসরের উত্তপ্ত বালুকারাশির উপর দিয়া চলিতে পারি না। জুতার অভাবে পদদ্বয় ক্ষত বিক্ষত হইতেছে। আর বােধ হয় হাঁটিতে পারিব না। ঠিক সেই সময় একটী লােক অতিকষ্টে ধীরে ধীরে সেই স্থানে আসিল এই লােকটীর দু’টী পা-ই ছিল না। এই হতভাগ্যকে দেখিয়া সাদির জুতার খেদ মিটিয়া গেল। সাদি মনে মনে পরম দয়ালু ভগবানের উদ্দেশে অসংখ্য ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাইয়া বলিলেন, মেহেরবান আল্লা, আমার প্রতি তােমার কত দয়া। আমার তবু পা আছে, এ হতভাগ্যের দু'টা পা-ই একেবারে নাই।” দামস্কাস ভ্রমণ করিয়া ফিরিবার পথে সাদি ফ্রাঙ্কদিগের হস্তে বন্দী হন এবং পূর্ব ত্রিপলীতে ইহুদী দাসগণের সহিত বিক্রীত হন। এই সময় তাহার ক্লেশের সীমা ছিল না। আলপ্পো নিবাসী জনৈক বণিক বন্দী, দাসরূপে বিক্রিত ও উদ্ধার লাভ। দশ দীনার পরিবর্তে কবিকে ক্রয় করেন। এই বণিকের সহিত সাদির পূর্ব পরিচয় ছিল। বণিক সাদিকে উদ্ধার করিয়া নিজ বাটীতে আশ্রয় দেন। কিছুকাল পরে বণিক সাদির সহিত নিজ কন্যার বিবাহ দেন। এই বিবাহে সাদি সুখী হইতে পারেন নাই। এই স্ত্রীর সম্বন্ধে সাদি গুলিস্তার একবিংশ উপাখ্যানে লিখিয়াছেন * তৎকালীন স্বর্ণ মােহর বিশেষ। প্রত্যেক দীনার মূল্য পনর টাকা।
[ ১৩ ] সাধু ব্যক্তির সংসারে মন্দ স্ত্রী ঢুকিলে তাহাকে নরক ভােগ করিতে হয়।” এই উক্তি হইতে বেশ স্পষ্টই প্রতীয়মান হয় যে, বিবাহ ; দত্য-জীবনে কবির দাম্পত্যজীবন সুখের ছিল না। যাহা অশান্তি ও পত্নী বিয়ােগ। হউক বেশী দিন তাহাকে দাম্পত্য-জীবনের অশান্তি ভােগ করিতে হয় নাই। সত্বর তার স্ত্রী-বিয়ােগ হয়। ১২২৬ খ্রীষ্টাব্দে সাবিন জঙ্গীর মৃত্যুর পর তাহার পুত্র আবুবকর বাদশা হন। ইনি পিতার মত রাজ্যউচ্ছেদকারী, কীর্তিলােপ ছিলেন না, পক্ষান্তরে ইনি শান্তিপ্রিয় ও প্রজারঞ্জক ছিলেন। দৌলত সাহ বলেন, বাদশা আবুবকর তার পূর্ববর্তী সুলতানগণের সম্পূর্ণ বিপরীত প্রকৃতির লােক ছিলেন। ইনি অত্যন্ত উদার ও জ্ঞানী ছিলেন তৎকালীন বিদ্বান, কবিগণের প্রতি তাহার অসীম অনুগ্রহ ছিল। রাজ- কাৰ্য্য সমাপন করিয়া বাদশা অধিকাংশ সময় বিদ্বানগণের সহিত জ্ঞানালােচনায় সময় অতিবাহিত করিতেন। পূর্ণ উদ্যমে নবীন বাদশা সিরাজের উন্নতির চেষ্টা করিতে লাগিলেন। অল্পদিনের মধ্যেই সিরাজের ঘরে ঘরে সুখশান্তি বিরাজ করিতে লাগিল। নবীন বাদশার অক্লান্ত পরিশ্রমে সিরাজের পূর্ব গরিমা ফিরিয়া আসিল। এই সময় সাদি সিরিয়া দেশে অবস্থান করিতেছিলেন। জন্মভূমি সিরাজের পূর্ব গৌরব, শান্তি ফিরিয়া আসিয়াছে শুনিয়া সাতিশয় স্বদেশ প্রত্যাবর্তন। আনন্দলাভ করেন। স্বদেশে ফিরিবার জন্য তাহার মন আকৃষ্ট হয়। ইহার কিছুদিন পরেই কবি জন্মভুমি সিরাজ- নগরে প্রত্যাবর্তন করেন। সাদি স্বভাবতঃ বড়ই আমােদপ্রিয় ও পরিহাস রসিক ছিলেন। পরিহাস রসিকতা। আমােদ বা পরিহাসের সুযােগ পাইলে কি বালক, যুবক, বয়ােবৃদ্ধ সকলেরই সহিত আমােদ ও পরিহাসে মাতিতেন। নৰ্ম্মোক্তিতে সাদি তৎসাময়িক প্রত্যেক গ্রন্থকার অপেক্ষ।
[ ১৪ ] গরিষ্ঠ ছিলেন। তাহার পরিহাসের মধ্যে শ্রোতারা উপদে-রত্ন লাভ করিত। কবি কখনাে কখনাে প্রকাশ্য স্থানে অথবা জিদে বক্ততা। বক্তৃতা, উপদেশ দিতেন। তাহা বক্তৃতা-সভায় বিস্তর ললাকের সমাগম হইত। অন্যান্য বিদ্বানগণের মত তিনি কখনাে কোন সম্প্রদায়ের নি-দা করিতেন না। অন্ধ গোঁড়ামি তাহার সাধু চরিত্র স্পর্শ করিতে সাহস করে নাই; হৃদয়ের প্রশস্ততা উদারতা যে তাহার রচনাবলীর সহিত এক সূত্রে গ্রথিত, তাহার রচনাবলী পাঠ করিলে ইহা বেশ স্পষ্টই বুঝিতে পারা যায়। সাদির মত উদার প্রকৃতির বিদ্বান, বাগ্মী, দেবত্বের পবিত্র ব্যাখ্যাতা (unsullied instructor of divinity) সিরাজনগরে ছিল না বলিলে অত্যুক্তি হয় না। তিনি এতই উদার উদারতা। ছিলেন যে তাহার জীবনী-লেখকেরা তাহাকে কোন্ সম্প্রদায়ভুক্ত স্থির করিতে না পারিয়া অনুমানে কেহ তাহাকে সিয়া, কেহ বা সুন্নী সম্প্রদায়ভুক্ত বলিয়া নির্দেশ করিয়াছেন। জনসাধারণ যে কবিকে শ্রদ্ধার পুস্পাঞ্জলী প্রদান করিত, তাহা তাহ'র দৃঢ়তার জন্য নহে পরন্তু হৃদয়ের প্রশস্ততা ও সার্বভৌমিক উদারতায় (catholicity) মুগ্ধ হইয়া সার্বজনীন প্রীতি ও উদারতাই কবির সর্বজনপ্রিয়তার (Popularity) কারণ হইয়াছিল। সাদির আত্মসম্মানজ্ঞান এতই প্রবল ছিল যে তিনি অতিকষ্টে পড়িলেও কখনাে আত্মসম্মান বর্জন করেন নাই। নিম্নলিখিত ঘটনাটী আত্মসম্মানজ্ঞান। তাহার আত্মসম্মানজ্ঞানের পূর্ণ পরিচয় দিতেছে। একবার সাদি দরবেশের বেশে দামস্কাসের কোন মসজিদে উপস্থিত হন। সেই সময় দামস্কাসে ভয়ানক দুর্ভিক্ষ। গৃহস্থেরা অর্থাভাব প্রযুক্ত দরবেশ- গণের সেবা করিতে পারিত না । নগরের এক ধনবান নপুংসক এই সময় দরবেশগণের সেবার বিশেষ বন্দোবস্ত করিয়াছিল। নির্দিষ্ট সময়ে মসজিদের সমস্ত দরবেশ নপুংসকের বাড়ীতে আহার করিতে [ ১৫ ] যাইবার জন্য প্রস্তুত হইল। তাহারা যাইবার সময় সাদিকে ডাকিল। সাদি নসকের বাটীতে আহার করিতে স্বীকৃত হইলেন না। তিনি বলিলেন, “রাজ সিংহ ক্ষুধায় মৃতপ্রায় হইলেও কখনন কুকুরের উচ্ছিষ্ট ভিক্ষা করে না।” বােস্ত। পাঠে জানা যায়, যে, কবি ভারতে আসিয়াছিলেন। কবির জীবনী-লেখকেরা বলেন যে সাদি একাধিকবার ভারতে আসিয়াছিলেন। একবার গুৰ্জরের সােমনাথ মন্দির দর্শন করিতে, একবার আফগান বাদশা আগমশের নিকট, ও দুইবার দিল্লির প্রসিদ্ধ কবি অমির খসুর নিকট। কবির একাধিকবার ভারতে আগমন সম্বন্ধে মতদ্বৈধ আছে। শুনা ভারতে আগমন ও সােমনাথের যায় এই সময়েই তাহার সহিত মন্দির দশ ন। দিল্লির প্রসিদ্ধ কবি অমির খর সহিত পরিচয় হয়।* সাদি খকে পুত্রবৎ স্নেহ করিতেন। কবি গুর্জরের সােমনাথের মন্দির দর্শন করিয়া প্রীতিলাভ করেন কিন্তু, মন্দিরের পাণ্ডাগণের ব্যবহারে বড়ই ক্ষুব্ধ হন। বােস্তার অষ্টম অধ্যায়ে সােমনাথের মন্দির দর্শন সম্বন্ধে একটা অদ্ভুত গল্প আছে। সেই কাহিনীটী আমরা নিয়ে প্রকাশ করিলাম। * সৈয়র-উল-মুতফরিণ পাঠে জানা যায় যে, সাদির সময়ে অত্যাচারী বাদশা জেঙ্গীষ খর কবল হইতে আত্মরক্ষা করিবার জন্য পারস্যের যে সমস্ত শিক্ষিত সম্প্রদায় পারস্য ত্যাগ করিয়া চলিয়া যান, তন্মধ্যে কবি অমির খ ও অমিয় হােসেন এই দুই কবি দিল্লির বাদশা সুলতান মহম্মদের পিতা গিয়াসুদ্দিন বলবনের রাজত্ব সময়ে পারস্যের সীমান্তবর্তী মুলতানে আগমন করেন। সুলতান মহম্মদের রাজত্ব সময়ে কবি অমির খস্ত্র দিল্লির রাজকবি-পদে প্রতিষ্ঠিত হন। কবি অমিয় খ সুলতান মহম্মদের সদাসঙ্গী ছিলেন। মহম্মদ পিতা অপেক্ষা অধিকতর শিক্ষত এবং তিনিই খ মুখে সাদির কবিত্বের প্রশংসা শুনিয়া ও হার গুলো ও বোস্তা পাঠ করিয়া প্রীত হন এবং কবিকে রাজকবি-রূপে দিল্লিতে অবস্থান করিবার জন্য অনুরোধ করেন।
[ ৬ ] সাদি লিখিয়াছেন, সােমনাথের মন্দির মধ্যে একটী হস্তীদন্তেরমূর্তি দেখিলাম। হীরা-মণি-মুজা-জহরৎ প্রভৃতি যত প্রকার বহুল্যবান ঐশ্বৰ্য্য আছে তদ্বারা এই মূর্তিটী মণ্ডিত। মূর্তিটী এত সুন্দর যে ইহা অপেক্ষা সুন্দর জিনিষ প্রস্তুত হইতে পারে না। সমস্ত দেশের তীর্থ- যাত্রীর। এই স্থানে আসিয়া জড় হয়। দেখিলাম, সকলেই অত্যন্ত শ্রদ্ধার অদ্ভুত গল্প। সহিত এই জড়পুত্তলিকার পূজা করিতেছে। একটা ব্রাহ্মণকে আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, “তােমরা চেতন মানুষ হইয়া অচেতন জড়ের পূজা করিতেছ কেন? তােমাদের কর্ম দেখিয়া আমি অতিশয় আশ্চর্যান্বিত হইতেছি; তােমরা সকলেই কুসংস্কার-কুপের মধ্যে পড়িয়া রহিয়াছ। এই জড় পুত্তলিকার হস্ত বা পদ উত্তোলন করিবার কোন ক্ষমতা নাই, যদি তােমরা ইহাকে ছুড়িয়া ফেলিয়া দাও, মাটী হইতে উঠিতে পারিবে না। তােমরা কি দেখিতে পাইতেছ না যে, এই জড় পুত্তলিকার দুটী চক্ষু ধাতু পদার্থে নির্মিত ? চেতন মানুষ হইয়া স্ফটিক চক্ষু জড়ের পূজা করা মূর্খতার পরিচায়ক।” ব্রাহ্মণ আমার কথা শুনিয়া অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয় এবং অন্যান্য ব্রাহ্মণগণকে ডাকিয়া তৎক্ষণাৎ আমাকে ঘেরিয়া ফেলে।' আমি দেখিলাম যে ইহারা আমাকে অনায়াসে বধ করিতে পারে। বিপদ বুঝিয়া মন্দিরের প্রধান পাণ্ডাকে বুঝাইয়া বলিলাম যে, তােমরা আমার বক্তব্যের তাৎপৰ্য বুঝিতে পার নাই, আমি এই ঠাকুরকে বড় ভক্তি করি; আমি বিদেশী লােক, ঠিক মত বুঝিতে পারি নাই, সেই জন্য জিজ্ঞাসা করিতেলাম। ভালরূপ বুঝিয়া খুব ভক্তিভরে পূজা করিব। তখন ব্রাহ্মণেরা আমার কথা বিশ্বাস করিল ও আনন্দের সহিত আমাকে বলিল, আজ রাত্রে মন্দিরে অবস্থান কর, কাল প্রাতে এ মূর্তির ক্ষমতা দেখিও, তখন তােমার অবিশ্বাস দুর হইবে। পরদিন প্রাতে দেখিলাম নগরের সমস্ত স্ত্রী পুরুষ মন্দির মধ্যে একত্রিত হইল। তখন মূর্তিটী এরূপভাবে হস্তোত্তলন করিল, যেন ৩ [ ১ ] • বা বরদান করিতেছে। তাহারা সকলে পূজার জন্য নানাবিধ দ্রব্য সামগ্রী প্রদান করিয়া গেল। প্রধান পাণ্ডার সহিত সাক্ষাৎ হইলে তিনি মাকে বলিলেন, ‘এইবার তােমার অবিশ্বাস দূর হইয়াছে ? প্রধান পূজারির অজ্ঞানতা দেখিয়া ক্রন্দনের ভান করিয়া বলিলাম, পূর্বের উপহাসের জন্য আমি বড়ই অনুতপ্ত হইতেছি। আমার প্রতি প্রধান পাণ্ডার বড়ই দয়া হইল; আমাকে মূর্তির নিকট যাইতে দিল। আমি মূর্তির হস্ত চুম্বন করিলাম। পাণ্ডারা আমার ভক্তিভাব দেখিয়া আমাকে ব্রাহ্মণ করিয়া লইল। ব্রাহ্মণ হইয়া তাহাদের সহিত বিস্তর তর্ক করিয়াছিলাম। কিছুদিন মন্দিরে বাস করিবার পর এক রাত্রে দেখিলাম মন্দির মধ্যে কেহই নাই; তখন মন্দিরের সদর দ্বার বন্ধ করিয়া দিলাম। সিংহাসনের নিকট আসিয়া আমি এই জড় পুত্তলিকার হাত উঠাইবার কারণ অনুসন্ধান করিতে লাগিলাম। সিংহাসনের পশ্চাতের পরদা তুলিতেই দেখিলাম, একজন ব্রাহ্মণ রঞ্জু হস্তে বসিয়া আছে। জড় মূর্তির হস্তোত্তলন-রহস্য তৎক্ষণাৎ আমার নিকট পরিষ্কার হইয়া গেল। আমাকে দেখিয়া রজ্জ্বধারী ব্রাহ্মণ পলায়ন করিল। আমি দেখিলাম, এই ব্রাহ্মণ যদি অন্যান্য পাণ্ডাগণকে লইয়া আসে, তাহলে আমার আর নিস্তার নাই। আমি তৎক্ষণাৎ দৌড়িয়া তাহাকে ধরিয়া একটী কূপের মধ্যে ফেলিয়া দিলাম। তৎপরে গুজরাত হইতে পলাইয়া আত্মরক্ষা করিয়াছিলাম।” এই গল্পটীর মত অদ্ভুত গল্প বােধ হয় আর নাই। ইহা সাদির রচনা বলিয়া বিশ্বাস করিতে আমাদের আদৌ প্রবৃত্তি হয় না। তাঁহার জীবনী-লেখকেরা বলেন যে গল্পটী সাদির রচনা। আমাদের বিশ্বাস, এই অদ্ভুত গল্পটী কোন পরবর্তী লেখক প্রক্ষিপ্ত করিয়াছেন, কেননা গল্পের মধ্যে মুসলমানকে হিন্দু দেব-মন্দিরে প্রবেশ অধিকার দেওয়া, মূর্তি স্পর্শ করিতে দেওয়া, মন্দির মধ্যে রাত্রিকালে অবস্থান [ ১৮ ] করিতে দেওয়া এবং মুসলমানকে ব্রাহ্মণ করিয়া লওয়া, এ মস্ত অদ্ভুত কথা যে অত্যন্ত অশ্রদ্ধেয়, তাহা বলাই বাহুল্য। এই কারণেই আমাদের মনে হয় গল্পটা কোন পরবর্তী লেকের প্রক্ষিপ্ত রচনা। পূৰ্বে আমরা বলিয়াছি যে, কবি অতি হীন অবস্থায় পতিত হইলেও কখনও আত্মসম্মানজ্ঞান হারাইতেন না; ইহা যে তাহার দৃঢ় চরিত্র ও অসামান্য মানসিক বলের পরিচায়ক, তাহা বলাই বাহুল্য। তিনি একদিকে যেমন অসাধারণ কবি, অন্যদিকে তেমনি অসাধারণ বিদ্বান, বক্তা, সাধু বলিয়া বিশেষরূপে খ্যাত ও সম্মানিত ছিলেন। এতগুলি সগুণের অধিকারী হইয়াও সাদি সম্পূর্ণ নিরহঙ্কার ছিলেন। সিরাজ- বাসিগণ কবিকে অত্যন্ত শ্রদ্ধার চক্ষে দেখিত। কবি যে শুধু আপন প্রকৃতি ও চরিত্র। কবিত্ব দ্বারাই জনসাধারণের হৃদয়ের উপর প্রভাব বিস্তার করিতে পারিয়াছিলেন—তাহা নহে; তিনি তাঁহার অনন্য- সাধারণ হৃদয়-মাধুৰ্য্য, উদারতা, শিশুর মত সরল ব্যবহার, পুষ্প-কোমল প্রকৃতি ও সাধু-চরিত্র বলেই কি স্বদেশবাসী, কি বিদেশবাসী সকলেরই হৃদয় জয় করিতে সমর্থ হইয়াছিলেন। কি কবিত্ব-সৌরভ মুগ্ধ ভক্ত, কি জ্ঞানপিপাসু ধৰ্ম্মানুরাগী ভক্ত, কি বাদশা, উজির, বণিক, কি জনসাধারণ সকলেরই মস্তক সাদির কবিত্ব ও পূত চরিত্রের নিকট আপনা আপনি ভক্তিভরে নত হইত। সৰ্বসাধারণেই কবির উদার হৃদয়ে স্থান লাভ করিয়া ভ্রাতৃ-নির্বিশেষে প্রীতি-মেহ লাভ করিয়া ধন্য হইতেন। সাদির প্রকৃতি ও চরিত্র এতই মধুর ও উদার ছিল। পৃথিবীর সকল সভ্যদেশবাসী বেশভূষার আদর করিয়া থাকেন। মনুষ্য সমাজের সকলেই 'বেশবিন্যাসের পক্ষপাতী। সমাজের মধ্যে এমন কতকগুলি লােক আছেন, যাঁহারা বেশবিন্যাসের বিষয়ে সম্পূর্ণ [ ১৯ ] । ইহাদের মধ্যে জ্ঞানী, ভক্ত, সাধু ও কবিগণকে এ বিষয়ে বেশবিস নিস্পৃহতা। উদাসীন দেখিতে পাওয়া যায়।* এই নিষ্প হতার জন্ম তাহারা সময়ে সময়ে প্রথমে ইহাদের সমুচিত সম্মান প্রাপ্ত হন না। সভ্যতা-দীপ্ত সমাজ অপরিচিতের গুণের অপেক্ষা বেশ- বিন্যাসের প্রতি সমধিক দৃষ্টি রাখেন। সাদিও বেশবিন্যাস বিষয়ে বড়ই উদাসীন ও নিষ্পহ ছিলেন। তজ্জন্য সাদিকেও সময়ে সময়ে বিড়ম্বনা ভােগ করিতে হইয়াছে। নিম্নলিখিত ঘটনাটী ইহার প্রকৃষ্ট উদাহরণ স্থল। একবার সাদি তাব্রিজের প্রসিদ্ধ কবি হামামুদ্দিনের সহিত সাক্ষাৎ করিতে যান। কবি হামামুদ্দিন খােজার সহিত সাদির পূর্ব বা প্রত্যক্ষ পরিচয় ছিল না কিন্তু উভয়ে উভয়ের কবিত্বে মুগ্ধ ছিলেন। কবি কবি হামামুদ্দীন ও হামামুদ্দিন সাদির হীনবেশ দেখিয়া সাদিকে সামান্য ব্যক্তি জ্ঞান করিয়া তাহার সহিত সাক্ষাৎ করিতে বা কথাবার্তা কহিতে স্বীকৃত হইলেন না। পরে শেখ একটা কবিতা আবৃত্তি করিয়া আত্মপরিচয় দিলে, কবি হামামুদ্দিন সাদির নিকট ক্ষমা প্রার্থনা ও তাহার হস্তচুম্বন করিয়া সাদিকে আলিঙ্গনপাশে বদ্ধ করেন। আর একবার এক বিদ্বান-সতা সাদির দীন বেশ দেখিয়া সাধারণ ব্যক্তি মনে করিয়া তাহার অসম্মান করিয়াছিল। ঘটনাটী এইরূপ, এক ধনী কাজীর বাটীতে এক বিদ্বান-সভার অধিবেশন হয়। সাদি দরিদ্রের বেশে তথায় উপস্থিত হন এবং সেই সভার বিদ্বানগণের বসিবার উচ্চাসনে নিজ আসন গ্রহণ করেন। দরিদ্র ব্যক্তিকে পণ্ডিত- – * পারস্যের কবি হাফেজ, ওমরখৈয়া, ইংলণ্ডের কবি কাউপর, টেনিসন বাঙ্গালার কবি কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার প্রভৃতি ইহার দৃষ্টান্ত স্থল। কবির জীবন-কথায় উদাহরণ বরূপ কবিদেরই নাম উল্লেখ করিলাম।
[ ২ ] গণের নির্দিষ্ট সম্মুখস্থ উচ্চাসনে বসিতে দেখিয়া গৃহস্বামী কাজি অতিশয় ক্রুদ্ধ হন এবং কর্মচারীর সাহায্যে সাদিকে তথা হইতে উঠাইয়া গৃহের সৰ্বশেষের আসনে বসিতে বলেন। সাদি কিছুই না বলিয়া কাজির নির্দেশ মত আসনে বসেন। অতঃপর সভার কাৰ্য্য আরম্ভ হয়। বিদ্বান মহাশয়েরা মােরগের যুদ্ধের অভিনয় করিয়া শ্রোতৃবৃন্দের আনন্দ- কাজি ও সাদি। বর্ধন করিয়া করতালি লাভ করিতে লাগিলেন। কিছুক্ষণ ধরিয়া এরূপ চীৎকার করিয়া পণ্ডিত মহাশয়ের পরিশ্রান্ত হইলেন; কিন্তু তর্কের কোন প্রকার মীমাংসা হইল না; ঘরের শেষের দিক হইতে কবি কিছু বলিবার জন্য অনুমতি প্রার্থনা করিলেন। গৃহস্বামী দরিদ্র ব্যক্তির অসম্ভব স্পর্ধা দেখিয়া ক্রোধে ও ঘৃণায় মুখ ফিরান ; কিন্তু পরে কবির বিনয় নম্র বচনে মুগ্ধ হইয়া অনুমতি প্রদান সামান্য কথায় সরলভাবে সাদি যখন সেই অমীমাংসিত জটিল প্রশ্নের মীমাংসা করিলেন, তখন সভা গৃহের চারিধারে ধন্য ধন্য তখন গৃহস্বামী কাজী অনুতাপ করিয়া বলিলেন, “বিজ্ঞবর। আমি আপনাকে চিনিতে পারি নাই; আপনার দীন বেশ দেখিয়া আপনাকে সামান্য ব্যক্তি মনে করিয়া পণ্ডিতের উচ্চাসন হইতে নামাইয়া যে অসম্মান করিয়াছি, তজ্জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করিতেছি। পূর্বে আপনার পরিচয় পাইলে, কখনই এরূপ ঘটিত না।” এই বলিয়া কাজী নিজ মস্তকস্থিত মূল্যবান রেশমী পাগড়ী খুলিয়া সম্মানের উপহার স্বরূপ কবির মস্তকে পরাইয়া দিবার জন্য কোন কর্মচারীকে আদেশ করিলেন। কৰ্ম্মচারী কাজির আদেশ মত সাদির মস্তকে পাগড়ী পরাইতে আসিলে, তাহাকে সাদি নিরস্ত করিয়া কাজিকে বলিলেন, “ আমি দরিদ্র ব্যক্তি, আপনার ও পাগড়ীতে আমার আবশ্যক নাই, আপনার ও পাগড়ীর এমন একটা বিশেষ গুণ আছে, উহা যে মস্তকে উঠে, তাহারি মস্তকে অহঙ্কারের সৃষ্টি করিয়া দেয়। করেন। রব উঠিল [ ২১ ] পাড়ীধারীর হিতাহিত বিচারের কোন ক্ষমতা থাকে না। মানুষের জ্ঞান আর মস্তিষ্কেই থাকে, শতহস্তপরিমিত পাগড়ীর মধ্যে থাকে । গন্দরেশমী পােষাক পরিলেও সে গর্দভই থাকে। সুতরাং এরূপ বিশেষ গুণবিশিষ্ট পাগড়ী মস্তকে ধারণ করিয়া আমি পশু হইতে ইচ্ছা করি না।” এই বলিয়া সাদি সেই সভাগৃহ ত্যাগ করিলেন। সাদি যে কেবল বেশ বিন্যাসের সম্বন্ধেই নিষ্পহ ছিলেন, তাহা নহে। সমস্ত কাৰ্য্যেই তাহার নিস্পৃহতা ও বৈরাগ্য প্রকাশ পাইত। কতশত ভক্ত কত অর্থ, কতশত মুল্যবান দ্রব্য সম্ভার আনিয়া কবিকে উপহার দিত। কবি এই সমস্ত অর্থ বা দ্রব্যাদি নিজে ব্যবহার করিতেন না। সমস্তই দরিদ্রগণের মধ্যে বিতরণ করিয়া দিতেন। পারস্যের নরপতি আবাখার রাজস্বসচিব শ্যামসুদ্দিন * সাদির একজন বিশিষ্ট ভক্ত ছিলেন ও পিতা” বলিয়া সম্বােধন করিতেন। ইনি সাদিকে দশ সহস্ৰ মুদ্ৰাপূর্ণ একটী থলি উপহার দেন। সাদি এই থলির একটী মুদ্রাও নিজ কার্য্যের জন্য ব্যয় করেন নাই। তিনি এই অর্থ দ্বারা সাধু সেবা ও একটি অতিথিশালা নির্মাণ করাইয়া দেন। এই সকল ঘটনাবলী হইতে স্পষ্টই প্রতীয়মান হয় যে, সাদি জীবন-যাত্রার বাহ আয়ােজনে কিরূপ নিস্পৃহ, ও ত্যাগে কিরূপ আত্মবিস্মৃত ছিলেন। সাদি নিজেই বলিয়াছেন, “ যে ঈশ্বরপরায়ণ সে আধপেটা খাইয়া তাহার সর্বস্ব সাধু সন্ন্যাসিকে দান করে।” একথা সাধু- চরিত্র সাদির সম্বন্ধে যেমন খাটে এমন আর কাহারও সম্বন্ধে খাটে না। * ইনি তাব্রিজের বিখ্যাত কবি আলাউদ্দিনের ভ্রাতা।
[ ২২ ] লাদি তাহার সমসাময়িক বিখ্যাত কবি ও সাহিত্যিকগণের সহিত পরিচিত ছিলেন। বিশেষতঃ কবি জেলালুদ্দিনরুমি,* হকিম/নিজারী ও খােজা হামামুদ্দিনের সহিত তাহার প্রগাঢ় বন্ধুত্ব ছিল। খেলা-সা-উল- আস-হর নামক পুস্তকে লিখিত আছে যে, সিরাজের বাজারের এক ফল বিক্রেতার দোকানে ঘটনাক্রমে সাদির সহিত কবি নিজারির সাক্ষাৎ হয়। ইহার পূর্বে কেহই কাহাকেও চিনিতেন না। কিন্তু উভয়ে উভয়ের কবিত্বের সহিত পরিচিত ছিলেন। সাদি যেরূপ রহস্যপ্রিয় ছিলেন, কবি নিজারি সাদি অপেক্ষা কম রসিক ছিলেন না; সরস কথাবার্তায় উভয়ে উভয়কে কবি বলিয়া চিনিতে পারেন। কবি নিজারি সাদিকে জিজ্ঞাস করেন যে, তাহার কবিতা তিনি আবৃত্তি করিতে পারেন কিনা; কবি সাদি ও কবি নিজারি। ইহার উত্তর স্বরূপ সাদি, কবি নিজারির কবিতার মতলা অর্থাৎ প্রথম শ্লোক (stanz8) আবৃত্তি করেন। সাদি কবি-ভাতা নিজারিকে নিজ গৃহে মহা সমাদরে নিমন্ত্রণ করিয়া লইয়া যান এবং কবি-বন্ধুর সম্মানের জন্য মহা আড়ম্বরের সহিত একটী প্রীতি-ভােজর আয়ােজন করেন। এই প্রীতি-ভােজে তাহার অনেক অর্থ ব্যয় হয়। কিছুকাল পরে সাদি খােরশন গমন করিলে তাহার সহিত কবি নিজারির সাক্ষাৎ হয়। নিজারি মহা আনন্দের সহিত সাদিকে নিজ গৃহে নিমন্ত্রণ করেন ও শেখ সাদির প্রচুর পরিমানে মূল্যবান খাদ্য দ্রব্যের আয়ােজন ও ব্যয় বাহুল্য প্রকাশের জন্য রহস্য করিয়া সাদিকে প্রথম দিবস একটী মৃন্ময় পাত্রে একটু গরম দুগ্ধ ও একখণ্ড রুটি প্রদান করেন। দ্বিতীয় দিন এক * সাধারণতঃ ইনি মুলােউই মানাে-ই অর্থাৎ mystical doctor নামে প্রসিদ্ধ। সাদি ও জেলালুদ্দিন উভয়েই মন্ত্রী শ্যামসুদ্দিনের পৃষ্ঠপােষিত ছিলেন। উভয় কবির মধ্যে প্রগাঢ় বন্ধুত্ব থাকা সত্ত্বেও কেহই কাহারও সম্বন্ধে নিজ পুস্তকে কোন প্রকার উল্লেখ করেন নাই। 1 [ ২৩ ] খাল, ভৰ্জিত মৎস্য, তৃতীয় দিন সিদ্ধ মাংস আহার করিতে দিয়া বলেন, বন্ধু, আমার গৃহের এই সামান্য খাদ্য-দ্রব্য তােমাকে সারাৎসর দিতে পারি কিন্তু তুমি অতিরিক্ত খরচ করিয়া মহা আড়ম্বরের সহিত যে সমস্ত খাদ্য দ্রব্যের ‘আয়ােজন করিয়াছিলে, ওরূপ ব্যয়-বাহুল্য ও আয়ােজন বেশী দিন চলে না।” রহস্য করিয়া চটুল জবাব দিতে তৎকালে সাদির সমকক্ষ কেহই ছিল না। কবির চটুল জবাব সম্বন্ধে যে কৌতুককর গল্প প্রচলিত আছে, সেটা আমরা এই স্থানে লিপিবদ্ধ করিলাম। পারস্যের কোন দেশে এক রাজকুমারী বাস করিতেন। এই রাজকুমারী যেরূপ অপরূপ সুন্দরী, তেমনি আশ্চৰ্য্য রকম বিদ্যাবতী ও কলাবতী ছিলেন। রাজকুমারীর অপরূপ রূপ লাবণ্যের খ্যাতির সহিত তাহার অপূৰ্ব মানসিক-সৌন্দৰ্য-পূর্ণ হৃদয়ের খ্যাতি চারি ধারে ছড়াইয়া পড়িয়াছিল। রাজকুমারীর অপূৰ্ব বিদ্যাবত্তা ও অপরূপ সৌন্দর্যের সাদি চটুল জবাব। খ্যাতি বহু পূর্ব হইতেই কবি সাদির কর্ণ- গােচর হইয়াছিল। অনেক দিন হইতেই কবির হৃদয়ে এই অপূর্ব সৌন্দৰ্য-সুধা পান করিবার ইচ্ছা জাগরুক ছিল। সাদি সদাই রাজকুমারী দর্শনের সুযােগের অপেক্ষা করিতেছিলেন। একদিন রাজকন্যা রাজপ্রাসাদসংলগ্ন উদ্যান-বাটিকায় উদ্যান-বাটিকায় দিনযাপনের গিয়াছেন। বাগানে প্রবেশ করিয়া তিনি হুকুম দেন যে, বাগানের চতু পার্শ্বস্থ দরজাগুলি এমনভাবে বন্ধ করিয়া দেওয়া হয় যেন, কোন ব্যক্তি বাগানের মধ্যে প্রবেশ করিতে না পারে। রাজকুমারী উদ্যান বাটিকায় অবস্থান করিতেছেন শুনিয়া সাদি প্রতিজ্ঞা করিলেন, যেমন করিয়া হউক এই স্বর্গীয় সৌন্দৰ্য্য-প্রতিমা দর্শন করিতেই হইবে। তিনি অনেক কৌশলে বাগানের মধ্যে প্রবেশ করিয়া একটা ঝোপের মধ্যে এমনভাবে লুকাইয়া রহিলেন, যাহাতে কবির মস্তক ভিন্ন আর কিছুই দেখা না যায় ! সাদি মস্তক তুলিবামাত্র রাজকুমারী ও কবির চারি জন্য | ২৪ ) চক্ষুর মিলন হইল। রাজকুমারী কবি সাদিকে দেখিয়া ছন্দে বলিয়া উঠিলেন, * মাটি ফাটিয়া এক বছরের মাথা দেখা দিয়াছে ! রাজকুমারীর এবম্প্রকার কথা শুনিয়া সাদি বলিলেন, মাদী গাধার কর্কশ ধ্বনি শুনিয়া মদ্দা মাটির মধ্য হইতে বাহির হইয়াছে।* সাদির এই চটুল জবাব (Repartees) শুনিয়া রাজকুমারী লজ্জিত হইলেন ও বুঝিলেন এ ব্যক্তি কবি সাদি ভিন্ন আর কেহই নয়। রাজকুমারী তৎক্ষণাৎ মহাসমাদরে কবিকে রাজপ্রাসাদে নিমন্ত্রণ করিয়া পাঠান। কবি সাদি প্রিয়দর্শন যুবকগণ অথবা রাজকুমারগণের সাহচর্য এত ভাল বাসিতেন যে আত্মগােপন করিয়া সামান্য আজ্ঞাবহ কৰ্মচারীরূপে তাহাদের সহিত বেড়াইতেন। একদিন একটী ঘটনা ঘটিল, সাদি এক কন্দর্প- বিনিন্দিত প্রিয়দরশন রাজকুমারের ঘােড়ার সহিসেব কর্মে নিযুক্ত হইলেন। একদিন রাজকুমার এই ছদ্মবেশী সহিসের সহিত ঘােটকে চড়িয়া ভ্রমণে বৰ্হিগত হইয়াছেন; রাজকুমারের মন সেদিন বড়ই প্রফুল্ল ছিল। তিনি প্রফুল্ল মনে একটা কবিতা আবৃত্তি করিতে করিতে চলিতেছিলেন, কিন্তু একটী চরণ বিস্মৃত হওয়ায় অনেক চেষ্টা করিয়াও এই শ্লোকটীর কবিতার পাদ পুরণ। পাদপূরণ করিতে পারিতেছিলেন না। অবশেষে মন্ত্রী, সভাসদ, তাঁহার রাজ্যের তাঁহার রাজ্যের বিদ্বানগণ সকলে মিলিয়া এই কবিতাটীর পদ পূরণের জন্য চেষ্টা করিল, কিন্তু সকলেই অপারগ হইল। রাজকুমার অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হইয়া তাহাদের বৃত্তি বন্ধ ও গৃহ বাজেয়াপ্ত করিবার হুকুম দিলেন। তখন ছদ্মবেশী সহিস উপযুক্ত সময় বুঝিয়া কবিতাটীর পাদ দিলেন। ছদ্মবেশী সহিসের রচনা শক্তি দেখিয়া রাজকুমার এতদূর আশ্চাৰ্যন্বিত পূরণ করিয়া * বর্তমান রুচিতে এরূপ রসিকতা অপরিপাক যােগ্য।
[ ২৫] হইয়াছিলেন, যে প্রথমে কিছুক্ষণ তার বাক্যস্ফুর্তি হইল না। অবশেষে প্রকৃতি হইয়া অত্যন্ত সম্মান ও শ্রদ্ধার সহিত সহিসরূপী সাদির হস্ত ধারণ করিয়া বলিলেন, “নিশ্চয়ই আপনি কবি শেখ সাদি, তিনি ভিন্ন এরূপ পাদ পূরণ করিবার ক্ষমতা কাহারও হইতে পারে না। আপনি সহিসের ছদ্মবেশে আমার সহিত আসিয়াছেন।” কুমার মহা সমাদর ও শ্রদ্ধার সহিত কবিকে রাজপ্রাসাদে নিমন্ত্রণ করিয়া লইয়া যান। এই সময় (৮২ বৎসর বয়সে) কবি বােস্ত'। রচনা করেন এবং ইহার এক বৎসর পরেই গুলিস্ত। রচনা করেন। বােস্ত। ও গুলিস্ত। প্রকাশের পর সাদির কবিত্ব-সৌরত বসন্তের বাতাসের মত চারি ধারে ছড়াইয়া পড়ে। গুলিস্ত। প্রকাশিত প্রকাশিত হইলে কি কবিত্বের প্রায়। স্বদেশ—কি বিদেশ—কি ধনী, নিধন, সুলতান, বাদশা উজীর মহাজনের গৃহে, কি রাজদরবারে সর্বত্রই পঠিত হইতে থাকে; সর্বত্রই কবির কবিত্বের প্রশংসা জনসাধারণে দলে দলে আসিয়া কবিকে অভিনন্দন প্রদান করে। কবিত্ব-সৌরভ লুব্ধ হইয়া, কেহ বা কবির মুখনিঃসৃত উপদেশ শ্রবণের আশায়, কেহ বা জ্ঞান-পিপাসা নিবারণের জন্য, কেহ বা কবির সার্বজনীন ভ্রাতৃভাবে মুগ্ধ হইয়া দলে দলে আসিত। সাদির কবিত্বের সৌরভ এতদূর বিস্তৃতিলাভ করিয়াছিল যে, দিল্লী বাদশা সুলতান মহম্মদ, সাদির কবিত্ব, জ্ঞান, পাণ্ডিত্য, ও রসিকতায় মুগ্ধ হইয়া কবির প্রতি বাদশার শ্রদ্ধা-নিবেদনের চিহ্ন স্বরূপ অনেক মহা- মূল্যবান উপহার ও নিমন্ত্রণপত্র সমেত একজন মাননীয় রাজকর্মচারী প্রেরণ করেন। এই পত্রে সুলতান কবি সাদিকে দিল্লির রাজ- কৰিরূপে অবস্থান করিবার জন্য অনুরােধ করেন। শেখ সাদি সুলতানের উপহারে পরিতুষ্ট হইয়া নিজহস্তে বােস্তা ও গুলিস্ত। নকল করিয়া সম্মানের নিদর্শন স্বরূপ বাদশাকে উপহার দেন এবং বলিয়া পাঠান [ ২৬ ] যে বৃদ্ধবয়সে (তখন সাদির বয়স নব্বই বৎসর) পারস্য ত্যাগ করিয়া যাইতে তিনি অপারগ। সাদির জীবনী-লেখক,দৌলত সাহ বলেন, সুদীর্ঘকাল পৰ্যটনের পর সাদি স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করিয়া সন্ন্যাসীর জীবনযাপন করেন, সেই সময় তক্তগণ নানাবিধ খাদ্য দ্রব্য আনিয়া কবিকে উপহার দিত। কবি ইহার কিয়দংশ উপস্থিত ভক্তদের মধ্যে বণ্টন করিয়া অবশিষ্টাংশ সিরাজের দরিদ্র কাঠুরিয়াগণের জন্য তুলিয়া রাখিতেন। সাদি যে কেবল শুধু বক্তৃতা বা উপদেশ দিরাই ক্ষান্ত ছিলেন, তাহা নহে—যে সমস্ত বিষয় উপদেশ দিতেন, সেই সমস্ত কাৰ্য্য তিনি ধৰ্ম্মজ্ঞানে যথা কৰ্ত্তব্য সম্পাদন করিতেন। তাহার উপদেশাবলীর সার মর্ম এই যে, ঈশ্বরের প্রীতির জন্য তাঁহার প্রিয়কাৰ্য্য ও অপরের প্রতি কর্তব্য পালন করিলেই তাহার প্রতি কর্তব্য সম্পাদন করা হইল। জনসাধারণের প্রতি কর্তব্য পালন করাই ধৰ্ম জপের মালা ঘুরাইলে ধৰ্ম্মকাৰ্য্য সম্পন্ন করা হয় না। সাদি ধর্মের ভান, সাধুর ভণ্ডামি সহ করিতে পারিতেন না। তিনি চিরদিনই ভণ্ডের শত্রু ছিলেন। সাধুগণের প্রতিও তার সহানুভূতি ছিল না। সাধুদের সম্বন্ধে তিনি লিখিয়াছেন, সাধুরা আত্মমুক্তির জন্য যেরূপ চিন্তিত সাদির ধর্মমত ও সাধু বিদ্বেষ। থাকেন, তাহাতে পতিতের উদ্ধারের দিকে তাহাদের আদৌ দৃষ্টি থাকে না; গুলিস্তার একটা উপাখ্যানে কবির সাধু- বিদ্বেষ স্পষ্টই ফুটিয়া উঠিয়াছে। সাদির সাধু-বিদ্বেষ-চিত্রটা নিয়ে আমরা চিত্রিত করিয়া দিলাম। এক রাজা রােগ যন্ত্রণায় অস্থির হইয়া মানসিক করিল যে, শীঘ্র রােগমুক্ত হইলেই সাধুদের ধন দান করিবেন। রােগ- মুক্ত হইয়া রাজা এক ক্রীতদাসের হস্তে প্রচুর অর্থ দিয়া সাধুগণের মধ্যে বিতরণ করিতে পাঠাইলেন। সে সমস্ত দিন পরে সন্ধ্যার সময় ফিরিয়া আসিয়া রাজাকে জানাইল, প্রভু, নগরে একটীও সাধু পেলাম না!” ;
[ ২৭ ]
রাজা সক্রোধে বলিলেন, “সেকিরে! আমি খুব ভাল রকম জানি যে
আমার রাজ্যে অন্ততঃ চারিশত সাধু আছে।” ক্রীতদাস বলিল “প্রভু,
যাহারা সাধু, তাহারা আপনার অর্থ স্পর্শ করে না, আর যাহার। অসাধু
তাহারাই অর্থ গ্রহণ করে।” রাজা কিছুক্ষণ
রাজা কিছুক্ষণ নীরব থাকিয়া বলিলেন,
“কথাটা কিন্তু সত্য।”
সাদির প্রকৃতি যেরূপ মধুর, হৃদয় যেরূপ মানস-সৌন্দৰ্য-পূর্ণ ছিল,
তাহার শারীরিক গঠন প্রণালী কিন্তু তদ্রুপ সুকুমার ও সুঠাম ছিল না।
আকৃতি।
তিনি সুপুরুষ ছিলেন না। সিরাজবাসীগণের অনেকের
মত তার মস্তকে টাক ছিল। তিনি শীর্ণ ও খর্বাকৃতি ছিলেন।
প্রথমা পত্নীর মৃত্যুর পর সাদি পুনরায় দারপরিগ্রহ করেন। এই
বিবাহ কাৰ্য্য আরব দেশস্থ ইয়ামান রাজ্যের অন্তর্গত সানা প্রদেশে
সাধিত হয়। দ্বিতীয় পত্নীর গর্ভে একটী পুত্র ও কন্যা
সন্তান জন্মগ্রহণ করে। পুত্র সন্তানটি শৈশবেই ইহলীলা সম্বরণ করে।
বােস্তাঁর নবম অধ্যায় পুত্ৰ-বিয়ােগ-কাতর কবির বিয়ােগবিধুর হৃদয়ের
উচ্ছাস ব্যক্ত করিতেছে। হাজি লতিফ আলিবেগ বলেন, কবি
হাফেজের সহিত এই কন্যার শুভ বিবাহ হয়।
সাদি নির্জনতাপ্রিয় ছিলেন। সুদীর্ঘকাল পৰ্যটনের পর স্বদেশ
প্রত্যাগমন করিয়া শেষ জীবন পর্যন্ত কবি নির্জনেই ধর্ম ও
নির্জন-প্রিয়তা ও কবির
ঈশ্বর-সমাধির পূর্বরাগ।
কাব্যালােচনাতেই অতিবাহিত করেন। কবির
এই সময়ের মানসিক অবস্থা ঈশ্বরমুখী ছিল।
উষার পূর্বকাশের
অরুনিমার ন্যায় ভক্ত কবি-হৃদয় ঈশ্বর-সমাধির পূৰ্ব্বরাগ রঞ্জিত ছিল।
সংসার।
* সাদির মত বাঙ্গালার কবি কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদারও দেখিতে কদাকার ছিলেন ।
অনেক বিষয়ে সাদির সহিত মজুমদার-কবির সাদৃশ্য আছে।
[ ২৮ ] সিরাজের যে নির্জন মনােম স্থানটীতে কবির বাসগৃহ ছিল। সেই স্থানটী সৌন্দৰ্য্য ও সুষমায় স্বর্গের নন্দনকাননের তুল্য ছিল । কবি জামি ভঁহার নাফ-উল-আনাস নামক গ্রন্থে সাদির হয়ে দৈবানুগ্রহ-লাভ ও ঐশী শক্তির সম্বন্ধে বলিয়াছেন যে, পবিত্র মক্কাতীর্থ অবস্থানকালে সাদি ভিস্তি হইয়া মক্কা সহরের রাস্তায় জল সেচন করিতেন ও জলদান করিয়া তৃষ্ণার্ত পথিকগণের তৃষ্ণা নিবারণ করিতেন। ভক্ত সাদির এই সাধুকার্যে সন্তুষ্ট হইয়া জলদেবতা খিজ-অৰু সাদিকে আবেহায়াৎ দান করেন। ইহার পর হইতে সাদি কাব্যশাস্ত্রে অদ্বিতীয় পারদর্শিতা ও বাকৃসিদ্ধি লাভ করেন। সাদির এক আত্মীয় এই সমস্ত অলৌকিক ঘটনার কথা শ্রদ্ধার চক্ষে দেখিতেন না, পরন্তু অবিশ্বাস করিতেন। রাত্রিকালে খিজ-অ7 এই অবিশ্বাসী ব্যক্তিকে তাহার সন্দিগ্ধচিত্ততার জন্য স্বপ্নে অতিশয় তিরস্কার করেন। স্বপ্নদর্শনের পর এই ব্যক্তির চৈতন্যোদয় হয়। (১১) “নাকাতুল-আনাস ” নামক গ্রন্থে নিম্নলিখিত অলৌকিক ঘটনাটা এরূপ লিখিত আছে। * কৰি জামি তৎপ্রণীত দিল্লির কৰি অমির খর জীবন-কথা গ্রন্থে বলিয়াছেন, যে কবি খও জলদেবতা খিজ-অরের নিকট হইতে প্রেরণা ও স্বর্গমন্দাকিনীর পবিত্র পানীয় প্রার্থনা করেন। কিন্তু জলদেবতা খিজ-অর তাহাকে বলেন যে, যাহা ছিল সমস্তই সাদি ও হাফেজ পাইয়াছে, আর কিছুমাত্র নাই। কবি হাফেজ দৈব- প্রেরণা ও ঐশীশক্তি লাভের পর দ্বিতীয় সাদি” রূপে পরিগণিত হইয়াছিলেন। হাফেজ নিজ দৈবানুগ্রহ লাভ সম্বন্ধে একটী গজলে লিখিয়াছেন, “গতকল্য প্রত্যুষে উগান জগতের দুঃখকষ্ট হইতে আমাকে মুক্ত করিয়া কৃপা পূর্বক স্বর্গ- মন্দাকিনীর পবিত্র পানীয় দান করিয়াছেন।” (১১) ভক্ত প্রেমিক কবি চণ্ডীদাস, নরােত্তমদাস প্রভৃতি বৈষ্ণব কবিগণের জীবনের অলৌকিক ঘটনাবলী তাঁহাদের আত্মীয় বন্ধু বান্ধবগণ প্রথমে অবিশ্বাস করিতেন, পরে দেবতার দৈবাদেশ ও তিরস্কারে তাহাদের চৈতন্যোদয় হয়। * [ ২৯ ] দরবেশের স্বপ্ন। এv থমণে আলফে ঈর্ষার চক্ষে দেখিত। সে সাদিকে ভক্ত-কবি বা বিদ্বান ববিয়া স্বীকার করিত না। একদিন রাত্ৰকালে এই দরবেশ স্বপ্নে দেখিল, যে দেবদূতগণ আলােক-ঝর্তিকা ও পারিজাত-মালা হস্তে স্বর্গ হইতে অবতরণ করিতেছে; দরবেশ দেদূতগণকে ইহার কারণ জিজ্ঞাসা করিলে, তাহারা বলিল, কবি সাদি বিশ্বস্রষ্টার গুণ কীৰ্ত্তন করিয়া একটী সুন্দর কবিতা রচনা করিয়াছেন, আমরা তাহার সম্মানের জন্য এই ভাবে যাইতেছি। দরবেশ জাগ্রত হইয়াই সাদির গৃহাভিমুখে ছুটিল ।। কবিকে নিজ স্বপ্ন বৃত্তান্ত শুনাইল। দরবেশ যে সময় সাদির বাটীতে উপস্থিত হইল, ঠিক সেই সময় কবি সেই কবিতাটীর রচনা শেষ করিয়া গুণ গুণ স্বরে কবিতাটী আবৃত্তি করিতেছেন। আমরা নিয়ে কবিতাটীর ভাবানুবাদ করিয়া দিলাম-- “যে বিজ্ঞ সেই কেবল শ্যামলপল্লবপূর্ণ বৃক্ষপত্রে স্রষ্টার সৃষ্টি-সৌন্দৰ্য- রহস্য দেখিতে পায় ও বুঝিতে পারে সৃষ্ট বস্তুর চারিধারে স্রষ্টার কত বুদ্ধি ও শক্তির ক্রীড়া বিরাজমান। দৈবাগ্রহলাভ ও ঐশীশক্তি সম্পন্ন হওয়ার পর হইতে জনসাধারণে কবিকে পয়গম্বর বিশ্বাসে ভক্তি করিত।* নিম্নলিখিত ঘটনা হইতে এ কথার যাথার্থ বেশ স্পষ্ট বুঝিতে পারা যায়। সাদি বলিতেছেন, আমি যখন পবিত্র মক্কাতীর্থ পরিভ্রমণ করিয়া তাব্রিজ সহরে উপস্থিত * পরবর্তী যুগের কবি মৌলানা হাতিফা তাহার একটী গজলে সাদির পয়গম্বয়ত্ব সম্বন্ধে লিখিয়াছেন,—“ যদিও পয়গম্বর মহম্মদ বলিয়াছেন “লা নাবিয়া বা আদি অর্থাৎ আমার পর আর কোন পয়গম্বর জন্মগ্রহণ করিবে না, তথাপি কবিদের মধ্যে তিনজন কষি ভগবৎ প্রেরণায় সিদ্ধিলাভ করিয়া পয়গম্বররূপে ভক্তি ও পুজা পাইৰে। ফাসি বীররস কাব্যে, আনওয়ারী বিষাদ সঙ্গীতে ও সাদি গজল বা গীতিকাব্য রচনায় চির অমরত্ব লাভ করিবে।”
[ ৩ ] হইলাম, তখন তত্ৰত্য কবি, দার্শনিক ও যাবতীয় বিদ্বানগণের সহিত আলাপ-আলােচনা করিয়া পরম ঐতিলাভ করি। সেই সূময়ে কবি আলাউদ্দিন ও তাহার ভ্রাতা, পারস্যের সুলতান আবাখার রাজস্ব-সচিব, ভক্ত শ্যামসুদ্দিনের সহিত সাক্ষাতের ইচ্ছা হওয়ায়, এই ভ্রাতৃ যুগলের সহিত সাক্ষাৎ করিবার জন্য গমন করিলে পথিমধ্যে দেখিলাম, উভয় ভ্রাতা সুলতানের সহিত অশ্বারোহনে ভ্রমনে বহির্গত হইয়া- ছেন। তখন তাহাদের, দর্শনাশায় হতাশ হইয়া ফিরিবার উপক্রম করিতেছি, এমন সময় ভ্রাতৃ-যুগল অশ্ব হইতে অবতরণ করিয়া আমার চরণ বন্দনা করিল। সুলতান ইহা দেখিয়া শ্যামসুদ্দিনকে আমার পরিচয় জিজ্ঞাসা করিলে শ্যামসুদ্দিন বলেন, “ইনি আমা- দের পিতা।” সুলতান বলিলেন, “আমি আপনাদিগকে কতবার আপনাদের পিতার পরিচয় জিজ্ঞাসা করিয়াছি, কিন্তু আপনারা ত আপনাদের পিতার পরিচয় কখনাে বলেন নাই।” শ্যামসুদ্দিন বলিলেন, “সুলতান, ইনি আমাদের পিতা অপেক্ষা পূজনীয় “শেখ সাদি”। ইহারই কবিত্ব-সৌরভ চারিধারে চারিধারে বিস্তৃতি বিস্তৃতি লাভ করিয়াছে সুলতানের ও কর্ণগােচর হইয়াছে।” সুলতান আমাকে অভিবাদন করিয়া দরবারে তাহার সহিত সাক্ষাৎ করিবার জন্য অনুরােধ করিলেন। কয়েক দিন পরে রাজদরবারে উপস্থিত হইলাম। রাজা সসম্মানে অভ্যর্থনা করিয়া তাহার সিংহাসনের পার্শ্বে আমাকে বসিতে স্থান দিলেন। আমি আসন পরিগ্রহ করিলে, রাজা কোন একটী উপদেশ দান করিবার জন্য আমাকে অনুরােধ করেন। আমি বলিলাম, “পুরস্কার অথবা শাস্তি ব্যতীত কিছুই আপনার সঙ্গে যাইবে , অতএব সুলতান! অপিনি সত্যব্রত ও দানব্রত হউন।” সুলতানের অনুরােধে এই বিষয়টী ছন্দে রচনা করিয়া আমি কবিতায় তাহাকে বুঝাইয়া বলিলাম, } [ ৩১ ] “হে রাজন! যে রাজা পুত্রনির্বিশেষে প্রজা পালন ও রাজ্যশাসন করেন, রাজকর তার পুরস্কার স্বরূপ এবং তিনি রাখালতুল্য; আর যে রাজা প্রজা পালন রূপ মহাব্রত পালন করেন না, তার রাজকর বিষতুল্য অর্থাৎ তিনি দুগ্ধদিয়া সর্পভীতি ক্রয় করেন।” রাজা আমার কথা শুনিয়া কাঁদিয়া ফেলিলেন, এবং বলিলেন, * শেখ, আমি কি রাখাল হইতে পারিব ?” আমি বলিলাম, “সুলতান। আপনি যদি রাখাল হইতে পারেন, তাহা হইলে আমার কবিতার প্রথমার্ধই যথেষ্ট, নতুবা অপরাৰ্দ্ধই যথেষ্ট হইবে।” পুনরায় কবিতা আবৃত্তি করিলাম, সুলতান, রাজা ঈশ্বরের ছায়া সদৃশ জানিবেন। এই ছায়া কি কখনন কায়া ছাড়িয়া থাকিতে পারে ? আর স্থির জানিবেন, অধম ব্যক্তিদ্বারা কখনাে সুকাৰ্য্য সম্পন্ন হইতে পারে না, আর ইহাও জানিবেন, তরবারি দ্বারা কখনাে রাজ্য শাসন করা যায় না। যে রাজা পুত্র নিৰ্বিশেষে প্রজা পালন করেন, তাঁর কীর্তি-খ্যাতি এ ক্ষিতি পৃষ্ঠে চিরদিন বিরাজমান থাকে।” সাদির মন্ত্র প্রভাব ও বাকৃসিদ্ধিলাভের নিদর্শন স্বরূপ আমরা দুইটা ঘটনা লিপিবদ্ধ করিলাম। পূর্বে আমরা বলিয়াছি যে, সুদীর্ঘ পৰ্যটনের পর কবি স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করিলে, জনসাধারণ, বাদশা, সুলতান, উজীর কবিকে দর্শন ও তাহার নিকট হইতে উপদেশলাভ করিতে আসিতেন এবং সকলেই কবিকে শ্রদ্ধার উপহার স্বরূপ প্রচুর অর্থ ও নানাবিধ মহা মূল্যবান দ্রব্যাদি দিতেন। একদিন একটা ঘটনা ঘটিল, এক চোর মূল্যবান দ্রব্যাদি চুরি করিবার জন্য কাঠুরিয়ার বেশে সাদির নিকট আসিয়া উপস্থিত হয়। সুযােগ বুঝিয়া চোর চুরি করিবার জন্য হাত উঠাইবামাত্র, তাহার হাত উদ্ধে রহিয়া গেল। সে কোনমতেই হাত নামাইতে পারিল না।
[ ৩২ ] সাদি। হইয়া যন্ত্রণায় ছটফট করিতে লাগিল। চোর অতি কাতর ভাবে সাদিকে বলিল, “শেখ, আর যে যন্ত্রণা সহ্য করিতে পারি না। আমাকে রক্ষা কর। » সাদি চোরের কাতরােক্তি শুনিয়া বলিলেন, তুমি যদি কাঠরিয়া বেশী চোর ও কাঠুরিয়া হও, তােমার হস্তে অস্ত্রাঘাতের চিহ্ন নাই কেন? আর যদি দস্যু হও, তোমার বাহুতে বল, ও হৃদয়ে সাহস নাই কেন?” যাহা হউক কবি চোরের জন্য মন্ত্রজপ করিলেন;" জপ শেষ হই- বার সঙ্গে সঙ্গে চোর যন্ত্রণা মুক্ত হইল ও তাহার হাত ধীরে ধীরে নামিল। এক যুবক এক রাজকুমারীর প্রেমে পড়িয়াছিল। দুভাগ্যের বিষয় বিধাতা যুবককে দেহ-সৌন্দৰ্য্য অথবা ঐশ্বৰ্য্য এই দুটী জিনিষ হইতে বঞ্চিত করিয়াছিলেন। রাজকুমারী যুবককে আদৌ পছন্দ করিতেন না বরং বামন হইয়া চাঁদ ধরিবার কল্পনার মত দরিদ্র যুবকের রাজকুমারীর পানিগ্রহণ করার ইচ্ছার জন্য মনে মনে ঘৃণা করিতেন। রাজনন্দিনীর রূপ এবং প্রেমে যুবকের এতই আত্ম- বিস্মৃতি ঘটিয়াছিল যে সে আহার নিদ্রা ভুলিয়া গিয়াছিল এবং রাজকুমারী ভিন্ন বাহ জগতের অন্য কোন প্রকার চিন্তা তাহার মনে ছিল না; আত্মবিস্মৃত যুবকের রাজকুমারীর প্রতি প্রেমানুরাগের কথা বাদশার নিকট পৌছিলে, সুলতান এই উন্মাদ যুবককে ডাকিয়া পাঠাইলেন এবং তাহাকে বলেন, “ যুবক, যদি তুমি সত্য সত্যই আমার প্রিয়তমা কন্যাকে ভাল বাসিয়া থাক, আমি তােমাকে আমার কন্যার নামে শপথ করিয়া বলিতেছি, যদি তুমি এই রাজ- প্রাসাদের প্রাচীর হইতে লাফাইয়া পড়িয়া অক্ষত দেহে আমার নিকট আসিতে পার, তাহলে বুঝিব, সত্য সত্যই তুমি আমার কন্যার প্রকৃত অনুরাগী এবং তােমার হস্তেই আমার প্রিয়তমা কন্যাকে দান করিব। রাজকুমারী লাভের উন্মাদ কল্পনায় বিভাের হইয়া প্রেম-বলে বলীয়ান যুবক বাদশার অসম্ভব প্রস্তাবে তৎক্ষণাৎ সম্মত হইল। বাদশা [ ৩৩ ] তৎক্ষণাৎ এই বার্তা রাজ্য মধ্যে প্রচার করিয়া দিলেন। রাজপ্রাসাদের সম্মুখে বৃহৎ সভামণ্ডপ বসিল। দলে দলে আসিয়া জনসাধারণ সমবেত হইল। প্রেম-বলে বলিয়ান যুবক রাজ-আদেশে অট্টালিকার প্রাচীরে উঠিল, সকলেই উন্মাদ যুবকের কাণ্ড দেখিয়া হায় হায় করিতে লাগিল। যুবক প্রাচীরের উপর উঠিয়া লম্ফ দিবার পূর্বে বলিল হে রাজন! আমার মৃত্যুর পর রাজকন্যাকে এখানে আনিবেন ; আপনার নিকট আমার অনুরােধ, আমার মৃতদেহ তাহারি ক্রোড়ে সমর্পন করিবেন; যদি আমার প্রিয়তমা অনুরাগে আমাকে চুম্বন করে” যুবকের কথা শেষ হইতে না হইতেই সে লক্ষ দিয়া মাটিতে পড়িবা মাত্র, তৎক্ষনাৎ তার মৃত্যু হইল। এই সভামণ্ডপে কবি শেখ সাদি উপস্থিত ছিলেন। তিনি প্রকৃত প্রেমিকের অদৃষ্টের বিড়ম্বনা দেখিয়া জলৰ গম্ভীর স্বরে যুবকের অসমাপ্ত বাক্য ভবিষ্যৎবাণী স্বরূপ উচ্চারণ করিলেন, “তা হইলেই আমি বাঁচিব, তােমরা কেহ আশ্চর্যান্বিত হইও না।” সভামণ্ডপের মধ্যে কবি শেখ সাদি উপস্থিত আছেন, জানিতে পারিয়া, সুলতান তৎক্ষণাৎ কবিকে মহা সমাদরে আনিবার জন্য লােক পাঠাইলেন; সাধু-প্রকৃতি কবির গাম্ভীৰ্য্য মণ্ডিত জ্যোতির্ময় মুখমণ্ডল দর্শন করিয়া সুলতান এবং তার সভাসদবর্গ শ্রদ্ধাভক্তি প্রকাশ করিলেন ও তাহার অভাবনীয় আগমনকে যেন দৈব প্রেরণার মত অনুভব করিতে লাগিলেন। সুলতান কবির নিকট সবিস্তারে সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করিলে, সাদি কিয়ৎক্ষণ নীরব থাকিয়া মৃত যুবকেরউক্তি- মত সাহজাদিকে সভা মধ্যে উপস্থিত করিবার জন্য বাদশাকে অনুরােধ করিলেন; রাজকুমারী উপস্থিত হইলে কবি, তাহাকে যুবকের মৃত দেহ ক্রোড়ে তুলিয়া মৃত আত্মার তৃপ্তি ও শান্তির জন্য চুম্বন করিতে বলিলেন। প্রেমিক-প্রেমিকার দু’টী অপরের মিলন হইল। বড়ই আশ্চর্যের
[ ৩ ]
বিষয় রাজকুমারীর অধর যুবকের অধরে মিলিত হইবা মাত্র, যুবক ধীরে
ধীরে চক্ষু মেলিল, যেন গাঢ় নিদ্রা হইতে উঠিতেছে।
নি ভবিষ্যৎবাণী সফল হইয়াছে দেখিয়া শেখ সাদি প্রেমিক যুবকের
অসমাপ্ত রহস্যময় বাক্যের বিষয় বাদশা কর্তৃক অনুরুদ্ধ হইয়া সমবেত
সভাসদবর্গকে বুঝাইয়া দেন। পরে প্রেমিক-প্রেমিকার শুভ-মিলন হয়।
সাদি সৰ্বশুদ্ধ বাইশখানি গ্রন্থ রচনা করেন।
তন্মধ্যে নিম্নলিখিত
দুইখানিই সর্বশ্রেষ্ঠ ও ইহাদের নাম সবিশেষ উল্লেখ যােগ্য।
.
* কবির গ্রন্থাবলীর সংখ্যা নির্ধারণ সম্বন্ধে, নানা জনের নানা মত আছে। প্রাচ্য
ভাষাবিৎ পণ্ডিত D'Herbelot এবং সুবিখ্যাত Sir william Jones বলেন,
বােন্ত, গুলিস্ত। ও মুনুম্যাৎ এই পুস্তকত্রয় ভিন্ন সাদি অন্য কোন গ্রন্থ রচনা করেন
নাই। মেজর ইয়াট (MajorStewart) তৎপ্রণীত ইতিহাস বিখ্যাত সুলতান টিপুর
রাজকীয় পাঠাগারের তালিকা মধ্যে সাদিপ্রণীত সতের খানি গ্রন্থের নাম নির্দেশ
করিয়াছেন। আলি ইবন আহম্মদ দ্বাবিংশখণ্ড গ্রন্থের কথা বলিয়াছেন। তন্মধ্যে
হয়খানি রান্না অর্থাৎ ধৰ্ম্ম সম্বন্ধীয় পুস্তিকা
।। গুলিস্ত।
৮। বােন্ত।
—আরব্য ভাষায় রচিত বিয়ােগ-সঙ্গীত
১০। দুইখণ্ড আরব ও পারস্য ভাষায় রচিত শােককাব্য (গজল)
১১। মিরাজি অর্থাৎ শােককাব্য (গজল)
১২। মুলুম্যাৎ অর্থাৎ পারস্য ও আরব্য ভাষায় মিশ্রিত কবিতা পুস্তক
১৩। তুজয়্যাৎ অর্থাৎ বিবিধ কবিতা
১৪। তায়াবাৎ অর্থাৎ (গজল)
১৫। বদ্যা অর্থাৎ ভক্তি রশ্রিত (গজল)
১৬। খাওয়াতিম অর্থাৎ সাদির পরিণত বয়সের রচনা
১৭। পদনামা সাদির প্রাথমিক রচনা
১৮। সাহাৰিয়া অর্থাৎ সাদির ভক্ত শ্যামসুদ্দিনের উদ্দেশে দেহ-ম্পঞ্জলি
১৯। ম্যাকাইতাৰাৎ অর্থাৎ ও কবিতা
[ ৩৫ ] (১) গুলিস্তা—অর্থাৎ গােলাপ-বাগান। (২) বােস্ত—অর্থাৎ ফলের বাগান। সাদি যে সমস্ত মূল্যবান রচনাবলীর দ্বারা পারস্য-সাহিত্য সমৃদ্ধিলাভ করে, তন্মধ্যে বাস্ত। ও গুলিস্ত। বিশ্বসাহিত্যে সমধিক আদৃত ও প্রসিদ্ধ। আমরা বােস্ত্র ও গুলিস্তাঁর কথাই লিপিবদ্ধ করিলাম ; স্বর্গীয় সুষমাপূর্ণ সিরাজের নির্জন পল্লীতে বসিয়া অভিজ্ঞতাপূর্ণ ও পৰ্যটনক্লান্ত জীবন- সায়াহ্নে বিরাশী বৎসর বয়সে কবি বােস্ত, তৎপর বৎসরে গুলিস্ত। বিশ্বসাহিত্যে বােন্ত ও রচনা করেন। বােস্তায় কবি নিজ জীবন ও গুলিস্ত। পৰ্যটন-কাহিনী লিপিবদ্ধ করিয়াছেন। বােস্তাকে কবির আত্মজীবনী বলিতে পারা যায়। কবির সমগ্র জীবনে সঞ্চিত জগতের কর্মক্ষেত্ৰলব্ধ জ্ঞান-পাণ্ডিত্য ও অভিজ্ঞতার কথায় গুলিস্ত। পূর্ণ। যে যুগে কবি তাহার জগৎ-প্রসিদ্ধ কাব্য বােস্ত। ও গুলিস্ত। রচনা করেন, সেই ত্রয়ােদশ শতা- ব্দীর প্রথম ভাগে ইয়ােরােপ অজ্ঞানতমসাচ্ছন্ন, তখনাে প্রতীচ্যে জ্ঞানের আলােক প্রজ্জ্বলিত হয় নাই—অন্ততঃ সাদির রচনাবলী নিহিত স্বর্গীয় ভাব বুঝিবার মত জ্ঞানের অভাব ছিল। সাদির মত কোন পারস্য কবিই কি স্বদেশে ও কি বিদেশে এত অধিক সমাদর প্রাপ্ত হন নাই। ধনী, নির্ধন, রাজা, উজীর, সকল সম্প্রদায়ের লােকের মুখে কবির কবিত্বের প্রশংসা। ২। খুসবিসায়েৎ গদ্য এবং পদ্যে রচিত (খেউড় গজল) ২১। রােবাইয়াৎ অর্থাৎ চতুস্পদি কবিতা ২২। মুফনি দাআত, অর্থাৎ দ্বিপদী কবিতা। When we consider indeed, the time at which it was written, the first half of thirteenth century a time when gross darkness brooded over Europe, at least darkness which might have been, but alas !' was pot felt the justness of many of its sentiments and the glorius views of the Divine attributes contained in it are truly remarkable. Prof. Eastwick, [ ৩ ] জগতের সকল সভ্য দেশেই তাহার কব্যাদির আদর ও প্রচার। অধ্যাপক ব্রাউন, গুলিস্তাঁকে পারস্য ভাষার নীতি-শাস্ত্র বলিয়া নির্দেশ করিয়াছেন।* কবি বলিয়াছেন, গুলিস্ত। রচনা করিতে তাহার জীবলে মূল্যবান সময় ব্যয়িত হইয়াছে। এই কাব্যদ্বয় পারস্যের সুলতান আবুবকর সাদ-বিন-জঙ্গীর নামে উৎসৃষ্ট হইয়াছে। বােস্তা ও গুলিস্ত। রচনার জন্য কবি তাহার কাব্য মধ্যে কৈফিয়ৎ বো। রচনার কারণ দিয়াছেন। তিনি লিখিয়াছেন, অনেক দেশ পৰ্যটন ও জগদ্বিখ্যাত পণ্ডিতগণের সংসর্গে কাল কাটাইয়া আমি যথেষ্ট অভিজ্ঞতা ও শিক্ষা লাভ করিয়া বুঝিয়াছি যে, সিরাজবাসীর মত সাধু চরিত্র, ভক্ত মানব আর কোথাও নাই—সিরাজের উপর শ্রীভগবানের অসীম করুণা বর্ষিত হউক—এই কারণেই যখন আমি সিরিয়া ও তুরস্কে বাস করিতেছিলাম, তখন আমার সমস্ত প্রাণ সিরাজের উপর পড়িয়া থাকিত। প্রিয় বন্ধুগণের নিকট জগৎ-রূপ বাগান হইতে আমাকে রিক্ত হস্তে ফিরিতে হইবে, ইহা চিন্তা করিয়া আমি বড়ই কাতর * That the Gulistan in particular is one of the niost macchiaveliau work in the Persian language. History of Persian Literature STI I । বােস্ত। কাব্যের জন্য কবি নিম্নলিখিত প্রকার উৎসর্গ পত্র রচনা করেন। কবি বলিতেছেন, রাজন্যবর্গের গুণগান না করিয়া আমার এই কাব্যগ্রন্থ একজন বাদশার নামেই উৎসর্গ করিলাম। ইহাতে বােধ হয়, ধার্মিকগণ বলিবেন যে, সাদের পুত্র সুলতান আবুবকরের রাজত্ব কালে প্রাদুভুত, কবি শেখ সাদি প্রতিভা ও বাগ্মিতায় অন্যান্য কবিগণকে অতিক্রম করিয়া শ্রেষ্ঠ পদবী লাভ করিয়াছে। যতদিন আকাশ- সাগরে চন্দ্রমূৰ্য্য ভাসমান থাকিবে, ততদিন এই কাব্যের সহিত বাদশার স্মৃতি অক্ষয়, চিরস্মরনীয় ও জয়যুক্ত হইয়া থাকিবে। ভগবান বাদশার মঙ্গল কামনা পূর্ণ করুন, জগৎবাসী তাহার বন্ধু মধ্যে পরিগণিত হউক, এবং সৃষ্টিকর্তা তাহাকে সতত মলে আগুন।”
[ ৩৭ ] হইয়া বলিতে ছিলাম, প্রত্যেক পৰ্য্যটক তাহাদের প্রিয় বন্ধুগণের প্রীতির জন্য মিশরের মধুর ইক্ষু উপহার আনিবে। আমার নিকট যদিও সুমিষ্ট ইক্ষু নাই তাহা হইলেও ইক্ষু অপেক্ষা অধিকতর মিষ্ট এবং সদ্ভাবপূর্ণ কাব্য আছে। আমি যে সুমিষ্ট দ্রব্য আনিয়াছি, যদিও তাহা ভক্ষণ করা যায় না, কিন্তু তথাপি সত্যান্বেষীরা পরম শ্রদ্ধাভরে ইহা গ্রহণ করিবে।” ঐশ্বৰ্যপূর্ণ প্রাসাদরূপ বােস্ত। রচনা শেষ হইলে, ইহাকে শিক্ষাপূর্ণ দশ দরজা রূপ দশম অধ্যায়ে বিভক্ত করিলাম। হিজরীর বৎসরে এই বিখ্যাত ঐশ্বৰ্য-রত্নাগার মুক্তারূপ বাগ্মিতায় (pearls of eloquence) পূর্ণ হয়। চীনের সূচি কাৰ্য্য খচিত রেশমী পরিচ্ছদের মধ্যেও কাপাশ বস্ত্রের গদির আবশ্যক হয়। যদি তােমার কিঞ্চিৎ পরিমানে সৌন্দৰ্য্য জ্ঞান থাকে, তাহা হইলে রেশমী পরিচ্ছদ ছিড়িয়া কার্পাস বাহির না করিয়া বরং সযত্নে এই কার্পাস বস্ত্রের গদিকে লুকাইবে, অর্থাৎ এই কাব্যের ছিদ্রান্বেষণ হইতে বিরত থাকিয়া উদার চিত্ত ব্যক্তিগণের মত ইহার গুণ গ্রহণ করিবে। মানব অপূর্ণ, সকল মানবই দোষ-গুণসম্পন্ন। মানব চরিত্র অনুসন্ধান করিলে দোষ ও গুণ দুই বাহির হইবে। মানব চরিত্র ত কোন ছার, নীল আকাশ-সাগরে ভাসমান পূর্ণচন্দ্রও কলঙ্ক শূন্য নহেন। গুণগ্রাহী সুধী ব্যক্তিগণ এই কাব্যের দোষের ভাগ আলােচনা না করিয়া উদারভাবে গুণভাগেরই আলােচনা করিবেন। আমি শুনিয়াছি, মানব-জীবনের শেষের দিনে দয়াময় ভগবান মঙ্গলের জন্য মন্দকেও ক্ষমা করেন। যদি তুমি আমার এই কাব্য গ্রন্থে রুচি বিগর্হিত কোন চিত্র দেখিতে পাও, তাহা হইলে গুণগ্রাহী সুধীর মত মন্দ অংশ পরিত্যাগ করিয়া ভাল অংশের প্রশংসা করিও। এই সহ শ্লোকের মধ্যে যদি একটী শ্লোকও তােমার চিত্ত বিনােদন করিতে পারে, তাহা হইলে দয়া করিয়া তুমি এই কাব্যের [ ৩৮ ) দোষ-রূপ ছিদ্রান্বেষণ হইতে বিরত থাকিবে। ইহাও ঠিক যে আমার রচনাবলী খুনের মৃগনাভির অপেক্ষা অমূল্য। প্রস্ফুটিত গােলাপ দ্বারা সাদি এই বাগানের শােভা-সম্পদ বাড়াইয়াছেন। তাহার কবিতা খর্জুরের মত মিষ্ট ও রসপূর্ণ, যতই চিবাইবে ততই সত্য-শিব- সুন্দরের মধুর রসে স্নিগ্ধ হইবে। গুলিস্ত। রচনার কারণ সম্বন্ধে কবি এইরূপ লিখিয়াছেন, একদিন রাত্রিকালে অতীত কালের কথা ভাবিয়া অতীত জীবনের গুলিস্ত। রচনার কারণ জন্য অনুতাপ করিয়া পাষাণে রচিত হৃদয়- মন্দিরকে অশ্রুবিন্দুরূপ হীরক খণ্ড দ্বারা বিদীর্ণ করিতে করিতে মানসিক অবস্থানুযায়ী একটী কবিতা আবৃত্তি করিতে ছিলাম। অনেক চিন্তার পর স্থির করিলাম যে, সমাজে বাস না করিয়া নির্জনেই আশ্রয় লইব। বৃথা বাক্য ব্যয় করিয়া কালহরণ করিব না । এই সময় আমার এক প্রিয় বন্ধু আমার বাটীতে আগমন করিলেন। বন্ধুবর সহাস্যবদনে মহা উৎসাহের সহিত কৌতুক ও স্নেহরূপ কার্পেট বিস্তৃত করিলেও, আমি তাহার কথার কোন উত্তর প্রদান করি নাই, ধ্যান হইতে মস্তক না উঠাইয়া মৌনী হইয়া রহিলাম। বন্ধু ব্যথিত অন্তঃকরণে ব্যগ্রতা সহকারে কথা বলিবার জন্য অনুরােধ করিলে, আমার পার্শ্বসহচরেরা আমার প্রতিজ্ঞার কথা বুঝাইয়া বলিলেন, “আপনার বন্ধু আজ হইতে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত মৌনীভাবে কাটাইতে কৃতসঙ্কল্প হইয়াছেন, সেই কারণ মৌনাবলম্বন করিয়া রহিয়া- ছেন। আপনি অনুগ্রহ পূর্বক এস্থান হইতে প্রস্থান করুন অথবা ভাল যাহা বুঝেন, তাহাই করুন। তিনি বলিলেন, “আমাদের বহুদিনের বন্ধুত্বের অনুরােধে ও ঈশ্বরের নামে শপথ করিয়া বলিতেছি, যতদিন না আমার বন্ধু আমার সহিত পূর্বেকার মত সহাস্যবদনে বাক্যালাপ করিতেছেন, ততদিন আমি এইস্থান হইতে প্রস্থান করিব না এবং বন্ধুর সম্মুখেই প্রানত্যাগ [ ৩৯ ] করিব।” প্রতিজ্ঞাভঙ্গজনিত প্রায়শ্চিত্ত্বও যখন দুঃসাধ্য নহে, তখন বন্ধুর সম্মুখে মৌনাবলম্বন করিয়া থাকা নিতান্ত অভদ্রজনােচিত ও বন্ধুকে ক্লেশ দেওয়া অথবা ত্যাগ করা নির্বোধের কাৰ্য ভাবিয়া আমি কথা না বলিয়া, থাকিতে পারিলাম না। বিশেষতঃ সে আমার জীবনের সুখ-দুঃখের দোসর, অভিন্নহৃদয় বন্ধু। মৌনব্রত ভঙ্গ করিয়া বন্ধুর সহিত আমি ভ্রমনের জন্য বহির্গত হইলাম; বসন্তকাল ; হিমবর্ষণসঙ্কুচিতা প্রকৃতি পত্ৰপুষ্প শােভিত হইয়াছে; বসন্ত সুন্দরী আপনার কণকরূপমাধুরী ছড়াইয়া সমস্ত প্রকৃতিকে লাবণ্য বিভাসিত করিয়া প্রেম ও স্বপ্ন সঙ্গীতের ধারায় জগত ভাসাইয়া চলিয়াছে। বুলবুলের ঝঙ্কারে দ্রাক্ষা ও হেনার কুঞ্জ শিহরিয়া উঠিতেছে; সবুজ পত্রে শিশির বিন্দু বাতাসে দুলিতেছে; দূর হইতে দেখিলে মনে হয় যেন রূপসীর গােলাপী গণ্ডবহিয়া অশ্রু-মুক্তা ঝরিতেছে। আমরা উভয় বন্ধুতে অধিক রাত্ৰ পৰ্যন্ত ফুলবাগানে বেড়াইতে ছিলাম। এই বাগানটী অতীব মনােহর ও সুন্দর; বাগানস্থ দ্রাক্ষা বৃক্ষে নক্ষত্রপুঞ্জের ন্যায় আঙ্গুরের স্তবক শশাভা পাইতেছে। আমার বন্ধু নানাবিধু সুগন্ধি পুষ্প ও বিচিত্র পল্লবে অঞ্চল পূর্ণ করিয়াছেন দেখিয়া আমি বলিলাম, বন্ধু, তুমি কি জান না যে, এই বাগানের পুষ্পপ্রসবিনী শক্তিকে বিশ্বাস করিতে পারা যায় না, আর ইহা অবিনশ্বর নহে? পণ্ডিতগণ বলেন, যে জিনিষের স্থায়িত্ব নাই, তাহাতে আমাদের মন আকৃষ্ট হওয়া উচিত নয়। আমার কথা শুনিয়া বন্ধু বলিলেন, তাহলে আমার মত লােকের উপায় কি ? আমি বলিলাম, তােমার মত * মুসলমানেরা হঠাৎ প্রতিজ্ঞভঙ্গ করিলে তিনদিন উপবাস করিয়া অথবা দশ- জনকে ভােজন করাইয়া কি একজন বন্দীকে মুক্ত করিয়া প্রতিজ্ঞভঙ্গজনিত পাপের প্রায়শিশুর করেন।
[ ৫ ] = লােকের চিত্ত-বিনােদন ও দর্শকগণের মনােরঞ্জনের জন্য বােধ হয় গুলিস্ত। নামক এমন একখানি কাব্য আমি রচনা করিতে পারি, যে হিমকুহেলিসমাচ্ছন্ন প্রকৃতি অথবা পরিবর্তনশীল প্রকৃতি কখনও আমার গােলাপ বাগানের ( গুলিস্তার) সৌন্দর্য নষ্ট করিতে পারিবে । হে বন্ধো, তবে চার তােমার পুষ্পের প্রয়ােজন কি ? যদি পুষ্পের প্রয়ােজনই হয়, তাহা হইলে আমার গুলিস্ত। হইতে পুষ্প চয়ন কর; প্রকৃতির স্বহস্তরচিত বাগানের পুষ্প দুই দিনের জন্য সৌরভ বিতরণ করিয়া ঝরিয়া পড়িবে, আর আমা গােলাপ বাগানের পুষ্প- সুরভি অবিনশ্বর, চিরদিনের জন্য থাকিবে। আমার কথা শুনিবামাত্র বন্ধু, তাহার যত্নআহরিত গােলাপ ও বিচিত্র পল্লবগুলি অঞ্চল হইতে দূরে নিক্ষেপ করিয়া দিয়া বলিলেন, “মহতেরা প্রতিজ্ঞা করিলে তৎক্ষণাৎ তাহা প্রতিপালন করিয়া থাকেন। সুতরাং হে বন্ধে ! সত্বর তােমার প্রতিশ্রুতি পালন করিলে সুখি হইব” কথােপকথনের প্রণালী অবলম্বন করিয়া সেইদিনের মধ্যেই শিক্ষার উপকারিতা বিষয়ক দুই অধ্যায় রচনা করিলাম ; আমার বিশ্বাস আছে যে, ইহা পাঠ করিলে সৰ্বসাধারণের বিশেষ উপকার হইবে। প্রকৃতি সুন্দরীর গোলাপ বাগানের শােভা শেষ হইতে না হইতেই আমার গুলিস্তায় ফুল ফুটিতে লাগিল ও ক্রমে গুলিস্ত। প্রকৃতপক্ষেই গুলিস্তায় (গােলাপ বাগানে পরিণত হইল। যখন ইহা রাজসভায় পঠিত হইয়া সৰ্বসাধারণের চিত্ত বিনােদন করিল, তখন বুঝিলাম, আমার গোলাপ বাগান প্রকৃতই গােলাপ বাগানে পরিণত হইয়াছে। কাব্যখানি সৰ্বাঙ্গসুন্দর করিবার জন্য অধ্যায়গুলি শৃঙ্খলাবদ্ধ করিয়া স্বর্গের নন্দন কাননের মত অষ্টম অংশে বিভক্ত করিলাম। (১) যথা, (১) কোরাণের মতে স্বর্গতি নন্দনকানন অষ্টভাগে বিভক্ত এবং ইহার পবিত্রতা প্রকাশক।
[ ৪১ ] গুলিস্তার অষ্টম অধ্যায়। (১) রাজকীয় ব্যবহার (Of the Customs of Kings), (২) দরবেশের গুণাবলী (Of the Morals of Darweshes). (৩) সন্তোষের উপকারিতা (Of the Preciousness of Contentment). (৪) মৌনাবলম্বনের উপকারিতা (0f the Benefit of Silence.) (৫) যৌবন ও প্রণয় (of Love and Youth). (৬) জরা ও দুর্বলতা (of Imbacility and old Age). (৭) শিক্ষার উপকারিতা (Of the Impressions of Education) (৮) সামাজিকের কর্তব্য (Of the Duties of Society). গুলিস্তার পূর্বাভাষ-চিত্ৰ অতি চমৎকার ও পরম উপভােগের বস্তু স্বর্গীয় সৌরভে পূর্ণ ও মঙ্গলময়ের মহিমা গানে পূত; ভগবদ্ভক্ত কবির লেখনীর উপযুক্ত। এই পূর্বাভাষ-চিত্র পাঠ করিলে অতি বড় পাষণ্ডেরও পাষাণ হৃদয়ে বিভু-প্রেমের প্রস্রবণ ছুটে। সাদির গুলিস্তাঁর গােলাপ, কৃত্ৰিমশাখায় বদ্ধ কারুকার্যময় কৃত্রিম গােলাপ নহে ইহা কবির মানস-প্রকৃতির উর্বর ক্ষেত্ৰ জাত কণ্টকাচ্ছন্ন অকৃত্রিম গােলাপ বৃক্ষের স্বর্গীয় সুষমামণ্ডিত প্রস্ফুটিত গােলাপ। তীব্র ব্যঙ্গ বিদ্ধপরূপ অনেক কণ্টক যদিও কবির গােলাপ বৃক্ষে আছে, কিন্তু গােলাপ, কণ্টকের বহু উর্ধে প্রস্ফুটিত হইয়া সৌরভ ছড়াইয়া দিগন্ত মাতাইতেছে। সে কণ্টকে বিষ নাই বা সেই মরগুঞ্জরিত, বুলবুলঝঙ্কত গােলাপের কুঞ্জে বিষধর সর্প লুকাইত নাই। সে গােলাপ- কুঞ্জ আত্মসমাহিত কবির পবিত্র আত্মায় বেদী। বসন্তের মধুর ও উজ্জ্বল স্মৃতিবিজড়িত সৌরভ পূরিত গােলাপ-কুঞ্জের দিকে আজও জীবন-পথের পথিক আনন্দ- বিল-দৃষ্টিতে তাকাইয়া আছে। পথিক [ ৪২ ] দেখে যে ভগবানের আশীষে মানবাত্মার আনন্দের জন্য উদ্যান রচয়িতার প্রাণই গােলাপ পুষ্পরূপে প্রস্ফুটিত হইয়া উঠিয়াছে। কবি তাহার উৰ্বরমস্তিষ্কপ্রসূত সুচিন্তাগুলি দ্যোতনাপূর্ণ ভাষায় সুপযুক্তভাবে প্রকাশ করিয়াছেন। এই চিন্তাগুলি আরবান ও অমূল্য বলিয়া ইহা হইতে সার সংগ্রহ করিবার আবশ্যকতা নাই। উদ্যান- স্থিত অসংখ্য কুসুম রাশির মধ্যে কোনটী বর্ণরাগে উজ্জ্বল, কোনটী বা সুগন্ধে ভরপুর অথবা বাক্সস্থিত মনিমুক্তাবলীর মধ্যে কোনটা সুন্দর, কোনটী বা অতিশয় সুন্দর ও অত্যুজ্জ্বল, ইহাদের মধ্য হইতে যেমন উৎকৃষ্টতর বস্তু নির্বাচন করিতে পারা যায়, তেমনি পারস্যের পুণ্য- শ্লোক সাধু কবির গুলিস্ত। হইতে কতকগুলি নয়না সুরতিপূর্ণ গুল চয়ন করিতে পারা যায়। গুলিস্ত। সুগন্ধি পরিমল পূরিত প্রস্ফুটিত গােলাপে পূর্ণ। ইহা হইতে কতকগুলি গুল চয়ণ করিয়া পাঠক- গণকে উপহার দিলাম। প্রথম অধ্যায় রাজকীয় ব্যবহার বিষয়ক। গল্পচ্ছলে কৰি উপদেশ দিয়া বলিয়াছেন, হিংস্ৰ শাৰ্দল যেমন কখনও মেষ পালনে সক্ষম হয় না, সেইরূপ অবিচারী অত্যাচারী রাজা কখনও প্রজাপালন করিতে পারেন না। যে রাজা প্রজার উপর অত্যাচার করেন, তাঁর রাজস্ব দুগ্ধ দিয়া সর্প-ভীতি ক্রয় করার তুল্য। প্রজার জন্যই রাজার আবশ্যক, রাজার জন্য প্রজা নহে; প্রজারাই রাজ্যের ভিত্তি এবং রাজা সৌধ ; প্রজারা বৃক্ষকাণ্ড—রাজা বৃক্ষ। বৃক্ষ কাণ্ড হইতে শক্তি সংগ্রহ করে, সৌধ মৃত্তিকা মধ্যস্থ ভিত্তির উপর দণ্ডায়মান। এই নীতিটী কবি গল্প-চিত্ৰ মধ্যে সুন্দরভাবে চিত্রিত করিয়াছেন; আমরা এই চিত্রটা পাঠকবর্গকে উপহার দিলাম পারস্য দেশে এক অত্যাচারী ও অবিবেচক নরপতি ছিলেন। প্রজারা তাহার অত্যাচারে এতই উৎপীড়িত হইয়াছিল যে, একে • একে রাজ্য ত্যাগ করিয়া বনে বাস করিতে লাগিল। প্রজাগণ [ ৪৩ ] বর্ণে সত্য। ৩ রাজ্য ত্যাগ করিয়া যাওয়াতে রাজস্ব সংগ্রহ হইল না, ক্রমশঃ ধনাগার শূন্য হইতে লাগিল। সুযােগ বুঝিয়া নিকটবর্তী কোন রাজা, রাজ্য আক্রমণ করিবে, এইরূপ সংবাদ রাজার কর্ণগােচর হইল। শাহনামার যে অংশে জাইকের রাজ্য নষ্ট ও ফরিদুনের রাজ্য প্রাপ্তির বিষ বর্ণিত আছে, রাজার সম্মুখে সেই অংশটী পাঠ করিয়া শুনান হইতে- ছিল। রাজমন্ত্রী বলিল, মহারাজ! ফরিদুনের রাজ্য ছিল না, ধন-বল প্রথম অধ্যায়ের গল্প-চিত্র। ছিল না, সৈন্য-বল ছিল না—তবুও তিনি কি প্রকারে হৃত-রাজ্য শত্রু রাজার কবল হইতে উদ্ধার করিতে সমর্থ হইলেন? রাজা বলিলেন, আপনারা যাহা শুনিয়াছেন, তাহা বর্ণে প্রজারা ফরিদুনকে গভীর শ্রদ্ধাভক্তি ও প্রেমের চক্ষে দেখিত ; সুদৃঢ় প্রেম-রজুই ফরিদুনকে তাহার হৃত-রাজ্য উদ্ধারে সাহায্য করিয়াছিল। রাজমন্ত্রী বলিলেন, মহারাজ! রাজার প্রতি প্রজার প্রেমানুরক্তিই যদি ফরিদুনের রাজ্য প্রাপ্তির কারণ হয়, তাহা হইলে আপনি কেন রাজ্য হইতে প্রজাগণকে বিতাড়িত করিতেছেন ? অবশ্য আপনার যদি রাজত্ব করিবার বাসনা না থাকে, সে স্বতন্ত্র কথা। মন্ত্রীর কথা শুনিয়া রাজা বলিলেন, মন্ত্রীবর! কি উপায় অবলম্বন করিলে প্রজারা রাজার অনুরাগী হর? মন্ত্রী বলিলেন, “মহারাজ! প্রজা- পুঞ্জকে বশীভূত ও অনুরক্ত করিবার দু’টা উপায় আছে। সে উপায় দু’টী হচ্চে রাজাকে ন্যায়পরায়ণ ও দয়ালু হইতে হইবে। তাহা হইলে প্রজারা পরম শান্তিতে রাজকীয় কৃপার ছায়ায় পরম সুখে বাস করিবে। মহারাজ! আমার অপরাধ গ্রহণ করিবেন না, বড়ই দুঃখের সহিত বলিতেছি যে এ দু’টী গুণের কোনটাই আপনার নাই। জ্ঞানীরা বলেন, অবিচারক, অত্যাচারী রাজা, হিংস্র শার্দুল সদৃশ, কখনো প্রজা- পালন করিতে পারেন না; যে রাজা প্রজার উপর অত্যাচার করেন, নি নিজ রাজ্য-ভিত্তি ধ্বংশ করেন জানিবেন” মন্ত্রীর উপদেশ [ ৪ ] ব্লাজার মনঃপুত হইল না; তিনি অত্যন্ত ক্রোধান্বিত হইলেন, এবং মন্ত্রীকে কারারুদ্ধ করিবার আদেশ দিলেন। কিছুকাল পরে এই রাজার খুল্লতাত ভ্রাতারা গােপনে সৈন্য সংগ্রহ করিয়া তাহার বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করিয়া তাহাদের পিতৃ-রাজ্য প্রার্থনা করিল; যে সকল প্রজা রাজার অত্যাচারে জর্জরিত হইয়াছিল, তাহারা সকলে বিপক্ষ রাজার পক্ষ অবলম্বন করিল। এইরূপে প্রেম অত্যাচারী রাজা সিংহাসন চ্যুত হইলেন। দরবেশের গুণাবলী অধ্যায়ে করি বলিয়াছেন, যাহারা ভগবানের সহিত মিলনের জন্য ব্যাকুল হইয়া জগৎরাজ্যের বাহিরে আসেন তাহারাই যথার্থ দরবেশ,। এই অধ্যায়ের একটা চিত্র এইরূপঃ- এক উজীর মিশৱ দেশের সাধু জুননুনের নিকট গমন করিয়া তাহাকে তাহার নিজের মঙ্গলের জন্য পরমেশ্বরের নিকট প্রার্থনা করিতে দ্বিতীয় অধ্যায়ের অনুরােধ করিয়া বলিলেন যে আমি সুলতানের অনুগ্রহ গল্প-চিত্র। লাভের আশায় ও তাহার ক্রোধের ভয়ে দিনরাত তাহারি কর্মে নিযুক্ত রহিয়াছি। ইহা শুনিয়া ভগদ্ভুক্ত সাধু জুননুন দিতে দিতে বলিল, “তুমি সুলতানকে যেরূপ শ্রদ্ধা কর, আমি যদি ভগবানকে সেইরূপ শ্রদ্ধা করিতাম, তাহা হইলে আমি একজন প্রধান ভক্ত হইতাম। সন্তোষের উপকারিতা নামক অধ্যায়ে কবি বলিয়াছেন, সন্তোষের মত শ্রেষ্ঠ ধন দৌলত ইহ সংসারে আর নাই। স্বল্পে সন্তুষ্ট ব্যক্তির কেই কোন প্রকার হিত বা অহিত করিতে পারে না। এই উপদেশপুর্ণ গল্প-চিত্রটা আমরা নিয়ে প্রকাশ করিলাম। এক অপুত্রক রাজা জীবনের শেষ মুহুর্তে এই মর্মে একখানি গুইল প্রস্তুত করান যে, তাহার মৃত্যুর পরদিবস প্রাতে যে ব্যক্তি লবপ্রথম নগরের তােরণ-রে আসিয়া উপস্থিত হইবে, সেই রাজ-
No text on this page.
শেখ সাদী-প্রার্থনা রত [ ৪৫ । সিংহাসনের উত্তরাধিকারী হইবে; তৎক্ষণাৎ যেন তাহারি মস্তুকে যাজমুকুট, হন্তে রাজদণ্ড দিয়া রাজত্বের ভার অর্পণ করা হয়। রাজার মৃত্যুর পরদিবস প্রাতে নগর-তােরণ-দ্বারে এক ভিখারী আসিয়া উপস্থিত হইল। রাজমন্ত্রী এবং সভাসদবর্গ একত্র হইয়া তৃতীয় অধ্যায়ের এই শতগ্রন্থিযুক্ত ছিন্নবাসপরিহিত ভিখারীর হস্তে গল্প-চিত্র। রাজদণ্ড দিয়া তাহাকে সিংহাসনে বসাইল। ভিখারী সিংহাসনে বসিয়া রাজদণ্ড হস্তে সুশৃঙ্খলার সহিত রাজ্যশাসন করিতে লাগিল। কিছুদিন পরে কতকগুলি পারিষদ এই ভিখারী রাজার আদেশ অমান্য করিতে লাগিল। নিকটবর্তী রাজারা চারিপাশ্ব হইতে রাজ্য আক্রমণ করিয়া ভিখারী রাজার সৈন্যদল, ধনাগার শূন্য করিয়া সমস্ত ধনসম্পত্তি কাড়িয়া লইল। বিপদে পড়িয়া ভিখারী রাজা হতাশ ভাবে রাজ্যের অবস্থার কথা চিন্তা করিতেছেন, এমন সময়ে রাজার ভিখারী-জীবনের এক বন্ধু আসিয়া উপস্থিত হইল। বন্ধুর অদৃষ্টের পরিবর্তন দেখিয়া, সে অত্যন্ত আনন্দের সহিত বলিল, “বন্ধু, সর্বশক্তিমান জগদীশ্বরকে ধন্য- বাদ, এতদিন পরে তােমার অবস্থার পরিবর্তন হইয়াছে দেখিয়া আমি অতিশয় সুখী হইলাম। আবার বলি, সর্বশক্তিমান ঈশ্বরকে শত ধন্যবাদ। দুঃখের পর সুখ, কুঁড়ি হইতে ফুল ফুটে, আবার পরেই ঝরিয়া যায়-জগৎ পরিবর্তনীল, কখনাে দেখি বৃক্ষ পপুপ- শূন্য, আবার দেখি বৃক্ষ পত্রপুষ্পে পরিশােভিত হইয়া মানবের নরনা বর্ধন করিতেছে। ভিখারী রাজ বলিল, “বন্ধু। তুমি কি বলিতেছ, আমার এ অবস্থায় আনন্দ করিবার কিছুই নাই। তােৰ সহিত শেষ সাক্ষাতের পূর্বে আমার একমাত্র চিন্তা ছিল যে কেমন করিয়া দিনের আহার জুটিবে; আর আজ আমাকে রাজত্বের সমস্ত দায়িত্ব গ্রহণ করিতে হইয়াছে। ইহাই যদি পৰস্থার ;
[ ৪৬ ] পরিবর্তন হয়, বন্ধু, তা হলে আমি অতি কষ্টের মধ্যে আছি জানিবে। এই রাজ-জীবন অপেক্ষা ভিখারী-জীবনই আমার শ্রেষ্ঠ। আমি বুঝিয়াছি যে সন্তোষের অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ সম্পদ আর কিছুই নাই; স্বয়ে সন্তুষ্ট ব্যক্তির কেহ কোন প্রকার অনিষ্ট বা ভাল করিতে পারে না। মৌনাবলম্বনের উপকারিতা বিষয়ক অধ্যায়ে কবি বলিয়াছেন, মৌনাবলম্বন পূর্বক নীরবে কৰ্ম্ম করাই ভাল, যেহেতু তােমার কর্মে কেহ হস্তক্ষেপ করিবেনা। এতদ্বিষয়ক গল্প-চিত্ৰটী এইরূপ :- এক বণিকের ব্যবসায়ে বিস্তর অর্থ লােকসান হইয়াছিল। তিনি পুত্রকে এই ক্ষতির কথা অন্যকে জানাইতে নিষেধ করিলেন। পুত্র পিতার আদেশ শুনিয়া বলিল, আপনি যখন নিষেধ করিতেছেন, তখন অবশ্যই অন্যকে জানাইব না। কিন্তু ক্ষতির কথা গােপন করিয়া, চতুর্থ অধ্যায়ের লাভের কথা প্রচার করিলে কি কাৰ্য্য সাধিত হয় ? গল্প-চিত্র। বণিক বলিল, এরূপ করাতে দুই রকম যন্ত্রণা থেকে অব্যাহতি পাওয়া যায়। প্রথমতঃ অর্থ-ক্ষতির যন্ত্রণা, দ্বিতীয়তঃ প্রতি- বেশীর ভৎসনা। তােমার ক্ষতির কথা কখনাে তােমার প্রতিদ্বন্দ্বীকে জানাইবে না। তাহা হইলে সে মনে মনে সুখী হইয়া ভগবানের নিকট তােমার ক্ষতির জন্য প্রার্থনা করিবে। অতএব হে পুত্র ! সোনাবলম্বন করিয়া নীরবে কৰ্ম্ম করাই সমূহ মঙ্গল জনক। প্রেম এবং যৌবন নামক অধ্যায়ে কবি বলিয়াছেন, প্রেমিকের চক্ষে তাহার প্রিয়তমা অতি কুৎসিতা হইলেও অতিশয় সুন্দরী। প্রেম-চক্ষু কদৰ্যতারও মধ্যে গুপ্ত সৌন্দৰ্য-রেখা নিরীক্ষণ করে। এই সম্পর্কে কবি লাইলি-মজনুর মধুর প্রেম-কাহিনী গল্প-চিত্রে ফুটাইয়াছেন। এই মধুর চিত্রটা নিয়ে চিত্রিত হইল ;- আরব দেশের কোন রাজার পারিষদবর্গ লাইলি-মজনুর প্রেম- কাহিনী ও উন্মত্ততার কথা সুলতানকে শুনাইতেছিল। তাহারা রাজাকে [ ৪৭ ] পঞ্চম অধ্যায়ের বলিতেছিল, বিশিষ্ট জ্ঞানী হইয়া মজনু মরীচিকাৰমে মরুভূমির দিকে অগ্রসর হইয়াছিল-মােহবশতঃ নিজেকে ধ্বংশের পথে উৎসর্গ করিয়া- ছিল। রাজা মজনুকে ধরিয়া আনিয়া রাজ-দরবারে উপস্থিত করিবার আদেশ দিলেন ;'মজনু উপস্থিত হইলে-রাজা ভৎসনাসুরে বলিলেন, মানুষ হইয়া তুমি কেন পশুর মত বনে বনে বিচরণ করিতেছ? আর মানবসমাজ ছাড়িয়া কেন তুমি দূর—অতি দূরান্তে গল্প-চিত্র। বাস করিতেছ? অপূর্ণনয়নে মজনু বলিল, প্রিয়তমা, লাইলিকে ভালবাসার জন্য আমার সকল বন্ধুই আমাকে তিরস্কার করিতেছে ; হায়! তাহারা যদি একবার আমার প্রিয়তমা লাইলিকে দেখিত, তাহা হইলে আর আমাকে তিরস্কার করিত না। মজনুর কথা শুনিয়া রাজা মনে মনে স্থির করিলেন, একবার মজনুর মনােহরণকারিণী রূপসী লাইলির অপরূপ রূপ নিজচক্ষে দেখিবেন, যে লাইলির রূপের সুরায় আকণ্ঠপূর্ণ করিয়া এই হতভাগ্য নিজেকে ছন্নছাড়া ও দৈন্যদশার চরম সীমায় উপনীত করিয়াছে, সেই রূপেশ্বৰ্য্যময়ী লাইলিকে রাজদরবারে উপস্থিত করিবার জন্য আদেশ দিলেন। বহু অনুসন্ধানের পর লাইলিকে রাজদরবারে উপস্থিত করা হইল। রাজা দেখিলেন, এক শীর্ণা কৃষ্ণবর্ণা কুৎসিত রমণী—এই রমণী এতই কুৎসিৎ যে হারেমে বাদীরূপে স্থান পাইবারও অযােগ্য। রাজার মনােমধ্যে কি ভাবের উদয় হইয়াছে, তীক্ষ্ণ বুদ্ধি মজনু বুঝিতে পারিয়া বলিল, মহারাজ! লাইলিকে আপনি নিশ্চয়ই কুৎসিতা দেখিতেছেন, কিন্তু হতভাগ্য মজনুর চক্ষু লইয়া দেখিলে, দেখিবেন, লাইলি কি অপূর্ব সুন্দরী।” জরা ও দুর্বলতা নামক অধ্যায়ে কবি উপদেশ দিয়াছেন যে বৃদ্ধ বয়সে যুবতী বধু গৃহে আনিয়া তাহার মনঃকষ্টের কারণ হইবার আবশ্যক নাই। এতৎসম্পর্কীয় ক্ষুদ্র গল্প-চিত্রটা এইরূপ, এক বৃদ্ধকে [ ৪৮ ] সেবার অভাবে বড়ই কষ্ট পাইতে দেখিয়া এক ব্যক্তি তাহাকে বলিয়াছিল, বৃদ্ধ বয়সে কষ্ট পাওয়ার চেয়ে কোন বৃদ্ধাকে বিবাহ করিয়া তাহার সেবা গ্রহণ করা সহস্রগুণে শ্রেষ্ঠ। ইহার উত্তরে বৃদ্ধ বলিয়াছিল, বৃদ্ধা স্ত্রী লইয়া কি করিব, সে কি আমার সেবা করিতে পারিবে ? বরং তাহাকেই সেবা করিবার জন্য একজন লােকের আবশ্যক হইবে। তখন তাহারা বলিল, তুমিত অবস্থাপন্ন, ইচ্ছা করিলে একজন যুবতী বধূ ঘরে আনিতে পার। এই কথা শুনিয়া বৃদ্ধ বলিল, আমি বৃদ্ধ, আমার যখন একজন বৃদ্ধাকে বণ্ঠ অধ্যায়ের পছন্দ হয় না, তখন আশাআকাঙ্ক্ষাপূর্ণদয়া নব গল্প-চিত্র। যুবতীর এই জীর্ণ শীর্ণ লােলচৰ্ম্ম বৃদ্ধকেই বা পছন্দ হইবে কিরূপে? শিক্ষার উপকারিতা নামক অধ্যায়ে কবি বলিয়াছেন যে, যদি তুমি তােমার বংশ গৌরব বজায় রাখিতে চাও, তাহা হইলে পুত্রকে অসৎসঙ্গ হইতে রক্ষা কর। এই অধ্যায়ের দু’টী গল্প-চিত্র এইরূপ- এক রাজা তাহার পুত্রকে এক আচার্যের নিকট বিদ্যাশিক্ষার জন্য প্রেরণ করিয়া আচাৰ্য্যকে অনুরােধ করিয়া বলেন, আপন পুত্রের মত রাজকুমারকে সযত্নে বিদ্যাশিক্ষা দিবেন। আচাৰ্য অতি যত্নের সহিত রাজপুত্রকে শিক্ষা দিতে লাগিলেন। কিন্তু আচার্যের সমস্ত পরিশ্রমই বৃথা হইল, সে কিছুতেই পাঠ আয়ত্ত করিতে পারিল না। আর এদিকে আচাৰ্য-পুত্রগণের জ্ঞান ও পাণ্ডিত্যগৌরবে দেশ মুখরিত হইল। রাজা একদিন আচাৰ্য্যকে তিরস্কার করিয়া বলিলেন, আপনি আপনার প্রতিশ্রুতি পালন করেন নাই; রাজপুত্রকে শিক্ষা দানে অবহেলা করিয়াছেন। আচাৰ্য বলিলেন, আমার পুত্র- গণকে এবং রাজপুত্রকে সমানভাবেই শিক্ষা দান করিয়াছি। কিন্তু দুঃখের বিষয় বুদ্ধিবৃত্তি সকলের সমান নহে, এই কারণে সকলে সমভাবে [ ৪ ] শিক্ষালাভ করিতে পারে নাই। পাথরখণ্ড কাটিয়া বসিয়া মাজিয়া যদিও হীরক খণ্ড প্রস্তুত করিতে হয়, তথাপি সকল পাথরই কিন্তু হীরক নয়। এই অধ্যায়ের আর একটী নীতিপূর্ণ চিত্র এইরূপঃ- এক দার্শনিক তাহার পুত্রগণকে উপদেশ দান করিতেছিলেন, বৎসগণ! জ্ঞান অর্জন কর, জ্ঞানের তুল্য মূল্যবান কোন জিনিষ জগতে নাই, স্থির জানিবে। পথি মধ্যে ধন দৌলত অপহৃত হইতে পারে, সপ্তম অধ্যায়ের কিন্তু জ্ঞানরূপ অমূল্য ধনকে কেহ হরণ করিতে গল্প-চিত্র। পারিবে না। নিঝরের গতি রুদ্ধ হইতে পারে, কিন্তু জ্ঞান-নিঝরের গতি রােধ করিবার উপায় নাই, জ্ঞান অবিনশ্বর। জ্ঞানী যেখানেই গমন করিবেন, সকলেই সম্মান ও আদর করিয়া তাহাকে উচ্চাসন প্রদান করিবে। কিন্তু মূখ আবর্জনার মত এক কোণে স্থান পাইবে। সামাজিকের কর্তব্য নামক শেষ অধ্যায়ে কবি বলিয়াছেন, জীবনের সুখ স্বাচ্ছন্দ্যের জন্যই ধন দৌলত, কিন্তু ধন দৌলত সঞ্চয়ের জন্য জীবন নহে। একজন দার্শনিককে জিজ্ঞাসা করা হইয়াছিল, ভাগ্যবানই বা কে, আর দুর্ভাগাই বা কে? দার্শনিকপ্রবর উত্তরে বলেন, সেই ভাগ্যবান যে বৃক্ষ রােপন করিয়া তাহার ফল ভােগ করে, আর সেই হতভাগ্য যে ফল ভােগ করিবার পূর্বে পৃথিবী হইতে বিদায় গ্রহণ করে। অতএব এই হতভাগ্যের মত জীবনব্যাপী খন দৌলত সঞ্চয়ে কোন লাভ নাই। সাদি সৰ্বগুণসম্পন্ন প্রতিভাশালী কবি হইলেও, তিনি একজন শ্রেষ্ঠ নীতিবিৎ ছিলেন। তাহার নীতি-বিজ্ঞান খুব সাদাসিদা ধরণের; এই নীতি প্রত্যেক গল্প-চিত্রের মধ্য দিয়া পরিস্ফুট। যেমন অন্যান্য পার নীতিবিৎগণের রচনাতে দেখিতে পাওয়া যায়, ইহার মধ্যে সুফীসুলভ সেরূপ কোন প্রকার রূপক নাই, কবির নীতি-বচনগুলি মহম্মদপ্রবর্তিত [ ৫ ] ধর্মভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত। সাদির নীতি উগদেশের মূলতত্ত্ব এই যে মানব-হৃদয়-নিহিত ধর্ম প্রবৃত্তিগুলির অনুশীলন ব্যতীত পার্থিব ঐশ্বর্যে সুখলাভ হয় না। এই সমস্ত উদারনীতি উপদেশগুলি শৃঙ্খলার সহিত আলােচিত হইয়া কবির রচনাবলীকে নীতিবিজ্ঞানে পরিণত করিয়াছে এবং ইহার মূলতত্ত্বগুলি চিরদিনই জগতে ধৰ্ম্ম শাস্ত্রের অনুশাসন রূপে বিরাজ করিবে। অধ্যাপক মােপ্পা বলেন, সুগভীর নৈতিক সত্য সকল সংক্ষিপ্ত অথচ সারবান সূত্রে গ্রথিত করিয়া অভিব্যক্ত করিতে কি প্রাচীন কি আধুনিক সময়ের কোন প্রাচ্য বা প্রতীচ্য পণ্ডিতই সাদির সমতুল্য হইতে পারেন নাই। গুলিস্তাঁর অধ্যায়গুলি কয়েকটী মূল্যবান উপাখ্যান, জনশ্রুতি, গল্প, গুলিস্তর বর্ণিত কবিতা ও পূর্বতন রাজগণের রীতি নীতি অবলম্বন বিষয় ও উদ্দেশ্য। করিয়া সংক্ষেপে রচিত হইয়াছে। কবি বলিয়াছেন, কবিতার মধ্য দিয়া ধৰ্ম্মতত্ত্বের জটিল প্রশ্নের মীমাংসা ও নীতিপূর্ণ উপদেশ দান করাই আমার কাব্যের উদ্দেশ্য। জনশ্রুতিমূলক একটি গল্প-চিত্র আমরা পাঠকগণকে উপহার দিলাম, কথিত আছে, সুলতান নশীৰ্বনের দরবারে কতকগুলি জ্ঞানী ব্যক্তি এক জটিল প্রশ্নের সমাধান করিতেছিলেন; প্রধান মন্ত্রী বুজর্কমিহিরকে নীরব দেখিয়া সুলতান তাহার নীরবতার কারণ জিজ্ঞাসা করাতে মন্ত্রী- প্রবর উত্তর দেন, মন্ত্রীরা চিকিৎসক সদৃশ, এবং চিকিৎসক কেবল মাত্র রুগ্নকেই ঔষধ প্রদান করেন। যখন আমি দেখিতেছি, সুলতানের অভিমত যুক্তিপূর্ণ, এরূপ অবস্থায় কোন অভিমত প্রদান না করিয়া নীরব থাকাই বুদ্ধিমানের কাৰ্য। যদি দেখিতাম, মীমাংসা কোন অন্যায় পথ অবলম্বন করিতেছে, তাহা হইলে নিশ্চয়ই আমি নীরব থাকিতাম না। * খাওয়াতিম-ই-সাদী।
[ ৫১ 1 গুলিস্তায় কবি নীতিপূর্ণ উপদেশ, অতীন্দ্রিয় জগতের কথা গুলিস্তর ভাব অফুরন্ত হাস্যরসের যে ফোয়ারা খুলিয়া দিয়াছেন,ও ধারা। জগদ্বাসী অঞ্জলী পুরিয়া এই পবিত্র ভাব-ধারা পান করিয়া কোন কালৈ নিঃশেষ করিতে পারিবে না। মৌলানা মুইনুদ্দিন জাউইনি ও মহাকবি জামি, যথাক্রমে ১৩৩৪ ও গুলি, বেহারিস্ত। ১৪৮৭ খ্রীষ্টাব্দে গুলিস্তাঁর আদর্শে ও অনুকরণে , ও নেগাবিন্ত। নেগারস্ত। বেহারিস্তাও রচনা করেন। গুলিস্তার উপক্রমণিকায় কবি লিখিয়াছেন, “যাহারা বিনীত ব্যক্তির দোষ সমূহ গােপনে রাখেন, এবং অধীনস্থ ব্যক্তিগণের ছিদ্র অন্বেষণ কবির আত্ম-কথা। করেন না, সেই সকল উন্নতমনা ব্যক্তিগণের উদার চিত্ত-বৃত্তির উপর নির্ভর করিয়া আমি এই কাব্য প্রচার করিতে সাহসী হইলাম । এই গ্রন্থ রচনা করিতে আমার জীবনের অধিকাংশ সময় ব্যয়িত হইয়াছে। এই কাব্য গ্রন্থ রচনা করিয়া কবির ধারণা হইল, তাহার অনিত্য, জীবনের শেষ হইবে, মাটীর দেহ মাটীতে মিশাইবে, কিন্তু কবির বাণী, সদ্ভাব ও অমূল্য উপদেশপূর্ণ কাব্য, কবি অক্ষয় স্মৃতি-রক্ষার সহায় হইবে। যদিও কবি জানিতেন যে, পার্থিব জগতের কোন বস্তুরই স্মৃতি কবির আশা। চিরস্থায়িনী নহে-তথাপি তিনি আশা করেন যে, এই পবিত্র কার্যের জন্য কেহ না কেহ তাহার আত্মার কল্যাণ কামনা করিবে। ১২৫৮ খ্রীষ্টাব্দে অর্থাৎ হিজরীর ৬৫৬ বৎসরে কবি গুলিস্ত। রচনা শে করেন।* গ্রন্থ শেষে কবি বলিয়াছেন, হিজরীর ছয়শত * গ্রন্থসমাপ্তির বৎসর সম্বন্ধে মতদ্বৈধ আছে। গুলিস্তার কোন কোন সংস্করণে হিজরীর ৩৬ বৎসর লিখিত আছে। সুতরাং গ্রন্থসমাপ্তির কাল ১২৫৮ অথবা ১২৮ খ্রীষ্টাব্দ।
[ ৫২ ] মম-সরি ছাপান্ন বৎসর মুসলমানগণের পক্ষে অতিশয় সুবৎসর ছিল, সর্বশক্তিমান ঈশ্বরকে শত সহস্র বঙ্গবাদ যে সেই বৎসরে তাহারি কৃপায় ও আজরেএল আগমনের পূৰ্বেই আমার রচনা সমাপ্ত হইল। আতাবক আবু বকর সা-বিন-জঙ্গীর নামে কবি বােস্তার ন্যায় গুলিস্তাও উৎসর্গ করেন; বােস্তর উৎসর্গপত্রের ন্যায় গুলিস্তার উৎসর্গপত্র রচনাও অতি চমৎকার। কবি তাঁহার স্বভাবসিদ্ধ সুমধুর বাক্য বিন্যাস দ্বারা বাদশার গুণকীর্তন করিয়া শেষে তাহার অনুগ্রহ- সুষ্টি লাভের আশায় বলিয়াছেন, “যদি আমার কাব্যের উপর বাদশার অনুগ্রহ-দৃষ্টি পতিত হয়, তাহা হইলে ইহা চীনদেশীয় চিত্রশালায় । পরিণত হইবে। আমার স্থির বিশ্বাস, আমার গােলাপ বাগানের সৌরভ সকলেরই চিত্ত হরণ করিবে। যাহাদের হৃদয় সর্বদাই বিষাদ অন্ধকারে আচ্ছন্ন, তাহাদেরও মানসিক অবসাদ ঘুচাইয়া মুখে মধুর হাসি ফুটাইবে, হৃদয় স্বাস্থ্য ও সৌন্দর্যে মণ্ডিত করিবে। যেহেতু আমার গােলাপ বাগানে বিরক্তিকর কোন চিত্ৰই নাই, বিশেষতঃ ইহা যখন আতাবক আবু বকর সাদ্-বিন-জঙ্গীর চির- স্মরণীয় নামের সহিত সংযুক্ত।” গুলিস্ত। গদ্যে ও পদ্যে সংমিশ্রিত। গুলিস্তার সহিত সংস্কৃত গুলিস্তার তুলনা। সাহিত্যের হিতােপদেশ, পঞ্চতন্ত্র প্রভৃতি, ইংরাজী সাহিত্যের কর্ণেল ফরেষ্টার রচিত পােলাইট ফিলজফার (Col. উৎসর্গ পত্র। + পূর্বকালে চীনদেশজাত চিত্র পারস্যে বিক্রয় হইত এবং সুলতানের আদেশে চীনদেশের সর্বশ্রেষ্ঠ চিত্রকর জর্জ পারস্য রাজদরবারে আসিয়া উৎকৃষ্ট চিত্রে চিত্রশালা পূর্ণ করেন।
No text on this page.
NAAN
to
( 111 ICT !
[ ৩ ] সংস্কৃত সাহিত্য। Forrestors Polite Philosopher) ও লাতিন সাহিত্যের মিনিপিয়েন (Minippian) এবং ভ্যারােনিয়ন (Varro-) ইংরাজী সাহিত্য। nean) লিখিত ব্যঙ্গ গ্রন্থাবলী, পিত্ৰোনিয়স (Petronius), সেনেকা (Seneca) এবং বোইটিয়াস (Boetius লাতিন সাহিত্য। লিখিত গদ্যে ও পদ্যে সংমিশ্রিত গ্রন্থাবলীর সহিত তুলনা করা যাইতে পারে। আরব-সাহিত্যের নাফাৎ-উল-ইয়ামান আরব সাহিত্য। নামক গ্রন্থেরও সহিত তুলনীয়। পারস্য, ইরাণ, তুরাণ দেশবাসীরাই যে শুধু কবি শেখ সাদির কাব্য নিহিত সত্য-শিব-সুন্দরের মধুর রস উপভােগ করিয়াছিল, ইয়ােরোপে গুলিস্ত। তাহা নহে, জড়বাদী ইয়ােরােপও এই মধুর রস-উপভােগ হইতে বঞ্চিত হয় নাই। অধ্যাপক ইষ্ট উইক (Prof. Eastwick) বলেন, প্রাচ্যখণ্ডে গুলিস্ত। যেরূপ আদৃত, যথেষ্ট অধীত ও বহুল প্রচারিত, প্রতীচ্যে কোন লেখকের কোন গ্রন্থই এরূপ ভাবে অধীত ও বহুল প্রচারিত হয় নাই। ১৬৫১ খ্রীষ্টাব্দে আমষ্টার্ডম সহর নিবাসী বিখ্যাত সাহিত্য-রসিক Georgius Gentius ইয়ােরােপীয় ভাষায় গুলিস্তার প্রথম অনুবাদ করেন। তিনি এই লাতিন অনুবাদ দ্বারাই ইয়ােরোপীয় সাহিত্য-রসিকগণের সহিত প্রাচ্যের গুলিস্তার পরিচয় Like the Minippian and Varronean Satire, of which Petronius Seneca, and Boetius, were the chief Latin Composers, and Col Forrester's Polite Philosopher, is an example in English, the Gulistan is written partly in Prose and partly in Poetry. Dr. James Ross. + The Gulistan of Sadi has attained a popularity in the East, which, perhaps has never been reached by any European work in this western world. Introduction of Gulistan. Georgius Gentius has the credit of first making known to European readers the Gulistan by his Rossaran Politicum published at Amsterdam A. D. 1651. Prof. Eastwick, [ ৫৪ ] } করাইয়া দেন; এই অনুবাদ Politicum Rossarum নামে প্রকাশিত সাদির নামে ইয়াে- হয়। অনুবাদে মূলের ভাবগত সৌন্দর্যে মুগ্ধ হইয়া রোপের জয়ধ্বনি। প্রতীচ্যদেশবাসীরা কবি সাদির নামে জয়ধ্বনি করেন ইহার ফলে ফরাশী ভাষায় পাঁচখানি ও জৰ্ম্মন ভাষায় পাঁচখানি অনুবাদ অনুবাদ ও প্রচার। প্রকাশিত হয়। নিয়ে অনুদিত পুস্তকগুলি প্রকাশে ইংরাজী সনের সহিত একটী তালিকা প্রদত্ত হইল • ১৬৩৪ খ্রীষ্টাব্দে প্রকাশিত ফরাশী অনুবাদকগণ :- ফরাশী অনুবাদ (১) A. du Ryer (২) D' Algere (৩) Goudin (8) Samulet (৫) C. Defremery ১৭০৪ ০ ১৭৮৯ ১৮২৮ ০ ১৮৫৮ ১৮২৬ জর্মন অনুবাদকগণ :- জন অনুবাদ- (>) B. V. H. Pergustall (R) Adam Oborms (৩) B, Dorn (8) Ph Walf (৫) K. H, Graf ১৬৫৪ 5 ০ ১৮২৭ ৪) ১৮৪১ ১৮৪৬ ১ ইয়ােরােপীয় ভাষায় গুলিস্ত। প্রচারিত হইবার পর প্রাচ্য খণ্ডের গুলিস্তুর প্রতি ইংরাজ সাহিত্য-রসিকগণের দৃষ্টি আকর্ষিত হয় ; ইহার ফলে অষ্টাদশ শতাব্দী হইতে ইংরাজী ভাষায় লণ্ডন হইতে উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যে গুলিস্তার আটখানি অনুবাদ প্রকাশিত হয়। যথা- [ ৫ ] , ২ ১) s ইংরাজী অনুবাদকগণ :- ইংরাজী অনুবাদ- (১) Fr Gladwin ১৭৮৭ খ্রীষ্টাব্দে প্রকাশিত (3) Damgulin ১৮০৭ (0) James Ross ১৮২৩ (8) Lee, ১৮২৭ (৫) Eastwick ১৮৫২ (৬) Dr. Sprenger ১৮৬১ (9) Major Anderson (b) J. T. Platts. ১৮৭৪ ইহা ব্যতীত কলিকাতা ও বােম্বাই হইতে কয়েক খণ্ড ইংরাজী অনুবাদও প্রকাশিত হইয়াছিল। শের আলী আফসুস “ হিন্দুস্থানের গুলিস্তর হিন্দি গুলিস্ত।” নামে হিন্দি ভাষায় গুলিস্তাঁর অনুবাদ অনুবাদ। করেন। এই অনুবাদ ১৮০২ খ্রীষ্টাব্দে Dr. John Gilchrist পরামর্শ ও তত্ত্বাবধানে কলিকাতা হইতে প্রকাশিত হয় ও তদানীন্তন গভর্নর জেনারেল মার্ক ইস অব ওয়েলেসলীর নামে ১৮৬৩ ১৮ উৎসৃষ্ট হয়।* কবি গুলিস্তাকে যেরূপ নন্দন-কাননের মত অষ্টম অংশে বিভক্ত বােস্তার দশম করিয়াছেন, সেইরূপ ঐশ্বৰ্য্যমণ্ডিত প্রাসাদরূপ বােন্ত। অধ্যায়। কাব্যকেও মুক্তারূপ বাগ্মীতায় পূর্ণ করিয়া দশ দরজা রূপ দশম অধ্যায়ে বিভক্ত করিয়াছেন; যথা ;- * Catalouge of Persian, Arabic, Postu and Hindustani manuscripts pri. pared by Dr. A. Sprenger M.D., page 198, catalouge of Persian manuscripts prepared by Prof. E. D. Sachu Pb. D. and Prof. Hermann Ethe M.A. Ph. D. page 546.
[ ৫৬ ] (১) ন্যায় বিচার ও রাজনীতি উপদেশ (Justice, Council and Administration) (২) পরােপকার (Benevolence) (৩) প্রেম (Love) (৪) দীনতা (Humility) (৫) আত্মসমর্পন (Resignation) (৬) সন্তোষ (Contentment) (৭) শিক্ষা (Education) (৮) কৃতজ্ঞতা (Gratitude) (১) অনুতাপ (Repentance) (১০) উপাসনা (Prayer) বােস্ত। কাব্যে মানব জীবনের নৈতিক, সামাজিক, ও ধর্ম সম্বন্ধীর সমুদায় অবস্থার বিষয় বিশদভাবে আলােচিত হইয়াছ। রচনাপ্রণালী সরল ও সুললিত, কাব্যাংশে কষ্ট-কল্পনা অথবা রহস্যসমাচ্ছন্নতার ভাব কিছুমাত্র নাই। গুলিস্তর মত বােস্ত। কাব্যের পূর্বাভাষ-চিত্রও বড় চমৎকার, বড়ই উপভােগ্য। ভগবৎ-চরণে উৎসৃষ্ট-প্রাণ কবি প্রথমেই সর্বশক্তিমান ভগবানের মহিমা কীর্তন করিয়াছেন। এই মহিমা-গীতি বিদ্রোহী মানব- হৃদয়কে সেই বিশ্বস্রষ্টার চরণপ্রান্তের দিকে অগ্রসর করে; অতিবড় ৰােন্তর সূচনা। পাপীও, যে কদাচ ভুলিয়া শ্রীভগবানের নাম উচ্চারণ করে না, সেও পাপ কাৰ্য ভুলিয়া ঈশ্বর-সান্নিধ্য লাভের জন্য ব্যাকুল পারস্যের অন্যতম কবি-পয়গম্বর ফারদৌসী, উপন্যাসিক ও কবি নিজামীর রচিত কাব্য যেরূপ মিলযুক্ত মুগ্মচরণে ও ইংরাজি সাহিত্যের [ ৫৭ ) পােপ (Alex Pope) ও এডিসনের (Addisou) কবিতা যেরূপ মিল যুক্ত বােস্তর আলােচ্য যুগ্ম চরণে ও একাদশ মাত্রায় রচিত, কবি সাদীর বিষয়, রূপ ও রচনা বােস্তও সেইরূপ মিল যুক্ত যুগ্ম চরণে ও একাদশ প্রণালী। মাত্রায় রচিত। যে ঈশ্বরানুরাগ, সাধুতা, পবিত্র রুচি, সাদি-চরিত্রের স্বাভাবিক লক্ষণ, বােস্তার প্রতি কবিতা সেইরূপ পবিত্রভাবে পূর্ণ; উপদেশ ও উদার নীতি-কথা শৃঙ্খলার সহিত আলােচিত হইয়া গুলিস্তাঁর মত বােস্তাঁকেও নীতি-বিজ্ঞানে (moral philosophy) পরিণত করিয়াছে। একজন ইংরাজ পারস্য-সাহিত্য- রসিক বলিয়াছেন, যুগ্ম চরণে রচিত ও দশমসর্গে বিভক্ত বােস্ত। কাব্য নীতি উপদেশ পূর্ণ মহাকাব্য বিশেষ। ইহা উচ্চাঙ্গের দার্শনিক ও ধৰ্ম্মতত্ত্ব—যাহার অস্তিত্ব খ্ৰীষ্টিয় ধৰ্ম্মশাস্ত্রে অতি বিরল--গতীর নীতি বিজ্ঞানের প্রাচুৰ্য্য, অনুপম ও মূল্যবান রত্ন সদৃশ অতিন্দ্রীয় মতবাদে পূর্ণ। গুলিস্ত। কাব্যে কবি হাস্যরসের ফোয়ারা খুলিয়া দিয়াছেন, বােস্থায় হাস্যরস কিছু সংযত করিয়াছেন; ইহার প্রত্যেক কবিতার মধ্যে ধর্মপালন, মানবের প্রতি মানবের কর্তব্য, ঈশ্বরের স্বরূপ মানুষ যে অদৃষ্টের অধীন, প্রেমভক্তি ঈশ্বরানুরাগ নিঝরমুক্ত । # The Bustan consists of couplets, or the heroic lines of Firdusi and Nizami of ten aud eleven syllables, aarl corresponding with that of Pope and Addison in English. Dr Ross. + The former (Rustan) also called Sadinama, is a kind of didactic epopie in ten chapters and doubly-rhymed verses, which passes in review the highest philosophical and religious questions not seldom in the very spirit of christinity, and abounds with sound ethical maxims aud matchless genus of transcedental speculation. Encyclopedia Britannic.
[ ৫৮ ] বারিরাশির মত তরতর বেগে প্রবাহিত। ইহার চমৎকার ও কবিত্বপূর্ণ ভাষায় বর্ণিত হইয়াছে। বােন্ত। কাব্য পাঠ করিলে একটী বিশেষ লক্ষণ পরিদৃষ্ট হয় যে কবি এই কাব্য মধ্যে অতিশয়ােক্তি, উপমা ও রূপক অলঙ্কারের প্রাচুর্য্য ঘটাইয়াছেন। অধ্যাপক এডওয়ার্ড বলেন, কবি শেখ সাদী যদি কেবল মাত্র বােস্ত'। রচনা করিয়া যাইতেন, তাহা হইলে তিনি নিশ্চয়ই সাহিত্য-জগতে অমর হইতেন। * কবির রচনার বিশেষত্ব সম্বন্ধে ইংরাজ মনীষী ক্লসটন বলিয়াছেন, মানবের কাৰ্য্যের নিগুঢ় উৎপত্তি-তত্ত্বে গভীর অন্ত দৃষ্টি, মানব জাতিগত সুদুর প্রসারিত জ্ঞান, গোঁড়ামী শূন্য প্রগাঢ় ধর্মনিষ্ঠা, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যে কবি-সুলভ অনুভূতি, প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব, সজীব হাস্যরস-বােধ প্রভৃতি সকল গুণই কবি শেখ সাদীর প্রতিভার বৈশিষ্ট ! আমাদের মনে হয় এই সকল গুণ ব্যতীত কবি শেখ সাদীর প্রতিভার অন্য বিশেষত্ব ছিল এই যে, সাধারণতঃ দেখিতে পাওয়া যায়, প্রকৃতির নিয়মানুসারে বয়ােবৃদ্ধির সহিত মানবের নবনবউন্মেষশালিনী প্রতিভার হ্রাস হয়, কিন্তু কবি শেখ সাদী এই সাধারণ নিয়মের বহিভূত। বয়ােবৃদ্ধির সহিত তাঁহার অমানুষী প্রতিভা প্রাপ্ত না হইয়া বরং উত্তরােত্তরই বৃদ্ধি প্রাপ্ত হইয়াছিল। ইহার * If the Bastan were the oply monument that remained of his genius, his name would assuredly still be inscribed in the roll of Immortals. Introduction to Bustan by A. H. Edwords. † A deep insight into the secret springs of human actions an extensive knowledg of mankind, fervent pity without a faint of bigotry, a poet's keep appreciation of the beauties of nature, together with a ready wit and lively sense of humour, are two characteristic of Sadi's masterly compositious. Flowers from the Persian Garden.
[ ৫৯ ] সহিত সত্য উপলব্ধির ক্ষমতাও বৃদ্ধি প্রাপ্ত হইয়াছিল। পৃথিবীর সাহিত্যের ইতিহাসে এরূপ ক্রমবর্ধনশীল নব নবউন্মেষশালিনী প্রতিভার উল্লেখ বােধহয় আর নাই। আমাদের মনে হয়, ইহাই শেখ সাদীর কবি-প্রতিভার শ্রেষ্ঠ বৈশিষ্ট। এই কাব্যের অধ্যায় নিহিত উপদেশ ও উদার নীতি-কথা জটিল ধৰ্ম্ম ও দার্শনিকতত্ত্বের মীমাংসা গল্প-চিত্রের মধ্যদিয়া অতি সুচারুরূপে চিত্রিত হইয়াছে ; আমরা নিয়ে যথাসম্ভব সংক্ষেপে বােন্তর দশ অধ্যায়ের পরিচয় দিলাম। প্রথম অধ্যায়ে কবি সুলতান আবুবকরকে সম্বােধন করিয়া বলিয়াছেন, হে সুলতান, ভজনার সময় আপনার চিত্তকে বিনীত ও নম্র করিবেন । ভক্তের মত সানুনয় প্রার্থনা করিয়া বলিবেন, হে সর্বশক্তিমান পরমেশ্বর ? হে বিশ্বস্রষ্টা! হে জগৎপতে! তুমিই বিশ্বসম্রাট, আমি তােমার স্নেহ-কণার ভিখারী, তােমার স্নেহ-হস্ত ভিন্ন কে আমাকে রক্ষা করিবে ? আমার প্রতি সদয় হও, আমার হৃদয়ে ধৰ্ম্মবল দাও, তুমি শক্তি না দিলে কেমন করিয়া আমি প্রজাপুঞ্জকে রক্ষা করিব ?” এই অধ্যায়ে কবি রাজাকে কিরূপভাবে অবস্থান এবং রাজ্য শাসন করিতে হইবে, গল্প-চিত্রের প্রথম অধ্যায়ের। মধ্য দিয়া তৎসম্বন্ধে কতকগুলি উপদেশ দিয়াছেন। গল্প-চিত্র। একটী গল্প-চিত্র নিয়ে চিত্রিত হইল। এক রাজাকে সামান্য মূল্যের মােটা পােষাক পরিধান করিতে দেখিয়া রাজার একজন বন্ধু তাহাকে বলেন, “হে রাজন! এই সামান্য মূল্যের সামান্য পােক পরিধান করিয়া, আপনি আপনার মৰ্যাদার হানি করিতেছেন, রাজার উপযুক্ত চীনদেশস্থ মূল্যবান রেশমী পােষাক পরিধান করুন। রাজী বলিলেন “বন্ধু! আমি যে পােষাক পরিধান করি, তাহাতে ত কোন প্রকার অসুবিধা দেখি না; আমি বেশ আরামেই আছি। বিলাসিতার চরম সীমায় পৌছিতে অথবা আড়ম্বরপূর্ণ বহুল্য পােষাক পরিমূখান [ ৬ ] পূৰ্ব্বক সাধারণের স্তুতি লাভ করিয়া আত্মপ্রসাদ লাভ করিবার ইচ্ছা আমার আদৌ নাই । স্ত্রীলােকের মত যদি আমিও বহুমূল্য পােষাক, পরিচ্ছদ ও অলঙ্কারে নিজ দেহ আবৃত করি, তাহা হইলে শত্রু দমন করিব কি উপায়ে ? রাজকীয় ধনাগার আমার জন্য নয়—অথবা আমার ব্যবহাৰ্থ অলঙ্কার, পােষাক, পরিচ্ছদ ক্রয় করিবার জন্য নহে, সৈন্য- বল বৃদ্ধির জন্য।” ঈশ্বরের সৃষ্টি-কাৰ্য্য ও কৌশল প্রসঙ্গে কবি বলিয়াছেন, হে মানব! ঈশ্বরের চমৎকার সৃষ্টি কৌশল অবলােকন কর ; কি সূক্ষ্ম হিসাবের সহিত প্রত্যেক অঙ্গুলী নির্দিষ্ট কতক গুলি গ্রন্থিতে বিভক্ত। তাঁহার সৃষ্টি কাৰ্য্য বা কৌশলের সমালােচনা করা তােমার পক্ষে ঘােরর মূখতা- তােমার শােভা পায় না। দেখ কয়েক খণ্ড অস্থিযুক্ত পদদ্বয় দ্বারা মানব কেমন চারিধারে গমনাগমন করিতেছে। পায়ের গােড়ালী, জানু, পদদ্বয় যদি গমনভঙ্গী (movements) শূন্য হয়, তাহা হইলে মানব চলচ্ছশূিন্য হইবে। দেখ, ভগবান দুইশত খণ্ড অস্থিদ্বারা তােমাকে সৃষ্টি করিয়াছেন, তােমার শরীরের মধ্যে শিরা প্রবাহিত। ইহার মধ্যে পেশী আছে, ৩৬০ টী প্রস্রবনের তুলু। ভগবান তােমার মস্তিষ্কে চিন্তাশক্তি, দর্শনশক্তি, বিচারশক্তি দিয়াছেন ; জীবশ্রেষ্ঠ ও সর্বজীবের উপর প্রাধান্তের অধিকারী করিয়া তােমাকে সৃষ্টি করিয়াছেন। অতএব হে জীবশ্রেষ্ঠ মানব ! বিশ্বস্রষ্টার শ্রীচরণে তােমার হৃদয়ের কৃতজ্ঞতা নিবেদন কর। ইতর প্রাণীগণকে লুব্ধ ও মনুষ্যের অধীন করিয়া ভগবান সৃষ্টি করিয়াছেন, কিন্তু হে মানব ! দেখ তুমি কেমন আলেফ অক্ষরের মত ঋছু ভাবে দণ্ডায়মান হইতে সমর্থ ; আহাৰ্য্য গ্রহণের সময় ইতর প্রাণীগণকে শির নত করিতে হয়, কিন্তু তুমি, অনবনত মস্তকে তােমার আহাৰ্য্য মুখে তুলিতে পার। হে জীবশ্রেষ্ঠ মানব, তার অনুগ্রহে শ্রেষ্ঠ জীববাচিত সর্ব বিষয়ে প্রাধান্যের [ ৬১ ] অধিকারী হইয়াছ, তুমি কি ঈশ্বরের শ্রীচরণে তােমার হৃদয়ের কৃতজ্ঞতা- পুষ্প অর্ঘ্যরূপে নিবেদন করিবে না ? পরােপকার নামক দ্বিতীয় অধ্যায়ের গল্প-চিত্রে কবি বিখ্যাত দানবীর হাতিম তাইয়ের পরােপকার-ব্ৰত-মহিমা কীর্তন করিয়াছেন।-গল্প- চিত্ৰটী এইরূপ;- আরব দেশের দক্ষিণ দিকে ইয়ামান রাজ্যে তাইদলের সর্দার হাতিম বাস করিতেন। তিনি সর্বসাধারণের নিকট হাতিমতাই নামে পরিচিত। তাই সর্দার সদাশয়তার জন্য এতই প্রসিদ্ধ ছিলেন যে, এখনও আরব দেশের লােকেরা অত্যন্ত শ্রদ্ধার সহিত তাহার স্মৃতি-পূজা দ্বিতীয় অধ্যায়ের করিয়া থাকে। হাতিমের একটী প্রিয় ঘােটক ছিল ; গল্প-চিত্র। এই ঘােটকটী পবনের গতিতে দ্রুত ছুটিত ; একদিন রুমের সুলতান, হাতিমতায়ের সদাশয়তা ও এই অপূৰ্ব্ব ঘােটকের বিষয় অবগত হইয়া মনে মনে স্থির করেন, হাতিমকে একবার পরীক্ষা করিতে হইবে; তাহার নিকট প্রস্তাব করিয়া পাঠাইতে হইবে যে, তুমি যদি তােমার প্রিয় ঘােটকটী আমাকে উপহার দিতে পার, তাহা হইলে বুঝিব যে, তুমি শ্রদ্ধার ও প্রশংসার যােগ্যপাত্র। আর যদি দেখি যে ঘােটকটীকে উপহার দিতে অস্বীকার করিতেছ, তাহা হইলে বুঝিব, যে সদাশয়তার জন্য চারিধার হইতে তােমার উদ্দেশ্যে প্রশংসা ও শ্রদ্ধার পুস্পাঞ্জলী বর্ষিত হয়, সে সমস্তই মিথ্যা— ঢাকের বাজনার মত। সুলতান পত্রসহ এক সুচতুর দূতকে হাতিমের উদ্দেশ্যে পাঠাইলেন। দুত হাতিম তাইয়ের গৃহে পৌছিল। অত্যন্ত সম্মানের সহিত হাতিম দূতকে অভ্যর্থনা করিয়া প্রতি-ভােজনের আয়ােজন করিলেন; অতিথির সম্মানের জন্য হাতিম একটী ঘোটক হত্যার ব্যবস্থা করিলেন। পর দিবস প্রাতে দূত সুলতানের সাক্ষরিত পত্রখানি হাতিমের হস্তে প্রদান করিয়া বলিল, দেখুন, আমি সুলতানের আদেশ [ ৬২ ] ক্রমে আসিয়াছি। তিনি জানিতে চাহিয়াছেন যে, আপনি সুলতানের সহিত বন্ধুত্বের চিহ্ন স্বরূপ আপনার প্রিয় ঘােটককে উপহার দিতে স্বীকৃত আছেন কিনা। হাতিম অত্যন্ত দুঃখ ও অর্ধ উন্মত্তের মত হইয়া বলিল, রাজদূত! গতকল্য আমাকে সুলতানের অভিপ্রায় জানান উচিত ছিল। গতকল্য প্রীতি-ভােজনে ঘােটকটীকে হত্যা করা হইয়াছে। এই ঘােটকটীই আমার সর্বাপেক্ষা প্রিয় ছিল এবং এইটী ছাড়া আর আমার দ্বিতীয় ঘােটক নাই। মেষ বা ছাগলের মাংস দিয়া রাজদূতের সমুচিত মৰ্য্যাদা রক্ষিত হইবে না ভাবিয়া আমি আমার একমাত্র প্রিয় ঘােটকটীকে হত্যা করিতে বাধ্য হইয়াছি। বন্ধুত্বের চিহ্ন স্বরূপ সেই ঘােটকটী সুলতানকে উপহার দিতে পারিলাম না বলিয়া অত্যন্ত দুঃখিত। হাতিম, দূতকে প্রচুর অর্থ ও নানাবিধ পরিচ্ছদ উপঢৌকন দিয়া বিদায় দিলেন। দূত সুলতানের নিকট সমস্ত কথা বলিল। হাতিম তাহার প্রিয় ঘােটকটীকে উপহার দিতে স্বীকৃত হইয়াছিল শুনিয়া সুলতান মুগ্ধ হইয়া মনে মনে বার বার বলিলেন, “হাতিম কি মহৎ! কি উদার।” হাতিমের উদারতা সম্বন্ধে কবি আর একটী গল্প-চিত্র অঙ্কিত করিয়াছেন। সেটা এইরূপ —আরব দেশের দক্ষিণে ইয়ামানের রাজা উদারতার জন্য প্রসিদ্ধ ছিলেন। এই রাজা যখনই প্রজাদের মঙ্গলের জন্য কোন হিতকর কাৰ্য্যের অনুষ্ঠান করিতেন, তখনই জনসাধারণে হাতিম তাইয়ের সাধু অনুষ্ঠানের সহিত রাজার কার্যের তুলনা করিত। যখন তখন হাতিম তাইয়ের প্রশংসা শুনিয়া রাজা হিংসায় অন্ধ হইয়া একদিন স্থির করিলেন, ধরাপৃষ্ঠ হইতে হাতিম তাইয়ের নাম মুছিয়া দিতে হইবে। যে ব্যক্তির রাজত্ব নাই, যার কোন ধন-বল, কি জন-বল নাই, লােকে কি বলিয়া সেই ভিখারীর সহিত আমার মত রাজার তুলনা করে ? একদিন রাজা এক বৃহৎ ভােজের আয়ােজন করিলেন, রাজ্যের সমস্ত গণ্যমান্য ব্যক্তিগণ নিমন্ত্রিত হইল। আমন্ত্রিত ব্যক্তিগণ রাজার ভূয়সী == [ ৬৩ ] প্রশংসা করিল, এবং সঙ্গে সঙ্গে হাতিম তাইয়ের কার্যাবলীর সহিত রাজার অনুষ্ঠিত কৰ্ম্মের তুলনা করিতে ভুলিল না। স্বনামধন্য হাতিম- তাইয়ের সহিত রাজার প্রীতি-ভােজনের অনুষ্ঠানের তুলনা করিয়া রাজাকে অধিকতর সম্মান দেখান হইতেছে ভাবিয়া নিমন্ত্রিত ব্যক্তিগণ এইরূপ তুলনা করিল। রাজা হাতিম তাইয়ের প্রশংসা শুনিয়া হিংসায় উন্মত্ত হইয়া প্রতিজ্ঞা করিলেন, যেমন করিয়া হোক, এই হাতেম- তাইকে হত্যা করিতে হইবে। তৎপরদিবস প্রাতে রাজা এই উদ্দেশ্য সাধনের জন্য একজন গুপ্তঘাতক প্রেরণ করিলেন। পথিমধ্যে এক যুবকের সহিত রাজ-প্রেরিত গুপ্ত ঘাতকের বন্ধুত্ব হয়। এই যুবক তাহাকে গৃহে নিমন্ত্রণ করিল। গুপ্তহত্যাকারী নিমন্ত্রণ রক্ষা করিয়া বিদায় গ্রহণ করিতে উদ্যত হইলে, যুবক তাহাকে তাহার গৃহে রাত্রি যাপনের জন্য বিশেষভাবে অনুরােধ করিল। সে বন্ধুর প্রীতি ওসৌজন্যে মুগ্ধ হইয়া বন্ধুগৃহে রাত্রিযাপন করিল। তৎপর দিবস পুনরায় বিদায় চাহিলে যুবক পুনরায় তাহার অতিথি বন্ধুকে কিছুদিন তাহার বাটীতে থাকিবার জন্য সানুনয় অনুরােধ করিল। রাজ-প্রেরিত গুপ্ত ঘাতকবলিল, “ ভাই, আমাকে বিদায় দাও, আমি বিশেষ আবশ্যক কর্মে বাহির হইয়াছি, আর আমার থাকিবার উপায় নাই।” যুবক বলিল, “ তােমার বিশেষ দরকারী কাজটা কি আমাকে জানাবে বন্ধু ? তােমাকে সাহায্য করিতে পারিলে বিশেষ আনন্দলাভ করিব।” অতিথি বলিল, ভাই, আমার কাজটী অতিশয় গােপনীয়-- আমার ভরসা আছে যে তােমার মত বন্ধুর নিকট ব্যক্ত করিলে, অন্যত্র প্রকাশ হইবার সম্ভাবনা নাই। তাহলে বলি শােন, তুমি নিশ্চয়ই হাতিম তাইয়ের নাম শুনেছ, যে হাতেম তাইয়ের প্রশংসা দেশ বিদেশে ছড়িয়ে পড়েছে, আমি জানিনা কি কারণে আমাদের রাজা হাতিমের প্রশংসার নামে হিংসায় অন্ধ হন। হাতিমতাইকে হত্যা করিবার জন্য [ ৬৪ ] রাজা আমাকে পাঠাইয়াছেন। তুমি কি বলতে পার, বন্ধু, কোথায় গেলে সেই হাতিম তাইয়ের সন্ধান পাবাে ?” যুবক তার অতিথির কথা শুনিয়া হাসিয়া বলিল, “বন্ধু, আমিই সেই হাতিম।” বলিয়া অতিথির সম্মুখে অগ্রসর হইয়া মাথ। পাতিয়া দিয়া বলিল, “বন্ধু, তুমি যাকে খুঁজছিলে, আমি সেই হাতিম, আমাকে হত্যা করিয়া তােমার রাজাজ্ঞা পালন কর।” রাজ-প্রেরিত গুপ্তহত্যাকারী তৎক্ষণাৎ হাতিমের পদতলে পড়িয়া অত্যন্ত শ্রদ্ধার সহিত তার পায়ের ধুলা মাথায় লইয়া বলিল, “বন্ধু, তােমায় হত্যাকরা ত দূরের কথা, তােমার মস্তকের এক গাছি কেশ উৎপাটন আমার দ্বারা হইবে না; বন্ধু! তুমি এত উদার! তুমি এত মহৎ।” বলিয়া হাতিমকে আলিঙ্গন পাশে বদ্ধ করিল। তারপর সে ইয়ামান রাজ্যের দিকে, চলিয়া গেল; তার গমনভঙ্গি দেখিলে মনে হয় যেন সে কোন পাপকাৰ্য্য করিতে গিয়া ভয়ে পলাইয়া আসিয়াছে। ঘাতক ইয়ামান রাজ্যে ফিরিয়া আসিল ; রাজা প্রতিপালন হয় নাই দেখিয়া রাজা কুটির সহিত বলিলেন, হাতিমের ছিন্নমুণ্ড কোথায় ? ঘাতক রাজাকে কুর্ণিশ করিয়া বলিল, সুলতান, হাতিম তাইয়ের সহিত আমার সাক্ষাৎ হয়েছিল ; আমি তাকে হত্যা করিতে পারি নাই ;-সে আমাকে তার সৌজন্য-তলােয়ার দ্বারা হত্যা করেছে ! সুলতান। হাতিম কিরূপ বিনয়ী, উদার ও জ্ঞানী, তার পরিচয় পেয়ে এলেম। এই মহৎ উদার ব্যক্তিকে হত্যা করিবার জন্য আমাকে পাঠাইয়াছিলেন, যে ব্যক্তি রাজাজ্ঞা শুনে স্বেচ্ছায় তার মস্তক তলওয়ারের উপরে এগিয়ে দিয়ে বলে, আমাকে হত্যা করে তােমার রাজাজ্ঞা পালন কর, তা, নইলে তুমি তােমার রাজার বােষ দৃষ্টিতে পড়িবে! এরকম জ্ঞানী, উদার, মহৎকে হত্যা করিবার জন্য আমাকে আজ্ঞা দিয়াছেন। আবার ! তাকে হত্যা করিতে পারিনি, সেই আমাকে তার বলি, সুলতা!
[ ৬৫ ] মহত্ব ও উদারতার তলােয়ার দ্বারা হত্যা করেছে। ঘাতকের কথা শুনিয়া রাজসভা নিৰ্বাক, নিশ্চল। হাতিমের উদারতা ও মহত্ত্বে মুগ্ধ হইয়া রাজা এতদিন পরে হিংসা ভুলিয়া শত মুখে তাহার প্রশংসা করিল। বাের তৃতীয় অধ্যায়ে কবি প্রেম-প্রসঙ্গ যেরূপ প্রকৃত প্রেমিকের অভিজ্ঞতা লইয়া আলােচনা করিয়াছেন, তাহা পাঠ না করিলে অনুভবে বুঝা যায় না। ভগবৎ প্রেমের মাহাত্ম্য কীৰ্ত্তন করিয়া কবি বলিতে- ছেন,-শ্রীভগবানের বিচ্ছেদ জনিত পীড়া অনুভব করুন, অথবা { তাহার সঙ্গলাভ জনিত) উপশম আরাম উপভােগ করুন। যাহারা একবার পরমেশ্বরের প্রেমে পাগল হইয়াছে, তাহাদের সময় সর্বদাই সুখে কাটিয়া যায়। বােস্তাঁর প্রেম অধ্যায় হইতে সাধারণ প্রণয়ীগণও অনেক উপদেশ ও সদযুক্তি লাভ করিতে পারিবে। আমরা নিয়ে এই অধ্যায় হইতে কবির প্রেম-বাণী উদ্ধত করিলাম। যথা- (১) যথার্থ প্রেমিক হইলেও তুমি কখনও তােমার প্রেমের অহঙ্কার করিও না, কেননা এই গৰ্ব্বজনিত পাপ শুধু তােমাকেই নহে—তােমার প্রণয়িনীকেও ভােগ করিতে হইবে । (২) যতক্ষণ পার যুদ্ধ কর, প্রণয় রণে ভঙ্গ দিয়া পলাইও না; প্রেম- যুদ্ধে ক্ষত বিক্ষত হইয়াও সাদী এখনও বাচিয়া আছে। ঈশ্বর প্রেম নামক অধ্যায় ভক্ত ও প্রেমিকগণের চিত্রে পূর্ণ। কবি ঈশ্বর প্রেম ও প্রেমিকগণের জয় গান করিয়া বলিয়াছেন, যাহারা সদাই ভগবানের প্রেমে মসগুল, তাহারাই সুখী, তাহারাই শ্রীভগবানের সহিত সংযােগ লাভ করিতে পারিলেই উৎফুল্প, যতদিন না ঈশ্বর-সান্নিধ্য লাভ করিতে পারিতেছে ততদিন তার বিচ্ছেদে মুহমান। যাহারা সত্য-শিব-সুন্দরের প্রেমে মসগুল, তাহারা কখনাে তাহার প্রেম-রজু ছিন্ন করিতে পারে না। অন্যের নিকট তিরস্কৃত [ ৬৬ ] হইলেও, তাহারা ধ্যান-রাজ্যের রাজা; কিন্তু তাহাদের রাজ্য সকলে নিকট সুপরিচিত নয়। বাহিরে যেন ইহারা ঠিক জালেমের মন্দির, ভিতরে সব আছে, কিন্তু দিনের পর দিন যতই যাইতেছে, মন্দিরের বাহির ধ্বংসও নিকটবর্তী হইতেছে। তাহারাই পতঙ্গের মত প্রেমময়ের প্রেম-দীপ-শিখায় আত্মাহুতি প্রদান করে। এই অধ্যায়ের একটী গল্প-চিত্র নিয়ে চিত্রিত হইল। এক ব্যক্তি ঈশ্বর প্রেমে উন্মাদ হইয়াছিল। সে দিন বা রাত্রে কিছুই আহার করিত না, সদাই বাহ্যজ্ঞানরহিত হইয়া থাকিত। ইহার জন্য তাহার পিতা অত্যন্ত দুঃখিত ছিল। একদিন এক ব্যক্তি এই যুবককে ভৎসনা করিল। প্রেমােন্মত্ত যুবক উত্তর দিল “ যেদিন থেকে প্রেমময় দয়ালবন্ধু আমাকে আপনার বলে তার নিকটে টেনে নিয়েছেন, সেদিন হইতে আমি আর কোন আত্মীয় বন্ধু চাহি না। তিনি যখন আমার গায়ে তার করুণা হস্ত বুলিয়ে দিয়েছেন, তিনি যখন তার স্বরূপ আমাকে দেখিয়েছেন, আমি আর কিছুই চাহি না।” প্রেমােত্ত যুবকের কথা বুঝিতে না পারিয়া সকলেই তাহাকে তিরস্কার করিল। দীনতা নামক অধ্যায়ে কবি মানবকে উপদেশ দিয়াছেন, হে মানব। দন্তে গর্বে মস্তক উত্তোলন করিও না; তােমার ধুলার শরীর, সুতরাং তুমি ধুলার মত দীন হও! অগ্নির মত উত্তেজিত হইও না। স্থির জানিও দানতার সােপান অবলম্বন করিয়া সাধুতার উচ্চস্তরে আবােহন করা যায় ; গৰ্বই মনুষ্যকে অধােগামী করে। এই অধ্যায়ের একটী গল্প- চিত্র এইরূপঃ এক যুবক তুরস্কের উপকুলে উপনীত হইয়া তত্ৰত্য এক মসজিদে থাকিবার জন্য আচার্যের নিকট প্রার্থনা করিল। আচাৰ্য এই বিদেশী মুবকের প্রিয় দরশন মূর্তি দেখিয়া তৎক্ষণাৎ তাহাকে আশ্রয় দিল। একদিন আচার্য্য যুবককে বলিল, দেখ আমাদের মসজিদের উঠান বড় অপরিষ্কার [ ৬৭ ] থাকে, তুমি পরিষ্কার করিয়া লইও। যুবক আচার্যের কথার কোন উত্তর দিল না ; মসজিদের উঠান পরিষ্কারও করিল না। নিজ জিনিষ পত্র লইয়া ধীরে ধীরে মসজিদ হইতে বাহির হইয়া গেল। মসজিদের অপরাপর ব্যক্তিগণ পরস্পর বলাবলি করিতে লাগিল যে এ যুবককে মসজিদ পরিষ্কার করিতে বলা হইয়াছিল বলিয়া সে অপমান বােধ করিয়া চলিয়া গিয়াছে। এই যুবকটীর ধারণা যে সে মহা- গন্যমান্য ব্যক্তি। তৎপরদিবস প্রাতে ঘটনাক্রমে মসজিদের কোন লােকের সহিত যুবকের সাক্ষাৎ হইলে লােকটী যুবককে জিজ্ঞাসা করিল “ভাই, তুমি ভুল করিয়া বড়ই অন্যায় কাজ করিয়াছ। কোন কাজ করিলে মানুষ অপমানিত হয় না বরং তার গৌরব বৃদ্ধি পায়। যুবক দুঃখিত স্বরে বলিল, ভাই, তােমরা আমাকে ভুল বুঝিয়াছ । আচাৰ্য্য যখন আমাকে পবিত্র মসজিদ পরিষ্কার করিতে আদেশ দেন, তখন দেখিলাম, তথায় একটুও ময়লা নাই, সেই জন্যই আমি মসজিদ ছাড়িয়া চলিয়া আসিয়াছি, আমি ভক্তি-প্রেমহীন, আমি পবিত্র স্থান মসজিদ পরিস্কার করিবার যােগ্য কি ? আত্মসমর্পণ নামক অধ্যায়ে কবি পরমকারুণিক ভগবানের শ্রীচরণে আত্মসমর্পণ করিবার জন্য উপদেশ দিয়াছেন। সন্তোষ নামক অধ্যায়ে কবি বলিয়াছেন, যে নিজ অবস্থায় সন্তুষ্ট নহে, সে কখনও ঈশ্বরের পূজা করিতে পারিবে না। সন্তোষই মানুষকে * শ্রেষ্ঠ করে। শিক্ষাসম্পর্কীয় অধ্যায়ে কবি মানবজাতিকে বলিয়াছেন, এই সংসার লােকপূর্ণ একটী নগরের মত, তুমিই এদেশের রাজা এবং বিবেকই তােমার জ্ঞানী মন্ত্রীর মত কাজ করিবে। অজ্ঞানীরা এই নগরে লােভের এবং লালসার ব্যবসা করে। সংযম এবং আত্মসমর্পণ এই নগরের যশ, ধৰ্ম্ম। কামুক এবং কামুকতা, এ নগরের চোর এবং গাঁটকাটা স্বরূপ জানিবে ।
[ ৬ ] কৃতজ্ঞতা নামক অধ্যায়ে কবি কায়মনােবাক্যে বিশ্বস্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকিতে উপদেশ দিয়াছেন। অনুতাপ নামক অধ্যায়ে কবি পাপ কর্মের জন্য অনুতপ্ত হইতে উপদেশ দিয়াছেন। প্রার্থনা নামক অধ্যায়ে কবি বলিয়াছেন, আজ হইতেই ভগবানের উপাসনা কর, কারণ আগামী কল্য তুমি শক্তিহীন হইতে পার। সৌজন্য প্রসঙ্গে কবি বলিয়াছেন, “নিজে দুঃখ না পাইতে কি তােমার ইচ্ছা হয় ? যদি এরূপ ইচ্ছা থাকে, তবে যেন পরের দুঃখে তােমার অন্তরে সহানুভূতির অভাব না হয় । অনত্র বলিয়াছেন, হে ধনি! অদ্যই তুমি দানে মুক্তহস্ত হও, কেননা আগামী কল্য তােমার ধনাগারের চাবী পরহস্তগত হইতে পারে। নিজ অবস্থার উপর সন্তুষ্ট হইতে না পারিলে জীবনে কখনও তৃপ্তি পাওয়া যায় না । তাই কবি উপদেশ দিতেছেন, “যে আপন ভাগ্য উপজীবিকা লইয়া সন্তুষ্ট নহে, সে অতি দুভাগ্য এবং কখনও ঈশ্বর সেবাশিক্ষা করে নাই। পুস্তকের প্রতি পৃষ্ঠা পুস্তকের প্রতি পৃষ্ঠা এইরূপ শতশত সদ্ভাব- কুসুমের স্বর্গীয় সৌরভে পূর্ণ । গুলিস্তর ন্যায় বােস্তাকাব্যেরও স্বদেশে ও বিদেশে বহুল প্রচার হইয়াছিল। জম্মণীর বিখ্যাত পণ্ডিত ও অধ্যাপক K. H. Graf, অধ্যাপক Schlechta Wehrd ও অধ্যাপক Fr. Reukert যথাক্রমে ১৮৫০, ১৮৫২, ১৮৮২ খ্রীষ্টাব্দে জৰ্ম্মণ ভাষায়, Borbier de Meynard ১৮৮০ খ্রীষ্টাব্দে ফরাসী ভাষায় ও ইংরাজী ভাষায় Lt Col. H. W. Clarke, E. Arnold, S. Robinsons, G. A. Davis 1977 আদালত খাঁ, অধ্যাপক A. H. Edwords যথাক্রমে ১৮৭৯, ১৮৮২, ১৮৭৭, ১৮৮৩, ১৮২৩, ১৮৯০ খ্রীষ্টাব্দে, ইংরাজী অনুবাদ প্রকাশ করেন।
[ ৬৯ ] বােন্ত ও গুলিস্ত। কবি শেখ সাদীর সর্বতােমুখিনী প্রতিভার সর্বশ্রেষ্ঠ দান। প্রতিভার চরমােৎকর্ষ ও বহুল প্রচার হিসাবে কবির রচনাবলীর মধ্যে গুলিস্ত। প্রথম ও বােস্ত। দ্বিতীয় স্থান অধিকার করিয়াছে। কর্মক্ষেত্ৰলৰূজ্ঞান, অভিজ্ঞতা, পৰ্যটনকালীন পুঙ্খানু- পুঙ্খরূপে মানব চরিত্র অধ্যয়ন ও ইহাদের সহিত ঈশ্বরানুরাগ, পবিত্র রুচি, কবির আজন্মপ্রকৃতিগত ছিল বলিয়াই তাহার পক্ষে বােস্তা ও গুলিস্তর মত সৰ্বগুণান্বিত কাব্য রচনা সম্ভব হইয়াছিল। বাল্যে কবির তরুণহৃদয়-ক্ষেত্র যে ঈশ্বরানুরাগ জ্ঞানান্বেষণের বীজ উপ্ত হইয়াছিল, বয়ােবৃদ্ধির সহিত তাহা ক্রমে অঙ্কুরিত হইয়া পরে পল্লবিত, পুষ্পিত ও ফলবান বৃক্ষে পরিণত হয়। বােস্ত। কবির জীবন- বৃক্ষের সুরভিপূর্ণ প্রস্ফুটিত পুষ্প; গুলিস্ত। এই বৃক্ষের সুস্বাদু ফল। সংসার-যুদ্ধে ক্ষতবিক্ষত, সংসারতাপদগ্ধ মানব, পথভ্রান্ত পথিক, প্রিয়জন-বিয়ােগ-কাতর, এই বিশাল মহীরুহের সুশীতল ছায়ায় আসিয়া শান্তিলাভ করে, তত্ত্বান্বেষী এই বােধিমতলে আসিয়া তত্ত্বজ্ঞানের সন্ধান লাভ করে। যে যুগে শেখ সাদী আবির্ভুত হন, সেই দ্বাদশ শতাব্দীতে পারস্যদেশে উৎকৃষ্ট সাহিত্য-নিদর্শন অতি অল্পই ছিল, যাহাকে আদর্শ করিয়া কবি সাহিত্য-জগতে অগ্রসর হইতে পারিতেন। কবি তাহার অমানুষী প্রতিভা বলেই উৎকৃষ্ট ও আদর্শ সাহিত্য সৃষ্টি করিয়া পারস্য সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেন এবং কৰি সৃষ্ট সাহিত্য, আদর্শ সাহিত্যরূপেই সম্মানিত হয়। কবির জীবন-বৃক্ষের প্রস্ফুটিত পুষ্প বােস্তা ও সুস্বাদু ফল গুলিস্তর অবিনশ্বর গুল-সৌরভে বিশ্বজগৎ সৌরভাকুল। কবির সুললিত বাক্যবিন্যাস, শব্দচয়ন, অলঙ্কারের সমৃদ্ধ সুষমা, ইন্দ্রজালময়ী কাব্যমায়ার বিচিত্ৰবিকাশ, বর্ণনার বিচিত্রভঙ্গী, নানাবিষয়িনী রচনার মধ্য দিয়া পরম উৎকর্ষ লাভ করিয়াই ক্ষান্ত নহে, ভাবের অনুভূতিতে, [ ৭০ ] f উন্মেষণে, মানব চরিত্র অধ্যয়নে, অভিজ্ঞতায়, চিন্তাশীলতার বিকাশেও চরম সার্থকতা লাভ করিয়াছে। সাধারণ পাঠক কবির কোমলকান্ত পদাবলীর মধুর ভাবে ও সৌন্দর্যে মুগ্ধ হন, ধীশক্তিসম্পন্ন তীক্ষ্ণবুদ্ধি সমালােচক তাহার স্বভাবসিদ্ধ সমালােচনা ভুলিয়া কবির রচনার সৌন্দর্য, দার্শনিকতা পূর্ণ নীতিকথা ও ভাবের প্রবাহে নিজেকে হারাইয়া ফেলেন। সাদীর সৃষ্ট সাহিত্য স্বর্গীয় মাধুরী ও তাবে অনুপ্রাণিত, সমস্ত হৃদয় দিয়া বুঝিবার, উপভােগের বস্তু, ইহাতে সমালােচনার স্থান নাই। কবির ভাব-সৌন্দৰ্য-পূর্ণ স্বাভাবিক চিত্রগুলিকে স্বর্গীয় অধ্যাপক আদালত খা রাজকীয় অস্ত্রাগারের সহিত তুলনা করিয়া বলিয়াছেন, রাজকীয় অস্ত্রাগার যেরূপ ভীষণ ভীষণ অস্ত্রশস্ত্রে পূর্ণ থাকে, কবি শেখ সাদীর ভাব-সৌন্দৰ্যপূর্ণ রচনাবলী জগতের জ্ঞান-পাণ্ডিত্য ও আভিজ্ঞতায় মণ্ডিত হইয়া কবির অমর তুলিকায় যেন নব নব সাজ সজ্জায়। পরিশােভিত হইয়া জগতের কাব্যচিত্রশালাকে মহা ঐশ্বৰ্য্য মণ্ডিত করিয়াছে।* অধ্যাপক ব্রাউন বলিয়াছেন, ব্রহ্মাণ্ডের এমন কোন বিষয় নাই, যাহা এই কাব্যদ্বয় মধ্যে আলােচিত হয় নাই ।। অধ্যাপক আদালত খাঁ বােস্তা ও গুলিস্তাকে যাদুঘরের সহিত তুলনা করিয়া ...... his works may be fairly compared to a « Vast arsenal of ideas drawn from every region of human speculation, and they are either themselves the condensed quintessence of knowledge and wisdom, or the dressing and adorning of the fairest and most majestic conception. Introduction to Bustan. + His (Sadi's) writings are a microcosm of the East, alike in its best and its most ignoble aspects and it is not without good reason that whenever the Persian Language is studied, they are and have been for six centuries and half, the first book placed in the beginers hands. Literary History of Persia. Val ii 1906.
[ ৭১ ] বলিয়াছেন, যাদুঘরে যেমন জগতের নানাদেশস্থ নানাজাতীয় আশ্চর্য আশ্চৰ্য্য জিনিষ স্তরে স্তরে সজ্জিত থাকে, বােস্ত। ও গুলিস্তয় কবি সেইরূপ জগতের এমন কোন বিষয় নাই, যাহার আলােচনা বা সন্নিবেশ করেন নাই। * • প্রকৃতপক্ষে কবি শেখ সাদী যে জগতের শ্রেষ্ঠ কবি- গণের মহান ভাব-সম্পদে ধনী ছিলেন, তাহা বলাই বাহুল্য। ঐতিহাসিক, দার্শনিক, নৈতিক, ব্যঙ্গ ও পরিহাসের চিত্রগুলি কবির উব্বর মস্তিষ্কের ও চিত্রণ শক্তির পূর্ণ পরিচায়ক। পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে মানব- চরিত্র অধ্যয়ন, কবির আশ্চর্য্য ভূয়ােদর্শনের পরিচায়ক। কি নীতি বেত্তা হিসাবে, কি পরিহাসরসিক হিসাবে, সর্ব বিষয়ে তিনি সফল কাম হইয়াছেন ও পৃথিবীর সমস্ত সভ্য দেশে তাহার যশঃ সৌরভ বিস্তৃতি লাভ করিয়াছে। তাহার রচনাবলী হইতে আমার কতকগুলি নৈতিক অনুশাসন (Precepts) সংগ্রহ করিতে পারি, যাহা সর্ব অবস্থায় মানব- জীবনের কল্যাণকর। তঁাহার রচনাবলী পাঠ করিলে মনে হয়, যেন তিনি পয়গম্বরের মত জ্ঞানী হইয়া কাব্যাবলী রচনা করিয়াছেন। সেক্সপিয়য়ের ভাষায় তাহার সম্বন্ধে বলিতে গেলে, বলিতে হয়, -Amuse of fire that would ascend The brightest heavens of invention. সর্বদেশের কবিগণ আত্মশ্লাঘা দোষে দুষ্ট। আত্মশ্লাঘা। ভবভূতি বলিয়াছেন, * উৎপৎস্যতেহস্তিমম কোইপি সমানধৰ্ম্মা।” জয়দেব বলিয়াছেন, শৃনুতদা জয়দেব সরস্বতীম্।” * In a word, it may be properly compared to a Museum, where all sorts of curiosities are richly displayed or to a large and ponderous sword, whose hilt lay at the bands of Sadi. Introduction to Bostan.
[ ৭২ ] সেক্সপীয়র বলিয়াছেন, “Criticise you may but first purchase." মিলটন বলিয়াছেন, .I thence Invoke thy aid to my adventurous song, That with no middle flight intends to soar, Above the Aonian mount, while it persues Things unattempted yet in prose or rhyme. আবার Comus কাব্যে কবি কিরূপ আত্মশ্লাঘা ভরে বলিয়াছেন শুনুন, For I will tell you now, What never yet was heard in fale or song, From old or modern bard, in hall or bower, আমাদের মধুসূদন এইরূপ আত্মশ্লাঘাপূর্ণ স্বরেই “ রচিব মধুচক্র গৌড় জন যাহে আনন্দে করিবে পান সুধা নিরবধি” বলিয়া মেঘনাদ বধ কাব্যের সূচনা করিয়াছেন। এই কাব্যের পাণ্ডুলিপি কবি তাহার বন্ধু রাজ- নারায়ণ বসুকে পাঠ করিতে দিয়া মহান্ আত্মশ্লাঘা ভরে বলিয়াছিলেন, “My dear Raj, this will surely make me immortal.” হাফেজ বলিয়াছেন, আমার কবিতা এত মধুর যে আকাশ মণ্ডল আমার কবিত্বে মুগ্ধ হইয়া মুক্তা বর্ষণ করিতেছে। শেখ সাদীও আত্মশ্লাঘা ভরে বলিয়াছেন, আমি এমন গুলিস্ত। (গােলাপ-গান রচনা করিব যে হিমকুহেলীসমাচ্ছন্ন অথবা পরিবর্তন- শীলু প্রকৃতি কখনও আমার গুলিস্তর (গােলাপ-বাগানের সৌন্দৰ্য্য ও পুষ্প-প্রসবিণীশক্তি নষ্ট করিতে পারিবে না। প্রকৃতির স্বহস্ত রচিত t গােলাপবাগান কােণ দু’দিনের জন্য সৌর বিতরণ করি, অয়িয়া পড়িবে, সময়ে ইহার পুশ-এসবি শক্তি লােপ হইবে, কিন্তু আমায় গােলাপ-গানের পুরভি ক্ষবিনগর এবং গুণ-এরিনী শক্তির ক্ষয় বালােপ হইবে না।” শুধু ইহাই নহে, বােস্ত। কাব্যে কবি আরও বলিয়াছেন, আমার কবিত্বের সৌরভে পারস্য দেশ এতই আচ্ছন্ন ও মুগ্ধ যে তাহারা খইতানের মৃগনাভি পরিত্যাগ করিয়া আমার কবিত্ব-সৌরভের অনুগামী। আমার কবিতার প্রত্যেক শ্লোক মধুর রসপূর্ণ খজুরের মত, যতই, চিবাইবে, ততই সত্য-শিব-সুন্দরের মধুর রস-ধারায় গিন্ধ শতাব্দীর পর শতাব্দী অতীত হইয়াছে, কিন্তু কবি শেখ সাদীয় জীবন-বৃক্ষ জগতের উত্থান-পতন-সংগ্রামে অচল অটল। কবির বাে। ও গুলিস্তার অবিনশ্বর গুল-সৌরভে পৃথিবী আমােদিত। কাব্য- রাজ্যে কবি যে মহান আদর্শের সৃষ্টি করিয়াছেন, তাহা অননুকরণীয় এবং তাহার সৃষ্ট আদর্শ ই পারস্যের সাহিত্য-জগতে কবির সর্বতােরুথিনী প্রতিার স্বাতন্ত্র বা বৈশিষ্টরূপে বিরাজিত। মনীষী ক্লসটন বলিয়াছেন, গুলি। প্রকাশিত হইবার পর ছয় শতাব্দী অতীত হইয়াছে, কবিয় যশ-সৌরভ কেবলমাত্র তাহার জন্মভূমিতেই আবদ্ধ নহে, পৃথিবীর সমস্তু দেশে বিস্তৃত এবং কবি এখনও আদি ও প্রতিভায় মুর্ত-জবর রূপে জগদ্বাসীর নিকট সজিত। অধ্যাপক ব্রাউন বলেন, পারকের * Bex cunturies have passed away since the gifted sage penned his Gulistan ; and his fame has not only contained in his own land and Waroughout the East generally but has spread into all European countries and across the Atlantic, where long after the days of Sadi still stoad the forests primeval. Flowers from A Persian Garden by W. A, Claustan 1889.
[ ৪ ] কোন কবিই আজ পর্যন্ত শেখ সাদীর মত লব্ধপ্রতিষ্ঠ ও প্রথিত যশা হইতে পারেন নাই, কবির যশঃ কেবলমাত্র তাহার জন্মভূমিতেই আবদ্ধ ছিল না, পরন্তু যে দেশে পারস্য ভাষার আলােচনা হয়, সেই দেশেই তার যশঃ বিস্তৃত। * কবির সর্বতােমুখিনী প্রতিভার উজ্জ্বল আলােকরশ্মি-পাতে পারস্য- সাহিত্যের সকল বিভাগই অপূৰ্ব ঐ ধারণ করিয়া ঐন্দ্রজালিকের প্রভাব বিস্তার করে। পারস্য-সাহিত্যের ইতিহাস পাঠ করিলে দেখা যায় যে পারস্য-সাহিত্য নানা ঐশ্বর্যে মণ্ডিত। তন্মধ্যে প্রধানতঃ- পারস্য সাহিত্যের সাহিত্যের (১) সজা (২) গজল, (৩) কসিদা (৪) তসবীব (৫) শ্রেণ বিভাগ। মসনবী প্রভৃতি শ্রেষ্ঠ সম্পদে সমুজ্জ্বল। শেখ সাদীর কুল্লিয়াৎ অর্থাৎ গ্রন্থাবলীর মধ্যে বােস্ত, গুলিস্ত। ও কয়েক খণ্ড রেশাল। ব্যতীত অবশিষ্টগুলি কসিদা ও গজল। এগুলি আরব্য ও পারস্য ভাষায় দীওয়ান। রচিত। শেখ সাদীর সময় হইতেই দীওয়ান অর্থাৎ গজলকে একত্র করিয়া আদ্য অক্ষর অনুসারে প্রকাশ-প্রথার প্রচলন হয়। কবির বন্ধু, বিসহুন নিবাসী আলি বিন আহমদ ৭২৬ হিজরাকে (খ্রঃ ১৩২৫) সাদীর গজলুকে দীওয়ানে পরিণত ও ৭৩৪ হিজরাব্দে (খ্রঃ ১৩৩৩) সম্পাদন করেন। No Persian writer enjoys to this day, not only in his own country but wherever his language is cultivated a wider celebrity on a greater reputation. Literary History of Persia Vol. Il 1906. + Catalogue of the Arabic and Persian Manuscripts in the Oriental Public Library at Radkipore, prepared by Khan Saheb Maulvi Abdul Muqtadir, Vol. I, 1908. Catalogue of the Arabic and Persian Manuscripts in the British Museum, prepored by Charles Rieu, Vol. II.
t ৭৫ ]. গজল একপ্রকার গীতিকবিতা অর্থাৎ ইহা, শুধু কবিতা নয়, গান ও কবিতা উভয়ই। সুন্দরীর সাহচর্যে গায়কের হৃদয়ে যে উল্লাস উখিত হয়, তাহার উচ্ছাস বর্ণনাই গজলের উদ্দেশ্য কবি গজলকে গানের উপযােগী করিয়াই রচনা করেন। ইহাদের গজল, তাহার রূপ, ছন্দভঙ্গীও গীতের উপযােগী। সাধারণ গানের মত উদ্দেশ্য ও ছন্নভঙ্গী। গজল কতকগুলি বয়েৎ বা কলিতে বিভক্ত ; উহার প্রথম বয়েৎ বা কলিকে মৎলা বলে। প্রথম বয়েৎ বা মৎলা এগার হইতে সতের মাত্রায় রচিত হয়। গজলের প্রথম কলি বা মৎলার দুই চরণের পরস্পর মিল থাকে। কিন্তু মৎলার পরবর্তী অন্যান্য বয়ের দুই চরণের পরস্পর মিল থাকে না। অপিচ পরবর্তী বয়েএর শেষ চরণের সঙ্গে প্রথম বয়েৎ বা মৎলার মিল থাকিবে। এই প্রকার মিলই ডাক্তার জেমস রসের (Dr. James Boss) মতে ফাশী এবং ছন্দ-বৈশি। আরবী কবিতার ছন্দবৈশিষ্ট্য। কসিদার ছন্দভঙ্গীও গজলের অনুরূপ। ইহারও মৎলা বা প্রথম কলির দুই চরণের পরস্পর মিল থাকে এবং পরবর্তী বয়েৎএর দুই চরণের পরস্পর মিল না থাকিলেও গজলের মত শেষ চরণের সহিত মৎলার বা প্রথম কলির মিল থাকিবে। ছন্দভঙ্গীতে কসিদা এবং গজল একরূপ হইলেও বিষয় এবং দৈর্ঘ্যে বিভিন্ন। সাদীর গজল গুলি সাধারণতঃ সৌন্দৰ্য, প্রেম ও অধ্যাত্মতত্ত্ব বিষয়ক। ইহা উৰ্দ্ধ সংখ্যা দশ বা বারটি পদ বা বয়ে কসিদা ও গজলের রচিত হয়। কয়িদা সাধারণতঃ গুতি, ব্যঙ্গ, বিভিন্ন রূপ। দার্শনিকতত্ত্ব অথবা নীতিকথা বিষয়ক। গজলের শেষ ছত্রে কবি নিজ তখষ্ণু। অর্থাৎ ভণিতা সংযােগ করেন। কিন্তু ধর্ম, • সাহিত্য ১৩১৩ ও ৯liss Costelo প্রণীত Rose Garden of Persia অব্য। । অধ্যাপক ব্রাউন অনুমান কমেন, দ্বাদশ শতাব্দী হইতে গজলে ভণিতা দিয়ায় এ প্রচলিত হয়।
[ ৬ ] কসিদাতে কোনপ্রকার ভণিতা দিবার প্রচলন অতি অল্পই দেখিতে পাওয়া যায়। অধ্যাপক ব্রাউন বলেন, পারস্য এবং ভারতবর্ষীয় কাব্যরসিকগণ আরবী ভাষায় রচিত সাদীর কসিদাগুলিকে অতি উৎকৃষ্ট রচনার নিদর্শন বলিযা অভিহিত কবিয়াছেন, কিন্তু সাদীর আবী কসিদা সম্বন্ধে বিশেষজ্ঞগণের আরবীয় বিদ্বানগণ উহাকে মাঝারি রকমের রচনা অভিমত। (mediocre performance) afast faitetaan করিয়াছেন।* কবির পারস্য কসিদাও অতি চমৎকার। হাজি লুতফ, আলি খ। বলেন, শেখ সাদীব কসিদা, গজল, নীতি-উপদেশ- পূর্ণ কবিতা ও হাস্যরসাত্মক রচনা কবিত্বে সৌন্দর্য্যে সর্বাঙ্গসুন্দর ও চরমােৎকর্ষে অমূল্য। শেখ সাদীর বাইশখানি গ্রন্থের মধ্যে চারিখানি গজলগ্রন্থ। তন্মধ্যে একখানি খাবিসাৎ (খেউড় গজল) ইব্রাহিম খ। বলেন, শেখ সাদীই as In Persia and India it is commonly stated that Sadi's Arabic Qasidas are very fine. But scholars of Arabic speech regard them very mediocre performances --Literary History of Persia vol. ii o06. + ইস্পাহান নিবাসী বিখ্যাত বিদ্বান ও কবি। কাব্যে ইনি অজব তখন ব্যবহার করিতেন। ১৯৩৪ হিজরাব্দে (১৭২১-২২ খ্রীঃ) জন্মগ্রহণ করেন। উনিশ বৎসর পরিশ্রম করিয়া সুবিখ্যাত আতসকদা (অগ্নি-মন্দিব)-পারস্য কবিগণের 'জীবন-চরিত রচনা কবেন। এই প্রামাণ্য জীবনী গ্রন্থ রচনা করিয়া ইনি সবিশেষ effafsato al Vide catalouge of Persian manuscripts in the Bodlien'Library (Oxford) compiled by Dr. Sachu Vol. I 1879. । সাতসকদা। ৪. অষ্টাদশ শতাব্দীর লেখক ও বারানসীর অধিবাসী। ইহার গ্রন্থের নাম সফোবি ইরাহিম।
[ ৭৭ ] বলী। সর্বপ্রথম পারস্যের গীতি-কুঞ্জের শোভা-সম্পদ বর্জন করেন। আমীর সাদীর গজল গ্রন্থা- দৌলত শাহ বলেন, দিল্লির কবি আমীর খােসরও গজল-রচনায় সাদী অপেক্ষা অধিকতর কৃতিত্ব প্রদর্শন করিয়াছেন। উপরি উক্ত অভিমত সম্বন্ধে মতভেদ আছে। অধ্যাপক ব্রাউন প্রণীত পারস্য-সাহিত্যের ইতিহাস ও ডাক্তার জেমস রসের অনূদিত গুলিস্তাঁর ভূমিকা পাঠে জানা যায় যে, খাকানি, জলি প্রভৃতি সাদীর পূর্ববর্তী কবিগণ গজল রচনা করিয়াছেন। সুতরাং সাদী প্রথম গজল-কবি না হইলেও, তিনি তাহার সমসাময়িক এমন কি পূর্ববর্তী গজলরচনাকারীগণ অপেক্ষা গজল রচনায় অধিকতর কৃতিত্ব প্রদর্শন করিয়াছেন; ঐতিহাসিক হামদুল্লা মুস্তওফি বলেন, গজল রচনায় শেখ সাদী চরমােৎকর্ষ লাভ করেন। এমন কি সাদীর রচিত গজল ভিন্ন পূর্ববর্তী অন্যান্য কবিগণের গজল, গজল নামেরই উপযুক্ত নহে । অধ্যাপক ব্রাউনও বলিয়াছেন, গজল রচনায় শেখ সাদী অন্যান্য পারস্য কবিগণ এমন কি হাফিজ * দৌলত শাহ বােড়শ শতাব্দীর লেখক ও খােরসানের অধিবাসী। আমির আলা উদ্দৌলা ইসফারাইনির পুত্র। তিনি মহত্ত্বে পাণ্ডিত্যে যেমন শ্রেষ্ঠ, তেমনি নিরহঙ্কার ও বিনয়ী ছিলেন। তাঁহার তজকিরাতুন শােয়ার অতি প্রসিদ্ধ ও প্রামাণ্য জীবনী পুস্তক। + পারস্যের অস্তগত কুয়াজিম এদেশের অধিবাসী বিখ্যাত ঐতিহাসিক ও ভূগােল-বিদ্যাবিশারদ। ইনি তারিখ-ই-গুজিদা ও মুজৎ-উল-কুলিৰ নামক দুখানি বিখ্যাত গ্রন্থ রচনা করেন। ৭৫০ হিজাব্দে (১৩৪৯ খৃঃ) দেহত্যাগ করেন। তারিখ-ই-গুজিদা। $ It is in the Persian Ghazal or ode, that he is especially held by orientals to have surpassed all other poets. They even go so far as to say that previous to Sadi there was no ode worthy the name in existence.
[ ৭৮ ] অপেক্ষাও শ্রেষ্ঠ ছিলেন * পারস্য ভাষা ও সাহিত্যে বিশেষজ্ঞ, বঁকিপুর ওরিয়েন্টাল পাবলিক লাইব্রেরীর মৌলভী আবদুল মুক্তাদির সাহেব বলেন, পারস্যে যে সমুদয় গতি-কবি আবিভূত হইয়াছেন, তন্মধ্যে হাফিজকে সর্বশ্রেষ্ঠ বলা যায়। গজলের উৎকর্ষ-জনিত- গৌরব খ্যাতনামা শেখ সাদীর প্রাপ্য সন্দেহ নাই; হাফিজের প্রবর্তিত রীতি যথেষ্টই মার্জিত ও পরিচ্ছন্ন (refined and polished ) এবং তাহার বিশেষ প্রকাশ-সৌন্দৰ্য আজ পর্যন্ত কেবল অনতিক্রম্য হইয়া আছে তাহা নহে, তাহার সমকক্ষও নাই। পারস্যের কবিগণের গজল রচনায় সাদীর মধ্যে সাদীর যশ অবশ্যই প্রচুর এবং তাহার কৃতিত্ব। গুলিস্ত। ও বুস্ত। এই দুটি শ্রেষ্ঠ রচনা তাহাকে অমরু করিয়াছে। কিন্তু হাফিজের সহিত তাহার গজলের তুলনা করিলে একথা অবশ্যই স্বীকার করিতে হইবে যে, সাদীর গজল অধিকতর প্রশংসাৰ্হ।। গজল রচনা বিষয়ে হাফিজকে সাদীর প্রতিদ্বন্দ্বী বলা যাইতে পারে। সাধারণের নিকট হাফিজের গজল রচনা-রীতি ( style) ও প্রকাশ-ভঙ্গিমার (expression) জন্য প্রশংসিত হইলেও পারস্যের গজল-কবিগণের মধ্যে শেখ সাদী শ্রেষ্ঠ ও গুরুস্থানীয় । হাফিজ নিজেও একটী শ্লোকে শেখ সাদীকে গজলের ওস্তাদ-শ্রেষ্ঠ বলিয়া স্বীকার করিয়াছেন, ওস্তাদি গজল সাদিস্ত পেশহর কিস ই আমা দারুদ শখুন হাফেজ তরফ, শখুন খাজু। এমন কি তিনিও সাদীর গজল অনুকরণ করিয়াছেন। সাদীর গজল, হাফিজের সরস অনাহতগতি ছন্দপ্রবাহে পূর্ণ অথবা জালালুদ্দিন রুমির * In his Ghazals, or Odes Sadi is considered as inferior to no Persian poet, not even Hafiz.-Literary History of Persia. Vol. ü 1906. + Khan Saheb Abdul Muqtadir's Catalogue of Persian and Arabic manuscripts Vol I 1908. + k. p. 4, irani.
[ ৭৯ ] ভক্তিরস ও ঈশ্বর-প্রেমের উচ্ছসিত গরিমাময় ভাব-ধারায় পূর্ণ না হইলেও, উহা গভীর করুণরস এবং নির্ভীক সত্যানুরাগেব পরিচয়ে পূর্ণ। যাহা হউক শেখ সাদী প্রথম গজল-রচনাকারী না হইলেও, তাহার দ্বারাই যে পারস্যের গজল-কুঞ্জের শােভা-সম্পদ বর্ধিত হইয়াছিল, তদ্বিষয়ে সন্দেহ নাই। গজল বা গীতি-কাব্য রচনায় কবি শেখ সাদীই প্রথম অমরত্ব লাভ করিয়া সাধারণের শ্রদ্ধা লাভ ও মৌলানা কবি হতিফির । গজলের সার্থকতা সম্পাদন করেন। সমরূক নিবাসী কবি নিজামী-আরুজি বলিয়াছেন, । Sadi's lyrical poems possess neither easy grace and melodious charms of Hafiz's songs nor the over-powering grandeur of Jalaluddin Rumi's divine hymns, but they are nevertheless full of deep pathos and show such a fearless love of truth as is seldom met with in Eastern poetry. Encyclopaedia Britannica, eleventh edition. । পারস্যের শেষ মরমী-কৰি নুরুদ্দিন জামীর ভাগিনেয়। ইহার প্রকৃত নাম আবদুল্লা। হিজরাতের অন্তর্গত জাম নগর ৯২৭ হিঃ (১৫২১ খ্রী:) জন্মগ্রহণ করেন। ইনি কবি নিজামী রচিত খামসা বা পাঁচখণ্ড কাব্যের আদশে অনেকগুলি কাব্য রচনা করেন।শেকান্দার নামার আদশে জাফর নামা রচনা করেন। পারস্য কবিগণের মধ্যে অনেকেই লাইলি-মজনুনের প্রণয় কাহিনী অবলম্বন করিয়া কাব্য রচনা করিয়াছেন, কীন (ii. G. Keeue) সাহেবের মতে কবি হতিফির রচিত লাইলিমজন সর্বপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। + দর শেএরু সেই তন্ পয়রানন্দ। কোলেস্তকে জুমলগি ব আনন্দ। ফিরদৌসি ও আনওরী ও সাদী। হরচন্দ কে লা নবিয় বাদি। ও সমরকন্দের বিখ্যাত বিদ্বান আমি মুইজ্জির ছাত্র। ইহার রচিত ওইসা- গুয়া-রামিন কাব্য বিশেষ প্রসিদ্ধ গ্রন্থ। চাহার মকুলা নামক গ্রন্থের রচয়িতা বলিয়া প্রসিদ্ধ।
[ ৮০ ] সাদীর দীওয়ান ভাবের উদ্দীপক ও চরমােৎকর্ষে পূর্ণ। পারস্যের সাদীই পারস্যের কবিগণের মধ্যে সাদীই প্রথম শ্রেণীর গজল-রচয়িতা গজল-কুঞ্জের শােভা- এবং তাহারই গজল ঐতিহাসিক হিসাবে বিখ্যাত সম্পদ বন্ধনকারী ও প্রথম শ্রেণীর গজল (classic)। অধ্যাপক ব্রাউন, সাদীর গজলের কবি। প্রচার ও জনপ্রিয়তা সম্বন্ধে বলেন, বহুলপ্রচার ও জনপ্রিয়তার হিসাবে হাফিজের পরই সাদীর গজলের স্থান। সাদীর পূর্ববর্তী গজল-কবি কানি ও জবলির পরিচয় যথা সস্তব সংক্ষেপে লিখিত হইল। খাকানি, পারস্যের শেওয়ান প্রদেশ নিবাসী বিখ্যাত কবি। পারস্যের কবিগণের মধ্যে ইনিই সুলতান-উস-শােওয়ার অর্থাৎ কবি-সুলতান-রূপে সম্মানিত ছিলেন। খাকানি’ কবির করিত নাম। প্রদেশে ( আধুনিক এলিজাভেতপল) কবি খাকানি কবি খাকানি। ৫০০ হিজরাকে (১১০৬-৭ খ্রীঃ) জন্মগ্রহণ করেন। কবির প্রকৃত নাম আফজল উদ্দিন ইব্রাহিম বিন আলি শেওয়ান। কবির পিতা সূত্ররের কর্ম করিতেন এবং মাতা প্রথমে খ্রীষ্টধর্মাবলম্বী ছিলেন, পরে মুসলমান হন। কবি খাকানি পারস্যের প্রাচীন কবি ফলকির শিষ্য। সুলতান খাকান মিনুচেহেরূএর রাজত্বকালে প্রাদুর্ভূত বলিয়া শেওয়ান প্রদেশের রাজকুমার কবিকে ‘খাকানি’ উপাধিতে ভূষিত করেন। গজল রচনার জন্যই কবি খাকানি বিশেষ প্রসিদ্ধ। কবি অনেকগুলি গজল- * চাহার মলা। । খাওয়াতিম-ই-সাদীর ভূমিকা। $ ...while his ( Sadi's ) Ghazal or, Odes, enjoy a popularity secoud only to those of his fellow towns man Hafiz. Literary History of Persia. Vol ii 1906.
( ৮১ ) গ্রন্থ রচনা করেন। তন্মধ্যে ‘হাফ-আলিম * বিখ্যাত গজল- গ্রন্থ। কবি পদ্যে 'একখানি ভ্রমণ বিষয়ক গ্রন্থও রচনা করেন। এই ভ্রমণ গ্রন্থখানির নাম তােহফতুল এরাকাইন।” এই গ্রন্থে খাকানি, ইরাকু-আজম, ইরাক-আরব দেশের বর্ণনা করিয়াছেন। ৫৮২ হিজরাব্দে (১১৮৬ খ্রীঃ) তাব্রিজে কবির মৃত্যু হয় এবং তাব্রিজ প্রদেশের অন্তর্গত সােখাব নামক প্রসিদ্ধ স্থানে কবিকে সমাধিস্থ করা হয়। কবি জবলি, গর্জিস্তানের পার্বত্য প্রদেশে জন্মগ্রহণ করেন বলিয়া ইহার নিশবা অর্থাৎ উপাধি আল জাবালি অর্থাৎ পার্বত্যপ্রদেশবাসী। কবির সম্পর্ণে নাম আব্দুল ওয়াসে আল জবলি। কবি জবলিও গজল রচনার জন্য বিশেষ প্রসিদ্ধ ছিলেন। কবি গর্জিস্তান হইতে হিরাত ও গজনায় আগমন করেন। কিছুকালের জন্য গনি-পতি সুলতান বাহরাম সাহ বিন্ মসুদের দরুবারে তিনি রাজকবি কবি বলি। রূপে অবস্থান করেন। কিছুকাল অবস্থান করিবার পর সুলতান বাহরাম সাহের সহিত সুলতান সঞ্জর শ্যালজুকির যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধে সুলতান বাহরাম শাহ পরাজিত হন। কবি এই যুদ্ধ ব্যাপারকে পরিমাময় ভাব এবং ছন্দের মধ্যে প্রকাশ করেন। এই কবিতায় কবি বিজয়ী সুলতানের বীৰ্যবত্তা ও মহিমা কীৰ্ত্তন করেন। সুলতান কবির কবিত্বে মুগ্ধ হইয়া তাহাকে নিজ রাজ্যের রাজকবি রূপে সম্মানের সহিত লইয়া যান। হিজরাব্দে কবির মৃত্যু হয়। ইহার রচিত অনেকগুলি গজল-গ্রন্থ আছে। ৫৫৫ ; সাদীর গজলগুলি চাৰিশ্রেণীতে বিভক্ত ; যথাঃ-(১) তৈয়েবাত, (২) বদায়ে (৩) খাওয়াতিম (৪) খাবিত বা মজহাকাত।
( ৮২ ) তৈয়েরাৎ-কবির সাদাসিদা ধরণের সাধারণ গজল-গ্রন্থ হইলেও বিশেষত্ব পূর্ণ। ইহার বিশেষত্ব সম্বন্ধে সুবিখ্যাত প্রাচ্যভাষাবিৎ সাদীর গজল গ্রন্থের সুপণ্ডিত সার উইলিয়ম জোন্স ও ডাক্তার জেমস শ্রেণী বিভাগ। বলেন, এই গ্রন্থের প্রথম চারিটি গজলের প্রথম দুই চরণ আলিকে ও অপর চরণগুলি ক্রমান্বয়ে আলিঙ্ক ও তৎপরবর্তী বর্ণের সহিত শেষ হয়। বদায়ে—শব্দালঙ্কারপূর্ণ অতীন্দ্রিয় ভাব ও ভক্তিরসপূর্ণ গজল-গ্রন্থ। এই গ্রন্থখানি সাধারণের নিকট অতি শ্রদ্ধার ও আদরের বস্তু। ইহাতে কবি প্রাকৃতিক সৌন্দৰ্য বৰ্ণন ও শ্রীভগবানের মহিমা কীৰ্ত্তন করিয়াছেন। খাওয়াতিম—কবির পরিণত বয়সের রচনাবলীর মধ্যে এই গজল- গ্রন্থখানি গভীর ও গরিমাময় ভাবে পূর্ণ। যে সময় কবি পার্থিব জগৎ হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া ব্ৰহ্মনিষ্ঠ যােগীর মত ধ্যান-জীবন যাপন করিতেন, যে সময়ে কবির মিলনাকাঙ্ক্ষী আত্মা সত্য-শিব-সুন্দরের শ্রীচরণে মিলিত হইবার আশায় সতৃষ্ণ নয়নে অপেক্ষা করিতেছিল, সেই ঈশ্বর-সমাধির পূৰ্ব্বরাগরঞ্জিত মুহূর্তে কবি এই অপূৰ্ব্ব-শ্রীসমন্বিত গজলগুলি রচনা করেন। ইহা পাঠ করিলে বেশ বুঝা যায় যে কবির হৃদয় মন সেই বিরাট বিশালতায় ব্যাপ্ত হইয়া গিয়াছে এবং বিশ্বপ্রকৃতির সমস্ত গরিমা, সমস্ত সৌন্দৰ্য তাহার প্রাণে সংহত হইয়া উঠিয়াছে। খাবিসাত, অর্থাৎ গদ্যে ও পদ্যে রচিত অশ্লীল গজল-গ্রন্থ। অশ্লীল গজলের প্রচলন গজনী রাজাদের সময় হইতে আরম্ভ হইয়া দেশময় * ... the two first lines of the first four Ghazals terminate in an Alií, and the others in succession in each letter of the alphabet.
( ৮৩ ) বিস্তৃতি লাভ করে। বাদশ শতাব্দীর শেষভাগে সাধারণ কবিগণ খেউড় গজলের অপেক্ষা খেউড় গজলের কবিগ সবিশেষ আদরপ্রাপ্ত ইতিহাস। হইতেন, এমন কি তাহারা হকিম (doctor ) উপাধিতে পৰ্য্যন্ত ভূষিত হইতেন। তৎকালীন রুচিতে এই শ্রেণীর রচনা অশ্লীল বলিয়া সাধারণের নিকট বিবেচিত হইত না। কবি শেখসাদী তৎকালীন এক দুশ্চরিত্র রাজকুমারের আদেশে গদ্যপদ্যময় অশ্লীল গজল রচনা করেন। এই সমস্ত গজল নীতিবিৎ কবি ( Ethical Poet) শেখ সাদীর স্বেচ্ছা প্রণােদিত রচনা বলিয়া আদৌ বিশ্বাস করিতে প্রবৃত্তি হয় না। কবি শেখ সাদী এই অশ্লীল রচনার জন্য কৈফিয়ৎ দিয়াছেন ও অনুতপ্ত হইয়া শ্রীভগবানের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করিয়াছেন। তিনি বলিয়াছেন-“ এক বাদশাহ-পুত্র হকিম সােজনীর অশ্লীল গজলকে সাদীর অশ্লীল রচনা আদর্শ করিয়া আমাকে কতকগুলি গজল রচনা করিতে আদেশ করেন। আমি তাহার প্রস্তাব কায্যে পরিণত করিতে অস্বীকৃত হইলে, তিনি আমাকে হত্যা করিবেন বলিয়া ভয় দেখান। প্রাণবধের আশঙ্কায় ভীত হইয়া এরূপ রচনা করিতে বাধ্য হইয়াছি। এই রুচিবিগহিত কর্মের জন্য আমি অনুতপ্ত ও ভগবানের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করিতেছি। পারস্য-সাহিত্যের ক্ষমা প্রার্থনা। ইতিহাস আলােচনা করিলে জানা যায় যে শুধু শেখ সাদীই নহেন, পারস্যের অনেক কবি, নীতিবেত্তা, অমার্জিত রুচি, চিন্তা ও তাব দ্বারা নীতির সীমা উলম্বন করিয়াছেন। Swift, Stern, and other wits of our last and the preceding age could relish indecency and nastiness; and it is creditable perhaps to the present generation that it has no taste for such grossness. This was not, however the case in the age and country in which Sadi flourished any more than it was in the early and best parts of our own literary history.--Introduction to Gulistan, translated by Dr. Ross, '823. + The author, however, seems to have repented of having wrilten these indecent verses, yet endeavours to exçuse himself on account of thus giving a relish to other poems, as "salt is used in the seasoning of meat."-T. W. Beal.
( ৮৪ ) পারস্যের প্রাচীন যুগে যে কবি অশ্লীলতার অবতার রূপে * হকিম উপাধিতে ভূষিত হইয়াছিলেন এবং যাহার অশ্লীল রচনাকে আদর্শ করিয়া কবি শেখ সাদী খেউড় গজল রচনা করিবার জন্য তৎকালীন বাদশাহ--পুত্র কর্তৃক আদিষ্ট হন, সেই খেউড় গজলের কবি হকিম মােজনীর সংক্ষিপ্ত পরিচয় প্রদত্ত হইল। সমরকন্দ নিবাসী হকিম মহম্মদ বিন আলি সােজনী * প্রধানতঃ অশ্লীল এবং বিদ্রুপাত্মক কবিতার জন্যই বিশেষ ভাবে বিখ্যাত। শৈশব হইতে সােজনী প্রধানতঃ অশ্লীল ও বিজ্ৰপাত্মক রচনার অনুশীলন করেন এবং পরিণত বয়সে তাহার প্রতিভা কুরুচি ছাড়া সুরুচিপূর্ণ কবিতা রচনার দিকে অতি অল্প সময়ই নিয়ােজিত হইয়াছিল। হকিম সােজনীর রচিত অশ্লীল গজলগুলির মত অশ্লীলতার এরূপ অত্যুকৃষ্ট নিদর্শন বােধ হয় কোন হকিম সােজনী। সত্য দেশের সাহিত্যে পাওয়া যায় না। ঐতিহাসিক হাইল্লা মুস্তওফি বলিয়াছেন, সােজনী তাহার কাব্যে চরম-অশ্লীলতা প্রকাশ করিয়াছেন। দৌলত শাহ তৎপ্রণীত পারস্য কবিগণের জীবনী পুস্তকে লিখিয়াছেন—সােজনীর কবিতা এতই অশ্লীল যে পড়িলেই বমনের উদ্রেক করে। এই কারণেই তিনি অশ্লীলতা প্রকাশ বৃদ্ধির ভয়ে সােজনীর কবিতা উদ্ধার হইতে বিরত হইয়াছেন। কিন্তু পারস্যের সুপণ্ডিত লেখক ও জীবনীকার মহম্মদ আউফি $ সােজনীর অশ্লীল গজল- * তারিখ-ই-গুজিলাতে-ইহার নাম আবুবকর-ই-ব্রিস সােলমানি বলিয়া উল্লিখিত হইয়াছে। * তারিখ-ই-গুজিদ। + অধ্যাপক ব্রাউন সম্পাদিত, আমির দৌলত শাহ প্রণীত তজকিরাতুশােয়রা $ ইনি মহম্মদ আউফি নামে সুপরিচিত। ইহার প্রকৃত নাম মহম্মদ আবদর অহমান বিন আউফি। আউফি তৎকালীন অনেকগুলি সাধুর জীবনচরিত রচনা করেন। লুবউল আল্বাব,” নামক গ্রন্থের জন্য আউফি বিখ্যাত। আউফি সুলতান নশীৰ্বন কুচারের রাজত্ব সময়ে ভারতবর্ষে আগমন করিয়াছিলেন।
( ৮৫, )
গুলিকে প্রতিভাশালী কবির প্রতিভা-সঞ্জাত রচনা বলিয়া প্রশংসা
করিয়াছেন।* কবির অশ্লীল রচনা ব্যতীত অল্প সংখ্যক সুরুচি ও গভীর
ভাবপূর্ণ কবিতা আছে। ঐতিহাসিক হামদুল্লা মুস্তওফি বলেন, সােজনীর
এই সকল রচনা সুন্দর ও অতুলনীয়। কথিত আছে, নিম্নলিখিত
কশিত রচনার জন্য কবি শ্রীভগবানের ক্ষমার পা।
উহার অনুবাদ প্রকাশ করিলাম --
তােমার এ বিশ্ব-গৃহে নাহি দুখ, নাহি দৈ, নাহি ত্রুটিপাপ,
পাত্র ভরি’ আমি তাহা করিয়া সৃজন বাড়াই সন্তাপ ।
আমরা নিম্নে শেখ সাদীর তৈয়েবাৎ, বদায়ে, খাওয়াতিম, তুর্জায়াৎ
শেখ সাদীর গজলের নামক চারিখানি পারস্য গজল গ্রন্থ হইতে চারিটা
মৰ্ম্মানুবাদ।
গজলের মৰ্ম্মানুবাদ প্রদান করিলাম,
(১)
তােমারি বিরহে প্রিয় পুড়িতেছি পলে পলে
স্মৃতি তবু ধূপ-সম জ্বলে যে মরম-তলে ;
সারাদিন কাটে মাের নীরব বিরহ গানে,
রজনী ফুরায়ে আসে চেয়ে চেয়ে পথপানে;
ঊষার কনক জিনি’ আনন-কমল তব
বারেক হেরিলে, প্রাণ, প্রেম-বসে হবে নব ।
(তৈয়েবাৎ)-
While Awfi, though regarding his facetiæ as full of talent, considers
it best *".-Oriental Biographical Dictionary.
। তারিখ-ই-জিদা।
( ৮৬ )
( (২)
হৃদয়ে আজ দেখছি তােমায় ওগাে পরাণপ্রিয়,
জীবন-মরণ-মিলন-ভূমে দেখছি তােমার হাসি ;
আমার মাটির দেহ তােমার ওষ্ঠে তুলে নিও,
নিপুণ করে বাজিও তাহে হাজার-সুরের বাঁশী ।
মৃত্যু যেদিন ডাবে এসে, ওগাে জীবন-স্বামী,
গানের ফুলে ফুটিয়ে দিয়ে গােপন প্রেমের ভাষা,
শেষের কুটীর বাঁধবাে গিয়ে তােমার দ্বারেই আমি.
ধন্য হব অঙ্গে মেখে তােমার ভালবাসা।
{ বদাযে )-
মুখ-অমৃত হতে, হে চির-বাঞ্ছিত,
বঞ্চিত করিয়া মােয়র করনা লাঞ্ছিত ;
চেয়ে আছে সুধা আশে মানস-চকোর,
নিরজনে দু’নয়নে ঝরে আঁখি-লাের ;
কেমনে বিরহ সহি দহি' মনে প্রাণে
যে জন ব্যথার ব্যথী সেই শুধু জানে।
( খাওয়াতিম )--
( ৪ )
অয়ি, সুন্দরী মম জীবনানন্দ
নন্দন-শােভা-সার।
মম, হৃদয়-কুঞ্জ সৌরভে তব
পুলকিত অনিবার!
[ ৮৭ ]
কি ছার চন্দ্র, মরকত মণি,
মরতে মিলে না ও রূপ লাবণি-
নিখিল শােভার প্রতিমা এ যে গাে
পারিজাত ফুলহার!
ললাট বেড়িয়া কুঞ্চিত কেশ
লীলা ভরে দুলে, হেরি অনিমেষ,
স্থির আঁখি দুটী পলক বিহীন
মিলে না তুলনা তার!
গােলাপ কপােল উষা রাগ সম
ভাবের লহর কিবা অনুপম,
অঙ্গ ঘিরিয়া শতেক ইন্দু
স্নিগ্ধ কিরণ ধার!
| তুজয়াৎ )
পারস্য-সাহিত্যের ইতিহাস আলােচনা করিলে জানা যায়
পারস্যের কাৰ্য-কুঞ্জে তিন জন কবি--পয়গম্বরের আবির্ভাব হয়। কবি
পারস্যের কবি-
শেখ সাদী ইহাদের অন্যতম। পারস্যের কোন
পয়গম্বর।
কবিই আজ পর্যন্ত শেখ সাদীর মত স্বদেশে কি
বিদেশে সম্পূজিত হইয়া কবির নিজ উক্তির সার্থকতা সম্পাদন করিতে
পারেন নাই। হাজি মুতফ, আলী রী বলিয়াছেন, পারস্যের কবি-
প্রতিভার জাগরণ-কাল হইতে আরম্ভ করিয়া আজ পর্যন্ত এমন কোন
* কবি, বাগ্মী, বিদ্বান সর্বত্র পূজিত। খাওয়াতিম-ই-সাদী দ্রষ্টব্য। এই উক্তি
ও কুশাগ্রবুদ্ধি চাণক্যের উক্তি একাৰ্থ সূচক।
[ ৮৮ ] । কবির আবির্ভাব হয় নাই, যিনি ফিৰ্দোসী * নিজামী । আনওরী । এবং শেখসাদী, এই কবি-চতুষ্টয় অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ আসন লাভ করিতে পারেন। কি প্রাচীন, কি আধুনিক যুগের লেখকগণের মধ্যে কবি শেখ- সাদী অসাধারণ জ্ঞানী ও প্রতিভাশালী লেখক; বাগ্মীতা ও রচনা-বৈশিষ্ট্যের জন্য বিখ্যাত চারিজন প্রতিভা-সম্রাটগণের অন্যতম। মােটের উপর বলিতে পারা যায়, যে সমস্ত দুলত গুণাবলীতে কবি শেখসাদীর হৃদয় ও ৩ * পারস্যের প্রথম কবি-পয়গম্বর ; খােরসানের অন্তর্গত তুসনগরের এক সম্ভ্রান্ত বংশে জন্মগ্রহণ করেন। বিখ্যাত মহাকাব্য শাহনামা রচনা করিয়া ফিৰ্দোসী চিরস্মরণীয়। কবির পিতামহ শাদাবে “ফিৰ্দোস” (স্বর্গ ) নামক এক মনােহর রাজ- উদ্যানের অধ্যক্ষ ছিলেন। কবি বাল্যকালে এই রাজ-উদ্যানে ক্রীড়া করিতেন, ইহাকে প্রাণের সহিত ভাল বাসিতেন। এই প্রাণপ্রিয় উদ্যানটীকে চিরস্মরণীয় করিবার জন্য কবি ফিৰ্দোসী তখস গ্রহণ করেন। তাঁহার পিতৃদত্ত নাম হসন। ইংরাজ মনীষী ফ্ল্যাট কিন্সন (Atkinson) পারস্যের মহাভারত শাহনামার অনুবাদ করিয়া ধন্য ও প্রসিদ্ধ হইয়াছেন। । গঞ্জা প্রদেশ নিবাসী প্রসিদ্ধ কবি। ইনি শেখ নিজামী গঞ্জোয়ী, কাহারও কাহারও মতে নেজামুদ্দিন গঞ্জেয়ী নামে পরিচিত। কবি নিজামী মহাবীর আলেক- জাণ্ডারের জীবন-ইতিহাস পদ্যে সেকেন্দার নামা নামে রচনা করেন। উহা পারস্য- সাহিত্যের একখানি সুবিখ্যাত গ্রন্থ। ইহা ব্যতীত কবি দশখানি কাব্য রচনা করেন। তন্মধ্যে (১) মকজা-উল-আশরার (২) লাইলিয়া মজনুন (৩) খুসনাে- সা-শিরিন (৪) হাপত পাইকার (৫) সেকান্দার নাম-পাঁচ খানি কাব্য গ্রন্থ একত্রে “খাসা” নামে প্রকাশ করেন। ১৯৯৪ খ্রীঃ দেহত্যাগ করেন। * পারস্যের দ্বিতীয় কবি-পয়গম্বর। দ্বাদশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে পারস্যের অন্তর্গত খােরসান প্রদেশে জন্মগ্রহণ করেন। কবি আনওরী কসিদা রচনার জন্য সবিশেষ প্রসিদ্ধ। তাহার রচনাবলীর মধ্যে “খােরসানের অশ্রু” নামক কাব্য বিখ্যাত। দ্বাদশ শতাব্দীর শেষ ভাগে বলকানগরে দেহত্যাগ করেন। Captain Kirpatric ‘খােরসানের অশ্রু”পদ্যে অনুবাদ করিয়াছেন। -~ [ ৮৯ ] মন পুর্ণ ছিল এবং গুহ ভাবে তাহাদের বিকাশ লাভ ঘটিয়াছিল, তাহা গুরুত্বে বাস্তবিকতার সহস্রের একাংশের সমতুল্য হইবে না বরং অধিক তর হইবে। যেখানে জ্ঞান, প্রেম, সৌন্দৰ্য্য ও দার্শনিকতা মণ্ডিত নীতিবচন, সেই স্থানেই কবি শেখ সাদীর আবির্ভাব এবং এই স্বর্গীয় চারি বস্তুর সম্মেলনে কবির কবিত্ব পরিস্ফুট। কবির জ্ঞান, কবির অন্তদৃষ্টি, অভিজ্ঞতায় মুগ্ধ হইয়া মীর সৈয়দ আলী মােসতাক । পরম শ্রদ্ধাভরে কবিকে “হাজার গানের বুলবুলি” নামে সম্মানিত করিয়া বলিয়াছেন, কবি শেখ সাদীর অলৌকিক প্রতিভাললাকের উজ্জ্বল হাজার গানের বুলবুলি। রশ্মিপাতে পারস্য-সাহিত্যের সকল বিভাগই অপূৰ্ব্ব শ্রীমণ্ডিত হয় ও ঐন্দ্রজালিকের প্রভাব বিস্তার করে। পারস্যের শেষ মরমী-কবি {MysticPoet) নুরুদ্দিন জামিও $ শেখ সাদীকে পারস্য-কাব্য-কুঞ্জের বুলবুল নামে সম্ভাষণ করিয়া সবিশেষ সম্মান ও শ্রদ্ধা প্রকাশ করিয়াছেন || গদ্য, পদ্য, গজল, কসিদা প্রভৃতি * আতশদ। । পারস্যের বিদ্বান লেখক ও কবি; সুবিখ্যাত চরিত-অভিধান আতশকদা রচয়িতা হাজি লুতফ, অলি খার সাহিত্য-গুরু। * আতশকদা $ কবির প্রকৃত নাম নুরুদ্দিন আবদুর রহমন। ৮১৭ হিঃ (১৪১৪ খ্রীঃ) হিরাতের অন্তর্গত জাম নগরে জন্মগ্রহণ করেন। কবি নিজ জন্মভূমি জামনগরীকে চিরস্মরণীয় করিবার জন্য “জামী” তখলুস গ্রহণ করেন। পারস্যে মহাকবি জামীর মত বিদ্বান ভাষাতত্ত্ববিৎ অতি অল্পই ছিল। কবি ৪৪ খানি গ্রন্থ রচনা করেন। শেখ সাদীর জগদ্বিখ্যাত কাব্য গুলিস্তার' আদশে বহারিন রচনা করেন। নাফৎ-উল-আনাস অর্থাৎ সুফীগণের জীবনী রচনা করেন। কবি ৮১ বৎসর বয়সে ৮৯৮ হিঃ (১৪৯২ খ্রীঃ) দেহ ত্যাগ করেন। || Oriental Biographical Dictionary.
সাহিত্যের সকল বিভাগেই কবির সর্বতােমুখিনী প্রতিভা চরমােৎকর্ষ ও সার্থকতা লাভ করিয়াছে। যে সকল মহামনীষাসম্পন্ন কবিগণের অতুলনীয় কবি-প্রতিভায় পারস্যের সাহিত্য-প্রতিভার জাগরণ হয়, কবি শেখ সাদী তাহাদিগের অন্যতম। শেখ সাদীর রচনাবলী নিমক-দান পারস্য-সাহিত্যের নিমক-দান অর্থাৎ লবণ-ভাণ্ডার রূপে সম্মানিত। লবণ অমৃত বিশেষ অর্থাৎ লবণ ভিন্ন রন্ধনের অন্যান্য প্রচুর উপাদান সত্ত্বেও যেমন কোন ভােজ ব্যঞ্জন সুস্বাদু, মুখরােচক ও তৃপ্তিকর হয় না, তেমন শেখ সাদীর রচনাবলী ভিন্ন পারস্য-সাহিত্যের অন্যান্য লেখকগণের সুরচিত রচনা সত্ত্বেও অপূর্ণ ও অঙ্গহীন ; শেখ সাধীর রচনাবলী পারস্য-সাহিত্য-রত্নহারের উজ্জ্বলতম মধ্যমণি। সংস্কৃত সাহিত্যে যেমন কালিদাস, ইংরাজি সাহিত্যে যেমন সেক্সপিয়র, জৰ্ম্মণ সাহিত্যে যেমন গেটে, ইতালীয় সাহিত্যে যেমন দান্তে, ফরাসী সাহিত্যে যেমন ভিক্তর হিউগাে, হিন্দি সাহিত্যে যেমন সুরদাস, আধুনিক বঙ্গ- সাহিত্যে যেমন রবীন্দ্রনাথ, পারস্য-সাহিত্যে তেমনি কবি শেখ সাদী । কবি শেখ সাদীর প্রাদুভাব-যুগই পারস্য সাহিত্যের সমৃদ্ধির যুগ । সম্রাট আগষ্টস, রাজ্ঞী এলিজাবেথের সময়ের গ্রীক ও ইংরাজী সাহিত্য, রাজা বিক্রমাদিত্যের সময়ের সংস্কৃত সাহিত্য, পাঠান শাসন কালের বঙ্গ সাহিত্য যেরূপ সমৃদ্ধিসম্পন্ন ও বিখ্যাত, পারস্যের সুলতান আবুবকর সাদ বিন জঙ্গীর রাজত্ব কালীন পারস্য-সাহিত্যেও সেইরূপ সমৃদ্ধ ও প্রসিদ্ধ। এই যুগেই পারস্যের কাব্য-কুঞ্জে বিখ্যাত ফরিউদ্দিন আত্তর * পারস্যের প্রসিদ্ধ মরমী-কবি। ইহার প্রকৃত মহম্মদ ইব্রাহিম। ইনি আতর প্রভৃতি গন্ধদ্র্য বিক্রেতা ছিলেন বালয়া নিজ ভনিতা আত্তির রাখেন ; ১১১৯ খ্রীঃ সুলতান সঞ্জরের রাজত্ব কালে নয়পুরে জন্ম গ্রহণ করেন। কবি আর ৪• খানি কাব্য ও অনেকগুলি গদ্য গ্রন্থ রচনা করেন। তাহার গদ্য গ্রন্থের মধ্যে তজ। কিরাতুল আউলিয়া সুবিখ্যাত প্রামাণ্য সুফী-জীবনী। ইংরাজী ও ফরাসী ভাষায় কবির কাব্য অনুদিত হইয়াছে।
[ ৯১ ] মৌলানা জালউদ্দিন রুমি * প্রভৃতি মরমী-কবি, আমির খসরও। হকিম নিজারী + প্রভৃতি প্রতিভাশালী কবিগণের আবির্ভাব হয়। ত্রয়োদশ শতাব্দীর য়ুরােপের সাহিত্যের সহিত পারস্যের সাহিত্যের তুলনা করিলে দেখা যায় যে রােমের অধঃপতনে ছয় শতাব্দী কাল যুবােপ অসভ্যতা ও অজ্ঞানতমসাচ্ছন্ন ছিল; ঠিক সেই সময় আরব্য ও পারস্যের সাহিত্য, দর্শন, বিজ্ঞান, শিল্প কলার চরম বিকাশ হইয়া উন্নতির উচ্চতম শিখরে অধিরােহন করিয়াছে; পারস্য কবিগণের বীণার মধুর ঝঙ্কারে সমগ্র পারস্য মুখরিত হয়। পারস্যের কবি-প্রতিভার জাগরণ-যুগে মহাকবি শেখ সাদী প্রতিভার মুৰ্ত-অবতার রূপে দণ্ডায়মান। রােমের অধঃপতনের পর গরিমাময় বিরাট গ্রীক-সাহিত্যকে আদর্শ করিয়া, যে সময় য়ুরােপে নষ্টশিল্প-সাহিত্য-কীর্তির উদ্ধারের প্রয়ােদশ শতাব্দীর য়ুরােপীয় সাহিত্য ও সূচনা হয়, যে সময় কবি দান্তে সবে মাত্র ভুমিষ্ঠ শেখ সাদীর সময়ের হইয়াছেন, কবি চসার সবে মাত্র ইংরাজি ভাষায় পারস্য সাহিত্য। প্রথম কবিতা রচনা আরম্ভ করিয়াছেন, ঠিক সেই সময়,–নবগঠিত মুখােপীয় সাহিত্যের সূচনার শুভ মুহূর্তে পারস্য কবি শেখ * ইনি কবি শেখ সাদীর সমসাময়িক, পারস্যের অন্যতম সুবিখ্যাত মরমী কবি। ১২০৭ খ্রীষ্টাব্দে বলকা নগরে জন্মগ্রহণ করেন। রুমীর মসনবী ও দীওয়ান জগদ্বিখ্যাত। মসনবী পারস্যদেশে কোরআনের মত শ্রদ্ধা ও ভক্তির সহিত পঠিত হয়। সুবিখ্যাত মসনবীর অনেকগুলি ইংরাজী ও ফরাসী অনুবাদ আছে। E. i, w. Gibbs, Sir James Red House, E. E. Whinfield, R. A. Nicholson প্রভৃতি ইংরাজী আনুবাদক। কবি নিজ গুরুর নাম চিরস্মরণীয় করিবার জন্য দীওয়ানে তাহার নামে—শামশে তাব্রিজ’ ‘তখস’ লিখিতেন। + দিল্লির রাজ-কবি আমির খসরও ৩৫১ হিজরাদে (১২৫২খী) জন্মগ্রহণ করেন। ৯৯ খানি কাব্য গ্রন্থ রচনা করেন। গজল রচনার জন্য কবি বিখ্যাত ছিলেন। কবি নিজামীর মত খামসা অর্থাৎ পাঁচখানি সর্বোৎকৃষ্ট কাব্য একত্র করিয়া প্রকাশ করেন। + কবি শেখ সাদীর সমসাময়িক বিখ্যাত কবি ও বিদ্বান। ইনি অত্যন্ত পিয়ালা-বিলাসী ও উচ্ছ খল চরিত্র ছিলেন। ইহার দীওয়ান ও মসনবী বিশেষ বিখ্যাত গ্রন্থ।-১০ হিজরাব্দে (১২২০ খ্রীঃ) পরলােক গমন করেন।
( ৯২ ) সাদী জ্ঞান-পাণ্ডিত্য-দার্শনিকত্ব ও কবিত্বের উচ্চতম শিখরে সমাসীন। কবি দান্তে তঁাহার জগদ্বিখ্যাত কাব্য ডিভাইন কমেডির স্বর্গ ও নরক বর্ণনার মধ্যে তৎকালীন য়ুরােপের সাময়িক পৰ্ম্ম ও চিন্তার ধারা প্রকট করেন। কবি দান্তে বর্ণিত চিত্রের সহিত মহাকবি শেখ সাদীর সদ্ভাবপূর্ণ চিত্রের তুলনা করিলে স্পষ্টই প্রতীয়মান হয় যে, দ্বাদশ শতাব্দীর পারস্য-সাহিত্য কত উন্নত,সংস্কৃত, বরেন্য ও জ্ঞান-পাণ্ডিত্যে কিরূপ মণ্ডিত। শেখ সাদীর পূর্ববর্তী কবিগণের মধ্যে আসজাদী ফরিক্কি, . ফিৰ্দোসী এবং নিজামী অপেক্ষা কবি শেখ সাদী কোন অংশে নূন ছিলেন না। যুগে যুগে পূর্বোক্ত কবিগণের স্মৃতি শ্রদ্ধার সহিত প্রত্যেক পারস্য-সাহিত্য-রসিকগণের স্মৃতি-পটে মুদ্রিত থাকিবে। অধ্যাপক আদালত খাঁ বলেন, ইহাও স্বীকৃত হইয়াছে যে যদিও উপরােক্ত কবিগণ সারবান উচ্চ কল্পনার জন্য হােমর, সফোক্লিস, ভার্জিল, শেখ সাদীর পূর্ববর্তী ও প্রতীচ্য কবিগুণ। সেক্সপিয়র অথবা মিলটন অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ না হইলেও রচনা কৌশলে, সালঙ্কার ভাষা, রূপক এবং প্রাকৃতিক দৃশ্যাদি বর্ণনে শ্রেষ্ঠ প্রতীচ্য কবিগণের প্রতিভা নিম্প্রভ করিয়াছেন সন্দেহ নাই। তথাপি পারস্য কবিগণের রচনাবলী একেবারে দোষশূন্য * খােরসান প্রদেশের অন্তর্গত তুৰ নগরের অধিবাসী বিখ্যাত কবি। সুবিখ্যাত কবি ফিৰ্দোসীর সাহিত্য-গুরু। কবির ‘দিন ও রাত্র’ নামক সুবিখ্যাত কাব্য ১৮৪৫ খ্রীঃ ফরাসী মহিলা কুমারী লুইস কষ্টিলাে (Miss Loius Costelo) অনুবাদ করিয়াছেন। + গজনীর সুলতান মহম্মদের রাজত্ব কালে প্রদুভুত বিখ্যাত কৰি। কবি আনুশরীর সাহিত্য-শিষ্য। ইহার দীওয়ান বিখ্যাত। # It must he admitted that though they (abrıve named poets) are not superior to Homar, Sophoclis, Virgil, Shakespere. or Milton, in the richuess of sublime thoughts, yet they eclipseil them in the use of florid style, redundant application of the figures of rhetoric and in the faithful deleneation of natores, scenes. Introduction to 31 [ ৯৩ ] নহে, তাহাদের রচনাবলীর অধিকাংশ স্থল উচ্চভাব ও প্রগাঢ় পাণ্ডিত্য পূর্ণ হইলেও তন্মধ্যে স্থানে স্থানে জটিল ভাব ও পদের সমাবেশ দেখিতে পাওয়া যায়। কিন্তু শেখ সাদীর রচনাবলী এরূপ দোষে দুষ্ট নহে। তাঁহার রচনা পারিপাট্য, পদ লালিত্য,এতই স্বাভাবিক ও সরল যে পারস্য ভাষায় সামান্য জ্ঞান থাকিলেই তাহার রচনা পাঠ করিতে কোন প্রকার কষ্ট হয়। না। সারল্যই কবি শৈখ সাদীর রচনাবলীর বিশেষ সৌন্দৰ্য্য ও বৈশিষ্ট্য। যাহা হউক কবি শেখ সাদী তাহার সমসাময়িক, শত শত বৎসর পরেও, আমাদের ও শেখ সাদীর প্রভাব পরবর্তী যুগেও অজেয় ও সঙ্গে সঙ্গে ঋষি এবং দার্শনিক হিসাবে জগদ্বরেণ্য হইয়া থাকিবেন। উপরে আমরা প্রতীচ্য ও সাদীর পূর্ববর্তী কবিগণের সহিত শেখ সাদীর প্রতিভার তুলনা করিয়াছি। এক্ষয়ে আমরা কবির সমসাময়িক হিরাত নিবাসী কবি ইমামীর সহিত তুলনা করিব। প্রথমে কবি ইমামীর সংক্ষিপ্ত পরিচয় দিলাম। ঐতিহাসিক হামদুল্লা মুস্তওফি বলেন, কবির সম্পূর্ণ নাম আবু আবদুল্লা মহম্মদ বি আবু বকর বি উথমন।* কবি হিরাতে এক সম্ভ্রান্ত কাজী বংশে জন্মগ্রহণ করেন। হিরাত কবির আদি বাসস্থান হইলেও তিনি জীবনের অধিকাংশ ইমামী ও শেখ সাদী সময় কীরমা ও ইস্পাহানে অতিবাহিত করেন। খােরসান প্রদেশের মধ্যে একজন বিশিষ্ট বিদ্বান ও কবি রূপে পরিচিত ছিলেন। কবি ইমামী, কবি শেখ সাদী ও কবি খােজা মজদ্দিন হামগরেরা * তারিখ-ই-গুজিদা। । ঐতিহাসিক হামদুল্লার মতে ইনি হামগর ফারুসী ও r. w. Beal সাহেবের মতে মজদ্দিন হায়বৎউল্লা নামে পরিচিত। কবিতার মধ্যে ইনি রিহি এবং মজদ- দুই প্রকার ভনিতা ব্যবহার করিতেন। বীল সাহেব বলেন, কবি সিরাজ নিবাসী ও আনুসারওয়ান বংশােদ্ভূত। শেখ সাদীর সমসাময়িক ছিলেন।
( ৯৪ ) : সমসাময়িক ছিলেন। ঐতিহাসিক হা ফ বলেন, এক সময়ে পারস্যের চারিজন বিখ্যাত বিদ্বান-খােজা শ্যামসুদ্দিন (১)মালিক মুইউনদিন পারওয়া (২) মৌলানা নুরুদ্দিন সিদি এবং মালিক ইঞ্চিখা- বুদ্দিন প্রত্যেকে পরামর্শ করিয়া শেখ সাদী, ইমামী ও মহম্মদ হানগর কবি ত্রয়ের মধ্যে রচনা-বৈশিষ্ট্য ও কবিত্বে শ্রেষ্ঠত্বের মীমাংসার জন্য মহম্মদ হামগরের নিকট প্রত্যেক কবির রচনার কিয়দংশ পাঠাইয়া দেন। মহম্মদ হামগর, কবি ইমামীর উৎকর্ষ সম্বন্ধে অত্যুক্তি করিয়া কবি ইমামীকে কৰি শেখ সাদী অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ বলিয়া অভিমত জ্ঞাপন করেন। । তিনি বলেন, আমি কিংবা শেখ সাদী কবি ইমামীর প্রতিভা, শিল্প-চাতুৰ্য্য ও কবিত্বের নিকট অতিশয় হীন। কবি ইমামীর সহিত আমার কিংবা শেখ সাদীর তুলনা হইতে পারে না। এই অত্যুক্তি পাঠ করিয়া হাজি লুতফ, আলি খাঁ, কবি শেখ সাদীর শেখ সাদীর প্রতি যুগে কবির অনাদর, অবিচার দেখিয়া বলিয়াছেন, সাহিত্য-সমাজের সুখের বিষয় এ যুগে মহম্মদ হামগরের মত, শ্রেষ্ঠ মনােভাব। কবির কবিত্বের অপমানকারী নাই। এজন্য ভগবানকে শত ধন্যবাদ! এ কথা সত্য বটে, কবি ইমামী, মহম্মদ হামগর অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ ছিলেন এবং তৎকালে এমন কোন কবি ছিলেন না যাহার সহিত পারস্যের সুবিখ্যাত কবি শেখ সাদীর সহিত তুলনা হইতে পারে। আর এক খানি গ্রন্থে মহম্মদ হামগরের তুলনা- প্রসঙ্গে যাহা লিখিত হইয়াছে, তাহা আমি যথা সম্ভব সংক্ষেপে এইস্থানে + * Catalogue of Persian and Arabic manuscripts in the oriental Public Library Vol I 1908. + ণুজহৎ-উল-কুলিব। Catalogue of Persian and Arabic manuscripts in the oriental Public Library..
[ ৯৫ ] লিপিবদ্ধ করিলাম । এক ব্যক্তি অপর এক ব্যক্তিকে করিতেছে, মহম্মদ হামগর, বিখ্যাত কবি শেখ সাদীর প্রতিভাকে উপেক্ষা করিয়া কবি ইমামীর প্রতিভাকে শ্রেষ্ঠ আসন দিয়াছে। এ বিষয়ে আপনার মত কি? তিনি বলিলেন, মহম্মুদ হামগরের বিদ্যা, বুদ্ধি যেমন, সেইরূপই তিনি বিচার করিয়াছেন। কালের বিচারে কবি শেখ সাদী চিরদিনই বিখ্যাত ও চিরস্মরণীয়। * উপরােক্ত কথােপকথন হইতে শেখ সাদী সম্বন্ধে কবির যুগের ও পরবর্তী যুগের সাহিত্য-সমাজের মনােভাব অবগত হইতে পারা যায়। ইহা হইতে প্রতিপন্ন হয় যে কবি শেখ সাদী সকল যুগেই বরেণ্য, শ্রেষ্ঠ ও অনতিক্রম্য ছিলেন। সাধারণতঃ দেখিতে পাওয়া যায়, কবি, লেখকগণ কোন-না-কোন উদ্দেশ্যের অনুবর্তী হইয়াই রচনা কাৰ্যে অগ্রসর হন। কবি কির্পোসী ফিৰ্দোসী ও সুবিখ্যাত শাহনামা রচনা কালে এক বিশেষ শেখ সাদী। উদ্দেশ্য সম্মুখে রাখিয়াই মহাকাব্য রচনা করেন। সমগ্র পারস্যের—ইরান, তুরানের রাজবংশের শৌর্য-বীৰ্য-কীর্তি-কাহিনী গৰিমাময় ছন্দে বর্ণন করিবেন, এই বিরাট ভাবের উন্মাদনায় বা মােহে আত্মহারা হইয়া প্রাণপাত পরিশ্রম করিয়া জগদ্বিখ্যাত মহাকাব্য রচনা করেন। ওমর খৈয়াম, মৌলানা জলালউদ্দিন রুমি ভাব-প্রবাহ দ্বারা অনুপ্রাণিত হইয়া রচনা করেন। কিন্তু শেখ সাদী সেরূপ প্রকৃতির ছিলেন * আতশকদা। । পারস্যের কবি-জ্যোতির্বিদ। ১৪.খীষ্টাব্দে খােরসান প্রদেশের অন্তর্গত নয়সাপুর নামক পল্লীতে জন্ম গ্রহণ করেন। এমন তবু নির্মাতার পুত্র ছিলেন। কবি নয়দপুরের নিজামিয়া মাদ্রাসায় সুফী সম্প্রদায় অশীতিপর বৃদ্ধইমাম মুয়াফিকের নিকট বিদ্যা শিক্ষা করেন। ওমরের তুল্য বিদ্বান, বৈজ্ঞানিক, দার্শনিক, গণিত, জ্যোতিষশাস্ত্রবিৎ পণ্ডিত ও স্বাধীন চিন্তাশীল ব্যক্তি তৎকালে কেহই ছিলেন না। স্বাধীন চিন্তার জন্য য়ুরোপীয় পণ্ডিতেরা তাহাকে ভলটেয়ারের সহিত তুলনা করিয়া- ছেন। পারস্য দেশে কবি হিসাবে তার কোন যশ ছিল না। পারস্যের সুবিখ্যাত [ ৯৬ ) । তাহার রচনাবলীর সম্বন্ধে বলিতে পারা যায় যে তিনি ফিৰ্দোসীর মত কোন প্রকার মুখ্য বা গৌণ উদ্দেশ্যের অনুবর্তী হইয়া রচনা করেন নাই। তিনি যে বাণী দান করিয়াছেন, তাহা নিঝর মুক্ত বারি-প্রবাহের মত আপন বেগে তরতর ভাবে প্রবাহিত হইয়াছে। তঁাহার রচনাবলী পাঠ করিলে বুঝিতে পারা যায় যে তিনি কুত্রাপি লিপি-নৈপুণ্য প্রকাশের চেষ্টা বা পরিশ্রম করেন নাই। উহ) সহজ সরল অনাহত ছন্দ- প্রবাহের মত কবির অজ্ঞাতসারে ভগবৎ প্রেরণায় আপনাআপনি ফুটিয়া উঠিয়াছে। মানব-জীবন-রহস্যের গূঢ় সন্ধান বা কোন প্রকার দার্শনিক তত্ত্বের মীমাংসা বা কোন প্রকার উপদেশ দেওয়া কবি শেখ সাদীর মুখ্য বা গৌণ উদ্দেশ্য ছিল না। তিনি নিজে যেরূপ পবিত্র রুচি, উদার ও ঋষি-চরিত্র ছিলেন, তাঁহার রচনাবলীতে তাঁহার সেই ভাবই মূর্তি পরিগ্রহ করিয়া আত্মপ্রকাশ করিয়াছে। কবি জলালউদ্দিন রুমি ও ওমর খৈয়ামেব রচনাবলী পাঠ করিলে যায় তাহারা দ্বারা প্রাণিত হইয়া রচনা করিয়াছেন। শেখ সাদী তাহাদের কাব্যে একই ভাবের স্রোত সমভাবে জলালউদ্দিন রুমি, প্রবহমান। শেখ সাদী কোন প্রকার মুখ্য আদর্শের ওমর খৈয়াম গণ্ডীতে আবদ্ধ ছিলেন না। আমাদের মনে হয়, সেই কারণ তাহার কাব্যে ভাব-বৈচিত্র বিশেষ ভাবে ফুটিয়া উঠিয়াছে। মুখ্য উদ্দেশ্য অনু কাব্য জীবনীকার আউফি, দৌলত শাহ প্রভৃতি ভঁহার সম্বন্ধে কিছুই লেখেন নাই। মিরসাদউল ইবাদ, তারিখ-উল-হকুমা, নুজহৎ-উল-বিলেদ, জামি-উৎ-তওয়ারিখ প্রভৃতি প্রাচীন ও প্রামাণ্য পারস্য ইতিহাসে ওমর বিদ্বান ও জ্যোতির্বিদরূপে সসম্মানে উল্লিখিত। ১৮৫৬ খ্রীষ্টাব্দে সুকবি ফিটজারল্ড ওমরের চতুস্পদী অনুবাদ করিলে বিশ্বের সাহিত্য-রসিকগণ ওমরের নামে জয়ধ্বনি করেন। ইংরাজী, ফরাসী, রুশিয়, ইটালী, জম্মণ, প্রভৃতি য়ুরােপীয় ভাষায় ওমরের চতুস্পদীর অনুবাদ প্রকাশিত হইয়াছে। বাঙ্গালা ভাষাতেও ওমরের কবিতার অনেকগুলি অনুবাদ প্রকাশিত ত [ ৯৭ ] আমাদের মধুসূদন ও রবীন্দ্র নাথে, মিলটন ও ওয়ার্ডসওয়ার্থে যে পার্থক্য, ফিৰ্দোসী ও শেখ সাদীতে সেই রূপই পার্থক্য। ফিৰ্দোসী কবি-প্রকৃতির মিলটন ও মধুসূদন মহা আড়ম্বরের সহিত গম্ভীর পার্থক্য ছন্দে শিল্পীর মত পরিশ্রম করিয়া মহাকাব্য রচনা করিয়াছেন, আর শেখ সাদী, 'ওয়ার্ডসওয়ার্থ ও রবীন্দ্র নাথের কাব্য আপনার মহিমায় আপনি পরিস্ফুট। কবি লালউদ্দিন রুমির মত কবি শেখ সাৰী সুফী গুরু ছিলেন না। ওমরের চতুষ্পদীতে সংশয়বাদ ও দুঃখবাদ যেরূপ আত্মপ্রকাশ করিয়াছে, কবি শেখ সাদীর কাব্যে সেরূপ কোন লক্ষণই লক্ষিত হয় না। কবি শেখ সাদী নিজের ভাবেই বিভাের ; এই আত্মসমাহিত শেখ সাদীর কাব্যে বিশেষ ভাব ও ভাব বা প্রেরণার দ্বারাই জগতের কাব্য-চিত্রশালায় সৌন্দয্য। তিনি আপনার স্বরূপ মূর্তি প্রকট করিয়াছেন। মােটের উপর বলিতে পারা যায়, তাহার কাব্য অতীন্দ্রিয় ভাবে পূর্ণ এবং ইহাই কবি শেখ সাদীর রচনাবলীর বিশেষত্ব, বিশেষ সৌন্দর্য্য ও সূক্ষ্ম দ্যোতনা (Grace and delicacy ) কবি শেখ সাদীর চিত্ত গঠনের সহিত আমাদের কবি রবীন্দ্র নাথের বলিষ্ঠ ও বিনয় নম্র চিত্তের প্রচুর সাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায়। তাহার সুবিখ্যাত সঙ্গীত “আমার মাথা নত করে দাও শেখ সাদী ও রবীন্দ্র নাথের হে তােমার চরণ ধুলার তলে” এবং শেখ সাদার মানসিকতার সাদৃশ্য। “কর পরমেশ পিপীলিকা মােরে, যে খুসি দলুক পায়” যেন একই হৃদয়ের সমপৰ্যায়ভুক্ত উক্তি। কিন্তু রবীন্দ্র নাথ যখন হইয়াছে। বিখ্যাত রাজেন্দ্র লাল মিত্রের বিবিধার্থ সংগ্রহ, পত্রিকায় সর্বপ্রথম ওমরের কতকগুলি রুবাইয়ের বাঙ্গালা অনুবাদ প্রকাশিত হয়। ৫১৭ হিঃ (১১২৩ খ্রীঃ) পরলােক গমন করেন।
[ ৯৮ ]
বলেন, “হাস্য মুখে অদৃষ্টেরে করব মােরা পরিহাস” কবি শেখ সাদী
তখনও জানেন—“মিনতি অথবা রােদনে কোথায় ভাগ্য ফিরেছে
কার?” তাই বলিয়া তাহাকে অদৃষ্টবাদীও বলা যায় না। তাহার
মত বিশ্বাসের জোর আমরা অল্পই দেখিতে পাই।
যখন তার
মুখে শুনি,
করেছ স্বরাষ্ট্র অন্তরে দিয়া ত্রিলােক চালক মন,
দশ ইন্দ্রিয়ে দশ দিকে যার উদ্যত প্রহরণ ;
তবু চিরঋণী সংশয় দীন ভয়ে ভয়ে হই সারা
পাছে না করগাে প্রতি দিবসের আহাৰ্য আয়ােজন।”
(গুলিস্ত)
তখন তাহার ভগবৎ-ভিত্ত আত্মশক্তি-নিষ্ঠার ভিতর হইতে আমরা
যেন আমাদের রবীন্দ্রনাথেরই কণ্ঠে শুনিতে পাই,—“হাস্য মুখে
অদৃষ্টেরে করবাে মােরা পরিহাস”। তারপর কবি শেখ সাদী যখন
বলেন,
অক্ষমতায় কণ্ঠ যাবৎ নাহি হয় নির্বাক
প্রতি বাক্যটী উজ্জ্বল করি সত্য ও শুত থাক্ ;
দেবদূত যবে দাঁড়াবেন আসি এ বাণী-সাধন-পিঠে
কোন খানে যাহে নাহি পান কোন তিরস্কারের কঁাক”—
(গুলি)
তখন আমরা যে নির্ভর-দৃঢ় ও ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে সম্পূর্ণ নিঃসংশয় মনের
পরিচয় পাই, তাহার নিকট সসমে নতি জানাইয়া ভাবি,
দেশ কাল কিছুই নহে, মানুষের আত্মবিশ্বাস-সাধনাই সত্য, তাহারই
জয় হউক।
রবীন্দ্র নাথের মানসী বলেন, * আকাশ নহিলে আমারে ধৰিবে
[ ৯৯ ]
কেবা ?” এবং তাহার কাব্য ‘মানসীর’ যে পরিচয় দেয়, তাহাতে
দেখা যায়--
গান তারে সুর দিয়ে পারে নাই ধরিতে
শেখ সাদী ও রবীন্দ্র কি নিভৃতে চুপে চুপে, মােহন নবীন রূপে
নাথের মানস-প্রতিমা। নিখিল নয়ন হ’তে ঢাকা ছিল, সখা, সে
প্রভাতের আলােকেতে ফোটে নাই প্রকাশে ।
(গীতাঞ্জলী)
এই ধরা-ছোঁয়ার অতীত, চির-অতৃপ্ত আকুলতার কল্পরূপ খানি
ত্রয়ােদশ শতাব্দীর পারস্য-কাব্য-কুঞ্জে প্রবেশ করিয়া কবি শেখ সাদীকেও
যে আকুল করিয়া আসিয়াছিলেন, তাহার প্রমাণ
জীব জগতের সব চিন্তার উৰ্দ্ধশায়িনী অয়ি,
সকল কৰ্ম্ম, স্বপন, বাণীর অধিগত চিন্ময়ী,
বার বার তব উপাসনা-শেষে ছেড়ে চলি মসজিদ
অর্থ তােমার না বুঝিয়া তবু চির বিস্ময়ে রহি।
(গুলিস্ত।)
মানসীর নিকট রবীন্দ্র নাথের প্রার্থনা
শুধু বীণা খানি দাও হাতে তুলি
বাজাই বসিয়া প্রাণমন খুলি
এবং এই কাৰ্য্যেই তিনি এত তন্ময় হইতে চান যে আর দ্বিতীয়
কিছুই চান না।
যার যাহা আছে তার থাক তাই
কারাে অধিকারে যেতে নাহি চাই
শান্তিতে যদি থাকিবারে পাই
একটী ঘরের কোণে।
[ ১০০ ]
কবি শেখ সাদীও ঠিক এইরূপই তাহার মানস-উপাস্যের রূপে
হৃদয় ভরিয়া লইয়া সৰ্বত্যাগে প্রস্তুত। তিনি বলেন,
নিত্য দিনের সেই মানসী নিখিল শােভার মূর্তি খানি
বারেক তারে পাই যদি গাে ঘুচে যে যায় সকল গ্লানি;
পূর্ণভাবে এই জীবনে সেই রূপসীর সঙ্গ পেলে
বিশ্ব ত্যাজি বিজন গুহায় রইব আমি সকল ফেলে।
( খাওয়াতিম-ই-সাদী।)
ই-সাদী
চির বাঞ্ছিতের অন্বেষণ ও প্রতীক্ষা রবীন্দ্রনাথ ও শেখ সাদীর
জীবন-বীণাকে যেন একই সুরে ঝঙ্কৃত করিয়া তুলিয়াছে। এদিকে
রবীন্দ্রনাথ জীবন-দেবতার উদ্দেশে বলেন,
প্রভু, তোমা লাগি আঁখি জাগে
দেখা নাহি পাই
পথ চাই,
সেও মনে ভাল লাগে।
( গীতাঞ্জলী)।
অপরদিকে শেখ সাদীর মুখেও সেইরূপ শুনি?
আশা আছে জীবন-পথেই
বিরহেরি অন্ত হবে ;
চির যুগের শূন্যতা সে
তােমার প্রেমে পূর্ণ রবে।
( খাওয়াতিম-ই- সাদী)
• ওমরের নিম্নোক্তৃত চতুষ্পদীও সাদীর ঐ আকাঙ্খার সাদৃশ্য সূচক।
এইখানে এই তরুর ছায়ে থাকুক সাথে কয়টী জুটি,
একখানি বই কাব্য গীতির, সুরার পাত্র, খানিক রুটি
এবং তােমার গানের নিঝর ঝঙ্কারিত আমার কানে,
নিমেষে এই বিজন মরু স্বৰ্গ শশাভায় উঠবে ফুটি!
শ্রী বিজয়কৃষ্ণ ঘােষ অনুদিত রােবাইয়াৎ।
[ ১০১ ] মানবজীবন যে নিদারুণ বেদনাময় ভগবৎ-বিরহ, এই ধারণা কি রবীন্দ্রনাথে, কি শেখ সাদীতে বারংবার নানা আকারে আত্মপ্রকাশ করিয়াছে। হেরি অহরহ তােমারি বিরহ রবীন্দ্রনাথ শেখ সাদীর ভগৎ-বিরহ। ভূবনে ভূবনে রাজে হে; কত রূপ ধরে কাননে ভূধরে আকাশে সাগরে সাজে হে; সারা নিশি ধরি’ তারায় তারায় অনিমেষ চোখে নীরবে দাঁড়ায় পল্লব-দলে শ্রাবণ-ধারায় তােমারি বিরহ বাজে হে”- ( গীতাঞ্জলী) রবীন্দ্রনাথের এই বিশ্বব্যাপী বিরহ-বেদনা শেখ সাদীকেও ক্লিষ্ট করিয়াছে। তিনিও বলিয়াছেন- তােমারি বিরহে প্রিয় পুড়িতেছি পলে পলে, স্মৃতি তবু ধূপসম জলে যে মরমতলে ; সারা দিন কাটে মাের নীরব বিরহ গানে, রজনী ফুরায়ে আসে চেয়ে চেয়ে পথ পানে ; উষার কনক জিনি আনন-কমল তব বারেক হেরিলে প্রাণ প্রেমরসে হবে নব। (তৈয়েবাৎ ) রবীন্দ্রনাথের বিরহ বিশ্ব-প্রকৃতিতে আরােপিত এবং শেখ সাদীতে উহা বিশেষ প্রকৃতিতে কেন্দ্রীভূত।
[ ১২ ] জীবন-দেবতার আবাহন-কল্পে রবীন্দ্রনাথ বলেন, তুমি এস নিকুঞ্জ-নিবাসে এস মাের সার্থক সাধন, লুটে লও ভরিয়া অঞ্চল জীবনের সকল সম্বল। (গীতাঞ্জলী) আর শেখ সাদী বলেন, “ হে অমৃত! বসে আছি পরশের অশে এস ভব সুধা লয়ে এ কবির প্রাণে ; তােমার বাঁশীর সুরে ধন্য কর দাসে ধন্য হােক দেহ মন প্রেমময় গানে।” ( খাওয়াতিম-ই-সাদী) এই সকল মিল ও ঐক্য সত্ত্বেও রবীন্দ্রনাথের ও শেখ সাদীর নীতি- বাদে একটী গুরুতর প্রভেদ লক্ষিত হয়। রবীন্দ্রনাথ যখন তাহার ভগবানকে ডাকিয়া বলেন- * অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে তব ঘৃণা তারে যেন তৃণ সম দহে।” তখনও শেখ সাদীর নীতিবাদে আমরা দেখি - দোষ করি কেহ যদ্যাপি রােষ জাগায় তােমার প্রাণে, শেখ সাদী ও রবীন্দ্র নির্মল কোরাে হৃদয়, বন্ধু, তারে মার্জনা দানে; নাথের নীতিবাদ।. মনে রেখাে ভাই, পরিণাম তব ধুলি বই নহে আর, ধুলিতেই সবে ফিরিবে আবার জীবনের অবসানে। (গুলি) বলা বাহুল্য, এই শেষােক্ত বিধানটী অপেক্ষাকৃত নিরহঙ্কার এবং খ্রষ্টীয় নীতিবাদেরই অধিকতর সন্নিকট। ভগবানের নিকট হইতে [ ১৩ ] ঘৃণার দাবী করিয়া তাহাকে মনুষ্যেতর করা অপেক্ষা, মার্জনার সাধনায় মানুষকে ভগবৎ-সান্নিধ্যে উন্নীত করিতে চাওয়ার মূল্য সহজেই উপলব্ধি করা যায়। দেশভ্রমণের মানসিক প্রবণতার দিক দিয়াও শেখ সাদী ও রবীন্দ্র- নাথের ঐক্য পরিলক্ষিত হয়। অপরূপকে নানা রূপের সাজে দেশে দেশে ও দিকে দিকে কবি রবীন্দ্রনাথ যেমন দেখিয়া বেড়াইয়াছেন, কবি শেখ সাদীও সেইরূপ তাহার জীবনের দীর্ঘ সময় যে নানা দেশের ও বিচিত্র বিষয়ক জ্ঞান লাভের আশায় পৰ্য্যটনে কাটাইয়াছিলেন, তাহা পূর্বেই উক্ত হইয়াছে। শুধু তাহাই নহে, তিনিও যে আমাদের রবীন্দ্রনাথেরই মত সুবক্তা ছিলেন এবং নানা প্রকাশ্য সভায় ও ধৰ্ম্ম-সমিতিতে চিত্ত- . গ্রাহী বক্তৃতা দিতেন, তাহাও পাঠক পাঠিকারা অবগত আছেন। পারস্যের মধ্যে শেখ সাদী যেমন শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী, শ্রেষ্ঠ বিদ্বান, অতি- দ্বন্দী কবি, শ্রেষ্ঠ নীতিবিৎ, তেমনি শ্রেষ্ঠ ও উদার ধর্ম সাধক-সুফী ছিলেন। কবি জামি বলিয়াছেন, শেখ সাদী সুফিগণাগ্রগণ্য ছিলেন। দ্বাদশ শতাব্দীতে সুফী সম্প্রদায়ে বিস্তর ভণ্ড সুফীর আবির্ভাব হইয়াছিল। কবি এই সজল ভণ্ড সুফীর চিত্র গুলিস্তাঁর দ্বিতীয় অধ্যায়ে অঙ্কিত করিয়াছেন; তাহাদের ভণ্ডামীর কাহিনী প্রচার করিয়া তাহাদিগকে ব্যঙ্গ বিদ্রুপ শ্লেষ দ্বারা কষাঘাত করিয়াছেন। কবি নিজে শ্রেষ্ঠ ও আদর্শ সুফী না হইলে কখনও ভণ্ডের বিরুদ্ধে কষাঘাত করিতে পারিতেন না। আউলিয়া বাস আর আল হাফি সুফীদের সংজ্ঞা নির্দেশ করিয়াছেন, যিনি পবিত্র অন্তঃকবণে ভগবানের উপাসনা করেন, তিনিই সুফী। আবুল হাসন আল নুরী বলিয়াছেন, তিনিই সুফী, যিনি পার্থিব * নাফ-উল-আনাস।
[ ১০৪ ] জগতে থাকিয়া পার্থিব জগতের কোন বস্তুরই প্রতি আকৃষ্ট নন।-- খ্রীষ্টীয় অষ্টম শতাব্দীতে পারস্যের এক ক্ষুদ্র সুফীর সংজ্ঞা। সম্প্রদায় প্রচলিত ইসলাম ধর্ম পরিত্যাগ করিয়া এক নূতন ধর্ম সম্প্রদায় গঠন করেন। এই নবােখিত ধৰ্ম্ম-সাধকগণ ইতিহাসে সুফী নামে পরিচিত। সুফীগণের প্রকৃতি সম্বন্ধে শেখ সাদী বলিয়াছেন, পূর্বকালে সুফীদের প্রকৃতি বিশৃঙ্খল সুফী সম্প্রদায় ও ছিল, কিন্তু আন্তরিক ব্যবহার স্থির ও নিশ্চিত। তাহাদের প্রকৃতি। আধুনিকেরা ভগবানের বিরহে ম্রিয়মান, এই কারণ অন্তরে অশান্তিময়। কিন্তু বাহিরে ধীর বলিয়া বিবেচিত ! কবির আর একটী উক্তিতে এই কথা সুপরিস্ফুট হইয়াছে। তিনি বলিয়াছেন, “আমি সত্য স্বরূপ শ্রীভগবানের নামে শপথ করিয়া বলিতেছি যে যখন তাঁহার বিশ্বব্যাপী ঐশ্বৰ্য্য সন্দর্শন করিলাম, তখন আমার নিকট সমস্তই মিথ্যা বলিয়া প্রতিভাত হইল।” কবির সুফী-চরিত্র সম্বন্ধে সুপ্রসিদ্ধ প্রাচ্যভাষাবিৎ ফরাশী পণ্ডিত Silvestere De Sacy. বলেন, যে সমস্ত ব্যক্তি অধ্যাত্ম-জীবন যাপন করিবার জন্য সুফী সাজিয়া আহারে বিহারে বিশৃঙ্খল টাইয়া সুফী ধৰ্ম্ম-তথা পবিত্র মুসলমান ধৰ্ম্মের অবমাননা করিত, সাদীর সুফি-চরিত্র। শেখ সাদা সেরূপ প্রকৃতির সুফী ছিলেন না। তিনি এই সমস্ত ভণ্ড সাধুগণের চরিত্র চিত্রাঙ্কণ করিয়া তাহাদের ভণ্ডামীর বিরুদ্ধে তীব্র শ্লেষ প্রয়ােগ করিতেন। + Sudi was not one of those hypocritical Sufis who embrace the spiritual life to live in voluptuousness and idleness at the expense of the credulity of pious muslims for he treated with scant ceremony those who brought dishonour on the religious profession by such conduct. Biographical notices of Persian Poets + গুলিস্তার দ্বিতীয় অধ্যায়ের চতুর্বিংশ উপাখ্যান দ্রষ্টব্য।
[ ১০৫] শেখ সাদীর জীবন-অধ্যায় আলােচনা করিলে দেখিতে পাওয়া যায় যে কবি যৌবন হইতে বৃদ্ধ বয়স পর্যন্ত ভক্ত ও ঘােরতর সুফী ছিলেন। তাহার ধর্মবিশ্বাস সুযুক্তি ও পাৰ্থিৰ অভিজ্ঞতা দ্বারা নিয়মিত হইয়াছিল। মৌলানা জালালউদ্দিন রুমির মত তিনি ভাবােন্মাদ ছিলেন । প্রত্যেক ভাবুক চিত্তে যে অনিশ্চয়তার অস্তিত্ব অবশ্যম্ভাবী, তিনিও কখনও কখনও তাহা প্রকাশ করিয়াছেন বটে, কিন্তু ওমর খৈয়ামের কতকগুলি চতুষ্পদীতে যেমন দেখা যায়, সেরূপ শেখ সাদী ও অন্যান্য হতাশার স্থান তাহার মনে ছিল না যাহার তাড়নায় সুফী কবিগণ । অত্যধিক পিয়ালা-বিলাসে মগ্ন থাকিতে হয়। হাফিজের গজলে যে ইন্দ্রিয়পরতার গন্ধ পাওয়া যায়, তাহার মধ্যে আমরা তাহা কচিৎ দেখিতে পাই। শেখ সাদী এ দলের কেহ ছিলেন না, কিন্তু সকল ভাবই কিছু কিছু তাহার মধ্যে ছিল । জলালউদ্দিনের সঙ্গীত আমাদের ভক্তি-সৌম্য মনের দুল্লভ মুহুর্ত গুলির উপযােগী ; হাফিজ আমাদের সহজ স্বাধীন ও আমেজী অবসর গুলির সহচর ; ওমর সংস্কারের সৃষ্টি ঝড়ে উড়াইয়া দেন, মনীষার উচ্চ শিখর অধিকার করেন, নিশ্চয়াত্মিক বিচার বুদ্ধির দ্বারা আমাদের শাসন করেন এবং যখন আমরা আপনাআপন এলাকায় ফিরিবার চেষ্টা করি, তখন তাহার নিকট হইতে কেমন—এক অস্পষ্ট শিহরণ লইয়াই ফিরি। কিন্তু শেখ সাদীর কবিতা মানব-জীবনের যাবতীয় ঘটনারই উপযােগী ; তিনি একাধারে আমাদের বন্ধু ও উপদেষ্টা, উপরন্তু মানব-বন্ধু ও উপদেষ্টা শেখ সাদী। এমন পথপ্রদর্শক, যাহাকে অনুসরণ করিতে, কেহই ভয় বা লজ্জার কারণ অনুভব করেন না। সুফী ধর্মের ইতিহাস পাঠে জানা যায় যে দ্বিতীয় হিজরাব্দ হইতে সুফী সম্প্রদায় শ্রদ্ধেয় ধর্ম সম্প্রদায় রূপে পরিচিত হয়। তৃতীয় হিজরাকে তাহারা নিশ্চেষ্টবাদ (Quietism) হইতে অদ্বৈতবাদ অবলম্বন
[ ১০৬ ]
করিয়া এক নূতন রূপ ধারণ করে। অদ্বৈতবাদী সুফীদিগের মধ্যে দয়িত
এবং প্রেমিক অভিন্ন এই বিশ্বাস হয়, এই ধারণার পর হইতে সুফী সম্প্রদায়
দিনের পর দিন অতিশয় রহস্যময় হইয়া পড়ে। * তৃতীয় হিজরাদে যে
সকল সুফী সাধকের আবির্ভাব হয়, তাহাদিগের মধ্যে
সুফী-ধর্ম ও
বােগদাদের অদ্বৈতবাদী সাধু মনসুর অল হল্লাজের নাম ,
সুফী সাধক।
সবিশেষ উল্লেখ যােগ্য। ইনি “আ-অল-হ” অর্থাৎ
আমিই সত্যস্বরূপ, তিনিই আমি, আমিই তিনি” এই কথা প্রচার করিয়া
প্রাণ হারাইয়াছিলেন। এই সময় সুফীরা মােসলেম-সমাজে অতিশয় লাঞ্ছনা
ভােগ করেন। এই কারণ তাহারা আত্মগােপন করিয়া চলিতেন।
সুফীধৰ্ম্ম পারস্যেই অধিকতর বিস্তার লাভ করিয়াছিল। সুফী-
সাহিত্যই পারস্যের অতিশয় গৌরবের বস্তু। পারস্যের শ্রেষ্ঠ কবিরাই
সুফী ছিলেন। মহাকবি শেখ সাদী, হাফেজ, সনাই, ফরিউদ্দিন
আত্তর, মৌলানা জলালউদ্দিন রুমি, নুরুদ্দিন জামী প্রভৃতি বিখ্যাত সুফী
সাধকগণই সুফী-সাহিত্যকে পুষ্ট ও সমৃদ্ধ করেন।
সুফী-সাহিত্য।
মৌলানা জলালউদ্দিন রুমির মসনবী, নুরুদ্দিন জামী
কাব্য গ্রন্থাবলী, হাফিজের গজল, শেখ সাদীর নীতি-বচন সুফী
সম্প্রদায়ের ধর্মগ্রন্থ (scriptures of sufis)।
সুফীদের মতে প্রেমই মানুষের উচ্চতম ভাব ও প্রেরণা। প্রেমিক :
প্রেমিকার মুখে যে লাবণ্য সৌন্দৰ্য্য দেখে, তাহাই সেই ইন্দ্রিয়াতীত
সতার মহান সৌন্দর্য্য ও অসীম লাবণ্য সুষমার সুস্পষ্ট প্রতিচ্ছবি।
প্রেমিক-প্রেমিকা যেমন দু’টা শিশির বিন্দু গলিয়া এক হইবার মত
পরস্পর পরস্পরের সহিত এক হইয়া মিলিত হয়,
প্রেমই সুফীদের ধর্ম
মানবাত্মাও সেইরূপ সেই ইন্দ্রিয়াতীত মহা সম্ভার
সহিত মিলিত হইয়া সার্থক, সুন্দর ও পূর্ণ হইতে চায়। অর্থাৎ তাহারা
* The Persian Mystic.
[ ১০৭ )
বলিতে চায়, ওগাে, ইন্দ্রিয়ের অতীত মহাপুরুষ! তুমি আমার প্রেমিক
তুমি আমার সখা, তােমাতে মিশিয়া আমার সকল অভাব, সকল দৈন্য,
সকল শূন্যতা, পরিপূর্ণতা লাভ করুক, সার্থক হউক, সুন্দর হউক।
নর নারীর ভালবাসার মুকুরেই ভগবৎ প্রেম প্রতিফলিত হয়। কবি
জামি গাহিয়াছেন “ওগো প্রেমিক, ওগাে সুন্দর ! তােমার সৌন্দৰ্য্যই
(তামার প্রেমই শত শত নর নারীর হৃদয়-দর্পণে প্রতিবিম্বিত হইতেছে।”
স্বামী যেমন স্ত্রীর অংশ, স্ত্রী যেমন স্বামীর অংশ, মানুষের আত্মাও
সেইরূপ ভগবানের অংশ বিশেষ। পরমাত্মার সহিত জীবাত্মার মিলন হয়।
ক্ষুদ্র গ্রহ উপগ্রহ বিরাট সৌর-জগতে প্রত্যাবর্তন করে, অনু পরমানুর
সহিত মিলিত হয়, সেইরূপ যথাসময়ে পরমাত্মার সহিত জীবাত্মারও
মিলন হয়।
মহাকবি শেখ সাদী গাহিয়াছেন,
তােমার সনে মিলন হবে
হবেই একদিন,
ভুলবনা তা জীবন-স্বামী
ভুলেও কোনদিন।
মৃত্যু যেদিন নিদান কালে
আসবে নিতে মােরে
তােমার সাথে মিলন আশায়
রাখবো-হৃদয় ভরে !
অরূপ! তব রূপের নেশায়
বিভাের হৃদয় মম,
আজ হ’তে নয় যুগে যুগে
হে মাের প্রিয়তম ।
[ ১৮ ]
ভাবছি প্রভু, জীবনটী মাের
বধি তােমার সাথ,
সেই বাধনে শত জীবন
কাটাই দিবস রাত।
ক্ষণেক যে গো রইতে নারি
তােমায় ছেড়ে আমি,
পারিজাতের গােয় মম
তৃপ্তি নাহি স্বামি ।
সকল ছেড়ে তােমার দ্বারে
আসি প্রেমের টানে,
বারেক এলে ফিরে যাবার
শক্তি নাহি প্রাণে।
সনাই গাহিয়াছেন,
যাচি শুধু তব প্রেম আর কিছু নয়।
ঐশ্বৰ্য চাহিনা প্রভু, মােহ মায়া ময় ।
প্রেম সাথে ভােগ কভু মিশিতে না পারে
নিয়ত ডুবায়ে রাখ প্রেম-পারাবারে।
তোমারে প্রাণের মাঝে লভেছে যে জন,
দুঃখ জ্বালা তার কভু থাকেনা কখন।
হাফেজ গাহিয়াছেন,
শত শশধর জিনি মুখের শােভা
নিখিলে মিলেনা রূপ হেন মনােলােভা
তােমারি প্রেমের বাসে দিও তিল ঠাঁই
রাজার প্রাসাদে কভু হেন শান্তি নাই'।
[ ১০৯ ]
নুরুদ্দিন জামী গাহিয়াছেন,
জিনিয়ে নিখিল শােভা সে রূপ পরম
হেরেনি জগত কভু, সে মধু লাবণি-
মরতে মিলেনা তার তুলনা রূপের
ইন্দ্রিয় অতীত সেই বিভু গুণমণি।
আপনি মােহিত তিনি আপনার সুরে
ভাষার অতীত তার প্রেমময় তান
কণামাত্র তারি সুধা স্বরগ ও নরকে
বিমােহিত চমকিত করে যত প্রাণ।
অসীম সৃজন ব্যাপি উঠে এক ধ্বনি
“হে বিভা, তােমারি জয়, নিখিলের স্বামী?”
লতায় পাতায় ফুলে
সৌন্দৰ্য্য তােমার,
রাজিছ প্রকৃতি পারে যবনিকা টানি
যে পারে ভেদিতে সেই যবনিকা খানি
নিমেষে মিলে গো তার অরূপ রতন।
ভার প্রেমে নিরাকুল হয়েছে যে জন,
সার্থক জীবন তার, সেই মহাজন।
লালউদ্দিন রুমি গাহিয়াছেন,
তােমাতে আমাতে ঘটিলে মিলন
থাকেনাক ভেদ পার,
শুধু দুটী কায়া বিরাজে বাহিরে
ভিতরে যে একাকার।
المسا
১১০ ]
কানন কুঞ্জ তুমি যবে সাথে
হয় কিবা মধুময়,
বিহগের গীতি, প্রকৃতির শােভা
তুলনা নাহিক হয়।
বৈষ্ণব কবিতায় আমরা যে সমৃদ্ধ মধুর ভাব ও রস দেখিতে পাই, সুফী
কবিতায় তাহার কি অপূর্ব সূচনা!
সুফীদের প্রেম-ধৰ্ম্মের সহিত বৈষ্ণবগণের মধুর রসের সবিশেষ
সাদৃশ আছে। বৈষ্ণবেরাও সুফীদের মত শ্রীভগবানকে প্রেমাস্পদ
বলিয়া আহ্বান করেন। চণ্ডিদাস, বিদ্যাপতি
সুফী প্রেম-ধর্ম ও
বৈষ্ণবের মধুর রস
গােবিন্দদাস, জ্ঞানদাস প্রভৃতি বৈষ্ণব কবিগণের
কবিতা পূর্ণভগবৎ প্রেমের উৎস-ধারা । তাহারাও
সুফীগণের মত সেই চিরসুন্দর ইন্দ্রিয়াতীত পুরুষের অনন্ত বিভূতির
পরিচয় পাইয়া গাহিয়াছেন,
জনম অবধি হাম রূপ নেহারি
নয়ন না তিরপিত তেল
লাখ লাখ যুগ হিয়ে হিয়ে রাখ
তবু হিয়া জুড়ল না গেল।
সুফী কবিগণের মত বৈষ্ণব কবিগণ, সান্তে ও অনন্তের গভীর সম্বন্ধ,
প্রেমের শেষ পরিণাম তন্ময়তা রাধার মুখ দিয়া ব্যক্ত করিয়াছেন,
যাহা হা প অরুণ বরণ চলিয়াত।
তাহা তাহা ধরণী, হও মৰু গাত
যাে দরপণে পহু নিজ মুখ চাহ।
হাম অঙ্গ জ্যোতি হইও তছু মাহ।
[ ১১১ ]
য সরবরে পঁহু নিতি নাহ।
হাম অঙ্গ সলিল হইও তছু মাহ।
যাে বীজনে পঁহু বীজ হত গত ।
মসু অঙ্গ তাহে হইও মৃদু বাত।
আঁহ পঁহ ভরমই জলধর শ্যাম।
মসু অঙ্গ গগন হইও তছু ধাম।
সুফী কবিগণ যেমন ভগবানের সঙ্গলাভের জন্য প্রাণের ব্যাকুলতা
প্রকাশ করিয়াছেন, বৈষ্ণব কবিরাও রাধার বিরহ সঙ্গীতে তাহা
অপূর্ব ভাবে ব্যক্ত করিয়াছেন।
মাধব কহত মিনতি করি তােয়
দেই তুলসি তিল, দেহ সমপি
দয়া জানি ছােড়বি মােয়।
জ্ঞানদাস গাহিয়াছেন,
বঁধূ তােমার গরবে গরবিনী আমি
রূপসী তােমারি রূপে।
হেন মনে করি
ও দুটী চরণ
সদা লইয়া রাখি বুকে।
গরে আছয়ে অনেক জনা
আমার কেবল তুমি।
পরাণ হইতে
শত শত গুণে
প্রিয়তম করি মানি।
সুফী-কাব্য অতীন্দ্রিয় ভাবে পূর্ণ। অতীন্দ্রিয় বই সুফী
কাব্যের চরম ও পরম সৌন্দৰ্য। অতীন্দ্রিয়তা ( Mysticism)
সম্বন্ধে বিশেষ জ্ঞান উপলদ্ধি না করিলে সুফী কবিগণের কাব
[ ১১২ ) গ্রন্থ পাঠ করিয়া যথাযথ ভাবে তাহার ভাব সকল হৃদয়ঙ্গম করা কঠিন ব্যাপার। সুফী-সাহিত্য আধ্যাত্মিকতায় পূর্ণ। এই আধ্যাত্মিক রহস্য ভেদ করিতে হইলে সুফী কাব্যের বাগবিন্যাসপদ্ধতির ( Sufistic phraseology) afro afafsu হওয়া সবিশেষ আবশ্যক; মরমী কবিগণ সাধারণ ভাষায় তাঁহাদের ভাব সকল সুফী কাব্যের ব্যক্ত না করিয়া আধ্যাত্মিকতার আশ্রয় গ্রহণ করিতে আধ্যাত্মিকতা ও বাধ্য হইয়াছেন, যে হেতু সাধারণ ভাষা মানব- সাঙ্কেতিক চিহ্ন। জীবনের সুখ দুঃখ, অভাব, অভিযােগ প্রভৃতি ভাব প্রকাশ করিতে সক্ষম। কিন্তু অধ্যাত্ম জগতের অতীন্দ্রিয় ভাব সমুহ সঙ্কেত ( Symbol) ও অলঙ্কার ব্যতীত প্রকাশ করিরার উপায় নাই। এই কারণে সুফী কবিগণ বিশেষ ভাবদ্যোতক শব্দ বা বাক্য (Expression) ব্যবহার করেন; জগৎ ব্যাপারের প্রতি অনুরাগ, সাময়িক বিচ্ছেদ বেদনার আবরণের মধ্য দিয়া মরমী কবিগণ আপনাদিগকে লুক্কায়িত করেন; পরমানন্দরূপ আধ্যাত্মিক সুরা পান করিয়া স্বর্গীয় দিব্য হর্ষাবেশে আপ্লুত ও রহস্যময় হয়েন। অতীন্দ্রিয়তার জন্ম এই ভারতবর্যে, ভারতবাসী ইহা যেমন অতীন্দ্রিয়তার জন্ম বুঝিবে, জগতের অন্য কোন জাতি তেমন ভাবে বুঝিবে না, কেন না ইহা প্রাচ্যের অস্থি মজ্জায় জড়িত। কোন অতীত যুগের শুভ মুহূর্তে এই অতীন্দ্রিয় প্রথম আলােক সন্দর্শন করিয়াছিল করিয়াছিল এবং মানব-শিশু ধূপগন্ধে কিরূপে তাহাকে বরণ করিয়া লইয়াছিল, তাহার ইতিহাস অতীতের অন্ধকার- গুহায় নিমজ্জিত বটে, কিন্তু উপনিষদ পাঠে জানা যায় যে সুদূর অতীতে বৈদিক ঋষিগণ এই ভাবের ভাবুক ছিলেন, তাঁহারাও ভাববাদী (mystic) ছিলেন। তাঁহারা নদীতীরে আহিতাগ্নি প্রজ্জ্বলিত করিয়া সেই ইন্দ্রিয়ের অতীত সত্তার উদ্দেশে আহতি প্রদান [ ১১৩ ] করতেন। গায়ত্রী মন্ত্রে সেই অতীতেন্দ্রিয় বস্তুকেই সবিতায় “বরেণ্য ভর্গদেব” বলিয়া ধ্যান করিতেন এবং ইহারই অনুভূতি-ইহারই স্পন্দন ইহারই প্রেরণা-রস বৈ হাবসা” রূপে তাহাদের হৃদয়-তন্ত্রে ধ্বনিত হইয়াছিল। দর্শনের যুগেও ইহাই ঋষির বীণায় প্রতিধ্বনিত। সেখানে বৈদিক ঋষিগণ ব্ৰহ্ম, জীব ও জগৎ আর ভিন্ন নয়—আত্মায় সর্বভূতের ও সুফী কবি বিকাশ ও সৰ্ব্বভূতে আত্মার বিকাশের বাণী প্রচা- রিত। বিশ্ব-প্রকৃতির সঙ্গে জীবের ভেদের সােহং এতেই অবসান ইন্দ্রিয়ের সহিত অতীন্দ্রিয়ের মিলন-মন্ত্র-গীতি। শেখ সাদী একাধারে পারস্যের শ্রেষ্ঠ কবি ও মহান নীতিবো ছিলেন। তিনি নিজে মহান ধার্মিক (Theologian) ছিলেন, পরিণত বয়সে যে ধৰ্ম্মজ্ঞান লাভ করেন, তাহাতে একজন --শিক্ষক ব্ৰহ্মনিষ্ঠ সাধু পুরুষ রূপে শ্রদ্ধালাভ করেন। শেখ সাদী তাঁহার প্রতিভা যে সকল সদ্ভাবপূর্ণ উচ্চশ্রেণীর নীতি-বচন কাব্য-জগতে দান করিয়াছে, তাহাতে তিনি একজন অপ্রতিদ্বন্দ্বী নীতি-শিক্ষক রূপে জগতে পরিচিত। শেখ সাদীর নীতি যে অতি মূল্যবান তাহার প্রধান কারণ, উহা আমাদের বাস্তব জীবনের বিশেষ কল্যাণজনক বলিয়া; নীতি সম্বন্ধে উচ্চ ধরণের সুদীর্ঘ বক্তৃতা না দিয়া জগতের কল্যাণের জন্য তিনি সরলভাবে ও সহজ বােধ্য ভাষায় তাঁহার নীতি-বিজ্ঞান প্রচার করিয়া গিয়াছেন। তাঁহার নীতি-বিজ্ঞানে সুফী সুলভ কোন প্রকার শেখ সাদীর জটিল ভাব না থাকায় যথাযথ দৃষ্টান্তদ্বারা সহজ নীতি-বিজ্ঞান বােধ্য হওয়ায় সাধারণে সেগুলির বিশেষ উপকারিতা উপলব্ধি করিয়া জীবনযাত্রার সঙ্গী করিয়াছে। এই সকল পবিত্র নীতি-বচন গুলি তাঁহার পবিত্র-উন্নত জীবন-উৎস হইতে স্বভােৎসারিতভাবে প্রবাহিত হইয়াছে। তাহার নীতি শিক্ষার ।
[ ১১৪ ]
মূল কথা এই যে, জ্ঞান ব্যতীত পার্থিব ঐশ্বৰ্য্য হইতে প্রকৃত সুখ
লাভ হয় না। -সে জ্ঞান, সন্তোষ, দয়া, ক্ষমা, কৃতজ্ঞতা, সাধুতা
ও মহানুভবতা প্রভৃতি হৃদয়ের সৎবৃতি সকলের উৎকর্ষ সাধনে লাভ
হইয়া থাকে।
কবি নিজে জগদ্ব্যাপার রহস্যে অভিজ্ঞ, জ্ঞানী ও
দার্শনিক ছিলেন, তাঁহার নীতি বচন গুলি অল্পাক্ষরগ্রথিত সরস
কবিতায় (Epigram) ও গজলের মধ্য নিয়া নিঝমুক্ত বারিরাশির
আপন বেগে আত্মপ্রকাশ করিয়াছে। প্রাচ্যভাষাবিৎ জন
পণ্ডিত ডাক্তার এখ, (Dr. Ethe Ph. D.) বলেন, মরমী (mystic)
অপেক্ষা কবি শেখ সাদী নীতি-শিক্ষক রূপেই অধিকতর পরিচিত
ছিলেন। *
নিয়ে মহাকবি শেখ সাদীর রচনা-
শেখ সাদীর বাণী :.
বলী হইতে কতকগুলি নৈতিক-বাণী প্রকাশ
করিলাম :-
-
সংযমই অভাব মােচনের প্রকৃষ্ট উপায়।
তুষ্টির পরিতৃপ্তিই মানবকে প্রকৃত সম্পদশালী করিতে পারে।
যথার্থ প্রেমিক হইলেও তুমি কখনও ভােমার প্রেমের অহঙ্কার করিও
, কেননা এই গর্বজনিত পাপ শুধু তােমারই নহে, তােমার প্রণয়ীর
বা প্রণয়িণীরও হইয়া থাকে।
যে তােমাকে তােমার প্রতিবেশীর দোষ শুনায়, নিশ্চয় জানিও সে
তােমার দোষও অন্যের নিকট প্রকাশ করিয়া থাকে।
Catalogue of Arabic & Persian Manuscripts Compiled by
Dr. Etbe.
'
[ ১১৫ ] লােকের গুপ্ত কথা প্রকাশ করিও না, কেননা তাহাদের অবমাননা করিয়া তুমি সুযশ কিনিতে পারিবে না। * দুইটা জিনিষ অমার্জিত ও অপরিপক্ক বুদ্ধির পরিচায়ক—কথা কহি- বার আবশ্যকতায় মৌমাবলম্বন করা, মৌনাবলম্বনের সময় কথা বলা। গন্ধেতেই মৃগনাভীকে চেনা যায়, বােতলের লেবেলে তাহার পরিচয় নাই। জ্ঞানী ব্যক্তি ডাক্তারখানার ভাণ্ড (Vase) বিশেষ—জ্ঞানপূর্ণ কিন্তু স্বল্পভাষী। অজ্ঞানী ঢাকের বাদ্যের মত। সুন্দর চেহারাবিশিষ্ট হইলেই সচ্চরিত্র হয় না। সদগুণ মানব- হৃদয়ে লুকায়িত—দেহের উপর তাহার কোন চিহ্ন থাকে না। জ্ঞানী হইয়াও যিনি অসংযমী, তিনি মশালধারীর সহিত উপমেয়। মশালধারী অপরের জন্য রাস্তায় আলাে দেয় কিন্তু সে নিজের দিকে একবারও তাকায় না। যদি তুমি তােমার বংশমর্যাদা বজায় রাখিতে চাও, তাহা হইলে পুকে সুশিক্ষিত কর । অসৎসংসর্গ হইতে তাহাকে রক্ষা কর। যদি তােমার ভগবদ্ভক্তি থাকে, তবে তোমার ভয় কি? তিনি করুণাসি একমনে তাহাকে ডাকিলেই তিনি সাড়া দিবেন।
[ ১১৬ ]
যদি তুমি বুদ্ধিমান হও, তােমার কৃত পাপকর্মের জন্য তার নিকট
ক্ষমা প্রার্থনা কারও।
*
তুমি যতই বীরপুরুষ হওনা কেন, একখানি শবাচ্ছাদন ব্যতীত আর
কিছুই তােমার সহিত যাইবে না।
তােমার শিশুর জন্য কেন বৃথা ক্রন্দন করিতেছ? শিশু স্বর্গের
মর্ত্তে কি সে থাকে ? সে স্বর্গ হইতে মর্তে আসিয়াছিল—আবার স্বর্গে
চলিয়া গিয়াছে।
যে ভাগ্যবান পুরুষের পত্নী পতিপরায়ণা ও সতী, সে ব্যক্তি দরিদ্র
হইলেও রাজার তুল্য ভাগ্যবান।
*
উদ্ধতা কোপনস্বভাবা সুন্দরী ভাৰ্যা অপেক্ষা।সুশীলা, প্রিয়ম্বদা স্ত্রী
সর্বতােভাবে প্রার্থনীয়।
কলহপূর্ণ গৃহ অপেক্ষা জেলখানা শতাংশে শ্রেষ্ঠ ; যাহার গৃহ মুখর।
স্ত্রীর জন্য অশান্তিপূর্ণ, দেশ ভ্রমণই তাহার পক্ষে মঙ্গলজনক।
কষা জুতা পরা অপেক্ষা নগ্নপদে ভ্রমণ শতাংশে শ্রেষ্ঠ। অশান্তিপূর্ণ
গৃহে বাস করা অপেক্ষা পৰ্যটন-কষ্ট ভােগ শতাংশে ভাল ।
4
ক্রোধের মত শক্ত নাই, অতএব ক্রোধ দমন করিতে অভ্যাস কর।
] ১১৭ ]
এই দেহ একটী নগর বিশেষ, এই নগরে ভাল ও মন্দ উভয় প্রকার
লােক আছে। তুমিই এই নগরের রাজা।তােমার বিবেক এই
রাজ্যের মন্ত্রী
যিনি সাধুতা ও উদারতার সহিত ব্যবসা করেন, তিনি ব্যবসায়ে
ধনী না হইতে পারেন, কিন্তু সাধু ও উদার প্রকৃতিরূপ অতুল ধনে তিনি
মহা ধনী।
দারিদ্রই মানুষকে গৌরবান্বিত করে। রাজ-অট্টালিকাবাসী রাজা
অপেক্ষা পর্ণ-কুটীর বাসী পল্লীর দরিদ্র দম্পতি কুটীরে সুখে নিদ্রা যায়।
;
ধনীর চাটুকারিতা অপেক্ষা দৰুিদ্ৰ সাধুর চাটুকারিতা সহস্র গুণে শ্রেষ্ঠ।
ভিক্ষুক মুষ্টি ভিক্ষায় সন্তুষ্ট হয় কিন্তু সুলতান ফরিদুন সমগ্র পারস্যের
অধিশ্বর হইয়াও সন্তুষ্ট হইতে পারেন নাই।
যিনি তত্ত্বজ্ঞান ও ধ্যান দ্বারা পরপারের সংবাদ জ্ঞাত হন, তঁার তুল্য
ভাগ্যবান আর নাই।
ভণ্ড সাধু অপেক্ষা নিশাচর ডাকাত শ্রেষ্ঠ।
শিক্ষা+হৃদয় কঠোর প্রস্তরের তুল্য।
[ ১১৮ ] গ্রীস বা রােমের কোন দার্শনিক পণ্ডিতই কণ্টক হইতে মধু বাহির করিতে পারেন নাই। হাজার সুশিক্ষা পাইলেও বন্য পশু কখনও মানুষ হয় না।-সে তাহার হিংস্র প্রকৃতি কখনও ত্যাগ করিতে পারে না। যে গৃহ শিশুর কলহাস্যে মুখর নয়, সে গৃহ সুখের নয়- কারাগৃহ। যিনি উচ্চ পদ বা অসীম ক্ষমতার গর্ব করেন, তিনি অহঙ্কারের কৃত- দাস। স্থির জানিও, বিনয় বা নম্রতার মধ্যেই মহত্ব লুকাইত। * তােমার দর্পী নয়ন প্রেমাঞ্জনে মার্জিত কর; তবে ত তুমি মহত্ত্বের উচ্চতম শিখরে অধিরােহণ করিবে। যাহা গ্রহণের অযােগ্য, তাহা কখনাে অপরকে গ্রহণ করিতে, অনু- রােধ করিও না। যদি তুমি দুঃখ পাও, তাহা হইলে অপরকে যেন দুঃখকষ্ট হইতে মুক্ত করিতে চেষ্টা করিবে। # গ যে নীচ, সেই প্রতিহিংসাপরায়ণ, জ্ঞানী এই হীনতা হইতে আপ- নাকে দূরে রাখেন। যে গৃহে পুরুষের অপেক্ষা পুরীর উচ্চকণ্ঠস্বর শ্রুত হয়, সে গৃহের দরজা যত শীঘ্র বন্ধ হয়, ততই মঙ্গল।
[ ১১৯ ] তুমি আজই মুক্তহস্ত হও, যেহেতু আগামী কল্য তােমার সিন্ধুকের চাবী পরহস্তগত হইতে পারে। দেখিও, তোমার দ্বার হইতে যেন কোন প্রার্থী নিরাশ হইয়া ফিরিয়া না যায়। তাহারা চিত্রকরের অঙ্কিত চিত্রে এতই বিমুগ্ধ হইয়াছে যে, প্রেমময় বিশ্ব-চিত্রকরের বিশ্ব-চিত্রের দিকে একবারও তাকাইল না। মন্দ লৌহে কখনও তরবারী প্রস্তুত হয় না। সর্বত্রই সমভাবে বৃষ্টি হয়, কিন্তু লবণাক্ত জমির উপরই তৃণ জন্মে। যে মাটীতে বৃক্ষ রােপণ করিলে বৃক্ষ ফল-ফুলে সুশােভিত না হয়, বৃথা কেন সেই মাটীতে কষ্ট করিয়া বীজ বপন করা। সকলেই স্ব স্ব কৰ্ম্ম ফল ভােগ করে; যশ অথবা অপযশ ভিন্ন কেহই কিছুই রাখিয়া যাইবে না। দীনতার সােপান অবলম্বন করিয়া সাধুতার উচ্চস্তরে আরােহণ কর! দীনতা মানুষকে ছােট করে না। যদি কোন কারণে দুঃখ পাও,-কেহ অত্যাচার করে, শােক করিও । ঈশ্বর ভিন্ন মানুষ কি, সুখ বা দুঃখ দিতে পারে। তিনি যে শত্রু মিত্র সকলেরই মধ্যে বিরাজমান।
[ ১২ ] অসৎ অভিপ্রায় করিয়া প্রকৃত সত্য-কথন অপেক্ষা, সাধু উদ্দেশ্যে মিথ্যা ভাষণ শতাংশে শ্রেয়। দশ জন সাধু অনায়াসে একখানি ছােট কম্বলে শয়ন করিতে পারে। কিন্তু এক রাজ্যে একাধিক রাজার স্থান হয় না। দার্শনিক লুকমানের মত, কদাচারীর নিকট সদাচার শিক্ষা কর; কদাচারীর যাহা খারাপ, সমস্ত বর্জন করিয়া সদাচার গ্রহণ করিবে। তুমি যদি উচ্চ সম্মান লাভ করিতে চাও।--অধীনস্ত ব্যক্তিকে নিজের মত দেখিতে অভ্যাস কর। তাহাকে সামান্য মনে না করিয়া সম্মান করিবে। সুশিক্ষিত ব্যক্তি দূরবর্তী থাকিয়াও নিকটবর্তী, কিন্তু অশিক্ষিত নিকটে থাকিয়াও দূরবর্তী। দুর্বল বলিয়া পিপীলিকারা যন্ত্রণা ভােগ করে, আর বলশালী বলিয়া ব্যাঘ্র হিংসা করে,এরূপ বুঝা ভুল। হিংস্র শাল যেমন কখনও মেষ পালনে সক্ষম হয় না, সেইরূপ অত্যাচারী অবিচারী রাজা কখনও প্রজা পালন করিতে পারে না। যে রাজা প্রজার উপর অত্যাচার করেন, তাহার রাজস্ব দুই দিয়া সর্প-ভীতি ক্রয় করার তুল্য।
[ ১২১ । প্রজার জন্যই রাজার আবশ্যক; রাজার জন্য প্রজা নহে; প্রজারাই রাজ্যের ভিত্তি এবং রাজা সৌধ ; প্রজারা বৃক্ষ-কাণ্ড—রাজা বৃক্ষ। বৃক্ষ, কাণ্ড হইতে শক্তি সংগ্রহ করে, সৌধ মৃত্তিকা মধ্যস্থ ভিত্তির উপর দণ্ডায়মান। সন্তোষের মত শ্রেষ্ঠ ধনদৌলত আর নাই। স্বয়ে সন্তুষ্ট ব্যক্তির কেহ কোন প্রকার ক্ষতি করিতে পারে না। , প্রেমিকের চক্ষে তাহার প্রিয়তমা অতি কুৎসিতা হইলেও অতিশয় সুন্দরী। প্রেম-চক্ষু কৰ্য্যতারও মধ্যে গুপ্ত সৌন্দৰ্য-রেখা নিরীক্ষণ করে। সেই ভাগ্যবান যে বৃক্ষ রােপণ করিয়া তাহার ফল ভােগ করে, আর সেই হতভাগ্য-যে ফলভােগ করিবার পূর্বে পৃথিবী হইতে বিদায় গ্রহণ করে। জীবনের সুখ স্বাচ্ছন্দ্যের জন্যই ধনদৌলত, কিন্তু ধনদৌলত সঞ্চয়ের জন্য জীবন নহে। যাহারা ঈশ্বর-প্রেমে মশগুল, তাহারাই সুখী; তাহারাই তঁাহার বিরহে মুহমান, মিলনে উৎফুল্ল হয়। যাহারা তাহার প্রেমে মসগুল, তাহারা কখনাে তাঁহার প্রেমবন্ধন ছিন্ন করিতে পারে না; অন্যের নিকট তিরস্কৃত হইলেও, তাহারাই ধ্যান-রাজ্যের রাজ কিন্তু তাহাদের রাজ্য সুপরিচিত নয়, বাহিরে [ ১২২ ] যেন ইহারা ঠিক জেরুজালেমের মন্দির ; ভিতরে সবই আছে, কিন্তু দিনের পর দিন যত যাইতেছে, মন্দিরের বাহির ধ্বংস হইতেছে। তিনিই মুক্তি-সিরাজী পান করেন, যিনি ইহকাল ও পরকালের । চিন্তা করেন। ; নিজেকে ধূলির মত তুচ্ছ মনে করিবে; কদাচ লােভী পীড়নশীল, রাগান্বিত হইওনা। মনে থাকে যেন তুমি ধূলির সমান, কদাচ অগ্নির মত উগ্ৰমূর্তি হইওনা। গৰ্বাগ্নি মনের মধ্যে জাগিলেই নিজেকে ধূলির মত তুচ্ছ মনে করিয়া এই অগ্নি নির্বাণ করিবে। যাহারা প্রেমাস্পদ—যাহারা পীরিতি রােগে রুগ্ন , মানুষের কোন ঔষধেই তাহাদের রােগের উপশম হয় না। যেহেতু সংসারীরা এ বােগের ঔষধ জানে না। প্রত্যেক অন্যায় গােড়া থেকে একটু একটু করেই আরম্ভ হয়, পরে মানুষে বড় বড় অন্যায় করে, ক্রমে মানুষ ন্যায় অন্যায়ের বিচারে জ্ঞান শূন্য হয়। বলবীৰ্যশালী অপেক্ষা দাতা শ্রেষ্ঠ ও সমধিক প্রশংসিত। ইহার সাক্ষ্য হাতেম তাই। যেমু সামর্থ্য সত্বেও পরের খাপেক্ষী হয়, সে কুকুরের জাম।
[ ১২৩ ] মানুষের জ্ঞান তার মস্তিস্কেই থাকে, শতহস্তপরিমিত রেশমী পাগড়ীর মধ্যে থাকে না। অন্ধের নিকট বিজ্ঞতা লাভ করিতে শিখ, কারণ অন্ধ ভূমি স্পর্শ করিয়া কখনও পদক্ষেপ করে না। বন্ধুকেও তােমার সকল ক্ষমতা দান করিবে না। কারণ সে যদি ভবিষ্যতে তােমার শত্রুতা করে, তাহাকে পরাস্ত করিতে পারিবে না। মনীষার অবতার, বিশ্বভারতীর কবি শেখ সাদীর আবির্ভাবে দ্বাদশ শতাব্দী যেমন আনন্দে উৎফুল্ল হইয়াছিল, তেমনি পুনরায় এয়ােদশ শতাব্দীর শেষ ভাগে সেই জগদ্বরেণ্য কবি-পয়গম্বরকে শেখ সাদীর মহা- হারাইয়া শােকে ম্রিয়মান হইল। এক শতাব্দীর অধিক কালব্যাপী যে সুকণ্ঠ বুলবুলের অশ্রান্ত ঝঙ্কারে সিরাজের গােলাপকুঞ্জ সতত ঝঙ্কত ছিল, সেই বুলবুলের কলকণ্ঠ চিরদিনের মত নরব হইল। যিনি নিদাঘ মধ্যাহ্ন তপনের মত পারস্যের সাহিত্য-গগনে জ্যোতি বিকীর্ণ করিতেছিলেন, সেই মধ্যাহ্ন গগনের দীপ্ত রবি গরিমাময় ভাবের সহিত উদয় হইয়া গরিমাময় দৃশ্যের সহিত পশ্চিমাকাশের কোলে ঢলিয়া পড়িলেন। কবি শেখ সাদীৰ পৰ্যটন- ক্লান্ত ঘটনাবহুল সুদীর্ঘ জীবন-নাটকের যবনিকা পাত হইল। ৬৯০ হিজরীর শওয়াল মাসের শুক্রবার দিন সন্ধ্যার সময় কবি ১২ বৎসর বয়সে মর-জগতে তাহার অক্ষয় কীর্তি-শ্বতি রাখিয়া সাধনাে- চিত ধামে গমন করেন। কবির বয়স ও মৃত্যু তারিখ সম্বন্ধে নানা * * আশ্বিন-কার্তিক মাস।
t [ ১২৪ ] প্রকার মতভেদ দেখিতে পাওয়া যায়। প্রাচ্যভাষাবিৎ জে, জে, টি, প্ল্যাটস (John. T. Platts) বলেন, সাদীর জন্মপেক্ষা মৃত্যু তারিখ আরও গােলমােগ পূর্ণ। * ঐতিহাসিক হামদুল্লা মুস্তওফি কবির মৃত্যু তারিখ বলেন, ৬৯০ হিজরাদে শুক্রবার ১৭ই তারিখে সিরাজ নগরে কবির মৃত্যু হয়। দৌলত শাহ বলেন, মুজাফর শিলগড় সাদ বিন জঞ্জীর পুত্র আবক মহম্মদ সাহের রাজত্ব সময়ে ৬৯০ হিজ- রাব্দে শওয়াল মাসে শুক্রবার দিন ১২০ বৎসর বয়সে শেখ সাদীর আত্ম- পক্ষী দেহ-পিঞ্জর শূন্য করিয়া মহাপ্রস্থান করে। কবি জমী কবি শেখ সাদীর জন্ম-মৃত্যু-তারিখ সম্বন্ধে বলেন, কবি শেখ সাদী ৫৭১ হিজরাদে জন্ম ও ৬৯০ হিজরাকে ১২০ (চান্দ্র) বৎসর বয়সে পরলােক গমন করেন। আমীন রাজী বলেন, কবি শেখ সাদী ১১০ বৎসর বয়সে দেহত্যাগ করেন। এ প্রাচ্যভাষাবিৎ ইংরাজ পণ্ডিত চার্লস রিউ (Charles Rieu) বলেন, কবি ১২০ বৎসর বয়সে দেহত্যাগ করেন। ৯ • The date of his death is scarcely less uacertaia than that of his birth. Introduction to Gulistan. ৫ তারিখ-ই-গুজি। * হজ, কিতু শােয়ারা। $ ফাং-উল-আনাস। # চরিত-অভিধান রচয়িতা। এই গ্রন্থের নাম “হাপ্ত আকলিপ” (সপ্তঋতু) এই গ্রন্থ খালি লেখক ১০২ হিজবাব্দে (১৫৯৪ গীঃ) সম্রাট আকবরের রাজশয়ে শোরেন। না হও আকৃতি। $ Catalogue of Persian manuscripts in the British Museum prepared by Charles Rieu Vol. II 1881.
[ ১২৫ } . মুস্তওফি খন্দেমির • বলেন, ৬৯০ হিজরাদে (১১ই ডিসের ১২৯১ খ্রীঃ) ১০৭ বৎসর বয়সে, হাঁজি খলিফা বলেন, ৬৯১ হিজরাব্দে (১২৯২খৃঃ) ১০৮ বৎসর বয়সে $ মুশে হেনরী মাস (M. Henry. Mass) বলেন, ১০৮ বৎসর বয়সে কবি দেহত্যাগ করেন। || দেখা যাইতেছে যে আমীন রাজী, মুস্তওফি খন্দেমির, হাজি খলিফা, ফরাসী পণ্ডিত মুশশা হেনরী মাস ব্যতীত ঐতিহাসিক হামদুল্লা মুস্তওফি, চরিতকার দৌলত শাহ ও কবি জামী শেখ সাদী মৃত্যু তারিখ সম্বন্ধে একমত। ইহা ব্যতীত প্রাচ্যভাষাবিৎ ইউরােপীয় সুধীবৃন্দও একবাক্যে সাদীর ১২০ বৎসর বয়স স্থির করিয়া ৬৯০ হিজরাব্দে কবির মৃত্যু তারিখ নির্দেশ করিয়াছেন। আমরা কবির প্রচলিত মৃত্যু ও বয়সের তারিখ অনুসরণ করিলাম । আমাদের মনে হয় ১২০ বৎসরই ঠিক, “কেননা তিনি অল্পমা ইবনে জৌজির উপদেশের কথা গুলির কয়েক স্থানে লিখিয়াছেন। তিনি ; * হিরাত নিবাসী সুবিখ্যাত ঐতিহাসিক। প্রসিদ্ধ আমির ও শাহের পুত্র। ইহার সম্পূর্ণ নাম ঘিয়াসুন্দিন মহম্মদ বিন হামিদ উদ্দিন খন্দা মুস্তওফি আমির ; ইনি অনেকগুলি ইতিহাস রচনা করেন। তন্মধ্যে রউ-সাৎ-উস-সাকা সুবিখ্যাত ও প্রামান্য গ্রন্থ। ইহা ৯০৪ হিজরাব্দে (১৪৯৮ীঃ) রচিত। + রউ-সাৎ-উস-সাফা। + সুবিখ্যাত জীবনী-অভিধান রচয়িতা। ইহার চরিত-অভিধানের নাম কাশফ-উস-জুন। ইহা ব্যতীত আরও দুখানি গ্রন্থ রচনা করেন। এই জীবনী- অভিধান খানি Orientai Translation Fund কর্তৃক ইংরাজীতে অনুদিত হইয়াছে। কাশফ-উস-জুননুন। Essaie on Le Port sur de Sadi. 1922. 1 Bodlion, British museum India Ofice set of stutta se পারস্য ও আরব্য ভাষার পাণ্ড লিপিতে উক্ত তারিখই লিখিত আছে।
[ ১২৬ ] অল্পমার কাছে হদিশও তফসীর পড়িয়া বিদ্বান মধ্যে গণ্য হইয়াছিলেন। অল্পমা কবিকে সুফীর দলে গান শুনিতে যাইতে নিষেধ করিতেন। কৰি লিখিয়াছেন, যৌবনের আবেগে তাহার উপদেশ অগ্রাহ করিয়া বকুনি খাইতাম। এই অল্পমা ৫৯৭ হিঃ ১২০১ খ্রীঃ) অর্থাৎ কবির মৃত্যুর ৯৪ (চান্দ্র) বৎসর পূর্বে দেহত্যাগ করেন। অতএব কবির বয়স একশত কুড়ি বৎসরই হইবে । ১০২ হইলে অল্পমার মৃত্যুর সময় কবির বয়স আট বৎসর, ১১০ হইলে ১৩ বৎসর হয়। এই বয়সের পূর্বে যৌবনের তাড়নায় গান শুনিতে যাওয়া ও বকুনি খাওয়া এবং হদীশ, ও তফশীরে কতবিদ্য হওয়ার কথা অশ্রদ্ধেয় * পারস্য কবিগণের জীবনী পাঠ করিলে দেখিতে পাওয়া যায় যে তাঁহারা নিজ নিজ সমাধিস্থান কিরূপ স্থানে ও কিরূপ ভাবে সজ্জিত হইবে, তাহা জীবতাবস্থায় স্থির করিয়াছেন। ওমর খৈয়াম বলিয়া- ছিলেন, আমার সমাধি-মন্দির এমন জায়গায় প্রস্তুত হইবে, যে স্থানের গােলাপ বৃক্ষ বৎসরে দুইবার আমার সমাধির উপর পুস্প বর্ষণ করিবে। কবি সাদীও বলিয়াছিলেন, তাঁহার প্রিয় জন্মভুমি স্বর্গীয় সুষমাপুর্ণ সিরাজের পূর্বপ্রান্তাদকের নির্জন পল্লীর মধ্যস্থলে যেন তাঁহার সমাধি- মন্দির প্রস্তুত হয়। সিরাজ বাসীরা কবির শেষ ইচ্ছা পূর্ণ করিয়াছিল। কবির সমাধি- কবির ইচ্ছামত সিরাজ নগরেব পূর্ব প্রান্তদিকে কবির মনােমত নির্জন স্থানে প্রস্তর সমাধি-মন্দির প্রস্তুত করেন। সমাধি-মন্দিরের চারি পার্শ্ব কবির প্রিয় গােলাপ বৃক্ষের দ্বারা ঘেরিয়া দেন; এই সমাধি-মন্দির সম্বন্ধে দৌলত শাহ লিখিয়াছেন, যে মনােরম নির্জন স্থানে কবির সমাধি-মন্দির প্রস্তুত হয়, সেই স্থানটী । * মানসী ও মর্মবাণী ১ম খণ্ড ১০২৫-২৬ । চাহার অকূল।
Yat मान-मौत मानि-कद्ध
No text on this page.
[ ১২৭ ] সৌধমালায় পরিবেষ্টিত ; তাহার চারিধারে ঝরণার ঝর ঝর বারি ধারা অবিশ্রাম গতিতে প্রবাহিত হইতেছে। এই নির্জন সমাধিক্ষেত্র তীর্থ- ক্ষেত্র অপেক্ষাও পবিত্র ও শ্রদ্ধার বস্তুরূপে পরিগণিত। ইব্রাহিম খাঁ বলেন, কবির প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের চিহ্ন স্বরূপ সিরাজবাসীগণ এই পবিত্র স্থানটীকে সাদীয়া নামে সম্মানিত করিয়াছেন। * গুলিস্তর অনুবাদক -প্লাটস বলেন, কবির সমাধির নিকটে একটী কলেজ ও জমকাল রকমের আশ্রম প্রতিষ্ঠিত আছে। সিরাজবাসীরা ও তন্নিকটবস্তী প্রদেশের অধিবাসী বৃন্দ কবির প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপনার্থ প্রতি বুধবার সমাধী-মন্দিরে সাদীয়া আসিয়া সমবেত হয়। কবির মৃত্যুর ৪৯১ বৎসর পরে অর্থাৎ ১৮৮৭ খৃঃ কর্ণেল ফুাঙ্কলিন নামক জনৈক ইংরাজ পৰ্যটক কবির সমাধি মন্দির পরিদর্শন করিবার জন্য সিরাজ যাত্রা করেন। তিনি বলেন, কবির সমাধি মন্দিরে তাহার একখানি ছবি ও সুস্কি ভাষায় লিখিত কবির কাব্য হইতে উদ্ধত জীবনের নশ্বরতা সুচক কয়েকটী কবিতা খােদিত আছে। কবি যে চতুষ্কোণ প্রস্তর সমাধি-মন্দির মধ্যে চিরনিদ্রায় শায়িত, সে মন্দিরটী দেখিলেই মনে কবির হয়, যেন কবিকে এই মাত্র সমাধিস্থ করা হইয়াছে। চিত্র সম্বন্ধে সমাধি মন্দির পরিদর্শনকারী আর একজন ইংরাজ পর্যটক বিনিঙ, (Binning) বলিয়াছেন, কবি নীল রঙের খিরকা মশক পরিধান করিয়া দরবেশের বেশে চিত্রিত। কবির মস্তকে টুপি, একহন্তে খাস ফুল অর্থাৎ ভিক্ষা পাত্র ও অন্য হস্তে একখানি * Introduction to Gulistan hy Ross. † He was burried short distance out of Shiraz, and his tomb ( adjoiniug which are a college and a superb monastry) is resiter every Wednesday by the inhabitants of the town and its vecinity. Brief sketc of life of Shaik Sadi by Platts.
[ ১২৮ ] কুড়ুল। • ০ ইব্রাহিম সাদিয়া সম্বন্ধে যে বিবরণ লিখিয়াছেন, তৎসম্বন্ধে ডাক্তার জেমস রস ( Dr. Jan • Ross ) বলেন, ইব্রাহিম খ। বােধ হয় সিরাজের তােরণ দ্বারকেই উদ্দেশ করিয়াই বলিয়াছেন। কর্ণেল ফাঙ্কলিনের শতাধিক বর্ষ পূর্কে ১৬৮৬ খ্রীষ্টাব্দে পৰ্যটকগণের সমাধি Engelbert Kompfer সিরাজ ভ্রমণ করেন। মন্দির পরিদর্শন ও তিনি শেখ সাদীর সমাধি-মন্দির পরিদর্শন করিয়। তাঁহাদের মন্তব্য। বলিয়াছেন, এই সমস্ত সৌধ অসংখ্য মহাত্মা ও জ্ঞানী মহাপুরুষগণের সমাধি মন্দির, ইহারা সংস্কারাভাবে জীর্ণাবস্থায় রহিয়াছে। প্রাচ্যভাষাবিৎ অধ্যাপক জ্যাকসন (Prof A. W. Jackson) কবির সমাধি-মন্দির সম্বন্ধে বলেন :- আরও মাইল খানেক উত্তরে সমতলের অপেক্ষাকৃত নিম্ন অশে শেখ সাদীর সমাধি মন্দির দেখতে পাওয়া যায় এবং উহাই “সাদীয়া” নামে পরিচিত। হাফিজের সমাধির ন্যায় ইহাও এক পুষ্পেদ্যান ও ঘনতরু নিকুঞ্জে পরিবেষ্টিত। যে অট্টালিকায় পারস্যের এই শ্রেষ্ঠ নীতি বিদ ও কবির দেহাবশেষ রক্ষিত, সেখানিকে ঘেরিয়া সাইপ্রেস, সুগন্ধি লতাগুল্ম ও নানা জাতীয় গােলাপ গাছের ঝড় শােমন। আপনার শ্রেষ্ঠ কাব্যদ্বয়কে যিনি গােলাপ বাগান (গুলিস্ত।) ও ফলের বাগান (বুস্ত।) নামে চিহ্নিত করিয়া ছিলেন, তাঁহার মত কবির বিশ্রামের পক্ষে এই স্থানটী যথােপযােগী। এই সীমানার মধ্যে একা কবি শেখ সাদীই সমাহিত, অন্ততঃ আমি অন্য কোন সমাধি দেখি নাই। এই সমাধিটাকেও এক বৃহৎ অট্টালিকার মধ্যে ঘেরিয়া লওয়া হইয়াছে। যে কক্ষে সমাধি- ফলক দণ্ডায়মান, তাহার প্রবেশপথ এক সুদৃঢ় তােরণের ভিতর দিয়া এবং ধাতব জালির কাজে সুদৃশ্য গুরুভার এক প্রস্তর-আধারে কবির * Binning's Travel in Persia Vol. ii.
[ ১২৯ ] ৩ দেহাবশেষ আবৃত। কক্ষটী অনাড়ম্বর, কিন্তু একখানি পারস্য দেশীয় বহুমুল্য গালিচায় উহার তলদেশ আচ্ছাদিত। মৃত । কবির উদ্দেশে সম্মান বহন করিয়া যখন দর্শকেরা শ্রদ্ধা-নম্র-চিত্তে ঐ সমাধি ফলকের চতুর্দিকে ভ্রমণ করেন, তখন গালিচাখানি তাহাদের পদশব্দ আত্মসাৎ করিয়া সমাধির শান্তি বিক্ষুব্ধ হইতে দেয় না। হাফিজের সমাধিতে যেরূপ, এখানেও তেমনি সমাধিফলকে স্বকীয় রচনা হইতে উদ্ধত পংক্তিও তাহার সহিত যুক্ত হইয়াছে। ঐ রচনাবলীর একটী সুন্দর পাণ্ডুলিপিও অট্টালিকার মধ্যে রক্ষিত হইয়াছে। * কবি শেখ সাদীর নশ্বর দেহ পঞ্চভূতে মিশাইয়াছে, তাহার প্রাণ মহাপ্রাণে মিশাইয়াছে। কিন্তু কবির অমৃতময়ী বাণী জগদ্বাসী কখনও বিস্মৃত হইবে না, চিরদিনই শ্রদ্ধার সহিত মস্তকে-ধারণ করিয়া রাখিবে। জগদ্বরেন্য ঋষি কবির উদ্দেশে আমাদের ভক্তি- শ্রদ্ধা-অঘ-নিবেদন। নম্র-চিত্তের শ্রদ্ধা-অর্ঘ্য নিবেদন করিয়া মানব- জাতিকে কবি ইমার্শনের বাণী স্মরণ করাইয়া আমরা বিশ্বভারতীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবির জীবনী শেষ করিলাম । সাদীর কুটীর দ্বারে হও সবে সজাগ প্রহরী, তাহার হৃদয় খানি ভাগবত-প্রজ্ঞার মন্দির, শ্রদ্ধায় তাহার বাণী চিত্তমূলে রাখগাে আহরি। বনদেবতারা সবে চারিধারে বাঁধে সুখ-নীড় ঘেরিয়া ঘেরিয়া তার জ্ঞান-দীপ্ত দীপশিখা খানি। কাব্য-উপবনে তার নিত্য নব অতিথির ভিড়। পরম আত্মীয়, তথা হৃদয়ের প্রিয় সখা জানি’ নিস্পাপ যুবক আর কুমারীর আসে পাশে তার সত্যের পূজারী, সবে হৃষ্ট মনে লয় কোলে টানি। Persia jyrst and! Present ; Curzon's Persian and Persian Questious.
[: ১৩• :)
.
যে চায়, তাহার তরে কবি-গৃহ সদা মুক্ত-দ্বার--
হারানাে হিয়ার তৃপ্তি লভে সবে এইখানি আসি’
লতে উচ্চতর লক্ষ্যে শ্রেষ্ঠতর কর্মে অধিকার।
দম্ভ করিওনা বৃথা, তীক্ষ্ণ বুদ্ধি ওগগা ছিদ্রান্বেষী,
ঢেকে রা বিদ্যা তব—তিক্ত স্বত বাক্য আড়ম্বর ;
ভুলেও ভেবােনা কভু তার চেয়ে তুমি জানাে বেশী।
মানবের মর্মকোষে সে যে গো আনন্দ-সুধাকর।
-----
তমা ও।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.