Makardah Saraswat Library, Howrah

Dhatri Panna

Sengupta, Sachindranath · 2009/08/18

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

ধাত্রী পান্না
শ্রীশচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত
গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় এণ্ড সন্স,
২০৩১১, কর্ণওয়ালিস স্ট্রীট, কলিকাতা

দেড় টাকা

এক যুগ আগে
আমার প্রথম নাটক ‘রক্তকমল’
লব্ধপ্রতিষ্ঠ নট
রবীন্দ্রমােহন রায়
সাপ্তাহিকের পাতা থেকে সংগ্রহ করে
মনােমােহন থিয়েটারে অভিনয়ের ব্যবস্থা করেন।
এক যুগ পরে
আমার এই বিংশতি-সংখ্যক নাটক
ধাত্রী পান্না
তাঁরই করকমলে অর্পণ করলাম

প্রথম অভিনয়, নাট্যভাৱতী, ১৮ই নভেম্বর ১৯৪৩ প্রযােজনা শিশির মল্লিক পরিচালনা নরেশ মিত্র ও সহুসেন পরিচালনা সহায়ক ববি রায় ও জহর গাঙ্গুলী স্মারক- --আবহ-যন্ত্র-সঙ্গীত বিশ্বনাথ চক্রবর্ত্তী ধীরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় পাঁচুগােপাল সান্যাল -যন্ত্ৰীসতঘ -রূপ সজ্জাকর- ধীরেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় রাখাল পাল ঘণ্টেশ্বর প্রামাণিক গগাবিন্দ দাস কমল বন্দ্যোপাধ্যায় যতীন দাস কালীপদ বন্দ্যোপাধ্যায় কেবলরাম পাঠক সেখ কাশেম আলি কার্তিক ঘাে -আলােক শিল্পী দেবকী এসাদ প্রফুল্ল ঘােষ -লাওয়াজীমা- পাঁচকড়ি দত্ত অমূল্য নন্দী জলধর নান -ব্যবস্থাপনা বেচু সাধুখ। সুকুমার মিত্র শৈলেন্দ্রনাথ গুহ বিজয়কৃষ্ণ মুখােপাধ্যায়

ধাত্রী পান্না
প্রথম অঙ্ক
প্রথম দৃশ্য
চিতােরের নগৰােপকণ্ঠে একটি বাগান-বাড়ী। একদিকে লাল পাথরের একটি
দ্বিতল গৃহ। সেই গৃহ-সংলগ্ন পাথরের বেড়ার পিছনে ফুলের বাগান। সাম্নে এককোণে
একটি বড় গাছ, ঘােট বড় প্রস্তরখণ্ড। মেবারের একদল সর্দার “বনবীর” “বনবীর”
বলিয়া ডাকিতে ডাকিতে প্রবেশ করিলেন।
সর্দারগণ। বনবীর! বনবীর ।
কর্ণজি। বনবীর গৃহে আছ ?
সর্দারগণ। বনবীর!
বনবীর !
গৃহের দ্বার উন্মুক্ত হইল। একটি প্রৌঢ়া নারী
বাহির হইয়া আসিলেন। হার নাম শীতলসেনী।
শীতলসেনী। একি! মেবারের মহামান্য সর্দারগণ !
তােমার পুত্র কোথায় শীতলসেনী ?
শীতলসেনী। বনবীর এসময়ে বনেবনে মৃগয়া করে বেড়ায়, ঘরে থাকেনা।
কর্ণজি।

ধাত্রী পান্না
প্রথম অঙ্ক
কণজি। মেবারের বড় প্রয়ােজনে আমরা তার কাছে এসেছি।
শীতলসেনী। একান্ত অপ্রয়ােজনীয় মনে করে যাকে একদিন আপনারা
উপেক্ষা করেছিলেন, সেই বনবীরের কাছে আজ মেবারের প্রয়ােজন !
আর আপনারা বলচেন বড় গুরুতর সেই প্রয়ােজন ?
করমাদ। সত্যই শীতলসেনী, বড় গুরুতর প্রয়ােজন।
শীতলসেনী। মেবারের প্রয়ােজন।
কর্ণজি। মহাবীর পৃথ্বীরাজের ঔরসজাত পুত্রের কাছে মেবারের
দাবী আছে।
শীতলসেনী। অবশ্যই আছে চন্দাবৎ শ্রেষ্ঠ কর্ণজি। বনবীরের এই দীনা
জননী তা অস্বীকার করেনা।
করমচঁাদ। বনবীরও তা করবেন।
শীতলসেনী। কিন্তু রাণা বিক্রমজিৎ? তিনি কি তা স্বীকার করবেন ?
কর্ণজি। তাঁর মতামতে কিছুই এসে যায়না।
শীতলসেনী। এতদিন তাই যেত। মেবারের মহামান্য সর্দাররা
এতদিন তার অবিচার, অনাচার সমর্থন করে এসেছেন ; তার স্পর্ধাকে
আকাশস্পর্শী হতে দিয়েছেন।
করমচা। হাতে হাতে তার প্রতিফলও আজ পেয়েছি।
শীতলসেনী। আজ ?
আজ ? আপনারা বলচেন আজ প্রতিফল পেয়েছেন ?
কর্ণজি।
শুনলে তুমি বিস্মিত হবে শীতলসেনী, রাণা বিক্রমজিৎ
আজ সকলের সম্মানের পাত্র প্রবীণ অমাত্য এই সর্দার করমাদকে
একা সভায়
ক্ষোভে অপমানে কর্ণজি কথা কহিতে পারিলেন না।

প্রথম দৃশ্য
ধাত্রী পান্না
করমচা। চন্দাবৎ সর্দারের কণ্ঠ দিয়ে আমার সে লাঞ্ছনার কথা
বার হচ্ছেনা শীতলসেনী ।
সকলে। সে লাঞ্ছনা আমাদের সবারই লাঞ্ছনা সর্দার।
করমাদ। তাই তােমাদের সকলের হয়ে সেই লাঞ্ছনার কথা আমি
নিজেই প্রকাশ করচি। দুবৃত্ত বিক্রমজিৎ প্রকাশ্য সভায় আমাকে আজ
প্রহার করেছে, শীতলসেনী ।
কর্ণজি আমরা এ অপমান সহ্য করবনা।
শীতলসেনী। শুনেছিলাম বিক্রমজিতের মহামহিমান্বিত পিতা মহাবীর
সঙ্গের বিপদের দিনে সর্দার করমাদ তাকে আশ্রয় দিয়েছিলেন।
কর্ণজি। শুধু কি তাই? গুর্জরের সুলতান বাহাদুরশা যখন চিতাের
ধ্বংস করে এই বিক্রমজিৎকে সিংহাসন চ্যুত করেন, তখনকার সেই
নরমেধ যজ্ঞে হবশিষ্ট সর্দারদের সমবেত করে এই স্বদেশপ্রাণ মহাবীর
করমাদই বিক্রমজিতের পুনঃ প্রতিষ্ঠার সহায়তা করেন।
বীরম। আমাদের এই মহানায়কের অপমান...
কর্ণজি। বল শীতলসেনী, তুমিই বল, তা কি সওয়া যায় ?
শীতলসেনী। আমি ত সয়েচি চন্দাবৎ সর্দার।
কর্ণজি। তুমি !
শীতলসেনী হাসিলেন। তারপরে কহিলেন :
শীতলসেনী। আমি মহাবীর পৃথ্বীরাজের পরিণীতা স্ত্রী নই বলেই বুঝি
আমার মান অপমান কিছুই নেই, আমার পুত্র বনবীর শিশােঙ্গীয় রক্ত
ধমনীতে নিয়েও অস্পৃশ্যের মতাে একান্তে জীবন যাপন সম্মানজনক বলে
মনে করবে ?

ধাত্রী পান্না
প্রথম অঞ্চ
কর্ণজি। তােমার বনবীরকে সর্বশ্রেষ্ঠ সম্মানের অধিকারী করব বলেই
আমরা এখানে এসেছি।
করমাদ। আমরা তাকে সিংহাসন দিতে এসেছি।
শীতলসেনী। সিংহাসন!
মুকুলজী। মেবারের সিংহাসন।
শীতলসেনী। যে মেবারের সিংহাসনকে বার বার রক্ষা করেও
মহাবীর পৃথ্বীরাজ তাতে উপবেশন করবার অধিকার পাননি।
বীরমল্ল। তােমার বনবীরকে আমরা সেই সিংহাসনে বসাবাে।
কর্ণজি। মেবারের সমস্ত সম্রান্ত সর্দার আমরা বনবীরকে রক্ষা
সকলে। আমরা শপথ করচি, শীতলসেনী।
একটি মৃত-হরিণ স্কন্ধে লইয়া বল্লমধারী ব্যাঘ্রচর্ম
পরিহিত বনবীর বৃক্ষের আড়াল হইতে আত্মপ্রকাশ
করিয়া কহিল :
বনবীর। না, না, আপনারা শপথ নেবেন না, শপথ নেবেন না।
আমার মাকে আপনারা জানেন না। একবার শপথ নিলে আপনাদের
একটু বেচাল উনি ক্ষমা করবেন না। ওঁর মায়া আছে কিন্তু
দয়া নেই।
কজি। বনবীর! আমরা তােমার কাছেই এসেছি।
বনবীর। আমার কাছে!
করমচঁাদ। হ্যা, তােমার কাছে।
বনবীর। তবে ত আপনাদের খাতির যত্ন করতে হয়।

ধাত্রী পান্না
কাঁধ হইতে হরিণটা ফেলিয়া দিয়া, বল্লমে তর দিয়া
বেড়া টপকাইয়া বনবীর সাম্নে আসিয়া কহিল :
মা, পরিচারিকাদের বল পান আতর নিয়ে আসুক..আপনাদের আসন••
আসন..তাইত আসন•••
চারিদিকে চাহিয়া দেখিল।
আচ্ছা ওই পাথর গুলােই টেনে দিচ্ছি।
অন্তরখওগুলাের দিকে অগ্রসর হইল ।
কর্ণজি। তােমাকে সিংহাসনে না বসিয়ে আমরা আসন গ্রহণ
করবনা।
বনবীর ফিরিয়া দাড়াইল।
বনবীর। কি বল্লেন !
করমচাদ। আমরা তােমাকে সিংহাসনে বসাবাে।
বনবীর। সিংহাসনে !
কজি। মেবারের সিংহাসনে !
বনবীর দৌড়াইয়া শীতলসেনীর কাছে গেল।
বনবীর। মা! এরা কি বলছেন।
শীতলসেনী। আমাকেও ওঁরা তাই বলছিলেন, বৎস।
বনবীর। সিংহাসন! সিংহাসনে বসব আমি।
কণজি। আমরা তােমাকে মেবারের অধীশ্বর করব, বনবীর।
বনৰী। যে বনবীর রাজসভা কখনো ভালাে করে চোখে দেখেনি।

ধাত্রী পানা
প্রথম অৰু
করমচঁদ। সেই বনবীরের হাতে আমরা রাজদণ্ড তুলে দেব।
বনবীর।
যে বনবীর বনে বনে মৃগয়া করে ঘুরে বেড়ায়, হরিণ, বরা
কাঁধে নিয়ে সন্ধ্যায় ঘরে ফেরে।
কর্ণজি। সেই বনবীর মেবারের শনিপাত করবার জন্য অসিহাতে
অশ্বপৃষ্ঠে আমাদের পরিচালিত করবেন আর মেবারের পতাকাবাহী আমরা
তাঁর সকল আদেশ সসম্মানে পালন করব।
বনবীর। আপনি চন্দাবৎ সর্দার, আপনি বলচেন এই কথা?
কর্ণজি। ভগবান একলিঙ্গের নামে শপথ গ্রহণ করচি।
করমাদ। মেবারের সর্দাররা কখনাে শপথ ভঙ্গ করেন না।
সকলে। আমরা কখনাে তা করবনা।
বনবীর। মা, এদের কথা শুনে, এদের মুখ দেখে ত মনে হয়না এর
পরিহাস করতে এসেছেন।
শীতলসেনী। পরিহাস এরা করেন নি পুত্র।
কর্ণজি। পৃথ্বীরাজের পুত্র আমাদের পরিহাসের পাত্র নয় ।
বনবীর। আপনারা স্বীকার করচেন! এতদিনে স্বীকার
করচেন, মেবারের মহাবীর পৃথ্বীরাজের উত্তরাধিকারে আমার
দাবী আছে।
করমদ। অস্বীকার করিনা বলেই ত তােমার কাছে এসেছি।
বনবীর। মা, ওরা আজ স্বীকার করচেন আমার পরমারাধ্য পিতৃদেব
মহাবীর পৃথ্বীরাজের গৌরবের অধিকারী আমি। আর ত তােমার কোন
দুঃখ রইলনা, মা।
শীতলসেনী। না, বাবা। আমার গর্ভে জন্ম নিয়েছিলে বলে যে কল
তােমার ললাটে আঁকা ছিল মেবারের শ্রেষ্ঠ সন্দারগণ আজ রাজ তিলক

প্রথম দৃশ্য
ধাত্রী পান্না
দিয়ে তা লােপ করে যখন দিতে চান, তখন আমার দুঃখের আর কারণ
নেই।
বনবীর।
বনবীর। রাজতিলক! আমার ললাটে রাজতিলক! মানাবে মা?
শীতলসেনী। যাতে তা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে তাই কর তুমি।
বনবীর। রাণবিক্রমজিৎ কি তীর্থে যাবেন ?
কর্ণজি। তাকে আমরা সিংহাসনচ্যুত করব।
। আপনারা বলচেন কি !
সকলে। আমরা শপথ নিয়েছি।
বনবীর। না, না, খােলসা করে বলুন, আপনাদের মতলব কি।
কর্ণজি। আমরা তােমাকেই সিংহাসনে বসাবাে।
বনবীর। রাজবলির দরকার হয়েছে, তাই এই নধর পশুটিকেই বলি
করতে চান ?
শীতলসেনী। চিতােরের অধিশ্বরী যাদের বলিরূপে গ্রহণ করেন, তারা
অমর হয়ে থাকে বৎস।
বনবীর। তাই অমর হবার লােভে মরবার জন্যে আমাকে গলা
বাড়িয়ে দিতে হবে? বেশ, তােমারও যখন সমর্থন রয়েছে মা, আমি
এদেরই ইচ্ছা পূর্ণ করব। মেবারের মহামান্য সর্দারগণ, সিংহাসন আমি
নােব। কিন্তু দেখবেন আপনারা যেন না সুড়ঙ্গ কেটে সে সিংহাসন তলিয়ে
দেন।
সকলে। আমরা শপথ করচি।
বনবীর। কি শপথ করচেন ?
কর্ণজি। সর্বপ্রকারে আমরা তােমার সহায়তা করব।
বনবীর। বেশ! আমিও তাহলে সিংহাসন গ্রহণ করব।

ধাত্রী পাকা
প্রথম অক
করমাদ। আমরা তােমার অভিষেকের আয়ােজন করি?
বনবীর। খুব সমারােহ করবেন ত ?
বীরমল্ল।
সমগ্র রাজস্থানে সাড়া পড়ে যাবে।
বনবীর। তাই আমি চাই। আপনারা তাহলে আজ আমাদের
আতিথ্য গ্রহণ করে আমাকে ধন্য করুন।
সর্দারগণ এই প্রস্তাবে অত্যন্ত অসম্মান বােধ
করিলেন।
একি! আপনাদের সবার মুখ ভারি হয়ে উঠল কেন? ভাবছেন আমাদের
আয়ােজন অপ্রচুর? ভাববেন না, ভাববেন না। দেখলেন ত কতবড়
একটা হরিণ শীকার করে এনেচি। প্রচুর মাংস হবে।
মাংস হবে। আর আমার
মায়ের ভাঁড়ারে মেঠাই মণ্ডার পাহাড় তৈরিই থাকে।
দেখবেন, শেষটা
হয়ত আপনাদের গড়িয়ে গড়িয়েই বাড়ী ফিরতে হবে। আসুন! আসুন।
সর্দারগণ পরস্পর পরস্পরের মুখের দিকে চাহিলেন।
কজি। আজ ত তােমার আতিথ্য গ্রহণ করবার অবসর আমাদের
নেই।
বনবীর।
কেন কর্ণজি ?
কর্ণজি। তােমাকে সিংহাসন দিতে হলে দিবারাত্র আমাদের কাজ
করতে হবে।
বনবীর। বটে।
করমচাঁদ। শত্রুপক্ষ দুর্বল নয়।
বনবীর। শত্রু! আমার ত শত্রু নাই সর্দার শিরােমণি।
বীরম। বিক্রমজিতের সমর্থকরাই তােমার শত্রু।

প্রথম দৃশ্য
ধাত্রী পান্না
বনবীর। তাহলে আমার হয়ে আপনারাই সে শত্রু নিপাত করবেন ?
কর্ণজি। তােমার শত্রু আমাদেরই শত্রু।
বনবীর। কিন্তু মনে রাখবেন, মেবারের সিংহাসন আপনাদের নয়
আমার।
করমাদ। মেবারের সিংহাসন আজ থেকে তােমার।
বনবীর। হ্যা, আমার, আমার ।
কর্ণজি। তুমি প্রস্তুত হয়ে থেকো বনবীর, সমস্ত আয়ােজন সম্পূর্ণ
করে আমরা তােমার অভিষেক করব। শীতলসেনী পুত্রকে তৈরি করে
রেখাে। এস মেবারের শ্রেষ্ঠ সর্দারগণ।
তাহারা চলিয়া যাইতে উদ্যত হইলেন
বনবীর। আমার নিমন্ত্রণ গ্রহণ করলেন না, এ কথা কিন্তু আমার
মনে থাকবে।
সর্দারগণ একটু ইতস্তত করিয়া চলিয়া গেলেন।
বনবীরকে ওঁরা খুব স্নেহ করেন দেখচি! সিংহাসনে বসাতে চান অথচ
নিমন্ত্রণ প্রত্যাখান করেন।
শীতলসেনী। সে শুধু তুই এই অভাগীর গর্ভে জন্ম নিয়েছিলি বলে।
বনবীর। কিন্তু আমি তােমাকে বলচি মা, ওদের এ দর্পও আমি
রাখবনা। রাণা বনবীরের উচ্ছিষ্ট ‘দুনা’ অনুগ্রহ রূপে পাবার জন্যে শ্রেষ্ঠ
এই সর্দাররা হাত পেতে একে অন্যের সঙ্গে প্রতিযােগিতা করবে, সে
তুমি দেখে নিয়ে মা।
শীতলসেনী। বনবীর!

ধাত্রী পান্না
প্রথম অঙ্ক
বনবীর। কি মা !
শীতলসেনী। সত্যই কি তুমি বিশ্বাস কর স্নেহবশত ওঁরা আজ
তােমাকে সিংহাসনে বসাতে চান ?
বনবীর। বনবীর নিরেট বােকা নয়, তা আর কেউ না জানুক, তুমি
ত জান মা।
শীতলসেনী। বুঝতে পারচকেনওঁরা তােমাকে সিংহাসনে বসাতে চান ?
বনবীর। কাঁটা দিয়ে কাটা তুলতে চান বলে।
শীতলসেনী । যে কাটা দিয়ে কাটা তােলা হয়, কার্যোদ্ধারের পরে••
বনবীর। বুদ্ধিমান লােকরা সে কাটাকেও দূরে ফেলে দেয়।
না মা ?
শীতলসেনী। তাহলে?
বনবীর। তাহলে কি ওঁদের এই আমন্ত্রণ আমি প্রত্যাখান করব না?
বলব, সিংহাসনে আমার প্রয়ােজন নেই ?
শীতলসেনী ।
প্রয়ােজন নেই। তোমার পিতা বার বার যে সিংহাসন
রক্ষা করেছেন, যে সিংহাসন তারই প্রাপ্য ছিল, সেই সিংহাসনে তােমার
প্রয়ােজন নেই।
বনবীর। পিতা জ্যেষ্ঠ পুত্র ছিলেন না।
শীতলসেনী। কোথায় ছিলেন তখন সিংহাসনের উত্তরাধিকারী জ্যেষ্ঠ
রাণ। সঙ্গ, যখন সিংহাসন রক্ষার জন্য পৃথ্বীরাজকে বার বার শত্রুর সম্মুখীন
হতে হয়েছিল ?
বনবীর। তবে পিতা কেন সিংহাসন পেলেন না ?
শীতলসেনী। অবিচারে ! পিতার প্রতি অনুষ্ঠিত এই অবিচারের
প্রতিকার যদি করতে পার, তাহলেই তার আত্মা তৃপ্ত হবেন।

প্রথম দৃশ্য ধাত্রী পান্না ১১ বনবীর। আমার পিতার অভিপ্রায় কেমন করে জানব মা? শীতলসেনী। আমি জানি। আমি জানি স্বর্গে থেকে তিনি তােমারই দিকে চেয়ে রয়েছেন, তােমা থেকেই তিনি চান তার আকাঙ্ক্ষার পরিতৃপ্তি। বনবীর। তঁার আকাঙ্ক্ষা কি ছিল ? শীতলসেনী। মেবারের গৌরব বৃদ্ধি। বনবীর। মেবারের গৌরব রবি ত অস্তমিত নয়। শীতলসেনী। কিন্তু মুঘল করুণ। কলঙ্ক হয়ে তাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। বনবীর। মা ! শীতলসেনী। মনে রেখাে মুঘল হুমাযুন দয়া করে মেবারকে যে স্বাধীনতা দিয়ে গেছেন, সে স্বাধীনতায় কোন গৌরব নেই। অপরের দান স্বরূপ যারা স্বাধীনতা পায়, পরাধীনতার শৃঙ্খল পরবার জন্য তারা প্রস্তুত হয়েই থাকে। রাণা বিক্রমজিতের কথা ভেবে দ্যাখ। যে কেউ চোখ রাঙাবে তার কাছেই সে মাথা নত করবে। নইলে মেবারের সর্দাররা বিক্রম- জিৎকে সিংহাসনচ্যুত করবার কল্পনা করতেও সাহসী হােতনা। বনবীর। মা তুমি কি বলতে চাও স্পষ্ট করে বল। বনবীর কথন তােমার অবাধ্য হয়নি, এখনাে হবেনা। শীতলসেনী বনবীরের কাঁধে হাত রাখিয়া কহিলেন : শীতলসেনী । জেনে রাখ পুত্র, যেমন জাতি, তেমন ব্যক্তিও পরের দান নিয়ে প্রতিষ্ঠা লাভ করতে পারেনা। তাই সর্দারদের দানের প্রত্যাশায় না থেকে নিজের শক্তি প্রয়ােগে সিংহাসন অধিকার কর। বনবীর। শক্তি আমার আছে। কিন্তু সৈন্যসামন্ত কোথায় ?

ধাত্রী পান্না প্রথম অঞ্চ শীতলসেনী। সিংহাসন অধিকার করে আছে একটি মাত্র লােক। সে দুর্বল, সে অক্ষম, সে ভীরু। সর্দাররা তার প্রতি বিরূপ। তাকে সিংহাসন থেকে, সংসার থেকে সরিয়ে দেবার মত শক্তি কি বনবীরের বাহুতে নেই ? বনবীর। মা ! তুমি কি বলচ মা। তুমি বলচ রাণা বিক্রমজিৎকে, আমার জ্যেষ্ঠতাত পুত্রকে হত্যা করতে! শীতলসেনী। তােমার পিতা তার জ্যেষ্ঠ সহােদরের একটি চক্ষু নিয়েছিলেন, প্রাণও নিতেন যদি না সঙ্গ পালিয়ে যেতেন। বনবীর। কিন্তু রাণা বিক্রমজিৎ যে দুর্বল। শীতলসেনী। দুৰ্বল যে, ভীরু যে, মে বারের সিংহাসন তার নয়। দুৰ্বলের দাবী অসম্ভব করে শক্তির পরিচয় দিয়ে মেবারের সর্দারদের সামনে গিয়ে দাড়াও, দেখবে দানের দম্ভে বুক না ফুলিয়ে মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে তারা তােমাকে শ্রদ্ধা জানাবে। তখুনি পুত্র, তখুনি তুমি হবে সত্যিকারের রাণা । বনবীর। সত্যিকারের রাণা! শীতলসেনী। সত্যিকারের রাণা; পুতুল রাণা নও! বনবীর। আমি সত্যিকারের রাণাই হব মা। অনুগ্রহের অপেক্ষায়, দানের প্রত্যাশায় আমি কারু ক্রীড়নক হয়ে থাকব না। পিতৃদেব পৃথ্বীরাজ, স্বর্গ থেকে শােন, তােমাকে বঞ্চিত করে যার সিংহাসন ভােগ করেছে, আমাকে তারা ফাকি দিতে পারবেনা।

দ্বিতীয় দৃশ্য
রাণা বিক্রমজিৎ ও জগমল
মঞ্চ আলােকিত হইবার পূর্বেই বিক্রমজিতের হাসি শােনা যাইবে।
!
বিক্রমজিৎ। বনবীর! বনবীরকে ওরা সিংহাসনে বসাবে !
জগমল। তাই ত শুনে এলাম, প্রভু।
বিক্রমজিৎ। পৃথ্বীরাজের উপপত্নীর সন্তান সেই বনবীর!
জগমল। সেই বনবীর প্রভু।
বিক্রমজিৎ। সে আবার রাজ্যপরিচালনার কি জানে! সে ত শুধু
বনে বনে মৃগয়া করেই ফেরে।
জগমল। তাই করে করে সে এমন হাত পাকিয়ে ফেলেচে যে মাথা
আর ধড়ের বিচ্ছেদ ঘটাতে তার একটুকু সময় লাগে না, প্রভু।
বিক্রমজিৎ। বল কি!
জগমল। আজ্ঞে ঠিকই বলছি।
বিক্রমজিৎ। তাহলে বড় ভয়ানক লােক ত সে!
জগমল। ভয় তাকে অনেকেই করে।
বিক্রমজিৎ। বিচিত্র কি! যে মায়ের ছেলে !
জগমল। আজ্ঞে, তার মা শীতলসেনী বড় তেজস্বিনী।
বিক্রমজিৎ। তেজস্বিনী! সেই তেজস্বিনী অশ্বিনীর একবার কি
দুর্দশা করেছিলাম জান ?
জগমল। কি সর্বনাশ! তাও করেছিলেন নাকি

১৪
ধাত্রী পান্না
প্রথম অক'
বিক্রমজিৎ। করিনি! দুশ্চরিত্রা বলে চিতাের থেকে দূর করে
দিয়েছিলাম। বনবীরের হাত ধরে প্রকাশ্য রাজপথ দিয়ে সেদিন তাকে
মাথা হেঁট করে চলে যেতে হয়েছিল ।
জগমল। তারপর ?
বিক্রমজিৎ। তারপর
নাই, পেটে অন্ন নাই।
আর কি । মাথার ওপর আচ্ছাদন
শুনলাম পাহাড়ের গুহায় থাকে, পায়
বনের ফল।
জগমল। তাহলে আবার চিতােরে ফিরে এল কেমন করে ?
বিক্রমজিৎ । দয়ায় ! আমার দয়ায়। সর্দাররা বল্লে নগরপ্রান্তে
পৃথ্বীরাজের উদ্যান বাটিকাটি তাদের ছেড়ে দিতে। দিলাম তাই। নইলে
ওই বনবীরকে এতদিন হয় সাপে কাটত, নয় বাঘে গিলত।
জগমল। তাহলে সে-কথা ত ওরা ভােলেনি প্রভু।
বিক্রমজিৎ। যাতে না ভােলে তাই করতেইত চেয়েছিলাম।
জগমল। যদি তারা প্রতিশােধ নিতে চায় ?
বিক্রমজিৎ। প্রতিশোেধ। ওরা আবার প্রতিশােধ নেবে কি করে?
জগমল। সর্দারেরা ওদের সহায়।
বিক্রমজিৎ। আমিই কি একেবারে অন্যহায় ?
জগমল। মেবারের রাণাদের চিরকাল সর্দারদের ওপরই নির্ভর
করতে হয়েছে।
বিক্রমজিৎ। কিন্তু আমি নির্ভর করি হুমায়ুনের ওপর।
জগমল। হুমায়ুন !
বিক্ৰমাজিৎ। হ, হ, হুমায়ুন। বাদশা হুমায়ুন। মেবারকে যিনি
একবার রক্ষা করেছিলেন, তিনি আবারাে রক্ষা করবেন।

দ্বিতীয় দৃশ্য
ধাত্রী পান্না
জগমল। তবেই হয়েছে।
বিক্রমাজিৎ। তুমি বিশ্বাস করচনা। দাড়াও, শুনিয়ে দিচ্ছি।
একটা ঘড়ি বাজাইলেন, প্রতিহারী প্রবেশ করিল।
যােধমলকে ডেকে দাও।
এতিহারী চলিয়া গেল।
তুমি ভাবচ আমি নিশ্চিন্ত রয়েচি এমন ব্যবস্থা করেচি জগমল যে,
মেবারের বীর সর্দারেরা কেঁচোর মতো বুকে হেঁটে আমার কাছে এসে
মার্জনা চাইবে। ওরা ভুলে যায় আমি রাণ। সঙ্গের পুত্র !
যােমল প্রবেশ করিল।
এই যে যােধমল! হুমায়ুনের কাছে লােক পাঠিয়েচ।
যােমল। না প্রভু।
বিক্রমজিৎ। না !
যােধমল। না প্রভু।
বিক্রমজিৎ। কেন ?
যােধমল। অশ্বারােহীরা রাণার আদেশ পালনে অসম্মত।
বিক্রমজিৎ। এতবড় স্পর্ধা তাদের।
জগমল। সর্দাররা তাদেরকে রাণার বিরুদ্ধে উত্তেজিত করেছে।
যােধমল।
তারা বলে•••
বিক্রমজিৎ। তারা কি বলে তা আমি শুনতে চাইনা, তারা কি করে
করে তাই আমি জানতে চাই।
যােধমল। তাদের কে বনা।

ধাত্রী পান্না
এথম
বিক্রমজিৎ। দুর্গ থেকে তাদের তাড়িয়ে দাও।
যােমল। তারা দুর্গ ত্যাগ করে চলে গেছে।
জগমল। সে কি !
বিক্রমজিৎ। কোথায় গেল?
যােধমল। বনবীরকে তারা নায়করূপে বরণ করেছে।
বিক্রমজিৎ। বনবীর তাদের খেতে দেবে ?
যােধমল। সর্দার করমচাদ আর কর্ণজি সে ভার নিয়েচেন।
জগল। আমি বলেছিলাম সর্দাররা সহায় না থাকলে মেবারের
রাণারা শক্তিহীন হয়ে পড়েন।
বিক্রমজিৎ। শক্তিহীন ! শক্তির পরিচয় ত দিলাম সেদিন সভায়
করমচঁাদকে প্রহার করে। পারল কেউ রুখতে।
জগমল। সে কাজ কি সঙ্গত হয়েছিল প্রভু ?
বিক্রমাজিৎ। না, সম্পূর্ণ সঙ্গত হয়নি। ত্রুটি ছিল। গর্দানা
নিলেই তা সঙ্গত হােতো।
জগমল। সর্দাররা বিদ্রোহী, বনবীর প্রতিশােধ নেবার জন্য অধীর,
হুমায়ুনের কাছে সংবাদ পাঠাবার উপায় নেই। প্রভু আত্মরক্ষা করবেন
কেমন করে, তাই আমি ভাবছি।
বিক্ৰজিৎ। ভেবে তুমি যদি উপায় স্থির করতে পারতে, তাহলে
তুমিই রাণা হতে।
aw
আমার প্রতি আর কোন আদেশ আছে ?
বিক্রমাজিৎ। আদেশ পালন করবার লােক যেখানে নেই, সেখানে
আদেশ অর্থহীন। যাও। আমার কিছু বলবার নেই,কিছু জানবারও নেই।
চলিয়া গেল।

দ্বিতীয় দৃশ্য
ধাত্রী পান্না
সর্দাররা করবে বিদ্রোহ, বনবীর নেবে সিংহাসন ; আর আমি, রাণা সঙ্গের
পুত্র আমি, হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকব !
আবার ঘড়ি বাজাইলেন, এতিহারী প্রবেশ করিল।
আমার বৰ্ম্ম, বল্লম, খঙ্গ ।
জগমল। প্রভু কি সর্দারদের সঙ্গে দেখা করতে যাবেন ?
বিক্রমজিৎ। যদি তাই যাই।
জগমল। তাহলে অস্ত্র নিয়ে যাবেন না।
বিক্রমজিৎ। দাতে কুটো কেটে বুকে হেঁটে যাব বল ?
জগল। আমি তা বলচিনে।
বিক্রমজিৎ। বলনি। কিন্তু বলতে তাই চাও সে আমি বুঝি।
প্রহরী অস্ত্রশস্ত্র লইয়া প্রবেশ করিল।
দাওত জগমল, এক এক করে সবগুলাে পরিয়ে দাও।
তরুণী চম্পাবাঈ প্রবেশ করিল।
বাবা !
চম্পা।
বিক্রমজিৎ। আয়ত চম্পা,এই বৰ্ম্মটৰ্ম্মগুলাে আমায় পরিয়ে দে ত মা।
চম্পা। কেন বাবা ?
বিক্রমজিৎ। কেন কিরে! রাজপুত মায়েরা চিরদিনই ছেলেদের
অঙ্গে বৰ্ম্ম পরিয়ে দিয়েছেন। মা হয়ে তুই প্রশ্ন করছিস ?
চম্পা। তুমি কি এই রাতেই যুদ্ধে যাবে ?
বিক্রমজিৎ। যুদ্ধে যাব না, যুদ্ধের আয়ােজন করতে যাব।
চম্পা। যুদ্ধ কার সঙ্গে হবে ?

১৮
ধাত্রী পান্না
প্রথম অঞ্চ
বিক্রমজিৎ। সর্দারদের সঙ্গে। ( হাসিয়া) জানিস চম্পা, সর্দাররা
সব বিদ্রোহ করেছে। তারা নাকি আমাকে সিংহাসন থেকে সরিয়ে
বনবীরকে সেখানে বসাবে।
চম্পা। বনবীরকে।
বিক্রমজিৎ।
আরে হ্যা, হ্যা, পৃথ্বীরাজের সেই দাসী পুত্রকে ! কিরে,
মুখখানা ভারি হয়ে উঠল কেন ?
চম্পা। মেবারের সর্দাররা বনবীরকে সমর্থন করবেন ।
বিক্রমজিৎ। করলই বা !
চম্পা । বাবা, সে মােটেও হাসির কথা নয়।
বিক্রমজিৎ। আমি এখনও হাসচি, শেষ পর্যন্ত হাসব, সে তুই দেখে
নি।
চম্পা। বনবীর বাদি সর্দারদের সমর্থন পায়......
বিক্রমজিৎ। তাহলে কি হবে শুনি?
চম্পা। অপরাজেয় হবে সে।
জগমল। আমিও সেই কথাই বলতে চেয়েছিলাম ।
বিক্রমজিং। থাম, থাম, তুমি আর বুদ্ধির পরিচয় দিয়ােনা। আমি
কি করব জানিস মা?
চম্পা। কি বাবা ।
বিক্রমজিৎ। আমি বাদশা হুমায়ুনের সাহায্য নােব।
চম্পা। বাদশা হুমায়ুন !
বিক্রমজিৎ। শুনিসনি আমার মায়ের রাখী-ভাই, বাহাদুর শাকে
মেবার থেকে তাড়িয়ে আমাকে সিংহাসনে বসালেন। তার কাছে যাব
বসেই ত এসব পরতে চাই।

ধাত্রী পায়
১৮
চম্পা। তিনি কোথায় থাকেন?
বিক্রমজিৎ। দিল্লী।
চম্পা। তুমি যাবে দিল্লী !
বিক্রমজিৎ। নইলে তিনি খবর পাবেন কি করে ? কোন অশ্বারােহী
যাবে না। সবাই সর্দারদের ষড়যন্ত্রে যােগ দিয়েছে।
চম্পা। তাই তুমি যাবে দিল্লী !
বিক্রমজিৎ। আমার আদেশ পালন করবার জন্যে চিতােরে নাকি
একটি অশ্বারােহীও পাওয়া যাবে না। নাইবা গেল কেউ। আমি
অক্ষমও নই, অথৰ্ব্বও নই ।
চম্পা। বাবা!
বিক্রমজিৎ। বল্ মা।
চম্পা। হুমাযুন বাদশার কাছে আমি যাব।
বিক্রমজিৎ। তুই যাবি কিরে!
চম্পা। তােমার আদেশ পালন করবার জঙ্গে আর কেউ যদি না
থাকে, তােমার মেয়ে আছে বাবা। তুমি আরজ লিখে রাখ, আমি
এখুনি তৈরি হয়ে আসছি।
বারের দিকে অগ্রসর হইল।
বিক্রমজিৎ। বাদশার কাছে তুই কি যাবি মা!
চম্পা ফিরিয়া আসিয়া পিতার সায়ে জড়াইল। কহিল :
চম্পা। বাবা, আমি যদি তােমার মেয়ে না হয়ে ছেলে হতাম ?
বিক্রমজিৎ। তা মেয়ে হয়েই যখন এসেচি তখন মেয়ের মর্যাদা
তােকে দিতে হবে ত। দিল্লী যেতে তুই কি পারিস মা ?

ধাত্রী পান্না
প্রথম অধ
চম্পা। দিল্লী দূরের পথ নয় বাবা, তােমার বিপৰুক্তির জন্য দিল্লীত
দিল্লী আমি নরকেও নেমে যেতে পারি।
বলিয়া চম্পা বেগে বাহির হইয়া গেল।
জগমল। এই মেয়ে যদি ছেলে হােত।
বিক্রমজিৎ। রাণা হতে পারতনা। রাজ্য থেকে নির্বাসিত হােত।
দূরে একটা অস্ফুট কোলাহল উঠিল।
জগমল। প্রভু!
বিক্রমজিৎ। এত রাতে কারা কোলাহল করে ?
জগমল। দেখে আসব প্রভু ?
বিক্রমজিৎ। সরে পড়তে চাও নাকি।
জগমল। মনে হয় লােকগুলাে এই দিকেই আসছে।
বিক্রমজিৎ। রাজপুত সর্দাররা তাদের রাণাকে হত্যা করেনা।
জগমল। বনবীর সর্দার নয়।
বিক্রমজিৎ। বনবীর কত বড় বীর তা দেখবার সুযােগযদি পাই, তবে
বনবীর লাফাইয়া প্রবেশ করিল
বনবীর। হ্যা, সেই সুযােগই তােমায় দিতে চাই কাপুরুষ।
বিক্রমজিৎ। কাপুরুষ !
বনবীর। নইলে অসহয়া এক নারীকে কেউ আশ্রয়হারা করে।
বিক্রমজিৎ। ও। তুমি তােমার মা পৃথ্বীরাজের উপপত্নী সেই
শীতলসেনীর কথা বলচ! (হাসিয়া) সে যে রাজ্যের পাপ, সমাজের
কলক!

দ্বিতীয় দৃশ্য
ধাত্রী পান্না
২১
বনবীর। সাবধান!
বিক্রমজিৎ। কোন সম্রান্তারমণী হলে আশ্রয়হারা করতাম না।
বনবীর। বৰ্ম্ম পর।
বিক্রমজিৎ। কেন ?
বনবীর।
আত্মরক্ষার সুযােগ পাবে।
বিক্রমজিৎ। অসি দিয়েই আমি আত্মরক্ষা করব, বৰ্ম্ম দিয়ে নয়।
বনবীর। তাহলে প্রস্তুত হও।
বনবীর আঘাত করিল, বিক্রমজিৎ প্রতিহত
করিলেন।
বিক্রমজিৎ। যে সর্দারদের প্ররােচনায় তুমি আমায় হত্যা করতে
এসেচ, তাদের আজ তােমার মৃতদেহ উপহার দেব।
বনবীরকে আঘাত করিলেন।
বনবীর।
কারু প্ররােচনায় আমি আসিনি। আমি এসেছি আমার
মায়ের অপমানের প্রতিশােধ নিতে, আমার পিতাকে যে সিংহাসন থেকে
বঞ্চিত রাখা হয়েছিল, তাই অধিকার করতে।
বিক্রমজিৎ। দাসীপুত্রের অসম্ভব উচ্চাশা !
বনবীর প্রচণ্ড আঘাত করিল।
বনবীর। সাবধান, তুমি আহত।
বিক্রমজিৎ। হ্যা, কিন্তু বাহুতে এখনও শক্তি আছে।
আঘাত করিল।
বীর বনবীরও অনাহত রইলনা।

ধাত্রী পান্না
প্রথম ৮
বনবীর। অক্ষম সেই সান্ত্বনা নিয়েই অন্তিম শয্যা গ্রহণ করুক।
বলিয়া বিক্রমজিতের বক্ষ বিদীর্ণ করিল। তাহার
হাতের অস্ত্র পড়িয়া গেল।
বিক্রমজিৎ। সত্যই তুমি বীর, বনবীর!
বনবীর তাহার বুকের উপর ঝাঁপাইয়া পড়ি
তাহাকে ভূতলে ফেলিয়া কহিল :
বনবীর। মরবার আগে জেনে যাও এখন থেকে মেবারের সিংহাসন
আমার।
বুকে ছুরি বসাইয়া দিল।
বিক্রমজিৎ। তােমার নয় ••রাণা সঙ্গের কনিষ্ঠ পুত্র উদয়সিংহের।
বনবীর। উদয়সিংহের।
বিক্রমজিৎ। আমার ভাইয়ের।
বনবীর ঝুকিয়া পড়িয়া দেখিল।
বনবীর। মৃত! রাণা বিক্রমজিৎ মৃত !
জগমল আত্মপ্রকাশ করিয়া কহিল :
জগল। কিন্তু রাণা উদয়সিংহ এখনাে জীবিত।
বনবীর দ্রুত ফিরিয়া কহিল :
বনবীর। রাণা উদয়সিংহ।

দ্বিতীয় দৃশ্য
ধাত্রী পান্না
জগমল। রাণা সজের কনিষ্ঠপুত্র, রাণা বিক্রমজিতের কনিষ্ঠভ্রাতা,
শিশু উদয়সিংহ।
বনবীর। শিশু উন্নয়সিংহ।
জগমল। ধাত্রী পান্নার পালঙ্কে শায়িত।
বনবীর। শিশু উদয়সিংহ।
জগমল। একান্তই শিশু, পােকার মত টিপে মারা যায়।
বনবীর। কিন্তু শিশুকে হত্যা করব কেমন করে?
জগমল। সর্প শিশুও বিষধর হয় বনবীর।
বনবীর। তুমি কে!
জগমল। নাম জগমল, রাণার পারিষদ; সকল রাণার, সিংহাসনের
সকল অধিকারীর।
বনবীর। তুমি বলচ সিংহাসনের উত্তরাধিকারী এখন উদয়সিংহ ?
জগমল। উদয়সিংহ। নধরকান্তি, পান্নার পালঙ্কে শায়িত
বনবীর। তুমি বলচ উদয়সিংহ জীবিত থাকতে সিংহাসন আমার
হতে পারেনা ?
বৰ্ম পরিহিতা চম্পা প্রবেশ করিতে করিতে কহিল :
চম্পা। আমি জীবিত থাকতেও নয় ঘাতক।
বনবীর। চম্পা!
চম্পা। হ্যা, ঘাতক, আমি চম্পা, মেবার-রাণার পুত্রী।
বনবীর। তােমার পিতা•••
চম্পা। জানি তুমি তাকে হত্যা করে।
বনবীর। দ্বন্দ্বযুদ্ধে তিনি নিহত।
চম্পা। দেখনা তাই আমার চোখে জল নাই।

২;
ধাত্রী পান্না
প্রথম অঞ্চ।
বনবীর। আমি তােমার কথা ভেবে দেখিনি, চম্পা।
চম্পা। কৈফিয়তের প্রয়ােজন নেই।
বনবীর।
তােমার পিতার শেষকৃত্যের আয়ােজন কর।
চম্পা। আমার পিতার শেষকৃত্য কিসে হবে জান?
বনবীর। কিসে?
চম্পা। তােমার রক্তে যদি তর্পণ করতে পারি।
আমার ত আত্মহত্যা করবার ইচ্ছা নেই।
চম্পা। আঘাত থেকে আত্মরক্ষা কর।
বনবীর ।
বলিতে বলিতে তরবারির আঘাত করিল। বনবীর
প্রতিরােধ করিলনা, আঘাতে তাহার বর্ম ঝন ঝন
করিয়া উঠিল।
বনবীর। তােমার আঘাত অনেকবারই বুকে বেজেচে, চম্পা।
চম্পা। তুমি তৈরি হবে কিনা বল।
বনবীর। তােমার আঘাত বুক পেতে নিতে আমি এখনো তৈরি।
কর আঘাত।
চম্পা একটুকাল বনবীরের মুখের দিকে চাহিয়া
রহিল, তারপর হাতের তরবারি ফেলিয়া দিয়া
বিক্রমজিতের বুকের ওপর ঝাঁপাইয়া পড়িয়া কহিল :
চম্পা। বাবা! বাবা! উদ্ধত নির্মম এই আততায়ীকে আমি
কেমন করে শান্তি দেব বাবা!
চম্পা ফুলিয়া ফুলিয়া কাঁদিতে লাগিল। বাহিরে
কোলাহল।

তৃতীয় দৃশ্য
কুমার উদয়সিংহের শয়ন কক্ষ
শিশু উদয়সিংহ এবং শিশু কনককান্তি। কোলাহল শুরু হইল। বারি প্রবেশ
করিল।
বারি। পান্না! পান্না!
পান্না তাহার কাছে দৌড়াইয়া গেল।
বারি। কুমার উদয়সিংহকেও যদি বনবীর বিক্রমজিতের মতো :
পায়। বারি ।
বারি। বনবীর যদি তাই করে পান্না ?
পান্না। সিংহাসন যাকে লােভ দেখায় সে সব করতে পারে।
বারি। রাণা সঙ্গের বংশ কি নির্মূল হবে পান্না ?
পান্না। রাণা সঙ্গকে তােমার মনে পড়ে?
বারি। দেবতাকে যে আমি নিত্য ধ্যান করি।
পান্না। সত্যিই তাকে তুমি দেবতা বলে মান ?
বারি। নইলে এই বুড়ো বয়েসেও তার পুত্রের সেবা করব কেন ?
পান্না। রাণসঙ্গের পুত্রকে বাঁচাতে প্রাণ দিতে পার ?
বারি। কেন পারব না, পান্না!
পারা। তাহলে উদয়কে বাঁচাবার চেষ্টা কর।

ধাত্রী পান্না
প্রথম অঞ্চ
বারি। প্রাণ দেওয়া সহজ, কিন্তু কি করলে তাকে বাঁচানাে যায়
তাই বল।
চঞ্চল হইয়া ঘুরিয়া বেড়াইতে লাগিল।
উদয়। তুমি ভয় পেলে আই-মা !
পান্না ছুটিয়া গিয়া উদয়কে জড়াইয়া ধরিল।
পান্না। উদয়, আমার উদয়।
কনক। এই দ্যাখ মা, কুমার আজ আমাকে তার পােষাক পরিয়ে
দিয়েছে।
উদয়। আজ কনক রাণা আর আমি তােমার কনক।
পান্না যেন আলাে দেখিতে পাইল।
পান্না।
কনক আজ রাণা!
উদয়। আজ রাতের মতাে ওই কনক হয়েচে উদয়সিংহ আর
তােমার এই উদয় তােমার কনক।
পান্না নিজের মনকে বুঝাইতে চাহিল।
পান্না। কনক উদয় আর উদয় কনক!
কনক। না মা, তুমি যদি দুঃখ পাও এক রাতের জন্যেও আমি
উদয় হতে চাই না।
পায়। কিন্তু বাবা, উদয় যে তাই চায় ।
এ আমাদের খেলা আই-মা।
উদয়।

তৃতীয় দৃশ্য ধাত্রী পান্না . পান্না। হ্যা বাবা, জীবনের বড় বিচিত্র খেলা। বারি ! ছুটিয়া বারির কাছে গেল আমি পথ পেয়েচি বারি। বল কি করতে হবে ? পান্না। বলি বারি। বারি। পান্না ইতস্তত করিতে লাগিল। বারি। পান্না। যা করবে, শিগগীর শিগগীর কর পান্না। হ্যা, বেশী দেরী করব না। শুধু একবার দৌড়াইয়া গিয়া কনককে জড়াইয়া ধরিল কনক, বাবা ! উদয়সিংহ দৌড়াইয়া গিয়া কনক আর পান্নার মাঝে গিয়া দাড়াইয়া কহিল : উদয়। তােমার বাবা আজ আমি, কনক শুধু রাণা। কনক। তাই তুমি চাও মা? পান্না। হ্যা, বাবা, তাই আমি চাই । পান্না। বারি, তুমি চিনতে পার কে রাণাসতের তনয় আর কেই আমার পুত্র ? রাজপুত্রের পােষাক যে পরে আছে সে রাজপুত্র নয়। বারি। রাজপুত্রকে তুমি তাহলে কখনো দেখনি। কনক। আমি রাণা। বারি।

২৮
ধাত্রী পান্না
প্রথম অ
উদয়।
বারি। তুমি রাণা !
কেমন মজার খেলা আরম্ভ হলো আই-মা।
পান্না। খেলা এখনাে আরম্ভ হয়নি বাবা।
উদয়। আরাে মজা আছে ?
পান্না।
আরাে মজা আছে।
উদয়।
কনক!
কনক। রাণা বল ।
উদয়। ( অভিবাদন করিয়া ) রাণা, এ খেলায় আরো মজা আছে।
কনক। আর কি মজা আছে মা ?
পান্না। সর্বস্ব দিয়ে দেখতে পাবে বাবা।
উদয়। তুমি কঁাদচ আই-মা !
পান্না।
এ খেলা যারা দেখে তাদের কাদতে হয়।
কেন ?
পান্না। নইলে খেলা জমে না।
উদয়। কাচ যখন, তখন খেলা জমিয়ে দাও।
পান্না। বারি !
বারি। বল।
পায়। পাশের ঘরে একটা করণ্ডক আছে, নিয়ে এস।
বারি পাশের ঘরে চলিয়া গেল।
করকে যে আমার জন্যে ফল এসেছিল।
পায়। ফল আমি তুলে রেখেচি বাবা !
উদয়। খালি করণ্ডকে কি হবে ?

তৃতীয় দৃশ্য
ধাত্রী পান্না
পান্না। খেলা হবে।
কনক। ভারি মজার খেলা হবে কুমার।
কনক বল, ভাই।
কনক। ঠিক, ঠিক। আর ভুলব না আমি উদয়, আমি উদয় ।
পান্না। খেলার উদয় আমাদের দিকে পেছন ফিরে দাড়াও
উদয়।
কনক তাহাই দাড়াইল। উদয়কে একদিকে
টানিয়া লইয়া চাপা গলায় পান্না কহিল :
খেলার কনক, বারি যেই করণ্ডক নিয়ে আসবে, আমি তুমি তার
মাঝে গিয়ে লুকোবে ।
উদয়। ভারি মজা হবে!
পায়। হ্যা, ভারি মজা হবে।
উদয় । তবে তুমি কাঁদছ কেন ?
পান্ন। বল্লাম যে নইলে খেলা জমে না।
উদয় তাহার গলা জড়াইয়া ধরিয়া কহিল ।
উদয়। তােমায় কাঁদিয়ে আমি খেলা জমাতে চাইনা, আই-মা !
বারি করগুক লইয়া প্রবেশ করিল।
পান্না।
এস, তােমায় লুকিয়ে রাখি।
করগুকের মাঝে বসাইয়া দিল।
চুপ করে বসে থাকবে। আমি ছাড়া কেউ ডাকলে সাড়া দেবে না।
মুখের ঢাকা চাপা দিল

ধাত্রী পান্না
প্রথম ৮
আর দেরী কোরােনা বারি। উদ্যানের ভিতর দিয়ে বেরিয়ে যাও।
বেরিশ নদী পার হয়ে উপত্যকার ঘন-বনে তুমি আমার জন্য অপেক্ষা
করবে।
বারি। তুমি যদি যেতে না পার।
পান্না। আমাকে কে বাধা দেবে ?
বারি। কুমারকে না পেয়ে বনবীর যদি তােমাকে বন্দী করে?
পান্না। তুমি যাও বারি। বৰুবীর কুমারের স্থান শূন্য দেখবে না,
তার সন্দেহের অবকাশও থাকবে না। মনে রেখে বারি, তােমার
কৰণ্ডকে রয়েচে মেবারের অমূল্য রত্ন।
বারিকে বাহির করিয়া ঘরের দ্বার বন্ধ করিয়া দিল।
কনক।
কনক। ফিরে দাড়াব, মা!
পান্না। বুকে আয় বাবা, বুকে আয় !
পান্ন হাটু গাড়িয়া বসিল। কনক দৌড়াইয়া
আসিয়া তাহার গলা জড়াইয়া ধরিল।
কনক। কুমার কোথায় মা ?
পান্না। এই ত আমার কুমার! আমার সাতরাজার ধন মাণিক।
কনক। মা, সত্যিই কি আজ রাতের জন্যে আমি রাণা?
পান্না। মেবারের মহামহিম যত রাণ। মেবারের সিংহাসনের জলে
আত্মত্যাগ করেছেন, আজ তারা সকলে তােমাকে আশীর্বাদ করবেন,
বাবা।

ধাত্রী পান্না
৩১
কনক। তােমার আর দুঃখ থাকবেনা ?
পান্না।
আমার সকল দুঃখ তােমার মা হবার গরবে ফুল হয়ে
ফুটে উঠবে।
কনক। তুমি কি বলচ আমি বুঝতে পারছিনা।
পান্না।
অনেক রাত হয়েছে বাবা, এস পালঙ্কে শুইয়ে দি।
কনক। কুমারের পালঙ্কে!
পান্না।
পালঙ্ক ৩, আজ তােমারই।
কনক। উদয়? উদয় কোথায় ?
পান্না।
এই ত আমার উদয়। মেবারের ধন-অন্ধকারে আত্মত্যাগে
মহিমময় নবারুণ-উদয় ।
বলিতে বলিতে পুত্রকে কোলে তুলিয়া উদয়সিংহের
পালঙ্কে শােয়াইয়া দিলেন।
কনক। আমার এখন ঘুম হবেনা, মা।
পান্না। দাড়াও ঘরের আলাে আমি স্নান করে দি।
পান্না ঘরের আলাে স্নান করিয়া দিলেন।
কনক। আমি যদি রাণা হলাম, আমার ভয় হচ্ছে কেন মা?
পান্না। কিসের ভয় বাবা ?
কনক। আমার ভয় হচ্ছে মা, অন্ধকারে এক দৈত্য আসবে।
পান্না। দৈত্য ত আসবেই বাবা।
কনক। আমি তাহলে কি করব ?
পান্না। বলবে আমি রাণা উদয়সিংহ, দৈত্য ভয় পেয়ে পালিয়ে যাবে ।
কনক। দৈত্যরা রাণাকে ভয় পায় ?

ধাত্রী পায়।
প্রথম অঙ্ক
পান্না।
যে রাণা আত্মত্যাগ করে, ভগবান একলিঙ্গ তার সহায়
থাকেন। দৈত্য-দানব দ্য-ঘাতক কেউ তার ক্ষতি করতে পারেনা।
দরজায় প্রচণ্ড ধাক্কা।
কনক। ও কি মা।
পান্না। দৈত্যই হয়ত এল, বাবা। ভুলােনা তুমি রাণা।
কনক। মা, আমি ভুলবনা যে রাণা আত্মত্যাগ করে, ভগবান
একলিঙ্গ তার সহায় হন।
পান্না। বিছানায় শুয়ে শুয়ে তুমি তার ধ্যান কর, বাবা।
পান্না পুত্রকে চাদর চাপ দিয়া দাড়াইলেন। দরজা
ভাঙিয়া বনবীর প্রবেশ করিল। ঘরের মৃদু আলােকে
পান্নার উজ্জ্বল আঁখি দুটি দেখিয়া বনবীর স্থির হইয়া
দাড়াইল।
বনবীর। উদয় কোথায় ?
পান্না। কে তুমি ?
বনবীর। আমি বনবীর।
পান্না। তুমি জাননা এটা রাণার শয়নকক্ষ ?
বনবীর।
কে রাণা ?
পান্না। বিক্রমজিতের অবর্তমানে উদয়সিংহই মেবারের রাণা।
বনবীর।
মেবারের রাণা আমি।
পান্না। ও, আপনিই মেবারের রাণা !
বনবীর।
আজ থেকে আমিই রাণ।

ধাত্রী পান্না
পান্না। তাহলে আপনায় সঙ্গে আমি বিরোধ করবনা। দাসীর
অভিবাদন গ্রহণ করুন রাণা।
বনবীর। তুমিই সর্বপ্রথমে আমাকে রাণা বলে অভিবাদন করলে।
তােমাকে আমি পুরস্কৃত করব।
পান্না। পুরস্কার আমি চাইনা, আমি অনুগ্রহ চাই।
বনবীর।
অনুগ্রই!
পান্না। অনুগ্রহ করে এই কক্ষ এখুনি ত্যাগ করুন।
বনবীর। কেন ?
পান্না। উদয়ের ঘুম বড় হাল্কা ।
বনবীর। সেজন্যে তােমার অস্বস্তির শেষ নাই ?
পান্না। অনেক কষ্টে ঘুম পাড়িয়ে রেখেচি।
বনবীর।
তোমায় আর দুশ্চিন্তা ভােগ করতে হবেনা :
এমন কাজ করতে এসেচি যার ফলে উদয়ের ঘুম আর ভাঙবেনা ।
পান্না। কিন্তু সে যদি ‘মা’ বলে আমায় না ডাকে, তাহলে আমার
মাতৃ-হৃদয় যে শান্ত হবেনা। তুমিও । মায়ের ছেলে। মায়ের মেই
তুমিও ত পেয়েচ।
বনবীর।
আমার মায়ের তুলনা নেই।
পান্না।
তাহলে রাত হয়েছে মায়ের কাছে ফিরে যাও। তিনি
ভাবচেন।
নবীর। তুমিই পান্না।
পান্না। দাসী সেই নামেই পরিচিত।
বনবীর। তাই তােমার এই চাতুরি !
আমি

৩৪
ধাত্রী পায়া
পান্না। নবীন রাণা কি দাসীর পরিচয় পেয়েছেন?
বনবীর। পেয়েছি বলেই ত তােমার কাছে এসোচ। উদয়সিংহ,
কোথায় ?
কনক বিছানায় উঠিয়া বসিয়া কহিল :
কনক।
এই যে আমি ।
রাণা উদয়সিংহ।
হারাগাের পাইলে লােকে কত দিয়া যেন শব্দ
করে বনবীরের কণ্ঠ দিয়া তেমনই একটা শব্দ বাহির
হইল।
একই সঙ্গে পান্না আক্তারে কহিল :
পান্না। না, না।
পান্না দুটিয়া পুত্রকে জড়াইয়া ধরিল। বনৰীৰ
পালঙ্কে কাছে আগাইয়া দিল
ওকে বাঁচতে দাও, বনবীর
বনবীর। এই রাণা সঙ্গের শেষ জীবিত সন্তান।
পান্না। একান্তই শিশু, বনবীর ।
কনক। আমি ভয় পাইনি মা। আমি জানি ভগবান একলি
সহায়।
বনবীর। দাও ওকে ছেড়ে পান্না।
পায়। তােমার মুখে-চোখে হিংস্র তাব। তুমি ওকে
করতে চাও !
বনবীর। তুমি বুদ্ধিমতী, ঠিকই অনুমান করে। দাও আমার
হতে তুলে।

তৃতীয় দৃশ্য ধাত্রী পান্না পান্না। এই শিশুর প্রাণ নিয়ে তােমার কি হবে বনবীর ? বনবীর। আমার সিংহাসন নিষ্কণ্টক হবে। পান্না। সিংহাসন কখনাে কন্টক শূন্য হয়না, তাকি তুমি জাননা? বনবীর। অন্তত রাণা সঙ্গের উত্তরাধিকারী কেউ থাকবে না। পান্না। আমি শপথ করচি বনবীর, এই মুহূর্তে তােমার সম্মুখ দিয়ে ওকে নিয়ে আমি চিতাের ছেড়ে চলে যাব, বনে বনে বাস করব, আর ফিরে আসব না। বনবীর। আমিও যখন শিশু ছিলাম তখন আমার মাও আমাকে নিয়ে চিতাের ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন। আমাদেরও আশ্রয় ছিল পাহাড়ের গুহা, খাদ্য বনের ফল। বড় হয়ে কিন্তু আমি চিতােরেই ফিরে এলাম, দাবী করলাম মেবারের সিংহাসন। আমরা যা করেছি, তােমরাও তাই করতে পার। তাই উদয় সিংহকে আমি চিতাের ছেড়ে যেতে দেব না। পায়া। তাহলে উদয়কে কারাগারে বন্দী করে রাখ। বনবীর। তুমি চতুর। কিন্তু আমি জানি যে সর্দাররা আজ বিক্রমজিতের প্রতি শ্রদ্ধা হারিয়ে আমাকে সিংহাসনে বসাতে চায়, তারা একদিন কারাগার ভেঙে ফেলে উদয়কে এনে আবার সিংহাসনে বসাতেও পারে। আমি সে সম্ভাবনাও রাখবনা। পান্না। কিন্তু রাজরক্তে তােমার সিংহাসন যে তলিয়ে যাবে বনবীর। বনবীর। রাজরক্ত সিংহাসনকে কোন কালেই তলিয়ে দেয়নি, রক্ত- সরসীতে শতদলের মতােই তাকে ফুটিয়ে ধরেচে। দাও ওকে আমার কাছে ছেড়ে! পায়। মায়ের বুক থেকে তুমি সন ছিনিয়ে নিতে চাও?

৩৬
ধাত্রী পান্না
প্রথম অঞ্চ
বনবীর। তুমি ওর মা নও।
পান্না। আমি ওর মা নই।
বনবীর। বেতনভােগী ধাত্রী মাত্র।
পান্না। ধাত্রী। কিন্তু ধাত্রারও তাে স্নেহ থাকে, মায়া থাকে,
মাতৃত্ব থাকে।
বনবীর। তার মর্যাদা দিতে আমি কুণ্ঠিত নই। আমার যখন সন্তান
হবে, আমার উত্তরাধিকারী ভবিষ্য-রাণার যেদিন আবির্ভাব হবে, সেদিন
তাকে আমি তােমার হাতে অর্পণ করে নিশ্চিন্ত থাকতে পারব। দাও,
দাও, আর সময় নষ্ট কোরােনা।
পান্না। আমি দোবনা! ছেড়ে দিতে আমি পারবনা।
বনবীর। নারীহত্যা আমার মায়ের নিষিদ্ধ। নইলে আমি একই
অস্ত্রে তােমাকে আর ওই ঘৃণ্য শিশুকে বিধে ফেলতাম।
পান্না।
তােমার মা ! পৃথ্বীরাজের সেই উপপত্নী, নারীর কলঙ্ক
হয়ে নারীকে সেও মৰ্য্যাদা দেয় ।
বনবীর। আমার মায়ের যে দুর্ণাম করে, মায়ের আদেশেও তাকে
আমি ক্ষমা করতে পারি না। আগে তাকে হত্যা করে ওই শিশু-সৰ্পকে
হত্যা করব।
পান্না। না, না।
কনককে ছাড়িয়া দিয়া সরিয়া গেল।
বনবীর। তােমার মাতৃত্ব ত তােমাকে নিজের প্রাণ তুচ্ছ করে
শিশুকে বাঁচাবার প্রেরণা দিলনা, পান্না। নিজের সন্তান হলে কি দূরে
সরে দাড়াতে পারতে ?

তৃতীয় দৃশ্য
ধাত্রী পান্না
পান্না। ভগবান একলিঙ্গ জানেন কেন আজ আমি মৃত্যুকে বরণ করে
নিতে চাইনা। ভগবান ! ভগবান! কোন মাকে কখনাে যা করতে
হয়নি, তুমি আজ আমাকে দিয়ে তাই করিয়ে নিলে। তােমারই ইচ্ছা
পূর্ণ হােক, ভগবান, তােমারই ইচ্ছা পূর্ণ হােক।
দুই হাতে মুখ ঢাকিয়া বসিয়া পড়িল।
বনবীর।
রাণা সঙ্গের কনিষ্ঠ সন্তান, তার সিংহাসনের শেষ
কনকের হাত ধরিয়া টানিয়া তুলিল।
উত্তরাধিকারী, ক্ষণিকের রাণা উদয়সিংহ, শিশু হলেও অসহায় হলেও
তােমাকে আমি বেঁচে থাকতে দোবনা।
বনবীর শিশু কনকের বুকে ছেরা বসাইয়া দিল,
শিশু ও পান্না আর্তনাদ করিয়া উঠিল।

চতুর্থ দৃশ্য
বনবীরের উদ্যান-বাটিকা
সর্দারগণ সমবেত, শীতলসেনী দাড়াইয়া আছেন।
কর্ণজি। তােমার পুত্র কোথায় শীতলসেনী?
শীতলসেনী। কাল প্রভাতেই অভিষেক, বনবীর छावरे
আয়ােজনে ব্যস্ত।
করমচাদ। অভিষেক হবেনা।
শীতলসেনী। হবেনা।
সকলে। না, না।
শীতলসেনী। কেন ?
কজি। রাজরক্তে যার হাত কলুষিত, মেরের সিংহাসনে
বসবার অযােগ্য।
শীতলসেনী। মেবারের কোন্ মহিমময় রাণা রাজরক্তে হাত কলুষিত
না করে সিংহাসনে বসবার সুযােগ পেয়েছেন?
বীরমল্প। আমরা তােমার সঙ্গে তর্ক করতে আসিনি, এসেছি
তােমার পুত্রের কাছে।
বনবীর বাহির হইয়া আসিল।
সামে
উপস্থিত। তার
বনবীর। পুত্র মেবারের পুরুষ-সিংহদের
অভিবাদন গ্রহণ করুন।

চতুর্থ দৃশ্য
ধাত্রী পান্না
বীরমল্ল।
কর্ণজি। বনবীর, তােমার বিরুদ্ধে আমাদের অভিযােগ আছে।
বনবীর। অভিযােগ !
গুরুতর অভিযােগ।
বনবীর। অপরাহ্নে আপনারা এসেছিলেন গুরুতর প্রয়ােজনে,
নিশাবসানকালে এলেন অভিযোেগ নিয়ে । রাজ্যের হিতচিন্তায় আপনারা
দেখচি আহার নিদ্রা ত্যাগ করেচেন।
করমচঁাদ। সির কথা নয় বনবীর। সত্যই আমাদের অভিযােগ
অত্যন্ত গুরুতর।
বনবীর। পরলােকগত বিক্রমজিতের মতো আমি ত সর্দার-শ্রেষ্ঠকে
একা সভায় প্রহার করিনি।
তােমার অপরাধ তার চেয়েও গুরুতর!
বনবীর।
সত্য চন্দাবৎ সর্দার ?
কর্ণজি। তুমি মেবারের রাণাকে হত্যা করে।
বনবীর। অস্বীকার করিনা। সাক্ষা আমার এই রক্তরঞ্জিত হাত।
কর্ণজি।
দুই হাত তুলিয়া ধরিল।
বীরম। ওই হাত আমরা কেটে ফেলব।
বনবীর। মার্জনা করবেন। আপনাদের এই সদিচ্ছায় আমি সায়
দিতে পারবনা।
কজি।
আমরা তােমাকে শাস্তি দেব।
বনবীর।
তার আগে আপনাদেরই শান্তি নিতে হবে। কাল
সিংহাসনে আরােহণ করে সর্বপ্রথমেই রাজদ্রোহের জন্য আমি আপনাদের
বিচার করব। রাজদ্রোহের শান্তি আপনারা অবশ্যই জানেন-হয়

30 ধাত্রী পান্না প্রথম অঙ্ক । মত্যুদণ্ড, নয় নির্কাসন। নিশাবসানের আর বিলম্ব নেই। আপনাদের আমি অবসর দিচ্ছি। আপনারা এখন নিজ-নিজ গৃহে প্রত্যুত হয়ে পুত্র পরিজনদের কাছে চির-বিদায় গ্রহণ করে প্রস্তুত হয়ে থাকুনগে। আমারও বিশ্রাম আবশ্যক। এস মা । সর্দারগণ হতবাক্ হইয়া রহিলেন। শীতলসেনী ও বনবীর দুয়ারের দিকে ফিরিতেই কর্ণজি কহিলেন ? কজি। তুমি কি আমাদের একেবারে শক্তিহীন মনে কর ? বনবার ফিরিয়া বঁাড়াইল ; শীতলসেনী চলিয়া 5ালেন ' ভুল রনবীর। প্রকাশ্য রাজসভায় অনুষ্ঠিত অপমানের প্রতিবিধান করতে পেরে মেবারের শ্রেষ্ঠ সর্দাররা সিংহাসন উপঢৌকন নিয়ে যখন এই ক্তিমানের দ্বারে এসে দাড়িয়েছিলেন, তখনই কি প্রমাণিত হয়নি যে আপনারা দুর্বল, আপনারা শত্তিহীন, আপনারা অনাচার নিবারণে অক্ষম? বীরল্ল। তােমাকে সিংহাসনে বসাতে চেয়ে আমরা করেছিলাম। বনবীর। খুব বড় রকমের ভুল করেছিলেন। আমি আপনাদের যার প্রত্যাশী নই। আমরা সে ভুল সংশোধন করব । করমাদ। আমরা রাণা সঙ্গের কনিষ্ঠ পুত্র উদয়সিংহকে সিংহাসনে যাবে। বনবীর। শুনুন মেবারের মহামান্য সর্দারগণ, কৃটরাজনীতিক যারা কজি।

চতুর্থ দৃশ্য
পাতী পান্না
৪১
র। কথাটা গােপন রাখতেন। কিন্তু আমি বনবীর, ছল চাতুরীতে
অনভ্যস্থ আমি, আমি কুণ্ঠায় মৌন না থেকে নিজের মুখেই বলচি শিশু
উদয়সিংহকেও আমি হত্যা করিচি।
সকলে। রাসহতা।
বনবীর। হা মহামহিম সর্দারগণ, যে-বাজাকে সিংহাসন থেকে টেনে
নামাতে আপনারাই বহু বিস্তার করেছিলেন ।
সকলে।
শিশুহত্যা!
বনবীর।
যে শিশুর ন্যায্য দাবী বিস্মৃত হয়ে আপনারা আমাকেই
সিংহাসন উপঢৌকন দিতে চেয়েছিলেন। শুনে রাখুন মেবারের সর্দারগণ,
সংগ্ৰামসিংহের পুত্ররা কেউ জীবিত নেই। তাই তার 'রত্যক্ত
সিংহাসনের সত্যিকার উত্তরাধিকারী আমি, রাণা সঙ্গে র ভ্রাতুস্পুত্র
বনবীর।
কজি। দাসীপুত্র!
বনবীর। মোৰ্য্য চন্দ্রগুপ্তর কথা স্মরণ করুন, তার বিশাল সাম্রাজ্যের,
অসীম প্রভাবের কথা স্মরণ করুন। যদি আপনাদের স্মৃতিলােপ হযে না
থাকে, তাহলে মতে পারবেন আপনাদের কুৎসা আমাকে অধিকারহারা
করতে পারবেনা।
সাররা উব খুজিয়া পাইলেন না ।
সার বীরমল, সকলের পেছনে দাড়িয়ে শর-সন্ধানে আপনি আমাকে
হত্যা করতে চাইছেন, কিন্তু পেছন ফিরে চেয়ে দেখুন আপনার চেয়েও
বলশালী এক ব্যক্তির :ল্লম আপনার পৃষ্ঠ স্পর্শ করেছে।

২
ধাত্রী পান্না
প্রথম অ
বীরমল্ল ফিরিয়া দেখিল বিশালকায় একটি লােক
সূচ্যগ্র বলমের ফলক তাহার পৃষ্ঠের কাছে
ধরিয়া আছে।
সর্দারগণ, বারমত্সজীর আচরণে বুঝতে পারলাম বীরত্বকে আপনারা
একেবারে বর্জন করেননি। আমার সঙ্গে দ্বন্দ্বযুদ্ধে সেই বীরত্বের পরিচয়
দিতে কে কে প্রস্তুত আছেন বলুন, আর বলুন কোন কোন অন্ত্রে
আপনার বীরত্বের পরিচয় দিতে অভিলাষী,--খঙ্গ ? বল্ল ? মুষল ?
বলুন, বলুন।
কজি। আমরা একযােগে তােমাকে আক্রমণ কবব, ঘাতক।
সকলে।
বধ কর, বধ কর ।
অস্ত্র তুলিয়া অগ্রসর হইল, মঞ্চে দুইদিকে তুষ্যনি
হইল, সদ্দাররা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইয়া পড়িল ।
বনবীর। পৃষ্ঠ রক্ষা করুন বারগণ, আপনাদের পৃষ্ঠরক্ষা করুন ।
বহু সৈন্য সর্দারদের বেষ্টন করিল। দুয়ার খুলিয়া
শীতলসেনী প্রবেশ করিলেন তাহার হাতে নানা
আয়ুধ।
বনবীর।
এইবার সাম্নে চেয়ে দেখুন বারগণ, শসুপাণিজননী নিজে
এসে দাড়িয়েচেন সন্তানের হাতে অস্ত্র তুলে দিতে।
শীতলসেনী। মেবারের সর্দারগণ, আমার পুত্র আপনাদের দয়ার
ওপর নির্ভর করে সিংহাসনে বসতে চায় না বলেই আমরা এই আয়ােন
কবিচি । আপনাদের রাণার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করুন।

ধাত্রী পান্না ৪৩ বনবীর। অস্ত্র ত্যাগ করুন সর্দারগণ! আপনাদের নিষ্ঠার পরিচয় পেলে আমি নিজে আপনাদের হাতে অস্ত্র তুলে দেব। করমচাদ। বনৰীর, রাণা বিক্রমজিৎ প্রকাশ্য রাজসভায় আমাকে প্রহার করেছিল। সেই অপমানের প্রতিশােধ নিতে এসে আমাদের কম অপমান ভােগ করতে হয়নি। তবুও আমি তােমাকে রাণা বলে স্বীকার করচি। সকলেও বিনা বাক্যব্যয়ে অঞ্জ রাখিলেন। তাহাই করিলেন । বনবীর । মা, এইবার তােমার সুন্দ-উপসুন্দদের সরে যেতে বল। শীতলসেনী ইঙ্গিত করিলেন, সর্দারদের যাহার ঘিরিয়া দাড়াইয়াছিল তাহারা সরিয়া গেল। সর্দারগণ, অপরাহে আপনাদের আমন্ত্রণ করেছিলাম আমার আতিথ্য গ্রহণ করতে। তখন আমার অভিষেকের আয়ােজনে অত্যন্ত ছিলেন বলে সে আমন্ত্রণ আপনারা গ্রহণ করতে পারেন নি। আমার সিংহাসনারােহণ আর আপনাদের অভিষেকোৎসবের অপেক্ষা রাখেনা, কেননা আমার নিজেই, সব আয়ােজন সম্পূর্ণ করেচেন। আপনারা এখন অত্যন্ত ক্লান্ত, আমিও অনাহারে বুয়েচি। সূপকাররা মৃগমাংস উষ্ণ রেখেচে। আসুন, একত্রে পান- ভােজন করে ক্ষুধা ও অবসাদ দূর করবেন । ররা নীরব রহিলেন।

৪৪
ধাত্রী পান্না
প্রথম অফ
শীতলসেনী। দাসী-পুত্রের আমন্ত্রণ বলে আপনারা, মেবারের সম্ভ্রান্ত
সর্দাররা, এখনাে তা গ্রহণ করতে অসম্মত। আমার অন্তঃপুরে আজ
এমন একজন
আছেন, যার আমন্ত্রণ আপনার উপেক্ষা করতে
পারবেন না। আমি তাকেই আপনাদের সামে নিয়ে আসছি।
শীতলসেনী গৃহে প্রবেশ করিলেন
কর্ণজি আমাদের কি আরে; অপমান করতে চাও, বনবীর ?
বনবীর। এ গৃহ আমার মায়ের গৃহ চন্দাবং সর্দার ; তার কোন ব্যবস্থা
নিয়ে
তোলবার কোন অধিকারই আমার নেই। আপনারা
শুধু মনে রাখবেন :মবারে । সৰ্ব্ব প্রধান হিতৈষীর জীবন সঙ্গিনী হয়েও
এই চিতােরেই আমার মাকে এবং আমাকেও কম অপমান সহ
করতে হয় নি।
গলমেনী প্রবেশ করিলেন . হার পশ্চাতে
দুইজন মশালধারিনীর মাঝে যিনি দেখা দিলেন,
তিনি বিক্রমজিৎ নয়তরুণী স্পা, আলুলায়িত
• কেশ', প্ল,ত: :
সর্দারগণ। চম্পাবাঈ।
চম্পা। আপনারা আমাকে চিনতে পেরেছেন।
কর্ণজি রাণ: বিক্রমজিতের কন্যাকে এখানে দেখতে পাব, তা
আমরা কল্পনাও করিনি।
চম্পা। বলতে পারেন সদ্দারগ, কেন আমি আজ এখানে ?
চম্পা নর্দারদের মুখের ওপর দিয়া দৃষ্টি বুলাইয়া
নইল ।

চতুর্থ দৃশ্য
ধাত্রী পান্না
৪৫
আপনারা নীরব। আমি জান্তাম জবাব আপনারা দিতে পারবেন না।
রাণা বিক্রমজিতের কন্যা আমি। আজ প্রাসাদে আমার ঠাই নেই,
মেবারের সর্দারদের গৃহে আমার ঠাই নেই, অনূঢ়া বলে স্বামী-গৃহ
বলেও আমার কিছু নাই ।
চম্পা চোখ মুছিল, তারপর বলিল :
জানি গাছতলা ছিল, পাহাড়ের গুহা ছিল, ভিক্ষা করবার জন্য নগর
আর পল্লীর পথ ছিল ; কিছু না থাকলেও নিশ্চিত করে ছিল মৃত্যুর
শীতল কোল। তবু আজ আমি পিতৃহন্তার গৃহে—কেন না আশ্রয়
নির্বাচনের স্বাধীনতা আমার ছিল না।
বনবীর। তুমি আমাদের বন্দিনী নও, চম্পা।
।
চম্পা একবার বনবীরের দিকে চাহিল । কিন্তু কোন
জবাব না দিয়া সর্দারদের বলিতে লাগিল।
চম্পা। আমার পিতৃহন্তা আমায় শােনালেন আমি তার বন্দিনী নই।
তিনি বলতে চান আমি স্বেচ্ছায় এখানে এসেছি। আপনারা জেনে
রাখুন তা সত্য নয়। স্বেচ্ছায় আমার পিতৃহন্তার গৃহে আমি
আসিনি, কিন্তু আপনাদের সাম্নে এসে দাড়িয়েচি স্বেচ্ছায়।
করমাদ। বনবীর, আমাদের রাজপুত্রীকে মুক্তি দাও, বনবীর!
কজি। আমাদের রাজপুত্রীকে আমরা সাদরে সসম্মানে রাখব।
চম্পা। আপনাদের আশ্রয় আমার পক্ষে পরম সম্মাজনক হােতাে, যদি
আপনারা বিশ্বাসঘাতকতা না করতেন, যদি আপনারা রাজদ্রোহে
লিপ্ত না থাকতেন। বুকে হাত দিয়ে বলুন ত আপনারা, আমার
পিতৃহত্যার জন্য দায়ী কে? আপনারাই নন কি ?

৪৬ ধাত্রী পান্না প্রথম এ কজি। অত বড় পাপ আমাদের কল্পনায়ও ছিল না। চম্পা। বনবীরেরও ছিল না। বনবীর বনে বনে মৃগয়া করে ফিরত, সিংহাসনের দিকে ফিরেও চেয়ে দেখত না। আপনারাই তাকে প্রলুব্ধ করেছেন! বনবীরকে প্রলুব্ধ করেছেন আপনারা আর বনবীরের অন্তরে বিষ ঢেলে দিয়েচে দুশ্চরিত্রা এই ঘৃণ্যা নারী! শীতলসেনীকে দেখাইয়া দিল। বনবীর। চম্পা! চম্পা। সমাজের বিচারে এই নারী চিরদিনই পতিতা; আর আপ- নারাও, সর্দারগণ, বিশ্বসহা বলে আজ পতিত। তাই পতিতার গৃহে পতিতার পুত্রের আমন্ত্রণ আপনাদের পক্ষে কিছুমাত্র অপমানজনক নয় জেনেই আমি বলচি আসুন আপনারা, আহাৰ্য্য গ্রহণ করুন, আমি নিজে পরিবেশন করব । চম্পা পুরিয়া শীতলসেনীর মুখখামুখি দাড়াইল। দু’জনার নয়নে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ। বনবীর মায়ের পিছনে গিয়া দাড়াইল : বনবীর। মা, চম্পা পিতৃ-শােকাতুরা, সীমারেখা মেনে চলা তার পদে এখন সম্ভব নয়। শীতলসেনীর ঠোটে মৃদু হাসি ফুটিয়া উঠিল। শীতলসেনী। সমের সীমারেখার কথা বলচ পুত্র? আমার বাবার সন্ত্রম! বনবীর। তবুও চম্পা তােমার অভিলাষ মত কাজ করেছে। শীতলসেনী। রাণার তনয়াকে নিয়ে যাও। মশাল বাহিনীদের সঙ্গে চপা চলিয়া গেল।

চতুর্থ দৃশ্য
ধাত্রী শান্না
৪৭
শীতলসেনী। সাত সর্দারগণ, আপনারা কি করবেন বলুন ? বনবীর
এখনাে অভুক্ত রয়েছে।
জগমল। বনবীর। বনবীর!
বনবীর।
জগমল প্রবেশ করিল।
জগমল। আমি জগমল,
আমি জগমল, বনবার।
শীতলসেনী। রাণা বল।
জগমল। আর রাণা ! এই যে সর্দাররাও রয়েছেন। আপনাদের
সব ষড়যন্ত্র ব্যর্থ !
বনবীর। কী বলতে এসেচ তুমি !
জগমল। বলতে কিছুই আসিনি, সংবাদ নিয়ে এসেছি। উদয়সিংহ
জীবিত।
বনবীর। জীবিত।
সকলে। জীবিত।
জগল। ধন্য পান্না! ধন্য পান্না ! শত শত কোটা কোটা প্রণাম
পাকে।
শীতলসেনী। বাচালতা না করে সরল ভাবে বল কি বলতে চাও।
জগমল। বলবার ভাষা খুঁজে পাই না শীতলসেনী।
শীতলসেনী। তাহলে নীরব থাক।
জগমল। বনবীর যাকে হত্যা করে এসেছে, সে জাল উদয়সিংহ।
শীতলসেনী। আসল উদয়সিংহ ?
জগমল। পায় তাকে আগেই পাচার করেছে।
বনবীর। নিহত শিশু উদয়সিংহ নয় ?

৪৮
ধাত্রী পান্না
প্রথম অ
জগমল । না, না, না।
বনবীর। তুমি জানলে কি করে ?
জগল। আমি যে নিজের চোখে দেখে এলাম চিতায়-শায়িত সেই
শিশুর মুখ। সে উদয়সিংহ নয়। পায়ার পুত্র কনক।
বনবীর পান্না! পান্না! পান্না! পান্নাকে এখুনি চাই
ছুটিয়া যাইতেছিল।
কমল। শােন বনবীর, শােন, শােন।
বনবীর ফিরিয়া আসিল।
পান্নাকে তুমি কোথায় পাবে?
বনবীর । প্রাসাদে।
জগমল । প্রাসাদে সে ফিরে আসেনি,পুত্রকে ছাই করে জলে ভাসিয়ে
দিয়ে বনের আঁধারে সে নিজেকে মিলিয়ে দিলে। পায়ের ধ্বনি শুনে শুনে
: আমি কিছুদূর তার অনুসরণ করলাম, তারপর সে ধ্বনিও দূরে মিলিয়ে
গেল!
কর্ণজি। নিহত শিশু যদি উদয়সিংহ হােতো, পান্না একা তার শব
বয়ে নিয়ে যেত না।
করমচাদ। রাণা সঙ্গের কনিষ্ঠ পুত্র উদয়সিংহ তাহলে জীবিত।
সকলে। জয় রাণ:••
বনবীর। সদ্দারগণ !
বনবীরের হুঙ্কারে সর্দাররা আর জয়নাদ করিতে
পারিলেন না। বনবীর হাসিয়া কহিল :
ও, আপনাদের বাধা দিলাম। জয়নাদ শেষ করুন।

চতুর্থ দৃশ্য
ধাত্রী পান্না
৪৯
বনবীর।
সকলে। জয় রাণা বনবীরের জয়।
জয় আমার সুনিশ্চিত। আপনারা সংশয় রাখবেন না,
সর্দারগণ। উদয়সিংহ সত্যই যদি এবার মৃত্যুকে ফাকি দিয়ে থাকে,
কাল সূর্যাস্তের পর সে আর জীবিত থাকবেনা। এখুনি আমার
সৈনিকগণ দিকে দিকে ধাবিত হবে, উদয়সিংহ বলে যাকে সন্দেহ হবে
তাকেই বেঁধে এনে আমার খতলে নিক্ষেপ করবে। যদি প্রয়ােজন
হয় দ্বিতীয় কংসের মতো রাজস্থানের শিশুকুল আমি নিৰ্ম্মল কম্ব।
বলুন সর্দারগণ, আমার শুভ-কামনা প্রকাশ করে আর একবার বলুন,
জয় রাণা বনবীরের জয়।
সকলে। (ক্ষীণকণ্ঠে ) জয় রাণা বনবীরের জয় ।
বনবীর। বড়ই ক্ষীণকণ্ঠে জয়নাদ করলেন বীরবৃন্দ। তবুও তা আমারই
সঙ্কল্পেরই সমর্থন সূচক। এইবার শুনুন আমি কি আদেশ প্রচার করি।
হইতে
मगंध
বিষাণ বাজাইলেন। চারিদিক
কয়েকটি বীর অগ্রসর হইল।
আপ্পা, রাঘব, নবকিশাের, পর--
যাহার যাহার নাম করিলেন সে সে যুক্তকরে প্রণাম
করিল।
এই মুহূর্তেই চিতাের থেকে বাইরে যাবার প্রতি রাজপথ, প্রত্যেক
বনপথ দিয়ে সশস্ত্র সৈনিকদের রাজস্থানের সর্বত্র প্রেরণ কর। প্রতি
পরিবারে অনুসন্ধান করে দ্যাখ উদয়সিংহ কোথাও আশ্রয় পেয়েছে কিনা।
জীবিত উদয়সিংহকে আর ধাত্রী পান্নাকে যে আমার কাছে উপস্থিত করতে
পারবে, বিত্ত দিয়ে সর্দারের শ্রদ্ধা দিয়ে আমি তাকে পুরস্কৃত করব।
৪

পঞ্চম দৃশ্য
বনপথ
তাের হইয়া আসিয়াছে। প্রথমে একদল সৈনিক সেই বনপথ অতিক্রম করিয়া চলির
গেল, দুইটি সৈনিক পিছনে পড়িয়া রহিল। মাথায় একটি কলসী লইয়া ধীরে
ধীরে পান্না আসিয়া দাঁড়াইল। চারিদিকে চাহিয়া দেখিয়া
ডাকিতে লাগিল।
পান্না। বারি ! বারি ।
কিছুক্ষণ অপেক্ষা করিল। আবার ডাকিল।
বারি! বারি !
পিছনে আসিয়া দুইজন সৈনিক দাড়াইল।
১ম। কাকে ডাকচ, সুন্দরি।
পান্না ফিরিয়া তাহাদিগকে দেখিতে পাইল।
২য়। কি গাে, লজ্জা পেলে নাকি।
পান্না। আপনারা কোথাকার সৈনিক ?
১ম। চিতােরের।
২য়। রাণা বনবীরের সৈনিক আমরা।
পান্ন। ৩। নমস্কার।
১ম। তুমি কাপচ কেন ?
পান্না।
ভয়ে।

পঞ্চম দৃশ্য
ধাত্রী পান্না
১
২য়। আমাদের দেখে তােমার ভয় হোলাে ?
পান্না। বীরপুরুষ দেখে মেয়েছেলের ভয় হয়না?
সৈনিকরা হাে হাে করিয়া হাসিয়া উঠিল ।
২য়। তােমার কিন্তু ভয়ের কারণ নেই।
পান্না। নেই ত !
১ম। তোমার ত ছেলে নেই।
পান্না।
ছেলে ? না-নেই ।
২য়। শােন, রাণা বনবীরের হুকুম, শিশু দেখলেই জানতে হবে
সে উদয়সিংহ কিনা। সন্দেহ হলেই তাকে ধরে নিয়ে যেতে হবে।
পান্না। উনয়সিংহ ! উদয়সিংহ কে ?
১ম। রাণা সঙ্গের ছেলে।
পান্না। তা রাণা সঙ্গের ছেলেকে বনে-জঙ্গলে দেখতে পাবে কেন ?
২য়। পান্না তাকে নিয়ে পালিয়েছে।
পান্না। পান্না বুঝি ছেলেধরা?
১ম। আরে দূর ! তুমি কিছুই জাননা। পান্না হচ্ছে উদয়সিংহের
ধাত্রী। উদয়সিংহকে রাণা করতে চায়।
পান্ন। রাণা বনবীর বেঁচে থাকতে।
২য়। বােঝ ত বনবীরের রাগ হবেনা !
পান্না। তা ত হবারই কথা।
১ম। তাই রাণা বনবীর হুকুম দিয়েছেন শিশু দেখলেই জানতে
হবে সে উদয়সিংহ কিনা, সন্দেহ হলেই বেঁধে নিয়ে যেতে হবে, কেউ
বাধা দিলে খুন করতে হবে।

ধাত্রী পান্না
প্রথম অঙ্ক
পান্না। তা পান্না যদি আর কোন পথ দিয়ে পালিয়ে গিয়ে থাকে ?
২য়। সারা রাজস্থানে আমাদের মতাে বড় বড় বীর ছড়িয়ে পড়েছে।
যাবে কোথায়!
পান্না। সবার সঙ্গে এম্নি তলােয়ার, এমি বল্লম রয়েছে ?
১ম। • তা আছে বৈকি।
পান্না। বাবা গাে!
২য়। তা তুমি ভয় পাও কেন? তােমার ত আর ছেলে নেই।
পান্না। না, আর ত আমার ছেলে নেই !
১ম। তােমার ও কলসীতে কি ?
পান্না। মধু।
২য়। তুমি মধুউলী।
পান্না। মধু বেচে খাই। বড় গরীব আমি ।
১ম। তুমি আবার গরীব !
২য়। তােমার বুকে মধু, গলায় মধু, তুমি আবার গরীব কিসের
মধুউলি ?
১ম। মধুউলি, তুমি গান গাইতে পার?
পান্না। না, বাবা।
১ম। বাবা ।
২য়। ইস্!
ইস্! সব মধু টকিয়ে দিলে।
১ম। দিলেই যখন তখন মেনে নিলাম আমি তােমার বাবা।
২য়। আর আমি তােমার কাকা।
১ম। আমি বাবা হলে তুই কাকা হােস কি করে রে, তুই ত
হােস জ্যাঠা।

পঞ্চম দৃশ্য
ধাত্রী পান্না
২য়। জ্যাঠা ! তাের চেয়ে আমি বয়েসে বড় ?
১ম। বড় নােস্? নির্ঘাত বড়।
২য়। দেখি তাের কটা দাত ?
১ম। খবর্দার মুখে হাত দিনি।
২য়। কি তুই আমায় চড় মারলি !
তলােয়ার খুলিল, দ্বিতীয় সৈনিকও তলােয়ার খুলিল।
১ম। দাড়াত ভাই, একটুখানি দাড়া ত।
২য়। ভয় পেলিত।
দূর ভয় পাব কেন? একটা লােক এই দিকে আসছে।
করগুক লইয়া বারি ধীরে ধীরে আগাইয়া আসিল,
পান্না বারিকে দেখিয়া চঞ্চল হইয়া উঠিল এবং ঠোটে
আঙুল দিয়া ইঙ্গিত করিল নীরব থাকিতে।
২য়। পিঠে কি বাধা ? শিশু নয় ত রে।
শিশু নয় তরে। তলােয়ার বাগিয়ে ধর,
তলােয়ার বাগিয়ে ধর।
১ম। এই । এই! তুমি কে হে?
তােমার এই করণ্ডকে কি ?
পান্না। শুকনাে পাতা বাবারা। বন থেকে ও কুড়িয়ে আনে, আমি
আগুন জ্বেলে রুটি সেকি।
১ম। ও বুঝি তােমার••••••
২য়। ইয়ে
দুজন হাে হাে করিয়া হাসিয়া উঠিল।

৫৪
ধাত্রী পান্না
প্রথম অঙ্ক
পান্না। বন থেকে ও মৌ-চাক ভেঙে দেয়, আমি
মধু
নিংড়ে
বার করি।
১ম। জামাই আমাদের খুব গুণী ত।
২য়। আমরা যখন এলাম, তখন ওকেই ডাকছিলে বুঝি ?
১ম। লজ্জা কি মা, লজ্জা কি।
২য়। তােমাদের মিলন হােলা, এইবার আমরা আসি। শােন
মা, তােমায় বলি। উদয়সিংহ বলে যদি কাউকে সন্দেহ হয়, ধরে নিয়ে যাবে
রাণার কাছে। তুমি সৈনিক নও, তবু পুরস্কার পাবে। আয় রে
আয়।
অনেক দেরি করে ফেলেছি।
তাহারা সােজা চলিয়া গেল। তাহারা দৃষ্টির বাইরে
গেলে পান্না কহিল :
পান্না। ভগবান একলিঙ্গ রক্ষা করলেন। উদয় ভালাে আছে ত।
বারি। গাছতলায় বসিয়ে বনের ফল খাওয়ালাম। নদীর জল
খাওয়ালাম। ঘুমিয়ে যখন পল, তখন করকে শ্যাওলার
বিছানা পেতে শুইয়ে দিলাম। তােমার কনককে কোথায় রেখে এলে ?
পান্না মুখ ঘুরাইয়া দাঁড়াইল। তাহার চোখ দিয়া বড়
বড় কয়েক ফোঁটা জল পড়িল ।
বারি। তাকে বুঝি বনবীরের হাত থেকে বাঁচাতে পারলে না !
পান্ন। ভগবান তাকে বলি নেবেন বলেই ত এক রাতের জন্যে রাণা
হবার বুদ্ধি তার মনে যুগিয়ে দিয়েছিলেন।
বারি। তারপরও তুমি এতটা পথ আসতে পারলে ?

পঞ্চম দৃশ্য
ধাত্রী পান্না
পান্না। হ্যা তারপরও বেঁচে থাকতে পারলাম, তারপরও বেঁচে
থাকতে চাইলাম।
বারি। তুমি দেবী বলেই হয়ত পাষাণী ।
পান্না। বনবীরের হাতের ছাের ঝক্ঝক্ করে উঠল, দুই হাতে আমি
মুখ ঢাকলাম। একবার, মাত্র একবার, কানে এল ‘মা’, তারপর মুচ্ছিত
হয়ে পড়ে রইলাম। কে যেন চেতনা এনে দিয়ে আমার কানে কানে বল্ল,
শিশাের্দীয় বংশধরকে বাঁচিয়ে রাখবার ভার যে তােরই ওপর, রাণা সঙ্গের
সন্তানকে রক্ষা করে তােকেই যে মেবারকে অরাজকতা থেকে বাঁচাতে
হবে। কৰ্ত্তব্য বেছে নিলাম, বারি। কঠোর কর্তব্য। যতদিন বেঁচে
থাকব, আমার একমাত্র কর্তব্য হবে উদয়কে নিরাপদ রেখে তাকে
মেবারের সিংহাসনে বসাবার ব্যবস্থা করা।
বারি। মেয়েছেলে তুমি পারবে ?
পান্না। রাজপুত রমণী অনেক কিছু পারে, বারি। শােন, এখানে
আর অপেক্ষা করা ঠিক নয়। বনবীর দিকে দিকে তার অনুচর
পাঠিয়েছে উদয়ের সন্ধানে। আমাকে চিনতে পারলেও ছেড়ে দেবে না।
শােন, আজ থেকে পথে আমরা পা দোব না, লােকালয় আমরা পরিহার
করব, ঘন বন হবে আমাদের বিশ্রামের স্থান।
বারি। রাণা উদয় কি সে ক্লেশ সইতে পারবেন ?
পান্না।
মেবারের রাণাদের চিরদিনই কঠোর জীবন যাপন করতে
হয়েছে।
বারি। কতদিন এইভাবে কাটাতে হবে পান্না ?
পান্না। যতদিন রাণা সঙ্গের প্রতি শ্রদ্ধাসম্পন্ন কোন বীর সর্দারের
আশ্রয়ে উদয়কে রাখতে না পারব।

ধাত্রী পান্না
প্রথম অঙ্ক
বারি। বনবীরের আদেশ অবহেলা করে কেউ কি আশ্রয় দেবে ?
পান্না। অনেকেই দেবে না, অনেকেই ভয়ে আমাদের তাড়িয়ে দেবে।
কিন্তু নিশ্চিত মৃত্যু থেকে যে মুক্তি পেয়েচে, ভগবান একলিঙ্গ বিশাল এই
রাজস্থানের কোথাও না কোথাও তার আশ্রয় রচনা করে রেখেছেন।
বারি। পান্না, পান্না, আর কোন কথা তােমাকে জিজ্ঞাসা করব না।
ভগবান তােমার হৃদয়ে আসন পেতে বসে আছেন। তার ইঙ্গিতে তুমি
পথ চল, তার নির্দেশে কাজ কর। আমাদের বুদ্ধি দিয়ে আমরা তােমাকে
বুঝতে পারব না। তুমি আদেশ করবে আমি সেই আদেশ পালন করব।
তুমি আগুনে ঝাঁপ দিতে বল্লে আমি তাই দেব, হাতে বিষ তুলে দিলে
অমৃত মনে করে আমি তাই পান করব।
পান্না। না বারি, অত সহজে তােমাকে আমি মুক্তি দেব না।
উদয়ের ভার নিয়ে তােমাকেই যে থাকতে হবে।
বারি। আর তুমি ?
পান্না। আমি ? উদয়ের একটা আশ্রয় স্থির করে আমি ফিরে যাব
চিতােরে।
বারি। চিতােরে ।
পান্না। হাঁ বারি চিতােরে ! চিতােরের কাপুরুষ সর্দারদের কর্তব্যের
পথ দেখিয়ে তাদের আগে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। তারপর••••
বারি। তারপর পান্না ?
প্রয়া। তারপর? তারপর পুত্রহন্তার সঙ্গে মায়ের আলাপন,
মৃত্যুর সঙ্গে মৃত্যুর আলিঙ্গন।
* * * *

দ্বিতীয় অঙ্ক
প্রথম দৃশ্য
চিতাের প্রাসাদের কক্ষ
চম্পাবাই পাথরের মূৰ্ত্তির মতো বসিয়া আছে। শীতলসেনী প্রবেশ করিলেন।
শীতলসেনী। রাজপুত্রি !
চম্পাবাঈ তাহার দিকে মুখ ঘুরাইয়া কিছুকাল
চাহিয়া রহিল।
রাজপুত্রি!
চম্পা। বল, ঘাতক মাতা।
শীতলসেনী। বনবীর যা করেছে, মেবারের রাণারা চিরদিনই তী
করে এসেছেন।
চম্পা। আমার পিতা তা করেননি।
শীতলসেনী। বিক্রমজিতের বীরত্বের খ্যাতি ছিল না।
চম্পা। হত্যা বীরত্বের পরিচয় নয়।
শীতলসেনী। হত্যা যেখানে অপরিহার্য, সেখানে মানবতা দুর্বলতা।
চম্পা। সকল সবলই বীর নয়।
শীতলসেনী। আমার বনবীর যেমন সবল তেমন উদার।
চম্পা। সেই বনবীরের গরব নিয়ে তুমিই আনন্দে থাক, আমাকে
পীড়া দিয়ােনা।
শীতলসেনী। পীড়া দোব বলেই কি তােমাকে এই প্রাসাদে রাজ
পুত্রীর সকল মৰ্যাদা দিয়ে রেখেচি। পীড়া দিতে চাইলে..

ধাত্রী পান্না
দ্বিতীয় অঙ্ক
চম্পা। কারাগারে স্থান দিতে ? কেমন?
শীতলসেনী। জানত বনবীর বন্দী দিয়ে কারাগার পূর্ণ করে রাখে না।
চম্পা। জানি হত্যাকেই সে সবচেয়ে সহজ নিষ্পত্তি বলে মনে করে।
শীতলসেনী। তােমাকেও সে হত্যা করতে পারত।
চম্পা। কেন করেনি তাও আমি জানি।
শীতলসেনী। কেন ?
চম্পা। হত্যার চেয়েও ঘৃণ্য কিছু তার কল্পনায় আছে বলে। ঘৃণ্যা
নারী তুমি তারই সহায়তা করচ।
চম্পা উঠিয়া পঁাড়াইল। শীতলসেনীর চোখ একবার
জ্বলিয়া উঠিল। পরক্ষণেই আত্মসম্বরণ করিয়া
কহিলেন?
শীতলসেনী। তুমি অবােধ !
চম্পা। আর কিছু তােমার বলবার আছে ?
শীতলসেনী। আছে। কিন্তু শােনবার ধৈৰ্য ত তােমার নেই।
চম্পা। ধৈৰ্য্য ! আরে ধৈর্য্য তুমি আশা কর? পিতৃহন্তার গৃহে মাসের
পর মাস, বছরের পর বছর আবদ্ধ রয়েচি, যাদের ঘৃণা করি, জীবনের
প্রতিটি মুহূর্তে তাদেরই দেখচি চোখের সম্মুখে। তাদেরই দেওয়া অন্ন
গ্রহণ করছি, তাদেরই দেওয়া পরিচ্ছদে লজ্জা নিবারণ করচি, তবু দেয়ালে
মাথা খুড়ে মরচি না। এও আমার ধৈর্যের পরিচয় নয় !
শীতলসেনী। রাজপুলি, তােমার মনের কথা তােমার মুখ দিয়ে
বার হয় না।
চম্পা শীতলসেনীর সম্মুখে আসিয়া দাঁড়াইল।

প্রথম দৃশ্য
ধাত্রী পান্না
চম্পা। তুমি কী বলতে চাও?
চম্পার হাত হাতে লইয়া শীতলসেনী কহিলেন :
শীতলসেনী । আমার বনবীরকে তুমি ঘৃণা করনা।
হাত ছাড়াইয়া লইয়া দু’পা পিছাইয়া গিয়া চম্পা
কহিল ।
চম্পা। ঘৃণা করিনা! আমার পিতৃ হন্তাকে আমি ঘৃণা করিনা।
শীতলসেনী। মনে মনে কতবার ভাব বলত, বনবীর যদি আমার
পিতৃহন্তা না হােত!
চম্পা বিস্ময়ে অভিভূত হইয়া একখানি আসনে
বসিয়া পড়িল, শীতলসেনী মুখে দানবীর হাস লইয়া
তাহার দিকে অগ্রসর হইতে হইতে কহিলেন ;
সরল, সুন্দর, উদার বনবীর যদি পিতৃহন্তা না হে, তাহলে তার সম্ভাষণ,
তার সান্নিধ্য, তার আতিথ্য কি সুখেরই না হেতাে, একথা যার মনে
জাগে সে কি ঘৃণা করতে পারে রাজপুত্ৰী ?
তাহার পাশে বসিল, তীব্র দৃষ্টিতে তাহার দিকে
চাহিয়া রহিলেন। সে বৃষ্টি সহ্য করতে না পারিয়া
চম্পা মুখ ঢাকিল।
লজ্জায় মুখ ঢাকলে রাজপুত্রি। স্বীকার করলে আমার সন্দেহ সত্য ?
মুখ হইতে হাত সরাইয়া চম্পা শীতলসেনার দুই হাত
চাপিয়া ধরিয়া কহিল :
চম্পা। তুমি আমায় কারাগারে পাঠিয়ে দাও,

ধাত্রী পান্না
দ্বিতীয় অঙ্ক
শীতলসেনী। জানি, তাতেই তােমার ভাল হােত। কিন্তু আমার
পুত্রের অমতে আমি তা করতে পারি না।
চম্পা। তুমি আমাকে হত্যা কর।
তাহলে আমার পুত্র আমাকে মার্জনা করবেনা।
শীতল।
চম্পা লাফাইয়া উঠিয়া দাঁড়াইয়া কহিল :
চম্পা। পুত্র! পুত্র! পুত্র ! ঘৃণ্যা নারী, তােমার মুখে ও-কথা
আমি সইতে পারিনা।
শীতলসেনী। পুত্র ছাড়া আমার যে আর কিছুই নেই রাজপুত্রি।
নারীর মর্যাদা নেই, পরিজনের প্রীতি নেই, নানুষের সহানুভূতি নেই।
চম্পা। নিজের হীনতায় সবই হারিয়েচ ।
শীতলসেনী। তাহঁত একমাত্র পুত্রকে হারাতে চাইনা।
বনবার প্রবেশ করিল।
বনবীর। আমাকে হারাতে হবে এমন অমূলক ভয় তােমার কোথা
থেকে এল মা !
শীতলসেনী। মায়ের মনে ও ভয় যে সব সময়েই থাকে বাবা!
চম্পা। আমি এখন যেতে পারি শীতলসেনী ?
বনবীর। যদি বিরক্ত না হও, তাহলে একটু অপেক্ষা কর।
শীতলসেনা। রাজপুত্রীর মন আজ ভালাে নেই বাবা, তাড়াতাড়ি
কথা শেষ করে ওকে বিশ্রাম করতে দিয়ে ।
বলিয়া শীতলসেনী চলিয়া গেলেন।

প্রথম পৃ
ধাত্রী পান্না
বনবীর। চম্পা, কতদিন চলে গেল। আজও কি তুমি আমাকে
ক্ষমা করতে পারলেনা ?
চম্পা কোন কথা কহিল না।
তুমি তােমার পিতার প্রাসাদেই রয়েচ, যথেচ্ছ কাজ করবার সব
অধিকারই তােমার আছে। তবু কেন
চম্পা। জানতে চাও, তবু কেন আমি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করিনা ?
বনবীর। কৃতজ্ঞতার কথা নয়, স্নেহের কথা। এক বিন্দু স্নেহ
পাবারও কি আমি যােগ্য নই ?
চম্পা। মেহ!
তােমার কি স্নেহের প্রয়ােজন আছে ?
তােমার উল্লাস, পরপহরণে তােমার আনন্দ, পীড়নে তােমার পৌরুষ।
তাই নিয়েই এই পাঁচ বছর তুমি মেতে আছ।
বনবীর। সত্য চম্পা তাই নিয়েই আমি এতদিন মত্ত ছিলাম।
কিন্তু আজ আমি যেন রিক্ত হয়ে পড়িচি। আজ মনে হচ্ছে জীবনে কি
চাইলাম আর পেলাম কি ! সৰ্বসুখ করায়াত্ত হবে জেনে সিংহাসন
অধিকার করলাম, কিন্তু পেলাম কি ? সর্দাররা ভূমি স্পর্শ করে আমায়
অভিবাদন করে, চারণরা চাটুকারের মতাে আমার বন্দনাগীতি গায়,
সৈন্যরা করে জয়নাদ ; আমি চেয়ে চেয়ে দেখি, কান পেতে শুনি আর
নিরালায় নিভৃতে নিজেকে নিজে জিজ্ঞাসা করি পেলি কী, ওরে
হতভাগা, তুই পেলি কী ?
চম্পা খিল খিল করিয়া হাসিল।
বনবীর। তুমি হাসচ !
আজ থেকে আমার হাসবার দিনই এলাে। প্রতিক্রিয়া
সুরু হয়েছে।

ধাত্রী পান্না
দ্বিতীয় অঙ্ক
বনবীর কিছুকাল তাহার মুখের দিকে চাহিয়া
রহিল।
বমবীর। তুমি ভাবচ ভিতরে ভিতরে আমি দুর্বল হয়ে পড়ছি।
আমার পতন আসন্ন ?
চম্পা। ঠিক তাই।
বনবীর। কিন্তু তার জন্য আর আমার ক্ষোভ নেই।
চম্পা।
ক্ষোভ নেই ?
বনবীর। ।
মাশরু। পার আবার সব ছেড়ে কেটে আগেকার মত বনে বনে
মৃগয়া করে ফিরতে ?
বনবীর। পারি, যদি.•••••
চম্পা। যদি
জুড়ে
উত্তরটাকে জটিল কোরােনা।
বনবীর। পারি, যদি আমার মায়ের সম্মতি পাই।
মায়ের ইচ্ছা পূরণই যদি তােমার জীবনে সব চেয়ে বড় কাজ,
তাহলে মায়ের ইচ্ছায় রাজহত্যা শিশু হত্যা করেও, সিংহাসনে বসেও কেন
ভাবচ জীবনে কী পেলে তুমি!
বনবীর। তাও ভাবি চম্পা। ভাবি মা আজ সুখী, আমি কেন
সুখী নই ? ভাবি তুমি কেন সুখী নও।
চম্পা। আমি কেন সুখী নই ।
বনবীর। চম্পা, তােমার সুখ কি আমার কাম্য হতে পারেনা ?
চম্পা। বনবীর, তুমি আমাকে কারাগারে নিক্ষেপ কর।
নবীর।
কেন চম্পা, তুমি এ কথা বলচ কেন ?
চম্পা। নইলে কোন্ দিন তােমাকে হয়ত আমি হত্যা করব।

প্রথম দৃশ্য
ধাত্রী পান্না
বনবীর। হত্যা যেদিন করতে পারতে, সেদিন হত্যা করনি। সামে
তােমার পিতার মৃতদেহ, ঘাতক আমি তােমার আঘাত নেবার জন্য
প্রস্তুত, তােমার হাতে তলােয়ার! অতবড় একটা সুযােগও যখন তুমি
কাজে লাগাতে পারনি, তখন বার বার হত্যার সঙ্কল্প নিয়েও তুমি
আমাকে হত্যা করতে পারবেনা।
চম্পা। কারাগারে না দিতে চাও, আমাকে মুক্তি দাও।
বনবীর। তুমি আমার বন্দী নও। ইচ্ছা করলেই তােমার পিতার
এই প্রাসাদ ছেড়ে তুমি চলে যেতে পার।
চম্পা। পারি বনবীর, পারি ?
বনবীর। বলত আমি নিজে তােমাকে সঙ্গে করে রেখে আসতে
পারি। বল, কোথায় যেতে চাও।
চম্পা জবাব দিতে পারিনা
বল। চুপ করে থেকোনা। বল চম্পা।
চম্পা। নিষ্ঠুর! তুমি জান যে আমার যাবার কোন ঠাই নেই।
বলিতে বলিতে চম্পা কাঁদিয়া ফেলিল। ঠিক সেই
সময়ে শীতলসেনী প্রবেশ করিলেন। তাহার সঙ্গে
মশালধারিণী পরিচারিকা।
শীতলসেনী। রাজপুত্রীর শরীর ভালাে নেই বনবীর, তাকে এখন
বিশ্রাম করতে দাও।
বনবীর। মা, চম্পার এখানে নানা অসুবিধা হচ্ছে।
শীতলসেনী। হ্যা, আমাকেও তাই বলছিলেন ওঁকে কারাগারে
পাঠিয়ে দিতে।

ধাত্রী পান্না
দ্বিতীয় অঙ্ক
বনবীর।
তা যখন হতে পারেন, তখন•••
বনবীর মায়ের দিকে চাহিয়া চুপ করিল।
শীতলসেনী। বল, তুমি রাণা, তােমার ইচ্ছা মতােই কাজ হবে।
বনবীর। রাণ। কিছু বলছেন না। সন্তান বলচে তার মায়ের কাছে।
শীতলসেনী। বেশ তাই বল।
বনবীর। চম্পার পিতার এই প্রাসাদ চম্পাকে ছেড়ে দিয়ে চল
আমরা আমাদের আগেকার বাড়ী গিয়ে বাস করি।
শীতলসেনী পুত্রের দিক হইতে মুখ ফিরাইয়া চম্পার
দিকে চাহিলেন, তারপর বলিলেন :
শীতলসেনী। রাজপুত্রীকে তার শয়নকক্ষে নিয়ে যাবার জন্য পরি-
চারিকা অনেকক্ষণ অপেক্ষা করচে।
চম্পা। চল, আমি প্রস্তুত।
পরিচারিকা অগ্রসর হইল, চম্পা তাহার অনুগমন
করিল। বনবীর অন্য দিকে মুখ ফিরাইয়া দাঁড়াইল।
শীতলসেনী দরজা পর্যন্ত অগ্রসর হইয়া দেখিলেন
চম্পা চলিয়া গেল। ফিরিয়া আসিয়া কহিলেন।
শীতল। চম্পা বাঈকে তার পিতার প্রাসাদ ছেড়ে দিলেই তুমি খুসি
হও বৎস ?
বনবীর না ফিরিয়াই জবাব দিল ।
বনবীর। প্রাসাদে তার অধিকার আছে।
শীতলসেনী। সিংহাসনেই কি নেই ?
বনবীর দ্রুত ঘুরিমা মায়ের মুখের দিকে চাহিল।
বনবীর। মা !

প্রথম দৃশ্য
ধাত্রী পান্না
শীতলসেনী। উদয়সিংহের সন্ধান যখন পাওয়া যাচ্ছেনা, তখন
চম্পাবাঈ সিংহাসনের অধিকারিণী। দাসীপুত্র বনবীর পরপহরণের
প্রায়শ্চিত্ত করে চম্পাবাঈকে সিংহাসন দিয়ে বনবাসে গেলে চিত্তের
শান্তি ফিরে পাবেন।
বনবীর। জীবনে আমার শান্তি নেই মা।
শীতলসেনী। রাণা হয়ে রাণার কর্তব্যে অবহেলা করে যুবতী চম্পা-
বাঈয়ের অপ্রাপ্য করুণার প্রত্যাশায় মনে আগুন জেলে তুল্লে শান্তি
কেমন করে পাবে ?
জগমল প্রবেশ করিল।
জগমল। রাণা! রাণা!
শীতলসেনী। জগমল ! রাণার আদেশে তুমি এখন আমার কৰ্ম্মচারী।
বনবীর। তুমি যে বার্তা নিয়ে এসেচ, মায়ের কাছেই তা ব্যক্ত কর।
জেনে রেখাে এ রাজ্যের অধীশ্বরী আমার মা।
বনবীর কক্ষের বাহির হইয়া গেলেন।
জগমল। দেবি ! আমি গুরুতর সংবাদ নিয়ে এসেছি।
শীতলসেনী। জগমল, তুমি বার বার আমাদের উপকার করচ।
আমরা তােমাকে পুরস্কৃত করতে চাই।
জগমল। দেবি !
শীতলসেনী। কি পুরস্কার পেলে তুমি প্রীত হও ওগমল ?
জগমল। দেবি অনুগ্রহ করে যা দেবেন
শীতলসেনী। অর্ধেক রাজধ আর রাজকন্যা পেলে তুমি কি খুসি
হও না জগমল?
জগমল। আমি দেবীর পরিহাসের যােগ্য নই।

ধাত্রী পান্না
দ্বিতীয় অঙ্ক
শীতলসেনী। রাজত্বের কথা এখন থাক, রাজকন্যার কথাই ভাব।
জগমল। রাজকন্যা!
শীতলসেনী। হ্যা, মেবারের ভূতপূৰ্ব্ব রাণার কন্যা, সুদর্শনা চম্পা।
জগমল। চম্পা!
শীতলসেনী। ঢল ঢল কাচা অঙ্গের লাবনী যাকে মােহিনী করে
তুলেচে।
জগমল। চম্পা।
শীতলসেনী। চম্পা, জগমল।
জগমল। দেবি, বামন আমি চাঁদ ধরবার জন্য হাত বাড়াব কোন
ভরসায় ?
শীতলসেনী। ভরসা আমি। চাদ তােমার হাতে আমিই তুলে দেব।
জগমল। কিন্তু বনবীর.•••••
শীতলসেনী। বনবীরের কথা আমি ভাবব। তুমি শুধু ভাব
চিতােরের বাইরের কোন রাজ-উদ্যানে সুন্দরী চম্পাকে নিয়ে কি সুখেই
তুমি দিন কাটাতে পার।
জগল। সে যে আমার স্বর্গবাস হবে দেবি।
শীতলসেনী। তােমাকে আমি সেই স্বর্গেই স্থান দিতে চাই, জগমল।
জগমল। চম্পা যদি সম্মত না হয় দেবি?
শীতলসেনী। তার চিত্তজয়ে মন দাও।
জগমল। চম্পার চিত্তজয় কি আমার পক্ষে সম্ভব ?
শীতলসেনী। অজেয় পৃথ্বিরাজকে আমি হেলায় জয় করেছিলাম।
জগমল। সে কৌশল তাে আমার জানা নেই।
শীতলসেনী। তাও আমিই শিখিয়ে দেব।

প্রথম দৃশ্য
ধাত্রী পান্না
জগমল। দেবি, আমি শপথ করচি দেবি, তােমার কাজে আমি
দেহপাত করব।
শীতলসেনী। ওঠ, ওঠ জগমল। আমার কাজে তােমাকে দেহপাত
করতে হবে না, জীবিত থেকে দেহে শক্তি আর মনে শান্তি নিয়ে আমার
আদেশ পালন করতে হবে।
জগমলকে তুলিলেন।
চম্পা সম্বন্ধে প্রয়ােজনীয় ব্যবস্থা অবিলম্বে করা হবে। এখন বল কি সংবাদ
নিয়ে তুমি এসেছিলে ।
জগমল। পান্না চিতােরে এসেছে।
শীতলসেনী। ধাত্রী পান্না।
জগমল। হঁা, দেবী।
শীতলসেনী। এতদিন পরে পান্না চিতােরে ফিরে এল।
জগমল।
এল, দেবী।
শীতলসেনী । কেন এল ?
জগমল। তাইত ভাবচি।
শীতলসেনী। চিতাের দেখতে নিশ্চিতই নয়।
জগমল। নতুন করে চিতােরের সে আর কি দেখবে দেবি ।
শীতলসেনী। দেখা করতে আসতেও পারে।
জগল। তিন কুলে তার কেইবা আছে ?
শীতলসেনী। তার কেউ নেই কিন্তু উদয়সিংহের ?
জগমল। উদয়সিংহ কি আর বেঁচে আছে ভাবছেন? আমার মনে
হয় রাণা বনবীরের হাত এড়িয়ে সে বাঘের পেটে গেছে, পান্না তাই
ফিরে এসেছে।

ধাত্রী পান্না
দ্বিতীয় অঙ্ক
শীতলসেনী। পান্নাকে কোথায় দেখলে জগমল ?
জগমল। চরকির মতাে ঘুরচে দেবি।
শীতলসেনী। সর্দারদের বাড়ী বাড়ী ?
জগমল। সর্দাররা ত সব আহেরিয়ার জন্যে মেতে উঠেছে। আজ
রাতেই তারা নাকি চণ্ডিপীঠে জমায়েত হবে, ভােরেই সেখান থেকে
বেরিয়ে পড়বে। ঘরে ঘরে সাজ-সাজ রব পড়ে গেছে।
শীতলসেনী। আহেরিয়ায় যাবে বলে ?
জগমল। হা। তিন দিন পরে সব ফিরবে।
শীতলসেনী। পান্না আর তাদের দেখা পাবেনা ?
জগল। কিছুতেই নয়।
শীতলসেনী। পান্না বদি চণ্ডী-পীঠে তাদের অপেক্ষায় থাকে ?
জগল। পান্না চণ্ডী-পীঠে। কোন মেয়েছেলে কি সেখানে যেতে
সাহস পায় দেবি ?
শীতলসেনী। মৃতপুত্রের শব বুকে নিয়ে নিশীথ-রাতে একাকিনী যে
শ্মশানে যেতে পারে, সে আর চণ্ডীপীঠে যেতে পারেনা?
জগমল। সত্য দেবি।
সে সব পারে।
শীতলসেনী। চণ্ডীপীঠে আমাকেও আজ যেতে হবে।
জগমল। এই রাতে !
শীতলসেনী। এখুনি। এস আমার সঙ্গে।
জগমল। মা চণ্ডী রক্ষে কর! মা চণ্ডী রক্ষে কর।
শীতলসেনী।
এস।
শীতলসেনী অগ্রসর হইলেন। জগমল অনুসরণ
করিল।

দ্বিতীয় দৃশ্য
চণ্ডীপীঠ। ঘন-বনের মাঝে একটি ভাঙ্গা মন্দির। মন্দিরের সাম্নে ধুনি জ্বলিতেছে।
তাহাই ঘিরিয়া সর্দাররা বসিয়া আছেন, পান্না সিড়িতে বসিয়া তাহাদের প্রশ্নের
জবাব দিতেছে।
কর্ণজি। তুমি রেখে এসেচ ?
পান্না। আমিই রেখে এসেছি।
করমচাদ। কার আশ্রয়ে ?
পান্না। আজ তা বলবনা।
বীরমল্ল। কবে বলবে ?
পান্না। যেদিন বুঝব রাণা সঙ্গর কনিষ্ঠ পুত্রকে আপনার সিংহাসনে
বসাতে স্থির সঙ্কল্প করেছেন।
কজি।
সে সঙ্কল্প যে আমাদের নেই, তা তুমি জানলে
করে ?
পান্না। সঙ্কল্প কার্যে পরিণত করবার আয়ােজনের অভাব দেখে।
কর্ণজি। তুমি নারী, রাজনীতি সম্বন্ধে অনভিজ্ঞ। তুমি বােঝনা
যে, ইচ্ছা মাত্রেই রাষ্ট্রে একটা পরিবর্তন আনা যায়না।
পান্না। নারী আমি একাকিনী মেবারের অমূল্য রত্ন বুকে নিয়ে
সমগ্র রাজস্থান
ঘুরে বেড়িয়েচি।
বনবীরের ভয়ে সর্দারের পর
সর্দার কুমারকে স্থান দিতে অস্বীকার করেচেন, হতাশায় ভেঙ্গে না পড়ে
আমি সর্দারের পর সর্দারের দ্বারস্থ হয়েচি। আমার আকুতি, আমার
মিনতি, রাণা সঙ্গের পবিত্র স্মৃতি, কাউকে কাউকে অবশেষে কর্তব্যে

৭০
ধাত্রী পান্না
দ্বিতীয় অঙ্ক
উদ্বুদ্ধ করেছে। রাজস্থানের শ্রেষ্ঠ এক সর্দার আজ কুমারকে পুত্রের
ন্যায় পালন করছেন। সর্দারদের মানসিক এই পরিবর্তন যার চেষ্টায়
সাধিত হয়েছে, তাকে কি আপনার শােনাতে পারেন অনভিজ্ঞা বলে
সে বােঝে না যে ইচ্ছা করলেই রাষ্ট্রে পরিবর্তন আনা যায় না?
করমচঁাদ। কিন্তু চিতােরের অবস্থা তুমি অবগত নও।
পান্না। দীর্ঘকাল অনুপস্থিতির পর আমি চিতােরে ফিরে এসেছি।
ফিরে এসে দেখচি চিতােরে আজ মানুয নেই। বনবীর সবাইকে পশু
করে ছেড়ে দিয়েছে।
কর্ণজি। বার বার বনবীরের নামােচ্চারণ কোরাে না নারী।
পান্না। কেন চন্দাবৎ সর্দার ?
কর্ণজি। যদি আর কেউ শুন্তে পায় !
পান্না। হায় মেবারের শ্রেষ্ঠ সর্দারগণ, আমি যদি জাম আপনারা
এতদূর অধঃপতিত হয়েছেন, তাহলে এত আশা নিয়ে আপনাদের কাছে
আসতাম না।
করমচঁাদ।
এ তােমার অন্যায় অভিমান। সময় ও সুযােগ উপস্থিত
হলে আমরা কাৰ্য্যে প্রবৃত্ত হতে পারি না।
পান্না। সময় কি আজও আসেনি? অত্যাচারে উপদ্রবে মানুষ
অতিষ্ঠ হয়ে উঠেচে, অনাচারে দেশ ছেয়ে গেছে, অধিকারীর স্পর্ধা
মেবারের পূর্ব গৌরব স্নান করে দিয়েছে, তবুও বলবেন আজো সময়
আসেনি ?
বীরম।
আয়ােজনের অবসরও ত আমাদের দিতে হবে।
পান্না। হায় মেবারের সর্দারগণ, নিজেদের অক্ষমতা চাপা দেবার
জন্য আপনারা আজ ‘সময়’ ‘সুযােগ’ ‘আয়ােজন’ গালভরা কথা বলে

দ্বিতীয় দৃশ্য ধাত্রী পান্না ৭১ আত্ম-প্রবঞ্চনা করচেন ! আপনারা কি শােনেননি আপনাদের পূর্ব- পুরুষগণ, মেবারের পূজ্যপাদ সর্দারগণ অশ্ববল্প হাতে নিয়ে মন্ত্রণা করতেন, কর্তব্য স্থির হলে মুহুৰ্তকালও বিলম্ব না করে কাৰ্যসাধনে অগ্রসর হতেন ? কর্ণজি। মেবারের সেদিন আর নেই। পান্না। কেন নেই সর্দারগণ ? কেন মেবারকে ঘিরে এই হতাশা নেমে এসেচে ? কেন মেবারকে গ্রাস করবার জন্য চারিদিকে শত্রু-কৃপাণ ঝলসে উঠেছে ? করমচঁাদ। তুমি বলতে পার কেন ? পান্না। এক দাসীপুত্রকে মেবার রাণা বলে মেনে নিয়েছে বলে। বীরমল্ল। বার বার ওই কথা বলে তুমি নিজেও বিপন্ন হবে, আমাদেরও বিপদে ফেলবে। পান্না। বিপদকে যারা ভয় করে, তাদের কাছে আমার বলবার কিছুই নেই। অকারণে আপনাদের সময় নষ্ট করলাম বলে আমি দুঃখিত। আপনাদের অনুমতি নিয়ে আমি এ স্থান ত্যাগ করচি। চলিয়া যাইতে উদ্যত হইল। কর্ণজি। কোথায় তুমি যাবে ? পান্না ফিরিয়া দাঁড়াইয়া কহিল ! পান্না। এ প্রশ্ন করবার অধিকারও আপনারা হারিয়েছেন। তারপর একটু একটু করিয়া সর্দারদের দিকে অগ্রসর হইতে হইতে কহিল : আর কখনাে হয়ত আপনাদের সঙ্গে আলাপ করবার অবসর আমার হবেনা। তাই আজই আপনাদের বলে যাই, নিরাপদ থাকবেন বলে আপনারা আজ

৭২ :
ধাত্রী পান্না
দ্বিতীয় অঙ্ক
আপনাদের সৰ্ব্বপ্রধান কর্তব্য অবহেলা করলেন। কিন্তু শুনে রাখুন
আপনাদের নিরাপত্তা নাই। রাজস্থানের দ্বাদশটি সর্দার সঙ্কল্প করেছেন
রাণা সঙ্গের উত্তরাধিকারীকে সিংহাসনের বসাবার জন্য তারা সর্বশক্তি
নিয়ােগ করবেন। পঞ্চ সহস্র ভীল তাঁদের এই শুভ সঙ্করের সহায়তা
করতে সম্মত হয়েছে।
করমচঁাদ। বল কি! আমাদের অজানায় এতবড় একটা আয়ােজন
চলচে।
পান্না। পৃথিবীর অনেক বড় বড় ব্যাপার আপনাদের অজানায় হয়ে
থাকে সর্দারগণ, মেবারের রাষ্ট্রবিপ্লবও আপনাদের সম্মতির আর
সহযােগের অপেক্ষা রাখবে না। জানবেন, সেই রাষ্ট্রবিপ্লব যে দুৰ্ব্বার
গতি নিয়ে চিতাের দুর্গে আঘাত করবে, তা শুধু পরস্বাপহারী বনবীরকে
নয়, তার কুকার্য্যের সহায়ক মরণের ভয়ে ভীত কাপুরুষ মেবার
সর্দারদেরও ভাসিয়ে তলিয়ে দেবে।
কর্ণজি। তুমি কি আমাদের ভয় দেখাতে চাও পান্না ?
পান্না। না চন্দাবৎ সর্দার, ভয় দেখাতে চাই না। অনাগতের
আবির্ভাব আপনাদের পক্ষে কি সঙ্কটজনক হবে তাই বুঝিয়ে দিতে চাই।
চলিয়া যাইতে উদ্যত হইল।
বীরমল্ল। রাজস্থানের দ্বাদশ সর্দারের যে আয়ােজনের কথা বল্লে,
তা যে মিথ্যা নয় তার প্রমাণ কোথায় ?
পান্না ফিরিয়া দাড়াইল।
কজি।
তারা ত আমাদের কোন নিদর্শন প্রেরণ করেন নি।

দ্বিতীয় দৃশ্য
ধাত্রী পান্না
পান্না সর্দারগণের কাছে আগাইয়া আসিয়া কহিল :
পান্না। সর্দারগণ, আমি পান্না, নিজের পুত্র বলি দিয়ে আমি
রাণ। সঙ্গের উত্তরাধিকারীকে বাঁচিয়ে রেখেচি। কুমার উদয়ের নাম
নিয়ে আমি যে মিথ্যা বলব না, এও কি প্রমাণ প্রয়ােগে বুঝিয়ে
দিতে হবে ?
করমচঁাদ। কিন্তু তুমিই যে প্রকৃত পান্না তাই বা আমরা জানব
কি করে ?
কজি।
আমরা কানে কেবলই শুনচি ‘পান্না’ ‘পান্না’ ‘পান্না।
পান্নাকে চোখে ত কেউ দেখিনি।
করমচঁাদ। চিতােরের কোন সর্দার তােমাকে জানে ?
পান্না। আমি অন্তঃপুরেই থাকতাম, সর্দারদের দৃষ্টির সাম্নে নেচে
বেড়াতামনা। তারা আমায় চিনবেন কি করে ?
কজি।
তবে তােনায় বিশ্বাস করি কি করে ?
মুকুলজী। তুমি যে আমাদের বিপদে ফেলবার জন্য ফাঁদ রচনা
করনি, তাই বা আমরা বুঝব কেমন করে ?
পান্না নীরব রহিলেন, সর্দাররাও নীরব।
করমচঁাদ।
এখন বুঝতে পারচ, তােমার প্রস্তাবে কেন আমরা সায়
দিতে পারি না।
পান্না। আমিই যে পান্না, তার প্রমাণ যদি আমি দিতে পারি ?
কর্ণজি। তােমার প্রস্তাব সানন্দে সমর্থন করব।
পান্না। উদয়সিংহের সাহায্যে আপনারা সম্মত হবেন।
করমচঁাদ। তাকে সিংহাসনে বসিয়ে আমরা পূৰ্ব্বকৃত অপরাধের
প্রায়শ্চিত্ত করব।

৭৪
ধাত্রী পান্না
দ্বিতীয় অঙ্ক
পান্না। চণ্ডীপীঠ স্পর্শ করে শপথ করতে পারেন ?
সকলে মন্দির স্পর্শ করিল।
সকলে। আমরা শপথ করচি।
কর্ণজি।
শপথ করচি রাজস্থানের দ্বাদশ সর্দার রাণা উদয়সিংহকে
সিংহাসনে স্থাপন করবার যে আয়ােজন করবেন, আমরা আমাদের সহযােগ
দিয়ে তা সফল করে তুলব।
সকলে। আমরা শপথ করচি।
পান্না। চণ্ডীপীঠ স্পর্শ করে আপনারা শপথ নিলেন, আমার ধারণা
আপনারা শপথ ভঙ্গ করবেন না।
সকলে। কখনো না।
পান্না। তাহলে শুনে রাখুন সর্দারগণ, আগামী ফাল গুনি পূর্ণিমায়
রাজস্থানের দ্বাদশ সর্দারথঘাষণা করবেন মেবারেরসত্যিকারের রাণা বীরবর
সংগ্রাম সিংহের কনিষ্ঠ পুত্র রাণা উদয় সিংহ, পরস্বাপহারী বনবীর নয় ।
কর্ণঞ্জি। আগামী ফাল্গুনী পূর্ণিমায় ?
বীরমল্ল। ঠিক এক পক্ষ পরে।
পান্না। আপনারা বলেছেন আমি যে পান্না, তার প্রমাণ যতক্ষণ না
দিতে পারব, ততক্ষণ আমার কোন কথা আপনারা সত্য বলে মেনে নেবেন
। প্রমাণ আমি দোব। কিন্তু সে প্রমাণ দেবার পর আমি আর
আপনাদের সঙ্গে কথা বলবার অবসর পাব না। তাই আমার যা বলবার
ছিল, আগেই তা বলে রাখলাম। গােপন রাখলাম উদয়ের আশ্রয় স্থল,
গােপন রাখলাম দ্বাদশ সর্দারের নাম। ফাল্গুনী পূর্ণিমায় তাদের
দেখা আপনারা পাবেন। সেদিন, সর্দারগণ, সেদিন যেন তাদেরকে
নিরাশ করবেন না

দ্বিতীয় দৃশ্য
ধাত্রী পান্না
কর্ণজি। যদি প্রমাণিত হয় তুমিই পান্না, তাহলে আমরা প্রস্তুত
হয়েই থাকব।
পান্না। শুনুন সর্দারগণ, চিতােরের এমন একজন লােক এত ভাল
করে আমাকে জানে যে দূর থেকে আমাকে দেখেই পান্না বলে চাকার
করে উঠবে। বর্শার ডগায় শীকার পেলে শীকারী যেমন উল্লাসে লাফিয়ে
ওঠে, তেম্নি সে লাফিয়ে উঠবে।
সকলে। কে সে !
পান্না। বনবীর ।
সকলে। বনবীর!
পান্না। আমার পুত্রহন্তা।
কর্ণজি। কিন্তু বনবীর যে তােমাকে সাম্নে পেলে তখুনি হত্যা করবে।
পান্না। তাইত আমার বলবার সব কথা আপনাদের আগেই বলে
রাখলাম। এখন আমাকে বনবীরের কাছে নিয়ে চলুন। প্রমাণ পেতে
আপনাদের বিলম্ব হবেনা। কোন সংশয়ও আপনাদের থাকবেনা।
করমচঁাদ। আর কোন প্রমাণ কি নেই পান্না ?
মন্দিরের পিছন হইতে শীতলসেনী বাহির হইয়া
কহিলেন :
শীতলসেনী। আছে সর্দারগণ। আমি জানি এই রমণীই ধাত্রী
পান্না।
সকলে। শীতলসেনী !
শীতলসেনী পান্নার আপাদমস্তক নিরীক্ষণ ক২িয়
সর্দারদের দিকে ফিরিয়া কহিলেন :

ধাত্রী পান্না
দ্বিতীয় অঙ্ক
শীতলসেনী। শুনেছিলাম চণ্ডীপীঠে পূজা দিয়ে আজই আপনারা
আহেরিয়ায় যাত্রা করবেন, কিন্তু এখানে এসে জানলাম ফাল্গুনী
পূর্ণিমাতে আপনারা শীকারে বেরুবেন।
দুইজন সৈনিক আসিয়া দাড়াইল ।
এই নারীকে বন্ধন করে দুর্গ-কারায় নিয়ে যাও।
সৈনিকরা পান্নাকে বন্ধন করিতে অগ্রসর হইল।
কর্ণজি। শীতলসেনী, মহিমময়ী পান্নার অপমান আমরা সহ
করবনা।
বীরম। সর্দারগণ! ঘৃণ্য। এই নারী যদি আজ তার পুত্রের
কাছে ফিরে যাবার অবসর পায়, তাহলে আমাদের কারুর নিস্তার নাই।
মুকুলজী। বেঁধে ফ্যাল, বেঁধে ফ্যাল ওই ঘৃণ্যা নারীকে ।
অনেকে। হত্যা কর।
বনবীর ছুটিয়া আসিয়া কহিল :
বনবীর।
কাকে বাঁধতে আদেশ কচ্ছেন সর্দারগণ, কাকে হত্যা
করবেন ?
সন্দায়রা স্তম্ভিত রহিলেন।
শীতলসেনী। পান্নাকে, পুত্র।
বনবীর। পান্না! ও। এই ত পান্না! পান্নার ভার আমি নিলাম
সর্দারগণ! বন্ধনের প্রয়ােজন নেই। এস পান্না, চল মা !
শীতলসেনী ও পান্নাকে লইয়া বনবীর মন্দিরের পিছন
দিকে চলিয়া গেল। সর্দারগণ কিয়ৎকাল অভিভূতের
মতাে দাড়াইয়া রহিলেন।

দ্বিতীয় দৃশ্য
ধাত্রী পান্না
৭৭
বীরম। কর্ণজি!
কর্ণজি। ঢিল হস্তচ্যুত, আর তা হাতে ফিরে আসবেনা।
বীরমল্ল। আমি শীতলসেনীর কথা বলছি না চন্দাবৎ সর্দার।
কজি। আমিও না।
করমচঁদ। দ্বিধার আর অবসর নেই বন্ধুগণ। শীতলসেনী প্রাসাদে
গিয়ে পুত্রকে সকল কথাই খুলে বলবে।
তখন ?
বীরম। চিতােরের বুকে আবার চলবে হত্যার তাণ্ডব ।
মুকুলজি। পক্ষকালের জন্য চিতাের ত্যাগ করাই সঙ্গত।
কর্ণ জি। পক্ষকাল পরে ফালগুনি পূর্ণিমায় চিতাের আমরা
জয় করব।
বীরমল্ল । কিন্তু পক্ষকাল আমরা কোথায় থাকব কর্ণজি?
করমচাদ। সমগ্র রাজস্থানে আমরা দাসী পুত্রের প্রতি ঘৃণা
জাগিয়ে তুলব।
কর্ণজি। তখন পান্না বর্ণিত দ্বাদশ সূৰ্য্য আত্মপ্রকাশ না করে থাকতে
পারবে না।
বীরা। কিন্তু পান্না, মহিমময়ী ওই নারী, মেবারের অমূল্য রত্ন রক্ষা
করে মেবারকে যে চিরঋণী করে রাখল, মেবারের সদ্দার আমরা তাকে
উদ্ধার করবার কোন চেষ্টাই কি করবনা?
করমচঁাদ। বন্ধুগণ, চন্দাবৎ সর্দার প্রকৃত বীরের মতই কথা
বলেচেন। চিতাের আমরা ত্যাগ করব না। বনবারকে আমরা জানিয়ে
দোব পান্নার প্রাণহানি করলে আমরা তাকে ক্ষমা করবনা । পান্না
মানবী নয়, পান্না দেবী।
সকলে। পান্না দেবী ! পান্না দেবী।

তৃতীয় দৃশ্য
প্রাসাদের একটি কক্ষ
শীতলসেনী আসনে বসিয়া আছেন, পান্না দাড়াইয়া আছে। বনবীর তাহার দিকে
পিছন ফিরিয়া দণ্ডায়মান।
শীতলসেনী। বল, উদয়সিংহকে কার কাছে রেখে এসেচ ।
পান্না। বার বার একই প্রশ্ন কেন শীতলসেনী ?
শীতলসেনী। শুধু ওই কথাটি জেনেই তােমাকে মুক্তি দিতে
চাই বলে।
পান্না।
স্বর্গের লােভ দেখাও যদি, তবুও তা বলব না।
বনবীর ফিরিয়া দাঁড়াইয়া কহিল :
বনবীর। আর যদি জীবন্তে ছাল ছাড়িয়ে নিতে চাই।
পান্না। তবুও না।
বনবীর স্থির পদবিক্ষেপে তাহার সাম্নে গিয়া দাড়াইল।
বনবীর। সেদিনও মৃত্যু যতক্ষণ না মুখােমুখি দাঁড়িয়েছিল, ততক্ষণ
তুমি দৃঢ় ছিলে। কিন্তু তারপর কি করেছিল মনে আছে ?
পান্না মুখ ফিরাইয়া লইল। বনবীর মায়ের আসনের
পীঠে ভর দিয়া কহিল ঃ
সেদিন, জান মা, সেদিন যে মুহূর্তে আমি স্থির করলাম অসির ডগায় ওকে
আর ওর পুত্রকে একসঙ্গে গেঁথে নেব, যে মুহূর্তে আমার সঙ্কল্প প্রকাশ

তৃতীয় দৃশ্য
ধাত্রী পান্না
৭৯
করলাম, সেই মুহূর্তেই ওর সব দৃঢ়তা গলে গেল, পুত্রকে আমার অসিমুখে
ফেলে দিয়ে দূরে সরে দাড়িয়ে প্রাণ বাঁচালো !
পান্না। আজও তুমি কি বুঝতে পার না ঘাতক, কেন সেদিন আমি
আত্মবলি দিইনি?
বনবীর। প্রাণীমাত্রেই যে কারণে প্রাণ বাঁচাতে চায় ।
পান্না। তুমি মূখ।
শীতলসেনীর দিকে ফিরিয়া কহিল ঃ
!
পুত্রকে নরহন্তাই করে তুলেচ, তার বুদ্ধিকে তীক্ষ করবার কোন চেষ্টাই
করনি।
শীতলসেনী। আমার পুত্র তােমার চেয়ে বেশী বুদ্ধি রাখে বলেই
তােমার আত্মত্যাগের মিথ্যা গৌরব স্বীকার করতে চায়না।
পান্না। মিথ্যা গৌরব ।
শীতলসেনী। পুত্রবলি দিয়েও তুমি উদয়সিংহকে রক্ষা করে,
এ-কথা মিথ্যা।
পান্না। মিথ্যা !
শীতলসেনী। নইলে উদয়সিংহ কোথায় তা বলতে চাওনা কেন ?
পান্না। তুমি ত নিজের কানেই শুনে এলে কবে তিনি দেখা দেবেন।
শীতলসেনী। কিন্তু দ্বাদশ বীর সঙ্গে নিয়ে পঞ্চসহস্র ভীলের কঁাধে চড়ে
যিনি চিতাের দুর্গে হানা দেবেন, তিনি যে সত্যই রাণ। সঙ্গের কনিষ্ঠ
পুত্র উদয়সিংহ ধাত্রীপান্নার পুত্র কনক নয় তার প্রমাণ কে দেবে ?
পান্না। সূর্যোদয় কি কোন প্রমাণের অপেক্ষা রাখে শীতলসেনি ?
মনেও ভেবােনা যে মেবারের অধিক ধাত্রীপুত্রকে রাণা
বলে মেনে নেবে।
বনবীর।

৮০
ধাত্রী পান্না
দ্বিতীয় অঙ্ক
পান্না। মেবারের অধিবাসীরা তারও চেয়ে অপরাধ করেচে এক
দাসী পুত্রকে রাণা বলে মেনে নিয়ে। কিন্তু প্রায়শ্চিত্ত তাদের করতে হবে।
বনবীর।
যেদিন দ্বাদশ বীর চিতােরে এসে উপস্থিত হবেন ?
পান্না।
যদি পার সেদিনের জন্য মায়ে-পুত্রে প্রস্তুত হয়ে থেকো।
বনবীর। তােমার ষড়যন্ত্র সফল হবেনা পান্না। তুমি ভেবেচ তােমার
মুখে দ্বাদশ বীরের অস্তিত্ব অবগত হয়ে আনি এখুনি দেশময় হত্যার তাণ্ডব
জুড়ে দিয়ে রাজ্যে অসগেষ জাগিয়ে তুলব আর তারই সুযােগ নিয়ে তুমি
তােমার পুত্র কনককে উদয়সিং বলে চালিয়ে দেবে। দ্বাদশ বীরকে
আমি বাধা দেবনা, চিতােরের সর্দারদেরকেও সাজা দোনা। নগর-দ্বার
উন্মুক্ত করে নিরস্ত্র আমি দাড়িয়ে থাকব। বলব, সিংহাসনের ওই দাবীদার
সত্যই যে উদয়সিংহ, তার প্রমাণ দাও, সিংহাসন ছেড়ে দিতে আমি
প্রস্তুত। কে প্রমাণ দেবে ? সর্দাররা সাহস পাবেনা, নাগরিকরা না,
প্রাসাদের অধিবাসীরাও না।
* শীতলসেনী। কেউ যখন প্রমাণ দিতে পারবেনা, তখন রাজদ্রোহের
অপরাধে তােমাকে আর তোমার সেই পুত্রকে প্রকাশ্যে বধ করা হবে !
ফলে পুত্রবলি দিয়েও শিশােদীয় কুলপ্রদীপের জীবন রক্ষা করেচ বলে যে
গৌরব তুমি দাবী কর, তাও ধোয়া হয়ে উবে যাবে।
পান্না। সত্যই তুমি শয়তানী শীতলসেনী !
শীতলসেনী। বুঝতে পারচ তােমার অতুল আত্মত্যাগের গৌরব
আমরা নষ্ট করে দিতে পারি।
পান্না। কোন গৌরব আমি কামনা করি না।
চম্পা প্রবেশ করিল
চম্পা। বনবীর ।
বনবীর। কি চম্পা !

তৃতীয় দৃশ্য
ধাত্রী পান্না
৮১
পান্না। চম্পা।
চম্পা। আই-মা !
দৌড়াইয়া গিয়া পান্নার গলা জড়াইয়া ধরিল।
যা শুনছি তা কি সত্যি আই-মা ?
শীতলসেনী। রাজপুলি, রাজকার্যের জন্যে আমরা কি ক্ষণকাল
তােমার বিরক্তিকর উপস্থিতি থেকে মুক্ত থাকতে পারবনা ?
চম্পা। বনবীর আমাকে প্রাসাদের সর্বত্র অব্যাহত গতি দিয়েছে।
বনবীর। চম্পা নিষেধ মানতে অভ্যস্থ নয় মা।
বলিয়া বনবীর গৃহ হইতে বাহির হইয়া গেল।
চম্পা। খুল্লতাত জীবিত এ-কথা কি সত্য আই-মা ?
পান্না। সত্য মা, আকাশের চন্দ্র সূর্যের মতােই সত্য।
চম্পা। দেখতে এখন কেমন হয়েচেন ?
পান্না। তােমার কি তাকে মনে আছে ?
চম্পা। নেই! সে মুখ কি কোনদিন ভুলব ?
শীতলসেনী। কার মুখ ভুলতে পারনি রাজপুলি?
চম্পা। রাণা উদয়সিংহের।
শীতলসেনী।
ও!
শীতলসেনী চম্পার দিকে তীব্র দৃষ্টিপাত করিয়া
কিছুকাল স্থির হইয়া দাঁড়াইয়া রহিলেন, তারপর
কাহাকেও কিছু না বলিয়া ঘর হইতে বাহির
হইয়া গেলেন।
চম্পা। এইবার তােমার পায়ের ধূলাে দাও, আই-মা।
বলিয়াই পান্নার পায়ের ধূলা মাথায় লইল।

৮২
ধাত্রী পান্না
দ্বিতীয় অঙ্ক
পান্না। এ কি করলি মা ।
চম্পা। মেবারের জন্যে কত লােকে কত ত্যাগ করেছে, কিন্তু
তােমার ত্যাগের যে তুলনা নাই।
পান্না। আজও সিংহাসনে ঘাতক বসে আছে, আজও ব্রত
উদ্যাপিত হয়নি।
চম্পা। তুমি এখানে কেন এলে আই-মা ? এরা ত তােমায় মুক্তি
দেবে না।
পান্না। নাই বা দিল। এদের কারাগার আর কতদিনইবা অটুট
থাকবে ?
চম্পা। এরা তােমায় পীড়ন করবে আই-মা।
পান্না। যে পীড়ন এতদিন আমাকে সইতে হয়েছে, তার চেয়ে
কঠোর পীড়ন কিছুই হতে পারে না।
চম্পা। শুধু আমরাই যে দুর্ভাগা তাই নয় আই-মা, বনবীরেরও
দুর্ভাগ্যের আর দুর্ভোগের শেষ নেই। বনবীরকে তুমি কি মার্জনা
করতে পার না ?
পান্না। মার্জনা ! তুমি পেরেচ ?
চম্পা। না।
পান্না। তবে আমি পারব কি করে ?
চম্পা। যদি জান্তাম তুমি পেরেচ, তােমার কাছে শিক্ষা নিয়ে
আমিও নিজেকে তৈরি করতে পারতাম।
পান্না। ভগবান যদি মনে বল দেন, হয়ত একদিন মার্জন করতে
পারব।

তৃতীয় দৃশ্য
ধাত্রী পান্না
দুইজন সৈনিকের প্রবেশ।
চম্পা। কি চাও তােমরা?
সৈনিক। বন্দিনীকে কারাগারে নিয়ে যেতে চাই।
চম্পা। কারাগার ওঁর স্থান নয়। আমি রাণার আদেশ নিয়ে
আসছি তােমরা একটু অপেক্ষা কর ।
শীতলসেনী প্রবেশ করিলেন।
শীতলসেনী। রাজকার্যে বিঘ্ন উপস্থিত কোরােনা, রাজপুত্রি।
বন্দিনীকে নিয়ে যাও। ক্ষিধে পেলে খেতে দেবেনা, তেষ্টা পেলে জল
দেবেনা, ঘুমে ঢলে পলেও শুতে দেবেনা।
পান্না। হায় শীতলসেনী, তুমি জাননা কতদিন মুখের অন্ন ফেলে
রেখে উদয়কে বুকে নিয়ে পাহাড়ে পাহাড়ে আত্মগােপন করেচি, কী তৃষ্ণা
কণ্ঠে নিয়ে মরুর পর মরু অতিক্রম করিচি, তােমাদের প্রেরিত ঘাতকদের
কবল থেকে উদয়কে বাঁচাবার জন্য কত রাত কাননে-কান্তারে
নিশি জেগেচি।
সৈনিকদের সঙ্গে চলিয়া গেল।
চম্পা। আমাকেও কারাগারে পাঠিয়ে দাও শীতলসেনী ।
শীতলসেনী। প্রয়ােজন দেখা দিলে তাও দোব।
বলিয়া শীতলসেনী চলিয়া গেলেন। চম্পা সেইখানেই
বসিয়া পড়িল।

চতুর্থ দৃশ্য
বনবীরের কক্ষ।
আপ্পা, রাঘব, নবকিশাের, পরভু করজোড়ে
বনবীর পায়চারি করিতেছে।
দাড়াইয়া আছে।
বনবীর। আমার কোন আদেশ নেই।
আপ্পা। সৈন্যরা শিবিরে থাকেনা প্রভু।
বনবীর। তাদের লাঙল কিনে দাও, দেশের মঙ্গল হবে।
রাঘব। প্রভু, দুর্গের পরিখা মজে গেছে, পঙ্কোদ্ধার প্রয়ােজন।
বনবীর। দুর্গ আমার অজেয়, পরিখার প্রয়ােজন নেই।
নবকিশাের। রাজ্যের সমস্ত কামারশালার দ্বার রুদ্ধ, অস্ত্র আর
তৈরি হয়না।
বনবীর। শাস্ত্রচর্চায় মন দাও, পরকালের কাজ হবে।
পরভু। রাজস্বও নিয়মিত পাওয়া যায়না।
বনবীর। রাজ্যের সত্ত্ব-স্বামিত্ব নিয়ে যখন প্রশ্ন উঠেছে, তখন রাজস্ব
দুল্লভ হবেই।
আপ্পা। দেবী আপনার কাছে নিবেদন করতে বল্লেন।
বনবীর। দেবী অন্যায় কাজ করতে পারেন না, কেননা দেবী
আমার মা।
রাঘব। শােনা গেল সমগ্র রাজস্থানে একটা অসাধারণ চাঞ্চল্য
দেখা দিয়েছে।

চতুর্থ দৃশ্য
ধাত্রী পান্না
বনবীর। রাজস্থানের রাণাকেই কি আজ বেশ অচঞ্চল স্থির বলে
মনে হচ্ছে ?
চম্পা দুয়ারের কাছে আসিয়া দাঁড়াইল।
চম্পা। বনবীর।
এস চম্পা। মনে মনে তােমাকেই আমি চাইছিলাম।
সরে পড় তােমরা, সরে পড়।
তাহারা চলিয়া গেল।
বনবীর।
চম্পা, রাজস্থান পৃথিবীর কতটুকু অংশ ?
চম্পা। আমি ত তা জানিনা।
বনবীর। আশ্চৰ্য্য, আমিও জানিনা। মেবার, চিতাের, রাণার
সিংহাসন, সবই ক্ষুদ্র ; তবু তাদের কত বড় করে তুলতে চাই, আর
মানুষকে চাহ বলির পশু করে রাখতে। কেন ? কেন ? বলতে
পার কেন ?
চম্পা। তােমাকে আজ বড় চঞ্চল দেখচি বনবীর ।
বনবীর । যেদিন তােমার পিতাকে হত্যা করেছিলাম, সেদিন অচঞ্চল
ছিলাম, নিজে তুমি দেখেছ ; শিশু হত্যা করবার সময় না কাপল আমার
হাত, না কঁপল আমার মন ; চিতােরের পথে পথে যখন রক্তের নদী
বইয়ে দিয়েছিলাম তখনাে আঘাত করতে আমার চোখের পাতা নড়েনি-
কিন্তু আজ, স্থির দীপশিখার মত, মানবী না দেবী জানিনা, অগ্নিময়ী
মূর্তি দেখে আমার সারা মন থর থর কেঁপে উঠল
খপ করিয়া চম্পার হাত বুকে রাখিয়া কহিল ঃ
বুকে হাত রাখলেই আমার মনের অবস্থা বুঝতে পারবে।
চম্পা। তুমি কার কথা বলচ, বনবীর !

ধাত্রী পান্না দ্বিতীয় অঙ্ক বনবীর। পান্নার কথা। চম্পা। তারই কথা বলতে তােমার কাছে আমি এসেছি। বনবীর। পান্নার কথা ছাড়া মেবারে আজ কোন কথা নেই। মেবার, চিতাের, সিংহাসন, পান্নার তুলনায় সবই ক্ষুদ্র তুচ্ছ নগণ্য, অথচ আশ্চৰ্য্য, বড় আশ্চর্য এই যে, সেই মেবারের জন্যে, মেবারের সিংহাসনের জন্যেই পায় তার পুত্রকে বলি দিল ; অবিচলিত নিষ্ঠা নিয়ে, সমগ্র রাজস্থানের বুকের ওপর দিয়ে পরিভ্রমণ করল অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের দাবী প্রচার করে ; অবনত কৰ্তব্যভ্রষ্ট সর্দারদের উদ্বুদ্ধ করে সে ফিরে এলাে চিতােরে। চিতাের তাকে চিনতে পারলেনা, পরিচয় চাইলে। সে বল্লে তার পরিচয় জানে একমাত্র বনবীর। শুনলে চম্পা, সে বল্লে তার পরিচয় জানে বনবীর—যে বনবীর তার পুত্রকে হত্যা করেছে, তার মাথা নেবার জন্য খঙ্গ তৈরি রেখেছে। নিজের পরিচয় দেবার জন্য সেই বনবীরের সাম্নে দাড়িয়ে সে নিষ্কম্প দীপ-শিখার মত জ্বলতে লাগল। স্থির হইয়া কিছুকাল দাড়াইয়া রহিল। আমি চঞ্চল পতঙ্গের মতাে প্রশ্ন স্থলে বার কয়েক পাখসাট মারলাম। তার দিকে চাইলাম, চাইলাম আমার মায়ের দিকে। সমস্ত মন ভূকম্পের কাঁপুনির মতাে কেঁপে উঠল। সে কঁপুনি এখনাে থামেনি। চম্পা। আমি জানতে এসেচি তাকে কি এখন মুক্তি দেওয়া যায়না? বনবীর। মুক্তি ও তার করায়ত্ত। চম্পা। তবু তােমরা তাকে কারাগারে রেখেচ। এ কতবড় বিড়ম্বনা বলত চম্পা, জীবনে কোন বন্ধনকেই যে স্বীকার করলনা, তাকে চাইলাম আমরা পাষাণ কারায় অবরুদ্ধ বনবীর।

চতুর্থ দৃশ্য
ধাত্রী পান্না
৮৭
রাখতে—ভাবলাম না তাকে মুক্তি দেবার জন্য পাষাণ আপনি ফেটে
চৌচির হবে।
চম্পা। তুমি আমার প্রশ্ন এড়িয়ে যাচ্ছ বনবীর।
বনবীর। বড়ই চঞ্চল হয়ে উঠেচি কিনা।
চম্পা। পান্নাকে কি মুক্তি দেওয়া যায়না ?
বনবীর।
কেন যাবে না ?
চম্পা। তাতে কি তােমাদের খুবই ক্ষতি হবে ?
পানা ক্ষতি ? কিছু না।
চম্পা। তবে তাকে মুক্তি দাও।
বনবীর। নিশ্চয়ই দোব।
দুয়ারের দিকে অগ্রসর হইল। থামিয়া কহিল ?
অবশ্য যদি উপায় থাকে।
চম্পা। তুমিও বলচ এই কথা।
বনবীর ফিরিয়া আসিয়া কহিল :
বনবীর। আমার মাকে জান ত। পান্নার মুক্তি যদি তার অনভিপ্রেত
হয়, তাহলে আমার আদেশ পালন করবার জন্যে কারারক্ষীদের আজ
খুঁজে পাওয়া দায় হবে।
চম্পা। হায়রে রাণা !
বনবীর। তােমার ওই সুরে সুর মিলিয়ে আমিও বলি, হায়রে
হতভাগ্য রাণা !
হাসিতে হাসিতে বনবীর বাহির হইয়া গেল। চম্পা
মাথা নত করিয়া দাড়াইয়া রহিল। জগমল ধীরে ধীরে
প্রবেশ করিল, তাহার হাতে একটি লাল ফুল।

৮৮ ধাত্রী পান্না দ্বিতীয় অঙ্ক জগমল। চম্পা ? তুমি কি কঁদচ? চম্পা। কাদব কেন ? জগমল। আগেকার কথা ভেবে তুমি সব সময় মন খারাপ করে থাক কিনা। চম্পা। আগেকার সে কথা কি ভােলা যায় জগমল ? জগমল। শীতের হিমেল হাওয়া এককালে হাড় কঁপিয়ে তােলে বলে কি মানুষ বসন্তকে বিফলে যেতে দেয় চম্পা ? চম্পা। তুমি এসব কথা শিখলে কোথা থেকে জগমল ? জগমল। তােমার মুখের দিকে অপলক চেয়ে থেকে থেকে। চম্পা। তুমি জগমল । জগমল। তােমাকে আমি এই পাপপুরী থেকে বাইরে নিয়ে যেতে চাই চম্পা। ৩ চম্পা। পার ? জগমল। পারি। চম্পা। কোথায় নিয়ে যেতে চাও? জগমল। চিতােরের বাইরে, পাহাড়ের গায়ে সুন্দর একটি উদ্যান- বাটিকায়। চম্পা। বল কি জগমল । জগমল। সেখানে শুধু তুমি আর আমি চম্পা। শুধু তুমি আর আমি ! জগমল। দেবী বলেছেন, তিনি সব ব্যবস্থা করে দেবেন। চম্পা। কে বলেচেন ? জগমল। দেবী শীতলসেনী। বনবীর বাধা দিতে পারবে না।

চতুর্থ দৃশ্য
ধাত্রী পান্না
চম্পা। দেবী তােমাকে খুবই অনুগ্রহ করেন।
জগমল। তার অনুগ্রহ যে নিগ্রহ তা আমি বুঝি চম্পা। কিন্তু
আমরা নিরুপায় কিনা, তাই সময় যতদিন না আসে ততদিন চুপ করেই
আমাদের থাকতে হবে। আর জানত আমাদের সুসময় এলাে বলে।
উদয়সিংহ আসছে, সৈন্যসামন্ত নিয়ে আসছে।
চম্পা। তুমি জানলে কি করে?
জগমল। আমি জানবনা! আমি ছুচ হয়ে ঢুকেচি ফাল হয়ে
বেরুবাে। উদয়সিংহকে বােললা গােপনে সব খবর সংগ্রহ করে আমি
তােমাকে দিতাম।
চম্পা। উদয় আসছেন।
জগমল। তার আসবার দিন গণে গণে আমরা আমাদের পাহাড়ের
সেই নিরালা উদ্যানে অপেক্ষা করব।
চম্পা। তােমার হাতে ওটা কি ফুল ?
জগমল। দেবীর উদ্যান থেকে তুলে আনলাম। অনাঘ্রাত ফুল।
তােমাকে নিবেদন করব বলেই নিয়ে এসেছি।
চম্পা ফুলটি লইল।
চম্পা।
এমন ফুল ত আগে কখনাে দেখিনি। আমিও দেখিনি।
জগমল। দেবী বলেন মন্দারের
চেয়ে মধুর এর গন্ধ। আমার
মানস-প্রতিমাকে দোব বলেই ঘ্রাণ নিইনি।
চম্পা ফুলটি একবার শুকি—আবার ও।
চম্পা। একি ফুল তুমি আমার হাতে দিলে জগমল
বলিয়া ফুলটি ফেলিয়া দিল ।

ধাত্রী পান্না
দ্বিতীয় অঙ্ক
জগমল। কেন ? হােললা কি ?
চম্পা। আমার শ্বাসনালী পুড়ে যাচ্ছে:•• আমার বড় কষ্ট হচ্ছে
জগমল ••জগমল আমি চোখে কিছু দেখতে পাচ্ছিনা•••
জগনল। রাজপুলি, আমার কোন অপরাধ নেই, রাজপুত্রি ।
চম্পা। শিগগীর বনবীরকে ডেকে আন। তাকে বল আমি আর
বাঁচবাে না।
জগমল। তােমার খুব কষ্ট হচ্ছে চম্পা ?
চম্পা । আমি এখুনি মরে যাব। তুমি বনবীরকে ডেকে আন
জগল।
জগমল। এখুনি ডেকে আনচি চম্পা।
যাইতে উদ্যত হইল। শীতলসেনী প্রবেশ করিলেন।
শীতলসেনী। কোথায় যাও মূখ ।
জগমল। রাজপুত্ৰী অত্যন্ত অসুস্থ হয়ে পড়েচেন দেবী।
শীতলসেনী। তুমি ত বেশ সুস্থ আছ! দাড়াও।
চম্পা। শীতলসেনী:••এ আমার কি হোলাে ? আমি.••আমি
যে নিশ্বাস নিতে পারছিনা। আমার বুকের ভিতর জ্বলে যাচ্ছে••একটা
ফুল শুকে কেন এমন হলো?
শীতলসেনী।
ফুল। ফুল কে দিলে ।
চম্পা। জগমল।
জগমল। তুমি যে ফুল দিয়েছিলে, দেবি।
শীতলসেনী। মূখ। বড় কষ্টে হচ্ছে রাজপুত্রি ?
চম্পা। তুমি আমাকে বাঁচাও শীতলসেনী-•••বাঁচাও.••ফানী
পূর্ণিমা পর্যন্ত আমাকে বাঁচতে দাও।

চতুর্থ দৃশ্য
ধাত্রী পান্না
শীতলসেনী। ফাল্গুনী পূর্ণিমা !
হাসিলেন।
চম্পা। উঃ শীতলসেনী, তুমি কি পাষাণী ! জগমল, বনবীরকে
ডেকে দাও।
শীতলসেনী। বনবীরকে তােমার প্রয়ােজন ?
চম্পা। তাকে একটা কথা বলে যেতে চাই ।
শীতলসেনী। কি কথা, তা কি শুনতে পাইনা রাণীর দুলালী ?
চম্পা। বলে যেতে চাই..তাকে.. তাকে আমি ক্ষমা করিচি।
চম্পার প্রাণহীন দেহ মেজেয় লুটাইয়া পড়িল।
শীতলসেনী। রাজপুত্রী আর পৃথিবীর কারু ডাকে সাড়া দেবেনা।
জগমল। রাজপুলি! রাজপুত্রি ।
জগল। হায় অভাগী রাজপুত্রী।
মাথা নত করিয়া তাহার সম্মুখে বসিল।
শীতলসেনী। ওঠ, ভাগ্যবান।
ফুল তুলে নাও।
জগমল দ্রুত সরিয়া গেল।
জগমল। না, না, ও ফুল 'আমি স্পর্শ করতে পারবনা।
শীতলসেনী। তুলে নাও ওই ফুল।
জগল। আমাকেও কি তুমি মেরে ফেলতে চাও শীতলসেনী ?
শীতলসেনী। ফুল যে আমি দিয়েছিলাম তার একমাত্র সাক্ষী তুমি।
তাই তােমারও বেঁচে থাকা হবেনা। তুলে নাও ফুল।
জগমল অবাক হইয়া তাহার দিকে চাহিয়া রহিল।

ধাত্রী পান্না
দ্বিতীয় অঙ্ক
মরতে তােমাকে হবেই জগমল। এখন, ভেবে দ্যাখ মাটির নীচেকার
গুপ্তকক্ষে ঘাতক সাড়াণী দগ্ধ করে তােমাকে হত্যা করবে, না এইখানে
রাণার এই সুসজ্জিত কক্ষে সুন্দর ওই ফুলের গন্ধ শুকতে শুকতে মৃত্যুর
কোলে পরম নিশ্চিন্তে ঢলে পড়বে ?
জগমল। না, না, আমি মরতে পারবনা; মরতে আমি চাইনা
শীতলসেনী। রাজপুত্রীই কি মরতে চেয়েছিল ? তুলে নাও ফুল।
বনবীর প্রবেশ করিল।
বনবীর।
কাকে ফুল দিয়ে আশীৰ্বাদ করচ মা ?
জগমল ছুটিয়া গিয়া বনবীরের পায়ের তলায় পড়িয়া
চীৎকার করিয়া কহিল :
জগমল। রাণা! আমাকে বাঁচাও রাণ। আমাকে বাঁচাও।
বনবীর।
কে তােমাকে মারতে চাইছে জগমল !
জগমল। ওই ফুল শুকে চম্পা প্রাণ হারালে।
বনবীর।
কে প্রাণ হারালে জগমল ?
বলিতে বলিতে জগমলের কণ্ঠ ধরিয়া টানিয়া তুলিয়া
তাহার মুখের কাছে মুখ সইয়া তাহার দিকে
চাহিয়া রহিল।
জগনল
চম্পা।
বনবীর
চম্পা !
জগমসকে ছুড়িয়া ফেলিয়া দিয়া শীতলসেনীর কাছে
গিয়া কহিল।

চতুর্থ দৃশ্য
ধাত্রী পান্না
চম্পা কোথায় মা ?
শীতলসেনী কোন কথা না কহিয়া আঙ্গুল দিয়া
দেখাইয়া দিলেন।
চম্পা ! চম্পা !
মাথা নীচু করিয়া কিছুকাল চম্পার দিকে চাহিয়া
রহিল। তার পর ধীরে ধীরে শীতলসেনীর মুখের
দিকে চাহিল, তারপর হাত বাড়াইয়া ফুলটি তুলিয়া
লইতে গেল।
শীতলসেনী।
, না, পুত্র, ও ফুল তুমি স্পর্শ কোরােনা।
বনবীর ধীরে ধীরে ফুলটি তুলিয়া লইল, মায়ের দিকে
স্থির দৃষ্টিতে কিছুকাল চাহিয়া রহিল। তারপর
কহিল :
বনবীর। অভাগী চম্পাকে হত্যা না করলেই কি তােমার পুত্রের
সিংহাসন তলিয়ে যেত?
ফুলটি লইয়া বনবীর ঘরের বাহিরে চলিয়া গেল।
শীতলসেনী। বনবীর! বনবীর! বনবীর !
বলিতে বলিতে শীতলসেনী উভ্রান্তের মতো পুত্রের
অনুগমন কহিলেন।

পঞ্চম দৃশ্য
দরবার কক্ষ
বনবীর সিংহাসনের দিকে মুখ করিয়া স্থির হইয়া দাড়াইয়া আছে। বনবীরকে
ডাকিতে ডাকিতে শীতলসেনী প্রবেশ করিলেন।
!
শীতলসেনী। বনবীর! বনবীর! ফুল হাত থেকে ফেলে দাও
বনবীর। ভয়ে আমার বুক কাপচে ।
বনবীর। ভয় ! তােমার বুকে ভয় ! কখনাে শুনিনি !
শীতলসেনী। ফুল ফেলে দাও।
বনবীর মায়ের কাছে আগাইয়া আসিয়া কহিল :
বনবীর। পাহাড়ের এ ফুল প্রাসাদে কেমন করে এল মা?
শীতলসেনী। জগমল এনেচে।
বনবীর। এ ফুল যেখানে ফোটে জগমল সেখানে যেতে সাহস
করবে না।
শীতলসেনী। জগমলই চম্পার হাতে তুলে দিয়েছিল।
বনবীর। হাতে হয়ত জগমলই তুলে দিয়েছিল, কিন্তু আনিয়েছিল কে?
শীতলসেনী। জগমল জানে।
বনবীর। তুমি ?
শীতলসেনী কোন কথা কহিলেন না।
মা, জীবনে আমি কখনাে তােমার কাছে কিছুই গােপন রাখিনি। তুমিও
সন্তানের কাছে মিথ্যা বােলােনা।

পঙ্কম দৃশ্য
ধাত্রী পান্না
৯৫
শীতলসেনী। আগে ওই ফুল ফেলে দাও।
বনবীর। দোব। কিন্তু তার আগে পরখ করে দেখব কি সর্বনাশা
শক্তি আছে এর গন্ধের।
ফুলটি নাকের কাছে লইয়া গেল।
শীতলসেনী।
না, না।
বলিয়া বনৰীরের হাত চাপিয়া ধরিল। বনবীর
মায়ের মুখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে কিছুকাল চাহিয়া
রহিল। তারপর ফুলটি ফেলিয়া দিয়া কহিল :
বনবীর। আর আমার কোন সন্দেহ নেই মা। বিষাক্ত এই ফুল
তুমিই আনিয়েছিলে চম্পাকে হত্যা করবার জন্য । জগমলের ঘাড়ে
দোষ চাপাতে তাকে দিয়েই পাঠিয়েছিলে ।
কঠোর দৃষ্টিতে মায়ের দিকে কিছুকাল চাহিয়া
থাকিয়া কহিল :
তুমি আমার মা ! নইলে••••••
শীতলসেনী পুত্রের নিকট হইতে পিছাইয়া গেলেন।
শীতলসেনী। নইলে ?
বনবীর। নইলে !•••
মায়ের দিকে অগ্রসর হইয়া হঠাৎ থামিল। কণ্ঠে
আবেদন আনিয়া কহিল :
মা, মা, কেন তুমি এ-কাজ করলে মা !
শীতলসেনী। তুমি কেন রাজহত্যা, শিশুহত্যা করেচ বনবীর ? তুমি
কেন নর-রক্তে রাজপথ ভাসিয়ে দিয়েচ ?

ধাত্রী পান্না
দ্বিতীয় অঙ্ক
বনবীর। কেন ? কেন ? কেন করলাম বলতে পার মা ? বলতে
পার মা মানুষ আমি কেন এমন পশু হয়ে গেলাম ?
শীতলসেনী। স্বার্থের জন্য ।
বনবীর। স্বার্থের জন্য ।
শীতলসেনী। স্বার্থের জন্য, সিংহাসনের জন্য তুমি যদি অগণিত
নরহত্যা করে মায়ের স্নেহ পাবার আশা রাখতে পার, তাহলে মা কেন
পুত্রকে সিংহাসনে স্থায়ী রাখবার জন্য তুচ্ছ একটা তরুণীকে হত্যা করে
বলে পুত্রের শ্রদ্ধা থেকে বঞ্চিত হবে ?
বনবীর। কিন্তু চম্পা, চম্পা ত সিংহাসন নিয়ে আমার সঙ্গে
প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেনি।
শীতলসেনী। ভােল কেন উদয়সিংহকে চিনতে পারত একমাত্র
চম্পা। ভােল কেন আমরা স্থির করিচি উদয়সিংহকে পান্নার পুত্র কনক
বলে প্রমাণ করে দিয়ে পান্নার ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করে দেব।
বনবীর। এই ভেবেই তুমি চম্পাকে বিষ প্রয়ােগে হত্যা করলে !
শীতলসেনী। নিজের কোন স্বার্থসিদ্ধির জন্য নয়।
বনবীর। হায় মা! নিজের সন্তানের জন্যে তােমার যে দরদ,
অপরের সন্তানের জন্য যদি তার কিছু অংশও তােমার বুকে থাকত,
তাহলে পান্না তােমার কাছে তুচ্ছ হয়ে যেত। তুমি তাকে ভয় করতে না।
শীতলসেনী। পান্নাকে ভয় !
বাহিরে একটা কোলাহল উঠিল। রাঘব প্রবেশ
করিল।
রাঘব। প্রভু, চিতােরের সর্দাররা কারাগার ঘিরে ফেলেছে। তারা
পান্নার মুক্তি চায়।

পঞ্চম দৃশ্য
ধাত্রী পান্না
১৭
শীতলসেনী। পান্নার মুক্তি।
রাঘব। সর্দাররা তাই চায় দেবী।
শীতলসেনী। দুর্গের সৈন্যরা কি নিরস্ত্র রাঘব ?
রাঘব। তারা রাণার আদেশের অপেক্ষায় রয়েছে।
বনবীর। পান্নার মুক্তির আবেদন নিয়েই আমি তােমার সন্ধানে
গিয়েছিলাম, মা।
শীতলসেনী। জানি, চম্পার অনুরােধে।
বনবীর। মৃতার সেই অনুরােধ :
শীতলসেনী। জীবিত কেউ রক্ষা করবেনা। রাঘব, সৈনিকদের
কারারক্ষায় নিয়ােগ কর।
রাঘব বাহির হইয়া গেল। বনবীর একটু পরেই
ডাকিল।
বনবীর।
রাঘব! রাঘব !
রাঘব ফিরিয়া আসিল।
শীতলসেনী। রাঘব, রাণ। তার মায়ের আদেশ রহিত করবার
অধিকার রাখেন।
বনবীর। মা !
শীতলসেনী। তােমার ইচ্ছানুযায়ী আদেশ প্রচার কর পুত্র।
বনবীর। মায়ের আদেশ পালন কর রাঘব।
রাঘব ফিরিয়া আসিল।
শীতলসেনী। তােমার এই অভাগী মাকে তাহলে তুমি পান্নার চেয়ে
বড় বলে মান !

ধাত্রী পান্না
দ্বিতীয় অঙ্ক
বনবীর। মা, সর্দারদের এই অনুচিত আচরণের শাস্তি তারা পাক।
কিন্তু এস মা, আমাদের উচিত কৰ্তব্যও আমরা পালন করি। পান্না
দেবীকে আমরা মুক্তি দান করি।
শীতলসেনী। পান্না দেবী।
বনবীর। দেবী নয় মা? শুধু একটা ন্যস্ত দায়িত্বের জন্য, একটা আদর্শের
জন্য নিজের একমাত্র পুত্রকে যে বলি দিতে পারল, সেত সাধারণ মানবী নয়।
শীতলসেনী। পান্না মুক্তি পেলে ওই সিংহাসন তােমাকে হারাতে
হবে সে কথা তুমি জান ?
বনবীর। পান্না যেদিন পুত্র বলি দিয়ে উদয়সিংহকে বাঁচিয়েচে,
সেইদিনই আমি সিংহাসন হারিয়েচি। তুমি মা, তুমি বার বার বলে
রাজ-কর্তব্যে আমি অবহেলা করি, মহত্বের অভিনয় করে প্রজার চিত্ত জয়
করতে আমি চাইনি, কিন্তু একবারও তুমি এ-কথা ভাবনি মা যে রাজার
সকল শক্তি, সকল গৌরব, সকল আড়ম্বর তুচ্ছ করে দিয়েচে তপস্বিনী
ওই পান্না।
আর সবারই মৰ্যাদা আজ ধুলােয় লুটোয় ।
নবকিশাের প্রবেশ করিল।
বনবীর।
নবকিশাের। প্রভু! সর্দাররা কারাগার ভেঙে ফেলে পান্নাকে
মুক্ত করেছে।
করেচে নবকিশাের !
নবকিশাের। তারা প্রাসাদ আক্রমণ করতে ছুটে আসছে।
বনবীর। কারাগার থাকে বলেই প্রাসাদ তার উদ্ধত শির তুলে
আকাশ স্পর্শ করে, নবকিশাের। কারাগার যখন ভেঙে পড়ে, তখন
প্রাসাদও ধূলােয় মিলিয়ে যায়।

পঞ্চম দৃশ্য
ধাত্রী পান্না
শীতলসেনী। ওরা প্রাসাদও অধিকার করবে ?
বনবীর। অধিকার করবে না, ধুলােয় মিলিয়ে দেবে।
পরভু ছুটিয়া আসিল।
পরভু। প্রভু, বিদ্রোহীরা প্রাসাদে প্রবেশ করেছে।
শীতলসেনী। ওদের আরাে প্রশ্রয় দেবে বনবীর।
বনবীর। ওরা ত আমার আদেশ আর পালন করবেনা, মা।
শীতলসেনী। একবার অস্ত্র হাতে তুমি তােমার সৈন্যদের সামে গিয়ে
দাড়াও, দেখবে ভয়ে বিদ্রোহীরা অস্ত্র ত্যাগ করবে। কতবার তাই
করেচে।
বনবীর।
যখন ওরা তা করত, তখন পান্না ওদেরকে ত্যাগের মন্ত্রে
দীক্ষা দেয়নি। তাই ওরা তখন ছিল ভীরু।
শীতলসেনী। এখন ?
বনবীর।
এখন ওরা ভয় জয় করেছে। এখন ওরা জেনেচে বনবীর
প্রকৃত বীর নয়, বনবীর শুধু একটা হিংস্র পশু। যাও নবকিশাের, যাও
পরভু, এখন থেকে আমি আর কোন আদেশ প্রচার করব না।
তাহারা চলিয়া গেল।
শীতলসেনী। কিন্তু ওরা যে আমাদের হত্যা করবে, বনবীর।
বনবীর। এতদিন আমরা হত্যা করিচি, মা। আজ থেকে ওদের
সুরু, আমাদের শেষ।
শীতলসেনী। তুমি বাধা দেবেনা?
বনবীর।
।
শীতলসেনী। তাহলে দাড়িয়ে দাড়িয়ে দ্যাখ তােমার মায়ের মৃত্যু।

ধাত্রী পান্না
দ্বিতীয় অঙ্ক
ফুলটি কুড়াইয়া লইল। বনবীর তাহার হাত
ধরিয়া কহিল।
বনবীর। মা, আত্মহত্যা মহাপাপ!
শীতলসেনী। কিন্তু ওরা যে আমাকে নির্মমভাবে হত্যা করবে।
বনবীর। তুমি নিশ্চিন্ত থাক মা। যে নিৰ্ম্মম হত্যার উৎসব আমরা
করিচি, ওরা তা করতে পারবেনা।
শীতলসেনী। আমি ত হত্যা করিনি বনবীর।
বনবীর। চম্পার কথা এরই মাঝে ভুলে গেলে।
ভীষণ কোলাহল করিতে করিতে সর্দাররা এবং
সৈনিকরা প্রবেশ করিল।
সর্দারগণ। এই কক্ষে। এই কক্ষে।
করমচঁদ। এই যে মাতাপুত্র একসঙ্গেই রয়েচ।
বনবীর মাকে বাহুপাশে বাঁধিয়া লইল।
কর্ণজি। আবার আমরা তােমার কাছে এসেছি, বনবীর।
বনবীর।
একবার এসেছিলেন আমাকে ওই সিংহাসন দিতে।
এবার কি তা কেড়ে নিতে এসেছেন ?
বীরবল্ল। সিংহাসন নয় জীবন, জীবন!
বনবীর। জীবন!
বীরমল্ল। তােমার জীবনের যবনিকা ফেলতে এসেচি এবার।
কর্ণজি। তােমাকে দণ্ড দিতে এসেছি।
করমাদ। তােমার অপরাধ অমার্জনীয়।

পঞ্চম তৃ
ধাত্রী পান্না
বনবীর। মার্জনা প্রত্যাশী আমি নই, মেবারের সর্দারগণ। আমি
স্বীকার করচি, আমি বিক্রমজিৎকে হত্যা করে সিংহাসন অধিকার
করিচি। কিন্তু তার পরও পাঁ
পরিপূর্ণ পাঁচটি বছর আপনাদের প্রতি না
পেলেও প্রণতি পেয়েচি, স্তুতি পেয়েচি, বশ্যতা পেয়েচি। পেয়েছি জন্যই
যে, রাজহত্যা রাজস্থানে নূতন নয়। মেবারের বহু সুসন্তান, সিংহাসন
পেয়েচেন হত্যায় কৃতিত্ব প্রকাশ করে।
একটুকাল চুপ করিয়া রহিল, তার পর আবার
কহিল :
রাজহত্যায় তারা কৃতিত্ব প্রকাশ করেছেন। কিন্তু কখনাে কেউ সিংহাসনের
সঙ্গে নির্লিপ্ত, আত্মরক্ষায় অসমর্থ, অসহায় কোন শিশুকে মায়ের কোল
থেকে কেড়ে নিয়ে ঘাতকের ছােরা তার বুকে বসিয়ে দিয়েছেন বলে
শুনিনি।
কর্ণজি। তুমি তাও করেচ ঘাতক।
কবীর। হ্যা, হ্যা, আমি তাও করিচি।
ভাই আমি ঘৃণ্য
ঘাতক।
বীরম।
দণ্ড নেবার জন্য প্রস্তুত হও।
বনবীর। আমি প্রস্তুত সর্দারগণ। কিন্তু সে দণ্ড কে দেবে?
করমচঁাদ।
দণ্ড দেবে পান্না।
বনবীর। দেবী পান্না।
সকলে। দেবী পান্না।
বনবীর। আপনারা ভুল করছেন। দেবীর দেওয়া দণ্ড ত পুত্রঘাতকের
পক্ষে শান্তি হবেনা, সে যে হবে পরম আশীৰ্বাদ !

ধাত্রী পান্না
দ্বিতীয় অঙ্ক
জগমল পান্নাকে লইয়া প্রবেশ করিল।
জগমল। ওই তােমার পুত্রঘাতক! পাশে দাড়িয়ে চম্পাকে যে
হত্যা করেছে, সেই শীতলসেনী ।
পান্না ধীরে ধীরে অগ্রসর হইল । বনবীরের সামে
গিয়া দাড়াইল।
পান্না। তুমি বনবীর, আমার পুত্র হন্তা! আর তুমি শীতলসেনী,
চম্পাকে তুমি হত্যা করেচ—যে চম্পা আমাকে অনুরােধ করেছিল ঘাতক
বনবীরকে ক্ষমা করতে !
বনবীর। চম্পা ! চম্পা আমাকে
ক্ষমা করেছিল।
আ-আ !
বনবীরের অভিশপ্ত জীবনে চম্পার ক্ষমাই হয়ে রইল পরম সান্ত্বনার কথা।
কর্ণজি। তুমি দণ্ড ঘােষণা কর পান্না।
পান্না। বনবীর, সেদিন আমার কোল থেকে কেড়ে নিয়ে তুমি আমার
পুত্রকে হত্যা করেছিলে। সেদিন বাধা দেবার শক্তি আমারও ছিলনা, সেই
ক্ষুদ্র শিশুরও ছিলনা। আজ তুমি নিরস্ত্র, সর্দারদের সকলের হাতে শাণিত
কৃপাণ। তারা আমার সহায়। তারা চান আমি দণ্ড ঘােষণা করি।
পান্না বনবীরের কটিবদ্ধ হইতে ছােরা তুলিয়া লইল।
বনবীর। আমিও তাই চাই।
পান্না। তুমিও তাই চাও!
বনবীর। তাই চাই দেবী।
পান্না। তুমি মা নও, তাই মায়ের কোল থেকে পুত্রকে ছিনিয়ে নিয়ে
হত্যা করেছিলে। কিন্তু না আমি মায়ের বুকের সন্তানকে দণ্ড দোব
কেমন করে, মা আর ছেলেকে পাশাপাশি দাড়িয়ে থাকতে দেখে তাই
ভেবে ঠিক করতে পারছিনা।
ছােরা দূরে ফেলিয়া দিল।

পঞ্চম দৃশ্য
ধাত্রী পান্না
কজি।
দুঃশীলা ওই নারী সহানুভূতি পাবার যােগ্যা নয়। , তুমি
চণ্ড ঘােষণা কর।
পান্না। দণ্ড? ঘাতকের কি দণ্ড চন্দাবৎ সর্দার ?
কর্ণজি! মৃত্যুদণ্ড।
পান্না।
সেও ত হত্যা।
বীরমল। তবুও তাই মানবসমাজে প্রচলিত।
পান্না। মানুষের কী কল্যাণ তাতে হয়েছে সর্দার? হত্য-শিয়ে
হত্যাকে রােধ করতে গিয়ে মানুষ হত্যার প্রবৃত্তিকেই মন থেকে মনান্তরে,
যুগ থেকে যুগান্তরে সঞ্চারিত করেছে। তাই মেবারে অবিরাম চলেচে
হত্যার উৎসব।
কর্ণজি। মেবারে এই শেষ রাজহত্যা।
পান্না। হত্যা যেখানে ন্যায়সঙ্গত বিবেচিত হয়, সেখানে হত্যার
আর শেষ থাকে না। জ্যেষ্ঠ রাণাসঙ্গকে পৃথ্বীরাজ হত্যা করতে চেয়েছিল,
বিষের ক্রিয়ায় হত হলে পৃথ্বীরাজ ; পৃথ্বীরাজের পুত্র বনবীর হত্যা করল
বিক্রমজিৎকে, আজ বনবীরকে আপনারা হত্যা করতে চাইছেন। কিন্তু
আমি স্থির জানি, বনবীরের অতৃপ্ত আত্মা প্রতিশােধ নেবার জন্য নূতন
আধারের সন্ধান করবে। আবার একজন কেউ হত্যার দাবী নিয়ে
মেবারে দেখা দেবে। আবারাে চলবে হত্যার তাণ্ডব। এর শেষ কোথায়
বলুন, সর্দারগণ ?
করমচাদ। কিন্তু ঘাতক কি তার প্রাপ্য দণ্ড পাবে না ?
হত্যা যেমন নিষ্ঠুর অপরাধ, তার শাস্তি মৃত্যুদণ্ডও তেমনই
নিৰ্ম্মম। আর নির্মম বলেই হত্যার প্রবৃত্তিকে তা নির্মূল করেনা—আঘাত
দিয়ে উত্তেজিত করে তাকে আরাে উদ্ধত করে তােলে।

ধাত্রী পান্না
দ্বিতীয় অঙ্ক
কর্ণজি।
এমন কথা আমরা কখনাে শুনিনি।
পান্না। শােনেননি এই জন্যেই যে, কোন মাকে মৃত্যুদণ্ড ঘােষণা
করতে আগে কখনাে আপনারা আদেশ করেননি। দণ্ড দেবার নির্মমতা
মা ছাড়া আর কাউকে ত ব্যথা দেয়না। দণ্ড নয় মমতা, মেবারের
সর্দারগণ, মমতা ঢেলেই মায়েরা এতটুকু মাংসপিণ্ডকে মানুষ করে তােলে,
দণ্ড দিয়ে নয়।
বনবীর। দেবি, তুমি সর্দারদের ঈপ্সিত দণ্ড ঘােষণা করে বনবীরের
শাপমুক্তির ব্যবস্থা কর।
দূরে কাড়া-নাকাড়া বাজিয়া উঠিল।
পান্না।
ওই ! ওই আসে আমার উদয় ।
বনবীরের দিকে ফিরিয়া চাহিয়া
নবীর! আমার উদয়ের প্রতি তােমার কি এখনাে বিদ্বেষ আছে ?
কর্ণজি। নির্বিষ সাপকে আমরা আর ভয় করিনা, পান্না।
নেপথ্যে ধ্বনিত হইল ‘জয় রাণা উদয়সিংহের জয়'।
নেপথ্যে।
জয় রাণা উদয়সিংহের জয়।
সকলে। জয় রাণা উদয়সিংহের জয় ।
পান্না। বনবীর! বনবীর! সত্যই যদি শাপ-মুক্তি তােমার কামনা
হয় বনবীর, তাহলে মুক্তির এই পরম মুহুর্ত বিফলে যেতে দিয়ােনা!
বনবীর।
তােমার ইঙ্গিত আমি বুঝিচি, দেবী।
বনবীর দুয়ারের দিকে অগ্রসর হইল।
শীতলসেনী। পুত্র! পুত্র !
বনবীর ফিরিয়া দাড়াইল

পঞ্চম দৃশ্য
ধাত্রী পান্না
পান্না।
পুত্রকে তার কর্তব্যপালন করতে দাও, শীতলসেনী ।
বনবীর চলিয়া গেল।
শীতলসেনী । তুমি আমার পুত্রকে জয় করে নিলে কোন্ যাদুবলে
মায়াবি ?
পান্না। পুত্র তােমার আজ হত্যার প্রবৃত্তিকে জয় করে মৃত্যুকেই
পরাজিত করে ফিরিয়ে দিল শীতলসেনী--মেবারে সে অমর হয়ে রইল।
জয় বনবীরের জয়।
বনবীর প্রবেশ করিল।
বনবীর ।
মেবারের সর্দারগণ! আপনাদের রাণার জয় কামনা
করুন। বলুন সমস্বরে জয় রাণা উদয়সিংহের জয়।
সকলে। জয় রাণা উদয়সিংহের জয় ।
বনবীর ঘরের দিকে ফিরিয়া কহিল :
বনবীর। শিশােদীয় কুলতিলক রাণা উদয়সিংহ, তােমাকে বঞ্চিত
করে মেবারের যে সিংহাসন আমি অন্যায় ভাবে অধিকার করেছিলাম,
সেই সিংহাসন তােমাকে প্রত্যর্পণ করে আমি আমার পাপের প্রায়শ্চিত্ত
করতে চাই। তুমি সিংহাসনে অধিগত হও।
বাঙ্গ বাজিয়া উঠিল, বাহিরে জয়ধ্বনি হইল,
উদয়সিংহ প্রবেশ করিলেন। বনবীর উদয়সিংহকে
অভ্যর্থনা করিয়া লইয়া সিংহাসনে বর্ষাইয়া দিয়া
সর্বপ্রথমে অভিবাদন কৰিল।
সকলে।
জয় রাণা উদয়সিংহের জয়!

ধাত্রী পান্না
দ্বিতীয় অঙ্ক
পান্না ধীরে ধীরে রাণা উদয়সিংহের দিকে অগ্রসর
হইল।
পান্না।
রাণা উদয়সিংহ ।
উদয়সিংহ উঠিয়া দাড়াইলেন।
উদয়।
মা!
পান্না।
আমার কর্তব্য শেষ। এইবার আমাকে বিদায় দাও, বৎস।
উদয় । তােমাকে বিদায় দোব আমি?
পান্না। দিতেই হবে বাবা। আমার আর একটি কর্তব্য অসম্পূর্ণ
রয়েছে। তােমার হয়ত মনে আছে আর একটি শিশু আমাকে মা বলে
ডাকত। সে এখন দূরে, বহু দূরে, ফোটা কয়েক অক্ষর প্রত্যাশায় অধীর
হয়ে রয়েছে। এতদিন আমি কাদবার অবসর পাইনি, অশ্রু দিয়ে তার তর্পণ
করতে পারিনি। আত্মা তার আজও অতৃপ্ত। তাকে তৃপ্তি দিতে হবে।
মা।
পান্না। যতদিন তুমি অসহায় ছিলে, ততদিন তােমাকে ছেড়ে যেতে
পারিনি। আজ সর্দাররা তােমার সহায়। আজ তােমার জন্য আমার
কোন ভয় নেই, কোন ভাবনা নেই। তুমি সিংহাসনে বােস বৎস,
যাবার সময় তােমার রাজরূপ চোখ ভরে দেখে যাই ।
উদয়।
উদয়সিংহ আসনে বসিলেন।
কর্ণজি। কোথায় তুমি যাবে পান্না ?
পান্না। অজানা দেশ, অচেনা পথ। তবুও আমায় যেতে হবে।
বনবীর !
বনবীর দ্রুত তাহার কাছে অগ্রসর হইয়া কহিল ?
বনবীর। দেবী ।

পঞ্চম দৃশ্য
ধাত্রী পান্না
পান্না। বােঝা নামিয়ে দিয়ে বড় ক্লান্ত হয়ে পড়েচি বনবীর, নিজেই
যেন বােঝা হয়ে উঠেছি।
বনবীর। বইবার অধিকার আমাকে দেবে দেবি?
বাহু বাড়াইয়া দিল, পান্না সেই বাহু অবলম্বন
করিয়া দাড়াইল।
পান্ন। হিংসাকে তুমি জয় করেছ, তােমাকে ত হিংসার মাঝে রেখে
যেতে পারিনা।
শীতলসেনী পুত্রের কাছে আসিয়া দাড়াইলেন।
শীতলসেনী। বনবীর! বনবীর!
বনবীর। দেবি, আমার মা ?
পান্না। তােমার অপর বাহু দুর্বল নয়।
বনবীর। মা !
অন্য বাহু বাড়াইয়া দিলেন। শীতলসেনী সেই বাহু
অবলম্বন করিলেন।
পান্না। মেবারের সর্দারগণ! আপনারা নবীন রাণার অভিষেকের
আয়ােজন করুন।
বলিয়া পান্না বনবীর আর শীতলসেনীকে লইয়া ধীরে
ধীরে বাহির হইয়া যাইতে লাগিলেন, উদয়সিংহ
সিংহাসন হইতে নামিয়া আসিলেন, সর্দাররাও একটু
একটু করিয়া পান্নার অনুসরণ করিলেন।
ধীরে ধীরে অন্ধকার হইয়া গেল।
যবনিকা
প্রকাশক ও মুদ্রাকর-শ্রীগােবিন্দপদ ভট্টাচাৰ্য, ভারতবর্ষ প্রিন্ট ওয়া-
২০৩১১, কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট, কলিকাতা

ভূমিকালিপি বনবীর জগমল বিক্রমজিৎ করমচঁাদ বীরমল্ল জহর গাঙ্গুলী রবীন্দ্রমােহন রায় কৃষ্ণধন মুখোপাধ্যায় শিবকালী চট্টোপাধ্যায় সনৎ মুখােপাধ্যায় কানন মুখােপাধ্যায় भासिएश বেচু সিংহ নবকিশাের বারি ষােধমল কর্ণজি মুকুলজি রাঘব সলিল বন্দ্যোপাধ্যায় কালী সরকার মণি মজুমদার সুধাংশু মুখােপাধ্যায় বিপিন বসু পরভু সেনানীদ্বয় কুমার মিত্র ও তুলসী চক্রবর্তী সরযূবালা পান্না শীতলসেনী। উদয় (বড়) উদয় (ছােট) বীণা গীতা ছায়া কেতকী কনক

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Dhatri Panna

Author
Sengupta, Sachindranath
Title
Dhatri Panna
File name
Dhatri Panna
Text
OCR done
Citation
1943
Published
2009/08/18
Publisher
Gurudas Chottopadhaya And Sons, Kolkata
Language
Sanskrit
Pages
118
Library
Makardah Saraswat Library, Howrah
Classification
Drama. Plays.
Keywords
Drama
DLI number
512598
Barcode
4990010019658.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
LdMqcHeCI8j
Download PDF

Dhatri Panna