Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Shri Krishanachaitanyaleelamrita Ed.1st
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
শ্রীকৃষ্ণচৈতন্যলীলাম্বত)।
শ্রীধাম নবদ্বীপ নিবাসী
শ্রীহরেন্দ্রকৃষ্ণ দত্ত প্রণীত।
প্রথম সংরণ
শ্রীধাম নবদ্বীপ চালিচায়াপাড়া, দত্ত আবাস হইতে
গ্রন্থকার কর্তৃক প্রকাশিত।
.
কলিকাতা,
২৪।এ মেছুয়াবাজার স্ট্রীট, “নিউ সরস্বতী প্রেসে
ঐমিহিরচন্দ্র ঘােষ দ্বারা মুদ্রিত।
১৩২৩ সাল।
মূল্য চারি আনা।
ভ্রম সংশােধন।
এই গ্রন্থের কোনও কোনও পৃষ্ঠার শিবরাদেশে
চৈতন্য লীলামৃত ছাপা হইয়াছে সেই সেই স্থলে
শ্রীকৃষ্ণচৈতন্যলীলামৃত হইবে।
গ্রন্থকার।
ওঁ নমাে ভগবতে গৌরহরয়ে ।
• ।
শ্রীকৃষ্ণচৈতন্যলীলামৃত
প্রথম অধ্যায়।
সূত্র খণ্ড।
বহুনি মে ব্যতীতানি জন্মানি তৰ চাৰ্জ্জুন।
তান্যহং বেদ সৰ্বাণি ন ত্বং বেহ পরন্তপ ।
অজোহপি সন্নব্যােত্মা ভূতানামীশ্বরােপি *
প্রকৃতিং স্বামধিষ্টায় সম্ভবামাত্মমায়া।
যদা যদাহি ধর্মস্য গ্লানি ভবতি ভারত।
অভ্যুত্থানমধর্মস্য তদাত্মানং সৃজাম্যহম।
পরিত্রাণায় সাধুলং বিনাশায় চ দুষ্কতাম্।
ধৰ্ম্মসংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে।
ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে কহিলেন “আমি অনেকৰার জন্ম
গ্রহণ করিয়াছি, তােমারও বহুজন্ম অতীত হইয়াছে, তুমি তাহার
কিছুই জান না, কিন্তু আমি তৎসমুদয় অবগত আছি। আমি জন্ম
রহিত, অনখর স্বভাব ও সকলের ঈশ্বর হইয়াও স্বীয় প্রকৃতিকে
আশ্রয় করিয়া আত্ম মায়ায় জন্মগ্রহণ করি। যে যে সময়ে ধর্মের
বিপ্লব ও অধর্মের প্রাদুর্ভাব হয় ; সেই সেই সময়ে আমি আপনাকে
• সৃষ্টি করি অর্থাৎ দেহ ধারণ পূর্বক ধরণীতে অবতীর্ণ হই। সাধু
গণের পরিত্রাণ, অসাধুগণের বিনাশ ও ধর্মের সংস্থাপনের নিমিত্ত
যুগে যুগে অর্থাৎ সেই সেই সময়ে অবতীর্ণ হই।
শ্রীকৃষ্ণচৈতন্যলীলামৃত
}
আসন বর্ণাস্ত্রমােহ গৃহুতােহনুযুগং তনু।
শুক্লোরক্তস্তথা পীত ইদানীং কৃষ্ণং গতঃ। (শ্রীমদ্ভাগবত)।
সত্য যুগে তুমি প্রভু শুভ্রবর্ণ ধরি।
তপােথৰ্ম্ম বুঝাও আপনি তপ করি।
কৃষ্ণাজিন দণ্ড কমণ্ডলু জট। ধরি।
ধর্ম স্থাপ, এহ্মচামিরূপে অবতরি।
ত্রেতাযুগে হইয়া সুন্দর রক্তবর্ণ।
হই যজ্ঞ পুরুষ বুঝাও যজ্ঞধ ॥
⇒ক বহন্তে যজ্ঞ আপনে করিয়া ।
সবারে করাও যজ্ঞ যাজ্ঞিক হইয়া ।
দিব্য মেঘ গম বর্ণ হইয়া পরে।
পূজা ধৰ্ম্ম বুঝাও আপনে ঘরে ঘরে।
পীতবাসে শ্রীবৎসাদি নিজ চিz ধরি।
পূজা কর মহারাজরূপে অবতরি।
কলিযুগে বিপ্ররূপে ধরি পীতবর্ণ।
নবদ্বীপে শচীগর্ভে হবে অবতীর্ণ,
বুঝাইবে বেদগােপ্য সঙ্কীর্তন ধর্ম।
প্রেমভক্তি দিয়া সবে ঘুচাইবে কৰ্ম্ম।
ভগবানের অবতার তিন প্রকার, অংশ অবতার, শুণ অবতার,
শক্ত্যাবেশ অবতার। সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর ও কলিতে ভগবান
দশবার অংশ অবতার হইয়াছিলেন। যথা-
প্রলয়পয়ােধি জলে ধুতবানসি বেগম,
বিহিত বহি চরিমর্থেদ।
কেশব তীনশরীর, খয় জগদীশ হয়ে।
শ্রীকৃষ্ণচৈতন্সলীলামৃত।
৮।
ক্ষিতিরতি বিপুলতরে তিষ্টতি তব পৃষ্টে,
ধরণিধরণ কিণচক্ৰগরিষ্টে।
কেশব ধৃহকুৰ্ম্ম শরীর, জয়জগদীশ হরে ।
বসতি দশনশিখরে ধরণী তব লগা,
শশিনি কলকলেব নিমগ্না।
কেশব ধৃত রূপ, জয়জগদীশ হরে।
তব করকমলবরে নখমত শৃঙ্গম,
দলিতহিরণ্যকশিপুতনু ভৃঙ্গ।
কেশবত নরহরিরূপ, জয় জগদীশ হরে।
ছয়সি বিক্রমণে বলিমদ্ভুত বামন,
পদনখনীরজনিত নপাবন।
কেশবত বামনরূপ, জয়জগদীশ হরে
ক্ষত্রিয়রুধিময়ে জগদপগতপাপ।
পয়সি পয়সি শমিত ভব তাপম্।
কেশবধৃত ভৃগুপতিরূপ, জয় জগদীশ হরে।
বিতরসি দিবণে দিপতি কমনীয়,
দশমুখমৌলিবলি রমণীয়।
কেশব ধৃতরাম শরীর, জয় জগদীশ হরে ।
বহসি বপুষি বিশদে বসনং জলদাভ,
হলহতি ভীতি মিলিত যমুনাভম্।
কেশব ধৃত হলধরহ্মপ জয় জগদীশ হরে।
নিন্দসি যজ্ঞ বিধেরহহ শ্ৰতিজাত,
সদয়হৃদয় দশিত পশুতম।
কেশবত বুদ্ধশরীর জয়জগদীশ হব।
শ্রীকৃষ্ণচৈতন্যলীলামৃত। স্লেচ্ছনিবহ নিধনে কলসি করল, ধুমকেতুমিব কিমপি করল। কেশব ধৃত কশিরীর, জয়জগদীশ হরে । (জয়দেব ) সতাযুগে চাক্ষুষ নামক মন্বন্তরে পৃথিবী জলমগ্না হইলে, ভগবান মৎস্য অবতার হইয়া মহীরূপ নৌকায় বৈরস্বত মনুকে আরােহণ করাইয়া রক্ষা করেন। সত্যযুগে যখন সুরাসুরগণ মিলিত হইয়া সমুদ্র মন্থনে প্রবৃত্ত হন, ভগবান মেই সময় কুৰ্ম্মরূপ পরিগ্রহ করিয়া পৃষ্ঠদেশে মন্দর পর্বত ধারণ করেন। সত্যযুগে কোনও মন্বন্তরে পৃথিবী রসাতলগত হইলে ভগবান বরাহরূপে পৃথিবীকে উদ্ধার করেন, সত্যযুগে আর এক মন্বন্তরে হিরণ্যকশিপু হরিদ্বেষী হইয়া বৈষ্ণবগণের প্রতি অত্যাচার করিলে ভগবান নরসিংহ মূৰ্ত্তিধারণ করিয়া, রজ্জ, নির্মাতা রজ্জ, নির্মাণার্থ যেমন এরক। নামক তৃণ বিদীর্ণ করে, বলদর্পিত দৈত্যেন্দ্র হিরণ্যকশিপুকে, হরি উরুদেশে রাখিয়া, নখদ্বারা সেইরূপে বিদীর্ণ করিয়াছিলেন। ত্রেতা যুগে ভগবান বামনরূপে অবতীর্ণ হন এবং বলির যজ্ঞস্থলে উপস্থিত হইয়া বিলােক অধিকারের অভিসন্ধিতে বলির নিকট ছলপুৰ্বক ত্রিপাদ পরিমিত ভূমি প্রার্থনা করেন। ত্রেতাযুগে ভগবান পরশুরামরূপ গ্রহণ করিয়া ক্রোধবশতঃ যাবতীয় ব্রাহ্মণদ্বেষী ক্ষত্রিয়গণকে এক বিংশতিবার নিঃশেষে সংহার করিয়াছিলেন। এই ত্রেতাযুগেই ভগবান, দশরথতনয় মহারাজ রামচন্দ্ররূপে অবতীর্ণ হইয়া দেবকাৰ্য” সিদ্ধিরনিমিত্ত সাগরবন্ধন প্রভৃতি অলৌকিক কাৰ্য্য সম্পাদন করিয়া দেবদ্বেষী লঙ্কেশ্বর দশাননকে বধ করেন। দ্বাপর যুগে ভগবান, পৃথিবীর আর নাশ করিতে অভিলাষী হইয়া বলরাম রূপে অবতীর্ণ হইয়াছিলেন। কলির প্রথমে ভগবান অহিংসা পরমধর্ম প্রচারের জন্য শ্রীকৃষ্ণচৈতন্যলীলামৃত এবং অসুরগণকে মুগ্ধ করিয়া নির্বাণমুক্তিদিবারনিমিত্ত গয়া প্রদেশে কপিলবস্তু নগরে, রাজা শুদ্ধোদনের ঔরসে ও তৎপত্নী মহামায়ার গর্ভে বুদ্ধরূপে জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন। শেষে কলির অন্তকালে রাজগণ দনুর ন্যায় ব্যবহার করিতে প্রবৃত্ত হইলে, নারায়ণ, বিষ্ণু যশা নাম এক ব্রাহ্মণের পুত্র হইয়া সম্বল গ্রামে জন্ম গ্রহণ করি, বেন। উপরােক্ত এই দশ অবতার ভগবানের অংশ অবতার ব্রহ্মা বিষ্ণু ও মহেশ্বর ভগবানের এই তিন গুণাবতার। নার, নরনারায়ণ কপিল, দত্তাত্রেয়, যজ্ঞ, ঋষভ, পৃথু, ধন্বন্তরি, মােহিনী, প্রভৃতি ভগবানের শ্যাবেশ অবতার। এই সমস্ত অবতা ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অংশ ও কলা মাত্র। এতে চাংশ কলাঃ পুংসঃ কৃষ্ণস্তু ভগবান স্বয়ং। ঈশ্বরঃ পরমঃ কৃষ্ণঃ সচ্চিদানন্দ বিগ্রহ ও অনাদিরাদি গােবিন্দ সৰ্ব্ব কারণ কারণ। ভগবানের অসং অবতার, অবতারাহসংখ্যেয়া হরেঃ সত্তনিধেদ্বিজা। কিন্তু পূর্ণ ব্ৰহ্ম শ্রীকৃষ্ণ সকল সময় অবতীর্ণ হন না, প্রতিনিধি দ্বার রাজা শাসন ও রাজ্যে শান্তি স্থাপন হইলে রাজা স্বয়ং রাজশা করিতে কিংবা শান্তি প্রতিষ্ঠা করিতে আগমন করেন না। দ্বাপ যুগে গীতারধর্ম প্রচারের জন্য ভগবান শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং পূর্ণরূপে অবতীর্ণ হইয়াছিলেন এবং কলিযুগে সৰ্বভাবে উপাসনা, হরিনাম মাহাত্ম্য প্রচার ও অনৰ্পিত প্রেম বিতবণের জন্য ভগবান শ্রী কৃষ্ণ পূর্ণরূপে গৌরাঙ্গ অবতার হইয়া গৌড়দেশে হিন্দুর প্রাচীন রাজধানী সরস্বতীর পীঠস্থান নবদ্বীপে জন্মগ্রহণ করিবেন, শ্রীমদ্ভাগবত মহাভারত ও নানা পুরাণ তন্ত্রে বহুপূৰ্বেই কে ভবিষ্যদ্বাণী বিঘােবিত হইয়াছে যথা ভাগবতে- আসন বণাস্ত্ৰয়ো হাস্য গৃহতােহনুযুগং তনু। ক্লো রক্ত থাপীত ইদানীং কৃষ্ণং গত
শ্রীকৃষ্ণচৈতন্যলীলামৃত।
৫
• ? - - - - -
,
.
ইতি দ্বাপর উৰ্ব্বীশ স্তবন্তি জগদীশ্বর।
নানা তন্ত্র বিধানেন কলাপি যথা শৃণু।
কৃষ্ণবর্ণং ত্বিষাকৃষ্ণং সাঙ্গোপাঙ্গাস্ত্র পার্ষদ।
যজ্ঞৈঃ সঙ্কীৰ্ত্তনপ্রায়ৈজন্তি হি সুমেধসঃ ।
যথ। মহাভারতে
সুবৰ্ণবর্ণো হেমাঙ্গো, বঙ্গশ্চন্দনাজদী।
সন্যাসকৃচ্ছমঃ শাস্তো নিষ্ঠা শান্তি পরায়ণঃ ।
যথা ভবিষ্যপুরাণে
অজায় মজায়ধ্বমজায় ধ্বং ন সংশয়ঃ ।
কলৌ সঙ্কীৰ্ত্তনারম্ভে ভবিষ্যামি শচীসুতঃ |
যথা ভাগবত সন্দর্ভে-
অন্তঃ কৃষ্ণং বহির্গেীরং দর্শিতাঙ্গাদি বৈভবম্।
কলৌ সঙ্কীৰ্ত্তনাদৌঃ স্ম কৃষ্ণচৈতন্যমাশ্রিতাঃ।
যথা কশ্চিৎ উপপুরাণে-
অহমেব কচিদব্ৰহ্মণ সন্যাসশ্রমমাশ্রিত।
হরিভক্তিং গ্রাহয়ামি কলৌ পাপহতারা।
গৌরমন্ত্র—ওঁ গেরায় নমঃ। হ্রীং ও গৌরায় নমঃ হ্রীং। হ্রীং
গৌরচন্দ্রায় হ্রীং। হ্রীং শ্রীগৌরচায় নমঃ। (ঈশানসংহিতা)
চৈতন্যমন্ত্র। ও চং চৈতন্যায় নমঃ। (রুদ্রজাল )
গৌরাঙ্গের ধ্যান-দ্বিভুজং সুন্দরং স্বচ্ছং বরাভয়করং বিভুম্ ।
সুহাং পুণ্ডরীকাক্ষং দধানং সিতবাসসী।
কৃষ্ণকৃষ্ণেতি ভাষন্তং সুস্বরং সুমনােহর।
যতিবেশধরং সৌম্যং বনমালা বিভূষিতম্।
তারয়ন্তং জনান্ সৰ্বান্ ভবাধােপধদয়ানিধি।
-
চৈতন্যলীলামৃত।
তথাহি রুদ্রযামলে-
অধুনা সংবেক্ষামি চৈতন্যমন্ত্রমুত্তমম্।
যেন বিজ্ঞানমাত্ৰেণ ভবাৰূৌ ন নিমজ্জতি ।
তং মন্ত্রং শৃণু দেবেশি সাক্ষাৎ ব্ৰহ্মস্বরূপকং।
কামবীজং সমুদ্ধত্য ছাদ্যবর্ণ সমুদ্ধরেৎ।
দক্ষিণাক্ষি সমাযুক্তং নাদবিন্দু বিভুষিতং ।
চৈতন্যায় ততঃ পশ্চাৎ পুনঃ কামং সমুদ্ধয়েৎ ॥
সপ্তাক্ষরো মহামন্ত্রঃ সৰ্বমন্ত্র প্রদীপক।
জীবানাং মুক্তিদে। মন্ত্রো ধৰ্ম্মকামার্থদায়ক।
একোচারেণ দেবেশি কিছু পুনব্ৰহ্ম কেবলং।
আ্যবীজেন দেবেশি ষড়ঙ্গাদান প্রকল্পয়েৎ।
ধ্যানং শৃণু মহামায়ে তথা তানুসারত।
যং ধ্যাত্ব পামরো লােকঃ সাক্ষাদ্ব হ্মময়াে ভবেৎ
দ্বিভুজং গৌরবর্ণঞ্চ বরদাভয়পাণিকং।
হরিনামাঙ্কিততমুং বনমালাবিভুষিতং।
আনন্দাশ্রুকলাপূর্ণং পুলকাবলি বিহবল।
কৈবল্যদায়কং শান্তং ততােত্রিভুবনেরং।
ইতি ধ্যাত্বা মহেশানি পুষ্পং দদাতু মন্তকে।
মানসে পুজনং কৃত্বা ততােদ্যস্থানঞ্চরেৎ |
পুনরন্তু সংযােজ্য পুনধ্যাত্বা তু সাধক।
আবাহ পূজয়ে ভক্ত্যা ষােড়ষৈরুপচারত।
মূল মন্ত্রং সমুচ্চাৰ্য সাধ্যমতবােচ্চয়েৎ।
চতুর্থনে সংয়োজ্য পূজয়ে যথাবিধিঃ ।
শ্রীকৃষ্ণচৈতন্যলীলামৃত
শতমষ্টোত্তরং জপা গীতাদ্যৈঃ প্রণমঞ্চরেৎ।
প্রদক্ষিণঞ্চ গানাদ্যৈশ্চৈতন্য বিশেষতঃ ॥
অশুচিবাশুচিবাপি যযা জপেনুসেকতঃ।
ভবাব্দিং সুস্তরং তীর্ণ। সাক্ষান্নারায়ণে। তবে |
হরিকীৰ্ত্তনমধ্যে যদি মন্ত্রপরায়ণ।
জিত্বখিলান্ ষড়ম্মাদী অন্তে বিষ্ণু স্বরূপকম।
ইতি মন্ত্রং মহেশানি তব প্রীত্য। ময়াে দিত।
সন্যাসীনমুপাস্যেনং গােপনীয়ং প্রযত্ন।
বৈষ্ণবায় বিশুদ্ধায় শিবিষ্ণুরতায় চ।
জিতেক্রিয়ায় সায় নিৰ্মলায় মহাত্মনে ।
বিষ্ণুভক্তায় শৈবায় সংযমাদিরতায় চ।
দদ্যাক্তায় শান্তায় নদদ্যান্নিন্দকায় চ।
ইতি শ্রীরুদ্রযামলে শিবপাৰ্বতী সংবাদে শ্রীচৈতন্যমন্ত্রোদ্ধারে
নাম দ্বাত্রিংশৎ পটলে ।
উদ্ধান্থায় সংহিতায় গৌরমন্ত্রোদ্ধাবো নাম তৃতীয় অধ্যায়ে আছে
শ্রীনারদ উবাচ
গৌররূপেণ ভগবান কলৌ পাপ প্রণাশকৃৎ।
কৃষ্ণচৈতন্যরূপ ভাবিতঃ পৃজিতস্তথা।
শ্রীব্যাস উবাচ
মহাপাতকরাশীংশ্চ দহত্যা ন সংশয়।
কেন মন্ত্রেণ ভগবান গৌরাঙ্গ পরিপূজিত।
সুখাবহঃ স্যাৎ লােকানাং তন্মে ব্রুহি দয়ানিধি।
শ্রীনারদ উবাচ
অহো গূঢ়তমঃ প্রশ্নো ভবতা পরিকীর্তিত।
মং বক্ষ্যামি তে ব্ৰহ্মন্ মহাপুণ্য প্রদং শুভং ।
শ্রীকৃষ্ণচৈতন্যলীলামৃত।
গ
ও গৌরায় নমঃ ইত্যেব মন্ত্রে। লোকে পূজিত।
দ্বিভুজং স্বর্ণরুচিরং বরাভয়করং তথা ॥
প্রেমালিঙ্গন সম্বদ্ধং গৃণং হরিনামকং।
মায়ারমানবীজৈবাগতীজেন চ পৃজিত।
ষষ্ঠাক্ষর কীৰ্তিতােহয়ং মরাজঃ সুরদ্ধপঃ।
এবং বহুবিধব্ৰহ্ম মন্ত্রান্তে পরিকীর্তিতাঃ ।
বর্ণলক্ষং জপেন্ম দশাংশ মধুপ্ল তৈঃ।
তুলসীপত্র সংযুক্তৈ জুহুয়াৎ পঙ্কজঃ ভৈঃ ।
ভক্তান্ সংভােজয়েস্তত্র পুরশ্চৰ্য্যা বিধৌ সদা।
হরিসঙ্কীর্তনং ব্ৰহ্মন্ সদা কাৰ্যং দয়ান্বিতৈঃ।
দেব দ্বিজপতিং নিন্দাঞ্চ মনসা পরিবর্জয়েৎ।
গঙ্গাতীরে কুরুক্ষেত্রে বারাণস্যা বিশেষতঃ |
বৃন্দাবনে চ মন্ত্রোহয়ং সাধিতঃ সিদ্ধিমায়াৎ।
পুরুষােত্তমে চ মন্ত্রোহয়ং শীঘ্রং সিদ্ধতি সাধিতঃ।
নন্দমূতবলি যারে ভাগবতে গাই। সেই কৃষ্ণ অবতীর্ণ চৈতন্য
গােসাঞি। শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য স্বয়ং ভগবান, নিত্যানন্দ তাহার স্বরূপ
প্রকাশ, অদ্বৈত তাঁহার অংশ অবতার, শ্রীবাস তাহার প্রধানভক্ত,
গদাধর
তাঁহার নিজশক্তি শ্রীকৃষ্ণ গােলােকে
শ্রীরাধার সহিত নিত্য বিহার করেন। ব্রহ্মার একদিনে তিনি
একবার ধরণীতে অবতীর্ণ হইয়া প্রকট বিহার করেন।
ত্রেত। দ্বাপর কলি এই চারি যুগে এক দিব্য যুগ। একাত্তর
চতুযুগে এক মন্বন্তর, চৌদ্দ মন্বন্তরে ব্রহ্মার একদিবস। বৈবস্বত
নামে সমন্বন্তরে, অষ্টাবিংশ চতুযুগে দ্বাপরের শেষে শ্রীকৃষ্ণ
ব্ৰজে প্রকট হইয়া বিহার করেন। দাস্ত, সখ্য, বাৎসল্য ও মধুর
শ্রীকৃষ্ণচৈতন্যলীলামৃত। ভাবে ভক্তগণ তাহার উপাসনা করেন। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ কলিযুগে যুগধর্ম নামসঙ্কীৰ্ত্তন প্রবর্তন করিতে ভক্তভাব অঙ্গীকার করিয়া অবতীর্ণ হন। ভগবান শ্রী রামচন্দ্র, শ্রীকৃষ্ণ, বুদ্ধদেব ভারতের এক এক জনপদের রাজধানীতে জন্মগ্রহণ করেন। রাজধানী অবতার গণের লীলার প্রধান সহায়, তথায় সাধু ও অসাধু সংখ্যায় অধিক। রাজধানী মাত্রই পুণ্য ও পাপের, জ্ঞান ও অজ্ঞানের প্রশস্ত ক্ষেত্র। শ্রীকৃষ্ণের জন্মভূমি মথুরায় অরের মত সাধু ও কংশের মত অসাধুর বাসছিল কলিকলুষ নাশন ভগবান গৌরাঙ্গের জন্মভূমি ও বিধাতা গৌড়ের রাজধানী নবদ্বীপ সহরে নির্বাচন করিয়া রাখিয়াছিলেন। কায়স্থকুল-শেখর মহারাজ বল্লালসেন দেবের পঞ্চগৌড় রাজ্যের রাজধানী নবদ্বীপ, তথায় তাহার পুত্র লক্ষণ সেন দেবও রাজত্ত করেন, ভক্তকবি গীত গােবিন্দ প্রণেতা জয়দেব মহারাজ লক্ষণসেনের সভাপতি ছিলেন লক্ষ্মণ সেনের পুত্র লাক্ষণে সেনের রাজত্ব কালে দিল্লীশ্বর কুতবুদ্দীনের সেনাপতি মহম্মদ ই বক্তিয়ার নবদ্বীপ অধিকার করেন। বল্লাল সেনের রাজ- প্রাসাদ সীতাদেবীর পাতালে প্রবেশের ন্যায় বিষাদে গঙ্গাগর্ভে প্রবেশ করিয়াছিল, গৌড়েশ্বর গৌরচন্দ্রকে দর্শন করিবার জন্য সেই প্রাসাদ গঙ্গাগর্ভ হইতে মস্তক উত্তোলন করে, অস্থাপিও নবদ্বীপের বল্লাল সেনের রাজপ্রাসাদ সারনাথের স্বপের ফায় বল্লালঢিবি নাম ধারণ করিয়া দণ্ডায়মান আছে। ভগবান নবদ্বীপে অবতীর্ণ হইবেন জানিয়া বিধাতা নবদ্বীপকে পূর্ব হইতেই আয়তনে, জ্ঞানে ও ধনে ভারতের সর্বশ্রেষ্ঠ স্থান করিয়া রাখিয়াছেন। নবদ্বীপতুল্য স্থান ত্রিভুবনে নাই। অবতরিবে যথা শ্রীচৈতন্য মােসঞী। নবদ্বীপ সম্পত্তি কে বর্ণিবারে পারে। এক গঙ্গাঘাটে লক্ষলােক স্নান করে।
শ্রীকৃষ্ণচৈতন্যলীলামৃত। ১১ ত্রিবিধ বসে এক জাতি লক্ষ লক্ষ। সরস্বতী প্রসাদে সবেই মহাদক্ষ। সবে মহা অধ্যাপক করি গর্ব করে। বালকেও ভট্টাচাৰ্য সনে কক্ষা করে। নানাদেশ হইতে লােক নবদ্বীপে যায়। নবদ্বীপে পাড়লে সে বিন্যাস পায়। নয়টা দ্বীপ লইয়া নবদ্বীপ রাজধানীর নামকরণ হইয়াছিল। ঐ দ্বীপ গুলি ভাগিরথির উভয়তীরেই অবস্থিত। অধুনা যেমন ভারত সম্রাটের বাসভূম লণ্ডন রাজধানী টেমসনদীর উভয় কুলে অবস্থান করিতেছে। নবদ্বীপের বধ্যে অন্তীপ, সীমদ্বীপ, গােমদ্বীপ মধ্যদ্বীপ ভাগিরথির পূর্ব তীরে এবং কোল দ্বীপ ঋতুদ্বীপ, মােদম দ্বীপ, জহুদ্বীপ ও রুদ্রদ্বীপ ভাগিরথির পশ্চিম তীরে অবস্থিত। নবদ্বীপ বা নদীয়া পৃথক গ্রাম নয়, নবদ্বীপে নবদ্বীপ বেষ্টিত হয়। নয়দ্বীপে নবদ্বীপ নাম, পৃথক পৃথক কিন্তু হয় এক গ্রাম। যৈছে রাজধানী কোন স্থান, যদ্যপি অনেক তথা হয় এক নাম। নবদ্বীপ মধ্যে স্থান আছে যত, এক মুখে তাহাকে কহিবে কত। তার মধ্যে কহি যে প্রধান প্রধান, চিনাডাঙ্গা পাটডাঙ্গা আদি রম্যস্থানবদ্বীপ মধ্যে মায়াপুর, জনম স্থান মহাপ্রভু। একালের কলিকাতার ন্যায় সেকালে নবদ্বীপে নয় লক্ষ লােকের বাস ছিল। বর্তমানের সহিত অতীতের তুলনা রাজধানীর পক্ষে সবপর নয়। রাজার সহিত রাজধানীর ঘনিষ্ট সম্বন্ধ। রাজধানী পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তথায় লােক সংখ্যা ও হ্রাস হইতে থাকে। গৌরাঙ্গ অবতারের প্রকালে নবদ্বীপ হইতে রাজধানী স্থানান্তরিত গৌড় নগরে পুনঃ প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল। তথাপিও শ্ৰীকৃষ্ণচৈতন্যলীলামৃত . গৌরাঙ্গের আবির্ভাব কালে নবদ্বীপের জনসংখ্যা নব লক্ষ ছিল। রেলপথ বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে ও জলপ্লাবনের জ৯ বৃহৎ বাধ হওয়ায় জলনিকাশের পথ রুদ্ধ হইয়া নবদ্বীপে ম্যালেরিয়া ও কলেরার প্রাদুর্ভাব বশবঃ জনসংখ্যা দিন দিন হ্রাস হইতেছে। রাজপ্রতিনিধি গণের এই বিষয়ে সুদৃষ্ঠি হইলে লােক সংখ্যা পূৰ্ব্ববৎ বৃদ্ধি হইবে । ১৮৭২ খৃষ্টাব্দে নবদ্বীপের জনসংখ্যা ৮৮৩ এবং ১৮৮১ খৃঃ ১৪১০৫ এবং ১৮৯১ খৃঃ ১৩৩৩৪ এবং ১৯৩১ খৃঃ ১৮৮০ এবং ১৯১১ খৃঃ ১২৪৮• ইহার মধ্যে পুরুষ ৫৮২১ স্ত্রীলােক ৬৫৯ নবদ্বীপে স্ত্রীলােকের সংখ্যাধিক্য বশতঃ সকল বিষয়েই স্ত্রীলােকের | প্রাধান্য দেখিতে পাওয়া যায়। নবদ্বীপে গৌরাঙ্গ অবতীর্ণ হইবেন জাত হইয়া বিশ্বকর্মা তৎপূৰ্বেই নবদ্বীপে যােগায়া পরমাতা বা পােড় এবং বুড়াশিব, যুগনাথ শিষ, বালকনাথ শিব, দণ্ডপাণি শিব ও আলােকনাথ শিব এবং শ্রীগৌরাঙ্গের অভেদ মূর্তি বৃন্দাবণচন্দ্র ও রাধারাণী নির্মাণ করেন। দ্বিতীয় অধ্যায়। (শ্রীগৌরাঙ্গের অঙ্গ ও মধ্য লীলা) শ্রীগৌরাঙ্গ অবতীর্ণ হইবার পূর্বে মহাবিষ্ণুর অবতার শ্রীঅদ্বৈত আচাৰ্য ১০৭ শকাব্দায় মাঘী শুরু মাকরী সপ্তমী তিথিতে শান্তিপুরে বারন্দ্র ৰাহ্মণ বংশে এবং সর্বণের অবতার নিত্যানন্দ রাড়ী ব্রাহ্মণ বংশে ১৩৯৫ শকাব্দায় মাঘী ও ত্রয়ােদশীতে মধ্যাহ্ন কালে একচ গ্রামে জন্মগ্রহণ করিয়াছেন। গৌরাঙ্গের গুরু বৰ্গ গঙ্গাদাস পণ্ডিত, মাধবেন্দ্র পুত্রী, ঈশ্বর পুরী, কেশব ভারতী গৌরাঙ্গেয় পূর্বেই আবি- ভূত হইয়া গৌরাজের ভক্তি ও প্রেমের ধর্ম প্রচারে ব্রতী হইয়াছেন।
শ্রীচৈতন্য লীলামৃত।
* * * - -
= = = = =
.
*
এই সময় কিছুকালের জন্য নবদ্বীপ অশান্তির নিকেতন হইয়াছিল।
নৈয়ায়িকের। তৈলাধার পাত্র কি পাত্ৰাধার তৈল, ঈশ্বর অস্তি কি
নাস্তি ইত্যাদি কুটতর্কজালে আপনাদিগকে জড়াইতেছিলেন। গ্রাম্য
লােকেরা কেবল বিষহরি, মঙ্গলচণ্ডী এই সমস্ত পূজা করিতেন,
কৃষ্ণনাম কেহই করিত না। চৈতন্যভাগবতে ইহার বর্ণনা
আছে। যথা-
কৃষ্ণনাম ভক্তি শূন্য সকল সংসার।
প্রথম কলিতে হইল ভবিষ্য আচার।
ধৰ্ম্ম কৰ্ম্ম লােক সবে এইমাত্র আনে।
মঙ্গল চণ্ডীর গীত করে জাগরণে।
দম্ভ করি বিষহরি পূজে কোন জন।
পাতলি করয়ে কেহ দিয়া বহুধন।
ধন নষ্ট করে পুত্র কন্যার বিভায় ।
এই মতে জগতের ব্যর্থ কাল যায়।
বুদ্ধদেব ও তাহার শিষ্যগণ পৃথিবী পরিত্যাগ করিলে এবং
রাজা অশােকের দেহান্তর হইলে ভারতবাসীগণ সনাতন বৈদিক
ধৰ্মকৰ্ম্ম বিস্মৃত হইয়া যে সময় বৌদ্ধ উপধৰ্ম্মের আশ্রয় গ্রহণ করেন
সে সময় ভারত অজ্ঞান অন্ধকারে আবৃত হইয়াছিল তখন জ্ঞান
তপন শঙ্করাচাৰ্য ভারতাকাশে উদিত হইয়া কিছুদিনের জন্য সে
অন্ধকার দূর করিয়াছিলেন। পুনরায় যখন কাপালিকেরা বৌদ্ধতন্ত্র
প্রচার করিয়া সদাশিবের শ্রীমুখব্যক্ত ও পার্বতীর শ্রুত তন্ত্রমত
খগুন ও বৈদিক ক্রিয়া কাণ্ড পণ্ড করিতে বৃথা চেষ্টা করিতেছিল,
সে সময় ভারত পুনরায় অজ্ঞান তিমিরে আচ্ছন্ন হয় সেই সময়
গৌড় গগনে গগৗরচন্দ্র উদয় হইয়া সে তিমির নাশ করিয়াছিলেন।
১৫ শ্রীচৈতন্য লীলামৃত। এr - ১৪০৭ শকে ফানী পূর্ণিমা তিথিতে ফনী নক্ষত্রে উচ্চলগ্নে সিংহ রাশিতে চন্দ্রগ্রহণকালে নবদ্বীপে শ্রীচৈতন্যদেব জন্মগ্রহণ করেন। তাঁহার পিতার নাম জগন্নাথ মিশ্র মাতার নাম শচীদেবী। তিনি যে পাশ্চাত্য বৈদিক কুলে সস্তৃত হন সে কুলের আদি পুরুষ ভরদ্বাজ গােত্ৰজজিতামিত্র মিশ্র বারাণসী হইতে সপরিবারে আগমন করিয়া গৌড়দেশে শ্রীহট্টে বাস কবেন। জগন্নাথ মিশ্র শ্রীহট্ট হইতে নবদ্বীপে অধ্যয়ন করিতে আগমন করেন। অবশেষে নীলাম্বর চক্রবর্তীর কন্যাকে বিবাহ করিয়া নবদ্বীপে বাস করেন। এই সদাচারী দম্পতীর দুই পুত্র বিশ্বরূপ ও নিমাই। নিমাইয়ের অনেক নাম,-চৈতন্য, বিশ্বম্ভর, গৌর, গৌরাঙ্গ, গৌরচন্দ্র, গৌরহরি, গােরা, গােরাচঁাদ, শচীনন্দন, মহাপ্রভু নবদ্বীপচন্দ্র, শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য। বাল্য লীলায় নিমাই একদিন একটা বিষধরকে ধরিলেন সে কুণ্ডলি করিয়া তাহাকে বেড়িয়া থাকিল। একদিন তাহার গাত্রের অলঙ্কারের লােভে তাহাকে পথে পাইয়া দুই চোর ভুলাইয়া তাহাকে তাহাদের বাড়ীতে কোলে করিয়া লইয়া যাইতেছিল কিন্তু ভ্রমক্রমে তাহারা তাহাদের বাড়ী মনে করিয়া নিমাইয়ের বাড়াতেই নামাইয়া দিল। এক একদিন নিমাই চলিতে থাকিলে তাহার পিতামাতা নুপুরের শব্দ শ্রবণ করেন। একদিন এক ব্রাহ্মণ জগন্নাথ মিশ্রের বাটীতে অতিথি হন। অতিথি রন্ধনাদি সমাধা করিয়া ইষ্টদেবতাকে ভােগ নিবেদন করিয়া দিবার অন্য যেমনই ধ্যানস্থ হইয়াছেন, অমনি নিমাই গৃহাভ্যন্তর হইতে আসিয়া সেই অন্ন ভক্ষণ করিতে লাগিলেন। ব্রাহ্মণ গােপাল মন্ত্রের উপাসক ছিলেন। তিনি তীর্থ ভ্রমণে বহির্গত হইলে ঐ গােপালকে গলদেশে স্থাপন করিয়া লইয়া যাইতেন। ব্রাহ্মণ চক্ষু শ্রীচৈতন্য লীলামৃত উন্মিলীত করিয়া বালকের ব্যবহার দেখিয়া আপন অদৃষ্টকে ধিক্কার দিলেন। মিশ্র পুত্রের আচরণে লজ্জিত হইয়া বালক পুত্রকে তাড়না করিতে উদ্যত হন, অতিথি নিবারণ করেন। অতিথিকে পুনরায় বন্ধনের আয়ােজন করিয়া দিয়া নিমাইজননী নিমাইকে অপর বাড়ীতে বেড়াইতে লইয়া গেলেন। পুনরায় ব্রাহ্মণ ইষ্ট- দেবতাকে নিবেদন করিতেছেন, ইত্যবসরে নিমাই মাতাকে ছলনায় মুগ্ধ করিয়া ব্রাহ্মণের নিকট উপস্থিত হইয়া অন্ন ভােজন করিলেন। অতিথি দ্বিতীয় বারেও এই প্রকার দেখিয়া স্থির করিলেন অদ্য কৃষ্ণ আমার অন্ন অদৃষ্টে লিখেন নাই। মিশ্র ক্রোধান্বিত হইয়া নিমাইকে তাড়না করিতে উদ্যত হইলেন, অতিথি নিষেধ করিলেন। এই সময় তথায় বিশ্বরূপ আসিয়া উপস্থিত হইলেন। তিনি সহােদরের ব্যবহারে ব্যথিত হইয়া অতিথিকে অনেক অনুনয় বিনয় করিলে পুনরায় রন্ধন করিতে সম্মত হইলেন। নিমাইকে গৃহে শয়ন করাইয়া মিশ্র দ্বাৱদেশে দণ্ডায়মান থাকিলেন। বালক যেন ক্লান্ত হইয়া নিদ্রিত হইল। তখন মিশ্র অসাবধান হইলেন। অমনি অন্ননিবেদনকালে কপট নিদ্রা পরিত্যাগ করিয়া নিমাই দ্রুতবেগে ব্রাহ্মণের নিকট আগমন করিলেন ব্রাহ্মণ হায় হায় করিতে লাগিলেন। নিমাই বাড়ীর সকলকে মোহ নিদ্রায় আচ্ছন্ন করিয়া আসিয়া ব্রাহ্মণকে বলিলেন, তুমি আমার মন্ত্র জপ করিয়া বারম্বার আমাকে আহবান করিতেছ আমি দেখা না দিয়া থাকিতে পারিলাম না। অতিথি হেরে তখন হয়ে পুলকিত। শঙ্খ চক্র গদা পদ্ম চাবি কবে শােভিত।
শ্রীচৈতন্য লীলামৃত।
এক করে ননী অন্য কবে করে ভক্ষণ ।
দুইভুজে বংশী ধরি করিছে বাজন।
শ্রীবৎস কৌস্তুভ বক্ষে করেছে ধারণ।
মণি মুক্তা সৰ্ব্ব দেহে ভাতিছে কেমন।
গুঞ্জবেড়ী শিখিপুচ্ছ শােভিছে মাথায়।
কুণ্ডল কর্ণে বৈজয়ন্তী মালা গলায়।
হতেছে নুপুর ধ্বনি চরণ কমলে।
মকর লােভে অলি ধায় দলে দলে।
ক্ষণে দেখে বৃন্দাবনে ময়ূর ময়ুরী।
ক্ষণে দেখে গাভীগণ হারব করি,
গােষ্ঠবিহারী সনে ধাইছে সবে গােষ্ঠ।
চিনিল অতিথি এতক্ষণে নিজ ইষ্টে।
দরিদ্র হরেন্দ্র পুণ্য করনি সঞ্চিত।
জনমিয় নবদ্বীপে গৌরাঙ্গে বঞ্চিত।
নিমাই বাল্যকালে অত্যন্ত দুরন্ত ছিলেন। দুষ্ট বালকদিগকে
সঙ্গে লইয়া নবদ্বীপে গঙ্গাস্নান করিবার সময় নিজের পায়ের জল
সকলের মাথায় দিতেন, জল কুল্লি করিয়া কাহারও মুখে দিতেন,
তাড়া করিলে ধরা দিতেন না। গঙ্গা মৃত্তিকায় শিব গড়িয়া
নৈবেদ্য দিয়া ব্রাহ্মণ ব্রাহ্মণীগণ পূজা করিবার সময় ধ্যানস্থ হইলে
তাহাদের শিবও নৈবেদ্য লইয়া পলায়ন করিতেন। তিরস্কার করিলে
বলিতেন যাহাকে নৈবেদ্য নিবেদন করিতেছিলে সে-ই খেয়েছে।
কখনও বলিতেন আমি শিব আমি কৃষ্ণ। কুলীন ব্রাহ্মণকুমারীগণ
নৈবেদ্য খাইতে বাধা দিলে তাহাদিগকে বলিতেন তােমাদের সাত
সতীন হইবে। ঘাটে পুরুষের বস্তু বদলাইয়া স্ত্রীলােকের বস্ত্র রাখিয়া
শ্রীচৈতন্য লীলামৃত। ১৭ - 5 - 5 ; দিতেন। কাহারও কেশের ভিতরে ওকড়ার বিচি দিতেন। নিমাই যখন ক্রন্দন করিতেন সে ক্রন্দনের কিছুতেই নিবৃত্তি হইত না কিন্তু নিবৃত্তি করিবার এক মুষ্টিযােগ ছিল ; হরিনাম তাহার নিকট করিলেই ক্রন্দন থামিয়া যাইত। নিমাইয়ের অগ্রজ বিরূপ পরম ধার্মিক ছিলেন সর্বদা গীতা ও ভাগবত পাঠ করিতেন। তৎকালে নবদ্বীপে কুমারহট্টবাসী শ্ৰীবাস ও তাঁহার ভ্রাতাগণ এবং শান্তিপুর বাসী অদ্বৈত আচাৰ্য্য বিষ্ণুপূজা ও হরিনাম করিতেন। বিশ্বরূপ অদ্বৈতের নিকটে প্রায়ই থাকিতেন এবং কৃষ্ণ কথার আলােচনা করিতেন। তিনি ধৰ্মকৰ্ম্ম বিবর্জিত নবদ্বীপের অবস্থা দেখি। সন্ন্যাস লইয়া চলিয়া যান। ইহার সন্ন্যাসের নাম শঙ্করারণ্য। বিদ্যা শিক্ষা করিয়া পণ্ডিত হইয়া পিতামাতাকে কাদাইয়া বিশ্বরূপ কৌমায্যে। ব্রহ্মচর্য লইয় চলিয়া গেল দেখিয়া জগন্নাথ মিশ্র নিমাইকে মুগ্ধ করিয়া রাখিবার সংকল্প করিলেন। নিমাই বিদ্যাশিক্ষা করিতে না পাইয়া অতিশয় মর্মাহ ও হইলেন। কিছুতেই তাহার তৃপ্তি হয় না। কি করিলে বিদ্যাশিক্ষা করিতে পাইব এই চিন্তা করিয়া চতুরচুড়ামণি একদিন বাড়ীর যে স্থানে অনাচার আবর্জনা পরিত্যাগ করে সেই অপবিত্রস্থানে ছল করিয়া পরিত্যক্ত মৃৎপাত্রের উপর নিব্বিকারচিত্তে মুখে উপবেশন করিলেন। শচীমাতা দেখিয়া বলিলেন ছিঃ ছিঃ কোথায় বসিয়াছ ঐ স্থানে গেলে স্নান করিতে হয় তোমার কোন জ্ঞান নাই। নিমাই বলিলেন জ্ঞান কি করিয়া হইবে তােমরা আমাকে মুখ করিয়া রাখিলে । প্রভূ বলে তােরা মােরে না দিলি পাড়তে । ভদ্রাভদ্র মূখ বিপ্র জানিব কিমতে।
১৮
শ্রীচৈতন্য লীলামৃত।
মুখ আমি না জানি গো ভালমন্দ স্থান।
সর্বত্র আমার এক অদ্বিতীয় জ্ঞান।
তৎকালে নবদ্বীপে গঙ্গাদাস নামে সান্দীপনী তুল্য এক পণ্ডিত
ছিলেন। নিমাই তাহার টোলে 'অধ্যয়ন আরম্ভ করিলেন। অল্প
দিনেই মুগ্ধধ কলাপ শেষ করিয়া কাব্য ও অলঙ্কারে অসাধারণ
ব্যুৎপত্তি না করিলেন। নবদ্বীপের তৎকালীন অবস্থা চৈতন্য
ভাগবতে কি সুন্দরভাবে বর্ণিত আছে।
পড়ুয়ার অন্ত নাহি নবদ্বীপ পরে।
পড়িয়া মধ্যাহ্রে সবে গঙ্গাস্নান করে।
এক অধ্যাপকের সহস্ৰ শিষ্যগণ।
অন্যান্য কলহ করেন আনুক্ষণ।
প্রথম বয়স প্রভু স্বভাব চঞ্চল।
পড়,য়াগণের সহ কৱয়ে কোন্দল।
নিমাইয়ের জন্মের বহুপূৰ্বেই রাঢ়দেশে এক চক্র গ্রামে রাঢ়ী
শ্রেণীর ব্রাহ্মণকুলে মাধী শুক্ল এয়ােদশীতে নিতাই জন্মিয়াছেন।
নিত্যানন্দের পিতা হারাধন ওঝা এবং মাতা পদ্মাবতী,
আদর্শ দম্পতী ছিলেন। নিত্যানন্দের দ্বাদশ বৎসর বয়ঃক্রম কালে
তাহাদের গৃহে এক সন্ন্যাসী অতিথি হন। তিনি তাহাদিগকে
কৌশলে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ করিয়া নিত্যানন্দকে ভিক্ষায় লাভ করেন।
সন্ন্যাসী, নিত্যানন্দকে তীর্থ সহচর করিয়া লইয়া যান! শ্রীহট্ট
নিবাসী উপেন্দ্র মিশ্রের কংসারি, পরনানন্দ, পদ্মনাভ, সৰ্বেশ্বর,
জগন্নাথ, জনার্দন, ত্রৈলােক্য নাথ, এই সাত পুত্র, তন্মধ্যে জগন্নাথ
একাকী আসিয়া নবদ্বীপে বাস করেন। জগন্নাথ একবার জন্মভূমি
শ্রীচৈতন্য লীলামৃত। দর্শন করিতে যাইবার সংকল্প করেন, কিন্তু তাহার জ্যেষ্ঠ পুত্র বিশ্বরূপ সন্ন্যাসী হইয়া চলিয়া যাওয়ায় মনের অশান্তিতে যাইতে পারেন নাই। বহুদিন পরে শ্রীহট্ট যাইবার জন্য পুনরায় কৃতসংকল্প হন, কিন্তু তিনি একদিন স্বল্প দেখেন নিমাই যেন শিখামুণ্ডন করিয়াছেন এবং সন্ন্যাসী হইয়া কৃষ্ণ কৃষ্ণ বলিয়া নানাদেশে পর্যটন করিয়া নীলাচলে অবস্থান করিতেছেন। শচীদেবী তার বৃত্তান্ত অবগত হইয়া তাঁহাকে বললেন স্বপ্ন অলীক, উহা মনের কল্পনা মাত্র, নিমাই আমার দিবারাত্রি বিদ্যা উপার্জন ব্যতীত আর কোনও কাৰ্যে মন দেয় না। নিমাই মামার গৃহে বসিয়া আজীবন বিদ্যাই উপার্জন করবে। মিশ্র কিন্তু স্বপ্ন দেখিয়া শ্রীহট্ট বাইবার সংকল্প পরিত্যাগ কবিলেন। নিমাই একদিন পিতাকে বলিলেন ব্যাকরণের সূত্র আমার সমস্ত কণ্ঠ জগন্নাথপুরে মেধাশক্তির মনে মনে সহস্র প্রশংসা করিলেন কিন্তু গহির বলিলেন মুখস্ত করলে কি হইবে, যথাস্থলে সূত্র প্রয়ােগ কবিতে ইবে। জগন্নাথ মিশ্র নিমাইয়ের মত প্রতিভাশালী ও পিতৃমাতৃভক্ত পুত্র পাইয়া আর ও কিছুকাল ইহলােকে আনন্দ উপভােগ করিয়া পরলোক গমন করিলেন। নিমাই পিতৃশােকে আকুল হইলেন। যথাকালে পিতৃকৃত্য সমাধা করি। শুদ্ধিলাভ করিলেন। গৌরসুন্দর দিবানিশি বিদ্যারসেই বিভাের থাকেন। গঙ্গাদাস পণ্ডিতের সভায় কখনও পূর্বপক্ষ কখনও প্রতিপক্ষ হইয়া বিচার করেন। মহাপ্রভু মুরারী গুপ্তকে ব্যাকরণ পড়তে দেখিয়া একদিন কহিলেন, যধা- প্রভু কহে বৈদ্য তুমি ইহা কেন পড়। লতাপাতা নিয়ােগিয়া রােগী কর দৃঢ়। ব্যাকরণ শাস্তু এই বিষম অবধি। কফ পিও অজীর্ণ ব্যবস্থা নাহি ইথি।
২. শ্রীচৈতন্য লীলামৃত শচীদেবী বিশ্বম্ভরের বিবাহযােগ্য বয়স হইয়াছে বিবেচনা করিয়া একটী সুলক্ষণা কন্যার অনুসন্ধান করিতে লাগিলেন। অবশেষে একদিন বনমালী ঘটক শচীদেবীর গৃহে গমন করিয়া প্রস্তাব করিলেন, বল্পভাচার্যের একটা পরমাসুন্দরী রূপবতী কন্যা আছে তাহার নামও লক্ষ্মী এবং গুণেও লক্ষ্মী স্বরূপিনী। নবদ্বীপের মধ্যে নিমাইয়ের যােগ্য সহধর্মিণী লক্ষ্মী বিনা আর কাহাকেও দেখিতে পাই না। শুভদিনে শুভক্ষণে লক্ষ্মীর সহিত নিমাইয়ের উদ্বাহ নিৰ্বাহ হইল। শচীদেবী পুত্রবধু লইয়া সুখে দিনাতিপাত করিতে লাগিলেন। তিনি কখনও গৃহাভ্যন্তরে অগ্নিশিখার ন্যায় জ্যোতি দর্শন করেন, কখনও পদ্মপুষ্পের গন্ধ গৃহ আমােদিত করিয়াছে অনুভব করেন, কিছুই নির্ণয় করিতে পারেন না। নিমাই কখনও কখনও তাহার অধ্যাপক গঙ্গাদাস পণ্ডিতের আলয়ে উপস্থিত হইয়া তাহাকে বলেন গুরুদেব ন তন পাঠ দেন, তিনি সহর্ষে কহেন তুমি চিরদিনের প্রবীন পড়ুয়া তােমার নিমিত্ত নূতন পাঠ কোথায় পাইব। নিমাইকে পথে দাম্ভিকের ন্যায় গমন করিতে দেখিয়া নবদ্বীপ প্রবাসী অদ্বৈত শ্রীবাস আদি ভাগবতগণ তাহার কদর্প বিনিন্দিতরূপ মাধুরী দেখিয়া মােহিত হন, পরক্ষণেই তাহাদের হরিষে বিষাদ হয়, তাহারা মনে করেন এমন সুন্দর সুঠাম পুরুষ, কেবল পাণ্ডিত্যেই পরিপূর্ণ, প্রেমের অঙ্কুরও ইহার ভিতর দেখিতে পাই না। আশি লক্ষ যােনী পরিভ্রমণ করিয়া দুর্লভ নানব জন্ম পাইয়া নিমাই পরাবিদ্যা পরব্রহ্ম শ্রীকৃষ্ণের সাধনা ফরিয়া অপরাবিদ্যা ব্যাকরণ, নিরুক্ত, ছন্দ জ্যোতিষাদির সাধনায় নিমগ্ন হইয়া বৃথা কালক্ষর করুিতেছে। নিমাই যদি ভাগবত অধ্যয়ন করিত তাহা হইলে পরম ভক্ত হইয়া আমাদের শ্রীচৈতন্য লীলামৃত। কত আনন্দ বর্ধন করিত। নিমাই মনে মনে কহিলেন আপনাদের আশীর্বাদে আমি এমন কৃষ্ণভক্ত হইব যে আপনাদের আনন্দের পরিসীমা থাকিবে না। নিমাই মুকুন্দকে দেখিলে তাহাকে মুগ্ধ- বােধের দুর্বোধ স্থান হইতে প্রশ্ন করেন, মুকুন্দ যথাযযাগ্য উত্তর দিয়া তাহাকে সন্তুষ্ট করেন। মুকুন্দ পরম বৈষ্ণব, সেইজন্য দাম্ভিক নিমাইয়ের সঙ্গ তিনি সর্বদা পরিহার করিবার চেষ্টা করিতেন নিমাই মনে মনে কহিতেন সময় আসিলে আমার ভিতরে এমন বৈষ্ণবের চিহু দেখিতে পাইবে যাহা শিব ও নারদের ভিতরে নাই। এই সময় নবদ্বীপে ঈশ্বরপুরী অদ্বৈতের প্রবাস ভবনে আগমন করি- লেন; অদ্বৈত তাহাকে বৈষ্ণব সন্ন্যাসী বলিয়া বুঝিতে পারিলেন । অবশেষে পরিচয়ে তিনি গুরু ভাই জানিতে পারিলেন। অদ্বৈতের গৃহে মুকুলের কীর্তন শুনিয়া পরম ভক্ত ঈশ্বর পুরীর ভাবাবেশ হইল। একদিন নিমাই পণ্ডিত অধ্যাপনা করিয়া গৃহে প্রত্যাগমন করিতেছেন এমন সময়ে ঈশ্ববপুরী নবদ্বীপের রাজপথে তাহাকে দেখিতে পাইলেম। ঈশ্বরপুরী সিন্ধুপুরুষের ন্যায় গম্ভীর মূর্তি নিমাইকে দেখিয়া তাহার সবিশেষ পরিচয় লইলেন। অবশেষে বলিলেন তুমি সেই, যাহার জন্য আমি দেশে দেশে পরিভ্রমণ করিতেছি নিমাইও তাহাকে তাহার ভাবী গুরু জানিয়া সমাদর করিয়া গৃহে লইয়া গেলেন এবং যযােগ্য তাহার পরিচর্যা করিলেন। ঈশ্বর পুরী কয়মাস নবদ্বীপে গােপীনাথ আচার্যের গৃহে বাস করিয়া গয়াধ্যমে যাত্রা করিলেন। নিমাই একদিন গদাধরকে দেখিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন তুমি ন্যায় পড়। গদাধর বলিলেন পড়ি। নিমাই পূৰ্বপক্ষ করিলেন মুক্তির লক্ষণ কি। গদাধর বলিলেন আত্যন্তিক দুঃখ নাশ। নিমাই তাহা খণ্ডন করিয়া স্বমত ૨૨ শ্রীচৈতন্য লীলামৃত স্থাপন করিলেন। নিমাই ভাগ্যবান মুকুন্দ সঞ্জয়ের গৃহের চণ্ডীমণ্ডপে বসিয়া অধ্যাপনা করিতেন। একদিন গৃহে বায়ুর ছলে মহাপ্রভু প্রেমের সাত্তিক লক্ষণ প্রকাশ করেন। বুদ্ধিমন্ত বসু খাঁ ও মুকুন্দ সঞ্জয় তৎকালে নবদ্বীপের মধ্যে ধনাঢ্য ব্যক্তি ছিলেন। তাহার নিমাইয়ের বায়ুবিকার দেখিয়া শিরদেশে মর্দন করিবার জন্য বিষ্ণু তৈল ও নারায়ণ তৈল দিয়াছিলেন। শচীদেবী ও লক্ষ্মীদেবী বায়ু বিকার দেখিয়া ভুতগ্রস্ত মনে করিয়া কঁদিতে কাদিতে রােজা ডাকিতে পাঠাইলেন। এমন সময় একজন বৈষ্ণব ভিক্ষা করিতে আসিয়া কৃষ্ণবিষয়ক সঙ্গীত করিতে লাগিলেন, সেই সঙ্গীত কর্ণ কুহরে প্রবেশ করিলে তাহার চৈতন্য হইল। লক্ষ্মীদেবী প্রতিদিন প্রত্যুষে সর্বাগ্রে গাত্রোখান করিয়া যাবতীয় গৃহকৰ্ম্ম সম্পন্ন করিয়া গঙ্গাস্নানে যাইতেন, তৎপরে স্বামীর নারায়ণ পূজার জন্য পুষ্প, তুলসী চন্দন আয়োজন করিয়া দিয়া রন্ধন করিতেন, মধ্যাহ্নে পতির ভােজন হইলে, শত্রুর সমস্ত আয়ােজন করিয়া দিতেন। তিনি মাতার ন্যায় শত্রুর সেবা শুশ্রুষা করিতেন। পুত্রবধুকেও শচীদেবী কন্যানিৰ্বিশেষে যত্ন করিতেন। নবদ্বীপে এক বিশ্বজয়ী পণ্ডিত আগমন করেন। তিনি নানা দেশ জয় করিয়া জয়পত্র পাইয়াছেন। নবদ্বীপ জয় হইলেই তাহার ভারতজয় সমাধা হয়। নিমাই পণ্ডিতের ও এই সমাচার কর্ণগােচর হইল তিনি বলিলেন দর্পহারী হরি কাহারও দর্প রাখেন না। দিনমণি অস্তাচলচূড়াবলম্বন করিয়াছেন, জ্যোৎস্নাময়ী যামিনীও সমাগত প্রায়, গগন চন্দ্রাতপ নক্ষত্রালোকে শােভমান, কুমুদিনী কান্তও কান্তার সহিত মিলনের আশায় কি রজাল বিস্তার করিয়া জল স্থল অন্বেষণ করিতেছেন, ভাগীরথী বক্ষের তরঙ্গ ঘাত শ্রীচৈতন্য লীলামৃত। প্রতিঘাতে বেলাভূমি সিক্ত করিতেছে, এই শুভ মুহুর্তে নিমাই পণ্ডিত সশিষ্য ভাগীরথীতটে উপবিষ্ট আছেন, এলন সময় তথায় দিঘীজয়ী পণ্ডিত সান্ধ্য সমীরণ সেবন করিতে আগমন করিয়া নিমাই পণ্ডিতের দর্শনলাভ করিলেন। পরস্পবের প্রশংসার পরে নিমাই পণ্ডিত দিীজয়ীকে একটী গঙ্গার স্তব রচনা করিতে বলিলেন। তিনি নিম্নলিখিত শ্লোক রচনা করিলেন। যথা- মহত্তং গঙ্গায় সতত মিদমাতি নিতরাং, যদেষা শ্রীবিষ্ণোশ্চরণকমলােৎপত্তি সুভগা। দ্বিতীয় শ্রীলক্ষ্মীরিব সুরনরৈরর্চচরণ, ভবানীভ যা শিরসি বিভবতদ্ভুত গুণা। দিগ্বজয়ী শ্লোকের ব্যাখ্যা করিলেন, নিমাই পণ্ডিত বলিলেন শ্লোকের কি দোষ আছে বিচার করুণ। তিনি বলিলেন শ্লোক নির্দোষ, নিমাই কহিলেন—যদি রােষ না করেন তাহা হইলে দোষ দেখাইতে পারি। দিগ্বজয়ীর অনুমতি লইয়া নিমাই বলিলেন অবিমৃষ্টবিধেয়াংশ দুই ঠাহ চিহ্! বিরুদ্ধমতি ভগ্নক্রমপুনরাত্ত দোষ তন। দিগ্বজয়ানিমাই পণ্ডিতের নিকট পরাজয় স্বীকার করিলেন। একদিন নিমাই জননীকে কহিলেন বঙ্গদেশে প্রবাসে যাইব উথায় কমাস থাকিতে মানস করিয়া আপনার নিকট অনুমতি লইতে আসিয়াছি। নিমাই কখনও বিদেশে গমন করেন নাই তাহাতে বালক, শচীদেবী কোথায় প্রাণটা রাখিয়া অনুমতি দিবেন, অবশেষে নিমাইয়ের কাতােরোক্তিতে সম্মতি প্রদান করলেন। লক্ষ্মী প্রতি কহিলেন শ্রীগৌরসুন্দর! মায়ের সেবন তুমি করিবে নিরন্তর | মহাপ্রভু শিষ্যগণকে লইয়া বঙ্গদেশে যাত্রা করিলেন। পাঠক, অধুনা যাহাকে পূর্ববঙ্গ বলা হয় সেকালে শ্রীচৈতন্য লীলামৃত উহার কতক অংশকে বল্লালের বঙ্গ কহিত। পদ্মানদী উত্তীর্ণ হইয়া নিমাই যথাসময়ে বঙ্গদেশে আসিলেন চতুর্দিকে প্রচার হইল নবদ্বীপের অধ্যাপক শিরােমণি দিগ্বীজয়ী নিমাই পণ্ডিত আসিয়াছেন। অনেক অধ্যাপক ও ছাত্র তাহাকে দর্শন করিতে আসিয়া বলিলেন আপনার কৃত টীকাই এখানে অধ্যাপনা ও অধ্যয়ন হইতেছে। নিমাই কয়মাস তথায় বাস করিয়া সুবর্ণ রজত জলপাত্র, দিব্যান সুন্দর বাসন, ভােট কম্বল ইত্যাদি বহুমূল্য দ্রব্যাদি বিদায় পাইয়াছিলেন। তিনি ঐ সকল দ্রব্যাদি লইয়া গৃহে প্রত্যাগমন করিলেন। নিমাই গৃহে উপনীত হইয়া জননীর পদধুলি গ্ৰহণ করিয়া কুশল জিজ্ঞাসা করিলেন, জননী মৌনী রহিলেন, তাহার নয়নপ্রান্তে দুই এক বিন্দু অশ্রু দেখা দিল। নিমাই জননীকে কহিলেন আমি ধন সম্পত্তি লইয়া বহু দিনের পরে প্রবাস হইতে গৃহে প্রত্যাগমন করিলাম, আপনি আমাকে দেখিয়া কত প্রফুল্ল হইবেন তাহা না হইয়া এত বিষন্ন কেন। একজন প্রতিবাসী রমণী নিমাইকে উৎ- কষ্ঠিত দেখিয়া কহিলেন নিমাই তােমার ব্রাহ্মণী নাই। নিমাই যে সময় বঙ্গদেশে ছিলেন সে সময় বিরহ ব্যাধিতে ব্যথিতা লক্ষ্মীদেবী দিন দিন ক্ষীণ কলেবর হইয়া তনু ত্যাগ করিয়াছেন। নিমাই পত্নীর বিয়ােগ বার্তা অবগত হইরা দক্ষালয়ে সতী প্রাণত্যাগ করিলে মহাদেব যেরূপ শােকাকুল হইয়াছিলেন তদ্রুপ হইলেন। তৎপমে ধৈৰ্য্যধারণ করিয়া কহিলেন। কাতৰ কান্তা কস্তে পুত্র। অনন্তর মাতাকে নানা প্রকারে সান্তনা করিতে লাগিলেন। প্রভু বলে মাতা দুঃখ ভাব কি কারণে। ভবিতব্য আছে যা তা খণ্ডিবে কেমনে।
শ্রীচৈতন্য লীলামৃত।
৬।
৭n
ra
এই মত কালগতি কেহ কার নয়।
সংসার অনিত্য তাই সৰ্ব্ব শাস্ত্রে কয়।
ঈশ্বরের অধীন যে, সকল সংসার।
সংযােগ বিয়ােগ কে করিতে পারে আর।
অতএব যে হইল ঈশ্বর ইচ্ছায়।
সেই সে হইল আর কি কাৰ্য দুঃখ তায়।
স্বামীর অগ্রেতে গজা পায় যে সুকৃতি।
তার বড় আর কেবা আছে ভাগ্যবতী। (চৈতা)
নিমাইয়ের প্রবোধ বচনে জননী কথঞ্চিৎ সান্তনা পাইলেন,
তৎপরে নিমাইয়ের মুখচুম্বন করিয়া তাহার কুশল বার্তা লইলেন।
নিমাই পূৰ্ববঙ্গ হইতে আসিয়া অবধি নবদ্বীপের বাঙ্গাল ছাত্রদিগকে
তর্দেশীয় ভাষা অনুকরণ করিয়া বিদ্রুপ করেন। একদিন কতিপয়
শ্রীহট্টবাসীকে ঐরূপ তামাসা করিতেছেন, তাহারা ক্রোধান্বিত
হই নিমাইকে যৎপরােনাস্তি ভৎসনা করিল। তাহারা কহিল
তােমার পিতামাতার জন্মভূমি কোথায়। বস্তুতঃ নিমাইয়ের
মাতামহ নীলাম্বর চক্রবর্তীর এবং পিতা জগন্নাথ মিশ্রের জন্ম
স্থান শ্রীহট্ট, তাহারা উভয়েই তথা হইতে আসিয়া নবদ্বীপে বাস
করিয়াছেন। কিছুদিন পরে শচীদেবী নিমাইয়ের জন্য পাত্রী
স্থির করিলেন। রাজপণ্ডিত সনাতনের কন্যা বিষ্ণুপ্রিয়া দেবীর
সহিত নিমাইয়ের বিবাহ হইল। শচীদেবী পুনরায় পুত্রবধু লইয়া
সংসার যাত্রা নির্বাহ করিতে লাগিলেন। নিমাইও নবীন৷ গৃহিণী
লইয়া কিছুদিন সংসারী হইলেন। নবদ্বীপে অদ্বৈত প্রমুখ
বৈষ্ণবগণ হরিভক্তি বিহীন সংসারের দুর্গতি দেখিয়া বড়ই ব্যথিত
হইলেন, এমন সময় হরিদাস নামে একজন ভক্ত নবীপে আগমন
শ্রীচৈতন্য লীলামৃত। করিলেন। বুঢ়ন গ্রামের একজন মুসলমান বৈষ্ণবধর্ম গ্রহণ করেন। তাহার বৈষ্ণব নাম হরিদাস। তিনি আপনার গৃহ পরিত্যাগ করিয়া বেনাপােলের বনমধ্যে কুটির নির্মাণ করিয়া, তুলসীর সেবা এবং দিবারাত্রে তিন লক্ষ হরিনাম সঙ্কীৰ্ত্তন, তথা ব্রাহ্মণ গৃহে ভিক্ষা নিৰ্বাহ করিতেন। রামচন্দ্র খান সেই দেশের জমিদার ছিলেন। তিনি বৈষ্ণবদ্বেষী পাষণ্ড, হরিদাসকে লােকে পূজা করে দেখিয়া তাহার হিংসা হইত। তিনি হরিদাসের ছিদ্র অন্বেষণ করিতে লাগিলেন, অবশেষে একদিন বেশ্যাগণকে আনাইয়া বলিলেন যদি তােমরা হরিদাস বৈরাগীর বৈরাগ্যধৰ্ম নাশ করিতে পার তাহা হইলে তােমাদিগকে বিশেষ পুরস্কার দিব। বেশ্যাগণ মধ্যে একজন সুন্দরী ছিল ; সে বলিল আমি তিন দিনে তাহার মন হরণ করিব। অনন্তর রামচন্দ্র খান কহিল, আমার একজন পাইক তােমার সঙ্গে যাউক, তােমার সহিত একত্র যেন তাহাকে ধরিয়া আনে। বেশ্যা কহিল আমার সঙ্গে তাহার প্রণয় হউক, তৎপরে তাহাকে ধরিবার নিমিত্ত পাইক লইয়া যাইব। রাত্রিকালে সেই বেশ্যা বেশবিন্যাস করিয়া হরিদাসের কুটিরে উপস্থিত হইল। তথায় তুলসী প্রণাম করিয়া হরিদাসের দ্বারে গিয়া নমস্কার করতঃ দাড়াইয়া রহিল। হরিদাস তাহার দিকে চাহিলে সে বলিল "ঠাকুর তুমি পরম সুন্দর, তােমার প্রথম যৌবন, তােমাকে দেখিয়া কোন নারীর মন ধৈর্য ধারণ করিতে পারে? আমি তােমাকে দেখিয়া এত মুগ্ধ হইয়াছি যে তােমাকে পাইলে প্রাণ ধারণ করিতে পারিতেছি না”। হরিদাস কহিলেন যে পৰ্য্যন্ত আমার নামের সংখ্যা পুর্ণ না হয়, সেই পৰ্যন্ত তুমি বসিয়া নাম সংকীর্তন শ্রবণ কর ; নাম সমাপ্ত হইলে তােমার মনবাসনা শ্রীচৈতন্য লীলামৃত। পূর্ণ করিব। এই শুনিয়া সেই বেশ্যা হরিদাসের নিকট বসিয়া রহিল। হরিদাসের নাম লইতে প্রাতঃকাল হইল দেখিয়া বেশ্যা চলিয়া গেল। সে রামচন্দ্র খানকে বলিল হরিদাস আমাকে অঙ্গীকার করিয়াছে কিন্তু কল্য তার অবকাশ না হওয়ায় সঙ্গম হয় নাই অন্য রজনীতে গমন কৰিলে আমার সহিত নিশ্চয় তাহার মিলন হইবে। বেশ্যা যামিনীযােগে পুনরায় হরিদাসের আলয়ে উপস্থিত হইল। হরিদাস তাহাকে আশ্বাস দিয়া কহিলেন কল্য রজনীতে তােমার বড় ক্লেণ হইয়াছিল, আমার অপরাধ লইও না, তুমি বসিয়া নাম সঙ্কীৰ্ত্তন শ্রবণ কর নাম সংখ্যা পূর্ণ হইলে তােমার কামনা পূর্ণ করিব। বেশ্যা সেই আশায় নিকটে বসিয়া থাকিল এবং কত হাবভাব দেখাইতে লাগিল। এই প্রকারে রজনী প্রায় অবসান হইল বেশ্যা নিরাশায় দুঃখ প্রকাশ করিতে লাগিল। হরিদাস কহিল আমি একমাসে কোটি নাম গ্রহণরূপ যজ্ঞ করিব, এই দীক্ষা গ্রহণ করিয়াছি, অদ্য ইহা সমাপ্ত হইবে এই জ্ঞান ছিল, সমস্ত রাত্রি নাম গ্রহণ করিলাম সমাপ্ত করিতে পারিলাম না। কল্য সমাপ্ত হইলে, আমার ব্রত উদযাপন হইবে তখন তােমার সহিত স্বচ্ছন্দে বিহার করিব। অনন্তর বেশ্যা রামচন্দ্র খানকে এই, সংবাদ কহিল। পুনরায় স্বায়ংকালে বেশ্যা হরিদাসের সমীপে উপ- নীত হইল। হরিদাস কহিলেন অদ্য আমার নাম সংখ্যা পূর্ণ হইবে, তৎপরে তােমার অভিলাষ পূর্ণ করিব। কীৰ্ত্তন করিতে করিতে রজনীও প্রভাত হইল, হরিদাসের নাম জপের সংখ্যাও পূর্ণ হইল। বেশ্যার কিন্তু তিন দিবস সাধুসঙ্গে থাকিয়া হরিনাম শ্রবণ করিয়া পূৰ্ব্বস্বভাবের এক অভিনব পরিবর্তন হইয়াছে। সে তখন গৃহে গমন না করিয়া হরিদাসের চরণে নিপতিতা হইয়া সকাতরে কহিল ।
শ্রীচৈতন্য লীলামৃত। ঠাকুর আমি আপনার নিকট অতিশয় অপরাধী, আমাকে রামচন্দ্র খাঁ পুরস্কারের লােভ দেখাইয়া আপনার বৈরাগ্য ধৰ্ম্ম নষ্ট করিবার জন্য প্রতি রজনীতে আমাকে এখানে পাঠাইয়াছে। আপনি আমার অপরাধ মার্জনা করুন আমি বেশ্যা হইয়া কতজনের সর্বস্ব হরণ করিয়াছি, আমার কপট প্রেমে মুগ্ধ হইয়া, আমার অনিত্য দৈহিক লাবণ্যের লালসায় কতজন তাহাদের অমূল্য জীবন হারাইয়াছে। মুঢ় কামান্ধ নর মরীচিকা ভ্রমে আমার মত মরু- ভূমিতে শীতল হইতে আসিত, আমার ছলনায় প্রতারিত হইয়া কতজন রূপবতী গুণবতী সহধর্মিণীকে দিবানিশি অশ্রনীরে ভাসাইয়াছে, পথের কাঙ্গালিনী করিয়াছে। ঠাকুর, আমার পাপের অবধি নাই। আপনি কৃপা করিয়া আমাকে পাপ হইতে পরিত্রাণ করুন এবং দয়া করিয়া আমাকে উপদেশ দেন যাহাতে আমি সমস্ত ক্লেশ হইতে মুক্ত হইতে পারি। হরিদাস কহিলেন সাধ্বি, তােমার অনুতাপেই তােমার পাপের প্রায়শ্চিত্ত হইয়াছে। তােমার বিবেকানলে সমুদয় পাপ ভষ্মীভূত হইয়াছে। তথাপি তােমার উপরােধে এই উপদেশ দিতেছি যে পাপ পথে থাকিয়া যে অর্থ উপার্জন করিয়াছ সর্ব অনর্থের মূল সেই অর্থ ব্রাহ্মণদিগকে দান করিবে এবং নিরন্তর হরিনাম শ্রবণকীর্তন ও তুলসীর সেবা করিবে তাহা হইলেই কৃষ্ণ তােমায় কৃপা করিয়া শ্রীচরণে স্থান তদনন্তর সেই বেশ্যা গুরুর আদেশ পাইলাম এই বলিয়া হরিদাস ঠাকুরকে প্রণাম করিয়া বিদায় লইল। সেই বেশ্যা মস্তক মুণ্ডন করিয়া দেহের অর্ধেক সৌন্দর্য নষ্ট করিল। প্রথমে সে ইন্দ্রিয় সংযমের জনা মৎস্য ত্যাগ করিল, তৎপরে একাহারী ও হবিষ্যান্নভােজী হইল অবশেষে ফলাহারী ও দিবেন।
শ্রীচৈতন্য লীলামৃত। চর্বন উপবাসী হইয়া দুৰ্ব্বার ইন্দ্রিয়গণকে বশীভূত করিয়া, প্রতিদিন তিনলক্ষ হরিনাম করিতে করিতে তাহার মন প্রাণ হরি- পাদপদ্মে লীণ হইয়াছে। এক্ষণে ঐ বেশ্যা ফুলিয়া নগরে একটা গােফার ভিতরে বাস করে, বাহিরে একটা অজাগড় সর্প থাকে, কোনও দুষ্টলােক তাহাতে বিরক্ত করিতে পারে না, সে মধ্যাহে কোনও গৃহীর গৃহে অতিথি হইয়া জীবনধারণের উপযােগী যং- কিঞ্চিৎ ভিক্ষা করে, অবশিষ্ট সময় হরিনামেই বিভাের থাকে। বড় বড় সাধু মােহান্ত তাহাকে প্রতিদিন দর্শন করিতে যান। ভগবানভক্তদিগকে কত প্রকারে পরীক্ষা করেন। প্রহ্লাদকে যেমন কঠিন পরীক্ষা করিয়াছিলেন, হরিদাসের প্রতি সেইরূপ কঠোর পরীক্ষা আরও কত হইয়াছে। একদিন মুসলমানগণ কাজী সাহেবের নিকট অভিযােগ করিল বুঢ়ণ গ্রামের একজন মুসলমান বৈষ্ণব হইয়াছেন,তাহার দৃষ্টান্তে দেশের আরও মুসলমান বৈষ্ণব হইতে পারে। কাজী সাহেব মুলুকপতির নিকট এই বৃত্তান্ত লিখিয়া পাঠাইলেন। মুলুকপতি প্রহরী পাঠাইয়া হরিদাসকে ধরিয়া আনিলেন, এবং তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন তুমি কত পুণ্যফলে একেশ্বরবাদী পবিত্র মুসলমান কুলে জন্মগ্রহণ করিয়াছ “এক্ষণে এই পবিত্র ইসলাম ধর্ম পরিত্যাগ করিয়া বৈষ্ণব ধর্ম কেন গ্ৰহণ কৰিলে।” হরিদাস কহিলেন পরমার্থে সকল ধর্মই এক, ঈশ্বর এক বই দুই নয়। মুসলমানেরা যাহকে খােদ, আল্লা, বলিয়া উপাসনা করেন, হিন্দুরা তাহাকেই হরি, কৃষ্ণ বলিয়া থাকেন। সকল ধর্মেই দুনিয়ার মালিক একজনই আছেন। অতএব আপনিও যাহার ভজন সাধন করেন আমিও তাহারই ভজন সাধন করি। অজ্ঞান ব্যক্তি এক ঈশ্বরেই বহু ঈশ্বর
শ্রীচৈতন্য লীলামৃত
দেখিয়া থাকে। মুলুকপতি হরিদাসের এই জ্ঞানগর্ভ উপদেশ
শ্রবণ করিয়া তাহার প্রতি বীতরাগ হইলেন, কিন্তু তথায় কাজী
সাহেবও উপস্থিত ছিলেন, তিনি হরিদাসের উপর নানা প্রকার
দোষারােপ করিলেন। অবশেষে কাজীর প্ররােচনায় মুলুকপতি
হরিদাসের প্রতি কঠোর দণ্ড বিধান করিলেন। তিনি আদেশ
করিলেন,-বাইশটী বাজার আছে, প্রতি বাজারে ইহাকে
লইয়া যাও এবং বাজারের সকল লােকই যেন ইহাকে প্রহার
করে। এই প্রকারে ইহার প্রাণান্ত না হওয়া পর্যন্ত প্রতি বাজারে
প্রহারের জন্য লইয়া যাইবে।
প্রহরীরা প্রভুর আদেশ পাইয়া হরিদাসকে প্রতি বাজারে
লইয়া গেল কিন্তু বাইশ বাজারে প্রহৃত হইয়াও হরিদাসের প্রাণ
বাহির হইল না। তখন প্রহরীরা তাহাদের প্রাণভয়ে ভীত হইয়া
কহিল, “মুলুকপতি, এই প্রহারের কথা কোনও মতেই বিশ্বাস
করিবেন না। অতএব ইহার পরিবর্তে আমাদেরই প্রাণদণ্ড
হইবে।” হরিদাস তাহাদের এই কাতরােক্তি শ্রবণ করিয়া
ব্যথিত হইলেন, তিনি যােগবলে শ্বাস প্রশ্বাস রােধ করিয়া ভূতলে
পতিত হইলেন। প্রহরীরা তাহাকে মৃত মনে করিয়া তাহার
শবদেহ লইয়া মুলুকপতির নিকট উপস্থিত হইল। তিনি কহিলেন,
কোরাণে আছে কবরে দিলে মৃত ব্যক্তির আত্মার সদগতি হয়,
অতএব এই ব্যক্তি যেরূপ পাপ করিয়াছে ইহার আত্মার
যাহাতে অসদগতি হয় সেই ব্যবস্থাই যুক্তিসঙ্গত। অবশেষে
হরিদাসের শবদেহ গঙ্গাগর্ভে নিক্ষেপ করা হইল। শববাহীরা
চলিয়া গেলে হরিদাস যােগনিদ্রা হইতে, জাগ্রত হইয়া পরপারে
উত্তীর্ণ হইলেন। তিনি মুলুকপতির নিকট পরক্ষণেই আগমন
শ্রীচৈতন্য লীলামৃত। করিলেন। মুলুকপতি তাহার এই অলৌকিক কাৰ্য্য দেখিয়া তাহার নিকট ক্ষমা ভিক্ষা করিলেন এবং তদবধি হরিদাসকে মহাপীয় বলিয়া শ্রদ্ধা ভক্তি করিতে লাগিলেন। এতাদৃশ পরমভক্ত হরিদাসকে পাইয়া নবদ্বীপের ভক্তগণের আনন্দের আর সীমা নাই অদ্বৈত প্রভু হরিদাস ঠাকুরকে আপনার প্রাণাপেক্ষাও প্রিয় জ্ঞান করিয়া ভালবাসিতে লাগিলেন। হরিদাস যখন নগরে নগরে উচ্চৈস্বরে হরিসঙ্কীৰ্ত্তন করেন তখন পাষণ্ডগণ তর্ক করিয়া বলে, ঘরে বসিয়া মনে মনে হরিনাম করিলে কি পুণ্য হয় না? হরিদাস তাহাদিগকে বিনীতভাবে নিবেদন করেন, কোনও সুমিষ্ট বস্তু একাকী খাওয়া ভাল কি পাচজনকে দিয়া খাওয়া ভাল হরিনাম শ্রবণে-কীর্তনে জীবের পাপ দূর হয়, অতএব যে সকল জীবের শ্রবণ কীর্তনের অবসর নাই তাহাদেয় কর্ণকুহরে প্রবেশ করিলে তাহাদের সমস্ত পাপ দুর হইবে বলিয়া আমি নগরে নগবে কীৰ্ত্তন করিয়া বেড়াই। একদিন নিমাই জননীকে কহিলেন, গদাধরের শ্রীপদাপয়ে পিতৃপিণ্ড প্রদান করিবার জন্য আমি গয়াধামে গমন করিব। জননী কহিলেন, তুমি প্রবাসে গমন করিলে আমি গৃহে কি করিয়া নিমাই কহিলেন, “পুত্রার্থে ক্ৰিয়তে ভাৰ্য্যা পুত্র পিণ্ড প্রয়ােজন।” পিতা যখন পুত্র রাখিয়া গিয়াছেন তখন পিতৃকাৰ্য পুত্রের করা কর্তব্য, অতএব আপনি এই শুভ কার্যে বাধা দিবেন । শচীদেবী বিশ্বম্ভরের আগ্রহাতিশয্য দেখিয়া গয়া গমনের অনুমতি দিলেন। বিশ্বম্ভর নবদ্বীপ হইতে একজন বিপ্র লইয়া শয়া যাত্রা করিলেন। একদিন গয়ার পথে ঐ বিপ্ন দেখিলেন, উপৰীতধারী তিন চার ব্যক্তি গােযান পরিচালন করিতেছে। থাকিব?
শ্রীচৈতন্য লীলামৃত
তিনি তাহাদিগকে জিজ্ঞাসা করিলেন, তােমরা কোন জাতি ?
তাহারা বলিল, ব্রাহ্মণ। তখন ঐ বিপ্রের তর্দেশীয় ব্রাহ্মণদের
প্রতি অভক্তির উদ্রেক হইল। অন্তর্যামী মহাপ্রভু বিপ্রের মনের
ভাব অবগত হইলেন। তিনি ব্রাহ্মণমাহাত্ম প্রচারের ব্যপদেশে
সহসা প্রবল জ্বরে আক্রান্ত হইয়া কাপিতে লাগিলেন, ঐ বিপ্ন
বিদেশে এই প্রকার এর দেখিয়া বিব্রত হইলেন। মহাপ্রভু
কপিতে কাঁপিতে কহিলেন, আমার কি তােমার পথিমধ্যে
কোনও অজ্ঞাত অপরাধের জন্য আমার পিতৃকার্যে বিঘ্ন ঘটিল,
যাহা হউক বিপ্রপাদোদক আনয়ন কর ; বিপ্রপাদোদক পানে
জীবের ত্রিতাপ দূর হয়।
মহাপ্রভুর সঙ্গী বিপ্র পথিমধ্যে
বিপ্রের অন্বেষণ করিতে লাগিলেন কিন্তু সকট পরিচালক ব্রাহ্মণই
দেখিতে পাইলেন, তাহাদের পাদোদক লইয়া
পাদোদক লইয়া মহাপ্রভুকে
পান করাইতে তাহার প্রবৃত্তি না হওয়ায় শুন্য হন্তে প্রত্যাবর্তন
করিলেন। মহাপ্রভু যন্ত্রণায় অস্থির হইয়া তাহাকে কহিলেন, বিপ্ন
পাদোদক কি পাওয়া গেল। তিনি কহিলেন, এদেশের ব্রাহ্মণ
অনাচারী আমি কেমন করিয়া তাহাদের পাদোদক আপনাকে পান
করিতে দিব ? মহাপ্রভু কহিলেন, “তাহারা অতি বিশুদ্ধ বিপ্ন,
ত্রিসন্ধ্যা ও গায়ত্রী জপ করেন, মৎস্য মাংস আহারে সতত বিরত,
সুরাপান ও পরস্ত্রী গমন করেন না। তুমি এখানে যে বিথ দেখিতে
পাইবে, কোনও বিচার না করিয়া তাহাদের পাদোদক ভক্তি
কলিয়া আনয়ন করিবে”। তখন নবদ্বীপের সেই ব্রাহ্মণ পশ্চিম
প্রদেশীয় বিয়ে পাদোদক ভক্তিপূর্বক আনয়ন করিয়া
মগ্রভুকে পান করাইবা মাত্র তাহার এর দূরীভুত ও শরীর
এ হইল।
শ্রীচৈতন্য লীলামৃত। মহাপ্রভু গয়ায় গমন করিয়া রাজপথে ঈশ্বর পুরীকে সহসা দেখিয়া অপার আনন্দসাগরে নিমগ্ন হইলেন। মহাপ্রভু ছলছল নেত্রে ঈশ্বরপুরীকে কহিলেন, অদ্যাপিও আমার দেহ মন শুদ্ধ হয় নাই, আপনি কৃপা করিয়া আমাকে দীক্ষা দিয়া পবিত্র করুন। আমার দেহ আপনাকে সমর্পণ করিলাম, আমি যেন আপনার প্রসাদে কৃষ্ণপাদপদ্মের মকরন্দপানে মত্ত হইতে পারি। ঈশ্বরপুরী নিভৃতে মহাপ্রভুকে দশাক্ষর গােপীনাথ মহামন্ত্র প্রদান করিলেন। মহাপ্রভুর অঙ্গ পুলকে পরিপূর্ণ হইল, নয়ন দিয়া নীর নির্গত হইতে লাগিল। মহাপ্রভু রাধাভাবে ভাবিত হইয়া কৃষ্ণ কৃষ্ণ বলিয়া উচ্চৈস্বরে ক্রন্দন করিতে লাগিলেন। এখন ভাবনিধি মহাপ্রভুর আর ভাবের অভাব নাই, তিনি দন্তে তৃণ লইয়া সকাতরে কহিলেন, আমি কৃষ্ণদাসী পরক্ষণেই “কৃষ্ণহে প্রাণনাথ আমার প্রাণের হরি, আমার মন প্রাণ হরণ করিয়া কোথায় পলায়ন করিলে ?” বলিয়া রােদন করিতে লাগিলেন। মহাপ্রভুর এই ভাবে দুইপ্রহর কাল গত হইলে তিনি প্রকৃতিস্থ হইয়া ঈশ্বরপুরীকে কহিলেন, “গয়ায় পিতৃশ্রাদ্ধ করিতে আসিয়াছি কিন্তু দীক্ষা গ্রহণ না করিলে দেহ শুদ্ধ হয় না, দেহ শুদ্ধ না হইলে ধৰ্ম্মকর্মে অধিকার হয় আপনার কৃপায় অদ্য সে অধিকার পাইলাম”। মহাপ্রভু পরদিবসে ফতীর্থে বালুকার পিণ্ড প্রদান করিয়া, প্রেতগয়া, রামগয়া, যুধিষ্ঠিরগয়', ভীমগয়া, শিবগয়া, ব্রহ্মগয়া, প্রভৃতি স্থানে শ্রদ্ধান্তে পিণ্ড প্রদান করিলেন, অবশেষে যােড়শ গয়ায় ষােড়শী করিয়া সকলকে পিণ্ড দিলেন। তদনন্তর মহাপ্রভু ব্ৰহ্মকুণ্ডে স্নান করিয়া গুদাধরের পাদপদ্মে পিণ্ড প্রদান করিলেন। মহাপ্রভু বাসায় প্রত্যাগমন করিয়া বিশ্রামান্তে রন্ধন করিতে লাগি- ৩৪ শ্রীচৈতন্য লীলামৃত। লেন, এমন সময় ঈশ্বরপুরী তথায় উপস্থিত হইয়া কহিলেন, ভাল সময় আসিয়াছি। মহাপ্রভু কহিলেন, দয়া করিয়া যদি এই সময় আসিয়াছেন তাহা হইলে এই অন্ন গ্রহণ করিয়া আমাকে কৃতার্থ করুন,আমি তিলাৰ্দেরমধ্যে পুনরায় আমার জন্য অন্ন প্রস্তুত করিয়া লইতেছি। মহাপ্রভু স্বহস্তে ঈশ্বরপুরীকে অন্ন পরিবেশন করিলেন তিনিওভােজন করিয়া তৃপ্ত হইলেন। তদনন্তর মহাপ্রভু তাহার সঙ্গী ব্রাহ্মণকে ভােজন করাইয়া আপনি গুরুর প্রসাদ গ্রহণ করিলেন। গয়াধামে একদিন রাত্রিশেষে মহাপ্রভু কাহাকেও না বলিয়া মথুরা যাত্রা করিলেন, পথি মধ্যে দৈববাণী শ্রবণ করিলেন, “হে দ্বিজরাজ! এক্ষণে মথুরা গমন করিও না, যখন সময় হইবে তখন যাইবে, তুমি নবদ্বীপে প্রতিগমন কর। মহাপ্রভু ঈশ্বরপুরীর নিকট বিদায় গ্রহণ করিয়া যথাকালে নবদ্বীপে উপনীত হইলেন। শচীদেবী ও বিষ্ণুপ্রিয়া মহাপ্রভুকে দেখিয়া আনন্দিত হইলেন। প্রতিবাসিগণ ও বিষ্ণুপ্রিয়ার পিতৃগৃহের আত্মীয়েরা নিমাইকে দেখিতে আসিলেন। মহাপ্রভু শ্রীমান্ পণ্ডিত সদাশিব ও মুরারিকে নিভৃতে লইয়া গিয়া কহিলেন, আমার দুঃখের কথা তােমাদিগকে কি বলিব ? আমি গয়াধামে ঈশ্বরপুরীকে আত্মসমর্পণ করিয়া তাহার কৃপায় সেই গােপীজনবল্লভ, নননন্দন, শ্রীরাধার জীবনসৰ্বস্ব ধনের দর্শন পাইয়াছিলাম, কিন্তু আমার এমনি দুর্ভাগ্য যে তিনি আমার মন প্রাণ হরণ করিয়া কোথায় গমন করিলেন আর তাহাকে দেখিতে পাইতেছি না। বিষ্ণুপাদোদক তীর্থের মাহাত্ম্য কি বলিব ? পূর্বে শ্রীকৃষ্ণ গয়ারকে কৃপা করিতে গয়াধামে আগমন করিয়া সেইস্থানে পদ প্রক্ষালন করেন।” এই কথা বলিতে বলিতে নয়নজলে তাহার বক্ষস্থল ভাসিয়া গেল, অবশেষে ‘হ কৃষ্ণ বলিয়া
শ্রীচৈতন্য লীলামৃত।
ভূতলে পতিত হইলেন। মহাপ্রভু সংজ্ঞা লাভ করিয়া বলিলেন,
“বন্ধুগণ অদ্যকার মত আপনারা গৃহে গমন করুন, কল্য শুক্লাম্বর
ব্রহ্মচারীর গৃহে ভক্তগণের সহিত মিলিত হইয়া আমার মনের
দুঃখ জানাইব।” পরদিন মহাপ্রভু প্রত্যুষে গঙ্গাদাস পণ্ডিতের
সহিত সাক্ষাৎ করিয়া গৃহে আগমন করিলে তাহার ছাত্রগণ
তাহাকে দেখিতে আসিল। তিনি তাহাদিগকে মুকুন্দ সঞ্জয়ের
চণ্ডীমণ্ডপে লইয়া গিয়া পাঠ দিতে দিতে বলিলেন,-
“পড় এক সত্য বস্তু কৃষ্ণের চরণ।
সেই বিদ্যা যাথে হরিভক্তির লক্ষণ।
অবিদ্যা সকল কৃষ্ণ বিনে শাস্ত্রে কহে।
রাধাকৃষ্ণভক্তি বিনে কেহ সঙ্গী নহে।
বিদ্যা কুল ধনমদে কৃষ্ণ নাহি পায়।
ভক্তিতে সে অনায়াসে পায় শ্যামরায়।
ব্যাধশ্যাচরণং ধ্রুব চ বয়ে বিদ্যা গজেন্দ্র কা, কুজয়াঃ
কিছু নাম রূপমধিকং কিং তৎ সুদামো ধন। বংশঃ কো বিদুরস্ত
যাদবপতেগ্রস্ত কিং পৌরুষং,
ভক্ত্যা তুষাতি কেবলং ন চ
গুণৈর্ভক্তিপ্রিয়াে মাধবঃ।” শ্রীমান পণ্ডিতও প্রাতে শ্রীবাসের
গৃহপ্রাঙ্গণে কুন্দপুষ্প চয়ন করিতে আসিয়া তথায় শ্রীবাস গদাধর
গােপীনাথ ও রামাইকে দেখিয়া কহিলেন, কল্য নিমাই পণ্ডিত
গয়া হইতে আসিয়াছেন, আমি তাহাকে দেখিতে গিয়াছিলাম,
কিন্তু দেখিলাম, নিমাই আদৌ উদ্ধত নাই, যেন নূতন মানুষ
হইয়া আসিয়াছেন, পাদপদ্ম তীর্থের বর্ণনা করিতে করিতে
‘হ কৃষ্ণ বলিয়া মূচ্ছ। গেলেন, আমি তাহার প্রেমের
লক্ষণই দেখিলাম। ‘বিশ্বস্তর গয়া হইতে বৈষ্ণব হইয়া
শ্রীচৈতন্য লীলামৃত আসিয়াছেন। অদ্য শুক্লাম্বরের কুটীরে সদাশিব ও মুরারি যাইবেন, বিশ্বম্ভর তথায় আসিয়া তাহার গয়াধামের অপূৰ্ব্বদর্শনের বিষয় বিশদরূপে বর্ণনা করিবেন। নির্দিষ্টকালে বিশ্বম্ভর শুক্লাম্বরের গৃহে উপনীত হইলেন। গদাধর, শ্রীমা, সদাশিব, শুক্লাম্বর ও মুরারি তথায় উপস্থিত ছিলেন। বিশ্বম্ভর কহিলেন, “ঈশ্বরপুরীর নিকট গয়াধামে দীক্ষা লইয়া আমি আমার ইষ্টদেব শ্রীকৃষ্ণকে প্রত্যক্ষ দর্শন করিয়াছিলাম,” এই কথা বলিতে বলিতে বিশ্বম্ভর ‘কৃষ্ণহে বঁধুহে তুমি কোথায় গেলে?” বলিয়া ভূতলে পতিত হইলেন। বিশ্বম্ভর বাহজ্ঞান লাভ করিয়া দেখিলেন, গদাধর রােদন করিতে- ছেন, তখন বিশ্বম্ভর দুঃখ করিয়া কহিলেন, গদাধরের বাল্যকাল হইতেই শ্রীকৃষ্ণে মতি আছে, আমার এমনি দুর্ভাগ্য যে, আমি প্রাণনাথ শ্রীকৃষ্ণকে পাইয়া হারাইলাম। একদিন বিশ্বম্ভর সঞ্জয়ের চণ্ডীমণ্ডপে ছাত্রদিগকে পাঠ দিতে দিতে কহিলেন, ব্যাকরণের সূত্র, বেদান্তসূত্র প্রভৃতি ত্রিলােকে যত সূত্র আছে সকলের মূল সুত্র শ্রীকৃষ্ণ কৃষ্ণই একমাত্র হর্তা কর্তা পালয়িতা ঈশ্বর। “কৃষ্ণস্তু ভগবান স্বয়ং।” মহাপ্রভু ত তাহার পড়য়াদিগকে কহিলেন, জীবের আয়ু যেন পদ্মপত্রস্থ নীর, অতএব এই বাল্যকাল হইতে তােমরা হরিসঙ্কীৰ্ত্তন করিবে। তাহারা কহিল “প্রভু আমরা হরি সঙ্কীৰ্ত্তন জানি না। বিশ্বম্ভর তাহাদিগকে শিক্ষা দিলেন,-হরি হরয়ে নমঃ। কৃষ্ণ যাদবায় নমঃ। বাদবায় মাধবায় কেশবায় নমঃ। গােপাল গােবিন্দ রাম শ্রীমধুসুদন। তদবধি পড়গণ ঐ সঙ্কীৰ্ত্তন করেন। বিশ্বম্ভর শ্রবণ করিয়া আনন্দিত হন। শুকার ব্রহ্মচারীর গৃহে ভক্তগণকে লইয়া মহাপ্রভু প্রতিদিন কীৰ্ত্তন বিলাস করেন, তাঁহার দেহে অশ্রু কম্প ।
চৈতন্য লীলামৃত। ৩৭ রুদ্র, পুলকাদি অষ্ট সাত্ত্বিক বিকার এবং তাহার মহাভাব দেখিয়া ভক্ত- গণ কিছুই নির্ণয় করিতে পারেন না। কেহ কহেন, এই মহা পুরুষ ধ্রুব শুক নারদ প্রহলাদাদির মধ্যে একজন হইবেন, কেহ বলেন ইনি শ্রী কৃষ্ণের অংশাবতার, কেহ বলেন ইনি স্বয়ং পূর্ণ শ্রীকৃষ্ণ। ভক্তগণ তখনও নানাবিধ জল্পনা কল্পনা করিতেছেন, মধুকর যেমন সুদূরে শতদলের সন্ধান পাহয়া মধুলােভে দলে দলে ধাবিত হয়, সেইরূপ সহস্রদল গৌরপদকমলের মকরন্দ পান করিবার জন্য ভক্ত ভৃঙ্গদলও দলে দলে নবদ্বীপে আগমন করিলেন। গদাধর, নরহরি, শ্ৰীনিবাস, মুরারি, মুকুন্দ, বক্রেশ্বর, শ্রীধর, শ্রীমান, সঞ্জয়, ধনঞ্জয়, শুক্লাম্বর, শ্রীরাম, মহেশ, হরিদাস, নন্দন আচাৰ্য, দামােদর জগদানন্দ পুণ্ডরিকাক্ষ গােবিন্দ প্রভৃতি ভক্তগণ নবদ্বীপে আসিলেন। একদিন মহাপ্রভু শ্রীবাস পণ্ডিত ও তাহার ভ্রাতাগণের সহিত গমন করিতে করিতে শ্রবণ করিলেন, কে যেন অলক্ষিতে বংশীধ্বনি করিতে করিতে তাদের অনুধাবন করিতেছেন। মহাপ্রভু একদিন ভক্তগণকে কহিলেন নিত্যানন্দকে না দেখিয়া আমি মনে সুখ পাইতেছি না, পরক্ষণেই নিত্যানন্দ আগমন করিলেন। মহাপ্রভু নিজ গৃহে বসিয়া কৃষ্ণপ্রেমে বিভাের হইয়া ক্রন্দন করিতে করিতে কহিলেন নন্দনন্দনকে কি আর আমি পাইব না। এমন সময় দৈববাণী হইল “আপনি ঈশ্বর তুমি শুন বিশ্বম্ভর প্রেম প্রকাশিতে তুমি হলে অবতার। প্রেম ভক্তি দিয়া নিস্তারিবে সৰ্বলােক। কলিহত জীবের যুচিবে সর্বশােক।” এই সময় অদ্বৈত এই প্রকার স্বপ্ন দেখেন যথা- আর কেন দুঃখ পাও পাইলে সকল। যে লাগি সংকর কৈলে সে হৈল সফল। ৪
৩
শ্রীচৈতন্য লীলামৃত।
যত উপবাস কৈলে যত আরাধন।
যতেক করিলে কৃষ্ণ বলিয়া ক্রন্দন।
যা আনিতে ভুজ তুলি প্রতিজ্ঞা করিল।।
সে প্রভু তােমার আসি বিদিত হইল।
সর্বদেশে হইবেক হরি সঙ্কীন।
ঘরে নগরে হরি বলিবে অনুক্ষণ।
ব্ৰহ্মার দুলভ ভক্তি যতেক যতেক।
তােমার প্রসাদে সৰ্বলােক দেখিবেক।
এই বাসের ঘরে যতেক বৈষ্ণব ।
নৃত্যগীত সঙ্কীর্তনে মজিবেক সব। (চৈতন্য ভাগবত )
একদিন মহাপ্রভু গদাধরকে সঙ্গে করিরা অদ্বৈতের গৃহে
উপস্থিত হইলেন, অদ্বৈত তুলসী ও গঙ্গাজল দিয়া মহাপ্রভুর পুজা
করিলেন এবং বললেন আমার নিকট তােমার লুকাচুরি চলিবে
না, মহাপ্রভু কহিলেন ওরে নাড়াবুড়ো তােমার মহারুদ্রের ন্যায়
হঙ্কার শ্রবণ করিয়া আমি গােলক হইতে আবার ভুলােকে
আসিলাম, অদ্বৈত মহাপ্রভুর স্তব করিতে লাগিলেন, তবে তুষ্ট
হইয়া মহাপ্রভু অর্জুনের ন্যায় অদ্বৈতকে বিশ্বরূপ দর্শন করাইলেন।
একদিন মহাপ্রভু অদ্বৈতের গৃহে ভক্তগণকে প্রেমভক্তি বিতরণ
করিলেন যথা—(চৈতন্য ভাগবতে)
তবে আচার্যের ঘরে কৈল কৃষ্ণ লীলা।
রুক্মিণী স্বরূপ প্রভু আপনে হইলা ।
কভুদুৰ্গা কভু লক্ষ্মী হয়েন চিচ্ছক্তি।
খাটেবসি ভক্তগণে দিলা প্রেমভক্তি।
মহাপ্রভুর ভক্তগােবিন্দ তাহার কড়চায় মহাপ্রভুর গৃহের ও
পরিবারবর্গের বর্ণনা করিয়াছেন যথা-
।
চৈতন্য লীলামৃত।
৩৯
গঙ্গার উপরে বাড়ী অতি মনােহর।
পাঁচখানা বড় ঘর দেখিতে সুন্দর ।
শান্তমূৰ্ত্তি শচীদেবী অতি খর্বকায়।
নিমাই নিমাই বলি সদা ফুরায়।
বিষ্ণুপ্রিয়া দেবী হন প্রভুর ঘরণী।
প্রভুর সেবায় ব্যস্ত দিবস রজনী।
লজ্জাবতী বিনােদিনী মৃদু মৃদু ভাষ।
মুই হইলাম গিয়া চরণের দাস।
এবাসের গৃহে একদিন নিত্যানন্দ একাকী উপবিষ্ট আছেন
এমন সময় মহাপ্রভু তথায় আগমন করিলেন নিত্যানন্দ মহাপ্রভুকে
প্রণাম করিয়া তব করিতে লাগিলেন। মহাপ্রভু কৃপাকরিয়া
তাহাকে ষড়ভুজরূপ দর্শন করাইলেন। একদিন শুক্লার ব্রহ্মচারী
মহাপ্রভুকে কহিলেন ভগবান আপনি কৃপা করিয়া আমাকে প্রেম
দান করুন যেন আমি হরি আরাধনা করিতে পারি ; মহাপ্রভু
কহিলেন,-
আরাধিততা যদি হরি শুপসা ততঃ কিং।
নাৱাধিতে। যদি হরি শুপসা ততঃ কিম্।
অন্তর্বহি যদি হরি অপসা ততঃ কিং।
নাহি যদি করি শুপসা তত: কিম্।
মহাপ্রভু ব্ৰহ্মচারীকে কহিলেন কলিতে হরিনাম ভিন্ন আর
গতি নাই। হরেনমি হরেনাম করেনামৈব কেবলম্। কলো
নাতে নাতে নাতে গতরন্যা।
ব্রহ্মচারী কহিলেন কি করিয়া হরিনাম করিব। মহাপ্রভু
কহিলেন—তৃণাদপ সুনীচেন তরােৰিব সহিষ্ণুনা। অমানিনা
মানদেন কীর্তনীয়ঃ সারি।
৪ ৫ শ্রীচৈতন্য লীলামৃত হে গৌরভক্তগণ মহাপ্রভুর মুখ নিঃসৃত ও তাহার স্বরচিত এই শ্লোক আপনারা কণ্ঠে ধারণ করুণ। মহাপ্রভু শুক্লাম্বরকে প্রেমদান করিলেন, শুক্লাম্বরের প্রেমে 'লােমকূপ সকল কদম্ব কোড়ক বৎ হইল। একদিন মহা প্রভু মুরারি গুপ্তের গৃহে গমন করিয়া তাহার ঠাকুর ঘরে প্রবেশ করিলেন, মুরারি দ্রুতবেগে তথায় গমন করিয়া দেখিলেন এক অদ্ভুত বরাহ দেবালয়ের দেব সিংহাসনের উপর দণ্ডায়মান হইয়া তর্জন গর্জন করিতেছে। মুরারিকে দেখিয়া সেই বরাহ বলিল আমায় স্তব পাঠ কর, মুরারি আদি বরাহের স্তব পাঠ করিলেন। তৎপরে সেই বরাহ কহিলেন আমি মীন, কুৰ্ম্ম, বরাহ, নরসিংহ, বামন, পরশুরাম রাম, কৃষ্ণ, বুদ্ধ, কল্কি। আমিব্যাস নারদ, হলধর, আমি ব্রহ্মা, শিব। শ্রীবাসের গৃহে সঙ্কীৰ্ত্তন হইত। নবদ্বীপের ব্রাহ্মণ ও কায়স্থগণ অধিকাংশই শাক্ত, তাহারা নবদ্বীপের বিশ্বম্ভরের প্রবর্তিত হরি সঙ্কীৰ্ত্তনের প্রবল বিরােধী হইলেন। মহাপ্রভু শ্রীবাসের গৃহে দ্বার রুদ্ধ করিয়া কীৰ্ত্তন করিতে লাগিলেন। একদিন গােপালচাপাল নামে এক ব্রাহ্মণ ভবানীপূজার উপকরণ লইয়া বাসের গৃহে রাত্রিকালে রাখিয়া দেন, শ্রীবাস প্রাতঃকালে দখিলেন তাহার দ্বার দেশে কলাপাতার উপরে ওড়ফুল হরিদ্রা, সিন্দুর, রক্তচন্দন, তণ্ডুল এবং পার্শ্বে মঙ্গ ভাও কে রাখিয়া গিয়াছে। শ্রীবাস নবদ্বীপের শ্রেষ্ঠ শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিদিগকে ডাকিয়া দেখাইলেন এবং বললেন আমি প্রতি রজনীতে ভবানীপূজা করিয়া থাকি আপনারা তাহার পরিচয় পাইলেন। মহাপ্রভু এই ঘটনায় ব্যথিত হইয়া ক্রোধভরে কহিলেন, পাষণ্ডী সংহারিতে মাের এই অবতার। পাষণ্ডী সংহারি ভক্তি করিব প্রচার। তিনদিন পরে চাপাল গােপালের কুষ্ঠ হইল।
শ্রীচৈতন্য লীলামৃত। ১১ মহাপ্রভু একদিন শ্রীবাসের গৃহে ভক্তগণকে লইয়া দুই প্রহর কাল কীৰ্ত্তন করিলেন ভক্তগণ ক্ষুধার্ত হইয়া পড়িলেন, মহাপ্রভু একটী আমের আঁটি বাস অঙ্গনে প্রােথিত করিলেন, তৎক্ষণাৎ সেই অটী হইতে সদ্য বৃক্ষ হইয়া পৰু আম্রে শাখা প্রশাখা শােভিত হইল। মহাপ্রভু সেই বৃক্ষ হইতে আম পাড়াইয়া শ্রীকৃষ্ণের ভােগ দিয়া ভক্তগণকে এক একটী আম খাইতে দিলেন। একটী আমের অধিক কেহ খাইতে পারিলেন না। মহাপ্রভু, নিত্যানন্দ, হরিদাস বাস অদ্বৈত প্রভৃতি ভক্তগণ সঙ্গে একদিন নবদ্বীপে নগর সঙ্কীর্তনে বহির্গত হইলেন, নিত্যানন্দ প্রভু প্রেমভরে মত্তকরীর ন্যায় ধাবিত হইয়া সকলের অগ্রে বহুদূরে গমন করিয়াছেন এমন সময় সেই পথে জগাই মাধাই নামে দুইজন ব্রাহ্মণ দত্যু নিত্যানন্দের মুখে হরিনাম শ্রবণ করিয়াই বেগে নিত্যাননের নিকট উপস্থিত হইল এবং মাধাই এক টী কলসীর কান। পথিমধ্যে পাইয়া নিত্য নন্দের প্রতি নিক্ষেপ করিল তৎক্ষণাৎ তাহার কপালে লাগিয়া রক্ত নির্গত হইল, নিত্যানন্দ রক্তপাতেও ব্যথিত না হইয়া কহিলেন ওরে মাধাই হরি বলনা। মেরেছ কলসীর কানা, তাই বলে কি প্রেম দিব না। মহাপ্রভুও তাহার সঙ্গীগণ ইতিমধ্যে তথায় উপস্থিত হইলেন এবং নিত্যানন্দের রক্তাক্ত কলেবর ও জগাই মাধাইকে পার্শ্বে দণ্ডায়মান দেখিয়া সমস্ত মৰ্ম্ম অবগত হইয়া স্বীয় চক্রকে স্মরণ কবিলেন, নিত্যানন্দ সেই সুদর্শন চক্রকে অর্থপথে আগত দেখিয়া মহাপ্রভুর দুটী কর ধারণ করিয়া কহিলেন তাই কলিহত পতিত জীবকে উদ্ধার করিতে তুমি অবতার হইয়াছ, তুমি এই অবতারে ইহাদের মত পতিত আর পাইলে ন', ইহারা পবিত্র ঋষিকুলে জন্মগ্রহণ করিয়া গো ব্রাহ্মণদ্রোগ এবং মাতাল ও বেশ্যাশক্ত ૨ শ্রীচৈতন্য লীলামৃত। ৭ ৭৭। ইহাদিগকে উদ্ধার করিয়া তােমার পতিতপাবন নাম সার্থক কর। মাথাই প্রহার করিলে জগাই তাহাকে কত ভৎসনা করিল মহাপ্রভু কহিলেন যখন দয়াল নিতাইয়ের কৃপা হইয়াছে তখন অবশ্যই উদ্ধার হইবে, এই বলিয়া মহাপ্রভু জগাইকে গঙ্গাস্নান করিয়া আসিতে বলিলেন এবং সে গঙ্গায় স্নাত হইয়া পবিত্র হইলে তাহাকে হরিনাম দিয়া উদ্ধার করিলেন, জগাইয়ের প্রেমভক্তি দেখিয়া মাধাইয়ের এতক্ষণে স্বকৃত অপরাধের জন্য অনুতাপ আসিল, সে তখন মহাপ্রভুরও নিত্যানন্দের পদ ধারণ করিয়া বলিল প্রভু আমার গতি কি হইবে। মহাপ্রভু কহিলেন তুমি নিত্যানন্দের অঙ্গে আঘাত করিয়া বৈষ্ণবাপরাধ করিয়াছ অতএব তােমার কোন মতেই নিষ্কৃতি নাই। নিত্যানন্দ কহিলেন আমি এতদিন হরিনাম করিলাম যদি ইহাতে আমায় কিছু পূণ্য হইয়া থাকে তাহা হইলে সেই সমুদয় পুণ্য মাধাইকে দান করিলাম। মহাপ্রভু দেখিলেন মাধাইকে উদ্ধার করাই নিত্যানন্দের একান্ত ইচ্ছা। তাহাকেও গঙ্গাস্নান করিয়া আসিতে বলিলেন সে গঙ্গায় অবগাহন করিয়া পূতত হইয়া আসিল মহাপ্রভু তার কর্ণে কৃষ্ণনাম প্রদান করিলেন। এইরূপে জগাই মাধাই উদ্ধার হইল। এই সময় একদিন মুসলমানগণ চাকাজীকে কহিল বৈষ্ণবগণ রাজপথে মৃদঙ্গ কর তাল লইয়া যেরূপ উচ্চৈস্বরে কীৰ্ত্তন করে তাহাতে আমাদের ধর্মকর্মের বড় ব্যাঘাত হয়। চঁাদকাজী কীৰ্ত্তন বন্ধ করিয়া দিলেন। ভক্তগণকে দুঃখিত দেখিয়া মহাপ্রভু একদিন কীৰ্ত্তনের তিনটা সম্প্রদায় করলেন প্রথম সায়ে হরিদাস, দ্বিতীয় সম্প্রদায়ে অদ্বৈত শেষ সম্প্রদায়ে মহাপ্রভু ও শ্রীচৈতন্য লীলামৃত। - - - গমন করিতে নিত্যানন থাকিলেন। এই তিন সম্প্রদায় কীৰ্ত্তন লইয়া মহাপ্রভু রাজপথ দিয়া নৃত্য করিতে করিতে লাগিলেন। গঙ্গাতীরে তীরে পথ আছে নদীয়ায়। আগে সেই পথে নাচি যায় গৌরয়ায়। আপনার ঘাটে বহু নৃত্য করি। তবে মাধাইয়ের ঘাটে গেল গৌরহরি। বারকোণা ঘাটে নাগরিয়া ঘাটে গিয়া। গঙ্গার নগর দিয়া যায় সিমলিয়া। সর্ব নবদ্বীপে নাচে ত্রিভুবন রায়। গদিগাছ। পারডাঙ্গা আছিদ দিয়া যায়। অবশেষে মহাপ্রভু চাঁদকাজীর গৃহে উপনীত হইলেন। চাদ- কাজী অপরাধ স্বীকার করিয়া ক্ষমা প্রার্থনা করিল এবং কহিল গ্রাম্য সম্পর্কে আমি তােমার মাতুল হই অতএব আমায় অপরাধ লইও না। মহাপ্রভু কাজীকে বিস্তর উপদেশ দিয়া তথা হইতে চলিয়া আসিলেন। এক দিন মহাপ্রভু ব্ৰজের ভাবে বিতাের হইয়া গােপী গােপী বলিয়া জপ করিতেছিলেন, একজন পড়ুয়া শ্রবণ করিয়া বলিল, কৃষ্ণনামের পরিবর্তে গােয়ালিনীর নাম জপ হইতেছে, মহাপ্রভু সেই পড়ুয়াকে প্রহার করতে গেলেন, সে দৌড়িয়া অন্যান্য পড়ুয়াদের নিকটে গেল পড়ুয়াগণ নিমাইয়ের যৎপরােনাস্তি নিন্দা করিতে লাগিল। বিশ্বম্ভর বঙ্গদেশের প্রচলিত বৈষ্ণবধর্মের সংস্কার করেন এবং জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সকলকেই তাহার প্রবর্তিত ধৰ্ম্মে প্রবেশাধিকার দেন এবং ব্রাহ্মণ, যবন, চণ্ডাল, কায়স্থ, বৈদ্য সকলেই বৈষ্ণবধর্ম গ্রহণ করিলে এক গােত্র এক জাতি এক সমাজ, ও কৃষ্ণের উপাসক হইবে এই নিয়ম প্রবর্তন করেন। নিমাই পণ্ডিত বৈষ্ণব হওয়ায় নবদ্বীপের যাবতীয় পণ্ডিত ও পড়ুয়া তার প্রতি বিরুপ হইলেন এবং যথা তথা তাহার নিন্দা করিতে লাগিলেন, নিমাই কৃষ্ণ উপাসনা প্রচারের জন্য ৪০ শ্রীচৈতন্য লীলামৃত অবতার হইয়াছেন, পড়ুয়া পণ্ডিত, মায়াবাদী সন্যাসীগণ যদি তাহাকে অবজ্ঞা করিয়া দূরে দূরে থাকে তাহা হইলে তাহার মৎ উদ্দেশ্য সিদ্ধ হয় না। সন্যাসীকে গৃহী এবং সন্যাসী, পণ্ডিত ও মূখ সকলেই সমাদর করে এবং সন্যাসী সকল শ্রেণীর নিকট ধায় প্রচারের সুবিধা পান, এই যুক্তি স্থির করিয়া নিমাই সন্যাস গ্রহণের সংকল্প করিলেন । এই সময় নবদ্বীপে কাটোয়ার সুবিখ্যাত সাধু সন্যাসী কেশব ভারতী আগমন করিলেন মহাপ্রভু গােপনে তাহার সহিত সাক্ষাৎ করিয়া তাহার নিকট সন্যাস গ্রহণ করিবার জন্য সত্বর কাটোয়ায় গমন করিবেন স্থির করিলেন। মহাপ্রভু এক দিন নিত্যানন্দকে নিভৃতে সন্তাস গ্রহণের কথা কহিলেন এবং নিমাইয়েব জননী, গদাধর, ব্রহ্মানন্দ, চন্দ্রশেখর আচার্য্য ও মুকুন্দ এই পাঁচজনকে এই সংবাদ দিবার জন্য নিত্যানন্দকে বলিয়া দিলেন। ১৪৩১ কে মকর সংক্রান্তির দিনে মহাপ্রভুর সন্তাস গ্রহণের দিন স্থির হই। গদাধর মুকুন্দ মহাপ্রভুর সন্যাস গ্রহণের সংবাদ শ্রবণ করিয়া মর্মাহত হইলেন নিত্যানন্দ যদিও কুমার সন্যাসী তথাপিও তিনি এই সংবাদে ব্যথিত হইয়া বলিলেন, প্রভু গেলে আমি কেমন করিয়া প্রাণ রাখিব। বহু পূর্বেই এই সমাচার নিত্যানন জানিতেন। নিমাই নিতাই এক আত্মা এক দেহ কেবল অভক্তের নিকট দ্বৈত জ্ঞান হয়। নিত্যানন্দ অবধূত সন্যাসী, তিনি জাতিভেদ মানিতেন না, সুবর্ণ বণিক মহাভক্ত উদ্ধারণ দত্ত তাহার শিষ্য ছিলেন নিত্যানন্দকে তিনি অনেক সময় রন্ধন করিয়া দিতেন। নিত্যানন্দ কহিতেন অধম পতিত সুবর্ণ বণিকাতির পরিত্রাণের জন্য আমি অবতার হইয়াছি। বণিকগণ এমন পতিত
শ্রীচৈতন্য লীলামৃত।
৪৫
---
পাবন অধমতারণ দয়াল নিত্যানন্দকে না ভজিয়া আর কাহাকে
ভজিবেন। নিত্যানন্দ ও অদ্বৈত শ্রীবাস অঙ্গনে একদিন মহাপ্রভুর
বিশ্বরূপ দর্শনে বিমােহিত ও প্রেমে মত্ত হইলেন, উভয়ে উভয়ের
গাত্রে ঢলিয়া পড়িলেন। এইরূপে বহুক্ষণ আনন্দ উপভােগ
করিয়া অদ্বৈত তাহার গৃহে গমন করিলেন এবং গৃহের দ্বাররুদ্ধ
করিয়া বিশ্বরূপের ধ্যানে নিমগ্ন আছেন, সহসা নিত্যানন্দ দ্বারভঙ্গ
করিয়া সেই গৃহের ভিতর প্রবেশ করিলে অদ্বৈত তাহাকে
কহিলেন।
দুয়ার ভাঙ্গিয়া আসি সান্ধাইলি কেন।
সন্তাসী করিয়া তােরে কহে কোন জন।
হেন জাতি নাহি না খাইলি যার ঘরে।
জাতি আছে হেন কোন জন কহে তােরে।(চৈতা)
নিত্যানন্দ অদ্বৈতকে কহিলেন
ওরে বুড়া বামুন তােমার ভয় নাই।
আমি অবধূত চন্দ্র, ঠাকুরের ভাই।
স্বীয় পুত্রে গৃহে তুমি পরম সংসারী।
পরমহংসের পথে আমি অধিকারী।
শুনিয়া অদ্বৈত ক্রোধে অগ্নি হেন জ্বলে।
দিগম্বর হইয়া অশেষ মন বলে।
মৎস্য খাও মাংস খাও কেমন সন্যাসী ।
বস্তু এড়িলাম আমি এই দিগবাসী ।
কোথা মাতা পিতা কোন দেশে বা বসতি।
কে জানয়ে ইহা বলুক দেখি সম্প্রতি।
তারে বলি সন্যাসী যে কিছু নাহি চাহে।
কহয়ে সন্যাসী দিনে তিনবার খায়ে।
শ্রীচৈতন্য লীলামৃত শ্রীনিবাস পণ্ডিতের মুলে জাতি নাই। কোথাকার অবধুতে আনি দিল ঠাই । অবধূত করিবে সবার জাতি নাশ । কোথা হইতে মদ্যপের হইল পরকাশ। মহাপ্রভু মকরসংক্রান্তির পূর্বদিনে প্রত্যুষে কাটোয়া যাত্রা করিবেন, জননীকে ভােজনকালে তার সন্তাস গ্রহণের কহিলেন। শচীদেবী এই মর্মভেদী বাক্য করিয়া মূৰ্জিত হইয়া তথায় নিপতিতা হইলে, নিমাই তাহার শুশ্রুষা করিয়া সংজ্ঞা সঞ্চার করিলেন। নিমাই জননীকে কহিলেন তুমি প্রশ্নি, অদিতি দেবহুতি কৌশল্যা, দেবকী প্রভৃতি রূপে কত বার আমার জননী হইয়াছে, তােমার সহিত আমার মাতা পুত্র সম্বন্ধ অচ্ছেদ্য, বৃথা শােক করিও না আমি জগতের কল্যানের জন্য সন্যাস গ্রহণ করিতেছি বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের সমস্ত জীবই আমায় সন্তান। আপনি মােহ মায়ায় মুগ্ধ হইয়া আমার পুত্র বলিয়া কেন রােদন করিতেছেন কস্য ক পুত্র স মােহন্দ্ৰবহি কেবলং। তথাপিও শচীদেবী কহিলেন, অদ্বৈত শ্রীবাসাদি তােমার অনুচর। নিত্যানন্দ আছে তাের প্রাণের সােসর। পরমবান্ধব গদাধর আদি সঙ্গে। গৃহে বহি সঙ্কীৰ্ত্তন কর তুমি রঙ্গে। বুঝাইতে যবেতাের অবতার। জননী ত্যজিয়া ফোন ধর্ম বা বিচার। তুমি ধৰ্ম্মময় যদি জননী ছাড়িবা। কেমনে জগতে তুমি ধৰ্ম বুঝাইবা। অবশেষে নিমাইকে কোন মতেই গৃহে রাখতে পারা যাইবে না বিবেচনা করিয়া শচীদেবী মৌনী হইলেন। বিষ্ণুপ্রিয়া অন্তরালে থাকিয়া সমস্ত শ্রবণ করিয়া নীরবে রােদন করিতেছিলেন নিমাই রজনীতে বিষ্ণুপ্রিয়ার শয়নালয়ে নিদ্রিত এমন সময় বিষ্ণুপ্রিয়া ধীরে শ্রীচৈতন্য লীলামৃত। ৪৭ ধীরে গমন করিয়া পতির পদতলে উপবেশন করিলেন এবং তাহার চরণদ্বয় স্বীয় বক্ষে স্থাপন করিয়া নীরবে রােদন করিতে লাগিলেন তাঁহার উষ্ট অশ্রুকণা নিমাইয়ের গাত্রে পতিত হইবামাত্র তাহার নিদ্রাভঙ্গ হইল। গৌরচন্দ্র তাহার রােদনের কারণ বারম্বার জিজ্ঞাসা করিলেন এবং স্বীয় পরিধেয় বস্ত্র দিয়া তাহার নয়ন জল মুছাইয়া দিলেন। বিষ্ণুপ্রিয়া অবশেষে ব্যাকুল হইয়া কহিলেন, প্রাণনাথ আমার শিরে হস্ত দিয়া বলুন আপনি কি সন্যাসী হইয়া উদাসীর ন্যায় গৃহ পরিত্যাগ করিয়া চলিয়া যাইবেন, আমার এখন নব যৌবন, নারী জন্মের সাধ এখনও মিটে নাই। আমি কত আশা হৃদয়ে পােষণ করিয়া রাখিয়াছি। তােমার মত সৰ্বগুণালঙ্কত পতি পাইয়া আমি আমাকে ভাগ্যবতী মনে করিতাম যথা- আম হেন ভাগ্যবতী, নাহি কোন যুবতী, তুমি মাের প্রিয় প্রাণনাথ। এই আশা ছিল ধ্রুব, নিজদেহ সমর্পিব, এ নব যৌবনে দিবে হাত। (চৈতন্য মঙ্গল।) বিষ্ণুপ্রিয়া দেবী প্রাণকান্তের হস্ত ধারণ করিয়া কহিলেন তােমার শিরীষ কুসুম সম কোমল চরণ বনভূমে কণ্টকাবৃত ও আতপতাপে তােমার মুণ্ডিত মস্তক তাপিত এবং বর্ষার বারিধারায় তােমার সর্বাঙ্গ প্লাবিত হইবে মনে হইলে আর আমার প্রাণে ধৈৰ্য্য থাকে না, ক্ষুধায় কাতর ও তৃষ্ণায় আতুর হইলে যথা কালে কে তােমায় ভক্ষ্য পানীয় দিয়া ক্ষুধা তৃষ্ণা দূর করিবে, পদব্রজে দূরপথ পরিভ্রমণ করিয়া যখন তােমার পদে ব্যথা হইবে, তখন কে তােমার পদ সেবা করিবে, প্রাণনাথ সন্যাস আশ্রম অতি কঠোর
৪
শ্রীচৈতন্য লীলামৃত।
* * *
কষ্টপ্রদ, অতএব তুমি সন্ন্যাস গ্রহণ করিও না, গৃহে বসিয়া
হরিদাস শ্ৰীনিবাস, মুরারি মুকুন্দ, অদ্বৈত, নিত্যানন্দকে লইয়া
হরি প্রেমানলে কালযাপন কর। তুমি সন্ন্যাসী হইলে তােমার
অনাথিনী মাতা কোন মতেই জীবন ধারণ করিবেন না, তুমি
মাতৃহত্যার পাপভাগী হইবে, তােমার ভক্তগণ তােমার বিহনে
জাহ্নবী জীবনে প্রাণ বিসর্জন করিবে তােমার ভক্তবৎসল নামে
কলঙ্ক হইবে। এই দুঃখিনীরও আর কেহ নাই তুমি চলিয়াগেলে
আমাকে কে দেখিবে।
শুনি বিষ্ণুপ্রিয় বাণী, তবে সেই গৌরমণি,
হাসিয়া তুলিয়া নিল কোলে।
বসনে মুছিয়া মুখ, করে নানা কৌতুক
মিছা দুঃখ না ভাবিও বােলে ।
আমি তােরে ছাড়িয়া, সন্ন্যাস করিব গিয়া,
একগা বা কে কহিল তােকে।
যে করি সে করি যবে, তােমারে কহিব তবে,
এখনে না কর মিছা শোকে ।
ইহা বলি গৌর হরি, আশ্লেষ চুম্বন করি,
নানা রস কৌতুক বিহারে।
অনন্ত বিনােদ প্রেম, লীলা লাবণ্যের সীমা,
বিষ্ণুপ্রিয়া তুষিলা প্রকারে।
বিনােদ বিলাস রসে,
ভৈগেল রজনী শেষে,
পুনঃ কিছু পুছে বিষ্ণুপ্রিয়া।
হিয়ার আগুনি আছে,
তেকারণে পুনঃ পুছে,
প্রাণনাথ বদন চাহিয়া ।
শ্রীচৈতন্য লীলামৃত। প্রভুর বুকে দিয়া, পুছে দেবী বিষ্ণুপ্রিয়া, মিছা না কহিও মাের ডরে। হেন অনুমান করি, যত কহ চাতুরী, পলাইবে মাের অগােচরে। তুমি নিজ বশ প্রভু, পরবশ নং কভু, যে করহ আপনার মুখে। সন্যাস করিবে তুমি, কি বলিতে পারি আমি, নিশ্চয় করিয়া কই মােকে । এ বােল শুনিক্ৰা পহু মুচকি হাসিয়া লহু, কহে শুন মাের প্রাণপ্রিয়া। কিছু না করিহ চিতে, যে কহিয়ে তাের হিতে, সাবধানে শুন মন দিয়া। জগতে যতেক দেখ, মিছা করি সব লেখ, সত্য এক সবে ভগবান। সত্য আর বৈষ্ণব, ত। বিনে যতেক সব, মিছা করি করহ গেয়ান। মিছা মুত পতি নারী, পিতা মাতা আদি করি, পরিণামে কেবা কাহার। শ্রীকৃষ্ণ চরণ বহি, আর ত কুটুম্ব নাহি, যত দেখ এ মায়া তাহার। কিবা নারী পুরুখ, সবার সে আত্মা এক, মিছা মায়া বন্ধে হয়ে দুই। শ্রীকৃষ্ণ সবার পতি, আর সব প্রকৃতি, এই কথা না বুঝয়ে কোই।
শ্রীচৈতন্য লীলামৃত কৃষ্ণ ভজিবার তরে, দেহ ধরি এ সংসারে, মায়া বন্ধে পাশরে আপন। অহঙ্কারে মত্ত হৈয়া, নিজ প্রভু পাশরিয়া, শেষে ভােগে নরক যন্ত্রণা। শুন দেবী বিষ্ণুপ্রিয়া, এ তেরে কহিল হিয়া, যখনে যে তুমি মনে কর। আমি যথা তথা যাই, আছিয়ে তােমার ঠাই, সত্য সত্য কহিলাম দৃঢ়। বিষ্ণুপ্রিয়া দেবী কোনও মতেই ধৈৰ্য্য ধারণ করিতে পারি- লেন না, পতির পদতলে পতিতা হইয়া রােদন করিতে লাগিলেন, এই সময় মহাপ্রভু সহসা চতুভুজ হইয়া তাহার সম্মুখে দণ্ডায়মান হইলেন বিষ্ণুপ্রিয়া তথাপি পতিবুদ্ধি পরিত্যাগ করিলেন না। মহাপ্রভু কিছুতেই বিষ্ণুপ্রিয়াকে সান্তনা করিতে না পারিয়া যােগমায়াকে স্মরণ করিলেন তখন দেবী বিষ্ণুপ্রিয়া যােগমায়ার আকর্ষণে নিদ্রাভিভূত হইলেন। যাও দেবী সুখে পতিপার্শ্বে নিদ্রা যাও, তােমার এই নিদ্রা যেন ভঙ্গ না হয়, নিদ্রাভঙ্গ হইলে ইহজীবনে এই নয়নে আর তােমার পতিধনে দেখিতে পাইবে না। মহাপ্রভু চারিদ ও রাত্রি পাকিতে শয্যাত্যাগ করিলেন যাত্রাকালে জননীর সহিত সাক্ষাৎ হইল তাহাকে কহিলেন আপনার ব্যব- হারিক ও পরমার্থিক সমস্ত ভার আমি লইলাম। আপনি রােদন করবেন না,অনন্তর জননীকে প্রণাম করিয়া বিদায় গ্রহণ করিলেন। মহাপ্রভু মকরসংক্রান্তির পূর্বদিবসে প্রত্যুষে নবদ্বীপের পারঘাটে পার হইয়া ভাগিরথীর পশ্চিম কুলে আসিলেন এবং তথা হইতে পদব্রজে সেই দিন অপরাহে কাটোয়ায় কেশব ভারতীর কুটীরে শ্রীচৈতন্য লীলামৃত। ১১৩১ উপস্থিত হইলেন, তাহার পৌছিবার পরক্ষণেই নিত্যানন্দ, গদাধর, মুকুল, চন্দ্রশেখর আচার্য্য ব্রহ্মানন্দ ও তথায় উপনীত হইলেন। পরদিনে নরসুন্দর মহাপ্রভুর মস্তকমুণ্ডন করিতে আসিয়া ব্রাহ্মণ দেখিয়া অগ্রে তাহার চরণস্পর্শ করিয়া প্রণাম করিল, তৎক্ষণাৎ তাহার ত্রিতাপ জ্বালা দূরে গেল, সে ভাবিল ইনি কি গঙ্গাধর, অথবা গঙ্গার নিঝর। মহাপ্রভু মস্তক মুণ্ডন করিয়া ভাগির থিতে অবগাহন করিলেন তাহার সঙ্গীগণ সন্যাসের সমস্ত আয়ােজন করিয়া দিলেন। শকের উত্তরায়ন সংক্রান্তিতে নিমাই সন্যাস গ্রহণ করিলেন। কেশব ভারতী তাহাকে শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য নাম দিলেন। চৈতন্য দেব কাটোয়া হইতে শান্তিপুরে অদ্বৈতের গৃহে উপণীত হইলেন। শচীমাতা সংবাদ পাইয়া নিত্যানন্দের সহিত অদ্বৈতের গৃহে আসিয়া তাহার নিমাইয়ের সন্তাস বেশ দেখিয়া কঁাদিয়া আকুল হইলেন। শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য শান্তিপুরে কিছুদিন জননীর নিকট ভিক্ষা গ্রহণ করিয়া তাহার অনুমতি লইয়া নিত্যানন্দ গদাধর মুকুন্দ গােবিল জগদানন ও ব্রহ্মানন্দের সমভিব্যাহারে নীলাচল যাত্রা করিলেন এবং ভুবনেশ্বর দর্শন করিয়া যথাকালে নীলাচলে উপণীত হইলেন। শ্রীচৈতন্যলীলামৃত। তৃতীয় অধ্যায়। পথিমধ্যে নিত্যানন্দ মুহাপ্রভুর দণ্ডভঙ্গ করিয়া দেওয়ায় মহাপ্রভু ক্রুদ্ধ হইয়া একাকী জগন্নাথের মন্দিরে প্রবেশ করিয়া জগন্নাথ শ্রীচৈতন্য লীলামৃত। বলরাম ও সুভদ্রাকে দর্শন করিলেন। শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য রাধাভাবে বিভাের হইয়া তাহার প্রাণনাথ জগন্নাথকে আলিঙ্গন করিবার জন্য ধাবিত হইয়া অৰ্দ্ধ পথেই মুচ্ছাপ্রাপ্ত হইলেন, পরিছাগণ তাঁহাকে প্রহার করিতে লাগিল, দৈবযােগে সেই সময় তথায় নবদ্বীপের অদ্বিতীয় নৈয়ায়িক বাসুদেব সাৰ্বভৌম উপস্থিত ছিলেন। এই বাসুদেব সাৰ্বভৌমই মিথিলা হইতে ন্যায়শাস্ত্র কণ্ঠস্থ এবং নবদ্বীপে আসিয়া লিপিবদ্ধ করিয়া " নবদ্বীপে, প্রথম ন্যায়ের চতুষ্পটা স্থাপন করেন এবং দীধিতি প্রভৃতি বহু ন্যায় শান্ত্রের গ্রন্থকার রঘুনাথ শিরােমণি বাসুদেবের ছাত্র, যে রঘুনাথ নৈয়ায়িক প্রধান মিথিলার সমগ্র পণ্ডিত মণ্ডলীকে পরাস্ত করিয়া নবদ্বীপের প্রাধান্ত স্থাপন করিয়াছেন এবং নবদ্বীপের নৈয়ায়িকগণ ন্যায়ের উপাধি পরীক্ষা লইতে ও উপাধি দিতে পারিবেন এই অধিকার যিনি সর্বাগ্রে মিথিলা হইতে প্রাপ্ত হইয়াছেন। বাসুদেব সার্বভৌম নবদ্বীপে যবন অত্যাচারের সময় দেশ পরিত্যাগ করিয়া সপরিবারে নীলাচলবাসী হইয়াছেন এবং নিজ পাণ্ডিত্যবলে উড়িষ্যার রাজার সর্বপ্রধান পণ্ডিতের পদে প্রতিষ্ঠিত। বাসুদেব আগন্তুক সন্যাসীকে মুচ্ছাপ্রাপ্ত ও পরি হার হস্তে প্রহৃত দেখিয়া তাহার আলয়ে তাহাকে লইয়া যান। কিছুক্ষণ পরেই নিত্যানন্দ, মুকুন্দ প্রভৃতি ভক্তগণ মহাপ্রভুকে জগন্নাথের মন্দিরে দেখিতে না পাইয়া সন্ধানে সন্ধানে সার্বভৌমের গৃহে উপস্থিত হইলেন, তথায় মুকুলের সহিত সৰ্ব্ব- ভৌমের ভগ্নীপতি ও মহাপ্রভুর ভক্ত নবদ্বীপবাসী গােপীনাথ আচার্যের সাক্ষাৎ হইল, গােপীনাথ মুকুলের নিকট সমুদয় অবগত হইয়া তাহাদিগকে গৃহাভ্যন্তরে মহাপ্রভুর নিকট লইয়া গেলেন।
শ্রীচৈতন্য লীলামৃত। ১) • - ২ সার্বভৌম যে সন্যাসীকে গৃহে আনিয়া সেবা শুশ্রুষা করিতেছেন ইনি নবদ্বীপের নীলাম্বর চক্রবর্তীর দৌহিত্র এবং জগন্নাথ মিশ্রের পুত্র বিশ্বম্ভর, এই পরিচয় গােপীনাথের নিকট নিকট পাইয়া সার্বভৌম নবদ্বীপের সম্বন্ধ ধরিয়া পরম প্রীত হইলেন এবং কহিলেন “নীলাম্বর মহাশয় আমার পিতার সহধ্যায়ী ছিলেন।” গােপীনাথ আচাৰ্য্য নিত্যানন্দ মুকুন্দ প্রভৃতি ভক্তগণকে লইয়া জগন্নাথ দর্শন করাইতে গেলেন, সার্বভৌম তাহাদের সমভিব্যাহারে স্বীয় পুত্র চন্দনেশ্বরকে পাঠাইলেন। নিত্যানন্দ জগন্নাথ দর্শন করিয়াই প্রেমে পুলকিত হইয়া মূচ্ছ। প্রাপ্ত হইলেন। ভক্তগণ সাৰ্বভৌমের গৃহে প্রত্যাগত হইয়া দেখিলেন, মহাপ্রভুর পদ হলে সাব্বভৌম বসিয়া আছেন তিন প্রহরেও মহাপ্রভুর মূচ্ছ। ভঙ্গ হয় নাই, ভক্তগণ হারধ্বনি করিতে লাগিলেন, কিছুক্ষণ পরেই চৈতন্যদেব প্রকৃতিস্থ হইলেন। সাধ্বভৌম চৈতন্যদেবকে কহিলেন সহজেই আপনি পূজ্য তাহাতে সন্যাসী হইয়া পরম পূজ্য হইয়াছেন, সার্বভৌম গােপীনাথের নিকট অবগত হইলেন মহাপ্রভুর সাসের নাম শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য এবং ইনি কেশব ভারতীর শিষ্য । সার্বভৌম সন্যাসীর আশ্রমের পরিচয় পাইয়া কহিলেন, ইনি শঙ্করাচার্যের দশনামী সম্প্রদায়ের অন্তর্বর্তী এবং ইনি বৈষ্ণব সন্যাসী পরিচয় দিলেও, আমি ইহাকে নিরন্তর বেদান্ত শ্রবণ করাইয়া অদ্বৈত জ্ঞানমার্গে লইয়া যাইব এবং সন্যাসীর কর্তব্য পালন করাইব। গােপীনাথ আচাৰ্য কহিলেন তােমার বেদান্ত প্রতিপাদ্য অদ্বিতীয় ব্ৰহ্ম যিনি তাহাকে তুমি বেদান্ত শ্রবণ করাইবে। ১। আসন বর্ণায়ােশ্য গৃহ্নােহনুযুগং তনু।
৫৪ শ্রীচৈতন্য লীলামৃত। = ২ - - - - শুক্লোরক্তস্থথা পীত ইদানীং কৃষ্ণং গতঃ । ২। কৃষ্ণবর্ণং ত্বিষাকৃষ্ণং সাঙ্গোপাঙ্গাস্ত্র পার্ষদ যজ্ঞৈঃ সঙ্কীৰ্ত্তন প্রায়ৈজন্তি হি সুমেধসঃ। ৩। সুবর্ণ বর্ণো হেমাঙ্গো বরাঙ্গননাঙ্গদী। সন্যাসকৃৎ সমঃ শান্তে। নিষ্টা শান্তি পরায়ণ। ভাগবতের প্রথম দুই শ্লোক এবং মহাভারতের শেষ শ্লোক গৌরাঙ্গ অবতারেরই ভবিষ্যদ্বাণী। মহাপ্রভু শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য সার্বভৌমের আদেশমত সন্যাসধর্ম পালনের জন্য বেদা শ্রবণ করিতে লাগিলেন। সাতদিন শ্রবণ করিলে সার্বভৌম তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন বেদান্ত বুঝিতে পারিতেছ ? শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য সাতদিন বেদান্তের যে সকল শ্লোক ও ব্যাখ্যা শ্রবণ করিয়াছিলেন মুখস্থ আবৃত্তি করিয়া কহিলেন বেদান্ত সুত্রের অর্থ বুঝিতে পারিয়াছি কিন্তু আপনি মুখ্যার্থ পাণ্ডিত্য বলে আচ্ছাদন করিয়া গৌণার্থ লইয়া যে ব্যাখ্যা করেন সেই ব্যাখ্যা শ্রবণ করিয়া আমার মস্তিষ্ক বিবৃত হইয়া যায়। শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য সার্বভৌমকে কহিতে লাগিলেন ষড়ৈশ্বর্য্য পরিপূর্ণ যিনি সাকায় সগুণ ভগবান আপনি তাহাকে নিরাকার নিগুণ ব্রহ্ম বলিয়া ব্যাখ্যা করেন কিন্তু বেদ, বেদান্ত, উপনিষদাদির তাৎপর্য তাহা নহে। মায়াবাদ অসৎ শাস্ত্রেই আছে। মায়াবাদ অসচ্ছাং প্রচ্ছন্ন বৌদ্ধ মুচ্যতে। ময়ৈব বিহিতং দেব কলৌ ব্রাহ্মণমূৰ্ত্তিন। শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য, সার্বভৌমকে কহিলেন আত্মারামাশ্চ মুনয়ে। নিগ্র অপুরুমে। কুর্বত্য হৈতুকীং ভক্তি মিখস্তৃত গুণে। হরি। আপনি এই শ্লোকের ব্যাখ্যা করুন সার্বভৌম পাণ্ডিত্য প্রতিভায় ঐ শ্লোকের নয়প্রকার ব্যাখ্যা করিলেন। শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য ঐ শ্রীচৈতন্য লীলামৃত। শ্লোকের অষ্টাদশ প্রকার নূতন ব্যাখ্যা করিলেন । সার্বভৌম শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্যের পাণ্ডিত্য ও প্রেম দেখিয়া তাহাকে ঈশ্বর বলিয়া বিশ্বাস করিলেন অবশেষে তাঁহাকে নমঃ ব্ৰহ্মণ্যদেবায় বলিয়া প্রণাম করিলেন মহাপ্রভুও তখন তাহাকে তাহার ষড়ভূজ গৌরাঙ্গ মুর্তি দর্শন করাইলেন। মায়াবাদী সাৰ্বভৌম পরম বৈষ্ণব হইলেন এবং জগন্নাথের মহাপ্রসাদে তাহার ভক্তি হইল, সার্বভৌম হৈল প্রভুর ভক্ত একতান। মহাপ্রভু বিনে সেব্য নাহি জানে আন। শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য শচীমুত গুণধাম। এই ধ্যান এই জপ এই লয় নাম। মহাপ্রভু তাহার অগ্রজ বিশ্বরূপের সন্ধানে সেতুবন্দ রামেশ্বর যাত্রা করিলেন। ভক্তগণ বিশেষ অনুরােধ করিয়া কৃষ্ণদাস নামে এক ব্রাহ্মণকে তাহার সঙ্গে দিলেন। সার্বভৌম বলিয়া দিলেন, বিদ্যা- নগরের অধিপতি রামানন্দ রায় নামে একজন ভক্ত পণ্ডিত আছেন, তঁাহার সহিত সাক্ষাৎ করিবেন। তাহাকে শূদ্র বিষয় জ্ঞানে উলেক্ষা করিবেন না। মহা প্রভু দক্ষিণদেশে গমন করিয়া পথিমধ্যে গােদাবরী তীরে রামানন্দ রায়কে দেখিতে পাইলেন এবং পরিচয় লইয়া তাহাকে আলিঙ্গন করিয়া কহিলেন, তুমি ভাগবতােত্তম, তােমাকে দর্শন করিয়া আমি মায়াবাদী সন্ন্যাসী আমিও কৃষ্ণপ্রেম সাগরে ভাসিতেছি। রামানন্দ কহিলেন আপনি সাক্ষাৎ ঈশ্বর নারায়ণ, আমি রাজসেবী বিষয়ী শূদ্ৰাধম। মহাপ্রভু কহিলেন একদিন সার্বভৌম কহিয়াছিলেন রামানন্দ রায় ভিন্ন শ্রীকৃষ্ণের নিগুঢ় তত্ত্ববেত্তা এখানে কেহ নাই। মহাপ্রভু কহিলেন কিবা বিপ্র কিবা ন্যাসী শুদ্র কেনে নয়। যেই কৃষ্ণতত্ববেত্তা সেই শুরু হয়। মহাপ্রভুর সহিত রামানন্দের প্রেমভক্তির আলাপন রজনীতে অনেকক্ষণ হইল। প্রভু কহে কোন শ্রীচৈতন্য লীলামৃত। বিদ্যা বিদ্যামধ্যে সার। রায় কহে কৃষ্ণ ভক্তি বিনা বিদ্যা নাহি আর। কীর্তিগণ মধ্যে জীবের কোন বড় কীৰ্ত্তি। কৃষ্ণপ্রেম ভক্ত বলি যার হয় খ্যাতি। সম্পত্তি মধ্যে জীবের কোন সম্পত্তি গণি। রাধাকৃষ্ণ প্রেম যার সেই বড় ধনী। দুঃখ মধ্যে কোন দুঃখ হয় গুরুতর । কৃষ্ণভক্ত বিরহ বিনু দুঃখ নাহি আর। মুক্ত মধ্যে কোন জীব মুক্ত করি মানি। কৃষ্ণপ্রেম যার সেই মুক্ত শিরােমণি। গান মধ্যে কোন গান জীবের নিজ ধৰ্ম্ম। রাধাকৃষ্ণ প্রেমকেলি যে গীতের মর্ম । শ্রেয় মধ্যে কোন শ্রেয়ঃ জীবের হয় সার। কৃষ্ণভক্ত সঙ্গ বিনা শ্রেয়ঃ নাহি আর। কাহার স্মরণ জীব করে অনুক্ষণ। কৃষ্ণনাম গুণ লীলা প্রধান স্মরণধ্যেয় মধ্যে জীবের কৰ্তব্য কোন ধ্যান। রাধাকৃষ্ণ পদাম্বুজ ধ্যান প্রধান। সৰ্ব্ব ত্যজি জীবের কৰ্তব্য কোথা বাস। ব্রজভূমি বৃন্দাবন যণ লীলা রাস। শ্রবণ মধ্যে জীবের কোন শ্রেষ্ঠ শ্রবণ । রাধাকৃষ্ণ প্রেম কেলি কর্ণ রসায়ন। উপাস্যের মধ্যে কোন উপাস্য প্রধান। শ্রেষ্ঠ উপায় যুগল রাধাকৃষ্ণ নাম। মুক্তি ভুক্তি বাঞ্ছে যেই কোথা দুয়ের গতি। স্থাবর দেহ দেব দেহ যৈছে অবস্থিতি। রামানন্দ মহাপ্রভুর অপরূপ রূপ দেখিয়া কহিতেছেন পহিলে দেখি তােম। সন্ন্যাসী স্বরূপ। এবে তােম। দেখি মুই শ্যাম গােপরূপ। তােমার সম্মুখে দেখি কাঞ্চন পঞ্চালিকা। গৌরকান্তি তােমার সর্ব অঙ্গ ঢাকা। রাধিকার ভাবকান্তি করি অঙ্গীকার। নিজরস আস্বাদিতে করিয়াছ অবতার। মহাপ্রভু তাহাকে কহিলেন তুমি মহাভাগবত সেইজন্য সর্বত্র তোমার শ্রীকৃষ্ণের স্ফুরণ হইতেছে। রামরায় কহিলেন আমার সহিত তােমার চাকুরী চলিবে না। তবে হাসি তারে প্রভু দেখাইল শ্রীচৈতন্য লীলামৃত। স্বরূপ। রসরাজ মহাভাব দুই এক রূপ। আলিঙ্গন করি প্রভু কৈল আখাসন। তােমা বিনা এইরূপ না দেখে কোন জন। গৌর অঙ্গ নহে মাের রাধাঙ্গ স্পর্শন। গােপেন্দ্র সুত বিনা তেঁহহ স্পর্শে অন্যজন। তার ভাবে ভাবিত আমি করি আত্মমন। তবে নিজ মাধুৰ্য রস করি আস্বাদন। মহাপ্রভু রামানন্দকে কছিলেন তুমি বিষয় পরিত্যাগ করিয়া নীলাচলে যাও, আমি তীর্থ করিয়া তােমার সহিত তথায় মিলিত হইয়া কৃষ্ণ কথায় কাল কাটাইব। মহাপ্রভু রামানন্দের রামানদের নিকট বিদায় লইয়া তীর্থে মহাভক্ত বেঙ্কট ভট্টের ভট্টের গৃহে চাতু- স্মাহ উদযাপন করেন। তথা হইতে পাণ্ডুপুরে আসিয়া বিঠঠল ঠাকুর দর্শন করিলেন এই স্থানে মাধবেন্দ্র পুরীর শিষ্য শ্রীর পুরীর সহিত সাক্ষাৎ হওয়ায় তাহার নিকট শ্রবণ করিলেন এই তীর্থে মহাপ্রভুর অগ্রজ বিশ্বকাপের সিদ্ধি প্রাপ্তি হইয়াছে তৎপরে সেতুবন্ধ রামেশ্বর ও অন্যান্য তীর্থ করিয়া প্রত্যা- গমনকালে পুনরায় রামানন্দের সহিত মিলিত হইয়া নীলাচলে উপনীত হইলেন। দক্ষিণ দেশ হইতে মহাপ্রভু কৃষ্ণকর্ণামৃত ও ব্ৰহ্মসংহিতা নামে দুইখানি গ্রন্থ আনয়ন করেন। মহা প্ৰতু দক্ষিণ দেশ উদ্ধার করিয়া নীলাচলে আসিয়াছেন এই সংবাদ পাইয়া হরিদাস, বাসুদেব দত্ত, মুরারি, শ্ৰীমান শ্ৰীধর, রাঘব, অচ্যুত, কুলীন গ্রামের সত্যরাজ বসু ও রামানন্দ বসু,খণ্ডের মুকুন্দ,নরহরি, রঘুনন্দন প্রভৃতি ভক্তগণ মহাপ্রভুকে দেখিতে নীলাচলে আসিলেন মহাপ্রভু রাত্রিদিন কৃষ্ণরসে আনন্দে বিহ্বল। বিদ্যাপতি, চণ্ডি দাস ও গীত গােবিন্দের পদই তাহার একমাত্র অবলম্বন। জগন্নাথের রথযাত্রা আগত প্রায়, মহাপ্রভু স্বহস্তে সম্মার্জনী লইয়া ৫৮ শ্রীচৈতন্য লীলামৃত। এবং ভক্তদিগের হস্তে এক একটী সম্মার্জনী দিয়া গুণ্ডিচা মন্দির মার্জন করিলেন। মহাপ্রভুর ভক্ত সঙ্গে গুণ্ডিচামন্দির মার্জন এক অপরূপ প্রেমের লীলা। মহাপ্রভুর সহিত ভক্তগণ রথযাত্রাকালে জগন্নাথের সম্মুখে মৃত্যাদি করিয়া দেশে গমন করিলেন মহাপ্রভুও কিছুদিন পরে গৌড়ে আগমন করিলেন এবং কুলীয়াতে দেবানন্দকে কৃপা করিয়া, পরে চাপাল গােপালের অপরাধ কুলিয়ার পাটে ভঞ্জন করিলেন। তদবধি সম্বৎসরের অপরাধ ভঞ্জন করিবার জন্য কত অপরাধী, কত কুলটা কুলের পাটে বৎসরান্তে এক বার গমন করেন। মহাপ্রভু কুলিয়া হইতে শান্তিপুরে গমন করিলেন। শচী মাতা সংবাদ পাইয়া শান্তিপুরে আসিলেন। শান্তিপুর হইতৈ গৌড় নগরের নিকট রামকেলী গ্রামে গমন করিয়া গৌড়াধিপের সাকর মল্লিক ও দবিরখাস নামক উজীর দ্বয়কে কৃপা করিলেন এবং তাহাদের দুই ভ্রাতার নাম যথাক্রমে রূপ ও সনাতন রাখিলেন। মহাপ্রভু তথা হইতে পুনরায় শান্তিপুরে আগমন করিলেন। সপ্ত, গ্রামের সুবিখ্যাত গােবন মজুমদারের পুত্র রঘুনাথ দাস মজুমদার শান্তিপুরে আসিয়া মহাপ্রভুর পদতলে পতিত হইয়া মহাপ্রভুর অনুচর হইবার জন্য প্রার্থনা করিলেন। তাহাকে উপদেশ দিলেন -মর্কট বৈরাগ্য না কর লােক দেখাইয়া। যথাযােগ্য বিষয় ভুঞ্জ অনাসক্ত হৈয়া। অন্তনিষ্ঠা কর, বাহ্যে লােক ব্যবহার। অচিরাতে কৃষ্ণ তােমায় করিবে উদ্ধার। বৃন্দাবন দেখি যবে আসি নীলাচলে। তবে তুমি আমা পাশ আসিও কোন ছলে। সে কালে সে ছল কৃষ্ণ ফুরাবে তােমারে। কৃষ্ণকৃপা যারে, তারে কে রাখিতে পারে। মহাপ্রভু শান্তিপুরে মাতা ও ভক্তগণের নিকট বিদায় লইয়া পুনরায় নীলাচলে গমন করিলেন মা গ্র
শ্রীচৈতন্য লীলামৃত।
এবং নীলাচলে কিছুদিন অবস্থান করিয়া বলভদ্র ভট্টাচাৰ্য্যকে সঙ্গে
লইয়া বৃন্দাবন যাত্রা করিলেন। মহাপ্রভু কটক দক্ষিণে রাখিয়া
বনপথে গমন করিতে লাগিলেন এবং নানা দেশের লােককে
হরিনাম দিয়া উদ্ধার করিয়া অবশেষে কাশীতে উপনীত হইয়া
চন্দ্রশেখরের গৃহে উপস্থিত হইলেন।
কাশীতে লেখক শূদ্র চন্দ্রশেখর।
তার ঘরে রহিল। প্রভু স্বতন্ত্র ঈশ্বর।
মিশ্রের সখা হেঁহো প্রভূর পূৰ্ব্বদাস।
বৈদ্য জাতি, লিখন বৃত্তি, বারাণসীবাস।
তপন মিশ্রের ঘরে প্রভুর ভােজন।
বলভদ্র ভট্টাচাৰ্য করয়ে রন্ধন। (চৈতন্যচরিতামৃত)
শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য গার্হস্থাশ্রমে যেরূপ বর্ণাশ্রম ধর্ম পালন করতেন
সন্ন্যাস আশ্রমও সেইরূপ পালন করিতেছেন। শূদ্রের গৃহে ও
সকল বিপ্রের হস্তে ভােজন করেন না। কাশীর এক বিপ্র চৈতন্য
দেবকে দেখিয়া ভক্তিরসে আপ্লুত হইল মহাপ্রভু তাহাকে কৃষ্ণ
কীৰ্ত্তন করিতে উপদেশ দিলেন। সেই বিপ্র একদিন প্রকাশানন্দ
সরস্বতীনামে কাশীর সর্ব প্রধান বৈদান্তিকের নিকট চৈতন্থ দেবের
প্রশংসা করিলেন।
শুনিয়া প্রকাশান বহুত হাসিলা।
বিপ্রে উপহাস করি কহিতে লাগিল।
শুনিয়াছি গৌড়দেশে সন্ন্যাসী ভাবুক।
কেশব ভারতী শিষ্য, লােক প্রতারক।
চৈতন্য নাম তার ভাবুকগণ লৈয়া ।
দেশে দেশে গ্রামে গ্রামে বুলে নাচাইয়া।
শ্রীচৈতন্য লীলামৃত। যে তারে দেখে সেই ঈশ্বর করি কহে। ঐ ছে মােহন বিদ্যা যে দেখে সে মােহে। সার্বভৌম ভট্টাচাৰ্য পণ্ডিত প্রবল। শুনি চৈতন্যের সঙ্গে হইল পাগল। সন্ন্যাসী নামমাত্র মহা ইন্দ্রজালী। কাশীপুরে না। বিকাবে তার ভাব কালী। বেদান্ত শ্রবণ কর না যাইহ তার পাশ। উচ্ছল লােক সঙ্গে দুই লােক নাশ। মহাপ্রভূ প্রকাশানন্দের কথা শুনিয়া কহিলেন- ভাব কালী বেচতে আমি আইলাম কাশীপুরে। গ্রাহক নাহি, না বিকায়, লয়ে যাব ঘরে। (চৈতন্যচরিতামৃত) মহাপ্রভু প্রকাশানন্দকে উপেক্ষা করিয়া মথুরায় ও বৃন্দাবনে গমন করিলেন এবং তথায় লীলাস্থল দেখিয়া প্রেমাকুল হইলেন। বলভদ্র তাহাকে ভুলাইয়া প্রয়াগে এইস্থানে রূপ গগাস্বামীর সহিত সাক্ষাৎ হইল, মহাপ্রভু তাহাকে ভক্তি শিক্ষা দিয়া মথুরায় পাঠাইলেন। মহাপ্রভু তথা হইতে কাশীতে পুনরাগমন করিয়া সনাতনকে দেখিতে পাইলেন, তাহাকে ভক্তিশিক্ষা দিয়া বৃন্দাবনে পাঠাইলেন। গৌড়াধিপ হুসেন খ। এক সময় গৌড়ের কায়স্থ রাজা সুবুদ্ধি রয়ের ভৃত্য ছিলেন সেই সময় কোন অপ- রাধের জন্য সুবুদ্ধি রায় তাহাকে বিষম প্রহার করেন, তাহাতে তিনি দুঃখিত হইয়া কৰ্ম্ম ত্যাগ করিয়া বাদসাহের সৈনিক শ্রেণীতে প্রবেশ করেন। অবশেষে বঙ্গে আসিয়া কৌশলে সুবুদ্ধি রায়কে সিংহাসনচ্যুত করিয়া রাজা হন। হােেেসনের বেগম একদিন তাহার স্বামীর পৃষ্ঠের প্রহারের চিহু দেখাইয়া সুবুদ্ধি রায়ের প্রাণ আনিলেন, শ্রীকৃষ্ণচৈতন্যলীলামৃত। হইল। দণ্ডের আদেশ প্রার্থনা করেন। হােসেন সাহ পূর্ব উপকার স্মরণ করিয়া তাহার প্রাণদণ্ড না দিয়া তাঁহার মুখে মুসলমানের কড়ােয়ার পানী দেওয়াইলেন। সুবুদ্ধি রায় সংসার ত্যাগ করিয়া বারাণসী আসিয়া পণ্ডিতদিগের নিকট প্রায়শ্চিত্ত ব্যবস্থা চাহেন তাঁহারা তাহাকে তপ্ত ঘৃত পান করিয়া প্রাণত্যাগ করিতে ব্যবস্থা দেন। সুবুদ্ধি রায় বারাণসীতে মহাপ্রভুকে দেখিতে পাইয়া প্রায়শ্চিত্তের ব্যবস্থা চাহেন—প্রভু কহে ইহ হৈতে যাহ বৃন্দাবন। নিরন্তর কর কৃষ্ণনাম সঙ্কন। এক নামাভাসে তোমার পাপ দোষ যাবে। আর নাম 'ৈতে কৃষ্ণ চরণ পাইবে। কাশীর এক মহারাষ্ট্রীয় ব্রাহ্মণের বাটীতে মহাপ্রভু নিমন্ত্রিত হইয়া গমন করিয়াছেন, তথায় প্রকাশানন্দ সরস্বতীর সহিত সাক্ষাৎ প্রকাশানন্দ মহাপ্রভুকে কহিলেন,—“আপনি সন্ন্যাসী হইয়া বেদান্ত পাঠ কিম্বা শ্রবণ না করিয়া নৰ্তন কীৰ্ত্তন কেন করেন। মহাপ্রভু কহিলেন গুরু আমাকে মুখ দেখিয়া বেদান্ত পাঠে অধিকার দেন নাই। ঈশ্বর পুরী ও কেশব ভারতী আমার কর্ণে কি মন্ত্র দিলেন, জপিতে জপতে সেই মন্ত্র আমায় পাগল করিয়াছে তাহাতে আমার স্বেদ কম্প রােমাঞ্চা গদগদ বৈবর্ণ উন্মাদ বিষাদ, ধৈৰ্য্য, গৰ্ব্ব হর্ষ দৈন্ত হয়। মহাপ্রভুর নিকট ভক্তি শাস্ত্রের ব্যাখ্যা শুনিয়া এবং মহাপ্রভুর প্রেম ও ভক্তি দেখিয়া প্রকাশানন ও তাহার ৬০ হাজার শিষ্য মহা ? ভুর শিষ্যত্ব গ্রহণ করিয়া বৈষ্ণব হইলেন। এইরূপে কাশীর সন্ন্যাসীদিগকে উদ্ধার করিয়া মহাপ্রভু নীলাচলে পুনরাগমন করিলেন। মহাপ্রভু চব্বিশ বর্ষ বয়সে সন্ন্যাসী হইয়া ছয় বৎফর নানাতীর্থ পৰ্যটন করিয়া সকলকে কৃষ্ণভক্তিও প্রেম দিয়া একাধিক্রমে অষ্টাদশ বৎসর
শ্ৰীকৃষ্ণচৈতন্যলীলামৃত।
নীলাচলে বাস করেন। তিনি কৃষ্ণ বিরহ ব্যথিত। দশমদশা
প্রাপ্তা শ্রীমতী রাধার ন্যায় হা হতােস্মি করিয়া নীলাচলে কাল
যাপন করেন। সপ্তগ্রামের সুবিখ্যাত জমিদার গোবর্ধন দাসের
পুত্র রঘুনাথ দাস বৈরাগ্য লইয়া নীলাচলে মহাপ্রভুর চরণ প্রান্তে
উপনীত হইলেন। মহাপ্রভু তাহাকে উপদেশ দিলেন,
বৈরাগী করিবে সদা নাম সঙ্কীৰ্ত্তন।
মাগিয়া খাই করিবে জীধন ধারণ।
বৈরাগী হইয়া যেবা করে পরাপেক্ষা।
কাৰ্যসিদ্ধি নহে, কৃষ্ণ করেন উপেক্ষা।
বৈরাগী হইয়া করে জিহ্বার লালস।
পরমার্থ যায় তা হয় রসের বশ।
বৈরাগীর কৃত্য সদা নাম সঙ্কীৰ্ত্তন।
শাক পত্ৰ ফল মূলে উদর ভরণ। .
জিহ্বার লালসে যেই ইতি উতি ধায়।
শিশ্লোদর পরায়ণ কৃষ্ণ নাহি পায় ।
গ্রাম্য কথা না শুনবে, গ্রাম্য কথা না কহিবে।
ভাল না খাইবে, আর ভাল না পরিবে।
অমানী মানদ কৃষ্ণ নাম সদা লবে।
ব্রজে রাধাকৃষ্ণ সেবা মানসে করিবে।
নীলাচলে একদিন মহাপ্রভুব কীৰ্ত্তনীয়া ছােট হরিদাস মাধবী
নামে এক বৃদ্ধ। তপস্বিনী বৈষ্ণবীর 'নকট গমন করিয়া বলেন
মহাপ্রভুর সেবার জন্য ভগবান আচাৰ্য্য চাউল চাহিতেছেন
মাধবীদেবী উৎকৃষ্ণ চাউল ভিক্ষা দিলেন, মহাপ্রভু সেই উৎকৃষ্ণ
চাউলের অন্ন ভােজন কালে জ্ঞাত হইলেন, হরিদাস এই চাউল
শ্ৰীকৃষ্ণচৈতন্যলীলামৃত।
মাধবীর নিকট ভিক্ষা করিয়া আনিয়াছে। মহাপ্রভু গৃহে আসিয়া
গােবিন্দকে কহিলেন ছােট হরিদাস বৈরাগী হইয়া স্ত্রীলােকের
সহিত কথা কহিয়াছে উহাকে আর আমার নিকট আসিতে দিবে
না। স্বরূপাদি ভক্তগণ মহাপ্রভুকে জিজ্ঞাসা করিলেন হরিদাসকে
আপনি আসিতে নিষেধ করিয়াছেন কেন।
প্রভুকহে বৈরাগী করে প্রকৃতি সম্ভাষণ।
দেখিতে না পারি আমি ভাঙ্গার বদন।
দুৰ্ব্বায় ইন্দ্রিয়করে বিষয় গ্রহণ।
দারী প্রকৃতি হরে মুনেপি মন।
ক্ষুদ্রজীব সব মর্কট বৈরাগ্য করিয়া।
ইন্দ্রিয়চড়া বলে প্রকৃতি সম্ভাষিয়া।
প্রভু কহে মাের বশ নহে মাের মন।
প্রকৃত সম্ভাষী বৈরাগী না করে দর্শন।
ছােট হরিদাসকে মহাপ্রভু কিছুতেই গ্রহণ না করায় তিনি
অবশেষে এই পাপের প্রায়শ্চিত্তের জন্য প্রয়াগে প্রাণত্যাগ করেন।
মহাপ্রভু কৃপাসিন্ধু কে পারে বুঝিতে।
প্রিয় ভক্তে দণ্ডকরে ধৰ্ম্ম বুঝাইতে।
দেখি ত্রাস উপজিল সব ভক্তগণে।
সপ্নেও ছাড়িল সবে স্বীসম্ভাষণে।
মহাপ্রভু ভক্তগণের সহিত নীলাচলে বিবিধ লীলা করিয়া
১৪৫৫ শকাব্দায়, আষাঢ় মাসে কৃষ্ণ সপ্তমীতিথিতে রবিবারে বেলা
তৃতীয় প্রহরে জগন্নাথের মন্দিরে প্রবেশ করিয়া তাহার গৌর রাধা
অঙ্গ জগন্নাথের শ্যামাজে লীন করিলেন।
সম্রমে উঠিয়া জগন্নাথ দেখিবারে।
ক্রমে ক্রমে গিয়া উত্তরিলা সিংহদ্বারে।
৬৪ শ্ৰীকৃষ্ণচৈতন্যলীলামৃত। --- ------ AWA সঙ্গে নিজ জন যত তেমতি চলিল। সত্বরে মন্দির ভিতবে উত্তরিল । নিরখে বদন প্রভু দেখিতে না পায়। সেই খানে মনে প্রভু চিন্তিলা উপায় । তখনে দুয়ারে নিজ লাগিল কপাট । সত্বরে চলিয়া গেল অন্তরে উচাট । তৃতীয় প্রহর বেলা রবিবার দিনে। জগন্নাথে লীন প্রভু হইল। আপনে । শ্রীকৃষ্ণচৈতন্যের তিরােভাবের পরে নবদ্বীপের পশ্চিমবাহিনী গঙ্গা পূৰ্ববাহিনী হইলেন। নবদ্বীপেশ্বর্য। যােগায়া পরামত বা পােড়া ম নবদ্বীপকে গঙ্গার পশ্চিমকুলে পাইয়া বারাণসী সমতুল করিলেন। অদ্বৈত প্রভু ১৭৬৩ শকে ঝুলন পূর্ণিমায় শান্তিপুরে জিয়কৃষ্ণ গােস্বামীরূপে, নিত্যানন প্রভু ১৭ ৬ শাকের ১০ই ফাল্গুন শুক্লপক্ষীয় দ্বিতীয়ায় কামারপুকুর গ্রামে কামিনীকাঞ্চন ত্যাগ ভগবান গদাধর শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংস রূপে এবং গৌরাঙ্গ মহাপ্রভু ১৭৭৮ শকে ১৩ই চৈত্র অশােকাষ্টমীতে পানিহাটী গ্রামে সর্বধৰ্ম্ম সমন্বয়কারী ভগবান্ নিত্যগােপাল-ঐশ্রীজ্ঞানন অবধূতরূপে আবর্ভূত হইয়াছিলেন। ৪৩০ চৈতন্যাব্দে আষাঢ় মাসে রথযাত্রার দিবসে দক্ষিণ রাঢ়ীয় কায়স্থ ভরদ্বাজ গােত্র মহাদেব দত্তের বৃদ্ধ প্রপৌত্র, নরহরির প্রপৌত্র, রামচাদের পৌত্র, রামগোপাল ও গিরিবালার পুত্র, যতীন্দ্রমােহনের অনুজ ও দাশরথির অগ্রজ নবদ্বীপনিবাসী হরেন্দ্রকৃষ্ণ দত্ত কর্তৃক শ্রীকৃষ্ণচৈতন্যলীলামৃত গ্রন্থ রচনা সমাপ্ত হইল। গৌরভক্তণ অভক্ত গ্রন্থকারের ত্রুটী মার্জন। করিবেন ইতি । = = = =
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.