Bally Sadharan Granthagar

Sadhabar Sanjam Ed. 1st

Swami, Swarupanand · 2010/02/20

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

***গর
সধবার সংযম
ছােটনাগপুরের অন্তর্গত একশত বিঘা-ভূমি-ব্যাপী
পুপুকী-অযাচক-ব্রহ্মচর্য-আশ্রমের
প্রতিষ্ঠাতা
শ্রীমৎ স্বামী (স্বরূপানন্দ পরমহংস
প্রণীত
থম সংর।
ফান, ১৩৪১
All Rights Reserved By the Author
Author
পুপুকী-অযাচক-ব্ৰহ্মচৰ্য-আশ্রম
পােঃ চাশ, মানভূম
মূল্য আট আনা মাত্র,
মাওলাদি স্বতন্ত্র।

নকুলেশ্বর বিদ্যার ৩৬নং কৈলাস শট কলিকাত [ অষ্টব্য অন্ততঃ সিকি মূল্য অগ্রিম না পাঠাইলে তিঃ পিঃ তে পুস্তক পাঠান অসুবিধাজনক। এক টাকার নীচে অর্ডার দিতে হইলে সম্পূর্ণ মূল্য অগ্রিম প্রেরণ কর্তব্য।] পুস্তকের অর্ডার কলিকাতায় শ্ৰীযুক্ত নকুলেশ্বর বিদ্যালয়ে নিকট দেওয়াই সুবিধাজনক। স্বামীজীর আশ্রমের পূর্ববঙ্গের প্রতিনিধি : ব্রহ্মচারী শ্রীহরি স্বৰূপানীর পােঃ ফেী, নােয়াখালী অপরাপর প্রাপ্তিস্থান- ১। মহেশ লাইব্রেরী ১৯৫২, কর্ণওয়ালিশট, কলিকাত ২। মনােমােহন সাহা ২নং নগদ নিবেদন ঋষি-প্রবর্তিত ব্রহ্মচর্য্য-ব্রত পালনের নিয়ম-নিষ্ঠার কঠোরতার একটা দিক আছে এবং তাহার সার্থকতাও একটা আছে। এই কঠোরতার মধ্য দিয়া যাহারা তােপদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করিয়া জীবন গঠন করিয়া থাকেন, ব্রত-পালনের একটা সময়ে তেমন পুরুষদের পক্ষে স্ত্রীমুখ দর্শন পৰ্য্যন্ত নিষিদ্ধ রহিয়াছে। বলা প্রয়ােজন, “সধবার সংযম” প্রণেতা শ্রীশ্রীমৎ স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেব জীবনের একটা সময় এইরূপ কঠোরতা পালন করিয়া- ছিলেন। ভ্রান্তলােকে তখন তাঁহাকে “স্ত্রীভীত কাপুরুষ” এবং “নারী বিদ্বেষী হিংসুক” বলিয়া আখ্যা দিত। “সধবার সংযম” গ্রন্থে প্রকাশিত পত্রগুলি তাহারই লেখা। প্রথম সময়ে শ্রীশ্রীমৎ স্বরূপানন্দ অবিবাহিত যুবক সমাজেরই আচাৰ্য্যরূপে আবির্ভূত হইলেও তাঁহার পদপ্রান্তে উপদেশ লইয়া যাহারা আত্মগঠনপরায়ণ হইয়াছিলেন, তাঁহাদের দারপরিগ্রহণের সঙ্গে সঙ্গেই তাহাদের সহধর্মিণীদিগকে তত্ত্বজ্ঞানােপদেশ এবং আত্ম- গঠনে প্রেরণা প্রদান আবশ্যক হইয়া পড়িল। সধবা নারীদিগকে কোন্ কল্পলােকের আলেখ্য দর্শন করাইয়া ইহমুখ খুললগ্ন চিত্তকে সত্য বস্তুর প্রতি, নিত্য বস্তুর প্রতি আকৃষ্ট তিনি করিয়াছেন, এই গ্রন্থে তাহার আভাস মিলিবে। তাঁহার প্রিয়তমা ধৰ্ম্মকন্যাদের নিকটে তিনি সধবা-জীবনের প্রকৃত আদর্শ সম্বন্ধে ইঙ্গিত ও উপদেশ দিয়া বৎসরের পর বৎসর যে অজস্র প্রাণময়ী পত্রাবলী প্রেরণ করিয়াছেন, তাহার সকলগুলির অনুলিপি রক্ষা করা সম্ভব হয় নাই।

যে পত্রগুলি সরম-বিনম্ৰা পল্লীকুলবধূর অপ্রকাশ্য জীবনকে সমৃদ্ধ করিবার জন্য লিখিত, তাহা কখনও প্রকাশের আবশ্যকতা পড়িবে বলিয়া মনে করা হয় নাই। কিন্তু বর্তমান সময়ে সধবা মহিলারা যেরূপ অত্যধিক সংখ্যায় শ্রীশ্রীমৎ স্বরূপানন্দের শ্রীপদাশ্রয় গ্রহণ করিতেছেন, তাহাতে তঁাহার অসামান্য কর্মময় জীবনের সামান্য অবসরে প্রত্যেক উপদেশ-প্রার্থিনীর নিকটে পৃথক পৃথক ভাবে লিপি প্রেরণ করিয়া আদর্শবাণী প্রচার বাহতঃ সম্ভব নহে। এইজন্যই জনৈকা ধৰ্ম্মকার অনুরােধে এই পত্রগুলি প্রকাশের সঙ্কল্প জাগরিত হয়। অল্প-সময়-মধ্যে সংগৃহীত মাত্র কয়েকখানা পত্র নিতান্ত ব্যক্তিগত অংশগুলি বাদ দিয়া এখানে প্রকাশিত হইল। আশা করা অনুচিত নহে যে, এই গ্রন্থ প্রকাশের দ্বারা বঙ্গমহিলাদের আভ্যন্তর জীবনগঠনের বিশেষ সহায়তা হইবে। ইহা বলিলেও অত্যুক্তি করা হইবে না যে, এই জাতীয় গ্রন্থ বঙ্গভাষায় ইহাই প্রথম। এতদ্দেশে একটা চলিত সংস্কার আছে যে, পিতার ধন যেমন পুত্রে পায়, গুরুর তপস্যা তেমন শিষ্যে পায়। শ্রীশ্রীস্বরূপানন্দের মহিলা শিয়াদের সম্পর্কে এই কথাটা সত্য বলিয়াই প্রতিপাদিত হইয়াছে। বিবাহের পূর্বে পিতামাতার আগ্রহাতিশয্যে যে কুমারী তাহার নিকট জীবনগঠনােপদেশ পাইয়াছেন, বিবাহিত হইবার পর স্বামীর উদ্দামগতি উচ্ছল চিত্তবৃত্তিকে সুকৌশলে সংযমের দিকে টানিয়া আনিতে নিপুণতা তিনি দেখাইয়াছেন। বিবাহ মাত্রই যে সধবা নারী তাহার উপদেশ প্রাপ্ত হইয়াছেন, সুদীর্ঘকালব্যাপী দাম্পত্য জীবনেও তিনি স্বামীর সানন্দ সমর্থনের মধ্য দিয়া পূর্ণ সংযম রক্ষার কৃতিত্বই প্রদর্শন করিয়াছেন। দীর্ঘকালব্যাপী দাম্পত্য-জীবনের পশুলীলা অনুষ্ঠানের পর যাহারা তাহার প্রত্যক্ষ উপদেশের সংস্পর্শে আসিয়াছেন, নিমেষ-মধ্যে লালসার

No text on this page.

"" শ্রীশ্রীস্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংস

দুর্বার তরঙ্গাক্রোশ নিস্তব্ধ করিয়া দিবার সামর্থ্য তাঁহাদের ভিতরেও
যথেষ্ট পরিমাণে দেখা গিয়াছে। পাশ্চাত্য ভােগবাদ যে সময়ে
নারীনৃত্যের বিভীষিকা লইয়া রঙ্গমঞ্চে অবাধে আবিভূত হইতে
কুষ্ঠিত নহে, ঠিক সেই সময়ে সংযমের এই অভিনব আন্দোলন অনেকের
চিত্ততােষকর না হইতে পারে। কিন্তু, যাহা সত্য, তাহার জয়
অবশ্যম্ভাবী। এশিয়ার রাজকবি হইতে আরম্ভ করিয়া মেছুয়া
বাজারের সাকীভােগের গ্রাহকেরা পর্যন্ত বেণু-বীণা, মূরজ-মন্দির
সহযোগে পাশ্চাত্য বিলাসিতার আবরণহীন যৌন মধুরতার গুণগান
করিয়া কচি মাথা চক্কণের পথ প্রশস্ত করিতে পারেন, কিন্তু ভারতের
জাতীয় প্রতিভা আপন সত্তা হারাইবে না। এই আশ্বাসের উপর
নির্ভর করিয়াই আমরা এই গ্রন্থ প্রকাশিত করিলাম।
সমাদৃত হয়, উত্তম । যদি অনাদৃত হয়, তবে, তার জন্যও আমরা
প্রস্তুত রহিলাম। কবীর সাহেব বলিয়াছেন,
“সতীকো না মেলে খােতি
গহস্তান্ পঢ়ে খাসা”
অর্থাৎ, “হায়রে!
সতী রমণীর পরিধানেরই বস্ত্র মিলে না,
অথচ, অসতী রমণী মূল্যবান্ বসন ভূষণে অঙ্গ আচ্ছাদিত করে!” ইতি,
পৌষ, ১৩৪১
গ্রন্থ যদি
নিবেদক
.
শ্ৰীধীরব্রত ব্রহ্মচারী
পুপুনী অযাচক
ব্রহ্মচর্য-আশ্রম
পােঃ চাশ, মানভূম
শ্রীসরলানন্দ ব্রহ্মচারী

No text on this page.

সধবার সংযম প্রথম পত্র জয় মা চট্টগ্রাম ২শে শ্রাবণ ১৩৩৯ মাতৃপ্রতীকা :- মেহের মা, তুমি তােমার স্বামীকে সংযমের ব্রতে সাহায্য করিতেছ শুনিয়া বড়ই সুখী হইলাম। ইহাই প্রকৃত সহধর্মিণীর কাজ। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সহধর্মিণীরা ইহাই করিয়া বরণীয় হইয়াছেন। ইতিহাস তাহাদের দাম্পত্য জীবনের এই গােপন কঠোরতার বিষয় কীৰ্ত্তন করে না সত্য, কিন্তু, যে সব নারী-পুরুষের তুচ্ছাতিতুচ্ছ অঙ্গভঙ্গীটুকু কীৰ্ত্তন করিয়া ইতিহাস পবিত্রতা ও অমরত্ব লাভ করে, তেমন ক্ষণজন্মা মহাপুরুষেরা এইরূপ দম্পতীর ঘরেই অবতীর্ণ হইয়া জগদ্ধার করেন। চিত্তের দুর্বলতা বশতঃ প্রবল ভােগ-পিপাসা জাগ্রত হইয়া মধ্যে মধ্যে যখন তােমার স্বামীকে তার পূর্বসত্য ভুলাইয়া দেয়, তখন তুমি তাহাকে সংযম রক্ষা করিতে, সত্য রক্ষা করিতে, ব্ৰত রক্ষা করিতে ও বীৰ্য্য রক্ষা করিতে যে সজাগ সচেতন করিয়া দিতে পারিতেছ, বিলাসের স্রোতে ভাসিয়া না যাইয়া তুমি যে এই আবর্জনার স্রোতের প্রবল আবেগকে থামাইয়া বাঞ্ছাকল্পতরু ৮ সধবার সংযম ভগবানের দিকে ফিরাইয়া দিতে পারিতেছ, ইহা জানিয়া আনন্দে তােমাকে কোলে করিয়া নাচিতে ইচ্ছা করিতেছে। আমি জানি, এরূপ সংযমের শক্তি, আত্মদমনের শক্তি, প্রলােভন জয়ের শক্তি প্রত্যেক রমণীর আছে। কারণ, স্ত্রীজাতি মহাশক্তিরই অংশ-সত। আত্ম- বিস্মৃতা নারীজাতি আজ নিজের মহীয়সী শক্তির বিশালতা ও স্বকীয় মহিমার সমুন্নতি সম্বন্ধে অচেতন রহিয়া স্বামীর শ্রেয়ঃ সম্পাদনে এই শক্তির প্রয়ােগ করিতেছে না, তাই শত কণ্ঠে “নরকের দ্বার” বলিয়া নিন্দিতা হইতেছে। তুমি তােমার আচরণের দ্বারা, দৃঢ়তার দ্বারা, তেজস্বিতার দ্বারা নিন্দামতার দ্বারা প্রমাণিত করিয়াছ যে, নারী নরকের পথ নহে, স্বর্গেরই সিংহদুয়ার। এক বৎসরের মধ্যে একবারও তুমি তােমার স্বামীকে ভােগের কোনও সুযােগ প্রদান করিবে না, একবারও তােমার দেহটাকে অপবিত্র লালসার পরিতৃপ্তি সাধনের সহায়করূপে ব্যবহৃত হইতে দিবে না বলিয়া তােমার স্বামীর সংস্কল্পকে অহরহ দৃঢ়তর করিয়া তুলিতেছ জানিয়া আমার চিত্ত আনন্দে নৃত্য করিতেছে। মহাশক্তি স্বয়ং তুই, র’র জীর্ণকুটীরে গৃহিনী সাজিয়া খেলা করিতে আসিয়াছিস, তাের আবার অসাধ্য কোন্ কাজ? র—তাের এইসব দৃঢ়তার বিষয় লিখিয়া আমার নিকট বিস্ময় প্রকাশ করিয়াছে যে, “সে দিনও যে ব্যক্তি সামান্য রমণীর ন্যায় নিকৃষ্ট সুখ-ভােগের জন্য নিতান্ত বিহ্বলতা প্রকাশ করিয়াছে, আজ সে এ অসামান্য সামর্থ্য কোথায় লাভ করিল ?” র—আশ্চর্যান্বিত হইয়াছে যে, সে দিন যে রমণী অনিচ্ছুক স্বামীকে নানা কৌশলে উত্তেজিত করিয়া জোর করিয়া রতিসুখ আদায় করিয়া লইয়াছে, সংযমেচ্ছুক স্বামীকে পরনারীতে অনুরক্ত বলিয়া অনুযােগ দিয়া যে রমণী চোখের জলে বা ডাকাইয়া হতবুদ্ধি স্বামীকে

সধবার সংযম
রমণমমাহে রত হইতে বাধ্য করিয়াছে, তার এই অত্যদ্ভুত পরিবর্তন
কোথা হইতে আসিল ? আমি কিন্তু মা বিস্ময়াবিষ্ট হই নাই।
সংসারকে বাঁধিবার জন্য মায়াময়ী তােরা ; ইচ্ছা করিলেই আবার
সকল বাঁধন খুলিয়া দিতে পারি। সেই শক্তি তােদর আছে, সেই
কৌশল তােরা জানি। কারণ, তােরা জগন্মাতারই অংশ-স্বরূপিণী।
আশীৰ্বাদ করি মা, স্বামি-সােহাগিনী হইয়া সম্বৎসরব্যাপী সংযমব্রত
অবহেলে উদ্যাপন করিয়া আমার আরও আনন্দ বৰ্দ্ধন কর।
আশীৰ্বাদক
তাের পাগল ছেলে
স্বরূপানন্দ
দ্বিতীয় পত্র
জয় মা
কালীঘাট
১০ বৈশাখ, ১৩৪
স্নেহভাজিনীষু ঃ
“মা” বলিয়া তােমাদিগকে অনেকেই ডাকিয়াছেন। কিন্তু “মা”
কিসে তােমরা হইতে পার, এই বিষয়ে তােমাদিগকে সচেতন কেহ
করেন নাই। কেন করেন নাই ? দৃষ্টি-দৈন্য বশতঃ নহে,-স্ত্রীজাতিতে
খাঁহারা মাতৃভাবের তপস্যা করিয়াছেন, প্রধানতঃ তাহাদিগকে পুরুষ
জাতির চরিত্র-সংস্কারেই ব্ৰতী থাকিতে হইয়াছে বলিয়া তাহারা
তােমাদের দিকে দৃষ্টি দিতে অবসর পান নাই।

সধবার সংযম আমিও অবসর পাইয়াছি, এমন কথা বলিতে পারি না। আমি জোর করিয়া অবসর করিয়া লইয়াছি এবং লইতেছি। কারণ, তােমাদের মধ্যে যথার্থ “মা” জাগিয়া না উঠিলে, আমাদের পুত্রজন্মলাভ বৃথা হইয়া যায়, মিথ্যা হইয়া যায়। “মায়ের লক্ষণ কি? পবিত্রতাই তার লক্ষণ। সকলের মুখ পানে তাকাইয়া আমি চিত্তে অপবিত্রতার আবেগ অনুভব করিতে পারি, কিন্তু মায়ের মুখ পানে তাকাইয়া তাহা পারি না। সমুদ্রের উদ্ধত তরঙ্গ যেমন বারিধি-বক্ষেই আস্ফালন করিতে করিতে ছােটে এবং সমুদ্র- তীরবর্তী পৰ্ব্বতগাত্রে আসিয়া আছাড়িয়া পড়িয়া আপনি স্তব্ধ ও বিলীন হইয়া যায়, চিত্তের উদ্দাম বাসনা-নিচয় তেমনি সৰ্বত্ৰ নিজ উচ্ছলতার পরিচয় দিয়াও মায়ের কাছে আসিতেই থমকিয়া দাঁড়ায়, লজ্জায় মাথা নত করে, মন্ত্রেীষধি দ্বারা বশীকৃত ভুজঙ্গের ন্যায় উদ্যত ফণা গুটাইয়া নেয় এবং অন্ধকারে আত্মগােপন করে। শুধু মুখে ‘মা’ ডাকিয়াই আমি তৃপ্ত হইব না, তােমাদিগকে এইরূপ মাতৃময়ী আমি দেখিতে চাহি। লম্পট পশু ঐ মুখের পানে তাকাইতেই সন্তান-ভাবের আবেশে বিহ্বল হইয়া যাইতে বাধ্য হয়, এমন পবিত্রতার প্রতিভা তােমাদের চোখের কোণে ঝলসিত দেখিতে চাই। মা-নাম তােমাদের সার্থক হউক, ইহাই আমার কাম্য। এই জন্যই আমি সংযমের আন্দোলনকে তােমাদের মধ্যেও বিসর্পিত করিতে প্রয়াসী হইয়াছি। মায়েদের মধ্য হইতেই কেহ কেহ এই আন্দোলনের মধ্যে ঝাঁপাইয়া না পড়া পর্যন্ত অযােগ্য হইয়াও আমাকেই পুনরাবর্তী থাকিতে হইবে, সন্দেহ নাই। আমার কাজ আমি করিয়া যাই, ফলাফল পরমাত্মার দায়িত্বে। তােমাদিগকে যে সংযত হইতে বলি, ইন্দ্রিয়-সুখের লালসা পরিত্যাগ সধবার সংযম করিয়া অতীন্দ্রিয় সুখের জন্য ব্যাকুল হইতে বলি, তার মধ্যে আমার একটা প্রসুপ্ত স্বার্থও আছে। এই দেহ পরিত্যাগ করিয়া পুনরায় দেহ লইয়া আসিব। তখন আমি যার তার গর্ভে জন্মিতে চাহি না। কত মহাত্মা শুধু বিশুদ্ধ জঠর পাইলেন না বলিয়া পুনরায় তনু ধারণ করিলেন না, তাহা তােমরা জান না। জানিলে, কাণা, খোঁড়া, অন্ধ, আতুর গুলিকে, মন্দবুদ্ধি, দুৰ্ম্মেধা, কুরুচিসম্পন্ন পশুগুলিকে গর্ভে ধারণ করিবার জন্য এত ব্যাকুলতা প্রকাশ না করিয়া সংযমের দ্বারা নিজেদিগকে পুণ্যময়ী করিয়া লইতে। পুণ্যময় জঠরেই পুণ্যাত্মারা আবিভূত হইতে ভালবাসেন। উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে জাগাও, সত্য-সঙ্কল্পকে চেতনা দাও, সংযমের মধু আহরণে উদ্বদ্ধা হও। একাকী নহে, স্বামি-সহকারেই এই ব্রত তােমাদিগকে উদ্যাপিত করিতে হইবে। মীরা বাঈএর দৃষ্টান্ত বিরল। প্রতিগৃহে সংযমের আদর্শ সতী-শিয়ােমণি সীতা। বহু সন্তান তােমার প্রকৃত মাতৃত্বের পরিচায়ক নহে। যােগ্য সন্তান একটী হইলেই তােমরও উদ্ধার হইবে, জগতেরও উদ্ধার হইবে। আশীষ, জানিও ইতি। শুভাশী: স্বরূপানন্দ ১২ সধবার সংযম তৃতীয় পত্র জয় মা ধানবাদ ১৪ বৈশাখ, ১৩৪ • পরমকল্যাণীয়াসু :- স্নেহের মা, অধমা নারী স্বামীকে মনে করে ভােগের সাথী, উত্তম নারী স্বামীকে মনে করে তপস্যার সঙ্গী, মধ্যমা নারী কখনাে ভােগ-পথে, কখনাে সাধন-পথে স্বামীর সহকারিণী। জগতে অধম নারীরই সংখ্যা অধিক, মধ্যমা নারী অত্যল্প, উত্তমা নারী প্রায় বিরল। এই জন্যই অনেক শাস্ত্রকার নারী-নিন্দা করিতে প্রলুব্ধ হইয়াছেন। শাস্ত্রকারদের সেই নিন্দা-বাণীর প্রত্যুত্তর দিবার জন্য নারীদের পক্ষ হইতে যাহারা কোমর কাছিতেছেন, দুঃখের বিষয়, তাহারা অধম নারীকে উত্তমা নারীতে পরিণত করিতে প্রয়াসী হন নাই, জঘন্য গালির বিনিময়ে জঘন্যতর গালিই বর্ষণ করিতেছেন। বলা আবশ্যক, ইহা দ্বারা লাভ কিছু হবে না। নারী মাত্ৰকেই আজ উত্তম নারী হইবার সাধনায় নামিতে হইবে। ইতর ভােগ-সুখের প্রতি একান্ত লােলুপ দৃষ্টিকে সংযত করিয়া পরমসুখ লাভের জন্য ব্যাকুলা ও অধ্যবসায়-পরায়ণা হইতে হইবে। ইহাই হইবে, নারী-নিন্দক শাস্ত্রকারগণের প্রতি উপযুক্ত উত্তর। জাগাও তােমার অন্তর্নিহিতা মঙ্গলমুখিনী শক্তিকে। তােমার ভিতরে রিপু-জয়ের সামর্থ্য আছে, লালসা-দমনের ক্ষমতা আছে, অনুশীলনের দ্বারা তাহাকে উদ্বুদ্ধ কর, অকল্যাণ-বিনাশে তাহাকে নিপুণ কর। মহাশক্তির অংশজাত তােমরা, প্রতি কাৰ্য্যে, প্রতি বাক্যে সধবার সংযম শক্তির পরিচয় দাও, বিলােল কটাক্ষে পুরুষের মন মদিলস না করিয়া পবিত্রতার দীপ্ত দৃষ্টি দিয়া তার অশুদ্ধ মনকে শুদ্ধ কর, সুন্দর কর, ! জ্জ্বল কর। আশীষ, জানিও। ইতি- তােমার আদরের ছেলে স্বরূপানন্দ চতুর্থ পত্র জয় মা পুপুকী আশ্রম ১৬ বৈশাখ, ১৩৪০ স্নেহের মা, সংযম তােমাদের প্রকৃতিগত সম্পদ। সংযমের স্বাভাবিক সামর্থ্য লইয়াই তােমরা জন্মিয়াছ। তােমাদিগকে যে লজ্জাশীলতা বিধাতা প্রকৃতিগত ভাবে দিয়া দেন, তাহা তােমাদের সংযম-সামর্থ্যেরই একটা লাক্ষণিক রূপ। লজ্জা কুসংস্কার, যদি তাহা সমাজের কৃত্রিম ব্যবস্থার ফলে জাত হয়। লজ্জা স্বাভাবিকী সম্পদ, যদি তাহা চরিত্রের অঙ্গীভূত ভাবে আপনিই ফুটিয়া উঠে। সভ্য সমাজের প্রভাবের বাহিরে অবস্থিত বন-পর্বত-বিহারিণী আরণ্য-গুহাচারিণী সঁওতাল রমণীর মধ্যেও যৌবনােন্মেষের সঙ্গে সঙ্গে লাজের বাণ ডাকে মা কার ইঙ্গিতে ? বাল্যের চপলতা সহসা গাম্ভীর্যের প্রশান্ত পরিচ্ছদ পরিধান করে কেন ? পুরুষের মধ্যে ত’ এভাবে করে না। তােমাদের চরিত্রের সম্পদ কি, বিশেষত্ব কোথায়, স্বাভাবিকী গতি কোন দিকে, সেই দিকে নারী-পুরুষ কেহই চক্ষু তুলিয়া চাহিয়া দেখে নাই। পুরুষ নারীকে নিজ প্রয়ােজনে, নিজ খােশ-খেয়ালে নির্বিচারে ১৪ সধবার সংযম ব্যবহার করিয়া আসিয়াছে, আর নারীরা বিনা বাধায়, বিনা আপত্তিতে নিজেদিগকে যে-কোনও সময়ে যে-কোনও ভাবে ব্যবহৃত হইতে দিয়াছে এবং ইহাই তাহারা স্বামি-সেবার বা সতীত্ব-সাধনার অঙ্গ বলিয়া মনে করিয়াছে। তাই, একবারও কাহারো লক্ষ্যে পড়ে নাই, নারীর সংযমের প্রয়ােজন কতখানি। আজ মা তােমাদিগকে নিজ চরিত্র অধ্যয়ন করিয়া দেখিতে হইবে, সত্যই তোমরা জন্মমাত্রই রাক্ষসী কি না, সত্যই তােমরা নর-শােণিত- তৃষ্ণার্তা ক্ষুধা-ক্ষিন্না ব্যাব্রিনী কি না, সত্যই তােমরা পুরুষ-প্রাণ-নাশিনী কাল-ভুজঙ্গিনী কি না। একটু বিচার করিলেই দেখিতে পাইবে, এ সকল আশঙ্কা অমূলক। সত্যই তােমরা বাঘিণী নহ, সত্যই তােমরা সাপিনী নহ, সত্যই তােমরা নর-শােণিত-পিপাসু রাক্ষসী নহ, ক্লেদ-দুর্গন্ধ-প্রিয়া পিশাচী-মূরতি তােমাদের নিজস্ব মুক্তি নহে। অবস্থার তাড়ণায় এই মূৰ্ত্তি তােমরা ধরিয়াছ, সাধনার বলে এই মূর্তি এখনি তোমরা পরিহার করিতে পার। সংসর্গের দোষে তােমাদের এ রূপান্তর ঘটিয়াছে, তপস্যার গুণে ইহার পরিবর্তন তােমরা সাধিতে পার। যাহা সত্য, তাহাই তােমাদের জীবনে জয়জয়কার প্রাপ্ত হইবে,যদি একটুখানি বিচার পূর্বক নিজ যথার্থ প্রকৃতিটাকে খুঁজিয়া বাহির করিতে চেষ্টা পাও। জাগাে মা কালভয়বারিণি, জাগ, ওঠ, করুণ-নয়ন-পাতে জগতের ত্ৰিতাপরাশি দুর কর, ধ্বংশ কর। আশীষ, জানিও। ইতি- শুভাশী : স্নেহের সন্তান স্বরূপানন্দ

সধবার সংযম
পঞ্চম পত্র
জয় মা
পুপুকী আশ্রম
২০শে বৈশাখ, ১৩৪০
পরমকল্যাণীয়াসু :-
মেহের মা,
জানাে,
সংযমই পবিত্রতার উৎস, তথাপি নিজ স্বামীকে সংযত থাকিতে
উৎসাহিত কর না, ইহা তােমার দুর্বলতা মাত্র। হিতবুদ্ধি
বিস্মৃত হইয়া
স্বামী যখন
জীবনের শ্রেষ্ঠ
লক্ষ্যকে কামের
পঙ্কিলতায় ডুবাইয়া দিতে উদ্যত, তখন তাহাকে বাধা না-দেওয়া
তোমার দুর্বলতা ব্যতীত আর কিছুই নহে। লজ্জা রমণীর ভূষণ,
কিন্তু এই সময়ে লজ্জা করিয়া সত্য পথে, মঙ্গলের পথে, স্বামীকে
পরিচালিত করিবার চেষ্টা না করাই মা সব চেয়ে বড় নির্লজ্জতা।
দাম্পত্য জীবনে স্বামী ও পত্নীর দৈহিক মিলনের একটা সম্মানযােগ্য
স্থান আছে, দম্পতীর মৈথুন-মিলনের প্রয়ােজন ও অধিকারকে
অস্বীকার কেহ করিবে না। কিন্তু, তাই বলিয়া হিতাহিত বুদ্ধিকে
বিসর্জন দিবার অধিকার তাহাদের একজনেরও নাই। হিতবুদ্ধি
লইয়া, মঙ্গলমূলক উদ্দেশ্য লইয়া যে দাম্পত্যমিলন, তাহাই প্রশস্ত
এবং আচরণীয়, অপর মিলন নিন্দা এবং কদাচার
কদাচার বলিয়া
গণনীয়। যে স্ত্রী স্বামীকে কদাচার হইতে রক্ষা করিবার চেষ্টা
করে না, চক্ষু বুজিয়া যে স্ত্রী স্বামীর কদাচার নিজের উপরে সহিয়া
যায়, তাহাকে লাজুকা বলিলে লজ্জা কথাটার অপমান করা
হইবে, লজ্জাহীনা বলাই তাহাকে সঙ্গত। অসৎ কাজে সঙ্কোচের
নামই লজ্জা, সৎপ্রয়াসে সঙ্কোচের নাম কখনাে লজ্জা হইতে পারে

১৬ সধবার সংযম । যে লজ্জা পরে অনুশােচনার সৃষ্টি করে, তাহাকে লজ্জা বলা চলে না। লজ্জা, বৰ্ম্মের ন্যায় ধর্মকে রক্ষা করে, এই জন্যই লজ্জার এত প্রশংসা। যে লজ্জা ধৰ্ম্মকে বিপন্ন করে, চিত্তকে কলুষিত করে, দেহকে অবাধে অত্যাচারিত হইতে দেয়, তাহা লজ্জা নহে, তাহা পাপ। স্বামীর সহিত দৈহিক সম্বন্ধের দ্বারা স্ত্রীর দেহ অপবিত্র হয়, এরূপ মনে করা অনুচিত। কিন্তু, মঙ্গলউদ্দেশ্যবিহীন, কল্যাণ- কামনাবিহীন, নিষ্প্রয়ােজনীয় মৈথুনের পরেও দেহ পবিত্র থাকে, এরূপ মনে করাও অসঙ্গত। সধবার জীবনে স্বামি-সহবাসের পুণ্যজনক একটা অধিকার আছে। কিন্তু, যদ্রুপ সহবাসে, যৎকালীন সহবাসে চিত্তস্থৈর্য নষ্ট হয়, অন্তরের অমৃতকুম্ভ লালসার তাপে শুকাইয়া যায়, আত্মপরায়ণতা বৃদ্ধি পায়, পঙ্কিল বাসনা দেহমনকে আচ্ছন্ন করিয়া ফেলে, তদ্রুপ বা তৎকালীন সহবাসে এক কণা পুণ্যও নাই বা থাকিতে পারে না। পুণ্যজনক যে সহবাস, তাহাই সধবার সতীত্ব-সাধনার অঙ্গীভূত, পাপজনক সহবাস তাহার সতীত্ব গৌরবকে বর্ধিত করে না, খতিই করে। বিবাহিত পুরুষের পক্ষে স্ত্রী-সম্ভোগ শাস্ত্রে নিষিদ্ধ হয় নাই, অথচ বিবস্ত্রা পত্নীকে দর্শনেও প্রায়শ্চিত্তের বিধান আছে। কেন জানো মা? মঙ্গলােদ্দেশ্যযুক্ত মৈথুনমিলনের দ্বারা জগতের কল্যাণ ব্যতীত অকল্যাণ কখনাে সম্ভবে না এবং মঙ্গলােদ্দেশ্য যেখানে প্রবল, সেখানে কামবুদ্ধি দুৰ্বল, লালসার বহ্নি নিষ্প্রভ, ভােগলােলুপতা ক্ষীণ- শ্রোতা। সম্ভোগ পাপ নহে, কাম-বুদ্ধিই পাপ। নিজ নারীরও উলঙ্গ মুর্তি দর্শনে কামবুদ্ধি জাগরিতা হইতে পারে, এই জন্যই বিবসনা স্ত্রীর মূর্তি দর্শন নিষিদ্ধ।

সধবার সংযম ১৭ তােমার সংস্পর্শ যদি তােমার স্বামীর কামবুদ্ধিকে উত্তেজিত করে, তবে তুমি তার কল্যাণঘাতিনী রাক্ষসী ব্যতীত আর কিছুই নহ। তােমার সংস্পর্শ যদি তােমার স্বামীর স্বতোজাগ্রত কামবুদ্ধিকে সঙ্কুচিত করিয়া দিতে না পারে, তাহা হইলেও তুমি তােমার সহধর্মিণীর কর্তব্য হইতে পরিভ্রষ্টা হইলে। তােমার সংস্পর্শ যদি তাহার অন্তরে দিব্য ভাবের একটা প্রেরণা যােগায়, পবিত্রতার বাণ ডাকায়, তবেই তুমি যথার্থ সহধর্মিণী, তবেই তুমি পতিতােদ্ধারকারিণী, সর্বপাপহারিণী, নরকদুঃখবারিণী, জাহ্নবী-প্রবাহিনী। স্বামীর ক্রোধ এবং স্বামীর বিরক্তিকে কৌশলে জয় কর। বৃথা- লজ্জা পরিহার কর। যাহা কর্তব্য, তাহা সম্পাদনের জন্য বজ্রসম দৃঢ় হও। প্রেমের দ্বারা স্বামীর হৃদয় জয় করিবার চেষ্টা কর, কামের দ্বারা নয়। কাম-সম্ভোগের দ্বারা ইন্দ্রিয় পথে প্রেমশক্তির অপচয় করিয়া কেহ স্বামীকে সুখীও করিতে পারে না, বশীভূতও করিতে পারে না। দেহের আকর্ষণে দেহকেই আটক করা যায়, আত্মাকে বাঁধা যায় না। বাই-বেষ্টনে বাহুকেই বাঁধিয়া রাখা যায়, আত্মাকে বন্দী করা চলে না। আত্মায় আত্মায় রমণই যথার্থ রমণ, দেহের রমণ রমণ নহে, উহা মরণেরই বর্ণান্তর মাত্র। আত্মায় আত্মায় প্রেমের বেষ্টনী রচিত হউক, দাম্পত্যজীবনের প্রকৃত সুখ আস্বাদিত হউক। দেহের ক্ষুধা মরিয়া যাক্, আত্মার প্রতি জন্ম গ্রহণ করুক। বিবাহের প্রকৃত যাহা উদ্দেশ্য, তাহা আত্মার সহিত আত্মার মিলনের দ্বারাই সার্থক হউক, সত্য হউক। লক্ষ্য কর, দেহের অভ্যন্তরে কাকে ভালবাসিবার জন্য স্বামী তােমার দেহটাকে অত আদর করিয়া বুকে টানিয়া নেন? সন্ধান নাও, কার প্রতি প্রবল আকর্ষণ হেতু স্বামি-বক্ষে মাথা গুজিয়াও আরও ভিতরে - ১৮ সধবার সংযম আরও অভ্যন্তরে প্রবেশ করিতে ব্যাকুলতা অনুভব কর? সে কি দেহটাই, না, দেহের অতিরিক্ত অন্য কিছু সত্য বস্তু ? এই অনুসন্ধিৎসাই তােমর নারী জন্মের সার্থকতাকে, বিবাহিত জীবনের সত্য উদ্দেশ্যকে সুস্পষ্ট করিয়া তুলিবে। আশীষ, জানিও। ইতি তােমার স্নেহের সন্তান স্বরূপানন্দ ষষ্ঠ পত্র জয় মা পুপুকী আশ্রম ২১ বৈশাখ, ১৩৪ ও কল্যাণীয়াসু :- মেহের মা, সাধারণ মেয়েদের নিকটে আমি যেরূপ দাম্পত্য জীবন আশা করিতে পারি, যে-সব মেয়েরা বিবাহের পূর্বে আমার কাছে আসিয়াছিল, আমাকে সন্তান বলিয়া জানিয়াছিল, তাদের কাছে আমি তার চেয়ে একটু আলাদা রকমের দাম্পত্য জীবন আশা করি। যাহারা নিজেরা আসে নাই, কিন্তু বিবাহের পূর্বে তাদের স্বামীরা আসিয়াছিল, তাদের কাছেও আমার আশা করিবার আছে। কারণ, যে ভাবের আমি প্রচারক, সে ভাব আমি মুখেই শুধু প্রচার করি নাই, অন্তর দিয়া আমি অবাল্য তাহার সাধনা করিয়াছি এবং তাহার ভিতরের সত্যকে নিজের জীবনে আস্বাদন করিয়া বিগতভী হইয়াছি। তুমি মা অবশ্য বিবাহের পূর্বে আমাকে দেখ নাই এবং তােমার স্বামীও পূর্বে আমাকে জানিতেন না। প্রচলিত সংস্কারের অনুবর্তী হইয়া তােমরা বিবাহ-মাত্রই রসের সন্ধানে নামিয়াছ এবং অপৰু আস্তে সধবার সংযম দাঁত বসাইয়া দিলে যে রস মিলে, শুধু তাহারই আস্বাদন পাইয়াছ। ইহা জীবনের ভুল ব্যতীত আর কিছুই নহে। কিন্তু, এই ভুলেরও সংশােধন চলে। ভুলিয়া যাও যে, দেহের ভােগের মধ্য দিয়াই স্বামী ও স্ত্রীর সম্বন্ধ সত্য হইয়া ওঠে। ভুলিয়া যাও যে, শয্যাসঙ্গিনী হইবারই জন্য স্বামীর সাথে বিবাহের বন্ধন রচিত হইয়াছে। ভুলিয়া যাও যে, তােমাদের সম্পর্ক শুধু ভােগ্যর আর ভােজার। অতীতে যাহা কিছু হইয়াছে, তার জন্য অনুতাপ করিয়া কালক্ষয়ের প্রয়ােজন নাই; কিন্তু নুতন জীবনটাকে দেবতাবের সুষমায় মণ্ডিত করিয়া তুলিতে আজ দৃঢ়ত হও। ছাগ-ছাগীর জীবনে আর মানব-জীবনের পার্থক্য অনুধাবন কর। ক্ষণিক সুখের অকিঞ্চিৎকর চিন্তা কর। প্রকৃত সুখ কোন পথে আসে, কেমন করিয়া আসে, তাহা অনুক্ষণ অনুসন্ধান কর। তােমার দেহ ভগবদুপাসনার পবিত্র মন্দির, ইহাকে মন্দিরের মত সুন্দর, স্বচ্ছ, আবর্জনামুক্ত, জঞ্জালরহিত রাখিতে হইবে। বল দেখি তুমি কে, যে আমার চোখের সুমুখে আমার মায়ের মুরতি ধরিয়া আসিয়া দাঁড়াইয়াছ? কেন তােমাকে মা বলিয়া ডাকিতে ভাল লাগিল, কেমনে তােমাকে মা বলিয়া চিনিলাম, কিসের জন্য তুমি আমার মা, কি ভাবে তুমি আমার মা হইলে? বল দেখি, কোনটা তােমার নিত্যরূপ ? রমণীর না জননীর? এই একটা প্রশ্নের জবাব যে দিন খুঁজিয়া পাইবে, সে দিন সমগ্র জগতের মহাপাতকীরা তােমার চরণ-- নখরের একটা কোণায় ঠেকিয়া উদ্ধার লাভ করিবে। আশীষ, জানিও। ইতি, শুভাশী : স্বরূপানন্দ -

সধবার সংযম
--
সপ্তম পত্র
জয় মা
ময়মনসিংহ
১২ শ্রাবণ, ১৩৪০
কল্যাণীয়াষু ঃ-
মেহের মা আমার,
আমার প্রাণভরা স্নেহাশীৰ্বাদ গ্রহণ কর। তােমার তেজ, তােমার
সংযম, তােমার দৃঢ়তা, তােমার গুরুভক্তি আমাকে মুগ্ধ করিয়াছে।
আশীর্বাদ করি, তােমার ব্রত সফল হউক, তােমার জীবন ধন্য হউক।
ইন্দ্রিয়-সম্ভোগ দ্বারাই স্বামীকে ভালবাসা যায় না, সম্ভোগ-বর্জন
দ্বারাই পরস্পরের প্রেম গভীরতা প্রাপ্ত হয়। পরস্পর পরস্পরকে সহস্র
প্রাণ দিয়া ভালবাসিতে সমর্থ হও, এই আশীৰ্বাদ করি।
জীবনে ইন্দ্রিয়ের সুখ বহুবার আস্বাদন করিয়াছ। কিন্তু মা, সেই
সুখ কতক্ষণ স্থায়ী ? সেই সুখের মধুরতা কতক্ষণ থাকে? তার চেয়ে
সহস্রগুণে বড় সুখের তুমি অধিকারিণী হইবে,-সংযমের পথে,
ব্ৰহ্মচর্যের পথে।
তুমি আমার আদরিণী মা, তােমাকে আমার প্রাণের আনন্দ
জানাইবার ভাষা নাই। অটল নিষ্ঠায় নিজ পবিত্রতার ব্ৰত ধরিয়া থাক,
সহস্র বাধা, বিঘ্ন-বিপত্তিকে পদতলে চাপিয়া রাখিয়া জগতের শ্রেষ্ঠা
সাধ্বী সতীরূপে পূজিতা হও, এই আমার অকপট আশীৰ্বাদ। ইতি,
শুভার্থী
তােমার স্নেহের সন্তান
স্বরূপানন্দ

সধবার সংযম ২১ অষ্টম পত্র জয় মা শিবপুর, ত্রিপুরা ১৪ ভাদ্র, ১৩৪০ কল্যাণীয়াযু : স্নেহের মা, এই সঙ্গে তোমার এক গুরু-ভ্রাতার লিখিত একখানা পত্র পাঠাইলাম। তােমার এক ভাগ্যবতী গুরুভগ্নী কি ভাবে অত্যদ্ভুত ধৈৰ্য্য ও নিপুণতা সহকারে তাহার স্বামীর সংযম রক্ষার সাহায্য করিতেছে, তাহা সঙ্গীয় পত্রখানা পাঠে বুঝিবে। তােমার গুরু ভ্রাতা আমাকে লিখিয়াছে,-“বাবা, আপনার স্নেহের মা সৰ্ব্বদা সতর্ক প্রহরীর ন্যায় আমার ব্রত রক্ষা করিতেছে। আমার মন টলিয়া গেলে সে অটল নিষ্ঠায় তাহার গতি ফিরাইয়া দিতেছে। সম্ভোগের জিনিষ অতি নিকটে রাখিয়াও এক নিমেষের জন্য সে তাহাযে চাহে না, ইহা দেখিয়া আমি বিস্ময়ে অভিভূত হইয়াছি। তার অফুরন্ত ললালুপতা পুৰ্ব্বে আমার শােণিত শশাষণ করিয়া খাইয়াছে। দিকা মােহিনী যে রাতকা বাঘিনী সত্য সত্যই বটে, তাহারই প্রমাণ সে পূৰ্ব্বে প্রতিদিন দিয়াছে। অনুনয় করিয়া, বিনয় করিয়া, কাতর আবেদন জানাইয়া তাহার আক্রমণ হইতে কখনাে নিজেকে রক্ষা করিতে পারি নাই, নিজের সহস্র সঙ্কল্প তার আবেগের কাছে হঠ মানিয়া গিয়াছে। আজ ঠিক তারই এই অত্যদ্ভূত পরিবর্তন একমাত্র আপনারই অব্যর্থ কৃপা বলিয়া উপলব্ধি করিতেছি। একটি সামান্যা রমণীর ভিতরে আত্ম-সংযমের এই প্রচণ্ড শক্তি দেখিয়া নিজের বুদ্ধির গৌরব বােকা বনিয়া গিয়াছে। তাহার সেই দুর্জয় ২২ সধবার সংযম অভিমান এমন কোথায়? তাহার সেই রিপুর উদ্দাম তাড়না এখন কোথায় ? এক দিন তাহাকে বলিয়াছিলাম,-তােমার এই সংযমের প্রয়ােজন কি ? সে উত্তর দিয়াছিল,—আমার কোনও প্রয়ােজন নাই, স্বামীর মঙ্গলের জন্য সুখে জলাঞ্জলি দিয়াছি। আর এক দিন তাহাকে বলিয়াছিলাম,এস আমরা ভােগ-সুখে কাল কাটাই। তখন উত্তর করিয়াছিল,—আরও তিন বৎসরের মধ্যে আমাকে স্পর্শও করিতে পারিবে না, সদ্গুরুর আদেশ আগে পালিয়া লই। বাবা, আমি তাহার কোনও অযথা প্রশংসা করিতে যাইতেছিনা। যাহা সত্য, তাহা বলিতে ভয় করিব না। পাপিষ্ঠ আমি, তাহাকে আমি এই সব কথা নিতান্তই ভােগ-কাতরতায় পীড়িত হইয়া দুৰ্ব্বদ্ধির বশে বলিয়াছিলাম। কিন্তু আপনার তেজস্বিনী কন্যা আমার সকল লুব্ধতাকে তার জ-ভঙ্গীতে স্তব্ধ করিয়া দিয়াছে এবং দিতেছে। আপনার নিকট পত্র লিখিবে বলিয়া আমাকে এক দিন লেখাপড়া শিখাইবার জন্য অনুরােধ করিয়াছিল। সেই দিন হইতে তাহাকে লেখাপড়া শিখাইতে আরম্ভ করিয়াছি। সমগ্র দিন এবং সন্ধ্যার- ও কতক পর পর্যন্ত হাটে-বাজারে দোকানদারী করিতে হয়, সুতরাং রাত্রিতে শয়নের পূর্বে ছাড়া তার অবসর করিতে পারি না। কিন্তু, অল্প দিনের মধ্যেই সে বর্ণগুলি লিখিতে ও পড়িতে শিখিয়া ফেলিয়াছে। আপনি যে এক দিন বলিয়াছিলেন, আগ্রহ থাকিলে বয়স্কা হইয়াও বিদ্যার্জন কঠিন নহে, দেখিতেছি, সে কথা সত্য।” এই মেয়েটী অশিক্ষিতা, বর্ণ-পরিচয় মাত্র সম্প্রতি হইয়াছে, বিবাহ হইয়াছে আজ দশ বৎসরের উপরে। স্বামী বাড়ীতেই থাকে। বিদেশে যাইবার প্রয়ােজন পড়ে না বলিয়া এতকাল স্বামীর সঙ্গেই কাটাইয়াছে। সংসারী জীবনের সুখলােলুপতার ক্রীতদাসীরূপে এত ।

সধবার সংযম দিন কালহরণ করিয়াছে এবং স্বামীর জীবনে রূপান্তর আসিবার পরেও সামান্য শ্রমে এই রমণীর মনে সংযমের প্রতি অনুরাগ সৃষ্টি করা যায় নাই। প্রায় দুইটী বৎসর ধরিয়া ক্রমান্বয়ে চেষ্টা করিতে করিতে তবে এই রমণী সংযমের প্রয়ােজনীয়তা উপলব্ধি করিয়াছে। কিন্তু, কি আশ্চৰ্য্য, যে মুহূর্তে সে বুঝিল ইহা প্রয়ােজন, যে মুহূর্তে সে বুঝিল ইহা গুরুপদেশ, আর সে কালবিলম্ব করিল না। দীর্ঘকালের সঞ্চিত কামনার রাশি বস্তায় বাঁধিয়া সুৰ্মা নদীতে ফেলিয়া দিল, কঠোর হইল, দৃঢ় হইল, স্বামীকে অসংযম হইতে বাচাইবার জন্য প্রাণপাতের সঙ্কল্প করিল। তুমি কি এইরূপ হইতে পার না মা ? এই মেয়েটীর তুলনায় তুমি বহুগুণে সুশিক্ষিতা। এই মেয়েটা এখনও সদ্গুরু দর্শন পায় নাই, তুমি পাইয়াছ। শক্তিমানের কণ্ঠে উচ্চারিত মহামন্ত্র এখনাে ইহার কর্ণে মন্দ্রিত হয় নাই, তােমার হইয়াছে। তােমার কাছে আমি কি প্রত্যাশা করি, তাহা তােমাকেও ভাল করিয়া বুঝাইয়া দিবার জন্যই উহার স্বামীর লিখিত পত্ৰখানা তোমাকে প্রেরণ করিলাম। কুশলে আছি। আশীষ জানিও। আশীৰ্বদিক স্বরূপানন্দ ২৪ সধবার সংযম নবম পত্র জয় মা চট্টগ্রাম ২১শে আশ্বিন, ১৩৪০ কল্যাণীয়াষু ঃ- স্নেহের মা, বহুকাল তােমার নিকটে পত্র লিখি নাই, লিখিবার অবসর পাই নাই। আজ লেখা নিতান্ত প্রয়ােজনীয় বলিয়া অনুভব করিতেছি। তােমার স্বামী সৰ্বস্ব ত্যাগ করিয়া দেশ ও দশের সেবা করিতেছেন। দিগদিগন্তে তার সেবা-পরায়ণ বাহুযুগল বিপুল বিক্রমে প্রসারিত হইতেছে। তুমি মা দূরে সরিয়া থাকিয়া এই মহৎ ভাগ্য হইতে নিজেকে বঞ্চিতা রাখিতেছ কেন ? আমি চাহি না, তােমার স্বামী তােমাকে চিরতরে পরিত্যাগ করুন। আমি চাহি, স্বামি-সােহাগিনী হইয়া, স্বামি-গৌরবে গরবিণী হইয়া আমৃত্যু তার সঙ্গে সঙ্গে সতী সাধ্বী পত্নীর ন্যায় সমগ্র জগতের সেবা কর। একদিন তােমার অন্তরে উচ্চাকাঙ্ক্ষার বান ডাকিয়াছিল। আজ তাহা কোথায় গেল মা ? তােমার হারাণাে মহিমা কি তুমি পুনরায় খুঁজিয়া বাহির করিবে না ? তােমার স্বামী ত্যাগী, তপস্বী, সাধক, জীব-হিতার্থে তিনি জীবন বিকাইয়াছেন। তাহাকে তুমি আর সংসারের দিকে, ভােগসুখের দিকে, ক্ষণিক তৃপ্তির দিকে মোড় ফিরাইয়া আনিতে চাহিওনা। চাহিলেও পারিবে না। এখন তােমার পক্ষে শ্রেষ্ঠ কৰ্তব্য, নিজের স্বার্থ, নিজের সুখ-লুব্ধতা, নিজের ক্ষুদ্রতা সব বিসর্জন দিয়া গঙ্গা যেমন সধবার সংযম ২৫ ব্রহ্মপুত্রের সহিত মিলিয়া সমুদ্রে গিয়া পড়িয়াছে, তেমনভাবে আত্মােৎসর্গের পথে অগ্রসর হওয়া। ভুলিয়া যাও মা অতীত, ভুলিয়া যাও মা বৰ্তমান। ভবিষ্যৎ গৌরবের মােহন স্বপ্নে বিভোের হইয়া ক্ষণপরিত্যক্ত মহদ ব্রতের পথে পুনরায় পদচারণা আরম্ভ কর মা। ভারত-রমণীর আদর্শ হইতেছেন সীতা, যিনি রাজৈশ্বৰ্য্য পরিত্যাগ করিয়া শ্রীরামচন্দ্রের সহিত বনে গমন করিয়াছিলেন, চতুর্বিংশ বৎসর কাল ফলমূল খাইয়া পূর্ণ ব্রহ্মচর্য পালন করিয়াছিলেন। ভারত-রমণীর আদর্শ হইতেছেন পাৰ্বতী, যিনি পিতৃগৃহের অতুল সম্পদ তুচ্ছ করিয়া শ্মশানচারী ভিক্ষাকরঙ্গধারী ভলিবপু শিবের সেবায় জীবন দিয়াছিলেন। ভুলিও না মা, রাজকন্যা লোপামুদ্রা দরিদ্র ব্রাহ্মণ অগস্ত্য ঋষির সহিত জটাবল ধারণ করিয়া তপস্যা করিয়াছিলেন, রাজকন্যা সাবিত্রী স্বামী সত্যবানের সহিত বনে বনে কাছ আহরণ করিয়াছিলেন। নিজের মহিমা, নিজের গৌরব বিস্মৃতা হইয়া নিজেকে নিজে অপমানিতা করিওনা। জীবনকে রূপান্তরিত করিবার জন্য আজ মা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হও। দুর্লভ মনুষ্য-জন্ম বৃথাই নষ্ট করিয়া দিও না মা, বিফলে যাইতে দিওনা। তােমার সর্বাঙ্গীন কুশল হউক। আশীৰ্বাদক স্বরূপানন্দ

সধবার সংযম
দশম পত্র
জয় মা
চাদপুর
১১ কার্তিক, ১৩৪
কল্যাণীয়াযুঃ-
মেহের মা, দুঃখের বিষয় আমার পুত্র খানা অপরের সাহায্য ছাড়া
পড়িবার মত লেখা-পড়াটুকুও জান না। তথাপি, আমি তােমাকে
অশিক্ষিতা বলিয়া মনে করিব না, যদি জীবনের সবচেয়ে প্রয়ােজনীয়
বিষয়ে তুমি সতর্ক দৃষ্টি না হারাও।
আর এক দিন আমি মৌখিকই তােমাকে বলিয়া আসিয়াছিলাম,
জীবনের লক্ষ্যই বা কি, জীবনের কর্তব্যই বা কি। ইন্দ্রিয়ের সেবাই
জীবনের লক্ষ্য নহে, ক্ষণিক সুখ-ভােগে ডুবিয়া যাওয়াও জীবনের কর্তব্য
নহে। লালসার দাস-দাসী হইয়া জীবন কাটাইয়া দিবার উদ্দেশ্যেই
তােমরা দুল্লত মানব-তনু ধারণ কর নাই। এই দেহ দিয়া, এই মন
দিয়া ভগবানের কাজ করিতে হইবে, ভগবানকে পূজা করিতে হইবে,
ভগবানকে লাভ করিতে হইবে। এই দেহের পবিত্রতা, এই মনের
পবিত্রতা জীবনের শ্রেষ্ঠ লক্ষ্য লাভের পক্ষে নিতান্তই প্রয়ােজনীয়।
লক্ষ্য রাখিও স্থির, সঙ্কল্প রাখিও অটল, নিষ্ঠা রাখিও কঠোর। জীবন
তােমার মঙ্গলময় হউক, আনন্দময় হউক। ইতি-
আশীৰ্বাদক
স্বরূপানন্দ

সধবার সংযম ২৭ একাদশ পত্র জয় মা বরিশাল ১৪ কার্তিক, ১৩৪০ কল্যাণীয়াষু :- মেহের মা, আমার পূর্ব পত্রগুলি যথাসময়ে পাইয়াও সময় মত 'উত্তর দিতে পার নাই বলিয়া আমি বিন্দুমাত্রও রুষ্ট হই নাই। কারণ, পত্রের উত্তর আমি পত্র দ্বারা পাইতে চাহি না, পাইতে চাহি জীবনের দ্বারা, তপস্যার দ্বারা। কল্পনার আলােকে তােমাদের মধ্যে আমি যে দিব্য মূৰ্ত্তির ব্যঞ্জনা ফুটাইয়া তুলিতেছি, জীবন্ত তপস্যার বলে তাহাকে পার্থিব রূপ তােমরা প্রদান কর, ইহাই আমি চাহি। সতীর দেশে সতী পুনরায় জন্মগ্রহণ করুক, সীতার দেশে সীতা পুনরায় আবিভূত' হউক। তাহাদের দেহবিচ্ছিন্ন প্রত্যেকটী অঙ্গ প্রত্যঙ্গে পুনরায় একান্ন সিদ্ধপীঠের উদ্ভব হউক, রাক্ষস-পরিবেষ্টিত ভারতবর্ষের গহন কণ্টকময় দণ্ডকারণ্য পতিব্রতা ব্রহ্মচারিণীদের পাদস্পর্শে পুনরায় পণ্যীকৃত হউক, রাক্ষস-নিধনের পন্থা হউক। তােমাদের জীবনের মহাশক্তির বিচিত্র লীলার যুগােপযােগী অভিনব অভিব্যক্তি যে আজ দেখিতে চাহি মা। তােমরা রমণী নহ, কামিনী নহ, সচল রতিমন্দির নহ। তোমরা মা, তােমরা জগদ্ধাত্রী, তােমরা নিখিল জগতের জননী, তােমরা অকল্যাণ-বিনাশিনী কল্যাণময়ী কালিকা। কাম তােমাদের পদতলে পড়িয়া পরিত্রাহি চীৎকার করিয়া মরুক, জগতে পুনরায় ভারত-জননীর সিংহবাহিনী মুর্তির পূজা হউক। ইতি- শুভাশীৰ্বাদক স্বরূপানন্দ

২৮
সধবার সংযম
দ্বাদশ পত্র
জয় মা
বাগেরহাট, খুলনা
২২ কার্তিক, ১৩৪০
কল্যাণীয়াষু :-
মেহের মা,
শুভাশীষ জানিও।
স্বামি-পত্নীতে সংযমের ব্রতে আবদ্ধ হইবার পরে বারংবার তােমরা
স্খলিতব্রত হইয়াছ, ইহা সত্য, কিন্তু শত পতন সত্ত্বেও পুনরায় উত্থান
লাভের প্রাণান্ত চেষ্টার মধ্য দিয়াই জীব পূর্ণ অভ্যুদয়কে লাভ করে।
আমি জানিয়া খুবই প্রীত হইয়াছি যে, এবার তােমাদের সংযম দীর্ঘকাল
ধরিয়' অটুট রহিয়াছে। সঙ্কল্পকে দৃঢ়তর কর, প্রতিজ্ঞাকে কঠোরতর
কর, দেহ মন প্রাণ পরমাত্মারূপী সদ্গুরুর পদপ্রান্তে আরও আবেগের
সহিত নিবেদন কর,-আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়াই অতুলনীয় নিষ্কামত
আপনি প্রতিষ্ঠিত হইয়া যাইবে। ভয় পাইও না মা, হতাশ হইও না,
প্রাণে আশা জাগাও, হৃদয়ে উৎসাহ জাগাও, বুকে সাহস জাগাও,
তপস্যায় পূর্ণ সিদ্ধি নিশ্চিত তােমার করতলগত হইবে। ইতি,
শুভাশীৰ্বাদক
স্বরূপানন্দ

সধবার সংযম
২৯
ত্রয়ােদশ পত্র
জয় মা
মাগুরা, যশােহর,
১লা অগ্রহায়ণ, ১৩৪০
কল্যাণীয়াষু :
মেহের মা, * নামে মন লাগাইয়া পথ চল। বাহিরের
কোলাহল বাহিরে পড়িয়া থাকুক। অন্তর দিয়া তুমি অন্তর দেবতার
পূজা করিতে থাক। যিনি নিজে পবিত্রতা স্বরূপ, তাহার ধ্যান, তাহার
অর্চনা তােমাকে পবিত্রতার দেশে আপনি টানিয়া লইয়া যাইবে।
বাহিরের সহস্র ঘৃণাজনক অবস্থাকে তুচ্ছ কর, অন্তরের প্রশান্তিতে ডুব
দাও মা, স্থির লক্ষ্য ভিতরে রাখ। * ইতি-
শুভাশীঃ
স্বরূপানন্দ
চতুর্দশ পত্র
জয় মা
ফেণী, নােয়াখালী,
৮ পৌষ, ১৩৪০
পরমকল্যাণীয়াষু ঃ-
মেহের মা, * সংসারী জীবনকে সুখময় করিবার এক
পন্থা শ্রীনাম, অপর পন্থা সংযম। শ্রীনাম সংযমকে প্রতিষ্ঠিত করে, সংযম
শ্রীনামকে প্রতিষ্ঠিত করে। একটীর পূর্ণতা অপরটীর পূর্ণতা সঞ্চারিত
করে। একটীতে গভীরতা আসিলে অপরটীতে আপনিই গভীরতা
আসে। শ্রীনাম সেবার দ্বারা সংযমকে লাভ কর, সংযম লাভের দ্বারা
শ্রীনামের মধুরস পূর্ণরূপে আস্বাদনের যােগ্যতা অর্জনে সমর্থ হও।

সধবার সংযম
শ্রীনাম রিপুভয়-বারণ পরমবস্তু, সংযম নামে-রুচিবর্ধন পরমমঙ্গল। সাধন
কর এবং সিদ্ধকাম হও। ইহাই আমার একান্ত আশীর্বাদ। ইতি
শুভাশীঃ
স্বরূপানন্দ
-
পঞ্চদশ পত্র
জয় মা
কুমিল্লা
১০ পৌষ, ১৩৪০
পরমকল্যাণীয়াযুঃ-
স্নেহের মা, তােমার পত্র খানা পাইয়া বড়ই আনন্দিত হইলাম।
ভিতরে সত্যিকার প্রেম জাগিয়া উঠিলে অন্তরের লুব্ধ কামনা আপনি
স্তব্ধ হইয়া যায়। দাম্পত্য জীবনে সত্য প্রেম সঞ্চারের ইহা এক
পরমােৎকৃষ্ট পরিচয়। নিজের অন্তরকে প্রতিনিয়ত অধ্যয়ন কর। যদি
দেখ তােমার জীবন-পথের সঙ্গী স্বামীটীকে নিতান্ত রক্তমাংসের
মানুষটীর মতই পাইবার জন্য তােমার চিত্ত ব্যগ্র হইয়াছে, তবে জানিবে
প্রেম এখানে মায়া-মরীচিকা, অতি দুরে, দুরান্তরে। প্রেমে স্বার্থ মরে,
আত্মসুখ পলায়ন করে। আশীৰ্বাদ করি, প্রকৃত প্রেমিকা হও, ভালবাসার
সত্য সম্পদে সমৃদ্ধ হও। বাজে, মেকি, মিথ্যা প্রেমের বেসাতী লইয়া
কয় দিন চলিবে ? ফাকিবাজিতে শান্তি মিলিবে না। স্বামীর সঙ্গ
তােমাকে শাস্তির পথে লইয়া যাইবে, এই জন্যই তােমার সধবা জীবন,
নতুবা ত’ কুমারী হইয়া থাকাই পরমমঙ্গল ছিল।
শুভাশীষ
জানিও। ইতি-
আশীৰ্বাদক
স্বরূপানন্দ

সধবার সংযম যােড়শ পত্র জয় মা নগরপাড়, ত্রিপুরা ১৩ পৌষ, ১৩৪০ কল্যাণীয়াষু ঃ- মেহের মা, * * * সংযম-সুখের আস্বাদন যে একবার পাইয়াছে, তার পক্ষে ইন্দ্রিয়-সুখে প্রলুব্ধ হওয়া এক অসম্ভব ব্যাপার। ইন্দ্রিয় সুখেও একটা তৃপ্তি আছে কিন্তু, তাহা অস্থির তৃপ্তি, ক্ষণস্থায়ী তৃপ্তি। সংযমের তৃপ্তি স্নিগ্ধ ও চিরস্থির। দেহের সহিত দেহের মিলনে ইন্দ্রিয়- সুখের আস্বাদন, ভগবানের সহিত জীবের মিলনে সংযম-সুখের আস্বাদন। ভগবানের জন্য ব্যাকুল হও, মনকে তারই ধ্যানে ডুবাইয়া রাখ, অহর্নিশ তার পরম পবিত্র নাম স্মরণ কর, প্রেমের মধু লুণ্ঠন কর। জগতের ঘৃণ্য আবর্জনার পানে আর ফিরিয়া চাহিও না। মনে জানিও, তুমি বিদেহী। দেহটা তােমার কিন্তু তুমি দেহ নহ। দেহ তােমার কর্তব্য কৰ্ম্ম সম্পাদনের জন্য যন্ত্র মাত্র, প্রয়ােজন-মত এ যন্ত্রের তুমি ব্যবহার করিতে পার। নিষ্প্রয়ােজনে ইহাকে ফেলিয়া রাখিতে পার। দেহের সহিত নিজেকে এক বলিয়া কখনাে ভ্ৰম করিও । দেহের ক্ষুধা আর ভােমার ক্ষুধা এক নহে। দেহের উত্তেজনা যেন তােমাকে উত্তেজিত না করিতে পারে। সর্বমঙ্গলদাতা তােমাকে মঙ্গলান্বিত করুন। ইতি আশীৰ্বাদক- তােমার আদরের সন্তান স্বরূপানন্দ

৩২
সধবার সংযম
সপ্তদশ পত্র
জয় মা
ধান্যকুড়িয়া, ২৪ পরগণা
১০ মাঘ, ১৩৪০
পরমকল্যাণীয়াষু ঃ-
মেহের মা, অনেক দিন পত্র দেই নাই। অবসর ছিল না।
তাই বলিয়া মনে করিও না, ছেলে তার মাকে ভুলিয়া গিয়াছে।
আজ দুই দিন হয় বাপ-ধনের পত্র পাইয়াছি। তোমার আচরণে
সন্তোষ জানাইয়া সে পত্র দিয়াছে। ইহাতে আমিও সন্তোষ লাভ
করিয়াছি। বাপধনের ভয় ছিল, বিবাহ করিয়া নরকে ডুবিবে।
কিন্তু মা, তুমি যদি হও নরকের প্রতিমূর্তি, তােমার দেহ-মন যদি
হয়, নরকের মত অপবিত্র অশুদ্ধ, তােমার চিত্তবৃত্তি যদি হয় নরকের
মত কদৰ্য্য, নরকের মত পাপ-পঙ্কিল, তবে ত’ তােমার স্বামী
তোমাকে পাইয়া নরকে ডুবিবে! আর তুমি যদি হও দেবতার
নিৰ্ম্মাল্যের মত পবিত্র, স্বর্গের পারিজাতের মত সুন্দর, যজ্ঞােপবীতের
মত শুভ, তবে তােমার সঙ্গ আর স্বর্গসুখ ত’ একই কথা হইবে না।
বাপধনকে তুমি পাপেও ডুবাইতে পার, পুণ্যের পথেও পরিচালিত
করিতে পার। তুমি যে পুণ্যময়ী হইয়া তাহাকে প্রতিপদে সত্যের
পথে, মঙ্গলের পথে সহায়তা করিতেছ, ইহাই আমার ঐকান্তিকী
তৃপ্তির কারণ জানিও। আশীষ লইও, স্নেহ দিও। ইতি
তােমার আদরের ছেলে
স্বরূপানন্দ

সধবার সংযম অষ্টাদশ পত্র জয় মা সিরাজগঞ্জ, পাবনা ১ লা ফাল্গুন ১৩৪০ পরমকল্যাণীয়াষু ঃ- স্নেহের মা, দিন কয়েক হয় আমি সিরাজগঞ্জ আসিয়াছি। একটা ম! বলিলেন,—কিছু উপদেশ দিন। আমি বলিলাম-“এতকাল পুরুষেরা তােমাদিগকে রাক্ষসীজ্ঞানে, সর্পিণীজ্ঞানে, ব্যাব্রিণীজ্ঞানে দূরে পরিহার করিতে চাহিয়াছে। তার কারণ, এতকাল তােমরা পুরুষজাতির রক্তশােষণে, পুরুষের সংযমের বিনাশ-সাধনে, পুরুষের দুর্বলতা বৃদ্ধির ব্যাপারে ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় কেবল সহায়তা করিয়াছ। আজ হইতে তাহা করিতে বিরত হও। আজ হইতে তােমরা নিজেদের সংসর্গের দ্বারা স্বামীদের ভিতরে পবিত্রতা জাগাইতে, সংযম জাগাইতে প্রয়াসিনী হও। ইহাই আমার একান্ত উপদেশ। পবিত্রতার হইবে যখন আকর, তখনি তােমরা তােমাদের প্রকৃত মহিমাতে প্রতিষ্ঠিত হইবে।” গত পরশ্ব এখানে মায়েরা প্রায় দুই তিন শত জন কিছু সদুপদেশ শুনিবার জন্য আসিয়াছিলেন। তাহাদিগকেও আমি ঐ কথাই বলিয়াছি। বলিয়াছি—“তোমরা কি মায়েরা পিশাচীর মত নিকৃষ্ট বস্তুতে মজিয়া থাকিতে চাও, না, দেবতার শ্রীমূৰ্ত্তি ধরিয়া পূজার আস্পদ হইতে চাও ? নিকৃষ্ট সুখে অনুরাগিণী হইয়া ইতর সুখের আস্বাদনে ডুবিয়া তােমরা যদি নারকীয় ঘৃণিত জীবনই যাপন করিতে চাই, চিরকাল পুরুষেরা তােমাদিগকে বিভীষিকার ন্যায় বর্জন ৩৪ সধবার সংযম করিবে, চিরকাল পুরুষের জাতি তােমাদিগকে নরকের দ্বার বলিয়া কীৰ্ত্তন করিবে, চিরকাল পুরুষের জাতি তােমাদিগকে দিনের মােহিনী রাতের বাঘিনী বলিয়া নিন্দা করিবে। আর তােমরা যদি সংসারীর সহস্র আবিলতার মধ্যে রহিয়া ও শ্রেষ্ঠ সুখকে পাইতে চেষ্টাশীল হও, শ্রেষ্ঠ সুখের পথে পুরুষকে পরিচালিত করিতে যত্নবতী হও, জঘন্য ইন্দ্রিয়-পরিতৃপ্তি ব্যতীতও জীবনের কুন্তে অপর মধু অাছে, তাহার সন্ধান নিজের লও এবং স্বামীকে দাও, তাহা হইলে চিরকাল পুরুষের জাতি তােমাদিগকে পরমেশ্বরের মহিমার আরতির বাতি বলিয়া সাদরে গ্রহণ করিবে।” মনে হইল এখানকার মায়েরা আমার কথাগুলি বুঝিয়াছেন। অনেকের মুখশ্রীতে একটা সজীবতার দীপ্তি ফুটিয়া উঠিতে দেখিলাম। বুঝাইতে জানিলে মেয়েরা সবই বুঝে, এতদিন কেই বুঝায় নাই। তুমি যে মা আসামের সুদুর পল্লীতে বসিয়া নির্বিকার সংযমে স্বামীর কাজ করিতেছ, তােমার এই অপূর্ব সামর্থ্য কি অমনি আসিত ? মায়ের জাতিকে তার প্রকৃত মর্যাদার কথা বুঝাইবার জন্য আজ তােমাদিগকে নিজ হাতে কভার গ্রহণ করিতে হইবে। সেইজন্য মনে প্রাণে প্রস্তুত হও। শুভাশীষ, জানিও। কুশল জানাইও। ইতি আশীর্বাদক- তােমার স্নেহের সন্তান স্বরূপানন্দ

সধবার সংযম
উনবিংশ পত্র
জয় মা
চন্দনবাইসা, বগুড়া
৬ ফান, ১৩৪•
কল্যাণীয়াষু ঃ-
মেহের মা,তােমার উৎসর্গে উন্মুখ চিত্তকে আমি অভিনন্দন দিতেছি।
কিন্তু তুমি যার সঙ্গে পরিণয়-বন্ধনে আবদ্ধ রহিয়াছ, তাকে সঙ্গে করিয়া
ত্যাগের পথে নামিয়া যাওয়া চাই। ইহাই জীবনের পূর্ণতার লক্ষণ।
তোমার সর্বস্ব ঐগুরুর,-তােমার স্বামীটী কি মা তঁর পর ?
আশীৰ্বাদক
স্বরূপানন্দ
বিংশ পত্র
জয় মা
চন্দনবাইসা, বগুড়া
৯ ফাল্গুন, ১৩৪০
পরমকল্যাণীয়াষু :-
স্নেহের মা, মৌখিক ইঙ্গিতে আমি তােমাকে বলিয়া আসিয়াছিলাম
যে, স্বামী ও পত্নীর সম্বন্ধটাকে কেবলই দেহের সম্বন্ধ বলিয়া বিবেচনা
করিলে চলিবে না, তাহাদের প্রকৃত সম্বন্ধ দেহের অতীত জগতে
বিরাজিত। ভালবাসা হইবে প্রাণে প্রাণে, আত্মায় আত্মায়। দেহের

সধবার সংযম
প্রতি দেহের আকর্ষণ ভালবাসা নামেরই যােগ্য নয়, ইহা অত্যন্তই
ক্ষণভঙ্গুর ও অলীক
তােমার প্রিয়তম স্বামীর দিকে তীক্ষ দৃষ্টিতে
তাকাইয়া অন্বেষণ করিয়া লও, তিনি আছেন কি তার দেহে, না অন্যত্র।
স্বামীর যথার্থরূপ চিনিয়া লও,-জীবন অমৃতময় হইবে, আনন্দময়
হইবে। পরস্পর পরস্পরের পরিচয় গ্রহণ কর এবং পরিচয়-প্রসঙ্গে
দেহের চঞ্চলতা যথাসম্ভব পরিহার করিয়া সংযমব্রত অবলম্বনেও যত্নবতী
চিত্তের স্নিগ্ধতা সংযম-পালনের সহায়। চিত্তের রুক্ষ্মতা সংযম
পালনের বিঘ্ন। ক্রোধ ও আলস্য এই দুইটাই সংযমের পরমশত্রু।
এইসব অরাতি-নিচয়কে ধ্বংশ করিয়া সিংহিনী-বিক্রমে কর্তব্যের পথে
ধাবিত হও।
আশীৰ্বাদক
স্বরূপানন্দ
জয় মা
একবিংশ পত্র
চন্দনবাইসা, বগুড়া
৯ ফান, ১৩৪০
পরমকল্যাণীয়াষু ঃ-
মেহের মা, সংসারের প্রতি আসক্ত চিত্তকে শনামের বলে
অনাসক্ত কর। যে বস্তুর প্রতি চিত্ত যখন লোলুপ হইবে, সেই
।

সধবার সংযম ৩৭ বস্তুই তৎক্ষণাৎ তোমার পরমােপাস্যের শ্রীচরণে অর্পণ কর। ভােগ-বুদ্ধি জাগ্রত হইলে ভােগ্যবস্তু তাহার পাদপদ্মে অঞ্জলি দাও। লালসার পীড়নে চিত্ত অধীর হইলে অহর্নিশ দেহ-মন-প্রাণ তারই শ্রীপাদপ্রান্তে উপঢৌকন দিতে নিরত হও। তােমার বলিতে কিছু রাখিও না, সব তুমি তারই শ্রীহস্তে তুলিয়া ধর, যন্ত্রী হইরা যন্ত্রবৎ তিনি তােমাকে একমাত্র নিত্যশুভের পানেই পরিচালিত করিবেন। তােমার ব্যক্তিত্ব, তােমার অহংবােধ, তােমার কর্তৃত্ববুদ্ধি সব তার কাছে বিকাইয়া দাও। এক কণা সুখলিঙ্গাও যদি অন্তরে জাগে, তবে তাও তাকেই দিয়া দাও। ইহাই পরমমঙ্গল লাভের পথ, অমৃত আস্বাদনের অভ্রান্ত উপায়,-সংযম লাভের শ্রেষ্ঠ কৌশল। জীবন তােমার দাম্পত্য,—এ জন্যই যে সংযম প্রতিষ্ঠা অসম্ভব, ইহা নিমেষের জন্যও বিশ্বাস করিও না। অসম্ভব হইলেও পূর্ণ-সংযম প্রতিষ্ঠার জন্যই আমি তোমাকে উপদেশ দিলাম। কিন্তু অসম্ভব ইহা আদৌ নহে,এমন কি ইহা খুব কঠিনও নহে। ইচ্ছা করিলেই তুমি পূর্ণ সংযমকে তোমার জীবনে প্রতিষ্ঠিত করিতে পার, এই জন্য অনেক কিছু অসাধ্যসাধন করিতে হয় না। তােমার জীবনের যিনি পরমােপাস্ত, তাকে একটুখানি ভালবাস, একটুখানি প্রেম দাও, প্রেমই তােমাকে নিত্যানন্দধামের দিকে টানিয়া নিয়া যাইবে, সংযম আপনিই সুপ্রতিষ্ঠিত হইবে। তােমার সংসারী জীবনটাই একটী আশ্রমীর জীবন বলিয়া মনে করিবে। শ্ৰীপ্রভু তােমার এই আশ্রমের অধিষ্ঠাতা প্রাণ-পুরুষ। তাঁর পুণ্যময় প্রভাব এই আশ্রমের সর্বত্র প্রকটিত। তার আশীষময়ী। অবস্থিতি এই আশ্রমের প্রতি অনুতে, প্রতি রেণুতে। তার প্রেমময় স্বভাব এই আশ্রমের অন্তরে বাহিরে সততভাবে বিরাজিত।

সধবার সংযম
খুলিয়া চাহিয়া দেখ, ধ্যানের নেত্রেও লক্ষ্য কর, এবং উপলব্ধি করিয়া
ধন্য হও। তােমার উপরে এই আশ্রমের পবিত্রতা রক্ষা করার ভার
তিনি দিয়াছেন, কারণ তুমি যােগা অধিকারিণী। অহংবুদ্ধির দিক্ দিয়া
বিচার করিতে যাইও না, তিনিই তার অপার কৃপার বলে তােমাকে এই
আশ্রমের সেবাধিকারিণী করিয়াছেন, এখানেও তারই মহিমা প্রস্ফুটিত।
তােমাকে তােমার কর্তব্য পালন করিতে হইবে, বড় আদরে যে কর্মভার,
যে দায়িত্ব তােমার স্কন্ধে তিনি অৰ্পণ করিয়াছেন, তাহার সম্মান প্রাণ
শ্রমসহকারে তােমাকে অক্ষুন্ন রাখিতে প্রয়াসিনী হইতে হইবে,—নিজের
জীবনের অলঙ্ঘনীয় মৰ্যাদা দ্বারা স্বামীকে রাখিতে হইবে ধর্মপথে,
পুত্রকন্যাদিগকে চালাইতে হইবে ধর্মপথে।
যখন যাহা জানাইতে হয়, অকপটে জানাইও। কুশলে আছি।
আশীষ জানিও। ইতি,
আশীৰ্বাদক
স্বরূপানন্দ
দ্বাবিংশ পত্র
জয় মা
চন্দনবাইসা, বগুড়া
৯ ফাল্গুন, ১৩৪০
পরমকল্যাণীয়াষু :-
মেহের মা, * * * নারীজন্ম গ্রহণ করিয়াছ,-মহাপুণ্যের ফলে,
পাপের ফলে নহে। এইরূপ বিশ্বাস সর্বদা অন্তরে পােষণ করিও।

সধবার সংযম মায়ের জাতি হইয়াছ, সন্তানের জাতির পূজার স্থানীয় হইয়াছ, নিশ্চয়ই জন্মজন্মান্তরীণ সুকৃতির ফলে। বিশ্বাস করিও, বিশ্বজগতের মা তুমি, জগদ্ৰব্ৰহ্মাণ্ডেরই তুমি জননী, তুমি জীবধাত্রী, পালয়িত্রী, মঙ্গলময়ী জগন্মাতৃকা। আমরা সন্তানেরা তােমাদিগকে পূজা করিব, মহামন্ত্র “মা” উচ্চারণে কামজয়ী হইব, রিপুকুল ধ্বংস করিব, তােমাদের স্নেহ- কটাক্ষের অব্যর্থ শক্তিতে জগতে দিগ্বিজয় করিব, কীৰ্ত্তি প্রতিষ্ঠা করিব। তােমার যে মহিমা কোথায়, তােমার যে গৌরব কোথায়, তােমার প্রকৃত প্রতিষ্ঠা কোথায়, তাহা তােমাকে সর্বদা স্মরণ রাখিতে হইবে মা। তবেই তুমি তােমার উপযুক্ত হইতে পারিবে। পুরুষজাতির নিকটে লালসার উগ্ৰমদিরা পরিবেশনই তােমার জীবনের চরম সার্থকতা নহে, উদ্বেলতরঙ্গাকুল বাসনা-বিপুল উন্মত্ত সমুদ্র-গর্জনকে কুটি- ভঙ্গীতে স্তম্ভিত করিয়া দেওয়াই তােমার জীবনের মহনীয় ব্রত। পবিত্র পরিণয়-সূত্রে গৃহলক্ষ্মীরূপে তুমি একজনের ঘর আলাে করিয়া বিরাজিতা রহিয়াছ কেন জান মা? পুরুষের বহির্মুখী মনকে মেহের বলে প্রেমের বলে অন্তরের দিকে আকর্ষণ করিবার জন্য, তাকে নরকে ডুবাইবার জন্য নহে। সাহায্য কর তাকে, বল দাও তাকে, উৎসাহ যােগাও তাকে। নিজের শক্তি নিজের মধ্যে রাখিয়া সে যেন তার জীবনের পরমারাধ্য দেবতাকে সত্য করিয়া লাভ করিতে পারে, তেমন প্রেরণা দাও তাহাকে। তবে ত তােমার গৃহলক্ষ্মীরূপে সান্ত গৃহে অনন্ত সুষমায় পরিমণ্ডিত হইয়া অবস্থান করার সার্থকতা সম্পাদিত হইবে। স্ত্রী স্বামীর নিত্যসঙ্গিনী হউক, অনিত্য সুখ হইতে তাহাকে বিরত করুক, অনিত্যের সেবা হইতে তাহাকে পরাত্মখ করুক, ক্ষণিক তৃপ্তির মােহে আজীবন দুঃখ-দুর্দৈন্য সঞ্চয়ের মন্দবুদ্ধি হইতে তাহাকে রক্ষা সধবার সংযম করুক। তবে ত স্ত্রী যথার্থই সহধর্মিণী-পদবাচ্যা হইবে। ভােগের পথ হইতে মা নিজে প্রাণপণ যতে নিজের মনকে আগে ফিরাও, তারপরে তােমার অসামান্য প্রভাবের দ্বারা স্বামীর মনকে নিত্যের প্রতি প্রধাবিত কর। সংসার সুখময় হউক, ধরণী স্বর্গত্ব প্রাপ্ত হউক, বিবাহিত জীবনের বন্ধনক্লেশ-মােচন ঘটুক, দাম্পত্যজীবন নিত্য-মুক্তির সুখাস্বাদনে মধুর আশীৰ্বাদক তােমার স্নেহের সন্তান স্বরূপানন্দ। ত্রয়ােবিংশ পত্র জয় মা সরিষাবাড়ী, ময়মনসিংহ ১৮ ফাল্গুন, ১৩৪০ পরমকল্যাণীয়াষু ঃ- স্নেহের মা-*** এইসঙ্গে দুইখানা পত্র পাঠাইলাম। প্রথম পত্ৰখানা যে লিখিয়াছে, সে তােমারই মত একটী অর্ধশিক্ষিতা স্ত্রীলােক, বাড়ী কাছাড়। দ্বিতীয় পত্রের লেখক, তােমারই মত এক স্বল্পবুদ্ধি মেয়ের স্বামী, বাড়ী ত্রিপুরা। প্রথম পত্রের লেখিকা লিখিয়াছেন, “বাবা, পতিমুখে আপনার আদেশ পাইয়া এক বৎসর কাল সংযমব্রত অবলম্বন করিয়াছিলাম। আমার স্বামী যখন বিচলিত হইয়া যাইতেন, তখন বাবাকেই স্মরণ করিয়া সকল বিঘ্ন অতিক্রম করিতে পারিয়াছি সধবার সংযম ৪১ শুধু শ্ৰীবাবারই কৃপাতে। কত সময় তিনি অনুনয়, বিনয়, কখনাে বা ভয় প্রদর্শনের দ্বারা আমাকে সংযমতা করিতে চাহিয়াছেন, বাবারই আশীষে তার মনে পরিবর্তন আসিয়াছে এবং আমি ব্ৰত-বিরােধী কথা শুনি নাই বলিয়া পরিশেষে তিনি আনন্দে গদগদ হইয়াছেন।” প্রথম পত্রের লেখিকার স্বামী আমাকে লিখিয়াছেন,—“এতদিন মনে করিয়া- ছিলাম, নি–আমারই একটা জিনিষ। কিন্তু এখন মনে হইতেছে যে গুরু পূজারই সে পবিত্র কুসুম।” দ্বিতীয় পত্রের লেখক লিখিয়াছেন,-“আপনার স্নেহের মা আমাকে ব্ৰতরক্ষায় সর্বদা সহায়তা করিতেছে। তাহার সাহায্যেই আমি অগ্রসর হইতে পারিতেছি। পূৰ্ব্ব-সংস্কার যখন আমাকে বিপথে টানিয়া নিতে চাহিয়াছে, আপনার আশীর্বাদের শক্তিতে বলীয়সী এই অবােধা বালিকা আমাকে ফিরাইয়া আনিতে সামর্থ্যের অভাব প্রদর্শন করে নাই। ধন্য তিনি, যার ইচ্ছার ইঙ্গিতে একটী মজ্জমানা ক্ষুদ্র তরণী নিজেকে সামলাইয়া লইয়া পরিশেষে প্রবল ঝড়ের মুখে কাণ্ডারীহীন মাস্তুলহীন মজ্জনোমুখ বিশাল অর্ণবপােতকে রক্ষা করিয়া যায়।” পত্ৰলেখক ও লেখিকারা অবশ্য তাহাদের সাফল্যজনিত আনন্দের উচ্ছাসে সকল প্রশংসা নিয়া আমার ঘাড়ে ফেলিয়াছেন। এই প্রশংসা আমার প্রাপ্য নহে, প্রথমতঃ প্রাপ্য ঐভগবানের এবং গৌণভাবে প্রাপ্য তাদের পুরুষকারের। কিন্তু সে কথা আমার আলােচ্য নহে। এই পত্রাংশগুলি উদ্ধত করিয়া আমি ইহাই বলিতে চাহি যে, সধবার জীবনে সংযম অসম্ভব নহে এবং সংযমের সাধনায় সিদ্ধি লাভ করিতে হইলে বি-এ, এম-এ, পাশ করিতেও হয় না, ডন-কুস্তিও করিতে হয় না। সামান্য একটু সঙ্কল্পের বল লইয়া, সামান্য একটু ভগব-বিশ্বাস লইয়া কাৰ্যারম্ভ করিলেই সিদ্ধি অনিবার্য।

৪২ সধবার সংযম একশত অশ্বমেধ যজ্ঞ করিলে যে ফল, এক বৎসর দাম্পত্য সংযমে সেই ফল। * ইতি আশীর্বাদক স্বরূপানন্দ চতুর্বিংশ পত্র জয় মা নবীনগর, ত্রিপুরা ২২ শে ফাল্গুন, ১৩৪০ মেহের মা, তােমার পত্ৰখানা পড়িয়া আনন্দ পাইলাম। ভােগের বুদ্ধি দ্বারা যখন নরনারী পরিচালিত হয়, তখন সংসার তাদের নিজের। সেবার বুদ্ধির দ্বারা যখন পরিচালিত হয়, তখন সংসার শ্রীভগবানের। তােমরাও তখন আর তােমাদের নও, তােমরাও তখন শ্রীগুরুর, তােমাদের দেহও তার, তােমাদের মনও তাঁর, তােমাদের বিলাসও তাহারই জন্য, তােমাদের লালসাও তাহারই প্রতি। নিজ- সুখার্থে কোনও কাজ তার সংসারে থাকিতে পারে না। নিবেদন কর নিজের সব কিছু, তারই অভয় চরণে। দেব-পূজার নৈবেদ্যের ন্যায় পবিত্রতার মাধুর্যে দেহ তােমার সাজুক, মন তােমার নাচুক, আত্মবিসর্জনের মধ্য দিয়া আজ অমর জীবন জাগাইয়া তােল। * এই পত্রখানা লিখিতে লিখিতে সহসা গুরুতর কাৰ্যানুরােধে শ্রীমৎ স্বামীজী লেখনী পরিত্যাগ করেন এবং এই সমাপ্ত অবস্থাতেই পত্রখানা ডাকে দেওয়া হয়।

সধবার সংযম ৪৩ দুইজনে মিলিয়া মহােৎসাহে নিজেদের শেষ আমিত্বটুকুও তার পায়ে ঢালিয়া দিবে, ইহারই নাম বিবাহ। লালসা মদিরা-পানে উন্মত্ত হইয়া পঙ্কিল সংসারের কাদামাটি অঙ্গে মাখিয়া মাতামাতি করার নামই বিবাহিত জীবন নহে। শুভাশীষ, জানিও। আশীৰ্বাদক স্বরূপানন্দ পঞ্চবিংশ পত্র জয় মা হবিগঞ্জ, হট্ট ২১ বৈশাখ, ১৩৪১ কল্যাণীয়াষু ঃ- মেহের মা, * * সংসার বর্জন করিয়া তােমাদিগকে ভগবৎ- কৃপা লাভের জন্য চেষ্টা পাইতে হইবে না। সংসারের মধ্যে থাকিয়াই সংসারকে জয় করিতে হইবে,বীরের মত যুদ্ধ করিয়া,প্রাণপাত সংগ্রাম চালাইয়া। প্রলােভনময় সংসারে থাকিয়াই সকল প্রলােভনের মুখে পদাঘাত করিয়া চলিতে হইবে। ক্ষণিক সুখ হইতে মনকে তুলিয়া নিয়া নিত্যসুখে প্রতিষ্ঠিত করিতে হইবে। অপর দশজন নরনারীর ন্যায় না চলিয়া জীবনকে সংযমের বলে ভােগবর্জনের বলে ত্যাগবুদ্ধির বলে একটা বিশিষ্টতা দান করিতে হইবে। তােমার জীবনের দৃষ্টান্ত দেখিয়া সহস্র সহস্র নরনারী কল্যাণের পথে অগ্রসর হউক, এই সঙ্কল্প লইয়া পথ চলিও। অন্তরে ভরসা রাখ যে, তােমার জীবন-কুসুমে একটা অপূর্ব সৌরভ থাকিবেই। কত অভাগিনী-নারী জগতে জন্মগ্রহণ করিল, ৪৪ সধবার সংযম দুই দিনের খেলা সাঙ্গ করিয়া সংসারের মায়া অনিচ্ছায় ছাড়িয়া চলিয়া গেল, কিন্তু ভগবৎ-প্রীতির রসাস্বাদন পাইল না, প্রকৃত সুখ চিনিল না, সংসার-সুখে মজিয়া, বিলাসিতায় ডুবিয়া, ভগবানকে ভুলিয়া, শুধু দুঃখ আর দাবানল, ব্যর্থতা আর অশান্তিই বহন করিয়া লইয়া গেল। এইরূপ জীবন যেন মা তােমাকে যাপিতে না হয়। তুমি যেই দিন নশ্বর তনু ত্যাগ করিবে, সেই দিন যেন ভগবানের পায়ের কোণায় তােমার একটা অসিন থাকে, চিরশান্তিময় পরমবিধাতার স্নেহময় ক্রোড়ে যেন তােমার অধিকার থাকে। বিলাসিতার পাপময় পঙ্কে জগৎ ডুবিয়া রহিয়াছে, ভােগের লালসায় সকলের প্রজ্ঞানেত্র পাইয়াছে,তােমার জীবনের ত্যাগ ও পবিত্রতার দ্বারা, সংযম ও শুদ্ধতার দ্বারা জগৎকে পরিত্রাণ কর । প্রমাণিত কর যে, দাম্পত্যজীবন ধৰ্ম্ম-সাধনারই জীবন, কামুকতার কদৰ্য্য অনুষ্ঠান সমূহ বাধ্যকর নহে। * * শুভাশীষ জানিও। ইতি আশীৰ্বাদক তোমার স্নেহের সন্তান স্বরূপানন্দ ষড়বিংশ পত্র ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ত্রিপুরা ৫ জ্যৈষ্ঠ, ১৩৪১ পরমকল্যাণীয়াযুঃ- মেহের মা, তােমাকে দর্শনমাত্র যেন পুরুষ মাত্রেরই মনে “মা” সধবার সংযম ৪৫ কথাটী জাগিয়া ওঠে, এমন ভাবে নিজের মহিমাকে প্রস্ফুরিত করিয়া তােল। “মা” কথাটা যেন জাগে দৈববাণীর মত, অনাহত ধ্বনির মত স্বতঃ-প্রেরণায়, “মা” কথাটা যেন জাগে বজ্রগর্জুনের মত অভ্রান্ত আরাবে। তােমার মুখের বাণী, তােমার পায়ের স্পর্শ, তােমার চখের দৃষ্টি, তােমার রূপের বিভা যেন পুরুষ-জাতির ভিতরে অনাড়ম্বর মাতৃভাব সহজাত প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ করিয়া তােলে। সাজিয়া গুজিয়া যেন কেহ তােমাকে “মা” ডাকিতে না আসে, “মা” বলিয়া ডাকিবার আগে যেন কাহাকেও থিয়েটারের পাঠ মুখস্থ করিতে না হয়। মাতৃজাতীয়া হইয়া জন্মগ্রহণ করিবার যে মহনীয় সার্থকতা, তাহা ইহা দ্বারাই প্রমাণিত হইবে। কিন্তু মা, সকল জগতের যিনি মা হইবেন, নিজ স্বামীর নিকটেও তার একটা পবিত্রতার মর্যাদা, একটা পরিশুদ্ধতার সৌন্দৰ্য্য অক্ষুন্ন থাকা দরকার। বিশ্বের যিনি জননী, তিনি স্বামি-সােহগের মধ্যেও একটা সম নিশ্চিতই রক্ষা করিয়া চলিবেন। স্বামীর নিকটে স্ত্রীর লজ্জা নাই, সঙ্কোচ নাই, একের সর্বস্ব অপরের, একের নিকট অপরে সর্বতােভাবে অকুণ্ঠিত-ইহা দাম্পত্য ধর্মেরই একটা বিশেষত্ব। কিন্তু সামান্য রমণীতে আর মাতৃময়ী রমণীতে পার্থক্য আছে। সামান্যা রমণী তার ছাগবুদ্ধি স্বামীর সন্নিকটে ছাগবৎ, শূকরবুদ্ধি স্বামীর নিকটে শূকরীবৎ, কুক্কুরবুদ্ধি স্বামীর নিকটে কুকুরীবৎ নিৰ্লজ্জা ও কামপরায়ণ। হইয়া থাকে। মাতৃময়ী রমণী তাহা হইতে পারেন না। মাতৃময়ী রমণী সন্তান-লাভার্থে ধৰ্ম্মবুদ্ধিতে স্বামি-সহবাস করিতে পারেন, করিয়া থাকেন, কিন্তু ধর্মবুদ্ধিবর্জিত বা সন্তান-লাভােদ্দেশ্য-ৰঞ্চিত বৃথা-সম্ভোগের জন্য উন্মত্ত-প্রায় লালসা-ব্যাকুল স্বামীকে তিনি স্নেহের প্রভাবে প্রেমের প্রভাবে সাদর সম্বর্ধনার মধ্য দিয়াই কামবিরত ও সংযমী করিতে পারেন ৪৬ সধবার সংযম এবং করিয়া থাকেন। শুধু সন্তানদের নিকট দাড়াইয়াই মা তােমাকে মাতৃময়ী প্রতিভার প্রকটন করিয়া ক্ষান্ত থাকিলে চলিবে না, তােমার প্রাণসম যে প্রিয় স্বামি-দেবতা, তারও চিত্তের প্রবল কামক্ষুব্ধ উন্মত্ততাকে স্নেহ-কর-পরশে স্নেহ-মধু-সুভাষে স্নেহ-সুধ'-দরশে প্রশান্ত করিয়া তার কামলুব্ধতা দূর করিতে হইবে, তার ভিতরের শিবকে, তার অন্তরের প্রেম-স্বভাব স্নিগ্ধ-চেতা মহামানবকে জাগাইয়া তুলিতে হইবে। বুঝিলে মা, ইহাই তােমার সতীত্ব-সাধনার পরম গৌরব। ইহাই তােমার সধবা-জীবনের পরম সৌষ্ঠব। ইহাই তােমার দাম্পত্য সাধনার পরম সৌরভ। তােমার জীবন ফুলের মত সহান্য আননে ফুঠিয়া উঠুক, শারদীয়া জ্যোৎস্নার ন্যায় পবিত্রতার দিব্য জ্যোতিঃ তােমার প্রতি অঙ্গ দিয়া প্রতি প্রত্যঙ্গ দিয়া বিকশিত হউক। সতা বা অসম্বতা, আবৃতা বা অনাবৃতা, যে কোনও অবস্থাতে তােমাকে দর্শন করিয়াও যেন তােমার স্বামীর চিত্তে কখনাে লালসার খাণ্ডবানল জ্বলিয়া না উঠিতে পারে, তার মনে বা প্রাণে লালসার কৃমিকীটগুলি কিলিবিলি করিয়া না উঠিতে পারে, তােমার সমগ্র শরীরের প্রত্যেকটী অনুপরমাণু তেমন ভাবে গঠিত হইয়া উঠুক। তােমার নিশ্চিতই মনে আছে, সেদিন আমি মৌখিক উপদেশকালীন তােমাকে বলিয়াছিলাম যে, সচ্চিন্তা অবিরাম করিতে থাকিলে চিন্তার অচিন্ত্য শক্তিতে দেহের অসাত্ত্বিক পরমাণু সমূহ ক্রমশঃ সাত্ত্বিক অনুপরমাণুতে পরিণত হয়। সত্যম্বরূপ শ্রীভগবানে সৎস্বরূপ নামের সহায়ে নিয়ত তােমার যাবতীয় চিন্তাপ্রবাহকে যুক্ত করিয়া রাখ,তােমার জীবনের পরম পবিত্রতা ইহা দ্বারাই আপনি সুপ্রতিষ্ঠিত হইয়া যাইবে। শুভাশীষ জানিও। বাপধনকে এই পত্র দেখাইও। তােমার

সধবার সংযম
৪৭
উন্নতিমুখিনীপ্রেরণা তােমার স্বামীকে সংযমের পথে, আত্ম-শাসনের
পথে টানিয়া আনিতে সমর্থ হউক। ইতি
আশীৰ্ব্বাদক
তােমার আদরের ছেলে
স্বরূপানন্দ
সপ্তবিংশ পত্র
জয় মা
গগাবিন্দপুর, ময়মনসিংহ
৭ জ্যৈষ্ঠ, ১৩৪১
নিত্যাশীৰ্ভাজিনীষু ঃ
স্নেহের মা, তােমার পত্রগুলি একে একে সবই আমার নিকট
পৌছিয়াছে। কিন্তু একান্ত অবসরের অভাবেই উত্তর দিয়া উঠিতে
পারি নাই। অদ্য একটা সুসংবাদ দিবার জন্য জোর করিয়া সময় করিয়া
লইয়া এই পত্র লিখিতে বসিলাম। অদ্য বিকালে সন্নিকটস্থ গাঙ্গাটিয়ার
জমিদার বাড়ীতে গিয়াছিলাম। যৌগিক আসন-মুদ্রাদি শিক্ষাদান
প্রসঙ্গে একটী সভা হইল। তাহাতে জমিদার-বাড়ীর কয়েকটী অল্পবয়স্কা
অনুঢ়া কন্যা আমার প্রদর্শিত আসন ও মুদ্রাগুলি সৰ্বসমক্ষে অভ্যাস
করিয়া দেখাইল। নিশ্চয়ই সংবাদটী শুনিয়া আনন্দিত হইবে।
ভারতবর্ষে কখনাে কখনাে প্রয়ােজনের অতিরিক্ত সংখ্যায়
চিরকৌমার-ব্ৰতধারী সন্ন্যাসী আবিভূত হইয়াছিলেন। তাহার ফলাফল
দর্শনে ইহাই মনে হয় যে, প্রকৃত সন্ন্যাস সহজলভ্য বস্তু নহে এবং

৪৮ সধবার সংযম যুগাচাৰ্য্য সন্ন্যাসী জগতে চিরকালই সংখ্যায় অল্প থাকিবেন। সম্প্রতি নারী-জাতির ভিতরে চিরকৌমার-ব্ৰত ধারণ করিয়া সন্ন্যাস-সঙ্কল্প লইয়া আত্মমােক্ষ বা জগদ্ধিত সাধনের প্রেরণা পরিলক্ষিত হইতেছে। ইহা খুবই প্রশংসনীয় সন্দেহ নাই, কিন্তু এর জুটাইতে পারি না বলিয়াই যাহার কন্যাদিগকে চিরকুমারী রাখিতে ইচ্ছুক, তাহারা চিরকৌমার্যকে তার প্রাপ্য সম্মান প্রদান করিতেছেন, এরূপ মনে করিতে পারি না। যে ক্ষেত্রে কন্যার মনে কোনও প্রকারেই বিবাহিত জীবনের জন্য একটা আগ্রহ সৃষ্টি করা সম্ভব হইতেছে না, শত বাধা বিষুে উপেক্ষা করিয়া কন্যা তার সহজাত সংস্কারের বলে নিলালস জগতে বাস করিবার দুর্বার দুর্জয় সৎসঙ্কল্প সংগঠিত করিয়া তুলিয়াছেন, সদ্গুরুর কৃপায় একমাত্র সেই স্থানেই নারীর চিরকৌমার্য বা সন্ন্যাসিনী-জীবন তার যথার্থ মৰ্য্যাদায় মণ্ডিত হয়। এইরূপ সন্ন্যাসিনীদের পদজ আমি মস্তকে ধারণ করিয়া আনন্দে নৃত্য করিব। কিন্তু মা, অধিকাংশ নারীকেই ঠিক অধিকাংশ পুরুষের ন্যায় দাম্পত্য জীবন যাপন করিতে হইবে এবং বিবাহিত জীবনের মধ্য দিয়াই মানব- তনু ধারণের পরিপূর্ণ সার্থকতা সম্পাদন করিতে হইবে। এই জন্য অনুঢ়া অবস্থাতেই প্রতি বালিকার মনের মধ্যে সংযমের ভিত্তিভূমি রচিত হওয়া একান্ত আবশ্যক বলিয়া বিবেচনা করি। তােমরা তােমাদের বিবাহিত জীবনের ইন্দ্রিয়-বিমুখতা দ্বারা অনুঢ়া কিশােরীদের মনে একটা পবিত্রতার মােহনমধুর আলেখ্য সৃষ্টি কর। মুখ ফুটিয়া মা উপদেশ দিতে হইবে না,-পবিত্র জীবন যদি যাপন কর, তাহা হইলে তােমাদের অন্তরের অদৃশ্য আলােক ইহাদের অন্ধকারাচ্ছন্ন মানসকন্দরে কিরণ-সম্পাত করিবে। তােমর তােমাদের ভােগবুদ্ধি- হীনতা বা সংযত ভোগের দৃষ্টান্তের দ্বারা অনুঢ়া কিশােরীদিগের মধ্যে সধবার সংযম ৪৯ ভােগবুদ্ধিহীনতার রুচি ও ভােগ-সংযমের সামর্থ্য সৃষ্টি কর মা। বিবাহিতা রমণীরা আজ ভােগবুদ্ধিতে আচক্ষু ডুবিয়া রহিয়াছে, তাই না আজ তাহাদের গর্ভজাতা কুমারীরা পিশাচ-প্রকৃতি সম্পটের গুপ্ত প্রলােভনে এত সহজে টলিতেছে। প্রতি বৎসর সন্তান প্রসব করিয়া, অসংখ্য পুত্রকন্যার জননী হইয়া এক শ্রেণীর সধবারা অনুঢ়া কিশােরীদের মনে বিবাহিত জীবন সম্বন্ধে যে কদৰ্য্য ও বিভীষিকা-সঙ্কুল ঘৃণিত চিত্র নিজেদের অজ্ঞাতসারেই আঁকিয়া যাইতেছে, তােমরা তোমাদের সংযমের দ্বারা সে চিত্র-রেখাকে স্তম্ভিত ও ব্যর্থ কর। স্বরূপানন্দের যদি স্নেহের ধন হইয়া থাক, তাহা হইলে এই একটি কর্তব্য-ভার তােমাদের প্রত্যেককে নিজ নিজ স্কন্ধোপরি বহন করিতে হইবে। প্রত্যেক সধবা অপর একটী সধবাকে সধবা-জীবনের দায়িত্ব সম্বন্ধে সচেতন করিয়া তুলিবার ব্রত গ্রহণ কর। নিজ অন্তরে সংযমের জাগরণের সঙ্গে সঙ্গে অপরাপরের অন্তরে জাগরণ আনয়নের গুরুভার কৰ্তব্য গ্রহণ করিতে হইবে। পারিবে না,-একথা বলিও না। পারিবে না,–এরূপ কথা বিশ্বাস করিও না। তােমার কোনও ধৰ্ম্মসখীকে, তােমার কোনও মর্মসখীকে এইরূপ প্রাণঘাতিনী মিথ্যাকথা বিশ্বাস করিতে দিও না। সংযম-ব্রত পালন করিবার তােমাদের শক্তি আছে। স্বামী যেখানে সংযম-ব্রতের আংশিকও অনুকূল, সেখানে সংযম-ব্রত পালনের শক্তি তােমাদের পূর্ণতঃ রহিয়াছে। স্বামী যেখানে সংযম-ব্রতের প্রতিকূল, সেখানেও তােমরা কৌশল অবলম্বন পূৰ্ব্বক কল্যাণবুদ্ধিহীন স্বামীকে আস্তে আস্তে কল্যাণবুদ্ধিযুক্ত করিতে পার,—সে শক্তি শ্রীভগবান্ জন্ম- মাত্রই তােমাদিগকে দিয়া রাখিয়াছেন। একদিকে তোমাদিগকে তিনি যেমন অবলা করিয়াছেন, অপর দিকে তেমনি মহাবলাও করিয়া সধবার সংযম রাখিয়াছেন। একথা বিশ্বাস করিও মা, বিশ্বাস করিও। শুভাশীষ জানিও। ইতি শুভাশীৰ্বাদক স্বরূপানন্দ অষ্টাবিংশ পত্র কিশােরগঞ্জ, ময়মনসিংহ ১৩ই জৈষ্ঠ, ১৩৪১ কল্যাণীয়াযু :- মেহের মা, তােমার পত্র পাইলাম। ছেলে-মেয়েদের সবাইকেই ব্রহ্মচর্য-আশ্রমে পাঠাইয়া দিতে চাহিয়াছ। কিন্তু মা, তােমার সংসারটীকেই ত’ তুমি ব্ৰহ্মচৰ্য-আশ্রমে পরিণত করিতে পার। গৃহীর গৃহই সকল আশ্রমের মূল। তবে কেন বাহিরের পানে তাকাইতেছ ? অবশ্য, সকল গৃহীর গৃহকেই “আশ্রম” বলা চলে না। কোনও গৃহীর গৃহ কারাগার মাত্র, কোনও গৃহীর গৃহ মাতালের আজ্ঞা, কোনও গৃহীর গৃহ বা সাক্ষাৎ নরককুণ্ড। সেই সকল গৃহীর গৃহের কথা আমি বলিতেছি না। যে গৃহে স্বামী ও পত্নী উভয়েই ভগবানে ভক্তিমান, নিত্যপূজা নিত্য উপাসনা নিয়মিতভাবে করেন, সাধ্যানুযায়ী কাম-ক্রোধাদিকে দমন রাখিতে প্রয়াস পান, যথাশক্তি সর্বজীবের হিতসম্পাদনে চেষ্টা করেন, সেই গৃহই অশিম-পদবাচ্য। তেমন গৃহীর ঘরেই বুদ্ধ, শঙ্কর ও চৈতন্য, রামচন্দ্র ও শ্রীকৃষ্ণ আবির্ভূত হন।

সধবার সংযম তােমার গৃহটাকে সেইরূপ আশ্রমে পরিণত কর। যেদিন হইতে তােমরা স্বামিপত্নী উভয়ে সংযমের ব্রত গ্রহণ করিয়া তাহা পালনে চেষ্টাশীল হইবে, সেইদিন হইতেই দেখিবে, বিনা উপদেশে তােমাদের পুত্রকন্যারা সংযমানুমােদিত জীবন যাপনে নিজেদিগকে আকৃষ্ট বােধ করিতেছে। সন্তানকে সংযমী করা কঠিন কথা নয় মা। তুমি ও তােমার স্বামী একযােগে সংযম-পালনে কৃতসঙ্কল্প হওয়া মাত্র পরিবারুের ঐ ফিরিয়া যাইবে, সংসার নন্দন-কাননে পরিণত হইবে। বিবাহের পর হইতে প্রথম যৌবনটুকু যদি হিতাহিতবুদ্ধি-বর্জিত উদ্দাম সুখভােগে কাটিয়াই থাকে, তবে তাহার জন্য আফশেষ করিয়া সমস্থ কাটাইবার আর প্রয়ােজন নাই। যাহা ঘটিয়া গিয়াছে, তাহাকে বিস্মৃত হইতে দাও। যাহা এখনাে ঘটে নাই, তাহার উপরে নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত কর। *** শুভাশীষ জানিও। ইতি আশর্বাদক তােমার মেহে স্বরূপানন্দ জয় মা উনত্রিংশ পত্র শিলমালী, ঢাকা ১৬ জ্যৈষ্ঠ, ১৩৪১ কল্যাণীয়াযুঃ- মা, * * * কেন তুমি নিজ সন্তানকে সংযমোপদেশ দিবার জন্য গুরু, পুরােহিত বা শিক্ষকের অপেক্ষা রাখিবে? এমন একটা গুরুতর বিষয়ে তুমিই যে সব চেয়ে অধিক যােগ্যা উপদেষ্ট্রী। বুকে করিয়া সধবার সংযম যাহাকে পালন করিয়াছ, স্তন্য দিয়া যাহাকে বাঁচাইয়াছ, এমন প্রয়োজনীয় বিষয়ে উপদেশ যে মা তাকে তুমিই দিবে! সন্তানকে সাদরে কোলে বসাইয়া সংযমের অমৃতমাখা উপদেশ প্রদান কর। আত্ম- অপচয় হইতে, কদভ্যাসের দাসত্ব হইতে, অকালমৃত্যু হইতে তাহাকে রক্ষা কর। নিজে যখন ঔষধ জান, তখন ডাক্তার-কবিরাজের উপরে নির্ভর করা ভুল। তােমার উপদেশ নিশ্চিত ফলপ্রসূ হইবে। কারণ, তুমি তার মা। এই উপদেশ আরও অধিক ফলপ্রসূ হইবার কারণ তােমার নিজের সংযমের সাধনা। তুমি ত’ জান, তুমি তােমার স্বামীর সান্নিধ্যকে পভাবে গ্রহণ করিতে বিরত রহিতে সর্বদা প্রাণপণ চেষ্টা পাইয়াছ। তুমি জান, তুমি কার সন্তান। তুমি জান,কার তপস্যার ব্রহ্মবীর্যে তােমার আধ্যাত্মিক নবজন্ম। তুমি কেন তােমার নিজ সন্তানের সৰ্ব্বাপেক্ষা আবশ্যকীয় সেবায় সন্দিগ্ধতাকে প্রশ্রয় প্রদান করিবে মা? অজ্ঞান জীব অসত্যে রমণ করিতেছে। অসাধক জীব ক্ষণিক সুখেই ডুবিতেছে। তুমি তােমার সন্তানকে জ্ঞান দান কর, সাধক কর। আনন্দে আছি। আশীষ জানিও। ইতি আশীৰ্বাদক স্বরূপানন্দ সধবার সংযম ত্রিংশ পত্র জয় মা ২৯ শে জ্যৈষ্ঠ, ১৩৪১ কল্যাণীয়াষু :- স্নেহের মা, এখানে আসিয়া একসঙ্গে এক তাড়া চিঠি পাইলাম, যাহার জবাব লিখিতে চারি পাঁচ দিন লাগিবে। এইজন্য তােমার পত্রের উত্তর অতি সংক্ষেপে দিব। ছােট করিয়া পত্র লিখিলে তুমি দুঃখ প্রকাশ কর, মনে ব্যথা পাও, কিন্তু মা সংক্ষিপ্ত পত্রটুকুর সাথে সাথে প্রতিবার আমি নিজেই কি ছুটিয়া যাই না, তােমাকে মধুর মাতৃ-সম্ভাষণ করিয়া চিত্ত তৃপ্ত করিতে? দেহের দিক হইতে বিচার করিলে পুরুষ-দেহ এবং রমণী-দেহ উভয়ই সমান রমণীয় বা সমান বীভৎস। যৌবনে উভয়ের দেহই ফুল্ল কমলের ন্যায় নয়নের আনন্দদায়ক, বার্ধক্যে উভয়ের দেহই দর্শনে অরুচিপ্রদ। জীবস্তে উভয়ের দেহই স্পর্শে অম্লাধিক কোমল ও সুখপ্রদ, মৃত্যুতে উভয়ের দেহই অসুখস্পর্শ ও বিভীষিকা-বিস্তারক। সুতরাং রমণী-দেহ-ধারিণী বলিয়া নিজেকে ধিক্কার দিও না। এই জন্মে একটা “মেয়েলি খােলস” পরিয়া আসিয়াছ বলিয়াই নিজের ভাগ্যকে নিন্দা করিও না। শিরা-কঙ্কাল-গ্রন্থি-শালিনী ঘৃণনীয়া মাংস-পুত্তলি বলিয়া নিজেকে নিকৃষ্টা ভাবিও না। তােমার দেহের প্রত্যেকটা শিরায়, প্রত্যেকটা কঙ্কাল-খণ্ডে, প্রত্যেকটী গ্রন্থিতেই সংযমের মধুময় মন্ত্র উচ্চারণ করিয়া মাংসের পুতুলকে রক্তমাংসের অতীত জগতে টানিয়া লও মা, জগৎপুজ্যা হও। অস্থি, মাংস, মেদ, মজ্জা, ৫৪ সধবার সংযম মল, মূত্র, রক্ত ও পূযের আধার ভাবিয়া হতাশায় দেহকে নরকে ডুবাইয়া দিও না, প্রতি খণ্ড অস্থিতে, প্রত্যেকটা মাংসপেশতে, প্রতি বিন্দু মেদে, প্রতিকণা মজ্জায়, শরীরস্থ সপ্তধাতুতে এবং তাহাদের প্রত্যেকটা বিকারে সংযমের সুরভি মন্ত্র উচ্চারণ কর, দেহ-মনকে অপবিত্রতার উর্ধ দেশে স্থাপিত কর। কে বলে তােমরা নরকের কীট ? এই সকল মুখ- জনােচিত প্রলাপ-ভাষণে অবিশ্বাস কর, অবজ্ঞা কর। দাড়াও মা আজ সন্তানের জাতির সমক্ষে মাতৃময়ী মহামূৰ্ত্তি প্রকটিত করিয়া,দীর্ঘকাল- ব্যাপী তমসাচ্ছন্ন নয়নে আশার জ্যোতি ফুটাইয়া,—ভারতের সহস্ৰবৰ্ষ- ব্যাপী দুর্ভাগ্য আজ অপনােদিত হউক, প্রাক্তনের নিদারুণ গঞ্জনা, অদৃষ্টের অসহনীয় পরিহাস আজ উপত হইয়া মহাপ্রস্থান করুক। কুশলে আছি। কুশল দিও। শুভাশীৰ্বাদ জানিও। ইতি আশীৰ্বাদক স্বরূপানন্দ একত্রিংশ পত্র জয় মা নবীপর, ত্রিপুরা ২২ শে জ্যৈষ্ঠ, ১৩৪১ নিত্যাশীৰ্ভাজিনীষু :- মেহের মা, * তপস্যার দ্বারা ভিতরের প্রবৃত্তিকে দমন কর। ভগবানের নাম একাৰ্য্যে তােমার পরম বান্ধব। ব্ৰহ্মচর্যের ব্ৰত-সাধনে তুমি তােমার স্বামীর সহিত সমরুচি হইতে পারিয়াছ জানিয়া আমার আনন্দ ধরে না। প্রলোভন কখনও সংযম-ভ্রষ্ট করিতে চাহিলে সধবার সংযম ভগবানের নামের শরণাপন্ন হইও। তার নামই দুর্বলের বল, তার নামই নির্বান্ধবের পরম বান্ধব। অবিশ্বাস করিয়া যে তার নাম স্মরণ করে, পবিত্র নাম তারও কল্যাণ বিধান করে। বিশ্বাস পূৰ্ব্বক যে নাম করে, সে শতগুণ ফল পায়। নবযৌবনের এই পরাজয়-সঙ্কুল দুঃখকর সংগ্রামে তুমি নামের বলে বলীয়সী হইয়া অগ্রসর হও, নামের হুঙ্কারে রিপুকুলকে বিতাড়িত ও বিধবস্ত কর। ** * শুভাশীষ জানিও। ইতি নিত্যন্তভাভিলাষী স্বরূপানন্দ দ্বাত্রিংশ পত্র জয় মা কলিকাতা ২৯ শে জ্যৈষ্ঠ, ১৩৪১ কল্যাণীয়াষু ঃ- স্নেহের মা, শ্ৰীমা ন’-র পত্র পাইয়াছি। শ্রীমান্ দুঃখপ্রদ সংবাদ প্রেরণ করিয়াছে। তােমাদের উভয়ের ব্রত-বন্ধনে শিথিলতার কাহিনী সে বর্ণনা করিয়াছে। তােমার স্বামী এই আকস্মিক ব্রতচ্যুতিতে হতাশ ও হতবুদ্ধি হইয়া পড়িয়াছে। সে মনে করিয়াছে যে, বিবাহিতের ভােগবর্জিত জীবন যাপন অসম্ভব। কিন্তু মা, অসম্ভব ত’ নহেই, এমন কি দাম্পত্য জীবনে সংযম-সাধনাকে খুব কঠিন বলিয়াও মনে করা উচিত হইবে না। যদি অবশ্য, নামে মন থাকে। তােমরা যে ক্ষণিকের মােহে আত্মহারা হইয়া, নিমেষের দুর্বলতায় বিচার-শক্তি হারাইয়া সধবার সংযম ব্রতভঙ্গ করিয়া ফেলিয়াছ, ইহাতে দুঃখিত হইলেও হতাশ হই নাই। আরও প্রবল সঙ্কল্প কর যে, কঠোরতার সহিত দাম্পত্য ব্রহ্মচর্য রক্ষা করিবে এবং সর্বসঙ্কল্পের যিনি প্রকৃত সিদ্ধিদাতা সেই ভগবানের পবিত্র ইচ্ছার সহিত নিজ সৎসঙ্কল্পকে অভিন্ন বলিয়া অনুধাবন করিতে প্রয়াস পাও। শ্রীমান্ন’-লিখিয়াছে,-“শ্রীমতী ক’-র কোনও দোষ ছিল না, আমিই তাহাকে নানা প্ররােচনায় বশীভূত করিয়া ব্রতবিরােধী কার্যে রতা করিয়াছিলাম।” আমি ত বলি,-“দোষ ছিল।” তােমরা যখন একটা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ব্ৰতে আবদ্ধ, তখন এই নির্দিষ্ট সময় অতীত হইবার পূর্বে স্বামীর সকল সন্তোগ-চেষ্টাকে তুমি বাধা দিতে বাধ্য। কিন্তু বাধা তুমি দাও নাই। ইহা ত’ আমি মনে করি, তােমার মস্ত বড় দোষ। আমার যে মা হইবে, তার মধ্যে এত বড় একটা দোষ থাকা বড়ই পরিতাপের কথা। বলিয়াছিলাম, একজনের সংযম যখন টুটিতে চাহিবে, অপর জন তখন তাহাকে সংযম রক্ষায় সাহায্য করিবে। এই কথা আমি পুনরায় বলিতেছি। এই কথা আমি দৃঢ়কণ্ঠে বলিতেছি। এই কথা উভয়ে প্রাণমন দিয়া শ্রবণ কর। *** তােমাদের কুশল দিও। আশীৰ্বাদ জানিও। ইতি ভাণীৰ্বাদক স্বরূপানন্দ

সধবার সংযম
ত্রয়ত্রিংশ পত্র
জয় মা
করকে, মানভূম
৯ আষাঢ়, ১৩৪১
কল্যাণীয়াষু
স্নেহের মা, শুভাশীষ জানিও।
স্বামি-পত্নীতে সংযমের ব্রতে আবদ্ধ হইবার পরে বারংবার তােমরা
স্খলিতব্রত হইয়াছ, এই কথা সত্য বটে। কিন্তু শত পতনের মধ্যেও
পুনরায় উত্থান লাভের প্রাণান্ত চেষ্টার মধ্য দিয়াই তােমরা পূর্ণ অভ্যুদয়,
লাভ করিবে।—হাল ছাড়িও না।
জানিয়া খুবই প্রীত হইয়াছি যে, এবার তােমাদের সংযম দীর্ঘকাল
ধরিয়া অটুট রহিয়াছে। সঙ্কল্পকে দৃঢ়তর কর, প্রতিজ্ঞাকে
কঠোরতর কর, দেহ-মন-প্রাণ তােমাদের পরমারাধ্যের পদপ্রাতে
আরও আবেগের সহিত নিবেদন কর। আত্মসমর্পণের মধ্য
দিয়াই অতুলনীয় জিতেন্দ্ৰিয়ত্ব প্রতিষ্ঠিত হইয়া যাইবে। ভয় পাইও না
মা, হতাশ হইও না। প্রাণে আশা জাগাও, হৃদয়ে উৎসাহ জাগাও,
বুকে সাহস জাগাও। তপস্যার পূর্ণ সিদ্ধি নিশ্চিত তােমার করতলগত
হইবে। ইতি
আশীৰ্বাদক
স্বরূপান

৫৮ সধবার সংযম চতুস্ত্রিংশ পত্র পুপুকী আশ্রম, ২২ শে আষাঢ়, ১৩৪১ মেহের মা, তােমার লিখিত ভক্তিমাখা পত্ৰখানা আমি অত্যন্ত বিলম্বে পাইয়াছি। কারণ পত্ৰখানা আশ্রম হইতে ঠিকানা কাটিয়া আমার নিকট প্রেরিত হইয়াছিল, কিন্তু আমি অনির্ধারিত ভাবে সেই স্থান ত্যাগ করায় নানাস্থান ঘুড়িয়া আশ্রমে ফিরিয়া আসিয়া তবে আমার হস্তগত হইয়াছে। এই জন্যই উত্তর দিতে দেরী হইল। এই জন্য মা দুঃখিত হইও না। শারীরিক দুর্বলতা জন্মিবার সুযােগে মানসিক দুর্বলতা সহস্র দিকে বাহু প্রসারিত করে, ইহা একটা মস্তবড় সত্য। এই জন্যই আমি তােমাদিগকে শারীরিক স্বাস্থ্য ও পটুত্ব রক্ষার জন্য সর্বদা চেষ্টিতা থাকিতে এত করিয়া লিখি। * * দেহের দুর্বলতাই তােমার সঙ্কল্পের শক্তিকে ক্ষণিকের জন্য দুর্বল ও নিষ্প্রভ করিয়া দিয়াছিল। তােমার এই পরাজয় শশাচনীয়, কিন্তু অনুশশাচনীয় নহে। যাহা হইয়া গিয়াছে, তাহার জন্য দিবারাত্রি মন খারাপ করিয়া বিষন্ন বদনে গৃহের অন্ধকার কোণে মুখ লুকাইয়া থাকিবার প্রয়ােজন নাই,-একবার ভাল করিয়া অন্তরকে পরীক্ষা করিয়া দেখ, সত্যই অনুতপ্ত হইয়াছ কি না। প্রকৃত অনুতাপ চিত্তবল বৃদ্ধি করে এবং সৎসঙ্কল্পকে পুনরুত্তেজিত করে। প্রকৃত অনুতাপের ধর্ম ইহা নহে যে, তােমাকে বর্ষের পর বর্ষ নিরুৎসাহ ও নিম করিয়া অল-মােহ-পাশে বাঁধিয়া রাখিবে।

সধবার সংযম পূৰ্বে বহুবার আমি বলিয়াছি যে, দাম্পত্য জীবনে দৈহিক মিলনের একটা সম্মানযােগ্য স্থানও আছে। সেই মিলনের উদ্দেশ্য ইন্দ্রিয়- পরিতৃপ্তি নহে, লালসার দুর্নিবার তাড়নার নিকটে আত্মহত্যা নহে, সেই মিলনের উদ্দেশ্য ধৰ্ম্মার্থে জগৎকল্যাণার্থে তেজোবীৰ্য্যশক্তিধর সন্তান লাভ। এমন দৈহিক মিলনকে পূর্ণ সংযমের সমান সম্মান আমি দিতে প্রস্তুত আছি, এমন দৈহিক মিলনকে পবিত্র বলিয়া গ্রহণ করা যাইতে পারে। অপর দৈহিক মিলনেই অপবিত্রতার অপবাদ পড়িয়াছে। পুনরায় সঙ্কল্প কর যে, দেহটাকে ইতর সুখের ভােগোপকরণ রূপে পরিণত হইতে দিবে না। পুনরায় প্রতিজ্ঞা কর, পশুভাবকে তােমার দিব্য চেতনার উপরে কিছুতেই জয়যুক্ত হইতে দিবে না। তােমার দেহ যে ভগবৎ-পাদপদ্মে উৎসর্গের জন্যই প্রস্তুত হইতেছে, এই বিশ্বাসকে কায়মনােবাক্যে প্রবর্ধিত কর। মনকে একমুখী কর, দৃঢ় কর। অভ্যাসের বলে, সঙ্কল্পের বলে দেহকে মনের অধীন করা যায়, দেহের দুর্বলতার দোষকে মনের সবলতার দ্বারা জয় করা যায়, শারীরিক ক্ষয়িষ্ণুতাজনিত পাপবাসনার উদ্যত ফণাকে শ্রীকৃষ্ণ-পাদস্পর্শে দমন করা যায়। এই জন্য মা দেহের সবলতা ও শুদ্ধতা বিধানের সঙ্গে সঙ্গে মনের সাধনার দিকেও প্রখরতর দৃষ্টি দাও।পরমমঙ্গল এই পথেই আসিবে। পবিত্রতা-স্বরূপ শ্রীভগবানে মন-প্রাণ লগ্ন কর, শ্রীনাম-রস-সাগরে নিমজ্জিত হইয়া ইহজগতের সকল কালিমা মুছিয়া ফেল। ইতি আশীর্বাদক স্বরূপানন্দ

৬০
সধবার সংযম
পঞ্চত্রিংশ পত্র
ওঁ নমঃ পরমাত্মনে
পুরুলিয়া
২৫শে আষাঢ়, ১৩৪১
কল্যাণীয়াষু ঃ-
সেহের মা, * * * লােহার জাল কাটিয়া যাহারা অনায়াসে
বাহির হইয়া যায়, তাহাদিগকেও অনেক সময়ে উর্ণনাভের তন্তুতে
আটক পড়তে হয়, এইরূপ দৃষ্টান্ত জগতে অনেক আছে। কিন্তু এরূপ
ব্যাপার ঘটিবার কারণ কি, তাহা কি জান মা? ভগবানকে ভুলিয়া
যাওয়াই ইহার কারণ।
নিমেষের জন্যও ভগবানকে ভুলিওনা। তােমার প্রাণের প্রত্যেকটা
কামনার সহিত, প্রত্যেকটা বাসনার সহিত শ্রীভগবানের অমৃতময়ী
অবস্থিতি কল্পনা করিতে চেষ্টা করিও। তােমার প্রত্যেকটা
প্রাণস্পন্দনের সহিত ভগবান নিয়ত বিরাজ করুন। তাঁর স্মৃতি যেন
ক্ষণিকের তরেও তােমার অন্তরে মলিন না হয়। যতক্ষণ তাঁর স্মৃতি
দীপ্যমান, কাম-মােহের সাধ্য কি ততক্ষণ তােমাকে স্পর্শমাত্রও
করিতে পারে ?
কামকে তােমার অধীন কর, কামের অধীন হইওনা। যুদ্ধ করিতে
ভয় পাইও না, সংগ্রাম দিতে অলস হইও না। শ্রীভগবানের পবিত্র
নামের অব্যর্থ প্রহরণ লইয়া দশভূজা শ্রীদুর্গার ন্যায় অসুর-নিবহ-নিধনে
অগ্রসর হও। রণচণ্ডিকার বংশবাহিনী মা আমার, দৈত্যদানবের
ক্ষণস্থায়ী হুঙ্কারে আত্মবিস্মৃত হইওনা। জাগগা মা কালভয়বারিনি
করালি কালিকে, নিজে জাগিয়া জগৎকে জাগরিত কর।
কুশলে আছি। শুভাশীষ জানিও। ইতি
আশীৰ্বাদক সন্তান
তােমার মেহের
স্বরূপানন্দ
}

সধবার সংযম ষট্‌ত্রিংশ পত্র ও মা বাঁকুড়া ৬ই শ্রাবণ, ১৩৪১ শুভান্বিতা :- মেহের মা, * * তােমার সংযম-ব্রত-পালনেচ্ছু স্বামীর পত্রের প্রত্যেকটা কথা আমাকে আনন্দিত করিয়াছে। কিন্তু বাপধন যে তার আকস্মিক ব্রতচ্যুতির ব্যাপারটিতে তােমাকে সম্পূর্ণরূপে নির্দোষ বলিয়া রায় দিয়াছে, তাহাতে আমি সায় দিতে পারিলাম না। শ্রীমানের পত্ৰখানা হয়ত তুমি দেখিয়াছ। ডাকে দিবার পূর্বে হয়ত এই পত্ৰ তােমাকে দেখান হইয়া থাকিতে পারে। যদি তাহাই হইয়া থাকে, তবে, তুমিও যে নিজেকে ব্রতচ্যুতির ব্যাপারে সম্পূর্ণ- নির্দোষ বলিয়া ভ্রম করিয়াছ, তাহাই মনে করিতে হইবে। আর যদি পত্ৰখানা তুমি দেখিয়া না থাক, তাহা হইলে তাহার অংশবিশেষ তােমার দেখা প্রয়ােজন। শ্রীমান লিখিয়াছে,-“বাবা, আজ ছয় মাস কাল ধরিয়া বিয়হীন পবিত্র জীবন যাপন করিয়া আজ নিজেরই বুদ্ধিদোষে পতিত হইয়াছি। অর্ধবৎসরব্যাপী সুস্নিগ্ধ শাস্তির সকল মধুরতা একটা দিনের ভ্রান্তিতে যেন দূর হইয়া গিয়াছে। কি যে অশান্তিতে দিন কাটিতেছে, বুঝাইবার ভাষা আমার নাই। হায়, সদগুরুকৃপায় বিনা যুদ্ধেই যে রিপুকে বশীকৃত করিয়া রাখিয়াছিলাম, আজ একেবারে বিনা যুদ্ধেই তাহার নিকট পরাজিত হইলাম। বুদ্ধিদোষে অনলে ঝাঁপ দিলাম, রতিসুখের লােভে পড়িয়া দহনের যন্ত্রণাই অর্জন করিলাম, প্রতপ্ত দেহমনে আর বহ্নিজাল সহিতে পারি না বাবা। } ৬২ সধবার সংযম * * এই ছয়মাস মর সহিত এমনভাবে কাটাইয়াছি, যেমন মায়ের বুকে সন্তান থাকে, নির্ভয়ে, নিশ্চিন্তে। আপনার কৃপায় বক্ষে বক্ষ মিলাইয়া সমগ্র রজনী কাটাইয়া দিয়াছি, অন্তরে কণামাত্র লালসা ঠাই পায় নাই। কিন্তু আজ কি হইল? * * * বাবা, এই বিষয়ে আপনার মেহের কন্যা ম'র কোনও দোষ নাই; এককণাও দোষ তার ছিল না—আমারই দোষে সেও আজ অন্তরে অত্যন্ত অনুতপ্ত।” ইত্যাদি আচ্ছা মা, সত্যিই কি তুমি একেবারে নির্দোষ ? নির্দোষ হইলে এই অনুতাপ কিসের? নিরপরাধের চিত্ত ত’ মা সমুদ্রতুল্য প্রশান্ত থাকে। নিরপরাধের অন্তরে ত’ অনুশােচনা বা হাহাকারের স্থান নাই! নিরপরাধের বক্ষ হইতে ত’ দুঃখসূচক দীর্ঘনিশ্বাস কখন ও বহির্গত হয় না ! এই ব্যাপারে তােমারও টা আছে, কিন্তু সেই টী তােমাদের চক্ষে পড়ে নাই। ইংল্যাণ্ডে এক সময়ে নারী-ধর্ষণ সম্পর্কে রাণী এলিজাবেথের দরবারে একটা আইন প্রচলনের আলােচনা হইতেছিল। সার ওয়াল্টার র্যালে নামক একজন মনীষী পুরুষ বলিলেন,-“রমণীর নিজের ইচ্ছা না থাকিলে কোনও পুরুষ তার সাথে সম্ভোগ-ক্রিয়া সমাপন করিতে পারে ; বলপূর্বক ধর্ষনের চেষ্টা চলিতে পারে, কিন্তু সঙ্গীনীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে সম্যক ধর্ষণ সম্ভব নহে।” এই বলিয়াই তিনি নিজের কোষ- বদ্ধ তরবারি কোষ হইতে মুক্ত করিয়া একজনকে দিয়া বলিলেন, “আমি আমার কোষটীকে হাত দিয়া নাড়িতে থাকিব, কিছুতেই স্থির হইতে দিব না, এস দেখি কোন্ কৌশলী ব্যক্তি তরবারিখানাকে কোষমধ্যে প্রবিষ্ট করিতে পার ?” এই ঘটনাটী হইতে নিশ্চয় তুমি তােমার স্বামীর আকস্মিক ইন্দ্রিয়াে- সধবার সংযম ত্তেজনার পরিতৃপ্তিমূলক ব্রতচ্যুতির ব্যাপারে নিজ দায়িত্বটুকু স্পষ্টরূপে উপলব্ধি করিতে পারিবে। বলিতে কি মা, তােমার যেখানে সঙ্কল্প দৃঢ় এবং হৃদয়মন পবিত্রতা-লিঙ্গ, সেখানে আপনা আপনিই তােমার মধ্যে অপকার্যে বাধা ও সৎকার্যে উৎসাহ দানের শক্তি জাগরিতা হইবে। স্বামিভক্তি স্বামীর প্রতি স্বাভাবিকভাবেই বশ্যতার দাবী করে, কিন্তু স্বামীর কল্যাণের জন্য স্থলবিশেষে স্বামীর ইচ্ছার বিরুদ্ধেও নিজেকে দৃঢ়রূপে পরিচালিত করিতে হয়। স্বামীর জ্বর হইলে কোনও সাধ্বী পত্নীই তাহাকে তেঁতুল-গােলা খাইতে দিতে পারেন না। স্বামীর কলেরা হইলে কোনও পত্নীই তাহার রােগ-বিকার প্রশমিত না হওয়া পর্যন্ত তার একান্ত প্রার্থিত অনুব্যঞ্জন প্রদান করেন না। তুমিও সাধ্বী- সতী, তােমাকেও স্বামীর প্রকৃত মঙ্গল কিসে, তাহা বুঝিতে হইবে। স্বামীর মঙ্গলের প্রতি তার নিজের চেয়ে তােমার অধিক তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখিতে হইবে। ইহাই পাতিব্ৰত্য ধর্মের সবচেয়ে বড় কথা। লালসাতুর স্বামীকে কি ভাবে প্রতিনিবৃত্ত করিতে হয়, তদ্বিষয়ে বিস্তারিত আমি দুই তিন দিন পর স্থানান্তরে গিয়া লিখিব। এখানে সহরের লােকের ভিড়ে আমি একেবারেই সময় পাইয়া উঠি না। কুশলে আছি। তােমার শ্বশুর-শ্বাশুড়ী প্রভৃতির মঙ্গল সহ তােমাদের উভয়ের কুশল দিবে। ইতি আশীৰ্বাদক স্বরূপানন্দ ৬৪ সধবার সংযম সপ্তত্রিংশ পত্র ওঙ্কার-হরি সােণামুখী, বাঁকুড়া ৯ই শ্রাবণ, ১৩৪১ নিত্যশুভান্বিতা :- মেহের মা, গতকল্য সােণামুখী আসিয়াছি। যাহাদের বাড়ী আসিয়াছি, তাহাদের বাড়ী হইতেই দেশপ্রচলিত কথকতা” প্রথার উৎপত্তি। এই বাড়ীটাকে একটী তীর্থস্থান বলিয়া মনে হইতেছে। আসিব মাত্রই দ্বারপ্রান্তের মালতী-লতিকা গুচ্ছে গুচ্ছে পুষ্প আন্দোলিত করিয়া দিব্য সৌরভে দশদিশি আমোদিত করিয়া এক অপূর্ব অভি- নন্দন প্রদান করিল। ঠিক তখনি মনে পড়িল তােমার কথা, তােমার পবিত্রতা-দীপ্ত স্নিগ্ধ মুখমণ্ডলের কথা, তােমার অদোষদর্শী মাতৃময়ী স্নেহ-দৃষ্টির কথা। এই মালতী-লতিকাটীর সহিত অনেক বিষয়ে তােমার সাদৃশ্য আছে, কিন্তু এই সাদৃশ্যকে আরও ফুটতর দেখিতে যে চাহি মা ! তােমার পবিত্রতার সৌরভ বাহির হইতে আরম্ভ করিয়াছে, কিন্তু মা এখনো যে তাহা দিগদিগন্ত-প্রসারী হয় নাই! তােমার দেহমনে গুচ্ছে গুচ্ছে ভক্তি-কুসুম ফুটিতেছে, কিন্তু মা এখনাে ত’ দুই একটা কীট তােমার অর্ধমুকুলিত ভাবকুসুমকে দংশন করিতে পারিতেছে! পূর্ণ- সংযম যে মা তােমাতে আমি চাহি। স্বামী যদি ভােগেচ্ছুক হন, তবে তাহাকে দমন করিয়া রাখা পত্নীর পক্ষে অসাধ্য হয়, কিন্তু আবার চেষ্টার মত চেষ্টা করিতে জানিলে সুসাধ্য হইতেও অধিক ক্ষণ লাগে না।

সধবার সংযম তােমার একটী তরুণী ভগ্নী স্বামীকে পশুসুলভ চেষ্টা হইতে নিবৃত্ত করিতে না পারিয়া কাঁদিয়া বুক ভাসাইয়াছেন। পত্নীর অকপট অশ্রুরাশি স্বামীর দুর্বার লালসাকে ধুইয়া দিতে সমর্থ হইয়াছে। তােমার অপর এক ভগ্নী সেবা, সৌন্দৰ্যবােধ ও মধুভাষণের দ্বারা স্বামীর চিত্তকে জয় করিয়া পরিশেষে তাহার মধ্যে সংযমের শুভ্রতাকে সুপ্রতিষ্ঠিত করিয়াছেন। তােমার আর একটা বােন্ নিয়ত ঈশ্বরীয় কথা, ঈশ্বরীয় আলােচনা, ঈশ্বরীয় বিচার প্রভৃতির দ্বারা স্বামীর অফুরন্ত ভােগাবেগকে স্তব্ধ করিয়া দিয়াছেন। এই দৃষ্টান্তগুলি হইতে তুমি তােমার উপযােগী কৌশল কি বুদ্ধিবলে বাহির করিয়া লইতে পারিবে না ? পৃথক্‌ শয্যায় শয়ন কোনও কোনও স্থলে সংযমের সহায়ক, কোনও কোনও স্থলে ভােগাকাঙ্ক্ষার অত্যধিক উত্তেজক। সুতরাং এই বিষয়ে কোনও সার্বজনীন উপদেশ নাই—অবস্থা বুঝিয়া ব্যবস্থা অবলম্বন করিতে হইবে। কিন্তু একজন আর এক জনকে শত্রু মনে না করিয়া এবং একজন আর একজনের পূর্ণ সান্নিধ্য প্রয়ােজন মত রক্ষা করিয়াও যে ভােগপথ হইতে সম্পূর্ণ বিনিবৃত্তি, তাহাই তােমাদের লক্ষ্য হউক। মন ও প্রাণ দিয়া একে অন্যকে আপনার করিয়া লও, ভােগসুখের আত্মীয়তা দ্বারা সেই অপার্থিব আত্মীয়তাকে যেন দুৰ্বল করিও না। মঙ্গল-লক্ষ্যহীন দেহের ঘনিষ্ঠতা অন্তরের ঘনিষ্ঠতাকে বিনষ্টই করে। শুভাশীষ জানিও। কুশলে আছি। ইতি আশীৰ্বাদক তােমার মেহের স্বরূপানন্দ সধবার সংযম অষ্টত্রিংশ পত্র ওঙ্কার-পরমাত্মা কলিকাতা ১৬ই শাবণ, ১৩৪১ শুভান্বিতা :- । মেহের মা, * * * সঙ্কল্পের শক্তিতে বিশ্বাস কর। তােমার যদি সঙ্কল্প সুদৃঢ় থাকে যে, স্বামীকে বশীভূত করিবই, তবে নিশ্চিতই করিতে পারিবে। আত্মসুখপরায়ণা রমণীরা যেভাবে স্বামীকে বশীভূত করিতে চাহে, তােমার পথ তাহা নহে। তােমার পথ তাহাদের পথ হইতে সম্পূর্ণরূপে ভিন্ন। প্রেম দিয়া সমগ্র জগৎ বশীভূত করা যায়। নিঃস্বার্থ প্রেমের অসাধ্য কিছু নাই। সর্বাগ্রে তােমাকে ভালবাসিতে হইবে। বলিতে পার, স্বামীকে কোন্ পত্নী ভালবাসে না? আমি সেই ভালবাসার কথা বলিতেছি স্বামীর দেহটাকে স্বামী বলিয়া ভ্রম করিয়া অনেক রমণীই স্বামীকে ভালবাসে। সে ভালবাসা দেহের সঙ্গেই যায়, তাহা চিরস্থায়ী বস্তু নৃহে। দেহের ভিতরে থাকিয়া কে রহিয়া রহিয়া স্বকীয় মাধুৰ্য্যকে বিকশিত করিতে প্রয়াস পাইতেছেন, সেই দিকে দৃষ্টি সঞ্চালিত কর এবং তারই পায়ে দেহ-মন-প্রাণ বিসর্জন দাও। দেহ রুগ্ন হইলেও যিনি রুগ্ন হন না, দেহ ছিন্ন হইলেও যিনি ছিন্ন হন না, দেহ ক্লিষ্ট হইলেও যিনি ক্লিষ্ট হন না, দেহ সুপ্ত হইলেও যিনি সুপ্ত হন না, সেই নিত্য-অনাময়ী, নিত্য অখণ্ড, নিত্য উদ্যত এবং নিত্য জাগ্রত পরমমহৎ সত্তাকে ভালবাসিতে শিখ। এই ভালবাসা যে বাসিতে শিখে, তার পক্ষে আর স্বামি-বশীকরণ কঠিন কথা নহে।

সধবার সংযম অধম নারী তাবিজ, কবচ, ঔষধ ও ইন্দ্রজাল দিয়া স্বামীকে বশীকৃত করিতে আবহমান কাল ধরিয়া চেষ্টা করিয়াছে। তামসিকী নারী ভােগ-মুখ-লালসে স্বামীর মনকে আবদ্ধ করিতে চাহিয়াছে। সাব্দিকী রমণী দিব্য অপার্থিব প্রেমবন্ধনে তাহাকে বধিবে। উত্তমা রমণী পবিত্রতার মাধুৰ্য্য দিয়া স্বামীকে আটক করিবে। স্বীয় ব্ৰত ভুলিও না, স্বীয় লক্ষ্য বিস্মৃত হইও না। মহাৰত উদ্যাপনের সঙ্কল্পকে দিনের পর দিন দৃঢ়তর ও বলবত্তর করিতে থাক, লক্ষ্য লাভের আকাঙ্ক্ষা ও ঐকান্তিকতাকে দিনের পর দিন পুষ্টতর ও সমৃদ্ধতর করিতে থাক। মহাকাঙ্ক্ষাই মহৎ জীবনের প্রারম্ভ-মন্ত্র, মহৎ সঙ্কল্পই মহৎ সাফল্যের মঙ্গলাচরণ। কাম-লালস স্বামীকে বিগতকাম করা মা কঠিন নয়। একটা কুকুরীও জানে অকালে উপগমেছু সহচরকে কিভাবে প্রতিনিবৃত্ত করিতে হয়। ইহা তিশাস্ত্রেরই একটা বিশাল অংশ। ভােগক্ষুধাগ্নিতে ইন্ধন দিয়া প্রতিদিন কোন রমণী তার স্বামীকে তৃপ্ত করিতে পারে না, দৈহিকভাবে ইহা একটা অস্বাভাবিক ব্যাপার। এই জন্য নিতান্ত কামুকী রমণীকেও সহচরের অবাঞ্ছনীয় ভােগেচ্ছাকে প্রশমিত করিয়া রাখিবার কৌশল অবলম্বন করিতে হয়। রূপােপজীবিনী গণিকাও হলবিশেষে ও সময়বিশেষে এই প্রতিপ্রবর্তক পন্থা গ্রহণ করিয়া থাকে। যাহাদের ভিতরে সংযমবুদ্ধির কোনও প্রতিষ্ঠা আছে, তাহাদের পক্ষে ইহা সহজতর। সংযমপথাশয় করিতে চাহিলে পতিদেবতা রক্তচক্ষু শনিগ্রহে পরিণত হইবেন,—এই ধারণা ভুল। পুরুষ রমণীর কাছে ভালবাসা চাহে। দেহ-মুখ ভালবাসা-জনিত ঘনিষ্ঠতার ফলস্বরূপেই আবির্ভূত হয়। দেহমুখ নাই, অথচ ভালবাসা আছে, এরূপ বহু দৃষ্টান্ত আছে। ভালবাসা সধবার সংযম নাই, অথচ দেহসুখ আছে, এরূপ দৃষ্টান্ত ও বহু আছে। অর্থাৎ দেহমুখ ও ভালবাসা ইহারা দুইজনে একে অপরের উপরে সম্পূর্ণরূপে নির্ভর করে না। প্রকৃত প্রেমিক দেইথ বৰ্জন করিয়াও প্রাণ-মন দিয়া ভালবাসিতে পারে। ইতর কামুক ভালবাসাকে বিসর্জন দিয়াও দেহসুখে প্রমত্ত হইতে পারে। কখনাে এমনও হয় যে, ভালবাসা ও দেহসুখ একের হাত অপর ধরিয়া চলিতেছে, এই দৃশ্য দেখিয়াই লােকে ভ্ৰম করিতেছে যে, ভালবাসা ও দেহমুখ একেবারে নিষ্ঠরূপে অভেদ বস্তু। অন্তরে ভালবাসার সম্পদ বাড়াও, ভালবাসার বল বাড়াও, ভালবাসার প্রসার বাড়াও। তােমার ভালবাসা সত্যের উপরে প্রতিষ্ঠিত হউক। তােমার এই প্রকৃত ভালবাসাই তােমার স্বামীর অশুদ্ধ অন্তরকে শুদ্ধ করিবে, আবিল লালসাকে বিগতমল করিবে, অপবিত্র মনকে পবিত্রতায় মধুময় করিবে। দাম্পত্য জীবন মা পিশাচ-পিশাচীর জীবন নয়, এই জীবনের মধ্য দিয়া আজ দেবভাব বিকশিত হইয়া উঠুক। শুভাশীষ জানিও এবং সর্বাঙ্গীন কুশল দিও। আশীর্বাদক- তােমার আদরের ছেলে স্বরূপানন্দ সধবার সংযম ঊনচত্বারিংশৎ পত্র চাদপুর, ত্রিপুরা ১৯শে শ্রাবণ, ১৩৪১ নিত্যনিরাপদাষু :- স্নেহের মা, তােমার পত্ৰখানা পাইয়া অত্যন্ত প্রীতি লাভ করিলাম। আমি নিজেকে ধন্য মনে করিতেছি যে, আমার মায়েরা এত সুন্দর, এত মধুর, এত পবিত্র। তােমার দেহমনের নির্মলতাই তােমার সুষমার জ্যোৎস্না, তােমার ভাব ও কর্মের বিশুদ্ধতাই তােমার সৌন্দর্যের কিরণ। সংযম-রশ্মিময়ী মা আমার, দীর্ঘজীবিনী হও এবং কামকলুষ-কলঙ্কিত দুঃখময় জগতে নিষ্কাম নিষ্কলুষ প্রেমের জাগ্রত মুরতিরূপে পূজাস্পদা 'ইও। রমণই রমণী-জীবনের চরম চরিতার্থতা নহে, প্রীতির পীযূষ ঢালিয়া স্বামীর জীবনকে পূর্ণতার রম্য নন্দনে পরিণত করিবার জন্য তুমি রমণী নাম ধরিয়াছ। কামের উপভােগই কামিনী জীবনের সম্যক সার্থকতা নহে; সৰ্বমুখকামনার পরিতৃপ্তি ঘটিয়া যায় যে পরমসুখ ভােগে, তারপ্রতি চিত্তকে আকৃষ্ট করিয়া স্বামীর মানব-তনু-ধারণকে ধন্যও পুণ্য করিবার জন্যই তুমি তার কান্তা হইয়া আসিয়াছ। স্বামীর যেখানে আপন গৃহ, আপন দেশ, স্বামীর যেখানে আপন অন্তরের সুনিবিড় পরিচয়, সেই পরমাত্মার মেহনিকেতনে তাহাকে বঁধিয়া রাখিবার জন্যই তুমি তার গৃহিণী। নয়নাভিরাম পরমরমণীয়া জননি আমার, তােমার অদেশ জগতের সকল শ্রেষ্ঠ চিন্তার জন্মভূমি হউক। তােমার অঙ্কে শ্রীকৃষ্ণ, শ্রীরামচ, ৭ সধবার সংযম বুদ্ধ, শ্রীগৌরাঙ্গ পবিত্রতার ভাব-মূরতি ধরিয়া ক্রীড়া করুন। তােমার পবিত্র অঙ্কভূমি যেন পাপবুদ্ধির মঙ্গশালায় পরিণত না হইতে পারে। বক্ষে, জঠরে, ক্রোড়ে আজ ভগবান সৰ্বস্ব জুড়িয়া উপবেশন করুন, লালসা বিহল স্বামী সহসা পবিত্রতার সেই ত্রিদিবলাঞ্ছন জ্যোতিধারা দর্শন করিয়া পরিবর্তিত-চিত্ত হউন, স্বস্থ হউন, আত্মস্থ হউন। শুভাশীষ জানিও। কুশলে আছি। কুশল দিও। ইতি শুভাশীৰ্বাদক তােমার আদরের সন্তান। স্বরূপানন্দ চত্বারিংশৎ পত্র ওঙ্কার-হরি বাঘাউড়া, ত্রিপুরা ২৩শে শ্রাবণ, ১৩৪১ কল্যাণকলিতা :- নেহের মা,* * * 'ইন্দ্রিয়জয়ী-গৃহীরাই সন্তান-জননে অধিকারী, অপর গৃহী নহে। নিজেদের প্রবৃত্তির উপরে যাহাদের প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় নাই, তাহাদের সন্তান-জননের অধিকার নাই। কারণ, অজিতেন্দ্রিয় নরনারীর সন্তান জন্মমাত্ৰই এক অস্বাভাবিক ভােগলােলুপতার উত্তর- ধিকার লইয়া আসে। বংশানুগত কাম-সংস্কার তাহাকে দিয়া জগতের সকল অবৈধ ও পৈশাচিক কাৰ্য্য করাইয়া লয় । ইন্দ্রিয়ের উপরে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় নাই বলিয়াই ত’ সর্বাগ্রে তােমাদের ইন্দ্রিয়-দমনের প্রয়োজন! বিদ্রোহী বলিয়াই ত’ ইহাকে শাসন করিতে হইবে। রাজভক্ত প্রজাকেই পালন করিতে হয়, শাসন সধবার সংযম ৭১ তাহার জন্য নহে। লােক-কল্যাণ-বিধাতনকারী দুৰ্বন্তের জন্যই কারাগার। যে ইন্দ্রিয় তােমার শাসন মানিতে অনিচ্ছুক, জোর করিয়াই তাহাকে শাসনের অধীনে আনিতে হইবে। চক্ষু যদি তােমার কল্যাণ-দেশনার বিরুদ্ধে যাইতে চাহে, তাকে প্রতিসংহৃত কর। কর্ণ যদি তােমার মঙ্গল বুদ্ধিকে অবজ্ঞা করে, তাকে নিরুদ্ধ কর। জিহ্বা যদি তােমার সুরুচির মুখে পদাঘাত করিতে চাহে, তাহাকে রজ্জবদ্ধ কর। স্পর্শেয় যদি তােমার প্রভুশক্তিকে অমান্য করিতে চাহে, তাকে কষাঘাতে জর্জরিত কর, শাসনের প্রচণ্ডতায় তাহাকে বশীভূত কর। যে তােমার কথা মানিয়াছে, একমাত্র তাহাকেই তুমি নিজ কার্যে ব্যবহার করিতে পারিবে। তােমার যে-সকল সঙ্গিনী ও বান্ধবীরা এই সকল কথা বিদ্রুপে উড়াইয়া দিতে রুচিমতী, তাহাদের সঙ্গ বর্জন তােমার সৎসঙ্কল্প বর্ধনের সহায়ক হইবে। তােমার যে-সকল বান্ধবী এইরূপ কথার প্রতি শ্ৰদ্ধাসম্পন্ন, তাহাদিগকে প্রেরণা দিয়া সৎপথশ্রমী ও সংযমব্রতা- সারিণী করিবার চেষ্টা তােমার সৎসঙ্কল্পকে কার্যে রূপান্তরিত করিবার পক্ষে ব্ৰহ্মাস্ত্র তুল্য অমােঘ হইবে। যে-সকল বান্ধবী মাত্র শ্রদ্ধাশালিনীই নহেন, পরন্তু নিজ নিজ জীবনের আচরণ-মধ্যে ভগবৎ প্রেমকে সত্য সত্যই ফুটাইয়া তুলিতে একান্তই অধ্যবসায়-পরায়ণা, তাহাদের সংসর্গ তােমার সর্ব প্রকার তপােবিঘ্ন-নিবারক এবং তপঃসামর্থ্যবৰ্ধক হইবে। তােমাদের মঙ্গল-প্ৰয়াস আজ সমগ্র জগৎকে পুণ্যময় করুক। কুশলে আছি, কুশল জানাইও। ইতি মঙ্গলাকী স্বরূপানন্দ

१२
সধবার সংযম
একচত্বারিংশৎ পত্র
হাবলাউচ্চের পথে
(নৌকায় )
২৪শে শ্রাবণ, ১৩৪১
মেহের মা,
নিজেকে সামান্য মানবী বলিয়া যে মনে করে না, জীবনের একটা
মহৎ লক্ষ্য কিছু আছে এবং সেই লক্ষ্যকে মৃত্যুর বিনিময়েও লাভ করিতে
হইবে, এই সঙ্কল্প যার আছে, সে আমার চক্ষে অপূর্ব সুন্দর, সে আমার
চক্ষে দেবী-প্রতিমা, তারই পূজার জন্য পুস্পাঞ্জলি প্রস্তুত করিয়া আমি
প্রতীক্ষমাণ। জননি, কবে তােমরা আমার এই পূজা গ্রহণ করিবে ?
একটী মা আসিয়া পূজা লইলেই আমার তৃপ্তি হইবে না। আমি
চাহি শত শত কুমারী, শত শত সধবা, শত শত বিধবা এই দীন সন্তানের
পূজাঞ্জলি গ্রহণ করিয়া তাকে কৃতার্থ করুন। একদিন একটী দশভূজার
অৰ্চনা করিয়াই আমি তুষ্ট হইব না, প্রতিদিন সহস্র সহস্র জননী আমার
অৰ্চনা গ্রহণ করুন।
জননি, সামান্যা মানবীর মধ্যেই অসামান্যা মানবী ঘুমাইয়া আছেন ।
তাকে জাগাইয়া তোল। এই জাগরণ-পর্বের প্রথম ঋক্‌-সংযম ।
শুভাশীষ জানিও। ইতি
তােমার স্নেহের সন্তান
স্বরূপানন্দ

সধবার সংযম দিচত্বারিংশৎ পত্র ওর-গুরু গঙ্গাসাগরের পথে (নৌকায় ) ২৭শে শ্রাবণ, ১৩৪১ পরমকল্যাণীয়াষু । মেহের মা, * * * ইহকালকে আমি অস্বীকার করিতে বলিতেছিনা। আমি চাহিতেছি, তােমরা তােমাদের ইহকালের মধ্যেও পরকালকে প্রতিষ্ঠিত কর। আমি চাহিতেছি, পার্থিব জীবনের মধ্যেও তােমর অপার্থিব অমৃতরসের আস্বাদন লও। আমি চাহিতেছি, দাম্পত্য জীবন কৌমার্যের পবিত্রতায় যতটা সম্ভব সুশুভ্র হউক। বাতায়ন-পথে কোনও রমণীর মুখারবিন্দ আমার চক্ষে পড়িলে, আমি ঐ মুখখানার ভিতরে জগতের অমরত্বের ক্রমবিবর্ধমান প্রবাহের ধ্যান করি। পথচারিণী কোন রমণীর মুখচন্দ্রমা আমার চক্ষে পড়িলে আমি তার মধ্যে একটা দেশের একটা জাতির সকল দুঃখ-দুর্ভাগ্য-বিদূরণকারী পরমপুরুষকারপ্রবুদ্ধ অলােককীৰ্ত্তিধর সন্তানগণের সম্ভাবনা কল্পনা করি। তনু আমার রােমাঞ্চিত হয়, আমি মুহুর্মুহু জগজ্জননী জ্ঞানে তাহাকে প্রণাম করি। পাশ্চাত্যের ভােগ-ব্যাকুলতা আজ ভারতের পবিত্র ভূমিকেও নবতরু এক ভােগাচ্ছাসে আত্মহারা ও প্রমত্ত করিতে চাহিতেছে। জননি, আজ খরকরবালিনী হুহুঙ্কারিণী মূর্তিতে তার প্রতিরােধ কর। অমঙ্গল- বিধ্বংশকারিণী দেববীৰ্যশালিনী জননি আমার, আজ নিজের শক্তিকে জাগাও। মন্দ ছেলেকে ঘুম পাড়াইতে যাইয়া ঐ যে মােহ-ঘুমে মজিলি, ৭৪ সধবার সংযন সেই তমােমিদ্রা, সেই পাপনিদ্রা, সেই মােহনিদ্রা তাের কবে অপগত হইবে ?—জাগৃহি জননি, জাগৃহি। দাম্পত্য জীবনকে তার ধর্ম হইতে বিভ্রষ্ট করিতে চাহি না, বরঞ্চ তার ধর্মে তাকে দৃঢ়তররূপে সংলগ্ন করিতে চাহি। উর্ণনাভের ন্যায় নিজ তন্তুজালে নিজে জড়াইয়া পড়িবার জন্য দাম্পত্য-জীবন নয়, সর্ববন্ধন হইতে মুক্তি পাইবার জন্য এই বন্ধনের স্বীকৃতি। দাম্পত্য জীবন অস্বীকার করিতে তোমাদিগকে বলি নাই,কেন না, তাহা হইলে কলিকলুষনাশন ত্রিলােক-পাবন পরমর্ষিদের আবির্ভাবের পথ রুদ্ধ হইয়া যাইবে। দাম্পত্য জীবন সত্য হউক, সার্থক হউক,—আমার কামনা সৎসঙ্কল্পের কথা যাহাদের নিকটে প্রকাশ করিলে সঙ্কল্পের মূলকে উৎখাত করিবার জন্য লােকাচার বা সংসার-বিমূঢ়তা ষড়যন্ত্রের বন্ধু পথ অন্বেষণ করিবে, তাহাদের নিকটে আত্মগােপন করিয়া চলিও। বাক্ সংযত করিও, বৃথা কথা পরিহার করিও। * শুভাশীষ জানিও। কুশলে আছি। তােমাদের সর্বাঙ্গীন মঙ্গল সংবাদে সুখী করিও। ইতি শুভাকাঙ্ক্ষী তোমার মেহের- স্বরূপানন্দ সধবার সংযম ৭৫ ত্ৰিচত্বারিংশৎ পত্র ওঙ্কারি-গুরু চট্টগ্রাম ২৯শে শ্রাবণ, ১৩৪১ কল্যাণীয়াষু ঃ- স্নেহের মা, ঠিক দুই দিন আগে তােমার নামে একপত্র লিপিবদ্ধ করিয়াছিলাম। কিন্তু চট্টগ্রাম পৌছিয়া দেখিলাম, পত্রখানা ডাকে দেওয়া হয় নাই, কাগজ পত্রের সঙ্গেই রহিয়া গিয়াছে। পূৰ্ব্বপত্র নৌকায় বসিয়া লিখিয়াছিলাম এবং গঙ্গাসাগরে ডাকে দিবার জন্য একজনকে দিয়াছিলাম। এখন দেখিতেছি, সে ডাকবাক্সে চিঠিখানা ফেলিয়া আমার বাক্সেই ফেলিয়া গিয়াছে। সম্ভবতঃ পত্রবাহক আমাকেই একটা ডাকঘর বলিয়া মনে করিয়াছে। যাহা হউক, পূৰ্ব্বলিখিত পত্ৰখানা যখন ডাকে দেওয়া হয় নাই, তখন তার সঙ্গে আরও দুই চারিটী অক্ষর সংযুক্ত করিয়া দিতে ইচ্ছা অনুভব করিতেছি। পূর্ব পত্রের শেষাংশে লিখিয়াছিলাম যে, সৎসঙ্কল্পের কথা অপরের নিকট হইতে গােপন রাখাই উত্তম। কেন উত্তম জানাে? দাম্পত্য জীবনের আত্মগঠন-প্রযত্ন যত্ন সঙ্গোপিত না করিলে, পরচর্চাকারী "অকর্মণ্যদের বৃথা-ভাষণ অতিরিক্তরূপে উচ্ছসিত হইয়া কৰ্ম্মবিঘ্ন উৎপাদন করিতে পারে। বলিতে পার, পরের কথায় কি আসে যায় ? দুই এক দিনে কিছু না আসিতে বা না যাইতে পারে, কিন্তু ধারাবাহিক কল্পিত বচনে অবাঞ্ছনীয় অবস্থার সৃষ্টি ঘটিয়া থাকে। মহাভারতে পড়িয়াছ, মহাবীর কর্ণকে নিন্দা করিতে করিতে সারথি-ব্রতধারী শল্য তার শক্তি হ্রাস করিয়াছিলেন। নিষ্প্রয়ােজনে নিন্দা শুনিতে যাইবে কেন? দাম্পত্য জীবনের নিকটতম ঘনিষ্ঠতার ভিতর দিয়াও যে ব্রহ্মচর্য রক্ষা করা যায়, একথা সাধারণ মানব-মানবী বিশ্বাস করে না। বিবাহিত সধবার সংযম হইয়াও যে নিষ্কাম নিষ্কলুষ থাকা যায়,একথা তাহাদের বােধগম্য হয় না । এইজন্যই তাহারা তােমার সৎপ্রচেষ্টাকে বিদ্রুপ-বাণে জর্জরিত করিবার জন্য প্রলুব্ধ হয়। বলিতে পার, পিন ফুটাইয়া ব্যথা দেওয়া চলিতে পারে, নরহত্যা সম্ভব হয় না। কিন্তু মা পিনের মত ছােট জিনিষই যদি কেহ একটার পর একটী করিয়া অবিরত তােমার শরীরে বিদ্ধ করিতে থাকে, তবে পিনেও তােমার মৃত্যু ঘটিবে। আমি কত দৃষ্টান্ত দর্শন করিলাম, যেখানে লােক-বিদ্রুপে জর্জরিত হইয়া পরিশেষে সৎসঙ্কল্প উদ্ধপুচ্ছে পলায়মান হইল। মন্ত্রগুপ্তি অনেক স্থলে সঙ্কল্পের দৃঢ়তার সহায়তা করে, অনেক স্থলে বা সঙ্কল্পের দৃঢ়তার ফল স্বরূপেই উদ্ভূত হয়। এই কথা স্মরণে রাখিয়া যথাসাধ্য মন্ত্রগুপ্তি রক্ষা করিয়া চলিবার জন্যই প্রয়াসিনী হও। অবশ্য জগতের অনেক কুকার্যেও মন্ত্রগুপ্তি অবলম্বিত হইয়া থাকে। চুরি, ডাকাতি প্রভৃতি পাপকাৰ্যে মন্ত্রগুপ্তির প্রয়ােজন হয়। ধর্মালােচনার নাম করিয়া বাংলার কত পল্লীতে কত পুরুষ ও নারী মন্ত্রগুপ্তির সহায়তা লইয়া অনৈতিক আচরণ সমূহের অনুষ্ঠান করিতেছে, ন্যক্কারজনক ব্যভিচারের দানবীয় লীলা প্রদর্শন করিতেছে। এই সব কদর্য্য ব্যাপারে মন্ত্রগুপ্তির ব্যবহার হইয়াছে বলিয়াই সৎকার্যেও স্থলবিশেষে মন্ত্রগুপ্তির ব্যবহার করা চলবে না, ইহা যুক্তিসঙ্গত নহে। মন্দ কাজে মন্ত্রগুপ্তি অবলম্বিত হয়, এই দোষ মন্ত্রগুপ্তির নহে। এই দোষ মন্দ কাজের, এই দোষ ব্যবহারকারীর বা ব্যবহারকারিণীর। মন্ত্রগুপ্তির অভাব যেখানে সৎ কাৰ্য্যকে দুর্বল করিবে, সেখানে মন্ত্রগুপ্তি অবলম্বনকেও সৎকাৰ্য বলিয়াই জানিবে। শুভাশীষ জানিও। ইতি আশীৰ্বাদক স্বরূপানন্দ সধবার সংযম ৭৭ চতুশ্চত্বারিংশ পত্র গুরু-পরমাত্মা ধর্মনগর, ব্রিটিশ ত্রিপুরা ১লা ভাদ্র, ১৩৪১ পরমকল্যাণীয়াষু স্নেহের মা, তােমার সুলিখিত পত্রখানা পাইলাম। তােমার প্রায় প্রত্যেকটা কথাই আমি সমর্থন করিতেছি। তবে কথাটা কি জানাে মা? দায়ে পড়িয়া সন্ন্যাস প্রকৃত সন্ন্যাস নয়, ঠেকায় পড়িয়া বৈরাগী প্রকৃত বৈরাগ্য নাও পাইতে পারে। অবস্থার তাড়নায় সংযম অবলম্বনের সহিত স্বেচ্ছায় এবং অসংযমের-সুযােগ-স্বত্বেও যে সংযম তাহার পার্থক্য আছে। এই সংযমেরই জগতে যত গৌরব। যেখানে স্বামিপত্নীতে গভীর ভালবাসা আছে এবং সঙ্গে সঙ্গে সংযম আছে, সেখানেই দাম্পত্য সংষম তার মঙ্গলময় লক্ষ্যকে লাভ করিতে পারে। যেখানে অকুণ্ঠিত অনুরাগ আছে, অবারিত ঘনিষ্ঠতা আছে, অথচ অচঞ্চল সংযম আছে, সেখানেই সংযমের পূর্ণ সৌন্দৰ্য্য প্রস্ফুটিত হইয়া উঠিয়াছে, স্বীকার করিব। দাম্পত্য কলহ এবং অশান্তির সুযােগে যে সংযম, তাহা সুমধুরও নহে, সুন্দরও নহে। আর এক কথা, সময় থাকিতে সংযম অবলম্বন করাই ব্ৰতগৌরব- বর্ধক। বহু-সন্তান-প্রসবে ক্লিষ্টতঃ বাৰ্ধক্যদশাগ্রস্ত অৰ্দ্ধজরতী রমণীর সংযমের কোনও অর্থ ই নাই। দাঁত পড়িয়া গেলে ব্যাঘ্র-ব্যাব্রিনী নরমাংস, ভক্ষণের চেষ্টা ছাড়িতে পারে, কিন্তু তাহা সংযম নহে। ভােগের শক্তি থাকিতে সেই শক্তিকে বৃহত্তর ও মহত্তর প্রয়ােজনে প্রয়ােগ করারই নাম সংযম। ভােগের সময় থাকিতে সেই সময়কে সার্থকতক ৭৮ সধবার সংযম মঙ্গলানুষ্ঠানে নিয়ােজিত করারই নাম সংযম। আমি এইরূপ সংযমই আমার পুত্রকন্যাদের জীবনে প্রতিপালিত দেখিতে চাহি। আমার বিশ্বাস, তুমি আমার কথাটুকু বুঝিয়াছ। তােমার বুদ্ধিমান স্বামীও যে এই কথা বুঝিতে পারিবেন, তাহাও নিশ্চিত। একাকী যাহা বুঝিয়াছ, পরস্পর পরস্পরের ভাব পুষ্টির সাহায্য করিয়া উভয়ে তাহা একযোগে বুঝিতে চেষ্টা কর। দুই দিক হইতে বুঝ যখন পূর্ণ হইয়া আসিবে, তখন তদনুযায়ী জীবন যাপন করিতে তােমাদের সবলতা ও কচি উভয়ই সমভাবে বাড়িবে। অনেকে আছেন বলবান্ কিন্তু রুচির অভাবে কল্যাণব্রত গ্রহণ করেন না। অনেকে আছেন রুচিমা কিন্তু বলের অভাবে কল্যাণব্রত পালন করেন না। তােমরা একজন অপর জনের রুচি বর্ধিত কর, বল বর্ধিত কর। তােমরা একজন অপর জনের "অন্তরে আশার কিরণ ঢালিয়া দাও। তােমরা একজন অপর জনের উৎসাহ বহ্নিতে ইন্ধন যােগাও। তােমরা একজন আর একজনের ‘পদস্খলন নিবারণ কর। তােমরা একজন আর একজনের মােহাচ্ছন্নতা বিদূরিত কর। তোমরা একজন আর একজনের ভ্রান্তিবিলাস অপনােদিত কর। একে অন্যের সুবিধা ও অসুবিধাগুলি চিন্তা কর এবং প্রতি পদক্ষেপে একে অন্যকে সাহায্য-হস্ত প্রসারিত করিয়া অধােগতি হইতে রক্ষা কর। দৈববশে তােমরা স্বরূপানন্দের সন্তান বলিয়া আত্ম-পরিচয় দিতেছ। কিন্তু প্রকৃত প্রস্তাবে তােমরা ভগবানের সন্তান। তােমাদের দেহে, মনে, প্রাণে ভগবানের উপস্থিতি জাগরিতা হউক, ভগবানকে তােমাদের প্রতি দেহস্পন্দনে স্ফুরিত বলিয়া অনুভব কর, ভগবান তােমাদের আপন উন, তােমাদের জীবন হউন। গৃহীর জীবনে ত্যাগীর দৈবী-সম্পদ প্রতিষ্ঠিত হউক। তােমরা সর্বজীবের আদর্শ বলিয়া পরিগৃহীত হও।

সধবার সংযম জগদীশ্বরের পরমপবিত্র নামের সাধনা নিমেষের তরেও ছাড়িও না। তােমাদের নানা-সংস্কার-দুষ্ট আত্মশক্তি যেখানে কৃতকাৰ্যতা আহরণে অসমর্থ হইয়াছে, ভগবানের নামের নিবিড় সাধনা সেখানে পূর্ণ সাফল্য প্রদান করিবে। শুভাশীষ জানিও। ইতি আশীৰ্বাদক স্বরূপানন্দ পঞ্চচত্বারিংশ পত্র ওঁ হরিঃ কলিকাতা ৫ই ভাদ্র, ১৩৪১ নিত্যশুভান্বিতা :- স্নেহের মা, তােমাদের দুজনের পত্ৰই পাইলাম। স্বামী ও স্ত্রী দুই জনের পত্ৰই দুই বিভিন্ন যুক্তিধারা অবলম্বন করিয়া একটা সিদ্ধান্তে আসিয়া উপনীত হইয়াছে। বাস্তবিক মা, সংযমই দাম্পত্য-প্রেমের যথার্থ পরিণতি। ভালবাসা যেখানে গভীর, দেহ-লিগা সেখানে হ্রাস পাইতে বাধ্য। ভালবাসা যেখানে অগভীর, দেহ-লিঙ্গ সেখানেই অযথা যখন-তখন দম্পতীর দেহকে উত্তেজিত ও মনকে প্রপীড়িত করে। প্রেমই তােমাদিগকে ইন্দ্রিয়াতীত কামগন্ধবঞ্চিত ভােগলিবর্জিত জগতে টানিয়া লইতে সমর্থ। স্ত্রী যখন স্বামীর মধ্যে পরমদেবতাকে দর্শন করে, তখনই তার সত্যিকারের ভালবাসার উন্মেষ হয়। স্বামী যখন স্ত্রীর মধ্যে সধবার যংযম পরমদেবতাকে দর্শন করে, তখন তারও প্রকৃত প্রেমের উদয় হয়। চন্দ্রমা দর্শন না করিলে যেমন সমুদ্রের উচ্ছ্বাস ঘটে না, ভগবানকে দর্শন না করিলেও তেমন মানব বা মানবীর প্রেমের উচ্ছাস আসে না। দেহ-সুখ ভালবাসার উৎস নহে, দেহের মধ্যে অনির্বচনীয় ভগবানকে পরমসুখরূপী ভগবানকে আংশিক ভাবেও উপলব্ধি করিতে পারার ফল ভালবাসা। উপলব্ধি যেখানে পূর্ণ, ভালবাসা সেখানে অনন্ত, অফুরন্ত, অখণ্ড; উপলব্ধি যেখানে সুচির, ভালবাসা সেখানে নিবিড়, গভীর, দীর্ঘস্থায়ী। উপলব্ধি যেখানে স্বল্পতৈল প্রদীপের আলােকের মত স্তিমিত, ভালবাসা সেখানে নিষ্প্রভ, ক্ষীণ ও উপলব্ধি যেখানে ক্ষীণতােয়া নদীর জলের মত স্বল্পপ্রাণ, ভালবাসা সেখানে শৈবাল- পঙ্গদিতে আচ্ছন্ন ও কদর্য্য। কিন্তু যেখানেই ভালবাসা আছে, জানিতে হইবে, সেখানেই ভগবানের একটা উপলব্ধি আছে ; যেখানেই ভগবানের একটা আস্বাদন আছে, সেখানেই ভালবাসা আছে। তার অবস্থিতির আস্বাদন যতটুকু, ভালবাসা ততটুকু। তাঁর সান্নিধ্যের স্বাদুত যতক্ষণ, ভালবাসা ততক্ষণ। কারণ, রসাে বৈ সঃ* তিনি রস-স্বরূপ, সকল রসের আস্বাদন তাহাকে লইয়া ; তাহার মধ্যে সকল রস বিরাজিত, তিনি সকল রসে বিরাজমান। তবে যে ভালবাসার নাম করিয়া মাঝে মাঝে পৈশাচিকী শীল। মানব-মানবীর জীবনমধ্যে অট্টহাস্য করিতেছে, তাহার কারণ, ভালবাসার মূল উৎস-স্বরূপ শ্রীভগবানকে প্রত্যেকটা হৃদয়স্পন্দনে তােমার ভালবাসার জনটীর মধ্যে খুজিয়া তুমি বেড়াও না। আচ্ছা, বল দেখি, যাহাকে বাহুপাশে বাঁধিয়া ভালবাসার অভিনয় কর, তাহাকে ক্ষমধ্যে আলিঙ্গনবদ্ধ ভাবে পাইয়াও তােমার পিপাসা কেন মিটে না, প্রাণপ্রিয়কে পাইবার ব্যাকুলতা কেন কমে না ?

সধবার সংযম “আলিঙ্গনে বাঁধিয়াও তাহাকে পাইবার জন্য বাহুর পেষণ কেন তীব্র হইতে তীব্রতর হয় ? কারণ, এখনাে তাহাকে পাও নাই। দেহ দিয়া দেহকে বাঁধিয়াছ কিন্তু তার ঐ দেহের ভিতরে অনির্বচনীয় ভাবে লুকাইয়া রহিয়াছেন তােমার প্রাণের-প্রাণ জীবনধন,-তাহাকে না পাওয়া পর্যন্ত শুধু দেহকে পাইলেই ত’ আর বাস্তবিক কিছু পাওয়া হইয়া উঠে না ! দেহ দিয়া দেহকে পাইয়াও যাহাকে পাওয়া বাকী থাকে, তিনিই রসস্বরূপ, প্রেমস্বরূপ, আনন্দস্বরূপ, অমৃতস্বরূপ ভগবান। সেই ভগবান্ তােমার স্বামীর দেহকে আশ্রয় করিয়াও আছেন, তােমার দেহকে আশ্রয় করিয়াও রহিয়াছেন। তুমি তােমার স্বামীর দেহের মধ্য দিয়া সেই ভগবাকে খুজিয়া লইবে, স্বামী তােমার দেহের মধ্য দিয়া সেই ভগবানকে অন্বেষণ করিবেন,—ইহাই প্রকৃত দাম্পত্য জীবন, ইহাই বিবাহিতের জীবনের প্রকৃত সাধনা। শাকের পক্ষে দুর্গাপ্রতিমা যেরূপ, শৈবের পক্ষে শিববিগ্রহ যেরূপ, বৈষ্ণবের পক্ষে বিষ্ণুমুর্তি যেরূপ, তােমার পক্ষে তােমার স্বামী-বিগ্রহটা তজপ হউক, তােমার স্বামীর পক্ষে তার স্ত্রী-বিগ্রহটাও তদ্রুপ হউক। তােমরা একজনে অপর জনের ভগবৎ-সাধনার প্রতীক, ভগবানের অনির্বচনীয় রূপ, রস, গন্ধ, স্পর্শ ও শব্দকে আস্বাদন করিয়া ধন্য হইবার জন্য প্রতিমা, অনন্ত পরমেশ্বরকে সান্ত মন লইয়া ধারণায় আনা চলিবে না বলিয়া তার সমস্ত শক্তিকে একটা সীমাবদ্ধ স্থানে কেন্দ্রীকৃত করিয়া তার সাহায্যে যাবতীয় ভাগবতী অনুভূতি জাগাইয়া তুলিবার বিগ্রহ। তােমার চক্ষে তােমার স্বামী পরমাত্মার অভেদ সত্বা রূপে প্রতিভাত হউন, তােমার স্বামীর চক্ষে তােমার অস্তিত্ব পরমাত্মার সহিত ভিন্ন রূপে ফুটিয়া উঠ। কাম-ক্রোধ দূরে পলাইয়া প্রাণ রক্ষা করিবে।

৮২ সধবার সংযম এতকাল ধর্মচর্চা করিয়াও যে ইন্দ্রিয়ের মুহুর্মুহু অধীনতা হইতে নিজেদিগকে মুক্ত করিতে পার নাই, তাহার কারণ মাত্র অভ্যাস। নিজেদের প্রত্যেকটা ইন্দ্রিয়-সুখভােগের চেষ্টার প্রতি একটু সুতীক্ষ বিচার-দৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়া দেখ, ভােগসুখলাভও ইহাদের প্রেরয়িতা নহে। কদভ্যাসই তােমাদিগকে প্রেরণ করিতেছে এবং সুখ না পাইয়াও সুখ” “সুখ করিয়া অনিবার দুঃখই আহরণ করিতেছে। এই অভ্যাস শাসনের অতীত নহে। অভ্যাসকে শাসন কর-প্রবল সঙ্কল্প দিয়া, কামকে শাসন কর—পরস্পরের মধ্যে ভগবানকে দর্শন করিয়া। গৃহীর গৃহ সত্য সত্যই আশ্রম নামের যােগ্য হউক। উন্নতিমুখিনী চিন্তা সমূহ দ্বারা হৃদয়-গগন ছাইয়া ফেল। সম্মুখে ও পশ্চাতে, দক্ষিণে ও বামে শুধু সংযম-সুরভি কুনুম-নিচয়েয় অবস্থিতি কল্পনা কর। পূতিগন্ধলি শৃগাল কুকুর তােমার সচ্চিন্তার লড়াঘাতে পলায়ন করিবে! তােমার মত শত শত নারী সংযত জীবন যাপন করিয়া ভগবানকে লাভ করিয়াছে। তােমার মত শত শত নারী স্বামীকে সংযমের পথে টানিয়া আনিতে সমর্থ হইয়াছে। দুঃথাক্রান্ত সংসারকে তুমিও সংযমের দিব্যাননে পূর্ণ করিতে পার। শুধু “পার” বলিয়াই ক্ষান্ত হইব না, ‘নিশ্চিতই” পার। অন্তরে উদ্যমকে জাগরিত কর। শুভাশীষ জানিও। ইতি আশীর্বাদক স্বরূপানন্দ সধবার সংযম বট-চত্বারিংশ পত্র জয় পরমেশ্বর বাঁকুড়া ৯ই ভাদ্র, ১৩৪১ পরমকল্যাণীয়াযু :- স্নেহের মা, তােমার পত্ৰখানা পাইয়া আনন্দিত হইয়াছি। তােমার বান্ধবীদের সমালােচনা বড় সত্যপূর্ণ। আমার পত্রগুলি যে প্রবন্ধের মত হইয়া যায়, ইহা ঠিক। কিন্তু পাণ্ডিত্য বিস্তারােদ্দেশ্যপ্রণােদিত প্রবন্ধের সহিত আমার পত্রের একটা পার্থক্য চিরকাল থাকিবে। শত শত প্রবন্ধ মানুষের কাণে প্রবেশ করিয়াছে, আমার পত্র প্রাণে পৌছিবে। কারণ সত্যই আমি জাতি গড়তে চাই। তােমর এক একটা সুদুল্লভ। কন্যা আমার গােমুখী হইয়া জাহ্নবী-প্রবাহিনীকে প্রসারিত করিবে। কিন্তু সেকথা এখন থাকুক। তুমি জিজ্ঞাসা করিয়াছ, সধবা-জীবনে সংযম-সাধনার সহজ কৌশল কি? সেই কৌশলটী আজ আমি তােমাকে শিখাইয়া দিব। নিজেকে মা বলিয়া জানিতে শেখাই সেই সহজ কৌশল। বিশ্বভূবনের যে তুমি মা, এই কথাটা অন্তরে প্রতিষ্ঠিত কর, সংযম আপনি প্রতিষ্ঠিত হইয়া যাইবে। নারীর অন্তরে মাতৃভাক যতক্ষণ না বিকাশ প্রাপ্ত হয়, ততক্ষণ তার জায়াভাব প্রবল থাকে সুতরাং ভােগলিগাও প্রবল থাকে। মাতৃভাব না যতক্ষণ জীবন- যৌবনের প্রান্তরকে বন্যার জলে ভাসাইতে সমর্থ হয়, ততক্ষণ নিজ সুখলােভে বা স্বামি-সুখ-সম্পাদনার্থে ভােগবাদের প্রশ্রয় দান নিতান্তই স্বাভাবিক। কিন্তু মা হইলে সন্তানের সেবাবুদ্ধি ভােগলােলুপতার ৮৪ সধবার সংযম স্থানটুকু অধিকার করিয়া লয়। এই জন্যই মাতৃত্ব অসংযম-নাশক, সংযম-সাধক। সন্তানের মঙ্গলের জন্যই মাতার সংযমের আবশ্যকতা। অসংযতা নারী অজ্ঞাতসারে সন্তানের জীবনে অসংযমের কালকূট উগারিয়া দেয়। এই জন্যই সতীত্ব ভারতীয় নারী-জীবনের শ্রেষ্ঠ সাধনা রূপে বিকাশিত হইয়া উঠিয়াছিল। নারীগুলিকে দাবাইয়া রাখিবার জন্য সতীত্ববাদের সৃষ্টি পুরুষেরা করে নাই, সন্তানের হিতকল্পেই নারী ও পুরুষ উভয়ের সম্মতিক্রমে সতীত্ব এক অপার্থিব মৰ্যাদা ভারত-ভূবনে প্রাপ্ত হইয়াছিল। সন্তানের মঙ্গলের জন্যই পুরুষের জীবনে আবাল্য কঠোর ব্রহ্মচর্য- ব্রতের বিধান হইয়াছিল। পিতা কিম্বা মাতার জীবনের সার্থকতা তাহাদের পুত্রকন্যার জীবনের সার্থকতাম। সধবা জীবনের যে সংযম তাহারও লক্ষ্য উহাই। সধবার সংঘমেয় লক্ষ্য,—পুত্রকন্যার জীবনমধ্যে আত্মদমনের শক্তিকে দৃঢ়মূল করা। বিশ্বভুবনকে যদি সন্তানরূপে গ্রহণ করিতে এখনাে সমর্থ না হও, এই সাধনাকে যদি নিতান্ত কঠিন বলিয়া গণনা কর, তবে তােমার অত দূরে যাইবারও মা দরকার নাই। তাকাও একবার সেই আত্মজগুলির দিকে, যাহারা তােমার জঠরে জন্মিয়াছে, তােমার শুন্য পান করিয়াছে। তাকাও একবার তাহাদের মঙ্গলের পানে। তােমার সংষম তাহাদের জীবন গড়িবে, তােমার অসংযম তাহাদের জীবন ভাঙ্গিৰে। মাকে গিয়া পুত্রকন্যার কাছে বলিতে হইবে না, আমি সংযম-ব্রতচারিণী। মায়ের অন্তরময় পবিত্রতা অজ্ঞাতসারে সন্তানের ভিতরে সংযমের প্রতি শ্রদ্ধাবুদ্ধি উক্তি করিয়া দিবে। ব্ৰহ্মচারিণী মাতার ব্রহ্মচর্যই সন্তানের নৈতিক মেরুদণ্ড দৃঢ় করিয়া দিবে, সধবার সংযম ৮৫ আধ্যাত্মিক জীবনের প্রসার বাড়াইয়া দিবে। সত্য আর ব্রহ্মচর্য্য জগতে অসাধ্য সাধন করিতে পারে। প্রশ্ন কর নিজেকে, তুমি কেমন ছেলের আর কেমন মেয়ের মা হইতে চাও। কামকাতর ক্ষণসুখী পুত্রকন্যার, না, জিতেন্দ্রিয় নিত্যানন্দ পুত্রকন্যার? অন্তরে মাতৃত্বকে জাগাও। মা-যশােদা হইয়া কি শ্রীকৃষ্ণকে ক্রোড়ে ধরিতে চাও, মাতা মেরী হইয়া কি যীশু খ্রীষ্টকে স্তন্য দান করিতে চাও ? না, গাঁটকাটা, সিঁদেল চোরের জননী হইতে চাও? কলিকলুষ- নাশন জগৎপাবন মহাপুরুষকে পুত্ররূপে চাও, না, পরনারীরত পন্থদ্রোহী গ্রন্থিচ্ছেদককে চাও? জিজ্ঞাসা কর নিজেকে। প্রতিদিন প্রতিক্ষণ নিজের কাছে নিজে বারংবার এই প্রশ্নের উত্তর দাবী কর। এই জিজ্ঞাসাই তােমাকে সংযমে সুদৃঢ় করিয়া দিবে। আজ ভারত-নারীর জায়া-ভাব তার মাতৃ-ভাবকে আচ্ছন্ন করিয়া রাখিতেছে। তাই আজ সে সংযম-সাধনাকে অসম্ভব মনে করে, অস্বাভাবিক মনে করে, বৃথা চেষ্টা মনে করে। ভারত-নারীর অন্তরে আজ মাতৃত্ববােধকে জাগাও, দেখিবে অবারিত অসংযম, দুর্দমনীয় কাম- কাতরতা দুই দিনে ভারত ছাড়িয়া পলায়ন করিবে। শুভাশীষ জানিও। সৰ্বাঙ্গীন কুশল সংবাদে সুখী করিও। ইতি আশীৰ্বাদক স্বরূপানন্দ ৮৬ সধবার সংযম সপ্তচত্বারিংশ পত্র জয় পরমাত্মা জামশেদপুর, সিংভূম ২৪শে ভাদ্র, ১৩৪১ কল্যাণীয়াষু :- মেহের মা, মাত্র দুই দিন হয়, পুপুকী আশ্রম হইতে জামশেদপুর আসিয়াছি। পথে পুরুলিয়া এক দিন অপেক্ষা করিয়াছিলাম। বাংলার অদ্বিতীয় সন্তরণবীর প্রফুল্ল থােষ পুরুলিয়ার ছােট সাহেব-বাঁধে সাতার কাটিতেছেন। দিবারাত্র অবিশ্রান্ত সাঁতার চলিতেছে। দেখিবার জন্য হাজার হাজার স্ত্রীপুরুষ বালক-বৃদ্ধ ছুটিয়াছে। এই দৃশ্য দেখিয়া তােমার কথা মনে পড়িল। মাটির জগতের পুকুর নয়, মনের জগতের পুকুরে তুমি সাঁতার কাটতেছ। অভ্যাস তােমাকে শক্তি দিয়াছে। তাই তুমি তলৈ ডুবিয়া যাইতেছ না। নিত্য প্রলােভনসঙ্কুল সংসার-জলাশয়ে বাস করিয়াও যে ভােবে না, অসংযমের পঞ্চ স্পর্শ করে না, সে ধন্য, সে সকলের দর্শনীয় মহাবস্তু। কিন্তু তােমার এই যে সংযম-সমর, তাহা লােককে দেখাইবার জন্য নহে। তােমার এই আশ্চৰ্য্য সংযম-সাধনা তােমার আত্মার উদ্ধারের জন্য, তােমার স্বামীর উদ্ধারের জন্য, তােমার ভাবী পুত্রকন্যার উদ্ধারের জন্য। তােমার এই অপূর্ব প্রয়াসের মাধুৰ্য্য দর্শন করিবেন পরম-গুরু, তুমি আর তােমার স্বামী। নিয়ত হস্ত-পদ সঞ্চালন না করিলে সন্তরণকারীকে ডুবিতে হয়, ঢেকে ঢেকে জল খাইয়া পেট ফুলিয়া মরিতে হয়। নাম ভুলিও না, নাম ছাড়িও না, নামে যেন নিমেষের জন্যও আলস্য না আসে। তন্দ্র।

সধবার সংযম ৮৭ আসিলে নামের হুঙ্কারে সেই তন্দ্রা বিদূরিত কর। অবসাদ আসিলে নামের অমৃত-রসায়ণে সেই অবসাদ ভাঙ্গ। বিশ্বাস কর নামে, নির্ভর কর নামে, শক্তি জাগাও নামে, অন্তরকে প্রবুদ্ধ কর নামে। শুভাশীষ জানিও। কুশল দিও। ইতি আশীৰ্বাদক স্বরূপানন্দ অষ্টচত্বারিংশ পুত্র জয়পরমাত্মা জামশেদপুর, সিংভূম ২৩শে ভা, ১৩৪১ পরমাম্বিতাষু :- মেহের মা, *** এখানকার বিবেকানন্দ সােসাইটির হলে দুই দিন বক্তৃতা দিলাম। অষ্ট এইমাত্র শেষ বক্তৃতা দিয়া আসিলাম। লােকজন বিদায় লইতে একটু সময় লাগিল। তার পরেই এই পত্ৰখানা লিখিতে বসিলাম। একটা সুসংবাদ আমি দিব। আজ এখানকার সিনেমা-হলে একটা নুতন বিলাতী ছবি ছিল, যার অশ্লীলতার বিষয়ে বড় বড় প্লাকার্ড ছাপিয়া লােক আকর্ষণের চেষ্টা করা হইয়াছে। কিন্তু তথাপি আমার অন্তকার বক্তৃতায় কল্য অপেক্ষা অধিক পুরুষ এবং মহিলার সমাগম ঘটিয়াছে। অদ্যকার মহিলাদের ভিতরেই বক্তৃতা শুনিবার আগ্রহ বেশী স্পষ্টরূপে প্রত্যক্ষ করিলাম। অথচ, বক্তৃতার বিষয় ‘সংযম। দেখিলাম, সংযমের প্রয়ােজন-বােধ যে-কোনও রমণীর মনে সহজে জাগাইয়া ভােলা যায় এবং বিলাস-ব্যসনে আসক্ত হইয়া যাহারা জীবনের সধবার সংযম শ্রেষ্ঠ সার্থকতা একেবারে ভুলিয়াই রহিয়াছে, সংযমের মধুরতা আস্বাদন করিবার একটা সুপ্ত লােভ তাহাদের মধ্যেও আছে। এখানে অনেক সাধু মহাত্মার শিষ্য-শিষ্যাও আছেন। কিন্তু গুরু- মুখে সংযমানুশাসন কেহ পাইয়াছেন বলিয়া শুনিলাম না। শুধু সাধন পাইয়াছেন এবং তদনুযায়ী নাম করিয়া যাইতেছেন। কিন্তু তাহারই ফলে আস্তে আস্তে সংযম রুদ্ধ সৃষ্ট হইতে চাহিতেছে। আমার খােল- খুলি বক্তৃতা অনেকের চমক ভাঙ্গিল। নারীর সংযম জাতির অমূল্য সম্পদ। কারণ, অসংযত পুরুষকে সংযত করিবার শক্তি এই নারী জাতিরই মাত্র আছে। অনেক কৌশল- বতী নারী পুরুষের অসংযমের উদ্দাম প্রবাহকে সংযমের তটবন্ধনে আবদ্ধ করিয়া পুরুষকে উদ্ধার ও নিজেকে রক্ষা করিয়াছে। এই সংবাদ পত্রিকা-পৃষ্ঠে প্রচারিত হইবার নয়, তাই লােকে সে খবর রাখে না এবং চপল পুরুষ ও চঞ্চলা রমণীর কদৰ্য্য দৃষ্টান্ত দর্শনে জগতে অসংযমেরই জয়- জয়কার ঘোষণায় রত হইয়াছে। যে জাতির কুমারীর মৈথুন-পরায়ণ, সধবারা পরপুরুষ-শ্লাঘিণী, বিধবার গৌরব-বােধ-বৰ্জ্জুিতা, সে জাতির সহিত পশুজাতির পার্থক্য ভারতীয় জাতির ঋষি-প্রবর্তিত শিক্ষা কুমারীদিগকে পবিত্র, সধবাদিগকে সংযত ও বিধবাদিগকে আধ্যাত্মিকতার জ্যোতির্ময় করিয়া তুলুক। তােমাদের জীবন সেই শিক্ষার বাহন হউক। এই শিক্ষা, মুখে নহে, জীবনের কাৰ্য্য দিয়াই প্রচার করিতে হইবে। কুশলে আছি। কুশল দিও। আশীৰ্বাদ জানিও, ইতি— তােমাদের স্নেহের - স্বরূপানন্দ

সধবার সংযম
উনপঞ্চাশৎ পত্র
জয় পরমাত্মা
জামশেদপুর, সিংভূম
২৪শে ভাদ্র, ১৩৪১
পরমান্বিতা :-
মেহের মা, কল্যাণীয়া শ্ৰীমতী এর পত্রখানা লিখিয়া ডাকে
ফেলিতে যাইতেছিলাম। কিন্তু ফেলিতে পারিলাম না। কারণ তােমাকে
দুই অক্ষর না লিখিলে তুমি অভিমান করিবে।
জীবনটা মহৎ কাৰ্য্যে লাগাইতে হইবে, এইরূপ যদি থাকে তীব্র
উদ্দীপনা, তাহা হইলে নীচ ইন্দ্রিয়-লালসা কাহারও কাছ ঘেঁষিতে পারে
। নিজের ভিতরে সেই সৰ্বজয়িনী উদ্দীপনাকে জাগরিত কর,
স্বামীর ভিতরে তাহা জাগাও,সন্তানগুলিকেও সেই উদ্দীপনার অংশভাগী
ভগবানের মঙ্গলময় পবিত্র নাম তােমার এই উদ্দীপনার উৎসকে
অফুরন্ত করিবে।
শুভাশীষ জানিও। ইতি
আশীৰ্বাদক
তােমার দেহের
স্বরূপানন্দ

৯ সধবার সংযম পঞ্চাশৎ পত্র জয় পরমাত্মা কলিকাতা ২৫ ভাদ্র, ১৩৪১ পরমান্বিতা :- স্নেহের মা, * * * সতীত্ব সম্বন্ধে অনেক ভ্রান্ত ধারণা আছে। সাধারণ রমণী মনে করে, স্বকীয় স্বামী ব্যতীত অপর পুরুষের সংসর্গ বর্জন করিলেই সতীত্ব রক্ষা করা হইল। কিন্তু বুদ্ধিমতী মেধাবিনী রমণী স্বামীর সহিত যথেচ্ছাচারকেও সতীত্ব-গৌরবের বিরােধী বলিয়া গণনা করেন। তােমাদের দৃষ্টি ঐ সকল অতিমৈথুনপরায়ণ। তিপ্রিয়া রমণীদের উপর হইতে উঠিয়া আসুক। তােমাদের শ্রদ্ধার দৃষ্টি তাহাদের উপরেই পতিত হউক, যাহারা প্রয়ােজনের অতিরিক্ত রতিক্রিয়া হইতে নিজে- দিগকে সন্তর্পণে দূরে রাখতে পারেন। কি অবস্থায় রতিক্রিয়া প্রয়ােজনীয়, আর কোন অবস্থায় বর্জনীয়, তাহা আমি এইখানেই এক নিঃশ্বাসে বলিয়া ফেলিতে চাহি না। আমি তােমাদের শুদ্ধা বুদ্ধির উপরে ইহা নির্ণয়ের ভার প্রদান করিতেছি। শুদ্ধা বুদ্ধি লাভ হয় অফুরন্ত নামের সাধনে। তােমরা নাম-সাধনে একান্তচিত্তা হও। নামের জ্যোতি তােমাদের অন্তরের অন্ধকার দূর করিবে, তখন তােমরা নিজেরাই নিজেদের শ্রেয়ঃ এবং প্রেয়, গ্রহণীয় এবং বর্জনীয় পন্থা চিনিয়া লইতে পারিবে। শুভাশীষ জানিও। কুশলে আছি। কুশল দিও। ইতি আশীর্বাদক স্বরূপানন্দ

সধবার সংযম
একপঞ্চাশৎ পত্র
কলিকাতা
২রা আশ্বিন, ১৩৪১
নিত্যমঙ্গলাম্বিতা :-
মেহের মা, তােমার পল্লী-সেবার আদর্শ সম্পর্কিত কর্মসূচী দর্শন
করিলাম। সবটুকুই আমার ভাল লাগিল। স্ত্রী-শিক্ষা-সম্পর্কিত কথা
গুলিও খুব সুন্দর লাগিল। কিন্তু মা, একটা বিষয় তােমাদিগকে লক্ষ্য
রাখিতে হইবে।
তাহা হইতেছে এই যে, নারীর উন্নতি সাধনের মানেই যে পুরুষের
সঙ্গে লড়াই করা, তাহা নহে। যুদ্ধোমই আত্মােন্নতি নহে। বৃথা
যুদ্ধে শক্তিক্ষয় ঘটে। বৃথা যুদ্ধে রুচিহীনতাই প্রকৃত যােদ্ধার লক্ষণ।
তােমরা প্রকৃত যােদ্ধা হইতে চেষ্টা করিও।
নারীর উন্নতি নারীর উপরেই বহুলাংশে নির্ভর করিবে। এই
চেতনায় উদ্বুদ্ধ করিয়া নারীকে যথাসাধ্য স্বাবলম্বিনী করিতে প্রয়াস
পাইও। কিন্তু স্বাবলম্বন’ শব্দকে যেন ‘বিদ্বেষ’ শব্দটীর দ্বারা অনুবাদ
করিতে না দেওয়া হয়।
কি নারী, কি পুরুষ, প্রত্যেকেরই যথার্থ উন্নতির মূল তার সংযমে।
‘সংযম মানে ‘আত্মমন’; লােভে আত্মদমন, ক্রোধে আত্মদমন, কামে
আত্মদমন। আত্মদমনের বিদ্যা যে আয়ত্ত করিবে, সেই সৰ্ব্বদমন হইবে।
'আত্মজয়ই প্রকৃত দিগ্বিজয়।
ভারতের নারী কি তার মহিমান্বিত সিংহাসন অধিকার করিবার
প্রাকালে এই কথা ভুলিয়া থাকিবে ?
কুশলে আছি। কুশল দিও। ইতি
আশীৰ্বাদক
স্বরূপানন্দ

৯২
সধবার সংযম
দ্বিপঞ্চাশৎ পত্র
জয় পরমাত্মা
চাদপুর, ত্রিপুরা
৪ঠা আশ্বিন, ১৩৪১
পরমকল্যাণীয়াষু ঃ-
মেহের মা, তােমার পত্র অন্য পাইয়াছি। পত্র অনেক পথ ঘুরিয়া
আসিয়াছে বলিয়া বিলম্বে পাইলাম। দেরীতে জবাব দেই বলিয়া রাগ
করিয়াছ। এজন্য আজ সকল পত্রের আগে তােমার পত্রেরই উত্তর
লিখিতে বসিলাম।
তােমাদের প্রতি মা আমার একটা মাত্র আশীৰ্বাদ,তােমরা
প্রেমিকা হও। প্রকৃত প্রেমিকা জগতে দুল্লভ,-তােমর সেই
দুল্লভ বস্তুটী হও। কাম দিয়া নহে, প্রেম দিয়া তোমরা সংসারকে
বাঁধিতে সমর্থ হও, তােমাদের প্রেমের শক্তিতে বিশ্বভুবন স্নিগ্ধ হউক,
সুন্দর হউক।
দাম্পত্য জীবনে প্রকৃত শান্তি কোথায় ? -প্রেমে, কামে নহে।
কামুক পুরুষ ও কামুকা রমণী প্রাণে প্রাণে মিলন চাহে না, আত্মায়
তাহাদের মিলন ঘটে না। তাই কামের মূলে শত শত বিসম্বাদ সৃষ্ট হয়,
এবং তাহাদিগকে জ্বালাতন করে। প্রেম ঘটে প্রাণে, প্রেমরস
আস্বাদিত হয় আত্মার আত্মায়,অন্তরের মিলনই প্রেমের প্রকৃতি।
প্রেমিকা হও, ইহাই আমার আশীর্বাদ। এই আশীৰ্বাদ আমি
শতবার উচ্চারণ করিব। প্রেমের প্লাবনে তােমাদের জীবনের সকল
ক্ষুদ্র, সকল নীচতা, সকল হীনতা ভাসিয়া যাউক। ইতি—
শুভাশীৰ্বাদক
স্বরূপানন্দ

সধবার সংযম ত্রিপঞ্চাশৎ পত্র জয় পরমেশ্বর চাদপুর, ত্রিপুরা ১১ই আশ্বিন, ১৩৪১ কল্যাণীয়াষু : মেহের মা, ভগবানের নামকে একেবারে জীবনের সঙ্গে মিশাইয়া লও। নামই তােমার জীবন হউক। নিশ্বাসে ও প্রশ্বাসে তার মধুময় নামের অমৃত ঝঙ্কার তুলিতে থাক। প্রাণ প্রেমময় হউক। ইহাই তােমার জীবন মধ্যে সংযমকে প্রতিষ্ঠিত করিবার অপূর্ব কৌশল। দেহের প্রতি অণুতে, প্রতি পরমাণুতে পবিত্রতাস্বরূপ শ্রীভগবানের অবস্থিতি চিন্তা কর। অসংযম উৰ্দ্ধশ্বাসে দূরে পলাইবে। তােমার চক্ষু, তােমার কর্ণ, তােমার ওষ্ঠ, তােমার গও, তােমার বক্ষ, তােমার স্তন, তােমার উদর, তােমার জরায়ু, তােমার যােনি, তােমার পায়ু-সৰ্বত্র সেই পবিত্রতা-স্বরূপ পরমাত্মা তার অপরূপ সুষমায়, তার সুস্নিগ্ধ সৌন্দর্য্যে, তার অতুলন মাধুর্যে বিরাজিত রহিয়াছেন। এই চিন্তা কর। এই ধ্যান যত জমিবে, কামুকতা তত কমিবে। কামুকতা কমা’র মানে জান ? কামের প্রেমে রূপান্তরিত হওয়ার নামই কাম কমা। নতুবা জোর করিয়া কামকে কেহ দমন করিতে পারে না। কামও যাহা, প্রেমও তাহা, শুধু প্রকাশের পার্থক্য। অনিত্য বস্তুর প্রতি আসক্তিই কাম, নিত্যানন্দ পরমাত্মার আসক্তিই প্রেম। পরমাত্মার প্রতি অন্তরের আসক্তি জাগাও। দেহের প্রত্যেকটী অঙ্গে পরমেশ্বরের ধ্যান কর এবং মনে মনে এই অঙ্গ তাহাকে অর্পণ কর। এই চক্ষু তুমি নাও, এই কর্ণ তুমি নাও,

৯৪
সধবার সংযম
বলিয়া তঁাকে দান কর। এই বক্ষ,তুমি নাও, এই উপস্থ তুমি নাও, বলিয়া
তার হাতে ইহা তুলিয়া দাও। দেহের প্রতি অংশ প্রতি প্রত্যংশ
তাহার পায়ে ঢালিয়া দাও। -সকল কামনা, সকল বাসনা তিনিই
নিরাকৃত করিবেন।
স্বামীর দেহটীতে স্ত্রীর অধিকার আছে। সেই অধিকারও তুমি
পরমাত্মারূপী শ্রীগুরুর পায়ে সপিয়া দাও। স্বামিসােহাগ তাঁর কাছে
দিয়া দাও। -তােমার স্বামীর মধ্য দিয়া অচিরেই তার জ্যোতির্ময়
বিগ্রহ ফুটিয়া উঠিবে।
শুভাশীষ জানিও। তােমাদের সর্বাঙ্গীন কুশল সংবাদে সুখী
করিও। ইতি-
শুভাশীঃ
স্বরূপানন্দ
চতুষ্পঞ্চাশৎ পত্র
=
জয় পরমাত্মা
টাকা
১৪ই আশ্বিন ১৩৪১
কল্যাণীয়াষু ঃ-
মেহের মা, * * * ভাগবত গ্রন্থে গােপীগনের সহিত গোপিকা-
বল্লভের যে পরমমধুর উজ্জল প্রেমের কথা কীৰ্ত্তিত হইয়াছে, সেই প্রেম
কাম-গন্ধহীন এবং জড়জগতের সকল কলুষ-বর্জিত। সেই প্রেমকে
দাম্পত্য জীবনে প্রতিষ্ঠা করাই বিবাহিত জীবনের চরমােৎকর্ষ।

সধবার সংযম ৯৫৫ দেহের লাগিয়া দেহ কাঁদিয়া মরিবে, ইহাই বিবাহের তাৎপৰ্য্য নহে। দেহ-সহায়ে আত্মোপলব্ধি জাগাইতে হইবে। প্রাকৃত মিলন বিবাহের স্বরূপ নহে, আত্মায় রমণই বিবাহের স্বরূপ। আত্মা যখন আত্মাকে ভালবাসিতে শিখে, তখন দেহকে পাইয়াও দেহ উত্তেজিত বা লােলুপ হয় না। স্বামীর প্রতি তােমার যে ভালবাসা, তাহা দেহকে অতিক্রম করিয়া তােমার প্রকৃত স্বামীটিকে বাহির করুক। যার জরা নাই, মৃত্যু নাই, রােগ নাই, ক্ষয় নাই, সেই স্বামীটাকে তােমার স্বামীর মধ্য দিয়া খুঁজিয়া বাহির কর। তােমার স্বামীও তােমার মধ্য দিয়া তার চিরসঙ্গিণীকে অন্বেষণ করুন। এই অন্বেষণই বিবাহিতের সাধনা। এই অন্বেষণ যখন সান্নিধ্যের দাবী করিবে, একমাত্র তখনই তােমরা দৈহিক মিলনে অধিকারী। ** সংযম যদি গৃহ-কলহ সৃষ্টি করে, তবে বুঝিতে হইবে, তােমাদের চেষ্টায় কোথাও চুক রহিয়া গিয়াছে। সংযম শান্তির অগ্রদূত, সংযম আনন্দের পতাকাবাহী। শ্রীভগবান্ তােমাদিগকে সৰ্বাঙ্গীণভাবে কুশলান্বিত করুন। ইতি- ক আশীর্বাদক তোমার দেহের সন্তান স্বরূপানন্দ

সধবার সংযম
পঞ্চপঞ্চাশৎ পত্র
ঢাকা
১৭ই আশ্বিন, ১৩৪১
কল্যাণীয়াষ -
প্রকৃত যে গৃহলক্ষ্মী, তাহার জীবনের সহিত প্রকৃত সন্ন্যাসিনীর
জীবনের পবিত্রতায় পার্থক্য খুব অধিক নাই। এই কথা স্মরণে রাখিয়া
নিজ কর্তব্য পালনে প্রয়াসিনী থাকিবে।
সন্ন্যাসিনীদের জীবন কেমন শুভ্র, কেমন সুন্দর, অনুক্ষণ এই চিন্তা
শ্রদ্ধান্বিত অন্তরে করিবে।
ভণ্ড সন্ন্যাসী বা ভ্ৰষ্টা সন্ন্যাসিনীর জীবন কখনাে আলােচনা
করিবে না।
সংযমের সত্য সৌরভ যে দেশে, যে যুগে বা যে জাতিতেই সমীরিত
হইয়া থাকুক না কেন, সেই খানেই প্রাণের অকপট একটা প্রণতি
জানাইবে।
এই ভাবেই তােমার পবিত্র ব্রত তোমাতে দিনের পর দিন দৃঢ়তরা
প্রতিষ্ঠা লাভ করিতে থাকিবে।
মঙ্গলশীষ গ্রহণ করিও। কুশল-সংবাদে সুখী করিও। তােমার
এই স্নেহের সন্তান আনন্দেই আছে। ইতি
আশীৰ্বাদক
স্বরূপানন্দ

সধবার সংযম ১৭ ষটপঞ্চাশৎ পত্র ফেণী, নােয়াখালী ২১শে আশ্বিন, ১৩৪১ * পরমকল্যাণীয়াষু :- স্নেহের মা, * # স্ত্রীর সাহচর্য স্বামীর স্বর্গপ্রদও হইতে পারে, নরকপ্রদও হইতে পারে। স্ত্রীর সাহচর্য স্বামীর পক্ষে কিরূপ ফলদায়ী হইবে, তাহার অনেকটা নির্ভর করিবে স্ত্রীর মনােবৃত্তির উপরে। তুমি কি তােমার স্বামীকে স্বর্গসুখ দিতে চাহ, না, তুমি তাহাকে নরক ভােগাইতে চাই, তাহার উপরেই নির্ভর করিবে, তােমার স্বামী কোন্ লােকে বাস করিবেন। অনেক স্ত্রী স্বামীর সর্বনাশ করিয়াছে, অনেক স্ত্রী স্বামীকে পরম- মঙ্গলে জাগ্রতও করিয়াছে। অনেক স্ত্রী স্বামীকে মােহাচ্ছন্ন করিয়াছে, অনেক স্ত্রী স্বামীর চখের বহুযুগসঞ্চিত ঘুমের ঘাের কাটিয়া দিয়াছে । অনেক স্ত্রী ভালবাসার নাম করিয়া স্বামীকে কালকূট পিয়াইয়াছে, অনেক স্ত্রী প্রকৃত প্রেমের সঞ্জীবন স্পর্শে মৃতপ্রায় স্বামীকে জীয়াইয়াও তুলিয়াছে। যে নারী বিষ-বল্লরীর ন্যায় মৃত্যুদায়িক, সেই নারীই আবার কল্পলতিকার স্যায় সৰ্বাভীষ্টপূরিকা হইতে পারে। একটী প্রভাতেও তুমি অন্তরকে জিজ্ঞাসা করিতে ভুল করিও না, আজ তুমি সমগ্ৰ দিন ধরিয়া স্বামীর সহিত কিরূপ ব্যবহার করিবে। একটী সায়াহ্নেও তুমি অন্তরকে জিজ্ঞাসা করিতে ভুলিয়া যাইও না, আজ তুমি সমগ্র রজনী স্বামীর প্রতি কিরূপ আচরণ করিবে। তীব্র চক্ষে নিজের অন্তরকে নিজে দেখিয়া লও, নিজেকে নিজে বুঝিয়া লও, ১৮ সধবার সংযম পতিমঙ্গলপ্রার্থিনী তুমি কতখানি, তার ওজন লও। পতিমঙ্গলের জন্য আত্মসুখ তুমি বলি দিতে পারিবে ? যদি পার, তবে তুমি স্বর্গদায়িনী। যদি না পার, তবে তুমি কি, তাহা নিজের কাছেই জিজ্ঞাসা করিও। রাক্ষসী রমণী স্বামীর রক্ত পান করে, দেবস্বভাব। রমণী নিজের রক্ত দান করিয়া স্বামীর প্রাণ-সঞ্চার করে। পিশাচী রমণী স্বামীসহ নরকের ক্লেদপঙ্কে গড়াইতে চাহে, স্বর্গীয়া রমণী স্বামীকে লইয়া পূতিগন্ধমুখরিত নরকোৎসব-প্রাঙ্গন দ্রুতবেগে পরিহার করিয়া কামবুদ্ধিহীন দিব্য ধামে ধাবমানা হয়। রাক্ষসী সৃষ্টি করে ভীতিকে, পিশাচী সৃষ্টি করে ঘৃণাকে, দেবী-স্বরূপিনী স্বর্গচারিণী সৃষ্টি করে প্রেম ও আনন্দকে।—জিজ্ঞাসা কর নিজেকে, স্বামীর জন্য তুমি ইহাদের মধ্যে কোটীকে সৃষ্টি করিতে চাই। স্বর্গসুখের লােভেই পুরুষেরা স্ত্রীলােকদিগকে বিবাহ করে। স্বর্গীয় মাধুর্যের আস্বাদন-আশেই পুরুষেরা স্ত্রীলােকের কাছে ছুটিয়া, আসে। সেই আশা পূরণ করিয়া দিতে যে পারে, সেই স্বামীর যথার্থ বান্ধবী। নরকদুঃখ-নিবারণই স্বামীর প্রতি স্ত্রীর মহনীয় দান। এই কথা মনে রাখিও। কুশলে আছি। কুশল দিও। শুভাশীষ জানিও। ইতি আশীৰ্বাদক স্বরূপানন্দ

সধবার সংযম
সপ্তপঞ্চাশৎ পত্র
জয় মা
সিরাজগঞ্জ, পাবনা
২৬শ আশ্বিন, ১৩৪১
পরমকল্যাণীয়াষু ঃ-
স্নেহের মা, তােমার পত্র পাইয়াছি। আমি এখানে আসিয়া
পৌছিবার পূর্বেই তােমার পত্র এখানে পৌছিয়াছে। আমি কুশলে
আছি। তুমি ও মান্ন-শুভাশীষ জানিও।
তােমার প্রত্যেকটা কথা যুক্তিপূত ও বিচার-সঙ্গত হইয়াছে।
স্বেচ্ছাকৃত বন্ধ্যাত্ব লাভই সধবার সংযমের উদ্দেশ্য নহে। তােমার শিশু
যখন ভূমিষ্ঠ হইবে, সকল দেবকন্যারা যেন শিশুর দোলনায় একটা
করিয়া অভিনব প্রেরণার দোল দিয়া যায়, তােমার সংযম তাহারই
সম্বৰ্ধনা। কমলের মত প্রস্ফুটিত কোমল হৃদয় আর গােলাপের মত
সৌরভময় সুন্দর পরাণ লইয়া তােমার শিশু আবির্ভূত হউক।
ভােমার সংযম তাহারই জন্য। এই কথা যে তুমি বুঝিয়াছ, ইহাতে
আমার আনন্দ ধরে না। তোমাকে মাথায় লইয়া আমার নাচিতে
ইচ্ছা করে।
বিবাহের পবিত্রতা সম্বন্ধে জগতের যত নরনারী সবাই সমভাবে
অচেতন। তােমাদের ভিতরে চেতনা জাগিতেছে। ইহা এ জাতির
মহাসৌভাগ্যের এক অভ্রান্ত সূচনা। ইহা এই দেশের ইতিহাসে
মহাগৌরবের এক অভিনব অধ্যায়-সংযােজন। তোমাদের মত
পুত্র-কন্যার পিতা হইয়া আমিও গৌরব অনুভব করিতেছি। আশীর্বাদ
করি, তােমাদের ব্রত সফল হউক, সার্থক হউক। ইতি
তােমার মেহের
স্বরূপানন্দ

১০০ সধবার সংযম === অষ্টপঞ্চাশৎ পত্র ঔষ্কার-হরি সিরাজগঞ্জ, পাবনা ২রা কার্তিক, ১৩৪১ কল্যাণীয়াষু ঃ- স্নেহের মা, যে প্রশ্ন আমাকে করিয়াছ, তাহার জবাব তােমার স্বামীর নিকটেই পাইবে। আমি এই প্রশ্নের কোনও উত্তর নাই প্ৰদান করিলাম। স্বামী যদি নির্দিষ্ট একটা সময়ের জন্য ব্রহ্মচর্যের ব্রত গ্রহণ করেন, ব্রত-গ্রহণ-কালে যদি পত্নীর সম্মতি প্রাপ্ত হন, তাহা হইলে সেই স্বামী পত্নীকে অসংযমমূলক কার্যে সঙ্গিনীরূপে পাইতে চাহিলে পত্নীর পক্ষে কৰ্তব্য কি হইবে, অকৰ্তব্যই বা কি হইবে, এই ত’ মা তােমার প্রশ্ন ? পতিতা পত্নী স্বামীর আদেশ বা অনুবােধ শ্রবণে বাধ্য,—ইহা হইল পাতিব্ৰত্য-ধর্মের দিক হইতে যুক্তি। ধর্মপত্নী স্বামীকে ধৰ্ম্মে সাহায্য করিবেন এবং অধৰ্ম্ম হইতে রক্ষা ও নিবৃত্ত করিবেন,-ইহা হইল সহধর্মিণী-ধর্মের দিক্ হইতে যুক্তি। তুমি নিজেকে একবার জিজ্ঞাসা কর যে, তুমি কি পতিব্রত। হইতে চাহ, না, সহধর্মিণী হইতে চাহ ? তুমি স্বামীকে একবার জিজ্ঞাসা কর, তিনিই বা তােমাকে কিরূপে পাইতে চাহেন ? কিন্তু আসল কথাটি জানাে মা? সহধর্মিণী ৰে নহে, পতিব্রতা সে হইতে পারে না। পতিব্রতা শব্দের প্রকৃত মানে আগে তােমাকে বুঝিয়া লইতে সইতে হইবে। পতির ধর্ম রক্ষাই যাহার ব্রত, তিনিই পতিব্রতা। পতির আয়ুৰ্ব্ব জিই যে-নারীর ব্রত, তিনিই পতিব্রতা। পতির আধ্যাত্মিক উদ্দীপনা বিধান করাই যার ব্রত, তিনিই পতিব্রতা। গভীরভাবে চিন্তা করিয়া দেখি ও মা, তুমি সত্যসত্যই পপতিব্রতা কি না।

সধবার সংযম
১০১
যখন অন্তরে এইরূপ সন্দেহ, সংশয় বা দ্বিধা জাগ্রত হইবে, তখন
আমাকে জিজ্ঞাসা না করিয়া বারংবার তারস্বরে নিজের মনকে
জিজ্ঞাসা করিবে। মন যদি জবাব দিতে না পারে, স্পষ্ট ভাষায়,
অভ্রান্ত ভঙ্গীতে পথ-নির্দেশ করিতে না পারে, তবে জানিও, সেই মন
রুগ্ন। তখন রুগ্ন মনকে ঔষধ সেবন করাইয়া সুস্থ করিয়া লইও।
সেই ঔষধ হইতেছে শ্রীভগবানের অমৃতময় নাম, যাহা তােমার জীবনের
বহু বিপদ বিদূরিত করিয়াছে। দুঃখদুর্গতিলাঞ্ছন বিবিপত্তিভঞ্জন
মঙ্গলালয় নামে নির্ভর হারাইও না। শুভাশীষ জানিও। ইতি
আশীর্বাদ ক
স্বরূপানন্দ
-
উনষষ্ঠিতম পত্র
শ্রীহরি-ওঙ্কার
মাগুরা, যশােহর
৯ই কার্তিক, ১৩৪১
মঙ্গলান্বিতা :-
মেহের মা, সচ্চিন্তার শক্তি অপরিসীম। অহর্নিশ মনটাকে পবিত্রতা-
স্বরূপ শ্রীভগবানে ডুবাইয়া রাখ, চন্দনের বনে থাকিয়া ইতর বৃক্ষও যেমন
চন্দন-গন্ধ-যুক্ত হয়, তুমিও তেমনি পবিত্রতাময়ী হইবে ।
বিশ্বাস কর, তুমি পবিত্রতা-স্বরূপিনী জগজ্জননী। বিশ্বাস কর, তুমি
সৃষ্টি-স্থিতি-প্রলয়-বিধায়িনী মহামায়া। মায়ার তুমি অতীত, মােহের
তুমি ঊর্ভে, লালসার তুমি প্রভু, কামনা-বাসনা তােমার ক্রীতদাসীরও
দাসী। বিশ্বাসই তােমাকে দীপ্তিশালিনী করিবে।
শুভাশীষ জানিও। ইতি
আশীৰ্বাদক
স্বরূপানন্দ

সধার সংযম । যঠিতম পত্র কমলীকদর, বরিশাল ১৩ই কার্তিক, ১৩৪১ কল্যাণীয়াযু : স্নেহের মা, পরখ রাত্রি তিনটায় ষ্টীমারে উঠিয়াছি, কল্য সমগ্র দিন ও রাত্রি ষ্টীমারে কাটাইয়া অদ্য এখানে আসিয়াছি। এটা একটা ছােট পল্লীগ্রাম । পল্লীগুলিতে যখন আমি আসি, তখন আমি যেন সত্য সতাই নিজেকে ফিরিয়া পাই। পল্লীপথের স্নেহচ্ছায়ার সাথে যেন মাতৃক্রোড়ের স্নেহ- স্পর্শের সাদৃশ্য রহিয়াছে। মধুর ‘মা’ নামে তোমাদিগকে ডাকিতে যেন আমার চিত্ত আবেগে আকুল হইয়া উঠে। তােমরাও কি মা সমগ্র জগতে নিজেদের মাতৃভাব বিস্তারিত করিবার জন্য তেমন আবেগ অনুভব কর? যার চিত্ত যত পবিত্র, সর্বজীবে সন্তানব সেই রমণীর পক্ষে তত সহজসাধ্য। আজকাল যে এক শ্রেণীর মহিলারা মাতৃভাবে পূজিতা হইতে অপছন্দ করেন, তাহার প্রকৃত কারণ কে জানে, হয়ত বা পবিত্রতারই অপ্ৰাচুৰ্য্য। তােমরা আজ পবিত্র হও, তাহা হইলেই তােমরা মধুর হইবে, সুন্দর শুভাশীষ জানিও। কুশলেই আছি। ইতি শুভাশীৰ্বাদক তােমার স্নেহের সন্তান স্বরূপানন্দ

সধবার সংযম
একষষ্ঠিতম পত্র
জয় পরমাত্মা
লক্ষ্মীপুর, নােয়াখালী
২৪ অগ্রহায়ণ, ১৩৪১
কল্যাণীয়াযু :-
স্নেহের মা, * * * দুশ্চরিত্র পুরুষের পত্নীরূপে যাহাদিগকে জীবন
কাটাইতে হয়, তাহাদের দুঃখ অসীম। আবার,দুশ্চরিত্রা স্ত্রীর স্বামীরূপে
যাহাদিগকে সংসারী করিতে হয়, তাহাদেরও দুঃখের সীমা নাই। নারী
এবং পুরুষ উভয়ের জীবন হইতেই দুশ্চরিত্রতা ও অসংযম নির্বাসিত হওয়া
আবশ্যক। ইহাই প্রকৃত সুখের উৎপাদক। ইহাই আদর্শ সমাজের
প্রতিষ্ঠাভূমি।
জীবনকে পবিত্র কর মা, মধুর কর। জীবনকে সংযত কর মা, সুন্দর
কর। জিতেন্দ্ৰিয়ত্ব প্রকৃত উন্নতির নিত্যসহচর।
কুশলে আছি। কুশল দিও। ইতি
নিয়ত শুভাকাঙ্ক্ষী
স্বরূপানন্দ
দ্বিষষ্ঠিতম পত্র
জয় মা
চৌমুহনী, নােয়াখালী
২৮ অগ্রহায়ণ, ১৩৪১
কল্যাণীয়াষু :-
মেহের মা, এখানেই একটী পল্লীগ্রামে একটা মেয়ে দেখিয়া আসিলাম,
মাকে দেখিবামাত্র তােমার কথা মনে পড়িল। বারংবার আমার সেই

১০৪
সধবার সংযম
পুরাতন কথাটাই মনে পড়িল, পবিত্রতাই সুন্দরতা, পবিত্রতাই মধুরতা।
তােমাদের সেই পবিত্রতা দীর্ঘজীবী হউক, যে পবিত্রতার কথা স্মরণমাত্র
আমারও অন্তর পবিত্রতার আবেশে আপ্লুত হয়।
কুশলে আছি। শুভাশীষ জানিও। ইতি
নিত্যশুভাশীঃ
স্বরূপানন্দ
ত্রিষষ্ঠিতম পত্র
গৌরীপুর, ময়মনসিংহ
১১ই পৌষ, ১৩৪১
কল্যাণীয়াষু :-
মা, তােমার পত্র পাইয়াছি আজ একুশ বাইশ দিন। কিন্তু উত্তর
দিব কখন? সময়ই পাই না। গত কল্য এখানে আসিয়াই ভগবানের
কৃপায় কলেরার মত দাস্ত আরম্ভ হইয়াছে। তাই তােমার পত্ৰখানার
উত্তর দিবার অবসর পাইলাম। কারণ দগুলি শষ্যায় না পড়িলে
মায়ের কথা স্মরণ করে না।
জগতের সকল সৃষ্টির মধ্যে তােমর অতুলনীয়, অনুপম। কেন জান
মা ? কারণ, তােমাদের স্মৃতি পবিত্রতার উদ্দীপক । তােমাদের কথা
ভাবিলে প্রাণ পবিত্রতার মধুতে পূর্ণ হইয়া যায়, তিক্ত জীবন সুধাময় হয়।
কারণ, মা হইয়া তােমরা সকল নীচতা, সকল হীনতা, সকল কামনা,

সধবার সংযম
১০৫
সকল লালসা এবং সকল জঘন্যতার উৰ্দ্ধদেশে প্রতিষ্ঠিত হইয়াছ। তোমরা
ধ, তােমাদের সন্তান হইয়া আমরাও ধন্য।
শীর অত্যন্ত দুর্বল হইয়া পড়িয়াছে। আশা করি, পত্র ছােট
হইয়াছে বলিয়া পূৰ্ব্ব বারের ন্যায় অভিমান করিবে না। মহিমাখিতা মা
আমার, পুণ্যপ্রতিভাশালিনী মা আমার, তােমার অন্তরের জ্যোতিঃ
আরও উজ্জ্বল হউক, আরও তুমি পবিত্র হও, আরও তুমি মধুর হও।
শুভাশীষ জানি। ইতি
আশীর্বাদক
তােমার স্নেহের
স্বরূপানন্দ
সমাপ্ত
Printed by Bankim Chandra Saha from 1-6 page at Dacca Printing
Works Songattola and by Pyari Mohan Kar from 67–106 pages
at Victoria Art Press, 8, Hara Nath Ghosh Lane, Dacca.

শ্রীশ্রীস্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসের নিঃস্বার্থ পরােপকার হিষ্টিরিয়া, মৃগী ও উন্মাদ রােগীদের জন্য নামমাত্র মূল্যে ঔষধ বিতরণ। যােগের বিস্তারিত অবস্থাসহ উত্তরের জন্য পাঁচ পয়সার টিকিট দিয়া নিম্নলিখিত ঠিকানায় পত্র লিখিতে হইবে। পুপুনকী অযাচক ব্রহ্মচর্য আশ্রম পােঃ চাশ, মানভূম। শ্রীশ্রীস্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসের শ্রীহস্তলিখিত ঘৃতসঞ্জীবনী-সুধার খনি-স্বরূপ অমূল্য গ্রন্থাবলি - (১) সরল ব্রহ্মচর্য-মূল চারি আনা, (২) আদর্শ ছাত্রজীবন-চাৰি আনা, (৩) গুরু-তিন আনা, (৪) জীবনের প্রথম প্রভাত—তিন আনা, (৫) অসংযমের মূলােচ্ছেদ—চারি আনা, (৬) দিনলিপি বা দৈনিক আত্মশােধন—চারি আনা (৩) সংযম সাধনা বা বীৰ্য্যক্ষয়ের প্রতীকার—বারাে আনা, (৮) স্ত্রী জাতিতে মাতৃভাব- আট আনা, (৯) সধবার সংযম—আট আনা, (১০) বিধবার জীবন-য-দশ আনা, (১১) বিবাহিতের ব্রহ্মচর্য্য-এক টাকা। পুপুকী আশ্রম প্রতিষ্ঠার বিস্ময়কর ইতিহাস জানিতে হইলে ভিক্ষু বাঙ্গালী” পাঠ করুন। বহুচিত্রে সুশােভিত হৃদয়-মনােহারী গ্রন্থ। মূল্য চারি আনা। পুস্তক ভিপি:তে প্রেরনের নিয়ম নাই। সর্বদা অগ্রিম মূল্য প্রেরন করিতে হয়। ডাক মালি স্বতন্ত্র লাগে। পুপুনকী অযাচক আশ্রম পােঃ চাশ, মানভূম।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Sadhabar Sanjam Ed. 1st

Author
Swami, Swarupanand
Title
Sadhabar Sanjam Ed. 1st
File name
Sadhabar Sanjam Ed. 1st
Text
OCR done
Citation
1934
Published
2010/02/20
Publisher
Sri Nakuleshwar, Kolkata
Language
Sanskrit
Pages
118
Library
Bally Sadharan Granthagar
Classification
Bengali Letters
Keywords
Swarupanand
DLI number
511333
Barcode
4990010018491.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
Ljeiw2E9dK0
Download PDF

Sadhabar Sanjam Ed. 1st