Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Paraloker Sandhan
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
পরলােকের সন্ধান ।
শ্রীমদাচাৰ্য ব্ৰহ্মানন্দ কেশবচন্দ্র সেনের
উপদেশাবলী হইতে সংগৃহীত।
১৩২৩ সাল।
কলিকাতা
৩নং রমানাথ মজুমদার স্ট্রট,
“নববিধান প্রসে”
বি, এন, মুখার্জি কর্তৃক মুদ্রিত ও প্রকাশিত
নাল দাদা, “প্রকৃতিকে হারিয়ে প্রাণের জ্বালায় পিতৃদেবের বইগুলির আশ্রয় নিয়ে এই মুক্তগুলি জড় করেছি। এই বইখানি তােমায় দিচ্ছি। তুমি কত লােকের শোকের সময় সান্ত্বনা দাও। এই বইখানি পড়ে, “পরলােকের সন্ধান পেয়ে আমার মত কত প্রাণ শান্তি পাবে। তােমার মেরে ধনী।
No text on this page.
পরলোকের সন্ধান। ar আচার্য্যের উপদেশ - প্রথম খণ্ড । বিশ্বজনীন জীবন্তু ধৰ্ম্ম- আশ্চৰ্য্য তাহার করুণা ! যখনই শােকে কাতর হইয়া তাহার নিকট ক্রন্দন করিয়াছি, তিনি আমার অশ্রুজল মােচন করিয়া, সান্ত্বনা দ্বারা তাপিত হৃদয়কে শীতল করিয়াছেন।—(পৃঃ ৩) সংসারের অন্ধকার মধ্যে তুমি আমাদের আলােক ; দুৰ্বলতার মধ্যে তুমি আমাদের বল; অনিত্য সম্পদের মধ্যে তুমি আমাদের চিরসম্পদ। পৃঃ ৮) ম স সত্যের সৌন্দৰ্য্য মনুষ্যার সহিত ব্রাহ্মধৰ্ম্ম সৰ্বব্যাপী ; আত্মার স্বধৰ্ম্মই ব্রাহ্ম - ধৰ্ম্ম। পৃঃ ১১) ম বিবেক ও বৈরাগ্য- বিবেক জীবাত্মার সহিত পরমাত্মার সম্মিলন করে, বৈরাগ্য মনুষ্যকে অনন্ত জীবনের দিকে অগ্রসর করে। বিবেক পাপকে বিনাশ করে, বৈরাগ্য মৃত্যুকে অতিক্রম করে। বিবেক অসত্য হইতে আত্মাকে সত্যস্বরূপে লইয়া যায়। বৈরাগ্য মৃত্যু হইতে ২ পরলোকের সন্ধান। আত্মাকে অমৃতেতে লইয়া যায়। অতএব এই দুয়ের শরণাপন্ন হইলে আমরা নিশ্চয়ই অধ্যাত্ম যােগ দ্বারাঅমৃত লাভ করিয়া কৃতার্থ হইতে পারি।--(পৃঃ ১৯) বিবেক যেমন আত্মাকে পাপ হইতে মুক্ত করিয়া, পবিত্র করিয়া, সত্য-স্বরূপ ঈশ্বরের জন্য প্রস্তুত করে ; বৈরাগ্য সেইরূপ আত্মাকে মােহ ও সংসারাসক্তি হইতে বিচ্ছিন্ন করিয়া পরলােকের জন্য, অনন্ত জীবনের জন্য প্রস্তুত করে। পৃঃ ২৩) কত শত লােকের মৃত্যু হইতেছে, কত জনপদ বিলুপ্ত হইতেছে, রাজ্য ও রাজা বিনষ্ট হইতেছে, কত সবল শরীর রোগ ও ব্যাধির আধার হইতেছে, কত উচ্চপদারূঢ় ব্যক্তিরা দুঃখ দারিদ্যে পতিত হইতেছে ; কত ধনাঢ্য ব্যক্তি নিধন হইয়া অন্ন-বস্থাভাবে বিলাপ করিতেছে ; এ সকল ঘটনা চতুর্দিক হইতে উচ্চৈঃস্বরে জীবন ও সংসারের অনিত্যতা ঘােষণা করিতেছে। কিন্তু ভ্রান্ত প্রমাদী বিষয়- লােলুপ মানব শুনিয়াও শুনে না; বারংবার এ সকল দর্শন করিলেও চৈতন্য লাভ করে না।-(পৃঃ ২৩) যাহারা ধন ঐশ্বৰ্য্য মান মর্যাদাতে তৃপ্তি সুখ অন্বেষণ করে, তাহাদের মন কি প্রকারে পরলােকের প্রতি আকৃষ্ট হইবে, যে লোকে ধন ঐশ্বৰ্য্য, মান মর্যাদা পাইবার সম্ভাবনা নাই। পৃঃ ২৪) মনে বৈরাগ্য না জন্মিলে, হৃদয়ে ঈশ্বরের অনুরাগ স্থান না পাইলে, মনুষ্য কখনই পরলােকের জন্ঠ ব্যস্ত হয় না।-(পৃঃ ২৫) বৈরাগ্য মৃত্যুকে বিনাশ করত ইহলােক ও পরলােককে একত্রী ভূত করিয়া অনন্ত জীবনের স্রোত অসীমৰূপে প্রসারিত করে। ইহার নিকট এ জীবন অনন্ত জীবনের এক ক্ষুদ্র কণা বলিয়া প্রতীয়মান ৬৪, ইং। অনন্ত সাগরের একটা তরঙ্গ মাল ; সুতরাং ধীর ব্যক্তির পরলােকের সন্ধান। ইহলােককে সর্বস্ব মনে না করিয়া এখানে অনন্তকালের জন্য সম্বল আহ- রণ করেন। মাতৃগর্ভে অবস্থানকালে যেমন ইহ জীবনের ক্ষুদ্র অংশ এবং মনুষ্য-শরীর যেমন ক্ষুদ্র জরায়ু মধ্যে প্রস্তুত হইয়া সংসারে অবতীর্ণ হয় ; আমাদের আত্মাও সেইরূপ শৈশবাবস্থায় এই ক্ষুদ্র সংসারে কিছুদিন অবস্থিতি করিয়া বৈরাগ্য সহকারে পরলােকের জন্য প্রস্তুত হয় এবং অনন্ত জীবনের যােগ সাধন করে। পৃঃ ২৫) যে ব্যক্তি ব্ৰহ্মনিষ্ঠ ও ঈশ্বরসধ্বস্ব হইয়া ইহলােক ও পরলােকে কেবল তাহাকেই চায়, সেই বিরাগী। পৃঃ ২৬) মৃত্যুকে পরলোকের দ্বার জানিয়া ইহাকে তিনি উপেক্ষা করেন। -(পৃঃ ২৭) প্রার্থনা-- যদি ঈশ্বরকে হৃদয়ের সহিত চাও, তাহা হইলে তিনি প্রার্থনা গ্রাহ্য করিবেন।-( পৃঃ ৩৫} প্রার্থনাই স্বর্গরাজ্যের স্তম্ভ। পৃ: ৩৭) * ৯ পরলােক- কিন্তু ধ সেই সাধক যিনি জীবনের সন্ধাকালে, এই প্রকার শান্ত ভাবে, এই প্রশান্ত নদী পার হইয়া, পরলোক গমন করেন।-- (পৃঃ ৪৮) ঈশ্বর প্রাণ ভক্তেরাই কেবল মৃত্যুতে শান্তি লাভ করেন। মৃত্যুভয় তাহাদের পক্ষে নিতান্ত অসম্ভব। বাস্তবিক মৃত্যু কেবল পরলােকের দ্বার মাত্র। পৃঃ ৪৯ ) মৃত্যুর ভয়ই যথার্থ মৃত্যু। ইহলোক ছাড়িয়া পরলোকে মাওয়া, ৪ পরলােকের সন্ধান। ইহাতে আশঙ্কার কারণ কি আছে ? ইহলােক পরলোক এক রাজ্যের ভিন্ন ভিন্ন দেশ মাত্র, এক ভবনের ভিন্ন ভিন্ন ঘর মাত্র। এখানেই থাকি, আর যেখানেই যাই, সেই এক রাজা, এক পিতার নিকটে আমরা থাকি। তবে মৃত্যুকে ভয় কি? পরলােককে একটা বহুদূরস্থ অপরিচিত অন্ধকার স্থান মনে করা কল্পনা মাত্র। এ কল্পনা তোমরা পরিত্যাগ কর, যাহা সত্য তাহা ধারণ কর। যে সকল ভ্রাতা ভগিনী ইহলােক হইতে অপসৃত হইয়াছেন, তাহার কোথায় গেলেন ইহা আলােচনা করিয়া ভীত হওয়া বা ক্রন্দন করা বৃথা। এই ভবনদী পার হইলেই পরলােক। আমরা যেমন এ পারে জীবিত রহিয়াছি, মৃত ভ্রাতা ভগিনীদিগের আত্মা সকল সেইরূপ পরপারে জীবিত রহিয়াছে ; মধ্যে কেবল এই নদী ব্যবধান। আমরা যত লােককে এখান হইতে বিদায় দিয়াছি, তাহারা সকলেই ঐ স্থানে অবস্থিতি করিতেছেন, এবং তাহারাও জানিতেছেন যে, আমরা সকলে এপারে বসিয়া আছি। আমরা তাহাদের কোন সংবাদ পাই না, তাহাতে কি? পিতা এখানে আমাদের নিকট আছেন, সেখানেও তাহাদের নিকট থাকিয়া তাঁহাদিগের মঙ্গল বিধান করিতেছেন। তবে কেবল এপার হইতে ওপারে যাইবার নাম যদি মৃত্যু হইল, তাহা হইলে আমরা কেন ভীত হইব ?- পৃঃ ৪৯ ) ঈশ্বরভক্তি না থাকাই আমাদের মৃত্যু-ভয়ের কারণ।-(পৃঃ ৫০) তিনি পরপারে লইয়া গিয়া তাহার শান্তিনিকেতনে তােমাদিগকে স্থান দিবেন এবং অনেক সম্পদ ঐশ্বৰ্য্য দিয়া তােমাদিগকে কৃতার্থ করিবেন। (পৃঃ ৫২ ) পরলােকের সন্ধান। জীব বিশ্বাস- সংসারের কষ্ট বিপদে মঙ্গলময়কে বিশ্বাস করাই তোমাদের জীব- নের শান্তি সুখ। পৃঃ ৫৫ ) যদি ঈশ্বর তােমাদিগকে দুঃখানলে দগ্ধ করেন, ঘাের বিপদে নিক্ষেপ করেন, তখন মনে করিও না যে, ঈশ্বর তোমাদিগকে ছাড়িয়াছেন। তিনি বিপদ দ্বারা আত্মাকে প্রস্তুত ও উপযুক্ত করেন। পৃঃ ৫৬) অশ্রুপাত করিয়া বপন তাহার ধৰ্ম্মরাজ্যে যে ব্যক্তি অপাত করিয়া বপন করে, সে নিশ্চয়ই আনন্দের সহিত শস্য সংগ্রহ করে।-(পৃঃ ৫৮) ক্রন্দনই আনন্দের সােপান। যিনি প্রথমে ক্রন্দন করিয়া ধৰ্ম্ম, জীবন আরম্ভ করেন, আনন্দ তাহার শেষ পুরস্কার হয়। যে পরিমাণে ক্রন্দন, সেই পরিমাণে আনন্দ। ধম্মরাজ্যে ক্রন্দনও স্বাভাবিক, আনন্দও স্বাভাবিক।-(পৃঃ ৫৯) ক্রন্দন করিতে করিতে যে প্রার্থনা করা হয়, তাহাই অবিকৃত ও সরল।-(পৃঃ ৬০ ) স্বর্ণ একবার অগ্নিতাপে তাপিত না হইলে কখনই বিশুদ্ধ মূর্তি ধারণ করে না, হৃদয়ে আঘাত না করিলে তাহা হইতে অমৃতপ্রবাহ প্রস্ত হয় না, অগ্রে কন্টক-শয্যায় শয়ন করিয়া শােণিতপাত না হইলে আনন্দ লাভ অসম্ভব।-- (পৃঃ ৬৩) গ এ ঈশ্বরই কে শান্তির অপার।" (পৃ: ১৭
পরলােকের সন্ধান।
ম
.
ঈশ্বরের পিতৃত্ব, নর নারীর ভ্রাতৃত্ব এবং ভগ্নী-
রােগের সময় ঔষধ, শোকের সময় সান্ত্বনা, পরীক্ষার সময় বল,
বিপদে শান্তি, মনে সুখ, শরীরে সুখ, তিনিই বিধান করেন।
(পৃ: ৮৫)
সকলে শ্মশানে পরিত্যাগ করিয়া যাইবে, যাহাদিগকে এত
আত্মীয় বলি তাহারা একবার ফিরিয়াও দেখবে না, প্রিয়তম
বন্ধুরা আর সংবাদ লইবেন না, কিন্তু দয়াময় পরমপিতা মৃত্যুকালেও
সন্তানকে ছাড়েন না, তাহার শান্তি ক্রোড়ে তাহাকে লইয়া পরলােকে
গমন করেন পৃ: ৮৮)
তিনি সুখ সম্পদে রাখুন, অথবা দুঃখ বিপদে নিমগ্ন করুন, সকল
সময়ে সকল অবস্থাতে আমরা যেন তাহার অনুগত থাকি ; তিনি
যাহা বলিবেন তাহাই করিব, যা ত্যাগ করিতে বলিবেন তাহাই
ছাড়িব, যে পথে লইয়া যাইবেন সেই পথে চলিব। পৃ: ৮৮)
তাহার সমুদয় আজ্ঞা পালনের নাম ধৰ্ম্ম।(পৃঃ ৮৯)
পাপক্ষয়-
বল, জীবনের সমস্ত দিন এরূপে যাপন করিয়াছি যে, মৃত্যুশয্যায়
সে সমস্ত দিন স্মরণ করিয়া আর পাপ-ভয়ে ভীত হইব না।-(পৃঃ ৯৬)
ব্যাকুলতা-
তিনি সর্বদা অমৃত পান করাইবার জন্য প্রস্তুত রহিয়াছেন, কেবল
'তোমাদের চাওয়ার অপেক্ষা। পৃঃ ১১৬)
*** বার পিল বসিয়া , তিনি স্বয়ং আসিয়া সন্তানের পিত
পরলোকের সন্ধান। ৭ স্বা শীতল করিবেন। আমাদিগের পিতা এমন নহেন যে, তিনি ব্যাকুল সন্তানের ক্রন্দন শুনিয়া উদাসীন থাকিবেন বা আমাদের দুঃখ দেখিয়া নির্দয় ব্যবহার করিবেন।-(পৃঃ ১১৬) তাহার চরণে ব্যাকুল হৃদয়ে অবলুন্ঠিত হও। দয়াময় তােমাদিগকে শান্তি দিবেন। পৃঃ ১২০ ) অদ্যকার অন্ধকার মধ্যে শােকে আকুল হইয়া বিলাপ কর, কল্য পিতার প্রসাদে সুপ্রভাত দেখিবে, তাহাকে দর্শন করিয়া জন্ম সফল করিবে, বিমলানলে পূর্ণ হইবে। প্রথমে একবার দুঃখী বেশ ধারণ কর, ব্যাকুলতার পথে প্রবেশ কর, ক্রমে সেই পথে যতই যাইবে, ততই আনন্দ ও শান্তি লাভ করিবে। পৃঃ ১২০ ) বিনয়- স্বর্গরাজ্যের দ্বার অধিক উচ্চ নহে, যদি প্রবেশ করিতে চাও, মস্তক অবনত কর ; গর্বিত ভাবে মস্তক উন্নত করিয়া যদি যাও, আঘাত পাইবে এবং প্রবেশ করিতে পারিবে না। যে দ্বার ধর্ম- ভিমানীদিগের প্রতি অবরুদ্ধ, তাহা দীন-হীন শাকান ভােজী পর্ণ- কুটীরবাসীদের সমাগমে উন্মুক্ত হয়, এবং ঈশ্বরের প্রেম আসিয়া সেই সামান্য ব্যক্তিদিগকে আলিঙ্গন করে। ধনী মানী জ্ঞানী তাহাকে না পাইয়া ফিরিয়া আইসে, কিন্তু দুঃখী বিনয়ী সন্তানকে তিনি দর্শন দিয়া কৃতার্থ করেন। অতএব, হে ভ্রাতৃগণ, বিনয়ী হও, যদি ঈশ্বরকে চাও, অবনত মস্তকে তাহার নিকট প্রার্থনা কর। পৃঃ ১২৪) ঈশ্বর যদি দেহ মনের আশ্রয় ও প্রাণ হইলেন, তিনি বিশেষরূপে আত্মার প্রাণ। আমাদের আধ্যাত্মিক জীবন, ধৰ্ম্ম-জীবন তিনি ভিন্ন থাকিতে পারে না।-(পৃঃ ১২৬) পরলােকের সন্ধান। বিনয়ীরা কেমন স্বর্গরাজ্যে প্রবেশ করিয়া স্বর্গীয় জ্যোৎস্নাতে আলােকিত ও পুলকিত হইতেছে।--(পৃঃ ১২৮) ঈশ্বর বিনা ধন দারিদ্র্য, সম্পদ বিপদ, জ্ঞান অজ্ঞান, বল দুর্বলতা, জীবন মৃত্যু, ধৰ্ম্ম অধর্ম ; ঈশ্বর বিনা সংসার শ্মশান সমান। (পৃঃ ১২৯) বিশ্বাস- শরীর সম্বন্ধে চক্ষু যেমন, আত্মা সম্বন্ধে বিশ্বাস সেইরূপ। (পৃঃ ১৩) এই বিশাল বিশ্বের শােভা ও শিল্পনৈপুণ্য, ভূলােকে গম্ভীর গিরি পৰ্বত, সুবিস্তৃত সাগর বক্ষ, বিচিত্র তরুরাজি, সুকোমল পুষ্পমালা, এবং মনুষ্য-হস্তরচিত সভ্যতা ও সুখের সহস্র নিদর্শন, দ্যুলােকে অসীম আকাশ, তেজোময় সূৰ্য্য, সুস্নিগ্ধ চন্দ্রমা, অগণ্য গ্রহ তারা, এ সমুদয় অন্ধ ব্যক্তির নিকটে কিছুই নহে, তাহার পক্ষে ইহার সত্তাই নাই। আধ্যাত্মিক জগৎ অবিশ্বাসীর নিকটে এইরূপ। উহার সত্য সকল জাজ্বল্যরূপে দীপ্যমান, উহার সুন্দর শৃঙ্খলা ও শাসন-প্রণালী স্পষ্টরূপে প্রকাশ পাইতেছে, কিন্তু অবিশ্বাসী কিছুই দেখিতে পায় না। ঈশ্বর, পরলােক ও ধৰ্ম্ম উহার নিকট অসৎ। সে চক্ষু খুলিয়া দেখে চারিদিকে কেবল জড় পদার্থ, কোথাও ঈশ্বর নাই; যতই তাহাকে অনুধাবন করে, ততই কেবল শূন্য ও অন্ধকার দেখে। আবার নিমীলিত নয়নে সে যখন আত্মার মধ্যে প্রবেশ করে, সেখানেও সেই অন্ধকার দেখে। জন্ধের যেমন দুর্দশা, তাহারও সেইরূপ দুর্দশা। পৃঃ ১৩০ ) অবিশ্বাসীর পক্ষে মৃত্যু একটী অভেদ্য প্রাচীর, তাহার অপর দিকে যে কিছু আছে বা থাকিতে পারে, ইহা সে মনে করিতে পারে না, পরলোকের সন্ধান। কেন নাস,অন্ধ। সে মনে করে, মৃত্যুকালে জীবনের দীপ একে- বারে নির্বাণ হইয়া যায়, সংসার-ক্রীড়া নিঃশেষিত হয়। যতই সে পরকাল ভাবিতে যায়, ততই অন্ধকারে জড়িত হয়। কিন্তু বিশ্বাসীর নেত্র মৃত্যুর প্রাচীর অতিক্রম করিয়া পরলােকে ধৰ্ম্ম-রাজ্যের বিস্তীর্ণ সাম্রাজ্য সন্দর্শন করে।—( পৃঃ ১৩২ ) সংসারে পাপ পুণ্য, সুখ দুঃখ, ইহার মধ্যে বিশৃঙ্খলা দেখিয়া অবিশ্বাসী সংশয় অন্ধকারে আচ্ছন্ন হয় এবং ধর্মকে অস্বীকার করে ; কিন্তু বিশ্বাসী ব্যক্তি পরলােকের সঙ্গে ঐহিক তাবৎ ব্যাপারের সুন্দর যােগ দেখিয়া এবং ধর্মাধৰ্ম্মের সহিত উহার ফলাফলের অনিবার্য কার্য-কারণ-সম্বন্ধ দেখিয়া পাপ হইতে বিরত হন ও ধৰ্ম্মপথে অগ্রসর হন। পৃঃ ১৩২) ঈশ্বর, পরলােক ও ধৰ্ম্ম, যাহা অবিশ্বাসীরা ছায়া ও অন্ধকার জ্ঞান করে, তাহা বিশ্বাসীর নিকট উজ্জ্বল, জীবন্ত এবং সার।-(পৃঃ ১৩২) সমস্ত হৃদয়ের সহিত মানিতে হইবে যে, তিনি পূর্ণ, মঙ্গলের আধার, তিনি কখনই অমঙ্গল করেন না ও করিতে পারেন না। তাঁহার স্বভাব মঙ্গলময়।-(পৃঃ ১:৪ ) যদি সহস্র দুঃখ বিপদ আমাদিগকে আক্রমণ করে, তথাপি পিতার দয়ার উপর আমরা কখনই অবিশ্বাস করিতে পারি না। আমরা বুঝি, আর না বুঝি, সেই দুঃখ বিপদের মধ্যে পিতা আমাদের মঙ্গল সাধন করেন। তিনি সুখেই রাখুন, আর দুঃথেই রাখুন, তিনি যাহা করেন, সকলই আমাদের মঙ্গলের জন্য।-(পৃঃ ১৩৪ ) পিতা হস্তে করিয়া যাহা দিবেন, সম্পদই হউক আর বিপদই হউক, অবনত মস্তকে তাহা গ্রহণ করিবে। পৃঃ ১৩৫) সুখের সময় ত সকলে তাহাকে স্বীকার করিতে পারে, কিন্তু পরলােকের সন্ধান। পরীক্ষাতে কেবল বিশ্বাসীরা তাহার অনুগত থাকেন এবং অটল ভাবে দাসত্ব-ব্রত পালন করেন। পৃঃ ১৩৫ ) ভবিষ্যতের জন্য ভীত হইও না, ভাবিত হইও না, কিন্তু বিশ্বাসী হইয়া তাহার মঙ্গল চরণে পড়িয়া থাক, বিপদ সম্পদ হইবে, দুঃখান্ধ- কারে সুখ-জ্যোৎস্না দেখিবে, এবং মৃত্যুতে জীবন লাভ করিবে। পৃঃ ১৩৬) যাহার মঙ্গল হস্ত তােমাদের মস্তকের উপরে, তাহাকে বিশ্বাস চক্ষে দেখ, ভয়ানক বিপদেও তােমরা ব্যাকুলিত হইবে না; বরং তােমাদের উৎসাহ, বল, সাহস ও আনন্দ প্রবর্ধিত হইবে। যখন বিপদের অমানিশা চতুর্দিক অন্ধকারে আচ্ছন্ন করে, একটীও আশা- তারা হৃদয়াকাশে লক্ষিত হয় না, যখন পিতা মাতা বন্ধু বান্ধব সকলে পরিত্যাগ করিয়া পলায়ন করেন, যখন প্রলােভন ও পরীক্ষা মুখ- ব্যাদনপূৰ্ব্বক গ্রাস করিতে উদ্যত হয় এবং জীবন ভয় দুঃখে মৃতপ্রায় হয়, তখন ভক্ত গম্ভীরস্বরে কেবল এই কথা বলেন, “তুমি আছ, হে ঈশ্বর, তুমি আছ।” এই কথা বলিতে বলিতে চারিদিক ঈশ্বরের পবিত্র মঙ্গল-জ্যোতিতে আলােকিত হয়, দুঃখ ভয়ের অন্ধকার বিদূরিত হয়, সেই সাধকের শরীর রােমাঞ্চিত ও সঞ্জীবিত হয় এবং তাহার আত্মা স্বর্গীয় উৎসাহ ও আনন্দে পরিপূর্ণ হয়।—(পৃঃ ১৩৬) “তুমি আছ” বলিবা মাত্র তিনি প্রকাশিত হইবেন এবং তােমাদিগকে বিধু বিপদ পরীক্ষা প্রলােভন হইতে উদ্ধার করিবেন। - পৃঃ ১৩৭ ) ঈশ্বর পিতা- সামান্য ধৰ্ম্মজ্ঞানের সঞ্চার হইবা মাত্র আমরা দেখিতে পাই, এ সংসারে কেহ আপনার নাই, সকলেই অপরিচিত। কেবল একজন পরলােকের সন্ধান। ১১ আত্মীয়রূপে বিদ্যমান থাকিয়া হৃদয়কে আকর্ষণ করেন। তিনি আমাদের পরম পিতা।-(পৃঃ ১৪০ ) সঙ্কট রােগে পড়িয়া, যখন আমরা নিরাশ হই, এবং পার্থিব পিতা মাতা বন্ধু বান্ধব আর উপায় নাই দেখিয়া আমাদিগকে পরিত্যাগ করেন, যখন মৃত্যু নিকটবর্তী হইয়া ভয় প্রদর্শন করে, তখন কে মৃত্যু শয্যায় বসিয়া আমাদিগকে শাস্তি দান করেন? হৃদয় বলে, সেই করুণার সাগর পিতা।-(পৃঃ ১৪১) এমন পিতাকে ভক্তি করিলে ইহকালে কল্যাণ ও পরকালে নিত্য শান্তি লাভ হয়। পৃঃ ১৪৬ ) ঈশ্বর রাজা- তাহার ধৰ্ম্মরাজ্য সম্বন্ধেও এইরূপ। ইহার দুই বিভাগ, ইহলােক ও পরলােক। ইহলােক অতি সঙ্কীর্ণ, কিন্তু ইহাই কেবল আমাদের নয়ন-গোচর হয়। যে প্রশস্ত বিভাগ পরলােকে, তাহা আমরা কিছুই দেখিতে পাই না। এই উভয়ের সমষ্টি ধৰ্ম্মরাজ্য। এ পৃথিবীতে ধরাজ শেষ হয় না, মৃত্যুতে ধৰ্ম্মশাসনের পরিসমাপ্তি হয় না। এখানে ধৰ্ম্মশাসন আরম্ভ হয়, পরলােকে ইহার সম্পূর্ণতা হয় । সুতরাং পরলােক ছাড়িয়া কেবল এই ক্ষুদ্র সংসারে দৃষ্টিকে বদ্ধ করিলে আমরা ধম্মরাজ্যের পূর্ণ বিচার উপলব্ধি করতে পারি না। -(পৃঃ ১৫• ) এখানে আমরা অনেক অবিচার দেখিতে পাই। কত পুণ্যাত্মা ঃখ দুর্দশায় নিপতিত, কত অসাধু সুখ সিংহাসনে অধিরূঢ়, কত পাপী চিরজীবন পাপ করিয়া অপর্যাপ্ত সুখ সম্পদ সম্ভোগ করিয়া অশে ইহলােক হইতে অপসৃত হয়। কিন্তু পরলােকের প্রতি দৃষ্টি করি উহা আর অবিচর বয়া বোধ হয় না। এখানে যা কিছু বিশৃ ) } ১২ পরলােকের সন্ধান। * বােধ হয়, মৃত্যুর পর তাহার সামঞ্জস্য হইবে; এখানে যাহা অন্যায় দেখা যায়, পরে তাহা সংশােধিত হইবে; ইহলােকের দণ্ড পুরস্কারের যে সমুদয় অনিয়ম দেখা যাইতেছে, ইহা পরলোকে পূর্ণভাব প্রাপ্ত হইবে। পুণ্যের পুরস্কার ও পাপের দণ্ড ঈশ্বরের ধৰ্ম্মরাজ্যে উপযুক্ত পরিমাণে প্রদত্ত হইবেই হইবে। যিনি পরম ন্যায়বান রাজা, তাহার রাজ্যে অবিচার হইতে পারে না ; অধাৰ্ম্মিকের শ্রী বৃদ্ধি ও ধাৰ্ম্মিকের দুর্দশা কি সে রাজ্যে থাকিতে পারে ? পুণ্যাত্মাদিগকে পূর্ণ পুরস্কার তিনি দিবেনই, পাপীদিগের প্রত্যেক সূক্ষ্ম পাপ তিনি বিচারে আনিবেনই। - পৃঃ ১৫১) বিচারের অসীম কাল সম্মুখে প্রসারিত রকিয়ছে, একদিন অবশ্যই নিস্পত্তি হইবে; এস্থানে না হয়, পরলােকে হইবে, কিন্তু কেহ চির- কালের জন্য নিষ্কৃতি পাইবেন না। পৃঃ ১৫১) বাস্তবিক ইহলােক ও পরলােক একত্র করিয়া না দেখিলে ধৰ্ম্ম, রাজ ঈশ্বরের শাসন-প্রণাণী অপূর্ণ ও দূষিত বােধ হয়; কিন্তু যখন উভয় নয়নগােচর হয়, তখন সংশয়-অন্ধকার তিরােহিত হয়; এবং আমরা দেখি, তাহার জড়রাজ্য যেমন নির্দিষ্ট ও অপরিবর্তনীয় নিয়মে শাসিত হইতেছে, তাহার ধৰ্ম্মরাজও সেইরূপ সুন্দর চিরপ্রতিষ্ঠিত শাসনের অধীন। পৃঃ ১৫২ ) সত্যং শিবং সুন্দরং- ঈশ্বরের রাজ্য কোথায় ? নাস্তিকের বলিবে, অন্ধকার ও কল্পনায় সে রাজ্য। কিন্তু আস্তিকেরা বলিবেন, ঈশ্বরের রাজ্য প্রেমরাজ। -(পৃ: ১৮৯) তিনি আবার জিজ্ঞাসা করিলেন, কাহার মনে কি শোক আছে, বল ! কে পুত্র হইয়া আমার ক্রোড়ে স্থান লাভ করিবে? অমনই ;
পরলােকের সন্ধান।
.
পুত্রেরা তাহাকে চারিদিকে বেষ্টন করিল, বর্ণিল, আমার এই দুঃখ
আছে, আমার এই দুঃখ আছে। মা, দুঃখ দূর কর, আমি তোমার
কোলে যাইয়া শীতল হইব। অমনই মা সেই দুঃখ-অগ্নি নির্বাণ
করিয়া দিলেন। মাতা কোলে লইলেন।--(পৃঃ ১৮৯)
কিন্তু ইহা জানি যে, কঁদিলে তিনি কাহাকেও নিরাশ করেন না।
এমনই আমাদিগের পিতা দয়াময় যে, যে ব্যক্তি যাহা চাহে, তাহাকে
তিনি তাহাই দেন।-(পৃঃ ১৯১)
বিবেক ও ভক্তি-
মনুষ্যের আত্মা ঈশ্বরের সহবাসে থাকি বার জন্য সংসৃষ্ট, তাহাতেই
তাহার উদ্যম, ঘূৰ্ত্তি ও আনন্দ সংসারের শুষ্ক ভূমিতে রাখিলে অমর
আত্মা কখনও জীবিত থাকিতে পারে না। পৃঃ ২০৭ )
ঈশ্বরের চরণই তাহার মুক্তি, তাহাই তার বিপদ কালের সহায়,
ইহকালের ধন ও পরকালের সম্বল।-(পৃঃ ২০৯)
এই প্রকারে ভক্ত আত্মা ঈশ্বরের সহবাসে থাকে, চারিদিকে
ঈশ্বরকে রাখিয়া দেয়। এক নিমেষ তাঁহা হইতে অন্তর হইলে মৃত্যু।
তাহাকে ছাড়িয়া অত্যন্ত সাধু কাৰ্য্যও মৃতু, তাঁহাকে সঙ্গে রাখিলে
সামান্য কাৰ্য্য ও জীবন। পৃঃ ১৩)
ঈশ্বরের বিশেষ করুণা--
তাহার কাছে দুঃখ প্রকাশ করিলে তিনি দুঃখের দুঃখী হইয়া
সান্ত্বনা আনিয়া দেন।-(পৃঃ ২২৬ )
ভঁহাকে হৃদয়ে বসাইয়া রাখ, মনের সকল বাসনা পূর্ণ হইবে।
তিনি ইহকাল পরকাল চিরকালের অন্থ আমাদিগের হইবেন।
১৪ পরলােকের সন্ধান। ভ্রাতৃগণ, তাহাকে নিজের বলিয়া জান। তিনি নিজের সন্তান বলিয়া আমাদিগের সকল দুঃখ দূর করিবেন।-(পৃঃ ২২৭ ) আচার্য্যের উপদেশ–দ্বিতীয় খণ্ড। শ্রীধর স্বামী নাইডুকে উপদেশ তাহার পবিত্র বিদ্যমানতা আপনার পথের আলােক হইবে, পরীক্ষা বিপদের মধ্যে তাহার বল আপনার বৰ্ম্ম হইবে।-(পৃঃ ৪) ভক্তি-শ্রীচৈতন্য— ভক্তিবলে আত্ম মধ্যাহ্ন সূৰ্যের ন্যায় উজ্জ্বল আলােকে সুশোভিত হয়।-( পৃঃ ১৩) তীর্থভ্রমণ কর, আর যাহাই কর, ঈশ্বর হৃদয়ে আছেন।—(পৃঃ ২০) ঈশ্বর চিরনূতন, তাঁহার ধৰ্ম্ম চিরসরস- সেইরূপ যে ধৰ্ম্ম আত্মারূপ ভূমিতে রােপিত হইয়াছে, তাহা যেমন এক দিকে সুদৃঢ়, অন্য দিকে তেমনই সুমধুর ফল প্রসব করে। ইহা স্বয়ং ঈশ্বর-হস্ত-সংরচিত এবং তিনিই ইহাতে জল সেচন করেন। তিনিই ইহার প্রাণের প্রাণ। পৃঃ ২৬) আত্মা ও পরমাত্মার যোগ ব্রাহ্মধৰ্ম্ম মােগের ধর্ম। ইহার সাহায্যে আমরা আত্মাকে গঢ়, রূপে পরমাত্মার সঙ্গে যোগ করিতে পারি।-(পৃঃ ২৬) বৃক্ষের মূল যেমন ভূমিতে গুপ্ত থাকে, তেমনই ধম্মের মু। মা আর অগিখীর ৪ নিভৃত স্থানে প্রতিষ্ঠিত আছে। (পৃঃ ২৭) পরলােকের সন্ধান। জীব উপযুক্ত সাধন দ্বারা পরমাত্মাতে বদ্ধমূল হইয়া, তঁাহার প্রসাদ-বারি সিঞ্চনে আপনার পুষ্টিসাধন করেন এবং অনন্তকাল বদ্ধিত হইতে থাকেন।-(পৃঃ ২৭) যােগ ভিন্ন ঈশ্বরকে অনন্তকালের জন্য লাভ করা যায় না। ইন্দ্রিয় দ্বারা যেমন বহির্জগতের সঙ্গে আমাদের যােগ স্থাপন হয়, আত্মার সঙ্গে সেইরূপ কতকগুলি আধ্যাত্মিক বৃত্তি দ্বারা ঈশ্বরের যােগ হয়।(পৃঃ ২৭) একদিকে সংসার, অপরদিকে ঈশ্বর, মধ্যে আমাদের আত্মা। - পৃঃ ২৭) পরমেশ্বর আত্মার মধ্যে এমন একটী শক্তি সন্নিবেশিত করিয়া দিয়াছেন, যাহাতে আত্মা আকাশে উডীয়মান হইয়া তাঁহার সহবাসের শান্তি উপভােগ করত জীবনকে কৃতার্থ করিতে পারে।-(পৃঃ ২৮) আধ্যাত্মিক রাজ্য দৃষ্টি করিবা মাত্র দেখি, মনােমধ্যে ঈশ্বরের সত্য জ্যোতি কোটী সূৰ্য্য পরাজয় করিয়া বিরাজ করিতেছে।—(পৃঃ ২৮) কেবল যাহাদের ভক্তি আছে, তাহারা অবশ্য বলিবেন যে, আত্মার দ্বারা ঈশ্বরকে উপলব্ধি করা যায়। যদি তাহা না হইত, তাহা হইলে কোন্ শান্তি-সরােবরে গিয়া হৃদয়কে শীতল করিতাম? মনে কর, যখন রােগ দুঃখে জর জর হই, তখন যদি জননীর মুখ একবার দেখিতে পাই, তাহা হইলে হৃদয়ের কষ্টগুলি কেমন দূর হইয়া যায়। সেইরূপ আত্মার শত শত কষ্ট আছে। সেই সময় যদি পিতার মুখ দেখিতে না পাই, তাহা হইলে বােধ হয় যেন, পৃথিবীতে আমাদের কোন প্রয়ােজন নাই। কিন্তু বিশ্বাস আমাদের হস্তে থাকিলে ঈশ্বরের সঙ্গে সহজেই যােগ হইবে। পৃঃ ২৯) ব্রাহ্মধৰ্ম্ম শান্তি সংস্থাপনের জন্য অভূদিত শান্তি সংস্থাপন করাই ব্রাহ্মধৰ্ম্মের বিশেষ ভাব।-(পৃঃ ৩৯) পরলােকের সন্ধান। তিনি এক হস্তে মুখের অন্ন, অপর হস্তে আত্মার অন বিধান করিতেছেন। এক হস্তে শরীরকে রােগ হইতে রক্ষা করিতেছেন, অপর হস্তে আত্মাকে পাপ মলিনতা হইতে মুক্তি দিতেছেন। ( পৃ: ৪৫) তিনি আমাদের হৃদয়-রাজ্যের ধন, সে রাজ্যের সার শােভা। -(পৃঃ ৪৭ ) আত্ম-তত্ত্ব- আমরা পরলােকের যাত্রী, আমরা জীবন পথের পথিক। (পৃঃ ৪৮ ) কিন্তু যাহা আত্মার মধ্যে দেখিবে, তাহার শেষ নাই, যাহা হৃদয়ের মধ্যে সঞ্চার করিবে, তাহা চিরস্থায়ী। মৃত্যুর পর পৃখিবীর কাৰ্য্যাড়- স্বরের শেষ হইবে; কিন্তু অন্তরের ধন অনন্তকাল থাকিবে। বাহিরের সৎকাৰ্য শেষ হইবে, কিন্তু অন্তরের প্রণয় চিরস্থায়ী। আত্মার মধ্যে যে বিশ্বাস, বিনয় এবং ব্রহ্ম-দর্শনের আনন্দ পাইতেছ, তাহা চিরস্থায়ী।-(পৃঃ ৪৯ ) বাহিরের এ সকল কিছুই নিত্যস্থায়ী নহে; এবং বাহিরের কোন বিষয়ের সহিত আমাদের চির-সম্বন্ধ নাই। এ সকল আধ্যাত্মিক রাজ্যে আরােহণ করিবার সােপান মাত্র । এ সমুদয়ই পরিত্যাগ করিয়া যাইতে হইবে। সংসারের সকল বস্তুর সঙ্গেই বিচ্ছেদ হইবে। (পৃঃ ৫১) এক বন্ধু থাকিবেন, যিনি গোপনে আত্মার অভ্যন্তরে সেই রাজ্য প্রকাশ করিবেন, সেখানে নিত্য শান্তি, নিত্য পবিত্রতা। অতএব যে পরিমাণে বাহিরের আকর্ষণ পরিত্যাগ করিতে পারিবে, যে পরিমাণে বাহিরের পদার্থে মুগ্ধ থাকিতে কষ্ট বােধ হইবে, সেই
রলোকের সন্ধান।
১৭
'পরিমাণ আত্মার চক্ষু কর্ণ প্রস্ফুটিত হইবে, এবং সেই পরিমাণে
আত্মার প্রকৃত উন্নতি। পৃ: ৫২)
অতএব বলিতেছি, আরও আন্তরিক হও, আরও আধ্যাত্মিক
হও। আর বাহিরের উপর নির্ভর করিও না। বাহিক ব্যাপার
দুর কর। ঐ দেখ, গমস্থান নিকটবর্তী হইতেছে। এই সময়
অন্তরের সম্বল চিনিয়া লও। সময় থাকিতে ব্রহ্ম-ধনের সঙ্গে পরিচয়
না হইলে মহা বিপদ ঘটিবে। পৃঃ ৫২)
কি জন্য ঈশ্বর আমাদের দায় মহাপাপীদিগের নিকট এই স্বর্গের
আলোক প্রকাশ করিয়াছিলেন? এই জন্য যে, আমরা তাঁহার
মুখের দিতে চাহিয়া, আশা করিয়া, ধৰ্ম্মরাজ্যে পড়িয়া থাকিতে
পারিব।—(পৃঃ ৫৩)
অন্তরে নিঃশব্দে তাহাকে মনের কথা বল, তিনি শুনিবেন; অম্বরে
ক্রন্দন কর, তিনি তােমার অশ্রু মােচন করিবেন। পৃঃ ৫৪)
আধ্যাত্মিক আনন্দ-চন্দ্রকে প্রকাশিত হইতে দাও। যিনি
অন্তরের অন্তরে রহিয়াছেন, তাহাকে ধারণ করিয়া পরলোকের জন্য
সম্বল কর।-(পৃঃ ৫৪ )
==
ঈশ্বর মঙ্গলময়-
মঙ্গলময়ের রাজ্যে অমঙ্গল নাই। কখন অমঙ্গল হইতে পারে
না, ঈশ্বর স্বয়ং মঙ্গল-স্বরূপ। তাহা হইতে যে কোন ঘটনা, যে কোন
ব্যাপার, যে কোন ভাব নির্গত হয়, তাহা মঙ্গলের জন্য। তিনি
কেবল যে মঙ্গল বিধান করেন তাহা নহে, অমঙ্গল করা তাহার পক্ষে
অসম্ভব।-( পৃঃ ৫৪ )
এক দিন মেঘেতে সমুদয় আচ্ছন্ন হইল, আর সূর্যের কিরণ
পরলােকের সন্ধান। প্রকাশ পায় না, তখন এমন অবােধ কে যে, বলিবে সূৰ্য্য নাই ? যদি সূৰ্য্য দশ দিন মেঘেতে আচ্ছন্ন থাকে, তথাপি আমরা বিশ্বাস করি, এই মেঘের মধ্যে সূৰ্য্য বিরাজ করিতেছে। সেইরূপ ঈশ্বর এই গভীর সংসারের অন্ধকার মধ্যে বিরাজ করিতেছেন, যদিও আমাদের মলিন চক্ষু তাঁহাকে স্পষ্ট রূপে দেখিতে পায় না; কিন্তু যখন আমাদিগের আবরণ চলিয়া যাইবে, তখন এই ঘন অন্ধকার ভেদ করিয়া, সেই পরম ঈশ্বরের প্রেমালােক দেখিয়া কৃতার্থ হইব। পৃ: ৫৫) ঘাের বিপদের মধ্যেও তাহার মঙ্গল-চরণ ধারণ করিয়া থাকিতে হইবে। মন্দ অবস্থা উপস্থিত হইল, বিষাদের ঘন মেঘ আসিয়া হৃদয় আচ্ছন্ন করিল, পিতা মাতা, স্ত্রী পুত্র, বন্ধু বান্ধব সকলেই পরিত্যাগ করিলেন, সংসারের ঘৃণা, নির্যাতন অন্তর জর্জরিত করিতে লাগিল, শরীর রােগ ব্যাধিতে পরিপূর্ণ হইয়া ভয়ানক যন্ত্রণার আলয় হইয়া উঠিল ; সেই বিপদের সময় ভক্ত ভিন্ন আর কে পরমেশ্বরের চরণ ধরিয়া থাকিতে পারেন ? ভক্ত যখন সেই বিপদের সময় পরমেশ্বরকে পিতা বলিয়া সম্বােধন করেন, সেই “পিতা* শব্দ কেমন মধুর! তিনি সেই ঘাের বিপদকে জিজ্ঞাসা করেন, বল দেখি, আমার পিতা কি অমঙ্গল করিতে পারেন ? সেই বিপদই তাহাকে বলিয়া দেয়, তিনি কখনও অমঙ্গল করিতে পারেন না। পৃঃ ৫৬) সংসারে যেমন কখনও আলােক কখনও অন্ধকার, কখনও হর্ষ কখনও বিষাদ, কখনও সুখ কখনও দুঃখ, তেমনি আধ্যাত্মিক রাজ্যে কখনও দিবা কখনও রাত্রি, কখনও প্রসন্নতা কখনও কখনও ঈশ্বর-দর্শন, কখনও ঈশ্বর-বিচ্ছেদ, কখনও পুণ্যের অভাবে হৃদয় নিতান্ত চঞ্চল, কখনও পুণ্যের সাহায্যে হৃদয় প্রশান্ত ভাব ধারণ করে। আধ্যাত্মিক রাজ্যের ভাব যদি বুঝিতে পারিতাম, কখনই বিষাদ, পরলােকের সন্ধান। ১৯. পিতাকে নির্দয় বলিতাম না। অমুক নিয়ম এখানে এখন পালিত হইতেছে, অমুক নিয়ম তখন ঐখানে পালিত হইয়াছিল, এ সকল স্পষ্টরূপে দেখিতে পাইতাম। পৃ: ৫৮) ঈশ্বর মঙ্গলময়, মুখে বলিলে হইবে না। কিন্তু যিনি অন্তরে এই দৃঢ় বিশ্বাস রাখিয়া প্রত্যেক অবস্থায় এবং ঘোরতম অন্ধকার মধ্যেও আপনার মনকে প্রফুল্ল রাখিতে পারেন, তিনিই বাস্তবিক নিরাপদ। যতদিন এই প্রকার নির্ভর না হয়, ততদিন জীবনের স্থিরতা হইতে পারে না।—(পৃঃ ৫৯) আঁচিয়া থাকি তাহাও মঙ্গল; মরিতে হয় অহাও মঙ্গল। ( পৃঃ ৫৯) মৃত্যু এই জন্য যে, তাহা হইতে নব জীবন লাভ করিব। বিপদ এই জন্য যে, সম্পদের মূল্য জানিতে পারিব; অন্ধকার এই জন্য যে, আলােকের প্রয়ােজন হৃদয়ঙ্গম করিব; রােগ এই জন্য যে, সুস্থ হইয়া অলরূপে তাঁহার চরণ সেবা করিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হইব। প্রত্যেক ব্যাপারই মঙ্গলপূর্ণ। অতএব যে কোন ঘটনা উপস্থিত হয়, অকুতােভঙ্গে তাহা বহন কর। বিপদে ভীত হইও না, অন্ধকারে মুহ্যমান হইও না। সুখ দুঃখ, সাময়িক সম্পদ বিপদ, উভয়ই কল্যাণ সাধনের জন্য প্রেরিত হয়; অতএব যাহা কল্যাণ, তাহার প্রতি দৃষ্টি রাখিবে এবং বিপদের মধ্যে অবিচলিত, থাকিয়া সেই মঙ্গলময়ের আজ্ঞা অনুসরণ করিবে।-(পৃঃ ৫৯) গ লােভ- কিন্তু যিনি একবার স্বর্গরাজ্যের দ্বার খুলিয়া দেখিয়াছেন যে, আমার পিতার নিকট কত সুখ সঞ্চিত রহিয়াছে, তখনই পৃথিবীর ধন, মান, २० পরলােকের সন্ধান। সকলই চলিয়া গেল, ঈশ্বর প্রদত্ত অনন্তকালের বস্তু হৃদয়ে গাথিক্স। রাখিলাম।—( পৃঃ ১০২) যাহারা স্বর্গের ধন দেখেন নাই, তাহারাই সংসারের রূপে মােহিত হইতে পারেন।-(পৃঃ ১০৫ ) পরলােক কত আনন্দে পরিপূর্ণ, তাহা দেখি না, এই জন্যই ইহলােকের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হই। পৃঃ ১৫) * শুষ্কতা- যথার্থ ব্রাহ্মর লক্ষণ কি, না তাহার আত্মা সৰ্ব্বদা সরস । শুষ্কতা তাহাকে অধিকার করিতে পারে না। ইহকাল, পরকাল, সকল সময় তাঁহার হৃদয় সরস ভাবে পরিপূর্ণ। পৃঃ ১২৩) আত্মা যখন পরমাত্মার মধ্যে অনুপ্রবিষ্ট হয়, তাহার সহিত যখন জীবন-যােগ সম্বদ্ধ হয়, এবং তিনি যখন সমস্ত হৃদয় অধিকার করেন, সেই অবস্থা আমাদের প্রতিজনের প্রার্থনীয় ; এবং ইহা ব্রহ্মের সর্বোৎকৃষ্ট লক্ষণ।(পৃঃ ১২৪) জীবনের যে গভীর প্রদেশে ঈশ্বরের রস জীবাত্মার মধ্যে প্রবেশ করিতেছে, মনুষ্যের চক্ষু সেখানে যায় না। যাহারা সেই স্থানে গমন করেন, শুষ্কতা তাহাদিগকে অধিকার করিতে পারে না।-(পৃঃ ১২৬) ব্ৰহ্মরূপ-শান্তি-সরােবরে অবগাহন করিয়া জীবাত্মার সমুদয় গ্লানি প্রক্ষালন করিবে। ব্রহ্মের সহবাসে আত্মাকে শীতল করিতে না পারিলে, আর কিছুতেই শান্তি পাইবে না, তিনিই ভগ্ন হৃদয়ের একমাত্র বন্ধু ; উহারই শীতল ছায়ায় সমুদয় অগ্নি নির্বাণ হয় । অতএব তাহারই সঙ্গে মধুময় ভক্তিযােগ সাধন কর।-( পৃঃ ১২৯) গোপনে ঈশ্বরের সঙ্গে সাক্ষাৎ কর, গোপনে তাহার নিকট মনের
পরলােকের সন্ধান।
২১
বেদনা প্রকাশ কর, তিনিও গোপনে তােমাদের সমুদয় দুঃখ দুর
করিবেন। পৃ: ১২৯)
তুমি যদি শান্তি-সরােবর হইয়া অন্তরে রহিয়াছ, তবে আশীর্বাদ
কর, যেন তােমাকে দেখিয়া জীবনের সমুদয় দুঃখ ভুলিয়া যাই।
{ পৃঃ ১৩০ )
স;
#
ইহার বলে,
৩
শূন্যতা
ধর্মের অতি আশ্চর্য ক্ষমতা। ধৰ্ম্ম লঘুকে গুরু করে, গুরুকে
লঘু করে, শূন্যকে পূর্ণ করে, অন্ধকার মধ্যে জ্যোতি প্রকাশ করে
এবং মৃত্যুর মধ্যে জীবন সঞ্চার করে।-(পৃঃ ১৩২)
সাংসারিক লােকের কাছে চার অক্ষর দয়াময় নাম কিছুই নহে ।
কিন্তু ব্ৰহ্ম ভক্তের কাছে ইহার ক্ষমতার শেষ নাই, এই নামের মধ্যে
তিনি ব্রহ্মাণ্ড হইতেও প্রকাণ্ড বস্তু দর্শন করেন।
জীবন মৃত্যু, সম্পদ বিপদ, সুখ দুঃখ, সকল অবস্থাই তাহার পক্ষে
সমান।-(পৃঃ ১৩৩)
অতএব যতক্ষণ না এই আকাশে ঈশ্বরের গম্ভীর সত্তার মধ্যে
অনুপ্রবিষ্ট হইতে পারি, ততক্ষণ আমাদের যথার্থ শান্তি নাই।
( পৃঃ ১৩৫ )
বিশ্বাস-হস্ত প্রসারণ কর, আকাশের মধ্যে ঈশ্বরের চরণ ধারণ
করিতে পারিবে।-(পৃঃ ১৩৬ )
চারিদিকে তঁাহার গম্ভীর মধুময় সত্তা ! ভূলােকে তাহার
সহবাস, দ্যুলােকে তাঁহার সহবাস, অন্তরে তাহার সহবাস, বাহিরে
তাহার সহবাস, ইহলােকে তাহার সহবাস, পরলােকে তঁাহার সহবাস।
সেই সংস-সাগরে ডুবিলাম, আর দুঃখ নাই, যন্ত্রণা নাই, কেবলই
=
পরলােকের সন্ধান। প্রেমের আনন্দ, ভক্তির আনন্দ, পবিত্রতার আনন্দ। এই প্রার্থ- নীয় সুখ শান্তির অবস্থা যেন আমরা প্রত্যেকে লাভ করি।—(পৃঃ ১৩৮) পিতা, আমার আর স্বর্গ কোথায়! হৃদয় মধ্যে যদি তুমি বাস কর, এই আমার স্বর্গ। পৃঃ ১৩৯) যদি ব্রাহ্ম করিলে, ব্রাহ্মধৰ্ম্মের গুরুত্ব বুঝিতে দাও। যাহাকে লােকে আকাশ বলে, শূন্য বলে, সেখানে তােমার পবিত্র চরণ ধরিয়া প্রাণকে শীতল করিতে ক্ষমতা দাও; যাহাকে লােকে নির্জন বলে, সেখানে তােমার প্রেমমুখ দেখিয়া জীবনকে সফল করতে সমর্থ কর। তােমার শ্রীচরণতলে চিরকাল বাস করিব। একাকী আছি, মনে করিয়া ভয় করিব না, ঐ চরণতলে শান্তি পুণ্য লাভ করিব। তােমার মধুময় সহবাস হৃদয়ের মধ্যে আনিয়া দাও। আকাশে তােমায় শান্তিপূর্ণ সত্তা অনুভব করিতে দাও। পৃঃ ১৩৯ ) আশীৰ্বাদ কর, যেন ইহকাল পরকাল আমরা তােমার সহবাসের গভীর শাস্তি উপভােগ করিতে পারি।-(পৃঃ ১৩৯ ) % গ নামের কত শক্তি- ঈশ্বরকে দেখিলে যেমন আনন্দ হইবে, তেমনই তাহার নামেও আনন্দ হইবে। সেই নাম তঁাহার ভাব উদ্বোধন করিয়া দেয়। নামের প্রতি যদি ভক্তি হইত, আজ ব্রাহ্মদের এই দুর্দশা থাকিত । নাম ব্ৰহ্মরাজ্যের দ্বার। এই নাম আপাততঃ দেখিতে ক্ষুদ্র, কিন্তু ইহার মধ্য দিয়া ক্রমশঃ সেই অনন্ত প্রেমসিন্ধু প্রকাশিত হইবে।(পৃঃ ১৪৭) যখন আত্ম অবসন্ন হইয়া মৃতপ্রায় হয়, তখন এই নামামৃত পান করি নর্জীবন লাভ করি। এই নামের সুমিষ্ট রস পান করিলে পরলােকের সন্ধান। অন্তরের সকল প্রকার বিষাদ দূর হয়। এই নাম-রূপ-জ্যোৎস্না চারিদিকের অন্ধকার তিরােহিত করে।-(পৃঃ ১৪৯) কৃতজ্ঞতা কেবল ইহলোকে আমাদিগকে সুখ দিয়া তিনি ক্ষান্ত হইতে পারেন না। কারণ কেবল ষাট বৎসর আমাদিগকে সুখী করিলে কি হইবে ? ইহা তিনি জানেন, এই জন্য তিনি আমাদিগকে অনন্ত- জীবন দান করিতে অঙ্গীকার করিয়াছেন। এখানে কত প্রকারে আমাদের উপকার করিতেছেন, আবার পরকালে আমাদের জন্য কত প্রকার সুখ সঞ্চয় করিয়া রাখিয়াছেন।-(পৃঃ ১৫৭) একদিনের করুণা ভাবিয়া দেখ, ভয়ানক যন্ত্রণার মধ্যেও শান্তি পাইবে। সময় থাকিতে থাকিতে কৃতজ্ঞতা সাধন করিয়া লও, নতুবা অবশেষে অকৃতজ্ঞ হৃদয় লইয়া কাঁদিতে কাঁদিতে পরলােকে প্রবেশ করিতে হইবে।-(পৃঃ ১৫৯) গ আমি আমার শত্রু, আমি আমার মিত্র- অন্তরে প্রবেশ কর। আমাদের মনােরূপ ঘরের মধ্যে সেই বিশ্বপতি বিরাজ করিতেছেন।-(পুঃ ১৬৫) তোমার কাছে শান্তি পাইবই পাইব, যদি তােমার মুখ দেখি, সকল জ্বালা দূর হইবে, জীবন সফল হইবে। দীনবন্ধু নাম ধরিয়া যখন তুমি পাপীদের কাছে আসিয়াছ, তখন শান্তি দিবেই দিবে। (পৃঃ ১৬৬) ২৪ পরলােকের সন্ধান। সত্যযুগের সরলতা যেমন বসন্তকালে প্রকৃতির চারিদিকে সকলই নূতন এবং সকলই সুন্দর, সেইরূপ মনুষ্যও এই অবস্থায় সরল শিশুর ন্যায় সেই সর্বাপেক্ষা পরম সুন্দর ঈশ্বরের নিকট গমন করিয়া আশ্চৰ্য্য শােভা এবং কোমলতা লাভ করে। এই অবস্থা স্বর্গের অবস্থা, ইহাই মনুষ্যের সত্যযুগ। (পৃঃ ১৬৮} - জীবনের উদ্দেশ্য সাধন- (হে ঈশ্বর), মৃত্যুর দিন যে কাছে আসিতেছে, এ সময়ে আমাদের কাছে আসিয়া দয়া কর।--- পৃ: ১৮৯) ভ্রাতৃপ্রেম- যখন জন্মগ্রহণ করিলাম, তখনও তাহার ক্রোড়ে, এখন যে এত বড় হইয়াছি, এখনও তাহার ক্রোড়ে আশ্রিত রহিয়াছি; এবং অনন্তকাল এই ভাবে তাহারই সেই পুরাতন ক্রোড়ে সঞ্চরণ করিতে হইবে। (পৃ: ১৯৩) সেই এক পুরাতন পিতা সম্পদে বিপদে, পাপ পুণ্যে, সকল অবস্থায় নিকটে বসিয়া আছেন। পৃঃ ১৯৪ ) যদি ঈশ্বরের অনুগত হও, তবে এখানেই সেই স্বর্গ আরম্ভ হইবে, যে স্বর্গে অনন্তকাল বাস করিবে। পৃ: ১৯৯) অাত্মার চক্ষু কর্ণ- স্বভাবতঃ চক্ষু যেমন বাহিরের বস্তু দর্শন করে, এবং কর্ণ যেমন s পরলােকের সন্ধান। ২৫ বাহিরের শব্দ শ্রবণ করে, আত্মাও সেইরূপ আপনার স্বাভাবিক অবস্থায় থাকিলে আধ্যাত্মিক রাজ্যের ব্যাপার সকল উজ্জ্বল রূপে দর্শন করিতে পায়, এবং সেই রাজ্যের মধুময় শব্দ স্পষ্টরূপে শ্রবণ করে। ( পৃঃ ২১০) চক্ষু কর্ণ পীড়াগ্রস্ত হইলে, যেমন বাহিরের দেখা শুনা কষ্টকর হয়, তেমনই আত্মা যখন বিকৃত হয়, তখন আর স্বর্গের সৌন্দর্য দেখিতে পায় না, এবং স্বর্গের বাক্য শ্রবণ করিতে পারে না। ঈশ্বর-দর্শন ঈশ্বরের কথা-শ্রবণ দুই তেমনই স্বাভাবিক, যেমন বাহিরের দর্শন শ্রবণ।-(পৃঃ ২১• ) কিন্তু ঈশ্বর যখন উপদেশ দেন, তখন জ্ঞান বল উভয়ই একত্র তখন আত্মার মূল-দেশ পর্যন্ত আন্দোলিত হয় এবং মন বিকম্পিত হয়। ঈশ্বর যখন কথা কহেন, আমাদের শরীর মন আলােকিত হয় । পৃ: ২১৪) সেই কোলাহল-শূন্য শান্তি-রাজ্যে প্রবেশ কর, প্রতিদিন উপদেশ আসিবে। শরীর মধ্যে রক্ত যেমন আপনি চলিতেছে, তেমনই ব্রহ্ম সত্যরূপ রক্ত হইয়া তোমাদের আত্মার মধ্যে সঞ্চালিত হইবেন!- (পৃ ২১৫} একমাত্র গুরু পরব্রহ্ম- তাহার সেই স্বর্গীয় সর্বোৎকৃষ্ট ভাষাতে তিনি স্বয়ং পরিত্রাণার্থী সন্তানের নিকট সেই ( মুক্তি ) শাস্ত্র ব্যক্ত করেন।-(পৃঃ ২২৫ ) প্রথমত সেই প্রত্যাদেশের দ্বারা ঈশ্বর আমাদিগকে জ্ঞান দান করেন, দ্বিতীয়তঃ ইহার দ্বারা তিনি আমাদের অন্তরে শান্তি দেন। (গৃঃ ২২৫) ৪
২৬
পরলােকের সন্ধান।
তাহাকে দেখিলে যেমন অন্তর জ্ঞান এবং শান্তিতে পরিপূর্ণ হয়,
তাহার কথা শুনিলেও তেমনই আমরা যুগপৎ জ্ঞান এবং সুখ লাভ
করি। ব্ৰহ্ম স্বয়ং গুৰু হইয়া জীবাত্মাকে আপনার শিষ্যের ন্যায়
আদরের সহিত মধুময় উপদেশ দেন, ইহা শুনিলেও হৃদয় উল্লসিত
হয়।-(পৃঃ ২২৬)
অন্তরের মধ্যে এমন একজন আছেন, যাঁহার একটী কথাতে
জীবনের যন্ত্রণা চলিয়া যায়।-(পৃঃ ২২৯)
ধ্যান--
নির্জনে সজনে, সম্পদে বিপদে তিনি সর্বদাই কাছে থাকেন,
এই জন্য যে, পাছে আমরা তাহাকে না দেখিয়া ভীত হই।
(পৃঃ ২৩১)
জগতের সমস্ত নিকৃষ্ট ব্যাপার পরিত্যাগ করিয়া ঈশ্বরের
আধ্যাত্মিক রাজ্যে (যেখানে সর্বদাই আনন্দ এবং যাহা শান্তি পুণ্যের
প্রস্রবণ) প্রবেশ করিতে হইবে। যাঁহারা সেই দিন এখানে উপনীত
হইতে চাহেন, তাহাদিগকে নিমন্ত্রণ করিতেছি। এখানে পিতার মুখ
কেমন সুন্দর দেখিবেন। এখানে শান্তি-সরােবরে অৱগাহন করিয়া
বহুকালের দুঃখ দূর করিবেন।-(পৃ: ২৩৩)
এই উৎসবে এমন কোন মধুর সােবর দেখাইবেন, যাহার জল
স্পর্শ করিলে জীবন শীতল হইবে। পিতা এমন কোন বৃক্ষতলে
লইয়া যাইবেন, যার ছায়ায় বসিয়া ফল ভােগ করিলে কত মৃত
ব্যক্তি অনন্ত জীবন পাইবে।(পৃঃ ২৩৪)
পরলোকের সন্ধান। ২৭ ঈশ্বর ইতিহাসে যদি প্রতিদিন শয়ন করিবার পূর্বে দেখিতে পাও যে, মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত রহিয়াছ, তবেই হাসিতে হাসিতে পিতার নাম করিয়া পরলােকে যাইতে পারিবে। পৃঃ ২৪১) অনন্যগতি হইয়া তাহার আশ্রয় গ্রহণ কর, ঘাের বিপদের মধ্যেও তিনি সহায় হইবেন, মৃত্যু-সঙ্কট তাহার হুঙ্কারে পলায়ন করিবে। -(পৃঃ ২৪২) ; পরলােক-সাধন- আমাদের একদিকে মৃত্যু, অন্যদিকে অমৃত ; একদিকে পৃথিবী, অন্যদিকে স্বর্গ ; একদিকে সংসার, অন্যদিকে ঈশ্বর। ইহার মধ্যে আত্মা বাস করে। একদিকে শরীররূপ মন্দির মধ্যে আত্ম, আর একদিকে ব্রহ্মরূপ মন্দির মধ্যে আত্ম—একদিকে দেহগত আত্মা, অন্যদিকে ব্রহ্মগত আত্মা। এই আত্মা ব্ৰহ্ম এবং শরীর উভয়ের মধ্যে থাকিয়া দুই দিক হইতেই জীবনের প্রয়ােজনীয় অন্ন জল গ্রহণ করে। যদি নিমেষের জন্য দেহের সঙ্গে আত্মার যােগ না থাকে, তৎক্ষণাৎ সেই দেহের মৃত্যু হয় ; দৈহিক জীবন কি, তাহা কাহাকেও বুঝাইয়া দিতে হয় না। ইহা বৃক্ষ, পশু এবং মনুষ্যদিগের মধ্যে সাধারণ। কিন্তু মনুষ্যের নিকট এই জীবন আত্মর অধীন। ইহা আত্মার আদেশ পালন করে এবং আত্মার অভিলাষ চরিতার্থ করে। নানা দেশ হইতে বিবিধ সামগ্রী সকল অনিয়া এই জীবনের ভৃত্য সকল আত্মার মনােরথ পূর্ণ করে। সেই সমস্ত ভৃত্য কে শরীরের ইন্দ্রিয়। এই ইন্দ্রিয় সকল আত্মাকে কত প্রকার সুখে সুখী করে। যে আত্মা এই সুথে মােহিত হয়, তাহার মৃত্যু হইলে শরীরের মৃত্যু হয় ; কারণ পরলোকের সন্ধান। শরীর মৃত্যুর প্রতিকৃতি, এবং শরীরের সুখও অনিত্য। আর এক দিকে দেখ, আত্মা ঈশ্বরের সঙ্গে বাস করে; যেমন ইন্দ্রিয়দিগের মধ্য দিয়া আত্মা সংসারের সঙ্গে আলাপ করে এবং পৃথিবীর সভ্যতা এবং সুখ সামগ্রী উপভােগ করে, সেইরূপ বিশ্বাস এবং আশা দ্বারা আত্মা গরলােক এবং ঈশ্বর-সহবাসের গভীর আনন্দ আস্বাদন করে। (পৃঃ ২৪৩) যে আত্মা শরীরের মধ্যে, সেই আত্মাই পরমেশ্বরের মধ্যে। এই যােগ কেমন গূঢ় যােগ, বাক্য তাহা প্রকাশ করিতে পারে না। একই আত্মা দুই প্রকার ব্রত পালন করিতেছে, দুই প্রকার সুখ ভােগ করিতেছে। একই মনুষ্য দুই জগতে বাস করিতেছে। যেমন শরীরের দ্বারা সংসারের যোগ, তেমনই আর এক দিকে বিশ্বাসের দ্বারা পরলােক এবং ব্রহ্মের সঙ্গে যােগ। জীবাত্মা যখন ঈশ্বরে বাস করে, আত্মার সেই অবস্থাই পরলােক। পৃঃ ২৪৩) ইন্দ্রিয় না থাকিলে যেমন সংসারের সঙ্গে যোগ হয় না, সেইরূপ বিশ্বাস ভক্তি না থাকিলে ঈশ্বর এবং পরলােকের সঙ্গে যােগ হয় না। =(পৃঃ ২৪৪) শরীরস্থ আত্মা যেমন সমস্ত বহির্জগৎ প্রত্যক্ষ উপলব্ধি করে, এবং ইচ্ছামত উপভােগ করে, সেইরূপ পরব্রহ্মবাসী আত্মা এই রাজ্য স্পষ্ট রূপে উপলব্ধি করে।-(পৃ: ২৪৫ ) বিশ্বাস, ভক্তি এবং অাশার মধ্য দিয়া ব্ৰহ্মরূপ রাজ্যে প্রবেশ কর, কি দেখিবে? পরলােক এবং পারলৌকিক সুখ।-(পৃঃ ২৪৫) শরীরী আত্মাণঙ্গে সময়ের সম্বন্ধ ; কিন্তু ব্রহ্মের মধ্যে জীবিত যে আত্মা, তাহার সঙ্গে অমৃতের ষােগ। তাহাই আত্মার অনন্ত জীবন এবং পরলােক। কল্পনার ব্যাপার নহে, কিন্তু পরব্রহ্মর মধ্যে যে পরলােকের সন্ধান। আমাদের অবস্থিতি, তাহাই পরলােক ; আত্মার এই অবস্থাই যথার্থ জীবন এবং ইহাই প্রকৃত যােগ। যতই ব্রহ্মের চরণে অবস্থিতি করিব, ততই পরলােক উজ্জ্বল দেখিব এরং পরলােক স্মরণ মাত্র হৃদয় আনন্দে উৎফুল্ল হইবে। ভ্রাতৃগণ, এইরূপে পিতার চরণ সাধন কর, এই পৃথি- বীর মধ্যে থাকিয়া অমরত্ব আস্বাদন করিতে পারিবে। পৃঃ ২৪৫) ধন্য সেই ব্রাহ্মের আত্মা, যিনি ঈশ্বরের মধ্যে জীবিত। তাঁহার নিকট এক নূতন রাজ্য আবিষ্কৃত হয়। অনন্তকাল তঁাহার সম্মুখে, যতই তিনি পরলােক-রাজ্যে বাস করিতে শিক্ষা করেন, ততই তাহার ব্ৰহ্ম-সাধন গাঢ়তর হয়, ততই তিনি ঈশ্বরের প্রত্যক্ষ সহবাসের গভীর আনন্দ অনুভব করেন।-(পৃঃ ২৪৬) কিন্তু পরলােক আমাদের শান্তিনিকেতন, পরলােক আমাদের পিতৃগৃহ, তাহার চরণে নিত্য শান্তি, নিত্য সুখ। ভ্রাতৃগণ ! সেই গৃহে চল, সকল দুঃখ দূর হইবে, প্রাণ শীতল হইবে। এক সূর্য এখানে মিট মিট করিতেছে; কিন্তু পিতার রাজ্যে যে স্বর্গের আলােক, তাহার তুলনায় ইহা অন্ধকার বইত নয়। এখানে পাপ, মলিনতা, বিষাদ, কিন্তু পিতার গৃহে কত রাশি রাশি পুণ্য, কত সুখ, কত আনন্দ। এখানে এই বিষয় হইল, এই বিষয় চলিয়া গেল, কিন্তু পরলােকে কিছুরই অন্ত নাই। অনন্তকাল সেখানে ধূ ধূ করিতেছে, পিতার অনন্ত প্রেম সেখানে অবিশ্রান্ত প্রবাহিত হইতেছে, যত ইচ্ছা সেই সুধা পান কর, ক্ষয় নাই। পিতা স্বয়ং আসিয়া সেখানে সন্তানদিগের প্রাণ শীতল করেন। অতএব সেই স্থানে যাইবার জন্য যত প্রকার কষ্ট সহ্য করিতে হয়, আহ্লাদের সহিত তাহা বহন কুর।-(পৃঃ ২৪৭ ) শরীরের জীবন কিছুই নহে; ঈশ্বরে জীবনই জীবন। যদি সেই জীবন গাই, তবে শান্তি-পুষ্পে সজ্জিত হইয়া কত সুখী হই।-(পৃঃ ২৪৮) পরলােকের সন্ধান। যখন পরলােক স্মরণ মাত্র তােমাদের হৃদয় আনন্দে প্লাবিত হইবে, তখনই বুঝিতে পারিবে, পরলােক তােমাদের পিতৃগৃহ এবং পরলােক তােমাদের শান্তিনিকেতন।-(পৃঃ ২৪৮) অচিার্য্যের উপদেশ-তৃতীয় খণ্ড। আত্মার গঠন সামাজিক মনুষ্যের আত্মার গঠন সামাজিক। আত্মা নিরবলম্ব হইয়া একাকী বাস করিতে পারে না।-(পৃঃ ৬) আত্মা জনসমাজ হইতে বিছিন্ন হইয়া কদাচ একাকী উন্নত হইতে পারে না।-(পৃঃ ৬) ঈশ্বর আত্মার প্রাণ, এই জন্য আমরা স্বতঃসিদ্ধ জ্ঞান দ্বারা পরলােকে বিশ্বাস করি। কারণ যখন প্রাণ-স্বরূপ পিতার চরণে অধিষ্ঠান করি, তখন শরীর-বিহীন হইলেও অনন্ত কাল জীবিত থাকিব, এই বিশ্বাস সহজেই আত্মার গূঢ়তম স্থানে প্রকাশিত হয়। চিরকাল প্রাণের প্রাণ ঈশ্বরের ঘরে বসিয়া তাহার অভয় চরণ দর্শন করিব। মৃত্যুর সাধ্য নাই সেই ঘরে প্রবেশ করে, পবন সেখানে যাইতে পারে না, অপ্তির কোন শক্তি নাই সেখানকার কোন দ্রব্য দগ্ধ করে। ঈশ্বর জীবনের জীবন এই সত্য বুঝিতে পারিলে সেই আশা অন্তরে বদ্ধমূল হয়। এইরূপে ঈশ্বরের সঙ্গে যেমন প্রতি আত্মার নিগূঢ় প্রাণ-বােগ, তেমন আবার তাহার সৃষ্ট অন্যান্য আত্মার সঙ্গেও ইহা বিশেষ বিশেষ সম্পর্কে আবদ্ধ। সকলকে ছাড়িয়া যিনি ঈশ্বরের নিকট যাইতে চাহেন, নিশ্চয়ই তিনি নিরাশ হইয়া ফিরিয়া আসি, বেন।-- পৃঃ ৭) পরলােকের সন্ধান। আত্মা যতই গভীররূপে এই অমৃত পান করে, ঈশ্বরের এমনই নিগূঢ় করুণা, ততই প্রবল বেগে ইহার মধ্যে উদারতা এবং প্রেম সঞ্চারিত হয়। পৃঃ ৮) = স্বগীয় পরিবার-- সমস্ত জগতের জন্য তিনি এক ঘর নির্মাণ করিতেছেন। যদি শান্তি চাও, সকলেই এই ঘরে প্রবেশ কর। আবার দেখ, ভবনদী পার হইবার জন্য একটী তাহার নিম্মিত ঘাট, তাহার নাম ভক্তি-ঘাট। যদি পরিত্রাণ চাও, এই ঘাটেই আসিতে হইবে। ঐ দেখ, এই ঘাটে পিতার চরণতরী রহিয়াছে।-(পৃঃ ৩৫) । ধ্যান- জড় জগৎ হইতে আধ্যাত্মিক দেশে প্রবেশ করিতে গেলে প্রথমে অন্ধকার, কিছুই দেখা যায় না, না জড়-রাজ্যের চন্দ্র সূৰ্য্য, না হৃদয়- রাজ্যের সুশীতল পবিত্র পদার্থ ; কিন্তু আশাপূর্ণ হৃদয়ে ধৈৰ্য্য ধারণ করিলে, ক্রমেই সেই গভীর অন্ধকার ভেদ করিয়া, ঈশ্বরের প্রেমােজ্জল সত্তা স্পষ্টরূপে প্রকাশিত হয়। যেমন বাহিরের জগৎ বাহিরের ইন্দ্রিয়ের দ্বারা প্রকাশিত হয়, তেমনই সেই অন্তরতম চিরজাগ্রত পুরুষ, আত্মার অন্তরতম ভক্তি-চক্ষুর নিকট বিদ্যমান।পৃ: ৩৭) একাগ্রচিত্তে তদগত ভাবে বিষয় রাজ্য হইতে ক্রমে চলিয়া যাও, অন্ধকারের পর অন্ধকার, তাহার পর অন্ধকার, গভীর হইতে গভীর- তর অন্ধকার এবং তাহা অপেক্ষাও ঘােরন্ধকর অতিক্রম করিয়া চলিয়া যাও, ভয় নাই, নিরাশ হইও না, শীঘ্র কাজ সারিয়া লইব এরূপ মনে করিও না; কিন্তু শান্ত ভাবে ধীরে ধীরে সেই পুণ্যালয়ের দিকে
৩২
পরলােকের সন্ধান।
গমন কর, কিছু দূর গেলেই দেখিবে, কেমন সুন্দর সেই লময়ের
প্রেমরাজ্য। পৃ: ৩৮)
%
ব্রাহ্মদিগের শাস্ত্র
ব্রহ্মবাণী শুনিবা মাত্র মৃতপ্ৰাণে জীবন সঞ্চারিত
(পৃঃ ৪৪)
প্রত্যাদেশ মনুষ্যের কল্পনা নহে; কিন্তু ইহা জীবাত্মার অন্তরে
সত্যস্বরূপ ঈশ্বরের প্রত্যক্ষ আদেশ। পৃঃ ৪৪)
আঁহারা মৃতপ্রায়, তাহাদিগকে বলি, ব্রহ্মের কথা শ্রবণ কর, জীবিত
হইবে। যাহারা দুর্বল, তাহাদিগকে বলি, ব্রহ্মের কথা শুন, বলীয়ান
হইবে। এক ঈশ্বরের মুখ হইতে একই কথা আসিতেছে। ভ্রাতৃগণ,
ভগ্নীগণ, সকলে মিলিয়া সেই কথা শুন, এবং সেই কথা পালন করিয়া,
চল আনন্দ মনে স্বর্গরাজ্যে চলিয়া যাই।-(পৃঃ ৪৬)
=
দীক্ষিতদিগের প্রতি উপদেশ
পাপ-বিকারে তিনি তােমাদের মুক্তি, মৃত্যুশয্যায় তিনি তােমাদের
একমাত্র সুহৃদ এবং শেষ গতি।-(পৃঃ ৪৮)
বিপদের সময় তাহার অভয় মূর্তি দেখিয়া পরিত্রাণ পাইবে।
{ পৃঃ ৪৮ )
দয়াময়, দয়াময় বলিয়া চলিয়া যাও, বলিতে বলিতে দেখিবে, শুষ্ক
বৃক্ষে প্রেম-ফুল সকল ফুটিবে, অসত্য কল্পনা পলায়ন করিবে;
অন্ধকারের মধ্যে আলােক প্রকাশিত হইবে এবং মৃত ব্যক্তিরা
পুনর্জীবিত হইয়া উঠিবে।-(পৃঃ ৪৮)
পরলােকের সন্ধান। ঈশ্বর আত্মাতে আমার শরীর আত্মা যেমন আমার, তেমনই এ সকল আমার ঈশ্বরের। যখন দেখি, আমার এই পাপাত্মার সঙ্গে সেই ধৰ্ম্মাধিপতি ঈশ্বরের এইরূপ গৃঢ় প্রাণ-যােগ, তখন পরকালে কিরূপে বাস করিব বুঝিতে পারি, তখন অনন্ত জীবন এবং আত্মার অমরত্ব কি, তাহ প্রকাশিত হয়।-(পৃঃ ৭৭ ) ঈশ্বর অন্তর্জগতে সত্য, প্রেম, পবিত্রতা, যিনি এই তিন পদার্থে পরিপূর্ণ, তাহারই নাম ব্ৰহ্ম। আমরা ব্রহ্মের সন্তান, এ জন্যই আমরা তাহার জ্ঞান, প্রেম এবং পবিত্রতার অধিকারী। এই তিন পদার্থেই জীবাত্মার সঙ্গে পরমাত্মার যােগ। পৃ: ৭৯) শরীর এবং মন যেমন তাহাদের প্রত্যেক শক্তির জন্য সকল শক্তির মূলাধার সেই প্রাণ-স্বরূপ ঈশ্বরের শরণাগত হয়, সেইরূপ তাহা অপেক্ষা অধিক পরিমাণে ধৰ্ম্ম-জীবন ঈশ্বরের উপর নির্ভর করে। (পৃঃ ৮২) নারী জাতির অধিকার নির্জনে বসিয়া যখন জিজ্ঞাসা করি, আমরা কি জন্য জন্ম ধারণ করিলাম, এই পৃথিবীর মধ্যেই কি চিরকাল আমাদিগকে বাস করিতে হইবে ? তখন দেখিতে পাই, এই যে সংসার, অতুল বৈভব এবং অপার ঐশ্বৰ্য্য, এ সকল আমাদের জন্য নহে, অচিরেই এ সকল পরিত্যাগ করিয়া আমাদিগকে এক অদৃশ্য এবং অজানিত রাজ্যে প্রবেশ করিতে পরলােকের সন্ধান। হইবে। তখন স্পষ্ট দেখিতে পাই, পৃথিবীর ধন ধান্য ভােগ করিবার জন্য আমরা এই সংসারে আসি নাই। আমাদের জীবনের লক্ষ্য স্বতন্ত্র এবং এই পৃথিবীতে তাহা সিদ্ধ হইতে পারে না। এইরূপে যখন উজ্জ্বলরূপে জীবনের উদ্দেশ্য প্রকাশিত হয়, এই কথোপকথনের তাৎপৰ্য তখনই সমক্যরূপে হৃদয়ঙ্গম করিতে পারি। তথন দেখিঞ্জে পাই, মৃত্যুর পর পৃথিবীর কোন বস্তুর সঙ্গেই সম্পর্ক থাকিবে না। কারণ পৃথিবীর কিছুই মনুষ্যাত্মার নিত্যকাল ভােগ করিবার জন্য নহে।-(পৃঃ ৮৮) কিছুদিন ঐহিক সুখ সম্ভোগ করিয়া জীবন অতিবাহিত করিবার জন্য আমরা পৃথিবীতে আসি নাই ; কিন্তু যাহাতে অনন্তকাল সুখ শান্তি লাভ করিতে পারি, সেই সম্বল সঞ্চয় করিবার জন্যই আমরা পৃথিবীর এ সকল অনিত্য ধন ঐশ্বর্যের অধিকারী হইয়াছি।-(পৃঃ ৮৯) যাহা দ্বারা আমরা অমর হইতে পারি, তাহাই আমরা গ্রহণ করিব।-(পৃঃ৮৯) এই সংসারে থাকিয়াই আমাদিগকে অনন্ত জীবনের আস্বাদ লাভ করিতে হইবে।(পৃঃ ৮৯) পৃথিবীর অনিত্য সুখ পরিত্যাগ করিয়া অনন্ত জীবনের উদ্দেশ্য সাধন করিবে, এ বিষয়ে কে তােমাদের প্রতিকুল হইবে? এই পথে ঈশ্বর স্বয়ং তােমাদের সহায়, তিনি তােমাদের নেতা, এবং তিনিই তােমাদের লক্ষ্য।-(পৃঃ ৯১) আত্মার সহজ অবস্থাই স্বাধীনতা। সমুদয় পাপ বন্ধন হইতে উন্মুক্ত হইয়া আত্মা যখন সহজেই অমরত্ব কামনা করে এবং সেই অমৃতস্বরূপে বিচরণ করে, আত্মার সেই গােপনীয় অবস্থাই যথার্থ স্বাধীনতা। পৃঃ ৯১)
প্রলােকের সন্ধান।
৩৫
.
অতএব পাপ এবং মৃত্যুকে অতিক্রম করিয়া যাহাতে তােমরা
প্রকৃত স্বাধীনতা এবং অমরত্ব লাভ করিতে পার, তাহাই আমাদের
প্রার্থনীয়। পৃঃ ৯১)
অমরত্ব আমাদের লক্ষ্য এবং অমরত্বই আমাদের জীবনের প্রয়াে-
জন। পৃঃ ৯১)
আবার বলিতেছি, এই অমরত্বে সকলের সমান অধিকার এবং এ
বিষয়ে কেহই কাহারও অধীন নহে।.পৃঃ ৯১)
ব্ৰহ্মমন্দির অামাদের আত্মার কল্যাণের জন্য। এখানে আসিয়া
আমরা অনন্ত জীবনের মধুরতা এবং আধ্যাত্মিক স্বাধীনতা উপভােগ
করিব। পৃ: ৯৪ )
ব্ৰহ্মদর্শন সহজ বিশ্বাসমূলক
যতক্ষণ ব্ৰহ্মকে স্পষ্টরূপে দেখিতে না পাও, নিশ্চয় জানিও, ততক্ষ।
আত্মার মৃত্যু।-(পৃঃ ১৩)
সেই অরূপ-মাধুরী দেখিবার জন্যই জীবাত্মা সৃষ্ট হইয়াছে, এবং
ঈশ্বর এখন যে আমাদিগকে পাপের এত কঠোর শাস্তি বিধান
করিতেছেন, তাহা এই জন্য যে, একদিন আমরা নিৰ্ম্মল হইয়া তাঁহার
সাক্ষাৎ দর্শন লাভ করিব। পৃ: ১০৩)
জড়-জগতের অতীত স্থান এই আকাশে জগতের ঈশ্বর প্রাণেশ্বরের
সাক্ষাৎ পাইতেছি। বায়ু দ্বারা নাসিকায় নিশ্বাস প্রশ্বাস, আত্মার ভক্তির
দ্বারা তেমনই সহজ ভাবে ঈশ্বরের বর্তমানতা উপভােগ করিতেছি।
পৃঃ ১০৫)
ঈশ্বরের সঙ্গে জীবাত্মার ব্যবধান নাই। -(পৃঃ ১৫)
পরলােকের সন্ধান। জীবন সার, জীবন সৎ- কারণ, যে পৰ্যন্ত উপাসনার স্রোত স্থায়িভাবে এবং গৃঢ়রূপে আত্মার মধ্যে প্রবিষ্ট না হয়, সে পর্যন্ত তােমাদের পদে পদে ভয় এবং বিপদের কারণ রহিয়াছে। অতএব যদি নির্ভয় হইতে চাও, অবিশ্রান্ত প্রার্থনা এবং উপাসনা কর।(পৃঃ ১০৮) সরস উপাসনা তাঁহার দয়াল স্বভাব সাধন কর। দেখিবে, অচিরেই তাঁহার শান্তিপূর্ণ পরম সুন্দর পবিত্র প্রেমরাজ্য তােমাদের নিকট প্রকাশিত হইবে। যতই সেই রাজ্যে প্রবেশ করিবে, ততই তােমরা পবিত্র আনন্দে পরিপূর্ণ হইবে। পৃঃ ১১৮) স্বর্গরাজ্য যেখানে ভাই ভগিনী নাই, কেবলই অন্ধকারপূর্ণ নির্জনতা, তাহ স্বর্গ নহে, তাহা কল্পনা। ঈশ্বরের স্বর্গরাজ্য তাহার পুত্র কন্যাদিগের দ্বারা পরিপূর্ণ।-(পৃঃ ১২৯) * * মুসলমান ধৰ্ম্মের নিকট ঋণী-- সুখের সময় যেমন তিনি দয়াময় পিতা, দুঃখের সময় তিনি আরও নিকটস্থ সহায় এবং আদরের ধন। অতএব কোন সময় তাহাকে ছাড়িও না।-(পৃঃ ১৩৭) পরলােকের সন্ধান। ৩৭ নিরাশা, ধৰ্ম্মরাজ্যের প্রাতঃকাল নিত্য প্রাতঃকাল, ধৰ্ম্মরাজ্যের বসন্ত চির- বসন্ত, আধ্যাত্মিক যৌবনের অবসান হয় না। সেই চিরপুরাতন ঈশ্বরের নিকট প্রার্থনা কর, যেন অনন্তকাল তাহার নিকট বালকের মত হইয়া থাকিতে পার।-(পৃঃ ১৪৩) ব্ৰহ্মরাজ্যে বাৰ্ধক্য নাই, সেই নিত্য প্রেমধামে সায়ংকাল নাই, সেই পুণ্যলােকে শীত নাই, তথায় অন্ধকার নাই, রজনী নাই। চিরকাল সেখানে নিত্য বসন্ত, নিত্য যৌবন, নিত্য প্রাতঃকাল। আর কেন তবে এমন সুন্দর পিতা হইতে বিচ্ছন্ন হইয়া শুষ্ক হও। প্রার্থনা করি, ঈশ্বর চিরদিন তােমাদের বসন্তকাল রক্ষা করুন। ( পৃঃ ১৪৩) যােগী ব্রাহ্ম কিন্তু যাহার আত্মা ব্রহ্মযােগে যোগী, তিনিই যথার্থ ব্ৰাহ্ম ।- (পৃঃ ১৪৪ ) ব্রাহ্মদিগের মন্দির নাই, তীর্থ নাই, ধর্মশাস্ত্র নাই, গুরু নাই, অবতার নাই। ইষ্ট সাধন করিবার জন্য বাহিরের কোন অবলম্বনই নাই। তাহাদের উপাস্য দেবতা কোন গৃহ কিম্বা স্থানে বদ্ধ নহে। এই জন্য নিরুপায় ব্রাহ্ম বাহ্য জগৎ হইতে সম্পূর্ণরূপে বিচ্ছিন্ন হইয়া সেই ইন্দ্রিয়াতীত আধ্যাত্মিক রাজ্যে প্রবেশ করেন, সেখানে উপস্থিত হইয়া দেখেন, “সুবিশালমিদং বিশ্বং পবিত্রং ব্রহ্মমন্দির। চেতঃ সুনিৰ্ম্মলন্তীর্থং সত্যং শাস্ত্রমনশ্বম্।” সেই অদৃশ্য রাজ্য দেথিবা মাত্র, নিরাশ্রয় ব্রহ্মের সমুদয় দুঃখ ঘুচিয়া যায়। সেখানে গিয়া এমন মন্দির এবং এমন গুক লাভ করেন, যাহার তুলনায় জগতের সমুদয় দেব পরলােকের সন্ধান। মন্দির এবং সমুদয় আচাৰ্য উপাচার্য কিছুই নহে। সেখানে অবতারের প্রয়ােজন হয় না; কিন্তু সাধক সাক্ষাৎ ঈশ্বরকে দর্শন করেন। সেই অন্ধকারাচ্ছন্ন হৃদয়-রাজ্যে (যেখানে চন্দ্র সূৰ্য্য কিছুই উদিত হয় না) আত্মারূপ জগতের মধ্যে তিনি যােগের সাধন লাভ করেন, সেই নিগুঢ় স্থানে বহির্জগতের কোন উপকরণেরই প্রয়ােজন হয় না। আত্মা সেই ঘােরান্ধকার মধ্যে ঈশ্বরের স্বর্গীয় পুণ্যালােকে উজ্জ্বল এবং তেজস্বী হয়। সাধকের সঙ্গে তথনই ঈশ্বরের প্রত্যক্ষ যােগ সংস্থাপিত হয়। যখন উপাস্য দেবতার সঙ্গে সৃষ্ট হৃদয়ের এইরূপ সংযােগ হয়, তখন বহির্জগতের সঙ্গেও আত্মার নূতন সম্পর্ক সংস্থাপিত হয়। তখন চক্ষু, কর্ণ ইত্যাদি ইন্দ্রিয় সকল আস্তিক হইয়া সমুদয় পদার্থে ঈশ্বরের জলন্ত সত্তা অনুভব করে। এইরূপে আত্মা যতই ঈশ্বরের অব্যবহিত সন্নিধানে অনুপ্রবিষ্ট হয়, ততই ইহা প্রগাঢ় আনন্দ-রসে আপ্লুত হয়। এই যােগ কিয়ৎকালের জন্য ক্ষণস্থায়ী যােগ নহে, কিন্তু ইহা গৃঢ়তম চিরস্থায়ী প্রাণের যােগ। পৃ: ১৪৪ ) যিনি ঈশ্বরের প্রতি গূঢ় রূপে অনুরক্ত, তিনি স্থির এবং প্রশান্ত, কারণ তিনি সর্বদাই তঁাহার আত্মার গভীরতম স্থানে সেই সুগম্ভীর পুরুষের সাক্ষাৎ লাভ করেন।(পৃঃ ১৪৬) ভক্তেরা এজন্যই হৃদয়ের এত আদর করেন, কারণ ঈশ্বর স্বয়ং সেখানে চিরবদ্ধ হইয়া অধিষ্ঠান করেন। এইরূপে নিজের অন্তরের মধ্যে যখন সেই অনন্তকালের সম্বল, নিত্য সঙ্গী পরমেশ্বরকে লাভ করিবে, তখন আর ভয় নাই। যাহার আত্মা এই অবস্থা লাভ করিয়াছেন, তিনিই ব্রহ্ম-প্রাণে প্রাণী, তিনিই যযাগী এবং তিনি বাস্তবিক ব্রাহ্ম । পৃ: ১৪৯ ) পরলােকের সন্ধান। ৩৯ প্রচারক কে- যাঁহারা পূর্ণ বিশ্বাসী এবং ঈশ্বরের আজ্ঞাধীন, তাহার স্বর্গ হইতে প্রচুর প্রেমা এবং শান্তিবারি লইয়া, দেশে দেশে যাইয়া, পিতার দুঃখী সন্তানদের ক্ষুধা এবং তৃষ্ণা দুর করেন; শত্রুতা মিত্ৰতা নির্বিশেষে সকলের নিকট তাহারা দয়াত এবং প্রেমব্রত পালন করেন। { পৃঃ ১৫৭) সংসার ও ধৰ্ম্ম- যে সকল ব্রাহ্ম আধ্যাত্মিক জ্যোতি—এই অপরূপ দৃশ্য দেখিলেন, তঁাহারা মােহিত হইয়া গেলেন, সংসার তাহাদের নিকট সামান্য অকিঞ্চিৎকর বােধ হইল। হাস্য করিতে করিতে তাঁহারা পৃথিবী হইতে বিদায় লইলেন। আবার যখন পরলােকের দিকে তাঁহাদের দৃষ্টি পড়িল, তখন সত্যের রাজ্য, প্রেমের রাজ্য, পুণ্যের রাজ্য অনন্ত- কাল বিস্তৃত দেখিয়া অন্তরের সহিত, জয় জগদীশ, জয় জগদীশ, বলিয়া আনন্দ প্রকাশ করিতে লাগিলেন। চক্ষু মুদ্রিত করিয়া যে নূতন সহর এবং তাহার সঙ্গে সঙ্গে যে সকল ব্যাপার দেখিলেন, আর তাহা ভুলিতে পারিলেন না।—(পৃঃ ১৬৬) কিন্তু কি সাধু কি অসাধু, কি অন্ধ কি চক্ষুষ্মন্ প্রতি জনকেই একদিন সেই আন্তরিক রাজ্য দেখিতে হইবে, এবং সেই প্রেমাবাসে প্রবেশ করিয়া শান্তি পরিত্রাণ লাভ করিতে হইবে। কিন্তু শীঘ্র না দেখিলে দুঃখ যায় না, অন্তরের গৃঢ় পাপ দূর হয় না। এই জন্য, ব্রাহ্মণ, ব্রাহ্মিক ভগ্নীগণ! তােমাদিগকে বিনীত ভাবে সম্বোধন করিতেছি, ত্বরায় সেই রাজ্যে চল, তােমাদের শােক তাপ চলিয়া যাইবে। যায় যা সংসারের সুখ, যায় যাক পৃথিবীর বন্ধুতা, যায় পরলােকের সন্ধান। যাক বাহিরের চন্দ্র সূর্য। তোমাদের আলােক অন্তরে, তােমাদের আনন্দ ঈশ্বরের চরণে। বাহিরে প্রসন্নতা থাক আর না থাক, দিন রাত্র প্রফুল্ল মনে ঈশ্বরের জন্য জীবন ধারণ কর এবং তাহার কাৰ্য্য করিয়া শান্তি পরিত্রাণ লাভ কর। পিতা মাতা, ভাই বন্ধু, স্ত্রী পুত্র, এই আছেন, এই নাই; কিন্তু ঈশ্বর তেমন আত্মীয় নন যে, তােমাদের বিপদ দেখিয়া নিমেষের জন্য তিনি চলিয়া যাইতে পারেন। অতএব বাহিরের সকল সম্পর্ক ভুলিয়া এবং জগতের স্তুতি নিন্দা অসার জানিয়া, অবিলম্বে সত্যের রাজ্যে চলিয়া যাও। হৃদয়ের মধ্যে সেই নিত্য সঙ্গী ঈশ্বরকে দেখ, ভালরূপে তাহাকে চিনিয়া লও। ঘোর বিপদের সময় তিনি ভিন্ন আর কেহই নিকটে থাকিবে না। তাহার সঙ্গে যদি পরিচয় হয়, সহস্র অস্ত্রাঘাতে কাতর হইলেও অভয় পদ লাভ করিতে পারিবে। যখন সকল কর্তৃক পরিত্যক্ত হইবে, তখন কেবল তিনি আসিয়াই অন্তরে সান্ত্বনা দিবেন।-(পৃঃ ১৬৬) যদি শান্তি উপভােগ করিতে চাও, তবে সেই পরম বন্ধুকে গ্রহণ কর। পৃঃ ১৬৭ ) সত্যে সত্যে বিবাদ নাই- তােমাদের উদ্দেশ্য এক, তােমাদের গমস্থান এক। পৃঃ ১৭১) গভীর ধর্ম সাধন বৃক্ষের সঙ্গে ভূমির যেমন সম্পর্ক, আত্মার সঙ্গে পরমাত্মার সেইরূপ সম্বন্ধ। বৃক্ষের মূল ভূমিতে, আত্মার জীবন ব্রহ্মে। পৃ১৭১) কিন্তু যথার্থতঃ আত্মার জীবন, বল, আনন্দ, উৎসাহ, প্রতাদেশ, শাস্ত্র, সকলই ব্রহ্মের মধ্যে। পৃ: ১৭২) পরলোকের সন্ধান। ৪১ জীবাত্মার জ্ঞান, প্রাণ, প্রেম, আনন্দ, পবিত্রতা, পরিত্রাণ, সকলই ঈশ্বরের মধ্যে।-(পৃঃ ১৭২) আত্মা যদি ব্রহ্মে বদ্ধমূল না হইয়া থাকে, পরিবর্তনের মধ্যে কেহই জীবনকে নিষ্কলঙ্ক রাখতে পারে না। পৃঃ ১৭২) অনেক ব্রাহ্ম চক্ষু মুদিত করিলেই দশ দিক অন্ধকার দেখেন, কিন্তু অন্ধকারের মধ্যে যাহারা সেই রাজাধিরাজের সহর দেখিতে পান, তাঁহারাই যথার্থ ব্ৰাহ্ম। পৃ: ১৭৪) তিনটী প্রশ্নের মীমাংস— অতএব সাবধান হইয়া জীবনের মূলদেশ বিশুদ্ধ কর, অটল সত্যের ভূমি অবলম্বন কর, বিপদের তরঙ্গ, অবিশ্বাসের তরঙ্গ আর তােমাদিগকে বিনাশ করিতে পারিবে না।-(পৃঃ ১৭৭) স্বর্গের প্রেম দোষ গুণ বিচার করে না; কিন্তু দোষ গুণ নির্বিশেষে ভাই ভগ্নীদিগকে আলিঙ্গন করে। পৃঃ ১৮০ ) যদি সুখী হইতে চাও, রােগ, শােক, দুঃখ, বিপদ, সকল অবস্থায় ঈশ্বরের সত্য গ্রহণ কর, এবং সেই সত্য পালন করিয়া জীবন পবিত্র কর। পৃঃ ১৮২) বিশ্বাসমূলক প্রেম- বিশ্বাসে স্বর্গরাজ্য দিন দিন নিকট হইবে।-- পৃঃ ১৯০) * * জীবন-পথের পথিক জীবন-পথের পথিক আমরা, সকলেই চলিয়া যাইতেছি, পথের মধ্যে কখনও ঝড় বৃষ্টি আসিয়া আমাদের উপর উৎপাত করে, কখনও ৪২ পরলােকের সন্ধান। সূর্যের সহাস্য কিরণ আমাদিগকে পুলকিত করে। কখনও লোকের মধ্যে, কখনও অন্ধকারের মধ্য দিয়া চলিয়া যাইতেছি। কখনও অন্তরে উৎসাহ এবং আশার অগ্নি প্রজ্বলিত হইতেছে, কখনও নিরাশা, নিরুদ্যম এবং নিরুৎসাহ আসিয়া অন্তরকে একবারে অবসন্ন করিতেছে। কখনও সম্পদ, কখনও বিপদ; কখনও সুখ, কখনও দুঃখ ; কখনও প্রসন্নতা, কখনও বিষন্নতা; এইরূপ পরস্পর বিপরীত এবং বিরুদ্ধ অবস্থা সকল জীবন-পথে আমাদিগকে আক্রমণ করে। কিন্তু ইহা নিশ্চয় যে, আমরা জীবন-পথের পথিক। সকল অবস্থার মধ্য দিয়া ঐ পথে চলিয়া যাইতেছি, কিন্তু কোথায় যাইতেছি, ইহা অতি অল্প লােকেই জানেন। পৃথিবীর কয়টী লােক অঙ্গুলি নির্দেশ করিয়া নিশ্চয়রূপে এই কথা বলিতে পারেন, ঐ আমাদের গমস্থান! একাগ্রতার সহিত আমরা এই পথে ঐ দিকে যাইতেছি, দক্ষিণে বামে পদ বিচলিত হইতে পারে না, কেন না, সম্মুখে ঐ লক্ষ্য দেখা যাইতেছে। ঐ আমাদের গম্যস্থান দিন দিন নিকটতর হইতেছে। ইতস্ততঃ ভ্রমণ করিয়া আমরা দিবস যামিনী যাপন করিতে পারি না। একবার এদিকে এক বার ওদিকে, একবার পূর্বে আবার পশ্চিমে, একবার উত্তরে আবার দক্ষিণে, এইরূপ অস্থির ভাবে আমরা জীবন ক্ষয় করিতে পারি না। কিন্তু প্রতিদিন অল্পে অল্পে ঐ সম্মুখস্থ লক্ষ্যের নিকটবর্তী হইতে হইবে। পূঃ ১৯) ঈশ্বরের স্বরূপ না জানিয়া উপাসনায় প্রবৃত্ত হওয়া যেমন বিড়ম্বনা, সেইরূপ জীবনের লক্ষ্য না জানিয়া, জীবন-পথে অগ্রসর হওয়া কেবলই 'ক্লেশাবশেষ। ঈশ্বরের সম্পর্কে যেমন পূর্ণজ্ঞান চাই, জীবনের আদর্শ সম্পর্কেও সেইরূপ পরিপক্ক জ্ঞান আবশ্যক। ঈশ্বরকে যেমন উজ্জল নয়নে দেখিবে, তেমনই কোথায় যাইতেছি, আমাদের লক্ষ্য কি, পরলােকের সন্ধান। ৪৩ তাহাও স্পষ্টরূপে জানিতে হইবে। লক্ষ্য সম্পর্কে অস্থিরতা, কল্পনা কিম্বা সংশয় থাকিলে সকল শ্রম বিফল হইবে, এবং পশ্চাৎ অনুতাপ করিতে হইবে। অতএব অগ্ৰেই যথাসময়ে লক্ষ্য স্থির করিয়া সত্য পথে বিচরণ করিব। পৃ: ১৯১) ঋদি পরিত্রাণ চাও, সত্যের আশ্রয় গ্রহণ করিতে হইবে। ৫ পৃঃ ১৯২) সাধক বিনীতভাবে ঈশ্বরকে জিজ্ঞাসা করিলেন, তিনি স্বয়ং গুরু হইয়া এই কথা বলিলেন, “যে স্বর্গধামে আমি বাস করি, অবশেষে যেখানে তােমরা সকলেই যাইবে, সেই স্বর্গধাম নির্জন, শূন্য নহে, কিন্তু সেখানে আমার পুত্র কন্যা সকল বিরাজ করেন। ১৯২) ঈশ্বর স্বয়ং যে দেশের রাজা, তিনি যে রাজ্যের সুখ কুশল বন্ধন করিতেছেন, সেই রাজ্যে যাইয়া যদি সেই প্রজাবৎসল রাজাকে দেখিতে চাও, তবে হৃদয়কে পরিবর্তিত কর। কাম, ক্রোধ, লােভ, হিংসা, স্বার্থ, অহঙ্কার বিনাশ করিয়া, অন্তরে ঈশ্বরের পবিত্র রাজসিংহাসনের দিকে ভক্তি, কৃতজ্ঞতা উঠিতে দাও। পবিত্ৰ-হৃদয় ব্রাহ্ম সাধক সেই রাজ্যে যাহা দেখেন, কোটী কোটী মহাকবি তাহা বর্ণনা করিতে পারেন না। ঈশ্বর যেমন সত্য, তেমনই তিনি সুন্দর। তিনি যদি সুন্দর হইলেন, তাহার রাজ্য কি কুৎসিত হইতে পারে? তাঁহার রাজ্য প্রেমের রাজ্য, সেই রাজ্যে নিত্য মঙ্গল, নিত্য কল্যাণ। সে ঘরে, প্রেম, কুশল, আনন্দ, শান্তি সখার ন্যায় একত্র হইয়া বিরাজ করিতেছে। এই সত্য লইয়া যে দিকে যাইবে, সে পথ সুন্দর। এই রাজ্য কোথায় ? আমাদের জীবনের শেষে।-(পৃঃ ১৯২) সাধু অসাধু সকলেই ' সেই রাজ্যে যাইতে হইবে। সবান্ধবে, কেবা পিতা মাতা এবং বন্ধু বান্ধবহীন হইয়া, দয়াময়, ৪৪ পরলােকের সন্ধান। দয়াময় বলিতে বলিতে পরলােক চলিয়া যাইবেন। কেহ নির্ভয় হইয়া ঈশ্বরের অভয় নাম উচ্চারণ করিতে করিতে ঈশ্বরের নিকট উপনীত হইবেন, কাহাকেও বা নিতান্ত ক্ষীণ এবং দুর্বল ভাবে ক্রমে ক্রমে শত শত বৎসরে পুণ্য সঞ্চয় করিয়া সেই পুণ্যালয়ে যাইতে হইবে। কিন্তু যে ঘরে ঈশ্বর এবং তাঁহার বৃহৎ পরিবার বাস করেন, সকলকেই একদিন সেই গৃহে প্রবেশ করিতে হইবে। ঐ স্থানই জীবনের লক্ষ্য এৰং ঐ গৃহই আমাদের শান্তিনিকেতন; কিন্তু এই ঘর দূরে না নিকটে? জানিলাম, ইহাই আমাদের গমস্থান, কিন্তু ইহা কোথায়, কতদূর? ভ্রাতৃগণ ভগ্নীগণ । ব্রাহ্ম ব্রাহ্মিকা হইয়া যদি বিশ্বাস কর, ঈশ্বরের প্ৰেম-পরিবারই তােমাদের মুক্তিধাম, পুণ্যরাজ্য, প্রেমরাজ্য, এবং শান্তিনিকেতন, তবে কখনও এরূপ মনে করিও না যে, ইহা দূরে কিম্বা ইহা বাহিরে। তবে কোথায় এই রাজ্য ? তবে কোথায় এই রাজ্য? ঐ দেখ, ইহা দূরে নহে, বাহিরে নহে, কিন্তু অতি নিকটে,তােমাদের হৃদয় মধ্যে। পবিত্রতা সম্পর্কে ঈশ্বর অতি দূরস্থ হইয়াও দয়গুণে যেমন তিনি আমাদের অতি নিকটে, সেইরূপ তাহার বাসস্থান স্বর্গরাজ্য অতি দুরস্থ হইয়াও আমাদের অতি নিকটে । অন্তরের অন্তরে সেই দূরস্থ স্বর্গরাজ্য। সাধু অসাধু নর নারী সকলেরই হৃদয়ে ঐ রাজ্য বিস্তারিত রহিয়াছে। সাধনবিহীন ঘাের পাষণ্ড অব্রাহ্ম হৃদয়ের মধ্যেও সেই স্বর্গরাজ্য প্রতিষ্ঠিত রহিয়াছে। -(পৃঃ ১৯৩) শান্তিনিকেতনের লক্ষণ কি, স্পষ্টরূপে না জানিলে, কল্পনার হস্তে পড়িয়া মরিতে হইবে। পরিত্রাণের জন্য ঈশ্বরকে ঠিক জানা যেমন নিতান্ত প্রয়ােজন, তেমনই স্বর্গরাজ্য কি, শান্তিনিকেতন কি, তাহা জানা ও নিতান্ত আবশ্যক। যেখানে সহস্র দুর্দান্ত-হৃদয় অসাধু প্রকৃতি বিবেকের পদতলে পড়িয়া ঈশ্বরের আদেশ মানিতেছে, সােথ সংসারীব পরলােকের সন্ধান। যেখানে বিষয়-লালসা পরিত্যাগ করিয়া ব্রহ্মোপাসনামন্ত্রে দিন দিন দীক্ষিত হইতেছে, পাতকীরা যেখানে পবিত্র হইবার জন্য মহানন্দে ব্ৰহ্ম-সংকীৰ্ত্তন করিতেছে, যেখানে বাহিরে মধুর ব্রহ্ম-নামের গভীর রােল উঠিতেছে এবং অন্তরে তদপেক্ষা গভীরতর সুমধুর প্ৰেমধ্বনি হইতেছে, যেখানে সকলের হৃদয়ে-ঈশ্বরের প্রতি অচলা ভক্তি, পরস্পরের প্রতি নিঃস্বার্থ স্বর্গীয় প্রেম, যেখানে সকলের অন্তরে পুণ্যপ্রভা এবং সকলের মুখশ্রীতে শান্তি-জ্যোৎস্না, যেখানে চারিদিকে স্বর্গের সৌন্দৰ্য্য, যতই সেই ভক্ত-মণ্ডলীর মধ্যে, তাহার সেই পরিবার মধ্যে ঈশ্বরকে দেখি, ততই দেখিতে পাই, তাহার মুখের আলােক শান্তিনিকেতনের প্রত্যেকের উপর পড়িয়াছে।(পৃঃ ১৯৪) যে সাধক একবার অন্তরে ঐ প্রেমধাম দেখিয়াছেন, তাহার পক্ষে পৃথিবীর দরিদ্রতা, সংসারের দুঃখ কষ্ট কিছুই নহে। একবার বিশ্বাস- চক্ষু খুলিয়া দেখ, পরলােকে সেই ধামে যাইবে। মানস-পথে যে ঐ সুন্দর ছবি দেখিতেছ, সেই ছবি ঐ প্রেমধামের ছবি। ঐ গুন, সেখানে নর নারী সকল দয়াময়, দয়াময়, বলিয়া ডাকিতেছেন। কিবা তাহাদের আনন্দ, কেমন তাহাদের শােভা! ধন্য হইব, সুখী হইব, যদি সেই নিগুঢ় উচ্চ ব্ৰহ্মমন্দিরে বাস করিতে পারি। সেখানেই আমাদের পরিত্রাণ, সেখানেই আমাদের শান্তি। পৃ: ১৯৫) পবিত্রতাশূন্য নর নারী সে রাজ্যে প্রবেশ করিতে পারে না। (পৃঃ ১১৫ ) ' এক লক্ষ্য পিতার সেই প্রেম-রাজ্যে গমন করাই মনুষ্য-জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য। যিনি যে কোন অবস্থায় থাকুন না কেন, ধনী হউন, মানী ৪৬ পরলােকের সন্ধান। হউন, জ্ঞানী হউন, মূখ হউন, সকল অবস্থাতেই এই এক কর্তব্য, এই এক সাধন; পরিশেষে ব্ৰহ্ম-নিকেতনে, শান্তিধামে, স্বর্গরাজ্যে উপনীত হইতে হইবে। বাহিরের বিভিন্নতা চিরদিন থাকিতে পারে না। আত্মা এক, ঈশ্বর এক, এক শান্তিধামই আত্মার উদ্দেশ্য। আমাদের লক্ষ্য এক, মন্ত্র এক, স্বর্ণ এক, অন্তরে বাহিরে গৃহ এক, পরিবার এক, সপরিবারে এক রাজ্যে গিয় উপনীত হইতে হইবে। একই স্বর্গধামের পথে চলিতে হইবে; ভিন্ন পথে চলিবার উপায় নাই; যিনি চলিবেন, তাহাকে ফিরিয়া আসিতে হইবে। এই লক্ষ্য পরিত্যাগ, মনুষ্যত্ব পরিত্যাগ একই। এই পথই মুক্তির পথ। ধন উপার্জন কর, বিদ্যা উপার্জন কর, কিম্বা জ্ঞানই লাভ কর, এই লক্ষ্য স্থির রাখিবে, বামে দক্ষিণে না গিয়া অটল ভাবে সেই দিকে অগ্রসর হও। পৃ: ১৯৬) একদিকে চক্ষু স্থির রাখিবে, একদিকে নয়ন সংস্থাপিত থাকিবে, যত কথা চিন্তা অবিভক্ত স্রোতে সেই দিকে ধাবিত হইবে। মন আত্মা, যত্ন ও পরিশ্রম, সমুদয়ের সমষ্টি এক লক্ষ্যের সঙ্গে সংযুক্ত করিয়া রাখিবে।-(পৃঃ ১৯৭) দেখ, স্বর্ণাক্ষরে মনের মধ্যে স্বর্গরাজ্য অঙ্কিত রহিয়াছে। বিচিত্র সুন্দর ব্রহ্মরাজ্য বিশ্বাস-নয়নে সেখানে দেখিতে পাইবে। সেই অনন্ত প্ৰীতি-ধাম, স্বর্গধামের যিনি রাজা, তাহাকে অন্ধকারে অন্বেষণ করিতে হয় না। যিনি বিশ্বপতি হইয়া এই ক্ষুদ্র হৃদয় মধ্যে বাস করিতেছেন, এখানে তাহাকে দেখিতে পাইয়া ভক্তি করে এমনই তঁাহকে ধারণ করা যায় যে, প্রাণ শীতল হয়। সহস্র ক্রোশ অন্তরে সেই স্বর্গরাজ্য, অথচ উহা এই ক্ষুদ্র হৃদয়মধ্যে মুদ্রিত রহিয়াছে। অনন্ত ব্ৰহ্ম, অনন্ত স্বর্গলােক একবার বিশ্বাস-চক্ষে দেখ, দুইই আমাদিগের অন্তরে। ঘরও আমাদিগের অন্তরে, গৃহদেবতাও অনুরে, রাজাও আমাদিগের পরলোকের সন্ধান। ৪৭ অন্তরে, রাজ্যও অরে, ইহকাল অন্তরে, পরকাল অন্তরে অন্তরে নিমীলিত-নয়নে দেখ, জাজ্বল্যমান সেই ঈশ্বর-হস্ত-রচিত সুন্দর রাজ্য নয়ন-পথে প্রকাশিত হইবে। পৃ: ১৯৭) স্বার্থপরতা স্বর্গরাজ্যের পথ নহে। সন্ন্যাসী হইয়া সংসারের সকল বন্ধন ছেদন করিয়া, সেই শান্তিধামে উপনীত হইবার পথ নাই। সংসারত্যাগী সন্ন্যাসীর জন্য স্বর্গধাম নহে। কল্পিত বৈরাগ্যে, স্বার্থপর উপাসনাতে স্বর্গধাম নিৰ্ম্মিত হয় নাই। সমস্ত প্রজামণ্ডলী, সমস্ত নর নারী, সেই গৃহ-দেবতাকে মধ্যে রাখিয়া তাহার নাম কীর্তন করিতেছে; সমুদয় স্বার্থ পরিত্যাগ করিয়া এক পরিবার হইয়া অবস্থান করতঃ তাহার সেবা করিতেছে; সকলে এক-হৃদয় হইয়া এক পিতার পূজা করিতেছে ; এই অবস্থাই ব্ৰহ্মরাজ্য।-(পৃঃ ১৯৮) হৃদয়ের মধ্যে ঈশ্বরের গৃহ অন্বেষণ কর।(পৃঃ ২০০) লক্ষ্য সাধন- মনুষ্য-জীবনের সেই একমাত্র লক্ষ্য কি? ঈশ্বরের শান্তিধাম। (পৃঃ ২২) অচিৰ্য্যের উপদেশ—চতুর্থ খণ্ড। উৎসবের বিরুদ্ধে পাপাচরণ করিও না- দয়াময় পরমেশ্বরের করুণা প্রকাশ্যভাবে প্রতিদিন যেমন আমা দিগের শরীর-রক্ষার্থে অন্ন জল পান বিধান করিতেছে, তেমনই আধ্যাত্মিক জীবন-রক্ষার্থে ধৰ্ম্মায় বিতরণ করিতেছে। পৃ: ১) ৪৮ পরলোকের সন্ধান। দেখ, ইহলােকে তিনি কত ধন জন সম্পত্তি অৰ্পণ করিয়াছেন, সুখ বিধান করিতেছেন, আবার স্বর্গলােককে তোমাদের জণ্ঠ শান্তিধাম করিয়া রাখিয়াছেন, কত শােভায় শােভিত করিয়া রাখিয়া- 'ছেন।-(পৃঃ ৮ } ব্রহ্মরাজ্য-- ব্রহ্মরাজ্য কি সুন্দর রাজ্য! এ রাজ্যের উপরে সংসারের কোন অধিকার নাই। এ রাজ্যে যাঁহারা বাস করেন, সংসার তাহাদের সুখ সৌভাগ্য হরণ করিতে পারে না।-(পৃঃ ১১) এদিকে দেখ, আমাদের ব্রহ্মরাজ্য পৰ্ব্বতের উচ্চ শিখরে অবস্থিত। নবীন উদ্যান, নুতন স্রোতস্বতী। এ রাজ্যে পার্থিব গােলাপ পুষ্প নাই। এখানে প্রেম-পুষ্প, ভক্তি-চন্দনের অভাব নাই। উৎসাহ-বসন্ত এখানে চিরবিরাজমান। এ পুষ্প কৃত্রিম নহে, এ পুষ্পের নিকট আর সকল পুষ্পই কৃত্রিম, এ চন্দনের সৌরভের নিকট কোথায় অন্য সৌরভ? এ উদ্যানের যিনি প্রভু, তাহার দ্বার প্রমুক্ত। অমূল্য রত্নে তিনি তাহার গৃহ পূর্ণ করিয়া রাখিয়াছেন। যে সন্তান সেখানে যায়, রাশি রাশি রত্ন গ্রহণ করে, কেহই বাধা দিতে পারে না। যে ব্যক্তি সেখানে বাস করে, স্বর্গের সুখ লাভ করে।-(পৃঃ ১২) প ব্রাহ্মধৰ্ম্ম অনাদিকাল সিদ্ধ বিশ্বাস ব্রাহ্মগণের প্রাণ। বিশ্বাসবিহীন হইলে তঁাহারা জীবনহীন হয়েন। পৃঃ ১৭)
পরলােকের সন্ধান।
মুঙ্গের ব্রহ্মমন্দির প্রতিষ্ঠা
মার ক্রোড় হইতে কন্যাগণ যেমন সামগ্রী পাইয়া অঞ্চলে বাঁধিয়া
আনন্দে চলিয়া যায়, আমরা তেমনই পিতার হস্ত হইতে শান্তির
লইয়া আনমনে ঘরে যাইব। পৃঃ ২২)
ভক্তি-ফুল।
আমি আছি-
বহির্জগতের প্রত্যেক বস্তুর মধ্যে খাকিয়া যেমন ঈশ্বর বলিতেছেন,
“আমি আছি’’, সেইরূপ অন্তর্জগতে থাকিয়া আরও উজ্জ্বলরূপে সৃষ্ট
আত্মাদিগের নিকট তাহার সত্তা প্রকাশ করিতেছেন।
মনের ভিতর
গিয়া দেখি, কতকগুলি ফুল ফুটিয়া রহিয়াছে। ভাব-ফুল, প্রেম-ফুল,
যেমন বাহিরের বাগানের ফুলে সুন্দররূপে “আমি
আছি” এই কথা লিখিয়া রাখিয়াছেন, তেমনই হৃদয়ের এ সকল ফুলে
আরও মনােহর, উজ্জল এবং হৃদয়গ্রাহিরূপে তাহার নাম লিখিয়া
দিয়াছেন।-(পৃঃ ৩৬ }
তিনি যখন আমাদিগকে গঠন করিয়া এখানে প্রেরণ করিলেন,
তখনই আমাদের প্রত্যেক আত্মাতে “আমি আছি” তাহার এই
সুমধুর নাম লিখিয়া দিলেন। যতদিন এখানে বাঁচিয়া থাকিব, এবং
মৃত্যুকালে ও মৃত্যুর পরেও চিরকাল, অনন্তকাল, এই নাম আমাদের
অন্তরে জ্বল জ্বল করিয়া অলিতে থাকিবে। “আমি আছি” অনন্ত
জীবন ঈশ্বরের মুখ হইতে এই কথা শুনিতে হইবে।(পৃঃ ৩৭)
যতই “আমি আছি” পিতার মুখে এই কথা শুনিবে, ততই অন্তরে
প্রেমােদয় হইবে এবং ভক্তিভাবে এই কথা শুনিতে শুনিতে আননে
পরলােকে চলিয়া যাইবে।-(পৃঃ ৩৮)
পরলােকের সন্ধান। ঈশ্বরের সৌন্দৰ্য- পিতা বড় সুন্দর, একবার তাহাকে ভাল করিয়া দেখ, দেখিলেই তিনি নিজে তাঁহার স্বর্গের শােভা দেখাইয়া তােমাদিগকে ভুলাইয়া লইবেন। পৃঃ ৪৭) ব্রাহ্ম পরিবার- পরস্পরের আকার ভুলিলে মনুষ্য সকলই ভুলিয়া যায়। পৃথিবীতে কি পারিবারিক, কি সামাজিক, রক্ত মাংসের যত সম্পর্ক, সমুদয় সেই আকারগত যােগে নিবদ্ধ রহিয়াছে। মৃত্যুর পর আকার বিলুপ্ত হইলে কিম্বা সেই আকার ভুলিয়া গেলে যে, কাহারও সঙ্গে কোন সম্পর্ক থাকে, সংসারীদিগের জীবন দেখিলে তাহা বোধ হয় না। আকারবিহীন কাহারও সহিত সম্পর্ক থাকিতে পারে, বিষয়ীরা ইহা অনেও ভাবিতে পারে না; যাই আকার বিনষ্ট হইল, সঙ্গে সঙ্গে সম্পর্কও চলিয়া গেল, সংসারের এই রীতি। কিন্তু ব্রাহ্মকে জিজ্ঞাসা কর, তিনি কিরূপে নর নারীর সঙ্গে যােগ স্থাপন করেন। যদি বলেন, এইরূপ সাকার ভাবে, তাহা হইলে তিনি অব্রাহ্ম। ভাই ভগ্নীদের সঙ্গে ব্রাহ্মের যােগ সম্পূর্ণ নিরাকার। তাহাদের শরীরের মুখ সুশ্রী হউক আর বি হউক, সে দিকে তাহার দৃষ্টি নাই, তাহার চক্ষু আত্মার উপর। আত্মাতে আত্মাতে তাহার নিগূঢ় যােগ। আত্মার আকার নাই, সুতরাং তাহার যােগও কোন প্রকার আকারমূলক নহে।-(পৃঃ ৭৫) ধুলি-নির্মিত দেহ ঈশ্বরের সন্তান নহে। দেহ যে অনুরাগ লয় অহা মায়া, তাহা পাপাসক্তি। পৃথিবীর ধূলি-নির্মিত সামান্য চর্মকে আমরা স্বর্গীয় প্রেম দিতে পারি না। পৃথিবীর বস্তু কি স্বর্গীয় প্রেম আকর্ষণ করিতে পারে? তবে প্রেম ভক্তি কে আকর্ষণ করিতে পরলােকের সন্ধান। ৫১ পারে? ঈশ্বর-নির্মিত সেই স্বর্গীয় বস্তু, নিরাকার কিন্তু প্রেমপুণ্যশীল আত্মা। স্বৰ্গই স্বৰ্গকে আকর্ষণ করে। আত্ম আত্মাকে দেখিতে পায়, আত্মা আত্মাকে চিনিয়া লয়, আত্মা আত্মার প্রেমে সম্বদ্ধ হয়, এবং আত্মা আত্মার পুণ্যে সুন্দর হয়। এই নিরাকার আশ্চর্য আধ্যাত্মিক যােগ ব্রাহ্মদিগের। পৃঃ ৭৬) যাহাদের সঙ্গে রক্ত মাংসের যােগ, তাহাদিগকে ভালবাসা নিকৃষ্ট ; কিন্তু শরীরের সঙ্গে যাহাদের কোন সম্পর্ক নাই, তাহাদিগকে ভাল- বাসাতেই মনুষ্যত্ব, সেই ভালবাসাই চিরস্থায়ী এবং তাহাই ব্রাহ্মের লক্ষ্য। পৃঃ ৭৭ ) নিরাকার ভাই ভগ্নীদের ভালবাসা এবং প্রাণপণে তাহাদের আত্মা পরিপুষ্ট করাই আমাদের জীবনের কাৰ্য। পরলোকে কাহারও শরীর সঙ্গে যাইবে না। অতএব ভ্রাতৃগণ, ভগ্নীগণ, যদি ঈশ্বরের হইতে ইচ্ছা কর, যদি মৃত্যুর পরে অনন্ত জীবনের সম্বল চাও, তবে আকারগত সমুদয় শারীরিক সম্পর্ক বিনাশ করিয়া, ঈশ্বরের সন্তান কোথায়, খুঁজিয়া লও। সাকার দেহকে ভাই ভগ্নী বলিয়া আর প্রতারিত হইও না। (পৃঃ ৭৭ ) কিন্তু যিনি যথার্থ ভাই, যিনি যথার্থ বন্ধু, তার সঙ্গে বিচ্ছেদ নাই ; যেথানে যাও, কি দূর দেশে, কি পরকালে, তিনি পির চরণতলে বসিয়া আছেন।-(পৃঃ ৭৭ ) ধন্য তাহারা, যাহারা শরীর ভেদ করিয়া আত্মার মধ্যে প্রবেশ করেন, এবং সেখানে প্রেম ভক্তির বস্তু সকল দেখিয়া গোপনে ঈশ্বরের পদতলে প্রেম ও কৃতজ্ঞতার অশ্রু বিসর্জন করেন।--(পৃ: ৭৮) শরীরকে ভালবাসে কে ? ঈশ্বরের শত্রু। আত্মাকে ভালবাসে কে? ব্ৰহ্ম-সন্তান। পৃ: ৭৯) পরলােকের সন্ধান। কিন্তু ব্রাহ্ম তিনি, যিনি বাহিরের সমুদয় সৌন্দৰ্য্য ভুলিয়া গিয়া আত্মার প্রেমে মুগ্ধ হন। ব্রহ্মকে নিরাকার জানিয়া যেমন তাহাকে প্রেম করিবে, তেমনই তাঁহার সন্তানদিগকে নিরাকার জানিয়া প্রাণের সহিত তাহাদিগকে ভালবাসিবে। ভাই কিম্বা ভগ্নীর মাধুৰ্য্য সে দিন দেখিব, যে দিন সাধন করিয়া তাঁহাকে মনে হইলেই তাহার ভক্তি বিনয় ইত্যাদি কেবল আধ্যাত্মিক পদার্থ সকল মনে হইবে, শরীর মনে থাকিবে না, কেবল তাহার মধ্যে যে ব্ৰহ্ম-সন্তান এবং আমার মধ্যে যে ব্ৰহ্ম-সন্তান, এই দুইজনের পরস্পর সাক্ষাৎ যােগ এবং দুইজনের মধ্যে পরস্পর সদালাপ হইবে। পৃঃ ৭৯) এই জন্য বলিতেছি, মনুষ্যের শরীর এবং বাহ্যিক আড়ম্বর ভেদ করিয়া ঈশ্বরের পুত্র কন্যার সঙ্গে নিরাকার ভাবে সম্পূর্ণ আধ্যাত্মিক ভাবে সম্মিলিত হও। শরীরের সৌন্দৰ্য্য ভুলিয়া গিয়া নর নারীর আধ্যাত্মিক প্রেমকে প্রেম কর। তাহাদের নিরাকার পবিত্র ভাব গ্রহণ কর; এবং পিতা মাতা, স্ত্রী পুত্র, ভ্রাতা ভগ্নী, বন্ধু বান্ধব সকলের মধ্যে যে ঈশ্বর-সন্তান আছেন, তাহাকে দেখিয়া আনন্দে ব্রহ্মরাজে, চলিয়া যাও।-(পৃঃ ৭৯)। পিতা যেমন নিরাকার, তাহার পুত্র কন্যারাও নিরাকার। { পৃঃ ৮• )। পরিবার কোথায়-- শিষ্য জিজ্ঞাসা করিলেন, পরিবার কোথায় ? আচাৰ্য বলিলেন, এখানে নহে, ওখানে নহে, তােমার অন্তরে। পুত্র জিজ্ঞাসা করিলেন, পিতা, আমাদের ঘর কোথায় ? পিতা বলিলেন, পিতা বলিলেন, এখানে নয়, খানে নয়; কিন্তু তােমার হৃদয়ে। পৃঃ ৮• ) পরলােকের সন্ধান। এই ঘর, এই পরিবার উভয়ই আমাদের অন্তরে। অতএব, অন্তরে প্রবেশ কর, দেখিবে এক নূতন রাজ্য ; সেখানে নিয়ম আছে, শাসন-প্রণালী আছে, রাজা আছেন। রাজা কে? যিনি জগতের নিয়ন্তা, অথচ ইহপরলােকবাসী অগণ্য আত্মদিগের বিচারপতি। (পৃঃ ৮১)। যিনি বলিলেন, স্বর্গরাজ্য অন্তরে, তিনি বলিতেছেন, স্বর্গরাজ্যের প্রজারাও অন্তরে। রাজা, প্রজা ও শাসন-প্রণালী, এ সমস্ত আধ্য- ত্মিক, সুতরাং সকলকেই অন্তরে খুঁজিতে হইবে।-(পৃঃ ৮১)। যে পরিমাণে ব্ৰহ্ম-প্ৰজাদিগের সঙ্গে প্রাণের যােগ, অন্তরের যােগ, সে পরিমাণে ব্রাহ্মের শ্রেষ্ঠতা এবং আধ্যাত্মিক উন্নতি। পৃঃ ৮২)। কিন্তু নিশ্চয়ই এমন দিন আসিবে, যখন এক একটা আত্মার মধ্যে সম্পূর্ণরূপে ঈশ্বরের রাজ্য এবং তাহার বিস্তীর্ণ পরিবার সংগঠিত হইবে।(পৃঃ ৮৩)। বাহিরের চক্ষে অস্থায়ী বাহিক বস্তু প্রতিবিম্বিত হয়; কিন্তু ভিতরের নয়নে চিরস্থায়ী আত্মার সৌন্দৰ্য্য, আত্মার প্রেম, পুণ্য এবং আত্মর জ্ঞানজ্যোতি প্রতিভাত হয়। ভক্তের উজ্জ্বল আন্তরিক চক্ষু শরীর ভেদ করিয়া আত্মাকে দর্শন করে, এবং যে আত্মার যেরূপ অবস্থা এবং স্বভাব, তাহাদের তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ঠিক সেইরূপ প্রকাশিত হয়। এইরূপে সহজেই ঈশ্বরের ব্রহ্মরাজ্য ভক্তের হৃদয়ে মুদ্রিত হয়। পৃঃ ৮৪) যখন আত্মায় আত্মায় যোগ হইবে, তখন কথা বলিবার প্রয়ােজন থাকিবে না, আপনা আপনি পরস্পরের ভাব পরস্পরের মধ্যে প্রবেশ করবে। সেই অবস্থায় দুই চক্ষু পরস্পরকে দেখিল, অমনই স্বর্গ রাজ্যের সেই উচ্চ পবিত্র মােহ আসিয়া পরস্পরকে আকৃষ্ট করি।
পরলােকের সন্ধান। কোন কথা বলিলেন না, অথচ অবাক হইয়াও ভাবের দ্বারা পরুস্পরের সঙ্গে কথা কহিলেন। দর্শনেই শ্রবণ হইল। পরস্পরের চক্ষে এমন কি দেখিলেন, যাহা আত্মাকে একেবারে মুগ্ধ করিয়া ফেলিল? সেই স্বর্গরাজ্যের সংবাদ পত্র । ভক্তের নয়নে সেই স্বর্গীয় প্রেম জলিতেছে। যাহারা এই প্রেম প্রভা না দেখিয়া কেবল নর নারীর চক্ষু দেখিয়া ভােল, তাহার পশু। এইরূপে যখন আত্মার মিলন হয়, তখন কথা বলিবার প্রয়ােজন হয় না, দেখিবামাত্র আত্মা আত্মাকে চিনিয়া লয়। ইহা অপেক্ষা উচ্চতর অবস্থায় পরস্পরকে দেখিবারও প্রয়ােজন হয় না, তখন সম্পূর্ণ আধ্যাত্মিকভাবে আত্মায় আত্মায় মিলন হয়। সেই অবস্থায় আমার বন্ধু কি ইংলণ্ডে, কি পরলােকে, যেখানেই কেন থাকুন না, আমাদের মধ্যে চুল মাত্র বিচ্ছেদ থাকিবে না, কেন না আত্মা ইহলােকে যাহা, পরলােকেও তাহা।-(পৃঃ ৮৫) আত্মায় আত্মায় কোন শারীরিক ব্যবধান নাই। প্রেমেই আত্মার যােগ, প্রেমের অভাবেই আত্মার বিচ্ছিন্ন অবস্থা, সুতরাং যতদিন প্রেম থাকিবে, ততদিন বন্ধুর লােকান্তরেও যােগের কোন পরিবর্তন নাই। পৃ: ৮৬)। ঈশ্বরের আধ্যাত্মিক রাজ্যে কাহারও মৃত্যু নাই। ইহলােকে থাকিয়া ভক্তগণ পরলােকবাসীদের সাহায্য লাভ করেন। পৃ: ৮৮) ব্রহ্মে বাস, ভাই ভগ্নীতে একত্ব আত্মার যেমন বিনাশ নাই, আত্মায় আত্মায় যে সম্বন্ধ, তাহারও অন্ত নাই।-(পৃঃ৯)। শান্তিজল কি ? ব্ৰহ্ম। পাপতাপে দগ্ধ ব্যক্তি যখন সেই ব্ৰহ্মরূপ- সাগরে প্রবেশ করে, তখন সহজেই তাহার সমস্ত আত্মাতে সেই পরলােকের সন্ধান। নিৰ্ম্মল শান্তিবারি সঞ্চারিত হয়। অতএব, ব্রাহ্মগণ, যদি শান্তি চাও, তবে কেবল ঈশ্বরের নিকটবর্তী হইয়া থাকিও না, তাহার মধ্যে প্রবেশ কর। ঈশ্বর-সহবাসী নয়, কিন্তু ঈশ্বরবাসী হইতে হইবে। (পৃঃ ৯৪)। আত্মার একটু সামান্য মৌন্দৰ্য্য দেখিলেই মন মােহিত হয়। আবার যখন ভাবি, ঈশ্বর-কৃপায় সেই আত্ম অনন্তকাল জীবিত থাকিবে, এবং তাহার রূপলাবণ্য ও গুণরাশি অনন্তকাল বৃদ্ধি হইবে, তখন দেখি, আত্মার আত্মায় যে প্রেম, তাহাও অনন্তকাল স্থায়ী। - পৃঃ ৯৬)। পরিবার (১) ঈশ্বর ভিন্ন দুটী মনুষ্যাত্মার পরস্পর মিলন অসম্ভব। যেমন একটা বিশেষ বস্তু আঠা মধ্যে রাখিবামাত্র দুটী প্রস্তর কিম্বা দুখানি ইষ্টক সংলগ্ন হয়, এবং সেই মধ্যস্থ বস্তু বিনষ্ট হইলেই দুখানা আবার দুদিকে বিচ্ছিন্ন হইয়া পড়ে, সেইরূপ দুটী আত্মার মধ্যে যদি ঈশ্বর মধ্যস্থ না হন, কদাচ তাহাদের মধ্যে পবিত্র যােগ হইতে পারে না।-(পৃঃ ১১) পিতার করুণা ভিন্ন কখনই একটা আত্মা আর একটা আত্মার নিকটতর হইতে পারে না।-(পৃঃ ১০১)। পরিবার (২) শরীরের আকার এবং রূপ যেমন ভিন্ন ভিন্ন, তেমনই লােকের বুদ্ধিও ভিন্ন ভিন্ন থাকিবে। দেহ মনের বিভিন্নতা কখনও আধ্যা- ত্মিক যােগের প্রতিবন্ধক নহে। এক প্রকার রূপ কি এক প্রকার পরলােকের সন্ধান। মত, এ সকল সামান্য নীচ ভূমির উপর আধ্যাত্মিক যােগ, স্থাপিত হয় না। সেই ভূমি অতি উচ্চ এবং অপরিবর্তনীয়, যাহার উপর ‘আত্মায় আত্মায় যােগ হয়। সেই ভূমি ছাড়িলে অন্য স্থানে যােগের বৃক্ষ জন্মে না। যে ভূমির যে বৃক্ষ, সে ভূমিতে সেই বৃক্ষ রােপিত হইলেই তাহা সারবান হইয়া ক্রমে ক্রমে ফল ফুলে সুশােভিত হয়। যে ক্ষেত্ৰতত্ব জানে, সেই জানে, কোন্ ভূমি কোন্ বৃক্ষের উপযােগী। গাছ হইলেই হয় না, কিন্তু উপযুক্ত ভূমিতে রােপণ করিলেই তাহা সফল হয়।-(পৃঃ ১১০)। এক ঈশ্বর আমাদের সকলের পিতা, এবং তাহার সঙ্গে এই সম্পর্ক চিরকাল থাকিবে। শরীর পড়িয়া থাকিবে শ্মশানে; কিন্তু আত্মা চিরকাল ঈশ্বরেতে বাঁচিয়া থাকিবে এবং তাহাকে পিতা বলিয়া ডাকিবে। এই সংসারের যাহা কিছু দেহ কিম্বা মনের দ্বারা গ্রহণ করি, সকলই পড়িয়া থাকিবে; কিন্তু পিতার সঙ্গে যে আমার প্রাণের যােগ, তাহার কিছু মাত্র হ্রাস হইবে না।—(পৃঃ ১১৩)। * * স্বর্গরাজ্য— বিশ্বাস-নয়ন খুলিলে প্রতিজন দেখিতে পাইবেন, বহুদূরে সুন্দর স্বর্গরাজ্য প্রসারিত রহিয়াছে। সেখানে সমুদয় মনুষ্যজাতি সুখ শান্তি এবং স্বর্গীয় সৌন্দর্য্যে সুশােভিত। পৃঃ ১২৪)। এই পৃথিবীর মধ্যে রাখিয়াই তিনি আমাদিগকে স্বর্গের জন্য প্রস্তুত করিতেছেন। পৃঃ ১২৫)। এক দিকের স্বর্গরাজ্য অর্থাৎ পরলােকের স্বর্গ সম্পর্ণরূপে নিরা- কার এবং অদৃশ্য, আর এক দিকের অর্থাৎ এই পৃথিবীর স্বর্গ যদিও ক্ষপাতহঃ সাকার, কিন্তু গৃঢ়রূপে দেখিলে ইহাও নিরাকার। এই পরলোকের সন্ধান। দু’দিক হইতেই শৃঙ্খল আসিয়া আমাদিগকে আকর্ষণ করিতেছে। (পৃঃ ১২৫)। ভবিষ্যতে ঈশ্বর আছেন, মৃত্যুর পরেও পরলােকে তিনি আমা- দিগকে রক্ষা করিবেন, এই বিশ্বাস থাকিলেই মৃত্যুর সময় আনন্দমনে এই পৃথিবী পরিত্যাগ করিয়া তাহার নিকট চলিয়া যাইতে পারি। (পৃঃ ১২৫)। প্রত্যেকের অন্তরে তিনি স্বর্গরাজ্যের আদর্শ রাখিয়া দিয়াছেন, কেন না। তিনি জানেন, ইহা ভিন্ন মনুষ্যসন্তান কখনই স্বর্গরাজ্য নিৰ্মাণ করিতে পারে না। পৃঃ ১২৯)। অতএব কেহই নিরাশ হইও না, ঈশ্বর হার প্রত্যেক পুত্র কন্যার জন্য একটী সুন্দর গৃহ নিৰ্মাণ করিতেছেন, সেই গৃহে বসিয়া চিরদিন আমরা তাহার সৌন্দর্য্য দেখিব, এবং তাহার অগণ্য সন্তান- দিগের সঙ্গে সম্মিলিত হইব। পৃঃ ১৩২)। স্বর্গরাজ্যে বিশ্বাস অন্তরের স্বর্গরাজ্য আগে, বাহিরের স্বর্গরাজ্য পরে, যখন ঈশ্বরের স্বর্গরাজ্য ভক্তের আত্মাতে উজ্জ্বলরূপে প্রকাশিত হয়, তখন আপনা আপনি তাহা যথাসময়ে বাহ্যিকরূপে পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত হয়। (পৃঃ ১৩৫)। গর্ভস্থ সন্তান যখন সম্পূর্ণাবয়ব লাভ করে, তখন আর ইহা সেই অন্ধকারময় জরায়ু মধ্যে থাকিতে পারে না ; দশমাস যে পৃথিবীর জন্য প্রস্তুত হইতেছিল, যাই তাহার সমুদয় অঙ্গ, পূর্ণ হইল, তখনই সে পৃথিবীতে আসিয়া প্রকাশিত হইল। সেই শিশুকে দেখিয়া সকলের হৃদয় উল্লাসে পূর্ণ হইল। সেইরূপ যখন ভক্তহৃদয়ে স্বর্গরাজ্যের পরলােকের সন্ধান। ছবি সম্পূর্ণরূপে চিত্রিত হয়, যথাসময়ে তাহা আপনি, পৃথিবীতে প্রকাশিত হইয়া পড়ে। অতএব বন্ধুগণ, তােমাদের আত্মাতে সেই শান্তিনিকেতনের বীজ অঙ্কুরিত হইতে দাও, তাহা হইতে যথা- সময়ে নিশ্চয়ই স্বর্গরাজ্য প্রসূত হইবে।(পৃঃ ১৩৫)। মৃত্যুর পর স্বর্গে যাওয়া দুরের কথা, কিন্তু ব্রাহ্মধৰ্ম্মের গুণে ইহ- লােকে থাকিয়াই আমরা স্বর্গ ভােগ করিব।-(পৃঃ ১৪১)। অমরত্ব লাভের স্থান- মনুষ্যের মনকে যদি একটা প্রশস্ত রাজ্যের সঙ্গে তুলনা করা ৰায়, তবে বলিতে হইবে, সে রাজ্যের প্রত্যেক বিভাগ মৃত্যুর অধীন। মনের মধ্যে কোন স্থানে সংশয়, কোন স্থানে বিশ্বাস, কোন স্থানে পাপ, কোন স্থানে পুণ্য, কোন স্থানে নরক, কোন স্থানে অশান্তি, কোন স্থানে শান্তি, ইত্যাদি নানা প্রকার ভাব এবং অভাব রহিয়াছে ; কিন্তু বাহিরে যেমন সকলের উপরেই মৃত্যুর আধিপত্য, কি সুস্থ, কি জীর্ণ শীর্ণ, কি ধনী, কি দরিদ্র, কি মূখ, কি পণ্ডিত, কি ধাৰ্ম্মিক, কি অসাধু, কেহই মৃত্যুকে অতিক্রম করিতে পারে না, মনের বিবিধ বিভাগ সম্পর্কেও সেইরূপ। কাহারও প্রতি পক্ষপাতী হওয়া মৃত্যুর স্বভাব নয়, দেখ মৃত্যু সকলকেই গ্রাস করিতেছে। ইহার স্পর্শে কল্য যাহা ছিল, অদ্য তাহা নাই। মন সম্পর্কেও সেইরূপ। ( পৃঃ ১৯) জগতের ইতিহাস পাঠ কর, নিজের জীবন দেখ, দেখিবে, সর্বত্র মৃত্যুর অধিকার; কিন্তু প্রতিজনের আত্মার মধ্যে একটী স্থান আছে, যেখানে মৃত্যু যাইতে পারে না, সেই স্থান অমর ; মৃত্যু বরং মরিতে পারে, কিন্তু মনের সেই বিভাগ কখনই মরে না। ঈশ্বর স্বয়ং তাহা পরলােকের সন্ধান। ৫৯ অমর করিয়া সৃষ্টি করিলেন। তাহা কি, কেহ বলিতে পারে না; কিন্তু সেই স্থানে আসিবার জন্য মনুষ্য-স্বভাৰ সৰ্ব্বদা ব্যস্ত।-পৃঃ ১৯১) অভ্যাসই শত্রু, অভ্যাসই মিত্র ঈশ্বরের নিয়ম অথও এবং অপরিবর্তনীয়। যেমন জড় জগতে, সেইরূপ আমাদের মনােরাজ্যে, তাহার নিয়ম অলঙ্ঘনীয়।(পৃঃ ২০৩) যেমন ছায়া অপেক্ষা বস্তুর এবং অসত্য অপেক্ষা সত্যের বল অধিক, সেইরূপ পাপ অপেক্ষা পুণ্যের বল অধিক। কেননা পাপে মৃত্যু এবং পুণ্যেতেই আত্মার যথার্থ জীবন। পৃঃ ২০৪) অচীর্চের উপদেশ—পঞ্চম খণ্ড। স্বর্গ- স্বৰ্গ কি ? যেখানে ঈশ্বর তাহার ভক্ত সন্তানদিগকে লইয়া বাস করেন, তাহাই স্বর্গ, ইহা ভিন্ন স্বর্গ আর কিছুই নহে। যেখানে ঈশ্বরের সন্তানগণ তাহার উপাসনা এবং তাহার নাম গান করিয়া পরিত্রাণ লাভ করেন, তাহাই স্বর্গ। যেখানে ঈশ্বর স্বয়ং মধ্যস্থলে থাকিয়া তাহার পুত্রে পুত্রে, কন্যাতে কন্যাতে, এবং পুত্র কন্যাতে পবিত্র প্রেমযােগে পরস্পরকে সম্বদ্ধ করেন, যেখানে জীবাত্মা পরমাত্মাকে পাইয়া সংসারের সমুদয় পাপ তাপ ভুলিয়া যায়, যেখানে মহাপাতকীর হৃদয় হইতে ঈশ্বরের প্রতি প্রেম, ভক্তি এবং কৃতজ্ঞতা উত্থিত হয়, যেখানে মনুষ্যের স্বার্থপরতা উদার প্ৰেমসিন্ধু মধ্যে এবং তাহার রিপু সকল জ্বলন্ত পুণ্যের মধ্যে বিলীন হইয়া যায়, যেখানে কোটী কোটা মনুষ্য ঈশ্বর-প্রেমে এক হইয়া যায়, তাহাই স্বর্ণ।—(পৃঃ ৩)
পরলােকের সন্ধান
স্বর্গে একদিকে যেমন ঈশ্বরের সঙ্গে মনুষ্যের অনন্তকালের ঘূঢ়
তম প্রেমযােগ, অপরদিকে তঁাহার সন্তানদিগের মধ্যে চিরকালের জন্য
অখণ্ড প্রেমযােগ। যেখানে যথার্থ স্বর্গের মিলন, সেখানে দ্বিবচন কিম্বা
বহুবচন নাই।
সেখানে সকল নরনারী এক-প্রাণ, একাত্মা ;
জাতি-
ভেদ, বর্ণভেদ সেখানে স্থান পাইতে পারে না। পৃ: ৪)
রূপ, গুণ, ধন, মান, জ্ঞান, ধৰ্ম্ম কিম্বা জাতিভেদ, কিছুতেই স্বর্গীয়
বন্ধন শিথিল করিতে পারে না। সেখানে সকলেই এক প্রাণ, একাত্মা;
ইহাই স্বর্গের প্রধান লক্ষণ। পৃঃ ৫)
সেখানে শােক, তাপ এবং হৃদয়ভার নাই। যাহারা স্বর্গের
বাহিরে, তাহারাই মলিন-হৃদয়, কিন্তু যাঁহারা স্বর্গের মধ্যে, তাহারা
চির-প্রফুল্ল ।
সেখানে সৰ্ব্বদাই আনন্দ-স্রোত, পুণ্য-স্রোত প্রবাহিত
হইতেছে ; নিরানন্দ, অপবিত্রতা সেখানে প্রবেশ করিতে পারে না।
-(পৃঃ ৬)
স্বর্গে আংশিক প্রেম, আংশিক শান্তি নাই, সেখানকার সকলই
সম্পূর্ণ পৃঃ ৬)
ঈশ্বর অতি নিকটে--
ধন্য তিনি, যিনি জীবন মৃত্যু, সম্পদ বিপদ, এবং সজন নির্জনে
পিতার মুখে এই কথা শুনেন, “এই আমি”। এই যে সুলভ ব্রহ্মধন,
ইহা আমাদের প্রতিজনের নিকটে। পৃ: ১৩)
তিনি আমার নিকটতম বন্ধু এবং প্রাণের সহিত গ্রথিত, ইহা
উপলব্ধি করিলে কি আর অন্তরে বিষাদ নিরানন্দ থাকিতে পারে ?
( পৃ: ১৪)
পরলোকের সন্ধান। কাহারও দূরে যাইতে হইবে না, নিকটে ঈশ্বরদর্শন পাইয়া শান্তি সুখ লাভ করিবে।-(পৃঃ ১৪) ভাই ভগ্নী- কিন্তু ঈশ্বরের আদেশে ইনি ঈশ্বরের পুত্র, ইনি ঈশ্বরের কন্যা, ইহা স্পষ্ট বুঝিয়া যখন কোন আত্মাকে আমার ভাই ভগ্নী বলিয়া আত্মার আসনে বরণ করি, তাহা চিরকালের জন্য এবং সেই সম্পর্কই যথার্থ স্বর্গীয় এবং পারলৌকিক।—(পৃঃ ১৬) দীক্ষিতদিগের প্রতি উপদেশ- তাহাকে গুরু বলিয়া ধারণ কর; জ্ঞান, প্রেম, পুণ্য, শান্তি, যাহা চাও, সকলই তাহার কাছে পাইবে।-(পৃঃ ২০ ) * আত্ম-পরিচয়ে ব্রহ্মপরিচয় ভক্তেরা চিরকাল বণিয়া আসিতেছেন, মনুষের মধ্যে আত্ম বলিয়া যে পুরুষ আছে, যিনি সেই পুরুষকে চিনিয়াছেন, তিনি নিত্য সুখের আধার পরম পুরুষকে দেখিয়াছেন; কেননা সেই পুরুষের সঙ্গে পরম পুরুষের নিগুঢ় প্রত্যক্ষ যােগ।-(পৃঃ ৪২) যাহার চক্ষু একবার সেই স্বর্গের শােভা দেখিয়াছে, আর তিনি তাহা ভুiতে পারেন না। পৃঃ ৪ : অতএব বন্ধুগণ, আর বাহিরে যাইও না, আত্মার মধ্যে প্রবেশ কর, আত্মারূপ শাস্ত্র পাঠ কর, আত্মারূপ আন্তরিক পথে চলিতে থাক, ) পরলােকের সন্ধান। এবং আত্মারূপ খনি খনন কর, আপনি আপনার রূপ দেখিয়া মুগ্ধ হইবে, আপনি আপনার ধনে ধনী হইবে। সুখ বল, শান্তি বল, নিত্য ধন বল, বাহিরে অন্বেষণ করিতে হইবে না, আপনার মধ্যে সকলই দেখিবে।-(পৃঃ ৪৪ ) জীবন্ত সাধন ধৰ্ম্মরাজ্যে এমন একটি উচ্চ স্থান আছে, যাহা অধিকার করিলেই সাধকের সঙ্গে ব্রহ্মের প্রত্যক্ষ যোেগ হয় এবং উপাসনা তখন স্বভাবতই সরস হয়।-(পৃঃ ৫২) যাহারা দেহত্যাগ করিয়াছেন, তাহাদের কাহারও মৃত্যু হয় নাই। তাহারা সকলেই সেই জীবনের জীবন ঈশ্বরের ক্রোড়ে বাঁচিয়া আছেন। কোথায় কি অবস্থায় রহিয়াছেন, তাহা আমরা জানি না, সে বিষয় ঈশ্বর আমাদিগকে জানিতে দেন নাই; কিন্তু এই জন্য আমরা ঈশ্বরকে ধন্যবাদ করি যে, তিনি আমাদের অন্তরে এই জ্ঞান দিয়াছেন যে, ইহলােকে আমি যাঁহার কাছে বাঁচিয়া আছি, পরলােকে আমার সমুদয় বন্ধুরা তাহারই কাছে বাঁচিয়া আছেন। এই জ্ঞানে আমাদের কত আনন্দ হয়, ইহলােকে আমরা যে ঈশ্বরকে ডাকিতেছি, তিনিই পরলােকবাসী সকলের ঈশ্বর। সকলেই এক ঈশ্বরের কাছে উপস্থিত রহিয়াছে, সুতরাং ইহ পরলোক দুইই আমার কাছে। ইহাই পরলােক সম্পর্কে জীবন্ত সাধন। যম নামে কোন জীব নাই, মৃত্যু বলে কিছুই নাই, এ ব্যক্তি মৃত, ইহার অর্থ নাই, কেননা দুইই জীবিত। আত্মার পক্ষে কেবল পাপই মৃত্যু।-(পৃঃ ৫৪ ) ঈশ্বরতত্ত্ব, পরলােকতত্ত্ব এবং নীতিতত্ত্ব, জীবন্ত ভাবে তােমরা এই তিনটী সাধন কর। দেখিবে, অচিরে তোমাদের মধ্যে ঈশ্বরের পবিত্র
পরলােকের সন্ধান।
রাজ্য সংস্থাপিত হইবে, এবং যে জন্য আমরা বাড়ী হইতে আসিয়াছি,
তাহ সুসম্পন্ন হইবে। পৃঃ ৫৬ )
*
*
*
ঈশ্বর আমাদের সহায়-
বিপকালে, “হে দয়াময়, কোথায় রহিলে, হে দয়াময়, কোথায়
হিলে” বলিয়া চীৎকার করিয়া ডাক ; দেখিবে, ডাকিতে না ডাকিতে
সেই বিপদভঞ্জন পিতা আসিয়া তােমাদের সহায়তা করিবেন।
(পৃঃ ৫৮)
নির্জন গহন বনে একাকী ভ্ৰমণ করিতে করিতে কোন বন্ধুকে
লাভ করিলে যেমন মনুষ্য নির্ভয় হয়, সেইরূপ এই সংসার-পথে যিনি
সেই ভয়বারণ ঈশ্বরকে লাভ করেন, তাঁহার আর আপদের ভয় থাকে
। পৃঃ ৫৮ )
ঈশ্বর আমাদের সহায়, ইহা শুনিলে কাহার মন না প্রফুল্ল হয়?
দেশ বিদেশে তিনি ভিন্ন আর উপায় নাই। দীনবন্ধু বলিয়া কাতর
প্রাণে তাহাকে ডাক, অন্তরের দুঃখ পাপ আপনি দূর হইবে।
(পৃ: ৫৮)
তাহারই গুণ গান কর, প্রচুর সুখ শান্তি পাইবে, আর দুঃখ ভয়
থাকিবে না; সমুদয় কষ্ট যন্ত্রণা অতিক্রম করিয়া সেই শান্তিনিকেতনে
পিত্রালয়ে প্রবেশ করিতে পারিবে।-(পৃঃ ৫৯)
তিনি হস্ত ধরিয়া তােমাদিগকে সেই গৃহে লইয়া যাইবেন, যেখানে
নিত্য পুণ্যের প্রবাহ প্রবাহিত হয়, এবং যেখানে ভক্তের হৃদয় নিত্য
স্বর্গের আনন্দ-জ্যোৎস্নায় পুলকিত হয়। পৃঃ ৫৯)
পরলােকের সন্ধান।
;
নৈকট্য সাধন-পরলােক
ঈশ্বরকে যেমন ভক্ত নিকটে উপলব্ধি করেন, সেইরূপ পরলোক ও
ভক্তের অতি নিকটে। অবিশ্বাসীর নিকট পরলােক অতি দূরে এবং
অন্ধকারময়,
অজানিত স্থান কিন্তু ভক্ত পরলােকবাসী লােকদিগের
সহিত একত্রে বাস করিতেছেন। কেননা তিনি জানেন, যেখানে
ঈশ্বর, সেখানেই পরলােক। ঈশ্বর নিকটে, সুতরাং পরলােকবাসী
আত্মা সকলও নিকটে। পৃথিবীতে যে সকল মহাত্মা আমাদের
উপকার করিয়া গিয়াছেন, পরলােকেও তাহারা আমাদের মঙ্গল
সাধন করিতেছেন, ভক্ত ইহা স্পষ্টরূপে অনুভব করেন।-(পৃঃ ৬১)
সর্বাগ্রে ঈশ্বরকে কাতর প্রাণে ডাক, তিনি পরলােক এবং স্বর্গ
তোমাদের নিকটে আনিয়া দিবেন। পৃ: ৬২)
৯
নিরাকার ঈশ্বর-দর্শন
সুখ এ পৃথিবীতে নাই, অসার বিষয়-সুখে জীবের তৃপ্তি হয় না,
প্রকৃত ঈশ্বরকে না জানিলে আত্মার শান্তি নাই।-(পৃঃ ৭৫)
অমৃত-পাত্র হাতে লইয়া হৃদয়ের মধ্যে তিনি দাড়াইয়া রহিয়াছেন
দগ্ধ মনের উপর প্রেমের শীতল জল বর্ষণ করিবেন, এই তাহার সঙ্কল্প।
( পৃঃ ৭৬)
দীক্ষিতগণের প্রতি উপদেশ
যখনই তাহাকে ডাকিবে, তখনই তিনি দেখা দিয়া তােমাদের
আত্মাতে প্ৰেমাত বর্ষণ করিবেন, এবং মাতার ন্যায় পুণ্য-সুধা পান
করাইবেন।-(পৃঃ ৮৩)
পরলােকের সন্ধান। সশরীরে স্বর্গে গমন- যতদিন দেহ লইয়া আমরা স্বর্গে প্রবেশ করিতে না পারি, তত- দিন কোন মতেই আমাদের দুঃখ পাপ দূর হইবার নহে। পৃঃ ৮৮) শরীর থাকিতেই আমরা স্বর্গে যাইব, ইহা পরমেশ্বরের ইচ্ছা, বর্গে যাইবার জন্য আমাদিগকে মৃত্যুর প্রতীক্ষা করিতে হয় না। কিন্তু সেই নাশ হইবার পূর্বে এই পৃথিবীতে থাকিতেই আমরা স্বর্গের সুখ ভােগ করিব, ইহা আমাদের স্বর্গীয় পিতার অভিপ্রায়। পৃঃ ৮৮) সশরীরে স্বর্গে যাওয়া, ইহার অর্থ কি? ইহা নহে বে, শরীর - ভক্ত হইয়া স্বর্গের সুখে মুগ্ধ হইবে; কিন্তু ইহার অর্থ এই যে, শরীরের মধ্যে যে আত্মা আছে, শরীর থাকিতে থাকিতেই সেই আত্মা সন্ন্যাসী হইয়া ঈশ্বরের প্রেমে উন্মত্ত থাকিবে। পৃথিবীর শরীর পৃথিবীতেই থাকিবে; কিন্তু আত্মা সংসারের সুখে উদাসীন হইয়া স্বর্গে বাস কৰিৰে এবং ঈশ্বরের আনন্দে পুলকিত থাকিবে।—পৃঃ ৮৯) ঈশ্বরের প্রকৃত ভক্ত জানেন যে, স্বর্গে যাইবার জন্য শরীরকে বিনাশ করিতে হয় না, এবং কিছু মাত্র ইহার বিষয় চিন্তা করিবারও প্রয়ােজন নাই, ইহার নিঃশ্বাস রুদ্ধ করিতে হয় না, অথবা ইহার রক্ত স্রোত থামাইতে হয় না; কেননা শরীর আত্মার দাস, আত্মা ঈশ্বয়ে সন্নিধানে উপস্থিত হইলে, শরীর কিছুমাত্র বাধা দিতে পারে না। মৃত্যুকে ডাকিয়া বলিতে হয় না, আমার শরীর বিনাশ কর। নতুবা শমীর থাকিতে আমার আধ্যাত্মিক জীবনের অভ্যুদয় হয় না। পৃঃ ৯১) সপরিবারে স্বর্গে গমন- যেখানে সাধক বিশ্বাস এবং বিয়ের উচ্চ শিখরে বসিয়া ঈশ্বরের চরণ ধারণ করেন, যেখানে সাধকের প্রেম জলস্রোতের আয় প্রবাহিত পরলােকের সন্ধান। হইয়া নিত্য ঈশ্বরের শ্রীচরণ ধৌত করে, যেখানে ভক্তি কৃতজ্ঞতার সৌরভে আত্মা নিত্য আমােদিত হয়, এবং সহজেই সাধকের মন ঈশ্বরের নাম গানে উন্মত্ত হয়, সেখানেই আমাদের দয়াময় পিতার স্বর্গ। যেখানে প্রকৃত বিশ্বাস এবং গভীর জ্ঞান ঈশ্বরের জ্বলন্ত সত্তা এবং অনন্ত মহিমা আবিষ্কার করে, যেখানে প্রেম এবং ভক্তি দয়াময় ঈশ্বরকে অতি নিকটে উপলব্ধি করে, যেখানে ভক্ত অনুগত সেবকের ন্যায় প্রভু পরমেশ্বরের আজ্ঞা পালন করেন, সেখানেই আমাদের যথার্থ স্বর্গ। অতএব কেহই বহিবিষয়ে স্বর্ণ অন্বেষণ করিও না; কিন্তু সকলেই হৃদয়ের পথে অগ্রসর হও, অচিরে স্বর্গ লাভ করিয়া সুখী হইবে। পৃঃ ৯৩) বহির্জগতে যে সৌন্দৰ্য্য, তাহার কবি অনেক, কিন্তু আত্মার মধ্যে যে পরম সুন্দর প্রেমময়ের রাজ্য, তাহার কবি নাই।—(পৃঃ ৯৪) বল, এই যে হৃদয়ের মধ্যে ঈশ্বরের রাজ্য, ইহাই আমাদের স্বর্গ। ইহকাল, পরকাল, অনন্তকাল আমরা এই স্বর্গেই বাস করিব, অন্য স্বর্গ আমরা চাহি না। পৃঃ ১৪) সেই ভিতরের স্বর্গরাজ্যে লইয়া যাইবার জন্য প্রতিদিন ঈশ্বরের রথ আসিতেছে, যদি একাকী যাইতে চাও, সেই রথ ফিরিয়া যাইবে; কিন্তু যদি সবান্ধবে, সপরিবারে যাইতে প্রস্তুত হও, তবে সেই স্বর্গের রথ তােমাদিগকে সশরীরে স্বর্গে লইয়া যাইবে।-(পৃঃ ১০০ ) গঃ স্বর্গ-প্রাপ্তি অৰ্গ-প্রাপ্তির জন্য পৃথিবী পরিত্যাগ করিয়া স্থানান্তরে যাইতে হয়, ইহা আমরা মানি না। কোন বিশেষ স্থানে আমাদের স্বর্গ আছে, তাহা আমরা বিশ্বাস করি না, স্থান পরিবর্তনে কাহারও স্বর্গ-লাজ পরলােকের সন্ধান। হয় না ;, কিন্তু হৃদয়ের ভাব-পরিবর্তনেই যথার্থ অর্গ-লাভ হয়। (পৃঃ ১০২) স্বৰ্গ-প্রাপ্তি কি ? পৃথিবীর আসক্তি পরিত্যাগ করিয়া ঈশ্বরের সহিত যােগ সংস্থাপন করা। যে অবস্থায় পৃথিবীর মধ্যে অবস্থান করিয়াও আত্মা ঈশ্বরে বাস করে তাহাই স্বৰ্গ, এবং তাহাই আমাদের দেৰত্ব। পৃঃ ১০২) ভাই ভগিনী অন্তরে-- ঈশ্বরের সঙ্গে যেমন প্রতি আত্মার এরূপ নিগূঢ় এবং নিত্য প্রাণ- যােগ, ভাই ভগ্নীর সঙ্গেও মনুষের সেইরূপ আধ্যাত্মিক এবং চিরস্থায়ী সম্পর্ক ; এই যােগ ভুলিয়া যাহারা বাহিরে ভাই ভগ্নী অন্বেষণ করে, তাহাদিগকে একদিন নিশ্চয়ই নিরাশ হইয়া ফিরিয়া আসিতে হয়। ভাই ভগ্নীরাও বাহিরে নহেন; কিন্তু অন্তরে। পৃঃ ১১৯) ; * দীক্ষিতদিগের প্রতি উপদেশ ব্রাহ্ম হইয়াছ কেন, তাহা কি বুঝিতে পারিতেছ না? সুখধামে লইয়া যাইবেন, এই জন্য ঈশ্বর তােমাদিগকে ডাকিয়াছেন; ঐ দেখ পথ শেষ হইয়া আসিতেছে, নিকটে কেমন সুন্দর একটী নিকেতন দেখা যাইতেছে, সেখানে প্রেম ভক্তি পুষ্প সকল ফুটিয়াছে, সমস্ত গৃহ গন্ধে আমােদিত। ভ্রাতৃগণ! এ ঘর ঈশ্বর তোমাদের জন্য নির্মাণ করিতেছেন; এ ঘরে গিয়া ভাই ভগ্নীদিগকে দেখিলেই পরিত্রাণ । ইহারই নাম শান্তিনিকেতন, এখানে আসিলে মহাপাপী পবিত্র হয়, নিঃসম্বল সম্বল লাভ করে।-(পৃঃ ১৪৪ ) © পরুললকের সন্ধান। কূল ও নদী- শান্তিবারির প্রয়ােজন নাই, এমন লােক নাই।-(পৃঃ ১৬২) অতলস্পর্শ অগাধ শান্তিবারি মস্তকের উপর দিয়া চলিয়া যাইতেছে, অন্য বিষয় কিরূপে দেখিব ? চারিদিকেই ঈশ্বরের পাদপদ্ম হইতে প্রেমজল, 'ভক্তিজল, সুখ, শান্তিজল বহিতেছে। (পৃঃ ১৬৪) দেব-প্রকৃতি কিন্তু বাহিরে যে পরিমাণে চক্ষু অশ্রুপাত করিবে, আত্মার গভীরতম স্থানে তাহারা সেই পরিমাণে স্বর্গের প্রফুল্লতা লাভ করি বেন।-(পৃঃ ১৮১) আত্মার গভীরতম স্থানে স্বর্গরাজ্য। পৃঃ ১৮২) স্বর্গীয় সম্বন্ধের সৌন্দৰ্য্য প্রত্যেক মনুষ্য তাহার পুত্র, কিম্বা কন্যা। তিনি জানেন, জগদ্বাসী প্রত্যেকের সঙ্গে তাহার এই একটি সম্বন্ধ আছে, যাহা চিরস্থায়ী, মৃত্যু বা বিনাশ করিতে পারে না, এক পাপ, পুণ্য, অথবা অন্য কোন পরিবর্তনেও যাহার বিনাশ নাই। পৃঃ ২••) ,, আশা-শাস্ত্র- যাহারা কেবল এই দেখেন, রাত্রির পর দিন আসিবেই, দুঃখের পর সুখ আসিবেই, বিপদের পর সম্পদ আসিবেই, কোন পরিবর্তনেই তাহাদের মৃত্যু নাই।(পৃঃ ২১৫) পরলােকের সন্ধান। চির উন্নতি শরীরের যেমন বৃদ্ধি হয়, আত্মারও সেইরূপ উন্নতি হয়। ভৌতিক নিয়মে শরীরের বৃদ্ধি, মানসিক নিয়মে অত্মার উন্নতি। শরীরে বৃদ্ধির সীমা আছে; কিন্তু আত্মার উন্নতির সীমা নাই।-(পৃঃ ২৩৬) উপাসনাতে সুখ- উপাসনাই আমাদের পথ এবং উপাসনাই আমাদের গমস্থান। উপাসনাই আমাদের উপায়, এবং উপাসনাই আমাদের উদ্দেশ্য। ঈশ্বরের প্রেমরাজ্যে যাইতে হইলে উপাসনা ভিন্ন আর অন্য পথ নাই। ইহা যেমন পথ, ইহাই আবার গমস্থান। পৃ: ২৪২) ঈশ্বর এত দয়া করিয়া আমাদিগকে কেবল তাহার সেই দূরস্থ পবিত্র গৃহে যাইতে আদেশ করিয়া নিশ্চিন্ত হন নাই, কিন্তু নিজে সঙ্গে সঙ্গে থাকিয়া, আমাদের পথের কষ্ট দূর করিবার জন্য পথের ধারে ধারে প্রচুর অন্ন, এবং তাহার শীতল প্রেমবারিপূর্ণ সবােবর খনন করিয়া রাখিয়াছেন। পৃঃ ২৪৪) উপাসনাতে যতদিন সুখী হইব, ততদিন কোন বিপদ পরীক্ষা ভয় দেখাইতে পারে না। ধন্য ঈশ্বর যে, তিনি উপাসনার মধ্য দিয়া আমাদের অন্তরে স্বর্গের মিষ্টতা ঢালিয়া দেন। পৃঃ ২৪৪) অনন্তকাল-সাগর- সেই অনন্তকাল যাহা ভাবিলে হৃদয় কম্পিত এবং প্রাণ স্তব্ধ হয়, ঈশ্বরের কৃপায় বিশ্বাসীদিগের নিকট তাহা আনন্দের ব্যাপার। { পৃঃ ২৫৪ ) পরলােকের সন্ধান। ক আমাদের স্বর্গরাজ্য সেই মহাকাল-সাগরে ভাসিতেছে। (পৃঃ ২৫৫) ভাই ভগ্নীদের সঙ্গে একবার সেই অনন্তকালের প্রেম-শৃঙ্খলে বদ্ধ হইলে আর বিচ্ছেদ হইতে পারে না। সেখানে পরিবর্তন নাই। প্রাতঃকাল, সায়ংকাল, মাস, বৎসর, শতাব্দী সেখানে নাই, এক অনন্তকাল সেখানে ধূ ধূ করিতেছে। আমাদের স্বর্গরাজ্য সেই অসীম সাগরে ভাসিতেছে। যদি আমরা তাহার মধ্যে প্রবেশ করিতে পারিতাম, তাহা হইলে সেই পরলােকবাসী এবং এই পৃথিবীর সমুদয় ঈশ্বর-পরায়ণ আত্মদিগের সঙ্গে আমরা এক-হৃদয় হইয়া সেই মহা- সাগরে ভাসিতাম।-(পৃঃ ২৫৬) # নির্লিপ্ত ঈশ্বর জগতে বাস করিতে হইবে; কেন না ইহা আমাদের বিদ্যালয় । এই বিদ্যালয়ে নানাবিধ পরীক্ষায় সংশােধিত এবং উত্তীর্ণ হইয়া আমাদিগকে ঈশ্বরের অমৃতরাজ্যে যাইতে হইবে। আমরা পৃথিবীর নানাপ্রকার ঘটনার মধ্যে পড়িয়া পরীক্ষিত এবং উন্নত হইব, এইজন্য আমাদের গুরু পথের মধ্যে এই বিদ্যালয় স্থাপন করিয়াছেন। এখানে সহস্র বিঘ্ন বিপদ এবং সহস্র প্রকার নিরাশা মৃত্যুর সঙ্গে সম্মুখ সংগ্রাম করিতে হইবে। শত শত প্রলােভনের মধ্যে বাস করিতে হইবে, অথচ কিছুতেই আত্মা মুগ্ধ এবং মৃতপ্রায় হইবে না। সম্পদ বিপদ, সুখ দুঃখ, রােগ শােক ইত্যাদি সমুদয় ঘটনার মধ্যে ঈশ্বর যাহা শিক্ষা দেন, বিনীতভাবে তারা শিক্ষা করিতে হইবে।-(পৃঃ ২৭২) যে মৃত্যু ব্ৰহ্মাণ্ডকে চূর্ণ করে, ঈশ্বরের শরণাগত ব্যক্তির উপর সেই মৃত্যুর কোন হস্ত নাই।--(পৃঃ ২৭৪) ।
পরলােকের সন্ধান। ৭১ ঈশ্বরের আশ্রিত ব্যক্তির মৃত্যু নাই; কেবল তাঁহাকে বিশ্বাস করিতে হইবে যে, আমি ঈশ্বরের আশ্রিত। যিনি ইহা বিশ্বাস করেন, পপেী হইয়াও তিনি অভয় পদ লাভ করিয়াছেন।-(পৃঃ ২৭৫) প্রত্যেক বিপদ গুরু হইয়া আমাদিগকে শিক্ষা দান করিয়া চলিয়া যাইবে। পৃঃ ২৭৬) যেমন পঙ্ক হইতে পদ্ম সকল প্রস্ফুটিত হয়, সেইরূপ ঈশ্বরের কৃপায় এই পৃথিবীর পাপ হইতে পুণ্য, দুঃখ হইতে সুখ, নিরাশা হইতে আশা উৎপন্ন হয়। পৃঃ ২৭৬) * প্রার্থনার উত্তর অবশ্যম্ভাবী প্রার্থনারূপ পরলােকের সম্বল হস্তে লইয়া, আনন্দের সহিত শান্তি- ধামে চলিয়া যাইবে।(পৃঃ ২৮) * পাপের অন্ত আছে, পুণ্যের অন্ত নাই আশ্রিত ব্যক্তির উপর মৃত্যুর কিছুমাত্র অধিকার নাই, ব্রাহ্মধর্মের এই প্রথম আশার কথা। পৃঃ ২৮১) যেখান হইতে যাহা আসে, সেখানে তাহা যাইবেই যাইবে। ঈশ্বর হইতে যাহা নিঃসৃত হয়, তাহা যাহার চরণে জন্মগ্রহণ করিয়াছে, অনন্ত- কাল তাহারই দিকে যাইবে। এইজন্য সকল সাধুভাব ঈশ্বরের দিকে যাইবেই।-(পৃঃ ২৮৪) অনন্তকাল মনুষ্য হাসিবে, অনন্তকাল মনুষ্য প্রফুল্ল হইবে, এই জন্য তিনি তাহাকে সৃজন করিয়াছেন। দয়াময় ঈশ্বরের রাজ্যে অশান্তির দিকে নিশ্চয় সীমা আছে; কিন্তু শান্তির দিকে অন্ত নাই। (পৃঃ ২৮৪) ;
१२ পরলোকের সন্ধান। ব্রাহ্মের সমক্ষে অৰ্গ হাসিতে লাগিল। স্বর্গ আপনার আকর্ষণ প্রকাশ করিতে লাগিল। স্বৰ্গ বলিল, আমারই রাজ্য চিরদিনের জন্য। - পৃঃ ২৮৭) সুখী, পুণ্যবান্ হইব অনন্তকালের জন্য ; অসুখী হইব কিয়ৎক্ষণের জন্য। চিরকাল ঈশ্বরের ক্রোড়ে বষিয়া হাসিব। পৃঃ ২৮৭) অচিৰ্য্যের উপদেশ-ষষ্ঠ খণ্ড। সম্মুখে আলােকময় ভবিষৎ--- বন্ধুগণ, তোমরা সকলেই অমরত্ব অমরত্ব যে দিকে, সেই পথে অগ্রসর হও। আশার শাস্ত্র যদি অধ্যয়ন করিতে চাও, তবে পশ্চাৎ দেখিও না; কিন্তু সম্মুখে তােমাদের জন্য ঈশ্বর কেমন সুন্দর ভবিষ্যৎ রাখিয়াছেন, তাহা দেখ।(পৃঃ ৩) ভবিষ্যতে অমৃতের সাগর, শান্তির অগাধ মহাসমুদ্র। বড় দুঃখ পাইয়াছ, পথিক, ইহা মানিলাম; কিন্তু যখন ঐ সম্মুখের সুন্দর ঘরে প্রবেশ করিবে, তখন কত সুখী হইবে, একবার ভাবিয়া দেখ। যখন সেই ঘরে ভক্তেরা আসিয়া হাত ধরিয়া তােমাকে পিতার কাছে লইয়া যাইবেন, তখনকার আনন্দ একবার বিশ্বাস এবং আশা-নয়নে দর্শন কর। আমাদের ভূতকাল যত কেন দুঃখময় হউক না, আমাদের ভয় নাই, কেন না আমাদের ভবিষ্যৎ শান্তিতে পরিপূর্ণ হইয়া আমাদের জণ্ঠ প্রতীক্ষা করিতেছে। পৃ: ৬)
পরলোকের সন্ধান।
ব্ৰহ্মদর্শনে ব্রাহ্মত্ব
যে চক্ষে ব্ৰহ্মদর্শন হয়, তাহা আকার দেখিতে পায় না।-(পৃঃ)
প্রাণ-দুর্গ
যদি হৃদয়ের মধ্যে যথার্থ বিশ্বাস থাকে, বিপদে ঈশ্বরের সঙ্গে
বিশ্বাসীর যােগ গৃঢ়তর এবং ঘনিষ্ঠতর হয়।-(পৃঃ ১২}
বিঘ্ন বিপদ আছে বলিয়াই ঈশ্বরের অভয় পদের এত আদর।
( পৃঃ ১৩)
চিরদিন যন্ত্রণার অনলে প্রাণ দগ্ধ হইতেছিল, কিন্তু ব্ৰহ্ম-সহবাসে
প্রাণ শীতল হইয়াছে। পৃঃ ১৩)
বিপদ বন্ধু হইয়া আমাদিগকে ঈশ্বরের অব্যবহিত সন্নিধানে
লইয়া যাইতেছে; অতএব যিনি বিপদকে ঈশ্বরের রাজ্য হইতে বাহির
করিয়া দেন, তিনি ধৰ্ম্ম-জগতের অর্ধেক বিশ্বাস করেন, পূর্ণ বিশ্বাস
তাহার হয় নাই।—(পৃঃ ১৩)
জল ত সর্বদাই দেখি; কিন্তু তৃষ্ণার পর যে জল পান করি,
তখন জলের কত সৌন্দৰ্য্য। সেইরূপ আত্মার তৃষ্ণার পর যখন তাহার
চরণারবিন্দের শান্তিবারি পান করি, তখনই বুঝিতে পারি, ব্ৰহ্মপ
কত মধুর। দুঃখের পর ঈশ্বরদর্শন অতি অপূৰ্ব। পৃঃ ১৪)
বিপদ-কন্টক স্বর্গ হইতে অমৃত লইয়া উপস্থিত হয়। পৃঃ ১৫)
প্রেমের জয়
যদি ঈশ্বরের কথা শুনিতে পাই, তবে ঘােতর পরীক্ষার অগ্নিও
আমাদিগকে দগ্ধ করিতে পারে না। পৃঃ ২১)।
৭৪ পরলােকের সন্ধান। নিত্যধামে চল, যেখানে অভয়দাতা ঈশ্বরকে লাভ করিয়া, আমরা সকলে ভয় মৃত্যুর হস্ত হইতে রক্ষা পাইব।(পৃঃ ২৭) বৈরাগীর গৃহ- স্বর্গের নিত্যধামে এবার ভাইদের সঙ্গে আলাপ করিয়া বহুকালের মনের দুঃখ দুর করিব। বন্ধুদিগকে ঈশ্বরের আরামপূর্ণ গৃহে দেখিয়া আনন্দিত হইব। সেই গৃহে স্বয়ং ঈশ্বর ভাণ্ডারী হইয়া হ-সকল বাহির করিয়া দিতেছেন।(পৃঃ ৩৪ ) : ঈশ্বর-দর্শন যতই তাহার দর্শনে আত্মাৰ ভাব মধুর হইবে, ততই তােমরা উন্নত হইবে। পৃঃ ৪• ) যখন আর সকলেই পরিত্যাগ করিয়া চলিয়া যায়, তখনও তিনিই অন্তরে দেখা দেন; ঘাের বিপদ এবং দুঃখ শােকের নদীর ভিতর দিয়াও তঁাহারই দর্শন।-(পৃঃ ৪০) তিনি তাহার নিরাকার সৌন্দৰ্য্য দ্বারা জীবাত্মাকে পুলকিত করেন। যদিও তিনি গুণ-বিশিষ্ট নিরাকার আত্মা, তথাপি তাহার দর্শনে মুগ্ধ ভাব হয়। যেখানে আকর্ষণ করিবার শক্তি আছে, সেখানে রূপের প্রয়ােজন কি? ঈশ্বর আমাদিগকে তাঁহার সৌন্দর্য হারা আকর্ষণ করেন।-(পৃঃ ৪২) . গ নিঃসন্দিগ্ধ ব্ৰহ্ম-দর্শন যেমন পরস্পরের দর্শনে মােহিত হই, তেমনই যথার্থ ঈশ্বর-দর্শনে জীবাত্মা মােহিত হয়।-(পৃঃ ৪৫) পরলােকের সন্ধান। ব্ৰহ্মবাণী যাহারা ঈশ্বরের নিকটে আছেন, তাহারা স্বর্গের কথা সফল সুস্পষ্টরূপে শুনিতে পান। যতই আমরা স্বর্গের নিকটস্থ হই, ততই স্বর্গের কথা সকল সুস্পষ্টরূপে আমাদের হৃদয় অধিকার করে। (পৃঃ ৬৬ ) তিনি চিরকালই তঁাহার সন্তানদিগকে “আশা কর, উৎসাহ, কর” কথা সকল বলিয়া আসিতেছেন।-(পূঃ ৬৯) ধৰ্ম্মজীবন কি ? ঈশ্বর আমাদের জন্য বাহিরের কাগজে শাস্ত্র লেখেন নাই; কিন্তু অন্তরের অন্তরে তিনি আমাদের সঙ্গে কথা কন; যদি সেই স্বর্গের কথা শুনিয়া জীবন পবিত্র করিতে চাও, এবং সকল সংশয় দূর করিতে ইচ্ছা কর, তবে সেই হৃদয়ের ঘরে প্রবেশ করিয়া ঈশ্বরের সঙ্গে সদালাপ কর, সমুদয় বিবাদের মীমাংসা হইবে। পৃ: ৭৩) সংসার-বিদ্যালয়- যাহা চিরকাল থাকিবে না, তাহার উপর হৃদয়ের সমুদয় অনুরাগ স্থাপন করাই অসারতা। পৃঃ ৭৭) প্রত্যেকেরই বৈরাগ্যের প্রয়ােজন। সেই বৈরাগ্যের সূত্রপাত হইল কোথায়? মৃত্যু-ঘটনায়। সুতরাং মৃত্যু আমাদের গুরু। মৃত্যু পৃথিবীর সমুদয় অসারতা এবং অনিত্যতা স্পষ্টাক্ষরে দেখাইয়া দিল।(পৃঃ ৮০ )
৭৬
পরলােকের সন্ধান।
দীনবন্ধু-
সংসারের কষ্ট যন্ত্রণায় যখন ভয়ানকরূপে হৃদয় বিদীর্ণ হইয়াছে,
তখন সেই অন্তরের অন্তরে, একজনকে দেখিয়াছি বলিয়া এখনও
বাঁচিয়া আছি, এবং তাহাই এ প্রাণ-ধারণের একমাত্র হেতু বলিয়া
নির্দেশ করিতেছি।-(পৃঃ ৯২)
একবার কেবল তাহার কাছে পঁহুছিতে পারিলেই হইল, যিনি
আপনাকে দীনের সখা বলিয়া পরিচয় দিয়াছেন। দর্শনে শ্রবণে
সমুদয় দুঃখ নিরানন্দ চলিয়া যাইবে।—পৃঃ ৯৫)
ঈশ্বর ভিখারী-
যে দুঃখ কঁদায়, সেই দুঃখই প্রাণেশ্বরকে নিকটে আনিয়া দেয়।
যে দুঃখ শত্ৰু কইল, সেই দুঃখই মিত্র হইল। যে চক্ষু কাদিয়াছিল, সেই
চক্ষুই হাসিল। পৃঃ ১১৬)
%
প্রমত্ত অবস্থা
বিচ্ছেদ হয় হউক, বিচ্ছেদের পর মিলন মিষ্টতর হইবে।
(পৃঃ ১৩)
জগজ্জননীকে দেখা
এক একদিন যখন আমাদের বুক দুঃখে বিদ্ধ হইয়া অবসন্ন হইয়া
পড়ে, তখন কাহার মুখ দেখিতে যাই ? যিনি দুঃখীদের ক্রন্দন
শুনেন, তাঁহারই চরণ আমাদের একমাত্র আরাম-স্থল। যদি দুঃখ
পরলােকের সন্ধান। ৭৭ দূর করিতে চাও, ইহাকে যত্ন করিয়া রাখিও, ভালবাসার আসনে ইহাকে রাখিও। পৃঃ ১৩৮) ব্রহ্মস্পর্শ (১) কেমন পুণ্য প্রদ, কেমন সুমধুর সেই স্পর্শ ! হস্ত নাই, অঙ্গুলি নাই, অথচ স্পর্শ হইল। যখন এই সুখ, এই পুণ্য বুঝিতে পারিবে, তখন দেখিবে, তােমার আশাক্ষেত্র আরও বিস্তৃত হইল। কেন না তখন জানিবে, পরমাত্মাকে কেবল দেখা যায়, শুনা যায়, তাহা নহে, কিন্তু তাহাকে জীবাত্মা স্পর্শ করিতে পারে। পৃঃ ১৫২) ব্ৰহ্মস্পর্শ (২) যদি দর্শন শ্রবণ আত্মার মধ্যে হইতে পারে, তবে স্পর্শও হইতে পারে।-(পৃঃ ১৫৩) স্পর্শেতে একদিকে যেমন যুক্তি ও প্রমাণ প্রবল হয়, আর এক দিকে তেমনই আত্মার শান্তি ও আনন্দ বৃদ্ধি হয়। আত্মার গভীরতম স্থানে আত্মর কর সকল প্রসারিত হইল, আর ব্রহ্ম-সহবাস অনুভূত হইল। যাহার আত্মার হস্ত ভগ্ন, অথবা স্পর্শ-শক্তি দুর্বল, তিনি কিরূপে ঈশ্বরের স্পর্শ-সুখাস্বাদ করিবেন ? কিন্তু যাহার আত্মার শক্তি সকল সতেজ, যাহার চক্ষু বলে, ঐ দেখ তােমার সম্মুখে কে, কর্ণ বলে, ঐ শুন কে কথা বলিতেছেন, স্পর্শ বলে, এই দেখ কে তােমাকে স্পর্শ করিতেছেন, তিনি বলেন, জগতে এমন কে আছে যে, এমন পবিত্র সুখ হইতে আমাকে বঞ্চিত করিতে পারে? যখন জীবাত্ম এই প্রকার প্রগাঢ় ভাবে পরমাত্মাকে ধারণ করে, তখন আত্মার আশ্চর্য ব্যাপার সকল শরীরের মধ্যেও প্রকাশিত হয়।- (পৃঃ ১৫৪
৭৮
পরলােকের সন্ধান।
আত্মা যদি স্বর্গবাসী হয়, শরীরও স্বর্গবাসী হয়।-(পৃ: ১৫)
*
দুই শ্রেণীর বিশ্বাসী
এই কথা যেন পিতাকে বলিতে পারি, দুঃখ দাও, কষ্ট দাও, ক্ষতি
নাই; কিন্তু অভয় দিও, তাহা হইলেই সুখী হইব।—(পৃঃ ১৬০ )
-
ব্ৰহ্মস্পর্শ (৩)-
সাধক যতই শীতল জল চান, ঈশ্বর ততই তাহা দেন।
(পৃঃ ১৬৭ )
ত্রিবিধ যােগ
শরীরের চক্ষু যেমন বাহিরের সৌন্দৰ্য্য দেখিতে চায়, আত্মাও
সেইরূপ স্বর্গের সুন্দর বস্তু সকল দেখিতে বাঞ্ছা করে, এবং শরীরের
কর্ণ ও হস্ত যেমন সুস্বর শনিবার জন্য ও সুকোমল বস্তু ধরিবার জন্য
সচেষ্ট হয়, আত্মার বিবেক-কর্ণ ও ভক্তি-হস্তও সেইরূপ ঈশ্বরের অমৃত
ময় বাক্য শ্রবণ ও তাহার পবিত্র শ্রীচরণ ধারণ করিতে ব্যাকুল হয়।
- পৃঃ ১৬৯)
আত্মর কর্ণও যাই একবার স্বর্গের সুর শুনিল, অমনই সেই
দিকে আকৃষ্ট হইয়া রহিল, আর ফিরিল না। সেখানে কেমন মধুময়
সদুপদেশ সকল শুনিতে লাগিল। একটীর পর একটা সুমিষ্ট কথা
কর্ণে প্রবিষ্ট হইতে লাগিল। শুনিল, সেখানে পৃথিবীর পক্ষিগণ হইতে
আরও সুমিষ্টস্বরে কে গান করিতেছে। সেখানে সাধক একটু
যদি সময় নষ্ট করেন, স্বর্গের কথা শুনিতে পান না, এবং তখনই
পরলােকের সন্ধান। ৭৯ তাহার অন্তরে বিষময় দুঃখ হয়, এইজন্য সর্বদাই তিনি ভিতরের কর্ণ জাগ্রত রাখেন। এইরূপে যতই দিন রাত্রি ক্রমাগত তিনি স্বর্গের সুমিষ্ট উপদেশ সকল শ্রবণ করেন, ততই অভ্যাস দ্বারা স্বর্গের শব্দের সঙ্গে সাধকের কর্ণের বন্ধন দৃঢ়তর হয়।-(পৃঃ ১৬৯) ফলতঃ গভীররূপে স্বর্গের শােভা দেখিলে এবং স্বর্গের কথা শুনিলে আর চক্ষু কর্ণ ফিরে না। সেইরূপ ঈশ্বরের পবিত্র শীতল চরণে একবার প্রণাম করিয়া আশীৰ্বাদ লাভ করিলে চিরকাল সেই চরণের আশ্রয় ভিন্ন আত্মা বাঁচিতে পারে না। পৃঃ ১৭০) সুখের বৈরাগ্য ঈশ্বরের বিশ্বাসী সন্তানের কিছুতেই ভয় নাই, কিছুরই অভাব নাই। অভাব-রাশির মধ্যে তিনি সুখী, ঘাের বিপদে আক্রান্ত হইলেও তিনি নির্ভয়, কেন না তিনি ভবকাণ্ডারীকে সহায় করিয়া- ছেন। পৃঃ ২৯) যেখানে অন্তরে আনন্দচন্দ্রের জ্যোৎস্না, সেখানে বাহিক অন্ধ- কারে কি করিবে ?(পৃঃ ২১৫) ব্ৰহ্ম-দর্শনের উপায় তােমাদিগের সম্বন্ধে ব্ৰহ্মদর্শন ইহ পরকালের সম্বল।—(পৃঃ ২২২) পরলােকজাত বৈরাগ্য— প্রকৃষ্ট বৈরাগ্য পারলৌকিক সামগ্রী, ইহলােকের নহে। উহার মূল ও ফল পারলৌকিক। পৃঃ ২৩৭) ৮০ পরলােকের সন্ধান। ইহলােক এবং শ্মশানের অতীত ভূমি পরলােক।-(পৃ.২৩৮) সংসারে থাকিয়া ইন্দ্রিয়-দমন চেষ্টা কর, মৃত্যু-চিন্তা করিও না। (পৃঃ ২৩৮ ) সর্বদা সেই পরলােক লাভের জন্য লালায়িত এবং যত্নবান থাক। (পৃঃ ২৩৮) পরলােকবাসীর নিকটে সকলই সার, অসার বলিয়া বিশেষণ নাই। যত সামগ্রী দর্শন স্পৰ্শন শ্রবণ করেন, সে সকলই সার- চিরকাল স্থায়ী। পৃঃ ২৪১) ইহলােককে পদাঘাত করিয়া, শ্মশানকে অতিক্রম করিয়া, আত্মা উড্ডীন হইয়া পরলােক প্রাপ্ত হয়।-(পৃঃ ২৪২) ব্ৰহ্ম আছেন যেমন প্রমাণ করিতে হয় না, পরলােক আছে এ কথাও তেমনই প্রমাণ করিতে হয় না। ঈশ্বর আছেন, পরলােক আছে, মানিতে হইবে। মৃত্যু নামে অবরােধক কোন প্রাচীর নাই। এই জীবনই প্রসারিত হইতেছে, বিস্তৃত হইতেছে, উহ ইহলােক নহে, পরলোক নহে, একই লােক। পৃঃ ২৪৩) দ্বিজত্ব--নবশিশু- পিতা মাতার সঙ্গে পুত্র কন্যার সাদৃশ্য পার্থিব, ঈশ্বরের সঙ্গে নিরাকার আত্মার সাদৃশ্য স্বর্গীয়।-(পৃঃ ২৯০) আত্মতে ঈশ্বরের মুখশ্রী প্রতিবিম্বিত হইয়া সেই বর্ণের জ্যোতি বাহিরের মুখ শােভিত করে। পৃঃ ২৯০ ) পরলোকের সন্ধান। উপাসনা- বিপদ নাহার কাছে সম্পদ, মৃত্যু-বিভীষিকা তাহার কি করিতে পারে?-(পৃঃ ৩১৭) অাচার্যের উপদেশ-সপ্তম খণ্ড। প্রেম-পিঞ্জর দয়াময় একটী পরম সুন্দর উদ্যান স্বর্গধামে নিৰ্মাণ করিয়াছেন, সংসার-জঙ্গলের পাখীগুলি ধরিয়া খাঁচায় রাখিয়া কিছুদিন শিক্ষা দিয়া তাহাদিগকে সেই উদ্যানে ছাড়িয়া দিবেন। সেই উদ্যান লতা পল্লবে কেমন শােভিত! কত অমৃত-বৃক্ষ, কত প্রেম-সরােবর, কত সুন্দর ফুল, কত সুমিষ্ট ফল ; তথায় উড়িয়া বেড়াইতে কত আনন্দ হইবে। পৃ: ৯) ধৰ্ম্মরাজ্যের যত উচচ স্থানে যাওয়া যায়, ততই সুখ শান্তি। (পৃ ১২) : ধ্যানের উদ্বোধন প্রাণের সমুদয় দুঃখ দূর হইবে, যদি রস-সাগরে ডুবিতে থাকি। { পৃঃ ১৩) হৃদয়ের অভ্যন্তরে অন্তরাত্মার প্রসন্ন মুখ দেখিয়া যখন আত্মার চক্ষু বিমােহিত হয়, এবং তাঁহার সেই মুখের রসামৃত পান করিয়া যখন আত্মর কর্ণ সুশীতল হয়, তখন মনুষ্য বলে, যখন এমন রূপ, এমন সুধা ঘরে পাইলাম, তখন আর বাহিরে যাইব কেন ? পৃঃ ১৩) পরলোকের সন্ধান। দুঃখ না হইলে জীবন হয় না আলােকের সময়, সুখের সময় যে সকল বস্তু উপস্থিত হয়, সে সকল যেমন সাধক ভক্তি এবং কৃতজ্ঞতার সহিত গ্রহণ করেন, ঘাের বিপদ অন্ধকারের মধ্যে ঈশ্বরের আজ্ঞাতে যে সকল কষ্টকর ঘটনা সমাগত হয়, সে সমুদয়ও সাধক সেই এক মঙ্গলকর হস্ত হইতে আসি- তেছে বিশ্বাস করিয়া, তাহাদিগকে চুম্বন করেন। দুঃখ মনুষ্যের উপ- কার করে।পৃঃ ৩১) অতএব স্বর্ণকে নির্মল করিবার জন্য যেমন অগ্নি চাই, তেমনই চিত্ত শুদ্ধ করিবার জন্য দুঃখ চাই।-(পৃ: ৩১) দানে ধন-বৃদ্ধি যত ঈশ্বরের তত্ত্ব আলােচনা করিবে, ঈশ্বরের প্রসঙ্গ করিবে, তত পরলােকের সম্বল হইবে।(পৃঃ ৪৪) পানে তৃষ্ণা-বৃদ্ধি ৰহ্ম-দর্শনের গভীরতা না হইলে দুঃখ বিষন্নতা ঘুচিবে না। ( পৃ: ৪৬) * চিত্ত-তীর্থ যথার্থ তীর্থে গমন করিলে আত্মার মধ্যে প্রবেশ করিতে হইবে। ভীর্ণ বাহিরে নহে, তীর্থ অন্তরে, তীর্থ দূরে নহে, অত্যন্ত নিকটে। (পৃঃ ৯৩) পরলােকের সন্ধান। ঈশ্বর প্রকাশ, না অপ্রকাশ আজ যেমন ব্ৰহ্ম দর্শন পাইলাম, ক্রমাগত ইহা অপেক্ষা উজ্জ্বল হইতে উজ্জ্বলতর দর্শন পাইব। ইহলােকে এইরূপ চলিল, পর- লােকেও এইরূপ চলিবে। গভীর আনন্দের পর গভীরতর আনন্দ। উজ্জল দর্শনের পর উজ্জলতর দর্শন।-(পৃঃ ৯৮) ভিতরে স্থিতি পরলােকের সম্বল নিজের হৃদয়ের মধ্যে করি। প্রকৃত, উন্নতি ভিতরের দিকে। প্রকৃত শ্রদ্ধা বিশ্বাস ভিতরে। এক দিকে যেমন মন উচ্চ হইতে উচ্চতর আকাশে যাইবে, অন্যদিকে তেমনই অন্তর হইতে অন্তরতর স্থানে যাইবে। পৃঃ ১৩১) ভিতরে বাড়ী আছে, বন্ধু সহায় আছেন, প্রেমােত্মান আছে। (পৃঃ ১৩২) গ শরীরের বার্ধক্য, আত্মার শৈশব। আত্মা শরীরের ধর্ম স্বীকার করে না। শরীরের বয়স ফে পরিমাণে বৃদ্ধি হইবে, আত্ম। সেই পরিমাণে দিন দিন শিশু হইবে (পৃ: ১৫৯) * * অশ্রুজলের মাহাত্ম্য জল বিনা সংসার চলে না, সেইরূপ ধৰ্ম্মরাজ্যেও হৃদয় শুষ্ক হইলে আর আশা থাকে না।-(পৃঃ ১৭০) কিন্তু বাস্তবিক আকাশ হইতে বারি-বর্ষণ না হইলে যেমন শস্যাক্তি ৮৪ পরলােকের সন্ধান। জন্মে না এবং সংসার চলে না, সেইরূপ চক্ষু হইতে বারি-বর্ষণ না হইলে ধর্ম-জীবন হইতে পারে না। পৃঃ ১৭০) প্রত্যক্ষরূপে তাহাকে দেখিলে যে নয়ন-বারি পতিত হয়, তাহাতে হৃদয় শীতল হয়।-(পৃঃ ১৭৩) আহলাদপূর্ণ আকাশ- ঈশ্বরকে কেৰল প্রেমময় বলিয়া জানিলে সকল সন্তাপ যাবে না। দুঃখী তাহার আনন্দ-মুখ দর্শন করিতে চায়। ভয়ানক দুঃখ বিপদের মধ্যে একবার বন্ধুর পানে তাকাইলাম, তিনি আমার প্রতি দৃষ্টি করিয়া একবার হাসিলেন, আর ঐ হাসির মধ্যে সুখের শাস্ত্র, পরিত্রাণের শাস্ত্র পাইলাম।পৃঃ ১৮৫) একবার আনময়ের প্রতি তাকাও, যখনই একবার তিনি সহাস্য- বদনে তােমার প্রতি দৃষ্টিপাত করিবেন, তােমার সকল সন্তাপ দূর হইবে। পৃং ১৮৫) দিব্য-চ্ছবি পরলােকে এমন স্থান আছে, যেখানে সভা আছে, যেখানে বিচ্ছিন্ন যােগী ধ্যান করেন, ইহা যেমন সত্য, তেমনই ঈশ্বর-প্রেমিকগণ দলবদ্ধ হইয়া ভক্তি-সরােবরে অবগাহন করেন, ইহাও সত্য। পৃ: ১৮৮) মনুষ্যের প্রকৃতি জানিয়া ঈশ্বর অতিশয় হৃদয়গ্রাহী এক একখানি ছবি টাঙ্গাইয়া রাখিয়াছেন। সুখ দুঃখের সময় সেই ছবি দেখিতে হইবে।-পৃঃ ১৮৯) পরলােকের সন্ধান। ৮৫ ধাঁহারা সংযুক্ত এখানে, তাহারা সংযুক্ত পরলােকে। এক প্রেম- সাগরে সন্তরণ করেন। এক প্রাণ-সহাকে লইয়া সকলে সুখী। (পৃঃ ১৮৯) • চির-বন্ধুতা মিলন হইলেই বিচ্ছেদ হয়, বিচ্ছেদ হইলেই প্রেমিক-হৃদয় জিজ্ঞাসা করে, আবার কবে মিলন হইবে ? আবার এইরূপে সুখে বসিয়া সদালাপ করিব কবে ? যাহার বিশ্বাস এবং প্রেম অল্প, সে নিরুত্তর থাকিবে; কিন্তু প্রেমিক বলিবে, নিশ্চয়ই আবার দেখা হইবে। স্বর্গধাম, যেখানে ভক্তগণ বাস করেন, এখানে নহে, ওখানে। সেখানে নিশ্চয়ই পুনর্মিলন হইবে।—(পৃ ১৯৩) ঈশ্বর যাহাদিগকে একত্র করেন, মৃত্যুও তাহাদিগকে বিচ্ছিন্ন করিতে পারিবে না। যদি একবার শুভ মিলন হইল এবং মৃত্যুও যদি তাহা বিনাশ করিতে না পারে, তাহা হইলে আমাদের বন্ধুতা চিরস্থায়ী হইল। মৃত্যু-ঘটনায় আমাদের বন্ধুতা এই পৃথিবীতে শেষ হইবে, কিন্তু চিরকালের জন্য শেষ হইবে না। আরও দৃঢ়তর বিশ্বাসের সহিত পরলােকে সম্মিলিত হইব। পৃঃ ১৯৪) ধ্যান এবং প্রেম- দয়াসিন্ধু, তােমার কৃপাতে বুঝিলাম, তােমার ভিতরে আবার সকলকে পাইব। মনুষ্য-জাতির সকল শাখা এক হইবে। যত পরিবার ঐখানে গিয়া এক-পরিবার হইবে।-(পৃঃ ২২৮)
পরলােকের সন্ধান।
সে বস্তু অনন্তকালের ব্যাপার, তাহার উপরে কালের মৃত্যু
আধিপত্য নাই। পৃঃ ২৬৯ )
শরীর ক্ষয় হউক না কেন, শরীর যখন নষ্ট হয়, তখনই তো আত্ম
স্কৃত্তি প্রকাশ করে। পিঞ্জর ছাড়িয়া যখন পাখী উড়ে, তখনই তো
ডানার অধিক বল প্রকাশিত হয়। পৃ: ২৬৯)
.
স্বর্গ এবং পৃথিবীর কথােপকথন
বাস্তবিক উপাসনা স্থানে স্বর্গ আছে। যদি কোনও স্থানে স্বর্গ
অবতীর্ণ হইয়া থাকেন, তাহা এই উপাসনা-স্থানে।-(পৃঃ ২৮২)
যখনই দুঃখ যন্ত্রণায় মন নিপীড়িত হইবে, তখনই এক একবার
স্বর্গের কথা শুনিবে। সকল যন্ত্রণা দূর হইবে। স্বর্গের কথা এমনই
মিষ্ট। পৃঃ ২৮৫)
-অষ্টম খণ্ড ।
আচার্য্যের উপদেশ
বীজে স্বর্গ, কি ফলে স্বর্গ
ঈশ্বরের নামই স্বর্গ, ঈশ্বরকে ডাকাই স্বর্গ। ঈশ্বর-সম্পৰ্কীয়
সমুদয় ব্যাপারের মধ্যেই স্বর্গ। পৃ: ৯২)
*
ঈশ্বর ও মনুষের শাসন
ঈশ্বরও কষ্ট দেন, দুঃখ দেন, হৃদয়ে আগুন জ্বলিয়া দেন, কিন্তু
তিনি পাপীকে যে বাণ দ্বারা বিদ্ধ করেন, তাহা বিষাক্ত নহে, সে,
ৰাণের ভিতরে প্রেম আছে-- পৃঃ ১৭৪ )
পরলােকের সন্ধান।
ঈশ্বরের বাণ মুহুর্তের মধ্যে বিদ্ধ করিয়া শান্তি আনয়ন করে,
ঈশ্বরের অগ্নি মুহূর্তের মধ্যে সােনার ময়লা নির্গত করিয়া বিশুদ্ধ করিয়া
ফেলে। পৃ: ১৭৫)
*
সংসার ঈশ্বরের মন্দির
আমরা মৃত্যুর পর কোথায় যাইব? স্বর্ণধামে যাইব।--
(পৃঃ ১৮৯)
বিপদে ঈশ্বরের দয়া-
বাহিরে যত অন্ধকারে ঘেরিবে, ততই অন্তরে উজ্জ্বল ব্ৰহ্মরাজ্য
প্রকাশ পাইবে।(পৃঃ ২৬৭)
ব্রহ্মে লীন হও, আরও তাহাকে ভালবাসিতে থাক, সুখ শান্তি
তােমাদেরই। পৃ: ২৬৭)
আচার্য্যের উপদেশ—নবম খণ্ড ।
সুখবেদ, দুঃখবেদ
সুখের বেদ পাঠ করা যেমন আবশ্যক, দুঃখের বেদ পাঠ করা
তেমনই আবশ্যক। পৃঃ ২৪)
যিনি ঈশ্বরের দুঃখী সন্তান, দুঃখ তাহাকে ঈশ্বর সম্বন্ধে এমন দিকে
রাখে যে, সেই দিক হইতে তিনি ঈশ্বরের করুণা সহস্র গুণ দেখিতে
পান। দুঃখের অবস্থায় এমন ভাবে তাহার দিকে তাকান যায় যে,
তাহার স্নেহ ভিন্ন আর কিছু দেখিতে পাওয়া যায় না। পৃঃ ২৮)
তাই বলি, ঈশ্বর যাহাকে দুঃখ দেন, তাহাকে বড় ভালবাসেন।
পরলােকের সন্ধান। তিনি চক্ষু কাণ করিয়া দিলেন কেন? খুব ভালবাসিবেন বলিয়া । তিনি খুব ভালবাসেন বলিয়াই কষ্ট দেন, পয়সা কাড়িয়া লন, সংসারের দুঃখ যন্ত্রণা বৃদ্ধি করেন। এই যে সমুদয় দুঃখ দেখিতেছি, ইহা কি জননীর স্নেহের লীলা? সমুদয় স্বর্গের ইতিহাস বলিতেছে, হাঁ, সাধকের প্রতি অতুল স্নেহ প্রকাশ করিবার জন্য তিনি এই সকল লীলা করিতে- ছেন। পৃ: ২৯) ভাগ্যে দুঃখ হইল বলিয়া কাতর অন্তরে ডাকিলাম, তাই তাঁহার প্রেমমুখ দেখিলাম; রৌদ্রে উত্তপ্ত হইয়া দৌড়িলাম, তাই তাহার শ্রীপদ- ছায়া লাভ করিলাম। ভাগ্যে শুষ্ক কণ্ঠ হইল, তাই প্রেম-সাগরের প্রেমামৃত পান করিতে সক্ষম হইলাম। দুঃখ না হইলে পিতার মর্যাদা কেহ বুঝিতে পারে না।-(পৃ: ২৯) দুই বৎসর চেষ্টা করিয়া তাহার যে মহিমা বুঝিতে পারা যায় না, দুঃখে পড়িলে মুহূর্ত মধ্যে সে মহিমা বুঝিতে পারা যায়।-(পৃঃ ২৯) নিশ্চয় বলিব, আকাশ ফাটাইয়া বলিব, হাসাইবার জন্য নয়, সরল ভাবে বলিব, আমাদিগকে সুখী করিবার জন্য, নিৰ্ম্মল চরিত্র করিবার জন্য ঈশ্বর এত দুঃখের সৃষ্টি করিয়াছেন।—(পৃঃ ৩০) যত তিনি আমাদিগকে কষ্ট দিবেন, তত বুকে জড়াইয়া ধরিবেন। -(পৃঃ ৩১) সুখ আইসে গ্রহণ কর, কিন্তু দুঃখকে আদরের সহিত আলিঙ্গন কর।-(পৃঃ ৩২) আধ্যাত্মিকতা- মনুষের শরীর-রক্ষা যেমন আবশ্যক, আধ্যাত্মিক হওয়া তেমনই আবশ্যক। পৃঃ ৩২) পরলােকের সন্ধান। যিনি ব্রহ্মের সাধক, ব্ৰহ্ম তাহার অন্ধকার আত্মার ভিতরে একটা রাজ্য নির্মাণ করেন, তিনি সেই ঘাের অন্ধকার হইতে একটা বৃহৎ জগৎ প্রকাশিত করেন। ঈশ্বর ঘাের অন্ধকার মধ্যে প্রবিষ্ট করিয়া লাধককে শিখান, প্রকাণ্ড বিশ্ব কিছুই নয়। ঈশ্বর সাধককে বলেন, হে ভক্ত, চক্ষু বন্ধ কর, দেথিকেপলকের ভিতরে বিশ্ব নাই। তুমি এই অন্ধকারের ভিতরে পবিত্র ইচ্ছা লইয়া উপবেশন কর, একটা মুর্তিমান নূতন জগৎ দেখিতে পাইবে।” সাধক সেই আদেশ পালন করিতে চেষ্টা করিলেন। পৃঃ ৩৩) আধ্যাত্মিক জগতে সময়ে সময়ে বাস না করিলে কিছুই থাকিবে না। যাহা কিছু ছিল, আছে, থাকিবে, তাহা উহারই মধ্যে। { পৃঃ ৩৪) অন্ধকার ভেদ করিয়া হৃদয়-জগতে ইহলােকেই পারলৌকিক মিলন হয়। পৃঃ ৩৪ ) অন্তরের মধ্যে একটা জগৎ নিৰ্মাণ করিতে হইলে প্রবলতর ইচ্ছা চাই। ব্যাকুল ভাবে ইচ্ছা করিলে ইচ্ছ। মাত্র পরলােকবাসী সকলকে ডাকিয়া আনিয়া মনের ভিতরে বক্ষের মধ্যে বসান যায়। ইচ্ছা করিলে তাহাদিগকে চিরকালের জন্য হৃদয়ের মধ্যে রাখিতে পারা যায় । কে কে আসিয়াছেন জানিয়া তাহাদিগকে চিরকালের জন্য আয়ত্ত করা যায়।(পৃঃ ৩৫) ধার্মিক সংসারী যিনি স্বর্গরাজ্যের অধিকারী, পৃথিবীর ঘাের দুঃখ বিপদের মধ্যেও তাঁহার মুখ কেমন প্রফুল্ল। পৃঃ ১০৮) পরলােকের সন্ধান। প্রকৃতির ঈশ্বর- প্রকৃতির মধ্যে প্রবেশ করিলে, প্রকৃতি সহায় হইলেই, মনের মানুষ অন্তরাত্মাকে দেখিয়া সুখী হয়। পৃ: ১৮৫) গাছ বল, পাখী বল, ফুল বল, জল বল, বায়ু বল, প্রকৃতির মধ্যে যাহা কিছু দেখিতে পাও, সকলই সেই রাজ্যের ব্যাপার। তাহারা সকলেই সাধকদিগকে স্বর্গরাজ্যে লইয়া যাইবার জন্য সেখান হইতে আসিয়াছেন। পৃঃ ১৮৫) উত্তরদাতা জাগ্রত ঈশ্বর- ঘাের বিপদ প্রলােভনের মধ্যে হরি রক্ষা না করিলে আর বাঁচিতে পারিবে না। হরির কথা না শুনিলে কেহই বাঁচিতে পারিবে না; কিন্তু সেই সময় আসিতেছে, যখন তুমি আমি যেমন কথা কহিতেছি, তেমনি ব্ৰহ্ম আমাদের সঙ্গে কথা কহিবেন। অতএব ব্রাহ্মের হৃদয় সাধকের হৃদয় হউক। ব্রহ্মের কথা সুমিষ্ট, শুনিতে ভাল লাগিবে। সেই কথা মধুময়, সুধাময়, অমৃতের সমান, তাহাতে জ্ঞান হয় এবং শােক দুঃখ যায়।=পৃঃ ১৯৮) হরি ভব-কাণ্ডারী হাল ধরিবেন। আমরা নিরাপদে নৌকায় বসিয়া, আস্তে আস্তে নৌকা চলিতেছে দেখিব ; হরি হাল ধরিয়াছেন দেখিয়া, নির্ভয় এবং নিশ্চিন্ত হইয়া শান্তিধামে চলিয়া যাইব। (পৃঃ ১৯৯) শরীর ব্ৰহ্মমন্দির * ব্ৰহ্ম-অর্চনা করিতে করিতে ভিতরের ব্রহ্মাগ্নি বাহিরে আসিবে, বাহিরের ব্রহ্মাগ্নি ভিতরে প্রবেশ করিবে। এই রূপ সাধন করিতে পরলোকের সন্ধান। করিতে সমস্ত পাপবন্ধন ছিন্ন হইবে এবং জীবাত্মা পরিত্রাণ লাভ করিবে। পৃঃ ২৪) ভক্তদল-বৃদ্ধি স্বপ্নেতে পৃথিবী দেখা যায়, জাগ্রত অবস্থায় পরলােক দেখা যায়। যে ইহলােকের ধন সম্পদ দেখিতেছে, সে স্বপ্ন দেখিতেছে, যিনি পরলােক ও পরলােকবাসী যাজ্ঞবল্ক্য, ঈশা, মুষা প্রভৃতি প্রেরিত মহা- পুরুষ সকলকে দেখিতেছেন, তিনি জাগ্রত। স্বপ্নেতে মনুষ্য পৃথিবী সাধন করে, জাগ্রত অবস্থায় মনুষ্য পরলােকে বাস করে। চক্ষু খুলিলে যদি পরলােক দেখিতে পাও, তবে তােমাদের জাগ্রত অবস্থা। যতই তােমা- দের আত্মার চক্ষু উজ্জল হইবে, ততই তােমাদের ঐহিক সুখের স্বপ্ন নষ্ট হইবে, এবং জীবনের প্রাতঃকাল দেখিতে পাইবে। পৃ: ২০৫ ) যদি জাগ্রত হইতে চাও, তবে সেই পরলােকবাসী সাধুদিগকে দেখ। -(পৃঃ ২০৬) ভয়ানক মৃত্যু সমক্ষে, দৌড়িয়া প্রাণ-রক্ষা করিতে ইচ্ছা হইতেছে ; কিন্তু স্বপ্নে দৌড়িতে পারি না, অগ্রসর হইতে পারি না, বল নাই, মনে তেজ নাই। পরলােকের যাত্রিগণ, যদি চলিতে চাও, যদি দৌড়িয়া অমৃতধামে যাইতে চাও, তবে স্বপ্নের অবস্থা হইতে উন্মুক্ত হও। (পৃঃ ২০৭ ) ভবিষ্যতের সন্তান- কিন্তু এখন দেখিতেছি, ঈশ্বর আমাদিগকে উচ্চ হইতে উচ্চতর, নিৰ্ম্মল হইতে নির্মলতর আলােক-রাজ্যে লইয়া যাইতেছেন। এই বর্তমান আলােকের অবস্থাও আমাদিগের পূর্ণাবস্থা নহে, ইহা কেবল ১২ পরলােকের সন্ধান। আমাদিগের ধর্মজীবনের প্রাতঃকাল, এই জীবন ক্রমশঃ মধ্যাহ্ন সূর্যের ন্যায় আলােকময় হইবে। পৃঃ ২৩২) অগ্রগামী ব্রাহ্ম হইয়া অগ্রসর হও। ঐ ঘরে গিয়া সকলে ব্রহ্মানন্দ- রস পান করিব, এই আমাদের জীবনের লক্ষ্য।-(পৃঃ ২৩৫) . দীক্ষিতদিগের প্রতি উপদেশ ঐ দেখ, সমক্ষে দীন-কাণ্ডারী তাহার চরণতরী ইয়া দাঁড়াইয়া আছেন, তােমরা ঐ নৌকায় আরােহণ করিয়া ভবসাগরের উপর দিয়া শান্তিধামে চলিয়া যাও।-(পৃং ২৩৯) * পরলােকবাসী সাধু কত সাধু আছেন, যাহাদিগকে দেখি নাই, নাম শুনি নাই, পরলােকে তাঁহাদের সঙ্গে দেখা হইবে।-(পৃঃ ২৭৭) = স্বর্গীয় কল্পনা পরলােক স্বর্গ যাহা কিছু আত্মা ভাবিবে, উহাতে কল্পনা নাই। (পৃঃ ২৯৪) নূতন দ্বৈত ও অদ্বৈতবাদ- জীবন সাধন দ্বারা উন্নত হইলে দেখিতে পাওয়া যায়, দুঃখ মঙ্গলের কারণ, অন্ধকার উন্নতির কারণ, বিপদ মৃত্যু সম্পদ। বিশ্বাসী নয়ন এ সকলের মধ্যে কাল কিছুই দেখিতে পায় না। উহা কোন অদ্ভুত চিহ্ন চাহিল না। যাহা ঘটিতেছে, তাহার মধ্যে সকলই মঙ্গল দেখিবে। ---(পৃঃ ৩••) পরলােকের সন্ধান। বিশ্বাস আর কিছু করে না, চুপ করিয়া পরলােকে গিয়া মর্ম আনিয়া আইসে। তখন বিশ্বাস এক একটা ঘটনার মহিমা দর্শন করে, উহা কেমন কল্যাণকর। উহা হইতে কেমন পবিত্রতা সমুৎপন্ন হয়, হৃদয়ঙ্গম করে। পৃঃ ৩০০ ) মুক্তিদাতা ঈশ্বর যখন কল্যাণের প্রেরয়িতা, তখন একটা ঘটনা হইতে, বিপদ হইতে, মন্দ হইতে পারে না। পৃঃ ৩০১। মৃত্যু কিছুই নয়, এ ঘর হইতে ও ঘরে যাওয়া। কোটী কোটি লােক মরিতেছে, তাহারা এখান হইতে ওখানে যাইতেছে। (পৃঃ ৩১) আচাষের উপদেশ—দশম খণ্ড। অঙ্গীকৃত দেশ- ব্রাহ্মধৰ্ম্ম-প্রসাদে এখন আমরা ঈশ্বরের অঙ্গীকৃত নূতন রাজ্যের দিকে যাইতেছি। কয়েক বৎসর পূর্বে এই নূতন রাজ্যের প্রতি আমাদিগের তেমন উজ্জ্বল বিশ্বাস ছিল না। পথিকেরা যতই গম্য- স্থানের নিকটবর্তী হইতেছে, ততই সেই রাজ্য উজ্জ্বলতর দেখা যাইতেছে। দর্শন এবং শ্রবণ দ্বারা আমরা সেই রাজ্যের প্রমাণ পাই- তেছি। দূর হইতে সেই দেশ দৃষ্ট হইতেছে এবং সেই দেশের শব্দগুলি ক্রমে ক্রমে কর্ণকুহরে প্রবিষ্ট হইতেছে। যতই সেখানকার সুমধুর প্ৰেমধ্বনি কর্ণে প্রবেশ করিতেছে, ততই প্রতীত হইতেছে যে, আনন্দধামের নিকটে আসিতেছি। যাত্রীদিগের পক্ষে সেই সুখম, সেই প্রেমরাজ নিকট হইল। ব্রাহ্মসাধকদিগের পক্ষে মহাত্মাদিগের সহবাস মিষ্টতর হইতেছে, পরলােকের শােভা অধিকতর মনােহর ৯৪ পরলােকের সন্ধান। হইতেছে এবং স্বর্গের ধেমফুলের সৌরভ সাধকদিগকে আমমাদিত করিতেছে। আগে কখনও কখনও দুই একজন সাধু আমাদিগের নয়ন-গােচর হইতেন, এখন কত যােগী ঋষিদিগের আশ্রমে, কত প্রেমিক ভক্তদিগের কুটীরে আমরা প্রবেশ করিতেছি। পূর্বে স্বর্গ- রাজ্যের শোভা অনুমান দ্বারা সিদ্ধান্ত করিতে হইত, নয়ন সাক্ষ্য দান করিতে পারিত না, এখন প্রত্যক্ষরূপে স্বর্গের সৌন্দর্য দেখিয়া মােহিত হইতেছি। এখন স্পষ্টতররূপে ব্ৰহ্মদর্শন হইতেছে। ব্ৰহ্ম- সহবাস, সাধু-সহবাস মিষ্টতর হইতেছে। পৃঃ ৩৪) ঈশ্বর সেই দেশে বসিয়া আছেন। কত সুমধুর বাক্য ৰলিয়া, কত প্রলোভন দেখাইয়া তিনি আমাদিগকে সেই দেশে লইয়া যাইতেছেন। -(পৃঃ ৩৫) ধন্ত তাহারা, যাহারা সেই রাজ্যের দিকে চলিয়াছেন! সেই রাজ্য ভক্তি-রাজ্য, সেই রাজ্য আনন্দ-রাজ্য, শান্তি-রাজ্য। (পৃঃ ৩৮ ) স শ্রীচৈতন্য- যেখানে হরির পাদপদ্ম, সেইখানেই স্বর্গ। রিপু জয় করিয়া, এখনই যদি আকুল-প্রাণে হরিকে ডাক, স্বর্গ এখনই দেখিবে।—(পৃঃ ৭০ ) বেদ পুরাণের মিলন যিনি ব্রহ্মকে মা বলিয়া ভালবাসেন, তাহার আর দুঃখ থাকে । সেই জগজ্জননীর অঞ্চল পরিয়া আমরা আনন্দে বৈকুণ্ঠে চলিয়া যাইব, এবং এই সংসারেই স্বর্গ-ভােগ আরম্ভ করিব।—(পৃঃ ৭৭)
পরলােকের সন্ধান।
সত্য গয়া-
আত্মার মধ্যে এমন একটী স্থান আছে, যে স্থান দিয়া আমাদিগের
পূৰ্ব্ব পুরুষের স্বর্গধাম পরলােকে চলিয়া গিয়াছেন। সেই স্থানে যােগ
সাধন করিতে করিতে, পরলােকবাসী মহাত্মাদিগের সঙ্গে আমাদিগের
মিলন হয়।
সেই স্থান হইতে সুবিস্তৃত পরলােক দেখা যায়।
(পৃঃ ৯২)
মনে করিও না, পরলােক অনেক দূরে। পরলােক অতি
নিকটে, তােমাদিগের প্রাণের মধ্যে, তােমরা ভক্তি-প্ৰেম-হস্ত প্রসারণ
করিলেই পরলােক ধারণ করিতে পাইবে। যে চক্ষে ব্ৰহ্মকে দেখি,
সেই চক্ষে পরলােকবাসী সাধুদিগকে দেখিতে পাই।—পৃঃ ৯২)
বাল্যকালে মনে করিতাম, পরলােক বহু দূরে; কিন্তু এখন
দেখিতেছি, বিশ্বাসীর এক হস্তে নিরাকার সর্বব্যাপী ব্ৰহ্ম এবং আর
এক হস্তে পরলােকবাসী সাধু মহাত্মাগণ। এক হস্তে ব্ৰহ্ম, অন্য
হস্তে পরলােক।-(পৃঃ ৯৩)
স্বর্গ বাহিরে নহে, আকাশে, পৰ্ব্বতে কিম্বা সমুদ্রে স্বর্গ নহে।
যথার্থ স্বর্গ আমাদিগের চিত্তের ভিতরে।(পৃঃ ৯৩)
যেমন ঈশ্বর প্রত্যক্ষ, তেমনই পরলােক প্রত্যক্ষ। পরলােক
আমাদিগের আসল বাড়ী, পরলােক জীবের শান্তিনিকেতন। সেই
নিকেতন নিত্যকালের আবাসস্থান।-(পৃঃ ৯৪ )
*
সংসারে স্বর্গভােগ—-
অশরীরী আত্মা, সকলেই অরূপ অথচ প্রতিজনেরই মনোহর
রূপ আছে।(পৃঃ ১৭২)
পরলােকের সন্ধান। ভবিষ্যতে শুভক্ষণ আসিবে বলিয়া বিলম্ব করিও না, যেখানে * পাপ দুঃখ অশান্তি নাই, সেখানে যাইতে কেন বিলম্ব করিবে ? তখন উদ্ধশ্বাসে সেই স্বর্গের ঘরে যাইবে। সেখানে নানা জাতীয় ফুল দেখিয়া তােমাদিগের প্রাণ সুখী হইবে। ঈশা, মুসা, নানক, জনক, লীগ, সাবিত্রী প্রভৃতি যাহারা এখন হইতে চলিয়া গিয়াছেন, সেই স্বর্গের ঘরে বাস করিতেছেন। দেখবে চমৎকার শােভা! এখানে যত সাধ্বী ছিলেন, সকলে সেখানে গিয়া বসিয়া আছেন। যখন পৃথিবীতে শােক সন্তাপ পাইবে, তখন সেই স্বর্গে যাইবে। তােমাদের প্রতিজনের বুকের ভিতর প্রেম দ্বার আছে, সেই দ্বার খুলিলে একটী কুটীর দেখিতে পাইবে, সেখানে ঈশ্বর নিত্য কালের জন্য আপনার স্বর্গধাম খুলিয়া রাখিয়াছেন। সেই কুটীর মধ্যে গিয়া জগদীশ্বরীকে বলিবে, মা, আমি কি স্বর্গে স্থান পাইব না ? যে একবার বলে, আমি ঈশ্বরকে চাই, সে ঈশ্বরকে পায়। তােমরা যদি বল, আমরা পৃথিবীতে থাকিব না, আমরা আমাদের প্রাণের স্বর্গীয়া ভগ্নীদের সঙ্গে থাকি, তাহা হইলে নিশ্চয়ই তােমরা স্বর্গের অধিকারিণী হইবে। যেখানে নিত্যানন্দ প্রভু আপনার ছেলে মেয়েদের নিয়ে নিত্য উৎসব করি- তেছেন, সেখানে গেলে আর দুঃখ থাকে না।-(পৃঃ ১৭৪) স্বর্গের ছেলে মেয়েরা মার কাছে বসে আছেন। তাদের যদি বাছা বলে আদর করিতে পার, তরিয়া যাইবে। নিরাকার মাকে ডাকিলে, নিরাকার ভাই ভগ্নীকেও পাওয়া যায়।-(পৃঃ ১৭৫) জলাভিষেক যেমন শরীয় জলে প্রবিষ্ট হয়, জলও শরীরে প্রবিষ্ট হয়। সেইরূপ যেমন জীবাত্মা নুতন বস্ত্র পরিয়া পরমাত্মাতে প্রবেশ করে, পরমাত্মাও পরলোকের সন্ধান। প্রাণরূপে জ্ঞানরূপে, ভক্তি শান্তিরূপে জীবের হৃদয়ে প্রবেশ করেন। পৃঃ ১৮) ঈশ্বরের শত্রু ইহপরলােকে যত সাধু ভক্ত বাস করিতেছেন,তাহারা তােমাদিগের বন্ধু। বিনীত ও বিশ্বাসী হইয়া তাহাদিগের স্বর্গরাজ্যে প্রবেশ কর। পৃঃ ২১৭) পৱলােকবাসী ভক্ত-দর্শন নিরাকার জীবাত্মা নিরাকার ঈশ্বরকে দেখিতেছে; এবং নিরা- কার ঈশ্বরের সঙ্গে সঙ্গে নিরাকার অমত্ম সকলকেও দেখিতেছে। (পৃঃ ২১৮) স্বর্গ ঈশ্বরেতে, ঈশ্বর নিজেই স্বর্গ। সুতরাং যত ঈশ্বরের মধ্যে প্রবেশ করিব, ততই সেই স্বর্গবাসী সাধুদিগকে নিকটে দেখি। (পৃঃ ২২০ ) যখনই বিশ্বাসের সহিত বলিৰে, এই আমার ঈশ্বর, এই আমার ভক্তিভাজন স্বর্ণবাসিগণ, তখনই তাহাদিগকে হস্তগত করিতে পারিৰে যােগবলে, প্ৰেমৰলে সকল ব্যবধান চলিয়া যায়।-(পৃঃ ২২১) ** ৪ বিধান-মাহাত্ম- এই নববিধানের ভক্তেরা মৃত্যুঞ্জয়ের আদেশে, মৃত্যুঞ্জয়ের হস্ত হইতে খঙ্গ লইয়া, মৃত্যুকে বধ করিয়া, ইহলােকে থাকিয়াই পরলােক- বাসী সাধুদিগের সঙ্গে ব্ৰহ্মপুজা করিতেছেন। ইহলােক পরলােকের ১৩ পরলােকের সন্ধান। মধ্যে যে ব্যবধান ছিল, নববিধান তাহা বিনাশ করিয়াছে। ইহলােক পরলােক মধ্যে এখন সেতু নির্মিত হইয়াছে। যেমন কলিকাতার লােক এখন সেতু পার হইয়া হাওড়ায় বেড়াইতে পারে, সেইরূপ এখন ইহলােক হইতে অনায়াসে পরলােকে যাওয়া যায়।-(পৃঃ ২২৪ ) ঈশ্বরের নিকটে ইহলােক পরলেঃকর ভিন্নতা নাই। যখন সাধ- কের নিকটে ঈশ্বর প্রকাশিত হন, তখন পলকের মধ্যে তিনি সাধকের চক্ষে স্বর্গবাসী পরলােকগত সাধুদিগকেও দেখাইয়া দেন। পৃথিবী ও স্বৰ্গকে এক করিয়া দিবার জন্য নববিধানের অভুদয়। ঈশ্বর দর্শন এবং স্বর্গ-দর্শন সহজ হইল।-(পৃঃ ২২৫) গ সাধুর রক্ত-মাংস পান-ভোজন- পরলােকবাসী মহাত্মারা দেশকালের অতীত। পৃঃ ২২৭) আৰ্য্যনারীদিগের প্রতি আচার্যের উপদেশ বড় বড় জাহাজ করিয়া ব্ৰহ্মকন্যাগণ ভবনদী পার হইতে লাগি- লেন। কোন জাহাজের উপর “একমেবাদ্বিতীয়, কোন জাহাজের উপর “ব্ৰহ্মকৃপাহি কেবলম্” ইত্যাদি নিশান উড়িতেছে। ভব- নদীর ওপারে শান্তিধামের দেব-দেবীগণ ব্ৰহ্মকন্যাদিগকে গ্রহণ করিবার জন্য প্রতীক্ষা করিতেছেন। সেই প্রাচীনকালের ঋষি এবং ঋষিপত্নীগণ, সেই যাজ্ঞবল্ক্য, মৈত্রেয়ী, সেই চৈতন্য, নানক, কবীর, তুকারাম প্রভৃতি, সেই সীতা, সাবিত্রী এবং অন্যান্য পুণ্যবতী নারীগণ, যাত্রীদিগকে অভ্যর্থনা করিবার জন্য ভবনদীর অপর পারে দাঁড়াইয়া আছেন। বঙ্গদেশ হইতে জাহাজ আসিতেছে, জাহাজ ক্রমশঃ শান্তি-উপকুলের নিকটবর্তী হইতেছে, উহা দেখিয়া পরলােকের সন্ধান। ৯৯ সেই দেবর্ষি এবং তাহাদিগের কন্যাগণের কত আহলাদ। (পৃ: ২৩৭) ঈশ্বর তােমাদের জন্য নৌকা লইয়া আসিয়াছেন। তােমরা আনন্দ-মনে তাহার নাম উচ্চারণ করিতে করিতে এই নৌকায় আরােহণ করিয়া নূতন দেশে চলি যাও। পৃঃ ২৩৮) * বিশ্বাসের উচ্চ ভূমি বিশ্বাসের উচ্চ ভূমি আরােহণ করিলে, ইহলােকে থাকিয়া পর- লােক দেখা যায়। বিশ্বাসের ভূমি হইতে নরলােকের ব্যাপার এবং স্বর্গলােকের ব্যাপার উভয়ই দেখা যায়।-(পৃ: ২৩৯ ) * আত্ম-পক্ষী তােমাদের শরীরের ভিতর যে দেখে শুনে, যে ভাবে, যে চিন্তা করে, সেই আত্মা। এই দেহ পিঞ্জর মধ্যে আত্মা-পক্ষী, মানস-পক্ষী বাস করিতেছে। যােগচক্ষু, জ্ঞানচক্ষু সেই পক্ষীকে দেখিতে পায়। --(পৃঃ ২৪৪) মন-মানুষের কাপড় এই শরীর। কাপড় ফেলিয়া দিলে যেমন শরীর যায় না, সেইরূপ শরীর ফেলিয়া দিলে মন যায় না। (পৃঃ ২৪৫ ) শরীরটা মন-পাখীর খাঁচা, দশ দিন পরে যেখানকার খাচা সেই- খানে পড়িয়া থাকিবে; কিন্তু পক্ষী ধামে চলিয়া যাইবে। যে খায়, যে শোয়, সে মানুষ নহে। তােমার নাম যদি কেদার কিম্বা রাম হয়, তােমার আত্মাহ কেদার কিম্বা রাম। শরীর কেদার কি স্বা রাম নহে। আ আই আমি, শরীর আমার। নাম উপাধি সমুদয় ১০০ পরলােকের সন্ধান। ৫ সেই আত্মার। শমীর খড়ের ঘর মাত্র, বাঁশ দিয়া বাঁধ ; তাহার আদর কেবল তাহার মালিকের জন্য। পৃঃ ২৪৫) সেখানে পরমাত্মা জীবাত্মা-পক্ষীকে আহার দিতেছেন ও বলি- তেছেন, “ও এবং গাও”। অনন্তকাল তিনি এই কথা বলিবেন। আত্ম। সেই অনন্ত শক্তি আদ্যাশক্তির পুত্র। ইহার আহার বিহার সেই শক্তিতে। নিজের কোন ক্ষমতা নাই। মার শক্তিতে শক্তি- মা, মার ধনে ধনবান্। আবার যখন সেই আদ্যাশক্তি আত্মাকে সৃজন করিলেন, তাহার ভিতরে কত অদ্ভুত তেজোময় পদার্থ নিহিত করিলেন। যেমন ময়ু-পক্ষী নানাবর্ণে সুশােভিত, তেমনই প্রত্যেক জীবাত্মা-পক্ষী বিচিত্র সুন্দর বর্ণে সুসজ্জিত। পৃ: ২৪৬) আমাদের প্রত্যেকের আত্মার ভিতরে যােগের বল, ভক্তির বল আছে। পৃ: ২৪৭) : গমনাগমন- পৃথিবীতে আসিবার পূর্বে অথবা জন্মিবার পূর্বে ব্রহ্মের ভিতরে আমরা নিদ্রিত ছিলাম।-(পৃঃ ২৫১) আধ্যাত্মিক জীবন সম্বন্ধে স্বয়ং ঈশ্বর আমাদিগেরু জন্মদাতা। (পৃঃ ২৫১) মনুষ্যের যথার্থ জন্মস্থান স্বর্গ। পর্গ তাহার পিতৃভূমি, স্বর্গ তাহার মাতৃভূমি-পৃঃ ২৫২) ঈশ্বরের নিকট আগমন ভিন্ন মনুষ্ণের পরিত্রাণ নাই, সুখ শাস্তি নাই। পৃ: ২৫) আমরা প্রতিক্ষনেই যেখান হইতে আসিয়াছি, আবার সেখানে
পরলােকের সন্ধান।
১০)
যাইব। ঈশ্বরের বক্ষ হইতে আসিয়াছি, আবার ঈশ্বরের বক্ষের
ভিতরে গিয়া বসি।—(পৃঃ ২৫৬)
ঈশ্বরের ইচ্ছারূপে, ঈশ্বরের শক্তিরূপে ছিলাম। আবার নিজের
ইচ্ছা নির্বাণের পর, ঈশ্বরের ইচ্ছার অন্তর্গত হইয়া থাকি। ইহাই
মুক্তি, ইহাই সমাধি।—পৃঃ ২৫৭)
সেই যে অনন্ত নিৰ্বাণ, এবং অনন্ত শান্তির আলয় ঈশ্বরের গৃহ,
সেই গৃহে তােমাদের শুভাগমন হউক। যাহার বক্ষ হইতে আসিয়াছ,
আবার সেখানে গিয়া চিরকালের শান্তি সম্ভোগ কর। পৃঃ ২৫৮)
বসন্তোৎসব
ইহলােকে থাকিয়াই আমরা পরলােকবাসীদিগের সঙ্গে যােগ
নিবদ্ধ করিতেছি। তাহাদিগের তাত্মা এখানেই আমাদিগকে বিশুদ্ধ
এবং প্রফুল্ল করিতেছে।-(পৃঃ ২৬৫)
আত্মার চিরবসন্ত যথার্থ মােক্ষ-ধামের অবস্থা।-(পৃঃ ২৬৮)
যেমন জড়রাজ্যে সুশীতল সমীরণ উত্তপ্ত শরীরকে স্নিগ্ধ করে,
সেইরূপ ধৰ্ম্মরাজ্যে শান্তিসমীরণ আসিয়া পাপতাপে উত্তপ্ত আত্মা
সকলকে সুন্নিগ্ধ করে।-(পৃঃ ২৬৯)
ফুল ঈশ্বরের হস্ত হইতে আসিতেছে। ফুল স্বর্গের উৎকৃষ্ট বস্তু।
পৃঃ ২৭১)
সেবকের নিবেদন প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড।
আদ্যাশক্তি-
তাহার সকল শক্তি জীবের হিতের জন্য।—(পৃঃ ৭১)
পরলােকের সন্ধান। আমার মা সত্য কি না ? সেই মাকে দর্শন করিতে করিতে ক্রমে এমন গভীর আনন্দের ভিতরে পড়িৰে যে, মাতৃদৰ্শন ভিন্ন তােমার আর কিছুই ভাল লাগবে , এবং মাকে ছাড়য়া আর কোথাও যাইতে পারিবে না। তখন ভিতরে বাহিরে সর্বত্র মাকে দেখিদে। তখন দেখিবে, স্বর্গ মর্ত্য এক হইয়াছে, পৃথিবী দেবলােক এক হইয়াছে, সংসার বৈকুণ্ঠ এক হইয়াছে। পৃঃ ১১৭) তাহার কোটি রূপ চারিদিকে বিকীর্ণ । তাহাকে দেখিলে পাপ তাপ লােগ শােক সমুদয় চলিয়া যায়। পৃঃ ১২০ ) গ যােগানন্দ- নিৰ্ব্বাণ-সরােবরে ডুব দিয়া যাহারা যোগরাজ্যে গমন করে, তাহারা পরলােকগত মহাত্মাদিগের অব্যবহিত নৈকট্য অনুভব করে। যােগরাজ্যে দেশভেদ জাতিভেদ নাই। যখন জড়রাজ ছাড়িয়া, চিন্ময় হইয়া আধ্যাত্মিক লােকে গমন করি, তখন সমুদয় অশরীরী আত্মা ঈশ্বরেতে সংযুক্ত দেখিতে পাই। সেখানে দেবদেব মহাদেব যোগেশ্বরের চিন্ময় যােগ নিকেতন এবং তার মধ্যে যােগীদিগের অসংখ্য নিরাকার গৃহ রহিয়াছে। পৃঃ ২৭৮ যখনই তুমি সেই রাজ্যে গিয়া সেই রাজ্যের ঈশ্বরকে পিতা মাতা বলিয়া সম্বােধন করিলে, তিনি তােমাকে আপনার বাগানের নানা প্রকার পেম ও পুণ। ফুলে সাজাইতে লাগিলেন। সেখানে বসিয়া পরলােকবাসী ভক্তদিগের সঙ্গে সহজে একাত্ম হইয়া যাইবে ; সেখানে ঈশ্বরের প্রত্যাদেশ, ঈশ্বরের শ্রীমুখের কথা শুনিতে লাগিলে। এক একবার তাহার উৎসাহ কর কথা শুনিয়া মৃত জীবনে নবজীবনের পরলােকের সন্ধান। সঞ্চার হইতে দেখিলে। সমস্ত জীবন কখন কি করিবে, সেই স্বর্গের পরম বন্ধুর নিকট সমুদয় জানিলে।—(পৃঃ ২৭৮) যে পরিমাণে ঈশ্বরের সঙ্গে প্রকৃত যােগ, সেই পরিমাণে চিত্তশুদ্ধি এবং আত্মার উজ্জ্বলতা। পৃঃ ২৭৯) সেবকের নিবেদন—তৃতীয় খণ্ড। ঈশ্বরের সখ্যভাব- মার ক্রোড়ে ইহলোক পরলােক এক হইল। পৃ: ৪৫) * ভাগবতী তনু আত্মার আধার শরীর। শরীরের আধার আত্মা। শরীরের ভিতরে আত্মা থাকে, আবার আত্মা বিনা শরীর জীবিত থাকিতে পারে না। আত্মাকে অবলম্বন করিয়া শরীর বাঁচিয়া আছে, আত্মা না থাকিলে মৃত শরীর কেন কাৰ্য্য করিতে পারে না। আবার শরীর বিনা আত্মা পৃথিবীতে কোন ক্রিয়া প্রকাশ করতে পারে না, সুতরাং শরীর যেমন আত্মার আধার, আত্মাও তেমনই শরীরের অবলম্বন। দুই কথাই সত্য। আমরা মনে করি, আত্মা শরীরের মধ্যে থাকে ; কিন্তু শরীরের সাহায্যে যে আত্মা ভক্তিরস, যােগরস, জ্ঞানর, পুণ্যরস ও শান্তিরস লাভ করে, তাহা সর্বদা ভাবিয়া দেখি । জীবাত্মা এই শরীরের ভিতর দিয়া পৃথিবী হইতে ধৰ্ম্মমধু, জ্ঞানমধু প্রভৃতি নানা প্রকার সুমিষ্ট রস আহরণ ও সঞ্চয় করে। অতএব শরীর যে আমাদিগের পক্ষে আদরের বস্তু, ইহা অবশ্যই স্বীকার করিতে হইবে।—(পৃঃ ৫৪) ১০৪ পরলােকের সন্ধান। জীবাত্মা ধরাধামে এই অসার শরীরের বারা অনন্তকালের প্রচুর সম্পত্তি সঞ্চয় করিয়া পরলােক গমন করে। পৃঃ ৫৫) ঃ দেহতত্ত্ব- নিঃশ্বাস প্রশ্বাস ক্রিয়া এবং রক্তসঞ্চালন ভিন্ন যেমন শরীরের জীবন থাকে না, সেইরূপ প্রেমভক্তির রক্ত এবং পবিত্রতার বায়ু ভিন্ন আত্মৰ ধৰ্ম্মজীবন থাকে না। পৃঃ ১০৬) প্রাণের প্রাণ ঈশ্বর স্বয়ংই আত্মার মধ্যে পুণ্যের নিঃশ্বাস এবং প্রেমের রক্ত হইয়া বাস করিতেছেন।-(পৃঃ ১০৭ ) মন্ত্র এবং ব্রত- আমার সঙ্গে যিনি কথা কহেন, যিনি আমার কথার উত্তর দেন, যিনি দুর্বলতার সময় বল দেন, পাপ-বিকারের ঔষধ দেন, দুঃখের সময় সান্ত্বনা এবং প্রাণ ভরিয়া সুখ শান্তি দেন, তিনিই আমার বন্ধু, তিনিই আমার জীবনদায়িনী মাতা।-(পৃঃ ১৫৮) অবতারবাদ- পরমাত্মার সঙ্গে জীবাত্মার বিশেষ সৌসাদৃশ্য রহিয়াছে। আধ্যা ত্মিক স্বভাবের মিলন আছে বলিয়াই মনুষত্মাকে ঈশ্বরের পুত্র বলা যায়। মনুষ্যাত্মার সঙ্গে যদি পরমাত্মার সৌসাদৃশ্য না থাকিত, তাহা হইলে আমরা ঈশ্বরকে মনুষের পিতা না বলিয়া, তাঁহাকে কেবল মনুষ্যের সৃষ্টিকর্তা বলিতাম।—(পৃঃ ২৭) পরলােকের সন্ধান। ধৰ্ম্ম স্বাভাবিক চক্ষু যেমন সহজে সৃষ্টি ও সৃষ্টির সৌন্দৰ্য্য দেখিতে পায়, শ্রোত্র যেমন সহজে বাহিরের শব্দ ও সঙ্গীতাদি শ্রবণ করে, হস্ত যেমন সহজে বাহিরের বস্তু সকল স্পর্শ করে, সেইরূপ অন্তরের বিশ্বাস-চক্ষু যখন সহজে ব্ৰহ্ম-দর্শন করে, অন্তরের বিবেককর্ণ যখন সহজে ব্ৰহ্মবাণ শ্রবণ করে এবং হৃদয়ের ভক্তিহস্ত যখন সহজে ব্ৰহ্ম-পাদপদ্ম স্পর্শ করে, সেই সহজ অবস্থায় দর্শন, শ্রবণ, স্পর্শ সকলই যথার্থ ও অকৃত্রিম।-(পৃঃ ২৩৩) সেবকের নিবেদন—চতুর্থ খণ্ড। স্বর্গীয় উদ্বাহ চক্ষু দেখে কেন? ভবিষ্যতে আত্মা দেখিৰে, এই জন্য। শরী: রের চক্ষু সৃষ্টির সৌন্দর্য্য দেখিয়া বিমােহিত হয়; আত্মার উজ্জল বিশ্বাস-চক্ষু স্রষ্টার অরূপ রূপ দেখিয়া বিমুগ্ধ হয়। কর্ণ শুনে কেন ? ভবিষ্যতে আত্মার বিবেক কর্ণ ঈশ্বরের আদেশ শুনিবে, এই জন্য । হস্ত ধরে কেন? ইহার গূঢ় অর্থ এই যে, যখন বাহিরে দুটি হাত অবসন্ন হইয়া পড়িবে, তখন আত্মার ভিতর হইতে ভক্তি-হস্ত বাহির হইয়া ব্ৰহ্মচন্দ্র ধারণ করিবে। পা চলে কেন ? পশুও চলে। মনুষ্যের শরীরে দুটী চরণ সংলগ্ন হইল কেন? অবশ্যই ইহার কোন গূঢ়তর অর্থ আছে। শরীরে যেমন গতি-শক্তি দিয়াছেন, বিধাতা আত্মার মধ্যেও গতি-শক্তি নিহিত রাখিয়াছেন; সেই গতি-শক্তি দ্বারা আত্ম সতেজে থাকব না আর এ পাপ-রাজ্যে, ব্ৰহ্মলােকে যাব চলে” এই কথা বলিতে বলিতে দুর্দশা ও অন্ধকারের রাজ্য ছাড়িয়া দিব্যধামে চলিয়া যাইবে।(পৃঃ ১৩) ১৪ পরলােকের সন্ধান। বাস্তবিক স্বর্গপতি, সর্বপতি, বিশ্বপতি, প্রাণপতি ঈশ্বরের সঙ্গে গৃঢ় প্রাণগত যােগ স্থাপিত না হইলে, জীবাত্মা কিছুতেই প্রকৃত সুখ শান্তি লাভ করিতে পারে না।—( পৃঃ ২০ ) তাহার মত প্রাণের সুহৃদ ও সৰ্ব্বসুখদাতা আর কেহ নাই, তিনিই পূর্ণ সুখ।-- পৃঃ ২৩) * কৰ্ম্ম-যােগ- তুমি তােমার কাৰ্য শেষ না করিয়া ইহলােক হইতে পরলােকে যাইতে পার না। পৃঃ ১১৮) কাৰ্য্য না করিয়া ইহলােক হইতে পলায়ন করিলে দুর্নাম হইৰে, পরলােকে কষ্ট সহ্য করিতে হইবে। যদি কাৰ্য্য করিয়া চলিয়া যাও, বিশেষ পুরস্কার লাভ করিবে।-(পৃঃ ১১৯) পৃথিবীতে ঈশ্বরের কাৰ্য শেষ না হইলে পয়লাকের দ্বার অবরুদ্ধ হইবে, সুতরাং সাবধান হইয়া ইহলােকে কাৰ্য শেষ করিতে হইবে। -(পৃ ১১৯) কাৰ্য শেষ করিয়া গেলে স্বর্গের দ্বার আপনি খুলিবে।-(পৃ: ১২৮) গ লক্ষী ও সরস্বতীর মিলন ধন সম্পদ শান্তি সুখ স্বচ্ছন্দতা সকলই আমাদের তাহার নিকটে। -(পৃঃ ১৫৫ ) # ভাই অঘােরনাথ মৃত্যুকে দেখিয়া মূখেরাই বিকম্পিত হয়, ভীত হয়। কিন্তু ভয়া- নক মৃত্যুই পরিত্রাণের সেতু। ঈশ্বরের সুন্দর মুখ দেখিলে লােভ পরলােকের সন্ধান। হয়, অন্ধকার মৃত্যু দেখিলে লােকে ভয় পায়, কিন্তু অন্ধকার আমা- দিগের উপকারী। পৃঃ ১৪৭ ) দুঃখ পাইয়া মানুষ যােগী হয়, মানহানি, ধনহানি, সন্তানহানি হইলে আরও যােগী হয়।-(পৃঃ ১৫৮) এক হাতে সুখ, এক হাতে দুঃখ ধারণ করিব। সুখ দুঃখ দুই মার কাছে লইয়া যায়। দক্ষিণ হস্ত ধরিল জীবন ও মুখ, মৃত্যু ও শােক বাম হস্ত ধরিল। ইহারা টানিয়া মার কাছে লইয়া চলিল। এক হস্ত উৎসুক হইয়। সুখের বস্তু ধরিল, আর এক হাত রােগ শােক কলহ বিবাদ প্রভৃতি পৃথিবীর দুঃখ ধরিল।-(পৃঃ ১৫৮) সুখে আমােদিত হইয়াও মাকে মনে পড়ে, দুঃখে কঁদিতে কাদি তেও মাকে মনে পড়ে। পৃঃ ১৫৮ ) সৎসঙ্গ- মৃত ব্যক্তির সঙ্গে সদালাপ সৎপ্রসঙ্গ প্রয়ােজন। সকল ভাই পৃথিবীতে রহিল, এখন আর বাহ্যিক আকার দেখিবার সম্ভাবনা এখন সৎ প্রসঙ্গে জীবিতগণ মৃতের দলভুক্ত। যিনি ইহ- লােকে রহিলেন না, তিনি আমাদের দলভুক্ত হইয়া রহিলেন। (পৃ: ১৭০) আমাদিগের একজন পরলােকে যাওয়াতে ইহলােক পরলােক এক হইল, সাধুগণের সঙ্গে আমাদিগের সম্বন্ধ স্থায়ী হইল, এই নুতন সম্বন্ধ জন্য নূতন কর্তব্য উপস্থিত হইল। পরলােকে সকলে বন্ধুকে সমাদরে গ্রহণ করিয়াছেন। এখন সকল প্রকারের পত্র পৃথিবীর ডাকে আর পাঠাইতে হইবে না। এখন আমাদিগের পত্র সহজে স্বর্গে পাঠাইতে পারিব। আমাদিগের বন্ধুর মধ্য দিয়া স্বর্গে যাইবে।
১৮ পরলােকের সন্ধান। আমাদিগের মধ্যে এক নূতন বিধান খুলিল। এক পার্থিব সম্বন্ধ ছিল, এখন ইহলােক পরলােকের সম্বন্ধ খুলিল। ইহলােকের ভদ্রতাই আর শেষ নয়, কত সৎপ্রসঙ্গ সদালাপ পরলােকের সাধু- গণের সঙ্গে হইবে।(পৃঃ ১৭) পরলােকের সম্বন্ধ আধ্যাত্মিক। আত্মার ভিতর দিয়া পরলােকের বিষয় দেখিতে হইবে। বাহিরের চক্ষে পরলােকের সাধুগণকে দর্শন কুসংস্কার, বাহিরে হস্তে যে তাহাদিগকে ধরিতে যায়, সে পাগল। পৃথিবীর প্রণালীতে তাহাদিগকে ধরিতে গেলে অপরাধী হইতে হয়, তাহারা তদ্বারা অপমানিত হন-পৃঃ ১৭১) পৃথিবী ও স্বর্ণ এ দুইয়ের ভিতরে সেতু নির্মাণ করিতে হইবে, ভিতরের পথ দিয়া করিতে হইবে, তথায় যাইতে কইলে মনের ভিতর দিয়া রাস্তা। সেখানে বাহির দিয়া যাইবার যাে নাই।-(পৃঃ ১৭২) মন বিশুদ্ধ কর, পরলােকের বিশ্বাস উজ্জ্বল কর, ঈশ্বরের ভক্তিতে উন্নত হও, ব্যাকুল-হৃদয়ে মনের ভিতরে প্রার্থনা কর, ঈশ্বর তােমার, বন্ধুকে দেখাইবেন, তােমার বন্ধুকে তুমি ঈশ্বরের ক্রোড়ে দেখিতে পাইকে।-(পৃঃ ১৭৩) তাহাদিগকে হৃদয়ে রাখিয়া সৎপ্রসঙ্গ কর। ঠিক যেমন মনুষের সঙ্গে সৎ প্রসঙ্গ করিয়া থাক, তেমনি করিতে হইবে। এখান হইতে তাহারা চলিয়া গিয়াছেন বলিয়া তঁহাদিগের সঙ্গে সম্বন্ধ চলিয়া গিয়াছে, এরূপ মনে করিও না। পার্থিব সম্বন্ধ তাহাদিগের সঙ্গে চলিয়া গিয়াছে, এখন আর তাহাদিগের সঙ্গে মিলন হইতে পারে না, স্বর্গে, গিয়া তৰে তাহাদিগের সঙ্গে সম্মিলন হইবে, এরূপ মনে করিও না। সংসারের পরপারে গিয়া পৃথিবীর পিতা আরও নিকট হইলেন, বন্ধুর তা আরও নিকট হইল, প্রত্যেক সাধুর সঙ্গে আমাদিগের আরও পরলােকের সন্ধান। নিকট সম্বন্ধ হইল। মরিলেই সম্বন্ধ গেল, ইহা হইতে পারে না। এখানে জীবন থাকিতে এক শ্রেণীভুক্ত, চলিয়া গেলে অপর শ্রেণীভুক্ত, ইহা মনে করিতে পার না। এক সময়ে যাঁহাকে দেখিয়াছি, সর্বদা দেখিব। পৃ: ১৭৪) পাঁচ জনের সঙ্গে যেমন সম্বন্ধ ছিল তেমনই রহিল, মরিয়াছেন বলিয়া তিনি অগ্রাহ্য হইলেন, আজ শ্রাদ্ধ কৰ্ম্ম করিয়া সমুদয় সম্বন্ধ শেষ হইল, এরূপ কখন মনে করিব না। শ্রাদ্ধে পাৰ্থিৰ সম্বন্ধ শেষ ইল বলিয়া স্বর্গীয় সম্বন্ধের শেষ হইল, তাহা নহে। শ্রাদ্ধে পার্থিব সম্বন্ধের শেষ, স্বর্গীয় সম্বন্ধের আরম্ভ। আজ যাহার শ্রাদ্ধ করিলাম, স্বর্গে তিনি জীবিত হইলেন, এই কথা ভাবিব। এখন সম্বন্ধ পূৰ্ব্বা- পেক্ষা আরও স্পষ্টতর। পৃঃ ১৭৪) স্বর্গের বন্ধু আপনি কি আমাদিগের হইতে পারেন ? কখনই না। হাতে ধরিয়া ঈশ্বর স্বর্গের বন্ধুকে আনিয়া মিলিত করেন। (পৃ: ১৭৫) সেবকের নিবেদনপঞ্চম খণ্ড। মুক্ত অবস্থা পিতা মাতার নিকট জন্মগ্রহণ করিয়া যেমন পৃথিবীতে আসি- ছি, তেমনই স্বর্গস্থ পিতার নিকটে জন্ম লইয়া স্বর্গে আসিব। দুই চক্ষু দুই কর্ণ লইয়া ভূমিষ্ঠ হইয়া সংসারক্রিয়া, সাধন করিতেছি ; এইরূপে বিশ্বাস ভক্তি, পুণ্য আনন্দ লইয়া, জ্ঞানচক্ষু বিবেককর্ণ লইয়া ভূমিষ্ঠ হইয়া, ভূমি পরিত্যাগ করিয়া, স্বর্গে আরােহণ করিয়া, স্বৰ্গক্রিয়া সমাধা করিব। পৃঃ ২০) ১১০ পরলােকের সন্ধান। ব্ৰহ্মতেজ- ব্ৰহ্মবলের তেজ যেখানে, সেখানে কালের কোন ক্ষমতা নাই। ব্ৰহ্মতেজে যিনি তেজস্বী, তিনি মৃত্যুশয্যায় বলেন, “শমন, আমি তােমার ধার ধারি না, আমার উপরে তােমার কোন অধিকার নাই। মৃত্যুঞ্জয় ঈশ্বর আমার মন্ত্রদাতা, দীক্ষাদাতা গুরু ; মৃত্যু, তুমি আমার কি করিবে ? আমি তােমার দ্বারা কখনই পরাস্ত হইব না”।-(পৃঃ ৬১) শরীর ক্ষয় হউক না কেন, শরীর যখন নষ্ট হয়, তথনই তো আত্মা ক্ষত্তি প্রকাশ করে। পিঞ্জর ছাড়িয়া যখন পাখী উড়ে, তখনই তো ডানার অধিক বল প্রকাশিত হয়।-(পৃ: ৬১) উপাসনাই উৎসাহের আকর। এই উপাসনা দ্বারা আমাদের আত্মা স্বর্গলােক, পরলােকের জন্য উপযুক্ত হউক।-(পৃঃ ৬২) গ প ব্ৰহ্মপ্রেম চির-সরস— ব্ৰহ্মপদ-সংস্পর্শে বহুকালের দগ্ধ প্রাণ শীতল হইয়াছে।-পৃঃ ৬৮) * পূর্ণ ধৰ্ম ভবিষ্যতে আকাশে এমন সকল নক্ষত্র আছে, যাহাদের জ্যোতি পৃথিবীতে এখন পর্যন্ত আসে নাই। সেইরূপ স্বর্গে এমন সকল সত্য গােপনে রহিয়াছে, পৃথিবী এখন পর্যন্ত যাহার আভাস পায় নাই।—(পৃঃ ৮২) * ব্ৰহ্মদর্শন ও শ্রবণ স্বাভাবিক এলে নামিলেই যেমন তাহাতে মগ্ন হওয়া যায়, পক্ষী যেমন অনা- পরলোকের সন্ধান। মাসে উপরে উঠে, আত্মার ব্রহ্মে নিমগ্ন হওয়া, মানসপক্ষীর উর্দ্ধে উঠ। তেমনই সহজ। পৃঃ ১০৫ ) অনিত্যের মধ্যে নিত্য মৃত্যুঞ্জয়ের মন্দিরের বাহিরে বৎসর চলিয়া যায়, কালের পরি- বৰ্ত্তন হয় এবং সমস্ত আন্দোলিত হয়; কিন্তু মহাদেবের মন্দিরের ভিতরে কাল প্রবেশ করিতে পারে না।-(পৃঃ ১৩১) চল আমরা সকলে ব্রহ্মের বুকের ভিতরে যাই। যেখানে কাল অথবা মৃত্যুর অধিকার নাই। পৃঃ ১৩১) আমরা যাহার ক্রোড়ে আশ্রিত, তিনি কালাতীত ব্ৰহ্ম মৃত্যুঞ্জয় । তাঁহার পদতলে ঘর করিলে মৃত্যুযন্ত্রণা থাকে না। অতএব যেমন বৎসর কাল-সমুদ্রে মিশিয়া গেল, সেইরূপ প্রত্যেক ক্ষুদ্র জীবাত্মা ঢেউ অনন্ত ব্রহ্মাণ্ডপতি পরমাত্মার মধ্যে সম্মিলিত হইয়া যাক। (পৃঃ ১৩৩) - সত। আত্ম-পরীক্ষা- সংসারের কোলাহল মধ্যে অন্তদৃষ্টি জাগ্ৰৎ রাখা অত্যন্ত আব- শ্যক।-পৃঃ ৩) সময় যিনি সর্বদা এলােক হইতে অপসৃত হইতে প্রস্তুত রহিয়াছেন, তিনিই উত্তমরূপে সময় ক্ষেপণ করিতেছেন।-(পৃঃ ।)
পরলােকের সন্ধান। সর্বদা কর্তব্য-জ্ঞানকে জাগ্ৰৎ রাখিবে ও মধ্যে মধ্যে মৃত্যুকে স্মরণ করিবে।-(পৃঃ ৭) নির্ভর অতএব যাহাতে আত্মা নিজবলে ঈশ্বরের দিকে গমন করিতে পারে, সেইরূপ চেষ্টা করিবে। পৃঃ ৮) সংসার যেমন শরীর মৃত হইলে বাহ বিষয়েতে অসাড় হইয়া পড়ে, তদ্রুপ সাংসারিক জীবন অতিক্রম করিলে সংসারের সুখ দুঃখে, সম্পদ বিপদে, আশা ভয়ে, আত্মা আর বিচলিত হয় না। পৃঃ ১৩) % পবিত্রতা আত্মাকে পবিত্র করাই আমাদের সমুদয় কার্যের লক্ষ্য থাকিবে। কৰ্ম্ম দ্বারা পাপ পুণ্য আত্ম হইতেই জন্মে, আত্মা সকল কর্মের মূল। অতএব আত্মার প্রতি সর্বদা দৃষ্টি রাখিবে।-(পৃঃ ১৭) ধৰ্ম্মপথে নিরাশা কতকগুলি পরীক্ষাতে হৃদয় আন্দোলিত হইলে নিরাশা উপস্থিত হয়। ইহার জন্য অগ্রে হৃদয়কে প্রস্তুত না রাখিলে অত্যন্ত বিপদ। মনে যদি একটু সংশয় কি নিরাশার ভাব থাকে, পরীক্ষার সময় তাহা দৃঢ়তররূপে বদ্ধমূল হয়। নিরাশা প্রমাণ দেখাইয়া অবিশ্বাসী হৃদয়কে বলে দেয়, “তাের আর আশা নাই, তুই আর জীবনকে এরূপ উপ- হাসের বিষয় করি না, ধৰ্ম্ম মিথ্যা, ঈশ্বর মিথ্যা, সকলই মিথ্যা।”
পরলােকের সন্ধান। ১১৩ ধর্ম যেমন প্রমাণ দেখাইয়া বিশ্বাস দৃঢ় করেন, অধৰ্ম্ম তেমনই অবিশ্বাস প্রবল করিয়া দেয়। যাহারা অবিশ্বাসী, তাহারা মরিবে প্রতিজ্ঞা করে। তাহারা মনে করে, “এ অবস্থা নিরুপায়, অসহায় অবস্থা। যিনি বলিয়াছিলেন, আমি পরম পিতা, তিনিও পরিত্যাগ করেন। বুঝছি, বিপকালে তিনিও শুনেন না, বিষয়ী বন্ধুর ন্যায় অকূল পাথারে ভাসাইয়া পলায়ন করেন। তিনি যদি দয়াময় হন, তবে কি এমন হয় ? তবে তিনি দয়াময় নন। তঁাহারও মনুষ্যের ন্যায় মেহ দয়া ও সহিষ্ণুতার সীমা আছে। দুই বৎসর নয়, পাঁচ বৎসর দয়া করিলেন, কিন্তু চিরকাল কি করিতে পারেন ?” কিন্তু ভক্ত সাধকের ভাব ইহার বিপরীত। তিনি বলেন, ঈশ্বর কখনই পরি- ত্যাগ করেন না, করিতে পারেন না। তিনি কখন চরণের আশ্রয় দেন, কখন পদাঘাত করেন; কখন মিষ্টান্ন, কখন তিক্ত বস্তু দেন; কখন সূৰ্য্য, কখন অন্ধকার দেখান; কখন বিপদ, কখন সম্পদ প্রেরণ করেন। তিনি বলেন, ঈশ্বর মাৱিতেছেন মারুন, কিন্তু তাহাতে আমায় ভয় নাই। কেন না আমি লক্ষণ মিলাইয়া দেখিয়াছি, তাহার যে চরণ এক সময় আশ্রয় দিয়াছে, সেই চরণই আঘাত করি- গেছে। তিনি আমার মঙ্গলের জন্য আমাকে পরীক্ষাতে ফেলিয়া কষ্ট দিতেছেন, ইহাতে আমার চৈতন্য হইবে। তিনি অন্ধকারের পর অালােক, বিপদের পর সম্পদ আনিবেন, কেন না উভয়ই ভঁহার প্রেরিত।-(পৃঃ ৪৭ ) ভয় ধর্মের আরম্ভ, প্রেম ধর্মের শেষ আমাদিগের মধ্যে ঈশ্বর-তত্ত্বের যত কথা হয়, পরলােক সম্বন্ধে তত হয় না, এতদ্বারা ভবিষ্যতে একটি বিশেষ ক্ষতি হইবে। বিলাতে ১১৪ পরলােকের সন্ধান। ; } এইরূপ ঘটিয়াছে যে, দৃঢ় একেশ্বরবিশ্বাসীদিগের মধ্যেও অনেকে পরকাল বিষয়ে কেবল অনুমান করেন ; ঈশ্বরে যেরূপ দৃঢ় বিশ্বাস আছে, পরলােকে তেমন নয়। তাহারা কোন নূতন ধর্মের ভিত্তি স্বরূপে কেবল একেশ্বরে বিশ্বাস রাখিতে চান, পরলােক সম্বন্ধে কোন কথা তাহার মধ্যে আনিতে ভালবাসেন না। আমাদিগের মধ্যেও ঈশ্বর সম্বন্ধে যেরূপ, পরকাল সম্বন্ধে সেরূপ সাক্ষাৎ প্রত্যক্ষ জ্ঞান নাই। তজ্জন্ত মৃত্যুর কথা তত ঘটে না। হিন্দুদিগের মধ্যে যে প্রকার শ্মশান-বৈরাগ্য আছে, সেরূপ আমাদের মধ্যে নাই, কিন্তু কেবল তাহা থাকিলেও চলিবে না; পরলােকের গম্ভীর ভাব, উজ্জ্বল সত্তা এবং অনন্ত উন্নতির শক্তি থাকা উচিত। কেবল ভয় দ্বারা অধিক বয়সের লােকদিগকে অধিককাল শাসন করা যায় না, সংসারের জীবন অস্থায়ী, কেবল ইহা বলিলে চলে না। কোন এক বিষয়ে ভাব এবং অভাব উভয় পক্ষে বলা উচিত। পৃ: ৭৬) যথার্থ বৈরাগ্যই ঈশ্বরে অনুরাগ। মৃত্যুভয় দ্বারা হৃদয়কে ঈশ্বরের দিকে, পবিত্রতার দিকে আনয়ন করে, কিন্তু ভক্তি-এখন যে পবি এতায় আছি, তাহা অপেক্ষা অধিকতর পবিত্রতায় থাকিবার আশা দিয়া-পরলােকে বিশ্বাস দৃঢ় করিয়া দেয়। সংসারের অনিত্যতা স্মরণ করার নাম বৈরাগ্য।-(পৃঃ ৭৭ ) ; আকস্মিক মৃত্যু ঘটনা হইতে শিক্ষা- মৃত ব্যক্তিদের আর জাতি বর্ণ ধর্মভেদ নাই, সকলেই এক পিতার সন্তান হইয়া তাঁহার পরিবারস্থ হন।-(পৃঃ ১১৮) পরলােকের সন্ধান। মৃত্যুরজ্জন্য প্রস্তুত হওয়া মৃত্যুর অর্থ যদি পরলােকের অবস্থা হয়, তাহার আর এক নাম ঈশ্বরের সহিত বাস করা। পৃঃ ১১৯) পরলােকের দিকে সকলেই চলিতেছে, জলস্রোতের বিয়াম নাই। পাপী তাপী, সাধু অসাধু, যিনি যে অবস্থায় থাকুন, সেই অবস্থাতেই যাত্রা করিতেছেন।(পৃঃ ১১৯) একজন আফিসের হিসাব না মিলাইয়া যদি ঘরে চলিয়া যান এবং পরদিন তাহার কৰ্ম্ম যায়, তিনি প্রভুর নিকট যেমন দায়ী ও দণ্ডভাজন হন, জীবনের কাজ না সারিয়া পরলােকে গেলেও সেইরূপ অবস্থা।-(পৃঃ ১২০ ) এ পৃথিবীতে যেমন একবার পাপ হইতে মুক্ত হইয়া আবার পতন হইয়া থাকে, পরলােকে সেইরূপ নহে। তাহা হইলে অনন্তকাল পতন ও উত্থান করিতে হয়। ইহলােকে আমাদিগর সঙ্গে সঙ্গে চিরকাল প্রলােভন ও পরীক্ষা চলিয়া থাকে, পরলােকে সেরূপ নয়। সেখানে বাহিরে কোন প্রলােভন নাই, সেখানকার পরীক্ষা মনের মধ্যে। মনের মধ্যে পাপ সংগ্রহ করিয়া লইয়া যাই, সেই পাপই উন্নতির পথে বাধক হয়। মূল সত্য এই, আমি শরীর ফেলিয়া মন কাইয়া যাইতেছি, পরলােকে নিজের আধ্যাত্মিক অবস্থানুসারে উন্নতি লাভ করিব। পৃ: ১২০ ) মৃত্যু কেবল লােকান্তর মাত্র, অবস্থান্তর নহে। আত্মা এক স্থানে ছিল, আর এক স্থানে যাইবে, কিন্তু এখানে যে অবস্থায় মৃত্যু, মৃত্যুর অব্যবহিত পরেই সে অবস্থার পরিবর্তন হইবে না। মৃত্যুর পরে যে অজ্ঞান অবস্থা, তাহা থাকিবে এরূপ নহে। শারীরিক বিকারে জ্ঞান কিয়ৎকাল মেঘাচ্ছন্ন সূর্যের ন্যায় আচ্ছন্ন থাকতে পরলােকের সন্ধান। ও মন পারে, কিন্তু পরে প্রকাশিত হইবে। নিদ্রার অবস্থাতে জ্ঞান বুদ্ধি যেমন প্রচ্ছন্ন থাকে, মৃত্যুকালে মােহও সেইরূপ। শরীর যতকাল সম্বদ্ধ আছে, ততকাল কিয়ৎ পরিমাণে পরস্পরে পরস্পরের অধীন। অত্যন্ত বিকারী রােগী যখন রােগমুক্ত হইয়া পুনরায় পূর্ব জ্ঞান লাভ করে, তখন যেমন সে অনে, বিকার-কালীন অজ্ঞানতার কোন দাগ থাকে না, মৃত্যুর পর আত্মার জ্ঞানও সেইরূপ বিশুদ্ধ ভাবে প্রকাশিত হয়।-(পৃঃ ১২০ ) মন আপনি আপনার স্বর্গ ও আপনি আপনার নরক। ইহলােকে যাহা পৃথিবী, পরলােকে তাহা মন। সেখানে মনের মধ্যেই আহার নিদ্রা, মনের মধ্যেই পরিশ্রম বিশ্রাম, মনের মধ্যেই আনন্দ ও বিষাদ। উপাসনা কালে গভীর ধ্যানে মগ্ন হইয়া, শরীরকে এককালে ভুলিয়া গেলে যে অবস্থা হয়, তাহাই পরলোকে সাধুদিগের অবস্থার আভাস। - পৃঃ ১২১) ঈশ্বর ও পরকাল সাধন ঈশ্বর ও পরলােক সাধন পরস্পরের সহকারী। আত্মার বাস স্থান পরকাল, উহা ঈশ্বরে। পৃঃ ১২৬) ঈশ্বরে অনন্তকাল বাস করিতেছি, তঁাহার মধ্যে ইহকাল ও পর- কাল গ্রথিত রহিয়াছে। ইহকাল ইহার অতি ক্ষুদ্র অংশ, তাহার পর পরকাল। মৃত্যু কিছুই নয়, একটা ঘটনা মাত্র। পৃঃ ১২৬) পরলােক হইতে ইহলােককে স্বতন্ত্র করিয়া ভাবিতে পারা ভয়ানক অবস্থা, কেন না তাহাতে ঈশ্বর ও পরকাল দুই স্বতন্ত্র থাকে ও ভাবিয়া ভাবিয়া স্থির করিতে হয়। সাধন-চশমা পরিলে ঈশ্বর ও পরকাল, একত্র অতি উজ্জলবেশে প্রকাশ পায়।-( পৃঃ ১২৭ ) পরলােকের সন্ধান। ১১৭ চত্বারিংশ সাম্বৎসরিক উৎসব- আত্মা যতক্ষণ ঈশ্বরের সহবাসে থাকে, ততক্ষণই তাহার সরস এবং সজীব অবস্থা। পৃঃ ৯৩৫) পুষ্পের জীবন জল, আত্মার জীবন ব্ৰহ্ম-প্রেম। ব্ৰহ্ম হইতে যাই আত্মা বিচ্ছিন্ন হইল, তখনই তাহা শুষ্ক হইল। পুষ্পের এমন শক্তি নাই যে রৌদ্রের মধ্যে থাকিলেও আপনার বলে রস উৎপাদন করে, সেইরূপ আত্মারও এমন কোন ক্ষমতা নাই যে ব্ৰহ্ম হইতে দূরে থাকিয়াও আপনার বলে সরস থাকিতে পারে। পৃঃ ১৩৫ ) উৎসবলব্ধ আশা- বিপদ যদি ঈশ্বর-লাভের উপায় হয়, সেই বিপদই প্রকৃত সম্পদ। (পৃঃ ১৪৭) - কৰ্ম্মযােগ বিবেক আমাদের মধ্যে থাকে, অথচ আমাদের অতীত-স্বর্গীয়। আত্মর কর্ণে আদেশ শুনাইবার জন্য ইহাকে ঈশ্বরের মুখ বলা যায়। -(পৃঃ ১৬৮) আশ্রম স্থাপনের উদ্দেশ্য চক্ষু চাহিয়া যে কিছু সম্বন্ধ স্থির করা যায়, তাহা কালে পুরাতন ও অবস্থা গতিকে বিচ্ছিন্ন হইয়া যায়, কিন্তু নিমীলিত নেত্রে কেবল আত্মার যােগে যে পরিবার সাধন হয়, তাহা স্থায়ী ও দুচ্ছেদ্য। (পৃঃ ১৯৪) الاد পরলােকের সন্ধান। মহাপুরুষগণের সঙ্গে যােগ-- ইহলােক ও পরলােক এক, কেন না আমাদিগের জীবন এক ভিন্ন দুই নহে। এখানে যে জীবনের আরম্ভ, সেই জীবনই অনন্ত- কাল পর্যন্ত প্রসারিত হইতে থাকিবে। মৃত্যু কিছুই নহে, কেবল একটা ঘটনা মাত্র। ইহা যদি সত্য হয়, তাহা হইলে মৃত ও জীবিত সকলেই এক হইল, কারণ যাহারা মৃত, তাহারা তত জীবিত রহিয়া- ছেন। দুই সহস্র বৎসর পূর্বে যারা মৃত, আর পর যাহারা মৃত, সকলেই সমান ভাবে বর্তমান। তাহারা কোথায় আছেন ? নিশ্চয়ই ঈশ্বরের কাছে। তবে উপাসনা দ্বারা আমি ঈশ্বরের নিকটস্থ হইলে তাহাদেরও নিকটস্থ হই। ঈশ্বরকে অবলম্বন করিয়া, তাহাদের সহিত সম্মিলিত হইয়া থাকিব, তাহাতে আর অসম্ভব কি ? ( পৃঃ ২২৪) প্রশ্ন।পরলােকস্থ ব্যক্তিদিগের সহিত এক পরিবার হওয়া কিরূপ? উত্তর।—এক পরিবার কি, না এক বাড়ীতে প্রতিযোগে একত্র বাস করা। নিকটস্থ দূরস্থ, ইহলােকের পরলােকের সকল লােকই ঈশ্বরের মধ্যে বাস করতেছেন, তাহা ছাড়া কাহার থাকিবার যে নাই। তার মধ্যে প্রবেশ করিলেই আমরা সকলকে পাই। (পৃঃ ২২৪ ) ধৰ্ম্মজীবনের উন্নতির ধাপ আছে। আমি যদি চায়ি ধাপ উঠি, পরলােকগত যে ব্যক্তি উন্নতিতে আমার সঙ্গে সমান, তাহার সহিত আমার যােগ দৃঢ় হয়। যাহারা অধিক উন্নত ধাপে, তাহাদের সঙ্গে যােগ করিতে হইলে আত্মাকে অধিক উন্নত করিতে হইবে। ধৰ্ম্ম- জীবনের শ্রেণী বিভাগও আছে। অধিক বিশ্বাসী, অধিক প্রেমিক,
পরলােকের সন্ধান।
অধিক স্বাধীনতাপ্রিয় ব্যক্তিরা পরস্পরে এক শ্রেণীস্থ হন। আত্মায়
আত্মায় গৃঢ় আকর্ষণ আছে, আপনার ভাবের লােককে টানিয়া লয়।
(পৃঃ ২২৫)
শরীরের যােগ কিছুমাত্র আবশ্যক নয়, আধ্যাত্মিক যােগে স্থায়ী
ও প্রকৃত প্রণয় হইতে পারে। পৃঃ ২২৫)
জীবিত ব্যক্তিদিগের পক্ষে যাহা সম্ভব, মৃত ব্যক্তিদিগের পক্ষে
তাহা কেন সম্ভব হইবে না ?— পৃঃ ২২৬)
আত্মায় আত্মায় এক ভাব হইলেই মিলিবে।-(পৃঃ ২২৭)
পরলােক
আমাদের ইহলােক পরলােক এক সূত্রে গ্রথিত এবং পরলােকের
আরম্ভ এখানেই। এ জীবনে যাহার আস্বাদন পাই, পরজীবনে
তাহা পাইব, নিশ্চয় বলিতে পারি- পৃ: ২৩০)
ব্রাহ্ম জানেন, পরলােকের আশা ইহলােকে নিশ্চয়ই কতক পরি-
মাণে চরিতার্থ হইয়াছে, পরলােকে তাহা ক্রমশঃ পূর্ণ হইতে থাকিবে।
পৃঃ ২৩০)
ইহলােক ও পরলােক এক। মৃত্যু এ ঘর হইতে ও ঘরে যাওয়া
মাত্র । পৃ: ২৩২)
ঈশ্বরে বিশ্বাস অর্থই পরলােকে বিশ্বাস। গভীর উপাসনায় নিমগ্ন
হইয়া যখন ঈশ্বরকে আত্মার একমাত্র অবলম্বন জানিয়া তাহার
উপর সম্পূর্ণ নির্ভয় করি, তখন বিষয়, সংসার ও এ পৃথিবীর অতীত
এক স্বতন্ত্র স্থানে আমরা বাস করি। তখন এই মাত্র জানি, তাহাতে
বাঁচিয়া আছি, চিরকাল থাকিব।-(পৃঃ ২৩২)
পরলােকের সন্ধান। নববিধানের গূঢ়তত্ব জীবাত্মার উদ্দেশ্য কেবল ব্ৰহ্মবান্ হওয়া, সে ধার্মিক কি সুখী হইতে চাহিবে না।-(পৃঃ ৩০০ ) প্রকৃত বিশ্বাস কেবল সংসারের বিপদ আপদ শান্তির জন্য যে ধৰ্ম্ম, তাহা স্বার্থপর ও ক্ষণিক, তাহা নিরাপদ ও স্থায়ী হইতে পারে না। ঈশ্বরের জন্য যে নিঃস্বার্থ ও উন্নত ধৰ্ম্ম, তাহাতেই মুক্তি ও পরিত্রাণ লাভ হন্স। ( পূঃ ৩২) ব্রাহ্মি কাদিগের প্রতি উপদেশ । পরলােক- পরকালই আমাদের যথার্থ গৃহ, এই পৃথিবী আমাদের থাকিবার স্থান নহে। ঐ সামনে একটা জায়গা আছে, তাহা অত্যন্ত সুন্দর। দূর থেকে ঝাপসা দেখিবে। যদি সহজ এবং স্বাভাবিক মন হয়, উহা দেখিলে নিনাশের আশা হইবে ; দুঃখ ভুলিয়া যাইবে। ঐস্থানে এমন ভাল ভাল ভাই এবং এমন ভাল ভাল ভগ্নী আছেন, তাহাদের সঙ্গে গিয়া মিশিব। তাহাদের ন্যায় ভক্তিভাবে দয়াল নাম গান করিব।পৃঃ ৪৮) যেমন অন্ধকারে পাইলে পিতাকে, তেমনি অন্ধকার বিপদের মধ্যে পাইলে একটা ঘর।-(পৃঃ ৪৮) . পরলােক মনােহর আমাদের ঈশ্বর এবং বাড়ী দুই নিরাকার।-(পৃঃ ৪৯ ) পরলােকের সন্ধান। সেই যে অন্ধকার মধ্যে নিরাকার ঈশ্বর আছেন, তাঁহাকে যেমন ভালবাসা যায়, সেইরূপ অন্ধকার মধ্যে যে পরলােকৰূপ ঘর আছে, "উহার প্রতিও ভালবাসা হয়। মৃত্যুভয়ে ভীত হইলে পরলােক দেখা যায়।-(পৃঃ ৫০) সেই পরলােকরূপ বাড়ীতে এমন সকল উপাসনার জায়গা আছে, যাহা তোমরা কল্পনাতেও ভাব নাই। আর সেখানে উপাসনার আয়ােজনই বা কত। রাশি রাশি স্তব স্তুতি, কত সঙ্গীত, কত প্রার্থনা সেই বাড়ীর চারিদিকে টাঙ্গান আছে, সেই বাড়ীর ভক্তগণের কত আহলাদ, কত উল্লাস। সেই জন্য বলি, ঐ বাড়ী বড় মনােহর। ঐ বাড়ীর ছবি বুকের উপরে রাখিলে প্রাণ জুড়ায়। উহার বাহ্যিক রঙ্গে নহে, কিন্তু উহার মধ্যে যে প্রেমসিন্ধু হইতে দক্ষিণের বাতাস এবং শাস্তির নির্মল জলের স্রোত বহিতেছে, তাহাতেই হৃদয় শীতল ব্রহ্মের শ্রীপদ হইতে গঙ্গা বাহির হইতেছে, সেই নদীতে ভক্তেরা স্নান করিতেছেন। সেই পুণ্যের জল, সেই প্রেমের জল এমন মিষ্ট যে, সেরূপ আর কোথাও পাওয়া যায় না। প্রেমের ছবি, পুণ্যের ছবি দেখিলে কত আহলাদ হয়। যথার্থ পুণ্যের নিকেতন, প্রেমের বাড়ী, সেখানে কত পবিত্রতা, কত প্রেম, কত আহলাদ, আত্মার পুষ্টির জন্য সেখানে কত চাউল, কত দাল রাহিয়াছে! এক দিনও ভাবিতে হইবে না, আজ কি খাইব। এমন বাড়ীর কথা বলিলে নিশ্চয়ই আহলাদ হয়। ঈশ্বর যথার্থই স্নেহময় পিতা। তিনি এই পৃথিবীতে আমাদিগকে কত সুখ দিতেছেন। আবার পৃথিবী ছেড়ে যখন চলে যাব, ভাল বাড়ীতে নিয়ে রাখিবেন। পৃঃ ৫১) আমাদের ঈশ্বর কোথায় ? ঈশ্বর কোথায়? এখানেও আর এখানেও আছেন, পরলােকেও আছেন। পৃঃ ৫২)
পরলােকের সন্ধান ।
সাধন করিতে করিতে পরলােকে যাওয়া যায়। আমরা যাই,
তােমরাও যাইতে পার। একবার যখন খুব ভক্তিভাবে ঈশ্বরের
কাছে বসা যায়, তখন সেই লােকের ঘর নিকটে অনুভব করা যায়।
পৃঃ ৫২)
ঈশ্বর যদি সত্য হন, তবে পরলেও সত্য।(পৃঃ ৫৩)
।
কন্যার প্রতি আহ্বান
তিনি বলিতেছেন, যখন আর কেহই সঙ্গে থাকিবে না, সেই মৃত্যু-
কালে এবং পরলােকে অনন্তকাল তিনি তােমার কাছে থাকিবেন।
(পৃঃ ৭০)
এখন যিনি তােমাদের কাছে আসিয়া বসিলেন, সেই বিপদের
সময়েও ইনি ভিন্ন আর কেহই কাছে থাকিবে না। ইহারই নাম ভবের
নাবিক। ইনিই তখন বলিবেন, “কন্যা, ভয় নাই, এই লও আমার
চরণতরী। অতএব ইহার চরণতরী এখনই ভাল করিয়া ধর।
অনায়াসে হাসিতে হাসিতে ভবসাগর পার হইয়া যাইবে এবার
তােমাদিগকে লইয়া যাইবার জন্য সঙ্কল্প করিয়া তিনি বাহির হইয়াছেন,
তাহার চরণ ধরিয়া আনন্দ মনে তঁাহার গৃহে চলিয়া যাও।
(পৃঃ ৭•)
তােমরা স্বর্গে বসিলে তঁাহার কত আনন্দ হইবে। ঐ দেখ,
তােমাদের জন্য তাহার ঘরে কত সুন্দর সুন্দর আসন খালি রহিয়াছে।
তোমাদিগকে নিয়া তাঁহার কাছে বসাইবেন, এই জন্য তিনি বাহির
হইয়াছেন। পৃঃ ৭২')
পরিশিষ্ট। আচার্য্যের উপদেশ—পঞ্চম খণ্ড। সুখধাম- যাঁহাদের অন্তর হইতে পিতা আপনি ভক্তি উপহার গ্রহণ করিতে ছেন, যাঁহাদের হৃদয় সৰ্ব্বদাই স্বর্গের পুষ্পগন্ধে আমােদিত, সেখানে দুঃখের সম্ভাবনা কোথায় ? একবার যদি সেই উদ্যানে উপস্থিত হইতে পার, এই পৃথিবীর বাড়ী ঘর, আত্মীয়, কুটুম্ব, ধন, মান, সুখ, সম্পত্তি, পদ, ঐশ্বৰ্য সকলই ভুলিয়া যাইবে। ঈশ্বর তােমাদিগকে যে স্থানে যাইতে ডাকিতেছেন, ইহা সামান্য স্থান নহে। সমস্ত পৃথি- বীর মধ্যে এই একটা মাত্র স্থান। এই ভূমি সমস্ত জগতের ভূমি, এই স্থানের বায়ু সমস্ত পৃথিবীর বায়ু, এই স্থানের আলােক সমস্ত পৃথি- বীর আলােক। এই আলােক পাইয়া এক দিন সমস্ত জগৎ আলাে- কিত হইবে, এই বায়ু সেবন করিয়া পৃথিবীর সমুদয় নর নারী যাচিবে। যখন সমুদয় জগদ্বাসী এই ভূমিতে আরােহণ করিবে, তথনই তাবৎ জগতের পরিত্রাণ। ঈশ্বর আশীর্বাদ করুন, ইহা ভিন্ন যেন আমাদের অন্য কোথাও বসিতে না হয়। পৃঃ ১৫ • ) পিতার এই চরণভূমি সন্তানদিগের সুখধান, ইহাই জীবের স্বর্গ এবং শান্তিনিকেতন।-(পৃঃ ১৫১)
সঙ্গীত।
আলেয়া—একতালা।
ইহলােক পরলোক, কভু নয় পৃথক, তােমারি অভয় চরণে। তুমি
বাঁধিয়ে রেখেছ দোহে, তােমার অচ্ছেদ্য প্রেম-বন্ধনে।
তুমি সুন্দর শ্রীহরি, উভয় লোক আলাে করি, আছ সমানে; তুমি
রাখিতেছ প্রেমকোলে, ইহ-পরলােকবাসিগণে।
তােমারি আহ্বানে এসে, থাকে জীব ভবসে, তব নিদেশে ;
আর যথাকালে ৰায় হে চলে, তােমার নিত্য নিকেতনে ১।
খাম্বাজ-একতাল।
ইহ-পরলোকে, আঁধারে আলােকে, তুমি আছ বর্তমান।
দেখে তােমাকে, যােগের আলােকে, থাকে না তার ভেদ-জ্ঞান।
বিশ্বাস-নয়নে যে জন তােমায়, করে নিরীক্ষণ আপন আত্মায় ;
বিরহ, বিচ্ছেদ, শােক, তাপ, খেদ, করে না তায় অবস্থান।
যে লভে তােমার সুন্দর চরণ, পুণ্য সহবাস মধুর মিলন; চিন্ময়
জগতে, সকলের সাথে, হয়ে থাকে এক-প্রাণ (যােগ-বলে)।
ইহ-পরলােকে রাখ দয়াময়, জীবনে কেবলই হোক তােমার জয় ;
ও পুণ্য নামে, যেন দিব্যধামে, পরিণামে পাই হে স্থান। ২।
*
পরলােকের সন্ধান।
১২৫
কীৰ্ত্তন--খ্যামটা।
জয় জয় সচ্চিদানন্দ হরে। হােক তব ইচ্ছা পূর্ণ, সুখ দুঃখের
ভিতরে।
বিচ্ছেদে মিলনে, জীবনে মরণে, তােমার ইচ্ছার জয় হেরি নয়নে ;
কর নিত্য নব বেশে খেলা, দাসের অন্তরে।
সম্পদে বিপদে, বিষাদে আনন্দে, রােগে শশাকে চিরদিন আছি
ওপদে ; হাসি কঁদি তােমার রঙ্গ দেখে, যােগানন্দ ভরে ॥ ৩ |
আলেয়া-একতালী।
নাথ! তুমি সর্বস্ব আমার।
প্রাণধার সারাৎসার, নাহি তােমা বিনে, কেহ ত্রিভুবনে, আপনার
বলিবার।
তুমি সুখ শান্তি সহায় সম্বল, সম্পদ ঐশ্বৰ্য্য জ্ঞান বৃদ্ধি বল ; তুমি
ৰাসগৃহ আরামের স্থল, আত্মীয় বন্ধু
পরিবার।
তুমি ইহকাল, তুমি পরিত্রাণ, তুমি পরকাল, তুমি স্বর্গধাম ; তুমি
শাস্ত্র বিধি, গুরু কল্পতরু, অনন্ত সুখের আধার।
তুমি কে উপায়, তুমি হে উদ্দেশ্য, তুমি স্রষ্টা পাতা, তুমি হে উপাস্য,
দণ্ডদাতা পিতা, মেহমহী মাতা, ভবার্ণবে কর্ণধার। (তুমি)। ৪।
খাম্বাজ-ঝাঁপতাল।
জীবন মরণে তুমি নিকটে আছ শঙ্করী।
ওমা শান্তি-প্রদায়িনী দয়াময়ী ক্ষেমঙ্করী।
পরলােকের সন্ধান। বসি’ মােহ অন্তরালে, ইহকালে পরকালে, অমর সাধু সকলে, স্বয়েছ মা কোলে করি'। যােগেতে জীবিত হয়ে, সাধুবন্ধুগণে লয়ে, থাকিব অনন্তকাল তব পদ স্বদে ধরি ; পাসরিব ভবতাপ, বিরহ শােক বিলাপ, হেরি অমৃতধামে, প্রিয়জনে প্রাণভরি ॥ ৫॥ মিশ্র জয়জয়ন্তী-একতালা। তুমি বন্ধু, তুমি নাথ, নিশি দিন তুমি আমার। তুমি সুখ, তুমি শান্তি, তুমি হে অমৃত-পাথার। তুমিই তাে আনন্দ লােক, জুড়াও প্রাণ নাশ শােক; তাপহরণ তােমার চরণ, অসীম শরণ দীন জনার। ৬ | সঙ্কীৰ্ত্তন-খয়রা। বল হে বিধাতা, গুরু জ্ঞানদাতা, বলে দাও কাণে কাণে; (দিব্যজ্ঞানে) কেন মৃত্যু শােকে, শেল হানে বুকে, দেয় মৰ্ম্মৰথা প্রাণে (এত) সুখের সংসারে। তােমার শাসন, নিগূঢ় নিয়ম, কেমনে বুঝিব হরি ; (তুমি ভাঙ্গ গড় দিবা নিশি) নিতা নব নব, লীলা খেলা তব, দেখে দেখে কেঁদে মরি। (বুঝিতে নারি) কত গুণবান, মানব-সন্তান, দেখা, দিয়া ধরাতলে ; ( আহা রূপে গুণে মুগ্ধ করে) ;
পরলােকের সন্ধান।
১২৭
তােমার ইঙ্গিতে, দেখিতে দেখিতে,
কোথা গেল হায় চলে। (জগৎ আঁধার করে)
এ জীবন যৌবন, বুঝিনু এখন,
সিন্ধুনীরে বিষপ্রায় ; (এই আছে আর এই নাই হে।
কালস্রোতে ভাসি,
ধীরে ধীরে আসি,
অনন্তে মিলায়ে যায়। (নয়নান্তরালে)
তুমি ধ্রুব সত্য,
সংসার অনিত্য,
এই সত্য শিখাইতে । ( অন্ধ জীবগণে)
জীবনের মাঝে,
মরণ বিরাজে,
অলক্ষিতে পৃথিবীতে। (প্রতি ঘরে ঘরে) । ।
তেওট।
ওহে মঙ্গলময়, তােমার জগতে নাহি কিছু অমঙ্গল।
রােগ শােক নির্যাতন, বিপদ মরণ,
জীব উদ্ধার লাগি এ সব কৌশল।
চিরদিন নিরাপদে, ভােগ সুখ শ্ৰীসম্পদে,
নাহি হয় সুশিক্ষা সাধনবল ; তাই সাধু-ভক্তজন,
করে আলিঙ্গন, ক্রুশ-যন্ত্রণা-পান পাত্র হলাহল।
সুখ দুঃখ মনের ভ্রান্তি, তুমি এক মাত্র শান্তি,
পরমানন্দ অনন্ত মঙ্গল ;
যে জন তােমার তরে,
প্রাণ দান করে,
তার মরণে জলে বিশাল অনল। ৮।
১২৮ পরলােকের সন্ধান। জয়জয়ন্তী-ঝাঁপতাল। চল সেই অমৃতধামে, চল ভাই যাই সকলে, নাহি যথা ব্যবধান ইহকাল পরকালে। ঘুচিবে ভয় ভাবনা, না রবে ভব-যাতন, নিরাপদে সুখে বাস করিব পিতার কোলে। সেখানে নাহি ক্রন্দন, শােক তাপ প্রলােভন, প্রেমানন্দে ভাসে সবে শান্তি সলিলে ; অনন্ত জীবনস্রোত, নিরন্তর প্রবাহিত, প্রেমের লহরী তাহে খেলে আশার হিল্লোলে। যথায় সাধকগণে, প্রাণযােগ-সাধনে, আছেন মগন হয়ে জীবন- জলধি-জলে ; প্রাণাধার পরমেশ্বরে, আত্মসমর্পণ করে, অমর হয়ে ছেন তারা ব্ৰহ্মকৃপা-বলে ॥ ৯ । ঝিঝিটকাওয়ালী। অক্ষয় আনন্দধামে, চলরে পথিক মন, পাইবে শাশ্বত সুখ, জুড়াবে দগ্ধ জীবন । সে বড় পবিত্র দেশ, নাহি পাপ তাপ লেশ, প্রেমানন্দে সমাবেশ, সকল শােকভঞ্জন। (ওরে) শান্তি নামে পুণ্য-নদী, বহিতেছে নিরবধি, রবে না মনের ব্যাধি, করিলে অবগাহন। অজস্র অমিয় সুধা, বাঞ্ছা পূরে পাবে সদা, ঘুচিবে আত্মার ক্ষুধা, সে সুধা করি’ সেবন। (ওরে) নিত্যানন্দ নিত্যোৎসব, অনন্ত পূর্ণ বৈভব, অ প্রাপ্য অভাব সব, তখনি হবে পূরণ। .
পরলোকের সন্ধান।
সদাব্ৰত তৃপ্তি অন্ন, লালসা থাকে না অন্য,
সেবনে কামনা পূর্ণ, চিদানন্দ উদ্দীপন। ১।
খয়রা।
মরণের পারে, অমৃতের দ্বা
অরণের পারে, অমৃতের দ্বারে, রয়েছ মা আগুসারি ।
(পথ পানে চেয়ে, দেবগণে সঙ্গে লয়ে )
অভয় বচনে, ডাকিছ সঘনে, প্রেমবাহু প্রসারি।
(কোলে নেবার তরে--ভয়ে ভীত মৃত জনে।
কালের সংহার-মূরতি ভীষণ,
ভয়ে কাপে হিয়া করি দরশন ;
( হুঙ্কার নাদে করে গরজন)
তার মাঝে তব মাভৈঃ রব,
দেয় প্রাণে শান্তিবারি।
( পথশ্রান্ত-জনে—মধুর বচনে)
রােগের বেদনা, শশাকের যাতনা,
তার সঙ্গে ভবপারের ভাবনা ;
(হায় কোথা যাব, কি হইবে—পথ চিনি না হে।
সেই অসময়ে, যেন মা অভয়ে,
তােমারে ডাকিতে পারি।
(মা মা বলে, প্রাণ ভরে সকাতরে)
দশকুশী।
শ্মশানে একাকী ফেলে, যবে সবে যাবে চলে,
কোলে তুলে লইবে যতনে; (মৃত্যুর আঁধারে )
৩০ পরলােকের সন্ধান। নিরখি মায়ের মুখ, ভুলিব সকল দুঃখ, চিরদিন রব তর সনে। (লােক-লােকান্তরে-দেবলােকে শাস্তিধামে । মিশিয়া অমরদলে, মা তােমার পদতলে, নিত্য যােগে করিব বিহার; (অনন্ত জীবনে) জীবনের পরিণাম, সেই সুখ স্বর্গধাম, যথা তব প্রেম-পরিবার ॥ ১১ ॥ ঝিঝিটকীৰ্ত্তন। ভীষণ শ্মশান-লীলা দেখে যেন ভয় না করি। মহা নিৰ্ব্বাণ বিনে যেন তব মুখ হেরি। (ও মা) অরক্ত নয়নে অসুর সংহারে, রত হও যখন পুণ্য অসি ধরে, বিশ্বাস-নয়নে তাহার ভিতরে, তব প্রেম-মুখ যেন হেরি। ভয়ঙ্কর বেশে হয়ে অবর্তীর্ণ, আমিত্ব স্বামিত্ব কর যবে চূর্ণ, থাকে যেন হৃদয় এই বিশ্বাসে পূর্ণ, কাছে আছ মা ক্ষেমঙ্করী। (এই যে) । ১২। ৫ খাম্বাজ বাহার-একতালা। দু’দিনের সুখ, দু’দিনের দুখ, দু’দিনে ফুরায়ে যায়। (হায় !) এ জীবনলীলা, এ ভবের খেলা, নিশার স্বপন প্রায়। দেখিতে দেখিতে হয় রূপান্তর, দিব্য দেহকান্তি লাবণ্য সুন্দর, শেষে ইন্দ্রধনু নিমেষে যেমন, মিশে আকাশের গায়। আদি অন্তে তুমি অনাদি অনন্ত, দেশ কালে তব নাহি হয় অন্ত, সৃজন-পালন-কারণ তুমি হে, জীবের জীবনােপায় ; তােমার ভিতরে আমরা সকলে, রয়েছি জীবিত ইহ-পরকালে, আত্মীয় স্বজনে অমর ভবনে, নিরখিব পুনরায়॥১৩ | পরলােকের সন্ধান। সঙ্কীৰ্ত্তন। চল চল ভাই, মার কাছে যাই, নাচি গাই প্রেম ভরে; (গিয়ে} অমর ভবনে, দেব দেবী সনে, হেরি তারে প্রাণ ভরে। থাকিব না আর মােরা ইন্দ্রিয়-গ্রামে, যােগবলে প্রবেশিব চিদানন্দ- ধামে ; আর রব না, রব নাদেহ-পুরবাসে ) সেই জন্মস্থান, হেথা অবস্থান, কেবল দু’দিনের তরে। মহামিলন-সঙ্গীত গাইব সকলে, বস মা আনন্দময়ীর এ চরণ- তলে; (সুরে সুর মিলাইয়ে ) (এক-হৃদয় হয়ে) অনন্ত জীবনে, অনন্ত মিলনে, বিহরিব লােকান্তরে। ১৪। দোঠুকি—সঙ্কীর্তন। সম্মুখে অমরধাম, আমাদের গমস্থান, । ঐ দেখ চেয়ে, বিশ্বাস-নয়ন খুলি) এ সংসার পান্থ-নিবাস ; দু’দিনের তরে) সেই নববৃন্দাবনে, নিত্যলীলা-দরশনে, করিবে সম্ভোগ স্বর্গবাস। ( ভক্ত-পরিবারে ) স্বর্গ-পারিজাত-গন্ধ, বহিতেছে মন্দ নন্দ, ভ্রাণে পুলকিত হয় প্রাণ শ্রীহরির শ্রীমন্দিরে, উড়িতেছে ধীরে ধীরে, বিশ্বজয়ী বিধান-নিশান। ( প্রেম-সমীরণে ) দেব-দেবীগণ যত, (দেবদূতগণ যত ) পুষ্পরথে ইতস্ততঃ, চারি- ধারে করে বিচরণ; (নব নব বেশে ) শ্রান্ত পথিক জনে, মধুর আশা- বচনে, মেরে দেয় আলিঙ্গন। ( আদরে হৃদয়ে ধরে, প্রেমে গলে ভাই বলে ) যথা আমাদের নেতা, ধপিতামহ পিতা, একে একে করিল। পয়ান ; (সেথা যেতে যে হবে,-দেহ গেহ পরিহরি-ভাগবতী তনু • ১৩ পরলােকের সন্ধান। ধরি) মিশে সেই যাব্রিদলে, স্বদেশে যাব সকলে, করি হসিনাম-গুণ- বেহাগ—কাওয়ালী। তোমার অসীমে প্রাণ মন লয়ে, যত দূরে আমি ধাই, কোথাও দুঃখ, কোথাও মৃত্যু, কোথা বিচ্ছেদ নাই। মৃত্যু সে ধরে মৃত্যুর রূপ, দুঃখ হয় সে দুঃখের কূপ, তােমা হতে যবে হইয়ে বিমুখ, আপনার পানে চাই। হে পূর্ণ তব চরণের কাছে, যাহা কিছু সব আছে আছে আছে, নাই নাই ভয় সে শুধু আমারি, নিশি দিন কঁাদি তাই ; অন্তর-গ্লানি সংসার-ভার, পলক ফেলতে কোথা একাকার, জীবনের মাঝে স্বরূপ তােমার, রাখিবারে যদি পাই ॥ ১৬। ছায়ানট-একতালা। অল্প লইয়া থাকি, তাই মাের যাহা যায় তাহা যায়, কণাটুকু যদি হারায়, তা লয়ে প্রাণ করে হায় হায় । নদী-তট-সম কেবলি বৃথাই, প্রবাহ অকড়ি রাখিবারে চাই, একে একে বুকে আঘাত করিয়া ঢেউগুলি কোথা পায়। মাহা যায় আর যাহা কিছু থাকে, সব যদি দিই সঁপিয়া তােমাকে, তবে নাহি ক্ষয়, সবি জেগে রয়, তব মহা মহিমায়। তােমাতে রয়েছে কত শশী ভানু, হারায় না কভু অণু, পরমাণু, আমার ক্ষুদ্র হারাধন গুলি রবে না কি তৰ পায়। ১৭। ,
পরলােকের সন্ধান।
মিশ্র-ইম কল্যাণ-ঝম্পক।
দুখের বেশে এসেছ বলে তােমারে নাহি ডরিব হে,
যেখানে ব্যথা, তোমায় সেথা, নিবিড় করি ধরিব হে।
আঁধারে মুখ ঢাকিলে স্বামী,
তােমারে তবু
চিনিব আমি,
মরণরূপে আসিলে প্রভু, চরণ ধরি মরিব হে।
যেমন করে দাও না দেখা, তােমারে নাহি ডরি হে।
নয়নে আজি ঝরিছে জল, ঝরুক জল নয়নে হে,
বাজিছে বুকে, বাজুক, তব কঠিন বাহু বাঁধনে হে;
তুমি যে আছ বক্ষে ধরে,
বেদনা তাহা জানাক মােরে,
চাব না কিছু কব না কথ', চাহিয়া রব বদনে হে ।
নয়নে আজি ঝরিছে জল, ঝরুক জন নয়নে হে ॥ ১৮।
সিন্ধু বিজয়-তেওরা।
ঐ যে দেখা যায় আনন্দধাম, অপূৰ্ব্ব-শােভন,
ভবজলধির পারে জ্যোতিন্ময়।
শােক-তাপিত
জন সবে চল,
সকল দুঃখ হবে মোচন;
শান্তি পাইবে
হৃদয় মাকে,
প্রেম জাগিবে অন্তরে।
ত্ব যােগীন্দ্র,
ঋষি মুনিগণু,
না জানি কি ধ্যানে মগন ;
১৩৪
পরলােকের সন্ধান।
স্তিমিত লােচন,
কি অমৃত রস,
পানে ভুলিল চরাচর।
কি সুধাময় গান,
গাহিছে মুরগণ,
বিমল বিভুগুণ-বন্দনা ;
কোটী চন্দ্র
তারা উলসিত,
নৃত্য করিছে অবিরাম | ১৯|
মিশ্র বিভাস-ঝাপতাল।
মা শাস্তিস্বরূপিণী, সঙ্কট-নিবারিণী।
শিবে সন্তান-বৎসলে,
শােক-সন্তাপহারিণী,
মূর্তিমতী শান্তি তুমি নিৰ্বাণদায়িনী ;
শান্তি বারি ল’য়ে হাতে,
ছিটাইয়া দাও মাথে,
নিজ মুখে বল শান্তি, শুনাও সান্ত্বনা-বাণী ।
ত্রিতাপ-অনলে প্রাণ জ্বলে দিন যামিনী,
অন্তরের ব্যথা সব জান অন্তর-যামিনী ;
কোথায় কঁদিব আর যাইব কোথায় বল,
অাদরে হৃদয়ে ধরে কে মুছাবে অশ্রুজল ;
তুমি মাতঃ কেবল,
অাশা ভরসা সম্বল,
দীন অনাথে কৃপা কর দীনতারিণী । ২০।
}
ভৈরবী।
কি আর চাহিব বল, হে মাের প্রিয়,
তুমি য়ে শিব, তাহা বুঝিতে দিও।
পরলােকের সন্ধান।
বলিব না রেখে সুখে,
চাহ যদি রেখে দুখে,
তুমি যাহা ভাল বােঝ তাই করিও--
শুধু তুমি যে শিব, তাহা বুঝিতে দিও।
যে পথে চালাবে নিজে, চলিব, চাব না পিছে,
আমার ভাবা, প্রিয়! তুমি ভাবিও
শুধু তুমি যে শিব, তাহা বুঝিতে দিও।
(দেখ) সকলে আনিল মালা, ভকতি-চন্দন থালা,
আমার যে শূন্য ডালা, তুমি ভরিও!
আর, তুমি যে শিব, তাহা বুঝিতে দিও । ২১।
বাউল।
আমারে এ আঁধারে এমন করে’ চালায় কে গো?
মি দেখতে নারি, ধরূতে নারি, বুঝতে নারি কিছুই যে গাে
নয়নে নাহি ভাতি, মনে হয় চিররাতি,
মনে হয় তুমি আমার চিরসাথী;
একবার জ্বালিয়ে বাতি, ঘুচিয়ে রাতি,
নয়নভরে দেখা দে গো!
(এই রাত-কাণারে) নয়নভরে দেখা দে গাে ।
কাদায়ে কাটার ক্লেশে, কঠিন এই পথের শেষে,
না জানি নিয়ে যাবে কোন বিদেশে ;
একবার ভালবেসে কাছে এসে,
কাণে কাণে বলে দে গাে !
(এ কালারে) কাণে কাণে বলে দে গাে !
পরলােকের সন্ধান।
।
রয়েছিস যদি সাথে, দারুণ এ আঁধার রাতে,
ক্লান্ত মােরে চালিয়ে নে যা হাতে হাতে;
হস্ত আমার হলেও শিথিল, তুই আমারে ছাড়ি নে গাে
(তাের পায়ে পড়ি। তুই আমারে ছাড়িস নে গগ। ২২।
মূলতান।
যখন ভেবে চিন্তে দেখি, দেখি আমার বলতে আমার,
তোমা বিনা আর কেউ নাই।
যত মহামূল্য ধন, প্রাণপ্রিয়জন, তােমারে হারালে সব হারাই
তৃষিত হৃদয় কাতর হইয়ে,
দাড়ায় কোথায় তােমারে ছাড়িয়ে,
আপনার বলে তুলে নিতে কোলে,
তােমা বিন। আর কারেও না পাই।
প্রভু, ইহলােক তুমি, পরলােক তুমি,
চির বাসস্থান, চির জন্মভূমি,
যত আত্মীয় স্বজন হারান রতন,
একাধারে প্রভু তােমাতে পাই।
তুমি সুখ শান্তি, শােকার্ডের সানা,
তুমি চিন্তামণি, ভবের ভাবনা,
নিয়াশের আশা, তুমি ভালবাসা,
তােমাতেই মােরা প্রাণ জুড়াই। ২৩।
No text on this page.
পরলােকের সন্ধান।
।
রয়েছিস যদি সাথে, দারুণ এ আঁধার রাতে,
ক্লান্ত মােরে চালিয়ে নে যা হাতে হাতে ;
হস্ত আমার হলেও শিথিল, তুই আমারে ছাড়িস নে গাে।
(তোর পায়ে পড়ি) তুই আমারে ছাড়িস নে গগ। ২২।
মূলতান।
যখন ভেবে চিন্তে দেখি, দেখি আমার বলতে আমার,
তােমা বিনা আর কেউ নাই।
যত মহামূল্য ধন, প্রাণপ্রিয়জন, তােমারে হারালে সব হারাই
তৃষিত হৃদয় কাতর হইয়ে,
দাড়ায় কোথায় তােমারে ছাড়িয়ে,
আপনার বলে তুলে নিতে কোলে,
তােমা বিন। আর কারেও না পাই।
প্রভু, ইহলােক তুমি, পরলােক তুমি,
চির বাসস্থান, চির জন্মভূমি,
যত আত্মীয় স্বজন, হারান রতন,
একাধারে প্রভু তােমাতে পাই।
তুমি সুখ শান্তি, শােকার্ডের সানা,
তুমি চিন্তামণি, ভবের ভাবনা,
নিরাশের আশা, তুমি ভালবাসা,
তােমাতেই মােয়া প্রাণ জুড়াই । ২৩।
No text on this page.
No text on this page.