Belgaria Sudha Smriti Pathagar
Bhuter Mato Adbhud
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
KEADING
BASIRHAT.
24 Pargarsas,
কাঞ্চনজয়িরিত্রের মেনু
RAHMANIA
ROOM
शा
NO-153
তারমত
भोईरटरन्यू
প্রকাশক–শ্রীসুবােধচন্দ্র মজুমদার
দেব-সাহিত্য-কুটীর
২২৫বি, ঝামাপুকুর লেন, কলিকাতা
s
it Leicoria
Vispa & bridal Dial 24 targanas.
পুনর্মুদ্রণ—১৩৫০
দাম-বারাে আনা
প্রিন্টার—এ সি. মজুমদার
দেব-প্রেস
২৪, ঝামাপুকুর লেন, কলিকাতা
No text on this page.
তিব্বত-ফেরৎ তান্ত্রিক ‘প্রাইজ-বুক’ হিসেবে-- ‘কাঞ্চনজঙ্ঘ-সিরিজ’এর বইগুলি অনুপম-অতুলন: প্রতিমাসে একখানি করে ডিটেকটিভ উপন্যাস প্রকাশিত হয় প্রথম বর্ষ-বৈশাখ, ১৩৪৮ দ্বিতীয় বর্ষ-বৈশাখ, ১৩৪৯ শ্ৰীহেমেন্দ্রকুমার রায়ের হেমেন্দ্রকুমার রায়ের অন্ধকারের বন্ধু ১৩। মুখ আর মুখােস সৌরীন্দ্রমােহন মুখােপাধ্যায়ের শ্রী প্রভাবতী দেবী সরস্বতীর ২। ছিন্নমস্তার মন্দির ১৪। হত্যার প্রতিশােধ শ্ৰীঅখিল নিয়ােগীর এসৌরীন্দ্রমােহন মুখখাপাধ্যায়ের ১৫। নীল আলাে নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়ের বুদ্ধদেব বসুর ৪। বিজয়-অভিযান ১৬। ভূতের মতাে অদ্ভুত শ্ৰীনীহাররঞ্জন গুপ্তের বুদ্ধদেব বসুর ১৭। রাতের আতঙ্ক ৫) ছায়া কালাে-কালাে শ্রীঅচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তের হেমেন্দ্রকুমার রায়ের ১৮। ঘাের প্যাচ ৬)রাত্রির যাত্রী শ্ৰীহেমেন্দ্রকুমার রায়ের ডক্টর নরেশচন্দ্র সেনগুপ্তের ১৯। বিভীষণের জাগরণ ! ৭। হারানাে বই এসৌরীন্দ্রমােহন মুখােপাধ্যায়ের ২০। নিঝুম রাতের কান্না ৮। জীবন্ত-সমাধি শ্রনীরদচন্দ্র মজুমদারের প্রভাবতী দেবী সরস্বতীর ২১। অভিশপ্ত মমি #। গুপ্তঘাতক শ্রীসৌরীন্দ্রমােহন মুখােপাধ্যায়ের ঐবিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ২২। স্বর্গের সিড়ি -তারপর পর-পর- নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়ের শ্রীপ্রবােপকুমার সান্যালের ১১। উদাসীবাবার আখড়া ২৩. ওপারের দূত সুনির্মল বসুর শ্ৰীযুক্তা শৈলবালা ঘােষজায়ার ১২৮ কেউটের ছােব ২৪। জয়-পতাকা প্রত্যেকখানি বারাে আনা শ্রীবিমল দত্তের » মিসূমিদের কবচ
No text on this page.
...রের ভিতরে মুখ বাড়াতেই যে চোখে পড়লাে
ভূতের মতাে অভূত
এক
নাম ব্রডওয়ে হােটেল, কিন্তু আসলে বৌবাজারে কেরানি ও
বেকারবাবুদের একটি মেস। এই মেসে শীতের রবিবারের
এক সকালবেলায় এ-গল্পের যবনিকা তােল গেলাে।
চাকুরেদের পক্ষে—বিশেষত কলকাতার কেরানিদের
পক্ষে-রবিবার দিনটি সত্যই স্বর্গীয়। এই তাে নরহরিবাবু,
যিনি অন্য সব দিন এই শীতেও ভাের না-হ’তে ওঠেন,
তারপর শ্যামবাজারে ছেলে-পড়ানাে চুকিয়ে, কোনােরকমে
নাওয়া-খাওয়া সেরে নটা না-বাজতেই আপিশে ছােটেন,
তিনি আজ বেলা আটটাতেও লেপের তলায় পাশ ফিরছেন।
এইমাত্র তাঁর ঘুম ভাঙলাে। গােটা দুই হাই তুলে তিনি
অস্ফুটস্বরে বললেন, ‘দুর্গা, দুর্গা। তারপর হাঁক, দিলেন,
‘দুর্গা।
শেষের ডাকটি জগৎমাতাকে লক্ষ্য করে নয়।
মেসের এক চাকর। 'এক ডাকে তার দেখা পাওয়া গেলে
ন নরহরিবাবু গলা চড়িয়ে আবার ডাকলেন, “দুর্গা
সুতর অসুত
গলার জোর আছে নরহরিবাবুর, কেরানি না-হয়ে
কলকাতার কলেজে প্রােফেসর হলে তাকে মানাতাে।
একতলার সিড়ির কাছে কলতলায় দুর্গা চায়ের পেয়ালা
ধুচ্ছিলাে, তার কানে সে-ডাক পৌছলে। সে তাড়াতাড়ি
হাতের কাজ সেরে একটা চায়ের কেলি নিয়ে বেরিয়ে গেলো,
মিনিট পাঁচেক পরে কেলিতে চা, একটা প্লেটে দু'খানা টোস্ট
আর হাতে একটা চায়ের পেয়ালা ঝুলিয়ে উঠে এলাে তেতলায়
নরহরিবাবুর কাছে।
তাকে দেখেই নরহরিবাবু চ’টে উঠে বললেন, ‘হতভাগা,
তােকে এতক্ষণ ধরে ডাকছি, কোথায় থাকিস
দুর্গা বললে, আপনার চা-টা একেবারে নিয়েই এলুম।
নরহরিবাবু তক্ষুনি জল হয়ে গিয়ে বললেন, ‘বাঃ, বেশ।
তাের বেশ বুদ্ধি আছে, দুর্গা। জীবনে তাের উন্নতি হবে।
দুর্গা বললে, ‘আমি তাে জানি আপনি রবিবারে সকালে
উঠেই প্রথমে এক পেয়ালা চা খান, তাই আপনার ডাক শুনে
উপরে না এসে একেবারে চা আনতেই চলে গেলুম।
চা নরহরিবাবু রােজই সকালে খান, তবে অন্যান্য দিন এমন
আরাম করে খাওয়া হয় না, টুশনি করতে যাবার পথে
দোকানে ঢুকে তাড়াহুড়াে করে খেয়ে নেন। আজ আরাম
করবার দিন, আজ সব ব্যবস্থাই অন্যরকম।
‘বেশ, বেশ। চা-টা ঢেলে দাও তাে বাবা। টোস্টও
এনেছিস দেখছি। খুব ভালাে। দুর্গা, তুই লেখাপড়া
জানিস ?
তক্তাপােষের পাশে টেবিলের উপর চায়ের পেয়ালাটি রেখে
দুর্গা বললে, ‘অল্প-অল্প জানি।
Cam
‘পাশ-টাশ করলে তাের ভালো চাকরি হতাে, দুর্গা
‘আজকালকার দিনে তা কি জোর করে বলা যায় ?
লেপের তলায় আঘাে শশায়া অবস্থায় তেখের
নরহরিবাবু বললেন, ‘তা যা বলেছিস। কত বিএ, এমএ
ফ্যা-ফ্যা করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তবু তাে গতর খাটাতে পারিস
বলে খেতে পাচ্ছিস। বড় খাটুনি মেসে, না রে।
‘তা খাটতেই তাে এসেছি।
নরহরিবাবু হঠাৎ তার বালিশের তলায় হাত দিয়ে একটি
আনি বের করে দুর্গার হাতে দিয়ে বললেন, ‘নে এটা। কিছু
কিনে-টিনে খাস। এখানে আমাদেরই যা খাওয়ার ব্যবস্থা,
তােরা যা খাস ভাবতেই ভয় করে।
দুর্গা আনিটি তার জামার পকেটে রেখে চুপ করে দাঁড়িয়ে
রইলাে। নরহরিবাবু প্রায়ই তাকে এ-রকম দু’চার পয়সা
দিয়ে থাকেন। মানুষটি তিনি একটু শৌখিন গােছের।
বােধ হয় তাঁর রােজগারও ভাললাই, তেতলায় আস্ত একটা ঘর
নিয়ে থাকেন। তার উপর হৃদয়টাও তাঁর কোমল। মেসে
যখনই যার দরকার, দু’চার টাকা ধার দিতে পরােয়া করেন না,
সে-টাকা সব সময়ই যে ফেরৎ আসে তাও নয়।
ছেলেদের চাকরির খোঁজ-খবর দেয়া, তাদের অ্যাপ্লিকেশন
নিজের আপিশ থেকে টাইপ করিয়ে আনাননা—এ-সব তিনি
হামেশাই করে থাকেন। এসব কারণে মেসে সকলেই তাকে
ভালােবাসে, ম্যানেজর থেকে শুরু করে সকলেরই তিনি
হরিদা।
নরহরিবাবু বললেন, ‘একখানা খবরের কাগজও যে চাই,
দুর্গা। তা না-হলে চা জমে না।
৭
ভুতের মতাে অদ্ভুত
‘নিয়ে আসবাে?
এক্ষুনি আবার এতগুলাে সিড়ি ভাঙবি ?
‘দিনরাতই সিড়ি ভাঙছি বাবু, ওতে আমাদের কিছু
হয় না।
দুর্গাকে নরহরিবাবু যেন বিশেষ-একটু স্নেহের চোখেই
দ্যাখেন। তার কারণও আছে। দুর্গা ভারি ছেলেমানুষ,
আঠারো উনিশ মতাে বয়েস। দেখতেও সুন্দর, হাত-পা
তকতকে পরিষ্কার, দেখে ভদ্রলােকের ছেলে মনে হয়।
কথাবার্তাও মার্জিত। এই মেসে সে নতুন এসেছে, পুরাে
একমাসও হয়নি। মেসের চাকরদের গালি-গালাজ এমনকি
মার-ধাের প্রায়ই সহ্য করতে হয় আর খাটতে হয় ভূতের মতাে।
দুর্গাকে দেখে মনে হয়নি সে কাজ চালাতে পারবে।
ম্যানেজরবাবুও বােধ হয় তার সুন্দর মুখ দেখেই দয়া করে
তাকে বাহাল করেছিলেন। বাবুদের ফাইফরমাশ খাটবার
জন্যে তাকে রাখা হয়েছে। মেসের সব বাবুরাই তাকে যেন
একটু-আধটু দয়া করেন—মাঝে-মাঝে এক-আধটু বকুনি দিলেও
এ-পৰ্য্যন্ত চড়-চাপড় তার পিঠে পড়েনি। তবে এও বলতে হয়
যে কাজকর্ম দুর্গা চালাচ্ছে ভালােই—শুধু তার সুন্দর মুখ দেখে
নয়, তার কাজেও সকলে তার উপর খুশি।
নরহরিবাবু বালিশের তলা থেকে আর একটা আনি বের
করে দিয়ে বললেন, তাহলে যা একখানা খবরের কাগজ
নিয়ে আয়।”
‘আনন্দবাজার ?
‘না, না, বাংলা কাগজ আমি পড়িনে। জানিস, বিশ বছর
আগে বি.এ. ফেল করেছিলুম, সুরেন বাঁড়ুয্যের বক্তৃতা এখনাে
তে
আমার মগজে ঘুরছে। অমৃতবাজার আনবি। আর শােন,
চারতলার বাবুকে একবার ডেকে দিবি—বলবি আমি তাকে
তাস খেলতে ডেকেছি।
প্রায় প্রতি রবিবারেই নরহরিবাবুর ঘরে তাসের আড়া
বসে। দুর্গা বেরিয়ে যাবার সঙ্গে-সঙ্গেই সরােজ ঘরে ঢুকে
বললে, “কী দাদা, আজ খেলা-টেলা হবে না?
‘হবে, হবে, বােসস। এই তাে ঘুম থেকে উঠলুম। তুমি
দেখছি এই সকালেই একেবারে ফিটফাট বাবু সেজেছে।
বেরুচ্ছো নাকি কোথাও ?
‘আর বলেন কেন—আজ আপিশের বড়ােবাবুর মেয়ের
বিয়ে। দশটা থেকেই হাজিরা দিতে হবে। ভাবছি তার আগে
দু’পিঠ খেলে যাই।
‘বেশ, লােকজন ডেকে আনে। আমি ততক্ষণ হাত-মুখ ধুয়ে
আসি’, ব’লে নরহরিবাবু লেপের তলা থেকে উঠে পড়লেন।
বাথরুমের দিকে যেতে-যেতে বললেন, ‘গগাবিন্দবাবুকেও খবর
পাঠিয়েছি।'
‘ঐ বুড়ােটাকে আবার কেন দাদা?
‘বুড়াে তত আমিও।
‘হাঃ, রেখে দাও—তােমার পঁয়তাল্লিশ হ'লেই খুব বেশি।
সত্যি, হরি-দা, ঐ একচোখাে গােবিন্দটাকে দু'চক্ষে দেখতে
পারিনে। ও এলে আড়াই মাটি হয়।
‘তােরা সকলে মিলে তাকে বয়কট করেছিস বলেই আমি
মাঝে-মাঝে ওঁকে ডেকে পাঠাই। তিনি যে কানা সে তাে
আর ওঁর দোষ নয়, আর উনি যে কিপটে তাও ওঁর স্বভাবেরই
দোষ। তাস খেলতে তিনি ভালােবাসেন, খেলেনও ভালাে
তরমুজেত এ-অবস্থায় একই মেসে থেকে তাঁকে না-ডাকলে কি ভালাে দেখায় ? সরােজ রাগে গজগজ করতে-করতে বললে, ‘রেখে দাও তােমার ভালাে দেখানাে ! লােকটাকে এই মেস থেকেই তাড়িয়ে দেয়া উচিত। ‘কী অপরাধে ? তিনি কুচ্ছিৎ আর কিপটে, তাই বলে কি মানুষ নন ?” ‘মানুষ ? ওকে তুমি মানুষ বলে হরি-দা! টাকার কুমির- এদিকে আমাদেরই মতাে একটা মেসে পড়ে আছে—হেঁটো ধূতি আর হাফ-শার্ট পরে, বিড়ি ফেঁাকে, মান্ধাতার আমলের একটা তেল-চিটচিটে বালাপােষ জড়িয়ে শীত কাটায়। ওর গায়ে দুর্গন্ধ, ওর দাড়িতে উকুন, ওর কাপড় এত ময়লা যে ওর পাশে বসতে ঘেন্না করে। অন্যের জন্য কিছু না-হয় না-ই করলাে, যথেষ্ট থাকা সত্ত্বেও নিজের জন্যেও যে একটা পয়সা খরচ করে , তুমিই বলাে তাকে কি মানুষ বলে ! নরহরিবাবু মুচকি হেসে বললেন, ‘বড্ড চটে গেছে দেখছি। ওর কাছে কিছু ধার-টার চাইতে গিয়ে জব্দ হয়েছিলে বুঝি ? সরােজ মুখ লাল করে বললে, ক্ষেপেছাে তুমি! পাথর ভাঙলে রক্ত বেরােবে, কিন্তু গােবিন্দ চাটুজ্যের আঙুল গ'লে একটি পয়সা পড়বে না তা তাে জানাে! ‘বড় ছেলেমানুষ আছে এখনে, সবােজ। সব মানুষ একরকম' নয়, 'এ-কথা এখনাে মেনে নিতে পারাে না কেন? এই যে দুর্গা এসেছে অমৃতবাজার নিয়ে। তুমি বসে-বসে একটু কাগজটা পড়াে, আমি আসছি। দুর্গা চারতলার বাবুকে বলেছিলি আসতে ?
ভূতের মতো অত
‘তার এখনাে ঘুম ভাঙেনি ! দরজা বন্ধ।
সরােজ বলে উঠলাে, বুড়াে খুব ঘুমুচ্ছে তাে আজ ! থাক
হরি-দা, ওকে তাহলে আর ডেকে কাজ নেই।
এ-কথার কোনাে জবাব না দিয়ে নরহরিবাবু হাত-মুখ ধুতে
চলে গেলেন।
ROOM.
HAM MANA
KEAMLING
BASIRHAT.
24 Pargannas,
Date.
তরতা দুই ই মিনিট দশেকের মধ্যে আরাে কয়েকটি ছােকরা সে-ঘরে এসে জড়াে হলাে। সকলেই তাসের গন্ধে এসেছে ; চারজন খেলবে—বাকি ক’জন দেখবে ও উৎসাহ দেবে, আবার খানিক পরে তারা বসবে অন্যেরা দেখবে। এইরকমই হয় প্রায় রবিবারে। দুগা নরহরিবাবুর বিছানা ঠিকঠাক ক'রে সুজনি দিয়ে ঢেকে দিয়ে ঘর থেকে চলে গেলো, তখন সেই বিছানার উপরেই গুলজার হয়ে বসলে সবাই। নরেশ আলােয়ান মুড়ি দিয়ে আরাম করে বসে বললে, “আঃ! ঐ একটি কথাতেই যেন ছ’দিনের খাটুনির পরে পুরাে একটি দিনের বিশ্রামের আনন্দ ফুটে উঠলো। মনােহর বললে, ‘বেশ কনকনে শীতটি পড়েছে আজ। এমন দিনেই তাে আড্ডা জমে। শুধু-শুধু তাস নয় ভাই, আজ হরিদাকে বলে চায়ের ব্যবস্থা করা যাক- —আর সেই সঙ্গে গরম শিঙাড়া,' বললে সরােজ। জানাে তােমরা, সে-ব্যবস্থাও করেছেন হরিদা। ফর্শা বেঁটে মতাে একটি ছেলে এক কোণে বসে তাস নিয়ে নাড়াচাড়া করছিলাে, সে বলে উঠলাে, ‘তা হরিদা তত আড়া বসলেই চা খাওয়ান, আমাদেরই একদিন বিনিময়ে কিছু করা উচিত।
শুভ ‘আরে শুধু কি চা-রীতিমতাে ভােজ, ফীষ্টি। নরেশ আর মনােহর একসঙ্গে চেঁচিয়ে উঠলাে, “হুরে ! সরােজ বলতে লাগলাে, ‘বিরাট ভােজ দিচ্ছেন শ্রীগােবিন্দ- চন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ! ঐ নামটা শশানামাত্র সকলে একসঙ্গে হেসে উঠলাে। সরােজ বললে, হরিদা আজ আবার ঐ বুড়ােটাকে ডেকেছেন। কী কাণ্ড দ্যাখাে দেখি তােমরা। তা আমিও মনে-মনে ভেবে রেখেছি আজ বুড়াের কাছে খাওয়া আদায় করবাে তবে ছাড়বে। ফর্শা ছেলেটি বলে উঠলো, গােবিন্দ বুড়াে খাওয়াবে ? তাহলেই হয়েছে ! সঙ্গে-সঙ্গে আবার হাসির হররা। হাসি থামলে পরে মনােহর বললে, ‘ভালাে করলে না, সরােজ, ঐ সক্কালবেলা বিটকেল বুড়ােটার নাম করে। কপালে কী আছে কে জানে। ‘আজ খাওয়া জোটে নাকি দ্যাখাে,' বললে নরেশ। সরােজ বললে, না, না, আমি যা প্ল্যান করেছি করাই চাই। এমন চেপে ধরবাে বুড়ােকে যে এ-আচ্ছায় তাস খেলতে আর অন্তত আসবে না। তােমরা সব আছে তাে আমার সঙ্গে ? নরেশ বললে, ‘হাঃ, তুমি কি ভেবেছাে ওর সঙ্গে আমরা পেরে উঠবাে। ওর কি এক ফোটা চক্ষুলজ্জা আছে! ফর্শা ছেলেটি বলে উঠলাে, তাছাড়া একদিন জোর করে খাওয়া আদায় করে লাভই বা কী?
দুতের
সরােজ কৌতূহলী চোখে ছেলেটির দিকে তাকিয়ে বললে,
‘তবে ? তােমার মতটা কী শোনা যাক, আনন্দ।
আনন্দ বয়সে ওদের সবার ছােটো, তাকে ছেলেমানুষ বলা
যায়। বেকার অবস্থায় আছে এই মেসে, চাকরির চেষ্টা করছে।
চাকরি হবার কোনাে আশাই দেখা যাচ্ছে না, মেসের দেনা
দু’মাস বাকি। অবস্থা তার সত্যি খুব খারাপ, পরনে ময়লা
কাপড়, শীতেও একটা ব্যাপার গায়ে নেই, নিচে একটা শার্ট
তার উপরে একটা খদ্দরের পাঞ্জাবি পরেছে, সব সুদ্ধ,
এই
দুটোই জামা তার। কোথা থেকে নানারকম বই জোগাড় করে
এনে গােগ্রাসে পড়ে সে, আর সুযােগ পেলেই খুব চড়া
ক্যানকেনে গলায় এমন সব বক্তৃতা করে যা শুনে মেসবাসীদের
তাক লেগে যায়। কেউ তাকে বলে পাগল, কেউ বলে ইডিয়ট,
কেউ বা এমনও সন্দেহ করে যে স্বদেশিওয়ালাদের সঙ্গে
কোনাে গভীর ষড়যন্ত্রে সে লিপ্ত—তাকে মেস থেকে তাড়িয়ে
দেয়া হােক এমন প্রস্তাবও কেউ-কেউ এনেছে! কিন্তু মােটের
উপর তার কথাবার্তা শুনতে সকলেরই বেশ মজা লাগে, অনেকে
ইচ্ছে করেই তাকে বেশ খানিকটা আস্কারা দেয়। আর
সত্যি—বেশ গুছিয়ে কথা বলতে পারে সে। তাকে নিয়ে
হাসাহাসি করে সকলেই, কিন্তু এ-কথাও অস্বীকার করা যায় না
যে ব্রডওয়ে হােটেলে সেই সব চাইতে ভালাে বক্তা, আর
পড়াশুনােও লােধ হয় তারই সব চেয়ে বেশি।
আনন্দ হাতের তাস ফেলে দিয়ে বলতে লাগলাে, আমার
মত ! আমার যা মত তা আপনাদের সকলেরই মনের কথা !
শুধু একজন গােবিন্দ চাটুজ্যে তাে নয়, এ-রকম দেশ ভ’রে, জগৎ
ভ’রে কত আছে। একজন বসে আছে রাশি-রাশি টাকা নিয়ে,
১৪
সে-সব টাকা হয় ব্যাঙ্কে পচছে নুয় নানা বদখেয়ালে উড়ছে,
এদিকে হাজার-হাজার লােক খেতে না পেয়ে মরছে কিংবা ঠিক
সেটুকু খেতে পাচ্ছে যাতে কোনােরকমে বেঁচে থাকা যায়।
মেডিকেল কলেজের সামনে সেদিন দেখলুম একটা ভিখিরি
মরে পড়ে আছে, কলকাতার রাস্তায় প্রায়ই দেখা যায়
ডাস্টবিনের এঁটো নিয়ে ভিখিরি আর কুকুরে মারামারি
চলেছে। আর আমি, আপনারা—আমরা সবাই—আমাদেরই
বা কী অবস্থা! বুকে হাত দিয়ে বলুন, আপনাদের যা আয়
তাতে কোনাে ভদ্রলােকের চলতে পারেনা চলা উচিত।
কলকাতার এই মেসের ফ্যান-মেশানাে ডাল আর এক টুকরাে
করে পচা মাছ খেয়েই কত লােকের সারা জীবন কেটে যায়
তা তাে জানেন! আর বেকার—তাই বা কত ? কত ভালাে
ছেলে পড়াশুনাে পর্যন্ত করতে পারে না, আর বড়ােলােকের
পেট-মােটা নাদুসনুদুস হোঁৎকা ছেলেগুলাে ইউনিভার্সিটির ডিগ্রি
নিয়ে বেরিয়ে আসে। এই আমাকেই দেখুন—আমি জোর
করেই বলতে পারি বিজ্ঞানে আমার মাথা খুব ভালাে, সুযােগ
পেলে হয়তাে পৃথিবীতে একটা নাম রাখতে পারতুম। কিন্তু
অভাবে আমার কিছুই হলাে না—একটা কুড়ি টাকার চাকরির
জন্য পথে-পথে কুকুরের মতাে ঘুরে বেড়াচ্ছি। আমার টাকা
নেই—আর টাকা আছে ওই কঞ্জুস গােবিন্দ চাটুজ্যের, যার বেঁচে
থাকারই কোনাে মানে হয় না বলতে-বলতে আনন্দর চোখ
দুটো জ্বলজ্বল করতে লাগলাে।
‘বাঃ, সাবাস ছেলে! বলে উঠলাে নরেশ। আচ্ছা, বলল
তাে আনন্দ, এ-সব কথা কি তােমার মুখস্থ করা থাকে ?
‘এ-সব আমার প্রাণের কথা, গম্ভীরভাবে বললে আনন্দ।
তরম
ঐ বেঁটে মােগা ছেলেটির মুখে এসব কথা শুনলে সত্যি
হাসি পায়, কিন্তু আবার পায়ও না, কথাগুলাে বােধ হয় সত্য
এ-রকম একটা ধারণা কোথা থেকে এসে জুড়ে বসে।
মনােহর ঠোঁট বাঁকিয়ে বললে, তুমি তাে দেখছি রীতিমতাে
একজন পরিক স্পীকর—তােমার বক্তৃতাগুলাে পার্কে দাড়িয়ে
দিলেই ভালাে হয়, আমরা সামান্য কেরানি, অত বড়াে-বড়ো
বিষয়ের চিন্তা করবার সময় আমাদের নেই।
আনন্দ একটুও দমে না-গিয়ে বললে, যদি আপনারা সবাই
চিন্তা করতেন তাহলে তাে হতেই।
সমােজ একটু সহানুভূতির স্বরে বললে, এ নিয়ে মন-খারাপ
করে কী আর করবে—এই তাে নিয়ম।
‘এই নিয়ম! কখনাে না। এ-ভাবে পৃথিবী চলতে পারে
। সাম্য চাই—সাম্য।
সরােজ বললে, ‘চাইলেই তাে হবে না, ঐ গােবিন্দ চাটুজ্যের
দল চিরকালই পথ আগলে দাঁড়িয়ে থাকবে।
‘যারা পথ আগলে দাঁড়িয়ে থাকবে, পথ থেকে তাদের
সরিয়ে দিতে হবে’, মৃদুস্বরে অথচ খুব জোর দিয়ে এই কথা ক’টি
ব’লে আনন্দ আবার তাস নিয়ে নাড়াচাড়া করতে লাগলাে।
মনােহর বললে, ‘বাপরে, রক্ত একেবারে টগবগ করে
ফুটছে যে। এ-সব ছাড়াে হে ছােকরা, শেষটায় একদিন বিপদে
পড়বে-
নরেশ আলােয়ানটা কাঁধের উপর টেনে দিয়ে বললে,
আর আমাদের সুদ্ধ জড়াবে।
আনন্দ চোখ তুলে বললে, ‘জানেন, ভস্টয়েভস্কির একটা
বইয়ে আছে—
অ7
কিন্তু তার কথা শেষ না-হতেই ব্যস্তসমস্তভাবে নরহরিবাবু
ঘরে এসে ঢুকলেন। তাঁর চেহারা দেখে সবাই চমকে উঠলো
—এই মাত্র যেন তিনি ভূত দেখে এলেন।
সরােজ বললে, “কী হয়েছে হরি-দা, আপনাকে অমন
দেখাচ্ছে কেন ?
‘গােবিন্দবাবুকে কে যেন খুন করে গিয়েছে’, ব’লে নরহরি-
বাবু কঁপতে-কাপতে বসে পড়লেন।
মনােহর আর নরেশ একসঙ্গে চেঁচিয়ে উঠলাে, ‘আঁ! আর
সরােজের মুখ একদম কাগজের মতাে শাদা হয়ে গেলাে। কিন্তু
আনন্দর মুখের কোনাে পরিবর্তন দেখা গেলাে না, সে মাথা নিচু
করে তাস নিয়ে নাড়াচাড়া করতে লাগলাে।
২
তরম
তিন
গগাবিন্দ চাটুজ্যে গেলে দশ বছর ধরে এই মেসের
বাসিন্দা। ইতিমধ্যে মেসের দু’বার হাত বদল হলাে, একবার
নাম বদল হলো, কত লােক এলো কত লােক গেলাে, কিন্তু
গােবিন্দবাবু ঠিকই আছেন। তাঁর জীবনযাপনের প্রণালী সত্যি
একটু রহস্যময়। চারতলার যে ঘরটিতে তিনি থাকেন সেটি
আসলে ঘর নয়, চিলেকোঠা, অতগুলাে সিড়ি ভেঙে ঐ ছােট্ট
ঘরে মস্ত ছাতের মধ্যে একদম একলা থাকতে সাধারণত কেউই
রাজি হয় না-ও-জায়গাটা খালিই পড়ে থাকে—কিন্তু
গগাবিন্দবাবু ঐ চিলতেটুকুই ভাড়া নিলেন মাসিক আড়াই
টাকায়। মেসের ম্যানেজর ভাবলে, ও-ঘর তাে আর-কেউ
ভাড়া নেবে না, ভাড়াটে যে পাওয়া গেছে এই বেশি, সুতরাং
আড়াই টাকাই বা মন্দ কী। গােবিন্দবাবুর খাওয়া-খরচ মাসে
পাঁচ টাকার বেশি নয়, কারণ তিনি মেসে সকলের সঙ্গে খান
—সকালে একটু ডাল-ভাত আলুসেদ্ধ, আর সন্ধে হবার আগে
খান দুই রুটি আর একটু ভাজা—এই তর আহার। চাকর
দু’বেলা তার খাবারটা ঘরে দিয়ে আসে। এ ছাড়া আর কিছু
তিনি খান এমন কখনাে শােনা যায়নি।
এক কথায় গােবিন্দবাবু একেবারে হাড়কিপটে; ললাকে
বলে তার মুখ দেখলে পাপ হয়, নাম নিলে হুঁড়ি ফাটে ইত্যাদি।
১৮
সুতরগত মেসে কেউ তাঁর সঙ্গে মেশে না। অবশ্য সেজন্য তার একটুও আপশােষ নেই, কারণ তিনি নিজে ঘােতর অমিশুক। চার- তলা থেকে তিনি কদাচিৎ নামেন, প্রায় সব সময়ই দরজা বন্ধ করে ঘরের ভিতর বসে থাকেন, সন্ধেবেলা ছাতে যখন পায়চারি করেন হঠাৎ দেখলে তাকে ভূত বলে ভুল হয়। কারণ চেহারাও তার অতিশয় কদাকার। একটা চোখ কানা, লম্বা-লম্বা চুল ঘাড় বেয়ে নেমেছে, নােংরা দাড়ি-গোঁফে মুখ ঢাকা, নাকের উপর একটা মস্ত আঁচিল-ছােটো ছেলেমেয়েরা তাকে দেখলে হয়তাে ভয়ে চেঁচিয়ে উঠবে। চেহারা দেখে তার বয়েস আন্দাজ করা সম্ভব নয়—চল্লিশও হতে পারে, পঞ্চাশ হলেও অবাক হবার কিছু নেই। সবাই বলে গােবিন্দবাবু অনেক টাকার মালিক। সে যে কত টাকা, আর সে-টাকা তার হাতে কেমন করে এলাে তা অবশ্য কেউ জানে না। তার কোনাে আত্মীয়স্বজন ‘কি বন্ধুবান্ধব আছে বলে কখনাে শােনা যায়নি, তার কোনো চিঠি আসে না, কেউ তাঁর সঙ্গে দেখা করতে আসে না, এদিকে তিনি তাে কাজকর্ম কিছুই করেন না, চারতলার ঐ চিলেকোঠা ছেড়ে রাস্তায় নামতেও কেউ তাঁকে ছাখেনি। লােকটি সত্যি রহস্যময়। অনেকে সন্দেহ করে যে টাকাকড়ি তিনি ব্যাঙ্কে -রেখে নিজের ঘরেই রেখেছেন—আর জীবিত যখ হ'য়ে দিন রাত সেই ঘর পাহারা দিচ্ছেন। এ-রকম সন্দেহ হওয়াই স্বাভাবিক, কারণ এপর্যন্ত কাউকেই তিনি তার ঘরের ভিতর ঢুকতে দেননি—চাকরদের পর্যন্ত না । তার খাবার নিয়ে চাকররা এসে দরজায় ধাক্কা দেয়, তিনি বেরিয়ে এসে খাবারের থালা নিয়ে ভিতরে চলে যান, খাওয়া হলে নিজেই থালাটি ১৯
সুতর মতো অত
;
বাইরে রেখে আবার দরজা বন্ধ করেন। এই নিয়মই বরাবর
চলে এসেছে। এক মিনিটের জন্য ঘর থেকে বেরুলেও ঘরে
তালা দিতে ভােলেন না; ম্যানেজরবাবু কি নরহরিবাবু—এ
দু’জন ছাড়া আর কেউই পারতপক্ষে তাঁর মুখদর্শন করতে রাজি
নয়ার কাছে গেলে ভেজানাে দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে-
দাঁড়িয়েই আলাপ করেন, আর সে-আলাপও দু’চারটে কথাতেই
শেষ হয়। তাঁকে দেখলে মেসের সকলেই খুব অস্বস্তি বােধ
করতাে, লােকটা যেন একটা জ্যান্ত ভূত, এই পৃথিবীর সঙ্গে
কোনাে সম্পর্কই যেন নেই।
গােবিন্দবাবুর সম্বন্ধে আর-একটা প্রবাদ মেসে প্রচলিত ।
তিনি নাকি কখনাে স্নান করেন না। স্নানের ঘরে তিনি অবশ্য
দু'একবার যান, কিন্তু তিনি যে স্নান করেন তার কোনাে প্রমাণ
পাওয়া যায়নি। চুল তাঁর সব সময়েই রুক্ষ, এলােমেলাে
বােধ হয় চিরুনিও ব্যবহার করেন না—সমস্ত গা কেমন বিশ্রী
নােংরা রকমের। লােকে বলে গচ্ছিত অর্থ ফেলে বাথরুমে দশটা
মিনিট কাটাতেও তার প্রাণে সয় না, তাই তিনি স্নান করাই
ছেড়েছেন। কেউ বা বলে—তা নয়, পাছে মনের ভুলে একদিন
একখানা সাবানই মেখে ফেলেন সেই ভয়ে তিনি জলই ছেন
। ম্যানেজরবাবু নাকি বলেন যে তিনি গােবিন্দবাবুকে
জিজ্ঞেস করে জেনেছেন যে ভদ্রলােকের কী একটা ব্যামাে
আছে যেজন্যে তার স্নান করা বারণ। শুনে সবাই বলেছে—
হাঃ, রেখে দিন ও-সব কথা, ব্যামােনা হাতি! এই গরম
দেশেও যে স্নান করে না সে কি মানুষ ! সে পিশাচ।
সকলের ঘৃণিত এই লােকটার উপরে শুধু নরহরিবাবুই
একটু সদয় ছিলেন। লােকটা যতই খারাপ হােক, লােকটা
ge,
অসুখী তাতেও সন্দেহ নেই ; নরহরিবাবুর কেমন দয়া হতাে।
তিনি মাঝে-মাঝে চারতলায় গিয়ে গােবিন্দবাবুর সঙ্গে যতটা
সম্ভব আলাপ করে আসতেন। এমনকি কখনাে-কখনাে তাস
খেলাতেও ডাকতেন তঁাকে। আশ্চর্যের বিষয় গােবিন্দবাবু
তাস খেলার সে-নিমন্ত্রণ রক্ষাও করতেন। . জীবনে যার কোনাে
শখ, কোনাে আনন্দ নেই, যাকে জীবিত না-ব’লে মৃত বললেই
যেন ঠিক হয়, তারও একটা শখ কোথায় যেন লুকিয়ে ছিলাে—
সে হচ্ছে তাসখেলার শখ। তাসের নাম শুনলে তিনি চঞ্চল
হয়ে উঠতেন—এক-একদিন নিজের ঘর ছেড়ে এসে ঘণ্টাখানেক
তাস খেলে যেতেন—সকলে অবাক হয়ে যেতাে। অবশ্য ঐ
নির্দিষ্ট এক ঘণ্টা হয়ে গেলেই তিনি আস্তে-আস্তে উঠে নিজের
ঘরে চলে যেতেন। তিনি যাবার সঙ্গে-সঙ্গে সকলেরই
যেন একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস পড়তাে।
তবে তাস তিনি
খেলতেন ওস্তাদের মতােই—যারা তাকে দু’চক্ষে দেখতে
পারতাে না তারাও মনে-মনে তারিফ করতাে। মুখে তার
হু-হ ছাড়া কথা ছিলাে না—শুধু কোনােদিন কেউ যদি কোনাে
নাটক দেখে এসে থিয়েটর সম্বন্ধে কথা তুলতে, তিনি মন দিয়ে
সে-সব কথা শুনতেন, এমনকি দু’একটা কথাও বলতেন।
একদিন নরহরিবাবু না-ব’তে পারেননি—“চাটুজ্যে মশাই
দেখছি থিয়েটরের খোঁজ-খবর একটু রাখেন।
‘হ্যা, এককালে খুব নেশা ছিলাে। গােবিন্দবাবুর কণ্ঠস্বর
ছিলাে খুব মােটা আর ভারি, অথচ খুব পরিষ্কার—শুনলে চমক
লাগে।
এর পর নরহরিবাবু একটা অসম্ভব কথা বলেছিলেন—“চলুন
একদিন সবাই মিলে থিয়েটর দেখে আসি।
রেতে
কিন্তু গোবিন্দবাবু গম্ভীরভাবে শুধু মাথা নেড়েছিলেন,
কোনাে কথা বলেননি।
মার সম্বন্ধে কিছু জানা যায় না, লােকের কল্পনা তার
সম্বন্ধেই উদ্দাম হয়ে ওঠে। গােবিন্দবাবুর সম্বন্ধে অনেকগুলি
থিওরি মেসে প্রচলিত ছিলাে। কেউ বলতে লােকটা খুনি
আসামি, ফেরার হয়ে আছে ; কেউ বা বলতে তিনি নিশ্চয়ই
সাধুপুরুষ, দরজা বন্ধ করে যােগ-টোগ করেন ; কেউ বা
বলতে এঁর স্ত্রী ছেলেমেয়ে সব একসঙ্গে জলে ডুবে মারা যায়,
তারপর থেকেই ইনি পাগল-মতাে হয়ে গেছেন, আর জলে
এমন ভয় হয়েছে যে স্নান পর্যন্ত করেন না। এমনি যার যা
হতো তাই বলতাে !
তবে মােটের
উপর মানুষটা
-কারু কোনাে ক্ষতি করে না, আর তার অস্তিত্বও
সহজেই ভুলে থাকা যায়, সেইজন্য এ নিয়ে কারু কোনাে
দুশ্চিন্তাও ছিলাে না। এমন সর্বনেশে কাণ্ড যে ঘটতে পারে
তা কেউ কখনাে স্বপ্নেও ভাবেনি।
:
সি
চার
মিনিট খানেক ঘরের সকলেই চুপ, তারপর নরেশ বললে,
‘সত্যি ?
নরহরিবাবু ক্ষীণস্বরে বললেন, 'সত্যি নয় তাে কী! আমি
নিজের চোখে দেখে এলুম।
‘নিজের চোখে দেখে এলে ?
‘হা। হাত-মুখ ধুয়ে ভাবলুম, যাই উপরে গােবিন্দবাবুকে
ডেকেই আনি। দুর্গা যে বলে গেলো বাবুর এখনাে ঘুম
ভাঙেনি—শুনে ভারি অবাক লেগেছিলাে, কারণ আমি জানি
খুব ভােরেই গােবিন্দবাবুর ঘুম ভাঙে। মনে হলে হয়তাে
ছাতে-টাতে বেড়াচ্ছেন, দুর্গা দেখতে পায়নি। গেলুম উপরে।
ছাতে কোথাও তিনি নেই, দরজা বন্ধ। ফিরে আসছিলুম
হঠাৎ কী মনে হলাে, ভাবলুম একটু ভালাে করে দেখে যাই।
কেমন একটু কৌতুহল হ'লো। এতদিন আছি, কখনাে তাঁর
ঘরের ভিতরটা দেখিনি। ওঁর ঘরে ঐ একটাই তাে জানলা,
তাও অনেকটা উচুতে, অনেক চেষ্টা করেও সে-জানলার
কাছে মুখ নিতে পারলুম না। তখন আর কী করি, দরজাতেই
আস্তে ধাক্কা দিলুম। অবাক হয়ে গেলুম যখন দেখলুম দরজাটা
আস্তে খুলে গেলাে। তাহলে ভােলাই ছিলাে দরজাটা ।
গগাবিন্দ চাটুজ্যে দরজায় খিল না এঁটে ঘুমুচ্ছেন এ যে চোখে
দেখেও বিশ্বাস হয় না। কিন্তু সত্যি—দরজা ফাঁক হয়ে আছে।
তরতাত
এই পর্যন্ত বলে নরহরিবাবু একটু থামলেন।
নরেশ রুদ্ধস্বরে বললে-তারপর?
কী-করি কী-করি ভেবে কয়েক সেকেণ্ড কাটলাে। কিন্তু
শেষ পর্যন্ত ওঁর ঘরের ভিতরে একটু উকি দেবার কৌতূহল
কিছুতেই সামলাতে পারলুম না। এই ঘর কতদিন ধরে একটা
রহস্যপুরী হয়ে আছে, আজ হয়তাে সে-রহস্যের কিছু সমাধান
হবে, এই ভেবে ঘরের ভিতরে মুখ বাড়াতেই যে-দৃশ্য চোখে
পড়লাে
বলে নরহরিবাবু দু’হাতে মুখ ঢাকলেন।
কয়েক সেকেণ্ড ঘরের মধ্যে ভারি নিঃশ্বাসের শব্দ ছাড়া
আর-কিছু শােনা গেলাে না। তারপর নরহরিবাবু আবার
বলতে লাগলেন—গােবিন্দবাবু মেঝের উপর চিৎ হয়ে পড়ে
আছেন, হাত দুটো দু'পাশে ছড়ানাে, চোখ দুটো প্রায় বেরিয়ে
আসছে, আর মুখটা বীভৎস। উঃ!”
আনন্দ জিজ্ঞেস করলে, ‘ঘরের ভিতর আর কী দেখলেন ?
কী যেন, তা তো মনে পড়ছে না।
‘কই, না।
আনন্দ খুব সহজভাবে বললে, তাহ'লে গলা টিপে
মেরেছে।
মনােহর বাঁকা চোখে আনন্দর দিকে তাকিয়ে বললে,
‘তুমি যেন খবরটা শুনে একটুও অবাক হলে না?
আনন্দ বললে, ‘তা এ-সব লােকের কপালে অপমৃত্যু
লেখাই থাকে।
খবরটা দেখতে-দেখতে সমস্ত মেসে—এমনকি সমস্ত
ত
পাড়ায় ছড়িয়ে পড়লাে, আর রবিবার সকালের আনন্দ মুছে
গিয়ে মেসের আবহাওয়া অস্বাভাবিক থমথমে হয়ে উঠলো।
এত বড়াে একটা মেসে কারাে গলার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে
, কাজকর্ম সব বন্ধ।
ম্যানেজরবাবু নরহরিবাবুর ঘরে এসে বললেন, পুলিশে
খবর দিয়েছি, ওরা এক্ষুনি লোক পাঠাচ্ছে। পুলিশ এসে
তদন্ত করে যতক্ষণ চ'লে না যায় আপনারা কেউ মেস থেকে
বেরােবেন না যেন। যে যেখানে আছেন ব’সে থাকুন।
উপরের ঘরেও কেউ যাবেন না—বুঝলেন ?-ও-ঘরে যা যেমন
আছে পুলিশ না-আসা পর্যন্ত একচুল নড়চড় হতে পারবে না।
চাকরদেরও সব বলে দিয়েছি-কারুর বেরুনাে বারণ।
হঠাৎ সমােজ বলে উঠলাে, কিন্তু আমাকে যে বেরােতেই
হবে—আমাদের বড়ােবাবুর মেয়ের আজ বিয়ে
‘অসম্ভব।
সরােজ আকুল হয়ে বলতে লাগলাে, ওখানে না-গেলে
আমার চলবেই না—আমার চাকরি যাবে-না-খেয়ে মরবাে।
আমায় ছেড়ে দিন, আমায় যেতে দিন- বলতে-বলতে সবােজ
দরজার কাছে ছুটে গেলাে, ম্যানেজরবাবু তাকে এক ধাক্কা
দিয়ে বললেন-“কী ছেলেমানুষি করছে, চুপ করে বসে
থাকো।
সয়ােজ কাপতে কাপতে বললে, ‘হরি-দা, তুমি একটু বলে
দাও, আমাকে যেতেই হবে--আমার চাকরি থাকবে না
নরহরিবাবু বললেন, ‘অত ব্যাকুল হােয়াে না, সরােজ,
চুপ করে বােসসা। কিচ্ছু ভয় নেই।
সরােজ হতাশভাবে বসে পড়ে ঠকঠক করে কাঁপতে
হােটেলের পরিচালনা করছেন, তার প্রতাপে ও প্রভাবে মেসের। লাগলাে। তার ভাব দেখে মনে হয় তার যেন এক মস্ত বিল ঘনিয়ে আসছে। আধ ঘণ্টার মধ্যেই নিচের ফুটপাথ লাল পাগড়িতে ছেয়ে গেলাে; দু’জন কনেস্টবল সঙ্গে নিয়ে মেসের ভিতর ঢুকলেন ইন্সপেক্টর রণজিৎ সামন্ত। সিড়ির ধারেই তাকে অভ্যর্থনা করলেন ম্যানেজরবাবু। ম্যানেজরবাবুর নাম পশুপতি ঘােষ। দেশ বরিশালে, মেজাজ বেশ কড়া। একটানা পাঁচ বছর তিনি ব্রডওয়ে যথেষ্ট উন্নতি ও সুনাম হয়েছে—আর এর মধ্যে এ কী কাণ্ড! বিপদের মুখে ঘাবড়ে যাবার লােক তিনি নন, মনে-মনে বরঞ্চ বেশ চটেই, আছেন--কোন দুষমনের এত সাহস যে তার মেসের মধ্যে একটা খুন করে গেলো, তঁার এত কষ্টে অর্জিত সুনামে কলঙ্কের কালি একে। ‘আসুন, ইন্সপেক্টরবাবু, আসুন। খুনি ব্যাটাকে কিন্তু ধ’রে দেওয়া চাই। ও ধরা না-পড়া পর্যন্ত আমি কিছুতে ছাড়বো না—্যাঃ, আমি-বরিশালের লােক, সেটা জানেন তাে! রণজিৎবাবু বললেন, সেটা আপনার কথা শুনেই টের পেয়েছি। চলুন তত উপরে, দেখা যাক। গােবিন্দ চাটুজ্যের পরিচয় দিতে দিতে ম্যানেজরবাবু ইন্সপেক্টরের সঙ্গে সিড়ি দিয়ে উঠতে লাগলেন। কেমন লােক ছিলেন গােবিন্দবাবু, অন্য সকলের সঙ্গে তার ব্যবহার কেমন ছিলাে। খানকয়েক ডিটেকটিভ নভেল পড়া ছিলাে ম্যানেজর- বাবুর, তা থেকে তার জানা ছিলাে যে কোনাে খুন হ'লে নিহত
ভেমত
ব্যক্তি সম্বন্ধে খবর নেয়াই সকলের আগে দরকার। তার
নিজের বুদ্ধি ও তৎপরতার উপর তার এতদূর বিশ্বাস ছিলো
যে তার সাহায্য ছাড়া যে এ-রহস্যের কোনাে কূল-কিনারা হ’তে
পারে তা তিনি ভাবতেও পারতেন না।
তেতলায় এসে রণজিৎবাবু বললেন, এর পর কোনদিকে?
‘গগাবিন্দবাবুর ঘর চারতলায়।
রণজিৎবাবু চারতলার সিঁড়ির দিকে মাত্র পা বাড়িয়েছেন
এমন সময় নরহরিবাবুর ঘর থেকে দুর্গা বেরিয়ে এলাে কয়েকটা
চায়ের পেয়ালা হাতে করে। তাকে দেখেই
তাকে দেখেই রণজিৎবাবু
থমকে দাঁড়ালেন।
দুর্গা পেয়ালাগুলাে নিয়ে বেগে নেমে যাচ্ছিলাে, রণজিৎবাবুর
দিকে চোখ পড়তেই সে-ও যেন কেমন আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে
গেলাে। পশুপতিবাবু এটা লক্ষ্য করে বললেন,
ওকে আপনি চেনেন নাকি ?
‘হ্যা, চিনি বইকি, বলে রণজিৎবাবু হেসে এগিয়ে গেলেন
দুর্গার দিকে। বললেন, কী খবর চঞ্চল, কেমন আছো ?
দুর্গা—মানে, চঞ্চল—কী যেন বলতে যাচ্ছিলাে, এমন সময়
পশুপতিবাবু দু’জনের মাঝখানে এসে বললেন, “আপনি ওকে
বেশ ভালােই চেনেন, মনে হচ্ছে। দেখুন, ও যদি কোনাে
দাগি আসামি বা অন্যকিছু হয় তাহলে আমি কিন্তু দায়ী নই
ওকে আপনি যা খুশি তা-ই করতে পারেন। ও নতুন এসেছে,
ওর সম্বন্ধে আমি কিছুই জানিনে। বরং ওর হাব-ভাব দেখে
আমার কেমন একটু সন্দেহই হয়।
‘ঠিক বলেছেন, সন্দেহ হবারই কথা।
‘ওকে আপনি কী-একটা অন্য নামে যেন ডাকলেন না ?
২৭
তেজ
ভাবছেন আমি শুনিনি? সব শুনেছি। এখন কথা হচ্ছে,
যে-লােক ভদ্রলােকের ছেলে হয়ে নাম ভাঁড়িয়ে মেসের
চাকরের কাজ করতে আসে, তাকে কি বিশ্বাস করা যায় ?
তার উপর এই তাে একটা অঘটন ঘটলাে। দ্যাখো ছােকরা,
তুমি যতই চালাক হও, আমার সঙ্গে চালাকিতে তুমি পারবে
, তা জেনাে। তােমার মৎলবখানা কী, খুলে বলল দেখি ?
আর এই যে গােবিন্দবাবু খুন হলেন, সে-বিষয়েই বা তুমি
কতদূর কী জাননা, শুনি?, সব বলতে হবে, কিছু গােপন করা
চলবে না। ভালােয়-ভালােয় বলবে তাে ভালাে, নয়তাে কী
করে পেট থেকে কথা আদায় করতে হয় তা আমার ভালােই
জানা আছে। হু-হু, আমি, যে-সে লােক নই, দেশ আমার
বরিশালে। আর দেখছে তাে পুলিশের ইন্সপেক্টর সামনেই
রয়েছেন—প্যাচ কষতে গেলে আরাে বিপদে পড়বে।
‘ইন্সপেক্টরবাবুকে জিজ্ঞাসা করুন না আমার কথা বললে
চঞ্চল।
রণজিৎবাবু বললেন, আপনি কিছু ভাববেন না, ওর ভার
আমিই নিচ্ছি। আপনারা একটু অপেক্ষা করুন, এর সঙ্গে
আমি একটু কথা বলে নিই।
পশুপতিবাবু গলা খাটো করে বললেন, ‘ছােকরাকে
অ্যারেস্ট করলেন তো? আমার মনে হচ্ছে ও তলে-তলে
এর মধ্যে আছে। ওকে ছেড়ে রাখা কোনাে কাজের
থা নয়।
‘না, না, ওকে ছাড়বে না। চোখে-চোখেই রাখবাে।
আপনারা একটু অপেক্ষা করুন, একে জেরা করে দেখি—কিছু
বেরােয় কিনা।
২৮
ভরসঅত
পশুপতিবাবু উৎসাহিত হয়ে বললেন, ‘হ্যা, তা-ই ভালাে।
কার পেটে কী আছে কে জানে! আজকালকার দিনে
কাউকেই বিশ্বাস নেই, মশায়। এই তাে সেদিন আমাদের
দেশের বাড়িতে...'
পাঁচ
কিন্তু রণজিৎ সামন্ত পশুপতিবাবুর কথা শেষ পর্যন্ত শােনবার
জন্য অপেক্ষা করলেন না। দুর্গা—অথবা চঞ্চলকে একটু দূরে
ডেকে নিয়ে বললেন, ‘চঞ্চল, এ তুমি করেছে কী ?
হাত থেকে পেয়ালাগুলাে নামিয়ে চঞ্চল বললে, “কেন,
করেছি ?
‘শেষটায় এই মেসে—চাকরের কাজ করছে।
চঞ্চল মেঝের দিকে তাকিয়ে বললে, ‘তা ছাড়া উপায় কী?
“উপায় ছিলাে বইকি। তুমি যদি আমার কাছে আসতে
‘কী করে জানবাে আপনি আমাকে মনে রেখেছেন ?
‘বাঃ, সেই “কলকাতা হরকরার ব্যাপারে তুমি যে-রকম
সাহস আর বুদ্ধির পরিচয় দিয়েছিলে—তােমাকে কি ভুলতে
পারি! আমি বরং মনে-মনে ভেবেছি সে-ছােকরাটির হ’লল।
কী ? দেখা পেলে বেশ হ'তাে-কাজে লাগাতে পারতুম।
তারপর—এ ক'মাস তুমি কোথায় ছিলে, কী করলে সব বলল
আমাকে।
তা ‘বলবার বিশেষ কিছু নেই। “কলকাতা হরকরা উঠে যাবার পর আমি একেবারে অকূলে ভাসলুম। তাই বলে খুব যে ঘাবড়ে গেলুম তাও নয়, এ তাে আমার অভ্যেসের মধ্যেই ছেলেবেলা থেকে এই রকমই তাে চলছে। পকেটে একটি টাকা আর কয়েক আনা পয়সা ছিলো ; খুচরােটা নিজে রেখে এক টাকার চীনে সিদুর, চুলের কাটা, বেলুন বাঁশি এ-সব কিনে ফেললুম রাধাবাজার থেকে। তারপর তাই নিয়ে বালিগঞ্জে ফেরি করতে বেরেলুম। রোদুরে বৃষ্টিতে বেশ কষ্ট হতো, কিন্তু বােজগারও মন্দ হতাে না। প্রথমটায় দু’ আনা দশ পয়সার বেশি হতাে না রােজ, কিন্তু তাই থেকে দু’চার পয়সা জমিয়ে-জমিয়ে আমার পুজি যখন একটু বাড়লাে, তখন জিনিসের স্টক ক্রমেই বাড়াতে পারলুম- শেষের দিকটায় চার আনা ছ’ আনা এমনকি আট আনা পর্যন্ত রােজগার হতাে। রণজিৎবাবু সবিস্ময়ে জিজ্ঞেস করলেন, তাতে তােমার চলতাে ? ‘বলেন কী! চলবে না! রােজ চার আনা যে অনেক। পাইস হােটেলে দু’ আনায় রীতিমতো ভােজ হয়ে যায় এক- বেলা। দু’ পয়সায় এক পেয়ালা চা, আর ছ’পয়সা হাতে থাকে। চার আনা কি কম! রণজিৎবাবু হেসে উঠে বললেন, তুমি অবাক করলৈ, চঞ্চল! এত কষ্ট করতে সত্যি পারাে তুমি ? চঞ্চল বিনীতভাবে বললে, ‘না, তা আর পারি কই! হাজার হােক, ভদ্রলােকের রক্ত তােত বইছে শরীরে। ভদ্রলােকের
সরকাজের
কাজ তে জোটেই না, এদিকে কুলির সঙ্গেও প্রতিযােগিতায়
পারি না—এই তাে এখন আমাদের অবস্থা। জিনিস ফেরি
করে একরকম চলে যাচ্ছিলাে, কিন্তু হঠাৎ অসুখ করেই আবার
গােল বাধালে।
‘অসুখের আর দোষ কী! নাওয়া খাওয়া শােওয়া কিছুরি
ঠিক নেই—বােদ জল মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে—ঐ তুমি যা
বললে—এ কি আর ভদ্রলােকের সয়! আমি অবাক হচ্ছি এ-কথা
ভেবে যে তুমি তক্ষুনি কোনাে খবর-কাগজের আপিশে চেষ্টা
করলে না কেন। ও-লাইনে তােমার তাে অভিজ্ঞতা ছিলাে।
‘চেষ্টা করলেই যে হতাে তার তাে মানে নেই। চাওয়া-
মাত্র কি আর কোনাে চাকরি হয় ! এদিকে আমার যে এখন
তখন অবস্থা—আজকে রােজগার না-করলে আজকেই উপােস।
কাগজের আপিশে চেষ্টা করতে গেলে হাঁটাহাঁটিই হজে সায়
এদিকে আমার সেই এক টাকা সাড়ে-সাত আনাও খামকা
খরচ হয়ে যেতাে। তাছাড়া “হরকরা” নিয়ে যে-রকম একটা
কেলেঙ্কারি হ’লল, আমাকে হয়তাে কেউ বিশ্বাস করতাে না,
হয়তাে সন্দেহ করতে আমিও তলে-তলে ষড়যন্ত্রের মধ্যে
ছিলুম। তাছাড়া আমি যে “হরকরা”য় কাজ করেছি তারই বা
বিশ্বাস কী! একটা সার্টিফিকেট নেই, কিচ্ছু নেই ! আপনিই
বলুন, তার চেয়ে এই কি ভালাে করিনি। চাকরির চেষ্টার
চাইতে হাঁটাহাঁটি খুব বেশি হ’লল না, অথচ সঙ্গে সঙ্গে দুটো
পয়সাও পকেটে এলাে—অবশ্যি আপনাদের অর্থে “দুটো পয়সা
নয়, অভিধানের অর্থে।
‘তুমি তাে দেখছি কথাবার্তাতেও বেশ তুখােড়, মিষ্টি করে
জুতােও দিতে পারাে, মন্তব্য করলেন সামন্তমশাই।
ভুতের ভেজাত ‘কিছু মনে করবেন না, সত্যি কথাটা মুখে এসে পড়লাে— সে যাকগে—যখন অসুখ করলাে, কী করলে তুমি ? কী আর করবাে-সােজা হাসপাতাল। টাইফয়েড হয়েছিলাে—আট-দশ দিন নাকি স্রেফ অজ্ঞান হয়ে ছিলুম। অসুখের কথা ভালাে করে আমার মনেও পড়ে না—কেমন একটা স্বপ্নের মতাে মনে হয়। এটা কিন্তু মস্ত বাঁচোয়া- অতখানি কষ্ট সজ্ঞানে ভােগ করতে হলে আর উপায় ছিলাে । দু মাস পরে অত্যন্ত রােগা হয়ে হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে এলুম। পকেটে একটি পয়সা নেই। যখন ফেরিওলা ছিলুম, চানাচুর চিবিয়ে ফুটপাতে ঘুমিয়ে দিব্যি দিনের পর দিন কেটে গেছে, কিন্তু এখন দুর্বল শরীরে মনে হলাে একটা আশ্রয় পেলে ভালাে হয়। সঙ্গে-সঙ্গেই মনে হ’লল চাকরের কাজ শেলে বেশ হয়, দু'বেলা খাওয়া জোটে, তাছাড়া ঘুমােবার একটা নির্দিষ্ট জায়গাও পাওয়া যায়। বৌবাজার দিয়ে হাঁটতে-হাঁটতে একটা পানের দোকানে খবর পেলুম ব্রডওয়ে হােটেলে একটা চাকরি খালি আছে। এক সেকেণ্ডও দেরি -করে এই হােটেলে এসে হাজির হলুম। ম্যানেজরবাবু আমার সঙ্গে দুটো চারটে কথা বলেই যেন খুশি হলেন—জানি কী-কারণে আমি তাকে খুশি করতে পেরেছিলুম। সেই থেকে আছি। ‘কত মাইনে পাও ? ‘পাঁচ টাকা। তাছাড়া বাবুরা মাঝে-মাঝে বখশিষ দেন- মােটর উপর কাজটা ভালােই। ‘হ্যা, ভাললাই’, ব’লে রণজিৎবাবু একটু হাসলেন । ‘ভালাে বইকি, পঁচিশ টাকা মাইনের কেরানিগিরির চাইতে
EAN
RHAT.
এ কি সত্যি? বা নহি কি সত্যি?
No text on this page.
অতঃসত
নিশ্চয়ই ভালাে। কেরানিকে লােকে “আপনি” বলে, আর
চাকরকে বলে “তুমি”—এ ছাড়া এ দুই কাজে আর-কোনাে
তফাৎ তাে আমি দেখতে পাইনে।
রণজিৎবাবু বললেন, “ওটাই তাে মস্ত তফাৎ।•••কিন্তু সে
যাই হােক, এভাবে আর কতকাল কাটাবে তুমি ?
যতদিন এর চেয়ে ভালাে কিছু না জোটে।
‘জোটাবার চেষ্টা কিছু করছে কি ?
চঞ্চল চুপ করে রইলাে।
রণজিৎবাবু তার কাঁধে হাত রেখে মৃদুস্বরে বললেন,
সাবাস ছেলে তুমি, চঞ্চল, “আমার যদি হােমার মতাে একটা
ছেলে থাকতত, নিজেকে ধন্য মনে করতুম। এ-রকম
আত্মনির্ভরশীল ছেলে বাংলাদেশে ক’টা আছে! এই তাে চাই!
তােমাকে দেখে, তােমার ক-শুনে আনন্দ.যেমন হচ্ছে তেমনি
মনটাও একটু খারাপ লাগছে এ-কথা ভেবে যে এত দুঃখে
পড়েও আমাকে তুমি একবার মনে করলে না! তােমার কি
একবারও মনে হলাে না যে আমি তােমার কোনাে কাজে
লাগতে পারি ?
চঞ্চল আমতা-আমতা করে বললে, ‘মনে যে না হয়েছিলাে
তা নয়, কিন্তু আপনার বাড়ির ঠিকানা...'
সামন্তমশাই হেসে উঠে বললেন, সে তত টেলিফোনের
বই খুললেই পেতে। যতই তুখােড় হও না, এখনাে একেবারে
ছেলেমানুষ আছে দেখছি।
চঞ্চল কিছু বললে না।
একটা কথা তােমাকে বলি, চঞ্চল। এখান থেকে এবার
তুমি ছুটি নাও। আমার ওখানে চলােভুল বুঝে না,
.
তেতে
তােমাকে আমার উপর নির্ভর করতে বলছি না—যতদিন ভালাে
কোনাে কাজ না-জোটে আমার ওখানে থাকবে আরকি। আর
কাজ যাতে তাড়াতাড়ি জোটে সেজন্য আমি যথাসাধ্য চেষ্টা
করব। আশা করি এতে তােমার আপত্তি হবে না। কী
বলাে ?
চঞ্চল নিচু গলায় বললে, বেশ তাে, আপনি যে-রকম
বলছেন তা-ই হবে।
‘পশুপতিবাবু তােমাকে আর রাখবেনও না এ তুমি ঠিক
জেনাে। একবার যখন তােমাকে সন্দেহ করেছেন•••যে-রকম
জবরদস্ত লােক দেখছি।
'শেষের কথাটা বলে রণজিৎবাবু একটু হাসলেন।—“চলল
এবার, এই ব্যাপারটার কিছু হদিশ করতে পারি কিনা দেখি।
‘চলুন।
রণজিৎবাবু এগিয়ে এসে বললেন, ‘এবার চারতলায় যাওয়া
যাক।”
পশুপতিবাবু উদ্গ্রীব হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “ওর পেটের
কথা বের করতে পারলেন কিছু?
‘ওর জন্যে ভাববেন না, ওকে আমি ঠিক করে নেবাে।
চলল হে চঞ্চল, তুমিও চলাে আমাদের সঙ্গে চারতলায়।
তরমুতে
এমন সময় চটি চটপট করতে-করতে নরহরিবাবু বেরিয়ে
এলেন বাইরে। তাকে দেখেই পশুপতিবাবু বলে উঠলেন,
‘আসুন মশাই, শুনে যান আপনার পেয়ারের চাকরের কাণ্ড।
আমি বরাবরই বলেছি—
তার কথায় বাধা দিয়ে নরহরিবাবু বললেন, ‘কেন,
হয়েছে কী ?
‘আরে মশাই ও আসলে চাকরই নয়। দেখছেন না, কেমন
সুন্দর চেহারা, পরিস্কার হাত-পা। উনি ভদ্দরলােকের ছেলে,
নাম ভাঁড়িয়ে বাসন মাজতে এসেছেন। ইন্সপেক্টরবাবু তাে
ওকে দেখেই চিনে ফেলেছেন। দাগি আসামি কিনা।
নরহরিবাবু মনে-মনে শিউরে উঠে বললেন, ‘সে কী কথা !
রণজিৎবাবু বললেন, ‘দাগি আসামি তা তাে আমি বলিনি।
‘আহা—আপনারা কি আর সব কথা খুলে বলবেন ! যাই
হােক, এর আসল নাম হচ্ছে—কী যেন তােমার নামখানি
বাপু ?
‘চঞ্চল নাগ।
‘হ্যা, হঁ্যা, চঞ্চল নাগ—খাশা অতি-আধুনিক নাম। তা এই
তােত ব্যাপার—এদিকে দেখছেন তাে অবস্থা। আপনাদের
সবাইকে বলে রাখছি, সাবধানে থাকবেন—যা দিনকাল
পড়েছে, কখন কী হয় কিছুই বলা যায় না।
৩
সুতরভাত
নরহরিবাবু বললেন, ‘তা ভদ্রলােকের ছেলে বিপাকে পড়ে
চাকরের কাজ করতে এসেছে, এ এমন একটা অন্যায় কী।
থাক, থাক, আপনার সঙ্গে ও-সব কথা পরে হবে, এখন
সময় নেই। ইন্সপেক্টরবাবু, ইনিই আমাদের নরহরি-দা, ইনিই
সকালবেলা চারতলায় গিয়ে ভীষণ দৃশ্য দেখে আসেন।
‘ও, আপনিই প্রথমে দ্যাখেন ? তাহলে আপনিও চলুন
আমাদের সঙ্গে, আপনার কথা শােনাও হবে।
কোথায় যেতে হবে ?
‘বেশিদূর নয়, এই চারতলায়। তুমিও এসো, চঞ্চল।
চারজনে গেলেন চারতলায়।
চারতলার প্রায় সমস্তটাই ছাত, শুধু এক কোণে ছােট্ট একটি
ঘর, আসলে সেটি চিলেকোঠা। কার্ণিশে ঘেরা এই মস্ত ছাত
কেউ বিশেষ ব্যবহার করে না। প্রায় সকলেই চাকুরে,
সকলেরই সময়াভাব, ছাতে এসে হাওয়া খাবার মতাে বাবুগিরি
কারুরই পােষায় না। তাছাড়া গােবিন্দবাবুর অখ্যাতি সমস্ত
মেসে এতই রাষ্ট্র যে কদাচ কারাে শখ হলেও ঐ দাড়িওলা
অলক্ষুনে মুখ মনে করলেই ছাতে যাবার ইচ্ছে উবে যায়।
ছাতটি বলতে গেলে গােবিন্দবাবুর একলারই দখলে ছিলাে।
ঘরে ঢােকবার আগে রণজিৎবাবু ছাতটি বার দুই ঘুরে
এলেন। আশ্চর্য–ছাতটি একেবারে তকতকে পরিষ্কার, একটা
কাগজের টুকরােও কোথাও পড়ে নেই। কার্ণিশে ভর দিয়ে
নিচের দিকে তাকিয়ে দেখলেন—জলের পাইপ বেয়ে উঠে
আসা অবশ্য অসম্ভব নয়, কিন্তু সিড়ি দিয়ে উঠতেই বা
ক্ষতি কী ?
তরমততে
তারপর গেলেন ঘরের ভিতরে। কনেবল দু’জন সিড়ির
কাছে রইলাে।
চারজন মানুষে ঘরটা যেন একেবারে ভরে গেলো। দড়িতে
ঝোলানাে সামান্য দু একটা জামাকাপড়, টিনের একটা ভাঙা
তােরঙ্গ—জিনিস বলতে এই। আর মেঝেতে হাত-পা ছড়িয়ে
চিৎ হয়ে পড়ে আছেন গােবিন্দ চাটুজ্যে—মুখটা ফুলে বীভৎস
হয়েছে, জিভ এসেছে বেরিয়ে, ভালাে চোখটা এমন বড়াে যেন
দৈত্যের চোখ, আর কানা চোখটা যেন আরাে বুজে চামড়ার
মধ্যে ঢুকে গেছে—গলায় চাক-চাক মাংস উঠেছে লাল হয়ে ফুলে।
রণজিৎবাবু একটু তাকিয়ে থেকে বললেন, নৃশংস বলতে
হয় এই হত্যাকারীকে। বুকের উপর হাঁটু চেপে বসে গলা
টিপে মেরেছে। দেখছেন গলায় লাল-লাল দাগ? বলেই
তিনি মৃতদেহের পাশে হাঁটু ভেঙে বসে পড়ে জামার পকেটে
হাত ঢোকালেন।
পকেট থেকে কিছুই পাওয়া গেলাে না। তারপর খােলা
হলাে তােরঙ্গ।
প্রথমে বেরুলাে গােটা কয়েক পুরােনাে, পাতা-হেঁড়া
নাটকের বই, তারপর এক কৌটো দাঁতের মাজন, তারপর এক
জোড়া নােংরা চিটচিটে তাস, তারপর—ব্যস, আর কিছু না।
টাকাকড়ি ? একটা আধলাও না।
গােবিন্দ চাটুজ্যের পার্থিব সম্পত্তি দেখে সকলে মুখ চাওয়া-
চাওয়ি করতে লাগলাে।
নরহরিবাবু বললেন, ‘টাকার জন্যেই ভদ্রলােক প্রাণে মারা
গেলেন। এই তােরঙ্গেই সব টাকাকড়ি রাখতেন নিশ্চয়ই
যে খুন করেছে সে নিয়ে সটকেছে।
ক
তি,তােমত
‘কিন্তু তােরঙ্গ তাে ভাঙা নয়,' বললেন ম্যানেজরবাবু।
‘ভাঙবার দরকার কী—'ওতে তাে আর তালা ছিলাে না।
আর তােরঙ্গটা এতই পুরােনাে যে তালা দেয়া সম্ভবও ছিলো
বােধ হয়।
‘তাহলে কি আপনি বলতে চান গােবিন্দবাবু তার সব
টাকাকড়ি একটা ভাঙা তােরঙ্গে ফেলে রাখতেন? তিনি কি
এতই অসাবধান ?
কত আর সাবধান হবেন ! ঘর ছেড়েই তাে বেরােতেন না।
হয়তাে কোনাে গুপ্ত জায়গায় লুকিয়ে রাখতেন ? কি
হয়ত তার টাকাকড়ি কিছু ছিলােই না, সবই আমাদের
অনুমান? ? পশুপতিবাবুর ডিটেকটিভ নভেল-পড়া মগজে
নানারকম থিওরি পাক খেয়ে বেড়াতে লাগলো। তিনি একটা
লাঠি দিয়ে দেয়াল ইকে-কে দেখলেন, কোথাও একটু ফাগ।
আওয়াজ হয় কিনা। সমস্ত দেয়া হাড়ে হাড়ে দেখলেন
কোনো লুকোনাে বােতাম বা হাতল হাতে ঠেকে কিনা। লাথি
মেরে-মেরে মেঝের সীমেন্ট প্রায় তুলে ফেললেন ! কিন্তু এত
করেও কোনাে ফল হলাে না।
রণজিৎবাবু বললেন, ‘নিহত ব্যক্তির সম্পত্তির সন্ধান পেতে
আপনি বড়ােই যেন ব্যস্ত হ্রয়ে পড়েছেন, ম্যানেজরবাবু। কিন্তু
বৃথা চেষ্ট', এই নিষ্ঠ হত্যাকাণ্ড যে করতে পারলে, সে কি
আর টাকাকড়ির লোভ সামলাতে পেরেছে !
পশুপতি বললেন-“না, না, তা নয়—এই দেখছিলুম
আরকি। ভদ্রলােকের সবই রহস্যময় ছিলাে কিনা। আপনার
কী মনে হচ্ছে? কোনাে ক্ল-টু পেলেন ?
‘আপাতত একেবারেই অন্ধকার।
ত
হঠাৎ চঞ্চল বলে উঠলাে, এ তাে ভারি আশ্চর্য !
ঘরের এক কোণে গােবিন্দবাবু বিছানাটা জড়ানাে পুটলি
হয়ে পড়ে ছিলাে, এতক্ষণ কেউ তা লক্ষ্য করেনি। চঞ্চল,
গিয়ে সেটা টেনে খুলে ফেলেছে। বিছানা বলতে অবশ্য শুধু
একটা কম্বল আর একটা ওয়াড-ছাড়া চিটচিটে বালিশ। কিন্তু
সেই কম্বলের মধ্যে জড়ানাে একখানা মস্ত বড়াে ঝকঝকে দামি
অয়না।
এই আয়নাটাই আশ্চর্ণ।
সই ঝকে পডে আয়নাটা দেখতে লাগলাে। সোনালি
রঙের ফ্রেম, খালা রেখে দেখা গেণে। কঁচি। অন্তত এক ইঞ্চি
পু। এ । পয়সা খরচ কতে যার প্রাণ বেরিয়ে যেতো,
তার এই দামি আয়নার অাগুবি শখ কেন ?' অংশই
বটে।
ম্যানেরবাবু বললো, “বয়ের প্রাণে তো রস দিলাে
ব! নিজের ঐ অলপুনে সুখখানাই নেধি হয় দেখতে
ব'সে-বসে।
‘কেন, 'ক্ষুনে মূখ কেন ? নিতে: করলেন ইন্সপেক্টর।
‘কেন তালক্ষুণে তা তাে নিজের চে ই দেখতে পাচ্ছেন।
খুন হয়ে ইনি অবশ্য দেখতে ভয়াবহ হয়েছেন, কিন্তু বেঁচে
থেকেও যে এর চেয়ে বেশি সুত্র ছিলেন তা তাে নয়। আচ্ছা,
ঐ বালিশটার ভিতরে নোট-টোট কিছু নেই তাে?
বলে পশুপতি বালিশটা তুলে নিযে এক টানে খােলটা
ছিড়ে ফেললেন। সারা ঘরে তুলে ছড়িয়ে পড়লো, নােট
একটিও বেরুলাে না।
চঞ্চল তখনও আয়নাটা নিয়ে নাড়াচাড়া করছিলাে, হঠাৎ
ভূতের সতে
কোথা থেকে একটা তীব্র আলাে এসে তার চোখ ধাধিয়ে দিলে।
উপরের দিকে তাকিয়ে দেখলে, ঘরের ইলেকট্রিক বালটা
তখনও জ্বলছে। দিনের আলােয় কেউ তা এতক্ষণ লক্ষ্য
করেনি।
রণজিৎবাবুকে ডেকে সে বললে, দেখছেন—কে বা
কারা হাতের কাজ শেষ করে আলােটা নেবাতে ভুলে
গিয়েছিলাে।
রণজিৎ বললেন, তা-ই তাে দেখছি।
চঞ্চল বললে, “আচ্ছা, আললাটা খুব বেশি উজ্জ্বল নয় কি ?
এই দিনের আলােতেও কেমন চোখে লাগছে।
‘হ্যা, খুবই উজ্জ্বল। অন্তত একশাে পাওয়ার হবে।
‘এতটুকু ঘরে একশাে পাওয়ারের আলাে! ভদ্রলােকের
কি মাথা খারাপ ছিলাে?
‘তা লােকের কত রকমই খেয়াল থাকে, বলে রণজিৎবাবু
শিষ দিতে-দিতে উঠে দাঁড়িয়ে আলােটা নিবিয়ে দিলেন।
ম্যানেজরবাবুর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘বালিশটা মিছিমিছি
ছিড়লেন দেখছি। তা এখানে তাে আর-কিছু করবার নেই।
চলুন নিচে গিয়ে গল্প-টল্প করা যাক।—আহা, কী নিষ্ঠুরভাবে
মেরেছে লােকটাকে, বলে তিনি মৃতদেহের কাছে গিয়ে মুখে
চুলে দাড়িতে একটু হাত বুলােলেন।
পশুপতিহঠাৎ বলে উঠলেন, আমাদের একটা কিন্তু ভুল
হয়ে গেছে—ডাক্তার ডাকা হয়নি।
রণজিৎ বললেন, ‘ডাক্তারের দরকার হবে না। ইনি যে
আত্মহত্যা করেননি সেটা নিঃসন্দেহ। এ ছাড়া আর যা জানবার
তা ধরা পড়বে পােস্টমর্টেমে।
৪০
ভুতের মতো অদ্ভুত
‘মৃতদেহ কি এখনই সরিয়ে নেবেন?
‘একটু পরেই। আপনাদের সঙ্গে দু’একটা কথা আছে।
চলুন নিচে।
সাত
ম্যানেজরবাবু
ইন্সপেক্টরকে নরহরি-দার ঘরে এনেই
বসালেন। সেখানে মনােহর, সমােজ, নরেশ আর আনন্দ
তখনাে বসে আছে।
ম্যানেজরবাবু বললেন, ‘এদের কি বাইরে যেতে বলবাে ?
না, না, আমার কথা কিছু গােপনীয় নয়। দু একটা
খোঁজ-খবর নেবাে শুধু। আচ্ছা, কাল রাত্রে আপনারা
গােবিন্দবাবুকে শেষ কখন দেখেছিলেন ?
সকলেই বললে যে রাত্রে কেউ তাকে দ্যাখেনি, এমনকি
বিকেলের দিকেই দেখেছে বলে কারুর মনে পড়ে না। পশুপতি
বুঝিয়ে বললেন যে গােবিন্দবাবু মানুষটা মােটেও মিশুক ছিলেন
, নেহাৎ দরকার না-হলে উপর থেকে নামতেন না, খাওয়া-
দাওয়াও নিজের ঘরেই করতেন। তাঁর সঙ্গে মেসের পাঁচজনের।
দেখাশােনা বলতে গেলে হ’তােই না, শুধু নরহরি-দার ঘরেই
এক-আধ সময় আসতেন।
আপনার ঘরে আসতেন ? কেন ?
‘আসতেন তাস খেলতে।
৪১
ছিলাে মনে হয় ।
ভুতের অবত
‘তাস খেলতে ভালােবাসতেন বুঝি ?
হ্যা, পৃথিবীতে ঐ একটা জিনিসেই তার একটু আসক্তি।
আর কিছু ভালােবাসতেন ?
‘মনে তাে হতাে না।
‘কথাবার্তা কী-রকম বলতেন ?
খুব কম।
‘কোনাে বিশেষ বিষয়ে উৎসাহ ছিলো?
‘কিছুমাত্র না।
‘একটু ভেবে দেখুন।
‘যদি খুব খুঁটিয়ে জিজ্ঞেস করেন তাহলে বলতে হয় এক
থিয়েটরের কথা উঠলে ভদ্রলােকের একটু উৎসাহ দেখা যেতো।
তথচ তিনি থিয়েটরে কখনাে যেতেন, না ?
‘কখনােই না। বাড়ির বাইরেই যেতেন না কখনাে।
‘আচ্ছা। এবার আপনি বলুন ম্যানেজরবাবু, গােবিন্দবাবুর
বিষয়ে কী জানেন ?
পশুপতি তার ম্যানেজারির প্রথম দিন থেকে পুঙ্খানুপুঙ্খ
বর্ণনা শুরু করলেন। গােবিন্দবাবু কী করতেন, কী খেতেন,
চাকরদের সঙ্গে কেমন ব্যবহার করতেন—কিছুই সে বর্ণনা
থেকে বাদ গেলাে না। সব শুনে ইন্সপেক্টর জিজ্ঞেস
করলেন ?
‘তার দেশ কোথায় ছিলাে ?
; 'তা তাে জানিনে।
‘াকে কখনাে জিজ্ঞেস করেছেন ?
‘অনেকবার করেছি, কোনাে জবাব পাইনি। এটুকু মাত্র
৪২
তরমুভেত
বলতে পারি যে কথা শুনে চব্বিশ পরগনার লােকই মনে
হতো।
‘তার কোনো আত্মীয়স্বজন•••?
‘কারো কথা জানিনে।
‘কেউ দেখা করতে আসতাে তার সঙ্গে ?
‘কেউ না। আর এতদিনের মধ্যে তার একটা চিঠি এসেছে
বলেও জানা যায়নি।
হঠাৎ আনন্দ বলে উঠলাে, ‘কাল কিন্তু ওঁর নামে একটা
চি এসেছিলাে।
‘আঁ? চিঠি ? ওঁর নামে ? পশুপতি রীতিমত চমকে
উঠলেন।
‘, ওঁর নামে চিত।
তুমি জানলে কেমন করে ?
‘কাল সকালে আমার কোনো চিঠি এসেছে কিনা দেখবার
জন্য আমি লেটারবক্স ঘাটছিলাম, নানা চিঠির মধ্যে গােবিন্দ
চ্যাটার্জির নামে একটি পােস্টকার্ড চোখে পড়লাে।
ইন্সপেক্টর জিজ্ঞেস করলেন, “ঠিক মনে আছে আপনার ?
“ঠিক মনে আছে। ওঁর নামে কখনাে কোনাে চিঠি আসে
না, সেইজন্য ওটা লক্ষ্য করেছিলাম। কোনাে জরুরি খবর
এসেছে মনে করে আমি তখুনি সেটা চাকরের হাতে পাঠিয়ে
দিলাম চারতলায়।
ম্যানেজরবাবু জিজ্ঞেস করলেন, ছিলাে সে-চিঠিতে ?
‘তা জানিনে। পরের চিঠি পড়বার অভ্যেস আমার নেই।
মনােহর বললে, তুমি তাে খুব পরােপকারী ছেলে, আনন্দ,
তক্ষুনি চিঠিটা চাকর দিয়ে পাঠিয়ে দিলে।
&৩
ভুতের মতো
‘তা দিয়েছিলুম, আপনাদের মতাে টিপ্পনি কেটেই তাে
আমার দিন যায় না।
পশুপতি বলে উঠলেন, “থাক, থাক, তােমার আর
ফাজলেমি করতে হবে না। কোন চাকর দিয়ে পাঠিয়েছিলে?
‘কেষ্টাকে দিয়ে।
ডাকা হলাে কেষ্টাকে। কেষ্ট বললে যে হঁ্যা, কাল সকালে
একতলার বাবু তার হাতে একখানা পােস্টকার্ড দিয়েছিলেন
বটে চারতলার বাবুকে দিয়ে আসতে।
‘তুই সেটা তখুনি দিয়ে এসেছিলি?
“আজ্ঞে হ্যা।
“চিঠি পেয়ে চারতলার বাবু কিছু বললেন ? জিজ্ঞেস
করলেন ইন্সপেক্টর।
কেষ্ট মাথা নাড়লাে।
‘ার মুখের চেহারা চিঠি পেয়ে কেমন হলাে?
কিন্তু কেষ্ট আর-কিছুই বলতে পারলে না। চিঠি দিয়েই
সে চলে এসে ছিলাে।
ম্যানেজরবাবু বললেন, ‘পােস্টকার্ডটা ঘরের মধ্যে পাওয়া
গেলে একটু সুরাহা হত।
ইন্সপেক্টর বললেন, ‘সেইজন্যেই তাে পাওয়া গেলাে না।
‘আপনি তাহলে মনে করেন পােল্টকার্ডটার সঙ্গে এই
ঘটনার কোনাে যােগাযােগ আছে ?
‘তা-ই তাে মনে হচ্ছে।
মেসের আরাে অনেককে জেরা করা হলো, তা থেকে দুটো
খুব বড়ােরকমের খবর বেরুলাে। দোতলার ললিতবাবু বললেন
যে কাল রাত প্রায় দুটোয় তিনি থিয়েটর দেখে ফিরেছিলেন।
৪ঃ
অততে যত
মেসের কাছে এসে তিনি দেখেছিলেন যে সমস্ত বাড়িটা অন্ধকার,
শুধু চারতলার এক কোণে আলাে জ্বলছিলাে। তিনি মনে-মনে
ভেবেছিলেন—বিটকেল বুড়াে এত রাতে আলাে জ্বেলে কী
করছে—সে-কথা তার মনে আছে ।
‘আলােটা কি আপনার চোখে খুব বেশি উজ্জ্বল লেগেছিলাে?
‘তা তাে বলতে পারবাে না। কার্ণিশের ফুটো দিয়ে
একটুখানি আলােই চোখে পড়েছিলো।
‘তবে আলাে দেখেছিলেন সেটা ঠিক মনে আছে ?
‘হ্যা, আলাে দেখেছিলুম ঠিকই।
ইন্সপেক্টর জিজ্ঞেস করলেন, আচ্ছা, আপনারা কেউ কি
কখনাে লক্ষ্য করেছেন যে গােবিন্দবাবুর ঘরের আলােটা খুব
বেশি জোরালাে ?
এ-কথার কোনাে জবাব কেউ দিতে পারলে না, কারণ :
গােবিন্দবাবুর ঘরের অভ্যন্তর সকলেরই অজ্ঞাত।
আর-একটা খবর দিলে মেসের ঠাকুর। সে বললে যে
গােবিন্দবাবু তাকে বলেছিলেন যে তাঁর ভাই কাল দেশ থেকে
আসছে, তার খাবার ব্যবস্থা যেন করা হয়।
‘কবে বলেছিলেন ?
‘কাল।
‘কখন বলেছিলেন ?
‘দুপুরে তার খাবার নিয়ে যখন যাই, তখন।•,
‘কী বলেছিলেন তােমাকে ঠিক করে বলল তাে?
ঠাকুর একটু ভেবে বললে, ‘বাবু বললেন, “ঠাকুর, কাল
সকালে আমার ভাই আসছে দেশ থেকে। তার খাবার ব্যবস্থা
কোরাে। সে আমার মতাে পেট-মােগা লােক নয়, বেশ খেতে-
সুতর মত
টেতে পারে। ওর জন্যে আলাদা করে একটু মাছ-তরকারি
রান্না কোরাে বেশ ভালাে করে বেঁধে—তােমাকে বখশিষ
একথা শুনে, সকলেই অবাক হয়ে মুখ চাওয়া-চাওয়ি
করতে লাগলাে। প্রথম নম্বর তাজ্জব কথা এই যে ভূতের
মতে, অদ্ভুত ঐ মানুষটারও পৃথিবীতে একজন ভাই আছে—
এবং তার চেয়েও যা আশ্চর্য—সেই ভাইয়ের জন্য হাড়-কঞ্জুষ
গােবিন্দ চাটুজ্যে রীতিমতাে ভােজের ফরমাস দিয়েছিলেন
এমনকি ঠাকুরকে বখশিষ পর্যন্ত দিতে প্রস্তুত ছিলেন !
পশুপতি বললেন, তাহলে বােঝা যাচ্ছে ঐ পােস্টকাডে
ভাইয়ের আসবার খবরই ছিলো।
সেইরকমই তো মনে হয়, বললেন ইন্সপেক্টর।
রণজিৎবাবু তার কথা মেনে নেয়ায় পশুপতি অত্যন্ত
উৎসাহিত হয়ে উঠে বলতে লাগলেন—এটাও মনে হয় যে
এমন কেউ আছে ঐ দু’ভাইয়ে দেখা হওয়ার সঙ্গে—অর্থাৎ
-হওয়ার সঙ্গে—যার গভীর স্বার্থ জড়িত। সে চায় না যে
গােবিন্দবাবুর সঙ্গে তার ভাইয়ের সাক্ষাৎ হােক। অতএব
তারই এই কাজ। এখন এটুকু শুধু জানতে বাকি থাকে
সেই লােকটি কে ?
‘বাঃ, বেশ বলেছেন। সমস্যাটা আপনি অনেকটা সরল
করে এনেছেন সে-কথা মানতেই হয়।
ইন্সপেক্টর ঠাকুরকে আরাে দু'একটা প্রশ্ন করলেন ।
‘গােবিন্দবাবু তােমাকে আর-কিছু বলেননি—না?
‘না, হুজুর।..
‘রাত্রে যখন তার খাবার দিতে গেলে?
অতঃসতে না। আর কোনাে কথাই বলেননি। তখন আমি তাকে দেখিওনি, দরজার বাইরে খাবার রেখে চলে এসেছিলুম। তাঁর ঘরের মধ্যে যাবার হুকুম তাে আমাদের ছিলাে না। ‘খাবারটা তিনি খেয়েছিলেন ? ‘হ। কেষ্ট খানিকপরে গিয়ে থালাটা নিয়ে এসেছিলাে। ‘আচ্ছা, রাত্রে তােমরা কোথায় শােও ? ‘একতলায় রান্নাঘরের দিকে। ‘কাল রাত্রে কোনােরকম শব্দ-টব্দ কিছু শুনেছিলে? আমাদের তাে শুতে-শুতেই একটা হয়। ‘তারপর ? ‘না, মনে তাে পড়ে না।•••া, ঘুমের মধ্যে একবার যেন কলতলায় জলের শব্দ শুনেছিলুম। পশুপতিবাবু ঠাকুরকে এক ধমক দিয়ে বললেন, কলতলায় জলের শব্দের কথা কেউ শুনতে চায় না। কোনাে চীৎকার- টীৎকার শুনেছিস ? কিন্তু বেচারা ঠাকুর তাে একতলায় কত দূরে শােয়-তার আর দোষ কী ? সমস্ত মেসে একজনও এন কথা বলতে পারলে না যে গত রাত্রে সে এমন-কোনাে শব্দ শুনেছে যা কোনাে বিপন্ন কি মরণােম্মুখ ব্যক্তির চীৎকার বলে ভুল
ভূতের
আট
পশুপতিবাবু ইন্সপেক্টরকে একটু আড়ালে ডেকে নিয়ে
বললেন, ‘ঐ আনন্দ ছােকরাকে একটু লক্ষ্য করবেন।
কেন বলুন তাে?
‘ছােকরার মতিগতি ভালাে নয়।
কীরকম শুনি?
‘বড় স্বদেশির দিকে ঝোঁক।
তা-ই নাকি?”
‘বাসরে, কী-সব গরম-গরম বক্তৃতা করে তা যদি শােনেন।
বলে কিনা, একজনের বেশি টাকা থাকবে আর-একজনের কম
থাকবে—এ নাকি দারুণ অন্যায়। যাদের অনেক আছে
তাদের টাকা'ড়ে নেয়া উচিত, এই হ’লল ওর মত। এ-সব
কথা যারা বলে তারা গুণ্ডা ছাড়া আর কী, আপনিই বলুন।
বড়ােলােক-গরিব নিয়েই তােত সংসার।
ইন্সপেক্ট বললেন, ‘হু।
‘আমার খুব সন্দেহ হয় যে এর মধ্যে ওর কোনাে হাত
আছে। দেখছেন না—আর-সবাই ঘাবড়ে গেছে, অথচ ও
দিব্যি বুক ফুলিয়ে বেড়াচ্ছে। ক্রিমিনাল না হলে এত সাহস
।
‘ও তত বাচ্চা ছেলে, ওর পক্ষে কি
৪৮.
ন
RH
—আর তাে দেরি করা চলে না-রাত যে ফুরিয়ে এলাে।
No text on this page.
;" """"
তাতে
‘আপনি পুলিশের লােক হ’য়ে কী বলছেন, সামন্তমশাই !
বাচ্চা ছেলেরাই তাে যত অঘটন ঘটায়। ওর ঘরটা অন্তত
একবার সার্চ করুন—দেখুন না, কী বেরােয়।
রণজিৎ সামন্ত বললেন, ‘বেশ, চলুন।
পর মুহূর্তে এক কাণ্ড ! সরােজ ছুটে এসে একেবারে
ইন্সপেক্টরবাবুর পায়ে লুটিয়ে পড়ে বললে, “স্যর, দয়া করে
আমাকে ছেড়ে দিন সর—আজ বড়ােবাবুর মেয়ের বিয়ে
আমি ঠিক সময়ে হাজির না-হলে ঠিক আমার চাকরি যাবে।
ইন্সপেক্টরবাৰু সরােজকে টেনে তুলে ধরে একটু
কঠোরভাবেই বললেন, ‘বিয়ে তাে রাত্রে, এখন যাবার জন্যে
এত ব্যস্ত হচ্ছেন কেন ?
‘আজ্ঞে আমি তাে নিমন্ত্রিত হয়ে যাচ্ছি নে, যাচ্ছি খাটতে।
আপিশের সব কটি কেরানিই তা-ই। আজকের দিনে যত
কাজ সব আমাদেরই করতে
করতে হবে। সবাই যাবে—আর
আমি যাবাে না, তাহলে কি আর বড়ােবাৰু আমাকে আস্ত
রাখবেন ! কোনাে • ওজর-আপত্তি শুনবেন না তিনি।
এ-বাজারে একবার চাকরি গেলে আর চাকরি হবে না, স্যর,
-খেয়ে মরবাে, উপােস করে মরবাে। আমি মিছে কথা
বলছি না, স্যর, বড়ােবাবুর বাড়িতে টেলিফোন আছে,
আপনি এক্ষুনি খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন। ফোন নম্বর
হলাে•••
কিন্তু সমােজর কথা শেষ হবার আগেই পশুপতিবাবু প্রচণ্ড
গলায় ধমকে উঠলেন, ‘চুপ করাে, সবােজ। আর-একটি কথা
বলবে তত তােমাকে একদম হাজতে পুরে রাখা হবে। ভালাে
চাও তাে চুপ করে বসে থাকোএখন কোথাও যাওয়া হবে
৪১
ভূতের তােমার। তাঁর কথার ভাবে মনে হ’লাে যেন তিনিই পুলিশের বড়ো কর্তা! তবু সরােজ আর-একবার বললে, আমাকে যেতে দিন, আমাকে কথা সে শেষ করতে পারলে না, ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদতে লাগলাে। ইন্সপেক্টরবাবু বললেন, ‘আপনি যখন এত করে বলছেন তখন আপনাকে যেতে দেবাে, কিন্তু তার আগে আপনার ঘরটি একবার সার্চ করবো। ‘আঁ! আমার ঘর! আমার ঘরে কিছু নেই, আপনার পা ছুঁয়ে বলছি, আমার ঘরে কিছু নেই। সে দেখা যাবে। এর পরে সমােজ আর কিছু বললে না, বােধ হয় কথা বলবার ক্ষমতাই তার চলে গিয়েছিলাে। হাঁটুতে মাথা গুজে মেঝের উপরেই সে বসে রইলাে, থেকে-থেকে তার শরীর কেঁপে উঠতে লাগলাে, যেন দমকে-দমকে কান্না আসছে। পশুপতিবাবু ফিসফিস করে বললেন, “আগে চলুন আনন্দর ঘরে। তারপর চেঁচিয়ে আনন্দকে ‘ওহে আনন্দ, ইন্সপেক্টর- বাবু তােমার ঘরটি একবার দেখতে চান। আনন্দ খুব সপ্রতিভভাবে বললে, বেশ তাে, বেশ তাে, আমার ঘরে আজ বড়ােলােকের পায়ের ধূলাে পড়বে—কত ভাগ্য আমার ! ওকে ঘর বললে অবশ্যি বেশি বলা হয়, কেননা সেখানে বাস করে ইদুর, আরশােলা আর আনন্দ। কথাটা মিথ্যে বলেনি আনন্দ, একতলার একটা এদো অন্ধকার কুঠুরিতে ওর বাসা। জিনিসের মধ্যে ভাঙা একটা তাপােষ, কেরােসিন কাঠের একটা টেবিল আর একটা রং-
ভূতত
-
চটা তালা-ছাড়া স্টীল-ট্রাঙ্ক। সার্চ করতে পাঁচ মিনিটও লাগলাে
না। কয়েকখানা বিজ্ঞানের পাঠ্যপুস্তক আর বাংলায় লেখা
একখানা লেলিনের জীবন-চরিত-এ-ছাড়া আর-কিছুই পাওয়া
গেলাে না।
বাংলা বইটার মলাট লাল। সেটা একটু নেড়ে-চেড়ে দেখে
পশুপতিবাবু গম্ভীর গলায় বললেন, বইটা পােস্ক্রাই
নয় তাে ?
ইন্সপেক্টরবাবু বললেন, না।•••চলুন এবার ঐ কেরানিবাবুর
ঘরটা দেখা যাক।
উপরে এসে দেখা গেলাে সরােজ তখনও মেঝের উপর
জবুথবু হয়ে বসে আছে। পশুপতিবাবু হাঁক দিলেন, “ওহে
ওঠো, একবারটি ঘরে যেতে হচ্ছে।
কলের পুতুলের মতাে সােজ উঠে দাঁড়ালাে। তার মুখে
এক ফোঁটা রক্ত নেই, ঠোট থরথর করে কাঁপছে।
পশুপতি
বললেন, ‘আপনিও
চলুন নরহরি-দা।
নরহরি বললেন, ‘অত ঘাবড়াচ্ছাে কেন, সমােজ ? তােমার
যে কিছু দোষ নেই তা তাে সবাই জানি।
সমােজ নরহরিবাবুর দিকে এমন করুণ দৃষ্টিতে তাকালে
যে বলবার নয়।
কিন্তু নরহরিবাবুও অবাক হয়ে গেলেন যখন সরােজের
ট্রাঙ্কের তলা থেকে পাঁচশাে টাকা বেরুলােকড়কড়ে পাঁচখানা
একশাে টাকার নােট।
‘এর মানে? বাঘের মতাে গর্জন করে উঠলেন পশুপতি।.
‘তুমি মাইনে পাও পঁচিশ টাকা, চালচুলাের খবর নেই, এত
টাকা তােমার হাতে কেমন করে এলাে?
তেজত
সরােজ চুপ।
পশুপতি বলতে লাগলেন, এর একটা জবাবদিহি তাে দিতে
হচ্ছে, ভায়া।
সয়ােজ জিভ দিয়ে একবার ঠোট চেটে বললে, “সত্যি কথাই
বলবাে, যদিও জানি সে-কথা আপনারা কেউ বিশ্বাস
করবেন না।
শুনি, শুনি, অবিশ্বাস্যটাই শুনি।
‘টাকাটা আমাকে গােবিন্দবাবু দিয়েছিলেন।
‘কী ? কী বললে ?
‘গগাবিন্দবাবু দিয়েছিলেন। গােবিন্দ চাটুজ্যে।
তার চেয়ে বললে না কেন আকাশের পরী ঘুমের মধ্যে
তােমার বালিশের তলায় রেখে গেছে !
“বানিয়ে বললে এমম-কিছু বলতুম যা লােকে বিশ্বাস করবে।
কিন্তু সত্যি বলছি বলেই অবিশ্বাস্য বলতে হচ্ছে। সমােজ
এতক্ষণ একেবারেই নেতিয়ে ছিলাে, কিন্তু সত্যিকার সংকটের
মুখে দাড়িয়ে তার বুদ্ধিসুদ্ধি যেন খুলে গেলাে।
নরহরিবাবু বললেন, ‘আহা—ও যে মিথ্যে বলছে তা তাে
এখনাে প্রমাণ হয়নি। হতেও তাে পারে। পৃথিবীতে কত
কী আশ্চর্য ঘটনা ঘটে যাচ্ছে, আর এই কি হতে পারবে না!
পশুপতি বললেন, ‘আপনি থামুন নরহরি-দা, ক্রাইম হাগুল
করা আপনার মতাে ভালােমানুষের কম্মাে নয়। কী ব্যাপার
খুলে বলল, সরােজ-নয়তাে কপালে দুর্ভোগ আছে।
রণজিৎ সামন্ত এগিয়ে এসে বললেন, “আচ্ছা, আচ্ছা, আমি
ওঁকে জিজ্ঞেস করছি সব কথা•••এ-টাকা আপনাকে গােবিন্দ
চাটুজ্যে দিয়েছিলেন?
‘ধার ? ‘না, আমার মত গরিবকে ধার দেবে কে? অহে তিনি দান করেছিলেন। ‘তিনি তত ভীষণ কৃপণ ছিলেন—হঠাৎ এতে দয়া কেন হ’লল তার ? ‘কেন হ’লাে তা আমি কেমন করে বলবো ? ‘আপনি তার কাছে চেয়েছিলেন? চেয়েছিলুম। অনেকদিন ধরেই চাচ্ছিলুম। ‘কেন ? ‘আমার বােনের বিয়ে দিতে হবে—সেইজন্যে। ‘তারপর কবে পেলেন টাকাটা ? ‘কাল। ‘কাল কখন ? ‘কাল সন্ধেবেলা—আপিশ থেকে ফিরে। ‘কী বলে দিলেন তিনি? ‘ব্যাপারটা এইরকম। আমরা অত্যন্ত গরিব। মা বিধবা, এক বােন আছে, তার বিয়ে দেয়া দরকার। টাকা ছাড়া বিয়ে হয় না। কোথায় পাই টাকা, সব সময় এই আমার ভাবনা। এই মেসে সকলেরই ধারণা যে গােবিন্দবাবুর অনেক টাকা। সেই ধারণারই বশবর্তী হয়ে আমি অনেকদিন ধরেইগগাবিন্দ- বাবুর কাছে কিছু সাহায্য পাবার চেষ্টা করছিলুম। আজ যেমন আপনার পায়ে ধরেছি তেমনি তাঁরও পায়ে পড়েছি । অনেকবার। অনেক কেঁদে-কেটে তার মনটা বােধ হয় একটু ভিজিয়ে এনেছিলুম। ।
মাগত
পশুপতি এখানে বাধা দিয়ে বলে উঠলেন, তাহলে তুমি
র ঘরে প্রায়ই যেতে ?
‘তার ঘরে যেতুম বললে ভুল হয়, মাঝে-মাঝে ছাতে দাড়িয়ে
তার সঙ্গে কথা কয়েছি বটে।
‘কিন্তু এ-কথা তো আগে কখনাে বললানি !
‘কথাটা কি বলবার মতাে? বােনের বিয়ের জন্য ভিক্ষের
চেষ্টা করছি এ-কথা কি পাঁচজনের কাছে বলে বেড়াবার
মতো।
ইন্সপেক্টরবাবু বললেন, ‘গােবিন্দবাবুর মন তাহলে একটু
ভিজেছিলাে ?
আমার তাে তা-ই মনে হয়েছিলাে। কিন্তু আমার ধারণা
ছিলাে তিনি বিশ-পঁচিশ কি বড় জোর পঞ্চাশ টাকা দিয়ে
ভিখিরি-বিদেয় করবেন। এদিকে দেশ থেকে মা চিঠি লিখেছেন
বোনের একটি ভালাে সম্বন্ধ উপস্থিত, কম-সে-কম শাে পাঁচেক
টাকা হ'লে শুভকার্য এ-মাসেই হয়ে যেতে পারে। তাই
মরীয়া হ'য়ে ধন্না দিচ্ছিলুম গােবিন্দবাবুর কাছে। কাল সন্ধেবেলা
আপিশ থেকে ফিরেই গেলুম তাঁর কাছে। ছাতে দাঁড়িয়ে ডাক
দিতেই তিনি ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। আমাকে দেখেই মুখ
কটমট করে বললেন, “কী চাই ?” আমি তার হাত দুটি জড়িয়ে
ধরে বললুম, “বােনের বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে, এ-যাত্রা আমাকে
উদ্ধার না করলে চলবে না!” তিনি প্রথমটায় কিছু বললেন না,
তারপর হঠাৎ অদ্ভুত একটু হেসে বললেন, “কত চাই ?” আমি ধ
করে বলে ফেললুম, “পাঁচশাে।” “একটু দাড়াও”, বলে তিনি
ঘরের ভিতর ঢুকলেন, একটু পরেই বেরিয়ে এসে আমার হাতে
কয়েকখানা নােট গুজে দিয়ে বললেন, “যাও, এখানে আর
ভূতের বাড়িয়ে থেকো না।” নিচে এসে আমি অবাক হয়ে দেখি যে তিনি পাঁচশাে টাকাই দিয়েছেন, সত্যি-সত্যি পাঁচশাে ! কথা শেষ করে সরােজ হাঁপাতে লাগলাে। ইন্সপেক্টর জিজ্ঞেস করলেন, তখন তাঁর ঘরে কি আলাে জ্বলছিলো ? ‘হ্যা, জুলছিলাে। ‘আপনি ঘরের ভিতরটা দেখতে পেয়েছিলেন ? ‘তার দরজা তাে সব সময় ভেজানাে থাকতাে। ‘কিছু দ্যাখেননি? মনে করবার চেষ্টা করুন। সমােজ একটু ভেবে বললে, তিনি যখন টাকা আনতে ভিতরে যান, তখন ঘরের ভিতরটা আমার একটুখানি চোখে পড়েছিলাে। মনে হয়েছিলাে ঘরে যেন আর-একজন মানুষ বসে আছে। কিন্তু সে নিশ্চয়ই আমার চোখের ভুল। ‘আচ্ছা, আপনি যখন টাকা চাইলেন তখন তিনি অদ্ভুত একটু হাসলেন, না ? ‘হঁ্যা, অদ্ভুত সে-হাসি। অমন হাসি তার মুখে আমি কখনাে দেখিনি। পশুপতি বলে উঠলেন, ‘মিছিমিছি ওকে জেরা করছেন, ইন্সপেক্টরবাবু, ওর সব কথাই বানানাে। ও-টাকাটা গােবিন্দ- বাবুর সেটা অসম্ভব নয়, কিন্তু তিনি ওকে তা দান করেছেন এ একেবারেই অসম্ভব। থানায় নিয়ে চলুন, কিল-গুতাে না- খেলে সত্যি কথা বােয়ােবে না। নরহরিবাবু বললেন, ‘কেন, ও যা বলছে তা হতেও পারে। আমারও মনে হয় যে গােবিন্দবাবুর বাইরেটা যতই রুক্ষ হােক, ভিতরের মানুষটা ঠিক ও-রকম ছিলাে না।
পশুপতি বললেন, দেখুন নরহরি-দা, আপনাকে আমরা সবাই ভালােবাসি, কিন্তু যা বােঝেন না তা নিয়ে কথা বলবেন দয়া করে। তাহলে ইন্সপেক্টরবাবু...’ কিন্তু তার মুখের কথা শেষ হলাে না। ঝড়ের মতাে একজন লােক ঘরের মধ্যে ঢুকে চারদিকে তাকিয়ে বলতে লাগলাে, এ কি সত্যি? যা শুনছি এ কি সত্যি?••গগাবিন্দ- বারু গােবিন্দবাবুকে কে নাকি খুন করে গেছে! শেষের কথাটি চীৎকার করে বলে লােকটি কঁপতে কাঁপতে একটা চেয়ারে বসে পড়লাে। তার চীৎকার এমন অমানুষিক যে তা শুনে সকলের গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠলাে। নয় আগন্তুক অপরিচিত। দাড়ি-গোঁফ কামানাে সুন্দর চেহারা, গায়ে সিল্কের পাঞ্জাবি আর দামি শাল, বেশ একটু বাবুগগাছেরই বেশবিন্যাস। দু তিন মিনিট কেউ যেন ভেবে পেলল না তাঁর সঙ্গে কে কথা বলবে, কী কথা বলবে। তারপর পশুপতি গেলেন এগিয়ে। জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কে? ভাঙা গলায় আগন্তুক জবাব দিলেন, আমি—আমি গােবিন্দবাবুর ভাই, আমার নাম ভুজঙ্গধর। ‘ও-আপনারই আজ আসবার কথা ছিলাে ! আপনিই পােস্টকার্ড লিখেছিলেন।
সে পােল্টকার্ড তিনি কি পেয়েছিলেন।
অতসত
পেয়েছিলেন। তারপর আজ সকালে উঠে তােত আমরা
দেখি এই কাণ্ড! কী আর করবেন, মশাই, সবই ভগবানের
হাত। পশুপতি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
একটু চুপ করে থেকে আগন্তুক বলতে লাগলেন, দশ বছর
দাদার সঙ্গে আমার দেখা হয় না, দশ বছর তিনি দেশ-ছাড়া।
আর আজ আমি তার সঙ্গে দেখা করতে যাও এলুম-হাতের
উল্টো দিক দিয়ে তিনি কপালে আঘাত করলেন, তাঁর চোখ
ছলছল করে উঠলাে।
ইন্সপেক্টরবাবু জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কি এইমাত্র এসে
পৌছলেন ?
“হাঁ, এইমাত্র।
‘সঙ্গে কোনাে জিনিস নেই ?
‘আছে বইকি। একটা বিছানা আর স্যুটকে। সে
নিচেই ফেলে এসেছি। শেয়ালদায় নেমে একটা রিকশ নিয়ে
এসেছি এখানে। কাছাকাছি এসেই দেখি চারদিকে লাল
পাগড়ি। দেখে তাে আমার চক্ষুস্থির—বুকের ভিতরটা
ঢিপঢিপ করতে লাগলাে। আমি মানুষটা একটু ভীতু গােছর,
তাছাড়া পাড়াগাঁয়ে থাকি—কোনােরকম হাঙ্গামাই ধাতে সয়
।••••••আমাকে এক গ্লাশ জল দিতে বলবেন?
পশুপতি তৎক্ষণাৎ চেঁচিয়ে বললেন, “ওরে কেষ্ট, ওরে কে
আছিস, এক গ্লাশ খাবার জল নিয়ে আয়।
জল আনা হলাে। এক চুমুক জল খেয়ে নিয়ে আগন্তুক
আবার বলতে লাগলেন, ‘রিকশ এসে দরজায় দাঁড়াতেই
শুনলুম আশে-পাশের লােক কী যেন বলাবলি করছে, তার
৫৭
তৱকতে
দয়া
মধ্যে “খুন” কথাটা স্পষ্ট শুনতে পেলুম। আমি গলা বাড়িয়ে
একজনকে জিজ্ঞেস করলুম, “কী হয়েছে, মশাই ?” সে বললে,
“গােবিন্দ চাটুজ্যে খুন হয়েছে।” সঙ্গে-সঙ্গেই আমার চোখে
দিনের আলাে নিবে গেলাে, পায়ের তলা থেকে মাটি গেলাে
স’রে। কেমন করে রাস্তায় নেমে, সিড়ি বেয়ে উপরে উঠে
এলুম তা আমি নিজেই জানিনে। দু’ একটা লাল-পাগড়ি
বােধ হয় বাধা দেবার চেষ্টা করেছিলাে, কিন্তু তখন আমার
কিছুই খেয়াল ছিলাে না। ঐ দেখুন, রিকশভাড়াটা পর্যন্ত দিতে
ভুলে গেছি। আর জিনিসগুলাে রিকশতেই রয়েছে।
করে ভাড়াটা পাঠিয়ে দেবেন, ব’লে ভুজঙ্গবাবু পকেট মােটা
মনিব্যাগ বের করে একটা চকচকে সিকি টেবিলের উপর
রাখলেন। সকলেই লক্ষ্য করলে যে ব্যাগটা এতই ভর্তি যে
টাকার চাপে যেন একেবারে ফেটে পড়ছে।
পশুপতি বললে, “আপনার জিনিসগুলােও উপরে আনতে
বলি।
কোনাে দরকার নেই। আমি পরের ট্রেনেই আবার ফিরে
যাবে। কলকাতায় যেজন্য এসেছিলাম তা তাে চুকেই
গেলাে।
ইন্সপেক্টর বললেন, ‘একটু বসুন। একটু বিশ্রাম করুন।
আপনাকে দিয়ে আমাদের একটু দরকার আছে।
‘আদেশ করুন।
‘আমি এই ব্যাপারটার তদন্তর ভার নিয়েছি। আপনার
কাছে গােবিন্দবাবুর ইতিহাস শুনতে চাই, তাতে যদি আমাদের
কোনাে সাহায্য হয়। আপনি যেটুকু জানেন সেটুকুই বলবেন।
“নিশ্চয়ই। ভুজঙ্গধর আর-এক টোক জল খেয়ে নিলেন।
ভুতৱতত
সকলে চারদিকে ঘন হয়ে দাঁড়ালাে। গােবিন্দ চাটুজ্যের
জীবনের রহস্য উদঘাটিত হবে—সকলেই শুনতে উৎসুক।
ভুজঙ্গধর বলতে লাগলেন, “আমাদের দেশ জয়নগর লাইনে
মােতিঝিল গ্রামে। আমরা দু’ভাই। দাদা আমার চেয়ে
পাঁচ বছরের বড়াে। ছেলেবেলা থেকে দাদা আমাকে খুব
ভালােবাসতেন, আমিও দাদার খুব ভক্ত ছিলুম। বাবা যখন
মারা গেলেন আমার বয়েস তখন পঁচিশ। কুসংসর্গে পড়ে,
কুলােকের পরামর্শে সম্পত্তি নিয়ে দাদার সঙ্গে ঝগড়া বাধালুম ।
দাদা অনেক বােঝালেন, অনেক সইলেন, মা-ও প্রাণপণ চেষ্টা
করলেন আমার মতি ফেরাতে। হায়, তখন যদি তাদের কথা
শুনতুম !
ভুজঙ্গবাবু দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে চুপ করলেন। ইন্সপেক্টর
জিজ্ঞেস করলেন, তারপর ?
‘এভাবে কিছুদিন কাটলাে। তারপর আমি এক ধূর্ত
উকিলের সাহায্যে নানারকম আইনের প্যাচ কষতে লাগলুম।
তখন আমার মাথার ঠিক ছিলাে না-দাদাকে যখন-তখন যা-তা
বলতুম, নানারকম অপমান করতুম। তারপর একদিন চরম
হ’লল। দাদাকে ঘাড় ধরে বাড়ির বের করে দিলুম। দাদা
সেই যে বাড়ীর বের হলেন আর ফিরলেন না। আমি একা
বিষয়-সম্পত্তি ভােগ করতে লাগলুম। দাদার শােকে মন-মরা
হয়ে মা-ও কিছুদিন পর মারা গেলেন। এদিকে আমারও মনে
শান্তি ছিলাে না। যখনি মাথা ঠাণ্ডা হ’লল, কুসংসর্গ ছাড়লুম,
অনুশােচনায় হৃদয় জ্ব'লে যেতে লাগলাে। হায় হায়, এ আমি
কী করলুম। তারপর আমার জীবন অসহ্য হয়ে উঠলাে।
মনে হ’লাে এ-পাপের প্রায়শ্চিত্ত না-করলে আমি বাঁচবাে না।
তাই আজ এসেছিলুম কলকাতায়—দাদাকে ফিরিয়ে নিয়ে
যেতে। বিষয়-সম্পত্তি থেকে এতদিনে যত টাকা তার প্রাপ্য
হয়েছে সব নিয়ে এসেছিলুম সঙ্গে—সে-টাকা তাঁকে দেবাে,
এরপর তার পায়ে ধরে ক্ষমা চেয়ে তাকে বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে
যাবে। কিন্তু পাপের প্রায়শ্চিত্ত করা আমার কপালে নেই।
ইন্সপেক্টর জিজ্ঞেস করলেন,বাড়ি ছেড়ে তিনি বেরিয়েছেন
কতদিন?
‘ত। বছর দশেক হবে।
পশুপতি বলে উঠলেন, “ঠিক দশ বছরই তিনি এই মেসে
আছেন।
ইন্সপেক্টর আবার জিজ্ঞেস করলেন, এর মধ্যে তিনি
আপনাদের খোঁজ-খবর নেননি ?
“না। তিনি বােধ হয় পণ করেছিলেন বাকি জীবন
অজ্ঞাতবাসে কাটাবেন। আমার মুখ আর দেখবেন না—সে-জন্য
তাকে দোষও দেওয়া যায় না।
‘আপনিও কোনাে খবর নেননি।
‘অনেকদিন নিইনি। তারপর মা যখন মারা গেলেন,
কলকাতায় এসে খবর নিয়ে জানলুম তিনি এই মেস-এ আছেন।
কিন্তু দেখা করবার সাহস হ’লল না—কিংবা ইচ্ছে হলাে
। একটা পােস্টকার্ড লিখে মা-র মৃত্যুসংবাদটা তাকে
জানিয়ে দিলুম।
‘সে আজ কতদিনের কথা ?
ভুজঙ্গবাবু একটু ভেবে বললেন, ‘তা সাত বছর হবে।
সে-চিঠির তিনি কোনাে জবাব দিয়েছিলেন?
‘না।
ভুতের মতাে অকুত
গেলাে। গােবিন্দ চাটুজ্যে দিল-দরিয়া মিশুক মানুষ!
‘আর-কোনাে চিঠি লিখেছিলেন এই দশ বছরে ?
না।
‘আপনি বললেন যে আপনার মা-র মৃত্যুর পর কলকাতায়
এসে খোঁজ নিয়ে জানলেন আপনার দাদা এই মেস-এ আছেন।
কার কাছে খোজ নিলেন ?
‘কেন, তাঁর বন্ধুদের কাছে।
পশুপতি বলে উঠলেন, সে কী কথা! তারও বন্ধু-বান্ধব
ছিলাে তাহলে?
‘বলেন কী! ছিলাে না। তিনি অত্যন্ত দিল-দরিয়া
মিশুক মানুষ ছিলেন যে!
এ-কথা শুনে উপস্থিত সকলের মধ্যেই খুব একটা চাঞ্চল্য
এমন অসম্ভব কথা কেউ কি ভাবতে পারে !
পশুপতি বললেন, তাহলে শেষের দিকে তিনি একেবারে
বদলে গিয়েছিলেন, বলতে হয়। আমরা তাকে দেখেছি-
অত্যন্ত কৃপণ, অতি রুক্ষ মেজাজ, কারাে সঙ্গে মেশেন না, কেমন
এক অদ্ভুত খাপছাড়া গােছের মানুষ। এই মেসে তিনি একটা
প্রবচন দাড়িয়ে গিয়েছিলেন।
আগন্তুক বললেন, ‘বুঝেছি। মনের কষ্টে ভর ও-রকম
হয়েছিলাে। আর সে-কষ্ট আমিই তাকে দিয়েছিলুম।
‘তার বন্ধুবান্ধব দু’ একজনের নাম করতে পারেন ?
জিজ্ঞেস করলেন ইন্সপেক্টর।
‘পারবাে না কেন? অমর ঘােষ, বিপিন মুখার্জি
‘কোন অমর ঘােষ? অ্যাক্টর ?
‘হ্যা, তার কথাই বলছি।
ভূতেরমঅত
‘তার সঙ্গে তাঁর বন্ধুতা হলাে কেমন করে ?
‘বাঃ, তিনিও যে অ্যাক্টর ছিলেন।
‘অ্যাক্টর ছিলেন। থিয়েটরে অভিনয় করতেন! পশুপতি-
বাবু যেন আকাশ থেকে পড়লেন।
‘পয়সা নিয়ে করতেন না, শখে করতেন। সেটাই ছিলো
তাঁর জীবনের প্রধান শখ। তার বন্ধুরা বলেন যে স্টেজে
টিকে থাকলে তিনি একজন উচুদরের অভিনেতা হতে
পারতেন।
‘তার বন্ধুরা তাকে স্টেজে ফিরিয়ে নেবার চেষ্টা করেননি ?
চেষ্টা কি আর কম করেছেন। কিন্তু আমার উপর রাগ
করে সমস্ত জীবনের উপরেই তিনি অভিমান করে ছিলেন।
শান্ধব এলে শেষটায় আর দেখাও করতেন না। অগত্যা
তাঁরা হাল ছেড়ে দিলেন। তার কাছে কেউ আর আসতে
না, তিনিও অবশ্য কোনােখানেই বেরােতেন না। ক্রমে লােকে
তার অস্তিত্বই ভুলে গেলাে।
‘তিনি বিয়ে করেছিলেন ?
‘না। বিয়ে করলে কি আর নিজের উপর এত নিষ্ঠুর
হতে পারতেন! .
হঠাৎ নরহরিবাবু বলে উঠলেন, তিনি অ্যাক্টর ছিলেন !
তাই বলল ! তাই থিয়েটরের কথা উঠলেই তাঁর যা একটু
উৎসাহ দেখা যেতাে।
‘আর তার ঘরেও কয়েকটা নাটকের বই পাওয়া গেছে তা
তাে জানেন।
নরহরি বললেন, কিন্তু আমি তাে বলতে গেলে থিয়েটরের
পােকা, গত বিশ বছর এই কলকাতা শহরের কোনাে নাটকই
অনেককে পিও।
তরত
প্রায় বাদ দিইনি। কিন্তু গােবিন্দ চাটুজ্যে নামে কোন অ্যাক্টর
তাে মনে পড়ে না।
ভুজঙ্গবাবু বললেন, ‘স্টেজে যে তার ছদ্মনাম ছিলাে। তার
মত ছিলাে যে গােবিন্দ নামটা এত সেকেলে যে স্টেজের
মােটেও উপযােগী নয়। তার স্টেজের নাম ছিলাে মণি দত্ত।
নরহরি সঙ্গে-সঙ্গে বলে উঠলেন, ‘মণি দত্ত ! তাই বলুন।
মণি দত্তের অভিনয় আমার মনে আছে বইকি! বছর পনেরাে
আগে সরস্বতী থিয়েটরে তার কর্ণের অভিনয় দেখে মুগ্ধ হয়ে
গিয়েছিলুম। হঁ্যা, হঁ্যা, ঠিক মনে পড়েছে। তারপর হঠাৎ
মণি দত্তকে আর থিয়েটরে দেখা যায় না। আমি অনেক সময়
ভেবেছি যে লােকটার কী হ’লল।
করেছি—কিন্তু কোনাে কূল-কিনারা পাইনি। কী আশ্চর্য, সেই
মণি দত্তই এই গােবিন্দ চাটুজ্যে !•••কিন্তু কিন্তু মুণি দত্ত তত?
চমৎকার সুপুরুষ ছিলেন।
‘তার মানে ? আপনি কি বলতে চান আমার দাদা দেখতে
খারাপ ছিলেন ?
‘মুখ ভরা দাড়ি গোঁফের জঙ্গল, একটা চোখ কানা, কপালে
মস্ত আঁচিল-এ-চেহারাকে ঠিক সুশ্রী বলা যায় না।
ভুজঙ্গধর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘কী যেন, পরে হয়তাে
তিনি ঐরকম দেখতে হয়েছিলেন। আমরা তাে তাকে ও-রকম
দেখিনি। হয়তাে চোখের কোনাে অসুখ করেছিলাে। দাড়ি-
গোঁফ ইচ্ছে করেই রেখেছিলেন—এ-মানুষ যে সেই মানুষ সে-
কথা নিজেও যেন ভুলে থাকতে পারেন।
এই দশ বছরের মধ্যে আপনি কি তাকে একবারও
দ্যাখেননি ?
না।”
তার এখানকার খরচ কী করে চলতে অনুমান করতে
পারেন ?
‘কী করে বলবাে! হয়তাে নিজের কিছু টাকা ছিলাে
সেটা নিয়ে এসেছিলেন, তাই দিয়েই চালাতেন।
‘খরচও তত ছিলো তার মাসে পাঁচ টাকার বেশি না,
বললেন পশুপতি।
ভুজঙ্গ বললেন, হয়তাে বাধ্য হয়েই ও-রকম চালে চলতে
ইন্সপেক্টর বললেন, ‘অথচ এখানে এই ভদ্রলােক বলছেন
যে কাল সন্ধেবেলা তিনি একে পাঁচশাে টাকা দান করেছিলেন
বােনের বিয়ে দেবার জন্য।
ভুজঙ্গধর আস্তে-আস্তে বললেন, ‘অসম্ভব নয়। তাঁর হাতে
টাকা থাকলে তিনি অমনি করেই বিলিয়ে দিতেন, ঐরকমই
তার স্বভাব ছিলাে। আপনারা তাকে যত কৃপণু বলেই জানুন,
আসল মানুষটা তিনি ছিলেন একেবারে উল্টো।
সমােজ বললে, ‘আমি হলফ করে বলছি এ-টাকা আপনার
দাদা আমাকে দান করেছিলেন। আপনি যদি ফেরৎ চান
এক্ষুনি ফেরৎ দেবাে, কিন্তু আমি যা বলছি তার এক বিন্দুও
মিথ্যে নয়।
ভুজঙ্গ বললে, “আমি তাে আপনার কথা অবিশ্বাস করছি
। আর আপনার টাকা আমি কেন ফেরৎ নেবাে? দাদাকে
অনেক ঠকিয়েছি, তিনি যদি নিজের ইচ্ছায় কাউকে কিছু দিয়ে
থাকেন সেটুকুই আমার সান্ত্বনা।
ইন্সপেক্টর বললেন, কিন্তু আপনি যা বলছেন সে-অনুসারে
s সঙ্গে সঙ্গে চঞ্চল যে কাণ্ড করলে তাতে দু’জনেই হাঁ করে ছুটে গেলেন
No text on this page.
ভুতের তাতে
ততা তার হাতে পাঁচশাে টাকা থাকবার কথা নয়। যিনি
পয়সার অভাবে অত কষ্ট করে থাকতেন, তাঁর পক্ষে অত টাকা
দান করা কি সম্ভব ?
‘অসম্ভব কেমন করে বলবাে? তার হাতে ঠিক কত
টাকা ছিলাে তা তাে আমি জানি না, হয়তাে ছিলাে কিছু
টাকা।
নরহরিবাবু ভুজঙ্গধরের মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন,
‘আশ্চর্য, আপনাদের দু’ভাইয়ের চেহারায় একটু মিল নেই। শুধু
কপালের কাছটায় একটু যেন মেলে।
পশুপতি বললেন, কিন্তু গলার স্বর একেবারে একরকম,
তাই নয় ?
ভুজঙ্গধর ক্লান্তভাবে বললেন, ‘ভাইয়ে-ভাইয়ে ও-রকম হয়।”
দশ
রণজিৎ সামন্ত বললেন, অনেক ধন্যবাদ, ভুজঙ্গবাবু। আপনি
যে-রকম সরলভাবে সমস্ত ঘটনা বললেন তা আমার সত্যি খুব
ভালাে লাগলাে। এখন চলুন আপনার দাদাকে একবার দেখে
আসবেন।
একথা শুনেই ভুজঙ্গবাবুর মুখ যেন এক অবর্ণনীয় যন্ত্রণায়
বিকৃত হয়ে উঠলল। অতি কষ্টে তিনি বললেন, “আমার
যাওয়া কি••একান্তই দরকার ?
‘চলুন একটু দেখবেন।
৯:‘চলুন। ভুজঙ্গবাবু উঠে বঁড়ালেন। তাঁকে দেখে
A
নরহরিবাবুর মনে হলাে যে দুঃখময় হতাশার এমন মূর্তি তিনি
কখনো দ্যাখেননি। ভুজঙ্গবাবুর চেহারা সত্যি ভালাে; কিন্তু তার
নিখুত করে আঁচড়ানাে চুল আর অমন পরিপাটি সাজ-সজ্জার
ভিতর দিয়েও তাকে এমন উদ্ভ্রান্ত এমন দুঃখী দেখাচ্ছিলাে যে
শুধু নরহরিবাবুর নয়, উপস্থিত অনেকেরই মৃত ব্যক্তির চাইতে
এই অনুতপ্ত দোষী ভাইটির জন্য কষ্ট হচ্ছিলাে বেশি।
ইতিমধ্যে চাকর ভুজঙ্গবাবুর বিছানা আর স্যুটকেস ঐ
ঘরেই এনে রেখেছিলাে! সেদিকে হঠাৎ চোখ পড়ে
ইন্সপেক্টরবাবু বলে উঠলেন, বাঃ, আপনার স্যুটকেসটা ভারি
নুতুন ধরনের তাে !
‘হ্যা, এটা নতুন কিনেছিলুম। আর এটাতে ভ’রে কী
এনেছিলুম, জানেন? দাদার জন্যে কাপড়-চোপড়। এই
দেখুন—বলে ভুজঙ্গঝাবু চাবি বের করে স্যুটকেস খুলে
ফেললেন। ভিতরে দেখা গেলাে পর-পর ভাঁজ করা অনেক
কাপড়-জামাদামি-দামি তাঁতের ধুতি, সিল্কের পাঞ্জাবি, গরম
জামা—সবই আনকোরা নতুন। সেগুলাের উপর আস্তে
একবার হাত বুলিয়ে ভুজঙ্গবাবু বললেন, এই ক’বছরে যত
পূজোর কাপড় ষষ্ঠির কাপড় দাদার পাওয়া উচিত ছিলাে, সব
একসঙ্গে কিনে এনেছিলুম, তাছাড়া জামাও অনেকগুলাে।
ভেবেছিলুম তিনি ক্ষমা করবেন, ফিরে আসবেন। কিন্তু...’
ভুজঙ্গবাবুর কথা শেষ হতে পারলাে না, তার গলা আটকে
এলাে, টপটপ করে কয়েক ফোঁটা চোখের জল ঝরে পড়লাে।
একটু চুপ করে থেকে রণজিৎবাবু বললেন, ‘চলুন তাহলে
একবার উপরে।
ম্যানেজরবাবু—আর
নরহরিবাবু, আপনিও আসতে পারেন।
আপনিও চলুন
ভরত
উপরে যাবার সিড়ির কাছে হঠাৎ দেখা গেলাে চঞ্চলকে।
রণজিৎবাবু বললেন, ‘চঞ্চল, এতক্ষণ কোথায় ছিলে?
‘এখানেই তাে ছিলুম।
‘তােমাকে অনেকক্ষণ দেখিনি মনে হচ্ছে।
‘না, এখানেই ছিলুম।
রণজিৎ চেঁচিয়ে বললেন, 'আপনারা এগােন, আমি আসছি।
তারপর চঞ্চলের সঙ্গে চুপি-চুপি মিনিট দুয়েক কী কথা বললেন।
তিনি যখন উপরে এলেন, চঞ্চলও এলাে তাঁর সঙ্গে।
ঘরে ঢুকে দাদার বীভৎস মৃতদেহ দেখে ভুজঙ্গবাবু
একেবারে আকুল হয়ে পড়লেন। দু’হাতে মুখ ঢেকে অঝোরে
কাঁদতে লাগলেন তিনি, তাঁর অবস্থা দেখে নরহরিবাবুরও চোখে
জল এলাে।
ইন্সপেক্টরবাবু বলতে লাগলেন, ‘অত অধীর হবেন না,
ভুজঙ্গবাবু, একটু ধৈর্য ধরুন, একটু শান্ত হবার চেষ্টা করুন।
কিন্তু ভুজঙ্গবাবু আরাে ফুলে-ফুলে ফুপিয়ে-ফুপিয়ে কাঁদতে
লাগলেন। খানিক পরে অনেক চেষ্টা করে বললেন, “আমি
এখন যাই। এ-দৃশ্য আমি আর সইতে পারিনে।
‘আর একটু অপেক্ষা করুন। অন্যরকম একটা দৃশ্য দেখে
যান’ বলে ইন্সপেক্টর চঞ্চলকে কী ইঙ্গিত করলেন। সঙ্গে-সঙ্গে
চঞ্চল যে-কাণ্ড করলাে তাতে নরহরি আর পশুপতি দু’জনেই
হাঁ-হাঁ করে ছুটে গেলেন, কিন্তু তারা কেউ বাধা দেবার আগেই
চঞ্চল মেঝের উপর হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে মৃতদেহের গাল
থেকে দাড়িগুলাে পটপট করে ছিড়ে ফেলতে লাগলাে, তারপর
ঘরের কোণ থেকে জলের বালতি, সাবান আর স্পঞ্জ নিয়ে
এসে (এগুলি সে আগেই এনে রেখেছিলাে) মৃতদেহের মুখের
অসে
উপর খুব জোরে স্পঞ্জ ঘষতে লাগলাে। উড়ে গেলাে কপালের
আঁচিল, কানা চোখ ভালাে হয়ে গেলাে, পাঁচ মিনিটের মধ্যে
দাড়ি-গোঁফ-কামানাে সুশ্রী একটি মুখ ফুটে উঠলাে, তাতে
নিষ্ঠুর মৃত্যুর চিহ্ন তখনাে স্পষ্ট, কিন্তু তাকে গােবিন্দ চাটুজ্যের
মুখ ব’লে চেনবার কোনাে উপায়ই আর নেই।
নরহরি আর পশুপতি রুদ্ধশ্বাস বিস্ময়ে এই দৃশ্য দেখলেন।
আর ভুজঙ্গ ?
তার মুখ ততক্ষণে মৃত ব্যক্তির মুখের চেয়েও বীভৎস
হয়ে উঠেছে। বড়াে-বড়াে চোখ যেন কপাল থেকে বেরিয়ে
আসতে চাইছে, ঠোট ঝুলে পড়েছে, সমস্ত শরীর থরথর ক'রে
কাপছে। একবার তিনি দরজার দিকে তাকালেন—দরজা
থেকে সিড়ি পর্যন্ত আগাগােড়া লাল পাগড়িতে ভরা। আর
একবার তাকালেন অন্যদিকে, ইন্সপেক্টর রণজিৎ সামন্তর
কঠোর দৃষ্টি তাঁর মুখের উপর পড়লাে।
ইন্সপেক্টরবাবু খুব স্পষ্ট উচ্চস্বরে বললেন, দেখুন
আপনারা, এই আমার পাশে যিনি দাঁড়িয়ে আছেন তিনি
আপনাদের চিরপরিচিত গােবিন্দ চাটুজ্যে, আর মেঝের উপর
মরে পড়ে আছে তার ভাই ভুজঙ্গধর। কাল রাত্রে গােবিন্দ
চাটুজ্যে তার ভাইকে এই ঘরে গলা টিপে মেরে ফেলেন—
গগাবিন্দবাবুর সাধ্য থাকে তাে এর প্রতিবাদ করুন।
এই কথাগুলি শুনে নরহরি আর পশুপতির শরীর যেন
পাথরের মূর্তিতে পরিণত হ’লল, আর ইন্সপেক্টরবাবু যাঁকে
গগাবিন্দবাবু বলে সম্বােধন করলেন তিনি কাঁপতে কাঁপতে
মেঝের উপর বসে পড়ে হাঁটুর মধ্যে মুখ ঢাকলেন।
গ
৬৮
সুতরগত
ইন্সপেক্টর রণজিৎ সামন্ত বলতে লাগলেন।
‘গগাবিন্দবাবু, আপনার অভিনয় অতি চমৎকার হয়েছিলাে।
ঐ ঘরে হঠাৎ এসে যখন ঢুকলেন তখন থেকে এ-ঘরে এসে
মৃতদেহ দেখে কেঁদে ওঠা পর্যন্ত সবই অতি নিখুঁত হয়েছে।
আপনি যে অতি নিপুণ অভিনেতা তা আপনি বলে না-দিলেও
আমরা বুঝতে পারতুম। আর আপনি যে কায়দা করে
আপনার ব্যাগের টাকা আর নতুন স্যুটকেসের নতুন জামা-
কাপড়গুলি আমাদের দেখিয়ে দিলেন তার জন্যেও আপনাকে
বাহবা দিই। আপনি ভেবেছিলেন যে ও-রকম করেই
সন্দেহের হাত এড়াতে পারবেন। হয়তাে পারতেন, কিন্তু
তার আগেই আমি একটা আবিষ্কার করে ফেলেছিলুম যেটা
আপনার পক্ষে মারাত্মক। প্রথম যখন আমরা এ-ঘরে আসি
তখন আমি মৃতদেহের মুখে হাত দিতেই অল্প একটু রং আমার
আঙুলে লেগে গিয়েছিলো। আমি লক্ষ্যই করিনি, এই চঞ্চলই
সেদিকে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। আপনার মেক-আপ
বাস্তবিকই প্রশংসনীয়, কিন্তু একটা জায়গায় রংটা একটু কঁচা
ছিলাে। অবশ্য আঙুলে ঐ একটু রঙের দাগ আমরা হয়তাে
গ্রাহ্য করতুম না, কিন্তু চঞ্চল কলতলায় গিয়ে দেখলাে একটা
ঘটির গায়েও একটু রং লেগে আছে। ঠাকুর বলেছিলাে,
অনেক রাত্রে সে কলতলায় জলের শব্দ শুনতে পেয়েছিলাে,
আপনি তখন এই পৈশাচিক কর্ম সেরে হাত ধুচ্ছিলেন।
তারপর আপনি ঘর ছেড়ে যাবার সময় আলাে নেবাতে ভুলে
গিয়েছিলেন, দেখা গেলাে আলােটা অত্যন্ত বেশি উজ্জ্বল।
এতটুকু ঘরে একশাে পাওয়ারের আলাে দিয়ে গােবিন্দ
চাটুজ্যের কী দরকার? আবার অত্যন্ত দামি একটি আয়নাই
স
বা কেন? বাক্সে নাটকের বই, থিয়েটর সম্বন্ধে আলাপে
উৎসাহ। এতে কী বােঝা গেলাে? এককালে গােবিন্দবাবুর
হয়তাে থিয়েটরের সঙ্গে সম্পর্ক ছিলাে। হয়তাে তিনি
অভিনেতা ছিলেন। তাহলে মেক-আপের বিদ্যে নিশ্চয়ই তার
জানা আছে ? যদিও আপনার রং-তুলি ইত্যাদি সরিয়েছিলেন,
কিন্তু আয়নাটা ছিলো, একশাে পাওয়ারের আলাে ছিলাে।
গােবিন্দবাবুর চেহারা অতি বিকট, কিন্তু সেটা তাঁর সত্যি
চেহারা তাে ? যে-রকম রহস্যময় মানুষ, হয়তাে কোনাে
কারণে অজ্ঞাতবাস করছেন, হয়তাে ও-মুখ তার মুখই নয়,
মেক-অপ-করা মুখােস। নকল দাড়ি পরে, নকল আঁচিল
বসিয়ে, নকল কানা চোখ নিয়ে আছেন। সেইজন্য ঘরের
মধ্যে কাউকে ঢুকতে দেন না, ঠাকুর-চাকরকেও না। কখনও
স্নান করেন না তাও একই কারণে। সব সময় মেক্-অপ
করে সেজে থাকা কষ্টকর, শুনতে অসম্ভব শােনায়, কিন্তু
এটাই তার অভ্যেস দাড়িয়ে গিয়েছিলাে। কেমন, তা-ই নয় ?
গগাবিন্দবাবু মুখ তুলে একবার তাকালেন, তারপর আবার
চোখ নামালেন।
‘তারপর এই খুনের ব্যাপার। আপনার ভাই আসবে
এই খবর কাল পেয়েছিলেন এবং ঠাকুরকে খাবার ব্যবস্থা
রাখতে বলেছিলেন। কিন্তু কোনাে কারণে সে কাল বিকেলেই
এসে পড়েছিলাে, মেসের কেউ তা লক্ষ্য করেনি। সরেজবাবু
যখন সন্ধেবেলা আপনার কাছে টাকা চাইতে যান, তখন ঘরে
আপনার ভাই বসে ছিলাে—কেমন, তা-ই নয়? সরােজবাবু
তাকে দেখেছিলেন, কিন্তু আপনার ঘরে অন্য লােক থাকা
এতই অসম্ভব যে তিনি সেটা চোখের ভুল মনে করে উড়িয়ে
f দিয়েছিলেন। সরােজবাবুকে পাঁচশাে টাকা আপনি কেন দিয়েছিলেন আপনিই জানেন। আবার তারই কয়েক ঘণ্টা পরে আপনার মায়ের পেটের ভাইয়ের বুকের উপর চড়ে বসে গলা টিপে তাকে হত্যা করলেন কেন তাও আপনিই বলতে পারবেন। মৃতদেহের মুখ ঠিক নিজের মুখের মতাে করে মে-অপ করলেন, তাকে পরালেন নিজের জামা-কাপড়, তারপর কলতলায় হাত ধুয়ে আস্তে-আস্তে বেরিয়ে গেলেন। তারপর নতুন জামাকাপড় জুতাে কিনলেন, চুল ছাঁটালেন, নতুন স্যুটকেসে নতুন কাপড় ভ’রে নতুন হােল্ডলে নতুন বিছানা বেঁধে গােবিন্দবাবুর ভাই ভুজঙ্গধর সেজে এসে উঠলেন এই মেসে। ভাইয়ের আজ সকালেই আসবার কথা, সুতরাং কেউ কিছু সন্দেহ করতাে না। আর যারা আপনার মে-অপ করা মূর্তি শুধু দেখেছে তাদের পক্ষে অবশ্য আপনাকে দেখে চেনা একেবারেই অসম্ভব। মৃতদেহের মেক-অপও পােষ্টমর্টেমে ধরা পড়তে না–দাড়িটা আসল না নকল তার বিচার করা পােষ্টমর্টেমের উদ্দেশ্য নয়। আপনার সব চালই ঠিক হয়েছিলাে, তবু ধরা পড়ে গেলেন। নেহাৎই দৈবক্রমে, বলতে পারেন। আমার হাতে একটুখানি রং লেগে না-গেলে এদিকে আমার কল্পনাই কখনাে যেতাে না। আর, একবার যখন ও- রকম একটা সন্দেহ হলে তখন দেখলুম পর-পর সব মিলে যাচ্ছে—আয়না, জোরালাে আলাে, নাটকের বই, আপনার পরনে নতুন জামা-কাপড়, আপনার অতি চমৎকার কথাবার্তা, নিখুত অঙ্গভঙ্গি—জানেন, আপনার কথা শুনতে-শুনতে আমার ঠিক মনে হচ্ছিলো নাটক দেখছি। অনেকদিন স্টেজে নামেন বটে, কিন্তু আপনার শক্তি লােপ পায়নি, আজ যা অভিনয় ৭১ ভরসত করলেন আমি তাে তা ভুলতে পারবাে না। গােবিন্দবাবুর ভাই বলে যিনি পরিচয় দিচ্ছেন তাঁর যে কপালের কাছটায় গােবিন্দ- বাবুর সঙ্গে মিলবে আর গলার স্বর একেবারেই একরকম হবে তাতে অবাক হবার কিছু নেই, কিন্তু এও ভাবতে হ’লল যে গােবিন্দবাবুর মুখ তাে কপাল বাদ দিয়ে দাড়িগোঁফেই ঢাকা, অন্য কোথাও মিললেই বা বােঝা যাবে কেমন করে ? ‘আমার যা বলবার তা তাে বললুম। এখন আপনি বলুন, গােবিন্দবাবু, কেন এই নৃশংস কাণ্ড করতে গেলেন। এগার গগাবিন্দ চাটুজ্যের জবানবন্দি । ‘হাতকড়া? না, দরকার নেই। আমি পালাবে না। আমি ফাসি যাবে। বাঁচবার চেষ্টা করেছিলুম। তা যখন ব্যর্থ হলাে তখন আমার আর বাঁচবার ইচ্ছে নেই। এখন মরলেই বাঁচি। ‘ভুজঙ্গধর সেজে আপনাদের যা বলেছিলাম তার অনেক কথাই সত্যি। আমাদের গ্রামের নাম ঠিকই মােতিঝিল। সত্যি আমরা দু’ ভাই। ভুজঙ্গ ছােটো। বাবা মারা গেলেন অনেক টাকা রেখে। সে-টাকায় আমাদের দু’ভায়েরই সমান অংশ। কিন্তু আমার মাথায় দুবুদ্ধি চাপলাে, আমি ওকে ঠকিয়ে সব টাকা মেরে দিলুম। কেমন করে ঠকালুম সে-সব না-ই বা শুনলেন। ‘ভুজঙ্গ ছিলে মিনিমুখাে ভালােমানুষ। আমাকে কিছু १२ তরতা বললে না, অভিমান করে চলে গেল আসামে চায়ের বাগানে চাকরি নিয়ে। মা-ও আমার উপর রাগ করে গেলেন ওর সঙ্গে। একা বাড়িতে বসে বসে আমার মন ভারি খারাপ হয়ে গেলাে। ভাবলুম, এ কী করলুম! সুখের সংসার ছার- খার করে দিলুম ! ‘ভুজঙ্গকে চিঠি লিখলুম ফিরে আসতে। সে জবাব দিলে । মা-কে লিখলুম, তিনিও নীরব। তখন নিজের উপর ধিক্কার এলো, তীব্র অনুশােচনায় হৃদয় জ্বলতে লাগলো। কলকাতায় এসে কুসংসর্গে পড়ে অনেক টাকা ওড়ালুম। কিন্তু মন কিছুতেই শান্ত হয় না। ‘হা—আমার থিয়েটরে শখ ছিলাে, এককালে ছিলুম নাম- জাদা অভিনেতা। তাছাড়া মেক-আপে আমার হাত খুব ভালাে ছিলাে। টিকে থাকলে লন চ্যানির জুড়ি হতে পারতুম। আর- একটা শখ আমার ছিলাে—তাসের ব্রিজখেলা। একবার সমস্ত কলকাতার চাম্পিয়ন হয়েছিলুম, আমার জুড়ি ছিলাে অ্যাক্টর অমর ঘােষ। ‘সে-সব দিন আমার কী সুখেই কেটেছে। কিন্তু ভাইকে ঘরছাড়া করবার পর থেকে আমার মনে আর সুখ ছিলাে না। কোনাে ভালাে কাজে মন দিতে পারিনে—নিতান্ত বাজে খেয়ালে পয়সা ওড়াই। এ ভাবে যখন প্রায় অর্ধেক টাকা উড়িয়ে দিয়েছি তখন মনে হলাে আর না! আর যা আছে রেখে দেবাে ভুজঙ্গের জন্য; যদি কোনােদিন ও আমাকে ক্ষমা করে, যদি কোনােদিন ফিরে আসে তাহলে ওর হাতে তুলে দেবাে। ‘পাপ করেছিলুম, এবার শুরু হলে তার প্রায়শ্চিত্ত। উঃ, ৭৩ word aan কঠোর কৃচ্ছসাধন! মেক-আপ করে মুখটা যথাসম্ভব কুৎসিত করে উঠলুম এসে এই মেসের চারতলার চিলকোঠায়। আমার সুন্দর মুখ আমাকে যেন সব সময় ব্যঙ্গ করতে—যার অন্তর অত নােংরা, তার মুখ সুন্দর হওয়া কি উচিত? আমার বাইরের চেহারা আমার ভিতরের চেহারার মতােই ভয়াবহ হবে এই ছিলাে আমার পণ। আয়নায় নিজের বিকট মূর্তি দেখে খানিকটা যেন ভালাে লাগতাে। যতদিন প্রায়শ্চিত্ত সম্পূর্ণ না হয়, এই আমার ছদ্মবেশ। এর জন্য কী কষ্টই না আমি করেছি। দশ বছরের মধ্যে একটা দিন ভালাে করে নাইতে পারিনি। কারাে সঙ্গে মিশতে পারিনি, কথা বলতে পারিনি, আমার অভিশপ্ত শুষ্ক জীবন নিয়ে একা পড়ে রয়েছি ঐ চার- তলায়। বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে সম্পর্ক চুকলাে, জগতের সঙ্গে সম্পর্ক চুকলো। বেঁচে ম'রে থাকা কাকে বলে তা বেশ ভালো করেই বুঝলুম। ‘আমি,গােবিন্দ চাটুজ্যে, অ্যাক্টর মণি দত্ত, একদা যে দু’হাতে টাকা উড়িয়েছি, আমি অকস্মাৎ ঘােরতর কৃপণ হয়ে উঠলুম। মনে হতাে একটা পয়সা বাঁচলে ভুজঙ্গর একটা পয়সা বাড়লাে। গল্প নয়—সত্যি আমার মাসিক খরচ পাঁচ টাকার বেশি ছিলাে । টাকাগুলাে সব নিজের কাছেই রাখতুম—ব্যাঙ্কে রাখতুম , হঠাৎ মরে গেলে ভুজঙ্গ হয়তাে সে-টাকা আর খুঁজে পাবে । তাছাড়া কোনােদিন নিজে ওর হাতে সব টাকা তুলে দেবাে এও আমার একটা ইচ্ছে ছিলাে। ‘একদিন ভুজঙ্গর একটা পােস্টকার্ড এলােমা মারা গেছেন। সুদ্ধ এই খবরটি—আর কিছু না। এই মেসের ঠিকানা আমিই অবশ্য ওকে জানিয়েছিলুম। ৭৪
র
বুঝলুম মা আমাকে ক্ষমা না-করেই চলে গেলেন। ভাইও
পাষাণ। ক্রমে আমার অন্তর-মন সবই যেন বদলে যেতে
লাগলাে। আমি অত্যন্ত নিষ্ঠুর রুক্ষ প্রকৃতির হয়ে উঠলুম
হবােই না বা কেন? এই পৃথিবীর আমি কে, এই জীবনের
সঙ্গে কোনােখানে আমার একটা বন্ধন নেই। আত্মহত্যা
করতে পারতুম—তা যে করিনি সুদ্ধ এই আশায় যে হয়তাে
কোনােদিন আবার ভুজঙ্গর সঙ্গে দেখা হবে, হয়তাে শেষ পর্যন্ত
সে আমাকে ক্ষমা করতে পারবে।
‘কিছুদিন আগে অত্যন্ত অনুনয় করে তাকে একখানা চিঠি
লিখেছিলুম একবার আসতে। কাল সকালে হঠাৎ পােষ্টকার্ড
পেলুম সে সত্যি-সত্যি আসছে। মন আনন্দে নেচে উঠলাে।
এতদিনের অভিমান তাহলে ভাঙলাে। কালকের দিনটা যে
কী-রকম একটা অধীর আগ্রহে কাটিয়েছি তা কাউকে
পারবাে না।
‘আজ সকালে আসবার কথা, হঠাৎ কাল সন্ধার একটু
আগেই সে এসে হাজির। মুগ্ধচোখে তার দিকে রইলুম চেয়ে।
সে আমাকে দেখে বললে, “দাদা, তুমি ও-রকম চেহারা করেছে
কেন?” আমি বললুম, “তাের জন্যে”।
‘একটু পরেই সরােজবাবু গেলেন আমার কাছে টাকা
দিয়ে দিলুম তাঁকে পাঁচশাে টাকা। মনে-মনে
বললুম, “ওরে গােবিন্দ, আজ থেকেই তাের নবজীবন শুরু
হােক। কাল থেকে তাে তুই মুক্ত। কাল থেকে তুই আবার
মানুষ, আবার জীবন্ত!” সমস্ত পাপের বােঝ এবার নামিয়ে
দেবাে। ভুজঙ্গকে সব টাকা গছিয়ে দিয়ে আমি আমার পথ
ধ’রবাে। যে-পথ মুক্তির, যে-পথ আনন্দের।
কে বােঝাতে
চাইতে।
ভssi ‘ভুজঙ্গ অনেক ভালাে-ভালাে খাবার নিয়ে এসেছিলাে। ও তা-ই খেলাে। আমি মেসের খাবারই খেলুম। অনেকদিন ভালাে খেয়ে অভ্যেস নেই, হয়তাে হঠাৎ সইবে না, এই মনে করে ভুজঙ্গর অনেক পিড়াপিড়িসত্ত্বেও ও যা এনেছিলাে তার কিছুই খেলুম না। খাওয়ার পর আলাে নিবিয়ে ওকে আমার প্রাণের সব কথা খুলে বললুম। ও বললে, “দাদা, কালই আমি চলে যাবে, তুমিও যাবে তাে আমার সঙ্গে ?” আমি বললুম, “পাগল! আমি কাল থেকে মুক্ত। আর আমি তােদের জড়াবাে না, তােরাও আমাকে আর জড়াসন্।ে” তবু সে বার- বার বলতে লাগলাে, “না, দাদা, তােমাকেও যেতে হবে। তুমি আমার কাছেই থাকবে *এখন থেকে।” আমি হেসে বললুম -কতকাল পরে যে একটু হাসলুম !—“আচ্ছা আচ্ছা, সে - হবে।” ‘ঐ ছােট্ট ঘরে মেঝেতে বিছানা পেতে দু’জনে পাশাপাশি ঘুমিয়ে পড়লুম। ও বিছানা আনেনি, আমার বিছানা ওকে দিলুম, আমি পড়ে রইলুম মাদুরে। অনেক রাত্রে হঠাৎ ঘুম ভেঙে শুনি ভুজঙ্গ অঘোের ঘুমে গভীর নিঃশ্বাস ফেলছে। মনে বলতে লাগলুম—কাল থেকে আমার নতুন জন্ম, কাল থেকে আমার নতুন জন্ম! আহা, যদি একেবারে নতুন হতে পারতুম, একেবারে নতুন হয়ে জন্মাতে পারতুম ! এমন যদি হতাে যে গােবিন্দ চাটুজ্যে বলে কেউ আর রইলাে না, অথচ আমি রইলুম, তাহলে কী চমৎকারই হ’তাে। ঐ তত ভুজঙ্গ কেমন অঘােরে ঘুমুচ্ছে। আমি যদি ভুজঙ্গ হতে পারতুম—যে কখনাে কোনাে অন্যায় করেনি, যার মনে কোনাে পাপ নেই! তা কি সম্ভব হয় না? কোনােরকমেই সম্ভব হয় না?
তরতে
কথাটা ভাবতে-ভাবতে আমার মাথা গরম হয়ে গেলাে,
আমি মাদুরের উপর উঠে বসলুম। তারপর হঠাৎ আমার
মাথায় এই বুদ্ধি এলাে। এর চেয়ে সহজ কিছুই নয়। মা মারা
গেছেন, ভুজঙ্গ বিয়েও করেনি, আমাদের নিকট কোনাে
আত্মীয়ও আর নেই—কে জানবে যে আমি ভুজঙ্গ নই! কে
জানবে ? কেউ না। এ আমার এক রকম আত্মহত্যা—অদ্ভুত
আত্মহত্যা বলতে পারেন। গােবিন্দ চাটুজ্যেকে আমি হত্যা
করবাে, তার নাম মুছে দেবব জগৎ থেকে—কাল থেকে আমি,
ভুজঙ্গধর চাটুজ্যে, নির্মম নিস্পাপ মুক্ত জীবনের অধিকারী হবে।
আনন্দে, উত্তেজনায়, নিষ্ঠুর সংকল্পে আমার সমস্ত শরীর কাঁপতে
লাগলাে।
‘তবু আমি অনেকক্ষণ ঘুমন্ত ভুজঙ্গর পাশে চুপ করে বসে
রইলুম। হঠাৎ ঢং-ঢং করে কোথায় তিনটে বাজলাে, সেই
শব্দে চমকে উঠলুম। না—আর তাে দেরি করা চলে না—রাত
যে ফুরিয়ে এলাে। তখন আমি আস্তে-আস্তে উঠে ভুজঙ্গর
বুকের উপর চেপে বসলুম। ঘুমের মধ্যে সে গোঁ-গোঁ করে
উঠলাে। তারপর দু’হাতে তার গলা টিপে ধরলুম শক্ত করে।
আমার গায়ে যত শক্তি আছে সব নেমে এসে ভর করলাে
আমার দশটি আঙুলে। বড়াে-বড়াে বিকট চোখ মেলে সে
তাকালাে-সে কি ঐ অন্ধকারেও আমাকে চিনতে পেরেছিলাে?
পেরেছিলাে নিশ্চয়ই। তখন তার মুখে যন্ত্রণায় আতঙ্কে ঘৃণায়
অভিযােগে মেশা যে ভীষণ ভাব ফুটে উঠেছিলাে তা আমি
নরকে গিয়েও ভুলবাে না।
‘অনেকক্ষণ সে গোঁ-গোঁ করলাে, ধ্বস্তাধ্বস্তি করার চেষ্টা
করলাে, কিন্তু আমার দশটি আঙুলের একটিও মুহূর্তের জন্য
৭।
৩ ।
শিথিল হলাে না। তারপর আস্তে-আস্তে তার ছটফটানি
কমে এলাে—খানিক পরে হঠাৎ একটা গভীর ভীষণ দীর্ঘশ্বাস
পড়লাে--তারপর চুপ।
তখন আমি উঠে আলাে জ্বালালুম। এতদিন নিজের মুখ
যা দিয়ে কুৎসিত করে রেখেছি, সেই সব দিয়ে সাজালুম ওর
মুখ সেই দাড়ি, সেই আঁচিল, সেই কানা চোখ, সেই
লম্বা-লম্বা আলুথালু চুল। কাজটি শেষ করতে পুরাে একটি
ঘণ্টা লাগলাে। নিপুণ শিল্পীর হাতে আঁকা হ’লল ওর মুখ—
গােবিন্দ চাটুজ্যের । মুখ—কোনােখানে খুঁত নেই। তারপর
আমার এই ঘেঁটো ধুতি আর খাটো পাঞ্জাবি ওকে পরালুম
আমি পরলুম ওর জামা-কাপড়।
‘মৃত গােবিন্দ চাটুজে পড়ে রইলাে ঘরে, জীবন্ত ভুজঙ্গধর
মির্গ নেয়ে এসে কলকলায় হাত-মুখ ধুলাে, তারপর রাস্তায়।
ওকে রেখে এলুম মেঝেতে শুইয়ে যেতদূর সম্ভব বীভৎস
ভঙ্গিতে, বিছানাটা এক কোণে গুটিয়ে রাখলুম, তার মধ্যে
রইলাে আমার এতদিনের অদ্ভুত প্রসাধনের সঙ্গী দামি
আয়নাটি। মুখের উপর ছবি আঁকার কাজ রাত্তিরেই করতে
হতাে, তাই আলােটা ছিলাে খুব জোরালাে—সেটা নেবাতে
ভুলে গিয়েছিলুম, এখন মনে পড়ছে।
আজ থেকে আমি ভুজঙ্গ, আজ থেকে আমি ভুজঙ্গ। কী
আরাম, কী শান্তি।
‘আমার রং তুলির পুটলিটা হাতে করে নিয়ে বেরিয়েছিলুম,
খানিকটা এসে সেটা ফেলে দিলুম একটা ডাস্টবিনে। বলতে
ভুলেছি—টাকা-পয়সা সব সঙ্গে নিয়েই বেরিয়েছিলুম। ও-টাকা
ততা ভুজঙ্গর, আমিই তাে ভুজঙ্গ। রাস্তায় ঘােরাঘুরি করে রাত
।
৭৮
তে
কাটিয়ে দিলুম। ভাের হ’লল, লােকজনের চলাচল শুরু হলাে।
কাছাকাছি একটা ভালাে হােটেলে গিয়ে উঠলুম। ডিম-রুটি
দিয়ে চা খেলুম ভদ্রলােকের মতাে। কতদিন পরে মানুষের
মতাে খাওয়া জুটলাে। তারপর বেরিয়ে রাশি-রাশি জামা-
কাপড়, গরম জামা, শাল, বিছানা, বালিশ, হােন্ডল, স্যুটকেস
সব কিনলুম। আর তাে আমি হাড়কিপটে গােবিন্দ চাটুজ্যে
নই, আমি ভুজঙ্গধর, আমি মানুষ, এখন থেকে মানুষের মতাে
বাঁচবাে। নাপিতের দোকানে গিয়ে চুল ছাঁটালুম, দাড়ি
কামালুম। হােটেলে ফিরে এসে গরম জলে ভালাে করে স্নান
করলুম-দশ বছর পরে এই আমার প্রথম স্নান। জলের স্পর্শে
সমস্ত শরীর যেন জুড়িয়ে গেলাে। আহাযে-কোনাে অর্জন
যে-সব সুখ থেকে বঞ্চিত নয়, আমি তা থেকে এতদিন বঞ্চিত
ছিলুম কোন প্রাণে ! কিন্তু আর না—আর মা-গােবিন্দ
চাটুজ্যে মরে গেছে আমি ভুজঙ্গধর, আজ থেকে আমার
মানুষের মতাে জীবন যাপন। জিনিসপত্র নিয়ে একটা রিকশ
করে গেলুম শেয়ালদা স্টেশনে, সেখান থেকে আর একটা
রিকশ নিয়ে এই মেস-এ।
‘এখানে আবার না এলেই হতাে, স্টেশনে গিয়ে রেলগাড়ি
ধরে যে-কোনাে জায়গায় চলে গেলেই হতাে। কিন্তু এলুম
কেন জানেন? আমি যে গােবিন্দ চাটুজ্যে নই, আমি যে
ভুজঙ্গধর, সেটা নিজের কাছে এবং সকলের কাছে প্রমাণ
করবার জন্যে। আজ সকালে এই মেসে ভুজঙ্গর আসবার
কথা। সে এলাে। সুন্দর চেহারা তার, চমৎকার ভদ্রলােক
সে, পরিপাটি ফিটফাট তার সাজসজ্জা। তারপর তাে আপনারা
জানেন।
ভুতেরমতে
‘ইন্সপেক্টরবাবু, আপনার কাছে আমার এই অনুরােধ
আপনারা আমাকে দয়া করে দ্বীপান্তরে পাঠাবেন না। আর
বিচারের ব্যাপারটা যথাসম্ভব সংক্ষেপে করবেন। যদি আজই
ফাঁসিকাঠে ঝুলতে পারতুম, তাহলে খুশি হতুম। বাঁচবার
শেষ চেষ্টা করলুম, তা ব্যর্থ হ’লল, এখন আর আমার বাঁচবার
ইচ্ছে নেই। এখন আমি মরলেই বাঁচি।•••আচ্ছা ইন্সপেক্টর
বাবু, ফাঁসিতে খুব কি লাগে ?
coot
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.