Makardah Saraswat Library, Howrah
Kuhu O Keka Ed. 5th
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
কুহু ও কেকা
সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত
বিখ্যাত সাহিত্যিক চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় এম-এ বিরচিত
কবির সংক্ষিপ্ত পরিচয় ও কাব্যাংশের
টীকা-টিপ্পনি সম্বলিত।
প্রকাশক :
শ্ৰীঅজিত শ্রীমানী
কলিকাতা।
পঞ্চম সংস্করণ
পরিমার্জিত ও সংশােধিত
বৈশাখ-১৩৪৮ সাল
দাম : আড়াই টাকা
কুহু ও কেকা
প্রথম সংস্করণ-ভাদ্র, ১৩১৯ সাল। (ইং ১৯১২)
দ্বিতীয় সংস্করণ-বৈশাখ, ১৩২৯ সাল। (ইং ১৯২২)
তৃতীয় সংস্করণ-কার্তিক, ১৩৩১ সাল। (ইং ১৯২৪)
চতুর্থ সংস্করণ—অগ্রহায়ণ, ১৩৪২ সাল। (ইং ১৯৩৫)
পঞ্চম সংস্করণ-বৈশাখ, ১৩৪৮ সাল। ( ইং ১৯৪১)
অজিত শ্রীমানী কর্তৃক প্রকাশিত এবং নিউ মহামায়া প্রেস ৫৭ নং কলেজ স্ট্রীট,
কলিকাতা হইতে গৌরচন্দ্র পাল কর্তৃক মুদ্রিত।
বর্ষার নবীন মেঘ এল ধরণীর পূৰ্ব্বদ্বারে,
বাজাইল বজ্ৰভেরী। হে কবি, দিবে না সাড়া তারে
তােমার নবীন ছন্দে ? আজিকার কাজরী গাথায়
বুলনের দোলা লাগে ডালে ডালে পাতায় পাতায় ;
বর্ষে বর্ষে এ দোলায় দিত তাল তােমার যে-বাণী
বিদ্যুৎ-নাচন গানে, সে আজি ললাটে কর হানি’
বিধবার বেশে কেন নিঃশব্দে লুটায় ধূলি-'পরে ?
আশ্বিনে উৎসব-সাজে শরৎ সুন্দর শুভ্র করে
শেফালির সাজি নিয়ে দেখা দিবে তােমার অঙ্গনে ;
প্রতি বর্ষে দিত সে-যে শুক্লরাতে জ্যোৎস্নার চন্দনে
ভালে তব বরণের টীকা ; কবি, আজ হতে সে কি
বারে বারে আসি’ তব শূন্যকক্ষে, তােমারে না দেখি
উদ্দেশে ঝরায়ে যাবে শিশির-সিঞ্চিত পুষ্পগুলি
নীরব-সঙ্গীত তব দ্বারে ?
জানি তুমি প্রাণ খুলি’
এ সুন্দরী ধরণীরে ভালবেসেছিলে। তাই তারে
সাজায়েছ দিনে দিনে নিত্য নব সঙ্গীতের হারে।
অন্যায় অসত্য যত, যত কিছু অত্যাচার পাপ
কুটিল কুৎসিত কুর, তার পরে তব অভিশাপ
বর্ষিয়াছ ক্ষিপ্রবেগে অর্জুনের অগ্নিবাণ সম,
তুমি সত্যবীর, তুমি সুকঠোর, নির্মল, নির্মম,
করুণ, কোমল। তুমি বঙ্গ-ভারতীর তন্ত্রী-'পরে
একটি অপূৰ্ব তন্ত্র এসেছিলে পরাবার তরে।
সে-তন্ত্র হয়েছে বাঁধা ; আজ হতে বাণীর উৎসবে
তােমার আপন সুর কখনাে ধ্বনিবে মরবে,
;
;
কখনাে মঙুল গুঞ্জরণে। বঙ্গের অনতলে
বর্ষা-বসন্তের নৃত্যে বর্ষে বর্ষে উল্লাস উথলে ;
সেথা তুমি একে গেলে বর্ণে বর্ণে বিচিত্র রেখায়
আলিম্পন ; কোকিলের কুহুরবে, শিখীর কেকায়
দিয়েছ সঙ্গীত তব ; কাননের পল্লবে কুসুমে
রেখে গেছ আনন্দের হিল্লোল তােমার।
বঙ্গভূমে
যে-তরুণ যাত্রীদল রুদ্ধদ্বার-রাত্রি অবসানে
নিঃশঙ্কে বাহির হবে নব জীবনের অভিযানে
নব নব সঙ্কটের পথে পথে, তাহাদের লাগি
অন্ধকার নিশীথিনী তুমি, কবি, কাটাইলে জাগি
জয়মাল্য বিরচিয়া, রেখে গেলে গানের পাথেয়
বহ্নিতেজে পূর্ণ করি’; অনাগত যুগের সাথেও
ছন্দে ছন্দে নানাসূত্রে বেঁধে গেলে বন্ধুত্বের ডাের,
গ্রন্থি দিলে চিন্ময় বন্ধনে, হে তরুণ বন্ধু মাের,
সত্যের পূজারি।
আজো যারা জন্মে নাই তব দেশে,
দেখে নাই যাহারা তােমারে, তুমি তাদের উদ্দেশে
দেখার অতীত রূপে আপনারে করে গেলে দান
দূরকালে। তাহাদের কাছে তুমি নিত্য-গাওয়া গান
মূৰ্ত্তিহীন। কিন্তু যারা পেয়েছিল প্রত্যক্ষ তােমায়
অনুক্ষণ তার যা হারাল তার সন্ধান কোথায়,
কোথায় সান্ত্বনা ? বন্ধু-মিলনের দিনে বারম্বার
উৎসব-রসের পাত্র পূর্ণ তুমি করেছ আমার
প্রাণে তব, গানে তব, প্রেমে তব, সৌজন্যে, শ্রদ্ধায়,
আনন্দের দানেও গ্রহণে। সখা আজ হতে, হায়,
জানি মনে, ক্ষণে ক্ষণে চমকি’ উঠিবে মাের হিয়া
তুমি আসসা নাই বলে, অকস্মাৎ রহিয়া রহিয়া
]
করুণ স্মৃতির ছায়া ম্লান করি’ দিবে সভাতলে
আলাপ আলােক হাস্য প্রচ্ছন্ন গভীর অশ্রুজলে।
আজিকে একেলা বসি’ শশাকের প্রদোষ-অন্ধকারে,
মৃত্যুতরঙ্গিণীধারা-মুখরিত ভাঙনের ধারে
তােমারে শুধাই,আজি বাধা কি গাে ঘুচিল চোখের,
সুন্দর কি ধরা দিল অনিন্দিত নন্দন-লােকের
আলােকে সম্মুখে তব, উদয়-শৈলের তলে আজি
নবসূর্য-বন্দনায় কোথায় ভরিলে তব সাজি
নব ছন্দে, নূতন আনন্দগানে ? সে-গানের সুর
লাগিছে আমার কানে অসাথে মিলিত মধুর
প্রভাত-আলােকে আজি ; আছে তাহে সমাপ্তির ব্যথা,
আছে তাহে নবতন আরম্ভের মঙ্গল-বারতা ;
আছে তাহে ভৈরবীতে বিদায়ের বিষন্ন মূচ্ছনা,
আছে ভৈরবের সুরে মিলনের আসন্ন অনা।
যে-খেয়ার কর্ণধার তােমারে নিয়েছে সিন্ধুপারে
আষাঢ়ের সজল ছায়ায়, তার সাথে বারে বারে
হয়েছে আমার চেনা ; কতবার ভারি সারি-গানে
নিশান্তের নিদ্রা ভেঙে ব্যথায় বেজেছে মাের প্রাণে
অজানা পথের ডাক, সূৰ্যাস্তপারের স্বর্ণরেখা
ইঙ্গিত করেছে মােরে। পুনঃ আজ তার সাথে দেখা
মেঘে-ভরা বৃষ্টিঝরা দিনে। সেই মােরে দিল আনি’
ঝরে-পড়া কদম্বের কেশর-সুগন্ধি লিপিখানি
তব শেষ-বিদায়ের। নিয়ে যাব ইহার উত্তর
নিজ হাতে কবে আমি, ওই খেয়া-'পরে করি’ ভর,
জানি সে কোন্ শান্ত শিউলি-ঝরার শুক্লরাতে,
দক্ষিণের দোলা-লাগা পাখী-জাগা বসন্ত-প্রভাতে
[ ৪ ]
••
নব মল্লিকার কোন্ আমন্ত্রণ-দিনে; শ্রাবণের
ঝিল্লিমন্দ্র-সঘন সন্ধ্যায় ; মুখরিত প্লাবনের
অশান্ত নিশীথ রাত্রে'; হেমন্তের দিনান্ত বেলায়
কুহেলি-গুণ্ঠনতলে ?
ধরণীতে প্রাণের খেলায়
সংসারের যাত্রাপথে এসেছি তােমার বহু আগে,
সুখে দুঃখে চলেছি আপন মনে ; তুমি অনুরাগে
এসেছিলে আমার পশ্চাতে, বাঁশিখানি লয়ে হাতে
মুক্ত মনে, দীপ্ত তেজে, ভারতীর বরমাল্য সাথে।
আজ তুমি গেলে আগে ; ধরিত্রীর রাত্রি আর দিন
তােমা হতে গেল খসি, সৰ্ব্ব আবরণ করি লীন
চিরন্তন হােলে তুমি, মৰ্ত্ত কবি, মুহূর্তের মাঝে।
গেলে সেই বিশ্বচিত্তলােকে, যেথা সুগম্ভীর বাজে
অনন্তের বীণা, যার শব্দ-হীন সঙ্গীত-ধারায়
ছুটেছে রূপের বন্যা গ্রহে সূৰ্যে তারায় তারায় ।
সেথা তুমি অগ্রজ আমার ; যদি কভু দেখা হয়,
পাব তবে সেথা তব কোন্ অপরূপ পরিচয়
কোন্ ছন্দে, কোন্ রূপে? যেমনি অপূর্ব হাে নাকো,
তবু আশা করি যেন মনের একটি কোণে রাখাে
ধরণীর ধুলির স্মরণ, লাজে ভয়ে দুঃখে সুখে
বিজড়িত,আশা করি, মর্ত্যজন্মে ছিল তব মুখে
যে-বিনম্র স্নিগ্ধ হাস্য, যে-স্বচ্ছ সতেজ সরলতা,
সহজ সত্যের প্রভা, বিরল সংযত শান্ত কথা,
.তাই দিয়ে আবার পাই যেন তব অভ্যর্থনা
অমর্ত্যলােকের দ্বারে,-ব্যর্থ নাহি হােক্ এ কামনা।
(আষাঢ়, ১৩২৯)
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
প্রকাশকের নিবেদন কুহু ও কেক কবি সত্যেন্দ্রনাথের একখানি শ্রেষ্ঠ কাব্যগ্রন্থ। প্রবাসীপত্রের সংগৃহীত ভােট অনুসারে ইহা বঙ্গভাষার একশত শ্রেষ্ঠ- গ্রন্থের অন্যতম। এই গ্রন্থখানি প্রথম প্রকাশিত হইবার পর ইহার সরস ও ঐশ্বর্যশালী কাব্য-সমৃদ্ধি তৎকালীন পাঠকসমাজকে মুগ্ধ করিয়াছিল। রবীন্দ্রনাথের কাব্য-প্রতিভা যখন অতি প্রবলভাবে সক্রিয় তখন সত্যেন্দ্রনাথের উদয় এবং প্রকাশ। শুধু তাহাই নহে, সত্যেন্দ্রনাথ ছিলেন রবীন্দ্রকাব্যের একজন বিমুগ্ধ অনুরাগী ; এই অনুরাগ লালিত হইয়াছিল রবীন্দ্রনাথের সহিত ঘনিষ্ঠ এবং অন্তরঙ্গ পরিচয়ের দ্বারা। তথাপি সত্যেন্দ্রনাথ স্বীয় কবি-প্রতিভার স্বকীয়তাবলে রবীন্দ্রনাথের দুরতিক্ৰম আকর্ষণী-শক্তিকে একটি সুস্পষ্ট সীমান্তরেখার বাহিরে রাখিতে সক্ষম হইয়াছিলেন ; এবং সেইকারণে বাঙলাদেশের কাব্য-সাহিত্যে তাহার কাব্যের একটি স্বতন্ত্র ও বিশিষ্ট স্থান আছে। কবি সত্যেন্দ্রনাথের অভিন্নহৃদয় বাল্যবন্ধু সুবিখ্যাত সাহিত্যিক চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় এম-এ মহাশয় আমার ঐকান্তিক অনুরােধে বহু পরিশ্রম ও যত্নপূর্বক এই গ্রন্থের কাব্যগুলির টাকা-টিপ্পনী এবং কবি সত্যেন্দ্রনাথের সংক্ষিপ্ত পরিচয় লিখিয়া দিয়া কাব্যরসেচ্ছু এবং কাব্যানুরাগীদের বিশেষ সুবিধা করিয়া দিয়াছেন। এইজন্য আমি তাহার নিকটে বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ। চারুবাবু সত্যেন্দ্রনাথের অন্তরঙ্গ বন্ধু ছিলেন, সুতরাং কবির এই পরিচয়ে যে বহু জ্ঞাতব্য তথ্যের সন্ধান পাওয়া যাইবে সে বিষয়ে ; সন্দেহ নাই।
পূর্ববর্তী সংস্করণগুলিতে যে সমস্ত ছাপার ভুল ছিল, বর্তমান সংস্করণে সেগুলি বিশেষ পরিশ্রম ও যত্নসহকারে সংশােধন করা হইয়াছে। এবিষয় যে-সব সাহিত্যিকদের সহিত বিশেবরূপে আলােচনা হইয়াছে, তাহাদের প্রত্যেককেই আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাইতেছি। কুহু ও কেকা’র ইতিপূৰ্বের (অগ্রহায়ণ, ১৩৪২ সালের) সংস্করণটি কবি-পত্নীর অনবধানে তৃতীয় সংস্করণ বলিয়া ছাপা হইয়াছিল। সম্প্রতি কলিকাতা ইম্পিরিয়াল লাইব্রেরীতে উহার পূর্ববর্তী আরাে তিনটি সংস্করণের গ্রন্থই (১ম সং, ২য় সং, ৩য় সং) আছে দেখিতে পাওয়ায়, বর্তমান সংস্করণটি পঞ্চম সংস্করণ বলিয়া ছাপা হইল। পূর্ববর্তী সংস্করণটি যাহা অগ্রহায়ণ, ১৩৪১ সালে তৃতীয় সংস্করণ বলিয়া ছাপা হইয়াছিল, উহা চতুর্থ সংস্করণ হইবে। যুদ্ধের দরুণ কাগজের অত্যধিক মূল্যবৃদ্ধি এবং গ্রন্থের আনুষঙ্গিক সৌষ্ঠববন্ধনে ব্যয়বাহুল্যে বর্তমান সংস্করণের মূল্য বুদ্ধি করিতে বাধ্য হইলাম । সহৃদয় পাঠক-পাঠিকা পারিপার্শ্বিক অবস্থা দৃষ্টে ইহা উপলব্ধি করিয়া সাদরে গ্রহণ করিলে কৃতার্থ হইব। ২৬শে বৈশাখ, ১৩৪৮ সাল কলিকাতা। অজিত শ্রীমানী
কবি ও বন্ধু
শ্রীযুক্ত দ্বিজেন্দ্রনারায়ণ বাগচী
করকমলেষু
প্রথম সংস্করণের ভূমিকা
এই গ্রন্থের অল্প কয়েকটি কবিতা ভারতী, প্রবাসী,
সাহিত্য, বঙ্গদর্শন এবং আরও দুই একখানি কাগজে ইতি
পূর্বে প্রকাশিত হইয়াছে। বেশীর ভাগ নূতন।
সুবিখ্যাত চিত্রশিল্পী এবং অকৃত্রিম সুহৃদ শ্ৰীযুক্ত
অসিতকুমার হালদার মহাশয় এবারেও আমার পুস্তকখানির
সৌন্দর্য বাড়াইয়াছেন;—প্রচ্ছদপটের পরিকল্পনাটি তাহারই ।
রাখী পূর্ণিমা
সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত
১৩১৯
সুচী বিষয় পৃষ্ঠা দুই সুর . ০ ০ ০ জ্যোৎস্না-মদির। কু? মদন-মহােৎসবে ০ ০ ০ মধুমাসে গান চার্বাক ও মঞ্জুভাষ সহজিয়া লীলার ছল ০ ০ ০ ০ ০ ০ ৭ ০ ০ ০ ০ ০ ০ ৪০০ অবগুষ্ঠিত ০ ০ ০ লব্ধ-দুলভ প্রিয়-প্রদক্ষিণ ১৮ তুমি ও আমি অকারণ পাল্কীর গান মুগ্ধ গ্রীষ্ম-চিত্র সাড়ে চুয়াত্তর গ্রীষ্মের সুর ই ও ও ০ ০ ০ অন্তঃপুরিকা আনন্দ-দেবতার প্রতি পৃষ্ঠা ••• Obu ৩৯ :: ৪০ বিষয় দরদী রিক্তা কনক-ধুতুরা চাতকের কথা ঝােড়াে হাওয়ায় বজ্র কামনা যক্ষের নিবেদন দুদ্দিনে ০ ০ ৪১ ৪২ ••• ••• ৪৪ ••• ••• ৪৬ ••• ••• ৪৮ ৫১ বর্ষা ••• নাগপঞ্চমী ০ ০ ০ রামধনু প্রাবৃটের গান ... t . . নূতন মানুষ প্রথম হাসি ••• ভাদ্রশ্ৰী ••• ••• তখন ও এখন ০ ০০ ০৮ ৫৯ ওগাে ৬০ কাশ ফুল ৬১ ০ ০ ০ জোনাকী ফুল-সাঞি ৪ ? জবা ৬৮ ••• ৬১ ছায়াচ্ছন্ন সৎকারান্তে ০ ০ ০ ৭১ ছিন্ন মুকুল ৫০ : ০ ০ ০ ৭২ ভূই চাপা ৭৩ পৃষ্ঠা ৭৫ ৭৬ ৭৬ ••• ৭৮ ৭৮ ০ ০ ০ ৮২ :: ৮৪ : ০ ০ ০ ৮৭ ০ ০ ০ ৯২ বিষয় ধূলি মাটি গঙ্গার প্রতি শােণ নদের প্রতি ••• বারাণসী হিমালয়াষ্টক কাঞ্চন-শৃঙ্গ মেঘলােকে চূড়ামণি “লরে” দার্জিলিঙের চিঠি সিংহল ••• সিদ্ধিদাতা ওঙ্কার-ধাম পদ্মার প্রতি পাগলা ঝােরা শূদ্র মেথর পথের স্মৃতি * দুর্ভিক্ষে সংশয় ••• হাহাকার শূন্যের পূর্ণতা ১৪ই জ্যৈষ্ঠ শ্মশান-শয্যায় আচাৰ্য হরিনাথ দে সাগর-তর্পণ ০ ০ ০ Sim ০ ০ ০ ০ ০ ০ ১০৪ ১০৭ ০ ০ ০ ১০৭ ০ ০ ০ ১১০ ১১১. ১১২ ১১:
পৃষ্ঠা । . ০ ০ ০ বিষয় ঋষি টলষ্টয় কবি-প্রশস্তি অর্ঘ্য নিবেদিতা ••• ১১৭ ১২ ০ ০ ০ ৪০০ ০ ০ ০ ১২১ নফর কুণ্ডু ৫০০ ০ ০ ০ ১২১ ••• দেশবন্ধু জ্যোতিমণ্ডল বিশ্ববন্ধু চৌদ্দ প্রদীপ ••• ••• ১২৩ ০ ০ ০ বন্দরে ••• ১২৬ ছেলের দল ••• ১২৮ কালাের আলাে ও ৮ আমর। ৫ ০ ০ ফুল-শিণি ০ ০ ০ ১৪ ••• ••• ০ ০ ০ ০ ০ ০ গান আমি ভােজ ও পুত্তলিকা নষ্টোদ্ধার কাটা ঝাঁপ ০ ০ ০ ১৪১ ১৪৩ গান ১৪ ক্ষুদ্রের প্রার্থনা ••• ৫০০ ১৪৪ শীতান্তে ••• ০ ০ ০ ১৪৫ সুদূরের যাত্রী ১৪৬ ১৪৭ তাবার পুনর্নব . প্রভাতের নিবেদন ০ ০ ০ ১৪৮ ১৪৮ পৃষ্ঠা বিষয় পরীক্ষা ••• ১৪৯ ০ ০ ০ ১৫১ • ২ ০ পথের পক্ষে যথার্থ সার্থকতা পপাসী ১৫১ সফল অশ্রু ১৫৪ প্রার্থনা ভিক্ষা আকিঞ্চন ১৫৪ । • • ১৫ ৬ নমস্কার ০ ০ ০ ১৬০ ১৬১ নিশান্তে দেবদর্শন কবির-পরিচয় টীকা-টিপ্পনী ১৬৩ + ০ ০ ১৬৬ কবি সত্যেন্দ্রনাথের রচনা প্রথম প্রকাশিত ০ ০ ০ ১৩১৩ সাল ••• ১৩১৪ ১৩১৫ ১৩১৭ ১৩১৮ . পুস্তকের নাম বেণু ও বীণা (কাব্য) হােমশিখা তীর্থ-সলিল তীর্থরেণু ফুলের ফসল জন্মদুঃখী (উপন্যাস) কুহু ও কেকা (কাব্য) রমন্ত্রী ( নাট্যকাব্য) তুলির লিখন (কাব্য) মণি-মঞ্জুষা অভ্র-আবীর হলন্তিকা • • E ১৩১৯ ••• D ১৩১৯, ১৩২১ । ••• ১৩২২ T? ১৩২২ ১৩২৩ চীনের ধুপ ১) ১৩৩০ 'বেলাশেষের গান ( কাব্য ) বিদায় আরতি ডানিশান (উপন্যাস) প্রবাসী’তে প্রকাশিত আষাঢ় হইতে ১৩৩০ ধূপের ধোঁয়ায় ( নাটিকা) কাব্য-সঞ্চয় (কাব্য) ০০০
কুহু ও ও কেক
দুই সুর
কোকিল-কালো কোকিল রচে সুরের ফুলে ফুলঝুরি
বসন্তে সে ভুলায়ে আনে হাওয়ায় করি মন চুরি !
কুটিকা-কুটিল নভে বুলায় তুলি রঙ্গিলা,
দোলায় তৃণ-বল্লরীতে মঞ্জু ফুল-মঞ্জরী !
বনের যত মনের কথা সেই জেনেছে অন্তরে,
কিশাের কিশলয়ের আশা তারি সে সুরে সন্তরে ।
শীতের গড়ে পাথর নড়ে-মুহুর্মুহু হয় চিল,
মােচন হ’ল বন্দী যত মুকুল-কুহু-মন্তরে !
সুখীর সুখী শিখী সে নাচে হেলায়ে গ্রীবা গৌরবে,
আওয়াজে তার কদম ফোটে,-কানন ভরে সৌরভে ;
কলাপ মেলি’ করে সে কেলি রৌদ্রে স্নেহ সঞ্চারি',
বনায় যা মােহন মায়া উচ্চকিত ঐ রবে।
কুহু ও কেক।
দগ্ধ দেশে মুগ্ধ নাচে নয়ন মেঘে অর্পিয়া,-
মেদুর নভেধূমল ফণী বেড়ায় যবে দর্পিয়া।
তমাল পরে মৃৎ করে কুহক কেকা উচ্চারি’,
মূচ্ছি’ পড়ে সর্প ত সত্ৰশিখা পিয়া।
বনের কুহু, বনের কেকা, কুহক-ভরা যুগ্ম-রাগ,
দেয় গাে বাটি নিখিল মাঝে আনন্দেরি যজ্ঞভাগ —
অনাদি সুধা,-অনাদি সােম,-হয় না কেহ বঞ্চিত ;
অনাদি সাম, অনাদি ঋক্ পূর্ণ করে বিশ্ব-যাগ।
;
মনের কুহু,মনের কেক, অনাদি তারাে মূচ্ছনা,
গােপন তার প্রচার, তবু, তুচ্ছ না সে তুচ্ছ না।
গহন-গেহে নিভৃতে রহে নিখিল-হৃদি-সঞ্চিত,
মিলিয়া আছে উহারি মাঝে বর সাথে জ্যোৎসনা।
-
আপনি পড়ে ছন্দে ধরা আপনি তার উদ্বোধন,
ক্রৌঞ্চী কঁদে করুণ কুহু,কবি সে-কেকা, নন।
উলসি’ ওঠে গুপ্ততােয়া সুপ্ত নদী সুড়ঙ্গের,
কল্পলতা মুকুল
মেলি’ বিতরে চির গুপ্তধন।
তাদিম কুহু, আদিম কেকা,ধরিবে কেবা ছন্দে সে,
জনম যার কামনা-লােকে মনের সুগােপন দেশে ;-
ফুটায়ে ফুল, ছুটায়ে হাওয়া, লুটায়ে ফণা ভুজঙ্গের
মিলায়ে দুহু গাহিবে মুহুগাহিবে মহান ।
জ্যোত্মা-মদিরা
ফুটিতে যাহা ঝরিয়া পড়ে,—গাঁথিতে তারে সঙ্গীতে!
কামনা বুঝি কনক-ধূনী সুমেরু-চূড়া লঙ্ঘিতে !
মানস-লীনা বাজে যে বীণা শিখিবে তারি মূচ্ছনা,
প্রকাশ যার আকাশ-তটে অযুত শত ভঙ্গীতে।
হৃদয়ে মুহু কোকিল কুহু ময়ুর কেকা রব করে,
গহন প্রাণ-কুহর মাঝে স্বপন-ঘেরা গহ্বরে !
ধেয়ান দোহে আরতি করি' ফুটাবে মেঘে জ্যোৎসনা
স্মিরিতি সাথে পীরিতি, আজি মন্ত্র-মধু মন্তরে।
জ্যোৎস্না-ঘদিৱা
চন্দ্র ঢালিছে তন্দ্রা নয়নে,
মল্লিকা বনে ঢালিছে মায়া ;
ছায়ায় আর্দ্র আলােখানি আজ
আলো-মাখা ফিকে হাল্কা ছায়া।
সুদূর-স্বপন-বিধুর প্রাণ,
উঠিছে মৃদুল মধুর গান,
মৃদুল বাতাসে মৰ্ম্মর ভাষে
উছসি উঠিছে বনের কায়া!
ফুরিত ফুলের
গাহে অন্তর কত না ছন্দে,
আলােকে ছায়ায় প্রেমে সুষমায়
ভুবনে বুলায় মদির মায়া।
উতলা গন্ধে
১
কু ?
বসন্তের প্রথম উষায়
ফুলদলে জাগাবে বলিয়া
বহিল দক্ষিণ বায়ু;-কে আজি সুধা
মুহুর্মুহু আনন্দে গলিয়া-কু ?
মধু আলো, মধুর বাতাস
বুঝি তারে করেছে বিহ্বল,
ভুলে গেছে দ্বন্দ্ব, দ্বিধা, দুখের আভাস,
তাই সে সুধায় অবিরল—‘কু?
-
সে যে আজ মেলেছে গাে পাখা,
দেখেছে গাে সৌন্দর্য্য অপার,
হাওয়া তারে মাতায়েছে চূত-রেণু-মাখা,
তাই বুঝি পুছে বারম্বার—কু ?
বিধাতা করেছে তারে কালাে,
নীরব শিশিরে বরষায়,
তবু সে ফেলেছে বেসে জগতেরে ভালো
প্রেমােচ্ছাসে তাই সে সুধায়—‘কু?
মদন-মহােৎসবে
বন উপবন আলাে করে অশােক ফুটে আছে,
অশােক ফুলের রূপটি ঠাকুর ! চাইছি তােমার কাছে ;
চোখের দাবী মিলে পরে তখন খোঁজে মন,
তাই তাে প্রভু ! সবার আগে রূপের আকিঞ্চন।
মল্লিকা ফুল হাসছে হরি’ হাওয়ার মগজ মন,
মনােহরণ বিদ্যাটি দাও এ মাের নিবেদন
মনের ক্ষুধা মিটিয়ে দিতে শক্তি যেন হয়,
নইলে, শুধু রূপের আদর হয় না সে অক্ষয়।
;
আমের মুকুল জাগছে আকুল ফলের আশা নিয়ে,
সফল কর আমায় ঠাকুর ! প্রেমের পরশ দিয়ে ;
প্রিয় আমার স্নেহের নীড়ে স্নিগ্ধ যেন রয়,
মনের মােহ ফুরিয়ে গেলেও প্রাণের পরিচয়।
গন্ধ-মধু-রূপ-সায়রে ভাসছে নীলােৎপল,
নিখুৎ-নধর অটুট আদর সােহাগ-শতদল ;
রূপে, রীতে, মাধুরীতে অম্নি হ’তে চাই,
চোখের মনের প্রাণের ক্ষুধা মিটিয়ে যেন যাই।
মল্লিকা ফুল, আমের মুকুল, অশােক, নীলােৎপলে,
ঠাকুর তােমার চরণ পূজি,পূজি নয়ন-জলে ;
অরুণ অরবিন্দ সম তরুণ এ হৃদয়,
তােমার বরে কামনা তার সফল যেন হয়।
=
মধুমাসে
-
-
যে মাসেতে পুষ্পে 'মধু,
মধু মধুকরের মুখে,
হিয়া যখন হাওয়ার আগে
হয় গো মদির অধীর সুখে ;--
আঁখি আকুল অন্বেষণে
ফিরছে যখন বনে বনে,
মুহু হু কুহু স্বরে
তন্ত্রী দুলে উঠছে বুকে ;-
তখন তুমি দিলে দেখা অমনি
ফুলের বনে ফুলের রাণী রমণী ।
অমনি বিপুল সুখের ভরে
আকুল আঁখি উঠল ভরে,
পুলক হাসি পাগল বাঁশী
বিদায় দিল মৌন দুখে!
গান
মুখখানি তার পদ্মকলি
ভাবের হাওয়ায় দোদুল-দুল !
সুখের স্বপন, বুকের সে ধন,
দুখের আপন সে বুবুল।
ভুবন-ভােলা নয়ন দুটি
খােজে না চল নেয় না ত্রুটি
চার্বাক ও মঞ্জুভাষা
ছুটির হাওয়া ছুটিয়ে সে দেয়,
আপন-ভােলা। মধুর ভুল !
উড়াে পাখীর লাগল পরশ
তাইতাে রে মন গেল উড়ে,
কি এক হাওয়া জাগল সরস
স্বপন-সুখের ভুবন জুড়ে !
তড়িৎ-ভরা মেঘের মতন
হৃদয় জুড়ে জাগল চেতন,
দেব,তা সে কোন ছদ্মবেশে
কল্পলতার কাম্য-ফুল !
চার্বাক ও মতাষা
বনপথে চলেছে চার্বাক,
সূর্যতাপে স্পন্দিত সে বন ;
ক্লান্ত আঁখি, চিন্তিত, নির্বাক,
বিনা কাজে ফিরিছে ভুবন।
হ্রদের দক্ষিণ কূলে ভিড়ি’
শ্যামলেখা শােভিছে শৈবাল,
মরালীর পক্ষে চঞ্চু রাখি’
আঁখি মুদে চলেছে মাল।
তীরে তীরে ঘন সারি দিয়ে
দেবদারু গড়েছে প্রাচীর,
বনস্থলী-মধুচক্র ভরি’
রশ্মি-মধু ঝরিছে মদির।
কুহু ও কেকা
চলিয়াছে চার্বাক কিশাের,
জকুঞ্চিত, দৃঢ় ওষ্ঠাধর ;
শিশিরের পদ্মকলি সম
রুদ্ধ প্রাণে দ্বন্দ্ব নিরন্তর।
“আজি যদি মঞ্জুভাষ আসে এই পথ দিয়া,
চকিতে আঁচলখানি নেব তার পরশিয়া,
সে যদি জানিতে পারে। সে যদি পালটি চায়।
মাগিয়া লইতে ক্ষমা আমি কি পারিব, হায় !
সে এলে অবশ তনু, কথা ন জুয়ায় আর!
কত যেন অপরাধ,আঁখি নােয় বারবার !
সময় বহিয়া যায়, চলে যায় রূপসী,
রাখিয়া রূপের স্মৃতি ডুবে যায় সে শশী ।
“কে বলে বিধাতা আছে, হায়,
কে বলে সে জগতের পিতা,
পিতা কবে সন্তানে কঁদায়,
ক্ষুধায় কঁদিলে দেয় তিতা।
পিতা যদি সর্বশক্তিমান
পুত্র কেন তাপের অধীন?
পিতা যদি দয়ার নিধান
পুত্র কেন কঁদে চিরদিন ?
নাহি-নাহি-নাহি হেন জন,
বিধি নাই—নাহিক বিধান ;
কোন্ ধনী পিতার সংসারে
অনাহারে মরেছে সন্তান ?
চার্বাক ও মঞ্জুভাষা
মােরা যে বিশ্বের পরমাণু
স্নেহ প্রেম মােদেরাে প্রবল ;
আর যেই ত্রিলােকের পিতা
তারি প্রাণ পাষাণ-নিশ্চল ?
দাসীপুত্র যারা জন্মদাস
ভয়ে ভক্তি জানি তাহাদের,
আজন্ম যে হ’তেছে নিরাশ,
সেও রত তােষামােদে ফের !
ধিক! ধিক! মরণের দাস !
মুখে বল পুত্র অমৃতের !
ছিল দিন,-হাসি আসে এবে;-
নখে চিরি’ বক্ষ আপনার,
আমিও করেছি লােহদান
লৌহময় পায়ে দেবতার।
==
বালকের অখল হৃদয়ে
আমিও করেছি আরাধন,
ধ্রুব কি প্রহলাদ বুঝি কভু
জানে নাই ভকতি তেমন !
ফল তার ?—পদে পদে বাধা
আজনম,বুঝি আমরণ !
মরণের পরে কিবা আর ?
নাহি-নাহি-নাহি কোনাে জন।”
অকস্মাৎ চাহিল চার্বাক
পশ্চিমে পড়েছে হেলে রবি,
রশ্মি-রসে ডুবু-ডুবু বন,
আবির্ভূতা বনে বনদেবী।
কুহু ও কেকা
মঞ্জু ভাষা রূপে বনদেবী
শিরে ধরি’ পাষাণ কলস,
আসে ধীরে আশ্রম বাহিরে
গতি ধীর, মন্থর, অলস।
পর্ণরাশি-মৰ্ম্মর-মঞ্জীর
পদতলে মরিছে গুঞ্জরি’ ;
অযতনে কুন্তলে বলে
লগ্ন তার নীবার-মঞ্জরী।
লতিকার তন্তু সে অলক,
মঙ্গল-প্রদীপ আঁখি তার ;
পরিপূর সংযত পুলকে
কপােল সে পুষ্প মহুয়ার ;
ওষ্ঠে তার জাগ্রত কৌতুক,
অধরেতে সুপ্ত অভিমান ;
বাহুলতা চন্দনের শাখা,
বর্ণ তার চন্দ্রিকা সমান।
চাহিয়া সহসা বালা ডাকিল চার্বাকে
“ওগাে! শােনাে শােনাে
শুনিনু এনেছ তুমি মৃগ-শিশু এক,
আছে কি এখনাে ?”
মন-ভুলে চেয়েছিল মুখপানে তার
বিস্ময়ে চার্বাক,
নীরব হইল বালা ; কি দিবে উত্তর ?
বিষম বিপাক!
কহে শেষে ক্ষীণ হেসে গদগদ বচন
“সুন্দর হরিণ,
চিত্রিত শরীর তার সােনার বরণ ;-
চার্বাক ও মঞ্জুভাষা
যেয়াে একদিন !
আজ যাবে?” মুখ চেয়ে জিজ্ঞাসে চার্বাক
ভরসা ও ভয়ে ;
মঞ্জুভাষ কহে “না, না, আজ —আজ থাক !
আধেক বিস্ময়ে !
সহসা সংবরি’ আপনায়,
কহে বাল চাহি মুখপানে,
“শুনিনু মা-হারা মৃগ-শিশু
মৃত মৃগী কিরাতের বাণে ;
ইচ্ছা করে পালিতে তাহায়,
শিশু সে যে মা-হারা হরিণ ;
পড় তুমি,—অবসর না থাকে তােমার,
বলিলে পালিতে পারি আমি সারাদিন।
বল, আমি মা হ’ব তাহার।”
“তাই হাে” কহিল চার্বাক,
“আমার স্নেহের ধনে তব স্নেহ-ধার
দিয়াে তুমি।” কহি যুবা হইল নিৰ্বাক্ :
কৌতুকে চাহিয়া মুখপানে
মঞ্জুভাষা মঞ্জুলীলাভরে
চ'লে গেল মরাল গমনে
জল নিতে ক্রৌঞ্চ-সরােবরে।
আশার বাতাসে করি ভর
ফিরে এল চার্বাক কুটীরে,
ভাষাহীন আশার আবেশে
সুখভরে চুমে মৃগটিরে।
“ঠেকেছিল মনােতরীখান্
প্রাণনাশা সংশয়-চরায়,
কুহু ও কেকা
ভাষাহীন আশা পেয়ে আজ
হর্ষে ভেসে চলে পুনরায়।
যত কিছু ছিল বলিবার
বলিতে হ’ল যেন বলা,
বােঝ-সােজা হ’ল মনে মনে,
ধুয়ে গেল যত মাটি মলা।
ছিল ঠেকে মনােতরীখান,
চলিল সে কাহার ইঙ্গিতে ?
কে গো তুমি দুয়ে মহান্ ?
কে দেবতা এলে আজি চিতে ?
“এ আনন্দ কে দিলে আমায় ?
আশা-সুখে মন পরিপূর !
এতদিন চিনি নি তােমায় ;
আজ বটে দয়ার ঠাকুর !”
রাত্রি এল ;-শয্যাতলে জাগিয়া চার্বার
আশা-সুখে ধন্য মানে জন্ম আপনার ;
নিগুণ মহেশে যেই করিয়াছে হেলা,
আনন্দ-মূর্তিতে হিয়া পূর্ণ আজি তার ।
সেই একদিন শুধু জীবনে চার্বাক
নত হয়েছিল নিজে চরণে ধাতার ;
প্রেমের কল্যাণে শুধু সেই একদিন,
সে যে আনন্দের দিন,—সে যে প্রত্যাশার।
সহজিয়া
ফুলের যা’ দিলে হবে নাকো ক্ষতি
অথচ আমার লাভ,
আমি চাই সেই সৌরভ,-শুধু-
অতনু অতল ভাব।
আমি চাই সেই দূর-হতে-পাওয়া
আমি চাই মধু-মশগুল হাওয়া,
অন্তরে চাই শুধু রূপসীর
অরূপ আবির্ভাব,
যাহা দিলে তার ক্ষতি নাই, তবু
আমার পরম লাভ।
বৃন্তটি হ’তে ছিড়িতে না চাই
দিতে নাহি চাই দুখ,
সহজ প্রেমের অমল আমােদে
ভরিয়া উঠুক বুক!
ঘাঁটিতে না চাই দুনিয়ায় মাটি
তারি মাঝে মিশে রয়েছে যা খাটি,
নিতে হবে সেই পরশ মণির
চুম্বিত সােনাটুক,
কারাে কোনাে ক্ষতি হবে না, অথচ
আমার ভরিবে বুক।
লীলার ছল
;
আমি যদি চাই, অবগুণ্ঠনে
তুমি মুখখানি ঢাক;
নয়ন ফিরালে, তবে, অনিমিখে
কেন গাে চাহিয়া থাক।
এমনি করিয়া চিরদিন কিগাে ।
জড়ায়ে রাখিবে মােরে ?
তবু কাছাকাছি হবে না ? আমার
জীবন দিবে না ভরে ?
নয়ন তােমার করে অনুনয়,
তুমি দূরে সরে থাক।
লীলায় হেলায় মেঘের মেলায়
রঙীন্ স্বপন আঁক।
পূজা চাও তুমি হৃদয়-প্রাণের
হায় গাে পাষাণ-দেবী।
তবুও আমায় ধন্য হইতে
দিবে না তােমায় সেবি’!
ফাগুন ফুরায় ফুল ঝরে যায়
ওগাে কৌতুক রাখ,
হৃদয়ের পুরে
ডাক গাে বারেক ডাক।
পরিচিত সুরে
অবগুণ্ঠিত।
আমি বসনে ঢেকেছি মুখ
দেখিতে তােমায় ।
দূরে সরে যাই, বুকে
আঁকিতে তােমায় !
তুমি অভিমান-ভরে ফিরে যেয়াে না,
নিরাশ নয়নে বঁধু তুমি চেয়াে না ;
আমার ভুবন ভরি’
আছ দিবা-বিভাবরী,
আঁখির পুতলি ! হেরি
আঁখিতে তােমায় !
লব্ধ-দুল
হে মম বাঞ্ছিত নিধি ! সাধনার ধন।
নিঃসঙ্গ এ অন্তরের চির-আকিঞ্চন।
করুণ-লােচনা !
অন্ধ এ মন্দিরে তুমি উদার জোছনা।
মলিন ধূলির কোলে লয়েছ গাে ঠাঁই,
জোছনারি মত তবু অঙ্গে গ্লানি নাই।
অয়ি ইন্দুলেখা!
অন্তরে পেয়েছি তােমা, নহি আর একা।
কুহু ও কেক।
নহি আর সমুদভ্রান্ত, ক্ষুধিত নয়ানে,
ফিরি নাকো দেশে দেশে নিস্ফল সন্ধানে ;
হে অমৃত-ধারা!
উঞ্ছ কটাক্ষের ভিক্ষা হয়ে গেছে সারা।
এসেছ হৃদয়ে তুমি সহজ গৌরবে,
পূর্ণ করি’ দশ দিক্ মন্দার সৌরভে ;
আমি
মুগ্ধ চিতে
ফিরেছি নীড়ের কোলে তােমারি ইঙ্গিতে !
আপনি মগন হয়ে গেছি আপনাতে,
ভাবিতেছি নিশিদিন-কী আছে আমাতে।
যাহার সন্ধানে
তুমি এসে ধরা দেছ ? হায়, কে তা জানে!
সংসারের মাঝে ছিনু সন্ন্যাসী উদাস,
তুমি সঙ্গে নিয়ে এলে ফুলের নিশ্বাস,
আনিলে চেতনা,
দুখের গগদ সুখ, সুখের বেদনা !
ভেবেছিনু জগতের আমি নহি কেহ,
তুমি ভেঙে দিলে
ভুল,
দিলে তব স্নেহ,
মৰ্ম্ম পরশিলে,
রুদ্ধ উৎস খুলে গেল, হে সুন্দরশীলে !
লব্ধ-দুর্লভ
১৭
আজি মাের সর্ব চিত্ত সারা তনু ভরি’
আনন্দ অমৃত-ধারা ফিরিছে সঞ্চরি'।
নীরবে নিভৃতে
আমাতে মিশেছ তুমি, অয়ি অনিন্দিতে।
জীবনে এসেছ পূর্ণা! রিক্তা-তিথি-শেষে,
মানসী দিয়েছ দেখা মানুষের দেশে,
অয়ি স্বপ্ন-সখি,
তােমারি মাধুরী আজ নিখিলে নিরখি।
তুমি সে বালিকা যার চম্পক অঙ্গুলি
লিখিত মেঘের স্তরে চঞ্চল বিজুলি!
যাহার লাগিয়া
জাগিত গাে তন্দ্রাতুর বালকের হিয়া।
।
শিয়রে সােনার কাঠি ঘুমাইতে তুমি,
মুক্ত দ্বারে রৌদ্র আর জ্যোৎস্না যেত চুমি’!
সাগরের তলে
তুমি সে গাঁথিতে মালা মুকুতার ফলে।
তােমারি পরশ বহে বসন্ত বাতাস,
বর্ষা-জলােচ্ছ্বাসে ছিল তােমারি নিশ্বাস ।
মূচ্ছিত বৈশাখে
ও লাবণ্যমণি ছিল চম্পকের শাখে।
২
১৮
কুহু ও কেকা
তুমি ছিলে অন্ধকারে কালােচুল খুলে,
চালােকে তােমারি অঞ্চল পড়ে দুলে ;
সন্ধ্যা সরােবরে
গন্ধতৃণে গন্ধ রেখে তুমি যেতে স’রে !
স্বপ্নে ছিলে স্বর্গে ছিলে মগ্ন পারিজাতে,
অতনু আভাস ছিলে, ছিলে কল্পনাতে ;
আজ একেবারে
মর্ত্যে এলে মূৰ্ত্তি ধরে আমারি দুয়ারে !
মুগ্ধ মােরে করেছ গাে মুগ্ধ চোখে চাহি,
ধুয়ে মুছে দেছ গ্লানি, তাই সখী গাহি
বন্দনা তােমারি,
তব প্রেমে মণিহার পরেছে ভিখারী।
গ্রিয়-প্রদক্ষিণ
প্রিয়ার ও তনু অতনু সে কোন্
দেবতার মন্দির ।
বন্ধনহীন মন উদাসীর
আলয় সে শান্তির।
তাহারে ঘিরিয়া ঘুরিছে হৃদয়
ঘুরিছে রাত্রিদিন,
উৎসুক সুখে কৌতুকে তারে
করিছে প্রদক্ষিণ ।
প্রিয়-প্রদক্ষিণ
১৯
ফিরিছে হৃদয় কুন্তলে তার
ফিরিছে কপােলে, চোখে ;
অধরে, উরসে, চরণে, পাণিতে
ফিরিছে তাম্রনখে!
ফিরিছে আঙুলে, ফিরিছে জড়লে,
ফিরিছে ভূরুর তিলে,
ফিরে অবিরাম,—কৌতূহলের
অন্ত নাহিক মিলে।
ঘুরি গাে যাত্রী দিবস রাত্রি
অনুপ দেউল ঘিরে,
নূতন প্রেমের নির্মল-করা
‘নিৰ্ম্মালি’ ধরি’ শিরে।
কত হাসি কত পুলক-অশ্রু
করি গাে আবিষ্কার,
দৈব প্রসাদে খােলে দেউলের
নূতন নূতন দ্বার!
নূতন প্রণয় নব পরিচয়
নব রাগিণীর গীতি,
কত জনমের মূচ্ছনা তাতে
মূচ্ছিত কত স্মৃতি।
প্রিয়ার দিঠিতে ভােলামন আজ
হয়েছে জাতিস্মর,
দৈব আলােকে ভরেছে দু’চোখ
ভরেছে নীলাম্বর।
কুহু ও কেকা
প্রিয়ার রূপের অন্ত নাহিরে
নূতন সে ক্ষণে ক্ষণে,
ক্ষণে ক্ষণে তার শােভা নব নব
হেরি বিস্ময় মনে ।
উদ্বেল তাই হৃদয়-পরাণ
নাচিছে রাত্রি দিন ;
নিবিড় পরশ আঁখি সনে করে
প্রিয়ারে প্রদক্ষিণ !
তুমি ও আমি
মি আমি—আমরা দেহে যুক্ত ছিলাম আলিঙ্গনে
ল-জনমে ;--ছিলাম যখন পাপড়ি-ঘেরা সিংহাসনে ,
মার ছিল সােনার রেণু, স্নিগ্ধ মধু তােমার হাসে,
মি ছিলে মধ্য-কেশর আমি তােমার ছিলাম পাশে।
ঠাৎ কি যে মর্জি হ’ল-হঠাৎ কেমন হ’ল মতি
ফাৎ হয়ে গেলাম দেহে,-বিমুখ পরস্পরের প্রতি।
ঘি দিনের তপস্যাতে কায়মী হ’ল ছাড়াছাড়ি,
মি ক্রমে হ’লাম পুরুষ, তুমি প্রিয়ে হলে নারী।
ফাৎ হয়েই ফুল আঁখি,-দেখতে পেলাম পরস্পরে-
ভতর থেকে টান পড়েছে,—চলবে নাকো থাকলে স’রে ;
নাল’ দিয়ে তাই এগিয়ে এলাম,—এগিয়ে হটে গেলাম পিছে
নি অভিমান জাগল দারুণ,—মিলন বাধা বাড়ল মিছে।
অকারণ
-
আজ বিরহের দারুণ দাহে পরস্পরে চাইছি মাের,
আজ বিধাতার বিড়ম্বনায় চোখের জলে ঝরছে বােরা ;
আর মিলনের নেইকো আশা মৌমাছিদের ঘটকালিতে,
ভাঙা এ মন জুড়তে এখন হচ্ছে নিতি জোড়-তালিতে।
তফাৎ হ'য়ে নেইকো তৃপ্তি, দু’ঠাই হয়ে দুখ মেনেছি,
লাভের মধ্যে, হায় গাে বিধি, হারিয়ে-পাওয়ার স্বাদ জেনেছি ;
হারিয়ে-পাওয়া ! গভীর সে সুখ !—প্রবল সে যে দুখের বাধায় !
বিচিত্র সে
নূতন
মিত্র এক সাথে সে হাসায় কঁাদায় ।
ফুল জনমে অভেদ ছিলাম,—যুক্ত ছিলাম আলিঙ্গনে,
আজ আমাদের এই মিলনে সেই কথাটিই জাগছে মনে ;
দূরে সরে দুনিয়া ঘুরে আবার মিলন এই জনমে,
মুক্ত দোহার যুক্ত হৃদয় আজ বিধাতার পায়ে নমে।
অকারণ
শূন্য যখন গাঙিনীর তীর,
পথে কেহ নাহি চলে,
পড়ে নাকো দাড় খেয়া তরণীর
তিমির-মগন জলে,
নীলাম্বরীর অঞ্চল দিয়া
সন্ধ্যা সে দেয় দৃষ্টি রুধিয়া,
গন্ধ তৃণের বিভােল গন্ধ
বাতাসের কোলে ঢলে ;-
২২,
কুকু ও কেকা
করুণে মুরলী বাজে পরপারে,
দীপ জ্বলে নিবে কিনারে কিনারে,
সুখ-নীড়ে পাখী ঘুম-ভরা আঁখি
স্বপনে কি যেন বলে ;--
তখনি এ হিয়া উঠে উছসিয়া
নয়নে-অশ্র ছলে
যবে ঝর ঝরে বারিধারা ঝরে
আর সব রহে চুপ
তরু পল্লবে সঞ্চিত জল
জলে পড়ে-টুপ টুপ,
যবে ঘুমন্ত কেতকীর শাখে
জড়ায়ে নিভৃতে সুনিবিড় পাকে
গন্ধ-মগন কাল ভুজঙ্গ
শ্বসিয়া শ্বসিয়া উঠে;-
দাদুরীর ডাকে ভরি’ উঠে বন,
দাপটিয়া ফিরে দস্যু পবন,
নব কদম্ব যূথীর গন্ধ
আকাশে বাতাসে লুটে,
তখনি এ হিয়া উঠে উছসিয়া
নয়নে অশ্রু ফুটে !
প্রথম শরতে অম্বরে যবে
মেঘ-ভম্বরু বাজে,
যবে খরশাণ বিধাতার বাণ
ঝলসে গগন মাঝে,
অকারণ
কমল-কলিকা শঙ্কিত মনে
রহে নতমুখে মুদিত নয়নে,
তরুণ অরুণ কিরণ স্মরিয়া
ঝুরিয়া বুরিয়া মরে,
ব্যাকুল পরাণ খুজে আশ্রয়,
খুজে সে শরণ চাহে সে অভয়,
এ তিন ভুবনে আপনার জনে
খুজি’ মরে সকাতরে, -
উছসি উঠিয়া বিরহী এ হিয়া
নয়ন-সলিলে ভরে।
==
পউষের রাতে কঙ্কাল সম
বিথারি’ রিক্ত শাখা,
কঁদে যবে তরু ভিজিয়া শিশিরে
ভস্ম-কুহেলি মাখা,
কুকুর তুলে বুক্কন ধ্বনি,
ঘুৎকার করে উল্ক অমনি,
উত্তর বায়ু শীতের প্রতাপ
প্রচারে ভূমণ্ডলে,-
দীর্ঘ যামিনী পােহায় জাগিয়া
তপ্ত হিয়ার পরশ মাগিয়া,
পরাণ ক্ষুন্ন নয়ন শূন্য
নিবিড় তিমির তলে,
তখনি এ হিয়া উঠে উছলিয়া,
নয়নে মুকুতা ফলে।
=
২৪
কুহু ও কেকা
এ কি বিধুর হায় রে বিরহী!
কালে কালে নিতি নিতি ।
এ কি রে দহন রহি’ রহি’ রহি
এ কি অপরূপ গীতি ।
এ কি মিছামিছি দুঃখের খেলা,
এ কি মিছামিছি আঁখিজল-ফেলা।
কোন্ বেদনার চির হাহাকার
চিরদিন জাগে প্রাণে!
কোন্ খানে সুরু, কোথা উন্মেষ,
কোন্ যুগে হায় হবে এর শেষ,
কোন্ রাগিণীর ব্যথা-ভরা রেশ
ধ্বনিছে সকল গানে !
অকারণে হায় অশ্রু গড়ায়
কোন্ সাগরের টানে
পাল্কীর গান
পাল্কী চলে!
পাল্কী চলে!
গগন-তলে
আগুন জ্বলে।
স্তব্ধ গাঁয়ে
আদুল গায়ে
যাচ্ছে কারা
রৌদ্রে সারা!
পাল্কীর গান
২৫
ময়রা মুদি
চক্ষু মুদি
পাটায় ব'সে
ঢুলছে ক’সে।
দুধের উঁছি
শুষছে মাছি,
উড়ছে কতক
ভন্ ভনিয়ে।
আসছে কা'র
হন্ হনিয়ে ?
হাটের শেষে
রুক্ষ বেশে
ঠিক দুপুরে
ধায় হাটুরে !
কুকুর গুলাে
শুকছে ধূলাে,
ধুছে কেহ
ক্লান্ত দেহ।
ঢুকছে গরু
দোকান-ঘরে,
আমের গন্ধে
আমােদ করে !
পাল্কী চলে,
পাল্কী চলে
দুলকি চালে
নৃত্য তালে !
কুহু ও কেকা
ছয় বেহারা,
জোয়ান তারা,
গ্রাম ছাড়িয়ে
আগ বাড়িয়ে
নাম্ল মাঠে
তামার টাটে ।
তপ্ত তামা,-
যায় না থামা,-
উঠছে আলে
নাম্ছে গাঢ়ায়,
পাল্কী দোলে
ঢেউয়ের নাড়ায় !
ঢেউয়ের দোলে
অঙ্গ দোলে।
মেঠো জাহাজ
সামনে বাড়ে,
ছয় বেহারার
চরণ-দাড়ে!
কাজলা সবুজ
কাজল পরে
পাটের জমি
ঝিমায় দূরে।
ধানের জমি
প্রায় সে নেড়া,
মাঠের বাটে
কাটার বেড়া !
পাল্কীর গান
সামাল হেঁকে
চলল বেঁকে
ছয় বেহারা,
মর্দ তারা !
জোর হাঁটুনি
খাটুনি ভারি ;
মাঠের শেষে
তালের সারি।
তাকাই দূরে,
শূন্যে ঘুরে
চিল ফুকারে
মাঠের পারে।
গরুর বাথান
গােয়াল-থানা,
ওই গাে! গাঁয়ের
ওই সীমানা !
-
বৈরাগী সে,
কণ্ঠী বাঁধা,
ঘরের কঁাথে
লেপছে কাদা;
মটুকা থেকে
চাষার ছেলে
দেখছে,-ডাগর
চক্ষু মেলে !
দিচ্ছে চালে
পােয়াল গুছি ;
২৮
কুহু ও কেকা
বৈরাগীটির
মূৰ্ত্তি শুচি।
পেজাপতি
হলুদ বরণ,
শশার ফুলে
রাখছে চরণ।
কার বহুড়ি
বাসন মাজে ?- *
পুকুর
ঘাটে
ব্যস্ত কাজে ;
এটো হাতেই
হাতের পোছায়
গায়ের মাথার
কাপড় গােছায়।
পাল্কী দেখে
আসছে ছুটে
ন্যাংটা খােকা,-
মাথায় পুটে !
পােডাের আওয়াজ
যাচ্ছে শােনা;
খােড়াে ঘরে
চাদের কোণা!
পাঠশালাটি
দোকান-ঘরে,
গুরু মশাই
দোকান করে !
পাল্কীর গান
পােড় ভিটের
পাের 'পরে
শালিক নাচে,
ছাগল চরে।
গ্রামের শেষে
অশথ-তলে
বুনাের ডেরায়
চুল্লী জ্বলে ;
টাকা কঁাচা
শাল-পাতাতে
উড়ছে ধোঁয়া
ফ্যাসা ভাতে।
গ্রামের সীমা
ছাড়িয়ে, ফিরে
পাল্কী মাঠে
ধীরে ;
আবার মাঠে,
তামার টাটে,
কেউ ছােটে, কেউ
;
কষ্টে হাটে ;
মাঠের মাটি
রৌদ্রে ফাটে,
পালকী মাতে
আপন নাটে!
শঙ্খচিলের
সঙ্গে, যেচে-
কুহু ও কেক।
পাল্লা দিয়ে
মেঘ চলেছে।
তাতারসির
তপ্ত রসে
বাতাস সাঁতার
দেয় হরষে !
গঙ্গা ফড়িং
লাফিয়ে চলে ;
বাঁধের দিকে
সূর্য ঢলে।
পাল্কী চলে রে !
অঙ্গ ঢলে রে !
আর দেরী কত ?
আরাে কত দূর?
“আর দূর কি গাে?
বুড়ো-শিবপুর
ওই আমাদের ।
ওই হাটতলা,
ওরি পেছুখানে
ঘােযেদের গােলা।”
পাল্কী চলে রে,
অঙ্গ টলে রে ;
সূৰ্য ঢলে,
পাল্কী চলে!
মুগ্ধ
ওই রূপে মাের মন ভুলেছে, ভরেছে মন মােহন রূপে!
জেগে তােমায় স্বপন দেখি, তােমার রূপে যাচ্ছি ডুবে !
ওগাে আমার দখিন হাওয়া! অসীম তােমার দক্ষিণতা,
ওগাে আমার তমাল ছায়া ! তপ্ত জনের ঘুচাও ব্যথা;
ওগাে শ্যামল শাঙনী মেঘ! স্বপ্নে তােমায় চায় যে যূথী,
ওগাে আমার গায়ক গুণী ! ওগগা আমার গানের পুথি !
এই গিয়েছ কাছটি থেকে,-ভাবছি ছুটে যাই এখুনি,
বাড়িয়ে-বলা নয় গাে এ নয় ভালবাসার-ভুল-বকুনি ;
হায় গাে বিধির এনি বিধান মিলন-বেলাই অল্প-আয়ু,
শীতের বেলার চেয়েও খাটো,-বইছে তবু দখিন বায়ু !
ফুল-জাগানাে দখিন হাওয়া,—দিল জাগানাে দক্ষিণ;
মিলন-মেলা যায় ফুরায়ে, ফুরায় না হায় মনের কথা।
দূরে কেন যায় গাে লােকে,—আমি যে চাই থাকতে কাছে,
আনাগােনা ফুরিয়ে দিয়ে কাছে থাকায় দোষ কি আছে ?
এসাে কাছে প্রিয় আমার—এস আমার জনম ভরি’ ;
এলা ঘরে ওগগা ! আমি তােমার কথা স্মরণ করি ।
আসতে তােমায় হবেই হবে—
—অগৌণতেই আসতে হবে,
জেগে ভাল ফেলে বেসে-স্বপ্নে ভাল বাসতে হবে।
গ্রীষ্ম-চিত্র
বৈশাখের খরতাপে মূচ্ছাগত গ্রাম,
ফিরিছে মন্থর বায়ু পাতায় পাতায় ;
মেতেছে আমের মাছি, পেকে ওঠে আম,
মেতেছে ছেলের দল পাড়ায় পাড়ায়।
৮
কুহু ও কেকা
সশব্দে বাঁশের নামে শির,
শব্দ করি’ ওঠে পুনরায় ;
শিশুদল আতঙ্কে অস্থির
পথ ছাড়ি’ ছুটিয়া পালায়।
স্তব্ধ হয়ে সারা গ্রাম রহে ক্ষণকাল,
রৌদ্রের বিষম ঝাঁঝে শুদ্ধ ভােবা ফাটে ;
বাগানে পশিছে গাভী, ঘুমায় রাখাল,
বটের শীতল ছায়ে বেলা তার কাটে।
পাতা উড়ে ঠেকে গিয়া আলে,
কাক বসে দড়িতে কূয়ার ;
তন্দ্রা ফেরে মহালে মহালে,
ঘরে ঘরে ভেজানাে দুয়ার।
সাড়ে চুয়াত্তর
দূর থেকে আজ ওগাে তােমায় মনের কথা কই,
নূতন খবর নেই কিছু আজ মনের খবর বই।
ভাবছি আমি কোথায় তুমি হায় সে কতদূর,
কোথায় সহর কলকাতা আর কোথায় কুসুমপুর !
জানি কি ভাবছ এখন করছ কিবা কাজ,
কার সাথে বা কইছ কথা? পরেছ কোন্ সাজ ?
ইচ্ছা করে হাওয়ার ভরে তােমার কাছে যাই,
করছ যে কি পিছন থেকে লুকিয়ে দেখি তাই।
ইচ্ছা করে শুতে তােমার বচন সােহগের,
ইচ্ছা করে—ইচ্ছা করেইচ্ছা করে ঢের ।
সাড়ে চুয়াত্তর ৩৩ ইচ্ছা করে কত কি যে—সাধ যে জাগে আজ- শাদার পরে কালি দিয়ে লিখতে সে পাই লাজ। তবে যদি না পড় সে দিনের বেলায় আর তবে লিখি,—লিখতে সে লােভ হচ্ছে যে বারবার। হচ্ছে সে লােভ, কিন্তু, ওগাে!—পড়াে না এর পর, আমার চিঠির এইখানে আজ সাড়ে চুয়াত্তর ; এইখানে শেষ করতে হবে দিনের বেলার পাঠ, রাতের পড়া রাতে হবে, ভাঙলে লােকের হাট। বাকিটুকু শােবার বেলায় বন্ধ করে ঘর এ খুলে দেখতে হবে রেখে শেষের পর ; সেই গােপনে মনে মনে পড়াে চিঠির শেষ, নি-মহলে বন্ধু ! আমার আর্জি হবে পেশ। সেই গােপনের আবরণে, জানাই তােমার পায়, একটি তােমার চুমার লাগি পরাণ কঁদে, হায় ! দিয়ে দিয়ে একটি চুমা আমার চিঠির গায়, প্রদীপ যদি হাসতে থাকে নিবিয়ে দিয়ে তায়। দাও যদি সে পাবই আমি, পাবই আমি টের, হাওয়ার আগে হবে বিলি বাৰ্তা হৃদয়ের। আসবে স্বপন তােমার বেশে মুদলে আঁখির পাত, কাটবে সারা রাত্রি সুখে বন্ধু ! প্রিয় ! নাথ ! দূর থেকে সুর লাগবে বীণায়,জাগবে গাে অন্তর, আমার চিঠির মাঝখানে তাই সাড়ে চুয়াত্তর। = 5। --
গ্রীষ্মের
সুর
হায়!
বসন্ত ফুরায় !
মুগ্ধ মধু মাধবের গান
ফন্তু সম লুপ্ত আজি, মুহমান প্রাণ।
অশােক নির্মাল্য-শেষ, চম্পা আজি পাণ্ডু হাসি হাসে,
ক্লান্ত কণ্ঠে কোকিলের যেন মুহুর্মুহু কুহুধ্বনি নিবে নিবে আসে!
দিবসের হৈম জ্বালা দীপ্ত দিকে দিকে, উজ্জ্বল জাজ্বল-অনিমিখ,
নিঃশ্বসিছে নিঃস্ব হাওয়া, হুতাশে মূচ্ছিত দশদিক্!
রৌদ্র আজি রুদ্র ছবি, আকাশ পিঙ্গল,
ফুকারিছে চাতক বিহ্বল,
খিন্ন পিপাসায় ;
হায়!
হায় !
আনন্দ-ধরায়
নাহি আজ আনন্দের লেশ,
চতুর্দিকে ক্রুদ্ধ আঁখি, চারিদিকে ক্লেশ।
সংবর ও মূর্তি, ওগাে একচক্র-রথের ঠাকুর !
অগ্নি-চক্ষু অশ্ব তব মূৰ্ছি' বুঝি পড়ে—আর সে ছুটাবে কত দূর?
সপ্ত সাগরের বারি সপ্ত অশ্বে তব করিছে শশাষণ তৃষ্ণাভরে,
তবু নাহি তৃপ্তি মানে, পিয়ে নদ, নদী, সােবরে ;-
পঙ্কিল পলে পিয়ে গােষ্পদে ও কূপে,
পুষ্পে রস—তাও পিয়ে চুপে!
তৃপ্তি নাহি পায় !
হায়!
গ্রীষ্মের সুর
সান্ত্বনা কোথায় ?
রৌদ্রের সে রুদ্র আলিঙ্গনে
জগতের ধাত্রী ছায়া আছে উষ্ম-মনে ;
আশাহত ক্ষুব্ধ নােক,—আকাশের পানে শুধু চায়,
ময়ূরের বৰ্হ সম ময়ুখের মালা বহিতেজে চৌদিকে বিছায় !
হৰ্ম্মতলে, জলে, স্থলে, স্নিগ্ধ পুষ্পদলে আজ শুধু অগ্নি-কণাক্ষরে,
হাতে মাথে ধূনি জ্বালি’ বসুন্ধরা কৃচ্ছ ব্রত করে ;
ওঠে না অনিন্দ্য চরু অমােঘ প্রসাদ,-
দেবতার মূর্ত আশীৰ্বাদ,
দীর্ঘ দিন যায়,
হায়!
হায় !
হৃদয় শুকায়।
নাহি বল, নাহিক সম্বল,
অন্তরে আনন্দ নাই, চক্ষে নাহি জল ।
মূক হয়ে আছে মন, দীর্ঘশ্বাসে অবসান গান,
বস্মৃত সুখের স্বাদ হৃদি অনুৎসুকধুক ধুক করে শুধু প্রাণ।
ক করিবে অনুযােগ ? দেবতার কোপ; কোথা বা করিবে অনুমোগ?
চারিদিকে নিরুৎসাহ, চারিদিকে নিঃস্ব নিরুদযােগ
নাহি বাষ্প-বিন্দু নভে,বরষা সুদূর ;
দগ্ধ দেশ তৃষায় আতুর,
ক্লান্ত চোখে চায় ;
হায়!
অন্তঃপুরিকা
আর যে আমার সইছে নারে সইছে না আর প্রাণে..
এমন করে কতদিন আর কাটবে কে তা জানে !
দিন গুণে দিন ফুরায় নাকো নিমেষ গণি তাই,
বুকের ভিতর হাঁফিয়ে ওঠে, আকুল চোখে চাই।
যে খাটিতে বসত সে জন বছি সেথায় গিয়ে,
দেখছি খুলে চিঠিটি তার ঘরে দুয়াের দিয়ে ;--
বেশী আমি পাইনি যে গাে পাইনি বেশী আর,
পারে যাবার একটি কড়ি একটি চিঠি তার।
হাসিয়েছিল কোন্ কথাতে,-হাছি মনে করে,
দেখতে হঠাৎ ইচ্ছে হ'য়ে চক্ষু এল ভরে।
শােবার ঘরে কবাট এটে ছবিটি তার লিখি,
হয় না কিছু,—সেইটি তবু নয়ন ভরে দেখি।
নানা কাজে ব্যস্ত থাকি, তবুও কেন ছাই,
মনটা ওঠে আকুল হয়ে, উদাস হয়ে যাই।
ডানা যদি দিতেন বিধি উড়ে যেতাম চলে,
সকল ব্যথা সইত, মাথা রাখতে পেলে কোলে।
সীতা সতী বুদ্ধিমতী,-প্রণাম করি পায়,
আজ বুঝেছি বনে কি সুখ, কি দুখ অযযাধ্যায়।
* *
আনন্দ-দেবতার প্রতি
এস প্রমােদ! পুলক! রভস হে!
আমি মুছেছি অশ্রুধার ;
আজ মুকুল নহে তো অবশ হে!
তায় নীহার নাহিক আর।
আজ ধরণী আঁচলে আবর’ গাে!
যত
কালিকার ঝরা ফুল,
পাখী কাকলি-কূজনে কুহর' গাে
নদী গাহ গাহ কুলুকুল।
তবু
নীহারে শিহরে ফুলদল !
পাখী
নীরব পুনর্বার !
নদী ভাসাইয়া আনে অবিরল
চিতার ভস্মভার !
আমি শ্মশানে বাসর রচিব গাে
পরি’ শুষ্ক ফুলেরি হার,
আমি নয়ন উপাড়ি রুধিব গাে
এই নয়নের বারিধার।
এস রভস-দেবতা! বঁধুয়া হে!
তুমি এস সখা একবার,
আমি রাখিব রাখিব রুধিয়া হে!
এই নয়নের বারিধার।
দরদী
(বাউলের সুর)
মনের মরম কেউ বােঝে না।
( এরা) হাসলে কাঁদে, কঁালে হাসে।
( আহা) দরদ দিয়ে কেউ দেখে না
(ওগাে) গরজ নিয়ে সবাই আসে।
( যেজন) হিয়ার হাসি কান্না বােঝে
(ওগাে) ছিলাম আমি তারি খোঁজে,
( হায় রে ) কাল বেলা ভাঙল মেলা
(তবু) বসেই আছি আসার আশে ।
বন্ধু! তােমায় বল্ব বা কি ?
আড়াল থেকেই মিলাই আঁখি
(আমি) প্রাণের খবর পাইনে চোখে
( শুধু) মুখ-চাওয়া সার দ্বারের পাশে ।
( ওগগা) মরমী কেউ মিত যদি
(তবে) বইত উজান জীবন-নদী-
(ওগাে) নিরবধি সেই দরদীর
( মােহন) বাঁশীর সুরে প্রেমােল্লাসে।
ৱিক্তা
(মালিনী ছন্দের অনুকরণে )
উড়ে চলে গেছে বুলবুল,
শূন্যময় স্বর্ণ-পিঞ্জর ;
ফুরায়ে এসেছে ফান,
যৌবনের জীর্ণ নির্ভর।
;
রাগিণী সে আজি মন্থর,
উৎসবের কুঞ্জ নির্জন ;
ভেঙে দিবে বুঝি অন্তর
মঞ্জীরের ক্লিষ্ট নিক্কণ ।
ফিরিবে কি হৃদি-বল্লভ
পুষ্পহীন শুষ্ক কুঞ্জে ?
জাগিবে কি ফিরে উৎসব
খিন্ন এই পুষ্প পুঞ্জে ?
ভাঙনে ভেঙেছে মন্দির
কাঞ্চনের মূৰ্ত্তি চূর্ণ,
বেলা চলে গেছে সন্ধির,
লাঞ্ছনার পাত্র পূর্ণ।
কনক-ধুৱা
;
কনক-ধুতুরা ! কনক-ধূতুরা !
পরিপূর তুমি বিষে
ও তনু-পাত্রে অতনু-সুষমা
উপচি উঠিল কিসে?
তুমি অপরূপ ওগগা রূপবতী !
অপ তব কথা।
মুকুলিত করি’ তুলিছ কেবলি
মৃ: ও মাদকতা।
উথলি উঠিছে একটি বৃন্তে
দুখের সঙ্গে সুখ,
মৃত্যু-অভেদ জীবন-মৃত্য!
মন করে উৎসুক ।
সােনার গেলাসে মুগ্ধ মদির!
কর্ণে কী কথা জপে!
ফেনগুঞ্জনে মত্তলােচনে
মৃত্যুর হাসি সপে ।
কনক-ধুতুরা ! কনক-ধুতুরা !
কিসে তুমি পরিপূর ?
মুগ্ধ নয়নে আমি তাের পানে
চেয়ে আছি তৃষাতুর।
চাতকের কথা
হে সরসী! তুমি স্বচ্ছ শীতল,
বলেছে আমায় অনেক পাখী ;
হায়, আমিও তৃষিত, তবু তাের পানে
নারিমু নারিনু ফিরাতে আঁখি !
তুমি সুন্দর, তুমি সুবিপুল,
সুলভ তােমার অগাধ বারি,
মাের সমুখে রয়েছ নিশিদিনমান
তবু তে ও জল ছুইতে নারি ।
নিয়ত আকাশে আশাপথ-চাওয়া,
নিত্য নিয়ত তৃষার জ্বালা,
তবু তাের পরে মাের ফিরিল না মন,
হায় গাে রূপসী সরসীবালা ।
ওগাে বাধাজল! করি’ কোলাহল
দর্দুরদল বলে তােরে,
হায় কাকের ভেকের তুমি আরাধ্যা
আমি তােরে সেবি কেমন করে ?
নিন্দা তােমায় করিনে গাে আমি,
নাই নাই মনে ঘৃণার কণা ;
খেলা-ছলে হেলা করিনে তােমায়,
পাই নি তেমন কুমন্ত্রণা।
৪২
কুহু ও কেকা
==
তৃষ্ণা আমায় দিয়েছেন বিধি,
সে তৃষা ফটিক-জলের তৃষা,
ওগো শান্তির আশা সুদূর আমার,
দহন আমার দিবস নিশা !
ক
আমি মেঘের রন্ধ্রে করি আনাগােনা,
বিজলীতে জ্বলি’ ফুকারি ত্রাহি ।
উধাও-ধাওয়ার হঠাৎ-পাওয়ার
চকিত-চাওয়ার তুলনা নাহি।
ওগাে বিধাতা আমায় এমন করেছে,--
দুষ্কর ব্রতে করেছে ব্ৰতী ;
তাই
পুষ্কর মেঘে মজে আছে মন,
নাই সে পুষ্করিণীর প্রতি।
হে সরসী! তুমি তারার আরসী,
স্বচ্ছ অগাধ আরামে ভরা ;
তবু আকাশে জলের রয়েছে যে দ্রোণী
সেই চাতকের তৃষ্ণা-হরা।
ৰােড়া হাওয়ায়
ঝােড়াে হাওয়ায় বােল উঠেছে কোলাহলের সাথ ?
আকাশ জুড়ে অকালে ওই ঘনিয়ে আসে রাত !
আজকে যারা ফিরত ঘরে
হারাল পথ পথের 'পরে
ধূলায় আঁখি বন্ধ, হ’ল অন্ধ অকস্মাৎ !
ঝোড়াে হাওয়ায়
ডাঙায় গাছের ডাল টুটিছে, বিষম ডামাডোেল,
জলে নায়ের হাল ছুটিছে,-বােল রে হরি বােল ।
তূর্ণ ছােটে ঘূণি হাওয়া
ফুরায় বুঝি পারে যাওয়া ;
পান্থ পাখী পালটে পাখা নিল মাঠের কোল।
যােজন জুড়ে মেঘে মেঘে বজ্র-আকর্ষণ,
বহুক হাওয়া ক্ষুরের ধারে,হবে সুবর্ষণ।
গম্ভীরা যে বুকের 'পরে
বসে আছে আড়ম্বরে,
দম্ভটা তার খর্ব হবে,-এ তার নিদর্শন।
ঝােড়ো হাওয়ার রােল শুনে আজ মেতেছে পরাণ !
সাবধানী ! তুই আজকে কারে করিস্ রে সাবধান।
মৃত্যু যে আজ চোখের আগে
নাচে মিলন-অনুরাগে,
বাহুতে তার মিলিয়ে বাহু গাইতে হবে গান !
ঝড়ের তালে নাচবে ধূলি উড়িয়ে ধূসর কেশ।
রুদ্রজটা পড়বে ছিড়ে-জুড়িয়ে যাবে দেশ।
স্বর্গ হতে গঙ্গা ঝরে
দিবে ভুবন স্নিগ্ধ করে ;
কুম্ভীরের ওই জিহ্বা-তালুর ঘুচবে পিঙ্গ বেশ ।
48
কুহু ও কেকা
জানি আমি অপূৰ্ব্ব ওই রুদ্র গঙ্গাধর,
যেথাই দাহ সুদুঃসহ সেইখানে তার ভর।
দুখের আদি,-সুখের নিদান,
তারি বরে দুঃখ-নিধান
মরণ করে অমৃত দান, শিব সে-ভয়ংকর ।
৩
-
ছুটুক না সে রুদ্র মরুৎ, নাই তাে কোনাে ভয়,
চেতনজড়ে না হয় হবে পাগড়ী-বিনিময় ;
নিশ্বাসে যার ঝঞা ছােটে,
প্রশ্বাসে প্রশান্তি ফোটে,
তার সুরে সুর মিলিয়ে মােরা মরণ করি জয়।
বজু কামনা
শূন্য জীবন নীরস হৃদয়
হায়
নীরব দহনে দহে,
ওগাে
লুপ্ত অশ্রু মরমের তলে
ফ-ধারায় বহে ;
রুদ্র আকাশ নিথর বাতাস
অন্ধ হুতাশে ভরে,
বরষণ-লােভে বিবশা ধরণী
বজ্র কামনা করে।
বজ কামনা হায় কুম্ভীরকের পিঙ্গল তালু আকাশ পিঙ্গ ছবি, জিহ্বার মত প্রান্তর ঢালু রৌদ্রে শুষিছে রবি ; খাকী রঙে খাক হ’ল দুই আঁখি দুনিয়াটা গেল খ’রে, ঘন-বরষণ-লালসে ধরণী বজ্ৰ কামনা করে ! হায় তাই আজ যেন সুখ নাহি দেহে বিশ্রাম গেহে স্বস্তি নাহিক প্রাণে, আঙার-ধানীর বাষ্প বিড়ােল শ্বসিছে সকল খানে! নাই ফুল ফল, ফলেনি ফসল ধূ ধূ ধূ তেপান্তরে, ফলের লালসে বন্ধ্যা ধরণী বজু কামনা করে। নাই ই হায় আর হিল্ মি কবে বহিবে সলিল ফেনমুখ ফণা তুলি? ঝিল্ মিল কবে দুলিবে সমীরে তাজা অঙ্কুরগুলি ? খালি কোল কবে ভরিবে আবার আর কত দিন পরে? সফলতা লাগি’ মৌনে ধরণী ওগাে বজ্ৰ কামনা করে !
৪৬ কুহু ও কেকা ওগাে বজ্রের রাজা অস্ত্র তােমার ওগাে হান একবার বেগে, ক্ষীণ বাষ্পের দীন উচ্ছাস পরিণত হাে মেঘে ; ঘনায়ে মিলায়ে কর সুনিবিড় তড়িত-জড়িত স্বরে, বধ-ভয় ভুলি’ বন্ধ্যা ধরণী বজ্র কামনা করে। আজ ওগো == বজ্র-দেবতা বজ্র তাে শুধু বধের যন্ত্র নয় ; বন্ধ্যা-জনের সন্তাপ-হারী, বন্ধন করে ক্ষয় ; মিলন ঘটায় কাঞ্চন-ডােরে ধরণী ও অম্বরে বন্ধ্যা ধরণী মরণ-দোসর বজ্র কামনা করে। 'ও যে তাই যক্ষের নিবেদন ( মন্দাক্রান্তা ছন্দের অনুকরণে ) পিঙ্গল বিল ব্যথিত নভতল, কই গাে কই মেঘ উদয় হও, সন্ধ্যার তন্দ্রার মূরতি ধরি’ আজ মন্দ্র-মন্থর বচন কও; সূর্যের রক্তিম নয়নে তুমি মেঘ। দাও হে কজ্জল পাড়াও ঘুম বৃষ্টির চুম্বন বিথারি’ চলে যাও—অঙ্গে হর্ষের পড়ক ধূম।
যক্ষের নিবেদন বৃক্ষের গর্ভেই রয়েছে আজো যেই—আজ নিবাস যার গােপনলােক সেই সব পল্লব সহসা ফুটিবার হৃষ্ট চেষ্টায় কুসুম হােক্ ; গ্রীষ্মের হাে শেষ, ভরিয়া সাদেশ স্নিগ্ধ গম্ভীর উঠুক্ তান, যক্ষের দুঃখের করহে অবসান, যক্ষ-কান্তার জুড়াও প্রাণ! শৈলের পইঠায় দাড়ায়ে আজি হায় প্রাণ উধাও ধায় প্রিয়ার পাশ, মূচ্ছার মন্তর ভরিছে চরাচর, ছায় নিখিল কার আকুল শ্বাস ! ভরপুর অশ্রুর বেদনা-ভারাতুর মৌন কোন্ সুর বাজায় মন, বক্ষের পঞ্জর কঁপিছে কলেবর, চক্ষে দুঃখের নীলাঞ্জন। রাত্রির উৎসব জাগালে দিবসেই, তাই তো তন্দ্রায় ভুবন ছায়, রাত্রির গুণ সব দিনেরে দিলে দান, তাই তাে বিচ্ছেদ দ্বিগুণ, হায় ; ইন্দ্রের দক্ষিণ বাহু সে তুমি দেব ! পূজ্য ! লও মাের পূজার ফুল, পুষ্কর বংশের চূড়া যে তুমি মেঘ ! বন্ধু ! দৈবের ঘুচাও ভুল! নিষ্ঠুর যক্ষেশ, নাহিক কৃপালেশ, রাজ্যে আর তার বিচার নেই, অজ্ঞার লঙ্ঘন করিল একে, আর শাস্তি ভুঞ্জা দুজনকেই! হায় মাের কান্তার না ছিল অপরাধ মিথ্যা সয় সেই কতই ক্লেশ, দুৰ্ভর বিচ্ছেদ অবলা বুকে বয়, পাংশু কুন্তল, মলিন বেশ। বন্ধুর মুখ চাও, সখা হে সেথা যাও, দুঃখ দুস্তর তরাও ভাই, কল্যাণ-সংবাদ কহিয়ে কানে তার, হায়, বিলম্বের সময় নাই ; বৃন্তের বন্ধন আশাতে বাঁচে মন, হায় গাে, বল তার কতই আর ? বিচ্ছেদ-গ্রীষ্মের তাপেতে সে শুকায়, যাও হে দাও তায় সলিল-ধার। নিৰ্ম্মল হােক্ পথ,শুভ ও নিরাপদ, দূর-সুদুর্গম নিকট হােল্ক হ্রদ, নদ, নিঝর, নগরী মনােহর, সৌধ সুন্দর জুড়া চোক্; চঞ্চল খঞ্জন-নয়না নারীগণ বর্ষামঙ্গল করুক্ গান, বর্ষার সৌরভ, বলাকা-কলরব, নিত্য উৎসব ভরু প্রাণ।
৪৮
কুহু ও কেকা
পুষ্পের তৃষ্ণার করহে অবসান, হােক্ বিনিঃশেষ যূথীর ক্লেশ,
বর্ষায়, হায় মেঘ! প্রবাসে নাই সুখ,হায় গো নাই নাই সুখের লেশ
যাও ভাই একবার মুছাতে আঁখি তার, প্রাণ বাঁচাও মেঘ! সদয় হও,
“বিদ্যুৎ-বিচ্ছেদ জীবনে না ঘটুক্” বন্ধু ! বন্ধুর আশীষ লও।
দুর্দিনে
মলিন আঁচল চক্ষে চাপিয়া
কে তুমি ভুবনে এলে,
অসীম অকূল দুর্ভাবনার
পাংশুল ছায়া মেলে!
হে নীরবচারী, বুঝিতে না পারি
মুখে কেন নাহি ভাষ,
কোন্ অঞর অতলে ডুবিয়া
হিম হয়ে গেছে শ্বাস?
ছিন্ন-বসন ! রিক্ত-ভূষণ !
গভীর-শ্বসন ! ওরে !
কেন গুমরিয়া উঠিস কঁদিয়া ?
কি বেদনা বল মােরে।
বিহ্বল সুর ডাকে দর্দুর,
চাতক উড়িয়া বসে;
মদালস তব মূরতি—সে কোন্
শােকের মাদক রসে।
দুদ্দিনে
৪৯
সহসা শিহরি’ চীৎকার কেন
করিলি, রে উন্মাদ,
রুদ্ধ ব্যথার রূঢ় তাড়নার
এই কি আৰ্তনাদ !
ত্রাসে মুদে এল বিশ্বলোকের
আয়ত চোখের পাতা,
আধা শাদা হয়ে গেল শঙ্কায়
বিকচ নীপের মাথা।
অকালে দিনের আলোেক হরিয়া
কে এলে গাে চুপে চুপে,
বিজুলির হাসি পাণ্ডুর করি’
দেখা দিলে ছায়ারূপে ।
আঁচল তােমার তিতিয়া ভূতলে
অশ্রু ঝরিয়া পড়ে,
বেদনায় তরু-বল্লরী বীথী
এ পাশ ও পাশ নড়ে।
ওগাে দুর্দিন! কে পূজিল তােমা
ভূই-চাপা ফুল দিয়া ।
চাদ-আঁকা পাখা দোলায় ময়ূর
বিস্ময়াকুল হিয়া।
মূচ্ছিত ধরা আঁখি মেলে, তােরে
পাইয়া ব্যথার ব্যথী,
খুলে গেল তার হাজার নেত্র,
ফুটিল হাজার যূথী !
৪
কুহু ও কেকা
;
ওগাে কামচারী। সন্তাপহারী ।
অন্তর তুমি জাননা,
বিষাদের বেশে এসে দেখা দাও,
ব্যথিতে বক্ষে টানাে
অশ্রু ঘুচাতে, ব্যথিতের সাথে
অশ্রু মিশাতে হয়,
তুমি তা জানাে, বন্ধু পুরাণাে!
দুর্দিন সহৃদয় !
ওগাে দেবতার অশ্রু প্লাবন।
তােমার পাবন-ধারে
মলিনতা তাপ ঘুচাও মহীর
উৰ্বর কর তারে ;
নীল পদ্মের মথিত নীলিমা
ব্যথিত চক্ষে দাও,
ঘন চুম্বন দান কর, ওগাে
বুকে নাও ! বুকে নাও !
অয়
মেঘ দেখে কেউ করিস্ নে ভয়,
আড়ালে তার সূর্য হাসে।
হারা শশীর হারা হাসি
অন্ধকারেই ফিরে আসে।
দখিন হাওয়ার অমােঘ বরে
রিক্ত শাখাই পুষ্পে ভরে,
সিক্ত যে প্রাণ অশ্রুধারায়
প্রাণের প্রিয় তারি পাশে।
বর্ষা
ঐ দেখ গাে আজকে আবার পাগলি জেগেছে,
ছাই মাখা তার মাথার জটায় আকাশ ঢেকেছে।
মলিন হাতে ছুয়েছে সে ছুয়েছে সব ঠাই,
পাগল মেয়ের জ্বালায় পরিচ্ছন্ন কিছুই নাই।
মাঠের পারে দাড়িয়েছিল ঈশান কোণেতে,
বিশাল-শাখা পাতায়-ঢাকা শালের বনেতে ;
হঠাৎ হেসে দৌড়ে এসে খেয়ালের ঝোঁকে,
ভিজিয়ে দিলে ঘরমুখাে ঐ পায়রা গুলােকে।
বজ্ৰহাতের হাততালি সে বাজিয়ে হেসে চায়,
বুকের ভিতর রক্তধারা নাচিয়ে দিয়ে যায় ;
ভয় দেখিয়ে হাসে আবার ফিফিকিয়ে সে,
আকাশ জুড়ে চিমিকিয়ে চিমিকিয়ে রে!
কুহু ও কেকা
ময়ুর বলে কে গাে ? এযে আকুল-করা রূপ ।
ভেকেরা কয় নাই কোনাে ভয়', জগৎ রহে চুপ ;
পাগলি হাসে আপন মনে পাগলি কাঁদে হায়,
চুমার মত চোখের ধারা পড়ছে ধরার গায়।
কোন্ মােহিনীর ওড়না সে আজ উড়িয়ে এনেছে,
পূবে হাওয়ায় ঘুরিয়ে আমার অঙ্গে হেনেছে ;
কে দেখি চক্ষে মুখে লেগেছে এক রাশ,
ঘুম-পাড়ানাে কেয়ার রেণু, কদম ফুলের বাস!
বাদল হাওয়ায় আজকে আমার পাগলি মেতেছে ;
ছিন্ন কঁাথা সূৰ্য্যশশীর সভায় পেতেছে !
আপন মনে গান গাহে সে নাই কিছু দৃপাত,
মুগ্ধ জগৎ, মৌন দিবা, সংজ্ঞাহারা রাত ।
নাগপঞ্চমী
হায় ! প্রতি বৎসরে
হাজার হাজার সােনার মানুষ নাগ-দংশনে মরে।
সেই নাগে মােরা পূজি!
সর্প-পূজার মন্ত্রের লাগি’ বেদ-সংহিতা খুজি।
নাগপঞ্চমী করি ।
গ্রন্থিল বাঁকা হিন্তাল-শাখা ধরিতে আমরা ডরি।
দুধকলা দিই সাপে!
পূজা খেয়ে খল দংশন করে!-মরি গাে মনস্তাপে।
জানিনে কিসে কি হয়,
মৃত্যুরে পূজি’ অমরতা-লাভ,—কিছু বিচিত্র নয়।
রামধনু
পুণ্য আখণ্ডল-ধনু মণ্ডিত কিরণে,
রম্য তুমি জলদের নীল শিলাপটে,
স্ফুরিত প্রসূনে আর প্রদ্যোত রতনে
রচিত ও তনুচ্ছদ ; ধূর্জটির জটে
ধূপছায়া শাটি-পরা জাহ্নবীর মত
মেঘমাঝে মূর্তিখানি মনােজ্ঞ তােমার ;
শ্যাম অঙ্গে রাখী সম, শােভন সতত ;
হর্ষ-কলতান বিশ্বে তােল বারম্বার !
ইন্দ্রধনু তুমি কিহে পুরাণ-বর্ণিত ?
কিম্বা রামধনু নাম যথার্থ তােমার ?
প্রজাবৎসলের কর করি’ অলঙ্কৃত
লভিছ কি আজো তুমি শ্রদ্ধা সবাকার?
রামধনু! রামরাজ্য অতীতে বিলীন,
তুমি তারি রম্য-স্মৃতি চির-অমলিন।
গ্রাবটের গান
‘াড়া গাে তােরা ঘিরিয়া দাড়া নীরব নত নেত্রে,
দেব আজি জীবন-ধারা বরিষে মরুক্ষেত্রে।
শুনিস নে কি ঘর্ঘরিয়া
চলেছে কে ও স্বৰ্গ দিয়া,
গগন-পথে বিপুল রথে হেলায়ে হেম বেত্রে !
৫৪
কুহু ও কেকা
আবৃত-করা প্রাবৃটু এল মেলিয়া মেঘ-পক্ষ,
বিবশা ধরা বিতথ বেশ, শ্বসিছে মুহু বক্ষ।
অজানা ভয়ে অচেনা সুখে
কথাটি কারাে নাহিক মুখে,
পাখীর গেছে বচন হরি’ আঁখির থির লক্ষ্য।
বৃহৎ সুখে বৃহিতে কি দিগগজেরা গর্জে ?
মিলাবে কিও অমরা ধরা আকাশ ভাঙি' বজে ?
ধরণী আছে প্রতীক্ষাতে
অর্ঘ্য ধরি’ স্বিন্ন হাতে,
সূচিত স্বরভঙ্গ তার কেকার রবে যড় জে !
দাদুরী করে উলুধ্বনি, দেবতা নামে মর্তে,
উশীর হ’ল সুরভি আজি ধূপেরি পরিবর্তে !
স্তব্ধ চলা, বন্ধ খেয়া,
একাকী উকি দ্যায় গাে কেয়া,
জ্বালায়ে মণি জাগিছে ফণী ত্যজিয়া নিজ গর্তে।
দেবতা নামে! পুলকে হের দুলােকে দোলে সিন্ধু।
রথের ধূলে মলিন হ’ল তপন তারা ইন্দু।
বাদল-বায়ে মন্ত্র পড়ি
বাজায় কেও সাঁঝের ঘড়ি?
থাকিতে বেলা ! বিধান বিধি মানেনা একবিন্দু।
অন্ধ-করা অন্ধকারে নাহিরে নাহি রন্ধ্র ।
বিরামহারা অধীর ধারা পাগল পারা ছন্দ।
নূতন মানুষ
হাজার-তারা সেতারখানি
বলিছে কিও ডাগর বাণী ।
তরল তারে উঠিছে ধ্বনি মেদুর মৃদু মন্দ!
দেবতা চুমে ধরার আঁখি অলক চুমে রুক্ষ !
এলায়ে পড়ে বাদল-মালা-রূপালি জরি সূক্ষ্ম !
চুমিয়া তনু কুসুমি' তােলে,
হষ-দোলে পরাণ দোলে !
সেচন করে সফল করে মােচন করে দুঃখ।
কঁড়াগাে তােরা রাখীর ডাের বাঁধিয়া নে গো এস্তে ;
দেবতা আসি’ আশীষ-ধারা বরিষে আজি মস্তে।
দেখিস্ নে কি নীলাম্বরে
এসেছে করী-কুম্ভ-'পরে,
আয়ত চোখে বিজুলি লেখা, উশীর মাখা হস্তে।
মুল মানুষ
ঝুলিয়ে দোলা দুলিয়ে দে।
দুনিয়াতে আজ নূতন মানুষ ! ভুলিয়ে নে রে ভুলিয়ে নে।
দুয়ার পরে আমের মুকুল ;
ঝুলিয়ে দে রে অশােক-বকুল,
দেব, তা আসে শিশুর বেশে, হায় রে, স্নেহের দান সেধে।
ঝুলিয়ে দোলা দুলিয়ে দে।
নূতন আঁখির সােনার পাতায় সােহাগ-কাজল বুলিয়ে দে !
নূতন আওয়াজ কান্না কাঁদে।
নূতন আঙুল আঙুল বাঁধে।
নূতন অধর পীযুষ পিয়ে নূতন মায়ার ফঁদ কেঁদে!
বুলিয়ে দোলা দুলিয়ে দে!
নরম আঁচে সদ্য-দুধের ফেনার রাশি ফুলিয়ে দে !
প্রাচীন দোলার নূতন
মালিক
এসেছে ঐ ঐন্দ্রজালিক!
অরাজকের আপনি-রাজা রাখবে হৃদয়-মন বেঁধে।
ঝুলিয়ে দোলা দুলিয়ে দে !
দোলনা ঘিরে কঁাকণ কারা বাজায় চামর দুলিয়ে রে।
মরণ-বচন-মেলার মাঝে
ওই রে শুভ শঙ্খ বাজে,
পুরাণাে দীপ চায় গাে হেসে, নূতন মানুষ চায় কেঁদে!
প্রথম হাসি
দোলার ঘরে শুনছি গাে আজ নূতন হাসির ধ্বনি।
ফুলঝুরিতে ফুকি হাসির রাশি।
রূপার ঘুঙর জড়িয়ে হাতে বাজায় কে খঞ্জনী !
কঁদুনে ওই শিখলে কোথায় হাসি।
পিচ কারীতে হানলে কেরে গােলাপজলের ধারা ?
ঝারার পাখী কয় কি হাসির কথা ?
বরফ-গলা ঝর্ণা যেন জাগল পাগল-পারা!
স্বচ্ছ প্রাণে সরল চঞ্চলতা ।
প্রথম হাসির পান সুপারি কে দিল ওর মুখে ?
হাসির কাজল কে পরালে চোখে ?
হাসছে খােকা ! হাসছে একা ! হাসছে অতুল সুখে।
এমন হাসি কে শিখালে ওকে ?
কলস্বরে হাসছে ! ওরে ! হাস্ছে আপন মনে!
দেখ-হাসি পরীর হাসি দেখে !
খুলেছে আজ হাসির কুলুপ কোন্ কুঠুরির কোণে,
মাণিকে তাই আকাশ গেল টেকে !
আনন্দের এই পরম অন্ন—প্রথম অন্ন-হাসি
কোন্ দেবতা প্রসাদ দিল ওকে ?
কঁদুনে আজ নূতন করে জন্মেছে রে আসি’
জন্মেছে সে হর-হাসি-লােকে।
ভাশী
টোপর পানায় ভল ডোেব নধর লতায় নয়ান-জুলী,
পূজা-শেবের পুষ্পে পাতায় ঢাল যেন কুণ্ডগুলি।
তাজা আতার ক্ষীরের মত পূবে বাতাস লাগছে শীতল,
অতল দীঘির নি-তল জলে সাঁৎরে বেড়ায় কাৎলা-চিতল ।
ছাতিম গাছে দোনা বেঁধে দুলছে কাদের মেয়েগুলি,
কেয়া-ফুলের রেণুর সাথে ইশে-গুড়ির কোলাকুলি ;
আকাশ-পাড়ার শ্যাম-সায়রে যায় বলাকা জল সহিতে,
ঝিল্লি বাজায় ঝাঁঝর, উলু দেয় দাদুরী মন মােহিতে!
কলকে ফুলের কুঞ্জবনে জ্বলছে আলাে খাসূগেলাসে,
অভ্র-চিকণ টিকলি জলের ঝলমলিয়ে যায় বাতাসে ;
টোকার টোপর মাথায় দিয়ে নিড়ে হাতে কে ওই মাঠে ?
গুড়-চালেতে মিলিয়ে কারা ছিটায় গায়ে জলের ছাটে ?
নলী রাতে চাষার সাথে চষা-ভূয়ের হচ্ছে বিয়ে,
হচ্ছে শুভদৃষ্টি বুঝি মেঘের চাদর আড়াল দিয়ে ;
ক’নের মুখে মনের সুখে উঠছে ফুটে শ্যামল হাসি,
চাষার প্রাণে মধুর তানে উঠছে বেজে আশার বাঁশী ।
বাঁশের বাঁশী বাজায় কে আজ? কোন্ সে রাখাল মাঠের বাটে?
অগাধ ঘাসে দাড়িয়ে গাভী ঘাসের নধর অঙ্গ চাটে।
আজ দোপাটির বাহার দেখে বিজলী হ’ল বেঙা-পিতল,
কেয়া ফুলের উড়িয়ে ধ্বজা পূবে বাতাস বইছে শীতল।
-
তখন ও এখন
( রুচিরা)
তখন কেবল ভরিছে গগন নূতন মেঘে,
কদম-কোরক দুলিছে বাদ-বাতাস লেগে ;
বনান্তরের আসিতেছে বাস মধুর মৃদু,
ছড়ায় বাতাস বরিষা-নারীর মুখের সীধু,
তখন কাহার আঁচলে গােপন যূথীর মালা
মধুর মধুর ছড়াইত বাস—কে সেই বালা।
বিপাশ হিয়ার বিনাইত ফাঁস অলক রাশে,
সুদূর সুদূর স্মৃতিখানি তার হিয়ায় ভাসে।
এখন বিভায় মহামহিমায় আকাশ ভরা,
শরৎ এখন করিছে শাসন বিপুল ধরা ;
এখন তাহায় চেনা হবে দায় নূতন বেশে,
তরুণ কুমার কোলে আজি তার হায় হেসে।
লুকাও লুকাও লালসা-বিলাস লুকাও ত্বরা,
বাসর রাতির সাথীটি -সে আর না দ্যায় ধরা ;
এখন কমল মেলিতেছে দল সলিল মাঝে,
বিলােল চপল বিজুলি এখন লুকায় লাজে ।
কিশাের প্রাণের কোথা সে ফেনিল প্রেমের পাতি,
কোথায় গাে সেই নব বয়সের নূতন সাথী ;
বিলাস-লীলায় দেখে না সে আর বারেক চাহি,
খেলার পুতুল কোথা পড়ে ?—আজ খবর নাহি ।
পুতুল পরাণ পেয়েছে গাে তার সােহাগ পেয়ে,
নূতন আলােক প্রকাশিছে তাই আনন ছেয়ে !
নূতন দিনের মাঝে পুরাতন লুকায় হেসে,
নূতন দুয়ার দেউলে ফুটাও নিশির শেষে।
“ওগাে”
কিছু বলে ডাকিনেকো তারে,
ডাতে হলে বলি কেবল ‘ওগাে!'
ডাকি রে হাজারাে দরকারে
জীবন-রণে সেই জেনারল টোগাে !
সন্ধি এবং বিগ্রহেরি মাঝে
মুহুর্মুহু চাই তারে সব কাজে ;
ডাতে কিন্তু বাধছে সম্বােধনে,
ডাতে গিয়ে এগিয়ে দেখি—“No Go
লজ্জা কেমন জোগায় এসে মনে
তাইতাে তারে ডাকি সেরেফ ‘ওগাে।
ছলে ছুতায় ডাছি সকাল থেকে
‘চাবিটা কই ? কাগজগুলাে ?—ওগাে।
‘পানের ডিবে?—কোথায় গেলে রেখে ?
হাঁক-ডাকেতে ডাকাত আমি বরাঘাে।
টানতে সদাই চাই গাে তারে প্রাণে
শব্দ খুজে পাইনে অভিধানে,
ভাষার পুজি শূন্য একেবারে,-
টাকশালে তার হয় না নূতন যােগও ;
মনগড়া নাম চাইরে দিতে তারে,
শেষ-বরাবর কিন্তু বলি ওগাে ।
-
বলব ভাবি ‘প্রিয়া’ ‘প্রাণেশ্বরী’
ছেড়ে দিয়ে শুনছ? ওগাে। হাঁগাে’ ;
বতে গিয়ে লজ্জাতে হায় মরি
ও সম্বােধন ওদের মানায় নাকো।
কাশ ফুল
ওসব যেন নেহাৎ থিয়েটারী
যাত্রা-দলের গন্ধ ওতে ভারি,
‘ডিয়ার’টাও একটু ইয়ার-ঘেঁষা,
‘পিয়ারা’ সে করবে ওদের খাটো,
এর তুলনায় ‘ওগাে’ আমার খাসা,
যদিও,মানি—একটু ঈষং মাঠো।
ঈষৎ মাঠে। এবং ঈষৎ মিঠে
এই আমাদের অনেক দিনের ওগো
চাষের ভাতে সদ্য ঘিয়ের ছিটে
মন কাড়িবার মস্ত বড় Rogue ও!
ফুল-শেষে সেই ‘মুখে-মুখের’ ওগাে!
রােগের শােকের দুঃখ-সুখের ‘ওগাে !
সব বয়সের সকল রসে ঘেরা,
নয় সে মােটেই একপেশে একচোখাে,
বাংলা ভাষা সকল ভাষার সেরা
স্নিগ্ধ মধুর ডাকের সেরা ‘ওগাে।
কাশ ফুল
হােথা
বরষার ঘন-যবনিকা খানি
সহসা গিয়েছে খুলি,
ঘাসের সায়র ফেনিল করেছে
কাশের মুকুলগুলি ।
হেথা
ওই
তুলি সমতুল শাদা কাশ ফুল
আলাে করে আছে ধূলি,
শারদ জোছনা অমল করিতে
ধরণী ধরেছে তুলি!
যেন
কুহু ও কেকা
যেন
রাতারাতি সুধা-ধবলিত করি’
দিবে গাে কাজল মেঘে,
গােপনে স্বপনে তুলি লাখে লাখ
সহসা উঠেছে জেগে !
তাই
কিছু রাখিবে না পাংশু ধূসর
কিছু রাখিবে না রুখু,
আকাশের চাঁদে বুলাইতে চায়
আপনার রং টুকু !
বাতাসের বুকে বুলিছে ধরার
ধৃত-তূলি অঙ্গুলি,
জোছনায় রং ফলাইতে চায়
কাশের ক্ষুদ্র তুলি!
তাই
'ওগাে
জোনাকী
ওই
একটি দু’টি পাতার পরে
একটু মৃদু আলাে,
দেখতে ভারি নূতন, ওরে
কেমন লাগে ভালাে ।
আয় জোনাকী বুকটি ভরে
একটু নিয়ে আলাে,
আঁধার রাতি বাদল সাথী
চাদের ভাতি কালাে।
যেটুকু তাের দেবার আছে
দিয়ে দে তুই আজ
ফুল-সাঞি
? •
ও যে
তারার মত নাই বা হ’ল
তাতেই বা কি লাজ?
ঘােট ?—সে তত ভালােই আরাে
ছােট বলেই মান ;
দুঃখীজনের ভিক্ষা মুঠি,
দানের সেরা দান !
থাক্ না তারা তপন শশী
থাক্ না যত আলল,-
তাদের মােরা করব পূজা,
বাসব তােরেই ভালাে।
স্কুল-সাoিn
মনে যে সব ইচ্ছা আছে
পূরবে না সে তােমায় দিয়ে,
তাইতে প্রিয়ে! মন করেছি
আরেকটিবার করব বিয়ে।
হাছ কিও? ভাবছ মিছে ?
মিথ্যা নয় গাে মিথ্যা নয় ;
মন যা’ বলে শুতে হবে,
মনের নাম যে মহাশয়।
মন বলেছে ‘বিয়ে কর’
কাজেই হবে করতে বিয়ে ;
এবার কিন্তু ফুলের সঙ্গে,
চলছে না আর মানুষ নিয়ে ;
কুহু ও কেকা
মনের কথা মনই জানে ;
লুকিয়ে কি ফল তােমার কাছে ?
মন সে বড় কেও-কেটা নয়
মনের নিজের মর্জি আছে।
মন বলেছে বাসলে ভালাে
পুড়তে হবে এক চিতাতে ;
মৃত্যু আমায় করলে দাবী
মরতে তুমি পারবে সাথে?
পারই যদি ;—তাতেই বা কি?
আইন তােমায় বাঁধবে, প্রিয়ে।
কাজেই দেখ,—যা বলেছি
চবে নাকো তােমায় দিয়ে।
এবার বিয়ে ফুলের কুলে,
জ্যোৎস্না-ধারায় অঙ্গ ধুয়ে,
হ’ক সে চাপা কিম্বা গােলাপ
আপত্তি নেই বকুল জুয়ে।
আন্-ঘরে কিশাের কুঁড়ি
মনের গােপন পাজী দেখে,
বাদীর মত আব বেছে
বনের বান্দাবাজার থেকে।
ফুল-সাঞি
সােহাগ দিয়ে রাখব ঘিরে
ঢাক্ব কভু প্রাণের নীড়ে
ইচ্ছা হলে তুলব শিরে,
ইচ্ছা হলে ফেলব ছিড়ে।
মজ্জি হ'লে হাজারটিকে
পরব গলায় গেঁথে মালা,
ঝগড়াঝাটির নেইকো শঙ্কা
সতীন-কাটার নেইকো জ্বালা ।
নেইকো দ্বন্দ্ব দু’ইচ্ছাতে,
নেইকো লােকের নিন্দাভয়।
—হাচ্ছ ? হাস। কিন্তু প্রিয়ে
করব বিয়ে সুনিশ্চয়।
ফুল-সাঞি যে ফকির আছে
ফুলকে তারা ভালবাসে,
তাদের ধারা ধরব এবার,-
থাক্ব মগন ফুলের বাসে।
•
থাব ডুবে অগাধ রূপে
কুরূপ কাটা দেখব নাকো;
ফুল নিয়ে ঘর করব এবার
তােমরা সবাই সুখে থাকো।
কুহু ও কেকা
তার পরে দিন আসবে যখন
মরতে আমি পারব সুখে,
ইতস্ততঃ করবে না ফুল
থাতে একা শবের বুকে।
ফুল—সে আমার সঙ্গে যাবে-
পুড়ব মােরা এক চিতাতে ;
দেখি তােরা দেখি সবাই
যেতে সে ঠিক্ পারবে সাথে।
ভেবেছিলাম প্রথম প্রিয়ে।
তােমায় এসব বলব নাকো,
লুকিয়ে করে আব বিয়ে
লুকিয়ে হবে সাতটি পাকও।
কিন্তু ছাপা রইল না, হায় ;
মনের কথাগােপন অতি--
বেরিয়ে গেল কথায় কথায়,
কথায় বলে মন-না-মতি।
মনের ভিতর মর্জি আছেন
নবাবী তাঁর অনেক রকম,
মনের কথা বললে খুলে
টিকারী সে করবে জখম।
ফুল-সাঞি
লুপ্ত যুগের অস্থিগুলাে
গুপ্ত আছে মনের ভিতে,
সভ্যতার এই সৌধতলেই,
বর্তমান এই শতাব্দীতে ।
=
তাই মগজের পােড়াে কোঠায়
অন্ধকারে ঘুরছে চাবী,
বসছে উঠে গঙ্গাযাত্রী ;
সহমরণ করছি দাবী।
বচন এই বে সম্প্রতি মন
মগন আছে ফুলের রূপে,
নইলে কি যে ঘত বিপদ!
বলব তাহা তােমায় চুপে ?-
মরণ-দায়ে গেছ বেঁচে ;
পালাও প্রিয়ে প্রাণটা নিয়ে ;
ফুল-সাঞিদের মতন আমি
ফুলকে এবার করব বিয়ে!
জবা
আমারে লইয়া খুসী হও তুমি
ওগাে দেবী শবাসনা !
আর খুজিয়ােনা মানব-শশাণিত
আর তুমি খুজিয়ােনা।
আর মানুষের হৃৎপিণ্ডটা
নিয়ােনা খঙ্গে ছিড়ে,
হাহাকার তুমি তুলােনা গাে আর
সুখের নিভৃত নীড়ে।
এই দেখ আমি উঠেছি ফুটিয়া
উজলি' পুষ্প-সভা,
ব্যথিত ধরার হৃৎপিণ্ড, গাে!
আমি সে রক্তজবা।
তােমার চরণে নিবেদিত আমি
আমি সে তােমার বলি,
দৃষ্টি-ভােগের রাঙা খপরে
রক্ত-কলিজা কলি।
আমারে লইয়া খুসী হও ওগাে ।
নম দেবী নম নম,
ধরার অর্ঘ্য করিয়া গ্রহণ
ধরার শিশুরে ক্ষম।
ছায়াচ্ছন্ন
ছিন্ন ছায়া ঘনিয়ে এল
ঘুমে নয়ন আলা,
ঘুমাক্ আহা ঘুমাক্ তবে
বালা ;
হাওয়ার ভরে যায় পরীরা,
ঢেউয়ের ফণায় নিব ল হীরা,
জড়িয়ে গেল ললাট ঘিরে
নিকুসুমের মালা !
ঘুমাক্ আহা ঘুমাক্ তবে
বালা।
-
তােলে নি আজ বৈকালী ফুল,
ভরে নি আজ থালা,
ছায়ায় ছাওয়া রূপের রসের
ডালা;
গন্ধ তৃণের গহন শ্বাসে
শিউলি কুঁড়ি ঝিমিয়ে আসে,
তন্দ্রা-ভারে পড়ল ভেরে
আঁধারে ডাল-পালা
ঘুমা আহা ঘুমাক্ তবে
বালা।
কুহু ও কেক।
শিয়রে থােও সােনার কাঠি
সন্ধ্যা-মেঘে ঢালা,
খণ্ড চাদের দীপখানি হাে
জ্বালা;
হাওয়ার মুখে নাই কোনাে বােল,
অশথ পাতায় দেয় না সে দোল,
আঁধার শুধু কোল ভরেছে,
হিমে শীতল-কালা !
ঘুমা আহা ঘুমাক্ তবে
বালা !
শুবে না সে আজ ঝিঝিদের।
রাত্রিব্যাপী পাল,
দেখবে না গাে বনে জোনাক্--
জ্বালা;
পর্দাখানি দাও গাে টানি
ঘুমিয়ে গেছে আলাের রাণী, ,
লুপ্ত-শিখা সােনার প্রদীপ
মৃত্যু-ভুবন আলা;-
ঘুমিয়ে গেছে ঘুমিয়ে গেছে
বালা।
সৎকান্তে
রেখে এলাম এ-যাবার পথের মােড়ে ;
সেই কথাটি জানাই প্রভু ! করজোড়ে !
নেহাৎ শিশু নয় সেয়ানা,
অচেনা তার মােল আনা,
ভয় যদি পায় নিয়াে তুলে অভয় ক্রোড়ে,
প্রভু আমার ! এলা-চলা পথের মােড়ে।
তােমার পায়ে সপে দিয়ে--নির্ভাবনা ;
নইলে প্রভু ! সইত কভু যম-যাতনা ?
যম—নিয়মের ভৃত্য তােমার,-
চিতার শিখা অঙ্গুলি তার,
সেই আঙুলে নেয় সে চুনি’ রত্ন-কণা ;
তােমার হাতে সপে সে হয় নির্ভাবনা !
সপে গেলাম প্রভু! তােমার চরণ-ছায়ে,
মুক্ত হ’লাম তােমার দয়ায় সকল দায়ে ;
ফিরিয়ে তােমার গচ্ছিত ধন
হাল্কা হয়ে গেল জীবন,
মায়ের বুকের রত্ন দিলাম বিশ্ব-মায়ে,
ওগাে প্রভু! সপে গেলাম তােমার পায়ে।
রেখে গেলাম তুমি-দোসর পথের মােড়ে,
সেই কথাটি জানাই তােমায় করজোড়ে ;
জানি তুমি নেবেই কোলে,
তবু তােমায় যাচ্ছি ব'লে,-
বিশ্বমায়ে বলছি,—অবােধ,—নিতে ওরে ;
দাড়িয়ে তােমার যম-জাঙালের বক্র মােড়ে।
ছিন্ন
মুকুল
সব চেয়ে যে ছােটো পীড়ি খানি
সেই খানি আর কেউ রাখে না পেতে,
ছােটো থালায় হয় নাকো ভাত বাড়া,
জল ভরে না ছােট্টো গেলাসেতে ;
বাড়ীর মধ্যে সব চেয়ে যে ছােটো
খাবার বেলায় কেউ ডাকে না তাকে,
সব চেয়ে যে শেষে এসেছিল
তারি খাওয়া ঘুচেছে সব আগে।
সব চেয়ে যে অল্পে ছিল খুসী,
খুসী ছিল ঘেষাঘেষির ঘরে,
সেই গেছে, হায়, হাওয়ার সঙ্গে মিশে
দিয়ে গেছে জায়গা খালি করে ;
ছেড়ে গেছে, পুতুল, পুতির মালা,
ছেড়ে গেছে মায়ের কোলের দাবী,
ভয়-তরাসে ছিল যে সব চেয়ে
সেই খুলেছে আঁধার ঘরের চাবী।
;
চলে গেছে একূলা চুপে চুপে,
দিনের আলাে গেছে আঁধার করে
যাবার বেলা টের পেলে না কেহ
পারলে না কেউ রাখতে তারে ধরে।
চলে গেল,-পড়তে চোখের পাতা,
বিসর্জনের বাজনা শুনে বুঝি ?
হারিয়ে গেল অজানাদের ভিড়ে,
হারিয়ে গেল,—পেলাম না আর খুজি।
দুই চাপা
হারিয়ে গেছে হারিয়ে গেছে, ওরে !
হারিয়ে গেছে বােবলা সেই বাঁশী,
হারিয়ে গেছে কচি সে মুখখানি
দুধে ধােয়া কচি দাতের হাসি।
আঁচল খুলে হঠাৎ স্রোতের জলে
ভেসে গেছে শিউলি ফুলের রাশি,
ঢুকেছে হায় শ্মশান ঘরের মাঝে
ঘর ছেড়ে তাই হৃদয় শ্মশান-বাসী।
সব চেয়ে যে ছােটো কাপড়গুলি
সে গুলি কেউ দেয় না মেলে ছাদে,
যে শয্যাটি সবার চেয়ে ছােটো
আজকে
সেটি
সব চেয়ে যে শেষে এসেছিল
সেই গিয়েছে সবার আগে স’রে,
ছােট্ট যে জন ছিল রে সব চেয়ে
সেই দিয়েছে সকল শূন্য করে।
শূন্য পড়ে কঁাদে ;
দুই চাপা
দিনের আলােয় লাগল রে নীল তন্দ্রা-লেখা ।
নিবিড় সুখে কি কৌতুকে বাজল কেকা।.
রসিয়ে রবি-রশ্মি হােথা
পূবে হাওয়ার বইল সোঁতা,-
পাতাল-ঘরের নাগিনী ওই বাইরে একা।
আজ
৭৪।
কুহু ও কেকা
কৌতূহলী কেকাধ্বনি মূর্তি ধরে!
ফুল সে ভূই চাপা হয়ে মাটির 'পরে ।
বিস্ময়েরি বােল বেজেছে,
বিনা-ডালেই ফুল সেজেছে !
লুপ্ত গাছের গােপন মূলে কী মন্তরে !
শাঁওল-বরণ শওলাতে ছায় কোমল মাটি,
মাটির কোলে পাপড়ি মেলে ভূই চাপাটি ।
মগন ছিল পাতাল-তলে
জাগল সে আজ কিসের ছলে ?
বুঝি ঠেল মাথায় বৃষ্টিধারার রূপার কাঠি ।
বেরিয়েছে তাই পাতালপুরীর রত্ন-কণা!
লক্ষ-ফণা অনন্তেরি একটি ফণা ।
আন্ জনমের মুকুল,-
এই দিনের এই ফুটন্ত ফুল,
ওগাে যুক্ত সে কোন্ গােপন সূতায়—অদর্শনা !
নষ্ট
দিনের আলােয় লাগছে আজি তন্দ্রা চোখে,
নিবিড় নীলে ডুবিয়ে নিল স্বপ্নলােকে !
পাতালপুরীর কুণ্ড হতে
অমৃত কে বহায় স্রোতে !
জন্ম-মরণ যুক্ত করে ফুল ও কে!
ওগাে
ধুলি
আজকে খালি ফিরে-পাওয়ার বইছে হাওয়া।
নেই কিছু নেই চিরতরেই হারিয়ে-যাওয়া।
হারানাে ফুল ফুটুছে ফিরে
শওল মাটির আঁচল ঘিরে।
মূলের ঘরে মি যে আছেই—যাবেই পাওয়া !
ধুলি
জীবনের লীলাক্ষেত্র পুণ্য ধরাতল,
প্রতি ধূলিকণা তার পবিত্র নির্মল।
মানবের হর্ষ, ব্যথা, মানবের প্রীতি,
মানবের আশা, ভয়, সাধনার স্মৃতি,
স্পন্দিত করিছে তার প্রত্যেক অণুরে
নিত্য নিশিদিনমান; অবিশ্রাম সুরে
উঠিছে গুঞ্জন গান অশ্রুত-মধুর
অতীতের প্রতিধ্বনি বিস্মৃত সুদূর !
এই যে পথের ধূলি উড়ায় বাতাস
মহামানবের ইহা মৌন ইতিহাস ;
তীর্থময় মত্তলােক ; প্রতি রেণু, তার
আনন্দ-গদগদ চির অশ্রু-পারাবার
;
মাটি
এই যে মাটি—এই যে মিঠা—এই যে চির-চমৎকার,
চরণে লীন এই যে মলিন—এই যে আধার নিরাধার
এই মাটি গাে এই পৃথিবী—এই যে তৃণ-গুলময়,
তারার হাটে মাটির ভাটা, তাই বলে এ তুচ্ছ নয়।
মাটি তো নয়-জীবন-কাঠি,কণায় কণায় জীবন তার,
মাটির মাঝে প্রাণের খেলা,—মাটিই প্রাণের পারাবার ।
মাটি তাে নয় মায়ামুকুর-একপিঠে তার লীলার খেল,
আরেকটি দিক অন্ধ-অসাড়, রশ্মিঘাতে অনুদ্ধেল!
মাটিই আবার মরণ-কাঠি, মাটির কোলে উদয় লয়,
যে মাটিতে ভাঁড় গড়ে রে তাতেই মানুষ মানুষ হয় ।
মাটির মাঝে যা আছে গাে সুৰ্যেও তার অধিক নেই,
তড়িৎ-সূতার লাটাই মাটি, জীবন-ধারার আধার সেই।
গঙ্গার প্রতি
সঞ্জীবিয়া উভতীর, সঞ্চারিয়া শ্যাম-শস্য-হাসি,
তরঙ্গে সঙ্গীত তুলি’ ছড়াইছ ফেন-পুষ্প-রাশি
অয়ি সুরধুনী-ধারা! অমােঘ তােমার আশীর্বাদ।
পালিছ সংসার তুমি লােকপাল-বিষ্ণুর প্রসাদ।
গঙ্গার প্রতি
রিক্ত ছিল মহী, তারে তব বর করিল উৰ্বর,
কৃতজ্ঞ মানব তাই কীৰ্ত্তি তাের গাহে নিরন্তর,
যুগে যুগে ওঠে তাই তােরে ঘিরি’ বেদ-মন্ত্র-গাথা,
ব্ৰহ্ম-কমণ্ডলু-ধারা ! সতীর্থময়ী তুমি মাতা।
তােরে ঘিরি’ উর্বরতা, তােরে ঘিরি’ স্তব-উপাসনা,
তােরে ঘিরি চিতানল উদ্ধারের শ্বসিছে কামনা ;
তীরে তীরে প্রেতভূমে ; অয়ি রুদ্র-জটা-নিবাসিনী !
শবেরে করিছ শিব তুমি দেবী অশিব-নাশিনী ।
অমল পরশ তাের বড় স্নিগ্ধ মাগাে তাের কোল,
অন্তকালে ক্লান্ত ভালে বুলাও গাে অমৃত-হিল্লোল।
কত জননীর নিধি সঞ্চিত রয়েছে ওই বুকে ;
তােরে সপি পুত্রকন্যা, তােরি কোলে ঘুমাইবে সুখে
একদিন তারা সবে ; দেহভার বহে প্রতীক্ষায় ;
আত্মার মিলন স্বর্গে, তাের জলে কায়ে মিলে কায়,-
ভস্ম মিলে ভস্ম সনে,-এ মিলন প্রত্যক্ষ সাকার ।
যুগে যুগে আমাদের মিলনের তুমি মা আধার।
পর্ব রচি’ তাই মােরা ততােরি তীরে মিলি বারম্বার,
পরশি তােমারে—অয়ি পিতৃ-পুরুষের ভস্মাধার ।
চক্ষে হেরি শূদ্র দ্বিজ সকলের মিলিত সমাধি,
অয়ি গঙ্গা ভাগীরথী ! ভারতের অন্ত, মধ্য, আদি।
শােণ নদের প্রতি সৈকত-শয্যার 'পরে সুবিশাল বাহু যেন কার সূচনা করিয়া শুভ স্ফুরিয়া উঠিছে বারম্বার বলদৃপ্ত, কাঞ্চন-বরণ। হে হিরণ্য-বাহু নদ- কোন্ দেবতার তুমি বাহু ? কত ঋদ্ধ জনপদ, কত গ্রাম, কত ক্ষেত্ৰ-সম্পদে দিয়েছ তুমি ভরি’ ; দিয়েছ—দিতেছ আরাে; নাহি জানি কত কাল ধরি। - - প্রাচীন পাটলিপুত্ৰ-পােষ্য প্রতিপাল্য সে তােমার মৌৰ্য্যমণি চন্দ্রগুপ্ত গ্রীকরাণী অঙ্কে ছিল যার, মৌৰ্য্যবংশ স্থাপয়িতা ; যে বংশের প্রতাপে মলিন সূৰ্য্যবংশ।-ধৰ্ম্মাশােক যাহারে পালিল বহুদিন জগতের শ্রেষ্ঠ রাজা। ওগাে শােণ। তােমারি শােণিতে পুষ্ট সে গােবিন্দসিংহ -গুরু নামে খ্যাত অবনীতে। । ওগাে শোণ ! স্বর্ণবাহু! অতীতের মুকুটের সােনা! তােমার ও উৰ্ম্মিজাল-গৌরবের স্বর্ণ-জরি বােনা। বারাণসী যাত্রীরা সবে বলিয়া উঠিল--‘দেখা যায় বারাণসী! চমকি’ চাহি—স্বর্গ-সুষমা মর্ত্যে পড়েছে খসি’! এ পারে সবুজ বজড়ার ক্ষেত, ও পারে পুণ্যপুরী, দেবের টোপর দেউলে দেউলে কঁপিছে কিরণ-ঝুরি ; শারদ দিনের কনক-আলােকে কিবা ছবি ঝলমল,- অযুত যুগের পূজা-উপচার,-হেম-চম্পকদল !
বারাণসী
আধ-চাদখানি রচনা করিয়া গঙ্গা রয়েছে মাঝে,
স্নেহ-সুশীতল হাওয়াটি লাগায় তপ্ত দিনের কাজে।
জয় জয় বারাণসী ।
হিন্দুর হৃদি-গগনের তুমি চির-উজ্জ্বল শশী।
অগ্নিহােত্রী মিলেছে হেথায় ব্রহ্মবিদের সাথে,
বেদের জ্যোৎস্না-নিশি মিশে গেছে উপনিষদের প্রাতে ;
এই সেই কাশী ব্ৰহ্মদত্ত রাজা ছিল এইখানে,
খ্যাত যার নাম শাক্যমুনির জাতকে, গাথায়, গানে ;
যার রাজত্ব-সময়ে বুদ্ধ
জম্মিল বারবার
ন্যায়-ধর্মের মর্যাদা প্রেমে করিতে সমুদ্বার।
এই সেই কাশী ভারতবাসীর হৃদয়ের রাজধানী,
এই বারাণসী জাগ্রত-চোখে স্বপন মিলায় আনি’!
এই পথ দিয়া ভীষ্ম গেছেন ভারত-ধুরন্ধর,
—কাশী-নরেশের কন্যারা যবে হইল স্বয়ম্বর।
সত্য পালিতে হরিশ্চন্দ্র এই কাশীধামে, হায়,
পুত্র জায়ায় বিক্রয় করি’ বিকাইল আপনায়।
তেজের মূর্তি বিশ্বামিত্র সাধনায় করি’ জয়
হেথা লভিলেন তিনটি বিদ্যা,-সৃষ্টি, পালন, লয় ;
বিদ্যায় যিনি জ্যোতির পুঞ্জ করিলেন সমাহার,
নূতন স্বর্গ করিলেন যিনি আপনি আবিষ্কার।
শুদ্ধোদনের স্নেহের দুলাল ত্যজিয়া সিংহাসন
করুণা-ধৰ্ম্ম হেথায় প্রথম করিল প্রবর্তন।
এই বারাণসী কোশল দেবীর বিবাহের যৌতুক
দেখিতেছি যেন বিম্বিসারের বিস্মিত স্মিতমুখ !
নৃপতি অশােকে দেখিতেছি চোখে বিহারের পইঠায়,
শ্ৰমণগণের আশীৰ্বাচনে প্রাণ মন উথলায় ।
.
.
কুহু ও কেকা
সমুখে হাজার স্থপতি মিলিয়া গড়িছে বিরাট স্তুপ,
শত ভাস্কর রচে বুদ্ধের শত জনমের রূপ।
চিকণ চারু শিলার ললাটে লিখিছে শিল্পজীবী
ধৰ্ম্মাশােকের মৈত্রীকরুণ অনুশাসনের লিপি !
মহাচীন হ'তে ভক্ত এসেছে মৃগদাব-সারনাথে,--
স্তুপের গাত্র চিত্র করিছে সূক্ষ্ম সােনার পাতে।
জয়! জয় ! জয় কাশী ।
তুমি এসিয়ার হৃদয়-কেন্দ্র-মূর্ত ভকতি রাশি !
এই কাশীধামে ভক্ত তুলসী লিখেছেন রামকথা,
ভকতি যাহার অপ্রমত্ত প্রভুপদে সংযতা।
এই কাশীধামে জোলাদের ছেলে কবীর রচিল গান,
যাহার দোহায় মিলেছিল দুহু হিন্দু মুসলমান।
এই কাশীধামে বাঙালীর রাজা মরেছে প্রতাপরায়,
যার সাধনায় নবীন জীবন জেগেছিল বাংলায়।
মৃত্যু হেথার অমৃতের সেতু, শব নাই—শুধু শিব !
মনে লয় মাের হেথা একদিন মিলিবে নিখিল জীব ;
আত্মার সাথে হবে আত্মার নবীন আত্মীয়তা,
মিলন-ধৰ্মী মানুষ মিলিবে ; এ নহে স্বপ্নকথা।
জয় কাশী! জয় ! জয় !
সারা জগতের ভকতি-কেন্দ্র হবে তুমি নিশ্চয়।
স্ফটিক শিলার বিপুল বিলাস মাত্র নহ তাে তুমি,
আমি জানি তুমি আনন্দ-ধাম ছুয়ে আছ মরভূমি ;
আমি জানি তুমি ঢাকিয়াছ হাসি কুটির মসীলেপে,
অমৃত-পাত্র লুকায়ে রেখেছ সময় হয়নি ভেবে ;
তৃষিত জগত খুজিতেছে পথ, ডেকে লও, বারাণসী।
পথিকের প্রীতে প্রদীপ জ্বালিয়া কেন আছ দূরে বসি’?
বারাণসী
৮১
-
মধু-বিদ্যায় বিশ্বমানবে দীক্ষিত কর আজ,
ঘুচাও বিরােধ, দম্ভ ও ক্রোধ, ক্ষতি, ক্ষোভ, ভয়, লাজ।
সার্থক হােক্ সকল মানব, জয়ী হাে ভালবাসা,
সঙস্কারের পাষাণ-গুহায় পচুক কৰ্ম্মনাশা।
ব্যাসের প্রয়াস ব্যর্থ সে কভু হবে নাকো একেবারে
সবারেই দিতে হবে গাে মুকতি এ বিপুল সংসারে।
তুমি কি কখনাে করিতে পার গাে শুচি অশুচির ভেদ ?
তুমি যে জেনেছ চরাচর ব্যাপী চির জনমের বেদ।
স্তম্ব হইতে ব্ৰহ্ম অবধি অভেদ বলেছ তুমি,
ভেদের গণ্ডী তুমি রাখিয়ােনা, অয়ি বারাণসী ভূমি।
ঘঘাষণা করেছ আশ্রয়ে তব ক্ষুধিত রবে না কেহ ;-
প্রাণের অন্ন দিবে না কি হয় ? কেবলি পুষিবে দেহ?
দাও সুধা দাও, পরাণের ক্ষুধা চির-নিবৃত্ত হােক্,
বিশ্বনাথের আকাশের তলে মিলুক সকল’লােক।
অখিল জনের হৃদয়ে রাজ্য কর তুমি বিস্তার,
সকল নদীর সকল হৃদির হও তুমি পারাবার।
পর যে মন্ত্রে আপনার হয় সে মন্ত্র তুমি জানাে,
বিমুখ বিরূপ জগত-জনেরে মুগ্ধ করিয়া আনাে ;
বিচিত্র মালা কর বিরচন নানা বরণের ফুলে,
অবিরােধে লােক সার্থক হােক পাশাপাশি মিলেজুলে ;
দূর ভবিষ্য নিখিল বিশ্ব যে ধনের আশা করে-
তুমি বিতরিয়া দাও সে অমৃত জগতজনের করে।
জয়! বারাণসী জয় !
অভেদ মন্ত্রে জয় কর তুমি জগতের সংশয়।
হিমালয়াষ্টক
নম নম হিমালয় ।
গিরিরাজ-তুমি, মানচিত্রের মসীর চিহ্ন নয় !
বর্ষা-মেঘের মত গম্ভীর।
দিগবারণের বিপুল শরীর।
অবাধ বাতাস বাধ্য তােমার, তােমারে সে করে ভয়।
নম নম হিমালয় ।
;
নম নম গিরিরাজ ।
অযুত বােরার মুক্তা-ঝুরিতে উজ্জ্বল তব সাজ
সূত্রবিহীন কুসুমের হার
উল্লাসে শােভে উরসে তােমার ;
মৃদু-পর্ণিকা করিছে অঙ্গে পত্র-রচনা কাজ ।
নম নম গিরিরাজ ।
নম মহামহীয়ান।
নতশিরে যত গিরি-সামন্ত সম্মান করে দান।
গুহার গূঢ়তা, ভৃগুর জাকুটি,
তােমাতে রয়েছে পাশাপাশি ফুটি,
ভীম অৰ্বদ, ভীষণ তুষার গাহিছে প্রলয় গান !
নম মহামহীয়া!
নম নম গিরিবর ।
স্থির-তরঙ্গ-ভঙ্গিমাময় দ্বিতীয় রত্নাকর।
শিখরে শিখরে, শিলায় শিলায়,
চপল-চমরী-পুচ্ছ-লীলায়,--
সাগর-ফেনের মত সাদা মেঘ নাচিছে নিরন্তর।
নম নম গিরিবর ।
হিমালয়াক
নম নম হিমবান্।
মৌনে শুনিছ বিশ্ব-জনের দুঃখ-সুখের গান ;
নিখিল জীবের মঙ্গল-ভার
নিজ মস্তকে বহ অনিবার,
চির-অক্ষয় তুষার তােমার শত চূড়ে শােভমান ;
নম নম হিমবান্।
নম নম ধরাধর !
নাগবেণী আর সরল শালেতে মণ্ডিত কলেবর ;
মেঘ উত্তরী’, তুষার কিরীট,
ছত্র আকাশ, ধর পাদপীঠ ;
তুমি লভিয়াছ মৃত্যু-ভুবনে চির-অমরতা-বর!
নম নম ধরাধর !
নম নম হিমাচল ।
কত তপস্বী তব আশ্রয়ে পেয়েছে কাম্যফল ;
মােরে দেছ তুমি নব আনন্দ,
মহামহিমার বিশাল ছন্দ
তােমারে হেরিয়া পরাণ ভরিয়া উছলিছে অবিরল।
নম নম হিমাচল ।
অতীত-সাক্ষী নম !
ক্ষুদ্র কবির ক্ষীণ কল্পনা অক্ষম ভাষা ক্ষম ;
বাল্মীকি যার বন্দনা গান,
কালিদাস যার অন্ত না পান,
সেই মহিমার ছবি আঁকিবার দুরাশা ক্ষম হে মম ;
বিশ্ব-পূজিত নম।
কুহু ও কেক।
তােমার আড়ালে বাস করি মােরা
তােমার ছায়ায় থাকি,
তােমাতে করেছে স্বর্গ রচনা
মুগ্ধ মােদের আঁখি ;
ভূলােকের হয়ে দ্যুলােক কেড়েছ
স্বলোক আছ চুমি',
অমর-ধামের যাত্রার পথে
দিব্য-শিবির তুমি
নম নম নম কাঞ্চন-গিরি !
তােমারে নমস্কার,
তুমি জানাতেছ অমৃতের স্বাদ
অবনীতে অনিবার !
তােমার চরণে বসিয়া আজিকে
তােমারি আশীর্বাদে
সােনার কমল চয়ন করেছি
সপ্ত ঋষির সাথে।
মেঘলােকে
গিরি-গৃহে আজ প্রথম জাগিয়া
আহা কি দেখিনু চোখে,
মর্ত্যলােকের মানুষ এসেছি
জীবন্তে মেঘলােকে !
গিরির পিছনে গিরি উকি মারে
চূড়ায় লঘে চূড়া,
বিন্ধ্যের মত কত পাহাড়ের
গর্ব করিয়া গুড়া !
তারি মাঝে মাঝে এ কি গাে বিরাজে?--
এ কি ছবি অদ্ভুত!
গিরি-উপাধান সামুতে শয়ান
কোন্ যক্ষের দূত ?
চারি দিকে তার তল্পি যত সে
ছড়ানাে ইতস্তত,
পাশমােড়া দিয়া ঘুমায় রৌদ্রে
ক্লান্ত জনের মত!
কে জানে কাহার কি বারতা লয়ে
চলেছে কাহার কাছে,
বসনের কোণে না জানি গােপনে
কার চিঠিখানি আছে !
সে কি যাবে আজ অলকাপুরীতে
ক্রৌঞ্চদুয়ার পথে ?-
তুষার ঘটার জটিল জটায়
লঙ্ঘিয়া কোনাে মতে ?
৮
কুহু ও কেকা
কূপ, নদী, নদ, সমুদ্র, হ্রদ
যার যাহা দেয় আছে,
সব রাজস্ব সংগ্রহ করে,
পবনের পাছে পাছে-
সে কি আসিয়াছে গিরিরাজ-পদে
করিতে সমর্পণ ?
কিবা, তার শুধু কূটজ ফুলের
জীবন বাঁচানাে পণ !
;
রৌদ্র বাড়িল, নিদ্রা ছাড়িয়া
উঠিল মেঘের দল,
শিখরে শিখরে চরণ রাখিয়া
চলিয়াছে টলমল ;
দেখিতে দেখিতে বিশা’য়ের এই
পাষাণ-যজ্ঞশালে
শত বরণের সহস্র মেঘ
জুটিল অচির কালে।
চমরী-পুচ্ছ কটিতে কাহারাে
ময়ূরপুচ্ছ শিরে,
ধূমল বসন পরিয়া কেহ বা
দাড়াইল সভা ঘিরে।
সহসা কুহেলি পড়িল টুটিয়া,
অমনি সে গরীয়ান্
উদিল বিপুল হৈম মুকুটে
গিরিরাজ হিমবান।
মেঘলােকে
গগন-গরাসী প্রলয়ের ঢেউ,
আদি প্লাবনের স্মৃতি,
প্রাচীন দিনের পাগল ছন্দ,
উদ্বেল মহাগীতি,
মহান্ মনের উচ্ছ্বাস যেন
সফল হয়েছে কাজে,
আদি কল্পনা রেখেছে নিশানা
সৃষ্টি-পুথির মাঝে ।
নীল আকাশের প্রগাঢ় নীলিমা
যেন গাে সবলে চিরি’
ধরার পরশ ঠেলিয়া, গগন—
ফুড়িয়া উঠেছে গিরি !
একি মহিমার মহান বিকাশ ।-
আকাশের পটে আঁকা,
দুলােকে দুলিছে স্বর্গের জ্যোতি
স্বর্গের স্মৃতি মাখা !
নিখিল ধরার উর্দ্ধে বসিয়া
শাসিছে পালিছে দেশ,
বজ টুটিছে, বিজুলী ছুটিছে,
নাহি ক্ষেপ-লেশ!
স
আজি দলে দলে গিরিসভাতলে
মেঘ জুটিয়াছে যত,
প্রমথ-নাথেরে ঘিরিয়া ফিরিছে
প্রমথ-দলের মত।
৯
কুহু ও কেকা
নীরবে চলেছে গিরি প্রধানের
সভার কর্মচয়,
সৃজন, পালন-বহু আয়ােজন
ওই সভাতলে হয় ;
কোন্ ক্ষেতে কত বরষণ হবে,
কোন্ মেঘ যাবে কোথা,-
সকলের আগে হয় প্রচারিত
ওইখানে সে বারতা ;
শিখরে শিখিরে তুষার-মুকুরে
ঠিকরে কিরণ-জ্বালা,
মুহূর্তে যায় দেশদেশান্তে
গিরির নিদেশমালা !
বার্তা বহিয়া শূন্যের পথে
মেঘ ওঠে একে একে,
রৌদ্র ছায়ার চিত্র বসনে
নানা গিরি বন ঢেকে ;
আমি চেয়ে থাকি অবাক্ নয়নে
বসি’ পাথরের স্তুপে,
সৃষ্টিক্রিয়ার মাঝখানে যেন
পশেছি একেলা চুপে !
হাজার নদের বন্যা-স্রোতের
নিরিখ, যেখানে রয়,
লক্ষ লােকের দুঃখ সুখের
হয় যেথা নির্ণয়,
মেঘেরা যেখানে দূর হতে শুধু
বৃষ্টি মারে না ছুড়ে,
মেঘলােকে
৯১
পাশাপাশি হাঁটে মানুষের সাথে,
পড়ে থাকে সানু জুড়ে ;-
কখনাে দাড়ায় ভঙ্গী করিয়া
কীর্তনিয়ার মত,
কেহ মৃদঙ্গে করে মৃদু ধ্বনি,
কেহ নৰ্ত্তনে রত ।
কখনাে আবার মেঘের বাহিনী
ধরে গাে যােদ্ধ, বেশ,
মৃত্যুতে যেন মর্ত-প্রেতের
কলহ হয়নি শেষ।
কৌতুকে মিহি চাদের সূতার
ওড়না ওড়ায় কেহ,
তারি ভারে তবু পলে পলে যেন
ভাঙিয়া পড়িছে দেহ!
আমি বসে আছি এ সবার মাঝে
এই দূর মেঘলােকে,
নিগুঢ় গােপন বিশ্ব-ব্যাপার
নিরখি চৰ্ম্ম-চোখে !
স্বর্গের ছায়া মর্তে পড়েছে,
শান্ত হয়েছে মন,
নয়নে লেগেছে ধ্যানের সুষমা-
দেবতার অঞ্জন ;
চক্ষে দেখেছি দেবতার দেশ
দূরে গেছে গ্লানি যত,
মেঘেরও উর্দ্ধে করেছি ভ্রমণ
গ্রহ-তারকার মত।
;
চুড়ামণি
ডুবেছে সকলি, তবু, শীর্ষ জেগে আছে,
জেগে আছে হিমালয় ; সে তত কারাে কাছে
কোনােদিন ভ্রমেও হয়নি অবনত।
শক, হুণ, মােগল, পাঠান কতশত
আসিয়াছে মুক্তরােধ বন্যা সম, তবু
পারেনি ডুবাতে কেহ কোনােমতে কভু
মহিমা-মণ্ডিত পুণ্য
হিমালয়
চুড়ে।
কোলাহল করেছে কেবল ফিরে ঘুরে।
পরাজয় স্বীকার করেনি হিমালয়।
তুষার-উষ্ণীষ তব কলঙ্কিত নয়
চরণধূলায় কারাে, ওগাে পুণ্যভূমি।
সকল গ্লানির উর্দ্ধে বিরাজিছ তুমি,
লয়ে তব ব্ৰহ্মবিদ্যা, তপস্যার বল;
জগতের চূড়ামণি অটল অচল!
“লরেল”
প্রতীচ্য কবির চির সাধনার ধন
তােরে আজি হেরি চক্ষে-লরেল-পল্লব !
রাজ্যবান্ রাজা হতে পূজ্য যেইজন
সেই লভে লরেলের মুকুট দুলভ।
। অন্ধকবি হােমরের ছিলি আঁখি তারা,
দান্তের প্রথম প্রিয়া ছিলি সখি তুই ;
তােরে পরশিয়া আজি আমি আত্মহারা,
ইচ্ছা করে হে শ্যামাঙ্গী! শিরে তােরে থুই।
দার্জিলিঙের চিঠি
প্রকৃতির প্রাণ-দেওয়া প্রাচীন হাপরে
গঠিত পল্লব তাের শ্যামল-কোমল,-
রসের রসা করা ; কবি বিনা পরে
অরসিকে রূপ তাের কি বুঝিবে? বল ।
চির-হরিতের গড়া তনু সুকুমার,
চির-নবীনের শিরে আসন তােমার ।
দার্জিলিঙের চিঠি
বন্ধু,
আমি এখন বসে আছি সাত-শো-তলার ঘরে ।
বাতাস হেথা মলিন বেশে পশিতে ভয় করে।
ফিরােজা রং আকাশ হেথা মেঘের কুচি তায়,
গরুড় যেন স্বর্গপথে পাখনা ঝেড়ে যায় !
অস্ত রবির আভাস লাগে পূর্ণিমা চাঁদে,
শীর্ণ ঝােরা যক্ষ-নারীর দুঃখেতে কঁদে !
তবু এখন নাই অলকা, নাই সে যক্ষ আর,
মেঘের দৌত্য সমাপ্ত, হায়, কবির কল্পনার ।
হঠাৎ এল কুঙ্কটিকা হাওয়ায় চড়িয়া,
ঘুম-পাহাড়ের বুড়ী দিল মন্ত্র পড়িয়া।
কুহেলিকার কুহকে হায় সৃষ্টি ডুবিল,
ঝাপসা হ’ল কাছের মানুষ দৃষ্টি নিবিল।
ভস্মভূষণ ভােলানাথের অঙ্গ-বিভূতি
বিশ্ব 'পরে ঝরে যেন বিশ্ব-বিস্মৃতি।
৯::
কুহু ও কেকা
সকল গ্লানি যায় ধুয়ে গাে দৈব এই স্নানে,
অরুণ আভা অঙ্গে জাগে আরাম পরাণে।
•
ক্ষণেক পরে আবার ভাঁটা পড়ে কুয়াসায়,
গুল্ম-ঘেরা পাহাড়গুলি আবার দেখা যায়
নীল আলােকের আবছায়াতে নিলীন তরুচয়,
‘কাঞ্চি’-মণির দুল দুলিয়ে হাল্কা হাওয়া বয় !
মেঘ টুটে, ফের ফুটে ওঠে আকাশ-ভরা নীল,-
নীল নয়নের গভীর দিঠি যেথায় খোঁজে মিল
শান্তি হ্রদে সাঁতারি তার মিটে না আশা,
নীল নীড়ে হায় আঁখি-পাখীর আছে কি বাসা?
••
*
সাঁতার ভুলে মেঘ চলে আজ লস্করী চালে,
আস্ত রবির সােহাগ তাদের গুমর বাড়ালে ।
মেঘের বুকে কিরণ-নারী পিচ কারী হানে,
রামধনুকের রঙীন্ মায়া ছড়ায় বিমানে ;
মেঘে মেঘে পান্না চুনীর লাবণ্য লাগে,
আচম্বিতে তুষার গিরি উদ্যত জাগে।
দিব্য-লােকের যবনিকা গেল কি টুটি’?
অপ্সরীদের রঙ্গশালা উঠে কি ফুটি’?
।
গিরিরাজের গায়বী-টোপর ওই গাে দেখা যায়,
স্বর্ণ-সারে সিঞ্চিত কি স্বর্গ-সুষমায় ।
পায়ের কাছে মৌন আছে পাহাড় লাখে লাখ,
আকাশ-বেঁধা শুভ্র চূড়া করেছে নির্বা!
নর-চরণ-চিহ্ন কভু পড়ে নি হােথায়,
নাইকো শব্দ, বিরাট, স্তব্ধ,—আপন মহিমায় ।
দার্জিলিঙের চিঠি
সন্ধ্যা প্রভাত অঙ্গে তাহার আবীর ঢেলে যায়,
রুদ্ধগতি বিদ্যুতের দীপ্তি জাগে তায় !
শিখায় শিখায় আরম্ভ হয় রঙীন মহােৎসব,
বিদূর-ভূমে রত্ন-ফসল হয় বুঝি সম্ভব ।
মর্ত্যে যদি আনাগােনা থাকে দেবতার
ওই পাদপীঠ তবে তাঁদের চরণ রাখিবার।
*
.
ওই বরফের ক্ষেত্রে হলের আঁচড় পড়ে নাই,
ওই মুকুরে সূৰ্য্য, তার, মুখ দেখে সবাই ।
হােথায় মেঘের নাট্যশালা, রঙ্গ কুয়াসার,
হােথায় বাঁধা পরমায়ু গঙ্গা যমুনার !
ওইখানেতে তুষার-নদীর তরঙ্গ নিশ্চল,
রশ্মি-রেখার ঘাত-প্রতিঘাত চলছে অবিরল।
উচ্চ হতে উচ্চ ওযে মহামহত্তর,
নির্মলতার ওই নিকেতন অক্ষয়-ভাস্বর !
হয় তাে হােথাই যক্ষপতির অলকানগর,
হয় তাে হবে হােথাই শিবের কৈলাস-ভূধর ;
রজতগিরি শঙ্করেরি অঙ্কোপরি, হায়,
কিরণময়ী গৌরী বুঝি ওই গাে মূরছায় !
হয় তাে আদিবুদ্ধ হােথায় সুখাবতীর মাঝে
অবলােকন করেন ভূলােক সাজি’ কিরণ সাজে।
কিম্বা হােথা আছে প্রাচীন মানস সরােবর,
স্বচ্ছশীতল আনন্দ যার তরঙ্গ নিকর ।
কবিজনের বাঞ্ছা বুঝি হােথাই পরকাশ
সরস্বতীর শুভ্র মুখের মধুর মৃদুহাস!
কুহু ও কেক।
লামার মুলুক লাসা কি ওই ঢাকা কুয়াশায় ?
বাংলা দেশের মানুষ যেথা আজো পূজা পায় !
এই বাঙালী পাহাড় ঠেলি’ উৎসাহ-শিখায়
ঘুচিয়েছিল নিবিড় তমঃ নিজের প্রতিভায়।
এই পথেতে গেছেন তারা দেখেছেন এই সব,
এইখানে উঠেছে তাদের হর্ষ-কলরব !
এমনি করে স্বর্ণ-শৃঙ্গ বিপুল হিমালয়,
আমার মত তাদের প্রাণেও জাগিয়েছে বিস্ময়।
দেশের লােকের সাড়া পেয়ে আজ কি তাহারা
চেয়ে আছেন মােদের পানে আপনাহারা ?
চোখে পলক নাইকো তঁাদের-পড়ে না ছায়া,
মমতা কি যায়নি তবুঘােচেনি মায়া ?
তাই বুঝি হায় ফিরে যেতে ফিরে ফিরে চাই,
কে যেন, হায়, রইল পিছে,-কাহারে হারাই ।
সন্ধ্যা এসে ডুবিয়ে দিল রঙীন চরাচর,
অনিচ্ছাতে রুদ্ধ হ’ল দৃষ্টি অতঃপর ।
উঠল সেজে সাঁঝের আলােয় দার্জিলিং পাহাড়,
ফুটুল যেন ভুবন-জোড়া গাঁদাফুলের ঝাড় !
কুঞ্জটিকায় সাঁজের আঁধার হ’ল দ্বিগুণ কালাে,
অরুণ-ছটার ছাতা মাথায় হাসে গ্যাসের আলাে।
তখন দুয়ার বন্ধ করে বন্ধ করে সাসি,
অন্ধ-করা অন্ধকারে স্বপন-সুখে ভাসি।
ঘুমের বুড়ীর মন্ত্র-মােহ অম্নি তখন খসে,
চেনা মুখের ছবিগুলি ঘিরে ঘিরে বসে।
ঘাের নিশীথে দারুণ শীতে কষ্ট যখন পাই,
ইচ্ছা করে কৃচ্ছসাধন পাহাড় ছেড়ে যাই ;
সিংহল
শিক্ষা-শাসন হেথা; সেথায় হরষ হিন্দোল,
এ যে কঠোর গুরু-গৃহ সে যে মায়ের কোল।
তাই নিশীথে ঘরের কথা জাগে সে সদাই,
মেঠো দেশের মিঠে হাওয়ায় গা মেলিতে চাই।
সংগােপনে শব্দযােজন করি দু’ চারিটি
সশরীরে যেতে না পাই তাই তাে পাঠাই চিঠি।
ভগ্নস্বাস্থ্য কর্তে আস্ত পড়ছে ভেঙে মন,
ডাক পিয়নের মূর্তি ধেয়ান করে সকল ক্ষণ ;
তাই অনুরােধ মাঝে মাঝে পত্র যেন পাই,
চিঠির ভেলায় প্রবাস-পাথার পার করে নাও, ভাই!
সিংহল
(“Young Lochinvar” এর ছন্দে )
সিন্ধুর টিপ সিংহল দ্বীপ কাঞ্চনময় দেশ !
ওই চন্দন যার অঙ্গের বাস, তাম্বল-বন কেশ !
যার উত্তাল তাল-কুঞ্জের বায়মন্থর নিশ্বাস !
উজ্জ্বল যার অম্বর, আর উচ্ছল যার হাস!
ওই শৈশব তার রাক্ষস আর যক্ষের বশ, হায়,
যৌবন তার ‘সিংহে’র বশ,-সিংহল নাম যায়
এই বঙ্গের বীজ ন্যগ্ৰাধ প্রায় প্রান্তর তার ছায়,
আজো বঙ্গের বীর ‘সিংহে’র নাম অন্তর তার গায়।
ওই বঙ্গের শেষ কীৰ্ত্তির দেশ সৌরভময় ধাম।
কাঠ, শর্কর যার বল্কল-বাস, সিংহল যার নাম।
যার মন্দির সব গম্ভীর,-তার বিস্তার ক্রোশ দেড়
যার পুষ্কর-মেঘ পুষ্কর্ণীর দশ ক্রোশ ঠিক বেড়।
৮৯ কুহু ও কেকা ওই ফান আর দক্ষিণ বায়—সিংহল তার ঘর, হায় লুব্ধের প্রায় সিংহল ধায় বঙ্গের অন্তর ; ছিল সিংহল এই বঙ্গের, হায়, পণ্যের বন্দর, ওগাে বঙ্গের বীর সিংহল-রাজ-কন্যার হয় বর। ওই সিংহল দ্বীপ সুন্দর, শ্যাম,—নিৰ্ম্মল তার রূপ, কণ্ঠের হার ল’ঙ্গর ফুল, কপূর কেশ-ধূপ ; কাঞ্চন তার গৌরব, আর মৌক্তিক তার প্রাণ, সম্বল তার বুদ্ধের নাম, সম্পদ নিৰ্বাণ। আর আর সিদ্ধিদাতা ( যবদ্বীপের একটি গণেশ মূর্তির ছবি দেখিয়া ) একি তােমার মূর্তি হেরি !একি হেরি সিদ্ধিদাতা! হাজার নর-মুণ্ড 'পরে ঠাকুর ! তব আসন পাতা। হাজার জীবন নষ্ট হ'লে—ব্যর্থ গেলে হাজার জন- তবে তােমার হয় প্রতিষ্ঠা ?—নির্মিত হয় সিংহাসন ? তখন তুমি প্রসন্ন হও—তখনি হও আবির্ভাব ? নইলে পরে ব্যর্থ আশা?-নইলে সুদূর সিদ্ধিলাভ? খুলে গেল দৃষ্টি এবার ঠাকুর ! তােমায় নমস্কার । হাড়ের স্তুপে সিদ্ধিদাতার আসন-পাতা ! চমৎকার। দুর্গমে কে যাত্রা করে যবদ্বীপে করলে জয় । কত বছর যুদ্ধ হ’ল কতই প্রাণের অপচয়! হিসাব তাহার নাইক’ কোথাও; শিল্পী শুধু কল্পনাতে আভাসখানি রেখে গেছে কঙ্কালের ওই অঙ্কপাতে;
সিদ্ধিদাতা
গ’ড়ে গেছে পাথর কেটে মূর্তিখানি জীবন্ত,
শবাসনে সিদ্ধিদাতা,শশাকের দহন নিবন্ত।
নৃমুণ্ডেরি স্তুপের 'পরে জাগল বিপুল জয়ের গাথা,
অভভদ হয়ে দিলেন দেখা সিদ্ধি সনে সিদ্ধিদাতা !
%
খর্ব তুমি-স্থূল রকমের, সিদ্ধি-তুমি লম্বােদর ;
তবু তােমায় চায় সকলে, তবু তুমিই মনােহর।
তােমার লাগি বিশ্বামিত্র পীড়া দিল নিখিল জীবে,
যাত্রী ছােটে তােমার লােভে মত্তলােকে আর ত্রিদিবে ;
কারাে হঠাৎ নিবছে বাতি, কারাে মাথায় চক্র ঘােরে,
কেউ বা লভে জ্ঞানের ভাতি, কেউ বা পথেই যায় গাে মরে।
সিদ্ধি লাগি’ কর্মী, জ্ঞানী ছুটছে কবি দিবস নিশা,
কেউ বা লভে স্বর্ণকণা, কেউ বা ধূলায় হারায় দিশা!
শিখাও প্রভু! বিঘ্ন বিপদ ফেলতে ঠেলে দুঃখ রাতে ;
করতে শিখাও কৃচ্ছসাধন নাম লিখিয়ে খরচ-খাতে,
মরতে শিখাও শুষ্ক মুখে, ফিরতে শিখাও শূন্য হাতেই,
সত্যভানু প্রদীপ্ত যে নৃ-কপালের শুভ্রতাতেই।
পণ্ড পূজা ঠাকুর ! তােমার ক্ষুদ্রচেতা বেনের ঘরে,
উঞ্জলােভী মূষিকে সে সিদ্ধিদাতার বাহন করে ।
তারা তােমায় চেনে না, হায়, চেনে নাকো সিদ্ধিদাতা,
অভ্রভেদী নৃকঙ্কালে প্রভু! তােমার আসন পাতা।
(Un Pelerin D'Angkar afyat ) ওঙ্কার-ধাম ! ওঙ্কার-ধাম ! চিত্ত-চমৎকার ! শ্যাম-কাম্বােজে কনকাম্ভোজ হিন্দুর প্রতিভার । তােরণে তাহার সপ্তশীর্ষ সর্প সে ফণা ধরে, পৰ্বত সম বিপুল দেউল মিশরের যশ হরে। যােজন ব্যাপিয়া পত্তন তার, বিধিয়া নীলাম্বর পর্বতজয়ী গর্বে উঠেছে দেউল স্তরে স্তর! গুম্বজ তার সােনার পদ্ম, চূড়ায় চতুর্মুখ— নীরব হাস্যে নিরখে চতুর- দিকের দুঃখ সুখ ; বিরাট মূরতি, আরতি তাহার জাগায় ভকতি ভয় ! দেউল ঘিরিয়া মূর্তি-মেখলা, রামায়ণ শিলাময় । রাক্ষস, রথ, হস্তী মহৎ, যুদ্ধের হুড়াহুড়ি, সাগর মথন, দেব অগণন,- রয়েছে যােজন জডি।
ওঙ্কার-ধাম - প্রতি শিলা তার পেয়েছে আকার শিল্পীর সুপরশে, সারি সারি সারি বুদ্ধ মূরতি মগন ধ্যানের রসে। বিম্ব হাজার একই দেবতার রেখেছে গাে খুদে খুদে, নিৰ্বাক্ শিলা নীরবে ঘােষিছে, দেবতা সৰ্ব্বভূতে ! শিল্পীর তপে হেথা অপ্সরা রয়েছে পাথর হয়ে হেম-মুখী প্রেম মদিরেক্ষণা— বহুর সােহাগ স'য়ে । যােজন জুড়িয়া রয়েছে পাষাণ- স্তম্ভের মহাবন, জনপদ দশলক্ষ লােকের নামশেষ সে এখন! নিবিড় বনের সবুজ আঁধার দিনে আছে দিক্ জুড়ে ; শব-শিব এক বিরাজিছে আজ চতুম্মুখের চূড়ে ! আধেক ভগ্ন ধূলায় মগ্ন আঙনে মূরতিগুলা, নাই লােক শুধু বাদুড় পেচক, পালক এবং ধূলা। ওঙ্কার-ধাম ! ওঙ্কার ধাম। নাই-কারাে নাই সাড়া,
কুহু ও কেকা
::
ঘণ্টার মালা দুলিছে কেবল
বাতাসে পাইয়া নাড়া।
ধ্বংসের দাড়া অশথ শিকড়
পাকড়ি’ ধরিছে আঁটি
তার সাথে ধূলি আর বিস্মৃতি,
শিয়রে মরণ-কাঠি।
ওঙ্কার-ধাম। ওঙ্কার-ধাম।
বিস্মৃত তুমি আজ,
জানেনা হিন্দু কীর্তি আপন ।
হায় নিদারুণ লাজ ।
পদ্মার প্রতি
হে পদ্মা। প্রলয়ঙ্করী । হে ভীষণা! ভৈরবী সুন্দরী।
হে প্রগলভা! হে প্ৰবলা! সমুদ্রের যােগ্য সহচরী
তুমি শুধু; নিবিড় আগ্রহ তার পার গাে সহিতে
একা তুমি; সাগরের প্রিয়তমা অয়ি দুর্বিনীতে ।
;
দিগন্ত-বিস্তৃত তব হাস্যের কল্লোল তারি মত
চলিয়াছে তরঙ্গিয়া,—চিরদৃপ্ত, চির-অব্যাহত।
দুর্ণমিত, অসংযত, গূঢ়চারী, গহন-গম্ভীর,
সীমাহীন অবজ্ঞায় ভাঙিয়া চলেছ উভতীর !
রুদ্র সমুদ্রের মত, সমুদ্রের মত সমুদার
তােমার বরদ হস্ত বিতরিছে ঐশ্বৰ্য-সম্ভার।
উর্বর করিছ মহী, বহিতেছ বাণিজ্যের তরী,
গ্রাসিয়া নগর গ্রাম হাসিতেছ দশদিক ভরি’!
পদ্মার প্রতি
অন্তহীন মূচ্ছনায় আন্দোলিছ আকাশ সঙ্গীতে,
ঝঙ্কারিয়া রুদ্রবীণা,—মিলাইছ ভৈরবে ললিতে।
প্রসন্ন কখনাে তুমি, কভু তুমি একান্ত নিষ্ঠুর ;
দুর্বোধ, দুর্গম হায়, চিরদিন দুয়ে-সুদূর !
;
শিশুকাল হ’তে তুমি উচ্ছ,ঙ্খল, দুরন্ত-দুর্বার ;
সগর রাজার ভস্ম করিলে না স্পর্শ একবার !
স্বর্গ হতে অবতরি’ ধেয়ে চলে এলে এলােকেশে,
কিরাত-পুলিল-পুণ্ড, অনাচারী অন্ত্যজের দেশে !
বিস্ময়ে বিল-চিত্ত ভগীরথ ভগ্ন-মনােরথ
বৃথা বাজাইল শঙ্খ, নিলে বেছে তুমি নিজ পথ ;
আৰ্য্যের নৈবেদ্য,
বিদ্রোহী নদী ।
অনাহূত-অনার্য্যের ঘরে গিয়ে আছ সে অবধি ।
বলি, তুচ্ছ
করি’ হে
সেই হ’তে আছ তুমি সমস্যার মত লােক মাঝে,
ব্যাপৃত সহস্র ভুজ বিপৰ্যয় প্রলয়ের কাজে।
দম্ভ যবে মূর্তি ধরি’ স্তম্ভ ও গুম্বজে দিন রাত
অভ্রভেদী হয়ে ওঠে, তুমি না দেখাও পক্ষপাত
;
তার প্রতি কোনােদিন; সিন্ধুসখী! হে সাম্যবাদিনী।
মূখে বলে কীর্তিনাশা, হে কোপনা ! কল্লোলনাদিনী।
ধনী দীনে একাসনে বসায়ে রেখেছ তব তীরে,
সতত সতর্ক তারা অনিশ্চিত পাতার কুটিরে ;
জানে সুপ্তির স্বাদ, জড়তার বারতা না জানে,
ভাঙনের মুখে বসি' গাহে গান প্লাবনের তানে,
নাহিক বাস্তুর মায়া, মরিতে প্রস্তুত চিরদিনই।
অয়ি স্বাতন্ত্রের ধারা! অয়ি পদ্ম! অয়ি বিপ্লাবিনী।
পাপলা বােরা
তােমরা কি কেউ শুনবে না গাে পাগলা ঝােরার দুঃখ-গাথা?
পাগল বলে কৰ্ব্বে হেলা? কৰ্ব্বে হেলা মর্মব্যথা ?
জন্ম আমার হিম-উরসে, কুলে আমার তুল্য নাই,
সিন্ধুনদের সােদর আমি গঙ্গাদিদির পাগল ভাই।
বরফ-মরুর একলা জীবন ভাল আমার লাগত না রে,
লুকিয়ে উকি তাইত দিতাম নীচের দিকে অন্ধকারে
সুড়সুড়িয়ে গুড় গুড়িয়ে বেরিয়ে এসে কৌতূহলে
গড় গড়িয়ে গড়িয়ে গেলাম,—ছড়িয়ে প’লাম শূন্যতলে !
পিছল পথে নাইক’ বাধা, পিছনে টান নাইক’ মােটে,
পাগলা ঝােরার পাগল নাটে নিত্য নূতন সঙ্গী জোটে!
লাফিয়ে পড়ে ধাপে ধাপে, ঝাঁপিয়ে পড়ে উচ্চ হতে
চড় চড়িয়ে পাহাড় ফেড়ে নৃত্য করে মত্ত স্রোতে,
তরল ধারায় উড়িয়ে ধূলি, জুড়িয়ে দিয়ে হাওয়ার জ্বালা,
জটার 'পরে জড়িয়ে নিয়ে বিনিতার রাস্নামালা;
এশাে যুগের বনস্পতি,-বাকল-ঝাঝি সকল গায়,
মড়মড়িয়ে উপড়ে ফেলে স্রোতের তালে নাচিয়ে তায়,
-
==
গুহার তলে গুমরে কেঁদে, আলােয় হঠাৎ হেসে উঠে,
ঐরাবতের বৈরী হয়ে, কৃষ্ণমৃগের সঙ্গে ছুটে,
স্তব্ধ বিজন যােজন জুড়ে ঝাঝড়ের শব্দ ক'রে,
অসাড় প্রাচীন জড় পাহাড়ের কানে মােহন মন্ত্র পড়ে,
পরাণ ভরে নৃত্য করে মত্ত ছিলাম স্বাধীন সুখে,
ছন্দ ছাড়া আজকে আমি যাচ্চি ম'রে মনের দুখে ;
যাচ্চি ম'রে মনের দুখে পূৰ্ব্ব সুখে স্মরণ করে ;
ঝারির মুখে ঝরার মতন শীর্ণ ধারায় পড় ছি ঝরে।
চক্রী মানুষ চক্র ধরে ছিন্ন করে আমার দেহ
ছড়িয়ে দিলে দিগ্বিদিকে, নাইক’ দয়া, নাইক’ স্নেহ!
আমি ছিলাম আমার মতন,—পাহাড়-কোলে নির্বিবাদে,
মানুষ ছিল কোন্ সুদূরে—সাধিনি বাদ তাদের সাধে ;
তবুও শিকল পরিয়ে দিলে, রাখলে আমায় বন্দীবেশে,
ক্ষুদ্র মানুষ স্বল্প-আয়ু, আমায় কিনা বাঁধলে শেষে।
কৌশলে সে ফঁদ কেঁদেছে, পারিনে তায় ছিড়তে বলে, ..
শীর্ণ হয়ে যাচ্চি, ক্রমে, পড়ছি গ'লে অশ্রুজলে।
আগে আমায় চিত যারা বলছে শােনন,—“যায় না চেনা।
বাজবে কবে প্রলয়-বিষাণ?—মুখে আমার উঠছে ফেনা ।
বিকল পায়ের শিকলগুলাে কতদিন সে থাকবে আরাে ?
রুদ্ৰতালে নাচব কবে? তােমরা কেহ বলতে পারাে?
শুভ্র
শূদ্র মহান্ গুরু গরীয়ান,
শূদ্র অতুল এ তিন লােকে,
শূদ্র রেখেছে সংসার, ওগাে !
শূদ্রে দেখােনা বক্র চোখে।
কুহু ও কেকা
আদি দেবতার চরণের ধূলি
শূদ্র,—একথা শাস্ত্রে কহে,
আদি দেবতার পদরেণু-কণা
সকল দেবতা মাথায় বহে।
বিধাতার পাদপদ্মের রেণু
করিবে শিরােধার্য কেবা?
কে সে দর্পিত—কে সে নাস্তিক
শূদ্রে বলে রে করিতে সেবা ?
গঙ্গার ধারা যে পদে উপজে
তাহে উপজিল শূদ্র জাতি,
পাবনী গঙ্গা, শূদ্র পাবন
পরশ তাহার পুণ্য-সাথী।
শূদ্র শােধন করিছে ভুবন
তাই তার ঠাই শ্রীপদমূলে,
আপনারে মানী মানিয়া সে কভু
শিয়রে হরির বসে না ভুলে !
শুদ্ধসত্ত্ব পাবকের মত
জগতের গ্লানি শূদ্ৰ দহে ;
মহামানবের গতি সে মূর্ত,
শূদ্ৰ কখনাে ক্ষুদ্র নহে।
মেথর
কে বলে তােমারে, বন্ধু, অস্পৃশ্য অশুচি ?
শুচিতা ফিরিছে সদা তােমারি পিছনে ;
তুমি আছ, গৃহবাসে তাই আছে রুচি,
নহিলে মানুষ বুঝি ফিরে যেত বনে।
শিশুজ্ঞানে সেবা তুমি করিতেছ সবে,
ঘুচাইছ রাত্রিদিন সৰ্ব্ব ক্লেদ গ্লানি !
ঘৃণার নাহিক কিছু স্নেহের মানবে ;-
হে বন্ধু ! তুমিই একা জেনেছ সে বাণী।
-
নির্বিচারে আবর্জনা বহ অহর্নিশ,
নির্বিকার সদা শুচি তুমি গঙ্গাজল !
নীলকণ্ঠ করেছেন পৃথীরে নিৰ্বিষ ;
আর তুমি? তুমি তারে করেছ নিৰ্ম্মল ।
এস বন্ধু, এস বীর, শক্তি দাও চিতে,
কল্যাণের কৰ্ম্ম করি লাঞ্ছনা সহিতে।
পথের স্মৃতি
হাত পেতে বসেছে ভিখারী
রাজপথে মৌন প্রত্যাশায় ;
শাখা মেলি’ শীর্ণ তরু সারি
শূন্যমনে আকাশে তাকায়।
কুহু ও কেকা
লঘু মেঘ চলে যায় ভেসে,
উপবাসী রহে শাখাদল ;
শাদা মেঘ ভেসে গেল হেসে
পিপাসীরে দিল না সে জল ।
ধােয়া ধুতি-রেশমী চাদর
চলে গেল ফিরাইয়া মুখ ;
অনুদার বিলাসী বদর
অভুক্তের বুঝিল না দুখ।
সহসা উড়ায়ে ধূলিজাল
ম্লান মেঘ এল বায়ুভরে,
বজ্রকণ্ঠ মূরতি করাল,
সেই শেষে দিল স্নিগ্ধ করে।
থামাইয়া থার্ড ক্লাশ গাড়ী
রুক্ষ মূৰ্ত্তি দুঃখী গাড়ােয়ান
গাড়ী হতে নামি’ তাড়াতাড়ি
গরীব গরীবে দিল দান !
শাদা মেঘ দেয় না রে জল,
ম্লান মেঘ! আয় তােরা আয়,
রিক্ত শাখে হবে ফুল ফল
বিন্দু বিন্দু তােদেরি দয়ায়।
দুর্ভিক্ষে
ক্ষিদের জ্বরে যাচ্ছে মারা, ক্ষিদেয় ঘুরে পড়ছে মরে :
উপর-ওলার মর্জি, বাবা, একে একে যাচ্ছে স'রে।
বিকিয়ে গেছে হালের বলদ, দুধুলি গাই বিকিয়ে গেছে,
চালিয়েছিলাম দু’ পাঁচটা দিন কঁসা পিতল সকল বেচে !
বিকিয়ে গেছে লক্ষ্মী মােহর জনার্দনের রূপার ছাতা,
ভিটার গ্রাহক নাইক’ গাঁয়ে, তাই আজো সব গুজছে মাথা।
বিকিয়ে গেলাম পেটের দায়ে, পেটের জ্বালা বিষম জ্বলা,
কেড়ে খাবার দিন গিয়েছে, কুড়িয়ে খাবার গেছে পালা ;
কচি ছেলের খেইছি কেড়ে,-কান্নাতে কান দিইনি মােটে, .
চোখে কানে যায় কি দেখা ?—ক্ষিদেয় যখন ভিতর ঘেটে ?
প্রথম প্রথম লুকিয়ে খেতাম, চোরের মতন হেথা হােথা,
নিজের ক্ষিদেয় ভুলতে হত ছেলে মেয়ের ক্ষিদের কথা !
ঘাস পাতাতে চলবে ক’দিন ? ক'দিন ওসব সইবে পেটে ?
শুকিয়ে আছে ক্ষিদের নাড়ী, কারাে নাড়ী দিচ্ছে কেটে।
ক্ষিদের জ্বালায় জোয়ান মেয়ে দেছে সেদিন গলায় দড়ি,
ক্ষিদের জ্বরে কচি কঁচা মরছে নিত্যি ঘড়ি ঘড়ি।
শুষছে পড়ে শ্মশান-ভিটায়,শুয়ে পড়ে সারি সারি,
সকল গুলাের মুক্তি হলে নির্ভাবনায় মরুতে পারি।
একে একে হচ্ছে নীরব খড়ের শেযে কঠিন ভূয়ে,
হচ্ছে নীরব—যাচ্ছে মরে, বুঝছি সবি শুয়ে শুয়ে।
কুহু ও কেকা
বুঝতে পারছি—ওই অবধি—জানতে পাচ্ছি মাত্র এই,
মুখে দেব জল দু’ ফোটা—তেমন ধারাও শক্তি নেই।
মড়ার লােভে ঢুকবে কুকুর,ভাবতে ওঠে শিউরে গা’টা,-
জ্যান্তে পাছে খায় গাে ছিড়ে, ভাবছি এখন সেই কথাটা।
চোখের আগে অকি ওড়ে, গায়ে মুখে বসূছে মাছি,
বুঝতেও ঠিক পারছি নাকো—মরেছি না বেঁচেই আছি।
হায় ভগবান! মর্জি তােমার! হায় জগদীশ ! তােমার খুসী।
রাখলে তুমি রাখতে পার, মারতে পার মারলে রুষি’ ;-
;
•
বাঘের ক্ষিদে মিটাও ঠাকুর-প্রাণ রাখ প্রাণহানি করে
মানুষ মরে ক্ষিদেয় জ’রে-হাত গুটিয়ে রইলে স’রে ।
সংশয়
গ্রহণ-দিনের গহন ছায়ায় গাহন করি’
গগনে উঠিছে শঙ্কার সুর ভুবন ভরি’!
রাহুর গরাসে হিরণ কিরণ হইল সারা,
হায় হায় করে আলাের পিয়াসী নয়নতারা।
যে দিকে তাকাই কেবলি যে ছাই পড়িছে ঝরি’!
ক্লান্ত পরাণ, দিনমান শুধু ভাবিয়া মরি ;
“কি হবে গাে’!-কারে সুধাইব, হায়, পাই নে ভাবি,
মধ্য সাগরে দিও তরণী যায় যে নাবি।
হাহাকার
১১১
স্থির-নিশ্চিত মৃত্যুর মত আসিছে ঘিরে,
নিশ্বাস হরি’ দৃষ্টি আবরি’ ঘন তিমিরে ;
কোথা শাদা পাল? কই তরী তব ? হে কাণ্ডারী।
লােনা জলে এ কি মিছে মিশে গেল নয়ন-বারি।
হাহাকার
দুর্ভিক্ষের ভিক্ষুকের মত
কেঁদে কেঁদে ওঠে সে নিয়ত,
রােদন উদ্যমে অবসান,
আছে শুধু বদন-ব্যাদান!
আছে বুকে বুভুক্ষার মত
জগতের ক্ষুন্ন খেদ যত,
আছে শুধু যমের যন্ত্রণা
প্রেতলােকে জাগাতে করুণা।
এ সংসার অন্ধকারাগার,
কোনােদিকে মিলে না দুয়ার ;
ক্ষুন্ন প্রাণ, সংক্ষুব্ধ বেদনা,
কেবল পিঞ্জরে আনাগােনা।
এ পিঞ্জর ভাঙ ভগবান,
শােক তাপ হােক্ অবসান ;
এ উৎকট রােদনের শেষ
কর, কর, কর পরমেশ!
শুন্যের পূর্ণতা
কৃষ্ণ হতে পাংশু হয়ে, ক্ষুদ্ৰ হ’তে ব্যাপ্তি লয়ে
শকুন্তের ছায়া ক্রমে আলােকে মিলায় ।
জিজ্ঞাসা সংশয়-শেষে, দগ্ধ রিক্ত চিত্ত দেশে
অনাসক্ত পূর্ণজ্ঞান বিহরে লীলায়।
১৪ই জ্যৈষ্ঠ
( আমার পিতামহ স্বর্গীয় অক্ষয়কুমার দত্ত মহাশয়ের
সাংবৎসরিক শ্রদ্ধদিনে রচিত)
অনেক দেছেন যিনি মানবেরে অকৃপণ করে, -
ধীশক্তির দাত বলি’ মুখ্যভাবে ধ্যান তঁার করে
আমাদের এ ভারত ; প্রতিদিন প্রভাতে সন্ধ্যায়
মুখরিত করি’ দিক শ্রেষ্ঠ সে দানের কথা গায়।
;
সেই শ্রেষ্ঠ বিভূতিতে ছিলে তুমি ভূষিত ধীমান্ !
জ্ঞানাঞ্জনে নেত্ৰ মাজি’ বিশ্ব-দৃশ্য দেখিলে মহান্ ।
বিজ্ঞানের ভূৰ্য্যনাদে স্তব্ধ করি’ দিলে তুচ্ছ কথা,
সর্ব সঙ্কীর্ণতা ত্যজি’ নিলে বরি’ বিশ্বজনীনতা ;-
অন্ধ বিশ্বাসের বিষে জর্জরিত এ বঙ্গ-ভুবনে
এনে দিলে জ্ঞানামৃত ; হ’লে গুরু চক্ষুরুন্মীলনে।
সত্যের করিতে সেবা স্বার্থ, সুখ, স্বাস্থ্য বিসজ্জিলে,
মিথ্যা সংস্কারের মােহ ক্ষয় করি’ দিলে তিলে তিলে।
অর্ধ পথে থামাে নাই সন্ধি করি’ অজ্ঞতার সনে,
সূৰ্য্যকান্ত মণি তুমি পরিপূর অপূৰ্ব্ব কিরণে।
শ্মশান-শয্যায় আচাৰ্য হরিনাথ দে
(২)
আজি তব মৃত্যুদিনে, ওগগা পূজ্য! ওগাে পিতামহ !
এনেছি যে দীন অর্ঘ্য—তুমি সে প্রসন্ন মনে লহ।
বার্ষিকী এ শ্রাদ্ধে তব পিণ্ডভােজী ডাকিনি ব্রাহ্মণ,
জানি তাহে হইত না, ওগগা জ্ঞানী ! তােমার তর্পণ ;
অন্তরের শ্রদ্ধা শুধু আমি আজি করি নিবেদন ;-
এই তাে যথার্থ শ্রাদ্ধ-কীর্তি-কথা স্মরণ কীৰ্ত্তন।
সত্য-দেবতার পদে আজ শুধু এই ভিক্ষা চাই,
বুদ্ধেরে পুজিতে যেন রক্তধারে বেদী না ভাসাই ;-
অবতার বলি’ মুখে, যেন হায়, অজ্ঞতার ফলে
রঘুবীরে না বসাই মৎস্য, কুৰ্ম্ম, বরাহের দলে ;-
তব প্রিয় কৰ্ম্ম ত্যজি’ যেন তব তর্পণে না বসি’
বিদ্যা তপ বিবর্জিয়া শুধু যেন কৌলীন্য না ঘােষি'।
হে আদর্শ জ্ঞানযােগী ! হে জিজ্ঞাসু তব জিজ্ঞাসায়
উদ্বোধিত চিত্ত মাের ;—গরুড় সে জ্ঞান-পিপাসায়।
শান-শয্যায় আচাৰ্য হরিনাথ দে
আজ শ্মশানে বহ্নিশিখা অভ্রভেদী তীব্র জ্বালা,
আজ শ্মশানে পড়ছে ঝরে উল্কাতরল জ্বালার মালা ।
যাচ্ছে পুড়ে দেশের গর্ব,শ্মশান শুধু হচ্ছে আলা,
যাচ্ছে পুড়ে নূতন করে সেকেন্দ্রিয়ার গ্রন্থশালা।
১১৪
কুহু ও কেকা
একটি চিতায় পুড়ছে আজি আচাৰ্য্য আর পুড়ছে লামা,
প্রােফেসার আর পুড়ছে ফুঙি, পুড়ছে শমস-উল-উলামা,
পুড়ছে ভট্ট সঙ্গে তারি মৌলবী সে যাচ্ছে পুড়ে,
ত্রিশটি ভাষার বাসাটি হায় ভস্ম হয়ে যাচ্ছে উড়ে।
একত্রে আজ পুড়ছে যেন কোকিল, ‘কুকু’, বুলবুলেতে,
দাবানলের একটি আঁচে নীড়ের পিঠে পক্ষ পেতে ;
পড়ছে ভেঙে চোখের উপর বর্তমানের বাবিল-চূড়া,
দানেশমন্দী তাজ সে দেশের অকালে আজ হচ্ছে গুড়া।
আজ শ্মশানে বঙ্গভূমির নিল উজল একটি তারা,
রইল শুধু নামের স্মৃতি রইল কেবল অশ্রুধারা;
নিবে গেল অমূল্য প্রাণ, নিবে গেল বহ্নিশিখা,
বঙ্গভূমির ললাট পরে রইল আঁকা ভস্মটীকা।
সাগর-তর্পণ
বীরসিংহের সিংহশিশু। বিদ্যাসাগর। বীর ।
উদ্বেলিত দয়ার সাগর,-বীর্যে সুগম্ভীর।
সাগরে যে অগ্নি থাকে কল্পনা সে নয়,
তােমায় দেখে অবিশ্বাসীর হয়েছে প্রত্যয়।
নিঃস্ব হয়ে বিশ্বে এলে, দয়ার অবতার।
কোথাও তবু নােয়াও নি শির জীবনে একবার ।
দয়ায় স্নেহে ক্ষুদ্র দেহে বিশাল পারাবার,
সৌম্য মূর্তি তেজের স্ফূৰ্ত্তি চিত্ত-চমৎকার !
১১৫
সাগর-তর্পণ
-
নামলে একা মাথায় নিয়ে মায়ের আশীৰ্বাদ,
করলে পূরণ অনাথ আতুর অকিঞ্চনের সাধ ;
অভাজনে অন্ন দিয়ে-বিদ্যা দিয়ে আর
অদৃষ্টেরে ব্যর্থ তুমি করলে বারম্বার।
বিশ বছরে তােমার অভাব পূরল নাকো, হায়,
বিশ বছরের পুরাণে শােক নূতন আজো প্রায় ;
তাই ত আজি অশ্রুধারা ঝরে নিরন্তর।
কীর্তি-ঘন মূর্তি তােমার জাগে প্রাণের পর।
স্মরণ-চিহু রাখতে পারি শক্তি তেমন নাই,
প্রাণ প্রতিষ্ঠা নাই যাতে সে মূরৎ নাহি চাই ;
মানুষ খুঁজি তােমার মত,-একটি তেমন লােক,
স্মরণ-চিহ্ন মূর্ত !—যে জন ভুলিয়ে দেবে শােক।
রিক্ত হাতে করবে যে জন যজ্ঞ বিশ্বজিৎ
রাত্রে স্বপন চিন্তা দিনে দেশের দশের হিত,
বিপ্ন বাধা তুচ্ছ করে লক্ষ্য রেখে স্থির
তােমার মতন ধন্য হবে,—চাই সে এমন বীর।
তেমন মানুষ না পাই যদি খুঁজব তবে, হায়,
ধূলায় ধূসর বাঁকা চটি ছিল যা ওই পায় ;
সেই যে চটি উচ্চে যাহা উঠত এক একবার
শিক্ষা দিতে অহঙ্কতে শিষ্ট ব্যবহার।
সেই যে চটি—দেশী চটি-বুটের বাড়া ধন,
খুজব তারে, আম্ব তারে, এই আমাদের পণ ;
সােনার পিঁড়েয় রাখব তারে, থাকব প্রতীক্ষায়
আনন্দহীন বঙ্গভূমির বিপুল নন্দিগাঁয়।
রাখব তারে স্বদেশপ্রীতির নূতন ভিতের পর,
নজর কারাে লাগবে নাকো, অটুট হবে ঘর ।
কুহু ও কেক।
উচিয়ে মাের। রাখব তারে উচ্চে সবাকার,--
বিদ্যাসাগর বিমুখ হত—অমর্যাদায় যার।
শাস্ত্রে যারা শস্ত্র গড়ে হৃদয়বিদারণ,
তর্ক যাদের অফলার তুমুল আন্দোলন ;
বিচার যাদের যুক্তিবিহীন অক্ষরে নির্ভর,
সাগরের এই চটি তারা দেখুক নিরন্তর।
দেখুক, এবং স্মরণ করুক সব্যসাচীর রণ,-
স্মরণ করুক বিধবাদের দুঃখ-মােচন পণ;
স্মরণ করুক পাণ্ডারূপী গুণ্ডাদিগের হার,
“বাপ, মা বিনা দেবতা সাগর মানেই নাকো আর!”
অদ্বিতীয় বিদ্যাসাগর ! মৃত্যু-বিজয় নাম,
ঐ নামে হায় লােভ করেছে অনেক ব্যর্থকাম ;
নামের সঙ্গে যুক্ত আছে জীবন-ব্যাপী কাজ,
কাজ দেবে না ? নামটি নেবে ?—এ কি বিষম লাজ ।
বাংলা দেশের দেশী মানুষ। বিদ্যাসাগর ! বীর !
বীরসিংহের সিংহশিশু! বীর্যে সুগম্ভীর !
সাগরে যে অগ্নি থাকে কল্পনা সে নয়,
চক্ষে দেখে অবিশ্বাসীর হয়েছে প্রত্যয়।
ঋষি টলষ্টয়
সঙ্কীর্ণ স্বার্থের ক্ষোভে ক্ষুন্ন ক্ষুব্ধ ছিল জগজন
অন্ধকূপে বন্দী সম ; তুমি খুলে দিলে বাতায়ন,
ওগাে ঋষি রুযিয়ার। মুক্ত রন্ধ্রে স্বর্গের বাতাস
পাবশিল অন্ধকপে • বিশবানী বঁচিল নিস
কবি-প্রশস্তি
ফেলি; ওগাে টষ্টয়! বিনাশিলে তুমি মহাভয়
মানবের ; প্রচারিলে পৃথীতলে বিশ্বাসের জয়।
মহাবৈষম্যের মাঝে প্রচারিলে সাম্যের বারতা,
উচ্চারিলে, দ্রষ্টা! তুমি, মহামিলনের পূর্বকথা !
বাণী তব মৃত্যুহীন মৃত্যুময় এ মর্ত্যভুবনে
ওগাে মৃত্যুঞ্জয় কবি ! হে মনীষি জাগে আজি মনে
সিদ্ধার্থের সুপ্ত স্মৃতি,-তােমার শুনিয়া করব,
সেই সুর, সেই কথা; তারি মত—তারি মত সব !
সেই ত্যাগ ! সেই তপ! সেই মহামৈত্রীর বাখান !
বুদ্ধকল্প বিশ্বপ্রেমে বর্তমানে তুমি মহাপ্রাণ ।
কবি-প্রশস্তি
( ঋষি কৰি শ্ৰীযুক্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মহােদয়ের সংবর্ধনা উপলক্ষে রচিত)
বাজাও তুমি সােনার বীণা হে কবি ! নব বঙ্গে;
মাতাও তুমি, কঁাদাও তুমি, হাসাও তুমি রঙ্গে।
তােমার গানে তােমার সুরে
উঠিছে ধ্বনি ভুবন জুড়ে,
লক্ষ হিয়া গাহিয়া আজি উঠিছে তব সঙ্গে।
কমলে তুমি জাগালে প্রাতে, নিশীথে নিশিগন্ধা,
পূর্ণা তিথি মিলালে আনি’ রিক্তা মাঝে না!
যে ফুল ফোটে স্বর্গ বায়ে
আহরি’ দিলে প্রিয়ের পায়ে,
মিলালে আনি’ অনাদি বাণী নবীন মধুচ্ছা!
১১৮
কুহু ও কেকা
জগৎ-কবি-সভায় মােরা তােমার করি গর্ব,
বাঙালী আজি গানের রাজা, বাঙালী নহে খৰ্ব্ব।
দর্ভ তব আসনখানি
অতুল বলি’ লইবে মানি’
হে গুণী তব প্রতিভা-গুণে জগৎ-কবি সর্ব ।
জীবন-তে পঞ্চাশতে পড়িল তব অঙ্ক,
বঙ্গ-গৃহ জুড়িয়া আজি ধ্বনিছে শুভ শঙ্খ ;
পান্থ এসে পুষ্প-রথে
পৌছিলে হে অর্ধ পথে,
সারথি তব শুভ্র-শুচি কীর্তি অকলঙ্ক !
অর্ধশত শরতে সােনা ঢেলেছ তুমি নিত্য,
অর্ধশত মিলিলে হেন তবে সে পূরে
চিত্ত
সােনার তরী দিয়েছ ভরি,
তবুও আশা অনেক করি ;
ভরিয়া ঝুলি ভিখারী সম ফিরিয়া চাহি বিত্ত ।
চাতক! তুমি কত না মেঘে মেখেছ বারি-বিন্দু,
কত না পারে ভরিয়া তুমি তুলেছ চিত-সিন্ধু ।
মরাল! তুমি মানস-সরে
ফিরেছ কত হরষ-ভরে,
চকোর তুমি এসেছ ছুয়ে গগন-ভালে ইন্দু।
বঙ্গ-বাণী-কুঞ্জে তুমি আনিলে শুভ লগ্ন,
বাজালে বেণু মােহন তানে পরাণ হ’ল মগ্ন !
বিষাণ যবে বাজালে, মরি,
গলিয়া শিলা পড়িল ঝরি’
মিশিল স্রোতে বন্ধ ধারা, পাষাণ-কারা ভগ্ন।
কবি-প্রশান্তি
গভীর তব প্রাণের প্রীতি, বিপুল তব যত্ন,
দিশারি। তুমি দেখাও দিশা, ডুবারি তােললা রত্ন।
যে তানে টলে শেষের ফণা
পেয়েছ তুমি তাহারি কণা,
অমৃত এনে দিয়েছে শােনে,—নহে সে নহে প্রত্ন।
অমৃত এনে দিয়েছে প্রাণে পরাণ-শােষী দুঃখ,
গৌণ যাহা না গণি’ তাহে চিনিয়া নিলে মুখ্য ;
শশাকের রাতে রহিলে ধরে
হিরণময় মৃণাল ডােরে,
রুদ্রে নিলে বরণ করে রসায়ে নিলে রুক্ষ।
রেখেছ তুমি দৈবী শিখা হৃদয়ে চির-দীপ্ত,
অবিশ্বাসে হতাশ্বাসে জগৎ যবে ক্ষিপ্ত ;
মত্ততারে করেছ ঘৃণা-
চাহ না তবু মুক্তি বিনা,
উজল মনােমুকুর তব হয়নি মসীলিপ্ত ।
বাজাও কবি! অলােক বীণা মধুর নব ছন্দে,
হৃদয়-শতদল সে তুমি ফুটাও সুধা গন্ধে ;
যে ভাব ওঠে প্রাণের মাঝে
তােমার গানে সকলি আছে,
তােমার নামে মেতেছে দেশ, মিলেছে মহানন্দে।।
গহন মেঘে বিজলি সম উজলি’ আছ বঙ্গ,
মাতাও কভু কঁদাও তুমি হাসাও করি’ রঙ্গ!
সূৰ্য্য সম উজলি’ ভূমি
সপ্ত ঘােড়া ছুটাও তুমি,
তৃপ্ত হ’ল হৃদয়-প্রাণ লভিয়া তব সঙ্গ।
অর্ঘ্য
-
(কবি-সম্বর্ধনা উপলক্ষে সাহিত্য-পরিষদের ছাত্র সভ্যদিগের পক্ষ হইতে প্রদত্ত )
নেতধটি মােরা পাই নাই খুজে,
বিশ আড়া ধান আনিনি কবি ।
এনেছি কেবল হৃদয়ের প্রীতি
বিকচ কমল কোমল ছবি।
পরগণা লিখে সপিতে কবিকে
কৃষ্ণচন্দ্র বঙ্গে নাহি,
আঁখিজলে শুধু করি’ অভিষেক
দ-আসনে বসাতে চাহি।
জীবনের বহু শূন্য প্রহর
ভরিয়া তুলেছ বীণার তানে,
অন্ধ যামিনী হেসেছে পুলকে,
যে হাসি হাসিতে অন্ধ জানে।
তােমার যােগ্য কি দিব অর্ঘ্য ?
কোথা পাব মােরা ভাবি গাে তাই ;-
জনক রাজার মত কোথা পাব
হিরণ-শৃঙ্গ হাজার গাই ।
ব্ৰহ্মবিদের তুমি বরেণ্য,
কাব্য-লােকের লােচন রবি ।
স্বর্গে বসিয়া আশীষিছে তােমা,
ব্ৰহ্মবাদিনী বাচকবী।
শ্রদ্ধার স্র চন্দন আর
অনুরাগ-ধারা এনেছি মােরা,
তােমার যােগ্য নাহিক’ অর্ঘ্য,-
তবু লও প্রীতি রাখীর ডােরা।
নিবেদিত
-
প্রসূতি না হয়ে কোলে পেয়েছিল পুত্র যশােমতী ;-
তেমনি তােমারে পেয়ে হৃষ্ট হয়েছিল বঙ্গ অতি,
বিদেশিনী নিবেদিতা! স্বাস্থ্য, সুখ, সম্পদ তেয়াগি
দীন দেশে ছিলে দীন ভাবে ; দুঃস্থ এ বঙ্গের লাগি
==
সপেছিলে সৰ্ব্বধন,-কায়, মন, বচন আপন,
ভাবের আবেশ ভরে,-করেছিলে আত্ম-নিবেদন।
ভালবেসে ভারতের কাছে এসেছিলে দূর হতে,
দিয়েছিলে স্নিগ্ধ করে অনাবিল মমত্বের স্রোতে।
তপস্যার পুণ্য তেজে করেছিলে অসাধ্য-সাধন,
জ্বেলেছিলে স্বর্ণ-দীপ অন্ধকারে ; নব উদ্বোধন
করেছিলে জীর্ণ বিহুমূলে মাতৃরূপা শকতির
স্মরিয়া সে সব কথা আজ শুধু চক্ষে বহে নীর।
=
এসেছিলে না ডাকিতে, অকালে চলিয়া গেলে, হায়,
চলে গেলে অল্প-আয়ু দুর্ভাগার সৌভাগ্যের প্রায়,
দেহ রাখি’ শৈল মূলে ;-শঙ্করের অঙ্কে মৃত সতী;
ওগাে দেবতার-দেওয়া ভগিনী মােদের পুণ্যবতী।
নফর কুণ্ড
নফর নফর নয়,এক মাত্র সেই তাে মনিব
নফরের দুনিয়ায় ; দীন হীন প্রতি জীবে শিব
প্রত্যক্ষ করেছে সেই। নহিলে কি অস্পৃশ্য মেথরে
বিপন্ন দেখিয়া, নিজ প্রাণ দিতে পারে অকাতরে
কুহু ও কেকা
দুঃস্থের উদ্ধার লাগি’? পঙ্কে সে মানে নি অগৌরব ;
সে শুধু মানস-চক্ষে দেখেছে গাে বিপন্ন মানব ;
শুনেছে মনের কানে মুমূষু জনের আত্তরব,
অমনি গিয়েছে ভুলে পুত্র, জায়া, পিতা, মাতা,-সব,
গৃহ, গৃহস্থালী-সুখ ; বাষ্প-বিষ-বিহ্বল-গহ্বরে
নেমেছে অকুতােভয়ে ;-একটি সে জীবনের তরে।
একটি প্রাণের লাগি’ নিজ প্রাণ দেছে মহাপ্রাণ।
স্বদেশী বিদেশী মিলি’ স্মরে আজি পুণ্য অবদান
নিঃস্ব এই নফরের। নফর আজিকে পুণ্যশ্লোক ;
আলােকিছে মাতৃভূমি শুত্র তার সুকৃতি-আলােক।
দেশবন্ধু
(স্বর্গীয় রমেশচন্দ্র দত্তের অভ্যর্থনা উপলক্ষে সাহিত্য-পরিষদে গীত)
-
বন্ধুর ভালে চন্দন-টীকা কণ্ঠে কমল-মালা,
দেশ-বন্ধুর শুভ আগমনে হৃদি-মন্দির আলা !
মাধবে মাধবী-কঙ্কণ বাঁধাে বন্ধুর মণিবন্ধে,
লােক-বন্ধুর গৌরব-গাথা গাঁথাে মনােরম ছন্দে ;
বেদের সরস্বতী এসেছেন লইয়া বরণডালা,
ইন্দু-কিরণ-নিন্দিত যার মুকুট-রশ্মি-জ্বালা !
বন্ধুর তরে তােরণ রচনা করেছে নূতন বর্ষ,
নবীন পুষ্পে নব কিশলয়ে ; উথলে নবীন হর্ষ ।
বর্ষণ করে লাজ-অঞ্জলি কল্যাণী পুরবালা,
জনবন্ধুর আগমন-পথে লক্ষ কুসুম ঢালা ।
জ্যোতির্মগুল
যাঁহাদের পুঞ্জ তেজে দীপ্ত আজি বঙ্গের গগন,
বাঙালীর চিত্তপটে তাহাদের একত্র মিলন !
মণ্ডলের মধ্যে রবি মহিমায় করেন বিরাজ,
সৌর জগতের সত্য সাহিত্য-জগতে হের আজ
হয়ে আছে সপ্রমাণ! উর্ধে তার নিস্পন্দ আলােক,
যুগ-যুগন্ধর রাজা আছেন রচিয়া ধ্রুব-লােক ;
আর্ষ-লােক পার্শ্বে তার,-তপঃক্লিষ্ট সপ্তর্ষি মণ্ডল,--
স্তব্ধ, শান্ত সুগম্ভীর পুরাতন জ্যোতিষ্কের দল,
অক্ষয় সে জ্ঞানযােগী, কৰ্ম্মযােগী বিদ্যার সাগর, -
দূরতায় মন্দীভূত রশ্মি তবু স্পষ্ট সুগােচর।
রবির দক্ষিণভাগে বঙ্কিম বঙ্গের বৃহস্পতি ;
বামে মধু শুক্রগ্রহ,-বিতরিল যেই শুভ্র জ্যোতি
রবি উদয়েরও আগে। শূন্যে শােভে নীহারিকা-সেতু,
উল্কা আছে, গ্রহ আছে, আছে তারা, আছে ধূমকেতু।
বিশ্ববন্ধু
( বিশ্ববন্ধু উইলিয়ম ষ্টেডের মৃত্যু উপলক্ষে )
গ্রহণ-বর্জিত শুচি সূৰ্য্য সম নিত্য নির্নিমেষ
নিয়ন্তার নেত্রবিভা পশেছিল ও তব পরাণে ;
তাই জান নাই শঙ্কা, তাই তুমি মান নাই ক্লেশ,
বিবাদ, বিপদ, বিপ্ন ; টল নাই নিন্দা অপমানে।
১২ঃ কুহু ও কেকা ; হে তেজস্বী ! অগ্নি-সত্ত্ব! হে তপস্বী! স্বদেশ বিদেশ ভিন্ন নহে তব চোখে ; তােমার নাহিক আত্মপর ; ঘােষণা করেছ তুমি নিত্য সত্য ; চিত্ত স্বার্থ-লেশ- শূন্য তব চিরদিন ; ধৃতব্ৰত তুমি ঋতম্ভর। •• “জাতির প্রতিষ্ঠা বাড়ে ন্যায়-নিষ্ঠ শুচি অনুষ্ঠানে” এ তােমার মূলমন্ত্র,-এ তােমার প্রাণের সাধনা ; জয়-ডঙ্কা-নাদে তাই আতঙ্কিত হ’তে তুমি প্রাণে দুৰ্ব্বলের পীড়াভয়ে। বিশ্ব-মানবের আরাধনা, সনাতন ন্যায়-ধৰ্ম্ম,-তুমি তার ছিলে পুরােহিত ;- কত অভিচার-মন্ত্র নষ্টবীৰ্য্য তব শঙ্খ রবে । হে বিশ্বাসী! বিশ্ববন্ধু। ওগগা কৰ্ম্মী উদার-চরিত । নিঃস্ব নিজ্জিতের পক্ষে একা তুমি যুঝেছ গৌরবে। হে ধর্মিষ্ঠ ! আত্মনিষ্ঠ! লভিয়াছ সমুদ্র-সমাধি অন্তে তুমি সমুদার! মানুষের রাজ্যের বাহিরে ; উর্দ্ধে শুধু নীলাকাশসীমাহীন, অনন্ত, অনাদি, নিম্নে লীলায়িত নীল উচ্ছসিত চন্দ্রম-মিহিরে। তােমার সমাধি ভঙ্গ করিবে না তরঙ্গ দুর্জয়, আত্ম-প্রাণ-দানে তব আত্রাণ ঘটেছে সুক্ষণে ; কীৰ্ত্তনীয় তব নাম ; কীৰ্ত্তি তব অমর অক্ষয়, ক্ষাত্রধর্ম মূর্ত তুমি, হে যশস্বী ! জীবনে মরণে।
চৌদ্দ প্রদীপ
চৌদ্দ প্রদীপে চৌদ্দ
ভুবন
উজল করি,
বিস্মৃত শত অমা-যামিনীর কাজল হরি ;
পিতৃযানের অজানা আঁধারে আলাে জ্বালি
আলাের রাখীতে বাঁধি গাে অতীতে-ঘুচাই কালি।
মৃত্যু গহনে বিস্মৃত জনে স্মরণ করি,
স্মৃতি-লােকে সবে জাগাই পুলকে চিত্ত ভরি'।
কল্পনা দিয়ে করি গো সৃজন করু-লতা-
অশ্রু-হিমানী জড়িত আকাশে অতীত-ক] :
চৌদ্দ প্রদীপে সপ্ত ঋষিরে স্মরণ করি,
ত্রিশঙ্কু আর বিশ্বামিত্রে বরণ করি ;
স্মরি অগস্ত্যে-ফেরে নি যে আর যাত্রা ক'রে,
স্মরি গো বুদ্ধে—জ্ঞানে প্রেমে যার ভুবন ভরে ;
স্মরি পরাশরে-তার রাক্ষস-সত্ৰ-কথা,
স্মরি মৈত্রেয়ী অরুন্ধতীরে পতিব্রতা ;
বাল্মীকি আর কালিদাস কবি জাগিছে মনে,
দোলাইয়া শিখা নমিছে প্রদীপ দ্বৈপায়নে।
;
ভীষ্মের স্মৃতি উজলিছে দীপ হৃদয়-লােকে,--
সারা ভারতের পিতামহ সেই অপুত্রকে।
জাগিছে ভরত সৰ্ব্বদমন ভারত-আদি,-
অশােক-প্রতাপ-পৃঙ্খী-বিজয়সিংহ-সাথী।
জাগে বিক্রম অভিনব নবরত্নে ধনী,
যবনী রাণীর বক্ষে জাগিছে মৌৰ্য্যমণি।
লুপ্ত দিনের বিস্মৃতি-লেপ ঘুচেছে কালাে,
চৌদ্দ প্রদীপে আজিকে চৌদ্দ ভুবন আলাে।
কুহু ও কেকা
কোলাকুলি আজ তিমিরে দোলায়ে আলাের দোলা।
চৌদ্দ যুগের চৌদ্দ হাজার ঝরােখা খােলা ।
এ পারে প্রদীপ উল্কা ওপারে উলসি’ ওঠে,
পিতৃযানের মাঝখানে আজ বার্তা ছােটে ;
আনাগােনা আজ জানা যেন যায় আকাশ পরে,
পিতৃগণের পদ-রেণু আজ আঁধারে ঝরে ।
আঁধার-পাথারে আকুল হৃদয় পেয়েছে ছাড়া,
চৌদ্দ প্রদীপে চৌদ্দ ভুবনে জেগেছে সাড়া।
বন্দরে
শাস্ত্র-শাসন রইল মাথায়, তর্ক মিছে,নেইকো ফল ;
বন্দরে ওই দাড়িয়ে জাহাজ,—বেরিয়ে পড় বন্ধুদল !
বাজে কথায় কান দিয়াে না, কান দিয়াে না ক্রন্দনে,
দুলতে হবে সিন্ধু-দোলায় বিরাট বুকের স্পন্দনে।
সাগর-পথে যাত্রা-নিষেধ ?—লক্ষ্মীছাড়ার যুক্তি ও,
লক্ষ্মী আছেন সিন্ধুমাঝে-মুক্তাভ শুক্তি ও ;
ফিরব মােরা দশটা দিকে রত্নাকরের বুক চিরে,
রত্ন নেব, মুক্তা নেব, সঙ্গে নেব লক্ষ্মীরে।
বাণিজ্যে সে বসত করে সিন্ধুজলে জন্ম তার,
সাগর সেচে আম্ব তারে আব ঘরে পুনৰ্বার ;
আব ঘরে মাথায় করে বিদ্যা মৃত-সঞ্জীবন,
শুক্র ঋষির চরণ-ধূলায় পরব মােরা জ্ঞানাঞ্জন।
দেবযানীরে রাখব খুসী ব্রহ্মচর্য ছাড়ব না,
আপনজনে ভুলব না রে পরের আদর কাড়ব না ;
১২৭ জালের কাঠি নিরেট খাঁটি, ছড়িয়ে পড়ে ছত্রাকার,- মিললে নিধি, জলের তলে থাকবে না সে ছড়িয়ে আর ;- ঘেঁষে ঘেঁষে ঘনিয়ে এসে মিলিয়ে দেবে সকল খুট,- ধন ঘড়াটি ধরবে আঁটি’ লাখ, আঙুলের লােহার মুঠ । ছড়িয়ে গিয়ে জগৎমাঝে মিলব মােরা অন্তরে ; নূতন করে পড়ব বাঁধা দেশের মায়া-মন্তরে। পাজি পুথি রইল মাথায়, জ্ঞানের বাড়া নেইকো বল, যৌবনের এই শুভক্ষণে বেরিয়ে পড় বন্ধুদল ! হিন্দু যখন সিন্ধুপারে করলে দখল যবদ্বীপ কোথায় তখন ভট্টপল্লী কোথায় ছিলেন নবদ্বীপ ? কোথায় ছিল জাতির তর্ক—অর্কফলার আন্দোলন- যে দিন রুদ্র সমুদ্রেরে বিজয় দিল আলিঙ্গন ? মেক্সিকোতে হ’ল যে দিন মঠপ্রতিষ্ঠা রামসীতার বিধান দিল কোন্ মনীষী?—খোঁজ রাখে কি পুরাণ তার? উড়প-যােগে দু’দিন আগে হিন্দু যেত সিন্ধু পার, মিশর, পেরু, বােম, জাপানে ছুত নিয়ে পণ্যভার ; তাদের ধারা লুপ্ত হবে। থাকবে শুধু পঞ্জিকা ? ধানের আবাদ উঠিয়ে দিয়ে ফসল হ’ল গঞ্জিকা ? করুক তবে সূক্ষ্ম বিচার শাস্ত্র নিয়ে পণ্ডিতে; নিঃস্ব করুক নস্যধানী গােময়-লিপ্ত গণ্ডীতে। চলবে না কেউ মােদের নিয়ে?—সাগরের তাে চলছে জল ; পরের কথা ভাবব পরে ;-বেরিয়ে পড় বন্ধুদল ।
হল্লা করে ছুটির পরে ওই যে যারা যাচ্ছে পথে,
হাল্কা হাসি হাসছে কেবল,-ভাসছে যেন আলগা স্রোতে,
কেউ বা শিষ্ট, কেউ বা চপল, কেউ বা উগ্র, কেউ বা মিঠে ;
ওই আমাদের ছেলেরা সব,-ভাবনা যা’ সে’ ওদের পিঠে।
ওই আমাদের চোখের মণি, ওই আমাদের বুকের বল,-
ওই আমাদের অমর প্রদীপ, ওই আমাদের আশার স্থল,-
ওই আমাদের নিখাদ সােনা, ওই আমাদের পুণ্যফল,--
আদর্শে যে সত্য মানে-সে ওই মােদের ছেলের দল।
ওরাই ভাল বাসতে জানে
দরদ দিয়ে সরল প্রাণে,
প্রাণের হাসি হাসতে জানে, খুলতে জানে মনের কল,-
ওই যে দুষ্ট, ওই যে চপল,—ওই আমাদের ছেলের দল।
;
ওরাই রাখে জ্বালিয়ে শিখা বিশ্ববিদ্যা-শিক্ষালয়ে,
অন্নহীনে অন্ন দিতে ভিক্ষা মাগে লক্ষ্মী হয়ে ;
পুরাতনে শ্রদ্ধা রাখে নূতনেরও আদর জানে
ওই আমাদের ছেলেরা সব,-নেইকো দ্বিধা ওদের প্রাণে ;
ওই আমাদের ছেলেরা সব—ঘুচিয়ে অগৌরবের রব
দেশ দেশান্তে ছুটছে আজি আনতে দেশে জ্ঞান-বিভব ;
মার্কিনে আর জৰ্ম্মনিতে পাচ্ছে তারা তপের ফল,
হিবাচীতে আগুন জ্বেলে শিখছে ওরা কজাকল ;
হােমের শিখা ওরাই জ্বলে,
জ্ঞানের টীকা ওদের ভালে,
সকল দেশে সকল কালে উৎসাহ-তেজ অচঞ্চল,
ওই আমাদের আশার প্রদীপ, ওই আমাদের ছেলের দল।
ছৈলের দল
-
মানুষ হয়ে ওরা সবাই অমানুষী শক্তি ধরে,
যুগের আগে এগিয়ে চলে, হাস্যমুখে গর্বভরে ;
প্রয়ােজনের ওজন-মত আয়ােজন সে কর্তে পারে,
ভগবানের আশীর্বাদে বইতে পারে সকল ভারে।
ওই আমাদের ছেলেরা সব,-ত্রুটি ওদের অনেক হয়,
মাঝে মাঝে ভুল ঘটে ঢের,কারণ ওরা দেবতা নয় ;
মাঝে মাঝে পঁাড়ায় বেঁকে নিন্দা শুনে অনর্গল,
প্রশংসাতেও হয় গাে কাবু,মনের মতন দেয় না ফল ;
তবু ওরাই আশার খনি,
সবার আগে ওদের গণি,
পদ্মকোষের বজ্ৰমণি ওরাই ধ্রুব সুমঙ্গল ;
আলাদিনের মায়ার প্রদীপ ওই আমাদের ছেলের দল।
কালাের আলো
কালাের বিভায় পূর্ণ ভুবন ; কালােরে কে করিস ঘৃণা?
আকাশ-ভরা আলাে বিফল কালাে আঁখির আলাে বিনা।
কালাে ফণীর মাথায় মণি,
সােনার আধার আঁধার খনি ;
বাসন্তী রং নয় সে পাখীর বসন্তের যে বাজায় বীণা ;
কালাের গানে পুলক আনে, অসাড় বনে বয় দখিনা
কালো মেঘের বৃষ্টিধারা তৃপ্তি সে দেয় তৃষ্ণা হরে,
কোমল হীরার কমল ফোটে কালাে নিশির স্যামসায়রে ।
কালাে অলির পরশ পেলে
তবে মুকুল পাপড়ি মেলে,
-
কুহু ও কেকা
তবে সে ফুল হয় গাে সফল রােমাঞ্চিত বৃন্ত পরে।
কালাে মেঘের বাহুর তটে ইন্দ্রধনু বিরাজ করে।
সন্ন্যাসী শিব শ্মশানবাসী,—সংসারী সে কালাের প্রেমে ;
কালাে মেয়ের কটাক্ষেরি ভয়ে অসুর আছে থেমে।
দৃপ্ত বলীর শীর্ষ 'পরে
কালাের চরণ বিরাজ করে,
পুণ্য-ধারা গঙ্গা হ’ল—সেও তাে কালাে চরণ ঘেমে ;
দূর্বাদলশ্যামের রূপে-রূপের বাজার গেছে নেমে।
প্রেমের মধুর ঢেউ উঠেছে কালিন্দীরি কালাে জলে,
মােহন বাঁশীর মালিক যেজন তারেও লােকে কালােই বলে ;
বৃন্দাবনের সেই যে কালাে-
রূপে তাহার
ভুবন
আলাে,
রাসের মধুর রসের লীলা,—তাও সে কালাে তমাল তলে ;
নিবিড় কালাে কালাপানির কালাে জলেই মুক্তা ফলে।
কালাে ব্যাসের কৃপায় আজো বেঁচে আছে বেদের বাণী,
দ্বৈপায়ন—সেই কৃষ্ণ কবি—শ্রেষ্ঠ কবি তারেই মানি ;
কালাে বামুন চাণক্যেরে
আঁটবে কে কূটনীতির ফেরে ?
কাল-অশােক জগৎ-প্রিয়,রাজার সেরা তঁারে জানি ;
হাবসী কালাে লােমানেরে মানে আরব আর ইরাণী।
কালাে জামের মতন মিঠেকালাের দেশ এই জম্বুদ্বীপে
কালাের আলাে জ্বলছে আজো, আজো প্রদীপ যায়নি নিবে ;
কালাে চোখের গভীর দৃষ্টি
কল্যাণেরি করছে সৃষ্টি,
ইমরা
বিশ্ব-ললাট দীপ্ত-কালো রিষ্টিনাশা হােমের টিপে,
রক্ত চোখের ঠাণ্ডা কাজল—তৈরী সে এই ম্লান প্রদীপে।
•
কালাের আলাের নেই তুলনা-কালােরে কী করিস ঘৃণা।
গগন-ভরা তারার মীনা বিফল—চোখের তারা বিনা
কালাে মেঘে জাগায় কেক,
চাঁদের বুকেও কৃষ্ণ-লেখা,
বাসন্তী রং নয় সে পাখীর বসন্তের যে বাজায় বী,
কালাের গানে জীবন আনে নিথর বনে বয় দখিনা।
আমরা
মুক্তবেণীর গঙ্গা যেথায় মুক্তি বিতরে রঙ্গে
আমরা বাঙালী বাস করি সেই তীর্থে-বরদ বঙ্গে ;-
বাম হাতে যার কলার ফুল, ডাহিনে মধুক-মালা,
ভালে কাঞ্চন-শৃঙ্গ-মুকুট, কিরণে ভুবন আলা,
কোল-ভরা যার কনক ধান্য, বুকভরা যার মেই,
চরণে পদ্ম, অতসী অপরাজিতায় ভূষিত দেহ,
সাগর যাহার বন্দনা রচে শত তরঙ্গ ভঙ্গে,
আমরা বাঙালী বাস করি সেই বাঞ্ছিত ভূমি বঙ্গে।
-
বাঘের সঙ্গে যুদ্ধ করিয়া আমরা বাঁচিয়া আছি,
আমরা হেলায় নাগেরে খেলাই, নাগের মাথায় নাচি।
আমাদের সেনা যুদ্ধ করেছে সজ্জিত চতুরঙ্গে,
দশাননজয়ী রামচন্দ্রের প্রপিতামহের সঙ্গে।
আমাদের ছেলে বিজয়সিংহ লঙ্কা করিয়া জয়
সিংহল নামে রেখে গেছে নিজ শৌর্যের পরিচয়।
একহাতে মােরা মগেরে রুখেছি, মােগলেরে আর হাতে,
চাঁদ-প্রতাপের হুকুমে হঠিতে হয়েছে দিল্লীনাথে।
কুহু ও কেকা
জ্ঞানের নিধান আদিবিদ্বান কপিল সাঙ্কার
এই বাঙলার মাটিতে গাঁথিল সূত্রে হীরক-হার।
বাঙালী অতীশ লঘিল গিরি তুষারে ভয়ঙ্কর,
জ্বালিল জ্ঞানের দীপ তিব্বতে বাঙালী দীপঙ্কর ।
কিশাের বয়সে পক্ষধরের পক্ষশাতন করি
বাঙালীর ছেলে ফিরে এল দেশে যশের মুকুট পরি’ ।
বাঙলার রবি জয়দেব কবি কান্ত কোমল পদে
করেছে সুরভি সঙস্কৃতের কাঞ্চন-কোকনদে।
স্থপতি মােদের স্থাপনা করেছে বরভূধরে’ ভিত্তি,
শ্যাম-কম্বােজে ‘ওঙ্কার-ধাম’,—মােদেরি প্রাচীন কীর্তি!
ধেয়ানের ধনে মূর্তি দিয়েছে আমাদের ভাস্কর
বিটুপাল আর ধীমান—যাদের নাম অবিনশ্বর।
আমাদেরি কোন সুপটু পটুয়া লীলায়িত তুলিকায়
আমাদের পট অক্ষয় করে রেখেছে অজন্তায়।
কীৰ্ত্তনে আর বাউলের গানে আমরা দিয়েছি খুলি’
মনের গােপনে নিভৃত ভুবনে দ্বার ছিল যতগুলি।
;
মন্বন্তরে মরি নি আমরা মারী নিয়ে ঘর করি,
বাঁচিয়া গিয়েছি বিধির আশীষে অমৃতের টীকা পরি।
দেবতারে মােরা আত্মীয় জানি, আকাশে প্রদীপ জ্বালি,
আমাদেরি এই কুটীরে দেখেছি মানুষের ঠাকুরালি ;
ঘরের ছেলের চক্ষে দেখেছি বিশ্বভূপের ছায়া,
বাঙালীর হিয়া অমিয় মথিয়া নিমাই ধরেছে কায়া।
বীর সন্ন্যাসী বিবেকের বাণী ছুটেছে জগৎময়,
বাঙালীর ছেলে ব্যায়ে বৃষভ ঘটাবে সমন্বয়।
আমরা
তপের প্রভাবে বাঙালী সাধক জড়ের পেয়েছে সাড়া,
আমাদের এই নবীন সাধনা শব-সাধনার বাড়া।
বিষম ধাতুর মিলন ঘটায়ে বাঙালী দিয়েছে বিয়া,
মােদের নব্য রসায়ন শুধু গরমিলে মিলাইয়া।
বাঙালীর কবি গাহিছে জগতে মহামিলনের গান,
বিফল নহে এ বাঙালী জনম, বিফল নহে এ প্রাণ।
ভবিষ্যতের পানে মােরা চাই আশা-ভরা আহলাদে,
বিধাতার কাজ সাধিবে বাঙালী ধাতার আশীর্বাদে।
বেতালের মুখে প্রশ্ন যে ছিল আমরা নিয়েছি কেড়ে,
জবাব দিয়েছি জগতের আগে ভাবনা ও ভয় ছেড়ে ;
বাঁচিয়া গিয়েছি সত্যের লাগি’ সৰ্ব্ব করিয়া পণ,
সত্যে প্রণমি থেমেছে মনের অকারণ স্পন্দন ।
সাধনা ফলেছে, প্রাণ পাওয়া গেছে জগৎ-প্রাণের হাটে,
সাগরের হাওয়া নিয়ে নিশ্বাসে গম্ভীরা নিশি কাটে
শ্মশানের বুকে আমরা রােপণ করেছি পঞ্চবটী,
তাহারি ছায়ায় আমরা মিলাব জগতের শতকোটী।
;
মণি অতুলন ছিল যে গােপন সৃজনের শতদলে,-
ভবিষ্যতের অমর সে বীজ আমাদেরি করতলে ;
অতীতে যাহার হয়েছে সূচনা সে ঘটনা হবে হবে,
বিধাতার বরে
ভরিবে
ভুবন বাঙালীর গৌরবে।
প্রতিভায় তপে সে ঘটনা হবে, লাগিবে না তার বেশী,
লাগিবে না তাহে বাহুবল কিবা জাগিবে না দ্বেষাদ্বেষি ;
মিলনের মহামন্ত্রে মানবে দীক্ষিত করি’ ধীরে-
মুক্ত হইব দেব-ঋণে মাের মুক্তবেণীর তীরে।
ফুল-শিনি
-
(মুসলমান সাহিত্যিকবৃন্দের অভ্যর্থনার জন্য বঙ্গীয়-সাহিত্য-পরিষৎ কর্তৃক
আহুত সভায় কোজাগর পূর্ণিমায় পঠিত )
গুগগুলু আর গুলাবের বাস
মিলাও ধূপের ধূমে !
সত্যপীরের প্রচার প্রথমে
মােদেরি বঙ্গভূমে।
পূর্ণিমা রাতি! পূর্ণ করিয়া
দাও গাে হৃদয় প্রাণ ;
সত্যপীরের
হুকুমে
মিলেছে
হিন্দু-মুসলমান !
পীর পুরাতন,-নূর-নারায়ণ,
সত্য সে সনাতন ;
হিন্দু-মুসলমানের মিলনে
তিনি প্রসন্ন হন্।
অঁরি ইশারায় মিলিয়াছি মাের।
হৃদয়ে জ্যোৎস্না আলি’ ;
তঁাহারি পূজায় সাজায়ে এনেছি
ফুল-শিণির ডালি।
পুলকের ফেনা সফে বাতাসা
শুভ্র চামেলি ফুল,
হৃদয়ের দান প্রীতির নিদান
আলাপের তাল!
মিলন-ধৰ্মী মানুষ আমরা
মনে মনে আছে মিল,
ফুল-শিণি খুলে দাও খিল, হাসুক নিখিল দাও খুলে দাও দিল্ । হিন্দু-মুসলমানে হয়ে গেছে উষ্ণীষ-বিনিময়, পাগড়ী-বদল-ভাই—সে আদরে সােদর-অধিক হয়। সুফি-বৈষ্ণবে করে কোলাকুলি আমাদের এই দেশে । সত্যদেবের ইঙ্গিতে মেশে বাউলে ও দরবেশে ! বাহারে মিলায়ে বসন্ত রাগ, সিন্ধুর সাথে কাফি,- এক মার কোলে বসি’ কুতূহলে মােরা দেহে দিন যাপি। মিলন-সাধন করিছে মােদের বিশ্বদেবের আঁখি, তাঁর দৃষ্টিতে হ’য়ে গেল ফুল- শিণিতে মাখামাখি ! গুগগুলু জ্বালি’ ধূপের ধোঁয়ায় মিলায়ে দাও গাে আজি, বাণী-মন্দিরে বীণার সঙ্গে সিতার উঠেছে বাজি’!
গান
-
মধুর চেয়েও আছে মধুর
সে এই আমার দেশের মাটি,
আমার দেশের পথের ধূলা
খাঁটি সােনার চাইতে খাটি।
চন্দনেরি গন্ধভরা,
শীতল-করা,
ক্লান্তি-হরা,
যেখানে তার অঙ্গ রাখি
সেখাটিতেই শীতলপাটি।
শিয়রে তার সূৰ্য্য এসে
সােনার কাঠি ছোঁয়ায় হেসে,
নিমহলে জ্যোৎস্না নিতি
বুলায় পায়ে রূপার কাঠি ।
নাগের বাঘের পাহারাতে
হচ্ছে বদল দিনে রাতে,
পাহাড় তারে আড়াল করে,
সাগর সে তার ধােয়ায় পাটি।
মউল ফুলের মাল্য মাথায়,
লীলার কমল গন্ধে মাতায়,
পায়জোরে তার লবঙ্গ-ফুল
অঙ্গে বকুল আর দোপাটি।
নারিকেলের গােপন কোষে
অন্নপানী জোগায় গাে সে,
কোলভরা তার কনক ধানে
আটুটি শীষে বাঁধা আটি।
আমি
সে যে গাে নীলপদ্ম-আঁখি,
সেই তাে রে নীলকণ্ঠ পাখী,
মুক্তি-সুখের বার্তা আনে
ঘুচায় প্রাণের কান্নাকাটি।
আমি
তােমরা সবাই যা’ বল ভাই, আমি তাে সেই আমিই,
সমান আছি সকল কালে,—সমান দিবাযামী ;
আমি তাে সেই আমি।
বাইরে থেকে দেখছে লােকে,
বেজায় বুড়ো,চশমা চোখে,
মুখােস্ দেখে যাচ্ছে ঠ'কে,-ভাবছে “এ নয় দামী”।
কিন্তু আমি জাছি মনে-আমি তো সেই আমি।
ভিতরে যে মনটি আছে
উল্লাসে সে আজো নাচে,
নাচত যেমন বাল্যে পেলে মুড়কি-লাছুর ধামী ;
আমি তাে সেই আমি ।
বাইরে ভেঙে পড়ছে মাজ।
কিন্তু আছে প্রাণটি তাজা,
যৌবনে সে যেমন ছিল হৃদয়-মধু-কামী ;
আমি তাে সেই আমি।
মায়ের দুলাল, মিতার মিতা,
দাদার ভাইটি, ছেলের পিতা,
সীতার শীরাম-তার মানে ওই গৃহিণীটির স্বামী।
;
১৩
কুহু ও কেকা
আমি তত সেই—আমি।
শানাই-বাঁশী -কানাই-বাঁশী
আগের মতােই ভালবাসি
ভালবাসি রঙ্গ হাসি—যায়নি লেহা থামি’ ;
আমি যে সেই আমি।
ফুলের গন্ধ চাদের আলাে
আগের মতােই লাগে ভালো
আবীর-মাখা মেঘের কোণে সূর্য অস্তগামী ;
আমি যে সেই আমি।
সকল শােভা সুখের মাঝে
আমার আমি মিশিয়ে আছে,
মােহন-মালার মধ্যিখানের পান্না-হীরার খামি ;-
আমি গাে এই আমি।
দেখছ বুড়াে বাইরে থেকে,
রায় দিতে হয় ভিতর দেখে,
দু’টো হিসাব ভজলে তবে মিলবে সালতামামী ;
আমি যে সেই আমিই।
==
ভােজ ও পুত্তলিকা
(সুরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায় অঙ্কিত চিত্র দর্শনে )
যে এসেছে আজ আসনে বসিতে
তাররা ভালে রাজ-টীকা,
তবে কেন তােরা হইলি বিমুখ
ওরে ও পুত্তলিকা!
তােরা কী বলিবি? চিরনির্জীব
তােদের কী আছে কথা ?
ভােজ ও পুত্তলিকা
পুতুল থাকিবি পুতুলের মত ;
কেন এই বাতুলতা ?
চাষারে তাে করে তুলেছিলি রাজা,
তাহাতে তো ছিলি রাজী,
ভােজরাজে দেখি তবে কেন হেন ?
কেন এই ভােজবাজী ?
চোখ, মুখ,-- সব থাকে পুতুলের,
তবু সে কহে না কথা,
পুরাণাে সেধারা ভেঙে চুরে
দিবি ?
সনাতন মৌনতা?
পুতুল হইয়া তর্ক করিবি?
ছেড়ে চলে যাবি পায় ?
ভােজ বসে যদি এ মহা-আসনে ?--
নাই কিরে দয়া মায়া ?
বত্রিশখানা হয়ে চ'লে তাের।
যাবি বত্রিশ দিকে?
জনমের মত ধূলিসাৎ করি
পুরাণে আসনটিকে?
বিক্রম এই আসনে বসেছে ?
বসেছে ;-তাহাতে কিবা ?
তার পরে কত বসেছে কুকুর,
বসেছে তাে কত শিবা।
তােরা তাে মাত্র পুতুল ; তােদেরাে
আছে নাকি মতামত ?
যাহােক কিন্তু, খুব দেখাইলি ;-
চরণে দণ্ডবৎ!
১৪০ কুহু ও কেক। - = রাজা নিজে খাড়া রয়েছে সমুখে, তাহারে বসিতে বল, তা না,জুড়ে দিলি প্রশ্নের পরে প্রশ্ন অনর্গল ! গল্পের পরে গল্প চলেছে নাম নাই ফুরাবার, লগ্ন ফুরায়ে যায় যে এদিকে, খবর রাখি তার? ভােজ হ’তে নয় বিক্রমই বড়, বড় বত্রিশ বার ; তা’ বলে আসনে বসিতে দিবি না? এই কি শিষ্টাচার ? বড় মুখ করে এসেছে বেচারা,- ওরে তােরা দয়া কর । দেখ দেখি কত ডঙ্কা, নিশান, কত সে আড়ম্বর! দধি, দর্পণ, দূৰ্ব্বা এনেছে সাজায়ে সােনার থালে, সপ্তদ্বীপা পৃথিবীর ছবি লিখেছে বাঘের ছালে। বিক্রম সম সাহসটি ঠিক হয় নাহিক’ বুকে, হয় অবােধ ঘােষণা করেছে নিজ যশ নিজমুখে ; তবু, একবার বসিতে দে, আহা কেন থাকে মনে খেদ ;- =
নষ্টোদ্ধার
এ কি! যা কোথা?—না ফুরাতে কথা
মাঝখানে দিলি ছেদ।
সওয়াল-জবাবে নাকাল করিয়া
শেষে দিলি পিটান ।
‘হাপু-গেলা’ হয়ে হবু-মহারাজ
হাপুস্ নয়নে চান !
পাষাণের প্রাণ নেহাৎ তােদের,
, না, থুড়ি, কেঠো প্রাণ,
বাদ্যভাণ্ড করিয়া পণ্ড
হলি অন্তধন !
কালকূটে ভরা চামচের মত
দিনে ওড়ে চামচিকা,
রাজটীকা তােরা ব্যর্থ করিলি,
নারাজ পুত্তলিকা !
-
নষ্টোদ্ধার
আমরা এবার মন করেছি
ডােবা-জাহাজ তুলতে,
যাচ্ছি সাগর-ভরাডুবির
ধনের ঘড়া খুলতে !
মােহরভরা ধনের ঘড়ায়
যদিই লােণ জল ঢুকে যায়-
সােনা তবু সােনাই থাকে
পারি নে সে ভুলতে;
আমরা এবার পণ করেছি
ডােবা-জাহাজ তুলতে।
২
কুই ও কেকা
মন করেছি আমরা ক’জন
নষ্ট মানুষ তুলতে,
পষ্টে আছি নাতে রাজী
মনের চাবী খুলতে !
দোষ যদি হায় ঢুকেই থাকে—
মজিয়ে থাকে মগজটাকে—
মানুষ তবু মানুষ, ওগাে
পারব না তা ভুলতে,
মন করেছি—পণ করেছি
হারা-হৃদয় তুলতে।
উছল ঢেউয়ের পিছলা পিঠে
হবে রে আজ দুলতে,
ক্ষতির খাতায় পড়বে না সব,-
পারি যদি উতে;
জাহাজীরা যাদের মানে
-হাজা-মজার হিসাব জানে-
তারা তাে কেউ দেখায় না ভয়,
দিচ্ছে সাহস উলটে ;
আয় তবে আয়, চল্ দরিয়ার
ওলােন্-ঝোলায় ঝুলতে।
লােণা জলে রেশম পশম
আর দেওয়া নয় ফুলতে,
আর দেওয়া নয় পতিত, জনে
পাপের নেশায় ঢুলতে ;
কাটা ঝাপ
১৪৩
দোষ যদি হায় ঢুকেই থাকে,
আমরা শােধন করব তাকে,
করতে হবে নূতন বােধন
জাগিয়ে তারে তুলতে,
মানুষ—দোষে গুণেই মানুষ,
পারব না সে ভুলতে।
কাটা ঝাঁপ
গটা ঝাপের বাজনা বাজে, ঢাকের পিঠে পাখনা দোলে,
মহেশ্বরে স্মরণ করে ঝাঁপ দিয়ে পড় কাটার কোলে।
দৃষ্টি রাখিস শিবের পায়ে, চাস্ নে রে আর নিজের প্রতি,
কঁটার জ্বলা ভােলায় ভােলা,-ভুলিসনে তা ব্রতের ব্রতী।
দেবতা মানুষ সবাই মিলে তাের পানে আজ আছে চেয়ে,
মঞ্চে উঠে ডরাস্ নে মন! পিছাসনে রে সামনে ধেয়ে।
সংসারী তুই সন্ন্যাসী আজ শিবের শুভ প্রসাদ লাগি',
শিবের পায়ে হৃদয় সপে পালিয়ে হ'বি পাপের ভাগী?
আগুন লুফে কাটায় শুয়ে দিন ক’টা তুই কাটিয়ে দেরে,
শিবের দোহাই পিছাস নে ভাই পরীক্ষাতে যানে হেরে।
ঝাঁপ দিয়ে পড়, কাঁটার বুকে উল্লাসে প্রাণ উঠুক মেতে,
কাঁটা সে হয় কুসুম-শয্যা মহেশ্বরের কটাক্ষেতে।
কাটা তাে নয় কেবল কঠোর,রুদ্র শিবের অঙ্গুলি ও,
কোল যে দিতে পারে কাটায় সেই মহেশের হয় রে প্রিয়।
জীবের মধ্যে শিব রয়েছেন সকল কালে সকল কাজে ;
শঙ্কা কি তাের ? ঝাঁপ দিয়ে পড়, দেখরে আঁরে নিজের মাঝে।
গান মন! আমার হারায়ে যা’ রে । (তাের) কাজ কি রে আর কূল-কিনারে ? কান্না-হাসির ঢেউয়ে ঢেউয়ে অকূল পানে চল রে বেয়ে (যেথা) কূল ভাঙে না বান ডাকে না-- তরঙ্গ নেই যে পাথারে । ক্ষুদের প্রার্থনা ঠাই দাও সখা! কুণ্ঠা-কাতর শীতল-শিথিল-কুন্দরে ;- ব্যথা-বিমর্ষে তােমারি হর্ষে তব নিরাময় সুন্দরে। লুকায়ে লও হে লাজ-লাঞ্ছিতে অনাথ-শরণ ধূলিতে- লজ্জা-হরণ তােমার চরণ- কমলের রেণুগুলিতে। কুহেলি আঁধার মরণের পারে অমৃতে জুড়ায়ে দাও হে তাহারে ; ক্ষুদ্র তরীটি লও হে ভিড়ায়ে চির-নিরাপদ বন্দরে।
শীতন্তে মন তবু এ আজিকে শীতের শেষ সবুজের নবােমেষ, জলস্থল বিকাশ-বিল। মত্ত হাওয়া হাহা স্বরে কারে যেন খুজে মরে, দেহ প্রাণ আকুল চঞ্চল। আজি কয় এই উৎসব কিছু নয়, আমি আর নহিক’ ইহার ; সকল হাসির মাঝে আমি দেখিতেছি রাজে আজ শুধু কঙ্কালের হার ! আমি শুধু ছায়া গণি’ শুনি’ নিজ পদধ্বনি খুঁজে ফিরি বিশ্বের দুয়ার, চড়ায় ঠেকেছে তরী, আমি শুধু ভেবে মরি, ফিরিল না এখনাে জুয়া র ! দুই পারে আনাগােনা দুই পারে যায় শােনা আনন্দের মৃদু কোলাহল, আমি হেথা কর্মহীন বসে আছি দীর্ঘ দিন, দীর্ঘ দিন বেদনা- বিল । দুনিয়ার দুই পিঠে মরা বাঁচা দুই মিঠে, তিক্ত শুধু মরে বেঁচে থাকা; খেলাঘরে বাস করে কলের টিপনে ডাক ডাকা । আর না, আর না খেলা, ডেকে লও এই বেলা, লীলাময়। আর কেন, হায় ! মরণ-সিন্ধুর নীরে তুফান তুলিয়া, ধীরে ডুবাইয়া লও করুণায়। পুতুলের প্রাণ ধরে
সুদুরের
যাত্রী
আজ আমি তােমাদের জগৎ হইতে
চ'লে যাই, ভাই,
জনেকের চেনা মুখ কাল যদি খোঁজ
দেখিবে সে নাই।
তােমরা খুজিবে কিনা জানিনা ; সকলে
চাহিয়াছি আমি;
খেলায় দিয়েছি যােগ, আমি তােমাদের
ছিনু অনুগামী।
তােমাদের মাঝে এসে অনেক ঘটেছে
কলহ বিবাদ,
আজ ক্ষমা চাহিতেছি, ক্ষমা কর ভাই
মাের অপরাধ।
আমার একান্ত ইচ্ছা ভাল মন্দ সবে
তুষ্ট রাখিবার,
সে চেষ্টা বিফল হয়ে গেছে বহুবার
অদৃষ্টে আমার।
আমি যদি কারাে প্রাণে ব্যথা দিয়ে থাকি,
আজ ক্ষমা চাই;
স্বেচ্ছায় বেদনা মােরে দাও নাই কেহ,
আমি জানি, ভাই।
তােমাদের কাছে যাহা পেয়েছি সে মাের
চির জনমের,
উঠাতে চাহিলে আর উঠিবে না কভু
চিহ্ন মরমের।
আবার
খেলাধূলা কতমত অশ্রুভরা স্মৃতি
সারা জীবনের
মেলামেশা, ভালবাসা, কোলাহল, গীতি,
আনন্দ মনের,
যেমন রয়েছে আঁকা মরমে আমার
রবে সে তেমনি,
যা কিছু প্রাণের মাঝে করেছি সঞ্চিত
অমূল্য সে গণি।
মনে থাকে মনে কোরো, আমি তােমাদের
ভুলিব না, হায় !
তােমাদের সঙ্গ-হারা সঙ্গী তােমাদেরি
বিদায় ! বিদায় !
আবার
যেদিন আবার ফুটবে মুকুল
সে দিন আমায় দেখতে পাবে ।
ফাগুন হাওয়া বইলে ব্যাকুল
থা দূরে কোন্ হিসাবে।
আসব আমি স্বপন ভরে,
গভীর রাতে ভুবন
হাসব আমি জ্যোৎস্না সাথে,
গাইব যখন কোকিল গাবে।
তােমরা যখন কইবে কথা
শুনব আমি শুনব গােতা,
আমার কথা হর-ব্যথা
হায় গাে হাওয়ায় ভেসেই যাবে ।
'পরে ;
পুনর্নব
আমার প্রাণের গানটি নিয়ে
গাইলে কে গাে আমার কানে ?
বন্ধ হ’ল কণ্ঠ আমার
উথলে-ওঠা অশ্রু-বানে।
আমারি বাসন্তী গীতি
আমারি সে কণ্ঠ নিয়ে,
আজি এ ঘুমন্ত রাতে
কে যায় গাে ওই গেয়ে গেয়ে।
যে গান আমার কণ্ঠে ছিল
ফুটুল সে আজ কাহার তানে ;
হারা দিনের লুপ্ত ধারা
জাগল সে কি
নূতন
প্রাণে।
প্রভাতের নিবেদন
প্রভাতে বিমল করেছ যেমন
অমনি বিমল কর মন,
অমনি শান্ত শীতল, অমনি
হরষের রসে নিমগন।
বেদনার কিবা উদ্বেজনার
চিহ্ন না থাকে কোনাে খানে আর,
ছেয়ে যায় যেন আলােয় পরাণ,
বয়ে যায় মৃদু সুপবন।
পরীক্ষা
আমারে আজিকে ফেলেছিলে প্রভু!
বিষম অগ্নিপরীক্ষায় ;
নব জীবনের দুয়ার যে সেই,
আমি তাে আগে তা বুঝিনি, হায়!
উদ্ধারি’ মাের মুকতি-মন্ত্র, -
মাের অজ্ঞাত আমারি বল,
করি’ প্রবুদ্ধ করিলে শুদ্ধ,
হৃদয় করিলে সুনির্মল।
সহসা পড়িল বজের শিখা
নিরালয় মাের পরাণ 'পরে,
জ্বলে গেল যত গ্লানি জঞ্জাল,
গেল জ্বলে গেল ধূ ধূ ধূ করে।
সে যে উর্বর করে দিয়ে যাবে
সে কথা জানিতে পারি নি আগে,
আমি ভেবেছিনু মূৰ্ত্তিমন্ত
মরণ আজিকে আমারে ডাকে।
একেবারে শত লেলিহ রসনা
লেহন করিতে লাগিল দেহ,
বিশুষ্ক তালু-লগন জিহা,
ফুকারি’ ডাকিতে নাহিক’ কেহ।
কুহু ও কেকা
বােম-কণ্টকে ভরিল শরীর
মূচ্ছা হাসিল মদির হাসি,
তখনাে জানি নি তুমি সে নিভৃতে
করিছ শিথিল মােহের ফঁাসী।
চপল মনের শেষ নির্ভর
অন্তরযামী জানিতে একা,
আগুনে পােড়ায়ে করি’ পবিত্র
চিত্তে আবার দিলে হে দেখা।
যত পণ করি আপনার মনে
বারবার তাহা টুটিয়া পড়ে,
তাই করুণায় কঠোর হয়েছ
শক্তি প্রেরণা করিতে জড়ে।
শ্যামিকায় তুমি শুদ্ধ করেছ,
উজল করেছ, করেছ খাঁটি,
দুঃসহ তাপে তপ্ত করেছ,
তাই তাে ঝরেছে মলা ও মাটি।
রুদ্র-মূরতি! তােমার আরতি
করিতে আজিকে শিখেছি, প্রভু!
বারে বারে মােরে কোনাে পরীক্ষা,
দুলে ভুলে থেক না, কভু।
পথের পঙ্কে
পথের পক্ষে পড়েছে যে ফুল
ওগাে ! তারাে পানে ফিরিয়া চাও।
তার কলঙ্ক-লাঞ্ছিত মুখ
তুমি স্নেহভরে মুছায়ে দাও !
এখনাে যে তার মৃদু-সৌরভ
নীরবে জানায় তারি গৌরব,
তারে পায়ে দলে যেয়ো না গাে চ'লে,
বেদনা তাহার তুমি ঘুচাও !
পরুষ পরশে তারে ছুয়াে নাকো’
পাপড়ি পড়িবে টুটিয়া,
নব বেদনায় ব্যথিত সে, হায়,
কঁদিবে লুটিয়া লুটিয়া ;
শুধু ভালবেসে নাও যদি ভুলে
গ্লানি কলঙ্ক সব যাবে ভুলে,
মরিবার আগে নব অনুরাগে
মননাপ্রাণ তার যদি জুড়াও!
যথার্থ সার্থকতা
আমার কামনা বিফল করিয়া
আমারে সফল কর, নাথ!
আবিল হৃদয়ে আঁখিজলে ধুয়ে
প্রভু! তুমি ধীরে ধর হাত।
কোন্ পথে যাব তুমি শুধু জান,-
কোথা আছে মম ঠাই,
কুহু ও কেকা
ভাঙা বাঁশী আর কি কাজে লাগিবে
আমি শুধু ভাবি তাই।
সাধ করে শুধু ঘটেছে বিষাদ
আর করিব না কোনাে সাধ,
হীন এ হৃদয়ে দীনতা শিখাও,
চরণে করি হে প্রণিপাত।
পিপাসী
ভুবনময়!-
তােমারি চরণকমলের মধু-
পিপাসায় প্রাণ কাঁদে।
চিত্ত-চকোর মত্ত হয়েছে
ছুইতে ছুটেছে চাঁদে !
স্বপন-বরষা নেমেছে সহসা
নীরবে
ফুলগুলি কথা কয় !
বাতাস কোথায় নিয়ে যেতে চায়
উদাসীন উন্মাদে!
মরম-বীণার ছিড়ে গেছে তার
তাই আছি ম্রিয়মাণ,
থেমে আছে তাই গান ;
তুমি তারে তারে দাও নব প্রাণ
জাগাও নূতন তান!
আঁখিজলে মােরে করি' নিরমল
ফোটাও তরুণ হাসি,
শারদ শেফালিরাশি ;
দুঃখের ধূপে সুরভি কর গাে
মিলনের আদে!
সফল অশ্রু
নয়নের জল সফল হয়েছে
প্রভু হে তােমার চরণ ছুয়ে ;
বর্ষা-যামিনী কেঁদেছিল, তাই
মলিনতা তার গিয়েছে ধুয়ে !
সূৰ্য্য ছিল না, চন্দ্র ছিল না,
বজ জ্বলিয়া করিলে আলল,
শুষ্ক আমার শূন্য হৃদয়
অশ্রু-সলিলে ভরিলে ভালাে।
অবিরল ধার করুণা তােমার
প্রভু হে দিয়েছ লুটায়ে ভূয়ে,
ভাবনার আজি অন্ত পেয়েছি
পরাণের ভার চরণে থুয়ে।
প্রার্থনা
ধরম বলে যা’ মরম জেনেছে
সেই সে করম করিতে দাও,
পরম শরণ! অভয় চরণ
কম্পিত করে ধরিতে দাও।
হৃদয়ে আমার ভালাে প্রভু আলাে,
তােমার করুণ নয়নেরি আলাে,
তােমারি প্রসাদ জনমে মরণে
নিত্য নিয়ত বরিতে দাও।
স্তব্ধ করিয়া দাও হে আমার
লুব্ধ মনের চির হাহাকার,
শান্তি-শীতল তব পারাবারে
শূন্য জীবন ভরিতে দাও।
সূৰ্য্য না ওঠে তুমি জেগে রবে,
বন্ধু না জোটে তুমি ডেকে লবে,
এই আশাবাণী অন্তরে মানি’
অকূল পাথারে তরিতে দাও।
ভিক্ষা
-
জাগিয়ে রেখে একটি তারার আলাে,
একটু দয়া রেখাে আমার 'পরে,
চোখে যখন দেখতে না পাই ভালাে
দু চোখ যখন চোখের জলে ভরে,
গহন আঁধার, অকূল পাথার, আবিল কুটিকা,
আলিয়ে রেখে তােমার প্রেমের শিখা।
ভিক্ষা
বিপুল জগৎ ক্ষুদ্র হ'য়ে এলে
ঠাই যেন পাই তােমার ছায়ায় প্রভু।
নীল আকাশে ক্লান্ত আঁখি মেলে
শান্তি যেন পাই পরাণে, তবু !
চক্ষে ধারা, বাইরে আঁধার—দ্বিগুণ কুদ্ধাটিকা,
জাগিয়ে রাখে অমর প্রেমের শিখা।
বাইরে যখন লজ্জাতে শির নত,-
নিস্ফলতার নিঃস্ব নিশাস প্রাণে,
অন্তরেতে অপমানের ক্ষত
রসাতলের পথে যখন টানে,
বুকে যখন জ্বলে সঘন সৰ্ব্বনাশী চিতা,
দয়া রেখাে পিতা! আমার পিতা।
একটি তারার একটু শুভ্র আলো
জাগিয়ে রেখে আমার যাত্রাপথে,
ঘিবে যেদিন মৃত্যু-আঁধার কালো
ফিরতে যেদিন হবে নীরব রথে,
যম-নিয়মের নিমে যখন সকল তনু তিতা;-
দয়া রেখে পিতা! আমার পিতা।
আকিঞ্চন
ভেঙে আমায় গড়তে হবে, প্রভু!
মনের মতন করতে হবে, মন!
অভাজনের এই নিবেদন, ওগগা।
দুর্বলের এই প্রাণের আকিঞ্চন।
ক্ষণে ক্ষণে পড়ছি দেখ হেলে,
ঢেউগুলাে সব যাচ্ছে আমায় ঠেলে,-
প্রাণের ভিতর শক্তি নাহি মেলে,
ঠাকুর আমার ! আমার নিরঞ্জন!
–
লক্ষ ঠায়ে দােয়াই মাথা, প্রভু!
দেখাদেখি ছোঁয়াই মাথা পায়ে,
চলতে বাঁয়ে ডাইনে কেবল চাহি,
ডাইনে যেতে তাকাই ফিরে বাঁয়ে।
মনে মনে জাছি যেটা মেকী
পরের চোখে তারেই খাঁটি দেখি ।
ভয় করি হায়,—বলবে শেষে কে কি ;-
আঁচড় কি আঁচ লাগতে না পায় গায়ে।
পঙ্গু হয়ে পড়ছি এমনি ক'রে
সায় দিয়ে যে ফেলছি গাে না বুঝে!
বিকিয়ে গেল মগজ-মহাল-খানা
সই দিয়ে হায় চক্ষু দুটি বুজে ;
জীর্ণ চাকা অভ্যাসেরি রথে
চলছি প্রভু! সর্বনাশের পথে,
খুলছে নাকো দৃষ্টি কোনাে মতে,
দিগ্বিদিকের ঠিক নাহি পাই খুজে।
আকিঞ্চন
;
সামনে বিপদ চক্ষে নাহি দেখি,
দারুণ আঁধার নাই গাে আমার সাথী ;
বাঁচাও তুমি বাঁচাও মােরে, প্রভু !
জাগাও প্রাণে তােমার অমল ভাতি।
মনকে আমার মনের মতন কর,
ওগাে প্রভু ! ভেঙে আমায় গড়,
সৃষ্টি তুমি কর নূতনতর
ফোটাও ফুলে বজ্র-অনল-পাতি।
ক্ষীণ, সে ক্রমে হচ্চে নিষ্করুণ।
রক্ষা কর, রক্ষা কর স্বামী !
কুণ্ঠা, গ্লানি দগ্ধ তুমি কর
হে বজ্রধর ! মর্মে এস নামি' ;
পণ্ড শত পূৰ্ব্ব প্রতিজ্ঞা সে
স্মৃতির হ্রদে শবের মত ভাসে,
টানছে আমায় সর্বনাশের গ্রাসে,-
বাঁচব তবু তােমার কৃপায় আমি ।
দয়া আমায় করতে তােমায় হবে
মনের মতন করতে হবে মন,
নূতন কথা নয়কো এ তাে প্রভু !
এ যে তােমার বিধান সনাতন ;
গড়তে বসে খেলছ ভাঙন-খেলা,-
জগৎজুড়ে চিহ্ন যে তার মেলা।
ভেঙে গড়ে তুচ্ছ মাটির ঢেলা
করলে মানুষ, -দিলে জ্ঞানাঞ্জন!
১৮
সৃজন-লীলার প্রথম হ’তে প্রভু !
ভাঙাগড়া চলছে অনুক্ষণ,
পাখী জনম শাখী জনম হ'তে
রাখছ কথা—শুনছ নিবেদন ;
আজ কি হঠাৎ নিঠুর তুমি হবে ?
কান্না শুনে নীবব হয়ে রবে?
এমন কভু হয় না তােমার ভবে,
মনে মনে বলছে আমার মন!
আমায় তুমি পক্ষী-মাতার মত
যুগে যুগে করলে আচ্ছাদন,
আকাশ-ডানা দিগন্তে তাই মুয়ে
নীড়ের তৃণ করছে আলিঙ্গন ।
সকল ধনে করলে আমায় ধনী,
পদ্ম-ফুলে রাখলে প্রভু! মণি,
বুদ্ধি দিলে—যােগ্য আমায় গণি’
তবু আমার ভল না, হায়, মন।
এবার আমায় কৰ্ত্তে হবে খাঁটি
ওগাে আমার দীপ্ত হুতাশন !
পুড়িয়ে দেবে সকল মলামাটি,
রাঙিয়ে আমায় নেবে নিরঞ্জন।
পাখী শাখী মানুষ হ’ল, তবু,
মনের মতন মন হ’ল না কভু,
ভেঙে আমায় গড়তে হবে, প্রভু!
মনের মতন করতে হবে মন।
নমস্কার।
অনাদি অসীম অতল অপার
আলােকে বসতি যার,
প্রলয়ের শেষে নিখিল-নিলয়
সৃজিল যে বারবার,
অহঙ্কারের তন্ত্রী পীড়িয়া
বাজায় যে ওঙ্কার,
অশেষ ছন্দ যার আনন্দ
তাহারে নমস্কার।
শ্রী-রূপে কমলা ছায়া সম যার
আদরে ও অনাদরে,-
মালা দিল যারে সরস্বতী সে
আপনি স্বয়ম্বরে,
কৌস্তুভ আর বন-ফুল-হার
সমতুল প্রেমে যার,
যার বরে তনু পেয়েছে অতনু
তাহারে নমস্কার।
=
ভাবের গঙ্গা শিরে যে ধরেছে
ভাবনার জটাভার,
চির-নবীন শিশু-শশী-রূপে
অঙ্কিত ভালে যার,-
জগতের গ্লানি-নিন্দা-গরল
যাহার কণ্ঠহার,-
সেই গৃহবাসী উদাসী জনের
চরণে নমস্কার।
.
কুহু ও কেকা
সৃজন-ধারার সােনার কমল
ধরেছে যে জন বুকে,
শমীত সম রুদ্র অনল
বহিছে শান্তমুখে,
অনুখন যেই করিছে মথন
অতীতের পারাবার,
অনাগত কোন্ অমৃতের লাগি,
তাহারে নমস্কার।
নিশান্তে
আঁধার ঘরের বাহিরে কে ওই
হের দেখ ওগাে চাহিয়া ।
সমীর এনেছে কার সংবাদ
সুপ্তি-সাগর বাহিয়া !
রুদ্ধ দুয়ার খুলে দাও, আঁখি মেলে চাও,
কমল-কোরক ধ্যানে কি জানিল—জেনে নাও,
চঞ্চল হ’ল আহলাদে পাখী
উড়িছে-পড়িছে গাহিয়া ;
ক্ষুরিছে আলােক ঝুরিছে গন্ধ
প্রেম-নীরে অবগাহিয়া।
••
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.