Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Matir Pradip
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
ভিন্ন প্রীপ
—শ্রীবিভূতি চৌধুরী,
প্রাপ্তিস্থান
প্রফুল্ললাইব্রেরী
৭১ কর্ণওয়ালিস্ ষ্ট্রীট
কলিকাতা।
প্রকাশ কোরেছেন
শচীন্দ্রকুমার মুখােপাধ্যায়
প্রফুল্ল-লাইব্রেরী
৭১ কর্ণওয়ালিস্ স্ট্রীট, কলিকাতা।
প্রথম প্রকাশ
ফান, ১৩ ৭
বার আনা
প্রিন্টার-শ্রীকৃষ্ণপ্রসাদ ঘােয়
প্রকাশ প্রেস,
৬৬ নং, মাণিকতলা ষ্ট্রীট, কলিকাতা
ভূমিকা ‘মাটির প্রদীপ জ্বলিয়াছেন আমার স্নেহভাজন শ্ৰমান্ বিভূতিভূষণ চৌধুরী। আজকালকার সহরবাসীর চোখ বৈদ্যুতিক আলাের ব্যবহারে এমন অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে, যে মাটির প্রদীপের আলাে আর তাদের চোখে লাগে , কিন্তু আমরা পল্লীগ্রামের লােক ;-পল্লী-চিত্র আমাদের প্রাণে ভাবের ও রসের সন্ধান দেয়। তাই পল্লী-চিত্রের একটু নিদর্শন দেখতে পেলে আমরা আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়ি। মাটির প্রদীপের স্নিগ্ধতা আমাদের প্রকৃতই আনন্দ দেয়,- স্মরণ করিয়ে দেয় সেকালের অনেক বিস্মৃতপ্রায় কাহিনী। তাই ‘মাটির প্রদীপ কাব্যখানি আকারে ছােট হলেও বেশ ভাল লাগছে। একথা নিঃসঙ্কোচে বলতে পারি যে, লেখকের বয়স কঁাচা হলেও তার লেখায় প্রকৃত কবিত্ব আছে, সে কবিতার ঝঙ্কারে প্রাণ সাড়া দিয়ে ওঠে। তা’র ‘পূজার ফুল, ব্যবধান, ‘উদাসিনী, ‘চাষার মেয়ে’ ধ্রুবতারা ‘পরদেশীয়া’ ‘বনের মেয়ে’ ‘ঝড়ের সমুদ্র’ প্রভৃতি কবিতায় তার কবি-মানসের নিখুত ছবি ফুটে উঠেছে। কয়েকটি কবিতার ছন্দোভঙ্গী ও শব্দ-সঙ্গীতের বিচিত্ৰতা আমাদের মন হরণ করতে পেরেছে। সাধনা করবার মত উপযুক্ত অবসর এবং সৌভাগ্য পেলে তিনি অদূর ভবিষ্যতে যে কবি-যশের অধিকারী হবেন তা বেশ বলা যেতে পারে। অবশ্য তাঁর কবিতায় যদি কেহ ভাবের বিশেষ গভীরতা দেখতে চান, তবে তাকে নিরাশ হতে হবে কারণ ও জিনিষটা তরুণ কবিদের কাছে এত শীঘ্র প্রত্যাশা করা যায় না। আশা করি অভিজ্ঞতার সঙ্গে সঙ্গে তার ভাবের গভীরতাও বাড়বে।
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের সুরের প্রতিধ্বনিও তার বাঁশীর ঝঙ্কারে মাঝে মাঝে শুনতে পাওয়া যায়। এটাকে আমি গর্বের বিষয় বলে মনে করি। কারণ এত বড় প্রতিভা-রবির আলােক যদি কোন কবিতায় না পড়ে তা হলে বুঝতে হবে সে-কবির মন মুক্ত আলাে-বাতাস নেবার সামর্থ্য পায়নি। রবীন্দ্রনাথের কাব্য-মন্দাকিনীর ধারা নানা ভাবে নানা কবির ভিতর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে। কিন্তু চাই আমরা সেই চিরন্তনী ভাব-ধারাকে নতুন ভাবে প্রকাশ করতে। শ্ৰীমান্ যে কাব্যের স্বপ্ন-লােকচারী তা তঁা’র কবিতা পড়ে বেশ বােঝা যায়। ভগবান করুন-রুক্ষ বাস্তবতার সঙ্গে যখন তাঁর দেখা-সাক্ষাৎ হবে তখনও যেন তাঁর কবিতা-লক্ষ্মী এমনই স্বপ্নের ভিতর মায়াপুরী রচনা করতে পারে। ফাগুন আশীৰ্বাদক করুণানিধন বন্দ্যোপাধ্যায়। কলিকাতা।
মাস দুই হ’তে মনে করছিলাম আমার রাখী’র দ্বিতীয় সংস্করণ করবাে, কিন্তু নানা কারণ বশতঃ তা’র পুনর্মুদ্রণ না করে, ওর থেকে তিন চারটি কবিতা নিয়ে নতুন করে মাটির প্রদীপ’ সাজিয়েছি। এর দু’একটি কবিতা ছাড়া প্রায় সব কবিতাই কোন-না-কোন কাগজে বেরিয়েছিলাে। বই প্রকাশ করা আমার পক্ষে দুরূহ হােয়ে উঠতাে-যদি না সহৃদয় প্রকাশক অকুণ্ঠিত চিত্তে এর সকল ভার গ্রহণ কোরতেন ; সুতরাং তাদের আমার আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি। এ বইয়ের প্রচ্ছদপটের রূপ দিয়েছেন আমাদেরই কলেজের দ্বিতীয় বার্ষিক সাহিত্য শ্রেণীর ছাত্র বন্ধুবর শরদিন্দু সেনগুপ্ত। শেষের ছবিটি এঁকেছেন তাঁরই সহপাঠী বন্ধুবর শ্রীশচীন্দ্রনাথ মিত্র। তাদের কাছে আমি ঋণী রইলাম। “মাটির প্রদীপের আলাের চেয়ে ছায়া হয়তাে অনেক বেশী, তা'র বিচারের ভার আপনাদের উপর রইলো। ফাৱনী-পূর্ণিমা সাকপুরা-চট্টগ্রাম প্রচয়িতা ১৩৩৭
No text on this page.
মাভির পীপ,
ঃঃ০
সন্ধ্যামণি
গগাধুলির বেলা ঘনাইয়া এলাে ওগাে ও সন্ধ্যামণি।
খােল খােল এবে জড়িত আঁখির তার বন্ধনী।
পিয়াল ফুলের রাঙা উৎসবে নীলিমা গিয়াছে ভরি,
ডালিম দানার বিধুর বেদনা মেঘে মেঘে পড়ে ঝরি।
তাহাদের পানে চেয়ে
নয়ম তােমার খােল একবার স্বপন-বিলাসী মেয়ে।
কার কথা তুমি ভাবিছ একেলা আজি সন্ধ্যার ক্ষণে,
রাঙা গােধূলির ফাগ-উৎসবে কাহারে পড়িল মনে?
বন্ধ্যা ঊষার হারান স্মৃতিকি জাগিছে মর্মে তব ?
তােমারে কি আজ হাতছানি দিল মরণ-মহােৎসব ?
সে তত গেছে মরে তার লাগি’ কেন মুদিয়াছ দুটি চোখ?
শুক্লা চতুর্দশীতে কে করে অমাবস্যার শােক?
ওগােও সন্ধ্যামণি! জানি তুমি সন্ধ্যাতারার মিতা,
কেমনে আজিকে ভুলিলে তাদের কহ মােরে বিশ্ব।
[ ১ ]
মাটির প্রদীপ
চাহ দুটি আঁখি মেলে
ফঁাকা আকাশের ফাটলে ফাটলে কারা আজ শ্বাস ফেলে?
গােবি সাহারার শূন্যতা নিয়ে সুদূর তারার পাতি
বিস্মরণী গাে! বল না কেমনে গােঙাইবে কালরাতি ?
লাখ তারা আজ কাণ পেতে আছে হে ভােলা সন্ধ্যামণি।
শুনিতে তােমার মুদিত বুকের ফোটার প্রতিধ্বনি।
সন্ধ্যাতারারে হেরিতে যদিগাে ব্যথা আসে বুকে ছেয়ে
তবে আঁখি খােল তুলসী-মঞ্চে মাের দীপ-পানে চেয়ে।
মুদিত নয়ন মেলিয়া চাহ তাে রাণি।
মাটির প্রদীপে ফুটিয়াছে কি না হারানাে উষার বাণী।
ষােড়শ-বর্ষ
ঘােড়শ-বর্ষের রম্য সুদুর্গম সুবঙ্কিম পথে,
সুদূরের পান্থ আমি অন্তহারা অতৃপ্তি উচ্ছাসে
ছুটিয়াছি রাত্রি দিন আরােহি’ এ'বিশ্ব-স্বপ্ন-রথে,
ধরিত্রীর ভাঙ্গণ পূর্ণ মাের বক্ষের প্রশ্বাসে।
সিন্ধুর উদাত্তমন্ত্র, নিঝরের ঝঝর সঙ্গীত,
কলাপীর কেকাধ্বনি, বজ্রাগ্নির বিশ্বপ্লাবী শিখা
মাের যাত্রা-সহচরী, ক্ষণে ক্ষণে করিছে ইঙ্গিত,
আঁকিছে ললাটে মাের সৌভাগ্যের জ্যোতির্ময়ীটীকা ।
কৈশাের-শেষে
যৌবনের পরপারে বাজে কার মঞ্জুল শিঞ্জিনী ?
গুঞ্জরিছে ঝিনি ঝিনি, বক্ষতলে উঠিছে স্পন্দন,
বিচিত্রা সে কোন্ নারী? অন্তরের অনন্ত রঙ্গিনী
সে কি মাের? তারি লাগি’ অনাদি ক্রন্দন ?
মরীচিকা-ময়ী সে কি স্বপ্নে-গড়া মর্ত্যের অপ্সরা ?
সঙ্গীত-ঝঙ্কারে মাের ছন্দসুরে নাহি দিবে ধরা ?
কৈশাের-শেষে
বিদায়, বিদায় আজি হে তরুণ কৈশাের আমার ।
সান্দোল আনন্দ-স্বপ্ন পঞ্চদশ বৎসরের স্মৃতি প্রীতি তারুণ্যের গান
অবসান সব-ই অবসান।
তােমার সবুজ তটে বসি’ রহি’ প্রভাত সন্ধ্যায় আলােকে আঁধারে
চিনিয়াছি মাের কায়া, তারি ছায়া নবীন পাথারে
স্রোতটানে ভেসে গেছে মরণের রত্নাগার মাঝে ;
আজিকে বিদায়-দিনে সেই সুর বক্ষে মাের বাজে।
কত ছন্দ কত গীতি কত তান দুঃখ সুখ শুচিশুভ্র হাস্য কোলাহল
ধ্বনিয়া উঠিত মাের চিত্ততলে নিত্য অবিরল।
[ ৩ ]
মাটির প্রদীপ
সৃষ্টির উল্লাস-স্বপ্ন তােমার আনন্দ চারু তীরে
হেরিয়াছি—হেরিতেছি আজো এই মরণের এপার ওপার,
উদয়াস্ত দুই তীর অঙ্গুলি নির্দেশে তব দেখায়েছ মােরে বার বার।
আয়ুর ভিখারী মৃত্যু-সাথে ওরে বন্ধু মাের! চিরদিন মিতালি আমার।
নগ্ন মরণেরে আমি জীবনের প্রতিক্ষণে রূপ দিব মসীর রেখায়,
সাজাইয়া যাব তারে স্মৰ্ত্ত হৃদে অক্ষয় শােভায়।
শােন আজি হে বন্ধু কৈশাের ।
অজানা মাধুরী-ধ্বনি কর্ণরন্ধে তরঙ্গিছে মাের
শৈশব-বাসর মাঝে গুপ্ত তব অভিসার সম,
উঠিছে আনন্দ-রেশ চঞ্চল স্পন্দন অঙ্গে মম।
অধীর পুলক-স্বপ্নে শুনিতেছি অস্ফুট নিক্কণ,
হেরিতেছি রম্যপুরী—জাগেতাই তনু মনে বিচঞ্চল কম্প্র-শিহরণ।
এ-পারের দ্বিধা-দ্বন্দ্ব-দুঃখ-সুখ গীতি-তান ছন্দ সুমধুর
ভুলে গেনু-ও-পারের মায়াডাকে আজি মাের চিত্ত ভরপুর।
আরােহি’ জয়-শ্রী-দীপ্ত শূন্য তব স্বর্ণ-শীর্ষ-রথে
বহুদূর আসিয়াছি রিক্ত মাের জীবনের সুদুর্গম পথে।
মল্লিকা-মঞ্জরী-রাখী পরাইয়া দাও করে আজিকার বিদায়ের দিমে,
বিচ্ছেদের অন্ধকারে হে কিশাের সখা তুমি লহ মােরে চিনে।
বিজয়ের ললাটিকা শুভ্র দীপ্ত ভালে মাের আজি দাও করিয়া অঙ্ক
ধন্য হাে’ক তৃপ্ত হাে’ক জীবনের পুণ্য প্রতিক্ষণ।
[ ৪ ]
কৈশোের-শেষে যৌবন-বসন্ত-সখা যােড়শ বর্ষের কাণে কহে গেছে আমন্ত্রন-বাণী, জানি আমি জানি আজি মাের নিমন্ত্রণ ধরিত্রীর ফানী-উৎসবে, আমার যাত্রার পথে মিলনের শঙ্খধ্বনি কর তুমি ঘন ঘন রবে। মাের অভ্যর্থনা-তরে সেথা কত মহােৎসব কত আয়ােজন, অপ্সরা কিন্নরী কত স্বপ্নের আসর রচি’ শ্লথকেশে করিবে নৰ্ত্তন ; স্বর্গের অমরা-সম দীপ-জ্বালা শুভ্রাসরে উঠিবে যে সঙ্গীতের ধ্বনি, আমার মরম-প্রান্তে মূরছিবে কি পুলক। চিত্ত-বীণা উঠিবে নিকণি। আনন্দ চটুল নৃত্যে কতসুরে বিদ্যাধরী মাের তরে করিবে বন্দনা, শুনাইবে বিভােল মন্ত্রণা;- রূপের পিয়ালা ভরি’ রিক্ত করি সুরাপাত্র মােরে দিবে করিবারে পান, নাহি পাব কভু পরিত্রাণ ; যৌবন আনন্দ-ভরে দিবে মােরে আলিঙ্গন তার, নন্দন বনের শােভা সুরভি মন্দার গন্ধ সঞ্চারিবে অঙ্গেতে আমার। উল্কা-শশী-গ্রহ-তারা-নীহারিকা নিৰ্ণিমেখে নিরখিবে মাের তনুখানি, যৌবন-বিকাশ-শেষে কর্ণে মাের নিণিবে নক্ষত্রের আয়ু-হীন বাণী। যখনি ফুরায়ে যাবে হাসি-নৃত্য কলগীতি আনন্দের চঞ্চল স্বপন, জীবনের স্রোতটানে নাহি জানি কোথা যা’ব ম্লানাধরে বিষাদে তখন। হে কৈশাের, হে বন্ধু কৈশোের । ছিন্ন করে দাও আজি তারুণ্যের সে বন্ধন-ডাের ; আবদ্ধ সীমার মাঝে বেঁধে আর নাহি রেখে মােরে, অভিনন্দনের ডাক শুনিতেছি মায়া-স্বপ্ন-ঘােরে।
মাটির প্রদীপ
সপ্তবর্ণ ইন্দ্রধনু হেরিতেছি মানসে আমার ;
বিদায়-গােধুলি-লগ্নে তােমারে কি দিয়ে যা’ব অর্ঘ্য উপহার ?
নহি কবি, নহি জ্ঞানী, অভিমানে সিক্ত নহে প্রাণ ;
রচিলাম ক্ষুব্ধচিতে তােমালাগি বিদায়ের বিক্ষোভিত গান।
মিলিব তােমার সাথে জন্মান্তরে ওগাে বন্ধু, শৈশবের মরণ-শয্যায়,
আজি মােরে লহ চিনি, লহ মাের গীতিমাল্য
বিদায়, বিদায়।
পূজার ফুল
কমল যখন মেলত আঁখি
রবির পানে চেয়ে,
ভােরের পাখী উঠত যবে
প্রভাতীসুর গেয়ে,
নিতুই এমন ভাের বেলাতে
সাজিটি তার নিয়ে হাতে
ফুল কুড়াতে আসত হেথায়
চৌধুরীদের মেয়ে।
কুঁড়িরা সব ঢুলত নেশায়
তার সে-পরশ পেয়ে।
পূজার ফুল
তুলত মেয়ে মালতী যুঁই
শিউলি ফুলদল,
জানি কোন পাষান-দেবের
ঢাকতে পদতল।
চাইলে তাহার মুখের পানে
ফুটত হাসি অকারণে ;
[ অই] কাল চোখের অতল দীঘি
করত ছলােছল।
তা’র সে-দেহে উঠত কেঁদে
ফুলের পরিমল।
অই কিশােরীর সাথে সাথে
আমিও ছল করে,
ফুল তুলিলাম কলাপাতার
সবুজ ঠোঙা ভরে।
আমার বুকের যতেক কথা
যতেক বেদন-আকুলতা,
ফুটত যেন অলির মুখে
তাদের সােহাগ-স্বরে,
আমি-ফুল কুড়াতাম না জানি মাের
কোন দেবতার তরে।
[ :
7
মাটির প্রদীপ
সুইয়ে যখন দিতাম তারে
কনক-চঁাপার ডাল
আপনি হত সরম-রাঙা
তা’র দুখানি গাল।
দুষ্ট হাওয়ায় বশ না মানি’
গােলাব-কাটায় বসন খানি
লাগত যখন,—অই কিশােরীর
উঠত ঘেমে গাল।
আমি: —আঁচল খানি ছাড়িয়ে দিতাম
নুইয়ে পােলাব-ডাল।
বাগান-ধারের অই পুকুরে
ফুটত শত দল,
তাহার পানে চেয়ে মেয়ের
প্রাণ হ’ত চঞ্চল।
তখন আমি আদর করে
সুধাইতাম সেই মেয়েরে
“চাই কি তােমার সূৰ্য্যমুখি !
অই সে নীলােৎপল” ?
বলত সে যে “কঁাটার ঘায়ে
রাঙবে পদতল।”
[ ৮ ]
পূজার ফুল
যাবার বেলা সাজিতে তার
আমার তােলা ফুল
ঢেলে দিতাম নিঃশেষে সব
করেই যেন ভুল।
বলত সে যে থাকি থাকি
“দেবতারে হায় দিচ্ছ ফাকি
এই নিখিলে নেই কোন পাপ
তাহার সমতুল।
অভিশাপের বইচো বােঝা
নিতুই করে ভুল।”
সেই ভুলেরই রয়েছে মাের
আজকে প্রয়ােজন,
তাতেই জানি মাের দেবতার
তুষ্ট রহে মন।
লাে কিশোরি । দেব তা আমার
নয়ক পাষাণ–তাই বারে বার
আমার তোলা কুসুম মাগে
তােমার শ্রীচরণ।
তােমার মাঝে দেবতা মোর
রাজেন অনুক্ষণ।
[ ৯
1
বনের মেয়ে
ওগাে ও কিশােরী শ্যামলী বনের মেয়ে।
বিস্ময় মাের লাগে দুনয়নে তব মুখ পানে চেয়ে।
অঙ্গে তােমার কী অরূপ জ্যোতি কিবা অপরূপ সাজ
মনে হয় তুমি মায়াকাননের মমতার মমতাজ।
কত সুন্দর তব দেহখানি কত সুন্দর হাসি,
তােমারে হেরিয়া পরাণ আমার উঠে আজ উচ্ছাসি।
কেতকী-রেণুর অমল সুষমা গােপনে হরণ করি’
কে রাঙাল অই সােণামুখ তব হে শােভনা সুন্দরী ?
তােমারে সুধাই অয়ি নাম-হারা ফাগুন-পরীর রাণী,
গৌরী চাপার নির্যাসে বুঝি মাজিয়াছ দেহখানি ?
করবী-গুচ্ছ কবরীরে তব করিতেছে বেয়াকুল,
কর্ণে তােমার ঈষৎ দুলিছে ঝুমকো লতার ফুল।
সেফালী কুম-মালা
হার হয়ে তব কণ্ঠে দুলিছে হে কিশােরী বনবালা।
কম করে তব পরিয়াছ তুমি মাধবীর কঙ্কণ,
কলমী লতারে করিয়াছ তব ক্ষীণ কটিবন্ধন।
দুটি ঠোট তুমি রাঙায়েছ মেয়ে মেহেদি ফুলের রসে,
মৌমাছি তােমা পীড়ন করে না ও রাঙা অধরে বসে
[ ১ ]
বনের মেয়ে
ওগাে অজানিতা! চপল তােমার আঁখির চাহনি-ছায়া।
মাগে নাকি কোনাে ভােলা পথিকের গােপন চাওয়ার মায়া ?
বন-বীথিকার ছায়াতলে রহি’ সিতপূর্ণিমা রাতে
কলঙ্কিনী সে চঁাদের স্বপন হেরিয়াছ আঁখি-পাতে ?
হে বন-বাসিনি। গেরুয়া তােমার আঁচল-প্রান্ত ধরি’
কহেনি কি কভু চইতের হাওয়া ‘আহা আহা মরি মরি।
শতদল সম তব দেহ হেরি কহ ওগাে সুন্দরী
শিহরি ওঠেনি মদালসা সেই মহুয়ার মঞ্জরী?
তব কায়া যেন মায়াবী রূপের কারা,
তারই মাঝে আজ বন্দিনী এই কবির আঁখির তারা।
তরু-আলবালে ঢালিতেছ বারি নিভাতে তাদের দাহ,
এই পথিকের ব্যথা-মরু-বুকে হতে পার বারিবাহ ?
ওগাে বনপাখি, তােমার পাখার একটি পালক লাগি
আমি আসিয়াছি এ শ্যাম কাননে পথে পথে রাত জাগি।
কি নামে তােমারে ডাকিব জানি না হে কিশােরী অনামিকা,
বনের হরিণী জানি তুমিনহ সাহারার মরুশিখা।
বনেরই শ্যামল সুষমা রয়েছে জড়ায়ে তােমার দেহ,
তব নয়নের তারা মাঝে আমি হেরি কাননের স্নেহ।
ঘন তরুমায়া ঘনায়েছে অই কমনীয় তনু’ পরে,
আজ হ'তে আমি ডাকিব তােমারে বনছায়া নাম ধরে।
[ ১১ ]
উদাসিনী
•
গাঁয়ের মেয়ে চলেছে অই কমল-দীঘির বাঁকে
অলস পদে কলস খানি লয়ে কোমল কঁাখে।
কি নাম তাহার জানিনে—আর বয়েসটি তার কত,
মুখটি তাহার আধেক-ফোটা সূর্যমুখীর মত।
অঙ্গে যেন হাসছে চাপা উজল মনােরমা,
দীঘল কেশে ঝুরছে তাহার কৃষ্ণারাতির অমা।
বিষের মায়া জড়িয়ে আছে তার সে নীলাম্বরী,
সে যেন ঠিক রূপকথারই নাম-না-জানা পরী।
রূপের স্বপন দেখে তাহার কাজল কাল অলি,
তা’র সে-চরণ-ছোঁয়ায় ফোটে ভূই পাটির কলি।
পথের কেয়া শিউরে ওঠে তাহার পানে চেয়ে,
চৈতী-হাওয়া গুমরে মরে তার সে-পরশ পেয়ে।
আমের শাখে লুকিয়ে থাকে কোকিল অনুখন,
শুনবে বলে অই কিশােরীর চুড়ীর, কন কন্।
দীঘির ঘাটে নামল বালা রাঙা চরণ ফেলি,
তার পানে আজ চাইছে শুধু কুমুদ আঁখি মেলি।
চরন দুটি ডুবিয়ে জলে বসল মেয়ে ধীরে
দীঘির ঘাটে,-কলসটারে ভাসিয়ে রাখি নীরে।
| ১২ ]
উদাসিনী
তার সে রূপের পরশ পেয়ে কমল দীঘির জল
ঈষৎ যেন শিউরে উঠে করল ছলােছল।
দীঘল কাল অলক তাহার আজকে ক্ষণে ক্ষণে
চাইছে যেন কইতে কথা চৈতী হাওয়ার সনে।
রূপটি যে তার তীরের মত বিধতে পারে দিল,
তাই বুঝি আজ মরছে ঘুরি মাছরাঙা আর চিল।
কতই কথা ভাবছে মেয়ে সলিল পানে চেয়ে,
তাহার মাঝে আপন ছায়া দুলছে সােহাগ পেয়ে।
আজ যেন সে বড়ই একা বুকটি শুধুখালি,
অঙ্গে তবু করছে খা খা রূপের চোরাবালি।
জল নিতে আজ এসে মেয়ের উদাস হল মন,
হায় না জানি পপল সে কোন কালার দরশন।
নীর-মুকুরে হেরছে আজি কিশােরী তার ছায়া,
কলস তাহার ভাসিয়ে নিল গহীন জলের মায়া।
হঠাৎ মেয়ে দেখল চেয়ে বাঁধা ঘাটের পাশে
গাগরী নেই—সে যেরে অই মাঝ-দীঘিতে ভাসে।
কমল-কাঁটার কোমল ঘায়ের পরশখানি আজ
গােপন ক্ষত অকল কত তার সে বুকের মাঝ।
কলস পানে চেয়ে মেয়ে বললে হতাশ ভরে :
“কেমন করে ফিরব আজি শূন্য কাঁখে ঘরে”।
[ ১৩ ]
মাটির প্রদীপ
ওগো ওগো সােণার মেয়ে ভয় রেখো না মনে,
হুতাশীশ্বাস ফেলছ কেন আজকে অকারণে?
হৃদ-গাগরী ভাসিয়ে দিলাম তােমার রূপের নীরে,
সেই কলসে জল ভরে আজ যাওলাে ঘরে ফিরে।
জংলী
‘পাগলী’ বলে জংলী’ বলে জ্ঞেনীরে সব গায়ের মেয়ে
ঠাট্টা করে দিন রজনী—তাদের মুখের পানে চেয়ে
ফিফিকিয়ে হাসে জ্ঞেনী,-যদিও সে নয়ক সােণা,-
নয়ক মাণিক-ফুল অথবা দামী হীরের জড়ির বােনা।
জংলী সুরে কয় কথা সে—পাগলামি তার সবকিছুতে,
সবাই যদি এগিয়ে চলে রয় পড়ে সে ঠিক পিছুতে।
দল বেঁধে সে পুকুর ঘাটে যায়না পাড়ার মেয়ের সাথে,
কাকন চুড়ী পরে না সে শ্যামল দুটি চিকণ হাতে।
গিণি সােণার হারের কাটা অই বুকে তার দেয় গো জ্বালা,
তার কাছেতে অধিক দামী শিউলী ফুল আর পুতির মালা
বিনিয়ে কভু বাঁধে না সে দুলিয়ে পিঠে দীঘল বেণী,
তাইতাে গাঁয়ের মেয়ের চোখে বিষ হয়েছে জংলী জ্ঞেনী।
জংলী
চোদ্দ বছর পেরিয়ে গেছে বয়েস এখন তার পনরাে,
তবুও সে মাথায় বুকে আঁচল টেনে দেয় না বড়।
দেখলে পথিক ন্ িগাঁয়েরই অবাক চোখে দাড়িয়ে থাকে,
তাই দেখে সব পাড়ার মেয়ে ঠাট্টা করে জ্বালায় তাকে।
এখনাে ভা’র চোখে মুখে ঝুরছে চপল চঞ্চলতা,
পায়নি যেন আজো সে হায় যৌবনেরই নীলবার;
আলতা পায়ে পরে না সে-পুইয়ের গােটার রস নিঙাড়ি’
চরণ দু’টি রাঙায় জ্ঞেনী—আর সে নতুন ডুরে সাড়ী।
বালা-দিনে ভিজতে সে যে বড়ােই যেন ভালােবাসে,
তার সে-হাতের ছোঁয়া পেয়ে কদম-কুড়ি মুচকি হাসে।
রামধনুকের সাতটি রঙই তার চোখে যায় উকি মেরে,
বিজলী-বাতি জ্বালায়ে মেঘ পাগলী মেয়ের রূপটি হেরে।
‘জংলী’ তারে যতই বলুক পাড়া গাঁয়ের মুখর মেয়ে,
মুখখানি তার দেখলে আসে আনন্দে মাের বুকটি ছেয়ে।
বীণাপাণির বােলটি আমি তার সুরেতে শুনতে পাই,
বুকের শিরা কাপায় আমার জংলী সুরের ভঙ্গিমাই।
পাগলী বলে জংলী বলে যতই তারে করুক হেলা,
ভারেই নিয়ে মাটির ঘরে গেঁয়াে কবির প্রাণের খেলা।
[ ১৫ ]
অসময়ে
জীর্ণপাণ্ডু পউষের বুকে অকালে এলােরে আজ
মৰ্ম্মের কোষে প্রাণ-রসভরি’ নববসন্ত-রাজ।
কী যেন বার এনেছে সে বহি
ধরনীর কাণে যাবে তারে কহি’-
দিবে সে ঘুচায়ে শিশিরের অই ম্লান শূন্যতা-লাজ,
নিঃস্ব তরুরে অকালে পরাবে রাঙা যৌবন-সাজ।
পউষের যত শীর্ণতা দিল ফান আজ ঢাকি,
নগ্নতা আর বিদ্রুপ তারে করিবে না থাকি থাকি।
চেয়ে দেখ ওরে চম্পার ডালে,
নটীসম ফিঙে নাচে তালে তালে,
অসময়ে যেন শাখে শাখে আজ কুহরি উঠিছে পাখী
পউষের যত দীনতা দিয়াছে অকাল ফাগুন ঢাকি।
উড়াে বসন্ত অতনু-স্বপন হেরিতেছে বসে বসে,
প্রকৃতির স্তন ফাটিয়া পড়িছে মধু উচ্ছলরসে।
কোকিলা দিতেছে আজি অকারণ
কোকিলের মুখে শুধু চুম্বন,
ভ্রমর ভ্রমরী করে গুঞ্জন পুষ্প-মর্মে প’শে,
উদ্বেল আজ প্রকৃতির বুক মধু উচ্ছলরসে।
[ ১৬ ]
অসময়ে
দক্ষিণা অই দীন পউষের কুয়াসার গুণ্ঠন
টুটিয়া ছিড়িয়া চাহিছে কি যেন করিবারে লুণ্ঠন।
শিশিরের চিরনগ্ন দু’পায়ে
সে চাহিছে দিতে নূপুর পরায়ে,
বক্ষেতে তার বাঁধিবারে চায় কঁচলীর বন্ধন,
বাসনা তাহার রিক্তেরে দিতে অনন্ত যৌবন।
হঠাৎ নিঃস্ব বালিকা পউষ বসন্ত-সাড়া পেয়ে
যােড়শী সাজিয়া উঠিছে আজিকে সৃজনের গান গেয়ে।
উরসে তাহার রূপ-দেবতার
ক্ষুধিত আত্মা করে হাহাকার।
শতদল সম সে আছে বিধুর সূর্যের পানে চেয়ে।
তারই ছায়া হেরি মাটির মৰ্ম্মে বেদনা আসিছে ছেয়ে।
পউষের বুকে ফাল্গুন অই ছড়াল স্বর্ণপাখা,
পুষ্পিত হয়ে উঠে দিকে দিকে মৃতমঞ্জরী শাখা।
কে তােরা বালিকা দখিণা-স্পর্শে
চিরদুরন্ত ষােড়শবর্ষে
পা বাড়ালি ওরে—উন্নত বুক আঁচিলেতে দেরে ঢাকা।
অসময়ে এলাে বসন্ত আজ ছড়ায়ে স্বর্ণপাখা।
[ ১৭ ]
পরিচয় ওগো ও অজানিতা একেলা কোথা যাও জানিনে তব নাম এ পথে কোন গায়ে দিবস নিশি, হেথা কভু ত হেরিনিক হেরেছি এ নয়নে তাদেরই ও-মুখে তাে ও এলাে কুন্তলা। কিশােরী সােণামেয়ে। আপন মনে গেয়ে? তােমারে নাহি চিনি, চলেছ বিদেশিনি ? আমি যে বসে থাকি, ও দুটি কালো আঁখি। কিশােরী রাশি রাশি, হেরিনি সােণা হাসি? চলেছ কোন গাঁও আমারে বলে যাও। সুদূর কোন হাটে দলি ? কিশােরী মেয়ে ওগগা চলিছ কেন হায় ও-ভূই চাপাটিরে সরমে শিহরিয়া তােমারে জানাইছে নাগকেশর-বুকে আধেক-ফোটা কলি ঝরা সে-ফুল চরণে গেলে ছুয়ে, পড়ে সে নুয়ে ছুঁয়ে। যুথিকা তা’র নতি, কঁপিছে প্রজাপতি। [ ১৮ ] পরিচয় অলিটি গুঞ্জরে পাখিটি কুহরিছে ‘দখিণা জোরে বও’ ; “বউ কথাটি কও।” ওগাে ও সুন্দরী পাগল হ’ল সবে ও তব কায়া যেন বাঁধিলে সেথা মাের তােমার পদ রাগে তাহারই সাথে মাের মিনতি করি তােমা’ এ কবি-সনে আজ রূপসী সােণা মেয়ে। তােমারই ছোঁয়া পেয়ে। মায়াবী রূপ-কারা, এ দুটি আঁখি-তারা। রঙিন্ হল ধূলি, পরাণ গেল খুলি। হে মিতা স্নেহলতা । কহগাে দুটিকথা। রূপের ছোঁয়া দিয়ে মরম-নিঝরিণী শুনিয়া যাও তবে আমার পরাণেতে আমারই এই বুকে শীতল বারিধারা তবে সে-স্রোতমাঝে সােহগে যাও ধুয়ে তাহারই পরশনে সলিলে ফুটিবে গাে দিলে গাে যদি খুলে চলার ক্ষণে ভুলে, পাতিয়া দুটি কাণ সোতের কলতান। বহালে যদি তুমি প্লাবিয়া মরুভূমি ওগাে ও রূপ-রাণি । রঙিন্ পা’দুখানি। উতল ছলছল অরূপ শতদল। [ ১৯ ] মাটির প্রদীপ আজিকার বিনু সেইদিন ছিল নাহি-ফোটা ফুলকলি, তা’র সে বুকের গন্ধে তখনাে উড়িয়া আসেনি অলি। বালক-বালিকা ছিলাম আমরা দুজনে দোহার সাথী, ধূলােতে গড়িয়া খেলা-ঘর মােরা কাটায়েছি দিবারাতি। গাছের আগায় উঠিত যখন সােণালী সে রােদ্দর, ঘরের চালেতে ময়না যখন তুলিত প্রভাতী সুর- সে সময় ভেঙে দিয়ে যেত ঘুম বিনু মাের ঘরে আসি, চোখ দুটি তার দেখাত তখন বড় মিঠে হাসি হাসি। চৌধুরীদের বাগানে দু’জনে তুলিয়াছি কত ফুল, কাঠালি-চাপার গন্ধে করিত দু’জনারে বেয়াকুল। পদ্মপুকুরে সাঁতার কেটেছি শত ঢেউ তুলে জলে, হারিয়ে যেতাম দু’জনেই কভু ডুবে সে সলিল তলে। আজিকার মত সরম তখন ছিলনাক ও নয়নে, যেতনা তখন লতাটির মত ভূয়ে নুয়ে অকারণে। এই বিনু যবে ছিল গাে কিশােরী কিশাের ছিলাম আমি, বাঁধা খোপা তার খুলে দিয়ে তা’রে রাগায়েছি দিবাযামী। প্রজাপতির সে ডানা ছিড়ে তার কপালে দিয়াছি টিপ, দেয়ালির রাতে এক সাথে মােরা জ্বালায়েছি শতদীপ। আমের শাখাতে ঝুলন ঝুলেছি মুখােমুখী দুইজনে, ফাগ-উৎসবে হােরী খেলা কত খেলেছি বিনুর সনে। [ ২২ ]
ব্যবধান
তখন সে জানি ছিলনা এমন পালাতনা মােরে হেরি’,
চরণে তাহার সেদিনও বাজেনি হেন লজ্জার বেড়ী।
চোখ দুটি তার ছিল চঞ্চল ভীরু কপােতের মত,
অকারণে বিনু হাসিত বলিয়া চাপড় খেয়েছে কত।
রাগ অভিমান চলিত তখন—দু’জনে ঝগড়া করি’
কাটায়েছি হায় মােরা দেহে কত ব্যথা-ভরা বিভাবরী।
সেই বিনু আজ মাের সাথে আর কহেনাক দুটি কথা,
বেড়ার আড়ালে মুখটি লুকায়ে বাড়ায় বুকের ব্যথা।
সাঁঝের বেলায় এবে যদি কভু হেরে মােরে বিনুরাণী,
ছুটিয়া পালায় ফু দিয়ে নিয়ে সন্ধ্যা-প্রদীপখানি।
পুকুরের পারে হঠাৎ যদিবা দেখা হয় তার সনে,
মাথা নীচু করে আঙুলটি বিনু জড়ায় বসন-কোণে।
চোখে চোখে এবে চাহিতে পারে না সেদিনের মত আর,
বাঁধিয়াছে আজি ষােড়শী বিনুরে সরমের কারাগার।
গােকুল ছাড়িয়া আসিয়াছে সে যে মায়াবী মথুরাপুরী,
কৈশাের-স্মৃতি কেঁদে উঠে হেথা মাের শূননা বুক জুড়ি।
( ২৩ ]
চাষার মেয়ে
সােণার ধানে ভরেছে আজ অই সে কাজীর বিল,
উড়াে তােতার পাখনা সেথায় কছে ঝিলিমি।
বাউরী বাতাস তার বুকে আজ তুলছে কেবল ঢেউ,
এমন ফসল এই গাঁয়ে আর দেখেইনিক কেউ।
ভবে এবার কানায় কানায় মোনা কাজীর গােলা,
করতে হবে উঠানখানি একটু আরও ভােলা ।
গাছগুলি আর সইতে নারে পাকা ধানের ভার,
তাই কি ক্ষেতে পড়ছে তারা নুইয়ে বারেবার ?
অই বিলেতে ধান কাটিছে এই গাঁয়ের এক চাষী,
একটি মেয়ে সঙ্গে—তাহার মুখটি হাসিহাসি।
ফুরিয়ে দিতে কাজটি বাপের কাস্তে লয়ে হাতে
ধান কাটিতে সেও এসেছে অই সে চাষীর সাথে।
পেঁয়াে চাষার মেয়ে—তবুই দিয়ে রূপের ছাপ
দেবতা যেন দেছেন তারে দারুণ অভিশাপ,
শক্ত করে বেঁধে বুকের আগা কাপড়খানি
কৃষাণ-বালা ধরূল পাকা ধানের গােছ টানি।
২৪ ]
চাষার মেয়ে
মাঘের হাওয়ায় উড়ছে তাহার চিকণ কালাে চুল,
কাণেতে তার দুলছে কেবল রূপাের দু’টি দুল।
ঝাঁঝাল রােদে গাল দুটি তা’র উঠছে ঘেমে খালি,
মুখর খাড়, তাই দেখে হায় পাছে কত গালি।
কোমরখানি নুইয়ে দিয়ে গেয়ে ফুলেল গান,
চাষার মেয়ে কাস্তে দিয়ে আস্তে কাটে ধান।
তা’র সে হাতের পরশ পেয়ে ‘গিরিং’ ধানের শিষ
কি যেন কয় মনের কথা গােপনে ফিসফিস্।
নিশাস্ তাহার যখনি যায় তাদের কায়া ছুয়ে,
আপনি হতেই পড়ে তারা চরণে তা’র নুয়ে।
চাষার মেয়ে আমনেতে গান গেয়ে যায়
দিগ-বিধবার অচল করে দিগন্তরে ধূ ধূ
মেঠো সুরের সে গান শুনে উড়াে বকের সারি
অবাক চোখে চায় মেয়েরে দুধ-মাখা পাখ নাড়ি।
মাঘের রউদ ঝিমায় যেন তাহার পানে চেয়ে,
হেথায় শুধু আফশেষে মাের বুকটি আসে ছেয়ে।
কৃষাণ-মেয়ে কাস্তে দিয়ে আস্তে কাটে ধান,
সেই আঘাতে পরাণটি মাের হয় যেন খান খান।
কি গান গাহে অই মেয়েটি বুঝতে পারি না যে,
সুরখানি তা’র শুলে শুধু হিয়ায় ব্যথা বাজে।
[ ২৫ ]
মাটির প্রদীপ
নেইক জানি অই কিশােরী কি-ই বা যায় বকে,
ব্যথার কাজল এখনও তত লাগেনি ওর চোখে।
এ যেন ঠিক হৃদয়-ছাচা ব্যথায় গলা সুর,
রয়েছে তার আধেক-ফোটা বক্ষে ভরপুর।
হয় তাে কোন বেদন আছে তার সে-বুকে টাকা,
সুখের গীতি নয়তাে কভুই এমন মধু-মাখা।
হয়তাে দেহে নামছে রূপের শাঙন বেয়াকুল,
শিহরি’ তাই উঠছে গাে তার বুকের কদমফুল।
হয়তাে মেয়ে একটু পেয়ে কস্তুরী-সন্ধান
গাইছে আজি গন্ধে-ব্যাকুল ছুটে চলার গান।
";
লাে কিশােরী। কৃষাণ-বালা, গান গেয়ে যাও তুমি,
সুরের সুরধুনীর ধারায় আমার মরুভূমি
দাওগাে মেয়ে দাও ডুবিয়ে—এই পথিকের কায়া
মাগছে আজি দূর হতে অই তােমার সুর-ছায়া।
গানের তানে দাও ভাসিয়ে গিরিংধানের বিল,
অই রেশে তার উঠুক ভরে দেউলিয়া মাের দিল।
চাষার মেয়ে। ধান কেটে যাও তার সাথে গাও গান,
উঠুক কেঁপে সেই গানে এই পেঁয়াে কবির প্রাণ।
[ ২৬ ]
বালুচর
ওই যেখানে করছে খাঁ খাঁ চোরাবালুর চর,
নিশায় যেথা ফুপিয়ে উঠে চক্রবাকীর স্বর ;
তপ্ত যাহার অঙ্গখানি
আছে ঘেরি’ গাঙের পানি,
মাছরাঙা আর গাঙচিলেরা উড়ছে যাহার পর,
সেইখানেতে বাঁধনু আমি আমার খেলা-ঘর ।
ঊষর
ধূ ধূ এ
সেই চরেতে নেইক তরু-ছায়া,
সেথা-রােদের তাতে জাগায় শুধু মৃগতৃষার মায়া।
দুপুর যখন সেথায় আসে
বিধুর বায়ু উছলে হাসে,
তার সে ছোঁয়ায় শিউরে উঠে দিগ-বিধবার কায়া
সাগর-ঘেরা সেই চরেতে নেইক তরু-ছায়া।
ঘুম ভাঙে না সেথায় কভু ঘুঘুর ডাকে হায় !
সেথা-ঘুঙর শুধু গুমরে মরে গাঙ-নটিনীর পায়।
ঘুর্ণী হাওয়ায় ঘুরে ঘুরে
বালুচরের বুকটি জুড়ে
ধূসর বালি শুধুই উড়ে অথির বেদনায়,
শখ-চিলের পালক ঝরে সেথায় ঝড়ের ঘায়।
[ ২৭ ]
মাটির প্রদীপ
সেই সে বালুর চরে তবুই বেঁধেছি মাের ঘর,
আমায় ঘেরে রয়েছে অই শূন্য দিগন্তর।
গাঙের পানি সেচর ঘিরে
তরঙ্গে দোল খাচ্ছে ধীরে,
ভাঙতে সে চায় বাঁধনটিরে হানি’ ঢেউয়ের কর,
সলিল-ঘেরা বালুর চরে বেঁধেছি মাের ঘর।
আমি-বালির বুকে হাতড়ে ফিরি হারা-মাণিক মাের,
যার লাগি হায় কেঁদে কেঁদেই নিশায় করি ভাের।
ভাঙন-ভরা শাঙন রাতে
বাঁশি শুধুই লয়ে হাতে
আঙনে মাের চখীর সাথে ঝরাই আঁখি-লোর।
বালুর বুকে হাতড়ে ফিরি হারা-মাণিক মাের।
উড়ােপাখীর ঝরা-পালক কুড়ােই নিশিদিন,
কখন শুনি মাছরাঙ্গারি সুরের রিণিঝি।
গাঙচিলেরে হায় না জানি
শুধাই কত অবােধ বাণী-
পাখনাখানি উড়িয়ে সে যায় শূন্যে হয়ে লীন,
এমনি ক'রে যায়গগ কেটে আমার নিশিদিন।
[ ২৮ ]
পথের কেয়া
বােঝাই করা নায়ের মাঝি দেয়গাে যবে পাড়ি,
তাহার পানে চেয়ে চেয়ে চোখ দুটি হয় ভারি।
পালতােলা সেই নায়ের মাঝে
খুজিগগা হায় সকাল সাঝে
হারিয়ে-যাওয়া সেই সাথীরে ঝরায়ে আঁখি-বারি ;
যার লাগিরে হলাম আজি বালুর মরুচারী।
ভাঙবে কখন নেইক জানি এই সে বালুচর
রুদ্র নেশার ঘূর্ণী হাওয়ায় ঈশান কোণের ঝড়।
ভয় বা কিসের ? রে বিবাগী ।
কূল যে রে তাের গেছেই ভাঙি,
একূল ওকূল যানা ভেসে-অকূল হবে ঘর।
রে কবি। তুই ছাডিসনে এই চোরাবালুর চর।
[ ২৯ ]
পথের কেয়া
পথের কেয়া। পথের কেয়া।
শাঙন প্রাতের অন্দরী।
বালা-রাণীর পর্শনে আজ
ফুটলি কি তুই সুন্দরী ?
উর্ধে বাজে মেঘ-ডমুরু
বুক যে রে তাের দুরু দুরু-
পড়ল কি আজ অই মুখে তাের
ইন্দ্রধনুর রঙ, ঝরি?
কৃষ্ণ অলি-লাঞ্ছিতা গাে ।
কোন অতনুর নিশ্বাসে
উঠলি জাগি কঁাটার বুকে
রােমাঞ্চিত উচ্ছাসে ?
বলনা সখী এমনি করে
কঁাচলি বাঁধি’ বক্ষ’পরে
হারিয়ে-যাওয়া দিনগুলাে তুই
কাটিয়ে দিলি কার আশে
[ ৩০
]
পথের কেয়া
আকাশ বাতাস উন্মনা আজ
তোর সে-বুকের গন্ধেতে,
সুর তুলে সে পেঁয়াে-বধুর
বুকের বাঁশির রন্ধেতে।
ডাহুকী তার ছোঁয়া পেয়ে
ঝিমায় লাে ােের মুখটি চেয়ে-
কৃষাণ-বালা থমকি দাড়ায়
উদাস চোখে পথ যেতে।
তাের সুবাসের ছন্দ আঁকে
চক্ষে ঘুমের আল্পনা,
অঙ্গে যে তাের লাখ কিশােরীর
সােণা হাসির জালবােনা।
জেগে জেগে তাইতাে রাণি ।
দেখি তােমার স্বপনখানি,
উদাস করে মর্ম আমার
তােমার সুরের মূচ্ছ না।
মউমাছি গায় বাউল-গীতি
তোমার রূপের অঙ্গনে,
রেশমী কেশর কয়লে তাদের
মোদের তােরা সঙ্গ নে।”
[
لا
,
মাটীর প্রদীপ
আজ বুঝিনু কেনই খালি
পরাণ তারা দেয় গাে ডালি,
কাঁটার রাণি, চরণে তাের
রূপ-সরাবের ঘূর্ণনে।
গৌরী কেয়া। গৌরী কেয়া ।
কাটায়-ফোটা ফুলরাণি।
তাের বুকে আজ রূপ-দেবতা
দিচ্ছে আমায় হাতছানি।
কি অঞ্জলি তা’র চরণে
দিয়ে যাব চন্দ্রাননে
নেইক জানি,—গেলাম শুধু
প্রেমের নতি আজ দানি।
L
৩২ ]
সূৰ্য্যমণি
জীর্ণপাণ্ডু পউষের গােধূলির ম্লানচ্ছবিখানি
বিচ্ছেদ-বিধুর শীর্ণ আপনার বিদাধরে টানি’
বক্ষে নিলে তুমি সূৰ্য্যমণি । বিরহের তিমিরের তীরে।
কজ্জল-বরণাস্মিতা সন্ধ্যাসতী বিশ্বে ধীরে ধীরে
নেমে আসে স্বপনের মত ;
ঝিল্লিরা তুলিছে তান, ভৃঙ্গদল গুঞ্জনে বিরত।
ক্ষের বল্লভ তব পশ্চিমের অস্তাচলে গেলো মৃদুহাসি’ ;
মৃদুল পূরবী-হাওয়া উদাস মানস-তলে
বাজাইছে বিচ্ছেদের বাঁশি।
দূর অনন্ত হ’তে মরণের বার্তা তব সন্ধ্যারাণী তমিস্র লগনে
বক্ষুব্ধ বিভােল প্রাণে বহিয়া এনেছে,-তাহা কহে যায়
তােমারি শ্রবণে
নকুঞ্জ বিতান-তলে আপনার বৃন্তমাঝে বিভাসিত হয়েছিলে অয়ি।
প্রস্ফুট যৌবনে তব তােমার সুরভি গন্ধ বিলাইল হে সৌন্দৰ্য্যময়ী
মদির চঞ্চলানিল স্মৰ্ত্ত প্রাণে মত্ত চারিভিতে,
তৃষাতুর ভৃঙ্গরাজি হে বিহ্বলা গুঞ্জরণ-গীতে
কম্প্রবক্ষে বরিল তােমারে,
প্রভাতের স্নিগ্ধ অভিসারে।
[ ৩৩ ]
৩
মাটির প্রদীপ
বিলাসিনি, হায়,
মৃত্যুর সায়াহে তােমা’ আজি তারা ফিরে নাহি চায়।
নিষ্ঠুর বধিরকাল ত্রুর হাসি’ রহি’ অন্তরালে
চুম্বিছে ক্ষুধিত শ্বাসে দীপ্ত তব আরক্তিম ভালে।
জীবন-দীপিকা-শিখা নিৰ্বাণ খুজিছে আজি
নিবে যায় অই.নিবে যায়,
হে সুন্দরী সূৰ্য্যমণি, হায় ।
নিঃশব্দ অস্ফুট ভাষে পাংশু তব বিম্বাধর খানি
বিচঞ্চল মারুতের কর্ণ-রন্ধে কহে যায় অতীতের কোন স্বপ্ন-বাণী?
বিরহ-বিহ্বলা অয়ি, বক্ষ-হিল্লোলিনী মাের উচ্ছিয়া উঠিছে ক্ষুব্ধবাতে,
দুঃসহ বেদনে তব, অম্লান কায়া আজি, কপােল আপ্লুত ধারাপাতে।
তােমার হিয়ার সাথে মিশে গেছে আজি মাের প্রাণ,
তাই বুঝি শ্রান্ত বক্ষে উঠে রণি বিদায়ের বিক্ষোভিত গান ।
সুরভি নিশ্বাস তব মিশে যায় অনাদ্যন্ত নীলব্যোম-মাঝে,
পাণ্ডু তব ঝরে দল আজিকার স্তব্ধ মৌন সাঁঝে।
অস্ফুট নক্ষত্রালােকে উপহাসে তােমারে বিমান,
আপনারে রিক্ত করি লভিলে এ শেষ প্রতিদান ।
তােমার অদৃষ্ট হেরি ভাবি মাের ভবিষ্যের নিষ্ফল প্রয়াণ,
বিশ্বে যাহা দানি’ যাব
সেকি দিবে তার প্রতিদান?
[ ৩ ]
কদম ফুল
নয়ন খােল, নয়ন খােল কদম-কলি সুন্দরি।
তােমায় আজি ডাকছে লাে সই বাদল-মেঘের নীলপরী।
শ্রাবণ-ধারা পড়ছে ঝরে
সবুজ পাতার কুঞ্জ’পরে,-
মন-চকোরী গুঞ্জরে তার মিহি চিকণ সুর ধরি।
বাজছে জলদ-সারঙ্গীতে মল্লার রাগ উল্লাসে,
মর্ত্যে হেথা বন-ময়ূরী পেখম ধরি’ দুব-ঘাসে
নাচছে সুরের মঞ্জু তালে,
সেই নাচনের অন্তরালে
ময়ুর শুধু নয়ন মুদি’ পড়ছে বাঁধা প্রেম-পাশে।
কদম্ব ফুল। কদম্ব ফুল! নয়ন খােল আজ রাণি ।
কাটার বুকে গৌরী কেয়া দিচ্ছে তােমায় হাতছানি।
বুকের কুঁড়ি ফুটল যে তার ছড়িয়ে পড়ে গন্ধ-বাহার
সেই সুবাসে যায়গাে তাহার কস্তুরী আজ হার মানি'।
বুকের চোখের ওড়নখানি খােল কদম ফুল-বালা,
দেখনা চেয়ে রামধনুকে লাল গােলাপের রঙ ঢালা।
বাউরী বাতাস ডাকছে লাে আজ ঘােষ্টাতে সই নেই কোন কাজ,
ঘুম্-নিদালির আড়ালখানি দেয় না বুকে দুখ-জ্বালা।
[ ৩ ]
মাটির প্রদীপ
চাতক চকোর যুথীর চোখে ঘনাল আজ নীল মায়া,
মনটি তাদের ভুলাল সই! শাঙন-মেঘের আবছায়া।
আজকে তারা কছে কেলি, উড়ছে স্বপন-পাখনা মেলি’
কোন বিদেহীর পরশখানি দোলায় তাদের দিলকায়।
কদম-কুঁড়ি! কদম-কুঁড়ি। দেখনা চেয়ে চোখ চাহি,
তাের ডালে আজ ঝুলছে ঝুলন কুলের বালা গান গাহি।
ফোটা ফুলের কেশর দিয়ে কপােল তাদের দাও রাঙিয়ে ;
বৃন্দাবনের কাজরী গাথা গাও,-সরমে কাজ নাহি।
ঘাটের 'পরে অই কিশােরীর চপল মুখর কিঙ্কিণী,
বছে মুখের ওড়না খানি খুলতে শুধু রঙ্গিনি।
তার বুকে আজ নেই কচলী ঘােটা মুখে নেইক কলি !
হে সুন্দরি। লওগাে আজি অই কিশােরীর মন জিনি’,
নয়ন খােল নয়ন খােল ঘুমের কারাবন্দিনি।
[ ৩ ]
মিনতি
ওগাে ও কিশােরী বালা ওগাে ও সােণার মেয়ে।
আজি কি গাঁথিছ মালা ফুল-পানে চেয়ে চেয়ে ?
চাপার আঙুল দিয়ে রূপালি সূতাের মাঝে
বিধিছ ফুলের হিয়া সােণালী বরণ সাঁঝে।
কুসুমে কঁাটা ত’ নাই -তবে কেন ব্যথা-হাসি
পাগলঃঅলক সাথে মিশিয়াছে ঠোটে আসি’?
অই মুখ অই অাঁখি চেয়ে চেয়ে মনে হয়-
এ যেন গােধুলি-তারা, ঊষার হাসিটি নয়।
বুঝিয়াছি আমি তব বুকের চিতার দাহ,
ফুল-মালা পরি’ গলে সে-শিখা নিভাতে চাহ ?
বুকে যার এত ব্যথা দেহে কেন এত সাজ ?
পরণে কেন বাসাড়ী-চরণে আলতা আজ ?
বিনায়ে বেঁধেছ বেণী ওগগা ও কিশােরী রাণি।
তারই কারাগারে মাের কঁদিতেছে হিয়াখানি।
তােমারে হেরিয়া কঁদে আলােভরা নভতল,
গাগরী-ভরণে গেলে জল করে ছল ছল।
ওগাে ও অধরা মিতা। নিভাতে তােমার দাহ
এ পথিক আনিয়াছে দুটি আঁখি বারিবাহ।
আজি রচিতেছ মালা কুসুমেরে বিধে প্রিয়,
সেই ফুলদল সাথে আমারেও গেঁথে নিও।
[ ৩৭
৩৭ 3
পরদেশীয়
পরদেশীয়া! পরদেশীয়া! রঙ্গিলা লাে বন-পাখি।
গুবাক সারির কুঞ্জে রহি আজ কারে তুই যাস্ ডাকি ?
কুয়াস-ঢাকা মাঘ-প্রভাতে
তুই এলি কা’র ঘুম ভাঙাতে ?
কনে এই শীতের কাপন দোলায় না তাের পাখনা কি ?
ডাকিস্ কারে দূর
দেশিনি! জংলী সুরের ভঙ্গীতে ?
এখনও তাে ঘুম কারাে হায় ভাঙল না তাের ইঙ্গিতে !
বঁধুর বাহু-শিথান’পরে
পরাণ-প্রিয়া তন্দ্রাভরে
রয়েছে অই, দেয় না সাড়া সে-যে মধুর সঙ্গীতে।
সুন্দরী লল! বুলবুলিয়া দিচ্ছে তােমায় টিটকারী,
শুনছি শালিক টিয়ার মুখে চটুল সুরের গিট্কারী।
সাঁই সাঁই:অই ঝাঝাল হাওয়া
তাের সনে গায় গজল-গাওয়া
দুর্বাঘাসে মুক্তা ছিটায় শুক্লারাতির পিচকারী।
[ ৩৮ ]
পরদেশীয়
নিশীথ-জাগার কোন সাথীরে ডাকিস্ রে তুই নিদ্-হারা।
বল না মােরে করল কেবা এমনি তােরে ঘরছাড়া ?
কার লাগি হায় রে বন-পাখি ।
বেহাগ সুরে উঠিস ডাকি ?
বহাল কে তাের নয়নে তপ্ত তরল নীর-ধারা ?
অই যে দূরের পূব-অচলে দিচ্ছে রবি হাতছানি,
লাখ তরুণীর ঠোটের চুমায় লাল হ’ল তা’র মুখখানি।
আজকে চেয়ে তাহার পানে
বেদন কি তাের বাজছে প্রাণে ?
ঘুম্-নিদালি ভাঙল রে তাের নিষ্ঠরা সে কোন রাণি ?
তাের সে বিধুর চঞ্চুপুটে সােহাগ চুমার দাগ রাখি’
আধেক রাতে পালাল যে-সে কোন পাষাণ বল পাখী ?
তাই কি আজি এমনি ভােরে
গুবাক তরুর কুঞ্জ’পরে
শিউরে একা উঠলি জেগে পাতার কোণে মুখ ঢাকি ?
দেখনা শিরীষ-শিমূল-কুঁড়ি চাইছে শুধু তাের পানে,
তাদের কেশর-শয্যাতে আজ গুঞ্জে মধুপ মুলতানে।
তাের গীতালির আমেজ আজি’
সারঙ্গে তা’র উঠছে বাজি’,-
সেই সে সুরের রেশখানি হায় মৰ্মে আমার দুখ হানে।
1 ৩৯ ]
মাটির প্রদীপ
পরদেশীয়া। পরদেশীয়া। তাের গানে আজ সুন্দরী।
উঠছে রে এই উদাস কবির শূন্য বিধুর বুকভরি”।
তােমার সুরের সুরা পিয়ে
আসছে দুটি চোখ বুজিয়ে,
ভাসিয়ে মােরে নিচ্ছে যেন অলখ-স্রোতে ঘুম-পরী।
গান গেয়ে যা গান গেয়ে যা সুন্দরী গাে নিদ-হারা ।
তাের বেদনে উঠুক দুলে এ দেউলিয়ার হৃদ-পারা।
তাের মত দুখ বক্ষে বাঁধি
আমিও হায় অমনি কঁাদি,
নিলাম বেঁধে তাের সুরে তাই আজকে আমার একতারা।
[ ৪ ]
আলেয়া
শােন শােন ওগগা কিশােরী মৌনাননা ।
এ কবিরে আজ করিয়াছ তুমি উন্মাদ উন্মনা।
চপল তােমার কাজল অলক এলােমেলাে বায়ে উড়ি
নয়ন ধাঁধিতে মায়া-জাল যেন বুনিছে বিশ্বজুড়ি।
কালাে দুটি চোখ যেন চুম্বক-চোরা চাহনিরে হানি’
ওগাে সুদূরিকা। দূর হতে লয় পথিকের হিয়া টানি।
সিদুরিয়া রাঙা দুটো লাল ঠোটে কি বাণী রেখেছ ঢাকি
কি যেন পরশ মাগে সে গােপনে প্রবল কামনা মাখি।
হােলদে চাপার প্রলেপ লেপিল কেবা অই চারুদেহে।
ফণীর মতন বিণায়ে বেণীটি বাঁধিয়াছ কত স্নেহে।
ওগাে বিদ্যুল্লতা ।
এ পথিক সনে অবাক নয়নে কহিলে কি আজি কথা ?
অই রাঙা মুখে বাণী ফুটিল না? কঙ্কণ-ঝঙ্কারে
তব হৃদয়ের গােপন বারতা জানাইছ বারে বারে ?
সুধাইলে তােমা হে কিশােরী মেয়ে হে শােভনা সুন্দরী।
কি মধু রেখেছ বঞ্চিত অই বুকের গাগরী ভরি ?
[ ৪১ ]
মাটির প্রদীপ
শােন শােন হে বিধুরা,
তােমার চরণ-রক্তিম আভা রক্ত কৃষ্ণচূড়া
চুরি করিল কি পথের ধূলারে লাল করিবার তরে?
তারই গৈরিকে সিদুর তুমি কি পরিবে সিথীর পরে ?
মউমাছি আজি বাঁধিয়াছে বাসা ঘেরি তব তনুখানি,
তারই মাঝে কিগগা ডাকিলে আমারে আজি কে মক্ষিরাণী?
আজ কোন কাজ নাহি ওগাে মাের—কোন কথা কহিব না,
দূর হতে শুধু হেরিব ও-তনু হে অনতি যৌবনা।
সুন্দরী নিরূপমা।
তিল তিল করে নিলে প্রাণহরি’ তুমি কি তিলােত্তমা ?
কমণীয় অই ললাটে ভাতিছে কামনার ললাটিকা,
সারাটি অঙ্গে জ্বলিছে তােমার যৌবন-দীপশিখা।
তারি আলােকে তাে আঁধি ঘুচিল না, জ্বলিল না মাের বাতি,
আজি হয় শুধু সৃজিলে এ বুকে কাজল কৃষ্ণা রাতি!
( ৪২ ]
হারিয়ে-যাওয়া পাখী
সেদিন বরষা-রাতি
গগনে তারার পাঁতি
মিশে গেছে আঁধারের কূলে,
গুরু গুরু গরজনে
বাদলের বরিষণে
ধরাখানি গিয়েছিনু ভুলে।
বিজলীর হাসি খানি
মরণের তমােবাণী
এনেদিল মাের কালাে বুকে,
বাহিরে আকাশ-পানে নাম-হারা কা’র টানে
চেয়ে আছি ব্যথা-ভরা সুখে।
পবনের স্ব স্ব
বরষার বরিষণ
দাদুরীর উতরােল গীতি,
পশিল মরম-কোণে
তারি সনে ক্ষণে ক্ষণে
ভেসে এলাে অতীতের স্মৃতি।
অস্ফুট স্বপন-ঘােরে আমি-হারা যেন মােরে
হারায়ে ফেলেছি সেইদিন,
আকাশে মৃদঙ্গ-রােলে
কেতকীর ঘনদোলে
উঠেছিল বেজে হৃদি-বীণ,।
[ ৪৩ ]
মাটির প্রদীপ
বিশ্ব যেন শুধু আলাে বাহিরে আঁধার কালােল
রাতিয়ায় বাদলেরক্ষণে,
আমার আঁখির দিঠি আঁধারে আলাের চিঠি
পড়েছিল যেন একমনে।
আমি যেন আছি একা অধিয়ায় ছিল লেখা-
কিছু নাই কিছু নাই আর,
আছে শুধু এক বাণী আজো তারে নাহি জানি
বাণী যেন জ্যোতি-পারাবার।
আধাে স্বপ্ন-জাগা প্রাণে চেয়ে আছি দূর পানে
বসে আছি বাতায়ণ-দ্বারে,
নীড়-হারা এক পাখী কারে যেন ডাকি ডাকি
মিশে গেল তিমিরের পারে।
তা’র আর্ড পাখাখানি
স্বপ্নে গড়া একবাণী
রেখে গেল মরমের কূলে,
বুঝি পাখী নীড়-হারা
হৃদয় পাগল-পারা
পথখানি গিয়াছে সে ভুলে।
রহিলাম আমি জাগি সারারাতি তারি লাগি
তবু ত’র নাহি পেনু দেখা,
মিশে গেল আধিয়ায়
গেল শুধু রাখি হায়
মাের বুকে ম্লান এক রেখা।
[ ৪ ]
হারিয়ে-যাওয়া পাখী
তিমির নিশার পাখী আজো যেন থাকি থাকি
ডেকে যায় মােরে নিশি-মাঝে,
জ্যোতি-হীন তা’র কায়া দিয়ে গেছে কালাে ছায়া
সুর তা’র রহি’ রহি’ বাজে।
আমার জীবন খানি আজো হায় নাহি জানি
পথভােলা পাখীর মতন
মিশিবে কি অন্ধকারে ?
মরণের পরপারে ?
বিশ্ব
কভু
করিবে স্মরণ?
নীড়-হারা পাখী মাের ঝরাইল আঁখি-লাে-
হেরি আজি জীবনের ধারা,
পাখী-সুর বুকে বাজে কোন দূর মরু মাঝে
মিশে যা’ব হয়ে নাম-হারা ?
[ ৪৫ ]
পথের মেয়ে
পথের মেয়ে ! পথের মেয়ে। একটু দাড়াও অই পথে,
উন্মনা এক গাঁয়ের কবি ডাকছে তােমায় দূর হতে।
একটু শুধু আস্তে চল; এখনও তাে সাঁঝ-রবি
যায়নি ডুবে মর্মে আঁকি লাল গােধূলির শেষ ছবি ।
কৃষ্ণচূড়ার আবছায়াতে ক্ষণেক দাড়াও আজ রাণি।
সন্ধ্যা-তারা এখনও যে দেয়নি তােমা’ হাতছানি।
কোন্ গায়ে আজ যাচ্ছ তুমি হিজলতলার কোন্ হাটে ?
যাত্রা-শেষে থামবে কোথা’ অচিন সুদূর কোন্ বাটে ?
এই পথিকের কথা শুনে হাসছ কেন কও মেয়ে ?
বুকখানি মাের উঠছে দুলি’ না জানি কোন সুখ পেয়ে।
অই হাসিতে ফুটছে তােমার হাস্নুহানার শ্বেতকলি,
চোখের কাজল হেরে’ ওঠে চিত্ত-চকোর চঞ্চলি’।
ধূপছায়া-রঙ সাড়ী তােমার ধূপের সুবাস আনছে গাে।
কালাে চুলের জমাট আঁধার বক্ষে বেদন হানছে গাে।
পদ্ম ফোটার শব্দ আমি শুনছি তােমার বক্ষেতে,
শতেক লাখ মৌমাছি আজ উড়ছে দুটি চক্ষেতে।
রঙিন্ পায়ে পড়ছে তােমার কৃষ্ণচূড়ার দল ঝরি’,
আমার বুকে ফুটছে স্বপন-গৌরী কেয়ার মঞ্জরী।
[ ৪৬ ]
পথের মেয়ে
পথের মেয়ে ! পথের মেয়ে। একটু দাড়াও অইখানে,
দুইটি কথা কইতে তােমা’ সাধ জাগে আজ মাের প্রাণে।
সন্ধ্যাপ্রদীপ যেই কথা কয় সন্ধ্যামণির মুখ চেয়ে ;
যেই ভাষাতে ভ্রমর ওঠে জুই ফুলেতে গান গেয়ে ;
বসন্ত কয় নিঃস্ব তরুর শাখায় শাখায় যেই বাণী
সেই সে কথা কইতে তােমা’ মন কঁদিছে আজ রাণি।
ভয় রেখােনা বুকের কোণে হে সুন্দরী চঞ্চলা।
রূপ-পিয়াসী কবির লাগি’ একটু থামাও পথচলা।
অতিথ সেজে এলাম আমি তােমার রূপের অঙ্গনে,
দুইটি তিথি রেখাে শুধুই আমায় মনের এককোণে।
তার পরে যাও যেও ভুলে দুঃখ কিছু নেই তাতে,
শিশির-কণা কদিন জ্বলে স্নিগ্ধ-শ্যামল দুৰ্ব্বাতে?
অচিন দেশের মেয়ে। তােমায় ডাকছে রূপের সন্ধানী,
যাবার আগে দাওতাে জ্বেলে আমার ঘরের দীপখানি।
সােণা হাতের পরশটুকু যাওগো রেখে সুন্দরী!
সেই দানেতে উঠবে জানি রিক্ত কবির বুক ভরি।
[ ৪৭ ]
ধ্রুবতারা
•
তৃতীয়া তিথির ক্ষীণ শশী-লেখা পশ্চিম নভ-তলে
‘নিবু নিবু করে উকি দিতেছিল যামিনীরে পলেপলে।
ফাগুন সেদিন বহিল প্রথম -দখিণা বাতাস রাশি
হেরিল আমারে বাতায়ন-পথে চঁাদিমার সাথে হাসি।
স্বপন-দেশের প্রণয়-বুলানাে মৃদুল কোমল বাণী
কয়ে গেল মােরে ফাল্গুন-সখা ধীরে করি কানাকানি।
ত্রিযামা-নিশার বিদায়ের শেষে বকুলের শাখে বসি’
গাহিল কোকিল প্রাণ-কাড়া সুরে,-তারি ভান কাণে পশি
উঠিল শিহরি’ তরুণ তনুটি, কপিল পরাণখানি,
প্রথম প্রেমের দূত সনে হ’ল সেইদিন জানাজানি।
জ্যোৎস্না মিলালাে আকাশের গায়ে, তারকা লুকালাে লাজে,
ধ্রুবতারাটির আলােক তখনাে রয়েছিল মাের মাঝে।
কত রজনীতে হেরেছিনু তা'রে কহিনি একটি কথা,
অধর কপিল সেদিন প্রথম জানাবারে ব্যাকুলতা।
হারানাে দিনের যতেক স্বপন ব্যর্থ স্মৃতির রূপে
পঁড়াল আসিয়া মরমের কোণে অতি ধীরে চুপে চুপে।
যে বেদনা মাের কেঁপেছিল প্রাণে উঠেছিল শিহরণ,
গেয়েছিল সেই বেদনার গীতি ধ্রুবতারা অনুখণ।
.
[ ৪৮ )
গ্যাসের আলাে
দু’জনে নিরখি’ রয়েছিনু হায় সেদিন দোহার পানে,
দু’জনার ছবি উঠেছিল ফুটি’ দু’জনার মন-প্রাণে।
বেদনার ঘরে আঁখি দুটি মেলি’ হেরিনু নীলিমা-ভালে,
ধ্রুবতারা মােরে নিরখি হাসিল আকাশ-অন্তরালে।
চিরজনমের পরিচয় হ'ল সে নিশায় তারই সনে,
সেই স্মৃতি জাগে মানস-দুয়ারে আজিকার নিশি-খণে।
পাষাণী উষার নিশাসের রাগে আমার মূরতিখানি
বুকে একে তার নিমিষে লুকাল না-দেখার রেখা টানি।
প্রণয়-মাখান যে-স্বপনখানি হেরেছিনু সেই রাতে,
ক্ষয়হীন তার স্মৃতিটুকু আজো ফিরে মাের সাথে সাথে।
গ্যাসের আলাে
দিবাশেষে যবে পশ্চিম নভে সূৰ্য পড়ে গাে ঢলি,
আঁধার যখন ধরণীর বুকে ধীরে ধীরে পড়ে গলি’,
ভজুয়া তখন মইখানি আর
দীপ-শলা ল’য়ে হাতে
ছুটোছুটি করে গ্যাসের আলোেক
জ্বেলে দেয় রাস্তাতে।
[ ৪৯ ]
মাটির প্রদীপ
এতে ভুল কভু হয় না ক তার
প্রতি সন্ধ্যার কাজল আঁধার
তারই কাছে শুধু মাগে বারবার
কি যেন রে অনুখণ
পরের গলিতে প্রদীপ জ্বালানাে
বড় তার প্রয়ােজন।
১
সন্ধ্যার ক্ষণে আলো উঠে জ্বলে
বস্তিতে বস্তিতে,
প্রতিবেশী সবে কাটায় রজনী
ঘরে ঘরে স্বস্তিতে
ঝিলিমিলি করে গ্যাসালােকে রাতি,
শুধু তার ঘরে নিবু নিবু বাতি--
তারই জ্বালা পথ-দীপ-পানে চেয়ে
করে তারে বিদ্রুপ,
আধাে-জাগ্রত স্বপনে সে হেরে
মহা জীবনের রূপ।
[
السا
গাড়ােয়ান
আমি শুধু মনে-মনে
ভাবি বিস্ময় সনে-
তা’র মত আরাে কত লাখ জন
আছে ধরণীর পরে,
আমরণ যারা পরের খাতার
হিসেব নিকেশ করে।
তারা—মিটাইছে শুধু অপরের ক্ষুধা
নিঃশেষে দানি’ নিজ প্রাণ-সুধা ;
বসন্ত সম বন্ধ্যা বাগানে
ফুটাইয়া রাঙা ফুল,
যাত্রার শেষে পেয়েছে:দেখে সে
কিছু কাটা, কিছু ভুল
গাড়ােয়ান
বােশেখ মাসের:তপ্ত দুপুর খাঁ খাঁ করে দিনমান,
রাঙা সূর্যের তল পেতে হাহাকারি.উঠে প্রাণ।
কঠিন নীরব রাস্তার শিলা
ঘেমে উঠে হেরি’ রৌদ্রের লীলা,
দিগন্ত জুড়ি’ ছুড়িছে কে যেন ধারালাে অগ্নি-বাণ।
বােশেখের চির খর বােন্দরে বিশ্ব মুহমান।
[ ১ ]
মাটির প্রদীপ
হাঁকায়ে চলিছে ভাড়াটিয়া গাড়ী এ হেন দ্বিপ্রহরে
গাড়ােয়ান এক—অঙ্গেতে তার আগুনের কণা ঝরে।
ঘােড়ার পৃষ্ঠে হানে সে চাবুক,
ফুলে ওঠে তা’য় পঞ্জর বুক
তবুও ছুটিছে জোর সে কদম—লাগামটি মুখে ধরে।
ঘন ঘন বাঁশি বেজে উঠে তার নাসার রন্ধ্র-স্বরে।
পথের শিলাতে গাড়ীর চাকাতে মিতালি না জানি কত,
চক্রনেমির চুম্বনে তা’র পরাণ ওষ্ঠাগত।
অশ্বের মুখে ঝরিতেছে ফেনা
শােধিছে কি তায় জীবনের দেনা ?
ভাড়াটে গাড়ীরে টেনে বুক তার ক্ষয়রােগে হল ক্ষত ;
গাড়ােয়ান শুধু দিন মজুরীর হিসেব নিকেশে রত।
বহুদূর গেছে আঁকিয়া বাঁকিয়া পুরাতন পথখানি,
কোন বাঁকে গিয়ে যাত্রা তাহার শেষ হবে নাহি জানি
কঁদিয়া কঁদিয়া ঘুরে চলে চাকা,
জীবন তাহার আজি বড় ফাকা
গাছােয়ান হেরে বাঁচার স্বপন ঘােড়ারে চাবুক হানি’,
অশ্ব ছুটিছে—মজুরি তাহার কিছু দানা আর পানি।
৫২ ]
কামারশালা
বহুকাল পরে গায়ে এসে মাের দেখিনু সেদিন সাঁঝে
চিরচেনা সেই দিনুরে তাহার কামারশালার মাঝে।
অতি পুরাতন কৰ্ম্মকার সে-বসে বসে দিনরাত
ঠুঙা ঠুং ঠুং হাতুড়িটি হানে করে শুধু প্রাণপাত।
তার একখানি ছোট্ট দোকান, ভাঙা বেড়া দিয়ে ঘেরা,
‘দাও’ বানাইতে দিনু এ গাঁয়ের সবার চাইতে সেরা।
মাঘেতে পৌষে পড়ােধূয়ে যারা করে খেজুরের চাষ,
ধারালাে কাটারি মাগে তারা আসি সে দোকানে বারমাস
বাজারের দিনে বড় কাজ তা’র-ঝালাপালা করে কাণ
কেউ বলে দাও কোদাল সারায়ে’ কেউ বলে ‘দাও শান্।
কহে কেউ ‘ভায়া। ভােলা হয়ে গেছে মাের কাস্তের দাত,
দিনু কয় “তবে বদল কর না মাের দন্তের সাথ।
চাষী ও রাখাল জটলা পাকায় বসে চুল্লীর পাশে,
কথাটি না ক'য়ে মাথা নেড়ে দিনু মাঝে মাঝে মৃদু হাসে।
বহ্নির তাপে ঝলসিয়া গেছে তাহার দুইটি চোখ,
কয়লার গুড়াে প্রিয় তার কাছে—যতই সে কালাে হােক।
[ ৫৩ ]
মাটির প্রদীপ
অঙ্গার-মুখে অগ্নি জ্বলিয়া টানে সে হাপর খানি,
সেই আগুনের বুকে চেপে দেয় কঠিন লােহারে আনি।
হাতুড়ির ঘায় থাতলিয়ে যায় হায়রে তাহার বুক,
যত ব্যথা পায় তত রাঙা হয়ে উঠে তার কালমুখ।
কামার ভায়া সে লৌহ পিটিছে একমনে নিশিদিন,
কানা করিবারে চাহে অাঁখি তার ফুকির আলপিন।
হাপর শুধুই ফুপিয়ে কঁদিছে—ফাকা বুকে বাজে বাঁশি,
রাঙা বহ্নিতে ফাটিয়া পড়িছে বারবনিতার হাসি।
সে-হাসিটুকুন কিছু নয়—শুধু দুখের জমাটরূপ,
বিশ্ব-কামারশালায় করে সে জীবনেরে বিদ্রুপ।
অনলের চির তল পেতে লােহা করে হায় হায় !
অঙ্গার শুধু সংজ্ঞা হারায় প্রাণান্ত বেদনায়।
মানুষের মতো তারাও বন্ধু । হাসিতে কঁদিতে জানে,
শিকল টানিলে বাতাস ফেঁাপায় হাপরের মরা প্রাণে।
বুঝেও বুঝিতে পারে না দিনু যে, তাহাদের ক্রন্দন,
কেন দুযি তারে? মজুরির আজ বড় তা’র প্রয়ােজন।
তােরা-বলিসনে কিছু চুপ,
কামারশালায় দেখে যারে শুধু মহাজীবনের রূপ।
[ ৪ ]
চৈতালি
মলয়-আয়ু ফুরিয়ে গেলাে,
বনের বুকে ফুলের গায়
বিদায়-বেলার ব্যাকুল শ্বাসে
চৈতী-হাওয়া মিলিয়ে যায়।
গ্রামের শেষে মাঠের বুকে
ফসল-কাটা কৃষাণ-গান
ধ্বনিছে মাের হিয়ার মাঝে,
গুরি উঠে আকুল প্রাণ।
রিক্ত-ফসল মাঠের 'পরে
আকাশ-বধূর আঁচিল-ব্যেপে
গােপন কথার গপন সুরে
: ণকে মন উঠছে কেপে।
তপ্ত বায়ুর উগ্র নিশাস
ঝিমিয়ে-পড়া পাতার বুকে
ফেলছে আছি ক্ষণে ক্ষণে
প্রণয়-ভরা গােপন সুখে।
[ ৫৫ ]
মাটির প্রদীপ
১
বিকোয় কৃষাণ ক্ষেতের ফসল
চোতের শেষে গ্রামের হাটে,
প্রাণ-উদাসী কপােত ডাকে
অশথ-শাখে বিজন মাঠে।
-
ওরে, আয় তােরা সব আয় ।
চোতের হাওয়া ফুরিয়ে এলাে,
বুকের ফসল ব্যাকুল বায়
সুরের দোলায় দুল্ছে আজি,
বিদায়-বেলার বইছে শ্বাস,
ফসল-কাটা মাঠের শেষে
ডাকছে আমায় নীল আকাশ।
এই জীবনের বিপুল বােঝা
লুটিয়ে নে’রে লুটিয়ে নে,
গানের ভারের বাধন তোর
মনের মানুষ টুটিয়ে দে।
শষ্য-হারা মাঠের বুকে
চোতের হাওয়া নিঃস্ব আজ,
বিলিয়ে দেওয়ার সে-সুর-কাঁপন
ঝঙ্কারে মাের মনের মাঝ।
৫৬ ]
চৈতালি
আয়রে তােরা—বিলিয়ে দেব
আমার হিয়ার ফসল যত,
আঁচল ভরে লুটিয়ে নেরে
নিঃস্ব করে মনের মত।
বসন্ত-শেষ গােপন শ্বাসে
নুইয়ে পড়ে যতেক ফল,
আয়রে তােরা, আয়রে আজি
আয়রে মনের মানুষ-দল।
আজ, আয় তােরা সব আয় ।
উদার মলয় রিক্ত মাঠে
তপ্ত হাওয়ায় মিলিয়ে যায়।
[ ৫৭ ]
শ্রমিক-প্রশস্তি
কহে শ্রমিকের কবি-
দু’টি আঁখি খুলে চাহ একবার পীড়িত নরের ছবি।
রূপের বাজারে বেসাতি করিতে এবার যাবনা ভাই,
বিশ্বদেবের কর্মশালায় চল একবার যাই।
চকোর চাতক চঁাদের বেদনা অনেক হল ত শোনা,
বিরহের রাতে ঝরিয়াছে কত নয়নের জল লােনা।
বুলবুলি-গান শুনিলাম কত ফুল-বাগিচায় বসি,
কত তরুণীর হাসিতে পরাণ উঠিয়াছে উচ্ছসি'।
রূপের ধনুর নির্মম শরে কত আঁখি হল কানা,
মােহ-মাখা হৃদি উড়িতে চাহিছে মেলি’ আজ দু’টি ডানা।
বন্ধ কর সে-পাখা,
এমন করিয়া দুনিয়ায় আর হবে না কাহারও থাকা।
রূপখাের আঁখি উপাড়ি ফেলিয়া ফতুর হইয়া সবে
কল্পনা ছাড়ি’ চলিতে হইবে সােজাপথে বাস্তবে।
মানুষের গান গাহিল না কেহ চাহিল না তার পানে,
মানুষ ছাড়িয়া চলিয়াছ সবে তার রূপ-সন্ধানে।
[ ৫৮ ]
শ্রমিক-প্রশস্তি
রঙিন স্বপনে প্রয়ােজন আজ নাই,
আপন ঘরেতে আগুন লেগেছে ফাগুনে কি কাজ ভাই ?
দখিণার বায়ে বধির করেছে মােদের কর্ণ দু’টি,
মানুষের যত হৃদয়-মমতা নিয়াছে সে সব লুটি।
মলয়-কাঙাল অন্তর নিয়ে তাইতাে আমরা হায় ।
সাড়া দিতে নারি দুনিয়ার যত ইতরের বেদনায়।
রূপের চরণে উজার করিয়া ঢালি মােরা অখি-জল,
তাইতাে বন্ধু পীড়িতের লাগি’ জেগে উঠে শুধু ছল।
তাই বলি-চল ভাই
একবার সবে বিশ্ব-শ্রমিক-কর্মশালায় যাই।
চল যাই সেথা হায়রে যেথায় মােদেরই মতন নর
ঘৰ্ম্ম ফেলিয়া কৰ্মশালায় মরিছে নিরন্তর ।
মর্মে তাদের কী বেদনা হায়!—মােরা যদি কভু পারি-
তাদেরই লাগিয়া সঞ্চিত করে রাখিব আঁখির বারি।
হাতুড়ি-শাবল-কোদাল-কুড়ােল-লাঙল আপন মনে
চালাইছে যারা রৌদ্রে পায়ে চির বেদনার সনে
দুর্গম গিরি কর্দম ক্ষেতে অন্ধ খনির তলে
ওরে দুই মুঠো অন্নের লাগি দিবারাতি পলে পলে
জীবন মৃত্যু তুচ্ছ করিয়া খাটিতেছে যারা হায় !
চল একবার সাড়া দিয়ে আসি তাহাদের বেদনায়।
[ ৫৯ ]
মাটির প্রদীপ
রূপ আর সেই ক্ষুদ্র প্রেমের বন্দনা-গীত ছাড়ি
মুক্ত
কণ্ঠে গাও সবে গান শ্রমিকের বেদনারি।
মােদের মতন তারাও বন্ধু। হাসিতে কঁদিতে জানে,
দুঃখ সুখের ছায়াটুকু লাগে তাদেরও মর্মে প্রাণে।
তারা-যে মানুষ একথা সুনিশ্চয়,
মনুষ্যত্ব তাহাদেরও আছে এ কভু মিথ্যা নয়।
তবে কেন মােরা দিবারাতি ওরে দু’পায়ে তাদের দলি?
তবে কেন যারা বিশ্বের প্রাণ ইতর তাদের বলি ?
তবে কেন যত উদ্ধত আর দৃপ্ত ধনীর দল
পিষিয়া মারিতে চাহিছে তাদের দিবারাতি পলে পল ?
মানুষ হইয়া মানুষেরে কেন বঞ্চিত করি হায় ।
বাধার শিকল পরাইয়া মােরা দিয়াছি তাদের পায়।
হাত ধরে আজ তাদের তুলিতে হবে,
ঘৃণা করে শুধু যাদের দলিয়া মােরা চলিয়াছি সবে।
ভাই বলে’ আজ করিতে হইবে তাদেরে আলিঙ্গন,
মুক্তি-মায়ের তনয় তাহারা একথা অনুক্ষণ
মর্মে মর্মে বুঝিতে হইবে—তবে স্বাধীনতা-সতী
মােদের দুয়ারে আপনি আসিয়া জানাইবে তা’র নতি।
এ-কথা মিথ্যা নয়,
গাও তবে ভাই একবার সবে ‘জয় শ্রমিকের জয়।
[ ৬ ]
ঝড়ের সমুদ্র মহাবারিধিরে মন্থন করি’ ভীমগরজনে উৰ্মিদল দুলিয়া ফুলিয়া ছুটে আসে অই কাপাইয়া মহাপৃথী-তল। মহাউল্লাসে প্রলয়ােচ্ছাসে গরল উগারি’ যেন রে ফণী তাথিয়া তাথিয়া নৃত্য করিয়া আসিতেছে—তা’র বিপুল ধ্বনি হুঙ্কারে ওরে ওম্ ওহ্ ওহ্, ত্রাসে কঁপে তা’র মহীতল ব্যোম্ তারই সুর শুনি’ ছায়াপথে অই থেমে গেছে গ্রহ-উল্কা-শনি। লক্ষ পাঞ্চজন্য আজিকে সঘনমন্ত্রে উঠিছে রণি। আসে কল্লোল মহাকল্লোল মহামানবের বার্তাবহি’, তাহারই মন্ত্র গাহে যেন আজ ফেন উচ্ছল লক্ষ অহি। প্রলয়-নাচন নাচে তারা আজ অঙ্গে জড়ায়ে ধ্বংসের সাজ- মহাকাল বুঝি উঠিয়াছে জেগে পীড়িত নরের বেদনা সহি। কলকল্লোল ছুটে আসে অই রুদ্র গরবে ধ্বনিয়া মহী।
মাটির প্রদীপ
আসে নটরাজ হাসে নটরাজ নাচে নটরাজ উৰ্ম্মি-সাথ,
জটার বাঁধন খুলে গেছে তার—ঘনায়ে আসিছে তিমির রাত
তাই বুঝি অই অর্ণব-তীরে ?
হাহা হাহা হাসি তাই ওরে কিরে
দিগম্বরের বিষের বাঁশিতে ফুকারি’ তুলিছে বজ্রনাদ?
জটা খুলে দিল নটরাজ—তাই গেল কিরে খুলে প্রলয়-বাঁধ ?
সিন্ধুর মহা উৰ্ম্মি তুলিছে তালে তালে ওরে রুদ্ৰতান,
তারই মাঝে আমি শুনিতেছি শুধু সাম্যসামের ছন্দগান।
পীড়িত ইতর শূদ্র চামার
মেথর মজুর কৃষাণ কামার
কল্লোল-সাথে মিশাইয়া ওরে মহান তাদের ব্যথিত প্রাণ
ভৈরব সুরে গাহিতেছে সবে সাম্য সামের বিপুল গান।
উদ্ধত যত দৃপ্ত ধনীর বিদ্রোহী তারা, এ কথা আজ
জানাতে চাহিছে সৃজি’ বিপ্লব ধনী-ভােগ্যা এ-বিশ্বমাঝ ।
ধনকুবেরের সঞ্চিত ধন
এক সাথে তারা করি’ লুণ্ঠন
মিটাইবে সবে ক্ষুধার যাতনা—লুণ্ঠনে তাই নাহিক লাজ ;
তারা সবে ওরে অন্নের লাগি’ পরিয়াছে আজ দস্য-সাজ।
;
[ ২ ]
ঝড়ের সমুদ্র
ধরণীর স্তন ছিন্ন করিয়া হাঁকিতেহে সবে “অন্ন চাই,
শ্রমিক আমরা ভবনে মােদের আজি একমুঠো অন্ন নাই।
সারাদিন মােরা খেটে খেটে হায়
ঘৰ্ম্ম ফেলিয়া যা’ করি উপায়,
তারই সব নেবে ধনীরা লুটিয়া-ব্যর্থতা শুধু আমরা পাই,
ভবনে মােদের নাহি কিছু আজ, দেরে দে অন্ন—অন্ন চাই”।
“ক্ষুব্ধ সিন্ধু-বক্ষ চিড়িয়া আমরা আহরি মুক্তাফল,
জোয়ান হাতের শাবল হানিয়া সমতল করি শৃঙ্গদল।
কণ্টক পথে চরণ ফেলিয়া
মােরা চলি যত বিপ্ন দলিয়া-
দংশন-ক্ষত হ’ল সে-আঘাতে ক্লান্ত মােদের চরণ-তল।
ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বলিছে মােদের তবু হায় ধনকুবের দল।”
“এত অন্যায় এত নিপীড়ন সহিবনা আর সহিব না রে,
আজ হতে শির লুটাবনা আর ভােগ-আসক্ত ধনীর দ্বারে।
আজি হ’তে মােরা ধন-বিদ্রোহী,
বল না কেমনে এ বেদনা সহি ?
ব্যথার মরুভূ ভুখার শ্মশান পাগল মােদের করিল আরে ।
ধু ধু প্রান্তর ছিল এ ধরণী শ্রমিক করেছে সজীব তারে।”
[ ৩ ]
মাটির প্রদীপ
মহা কল্লোলে শুনিলাম কত পীড়িত নরের ব্যথিত গান,
তপ্ত শলাকা হানিয়া কে যেন ফুড়িছে তাদের কলিজাখান।
কত বেদনার আঘাতে আঘাতে
উঠিয়াছে তারা জেগে আজ প্রাতে,
বিপ্লব-ঝড়ে আনিবে তাহারা ধরণীর পরে মহাতুফান,
প্রলয়ের প্রাতে আজিকে তাদের জাগিয়া উঠেছে সুপ্ত প্রাণ
হে চারণকবি । ওরে আজ তুই কল্লোল-সাথে কণ্ঠ খুলি’
গারে একবার সাম্যের সাম বিজয়-নিশান হস্তে তুলি।
শ্রমিকের ব্যথা কণ্ঠে তুহার
উঠুক সঘনে ধ্বনি বারবার।
স্বপ্ন ছাড়িয়া দেখ ওরে তুই ব্যথিত মহান মানুষগুলি,
কল্পনা ছাড়ি’ গা’রে কবি তুই মানুষের গান কণ্ঠ খুলি।
[ ৬ ]
জাগগা নারী
দীপান্তরের বাঁশী বাজিয়াছে বন্দিনী মা জাগাে,
বুক-ফাটা সুরে ঘুম
কি র তাের আজিও ভাঙিল না গাের
জাগো জাগাে ওমা জাগাে।
বৈশাখী-হাওয়া ঈশন, কাণেতে বিষাণ বাজায় অই,
হেন দুর্যোগে তাের হ!ত ওমা বিজয়-নিশান কই ?
ক’দিন রহিবি রূপকথার সে রাজার দুলালী সাজি’ ?
সােণার কাঠি যে ছেয়ায়ে দিয়েছে তাের শিরে ওরে আজি
ঘুম-ভাঙানিয়া ভীম মহাকাল দিয়ে ঘন করতালি,
জেগ ওঠ ওরে কল্যাণী নারী শক্তিরূপিণী কালী।
ওরে ও বাসুকী লাখ নাগ-মাতা ওরে ও সর্বনাশী ।
কালকূট তুই দেরে দে ছড়ায়ে অট্টহাস্যে হাসি'।
লক্ষ গােখর লিক্ লিক্ করে তাের কম কাল কেশে
উঠুক ফুসিয়া খসিয়া শ্বসিয়া ধূর্জটি হাসি হেসে।
পতিত জাতির রক্তে রাঙান মণি মুকুতার ভার
করিয়াছ তুমি মৃণাল দেহের ভূষণ চমৎকার।
কিবা তা’য় প্রয়ােজন ।
লক্ষ প্রাণের মূল্য হ'তে কি অমূল্য সে-রতন।
রূপ-মরীচিকা জ্বালায়ে হে নারী কিবা হবে আর ফল।
তােদেরি লাগিয়া লাল হ’ল জানি যুগে যুগে ধরাতল।
[ ৬ ]
মাটির প্রদীপ
হেম হৰ্ম্মের রম্য পুরীতে হয়ে রাজ-নন্দিনী
রহিবি কি ওরে বিলাসিনী তুই চিরকাল বন্দিনী।
মনে করিয়াছ মহারাণী তুমি,-তাই মুখে মৃদু হাসি ?
মিথ্যা সে কথা, হয়ে আছে শুধু পুরুষের সেবাদাসী।
হীন সমাজের কারাগার ভাঙি’ বাহিরিয়া এসে পথে,
বিশ্ব-নরের সাথে উঠে পড় জগন্নাথের রথে।
পুরুষ তােমারে দিবে না মুক্তি এ কথা সুনিশ্চয়,
নিজ হাতে তব করিতে হইবে সব বন্ধন ক্ষয়।
জাগগা জাগাে নারী ষােড়শী কিশােরী ধরার দুলালী মেয়ে।
স্বাধীনতা-সতী রয়েছে তােমার সােণা মুখ-পানে চেয়ে।
শান্তি যে তুমি শক্তি যে তুমি—তুমি নারী ছায়া-তরু,
তােমারই পরশে শ্যামল হয়েছে ধরণীর মহামরু।
হে সুষমা সুন্দরী।
চারিদিকে আজ জ্বলেছে পীড়ন-বহ্নি ভয়ঙ্করী।
মুক্তির লাগি’ মরণে বরিল কত না সত্যবান,
ওগাে সাবিত্রী! দিতে হবে তাের তাহাদের বুকে প্রাণ।
লখীন্দরেরে করিয়াছে আজি কাল ফণী দংশন,
হে বেহুলা। আজি আত্মা তাহার মাগে তাের পরশন।
শিব-হারা-যাগ করিতেছে আজি দক্ষ সে প্রজাপতি,
তারই প্রতিশােধ নিতে হবে তাের অয়ি চিন্ময়ী সতী।
[ ৬ ]
জাগগা নারী
শােন ওরে কল্যাণী ।
ভুলিনে তুই দুর্যোধনের সেই উদ্ধত বাণী।
আজো এলো কেশে বাঁধিস্ কবরী অগুরু-গন্ধ সনে?
ছেলে মরে তাের মরণ-দোলায়—পতি সত্যের রণে।
ফাগুনে এখন কি কাজ হে নারী।—আগুন লেগেছে ঘরে,
সব-হারাদের দখিণ দুয়ার দেরে দে বন্ধ করে।
ঝড়ের হাওয়ায় উড়াইয়া দাও মুখের ওড়নাখানি,
মৃত্যুর সাথে হােক আজি তব অক্ষয় জানাজানি।
নব প্রলয়ের রাঙা মেঘ হতে লয়ে বহ্নির শিখা
সীমন্তে প’র সিদুর হিন্দু ওগগা নারী স্বস্তিকা।
কম করে তব মুছাইযা দিও পুরুষের ক্ষতদাহ,
নারীর নয়ন জানি যুগে যুগে শান্তি সলিল-বাহ।
ওগাে কল্যাণী বিজয়-ক্ষ্মী ওগগা ও সীমন্তিনী ।
কালকূটে তুমি বানাইতে পার পীযুষ সঞ্জীবনী।
যুগের শঙ্খ তাই
ফুকারে বারতা এ কবির সনে “জেগে ওঠ, ভয় নাই।”
[ ৬ ]
চরকা ও তকলী চরকা ও তলী বাংলার ঘরে ঘরে চরকার চাকা ঘুরে মুকৃতি-দেবতা যেন তকূলীর ঘূর্ণনে শােন তােরা অনুখণ দিবারাতি অনুখণ ঘুরে আজ বন্ বন্। তারই প্রতি সুরে সুরে নাচে ওরে বুক জুড়ে। বুঝি সে সুদর্শন। স্ব স্ব বন্ বন্। চরকা সে ঘুরিতেছে তলীর সাথে সাথে আজ অন্তরে অন্তরে এ যেন সে মরা হাড়ে মঞ্জুল রেশে তার চরকা ও তলী ঘর ঘর্ঘর, ফুকারিয়া মন্তর কি পুলক সন্তরে। পরাণের স্পন্দন। মূখরিত অঙ্গন ; ঘুরে অই অনুখণ। তলী ও চরকা তার ঘূর্ণনে যেন তারই সে-চাকার জোর উড়ে তার ঘূর্ণনে কি যেন সে উগারিছে ঘােরে চাকা দিনরাত ঘুরে আজ প্রতি পল, টুটে পার শৃঙ্খল। ভেঙে দেয় ঘুম-ঘাের ; বিদেশীর ছলবল। রক্ষিতে এ জীবন- ঘর্ঘর বন বন। [ ৬৮ ] চরকা ও তকূলী চরকার সূততা যেন অলক্ষ্য বিধি-হাত, হিন্দু ও মুসলিমে বাঁধিতেছে একসাথ ঘূর্ণন-রবে হেথা এক জাতি জাগে আজ, ভিন্-জাতি শির’পরে যেন পড়িতেছে বাজ। তাদের শবদ আরে সিন্ধুর পরপারে পৌছিছে দিবারাতি। বিনারে বারেবারে ; মমাদের হাসির স্বরে করে কারা ক্রন্দন ? শােন ওরে ঘরে ঘরে তলীর বন্ বন্। চরকার ঘূর্ণন রেশে তার ঝঙ্কারে পূবের অচল-পথে উদিছে অরুণ–পরি’ চরকা তলী ঘুরে হুঙ্কারে আজি ‘ও, নভতল মহী ব্যোম, আজিকে সােণালী রথে ভালে লাল চন্দন। অনুখণ স্ব স্ব। এর চঞ, চরকা সুদর্শন তা’র ক্ষুরধারে কাটিল রে তা’র ঘূর্ণন-প্রতিঘাত সিন্ধু-ডাকাত ওরে তারই নাগপাশ পরি’ ঘর্ঘর ঘােরে চাকা ফণী-ফণা বক্র। ভেঙে দেয় বিষ দাত, ত্রাসে কঁপে দিনরাত। কেঁদে মরে দুষমন। ঘরে ঘরে বন্ বন্। [ ৬ ] আজ মাটির প্রদীপ লাঞ্ছিত বঞ্চিত দ্রৌপদী মা মােদের ভয় নাই—তাকাবেন। মুখ-ছায়া আর ওদের তা’র দ্বারে আগমনী গাহে রণ-জাগরণী, হবে না এ সজ্জায় লজ্জা কি নিবারণ ? কে করিবে আর তার বস্তু অপহরণ ? চরকা! ঘাের তবে ঘর্ঘর বন বন অনুখণ স্ব স্ব মুছুক সে ঘূর্ণনে বাজুক সে-সুরে বাঁশি দেশ-মা’র অঙ্গনে চরকা-সূতােয় হাতে আজ ভাই ভাই এক ঠাই ওরে ও তরুণ দল ছি ডিবারে কর পণ তােরা আগুয়ান হ’রে তার চরকা! তকূলী। ঘাের চরকা! ঘাের ঘাের, জননীর অখি-লাের। আস্যে ফুটুক হাসি, আজ তােরা দাড় আসি। মিলনের রাখী পর, কেউ কারো নহে পর। কাপাইয়া ধরাতল জননীর শৃঙ্খল। ঘুচাইতে ক্রন্দন, ঘর্ঘর বন্ বন্। [ ৭০ ] ‘রাখী’ কাব্যগ্রন্থ সম্বন্ধে কয়েকটি অভিমত Advance-* * * The poems deal with varied themes and their chief beauty lies in freshness and simplicity mingled with that touch of idealism which transcends the material and svars into the unknown. His poems breathe with hopeful thoughts ond ardent aspirations ; but the poet is not without duubts and discouragements. A tender melancholy strain, a depressing possimism scom, therefore to prevade them all. They are howover sweetest of the lot, because they happen to be the saddest. বঙ্গবাণী-কবি বিভূতিভূষণের বয়সমাত্র যােল বৎসর। এই বয়সে তিনি যে কবি-প্রতিভার পরিচয় দিয়াছেন, তাহাতে বিস্মিত হইতে হয়। প্রত্যেক কবিতার ছন্দ সুন্দর, বর্ণনাভঙ্গী সুন্দর, এবং ভাবও মনােম। আমরা এ কিশাের কবিকে সাদরে সাহিত্য ক্ষেত্রে আহ্বান করি। Liberty—The poems are well-written and really charming, the more so, as they are written by a boy of sixteen only. The poet has got a sympathetic heart, able to analyse the joys and sorrows of the world. We find promise in his writing and trust that by culture he will win success in this line in future. [ ১ ] কয়েকটি অভিমত বিজলী—এই রাশি রাশি, অগণন কবি-প্রবাহের থেকে আমরা বিভূতি- ভূষণকে একটুখানি আলাদা করে দেখতে চাই। এ কিশোের-কবির একটা বেগ আছে যেটা চেষ্টাকৃত নয়, একটি আবেগ আছে যেটা স্বতঃ ফুৰ্ত্ত। ভাল কবিতা লিখবার চেষ্টা করলে, তিনি যে তা’ পারবেন, তা’র প্রমাণ তার কৈশাের-শেষে’ ‘হারিয়ে-যাওয়া পাখী’ প্রভৃতি কবিতা। A উঃদীনেশচন্দ্র সেন ডি, লিটু, রায় বাহাদুর মহােদয় বলেন—শ্রীমান বিভূতি ভূষণের কয়েকটি কবিতা আমি পড়িয়াছি। ইহার বয়স অতি অল্প। এই বালক-কবির কবিতাগুলি আমার সত্যই ভাল লাগিয়াছে। * * * এত অল্প বয়সে এরূপ কবিতা লিখিতে পারায় যে গৌরব আছে, তাহা ইহাকে দিতে কেহ কুণ্ঠাবােধ করিবেন না। | ৭২ ]
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.