Belgaria Sudha Smriti Pathagar
Sindhu-gourav Ed.3
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
সিন্ধু-গৌরব
পঞ্চাঙ্ক ঐতিহাসিক নাটক
শ্ৰীউৎপলেন্দু সেন :--
ঐশুরু লাইব্রেরী
২০৪, কর্ণওয়ালিস্ট, কলিকাতা।
প্রকাশক-শ্ৰীভূবনমােহন মজুমদার
শ্রীগুরু লাইব্রেরী
২০৪, কর্ণওয়ালিস্ স্ট্রীট, কলিকাতা।
তৃতীয় সংস্কয়ণ
অগ্রহায়ণ, ১৩৪৭
এক টাকা চারি আনা
মহলে অভিনীত
প্রথম অভিনয়-রজনী
২৫শে জুন, ১৯৩১
প্রিন্টার পঞ্চানন দাস
সত্যনারায়ণ প্রেস
২৮৪এ বিডন রাে, কলিকাতা।
* * * * * * भौबा আমার এই বইখানির সঙ্গে তাের সেই রাঙা মুখখানির স্মৃতিটুকু জড়িয়ে রাখতে চাই। অথচ তুই আজ জীবনের পরপারে,আমাদের হাতের নাগালের বাইরে। কোথাও কিছু সেখানে আছে কিনা জানি । তাই আজ আমার ব্যথিত অন্তঃকরণ পরপারের সে কোন্ অনিৰ্দেশ্য অন্ধকারের মাঝে তােরই সন্ধানে মাথা ঠুকে সান্ত্বনা খুজছে। মৃত্যুর পর আত্মার অস্তিত্ব যদি কোথাও কিছু থাকে ত’ তাের স্নেহময় পিতার এই অকিঞ্চিৎকর দানটুকু তাের কাছে পৌছে দেবার ভার আমি তারই হাতে অর্পণ করলাম—যিনি আমার বুক থেকে অতি নিষ্ঠুরভাবে তােকে ছিনিয়ে নিয়ে গেছেন। তাের বাবা
No text on this page.
নিবেন “সিন্ধু-গৌরব” তৃতীয় সংস্করণ আমার কাছে পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্য বলে মনে হচ্ছে। পুলিশ কমিশনার বাহাদুরের আদেশে যখন সম্পূর্ণ পঞ্চম অঙ্ক এবং অন্যান্য বহুস্থানে পরিবর্তন করিতে বাধ্য হই তখন স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি যে এ নাটকের তৃতীয় সংস্করণ বের হবে। বাঙ্গলার নাট্টামােদীগণ যে কত ভাল কত ক্ষমাশীল, তা আমি যতটা প্রাণে প্রাণে বুঝছি—ততটা বােঝবার সৌভাগ্য অন্য কোন নাউকারের হয়েছে কিনা জানি না। প্রথম ও দ্বিতীয় সংস্করণের পঞ্চম অঙ্ক পড়বার সময় আমার নিজেরই লজ্জা বােধ হত। কিন্তু এই নাটকের কোন ভবিষ্যৎ নেই ভেবে, পঞ্চম অঙ্ক নূতন করে লেখবার কোন চেষ্টা করি নাই। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে—উপেক্ষা না করাই উচিৎ ছিল। এবার পঞ্চম অঙ্ক নূতন করে লিখলাম। আমার মনে হয়, এবার নাটকখানি নাট্টা- মােদীদের হাতে তুলে দেবার যােগ্যতা অর্জন করেছে। খুব তাড়াতাড়ি ছাপবার জন্য কিছু কিছু ক্ৰটী রয়ে গেল—আশা করি, সহৃদয় পাঠক- পাঠিকা নিজ গুণে ক্ষমা করবেন। বিনীত উৎপলেন্দু সেন —পরিচয়- পুরুষ দাহির শোেকর ••• ••• সিন্ধুদেশের রাজা ঐ সেনাপতি আশ্রিত দ্য-দলপতি ঐ পালিত পু। রঙ্গলালের পার্শ্বচর রঙ্গলাল ••• : ••• শশাভনলাল . লছমাপ্রসাদ বীরভদ্র রণরাও সিন্ধুর প্রজাগণ চন্দ্রসেন কেতনলাল কাশিম ইব্রাহিম খালিফের ভ্রাতুস্পুত্র দ্যগণ, প্রজাগণ, সৈন্যগণ ইত্যাদি । खौ দাহিরের কন্যা ০ ০ ০ সুমিত্রা সিংহলের সুন্দরী চিত্রা নাগরিকাগণ, নর্তকীগণ, সখীগণ ইত্যাদি।
পরিচালক : ••• প্রযােজক সুরশিল্পী মঞ্চাধ্যক্ষ মঞ্চ-শিল্পী নৃত্য-শিক্ষক হারমােনিয়াম-বাদক বংশীবাদক সঙ্গতি দি রঙমহল লিমিটেড শ্রীসতু সেন, শ্রীকৃষ্ণ চন্দ্র দে শ্রীপূর্ণ চন্দ্র দে (এমেচার) শ্রীসুনীল দত্ত শ্ৰীঅনাদি মুখােপাধ্যায় শ্রীকালীপদ ভট্টাচার্য বঙ্কিম চন্দ্র ঘােষ শ্রীহরিপদ দাস শ্রীবিমল চন্দ্র ঘােষ ননীগােপাল দে (এমেচার) শ্ৰভূতনাথ দাস শ্ৰবিভূতি ভূষণ রায় শ্রীকালিপদ ভট্টাচাৰ্য্য নগেন্দ্র নাথ দে এ ৫ । স্মারকদ্বয় ••• মঞ্চ-সজ্জাকর ॥ ৫॥ আলােক-শিল্পী GHOSH, , . .. CALCUTTA.
০ ০ ০ শেষাকর ০ ০ ০ ০ ০ ০ ••• প্রথম অভিনয়-রজনীর অভিনেতা ও অভিনেত্রীগণ * রঙ্গলাল শ্ৰীনির্মলেন্দু লাহিড়ী শ্রীরবি রায় অম্বর শ্রীকৃষ্ণ চন্দ্র দে • দাহির শ্রী প্রফুল্ল দাস শ্ৰীমণীন্দ্র চট্টোপাধ্যায় কাশিম শ্রীধীরাজ ভট্টাচাৰ্য্য-পরে শ্ৰীযুগল দত্ত ইব্রাহিম শ্রীধীরেন পাত্র শােভনলাল শ্রীসত্য বন্দ্যোপাধ্যায় ( এমেচার ) লছমী প্রসাদ শ্রীকুসুম গগাস্বামী বীরভদ্র বিজয় মজুমদার রণরাও শ্ৰীধীরেন্দ্র মুখােপাধ্যায় ( এমেচার) কেতনলাল। শ্ৰীগােছ ঘােষাল অরুণা শ্ৰীমতী সরষুবালা সুমিত্রা শ্ৰীমতী চারুবালা চিত্রা শ্ৰীমতী কমলাবালা সখীগণ শ্ৰীমতী রাজলক্ষ্মী, শ্ৰীমতী কমলাবালা, শ্ৰীমতী সূৰ্যমুখী, শ্রীমতী প্রফুল্লবালা, শ্ৰীমতী মহামায়া, শ্ৰীমতী ভানুবালা, শ্ৰীমতী আশালতা, শ্ৰীমতী সুনীলাবালা, শ্ৰীমতী মুলা, শ্ৰীমতী ফিরােজা, শ্ৰীমতী আনন্দময়ী, শ্রীমতী জ্যোতির্ময়ী, শ্ৰীমতী পূর্ণিমা, শ্ৰীমতী আয়ারাণী, এমতী নিৰ্মলা। ০ ০ ০ ৪ ০ ০ ৫০০
সিন্ধু-গৌরব
প্রথম অঙ্ক
প্রথম দৃশ্য
সিন্ধুর উপকুল। একখানি অর্ণবপােত, তীরে অবতরণ করিবার জন্য
একটি কাষ্ঠ নির্মিত সিড়ি। দুরে দুইজন প্রহরী সশস্ত্র পাহারায় নিযুক্ত।
অন্ধকার রাত্রি—দুৰ্যোগঘন।
চিত্রা।
[ তরণীর কক্ষ হইতে সুমিত্রা ও চিত্রার প্রবেশ ]
সুমিত্রা। উপযুক্ত অবসর এই
এস মােরা দুইজন যাই পলাইয়া।
[ রক্ষীদের দেখাইয়া ]
পালাবার নাহিক উপায়।
[ দুইজন দস্যু ধীরে-ধীরে প্রবেশ করিল। দূর হইতে প্রহরীদ্বয়কে
লক্ষ্য করিয়া বর্শা নিক্ষেপ করিল। প্রহরীদ্বয় : আহত হইয়া ভূমিতলে
পড়িয়া গেল। ভেরী বাজিয়া সঙ্গে সঙ্গে চারিদিক হইতে ভীষণ
কোলাহল উখিত হইল। ]
সুমিত্রা। দস্যুদল আক্রমণ করিয়াছে
মােদের তরণী।
ব্যস্ত সবে আত্মরক্ষা হেতু।
-
সিন্ধু-গৌরব
[ প্রথম অঙ্ক
কেহ নাই রেধিবারে গতি আমাদের,
শীঘ্র এস পশ্চাতে আমার ।
[ দুইজনই তরণী হইতে অবতরণ করিয়া দ্রুত পলাইল। রঞ্জন তরণীর
একটি রজু বাহিয়া তরণীর ছাদের উপর উঠিয়া ভেরী নিনাদ করিল—দূরে
আর একটি ভেরী বাজিল। পরমুহূর্তে সশস্ত্র রঙ্গলাল প্রবেশ করিয়া ভেরী
বাজাইল। সেই শব্দ লক্ষ্য করিয়া রঞ্জন রঙ্গলালের পাশে গিয়া দাঁড়াইল। ]
রঞ্জন। পিতা-
যুদ্ধ জয় হয়েছে মােদের।
পলায়িত শত্রু সেনা সবে
নিশীথের ঘন অন্ধকারে।
রঙ্গলাল। আশ্চর্য্য হইনু বৎস বীরত্বে তােমার ।
এই সূচীভেদ্য অন্ধকারে ডরে নর
ঘরের বাহির হতে।
ভেবেছিনু উষারম্ভে আক্রমণ করিব তরণী ;
কিন্তু তুমি নিষেধ না মানিয়া আমার
এই রাত্রিকালে—এই সূচীভেদ্য।অন্ধকারে
অনায়াসে বিধ্বস্ত করিলে
ওই শত্রুসেনা দলে।
এতদিনে বুঝিলাম,
শিক্ষা মাের হয়নি নিল।
পিতা-
আগে বিতাম
কেমনে মানুষ হাসি-মুখে
। প্রথম দৃশ্য ] পাতা মোড়া এহশ নিষেধ। সিন্ধু-গৌরব মানুষের বুকে তীক্ষ্ণধার তরবারি আমূল বি ধায়ে দেয় ? কিন্তু যুদ্ধে এ কি উন্মাদনা পিতা! সূচীভেদ্য ঘন অন্ধকারে শত্রু-সৈন্য যবে উঠিল গজ্জিয়া অস্ত্রের ঝনঝনা যবে নিশীথের নিস্তব্ধতা দিল ভেদ করি, উষ্ণ রক্তস্রোত শিরায় শিরায় মাের হ’লল প্রবাহিত। মনে হলাে মাের- ক্ষত্রিয়-সন্তান আমি, যশ, মান, বীৰ্য্য সবি কোষবদ্ধ অসি মাঝে আছে লুকায়িত। দৃঢ়-করে উন্মুক্ত করিয়া অসি ঝাপ দিনু শত্রু-সৈন্য মাঝে। তারপর কি করেছি কিছু নাহি জানি। রঙ্গলাল। হও দীর্ঘজীবী— পিতৃ-পুরুষের নাম করহ উজ্জ্বল। সে সকলি তব আশীর্বাদ। কতবার নিবেদন করেছি চরণে সঙ্গে করে নিয়ে যেতে যুদ্ধে তব সনে। তুমি শুধু কহিতে আমারে-
সিন্ধু-গৌরব
[ প্রথম অঙ্ক
এখনাে বালক আমি
পারিব না
যুদ্ধ
করিবারে।
এইবার স্বচক্ষে দেখিলে পিতা-
পারি কি না পারি ।
কিন্তু পিতা-
আর না থাকিব আমি
অশিক্ষিত নিরক্ষর সেনাগণ সাথে।
এতদিন ধরি শুনিয়াছি তােমার নিকট,
রাজা তুমি,
আছে তব অগণিত রাজভক্ত প্রজা।
তুমি যদি রাজা-
তবে আমিই তাে সে রাজ্যের ভাবী অধীশ্বর।
আর কতদিন পিতা রাখিবে আঁধারে
কহ মােরে, কবে নিয়ে যাবে
রাজধানী মাঝে ?
রঙ্গলাল। যেতে দাও আরও কিছুদিন
রঞ্জন। আরও কিছুদিন !
না পিতা,
আমারও কি নাহি সাধ হয়
দেখিবারে মাের রাজ্য, মাের প্রজাগণে?
শােন পিতা-
কল্পনায় কতদিন আমি যেন গেছি
৪
= প্রথম দৃশ্য ] ওই রাজধানী মাঝে ; প্রজাগণ সবে দেখিয়া আমারে, “জয় যুবরাজ জয় যুবরাজ” বলি উচ্চৈঃস্বরে সম্বৰ্ধনা করিছে আমায়। মাের যতখানি সুখ- দুঃখী প্রজা মাঝে যেন দিছি বিলাইয়া। তাহাদের সব দুঃখ যেন নিছি টানি মাের বক্ষোমাঝে। যেন- সুমিত্রা। [ নেপথ্যে ] রক্ষা কররক্ষা কর- রঞ্জন। এ কি ! রমণীর আর্তনাদ। কোথা হতে—কোন্ দিকে [ একটি পতিত ভল্ল কুড়াইয়া লইয়া দ্রুত প্রস্থানােত ] রঙ্গলাল। [ বাধা দিয়া ] কোথা যাও ? রঞ্জন। ক্ষত্রিয়-সন্তান আমি শুনি এই মর্মভেদী আৰ্তনাদ, নিশ্চিন্তে দাঁড়ায়ে রব ? বারণ করাে না মােরে [ দ্রুত প্রস্থান ] মঙ্গলাল। নিশ্চয়ই কোন এক সহচর মাের আক্রমণ করিয়াছে ওই রমণীরে। করেছি বিষম ভ্রম সিন্ধু-গৌরব ( প্রথম অঙ্ক সঙ্গে করি আনি রঞ্জনেরে। সর্বব সুলক্ষণযুক্ত দেখিয়া বালকে সর্বব-শাস্ত্রে সুশিক্ষিত করিয়াছি আমি। অবােধ বালক- নাহি জানে তার সত্য পরিচয়। তীব্র বহ্নিশিখা সম উচ্চ আশা প্রজ্জ্বলিত হৃদয়-কন্দরে। জানে আমি তার পিতা, জানে আমি রাজা—নিজে রাজপুত্র। কতবার মনে মনে করিয়াছি স্থির শুনাইব তারে তার সত্য পরিচয়। কিন্তু ভয় হয়- শুনে তার সত্য জন্ম কথা, আমারে তেয়াগি যদি যায় পলাইয়া । হায়রে অবােধ মন। পর-পুত্র লাগি এত মায়া এত আকিঞ্চন। [ শােভনলালের কেশাকর্ষণ পূৰ্ব্বক রঞ্জনের প্রবেশ ] [ রঙ্গলালের প্রতি ] পিতা- তােমার সৈনিক হেন কাপুরুষ রমণীর 'পরে করে অত্যাচার।
প্রথম দৃশ্য ]
সিন্ধু-গৌরব
দেহ অনুমতি
উপযুক্ত শাস্তি দিই অধম বর্বরে !
রঙ্গলাল। কি কর রঞ্জন,
ছেড়ে দাও এরে।
রঞ্জন।
ছেড়ে দিব!
।
কি কহিছ পিতা?
নাহি জান কিবা গুরু অপরাধে
অপরাধী এই নরাধম ।
কুসুম-কোরক সম,
শুভ্র এক বালিকার পূত অঙ্গে
পাপ-লালসায় করিয়াছে হস্তক্ষেপ
এ হেন বর্বর এই
জগতেব সর্বাপেক্ষা মহাপাপে
অপরাধী যেই নরাধম
তার তুমি বল ক্ষমা করিবারে ?
না পিতা পারিব না ক্ষমিতে ইহারে।
হে কুমার !
শুনিতে কি পারি আমি-
কোন্ অধিকারে চাহ করিবারে বিচার আমার?
মানুষ—এই অধিকারে।
এ রাজ্যের ভাবী অধিপতি
এই অধিকারে।
শােভন।
সিন্ধু-গৌরব
[ প্রথম অঙ্ক
শােভন। শুনিতে কি পারি, কোন্ সে রাজত্ব
যার ভাবী অধিশ্বর তুমি
কিবা নাম তার ?
রঙ্গলাল। স্তব্ধ হও-স্তব্ধ হও !
কি কহিছ তুমি ?
বালকের সঙ্গে সঙ্গে তুমিও কি হয়েছ উন্মাদ ?
শাভন। সর্দার ;
শুনিব না কোন কথা।
তব মুখ চাহি, এতদিন ধরি
এই বালকের সহিয়াছি বহু অত্যাচার।
কিন্তু আর না সহিব ।
রাজপুত্র-রাজপুত্র ।
সম্মুখে দাঁড়ায়ে জনক তােমার,
জিজ্ঞাস তাহারে
কোন্ রাজত্বের ভাবী অধীশ্বর তুমি !
রঙ্গলাল। সাবধান—এখনও নিরস্ত হও।
সর্দার !
সামান্য বালক তরে নাহি কর বাদ-বিসম্বাদ
আমা সম অনুরক্ত অনুচর সনে।
দর তনয় ;
এ হেন স্পর্ধার বাণী তার মুখে
সহ নাহি হয় ।
প্রথম দৃশ্য ] সিন্ধু-গৌরব রঞ্জন। দস্তুর তনয় ! পিতা ! রঙ্গলাল ! বৎস ! রঞ্জন। একি সত্য! রঙ্গলাল। কি পুত্র ! রঞ্জন। তুমি দস্য? রঙ্গলাল। হ—দস্য। রঞ্জন। নহ তুমি রাজা? রঙ্গলাল। বীরত্বের লীলাভূমি এই বসুন্ধরা। বাহুবলে বলীয়ান বীৰ্যবান্ যেবা, সে-ই রাজা। রঞ্জন। ছলনা কোরো না মােরে, কহ সত্য- নহ তুমি রাজা? রঙ্গলাল। নহি রাজা। রঞ্জন। দস্যুবৃত্তি জীবিকা তােমার ? রঙ্গলাল। হাঁ—দ আমি, দস্যুবৃত্তি জীবিকা আমার। এতক্ষণে বুঝিলাম, কেন তুমি রাখিয়াছ মােরে জনহীন পার্বত্য প্রদেশে, কেন তুমি মিশিবারে নাহি দাও মােরে
সিন্ধু-গৌরব
[ প্রথম অঙ্ক
উদ্বেগ বিহীন শান্ত নরনারী সনে,
সংসারের অবিচ্ছিন্ন সুখ শান্তি হতে
কেন তুমি রাখিয়াছ দূরে সরাইয়া ;
এতদিনে বুঝিলাম সব।
রঙ্গলাল। অধীর হয়ে না পুত্র।
অধীর !
জান না কি পিতা কি হয়েছে মাের ?
এই পঞ্চবিংশ বর্ষ ধরি যেই উচ্চ আশা
নীরবে নিভৃতে হৃদয়ের অন্তঃস্থলে
সাগ্নিকের অগ্নিশিখা সম
অতি যত্নে রেখেছিনু প্রজ্জ্বলিত করি,
আজি অকস্মাৎ প্রলয়ের বিকট হুঙ্কারে
আবাল্যের সাধনা কামনা মাের
অদৃষ্টের তীব্র পরিহাসে
অন্তহীন গাঢ় অন্ধকারে গেল মিশাইয়া।
পিতা-পিতা,
এতদিন কেন তুমি দাও নাই মােরে
মাের সত্য পরিচয় ?
মঙ্গলাল। স্থির হও—পশ্চাতে কহিব
কি কারণে করেছি গােপন।
কারণ কারণ।
প্রথম দৃশ্য ]
কি কারণ দেখাবে আমারে ?
কেন তুমি এতদিন ধরি
উজ্জ্বল মধুর চিত্র ধরিয়াছ সম্মুখে আমার?
কেন তুমি ত্যাগের মহান্ মন্ত্রে
দীক্ষা দিয়েছিলে ?
জান যবে সবি মিথ্যা
তবে কেন আদর্শ রাজ্যের ছবি ধরিয়া সম্মুখে,
উন্মাদ করিয়া দিলে দস্যু পুত্রে তব ?
কেন তুমি শিখালে না মােরে—
হিংস্র শার্পলের সম তীক্ষ্ণ-নখাঘাতে
বিদীর্ণ করিয়া বক্ষ
উষ্ণ রক্তপান—চিরধর্ম মানবের।
কেন তুমি মর্মে মৰ্ম্মে বােঝলে না মােরে—
স্নেহ, মায়া, ভালবাসা নাহি এ সংসারে ;
আছে শুধু
নৃশংসতা, অবিচার, স্বার্থের প্রসার ?
রঙ্গলাল। বৎস!
বুঝিয়াছি আজিকার এই পরিচয়
শেল সম বিধিয়াছে
কোমল হৃদয়ে তব ।
সত্য, দস্যু বটে আমি
তবু তাের পিতা ;
সিন্ধু-গৌরব
[ প্রথম অঙ্ক
পিতা হয়ে মাগিতেছি ক্ষমা তাের কাছে
কর ক্ষমা
ভুলে যাও সব অপরাধ।
রজন।
পিতা!
ধরি পায়-ক্ষমা কর অবােধ সন্তানে।
কহিয়াছি অতি রূঢ় বাণী ;
কিন্তু মুহূৰ্ত্তেক না রহিব হেথা।
প্রতি পলে শ্বাসরুদ্ধ হইতেছে মাের।
চল পিতা চলে যাই
যেথা দুই চক্ষু নিয়ে যায়।
ভিক্ষা করি খাওয়াইব তােমা,
কিন্তু তার পূর্বে
শপথ করহ তুমি স্পর্শ করি মস্তক আমার
কভু না মিশিবে আর
নরাধম দস্যদের সনে।
রঙ্গলাল। করিলাম পণ,
আজি হতে
শােভন। সর্দার ! সর্দার।
উন্মাদ হয়েছ তুমি।
পথ হ’তে কুড়ায়ে আনিয়ে
পালন করেছ যারে।
প্রথম দৃশ্য ] সিন্ধু-গৌরব রঞ্জন। তার তরে হেন অধীরতা সাজে না তােমার। কি—কি—কি কহিলে তুমি ? কহি সত্য- পুত্র তুমি নহ সর্দারের। পথ হ’তে কুড়ায়ে আনিয়া পুত্র সম করেছে পালন। রঙ্গলাল। রঞ্জন! রঞ্জন ! রঞ্জন। রঙ্গলাল। রঞ্জন। এই স্থান ত্যজি- একি শুনি! নহ—তুমি, নহ তুমি—পিতা মাের? [ স্খলিত স্বরে ] আমি—আমি তব পিতা। বিশ্বাস কোরাে না পুত্র মিথ্যা বাক্যে এর। তব স্বর, প্রতি ভঙ্গী তব উচ্চৈঃস্বরে কহিতেছে মােরে নহে ইহা মিথ্যা কথা। বিন্দু মাত্র দয়া যদি থাকে তব হৃদে কোরাে না ছলনা পিতা- ধরি পায়- উন্মাদ কোরাে না মােরে।
সিন্ধু-গেরব [ প্রথম অঙ্ক রঙ্গলাল। সত্য, পিতা নহি তাের ; তবু এতদিন পুত্রের অধিক স্নেহে পালিয়াছি তােরে। রঞ্জন। শীঘ্ৰ কহ তবে কেবা মাের পিতা। রঙ্গলাল। নাহি জানি আমি । [ রঞ্জন দুই হাত দিয়া মুখ ঢাকিয়া বসিয়া পড়িল । রঙ্গলাল। [ রঞ্জনের স্কন্ধে হস্ত রাখিয়া মৃদু কণ্ঠে ] বস- রঞ্জন। লক্ষ লক্ষ ধুজ্জটীর প্রলয় বিষাণ এক সঙ্গে ওঠ’ বাজি মাের চারি ভিতে; বিশ্বনাশী দাবাগ্নির লেলিহান শিখা ওঠ’ জ্বলি দাউ দাউ ভীম প্রভঞ্জনে। ব্যথিতের চির-বন্ধু দুর্বার মরণ রক্তাক্ত করাল হস্তে কণ্ঠ মাের কর নিপীড়ন! [ দুই হন্তে নিজের কণ্ঠ চাপিয়া ধরিল ] ( বাধা দিয়া ] একি কর উন্মাদ বালক। ছেড়ে দাও মােরে। তুমি—তুমি কি বুঝিবে অভিশপ্ত জীবনের ব্যথা, ১৪
প্রথম দৃশ্য তা মােড়া ও হস্তান্তর নিবে।
সিন্ধু-গৌরব
নিষ্ফল এ জীবনের দীর্ণ হাহাকার,
যার নিষ্পেষণে আজি প্রতি অনু মাের
উচ্চরােল উঠিছে কাদিয়া।
পথের ভিক্ষুক,—সেও দিতে পারে
বংশ পরিচয়,
কিন্তু আমি
[ অসহ্য বেদনার কণ্ঠ রূদ্ধ হইল ।
রঙ্গলাল। বংশ পরিচয়—সে তাে দৈবের অধীন ;
নহে তাহা মানবের শ্রেষ্ঠ পরিচয়।
নিজ শৌর্য্যে পুরুষত্বে করিয়া নির্ভর
যেবা পারে করিবারে প্রতিষ্ঠা অর্জন
সেই তাে মানুষ।
তােমারে কি সাজে পুত্র হেন অধীরতা?
রঞ্জন।
বলিতে কি পার মােরে
আমা হতে নিঃস্ব কেবা এজগতে আজ ?
বিপুল জগৎ মাঝে
আপনার বলিবার কেহ নাহি আর ;
আত্মীয় স্বজন, মাতা পিতা
কেহ কেহ নাহি মাের।
রঙ্গলাল। আর—আমি কেহ নহি।
তুই কি জানিবি পুত্র
তখনাে ফোটেনি কথা চাঁদমুখে তাের
সিন্ধু গৌরব
[ প্রথম অঙ্ক
শুধু এতটুকু হাসি দেখিবার তরে
কেটে গেছে কত রাত্রি নিভৃতে নীরবে।
রঞ্জন।
না, কেহ নহ মাের
ছেড়ে দাও, ছেড়ে দাও মােরে ।
রঙ্গলাল। তাপ-ক্লিষ্ট জীর্ণ শীর্ণ অন্তর আমার
একমাত্র তােরই স্নেহ পরশনে
আছে সঞ্জীবিত।
চল্ বাপ-গৃহে চল্ !
রঞ্জন।
গৃহ!
কোথা গৃহ মাের ?
কোথা চাহ নিয়ে যেতে মােরে ?
কলহাস্যমুখরিত মানব সমাজে ?
স্মরণেও শ্বাসরুদ্ধ হইতেছে মাের।
না না—পারিব না, পারিব না
যাইতে সেখানে।
পিতা,
জনমের মত আজ লইনু বিদায়।
রঙ্গলাল। হানি’ বাজ বক্ষে মাের
কোথা যাবি আমারে ছাড়িয়া ?
ওরে, যাইতে দিব না তােরে,
নির্দয় নিম্মম।
[ হাত চাপিয়া ধরিল।
প্রথম দৃশ্য.]
সিন্ধু-গৌরব
রঞ্জন।
ছেড়ে দাও ছেড়ে দাও মােরে ;
মুক্ত বিহঙ্গমে
আর পারিবে না বাঁধিয়া রাখিতে।
আঃ ছেড়ে দাও-দাও ছেড়ে
[ দ্রুত প্রস্থান।
রঙ্গলাল। ওরে ওরে-শুনে যা শুনে যা !
জানি আমি তাের জন্ম-কথা,
জানি তাের পিতৃ-পরিচয় ;
শুনে যা—শুনে যা-
[ রঞ্জনের পশ্চাৎ দৌড়িয়া
যাইতে যাইতে হঠাৎ একটি পাথরে
আঘাত লাগিয়া পড়িয়া গেল।
১৭
দ্বিতীয় অঙ্ক
প্রথম দৃশ্য
শৈলেশ্বরের মন্দির। অম্বর বসিয়া গাহিতেছিল-রাজা দাহির
মন্দিরের ভিতর হইতে বাহির হইয়া অম্বরের পাশে গেল।
অম্বরের গীত
==
আমার মনের মুগ্ধ হরিণ কে তােরে ডেকেছে রে।
বাঁশীর মায়ায় আপনারে হায় হারায়ে ফেলেছে সে।
নয়নে তাহার ছল ছল জল, নিজের ব্যথায় নিজেই চঞ্চল
আকুল শেফালি ঝরার পুলকে ভূতলে ঝরিছে সে।
পথের গােপনে কোথায় কে আছে
সে খোঁজ সে রাখে কি-
গানের আড়ালে বাণ যদি থাকে তার যায় আসে কি।
বঁধুর বাঁশরী ডাক দিল যারে
ঘরের বাঁধন বঁধিয়ে কি তারে
বালির দেয়ালে জোয়ারের জল
রােধিতে পেরেছে কে?
দাহির। অম্বর।
অধর। মহারাজ।
দাহির। একটি সত্য কথা বলবে ?
১
প্রথম দৃশ্য )
সিন্ধু-গৌৰ
;
;
জ্ঞানাৰধি আমি কখনো মিথ্যা কথা বলিনি
মহারাজ ; তার ওপর আপনি আমার অন্নদাতা-পিতৃতুল্য।
দাহির। পূজায় বসেছিলাম -হঠাৎ ধ্যান ভঙ্গ হ’ল।.
তােমার গান শুনে আমি মন্দিরের ভেতর থাকতে পারলাম
আমার নিজের অজ্ঞাতসারে তােমার পাশটিতে এসে
বসলাম—কিন্তু এসে গান শুনতে পেলাম না। আমি শুনলাম
একটা হাহাকার-একটা গভীর দীর্ঘনিশ্বাস—একটা মর্মন্তুদ
ক্রন্দন-ধ্বনি। আমার কাছে কিছু গােপন কোনাে না আর
কিসের দুঃখ তােমার ?
অম্বর। আমার তাে কোন দুঃখ নেই মহারাজ ।
দাহির। আমার কাছে মিথ্যা কথা বলাে না অম্বর।
তােমার বুকের ভেতর যদি দুঃখ না থাকবে—তবে তােমার গান
শুনে আমার দুই চোখ জলে ভরে আসে কেন ?
অম্বর। আমাদের কোষ্টা যে সত্যিকারের সুখ, আর
কোটা যে সত্যিকারের দুঃখ তা তাে আমরা সব সময় ঠিক
বুঝে উঠতে পারি নে মহারাজ।
দাহির। তুমি অন্ধ বলে, তােমার কি কোন দুঃখ নেই
অস্বর। কি জন্যে দুঃখ ক’র মহারাজ । আপনি হয়
করে আমাকে আশ্রয় না দিলে—দু’মুঠো খেতে না দিলে,
আমাকে হয়তাে রাস্তায় অনাহারে শুকিয়ে মরে পড়ে থাকতে
হত; আজ যদি আপনার দয়াৰ উৎস শুকিয়ে যায়-যদি
সিন্ধু-গৌরব
[ দ্বিতীয় অঙ্ক
আপনি আপনার দয়া ফিরিয়ে নেন—তবে কি আপনার উপর
আমার অভিমান করা চলে ?
দাহির। একবার দয়া করে—বিনা অপরাধে কারও ওপর
থেকে দয়া ফিরিয়ে নেওয়া মহাপাপ, ভগবানের কাছে
প্রার্থনা করি যেন কখনাে আমার এমন দুৰ্ম্মতি না হয়।
অম্বর। দান করে দান ফিরিয়ে নেওয়া মহাপাপ?
দাহির। নিশ্চয়।
অথর। এ কথা যে আমি বিশ্বাস করতে পারছিনে
মহারাজ!
দাহির। কেন ?
অম্বর। আপনার কথা বিশ্বাস করলে আমি যে ভগবানের
ওপর বিশ্বাস রাখতে পারবাে না। তাহলে যে স্বয়ং ভগবানকে
মহাপাপী বলে মনে করতে হবে।
দাহির। কেন?
অম্বর। তার পায়ে আমি কোনদিনই তাে কোন অপরাধ
করিনি, তবে তিনি কেন তার দয়া থেকে আমাকে বঞ্চিত
করলেন। আমি তাে চিরদিন অন্ধ ছিলাম না মহারাজ।
দাহির। পেয়ে হারানাের কি সে দুঃখ-তা’তাে আমি
বুঝি অম্বর । আজ আমার কিছুরই অভাব নেই—অফুরন্ত
ঐশ্বৰ্য, দেশব্যাপী যশ, স্ত্রী-পুত্র, আত্মীয়-স্বজন আর সবার উপর
গদ্ধাত্রীর মত আমার মা অরুণা। কিন্তু যদি বিধাতার
অভিশাপে আমাকে সব হারাতে হয় তবে আমি এ জগতে
প্রথম দৃশ্য ]
সিন্ধু-গৌরব
কি নিয়ে বেঁচে থাকবাে। সে বাঁচা তাে বাঁচা নয়—সে যে
মরণেরও অধিক। অম্বর, তুমি না বললেও আমি বুঝতে
পেরেছি-তােমার কি দুঃখ।
অম্বর। আমায় ভুল বুঝবেন না মহারাজ ।
আমি
মিথ্যা বলি নি। যিনি দিয়েছিলেন-তিনিই নিয়েছেন।
বিশ্বাস করুন মহারাজ, তার উপর আমার কিছুমাত্র অভিমান
নেই। ক্ষমা করবেন মহারাজ, আপনার পূজার ব্যাঘাত
করলেম-এখন তাহলে আসি।
[ প্রস্থান
দাহির। কি গভীর বিশ্বাস—কি একান্ত নির্ভরতা ! এর
কণামাত্র বিশ্বাসও যদি আমার ভগবানের উপর থাকতাে।
(অরুণার প্রবেশ)
এই যে পাগলী-মা, বুড়াে ছেলের দেরী দেখে তাকে ধরে
নিয়ে যেতে এসেছিস্?
অরুণা। আসব না ? সেই কতক্ষণ আগে তুমি পূজা
করতে এসেছ, এখনও ফেরবার নামটি নেই। এতক্ষণ ধরে কি
করছিলে বাবা?
দাহির। কি যে করছিলেম তা তাে আমি নিজেই ভালাে
করে জানি নে মা। তবে এইটুকু মনে আছে দেবদেব শৈলে
শ্বরের পায়ে মাথা খুঁড়ে একটি সন্তান কামনা করছিলাম।
অরুণা। সে কি বাবা ?
উঠছে।
সিন্ধু-গৌরব
[ দ্বিতীয়-অঙ্ক
দাহির। ঘঁ৷ মা-এমন একটি সন্তান কামনা করছিলাম
যাকে আমার এই মায়ের পাশটিতে মানায়। বৃদ্ধ হয়েছি,
প্রত্যেক মুহূর্তে মৃত্যুর পায়ের শব্দ আমার কানের কাছে বেজে
তাই সময় থাকতে পাগলী মাকে-মহাদেবের
মত পাগল বাবার হাতে সঁপে দিয়ে নিশ্চিন্ত হতে
চাই।
অরুণা। তুমি ভারি দুষ্ট হয়েছ বাবা। আমার জন্য অত
ভাবতে হবে না। আমি কখনাে বিয়ে করবাে না।
দাহির। সাধ করে কি আর পাগলী বলে ডাকি, এখন
বিয়ে করবে না বলছিস, কিন্তু এমন দিন আসবে—যখন এই
বুড়াে বাপের কথা একটি বার ও মনে হবে না। তখন হয়তাে
কোথায় কোন্ দূরদেশে কার ঘর আলাে করে থাকবি—ততাকে
দেখবার জন্য এই বুড়ো বাপের প্রাণটা ব্যাকুল হয়ে কেঁদে
উঠলেও একটি বার তােকে চোখের দেখা দেখতে পাবে না।
অরুণা—অরুণা, তুই যদি আমার মেয়ে না হয়ে ছেলে ছতি।
অরুণা। কেন বাবা ।
দাহির। তাহলে কেউ তাে তােকে আমার বুক থেকে
ছিনিয়ে নিতে পারতাে না মা।
অরুণা। তােমাকে না দেখলে আমি যে থাকতে পারি
মা বাবা। তােমার কাছ থেকে আমাকে দূরে পাঠিও নী
আমার যে বড় কষ্ট হবে।
দাহির। আচ্ছা—তাই হবে মা-ভাই হবে।
প্রথম দৃশ্য ]
সিগৌরব
অরুণা। আজ দশ দিন রাজধানীছেড়ে এসেছি—আর
কতদিন এখানে থাকবে?
দাহির। এখানে একলাটি থাকতে বড় কষ্ট হচ্ছেনা
মা ?
অরুণা। তুমিও তাে এলা আছ, তােমারও তাে কষ্ট
হচ্ছে ?
দাহির। না মা, এখানে থাকতে আমার কোন কষ্ট হয়
না। রাজধানীতে যখন থাকি-রাজকার্য্যের গুরুভার আমার
সমস্ত চিন্তাকে আচ্ছন্ন করে রাখে।
পূজায় বসেছি
বিশ্বনাথের চরণ ধ্যান করছি-সহসা সেই চিন্তাকে ডুবিয়ে দিয়ে
রাজ্যের চিন্তা, প্রজাদের সুখ-দুঃখের চিন্তা আমার একাগ্রতা
ভঙ্গ করে দেয়। আমি পূজা ভুলে যাই, তাই মাঝে মাঝে
সংসারের কোলাহল থেকে দূরে—এই নির্জনে-শৈলেশ্বরের
মন্দিরে বিশ্বনাথের চরণ ধ্যান করতে আসি।
হয়েছে, চল মা চল।
অরুণা। ঠাকুরের জন্য সুন্দর মালা তৈরী করে রেখেছি।
তুমি একটু দাড়াও বাবা, আমি এখনই নিয়ে আসছি।
ঠাকুরের গলায় মালা পরিয়ে দিয়ে ঠাকুরকে প্রণাম করে
তােমার সঙ্গে ফিরে যাব।
পূজা শেষ
[ অরুণার প্রস্থান
দাহির। কি যে যাদু জানে—একদণ্ড ছেড়ে থাকতে পারি
সিন্ধু-গৌরব
[ দ্বিতীয়-অঙ্ক
। মায়ের আমার বয়স হয়েছে—আর তো বিলম্ব করা
যায় না।
(শেষাকরের প্রবেশ)
দাহির। একি—শেষাকর! তুমি অকস্মাৎ রাজধানী ছেড়ে
এখানে এসেছ ? কি সংবাদ ?
শেষাকর। আরবের দূত আপনার নিকট এসেছে। সংবাদ
অত্যন্ত গুরুতর—তাই আপনার বিশ্রামের ব্যাঘাত করতে বাধ্য
হয়েছি।
দাহির। আরব-দূত আমার নিকট এসেছে । কি
প্রয়ােজন?
শেষাকর। কিছুদিন পূর্বে সিংহলের রাজা একটি মহার্ঘ্য
তরণী বহু দ্রব্য পরিপূর্ণ করে আরবাধিপতির জন্য ভেট
পাঠিয়েছিল। সিন্ধু-উপকূলে দস্যুদল সেই তরণী লুণ্ঠন
করেছে—তাই আরব-নরপতি ক্ষতি পূরণের দাবী করে
আপনার নিকট দূত পাঠিয়েছে।
দাহির। আমার রাজ্যে এতবড় একটা লুণ্ঠন হয়ে গেল
অথচ আমি তার কোন সংবাদই জানিনা, আশ্চৰ্য। কিন্তু
আমি বুঝতে পারছিনা—এই লুণ্ঠনের জন্য আমাকে কেন
দায়ী করছে।
এ অনর্থ আপনার রাজত্বে ঘটেছে—হয়তাে
এই কাৰণ।
প্রথম দৃশ্য ]
সিগৌর
দাহির। অদ্ভুত কারণ ; কোথায় লড়পকূলে দস্য।
লুণ্ঠন করেছে—তার জন্য আমি দায়ী ! যদি আমি এই
অনুরােধে অসম্মত হই ।
শেষাকর। তা হলে অবিলম্বে আরবের সৈন্য-স্রোতে
সিন্ধুদেশ প্লাবিত হবে।
দাহির। তাইতাে—এ দেখছি বিষম সঙ্কট। শেষাকর,
আমি বুঝতে পারছিনে—এখন আমার কি কর্তব্য।
শেষাকর। বাল্যকাল থেকে ঈশ্বরের আজ্ঞার মত
আপনার সমস্ত আদেশ—ভাল মন্দ বিচার না করে পালন
করেছি।
আপনাকে উপদেশ দেবার মত ধৃষ্টতা আমার
কখনও হয়নি। আপনি যদি অনুমতি দেন—তবে আমার
যা বলবার আছে অপনার চরণে নিবেদন করি
দাহির। বেশ বল।
শেষাকর। কে সে হাজ্জাজ ! কি সাহসে—কি স্পর্ধায়
সে আমাদের রক্তচক্ষু দেখায়। সে আমাদের কাছে দূত
পাঠিয়েছে অনুরােধ জানাবার নয়—তার আদেশ
জানাবার জন্য। দূর আরবের মরু-প্রান্তরে বসে’ হাজ্জাজ হিন্দুর
উন্নত শির ধূলায় লুটাতে চাচ্ছে। অবনত মস্তকে এই অপমান
সহ্য করা আমাদের কখনই উচিত নয়।
দাহির। সবই বুঝি, কিন্তু অসম্মত হওয়ার পরিণাম
বুঝতে পারছ শেকর?
শেষাকর। হ্যা, তা বুঝতে পারছি। জানি আমি
জন্য
।
२६
সিগৌরব [ দ্বিতীয় অঙ্ক প্রস্তাবে অসম্মত হ'লে—অচিরাৎ সমস্ত সিন্ধুদেশ রক্তস্রোতে প্লাবিত হবে। কিন্তু তবু আমার মনে হয় মহারাজ, জীবনের চেয়ে মান শ্রেয়। দাহির। সবই জানি-সবই বুঝি। শেষাকর, একবার স্থির নেত্রে সুজলা সুফলা এই দেশের পানে চেয়ে দেখ— যার প্রত্যেক পল্লীর প্রত্যেক তরুলতা শান্তির সঙ্গেই স্পর্শে সঞ্জীবিত হয়ে উঠেছে। প্রত্যেক গৃহ থেকে সকাল-সন্ধ্যায় শঙ্খ- ঘণ্টার মঙ্গলধ্বনি ঘাের শব্দে গগন-পবন মুখরিত করে, দেবতার চরণ-উদ্দেশে ঊর্ধে ধেয়ে যাচ্ছে। কি নিশ্চিন্ত নিরুদ্বেগে প্রত্যেক প্রজা কালযাপন করছে। আজ যদি আমার তুচ্ছ মান রক্ষা করবার জন্য হাজ্জাজকে প্রত্যাখ্যান করি, তা হলে মৃত্যু মূর্তিমান হয়ে লেলিহান রক্ত-জিহ্বা বিস্তার করে সিন্ধুর প্রান্ত হতে প্ৰাস্তান্তরে ছুটে যাবে। তুচ্ছ অর্থ দিয়ে এই দারুণ সঙ্কট থেকে যদি পরিত্রাণ পাওয়া যায়—তবে সে চেষ্টা করা কি উচিত নয় শোেকর ? শেষাকর। কিন্তু মহারাজ--আজ যদি হাজ্জাজকে তার দাবী মত অর্থ দেন, তবে আপনাকে দুর্বল ভেবে কাল অন্য হলে সে আপনার নিকট অর্থ দাবী করবে। তখন আপনি কি করবেন মহারাজ? দাহির। তােমার কথা যে একেবারে যুক্তিহীন তা নয়। আৰুদূতকে কোথায় রেখে এসেছ ? শোকর। তাকে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছি।
সিগােয়
দাহির। তাকে শীঘ্র এখানে নিয়ে এস ; তার নিজের
মুখে শুনতে চাই হাজ্জাজ আমার কাছে কত অর্থ চায়।
[ শেষারের প্রস্থান।
বিশ্বনাথ ! শৈলেশ্বর ।
আশৈশব আরাধনা করিয়াছি চরণ তােমার
ধ্যানে জ্ঞানে তােমা ছাড়া নাহি জানি কিছু;
কহ মােরে কি কৰ্তব্য এ মহা সঙ্কটে ?
;
(রঞ্জনের প্রবেশ)
রন। তুমি রাজা?
দাহির। কে তুমি ?
দরিদ্র যুবক আমি।
নাহি মাের অন্য পরিচয়।
*কোথা রাজা?
আছে কিছু নিবেদন চরণে তঁাহার।
দাহির। নিঃসঙ্কোচে কহ মােরে--আমি রাজা।
রন।
ভাগ্যবান মহাভাগ্যবান আমি
তাই তব পেয়েছি দর্শম ;
ই দেৰ এণাম আমার।
দাহির। কহ বৎস কিবা প্রয়ােজন।
তুমি !
মন।
সিগৌরব
[ দ্বিতীয় অ
আসি নাই তব পার্শ্বে নিজ কাৰ্য আশে।
নিরাশ্রয় শরণার্থ দুটি বালিকার তরে
বহু দূর হতে আসিয়াছি তােমার সকাশে।
দাহির। কেবা তার—কিবা পরিচয় ?
রঞ্জন। পরিচয়! নাহি জানি কিবা পরিচয়,
তবে বহুদূর দেশে বাস তাহাদের ।
দস্য আক্রমণে আত্মীয়-স্বজনহারা হয়েছে তাহারা,
ফিরে যেতে চায় এবে নিজ জন্মভূমি।
উপযুক্ত রক্ষী সহ তাহাদের দাও পাঠাইয়া
জানাইতে এই আবেদন চরণে তােমার
আসিয়াছি হেথা।
দাহির। কোথায় তাহারা ?
রন। হলে আজ্ঞা এই দণ্ডে করি উপস্থিত
সকাশে তােমার।
-
(শেষাক ও ইব্রাহিমের প্রবেশ
দাহির। [ রঞ্জনের প্রতি ] তিষ্ঠ ক্ষণকাল,
পশ্চাতে শুনিব সব।
শেষাকৱ। দূত! নরশ্রেষ্ঠ সিন্ধুরাজ সম্মুখে তােমার
বার্তা তব কর নিবেন।
ইব্রাহিম। বীৰ্যবান্ বীরশ্রেষ্ঠ আরব-নৃপের
প্রথম দৃশ্য ]
সিগৌরব
বার্তা বহি আসিয়াছি মহারাজ, সকাশে তােমার।
তব রাজ্যে দস্যুদল করিয়াছে
আরবের তরণী লুণ্ঠন।
তুমি রাজা,
দায়ী তুমি এ রাজ্যের প্রতি কাৰ্য্য তরে।
দাহির।
এ রাজ্যের কোন কাৰ্য্য তরে
দায়ী কিম্বা নহি দায়ী আমি
তােমা সনে সে বিচারে নাহি প্রয়ােজন।
কহ --কত অর্থ চাহিয়াছে তােমার সম্রাট ?
ইব্রাহিম। এক লক্ষ স্বর্ণমুদ্রা।
এক লক্ষ স্বর্ণমুদ্রা।
স্বর্ণ-প্রসবিণী এ ভারত-ভূমি
দাহির।
নাহিক সন্দেহ।
তবু–এক লক্ষ স্বর্ণমুদ্রা অত্যন্ত অধিক।
ইব্রাহিম। বিচারের ভার নিয়ে আসেনি কিঙ্কর।
সম্মত কি অসম্মত প্রস্তাবে তাহার
এই কথা জানিবারে আসিয়াছি আমি।
সপ্তাহের শেষে তুমি লভিবে উত্তর।
যাও এবে ক্লান্ত তুমি,
লওগেবিশ্রাম।
শেষাকর, কর উপযুক্ত আযােজন
দাহির।
বিশ্রামের হেতু।
সিন্ধু-গৌরব
[ দ্বিতীয় অঙ্ক
ইব্রাহিম। আরাে কিছু আছে নিবেদন।
মহামান্য হাজ্জাজের উপহার লাগি
অপূর্ব সুন্দরী দুই সিংহল-যুবতী
ছিল সেই তরণীতে।
শুধু অর্থ নহে—তাহাদের ফিরে দিতে হবে।
দাহির।
অসম্ভব রক্ষা করা এই অনুরােধ ।
অর্থ আমি দিতে পারি রাজকোষ হতে,
কিন্তু কোথা পাব তাহাদের আমি।
ইব্রাহিম। আজ্ঞা তব গ্রামে গ্রামে করহ ঘােষণা
অবিলম্বে মিলিবে সন্ধান।
দাহির।
শেষাকর। এই দণ্ডে রাজ্য মাঝে করহ ঘােষণা
বন্দী করি’ নারীদ্বয়ে
উপস্থিত করিবে যে সম্মুখে আমার,
উপযুক্ত পুরস্কার মিলিবে তাহার।
রন। ঘােষণার নাহি প্রয়ােজন রাজা,
আমি জানি তাদের সন্ধান।
দাহির। নিশ্চিন্ত করিলে মােরে বিদেশী যুবক।
কহ, কোথায় তাহাৱা ?
উপযুক্ত পুরস্কার মিলিবে তােমার।
পুরস্কার আশে আসি নাই রাজা।
নিবেদন করিব সকলি চৰণে তােমার
রন। প্রথম দৃশ্য ] সিন্ধ গৌরব কিন্তু তার পূর্বে জানিতে বাসনা মাের, কি করিতে চাও তুমি তাহাদেরে লয়ে? দাহির। নির্বোধের সম প্রশ্ন করিছ যুবক। এই মাত্র দূত-মুখে শুনিয়াছ সব, তবু তুমি জিজ্ঞাসিছ মােরে কি করিব তাহাদের লয়ে ? মূখ আমি নাহিক সন্দেহ, তাই পারি নাই বুঝিবারে তব অভিলাষ ; এতক্ষণে—এতক্ষণে বুঝিলাম সব। দাহির। নিরুত্তর কেন যুবা, কহ কোথায় তাহারা । রঞ্জন। কহিব না। দাহির। কহিবে না মোরে ? রঞ্জন। -না-কৰি না কভু । দাহির। শীঘ্ৰ কহ কোথায় তাহারা । রাজ-আত্মা করাে না লবন । রঞ্জন। সত্য রাজ-আজ্ঞা হলে অবনত শিরে করিতাম পাহার। কিন্তু জানি আমি নহে রাজ-আজ্ঞা ইহা। শেষাকর। দাম্ভিক-যুবক ! জান তুমি কার সনে কহিতেছ কথা? উদ্ধত যুবক !
সি-গৌরব [ দ্বিতীয় অঙ্ক রন। নাহি জানি- জানিবার নাহি প্রয়ােজন। মৰ্যাদা রক্ষার তরে প্রবলের নিপীড়ন হতে আশ্রিতের আর্তবেশে উপস্থিত আজি যে রমণী, তারে যেবা নির্বিবাদে দিতে চায় শত্রুর কবলে, হলেও সে আসমুদ্র ভারতের রাজা নহে রাজা মাের- রাজা বলে তারে আমি কভু না মানিব। দাহির। নহ অবগত তুমি জটিল সাম্রাজ্য-নীতি, তাই কহিতেছ হেন প্রলাপ বচন ; নাহি জান রাজধৰ্ম্ম কিবা। রন। কিন্তু জানি কিবা ধৰ্ম্ম মানুষের কারণ মানুষ আমি-নহি আমি রাজা। প্রস্থানােত - উদ্ধত যুবক! ইব্রাহিম। দাড়াও যুবক, রাজা পারে নির্বিচারে ছেড়ে দিতে তােমা কিন্তু আমি নাহি পারি।
প্রথম দৃশ্য।
সিন্ধু-গৌরব
করিলাম বন্দী তােমা
বীরশ্রেষ্ঠ হাজ্জাজের নামে।
( অসি নিষ্কাষণ)
রঞ্জন। সাবধান আরবের দূত !
নহি রাজা আমি
রক্ত-আঁখি দেখায় না মােরে।
এই দণ্ডে কর অসি কোষবদ্ধ তব, নহে-
অগ্রসর হইল)
দাহির। ( বাধা দিয়া ] একি কর, শান্ত হও।
উন্মাদ হয়েছ তুমি ?
রঞ্জন। সত্য হে রাজন্ ।
তুমি—তুমি মােরে করেছ উন্মাদ।
মূৰ্ত্তিমান হিন্দুধৰ্ম্ম ভাবিয়া রাজারে,
কল্পনায় দেবমূৰ্তি করিয়া অঙ্কিত
এতদিন ধৰি নিভৃতে নীরবে
একমনে করিয়াছি যার আরাধনা,
আজি তুমি চাহ চুর্ণ করিবারে
চিরারাধ্য সেই দেবমূর্তি মাের!
না-না-না-দিবনা—দিবনা তােমা
হতে হীন জগতের চোখে।
কে-কে তুমি
হিন্দুর উন্নত শিরে
সি গৌরব
[ দ্বিতীয় আৰু
ইব্রা।
করিবারে পদাঘাত আসিয়াছ আজি ?
যাও – দূর হও এই দণ্ডে সম্মুখ হইতে।
উত্তম-চলিলাম আমি ;
কিন্তু শােন হে রাজন,
অবিলম্বে অসিমুখে প্রত্যুত্তর পাইবে ইহার।
রন। তবে আর বিলম্ব কোরো না
বার্তা লয়ে যাও ত্বরা স্বদেশে ফিরিয়া ।
শীঘ্র যাও হে বীর কেশরী,
সাগ্রহে রহিল রাজা,
সাগ্রহে রহিনু মােরা-
তােমাদের উত্তর-আশায়।
এখন-চঞ্চল মােরা।
বিদায় বিদায়-
( রঞ্জনের অভিবাদন ও ইব্রাহিমের প্রস্থান।
দাহির।
কি করিলে–কি করিলে -অবােধ অজ্ঞান।
রঞ্জন। দেবতারে বাঁচায়েছি অপমান হতে
এইবার দাও মােরে মৃত্যুদণ্ড রাজা।
(দাহিরের পদতলে পড়িল)
জাহির। দণ্ড! দণ্ড তব, আজীবন রবে বন্দী
মাের স্নেহ-কারাগারে।
[ রনকে বক্ষে লইয়া এন।
৩
প্রথম দৃশ্য ]
সিগৌরব
গ্রাম্য রমণীগণের প্রবেশ
নৃত্য ও গীত
• আজ আলােকের ঝরণা ঝরে
সাঝের অলকে।
নীল পরীরা পাখনা মেলে
মনের পুলকে।
হালকা হাওয়ায় মেঘের ভেলা,
আকাশ জুড়ে করছে খেলা,
ঐ খেলারই দোলায় আজি
দুলবি বল কে?
ভাের ভেবে ঐ কমল-বনে,
পদ্ম তাকায় আড়-নয়নে
ঘর ছেড়ে সব বােড়য়ে পড়
চোখের পলকে।
[ প্রস্থান।
( ইব্রাহিম ও সৈনিকগণের প্রবেশ)
ইব্রাহিম। আমার প্রাণ যায় তাও স্বাকার—কিন্তু তবুও
এ অপমানের প্রতিশােধ না নিয়ে আমি কিছুতেই ইরাকে
ফিরে যাব না।
১ম সৈনিক। ক্রোধে জ্ঞান হারাবেন না। যা করবেন
একটু বিবেচনা করে করবেন।
ইব্রাহিম। তােমরা জান না যে কি ভীষণ অপমানিত
হয়েছি আমি। একটা সামান্য বালক—ভাবতেও আমার সব
শরীর দিয়ে যেন অগ্নিস্ফুলিঙ্গ নির্গত হচ্ছে! একটা তুচ্ছ যুবক
মহামান্য হাজ্জাজের প্রতিনিধিকে অপমান করতে দ্বিধা কলে
! তােমরা ভেবাে না ভাই-সব যে এই অপমান শুধু আমার
সিন্ধু-গৌরব
[ দ্বিতীয় অঙ্ক
অপমান-এ অপমান শূরশ্রেষ্ঠ হাজ্জাজের অপমান, ইরাকের
অপমান।
১ম সৈনিক। সত্য কথা বলেছেন, এ মহামান্য হাজ্জাঙ্কের
অপমান।
ইব্রাহিম।
কেমন করে এ কলঙ্কিত মুখ নিয়ে আরবে
ফিরে যাবােয় কেমন করে সেই বীরশ্রেষ্ঠ হাজ্জাজের সম্মুখে
দাড়াব! তিনি যখন জিজ্ঞাসা করবেন যে আমি সিন্ধু থেকে
কি উত্তর নিয়ে এসেছি, তখন আমি কেমন করে বলবাে যে
এরা আমায় অসহায় দুর্বল পেয়ে অপমান করেছে। না—
—আমি প্রতিশােধ না নিয়ে কিছুতেই ফিরে যেতে
পিরবাে না।
১ম সৈনিক। কি করতে চান ?
ইব্রাহিম। কি যে করতে চাই আমি বুঝতে পারছি না।
কিন্তু এমন একটা কিছু করবাে যাতে এরা বুঝতে পারে,
যে আমরা অপমানিত হলে অপমানের পূর্ণ প্রতিশােধ
নেই।
১ম সৈনিক। চুপ করুন।
ঐ কে যেন এদিকে
আসছে।
ইব্রাহিম। কে এ-বালিকা! এ নিশ্চয়ই রাজা দাহিরের
কন্য। ঠিক হয়েছে, এইবার আমার অপমানের প্রতিশােধ
পূর্ণ মাত্রায় নেব। সিংহলের বালিকাভুটীর পরিবর্তে এই
বালিকাকে বন্দী করে হাজ্জাজের পদতলে উপঢৌকন দিয়ে
প্রথম দৃশ্য ] সিন্ধু-গৌরব বলবাে-ভারতবর্ষ থেকে আমি শুধু অপমানিত হয়ে ফিরে আসিনি; তাদেরও উপযুক্ত শিক্ষা দিয়ে এসেছি। চলে [ ইব্রাহিম ও সৈনিকগণের প্রস্থান। [ অরুণা প্রবেশ করিয়া মন্দিরের দিকে অগ্রসর হইল- এমন সময়ে শোেকর প্রবেশ করিল ] শেষাকর। অরুণা ! অরুণা। একি! শেষাকর! তুমি কখন এসেছ ? শেষাকর। অনেকক্ষণ এসেছি। অরুণা। অনেকক্ষণ এসেছ-অথচ আমার সঙ্গে দেখা কর নাই ? তুমি নিশ্চয় জাতে আমি পিতার সাথে এখানে এসেছি। শেষাকর। বৃথা আমায় অনুযােগ কোরাে না অরুণা । গুরুতর রাজকার্যে ব্যস্ত ছিলাম তাই তোমার সাথে দেখা করতে পারিনি। অরুণা। কি এমন রাজকার্য শেষাকর--যাতে আমার কথা একেবারে ভুলে গেছ। শ্যেকর। সিন্ধুর ভাগ্যাকাশে প্রলয়ের মেঘ ঘনিয়ে এসেছে--জানি না তার কি পরিণাম। আরবের অধিপতি হাজ্জাজের সাথে যুদ্ধ অনিবাৰ্য্য-আজই তার সূচনা অরুণা। সে কি! আরব তাে বহুদূরে। হঠাৎ তার [ দ্বিতীয় অঙ্ক বুঝিয়ে বলােযাতে তিনি এই যুদ্ধের অভিপ্রায় ত্যাগ। সি-গৌরব অধিপতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘােষণার কি প্রয়ােজন হয়ে উঠেছে— আমি তাে বুঝতে পারছি না। তার কি অপরাধ ? শেষাকর। তার কোন অপরাধ নাই অরুণা, অপরাধ আমাদের। অরুণা। অপরাধ তােমাদের ? শেষাকর। হাঁ অরুণা, অপরাধ আমাদের—অপরাধ এই দেশের। জানি না কত যুগ ধরে এই সৌম্যকান্ত আৰ্যজাতি শাস্ত্রে, শিল্পে, বিজ্ঞানে এই পৃথিবীর মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ বলে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছে- অভ্রভেদী হিমাদ্রির মত শুভ্র উচ্চ শির কারাে কাছে নত করে নাই। এই তার অপরাধ। অরুণা। সে তত বিধাতার আশীর্বাদ শেষাকর! সে কি অপরাধ? শেষাকর। জগতের রীতিনীতি অত্যন্ত জটিল, তুমি তা বুঝতে পারবে না। অরুণা। অন্যের সুখে ঈ করা, অনাবিল শান্তির মধ্যে হত্যার বিভীষিকা জাগিয়ে তােলাই যদি সে রীতিনীf হয়, তবে তাতে আমার প্রয়ােজন নেই। আমি পিকে শেষকর। তুমি জাননা না অরুণা, রাজ্যের কল্যাণের জ- বলেন গৌরব রক্ষার জন্য এ যুদ্ধ অনিবার্য।
প্রথম দৃশ্য ]
সিগৌরব
আরবের দূত মহারাজের সম্মুখে অপমানিত হয়েছে—আর সেই
অপমান করেছে একজন অপরিচিত যুবক।
অরুণা। বুঝলাম তুমিও এ যুদ্ধে মত দিয়েছ। শেষাকর।
নিৰ্ম্মম ঘাতকের মত মানুষের তপ্তরক্তে পৃথিবীর বুক ভাসিয়ে
দিতে তােমার একটুও কষ্ট হবে না ?
শেষাকর। অরুণা ।
অরুণা ; সৈনিকের ব্রত যে কি কঠিন,
তা তুমি বুঝবে না। স্নেহ মায়া মমতা বন্ধন--সে বীরের জন্য
নয়। মমতার প্রতিচ্ছবি নারী তুমি—তুমি এ বুঝতে পারবে
। অরুণা ।
অরুণা। শেষাকর!
শেষাকর। এ রাজ্যের দীনতম ভিখারীর জন্যও করুণায়
তােমার আঁখি সজল
আঁখি সজল হয়ে ওঠে—শুধু আমার পানে
একটিবারও কি চাইবে না? অরুণা—তােমার স্নেহ সেকি
চিরদিন মরীচিকার মত আমায় মিথ্যা আশায় ভুলিয়ে
রাখবে ?
অরুণা। আমি তােমাকে স্নেহ করি না? যাদের
কখনাে দেখিনি--যাদের জানিনা, তাদের জন্য যদি আমি
কাদি—তবে আবাল্যের সাথী তুমি, তােমার জন্য আমার মন
কঁদবে না।
শেষকর। ওই শােন অরুণা, শ্রান্ত ক্লান্ত কৃষকের মিলনের
গানে সন্ধ্যার আকাশ ভরে গেছে। এই মিলন-সন্ধ্যায় একটিবার
বলল যে তুমি আমায় ভালবাস।
: দ্বিতীয় অল্প
সিং-গৌরব
অরুণা। তুমি কি জাননা শেষাকর—যে আমি তােমায়
ভালবাসি।
শেষাকর। সত্য-সত্য অরুণ তুমি আমায় ভালবাস?
অরুণা। বাসি।
শেষাকর। এতদিন পরে আমার আজমের স্বপ্ন সত্যই কি
সফল হবে! মহারাজ আমাকে স্নেহের চক্ষে দেখেন—আমার
ভিক্ষা তিনি কখনই প্রত্যাখ্যান করবেন না। তার কাছে নতজানু
হয়ে তােমাকে ভিক্ষা চাইব, তারপর তার অনুমতি হলে
তােমাকে বিবাহ করে-
অরুণা। বিবাহ--আমার সঙ্গে
শ্যেকর। হ। অরুণা।
অরুণা। না না শেষাকর। বিবাহের কথা বাবাকে বােল
--আমি বিবাহ করতে পারবাে না।
শেষাকর। আমি কি এতই অপদার্থ ?
অরুণা। সে কথা তাে আমি বলিনি।
শেষাকর। বুঝলাম তুমি আমাকে ঘৃণা কর।
অরুণা। "আমি তােমাকে ঘৃণা করিও কথা বলে
আমাকে কষ্ট দিও না। সত্যি শেষাকর—আমি তােমাকে
ভালবাসি। পিতা মাতা ছাড়া, তােমার মত প্রিয় এজগতে
আমার কেউ নেই। কিন্তু তবুও বিবাহের কথা আমায় বােলাে
। বিবাহের কথা শুনলেই একটা অজানা আহয়ে আমি
শিউরে উঠি।
প্রথম দৃশ্য ] সিগৌরব শেষাকর। অবােধ বালিকার মত কথা বলছ অরুণা। সমাজের বিধান তােমাকে মানতেই হবে। বিবাহ তােমাকে এক দিন করতেই হবে। তবে অকারণ কেন আমায় কষ্ট দিচ্ছ অরুণা ? অরুণা। মূহুর্তের জন্যও বিবাহের কথা আমার মনে কোনদিন হয়নি। আজ হঠাৎ তার মীমাংসা করে উঠতে পিরবাে না। শেষাকর-এইবার আমি ঠাকুরকে প্রণাম করে আসি। | অরুণা মন্দিরের ভিতর প্রবেশ করিল ] শেষাকর। অরুণা-অরুণা, আমার প্রাণের ভাষা বুঝতে পারলে না। আজন্মের পিপাসার্ত এই অন্তরে-একমাত্র তুমিই শাস্তি দিতে পারতে অরুণা—কিন্তু তুমিও নিষ্ঠুর হলে। [ শেষাকর ধীরে ধীরে প্রস্থান করিল। কিছুক্ষণ পরে ইব্রাহিম সৈন্যসহ প্রবেশ করিয়া সৈন্যদের গুপ্ত স্থান নির্দেশ করিল। অরুণা মন্দির হইতে বাহির হইবামাত্র ইব্রাহিম ও তাহার সঙ্গীগণ অরুণাকে আক্রমণ করিল ] অরুণা। কেকে তোমরা ? ইব্রাহিম। চীৎকার করতে দিওনা, মুখ বেঁধে ফেল। অরুণা। শেষাকর! রক্ষা করা কর- [ অরুণা মুচ্ছিত হইল। একজন মুসলমান অরুণাকে কোলে তুলিয়া লইল। ইব্রাহিম। রাজকন্যা মুচ্ছিত হয়েছে, আর ভয় নাই। সমুদ্রতীরে আমাদের জন্য তরণী অপেক্ষা করছে। এইবার ভীৱবেগে অশ্ব চালিয়ে সেখানে উপস্থিত হতে হবে। দায়ি ক
সিগৌরব
[ দ্বিতীয়
আর কিছুক্ষণ পরে বুঝবে আমরা অপমানিত হলে কি জানে
তার প্রতিশােধ নিই।
[ একটি সৈনিক অরুণাকে লইয়া অগ্রসর হইল। এমন সময় রঞ্জন
প্রবেশ করিয়া তাহাকে নিহত করিল। অন্যান্য সকলে রঞ্জনকে আক্রমণ
করিল। আরও দুইজন নিহত হইল। ইব্রাহিম পলায়ন করিল। রঞ্জন
অরুণাকে কোলে লইয়া ব্যাকুলভাবে চারিদিকে চাহিতে লাগিল। এমন
সময় শোেকর প্রবেশ করিল ]
শেষাকর। একি! কি হয়েছে ?
রঞ্জন। দুবৃত্তেরা একে হরণ করে নিয়ে যাচ্ছিল। মূচ্ছিত
হয়েছেন—শীঘ্র জল নিয়ে আসুন।
[ শেষাকরের দ্রুত প্রস্থান।
[ রঞ্জন স্থিরদৃষ্টিতে অরুণার মুখের দিকে চাহিয়া রহিল। তারপর
কয়েকবার উদভ্রান্তের মত কি সুন্দর, কি সুন্দর” কহিয়া যেন নিজের
অজ্ঞাতসারে অরুণাকে চুম্বন করিতে উদ্যত হইল। এমন সময় অরুণার
ও ভঙ্গ হইল; সে রঞ্জনের দিকে মুহুর্তের জন্য তাকাইয়া একটি কাতরত
নকশ কুরিয়া আবার মুচ্ছিত হইল। রঞ্জন ভূমিতলে অরুণা
শােয়াইয়া দিয়ে দ্রুত প্রস্থান করিল। কিছুক্ষণ পরে শোেকর জল লই
প্রবেশ করিয়া অৰুণাকে কোলে লইয়া চোখে-মুখে জল দিতে লাগি
ক্রমে অরুণার মুচ্ছা হইল।
কের।. অরুণা-অরুণা!
---------
শেষাকর। আৰু ভয় নেই অরুণা—তুমি স্থির হও।
অরু। এরা কারা শেকর ?
শোেকর। এরা আরবের সৈন্ত। আজকের অপমানে
তশােধ নেবার জন্যে তোমায় হরণ করতে এসেছিল।
!
প্রথম দৃশ্য ]
সিগৌরব
অসীম সাহস! কি স্পর্ধা! সিন্ধুর বুকে এসে—নারীর অপমান
-নারীর অঙ্গে হস্তক্ষেপ !
অরুণা। শেষাকর—তবে তুমি আমাকে আজ রক্ষা
করেছ?
শেষাকর। (ইতঃস্ততঃ করিয়া) আমার কি সাধ্য অরুণা
-ভগবান তােমাকে রক্ষা করেছেন।
অরুণা। আজ যদি আমায় ধরে নিয়ে যেত তাহলে কি
হ’ত ! জীবনে তােমাদের আর দেখতে পেতাম না-হয়তো-
—ভাবতেও আমার সর্বাঙ্গ কেঁপে উঠছে। কি অদ্ভুত
সাহস নিজের জীবন তুচ্ছ করে তুমি আজ আমাকে রক্ষা
করেছ ? তুমি আমাকে এত ভালবাস শেষাকর ?
শেষাকর। অরুণা—তুচ্ছ জীবন ; তােমার জন্য ইহকাল
পরকাল, স্বর্গের রাজত্ব, সব—সব আমি অনায়াসে বিসর্জন
দিতে পারি। তুমি আমার জীবনের আরাধ্যা প্রতিমা-তাকি
তুমি এখনও বুঝতে পারনি ?
অরুণা। আগে আমি কখনও ভাবতে পারিনি যে, মানুষে
এত ভালবাসতে পারে—যাতে নিজের প্রাণ পৰ্যন্ত তুচ্ছ মনে
হয়। শেকর, তুমি আমাকে জীবন দিয়েছ—আমার ধর্ম রক্ষা
করেছ; এ জীবনে আর আমার অধিকার নেই—আজ হতে
এ জীবন তােমার।
শেবার। অরুণা-অরুণা [ বক্ষে চাপিয়া ধরিল] ক্লান্ত তুমি,
চল-ঘরে ফিরে চল।
সিগৌরব
[ দ্বিতীয় অঙ্ক
[ অরুণা শেষাকরের স্কন্ধে মস্তক রাখিয়া ধীরে ধীরে অগ্রসর হইল।
এমন সময় পশ্চাৎ হইতে রঞ্জন প্রবেশ করিয়া তাহাদের সেই অবস্থায়
দেখিয়া থমকিয়া দাঁড়াইল। তাহার হাত হইতে ভল্লটি পড়িয়া গেল।
সেই শকে অরুণা ফিরিয়া রঞ্জনকে দেখিয়া চমকাইয়া উঠিল।]
অরুণা। কেকে তুমি ?
রঞ্জন। [ ম্লান হাসিয়া ] আমি এক গৃহহীন দরিদ্র যুবক
দেবী।
তৃতীয় অঙ্ক
প্রথম দৃশ্য
রাজপ্রাসাদ-সংলগ্ন উদ্যানের এক পার্শ্ব। সুমিত্রা একাকিনী গাহিতেছিল।
সুমিত্রার গীত
নিশীথ নিবিড় অতি-ঘন তিমিরে
বিজলী শিহরি ওঠে, মেঘের চিরে।
ধারা ঝরে ঝর ঝর
হিরা কঁপে থর থর,
পথ-রেখা ক্ষীণতর, আকুল নীরে।
পাগল উঠেছে মাতি গগন ঘেরি,
মেঘে মেঘে বাজে তার বিজয়-ভেরী ;
আমারাে বুকের
ফাকে,
গুরু গুরু দেয়া ডাকে
ঘরে হিয়া নাহি থাকে, লুটে বাহিরে
( উদ্যানের একটি প্রাচীর উল্লম্বন করিয়া ছদ্মবেশী রঙ্গলাল প্রবেশ
করিয়া ধীরে ধীরে পশ্চাৎ হইতে সুমিত্রাকে স্পর্শ কয়িল। সুমিত্রা চমকাইয়া
উঠিল।]
সুমিত্রা। কে ?
৪৫
সিগৌরব
[ তৃতীয় অ
রঙ্গলাল। চিনিতে পারকি মােরে ?
সুমিত্রা। চিনিয়াছি।
ভয় নাই মা, আমি সন্তান তােমার।
সুমিত্রা। কি সাহসে আসিলে এখানে।
শােন নাই তুমি
তােমারে করিতে বন্দী-
মহারাজ দিকে দিকে করেছে ঘােষণা?
রঙ্গলাল শুনিয়াছি।
সুমিত্রা। কোন মতে ধরা পড় যদি-
প্রাণরক্ষা সুকঠিন হইবে তােমার
কেন আসিয়াছ এই বিপদের মাঝে ?
রঙ্গলাল। কোনদিন হও যদি সন্তানের মা,
বুঝিতে পারিবে কেন আসিয়াছি।
তােমার নিকট কিছু নাহিক গােপন,
বি জান তুমি ।
সে সকল কথা যাক,
শােন মাতা-স্থিরচিত্তে শােন মাের কথা ;
আরবের সেনা আসিতেছে
আক্রমণ করিতে ভারত।
ধারিয়া প্রান্তরে বাধা দিতে তারে
মহারাজ করেছেন স্থির
সেই হেতু সৈন্য সমাবেশ তথা।
সিগোঁৱৰ প্রথম দৃশ্য ] কিন্তু ইহা নহে সমীচীন- বিপক্ষেরে এতদূর নির্বিবাদে অগ্রসর হােতে দেওয়া নহেক উচিত। হের এই মানচিত্র যে পথেতে অগ্রসর আরব-বাহিনী, অঙ্কিত রয়েছে হেথা। সিন্ধুনদ-উপকূলে তারকা-চিহ্নিত স্থান ঝনঝিয়া গ্রাম- তিনদিকে খরস্রোতা নদী দিয়ে ঘেরা। কহিবে রঞ্জনে- করিবারে এইস্থানে সৈন্য সমাবেশ। পরে যাহা কৰ্তব্য—সকলি বর্ণিত রয়েছে হেথা; সযতনে সাবধানে রাখ মানচিত্র, প্ৰদানিবে গােপনে অঞ্জনে। সুমিত্রা। যদি সে জিজ্ঞাসে- কে দিয়াছে মানচিত্র মােরে, কি কহিব তারে ? গৌরব রক্ষা তরে, রঙ্গলাল। কহিও তাহারে—সিন্ধুর গুঞ্জরের স্বাধীনতা রাখিতে অটুট, রাখি গেল ইহা তার
লি-গৌরব
[ তৃতীয় অঙ্ক
[ ম্লান হাসিয়া ] রাখি গেল ইহা
এক ভিখারী সন্ন্যাসী।
[ বুলালের প্রস্থান ।
[ চিত্রার প্রবেশ ]
চিত্রা। সুমিত্রা -সুমিত্রা-
সুমিত্রা। জিজ্ঞাস্য নেত্রে চাহিল ]
চিত্রা। রাজা আমাদের সিংহলে ফিরে যাবার ব্যবস্থা
করছেন। কাল প্রাতেই আমরা যাত্রা করবাে।
সুমিত্রা। তুমি যাও চিত্রা, আমি যাব না।
চিত্রা। সেকি ?
সুমিত্রা। আমার তাে কেউ নেই সেখানে, তবে কার
কাছে যাব
চিত্রা। সেকি! তােমার পিতা মাতা-
সুমিত্রা। যারা নিজের হাতে স্নেহের বন্ধন ছিন্ন করে শত্রুর
ঘতে আমায় তুলে দিয়েছে, আমাকে আমার জন্মভূমির কোল
থেকে চির-নির্বাসিত করেছে, তারা আমার কে ? কেন আমি
তাঁদের কাছে ফিরে যাব ?
চিত্রা। তবু—তবুসিংহল আমাদের স্বদেশ; স্বদেশের
প্রতি ধূলিকণাটিও যে স্বর্ণরেণুর মত পবিত্র সুমিত্রা। আর
আমার মা যে তােমার পথ চেয়ে বসে আছেন।
সুমিত্রা। চিত্রা, চিত্রা, এই দু’দিনের পরিচিত আত্মীয়দের
**
প্রথম দৃশ্য ]
সিগৌরব
ছড়ে যেতে যার প্রাণ কেঁদে ওঠে, আজন্মের মধুর স্মৃতি
দিয়ে ঘেরা সেই বাড়ী বাবা মা ভাই বােনদের চিরদিনের
মত ভুলে যেতে কি তার বুকখানা ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যায়
? সুখময় শৈশব-স্মৃতি যখন আমার মানস-চক্ষুর সম্মুখে
ভেসে ওঠে, অশ্রুর উৎস কি আমার দৃষ্টিপথ রুদ্ধ করে দেয়
? আমার অন্তর কি রুদ্ধ আবেগে স্বদেশের শান্তিময় কোলে
ছুটে যেতে চায় না ? না চিত্রা, আমি সিংহলে ফিরে যেতে
পারবে না—তুমি আমায় ফিরে যেতে বােলল না।
চিত্রা। দেশে যদি ফিরে না যাও, কোথায় থাকবে তুমি ?
অভিমান করােনা সুমিত্রা।
সুমিত্রা। অভিমান ! না চিত্রা, এ অভিমানের কথা নয়।
চিত্রা। তবে ?
সুমিত্রা। এ আমার কর্তব্যের কথা। আরবের বিরাট
বাহিনী আজ রণােন্মাদনায় ছুটে আসছে শান্তির রাজ্যে
অশান্তির আগুন জ্বালাতে; এর জন্য দায়ী কারা চিত্রা? আর
রঞ্জন—ঐ সরল উদার বীর, যে আমার কুমারী-ধৰ্ম্ম রক্ষা
করেছে, তাকে কি এই বিপদের মাঝে ফেলে দূরে সরে
যাওয়া আমার কর্তব্য।
চিত্রা। তােমার সব কথাই আমি বুঝেছি সুমিত্রা ;
কিন্তু যখন তােমার মা আমায় জিজ্ঞাসা করবেন--আমার
সুমিত্রাকে কোথায় রেখে এলি, আমি তখন কি উত্তর
5
লিগৌরব [ তৃতীয় অয় সুমিত্রা। তাকে বলল, তঁার অভাগী সুমিত্রা—মরে গেছে। চিত্রা। তােমার স্নেহের পুতলি—অম্বা যখন ছুটে এসে আমার গলাটা জড়িয়ে ধরে জিজ্ঞাসা করবে—“দিদি, আমার দিদি কোথায়? সুমিত্রা-বলে দাও-বলে দাও কী বলে তাকে সান্তনা দেব ? সুমিত্রা। চিত্রা—চিত্রা, আর আমি সইতে পারি না—সইতে পারি না। যাও যাও তুমি চলে যাও এখান থেকে। [ মর্মাহত চিত্র প্রস্থান করিল। ওগাে আমার অভিশপ্ত জীবনের শেষ সাথী। জননী-জন্ম- ভূমির কোলে ফিরে যাও ! মামাগাে তােমার স্নেহের অমৃত- ধারা থেকে আমি আজ নিজে আপনাকে বঞ্চিত করলাম। ( সুমিত্রা প্রস্তর আসনে বসিয়া আকুল হইয়া কঁদিতে লাগিল। এমন সময় নান প্রবেশ করিল) রঞ্জন। একি! সুমিত্রা, কঁদছো কেন? চিত্রা কি তােমায় বলেনি কিছু? অমিত্রা। (ঘাড় নাড়িয়া জানাইল যে বলিয়াছে ] তবে কেন কাঁদছে সুমিত্রা ? কালই তােমরা সিংহলে যাত্রা করবে, আনন্দ কর আজ। ওকি! তবু কাহহ? কেন তােমার কি আমার কথা বিশ্বাস হচ্ছে না? আজ তােমার কাছে আমার একটি অনুরােধ মন। অনুরােধ কেন অমিত্রা, আদেশ বল।
থম দৃ)
সিগোয়
সুমিত্রা। নানা রঞ্জন! আদেশ নয়, অনুৰােধ। তোমার
কাছে আমার শেষ ভিক্ষা, বল-বল রঞ্জন, এই ভিক্ষা থেকে
মামাকে বঞ্চিত করবে না ।
রঞ্জন। তুমি কি জাননা সুমিত্রা, তােমায় অদেয় আমার
কছুই নেই—
সুমিত্রা। তবে বলবল রঞ্জন, তােমার কাছ থেকে আমায়
পাঠাবে না—আমাকে তােমার পার্শ্বচারিণী করে রণক্ষেত্রে
নিয়ে যাবে !
রঞ্জন। তুমি পাগল হয়ে সুমিত্রা রণক্ষেত্রে যাবে কি ?
জান তাে রণক্ষেত্র প্রমােদ-উদ্যান নয়। সেখানে হাসিমুখে কেউ
পরিচয় জিজ্ঞাসা করে না—অস্ত্রমুখে যে যার পরিচয় দেয়।
সুমিত্রা। রঞ্জন, যুদ্ধ ক্ষেত্র কি তা আমি ভাল কোরেই
জানি। যত ভীষণ দৃশ্যই সে হােক না কেন, দেখবে আমি
হাসিমুখে তা দাড়িয়ে দেখবাে; বল আমায় নিয়ে যাবে ।
রঞ্জন। তুমি কি বলছো সুমিত্রা! উন্মাদ হয়েছ তুমি, তা
না হলে এমন কথা তােমার মনে উদয় হবে কেন? নারী তুমি,
কোমলতা বিসর্জন দিয়ে যাবে সেই আর্তনাদ-ভরা রণক্ষেত্রে
মৃত্যুর সঙ্গে যুদ্ধ করতে ? একি সম্ভব ?
সুমিত্রা। কেন সম্ভব নয় রঞ্জন, যে নারী হালি
মুখে পতি-পুত্রকে রণ-সাজে সাজিয়ে মৃত্যুমুখে পাঠাতে পারে,
তার পক্ষে একি কঠিন ৰঞ্জন ?
রন। ঠিকঠিক বটে সুমিত্রা, আমি বিস্তৃত হয়েছিলাম
সিগৌরব
[ তৃতীয় অঙ্ক
যে এই নারীই জগজ্জননী মহাকালীর অংশ-সন্ধু।
প্রয়ােজন হলে মেহের আধা-ধারা
পান করিয়ে যেমন
এরা পারে জগতকে নব-জীবন দিতে, তেমনি আবার
দুষ্কৃতদমনে তাণ্ডবের বিকট লীলায় এরাই পারে
পারে ধ্বংস
করতে।
সুমিত্রা। বল রঞ্জন, আমায় নিয়ে যাবে! জেনাে রঞ্জন,
আমার মত ক্ষুদ্র নারীর দ্বারাও তােমরা বহু উপকার পেতে
রঞ্জন। বহু উপকার। একটি নয়—দুটি নয়, একেবারে
বই!
সুমিত্রা। তুমি অমন কোরে হেসাে না রঞ্জন, যুদ্ধ তাে পরের
কথা, এখুনি আমি তােমার অনেক উপকার করতে পারি।
রঞ্জন। অনেক উপকার ? আচ্ছ। একে
একে একে বল
সুমিত্রা, তােমার কথা শােনবার জন্য অন্তর আমার অধীর হয়ে
উঠছে, আর কিছুতেই ধৈৰ্য্য মানছে না।
সুমিত্রা। ঠাট্টা হচ্ছে । আচ্ছা রঞ্জন, আরব-বাহিনী কোন্
পথে অগ্রসর হচ্ছে বলতে পার ?
রঞ্জন। নিশ্চয়।
সুমিত্রা। নিশ্চয়? বেশ, তাদের গতিরােধ করতে তােমরা
কোথায় সৈ-সমাবেশ করবে ?
অঞ্জন। এদেশে নূতন এসেছ, নাম শুনে তুমি কেমন কোরে
চিনৰে সুমিত্রা ?
২.
"
প্রথম দৃশ্য ]
সিগৌরব
সুমিত্রা। তবু বলই না শুনি।
রঞ্জন। ধারিয়া প্রান্তরে।
সুমিত্রা। কিন্তু রঞ্জন, আমার মনে হয়,
শত্রু-সৈন্য
গ্রামের কাছে সিন্ধুনদ পার হবে। যদি আমরা আগে থেকে সেই
পথে সৈন্য সমাবেশ করি, যদি রাত্রিকালে অতর্কিতে তাদের
আক্রমণ করি তবেই আমরা জয়ী হব।
রঞ্জন। [ সবিস্ময়ে ] সুমিত্রা ।
সুমিত্রা। বিশ্বাস হচ্ছে না রঞ্জন? বেশ, এই মানচিত্র
দেখ! [ মানচিত্র দেখাইল ]
রঞ্জন। মানচিত্র! কে দিয়েছে তােমাকে।
সুমিত্রা। এক সন্ন্যাসী আমায় এই মানচিত্র দিয়েছেন।
আরও তিনি বলেছেন—তার পরামর্শ-মত কাজ না করলে
আমরা কিছুতেই জয়লাভ করতে পারব না।
রঞ্জন। [ স্বগত ] সন্ন্যাসী! সন্ন্যাসী এর অভিজ্ঞতা কোথা
থেকে পাবে! তাইতাে, কে সে ছদ্মবেশী ? এ অভিজ্ঞতা,
এ দূরদৃষ্টি শুধু একজনের সম্ভবপর—তবে কি-তাইতাে
পিতা-পিতা—তবে কি তুমিই এসেছিলে ছদ্মবেশ ধরে
আমার জ্ঞান চক্ষু উন্মীলন করে দিতে। কিন্তু পিতা,
সন্ন্যাসীর ছদ্মবেশে কি ভােলাতে পারবে তুমি—তােমার
পুত্রকে তােমার শিষকে? [ প্রকাশ্যে ] সুমিত্রা, শুধু আমি
নই; আজ হতে এ রাজ্যের প্রত্যেক নরনারী তােমার কাছ
চিরশণী থাকবে।
।
9
সিগৌরব ( তৃতীয় অল্প সুমিত্রা। কবে আমরা যুদ্ধ যাত্রা করবো রঞ্জন ? রঞ্জন। যুদ্ধে যেতে তােমার খুব আগ্রহ দেখছি, কিন্তু সুমিত্রা, আগামী বাসন্তী-পূর্ণিমা পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা কোরতেই হবে। ঐদিন রাজকন্যা অরুণার পরিণয়-উৎসৰ — হাসি-আনন্দ-ভরা বাসন্তী-পূর্ণিমা-নিশিতে বীরশ্রেষ্ঠ শেষাকরের সঙ্গে রাজকন্যার বিবাহ। বিবাহের উৎসব অন্তে মরণােৎসবে মাতব আমরা --শত্রুর সঙ্গে সিন্ধুনদ-তীরে। সুমিত্রা। রাজকন্যার বিবাহ—শেষাকরের সঙ্গে। রঞ্জন। হাঁ, এতে আশ্চর্য হচ্ছে কেন সুমিত্রা ? রাজ- কন্যাতাে মুক্তকণ্ঠে স্বীকার করেছেন বিধর্মী শত্রুর হাত হতে যে-বীর তার কুমারী-ধৰ্ম্ম রক্ষা কোরেছেন তাঁকেই তিনি বরণ করে নেবেন তার জীবনের সাথীরূপে। তবে আশ্চর্য হবার এতে কি আছে সুমিত্রা ? সুমিত্রা। কিন্তু রঞ্জন, রাজকন্যা শেষাকরকে তাে ভাল বাসে না। রঞ্জন। ভালবাসে না! সত্য বলছো? না না সুমিত্রা তুমি ভুল কোরছে। আমি নিজের চোখে দেখেছি—শৈলেশ্বর- মন্দির-প্রাঙ্গনে নিজে রাজকন্যা শেষাকরের কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন। আর কেনই বা আত্মসমর্পণ করবেন না ! আৱী স্বভাবতই বীরের প্রতি আকৃষ্ট হয়। যে তার ধর্মরা কয়েছে, রাজকন্যার কি উচিৎ নয় সুমিত্রা, নির্বিচারে তাকেই পতিত্বে করণ করা।
প্রথম দৃশ্য ]
সিগৌৰ
সুমিত্রা। কিন্তু সে তো মিথ্যা কথা; শোকর তাে
তার কুমারী-ধৰ্ম্ম রক্ষা করেনি।
রঞ্জন। [ চমকাইয়া । মিথ্যা কথা। তবে—তবে কে করেছে
সুমিত্রা ?
সুমিত্রা। তুমি-রঞ্জন—তুমি।
রঞ্জন। আমি ?
সুমিত্রা। হাঁ, তুমি। সে সময় তুমিও তাে সেখানে ছিলে।
রাজকন্যা তােমাকে দেখেছিলেন সেখানে।
রঞ্জন। হাঁ, আমি ওই দেবাদিদেব মহাদেবকে প্রণাম
করতে গিয়েছিলাম।
সুমিত্রা। তুমি আমায় ভুল বােঝাতে চেষ্টা করােনা রঞ্জন,
আমি সব জানি। যে নীচ চোর, পরের গৌরব চুরি করে নিজে
বড় হতে চায়, সে কি পারে রঞ্জন, উৎপীড়কের হাত হােতে
আৰ্ত্তকে ত্রাণ করতে?
রঞ্জন। সুমিত্রা! সুমিত্রা ! তুমি আর শোেকর ছাড়া
এ কথা কেউ জানে না। সুমিত্রা, আমার অনুরােধ একথা,
আর কারাে কাছে প্রকাশ করাে না।
সুমিত্রা। কেন প্রকাশ করৰাে না রঞ্জন? তুমি कान
একথা গােপন করে তুমি অরুণার প্রতি অবিচার ক’রহ।
রঞ্জন। অবিচার। না না সুমিত্রা, পাছে কোনও
অবিচার তাঁর প্রতি কোরে ফেলি সেই ভয়ে আমি থাকতে
চাই—দূরে।
'
সি-গৌরব
[ তৃতীয়-অঙ্ক
সুমিত্রা। রঞ্জন, তুমি অরুণাকে ভালবাস? চুপ করে
বইলে কেন? উত্তর দাও-রঞ্জন।
রঞ্জন। কি ?
সুমিত্রা । তুমি
অরুণাকে
ভালবাস
; জগতকে ফাঁকি
দিতে পার, কিন্তু আমায়-আমি যে••••••
রন। স্বগত ] আমার অন্তরের বাণী ছুটে বেরিয়ে এসে
যে-কথা বলতে চায়, আমি তাে তা বলতে পারবাে না। আমি
যে নিরুপায়। আমার সত্য-পরিচয় জানতে পারলে সমস্ত
গত ঘৃণায় আমার কাছ থেকে দূরে সরে যাবে।
সুমিত্রা। কি ভাবছে রঞ্জন। দেখ, আমি তােমায় কত
চিনেছি-রাজকন্যাকে তুমি সত্যই ভালবাস।
রঞ্জন। সুমিত্রা—এসব কথা আমাকে বলা তােমার উচিৎ
নয়। আর কোনদিন বলল না।
সুমিত্রা। আমি জানি তুমি ভালবাস। রঞ্জন, তবে স্বীকার
করতে ক্ষতি কি?
রঞ্জন। [ কঠোর স্বরে] সুমিত্রা -এখান থেকে যাও-যাও
আমায় একটু একলা থাকতে দাও।
[ কিছুক্ষণ নির্বাক বিস্ময়ে চাহিয়া থাকিয়া-পরে ধীরে
ধীরে সুমিত্রার প্রস্থান ।
অঞ্জন। সেইদিন•••সেই গােধূলি সন্ধ্যায়
যৌবনের প্রথম পরশ
জাগ্রত করিয়া দিল চি সুপ্ত
नियोजन
প্রথম দৃশ্য ]
প্রাণপণ এত চেষ্টা করিতেছি আমি
তবুও পারি না কেন চিত্ত মাের
বশ করিবারে।
জাগ্রতে স্বপনে
তারি চিন্তা মােরে ঘেরি
নৃত্য করে তাণ্ডব নৰ্ত্তনে।
সেও কি—সেও কি ভালবাসে মােরে ?
না না—উম্মাদের সম কার চিন্তা
করিতেছি আমি।
তার—আর মাের মাঝে
পর্বতের মহা ব্যবধান।
অন্তর্যামী ! অন্তরের ব্যথা নেই
সবি জান তুমি;
তবে কেন চির আঁধারের মাঝে
দেখাইয়া আলেয়ার আলো
উন্মাদ করিছ মােরে ?
শক্তি দাও—দাও শক্তি
ভুলিতে তাহারে।
গাঢ় তীব্র অন্ধকারে
লুপ্ত কর মাের যত অতীতের স্মৃতি।
;
[ এখন।
লিগৌরব
[ তৃতীয় অফ
[ সখীদের সঙ্গে অরুণার প্রবেশ
রে গত
আজকে মনে দখিন্ হাওয়ার পরশ লেগেছে।
আপন-হারা ফুলকলি তাই-নয়ন মেলেছে।
ওলােচা সখি তুই মুখটি তুলে
ঘােমটা পড়ে পড়ুক খুলে
এ চপল চোখের মধুর হাসি ভুবন মেগেছে।
[ সখিগণের প্রস্থান।
(অর প্রবেশ করিয়া একমনে গান শুনিতেছিল)
অধর। আর একখানা গান গাও তাে।
অরুণা। ওরা যে সব চলে গেছে অম্বর। ওদের
ডাবাে?
অবর। না ডেকে দরকার নেই। তুমি বুঝি গান
শুনছিলে?
অরুণা। হাঁ। তুমি কখন এলে অস্বর ?
অম্বর। দূর থেকে গান শুনে বেশ ভাল লাগল তাই
এলাম ; তুমি যে এখানে আছ তা আগে জানতে পারিনি।
ও বেশ গায়, না অরুণা ?
অরুণা। হাঁবেশ গায়, তবে তােমার মত নয়।
র। 'ওদের গানের চেয়ে আমার গান তােমার
ভাল লাগে ?
এখৰ মৃত ]
সিগৌৰ
অরুণা। হাঁ, অনেক বেশী।
অম্বর। হয়তাে আগে তােমার ভাল লাগতাে, কিন্তু
এখন যে তােমার ভাল লাগে না তা আমি জানি।
অরুণা। কি কোরে জানলে ?
অথর। আগে সকাল-সন্ধ্যায় যখন-তখন আমার কাছে
আসতে। কোনাে সময় হয়তাে আমি দুঃখের সাগরে—আমার
কল্পনার ভেলাখানি ভাসিয়ে দিয়ে চুপটি করে বােসে আছি,
তুমি এসে জোর করে আমাকে দিয়ে গান গাইয়েছ। গানের
পর গান গেয়ে আমি ক্লান্ত হয়ে পড়েছি, তবু তুমি আমাকে
থামতে দাওনি। আমার উদাসীন মনের ভাষাহীন ব্যাকুলতা
আমার গানের ছন্দে ছন্দে বেজে উঠতাে। গাইতে গাইতে
আমি নিজেই কেঁদেছি, তুমিও আমার পাশে বসে কেঁদেছ।
কিন্তু শৈলেশ্বর-মন্দির থেকে ফিরে এসে এতদিনের মধ্যে
আমার কাছে ত, কই আসনি।
অরুণা। না, তা আসিনি। অম্বর, আজ এমন একটা গান
গাও যা শুনে সত্য-সত্যই আমার কান্না পায়।
অম্বর। আজ হঠাৎ এত কান্নার সখ হ’ল কেন
অরুণী ?
অরুণা। তা জানি না, কিন্তু আজ ভারী কাদতে ইচ্ছে
হচ্ছে।
অস্বর। তবে তাে দেখছি দুঃখ আমারই কেবল নিজস্ব
নয়; সংসারে দুঃখ করবার আরও লােক আছে। ভগবান
মেহের সিগৌরব তৃতীব অঙ্ক তােমায় সবই দিয়েছেন, পিতা-মাতার অগাধ অধিকারিণী তুমি। তােমার রূপ যে কেমন তা আমি দেখেনি কিন্তু লােকের কাছে শুনেছি তুমি অপূর্ব সুন্দরী। তােমার আবার দুঃখ কি ? অরুণা। আমার তাে কোন দুঃখ নেই অকার। অস্বর। আবার মিছে কথা? দুঃখ নেই? এই যে বললে তােমার কাঁদতে ইচ্ছে হচ্ছে। অরুণা। সে কথা অমনি বলেছি। অম্বর। অরুণা ! আমি তােমায় জানি। তােমার এই পরিবর্তন শৈলেশ্বর-মন্দির থেকে আরম্ভ হয়েছে। অরুণা•••লজ্জা করে না, তবে কি- অরুণা। কি ? অস্বর। তবে কি তােমার যৌবনের আরক্ত-রাগ বসন্তের নেশায় রঙ্গিন হয়ে উঠেছে। অরুণা। ছিঃ•••অস্বর । অস্বর। এতে তাে লজ্জা করবার কিছুই নেই অরুণা ! এই যৌবনের গান, এই আকুলতা, প্রত্যেক নারী-জীবনেই আসে। আজ সেই আকুলতা যদি তােমার প্রাণে এসে থাকে তবে তােমার চিরঞ্ছিতকে পাবে, আমি বলছি তুমি নিশ্চয়ই আশা। ভুলে গেছ অর? গাও-
সি-গৌরব
প্রথম দৃশ্য ]
অথরের গীত।
আঁধার-ঘেরা নয়ন আমার
চাই না আলাে চাই না আলাে।
কাজ কি আমার রূপের নেশায়
অরূপরতন বাসবাে ভালাে।
শুনেছি কোন্ কমলিনী
হাসছে তােমার সরােবরে।
তার পরশে ফুটলাে হাসি-
কোন রূপসীর বিশ্বধরে ;
দেখবাে না আর এ জীবনে
ওগাে কার ঘরে কে প্রদীপ আলো।
আরের অস্থান।
অরুণা।
কে গাে তুমি ?
স্বপন রাজ্যের মাের একচ্ছত্র রাজা,
সুদূর সাগর পারে
বাজাইয়া সুনােহন বাঁশীটি তােমার
বারে বারে উন্মাদ করিছ মােরে ?
মাের ঘুমন্ত চোখের পরে
আপনার সজল কাজল
আঁখি দুটি রাখি
কতদিন কত ছন্দে কহিয়াছ কথা,
তবে আজ কেন সব হইয়া
সিগৌরব
[ তৃতীয় আৰু
;
ধরা নাহি দাও
চির-পিপাসিত
শূন্য বাহুপাশে মাের।
(শেষাকরের প্রবেশ )
শেষাকর। অরুণা-অরুণা-
এখানে রয়েছ তুমি ?
প্রাসাদের প্রতি কক্ষে খুঁজেছি তােমারে ;
অরুণা !
এতদিন পরে
সেই শুভদিন আসিয়াছে মাের
ব্যাকুল আগ্রহে যার ছিনু প্রতীক্ষায় ;
কালি প্রাতে রাজসভা মাঝে-
আমাদের বিবাহের কথা
মহারাজ নিজে করিবে প্রচার।
বাসন্তী পূর্ণিমা নিশি
উদ্বাহের প্রশস্ত দিবস বলি
গ্রহাচাৰ্য করেছেন স্থির।
অরুণা-অরুণা-
রাণীর দুয়ারে
আনিলাম হেন সুসংবাদ
হাসিমুখে সম্বর্ধনা করিবে না মােরে ?
(সজল চোখে শেষারের দিকে চাহিয়া )
প্রথম দৃশ্য ]
সিঙ্গ-গৌরব
শেষাকর। একি, জল কেন নয়নের কোলে ?
অরুণা, অরুণা কিসে ব্যথা
পাইয়াছ তুমি,
কহিবেনা মােরে ?
অরুণা। শেষাকর, একটি মিনতি মাের
রাখিবে কি তুমি ?
শেষাকর। অমন কাতর স্বরে কহিও না কথা ।
তােমার মুখের হাসি ফিরায়ে আনিতে--
কহ কিবা করিতে হইবে মাের ?
অরুণা। আরো এক মাস পরে
এই বিবাহের কথা করিতে প্রকাশ--
অনুরােধ করিও পিতারে।
শেষাকর। কেন?
অরুণা। গুধাইও না মােরে।
কেন, আমি নিজে নাহি জানি।
শেষাকর। বুঝেছি অরুণা
তুমি নাহি ভালবাস মােরে।
তাই যদি সত্য হয় কহ অকপটে
হাসিমুখে আশীর্বাদ করিয়া তােমারে
চির জীবনের মত এই দণ্ডে লভি বিদায়।
অরুণা।
শেষাকর! আমারে বুঝাে না ভুল।
নহি আমি অকৃতজ্ঞ হেন,
সিগৌরব
[ তৃতীয় অঙ্ক
ভুলে যাব প্রাণদাতা জনে।
আজো ভুলি নাই
শৈলেশ্বর মন্দিরের ঋণ।
শ্যেকর। ঋণ-ঋণ-ঋণ, ওই এক কথা।
অরুণা -
স্নেহে বন্দী করিবারে পারি যদি কভু
জীবন সার্থক বলি’ মানিব আমার।
নহে চিরমুক্তি দিলাম তােমারে।
[ শেষারের প্রস্থান।
অরুণা। চলে গেল তীব্র অভিমানে।
প্রাণপণে এত চেষ্টা করিতেছি আমি,
এত যুদ্ধ করিতেছি হৃদয়ের সনে
তবু কেন তাকে ভালবাসিতে পারি না।
রঞ্জনে হেরিলে যেন
সর্ব দেহ মাের--
শিহরিয়া ওঠে এক অপূর্ব পুলকে।
না-না-শ্যেকর প্রাণরক্ষা
করিয়াছে মাের,
বাক্যদান করিয়াছি তারে;
মাের প্রাণে আর কারাে নাহি অধিকার।
শেকর ! কেন ভালবেসেছ আমারে-
}
প্রথম ] সিন্ধু-গোয়ব কেন তুমি প্রাণ রক্ষা করিলে আমার । কেন-কেন- (একটা প্রস্তর বেদীর উপর বিসয়া দুই হস্তে মুখ ঢাকিয়া ক্রন্দন করিতে লাগিল। অপর পার্শ্ব দিয়া রঞ্জন প্রবেশ করিল। রন। অন্ধকারে ছেয়েছে গগন ; বিশ্বনাশী প্রলয়ের প্রতীক্ষায় যেন রুদ্ধশ্বাসে ধীর স্থির রয়েছে প্রকৃতি। হৃদয়ের অন্ধকার আরও নিবিড় নিৰ্বাক্-নিস্তব্ধ। পাষাণ-দেবতা মাের, নিৰ্ম্মম কঠোর আশৈশব মনে প্রানে তােমারে করিয়া পূজা আজি মাের এই পুরস্কার। অভিশপ্ত সে মুহূর্তে বীৰ্য-দীপ্ত সমুন্নত ললাট আমার কলঙ্কের ঘন কৃষ্ণ কালিমায় বৰে হইল আবৃত, সমস্ত গ্লানির ভার লইয়া মন্তকে কেন আমি ঝাপ দিমু অনিশ্চিত অন্ধকার মাঝে। ফশ-পরিচয়হীন সমাজ-কলঙ্ক বলি আপনারে যবে চিনিলাম- সিগৌরব [ তৃতীয় অধ - জীবনের সব আশা ডুবাইয়া সাগরের অতল সলিলে কেন আমি ফিরে এ মানব সমাজে জগতের বিদ্রুপ হইয়া । দেব-ভােগ্য কুসুমের লাগি কেন তবু হতেছি উন্মাদ। জীবনে পাব না যারে- তার লাগি কেন মাের ব্যাকুল অন্তর ? [ প্রস্তৱ-বেদীর অপর পার্শ্বে উপবেশন করিল, ক্ষণকাল স্তব্ধ থাকিয়া উচ্ছ্বসিত স্বরে কহিল ] অরুণা—অরুণা । দেবী মাের— অরুণা। কে-কেগাে তুমি চির-পরিচিত কণ্ঠে ডাকিলে আমারে ? কোথা তুমি—কত দূরে? (রঞ্জনের কণ্ঠস্বর লক্ষ্য করিয়া ছুটিয়া যাইবার সময় একটি প্রস্তর- আসনে বাধা পাইয়া মাটিতে পড়িয়া গেল, যন্ত্রণায় কাতরতাব্যঞ্জক শব্দ করিল—জন বিদ্যুৎদ্বেগে ছুটিয়া গিয়া অরুণাকে ধরিয়া তুলিল। অরুণা রঞ্জনের দুইটি হাত আপনার বক্ষে টানিয়া লইয়া-স্বপ্নাবিষ্টের মত কহিতে লাগিল।) ওগাে, কি মধুর পরশ তােমার কত জন্ম ধরি এই পৰশের লাগি পিপাসিত অন্তর আমার রয়েছে উন্মুখ। এতদিন পরে তুমি এসেছ নিঠুর, থম দৃশ্য। সিগােৰ মিটাইতে মাের অন্তগোডা ও হত্যার নিবে ওগাে পাষাণ-দেবতা মাের- কথা কও, থেকো না নীরব। অরুণা- মরুণা। কে তুমি, কে তুমি? একি!-রঞ্জন ? (রঞ্জনের মুখখানি নিজের চোখের সম্মুখে টানিয়া আনিয়া ক্ষণকাল উদভ্রান্তের মত চাহিয়া থাকিয়া পরে লজ্জিত হইয়া মনকে ছাড়িয়া দিল।) রঞ্জন। রাজবালা, মনে হয়, নহ প্রকৃতিস্থা তুমি; অন্ধকারে একাকিনী রহিও না দেবী। চল গৃহে রেখে আসি- অরুণা। চল— কিছুদূর যাইয়া কহিল) দাড়াও-রঞ্জন! আচরণে মাের নিশ্চয় হয়েছ তুমি অতীব বিস্মিত। অন্ধকারে অকস্মাৎ ওই কী তব আনহারা করিল আমারে- আমি নিজে তার জানি না কারণ। ভুলে যেও মাের আচরণ। ভুলে যাব। ভাল তাই হবে। ক্লান্ত তুমি এবেগৃহে চল দেবী।
সিগৌরব
[ তৃতীয় অঙ্ক
রন।
অরুণা। ( যাইতে যাইতে সহসা ফিরিয়া জিজ্ঞাসা করিল) রঞ্জন,
উর্দ্ধে চেয়ে দেখ, অগণিত তারকার মালা
ঈশ্বরের কোটী কোটা সমুজ্জ্বল আঁখি,
ভেদ করি পৃথিবীর গাঢ় অন্ধকার
নির্নিমেষে চেয়ে আছে আমাদের পানে;
সাবধান—মিথ্যা কহিও না,
প্রথমে কোথায় আমি দেখেছি তােমারে ?
পূর্বে কহিয়াছি, আজো কহিতেছি
মূচ্ছা-ভঙ্গে আসিবার কালে
আমারে দেখেছ তুমি শৈলেশ্বর-মন্দির-প্রাঙ্গণে।
অরুণা। অসম্ভব। তাই যদি হবে,
সেই ধূসর-সন্ধ্যায় যখনি দেখিনু তােমা
কেন মাের অন্তরাত্মা
উচ্চৈঃস্বরে কহিল আমারে
চিরজীবনের চিরপরিচিত তুমি!
দেবী, কাজ আছে মাের, চলিলাম এবে।
অরুণা। ক্ষণেক অপেক্ষা কর।
রঞ্জন ! ভেবেছিনু জীবনে কব না কারে-
কিন্তু—আর সাধ্য নাই মাের করিতে গােপন।
নাহি জানি কিবা পরিণাম,
নাহি জানি কি লাভ তাহাতে,
তথাপি কহিৰ ৰি
রন।
প্রথম হয় ) निगोहर যেই ক্ষণে প্রথম দেখি তােমা নাহি জানি অমৃত কি বিষ আকণ্ঠ করেছি পান। বুঝিতে না পারি— সে মুহূৰ্ত্ত হতে নরকের জ্বালা– কিম্বা স্বর্গের আনন্দ-ধারা আচ্ছন্ন করিয়া মােরে করেছে উন্মাদ। রঞ্জন! রঞ্জন! আমি ভালবাসি তােমা! রঞ্জন। দেবী ! অনুমানি ভুলে গেছ মাের পরিচয়। ভুলে গেছ কি সম্বন্ধ তােমায় আমায়। সামান্য সৈনিক আমি, অসি মাত্র সম্বল জীবনে আর তুমি দেব-স্তুত মহারাজ দাহির-তনয়া ; তােমার আমার মাঝে পৰ্বতের মহা ব্যবধান। লােক-নিন্দা, সমাজ- অরুণা। আর হৃদয়ের ভাষা বুঝি তুচ্ছ তার কাছে। রঞ্জন। কিন্তু দেবী-অপাত্রে করেছ তুমি হৃদয় অর্পণ। অন্য এক রমণীরে ভালবাসি আমি। অরুণা। না-না-না-অসম্ভব- ;
সিগৌরব
[ তৃতীয় অঙ্ক
এ ছলনা তােমা,
মিথ্যা কহিতেছ।
নহে মিথ্যা দেবী
তুমি চেন সেই রমণীরে।
সুমিত্রা—তাহার নাম।
অরুণা। রঞ্জনরঞ্জন, কহিও না আর,
উন্মাদ করােনা মােরে
নির্দয় নিষ্ঠুর।
সুখ যদি নাহি পাই,
সুখের স্বপন ভাল।
বেঁচে রব তারি স্মৃতি লয়ে,
সে স্বপন দিও না ভাঙ্গিয়া মাের।
[ চোখে আঁচল দিয়া দ্রুত প্রস্থান।
অরুণা -অরুণা! শােননা প্রিয়তমে।
আমি ভালবাসি
আমি ভাল
নানান না শুন না তুমি।
অজ্ঞাতে আমার কী
মিথা কহিয়াছে—মিথ্যা কহিয়াছে।
(আপনার গলা টিপিয়া ধরিল).
চতুর্থ অঙ্ক
প্রথম দৃশ্য
পথ
( লছমীপ্রসাদ ও বীরভদ্রের প্রবেশ)
লছমী। ভাল বিপদেই পড়েছি এই বুড়ােটাকে নিয়ে।
তাড়াতাড়ি এসে খুড়াে, তাড়াতাড়ি এসাে-
বীরভদ্র। তুমি তাে বলছে তাড়াতাড়ি যেতে—কিন্তু
আমি বুড়াে মানুষ এই ভীড় ঠেলে কি করে আসি বলল তাে?
কি ভীড় হয়েছে বাবা–জন্মে এমন ভীড় দেখিনি।
লছমী। ভীড় হবে না—ব্যাপারটা কি! এক আধটা
নয়, দুটো দুটো যুদ্ধে পারস্যের সৈদের কচুকাটা করে
মহারাজ রাজধানীতে ফিরে আসছেন। আজ ভীড় হবে
না।
বীরভ। তবে যে শুনলুম, কোথাকার একটা হােকরা
যুদ্ধ করে শত্রুদের হটিয়ে দিয়েছে
লমী। আমিও তাই শুনেছি খুড়ে। রঞ্জন নাকি তার
নাম। কিন্তু যাই বল খুড়াে, আমার কিন্তু বিশ্বাস য় না।
বিশ বাইশ বছরের ছােয়া যুদ্ধের কি জানে?
সি-গৌরব ( চতুর্থ অঙ্ক বীরভদ্র। যা বলেছ বাবাজী-এ রাজ্যের মহারাজ থাকতে, বড় বড় সেনাপতি থাকতে কোথাকার এক পুচকে ছোঁড়া দু’বার তরােয়াল ঘুরিয়ে সব কাজ ফতে করে দিলে, একি বিশ্বাস হয়। এই যে তােমাদের খুড়ােটিকে দেখছে। বাবাজী, ছেলেবেলায়—বুঝেছ, একবার—তখন তােমাদের জন্মই হয়নি, বুঝেছ—গিয়েছিলাম একটা যুদ্ধে, বুঝেছ—তারপর সে কী যুদ্ধটাই না করেছিলাম। বুঝেছ ? বলে হয় তাে প্রত্যয় যাবে না, বুঝেছ—দুই হাতে দুইখানা তরােয়াল নিয়ে এমনি করে ঘুরুতে ঘুরুতে-বুঝেছ, যা যুদ্ধটা করেছিলাম বাবাজী, বুঝেছ, তােমরা তেমন যুদ্ধ করা কখনাে দেখনি। বুঝেছ ? লছমী। আর বিশ্বাস-অবিশ্বাসে দরকার নেই; একটু পা চালিয়ে চল দেখিনি—আগে গিয়ে ভাল জায়গায় দাড়াতে হবে, নইলে কিছুই দেখতে পাব না। বীরভদ্র। তুমি বুঝি আমার সেই যুদ্ধের কথাটা বিশ্বাসই করলে না বাবাজী ? আর-একবার আর-একটা যুদ্ধে, লছমী। তােমার পায়ে পড়ি খুড়ে, বাড়ী গিয়ে তারপর বুঝিয়ে দিও—এখন দয়া করে তাড়াতাড়ি এসাে। বীরভদ্র। তুমি বাবাজী বিশ্বাসই করলে না—আচ্ছ- আর-একদিন বুঝিয়ে দেব। এই খুড়ােটাকে বুঝি সহ লােক চাউৱে।
প্রথম দু]
गिलास
••
(ছদ্মবেশী রঙ্গলাল ও তাহার সহচর শশাভনলালের প্রবেশ)
শােভন। কহি পুনৰ্ব্বার
এখনাে ফিরিয়া চল।
ছবেশ কোন মতে হইলে প্রকাশ
প্রাণ রক্ষা হবে সুকঠিন।
রঙ্গলাল। এতদিন বহু যত্নে এ প্রাণেরে রেখেছি বাঁচায়ে
এত অল্পে যদি প্রাণ যায়,
আক্ষেপ নাহিক মাের।
শােভন। অকারণে কেন এ বিপদ মাঝে পড়িছ ঝপায়ে ।
রঙ্গলাল। অকারণে!
শুনিয়াছ বিচিত্র বারতা ;
দিগ্বিজয়ী পারস্য-বাহিনী
পরাজিত ছত্রভঙ্গ সিন্ধু-সৈন্য করে।
জান কেবা সেই দুৰ্ম্মদ সেনানী
যার পরাক্রমে এই অঘটন হ’লাে সংঘটিত ?
রঞ্জন-আমার রঞ্জন,
স্নেহের পুত্তলী রঞ্জন আমার।
এ রাজ্যের নগরে নগরে-
প্রতি গ্রামে প্রতি গৃহ হতে
কোটী কণ্ঠে উঠিছে কল্লোলি
মাের রগনের নাম।
শুনিতে শুনিতে বিরাট আনলে
?
==
সিগৌরব
( চতুর্থ অঙ্ক
বক্ষ মাের উঠিছে ফুলিয়া।
দণ্ডে দণ্ডে সর্ব দেহ মাের
রােমাঞ্চিত হইতেছে অপূর্ব পুলকে।
রঞ্জন—আমার রঞ্জন।
শােভন। আত্মহারা হয়ে না সর্দার,
ভয় হয় পাছে কেহ শােনে তব কথা।
লাল কি করিব।
দুরন্ত উল্লাস-ক্ষুদ্র মাের বক্ষ মাঝে
কতক্ষণ রাখিব চাপিয়া
সে যে মাের পুত্র, মাের শিষ্য—
মাের নয়নের নিধি।
মাের এ কঠোর বক্ষ উপাধান করি
সে যে কতদিন নিরুদ্বেগে পড়িত ঘুমায়ে।
অধরের সুমধুর হাসিটি তাহার
আমার স্নেহের স্পর্শে উঠিত উজ্জ্বল হয়ে।
সকালে সন্ধ্যায় সর্বক্ষণে
আশীষ চুম্বন মাের
দুচ্ছেদ্য বন্মেতে তারে করেছে আবৃত।
কত কষ্টে, কত যত্নে
শিক্ষা দিছি তারে।
আমিই যে একাধারে
পিতা মাতা-গুরু।
* এম
প্রথম দৃ]
সিগৌৰ
শােভন। তােমার এ স্নেহের উচ্ছ্বাসে
তুমি নিজে সর্বনাশ করিবে তাহার।
তার সনে সম্বন্ধ তােমার
কোনরূপে হইলে প্রকাশ
যশ, মান, খ্যাতি, অর্জন করেছে যাহা
হৃদয়ের উষ্ণ রক্ত ঢালি,
নিমিষে যে চূর্ণ হয়ে যাবে।
রঙ্গলাল। সত্য-সত্য কহিয়াছ তুমি
একটি কথাও আর কহিব না আমি।
শুধু নিমিষের তরে দাড়াইয়ে দূরে
বারেক দেখিব তার গর্বদীপ্ত মুখ।
তারপর মনে মনে করি আশীর্বাদ
ফিরে যাব মাের সেই নির্জন কুটীরে।
( রণরাও ও চন্দ্রসেন প্রবেশ করিল)
রণরাও। আর বাপু দেরী করা যায় না। অনেক বেলা
হয়ে গেছে। চল এইবার বাড়ী ফিরে চল।
চন্দ্রসেন। সে কি হে—এত কষ্ট করে এসে এখন বাড়ী
যাব কি? না দেখে ফিরে যাচ্ছি না।
রণরাও। কি আর দেখবে—মহারাজকে কি আর কোন
দিন দেখনি ।
চন্দ্রসেন। মহারাজকে তাে অনেকদিন দেখেছি কিন্তু
সিগৌরব চতুর্থ অঙ্ক আমাদের সেই নূতন সেনাপতিকে কোন দিন দেখিনি। রণরাও। নূতন সেনাপতির কি আর চারটা হাত বেরিয়েছে যে এই দুপুর রােদে হাঁ করে দাড়িয়ে আছ ? সেও ততা আমাদেরই মত মানুষ। চন্দ্রসেন। মানুষ, এ আমার বিশ্বাস হয় না-রক্ত-মাংসের শরীরে কি এত তেজ, এত বিক্ৰম সম্ভব? ছদ্মবেশী দেবতা আমাদের দেশের বিপদ দেখে স্বশরীরে মর্ত্যে নেমে এসেছেন। রঙ্গলাল। [ অগ্রসর হইয়া আমার রঞ্জন—আমার- (শশাভনলাল বাধা দিল, রঙ্গলাল প্রকৃতিস্থ হইল) রণরাও। যতটা শুনছি ততটা কিছুই নয়। সব গল্প- সব গল্প। চন্দ্রসেন। গল্পই হােক আর যাই হােক, তাকে একবার না দেখে কিছুতেই ফিরে যাচ্ছি না। (কেতনলালের প্রবেশ) মণরাও। কি দেখলে ভাই ? চন্দ্রসেন। আর কতদূর? কেতন। দাড়াও বাবা একটা দম ছেড়েনি—তারপর বলছি সব কথা। রণরাও। মহারাজকে দেলে? । তা আর দেখুন না-
তিনি ?
এথম দৃশ্য ].
সি-গৌরব
যুণরাও। কিসে আছেন
হাতীতে
ঘােড়াতে?
কেতন। সে আর তােমায় কি বলবাে ভাই-সে এক
বিরাট ব্যাপার। মাথা দিয়েছেন তিনি হাতীর ওপর আর
পা দুটা রেখেছেন ঘােড়র ওপর। মুখে বলছেন মার মার
কাট কাট। কি ভীষণ আওয়াজ রে বাবা-
চন্দ্রসেন। মাথা দিয়েছেন হাতীর উপর আর পা দিয়েছেন
ঘােড়ার উপর—একি কখনাে সম্ভব ?
কেতন। কি—আমাকে মিথ্যাবাদী বলা । কটা রাজরাজড়া
দেখেছ ?
চন্দ্রসেন। তােমার মত হাজার গণ্ডা না দেখলেও দু’
একটা দেখেছি। যাক সে কথা—আমাদের নূতন সেনাপতিকে
দেখলে ?
কেতন। সে আবার কে ?
চন্দ্রসেন। যিনি এ যুদ্ধে মুসলমান সৈন্যদের পরাস্ত
করেছেন।
কেতন। মহারাজই তাে যুদ্ধ করে তাদের পরান্ত
করেছেন—সেনাপতি-টেনাপতি কেউ নেই।
চন্দ্রসেন। তবে দেখছি তুমি কিছুই জাননা
কেতন। কি—আমি কিছুই জানি না। এত বড় কথা
আমাকে অপমান ?
৭৭
সিগৌরব
( চতুর্থ অঙ্ক
রঙ্গলাম। [ অগ্রসর হইয়া ] সত্য সত্যই মহাশয় আপনি
কিছুই জানেন না
কেতন। তুমি আবার
এলে
সে যেই হই। সেই নবীন সেনাপতি না থাকলে
এ যুদ্ধজয় অসম্ভব হতাে।
কেতন। অসম্ভব হতো—তুমি বলেই হ’লাে-অসম্ভব
হতাে !
কোথাকার লােক তুমি হেযুদ্ধক্ষেত্রে আমাদের
সেনাপতি শেষাকর ছিলেন, মহারাজ স্বয়ং উপস্থিত ছিলেন
আর তুমি বলছো সেই কোন একটা ভেঁপাে ছােরা না থাকলে
যুদ্ধে আমাদের জয়ই হতাে না।
রঙ্গলাল। খবরদার, তােমাদের সেনাপতি কিম্বা মহারাজের
সাধ্যও ছিল না এই যুদ্ধ জয় করা।
কেতন। কী—এত বড় কথা—আমাদের সামনে আমাদেরই
মহারাজের নিন্দা। কে তুমি হে ? (ছদ্মবেশ টানিয়া লইল)
রণরাও। চিন্তে পেরেছি—ডাকাতের সর্দার-রঙ্গলাল,
ধর ধর বাঁধাে বাধে
(রঙ্গলালকে সকলে মিলিয়া বন্দী করিল। শােভনলাল পলায়ন করিল।
সৈন্যগণের সহিত রাজা দাহিরের প্রবেশ)
রণরাও। মহারাজ! দস্যপতি রঙ্গলাল পরিয়াছে ধরা
দাহির। উত্তম সংবাদ।
দেহ মােরে সত্য পরিচয়কে তুমি?
প্রথম । बाजागाजनिसमा সিগৌৰৰ রঙ্গলাল। শুনিয়াছ নাগরিক মুখে মাের পরিচয়, পুনরায় জিজ্ঞাসার নাহি প্রয়ােজন। দাহির। তুমি সেই অত্যাচারী বর্বর তস্কর ? জন্মাবধি দুর্বলেরে করি নিপীড়ন শান্ত বক্ষ ধরণীর নর-রক্তে করেছ প্লাবিত ? নাম শুনি তব- আতঙ্কে শিহরি’ ওঠে এ রাজ্যের যত নরনারী। জান তুমি তােমার কার্যের ফলে, আরবের বিরাট বাহিনী শত্রু-রূপে উপস্থিত সিন্ধুর দুয়ারে। রণ-ধূমে সমাচ্ছন্ন গগন পবন ; স্বামীহীনা পুত্রহীনা লক্ষ-লক্ষ নারী আর্তস্বরে লুটায় ধরায়। জগতের অভিশাপ, কুগ্রহ রাজ্যের কালি প্রাতে করিয়া বিচার আদর্শ দণ্ডেতে তােমা করিব দণ্ডিত। বলাল। বিচারের কিবা প্রয়ােজন। অতি গুরু অপরাধে অপরাধী আমি,
লিগৌরব
[ চতুর্থ অঙ্ক
দাহির।
নেপথ্যে
,
রজলাল
মৃত্যু দণ্ড দাও মােরে রাজা।
এ রাজ্যের সর্বনাশ করিয়াছি আমি;
কিবা ফল বিলম্ব করিয়া,
এই দণ্ডে দাও মাের মৃত্যুদণ্ড রাজা।
স্তব্ধ হও দুরন্ত.তস্কর !
কালি প্রাতে রাজসভা মাঝে
সমবেত প্রজার সম্মুখে
দণ্ড তব করিব প্রচার।
জয় মহারাজ দাহিরের জয় ।
জয় নূতন সেনাপতির জয়।
ঐ বুঝি আসিছে রঞ্জন !
হায় হায় নিজ দোষে
সর্বনাশ করিলাম তার।
( প্রকাশ্যে ) রাজা-রাজা-রাজা-
শুনিয়াছি দয়ার সাগর তুমি।
একটি মিনতি মাের,
শেষ ভিক্ষা হ’তে মােরে করােনা বঞ্চিত।
আদেশ’ ঘাতকে-
এই দণ্ডে বধ্যভূমে লউক আমারে।
জয় মহারাজ দাহিরের জয়।
জয় নূতন সেনাপতির হয়।
যাও, নিয়ে যাও সম্মুখ হইতে।
নেপথ্যে-
লাহির।
প্রথম দৃশ্য ] সিগৌরব (রঞ্জন ও সৈন্যগণের প্রবেশ) দাহির। এস বস- নাহি জানি কোন পুণ্যফলে পাইয়াছি তােমা সম সুকৃতি সন্তানে। শুন শুন পুত্ৰাধিক প্রজাবৃন্দ মাের। এই সেই বীর যুবা, বাহুবলে যার ছিন্ন ভিন্ন আরব-বাহিনী। এই সেই বীর শ্রেষ্ঠ, আরবের কবল হইতে যেবা রক্ষিয়াছে তােমাদের ধন, প্রাণ, মান। রঞ্জন! শােন সুসংবাদ, যার লাগি ঘরে ঘরে উঠিয়াছে ঘাের হাহাকার সেই নরাধম দস্যপতি রঙ্গলাল পড়িয়াছে ধরা। বন্দী রঙ্গলাল ! কোথায় সে দস্যপতি রাজা? রঞ্জন। (রাজা দাহির রঙ্গলালকে দেখাইয়া দিল। রঞ্জন রঙ্গলালের পদতলে পড়িল) পিতা-পিতা-পিতা মাের- ১
নিগৌৰ
[ অ
রলাল। ওরেরে-
আর তাে পারি না,
এ রাজ্যের শ্রেষ্ঠ বীর আমার রঞ্জন;
দর নয়,
নিজ বাহু বলে
জগতের বুকে আজ
করিয়াছে প্রতিষ্ঠা আপন।
রঞ্জন।
পিতা-আশীর্বাদে তব
মাের চেয়ে ভাগ্যবান এ জগতে কেবা ।
পিতা-পিতা
করুণার পূত
মন্দাকিনী
ছড়াইয়া নয়নে আননে,
ডাক মােরে রঞ্জন বলিয়া।
একবার নাও বুকে তুলে
ঘােট শিশু রঞ্জনেরে যে নিবিড় স্নেহে
বক্ষে তব ধরিতে চাপিয়া।
রঙ্গলাল। ভগবান্ভগবান
এত বড় অভিশাপ কেন দিলে মােরে,
পদতলে পড়ি মাের প্রাণের দুলাল
বক্ষে তারে তুলে নিতে নাহি অধিকার।
একি।
শৃঙ্খলিত তুমি আজ আমার সম্মুখে !
পাতা মােড়া ও হস্তান্তর নিষেধ। লিগেট
রাজা-রাজা !
জীবনে কাহারাে কাছে আপনার লাগি,
কোন দিন কোন ভিক্ষা চাহি নাই আমি
প্রথম ভিক্ষায় মােরে করােনা বঞ্চিত।
•
ধরি পায়,
দাহির।
হ্যা রাজা,
মুক্ত করি দাও তুমি পিতারে আমার।
একি অসম্ভব বাণী
শুনিতেছি আমি।
পিতা তব—দস্য রঙ্গলাল ?
রন।
পিতা মাের দ্য রঙ্গলাল।
রঙ্গলাল। না না মিথ্যা কথা,
নহি-নহি আমি পি রঞ্জনের।
দাহির রঞ্জন—কার কথা সত্য ?
রন।
নহে জন্মদাতা,
তবু মাের পিতা-পিতার অধিক।
রাজা-রাজা ।
মুক্তি দাও—মুক্তি দাও—পিতারে আমার ।
রণরাও। মহারাজ!
ছিনু আমি তিনটি পুত্রের পিতা,
কিন্তু একটিও আজি নাবিক জীবিত।
এই দম্য তরে পুত্রহীন আমি।
[ চতুর্থ অঙ্ক দাহির। চসেন। মহারাজ। এ রাজ্যের মহাশক্ত এই দস্যপতি। এরি তরে সিন্ধুর প্রত্যেক গৃহে আজি হাহাকার। আমাদের সকলের নিবেদন চরণে তােমার, দেহ শাস্তি এই নরাধমে। মহারাজ-তােমার উত্তর ? সমবেত প্রজাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে নাহি পারি মুক্তি দিতে পিতারে তােমার। বিশেষত সিন্ধু উপকূলে করেছে সে আরবের তরণী লুণ্ঠন। যার ফলে অগণিত প্রিয় প্রজা মাের রণক্ষেত্রে করিয়াছে প্রাণ বিসর্জন। রন। চাহি কোন মতে পারন কি কমিতে পিতারে ? । তবে লহ ফিরাইয়া দেব তব তরবারি ; লহ ফিরাইয়া উষ্ণীষ তােমার- নিহস্তে তুমি যাহা করেছিলে দান। { উষ্ণীষ ও তরবারি দাহিরের পদতলে ফেলিয়া দিল। মাের মুখ দাহির।
প্রথম দৃ]
শােন হে রাজন্ ।
শােন শােন সমবেত জন-সাধারণ!
যেই অপরাধে অপরাধী করিয়া পিতারে
প্রাণদণ্ড দিতে আজি উদ্যত তােমরা
সেই অপরাধে অপরাধী নহে মাের পিতা।
আমি নিজে সিন্ধুনদ-তীরে
করেছি লুণ্ঠন সেই আরব তরণী।
সৈন্য পুরভাগে তীক্ষ্ণধার তরবারি হাতে
সেনাপতি রূপে নহে মাের সত্য পরিচয় ;
মাের পরিচয় তর পিতার পুত্র
লুণ্ঠনের প্রধান নায়ক।
রঙ্গলাল। রাজা-রাজা-
অবােধ বালক,
জানিত না মাের সত্য পরিচয়।
সেই রাত্রে দস্যু বলি চিনিয়া আমারে
ঘৃণায় আমারে ছাড়ি এসেছে চলিয়া।
শুভ্র কুসুমের সম
নিষ্কলঙ্ক পবিত্র হৃদয়-
ওর প্রতি হয় না নির্দয় ।
কন। জ্ঞানে বা অজানে
আমি অপরাধী।
আমারে না বধ করি,
(সুর্থ কারাে সাধ্য নাই শাস্তি দিতে পিতারে আমার। হান এই তরবারি বক্ষেতে আমার, তারপর যা ইচ্ছা করাে তুমি পিতারে লইয়া। রজলাল। অপরাধী আমি রাজা। শান্তি দাও মােরে, পুত্র নহে কোন দোষে দোষী। চন্দ্রসেন। মহারাজ! এই বীর যুবা তরে- সব ক্রোধ শান্ত হইয়াছে; কর ক্ষমা দস্যু রঙ্গলালে। দাহির। ওঠ বৎস- তব মুখ চাহি, মিলাম পিতারে তােমার। [ রান ছুটিয়া গিয়া রঙ্গলালকে জড়াইয়া ধরিল ] রন। পিতা-পিতা। বল এইবার কভু তুমি যাইবে না আমারে ছাড়িয়া। রজলাল। ওরে-প্রাণ হাড়ি দেহ কি রহিতে পারে? ( ফেলি ধরিল।
দ্বিতীয় বৃত]
निकोबार
রাজপথ।
সৈন্যদের গীত
আজি শােনিতের ধারে ভিজায়ে ধরণী
আনিয়াছি জয় গৌরব।
শক্ত দলিয়া ফিরিয়াছি ঘরে
কর সবে আজি উৎসব।
শত্রু গর্ব খর্ব করিয়া
পতাকা তাদের এনেছি কাড়িয়া
মাতলি মনের তালে তালে নাচে
আজি ধ্বংসের তাণ্ডব ।
শত শত বী, ক্ষীপ্ত সমরে
জীবন করেছে দান,
জীবন দিয়াছে সেই তাে তাদের
সুমহান সম্মান,
তুচ্ছ মরণ তাহারে কি ভয়
মৃত্যুই দেয় অক্ষয় জয়
জয়ের মাল্যে বাড়িয়াছে যার
কণ্ঠের সৌষ্ঠব ।
৮
সি-গৌরব
[ চতুর্থ অঙ্ক
তৃতীয় দৃশ্য
রঞ্জনের কক্ষ।
সুমিত্রার গীত
মন যে বােঝে না হয়, একি হলাে দায়,
যতই বুঝাই তারে বুঝিতে না চায়।
যারে চাহে বুকে জুড়ে, সে রহে তফাতে দুরে,
তবুও সে পড়ে ধরা তাহারই মায়ায় ॥
(রঞ্জনের প্রবেশ)
রন। সুমিত্রা-পিতা কোথা?
সুমিত্রা। নাহি জানি আমি।
রঞ্জন, কাজ নাই এই কাল-রণে।
গত যুদ্ধে দেখিয়াছি-
প্রাণে প্রাণে বুঝিয়াছি
যুদ্ধক্ষেত্ৰ কিবা ।
সঙ্কল্প করেছি স্থির
ধরা দিব আমি,
হােক এই যুদ্ধ অবসান।
রুন। অবােধ বালিকা-
তুমি ধরা দিলে হইবে না যুদ্ধ অবসান।
এই যুদ্ধ নহে ব্যক্তিগত।
=
তৃতীয় দৃশ্য। निकायोग्य এক মহা জাতির বিরুদ্ধে আর একটি জাতির অভিযান, ভবিষ্যৎ ইতিহাসে যুগান্তর আনিবে নিশ্চয়। যদি যুদ্ধে জয়ী হই মােরা হিন্দুর পবিত্র ধর্ম এসিয়ার সুদূর প্রান্তেও হইবে ধ্বনিত। কিন্তু যদি হয় পরাজয় তবে স্থির জেনাে, এই মুশ্লিম ধৰ্ম্ম, অদূর ভবিষ্যে ভারতের সর্বস্থানে আপন গরিমা তার করিবে প্রচার। সুমিত্রাকোন গ্লানি রাখিও না অন্তরে তােমার। এই যুদ্ধ অনিবার্য তুমি উপলক্ষ মাত্র। সুমিত্রা। রম- আশঙ্কায় মাের প্রাণ বার বার উঠিছে শিহরি; কেন মনে হইতেছে মাের- এই কালরণে তােমারে হারাব আমি। . রন। ধরি পায়- এ যুদ্ধে যেওনা তুমি।
[ চতুর্থ অঙ্ক ; সুমিত্রা কোথা ব্যথা মাের সবি জান তুমি; বিশাল এ জগতের মাঝে আপন বলিতে কেহ নাই- কিছু নাই মাের। সমাজের বুকে বসি ভিক্ষুকও সগর্বে পারে দিতে তার বংশ-পরিচয় কিন্তু আমি পরিচয়হীন, ঘৃণ্য সমাজের। অমিত্রা। রঞ্জন! যুদ্ধক্ষেত্র আমার সমাজ অসির ফলকে মাের পিতৃ-পরিচয়। একমাত্র যুদ্ধ সত্য- আর সব মিথ্যা মাের কাছে। সুমিত্রা। রুন! জানি তুমি স্নেহ কর মােরে ; প্রতিষ্ঠার পথে মাের হয়াে না কণ্টক। অমিত্রা। বেশ—তবে তাই হােক। আজি হতে হৃদয়েরে করিব পাণ; হাসিমুখে সকলি সহিব।
সিগৌরব রঞ্জন- ভাল করে ভেবে তুমি দেখিও একাকী, মিছে তুমি ঘুরিতেছ মিথ্যার পিছনে। [ প্রস্থান। রন। মিথ্যা—মিথ্যা মিথ্যা এ জগতে সব মিথ্যা। মিথ্যা আমি—মিথ্যা ঐ রাজার উষ্ণীষ, মিথ্যা ঐ রাজ-সিংহাসন, মিথ্যা ঐ রাজার সম্মান হিংস্র শার্পলের সম সমগ্র মানব ক্ষুধিত ব্যাকুল নেত্রে যার পানে রয়েছে চাহিয়া। মিথ্যা শিক্ষা, মিথ্যা দীক্ষা, মিথ্যা যত বাসনা কামনা যার লাগি অবিরাম যুদ্ধ করি ভ্রান্ত নর আপনারে করিছে বিক্ষত। কোথা সত্য—কিব।সত্য, কে বলিবে মােরে। (রঙ্গলালের প্রবেশ) বলাল। রন! পিতা।
সিগৌরব [ চতুর্থ অঙ্ক অঙ্ক। রঙ্গলাল। বিষয় কি হেতু পুত্র ? কি হয়েছে? রঞ্জন। কিছু তাে হয়নি পি। আশীর্বাদে তব যশ, মান, খ্যাতি, অর্থ- যার তরে মানব ভিক্ষুক, সব আজি আয়ত্তে আমার। কিন্তু পিতা- পার কি ফিরায়ে নিতে সব শিক্ষা তব ? পার কি নিভাতে সেই উচ্চাশার তীব্র বহ্নি শিখা সযতনে শিশুকাল হতে স্বহস্তে জ্বেলেছ যাহা রঞ্জনের বুকে ? পার কি করিতে মােরে অবােধ অজ্ঞান, পারিবে কি নিয়ে যেতে মােরে সেই দূর নির্জন কাননে সমাজের বিষাক্ত বিশ্বাস যেথা পারে না পশিতে ? রঙ্গলাল। পুত্র—কেন এই ভাবান্তর আজি? কেন-কেন নিজ পরিচয় দিতে অক্ষম যে জন, কি যে ব্যথা তার- সি-গৌরব তৃতীয় দৃশ্য ] একমাত্র সে-ই জানে। কোন মতে পারিতাম যদি জানিবারে পিতার সন্ধান, হলেও সে এ রাজ্যের দীনতম প্রজা, ভিক্ষালব্ধ অম্নে তার জীবন যাপন, তবু শির উচ্চ করি দাড়াইতে পারিতাম মানব-সমাজে। সর্বষের বিনিময়ে পারি না কি জানিবারে পিতৃ-পরিচয় ? রঙ্গলাল। স্থির হও, আজি তােমা কহিব সে কথা। #ন। পিতা- রঙ্গলাল। শােন বস- বহুদিন ভাবিয়াছি শােনাব তােমারে অভিশপ্ত জীবনের ইতিহাস মাের, কিন্তু এক দুর্নিবার দুর্বলতা আসি করিয়াছে কণ্ঠরােধ। সাক্ষাৎ মৃত্যুরে পারি বরণ করিতে কিন্তু ঘৃণা তাের সহিতে পারি না। রঞ্জন। সেকি পিতা- আমি ঘৃণা করিব তােমারে ? রঙ্গলাল। শােন পুত্র- : শােন মাের অতীতের কথা। - সিগৌৰ [ চতুর্থ অল্প তখন যুবক আমি, হৃদয়ে অদম্য শক্তি প্রাণে মাের সীমাহীন আশা। শক্তিপুর রাজ্য মাঝে নগরের উপকণ্ঠে ক্ষুদ্র মাের গৃহখানি। অধিষ্ঠাত্রী দেবী তার প্রিয়া মাের প্রেমের প্রতিমা, ক্রোড়ে তার শিশুপুত্র নয়ন-আনন্দ শঙ্কর তাহার নাম। স্বগের সকল সুষমা পড়েছিল ঝরি সেই সুখনীড় পরে ; কিন্তু অত সুখ সহিল না ভাগ্যে অভাগার। ধন-গর্বে গব্বী এক বিলাসী বণিক মিথ্যা এক অপরাধে অভিযুক্ত করিল আমারে শক্তিপুর বাজার নিকটে। শক্তিপুর রাজা কারাদণ্ড দিল মােরে পঞ্চ বর্ষ তরে। আছাড়িয়া পড়ি ভূতলে, কাতরে কহিনু কত- অভাবে আমার, পত্নীপুত্র অনাহারে ত্যজিবে জীবন। ১৪ তৃতীয় ) সিগৌরব : কোন কথা না শুনিল কানে বিন্দুমাত্র দয়া তার নাহি উপজিল- গেনু কারাগারে। রন। তারপর—তারপর পিতা ? রঙ্গলাল। দীর্ঘ পঞ্চ বর্ষ পরে- লভিলাম মুক্তির আলোেক। রুদ্ধশ্বাসে ছুটিলাম গৃহ পানে মাের। দেখিলাম শূন্য গৃহখানি আছে পড়ি পরিত্যক্ত শ্মশানের সম। শঙ্কর-শঙ্কর বলি- চীৎকার করিনু কত, কেহ তার দিল না উত্তর। শুধু তার প্রতিনি মর্মভেদী হাহাকারে বাতাসে মিশায়ে গেল। দুই হস্তে দীর্ণ বক্ষ চাপি- ভূমিতলে পড়ি লুটায়ে। রঞ্জন। কি হ’ল তাদের, কোথা গেল তারা? রঙ্গলাল। অনাহারে পলে পলে চির শান্তি লভিয়াছে মরণের কোলে। রন। তারপর-তারপর পিজ।
;
সিগৌরব
[ চতুর্থ অঙ্ক
রঙ্গলাল। চাহিমু বিহ্বল নেত্রে দূর আকাশের পানে,
দেখিনু সেথায়
অগ্নির অক্ষরে যেন রহিয়াছে লেখা-
‘লই প্রতিশােধ
ফিরাইসু দৃষ্টি নিজ হৃদয়-কদরে,
সেথায়গা দেখিনু প্রলয়ের ঘনঘাের
অন্ধকার ভেদি সুস্পষ্ট উঠিছে ফুটি,
অই এক কথা—‘লহ প্রতিশােধ।
সেই ক্ষণ হতে
প্রতিহিংসা হ’ল মাের জীবনের ব্রত।
হিতাহিত জ্ঞানশূন্য আমি
দস্যুদল করি গঠন।
অবিলম্বে মিলিল সুযােগ।
একদিন সন্ধ্যাকালে শক্তিপুর
সীমান্ত প্রদেশে
পাইমু রাজারে,
সঙ্গে রাণী আর দুই বছরের শিশু
একমাত্র বংশধর তার।
সঙ্গীগণ সহ ভীম বেগে আক্রমণ
করিলাম তারে।
প্রচণ্ড আঘাতে রক্ষি যারা ছিল
আসি গেল স্রোতে তৃণ সম,
তৃতীয় দৃশ্য ]
সিন্ধু-গৌরব
কবলিত কণ্ঠ তার লৌহ-হস্তে মাের।
রক্ষা তরে স্বামীর জীবন,
পত্নী তার পদতলে পড়িল লুটায়ে।
অকস্মাৎ উঠিল ফুটিয়া নয়নের পথে মাের
নারীমূৰ্ত্তি এক
রােগে শােকে অনাহারে শীর্ণ দেহখানি,
শঙ্করের মাতা বলি চিনিনু তখনি।
তীক্ষ্ণ ধার ছুরি রমণীর বক্ষ-রক্তে
হইল রঞ্জিত।
তারপর খণ্ড খণ্ড করি
সেই ক্ষত্রিয় অধমে
উষ্ণ রক্তে করিলাম হিংসার তর্পণ
রন।
উঃ কি ভীষণ !
রঙ্গলাল। সহসা হেরিনু চাহি পদতলে মাের
আছে পড়ি ক্ষুদ্র সেই শিশু,
আকাশে বাড়ায়ে তার ক্ষুদ্র বাহু দুটি
কঁদিতেছে মা’র কোল লাগি।
পুনঃ ছুরি উর্ধেতে উঠিল—
কিন্তু কি আশ্চৰ্য্য।
মুখপানে চাহিতে তাহার
ঠিক যেন মনে হ’ল শঙ্কর আমার।
ছুঁড়ে ফেলে দিনু ছুরি
-
লি-গৌরব চতুর্থ- আমি ? দু’হাত বাড়ায়ে, আকুল আগ্রহে তারে নিনু বক্ষে তুলি। রন। পিতা—কোথা সেই ভাগ্যহীন শিশু ? রঙ্গলাল। রঞ্জন—তুমি- তুমি সেই ভাগ্যহীন শিশু। রন। রঙ্গলাল। হ্যা তুমি। হও দৃঢ়-হয়াে না উদ্বেল। ক্ষত্রিয় সন্তান তুমি, ক্ষত্র রক্ত প্রবাহিত শিরায় ; রঞ্জনরঞ্জন পিতৃ-হত্যাকারী মাতৃহত্যাকারী তব দাড়ায়ে সম্মুখে। লৌহ-করে ধর এই শাণিত ছুরিকা, লােল বক্ষ দিনু পাতি সম্মুখে তােমার, নৃশংস হত্যার লহ পূর্ণ প্রতিশােধ, উত্তপ্ত শােণিতে কর আত্মার তর্পণ। [ রঞ্জন উত্তেজিত অবস্থায় ছুরিকা লইল-তারপর হঠাৎ ছুরিখানি দূরে নিক্ষেপ কৰিল ) পিতা-পিতা। লালকে জড়াইয়া ধরিল ; রঙ্গলাল সন্ধেহে রঞ্জনকে আশীর্বাদ করিল।
অরুণা।
দাহির।
অরুণা।
দাহির।
অরুণা।
পঞ্চম অঙ্ক
প্রথম দৃশ্য
প্রাসাদ-অলিন্দ।
দাহির ও অরুণা।
এখনি চলে যাবে পিতা ?
হা মা, এখনই যেতে হবে।
বাবা-
কি মা !
কাল রাত্রে দেখিয়াছি এক স্বপন ভীষণ,
তাই যুদ্ধে যেতে দিতে শিহরি উঠিছে প্রাণ ;
আমার মিনতি রাখ—এ যুদ্ধে যেওনা তুমি।
এ যে অসম্ভব মাগাে।
আমি রাজা—এ রাজ্যের কর্ণধার,
পিতা প্রজাদের।
আমার আদেশে তারা-
জনে জনে প্রাণ দেবে সমর অনলে,
আর আমি রাজা হয়ে
নিশ্চিন্তে বসিয়া রব অন্তপুর মাঝে।
তবে আমাকেও সঙ্গে নিয়ে চল।
-না-সন্তব অনুরােধ করিও না মা।
দাহির।
অরুণা।
দাহির।
সিং-গৌরব [পম-অৰু অরুণা। দাহির। সুকোমল প্রাণ তব- পারিবেনা দেখিবারে সে দৃশ্য ভীষণ। বাবা—আমি জানি প্রাণ তব কত যে করুণ। সামান্য পশুরে তুমি কোনদিন করনি আঘাত। তুমি যদি নিজ হস্তে মানুষের বুকে হানিবারে পার তরবারি বহাইতে পার যদি শােণিত প্রবাহ উচ্ছসিত তটিনীর মত, তবে ক্ষত্রিয় রমণী আমি রাজার দুহিতা আমি কি পারি না সে দৃশ্য দেখিতে শুধু দাঁড়াইয়া দূরে। চিরশান্ত স্নেহময়ী জননী আমার বৃথা অনুরােধ করিও না মােরে। (রুদ্ধ কণ্ঠে.) বাবা! কি আছে অদৃষ্টে একমাত্র জানে বিশ্বনাথ। সাধ ছিল— শোেকর সনে তােমার বিবাহ দিয়া নিশ্চিন্ত হইব আমি। শােন মা অরুণা, যদি দৈব বিড়ম্বনে কভু আর নাহি ফিরি সমর হইতে অরুণা। দাহির।
প্রথম দৃ]
সিগৌরব
শেষকরে ভুলিও না কভু।
ধীর স্থির বীৰ্য্যবান উদার সরল ;
তাহার আদেশ ছাড়া কোন দিন করিও না কিছু।
ভুলিও না কভু
শেষাকর প্রাণ রক্ষা করিয়াছে তব,
নারীধৰ্ম্ম রক্ষিয়াছে শৈলেশ্বর মন্দির প্রাঙ্গনে।
তারে ছাড়া অন্য কারে আত্মদান করিও না তুমি।
সৈন্যগণ প্রস্তুত হইয়া অপেক্ষা করিছে ওই
আর যে মা বিলম্ব করিতে নারি ;
থেকো সাবধানে।
(দাহিরের প্রস্থান)
অরুণা। তােমার আদেশ—তােমার আদেশ
পি! হােক না সে যতই কঠোর
তবু—তবু আমি পালিব নিশ্চয়।
কে সে রঞ্জনকে সে আমার ।
রাজার নন্দিনী আমি-
আমি কেন ভালবাসিব তাহারে ?
সে তাে নিজে কহিয়াছে ভালবাসে সুমিত্রারে ;
তবে আমি কেন করজোড়ে প্রেম ভিক্ষা করিব তাহার।
বংশ পরিচয় হীন উদ্ধত দুর্মুখ ;
ঘৃণা করি—ঘৃণা করি-
অন্তরের সাথে আমি ঘৃণা করি তারে।
সিগৌরব
[ পঞ্চম অঙ্ক
অরুণা।
রন।
কোন অপরাধে অপরাধী নহে শেষাকর;
সুন্দর উদার আবাল্যের সহচর মাের—
প্রাণ দিয়া ভালবাসে মােরে।
কেন—কেন ভালবাসিব না তারে ।
পিতার আদেশ
আজি হতে সেই মাের আরাধ্য দেবতা।
(রঞ্জনের প্রবেশ )
দেবী ! আসিয়াছি আমি।
আছে কিছু প্রয়ােজন আমার নিকট ?
এতদিন পরে
জানিয়াছি মাের পিতৃ পরিচয়,
এতদিনে জানিয়াছি কোন জাতি-
কোন বংশে জনম আমার ;
তাই মাের জীবন প্রভাতে
সব কাজ ফেলি—
তােমার দুয়ারে দেবী আসিয়াছি ছুটি।
শােন শােন দেবী
কত্র বংশে জনম আমার
শক্তিপুর রাজার নন্দন আমি।
সত্য ?
সরাইয়া নৈশ অন্ধকার,
উষা অন্তে প্রাচীমূলে তরুন তপন
অরুণা।
রুন।
প্রথম দৃশ্য ]
অরুণা।
রঞ্জন।
সিগৌৰ
অস্ফূট আলেঞ্জসম ফুটে ওঠে যবে,
প্রকৃতির উপাসক তখন যেমন
নিনীমেষে চেয়ে থাকে আপনা হারায়ে,
সেই মত হে প্রিয়া আমার
এতদিন ধরি নীরব পূজারী সম
এক মনে এক ধ্যানে চেয়েছি তােমারে।
মিথ্যা কথা।
তুমি নিজে কহিয়াছ—সুমিত্রারে ভালবাস তুমি।
মিথ্যা কথা দেবী—মিথ্যা কথা,
সুমিত্রারে কল্পনাতে কোনদিন বাসি নাই ভাল।
এতদিন জানিতাম
পরিচয় হীন সমাজ কলঙ্ক আমি।
তাই তােমার মঙ্গল তরে,
সেই সন্ধ্যাকালে মিথ্যা কয়েছি।
এ জগতে তুমি ছাড়া অন্য কোন রমণীরে
প্রেম চক্ষে দেখি নাই কভু।
তুমি শুধু একবার দেহ অনুমতি
মহারাজ পাশে ভিক্ষা মাগি লইব তােমারে।
অসম্ভব।
নহে অসম্ভব দেবী।
মহারাজ স্নেহ করে মাের,
ভিক্ষা মম হবে না নিস্ফল।
ক
রন।
সিন্ধু-গৌরব
( পঞ্চম অৰু
অরুণা।
রঞ্জন।
অরুণা।
রন।
বৃথা চেষ্টা করনা রঞ্জন।
আছে কোন মহা অন্তরায়।
অন্তরায় !
দেবী তুমি শুধু একবার কহ ভালবাস মােরে-
তারপর দেখিব সে কিবা অন্তরায়।
কোন বাধা পারিবেনা বােধিতে আমারে।
বৃথা চেষ্টা তব,
( অতি কষ্টে আত্ম-সম্বরণ করিয়া)
রঞ্জন—তােমারে চাইনা আমি।
আমারে চাওনা তুমি!
সেই দিন সন্ধ্যাকালে
তুমি নিজে কয়েছিলে মােরে—
অবােধ বালিকা আমি
তাই পারি নাই বুঝিবারে আপনার মন।
রুমা-ক্ষমা কর মােরে ;
মিনতি আমার
কোন দিন আসিও না সম্মুখে আমার।
রঞ্জনরঞ্জন—আমি ভাল নাহি বাসি—
কোন দিন পারিব না ভালবাসিতে তােমারে।
নিষ্ঠুর রমণী—সত্য যদি তাই হয়,
কেন তবে সেইদিন সন্ধ্যাকালে
মাের সনে কনেই হন?
অরুণা।
প্রথম দৃশ্য।
সিগৌরব ,
কেন তবে ব্যথিত ব্যাকুল ব্যাগ্র আঁখি হ’তে তব
ঝরেছিল অনাবিল প্রেমের ঝরণা !
কেন তুমি না চাহিতে এসেছিলে মন্দিরে আমার
গােপন চরণ পাতি অজ্ঞাতে নীরবে
পুরুষের প্রাণ বুঝি পাষানেতে গড়া,
পুরুষের বুকে বুঝি বাজে নাকো ব্যথা
ঠিক তােমাদেরি মত?
তাই তার প্রাণ লয়ে খেলা কর তুমি?
রঞ্জন-রঞ্জন
অরুণা।
চলে যাও–যাও চলে
রওন।
এখানে থেকোনা আর।
বােঝ নাকি কত কষ্ট হইতেছে মাের।
যখনি শুনিনু আমি পিতৃ পরিচয়,
আঁখির সম্মুখে মাের উঠিল ফুটিয়া
স্বচ্ছতােয়া কল্লোলিনী তটিনীর পারে
লতা-কুঞ্জে ঘেরা ছােট কুটীর আমার;
স্নিগ্ধাজ্জ্বল শারদের রূপালী জোছনা
দিকে দিকে আপনারে দিয়াছে বিছায়ে,
চারিদিকে ফুটিয়াছে চামেলী কেতকী,
আর তার মাঝে তুমি মাের আজম্মের প্রিয়া
মর্তের মাঝারে স্বর্গ করেই রচনা।
একি সব-সব মিথ্যা কথা।
লিগৌরব [ পঞ্চম অঙ্ক অরুণা। নিষ্ঠুর পুরুষ রন। বােঝ নাকি রমণীর মরমের ভাষা । বােঝ নাকি—বােঝ নাকি -না যাও—চলে তুমি যাও। হ্যা যাইতেছি- যুদ্ধে চলিলাম দেবী। বুঝিতেছি আসিয়াছে মহা আহ্বান আমার এ জীবনে তব সনে কভু আর হইবে না দেখা। কিন্তু একটী মিনতি মাের ভুলিও না দেবী, যখনি শুনিবে মাের মরণের কথা (অরুণার অস্ফুট ক্রন্দন ) ওকি কঁদিতেছ ? তুমিও ফেলিছ অশ্রু আমার লাগিয়া ? অরুণা-অরুণা- ওই উচ্ছ্বসিত আঁখিধারা তব- মরণের পরে হতভাগ্য জীবনের একমাত্র সান্ত্বনা আমার। (প্রস্থান) অরুণা। ওগাে প্রি-ওগো প্রিয়তম ব্যর্থ করি নাই শুধু জীবন তােমার আজি হতে ব্যর্থ হলাে মারো জীবন ;
= ক + ---
' - - - - -
!
প্রথম দৃশ্য।
সিন্ধু-গৌরব
তুমি তাে জানােনা প্রিয়
এ নহে উপেক্ষা মাের।
( দূরে অশ্বপদ ধ্বনি)
ওই ওই যুদ্ধে চলে গেল,
জীবনে হয়তাে দেখা হবে নাকো আর।
হে প্রিয় আমার—হে মাের দেবতা-
অন্তরের কথা মাের বােঝ নাকি তুমি
বাহিরের ভাষা আজি তাই সত্য হলাে।
( শেষারের প্রবেশ )
শেষাকর। একি কাঁদিতেছ !
কিছু দিন ধরি লক্ষ্য করিয়াছি
নহ সুখী তুমি;
হৃদয়ের মাঝে এক দ্বন্দ্ব অবিরাম
প্রতি পলে বিক্ষত করিছে তােমা।
ওই বিষন্ন মুখের দিকে চাহিয়া চাহিয়া
আমারাে যে দুই চোখ জলে ভরে আসে।
বিশ্বাস করহ আমি হিতাকাঙক্ষী
চির বন্ধু আমি;
সত্য করি কহ মাের কেন এ লােদন ?
সত্য যদি বন্ধু তুমি মাের
হান ওই তরবারি বক্ষেতে আমার
কৃতজ্ঞতা ঋণ হতে মুক্তি দাও মােরে।
;
সিন্ধু-গৌরব
[ পঞ্চম অঙ্ক
৩০
শেষাকর। এতদিনে বুঝিলাম কিবা তব ব্যথার কারণ :
তুমি নাহি ভালবাস মােরে,
শুধু কৃতজ্ঞতা লাগি
চেয়েছিলে বিবাহ করিতে।
অরুণা-অরুণা-
কঠোর সৈনিক আমি, শাস্ত্র-ধৰ্ম্ম কিছু নাহি জানি ;
কিন্তু তবু-তবু তােমার সুখের তরে
আপনার
সুখ হাসি মুখে
দিব বিসর্জন।
শৈলেশ্বর মন্দির সম্মুখে
বিধর্মী কবল হতে রক্ষিয়াছি তােমা
হেন কথা কভু কহিনি তােমারে ;
নহি আমি-
অন্য একজন সেইদিন রক্ষেছিল তােমা।
অরুণা। নহ তুমি ।
শীঘ্ৰ কহ কেব। সেইজন ?
শ্যেকর। রঞ্জন।
অরণা।
রঞ্জন!
শোেকর
আমি নিজে মৃত্যুবান হানিয়াছি বৃক্ষেতে তাহার
ফেরাও-ফেরাও তারে।
(মুচ্ছিত হইয়া পড়িয় গেল।
দ্বিতীয় দৃশ্য )
সিন্ধু-গৌরব
দ্বিতীয় দৃশ্য
যুদ্ধস্থলবনের একাংশ
রঞ্জন একাকী
রঞ্জন।
অই অই - সৈন্যগণ করে মহারণ
মহারাজ প্রাণপনে নিবারিতে নারে
অই বীরশ্রেষ্ঠ শোেকর
যুঝিতেছে প্রবল বিক্রমে।
রক্ষাতরে ভারতের মান
একে একে প্রাণ দিছে সবে,
আর আমি রয়েছি দাঁড়ায়ে
নির্জন বনের প্রান্তে পুত্তলিকা সম!
সত্যই কি আমি সেই আগের রঞ্জন
কিম্বা কঙ্কাল তাহার !
এত চেষ্টা করিতেছি—
তবু দৃঢ় করে অসি আর পারিনা ধরিতে,
ঈশ্বর-ঈশ্বর—
কেন তুমি শক্তিহীন করিলে আমারে।
[ একটা মুসলমান সৈন্য প্রবেশ করিয়া দূর হইতে রঞ্জনকে লক্ষ্য
করিয়া বা নিক্ষেপ করিল। সুমিত্রা রঞ্জন সাবধান” বলিয়া চীৎকার
করিয়া তাহাদের মাঝখানে আসিয়া দাড়াইল। বর্ষা সুমিত্রার বক্ষ বিদ্ধ
কৰিল, রঞ্জন বিদ্যুৎবেগে ছুটিয়া গিয়া সেই সৈন্যটিকে হত্যা করিল ]।
সিগৌরব [ পঞ্চম অঞ্চ রন। সুমিত্রা! রঞ্জন। সুমিত্রা—সুমিত্রা রঞ্জন: সুমিত্রা— কেন তুমি বাঁচাইলে মােরে, কেন মাের তুচ্ছ প্রাণ তরে- স্বইচ্ছায় মরণেরে করিলে বরণ ? কেন ? পরলােকে যদি দেখা হয় তখন কহিব, নহে ইহলােকে। সুমিত্রা। রন। সুমিত্রা। (মৃত্যু) আরাে কাছে নিয়ে এস মুখখানি তব বল অন্তিম বাসনা মাের করিবে পূরণ। বলবল- আমার মৃত্যুর পর শীতল অধরে মাের ৩-রঞ্জনরঞ্জন- সুমিত্রা—সুমিত্রা—সব শেষ। অভাগিনী তুমি চলে গেলে কিন্তু চিরজীবনের মত অপরাধী করে গেলে মােরে। স্বর্গের দুয়ারে দেবী—ড়াও ক্ষণেক লহ মাের নয়নের তপ্ত আঁখি ধারা, লহ মাের হৃদয়ের পূর্ণ কৃতজ্ঞতা।
দ্বিতীয় দৃ] সিগৌরব (বেগে রঙ্গলালের প্রবেশ ) রঙ্গলাল। রন-রঞ্জন এ কে ? সুমিত্রা ! রক্ষিতে আমারে- গুপ্ত ঘাতকের অস্ত্রে হয়েছে নিহত। রঙ্গলাল। অভাগিনী। রঞ্জন-শোেকর নিহত সমরে- ছত্রভঙ্গ দক্ষিন বাহিনী। (নেপথ্যে জয়ধ্বনি আল্লা হাে আকবর) ওই শােন- বিপক্ষের জয়ধ্বনি ওঠে ঘন ঘন নায়ক বিহীন অসহায় ক্ষত্রসেনা করে পলায়ন মহারাজ প্রাণপণে নিবারিতে নারে। রঞ্জন। পিতা যাও শীঘ্র- রক্ষা কর মহারাজে। রঙ্গলাল। বৃদ্ধ আমি আমা হতে সেই কাৰ্য্য হইলে সম্ভব ত্যাজি রণ নাহি আসিতাম ছুটী তােমার সকাশে। কি দারুণ অবসাদে দেহ মন আছন্ন আমার, রন।
সিগৌরব [ পঞ্চম অঙ্ক বার বার চেষ্টা করিয়াছি কিন্তু দৃঢ় করে অসি আর পারি না ধরিতে। রঙ্গলাল। ছিঃ ছিঃ ছিঃ এতদূর অধােগতি হয়েছে তােমার মনুষ্যত্ব হারায়েছ তুচ্ছ নারী তরে। দক্ষিণের ভার সমর্পন করিয়া তােমারে নিশ্চিন্ত রয়েছে রাজা। আর তুমি লজ্জাহীন- নিশ্চেষ্ট বসিয়া আছ নির্জন কাননে । ছিন্ন ভিন্ন দক্ষিণ বাহিনী শৈথিল্যে তােমার কি দারুণ পরাজয় ভারতের আজ। ( জনৈক সৈনিকের প্রবেশ) কি সংবাদ । সৈনিক। ঘটিয়াছে সর্বনাশ মহারাজ নিহত সমরে ছত্রভঙ্গ সেনাদল। লাল। ভয় নাই—যাও। (সৈনিকের প্রস্থান) ; রঞ্জন মনরঞ্জন এখনাে সময় আছে; নিকের এই অবসাদ
দ্বিতীয় দৃশ্য ]
সিন্ধু-গৌরব
নি।
দূর করে দাও,
মুছে ফেল অশ্রুজল
ভেঙ্গে ফেল মােহের শৃঙ্খল,
উন্মুক্ত কৃপাণ করে
ক্ষুধিত শার্দল সম
উল্কা বেগে শত্রুবুকে পড় ঝাঁপাইয়া।
রক্ষা কর ক্ষত্রিয় গৌরব
রক্ষা কর ভারতের মান্ড।
সত্য—সত্য কথা কহিয়াছ পিতা
ক্ষত্রিয় কলঙ্ক আমি।
দুর্বলতা হৃদয় কম্পন
যাও দূর হয়ে যাও হৃদয় হইতে।
( তরবারী কুড়াইয়া লইল)
বিশ্বনাশী মহাকাল তাণ্ডব নৰ্ত্তনে
তাথৈ তাথৈ থৈ নাচিবে সমরে,
এস পিতা-সাক্ষী রবে তার।
(প্রস্থান)
তৃতীয় দৃশ্য
দাহিরের রাজধানী আলােয়ারের সম্মুখে অবস্থিত আরব শিবির।
আরব সেনাপতি মহম্মদ বীন কাশিম উপবিষ্ট।
নর্তকীরা নৃত্যগীত করিতেছিল।
নর্তকীদের গীত
ভরপুর পেয়ালা মশগুল মন গাে
ঘুঙ ঘুরে রুনু ঝুনু গান ঝরে শােন্ গাে
দ্রুত চরণ-ঘায়,ছল সে চমকায়,
সারা দেহে মুরছায় তরঙ্গ-ভঙ্গ।
সাকি তাের আঁখি তলে হরিণের দৃষ্টি,
দুটি চোখে চেয়ে কর স্বরগের সৃষ্টি,
সুচপল নৃত্যে আয় নেবে চিত্তে,
নব তনু ফিরে পাক, দগ্ধ অনঙ্গ।
[ নর্তকীদের প্রস্থান
(ইব্রাহিমের প্রবেশ
কাশিম। কি সংবাদ ইব্রাহিম ?
ইব্রাহিম। সঠিক সংবাদ কিছুই পাওয়া যাচ্ছে না।
কাশিম। ( চিন্তিত ভাবে) । এক মাসের উপর দূর্গ অবরােধ
করে বসে আছি, কিন্তু সহস্র চেষ্টা করে দুর্গের কাছেও
এগুতে পারছিনা। দাহির, সেনাপতি শেষাকর দুজনেই যুদ্ধে
প্রাণ দিয়েছে; ভেবেছিলাম রাজধানী অধিকার করতে একটুও
১১৪ "
তৃতীয় দৃশ্য ]
সি-গৌরব
বিলম্ব হবে না। কিন্তু -হা হিন্দু সৈন্যরা কার নেতৃত্বে যুদ্ধ
করছে সংবাদ পেয়েছ ?
ইব্রাহিম। পেয়েছি সেনাপতি—তার নাম রঙ্গলাল।
কাশিম। রঙ্গলাল ? কই নাম শুনেছি বলে তাে মনে
হচ্ছে না। কে সে?
» ইব্রাহিম। তার সত্য পরিচয় কেউ জানে না। কিছুদিন
পূর্বেও দস্যুবৃত্তি তার উপজীবিকা ছিল। সিন্ধু উপকূলে সেই-ই
আমাদের বাণিজ্য তরণী লুণ্ঠন করেছিল—তারই ফলে
ভারতবর্ষে আজ আরবের বিজয় অভিযান শুরু হয়েছে।
কাশিম। তাহলে দেখছি আমরা তার কাছে কৃতজ্ঞ।
ইব্রাহিম। কৃতজ্ঞ ।
কাশিম। নিশ্চয়। সেই মহাপুরুষ দয়া করে আমাদের
তরী লুণ্ঠন না করলে—ভারতবর্ষের সঙ্গে পরিচিত হবার
সৌভাগ্য এত শীঘ্র আমাদের হতােনা।
ইব্রাহিম। হা—এ কথা সত্য।
কাশিম। মহাপুরুষটীর হঠাৎ বৈরাগ্যের কারণ কি?
হঠাৎ তিনি তার স্বাধীন ব্যবসা ছেড়ে দিয়ে রাজধানীতে এলেন
কেন আর হিন্দু সৈন্যদের ভাগ্য-বিধাতা হয়ে বসলেন কি
ইব্রাহিম। আমি কিছু কিছু সংবাদ সংগ্রহ করেছি। সব
ঘটনাটাই যেন কেমন একটা রহস্যের অন্ধকারে ঢাকা। এদের
সেই নূতন সেনাপতি রঞ্জনের কথা মনে আছে?
সিন্ধু-গৌরব [ পঞ্চম অঞ্চ Z, কাশিম। মনে নেই! সেদিনকার যুদ্ধে শেষাকর আর রাজা দাহিরের মৃত্যুর পর হিন্দু সৈন্যরা যখন ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়লাে—ভাবলাম জয় মুষ্ঠিগত। অকস্মাৎ সেই পলায়নপর হিন্দু সেনাদল কি এক দৈব প্রেরণায় উদ্দীপিত হয়ে অমিত- তেজে ফিরে দাঁড়াল। চেয়ে দেখি একটা তেজস্বী অশ্বের উপর এক অপূর্ব যুবক। সুদীর্ঘ গঠন—উন্নত ললাট—চোখে তার অগ্নির দৃষ্টি-কণ্ঠে তার বজ্রের হুঙ্কার। আর কিছুক্ষণ যুদ্ধ চললে আমাদের পরাজয় অনিবার্য ছিল। কিন্তু মেহেরবান খােদার কৃপায় যুবক দূর হতে নিক্ষিপ্ত এক বর্শায় আহত হয়ে অশ্ব থেকে পড়ে গেল। আমি ঠিক দেখেছি, কে একজন তার সেই পতনােমুখ দেহটীকে দৃঢ় হস্তে ধরে ফেললাে। ইব্রাহিম। মনে হয় সেই-ই রঙ্গলাল। কাশিম। রঞ্জনের সঙ্গে তার কি সম্বন্ধ ? ইব্রাহিম। রঙ্গলাল পিতৃ-মাতৃহীন রঞ্জনকে বাল্যকাল থেকে পুত্রের মত পালন করে। রঞ্জন জানতো রঙ্গলালই তার পিতা কিছুদিন আগে সে জানতে পারে যে রঙ্গলাল তার পিতা নয়, আর হীন দস্যুবৃত্তি তার উপজীবিকা। ঘৃণায় তখন সে রঙ্গলালকে ছেড়ে চলে আসে। তারপর নিজের শৌর্যে সিন্ধুর সেনাপতি হয়। মেহান্ধ রঙ্গলাল দস্যুবৃত্তি ছেড়ে দিয়ে রঞ্জনের কাছে ফিরে আসে। কাশিম। তােমার কাহিনীটি চমৎকার ইব্রাহিম। বিশ্বাস না হলেও বিশ্বাস করতে ইচ্ছা হয়।
তৃতীয় দৃশ্য )
সিগৌরব
ইব্রাহিম। আর কতদিন নিশ্চেষ্ট হয়ে বসে থাকবে?
কাশিম। তুমি তাে জান ইব্রাহিম, বার বার আক্রমণ করে
শুধু পরাজয়ের সংখ্যাই বাড়িয়েছি।
ইব্রাহিম। কিন্তু এই প্রতীক্ষায় ওদের শক্তি বাড়ছে।
কাশিম। কিন্তু আমি জানি—শক্তি ওদের কমছে।
ইব্রাহিম। কমছে !
কাশিম। হ্যা। আমি সংবাদ পেয়েছি, দুর্গে রসদের অভাব
হয়েছে।
ইব্রাহিম। কিন্তু শুনেছি হিন্দুরা নাকি বেলপাতা খেয়ে
একমাস থাকতে পারে।
কাশিম। (চিন্তিত ভাবে) দুর্গের ভেতর সে গাছ আছে
নাকি ?
ইব্রাহিম।
ওদের ধৰ্ম্ম উপবাসের ধৰ্ম্ম, অনাহারে ওরা
মরবে না।
কাশিম। (হাসিয়া) বল কি ইব্রাহিম। আমি বলছি ওরা
মরবে। ওদের রসদ যােগাবে কে ? আমরা আরও কিছুদিন
দুর্গ অবরােধ করে বসে থাকবাে।
ইব্রাহিম। ভারতে সিন্ধু ছাড়া অনেক হিন্দুরাজ্য আছে।
তারা যদি এদের উদ্ধারের জন্য আমাদের আক্রমণ করে ?
কাশিম।
যদি আক্রমণ করে। আমি বলছি বাইরে
থেকে কেউ আমাদের আক্রমণ করবে না। হিন্দুর বিপদে যদি
হিন্দুর প্রাণ কেঁদে উঠতাে তাহলে এদের জয় করা তাে দূরের
সিন্ধু-গৌরব [ পঞ্চম অঙ্ক কথা, হিন্দুস্থানের মাটীও কোনদিন আমরা স্পর্শ করতে পারতাম । যুদ্ধের কথা কাল হবে ইব্রাহিম। এখন ফুর্তি কর, নাচ-গাও- [ নর্তকীরা প্রবেশ করিয়া নৃত্যগীত আরম্ভ করিল ] নর্তকীদের গীত দুঃখ সুখের ভাবনা কিরে, ভর পিয়ালা সরাব পিলাও। সাগরে আজ বান ডেকেছে ঘাটে কেন নৌকা ভিড়াও। পায়ে মিঠে বাজছে নুপুর, ঝরছে গানে রঙ্গীন সুর, দেউলে হলো দুনিয়া আজি পিছন পানে মিছেই তাকাও। । চতুর্থ দৃশ্য দুর্গের একাংশ দূরে সামান্য কোলাহল। অরুণা একটি উচ্চ স্থানে দাঁড়াইয়া কি যেন লক্ষ্য করিতেছিল। আহত বন ব্যক্ত ভাবে প্রবেশ করিল। মন। অরুণা ! অরুণা। (তাড়াতাড়ি নামিয়া আসিল) একি তুমি। বাইরে
চতুর্থ দৃশ্য ]
সিগৌৰ
রন। ও কিসের কোলাহল অরুণা ।
অরুণা। (রঞ্জনকে একটা আসনের উপর বসাইয়া) ঠিক বুঝতে
পারছি না—কাশিম বােধ হয় আবার দুর্গ আক্রমণ করেছে।
রঞ্জন। পিতা কোথায় ?
অরুণা। জানি না। কেন তুমি ব্যস্ত হচ্ছ? ওদের এ
আক্রমণ নূতন নয়।
বারবার তারা এসেছে আর আমাদের
হাতে লাঞ্ছিত হয়ে ফিরে গিয়েছে।
রঞ্জন। তুমি বুঝতে পারছনা অরুণা। প্রায় এক মাস
ধরে দুর্গে রসদের অভাব। সৈন্যরা অনাহারে দুর্বল হয়ে
পড়েছে, তাদের মনে আশা নেই-বুকে ভরসা নেই; কেমন
করে তারা যুদ্ধ করবে ?
অরুণা। স্থির হও বঞ্ছন—কেন তুমি বৃথা উত্তেজিত
হচ্ছ ?
রঞ্জন। বৃথা—বৃথা—সবই বৃথা। একবার আমাকে
বাহিরে নিয়ে যেতে পার অরুণা—সৈন্যদের সামনে—যেখানে তারা
যুদ্ধ করছে। আমি এমন করে ঘরের কোণে লুকিয়ে থাকতে
পারি না; লুকিয়ে থেকে কুকুরের মৃত্যু বরণ করে নিতে পারবাে
। আমি যুদ্ধ করবে।
অরুণা। এখনও যে তুমি সুস্থ হয়ে উঠনি-কেমন করে
বাইরে যাবে? চল ঘরে চল।
রঞ্জন। বলতে পার অরুণা বিশ্বাসঘাতকের শাস্তি কি ?
অরুণা। তুমি তাে বিশ্বাসঘাতক নও।
সিন্ধু-গৌরব
[ পঞ্চম অঙ্ক
রঞ্জন। তুমি জাননা—জাননা অরুণা আমি কি সর্বনাশ
করেছি, শুধু সিন্ধুর নয়—সমস্ত ভারতের। (দুরে কোলাহল)
ওই আবার।
(রঞ্জন উঠিবার চেষ্টা করিল অৰুণা বাধা দিল )
অরুণা। তােমাকে এখান থেকে যেতে দেব না। কথা
শুনলে ঘরের ভিতর দরজা বন্ধ করে রেখে দেব।
রঞ্জন। বাইরে কি হচ্ছে না জানতে পারলে আমি যে
স্থির হতে পারছি না।
অরুণা। কথা দাও তুমি এখান থেকে কোথাও যাবে
—আমি সংবাদ নিয়ে আসছি।
রঞ্জন। কোথাও যাব না। তুমি এখনি সংবাদ নিয়ে এস।
( অরুণার প্রস্থান)
রঞ্জন। বিশ্বাসের অপমান করিয়াছি আমি।
কেন রণে নাহি মরিলাম,
কেন পিতা বাঁচাইল মােরে ।
বিবেকের কশাঘাত সহ নাহি হয়—
মৃত্যু শ্ৰেয় এ যন্ত্রনা হতে।
(ধীরে ধীরে শয়ন করিল, আবার বসিল)
থাকি ভাল যতক্ষণ রয়েছি জাগিয়া,
আঁখি মুদিলেই দেখি স্বপ্ন বিভীষিকা।
দেখি যেন শত শত রক্তাক্ত কবন্ধ,
শত শত অগ্নিবর্ষি কুদ্ধ রক্ত আঁখি-
; চতুর্থ দৃশ্য । সিন্ধু-গৌরব মহাতীব্র অভিশাপ কণ্ঠে তাহাদের । প্রায়শ্চিত্ত সুকঠোর প্রায়শ্চিত্ত করিতে হইবে; কোনমতে পারি নাকি যাইতে সমরে। ( উঠিয়া দাঁড়াইল) অসম্ভব ; সর্ব অঙ্গে কি যন্ত্রনা পারি না দাড়াতে আর । ( ধীরে ধীরে শয়ন করিবার পর তাহার তন্দ্রা আসিল, কিছুক্ষণ পরে চীৎকার করিয়া উঠিল) কে কে তুমি জননী ? ভী এস্তা রােদন বিহ্বলা সর্ব অঙ্গে ঝরিতেছে রক্ত ভাগীরথি— আর্তস্বরে ডাকিছ আমারে ? তুমি কি গাে রাজলক্ষী মহা ভারতের ? ভয় নাই—ভয় নাই মাতা সন্তান জীবিত তব কার সাধ্য করে অপমান- ( দ্রুত বাহিরে যাইবার চেষ্টা করিল কিন্তু যন্ত্রণায় চীৎকার করিয়া ভূমিতলে পড়িয়া গেল।) রঙ্গলাল। (নেপথ্যে) রঞ্জনরঞ্জন রঞ্জন। ( আত্মসন্মরণ করিয়া উঠিয়া দাঁড়াইল) পিতা- পিঙ্গ
সিগৌরব
[ পঞ্চম অঙ্ক
''
( রঙ্গলালের প্রবেশ)
রঙ্গলাল। রঞ্জন—দুর্গ রক্ষা অসম্ভব।
রঞ্জন। অসম্ভব।
রঙ্গলাল। হ্যা
অসম্ভব। আজ আমরা নিজেদের
কারাগারে নিজেরাই বন্দী। কেন তা তুমি জান ?
( রঞ্জন মস্তক অবনত করিল) যুদ্ধে জয় পরাজয় আছে—দুঃখ
সে জন্য নয় ; দুঃখ এই জন্য যে এক বৃহৎ কল্পনাকে তুমি
ব্যর্থ করে দিয়েছ রঞ্জন। এর চেয়ে আমার মৃত্যু ভাল ছিল।
রঞ্জন। পিতা।
রঙ্গলাল। হ্যা—মৃত্যু ভাল ছিল। ভাল ছিল আমার
সেই দস্যুবৃত্তি ক্ষুদ্র যার সীমা, বৃহৎ কল্পনা নাই—মহতী সাধনা
নাই, তুমি দস্যপুত্র—আমি দস্যুপতি।
(রঞ্জন রঙ্গলালের পায়ের উপর পড়িল)
রঙ্গলাল। আমার সিন্ধুকে দেখেছি তােমারই মুখে।
রণক্ষেত্রে তােমার সেই প্রশান্ত হাস্যোজ্জ্বল মুখে আমি আমার
কল্পনার সিন্ধুকে দেখেছি রঞ্জন। তােমার জয়গানে যখন আমার
বুক ছ, তখন মনে হয়েছে এ হলাে না—এ হলো
—আমার রঞ্জন কি এতটুকু।
(নেপথ্যে তুৰ্য্যধ্বনি ও কোলাহল)
রঙ্গলাল। কোন রকমে যদি পূর্ব শক্তি ফিরে পেতাম।
বাকা—এই বার্ধক্যই জীবনের অভিশাপ।
আর উপায়
সিগৌয়ক
চতুর্থ দৃশ্য ]
নাই—চারিদিকে আগুন
ধরিয়ে দাও—আগুন ধরিয়ে
;
[ দ্রুত প্রস্থান ]
(অন্ধকার—চতুর্দিকে ভিতরে বাহিরে কোলাহল ; সেই অন্ধকারেই
আক্রমনের ভীষণতা ফুটিয়া উঠিল। কিছুক্ষণ পরে দেখা গেল, প্রাচীরের
একাংশ ভাঙ্গিয়া গিয়াছে— দূরে অগ্নিকুণ্ড দাউ দাউ জলিতেছে। ভিতরে
অসংখ্য রমনীর কোলাহল। অরুণা প্রাচীরের উপর আসিয়া দাঁড়াইল।)
অরুণা। রঞ্জন !
রঞ্জন। অরুণা !
অরুণা। কাশিম দুর্গ অধিকার করেছে। আর কোনও
উপায় নেই।
অনশন ক্লিষ্ট সিন্ধুর নরনারী নিরুপায় হয়ে
নিজেদের মর্যাদা রক্ষা করতে ঐ জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডে জীবন আহুতি
দিচ্ছে।
রঞ্জন। আজ আর একা নয় অরুণা, চল আজ ঐ অগ্নি-
বাসরে আমাদের মিলন হােক ।
অরুণ। রঞ্জন!
রঞ্জন।
চল।
যাও, শীব্র
(ইব্রাহিম ও সৈন্যগণের প্রবেশ )
ইব্রাহিম। ঐ রাজকন্যা—ঐ রঞ্জন।
পশ্চাদ্ধাবন কর।
রঞ্জন। অগ্নিগর্ভে অন্বেষণ করে শত্রু।
ইব্রাহিম। যাও, শীঘ্র বন্দী কর।
১২৩
সিগৌরব [ পঞ্চম আৰু অরুণা। বৃথা চেষ্ট। তুমি পারবে না-পারবে না ইব্রাহিম। সিন্ধু জয় করেছ বটে, কিন্তু আমাদের জয় করতে পারনি শয়তান। ঐ জ্বলন্ত চিতায় আরােহন করে আজ ন- আমরা হিন্দু নারীর মর্যাদা-সিন্ধুর গৌরব রক্ষা করব। [ রঞ্জন ও অরুণা অগ্নিকুণ্ডে ঝাপ দিল") + ক = * * * * * * (কাশিমের প্রবেশ) কাশিম। তাই কর মা, তাই কর। তােমার সাধের সিন্ধু আরবের শক্তি সংঘাতে বিধ্বস্ত, কিন্তু তার গৌরব আজ তােমরা যে মূল্যে অক্ষুন্ন রাখলে, তা ইতিহাসের পৃষ্ঠায় ঐ লেলিহান অগ্নি- শিখার মতই জ্বলন্ত অক্ষরে লেখা থাকবে। ভারতে সর্ব প্রথম মুসলমান আমি তােমাদের ঐ যজ্ঞাগ্নির সম্মুখে শ্রদ্ধায় মস্তক অবনত করছি। (কাশিম শ্রদ্ধায় মস্তক অবনত করিল) * 's t৪৪ * * মক
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.