Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Jeneva-bhraman
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
জেনেভাদ্রমণ
শ্রীদেবপ্রসাদ সৰ্বাধিকারী,
মূল্য বাৰু আনা
প্রকাশক-শ্ৰীনিখিলচন্দ্ৰ সৰ্বাধিকারী
২০ নুরী লেন, কলিকাতা
আশ্বিন, ১৩৪ •
ঞ্জিটার-কৃষ্ণপ্রসাদ ঘোেষ
প্রকাশ, প্রেস
৬১ বহুবাজার স্ত্রী,
কলিকাতা।
. দেবপ্রসাদ সৰ্বাধিকারী
No text on this page.
জেনেভা-ভ্রমণ বর্ষে পথে শুক্রবার, ১৫ই আগষ্ট ১৯৩০ আবার রেলে-জাহাজে চলিতে চলিতে যথাসাধ্য ভ্রমণকথা লিখি- বার পালা। ছেলে মেয়ে, নাতি, নাত্নী সবার অনিচ্ছায় এই দুঃসাধ্য কৰ্ম্ম চেষ্টা! হাতে, চোখে বল নাই, মনে শরীরে বল নাই, তথাপি তৃতীয়বার বিলাত-যাত্রার চেষ্টা যে করিতে পারিতেছে, সে সময়মত দু'এক ছত্র লিখিতে পারিবে না এ কথা শুনিবে কে? যাহারা এই কথা পড়িতে চান তাহাদেরই জন্য এই চেষ্টা। যেদিন বাঙ্গালার গবর্ণর সার হিউ ষ্টিফেনসন বড়লাট লর্ড আরউইনের পক্ষ হইতে জেনিভায় “লিগ অব নেসনসে” যাইবার জন্য আহ্বান ও নিমন্ত্রণ করিলেন সেই দিন হইতে গৃহে কি নিৰ্বেদ উপস্থিত হইয়াছে! কত বাধা-বিঘ্ন অতিক্রম করিতে হইয়াছে, কতই বুঝিতে ও বুঝাইতে হইয়াছে, কত করিতে ও করাইতে হইয়াছে তাহা যে জানে ও দেখিয়াছে সেই বুঝিবে। অপরকে বুঝাইবার প্রয়ােজন কোথা ? প্রতিবারই হয় এই ব্যাপার। তিনবার বিলাত * ২ জেনেভা-ভ্রমণ ও এককার দক্ষিণ আফ্রিকা যাওয়ায় এই সকল বাধা অতিক্রম করিতে হইয়াছে। অতএব নূতন কিছুই নহে, তবে এবার পুত্র নিখিল চন্দ্র সঙ্গে যাইতেছে না। শরীর ও মন ভগ্ন এবং বাড়ীসুদ্ধ সকলের অসুখ এইজন্য বাধা এইবার কিছু গুরুতর ; কিন্তু ইচ্ছাশক্তিতে তাহা অতিক্রম হইয়াছে। নিজের শরীরও কয়েক মাস অবধি বিশেষ ভাল ছিল না, উপস্থিত অনেকটা ভাল। কর্তব্যের আহ্বান বলিয়া যাহা মনে করিয়া আসিতেছি ও মনে করি তাহা প্রত্যাখ্যান করিতে পারিলাম না। অনিচ্ছাসত্ত্বেও যাহারা শেষে মত করিয়া শক্তি ও উৎসাহ দিয়া এই গুরুতর কাৰ্য্যের বিশেষ সহায় করিয়াছে তাহাদিগকে আশীর্বাদ করিয়া ও শ্রীভগবানের চরণে মঙ্গল প্রার্থনা করিয়া বিলাতী মেলে রাত্রি দশটার সময় হাওড়া ষ্টেশন ছাড়িয়াছি। বিদায় ও আয়ােজনের পালা কয়দিন ধরিয়া চলিতেছিল। গতকল্য তাহ চরম মাত্রায় উপনীত হইল, শতজনের সহিত আলাপ-আপ্যায়ন, শতাধিক রকমের কাৰ্যের মধ্য দিয়া যাত্রার সময় উপস্থিত হইল। সাশ্রনয়নে সকলে বিদায় দিল । বাড়ীতে ও ষ্টেশনে কতলােক আসিয়াছিল তাহার ঠিক নাই। অনেককে আসিতে নিষেধ করিয়াছিলাম। অনেকে সে কথা শুনিয়া- ছিলেন, আবার অনেকে শুনেনও নাই। পথেও মালা তােড়ার অভাব হয় নাই। এখনও এত লােকের দয়া ও স্নেহ প্রাপ্তির সৌভাগ্য হইয়াছে ইহাই যধেষ্ট। সমস্ত দিন কত রকমের কতলােক শুভ ইচ্ছা জানাইয়া গেলেন তাহা বলিতে পারি না। নিজের সাংসারিক ব্যবস্থা পরিবারবর্গের সহিত ধীরে সুস্থে দেখাশুনা ও কথাবার্তা এবং পথের আয়ােজন, শেষ করিয়া একটু বিশ্রাম ও খাবার সময় পাওয়াও শেষ *য্যন্ত দুর্ঘট হইল। বিলাত যাওয়া বা আফ্রিকা যাওয়ার কথা লইয়া পূৰ্ব্ব হইতে কোনবার ঢাকা নিনাদিত হয় নাই। অনেকে শেষ মুহূর্তে বম্বে পথে জানিতে পারিয়া দেখা করিতে আসিলেন। অনিশ্চিত অবস্থায় যাওয়া হইবে কি না জানিবার জন্য অনেকে আসিলেন। এইরূপে অতি কষ্টে আসিবার আয়ােজন সম্পন্ন হইল। সমস্ত দিন বৃষ্টি হইয়াছে মনে হইল যথাসময়ে হয় তাে যাত্রা দুর্ঘট হইবে, কিন্তু ভগবানের কৃপায় সকল রকমের মেঘ কাটিয়া গেল। সুসজ্জিত ওভারল্যাণ্ড মেলে যাত্রা হইল। সহযাত্রী সার জেহাঙ্গীর কয়াজী, প্রেসিডেন্সি কলেজের অর্থনীতির অধ্যাপক, আমার কামরাতেই স্থান গ্রহণ করিয়াছিলেন। তাঁহার স্ত্রী তাহাকে তুলিয়া দিয়া গেলেন। মােগলসরাই ষ্টেশনে পরলােকগত রাজা মুনসী মাধােলালের দৌহিত্র লেফটন্যান্ট নন্দলাল ও চিওকী ষ্টেশনে প্রভাতচন্দ্রের শ্বশুর মণীন্দ্র বাবু দেখা করিয়া গেলেন। বৰ্মার গবর্নর সার চালর্স ইনেস্ ও কাশী-নরেশের কর্মচারী কর্ণেল গিরিজাপ্রসাদ এই গাড়ীতেই যাইতেছেন। বৃষ্ঠীর বিরাম নাই, পাহাড়, জঙ্গল, বনপ্রদেশ সব বারিবিধৌত হইয়া নবশােভা ধারণ করিয়াছে। খর গ্রীষ্মের মধ্যাহ্নপদগ্ধ এই প্রদেশের নগ্নসৌন্দৰ্য্য দর্শনে ১৯১২ সালে প্রথম বিলাত-যাত্রার সময় স্তম্ভিত ও ভীত হইয়া- ছিলাম। ১৯২৫ সালে আফ্রিকা-যাত্রার সময় এ পথে যাওয়া ঘটে নাই, কারণ সেবার দিল্লী হইয়া বম্বে যাইতে হইয়াছিল। যে পথে বার বার যাওয়া হয় সে পথের সৌন্দৰ্য সকল সময় উপভােগ্য হয় না, বিশেষতঃ নয়ন এখন নবীন নহে। বহু বৎসর সেবার পর নয়ন যে এখনও সাহায্য করিতেছে ইহাই শ্রীভগবানের পরম আশীৰ্বাদের নিদর্শন। পূৰ্বপরিচিত মাণিকপুর, বাটন, কাটনী, জব্বলপুর প্রভৃতি সহর পার হইয়া গাড়ী ছুটিয়াছে। নূতন বড় কিছু নয়ন পথে পড়িল না। কেবল নূতনের মধ্যে নর্মদা নদীর বার, নবীন শােভা দর্শনে মােহিত হইলাম। বন্যা হইলে জল প্রায় সাঁকোর সমান হইয়া থাকে। নদী বর্ষায় ফুলিয়া উঠিয়াছে, কুলে কুলে জল উঠিয়াছে s জেনেভ-ভ্রমণ তথাপি জল নূতন পুলের অনেক নীচে। পূর্বে যে পুলে পার হইয়া- ছিলাম বন্যায় তাহা নষ্ট করিয়াছে। নূতন লােহার পুল নবীন গৌরবে দাঁড়াইয়া আছে। পথে মাঝে মাঝে ঘােট ঘােট গ্রামে চাষ কিংবা কুলির দল রেলের ধারে ঘর বাঁধিয়া নাচ-গান আমােদে কাজের অবসরটুকু উপভােগ করিতেছে। তাহাদের নাচটা প্রায় সাঁওতালি ধরণের। বর্ষার প্রাচুর্যে অধিক শস্যলাভের আশাই এই আনন্দের কারণ। মানুষ আশাশূন্য থাকে না, থাকিতে পারে না, থাকিতে চাহেও না । কোট-প্যান্টের দাসত্ব ছাড়িয়া ধুতিতেই চলিতেছি। নানা কারণে অনিদ্রার হাত হইতে অব্যাহতি নাই। শনিবার ১৬ই আগষ্ট ১৯৩০ । প্রায় সমস্ত রাত্রিতেই বৃষ্টি হইয়া যথেষ্ট ঠাণ্ডা হইয়াছে, বৈদ্যুতিক পাখা চালাইতে হয় নাই। গাড়ীর অতি দ্রুত বেগবশতঃ ভাল নিদ্রা হয় নাই। নাসিক ষ্টেশনে প্রভাত হইল। রাম-সীতা-লক্ষ্মণের কীর্তিপূত নাসিকতীর্থ ষ্টেশন হইতে অল্পদূরে। পুণ্য কথা স্মরণ করিয়া আনন্দ পাইলাম। ঘাটপৰ্বতের রেলওয়ে প্রণালীর কৌশলের বিবরণ পূর্বে প্রকাশিত “ইয়ুরােপে ৩ মাস” “প্রবাস কথা” প্রভৃতি গ্রন্থে দিয়াছি, তাহার পুনরুক্তি নিষ্প্রয়ােজন। সুইজারল্যাণ্ডে আলপস পর্বতে উঠিবার ছােট রেল- গাড়ীতে চড়িবার সুযােগ গত বার হয় নাই, এবার তাহা মিটিবার সম্ভাবনা আছে। ঐ ছােট রেঙ্গের অনুকরণে সিমলায় ও দার্জিলিঙ্গে রেলপথ তৈয়ারী হইয়াছে। ব্যাবিধৌত ঘাট-পর্বতাদির শােভা ,অতুলনীয়। অতুলনীয়। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যে মােহিত হইতে হয় । সে মােহের অবসর কিন্তু এখন কম।
বষে পথে নানা মােহে এখন মন সমাচ্ছন্ন। ভাবিয়াছিলাম ঘাট ও পার্বত্য দেশ বেশী ঠাণ্ডা হইবে কিন্তু তাহা না হইয়া বরং গরম অধিক। জাহাজে উঠিবার আয়ােজনে গরম অধিকতর কষ্টকর হইল। কয়াজী সাহেবের সাহায্যে পরিশ্রমের কতকটা লাঘব হইল। ছেলে-মেয়েরা যত্নপূৰ্ব্বক যেরূপ সুচারুভাবে অল্প স্থানে সকল আবশ্যকীয় দ্রব্যাদি গুছাইয়া দিয়াছিল, সেভাবে রাখা আমার পক্ষে অসাধ্য হইল। যা তা করিয়া সারা জীবনটাই তাে কাটিল এখন তা ছাড়া গতি কি ? কোন্ কাপড়ের পাট ভাঙ্গিব তাহার চিন্তার শক্তিও নাই আবশ্যক ও নাই। কল্যাণ জংশন পার হইয়া প্রাতভর্ভাজন শেষ করিলাম। কয়াজী সাহেবকে দিয়াও তিন বেলা বাড়ীর তৈয়ারী স্বাস্থ্যকর খাবার খাইয়া দিন কাটিল । বিশেষ প্রয়ােজন না হইলে সাধ্যপক্ষে চা ও কফি ছাড়া রেলের খাবার স্পর্শ করি না, যদিও বম্বের পথে ব্রান কোম্পানি খাবার দেয় ভাল। ক্রমে বম্বের নিকটবর্তী খাড়ি ও উপনগর পার হইলাম। ভিক্টোরিয়া ষ্টেশন হইয়া সহরের ভিতর দিয়া ডাকগাড়ী ব্যালাড পিয়ার বন্দরে জাহাজের গায়ে লাগিবার জন্য মন্থরগতিতে চলিল। আমিও ভ্রমণ কথার প্রথমাংশ শেষ করিয়া পুণ্য-ভারতভূমির কূল ত্যাগ করিবার জন্য ভগবচ্চরণে প্রণত হইয়া প্রস্তুত হইলাম। তিনি সকলের সর্ববিধ মঙ্গল সাধন করুন ও সকলকে সুমতি দিন। ১৬ই আগষ্ট শনিবর ১৯৩০ (এ এস্ নারকণ্ডা ) বেলা ১১ টার সময় ডাকগাড়ী বম্বে ব্যালাড পিয়ার বন্দরে পৌছিল। বম্বের এটর্ণী বন্ধুরা অনেকে উপস্থিত। শ্ৰীযুক্ত নগীন দাস ও তঁাহার কন্যা মালা তােড়া দিয়া অভ্যর্থনা করিলেন। ) মারচ্যান্ট, দাদা চাদজী প্রভৃতি যাঁহারা পূৰ্ববারে বম্বেতে যথেষ্ট আপ্যায়ন জেনেভা-ভ্রমণ করিয়াছিলেন ও কলিকাতায় গিয়া আমাদের আতিথ্য গ্রহণ করিয়া- ছিলেন, তাঁহারা দলবলে আসিয়া বিশেষ সম্বর্ধনা করিলেন। ফিরিবার সময় দুই চারিদিন থাকিয়া যাইবার জন্য অনুরোধ করিলেন। শ্রীভগবান্ যেরূপ নির্দেশ করিবেন তাহাই শিরােধার্য। ব্যালাড পিয়ার পৌছিবার পর ডেলিমেল সংবাদপত্রের ফটোগ্রাফার ছবি তুলিলেন। হিন্দুস্থান সংবাদ পত্রের রিপোের্টর বর্তমান রাজনৈতিক আন্দোলন সম্বন্ধে মতামত লইবার জন্য আসিলেন। মহাত্মা গান্ধী-নেহেরু-নাইডুর সঙ্গে সঞ্চ- জয়াকর সম্প্রদায়ের সন্ধি স্থাপনের যে চেষ্টা করিতেছেন—তাহার সম্বন্ধে মতামত প্রকাশের জন্য বিশেষ পীড়াপিড়ি করিলেন। এ সম্বন্ধে পূৰ্বে যাহা প্রকাশ করা আমার পক্ষে সহজসাধ্য হইত, আজ তাহা সম্ভব হইল না। ইহার কারণ কিছুক্ষণ পূৰ্ব্বে সার তেজবাহাদুর সর সহিত জাহাজে আসিয়া যে আলােচনা হইয়াছে তাহা পূৰ্ব্বাহুে প্রকাশ করা আমার পক্ষে অসম্ভব। তবে এই মাত্র বলিলাম “নেহেরু সম্প্রদায়” যে জিদ ধরিয়াছেন যে, বড়লাট ভবিষ্যৎ কাৰ্যপ্রণালী নির্ধারণ করিয়া ঘােষণা করিয়া দিন যে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে “ডােমিনিয়ন ষ্টেটাস" পূর্ণমাত্রায় দেওয়া হইবে—ইহা না হইলে তঁাহারা শান্তি-স্থাপন সম্বন্ধে কোন কথাই বলিবেন না। বর্তমান সময় এ কথা বলা দুঃসাধ্য ; কারণ এরূপ ব্যবস্থা নির্দেশ করা বড়লাটের অধিকারের বাহিরে। কেবল পালামেন্ট ইহা বিচার ও বিবেচনার পর স্থির করিতে পারেন । এইরূপ বাৰ্তা বড়লাট ঝটিতি প্রকাশ না করিলে যদি নেহেরুদলের শান্তি স্থাপন করা অসম্ভব হয়, তাহা হইলে শান্তির আশা সুদূরপরাহত। হিন্দুস্থান সংবাদপত্রের রিপাের্টারকে আমি ইহার অধিক কোন কথাই বলিতে পারিলাম না। সূর নিকট কোন কথা স্পাইয়া আমার সহিত তাহার কি কথা হইল জানিবার জন্য রিপাের্টার মহাশয় বিশেষ পীড়াপিড়ি করিলেন বষে পথে অন্যবার ছােট ঘােট জাহাজে গিয়াছিলাম, সহজে ‘ঘর বাড়ী’ করিয়া লইতে সমর্থ হইয়াছিলাম। এ জাহাজ লােকারণ্য, শীঘ্র সহিয়া যাইবে সন্দেহ নাই। সিভিলিয়ান গিরিজাশঙ্কর বাজপাই আমাদের সঙ্গে দক্ষিণ আফ্রিকায় সেক্রেটারী হইয়া গিয়াছিলেন, তাহা ১৯২৫ সালের কথা। মহারাজ বিকানীরের নিজ সেক্রেটারী রূপে সপরিবারে এবারও সহযাত্রী। মহারাজ ১৪ জন অনুচর লইয়া লিগ অব নেসসে যাইতেছেন। তিনি যথেষ্ট ভদ্রতা করিলেন । তঁাহার সহিত পূৰ্ব্বে পরিচয় ছিল। এটর্নী শ্ৰীযুক্ত প্রমথনাথ করের জামাতা শ্ৰীযুক্ত সুখময় ঘােষ ( বাঙ্গলার স্বাস্থ্যবিভাগের ইঞ্জিনিয়ার) ও তাঁহার পুত্র এ জাহাজে আছেন। বৰ্ম্মার গভর্নর স্যর চার্লস ইনেস ৪ মাস ছুটী লইয়া আমাদের সঙ্গে যাইতেছেন। অতএব পরিচিত লােকের অভাব নাই। আমার ক্যাবিন সউপরের ডেকে। বর্ষার সময় সেটা বড় সুবিধা- জনক নহে। জাহাজ বড় হইলেও ক্যাবিন ছােট। আহারের টেবিলে দেশী ললাকেরা এক টেবিলে ও সাদা লােকেরা অন্য টেবিলে আপনা হইতে বসিয়া পড়ে। এ ব্যবস্থা একপক্ষে মন্দ নহে। কোন পক্ষেরই ইহাতে অসুবিধা নাই বরং সুবিধা। আহারের ব্যবস্থা প্রচুর। আহার চলিতেছেও মন্দ নয়। শেষ বর্ষায় আরবসমুদ্র কি মূর্তি ধারণ করিবেন সে বিষয় জল্পনা ও কল্পনা রীতিমত চলিতে লাগিল ; কাহার সমুদ্র পীড়া কিরূপ হয়, তাহার আললাচনাও চলিতে লাগিল। প্রকাণ্ড বৈঠকখানা ঘর। কফি খাইবার প্রকাণ্ড স্বতন্ত্র ঘর, বেড়াইবার ও খেলিবার বিস্তীর্ণ স্থান, পুষ্করিণীতে অবগাহন স্নান ও সাঁতারের বীতিমত ব্যৱস্থা রহিয়াছে। কুন্তী ইত্যাদি খেলার নানাপ্রকারের আখড়া আছে। বহুবিধ আমােদ*মেছে ব্যবস্থাও প্রচুর।
জেনেভা-ভ্রমণ ; বেলা ১০ টার সময় জাহাজ ছাড়িল ; ডক হইতে সাবধানে ধীরে ধীরে বাহির হইয়া যাইতে লাগিল। দুর হইতে বম্বের পুরাতন পরিচিত গৃহ, কল ও সহরের সাধারণ শােভা দেখিতে দেখিতে এলিফ্যান্টা কেভ ও দুর্গকে পশ্চাতে রাখিয়া জাহাজ ধীরে ধীরে আরব.সমুদ্রে পশ্চিমাভি- মুখে অগ্রসর হইতে লাগিল। সংযতচিত্তে সর্বনিয়ন্তার পদে আত্ম- নিবেদন করিয়া চতুর্থবার মাতৃভূমির চরণে বিদায় লইলাম। আজ মহারাজ বিকানীর লাটসাহেবের তার পাইলেন ; তাহাকে রাউণ্ড টেবলে বসিতে হইবে। মহারাজ বিকানীর ডাকিয়া অনেক কথা আলােচনা করিলেন এবং পরে আরও ঐ বিষয়ে বিশদ আলােচনা করিবেন ইঙ্গিত করিলেন। এ সকল বিষয় এখন প্রকাশ করা অসঙ্গত। স্যর হবার্ট কার নামে একজন খ্যাতনামা কলিকাতার সওদাগর এ জাহাজে আছেন। সম্প্রতি তিনি এ সকল বিষয় কাগজে অনেক আলােচনা করিতেছেন। তাঁহার সঙ্গেও এ বিষয় লইয়া অনেক কথা- বার্তা হইল। ভারতের ভাগ্য ও ভবিষ্যৎ বিষয়ে শুধু হিন্দুর বা এক শ্রেণীর হিন্দুর কথা কহিবার অধিকার আছে তাহা নহে। সকল মতের সমন্বয় করিয়া কাৰ্য্য করিতে না পারিলে কাৰ্য্য পণ্ড হইবে। লােকের কষ্ট আরও বাড়িবে, ইহাতে আসল কথা কিছু মাত্র অগ্রসর হইবে না। বম্বে সহরকে পশ্চাতে রাখিবার অল্প পরই ঝড় উঠিল এবং ডেকের উপর সময় সময় ঢেউ আছড়াইতে লাগিল। ঢেউ ও বাতাসের জন্য ডেকে বেড়ান সুখকর হইল না। বৈঠকখানা ঘরেই গল্পগুজবে সময় কাটিতে লাগিল। আর সময় গেল ঘর বদল করিয়া ঘর গুছাইতে। বিনয়ী, কর্মঠ, ভৃত্যদলের সাহায্যে মনের মত যত দূরু হয় পরিচ্ছদাদি ল্প সময়ের মধ্যে হইল। নন্দলাল পুরী সাহেবের পুত্র স্বরূপ- প্রকাশ, বাজপাই সাহেবের স্ত্রী ও বিকানীর মহারাজার কোন কোন বম্বে পথে ৯ পারিষদের মধ্যে “সমুদ্রশীড়া” উপস্থিত হইল। জাহাজ বাতাসে নাচিতেছে, দুলিতেছে, হেলিতেছে। বর্ষার শেষে আরব সমুদ্রে যাত্রী- গণের সমুদ্র-পীড়া হয়। ইহা বেশী না হইলেই পরিত্রাণ পাওয়া যায় । আপাততঃ আমার সমুদ্রপীড়ার কোন চিহ্ন দেখিতেছি না। কয়েকটী ক্যাবিনের লােকের খাওয়া তাে প্রায় বন্ধই হইয়াছে। আজ জাহাজ ছাড়িবার পূৰ্ব্বে সামুদ্রিক “ওজোনের” (ozone) সাহায্যে আহারক্রিয়া রীতিমত ও সুচারুরূপে চলিয়াছে। জলযােগ, চা ও রাতের খাওয়া সবই চলিয়াছে ; অতএব স্বাস্থ্যোন্নতির সম্ভাবনা খুবই আশা করা যাইতে পারে। প্রত্যহ লিপিবদ্ধ করিবার ও উল্লেখযােগ্য ঘটনা জাহাজে সৰ্ব্বদা ঘটে না। যে পথে একাধিক বার যাতায়াত হইয়াছে, “চশমার নম্বর যতই বদল হউক সে পথে নৃতন জিনিস দেখা কঠিন। বর্ষার শেষে আরব সমুদ্রের তরঙ্গ অধিক। উত্তাল তরঙ্গমালায় সাগর আলােড়িত হইতেছে। রেলিং ধরিয়া অনন্ত “লবণাম্বুরাশির” শশাভা উপভোগ করা সর্বদা সহজ নহে। ডেকে বেড়ানও বড় সুখকর নহে। প্রায়ই ডেকের উপরিভাগ তরঙ্গভঙ্গের জলরাশির দ্বার। বিধৌত হইয়া থাকে। এরূপ সময়ে মনে পড়ে রাজা রামমােহন রায়ের অমর সঙ্গীত “বন্ধু সকলে কোথায় আনিলে”। এক্ষেত্রে বন্ধুদিগকে, আত্মীয়দিগকে দোষ দিবার আমার উপায় নাই; কারণ বারণ তাে সকলেই করিয়াছিলেন। কেহ এ বয়সে দীর্ঘ পথ বর্ষাশেষে ভরাভাদ্রে আসিতে উৎসাহ দেন নাই। গ্রীষ্ম, শীত, বর্ষা যাহার সৃষ্টি, সেই সৰ্বনিয়ন্ত। সকল বিপদ ও অসুবিধার মধ্যে পথ দেখাইতেছেন ও দেখাইবেন। আমি এখন যে ক্যাবিন পাইয়াছি তাহ“বি” ডেকের উপর ষ্টার- বাের্ডের প্রথম ক্যাবিন।' দুইদিকে জানালা আছে তাহাতে সুবিধা ও অসুবিধা দুইই। জাহাজে জনতার ভিড়, খেলাধুলা, নাচগানের জেনেভা-ভ্রমণ গােলমাল, ঝড়ঝাপট প্রকোপ ইত্যাদির অসুবিধার সহিত মুক্ত হাওয়ার শ্রেষ্ঠ সুবিধা আছে। আমার ক্যাবিনের উপরে কর্মচারীদের আবাস- স্থান। সম্মুখে কিছু দূরে বসিবার ঘর, সঙ্গীতালাপের ঘর। এই ঘরের মােটা কঁাচ-আঁটা জানালার ভিতর দিয়া দেখা যায় বড় বড় ঢেউ উঠিতেছে, আছড়াইতেছে ভাঙ্গিতেছে—“সফেনপুঞ্জ নীলাম্বরী আঁচল মেলিতেছে ; দেখিতে বড়ই মনােরম। ভয় ও বিস্ময়ের আনন্দ ও আতঙ্কের ভাব উপভােগ করিবার এমন সুযােগ কখন হয় নাই। এ সময়টা পারতপক্ষে আরব সাগরে সহজে কেহ পাড়ি জমাইতে চাহে না, কিন্তু বিধির নির্দেশে আমার ঘটিয়াছে। ফাষ্ট ক্লাশ ও সেকেণ্ড ক্লাশের অনেক যাত্রীই অসুস্থ। ডেকের উপর দু’দিন দৌড়াদৌড়ির ধুমধাম তেমন নাই। সেকেণ্ড ক্লাশে অনেকগুলি ভারতীয় ছাত্র ও যুবক যাইতেছেন। তাহাদের কাছে সৰ্ব্বদাই যাইয়া আলাপ ও আপ্যায়ন করি। নিখিলের সহপাঠী শ্ৰীমান্ হীরেন্দ্রনাথ দত্ত, পুরী সাহেবের পুত্র, ঠাকুর’ ‘ঘােষ’ ‘রায়’ ‘সিংহ’ প্রভৃতি অনেকেই যাইতেছেন। বড় জাহাজ বলিয়া ক্যাবিন ও বসিবার ঘর প্রভৃতির বন্দোবস্ত ভাল। পূর্বে যে সকল জাহাজে গিয়াছি তাহাতে এত সুবিধা ছিল না। এ জাহাজ কয়লার সাহায্যে চলে না, তেলের সাহায্যে চলে, একারণে গরম ও অপরিষ্কার কম হয়। ক্যাবিনে রীতিমত রেলিং দেওয়া খাট, আরসী-দেওয়া আলমারী, দেরাজ প্রভৃতি আছে। নিয়মিত সমুদ্রের ঠাণ্ডা ও গরম জলে স্নান ও আহার দস্তুরমতই চলিতেছে ; কোন বিষয়ের অভাব জানা যায় না। নিদ্রার প্রাচুর্য ও মেরৈ ঘনঘটার জন্য সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত-দর্শনের সাভাগ্য ঘটিতেছে না। কিন্তু প্রথম যাত্রার “বৰ্ণরূপং নমামি” যাহা সম্ভব হইয়াছিল তাহা ভুলিতে পারিব না। রবিবার গির্জা হইয়াছে, বম্বে পথে শনিবার বিকাল বিপদের সময় আত্মরক্ষার ব্যবস্থার অভিনয় হইয়াছে। সাঁতার দিয়া সমুদ্রে ঝড়ে আত্মরক্ষার শক্তি ভগবান্ দিলে সবই সম্ভব। যথাসাধ্য বিপদ হইতে রক্ষা পাইবার শিক্ষা দেওয়াই এসব আয়ােজনের উদ্দেশ্য। রাত্রি দুইটা পর্যন্ত নিদ্রা হয় নাই। বাতাসের জোর, সমুদ্রের তরঙ্গ জাহাজের গতি রােধ করিতেছে। প্রথম দুদিন জাহাজ ৩৬০ মাইলের অধিক চলিতেছিল, এখন গতি কমিয়াছে। হাওয়ার বেগ হইতে আত্মরক্ষার জন্য রাত্রে কিছুক্ষণ জাহাজের মুখ ঘুরাইয়া রাখিতে হইয়াছিল। মধ্যে মধ্যে অত্যন্ত গরমের সময় এরূপ করিতে হয় কিন্তু হাওয়ার সময়ও ঐরূপ করিতে হয়, তাহা জানিতাম না। জলের দিকের সব জানালাই বন্ধ রাখিতে হইয়াছে। যাহারা নীচের ক্যাবিনে আছেন, হাওয়া বন্ধ হওয়াতে তাহাদের বেশী কষ্ট, সৌভাগ্যক্রমে আমাদের সে অসুবিধা নাই। মাঝে মাঝে ডেকের উপর বড় বড় ঢেউ আছড়াইয়া পড়িতেছে আবার ডেক ধুইয়া সরিয়া যাইতেছে। ভয়, বিস্ময় ও পুলকের সহিত এই সাগরনৃত্য দেখিয়া স্তম্ভিত হইতে হয়। ঢেউরেয় উপদ্রবে পানকৌটি আর জলের উপর দেখা দেয় না, উড়ােমাছও জাহাজের সঙ্গে আর উড়ে চলে না, প্রাণীমাত্রেই আত্মরক্ষার চেষ্টা করে। যে সকল নরনারী আজ জাহাজ কত মাইল চলিতেছে বা চলিবে তাহা লইয়া বাজী খেলেন ও বিশেষ ব্যস্ত থাকেন তাহারাও নিস্তব্ধ। খেলাধূলা কম, পড়াশুনাই লােকে অধিক করিতেছে। শ্ৰীযুক্ত রবীন্দ্রনাথের নৃতন গ্রন্থ “যােগাযােগ” কোন বাঙ্গালী সহযাত্রীর কাছে ছিল। প্রবীণ সাহিত্যিকের বহুদিনের সামাজিক নূতন পুরাতন অভিজ্ঞতার ফলে ইবসেনের “ডলস হাউস” জাতীয় সাহিত্যের সৃষ্টির প্রয়ােজনীয়তা বুঝিবার ক্ষমতা আমাদের কমিয়া আসিতেছে। যুক্ত নগেন্দ্র গুপ্তের “জয়ন্তী” ও পাঠ করিলাম।
জেনেভা-ভ্রমণ সার জেহাঙ্গীর কয়াজী, গিরিজাশঙ্কর বাজপাই, সার চাল ইনে, সার হবার্ট কার, মহারাজ বিকানীর প্রভৃতির সহিত অধিক সময়ই লীগ ও রাউণ্ড টেবল সংক্রান্ত আলােচনা হয়। জানি না কার অনুগ্রহ বা নিগ্রহবশতঃ এই অচিন্তিত ও অযাচিত সম্মান লাভ করিয়া পৃথিবীর সুখ শান্তি সম্পদ স্থাপনের প্রয়াসী লীগ মহাসভার সদস্য হইবার অধিকারী হইয়াছি। শ্রীভগবানের আশীর্বাদে পূৰ্ব্ব পূৰ্ব্ব বারের মত এবারও মুখরক্ষা হউক ইহাই বিনীত প্রার্থনা ও আশা। আকাশ সৰ্ব্বদা মেঘাচ্ছন্ন, তরঙ্গের ঘাের গর্জন, প্রতিকূল বায়ুর সহিত সংগ্রাম চলিতেছে ; পৰ্বতসমান তরঙ্গ শ্ৰেণী। এই বিরাট তরণীও যেন অবস্থা-বৈগুণ্যে অবসন্ন। আমার এ ভগ্নপ্রায় ক্ষুদ্রতরিখানি কি প্রকারে কুলে আশ্রয় পাইবে তাহা বিধাতাই জানেন। বম্বে ছাড়িবার পরদিন রবিবার শ্রীকৃষ্ণের জন্মােৎসব-জন্মাষ্টমী—এই মহাজলধি বক্ষে বিস্ময় ও পুলকের সহিত কাটিয়াছে। গত বৎসর “প্রসাদপুর বাটীতে সহধর্মিণীর সঙ্গে জন্মাষ্টমী উপলক্ষ্যে ব্রতপালনের দিন কত আনন্দ, কত আশার ও কত অশঙ্কার উদয় হইয়াছিল। আর এক বৎসর কাটিয়াছে কিন্তু কি ভাবে কাটিয়াছে তাহা সঁহার ভার তিনিই জানেন। তখন স্বপ্নেও ভাবি নাই যে, এই শুভদিনে শ্রীরাধাগােবিন্দপদে উভয়ে একত্রে প্রণাম করিবার সুযােগ পাইব না। গঙ্গার ধারে ষ্ট্ৰাণ্ডে ও খিদিরপুরের ডকের পুলের উপর তাহাকে লইয়া এক দিন বেড়াইতে গিয়া কথাচ্ছলে বলিয়াছিলাম, কলিকাতার জেটিতে জাহাজে চড়িয়া একেবারে বিলাতের জেটিতে নামিব । তাহা ঘটিবার অযাচিত ও অপ্রত্যাশিত সুযােগ কে জানে কোথা হইতে আসিল। আসিলাম একলা ভাবিতে ভাবিতে সংসারের যাবতীয়, ভার তার ক্ষীণ ক্লিষ্ট ও বহু ভারাক্রান্ত স্কন্ধের উপর ফেলিয়া। নিতান্ত চিন্তাহীন স্বার্থপরে ও বম্বে পথে ন্যায় চলিয়া আসিলাম। বিস্তীর্ণ জলধি মাঝে এ-চিন্তাই অধিকতর পীড়াদায়ক হইয়াছে। সমুদ্রের বিশুদ্ধ বাতাসে কয়দিনে শরীরের কিছু উপকার হইয়াছে। ডেকের উপর দৌড়াদৌড়ি না হউক বেড়ান রীতিমতই চলিতেছে। আহার দিনে রাত্রে ৫ বার কিছু না কিছু চলিতেছে। আহারের উৎপীড়নে বাকি যে কয়টা দাঁত আছে তাহাও বুঝি হারাইতে হয়। মেঘ অনেকটা কাটিয়াছে, বিকালের দিকে হাওয়ার বেগ কম, সূৰ্য্যদেবও দেখা দিতেছেন। আমরা আরব সাগরের শেষ বর্ষা “মসুন, বা “মন্সুনের রাজ্য ছাড়াইয়া আসিয়াছি। আফ্রিকার উপকূল হইতে যে পশ্চিমের হাওয়া জাহাজকে বিচলিত করিতেছিল তাহার প্রকোপ এখন এড়াইয়াছি। এখন সকোট্রা দ্বীপ বামদিকে—বহু দক্ষিণেরাখিয়া সমুদ্রের ছােট খাড়ির মধ্যে প্রবেশ করিয়াছি। সকোট্রা দ্বীপ জাহাজের পথ হইতে অনেক দূরে দেখা যায় না; এখন বামে (দক্ষিণ দিকে) আফ্রিকার উপকূল, দক্ষিণে (উত্তর দিকে) আরব দেশের, তীরভূমি আমাদিগকে বায়ুর বেগ হইতে রক্ষা করিতেছে। পূর্বতন নাবিকেরা এই জন্যই এ দ্বীপের নামকরণ করিয়াছিলেন “সুখধারা” (সকোট্রা) ইহা পার হইলেই ‘মসুনের হাওয়ার দৌরাত্ম হইতে ত্রাণ পাওয়া যায়। খােলা ধাও (Dhow) নৌকা কিংবা যে ছােট জাহাজ চিড়া ও মিঠাজল সম্বল করিয়া নির্ভয়ে গুজরাট হইতে সমুদ্র পার হইয়া পারস্য, আরবদেশ, আফ্রিকায় বাণিজ্য করিত, তাহাদেরই একজন নাবিক পথ দেখাইয়া ভাকোডিগামাকে ভারতের পশ্চিম উপকূলে লইয়া যান ও ইউরােপীয় রাজত্বের ভিত্তি স্থাপন করেন। ভারত-গভর্ণমেন্টের রাজস্ব-মন্ত্রী সার জর্জ সুষ্টারের স্ত্রী আমার পূর্ব পরিচিত। লেডি সুষ্টার এই জাহাজে যাইতেছেন, আজ দেখা হইল। বিনা তারের সংবাদে খবর আসিল শ্রীমান সুভাসচন্দ্র বসু জেলে ১৪ জেনেভা-ভ্রমণ থাকিয়াও অডারম্যান নির্বাচিত হইয়াছেন। শ্ৰীযুক্ত যতীন্দ্র সেন গুপ্তের দলের সহিত বােধ হয় সন্ধি হইয়াছে নতুবা অল্ডারম্যান পদপ্রার্থীকে পরাজিত করা সহজসাধ্য হইত না। জাহাজ কাল এডেন পৌছিবে এজন্য যাত্রীদল পত্রলেখা লইয়া ব্যস্ত। যে সময় এডেনে পৌছিবার কথা সে সময় কিন্তু পৌছিবে না। আজ বায়ুবেগ কমে নাই জাহাজ মাত্র ৩৩৫ মাইল চলিয়াছে। কাল ঝড়ের পর মেরামতের জন্য অর্ধঘণ্টা মাঝসমুদ্রে দাঁড়াইয়া সময় কাটাইতে হইয়াছে, অতএব সময়ে পৌছান অসম্ভব। বুধবার ২০এ আগষ্ট, ১৯৩০। গালফ অফ এডেনে প্রবেশের পর ভাের হইতেই গরম বােধ হইতেছে। গরম ক্রমশঃ বাড়িতেছে, কাল যে সব গরম পােক বাহির করিয়াছিলাম তাহা ছাড়িতে হইল। সমূদ্র জলে কাল স্নান বন্ধ ছিল, আজ স্নান হইল। তিনবার করিয়া কিছু না কিছু মাছ-মাংস খাওয়া চলিতেছে আজ তাহা বন্ধ করিয়া ফল ও ডিমের সাহায্য লইতে হইল। ঔষধ খাইবার কোনই প্রয়ােজন হয় নাই। আজ ডেকের উপর এত জোরে বেড়াইয়াছি, বােধ হয় গত দু-বৎসরের মধ্যে এভাবে বেড়ান ঘটে নাই। আর কিছু না হউক এক সপ্তাহের মধ্যে এরূপ স্বাস্থ্যোন্নতি হইয়াছে ইহা জানিয়া পরিজনবর্গ সুখী হইবেন। যাহারা সমুদ্র-পীড়ায় শয্যাগত ছিলেন, তঁাহারাও গা-ঝাড়া দিয়া উঠিয়াছেন। খেলা-ধূলা ও বাজি-খেলা বাড়িয়াছে। নীলাম্বরী সাড়ীর সাদা লেশের বাহারও বাড়িয়াছে। ডেকের উপর আড়াল দিয়া সমুদ্র-জলে সাঁতার দিবার ব্লাস্থা পর্যন্ত চলিতেছে, দেখি মেয়েরাও পিছপা নন। আমাদের সহযাত্রী ইণ্ডিয়া গভর্ণমেন্টের সেক্রেটারী গিরিজাশঙ্কর বাজপাই সপরিবারে যাইতেছেন। মিসেস্ বাজপাই দৌড়ধাপের বম্বে পথে • মধ্যে নাই; কিন্তু বেশ সরল অবাধ ও নির্ভীক ভাবে নিজের স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখিয়া চলিয়াছেন, তাহার জন্য স্বামী আদৌ ব্যতিব্যস্ত নন। জেনিভা মহাসভার পূর্ব পূৰ্ব রিপাের্ট যতই নিবিষ্টচিতে পড়িতেছি ততই কাৰ্যের মহত্ত্ব ও গুরুত্ব উপলব্ধি হইতেছে। হাওয়া খাইয়া, বেড়াইয়া, ফাকি দিয়া ছয় জনের একজন হইয়া রিপাের্টে নাম দস্তখত করিয়াও চলিতে পারিত কিন্তু তাহা হইলে বিষম দায়িত্বের কাজ মনে করিয়া পৃথিবীর ৫৪টা সভ্য জাতির প্রতিনিধির সভায় ভারতের মুখ উজ্জল করিতে হইবে এবং ভারতের মঙ্গল-সাধনের জন্য চেষ্টা করিতে হইবে এ-কথা মনে করা চলিতে পারে না। শ্রীভগবান্ যেমন মতি-গতি ও শক্তি দিবেন তাহাই হইবে। এডেন পৌছিতে অনেক রাত হইবে বলিয়া চিঠিপত্র সকাল সকাল ডাকবাক্সে দিলাম। রাত্রে নিদ্রা হওয়া একপ্রকার অসম্ভব। শুক্রবার ২২এ আগষ্ট, ১৯৩০ ২০এ আগষ্ট দুই প্রহর বেলায় এডেন পৌছিবার কথা ছিল তাহা ঘটিল না। মধ্যরাতের পর জাহাজ এডেনে পৌছিল। মধ্যরাত্রেও এডেন বন্দরের আলাে দেখিবার আশায় আমার জানালার তলে সাহেব মেমেরা নাছ-গান ও চীৎকারে নৈশশান্তিভঙ্গের ত্রুটি করেন নাই; ইঙ্গিত বন্দর পৌছাইতে কিন্তু বিলম্ব হইল। ভােরের অস্পষ্ট আলােক পূৰ্ব্ব-পরিচিত নগ্ন হৃত-সৌন্দৰ্য অথচ রাজনীতি-ক্ষেত্রে, সমরনীতি-ক্ষেত্রে বিশেষ মূল্যবান্ পৰ্বতশ্রেণী দেখিলাম। অস্পষ্ট ছায়া ও আলােতে যাহা কমনীয় দেখিলাম, অহাই প্রখর সূর্যালােকে রুদ্রমূর্তি ধারণ করে। এরূপ বিশ্বব্রহ্মাণ্ডেই অবস্থা বিপর্যয়ে একই বস্তু বিভিন্ন মূর্তি ধারণ করে ও বিষম প্রমাদ ঘটায়। জাহাজের স্নানাগারে সমুদ্র-জলের স্নানের জেনেভী-ভ্রমণ সুবিধার জন্য সকল ব্যবস্থাই আছে কিন্তু এক শ্রেণীর লােক আছেন যাহারা সর্বদাই “যা হয় নৃতন কিছু কর” সুরের উন্মাদনা হইতে পরিত্রাণ পান না। যাত্রীদের মধ্যে একদল স্নানের পরিচ্ছদ পরিয়া নৌকা বাহিয়া এডেন-তীরে নামিয়া সমুদ্র-স্নান উপভােগ করিয়া আসিলেন, বেলা ১টার সময় জাহাজ এডেন ছাড়িল। মনে হইয়াছিল এইখানে কিছু টাটকা খাবার সংগ্রহ করিবে কিন্তু তাহা করিল না। ফল, শাক, সবজি ক্রমশঃ কম হইয়া আসিতেছে। জাহাজে এবার রজকের সুবিধা আছে। মাছ মাংস আর যেন মুখে করা যায় না। উড়াে মাছ প্রভৃতি আবার দেখা দিয়াছে। গরমের প্রকোপ ক্রমশঃই বাড়িতেছে। যদিও রাত্রে এখনও ডেকে বিছানাপত্র বহিয়া লইয়া গিয়া শুইতে হয় না, কিন্তু দিনের বেলা ক্যাবিনের মধ্যে তিষ্ঠান দায় ; ঝড়-তুফান থামিলে লেখাপড়ার কিছু আশা করিয়াছিলাম, গরমের দৌরাত্মে তাহা করা প্রায় অসম্ভব। জাহাজেৰু সৰ্ব্বত্র হাওয়া না পাওয়াতে যেখানে হাওয়া আছে সেখানেই ভিড় ও জটলা, কাজেই সেখানে কাজ-কর্ম করা অসম্ভব। স্যার চার্লস ইনেস, স্যর হবার্ট কার প্রভৃতির সহিত আললাচনায় কাজের কথা কতকটা পরিষ্কার হইয়া আসিতেছে। রাত্রে লাইট হাউসের আলাে মাঝে মাঝে দেখা গিয়াছে। সঙ্কীর্ণ লােহিত সমুদ্রের পথে অনেক বিপজ্জনক জলমগ্ন পাহাড় আছে। বহুকাল আগে “চায়না” নামে যে জাহাজখানি ডুবিয়াছিল, তাহাকে এ পর্যন্ত তুলিতে পারা যায় নাই। ইহার মাস্তুল জাগিয়া থাকিয়া সর্বদাই সতর্ক করিতেছে যে সঙ্কীর্ণ সমুদ্রপথেও বিপদ যথেষ্ট । জীবনের সঙ্কীর্ণ পথেও এ মূল সত্য মনে রাখা উচিত? যত সাবধান হইয়া জীবনের গন্তব্য পৰ্থ ও প্রণালী স্থির করিতে পারিয়াছ মনে করিতেছ কিন্তু অবস্থা ভেদে হঠাৎ দেখিবে অসতর্ক থাকার দরুণ পথভ্রষ্ট হইয়াছ। “ফেরাে” আততায়ীভাবে বম্বে পথে ১৭ পলাতকের অনুসরণ করিতে গিয়া এই সঙ্কীর্ণ জলপথে বিপদগ্রস্ত হইয়াছিলেন। সঙ্কীর্ণ পথে জাহাজের গমনাগমন অধিক দেখা যাইতেছে। যাহাকে সি লেন অর্থাৎ সমুদ্র গলিপথ বলে, তাহা বাহিরের সমুদ্রে ও সংকীর্ণ সমুদ্রে স্থির করা আছে। নদীতে যেমন বয়া দিয়া নির্দেশ করা থাকে ঠিক সে-ভাবে না হউক মানচিত্রে বিশেষভাবে ঐরূপ নির্দেশ করা আছে। নাবিককে অতিশয় সাবধানের সহিত এরূপ স্থানে জাহাজ চালাইতে হয়। “গরম গরম” করিয়া কোট খুলিয়া কঁাধে ফেলিয়া ছােটাছুটি সাহেব-মেমেদের খুবই বৃদ্ধি পাইয়াছে। কষ্ট হইলেও আমরা সংযত হইয়া চুপচাপ করিয়া থাকিতে পারি ও থাকি। আমাদের সভ্যতার মাপকাটি স্বতন্ত্র। গরম জলে স্নান করিয়া দেহ শীতল করিবার চেষ্টা করিতে হইল। কথাটা শুনিতে অদ্ভুত হইলেও সত্য। লীগ অব নেশসের কাগজ-পত্র দেখা শুনা করিতে হইতেছে। প্রতিশ্রুতি মত পরের সাহায্যের আশায় বসিয়া থাকা চলে না। পাের্ট সৈয়দে চিঠিপত্র ডাকে দিবার তাড়াও পড়িয়াছে। মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ দেখা দিতেছে—আশা হইতেছিল একটু বৃষ্টি হইবে কিন্তু আশা ফলিল । ভগবান্ মানুষকে কিছুতেই তুষ্ট করিতে পারেন না। আরব সাগরের খােলা সমুদ্রের ঝড়ঝাপটায় বিষম অনর্থ ঘটিয়াছিল। এখন একদিকে আফ্রিকা ও আর একদিকে আরব দেশ এই দুই উত্তপ্ত বালুপ্রধান দেশের মধ্যে সমুদ্রের গরম যেন আর সহে না। পূৰ্ব্ব পূর্ব বারে কখন কখন তীরের পক্ষীবিশেষ উড়িয়া আসিয়া মাস্তুলে বসিতে দেখিয়াছি, মাছের সারের নৃত্য দেখিয়াছি, কিন্তু এবার সব বন্ধ ! সেকেণ্ড ক্লাসে বাঙ্গালী, হিন্দুস্থানী ও পাঞ্জাবী ছাত্রদিগের খবরাখবর দুই বেলাই লইতেছিলাম এখন আর তাহা হইতেছে না। গরমের জন্য তাহারাও আসিয়া জুটিতেছে না।
১৮ জেনেভা-ভ্রমণ রবিবার ২৪এ আগষ্ট ১৯৩০ কাল দিবারাত্র যেরূপ গরম গিয়াছে তাহা বলিবার নয়। খেলাধুলা দিনের একেবারে বন্ধ আছে, ফলে রাত্রের উৎপাত বাড়িয়াছে। জাহাজে এবার ঘােড়দৌড়ের হাঙ্গাম দেখিলাম। ডাঙ্গায় ইহা কখনও বুঝিতে পারি নাই। জাহাজের উপর কি প্রকারে ইহা বুঝিব? একটা যা হয় কিছু লইয়া হাঙ্গামা পাইলেই যাহাদের সুখ তাহারা সকল বিষয়েই উৎসাহী হইবে বিচিত্র কি? রীতিমত বাজি রাখিয়া জুয়াখেলা ইত্যাদি ঘােড়দৌড়ের আনুসঙ্গিক ব্যাপারের অভাব রাখিল না! ঘােড়ার অভাবে মেয়েরা দৌড়ের কাৰ্য্য সমাধা করিলেন, “জকিরা” তাহাদের আগে পাছে চলিলেন। ঠিক দৌড়ান না হউক, সঙ্কেত ও হিসাবমত আনাগােনাতে যাহার জিৎ হইল সেই বাজি জিতিল। “বিনা তারের” বড় বড় সংবাদ দেশ-বিদেশ হইতে আসিতেছে, কিন্তু ভারতবর্ষের সংবাদ নিতান্ত অল্প। কারণ বােধ হয় এই যে, সাধারণ যাত্রীর সে সংবাদে রুচি নাই। যতদূর বুঝা যাইতেছে ‘ভাইয়ে’র ও কংগ্রেসদলের মিটমাটের যে কথা চলিতেছে তাহার সাফল্যের সম্ভাবনা নাই বলিলেও হয়। ধড়পাকড় সমানই চলিতেছে। কলিকাতায় শীঘ্র একটা গােলমালের সম্ভাবনা আছে মনে হয়। ইংরাজ সওদাগরের দল “সাইমন কমিশনের” মন্তব্য সম্যক সমর্থন করিতে প্রস্তুত নন, এজন্য বড় বড় মিটিং হইতেছে। দুই দলের আপত্তির কারণের প্রভেদ থাকিলেও ফলে একই দাড়াইয়াছে ; কোন সম্প্রদায়ই “সাইমন কমিশনের সমর্থন করিতে প্রস্তুত নয়। ভূপালের নবাবের ম্যানেজার আলি আহাম্মদ সাহেব নবাবের জন্য বিলাতে ব্যবস্থা করিতে চলিয়াছেন। পাতিয়ালার মহারাজার পক্ষ হইতে ব্যারিষ্টার রায়না সাহেব চলিয়াছেন। মহারাজা বিকানীরের সহিত সস্ত্রীক বম্বে পথে ১১ গিরিজাশঙ্কর চলিয়াছেন। ইংরাজ সওদাগরদিগের পক্ষে সার হবার্ট কার চলিয়াছেন। আরাে কত দলের তরফ হইতে কত জনে আসিবেন তার ইয়ত্তা নাই। কোথাকার জল কোথা গিয়া মরিৰে বুঝা মানুষের দুঃসাধ্য। মাঝে মাঝে উপবাসের সাহায্যে শরীর ঠিক রাখিতে হইয়াছে। যখন যে কাজ পড়িবে সংযত হইয়া তাহা করিবার শক্তি ভগবান্ দিন। সােমবার ২৫শে আগষ্ট ১৯৩০ কাল বিকালে তাড়াতাড়ি চিঠি সুয়েজের মুখে ডাকে দিবার বিশেষ কোন প্রয়ােজন ছিল না। ভারতগামী ডাকজাহাজ বুধবার পাের্টসৈয়দে ও বৃহস্পতিবার সুয়েজ পৌছিবে। অতএব সকালে পাের্ট সৈয়দে পৌছিয়া চিঠি ডাকে দিলে চলিত। জাহাজে কেন, সকল জায়গাতেই দুই মত চলে । দুই মতের দোলনায় ছােট বড় সকল জিনিস ক্ষণে রূপান্তর প্রাপ্ত হয়। সাবধানের মার নাই হিসাবে বাড়ীর চিঠি সুয়েজের মুখে দেওয়াতে ক্ষতি হয় নাই। আমরা বিকালে খালের মুখে পৌছিলাম। আমাদের সম্মুখে ফরাসী “এথস্” (Athos) জাহাজ আগে আগে যাইতেছিল অতএব সে আগে খালে প্রবেশ করিতে পারিল। পূর্বে এই অগ্র-পশ্চাৎ যাওয়া লইয়া অনেক হাঙ্গামা হইত। ইংরাজের ডাক জাহাজ সর্বাগ্রে যাইবে বলিয়া একটা প্রসিদ্ধিছিল। অধুনা সে কুহেলিকা কাটিয়াছে। লীগ অফ নেশনস্ আর কিছু পারুক না পারুক এ সকল বৃথা হাঙ্গামা অনেক কমাইয়াছে। ডিজরেলির প্রধান মন্ত্রিত্ব সময়ে তার কৌশলে ইংরেজ সুয়েজ খাল ইংরেজ সুয়েজ খাল কোম্পানীর প্রধান অংশিদার হইয়াছিলেন। ইজিপটে ইংরাজের সহিত বিবাদের প্রধান কারণ এই সুয়েজ খাল। কথিত আছে নেপোলিয়ান বােনাপার্ট সুয়েজ খাল জেনেভা-ভ্রমণ কাটিবার কল্পনা করিয়া আপন দেশের ইঞ্জিনীয়ার প্রেরণ করিয়াছিলেন । সেই ইঞ্জিনীয়র রিপাের্ট করিলেন যে ভূমধ্য সাগরের জল লােহিত সাগরের জল অপেক্ষা অনেক উচ্চ। প্রকাণ্ড ল (Lock) ব্যবস্থা না করিলে খাল হইতে পারে না। ইহাই তাঁর ভ্রম ছিল। অন্যতম প্রধান ফ্রেঞ্চ ইঞ্জিনিয়ার (Lesseps) লেসেপস এ ভ্রম সংশােধন পূৰ্ব্বক বিনা “লকে” বহুকাল পরে খাল কাটিলেন। প্যানামা খাল কাটিতে অকৃতকার্য হইয়া অপমানিত লেসেপস এই খাল কাটিলেন। নেপােলিয়নের কৃতিত্বে যদি খাল কাটা হইত তাহা হইলে এসিয়াতে ফরাসী একাধিপত্য হইত এবং হয় তাে সঙ্গে সঙ্গে ভারতের ইতিহাস ভিন্নরূপ হইত। খালের মাঝে মাঝে অন্য জাহাজ দাড়াইবার সাইভিং (siding) আছে ; রেলওয়ের মত সিগনালের ব্যবস্থাও আছে। মাঝে মাঝে বিল বল, জলা বল, হ্রদ বল ,বড় বড় জলাশয় আছে। জাহাজের পথ “কেনাল” (Canal) কোম্পানী যত্নে রক্ষা করেন। বয়ার দ্বারা পথ নির্দিষ্ট হয়, কোন অসুবিধা নাই। দুই ধারে মরুভূমি মাঝে কাটা খাল। ঠিক শত্রু না হউক দুই ধারেই ইজিপসিয়ান ও আরবের সতত অবিশ্বাসের দৃষ্টি ইহার উপর রাখিয়াছে- ইউরােপীয়ানের এই ঐশ্বৰ্য্যভােগের বাধা দিবার জন্য সর্বদাই ব্যস্ত। গত মহাসমরে এই খালের কতক অংশ রক্ষা করিবার ভার ভারতবাসীর উপর ন্যস্ত ছিল। মহারাজ বিকানীরের উষ্ট্রসেনা ইসমালিয়ার পথ শত্রু তুর্কীর আক্রমণ হইতে রক্ষা করিয়া বিশেষ খ্যাতি অর্জন করিয়াছিল। মহারাজ সগর্বে বিশেষ আগ্রহের সহিত সেই সব স্থান দেখাইলেন। বেহারের এক নীলকর, রীড়, (Reid), ভারত হইতে অর্থোপার্জন, করিয়া অষ্ট্রেলিয়া ভ্রমণ করিয়া বিলাত যাইতেছেন। লােকটী সৌজন্য প্রকাশ করিয়া স্বয়ং আসিয়া আলাপ করিলেন। দুঃখ ও মুখের কত 2 বম্বে পথে ২ কথাই বলিলেন। গত দুই বৎসর যতদূর সম্ভব পিছাইয়া আছি, ক্রমে আপনা আপনি এরূপে লােকের সহিত পরিচয় হইতেছে। মনে হইয়াছিল গালফ অফ, সুয়েজ প্রবেশ করিয়া ঠাণ্ডা পাইব, কিন্তু তাহা হইলনা। খালে পড়িয়াও রাত্রে ডেকে যাইয়া শুইতে হইয়াছিল। ঘাের আঁধার রাত দূরে খালের ধারে গ্রাম বা ছােট সহরের আলাে দেখা যাইতেছিল। খালের উপর লাল নীল ও সবুজ আললা রেলওয়ের মত দেখাইতেছিল। মরুভূমি ও অন্ধকার আকাশ যেখানে দূরে মিশিয়াছে সেখানে একট। সবুজ ও রক্ত বর্ণের রংএর মিশ্রণের পরিখা ফুটিয়া উঠিয়াছে। একটা হর্ষ ও বিপদের কৌতুহলােদ্দীপক আভার সৃষ্টি করিয়াছে। মিল্ট, দান্তে বা মধুসূদন না হইলে সে গরিমার সৌন্দৰ্য্য উপলব্ধি করিয়া বর্ণনা করা যায় না। এইরূপ আলাের জ্যোতিতেই ইউরােপতারণ যীশুর জন্ম হয়, আর ওমারখায়েম অপূর্ব গীতি রচনা করেন। সুয়েজ খালে সারা রাত কাটিল। ৯০ মাইল পথ আসিতে সমস্ত দিন ও সমস্ত রাত গেল। ভােরে জাহাজ পাের্ট সৈয়দে পৌছিল। ডাক্তার, পুলিশ ইত্যাদি সদলবলে পাের্টের মুখে দেখা দিলেন। পোর্ট সৈয়দ অনেক উন্নতি লাভ করিয়াছে, দেখিলাম সহরও অনেক পরিষ্কার হইয়াছে। এখন নৌকার সাহায্যে তীরে অবতীর্ণ হইতে হয় না। নৌকার উপর পনটুন ব্রিজ, বঁাধা হইয়াছে। এখন জাহাজ হইতে হাঁটিয়া নূতন ব্রিজের উপর দিয়া তীরে পৌছান যায়। বন্দরের ধারের বাড়ী ঘর পূর্বের মতই রহিয়াছে। এখানের বন্দরের রেলিং কলিকাতা, মার্সেলস বা অপর বড় বড় বন্দরের মতই দেখিতে। লক্ষ্য করিয়া না দেখিলে কোন বন্দরে আসিলাম সহসা বলা যায় না। পৃথিবীর সকল সভ্যজাতির বহিরাবরণ একরূপ করিবার চেষ্টা বহুকাল হইতে চলিয়াছে। অনেক বিক্রেতা ইজিপসিয়ান আসিয়া জুটিল। ইউরােপিয়ান পােযাকে বাঙ্গালী, পাঞ্জাবী ও ইজিপসিয়ান ২২ জেনেভা-ভ্রমণ ছাত্রের পার্থক্য সহজে নজর পড়ে না। ব্যক্তিগত ও জাতিগত পার্থক্য ঘুচাইবার চেষ্টা হইতেছে, বর্ণগত পার্থক্যকে ঘুচাইবে ? বেলা ১০টার সময় জাহাজ ছাড়িবে এজন্য দূরে সহর বেড়াইতে যাইবার সুবিধা হইল না, প্রয়ােজনও নাই। তীরে নামিয়া খানিক এদিক ওদিক ঘােরা গেল। বাড়ীতে ও লণ্ডনে প্রভাতের নিকট “তার” করা গেল। টমাস কুকের আফিস হইতে চেক ভাঙ্গান প্রভৃতি গৃহস্থালির কাৰ্য শেষ করা গেল। এখানে রাস্তায় হাঁটা দুঃসাধ্য, ফেরিওয়ালার দৌরাত্মে পা বাড়ান শক্ত। প্রয়ােজনীয় অপ্রয়ােজনীয় বা নিস্পয়ােজনীয় সকল দ্রব্যই একগুণের স্থানে ৫ গুণ মূল্য, তবু হকিতেছে “সস্তা”। কিনিবার জন্য খরিদ্দারের কাছে আবদার, জ্বালাতন ও সময়ে পীড়নও চলে। ধমক দিয়া তাড়ান যায় না, তীর্থের “পাণ্ডারা” ইহাদের কাছে কোথা লাগে? ভাঙ্গা ফ্রেঞ্চ ও ইংরাজীতে ইহাদের কথা আরম্ভ, পরিশেষে অশ্রাব্য মাতৃভাষায় গালাগালি ! সহরের ভিতরে ধমকাইয়া তাড়ান বড় সােজা হইত না। গলিঘুজিতে বা দূরের রাস্তায় সময় ও সুযােগ পাইলে ইহারা মারধর করিয়া লুটপাট করিয়া লইতেও পশ্চাৎপদ হয় না। এসব অত্যাচার এখন কমিয়াছে। কিন্তু “সেন্টার অব ইন্টারন্যাশানাল রােগারী” (সৰ্বজাতির শয়তানীর কেন্দ্রভূমি) হইতে সাবধান থাকা কর্তব্য। পূর্বে ইংরেজ ও ফরাসীদের পুলিশ ও সৈনিকে শান্তি রক্ষা করিত। ইজিপ্টের সম্পূর্ণ স্বাধীনতা প্রাপ্তির পর সকল ক্ষমতা ইজিপট গভর্ণমেন্টের হস্তে গিয়াছে, কিন্তু যতদূর সম্ভব ইংরেজ সে ক্ষমতা সম্পূর্ণ ছাড়ে নাই। মাঝে মাঝে সেই জন্য কায়রাে প্রভৃতি স্থানে যথেষ্ট গােলযােগ হয়। পাের্ট সৈয়দ হইতে কায়রাে রেলে ৩, ৪ ঘণ্টার পথ। সেখান হইতে এখন মটরকার করিয়া “পিড়ামিড” দেখিভে যাওয়া যাইতে পারে। এ সুযােগ না যাইবার সময় আসিবার সময়--একবারও ঘটিল।
বম্বে পথে ; জাহাজের মাস্তুল হইতে জলে ঝাপাইয়া পড়া জলে বহুক্ষণ ডুবিয়া থাকা ইত্যাদি অদ্ভুত বাজীকর পূর্বের মত দেখিলাম। ধুমধাম কিন্তু কমিয়া গিয়াছে। এ সকল বিষয়ের আনন্দ উপভােগের স্পৃহা ও শক্তি কমিয়া আসিয়াছে। পাের্টসইয়দেও কয়েকজন যাত্রি উঠিল। ভূমধ্য সাগরের ভিতর বহুদূর পর্যন্ত “মাে” বা সি ওয়াল (mole or sea wall) লইয়া গিয়া বন্দর রক্ষা হইতেছে তাহারই মধ্যস্থলে “লেসেপ্লের” সেই শান্ত স্নিগ্ধ বিরাট হাত সাদরে বাড়াইয়া পথ নির্দেশ করিতেছে। হাওয়া ক্রমশঃ বেশ ঠাণ্ডা বােধ হইতেছে। বামে আফ্রিকার উত্তরকূল। দূরে এলেঙ্ক্যাণ্ডিয়া আবুকায়ার প্রভৃতি ইতিহাসপ্রসিদ্ধ স্থান। দক্ষিণে এসিয়া ছাড়িয়া Levant পারে যীশুর জন্মস্থান পালেষ্টাইন। উত্তরে ভূমধ্য সাগর পারে পাশ্চাত্য সভ্যতার আদি জন্মস্থান গ্রীস ; এই অতুলনীয় ত্ৰীবেণী-সঙ্গম পৃথিবীর আর কোথাও আছে কি না সন্দেহ। পাপ পুণ্যের এমন সঙ্গম বােধ হয় আর কোথাও নাই। মধ্যাহ্ন সৌর করােদ্ভাসিত সাগরতটে সুনীল বীচিমালার নৃত্যের তালে তালে নূতন পুরাতন কত ভাল মন্দ কথা মনে জাগিতে লাগিল তাহা বর্ণনা কর। অসাধ্য। বলিয়াছি জাতিগত সকল সমস্যা সমাধানের চেষ্টার জন্য সৰ্বজাতির মহাসভার আহ্বান। এ মহৎ কর্মের সাফল্যের জন্য মহতােমহীয়ানের কৃপাভিক্ষা স্বতঃই করিতে হয়। যতটা ঠাণ্ডা হইবার কথা তত হইতেছে না এই লইয়া যাত্রিগণের মধ্যে মহা আলােচনা ও আন্দোলন শুরু হইল। গরম কাপড় পরা উচিত কি ঠাণ্ডা কাপড় পরা উচিত ইহা লইয়াও বিষম তর্ক উঠিল। ইউরােপীয় যাত্রীরা বাড়ী আসিলাম” ভাবিয়া ভাবে বিভাের। খেলাধূলা, নাচ, গান অনুপাতেই বাড়িতে লাগিল। আমাদেরও মনের ভার গ্লানি ও দৈন্য সেই অনুপাতেই বাড়িতে লাগিল। “যাদৃশী ভাবনা যস্য” এ বাক্যের যাথার্থ পদে পদে প্রমাণিত হইতে লাগিল।
২৪ জেনেভা-ভ্রমণ উত্তরে সাইপ্রাস ও গ্রীসিয়ান দ্বীপপুঞ্জ রাখিয়া আমরা সরাসর পশ্চিমে যাইতেছি। একারণেই ঘড়ির কাটা আবার বেশী করিয়া সরাইতে হইতেছে। বেলা ১টা বাজিতে মধ্যাহ্নভোেজনের ব্যবস্থা হইতেছে। তখন কলিকাতায় ৪টা বাজিয়া গিয়াছে। সেখানে দিবানিদ্রাভঙ্গের পর মুখহাত ধুইয়া বৈকালিক চায়ের উদ্যোগ হইতেছে। যেমন দুই স্থানে সময়ের পার্থক্য তেমনি ভাবের ধারারও পার্থক্য। যে সব খুটিনাটি লইয়া চিত্ত দিবারাত্র সেখানে ব্যস্ত ও সময় সময় অবসাদগ্রস্ত থাকে তাহা সবই পশ্চাতে পড়িয়া রহিয়াছে ; যে প্রকাণ্ড কৰ্ম্ম সম্মুখে রহিয়াছে তাহার চিন্তায় অন্তর ব্যতিব্যস্ত। নিজের মুখ, জাতীর মুখ, দেশের মুখ কি করিয়া রক্ষা হইবে এই ভাবনা দিবানিশি। ইহারই মধ্যে ভাবী অমঙ্গলের ছায়া মনকে চঞ্চল করিয়াছে। আপদসমূহ যাহার তর্জনী হেলনে নির্দিষ্টও অন্তর্হিত হইতেছে তাহার উপর সকল ভার দিয়া নিশ্চিন্ত হইতে এখনও শিখিলাম না। বুধবার ২৬এ আগষ্ট ১৯৩০ অমঙ্গলের ছায়া কখন বৃথা যায় না। কাল সারা রাত্ৰি-আজ সকালে একটা কি অমঙ্গলের ছায়া মনকে এখনও আচ্ছন্ন করিতেছে। কতকটা ইঙ্গিতও পাওয়া গেল আজকে বেতারের খবরে। কলিকাতার পুলিশ কমিশনার স্যর চার্লস টেগার্টকে বােমা করিয়া হত্যা করিবার চেষ্টা ও আততায়ীদিগের দারুণ পরিণামের সংবাদ অনিশ্চিত বিপদের কথা কতকটা জানাইয়া দিল ! ইহা অপেক্ষা অধিকতর অনর্থ অদূর ভবিষ্যতে আছে কি না তাহা কে জানে। কলিকাতায় এই দুর্ঘটনা লইয়া কি ব্যাপার হইবে, তা ভগবানই জানেন। ভারতবর্যে শান্তিস্থাপনের চেষ্টা কতদূর সফল হইবে ? কঠিন দাঙ্গা-হাঙ্গামার সম্ভাবনা কলিকাতায় বিশেষভাবেই আছে মনে হয়। এ বিষয়ে যাত্রীদের মনােভাব যথেষ্ট তিক্ত।
বাথে পথে ২৫ মহারাজ বিকানীরের ঘরে আজ লীগ অব নেশনস সম্বন্ধে আলােচনা হইল। তিনিই ভারতের প্রতিনিধিদিগের দলপতি। পূর্বে ইংরাজ দলপতি হইতেন। গত বৎসর সার মহম্মদ হবিবুল্লা দলপতি ছিলেন। এবার বিকানীর। তিনি কর্মঠ। পূর্বে ভারতের সাধারণ প্রতিনিধি হইয়া লিগে গিয়াছিলেন। তাহাকে ইম্পিরিয়াল কারেন্সে এবং রাউণ্ড টেবেল কনফারেন্সেও থাকিতে হইবে। এ সব কারণের জন্য ভারত গবর্ণমেন্টের সেক্রেটারী শ্ৰীযুক্ত গিরিজাশঙ্কর বাজপাইকে মন্ত্রী রূপে পাইয়াছেন। এখন আমরা ক্রীট দ্বীপের দক্ষিণ দিয়া যাইতেছি। বিকালে অল্প গরম ছিল। সন্ধ্যার পূর্বে ঝড় উঠিয়া সমুদ্রকে নাচাইয়া তুলিল। ডেকের উপর আবার ঢেউ আসিয়া পড়িতে লাগিল। আরব সাগরে ঝড়ে যে কষ্ট হইয়াছিল মনে হইল ইহা তাহা অপেক্ষাও প্রচণ্ড । শয়নাগার হইতে ভােজনাগারে যাওয়া সুকঠিন। - বৃহস্পতিবার ২৮৮৩০ কখন ঝড় ও ঢেউ কখন বা বিষম গরম কিংবা কখন আবার শীত। কাল সমস্ত দিন এইভাবে কাটিয়াছে। ইটালী পার হইবার পর রাত্রে পাখা চালাইতে হইয়াছিল ; এরূপ পূর্বে কখন ঘটে নাই- প্রায় শােনাও যায় নাই। লণ্ডনের উত্তাপ ৯২ ডিগ্রী পর্যন্ত উঠিয়াছে। সেখানে ১৯১২ সালে গরম কাপড় ব্যবহার করিয়া বিশেষ কষ্ট হইয়াছিল মনে আছে। কাল সন্ধ্যার সময় মেসিনা পার হইয়াছি। এক দিকে ইটালীর সহর অপরদিকের মেসিনার দ্বীপের আলােকমালা অতি রমণীয়। ভাদ্র চতুর্থীর চন্দ্র সমুদ্রগর্ভে সান্ধ্য আহারের পর ডুবিয়া গেলেন। নষ্ট চন্দ্রের কলঙ্ক হইতে কখন তাে. নিস্তার পাইলাম না, এ মহাকার্যের উদ্দেশে ' যাইবার সময়ই বা তাহার অন্যথা হইবে কেন? যৎবিধেৰ্মনসি স্থিত।
জেনেভা-ভ্রমণ ভারতের রাজনৈতিক গগন ক্রমশঃ অন্ধকারাচ্ছন্ন হইতেছে। একদিকে বড়লাট, সার তেজ বাহাদুর ও জয়ার প্রভৃতি শান্তি- স্থাপনের চেষ্টা করিতেছেন, অপর দিকে বিপ্লবীদিগের বােমা নিক্ষেপে দুর্ঘটনার সৃষ্টি করিতেছে। খবর আসিয়াছে জোড়া বাগান পুলিস কোর্টের নিকট ৬ জন বােমার আঘাতে মৃত ও আহত! বােমা নিক্ষেপের অপরাধে যাহারা ধরা পড়িয়া অভিযুক্ত হইয়াছে তাহারা কে কোন্ শ্রেণীর লােক তার সংবাদ মনে হয় বিলাত পৌছানর পরে পাইব । দিল্লীতে শ্ৰীযুক্ত মদনহােহন মালব্য, ভি, জে প্যাটেল ও ডাক্তার অনসরি প্রভৃতি কংগ্রেস কমিটির মিটিং করার অপরাধে ধৃত হইয়াছেন। কংগ্রেস দলপতির সাহায্যে যদি শান্তি-স্থাপনের চেষ্টা হয় তাহা হইলে এ অবস্থায় এ নীতি অনুসরণে কতদূর কাজ হইবে কে জানে? কোন পক্ষেরই পরিণামদর্শিতার প্রশংসা করা যায় না। তাঁহার ইচ্ছা ও অনুমতি মত কাজ শেষ পর্যন্ত অনুচরেরা করিবে কি না এই সন্দেহে মহাত্মা গান্ধী শান্তির পথে অগ্রসর হইতে ইতস্ততঃ করিতেছেন। ক্রমশঃই মন অবসাদে ডুবিয়া যাইতেছে। লীগের কাৰ্য্য এ অবস্থায় সুচারু রূপে চালান সুকঠিন। পাঞ্জাবের কো-অপারেটিভ সসাসাইটীর ভূতপূৰ্ব্ব রেজিষ্ট্রার মিঃ স্ত্রীকল্যাণ্ড সাহেব প্যালেষ্টাইনে এই কো-অপারেটিভ তথ্যসন্ধান করিতে গিয়াছিলেন। তিনি এ জাহাজে ফিরিতেছেন। বেহারের ভূতপূর্ব নীলকর মিঃ রিড ও উজিরস্থানের কর্নেল টিলনী আমাদের সহযাত্রী হইয়াছেন। ভারতবর্ষ সম্বন্ধে তঁাদের সঙ্গে অনেক কথাই হইতেছে। উপস্থিত সমুদ্রযাত্রা প্রায় শেষ হইতে চলিল। কাল শুক্রবার সকালে মাসেলস্ পৌছিবার কথা। পুনর্বার জিনিষ পত্র গােছান, বঁধা, জাহাজের হিসাব মিটান চলিতেছে। জীবন-যাত্রাও ঠিক এইরূপ এই উঠ, এই নাম, এই খােল এই বাঁধ, এই হিসাব মিটাও আবার বম্বে পথে ২৭ নূতন হিসাব খােল নূতনকে পুরাতন কর, আত্মীয় কর, হয় তত বা বাদানুবাদে ও বুঝিবার দোষে শক্ত কর। তাই মনে হয় সমুদ্র-যাত্ৰাটী জীবন-যাত্রার একটা ছােটখাট সংস্করণ মাত্র। আশ্চৰ্য্য এই যে, জীবনের সায়াহ্নে' যেমন জীবনকে গাঢ়তর আলিঙ্গনে মানুষ আবদ্ধ রাখিতে প্রয়াস পায়, সমুদ্রযাত্রার শেষটাও বাস্তবিকই মনে হয় এ যাত্রা এত শীঘ্র শেষ হইল কেন। মানুষ বর্তমানের দাস, ভবিষ্যতের প্রতি তার দৃষ্টি ক্ষীণ ও অতীতকে সে ভুলিতে চায়। ভূমধ্যসাগর আজ শান্ত। সমুদ্র যেন একখানা স্বচ্ছ প্রকাণ্ড কঁচের মত স্থির। জাহাজ সুযােগ পাইয়া বেশ জোরে যাইতেছে ডাক যথাসময়ে মাসে পৌছাইয়া দিবারই চেষ্টা হইতেছে। দক্ষিণে নেপােলিয়ান বােনাপাটের জন্ম স্থান কর্সিকা দ্বীপ ও বামে সার্ডিনীয়া দ্বীপ—পূৰ্ব্বেকার পরিচিত পথেই অগ্রসর হইতে লাগিলাম। কূলের পাহাড় পর্বত, বনানী, স্পষ্ট দেখা যায়। আজ বিদায়ের পালা! আহারাদি নাচ গান একটু বিশিষ্ট রকম হইল। যাহারা ১৫ দিন একত্র আমােদ-আহ্লাদ করিয়াছে তাহাদের বিদায়ের পালাটাও কিছু দীর্ঘব্যাপী হওয়া সম্ভব। ভাের রাত্রে মার্সেল পৌছিব; অতএব যথাসময়ে ডাকের জন্য প্রস্তুত হইতে হইল। •• ন্যাশন্যাল লিবারেল ক্লাব • লণ্ডন রবিবার ৩১শে আগষ্ট, ১৯৩০ মূকং করােতি বাচালং পঙ্গুং লঘয়তে গিরিম্ । যৎ কৃপা তমহং বন্দে পরমানন্দমাধবম্ । বারংবার ভক্তিভরে অবনতমস্তকে এই কথা স্মরণ করিতে করিতে পুরাতন পরিচিত এই আশ্রয়স্থানে কাল বেলা সাড়ে ছয়টার সময় ২৮ জেনেভা-ভ্রমণ পরিশ্রান্ত দেহে ক্লান্ত মনে আসিয়া উপস্থিত হইয়াছি। পােট সৈয়াদ হইতে তার দিয়াছিলাম, তথাপি কি কারণে জানি না প্রভাতচন্দ্র ভিক্টোরিয়া ষ্টেশনে উপস্থিত হন নাই। যৎসামান্য নিজের ব্যবস্থা নিজে করিয়া লইবার শক্তি ভগবান্ হঠাৎ কোথা হইতে দিলেন তিনিই জানেন। সঙ্গে সমভিব্যাহারী ও পরিচিত লােকের অভাব ছিল না ; ষ্টেশনে উপস্থিত ছিলেন রে ( Rae) প্রভৃতি অন্যান্য পরিচিত কলিকাতার বন্ধু, কিন্তু সকলেই যে যাহার কাজ লইয়া ব্যস্ত। সঙ্গের মাল আসিতে বিলম্ব হইয়াছিল ; যদিও বিলম্বে আসিয়া পৌছিল, রসিদের গােলমালে আরও বিলম্ব হইল। মাল পাইতে, গুছাইতে, খুঁজিতেও বিস্তর বিলম্ব হইল। তখন সন্ধ্যার সন্ধ্যার অন্ধকার ষ্টেশন- প্লাটফর্মের ভিতর আসিয়া ঢুকিয়াছে। ফ্রান্সে মাল পাইতে এত গােলমাল হয় নাই। ইংলণ্ডের ব্যবস্থা কেন এত গােলমাল ইংরাজের। নিজেরাই তাহা জিজ্ঞাসা:করিতে লাগিলেন। যাহাহউক দেহে ও মনে হঠাৎ অসীম শক্তি ও ক্ষমতা কোথা হইতে আসিয়া পড়িল জানি না। কোনগতিকে কাজ সমাধা করিয়া ন্যাসান্যাল লিবারেল ক্লাবে ( National Liberal Club) পৌছিলাম। ব্যবস্থা যতদূর সম্ভব ভালই ছিল। লর্ড লিটন (Lord Lytton), লর্ড রেডিং ( Lord Reading), রেভারেণ্ড মিষ্টার এণ্ডারসন, (Rev. Mr. Anderson) প্রভৃতির আপ্যায়ন পত্ৰ আসিয়া অপেক্ষা করিতেছিল। ঘর গুছাইতে ব্যবস্থা করিতেও কিছু বিলম্ব হইল। ২৮ আগষ্ট রাত্রে মাসেলস-এ পত্র ডাকে দিবার পর হইতে ক্রমাগত ভ্রমণ হইয়াছে। কুলী ও কুলী-সর্দারদিগের প্রতারণায়, পথের গরমে উত্যক্ত হইতে হইয়াছিল, কাগজে দেখিলাম নব্বই বৎসর এরূপ গরম হয় নাই। টেম্পারেচার প্রায় বিরানব্বই-এর কাছাকাছি হইয়াছে আবার মাঝে মাঝে হঠাৎ হাওয়াও খুব বয় ; কাজেই গরম কাপড় না বম্বে পথে পরিয়া উপায় নাই। P. & ০, Express গাড়ীর খাওয়া ও বিছানার বাবুগিরি প্রসিদ্ধ। অতএব.সে পথে কোন কষ্ট নাই, বরং জাহাজের বিলাতি ধরণের খাওয়ার পর P. & ০. Express Train-এ ফরাসী প্রণালী-মত রান্না মুখরােচক হইল, আহার সম্বন্ধে যতদূর সম্ভব সাবধান হইয়া বরাবর চলিতেছি; কাজেই শরীর খারাপ হইতে পায় নাই জাহাজ বেলা আটটার সময়ই মাসেল বন্দরে পৌঁহুছিয়াছিল। গাড়ী ছাড়িল বেলা চারিটার সময়। এই দীর্ঘকাল অকারণ জাহাজে বসিয়া থাকিতে কষ্টবােধ হইতেছিল। সহযাত্রীদের মধ্যে যাহাদের ইচ্ছা ও শক্তি হইল তাহারা গাড়ী লইয়া সহর ঘুরিয়া আসিল। সকলে অধিক খরচ করিয়া De Luxe অর্থাৎ নবাবী ধরণের P. & 0. Express গাড়ীতে না গিয়া পরে সস্তা সচরাচর চলতী গাড়ীতে যাইবার ব্যবস্থা করিতে গেল। বক্সিস, মাশুল, ট্যাক্স, কাষ্টম তদারক ইত্যাদির জ্বালায় রীতিমত ব্যতিব্যস্ত হইবার পর গাড়ী বেলা ৪ টার সময় বন্দর ছাড়িল । পথে নূতন দেখিবার কিছু নাই—সুতরাং সে সকল বিস্তারিত বর্ণনা নিস্পয়ােজন। রােন (Rhone) নদী যেখানে সমুদ্রে পড়িয়াছে, সে জায়গাটা ও তাহার উপর পােল দেখিবার ও মনে করিয়া রাখিবার জিনিষ। নদীমাতৃক ভারতবর্ষের লােক ইউরােপের নদী দেখিয়া স্তম্ভিত হইতে পারে না। রাইন, রােন, টেমস, টাইবার, সেন নদী প্রভৃতি সকল নদীই “জাহ্নবী-যমুনা সিন্ধু, ব্ৰহ্মপুত্র, নর্মদা, কাবেরীর নিকট তুচ্ছ ও নগণ্য। কোনটা বা বেলেঘাটার খাল বলিলেই হয়। কিন্তু সমুদ্র সঙ্গমে ফ্রান্সের রান নদী মনে করিয়া রাখিবার বস্তু। বড় বড় পােল আমাদের দেশে অনেক আছে। কিন্তু সমুদ্র-সঙ্গমের কাছাকাছি কোথাও এমন পােল বােধ হয় নাই। নদীর দুই পারে পাহাড় পাওয়াতেই এ কীর্তি সম্ভব হইয়াছে। সমুদ্রের ধারে ধারে, কোথাওবা হ্রদের ধারে ধারে বনজঙ্গল, ক্ষেত, বাগান, সহরের ভিতর জেনেভা-ভ্রমণ দিয়া রেলওয়ে যাতায়াতে দৃশ্য বড় সুন্দর। ফ্রান্স, ইংলণ্ড প্রভৃতি দেশের বৈশিষ্ট্যই এই যে এক ছটাক জমিও. অনাবাদে পড়িয়া নাই সর্বত্রই লক্ষ্মীর আবির্ভাব। ক্যালে না গিয়া গাড়ী বােলােন (Boulogn) পথে আসিল। বােলােন হইতে ফোকষ্টোন (Folkstone)। faattio (Biatrizz) নামক দ্রুতগামী পারাপারের জাহাজে পুনরায় সমুদ্র পার হইতে হইল। বেলা ২ টার সময় সমুদ্র পার হইয়া নয় বৎসর পরে নিয়তির ফেরে পুনরায় শ্বেতদ্বীপ ইংলণ্ডে দেশহিতকর কাৰ্য্যে আগমন ঘটিল। মন নানা চিন্তায় পরিপূর্ণ। বিষম গরমে সকলেরই কষ্ট। যাহারা মহাসমুদ্র পার হইবার সময়ও “সমুদ্রপীড়ায় কাতর না হন তাহারাও প্রায়শঃ ৯|| ঘণ্টা বিলাতী খড়ি English Channel পার হইবার সময় কষ্ট পান। কিন্তু হাওয়া না থাকাতে সুবিধা এই হইল—নিত্যচঞ্চল English Channel স্থির ওঅচঞ্চল। ফ্রান্সে সমস্ত দিন রাত বড় বড় নগর-গ্রাম দ্রুতগামী রেল গাড়ীর জানালা হইতে দেখিতে দেখিতে আসিয়াছি। Avignon, Lyons, Paris, Amiens প্রভৃতি সহরগুলি পূর্বে যা দেখিয়াছি এবারও তাই। সহরের বাহির দিয়াই P. & 0. Express যাতায়াত করে, অতএব দেখিবার বেশী কিছু নাই। যদিও গ্রীষ্মে অনাবৃষ্টিতে লােকের কষ্ট ও চাষবাসের ক্ষতি যথেষ্ট হইতেছে, তথাপি পথে প্রাকৃতিক শােভা কিছুমাত্র কম নাই। ছােট ছােট ছবির মত বাটীগুলি ছােট ছােট বাগানে ঘেরা ; দেখিতে বড় চমৎকার। কয়দিন ভয়ানক গরম পড়িয়াছে। শুনা যায় নব্বই বৎসর বিলাতে এমন গরম হয় নাই; ক্রমশঃ ঋতু-পরিবর্তন যথেষ্ট হইতেছে ; গরমে মানুষ ও ঘােড় অনেক মরিয়াছে। আবার সঙ্গে সঙ্গে ভাদ্র মাসেই কালবৈশাখীর মত ঝড়-জল-বিদ্যুৎ সব আরম্ভ হইয়াছে। বর্ষা-বন্যার জেনেভা-ভ্রমঃ •• অভাব নাই। এসব উৎপাত এতদিন কেবল আমরাই ভােগ করিতাম; বিলাতে এসব হাঙ্গামা ছিল না; এখন প্রচুর পরিমাণে তাহা আরম্ভ হইয়াছে। আমি ১৯২১ সালে যখন আসি তখনও গরম খুব পড়িয়াছিল, অপেক্ষাকৃত হালকা কাপড় না আনাতে সে-বার এবং এবারও কষ্ট পাইয়াছি। এত গরমেও কিন্তু ফ্রান্সের ও ইংলণ্ডের সাজান বাগানের শােভার কিছুমাত্র হ্রাস হয় নাই। সকল বাড়ীতেই ছােট বা মাঝারী ফুলের ও শাক-সবজীর বাগান আছে। গৃহস্থ মালির সাহায্যের জন্য বসিয়া থাকে না। নিজ হাতে বাগানের কাজ করে। তাহাতে স্বাস্থ্যও ভাল থাকে, আরমও পায়। লণ্ডনের পরিবর্তন নিত্য হইতেছে, ১৯১২ সালে যাহা দেখিয়াছি ১৯২১ সালে তাহা অপেক্ষা অনেক পরিবর্তন দেখিয়াছি, ১৯৩০ সালে তার চেয়েও বেশী। ভিক্টোরিয়া ষ্টেশন হইতে বাহির হইয়া রাস্তা ও ঘর বাটীর দৃশ্য কতকটা বম্বের মত। তারপর দৃশ্য ইন্দ্রপুরীর ভারতবর্যের কোন নগরের সহিত এদৃশ্যের তুলনা হয় না। মােটর এবং বাসের ভিড় এত বেশী যে তাহা মনে করিতেও মাথা ধরিয়া যায়। আমার অপেক্ষা চক্ষুস্মান ও শক্তিমান লােকেরও স্থানে স্থানে সাদা আস্তীন-ওয়ালা ট্রাফিক পুলিসের (Traffic Police) সাহায্য ব্যতীত রাস্তা পার হওয়া দুঃসাধ্য। অতি সাবধানে পথ চলিতে হয়। যখন-তখন যেথা-সেথা যাইবার আর উপায় নাই। যখন সাউথ আফ্রিকায় (South Africa) সরকারী কাজে ১৯২৫-২৬ সালে গিয়াছিলাম, তখন যাতায়াতের সুবিধার জন্য সরকারী মােটর বরাবর দরজায় হাজির থাকিত, কিন্তু এখানে ব্যবস্থা কার্পণ্যদুষ্ট। বাস্, ট্রাম, রেলপথে যাতায়াতের পয়সাও সরকারী “ভাতা” হইতে কুলাইয়া উঠা কঠিন। আগষ্ট-সেপ্টেম্বর ছুটীর সময়। বড়লােক সবাই দেশবিদেশে বেড়াইতে যায় ও গিয়াছে। সকলেই বলে লণ্ডনে এখন কেহ নাই ও মত। ।
বােম্বে-পথে যায় না। কিন্তু কাজে তাে তাহা নয়। রাস্তা-ঘাট বিষম জনতাপূর্ণ। একবার Punch-এ বােধহয় পড়িয়াছিলাম, “London is empty but for the few negligible millions that one sees in the streets”। আসল কথাই তাই, রাস্তায় যে লক্ষ লক্ষ লােকে লােকারণ্য করে “হাওয়া-খেকো” বাবুরা তাহাদিগকে মানুষ বলিয়াই মনে করে না; তাহাদের গ্রাহের মধ্যেই আনে না। 775 caft: (Lord Reading), at falla (Lord Lytton) প্রভৃতির পত্ৰ পাইলাম যে, তঁাহাদের এখন লণ্ডনে আসিবার সময় নয় ; দেখা হইবার সম্ভব অল্প। পার্লামেন্ট, কলেজ, ইউনিভার্সিটি, ব্রিটিশ মিউজিয়ন প্রভৃতি সব বন্ধ। ন্যাশন্যাল লিবারেল ক্লাবে (National Liberal Club) আসিয়া আশ্রয় পাইলাম। আরাম, সুবিধা, ব্যবস্থা বন্দোবস্তের কোন ত্রুটী নাই। কিন্তু লােকের জীবনীশক্তির যেন বিশেষ অভাব দেখিলাম । পুরাতন লোক কাহাকেও দেখিতে পাইলাম না। অথচ প্রাচীন লােকে ঘর পরিপূর্ণ। সবাই বৃদ্ধ, সবাই স্থবির, কারণ বিচার করিয়া বুঝিলাম যে নৃতন যুগে লিবারেল (Liberal)-দের স্থান নাই বরং কনজারভেটিভ (Conservative)-দের স্থান আছে, শ্রমজীবী (Labour) দলের স্থান আছে কিন্তু লিবারেলদের স্থান নাই, আদর নাই। ভারতবর্ষে এব্যাপার ঘটিতেছে, সর্বত্র এই ব্যাপার ঘটিতেছে। মধ্যপন্থীদলের সম্মান ও আদর এখন তিরােহিত। উদারনীতির ঔদাৰ্য্য ও মহত্ত্ব রক্ষণশলদিগের জরদগবের অবস্থা অপেক্ষাও হেয় হইয়া পড়িয়াছে। লণ্ডন, রবিবার, সেপ্টেম্বর ৯ আজ নয়দিন লণ্ডনে পৌছিয়াছি। অনেকস্থান পরিদর্শন করা হইয়াছে। নূতন করিয়া কোন কিছুই চোখে পড়িতেছে না। শনিবার
65 Gendvo - Nouveau Palais des Nations
F
.
জাতীয় প্রাসাদ
No text on this page.
বম্বে পথে (৩০এ আগষ্ট) হইতে বুধবার পর্যন্ত ন্যাশন্যাল লিবারেল ক্লাবেই অবস্থান হইয়াছিল। তারপর ভ্রাম্প প্রভাতচন্দ্রের রেড, ব্রিফ, রােডস্থ বাসায় আসিয়া কয়দিন বড় আনন্দেই কাটাইলাম। প্রভাতচন্দ্র বধূমাতাকে চিকিৎসার জন্য আনিয়াছে। আইল অফ ওয়াইট প্রভৃতি স্বাস্থ্যকর স্থানে গিয়া স্বাস্থ্যোন্নতি হইয়াছে। ইহারা বেশ সুন্দর বাসা পাইয়াছে। কোন গােলমাল এখানে নাই। একটী ঠিকা ঝি লইয়া বাঙ্গালীর মেয়ে বাঙ্গালীর বধূ গৃহস্থালী ঘরকন্না করিতেছেন। রন্ধন, হাট-বাজার ইত্যাদি সমস্তই ঝিয়ের সাহায্যে করেন। বিলাতী ক্ষিপ্ৰকারিতা ও কর্মপটুতা জন্মিয়াছে কিন্তু বিলাতি বিলাসিতা ও অনাবশ্যকীয় আদব-কায়দার দূষণীয় ব্যাপার স্বভাবগত হয় নাই, ইহ। বিশেষ আনন্দের কথা। বিস্তৃত কর্মক্ষেত্রে বাঙ্গালীর মেয়েকে এখন দেশ-বিদেশে যাইতে হয়, হইতেছে এবং হইবে। পশ্চাপদ হইলে স্বামী-পুত্রের কর্মে ক্ষতি ও গ্লানির কারণ হয়। স্বধর্ম স্বীয় আচার-ব্যবহার ও শীলতা বজায় রাখিয়া স্ত্রী-পুরুষ সকলেই দেশ-বিদেশ যাইতে পারেন। স্ব স্ব জাতীয়তা বিসর্জন দিবার কোনই হেতু নাই। ইহাদের সেবা ও যত্নে সকল কষ্টই দূর হইল। বহুকাল পরে পারিবারিক প্রথামত লুচি, রুটি, ব্যঞ্জন, ক্ষীর ইত্যাদি খাইয়া পরিতৃপ্ত হইলাম। বৌমার “মেজমা” অর্থাৎ লেডী সৰ্বাধিকারী প্রভাতের বিবাহকালে বৌমাকে যে সকল উপদেশ দিয়াছিলেন বৌমা অক্ষরে অক্ষরে তাহা পালন করিতেছেন। ইহাদের সেবায় ক্লেশ ভুলিয়া গেলাম, মনে হইতে লাগিল যতদিন ইহারা এখানে থাকিবেন ততদিন আমিও ইহাদের সহিত থাকি, কিন্তু কৰ্ম্মসূত্র অন্যস্থানে আকর্ষণ করিতেছে। এ কয়দিন ক্রমাগত ইণ্ডিয়া আফিসে ও ইণ্ডিয়া হাউসে গিয়া উপস্থিত কর্তব্য সম্বন্ধে আদেশ, উপদেশ লইতে হইল। যদিও লিগ, অফ নেসনসের কর্মক্ষেত্র বহু বিস্তৃত-সাম্রাজ্য সভ্য”-জগৎব্যাপী ৩৪ জেনেভা-ভ্রমণ দুর্ভাগ্যবশতঃ ভারতের পক্ষে ভারতীয় প্রতিনিধির পক্ষে তাহা অতীব সঙ্কীর্ণ। হাদের হাতে, কর্তৃত্বের ভার -হারা সঙ্কীর্ণচেতা, ফলতঃ ভারতীয় কৰ্ম্মক্ষেত্রও সঙ্কীর্ণতর হইয়াছে। সরকারী লােক, সরকারী পেনসনার ও সরকারের মুখাপেক্ষী প্রতিনিধি ব্যক্তির দ্বারায় ভারতবর্ষের এ কাৰ্য্য এতদিন চলিতেছিল। সাধারণের প্রতিবাদের ফলস্বরূপ সময় সময় দু’ একজন মধ্যবিত্ত শ্রেণীর স্বাধীনচেতা প্রতিনিধি নিযুক্ত হইয়াছেন। সহায়তার অভাবোহারাও নিজমতানুযায়ী কৰ্ত্তব্য-সাধনে অক্ষম হন। এই সকল কটু সত্য সেক্রেটারী-অব-ষ্টেট মিঃ ওয়েজউড বেনকে সবিশেষে বলিলাম—নির্ভীক অকৃত্রিম বন্ধুভাবেই বুঝাইতে চেষ্টা পাইলাম । তিনিও যে না বুঝিলেন তাহা মনে হইল না, কিন্তু প্রচলিত প্রথার পরিবর্তন না হইলে ফলের আশা করা বিড়ম্বনা। ভারতবর্ষ স্বাধীন রাজ্য নহে; ঘরে-বাহিরে, সময়-অসময়ে একথা প্রতিপলেই বিশদভাবেই বুঝাইয়া দেয়। যেখানে স্বাধীন কিম্বা স্বায়ত্ত শাসনাধীন রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয় নাই, স্বাধীন জাতিরা তাহাদিগের প্রতিনিধিকে কেনই বা আমল দিবে ? ভারতবর্যের পক্ষে হাই-কমিশনার স্যর অতুল চট্টোপাধ্যায়কেও এ সম্বন্ধে বিস্তর কথা বলিলাম। ট্রেড-কমিশনার মিঃ লিসে, শিক্ষা বিভাগের পরামর্শদাতা ডাক্তার পবিত্র দত্ত প্রভৃতি পদস্থ কর্মচারীদিগের সহিত এ সম্বন্ধে আলােচনা করিলাম কিন্তু ফল অকিঞ্চিৎকর হইল ! অন্ডউইচএ কিংস ওয়েতে যে নূতন প্রতিরম্য অট্টালিকায় “ইণ্ডিয়া হাউসে” হাই কমিশনারের অফিস এখন উঠিয়া গিয়াছে তাহা ভারতবর্য হইতে আনীত মাৰ্বল, কাঠ, ইত্যাদির সাহায্যে ভারতীয় কারিকর দ্বারায় গঠিত হইয়াছে। এই ইমারত প্রস্তুতের জন্য বহু ক্লেশ স্বীকার ও অর্থব্যয় করিতে হইয়াছে। অষ্ট্রেলিয়া নিউজিল্যাণ্ড প্রভৃতি সম্পূর্ণ স্বায়ত্ত শাসনপ্রাপ্ত উপনিবেশগুলির এক একটা নিজস্ব আফিসের জন্য বম্বে পথে বৃহৎ বৃহৎ সুরম্য অট্টালিকা এইস্থানে নির্মিত হইয়াছে। “ইণ্ডিয়া হাউস ইহারই অনুকরণ ! ইম্পিরিয়াল কনফারেন্স ও জেনেভায় লিগ-অফ নেসলে এই সকল স্বত্ব ও স্বামিত্ব রক্ষার মীমাংসার জন্য আলােচনা হয়। নিজরাজতন্ত্র-বজ্জিত ভারতের পক্ষে ঐ রম্য সুবৃহৎ অট্টালিক। নির্মাণে এ সকল সত্ব ও স্বামিত্ব-অর্জনের বা রক্ষার আড়ম্বর বিসদৃশ মনে হয় এবং পদে পদে ইহাই প্রমাণিত হইতেছে! বহু বাধা, বিঘ্ন, বিপত্তি ও অসুবিধার মধ্য দিয়াও দেশের কাৰ্য যথাসম্ভব উদ্ধার করিতে হইবে এই উদ্দেশ্য করি। গুরুভার এত আপত্তি ও অসুবিধা সত্ত্বেও নিজ স্কন্ধে উঠাইয়া লইয়াছি। ভগবান এ উদ্যোগের সহায় হউন। গতবৎসর ও তাহার পূৰ্ব্ব পূৰ্ব্ব বৎসর সেক্রেটারী অফ ষ্টেটের অফিলের একজন নিম্নতর কর্মচারী ভারতীয় প্রতিনিধিগণকে অভ্যর্থনা করিয়াছিলেন, কিন্তু এ বৎসর দেখিলাম সেক্রেটারী অফ ষ্টেট কাপ্তেন ওয়েজ উড বেন ও শাজীবিলের সেক্রেটারী স্বয়ং অভ্যর্থনা করিলেন ও নিজ নিজ মন্তব্য প্রকাশ করিলেন। ইহাদের কথার মধ্যে কিন্তু ওর ঐ এক! ভারতবর্ষের রাষ্ট্রগত নিজস্ব কোনই অধিকার নাই এবং সেক্রেটারী অক, ষ্টেটের উপদেশ মত চলিতে হইবে এ কথার ইঙ্গিত বার বার করিলেন। গতযুদ্ধের সময় ভারতবর্ষ ব্রিটিশ সাম্রাজ্য রক্ষার বিশেষ সহায়তা করিয়াছিল। ইহারই ফলে ভার্সেল সন্ধি-প স্বাক্ষরের সময় লর্ড সিংহ ও মহারাজা বিকানীব ঐ সৰ্তে ভারতের পক্ষ হইতে স্বাক্ষর করেন এবং তারতকে স্বাধীন রাজ্যরূপে গণ্য করার পরোক্ষে অধিকার দেওয়া হইয়াছিল। প্রত্যক্ষ ভারত যে তিমিরে সেই তিমিরেই রহিয়াছে। বাস্তবপক্ষে কেবল বৃটিশ দলের ছয়ট। ভােট লিগ অফ নেশনসে পাইকর জন্যই ভারতবর্ষকে স্বাধীনরূপে খাড়া করান হইয়াছিল ! যে আমন্ত্রণে যে বিষয়ের জন্য আসিয়াছি তাহাতে অন্ততঃ আংশিক কৃতকাৰ্য্য হইলে ধন্য ভান করিব।
জেনেভা-ভ্রমণ সেক্রেটারী অফ ষ্টেট যখন আমাদের অভ্যর্থনা করিলেন সে সময় আণ্ডার সেক্রেটারী সার ফিল্যাণ্ড ষ্টুয়ার্ট-যিনি সাইমন্ কমিশনের সেক্রেটারী ছিলেন) ও সার ম্যালকম্ সিট সঙ্গে ছিলেন। ইহাদের সহিত পূৰ্বপরিচয় ছিল, আদর-আপ্যায়ন যথেষ্ট করিলেন। বেহারের ভূতপূৰ্ব গভর্নর ও বাঙ্গলার ভূতপূৰ্ব্ব মন্ত্রী সার হেনরী হুইলার ও সার ওমার হয়াৎ খাঁ, সার বসন্ত মল্লিক মহােদয়গণ আসিয়া সম্মান করিলেন এবং যাহার যেমন মতি সেই মত উপদেশ দিলেন। সার ক্যাম্বেল রােডস একজন পুরাতন সওদাগর ছিলেন। তিনি বিশেষ যত্ন দেখাইয়া তার “হেনলী অন টে”এর বাড়ীতে আতিথ্য স্বীকারের নিমন্ত্রণ করিলেন। সময়াভাবে গ্রহণ করিতে পারিলাম না। ভূতপূৰ্ব গবর্নর লর্ড লিটন, প্রেসিডেন্সি কলেজের ভূতপূৰ্ব্ব প্রফেসার ষ্টারলিং ও টেম্পারেন্সের হারবাট, এণ্ডারসনের সঙ্গে সাক্ষাৎ ঘটিল না। ভূতপূর্ব ভাইসরয় লর্ড হার্ডিং তাঁহার দেশের বাড়ীতে আছেন তাহার সহিত সাক্ষাৎ হইতে পারিবে না জানিয়া দুঃখ করিয়া পত্র লিখিয়াছেন। সময়ের অল্পতার জন্য বহু বন্ধুর সহিত দেখা ঘটিতেছে না, ইহাতে মনে হয় কাজের সুবিধাও কমিয়া যাইবে। সেক্রেটারী অফ, ষ্টেটের কর্মচারী মিঃ ক্রফট আমাদের সেক্রেটারী হইয়া জেনেভা যাইতেছেন। তাহার নিকট এসেমব্লির কাগজ পত্র বুঝিয়। লইয়া আমার মালপত্র তাহারই জিম্বায় দিয়া নিষ্কৃতি পাইলাম। দু একদিন পূর্বে যাইয়া প্যারিস ইন্টেলেকচুয়াল কে! অপারেস ইনষ্টিটিউট দেখিয়া যাইবার ইচ্ছা ছিল কিন্তু এখন, তাহা বন্ধ, কাজেই তাহ স্থগিত রহিল। আপাততঃ যেরূপ গতিক দেখিতেছি জেনিভার কাৰ্যান্তে লণ্ডনে প্রত্যাগমন না করিলেও বােধ হয় চলিবে। জেনিভা হইতে সােজ। দেশে ফিরিবার চেষ্টাই করিতেছি। অক্টোবর মাসের শেষে সকলেই বম্বে পথে ৩৭ বাউণ্ড টেবল্ কারেন্সে ব্যস্ত থাকিবে। অকারণে শীত ও নানা অসুবিধা ভােগ করার আবশ্যকতা মনে হয় না। যদি প্রয়োজনবশতঃ দুই তিন সপ্তাহের জন্য পুনরায় লণ্ডনে ফেরা দরকার হয় তবে অবশ্য আপত্তি করিলে চলিবে না যা’ হােক ভবিষ্যতে বুঝিয়া ঠিক করিব। কলিকাতা পুলিশকমিশনার টেগার্টকে হত্যার চেষ্টা, ঢাকায় লােমানকে হত্যা ও হডসনকে হত্যার চেষ্টা, ময়মনসিংহে বােমা ফেলা, গান্ধী-নেহারু ও স-জয়াকার শান্তি স্থাপনের চেষ্টার অকৃতকাৰ্য্যতা, ইত্যাদি ব্যাপারে এ দেশের লােকের মন ভারতবর্ষের প্রতি অত্যন্ত অপ্রসন্ন ও বিরূপ হইয়া উঠিয়াছে। উপস্থিতক্ষেত্রে সকলের সহিত ঘনিষ্ঠভাবে মেশার সুবিধা নাই। এরূপ ব্যাপার স্বাধীনতাপ্রয়াসী সকল জীবের মধ্যেই আছে, সকল যুগে হইয়াছে ও হইবে। এ কথা বুঝাইবার চেষ্টা ভারতহিতৈষী মাত্রেরই করা উচিত। যথাসাধ্য এ বিষয় চেষ্টা করিতেছি, ফল কি হইবে তা ভগবানই জানেন। মনে হয় এত কষ্ট করিয়া বিদেশে আগমনের মুখ্য উদ্দেশ্য এই সকল অবস্থা যথাযথভাবে বুঝানর চেষ্টা। যাহার। শাসনকার্যে লিপ্ত তাহাদিগকে বুঝিতে হইবে যে এক হাতে তালি বাজে না। চিরদিন তাহাদের এই কর্তব্য অক্ষুন্নভাবে বজায় থাকিতে পারে না সময় থাকিতে হিসাবমত প্রয়ােজনীয় পরিবর্তন করিলে সকল দিক রক্ষা পায়। সাম্যবাদী স্বাধীনতাপ্রয়াসী লিবারলদলের এই কথা এবং আমাদিগকে এই মতের অনুযায়ী কথা কহিতে হইবে এবং কাৰ্য্য করিতে হইবে। রাউণ্ডটেবল কনফারেন্স যা পারে তা করুক। জেনেভার কাজের যে ভার আমি পাইয়াছি তা পালন করিবার অবসরে আমি মূলমন্ত্র লইয়াই কাজ করিয়া কথা কহিব। মরাল এডুকেশন কংগ্রেস-এর সেক্রেটারী মিঃ গুন্ডের সহিত দেখা হইল। প্যারিসে ২৩এ হইতে ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সভা হইবে।
জেনেভা-ভ্রমণ আমার উপস্থিত থাকা অসম্ভব। বিশেষতঃ এ সভার মধ্যেও পরস্পর যেরূপ বিবাদ উপস্থিত হইয়াছে তাহাতে সভায় উপস্থিত থাকাই উচিত। ১৮ বৎসর পূর্বে হেগে এই কনফারেন্সে, আমার যথেষ্ট প্রতিপত্তি হইয়াছিল, ঘনিষ্ঠতাও বড়িয়াছিল ; সেই জন্যই আমার মায়া, কিন্তু অকারণ বিবাদ-বিসংবাদের মধ্যে যাইতে আমার আর প্রবৃত্তি হয় না। ট্রাভলাস ক্লাবে জর্জ ফক্স পিটএর সঙ্গে দেখা করাতে এ সকল বিবাদের বিবরণ বিশেষ করিয়া পাইলাম। দেখিতেছি সকলের সঙ্গেই সকলেরই মতান্তর, বিবাদ ও বিদ্বেষ-কোথাকার ব্যাপার কতদূর গড়াইবে কে জানে? টেম্পারেন্স সভার প্রেসিডেন্ট লর্ড ক্লইড (Clwyd)এর সহিত রিফরম্ ক্লাবে ও তাহার সেক্রেটারী ফ্রেডারিক গ্রাবের সঙ্গে আরকব্রুক ও হ্যামপিক রােডে ওয়েমবেলড়ন পার্কে দেখা করিলাম। সুরা ও মাদক দ্রব্য বিরােধে আমরা এক্ষণে যে সংগ্রাম দেশে করিতেছি ইহারা তাহার বিশেষ সহায়ক। এসময় দাঙ্গা-হাঙ্গামার মধ্যে এ সাধুকার্যে ব্যাঘাতপড়িতেছে এসব কথা তাহাদিগকে বুঝাইলাম। আফিং- প্রভৃতি মাদকদ্রব্যের অবাধ বিক্রয় সম্বন্ধে জেনিভাতে আলােচনা হইবে। এ বিষয়ে আমার মত সরকার পক্ষের মতের নিতান্ত বিরােধী। যে কারণেই হউক, জেনিভা রাজসূয় যজ্ঞে আমার প্রতি মাদক নিবারণ-সম্বন্ধে বাদানুবাদের ভার পড়ে নাই। সরকার পক্ষের সহিত বিবাদ করিয়া যে ব্যক্তি লাট সাহেবের অনুবােধ সত্ত্বেও Licensing Boardএর সভাপতিত্ব ত্যাগ করিয়া ছিল—সকল সভ্যজাতির প্রতিনিধি বর্গের সম্মুখে সে বিষয়ের আলােচনার ভার এহেন ব্যক্তির উপর দেওয়া নিতান্ত নিরাপদ নহে, কর্তৃপক্ষ তাহা বুঝিয়াছেন। আমার প্রতি সেভার না পড়াতে আমিও নিশ্চিন্ত। ' বম্বে পথে Holloway বলিয়া একজন নূতন অভিনেতা New Theatre Richard III নাটকের অভিনয় করিতেছেন। নাম রক্ষার জন্য সে অভিনয় দেখিতে গিয়া ১৮ (আঠার) শিলিং জরিমানা দিলাম ও নিতান্ত হতাশ হইয়া ফিরিয়া আসিলাম। সেকালের রামযাত্রার মত চীৎকার ও তরবারির ঠোকাঠুকী। তবে সাজসরঞ্জাম দৃশ্যপটের যথেষ্ট উৎকর্ষ দেখলাম এবং অভিনয়ের সুবন্দোবস্ত ও বাড়িয়াছে। Stratford on Avonএ এবং Old Victoriaতে ১৯২১ সালে যে অভিনয় দেখিয়াছি তাহার মত সুন্দর নিখুঁত অভিনয় আর দেখিব না। Picadilly Circus এর মাঝখানে Eros এর যে মূর্তি ছিল তাহা উঠাইয়া দিয়া রাস্তা চওড়া করা হইয়াছে। লােকে তাহাতে নিতান্ত অসন্তুষ্ট হইয়াছে বলিয়া সে মূর্তি আবার পূৰ্ব্বস্থানে তুলিয়া আনিবার কথা হইতেছে লােক-মত অগ্রাহ্য করা এখানে অসম্ভব। কিন্তু একটা বিষয় লােকমতের দ্বৈধবশতঃ প্রাচীনপন্থীরা হটিতে আরম্ভ করিয়াছে। আমাদের দেশের ন্যায় এখানেও সেন্টপলের বড় গিরজার সামনে ও ট্রাফালগার স্কোয়ারের সামনে খােলা জায়গায় বিস্তর পায়রাকে লােকে নিত্য খাওয়াইয়া আনন্দ লাভ করে। লণ্ডন কাউন্টি কাউনসেল ঠিকাদার দিয়া সেই সব পায়রা ধরিয়া নষ্ট করিবার চেষ্টা করিতেছে। বৃন্দাবন ধামে বানর ধরা ব্যাপারে যেমন দুই দল হইয়া আমার পরিশ্রম ও চেষ্টা ব্যর্থ করিয়াছিল এখানেও সেইরূপ দুইদল হইয়াছে। সােমবার হইতে পায়রাধরা ও মারার সংগ্রাম আরম্ভ হইবে। পায়রা ধরিলে ও মারিলে লক্ষ্মী ছাড়েন, আমাদের দেশের প্রবাদ ও বিশ্বাস, একথা এখানে বলিবার ও বুঝাইবার লােক নাই বােধ হয় । পিকাডেলী সার্কাসে খুব নীচে দিয়া মাটীর তলদেশে ‘টিউব রেলওয়ে বহুদিন চলিতেছে। এখানে রাস্তা পারাপার হওয়া বড় কঠিন বলিয়া মাটীর তলাদিয়া পারাপারের রাস্তা (Causeway) ও ছিল। এবার ৪০ জেনেভা-ভ্রমণ দেখিলাম সেই রাস্তার চারিদিক জুড়িয়া বিস্তৃত একটা বাজার বসিয়াছে। বাজার যেন একটা ছােট নগর বলিলেও হয়। কত দোকান-পাট ও নগর সেই মাটীর-নীচে খােলা হইয়াছে তাহার সংখ্যা নাই। গাড়ী চাপা পড়ার ভয় নাই; কাজেই লােকে ধীরে সুস্থে সেখানে বাজার-হাট করিতে পারে—বেড়াইতে পারে। লণ্ডনে যাহা সম্ভব কলিকাতায় কাদামাটীর বনিয়াদের সহরে তাহা সম্ভব নয়--গঙ্গার তলা দিয় টনেল হইল না ; কলিকাতার রাস্তার তলায় টিউব রেলওয়ে হইল না। Sir Edwin Lutyns এর নকসার লণ্ডন কাউন্টা কাউন্সিলদের যে বাড়ী হইয়াছে তাহা দেখিবার যােগ্য Selfridge Gammage, Whitly, Harrod, প্রভৃতির ন্যায় আরও অনেক * store লণ্ডনে বাড়িয়াছে, দশ বিশটা হােয়াইটওয়ে লেডল (whiteaway Laidlaw) কোম্পানী এইসকল' কোম্পানীর পকেটে থাকিতে পারে। ইহাদের প্রকোপে ঘােট ঘােট দোকান সব মারা যাইতেছে। অথচ ভাল জিনিস ইহারা সস্তায় দেয়। এখন বিদেশীবর্জন যুগে ভারতবর্ষে এ সকল কোম্পানীর নামের কোন সার্থকতা নাই। কিন্তু ইহারা যে প্রণালীতে গরীর লােককে সস্তায় ভাল জিনিস দিবার চেষ্টা করিতেছে, সে চেষ্টা বৰ্তমান স্বদেশী-যুগে ভারতবর্ষে অভাব ; ইহা দুঃখের বিষয়। সকল দেশে যে দৈন্য ও অন্নসমস্যার হাহাকার উঠিয়াছে সুসভ্য ও সমৃদ্ধ বিলাতও তাহার হাত এড়াইতে পারে নাই। পৃথিবী প্লাবিয়া এই হাহাকার। শ্রমজীবী ও ধনীর নিত্যসংগ্রামে ধনী ক্রমশঃ হটিতেছে। তাহাদের প্রবর্তিত বিলাসিতা শ্রমজীবীদের আক্রমণ করিয়াছে। শ্রমজীবীরা চায় অল্প পরিশ্রম, অধিক রােজগার ও প্রভূত বিলাসিতা ; কাজেই মজুরী বাড়িয়া যাইতেছে-রাজনৈতিক ক্ষমতা ক্রমশঃ শ্রমজীবী- বম্বে পথে ৪১ *দের হাতে আসিতেছে। অন্যান্য সম্প্রদায়ের লােকেও তাহাদের সহিত যথেষ্ট সহানুভূতি দেখাইতেছে। কাজেই তাহাদের হাতে গভর্ণমেন্ট ( Government) আসিয়াছে। কতদিন সে ক্ষমতা থাকিবে তাহা বলা যায় না। কিন্তু এই বিলাসিতা-স্রোত আনিতেছে দারিদ্র্য ; সকলে রােজগার করিবার সুবিধা পায় না। সরকার হইতে তাহাদিগকে ভাতা ( dole) দিতে হয়, বসিয়া বসিয়া খাইতে পাইলে কে আর পরিশ্রম করিবে, জিনিষের দামও এই ভাতা দিবার ভার তাে দুষ্ট (vicious circle) চক্ররীতি-অনুসারে পড়িতেছে সেই শ্রমজীবীরই উপর। ধনীর দলও উৎস যাইতেছে। ট্যাক্স দিতে না পারার জন্য অনেক বড়মানুষ বসত বাড়ী দিয়া ভারাটিয়া বাড়ীতে অথবা হােটেলে বাস করিতেছেন। চৌরঙ্গীর অপেক্ষা ফ্যাসানের জায়গা Park Lane নামক স্থানে Duke of Devonshire এর মত বড়মানুয ও ইতিহাস প্রসিদ্ধ লােক সুরম্য বসত বাড়ী ভাঙ্গিয়া দিয়া ছােট ছােট ফ্লাট তৈয়ার করিয়া ভাড়া দিতেছেন। ফ্লাটের ভাড়া বৎসরে দু হাজার গিনি অর্থাৎ প্রায় ত্রিশ হাজার টাকা। বিলাসিতার শ্ৰেতি কোথায় গিয়া দাঁড়াইবে কে জানে ? Free Masons Hall (Great Queen Street Aldwych ) এবারও দেখিতে গিয়াছিলাম। Polytechnic Institute, Regent Streetএ Sir Kenyston Studd এর সঙ্গেও দেখা করিলাম। তিনি Lord Cornwallis এর সঙ্গে ভারতবর্ষে Grand Lcdge Deputationএ দুই বৎসর পূর্বে গিয়াছিলেন। তার পর লণ্ডনের লর্ড মেয়র হইয়াছিলেন, তাহারা যে সময় ভারতবর্ষে গিয়াছিলেন তখন eta Lodge Anchors and Hope 234 E. C.) 47 Master. আমাদের অভ্যর্থনায় এবং আমার অভিনন্দনে তাঁহারা বিশেষ প্রীত হইয়াছিলেন, সে কথা তাহাদের মনে আছে।
৪২ জেনেভা-ভ্রমণ সােমবার ৮ই সেপ্টেম্বর, ১৯৩০ এবার দশদিন মাত্র লণ্ডনে বাস হইল । আজ ১১-১৫ মিনিটের গাড়ীতে ভিক্টোরিয়া ষ্টেশন হইতে প্যারিস হইয়া জেনেভা যাত্রা করা হইল, স্যার ইওয়াট গ্রীভস (হাইকোটের ভুতপূৰ্ব জজ), স্যার ডেনিস ব্রে ভূতপূর্ব ভারত-সরকারের বৈদেশিক সেক্রেটারী (Late foreign Secretary to ihe Government of India ), স্যার জাহাঙ্গীর কয়াজী (প্রেসিডেন্সী কলেজের অর্থনীতিশাস্ত্রের Economics এর ) অধ্যাপক এবং আমি জেনেভা সভার সহযােগী এবং অদ্য সহযাত্রী। মালপত্ৰ পূৰ্ব্বে গিয়াছে, মহারাজা বীকানীরেরও সেক্রেটারী বাজপাই সাহেব প্যারিসে অপেক্ষা করিতেছেন, প্যারিসে তাহাদের সঙ্গে দেখা হইয়া একত্র যাওয়া হইবে। লণ্ডনে ছিল কেবল বােঝাপড়ার কাজ, তাহা শেষ হইয়াছে, অনেকের সঙ্গে দেখা করা হইল না। অনেক জায়গায় যাওয়া হইল না, অনেক জিনিস দেখা হইল না। এই অসম্পূর্ণ অবস্থাতেই আমার জীবনের আকাঙ্ক্ষা শেষ করিতে হয়। ১৯২১ সালে যখন লিটন মিটির কাজ শেষ করিয়া লণ্ডন ত্যাগ করি তখন মনে তাে ছিল না যে তৃতীয়বার ইংরাজ সাম্রাজ্যের রাজধানীতে আবার আসিব। বিধি- লিপি বলিয়া বাধা-বিঘ্ন-আপত্তি সত্ত্বেও আসিয়া না হয় কিছু দেখা হইল না—প্রারদ্ধবলে আবার যদি আসা হয় ভাল করিয়া দেখা যাইবে। ভগ্নস্বাস্থ্যের আপাততঃ উন্নতি হইয়াছে ইহাই যথেষ্ট; রেল, বাস, মােটর প্রভৃতিতে রাস্তা-ঘাট বিপদসঙ্কুল, ইহার মধ্যে ভগবৎকৃপায় যে দৌড়ধাপ কয়দিন ধরিয়া চলিতেছে তাহাতে পূর্বপরিচিত সকলেই আশ্চর্য হন, আমি স্বয়ং আশ্চর্য্য হই। প্রভাতচন্দ্র ও বধুমাতার সেবা-যত্নে সকল ক্লেশ ভুলিয়াছি, বাড়ী হইতে বাড়ীতেই আসা হইয়াছে, ইংরাজীতে ৪৩ • বােম্বে-পথে যাহাকে বলে Home to home, এ ঠিক তাই ; তাহাদের ছাড়িয়া যাইতে পুনরায় বাড়ী ছাড়িবার সময়ের মত ক্লেশ হইতেছে। প্রভাতচন্দ্রের সনির্বন্ধ ইচ্ছায় Oxford Circusএ গিয়া ছবি তােলনি হইয়াছে, ছবি দেখিয়া ভগ্নদেহ এ অধমকে চেনা দায় হইবে । চক্ষুর সহায়তার জন্য প্রকরণও সংগ্রহ হইয়াছে, যদিও কর্মক্ষেত্রে বিপত্তি- বাধা-বিঘ্ন অনেক, যথাশক্তি কৰ্ম্ম সমাধা করিবার চেষ্টা করিতেই হইবে। যে গরমে সমন্ত দেশ কষ্ট পাইতেছিল তাহা কমিয়াছে, মধ্যে মধ্যে বৃষ্টি হইয়া বেশ ঠাণ্ডা পড়িতেছে ; আসিবার সময় ইংলিশ চ্যানেল পার হইতে কিছুমাত্র কষ্ট হয় নাই, অাজ ডােভার (Dovar) ক্যালের পথে, কিরূপ হইবে তাহ। তিনিই জানেন যিনি সকল পথের নিয়ন্তা। • বুধবার ১০ই সেপ্টেম্বর ১৯৩০ আজ লীগ অব নেস এসেম্বলী মহাসভার প্রথম অধিবেশন হইল। বহুদিন হইতে এ সভার কথা শুনিয়া আসিতেছি। মহাযুদ্ধের পর সকল জাতিরই মনে হইল যে অকারণ দ্বন্দ্ৰবিবাদ রক্তপাতে কোন ফল নাই, যুদ্ধবিগ্রহে পৃথিবী ভারাক্রান্ত। বিজয়ী জাতিও এত দুৰ্বল হইয়া পড়ে যে তাহার পক্ষে পরাজয় অপেক্ষা জয় হানিকর, সন্ধিস্থাপনের পর সকলেরই চেষ্টা যে বিবাদবিসংবাদ আপােষে শালিসী দ্বারা মিটাইয়া লওয়া উচিত, সৈন্যবল রণতরীবল, আজকাল একজাতির অপেক্ষা আর একজাতি বাড়াইয়া চলিতেছে—দেশের ধনহানি যথেষ্ট তাহাতে হইতেছে। অতএব যুদ্ধবিগ্রহ বন্ধ করিয়া যথার্থ শান্তিস্থাপন করিতে পরস্পরের বােঝাপড়া ভাল করিয়া করিতে হইবে, সকল বিবাদের নিষ্পত্তি করিতে হইবে। এই উদ্দেশ্যে চুয়ান্নটা সভ্য জাতির প্রতিনিধি, প্রতিবৎসর জেনেভাতে একত্র হন ও সংবৎসর ধরিয়া যে সকল কথা উঠিয়াছে তাহার মীমাংসা করেন। ।
৪৪ জেনে-ভ্রমণ ভারতবর্ষ কোন বিষয়ে বাস্তবিক স্বাধীন না হইলেও জেনেভা রাজনীতি ক্ষেত্রে স্বাধীন এবং ভারতবর্ষের প্রতিনিধির অন্ততঃ এখানে সম্মান আছে। কাল সকালে লণ্ডন হইতে প্যারিস পথে এখানে আসিয়া পৌছিয়াছি, জেনিভা হ্রদের উপর প্রাসাদতুল্য হােটেলে বিষম খরচা দিয়া বিষম বাবুগিরির মধ্যে পড়িয়াছি। হোটেলের ঘর-বিছানা আসবাব-আয়ােজন দেখিয়া তাক লাগিয়া যায়। নানালােকের সঙ্গে দেখাশুনা আলাপ- পরিচয় হইতেছে। ভারতবর্ষের কাপড়ের আদর এখানেও যথেষ্ট হইতেছে। আমি ছাড়া স্বদেশী কাপড় আর কাহারও অঙ্গে নাই। কাজেই খাতির-যত্ন যথেষ্ট হইতেছে, পরস্পরের খানা দেওয়া, আদর ও আপ্যায়ন প্রচুর হইতেছে। তাহাতে খরচা বেশী হয়। ভারতবর্ষের লােকও এখানে কেহ কেহ আছেন, তাঁহারা যথেষ্টই অনুগ্রহ করিতেছেন। স্যার অতুল চট্টোপাধ্যায়ের ভ্রাতা শ্রীযুক্ত অমূল্য চট্টোপাধ্যায় ও ডাক্তার রজনীকান্ত দাশ এখানে কৰ্ম্ম করেন, তঁাহারা ও তাহাদের সহধর্মিনীরা যে কি যত্ন করিতেছেন তাহা বলিয়া শেষ করিতে পারিতেছি না। বাঙ্গালী ও হিন্দুস্থানী ছাত্র ও অধ্যাপক যথেষ্ট আছেন। তাহারাও আসিয়া দেখাশুনা করিতেছেন। ব্রিটিশ সামাজ্যের ফরেন সেক্রেটারী (Foreign Secretary) আর্থার হেণ্ডারসন, দক্ষিণ আফ্রিকার প্রধান মন্ত্রী জেনারেল হার্টজহগ ( General Hartzhog) লীগ অব নেশন্এর প্রাণস্বরূপ লর্ড রবার্ট সেসিল (Lord Robert Cecil) পার্লামেন্টের মেম্বর মিস লরেন্স, মিস উইলকিনসন, মিষ্টার বক্সটন, অষ্টিােন পণ্ডিত ঋষিতুল্য মসিয় গােটয়েটি ( Mr. Goitie) প্রভৃতির সঙ্গে ভারতবর্ষ সম্বন্ধে কথা নিত্য চলিতেছে, প্রথম হইতে আমার প্রতি নানা কাজের ভার অযাচিতভাবে অনেকে বথে পথে ৪৫ আসিয়া পড়িয়াছে। কাজ ও খানা প্রভৃতির মধ্যে হাঁটিয়া ও মােটরে করিয়া সহরে হ্রদের ধারে বেড়ানও যথেষ্ট হইতেছে। জেনিভা অতি প্রাচীন শহর। চজুর্দিকে উচ্চ আলপস পৰ্বতরাজি, মধ্যে হ্রদ, ভূস্বর্গ কাশ্মীরের সহিত ইহার তুলনা করেন, স্থানে স্থানে আমার দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউন দৃশ্য মনে পড়ে। ইউরােপের অন্যান্য সহরেরই মত বাড়ী ঘর-দ্বার, নূতন পুরাতন সহরে অনেক পার্থক্য আছে, নূতনের কাছে পুরাতনকে সতত হটিতে হইতেছে। ইউরােপের রাজনৈতিক হাঙ্গামা হইতে পরিত্রাণ পাইবার জন্য অনেকে এই স্বাধীন ক্ষুদ্র রাজ্যের আশ্রয় বহুবার লইয়াছেন। ফ্রাসের ভল্টেয়ার ও রুসসা, ইটালীর মুসােলিনী, ভারতবর্ষের শ্যামজী কৃষ্ণবৰ্ম ও মহেন্দ্র প্রতাপসিংহ এখানে আশ্রয় পাইয়াছেন, খৃষ্টিয়ান যাজক ক্যালনি ও নক্স এইখানে তাহাদের কীর্তিস্থাপন করিয়াছিলেন। গিবন এইখানে বসিয়াই তাহার অপূৰ্ব্ব, রােমের ইতিহাসের উপাদান সংগ্রহ করেন ও পুস্তক রচন শেষ করেন। এদিকে zenith ওমেগা প্রভৃতি ঘড়িওয়ালার বিজ্ঞাপনে ভারতবর্ষের সঙ্গে সম্পর্ক সৰ্ব্বদা মনে করিয়া দিতেছে, জেনেভার হ্রদ হইতে বেগবতী বােন নদী (Rhone) উৎপন্ন হইয়া ফ্রাসের ভিতর দিয়া প্রবল বেগে প্রবাহিত হইয়া সমুদ্রে পড়িতেছে, শিল্প ও বাণিজ্যের বহু বিস্তার না থাকিলেও কৃষিসাহায্যে লােকের বেশ চলিয়া যাইতেছে। বহুকাল ধরিয়া ভূগােল ও ম্যাপ মাত্রে যে সব দেশের পরিচয় ছিল এখন চুয়ান্নটা জাতির প্রতিনিধি প্রধান পুরুষদের সহিত চাক্ষুষ আলাপ হইল, পুনরায় ভূগােল পড়িবার প্রয়ােজন হইল। যে স্থানে মহাসভাক্স অধিবেশন সেখানে ধুমধাম ঐশ্বর্যের কোন চিহ্ন নাই, অতি সাধারণ ধরণেরও কোন আঁক-জমক-আড়ম্বর নাই বন্দোবস্ত ভাল ; নিশান-পতাকা নাই, বাজনা-বাদ্য নাই, Democratic • ৪৬ জেনেভা-ভ্রমণ ধরণের সব কাজ। ইতিমধ্যে সভাপতির আসন ও অভ্যর্থনা সম্বন্ধে ধূমধামের কথা হইয়াছিল, তাহাতেও কাহারও মত হয় নাই। ফ্রেঞ্চ ও ইংরাজী ভাষায় বক্তৃতা হয়। যাহার যে ভাষায় ইচ্ছা ও সুবিধা তিনি সেই ভাষায় বক্তৃতা করিতে পারেন। সঙ্গে সঙ্গে অদ্ভুত ক্ষিপ্রতার সহিত একজন বক্তৃতার অনুবাদ করিয়া শুনান। Loud speakerএর ব্যবস্থা অতি সুন্দর, ভারতবর্ষে এ চেষ্টা বিশেষ কৃতকার্য হয় নাই। এখানে Loud speaker এর সুব্যবস্থার জন্য এই বিস্তীর্ণ সভার সকল স্থানেই সকলের কথা শোনা যায় । আমাদের দলপতি মহারাজা বিকানীরকে একটা অংশিক সভা বা কমিটির সভাপতি করিবার চেষ্টা বিফল হইয়া গেল। ডাঃ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও বৈজ্ঞানিক স্যার জগদীশচন্দ্র বসু সম্প্রতি জেনেভাতে আসিয়া- ছিলেন, স্যার জগদীশ বিলাতেও গিয়াছিলেন। সোমবার ৮ই সেপ্টেম্বর লণ্ডন হইতে আসিয়াছি, আর সেখানে ফেরা হইবে কি না সন্দেহ। শ্বেতদ্বীপের শ্বেতযুগ প্রদেশের নিকট বিদায় লইবার সময় অনেক কথাই মনে হইল । চ্যানেল পার হইতে কিছুমাত্র কষ্ট হয় নাই, দীর্ঘ রেলপথের যাত্রাতেও অসুবিধা হয় নাই, Pullman কার ও Sleeping কারের বিলাসিতাতে ভ্রমণের সুখ খুব বাড়িয়া গিয়াছে। সােমবার বৈকালে প্যারিস পৌছিয়া যতদূর সম্ভব প্যারিসের রাস্তা-ঘাট ও বাড়ীগুলি আর একবার দেখিয়া লইলাম, নতর দাম ( Notre Dame) লুভর ( Louvre) টুলিয়ার গার্ডেন ( Tullier Garden ) Bastille Memcrial ( 6321767 129 কারাগার ছিল তাহার চিহ্নস্থান) ইত্যাদি পূর্বপরিচিত স্থান দেখিয়া সেন নদীর (Seine) ধার দিয়া (Champs Elyées) “সাজ, ইলীজ” বাগানের ভিতর হােটেলে প্যারিসীয় ধমণের খানা খাইয়া পূৰ্বস্মৃতি জাগরূক হইল। এক ভূতপূৰ্ব্ব হাইকোর্টের জজ স্যারইওয়াট গ্রীভ ও বম্বে পথে ৪৭ ভুতপূর্ব ফরেন সেক্রেটারী স্যর ডেনিস সুব্র সঙ্গে থাকাতে ফরাসী ভাষায় অজ্ঞতা জন্য বিশেষ কষ্টহইল না। Intellectual Co-operation to Paris Institute দেখিয়া আসিবার ইচ্ছা ছিল, কিন্তু তাহার বর্তমান অবস্থা শােচনীয় বলিয়া তাহা দেখিতে যাওয়া হইল না। এই প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ মঙ্গলের জন্য লীগ অব নেশনসে এবার চেষ্টা হইবে। অধ্যাপক ডাঃ কালিদাস নাগ এখন এখানে অাছেন। তিনি এ বিষয়ে চেষ্টা করিতেছেন। বৃহস্পতিবার ১১ই সেপ্টেম্বর ১৯৩০ আজ মহাসভার প্রকাশ কাজের প্রথমদিন। পৃথিবী হইতে যুদ্ধ- বিগ্রহ বাদ-বিসম্বাদ উঠিয়া যায় ও অপোষে সালিসীতে সকল বিষয়ের মীমাংসা হউক, সকল বক্তারই এই কথা। মনের কথা ইহা কাহার কতদূব তাহা ভগবান জানেন। উপস্থিত অবস্থায় ভারতবর্ষের এ, বিয়ে বক্তব্য কিছু নাই,—কেবল শুনিয়া যাওয়াই কাজ। ক্যানাডার স্তর রবার্ট বরছেন, ফ্রান্সের মােদিয়ে ব্রিয়ান এবং ইংলণ্ডের মিষ্টার হেণ্ডারসন আজকার সভায় প্রধান বক্তা। বরছেন ও হেণ্ডারসন ইংরাজীতে আধুনিক ধরণের সুন্দর বক্তৃতা করিলেন, কিন্তু মোসিয়ে ত্ৰিয়াল-এর ফরাসী বক্তৃতা সকলের উপরে গেল । পুরাতন প্রথামত হাত-পা নাড়া, অলঙ্কার-প্ৰাচুৰ্য্য ও ভাষার গাম্ভীৰ্য্য যথেষ্ট ছিল। সভাশুদ্ধ নােক ধন্য ধন্য করিতে লাগিল। ইংরাজীতে এ শ্রেণীর বক্তৃতা প্রথা লােপ পাইয়াছে। Loud Speaker সাহায্যে সকলের শুনিবার ব্যবস্থার সঙ্গে আর- এক নূতন ব্যাপার আজ দেখিলাম, ইংরাজীতে বক্তৃতা হইয়া যাইতেছে আর সঙ্গে সঙ্গে টেলিফোতে তাহার ফরাসী তর্জমা একজন টেবিলে ৪৮ জেনেভা-ভ্রমণ দল টেবিলে Telephone Rectriver সাহায্যে শুনাইতেছে। যাহার শনিবার প্রয়ােজন ও ইচ্ছা তিনি নিজের টেবিল হইতে টেলিফোন কানে তুলিয়া ধরিলেই ইংরাজী বক্তৃতার সুন্দর ফরাসীর অনুবাদ সঙ্গে সঙ্গে শুনিতে পাইতেছেন। বক্তার মঞ্চের ঠিক নীচে এক ক্ষিপ্ৰকৰ্ম্মকুশল অনুবাদক ইংরাজী হইতে ফরাসী ভাষায় অনুবাদ করিয়া মাইক্রোফেন (mycrophone) সাহায্যে সভায় মধ্যভাগের সকল টেবিলে ফরাসী অনুবাদ বিবৃত করিছেন অর্থাৎ ইংরাজী সমজদার শ্রোতার খাটী ইংরাজীতে বক্তৃতা শুনিতেছেন ঐ ঠিক একই সময়ে অপূর্ব ফরাসী অনুবাদ অত্যুন্নত শ্রেণীর টেলিফের সাহায্যে ফরাসী সমজদার ঐ ঠিক একই সময়ে ফরাসী ভাষায় সেই বক্তৃতা শুনিতেছেন। গত বৎসর International Labour Bureau সভায় এই ব্যবস্থা প্রথম প্রবর্তিত হয়—এবৎসর বহু উন্নতির সহিত সেই প্রথা League of Nations সভায় প্রবর্তিত হইয়াছে না দেখিলে ইহা প্রত্যয় হওয়া দুঃসাধ্য। যখন মঞ্চোপরি অন্য বক্তা ফরাসী ভাষায় বক্তৃতা করিবেন তখন ঠিক এই ভাবে ইংরাজী অনুবাদ সভাস্থগণের টেলিফোর চোঙ্গায় পৌছিবে। সভার ভিতর বক্ততা হইতেছে আর বাহিরে Radio gram সাহায্যে বক্তৃতায় দেশ বিদেশে ছড়াইয়া পড়িতেছে। সেই দিন বিকালে ভিন্ন ভিন্ন দেশে ঠিক একই সময়ে Radio gram সাহায্যে একই বক্তৃতা শােনা যায়। Reporter বা সংবাদপত্রের মুখাপেক্ষী করিতে হয় না। প্রয়ােজন হইলে পরদিনের সংবাদপত্রে পূর্বদিন প্রকাশিত Reportএর ভ্রম সংশােধন হইতে পারে। সেইরূপ যখন ফরাসী ভাষায় বক্তৃতা হইতেছে, ইংরাজী তর্জমা একজন টেলিফোতে শুনাইতেছে। এই অদ্ভুত ব্যবস্থার কথা পূৰ্ব্বে কাণে শুনিয়াছিলাম। আজ স্বচক্ষে দেখিলাম। ইউরােপে ও আমেরিকায় জ্ঞান-বুদ্ধি-বিস্তারের চেষ্টা যাহা হইতেছে তাহার আর ইয়ত্তা নাই।
সিলন দুর্গদ্বারে
শ্ৰীযুক্ত অমূল্যচরণ চট্টোপাধ্যায় ও তৎপত্নীসহ
সার দেবপ্রসাদ সৰ্বাধিকারী
* - *
-
-
লীগ অব নেশনের অধিবেশন গৃহ
No text on this page.
বােম্বে-পথে ৪১ মহাসভার কাজের মাঝে মাঝে সরকাঞ্চ-নিযুক্ত মােটর লইয়া সহর- ভ্রমণ, হ্রদের ধারে বেড়ান ও দর্শনীয় জায়গা সব দেখিয়া বেড়ানও হইতেছে। শ্ৰীযুক্ত অমূল্যচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের স্ত্রীর সহিত পরিচয় হইল। ডাঃ কালিদাস নাগক্ষে লইয়া পুরাতন তথ্যের আলােচনা অনেক হইল। ফরাসী লেখক রুসে যেখানে জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন, যেখানে বাস করিতেন, Calvin, Knox প্রমুখ ধৰ্ম্মযাজকদিগের যেখানে যেখানে কীর্তিস্তম্ভ রহিয়াছে, তাহা তন্ন তন্ন করিয়া দেখা হইল। Indian Legislative Assemblyর ভূতপূর্ব সভাপতি Sir Frederic Whyteএর মাতা গতবার তাহার লণ্ডনের হ্যাম্পষ্টেডের বাটীতে অনেক যত্ন করিয়াছিলেন। তিনি পাশের হােটেলে আছেন। তিনি বিশেষ যত্ন ও অপ্যায়ন করিতেছেন—বিলাতে ফিরিয়া গিয়া তাঁহার বাটিতে থাকিবার জন্য জেদ করিলেন। বিলাতে ভারতহিতৈষিণী যে সকল রমণী আছেন তিনি তাহাদের একজন। তাহার পুত্র এখন চীনদেশে সরকারী adviser-পদে প্রতিষ্ঠিত রহিয়াছেন। ভারতের প্রতি তঁাহার টান এখনও আছে। সােমবার ১৫ই সেপ্টেম্বর ১৯৩০ প্রত্যহ খানা ও পাটীর অত্যাচারে শরীররক্ষা দুষ্কর হইতেছে, অথচ এসকল ব্যাপার ছাড়িবার নয়। সভায় ও কমিটিতে বসিয়া যে কাজ সম্ভব এই সকল ব্যাপারে ভারতবর্ষের পক্ষে তাহা অপেক্ষা শতগুণ কাজ হয়। পৃথিবীর সকল জাতির প্রতিনিধির নিকট ভারতবর্ষের কথা খােলাখুলি রকমে এইসকল মিলনস্থানেই সম্ভব। যথাসম্ভব তাহা করিতেছি। ক্যানাডার প্রতিনিধিগণ নিকটস্থ Hotel Burgasisএ এক প্রকাণ্ড ভােজ দিয়াছিলেন। বৃটিশ প্রতিনিধিগণ এবং অন্যান্য ৫৩ জাতির ৪ জেনেভা-ভ্রমণ দলপতি ও তাহাদের পত্নীগকে নিমন্ত্রণ করিয়াছিলেন। ইংরেজ রমণীরা সকলে সমান সুন্দরী হন না—বিশেষতঃ আজকাল খাট ঘাঘরার উৎপাতে তাহাদের স্বাভাবিক রূপেরও লাঘব হইতেছে। ক্যানাডা, দক্ষিণ আফ্রিকা প্রভৃতি দেশের মেয়েরা পূর্বের মত দীর্ঘ সুশ্রী গাউন পরিয়া আসিয়াছিলেন, দেখিতে বড় সুন্দর। আজ সকলে যে যার উপাধির পরিচয়—মেডেল পরিয়া আসিয়া সভার শােভাবর্ধন করিয়া- ছিলেন। বাড়ীর লােকে এ বিষয়ে মনে করিয়া দেওয়া সত্ত্বেও আমার মেডেল আনা হয় নাই। নূতন বহুতর লােকের সহিত আলাপ-পরিচয় হইয়া ভারতবর্ষ সম্বন্ধে বিস্তর কথা হইল, গােলটেবিল বৈঠকে (Round Table Conference) যে সকল প্রতিনিধি আসিয়াছেন, তাহাদের অধিকাংশের দ্বারা কোন কাজ হইবে না ইহা অনেকেরই ধারণা। ভগবান জানেন কি হইবে। নানা কারণে আমার এ সকল কথাবার্তা বলা অসঙ্গত। বাঙ্গালী মুসলমান, হিন্দুস্থানী অনেক স্ত্রীলোকের সঙ্গে দেখা হইতেছে। তাহারা সকলে দিগ্ গজ পণ্ডিত কিংবা বক্তা কিংবা স্বধর্মচ্যুত তাহা নহেন। নিজ নিজ স্বামীর সাহচর্যের জন্য আসিয়াছেন ও কাজ চালাইয়া লইতেছেন। Fermey of voltaire নামক অদূরবর্তী গ্রামে আজ বেড়াইতে গিয়াছিলাম। প্রসিদ্ধ লেখক vottaire ফ্রান্সের উৎপাতে মাঝে মাঝে পলাইয়া এখানে প্রাণরক্ষা করিতেন এবং এইখান হইতে তাহার অনলবর্ষী রচনাবলী ফ্রাসের বিপ্লববাদে ইন্ধন যােগাইয়াছিল। রুমে এবং ভল্টেয়ার উভয়েই এই সুইজারল্যাণ্ডে বসিয়া ফ্রান্সের বিপ্লবকার্যে সহায়তা করিয়াছিলেন। প্রসিদ্ধ ইংরাজ ফবি বায়রন কিছুকাল জেনিভায় বাস করিয়াছিলেন। ৫৬ বৎসর পূর্বে হেয়ার স্কুলের শিক্ষকশ্রেষ্ঠ নীলমণি চক্রবর্তী মহাশয়ের বম্বে পথে, নিকট বায়রনের Prisoner of Chillon পড়িয়াছিলাম। “My hairs are grey but not with years’ এখনও কাণে বাজিতেছে। সেই Chillon দুর্গে Savoy রাজবংশীয় অত্যাচারী নরপতির হস্তে বন্দী Bonnivard যে নির্যাতন সহিয়াছিলেন, বায়রন অমর ভাষায় তাহা চিরস্মরণীয় করিয়া গিয়াছেন। Lake of Genevaর উপর বহুতর সুন্দর সহর ও গ্রাম আছে। ষ্টীমারে চাপিয়া সেইসকল সুন্দর সহর, গ্রাম ও মনােরম শৈলমালা দেখিতে দেখিতে দুর্গে পৌছিলাম । তন্ন তন্ন করিয়া দুর্গের সকলভাগ দেখিলাম। বন্দী বনিভার্ড ছয় বৎসর যে অন্ধকারে লৌহশৃঙ্খলে আবদ্ধ ছিলেন সেই গৃহের প্রস্তরস্তম্ভে বায়রন নিজের নাম ক্ষোদিত করিয়া দুর্গকে অমর করিয়া গিয়াছেন। হ্রদের উপর Fevityষ্ট, Montriou, Beri, Eviant, Lusanne প্রভৃতি সহর। স্যার জগদীশ বসু, রবিবাবু প্রভৃতি এখানে আসিয়া সৰ্ব্বদা বাস করেন। তাহাদের স্বাস্থ্য ও চিত্তবৃত্তি তাহাতেই এখনও এত ভাল আছে। যাহারা ক মীর দেখিয়াছেন তাহারা এই স্থানের সহিত তাহার তুলনা করেন। বায়রনের কবিতা Prisoner of Chillon পুনরায় পাঠ করিয়া তবে বিশ্রামলাভ করিলাম। শনিবার British and Dominions Universities Students Conferenceএ আহার ও বক্তৃতা করিবার নিমন্ত্রণ ছিল। প্রায় চল্লিশ মিনিট ধরিয়া বক্তৃতা করিয়া তাহাদের সন্তোষবিধান করিতে পারিয়াছি বলিয়া মনে হইল যত জায়গায় যাইতেছি, যত লােকের সহিত আলাপ-পরিচয় হইতেছে সে সকল বিষয়ে বিস্তীর্ণ বিবরণ লেখা অসম্ভব। মিটিংএ ৫৪ জাতির দলপতিদেরই বক্তৃতা হইতেছে। দক্ষিণ আফ্রিকা, কানাডা, ইংলণ্ড, ফ্রান্স ও জাৰ্মাণী প্রভৃতির বক্তৃতাই ভাল হইল। সকলেরই জেনেভা-ভ্রমণ মুখে এক কথা-“পৃথিবীতে শান্তি বিরাজ করুক’, “যুদ্ধ-বিগ্রহ উঠিয়া যাউক।” ফাক কথায় এ কথার মীমাংসা হইতে পারে না; কাজে কতদূর কি হয় দেখা যাউক। শীত ক্রমশঃ বেশ পড়িতেছে। সকল বিষয়েই বিশেষ সাবধান হইয়া স্বাস্থ্যরক্ষা করিতে হইতেছে। মঙ্গলবার ১৬ই সেপ্টেম্বর ১৯৩০ ক্রমশঃ শীত পড়িয়া আসিতেছে। যেদিন বৃষ্টি হয় শীত আরও বেশী হয়। বৃষ্টি না হইলে পরিষ্কার থাকিলে হ্রদের উপরের বাড়ীগুলি বড় সুন্দর দেখায়, তাহার পশ্চাতে দূরে আলগের পশ্চাতে আল্পস্ (Alps on Alps arise )। বহুদূরে Mount Blanc (ব্লাঙ্ক) (শ্বেত পৰ্ব্বত) দেখা যায়। শরতের নির্মল আকাশে এ পৰ্বত-শ্রেণীর শােভ অতি রমণীয় । দশী-বিদেশী বহুলােকের সেবা-যত্ন-আপ্যায়নে কোন ক্লেশ অনুভব করিবার অবকাশ পাইতেছি না। লাঞ্চ ‘ডিনার-পার্টি’র অত্যাচার হইতে বহুকষ্টে করযােড়ে সকলের নিকট মুক্তি চাহিয়া লইতেছি। যদিও ভারতবর্ষের পক্ষ হইতে করিবার কিছুই নাই তথাপি যেটুকু কাজ হওয়া সম্ভব তাহার ত্রুটি না হয় তাহার জন্য সর্বদা বিশেষ সতর্ক থাকিতে হয়। Assemblyর মিটিংএ সৰ্ব্বদা উপস্থিত থাকা, কমিটী কাজের জন্য প্রস্তুত হওয়া ও কাগজ-পত্র পড়াতেও অনেক সময় যায় ও পরিশ্রম হয়। সবদিক্ বাঁচাইয়া স্বাস্থ্যরক্ষার চেষ্টার কিছুমাত্র ত্রুটী হইতেছে না, তাহার ফলে ভাল আছি। বাড়ীছাড়া হইয়া ঔষধ স্পর্শও করি নাই, খাওয়া, ঘুম, হজম খুব হইতেছে। • হােটেলের রাজভােগের ' খাওয়া অনেক বাদসাদ দিয়া যাইতে হয়, পরিশ্রমের চোটে এক-একদিন ১২ ঘণ্টাও ঘুম হয়। কোন কোন দিন বিশেষ রাত্রের, খানা কিংবা পাটীর । বম্বে পথে, পর ঘুম হয় না। বিছানায় বসিয়া কাজ করি কিংবা পড়ি। কথাবার্তায়, কাজে-কর্মে পড়া-শুনায় ও ভ্রমণে সময় শীঘ্র কাটিয়া যাইতেছে। মহাসভার নিয়ম হইতেছে প্রত্যেক জাতির পক্ষ হইতে এক-একজন দলপতি স্বরূপে সাধারণভাবে Assemblyর প্রকাশ্য মিটিংএ বক্ততা করিবেন। আমাদের দলপতি স্বরূপই আজ মহারাজা বিকানীর বক্তৃতা করিবেন, তাহার লম্বা-চৌড়া চেহারা, সৈনিকোচিত ভঙ্গী, গলার গম্ভীর আওয়াজ সুখ্যাতি অর্জন করিল। দলস্থ সকলে মিলিয়া বক্তৃতা তৈয়ারী জাহাজ হইতেই হইতেছিল। লণ্ডনে ও এখানে সরকার-পক্ষ হইতে তাহার তদারক হয়। মহারাজা বক্তৃতা বেশ আরম্ভ করিয়া লইয়াছিলেন। কাগজ না দেখিয়া বেশ সুন্দরভাবে বক্তৃতা করিলেন। সকলেই অজস্র প্রশংসা করিল। আমরা আপ্যায়িত হইলাম । চীন, জাপান ও শ্যামদেশের প্রতিনিধির বক্তৃতা সুন্দর হইয়াছিল। ইউরােপের শ্বেতজাতিদল যাহাতে এসিয়ার জাতির উপর অত্যাচার- অনাচার না করিতে পারে এই মর্মে সকলেই বক্তৃতা করিলেন, ভারতের পক্ষে বক্তৃতার অর্থও তাই, পরস্পরের বােঝা-পড়া ক্রমশঃ বাড়িয়াছে, ভাল ফল হওয়া সম্ভব। বুধবার ১৭ই সেপ্টেম্বর, ১৯৩০ আজ এসেম্বলীর Primary Meetingএর শেষ দিন। এইবার কমিটীর কাজ আরম্ভ হইবে। তিন সপ্তাহ এই কাজ চলিবে। League of Nationsএর সাধারণ প্রকাশ্য বক্তৃতা অপেক্ষা কমিটির কাজ অধিক প্রয়ােজনীয়। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সুনীতি, শিশুমঙ্গল প্রভৃতি বিষয়ে কমিটিতে আমার প্রতি কাজের ভার পড়িয়াছে—ভারতবর্ষের ছয়জন মেম্বরের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন কাজের ভাগ করিয়া লওয়া হইয়াছে।
৫৪ জেনেভা-ভ্রমণ অন্যান্য জায়গার মত এখানেও ‘কাউনসেল’ আছে এবং কাউনসেল ও অন্যান্য ইলেকসান’ লইয়া বিবাদ-বিসম্বাদ হয়। যেখানে খানা, পাটী প্রভৃতি চলিয়াছে সেখানেও এই ইলেকসনের প্রচণ্ড আন্দোলন বৃটিশ সাম্রাজ্যের মন্ত্রী এবার আয়ারল্যাণ্ডের কাউনসেলে প্রবেশের সমর্থক। ভারতবর্ষ স্বতন্ত্র-শাসন-প্রণালী পায় নাই বলিয়া আমাদের কাউনসেল-প্রবেশের যাে নাই। চীন এতদিন কাউনসেলে ছিল। তাহার সময় উত্তীর্ণ হইয়া গিয়াছে। চীনদেশ পুনরায় এ অধিকার পাইবার চেষ্টা করিয়া কৃতকাৰ্য্য হইল না—ইহাতে চীন ক্ষুন্ন। ইউরােপের বাহিরে সব জাতিই তাহাতে ক্ষুন্ন। ইউরােপের জাতিদিগকে কোন বিষয়ে আঁটিয়া উঠা দুঃসাধ্য, যাহাহউক, ক্রমশঃ উন্নতির আশায় সকলকে ধৈৰ্য্যধারণ করিয়া থাকিতে হইবে। কাল রাত্রে বিষম ঠাণ্ডা পড়িয়াছিল। ঠাণ্ডা যদি ক্রমশঃ এইরূপ বাড়ে, বিলাত ফিরিয়া যাইবার কল্পনা ত্যাগ করিতে হইবে। দুইদিন পূর্বে রাত্রে হােটেলে একজন মেম্বরের ঘরে পিস্তল লইয়া চোর ঢুকিয়াছিল। ভাল-মন্দ সকল শ্রেণীর লােক এখন জেনেভায় আসিয়া ইহা কাশীধামের তুল্য করিয়া তুলিয়াছে। দরজা বন্ধ করিয়া শুইবার প্রথা এখানে নাই। নানাস্থান ঘুরিয়া শ্রাবণ মাসের পঞ্চপুষ্প “স্মৃতিরেখ।” লইয়া আসিয়া পৌছিয়াছে। রাধানগরের বামুনপাড়ার বাল্য-স্মৃতিকথার সঙ্গে সঙ্গে আধুনিক সাংসারিক চেষ্টায় সামাজিক ও রাজনৈতিক স্মৃতি জাগরিত হইয়া উঠিল । Legislative Assemblyর মেম্বর শ্রীযুক্ত ক্ষিতীশচন্দ্র নিয়োেগী বিলাত যাইবার পথে আজ এখানে আসিয়া পৌছিয়াছেন। তাহারও নিকট কোন কোন গুহ কথা শুনিলাম। ভারতবর্ষের নিয়তি কোন্ পথে " যাইতেছে, কোথায় যাইবে, বম্বে পথে আমাদের ইহাতে কৰ্তব্য কি, আমার নিজের কর্তব্য কি, নিশিদিন ভাবিয়াও স্থির করিতে পারিতেছি না। এই মহাসভায় কত লােকের সঙ্গে কত কথা হইতেছে। তাহাতে ধাঁধ। বাড়িতেছে বই কমিতেছে । ভগবান বল দিন, পথ দেখাইয়া শান্তি দিন। শুক্রবার ১৯ সেপ্টেম্বর ১৯৩০ পূৰ্ববৃত্তান্তে লিখিয়াছি যে আপাততঃ লীগ এ্যাসেমব্লির সাধারণ প্রকাশ্য মিটিং স্থগিত আছে, উপস্থিত চুয়ান্ন জাতির প্রতিনিধিগণের পক্ষ হইতে প্রতি জাতির মধ্যে এক একজন প্রকাশ্য সভায় বক্তৃতা করিবার পর সভা ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ের বিচার-জন্য ভিন্ন ভিন্ন কমিটির উপর ভর দিয়াছেন। ভারতবর্ষের পক্ষে আমাদের দলপতি মহারাজা বিকানীর বক্তৃতা করেন, তাহার ভাষা, উচ্চারণ ও বক্তৃতা-ভঙ্গী সকলের সুখ্যাতি অর্জন করিয়াছে। শ্যাম, চীন ও জাপান-পক্ষের বক্তৃতাও সকলের সুখ্যাতি লাভ করিয়াছে। আশ্চর্যের বিষয় এই যে ইংরাজী কিংবা ফ্রান্সের ভাষায় ভারতবর্ষ, শ্যাম, চীন ও জাপানের প্রতিনিধিগণের বক্তৃতা সকলের অপেক্ষা ভাল হইয়াছে। M. Briand, Foreign Minister of France বিশ্ববিখ্যাত বক্তা, তঁহাদের কথা ছাড়িয়া দিলে এসিয়ার ৪ জন প্রতিনিধির বক্তৃতা সর্বাপেক্ষা ভাল হইয়াছে ; সকলেই মুক্তকণ্ঠে এ কথা স্বীকার করিলেন। এ্যাসেমীর প্রধান কাজ ছয়টা কমিটির সাহায্যে হয়। এই সকল কমিটিতে সকল বিষয় বিশেষভাবে বিচার হইয়া রিপাের্ট হইলে সেই সকল রিপাের্ট পরে পুনরায় এ্যাসেমীর প্রকাশ্য সভায় দাখিল হইয়া চূড়ান্ত বিচার হইবে। ভারতবর্ষের প্রতিনিধি ছয়জন ভিন্ন ভিন্ন ছয়টা কমিটির মেম্বর নিযুক্ত হইয়াছেন, আমি দ্বিতীয় ও পঞ্চম কমিটীতে আছি।
জেনেভা-ভ্রমণ দ্বিতীয় কমিটিতে আমার জিম্বার কাজ স্বাস্থ্য-সম্বন্ধীয় আলােচনা এবং ভিন্ন ভিন্ন দেশের মধ্যে ভাবের, সাহিত্যের, শিল্পের ও শিক্ষার আদান-প্রদান হইয়া লীগের উদ্দেশ্য কিসে সাধিত হয়, সকল জাতির মধ্যে কিসে সদ্ভাব স্থাপিত হইয়া জগতের মঙ্গল হয় ইহা অন্যতর আলােচ্য বিষয়। ইহার নাম Intellectual Co-operation- এ দুইটী অতি গুরুতর বিষয় স্বাস্থ্যসম্বন্ধে আলােচনা হইয়া গিয়াছে। সময় অল্প বলিয়া ভারতের পক্ষে প্রধান বিষয়গুলির উল্লেখমাত্র সম্ভব হইয়াছিল। বক্তৃতার সুখ্যাতি হইয়াছে ; আমি লিখিয়া সভাস্থলে বক্তৃতা পাঠ করি নাই; মুখে বলিয়াছিলাম ইহাতে অনেকে আশ্চৰ্য্য ও হইয়াছেন। পঞ্চম কমিটির কাজ কারাগারের কঠোর নিয়মসংশােধন এবং শিশু-মঙ্গল, সে দুইটা কাজও শেষ হইয়া গিয়াছে ; যাহা সাধ্য বলিয়াছি ও করিয়াছি। আসিয়া অবধি অনেকগুলি বক্তৃতা হইয়া গেল। কাজেই আরও বক্তৃতার জন্য তলব আসিতেছে, ক্রমে ক্রমে যথাসাধ্য কর্তব্য পালনে চেষ্টা করিতেছি। দ্বিতীয় ও পঞ্চম কমিটির বড় বড় কাজ এখনও অনেক বাকী আছে। প্রস্তুত হইতে পরিশ্রমও খুব হইতেছে। প্রস্তুত হইবার জন্য বহু লােকের সহিত আলাপ-পরিচয় ও আলােচনা প্রয়ােজন। তাহার জন্য অন্য লােকেও যেমন প্রায় প্রতিদিন খানা ও পাটী দিতেছে, আমরাও সেইরূপ তাহাদিগকে ফেরৎখানা দিতেছি। তবে স্বাস্থ্যের অনুরােধে বহুরাত্রের পাটীগুলা ক্রমশঃ বাদ দিতে হইতেছে। যাহাদের সঙ্গে এইরূপ দেখা-শুনা হইতেছে তাহাদের ভিতর ভারতবাসিগণের মধ্যে উল্লেখযােগ্য হইতেছেন—শ্ৰীযুক্ত অমূল্যচন্দ্র বম্বে পথে চট্টোপাধ্যায় ও তাহার স্ত্রী, ডাক্তার রজনীকান্ত দাস ও তাঁহার স্ত্রী (ইনি Russian Jew) পণ্ডিত শ্যামশঙ্কর, কলিকাতা হাইকোর্টের ভূতপূৰ্ব জজ শ্ৰীযুক্ত বিপিনবিহারী ঘােষ মহাশয়ের পুত্র ডাক্তার সুধীন্দ্র- নাথ ঘােষ, সত্যেন্দ্রনাধ গুহ, বেহারের তারিণী সিংহ, ডাক্তার সুরেশচন্দ্র ভট্টাচাৰ্য, মান্দ্রাজের মিষ্টার রাও, ভারতবর্ষ হইতে সদ্য সমাগত শ্ৰীযুক্ত ক্ষিতীশচন্দ্র নিয়োেগী, এম-এল-এ। ইউরােপীয় ও আমেরিকার ভদ্রলােক ও মহিলাগণ ও বিস্তর সাহায্য করিতেছেন। British and Dominion University Students' Conferenceqp feta জড (Judd) মিষ্টার পুল, Moral Education Congressএর মিষ্টার স্পিলার, International Education Bureauর সেক্রেটারী এবং লর্ড রবার্ট সিসিল, মিষ্টার হেণ্ডারসন, মিষ্টার বক্সটন, ফরেন অফিসের অণ্ডার সেক্রেটারী মিঃ ডান্টন, মিঃ নােয়েল চেকার, ডবলিন ইউনিভারসিটির মিঃ বিঞ্চি, লাইডেন ইউনিভারসিটির আইন-অধ্যাপক প্রভৃতির নাম বিশেষ উল্লেখযােগ্য। সকলের নাম ও উপাধি মনে করিয়া রাখা অসম্ভব, জিজ্ঞাসা করাও অভদ্রতা। বিশ্ববিশ্রুত বহু মহাজনের সমাগমে নূতন মানসিক শক্তি, আনন্দ, কুতূহল ও অভিজ্ঞতা সঞ্চার হইতেছে। স্বাস্থ্য ভগবৎ কৃপায় এখনও ভাল আছে। এ সম্বন্ধে প্রিয়জনের চিন্তার কারণ জন্মে নাই। গুরুতর পরিশ্রমের মধ্যে বেড়ান, স্বভাবের শােভাদর্শন প্রভৃতিও বন্ধ থাকিতেছে না। আহার-ঔযধ দুই এইরূপভাবে চলিয়াছে। আমাদের সহযােগী হাইকোর্টের ভূতপূৰ্ব জজ স্যর ইউয়ার্ট গ্রীভ তাহার ভগিনীর বিষম পীড়ার জন্য গত শুক্রবার লণ্ডনে গিয়া মঙ্গলবার আসিয়াছিলেন। ভগিনীর অবস্থা অত্যন্ত খারাপ হইতেছে বলিয়া তিনি কাল একেবারে চলিয়া যাইবেন তাহার জায়গায় ভূতপূৰ্ব জজ ও সেক্রেটারী অব ষ্টেটের কাউনসেলের মেম্বর স্তর বসন্ত জেনেভা-ভ্রমণ মল্লিক প্রতিনিধি হইয়া আসিতেছেন। স্যার ইউয়ার্ট গ্রীভস বিশেষ যত্ন ও আত্মীয়তা করিতেছিলেন। তাঁহার যত্নে কোন কষ্ট বা অসুবিধাই জানিতে পারিতেছি না। আমাদের ফেরৎ যাইবার জাহাজের সংবাদ কিছু পাইতেছি না। এখানকার কাজ শেষ হইলে সাধারণত আমাদের বিলাত ফিরিয়া গিয়া রিপাের্ট লেখার সাহায্য করিবার কথা; কিন্তু শীত ক্রমশঃ অধিক পড়িবে। রিপাের্ট লেখা সম্বন্ধে আমাদের বিশেষ কোন কাজ নাই। Imperial Conference Round Table Conference47 হাঙ্গামার জন্য এখন বিলাতে কাহারও সঙ্গে দেখাশুনা কিংবা কথাবার্তার বিশেষ সম্ভাবনাও কিছু নাই। এইসকল কারণবশতঃ ১০ই কিংবা ১৭ই অক্টোবর মাসেলস হইতে জাহাজের জন্য চেষ্টা করিতেছি। এখনও সংবাদ পাওয়া যায় নাই। জাহাজ না পাওয়া গেলে কাজেই বিলাতে অল্পদিনের জন্য ফিরিয়া যাইতে হইবে। ২২শে সেপ্টেম্বর, সােমবার। গতকল্য (রবিবার) জেনিভা হইতে ৭০ ৮০ মাইল দূরে সামােনে ডি মন্ট ব্লাঙ্ক (Chamoni D' Mont Blanc) নামক অপূৰ্ব পার্বত্য প্রদেশে বেড়াইতে গিয়াছিলাম। পূৰ্ব্বাম্নে ঝড়-জল বজ্রপাত যথেষ্ট হইয়াছিল , পূৰ্ব্ব-ব্যবস্থামত রবিবার যে সামােনিতে যাইতে পারা যাইবে তাহা কোনমতেই মনে করিতে ভরসা হয় নাই; কিন্তু সকালে দুৰ্যোগ কাটিয়া খুব বােদ দেখা দিল অতএব যাইবার কোন অসুবিধা হইল না। শ্ৰীযুক্ত অমূল্য চট্টোপাধ্যায় ও তাহার স্ত্রী লুচি, আলুর দম, বেগুন ভাজা সংগ্রহ করিয়া লইয়াছিলেন। বহুকাল পরে দেশী খাওয়ায় আপ্যায়িত হইলাম। পথে চা, কফি প্রভৃতির আয়ােজনও হােটেলে ছিল। যাহা দেখিলাম তাহাতে ক্ষুধা-তৃষ্ণা সব দূর হইয়া গেল।
বম্বে পথে অনন্যমনা হইয়া স্বভাবের অপূৰ্ব্ব শােঙ দেখিয়া মুগ্ধ, চমৎকৃত ও স্তম্ভিত হইলাম। পার্বত্য : উপত্যকা অনেক দেখিয়াছি, এমনটা দেখি নাই। উপত্যকার উভয়পার্শ্বের আকাশস্পর্শী পাহাড় ; উপত্যকার মাঝখানে আভার (Aver) নদী খরবেগে বহিয়াছে। পাইন (Pine), ওক (Oak) প্রভৃতি গাছে পাহাড়ের গা ঢাকা। পাহাড়ে অনেক ছােট বাড়ী ও হােটেল আছে । গ্রীষ্মকালে ইউরােপের সকল জায়গা হইতে লােক আসিয়া এইসকল বাড়ী ও হােটেলে বাস করে। উপত্যকা হইতে ফুনিকুলার রেলওয়ে ( Funicular Railway) অর্থাৎ তারে ঝােলা রেলওয়েতে এই সকল পাহাড়ে উঠিতে হয়। সিমলার মালগুদামের কাছে ও দার্জিলিংএ Sanitarium এর নীচে ময়ল। ফেলিবার ও মাল তুলিবার জন্য এইরূপ তারের ঝােলান রেলের ব্যবস্থা আছে ; উহা অতি মােটামুটি রকমের ; এখানে এরূপ “রােপ”—রেলপ্রণালীর চরম উৎকর্ষ দেখা যায় এবং ইহাই পৃথিবীর সৰ্বোচ্চ “রােপওয়ে”। গ্রীষ্মকালের অপেক্ষা দারুণ শীতের সময় এইসব জায়গায় শীতের খেলার (winter sports ) জন্য বহুলােকের সমাগম হয়। সকল পাহাড় বরফে আবৃত—উপত্যকা-অধিত্যকা সব বরফে আবৃত--সেই বরফের উপর স্কেট, সী ( Ski ), Tabbagon Sledge প্রভৃতি খেলার জন্য বিস্তর লােক আইসে। গাইড বা পথপ্রদর্শকের সাহায্যেও পাহাড়ে উঠিতে গিয়া সময়ে সময়ে কেহ কেহ প্রাণ হারায়, এইরূপে অনেকবার বিশেষ ভয়াবহ ব্যাপার ঘটিয়াছে। Funicular Railway তে উঠিতে বিশেষ কোন বিপদ নাই। সময় অভাবে তাহা হইল না। কিন্তু যাহা হইল তাহা Punicular Railway অপেক্ষা চমৎকার। পূৰ্ব্বে খরস্রোতা আভার নদীর কথা বলিয়াছি। জেনিভা হ্রদ হইতে বােন নদী ফ্রান্সের ভিতর দিয়া বহিতেছে। হ্রদের বিপরীত জেনেভা-ভ্রমণ পাড়ের উচ্চ পর্বতরাজির গ্লেসিয়ার (Glacier) অর্থাৎ বরফের সমতল পাহাড় গলিয়া রােন নদীর উৎপত্তি। সেই নদী হইতে জেনিভার লাকমান হ্রদের উৎপত্তি এবং সেই হ্রদ হইতে বাহির হইয়া বােন নদীর গতি ফ্রান্সের ভিতর দিয়া বহিতেছে। প্যারিস হইতে আসিবার সময় রেলের ধারে এই নদীর গতি প্রাতঃ সূৰ্য-কিরণে প্রতিফলিত দেখিয়া আনন্দ উথলিয়া উঠিয়াছিল। জেনিভার অদূরেই যােন নদীর নীল জল ও আভার নদীর সাদা জল মিলিয়া ত্রিবেণী-সঙ্গম সৃষ্টি করিয়াছে। সিমােনা পৰ্বতের গ্লেসিয়ার গলিয়া আভার নদীর উৎপত্তি হইয়াছে। আমরা সিমােনার উপত্যকার ভিতর দিয়া কতবার আভার নদীর পারাপার হইলাম বলিতে পারি না, কখন এ পারে, কখন ও পারে, কখন পােলের উপর দিয়া নদী পার হইতে হইতে সমস্ত দিন উপত্যকা দিয়া আভার নদীর শােভা দেখিতে দেখিতে গমন ও প্রত্যাবর্তন করিলাম—গাছে ঘাসে, ফুলে ফলে, লতায় পাতায় লতাকুঞ্জে উপত্যকা স্বৰ্গশােভা ধরিয়াছে। ছােট বড় নগর, গ্রাম, সহর তাহার পাহাড়ের গায়ে এবং উপত্যকার উপর রহিয়াছে, রেলওয়ের বড় কারখানা এখানে আছে। পশু পক্ষীর খেলা সহরের ‘মেলা’-পথের ধারে অজস্র দেখা যায়, লােকে আমােদে এবং কর্মে নিত্য সমভাবে ব্যস্ত। কৰ্ম্ম সাফল্যের ইহাই প্রকৃত মূলমন্ত্র। এক-একটা নগর, সহর, গ্রাম, গণ্ডগ্রাম ছাড়িয়া ক্ষেতের, মাঠের, ও বাগানের যে শােভা তাহা কখনও দেখি নাই- দেখিবও না। পাহাড়ের মাথার উপর তুর পড়িয়া জমিয়াছে দেখা যাইতেছে। তাহার উপরের পাহাড়েও সেইরূপ তুষার জমিয়া বরফ পড়িয়া আছে। যেন বহতা নদী হঠাঃ, জমিয়া গিয়া জলের নদীর পরিবর্তে বরফের নদী হইয়া অনন্তকাল পড়িয়া আছে—আমাদের যেমন মাটী-পাথর, ।
বম্বে পথে গাছ-পালার পৃথিবী—এই গ্লেসিয়ার যেন জমা জলের নিরেট বরফের পৃথিবী। এইরূপ চারিধারে পাহাড়ের উপর পাহাড় তাহার উপর পাহাড় (Alps on Alps arise)। গ্রীষ্মের প্রখর উত্তাপে উপরে অংশটী অল্প অল্প করিয়া গলিয়া জল হইতেছে, সেই জল গড়াইয়া ক্রমশঃ ধীরে ধীরে, পরে বেগে—বহু বেগে নদীর আকার ধারণ করিয়া দেশ ভাসাইয়া চলিয়াছে। এই বরফের নদী কতদূর ব্যাপী তাহার ইয়ত্তা করা সহজ নয়। কোন কোন নদীর উৎপত্তি-স্থান নির্ণয় করিতে গিয়া আবিষ্কারকরা এই বরফ-নদী ধরিয়া উঠিতে উঠিতে প্রাণ দিয়াছেন এবং প্রতিবৎসর দিতেছেন। কখনও গঙ্গোত্রীর পথে যাওয়া হয় নাই—হইবার সম্ভাবনাও নাই। চৌদ্দ হাজার ফুট উচ্চ অমরনাথ উঠিয়া দেখার সম্ভাবনাও নাই। মােটর ও রেল সাহায্যে ৭,০০০ সাত হাজার ফুট উচ্চ আল্পস পর্বতের সিমােনিয়া গ্লেসিয়ার দেখিয়া সে সকল খেদ মিটাইতে হইল। পথে উচ্চ পাহাড়ে বনিয়া (Bosnia) গ্লেসিয়ার ও আর একটী গ্লেসিয়ার দেখিতে পাওয়া যায়, তাহার শােভা, মহিমা ও সৌন্দর্য বর্ণনা আমার সাধ্যাতীত। মেঘনিম্মুক্ত আকাশ সূৰ্যালােক প্রতিভাত এবং সূৰ্য্যালােক-বিচ্ছুরিত জমাট হিমানী-সমুদ্র উচ্চ দুই পর্বত চূড়ার মধ্যে যেন হীরক সমুদ্রের মত দেখাইতেছিল। সে জমাট বরফের সাগর উপত্যকার সমতল পৰ্য্যন্ত পৌছে না। যে পর্যন্ত যথেষ্ট শীতল সেইখানে তাহার জমাট আকার, যেখানে শৈত্যের অভাব সেইখানে পৌছিয়াই গলিতে আরম্ভ করে এবং গল্লিয়া হয় প্রস্রবণ-প্রস্রবণ হইতেই নদী। উপত্যকার সমতলদেশ হইতে এই দুই গ্লেসিয়ার বহু ঊর্ধে, সে পর্যন্ত ফুনিকুলার রেলওয়ে যায় না; অতএব নীচে দুর হইতে গ্লেসিয়ার- শােভা দেখিয়া তৃপ্ত হইতে হয়। কিন্তু সামেনি গ্লেসিয়ার পর্যন্ত পৌছিতে সুন্দর ব্যবস্থা আছে। সমুদ্র হইতে ৭,০০০ ফুট উচ্চে এই পৰ্বতরাজি—সচরাচর পাহাড়ে ৬২ জেনভা-ভ্রমণ উঠিবার যেরূপ রেল দার্জিলিং ও সিমলায় দেখা যায়, তাহার অপেক্ষা চওড়া রেলওয়ে সাহায্যে পাহাড়ে উঠিতে হয়, মাঝে মাঝে বড় বড় টানেল তাে আছেই আর রেলওয়ে রাস্তা নূতন ধরণের। এত উচ্চ পাহাড়ের খাড়াই অতিক্রম করিতে যেরূপভাবে রেলওয়ে পাতিলে সহজে গাড়ী যাইতে পারে, তত জায়গা এখানে পাওয়ার সম্ভাবনা নাই বলিয়া রেল খাড়া উঠিয়াছে। তবে মসৃণ রেলের উপর এত ভারী গাড়ী লইয়া যাওয়া বিপজ্জনক বলিয়া গাড়ীর চাকা ও রেল খাজ কাটা আছে। সেই খাঁজে খাঁজে গাড়ী ওঠে ও নামে এবং গাড়ী ও লাইন তাহাতে আটক থাকে। সামেনি পাহড়ের তলাতেই খুব শীত লাগিয়াছিল। গরম গেঞ্জি, ইজের, ওয়েষ্ট-কোট, ওভারকোট, গলা-বন্ধ, পাগড়ী, টুপি, হাত-দস্তানা সব চড়ান ছিল। পূর্ব হইতে সাবধান হইয়া এইসকল আয়ােজন করিয়া আনিতে হইয়াছিল। ছাতা-লাঠি তাে সঙ্গেই আছে। এই পাহাড় বেশে অমূল্যবাবু বার দুই ছবি তুলিয়া লইলেন। গরম কফি ইত্যাদি খাইয়া পাহাড়ে চড়িবার রেলে উঠিলাম। উঠিতে উঠিতে সিমলা পাহাড়ের গাড়ী উঠা মনে পড়িল—উপত্যকার ভিতর আভার নদী হেলিয়া দুলিয়া বঁাকিয়া চলিয়াছে। সামেনি সহর পাহাড়যাত্রীদের কৃপায় বেশ রীতিমত বড় সহর, তাহার বাড়ী-ঘর-দ্বারও খেলাঘরের মত দেখাইতে লাগিল-ক্ৰমশঃ অদৃশ্য হইতে লাগিল, একদিকে আকাশ- স্পর্শী আলপস্ (Alps ) পৰ্বতের উচ্চচুড়া—যেখানে গাছ পালা পর্যন্ত নাই—পাহাড় খাড়া উঠিয়াছে। আর একদিকে অতল খাদ—নীচে চাহিতেও মাথা ঘুরিয়া যায়, মাঝে মাঝে বিশাল বিকট অন্ধকার টানেল, পাহাড় ভেদ করিয়া কাটা। সকল সময় তাহার ভিতর যাইতে আলােও জ্বলে না। পাশের মানুষ দূরে যাউক, নিজের হাতের আঙ্গুল চোখের কাছে আনিয়াও দেখা যায় না। ইঞ্জিনের পেট্রোল ধোয়া দীর্ঘ বম্বে পথে পথে টানেল হইতে বাহির হইবার পথ না পাইয়া ঘুরিয়া ফিরিয়া কষ্ট দেয়, গাড়ীর পরদা ফেলিয়া আঁটীয়া ধরিয়া রক্ষা পাইতে হয় । ১৯২১ সালের ইউরােপ যাত্রায় বাইশ মাইল দীর্ঘ সামগপ্লান টনেল (Simplon Tunnel)এর ভিতর দিয়া সুইজারল্যাণ্ড হইতে ইটালী যাইবার সময় এত কষ্ট হয় নাই। উঠিতে উঠিতে পাহাড়ের গায়ে পাথরের ও গাছের ভিন্ন ভিন্ন বেল্ট (Belt) স্তর’এর বন্ধন লক্ষ্য হইতে লাগিল। ৭,০০০ ফুট:খাড়াই হইতে মাটী, জমি, পাথর, গাছ, ঘাস, লতাপাতা সবেরই প্রভেদ দেখা যায়। উঠিতে উঠিতে Mere de glace Mont Blanc মেয়ার ডি গ্লাস মন্ট ব্ল্যাঙ্কের শােভা ও ঐশ্বৰ্য্য দূর হইতে দেখা যাইতে লাগিল। জগন্নাথদেবের মন্দির-চূড়ার দূর হইতে ধ্বজা দর্শন পাইলে ভক্ত যাত্রীদল যেমন ভক্তিগদগদ চিত্তে জয় জগন্নাথকি জয় বলিয়া জয়ধ্বনি করিয়া উঠে এখানকার যাত্রীরাও সেইরূপ জয়ধ্বনি—আনন্দ কৌতুহল ও বিস্ময়মিশ্রিত কোলাহল করিতে লাগিল। এদেশের লােক সর্বত্র সর্বদা সৰ্ববিষয়ে জগন্নাথ দেখিতে এখনও শিখে নাই, কাজেই জয় জগন্নাথ- জীকি জয় না বলিয়া একটা বিশাল আনন্দ-কোলাহল মাত্র সৃষ্টি করে। দুই অত্যুচ্চ পর্বতরাজির মধ্য দিয়া কোন অতীত যুগের বিশাল জলরাশির প্রবাহ হঠাৎ যেন জমিয়া গিয়া স্থগিত হইয়াছে। যুগ- যুগান্তর ধরিয়া এই বিরাট জমাট বরফ সমুদ্র পড়িয়া আছে, তাহার শেষ সীমা অপেক্ষাকৃত উষ্ণ উপত্যকার সমীপবর্তী হইলে অল্পে অল্পে সেই বরফরাশি গলিয়া নদীর আকার ধারণ করিয়া জগতের হিতসাধন জন্য যুগ-যুগান্তর ধরিয়া আত্মােৎসর্গ করিতেছে। নড়ন চড়ন নাই—বিরাম নাই, আলস্য নাই। কোথায় সে ভাবুক কবি, শিল্পী,কথা-সাহিত্যিক বিরাট মূর্তির যথাযথ বর্ণনা দূরে যাউক সম্যক ধারণাও করিবে ? যে এই ৬৪ জেনেভা-ভ্রমণ পাহাড়ের চূড়ার উপর নূতন তুষার পড়িয়াছে ও পড়িতেছে, জমিতেছে, গলিতেছে ; গলিয়া বরফ-সমুদ্রের উপর আসিয়া পড়িয়া গড়াইয়া যাইতেছে—আবার বরফের সঙ্গেই জমিয়া যাইতেছে। উপর উপর যাহা গলিতেছে তাহাই ধীরে গড়াইয়া নীচে উপত্যকার দিকে অগ্রসর হইতেছে—তাহার বেগ নাই—চাঞ্চল্য নাই—যেন সে বিরাট জমাট সমুদ্রের উপর চাঞ্চল্য প্রকাশ করিতে লজ্জিত। যখন এই সমুদ্র হঠাৎ জমিয়া গিয়াছিল, তখন হইতেই জমা অবস্থাতেই উহা চিরন্তনকাল রহিয়া গিয়াছে। সমতল ক্ষেত্র হইতে জমাট বরফসাগর তিনতলা চারতলা বাড়ীর মত উচ্চ, কোথায়ও বা ছােট পৰ্বতের মত উচ্চ। স্থিরনেত্রে দেখিলে মনে হয় যেন বিশাল চিত্রপটে কো : নিপুণ শিল্পী বিশাল তুলিকা সাহায্যে বিশাল সমুদ্র আঁকিয়া বিছাইয়া রাখিয়াছে। এই বিশাল চিত্র যুগ-যুগান্তর হইতে ভূলুণ্ঠিত হইয়া উচ্চ পর্বতশ্রেণীর মধ্যদেশ সুশােভিত করিয়া রাখিয়াছে ; প্রলয় বিষাণ বাজিলেই প্রলয়বেগে এই পুঞ্জীভূত তুষার দ্রব হইয়া বিশ্বগ্রাস করিবে। “দেশ ভেদে কাল ভেদে বিশ্বনাথের এই বিশ্বরূপ দর্শন করিয়া আকুলহৃদয়ে তাহার রাতুল চরণতলে লুটাইয়া পড়িলাম—লােকসঙ্গ তখন ভাল লাগিল না, সঙ্গীরা অনেকে দূরে পড়িয়াছেন—যিনি শেষ পৰ্য্যন্ত সঙ্গে ছিলেন তাহা হইতে দূরে গিয়া ধীরে ধীরে একটা পাথরের উপর বসিয়া পড়িলাম। প্রাণ-মন-হৃদয় বিশ্বদেবের চরণতলে লুষ্ঠিত করিয়া বহুকাল পরে তাপক্লিষ্ট মন অপূর্ব অনুভূতিতে ভরিয়া গেল। মহাসমুদ্রতটে পৰ্বতশিখরে পার্থিব আয়ােজন সাহায্যে পিতৃমাতৃ-গুরুজন-প্রিয়জনের তৰ্পণ করিয়াছি—করিয়া তৃপ্তি পাইয়াছি। যে সব অমর আত্মার সান্নিধ্য-অনুভূতি পুরীতে, হরিদ্বারে, সেতুবন্ধ
;
সামােনি ডি মূণ্ট ব্লাঙ্ক তুষার সমুদ্রতীরে
শ্রীদেবপ্রসাদ সৰ্বাধিকারী
No text on this page.
বম্বে পথে এবং মধ্য-আফ্রিকার ভিক্টোরিয়া জলপ্রপাত সান্নিধ্যে পাইয়াছি—পাইলাম আজ তাহা এই বিশাল তুষার-সমুদ্রের কূলে। তর্পণের দাবীদার আজ আর একজন বাড়িয়াছেন-বংশের, পরিবারের ও আমার . চিরহিতৈষী আত্মীয়প্রবর শ্ৰীযুক্ত যদুনাথ চটোপা- ধ্যায়—আমাদের চিরদিনের সাধের চাটুয্যে মহাশয়” পূৰ্বভ্রমণ-কাহনীতে উল্লিখিত “কাশীর দাড়ীবাবা” ইহলােক ত্যাগ করিয়াছেন। এবার যাত্রার সময় রুগ্নদেহ লইয়া সূরি লেনের বাড়ীতে আসিয়া আশীর্বাদ করিয়াছিলেন—দুৰ্বলদেহ লইয়াও হাওড়ার ষ্টেশনে আসিয়া বিদায় দিয়া গিয়াছিলেন। তাহাই চির-বিদায় হইয়াছে। এ কথা কাল রাত্রে বাড়ীর পত্রে সংবাদ পাইয়াছিলাম। নিভৃতে আন্তরিক ভক্তিভরে তর্পণের সময় তাহার উপিস্থিতি কে রোধ করিতে পারে ? অন্যান্য অতীত বান্ধবগণের সঙ্গে চাটুয্যে মহাশয়ের আত্মার অক্ষয় মঙ্গল-কামনা করিলাম । মধ্যাহ্ন সূৰ্য্য গগন উদ্ভাসিত করিয়া সেই অপূৰ্ব্ব ঐশ্বৰ্য-সমৃদ্ধির শােভাবর্ধন করিতেছেন। অথচ ধীরে ধীরে তুষারপাত হইতেছে এ তুষার পাতে অসুখ হয় না, বরং স্বাস্থ্যোন্নতি হইয়া থাকে ইহাই প্রসিদ্ধি। তুষারপাত কিছুক্ষণ উপভােগ করিবার পর আর ভরসা হইল না—ছাতা খুলিলাম, অধিকক্ষণ ছাতা রাখিতে পারিলাম না, তুষারে ছাতার চাল ভরিয়া উঠিবার উপক্রম হইল। যে দেশে সর্বদা তুষারপাত হয়, সেখানকার বাড়ী-ঘরের ছাত এইজন্য ঢালু হয়, যাহাতে তুষার জমিতে না পারে। বরফ সমূদ্রের মাঝে যেন বড় বড় ঢেউ উচু হইয়া জমিয়া আছে, তেমনি অনেক ঢেউ নীচু হইয়া গিয়া সেই ভাবেই আছে। কোথাও বা উচু ও নীচু জমাট ঢেউ-এর মাঝে ঢেউ-এর সঙ্গমস্থান ফাটিয়া গিয়া বড়বড় ফাটল হইয়াছে, তাহাতে সময়ে সময়ে বিপদও যথেষ্ট হয়। অনেক জেনেভা-ভ্রমণ বিপদের গল্প শােনা গেল, পাহাড়ে চড়া যাহাদের সখ ও বাতিক তাহারা সময়ে সময়ে এই সকল স্থানে বিপন্ন হয়। আমাদেরও. এই সখ উপ- ভােগ করিবার জন্য নিমন্ত্রণের অভাব হইল না। তীর্থের পাণ্ডা অথবা সমুদ্রতীরে স্নানসহায়ক ‘মুলিয়ার’ যেমন অভাব নাই তেমনই এই জমাট বরফ-সমুদ্রের ধারেও গাইড (Guide) বা পথপ্রদর্শকের অভাব নাই ; তাহারা পৰ্ব্বতের ও জমাট সমুদ্রের সকল সন্ধান রাখে। পৰ্বত- আরােহণ উপযােগী পােষাক পরিয়া কোমরে মােটা কাছি জড়াইয়া এবং পাহাড় কাটা “গাতি” হস্তে দাঁড়াইয়া আছে। হাতে পাহাড়ে চড়িবার যষ্টি যন্ত্র (Alpine stock) একদিকে ছুচাল ধারাল ডগা, উহা বরফ বা পাহাড়ের উপর জিয়া দিলে ভর দিয়া উঠা যায় যন্ত্রের আর একদিকে ছােট কুড়ালী বা বাশের মত ব্যবস্থা,তাহার সাহায্যে বরফে বা পাহাড়ে ধাপ কাটিয়া উঠা যায়। যাত্রীর কোমরে কাছি বাঁধিয়া উপরে টানিয়া তোেলা হয়। এই সম্প্রদায়ের ‘সুইস’গাইড় কেহ কেহ ভারতবর্ষে আসিয়া ‘কারাকোরা’ নাঙ্গা পৰ্বত এবং গৌরীশৃঙ্গ আরােহণ প্রয়াসীদলকে সহায়তা করিতেছেন। প্রলোভন ও নিমন্ত্রণসত্ত্বেও এ অসমসাহসিক কার্যে ভরসা হইল না। দূর হইতেই বিশাল বিরাট, অক্ষয় তুষার-ক্ষেত্রের শোভা উপভােগ করিয়া যথাসময়ে নীচে নামিলাম। তখন আর কিছুই ভাল লাগিতেছিল না। পুনরায় বন, পৰ্বত, উপত্যকা, অধিত্যকার শােভা উপভােগ করিতে করিতে এবং পূৰ্বদৃষ্ট ক্ষুদ্র গ্লেসিয়ারদ্বয়ের শােভার সহিত সামােনি Mere de glace Mont Blancap মানসিক তুলনা করিতে করিতে জেনিভা ফিরিলাম। দূরে Mont Blaneএর উচ্চশির সদাই জাগিয়া রহিয়াছে। হিমালয়ের কাঞ্চনজঙ্ঘার ন্যায় মালপস্ (Alps) প্রদেশের সকলস্থান হইতেই ইহা দেখা যায়। যাইবার সময় ও ফিরিবার সময় বাব বার মনে পড়িতেছিল বহুদিন পূৰ্বে ঝাঝা সিমূলতলার পার্বত্য পথে রচিত গাথা
বম্বে পথে
৬৭
“অয়ি জীবন-সঙ্গিনী
ভনণ রমণ দেখে
বড় সাধ হয় মনে
“করি তােমা ভ্রমণ-সঙ্গিনী।” তাহা হইল না।
বুধবার ২৪ সেপ্টেম্বর, ১৯৩০
প্রত্যহ খান। ও বক্তৃতা স্রোত প্রবলবেগে চলিয়াছে, কোনদিন দু’টা
কোনদিন তিনটা বক্তৃতাও হইতেছে, যত হইতেছে তত বক্তৃতার আদর
আহ্বান বাড়িতেছে ; না বলিয়া পরিত্রাণ নাই। আমাদের কমিটির
কাজ যাহা আছে তাহা ছাড়া International club, Society for
Protection of Animals, Humanistic Society প্রভৃতির
বাহিরের প্রতিষ্ঠানেও
বক্তৃতা চলিয়াছে।
তার উপর চোখের ডাক্তার, চশমার দোকান, ঘড়ির দোকান
দেখিতে ও অন্যান্য লােকের সঙ্গে দেখা-শুনাতেও সময় যাইতেছে।
মাঝে মাঝে বাজার-হাট ও দেখিতে যাই। কিন্তু সব জিনিস দুৰ্ম্ম ল্য
বলিয়া ছুইবার উপায় নাই। জেনিভাতে ঘড়ি ছাড়া আর কিছু জন্মায়
। বাহির হইতে সব জিনিস আসিবার দরুণ এবং জগতের নানা
দেশের লােক এই সময় আসিয়া জোটে বলিয়া সকল জিনিসেরই দাম
অত্যন্ত অধিক। আমাদের দেশের মত রাস্তার ফুটপাতে হাট বসে,
তফাতের মধ্যে পুলিশ ও তােল তােলার জুলুম নাই।
এই সকল কাজ ও অকাজের অবসরে Geneva Cathedral,
City Hall, ও মিউজিয়াম দেখিয়া আসিয়াছি। ক্যাথিড্রেল, রোমান
ক্যাথলিক (Roman Catholic) দলের ছিল। Calvin, Knox
প্রভৃতি মূর্তিবিদ্বেষী ধর্মযাজকদিগের আমলে সমস্ত প্রস্তরমূর্তি ও ছবি
৬৮ নভ-ভ্রমণ জেনেভা- দূরীভূত হয়। পরবর্তী যুগে এক ধনকুবের অপর মূর্তি সেখানে বসাইয়াছেন দর্শকদিগের নিকট দর্শনী আদায় হয়। সিটি হল বা টাউন হল পুরাতন বাড়ী, পুরাতন সব ঠাট বজায় আছে, পাঁচতলা পর্যন্ত উঠিবার সরাসরি গড়ানে রাস্তা। বড়লােকেরা গাড়ী-ঘােড় পাল্কীতে (Litter) একতলা হইতে পাঁচতলা পর্যন্ত চড়িতেন। তাঁহাদের এই সুবিধার জন্য এত বড় বাড়ীতে এখনও সিড়ি নাই। Salle Nationale (জাতীয় দালান) নামে একটা বড় সাজান ঘর আছে। এই ঘরে Alabama জাহাজ-সম্বন্ধে আমেরিকা ও ইংলণ্ডের ঝগড়া শালিসীতে মীমাংসা হয়, ও সেই অবধি জেনিভাতেই শালিসী ও মধ্যস্থের সম্পর্কিত সকল ব্যাপার মীমাংসা হয় । Red Cross Societyও এই ঘরেই প্রতিষ্ঠিত হয়। এই জন্য এই ঘরটী বর্তমানে জগতের লােকহিতকর কাজের স্মৃতি-উপলক্ষে এত মূল্যবান্। তরবারি’ ভাঙ্গিয়া লাঙ্গল প্রস্তুত কর, এই শিক্ষার জীবন্ত দৃষ্টান্তস্বরূপ, যাথার্থ এক- খানা তরবারী ভাঙ্গিয়া আমেরিকায় যে লাঙ্গল তৈয়ারী হইয়াছিল, তাহা এইস্থানে রক্ষিত আছে । ২৫ সেপ্টেম্বর ১৯৩০ । yg Gstatat TI Intellectual Co-operation Commiteet মেম্বররূপে বহুদিন নিৰ্বাচিত হইয়াছেন, বৎসর বৎসর এই উপলক্ষে আসিয়া দুই-একদিন জেনিভা নগরে থাকেন—বাকী সময় স্বাস্থ্যের জন্য কিংবা নিজের আবিষ্কারের বহুল প্রচার-জন্য ইউরােপের নানাস্থানে বেড়ান। Intellectual Co-operation Committee Gay facwa কোন কাজ করিবার সময় ও সুবিধা হয় না। সকলের সঙ্গে তাহার বােম্বে-পথে } মতের ও মনের ঐক্য হয় না বলিয়া তিনি অনেক সময় এখানে থাকেন । যদিও সুইজারল্যাণ্ডে অনেকদিন আছেন, এখানে বড় আসেন না। গত পূৰ্ব্ব রবিবার জেনিভা-হ্রদের উপর টেরিটি শহরে বেড়াইতে গিয়া- ছিলাম, সেইখানে পাহাড়ের উপর বাড়ী লইয়া তিনি অনেকদিন ছিলেন। আজ জেনিভার ভিতর দিয়া মার্সেল চলিলেন-এই মেলে বাড়ী যাইবেন। লেডি বস্তু আমার প্রতি বিশেষ অনুগ্রহ প্রদর্শন করেন। স্যর জগদীশের অসুস্থ শরীর বলিয়া তিনি কখন কাছ ছাড়া হন না। দেশে-বিদেশে তার সেবা-শুশ্রুষার জন্য সঙ্গে থাকেন। তাহাদের সঙ্গে দেখা করিবার জন্য রেলওয়ে ষ্টেশনে সন্ধ্যাসময় গিয়াছিলাম। আমায় ভাল দেখিয়া যাইতেছেন এই কথা বাটীতে সংবাদ দিবার জন্য লেডি বসুকে বলিয়া দিলাম, দিলাম, বিদেশে আসিয়া ও থাকিয়া শরীরের অসুখ সারিয়াছে ও ভাল আছি এ সংবাদ স্বয়ং দেখিয়া গিয়া কেহ বলিলে বাড়ীর লােকের প্রত্যয় হইবে। আমি লণ্ডনে না গিয়া বরাবর ভারতবর্ষে ফিরিয়া যাইতেছি বলিয়া স্যর জগদীশ দুঃখপ্রকাশ করিলেন। লীগ অব নেশন্স-এর কাৰ্য শেষ হইয়াছে ; লণ্ডন যাইবার বাস্তবিক আর কোন প্রয়ােজন নাই এবং রাউণ্ড টেবল কনফারেন্স-এর যেরূপ ব্যবস্থা হইয়াছে ও হইতেছে তাহাতে অসাফল্য অবশ্যম্ভাবী এবং গায়ে পড়িয়া কোন দলের কোন লােককে ধর-পাকড় করিয়া কোন ফল নাই; এ কথা তাহাকে বােঝন দুঃসাধ্য হইল। দেশে যেরূপ নানারূপ জুলুম ও অত্যাচার ও অশান্তি ক্রমশঃ বাড়িতেছে এবং যাহারা সাধারণের প্রতিনিধি বলিয়া পরিচয় দেন তাহাদের হঠকারিতা যেরূপ বাড়িয়া চলিয়াছে তাহাতে শীঘ্র কোন সামঞ্জস্য সম্ভাবনার লক্ষণ দেখা যাইতেছে না। অশান্তির অনেক কথা বিলাতী কাগজ- জেনেভা-ভ্রমণ ওয়ালারা প্রকাশ করেন না; কিন্তু আমেরিকার সংবাদপত্রপরিচালকগণ সে সব কথা বিশেষ সংবাদদাতা দ্বারা প্রকাশ করিতেছেন। ভগবান্ সকলপক্ষকে যতদিন সুমতি না দেন কোন পক্ষেরই মঙ্গল সম্ভব নয়। লীগ অব নেশন্স-এর পক্ষ হইতে আন্তর্জাতিক শান্তিসংরক্ষণের চেষ্টা হইতেছে—ভারতবর্ষ এদিকে জ্বলিয়া যাইতেছে অথচ সে সকল বিষয়ে এখানে উচ্চবাচ্য হইবার যাে নাই। এ অবস্থায় দীর্ঘপথ অতিক্রম করিয়া লণ্ডনে ফিরিয়া যাওয়ায় কোন উপকারের আশা নাই। পুনার নিকটস্থ সাঙ্গেলী রাজ্যের রাজা, বম্বে-প্রদেশের ভাের রাজ্যের রাজা প্রভৃতি এখানে আসিয়া জুটিয়াছেন। ভারতীয় ডেলিগেসনের পক্ষ হইতে আমরা খানা দিতেছি ; তাহাতে এই সকল রাজা-রাজড়া বিলাতের রাজনীতিজ্ঞ-পুরুষগণের ও ইউরােপ, আমেরিকার নানা রাজনীতিজ্ঞগণকে নিমন্ত্রণ করিয়া এসকল বিষয়ে যতদূর সম্ভব আলােচনা করিতেছি। পার্লামেন্টের সভ্য Mr. Buxton, Mr. Noel Baker, Mr. Dalton, Mr. Arther Henderson, Miss Lawrence প্রভৃতি শ্রমজীবী মন্ত্রীদলের যে সকল সভ্য আসিয়াছেন তাহাদিগকে ক্রমাগত বুঝাইতেছি যে ঔপনিবেশিক স্বাধিকার (Dominion Status) ব্যতীত ভারতবর্ষের কোন সম্প্রদায়ই সন্তুষ্ট হইবে না। তাহারা মুখে সহানুভূতি দেখান কিন্তু কাজের বেলা কিছুই করেন না বা পারেন না। কনসারভেটিভ ও লিবারেল সম্প্রদায় তাহাদের বিরােধী; এইজন্য তাহারা বিশেষ কিছু করিয়া উঠিতে পারিতেছেন না ; তাঁহাদের এই ওজর। তাহাদের মন্ত্রিত্বের মেয়াদ বােধ হয় শীঘ্র শেষ হইয়া আসিবে। দলে দলে যেখানে যে সুত্রে ভারতবর্ষের পক্ষ হইতে এসকল কথা! বলিবার সুবিধা ও অবকাশ পাইতেছি, তাহার সম্পূর্ণ সদ্ব্যবহার করিতে বষে পথে, ৭১ কিছুমাত্র ঔদাস্য কিংবা কার্পণ্য করিতেছি না—নিজের স্বাস্থ্য ও সুবিধার পক্ষে লক্ষ্য রাখিতেছি না। আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী-প্রতিষ্ঠান হইতে শ্রমজীবীদিগের প্রয়ােজনীয় উচ্চ শিক্ষার ব্যবস্থার জন্য যে কমিটী হইয়াছে তাহারা সাদরে বার বার আহ্বান করিয়া আমার সহিত আলােচনা করিতেছেন। লীগ, অব নেসসের যে কাজের জন্য আসিয়াছি, একাজ তাহা হইতে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। তথাপি এই উপরি পরিশ্রম করিতেও ইতস্ততঃ করিতেছি না; কারণ ইহার সাহায্যে ভারতবর্ষের যথেষ্ট উপকার সম্ভব। International Labour Officeএর ডাইরেক্টর M. Doma, ডেপুটী ডাইরেক্টর মিঃ বলর, সেক্রেটারী ডাঃ Eastman প্রভৃতির সঙ্গে এই সকল আনুষঙ্গিক বিষয়ে ক্রমাগত আলােচনা হইতেছে—প্রয়ােজনমত বক্তৃতা ও লেখালেখি চলিয়াছে। স্যর ইউয়ার্ট গ্রীভ-এর ভগিনী মরণাপন্ন পীড়ার জন্য তিনি লণ্ডনে ফিরিয়া গিয়াছেন, তাহার জায়গায় বিহার ও বাঙ্গলার ভূতপূৰ্ব জজ স্তর বসন্তকৃষ্ণ মল্লিক আসিয়াছেন। Imperial Conference উপলক্ষে এবং প্যারিসে চিকিৎসা ও বাজার-হাট করা উপলক্ষে মহারাজা বিকানীরও আজ প্যারিসে চলিলেন। ভারতীয় ডেলিগেশনের পক্ষ হইতে আজ শেষ মধ্যাহ্ন-ভােজ দেওয়া হইল, তারপর ছবি উঠাইবার পালা। আর-একট। এইরূপ মধ্যাহ্ন-ভােজ ও একটা রাত্ৰ-ভােজ হইয়া গিয়াছে, অন্যান্য ডেলিগে যেরূপ আমাদের ভােজ দিয়াছেন, ইহা তাহারই ফেরৎ ভােজ। ভারতবর্ষের খরচেই এসব ভােজ দেওয়া হয়, তবে অন্যান্য দেশের পক্ষ হইতে খানার যেরূপ আড়ম্বর হয় দরিদ্র ভাতের পক্ষে তাহা সম্ভব নয়। সামান্য ব্যবস্থাতেই সন্তুষ্ট হইতে হ মহারজা বিকানীর নিজে দুইটা মধ্যাহ্ন-ভােজ ও একটা রাত্র- পৃভাজ দিয়াছেন, আমাকেও কয়েকটা মধ্যাহ্নভোেজ ও বৈকালিক চা ৭২ জেনেভ-ভ্রমণ পার্টির আয়ােজন করিতে হইয়াছিল, এ সকল সভা সমিতিসম্পর্কে ইহা অবশ্য কর্তব্য। সকলের সঙ্গে বিশেষ সৌজন্য ও আত্মীয়তা করিয়া যথেষ্ট সুখ্যাতি অর্জন হইতেছে। দেশে ফিরিয়া গিয়া তাহার রাজ্যে যাইবার জন্য মহারাজ বিকানীর বারংবার সাদর আমন্ত্রণ করিলেন। লীগের কমিটীর কাজই আসল কাজ, তাহা খুব জোর চলিয়াছে। ছয়টার মধ্যে দুইটা কমিটীর প্রধান কাজের ভার আমার উপর ; সে কাজ ভালই হইয়াছে ও হইতেছে বলিয়া শুনিতে পাই। কমিটীর কাজের সঙ্গে সঙ্গে মাঝে মাঝে লীগের সাধারণ অধিবেশনও চলিয়াছে। তাহাতে ভােট-মঙ্গলই অধিক। সালিসীর বিচারে বিবাদ মিটাইবার জন্য লীগের পক্ষে সকল জাতির প্রতিনিধির মধ্য হইতে ১৫ জন জজ নিযুক্ত হন। সে ভােটমঙ্গল-ব্যাপারে হাঙ্গামা হয় অনেক, আজ সমস্ত দিন ধরিয়া সেই হাঙ্গামা চলিল। ভারতবর্ষের পক্ষ হইতে বােম্বের ব্যারিষ্টার স্যর চিমনলাল শিতলবাদের নাম প্রস্তাব হইয়াছিল, তিনি একটী মাত্র অর্থাৎ ভারতবর্ষেরই ভােট পাইলেন। পৃথিবীর সমগ্র সভ্যজাতির আন্তর্জাতিক সভায় ভারতের প্রধান আসন পাইতে বিলম্ব অনেক, নিজেদের বিবাদ-বিসংবাদ মিটাইতে হইবে—রাষ্ট্রীয় অধিকার পূর্ণভাবে লাভ করিতে হইবে এবং প্রধান পুরুষেরা নিঃস্বার্থভাবে দেশ-সেবার জন্য এখানে বপন আসিবেন ও অন্যান্য দেশের প্রতিনিধিগণের মত বারমাস থাকিয়া ভারতবর্ষের অভাব দূর করিবার জন্য প্রাণপাত করিতে প্রস্তুত হইবেন তখনই কিছু হইবে। আপনাদের ভিতর মারামারি, কাটাকাটি ওদেশব্যাপী নানাবিধ অত্যাচার নিবারণ করিয়া কোন সুফল আশা করা যায় না। তিন তিন বারতাে ইউরােপে আসিয়া দেশ-সেবার চেষ্টা ক য়- মনোবাক্যে করিলাম।
বম্বে পথে সকলেই আশ্চর্য হন এই বয়সে, এই শরীর লইয়া, কাহারও নিকট কখন কোনরূপ উৎসাহ বা সহায়তা না পাইয়া এত বাধা-বিঘ্ন অতিক্রম করিয়া এই গুরুভার ক্ষীণ স্কন্ধে লইতে কিরূপ দুঃসাহসী হইয়াছি! এত কাজ-কর্মের মধ্যেও যেখানে যাহা দেখিবার তাহাও যথাসাধ্য দেখিতে ভুলি নাই। যেমন সামােনি প্রদেশে পার্বত্য সৌন্দর্যের অপূর্ব সমাবেশ, জংফ্র ও সেন্ট বার্ডস প্রদেশেও সেইরূপ বা তদপেক্ষা অধিক, কিন্তু তাহা দূরবর্তী স্থান এবং যাইতেও কষ্ট ও শ্রম যথেষ্ট হয়। শীত ক্রমশঃ বাড়িতেছে ও সকল প্রদেশে তুষারের ঝড় (Blizzard) আরম্ভ হইয়াছে। সে ঝড়ের সময় পূর্বে সেন্ট বার্নার্ডস কুকুরেরা পথিককে মৃত্যুমুখ হইতে রক্ষা করিত, এখন টানেল হইয়া পৰ্বত পার হইবার সময় পথিকের সেই শ্রেণীর ঝড় হইতে বিপদ-সম্ভাবনা অনেক কম, কাজেই সেন্ট বার্ডস মনাষ্টারি (Monastery) এবং সেখানকার আশ্রিত কুকুরের কথা আর বড় শােনা যায় না। এই আল্পস পৰ্বত লক্ষ্য করিয়াই নেপােলিয়ান বলিয়াছিলেন—Alps! There shall be no Alps. নিজ বীর্যে আল্পস পর্বতের বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করিয়া বিশ্ববিজয়ী বীর এই দম্ভ প্রকাশ করিয়াছিলেন। এই সব মনােরম প্রাকৃতিক দৃশ্য যেরূপ দেখা চলিতেছে, ছােট ছােট গৃহস্থালীর খুটিনাটি ব্যাপারও তেমনই দেখিতে হইতেছে। হােটেলের খাবার তিনবার না খাইয়া মাঝে মাঝে খাবার বন্ধ করিয়া ফল খাইবার আয়ােজন নিজে করিতে হয়। যথাসময়ে দোকানে যাতায়াত করিয়া চক্ষুর চিকিৎসার প্রধান ডাক্তার বোল-এর কাছে যাতায়াত করিয়াও সময় কাটাইতে হয়। জেনিভার ঘড়ির হয়, আবার চার পয়সার জায়গায় চার ফ্র্যাঙ্ক অর্থাৎ দুই টাকা খরচ করিয়া নাপিত নয় নাপতানীর বাড়ী গিয়া পায়ের আঙ্গুলের বসা নখ কাটিয়া আসিতে হয়, বাঙ্গালী ৭৪ জেনেভ-ভ্রমণ ছাত্রেরা আসিয়াআত্মীয়তা করিয়া গত বারের মত হাতের নখ কাটিয়া দেয়। নাত-জামাই পার্বতীপ্রসন্ন হাওয়ার-জাহাজ ডাকে লিখিয়াছেন ইউরােপে তিন মাস ও প্রবাস-পত্ৰ যত্ন করিয়া পড়িয়া বিলাত যাত্রার জন্য প্রস্তুত হইতেছেন। এ পর্যায়ের পত্রও পড়িবেন। সােমবার ২৯শে সেপ্টেম্বর ১৯৩০ লীগের কাজ ক্রমশঃ কমিয়া আসিতেছে, মাঝে মাঝে লীগের অধিবেশন অল্প সময়ের জন্য হইতেছে, তাহাতে, চলতি কাজ মাত্র হয় বেশী বক্তৃতা হয় না। কাজ বেশী হইতেছে। ছয়টা বড় বড় কমিটিতে ক্রমাগত সকাল-বিকাল কখন বা রাত্রে সে কাজ চলিতেছে। ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ে বাদানুবাদ হইয়া যেমন কোন বিষয়ে স্থির হইতেছে তেমনি সঙ্গে সঙ্গে রিপাের্টার তাহার রিপাের্ট দাখিল করিতেছেন। রিপাের্ট লইয়াও অনেক বাদানুবাদ হয়, তাহার পর প্রস্তাব হয়, সেই প্রস্তাব লীগের প্রকাশ্য মিটিংএ দাখিল হইয়া পাশ হয়। দু'নম্বর ও পাঁচ নম্বর কমিটিতে আমার খাস কাজ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, শিল্প, নীতি এই সকল বিষয়ে কাজের ভার পড়িয়াছে। যথাসাধ্য কাজ করিয়া যাইতেছি, ফল নিতান্ত মন্দ হইয়াছে বা হইতেছে বলিয়া মনে হয় না, আমাদের যথার্থ রাষ্ট্রীয় অধিকার কিছু নাই, কাজেই কাজ ও কথাগুলা অনেকটা খেলাঘরের কাজ ও কথার মত হইয়া চলিতেছে। তবে এই রকম হইতে হইতেই কাজে প্রাণ আসিবে, দশ বৎসরের মধ্যে যে সব ভারত-প্রতিনিধি আসিয়াছেন তাহাদের অনেকের এই সকল কাজে অনুরাগ বা কৃতিত্বের অভাবে কাজ বড় জমাট বাঁধিবার অবকাশ পায় নাই, বে-সরকারী প্রতিনিধির অভাবে কাজের জমজমা হয় না। এবার ভারত-প্রতিনিধিরা কাজের একটা জমজমা বাধাইয়াছেন- একখা সকলের মুখেই শােনা যাইতেছে।
বম্বে পথে ৭৫ এই কারণে লীগ-কমিটিতে যে কাজ অবশ্য কর্তব্য, তাহা ছাড়া অন্য কাজ আরও আসিয়া পড়িতেছে, ভারতের মুখরক্ষার জন্য সে-সকল আহ্বান অমান্য করা যায় না। যদিও International Labour Officeএর সঙ্গে আমাদের লীগের কাজের আপাতত সাক্ষাৎ-সম্বন্ধে কোনরূপ সম্পর্ক নাই তথাপি শ্রমজিবীদিগের শিক্ষা-ব্যবস্থা কল্পে যে কনফারেন্স হইতেছে তাহার জন্য উপযুপরি পরিশ্রম করিতে হইতেছে। Director M. Doma, Deputy Director Mr. Butler, Secretary Dr. Eastman, Dr. R. K. Das, Mr. Rao atero কর্মকুশল কম্মািগণ যথেষ্ট খাটাইয়া লইতেছেন। লীগের শিক্ষা, শিল্প প্রভৃতি বিভাগের প্রধান কর্মচারী Mr. Duper Firor, Mr. Opprescue, Mr. Bunnet, Mr. Comne, Information-fotosts Mr. A. C. Chatterjee at fos afue সৰ্ব্বদা জটিল বিষয়েরও আলােচনা হইতেছে। আমাদের ডেলিগেটগণের মেম্বারদিগের মধ্যে কর্মচারী Croft Goodchild প্রভৃতির সঙ্গে সর্বদা আলােচনা চলিতেছে। British Delegationএর Miss Hamilton, Miss Lawrence, Mr. Dalton, Mr. Buxton, Lord Robert Cecil, Foreign Secretary Mr. Henderson, Mr. N. Hotel Burivarn ( Caracat cafe49) Mr. Baker, Australian Delegationএর Mr. Coleman প্রভৃতির সহিত দিবারাত্র আলােচনা চলিতেছে। এক হােটেলে থাকার দরুণ খাইবার সময়েও বিশ্রাম নাই। মহারাজা বীকানীর চলিয়া যাওয়াতে কাজের ভার আরও বাড়িয়া চলিয়ছ। South Africa Canada ও Canada Delegationএর প্রতিনিধিরা Irkernational Conferenceএর জন্য লণ্ডনে গিয়া খাতির জমাইয়া ৭৬ জেনে-ভ্রমণ বসিতেছেন। সে কনফারেন্স Imperial Conference ভারতবর্ষের পক্ষে কোন মঙ্গলের সম্ভাবনা দেখা যাইতেছে না। বােম্বাই, কলিকাতা, মেদিনীপুর, চন্দননগর, মৈমনসিংহ, চট্টগ্রাম, পাঞ্জাব প্রভৃতি স্থানে যেরূপ দিন দিন হাঙ্গামা বাড়িতেছে তাহাতে দেশের অবস্থা ক্রমশঃ অতি শশাচনীয় হইয়া উঠিতেছে। লণ্ডনে এ শশাচনীয় অবস্থার উন্নতির কোন আশাই দৃষ্ট হইতেছে না। স্থিরভাবে আত্ম- সম্মানমর্যাদা রক্ষা করিয়া চুয়ায় জাতির প্রতিনিধিগণের সাক্ষাতে কাজ করা বড়ই কঠিন হইতেছে। লেডি ব্লুমফিল্ড “সুপ্রীম পীস মুভমেন্ট” নামে শান্তিস্থাপন-আনুকূল্যে যে সভা স্থাপন করিয়াছিলেন সেখানে আজ ভারতের রীতিনীতি, ধৰ্ম প্রভৃতি সম্বন্ধে বক্তৃতা করিবার আহবান ছিল। বিস্তর লােক সমাগম হইয়াছিল—কথাগুলা সকলেরই ভাল লাগিল। আজ মহাসপ্তমী পূজা। সেই কথা উল্লেখ করিয়া বক্তৃতার সার্থকতা সম্পাদনে সুবিধা হইল। বহু সহস্র ক্রোশ দূরে প্রিয়জন-বিরহে বিদেশে আজ মহামায়ার পূজার উপলক্ষে মহাশান্তি-স্থাপন-আনুকুল্যে দুইবার কথা বলিবার সুবিধা ও বিদেশীকে আমাদের প্রাণের কথা বুঝাইবার অবকাশ পাইয়া ধন্য হইলাম। বক্তৃতা এক ঘণ্টার উপর হইয়াছিল । আজ সমস্ত দিন বৃষ্টি হওয়ায় খুব ঠাণ্ডা অথচ সভায় লােক ধরে না। জেনিভাতে যে বাঙ্গালী দল আছেন, তাহাদের পূজার কথা স্মরণ করাইয়া দেওয়ায় তাহারা বিজয়াদশমীর সম্মিলন-ব্যবস্থার আয়ােজনের চেষ্টা আরম্ভ করিলেন। গতকল্য রবিবার ছিল। প্রায় পঁচিশ, ক্রোশ দূরে আ উচ্চ পাহাড়ের কোলে এ্যানিসি হ্রদের উপর এ্যানিসি শহরে বেজ ইতে গিয়াছিলাম । এখানকার পর্বতও হ্রদের স্বাভাবিক সৌন্দৰ্য্য তি বম্বে পথে ৭৭ চমৎকার, দেখিয়া আশা মেটে না। পথে ছােট বড় অনেক শহর আছে, “গ্রাম” কিন্তু দেখিতে পাইলাম না। রবিবার বলিয়া সব সহরের পথে ঘাটে মেলা বসিয়াছে। নাগরদোলা ও মেলার সরঞ্জামের ধূমধাম যথেষ্ট, জেনিভা শহরেও এইরূপ মেলা বসিয়াছে। মধ্যে একটা বড় সার্কাস আসিয়াছিল, নাচ, তামাসা, থিয়েটার প্রভৃতির অন্ত নাই, নানা জাতীয় লােকের আনন্দ-কোলাহলে আনন্দ-কোলাহলে রাত্রে বাহিরে যাওয়া বন্ধ করিয়া দিয়াছি, দিনের বেলা যে হাঙ্গামা তাহাতেই প্রাণ ওষ্ঠাগত। আমাদের কাজ-কৰ্ম্মের সুবিধার জন্য লণ্ডন হইতে ৩৪ জন কেরাণী ও ২ জন মহিলা-টাইপিষ্ট আসিয়াছেন, তাহারা যথেষ্ট সেবা করিতেছেন, তাহাদেরও রবিবারে আনন্দ করিবার জন্য চাদা তুলিয়া খাওয়া-দাওয়া, মােটরে বেড়ান প্রভৃতির আয়ােজন করা হইয়াছিল, তাহারা পূর্ণ আনন্দলাভ করিয়াছেন অকুণ্ঠিত চিত্তেই ইহা তাহারা জ্ঞাপন করিয়াছেন। রুশিয়া-গভর্নমেন্ট পক্ষ হইতে সেদেশে ভগবং পূজা ও সমস্ত গীর্জা বন্ধ করিয়া দেওয়া হইয়াছে, তাহা দেশান্তরে আশ্রয় পাইয়াছে এবং স্থানীয় গীর্জ। হইতে ধৰ্মকৰ্ম্ম লােপ হইয়াছে । ভগবান্ সিংহাসনচ্যুত হইয়াছেন। জেনিভাতে রুশিয়ানদের যে গীর্জা আছে তাহা দেখিতে গিয়া মুগ্ধ হইলাম। অলাে-ধূপ, দীপ, অৰ্চনা আমাদেরই মত, অতি ভক্তিভরে ভগবৎপূজা চলিয়াছে, আৰ্তসেবার ব্যবস্থাও আছে। মঙ্গলবার ৩০ এ সেপ্টেম্বর ১৯৩০। নি দিদেশের নানাজাতি জেনিভা নগরে চিরকাল আসিয়া জমে, সেজন্য ইহা গরীবের জায়গা নয়। লণ্ডন-প্যারিসে পধে-ঘাটে নানা * দের ভিখারী দেখিতে পাওয়া যায়, যদিও আইন-অনুসারে ভিক্ষা করা, ৭৮ জেনেভী-ভ্রমণ ভিক্ষা। বন্ধ ও শাস্তিযােগ্য, তথাপি নানা ছাদের ভিখারীর অভাব সে সব বড় বড় নগরে নাই—কেহ জুতার ফিতা ও দেশালাই বিক্রয়ের ভাণ করে, কেহ বাজনা বাজাইবার ভাণ করে, কেহ ফুটপাতের উপর রঙ্গের গুড়া ছড়াইয়া ছবি আঁকার ভাণ করে (Pavement Artist) কিন্তু করে দারিদ্র্য নিবারণ জন্য Unemployment Pension, Sickness Pension, Widow's Pension, Old age pension প্রভৃতি স্থাপিত হইয়া দেশের লােকের উপর ট্যাক্সের বােঝ বিষমরূপ চাপিয়াছে। Poor Law 115, Alms House আছে, তবু ভিক্ষা বন্ধ হয় না। কিন্তু জেনিভাতে ভিক্ষার ব্যাপার আদৌ নাই—মদের দোকান যথেষ্ট আছে কিন্তু প্রকাশ্য বেশ্যা নাই, স্কুল-কলেজ-ইউনিভারসিটি যথেষ্ট, জাতি যদিও বহুদিন সম্পূর্ণ স্বাধীন ও সাধারণ-তন্ত্র-পরিচালিত তথাপি উহাদের নিজস্ব ভাষা নাই। সুইজারল্যাণ্ডের চারিদিক্ ঘিরিয়া আছে পর্বতরাজ আল্পস (Alps) আর তাহার কোলে বিচিত্র হ্রদ ও নদী এবং হ্রদ ও নদীর কোলে শােভাময় অতুল স্বাভাবিক ঐশ্বৰ্যময়ী উপত্যকা, পৰ্ব্বতের অপর পারে ফ্রান্স, জাৰ্মাণী, অষ্ট্ৰীয়া, ইটালী প্রভৃতি দেশ। তাহাদের ভাষাই সুইস জাতি ব্যবহার করে। সুইজারল্যাণ্ডের যে অংশ অন্য যে দেশের গায়ে ও পাশে পড়িয়াছে ইহারা তাহাদের ভাষাই ব্যবহার করে। অধিকাংশ লােক ফরাসী ভাষা ব্যবহার করে। এখানে ঘড়ি, এনামেলের কাজ ও লেসের কাজের ব্যবসাই অধিক। অন্যান্য শ্রমজীবী খুব কম, চাষবাস ও গােপালন পল্লীগ্রামের লােকেরাই করিয়া থাকে। পাহাড়ের গায়ে নধরদেহ' সুন্দর গাভী দেখিয়া নয়ন জুড়াইয়া যায়। এই গাভীর দুগ্ধেই, বিশ্ববিখ্যাত ভূখ- প্রচলিত জমাট দুধ তৈয়ার হয়। সব জিনিসই দুৰ্ম্ম ল্য, কিন্তু দুধ, মাখ পনীর মােটের উপর সন্তা ও উৎকৃষ্ট। ফলমূল, শাকসজীও দুর্মূল্য বথে পথে ৭১ ভাল বড় পীচ এক ফ্রাঙ্ক অর্থাৎ আট আনার কম পাওয়া যায় না। সামান্য একজন ট্রাম-কণ্ডাক্টরের নিত্য খরচ তিন ফ্রাঙ্ক বা দেড় টাকা। স্থানীয় কোন কলকারখানা নাই বলিয়া সকল জিনি দুর্মূল্য। কাপড়-চোপড়, বাক্স, পেটরা গৃহস্থালীর যে কোন জিনিস লণ্ডন, প্যারিসের অপেক্ষা দুর্মূল্য। দেশপ্রান্তে কড়া পাহারা, বিনা মাশুল দিয়া কোন জিনিস আনিবার যে নাই, রেলে, মােটরে, ষ্টীমারে বা পদব্রজে সুইজারল্যাণ্ড হইতে পার্শ্ববর্তী দেশে কিংবা পার্শ্ববর্তী দেশ হইতে সুইজারল্যাণ্ডে আসিতে হইলে ফ্রেঞ্চ ও সুইস ঘাটীর দাবােগা উভয়ে খানা-তল্লাসী করিবে ; “কাপড় ঝাড়া নিয়া তবে ছাড়িবে। আমাদের উপর যাতায়াতের সময় এসব অত্যাচার হয় নাই, কারণ আমরা ভারতবর্ষের প্রতিনিধি এবং সম্রান্ত ও সম্মানিত অতিথি। আমাদের মােটরের মাথায় যে ছােট বৃটিশ পতাকা নিত্য উড্ডীয়মান তাহাই ইহার জ্ঞাপক—কিন্তু জেনিভার বাহিরে যে কয়দিন মােটরে করিয়া নিকটে কিংবা দূর গ্রামে বেড়াইতে গিয়াছি সঙ্গে (Pass Port) ছাড়পত্র রাখিতে হইয়াছে এবং আমাদের সুইস ড্রাইভারের নাম-ধাম-নম্বর সব প্রতিবার যাইতে-আসিতে লিখাইতে হইয়াছে। প্রতিনিধিদিগের নিত্য ব্যবহারের জন্য তিনখানা বড় ভাড়া-মােটর সরকার হইতে হাজির থাকে, তাহাতে চড়িয়া বেড়াইতে যাওয়া হয়। সহরের বাহিরে গেলেই এই হাঙ্গামা। এইরূপে সুইজারল্যাণ্ড ক্ষুদ্র দেশ হইলেও “সেভ” রাজবংশীয়দিগকে ( House of Savoy) তাড়াইয়া শতাব্দীর পর শতাব্দী নিজ স্বাধীনতা রক্ষা করিতেছে, ও প্রজাতন্ত্র-নিয়মে শাসন চালাইছে। বড় বড় বিষয় শুধু কাউন্সিলে স্থির হয় না, প্রজা ধারণের প্রত্যেকের’ভােট লইয়া স্থির হয়। রাস্তা-ঘাট অতি সুন্দর, অতি পরিষ্কার। কোথায়ও ময়লা- জেনেভা-ভ্রমণ আবর্জনা নাই, ৭০ মাইল লম্বা-জেনিভা হ্রদের চারিধারে বঁাধান সুন্দর মােটর রাস্তা আছে। যত ইচ্ছা বেড়াও। শীত যদিও পড়িয়াছে কিন্তু আকাশ পরিষ্কার। লণ্ডনের মত ধোয়া ও কুয়াসাতে কষ্ট হয় না। সেই জন্য এখানে শীত, গ্রীষ্ম সকল সময়েই বায়ুসেবনের জন্য বিদেশের ভবঘুরের দল আসিয়া বাস করে, ছােট-বড় হােেেল দেশ ছাইয়া গিয়াছে। লােকে বলে সুইস হােটেলওয়ালা ও হােটেল পরিচালক জগতে অতুলনীয়, ফরাসীরা রাধে ভাল কিন্তু এমন সৰ্বাঙ্গসুন্দর পরিচারক হয় না। আমাদের হােটেলের নাম হােটেল বাে রিভাজ (Hotel Beau Rivage), খুব বড় হােটেল। ব্রিটিশ ও ইণ্ডিয়ান ডেলিগেটগণ প্রতি বৎসর এইখানে আড়। পাতেন—ইহা একরূপ প্রসিদ্ধ হইয়াছে। নিকটে এবং হ্রদের উপরেই অন্যান্য বড় বড় হােটেলে অন্যান্য দেশের ডেলিগেটরা আশ্রয় লন। হােটেলের খরচ বড় চড়া। ঘরের ভাড়া এক পাউণ্ড ; প্রত্যহ মধ্যাহ্ন ভােজ পাঁচ টাকা সান্ধ্য ভােজ ছয় টাকা; চা-কফি ইত্যাদি দুই টাকা-এই রকম সব দাম, রান্নার প্রসিদ্ধি থাকিলেও প্রতিদিন তিনবার মাছ, মাংস খাওয়া দুঃসাধ্য বলিয়া আমি অনেক খানা বাদ দিয়া, ফলমূল লীগের কর্মচারী শ্ৰমান্ অমূল্যচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (স্যর অতুল চট্টেপোধ্যায়ের ভ্রাতা) অনেক সময় নিমন্ত্রণ করিয়া ঝােল-ভাত খাওয়ান। International Labour Officeএর ডাক্তার রজনীকান্ত দাস এক রাসিয়ান ইহুদীকে বিবাহ করিয়া এখানে আছেন। তিনিও মাঝে মাঝে বাঙ্গলা খাওয়া খাওয়ান, ভূতপূর্ব অজ শ্ৰীযুত বিপিনবিহারী ঘােষের পুত্র সুধীন্দ্রনাথ ঘােষ ফরাসী কন্যা বিবাহ করিয়া এনে আছেন। কিন্তু তার স্ত্রীর ব্যারাম। সত্যেন্দ্রনাথ গুহ (এম-এস-স) এখানে বাসায় আছেন। আরও আছেন ডাক্তার সুরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য খাই।
লেখকের আবাস হােটেল [ বাে রিডাজের নীচে জেনিভার হ্রদের দৃশ্য )
No text on this page.
বােম্বে-পথে ৮১ বেড়াইতে আসিয়াছিলেন। কলিকাতা, ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক কালিদাস নাগ ও ডাক্তার প্রফুল্লচন্দ্র ঘোেষ আছেন অতএব বাঙ্গালীর সঙ্গে দেখা শুনা যথেষ্ট হয়। বম্বে, মাদ্রাজ, লক্ষ্ণৌ প্রভৃতি জায়গার লােকও দুই-চারিজন, কর্ম- উপলক্ষে কিংবা কর্মের উমেদারী উপলক্ষে বাস করিতেছেন। কিন্তু আমাদের দেশ-প্রচলিত সনাতন নিয়ম-অনুসারে পরস্পরের মধ্যে মনের মিল বড় কম। এর নিন্দা ওর কাছে ওর নিন্দা এর কাছে সর্বদা শুনিতে পাওয়া যায়, কাজেই কাহারও বৃদ্ধি ও প্রতিপত্তি নাই। শীত খুব পড়িয়াছে, এখন ঘরে আগুন করার প্রথা প্রায় উঠিয়া গিয়াছে-central Heating অর্থাৎ নলে করিয়া ঘরে ঘরে উত্তাপ আনিবার ব্যবস্থা হইয়াছে, ইহাতে বড় সুবিধা হয়। জাহাজে এবং বিলাতেও ধুতি চালাইয়াছি। কিন্তু আলপস্ বক্ষে সুইস শীতে ধূতি ছাড়াইয়াছে। একবার বিনা পাগড়ীতে দশ পা বাহিরে গিয়া অসুখ হইবার জোগাড় হইয়াছিল। বৃহস্পতিবার ২রা অক্টোবর, ১৯৩০ বিজয়াদশমী শরতের নির্মল নীল আকাশে চিরপরিচিত সুধাকর পাহাড়-জঙ্গল- হ্রদের উপর দেশেরই মত মধূবর্ষণ করিতেছেন। দেশের কথা, দেশের লােকের কথা বার বার মনে করিয়া দিতেছেন। পাঁচ ঘণ্টা আগে দেশে এই সুধা-বণ্টন করিয়া চির-অতৃপ্তকে তৃপ্ত করিবার জন্যই যেন বহু সহস্র ক্রোশ পথ পৰ্যটন করিয়া আসিয়া অভয় দিতেছেন। অভয়ার কৃপায়'বিজয়া যখার্থ বিজয়া হোক। এবার লীগ অব নেসনস্ সভায় ভারত-প্রতিনিধিগণের কৃতিত্বের যথেষ্ট যশ হইয়াছে। কিন্তু আসল কথার ধার দিয়াও কেহ ২ জেনেভা-ভ্রমণ যাইতেছেন না। আমার দাঁত কন্ করিয়াছে এ-সংবাদ তারে পাইওনীয়ার পত্রে গিয়াছে। কিন্তু দেশের যে সমূহ সৰ্ব্বনাশ হইতেছে এবং চুয়ান্ন জাতির প্রতিনিধির সম্মুখে প্রকাশ্যভাবে সে কথা তুলিবার যাে নাই, এ-কথা কোন কাগজে তারে বা বেতারে যায় না। বিনা তার প্রবর্তন-কোম্পানীর একজন প্রতিনিধি-মিঃ আর্থার বরােজ—মিসেস হােয়াইটের পরিচয়পত্র লইয়া দেখা করিতে আসিতেছেন। তাহাকে এ কথা বলিব। ভারতবর্ষ সম্বন্ধে লীগ যেরূপ ঢিমে-তে-তালায় নির্জীবভাবে চলিয়াছে, তাহাতে কোন কাজ হইবে না। এ বিষয়েও পরিবর্তন এবং উন্নতি প্রয়ােজন। লীগের খরচ ভারতবর্ষ যাহা দেয়, তাহা ৭ লাখ হইতে ১০ লাখ টাকা হইবে। এ দান হিসাবে অন্যান্য চুয়ান্নজাতির দানের তুলনায় ভারতের স্থান ষষ্ঠ—ইহাতে প্রচুর সম্মান অবশ্য আছে, কিন্তু প্রতিদান নাই। ভারতবর্ষের লােক বিশেষ কোন উপকার পায় না, ইহা বলিলে অত্যুক্তি হইবে না। রােম, টোকিও, ন্যানকিন, লণ্ডন, প্যারিস, বার্লিন, বুড়াপেষ্ট, পিকিং-এ লীগের নিজ আফিস আছে। কিন্তু এত বড় ভারতবর্ষের কোথাও একটা আফিস নাই। ভারতগভর্নমেন্ট খরচ করিয়াকেন আফিস করিবেন তাহার কারণ নাই। লীগের পক্ষ হইতে তাহা হওয়া উচিত এ কথা আমি বারংবার জেদ করিয়াছি তাহার ফলে শ্ৰীযুক্ত অমূল্য চরণ চট্টোপাধ্যায় মহাশয়ের কর্তৃত্বে বম্বে সহরে আপিস হইয়াছে। শ্রীযুক্ত অমূল্য চরণ মধ্যে মধ্যে তাহা পরিদর্শন করিতে আইসেন। যদি লীগের কাজে কোন বিশেষ বাধা ঘটে—তাহা হইলে ভারতবর্ষে আর একটা আপিস স্থাপিত হওয়ার আশা আছে এবং ভারতবর্ষের কথা লীগ সভায় আর ও বিশেষ • ভাবে আলােচিত হইতে পারে। এখানকার লীগ আফিসে সকল জাতির লােকের বড় বড় চাকুরী ;
বম্বে পথে ৮৩ কিন্তু ভারতবর্ষের অতি অল্প লােকের ছােট ঘােট চাকুরী। ভারতবর্ষ হইতে যে সব অধ্যাপক ও নেতা আসেন, তাহাদের দ্বারা এখানে বিশিষ্ট বিষয়ে বক্তৃতার ব্যবস্থা নাই। লীগের মধ্যে ভারতবর্ষের প্রতিনিধিগণকে মাথা হেঁট করিয়া থাকিতে হয়, কারণ ভারতবর্ষের রাজনৈতিক দৈন্য অত্যধিক। এই সকল কথার আলােচনা অতি তীব্রভাবে আমার করিতে হইল। আমার সহ-প্রতিনিধিগণকে আমাদের রিপাের্টে এই সব কথা তুলিতে বলিয়া বিজয়ার আয়ােজন করিলাম। ভগবৎ ইচ্ছায় বিজয় হউক। শুক্রবার ৩রা অক্টোবর, ১৯৩০ গতকল্য জেনিভা-ইউনিভারসিটির অধ্যাপক মিঃ র্যাপার্ড সাহেবের পল্লীনিবাসে মধ্যাহ্ন-ভােজের নিমন্ত্রণ ছিল। য়্যাসেম্বিলীর মিটিংএর পর তাহার মােটর করিয়া তাহার বন-ভবনে লইয়া গিয়া অতিথি-সংকারের চূড়ান্ত করিলেন। সদানন্দ-অধ্যাপক নিজের কাজের আনন্দে উৎসাহে বিভাের হইয়া আছেন ; স্ত্রীও তদনুরূপ। পাঁচ মিনিটের পরিচয়ে নিতান্ত আপনার করিয়া লইলেন—নিষিদ্ধ মাংস ব্যতীত তাঁহাদের কোন আয়ােজন ছিল না বলিয়া আমার আহারের জন্য তাহারা ব্যস্ত হইয়া অল্প সময়ের মধ্যে যথাসাধ্য উদ্যোগ করিয়া আমাকে তৃপ্ত করিলেন। এই স্থানে আপদ্ধৰ্ম্ম মনে করিয়া হয় তাে নিয়মিত আহারের বহির্ভূত কাজের প্রয়ােজনীয়তা কাহারও কাহারও মনে হইতে পারে। কিন্তু “মা থাকিলে কি মনে করিতেন” এই ভাবিয়া আমি আজীবন এ বিষয়ে বিশেষ সতর্কতা রক্ষা করিতেছি। এবং সেই নিয়মের বিপর্যয় ঘটিতে দিইনা। রুটী, পনীর, শাকসজীতে একবেলা একদিন কাটান হিন্দুর ছেলের পক্ষে শক্ত কথা নয়। আমেরিকার দুইজন অধ্যাপক অতিথি ছিলেন। তাঁহারা কিছু ০ ৪ জেনেভা-ভ্রমণ আশ্চৰ্য্য হইলেন, একজন শিক্ষিত হিন্দু বিদেশে আসিয়া অসুবিধা সত্ত্বেও নিজ নিয়ম পালন করিতে তৎপর, ইহা তাহাদের ধারণার মধ্যেই আসে নাই। এই উপলক্ষে ভারতের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ-সম্বন্ধে কিছু কথাবার্তা হইল। মিস মেওর পুস্তক পড়িয়া ভারতবর্ষ সম্বন্ধে তাহাদের যে অদ্ভুত ধারণা হইয়াছে তাহা দূর করিবার জন্য বেগ পাইতে হইল। ভারতকে সৰ্বজাতির সম্মুখে হেয় প্রতিপন্ন করিবার উদ্দেশ্যে প্ররােচিত হইয়া মিস মেও যে সকল জঘন্য কুংসার অবতারণা করিয়াছেন, অনবরত তাহার প্রতিবাদ করা ছাড়া ভারতবাসীর গত্যন্তর নাই। য়্যাসেম্বিলীর কমিটীতে যথেষ্ট পরিশ্রম করা হইতেছে। কাজও কিছু হইতেছে। এ পর্যন্ত মহারাজা বিকানীর ছাড়া প্রকাশ্য সভায় কোন ভারত-প্রতিনিধি কোন কথা বলেন নাই। অধ্যাপক ব্যাপার্ড ও তাঁহার অতিথিগণের সহিত কথাবার্তার ফলে মনে হইল যে প্রকাশ্য সভায় বড় গলায় বলিয়া যাইতে হইবে যে সভ্য ইউরােপ ও আমেরিকাকে দিবার মত ভারতবর্যের নিজস্ব অনেক কিছু এখনও আছে। আজ ম্যাসেম্বিলীর সভায় সেই সুরে সুদীর্ঘ বক্তৃতা করিলাম। লােকের যথেষ্ট মনঃপূত হইল, করতালি, ‘সেকহাণ্ড’ ‘কনগ্রাচুলেসেনর’ অভিনন্দনের অতি মাত্রা পাইয়া অভিভূত হইয়া পড়িলাম। দুঃখের বিষয় আমি লিখিয়া বক্তৃতা করিতে পারি না। যদি বক্তৃতা লিখি তাহা হইলে মুখস্থ করিয়া বলিতে পারি না। কাগজ হইতে পড়িতে হয়, তাহা এরূপ সভায় অশােভন। কাজেই মনে যা আসে মুখে তাহাই বলিতে হয়। বলাটা নিতান্ত মন্দ হয় নাই, দেশে কাউন্সেলের রিপাের্টারেরা সৰ্বা অনুযােগ করিতেন যে আমার দ্রুত বক্তৃতা তাহারা রিপাের্ট করিতে পারেন না, এখানেও সেই দুর্দশা। বক্তৃতার পর লিখিয়া বষে পথে p কাগজওয়ালাকে দেওয়া আমার অভ্যাস নাই, কাজেই এ সকল সংবাদ দেশে বা বিদেশে প্রকাশ হইবার অবসর হয় না। আমার দাঁতের কন্নানির কথা বিলাত হইতে তারে পাইওনীয়ার পত্রে গিয়াছিল কিন্তু দেশের জন্য এত কথা বলিতেছি তাহার সংবাদ যায় না। ব্রিটিশ ডেলিগেশনের মিষ্টার বাক্সটন প্রথম হইতেই বিশেষ যত্ন এবং আপ্যায়ন করিতেছেন। আজ চা খাইতে নিমন্ত্রণ করিয়াছিলেন। তাহাকে বারংবার স্পষ্টাক্ষরে বলিলাম এবং তাহার দলকে ও দলপতি গণকে বুঝাইতে বলিলাম যে, ভারতবর্ষের প্রতি ন্যায় বিচার না করা অবধি ভারতবাসী কিছুতেই শান্তিলাভ করিতে পারিবে না। সকল কথায় তাহারা মুখে একমত হন, কিন্তু কাজের বেলায় কিছু হয় না- বিভ্রাট তাে এখানেই। পুনরায় বিলাত যাইবার জন্য মেয়ে-পুরুষে বারংবার আমাকে জিদ করিতেছেন, সময়ে সময়ে মনও টলিতেছে। কিন্তু মত পরিবর্তন করিতে প্রস্তুত নই। ক্রমশঃ খুব ঠাণ্ডা পড়িয়া আসিতেছে। অন্য কোন কারণে না হউক এই কারণেই শীঘ্র দেশে ফিরিতে হইবে। মহারাজাধিরাজ বর্ধমান বিজয়া-সম্ভাষণের কার্ড প্রতি বৎসর যেমন পাঠান, এবারও এখানে তাহা পাঠাইয়াছেন, তঁাহার অভিবাদনের পরিবর্তে অভিবাদন পাঠাইলাম। পুনরায় বিলাতে ফিরিয়া যাইবার জন্য পীড়াপীড়ি বাড়িয়া গেল। বিলাতে লর্ড লিটনের সঙ্গে দেখা হয় নাই। আমি লণ্ডনে ফিরিয়া যাইব না শুনিয়া তিনি বিশেষ দুঃখ করিয়া পত্র লিখিয়াছেন। মিষ্টার বক্সটন ও মিষ্টার ডাণ্টন উভয়েই পার্লামেন্টের বিশিষ্ট সভ্যদের সঙ্গে দেখাশুনা ও কথাবার্তা কহিলে ভারতের পক্ষে অনেক উপকার সম্ভব জানাইলেন ; হয় তত ইহা আংশিক সত্য, কিন্তু বর্তমান অবস্থায় আমার পক্ষে এ পথ অবলম্বন দুঃসাধ্য।
জেনেভা-ভ্রমণ য়্যাসেম্বিলীতে প্রকাশ্য বক্তৃতার পর ক্যানেডা, অষ্ট্রেলিয়া প্রভৃতি স্থানের প্রতিনিধিগণের সহিত সখ্যতা আরও বাড়িয়া গেল, ক্যানাডার ভূতপূৰ্ব প্রধান মন্ত্রী স্যর রবার্ট বর্ডেন বক্তৃতার পর আমার নিকটে উঠিয়া আসিয়া অভিনন্দন করিলেন। ইংরাজিতে যাহারা বক্তৃতা করিয়াছেন তাহাদের মধ্যে বর্ডেন একজন প্রধান বক্তা। তাহার খ্যাতিও জগৎ বিখ্যাত। রবিবার ৫ই অক্টোবর, ১৯৩০। কাল শনিবার লীগ অব, নেসস য়্যাসেম্বিলীর শেষ অধিবেশন হইয়া কাৰ্য শেষ হইয়াছে। তারপর সভাস্থলে বিদায়ের পালা, রাত্রেও বিদায়ের পালা। যাহারা বিলাত ফিরিবেন ও যাহারা এই হােটেলে এতদিন একত্রে থাকিয়া সখ্যতাসূত্রে আবদ্ধ করিয়াছেন কাল তাহারা সকলেই চলিয়া গেলেন, স্যর ডেনিস ব্রে, স্যর বসন্ত মল্লিক, স্যর জুলফিকার আলি, মিষ্টার বাজপাই ও অন্যান্য অনেক লােক গেলেন, আমাদের সঙ্গে যে সেক্রেটারী ও কর্মচারিগণ আসিয়াছিলেন তাঁহারাও গেলেন। সকলেই কাজের সুবিধার ও ব্যক্তিগত সুবিধার জন্য যথেষ্ট চেষ্টা ও পরিশ্রম করিয়াছেন, সকলকে যথাযথ ধন্যবাদ ও কর্মচারিগণের মধ্যে কাহাকেও কাহাকেও কিছু কিছু পুরস্কার দিয়া তুষ্ট করিবার চেষ্টা করিলাম। কর্মচারী ও লেডী টাইপিষ্টদিগের বাহিরে গিয়া “চড়ুই ভাতির ব্যবস্থাও করা হইয়াছিল। নানাপক্ষী এক হােটেল-বৃক্ষে মাসাবধি বাস করিয়া আজ দশদিকে গমন কগিল। ব্রিটিশ ও অন্যান্য ডেলিগেটরা ক্রমে ক্রমে অন্তর্ধান হইয়াছেন, 'বাকী আজ সব গেলেন । হােটেল একেবারে ফাক হইয়া গেল। বিজয়া দশমী অন্তে উৎসবগৃহে বাস অপেক্ষা কষ্টকর অবস্থা কল্পনা করা যায় না। আমাদের মাসেলস এ জাহাজ ধরিতে আরও পাঁচদিন বাকী।
বথে পথে ৬৭ হয়তো এ পাঁচদিন ফ্রান্সের দক্ষিণে কোন কোন স্থানে বেড়াইয়া যাওয়া যাইতে পারিত, কিন্তু তাহার ক্ষমতা ও উৎসাহ কুলাইতেছে না। সেইজন্য এইখানেই পাঁচদিন কাটান স্থির করিলাম। হােটলের খরচা বিষম। ঘরের ভাড়া প্রত্যহ এক পাউণ্ড, খাওয়ার খরচ প্রত্যহ এক পাউণ্ডের উপর। সকল জিনিষই এখানে দুর্মূল্য। তথাপি মােটের উপর এখানে থাকাই স্থির। যেমন লােকে নিমন্ত্রণ করিয়া খাওয়াইতেছে, তেমনই আমাদিগকেও সঙ্গে সঙ্গে প্রতিনিমন্ত্রণ করিতে হইতেছে। দুপুরে, রাত্রে চা-পানের নিমন্ত্রণে ক্রমশঃ সব বন্ধুবান্ধবকে খাওয়ান হইয়াছে। বাকী যে সব বন্ধুবান্ধব আছেন আজ হােটেলের খানা টেবিলে বা চা পাটীতে আহ্বান করিয়া আলাপ-পরিচয় ও বিদায় গ্রহণ করা হইল। কোন কোন ক্ষেত্রে ভঁহাদের নিজের মধ্যে মনােমালিন্য-বশতঃ সকলকে একদিনে নিমন্ত্রণ করা সম্ভব হয় নাই, ভারতবাসীর অল্প সংখ্যক অধিবাসীর মধ্যেও এ দারুণ মনােমালিন্য বড়ই পরিতাপের বিষয়। কালরাত্রে ও আজ সমস্তদিন বৃষ্টি হইয়া খুব ঠাণ্ডা পড়িয়াছে। সােমবার ৬ই অক্টোবর, ১৯৩০ আজ ক্ষণে ক্ষণে জলবায়ুর অবস্থার পরিবর্তন হইতেছে। সকালে জলবৃষ্টি—তারপর খুব রৌদ্র, তারপর খুব জল, তারপর মেঘ, তারপর শীত। এইরূপ পরিবর্তন যথেষ্ট অসুখ হয়—সর্দি কাশী, নিউমোনিয়া প্রভৃতি খুব হইতেছে। বাহিরে বেড়াইতে যাইবার মােটে সুবিধা নাই, শহরের পথ-ঘাটও বন্ধ, যাইতে হইলে মােটরের প্রয়ােজন। কয়দিনে প্রায় হাজার মাইল মােটরে গতিবিধি হইয়াছে। যতদূর সাধ্য সাবধানে থাকার চেষ্টা করিতেছি। এখনও বহুখানার নিমন্ত্রণ ৮৮ জেনেভী-ভ্রমণ আসিতেছে—তাহা প্রত্যাখ্যান করিতে বাধ্য হইতেছি। আমাদের নিমন্ত্রণকারীদের মধ্যে 'কাহাকেও কাহাকেও এখনও খাওয়ান হয় নাই, কাজেই ক্রমশঃ সে সব কাজ সারিয়া যাইতে হইতেছে, এ সকল সামাজিক দেনা রাখিয়া যাওয়া কোন মতেই হইতে পারে না। ক্রমে ক্রমে যাহাদের সঙ্গে দেখা করিয়া বিদায় লওয়া উচিৎ তাহাদের নিকট বিদায় লইতেছি, অনেক প্রধান কর্মচারী চলিয়া গিয়াছেন। লীগ সভার প্রধান কর্মচারী স্যর এরিক ডুমণ্ড লীগের প্রাণ স্বরূপ, তিনি বিশেষ যত্ন ও আদরের সহিত বিদায় দিলেন। যাহাতে ভারতবর্ষে লীগের অফিস স্থাপিত হয় এবং যে সকল বরেণ্য সভ্যরা লীগে প্রতিবৎসর আসেন তাহাদের মধ্যে বাছাই করা পণ্ডিতগণের দ্বারা ভাল ভাল বক্তৃতা করিবার ব্যবস্থার জন্য বিশেষ অনুরােধ করিলাম। স্যর এরিক ডুমণ্ড, বড়লাট আরউনের অনুরক্ত বন্ধু। তাঁহাকে অভিবাদন জানাইতে বলিলেন। এখন সার এরিক ড্রাম লীগসভার সম্পাদক পদ ত্যাগ করিয়াছেন এবং রােম নগরে প্রধান রাজদূত পদে অধিষ্ঠিত হইয়াছেন। তাহার সহিত এখনও পত্র ব্যবহার চলিতেছে । জেনিভা সহরে Reformers Monument নামে যে অপূৰ্ব ও অতিকায় ধর্ম-সংস্কারকগণের প্রতিমূর্তি আছে—তাহার পার্শ্বে রাজা রামমােহন রায়ের মূর্তি স্থান পাওয়া উচিত এ কথা জেনিভার প্রধান পুরুষগণের নিকট উপস্থিত করিয়াছিলাম। রামমােহন রায় শতবার্ষিক- স্মৃতি সভায় সে কথা তুলিয়াছি। সম্প্রতি সার এফি ড্রামণ্ডকে এ বিষয়ে বিশেষ সাহায্যের জন্য লিখিয়াছি। তিনি তাহার ভূতপূর্ব জেনিভা সহযােগীগণকে অনুরােধ করিলে ইহা কার্যে পরিণত হইতে পারে। গত শনিবার রাত্রে ফ্রান্সে লােমহর্ষণ ব্যাপার হইয়া গিয়াছে, সভ্য-জগৎ তাহাতে স্তম্ভিত। B-101 নামে প্রকাণ্ড হাওয়ার জাহাজ বধে পথে, ৮৯ বিস্তর যাত্রী লইয়া বিলাত হইতে ভারতবর্ষে যাইতেছিল, এতলােক লইয়া এত বড় হাওয়ার জাহাজ কখনও ভারতবর্ষে যায় নাই। রাত্রি দুইটার সময় ফ্রান্সের মাঝ বরাবর সেই জাহাজে কিরূপে আগুন লাগিয়া পুড়িয়া ৫০/৬০জন লােক মারা গিয়াছেন। এই শােকাবহ ব্যাপারে হাওয়ার জাহাজ বিভাগের প্রধান মন্ত্রী লর্ড টমসন, Air Admiral ( হাওয়ার জাহাজ-বিভাগের প্রধান সেনাপতি) প্রভৃতি অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তি জীবন হারাইয়াছেন। সকলের প্রাণে দারুণ আঘাত লাগিয়াছে -হাহাকার পড়িয়া গিয়াছে ; জাহাজ যখন মাটীতে পড়ে তখন সাহায্যার্থ বিস্তর লােক ছুটিয়া গিয়াছিল। রাত্রে এ দুর্ঘটনা হইলেও সাহায্য-চেষ্টার ত্রুটী হয় নাই। কিন্তু অগ্নিকাণ্ড এমন ভীষণ যে বহুদূর হইতেও উত্তাপের জন্য কেহ অগ্রসর হইতে পারে নাই। জাহাজের জলের চৌবাচ্চা ভাঙ্গিয়া যাওয়াতে কয়েকজন অর্ধদগ্ধ যাত্রী রক্ষা পাইয়াছেন। আজ লেডী ব্লমফিল্ডের উদ্যোগে এ বিষয়ে শােকপ্রকাশ জন্য এক সভা হয়। আমাকে সে সভায় প্রধান বক্তা হইবার সম্মান দেওয়া হইয়াছিল। মানুষের শিল্প-কৃতিত্ব ও বিজ্ঞান-কৃতিত্ব সময়ে সময়ে এই সকল দারুণ বিভ্রাট নিবারণ করিতে পারে না—এই কথা লইয়া কিছু আলােচনা হইল। ভগবদিচ্ছা ছাড়া মানুষের ইচ্ছায় কাৰ্য হয় না। পরমহংস রামকৃষ্ণ দেবের স্মৃতি উপলক্ষে শ্ৰীযুত অমূল্যচরণ চট্টোপাধ্যায় মহাশয় এক প্রবন্ধ পাঠ করেন। সে উপলক্ষেও বক্তৃতা করার আহ্বান ছিল। এ সকল বিষয়ে পাশ্চাত্য নরনারীর মনােযােগ ক্রমশঃ আকৃষ্ট হইতেছে। ইহা আশা ও আনন্দের কথা। ইউরােপ ও আমেরিকার এ সকল আলােচনার সাহায্যে ভারতবর্ষের দাবী সভ্য- জগতের নিকট দিন দিন স্বীকৃত হইবে। ইহাতে সুফলের আশা করা অসঙ্গত নয়।
জেনেভা-ভ্রমণ T জলবায়ুর গতিক দেখিয়া মনে হইতেছে যে, যতদিন জাহাজে না চড়া যায় ততদিন ফ্রান্সের দক্ষিণে কোনস্থানে গিয়া কাটাইলে ভাল হইত। কিন্তু অল্পদিনের জন্য নূতন ব্যবস্থার সুবিধা হইল না। আজ ভারি ভারি মাল কুক এণ্ড সন-এর প্রতিযােগী কোম্পানী Wagon Litzএর জিদা করিয়া ঝাড়া হাত-পা হওয়া গেল ; কিন্তু প্রয়ােজনীয় অনেক জিনিসের অভাব হইতেছে। তিন চারদিন নিতান্ত বাসায় থাকা কিংবা রেল গাড়ীতে থাকার মত করিয়া থাকিতে হইবে। চশমার সুবিধা হইতেছে না বলিয়া চক্ষুরােগের বিখ্যাত ডাঃ বােল (Dr. Bolle)-এর নিকট পুনরায় যাইলাম। তাহার পরামর্শ মত চশমা বদলাইতে দোকানে দোকানে গিয়া দেখিলাম যে দোকানদারের নিকট সেদিন চশমা কিনিয়াছিলাম তাহার মৃত্যু হইয়াছে। কিমাশ্চৰ্য্যমতঃপরং মনে পড়িয়াও তত মানুষের কাজ কিছু হয় না। স্যর বসন্ত মল্লিকের R-101 হাওয়ার জাহাজে ভারতবর্ষে যাইবার কথা ছিল, আমাদের যাওয়ার কথাও তিনি বলিয়াছিলেন। মারে কৃষ্ণ রাখে কে, রাখে কৃষ্ণ মারে কে ? মঙ্গলবার ৭ই অক্টোবর, ১৯৩০ সমস্ত দিন বৃষ্টি-বাদল মেঘ ও ঠাণ্ডা। হােটেলের বাহিরে যাওয়া দুঃসাধ্য। সমস্ত সকাল বেলাটাই ঘরে পড়িয়া কাটিল। ডাক্তার সুধীন্দ্রনাথ ঘােষ যে ফ্রেঞ্চ-সুইস মহিলার পাণিগ্রহণ করিয়াছেন, তিনি তাহার আড়াই বৎসরের মেয়েটি লইয়া দেখা করিতে আসিলেন, ডাক্তার ঘােষ আসিতে পারেন নাই; মহিলা বিদুষীও বুদ্ধিমতী, যথাসাধ্য তাহাকে গৃহস্থালীর পৈদেশ দিলাম। ২টার পর বৃষ্টি সত্ত্বেও চশমাওয়ালার দোকানে গেলাম। কাৰ্য শেষ হইল না, হােটেল মিরাবাে হইতে পণ্ডিত শ্যামশঙ্করকে লইয়া জেনেভা ইউনিভারসিটি দেখিতে গেলাম। ইনি নৃত্যকলাবিদ শ্রীযুক্ত উদয় শঙ্করের বম্বে পথে পিতা। International Lawএর অধ্যাপক Professor Rappard, Rectorকে পূর্বে পরিচয় পত্র পাঠাইয়াছিলেন। রেক্টর মহােদয় স্বয়ং উপস্থিত ছিলেন, অনেকক্ষণ ধরিয়া ইউনিভারসিটির কাৰ্যকলাপ দেখাইলেন উদ্ভিদবিদ্যার অধ্যাপক একজন দিগগজ পণ্ডিত। যেরূপভাবে সে বিভাগ গঠিত হইয়াছে ভারতবর্ষে তাহা করিতে এখনও ২০২৫ বৎসর লাগিবে। ছােট নগণ্য ইউনিভারসিটি জেনেভাকে তাচ্ছিল্য করিবার যাে নাই। অনেক তথ্য সব শুনিলাম, যাহার ধারণা পূর্বে কিছুমাত্র ছিল না। জেনেভার অধ্যাপকদিগের একটা বৈশিষ্ট্য এই যে তাহারা নিজ নিজ আসনে” বা “গ্রামে” বসিয়াই নিজ নিজ শাস্ত্রচর্চায় তৎপর। বিদেশে জাঁকজমক প্রকাশের তাঁহাদের ইচ্ছা নাই। গণিতবিভাগ, আইনবিভাগ, বিজ্ঞান, ইতিহাস, ধর্মশাস্ত্র প্রভৃতি সকল বিভাগেই খুব জোরের সহিত কাজ হইতেছে। বহুপূর্বেই ইউনিভারসিটির সহিত পরিচয় হইয়া নিত্য সেখানে যাতায়াত করি নাই ইহাতেই দুঃখ হইল। যেখানে লীগ মিটিং হইত, ইউনিভারসিটি ঠিক তাহারই সম্মুখে। মান্দ্রাজ অঞ্চলের পিঠাপুরাম দেশের মহারাজা সপরিবারে বেড়াইতে আসিয়া এখানে আছেন, আজ হঠাৎ তাঁহার সঙ্গে পরিচয় হইল। রাজা রামমােহন রায়, ব্রাহ্মসমাজ, ইউনিভারসিটি প্রভৃতি-সম্বন্ধে বহু আলাপ হইল। তিনি ব্রাহ্মসমাজের হিতৈষী, নিজে ব্রাহ্মধর্মাবলম্বী স্বাধীনচেতা, শিক্ষিত, সৎসাহসী জমিদার। ব্রাহ্মসমাজের প্রভূত উপকার করিয়াছেন। ব্রিষ্টলে রাজা রামমােহন রায়ের স্মৃতি-মন্দির মেরামত করিয়া দিয়াছেন। বুধবার ৮ই অক্টোবর, ১৯৩০ আজ ও মেঘ ও ঠাণ্ডা। জেনেভার লােকেই বলিতেছে এমন সময় এমন জঘন্য জল-হাওয়া কখন দেখে নাই।
জেনেভা-ভ্রমণ মানের দায়ে বড় হােটেলে কয়েকদিন কাটাইয়া খরচ করা ছাড়া বিশেষ কোন ফলােদয় হইল না। মধ্যাহ্ন ভোেজনের পর ইউনিভারসিটি অঞ্চলে পুনরায় বেড়াইতে গেলাম, কাল যে সব জিনিষ দেখা বাকী ছিল ও যে সব অধ্যাপকগণের সহিত কথাবার্তা হয় নাই তাহা হইল। সব হওয়া সম্ভব নয়, যতদূর সম্ভব তাহাই হইল। এই চার পাঁচদিন কাছাকাছি, সুবিধা মত থাকিলে এ কাজ আরও ভাল হইত। ইউনিভারসিটির পশ্চাতেই সুন্দর বাগান, বড় বড় গাছের সারি দেওয়া পথ ও চমৎকার দূৰ্ব্বাক্ষেত্র। পড়াশুনার জায়গা বলিয়া এখানে কোন নীরস বা কঠোরতা নাই। লাইব্রেরী ও পড়িবার ঘরের ব্যবস্থা ও আলােক-প্রণালী দেখিয়া চমৎকৃত হইতে হয় বড় বড় জানালা দিয়া আলােক আসিতেছে, ছাতের উপর হইতে আলাে আসিতেছে। প্রত্যেক পাঠকের স্বতন্ত্র আসন, তাহাদের ছাতা, কোট, টুপী রাখার ব্যবস্থা স্বতন্ত্র। কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরীর মত দিন দুপুরে আলাে আলিয়া চোখের মাথা খাইয়া পড়িতে হয় না, (Reaussue) রুসাে কীর্তি স্মরণাৰ্থ স্বতন্ত্র লাইব্রেরী আছে—তাহার প্রতিমূর্তি (Bust) ও এখানে আছে। প্রত্যেক ফ্যালটীর স্বতন্ত্র লাইব্রেরী আছে, Relief Map-সাহায্যে আল্পস পর্বতের ভিন্ন ভিন্ন অংশ, সুইজারল্যাণ্ড, ফ্রান্স, ইটালী ও অষ্ট্রিয়া দেশের আলপস বিভাগ দেখিয়া অনেক জিনিস সহজে বােঝা গেল। Rhine, Rhone, Danube, Po, Aver প্রভৃতি বড় বড় নদী ভিন্ন ভিন্ন গ্লেসিয়ার হইতে বাহির হইয়া ভিন্ন ভিন্ন উপত্যকা ভেদ করিয়া সাগরে গিয়া কেমন পড়িতেছে তাহা অতিকায় “রিলিফ ম্যাপ” সাহায্যে সুন্দররূপে দেখা গেল। Hotel De ville অর্থাৎ টাউন হলে পুরাতন পূথি পত্র ও নূতন পুস্তকের সম্ভার দেখিয়া আশ্চর্য্য হইতে হয়। সেখানে অধ্যাপক (Bouregois) বাের্জোয়াস প্রকৃতিতে ও মূর্তিতে ঋষিতুল্য ব্যক্তি।
বধে পথে 1977 167 Reform movemente, History of Switzerland প্রভৃতি-সম্বন্ধে কথাবার্তা কহিয়া মুগ্ধ হইতে হইল। ৭০ বৎসর বয়সেও তাহার অদম্য জ্ঞান-পিপাসা ও কর্মশক্তি। রাজা রামমােহন রায়- সম্বন্ধে তাহার বিশেষ কিছু জানা ছিল না,—সব বুঝাইয়া বলিলাম যে Reform-যুগের যেমন অন্যান্য মনীষিগণের মূর্তি Reform Monumentএ রহিয়াছে, রাজা রামমােহন রায়ের মূর্তিও সেই স্থানে স্থান পাওয়া উচিত। যদি কখন পুনরায় ইউনিভারসিটি সংস্কার ও পুনর্গঠন সাহায্যের সুবিধা পাই তাহা হইলে এই ক্ষুদ্র জেনেভা ইউনিভারসিটিতে যাহা দেখিলাম ও শুনিলাম তাহা কাজে লাগিবে। ভারতবর্ষের ছাত্রের আসিলে প্রভূত উপকারের সম্ভাবনা। এখন লীগ অব নেস-এর সাহায্যে জগতের সকল সভ্যজাতির নিকট ভারতের কথা উপস্থিত করিতে হইবে, ভারতের দাবী জানাইতে হইবে। তাহার জন্য যে সকল পণ্ডিত-কর্মীর প্রয়ােজন তাহারা এখানে যত শীঘ্র সমবেত হইয়া স্থায়ী প্রতিষ্ঠান স্থাপন করিয়া সৰ্বাঙ্গীন কর্মের জন্য প্রস্তুত হইতে পারিবেন ততই মঙ্গল। আমি বারংবার বিশেষভাবে অনুরােধ করিয়াছি এবং করিতেছি—অন্যান্য মহাজাতির ন্যায় ভারতবর্ষীয় প্রতিনিধিগণের জেনিভা সহরে স্থায়ী প্রতিষ্ঠান স্থাপন বিশেষ প্রয়ােজন। International Law এবং Constitutional Law-সম্বন্ধে এখানে প্রচুর আলােচনা হইতেছে এবং International Tribunal of Justice-সাহায্যে তাহা কাজে লাগান হইতেছে। এইরূপ অনেক কীর্তি লীগ স্থাপন করিতেছে। এই Hotel De Ville ও ইউনিভারসিটির মধ্যে এক প্রাচীর আছে। গৃহাকে কেন্দ্র ও উপলক্ষ্য করিয়া জেনেভার লােকদের ১৪ জেনেভা-ভ্রমণ বাৎসরিক উৎসব হয়। সপ্তদশ শতাব্দীতে এইখানে House of Savoy এর সৈনিকগণকে নৈশ সমরে পরাস্ত করিয়া জেনেভার স্বাধীনতা স্থাপিত হয়—ইহার স্মরণ চিহ্রস্বরূপ এই উৎসবের আয়ােজন। নিকটেই Historical Museum প্রভৃতি লােক শিক্ষার স্থান আছে। ইউনিভারসিটির সম্মুখে মিস ষ্টোরী নামে এক সুইস রমণীর পুস্তকের দোকান আছে। ভারতবর্ষ-সম্বন্ধে অনেক পুস্তক এখানে বিক্রয় হয়। মিস ষ্টোরী রবিবাবুর ভক্ত। তাহাকে আনিয়৷ জেনেভার বাহিরে বাগানে রাখা হইয়াছিল। তাঁহার স্বাস্থ্য-সম্বন্ধে বিশেষ কড়া পাহারার তদ্বির হইয়াছিল। স্যর বসন্ত মল্লিক পৰ্যন্ত দেখা করিতে পান নাই। মিস্ ষ্টোরী ও এজ সাহেবের তত্ত্বাবধানে টিকিট করিয়া বক্তৃতা, কবিতা-পাঠ ও শিল্প-প্রদর্শনী হইয়াছিল। রবিবাবু এখান হইতে রুসিয়া গিয়াছেন, সেখান হইতে আমেরিকা যাইবেন। ৯ই অক্টোবর, বৃহস্পতিবার, ১৯৩০ আজ জেনেভায় অবস্থিতির শেষ দিন। যাত্রার দিনটা কোথায়ও ভাল লাগে না, আনন্দের দিন নয়। নানা পক্ষী এক বৃক্ষ হইতে নিশাবসানে যখন দশদিকে ধাবিত হয়, তাহাদের প্রভাতীগানের আনন্দলহরীর সহিত করুণ রসের মিশ্রণ আছে কি না তাহারাই জানে, আর জানেন বিধাতা; কিন্তু মায়াজালবদ্ধ মানবের মানসিক গঠন অন্যরূপ। যেখানে থাক, যতক্ষণ থাক, যতদিন থাক মায়ার জাল সেখানে বােনা হইয়াছে, মাকড়সার জালের মত ক্ষীণবল হইলেও তাহা জাল উহা ছিন্ন ভিন্ন করিতে বাধ্য হইতে হয় ; তাহাতে সৌন্দৰ্য্য ও সৌকুমাৰ্য্যের অভাব ঘটিবেই ঘটিবে। দেশী-বিদেশী বন্ধুদের কৃপায়, যত্নে ও আতিথ্যে জেনেভন প্রবাসক্লেশ 'বম্বে পথে, বিশেষ অনুভূত হয় নাই। যে হােটেলের খাবার জ্বালায় ও ঐশ্বৰ্য্য পীড়ায় বিব্রত হইয়া পড়িয়াছিলাম তাহা ছাড়িতেও ক্লেশবােধ হইল। যে ঘরটীতে (৯১নং) ছিলাম তাহার অসুবিধা নিবারণের জন্য ম্যানেজার কয়দিন ধরিয়া অন্য ঘর লইতে বলিতেছিলেন কিন্তু তাহাও পছন্দ হইতেছিল না। সুবিধা-অসুবিধার মধ্যে যে ঘরে বেশী দিন কাটাইয়া সামান্য শেষ কয়দিনের জন্য তাহাও ছাড়িতে ইচ্ছা গেল না, অন্য হােটেলে উঠিয়া যাইতে ইচ্ছা গেল না। ফ্রান্সের দক্ষিণে বা সুইজার- ল্যাণ্ডের অন্য কোন ভাল জায়গায় যাইতেও ইচ্ছা গেল না। সংসারের নিয়মই এই। যাহাদের ছাড়িয়া যাইতে বা ছাড়িয়া থাকিতে মায়া হয় তাহারা তো তাহা বোঝে না। বয়স-দোষে অনিচ্ছার মূলে আলস্যও হয় তাে আছে। কয়দিন ক্রমাগত বৃষ্টি ও ঠাণ্ডার জন্যও কোনও পরিবর্তন হইল না। বাদলার জন্য সমস্তদিন হােটেলেই কাটিল, আজও নিমন্ত্রণের ধুম খুব। ডাক্তার ও মিসেস দাস, মিষ্টার ও মিসেস চ্যাটার্জী- অমূল্য) মিষ্টার ও মিসেস দালাল সকলেই বিদায়-ভােজের আয়ােজন ও পীড়াপিড়ি করিয়াছিলেন, সকলেই ষ্টেশন পর্যন্ত দেখা করিতে আসিলেন। আর আসিলেন পণ্ডিত শ্যামশঙ্কর, মিষ্টার তারিণী সিংহ, ডাক্তার সুরেশ ভট্টাচাৰ্য্য এবং শ্রীমান্ সুধীন্দ্র ঘােষ। বিদায়-পৰ্য্যায় করুণ। জল-বৃষ্টির মধ্যেই মার্শেলস্-এর ট্রেণ রাত ৮৩৫ মিনিটের সময় জেনেভা ছাড়িল। বেগ্রেড ষ্টেশনে ফরাসীরাজ্য আরম্ভ। চুঙ্গী- মাম্বল আদায়ের জন্য গাড়ী অনেকক্ষণ থামিল। মাল তদারক- সম্বন্ধে আমাদের উপর কোন গােলযােগ হইল না। ব্রিটিশ গভর্ণমেন্ট ও ফ্রেঞ্চ রাজত যে ছাড়পত্র দিয়াছেন তাহার উপর কথা চলে না। রাজার হলে Wagon Litz গাড়ীতে শয্যা ও শয়নকক্ষের জেনেভ-ত মণ আসবাবের কোন অভাব বা অসৌন্দর্য্য “নাহ, ইহার জন্য দণ্ড অনেক দিতে হয়, কিন্তু শয্যাসম্ভারে যদি সুনিদ্ৰা আনিতে পারিত তাহা হইলে জগতের অনেক দুঃখ ঘুচিত। সমস্ত রাত্রি নানা চিন্তায় অভিভূত ছিলাম। পলকমাত্রও নিদ্রা হইল না। ভাের পাঁচটার সময় মার্শেল নামিতে হইবে এই কারণেও নিদ্রার অভাব হইল। রজনী কিন্তু বৃথা গেল না বরং সার্থকতা ও সাফল্যে পূর্ণ। প্রথমবার ১৯১২ সালে ফ্রান্সের রাস্তায় বাড়ী ফিরিবার সময় রেল গাড়ীতে যে সার্থকতায় ধন্য হইয়াছিলাম, আজও প্রভুর কৃপায় তাহা ঘটিল। অনেক কাজ বাকী—তাহার অপার দয়ায় হৃদয় অনুভূতি পূর্ণ; প্রভূতশক্তি সঞ্চার সম্ভব হইল। 4. S. Razmak ( রাজমাক ) ১০ই অক্টোবর, শুক্রবার, ১৯৩০ এত বড় ষ্টেশন মার্সেল-ইহাতে যাত্রী বসিবার ঘর-( Waiting Room) এর চিহ্নও নাই—যাহা আছে, তাহাতে সময় অতিবাহন ভদ্রলােকের পক্ষে দুঃসাধ্য। বিশ্রামাগার ও জলযােগের ব্যবস্থা (Refreshment Room) ষ্টেশনে থাকিলে হােটেলওয়ালাদের ব্যবসায় চলে না বলিয়া বােধ হয় এইরূপ ব্যবস্থা। প্লাটফর্মের উপর ঠেলা গাড়ীতে ভােরে কাফি বিক্রয় হইতেছে। বিস্তর লােক তাহা খাইতেছে, কিন্তু আমাদের প্রবৃত্তি ও ভরসায় কুলাইল না। কাজেই হােটেলের আশ্রয় অবলম্বন করিতে হইল, বড় বড় দুরে নানা রকম চোর- জুয়াচোর জোটে। অত ভােরে টমাস ‘কুক প্রভৃতির দোভাষীও উপস্থিত না থাকাতে হােটেলে উঠিতে হইল। হাত-মুখ ধােওয়া, জঘন্য কাফি খাওয়া ও কিছুক্ষণ শয্যায় আশ্রয় লইয়া অনিদ্রার শেষ দুঃখ ভুলিবার চেষ্টার জন্য দণ্ড বড় কম দিতে হইল না।
is se)
aীপে ••
= 4 ***
News
* - ৮৭.
১। **
*, ' ১ ।
As ।
Hv
*
২
hNখ৯
১৯
জেনেভা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যানে “রিফৰ্ম্মাস মনুমেন্ট”
No text on this page.
বৈম্বে পথে, । বেলা হইলে টমাস কুকের লােকের সাহায্যে মালপত্র সংগ্রহ করিয়া বেলা ১০টা নাগাদ জাহাজে উঠিলাম। মার্সেলস শহরে উল্লেখযােগ্য পারিপাট্য বিশেষ কিছু নাই—রাস্তা ঘাট বাড়ী সবই ফ্রান্সের ও ইউরােপের অন্যান্য দেশের শহরের মত, কিন্তু বহু পুরাতন শহর বলিয়া গির্জা, মনুমেন্ট প্রভৃতির বাহুল্য যথেষ্টই আছে। বিদেশীকে অল্প সময়ের জন্য থাকিতে হয় বলিয়া হােটেলও অনেক। রাস্তায় গাড়ী চলাচলের ব্যবস্থা লণ্ডন বা জেনেভা কিংবা কলিকাতার মতও সুখের নয়, বরং অনেক অংশে হীন। Notre Dame, Shateud If (ঔপন্যাসিক ডুমা প্রনীত “মণ্টিক্রিষ্টো” অভিনয় কেন্দ্র) প্রভৃতির উল্লেখ পূৰ্ব্ব পূৰ্ব্ব বারে করিয়াছি, তাহাতে বিশেষ কিছু নাই। কদৰ্য্য জল-হাওয়ার দেশ ছাড়িয়া সূৰ্য্যালােকে তৃপ্তিবােধ হইলবরং গরমও ছিল। কিন্তু সমুদ্রের ধারে পৌছিতে দারুণ ঠাণ্ডা, কনকণে হাওয়া বহিতে লাগিল। জাহাজের বাহিরে দাড়ায় কার সাধ্য, সমস্তদিন প্রায় কেবিনেই কাটিল—রাত্রের অনিদ্রা, এই হাওয়া তার উপর আবার গলফ অব লিনােতে (Gulf of Lyous) সমুদ্র- চাঞ্চল্য (Ground Swell) এর সঙ্গে সঙ্গে তুফান উঠিল। বেলা ১টার পর জাহাজ ছাড়িল, সমস্ত দিনরাত ঐ বিক্ষোভের দরুণ জাহাজের চারিদিকে উদ্দাম নৃত্য আরম্ভ ( Pitch and toss) হইল। আবার টেবিলে বাসন রক্ষার জন্য বেড়া (Barrier) দিতে হইল। শনিবার, ১১ই অক্টোবর, ১৯৩০ রাত্রের দুর্যোগ কাটিয়া গিয়া সুন্দর প্রভাত। “অজপা” মন্ত্র আপনা হইতে মনে পড়িল, ক্রমে ক্রমে লােজনের সঙ্গে আলাপ আর+পরিচিত-অপরিচিত অনেক লােক, জেনেভায় আমাদের সরকারী ভেজে যাহাদের নিমন্ত্রণ করিয়াছিলাম তাহার মধ্যে বম্বে ১৮ জেনেভা-ভ্ৰম প্রদেশের ভাের-রাজ্যের মহারাজা ছিলেন, তিনি সদলে জাহাজে আছেন। মাদ্রাজ জেলের অধ্যক্ষ Major Contractor . M. S. আছেন, ভারতীয় হিসাব-বিভাগের পেনসন্ প্রাপ্ত কর্মচারি হেজেলন্টাইন (Hezeltine) আছেন। কলিকাতার সওদাগর Herredge আছেন, চক্ষুর ডাক্তার Major Kirwan আছেন, আর আছেন আমার এই কয় মাসের ভ্রমণ ও কর্মসহচর প্রেসিডেন্সি কলেজের অর্থনীতির অধ্যাপক স্তর জেহাঙ্গীর কয়াজী। জাহাজটী ঘােট, ব্যবস্থা-বন্দোবস্তও বড় সুবিধার নয়। শুনিলাম ভারতে ডাক এ জাহাজে যাইতেছে না। ‘ওলপিণ্ডি’ নামক অন্য জাহাজে যাইতেছে, যাত্রী বেশী হওয়াতে একটা বেশী জাহাজ দিয়াছে। গত্যন্তর নাই। রবিবার, ১২ অক্টোবর, ১৯৩০ সুন্দর প্রভাত, না গরম না বেশী ঠাণ্ডা, জাহাজের সকলে যে যার ব্যবস্থা করিয়া বসিয়াছে। নূতন বাড়ীতে নূতন ঘরকন্না পাতা হইয়াছে। নূতন বন্ধুত্ব, নূতন আত্মীয়তা, নূতন প্রীতি-অপ্রীতির সৃষ্টি হইতেছে । পুরাতন পশ্চাতে পড়িয়াছে। পূৰ্বশ্বতি অনেক মুছিয়া গিয়াছে দারুণ ভবিষ্যৎ-সম্বন্ধে কাহারও খেয়াল নাই, সংসারের সুখ-দুঃখ মান- অপমান, শােক, আনন্দ সব ভােলা আছে কিন্তু যেন যােগবলে অতীতও ভবিষ্যৎ লুপ্ত, সুন্দর প্রভাতের মধুর বাতাস সব পরিষ্কার করিয়া দিয়াছে। ভূমধ্যসাগর অপূৰ্ব্ব গৌরবের অধিকারী। টেবেনিয়ান সমুদ্রে অতীত কলহ, বর্তমানে অশান্তি স্মরণ করাইয়া দিতেছে—তাহার নীল বক্ষ কত আততায়ীর রক্তে রঞ্জিত, ইতিহাস তাহার অকাট্য সাক্ষ্য দিতেছে, 'তথাপি কৰ্তমান-মুগ্ধ মানব অন্ধ—ইচ্ছা করিয়া অন্ধ সিসিলি ও ইটালির মধ্যে গলফ অব মেসি (Gulf of ।
বম্বে পথে . থে Massina) সকালে পার হইলাম, কাজেই আগ্নেয়গিরির সৌন্দৰ্য্য ও নৈশ ঐশ্বৰ্য্য নয়নােচর হইল না। মনে পড়িল রােমানদিগের সহিত কার্থেজ বীর হানিবল-(Hannibal) এর আমরণ পণ সংগ্রাম। কোথা আজ সেই রােম, কোথায় কার্থেজ। আছে বর্তমান ভূমধ্যসাগর- পূৰ্বে যাহা ছিল নৃশংস সাহারা তুল্য মরুভূমি। রবিবার ভগবান আরাধনার ঘণ্টা শুনিতে পাইলাম সস্যমবার, ১৩ই অক্টোবর, ১৯৩০ জাহাজ পূৰ্ব্বমুখে চলিয়াছে। ঘড়ির কাটা এখন না পিছাইয়া দিয়া আগাইয়া দেওয়া হইতেছে। বাড়ীর কাছে যত আগাইয়া যাইতেছে সময়ের তারতম্য তত কমিতেছে। বেলা একটার সময় ক্রীট দ্বীপ বামে রাখিয়া জাহাজ চলিল। তীরের খুব নিকট দিয়াই যাইতেছে, ক্রীট দ্বীপের পাহাড়ে বরফ খুব পড়ে—ঠাণ্ডা বেশ বুঝা যায়। সর্বত্র পাহাড়ে বরফ পড়িতে আরম্ভ হইয়াছে, আমরা জেনেভা ছাড়িবার পূর্ব হইতে কয়দিন ধরিয়া আলপস পৰ্বতে তুষার পড়িতে আরম্ভ হইয়াছে, কাজেই শেয কয়দিন সেখানে শীতের খুব প্রকোপ ছিল, মার্সেলএও তাহার জের চলিয়াছিল, এখন ঠাণ্ডা বেশ কমিয়া আসিতেছে, বরং দুপুর বেলা গরম। আমার এবারকার কেবিন পাের্ট সাইডে নয় কাজেই দুপুর বেলা বিকালের রৌদ্র ভােগ করিতে হয় বেশী । এই জাহাজে পাটনা হাইকোর্টের চারজন জজ ছুটির শেষে ফিরিয়া যাইতেছেন। ইহাদের মধ্যে জজ রস পূর্ব-পরিচিত। আলিপুর, হুগলী প্রভৃতি স্থানে ইনি জজিয়তী করিয়া পাটনা হাইকোর্টে আসিয়াছেন। ইহাদের ছুটী কলিকাতা হাইকোর্টের পুর্বে হয়, কাজেই পাটনা হাইকোর্ট পূর্বে--খােলে। কলিকাতা হাইকোর্টের জজেরা , পরের জাহাজে ভারতবর্ষে ফিব্রিবেন। জজ বাহাদুরদের সঙ্গে পুরাতন, কথা অনেক জেনেভা-ভমঃ হইল, সহযাত্রীদিগের সহিত আলাপ পরিচয় ক্রমশঃ বাড়িতেছে এবং নানা কথার আলােচনা চলিতেছে। বরাবরই দেখিয়াছি একটু সাবধানে থাকিয়া নিজের মর্যাদা রক্ষা করিয়া চলিলে লােক আপনা- আপনি আলাপ করে। ইহাদের সঙ্গে আলাপের মূল্য আছে। এক শ্রেণীর লােক আছেন যাঁহারা ভারতবাসীর সঙ্গে মােটেই মিলিতে চান , অথবা শিক্ষা ও ভদ্রতার অভাবে মিশিতে পারেন না, তাঁহাদের হইতে দূরে থাকাই শ্রেয়। থাকাই শ্রেয়। এখন ইহাদের মধ্যে ভারতবিদ্বেষ যেরূপ বাড়িয়াছে তাহাতে ইহাই মঙ্গল। সকলেরই মুখে এক কথা। ভারতের অগ্রপন্থী দেশ-হিতৈষীদিগের অনুচিত ব্যবহার ইংরাজের অপ্রীতির কারণ হইয়াছে, ইহাই তাহারা প্রমাণ করিতে চান। কোন অনুচিত ব্যবহারের জন্য সকলে দায়ী নয়। যতদিন এ ব্যবহার প্রকট হয় নাই তখনও এই শ্রেণীর লােকের ভারতবাসীর প্রতি যথেষ্ট বিদ্বেষ ছিল, একথা তাঁহার ইচ্ছা করিয়া ভুলিয়া যান। এবার জাহাজে পুরুষ অপেক্ষা স্ত্রীলােক ও ছেলেপুলের সংখ্যা বেশী ; আঁহাদের পরিবারগণ বিলাত গিয়াছিলেন তাঁহারা সব ফিরিতেছেন। Rangoon Port Office এর Mr. Price ও কলিকাতার এক Cable companyর Mr. Leake নামে দুইজন ইংরাজ খুব ঘনিষ্ঠতা করিতে- ছেন, বম্বে প্রদেশের মহারাজা ভাের খুব আত্মীয়তা করিতেছেন। তাহার রাজ্য ক্ষুদ্র হইলেও তিনি অনেক লোেকহিতকর কার্যের উদ্যোগী, সেই সকল উদ্যোগকে সাফল্যমণ্ডিত করিবার প্রয়াসে পুত্রকে লইয়া দেশ- ভ্রমণে বাহির হইয়াছেন, সঙ্গেলােক জন ও কর্মচারী অনেক আছে। আলস্যবশতঃ সূর্যোদয়-দর্শন বড় ঘটে না, কিন্তু অস্তশােভা দেখিয়া মিত্য মুগ্ধ হইতেছি, “নীল সিন্ধু-জল”-বক্ষে সে অপূর্ব লালিমার-বিকাশ ভুলিবার নয়।
বন্ধে পথে, ১০১ বেড়ান, খাওয়া-দাওয়া প্রভৃতি যেরূপ চলিয়াছে তিন মাস পূর্বে পরিজনবর্গ বােধ হয় তাহা স্বপ্নেও ভাবিতে পারিত না। মঙ্গলবার, ১৪ই অক্টোবর, ১৯৩০ ক্রমশঃ গরম বাড়িতেছে, কিন্তু ঠাণ্ডাও বেশ আছে, নরম-গরম মিলিয়া জল-হাওয়া একরকম উপভােগ্য রূপ ধারণ করিতেছে। লেভান্ট সমুদ্ৰ পূৰ্ব কীর্তির বহু পরিচায়ক ফিনিসিয়ান-ইহুদী ইতিহাসের সহিত নিগুঢ়ভাবে সম্বদ্ধ। বর্তমান ইতিহাসেও ইহার স্থান কম নয়। প্যালেষ্টাইনের ভবিষ্যৎ-সম্বন্ধে সকল জাতিরই ঔৎসুক্য, আশঙ্কা ও আশার অবধি নাই। লর্ড লটনের পত্রে জেনেভাতে অবগত হইয়াছিলাম যে, তিনি আপাততঃ অল্পদিনের জন্য ও শীঘ্র অধিকদিনের জন্য প্যালেষ্টাইন যাইবেন, তাহার সেখানে কি কাজ ঠিক জানি না। গােলমল যদি মিটাইতে পারেন তাহা হইলে দুঃর্ভাগ্যবশতঃ বঙ্গদেশে যে অকীৰ্ত্তি অর্জন তাহার ভাগ্যে ঘটিয়াছিল তাহার কিয়দংশ মােচন হইবে। • ‘আমরা পােট সৈয়দ শীঘ্র পৌছিব’ কাল এই কথা চায়ের টেবিলে উল্লেখ করাতে পেশওয়ার প্রদেশের একজন সৈনিক কর্মচারী বিস্ময়ের সহিত বলিলেন “I am afraid so” (তাই তাে ভয় হচ্ছে)। সে কথা আমার মনে বা মুখে আসিবে কেন ? তিনি যাইতেছেন দেশ ছাড়িয়া ; আমি যাইতেছি দেশে; আমি যাইতেছি উদগ্রীব হইয়া, তিনি “I am afraid so” বলিবেন ইহার আশ্চৰ্য্য কি ? আগামী কল্য সকালে পাের্ট সৈয়দ পৌছিবার কথা ছিল। কিন্তু জাহাজ খুব দ্রুত চলিয়াছে, যদি লণ্ডন হইতে বারংবার নিষেধ বিনা তারে না আসিত আমার আরও শীঘ্র পৌছিম, পুরাতন হইলেও আমজাক জাহাজ কর্মঠ ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন; 2. & ০, কোম্পানী জেনেভা জেনেভী-ভণ এই যাত্রার পরই কোন আমেরিকান কোম্পানীকে ইহা বিক্রয় করিবেন স্থির হইয়া গিয়াছে। কর্মচারী মহলে হাহাকার পড়িয়াছে কারণ আজকাল মন্দার দিনে সহসা চাকুরী মেলা দায়। ষ্টুয়ার্ড (Steward) পাশার (Purser) প্রভৃতি কর্মচারী খুব যত্ন আপ্যায়ন করিতেছেন তাহাতে দুপুরবেলা সুরুয়া পােলাও ডাল প্রভৃতির আয়ােজন হইতেছে । দুপুরবেলা ডেকের উপর গােমাংসের সুরুয়ার ব্যবস্থা বরাবর ছিল কাজেই মাদৃশ জন তাহাতে বঞ্চিত থাকিত। আমি জাহাজের কর্তৃপক্ষ- গণকে এবার স্পষ্ট বলিলাম যে কেবল Bovril ব্যবস্থা অত্যন্ত অন্যায় কারণ তাহা আমরা গ্রহণ করি না, কাজেই অপর ব্যবস্থা হইয়াছে। গুছাইয়া সময় মত চেষ্টা করিলে এ সব সামান্য ক্ৰটী শােধন হইয়া যায়। দিল্লী রেলওয়ে বাের্ডের একটী কর্মচারী সপরিবারে যাইতেছেন। ভঁহাদের বাল গােপাল তুল্য কুড়ি মাসের একটা চমৎকার শিশু আছে, কি জানি কেন তাহার আকর্ষণ আমার উপর পড়িয়াছে। মা, বাপ ছাড়িয়া ছুটিয়া আমার কোলে আসিয়া ঝাঁপাইয়া পড়ে ও থাকিতে চায়। পােপাল-মহাত্ম তাহাদিগকে কিছু বুঝাইলাম। কানপুর (Cawnpur Atherton West company) তুলা কলের একজন মালিক ওয়েষ্ট সাহেবের সঙ্গে খ্রীষ্ট চরিত ও ক্রশের মহাত্ম-সম্বন্ধে অনেক কথা হইল। কুলিদের দুর্দশা-মােচনে সাহেব প্রতিশ্রুত হইলেন এবং ভারতীয় তথ্য- সম্বন্ধে অভিজ্ঞতা লাভ ও সহানুভূতি সৃষ্টির উদ্দেশে তথ্য সংগ্রহ জন্য পুস্তকের তালিকাও করিয়া লইলেন। কলিকাতার জহুরী হামিণ্টন কোম্পানীর বড় সাহেব মিঃ গ্র্যান্ট এবং ঘােধপুর মহারাজার কৌন্সলের ভাইস প্রেসিডেন্ট Col Wyndham স্বতঃপ্রবৃত্ত হইয়া ভারতীয় ব্যাপার সম্বন্ধে অনেক আলােচনা করিলেন। সকল শ্রেণীর ইংরাজের মধ্যে একটা সাড়া পড়িয়াছে-চেষ্টা হইতেছে যে কিসে হাঙ্গামার মীমাংসা হয়। খেলাধূলা, বাজী, ঘােড়-দৌড় নাচ ও তজ্জন্য চাল প্রভৃতির বষে পথে ১০০ ৫ আয়জন হইতেছে। গর বেশী পড়িবার পূর্বে এ সকল বিষয়ের শেষ করিবার চেষ্টা হইতেছে। তবে জাহাজ ঘােট, স্থান অল্প ; কাজেই আসর জমিতেছে না। পাের্ট সৈয়দ পৌছিতে প্রায় পাঁচটা বাজিল। অন্ধকারে বন্দরে নামিতে ইচ্ছা হইল না। বারংবার যাতায়াতের জন্য ঔৎসুক্য, উত্তেজনা সব কমিয়া আসিতেছে। নামিয়া দেখিবার বিশেষ কিছু নাই। দোকান, হােটেল, আফিস, বদমাইসের আড়া এই সব লইয়া পাের্ট সৈয়দ। পূর্বে যেরূপ বীভৎস ও জঘন্য কাণ্ড হইত এখন তাহার কম। ইংরেজ ফরাসী ও ইজিপ্সিয়ান কর্তৃপক্ষগণের হস্তে সব ভার। ডুবুরি, বাজীকর, দোকানদারের ভিড় ও হাঙ্গামা বরাবর যেমন দেখা যায় এবারও তাই ; পুরাতন যাত্রী নামিল নূতন উঠিল—পাইলট, ডাক্তার, পুলিস, চুঙ্গী আদায়ের কর্মচারী, যাত্রীদের আত্মীয় প্রভৃতিতে ছোট জাহাজ রাত্রি ১১টা পর্যন্ত মুখরিত ; বন্দরের দুইদিক প্রকাণ্ড ইলেকটিক আলাে ও ইলেকটিক আলাের বিজ্ঞাপনে জল স্থল ও আকাশ আলােকিত হইয়া অপূৰ্ব শােভাধারণ করিল। পূর্ব পূৰ্ব্ব বারে দিনে দিনেই পাের্ট সৈয়দে যাওয়া আসা হইয়াছে কাজেই এখানে অপূর্ব আলােকপাত দেখি নাই। বম্বে, এডেন, মার্সেল এর আলােকপাতের সম্ভাবনা নাই। দুক্ষিণ আফ্রিকার কোন কোন বন্দরে দেখিয়াছি। এই স্থানের মধ্যে দেখিলাম আর এক অপূৰ্ব শােভা—আমার ডাইনে ও বঁায়ে একখানা বড় জার্মান ও একখানা বড় ডচ, জাহাজ পূর্ণ- আলােকিত অবস্থায় ভূমধ্য সাগরে প্রবেশ করিল। এই দুই বড় জাহাজ ধীর গতিতে যখন দক্ষিণে ও বামে গেল তখন পুলকিত না হইয়া থাকিবার যাে ছিল না। Like ships passing in the night অথচ পূর্ণ আলােকে উদ্ভাসিত। এরূপ জেনেভা-ভ্রমণ এই দ্বীমালার মধ্যে দিয়া এসিয়া, আফ্রিকা, ইউরােপের মহাসঙ্গম ত্রিবেনী পশ্চাতে রাখিয়া সুয়েজখালে রাত্রি ১১ টার সময় প্রবেশ করিলাম। মন যে তিমিরে সেই তিমিরে। বুধবার, ১৫ই অক্টোবর, ১৯৩০ সমস্ত রাত ধরিয়া সুয়েজখাল পার শেষ হইল না। প্রাতঃকালে দুই ধারে বিস্তীর্ণ মরুভূমির সহিত পুনঃ পরিচয় করিতে করিতে ধীরে ধীরে অগ্রসর হইলাম। মাঝে মাঝে বড় বড় হ্রদ-Bitter Lake-- মাঝে অন্য জাহাজের স্থান করিবার জন্য খাল চওড়া করা হইয়াছে। Dredger সৰ্ব্বদা খাল দোরস্ত রাখিবার জন্য মাটী কাটিতেছে। মরুভূমির মাঝেও গাছপালা আছে, আরব ও ইজিপসীয়ান (মিশর দেশীয়) বালক বালিকারা জাহাজ দেখিয়া চিৎকার করিতেছে, আনন্দে নাচিতেছে। নিত্য যাহা দেখিতেছে, তাহা দেখিয়াও এই আনন্দ। গরম পড়ার সঙ্গে সঙ্গে তীরের মাছির দল আসিয়া পরিচয় করিতেছে। বহু কাল মশা, মাছি, ছারপােকার উপদ্রব হইতে রক্ষা পাইয়াছি, পুনঃ পরিচয় আরম্ভ হইল। কান্টারা, পাের্ট টিউফিক (Port Towfik) প্রভৃতি পার হইয়া সুয়েজ পৌছিতে প্রায় সাড়ে বারটা বেলা বাজিল। দেখিতে দেখিতে খােলা সমুদ্রে আবার পডুিলাম, লােহিত সমুদ্র লােহিত মূর্তি ধারণ করিতে বিলম্ব করিল না। দূরে উত্তর পশ্চিমে পড়িয়া রহিল, সুয়েজ শহর-তাহার পশ্চিমে Murray Hill. বৃহস্পতিবার, ১৬ই অক্টোবর, ১৯৩০ গরম গরম করিয়া মেয়ে পুরুষে ছুটাছুটি করিতেছে, কিন্তু তাহাতে আমােদ-আলাদ, খেলা-ধূলার ত্রুটী কিছুই নাই, আমরাই কেবল অস্লাড় হইয়া ডেক-চেয়ারে পড়িয়া আছি। আর পরের পর Morning Tee, বম্বে বােম্বে-পথে Breakfast, Decksoup, Lunch, Afternoon Tea, Evening appetiser, Dinner and supper তুই এই কয়টা খাবার ঠিক ঘণ্টা মত পাইয়া খাইতেছি, ইহার বিপৰ্যয় ব্যত্যয় কিছুমাত্র নাই। অনিদ্রা বন্ধ করিবার জন্য কোন কোন রাত্রে ২টার সময় রুটী ও বাদাম ভাজা চলিয়াছে, ইহার একবর্ণও অতিরঞ্জিত নয়। মাত্রায় কম হইলেও বারে কম নয়। রুটী, বিস্কুট, কেক, স্কন্স Oat meal cake, শাক-সজী, নানারকম ফল, মাখম পনির, পুংডি, আইসক্রীম, শ্যাণ্ডউইচ সব পৰ্য্যায় মত আসিতেছে। এ তালিকা নূতন করিয়া দিতে চাই এইজন্য যে, দেখাইতে চাই গাে-মাংস ও শূকর মাংস না থাইলেও জাহাজে বা বিদেশে অনাহারে মরিতে হয় না। fantacat Cavalry officer, Southern Maharatta Ry Assistant Transport officer, লাহাের বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের নূতন অধ্যাপক মিঃ ব্রুস, (Mr. Bruce) প্রভৃতি সহযাত্রী অযাচিত- ভাবে অগ্রসর হইয়া আলাপ করিলেন। ভারতের এখন বড় দুর্ভাগ্য, তাই আমাদিগকে ইচ্ছা করিয়া পিছাইয়া থাকিতে হয়। যখন কোন মহাত্মা আগুয়ান হইয়া আলাপ পরিচয় করেন, তখন আহলাদের কথা- বার্তা হয় অনেকে আমাদিগকে সন্দেহের চক্ষে কেহ কেহ বা ভয়ের চক্ষে দেখেন অতএব অগ্রসর হইতে ইচ্ছা করেনা। কলিকাতার চক্ষু-চিকিৎসক কর্ণেল কারওয়ান (col. Kirwan) এর সঙ্গে আলাপের ইচ্ছা ছিল, হঠাৎ তিনি নিজেই আসিয়া জুটিলেন। কাল রাত্রে সাদা-মাটা নার্ট হইয়া গিয়াছে। আজ Fancy Dress Ball—সাজ-গােজ ধূম-ধাম খুব হইল, পাছে ইহারা মনে করেন যে বাবুরা নিজেদের মেয়েদের বাহিরে আনেন না, অথচ আমাদের মেয়েদের অনাবৃত সৌন্দৰ্য্য দেখিবার ইচ্ছা করেন সেই জন্য নাচের দিকে আগাইলাম না। এখানেও পশ্চাৎপদী” ভাল।
জেনেভা-প্রণ - সকাল, দুপুর, বিকাল, সন্ধ্যা, রাত্রি আলােচনার বিষয় :-“উঃ কি গরম” বাস্তবিক সকলে মিলিয়া দেখা হওয়া মাত্র এ সংবাদ নৃতন সংবাদ দিবার মত ঔৎসুক্যের সহিত না দিলেও দিলেও জানিতে বাকী থাকে না যে কয়দিন বিষম গরম চলিয়াছে। লােহিত সমুদ্রে গরম চলিবে ইহার আর আশ্চর্য কি ? কিন্তু অন্যান্য বারের ন্যায় এবার বিশেষ কষ্টকর গরম এ-কথা বলা চলে না। দুপুরের পর হইতে এবার আমার কেবিনের দিকে পশ্চিমে রৌদ্র পাওয়া যায় তাহার জন্য গরম বেশী বােধ হইতেছে। রাত দুইটার পর হইতে অনেকক্ষণ ডেকে কাটাইতে হইয়াছে, মেয়েরাও যে যার বালিস চাদর বগলে লইয়া ডেকে আশ্রয় লইতে বাধ্য হইয়াছেন, লােহিত সমুদ্রে প্রতিবারই এরূপ হয়। জল নীল দেখিতেছি, লােহিত কখনও দেখি নাই। কেহ কেহ কখনও কখনও লােহিত জল দেখেন, কিন্তু গগনে যে লােহিত তেজ দেখিতেছি তাহাই যথেষ্ট। দুই দিকে, নিকটে না হয় দূরে মরুভূমি; উত্তপ্ত বালুর উপর দিয়া যে হাওয়া আসে তাহাও বিষম উত্তপ্ত। আলস্যবশতঃ সূর্যোদয় দর্শন ঘটে না। আজ ছয়টা বাজিবার পূর্বে ডেকে আসিয়া অপূর্ব সুৰ্যোদয়-শােভা দর্শন করিয়া “অজপার” পূর্ণ উপলব্ধি করিবার সৌভাগ্য ঘটিয়াছে। অরুণ ও সূৰ্য্য প্রতিনিয়ত এই মােহন সাজে সাজিয়া জগতের প্রতি অংশকে উদ্বুদ্ধ ও আনন্দিত করিতেছেন। আমি যেখানে আছি আমারই জন্য সেখানে উদয় ও অন্তের এই অপূৰ্ব্ব নানা অভিনয় হইতেছে, তাহা নয়। লীলাময় প্রতি- নিয়ত পৃথিবীর প্রত্যেক অংশে আবর্তন বলে এ শােভাসম্পৎ ছড়াইতেছেন। কয়াজী সাহেবের, জাহাজের রাধুনী ঠাকুরের সহিত প্রত্যহ দেখা শুনা করার ফলে ডাল, পােলাও, চাঁপাটী, কোর্মা প্রভৃতির নিত্য বথে পথে অবতারণা হইতেছে। নিত্য নূতন নূতন লােক যাচিয়া কথাবার্তা কহিতেছেন, ভারতবর্ষের ভাগ্য-বিচার, ভারতবাসীর বিচার সকলেই অল্পবিস্তর করিতেছেন। • সামান্য যে-কিছু সংবাদ পাওয়া যাইতেছে তাহাতে ভারতের দুর্দৈব নিত্য বাড়িতেছে মনে হয়। আমি এ সকল নাচ-তামাসা হইতে দূরে থাকিয়া নিজের কেবিনের দিকেই ঘেসিয়া বসিয়াছিলাম, সাজগােজ করা অনেক মেম সাহেব আসিয়া আলাপ আপ্যায়ন করিলেন—তাঁহাদের সাজগােজ কেমন হইয়াছে, তৎসম্বন্ধে মতামত জিজ্ঞাসা করিলেন, কেহ পাঠান, কেহ বেদুইন, আরব সর্দার, কেহ ভাঁড়, কেহ আরও কত কিছু সাজিয়া গরমে গলদ ধৰ্ম্ম হইয়াও নাচ তামাসায় রাত ১২টা পর্যন্ত কাটাইলেন। জাতির শক্তি ইহাতেই বাড়িয়া যাইতেছে । মেমেদের “স্কার্ট” ও ঘাঘরা ক্রমশঃ অল্প অল্প করিয়া আবার দৈর্ঘ্যে বাড়িতেছে, সঙ্গে সঙ্গে শীলতা ও সুনীতিপ্রিয়তা ফিরিয়া আসিলেই রক্ষা, সকল বিষয়েই স্ত্রী ও পুরুষের তুল্য অধিকার দাবীর পর যে সব ভয়াবহ ব্যাপার ঘটিতেছে তাহাতে চমকিয়া উঠিতে হয়। বিলাতের বিখ্যাত পাদরী Dean Inge ও Cannon Streaten তাঁহাদের পুস্তকে এ সম্বন্ধে যে ভীতিপূর্ণ বিবৃতি করিয়াছেন তাহা যেন বিশ্বাসই হয় না। শনিবার, ১৮ই অক্টোবর, ১৯৩০ বেলা ১০ সময় মধ্যাহ্ন ভোেজনকালে পেরিন (Perin) দ্বীপ বামে রাখিয়া এডেনের দিকে জাহাজ অগ্রসর হইতে লাগিল, ললাহিত সমুদ্রের লােহিত মূর্তি ক্রমশঃ কমিতে লাগিল। দুইদিন হইতে যে ভীষণ গরম এবং হাওয়ার অভাব সকলেই অনুভব করিতেছিল তাহা কমিয়া আসিল, সন্ধ্যার পূর্বে এডেন পৌছিবার কথা ছিল তাহা হইল না, সন্ধ্যার পর জাহাজ এডেন পৌছিল। শােভাশূন্য নগ্নগাত্র এডেনের পাহাড়ও * '? ১০৮ জেনেভা-ভম আলােকমালায় সজ্জিত হইয়া নিতান্ত মন্দ দেখাইতেছিল না। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের অভাবেও মানবের চেষ্টায় ও যত্নে মনােহারিত্ব লাভ করা একেবারে দুর্লভ নহে। জগতে মনােহারিত্বের স্থান ও প্রয়ােজন যথেষ্ট আছে। এ বন্দর ও পাের্টসৈয়দ রাত্রের আলােকে কখনও দেখি নাই-- মন্দ লাগিল না। বন্দরে নামিবার ইচ্ছা ছিল না। তবে সহযাত্রী পারসী- গণের অনুরােধে এডেনওয়ালা স্যর হরমসজী দিনসার (Sir Harmosji Dinshow) Aden Wallaর পক্ষের সনির্বন্ধ আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করিতে পারিলাম না। তাঁহারাই ষ্টীমলাঞ্চে করিয়া লইয়া গেলেন, পাঁচ মাইল দূরে crater অর্থাৎ আগ্নেয়গিরির গর্ভস্থানে তাহাদের অগ্নি পূজার মন্দিরে ( Fire Temple) লইয়া গেলেন—পার্শী প্রথামত ভূরিভােজনের ব্যবস্থা করিলেন। আজ স্যর হরমসজীর পিতৃশ্রাদ্ধ বাসর—অনেক লােকের আহ্বান হইয়াছিল। ইহাদের এডেনের কারবার ১৮৬৪ সাল হইতে চলিয়াছে—সম্রান্ত যাত্রীদিগকে স্বল্প সময়ের জন্যও নামাইয়া লইয়া তাঁহারা এইরূপে আদর আপ্যায়ন করেন। ১৯১২ সালে এইরূপে আতিথ্যলাভ করিয়াছিলাম মনে আছে। তাহাদের কর্তৃপক্ষগণের মুখ মাঝে মাঝে মনে হয়। পুরাতন লােক কাহাকেও দেখিলাম না। রাত্রি অন্ধকার বলিয়া Moses Tank নামে বিখ্যাত জলাধার দেখিতে যাইবার সুবিধা হইল না। গতবারে তাহা দেখিয়াছি ও বর্ণনা করিয়াছি। সমুদ্রের লােনা জল হইতে সুপেয় পানীয় জল তৈয়ারী করিয়া বিক্রয় করা দিনশা কোম্পানীর প্রধান কারবার ছিল। জলের দাম অনেক দিতে হয় বলিয়া অনেকে আটশত নয়শত ফিট পূৰ্য্যন্ত নামাইয়া পাতকুয়া করিয়াছে—কিন্তু জল তত সুপেয় নহে। লােহিত সমুদ্রে নূতন নূতন ছােট বন্দর অনেক হইয়াছে বলিয়া •এখানকার কারবার কম হইয়াছে। এভেন সম্প্রতি ভারত গভর্ণমেন্টের বথে-পথে, ১০৯ । কর্তৃত্বের অধীন হইতে উপনিবেশ আপিস (Colonial office) এর অধীনে যাইবার চেষ্টা চলিতেছে। ভারতবাসীরও জীয় লােকের তাহাতে বিশেষ অসুবিধা ; দক্ষিণ আফ্রিকায় যাহা হইতেছে এখানেও তাহাই ক্রমশঃ হইবে। ভারতবাসীর ভাগ্য উপনিবেশ মাত্রেই ক্রমশঃ অপ্রসন্ন হইতেছে এবং হইবে। ছােট জায়গা বলিয়া এই শাসনপ্রণালী পরিবর্তন ব্যাপারটা নিতান্ত ছােট নয়। পাশী মহাজনেরা এ সকল জায়গায় একচেটিয়া ব্যবসায় চালাইতেন। এখন তাহাদের প্রতিপত্তি কমিয়া গিয়াছে বলিয়া তাঁহাদের মধ্যে বিদ্বেষের ভাব যথেষ্ট বাড়িয়াছে। কর্মপ্রাণ পার্শী সম্প্রদায় যে অগ্রপন্থীগণের সহিত পূর্ণপ্রাণে যােগ দিবেন পূর্বে তাহা কেহ মনে করিত না। কিন্তু এখন তাহা ঘটিয়াছে। এ জাহাজেও কয়লা পােড়ে না। তেলের আগুনে জাহাজ চলে। P & ০ কোম্পানী এ জাহাজ বিক্রয় করিয়াছেন। বম্বে হইতে নিউ- জিল্যাণ্ডে চলিয়া যাইবে । সেইজন্য অনেক তেল লইতে হইল। কাজেই ১১টার সময় না ছাড়িয়া জাহাজ ছাড়িতে ভাের হইয়া গেল। একে তো গরম তার উপর আবার কখন জাহাজ ছাড়ে এই অনিশ্চিততায় রাত্রে নিদ্রার যথেষ্ট ব্যাঘাত হইল। ঘরে ফিরিবার মুখে চিন্তা-স্রোতের ব্যাঘাত না হইয়া বৃদ্ধিই প্রাপ্ত হইল। এই মহাসমুদ্র অনন্তকাল অক্লান্ত পরিশ্রমে নিজের কাজ করিয়া যাইতেছে—কে জানে তাহার চিন্তা-স্রোত কি। ক্ষুদ্র নগণ্য অকর্মণ্য মানব এই বিস্তীর্ণ জলরাশি দেখিয়াও চিন্তাক্ষেভে এত অধীর হয় কেন ? নিজ অকর্মণ্যতা প্রতি পদে তাহার চিন্তার সহায় হয়। রবিবার, ১৯ অক্টোবর, ১৯৩০ বম্বে এটর্ণী-সভার সম্পাদক মিঃ নারায়ণ পাণ্ডিয়া বম্বেতে দুইদিন থাকিয়া এটর্ণী-সম্প্রদায়ের কনফারেন্সের যে সব কাজ বাকী আছে জেনে-ভ্রমণ ৫ তাহার আংশিক আললাচনার জন্য লিখিয়া-ছন। সহসা বম্বে পুনরায় আসা সম্ভব হইব না বলিয়া ইহাতে স্বীকার করিয়াছি। বম্বে হইতে ছাড়িবার সময় তাহারা এ কথা বলিয়াছিলেন, কিন্তু বম্বেতে গােলমাল যেরূপ বাড়িতেছে তাহাতে এ সকল কাজ-কর্ম ধীরে সুস্থে করিবার সময় ও সম্ভাবনা কোথায়—দেশের সাধারণ বিপদে সকলেই ব্যস্ত, এ সকল অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র বিষয়ে সংযতভাবে মন দেওয়া সম্ভব হইবে কি না সন্দেহ। এডেন হইতে পূৰ্বমুখ হইয়া জাহাজ দ্রুত চলিতে পারিতেছে না— জোর হাওয়া বাধা দিতেছে। গরম ক্রমশঃ কমিয়া আসিতেছে, জাহাজ যত পুরাতন শুনিয়াছিলাম তত নয়। ইলেকটিক পাখা নাই; তাহার পরিবর্তে আছে বড় বড় নলে করিয়া ঘরে ঘরে জমাট ঠাণ্ডা হাওয়া বিতরনের ব্যবস্থা, যে দিকে ইচ্ছা নল যােরান যায়, কিন্তু ঘর ঠাণ্ডা হয় না। এক জায়গাতেই হাওয়া লাগে। সােমবার, ২০ অক্টোবর, ১৯৩০ আজ ভূত চতুর্দশী-আগামী কাল অমাবস্যা, কালী পূজার দিন বম্বে পৌছিব। বৃহস্পতিবার ভ্রাতৃদ্বিতীয়া। বম্বে হইতে যাত্রার দ্বিতীয় দিবসে হইয়াছিল জন্মাষ্টমী, পথে পথেই সব পাল পাৰ্বণ কাটিতেছে। ভবঘুরের দশাই এই। এ বয়সেও একথা আমার প্রতি বিশেষ প্রযােজ্য। তিনবার বিলাত, একবার দক্ষিণ আফ্রিকা, একবার বৰ্মা, একবার সেতুবন্ধ-রামেশ্বর, তারপর কতবার বম্বে, লাহাের, সিমলা, দিল্লী, গৌহাটী, চট্টগ্রাম, পুরি, মাদ্রাজ প্রভৃতি ঘুরিয়াছি তাহার সংখ্যা নাই। কত হাজার হাজার মাইল জলে স্থলে ঘুরিলাম,পাইলাম কি তা জানি না। যিনি ঘুরাইতেছেন তিনিই জানেন। আমি পাই নাই কিছু, খুঁজি নাই কিছু। যখন যে কাজে ভাগ্যবিধাতা ফেলিয়াছেন বিনা দ্বিরুক্তিতে ১১ বম্বে-পথে, তাহা করিয়া গিয়াছি। হৃদিহিত হৃষীকেশ তাহার কাজ জানন বােঝেন করেন, এবং করান আমার এই নেশার মধ্যে দিয়াই তাহাজ। আর কিছু করিতে পারি বা না পারিয়া থাকি, দেশের কোন কাজ হউক না হউক যেখানে ব্যথা পৌছায় ও খুব লাগে সেখানে যথেষ্ট ব্যথা দিয়াছি—এটা ধ্রুব স্থির। সকল আপদ-বিপদ কাটিয়া যাইতেছে, সে কেবল সেই ব্যথার মাঝে তন্ময় তপস্যার ফলে। সকল রকমে সকল বিষয়ে সুদরিদ্র হইয়াও আমি ধন্য। সে কেবল উপরােক্ত ব্যথীর অক্লিষ্ট অক্লান্ত তন্ময় তপস্যার ফলে ও বলে। অশ্রান্ত অক্লান্ত গতিতে আবহমান কালের সাগর চলিয়াছে—মানবকে সে তাহার মহান্ কর্তব্য শিখাইতেছে নিশিদিন যুগ যুগান্ত ধরিয়া । ক্যাবিনে শুইয়া এবং ডেকের রেলিং ধরিয়া দাড়াইয়া নরনারীর স্রোতের মাঝে ক্ষুদ্র তৃণের মত ভাসিয়া যাইবার অনুভূতি পাইয়া আমি একটা আশ্বাস ও অভয়বাণী পাই। এবার সাত হাজার মাইলের বেশী বােধ হয় জলভ্রমণ হয় নাই। প্রতি উত্তাল তরঙ্গের তালে তালে যেন মনে হয় আমি স্মৃতি-বিস্মৃতির মধ্য দিয়া জীবনের আদি হইতে এই তরঙ্গেরই মত উঠিতেছি পড়িতেছি ছুটিতেছি। কোথায় অন্ত কে জানে? স্যর জাহাঙ্গীর কয়াজী রান্নাবান্না ও Special Dishএর তদ্বির খুব করিতেছেন—পােলাও, কালিয়া, খিচুরী, পায়স (চোদ্দ শাক না জুটুক) অনেক রকম সবজী ভূতচতুর্দশীর মহিমা রক্ষা করিয়াছে। সাহেব বা মেমদের কাছে ভূত-চতুর্দশী, অমাবস্যা, ভ্রাতৃদ্বিতীয়া, জন্মাষ্টমী প্রভৃতির তথ্য আলােচনা করিতেছি। বুঝাইলে অনেকে বােঝেনুকেহ কেহ চমকিত ও মােহিতহন। উৎকৃষ্ট শ্রেণীর ইংরেজ স্ত্রী ও পুরুষের ভারতে যথেষ্ট প্রয়ােজন। সখ্যতা ও শান্তিসূত্রে আবদ্ধ হইতে হইলে পরস্পরের বােঝাপড়া নিতান্ত আবশ্যক। বিনাতারে যে সকল সংবাদ জাহাজে পৌছিতেছে তাহাতে ॥
১১২ জেনেভা-ভ্রমণ বােঝা-পড়ায় চিহ্ন তত কিছুই নাই। বম্বের অবস্থা শশাচনীয়, সর্বত্রই তাই মঙ্গলবার ২১ অক্টোবর, ১৯৩০ অমাবস্যা জাহাজের জোর বাড়িতেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ৪২৮ মাইল দৌড় করিয়াছে। জাহাজের দৌড়ের পরিমাণ উপলক্ষ্য করিয়া অনেক জুয়া-বাজী-খেলা হইতেছে। দেওয়ালী পর্বের মাহাত্ম এইরূপেই রক্ষিত হইতেছে। কালরাত্রে “গুপ্তধন অন্বেষণের খেলার দৌড় ধাপে রাত বারটা পর্যন্ত কাটিয়াছে। জাতটা আমােদ-আহলাদে বিশেষ পারদর্শী, আজ খেলাধূলা শেষ হইয়া বিজয়ী দলকে পুরস্কার বিতরণ করা হইবে, সুন্দরী যুবতীরা প্রােগ্রাম বেচিয়া বেড়াইতেছেন। আসিয়া হাসিয়া দাঁড়াইলেই তাহা লইতে হয়। যেমন এসব ব্যাপার চলিয়াছে তেমনি চলিয়াছে স্যার জর্জ অ্যাণ্ডার্সন, মিঃ জষ্টিস ম্যাকফারসন, কর্ণেল উইগুহাম, প্রােফেসর ব্রুস, কর্ণেল কন্টাক্টর, কর্ণেল কারওয়ানের সহিত নানা বিষয়ে সারগর্ভ আলোচনা। কলিকাতার সওদাগর স্মিথ সাহেবের স্ত্রী সেন্ট এজ বিদ্যায়তনে আমার সহ-গ্রাজুয়েট, তাহার সঙ্গে ও অন্যান্য মহিলাগণের সহিত আলাপ আপ্যায়ন চলিয়াছে। বুধবার ২২ অক্টোবর, ১৯৩০ জাহাজ খুব চলিয়াছে দিনে ৪০৮৪ ০৯ মাইল চলিয়াছে। কাল বেলা ৯০ টার সময় জাহাজ বন্ধে বন্দরে লাগিবার কথা, দেশে যাইতেছি, বাড়ী যাইব ; তবু মন এত নিরুৎসাহ কেন ; এত ভার কেন ? দেশের দিন দিন যে সংবাদ আসিতেছে তাহাতে মন ভার ও নিরুৎসাহ হইবে বিচিত্র কি ? ভগবান যে জ্ঞান, শক্তি, বুদ্ধি ও ইচ্ছা দিয়াছেন তৎসাহায্যে দেশ-মাতৃকার সেব্বার চেষ্টায় সাধ্যমত কোন ক্ৰটী এ পর্যন্ত হয় নাই। কিন্তু কোথায়ও যেন কিছু খাপ খাওয়াইতে পারিতেছি না। চারিদিকের 'বম্বে পথে। সকল চেষ্টাই ব্যর্থ হইয়া নিল্লাশার অন্ধকার ঘনাইয়া আসিতেছে, ঝাঁসীর কাছে বিস্ফোরক গণকটন (Guncotton) দিয়া আততায়ীর দল রেলপথ দুই চারদিন পূর্বে উড়াইয়া দিয়াড় কিছুদিন পূৰ্বে পূর্ববঙ্গ রেলওয়েতে এইরূপ ব্যাপার হইয়াছে। খুনখারাপী দাঙ্গা লুট ঘর-জালান জেলযাত্রা নিত্য কর্তব্যের মধ্যে দাঁড়াইয়া গিয়াছে। উভয় পক্ষেই পাগলের মত ব্যবহার করিতেছে, কর্তৃপক্ষ কি করা উচিৎ তাহার সু-পরামর্শ চাহিলেই বা কি পরামর্শ যুক্তিসঙ্গত ও কি পরামর্শ গ্রাহ্য হইবে তাহাও তত বুঝা যায় না। এই তত সব দেশের দশের কথা, পারিবারিক ক্ষেত্রেও চিন্তার যথেষ্ট কারণ—যত ভারতবর্ষের নিকটবর্তী হইতেছি তত চিন্তাভারে ক্লান্ত হইয়া পড়িতেছি। এত শীঘ্র বম্বে পৌছান বিষয়ে যদি ভােট দিতে হয় তবে কোন পক্ষে ভােট দিব স্থির করা দুঃসাধ্য। জাহাজ চলিতেছে ভাল হাওয়া ভাল, গরম কাটিয়া গিয়াছে—খাওয়া-দাওয়ার তদ্বির রীতিমত চলিয়াছে-কর্মচারীরা সকলেই আমাদের সুখ-স্বাচ্ছন্দের জন্য সর্বদাই ব্যস্ত। P. & 0. Companyর অধীনে রাজমাক জাহাজের এই শেষ যাত্ৰা বলিয়াই বুঝি তাহারা সকল যাত্রীর সুখ-আনন্দ-সুবিধার জন্য বদ্ধপরিকর। সহযাত্রীগুলিও ভাল জুটিয়াছেন, নৃতন কত লােকের সঙ্গে আপ্যায়ন হইল তাহার ইয়ত্তা নাই, কাহা কাহারও সঙ্গে এ বয়সেও এই চিন্তাভারগ্রস্ত মনেও বন্ধুত্বের সূত্রপাত হইয়া গেল। নানা লােকের সঙ্গে নানা ছাদে নানা ভঙ্গিতে কথা, সর্বত্রই ভাবরাজ্যের আধিপত্য স্থাপনের চেষ্টা, এস্থানে স্বতঃসিদ্ধ, বহু স্থলেই সে চেষ্টা কৃতিত্ত্ব মণ্ডিত। জজ সম্প্রদায় আছেন, শিক্ষক সম্প্রদায় আছেন, ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার, সরকারীকর্মচারী, কন্টাক্টর, সওদাগর মহাজন সব ১১১ জেনেভা-ভ্রমণ আছেন। দলে দলের সহিত স্বতন্ত্র কথা অনেক কহিতেছি; বুঝি বা দেশহিতার্থে কিছু শিখাইতেছি। এ দিক টুইতে দেখিলে রাজমাক জাহাজে যাত্রা নিতান্ত নিল হইল না। Last night of the voyage বলিয়া বিশেষ খ্যাতনামা ইংরেজ শিল্পীর চিত্রপট বহুদিন পূর্বে দেখিয়াছিলাম। আজ সেই Last night—সকলেই বিদায় গ্রহণে তৎপর। জিনিস প্যাক ও চিঠি লেখার হাঙ্গামাও খুব চলিয়াছে। কর্মচারীদিগকে বকসীস (tip) কি হারে দেওয়া হইবে তাহার পরামর্শ ও ব্যবস্থা চলিয়াছে, খেলা-ধূলা, আমােদ- আহাদ, ব্যাণ্ড; নাচ ইত্যাদি চলিতেছে। আজ রাত্রি আহারের পর Spanish bandএর আয়ােজন। ইংরেজ কাজও জানে আমােদও জানে ও করে। ভাের (Bhore) রাজ্যের অধিপতি ও তঁহার পুত্র যুবরাজ বিশেষ ভদ্রতা ও সৌজন্য দেখাইতেছেন ও আদর-আপ্যায়ন করিতেছেন। নিজ রাজ্যে যাইবার জন্য সনির্বন্ধ আমন্ত্রণ জানাইলেন। বহু কাৰ্য্য অবশিষ্ট রহিয়াছে। শ্রীভগবানের নাম লইয়া প্রার্থনা করি বুদ্ধি ইচ্ছা ও শক্তি নিজ ক্রুটীর সম্যক প্রায়শ্চিত্তস্বরূপ দেশমাতৃকার মহাসেবায় যেন জীবন সন্ধ্যা কাটাইতে পারি উচ্ছাসে এই কথা লিখিলাম। বৃহস্পতিবার ২৩শে অক্টোবর, ১৯৩০। আজ সমুদ্র যাত্রার শেষ দিন—যেমন হয় তাহাই হইল। সমস্ত রাত্রি নিদ্রা হইল না, আশায়-উৎকণ্ঠায়, আশঙ্কায় রাত্রি প্রভাত হইল, ভারতের সুৰ্য্য আবার ভারত গগনে উদিত দেখিলাম ‘জয় জগদীশ হরে- নিরাপদে মায়ের চরণ তলে আবার ফিগাইয়া আনিলে প্রভু! প্রিয়জনের । বম্বে-পথে . আশঙ্কা শঙ্কা, দূর করিলে, তুমি জান আমার কি গন্তব্য প, কোথায় গিয়া উঠিব ; চক্ষু দৃষ্টিহীন, তুমি না আলাে দিবে, শক্তি দিলে কে দিবে? বম্বের কুলের দৃশ্য ভােরের আলােতেই চখে পড়িল। তখন s তালীবনরাজি নীলার শােভা কমে নাই বরং বাড়িয়াছে। সৌধ-হ- শােভাও অতুলনীয় কিন্তু কি একটা দারুণ অভাবেও বিরাট শূন্যতায় বুক ভরিয়া ও ভাঙ্গিয়া যাইতেছে। জাহাজ থামিবার ও যাত্রী নামিবার মামুলী গােলযােগে বহুক্ষণ কাটিল, বিদায়ের পালা দীর্ঘ হইল, বহুলােকের সহিত নৃতন পরিচয় হইয়াছে ; বহু পুরাতন পরিচয় ঘনীভূত হইয়াছে, চৌদ্দদিন এক জায়গায় বাসে সাদা-কালার ভেদ অনেক কমিয়া যায়। সুয়েজের পূর্বে পৌছিলে কি সে প্রভেদ আবার জাগিয়া উঠে, আমার ভাগ্যে তাহা হয় নাই। জাহাজ হইতে নামিবার সময় ও নূতন পরিচয়ের সূত্রপাত অনেক হইল। জাহাজ সময়ের পূর্বেই পৌছিল—কাজেই বন্ধুবান্ধব যাহাদের বন্দরে যাইবার কথা তাহাদের পৌছিতে বিলম্ব হইল। চুঙ্গী মাসুল কর্তাদের হাত হইতে মাল খালাস করিতে দৌড়াদৌড়ি করিতে হইল, গলদঘর্ম হইতে হইল। দক্ষিণ আফ্রিকা হইতে ফিরিবার সময়ও এইরূপ হইয়াছিল আর একথা মনে হইয়াছিল যে বিদেশে আদর আপ্যায়ন ও সুবিধার অন্ত নাই আর দেশে ফিরিতে না ফিরিতে তুমি যে তিমিরে সেই তিমিরে। বিষয়ের জন্য দেশীয় কর্মচারিগণ বিশেষভাবে দায়ী। Bombay Incorporated Law Societya President Mr. Payne স্বয়ং অভ্যর্থনা করিতে আসিয়াছিলেন এবং আসিয়াছিলেন চির- সহিষ্ণু লােকপ্রিয় কর্মঠ নীরব কর্মী সেক্রেটারী নারায়ণপাণ্ডিয়া মহাশয়। তাজমহল হােটেল এর পাণ্ডিয়া মহাশয়ের বাটী এই জায়গাতে বাসস্থান ১১৬ জেনেভা-ভ্রমণ নির্দিষ্ট ছিল কিন্তু পাণ্ডিয়া মহাশয়ের বার্ততে গিয়া বাড়ীর মত থাকিয়া সুস্থ হওয়াই শেয়ঃ বােধ হইল। অপব্যবহারে বহুকালের পর ডাব খাইয়া ধুতি পরিয়া মানুষের উপর বসিয়া পান খাইয়া বঁচিলাম। এগার সপ্তাহ সাহেবানার পর তাজমহল হােটেলে বাস চলিল না। দশবার জলযাত্রা শেষ হইল, যাহার কৃপায় সকল বিপদ হইতে রক্ষা পাইয়াছি তাহার অভয় চরণে কোটী কোটী প্রণিপাত। ইজিপ্ট ও আরেবিয়া (Egypt and Arabia) নামক যে দুই জাহাজে প্রথমবার যাওয়া আসা হইয়াছিল, তাহা যুদ্ধের সময় ডুবিয়াছে। একবার ব্রিণ্ডিসি (Brindisi) হইতে আইসিস ( Isis) নামক জাহাজে পাের্ট সৈয়দ পৰ্য্যন্ত আসিয়াছিলাম তাহা বিক্রয় হওয়ায় হস্তান্তর হইয়া গিয়াছে। এবার যে জাহাজে আসিলাম রাজমাক ( Razmak) তাহাও বিক্রয় হইয়া Newzeland চলিয়া গেল। আমায় দয়া করে যাহারা আশ্রয় দেয় তাহাদের অনেকেরই এই দশা । যাহাদের সনির্বন্ধ আগ্রহে বম্বেতে দুই দিন থাকা স্থির করিয়াছি- আঁহাদের পত্র পাইয়া এখানে রহিয়া গেলাম, তাঁহাদের কেহ কেহ বিষম স্বাধীনচেতা—নির্ভীক প্রিয়ভাষী খারে (Khare) পূৰ্ব্ব হইতেই জেলে পচিতেছেন; নগীন্দ্র মাষ্টার ( Nagindra Master) বিলাত যাইবার সময় মেয়েকে সঙ্গে লইয়া গিয়া বন্দরে মালা পরাইয়াছিলেন—অন্তরের শুভ ইচ্ছার সহিত বিদায় দিয়াছিলেন, তিনিও এখন জেলে। বম্বে সহর এক রাজনৈতিক ঘটনা পরম্পরায় থরহরি কম্পিত। এডেনে আমি পাণ্ডিয়ার যে পত্ৰ পাই তাহার পর নগী মাষ্টার কারারুদ্ধ হইয়াছেন, কার কখন নির্যাতন ও কারাবােধূ হয় কে বলিতে পারে ? ** tate Round Table Conference, House of Lords Royal Galleryতে, রাজকীয় বক্তৃতার সহিত খুলিবেন। এরূপ । বিপন্ন। ;
১১৭ ; সাধারণ বম্বে পথে . সভার আয়ােজন ; যথার্থ কাজ কতদূর হইবে কে জানে। মর্মপীড়িত—উভয় পক্ষেই বুদ্ধির ত্রুটী যথেষ্ট হইতেছে। বম্বেতে দেওয়ালীর ধুমধাম কিছু মাত্র হয় নব কোন প্রাণে ধূমধাম হইবে । পুরে শুক্রবার ২৪শে অক্টোবর, ১৯৩০। পুরাদস্তুর দেশীভাবে বেশে ও ধরণে চব্বিশ খণ্টা কাটাইয়া বিশেষ আরাম হইল। Incorporated Law Society সম্পাদক নারায়ণ পাণ্ডিয়া পুরা দেশী ভাবের গুজরাটী ব্রাহ্মণ—নিষ্ঠা ও শুদ্ধাচারের পরাকাষ্ঠা দেখান। নাগর ব্রাহ্মণদিগের আহারাদি সম্বন্ধে যেরূপ কঠোরতা তাহা পূৰ্ব্ব হইতে জানা আছে। ইংরেজী হােটেলে কিংবা ইংরাজ পরিবারের আতিথ্য গ্রহণ করিলে এরূপ স্বাধীন দেশী দেশী ভাবের আরাম পাইতাম না। যে সকল কাজের মধ্যে বম্বেতে আটক পড়িলাম, তাহার সম্বন্ধে মিটিং কাল বম্বে হাইকোর্টে সন্ধ্যা পর্যন্ত হইয়া গিয়াছে, আজ ভিন্ন ভিন্ন দলের সহিত কথাবার্তা কহিয়া গােলযােগ পরিষ্কার হইয়া গিয়াছে। যেখানে যাও—যে বিষয়ে হউক—শুধু তর্ক বাদানুবাদ নয়, আসল ঝগড়া পৰ্যন্ত আরম্ভ হইয়াছে, কাজেই কাজের চেয়ে অকাজই বেশী। ২৩ দিনে এই সব হাঙ্গামা মিটাইয়া কাল শনিবার রাত্রের বন্ধে মেলে কলিকাতা যাওয়া স্থির হইয়াছে। যাহাদের সঙ্গে দেহইবার কথা ছিল তাহারা কেহ কেহ Round Table conferenceএ গিয়াছেন, কেহ কেহ পুণ কিংবা অন্য কোন ঠাণ্ডা জায়গায় গিয়াছেন, কেহ বা অন্য কাজকর্মে গিয়াছেন, সকলের সঙ্গে দেখা হইল না, গরমের ছুটীতে হাইকোর্ট এখন বন্ধ, যাহারা আছেন তাঁহাদের লইয়াই কাজকর্ম যতদূর সম্ভব সারিয়া লইতে হইল।
১১৮ ; জেনেভা-ভ্রমণ “বানরসেনা” বলিয়া ছােট ছোট ছেলেদের লইয়া একদল হইয়াছে। “মার্জার-সেনা” নামে ঘােট ঘােট মেয়েদের দল হইয়াছে, “ স্বল্প-সেবিকা সচ্ছ বলিয়া মেয়েদের দল হইয়াছে। এ ছাড়া পিকেটদল,ভলানটয়ার দল প্রভৃতি আছেই। নিত্য পুলিশের সঙ্গে মারামারি, নিত্যহরতাল, জেলে যাওয়া ইত্যাদি লইয়া মানুষ যেমন অত্যাচার-জর্জরিত, প্টেমনই ভয় শূন্য হইতেছে। যাহারা Round Table conferenceএ গিয়াছেন কিংবা যাইতেছেন তাঁহাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন ও অপমান ব্যবস্থা হইতেছে, নগরের বাণিজ্য ও এ সব অন্তর্হিত, গরম ও তেমনই পড়িয়াছে। আড়াই বৎসর পূর্বে যখন আসিয়াছিলাম ; তখন প্রসিদ্ধ ভাস্কর ওয়াগ (Wagh) “এক প্রস্তর মূৰ্ত্তি” আরম্ভ করিয়াছিলেন, তখন তাহা শেষ হয় নাই। তাড়াতাড়ি চলিয়া যাইতে হইয়াছিল বলিয়া কাজ কর্ম বন্ধ ছিল, এবার দুই তিনদিন ধরিয়া সব কাজ তিনি শেষ করিলেন। জেনেভার শ্রীযুক্ত অমূল্য চট্টোপাধ্যায়ের কন্যা ও জামাতা তাঁহার পত্ৰ পাইয়া দেখা করিতে আসিয়াছিলেন, অন্যান্য অনেক বন্ধু- বান্ধবও দেখা শুনা করিতে আসিয়াছিলেন; অতএব বিশ্রামের সময় অল্প, আজ অনেক মিটিং ও লােকজনের সঙ্গে দেখা করার দরকার ছিল সে সকল সারিতে অনেক বিলম্ব হইল। যথাসময়ে বয়ে মেল কলিকাতায় পৌছিল—ঘরে ফিরিলাম। দেখিলাম অনেক, শিখিলাম অনেক। ভাবনার ও চিন্তার নৃতন সমাম সংগ্রহ করিলাম অনো। তুষারসমুদ্রে অক্ষয় ঐশ্বৰ্য্যশালী সৰ্বজাতির সমন্বয় তীর্থক্ষেত্র স্বাধীন সুইজারল্যাণ্ডের কথা চিরদিন হৃদয়পটে অক্ষুণ্ণভাবে অঙ্কিত থাকিবে। চিরদিন তাহার এবং তাহার নিকট আশ্রয়প্রাপ্ত স্বাধীনতাপ্রয়াসী জাতিগণের কথা সেইরূপ অঙ্কিত থাকিবে। কে জানে স্বাধীনতাপ্রয়াসী- বষে পথে, দিগের বিশ্বদরবারে ভারতের স্থান কি ভাবে কবে উন্নীত হইবে। চেষ্টা হইতেছে অনেক চেষ্টার বিফলতাও অনেক। ফল্যকামী ভারত আশাও প্রতীক্ষায় রহিয়াছে। • সুইজারল্যাওর তুষারসমুদ্রের অদ্ভুত ঐশ্বৰ্য্য কথার সঙ্গে মনে পড়ে—এবং সতত মনে পড়িতেছে-- মহাকালের ভীষণ রুদ্রমুর্তি। মধুর এবং উগ্রের অত সমবায়। গ্রন্থ শেষ সময়ে সংবাদ পাইলাম প্রতিবর্ষে যেমন হয় এবং রিও (আগষ্ট, ১৯৩৩) তথায় তদপেক্ষা ভীষণ দৈবদুর্ঘটনা ঘটিয়াছে। খ্যাতনামা সুইস পর্বতারােহন বিশারদ ফ্রানজ লম্যাটার (Franz Lochmatter) জগতের পর্বতারােহন রসিকদিগকে স্তম্ভিত করিয়া পর্বতারােহন সময়ে অকালে কালগ্রাসে পতিত হইয়াছেন। ইহার ন্যায় দক্ষ ও কুশলী পর্বতারােহী অতি অল্পই ছিল। ভারতের ভচ রাজদূত মিঃ ভিসার (PH. c. VISSER) সাহেবের সস্ত্রীক কারাকোরা ভূষার পৰ্ব্বত অভিযান কালে ইনিই পথপ্রদর্শক ছিলেন। এই অভিযান উপলক্ষ করিয়া ভিসার মহােদয় যে সকল বক্তৃতা করেন তাহার এক বক্তৃতা সভায় আমি সভাপতির পদলাভ করিয়া ধন্য হইয়াছিলাম। তাঁহার বক্তৃতা হইতে ও বক্তৃতার পর যে পত্র ব্যবহার হইয়াছিল তাহা হইতে বুঝিয়া ধন্য হইয়াছিলাম যে গঙ্গার উৎপত্তি সম্বন্ধে প্রাচীন শাস্ত্র সম্মত মত, বিজ্ঞান সম্মত। যেখানে আজ উত্তঙ্গ হিমাচল—সেখানে ছিল বিশাল সমুদ্র। ক্রমে সমুদ্রস্থলে গিরিরাজি প্রকাশের প্রাক্কালে অদ্ভুত ও অনৈসর্গিক উপায়ে তপস ভগীরথের পায় তদানীন্তন ভারত সীমান্ত হইতে ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশ্বরের দয়ায় ভাগীরথী প্রকট হন। এই পােরাণিক কাহিনী ভিসারের মনােক্ত পুক ও বক্তৃতা হইতে বিজ্ঞান সন্মত বলিয়া প্রতিপন্ন হয়। মহামতি এ, জি, ওয়েলস (E, G. Wells) তাহার প্রসিদ্ধ সভ্যতার ইতিহাস গ্রন্থে Sir P. Roy Lankoster, Sir Ernest Barker সার এইচ জনন (Sir H, Johnston) করেন। ১২০ জেনেভা-ভ্রমণ প্রােফে মারে (Prof Gilbert Murray) প্রভৃতি বৈজ্ঞানিক সাহায্যে বিজ্ঞান সম্মত বলিয়া স্বীকার করিয়াছেন। আধুনিক ভগীরথ, ভারতেরৗপথ বিশারদ, জেনারেল উইলকক্স একথার সমর্থন FranzLochmatterকে কেন্দ্র করিয়া এই সকল কথা বিচার ও প্রমৗন্থ বলিয়া, তাহার অকাল মৃত্যুতে চিত্ত ব্যথিত হইয়াছে। এই শােকাবহ ব্যাপাৰেই দৈবদুর্ঘটনার শেষ হয় নাই। ইটনের ৪জন খ্যাতনামা অধ্যাপক এবং ছাত্র আলপস্ পৰ্ব্বতের রােজেগ শৃঙ্গ (Roseg Peak) নামক তুঙ্গ তুষার শৃঙ্গ হইতে অবরােহনকালে অতর্কিতভাবে কালগ্রাসে পতিত হইয়াছেন—মহীয়ান শিক্ষায়তনকে শােকসাগরে নিমগ্ন করিয়াছেন। আমি ইহাদের ইহাদের কাহাকেও কাহাকেও জানিতাম। একজন শ্রীমান হাউসেন- একজন শ্ৰমান হাউসেন—কেম্বুিজ টিনিটি কলেজের অধ্যক্ষ, অতিথি বৎসল, সৰ্বগুণােপেত ডাক্তার বাটলারের দৌহিত্র। কেজি অবস্থান কালে আমি ইহাদের আতিথ্যে মুগ্ধ ও গৌরবান্বিত হইয়াছিলাম। তাই তাঁহাদের শােকভার আমাকেও স্পর্শ করিয়াছে। ভারতের নাঙ্গা পৰ্বত, গৌরীশৃঙ্গ (এভারেষ্ট) প্রভৃতি তুঙ্গ গিরিশিখর আরােহন প্রয়াসী ইউরােপ আমেরিকার অসমসাহসী পৰ্বতবিহারীদল বর্যে বর্ষে যে অসমসাহসিকতা, একাগ্রতা এবং শ্রেষ্ঠ পৰ্য্যায়ের তপক্ষতার পরিচয় দিতেছেন সহ অতুলনীয়। লােকচক্ষুর অন্তরালে নিভৃতে আমাদের বরনীয়, তাগী, সন্ন্যাসীদল চিরদিন এ-পথের পথিক, কিন্তু তাহাদের তপস্যার ফল সাধারণ গােছর নহে। যাহারা সন্নাসী ও তপস্বী না হইয়াও অসাধারণ :তপস্কতার পরিচয় দিয়া প্রাণ তুচ্ছ করিয়া প্রতি বৎসৰু এই অত্যুগ্ম সাধনার পরিচয় দিতেছেন তাহারা ও বরেণ্য। সকল ক্ষেত্রেই নির্জীব হৃতলক্ষ্মী ভারতবাসী তাহাদের অক্ষুন্ন
বষে পথে
আদর্শ অনুসরণ করে-ভচ্চরণে ইহাই প্রার্থনা। রানীতিক্ষেত্রে
ইহা করা ও হওয়া সম্ভব এবং বাঞ্ছনীয়। জেনেভা মহাসভায় তাহার
আংশিক চেষ্টা হইতেছে—তাহ মহাসভার কথা ও দিশফুল তুঙ্গ
আরােহণপ্রয়াসী মহাবীরগণের কথা যুগপৎ স্মরণ করিয়া আশান্বিত
হইতেছি। ভগবান সে আশা সফল করুন।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.