Bally Sadharan Granthagar

Prithibir Shrestha Galpo Vol. 5

Naresh Chandra Pal · 2009/10/14

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গল্প
পঞ্চম খণ্ড
হিন্দী
নরেশচন্দ্র পাল
অদিত
১০, খামাচরণ দেই, কলিকাতা

—আড়াই টাকা-
মিত্র ও ঘােষ, ১•, শ্যামাচরণ দে জট, কলিকাতা হইতে সুমনা
ঘােষ কর্তৃক প্রকাশিত ও সুরেন্দ্র (এস ১৮৭ সি, আপার
সারকুলার রােড হইতে হীরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় কর্তৃক মুদ্রিত

নিবেদন কথায় বলে, রঘু আবার কাব্য, তার আবার টাকা। কিন্তু কাব্য যাহারা লিখিতে পারে না অথচ কলম কযনের ব্যাধিতে ভূগে তাহারা অগত্যা টাকাই লেখে। ভাল কাব্যের না পারিলে মন’ কবির ল্যাজ ধরিয়া সাহিত্য সাগরে সন্তরণ প্রয়াসী হয। এক সঙ্কলন গ্রন্থে যে দেড়গঞ্জী নিবেদন জুড়িযা দিতেছি, তাহাব কারণও তাই,-অন্যাশিত রচনার নৌকায় নিজের এক আঁটি তুলিয়া দেওয়া। বােঝার উপর, শাকের আঁটি বইত নয়! বােঝার ভার সহিলে আঁটির ভারও সহিবে। মনে করিয়াছিলাম, প্রতিবেশী ভারতীয় সাহিত্য সম্বন্ধে স্ব-সাহিত্য- গর্বিত বাঙ্গালীরা যে উন্নাসিক মনােভাব পােষণ করেন, তাহার প্রতি কটাক্ষ করিয়া সখেদ উদারতা প্রকাশ করিব। কিন্তু সাতপাঁচ ভাবিয়া এই আত্মপ্রসাদ হইতে নিজেকে বঞ্চিত করাই স্থির করিয়াছি। শেষকালে ধরা পড়িযা নাজেহাল হওয়ার চেয়ে আগেই কবুল খাওয়া সুবুদ্ধি উন্নাসিকতায আমিও ত কম যাই না। সাহিত্যের মধ্য দিয়া অপরপ্রান্ত বাসিদের সঙ্গে পারস্পরিক পরিচয ইত্যাদি উচুদরের গালভরা কথা আমার মুখে মানাইবে না। তবে যে হিন্দী হইতে গৌড়জনের মৌচাকের জন্ধ মধভাবে গুড় বহি আনিলাম, সে শুধু গরজ বড় বালাই বলি। অনেকের মত আমারও লেখক হইবার সখ চাগিয়াছিল, কিন্তু শক্তি এক আধলা পরিমিতও আছে, ইহা আজ পর্যন্ত শত্রু মিত্র কেহ স্বীকার করিল না। নাকের জলে চোকের জলে কাগজ কলম সিক্ত করতে করিতে যাহাই লিখি, বিন্দুমাত্র অনুকম্পা না দেখাইয়া তাহা মুদ্রণ-রাজ্যের কর্তারা যথেচ্ছ ফেলিয়া দেন। তাই মগজ হইতে বানাইয়া লেখার দুরাশা ত্যাগ করিয়া ভুক্ত-পূৰ্ব্ব মালের কারবারে নামিতে হইল। নামের জোরে অনেক কিছুই কাটে। নামৈব কেবল কলে। শুনিতে পাই প্রমথনাথ বিশ মহাশয় প্রথম-প্রথম নিজের লেখা কিছুতেই চালাইতে না পারিয়া শেষকালে স্বরচিত কবিতা অনুবাদ বলিয়া চালান। “প্রাচীন পারসীক হইতে” “প্রাচীন অসমিয়া হইতে” ইত্যাদি চিত্তদ্রাবক শীর্ষকের ইহাই নাকি ইতিহাস। নূতন মাল পুরাতন বলিয়া আমি পাচার করি নাই বটে, কিন্তু নূতন কিছু করার মােহকে একেবাবে ঠেকাতেও পারি নাই, একাধিক ক্ষেত্রে তাহা সুপ্রকট হইয়া পড়িয়াছে। প্রথমত, হিন্দী রস-সাহিত্য হইতে বঙ্গ ভাষান্তর এই প্রথম। আমার আগে কেহ করিয়াছেন বলিয়া জানি না। এই পুস্তকে সংগৃহীত গল্প কয়টি, ইতােপূর্বে পত্র পত্রিকায় বাহির হইয়াছে। প্রথম প্রকাশ কাল : ১৩ই জুন, ১৯৪৩ সাল। স্থান : রবিবাসরীয় আনন্দবাজার ; গল্পের নাম : কুমুরে পােকা। দ্বিতীয় নূতনত্বটি কিঞ্চিৎ বিপদসঙ্কুল হইলেও প্রকাশ করা কর্তব্য। আধুনিক হিন্দী রস-সাহিত্যে কি পরিমাণ রস আছে, কি পরিমাণ গাদ, তাহা একদিন বলিবার প্রয়ােজন হইতে পারে। যাহারা হিন্দী জানেন, বর্তমান গল্পগুলি মুলের সহিত মিলাইয়া দেখিলেই হাল মালুম করিতে পারিবেন। যাহারা এই অধীন কর্তৃক প্রদর্শিত উৎস হইতে কুন্ত ভরিতে প্রবৃত্ত হইবেন, (বা ইতিমধ্যেই হইয়াছেন) তাঁহারা হাড়ে হাড়ে টের পাইবেন। মূল গােপন না করিয়াও যতদুর মৌলিকতা জাহির করা যায় করিয়াছি এবং পরিণাম ফলের জন্য আগে হইতেই প্রস্তুত হইয়া আছি। ইঙ্গিমধ্যে হুল্লোড়ে পড়িয়া বই যদি কিছু কাটিয়া যায়,–এই যথা-লাভ।

• কোন এক রকমের বিস্ফোরণ না ঘটাইতে পারিলে বই যে কাটিবে, সেই দুরাশা রাখি না। পত্রিকায় যখন বাহির হইতেছিল, তখন গল্পগুলি নিজে যাচিয়া কেহ পড়িছেন, এমন ত শুনি নাই। তথাপি সম্পাদকগণ সদ্য চিত্তে এইগুলি পৃষ্ঠা ভবাইবার কাজে লাগাইয়াছিলেন। এখন, পুস্তকাকারে বাহিৰ কবিবার মত অসমসাহসী প্রকাশকও ভাগ্যগুণে পাইলাম। এর পর আর, ভগবান নাই, একথা বলিতে পারিব না। হাজার হৌক অকৃতজ্ঞতারও একটা সীমা থাকা উচিত। প্রকাশক মহাশ্য আমার অনুনয় বিনযে কান দিযা বড় একটা ঝুকি ঘাড়ে করিলেন। খবচা পােষাইবেনা, ইহাই একমাত্র ঝুকি হইলে কথা- ছিল না। যাহাহৌক, নিজ নাম ছাপার হরফে দেখিবার আমার বহু কালের সাধ সম্পাদকমণ্ডলী ও প্রকাশক মহাশযের প্রসাদাৎ পূর্ণ হইল। তাহাদের এই সহৃদয অনুকম্পার জন্য কৃতজ্ঞতা নিবেদন করিতেছি। মূল লেখকদের নিকট নিবেদন কিছুই নাই। একজন বাদ দিয়া অন্য সকলে পাকাপাকি ভাবে ঠিকানা বদল করিয়াছেন বলিয়াই আমি সুযােগ পাইয়াছি। স্বর্গে কিম্বা যেখানেই থাকুন, আমাকে যদি শেষ পৰ্য্যন্ত ক্ষমা করিতে পারেন, বড় বাঁচিয়া গিযাছি মনে করিব। নিবেদন এইখানেই ইতি। হে পাঠক (যদি কেহ থাকেন), পরবর্তী আকর্ষণ বিকর্ষণের জন্য প্রস্তুত থাকুন। অদ্য রজনীই শেষ রজনী নয— The worst is yet to be! । দেরাদুন, রবীন্দ্র জন্মতিথি নরেশচন্দ্র পাল मूको চন্দ্ৰধৰ শৰ্মা ভুলি নাই কেমচশ ০০০ শতরঞ্জ খেলােযাড় বামলীলা চন্দ্রবতী জৈন কুমুরে পােকা •• ৪৫ মেচ কাযের জয ৫৮ :: १२ দুধের দাম সদগতি ••• ০ ০ ০ পৌষের রাত সৎকাব ১০৯ লও এ নগর চত্রবতী জৈন বনিয়াদেব হট ০ ০ ০ ১৩৬ অজ্ঞাত এক পণাম কে ওযাস্তে •• ১৪০ প্ৰখিবীরশ্রেষ্ঠ গল্প ভুলি নাই বড় বড় সহরে একাচালকদের কটুকাটব্য শুনিতে শুনিতে যাদের কানে ফোস্কা পুড়িয়া গিয়াছে, তাহারা একবার অমৃতসরে গিযা ক্ষতস্থানে প্রলেপ লাগাইতে পারেন। বেনারসে, দিল্লীতে, লক্ষেয়ে একেশ্বরগণ এককালে হাত ও মুখ চালায়। ঘােড়ার সঙ্গে নিজেদের ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ স্থাপন করি, পথচারীদের দৃষ্টিহীনতা ও ক্ষীণতার জন্য আক্ষেপপূর্ণ সমবেদনা প্রকাশ করিয়া, সমব্যবসায়ীদের সঙ্গে গালিগালাজ ও দ্রুত ধাবনে পাল্লা দিয়া রাজপথকে সচকিত কম্পিত করিতে করিতে ইহার মরি বাঁচি দৌড় লাগায়। নিজের, পথিকের ও ঘােড়র প্রাণের প্রতি লেশমাত্র দয়া মায়া নাই। অমৃতসরে কিন্তু ব্যাপার একটু স্বতন্ত্র। এক্কাও চলে একেশরগণের মুখও চলে, কিন্তু ভাষায় বিশেষ দরদ মাখানাে। বাপু বাছা ছাড়া কথাই নাই। মুখে, বচো খালসাজী, হটো ভাইজী, টহনা মাই, আনে দে লালাজী ইত্যাদি লাগিয়াই আছে। বিচিত্র বেশ-বাস, বিচিত্রতর ব্যবসায়ী ও পথিকের ভিড় কাটাইয়া, নিজের ও অন্যের প্রাণ বাঁচাইয়া সন্তর্পণে ইহারা অগ্রসর হয়। কোন পথচারীর যদি চকু-কর্ণের বিশেষ অভাবও প্রমাণিত হয়, তবু ইহারা ধৈর্য্য হারায় না। মনে করুন কোন তালকাণ বুড়ী সরাসরি মাঝ রাস্তা দিয়া চলিতেছে, কিছুতেই এক পাশে সরিতেছে না। তখন একাওয়ালার ভাষা এই রকম হয় :-হট যা জীন যুগিয়ে, হট যা করমওয়ালিয়ে, হট যা পুত্তপ্যারিয়ে, বচ, যা লখী উমর- ওয়ালিয়ে, অর্থাৎ এই বুড়ি মাই, তুই এখনও অনেকদিন বাঁচবার যুগ্যি, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গল্প বরাত তাের খুব ভাল, ছেলেপিলে খুব ভালবাসে, অনেকদিন এখন পরমায়ু বাকী, সরে যা রাস্তা থেকে, খামােখা গাড়ীর তলায় প্রাণটা কেন দিবি? এই রকম বহু একা ও একচালকগণের মধুর বাক্যবর্ষণের মধ্যে পথ করিয়া একটি ছেলে ও একটি মেয়ে গলির মােড়ে এক দোকানে আসিয়া পৌছিল। স্পষ্টই বােঝা যাইতেছে, ইহারা শিখ। মেয়েটি দোকান হইতে ডালবড়ী কিনিতে আসিয়াছে। ছেলেটি মামার মাথার উকুন বধের জন্য দই কিনিবে। দোকানদার এক বিদেশী ক্রেতার সঙ্গে বচসায় ওজন দরে পাঁপড় কিনিয়া মনােমত না হওয়ায় গুণিতে বসিয়াছে এবং দোকানদার এই দ্বিবিধ সতর্কতার প্রতিবাদ করিতেছে। কোথা হইতে এই উজবুক খদ্দের জুটিল? এ পাই, তেরা কর কার্য—অর্থাৎ এ ভাই, কোন দেশে তাের বাস? পাঞ্জাবীরা যখন হিন্দী বলে তখনও ‘ভ’কে প’, ‘খ’কে ‘ক’ বলিয়া ফেলে। বালক-বালিকা দুইটি মহানন্দে ঝগড়ার রস উপভোেগ করিতেছিল। অকস্মাৎ সওদার কথা স্মরণে পড়ায় দু’জনে তারস্বরে চীৎকার করিয়া দোকানীর দৃষ্টি আকৰ্ষণ করিবার চেষ্টা করিতে লাগিল। কিন্তু দোকানীর স্বর তখন পঞ্চমে চড়িয়াছে। সে বালক-বালিকার কথায় কর্ণপাত করিল না। ছেলেটি তখন বালিকার দিকে ফিরিযা জিজ্ঞাসা করিল—এই, তাের বাড়ী কোথায় ? —মগরায়? আর তাের ? -মাঝায়। এখানে এসেছিস কার কাছে ? --অমর সিংএর বাড়ী। অমরসিং আমার মামা। আমিও এসেছি আমার মামার বাসায়। গুরুবাজারে থাকি। কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলিয়া দু’জনে আবার দোকানীকে সওদা দিতে বলিল। দোকামী ততক্ষণে পাপড়-মামলার হেস্তনেস্ত করিয়া ‘ফাইতেছিলউ ভুলি নাই সওদা দি ছেলেমেযে দু’টিকে বিদায় কবিল। দু’জন এক পথে চলিতেছিল। কিছুদূর গিযা বালক মৃদু হাসি জিজ্ঞাসা করিলতাের কুড় মাই হযেগিযেছে? কুড় মাই অর্থাৎ বাগদান। ৰণি থে বলিযা দৌডিয়া পালাইল। এব পবে প্রায় রােজই, কোনদিন দুধের দোকানে, কোনদিন শাক সজীব বাজাবে উভযের দেখা হয়। মাঝে মাঝে বালক সেই একই প্রশ্ন কবে। জবাব পায—ধেৎ। ক্ষ্যাপাইবার জন্য আর একদিন বালক যখন জিজ্ঞাসা করিল, বালিকা- অপ্রত্যাশিত উত্তর দিল, হাঁ, হয়ে গিয়েছে। কাল। দেখছিসনে এই রেশমেব ফুলওলা ওড়না? বলিব বালিকা উৰ্দ্ধশ্বাসে ছুটিয়া পালাইল। বালক নিজ বাভীর রাস্তা ধরিল। পথে এক ছেলেকে নর্দমায ধাক্কা দিয়া ফেলিয়া দিল, এক তিলের মিঠাই বিক্রেতার সারাদিনেব উপার্জন নষ্ট কবিল, এক কুকুরকে ঢিল ছুড়ি, এক ফুলকপি বিক্রেতাব ঝুভি মধ্যে হাতেব লােটা হইতে দুধ ঢালিয়া দিল। মান কবি এক বৈষ্ণবী ঘবে ফিরিতেছিল, তাহাকে দুই দি গালাগালি খাইল। এইভাবে গাযেব ঝাল মিটাইয়া ঘরে পৌছিল। “এও কি আবার একটা লড়াই? দিনরাত নালীতে গড়িয়ে গড়িয়ে হাত-পাযে খিল ধবে গেল। লুধিয়ানাব দশগুণ শীত, তার উপর বৃষ্টি আর বরফ! কাদা কাদায় হাঁটু অবধি হেজে যাবার জো হযেছে। দুশমনের দেখা নেই। ঘণ্টা দু' ঘণ্টা পরে পরে এক একবার কানে তালা লাগিয়ে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গল্প ব্ৰহ্মাণ্ড চৌচির হবার শব্দ হয়, সমস্ত নালা কেঁপে ওঠে, শ' শ' গজের মধ্যে আর কিছু অস্ত থাকে না। এই রকম আচম্‌কা গােলার হাত থেকে বাঁচলে তবে ত লড়বে। নালীর বাইরে সামান্য একটু কনুই বা হাত বেরিয়েছে কি মরেছে। কোথা থেকে অমনি এসে লাগে গুলী। বেইমান ব্যাটারা ঘাসের মধ্যে লুকিয়ে আছে নাকি?” “লহন সিং, আর তিনদিন বাকী। চারদিন কেটে গেছে। পরশু বদলী আসবে, তারপর সাত দিনের ছুটি। নিজের হাতে পাঁঠা কেটে রান্না চড়াব, খেযে আরামে ঘুম লাগাব। সেই মেম সাহেবের বাগানে মখমলের মত নরম ঘাস। আবার বুড়ী আমাদের দেখলে যেন হাতে স্বৰ্গ গায়। দুধ-ফল দিনে দশবার নিয়ে আসে। বলে, তােমরা আমার দেশ রক্ষা করতে এসেছ, তােমরা দেবতা।” “চারদিন চোখের পাতা এক করিনি। চলতে না পেলে ঘােড়া বিগড়া, লড়তে না পেলে সেপাই। সঙ্গীন চড়িযে মার্চ করতে যদি পাই, তবে আর কিছু চাইনে। এর পর যদি সাত ব্যাটা জাৰ্মানকে না মেরে ফিরি, তবে দিল্লির গুরু দরবারে যেন আর ভজন গাইতে না পাই। বদমাস সব—যা কিছু করবে করাবে, সব কলে। সঙ্গীন দেখলেই কলেব কামানের ঘােড় টেপে। নষ ত আঁধারে ত্রিশমুনে গােল ফেলে। সেদিন আক্রমণ করবার হুকুম পেযে চার মাইলের মধ্যে এক ব্যাটা জাৰ্মানকে ছাড়িনি। জনবল সাহেব হুকুম দিলে, তাই ফিরতে হ’ল—নইলে নইলে সােজা বালিন পৌঁছে যেতে-কেমন?” বলিযা সুবেদাব হাজরা সিং মৃদু হাস্য করিলেন। “ভায়া, লড়াই জমাদার হাবিলদারের বুদ্ধিতে চলে না। বড় যার দায়িত্ব, সে অনেক ভেবেচিন্তে তবে কাজে হাত দেয় ? তিনশ মাইলের লাইন। এক কোণে দু চারশ’ গজ আগে এগুলেই কি, আর না এগুলেই কি।”

ভুলি নাই লহনা সিং জবাব দিল—“সুবেদার সাহেব, বলছ ঠিক, কিন্তু করি কি? বাড়িয়ে দাড়িয়ে শীতে জমে যাচ্ছি যে। সূর্যের মুখ দেখতে পাইনে। এদিকে নালার গা বেয়ে দু’দিক থেকে অঝােরে ধারা ঝরছে।” সুবেদার সৈন্যদিগকে সম্বােধন করিয়া বলিলেন—“উদ্য সিং, তুমি উনুনে কিছু কয়লা দাও। বজীরা সিং, তােমরা চারজন মিলে বালতী ভরে ভরে জল কাদা বাইরে ফেল। মহা সিং, তুমি খাইয়ের মুখে পাহারা বদলাতে যাও” বলিয়া নিজেই তারক করিতে খাইয়ের মধ্য দিয়া আগাইয়া চলিলেন। বজীর সিং বালতী ভরিযা কাদাজল ফেলিতে ফেলিতে বলিল, -“জার্মান বাদশার তর্পণ কচ্ছি।” সকলে হাসিয়া উঠিল, হাসির হাওয়ায় অবসাদের মেঘ কাটিয়া গেল। লহন সিং আর এক বালতী ভরিযা বর্জীরা সিং-এর হাতে দিয়া বলিল, “বাদশার শ্রাদ্ধ তর্পণ ত হল, এবার খরমুজের খেতে সার দাও। সারা পাঞ্জাবে এমন সার ত আর পাবে না।” —যা বলছে! দেশ ত নয় একেবারে স্বর্গ। আমি ত ভাবছি, লড়াইয়ের পর গভর্ণমেন্ট থেকে দশ বিঘা জমী এখানেই চেয়ে নেব আর কলের বাগান করব। —দুলারীকেও নিয়ে আসবে নাকি? না ঐ দুগ্ধবতী মেম -চুপ কর বাপু। এদেশের লােক কেমন ধারা, লজ্জা-শরম নেই যেন, যে দেশের যে আচার। আজ পর্যন্ত মেমকে বােঝতেই পার যে, শিখ তামাক-সিগারেট খায় না। সিগারেট নিয়ে ও বার বার জিদ করবে, চুমাে খেতে আসবে। পিছিয়ে গেলে দেবতা রাগ করেছেন মনে করে। ভাবে বােধহয় যে, এবার এরা রেগে মেগে দেশে চলে যাবে—আমাদের জন্য আর লড়বে না।

পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গল্প
-আচ্ছা, এখন বােধা সিং কেমন আছে ?
—আগের চেয়ে ভালই।
থাকবে না কেন। রাত ভাের তুমি ত নিজের কম্বল দু’খানি ওর
গায়ে চাপিযা নিজে শীতে ঠক ঠক করতে থাক। উনুনের পাশে বসে কি
এই শীত কাটতে পারে? ওর পাহারার সময় তুমি পাহারা দিচ্ছ, নিজের
শুকননা তক্তাষ ওকে শােয়াচ্ছ, নিজে জল-কাদায় দাঁড়িয়ে আছ।
শেষকালে অসুখে পড়ে মরবে আর কি! শীত ত না যেন কাল।
নিউমােনিয়া হতে কতক্ষণ?
-আমাৰ জন্য ভেবাে না ভাই, আমার কপালে দেশে মরণ আছে।
ভাইযের কোলে মাথা থাকবে, উপরে থাকবে আম-গাছের ছাযাবে
আমগাছ নিজের হাতে আঙ্গনে লাগিয়েছি।
বজীরা সিং ক্রুদ্ধ হইযা ধমক দিয়া বলিল, কি সব অলক্ষুণে
কথা হচ্ছে ? ভাল হবে না বলে দিচ্ছি।
ক্ষণপরে খাইযের এক দিক হইতে পাঞ্জাবী গীতের গুঞ্জন উঠিল
গান শুনি সকলের প্রাণে আবার স্ফুর্তি দেখা দিল।
দ্বিপ্রহর রাত্রি। ঘুটঘুটে অন্ধকার। চারিদিক নিঝুম। বােধা সিং
খালি তিনটি বিস্কুটের টিনের উপর নিজের দুই কম্বল পাতি লহনা সিংএর
কম্বল ও ওভারকোট গায়ে দিয়া শুইয়া আছে। লহন সিং খাড়া পাহারা
দিতেছে।
এক চোখ খাইযের মুখে, এক চোখ বােধসিংএর জরতপ্ত
দেহের উপর। বােধা সিং উঃ-আঃ করিতেছিল।
—বােধা ভাই, কি রকম বােধ কচ্ছ।

ভুলি নাই
-একটু জল দাও লহনা।
লহনা সিং নােগীর মুখের কাছে ফ্লাস্ক লাগাইযা বলিল, “কোন কষ্ট
হচ্ছে, বােধসিং?
এক ঢােক জল খাইযা বােধা সিং বলিল, শীত যেন একেবারে হাড়ের
মধ্যে ঢুকে গেছে। রােমে রােমে বিজলী চলছে।
-আচ্ছা আমার জারসীটা পরে নাও।
-তুমি কি করবে?
—আমার পাশে ত উনুনই রযেছে। আমার এমনিতে গরম লাগছে।
ঘাম ছুটছে যেন।
-না, না আমি পরব না। চারদিন থেকে তুমি শীতে জমে যাচ্ছ,
দিনরাত আমার পেছনে লেগে আছ।
—ভাল কথা মনে পড়েছে !
আজ সকালেই এক নূতন
জায়সী
এসেছে যে ! বিলাত থেকে মেমসাবেরা বুনে বুনে পাঠায়। গুরু ওঁদের
বলিযা লহমা সিং কোট খুলিয়া ভিতব হইতে নিজের জায়সী বাহির
করিল ও বােধা সিংকে পরাইযা দিযা সেই নিষ্ঠুর শীতে শুদ্ধমাত্র জিনের
কোট ও খাকী শার্ট পরিযা পাহারা দিতে লাগিল।
আধ ঘণ্টা কাটিয়া গেল। খাইযের মুখ হইতে শব্দ আসিল, সুবেদার
হাজারা সিং ?
-কে, লপটন সাযেব? কি হুকুম হুজুর? ফৌজী সেলাম করিয।
অবদার পাশে গিযা দাঁড়াইলেন।
দেখাে, এখুনি আক্রমণ করতে হবে। এক মাইল দূরে পূর্বদিকের
ঐ কোণে জার্মেনদের এক খাই আছে। ওতে পঞ্চাশের বেশী লােক
নেই। ঐ সব গাছের পাশ দিয়ে রাস্তা, তিন চাব বার মােড় ঘুরতে হয়।

পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গল্প যেখানে পয়লা মােড় সেখানে আমি পনেরাে জন লােক মােতায়েন করে এসেছি। দশজন এখানে রেখে বাকী সব নিয়ে তুমি এগিয়ে যাও। খাই ওদের হাত থেকে ছিনিয়ে নিযে, যতক্ষণ দ্বিতীয় হুকুম না পাবে, ওখানে দাঁড়িয়ে থাকবে। -জো হুকুম। নিঃশবে আক্রমণের উদ্যোগপর্ব সমাপ্ত হইল। বােধা সিং কম্বল এক পাশে সরাইয়া রাখি যাইতে উদ্যত হইলে লহনা সিং তাহাকে নিবৃত্ত করিল। লহনাসিং যাইতে প্রস্তুত হইলে বােধার বাপ সুবেদার হাজরা সিং তাহাকে আঙ্গুলের ইশারা করিয়া নিষেধ করিলেন। সঙ্কেত বুঝিয়া লহনা সিং খাই পাহারায় থাকিয়া গেল। কে কে পাহারায় থাকিবে, এই নিয়া কিছুক্ষণ কথা কাটাকাটি চলে। কেহ থাকিতে চায় না। সুবেদার সকলকে বুঝাইয়া শেষে লােক লইয়া আগাইয়া গেলেন। লহনা সিং-এর দিক হইতে মুখ ফিরাইযা, সাযেব উনুনে সিগারেট ধরাইয়া লহনাকে এক সিগারেট দিয়া বলিল, “এই নাও, তুমিও খাও।” বিস্মিত হইয়া লহনা সিং ভাল করিয়া সায়েবের মুখ দেখিবার চেষ্টা করিল। মনােভাব গােপন করিয়া বলিল, “আচ্ছা দাও।” হাত বাড়াইতে কৌশলে চোখ ফিরাইয়া লহনা সিং সায়েবের মুখ দেখিতে পাইল। তাদের লপটনের লম্বা চুল ছিল, এর চুল কযেদীর মত ছােট করিয়া ছাটা। ব্যাপার বুঝিতে বিলম্ব হইল না। কিন্তু সন্দেহ হইল, কাটাইবার সুযােগ পাইয়াছে। পরীক্ষা করিবার জন্য লহনা সিং। গল্প জুড়িয়া দিল। সে পাঁচ বৎসর হইতে সায়েবের রেজিমেন্টে আছে প্রথমে জিজ্ঞাসা করিল, “আচ্ছা সায়েব, আমরা দেশে ফিরব কবে?” লড়াই শেষ হলেই। কেন, এ-দেশে ভাল লাগছে না নাকি? -না সায়েব। শিকারের কোন সুযােগই নেই। তােমার মনে হয়ত চুল ৯ ভুলি নাই আছে, গেল বছর নকল লড়াইয়ের জন্য আমরা জগাধরী জেলায় গিয়ে ছিলুম? একদিন শিকারেও যাওয়া হয়েছিল। তুমি ছিলে খচ্চরের পিঠে। তােমার খানসামা আবদুল্লা রাস্তার পাশে এক শিবমন্দিরে পূজা দিতে গেল। তােমার গুলিতে ইয়াবড়া নীল গাই পড়ল। কী তার শিং। তুমি বলে- ছিলে শিং বাঁধিয়ে রেজিমেন্টের মেসে টাঙাবে। কিন্তু শেষকালে শিং দু’টিব হ’লকি ? -আমি বিলাতে পাঠিয়ে দিযেছিলুম। -খুব বড় শিং ছিল, না? দু’ দু’ফুট ত খুব হবে? দু’ফুট পাঁচ ইঞ্চি ছিল। তুমি সিগারেট খেলে না? -এই খাই সাহেব। দেশালাই নিয়ে আসি। বলিযা লহনা সিং স্থানত্যাগ করিল। কর্তব্য সে স্থির করিয়া ফেলিযাছে। লােকটি যে জাৰ্মেন আব সন্দেহ নাই। আঁধারে কে একজনের সঙ্গে ঠোকাঠুকি হইতেই লনা সিং বলিল, “কে? বজীরা সিং?” - হ বজীর সিং। একটু শুতে দেবে না নাকি? দুষমন কোথা- কাব। দুটো চোখের পাতা লেগে এসেছে, কি বিপর্যয় ধাক্কা। হচ্ছে না কি ? —একটু আস্তে কথা বল বজীরা। প্রলয়ই বটে! লপটন সাহেবের জামাকাপড় পরে এসেছে। আমাদের আসল সাহেব হয মারা গেছে, না হয ধরা পড়েছে, সুবেদার ত’ ওঁর মুখ দেখতে পাননি, হুকুম পেয়ে খাই খালি করে সব লােকজন নিয়ে ও-পারে চলে গিয়েছেন। আমি ওর সঙ্গে কথা বলেছি, আর চেহারাও দেখেছি। বেটা কি পরিস্কার উর্দু বলে। তবে বইয়ের উর্দ। আর জান, আমায় সিগারেট দিলে খেতে। -তা হলে এখন উপায়?

পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গল্প -বেঘােরে মারা যাবে সব দেখছি। সুবেদার জলকাদা ভেঙ্গে এক মাইল দূরে মরণের মুখে এগিয়ে গিয়েছেন। এদিকে খাইয়ের উপর হবে আক্রমণ। তাড়াতাড়ি এক কাজ করাে, পণ্টনের পায়ের চিহ্ন দেখে দেখে তুমি তাড়াতাড়ি এগিয়ে গিয়ে সুবেদারকে ফিরিয়ে আন। এখনও বেশী দূর যেতে পারেন নি। ওকে সব বুঝিষে বলবে। এমন ভাবে যাবে যেন পাতার উপর পায়ের শব্দ না হয়। —কিন্তু লপটন সাহেবের হুকুম ত-- -লপটন সাহেবের বাবা লহনা সিং তােমায় হুকুম দিচ্ছে। আমি এখন সকলের বড় অফিসার। যাও, যা বলছি করাে। —কিন্তু ভাই, তােমরা এখন আটজন মাত্র রয়েছ। সামলাবে কি -আট জন নয়, দশলাখ! শিখের নাম ডুবালে দেখছি। ছেলে- বেলা থেকে শােননি-এক শিখ সওযালাখের সমান? যাও, যাও দেরী করাে না। লহনা সিং ফিরিয়া খাইযের মুখে পৌছিয়া থমকি দাড়াইল। লপটন তখন জেব হইতে বেলের মত তিনটি বােমা বাহির করিয়া খাইয়ের গায়ে ওজিয়া দিতেছে। এক তার দিয়া তিনটির মুখে বাঁধিল। তারের গােড়ার দিকে তার এক থলির মত ছিল। থলে উনুনের পাশে রাখিয়া, সায়েব বাইরের দিকে গেল। সেখান হইতে দিয়াশলাই জ্বালাইয়া খলির উপর রাখিতে যাইতেছে, এমন সময় লহনা সিং বন্দুকের চোঙ দু’হাতে ধরিয়া বাট ফিরাইয়া লপটনকে আঘাত করিল। কঁাধে আঘাত লাগিয়া সায়েক ১১ ভুলি নাই পড়িয়া যাইতেই লহনা সিং এক লাফে পাশে আসিয়া তাহার পকেট জিতে লাগিল। গােটাচারেক খাম ও এক ডাযেরী বাহির করিয়া নিজের পকেটে পুরিল। সায়েবের মূচ্ছ ভাঙ্গিলে লহনা হাসিতে হাসিতে বলিল, “কি গাে লপটন, হুজুরের মিজাজ শরীফ? অনেক জিনিস আজ শেখালে সায়েব। শিখ সিগারেট খায়, জগাধরী জেলায় নীল গাই পাওয়া যায়, আর তার শিং হয় দু'ফুট পাঁচ ইঞ্চি। মুসলমান খানসামা শিবমূর্তি পূজা করে, আর লপটন সায়েব খচ্চর চড়ে। কিন্তু এমন সাফ উর্দু শিখলে কোখেকে ? আমাদের সায়েব ত ড্যাম না বলে চারটি শব্দও মুখ থেকে বের করতে পারে না। লহনা “লপটনে”র পালুনের জেব খুজিয়া দেখে নাই। সায়েব যেন শীতের জন্য হাত দু’টি পাৎলুনের পকেটে ঢুকাইল। লহনা সিং বকিয়া চলিয়াছে-“কি চালাকীই করলে। কিন্তু লহনা সিং যে পাঁচ বছর থেকে সায়েবের সঙ্গে সঙ্গে ঘুরছে। তার চোখে ধূলো দেওয়া কি চাট্টিখানি কথা। দেশ ছেড়ে আসবার তিন মাস আগে আমাদের গায়ে এক মৌলবী এলেন। মেয়েদের ছেলে হবার ওষুধ, ছেলেদের রােগ সারবার ওষুধ দিয়ে বেড়ান, চৌধুরীদের বারান্দায় মাদুর বিছিয়ে বসে লােক জমা করে বক্তৃতা দেন। আমি মৌলবীর দাড়ী- সায়েবের জেব হইতে পিস্তলের আওয়াজ হইল। লহনার জয় খালি লাগিল। এদিকে লহনার বন্দুকের গুলিতে সায়েবের মাথার খুলি উড়িয়া গেল। লহনা পাগড়ী ছি’ডিয়া ক্ষতস্থানে কসিয়া পটি বাঁধিয়া রক্ত বন্ধ করিল। ইতিমধ্যে সত্তর জন জার্মান চীৎকার করিয়া খাইয়ের মধ্যে লাফাইয়া পড়িল। আট জন শিখ একজোট হইয়া বাধা দিল । কিন্তু কতক্ষণ? জার্মানরা ক্রমে আগাইয়া আসিতেছে।

পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গল্প ১২ সহসা পিছন হইতে ধ্বনি উঠিল, “ওয়াহ গুরুজী দী ফতেহ। ওয়াহ গুরুজী দা খালসা। তৎ শ্রী অকাল।” বজীরা সিংহ সুবেদারকে সঙ্গে লইয়া ফিরিয়াছে। সঙ্গে আরাে অনেক শিখসৈন্ত। লড়াই শেষ হইতে বিলম্ব হইল না। জার্মানরা নিঃশেষে প্রাণ দিল। শিখেদের ১৫ জন প্রাণ হারাইল। লহনা সিং-এর পসলীতে (rib)-ও গুলি লাগিছিল। ঘায়ে খাইয়ের মাটি পুরিয়া পাগড়ীর কাপড় দিয়া শক্ত করিয়া পটি বাঁধিয়া লহনা কাজ করিতে লাগিল। কিন্তু দ্বিতীয় ক্ষতের রক্ত বন্ধ হইল না। কেহ জানিতে পারিল না যে, লহনা সিং গুরুতর আহত হইয়াছে। লড়াইয়ের সময় চন্দ্র মেঘমুক্ত হইয়া আকাশে হাসিতেছিল। কিন্তু হাওয়ায় হাড়ে কঁপুনি ধরাইয়া দেয়। একেবারে বাণভট্টের-দবীণে- পদেশাচাৰ্য—অর্থাৎ দাতের ঠক্ঠক্ বীণাবাদন শিক্ষাদাতা। বজীরা সিং বলিতেছিল—আমি ফ্রান্সের মণখানেক মাটি দুই জুতায় ভরিয়া সুবেদারের কাছে পৌছিলাম। সুবেদার সব শুনে তােমার উপস্থিতবুদ্ধির খুব তারিফ করতে লাগলেন।” এই লড়াইয়ের শব্দ তিন চার মাইলের মধ্যে যে যেখানে ছিল শুনিতে পাইয়াছিল। টেলিফোনে ফীল্ড হাসপাতালে খবর পৌছিতে বিলম্ব হয় নাই। দেড় ঘণ্টার মধ্যে ডাক্তার, চোর, ওষুধপত্র ব্যাণ্ডেজ পৌছিয়া গেল। সাধারণভাবে প্রাথমিক শুশ্রুষা শেষ হইলে আহতদিগকে হাসপাতালে পৌঁছাইবার ব্যবস্থা হইতে লাগিল। সুবেদার লহনা সিং-এর ঘায়ে ব্যাণ্ডেজ বাধাইতে চাহিলে লহনা সিং হাসিয়া উড়াইয়া দিল। বােধা সিং জ্বরে কাতরাইতেছিল। তাকে গাড়ীতে শশায়াইয়া দেওয়া হইল। লহনাকে ছাড়িয়া সুবেদার যাইতে চাহিতেছিলেন না, কিন্তু লহনা সিং ।

ভুলি নাই কঠিন কঠিন শপথ করিতে লাগিল—“বােধা সিং-এর দিব্যি, সুবেদারণীব দিব্যি, যদি তুমি না যাও।” -কিন্তু লহনা সিং, তােমারও ত যাওয়া দরকার। -তোমরা পৌছে গিয়ে গাড়ী পাঠিযে দিযাে। তাছাড়া জার্মান যারা মরেছে, তাদের সবার জন্যও ত গাড়ী ফের আসবে? আমার ঘা সামান্য। দেখছ না, দিব্যি দাড়িয়ে আছি। বজীয়া সিং আমার কাছেই বুইল। -আচ্ছা ভাই, তােমার কথাই মানছি, কিন্তু -আব কিন্তু টিন্তু নয সুবেদাবজী। বােধা সিংকে ভাল করে শুইযে দিয়েছ ত? আর শােন, সুবেদারণী হীরাকে যে চিঠি লিখবে তাতে আমার নমস্কার জানিযে বলবে যে, ওঁব কথা আমি রেখেছি। কিছু ভুলিনি। গাড়ী চলিতে আরম্ভ করিযাছিল। মুখ বাড়াইযা সুবেদার বলিলেন, “লিখব মানে? এক সঙ্গে দেশে যাব। সুবেদারণীকে যা বলবার তুমিই বলাে! তুমি আমার আর বােধার প্রাণ বাঁচিযেছ লহনা সিং। জনম ভাের তােমার ঋণ ভুলব না। -আচ্ছা, আচ্ছা, সে হবে এখন। যা আমি বলেছি, তাই করাে। সুবেদারণীকে জানিযে তার কথা আমি ভুলিনি। সাধ্যমত রাখবার চেষ্টা করেছি। লিখতে ভুলে না। দেশে গিয়ে মুখেও বলল। গাড়ী দৃষ্টির বাহিবে যাইতেই লহনা ভূমিশয্যা গ্রহণ করিল। “বজীরা সিং, জল দে ভাই। আর আমার পট খুলে দে। রক্তে একেবারে ভিজে গিযেছে।”

t পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গল্প ১৫ মৃত্যুর ছায়ায় যখন জীবন অন্ধকারাচ্ছন্ন হইয়া উঠে, তখন পূৰ্ব্বতি উজ্জ্বল হয়। কুয়াশা কাটিয়া গিয়া বহুদিন-বিস্মৃত বস্তু ব্যক্তি পুনরায় স্মরণ পথে জাগিয়া উঠে। লহনা সিং স্বপ্নজাগরণের ঘােরে বাল্যে ফিরিয়া গিয়াছে —এক এক করিয়া পূৰ্ব জীবনের ঘটনা মােহাচ্ছন্ন দৃষ্টির পটে ফুটিয়া উঠিতেছে। আবার মাঝে মাঝে আচ্ছন্ন ভাব কাটিয়া যাইতেছে। -বার বৎসরের এক বালক। অমৃতসরে মামার কাছে আসিয়াছে। দইওয়ালার দোকানে, সজী বাজারে যেখানে সেখানে এক বালিকাকে দেখিতে পায়। আট বৎসর বয়স তার। দেখিলেই জিজ্ঞাসা করে- “তাের কুড়মাই হয়ে গিয়েছে? জবাব পায়—ধেৎ। একদিন জবাব পাইল—“হুঁ হয়ে গিয়েছে, দেখছিসনে রেশমী ফুলদার এই ওড়না? শুনিতেই লহনা সিং বিষম ক্রুদ্ধ হইয়া উঠে।•••••• বজীরা সিং জল দে ভাই। জীবনের পঁচিশ বর্ষ কাটিয়া গিয়াছে। বাল্যস্মৃতি মন হইতে মুছিয়া গিয়াছে। সাত দিনের ছুটি লইয়া জমাদার লহনা সিংহ গ্রামে ফিরিয়াছিল। তিনদিন পরেই চিঠি আসিল-শীঘ্র চলে এসাে। সঙ্গে সঙ্গে সুবেদার হাজার সিং-এর পত্ৰও আসিল। “বােধা সিংকে নিয়ে আমিও ফিরছি। তুমি ফিরতি পথে আমাদের বাড়ী হয়ে এলে ভাল হয়! একসঙ্গে পৌছে যাব।” লহনা সিং সুবেদারের বাড়ী পৌছিল । যখন সকলে রওয়ানা হইবে, তখন সুবেদার বলিলেন--“লহনা, সুবেদারণী তােমায় চেনেন। ডাকছেন ওঘরে। একবার ভেতরে হয়ে এসাে।” সুবেদারণী আমায় জানেন? কোথায় দেখা হয়েছিল? কবে ? ভাবিতে ভাবিতে লহনা ভিতরে পৌছিল। নমস্কার করিল। ভিতর হইতে আশীর্বাদ হইল। -আমাকে মনে পড়ে?

ভুলি নাই তাের কুড়মাই হয়ে গিযেছে ?—ধেৎ। - কাল হয়ে গিয়েছে। দেখছ না ফুলদার ওড়না ? -মনে পড়ে না অমৃতসরের কথা? ভাবের আঘাতে বিকারের ঘাের কাটে। রক্তচক্ষু মেলিয়া লহনা সিং ফের জল চায়—“বজীরা সিং পানি পিলা দে।” আবার চোখ মুদিয়া আসে। গুপ্তের সূত্রে জোড়া লাগে—আমি তােমায় দেখেই চিনেছিলাম। এক মিনতি আছে। আমার ত কপাল মন্দ। বাে সিং-এর পর চার ছেলে হয়েছিল-পােড়াকপালীর ভাগ্যে সইল না, এখন এই এক বেটা। সেও যাচ্ছে লড়াইয়ে। সুবেদারণীর চোখ দিয়া জল পড়িতে লাগিল। ক্ষণেকের জন্য অমুখী বেদনাবিকল মাতৃমুখচ্ছবি স্মৃতিপটে দীপ্যমান হইয়া উঠিল। চোখ মুছিয়া আবার—“এখন দুজনেই চলে যাচ্ছে। আমি একলা ঘরে কি নিয়ে দিন কাটাব। কপালে আর কি আছে কে জানে। তােমার মনে পড়ে কি, একদিন টাঙ্গার নীচে থেকে আমায বাঁচিয়েছিলে, তােমার নিজের হাত পা জখম করে? আমার প্রাণ একদিন বাঁচিয়েছিলে লহনা সিং। এখন সেই এক প্রাণ দু’ দেহ ধরে বিদেশে বিভূযে যাচ্ছে-আবার তােমার হাতে সপে দিলুম। দুঃখিনী আঁচল বিছিয়ে ভিক্ষে চাইছে, লহনাসিং। বল, এদের রক্ষা করবে ? কাঁদিতে দিতে সুবেদারণী ভিতরে চলিয়া গেলেন। চোখ মুছিয়া লহনা সিং ফিরিল।•••••• লহনা সিং-এর মাথা কোলে রাখিয়া বজীরা সিং বসিয়া আছে। মাঝে মাঝে মুখে জল দিতেছে। আধ ঘন্টা নীরব থাকিয়া লহনা হঠাৎ বলিয়া ঠিল—কে, কীরত সিং ?

পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গল্প
বজীরা কি বুঝিয়া বলিল-“ই।”
কীরত সিং লহনার ভাই।
“কীরত সিং, আমার মাথাটা আর একটু উচুতে রাখ। সেই আম
গাছে এবার আম ধরবে খুব। খুড়াে ভাইপাে মিলে খুব আম খাবি।
যত বড় আম, তত বড় ভাইপাে। দুটির একই ব্যস। যে মাসে ওর জন্ম
সেই মাসেই গাছ লাগিয়েছিলাম।
.
কিছুদিন পরে সংবাদপত্রে খবর বাহির হইল, ফ্রান্সের রণক্ষেত্রে জমা
দার লহনা সিং বীরগতি প্রাপ্ত হইয়াছে।

• শতর'খেলােয়াড় ওয়াজিদ আলী শাহের রাজত্বকাল। লক্ষ্যে বিলাসের স্রোতে আক মগ্ন। ঘােট বড় ভেদ নাই, আমীর গরীবের কথা নাই, প্রত্যেকটি লােক নিজ নিজ কুচি ও সামর্থ অনুসারে নানা অনাবশ্যক নেশায় চুর হইয়া দিন কাটায। নাচ-গানে কেহ মত্ত, কেহ আফিমের নেশায় বুদ। মােরগের লড়াই, বটেরের লড়াই, বাজ পাখীর শিকার; আর আছে ঘুড়ি উড়াইবার ধুম! যে জিনিষ আজকাল মাত্র ছােট ছােট ছেলেদের মনােরঞ্জন করে একটু ব্যস বাড়িলেই যাহা কিশাের বয়স্কদের কাছে নেহাৎ অকিঞ্চিৎকর মনে হয়, সেই ঘুড়ির লড়াইয়ে যুবক-প্রৌঢ়-বৃদ্ধের কি প্রচণ্ড উৎসাহ। যেখানে সেখানে এক একটি মেলার মত লােক-কি নাকি, ঘুড়ি-যুদ্ধ হইতেছে। চীৎকারে কর্ণ বধির হইবার উপক্রম। মাঝে মাঝে কবি মজলিস বসে। অতি তুচ্ছ ধরণের কবিতাকণা লইয়া চেঁচামেচির অন্তু নাই। বাহবা, ক্যা খুব, তুমনে ত গজব কর দিয়া, ইত্যাকার ধ্বনিতে কানে তালা লাগে। তাও আবার সব কবিতা অশ্লীল, অধিকাংশই ধর্মবিরােধী এবং ন্যক্কারজনক। রাজ্যশাসন, সাহিত্য, ব্যবসায়, সমাজ ব্যবস্থা সব কিছুরই উপর বিলাসিতার ছায়া পড়িয়াছে। বিলাসিতার ছা ত নয়, আসন্ন সন্ধ্যা দিনান্তের ছাযা। মুসলমান রাজশক্তি নিঃশেষে নিভিয়া যাইবার পূর্বে একবার যেন বিলাসিতার প্রলয় শিখায় শেষ মুহূর্তে শ্মশানােৎসব লাগাইয়া দিয়াছে। রাজকর্মচারী শাসনবিমুখ, ঘুষখাের; কবিগণ অশ্লীলতা ও অধৰ্ম্মকেই বিষয়বস্তু করিয়াছেন; যন্ত্র ব্যবসায়ীরা ঝালর, জরী ও চিকনের কাজ, নানা রূপের ও নানা রঙের ফুলতােলা প্রভৃতি সুক্ষ্ম কারুকার্য নিয়াই আছে। সুরমা, ২ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গল্প আতর, নানা ধরণের গন্ধ দ্রব্য, মিযী, কাজল, বিবিধ প্রকার মশলা “কতকী দবা,–এই সবের বাজার সর্বদা সরগরম। প্রতি বাড়ীতে বটের, তীতর প্রভৃতি পাখী লড়াইয়ের জন্য পালিত হইতেছে। আর আছে 'নিরন্তর তাস, পাশা, দাবা, শতরঞ্জ। বাজীর পর বাজী, অবিরাম বাজী চলিতেছে। এই ব্যসনােত্ত নগরে, যেখানে সকলেই ইহ-পরকাল ভুলিয়া আমােদ- প্রমােদের স্রোতে গা ভাসাইয়া দিয়েছে, সেখানেও মির্জা সজ্জাদ আলী ও মীর রৌশন আলীর তুলনা মেলা ভার। তবে ভিক্ষুক যেখানে ভিক্ষালব্ধ অর্থে আয়ের পরিবর্তে মাদক দ্রব্য, গঞ্জিকা, আফিম ইত্যাদি সংগ্রহ করে, সেখানে পুরুষানুক্রমে জায়গীর ভােগকারীদের স্থানকাল বিস্মৃত হইয়া প্রমােদ-অন্ত-প্রাণ হওয়া আশ্চর্য কি। দুই বন্ধু সকালে উঠিয়া নাকে- মুখে তাড়াতাড়ি প্রাতরাশ গুজিয়া লইয়া দাবার ছক লইয়া বসেন। দাবা- বােড়ে সাজাইয়া লইয়া, হয় হন্তী গজবাজী রাজা উজীরের সান্নিধ্যে শতরঞ্জ- লােকে একবার প্রবেশ করিলেই মন রঙীন লঘু পাখায় অবিরাম উড়িয়া চলে। শ্রান্তি ক্লান্তি নাই, সময়ের খেয়াল নাই। প্রভাত হইতে দুপুর ; দুপুর গড়াইয়া বিকাল ; তারপরে দিনের আলাে নিভাইয়া দিয়া আসে রাত্রি। ইহারা সমস্ত চৈতন্যকে এক কেন্দ্রীভূত করিয়া তেমনি নিবিষ্ট, ধ্যানস্তব্ধ। মাঝখানে একবার যখন দুপুরের আহার আসে, অন্যমনস্কভাবে খাবারগুলি উদরস্থ হয়, খেলা এদিকে সমানে চলিতে থাকে। এক হাতে ঘুটি চালান, অন্য হাতে খাবার। মির্জা সজ্জাদ আলীর বৈঠকখানাতেই শতরঞ্জের ছক পাতা হইত। সাহস করিয়া কেহ কিছু বলিতে পারিত না বটে কিন্তু চাকরবাকর পৰ্য্যন্ত একেবারে অতিষ্ঠ হইয়া উঠিয়াছিল। মির্জার বেগম সুযােগ পাইলেই গায়ের ঝাল ঝাড়িতেন, কিন্তু সুযােগ পাইলে তবে ত! বেগম সকালে শয্যাত্যাগ করিবার পূর্বেই সেই যে মির্জা গিয়া বৈঠকখানায় • দাখিল হইতেন, আর তিনি রাত্রে শয্যায় করার পর পুনরায় শষন গৃহে উদিত হইতেন। বেগম আর কোন পথ না পাইযা চাকরদের উপর রাগ ঝাড়িতেন। যদি কেহ মির্জা সাহেবের নাম করিয়া আসিয়া পান, জল, দুপুরের আহার লইয়া যাইতে চাহিত তখন বেগম চেঁচামেচি করি বাড়ী মাথায় করিতেন। কিন্তু অন্তঃপুর দুরে, গভীর পর্দার অন্তরালে বৈঠকখানায় তাহার তর্জন গর্জন পৌছিত না। বেগমের ক্রোধটা মীর সাহেবের উপরই বেশী। তিনি ভাবিতেন স্বামীকে সাদাসিদা ভালমানুষ পাইয়া মীর সাহেব না হক উন্মত্ত করিয়া তুলিযাছেন। তাহার কারণও ছিল। কালে-ভদ্রে স্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ হইলেই মির্জা সব দোষ মীরের উপর চাপাইতেন। মীরই তাহাকে বিগড়াইতেছে-এই ধারণা তাই বেগমের মনে বদ্ধমূল হইয়া গিয়াছে। একদিন বেগমের মাথা ধরিল। তিনি তাড়াতাড়ি দাসীকে স্বামীর কাছে পাঠাইয়া খবর দিলেন-অবিলম্বে একবার আসিতে হইবে। হকীমের কাছে লােক পাঠানাে চাই। কিন্তী সামলাইতে ব্যস্ত মির্জা কথা কানে না তুলিয়া জবাব দিলেন, “বলগে এখুনি যাচ্ছি।” বলিয়া সমন্ত বিশ্বত হইযা গেলেন। বেগম পুনরায় দাসীকে পাঠাইয়া জানাইলেন-এই মুহূর্তে না আসিলে, তিনি স্বয়ং হীমের কাছে চলিয়া যাইবেন। মির্জা তখন বাজী জিতিবার মুখে। ঝালাইযা বলিলেন—“একেবারে শেষ দশা উপস্থিত নাকি ? দু’মিনিটের সবুর সয় না?” মীর-শুনেই এসাে হে। মেয়েদের মেজাজ একটু নরম-গরম হয়েই থাকে। মির্জাহাঁ হুঁ, তুমি ত বলবেই। দুকিস্তিতে তুমি মাত হয়ে যাচ্ছ কি না।

अपिलीय ई- —সেই ভরসায় থেকে না জনাব; এমন চাল ভেবে নেছি যে, তােমার বাবা বােড়ে যেমন আছে, তেমনি থেকেও একেবারে চিৎপাত হয়ে যাবে। সে কথা যাক। একবার গিয়ে দেখে এসে ব্যাপায়খানা কি। খামােখা কেন বেচারীকে দুঃখ দাও। -তােমার অতি আশ্চৰ্য্য চালটি দেখেই যাই। -আমি খেলব না বলে দিলাম। তুমি একবার হয়ে এসাে আগে। -ভায়া, তুমি বুঝতে পাচ্ছ না, যেতে হবে হকীমের বাড়ী। মাথাধরা- টরা সব মিথ্যে। খামােখা আমাকে নাজেহাল করার ইচ্ছে। যাই হােক, একবার দেখেই এসাে। —আচ্ছ, এই চালের পর। -কিছুতেই না। যতক্ষণ পর্যন্ত একবার বাড়ীর ভিতর না হয়ে এসেছ, আমি বােড়েতে আর হাত দিচ্ছি না। মির্জা আর কি করেন, যাইতেই হইল। বেগম কাতরাইতে কাতরাইতে খেদ ও ক্রোধ প্রকাশ করিয়া কহিলেন, “ঐ ছাই পাশ খেলা তােমায় এমন পেয়ারের চীজ। এদিকে আমি মাথা ব্যাথায় মরে যাচ্ছি, এক মা উঠে আসতে চাও না। চুলােয় যাক এমন খেলা। মির্জা—কি করি বল, মীর সাহেব যে মানতেই চান না। কত হাঙ্গামা করে তবে আসতে পেলাম। -পােড়র মুখ হতভাগা উচ্ছঃ যাক। নিজে যেমন নিষ্কর্মা অপদার্থ সকলকে তেমনি মনে করে না কি? ওরও ত নিজের ছেলে পিল ঘর-সংসার আছে-না সব খেয়ে বেরিয়েছে। -বড় নাছােড়বান্দা লােক। একবার এসে পৌছে যাবার অপেক্ষা এরপর খেলিয়েই ছাড়বে। তাড়িয়ে দাও না কেন?

শতম -কি করে তাড়াই, তুমিই বল। সমান ব্যস, সমান মর্যাদা বরং একটু উচুই বলতে হয়। চক্ষুলজ্জাও ত আছে। -তাহলে আমিই তাড়াব। রাগ করে, করবে। তার খাইও না পরিও না। রেগে যান ত যাবেন, ঘরে ভাত বেশী করে খাবেন। -এই হিরিয়া, বাইরে থেকে সতরঞ্জ তুলে নিয়ে আয। আর অমনি মীর সাহেবকে বলে দিবি আজ আর খেলা হবে না। মেহেরবাণী করে নিজের পথ দেখুন। -কর কি, কর কি বেগম ? ভদ্রতা বলে একটা জিনিষ ত আছে- গঙ্গা হিরিযা, যাস কোথায় ? -ওকে মানা কচ্ছ কেন? আমার মাথা খাও, আমার রক্তে গান কর, যদি তুমি ওকে যেতে না দাও। আচ্ছা বেশ। ওকে ত মানা করলে। আমাকে আটকাও দেখি। বলিয়া ক্রোধভরে বেগম পর্দা অগ্রাহ কবি একেবারে সােজ বৈঠকখানার দিকে সবেগে অগ্রসর হইলেন। স্ত মির্জা সাহেব পিছনে পিছনে মিনতি করিতে করিতে আসিতেছেন আল্লার দিব্য, হজরত হুসেনের দিব্য, আমাব মামুখ দেখবে, যদি ওদিকে পা দিযেছ। বেগম কর্ণপাত না করিযা ততক্ষণে বৈঠকের দরজা পর্যন্ত পৌছাইয়া গিযাছেন। কিন্তু আজন্ম সংস্কার ও অভ্যাস ছিন্ন করি সহসা পরপুরুষের সম্মুখীন হইতে পারা সহজ ব্যাপার নহে। ক্রোধের সময়ও সংস্কার সজাগ। বেগম দরজার পাশে থমকি দাড়াইলেন। তারপর এক ফাক দিয়া মুখ বাড়াইযা ঘরের মধ্যে দৃষ্টিপাত করিলেন। বা খালি। মীর দু-এক ঘুটি এদিক ওদিক করিয়া নিজের সততায় প্রমাণ সংগ্রহের জঙ্ক বাহির বারান্দায় পদাচরণ করিতেছিলেন। বেগম অণক্ষেত্র দেখিয়া বেগে ভিতরে প্রবেশ করিলেন। দাবা-যুদ্ধের পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গল্প সাজ-সরঞ্জাম এদিকে ওদিকে ছড়াইয়া দিলেন, ছকখানা টান মারিয়া এক পাশে ছুড়ি ফেলিলেন। তারপরে বাহিরে দরজা ভিতর হইতে বন্ধ করিয়া দিলেন। মীর ভিতর হইতে একাধিক খুঁটি নিক্ষিপ্ত হইতে দেখিলেন, চুড়ির ক্রোধ-ব্যঞ্জক শব্দ শুনিলেন, শেষে যখন সশব্দে দরজা বন্ধ হইল, ব্যাপার অনুমান করিযা যথাসম্ভব সত্বর নিজের বাড়ীর পথ ধরিলেন। বিজযযৎফুল্ল বেগমকে মির্জা সখেদে কহিলেন, “তুমি একেবারে সর্বনাশ করেই ছাড়লে।” বেগম–এখনই হযেছে কি। মীর আর এ মুখখা হলে, সােজা গর্দান ধরে বার করে দেব। কমবখত নিখটুটু কঁহী কা।••••••হকীম সাহেবের ওখানে যাবে কি যাবে না ? মির্জা ঘর হইতে বাহিব হহলে ত হকৗমের ঘরের দিকে পিছন করিয়া মীব সাহেবের বাড়ী পৌছিলেন। সমস্ত বৃত্তান্ত শুনিয়া মীর সাহেব বলিলেন, “ঘুটি উড়ে আসতে দেখেই আমি ব্যাপার আন্দাজ করে- ছিলাম। বেগম তােমার বড় বদরাগী ভাষা। তুমিই নাই দিয়ে দিয়ে ওকে মাথায় চড়িয়ে বেখেছ, তুমি বাইরে কি কর না কর সে খবরে ওর কাজ কি ? ঘরের বউ, বউযের মতই থাক না।” मिकी যেতে দাও ওসব কথা। এখন বল, কাল থেকে কোথায় বসবে ? মীর-জাযগাব কি অভাব হে; এতবড় ঘর পড়ে আছে কি করতে । -কিন্তু বেগমেব গােসা ঠাণ্ডা করি কি উপায়ে। নিজের বাড়ী বসেই খেলতাম, তাতেই তার রাগ দেখাে না। এখন তােমার বাড়ীতে খেলতে সুরু করলে আমায আর আস্ত রাখবে না। -কি যে বল তুমি। মেযেদের রাগ জলের দাগ। দু’চার বার হাত == শতরঙ্গ খেলােয়াড় পা ছুড়বে, চেঁচাবে, হট্টগােল করবে, তারপরে আপনা আপনি সব ঠাণ্ডা। তবে তােমাকে একটু শক্ত হতে হবে এখন থেকে। স্ত্রীর সামনে অমন মেনিমুখাে হলে কি চলে? মীর সাহেবের বেগম সাহেবা কোন এক অজ্ঞাত কারণে নিরন্তর স্বামীর অনুপস্থিতিই কামনা করিতেন। সেইজন্যই তিনি কখনও মীরের শতবঞ্জ প্রেমের উপর রুষ্ট হন নাই, বরং যেদিন মীর ঘর হইতে বাহির হইতে কোন আকস্মিক কারণে সামান্য বিলম্ব করিতেন, সেদিন বেগম অস্থিব হইয়া উঠিতেন; বার বার স্মরণ করাইয়া দিতেন সময় বহি যাইতেছে। মীর এজন্য খুশি মনে ভাবিতেন তাহার স্ত্রী অতিশ্য পব্রিতা, স্বামীব সুখকেই সুখ জ্ঞান করেন। এখন যখন মীরের বৈঠকখানায় শতবঞ্জেব আসর বসিতে লাগিল, তখন বেগমের বড় কষ্ট হইতে লাগিল। তাঁহার অবাধ স্বাধীনতায় বাধা পড়িল। চাকরদেরও অসুবিধার সীমা নাই। এতদিন কোন হাঙ্গাম হুজ্জত ছিল না। শুইযা বসিয়া দিন কাটাইয়াছে। দু’একটি দৃষ্টিকটু বাপার হইতে চক্ষু ফিরাইয়া লইলেই দিনভাের আরাম। যাহার যেমন খুশী চলুক , তাহাদের কি। শুধু তাহাদের আয়েসিতে বাধা না দিলেই হইল। সেই সুখের দিন আর বুঝি থাকে না। পান নিয়ে আষ, মিঠাই কিনে আন, এলাচিদামা হাজির কর—এসব তাে আছেই। তার উপর আছে অনির্বাণ গুড়গুড়ি। রাবণের চিতার মত, সাগ্নিক ব্রাহ্মণের অগ্নির তাহ আর নিভিতে পায় না। দৌড়াদৌড়ি করিতে করিতে হাতে পায়ে ব্যথা, কোমরে বাত ধরিবার যােগাড়। দাসদাসীরা আসিয়া সমদুঃখিনী, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গ ২৪ হুজুর বেগম সাহেবার বরাবর সমস্বরে নালিশ পেশ করিল। বেগম আখাস দিলেন উপায় হইবে। মাজ্যে হাহাকার উঠিয়াছে। দিনদুপুরে ডাকাতি, খুন, রাহাজানি। নিরীহ প্রজার ধন-প্রাণ বলবানের খেলার বস্তুতে পরিণত। সর্বত্র ঘাের- তর বিশৃঙ্খলা। প্রতিকার করিতে পারে বা ইচ্ছা রাখে, এমন কেহ নাই। গ্রামের ধন-দৌলত সহরে আসিযা কেন্দ্রীভূত হয়, সেখান হইতে তাহা বারবনিতার ঘরে, তাহাদের দালালের ঘরে গিয়া উঠে। ইংরেজ কোম্পা- নীর নিকট ঋণ দিন দিন বাড়িতেছে, ভিজা কম্বলে অনবরত জল জমিয়া তাহা ভীষণ ভারী হইযা উঠিতেছে। রাজকোষও শুন্য—ইংরেজের বার্ষিক প্রাপ্যই আদাষ হয় না। রেসিডেণবরাবর নবাবকে সাবধান করিতেছেন কিন্তু নবাব কানে তুলা গুজিয়া আছেন। বাহিরে এইভাবে ধ্বংসের শেষ দিন ত্রুত পদক্ষেপে আগাইযা আসিতেছে; কিন্তু চক্ষু-কর্ণহীন দুই জায়গীরদার দিনের পর দিন, মাসের পয় মাস, শতরঞ্জ ক্রীড়া আপন-পর বিস্মৃত হইয়াই আছেন। নিত্য নূতন ধরণের বাজী; নিত্য অপর পক্ষকে বৈঠকী-ণে পরাজয়ের প্রয়াস। নূতন ব্যুহৰচনা ; নব পরিকল্পনা সৈন্যসামন্ত সমাবেশ। ঝগড়া, চেঁচামেচি, অপভাষা প্রয়ােগ। ক্ষণ পরে মিত্রতা ও পুনরায় নূতন উদ্যমে খেলা শুরু হয়। মাঝে মাঝে রাগারাগির মাত্রা একটু বেশী চড়িয়া যাইত। খেলা ফেলিযা মির্জা ঘরে চলিয়া যাইতেন। রাত্রি প্রভাতের সঙ্গে সঙ্গে আবার উভয়ে একই প্রেরণাবশে একই কালে বৈঠকখানায় উপস্থিত। দোয়া-সালাম বিনিময় এবং তৎক্ষণাৎ খেলা আরম্ভ। গত কলাের বসার উল্লেখমাত্র কেহ করে না। দুই বন্ধু শতরঞ্জের পাঁকে আকণ্ঠ মগইয়া আছেন, এমন সময় একদিন নিলাশেষের দুঃস্বপ্নের মত এক বাদসাহী ঘােড়সওয়ার আগে আসিয়া কখন কখন

২৫
জে
উপস্থিত হইল। মীর সাহেবের সন্ধান করিতেছে। মীর তাড়াতাড়ি
উঠিয়া দরজা বন্ধ করিয়া দিলেন। চাকরকে বলিলেন, “বলে দে ঘরে
নেই।”
ঘােড়সওয়ার-ঘরে নেই ত কোথায় ?
চাকর-জানিনে। কি দরকার?
দরকারে তাের কি দবকার ? নবাব সাহেব তলব করেছেন আর
কি! বােধ হয ফৌজের জন্য সেপাই চাই। জায়গীরদার হলেই হল
অমনি। দল নিয়ে লড়ায়ে যেতে হলেই কত ধানে কত চাল বােঝা যাবে।
কুডের বাদশার মত দিনরাত বয়ে বসে অমনি নবাবের নিমক খাচ্ছেন।
-আচ্ছা আচ্ছা, তুমি এখন যাও তুলে বলে দেব।
—তােমার বলে কাজ নেই। আম্রি কালই ফের আসব। সাথে
করে নিয়ে যাবার হুকুম আছে।
ঘােড়সওযার চলিয়া গেল। মীর গ্লাসরুদ্ধ করিযা এতক্ষণ উহাদের
কথাবার্তা শুনিতেছিলেন, জমা সব হাওয়া এক সঙ্গে ছাড়িয়া দিয়া হতাশ
কণ্ঠে দোস্তকে শুধাইলেন, “এখন উপায়?”
মিরজা নিজের কথাই আগে ভাবিতেছিলেন। চিন্তিতমুখে বলিলেন
“রি মুশকিল হল দেখছি। আমাকেও না ডেকে পাঠায়।”
ব্যাটা ফের কাল আসবে বলে গেল যে।
-যত সব আপদ কি আমাদেরই কপালে। কোথাও যদি লড়াইযে
যেতে হয়, তবেই গেছি আর কি।
—আমি বলি, ঘর থেকে উধাও হওয়া যাক। কাল থেকে চল
গামতীর কিনারে কোন নিরালা জায়গায় আসর জমাই। ওখানে
কে কাজে আসবে। সেই সে নবাব আসফৌদ্দলায় তৈরী তা
ফাজিদ আছে।

পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গল্প —উল্লাহ, ক্যা খুব, তােমার বুদ্ধির তারিফ করতে হয় দোস্ত। এদিকে মীর সাহেবের বেগম হাসিয়া লুটোপুটি। ঘােড়সওয়ারকে ঐ কথাই বলিতেছিলেন ; বলিহারি তােমার বুদ্ধির। সওয়ার আত্মপ্রসারে টইটুম্বুর হইয়া, সব দন্ত বিকশিত করিয়া জবাব দিল—এদের কি আর হুস আছে। শতরঞ্জ ওদের মাথার ঘি চেটে মেরে দিয়েছে। কাক থেকে আর ঘরে থাকতে হয় না। আমাদের রাস্তা ফের পরিষ্কার। পরদিন সকালে দুই বন্ধু অন্ধুকার থাকিতেই গৃহ হইতে অন্তর্হিত হইলেন। বগলে একখানা বসবার জন্য ছােট সতরঞ্চ, হাতে পানের ডিবে, এক পুটুলিতে খেলার সরঞ্জাম ত্বরিৎপদে গােমতী পার হইয়া পূর্বোক্ত প্রাচীন জনসমাগম ভাঙ্গা মসজিদে আশ্রয় লইলেন। নােনাধরা দেওয়াল, মাঝে মাঝে ইট খসিয়া গিয়াছে , এখানে-ওখানে মেজেতে গর্ত। ভিতরে দিনের বেলায়ও চামচিকা উড়িতেছিল। একটু জায়গা পরিষ্কার করিয়া লইয়া উভয়ে ছক পাতিলেন রাস্তায় তামাক-ছিলিম ইক টিকা সংগৃহীত হইয়াছিল। হুকা ভরিয়া লইয়া তামাক সাজিয়া শতরঞ্জ পাতিয়া সেই যে খেলায় নিমগ্ন হইলেন, ক্ষুধার তাড়না অনুভব না করা পৰ্যন্ত আর পার্শ্বপরিবর্তন করিলেন না। ক্ষুধার জ্বা তীব্র হইয়া উঠিলে কিছু দূরে এক রুটিওয়ালার দোকানে গিয়া ইঞ্জিনে কয়লা দিয়া আসিলেন। তামাক সাজিয়া লইয়া আবার খেলায় বসিলেন। এইভাবে নিত্য চলিতে লাগিল। কোন কোন দিন খাবার কথা পর্যন্ত মনে থাকে না। এদিকে দেশের অবস্থা আরও শােচনীয় হইয়া উঠিয়াছে। কোম্পানীর ২৭ শতয় খেলােয়াড় ফৌজ ক্রমে লক্ষের নিকটবর্তী হইতেছে। সহরে বিষম অব্যবস্থা। অধিকাংশ লােক ছেলেমেষে, স্ত্রী লইযা দূব গ্রামে পালাইতেছে। কিন্তু মির্জা মীরের কোন খেয়ালই নাই। একেব পব এক কিস্তিমাৎ হইতেছে। প্রাতঃকালে যখন মসজিদে আসিতেন, বাত্রে যখন ঘবে ফিরিতেন, বড় রাস্তা দিয়া যাইতে সাহসে কুলাইত না-পাছে নবাবেব লােক দেখিতে পাইযা ধরিযা লইয়া যায়। নিত্যকার মত সেই ভাঙ্গা মসজিদে উভষে খেলায় মগ্ন আছেন, এমন সমষ একদিন দূরে ইংরেজ কোম্পানীব ফৌজ আসিতে দেখা গেল। লক্ষে দখল কবির জন্য গােবা সৈন্য আসিতেছে। সেদিন মিরজার বাজি কিছু দুর্বল ছিল। তিনি তদগতচিত্তে আত্ম- বক্ষাৰ উপায় চিন্তা করিতেছিলেন। মীবের দৃষ্টিই প্রথমে গােরাদের দিকে দৃষ্টিই আকৃষ্ট হইল। তিনি বলিযা উঠিলেন, “দেখ দেখ, ইবেজের ফৌজ আসছে। আজ কি জানি কি হয়।” মিজা-তুমিও যেমন। ইংরেজ আসছে। এদিকে তােমার উজির যে মশলা। বাঁচবে তত এগােও। মীর—একটু দেখা দরকার। এসাে এই দেয়ালের আড়ালে দাড়িয়ে দাড়িযে ব্যাপার কি দেখি। -জলদি কিসের, দেখে নিযাে পরে। এই কিস্তি তাে আগে সামলাও। সঙ্গে তােপও আছে দেখছি। পাঁচ হাজার লােক তাে খুব হবে। দেখতে বেঁটে বেঁটে বটে, কিন্তু সাবাস জোযান। বাঁদরের মত লাল মুখ। দেখে ভয় হয়। কেন খামকা বকছ হে , টালবাহানা করে আমাৰ চাল থেকে রেহাই পাবার ফন্দী খুঁজছ বুঝি। সামলাও কিস্তি। আসূছে ত পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ২ -তুমি বড় আজব লােক ভায়া। সহরের উপর এই বিপদ, আর তােমার কিস্তির নেশাই ছুটছে না। ভেবে দেখছ কি, চারদিক থেকে সহর যদি ঘিরে ফেলে তাে ঘরে পৌছবে কি করে ? -ঘরে যাবার সময় হলে ভাবব খন। এসে তােমার উজির তত সামলাও। আর সামলতে হয় না ; এক কিস্তিতেই একেবারে মাৎ। সৈন্যদল দৃষ্টপথের বহির্ভূত হইল। আবার ছক পাতা হইল। খেলা চলিল বেলা দশটা অবধি। মীর তখন জিজ্ঞাসা করিলেন, “আজ তাে সব ওলটপালট হয়ে গিয়ে থাকবে। খাবে কোথায়?” -তােমার তাে একটা না একটা উৎপাত লেগেই আছে। কোথায়? কেন, আজ বােক্স রাখা যায় না। বেলা তাে মােটে দশটা, এরই মধ্যে পেটে আগুন লেগে গেল নাকি? মীর অন্যমনস্কভাবে জবাব দিলেন, “না, না, তা কেন। সহরে না জানি আজ কি হচ্ছে। বাড়ীতে সৰু একেলা।” মিরজা বলিলেন, “হবে স্থাবার কি। লােক খাচ্ছে দাচ্ছে, মৌজ করছে। হুজুর নবাব সাহেবও প্রমােদকুঞ্জেই আছেন নিশ্চয়ই।” আবার খেলা চলিতে লাগি খেলিতে খেলিতে তিনটা বাজিয়া গেল। এইবারও মিরজার বাজি টলমল করিতেছিল। তাহায় ঘণ্টা অনেকের মধ্যেই গােরা সৈন্য ফিরিয়া আসিতেছে দেখা গেল। নবাব ওয়াজিদ আলীকে বন্দী করিয়া ইংরেজরা কোন এক অজ্ঞাত স্থানে লইয়া লিয়াছে। সরে কোন বিক্ষোভ নাই, দাঙ্গাহাঙ্গামা নাই ; একবিন্দু রূপাত হয় নাই। ইতিহাসে লেখে না আজ পর্যন্ত কোন স্বাধীন দেশের মাজার রাষচ্যুতি এমন বিনা রক্তপাতে হইয়াছে। কিন্তু এ তে শান্তি নয়, এ মুনিজনকাম্য অহিংসা নয় ; ঘাের কাপুরুষতা বহুদিন বিলাস সদ্যোগের পরিণামে দেহ মনে যে ঐকান্তিক দৈন্যদশা উপস্থিত হয়,

;
”
শয়া
এ তাহাই। বিশাল অষ্যার অধীশ্বর সাধারণ চোর-ডাকাতের গল্প
শৃঙ্খলাবদ্ধ অবস্থায় আপন রাজধানীর মধ্য দিয়া নীত হইতেছেন; প্রজাপু
আরামের, ব্যসনের নেশায় বুদ হইয়া ভাল করিয়া চক্ষু চাহিয়াও
দেখিতেছে না।
মীর বিমনা হইয়া কহিলেন—জুর নবাব সাহেবকে লালমুথাে বাঁদরের
ধরে নিয়ে গেল।
মিরজা বলিলেন—হবে। সামলাও কিস্তি।
মীর—তােমার কি আর কিছুতেই হুস হবে না। আমার আজ আর
কিছু ভাল লাগছে না। বেচারা নবাব। যে অঞ্চ এখন তার চোখ
দিয়ে ঝরছে, সে তাে আঁখিজল নয, হৃদযের শােণিত বিন্দু বিন্দু হয়ে বেরিয়ে
আসছে।
মিরজা-তা আর বলতে। এমন আয়েস-আরাম আর কি কোথাও
নসীব হবে?
—এমন হৃদয়হীনের মত কথা বলে না ভাষা , কারও দিন এক ভাবে
যায় না।
- হ সে তাে ঠিক কথা। নাও, এবার কিস্তি সামলাও। বানচাল
হলাে বলে।
-খুদা কি কসম, তুমি বড় হৃদয়হীন। এমন সর্বনাশ চোখের সামনে
দেখেও মনে একটু দুঃখ নেই। হায, বেচারা ওয়াজি আলী
শাহ, !
—আগে নিজের বাদশাকে তাে বাঁচাও ভায়া ; ওয়াজিদ আলী শা’র
ভাবনা পরেই না হয় ভেবাে। এই কিস্তিতেই মাৎ, তা বলে রাখছি।
ফেললা বাজি।
সন্ধ্যা হইয়া আসিতেছে। ভাঙ্গা মসজিদে চামচিকা দলের কলকোলাহল

পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গল্প অতিশয় বৃদ্ধি পাইয়াছে। বাবুইপাখী আসিযা নিজেদের নীড়ে বিশ্রাম করিতে লাগিল। কিন্তু খেলােয়াড় দুজনের বিশ্রাম নাই। মিরজা ক্রমান্বয়ে তিন বাজী হারিয়া অত্যন্ত উত্তপ্ত হইয়া উঠিয়াছেন। এবারকার বাজীও তেমন সুবিধার নয়। কিন্তু ক্রোধ ও হৃদয়াবেগকে প্রাণপণে সংহত করিয়া মুখ চোখকে অত্যন্ত কঠিন করিয়া মির্জা খেলিয়া যাইতেছেন। এবার জেতা চাইই। এদিকে মীরের যেন জয়ের নেশা লাগিয়া গিয়াছে। ক্ষণকাল পূর্বের বিমনা ভাব আর নাই। ফুর্তির চোটে কখন কবিতা আবৃত্তি করিতেছেন, কখন তুড়ি দিতে দিতে কোন গজলের দু’একচরণ গাহিতেছেন। মির্জা রাগে ফুলিতেছেন। বাজী যতই হারিবার মুখে যাইতেছে, ততই ধৈৰ্য্যচ্যুতি ঘটিতেছে। এখন কথায় কথায় ঝগড়া বাধিবার উপক্রম। বলিতেছেন, “একি রকম চাল তােমার মীর সাহেব! ঘুটি হাতে নিয়ে বসে আছ ত আছই। এতক্ষণ নেবে কেন? যতক্ষণ চাল স্থির না করেছ, খুঁটিতে হাত দিতে পাবে না। তা না, কখন এদিক ফেরা কখন ওদিক ফেরাচ্ছ। এক চালে রাত কাবার। ওরকম চলবে না বলে দিচ্ছি। এক চাল চালতে পাঁচ মিনিটের বেশী নাও ত বুঝব হেরে গেলে।•••ফের তুমি চাল বদলালে ? যেখানে বসিয়েছিলে, সেখানেই রাখ বলছি।” মীরের হার হইবার উপক্রম হইয়াছিল। বলিলেন, “আমি চাল দিলাম কবে যে বদলাবার কথা উঠছে ?” চাল তুমি চেলেছ। বােড়ে যেখানে রাঁখছিলে, ওখানে ছেড়ে দাও। ঠিক ওই ঘরেই রাখা চাই। —আমি ত বােড়ে হাত থেকে নামাই নি। -ওই হাত ওদিকে নিয়ে গেলেই হল। ঘুটি আঁকড়ে প্রলয়কাল পৰ্যন্ত বসে থাকবে নাকি? একবার ওদিকে ত একবার ওদিকে।

যেই দেখলেন হেরে যাচ্ছেন, অমনি চাল বদলে দিলেন। সে হবে না ।
কুন্তীর মারপ্যাচ নাকি? যত সব চালাকি।
-হারজিত ভাগ্যের খেলা। চালাকী করছি আমি না তুমি ?
-তাহলে মেনে নাও তুমি এই বাজী হেরেছ ?
-বললেই হােল? আমি হারলাম কবে ?
-তবে ঘুটি ঐ ঘরেই রেখে দাও। হার কি জিত, এখনই মালুম
হয়ে যাবে।
-ওখানে কেন রাখব? কিছুতেই রাখব না।
রাখতেই হবে। রাখবেন না আবার। চৌদ্দপুরুষ কি তােমার
কেউ শতরঞ্জ খেলেছে যে, খেলার মর্ম জানবে! বাপদাদা ত ছিল
ঘাসিয়ারা। এখন হয়েছেন মীর সাহেব। জাযগীর পেলেই যদি স্বভাব
বদলে যেত, তবে কথা ছিল কি?
-ঘাসিয়ারা ছিল তাের বাপ, বলি মীর ক্রোধভরে উঠিয়া
দাড়াইলেন। মির্জাও উঠিয়া পড়িয়া আরক্তমুখে বলিলেন, যত বড় মুখ
ততবড় কথা। নবাব বাড়ীতে বাবুঢ়ীখানায মা ঠাকুমা কাজ করে পেট
চালিয়েছে, এখন তুমি আমীর হয়েছ। ছােট লাের্কের মুখে আগুন।
মীর গর্জিয়া উঠিয়া বলিলেন, “সাবধান মির্জা, প্রাণের মায়া থাকে ত
চুপ করাে।”
মিরজা-ঘাসিয়ারার ছেলের আবার সাহস আছে নাকি। সাহস
থাকে ত বের কর তলােয়ার। তৎক্ষণাৎ উভযে কোমরে ঝুলানাে ধাপ
হইতে তলােয়ার বাহির করিলেন।
নবাবী আমলে প্রায় সকলেই অস্ত্র রাখিত-বিশেষ, আমীর
ওমরাহগণ। প্রচলিত প্রথানুসাবে মীরজা মীর, দুজনেই দেহ সজ্জর
অপরিহার্য অঙ্গরূপে তরবারি ঝুলাইয়া চলিতেন। কিন্তু তাহা খাপ হইতে

সুফিবীয় শ্রেষ্ঠ গ বাহির করিবার আর অবকাশ ঘটে না, বনিঃশেষিত বিদ্যুতের মত কৃপাণ কোষ মধ্যে নিদ্রাগতই থাকে। বাল্যে উভযে একই ওস্তায় নিকট অসিচালনা শিক্ষা করিয়াছিলেন কিন্তু অব্যবহারে লব্ধবিদ্যা লুপ্ত প্রায় হইয়া আসিয়াছে। এতদিন ধরিযা উৎসমুখে যে জড়ত্বের জঞ্জাল জমিয়াছে, আচম্বিতে অতি প্রবল ধাক্কা লাগিযা তা নিমেষে সরিয়া গেল । ধমনীতে পুনরায় উষ্ণ শশানিত স্রোত খর বেগে বহিতে লাগিল। ভােগ- বিলাস আরাম আযেসীর বিপুল ভস্মস্তুপে আচ্ছাদিত হইয়াও তাতাররজের তেজবীৰ্য্য নিঃশেষে নিভিয়া যায় নাই। যাহাবা নবাব সৈন্যে যােগ দিবার ভযে, যুদ্ধে যাইবার সম্ভাবনামাতে, আঁধারে আঁধাবে পেচকের মত মুখ লুকাইয়া বেড়াইতেছিল, মৰ্ম্মস্থলে আঘাত লাগিতেই তাহারা আহত সিংহের মত রুখিয়া দাড়াইয়াছে। তলােখার চলিতে লাগিল; সান্ধ্য সমীরণে তরঙ্গ তুলিয়া সদ্যনীড়াশ্রয়ী পক্ষীদিগকে সচকিত করিযা অন্ত্রেব ঝনঝনা বাজিতে লাগিল-প্রথমে ধীরে ধীরে, ক্রমে ক্ষিপ্রগতিতে। আঘাত সামলাইয়া, প্রতিঘাত করিয়া দুই বন্ধু লড়িতে লড়িতে মসজিদের বাহিরে উন্মুক্তস্থানে আসিয়া পৌছিলেন। দূর- দিগন্তে তরুশ্রেণীর অন্তরালে সন্ধ্যার রক্তরশ্মি সুন্দরীর সীমন্তে সিন্দুর রেখায় মত তখনও জলজল করিতেছিল। মাথার উপরে, একটি দুইটি করিয়া কৌতুহলী তারকা পাতলা অন্ধকারে নিকা সামান্য সরাইয়া অন্তরাল হইতে উকি দিতেছে, আবার তথনই সভয়ে মুখ লুকাইতেছে। সেই অর্থ স্বচ্ছ প্রদোষান্ধকারে উন্মুক্ত অম্বর তলে পরস্পর শানিতপিপাসু দুই সুহৃৎ ঘাতপ্রতিঘাত করিতে করিতে কখন একই সঙ্গে সাংঘাতিক আহত হইয়া ভূতলে পড়িয়া গেলেন; প্রাণবায়ু বহির্গত হইতে বিলম্ব হইল না। যুদ্ধ ইহারা ভূলিয়া যায় নাই, উদ্দীপ্ত হইলে প্রাণের মায়া ত্যাগ করিতে জানে, -হৃদযের শােনিতে সেই প্রমাণ লিপিবন্ধ করিয়া, বিলাস ব্যসনের যুগান্ত তর খেলােয়াড় সঞ্চিত পাপের প্রায়শ্চিত্ত করিয়া আবাল্য সহচর দুই অভিজাত বংশীয় যুবক অযযাধ্যার নবাবী আমলের সঙ্গে সহমৃত হইল। শত উত্থান পতনের সহ- চক্ষু মূক সাক্ষী সূৰ্য্যদেব পশ্চিম দিগন্তে ঢলিযা পড়িলেন ; নবাবের ভাগ্যরবি, মীবজা-মীবেব জীবনরবি সেই সঙ্গে চিরতবে অস্তমিত হইল।

রামলীলা এক যুগ হইয়া গিয়াছে, ইদানীং আর রামলীলা দেখিতে যাই না। সেই বয়স নাই, সেই চোখ নাই। বীভৎস মুখােস, কালাে রঙের খাটো কোর্তা, হাঁটু অবধি লম্বা পাজামা-এই পরিযা ছ’ ছ’ ফিট লম্বা জোয়ান মন্দ সব লাফাইতেছে, ঝাপাইতেছে, হস-হাস, উপ-আপ কবিতেছে। দেখিয়া এখন হাসি পায, অভিভূত হই না। কাশীব রামলীলা দেশ- বিখ্যাত। দূর দূরান্ত হইতে কত লােক ভিড় করিযা আসে। অনেক দিন হইল একবার কৌতুহলবশে আমিও গিযা জুটিয়াছিলাম। কিন্তু আমার চোখে কাশীর রামলীলা ও আমাদের অজ পাড়াগাঁর রামলীলায় তেমন কোন ইতর-বিশেষ ধরা পড়িল না। রামনগরে সাজ পােষাক একটু জমকালাে সন্দেহ নাই। রাক্ষস ও বানরের মুখােস সব পিতলের তৈরী; বনগমনােত ভ্রাতৃযুগলের মাথার মুকুটও বেশ দামী ও ভাল কাজ করা মনে হইল। এই মাত্রই। বাকী সব সেই হস-হাস, লাফ-ঝাপ, তীর ধনুক লইযা নকল লড়াইযের মারপ্যাচ। হাতে গোঁফ। ঢাকি একজন স্ত্রী ভূমিকায় অভিনয় করিও গেল। তবু শত শত সহস্র সহস্র দর্শনার্থীর ভিড়। তেল-নুন-লকড়ীর চাপে, গৃহিণীর প্রতাপে, সাম্প্রতিক সাহিত্যের উত্তাপে যাহাদের অন্তরের অন্তঃ- শীলা রসধারা নিঃশেষে শুকাইয়া যায় নাই, কল্পনাশক্তি একেবারে পক্ষা- ঘাতগ্রস্ত হইয়া পড়ে নাই, তাহারা এখনও উচ্ছসিত হইয়া উঠে। । কাহারও কাহারও কাছে গোঁফ এমন প্রিয় বস্তু যে অভিনয়ের প্রয়ােজনেও দু’গরি দিনের জন্য তার বির সয় না। যদি তাহাদিগকে খ্রীলােক সাজাইতেই হয়, তবে গোফও চালাইয়া দেওয়া ছাড়া গত্যন্ত নাই।

অভিনেতারা তাহাদের কাছে উদ্দীপক উপলক্ষ্য মাত্র। আসরে পা রাখিতে না রাখিতে ইহারা সত্যযুগে, কল্পান্থপূর্বের অযযাধ্যা-দণ্ডক-লঙ্কায় উত্তীর্ণ হইয়া যায়। রাম, সীতা, লক্ষ্মণ হনুমান্ তাহাদের হৃদয়-রাজ্যে সজীব মূর্তি ধরিয়া সঞ্চরণ করিতে থাকেন। তাই ত, নৈশ গগন মথিত করিয়া শত সহস্র ভক্তিগদগদ আবেশ-বিহবল কণ্ঠ হইতে মুহুর্মুহুঃ বন্দনা ধ্বনি উঠে :- জয় সীয়াবর রামচন্দ্র কী জয়। সীতারাম-জয-ধ্বনিতে সেদিনও যােগ দিয়াছিলাম, কিন্তু তাহা যেন ক্ষণিকের আবেশ মাত্র। হায় রে, কোথায় গেল বাল্যের সেই পুলক- বিহ্বলতা, সেই তন্ময় আত্মবিশ্বতি ! একদিন আমিও কি সমগ্র মন-প্রাণ- চৈতন্য এককেন্দ্রীভূত করিয়া রামলীলা দেখি নাই, শুনি নাই, প্রাণের পরতে পরতে স্নিগ্ধ বিদ্যুৎ-সঞ্চারের মত অপরােক্ষ অনুভূতি লাভ করি নাই! বাস্তবে কল্পনায় মিশামিশি-স্বপ্ন-জাগরণে একাকার সেই দিনগুলি কি আর একবার ফিবিয়া পাই না ? আমাদের বাড়ী হইতে রামলীলার মাঠ বেশী দূরে ছিল না। যে ঘরে অভিনেতাদের সাজানাে রঙ, পরানাে হইত, তাহা ত আমাদের বাড়ীর একেবারে লাগাও ছিল। বেলা দুইটার সময় হহতেই রঙ করা আরম্ভ হইয়া যাইত। তার অনেক আগেই আমি নাকে-মুখে গুজিয়া লইয়া উদ্ধশ্বাসে সেখানে পৌছি হাজিরা দিতাম। তাহাদের টুকিটাকি ফরমাশ খাটিতে পাইলে আর কিছু চাহিতাম না। তাহারাও খুব খাটাইয়া লইত। আমার শ্রান্তি-ক্লান্তি নাই, অনবরত দৌড়াদৌড়ি ছুটাছুটি করিতেই লাগিয়া আছি। সে উৎসাহ-আনন্দ-উত্তেজনার কি তুলনা হয়। এখন ত টাকা ধৰ্ম্ম, টাকা স্বর্গ অবস্থা, কিন্তু পেন্সন আনিতে যাইতেও সেই বাস্য-উৎসাহের কণামাত্র আর অনুভব করি না। কোণের এক ছােট কামরায় রাজকুমারদের ‘শিঙ্গার’ হইত। “রামবঙ্গ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গল্প চুর্ণ করিয়া অজে লাগান হইত, মুখে পাউডার, তার উপর লাল সবুজ নীল রঙের বিন্দু দেওযা-কপাল, ভুরু, গাল চিত্র-বিচিত্র বিন্দুতে ভরিয়া যাইত। দলের মধ্যে একটি মাত্র লােক অঙ্গসজ্জায় নিপুণ ছিল। সেই ক্রমান্বয়ে রামসীতা-লক্ষ্মণকে সাজাইত। রঙের পেয়ালায় জল লইয়া আসা, রামরজ চুর্ণ করা, পাখার বাতাস করা—এই সব ছিল আমার কাজ। সাজসজ্জার পর যখন রামচন্দ্রের রথ বাহির হইত, তখন তাহাদের পিছনে এক আসন অধিকার করিয়া আমার সে কি উল্লাস! ভিক্ষুক যেন অকস্মাৎ রাজ্যখণ্ড পাইয়া গিয়াছে। আজ লাট সাহেবের দরবাব খানা- পিনায় নিমন্ত্রিত হই; ঈর্ষাকাতর দৃষ্টির সম্মুখ দিয়া চলিবার কালে অন্তরে গর্বোৎফুল্ল ভাবের আমেজও যে অনুভব করি না তাহা নহে, কিন্তু বাল্যের সেই দিব্য অনুভূতির আস্বাদ আর পাই না। জীবনপথে চলিতে চলিতে দুঃখ বিপদের ফাকে ফাকে কত রকমের সাফল্য, সৌভাগ্য সুদিনের সাক্ষাৎ পাইয়াছি—বিবাহ, পুত্র-পৌত্রের মুখ দর্শন, নিজের ও সন্তানদের বড় চাকুরী প্রাপ্তি, দেশী ও সরকারী নানা রকম খেতাব ও সম্মান, কিন্তু আর একবারও কি ক্ষণেকের তরেও বাল্য-কৈশােরের সেই আনন্দ-সমাহিত শান্তরসম্পদ অপরােহ্মানুভূতির দর্শন পাইতে নাই। সেই দিন নাই, সেই বয়স নাই, সেই চোখ নাই, সর্বোপরি যাহা নয়কে হয়, হয়কে নয় করে, সেই অঘটনঘটনপটীয়সী মায়াবিনী কল্পনা নাই। বুঝিতে পারিতেছি, প্রাণপণে কতকগুলি বিশেষণ একত্র করিয়া সেই আনন্দ-সমাধির আভাস দেওয়ার চেষ্ঠা কি নিষ্ফল বিড়ম্বনা। তাহার চেয়ে সেই কাহিনী শােনাই, কি করিয়া স্বপ্নভঙ্গ হইল। বয়ঃসন্ধিকালে যখন সব কিছু বয়সের ধর্মেই ভারী হইয়া আসিয়া মনকে নিম্নগামী করিতে আরম্ভ করিয়াছে, তখন এক রূঢ় আঘাতে স্বপ্ন টুটিয়া গেল। প্রতিমার পিছনের খড় বাহির হইয়া পড়িল। সেও এক অশ্রুজলাভিষিক্ত করুণ কাহিনী, बामनौना কিন্তু তাহা পূৰ্বাস্বাদিত দিব্যানুভূতি নহে। বড় পার্থিব ধরণের আঁখিজল, পার্থিব কারণেই ঝরিয়াছিল। তাহার সঙ্গে আবার ক্রোধ ও লজ্জাবােধ মিলিয়া আছে। এই বয়সের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিল আছে বলিয়াই এতকাল পরেও সব খুটিনাটি স্মরণে পড়ে। রামলীলা সেই বছরের মত শেষ হইয়া গিয়াছিল ; শুধু রামের সিংহাসনা- রােহণ কী। অন্যবার তাই তাড়াতাড়ি হইয়া যায়। এইবার বিলম্ব হইতেছিল। আমি ত অধীর হইযা উঠিযাছিলাম। নিত্য খোজখবর লইতাম। ক্রমে বুঝিতে পারিলাম, খোঁজখবর আমিই শুধু লই, আর কেহ দুইদিন আগের শত সহস্র লােকের নয়ন-পুত্তলি রামচন্দ্রের সম্বন্ধে কোন কৌতুহলই পােষণ করে না। রােজ যাই আর দেখি আমার রামচন্দ্রের মুখ ম্লান । বেচারাকে বাড়ী যাইতেও দেয় না, অথচ এদিকে অনাদর অবহেলার অবধি নাই। চৌধুরীর ওখান হইতে সিধা আসিতে আসিতে মােজ বেলা তিনটা বাজিয়া যায়। রাম-সীতা-লক্ষ্মণ তখন রান্না করিতে বসেন। সকাল হইতেই কিছু পেটে পড়ে নাই। তাহাদের করুণ ক্ষুৎ- পিপাসাকাতর মুখের দিকে চাহিযা আমার যেন বুক ফাটিয়া যাইত। সাজ- পােষাক, রঙ না থাকিলে কি হইবে। আমার চোখে যে তাহারা তখনও অযােধ্যার রাজকুমার, রাজকুলবধু। মাসাধিক কালের একাগ্র চিন্তার মােড় কিশাের মনে এত সহজে কি ঘুরিয়া যাইতে পারে ? মা আমাকে সকালে যা কিছু খাইতে দিতেন, আমি তাহার অর্ধেক রাম-লক্ষ্মণদের জন্য লইয়া যাইতাম। মা কোনদিন নিষেধ করেন নাই, বরং খাবার বরাদ্দ বাড়াইয়া দিয়াছিলেন। তবে বাবাকে জানাইয়া নহে। সে আর এক শাহিনী।

পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গল্প দুঃখীর দিনও কাটে। অবশেষে রামচন্দ্রের ক্লেশ অবসানের দিন নিকটবর্তী হইল। আবার রাম-সীতা-লক্ষ্মণকে অপরূপ প্রাণমনােহারী সাজে সাজানাে হইল। আজ সন্ধ্যায় রাজা রাম রাজ্যারােহণ করিবেন। রামলীলার মাঠে বিরাট সামিনা খাটানাে হইযাছে। লােকের ভিড়ও খুব। সন্ধ্যায় শােভাযাত্রা বাহির হইল। প্রতিগৃহের পত্ৰপুষ্পসজ্জিত দ্বারে শশাভাযাত্রা থামাইয়া রামচন্দ্রের আবতি হইতে লাগিল। সকলে সাধ্যমত ভেট দিল। আমার পিতা ছিলেন পুলিশের দাবােগা। ইহলােকে যেমন সব জিনিষ বিনামূল্যে পান, কলা-মূল হইতে কাপড় চোপড় বাসনপত্র কোন কিছুর জন্য নগদ নারায়ণ বাহির করিতে হয় না, পরলােকেও সেই রকম সস্তায় সওদা করিবার পূর্ণ ভরসা রাখিতেন। প্রথা মত আমাদের বাড়ীর দ্বারেও আরতি হইল, কিন্তু দারােগাজী কিছু দিলেন না। আমার দুঃখ-নিরাশার যেন অবধি নাই। এত দুঃখ সহ্য দ্বাদশবর্ষ বনে বনে ভ্রমণ করিযা আনামৃতবক রাজাধিরাজ রামচন্দ্র ঘরে ফিরিতেছেন, তাহাকে কিনা আমাদের দরজা হইতে এক রকম ফিরাইয়া দিলে। আমি আর থাকিতে পারলাম না। দশহরার সময় মামা আমাদের ওখানে বেড়াইতে আসিয়াছিলেন। যাইবার সময় আমাকে একটি টাকা দিয়াছিলেন। আমি উৰ্দ্ধশ্বাসে ঘরে ছুটিয়া গেলাম, নেকড়ায় বাঁধা টাকাটি টিনের বাক্স হইতে বাহির করিয়া, আরতির থালায় রাখিয়া দিলাম। পুত্রের দানশীলতা ও পিতার কার্পণ্য দেখিয়া সকলের মুখে চকিতে অদৃশ্য রকমের হাসির আভাস থেলিয়া গেল। বাবা আমার দিকে রােষকষাযিত দৃষ্টিপাত করিলেন। কিন্তু আমি তখন যেন হাওয়ায় উড়িয়া চলিয়াছি। “দাবােগাই” দৃষ্টির তেমন কোন প্রভাব অনুভব করিবার মত অবস্থা নহে। কাবু হওয়া ত দুরের ब्रामगीना রাত্রি দশটায় পরিক্রমা শেষ হইল। আরতির থালি টাকা পয়সায় ভরিয়া উঠিয়াছে। সকলে অনুমান করিল পাচশ টাকার কম হইবে । কিন্তু চৌধুরীর মুখ ভার। তিনি কিছু বেশীই খরচ করিয়া ফেলিযাছিলেন। শ’ দুই টাকা গচ্ছা যাইবে দেখিয়া তিনি বিমনা হইয়া পড়িলেন। অবশেষে এক উপায় বাহির করিলেন। রাজ্যাভিষেকের রাত্রে প্রতি বৎসর “মেযেদের দ্বারা নাচগান করানাে হইত। রাজসভায নর্তকী আসিয়া নৃত্য-গীত-বাদ্যে নৃপতির সন্তোষ বিধান করিব—ইহা ত অভিষেকের এক অচ্ছেদ্য অঙ্গ। পুথি-পত্রেই লেখা আছে। তবে এই সব ছলাকলার কারবারীরা যে নেহাৎ দেবকন্যা নয়, সেই বােধ ক্রমে জাগ্রত হইতেছিল। এবার হঠাৎ আমার জ্ঞাননেত্র খুব ভাল করিয়াই খুলিয়া গেল। কি কারণে মনে পড়ে না, আমি এক কোণে আঁধারে দাড়াইয়া- ছিলাম। আর একটু দূরে আলােতে চৌধুৰী দাড়াইয়া কাহার সঙ্গে যেন কথা বলিতেছিলেন। আমি দু পা আগাইয়া গিয়া দেখিলাম, অযযাধ্যার রাজসভার সেই নটী। আমার ব্যস কম বলিয়া তাহারা আমাকে গ্রাহই করিল না নিজেদের সলাপরামর্শ তেমনি করিয়া যাইতে লাগিল। চৌধুরী বলিতেছেন , “দেখ আবাদীজান, এ তােমার ভারী অধ্যায়। এ কি আমাদের নূতন জানাশােনা যে, এত দরকষাকষির দরকার পড়ছে। এত কাল ধরে প্রতি বৎসর আসছ যাচ্ছ ; ভবিষ্যতেও তােমার পুরােপুরি আশা রয়েছে। দেখছ ত এ বছর টাকাকড়ি আর বছরের চেয়ে কম এসেছে। নইলে কি আমি সামান্য টাকার জন্য কিপ্টেমাে করেছি কোন দিন ?” আবাদীজান নাক-মুখ ঘুরাইযা জবাব দিল, “আমি তােমার খাস তালুকেও বসত করিনে যে তােমায় ভয় করব; তােমার ঘরের বউ মই ৪০ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গল্প যে বুক ফাটবে ত মুখ ফুটবে না। জমীদারী চাল-চালাকি তােমার খাতক- প্রজা, চাকর-বাকরের জন্য তুলে রাখ। আমার চোখে ধূলাে দেওয়া তােমার কর্ম নয় চৌধুরী সাহেব। টাকা আদায় করব আমি, আর গোঁফে তা দিয়ে পকেটে পুরবে তুমি। ভ্যালা টাকা রােজগারের ফন্দী ঠাউরেছ যা হােক। দাও না বাইজীদের একটা চাকলা বসিয়ে। দু’দিনে লালা মােহরী লাল হয়ে যাবে।” চৌধুরী কাতর হইয়া কহিলেন, “আবাদীজান, এই কি ঠাট্টা-তামাসাব সময়। এদিকে আমার বলে ধড়ে প্রাণ নেই। দু’ দুশো টাকা যদি আমার ঘর থেকে যায়, তবে আমার কি অবস্থা হবে ভেবে দেখ।” আবাদী তেমনি অবিচলিতভাবে জবাব দিল, “আমার সঙ্গে চালাকি না করলেই পার। তােমার মত এমন অনেক চৌধুরীকে বােজ আমি নাকে দড়ি দিয়ে ঘােরাই—বলিয়া চৌধুরীর নাকের ডগা হইতে কিছু দূর পর্যন্ত আঙ্গুলের সাহায্যে এক দড়ির আকার আঁকিয়া দিল। চৌধুরী হতাশ ভাবে বলিলেন, “তুমি কি চাও খুলেই বল।” আবাদী-তবে শােন। আমি যা উশুল করব, তার অর্ধেক আমার।” অনেক ইতস্ততঃ করিয়া চৌধুরী শেষকালে বলিলেন—“আচ্ছা, আমি রাজী।” -“তা হলে আগে আমার ফুরনের একশাে টাকা দাও।” চৌধুরী বিস্ময়ে ছােট চোখ দু’টি যথাসম্ভব বিস্ফারিত করিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “গাছের খাবে, তলারও কুড়ােবে? আদায়ী টাকার অর্ধেক যদি নাও, তবে আবার ঐ একশাে কেন?” আবাদীজান বাঁ-হাতের বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ নাচাইয়া বলিল, “আমার সঙ্গে ত’ টাকা আয় করবার কোন কথা নয়। ফি বছর আসি, নাচি গাই চলে ৫১ রামলীলা যাই, এবারও তাই করে যাব। কারাে পকেটে হাত চালাতে যাব কেন ? ’ যদি করাতে চাও, অর্ধেক বখরা।” কি করেন, মুখ ভার করিয়া চৌধুরী অগত্যা রাজী হইলেন। নাচ শুরু হইল। আবাদীজানের চেহারা বেশ ভালই ছিল। বয়সও কম। যার সামনেই একবার বসিল, তাহারই পকেটের ভার কিছু না কিছু লাঘব করিয়া তবে উঠিল। এক রকমের নীরব প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলিতেছিল। পাঁচটাকার কম কেহ আর বাহির করিতে পারে না। আবাদীজান এর ওর কাছে টাকা আদায় করিয়া শেষকালে আমার পিতৃদেবতার সামনে গিয়া হাঁটু গাড়িয়া বসিল এবং তাহার হাত ধরিয়া গানের কলি বার বার গাহিয়া চলিল। আমার কি জানি কেন মুখ লজ্জায় একেবারে রাঙা হইয়া আসিতেছে। সব লােক বাবাকে ভয় করিয়া চলে। চেহারাও খুব রাশভারী। যাহারা দেখা করিতে আসে সকলেরই কাঁচুমাচু মুখ, সশঙ্ক দৃষ্টি। বাবা কথা বলেন ত ধমক দিয়া। আমি কল্পনাও করিতে পারি নাই, কেহ তাহার হাত ধরিতে পারে। তাও আবার শত শত লােকের সাক্ষাতে। বাবার কিন্তু সেই স্বাভাবিক রাগত ভাব কোথায় উৰিয়া গিয়াছে। তিনি হাত ছাড়াইয়া লইলেন বটে, কিন্তু অপ্রসন্নভাবে নহে। কে একজন পিছন হইতে বলিল, “এখানে তােমার কারসাজি চলবে না আবাদীজান, বৃথাই হয়রাণ হচ্ছ। কিন্তু আবাদী এবার দু’হাতে বাবার গলা জড়াইয়া ধরিল। আমি প্রাণপণে কামনা করিতেছিলাম, বাবা যেন মেয়েটাকে ঠেলিয়া ফেলিয়া দেন। কিন্তু ঠেলিবার কোন লক্ষণ দেখিলাম না। বরং তিনি এমন ভাব ধরিলেন—যেন স্বর্গ সুখ অনুভব করিতেছেন। চোখ-মুখ হইতে তৃপ্তি উছলিয়া পড়িতেছিল। পিছন হইতে যে তাহার কার্পণ্যসূচক টিপ্পনি কাটিয়াছি তার দিকে এক অগ্নিদৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়া তিনি পকেট হইতে এক মােহর বাহির করিলেন।

পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গল্প ৪২ দেখিয়া আমার যে কি হইল বলিতে পারি না। আমি সভা ছাড়ি তৎক্ষণাৎ উঠিয়া আসিলাম। একবার ভাবিলাম—মাযের কাছে গিয়া সব বলিষ দিই। কিন্তু তাহা আর করিলাম না। মা যে আমার সুখী নহেন, তাহা সেই বয়সেই বুঝিতে আরম্ভ করিয়াছিলাম। বৃথা তাহার দুঃখ বাড়াইয়া কি লাভ। পরদিন প্রাতে রামচন্দ্র বিদায হইবেন। আমি ভােরে শয্যা ত্যাগ করিয়াই চোখ কচলাইতে কচলাইতে উহাদের ঘরে গিয়া হাজির। ভয় হিল, পাছে আমার সঙ্গে আর একবার দেখা হইবার আগেই উহারা চলিয়া যান। গিয়া দেখি, আবাদীজানের যাত্রার জন্য গাড়ী আসিযাছে। জিনিষপত্র সব বাধাছাদা হইতেছে। এত ভােরেই বিশ পঁচিশ জন ভক্ত রসিক সেখানে জুটিয়া গিয়াছে। আমি তাহাদের দিকে দৃষ্টিপাত না করিয়াই সােজা রাম-লক্ষ্মণের ঘরে পৌঁছিলাম। সীতা ও লক্ষ্মণ নিজেদের চারপাইয়ের উপর বসিয়া কাঁদিতেছেন। রামচন্দ্র তাহাদিগকে সান্ত্বনা দিতেছেন। রামও বাড়ী যাইবার জন্য প্রস্তুত। কাধ হইতে দড়িতে বাধা এক লােটা পিঠের উপর ঝুলিতেছিল। বগলে গামছায় বাঁধা মলিন এক পুটুলী। আমি ছাড়া ওখানে আর কেউ নাই। আমি কুণ্ঠিত স্বরে জিজ্ঞাসা করিলাম, “তােমাদের বিদায় হয়ে গেছে ? — হয়ে গেছে। আমাদেব আর বিদায় কি ভাই। চৌধুরী সাহেব বললেন, “চলে যাও”, তাই যাচ্ছি। -টাকা-কড়ি কাপড়-চোপড় পেয়ে গেছ ? -আর ভাই টাকাকড়ি। কিছুই ত দিলেন না চৌধুরী সাহেব, বললেন এবার কিছু বাঁচেনি। পরে একদিন এসে নিয়ে যেয়াে। —একেবারে কিছু পাওনি? —এক পয়সাও না। বলেন কিছু বাঁচেনি। আমি ভেবেছিলাম- ৪৩ রামলীলা কিছু পেলে পড়বার বই কিনব। গত বছর অন্যদের বই নিয়ে মিয়ে পড়েছি। পরীক্ষার সময় কেউ দেয় না। তখন ভারি অসুবিধে হয়। কথা বলিতে বলিতে রামচন্দ্র দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিলেন ; চোখ দুইটি জলে ভরিয়া আসিল। রুদ্ধকণ্ঠে বলিতে লাগিলেন, “পথের খরচও কিছু দিলে ভাই। বলে, কতই বা দূর, হেঁটে চলে যাও।” আমার মনে এমন ক্রোধ হইল যে, সব কিছু তছনছ করিয়া ফেলিতে ইচ্ছা হইতে লাগিল। বাইজীর জন্য শত শত টাকা, গাড়ী-ঘােড়ার বন্দোবস্ত। আর এদের জন্য দু’চার আনাও কেহ ব্যবস্থা করে নাই। কাল রাত্রে যাহারা বেশ্যার দৃষ্টিতে মােহিত হইয়া পাঁচ পাঁচ দশ শ টাকা ভেট চড়াইয়াছিল, তাহারা দু’দুটি পয়সা এদের দিতে পারে না? বাবাও ত কাল এক মােহর দিযাছেন। দেখি এবার এদের জঙ্গ কি দেন। বাড়ীর দিকে ছুটিলাম। কিন্তু আমি গিয়া মুখ খুলিবার অবসর পাইলাম না আমাকে দেখিয়াই বাবা গৰ্জন করিযা উঠিলেন, ‘ঘুম থেকে উঠেই কোথায় গিয়েছিলেন বাবু সাহেব ? পড়াশােনার নাম নেই, সকাল থেকেই উধাও! কোথায় ছিলি? আমি দম লইবার অবকাশ পাইতেই বলিয়া ফেলিলাম, “রাম-লক্ষ্মণকে বিদায করতে গিয়েছিলাম। চৌধুরী ওদের কিছু দেন নাই বাবা।” -তাতে তাের কি? ভক্ত হনুমান সেজেছেন। খেয়ে দেয়ে ক নেই, পাজী কোথাকার। আমি মরিয়া হইয়া বলিলাম, ওরা যাবে কি করে? রাস্তা খরচও কিছু পায় নি। বাবা যেন একটু নরম হইলেন। বলিলেন—এ চৌধুরীর ভারী অন্যায়। কিছু দেন নি ?

পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গল্প 33 আমি সাহস পাইয়া বলিলাম, “না বাবা, এক পয়সাও না। ওরা কাঁদছিল। আপনি যদি দুটো টাকা-* বাক্য আর শেষ করিতে হইল না। বাবা এমন বিকট হুঙ্কার দিয়া উঠিলেন যে, আমি তৎক্ষণাৎ স্থান ত্যাগ করাই সুবুদ্ধি বিবেচনা করিলাম। পিতার উপর ক্রোধ ছিল, কিন্তু ভয় ছিল তারও বেশী। কথায় কথায় তিনি চড়-চাপড় চালাইতেন। আমি আর কি করি ; উদ্দীপ্ত ক্রোধ শান্ত করিয়া মাযের নিকট হইতে দুই আনা পয়সা সংগ্রহ করিযা দেব দিয়া আসিলাম। দুই আনা মাত্র পয়সা, কিন্তু তাহাদের আনন্দ ধরে না। তিনজন ঐ দুই আনা সম্বল করিযাই বাড়ী চলিলেন। যতক্ষণ না তাবা সৃষ্টির বহিভূত হইযা গেলেন, ততক্ষণ আমি সেই শূন্য কক্ষের দ্বারে মুর্নিব মত স্তব্ধ হইয়া দাড়াইযা বহিলাম। পরে চোখের জল মুছিতে মুছিতে বাড়ী ফিরিলাম। সেইবারের রামলীলার প্রভাব আমাৰ সমগ্র জীবনে বিস্তৃত হইযাছিল । আমাদের পিতাপুত্রের প্রকাশ্য তিক্ততা সেই যে শুরু হইল, তাহা আর থামে নাই। আমি আর কোনদিন পিতাকে মান্য করি নাই, কোন কথা শুনি নাই। দারুণ প্রহার করিযাও তিনি আমার জেদ ভাঙ্গাইতে পাবেন নাই। শেষকালে আমাদেব বাক্যালাপ বন্ধ হইয়া গিয়াছিল।

কুমুরে পােকা গ্যালিলিও দূরবীক্ষণ যন্ত্র আবিষ্কার করিলেন, যাহাতে দূরের জিনিষ নিকটে দেখিতে পাওয়া যায়। এই আবিষ্কার কত বর্ষব্যাপী সাধনার ফল, কত বিনিদ্র রজনী ভাবনাসঞ্জাত, কে বলিতে পারে! দূরবীক্ষণটার জন্য বৈজ্ঞানিকের চিত্তে এই ব্যাকুলতা কেন জাগিযাছিল ? প্রশ্নটা তামাসার মত মনে হইতে পাবে, কিন্তু প্রত্যেক আবিক্রিয়ার পশ্চাতে আবশ্যকতাবােধ ত সিদ্ধ হওয়া চাই। সুতরাং স্বীকার করিতে হয় যে দূরকে নিকটে করিবার বাসনা জগতে বিদ্যমান ছিল। বৈজ্ঞানিকের প্রতিভায় তাহা আন্দোলন উপস্থি কবিল এবং তাহার ফলে হইল এক নূতন বস্তুর সৃষ্টি। মন যেন প্রশ্নের খনি। মুহূর্তে মুহূর্তে নুতন ‘কেন’র সেখানে উদয় হয়। সুতরাং এক কথায় কৌতুহল নিবৃত্ত হইতে পারে না। এর পরেও কেন আছে। মানুবের মনে দূরস্থকে নিকটস্থ করিবাব বাসনা কেন উপস্থিত হইল? আশেপাশে যে সব জিনিষ রহিয়াছে, তাহা ত’ এখনও ভাল ভাল করিযা দেখা হয় নাই! হাতের কাছে, সুখ-দুঃখের আলাে-ছায়ায় সৃষ্টি-বিনাশের যে অভিনয় রাত্রিদিন চলিতেছে, তাহা হইতে দৃষ্টি ফিরাইয়া চন্দ্রলােকের ধ্যানে বিভাের হইবার আগ্রহ কেন ? ভাবিতে ভাবিতে, আমারই ঘরের মধ্যে এই একমাস ধরিয়া যে বিচিত্র ব্যাপার ঘটিতেছিল, বায়স্কোপের ছবির মত তাহার একের পর এক দৃশ্য চোখের সামনে ভাসিয়া চলিল। আর কিছু নয় এক কুমুরে পােকার কথা। স্মরণাতীত কাল হইতে মা, দিদিমার বলিয়া আসিতেছেন, কুমুরের বাসা ভাঙ্গিতে নাই। জিলে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গল্প ৪৬ চোখে আঙুনি হয়। আহারান্তে বিছানায় শুইয়া এক ফরাসী গ্রাম্য গাথা- সংগ্রহ পড়িতেছিলাম। এমন সময় এক কুমুরে খসখসের পর্দা ডিঙাইয়া কামরায় প্রবেশ করিল—ভ••বে।•••••বে। বই ছাড়িয়া আমার চোখ তাহার অনুসরণ করিতে লাগিল। গুপ্তধনের অন্বেষণে সন্ধানী যেমন নিণীত স্থানের প্রত্যেক অংশ শ্যেনদৃষ্টিতে দেখে, ও-ও তেমনি ঘরের প্রত্যেক কোণ তন্ন তন্ন করিয়া দেখিয়া চলিল। প্রায় আধঘণ্টায় তাহার পরীক্ষা সমাপ্ত হইল। এক জায়গা পছন্দ হইয়াছে। ঠিক ঝরােকার নীচেই। আরাে কিছুকাল এদিক ওদিক সতর্কতার সঙ্গে পৰ্যবেক্ষণ কবিয়া সে ঘরের বাহির হইয়া গেল। এত সময বৃথা নষ্ট হইয়া যাওয়াতে মনে মনে একটু বিরক্তও হইলাম। যাহােক, সেদিনের মত ত’ শেষ। পরদিন মধ্যাহ্নভোেজনের পর শয্যাশ্ৰয করিতেই দেখি জানালার নীচে সেই মনােনীত স্থানে মাটির এক গােল ঘর তৈয়ারী হইতেছে। মসজিদের গম্বুজের মত ঘর, মাঝখানে এক ছােট্ট দরজা। বাল্যে পিতৃভবনে, যৌবনে পতিগৃহে গৃহ-নিৰ্মাণ অনেক দেখিয়াছি। ইট-পাথরের, চুণ-বালির স্তুপ, মিন্ত্রীদের আনাগােনা—এত নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। কিন্তু এই পতঙ্গ যে বাসা তৈযার করিতে লাগিল, ফরাসী পল্লী- গীতিকার মদির রসপ্রবাহকে উপেক্ষা করিয়া মন আমার হাতেই পড়ি। রহিল। ছােট হােক, বড় হােক, একখানা ঘর তৈরী করিতে কতলােক লাগে ?•••নােগশীর্ণা বালিকা মাকে বলিতেছে, “মা আমার রেশমী পােষাক এনে দাও। আমি আমার নিঠুর প্রেমিকের সঙ্গে একবার দেখা করতে যাব।” “বলিস কি বাছা? সাতদিন ধরে বিছানায় পড়ে আছিস তুই। ডাক্তার উঠতে মানা করেছে যে! এতদূর কি করে যাবি মা?” আখাস দিয়া মেয়ে বলিতেছে, “তুমি ভেবাে না মামণি; দেখা না s করে আমি যে সােয়ান্তি পাচ্ছিন। ওসব ডাক্তারের ওষুধে আমার অসুখ সারবে না। যেতেই হবে আমায়। আমার রেশমী জামা আর টুলী এনে দাও না-সেই রঙীন কিনারাওয়ালা টুপীটা। ••••••কি নিষ্ঠুর পুরুষ! মরণাপন্ন বিরহিনীকে একবার কি চোখের দেখা দেখিতেওঁ আসিল না! কিন্তু প্রেমে আত্মবিস্মৃত তরুণীর হাতে কোন অভিমান নাই। নিজেই সে দেখা করিতে যাইবে। কি রসােদ্বেল এই পল্লীগাথা !•••কিন্তু মন আবার সেই কুমুরের বাসায় ফিরিয়া আসিল। ছােট হােক, বড় হােক, সেই ঘর তৈরী করিতে কতলােক লাগে? কেউ নক্সা তৈরী করে, কেউ জিনিষপত্র আনে; মজুর মিন্ত্রী ঠিকাদার গাড়ী- ওয়ালাদের রীতিমত ভীড় লাগিয়া যায়। আর এই নগণ্য পতঙ্গ ? একা- ধারে সব ! একেলাই সব ঝক্কি পােয়াইতেছে! মানুষ মনে করে সে বুদ্ধির ভাণ্ডার, কিন্তু এই ক্ষুদ্র প্রাণীর কত জ্ঞান। এত সব ও ভাবে কি করিয়া ? এর মনেও কি মানুষের মত সংস্কার, স্মৃতি, ভাবনা আছে ? রৌদ্র-বর্ষায় ব্যতিব্যস্ত হইয়া হয়ত মনে হইল একখানা ঘর চাই। ঘরের উপকরণ সম্বন্ধে ভাবিল, স্থান নির্ণয় করিল, শেষে কাজে লাগিয়া গেল। আমি ভাবিতেছিলাম, ও কাজ করিতেছিল। এরই মধ্যে কতবার যে ভিতর-বাহির হইল তার ইয়ত্তা নাই। বাহিরে গিয়া কোথা হইতে এতটুকু কাদা মুখে করিয়া ফিরে। ঘরের উপরে বসিয়া তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চারিদিক দেখে। যেখানে একটু নীচু, সেখানেই কাদাটুকু লাগায়। ঠিকভাবে লাগিল কিনা দেখিয়া আবার উড়িয়া যায়। ঘর তৈরী হইয়া গিয়াছে। এবার সে ঘরের প্রবেশপথে আসিয়া বসিল, শুড় ভিতরে চালাইয়া দিয়া কোথাও উচু নীচু আছে কিনা পরীক্ষা করিল। সদ সঃ হইবার পাত্র নয়। উহার সতর্কতার কথাই চিন্তা করিতেছিলাম। এমন সময় দেখি কোণ : পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গল্প হইতে মুখ ও পায়ের সাহায্যে এক লম্বা, সবুজ রঙের কীট ধরিয়া লইয়া ফিরিতেছে। সেই ক্ষুদ্র ছিদ্রপথে এমন আলগােছে উহাকে প্রবেশ করাইল যে দরজার কোন অংশে ওর শরীর স্পর্শ হইল না। আমি হাসিয়া ফেলিলাম-“এটি তােমার জলখাবার বুঝি?” অল্পক্ষণ পরেই ও আবার একবিন্দু কাদা মুখে লইয়া ফিরিল এবং সেই ছিদ্রেরই উপর বসিয়া পড়িল। এখন আবার কি করিতেছে? যতক্ষণ বসিয়া রহিল, কিছু বুঝিতে পারিলাম না। উড়ি গেলে দেখিলাম ছিদ্র বন্ধের আয়ােজন হইতেছে। এতক্ষণ ব্যাপার বােঝা গেল। ওটি কোন ভক্ষ্যজীব নহে। নিজেরই গুটি। কিন্তু গুটি পূর্ণাবয়ব হইয়া বাহির হইবে কখন? পবিণত হইয়া গেলে দরজা ভাঙ্গিয়া মা সন্তান লইয়া যাইবে; কিন্তু ততদিন ও নিজে থাকিবে কোথায়? আর, ও কি করিয়া জানিবে, কতদিন পরে তাহার সন্তানের এই দ্বিতীয় গর্ভস শেষ হইবে ? যদি বা দিনের সংখ্যা জানে, গুণিবে কিসের সাহায্যে? আমার ঘর হইতে একদিনের জন্য যদি দোেল- পঞ্জিকা অন্তর্হিত হয়, তবে দিনে দশবার তারিখ জিজ্ঞাসা করিযা মরি। দেখালে, টেবিলে, আলাদা আলাদা ক্যালেণ্ডার। কিন্তু কুমুরে স্মৃতি- সাহায্যে দিন গুণিবে? সমযের প্রবাহ পবিমাপক কি যন্ত্র ওর আছে ? মানুষ যে সব জীবকে গণনার মধ্যে ধরে না, কত বিষয়ে তা মানুষ হইতে শ্রেষ্ঠ। অল্পে অল্পে আমার নিদ্রাকর্ষণ হইল, কিন্তু স্বপ্নেও সেই একই দৃশ্য দেখিতে লাগিলাম—কুমুরে গুটি লইযা উড়িযা আসিতেছে। *এখন আবার কি হচ্ছে ?”—মুখ দিয়া এই কথা হঠাৎ বাহির হইবার কারণ ছিল। যথানিয়ম দুপুরের বিশ্রামের জন্য ঘরে ঢুকিতেই দেখি, প্রথম ঘরের গা ঘেসিয়া কুমুরে আর একখানা নূতন ঘর খুঁলিয়াছে। প্রশ্ন ত করিলাম কিন্তু উত্তরু দিবে কে? কারাে কথায় কান দিবার ওর ফুসৎ কোথায়? একমনে কাজ করিয়া যাইতেছে। দুই দিনের মধ্যে দ্বিতীয ঘরও সম্পূর্ণ হইল। পূর্ববারের ন্যায় এর মধ্যেও আর একটি গুটি চুকাইয়া সে ছিদ্র বন্ধ করিয়া দিল। এই গুটি ও আনে কোথা হইতে ? ছাদে উঠিয়া দেখিবার চেষ্টা করিলাম কোন্ দিকে ও উড়িয়া যায়, কিন্তু কিছু ঠাহর হইল না। অবশ্য কাদা যে আমাদের বাগানের গর্ত হইতে আনে, সে বিষয়ে সংশয় নাই। বাগানে গিয়া দেখিলাম গর্তের মাটি প্রায় শুকাইয়া আসিয়াছে, কুমুরে খুজিযা পাতিয়া একেবারে ভিতর হইতে নরম মাটি লইয়া আসে। বলিহারি বুদ্ধি । প্রায় পরদিন নিরন্তর পরিশ্রম করিয়া কুমুরে ছয়খানি ঘর নির্মাণ করিল এবং তাহাদের মধ্যে ছয়টি গুটি বন্ধ করিল। ইহার সম্বন্ধে আমার কৌতুহল এমন প্রবল হইয়া উঠিল যে সবকিছু জানিবার অদম্য আকাঙ্ক্ষা আমায় একেবারে পাইযা বসিয়াছিল। কিন্তু জানিবার কোন পথই যে নাই। এখন সাত নম্বর ঘর তৈয়ার হইতেছে। আরও গুটি আছে নাকি? কত ডিম দেয় ও একসঙ্গে? নিজে থাকে কোথায় ? একসঙ্গে অনেক ডিম পাড়িয়া রাখিয়াছে অথবা ঘর তৈরীর সঙ্গে তাল রাখিয়া ইচ্ছামত ডিম পাড়িতেছে ? মায়ার এক বিচিত্ৰতর ইন্দ্রজাল এই পতঙ্গের জীবন। আজ চা-টা পাওয়া যাবে, না•••কুমুরে-ফিল্ম চলতেই থাকবে দিনরাত ধরে ?” চমকিয়া পিছন ফিরিয়া দেখি, স্বামী নিকটে দাড়াইয়া মৃদু মৃদু হাসিতেছেন। চারটা বাজিয়া গিয়াছে অথচ আমার খেয়াল নাই। তিনটা সময় চা খাওয়া ওঁর অভ্যাস। আজ এক ঘণ্টা চায়ের জন্য অপেক্ষা করিয়া শেষকালে অফিস হইতে উঠিয়া আসিয়াছেন, আমার পৃথিবীর গুষ্ঠি গল্প ন্ময়তা সকলের হাসিতামাসার খােরাক জোগাইতেছে। সত্য সত্যই মনের দূরতম গহন পৰ্যন্ত এই ক্ষুদ্র প্রাণী জুড়িয়া বসিয়াছিল। রাত্রিদিন একতাবের ঘরে কাটিতেছে। স্বামীর প্রতি এই অবহেলায় মনে অনুতাপ হইল। চা-পর্ব শেষ করিয়া আবাব শয্যা নিলাম। গরমের জন্য পাথা খুলিয়া দিয়াছিলাম। পাখার বো বোর সঙ্গে আর এক বো বো মিলিতেই পাশ ফিরিয়া চাহিলাম। দেখি কুমুরে আর এক গুটি মুখে লইযা ফিরিতেছে। কিন্তু এবার বড় শক্ত পালা। এ যেন নৌকার ঘুণীতে পড়া অথবা জাহাজের উপর টর্পোেের আঘাত। একেত বেচারী গুটির ভারেই হিমসিম খাইতেছে। তার উপর বিজলীর পাখার প্রবল বায়ুস্রোত! উপর হইতে তাহাকে নীচে নামিতে হইবে, কিন্তু এতটুকু নামিতে না নামিতে হাওয়ার বিষম তােড় তাহাকে উপরের দিকে ঠেলিয়া দিতেছে। বহু সন্তান প্রসবে শীর্ণ। ভারপীড়িত গর্ভিণী কতক্ষণ এই অসম দ্বন্দ্বে যুঝিতে পারিবে ? ইচ্ছা হইল পাখা বন্ধ করিয়া দিই। কিন্তু দধর্ম যৌবনের কৌতুহলের নিকট পরাভব স্বীকার করিল। দেখাই যাক না এই কঠিন অগ্নিপরীক্ষায় ও কি করিয়া উত্তীর্ণ হয় ? বায়ুর প্রবাহের উপরে ও উড়িতেছিল। বারকয়েক উন্ধে নিক্ষিপ্ত হইবার পর আবার গাছকোমর বাঁধিয়া ঘূর্ণাবর্তে অবতরণ করিল। হাওয়া তাহাকে ঠেলিয়া দিতে চাহিল আর সে দৃঢ়ভাবে পাখা মেলি ধাক্কা সামলাইয়া অগ্রসর হইল। এবার কুমুরে পাখার ঠিক সামনে আসিয়া পৌছিল বলিয়া। কিন্তু আমার মনে হইল যেন মাতালের মত তাহার পা ও পাখা টলিতেছে, মাথা ঘুরিতেছে, সারদেহ কঁপিয়া কঁপিয়া উঠিতেছে। বো বো শৰে পাখা ঘুরিতেছে, ভয় শব্দে কুমুরে আগাইয়া আসিতেছে। যেন দুইখানি যুদ্ধবিমান। হঠাৎ পাখা একটু জোরে চলিল। কুমুরে তাল সামলাইতে না পারিয়া পাখারই চারিপাশে পাখার পাখার সমান বেগে ঘুরিতে লাগিল। আমার মুখ দিয়া বাহির হইল—“পাল্লা দিয়ে ছুটতে খুব মজা লাগছে বুঝি?” বলিয়াই বুঝিলাম গতিক সুবিধার নয়। মনে হইল ও দিশাহারা হইয়া পড়িয়াছে। স্বাভাবিক গতির অপেক্ষা বহুগুণ বেগে পাখার চারি পাশে যন্ত্রচালিতবৎ ঘুরিয়া ঘুরিয়া তাহার সংজ্ঞালােপ পাইতেছে। রেল- গাড়ীর সঙ্গে গরুর গাড়ী জুড়িয়া দিলে কি অবস্থা হয় ? , এবার পাখা বন্ধ করতেই হইবে। উঠিয়া সুইচ ঘুরাইয়া দিলাম। পাখা বন্ধ হইল কিন্তু কুমুরে কোথায় ? উপরে ত উড়িতেছে না? নিচে মাটির পানে চাহিলাম। হায় হায়, সন্তান সমেত জননীর প্রাণহীন দেহ দ্বিখণ্ডিত হইযা ভূতলে পড়িয়া আছে। হাতে তুলিয়া লইলাম, কাটা অংশ দুটি পাশাপাশি রাখিলাম, কিন্তু সব শেষ হইয়া গিয়াছে। সদ্যজাত সন্তান সহ প্রসুতিকে মরিতে দেখিয়াছি, কিন্তু এই ক্ষুদ্র জননীর আকস্মিক অকালমৃত্যু আমাকে ততকাধিক বিচলিত করিয়া তুলিল। অশ্রু আর বাধা মানিল না। সন্ধ্যা উত্তীর্ণয়। আমি বিমনা হইয়া বসিয়া আছি। ঘরে আলাে নাই। হাসি তামাশায় মনের ভার লাঘব করিবার জঙ্ক স্বামী আসিয়া বলিলেন, “তাহলে, লাহাের থেকে কাঁদবার জন্য কতলােক আনতে পাঠাব?” কোন রকম আত্মসম্বরণ করিয়া আমি উত্তর দিলাম—“যত সব অলক্ষুণে কথা, আমার ভরা সংসারে ওসব অমঙ্গলের দরকার ?”

পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গল্প “তােমার সই কুমুরে বেচারী মারা গেল যে। তার পরলােকগত আত্মার শান্তি বিধানের কোন দরকার নেই বুঝি!” সকলে হাে হ করিয়া হাসিয়া উঠিলেন, আমার মুখেও ক্ষীণ হাসির আভাস দেখা দিয়া পরক্ষণে মিলাইয়া গেল। আমি ধরা গলায় বলিলাম- “আহা বেচারী কি পরিশ্রমে এক সংসার বসালে, কিন্তু ভােগ করবার আগেই চলে গেল। মরবার সময়ও হয়ত নিজের বাচ্চাদের কথাই ভেবেছে।” আমার চোখ ছল ছল করিতেছিল, অশ্রুবিকৃত কণ্ঠে তাহার আভাস পাইয়া তিনি পুনরায় পরিহাস তরল কণ্ঠে বলিলেন-“আমি বলি কি, সংবাদপত্রের প্রতিনিধিদের ডেকে এক সভা করা যাক। আর তুমি এই পরমশােকাবহ ঘটনা সম্বন্ধে এক বিবৃতি দাও।” পরদিন মধ্যাহ্ন-বিশ্রামের জন্য কামরায় গেলাম। ঘর খালি খালি মনে হইতে লাগিল। গুমােট সত্ত্বেও আজ আর পাখা চালাইলাম না। পাখার উপর মন বিরূপ হইয়া উঠিয়াছিল। পাখা হইতে চোখ কুমুরের বাসায় গিযা পৌছিল। ছয়টি ঘর তেমনি বন্ধ, সাত নম্বরের দরজা খােলা। যেন কোন ডাকাত পথিকের জিহবা কাটিয়া দিয়াছে, পথিক সাহায্যের জন্য চীৎকার করিতে চায়, মুখও খুলিয়াছে, কিন্তু বাণী নাই— মুক বেদনার তাহার মুখ মর্মান্তিক হইয়া উঠিয়াছে। গােল গুম্বুজের মত ক্ষুদ্র ঘর—অতি ক্ষুদ্র তাহার প্রবেশ পথ। দুই-ই শূন্য বিকল হৃদয়ে গৃহস্বামিনীর প্রতীক্ষা করিতেছে। এই প্রতীক্ষা অব্যক্ত ক্রন্দনের মত আমাকে এমন আকুল করিয়া তুলিল যে, মনে হইতে লাগিল পারিলে ক্ষুদ্র পতঙ্গ হইয়া এই ঘরে প্রবেশ করি। মনের অস্থিরতা হেতু একভাবে অনেকক্ষণ থাকা যাইতেছিল না। উঠিয়া আসিয়া কুমুরের ঘরের নিকটে দাড়াইলাম।

খােলা ঘর হইতে দৃষ্টি ক্রমে বন্ধ ঘরে গিয়া পড়িল। সবুজ নরম নরম ছয়টি গুটি ইহাদের মধ্যে রহিয়াছে। হঠাৎ মনে হইল—এই সব গুটি কখন পরিণত হইবে? ভাবিতেই শরীরে এক তড়িতপ্রবাহ খেলিযা গেল। এর এই বন্দিশালা হইতে বাহির হইবে কি করিয়া ? মা থাকিলে যথাকালে দরজা খুলিয়া দিত, কঁাধে পিঠে করিয়া উড়াইয়া লইয়া যাইত কিন্তু এখন ? রুদ্ধ দ্বার গৃহে এই সব পতঙ্গ-শাবক কি শ্বাসরুদ্ধ হইযা মৃত্যুর কোলে ঢলি পড়িবে? আমার নিজের জীবনের এক হৃদয়বিদারক ঘটনা স্মৃতিপথে উদিত হইল। কোয়েটায় যখন ভূমিকম্প হয়, আমি তখন সেখানে। নিজের ঘরে নিদ্রিত ছিলাম। পাশে বােনঝি রমা। অকস্মাৎ ধরণী টলি উঠিল, সমস্ত ঘর হুমড়ি খাইযা আমাদের উপর পড়িল। কতক্ষণ মুচ্ছিত অবস্থায় ছিলাম জানি না, জ্ঞান হইলে রমার ক্ষীণ আর্তস্বর শুনিতে পাইলাম। কি যে হইয়াছে, সহসা বুঝিতেই পারিলাম না। আন্দাজে এদিক ওদিক হাতড়াইয়া নিজের অবস্থা অল্পে অল্পে হৃদয়ঙ্গম হইল। মেঝের উপর দেয়ালের গা ঘেষি পাতা বিছানায় আমরা শুইয়াছিলাম। ছাদের এক কড়ি আড়াআড়িভাবে আমাদের উপরে আসিয়া পড়িয়াছে। রমা ফাপাইয়া ফোপাইয়া কাদিতেছিল। নিবিড় অন্ধকারে কিছু দেখিবার ত যাে ছিল না। আমি হাতড়াইয়া রমার পাশে পৌছিলাম ও তাহাকে বুকে তুলিয়া লইলাম। রমা জল চাহিল, কিন্তু কোথায় জল ? মৃত্যু হিংস্র পশুর মত করাল দংষ্ট্রা ব্যাদন করিয়া লােলুপ দৃষ্টিতে চাহিয়া আছে। উদ্ধারের কোন উপায় নাই। রমা “জল” “জল” করিতেছে, আমার নয়নে জলধারা বহিতেছে। ধীরে ধীরে বালিকার ক্ষীণক ক্ষীণতর হইয়া আসিল। ছটফট করিতে করিতে সে শেষে চিরদিনের মত নীরব হইয়া গেল। আমি প্রাণপণে চীৎকার করিয়া কোন সাড়া পাইলাম না।

পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গল্প
আমার আর সেই কারাগার ভেদ
ভেদ করিয়া বাহিরে পৌছিতে
পারিল না।
তৃতীয় দিনে লােজন আসিযা টানিযা হেঁচড়াইয়া অর্ধমৃত অবস্থায়
আমাকে সেই জীবন্ত সমাধি হইতে উদ্ধার করিল, কিন্তু খুকীর জীবনদীপ
ততক্ষণে অন্ধকাবে মিলাইয়া গিয়াছে। বাছা আমরা ঝরা ফুলের মত
মৃত্যুর তাপে একেবাবে ঝলসাইয়া গিয়াছিল।
রুদ্ধদ্বার ঘরগুলিব সামনে দাড়াইযা আমি আবার রমার মরণাহত
করুণ ক্রন্দন শুনিতে লাগিলাম, চোখের উপর তাহার বৃচ্যুত নিদাঘদগ্ধ
পুষ্পকোরকতুল্য মুখচ্ছবি ভাসিতে লাগিল। রােমে রােমে বিদ্যুৎ প্রবাহ
বহিতেছে। আমার রমার মত এই সব শিশুও কি শ্বাসরুদ্ধ হইযা মরিবে ?
এখন আমি কি করি? কিছু করিতে যেন পাগলের মত হইযা
উঠিযাছিলাম। তাড়াতাড়ি নরুণ লইয়া আসিলাম। ইচ্ছা ছিল
সাবধানে দরজার পর্দা কাটিয়া টচ ফেলিয়া ভিতরের অবস্থা দেখিব।
তাহারই উদ্যোগ করিতেছি, ঝি আসিয়া উপস্থিত হইল।
“কি কচ্ছে বৌ-দিদি ?”
“হীরা, এই সব ঘরে কুমুরের গুটি বন্ধ হয়ে আছে। ওদের মা মরে
গিয়েছে। মুখ খুলে আমি ওদের বেরুবার পথ করে দিই?”
“ওমন কাজ করাে না বৌদি। গুটি কখন পাকবে, তাকি তুমি
জান? কাচা অবস্থায় গাযে হাওযা লেগেছে কি মরেছে।”
তাই ত! আমি নরুণ রাখিয়া দিলাম।
গুটি পাকিবার সময় কি করিযা জানিব ? আমাদের বাগানের
মালিকে ডাকিয়া জিজ্ঞাসা করিলাম। সেও কিছু বলিতে পারিল না।
ড্রাইভার পাঠাইয়া এক ডিমওয়ালাকে আনাইলাম। অনেকক্ষণ ত সে
আমার কথাই বুঝিতে পারিল না। বহুক্ষণ ভাবিয়া চিন্তিয়া গলদঘর্ম

হইযা শেষ কালে এই মুল্যবান উপদেশ দিল-“মরে ত মরবে, আপনি
এত মাথা ঘামাচ্ছেন কেন বউরাণী ?”
জীবনে যে স্বয়ং হাজার হাজার ডিমের প্রাতােশ করিয়াছে,
তাহাকে আমার ব্যাকুলতা বুঝাই কি করিযা ?
“মালি, চাব পাঁচটি কুমুবে ধব আন। সাবধানে ধরবি, যেন পাখা
থেতলে না যায়। বকশিস পাবি।” জানি না ও কি কবি তিনটি
কুমুবে ধৰিা আনিল। আমি কামরাব সব ঝবােকা বন্ধ করি
আলো আলিযা উহাদেব ছডিবা • দিলাম। দুরুদুরু বুকে উহাদের
গতিবিধি লক্ষ্য কবিতে লাগিলাম। আগ্রহে, উত্তেজনায় আমার দম
আটকাইযা আসিতেছিল, মূৰ্তিব মত স্থিবভাবে এক জায়গায় দাড়াইযা
আছি। কতবাব যে তাহাবা ঘবেব মধ্যে চব কাটিল, তাহার
লেখাজোখা নাই, কিন্তু মাটিব বাসাগুলি যেন তাহাদের নজবেই
পড়িল না।
কোন রকমে তাহাব। প্রাণ লইযা পলাইতে ব্যস্ত।
কি কবি। এদের আমার অধীবতা বুঝাই। সেই যুগ ছিল ভাল
যখন পশুপক্ষী মানুষের ভাষা বুঝিত। এক পলকের জন্য কি সেই
হবাণাে যুগ ফিবিযা পাই না যাহাতে আমার অন্তর্বেদনা ইহাদের গােচর
কবিতে পাবি? মালিকে আবাব ডাকিলাম। সে একটি কুমুরে ধরিয়া
বন্ধ ঘবেব সাবিব উপব বসাইযা দিল, কিন্তু বৃথা। এ যেন বিদ্রোহীকে
রাজক্ত করিবার প্রয়াস। নিবাশ হইযা ঝবােক খুলি দিাম।
তাহাবা পলাইযা বঁচিল ।
এখন কি কবি।
পবদিন মালিকে আবাব ডাকিযা পাঠাইলাম। এই রকম ঘর কি
বাগানে আর কোথাও তাহাব নজবে পড়িছে ? তৃতীয় দিনে মালি
আমাকে এমনই আটখানি কুমুবের বাসার সন্ধান দিল। আমি স্বয়ং
{

পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গল্প গিয়া দেখিয়া আসিলাম। মালিকে বলিলাম, মা কখন আসে, কি করে, লক্ষ্য করিয়া যেন আমায সংবাদ দেয়। আমার রকমসকম দেখিয়া তাহার বােধহয় ধারণা জন্মিয়াছিল যে, আমার মাথা খারাপ হইয়া গিয়াছে; কিন্তু মুখ ফুটিয়া কিছু বলিবার সাহস ছিল না। আমার কথামত রােজ ঘরগুলি দেখিয়া আসিত। তিনদিন পরে আসিয়া জানাইল, “কোন ঘরেই ত কুমুরে আসতে দেখি নে বৌরাণী।” —“তুমি দেখতে থাক। একদিন না একদিন এই সব গুটির ত বাচ্চা হয়ে বেরুবার সময় আসবেই ? তখন নিশ্চয়ই ওদের মা আসবেই ? তখন নিশ্চয়ই ওদের মা আসবে।” কিন্তু ঝির কথায় আমার চমক ভাজিল—“সব ঘর ত একসঙ্গে তৈরী হয় নি যে সব বাচ্চা একসঙ্গে বেরুবে ? বাগানের বাসায় গুটি পাকতে পাকতে হয়ত এখানকার বাসায় সবগুটি দম আটকে মারা যাবে।” তবে উপায় ? কে বলিবে ঘরগুলির মধ্যে গুটি পরিণত হইতেছে অথবা এতদিনে মরিয়া গিয়াছে। বিংশ শতাব্দীর মনুষ্যের বিজয়পতাকা জলে স্থলে আকাশে উড়িতেছে, কিন্তু সামান্য সামান্য বিষয়ে সে কত অসহায়। পুথিপত্রে এই বিষয়ে হয়ত কিছু মিলিতে পারি। যেই ভাবা সেই কাজ। তৎক্ষণাৎ বড় বড় পুস্তক-প্রকাশকদের তালিকা আনাইয়া দেখিতে বসিযা গেলাম। প্রাণীতত্ত্ব সম্বন্ধে দশবারখানা বইয়ের সন্ধান পাওয়া গেল। সবগুলি ভি-পীতে পাঠাইবার অর্ডার দিয়াছিলাম। স্বামী বলিতেছেন, কিছু মিলিবে না। না হক পরিশ্রম করিয়া মরিতেছি। কিন্তু কিছু না করিয়া যে আমার সােয়ান্তি নাই। কখন কখন স্বামী বিরক্ত হইয়া উঠেন, “দিন রাত এ কি পাগলামাে।” আমার মন যে কি

করিতেছে তাহা আমিই জানি। আমি যে আর কিছু ভাবিতেই পারিতেছি
। চোখের সামনে রমার মরণ বিকৃত মুথ সিতেছে। বই আসিতে
ক’দিন লাগিবে জানি না। ততদিনে কি হইবে? গুটিগুলি বাড়িতেছে
অথবা মরিয়া গিয়াছে ?

গায়ের জয় হজরত মুহম্মদের দৈবাদেশ প্রাপ্তির অল্পদিন পরের কথা। দু'চারজন নিকট আত্মীয় ও প্রতিবেশী ছাড়া এখনও বড় একটা কেহ নবধর্মে আস্থা স্থাপন কবে নাই। এমন কি তাঁহার কন্যা জামাতাও না। তবে জয়নাবের মন ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হইতেছে। বিবাহ, আগেই হইয়া গিয়াছিল। মাঝে মাঝে যখনই পিতৃগৃহে আসিতেন, পিতার মুখে ভগবৎ প্রসঙ্গ শুনিতে পাইতেন। বিদ্যদ্দীপ্ত মুখমণ্ডল, প্রত্যক্ষদর্শনপ্রসূত আন্ত- রিকতায় ভরা বাণী ;—এ যেন নূতন মানুষ, নুতন এক জ্যোতিরুদ্ভাসিত াতের বার্তা বহিয়া আনিতেছে ; অমৃতনিষেকে পুলকস্পন্দনে প্রাণমন শিহরিয়া উঠিতেছে। ভাবের ঘােরে আত্মবিস্মৃত জনাব নিজের অজ্ঞাত সারেই নুতন পথে পা বাড়াইলেন। কিন্তু ধর্মপথে স্বামীর ভালবাসাই প্রবল বাধা। আবুল আস সাদাসিধা সুস্থ সবল সংসারী মানুষ। পৃথিবীতে স্ত্রী ছাড়া অন্য কোন নেশাই নাই। ঘরে স্ত্রী, বাহিরে কলচালানী কারবার—এই তার জগৎ। নেশায় ও পেশায় মিলিয়া তাহার জীবনটা এমনই ভরাট করিয়া তুলিয়াছিল যে পরলােকের ভাবনা মাথা গলাইবার মত এতটুকু ফাক বা ফুরসৎ পাইত না। সরলবিশ্বাসী, পরিশ্রমী, এক কথার মানুষ আবুল আস-ব্যবসায়ী মহলে সততার সুনামে তাহার জুড়ি নাই। কিন্তু স্ত্রীর প্রতি তাহার অনুরাগ সততার খ্যাতিকেও হার মানাইত। জয়নাব উভয়সঙ্কটে পড়িলেন। নবধর্ম তাহার প্রাণমন অধিকার করিয়াছে, এ অপূর্ব দিব্যানুভূতি সমগ্ৰ চেতনাকে আবিষ্ট করিয়া প্রবল শক্তিতে আকর্ষণ করিতেছে কিন্তু স্বামী ত ধর্মের কোন ধার ধারেন না। স্বর্গ ও সংসারের • রে দ্বন্দ্বে স্বামী-প্রেমমুগ্ধা নারী কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইয়া পড়িলেন। দ্বিধাসংশয়ে ঝঞ্চাক্ষুব্ধ তরণীর ন্যায় আন্দোলিত হইয়া জনাবের দিনরাত্রি যেন কন্টক শনে কাটিতে লাগিল। পতিব সংসারে সকলেই মূর্তিপূজক। মুহম্মদমণ্ডলীকে সমগ্র সমাজ বিষম বিদ্বেষেব চক্ষে দেখে। অঙ্কুবেই ইহাদিগকে উৎখাত করিতে হইবে। এমন অবস্থায় জনাব নিজের মত পবিবর্তনের কথা কাহাকেও জানাইতে সাহস করেন না। কোনদিন যাব নিকট কিছু লুকাইতে হয নাই, আজ জীবনে প্রথমবার তাহার নিকট হইতেই ভাবগােপন করিবার প্রযােজন হইল। পবমত-সহিষ্ণুতা সংসারে চিবকালই বিরল। তখনকার দিনে ত মৌখিক উদাৰতাও ছিল না। সর্ববিধ মতভেদের একমাত্র সমাধান শাণিত তববারী। কথায় কথায় রক্তে নদী বহিত ; গােটা এক একটা পরিবা নিঃশেষে ধবণী পৃষ্ঠ হইতে মুছিয়া যাইত। যে মরুচারী ক্ষাত্রবীৰ্য্য ধর্মমন্ত্রে সংযত সঙ্ঘবদ্ধ হইযা পরবর্তীকালে দূৰ্ব্বাব সাগবােৰ্ম্মিব মত দিগদিগন্ত প্লাবিত কবিযাছিল, তাহা তখন আত্মহননে ব্যাপৃত। না ছিল ধর্মের একতা, না ছিল বাষ্ট্রনৈতিক সংহতি। হত্যার পরিবর্তে হত্যা, অপমানের পরিবর্তে হত্যা, ধনেব ক্ষতিপূরণে হত্যা—মানবরক্তেই সৰ্ব্ব-গ্লানি মুছিতে হইবে। শােণিত- পিপাসু সমাজ, কথায় কথায় আসিব ঝঞ্চন বাজি উঠে। এই অবস্থায় জানাব যদি প্রকাশ্যে পিতৃধর্মে দীক্ষা গ্রহণ করেন, তবে শক্তিশালী আবুল আস গােষ্ঠীর সঙ্গে বিশ্বাসিমণ্ডলীর শােণিত-পঙ্কিল সংঘর্ষ অনিবাৰ্য। কিন্তু বাহিরের এই অবশ্যম্ভাবী ঝটিকা জষনাবেব অন্তদ্বন্দের ক্ষীণ প্রতিধ্বনি মাত্র। কিছুকাল নিদারুণ মানসিক যন্ত্রণা ভােগ করিযা জনাব কর্তব্য স্থির করিলেন। ধৰ্ম্মানুরাগ বিরলবস্তু। লক্ষের মধ্যে একজনের হব কিমা সন্দেহ। কিন্তু তাহার শক্তি এমন যে একের অনুরাগ লক্ষের উদাসীনতার পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গল্প তুল্যমূল্য হইয়া দাঁড়ায়। সুপ্ত ধর্মপ্রীতি যখন জাগে, তখন বহুদিনের ক্ষতি একদিন পােষাইয়া লয়। জয়নাব পিতার নিকট দীক্ষিত হইবার স্থির সঙ্কল্প লইয়া উপস্থিত হইলেন। দুপুরের চোখ-ঝলসানাে রােদ। এমনই তার তেজ যে চাহিলে। চোখ জ্বালা করিয়া আসে। হজরত মুহম্মদ চিন্তাসমুদ্রে ডুবিয়া আছেন। চারিদিকে নিরাশার অন্ধকার। খুদেজাও মাথা নােয়াইযা একমনে বুঝিবা দুরদৃষ্টের কথাই ভাবিতেছিলেন। মন ভার গ্রস্ত কিন্তু বসিয়া থাকিলে ত চলে না। উঠিযা গিয়া এক ছেড়া জামা লইযা আসিলেন ও তাহাতে তালি লাগাইতে আরম্ভ করিলেন। ধনসম্পত্তি যা কিছু ছিল, প্রায় সমস্তই আহুতি হইয়া গিয়াছে। শত্রুদের অত্যাচার দিন দিন বাড়ি চলিয়াছে। বিশ্ববাসিগণের দুর্দশার নিত্য নুতন কাহিনী সাহসীকেও অবসাদগ্রস্ত করিয়া তােলে। স্বয়ং হজরতের পক্ষও ঘর হইতে বাহিরে আসা প্রায় অসম্ভব হইয়া দাড়াইতেছে। লােক ‘মুসলিম’দিগের ঘর জালাইতেছে, মারপিট করিতেছে, সম্পত্তি লুটিয়া লইতেছে। বিপত্তিব ভারে তরণী টলমল কিন্তু হজরতের বিশ্বাস অটুট। যিনি পথ দেখাইয়াছেন, তিনিই কাণ্ডারী হইবেন—এই আশ্বাস অবলম্বন করিয়া, অনুগামীদিগকে অভয়বাণী শােনাইয়া, ধ্যান ধারণা প্রার্থনায় তিনি দিন কাটাইতেছেন। কিন্তু সময় সময় প্রবর্তকদের হৃদয়েও সংশয়ের ছায়া পড়ে। খুদেজা নতমুখে সেলাই করিতেছিলেন। হজরত বলিলেন, “এখানে আমাদের আর থাকতে দেবে না। নিজের জন্য সব সইতে পারি, কিন্তু বন্ধুদের দুর্গতি আর চোখে দেখা যায় না।” খুজো জবাব দিলেন, “কিন্তু আমরা চলে গেলে এদের যে আর কোন আশ্রয় থাকবে না।” হজরত আমি ত একেলা যেতে চাইছি না। এখানে সব ছড়িয়ে ৬১ আছে। একজনের ওপর আক্রমণ হলে, অন্যেরা খবরও পায় না। এমন যদি ব্যবস্থা হয়, যে সব একসঙ্গে একজায়গায় এক পরিবারের মত থাকে, তবে সেই দিকেই সুবিধে। সেই কথাই ভাবছিলাম, ক’দিন থেকে। এমন সময় জয়নাব আসিতেছেন দেখা গেল। সঙ্গে কেহ ছিল না। এমন তন্ময়ভাবে দ্রুত পদচারণ করিতেছিলেন যে, দেখিলেই মনে হয়, যেন কোথাও হইতে পলাইয়া আসিতেছেন। খুদেজা উঠিয়া তাহাকে আদর করিয়া পাশে বসাইলেন। প্রশ্ন করিলেন—“এমন উতলা কেন মা? সব ভাল ?” জয়নাব নিজের অন্তদ্বন্দ্বের কথা শােনাইলেন। বলিতে বলিতে চক্ষু অশ্রুসজল হইয়া উঠিল। চোখ মুছিয়া স্থির হইয়া শেষকালে দীক্ষিত হইবার বাসনা জ্ঞাপন করিলেন। হজরতের চক্ষুও অক্ষশূন্য ছিল না। তিনি উত্তর দিলেন, “আমার কাছে এর চেয়ে আনন্দের কথা কি হতে পারে, মা ? কিন্তু তােমার যে বড় কষ্ট হবে।” জয়নাব দৃঢ়চিত্তে বলিলেন—“আমি সব কিছু সইতে প্রস্তুত হয়েই এসেছি। সংসারের মুখ চেয়ে ধৰ্ম্মের আহ্বান অবহেলা করতে আর পারিনে।” হজরত-জয়নাব, ধর্মপথে পদে পদে কাটা বি ধবে। জয়নাব--কাটার পথই আমি বেছে নিলাম, বাবা। হজরত—ভাল করে ভেবে দেখ ; শ্বশুর বাড়ীর সঙ্গে তােমার সম্পর্ক ভেঙ্গে যাবে । জয়নাব—তার বদলে সকল আত্মীয় হতে যিনি পরমাত্মীয়, তার সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় হবে? হজরত-কিন্তু আবুল আস ?

বীরশ্রেষ্ঠ গল্প জয়নাবে চক্ষে এবার প্রাবণের ধাবা বহিতে লাগিল। মনে মনে সহস্রবার যাহা তােলাপাড়া কবিছেন, পিতার প্রশ্নে তাহাই যেন নূতন হইযা দেখা দিল। সামলাইষা লইযা কিছুক্ষণ পরে ক্ষীণ কম্পিত ঋবে বলিলেন-“বাবা, ওঁর জন্যেই আমি মন স্থিব কবতে পাবছিলাম না। এতদিন দোটানায় কেটে গিযেছে। নইলে কবে চলে আসতুম। যিনি আমাকে এই নুতন পথে চলবাব ইঙ্গিত দিচ্ছেন, তিনিই আমাকে বিচ্ছেদ ব্যথা সইবার শক্তি দেবেন। হযত একদিন ঔব মতি ফিবে। নবধম্মেব শরণ নেবেন।” হজরত বলিলেন-“আবুল আস সবল, সচ্চবিত্র, সৎস্বভাব কিন্তু ঈশ্বব- বিমুখ। কোন বকম অতীন্দ্ৰিয ব্যাপাবে মন দিতে চায় না। থামেখা ঈশ্বব ঈশ্বব করায় লাভ কি? এমনিতেই বেশ আছি। বিবেক আর বুদ্ধি এই দুটিই জীবনে পথ দেখানাের পক্ষে যথেষ্ট। —পাষণ্ডের পক্ষে ধার্মিক হওযা তেমন কঠিন নয়, কিন্তু মুক্তবুদ্ধি ধীবস্থিব নীতিপরায়ণ ব্যক্তি সহজে ধর্মের উন্মাদনা অনুভব কবে না। জনাব কম্পিত হৃদযকে দৃঢ় কবি বলিলেন-“আমি সব জেনে শুনে, সব আশা ছেড়ে পরমেশ্ববের শবণ নিলাম বাবা , সংসারের কোন প্রলােভন আমার ধর্মপথে বাধা না হােক, এই আশীর্বাদ করুন। হজবত পরিপূর্ণ হৃদযে কন্যাকে আশীর্বাদ কবিলেন--“জগদীশ্বৰ তােমার মঙ্গল করুন মা। খুদা হাফিজ।” পরদিন যথাৰীতি মসজিদে জনাব কলমা পড়িযা দীক্ষা গ্রহণ করিলেন।

কুরেশীগণ আগে হইতেই জ্বলিয়া ছিল। এখন যেন অগ্নিতে ঘৃতাহুতি
পড়িল। ইসলামের সাহস যে বাড়িয়া যাইতেছে ! এতদিন চুণগাপুটি
শিকার করিয়া এবার রুইকাতলা গাঁথিবার মতলব দেখিতেছি। যদি
এমন অবস্থা কিছুকাল চলে তবে কাহারও মঙ্গল নাই। সাজ সাজ রব
পড়িয়া গেল। কর্তব্য নির্ণয়ের জন্য আবুল আসের গৃহে এক মজলিস বসিল।
ইসলাম-বিরােধীদের মধ্যে প্রধান আবুসিফিয়ান আবুল আসকে
বলিলেন—“তুমি স্ত্রীকে তালাক দাও।”
আবুল আস গর্জিয়া উঠিয়া কহিলেন, “কখনও না—
তবে কি তুমি মুসলমান হতে চাও?
নিশ্চয়ই না।
-তাহলে তােমার স্ত্রীর সঙ্গে তােমার কোন সম্পর্ক রাখা চলবে না।
ওকে তার বাপের বাড়ী থাকতে হবে।
—এ কি সম্ভব নয় যে আমার স্ত্রী আমার কাছে থেকে নিজের ইচ্ছা-
মত ধর্মাচরণ করে?
নিশ্চয়ই না।
-আমার স্বজাতির কাছ থেকে এতটুকু সুবিচার, সহানুভূতি আমি
আশা করতে পারিনে ?
নিশ্চয়ই না।
-তাহলে আপনারা আমাকে একঘরে করতে পারেন। আপনার
যা ইচ্ছা শান্তি আমায় দিন কিন্তু আমি জয়নাবকে ছেড়ে থাকতে পারব
না। তাছাড়া কারাে ধৰ্ম্ম-স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা আমি অনুচিত মনে
==
করি।
-তুমি কি পাগল হয়ে গেলে আবুল আস ? আমাদের গােষ্ঠতে
কি তােমার জন্য মেয়ে আর পাওয়া যাবে না?

পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গল্প
-জয়নাবের মত কেউ নেই।
—তােমাকে আমরা এমন মেয়ে এনে দিতে পারি যে সৌন্দর্য্যে
অপ্সরী।
--আমি সৌন্দর্য্যের উপাসক নই।
এমন মেয়ে দিতে পারি যে সকল কাজে নিপুণ, শিক্ষাদীক্ষা
শীলসহবতে অতুলনীয়।
আমি কোন গুণের উপাসক নই। আমি চাই শুধু ভালবাসা।
যা পেয়েছিলাম তার তুলনা নেই। দুনিয়ায় জয়নাবের স্থান দিতে পারে
এমন কাউকে দেখিনে!
—ভারী ত প্রেম! তাহলে কি তােমায় ছেড়ে চলে যেত?
-সাবধানে কথা বল আবুসিফিয়ান। আমি চাইনে ও আমার
ভালবাসার জন্য ধর্ম ত্যাগ করে।
—মােট কথা তুমি সমাজকে পদাঘাত করে সমাজের বুকে বাস
করবে। তােমাকে আমরা সাবধান করে দিচ্ছি। এই অনাচারের
ফল পেতে দেরী হবে না।
আবুসিফিয়ান ও তার দলের লােকেরা আবুল আসকে যথারীতি
শাসাইয়া বিদায় লইলে পর আবুল আস কিছুক্ষণ চুপচাপ বসিয়া থাকিয়া
গৃহ হইতে নিক্রান্ত হইলেন। সন্ধ্যার অন্ধকার ঘনাইতেছিল। আবুল
আস যখন শ্বশুরালয়ে উপনীত হইলেন, তখন হজরত শিষ্যদের সঙ্গে
মগরিবের নমাজ পড়িতেছিলেন। আবুল আস তাহাকে অভিবাদন
করিয়া একপাশে অপেক্ষা করিতে লাগিলেন। প্রার্থনারত বিশ্বাসিগণ
একসঙ্গে উঠিতেছেন, বসিতেছেন, নতজানু হইতেছেন—দেখিতে দেখিতে
আবুল আসের মনে ভাবান্তর হইতে লাগিল। মহাপুরুষের উপস্থিতি
প্রার্থনাকক্ষে যে আধ্যাত্মিকতার তড়িৎপ্রবাহ সঞ্চার করিতেছিল, তাহারু

তর-ধৰ্ম্মী কূল নেব হৃদয়েও,পৌছি। তিনি নিজের অজ্ঞাত
সারে মণ্ডলীর সঙ্গে উঠিতে বসিতে নত হইতে লাগিলেন। ক্ষণকালের
জন্য আত্মবিস্কুত আল আস অতীন্দ্রিযভাবুপ্রবাহে ভাসিযা চলিলেন।
প্রার্থনা অন্তে আবুল আস যেন স্বপন হইতে জাগবিত হইলেন
নিজেকে সামলাইয়া লইয়া ইজতের নিকট গিযা পুনরায় অভিবাদন
কবিলেন। বলিলেন, “আমি জয়নাবকে নিতে এসেছি।”
হজরত বিস্মিত হইযা কহিলেন-“তুমি কি শােননি যে জবাব ইসলাম
গ্রহণ করেছেন?”
- আজ্ঞে , জানি।
-এও নিশ্চয়ই জান, ইসলামে বিধর্মীর সঙ্গে এভাবে বাস নিষিদ্ধ?
-এব অর্থ কি এই যে জনাব আমাকে তালাক দিয়েছেন ?
—তাই যদি হয় ?
--আমার কিছু বলবার নেই । জয়নাবের কল্যাণ হােক, ধু
ও সুৰুে-উপৰু বিশ্বাস করে তার দিন, আনন্দে কাটুক। আমি
চিবদিনের জন্য বিদায় নেবার আগে তার সঙ্গে একটা বার, দেখা ক্লৱে
যেতে চাই। আর একটা কথা, আপনাদের এই আচরণের ফলে
কুবেশগােষ্ট যদি বিব হল প্রবৃত্ত হয়, আমায় তখন দোষ দেবেন না।
—আবুল আস, আমি এখন বিবাদে জড়াতে চাইনে।
“তাহলে জয়নাবকে আমাব সঙ্গে পাঠিয়ে দিতে আজ্ঞা দিন। তাকে
ঘরে নিয়ে গেলে, স্বজনদেব ক্রোধ আমারই উপব পড়বে, আপনি
বিপন্মুক্ত থাকলে।
তুমি তােমার আত্মীযের চাপে জয়নায়কে ধর্ম ত্যাগে
করবে না ।
” —আমি কার ধর্ম-স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ ক্ষয় অধর্ম মনে কtি

भूपिवीन Cई गन
-তুমি কি বলতে চাও জয়নাবকে তালাক দিতে তােমায় কেউ বাধ্য
করাতে পারবে না ?
-জয়নাবকে ত্যাগ করার আগে আমি নিজের প্রাণকে ত্যাগ
হজরত আবুল আসের দৃঢ়তায আনন্দিত হইলেন। পতিপত্নীর
সাক্ষাৎ হইল। আবুল আস জিজ্ঞাসা করিলেন,—“জনাব তােমায
আমি ঘরে ফিরিযে নিতে এসেছি। ধর্ম পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তােমার
মনােভাব ত বদলে যায় নি?”
অমুখী জয়নাব জবাব দিলেন,—“ধৰ্ম্ম বার বার মিলে, হৃদয় শুধু
একবার। যেখানেই থাকি আমি তােমারই। তােমার ঘরে আমি
এসে থাকলে লােকে তােমার উপর অত্যাচার করবে না ত ?
আবুল আস-“সমাজ যদি আমাদের মিলনেব অন্তরায় হয়, আমি
সমাজ ত্যাগ করব। দুনিয়ায় থাকবার জায়গার অভাব কি। তুমি ত
আন, আমি ধৰ্ম্ম ব্যাপারে স্বাধীনতার পক্ষপাতী। আমি কখনও তােমার
পথে বাধা দেব না।”
জয়নাব আবুল আসের সঙ্গে চলিলেন। বিদাযকালে খুদেজা তাঁহাকে
পুরাতন কালের নষ্টাবশেষ এক মুক্তাহার উপহার দিলেন।
ইসলামের উপর বিধৰ্মীদের অত্যাচার ক্রমে ভযঙ্কর হইযা উঠিল।
কুরেশীগণ এতদিন অবহেলা ভরে তুচ্ছতাচ্ছিল্যই করিতেছিল; এখন
রীতিমত যন্ত্রণা দিতে আরম্ভ করিল। মুসলমানদিগকে সমূলে বিনাশ
করিবার জন্য তাহারা এখন সৈন্যদল গঠনে ব্যাপৃত। হজরত মুহম্মদ

শেষকালে স্থির করিলেন, মক্কা ত্যাগই শ্রেয়। শিষ্য ও অনুচরবৃন্দকে লইয়া সঘবদ্ধভাবে একত্র জীবন যাপন না করিলে ইতঃস্তত বিক্ষিপ্ত অবস্থায় এক এক করিয়া সমগ্ৰমণ্ডলী ধ্বংস হইবে। অনেক ভাবিয়া চিন্তিয়া মদীনায় যাওয়াই স্থির হইল। আবাল্যের বাসভূমি ত্যাগ করিয়া সকলে মদীনায় উপস্থিত হইলেন। এদিকে কুরেশীরাও চুপচাপ বসিয়া নাই। মক্কা হইতে ইহারা চলিয়া গিয়াছেন বটে, কিন্তু মদিনাওত আরব দেশেরই মধ্যে। যুদ্ধের যে আয়ােজন বহুদিন হইতে চলিতেছিল, তাহা পূর্ণোদ্যমে চলিতে লাগিল। একদিন আবুল আস আসিয়া বলিলেন,- “জয়নাব, আমাদের দলপতিরা ইসলামের বিরুদ্ধে জিহাদ (ধর্মযুদ্ধ ) ঘােষণ করেছেন। মুসলমানগণের দিন দিন শক্তি সাহস; বাড়ছে। এখনই প্রতিকার না করলে শেষকালে সামলানাে যাবে না।” জয়নাব বলিলেন, “ওরা ত কেউ এখানে নেই। লড়বে কাদের সঙ্গে ?” মক্কায় নেই বটে, কিন্তু মদীনাও ত আমাদেরই দেশে। আমাকে বড়াইয়ে যেতে হবে জয়নাব। -আমিও সঙ্গে যাব। -তুমি সঙ্গে যাবে ! কি করবে ওখানে গিয়ে ? -আমি আহত মুসলমানদের শুধা করব। বেশ, চলল। ভীষণ যুদ্ধ হইল। ভাই ভায়ের সঙ্গে, পিতা পুত্রের সঙ্গে যুদ্ধ করিল। রক্তবন্ধন হইতে ধৰ্ম্মবন্ধন দৃঢ়—ইহাই প্রমাণ করিতে প্রাণপণ করিয়াছে। শৌর্যবীর্য্যের অভাব কোনপক্ষেই ছিল না। কিন্তু মুসলমানদের মধ্যে ছিল ঈশ্বরের উপর অটল বিশ্বাস। জিহাদে মৃত্যু হইলে পরলােকে সগতি হইবে, জিতিলে মুসলমানদের রাজ্য স্থাপিত হইবে। এই উভয় #tষ্ঠ গল্প আখাস তাহাদিগের দেহে যেন শতগুণ বল বৃদ্ধি করিল। বিধর্মীদের এই ধর্মোন্মাদনা ছিল না-নূতনের বিরুদ্ধে আক্রোশ ছাড়া আর কোন প্রেরণা ছিল না। কয়েকদিন ভীষণ যুদ্ধ হইবার পর কুরেশীগণ হারিয়া গেল। অঙ্গ কয়েকজনের সঙ্গে আবুল আসও বন্দী হইলেন। জয়নাব স্বামীর বন্দিদশার কথা শুনিতে পাইবামাত্র, মাতার নিকট হইতে যে বহুমূল্য হার পাইয়াছিলেন, তাহাই মুক্তিপণরূপে পাঠাইয়া দিলেন। বন্দীগণকে একে একে হজরতের সম্মুখে উপস্থিত করা হইতেছিল। যাহাদের জন্য মুক্তিমূল্য আসিয়াছিল, তাহাদের মুক্তি দেওযা হইল। জামাতা আবুল আস বন্দী অবস্থায় হজরতের সম্মুখে নীত হইলে হজরত বলিলেন,-“দেখলে আবুল আস, খােদ ধার্মিকের সহায়। আমরা ঈশ্বরের অনুগ্রহে বিজয়ী হয়েছি।” আবুল আস নির্ভিক কণ্ঠে জবাব দিলেন-“যুদ্ধে জয়পরাজয় শৌর্যবীর্যের উপর নির্ভর করে। মুসলমানগণ শক্তি সাহসের জন্যই জয়ী হইয়াছেন। হানাহানি মারামারির মধ্যে ঈশ্বরকে টানিয়া আনিবার কোন কারণ দেখি না।” বিজিত শত্রুর তেজ সহ করিবার মত উদারতা সকলের থাকে না। মহম্মদ-শিষ্য একজন বলিলেন,-“ধর্মের তর্ক তােমার সঙ্গে না হয় নাই করা গেল আবুল আস। কাজের কথা হােক। তােমার মুক্তিপণ কোথায় ? হজরত জবাব দিলেন—“আবুল আসের মুক্তির জঙ্ক এই হার এসেছে, বলিয়া মুক্তাহার সামনে রাখিলেন। আবুবকর বলিলেন, “আবুল আসের বরে এর চেয়ে দামী জিনিষ আছে। আমরা এই হার যথেষ্ট মনে করি না।” -কি সে বস্তু?

জয়নাব সেই গঙ্গ, যার মূল্য এই রকম লক্ষ মুক্তাহারের চেয়ে বেশী। -তাহলে তােমাদের মতলব এই যে আমার মুক্তির মূল্য জয়নাব ? হা তাই। —এর চেয়ে আমার মৃত্যুই বাঞ্ছনীয়। —আমরা রসুলের জামাতার প্রাণনাশ করতে পারি না। হয তুমি আমাদের সঙ্গে থাকবে, নষ জয়নাব। আমরা আতিথ্যের কোন ত্রুটি রাখব । নিজের জামাতা সম্বন্ধে কোন কিছু বলা শশাভা পায় না বলিয়া হজরত নিলিপ্তের মত সব শুনিতেছিলেন। আবুল আসের সম্মুখে কঠিন সমস্যা উপস্থিত হইল। শত্রুদের আতিথ্যে দারুণ অপমান ; আবার জয়নাবের বিচ্ছেদে প্রাণান্তকর বেদনা। কিন্তু বীরধৰ্মীর অভিমানই জয়ী হইল। প্রেমকে আত্মগৌরবের বেদীমুল বলি দিতে প্রস্তুত হইয়া আবুল আস বলিলেন—“তােমাদের সিদ্ধান্ত আমি মানিয়া লইলাম। জনাব তােমাদের সঙ্গেই থাকিবেন।” রসুল-দুহিতার যেমন আদর সম্মান হওয়া উচিত, তার চেয়ে জয়নাব বেশী পাইতেছিলেন। কিন্তু জীবন যেন শূ। তিন যুগের সমান তিন বৎসর গেল; আর যেন দিন কাটে না। এদিকে আকুল আষে আত্মীয়গণ হাকে পুনরায় বিবাহের জন্য পীড়াপীড়ি করিতে লাগিলেন। কিন্তু বু আল কাহারও কথায় কান দেন না। খ, তরাং বাহিরে কাজে ডুবিয়া গেলেন। ব্যবসায়ই একমাত্র ধ্যানজ্ঞান হইয়া উঠল। উপার্জন কে এনের লােতে করিতেন, অহা নহে। কোন একটা উন্মাদনায় পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গল্প দিনরাত কাটিয়া যায় ইহাই চান। নিবাশা ও দুশ্চিন্তার মধ্যে কাটি যায। বিরহ ব্যথা শান্ত করিবার উপায কর্মোম্মাদের মদিরা। আবুল আস কৰ্ম্ম-কোলাহলে জনাবকে বিস্তৃত হইবার চেষ্টা করিতেছেন। একবার মক্কা হইতে মাল লইযা ইরাক যাইতেছিলেন। অনেক সওদাগর একত্র হইযা মরুপথে বাণিজ্যযাত্ৰা করিয়াছেন। পথে দস্যু ভয ছিল। সুযােগ সুবিধামত মুসলমানগণ বিধর্মীদের ও বিধৰ্মীগণ মুসলমান- ফের জিসিষপত্র লুঠিযা লইত। কয়েকবার উপর্যুপরি ক্ষতিগ্রস্ত হই মুসলমানগণ বিশেষ আযােজন করিল এবং আবুল আসের দলের মালপত্র লুঠিযা, হতবশেষ বণিকদিগকে বন্দী করিযা হজরত সকাশে উপস্থিত কগিল। ইজরত করুণ দৃষ্টি মেলিযা আবুল আসের দিকে চাহিলেন। অনুচরগণ জিজ্ঞাসা করিলেন—“আবুল আস সম্বন্ধে আপনার কি আদেশ? হজরত বলিলেন-“আমার জামাতা সম্বন্ধে বিচারের ভার আমি নিতে পারিনে। হয়ত পক্ষপাতের সম্ভাবনা আছে। তােমরা যা ভাল মনে কর, কর। আমাকে জিজ্ঞাসা করাে না।” বলিয়াই তিনি ভিতরে চলিযা গেলেন। জনাৰ কঁদিতে দিতে পায়ে পড়িয়া বলিলেন-“কতলােককে আপনি মুক্ত করে দিয়েছেন। আবুল আসই কি শুধু আপনার দয়া থেকে বঞ্চিত হবে ? কন্যার অশ্রু মুছাইয়া মেহকরুণকণ্ঠে হজরত বলিলেন—“ন্যায়ের আসনে বসে অবিচার করতে পারিনে মা। ন্যায় অন্ধ। নিয়ম আমিই করেছি, কিন্তু অন্যকে শেখাতে হলে নিজেকে তা মানতে হয়। আবুল আজকে আমি দেহ করি। দেহে অন্ধ হয়ে ন্যায়কে প্রেমকলঙ্কিত করতে পারব না।” শিগণ হজরতের পক্ষপাতশূন্য ব্যবহারে মুগ্ধ হইয়া আকুল ৪ তার অa আসকে মুক্ত কবি দিল । কিন্তু সর্বাপেক্ষা গভীর প্রভাব পড়িল সদ্যমুক্ত বন্দীব উপব। যুদ্ধে রাইযা, তর্কে হাবাই যাহাকে কাবু করা সম্ভব ছিল না, সেই বীবধৰ্ম্মী হৃদয এই ন্যায়পরতায় অভিভূত হইযা কলমা পডিল-লাইলাহাইল্লাল্লা।

আজকাল বড় বড় সহরে দাই নাস লেডী-ডাক্তাবের 'ছড়াছড়ি, কিন্তু গ্রাম্য সুতিকাগারে এখনও মেথর-পত্নীর অখণ্ড একাধিপত্য। অদূর ভবিষ্যতে তাহার ভাগ্যবিপর্যয়ের কোন সম্ভাবনাও নাই। বাবু মহেশনাথ ছিলেন ক্ষুদ্র এক গ্রামেব জমিদার। শিক্ষিত লােক, সুতরাং সূতিকাগৃহের শাসন-সংস্কারের আবশ্যকতা অবশ্যই স্বীকার করিতেন; কিন্তু যে সব বাধা সামনে দেখা দিল, তাহা লন করিতে সাধ্যে কুলাইল না। কোন নার্স অজ পাড়াগাঁযে পদার্পণ করিতে রাজী হয় না , যদি বা হয় তবে এত নগদনাবাষণ চায় যে, বাবু সাহেব মাথা নােযাইযা চলিযা আসিতে বাধ্য হন। এর পর লেঙী-ডাক্তারের সন্ধানে বাহির হইবাব সাহস রহিল না। তাদের দক্ষিণা দিতে বােধ হয জমিদাবীই বাঁধা পড়িবে। সুতরাং তিন কন্যাব পর যখন পুরবে মুখ দেখিলেন, তখনও আবাব ছাই ফেলতে ভাঙ্গা কুলাে দামড়ি ও তস্য পত্নীর শরণাগতি ভিন্ন গত্যন্তর রহিল না। অন্ধরাত্রে একদিন জমিদাব-বাড়ির চাপরাশী আসিযা দাড়ির গরজায় এমন প্রচণ্ড হাঁক দিল যে প্রতিবেশীরা পর্যন্ত ধড়মড় কবি জাগিয়া উঠিল। গাড়ির ঘরে এই শুভদিনের প্রতীক্ষায় কযেকমাস আগে হইতেই উদ্যোগ-আয়ােজন জল্পনা-কল্পনা চলিতেছিল। স্ত্রী-পুরুষে এই বিষয়ে কলার যে কথা কাটাকাটি হইযাছে, তাহার হিসাব নাই। শঙ্কা ছিল এই যে, আবার যদি মেযে হয়, তবে সেই একখানা শাড়ী আর মগ এৰু তাই বরাতে আছে। স্ত্রী বলিত-“এবার যদি ছেলে না হয় কুটির ভোতা 'কি বলছি। সৰ লক্ষণ ছেলের।” দাড়ি স্ত্রীর বাক্যে প্রতিবাদ পুরুষের অবশ্য কর্তব্য মনে করিয়া বলিত—“ছেলে হবে। মেয়ে যদি নাহয় তবে গোঁফ মুড়িয়ে ফেলব।” হয়ত মনে মনে তাহার এই ধারণাও উকি মারিতেছিল যে, স্ত্রীর জেদ বাড়াইয়া দিলে তাহার পুত্রকামনা বলবতী হইয়া সত্য সত্যই অঘটন ঘটাইয়া দিবে। এখন ভুজী বলিল- নাও, এখন হল ত। গোঁফ মুড়াও দেখি এবার। আমার কথা গেরাহিই হয় না। গোঁফ মুড়াবে, গোঁফ মুড়াবে। আমি নিজের হাতেই জঞ্জাল সাফ করে দিচ্ছি।” বলিয়া তখনই, কঁচির অভাবে তরকন্থী ছুরি লইয়া অগ্রসর হইল। দুরি-ধারিণী হইতে দুই পা পিছাইয়া গিয়া দাঙি বলিল-- আচ্ছা, আচ্ছা, পরে করিস এখন। গোঁফ পালিয়ে যাচ্ছে কোথায়। আর মুড়ালেই কি! তিন দিন দিন যেই সেই শােনল। না বিছু পাবি, আদ্ধেক বখরা।” উত্তরে পতিব্রত বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ প্রদর্শন করিল। তিন মাসের শিশুপুত্রক্ষে মীর কোলে ফেলিয়া দিয়া চাপরাশীর সঙ্গে চলিয়া যাইতে উদ্যত ছুইতেই দাড়ি বলিল—“এই পাগলী, শােন! যেতে ত আমাকেও হবে। চোল বাজাতে' ডাক পড়বে, কি পড়বে না ! ছেলে সামলাবেকে তখন ?” “মাটিতে শুইয়ে রেখে চলে যেয়াে। আমি একবার ফুৎ করে এসে দুধ খাইয়ে যাব।” মহেশনাথের বাড়ীতে ভুলীর আদয় দেখে কে! সকালের খাবার, ফুপুরে হলিয়াপুরী, আবার বিকালে জল খাবার। সৈ ভােজমেজ পর পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গল্প দুধ এক গ্লাস। এদিকে দাড়ির জন্যেও দিনে রাতে তিনবার থালি যায়। নিজের ছেলেকে ভুদী দিনে-রাতে দুই তিনবারের বেশী দুধ খাওয়াইতে আসিতে পারে না। তার জন্য গরুর দুধের ব্যবস্থা করা হইয়াছে। নবজাত শিশু তাহার স্তন্যপান করিয়াই বাড়িতে লাগিল। আশা ছিল বারদিনের দিন এই ব্যবস্থা বন্ধ হইবে, কিন্তু মায়ের বুকে দুধ নেই। জমীদার-গৃহিণী বেশ সুস্থ সবল, কিন্তু এবার অকস্মাৎ দুগ্ধের উৎস শুখাইয়া গিয়াছে। অর্থ অন্যবারে এত দুধ হইত যে মেয়েদের পেটের অসুখ হইয়া পড়িত। এবার একবিন্দুও নাই। ভুঙ্গীকে একাধারে প্রসূতি-পরিচারিকা ও ধাত্ৰীমা হইতে হইল। ক্ষীণ হাসিয়া গৃহিণ বলেন—“তুজী, আমার বাছাকে তুই বাঁচিয়ে দে ; যতদিন বাঁচৰি তােকে কাজ করতে হবে না, বসে বসে খাবি। পাঁচ বিঘে নিষ্কর করিয়ে দিচ্ছি। নাতিনাতিনী পৰ্যন্ত তাের সুখে থাকবে।” এদিকে ভুঙ্গীর নিজের সন্তান গরুর দুধ হজম করিতে পারে না। বারবার বমি করে। দিন দিন শীর্ণ হইয়া উঠিতেছে। ভুলী বলে—“বহুজী, মুণ্ডনের সময় চুড়ড় নেব, এখন থেকেই বলে রাখছি।” গৃহিণী জবাব দেন—“তাই নি বাপু! কত ভয় দেখালি কেন? কিসের চাই—সােনার না রূপাের ?” “কি যে বল বহুজী! রূপাের চূড়াে আবার পরে নাকি? তােমার মাথা হেঁট হবে না?” “আচ্ছা আচ্ছা, সােনারই নিস্ এখন।” “বিয়ের সময় কথা চাই, আর চৌধুরীর (দাড়ির) জঙ্গ তােড়।” *বেশ তাই পাবি। ভগবান আগে সেদিন ত দেখান। জমীদার গৃহে গৃহিণীর পরই ভুলীর প্রতাপ। রাধুনী, চাকর, চাকরাণী সকলে তাহাকে সমীহ করে চলে। গিন্নী নিজেও রে ভয়ে থাকেন। একবার ত ভুঙ্গী স্বযং মহেশনাথকেই ধমক দিয়া বসিল। তিনি হাসিয়া চুপ করিযা গেলেন। কথা হইতেছিল মেথরদের সম্বন্ধে। মহেশনাথ একটি বেফাস কথা বলিযা ফেলিযাছিলেন-“দুনিয়ার আর যাই হােক, মেথর ত মেথরই থাকবে। এদের মানুষ বানানাে অসম্ভব।” ভুঙ্গী তৎক্ষণাৎ জবাব দিছিল—“বাবুজী মেথর ত অনেককেই মানুষ করছে। ওদের আবার মানুষ বানাবে কে?” অন্য সময হইলে ভুঙ্গীর কঠিন শাস্তি হইত। আজ বাবুর বসবােধ যেন অকস্মাৎ উছলিযা উঠিল। হাে হাে করিয়া হাসি বলিলেন—“তুঙ্গী বলে কথা ঠিকই।” ভুঙ্গীর রাজত্ব এক বৎসরের অধিক টিকিল না। ব্রাহ্মণ-দেবতারা জমীদার বালকের মেথরাণীর দুধে পালিত হওয়ার বিরুদ্ধে আন্দোলন আরম্ভ করিলেন। ভুড়ি হেলাই টিকি, মাথা ও হাত একসঙ্গে নাড়ি মােটেরাম শাস্ত্রী ত প্রায়শ্চিত্তের বিধান লইয়া আগাইয়া আসিলেন। হাসি তামাশা তিরস্কারে প্রায়শ্চিত্তের কথা ভাসিয়া গেল ; তবে দুধ ছাড়াইতে হইল। মােটেরাম শাস্ত্রী শাস্ত্রী হইবার পূর্বে, অনুরূপ অবস্থার আর এক মেথরাণীর দুধেই মােটা হইয়াছিলেন। জমীদার পূৰ্ব্ব বৃত্তান্ত স্মরণ করাইয়া বলিলেন—“প্রায়শ্চিত্ত চাই বটে। তাহলে তােমার বপুখানার কি গতি হবে শাস্ত্রীজী? মেথরাণী মায়ের দুধ এখন কি আর চাইলেই টান মেরে ফেলে দিতে পারবে? সবেগে শিখা আন্দোলন করিয়া ভাটার মত চোখ নাচাইয়া মােটে ত্যিষ্ঠ গল্প শত্রী বলিলেন-“বাবুজী যথাৎ আল করেছেন। সেখরাণীর রক্ত মাংসে আমার দেহ গড়া, অধীকার তু করছিনে, কিন্তু গত শােচনা নাস্তি। জগন্নাথক্ষেত্রে ছত্রিশ জাতে একসঙ্গে বসে খায় ; অ বলে সেটা এখানেও চালাবেন না কি? এই দেখুন না, অসুখে পড়লে আমি অং জামা কাপড় না খুলেই খেতে বসি। সেবে গেলে ত আর তা চলে স। আপধর্মের কথা আলাদা। “অর্থাৎ আপনি বলতে চান, ধৰ্ম্ম বদলায়। এখন একম, তখন একবকম।” “তা নত কি। সকলেব কি ধৰ্ম্ম এক? রাজার এক ধর্ম, প্রজাব আলাদা ধৰ্ম্মআমীব গবীব এক নৌকোয় চলবে কি করে? রাজা মহাবাজেব কোন নিয়ম বন্ধন নেই। যেখানে ইচ্ছে খায, যত্রতত্র বিযে- ব্যাভাব করে। ওরা হল নিমেব বাইবে। নিয়মকানুন আমাদেব মত মাঝারির জন্য।” যাহােক প্রায়শ্চিত্ত হইল না । তবে ভুঙ্গী বাজত্বও আর হিল না। কান দক্ষিণ সে অবশ্য অজ পাইল। এত পাইল যে বহিষা লইয়া যাইতে একেলার সাধ্যে কুলা না। সােনা চুড়াও মিলিল। একের স্থান জুন সুন্দর শাড়ী-মেযেদের বেলায় যেন পাইযাছিল, সেইরকম সাদা- সিধা শাড়ী নষ। ই খ শাে লোক অতি লাগিল। সকলের আগে মারা গেল দাড়ি, ভুঙ্গী এখন সংসারে একা কিন্তু সংসার আগেই চলে। যাকে বিল ভুলী এর গ্রাম ছাড়িয়া চলি যাইবে কি দেখিতে ১ দেখিতে পাচ বৎসর কাটিয়া গেল। তার ছেলে মঙ্গল দুর্বল, স্লোগালি হইলেও ক্রমে-বাড়িয়া উঠিতে লাগিল; অন্য ছেলেদের মত না হইলেও সে ক্রমে দৌড়াদৌড়ি ছুটাছুটি আরম্ভ করিল--মধুর কনিষ্ঠ জমীদার তনপ্লেক্স তুলনায় বােধ হইত যেন হাড়গিলা। একদিন ভুঙ্গী মহেশনাথের ঘরের পরমালা পরিষ্কার করিতেছিল। কয়েক মাসের ময়লা জমিয়া জলের পথ প্রায় বন্ধ হইয়া আসিয়াছে। তুই নিজের ডান হাত পরনালার মধ্যে চালাইয়া এক বাঁশের সাহায্যে ভিতরে নাড়া দিতেছিল। হঠাৎ চীৎকার করিয়া সে হাত বাহিরে টানিয়া আনিশ সঙ্গে সঙ্গে কালাে এক সাপ পরনালার মুখে বাহিয়া বাহির হইয়া পড়িল। লোকজন দৌড়িয়া আসিল, সাপকে মারিতে দেরী হইল না। সকলে মনে করিল, জোলাে সাপ, বিষ নাই। সেইজ ভুব্দীর দিকে বিশেষ মনাে- যােগ দিবার তেমন কোন আবশ্যকতা কেহ বােধ করিল না। কিন্তু জলে সাপ নয়,-গেই বনের। বিষ যখন ছড়াইয়া পড়িয়া সমস্ত দেহ নীল করি দিছে, তখন চমক ভাগিলেও আর উপায় ছিল না। ধীরে ধীরে ভুঙ্গী চিরকালের জন্ঠ চক্ষু বুজিল, মঙ্গল এখন পিতৃমাতৃহীন অনাথ। সারাদিন মহেশবাবুর দরজার আশে পাশে ঘােরে। ঘরে এটো কাটা এত হইত যে মঙ্গলের মত পাঁচ সাতটি বালকের স্বচ্ছন্দে পেট ভরিতে পারে। সুতরাং খাবার অভাৰ তাহার হয় নাই। কিন্তু মাটির সরাতে যখন তাকে জমীদার ও জমীদার পুত্রের উচ্ছিষ্ট চালিয়া দিত তখন খারাপ লাগিত। সকলে কেমন থাল বাসনে খায়, আর তার জন্য কিনা মাটির সানকী! এতে যে কোন হীনতা বা অপমান আছে, তাহা বালকের বুঝিবার কথা নয়, কিন্তু গ্রামের ছেলেরা তাহাকে ক্ষেপাইয়া ক্ষেপাইয়া এই দুঃখৰােখ জাগ্রত করিয়া দিল। কেউ তার সঙ্গে থেলিত না; যে টাটে,সে শুইয়া পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গল্প রাত্রি কাটাইত, তাহা পৰ্যন্ত অস্পৃশ্য। জমীদার বাড়ীর সামনে এক কোণের দিকে এক নিমগাছ ছিল, তাহার তলাযই মঙ্গলের আস্তানা। ছিন্ন মলিন গুনচটের এক টুকরা, মাটির দু’খানা সরা, আর সুরেশের পরিত্যক্ত পুরানাে একখানা ধুতি। শীত গ্রীষ্ম বর্ষায ঐ সম্বল। কনকনে শীত, আগুনের হল্কার মত সু আর মুষলধারে বর্ষণ—এই সমস্ত মাথাষ করিয়া তাহার দিন কাটে। ভাগ্যের কষাঘাতে, লােকের অনাদরে বরং তাহার স্বাস্থ্য আগের চেয়ে ভালই হইযাছে। শীততাপ সহিয়া দেহ পুৰ্ব্বা- পেক্ষা সবল। তার সমদুঃখী, সুখদুঃখের অংশভাগী একটিমাত্র প্রাণী ছিল—রোয়া উঠা, হাড় বের করা এক কুকুর। বেচারা ভয়ে পথে বাহির হইত না। কুণ্ডলী পাকাইয়া দিনরাত টাটের একাংশে পড়িয়া থাকিত। একটি অবােধ অব্যক্তভাষী ইতর প্রাণী, আর একটি দুঃথে মুক অবহেলিত মানব সন্তান। ভাষার পদ বন্ধ হইলেও,-অনুভূতির পথে দু’জনে মিলিয়াছে। সেই মুক্ত পথে উভয়ের সাক্ষাৎ পরিচয় এবং ঘনিষ্ঠতা। পরস্পর পরস্পরকে চিনিয়াছিল। একে অপরকে আশ্রয় করিয়াছিল। গ্রামের ধর্মপ্রাণ ব্যক্তিরা জমিদারবাবুর উদারভায় ত হতবাক! একেবারে দ্বারের সামনে, পঞ্চাশ হাতও হইবে না, এ রকমভাবে অন্ত্যজকে আশ্রয় দেওযা ? যদি এমন অনাচার চলে, তবে ধর্ম টিকিবে ক’দিন ? মেথরও ভগবানের সৃষ্ট-সে ত জানে সকলেই। তার উপর অন্যায় অত্যাচার না হয়, সেটা দেখিতে হয় বৈকি! কিন্তু সমাজ বলিয়া কিছু আছে ত। জমিদারের বাড়ী ত যাইতে গা ঘিন ঘিন্ করে। গাযের মালিক, যাইতেই হয় এক-আধবার ; কিন্তু এ অনাচার ধর্মে সহিবে কেন ? কোথা হইতে শুনিয়া মঙ্গল সাধ করিয়া কুকুর বন্ধুর ইংরেজী নামকরণ করিয়াছিল। “টমি একটু সরে শশা দিকি। আমার শােবার জায়গা রাখলি কোথায়, সারা চট ত তুইই দখল করলি!” = টমি প্রীত হইয়া লেজ নাড়িয়া প্রস্তাবে ও অনুযােগে সম্মতি জানাইল এবং মঙ্গলের আর একটু কাছে আসিয়া গা ঘেসিয়া শুইল। তাহাতেও যথেষ্ট হইল না মনে করিয়া জিভ দিয়া তাহার গা চাটিতে আরম্ভ করিল। এইভাবে দিন কাটে। রােজ সন্ধ্যাবেলা মঙ্গল নিজেদের পরিত্যক্ত শূন্য কুঁড়েখানি দেখিয়া আসে। মায়ের অন্তিম নিঃশ্বাস যেন ঘরে আটকাইয়া আছে ; সন্ধ্যার আবছা অন্ধকারে মায়ের স্নেহকোমল মুখখানি, করুণ চোখ দুটি বুঝি সন্ধ্যাতারার মত গৃহকোণে ফুটিয়া উঠে। মাটির ঘর। অযত্নে দেয়াল পড়িয়া যাইতেছে। চালে মস্ত মস্ত ফাক। মঙ্গল স্বপ্নাচ্ছন্নের মত শূন্য ঘরের পানে তাকাইয়া অনেকক্ষণ সেখানে কাটায়। এক অব্যক্ত বেদনায় বুক কি রকম করিতে থাকে অক্ষ-পারাবার উথলিয়া উঠে। । একদিন কয়েকটি বালক খেলিতেছিল। মঙ্গল ও সাহচর সেখানে পৌছিয়া গেল এবং নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখিয়া সতৃষ্ণদৃষ্টিতে সমবয়সীদের খেলা দেখিতে লাগিল, তাহাদের সােৱাস চীৎকার শুনিতে লাগিল। সুরেশও খেলিতেছিল। একটি ছেলে পা মচকাইয়া ক্রন্দন সুরু করিতেই তাহার স্থান লইবার জন্য লােকের দরকার হইল। মঙ্গল দাড়াইয়া আছে দেখিয়া সুরেশ ভাবিল তাহাকে ডাকিয়া আনিবে। ওখানে ত অন্য কেহ নাই। কেহ জানিতে পাইবে না। “কিরে মঙ্গল, খেলবি ?” “না ভাই। তােমার বাবা দেখে ফেলেন তাে? তােমার কি, আমিই শেষকালে মরি। হাড় এক ঠাই মাস এক ঠাই করে ছাড়বে।”

কষ্ঠ গল্প “এখানে কে দেখতে আসবে। চলে আয। আমরা সব ঘােড়সওয়ার হব, তুই হবি মােড়া। আয় না।” আমি কি মায়াক্ষণ ঘােড়াই পাকব; না আমায চড়তে দেবে?” কঠিন প্রশ্ন! বালকেরা এই দিক দিযা ব্যাপারটা দেখে নাই। সুরেশ কিছুক্ষণ ভাবিয়া বলিল—“তােকে কে পিঠে চড়াবে বল দেখি। তুই হলি মঙ্গল ঝঝি উঠিল—“আমি কি বলেছি যে আমি বামুনঠাকুর? কিন্তু আমার মা-ই ত তােমায দুধ দিয়ে পুষেছিল? সে হবে না। আমাকে যদি সওয়াব হতে না দাও, তবে কাজ নেই আমার ঘােড়া হযে-বা।” সুরুেশ ধমক দি মুখ খি চাইযা বলিল—“কাজ নেই হযে। তােকে হতেই হবে।” বলিযা মঙ্গলকে ধরিতে ছুটিল। মঙ্গলও দে ছুট। সুরেশ প্রাণপণে পিছনে ছুটি কিন্তু বেশী দুধ-ঘী ও আদব খাইয়া শরীর থলথয়ে হইয়া গিয়াছে। অধিকক্ষণ চলিতে পাবিল না। দম আটকাইযা আসিতে লাগিল। শেষে হার মানিযা দাঁড়াইয়া পড়িল। আবার আদেশের সুবে বলিল-“এসে ঘােড় হ বলছি ; নইলে যখন হাতের কাছে পাব, মজা টেব পাবি।” “তাহলে তােমাকেও ঘােড়া হতে হবে।” “আচ্ছা শে; তাই হব এখন। তুই ত আয।” তুমি পরে কথা রাখবে না। আগে আমি চড়ে নি, আর পরে তোমায় চড়ব।” সুরেশ ফাকি দিতেই চাহিযাছিল। মঙ্গলের এই চালাকি দেখিয়া ফের চটি গেল। ততক্ষণে অন্য সাথীরাও সেখানে আসিষা জুটিয়াছে। সুরেশ অবজায় ঠোঁট উল্টাইয়া বলিল—“শুনলে কথা! মেথর কি না।” চোখে চোখে ইশার হইয়া গেল এবং একসঙ্গে তিনজন তিন দিক হইছে ও দুধের দাম মঙ্গলকে ঘিরিয়া ধরিল। হাত ও হাঁটু মাটিতে নােয়াইয়া দিয়া মঙ্গলকে জোর করিয়া ঘােড়া করা হইল। সুরেশ পিঠে চড়িয়া হাঁটুর গুতা দিয়া বলিল—“চি হি হি, চল ঘােড়া, চল।” কি করে, মঙ্গলকে কিছুদূর পর্যন্ত অশ্ব-গিরি করিতেই হইল। কিন্তু লিকলিকে চেহারার ছেলে কতকক্ষণ পর্যন্ত একমণ মাংসের তালকে পিঠে ফরিয়া বেড়াইতে পারে। হাঁফাইতে হাঁফাইতে বলিল—“নাও, এবার নামম। আমি আর পারিনে।” কিন্তু অশ্বারােহী এত অল্পে সন্তুষ্ট হইবার পাত্র নহেন। তিনি জাকিয়া বসিলেন। মঙ্গল গাঝাড়া দিতেই পপাত ধরণীতলে এবং তৎক্ষণাৎ সচীৎকার ক্রন্দন আরম্ভ। কান্নার আওয়াজ মায়ের কানে পৌছিতেই তিনি চাকরাণী পাঠাইয়া দিলেন। এমনি তিনি কানে কম শােনেন কিন্তু সুরেশ মায়ের প্রয়ােজন বুঝিয়া স্বরগ্রাম এত চড়াইতে পারিত যে স্বাভাবিক শ্রবণ শক্তিতে তালা লাগিবার জো হইত। ফেকুর মা আসিয়া ‘সােণা আমার, মাণিক আমার’ করিয়া সুরেশকে লইয়া গেল। মা জিজ্ঞাসা করিলেন—“কাঁদছিস কেন, মারলে কে?” সুরেশ ফোপাইতে ফোপাইতে বলিল-“মংলু, ছুয়ে দিয়েছে।” মা বিশ্বাস করিতে চাহিলেন না। মঙ্গল স্বভাবতই নিরীহ। তার উপর অবস্থার চাপে এমন হইয়া গিয়াছিল যে সাত চড়ে রা ফুটে না। কিন্তু সুরেশ যখন নানা রকম শপথ করিতে লাগিল, তখন বিশ্বাস না করিয়া উপায় কি। মঙ্গলকে ডাকাইয়া তিরস্কার করিতে লাগিলেন- “মংলু, কতবার না তােকে মানা করেছি, সুরেশকে ছুবি না। কানে কথা ঢেকে না বুঝি? বার করছি তােমার নষ্টামি। বল ওকে কেন লি?”

৮২ পৃথিবীশ্রেষ্ঠ গল্প “আমি ছুইনি।” “ছুসনি ত কঁদছে কেন?” “পড়ে গিয়ে লেগেছে তাই।” এ যে চোরের উপর বাটপাড়ী। দাতে দাত পিষিয়া জমিদার গৃহিণী ক্রোধ দমন করিতে লাগিলেন। মারধাের করতে গেলে স্নান করিতে হয়। তাই মঙ্গল সে যাত্রা রক্ষা পাইয়া গেল। কিন্তু তিনি হস্ত প্রহারের অভাবে বচন প্রহার করিয়া সুদে আসলে পােষাইয়া লইলেন। মনের সাধে গালাগালি করিয়া শেষকালে যখন, নূতন কিছু বলিবার রহিল না তখন হুকুম দিলেন—“এখুনি এখান থেকে বেরিয়ে যা। যদি এ বাড়ীর দুয়ােরে তােকে দেখি, তবে আর আস্ত রাখব না।” অপমান যেমনই লাগুক, ভয় লাগিল বেশী। চুপ চাপ মাটির শানকী হাতে উঠাইয়া লইল, টাটখানা বগলে গুজিয়া, ধুতি কঁাধে ফেলিয়া কঁদিতে কঁদিতে মঙ্গল বাহির হইযা গেল। সঙ্কল্প করিল আর আসিবে । ক্ষুধায় মৃত্যু হয়, তবুও না। এরকম করিয়া বাঁচিয়া লাভ ক? অভিমানে আশ্রয়হীন বালকের হৃদয় ভরিয়া আসিল। একবার চোখের জল বন্ধ হয়, কিছুক্ষণ পরে আবার জ্বালা করিযা আসে; আবার টপ টপ করিযা অশ্রুবিন্দু পড়িতে থাকে। এক পা এক পা করিযা চলিয়া অবশেষে জীর্ণ কুঁড়ে ঘরে পৌছিল। কিছুক্ষণ পরে টমিও আসিযা জুটিল। দিনের আলো ম্লান হইয়া আসিতেছে। অল্পক্ষণ পরেই সুৰ্য পাটে বসিবেন। ধরণীর পৃষ্ঠ হইতে আলাে-রেখা মুছিয়া যাইতেছে; মঙ্গলের মন হইতে গ্লানিও তিরােহিত হইতেছে। মানসিক চাঞ্চল্য ছাপাইয়া ক্রমে

पत्रकार
ক্ষুধার তাড়না প্রবল হইয়া উঠিল। বার বার সরার দিকে দৃষ্টি আপনা হতেই
যাইতে লাগিল। ওখানে থাকিলে এতক্ষণে সুরেশের এটো মিঠাই
মিলিযা যাইত। এখানে খাইবার কি আছে ?
টমিকে বলিল—“না খেয়ে থাকতে পারবে টমি ? আমি ত অমনি
যে পড়ব আজ।”
টমি কুঁকুঁ করিযা জবাব দিল। মঙ্গল তার ভাষা বােঝে। টমি
বলিতেছে—“এ রকম অপমান ত সারাজীবন অঙ্গের ভূষণ হযে থাকবে
তােমাব। এইটুকুতেই যদি সাহস হারাও, তবে চলবে কেন। দেখাে
, আমার অবস্থা। এই ত এক্ষুনি একটি লােক লাঠি মেরেছিল।
কেঁদে কঁকিযে কিছুক্ষণ পরে আবার লেজ নাড়তে নাড়তে তারই কাছে
গেলাম। আমবা দুজনই যে এরই জন্য জন্মেছি।”
মঙ্গল—“তাহলে তুমি যাও ভাই। যা পাও খেয়ে এসাে। আমার
জন্য ভেবাে না।”
টমি শ-ভাষায অসম্মতি জ্ঞাপন করিল।
“কিন্তু আমি ত যাব না টমি।”
“না খেয়ে মারা যাবে মংলু?”
“তুমিই কি বাঁচবে?”
“আমার আছেই বা কে যে আমি মরলে দুঃখ করবে। যৌবনে
প্রেমে পড়েছিলাম ; প্রি কিছুকালপরে আমাকে ছেড়ে গিযে আমারই
এক দোস্তের ঘরে গিয়ে উঠেছেন। কপাল ভাল ছিল যে, ছেলে মেয়ে
সঙ্গে নিয়ে গিযেছিলেন। নিঝঞ্জাট ঝাড়া হাত পা আছি। নইলে
পাঁচটি কাচ্চাবাচ্চার ভারে তলিযেই যেতাম।”
কিছুক্ষণ পরে ক্ষুধা দ্বিতীয় এক যুক্তি বাহির করিল। আহত
অভিমানকে কোন রকমে ভুলাইবার চেষ্টার ত্রুটি নাই।

৮ঃ
পৃথিবীর এ গল্প
“মাইজী নিশ্চয়ই আমার খোঁজ করছেন। কি বলিস টমি?”
“তা নয়ত কি! বাবুজী আর সুরেশ দুজনেরই খাওযা হযে গেছে
নিশ্চয। কাহার থালী থেকে এটো নিয়ে আমাদের খুঁজছে।
“বাবুজী আর সুরেশ দুজনের থালাতেই খুব ঘা থাকে; আর সব।”
“সব কিছু শেষকালে নর্দমায় ফেলে দেবে যে।”
“আচ্ছা দেখা যাক, আমাদের খুজতে কেউ আসে কি না।”
“খুজতে আসবে বই কি। গুরু ঠাকুর কি না! একবাব হযত মংলু,
বলে কেউ আওযাজ দেবে। তারপর থালীর সব এটো পৰনালায় ঢেলে
দেবে।*
“আচ্ছা তা হলে চল। আমি কিন্তু আড়ালে থাকব টমি। মনে
রেখাে, যদি কেউ আমায না ডাকে, তবে যাব না।”
দুই বন্ধু—একসঙ্গে বাহিব হইয়া মহেশনাথের দরজায় অন্ধকারে পা
টিপি টিপিযা দাঁড়াইল। টমির তর সয়না। আস্তে আস্তে ভিতবে
ঢুকিয়া গেল। গিয়া দেখিল সুরেশ ও মহেশবাবু খাইতেছেন। উঠানেই
বসিয়া রহিল, কিন্তু মনে ভয, পাছে কেহ লাঠি মারিয়া তাড়াইয়া
দেয়।
চাকবদের মধ্যে কথাবার্তা হইতেছিল। চমকু বলিতেছে—“আজ
মংলুকে দেখছি নে ত ? মাইজী আজ ধমকেছিলেন, বাবুসাহেব তাই
গােসসা করে অদর্শন হযেছেন।”
চুমু বলিল—“বেশ হযেছে, বের করে দিয়েছে। সকালে উঠেই
মেথরের মুখ দেখতে হয়।”
মাল আৰ একটু সরিষা বসিল। না, কোন আশাই নাই মনে
হইতেছে। মহেশনাথ আহার শেষ করিযা উঠিলেন। চুনু হাতে জল
ঢালিয়া দিল। এবার তামাক খাইবেন, তারপর নিদ্রা। সুরেশ মাযের

৫
কাছে বসিয়া গল্প শুনিতে শুনিতে ঘুমাইয়া পড়িবে। অভাগা মঙ্গলের জয়
কারাে কোন মাথা-ব্যথা নাই। ভুলেও কেউ নাম লইবে না।
কিছুক্ষণ পর্যন্ত দাঁড়াইয়া থাকিয়া নিরাশ হইয়া মঙ্গল নানা চিত্র
করিতে লাগিল। দীর্ঘশ্বাস ফেলিয়া ফিরিবার উদ্যোগ করিতেছে এমন
সময কাহার পাতায় এটো লইয়া আসিতেছে দেখা গেল।
মঙ্গল গ্রহে অন্ধকার হইতে আলােতে আসিল।
কাহার দেখিতে পাইয়া বলিল—“কোথা ছিলি তুই মংলু? আমি ত
ভেবেছিলাম চলে গিযেছিস। সব আস্তাকুঁড়ে ফেলতে যাচ্ছিলাম।”
মঙ্গল বিনীত স্বরে কহিল-“আমি সারাক্ষণ এখানেই বসে আছি,
খুড়ে।।
“আওয়াজ দিসনি কেন?”
“ভয় কচ্ছিল।”
“আচ্ছা নে, খেয়ে নে।”
মঙ্গল সকৃতজ্ঞভাবে শানকিতে উচ্ছিষ্ট গ্রহণ করিল।
টমি ভিতর হইতে লেজ নাড়িতে নাড়িতে আসিয়া জুটিল।
দুই বন্ধু নিম গাছের নিচে একই পাত্র হইতে খাইতে লাগিল। ম
এক হাত টমির মাথায় বুলাইতে বুলাইতে কহিল-“দেখলি, পেটের আগুন
এমনি জিনিষ বটে। দুর ছাই করে এই যা দেয়, না পেলে কি করতিস্?”
টমি লেজ নাড়িল।
“সুরেশকে মা বাচিয়েছিল , দুধ দিয়ে পুষেছিল।”
টমি আবার লেজ নাড়িল।
“লােকে বলে দুধের দাম কেউ দিতে পারে না। আমার মায়ের
দুধের দাম আমি এ রকম করেই পাচ্ছি।”
টমির লেজ নাড়া চলিতে লাগিল।

সদগতি দুখী চামার নিজেদের কুঁড়ে ঘরখানির সামনের দিকটায় ঋতু দিতেছিল। তার স্ত্রী ঝুরিয়া ভিতরটা নিকাইতেছিল। উভয়ের কাজ যখন শেষ হইল, তখন ঝুরিয়া স্বামীকে বলিল, “এবার তুমি পণ্ডিত- বাবাকে খবর দিয়ে এসাে। বেলা হয়ে গেলে হয়ত কোথাও বেরিয়ে যাবেন।” দুখী—এই যাই। কিন্তু এলে বসাবে কোথায়?” —একটুক্ষণের জন্য কারাে একখানা চারপাই চেযে আনন না। ঠাকুরদের বাড়ী পাওয়া যাবেনা ? -ঠাকুররা দেবে তােকে খাটিয়া ? মাঝে মাঝে এমন কথা বলিস যে হাসিও পায়, রাগও ধরে। ঘর থেকে একটু আগুন দিতে চায় না, দূরে দাড়িয়েও একলােটা জল চাইলে পাওয়া যায় না। তারা তােমায থাট পালঙ্ক দেবে ! একি আমার ঘুটে ভুসি না জ্বালানি কাঠ যে যার খুশী উঠিয়ে নিয়ে গেল ? আমাদের যে বসবার পটোলী আছে, তাই ধুয়ে মুছে এনে রাখ। পণ্ডিতজী আসতে আসতে শুকিয়ে যাবে এখন। পণ্ডিতজী মহারাজ কি আমাদের খটোলীতে বসবেন ভাবছ? কি রকম নেম-ধরম মানেন সেত জানই। দুখী চিন্তিতমুখে সায় দিল—“বলেছিস কথা ঠিকই। আচ্ছা, এক কাজ করিনা কেন। মহুয়ার পাতা খান কয়েক ভেঙ্গে নিয়ে আসছি, তাই দিয়ে একখানা আসন বানিয়ে দিই। পাতা বড় পবিত্তর বস্তু। বড় বড় নেমধর্মীরাও পাতায় যেতে আপত্তি করে না। ডাণ্ডাটা আমায় দিয়ে যা দিখিন, নিয়ে আসি খান ওক পেড়ে।”

ঝুরিয়া বলিল-“পাতার আসন আমিই বানাতে পারব। তুমি এবার যাও। সিধেও তত দিতে হবে। আমাদের থালায় দিয়ে দেব নাকি?” দুখী এবার বিরক্ত মুখে বলিল—“তাের কি কিছুতেই আর আকেল হবে না? বাবা থালাখানা ছুঁড়ে ফেলবে না? সিধেও যাবে, থালিখানাও চুরমার হবে। পণ্ডিতজী যা রাগী মানুষ। রাগলে নিজের স্ত্রীকেও ছেড়ে কথা কন না। ছেলেটাকে সেদিন কি মারই মারলে। না না, থালা টালা নয়। সিধে ঐ পাতা দিতে হবে। আর শােন, তুই ছুবিনে। ভূরী গৌড়ের মেয়েকে সঙ্গে করে দোকানে যাবি, ওর হাত দিয়ে সব জিনিষ আনাবি। দেখি, সিধে যেন কম না পড়ে। একসের আটা, আধসের চাল, একপাে ডাল, আধপাে ঘী, তার সঙ্গে ঠিক মাপে লঙ্কা, লবণ আর হলদি। পাতার এক পাশে চার আনা পয়সা রেখে দিবি। গৌড়ের মেয়ে যদি আসতে না চায়, তবে ভূৰ্জিনকে কাকুতি মিনতি করে নিযে যাবি। মােদ্দাকথা তুই কিছুতে চুসনে। তাহলে অনৰ্থ হবে।” বারবার এইভাবে সাবধান করিযা দুখী বড় গাটরীর এক গাঁটরী ঘাস তুলিয়া লইল। এক হাতে নিজের লাঠিগাছা লইয়া, ঘাসের বােঝা মাথায় করিয়া, দুখিযা পণ্ডিত ঘাসীরামের বাড়ীর দিকে চলিল। ব্রাহ্মণ-পণ্ডিতের দর্শন ত আর খালি হাতে করা যায় না। দুখী ঘাস ছাড়া আর কিই বা ভেট দিতে পারে! ঘাসীরাম পরম নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ। সকালে চোখ খুলিয়াই পাড়া সরগরম করিয়া স্তোত্র পাঠ করেন। পরে মুখ হাত ধুইযা একলােটা ভাঙ, উদরস্থ করেন এবং চন্দন পিষিতে লাগিয়া যান। তারপর আয়না প্রিয় শ্রেষ্ঠ গল্প মনে রাখিয়া ললাটে তিলক ত্রিপুণ্ড, আঁকেন। চন্দনের দুই রেখার মধ্যে টকটকে লাল বিন্দু দিয়া বক্ষে বাহুতে অজস্র গােলাকার ছাপ ও নামাবলী মুদ্রিত করেন। তারপর ঠাকুরজীর মূর্তি বাহির করিয়া তাহাকে ধােওযানাে, চন্দন লাগানাে, ফুল দিয়া সাজানাে আছে। ঘণ্টা বাজাইয়া আরতি আরম্ভ করিতে না করিতে ঠাকুরপূজার মূর্তিমান পারিশ্রমিকস্বরূপ দু'একজন যজমান আসিয়া উপস্থিত হন। আজ নিত্যকার পূজাপাঠ সাঙ্গ করিয়া বাহিরে আসিতেই দেখিলেন, দুখী ঘাসের বােঝা লইয়া একপাশে বসিযা আছে। তাঁহাকে দেখিতে পাইযা উঠিযা দাঁড়াইল, মাটিতে যুক্তকর ও তদুপরি মাথা ঠেকাইয়া নমস্কার অন্তে পরম সম্বমের চক্ষে তেজোময় মূর্তি নিরীক্ষণ করিতে লাগিল। পণ্ডিতজীর বেঁটে খাটো গােলগাল চেহারা, ললাটে তিলক, সৰ্বাঙ্গ চন্দন চর্চিত,—ব্ৰহ্মতেজ ও ভাঙের প্রভাবে দীপ্ত চক্ষু। দুখী একেবারে অভিভূত হইয়া গেল। তাহার মুখে কথা নাই দেখিয়া ঘাসীরাম নিজেই প্রশ্ন করিলেন—“কি খবর রে দুখিয়া ? সকাল- বেলায়ই যে ?” দুখী মাথা নােয়াইযা হাতজোড় করিযা বলিল-“মেয়ের বে ঠিক কবেছি বাবা ঠাকুর। সগাই ( বাগদান )-এর দিন দেখে দিতে হবে। কখন পায়ের ধুলাে পড়বে?” -আজ ত হবে বলে মনে হচ্ছে না। দেখি, যদি সন্ধ্যা পর্যন্ত পারি। -না না বাবা, আজই দয়া করতে হবে। দয়া করতে হবে। সব ঠিক ঠাক করে রেখে তবে এসেছি। এই ঘাস কোথায় রাখি ? —গাইয়ের সামনে ঢেলে দে। আর ঝাড়ু দিয়ে দরজার সামনেটা একটু পরিষ্কার করে দে দেখি। ঝটপাট হয়ে গেলে অমনি বৈঠক ; খানাটা একটু নিকিয়ে দিবিক’দিন থেকে নিকানাে হয় নি। ততক্ষণে আমি দুটো মুখে দিয়ে নি। তারপর একটু বিশ্রম করে তাের সঙ্গে চলব। হাঁ, ভাল কথা মনে পড়ল। ঐ যে কাঠের একটা গাঁট পড়ে আছে দেখছিস, সেটা ফেড়ে চ্যালা করে দিতে হবে। আর ঐ পাশে যে ভুসি পড়ে আছে, ধামায় ভরে তা ভুসির ঘরে রেখে আসবি। আর এক গাড়ী ভুসি আসবার কথা আছে ; এলে ote ঘরে তুলে রাখবি। দুখী তৎক্ষণাৎ হুকুম তামিল করতে লাগিয়া গেল। কিন্তু যত কাজের ফরমাশ হইয়াছে, তাহার সব করিতে যে দিন কাবার হইবে, দুখী প্রথমেই তাহা বােঝে নাই। ঝাড় দিতে, ঘর নিকাইতে, ভুসি বহিতে যখন বেলা দুপুর বাজিয়া গেল, তখন দুখীর হুস হইল। কিন্তু সব কাজ না করিলে পণ্ডিত-বাবা ত প্রসন্ন হইবেন না। পণ্ডিতজী এতক্ষণ দাঁড়াইয়া দাড়াইয়া তদারক করিতেছিলেন এখন মধ্যাহ্নভােজনের ডাক আসিতেই ত্বরিত পদে ভিতরে চলিয়া গেলেন। দুখী সকাল হইতে কিছু খায় নাই তার উপর এতক্ষণ ধরিয়া কাজ করিতেছে। তাহার ক্ষুধা অতিশয় প্রবল হইয়া উঠিল। কিন্তু এর এক মাইলের উপর দূরে। যদি খাইতে চলিয়া যায়, তবে পণ্ডিতজী হয়ত বিষম রাগ করিবেন, হয়ত তাহার বাড়ী যাইতে চাহিবেন না। ক্ষুধাকে আমল না দিয়া দুখী লাকড়ী চিরিতে লাগিয়া গেল। মস্তবড় এক গাঁট। দু’চারজন যজমান ইতিপূর্বে ইহার উপর শক্তি পরীক্ষা করিয়া হার মানিয়াছেন। কুড়াল ভাঙ্গে ত গাঁট ভাঙ্গে না। দুখী প্রাণপণ করিয়া কুড়াল চালাইতে লাগিল। অনত্যন্ত পরিশ্রমে দরর ধারায় ঘাম ঝরিতেছে, ক্ষুধায় শরীর রিমঝিম করিতেছে, তবু সে সমানে আঘাতের পর আঘাত করিয়া যাইতেছে। কিছুক্ষণ শুদ্ধমাত্র মনের ও সব পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গল্প জোরে, যেন এক নেশার ঝােকে কুড়াল চালাইফ গেল। তারপর হাত আর চলে না, পা কাঁপিতেছে, কোমর সােজা করিযা রাখা দুর্ঘট;- চোখের সামনে সব যেন অন্ধকার হইয়া আসিতেছে । ঘাস কাটা যাহার পেশা তাহার এমন মেহনত সহিবে কেন! কিছুক্ষণ জিবাইযা লইবার জন্য দুখী ভূমিতে শুইযা পড়িল। এক চিলিম তামাক পাইলে শরীরটা হয়ত একটু চাঙ্গা হইত, কিন্তু তামাক পাইবে কোথায়? ব্রাহ্মণ দেবতারা কি আর তামাক-টামাকেব ধার ধারেন। গরীব ছােটলােকের নেশা। হটাৎ তাহার স্মরণ হইল গ্রামে এক ঘর গৌড়ও বাস করে। যদিও তারা জাতে একটু উচু তবু একেবাবে নাগালের বাহির ন্য। তাড়াতাড়ি তাহাদের বাড়ীতে তাহাদের বাড়ীতে গিয়া দুখী তামাক ও যুটে চাহিল। তামাকু মিলিন্স, চিলিমও, কিন্তু আগুন পাওয়া গেল না। খাওয়া দাওযার পর তাহারা আগুন নিভাইয়া ফেলিযাছে। এখন আবার ঘুটে ধরাইবাব হাঙ্গামা পােয কে! দুখী ভাবিল, আগুনের ভাবনা কি। পণ্ডিতজীর বাড়ীতে এইমাত্র রান্নাবান্না শেষ হইযাছে, ঘুটে ধরাইবার জন্য একটু কাঠকয়লা মিলিবেই। পণ্ডিতজীব রান্নাঘর হইতে নিবাপদ দূরত্ব বজায বাখি দুখী গিযা সসঙ্কোচে আগুন চাহিল-“একটু আগুন পাব কি বাবা ? একটান তামাক খেযে নিতাম।” সীরামের তখনও আহার শেষ হয় নাই। ঠোট উল্টাইয়া পণ্ডিতানী তিক্তকণ্ঠে জিজ্ঞাসা করিলেন, “আগুন চাইছে কে ?” পণ্ডিত—ঐ ব্যাটা দুখ্যিা চামার, আর কে! বলেছিলাম কি কাঠ ফেড়ে দিতে। দিয়ে দাও একটা আংরা।” পণ্ডিতানী নাকমুখ খিচাইয়া বলিলেন-“ধৰ্ম্ম-কর্ম আচার-নিযম সব গােল্লায় গেল, মুঢ়ীমেথর চামার যে সে একেবারে বাড়ীর ভেতর চলে

माडि
আসে। একি হিন্দুর ঘর না মুসলমানের
সরাইখানা? বলে দাও
হতভাগাকে চলে যেতে ; নইলে মুখ পুড়িয়ে দেব।
পুড়িয়ে দেব। ভাল করেই
আগুন দেব।”
পণ্ডিতজী পত্নীকে যথেষ্ট ভয় করিতেন। তবু অবুঝকে বােঝাইবার
মত করিয়া বলিতে লাগিলেন, “তােমার কোন জিনিষ ত ছােয়নি;
উঠোনেই শুধু পা দিয়েছে। মাটি ত আর অশুদ্ধ হয় না। সকাল
থেকে আমাদেরই কাজ করছে। মজুর ডাকলে চার চার আনা
পয়সা বেরিয়ে যেত। তাও আবার ঐ গাঁট, দিয়ে দাও না একটু
আগুন।”
পণ্ডিতানীর রাগ আর পড়ে না। তিনি কণ্ঠস্বর পঞ্চমে চড়াইয়া
জিজ্ঞাসা করিলেন-“ভেতরে এলাে কেন? বাইরে থেকে চাইতে
পারত না?”
-বরাত মন্দ, আর কেন ?
-আচ্ছা, এবার দিয়ে দিচ্ছি। ফের যদি তুমি ছত্রিশ জাতকে
বাড়ী ঢােকাবে, ত মজা টের পাওয়াব।
দুখীর কানে সব কথাই যাইতেছিল। সে ভাবিতেছিল-সত্যই
ত! পণ্ডিতবাবার বাড়ীর ভিতরে ঢােকাটাই তার অন্যায় হইয়াছে।
তাহা হইলে চামারে ব্রাহ্মণে পার্থক্য রহিল কোথায় ? এরা ছোয়া-
চুত মানিয়া আলাদা আলাদা থাকেন বলিয়াই ত এত মানা।
সঙ্গে বাস করিয়া চুল পাকাইয়া ফেলিলাম, কিন্তু বুদ্ধি আর
পাকিল না।
পণ্ডিতানী আংরা লইয়া আসিতেই দুখী যুক্তকরে ভুমিতে শির
লুটাইয়া ক্ষমা চাহিতে লাগিল—“বড় ভুল হয়ে গেছে মাইজী, একেবারে
রান্নাঘরের পাশে এসে গেছি। চামারের আর কত বুদ্ধি হবে।
এদের

পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গল্প ৯২ এই জন্যেই ত লাথি ঝাটা আমাদের কপালে আর ঘুচে না। এই বারটি মাপ করাে- পণ্ডিতানী চিমটা করিযা আগুন আনিয়াছিলেন। দীর্ঘ অবগুণ্ঠনের অন্তরালে দুখীকে এক ঝলক দেখিয়া লইযা, পাঁচ হাত দুর হইতে তার দিকে কয়লা ছুড়িযা মারিলেন। বড় একটি আংরা দুখীর মাথায় আসিযা ঠেকিল। তাড়াতাড়ি দুই পা পিছাইয়া গিযা দুখী পােড় জায়গায় হাত বুলাইতে লাগিল। ভাবিল, এক পবিত্র ব্রাহ্মণের ঘর অপবিত্র করার ফল হাতে হাতে পাইয়াছি। এই জন্যই ত ললাকে ব্রাহ্মণদের এত ভয করে। আর সকলের টাকা কড়ি মারি লােক পার পাইযা যায় কিন্তু ব্রাহ্মণের এক পয়সা রাখিয়া দিলে মহাব্যাধিতে হাত পা গলিয়া গলিয়া পড়ে। সারা পরিবার উচ্ছন্ন যায়। বাহিরে আসিয়া দুখী তামাক খাইল। তারপর আবার কুড়াল লইয়া পরমেশ্বরের মত অক্ষয অব্যয় কাষ্ঠ-গ্রন্থিকে ছিন্ন করিবার চেষ্টা করিতে লাগিল। কিন্তু যা জোয়ান যজমানগণ যা পারেন নাই, অর্ধাশনজীর্ণ সারাদিনের উপবাসে ক্ষীণ ঘাসিযারা সেখানে কি করিতে পারিবে। গাঁট তেমনি গ্যাট হইযা রহিল, এ দিকে দুখী ক্ৰমে অবসন্ন হইয়া আসিতে লাগিল। দুখীর মাথায় আগুন পড়িয়া যাওয়াতে পণ্ডিতানী কিঞ্চিত লজ্জিত হইয়াছিলেন। বেচারীর কাকুতিমিনতিতে তাহার মন আরও নরম হইয়া পড়িয়াছিল। পণ্ডিতজী ভােজন সমাপ্ত করিয়া উঠিতেই বলিলেন- “ওকে কিছু খেতে দিতে হয়। সেই সকাল থেকে কাজ করে যাচ্ছে।” পণ্ডিতজী বলিলেন-“বাড়তি কী হবে কিছু?” -তাহৰে দুচারখানা।

সময় -দুচার থানায় ওদের কি হয। চামার হচ্ছে, সের খানেক আটার রুটা ত খাবে নিশ্চয়ই। আহারের পরিমাণ শুনিতেই, পণ্ডিতানীর দধর্ম অঙ্কুরে বিলুপ্ত হইল। কানে হাত দিয়া বলিলেন-“ও বাবা, একসের? কাজ নেই তবে, থাক।” এবার পণ্ডিতজীর দপ্রদর্শনের পালা। বলিলেন—“আটার ভুসি আছে ত? অল্প আটাব সঙ্গে বেশ খানিকটা ভুসি মিলিয়ে গােটা পাঁচসাত টিকর তৈরী করে দাও। নুন দিযে খেযে নেবে এখন। পণ্ডিতানীর ক্ষণিক সহৃদযতা সম্পূর্ণরূপে উবিয়া গিয়াছিল। তাচ্ছিল্য সহকারে বলিলেন-“থাকগে। কে আবার আগুন তাতে মরতে যায়।” এক চিলিম তামাকের জোরে পুরা আধঘণ্টা কুড়াল চালাইল। কিন্তু মহেন্দ্রের বর্জও বুঝি গাঁটে ঠেকিলে ব্যর্থ হইযা ফিরিত। মাথা ঘুরিতে ঘুরিতে দুখী বসিযা পড়িল। কিছুক্ষণ পরে সেই গৌড়, যাহার বাড়ী হইতে সে তামাক ও চিলিম সংগ্রহ করিযা আনিয়াছিল, সেখানে আসিয়া উপস্থিত হইল। বলিল-“কেন নাহ’ক প্রাণটা দিচ্ছ খুড়ে ? ও গাঁট চেব তােমার কৰ্ম্ম নয়।” দুখী প্রায-অবশ হাতে মাথার ঘাম মুছিতে মুছিতে বলিল, “এখনও অনেক কাজ বাকী। আরাে এক গাড়ী ভুসি এই এলাে। সে গুলাে ভুসির ঘরে নিয়ে যাবার হুকুম হযেছে।” —কিছু খেতে দিযেছে কি? না অমনি খাটিয়েই নিচ্ছে? গিযে চেয়ে নিতে হয়। ওরা হাড়কিপ্টে ; অমনি যে তােমাষ সেধে দিতে আসবে সে ভরসায় থেকো না।

পৃখিবীর শ্রেষ্ঠ গল্প গাতে জিভ কাটিয়া দুখী বলিল-“ও রকম করে বলতে নেই বাবা। ব্রাহ্মণের কটা কি আমদের হজম হয় ?” গৌড় বলিল—“হজমের ভাবনা পরে। আগে পেটে পড়ক ত। খেয়ে দেযে গোঁফে তা দিযে আরাম কচ্ছেন, তােমার ওপর ঢালা হুকুম, কাঠ ফেড়ে দে। যেন চৌদ্দ পুরুষের কেনা গােলাম। এমন যে জমিদার সেও ব্যাগার খাটালে কিছু খেতে দেয়। জজ মাজিষ্টরও কাজ করিয়ে মজুরী দেয়। বামুন ব্যাটারা যে কশাইয়ের এককাঠি ওপরে যাচ্ছে।” দুখী সন্ত্রস্ত স্বরে বলিল-“চুপ কর। আমার সারা দিনের মেহনত মাটি করবি?” কথা বাড়িবার অবকাশ না দিয়া দুখী আবার সেই গাঁট লইয়া পড়িল । কিন্তু দুই টুকরা হওয়া ত দূরের কথা, উহাতে সামান্য চিরও পড়িল না। গৌড় তখনও দাঁড়াইয়াছিল। দুখী ধুকিতেছে দেখিয়া তাহার দয়া হইল। তাহার হাত হইতে কুড়াল খানা লইযা সে প্রাণপণে চালাইতে লাগিল। কিন্তু বৃথা চেষ্টা। তেমন গ্রন্থিছেদক বােধ হয় ফরমাশ দিয়া তৈরী না করিলে পাওয়া যায় না। কিছুক্ষণ দমাদম আঘাত করিবার পর সে কুড়াল ফেলিয়া দিল। পরিশ্রমের ফলে তার মেজাজে আরও উত্তাপ সঞ্চারিত হইয়াছিল। যাইতে যাইতে বলিল—“প্রাণটা দিযেই যাও খুড়াে, একেবারে সােজা স্বগগে পৌছে যাবে।” দুখী করুণ নেত্রে সেই নির্বিকার অটুট গাটের দিকে চাহিয়া রহিল। শেষকালে উঠিযা পড়িয়া ভাবিল—“আগে ভুসিগুলো ঘরে নিয়ে যাই। কাল এসে গাঁট ফেড়ে দিয়ে যাব। সেই সকালে বাড়ী থেকে বেরিয়েছি, কাজকর্ম সব পড়ে আছে। চুমী বােধ হয় তার মামার বাড়ী থেকে এতক্ষণে এসে পৌঁছে গেছে। কিন্তু সে হ’ল কনে, সে ত আজ তার মাকে मालकि বেশী সাহয্য করতে পারবে না। একা একা ঝুরিকেই খাটতে হচ্ছে। দুখী ধামা লইযা ভুসি বহিতে আরম্ভ করিল। ভুসির ঘরও বেশ দূবে। এক বােঝ পৌছাইয়া আসিতে মিনিট দশ লাগি যায। ধামা পুরাপুরি ভরিষা নিলে দুখী তাহা আর মাথায় উঠাইতে পারে না। তাই অল্প অল্প করিয়া লইয়া যাইতে লাগিল। যখন ভুসি বহন শেষ হইযাছে তখন চারটা বাজে। দিবা-নিদ্রা হইতে উঠিযা চক্ষু মুছিতে মুছিতে পণ্ডিতজী মহাবাজ বাহিরে আসিযা দর্শন দিলেন। —অ্যা, দুমুঠো ভুসি ওঠাতে তুই দিন কাবাব করে দিলি দুখি? একেবাবে কোন কৰ্ম্মের নস দেখছি। কাঠও ত তেমনি পড়ে আছে। যেমন তাের সেবাভক্তি, তেমনি বিযেব দিনক্ষণ হবে। কুতুলখানা নিয়ে গাঁটটা চিরে ফেল। দুখী আবাব কুড়াল উঠাইল। কাল আসিযা ফাড়িযা দিবার কথা মুখ হইতে বাহির করিতে পাবিল না। মেযেব ভাগ্য যে ব্রাহ্মণ দেবতাদেরই হাতে। যেমন চান করতে পারেন। ভাল করে দেখে শুনে লগ্ন স্থির না করলে মেযেব কপালে সুখ হবে না। কন্যাব ভবিষ্যৎ ভাবিয়া মেহার্ভ হৃদয় পিতা, মৃত্যুর সঙ্গে যেন বাজী বাখিযা কুড়াল চালাইতে লাগিল। পণ্ডিতজী নিকটে আসিযা আরাে জোন হেঁইযাে’ ‘আউরভী জোরে হেঁইযাে’ বলিযা সাহায্য করিতে লাগিলেন। দুখীর যেন আর হুশ ছিল না। কোথা হইতে হঠাৎ শরীরে অসুরের সঞ্চারিত হইযাছে। শান্তি ক্লান্তি বিন্দুমাত্র নাই। যজ্ঞের মত কোপের পর কোপ মারিতে মরিতে হঠাৎ কখন গাঁট দ্বিখণ্ডিত হইযা গেল, সঙ্গে সঙ্গে কুড়াল হাত হইতে দূরে ছিটকাইয়া পড়িল, দুখীও হুমড়ি খাইয়া মাটিতে পড়িয়া গেল। হাত পা একটু প্রসারিত হইল। বার দুই দুখী ভূমিতে গড়াইল, তারপর তাহার চক্ষুর তারকা কপালে উঠিয়া স্থির হইল। বল পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গল্প পণ্ডিতজীর এদিকে খেয়াল ছিল না। তিনি গাঁট খণ্ডিত হইতে দেখিয়া উল্লসিত চিত্তে বলিতেছিলেন-“বেড়ে জোয়ান, সাবাস। দেখতে লিক লিকে হলে হবে কি, গায়ে জোর আছে। এবার আর দু এক হাত লাগিয়ে দে-ছােট ঘােট চ্যালা হয়ে যাক।” দুখী উঠিল না। পণ্ডিতজীর দয়া হইল। আহা বেচারী একটু গড়াইয়া আরাম করুক। তিনি ভিতরে চলিয়া গেলেন। ভিতরে গিয়া পণ্ডিত ঘাসীরাম শৌচে গেলেন, স্নান করিলেন ও একলােটা ভাঙ, উদরস্থ করিলেন। তারপরে পণ্ডিতী পােষাক পরিয়া বাহিরে আসিয়া দেখিলেন, দুখী তেমনই পড়িয়া আছে। জোরে হাঁক দিলেন-“ওরে ও দুখিয়া, কতক্ষণ আর ঘুমবি। উঠ, এবার তােরই ওখানে যাচ্ছি। চল, চল আর দেরী করিসনে।” দুখী নড়েনা দেখিয়া এবার পণ্ডিতের কিছু ভয় হইল। নিকটে দেখেন দুখীর হাত পা কাঠের মত সটান হইয়া আছে। এবার ব্যাপার বুঝিয়া উদ্ধা শ্বাসে বাড়ীর মধ্যে ঢুকিয়া স্ত্রীকে ডাকিলেন, “শুনছ, দুখিয়া ত মরে গেছে মনে হচ্ছে।” ভয়ে পণ্ডিতানীর মুখ শুকাইল, চকু কপালে উঠিল। বলিলেন, “এই ত একটু আগে কুতুলের আওয়াজ পাচ্ছিলাম। এর মধ্যে কি হয়ে গেল ?” কুল মারতে মারতেই মরে গেল। এখন উপায়? পণ্ডিতানী ততক্ষণে একটু সামলাইয়া লইয়াছেন। -উপায় আবার কি? চামার পাড়া খবর দাও। লাশ উঠিয়ে নিয়ে যাক এসে। বিদ্যুবেগে চারিদিকে খবর ছড়াইয়া পড়িল। ঐ এক ঘর গৌড় বাদ দিলে গ্রামে আর সবই ব্রাহ্মণ। লােক ঐ পথে আসাই ছাড়িয়া দিল। যে বাড়ীতে চামারের শব রহিয়াছে, তাহার দুষিত হওয়া নাকে গেলেই জাত যায়। অথচ গ্রামের একমাত্র কুয়ার পথ এই দিক দিয়াই। জল হইলেও একদিনও চলিবে না। এক বৃদ্ধা ব্রাহ্মণী নাকে কাপড় গুজিয়া বাহিরে দাড়াইয়া হাঁক লাগাইল-“দুখিয়ার লাশ সরানা যে? গাঁয়ের লােক কি আজ জল নিতে কুয়ােয় আসবে না?” এদিকে গৌড় দুখিয়ার গ্রামে পৌছিয়া সব চামারকে সাবধান করিয়া দিল—“খবরদার, লাশ উঠাতে কেউ যাবে না! এখুনি পুলিশ আসবে। ব্যাটা কশাই এক গরীবের প্রাণ নিয়েছ। হাতকড়ি পরে হাজতে গেলেই বামনাই বেরিয়ে যাবে। মড়া ছুলেই তােমাদের বিপদ বলে দিচ্ছি।” গৌড় চলিয়া যাইবার পরেই পণ্ডিতজী আসিয়া উপস্থিত। কিন্তু চামারেরা কেহ অগ্রসর হইল না। শুধু দুখীর স্ত্রী কপালে করাঘাত করিতে করিতে পণ্ডিতজীর বাড়ীতে গিয়া পৌছিল। তাহাদের সঙ্গে ক্রমে আরাে দু’একজন চামারণী আন্সিয়া জুটিল। তাহাদের বুকফাটা কান্নায় বামুনপাড়ার আকাশ বাতাস শােকাকুল হইয়া উঠিল! অর্ধরাত্রি পর্যন্ত হাহাকার কান্নাকাটি চলিল। ব্রাহ্মণ-দেবতাদের পক্ষে নিদ্রা যাওয়া হইয়া পড়িল। কিন্তু তবু লাশ উঠাইতে কোন চামার আসিল । ব্রাহ্মণ মানুষ চামারের মৃতদেহ কি করিযা স্পর্শ করিবেন? কোন শাস্ত্রে লেখা আছে ? পণ্ডিতানী অবিশ্রাম হাহাকার শুনিয়া অতিষ্ঠ হইয়া উঠিয়াছিলেন। আপন মনে বকিতে লাগিলেন—“বলিহারি এদের গলা। সেই এক নাগাড়ে সন্ধ্যে থেকে চেঁচিয়েই যাচ্ছে-“তােদের বাপু এত দরদ কিসের? দুদিন বাদেইত আবার বিয়ে করবি। দুচারবার হাঁক ডাক দিলি, বাস হয়ে গেল। তারপর ঘরে গিয়ে শশা। তা না, গলাবাজী করেই যাচ্ছে। আদিখ্যেতা দেখে আর বাচিনে।” মড়া কান্নার মধ্যেই ঢুলিতে ঢুলিতে পণ্ডিতানী কখন ঘুমাইয়া পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গল্প পড়িয়াছিলেন। প্রভাতে যখন ভাঙিল, তখন দেখিলেন, ঝুরিয়া বা তাহার কন্যা কেহ নাই। দুখিয়ার লাশ সেখানেই পড়িয়া আছে। ঝুরিয়া একখানা হেঁড় কম্বল চাপাইয়া গিয়াছে। পণ্ডিতজী আর কি করেন। যদিও শাস্ত্রে লেখা নাই, তবু গােৰু বাঁধিবার দড়ি বাহির করিলেন। লাশের পা দুখানা দড়ি দিয়া মজবুত করিয়া বাধিয়া টানিতে টানিতে গ্রামের বাহিরে লইয়া গেলেন। গাে- ভাগাড়ে ফেলিয়া আসিয়া স্নান করিয়া, গঙ্গাজল স্পর্শ করিয়া শুদ্ধ হইলেন। ব্ৰহ্মণের সেবাধিকার লাভ করিয়া, ব্রাহ্মণসেবায় জীবনপাত করিয়া, অন্তিমে ব্রাহ্মণ-দেবতার স্পর্শ পাইয়া দুখিষা চামারের অক্ষ্য সদগতি হইল সন্দেহ নাই।

পৌষের রাত হন্তু, আসিযা স্ত্রীকে বলিল—সহনা এসেছে! যে টাকা তাের কাছে রেখেছিলুম এনে দে। ওব হাত থেকে ত বাঁচি। মুন্নী ঝাট দিতেছিল। পিছন ফিবিযা বলিল, “তিনটি ত মাত্র টাকা। ওকে দিয়ে দিলে কম্বল কিনবে কোখেকে? পৌষ মাষের রাতে ক্ষেত পাহারা দেওয়া কি চাট্টিখানি কথা? শীতে জমে পাথব হয়ে যাবে যে। ওকে বলে দাও এখন নেই। ফসল কাটা হলে পব পাবে।” হন্তু কিছুক্ষণ চিস্তিতমুখে দাঁড়াইয়া বহিল। শিয়রে শমনের মত পৌষ আসিযা পৌছিয়াছে, কম্বল না হইলে দারুণ শীত কিছুতেই বাগ মানিবে । কিন্তু জমীদারের পাইকই কি এমনি বাগ মানিবে? ধমক দিবে, গাল দিবে, শেষকালে হয়ত আদালতের পিযাদা লইয়া হাজির হইবে। শীতের কথা পরে, আগে এই যমদূতের হাত হইতে ত নিস্তার পাই। ভাবিয়া-চিন্তিযা হন্তু পুনরায স্ত্রীর কাছে গিযা অনুন্য করিতে লাগিল, “দিয়ে দে না যা আছে। কম্বলের জন্য অন্য ব্যবস্থা হবে।” মুন্নী একটু দূরে সরিয়া গিয়া চোখমুখ ঘুরাইয়া বলিতে লাগিল, হলেই হয়েছে। একটু শুনতে পারি, কি ব্যবস্থা করে রেখেছ। দান খাবাতের আশায আছ নাকি? এখানে ওখানে এত ধারকর্জ হযেছে যে এখন কোথাও হাত পাতলে পাবে সে আশা আর নেই। কতদিন থেকে বলছি চাষবাস ছেড়ে দাও। বছর ভাের দিনরাত খেটে খেটে দু'চার মন ঘরে আসতে না আসতেই পাওনাদার হেঁকে ধরে। জমীদারের বকেয়া, সুদের ওপর সুদ, দোকানদারের বাকী সব মিটিয়ে দু’চার দানাও বাঁচে । উপােষের কপাল আর এজন্মে ঘুচল না। তার চেয়ে দিন মজুরী পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গল্প ভাল। নিত আনি নিত খাই, বাকী বকেয়ার ধার ধারিনে। অমনি ক্ষেতির মুখে আগুন। যাও যাও, টাকা পাবে না।” হন্তু যদিও ফুযে উড়িবার মত হাল্কা শরীর নয়, তবু স্ত্রীর কথায় দমিয়া গেল। ভয়ে ভয়ে বলিল, “তবে আমাকে গাল খাওযানােই তাের ইচ্ছে।” মুন্নী গরম হইযা বলিল, “কেন গাল দেবে? মগের মুল্লুক নাকি?” বলিযাই এমন ভাব ধরিল যেন স্বর্যম্ একবাব বােঝাপড়া করিয়া লইবে। কিন্তু পাওনাদারের, জমীদারের পাইক পেয়াদাব রকম-সকম সে জানে। ভালােমানুষ স্বামীটির মত তাহাবা ধমকে টলিবে না। সে একটু ইতস্ততঃ করিল, দু'ফোটা চোখের জল ফেলিল ; শেষকালে কুলুঙ্গী হইতে নেকড়ায বাধা টাকা তিনটি আনিযা চোখ মুছিতে মুছিতে স্বামীর হাতে দিল। হ টাকা দিয়া ফিরিষা দেখিল মুমী পা ছড়াইযা বসিযা কঁদিতেছে, কান্নার ফাকে ফঁাকে গালি পাড়িতেছে। হল্করও কান্না পাইতেছিল। এক এক পয়সা করিযা জমাইয়া, আট নয় মাসে তিনটি মাত্র টাকা হইযাছিল। তাহাও গেল। সামনে দুর্জয শীত। এবারও শুধু একখানা চাদর ও কযেক ছিলিম তামাক সম্বল করিয়া রাতে খেত পাহারা দিতে হইবে। কিন্তু আর যেন সহেনা। ব্যসের সঙ্গে সঙ্গে রক্তের তেজ কমি আসিতেছে ; শতচ্ছিন্ন তালি দেওযা সামান্য সুতী চাদরে আব কিছুতেই কুলায় না । পৌষের প্রখর রাত্রি। মানুষের কথা, কি, শীতের প্রতাপে আকাশের তারাগুলি পৰ্য্যন্ত থরহরি কঁপিতেছে। হল্ক খেত পাহারা দিতেছে যেমন প্রতি বৎসর দেয়। নাহলে নীল গাইয়ের পাল আসিয়া এক রাত্রির মধ্যেই পৌবের রাত সব উজাড় করিয়া দিবে। খেতের এককোণে পাতা দিয়া তৈরী এক ছাতা বাঁশের হাতলের উপর বসান। তাহারই নীচে বাঁশের তৈরী খাটিয়া ! তাহার উপর হন্তু আপনার মলিন ছিন্ন চাদরখানা গায়ে দিয়া আচ্ছন্নের মত পড়িয়া থাকে। নিদ্ৰা আসিবে সে ভয় নাই। এমন তীব্র শীত যে, সর্বাঙ্গে যেন বিদ্যুতের কশা হানিয়া' চেতনাকে সদা কম্পমান করিয়া রাখে। খাটের নীচে হল্কর কুকুর জব্বরেরও সেই দশা। বেচারী এখন বার্ধক্যের প্রান্তে আসিয়া পৌছিযাছে। গায়ের লােম পাতলা হইয়া গিযাছে। । সুতরাং শীতের আক্রমণে সেও কম কাহিল নয়। তার উপর, অনশন অর্ধাশনে সে প্রভুর সমভাগী। গ্রামে বাহির হইয়া কাড়াকাড়ি মারামারি করিযা পেট ভরাইবে সে ব্যস নাই ; প্রভু পরিবর্তনও এখন সম্ভব নয়। হাড় বাহির করা কুকুরকে কে আদর করিযা আশ্রয় দিবে? সুতরাং জব্বর কুণ্ডলী পাকাইয়া, পেটের গহ্বরে মুখ পুরিয়া দিয়া, খাটিয়ার নীচে পড়িয়া আছে ; মাঝে মাঝে কুঁকু করিয়া শীত ও অনশন-জর্জর প্রাণের কাতরতা ব্যক্ত করিতেছে। নিদ্রার সুখ প্রভু ভৃত্য কাহারও ভাগ্যে নাই। হল্ক, এতক্ষণ সটান শুইয়াছিল। এখন হাঁটু দুইটি গলার কাছে টানিয়া আনিয়া জব্বরের মতই কুণ্ডলী পাকাইল। তারপর খাটিয়ার ছিদ্র পথে নিচের দিকে চাহিল। জব্দর মাঝে মাঝে কুঁকু করিতেছে, তারপর কুণ্ডলীকে আরাে ছোট করিবার চেষ্টা করিতেছে। কিছুক্ষণ চাহিয়া খাকি হৰু বলিল, “খুব শীত না রে জবরা? তখন বন্ধুম ঘরে খড়ের উপর শুয়ে থাক, সে কথা ত শুনলিনে। কেন যে সব জায়গায় আমার আগে আগে চলে আসিস। এখন মর শীতে কেঁপে।” অবয়া শুইয়া শুইয়াই কুণ্ডলীর পার্শ্বস্থ লেজ যৎসামান্য নাড়িয়া দিল, কুঁকে দীৰতর করিল, একবার হাই তুলিল এবং প্রভুর সমেহ অনুযােগের জবাব হইয়াছে মনে করিয়া তাপ চুপ করিল। ;

পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গল্প ১০২ হন্তু নিচের দিকে হাত গলাইয়া দিয়া জব্বরের পেটে হাত বুলাইল, আর বলিতে লাগিল, “কাল থেকে আর আসিসনে, খবরদার! নইলে আর ফিরে যেতে হবেনা : শীতে জমে যাবি। বাপরে বাপ, কি শীত।” বলিয়া হৰু, উঠিল, এক চিলিম তামাক সাজিল। আট চিলিম ইতিমধ্যেই হইয়া গিয়াছে। বলিতে গেলে, শীতের বিরুদ্ধে এই ত এক সম্বল। চিলিমে দম দিতে দিতে হল্ক ভাবিতে লাগিল : ক্ষেত করার এই ত সুখ। তাও যদি পেট ভরে খেতে পেতাম। সবই বােধহয় ভাগ্যে খেলা। আমার গায়েই কতলােক আছে, শীত যাদের কাছে গিয়ে গরমের ভয়ে পালিয়ে আসে। লেপ তােষক কম্বল কত কী আযােজন। আব আমি? কী কপাল করেই এসেছিলাম। ততক্ষণে জব্বরও উঠিয়া, খাটিয়ার নিচ হইতে বাহিরে আসিয়া বসিযাছে হৰু বলিল, “কি রে খাবি নাকি এক টান? এতে শীত যে তেমন কমে তা নয়, তবে হ মনকে আঁখি ঠারা বটে। আচ্ছা, কাল তাের জন্যে বাড়ী থেকে খড় নিয়ে আসব। আজ রাতটা কোন রকমে কাটিয়ে দে বাবা।” জব্বর এবার হল্কর পাশে আসিয়া গা ঘেসিয়া বসিল। যতক্ষণ না হলকুর তামাক খাওয়া শেষ হইল, ততক্ষণ এইভাবেই বসিয়া রহিল। চিলিম রাখিয়া দিয়া হল্ক, আবার খাটিয়া আয় করিল। এবার সে খুমাইবেই। শরীরে যে একটু উত্তাপ সঞ্চারিত হইয়াছে, তাহা উবিয়া যাইবার আগেই ঘুম আসা চাই। কিন্তু চিলিমে প্রভাব যেন চক্ষের পলকে অন্তর্হিত হইল। একটু পাশ ফিরিতে না ফিরিতেই আবার সেই ঠকঠক কাপুনি। শীত যেন নাম না জানা এক দৈত্যের মত বুকে চাপিয়া বসিয়াছে, নিঃস নিশাস লইতেও - কষ্ট হয়।

পৌরে কোন মতেই যখন ঘুম আসিল না, তখন হৰু আবার উঠিল, জবরকে আস্তে আস্তে খাটিয়াব উপর তুলি নিজের বুকের কাছে শােযাই। সাবান-মাখা কুকুর ত ন , সুতরাং ইহজন্মে স্থান না করার ফলে যে পরিমাণ দুর্গন্ধ তাহার গাযে পুঞ্জীভূত হইযাছে, নিঃশ্বাসের সঙ্গে সঙ্গে তাহার এক চাপ হন্ডুর নাকের মধ্যে ঢুকিতে লাগিল। কিন্তু জব্বরের দেহ হইতে সামান্য উত্তাপও হল্কর দেহে সঞ্চারিত হইতেছিল। সেই একবিন্দু আরামের লােভে হন্ধু, দুর্গন্ধকে গ্রাহ করিল না। আর জব্বর? সে ত আহলাদে আটখানা হইযা কি যে করিবে, কি করিলে মনিবেব আত্মীয়তার প্রতিদা যথেষ্ট কৃতজ্ঞতা প্রকাশ হইবে, যেন ভাবি পাইতেছিল না। একবার চাটে, পরক্ষণে প্রবলবেগে লেজ আন্দোলন করে, তাবপরে উৎসাহে প্রবল তােড়ে খাটিযা হইতে লাফাইয়া কাল্পনিক শত্রুব অভিমুখে সবেগে স” ( ধাবমান হ্য, লাফাইযা ঝাপাইযা চেঁচামেচি করিযা খাটিযায় আরােহণ করে। কিছুক্ষণ এইভাবে চলিল, তারপরে যেন প্রান্ত হইযাই হক্ব গা ঘেসিযা কুণ্ডলী পাকাইয়া শুইয়া বহিল। একঘণ্টা চুপচাপ কাটিল। রাত্রি প্রায় চারিটা। ঘুম আসিবার সম্ভাবনামাত্র ছিলনা। দুই প্রাণী জীবন্মতবৎ পাশাপাশি পড়িয়া আছে। এখন একটু একটু হাওযা দিতে লাগিল, সঙ্গে সঙ্গে শীত দেহের নিভৃততম প্রদেশে প্রবেশ করিয়া অভ্যন্তরস্থ যন্ত্র সমূহকে যেন থামাইয়া দিবার উপক্রম করিল। আর ত কোনমতেই পড়িয়া থাকা যায় না। হক, উঠিয়া বসিল বুকে হাঁটু দুইটি লাগাইয়া তাহার মধ্যে মাথা ওজিল। কি খিৰয় তে গল্প অবস্থান পরিবর্তনে অবস্থা বদলায় না। পলকের মধ্যে যেই সেই। মনে হইতে লাগিল, রক্তস্রোত বুঝি বন্ধ হইয়া গিয়াছে, তরল প্রাণধারা দইয়ের মতে জমিয়া ধমনীতে থমকিয়া দাড়াইয়াছে। হা ঈশ্বর, আজকের কাল- রাত্রি কি কাটিবে না! শীত-সমাধিই শীত-সমাধিই বুঝি ভাগ্যে আছে। হল্ক গড়াইয়া পড়িল, ছাতার বাহিরে আসিয়া আকাশের দিকে চাহিয়া রাত কত বাকী ঠাহর করিতে লাগিল। সপ্তর্ষি এখনও অর্থপথ অতিক্রম করে নাই, মধ্যগগনে পৌছিতে পৌছিতে একপ্রহর এখনও লাগিবে। দীর্ঘশ্বাস ফেলিয়া গন্তু আবার তামাক সাজিতে বসিল। ঘুটে ধরাইবার সময় অকস্মাৎ কি মনে পড়িতেই চমকাইয়া উঠিল। এতক্ষণ এই সামান্য কথাটি তাহার কেন স্মরণ হয় নাই, তাহা হইলে কি এমন দুর্ভোগ কপালে ঘটিত। হন্তু তামাক সাজা রাখিয়া ত্বরিতপদে যেত পার হইল, রাস্তার পাশের জঙ্গলে প্রবেশ করিয়া রাশি রাশি শুকনাে পাতা চাদরে বাঁধিয়া এইয়া আসিল। যথেষ্ট হইবে না মনে করিয়া আবার গেল, আবার এক বােক লইয়া ফিরিল। তারপরে আমাক সাজিয়া খেত হইতে রশিটাক দুরে ধূনী আলিয়া আরাম করিয়া বসিল ; দশ পাঁচটি করিয়া পাতা আহুতি দিতে দিতে “জঠরেণ হুতাশন” সেবন করিতে লাগিল। ধমনীর শােণিত- প্রবাহে আবার ধীরে ধীরে জীবন-চাঞ্চল্য সঞ্চারিত হইল। পাতা জালাইতে আলাইতে স্মরণ হইল, পাশেই অড়হরের ক্ষেতের কথা। হন্তু আবার উঠিয়া গেল, গােটা দশ বারাে গাছ উপড়াইয়া লইয়া আসিল। অববরের ভাগ্যও খুলিয়া গিয়াছে। পাতা সংগ্রহ কালে সে একস্থানে দুইটি হাড় আবিষ্কার করিয়াছিল। এর পুলকিতচিত্তে তাহাই মুখে করিয়া লইয়া আসিয়াছে ও পরম পরিতৃপ্তিভরে, আগুনের পাশে বসিয়া তাহাই দিবা খাইতেছে। মাঝে মাঝে হাড় মাটিতে রাখে, বার কয়েক পৌষেয় গত কুঁ করে, আবার অধিতে মন সন্নিবেশ করে। এবারকার ইতে শীতার্তের কাতরানি নয়, বেশ আরামের আমেজ পাওয়া যাইতেছে। হাওয়া আগের চেযে সামান্য জোরে বহিতেছে কিন্তু বরফের চুরীর মত বিধিতেছে না। বরং অগ্নিতাপে সমস্ত ইন্দ্রিয় আচ্ছন্ন অবস্থা হইতে জাগিয়া উঠায়, হন্তু এখন রাত্রি শেষের ধীর-সমীরণ-বাহিত মেহদীকুলের সুগন্ধ সম্বন্ধে সচেতন হইয়া উঠিল। চিলিম নামাইয়া রাখিয়া ক্ষণকাল সে মুখ বন্ধ করিয়া নাক দিযা হাওয়া হইতে গন্ধ শুকিতে লাগিল। কি মৃদু-মধুর সুবাস। খালি পাযে শিশিরসিক্ত ঘাসের উপর দিযা যাতায়াত করাতে, তাহার পা দুখানি যেন অসাড় হইয়া গিয়াছিল ; উত্তাপ-সান্নিধ্য হেতু ধীরে ধীরে তাতে জীবন সঞ্চারের সঙ্গে সঙ্গে ঝিন ঝিন করিয়া এক সূচ ফোটানাে অনুভূতি হইতেছে, কিন্তু ফুলের মদির সুবাসে, তাহা যেন গাযেই লাগিতেছে না। -কিরে জবরা, এখন ত শীত কচ্ছে না? জব্বর মিঞার চিরকাল যদিও একই ভাষা—সেই সনাতন আদি ও অকৃত্রিম ঝুঁকুঁ, তাহার রকম ফের আছে, গমক ঠমক, দীর্ঘ হ্রস্থ, উচু নিচু পর্দা আছে। তার উপর আনুষঙ্গিক পো ধরিবার পক্ষে লেজ খানাও কম কাৰ্যকরী নয়। সে সকল অস্ত্র একসঙ্গে প্রয়োেগ করিয়া প্রবলবেগে প্রতিপন্ন করিল,শীত? সে বেটা আবার কে? নাম শুনিনি ত ? অবশ্য একটা সূক্ষ্ম অর্থবােধ হন্ডুর মত ছিলনা। সে মােটের উপর বুঝিল জব্বার আর শীতে কাবু নহে, সে এবার যেন আপন মনে বলিয়া উঠিল, “চাষার বুদ্ধি কি না; এতক্ষণ একথাটাই মনেই হয়নি। নইলে এই দুর্ভোগ?••আচ্ছা অবয়া, লাফ দিয়ে ধূনী পার হতে পারিস?” এই বলিয়া হল অঙ্গুলি সঙ্কেতে কি করিতে হইবে বুঝাইয়া দিল। ৰােয় মানবিক ভাষায় জবরের দখল সন্ধে সংশয় থাকাতেই ইজিতের • পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গল্প সহায়তা লইতে হইল। জব্বর গম্ভীর নেত্রে, দীর্ঘ মুখখানা আর একটু দীর্ঘ করিয়া অগ্নিরাশির পরিমাপ করিল, তারপর মিটমিট করিয়া বারকয়েক হকুর পানে চাহিল। তাহার অর্থ কি এই কাল মুন্নী বিবির কাছে ত কথাটা ফাস করিবেনা, নইলে অনেক দুর্গতি কপালে লেখা আছে অন্তত, হল সেই রকম বুঝিল। বলিল, “না না বলবােনা, ভয় নেই একবার তুই লাফ ত দে। দেখি গায়ে কি রকম জোর আছে”—বলিয়া হল আর একবার অঙ্গুলি-সঙ্কেতে কর্তব্য নির্দেশ *করিল। জবরা একটু ইতস্তত করিয়া কয়েক পা পিছাইয়া গেল, এবং ঠিক উপর দিযা না হইলেও, একলাফে ধূনী পার হইল। হল চেঁচাইযা উঠিল, “সাবাস বাহাদুর !” জব্বর ওপাশ হইতে আর লাফ দিলনা। পেটে আগুনের আঁচ লাগিয়াছিল, কিছু লােম পুড়িয়া গিয়াছিল। আস্তে আস্তে ধূনী প্রদক্ষিণ করি প্রভুর পাশে আসিয়া বসিল। পাতা সব জ্বলিয়া গিয়াছে, অড়হরের গাছগুলিও। রাত্রি এখনও ঘণ্টা দুই বাকী। পাশের জঙ্গলে এখনও ঘাের অন্ধকার। বড় বড় গাছগুলি যেন মাথার সাহায্যে অন্ধকারের আকাশবিলম্বিত পাখানাকে টাঙ্গাইয়া রাখিয়াছে। হাওয়ার আন্দোলনে সেই পর্দা সামান্য হেলেদুলে ; এদিকে আবার নির্বাপিত অঙ্গারপে শিখা জাগিয়া উঠে; আবার অন্ধকার-সমুদ্রে তরঙ্গতাড়িত লােহিতবর্ণ তরণীর মত ক্ষণকাল কাপিতে ৩০ হৰু চাদরখানা খুলিয়া ফেলিয়াছিল। এবার তাহার সাহায্যে সৰ্বাঙ্গ মুড়িয়া অগ্নিগর্ভ ভন্মরাশির পাশে শুইয়া পড়িল এবং চাদরের পৌষে রাত ১০৭ * ভিতরেই গুণগুণ করিয়া গান গাহিতে লাগিল। সমস্ত রাবির জাগরণে ক্লান্ত চোখ দুটি আলস্যে জড়াইয়া আসে, সুখস্পর্শ মৃদু উত্তাপ মাতৃ-স্নেহের মত দেহে হাত বুলাইয়া ফিরে। কিন্তু ঘুমাইলে ত চলিবে না। রাত্রির শেষপ্রহরই যে নীলগাইদের চরিবার বিশিষ্ট সময়। খেত হইতে সে বেশ একটু দুরের আছে, ইহা চিন্তার কথা। কিন্তু জব্বরসিং থাকিতে বিশেষ ভাবনাও নাই। (হলকু কুকুরের এমন নাম রাখিয়াছে, যাহাতে ইচ্ছামত যে কোন উপাধি যােগ করার বাধা নাই, বেশ মানাইয়া যায়।) জব্বর নবলব্ধ শক্তির বেশ ভালই ব্যবহার করিতেছে। তবে সে যেভাবে এখন একনাগাড়ে চেঁচাইয়া যাইতেছে, তাহাতে বােঝা কঠিন, কোন জানােয়ার আসিয়াছে কিনা, অথবা ইহা তাহার অতিরিক্ত স্ফুর্তিসঞ্জাত। একবার জবরা ভীম পরাক্রমে ধাওয়া করাতে হকু উঠিয়া বসিল। না, কোন জানােয়ারের সাড়া শব্দ নাই। জবরা থাকিতে জানােয়ার আসিবে সাধ্য কি! আবার হলকু শুইয়া পড়িল। নিজেকে সজাগ রাখিবার উপায়- স্বরূপ এবার নূতন এক রাগিণী ভঁজিতে লাগিল। কিন্তু রাগিণীর জোর ক্রমেই কমিয়া আসিতেছে, চোখের পাতা ধীরে ধীরে বুজিয়া আসিল। জব্বরের দিগ্বিদিকমন্থনকারী প্রবল ঘেউ ঘেউ শব্দ দূরাগত ক্ষীণ কলকোলাহলের মত ভাসিয়া আসিতেছে, লুপ্তাবশেষ চেতনায় তাহা আর রূঢ় আঘাত করে না; বরং ঘুমপাড়ানি গানের মত নেশা ধরায়। হল জাগরণের বিভিন্ন দেউড়ী পার হইয়া শেষে সুপিসাগরে তলাইয়া গেল। যখন জাগিল, তথন বােদ উঠিয়াছে ; শিশিরস্নাত পত্ৰপুষ্প তৃণলতা আলােতে যেন মুক্তা বিন্দু পরিয়া ঝলমল করিতেছে। চোখ কচলাইতে কচলাইতে হৰু খেতের দিকে চলিল। হঠাৎ তাহার হৃৎস্পন্দন যেন বন্ধ হইবার উপক্রম। সমস্ত ক্ষেত একেবারে চাচাছােলা পরিষ্কার। একটি ; ;

পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গল্প ১০৮ পাতা কোনখানে অবশিষ্ট নাই। জব্বর যথাসাধ্য কোলাহল করিয়াছে কিন্তু মানুষের কষ্ঠ কুকুরের কণ্ঠস্বরের সঙ্গে মিলিত না হওয়ায় নীল গাইযের ফল নিশ্চিন্ত মনে খেতখানা চষিয়া গিয়াছে। বিস্ময়ের বেদনার প্রথম আঘাত সামলাইলে পর, হলকু যেন একটু আরাম বােধ করিল। যাক্, আর আকাশের নীচে হিম খাইতে হইবে না, সেদিক দিয়া নীল গাইযেরা নিশ্চিন্ত করিয়া দিয়া হিতৈষীর কাজই করিয়াছে। খেত করার পাট আর নয়, দিন মজুরীই সই। পৌষের রাত্রে ঘুমাইতে ত পারিবে। হৌক না খড়ের ঘর, খড়ের বিছানা। শীতের দারুণ প্রহারের হাত হইতে এতদিন অব্যাহতি মিলিল।

সৎকার
নিস্তব্ধ শীতের রাত্রি। জীবন-মুখর গ্রামখানি যেন অন্ধকারে
অতলে নিঃশেষে বিলুপ্ত হইয়া গেছে। কুঁড়েঘরের সামনে পিতাপুত্র
মুখখামুখি বসিষা আগুন পােহইতেছিল। খড়কুটা লতাপাতার আগুন
কতক্ষণ থাকে। পাতা ফুরাইযা আসিল, আগুন নিভিয়া গেল।
আবার সেই হাড়-কাপানাে শীত। কিন্তু শীতের কাঁপুনি অপেক্ষা অধিক
মর্মভেদী, বুধিযার কাতরাণি। প্রসব-বেদনায বুধিযা ভিতরে আছাড়ি
পিছাড়ি খাইতেছে। এক-একবাব এমন চীৎকাব করিয়া উঠে যে
শ্রোতা দুইজনের হৃৎস্পন্দন যেন বন্ধ হইয়া যায়।
ঘী বলিল, “মনে হচ্ছে বাঁচবেনা। কালও সারাদিন বেচারী
আমাদেরই জন্য দৌড়াদৌড়ি কবেছে। যা যা, একবার ভেতরে গিয়ে
দেখে আয, মধুযা!”
মাধব দাতমুখ খিচাই জবাব দিল, “মববি ত তাড়াতাড়ি মর।
চেঁচামেচির হাট বসিযেছে! দেখে কবব কি ?”
বী, “তুই দেখছি একেবারে জানােয়ারের অধম হয়ে গেছিস,
পাষণ্ড কোথাকার! পুরাে একটি বছর মেহনত-মজুরী করে তাের
পিণ্ডি জুটিযেছে বেচারী—এখন চোখের দেখা দেথতেও নবাব-পুত্তরের
কষ্ট হচ্ছে। একেবারে ডাহা নিমকহারাম।”
মাধৰ কাতর হইয়া বলিল, “ওর ছটফটানি চোখে দেখতে পারিনে
বাবা! এর চেয়ে যে মরে গেলে শান্তি।”
জাতিতে চামার। সমস্ত গ্রামে ইহাদের বদনাম। মাধব এমন
কাজচোর যে আধঘণ্টা কোথাও যদি খাটে তাে তারপর একঘণ্টা ঠায়

পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গল্প ১১০ বসিয়া তামাক টানিতে থাকে। গ্রামে কাজের অভাব নাই কিন্তু এমন অ-কুড়েকে কাজ দিবে কে? আর কাজের জন্য ইহারও যে বিশেষ চেষ্টা আছে তাহা বলা যায় না। কেহ কোথাও যদি কোন কারণে অন্য মজুর না পাইযা দাযে পড়িয়া মাধবকে একদিন কাজে লাগাইত, তারপর তিনদিন কেহ তাহাকে ঘর হইতে নড়াইতে পারিনা। দু'একদিন উপবাস করিলে তবে টনক নড়িত। ধীশু এদিক-ওদিক হইতে একবােঝা কাঠ সংগ্রহ করিযা আনিত ; মাধব বাজারে লইয়া গিয়া বেচিয়া আসিত। তারপর আবার বাপ-বেটা হাত পা গুটাইযা, ঠায় বসিয়া থাকিত। ধৈর্য্যে উভযে একেবারে যেন পরমহংস হইয়াই জন্মিয়াছে; সাধনা না করিলে এমন নিশ্চল নির্লিপ্ত ভাব জন্মায় না। ঘরে দু’চারটি মাটীর ঘড়িকুঁড়ি ছাড়া কোন বাসন-বৰ্তন নাই। পরণে শতছিন্ন মলিন গাঁট দেওয়া কাপড়। কাকুতিমিনতি করিযা গ্রামের সকলের করিয়া গ্রামের সকলের কাছ হইতেই সুবিধা মত দু চার টাকা কর্জ লইয়াছে। উত্তমর্ণগণকে হস্ত ও বচন প্রহারে সন্তুষ্ট থাকিতে হয। ইহজমে ইহাদের চিৎহস্ত আর উপুড় হইবার সম্ভাবনা নাই। গাল খাইযা, মার খাইয়া ইহাদের মনে কোন বিকার উৎপন্ন হইতে দেখা যায় না। মুখে রা নাই, চোখ- মুখে দীনতা ঝরিয়া পড়িতেছে, সৰ্ব্বদাই জোড় হন্ত। দেখিয়া লােকদের গয়া হইত। প্রাপ্তির আশা না থাকিলেও কাল-ভেদে দু’চার পয়সা উহাদের দিত। গ্রামের কৃষকদের মঠর, আলু প্রভৃতির চাষ হইলে ইহারা ফসলের সময় না বলিয়াই কিছু কিছু উঠাইয়া আনিত—কখন আখ ভাঙ্গিয়া আনিয়া তপ্তমুখে চিবাইতে থাকিত। ফসলের সময় এইভাবে পাঁচ সাত দশদিন মহাননে কাটিয়া যায়। কিন্তু ফসল ত সারা বৎসর ক্ষেতে লাগিয়া থাকেনা। তখন আবার একটু-আধটু ১১১ চেষ্টা-চরিত্র না করিলে অনাহারে মারা পড়তে হয়। সুতরাং কষ্টে-সৃষ্টে মাঝে মাঝে হাত পা নাড়িতে হয় বই কি। ঘীর এইরকম উবৃত্তি করিয়াই যাট বৎসর পার হইয়াছে, সুপুত্র মাধব বাপের পদচিহ্ন অনুসরণ করিতে করিতে আরও এককাঠি উপরে পৌছাইয়া বাপের নাম আরও বেশী উজ্জল করিতেছে। এই মুহূর্তে বাপবেটা দু’জনে আগুন পােহইতেছিল ও সঙ্গে সঙ্গে নালিয়া- আনা আলু পােড়াইতেছিল। মাধবের মার দেহান্ত অনেক কাল হইয়াছে। গত বৎসর বিবাহ করিয়া সে বউ , আনিয়াছে। বউ ঘরে পা দিয়াই চালচুলাহীন গৃহস্থালীতে কিঞ্চিৎ সুব্যবস্থা আনিবার চেষ্টা করিতেছিল। প্রতিবেশীর গম পিষিয়া, ঘাস কাটিয়া, বাসন মাজিয়া বুধিয়া দিনান্তে সের খানেক আটা সংগ্রহ করিয়া আনিত। আর নিত্য পরমনির্মা স্বামী-শ্বশুরের শূন্য উদরে পিণ্ড যােগাইত। বুধিয়ার অভ্যুদয় কাল হইতে তাহারা আরও বেশী কুঁড়ে হইয়া উঠিল। সঙ্গে সঙ্গে তাহাদের মেজাজের পারাও দু'এক ডিগ্রী চড়িয়া গেল। দায়ে ঠেকিয়া কেহ কাজের জন্য ডাকিতে আসিলে দ্বিগুণ মজুরী হাঁকিয়া বসে।•• সেই অন্নদায়িনী উদয়াস্ত পরিশ্রমশীলা বুধিয় এখন প্রসব-বেদনায় মরণােন্মুখ। ঘরের বাহিরে পিতা-পুরে বসিয়া বচসা করিতেছে। তাহাদের মুখ দেখিয়া মনে হয় বুধিয়ার যন্ত্রণা অপেক্ষা তাহাদের ঘুমের ব্যাঘাতই অধিক কষ্টদায়ক হইতেছে। এসপার উপায় একটা কিছু হইয়া গেলে আরামে ঘুমানাে যায়। ধী ছাইয়ের নিচু হইতে আলু বাহির করিতে করিতে বলিল, “ভেতরে গিয়ে একটু দেখেই আয়না, বাপু। কোন অপদেবতা ভর করছে বলে মনে হচ্ছে। আ গেরাে! ওঝা ডাকালেই তাে একটাকা চেয়ে বসবে।” বলি মুখ বিকৃত করি।

পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গল্প ১১২ মাধবের আশঙ্কা-কুঁড়ের মধ্যে গেলেই বাবা আলুর বেশী ভাগ অমনি উদরে চালান করিবে। জবাব দিল, “আমার ত ওখানে যেতে ভয় কর।* -ভয় কিসের? আমি ত এখানে রয়েছি। -তুমি নিজেই যাও না কেন? -তাের মা যখন মারা গেল, তিনদিন আমি তার পাশ থেকে নড়িনি। আর তাের এই ব্যাভার। আমি যে যাব, আমাকে দেখে লজ্জা পাবে, কি, পাবেনা? আজ পর্যন্ত যার মুখ দেখলুম , এখন তার এ অবস্থায় যাই কি করে ? তবু যা হােক হাত পা ছুড়ে যে আরামটুকু পাচ্ছে, আমাকে দেখলে তাও আর পাবে না। —আমি ভাবছি ছেলেপিলে কিছু যদি হযে থাকে, তবে তাে আবার নতুন ফ্যাসাদে পড়তে হবে। শুট চাই, গুড় চাই, তেল চাই। ঘরে ত যাকে বলে লবডঙ্কা-ঠনঠন হাঁড়ির অবস্থা। -ভাবিসনি মেধাে, সব এসে পড়বে। ভগবান দেবে। যারা আজ এক পয়সা দিচ্ছে না, তারা কাল ডেকে যেচে টাকা দেবে। আমার ন’ নটি ছেলে হযেছে। ঘরে চিরকালই এমনি হুঁড়ি ফাটত কিন্তু প্রতিবারই ঐ উপরিওলা কোন না কোন উপায়ে দায় উদ্ধার করেছে। যে সমাজ-ব্যবস্থায় রাত্রিদিন পরিশ্রমকারীর অবস্থাও মাধব-ধীসুর দৈন্যদশা হইতে খুব বেশী ভাল নয়, যেখানে চতুর ফাকিবাজ গাঁতিদার কৃষকের পরিশ্রমলব্ধ ধনের বারােনা বিনা মেহনতে আত্মসাৎ করিয়া লয়, সেখানে এই নিরুপায় অদৃষ্টনির্ভরতা যে নিরাশ লােকের মনে আধিপত্য করিবে, তাহার আর বিচিত্র কি। ঘী বরং ভালই আছে, পরিশ্রমও করেনা, বঞ্চিতও হয়না। কিছু খাটিয়া যাহাৱা সৎকার পর ভােগ করে সে তাহাদেরই একজন। তবে পার্থক্য এই যে বুদ্ধি বিদ্যা গায়ের জোর নাই ; চালাক চতুর নহে; তাই মাথা উচু করিয়া চুরি করিতে পারেনা। তাই, পরগাছাদের মধ্যে সে দীনতম। যেখানে তাহার সমধর্মীরা গ্রামের মুখি, জমিদার পত্তনিদার হইয়া আছে, সেখানে সে উপহাস ও করুণার পাত্র। তবু ভাল যে প্রাণান্ত পরিশ্রম ত করিতে হযনা, কেহ তাহার পরিশ্রম-ফল কাড়িও লইতে পারে না। সেই সান্ত্বনা। আলু বাহির করিযা ছাই ছাড়াইযা উভযে আহারে প্রবৃত্ত হইল। বুধিয় সকাল হইতে অর্ধ-অচেতন অবস্থায় পড়ি আছে। পিতাপুত্রের পিণ্ড ব্যবস্থা করিতে পারে নাই। ক্ষুধার তাড়না এখন যে বিলম্ব সহেনা। গরম আলু চিবাইতে গিয়া জিহ্বা জ্বলিযা গেল। খােসা ছাড়াইলে আলুব বাইরের দিকটা ঠাণ্ডা হইযা আসে কিন্তু ভিতরে তখনও খুব গরম। তাড়াতাড়ি মুখে পুরিলে মুখের দুর্দশা অনিবার্য। সুতরাং উভযে আলু মুখে পুরিয়াই না চিবাইযা গিলিতে লাগিল। একবার জঠরে পৌছিয়া গেলেই হয়—সেই অগ্নিসমান তপ্ত বস্তুকেও ক্ষণমাত্র ঠাণ্ডা করিবার কলকজার অভাব নাই। গােটা গােটা আলু গিলিতে গিয়া চক্ষে জল আসিয়া পড়িল। ধারা-চিহ্নিত মুখে আলু গিলিতে গিলিতে ঘীর বিশবৎসরের আগের কথা স্মরণ হইতে লাগিল। ঠাকুরদের বাড়ীর বিবাহে কি খাওয়ানটাই খাওয়াইয়াছিল। বলিল, “সেবারকার কথা সারা জীবনে ভুলিনি। এর পর আর ভরপেট খাওয়াই কোথাও জুটলনা। কন্যাপক্ষে সকলকে পেট ভরে হালুয়া পুরী খাওয়ালে। কেউ বাদ যায়নি। ছােড় সকলে পুরী, কুরী খেল, আর সে-সব একেবারে খাট ঘিয়ের। চাটনী, বা ‘চ রকমের তরকারী, দই মিঠাই, আনাে,

পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গল্প
১১৪
এমনি কত! ঢালা হুকুম-যত পার খাও। যা চাও পাবে। সকলে
যা খেলে, তার আর কি বলব। কেউ আব জল খানা, পাছে
পেটে জায়গা জুড়ে যায়। পরিবেশনকারীরা কেবল দিযেই যাচ্ছে,
মানা করলেও শােনেনা। খাওয়ার পর আবার পান এলাচীও দিলে।
কিন্তু পান খাবে কে! গলা পর্যন্ত এসে ঠেকেছে, দাড়াতে পাবছিনে।
বাড়ী এসেই শুয়ে পড়লুম। এমন আবামেব ঘুম এলাে যে কি বলব।
এখন আধপেটা খেযে শুই , ক্ষিধ্যে ঘুম ভেঙ্গে যায়।”
মাধব বর্ণনা শুনিতে শুনিতে জিভ চাটিযা বিষন্নকণ্ঠে বলি, “এখন
আর কি তেমন লােক আছে যে খাওযাবে।”
ঘী উদাসবে জবাব দিল, “সেই যুগ কি আর আছে বাবা।
সব সােনার মানুষ আর হয়না। এখন সব ব্যাটাদেব টাকা জমাবার
নেশায় ধরেছে। হাডকেল্পন সব, একপর্যসা ফালতু খচ করবে না।
‘কিবিয়া করম’ পালপাৰ্বণ সব উঠেই গেল।”
—তুমি বােহ কুড়িখানেক পুরী উডিযেছিলে?
-বলিস কি মেধাে? মােটে কুড়িখানা? অনেক বেশী ।
অনেকের উপর ‘বেশ একটু’ মুখটান দিয়া আধিক্য বুঝাইতে হইল।
-আমি পঞ্চাশ খানা খেয়ে তবে উঠতাম।
-তুই কি ভাবছিস আমি তার কম খেয়েছিলাম? জোযান বয়সে
আমি দেহে তাের দুগুনাে ছিলাম। তুই আমার সমান কি খাবি মেদে !
আমার অর্ধেক শরীরও ন্য তাের।
আলু খাইযা দুজনে সেই নির্বাপিত-প্রায় ধূনির পাশে ময়লা
কাপড়ের একাংশ পাতিবা শুইয়া পড়িয়া পড়িল। বুধিয়ার কাতরাণি তখন
একটু ক্ষীণ হইয়া আসিতেছিল। বাপ-বেটার এবার আরামে ঘুমাই
পড়িবার বাধা নাই।

১১৫ সৎকার সকালে উঠিতে একটু বেলা হইয়া গেল। মাধব ভিতরে গিয়া দেখি, বুধিয়ার শরীর ঠাণ্ডা। মুখে মাছি ভনভন করিতেছে। চোখ কপালে। সারা শরীর ধূলায় আচ্ছন্ন। ছটফট করিতে করিতে অনবরত মাটিতে গড়াইয়াছে,-মাটীতে তাহারই চিহ্ন। প্রসব হয় নাই। ছেলে পেটেই মরিয়া গিয়াছে। মাধব দৌড়িয়া ঘীর নিকট আসিল। দুজনে বক্ষে করাঘাত করিতে করিতে নিয়মমাপিক শােক প্রচারের জন্য মড়া-কান্না জুড়িয়া দিল। প্রতিবেশীরা একে একে জুটিতে লাগিল এবং প্রাচীন প্রথানুসারে শােকে সান্ত্বনা দিতে সুরু করিল। বিনাইয়া-বিনাই কাদিবার জুতসই ফুৎ নাই। এখনি শবের আচ্ছাদন-বস্ত্র ও সৎকারের জন্য কাঠ যােগাড় করিতে হইবে। বলাবাহুল্য ঘরে এক কাণাকড়িও নাই। পিতাপুত্র হায়-হায় করিতে করিতে গ্রামের জমিদারের নিকট পৌছিল। জমিদার ইহাদিগকে দু’চোখে দেখিতে পারিতেন না। জমি দার কেন, ইহারা অনেকেরই চক্ষুশূল ছিল। ছিচকে চুরির অপরাধে কথা দিয়া ও আগাম লইয়া মজুরি করিতে না আসার অপরাধে, জমিদারের হাতে উভয়ে একাধিকবার প্রহৃত ও লাঞ্ছিত হইয়াছে। চেঁচামেচিতে বিরক্ত হইয়া জমিদার জিজ্ঞাসা করিলেন-“হল কি তােদের। দু’বছর পরে এলেন ত বাড়ী মাথায় করে তুলছেন! আমি ত ভাবছিলাম, তাের আর এখানে নেই, আপদ গেছে।” ঘী ভূমিতে মাথা নােয়াইয়া স্বভাবসিদ্ধ দীনতার সঙ্গে বলি, ওর পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গল্প ssa “সরকার, বড় বিপদে পড়ে এসেছি। মাধবের বোঁটা কাল রাতে মারা গেল। রাতভর ছটফট করছিল, হুজুর। আমরা বাপবেটা দু’জন রাত- ভাের দু’চোখের পাতা এক করিনি। ঠায জেগে বসেছিলাম। পাশে। ওযুদ-পত্তর যা পেরেছি, করেছি। কিন্তু কিছুতেই কিছু হােল না, মালিক। আমাদের সর্বনাশ হয়ে গেল, ঘর উজাড় হয়ে গেল। এখন কাঠ চাই, কাপড় চাই। আমাদের যা কিছু ছিল, চিকিচ্ছে করাতে সব গেছে হুজুব। এখন আপনি দযা না করলে আর গতি নেই। আর ক্যর দরজায যাব।” ইত্যাদি জমিদার দ্যালু-প্রকৃতির লােক ছিলেন। বারবাব প্রতারিত হইবাব ফলে যদিচ তাহাদের প্রতি বিশ্বাস একেবারে নষ্ট হইযাছিল, তবুও মৃত্যুর কথা যে বানাইযা বলিবে, এমন ত হইতে পারে না। আর এদের অবস্থা তাহার অজানা ছিল না—যদিও ঐ দারিদ্র্যের জন্য তাহাদিগ কই দোষী করিতেন। একবার ইচ্ছা হইল তাড়াইযা দেন। প্রযােজনেব সময় কোনকালে এদের ডাকিয়া পাওয়া যায় না। আজ নিজের গরজ পড়িয়াছে, ত আসিয়া কান্নাকাটির হাট বসাইযাছে। কিন্তু একি দণ্ড দিবার সমষ! ভাবিয়া-চিন্তিয়া বিনা বাক্যব্যযে দু’টা টাকা তাহাদের দিকে ছুড়ি ফেলিয়া দিলেন। জমিদার দিযাছেন, সুতরাং আর কেহ প্রত্যাখ্যান করিতে সাহস করিল না,-কেহ দু’আনা কেহ চার আনা দিল। অল্পক্ষণের মধ্যে পুরা পাঁচটাকা নগদ-নারায়ণ ট্যাকস্থ হইয়া গেল। কেহ কেহ ধান, গম দিল আবার কিছু কাঠও যােগাড় হইল। দুপুরে পিতাপুত্র শবাচ্ছাদন বস্ত্র কিনিতে বাজারে বাহির হইল। প্রতিবেশী আত্মীয়, কুটুম্বগণ কাঠ ও বাশ কাটিতে ব্যাপৃত হইল। মেযেরা আসিয়া বুধিয়ার শবদেহ ঘিরিয়া বিশন করিতে লাগিল।

সকা
=
বাজারে পৌছি ঘী বলিল, “কাঠ তাে অনেক হযেই গিয়েছে।
কি বলিস্ মধুযা?”
—হ, কাঠ তো মিলেছে। এবার কাপড় হলেই হয়।
-তাহলে চল, হালকা দেখে সস্তায় একখানা কিনে নিই।
-তা না ত কি! চিতে তুলতে তুলতে রাত হয়ে যাবে। রাতে কে
আর দেখতে আসবে, কাপড় ভাল কি মন্দ ?
-ভেবে দেখ, কি বিচ্ছিরি রেওয়াজ। বেঁচে যতদিন ছিল, তখন ঢাকবার
মতন ছেড়া ন্যাকড়াও জোটেনি। এখন অক্কা পেল ত নতুন বস্তর চাই।
-কাপড় ত লাসের সঙ্গে সঙ্গে অলেই যাবে।
--তা নাত কি আর থেকে যাবে? এই পাঁচটি টাকা যদি আগে
পেতাম দু'ফোটা ওষুধ পেটে পড়তে পারত।
এইভাবে একে অন্যের মনােভাব আঁচ করিতেছিল। উভয়ের মৌন
যুগ্ম-সম্মতি অনুসারেই যেন বাজারে যােরাফেরা আরম্ভ হইয়া গেল।
এক দোকান হইতে অন্য দোকান, এক গলি হইতে অন্য গলি। সূতী,
রেশমী কতরকমের কাপড় উহারা দরদস্তুর করিল কিন্তু পছন্দ হয়না।
দেখিতে দেখিতে সন্ধ্যা হইয়া আসিল। তখন দুজনইে এক দৈবপ্রেরণা
বশে মদের দোকানের সামনে পৌছিয়া গেল। কোনকিছু জিজ্ঞাসাবাদ
নাই, যেন সব আগে হইতেই স্থির ছিল। এইভাবে বাপবেটা দু'জনে
ভিতরে পৌছি, কিছুক্ষণ অব্যবস্থিত চিত্তে দাড়াইয়া রহিল। তারপর
ঘী আড্ডাধারীর গদীর সামনে গিয়া বলিল—সাউজী, আমাদেরও এক
ৰােত দিতে আজ থােক।

পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গল্প
১১৮
তারপর চাট আসিল—চাল ভাজা, মাছ ভাজা। দু’জনে নীরবে
পান ও চর্বণ করিযা খাইতে লাগিল। বারুণী দেবী কিছুক্ষণ পরে ক্রিয়া
আরম্ভ করিলেন। তখন দু’জনেরই মুখ খুলিযা গেল।
ঘী আরম্ভ করিল, কাপড় দিয়ে ঢেকে দিলে কি আর স্বর্গ লাভ হ’ত?
একমিনিটে জলে ছাই! বউয়ের সঙ্গে ত যেতনা।
মাধব উন্ধনেত্র হইযা যেন ইষ্টসাক্ষী করিতে করিতে বলিল, “দুনিয়ার
এই নিয়ম। না হলে লােক ব্রাহ্মণদেব হাজার হাজার টাকা কেন
দেয? কেউ কি আব দেখছে, দানপুণ্যেব ফলে পরলােকে কিছু
মিলে কি না?”
বড়লােকের টাকা আছে—তারা যত খুশী উড়াক না। আমাদের
আমাদেব আছে কী!
তখনও চেতনা আছে। মাধব বলে, কিন্তু লােকের কাছে
কি জবাবদিহী
করবে ?
সকলে যে জিজ্ঞেস করবে, কাপড়
কি হল ?
ধীমুর সুরা-বিকশিত অধরে মৃদুহাসি খেলিয়া গেল,-“বলে দেব
টাকা হারিয়ে গেছে, টাক থেকে, সুডৎ করে কোথায় পড়ে গেছে।
অনেক খুঁজলু, পাওয়া গেলনা। তাইতাে এতাে দেরী হলাে•••কেউ
বিশ্বাস করবেনা—এটা ঠিক। কিন্তু দেখি, টাকা ওরাই আবার দেবে।
এমে কি লাশ পড়ে থাকবে মনে করিস?”
মাধবের মন এবার সুরায় ভিজি উঠিতে লাগিল। বলিল, “বুধি
ছিল বড় ভাল মেয়ে। খেটেখুটে এতদিন খাওয়ালে, মরলে ত, আমাদের
আর একবার ভাল করে খাবার পথ করে মরল।”
বােতলের জকে ততক্ষণে কাবার হইযাছে। খী জুসের পুরী
কানাইল। তার সঙ্গে সামনের দোকান হইতে চাটনি, আচার ও পাঠ

মেটুলি। তগতচিত্তে দুজনে পানভােজনে ব্যাপৃত হইল—যেন কোন ভাবনা-চিন্তা ভয়-অনুতাপ নাই। সহসা ঘীর মধ্যে সাধু বাবাজী জাগিয়া উঠিল। বলিল, “ভেবে দেখ, আমাদের মন যদি খুসী হয়, বুধিয়ার কি তাতে সদগতি হবে না?” মাধব শ্রদ্ধাভরে শির ঝুকাইয়া তৎক্ষণাৎ সায় দিল, “নিশ্চয়, নিশ্চয়, তা আর বলতে। ভগবান, তুমি ত অন্তর্যামী। বেচারীকে বৈকুণ্ঠে পৌঁছে দিযাে। আমরা দুজনে অন্তর থেকে আশীৰ্বাদ দিচ্ছি : বুধিয়ার কল্যাণ হোক। মরে আমাদের যা খাইয়ে গেল, বেঁচে থাকলে তা পারত না। জীবনে আর এমন খাইনি।” বলিয়া একসঙ্গে তিনখানা মেটুলি মুখে পুরিল। ঘীষ্ট শঙ্কিত নেতে, নিজের প্লেট একটু তফাতে সরাইল। কিছুক্ষণ পরে মাধবের মনে এক সংশয় উপস্থিত হইল। -বাবা, আমরাও ত একদিন ওখানে পৌছব ? ঘী অতসব ভাবিতে চাষনা। বেশী ভাবিলে নেশা ছুটিয়া যায়। কিন্তু মাধব দমিবার পাত্র নয়। -বাবা, ওখানে দেখা হলে যদি বুধিয়া জিজ্ঞেস করে, আমাকে কাপড় কেন দাওনি, তবে কি জবাব দেবে ? বী ঝঝাইয়া উঠিল, “জবাব তাের মাথা। বকবক বকবক করেই যাচ্ছে। দুশমন কোথাকার!” মাধব কিন্তু নাছােড়বান্দা।—জিজ্ঞেস করবেই! বাওয়া,•••বলনা বাওয়া ঘী এবার সান্তনা দিবার ভঙ্গিতে কহিল, “কি করে জানলি যে ও কাপড় পাবেন? আমাকে কি এমনি গাধা পেয়েছিস? ষাট বছর ঘাস কেটেই এলুম? তােকে বলছি, ওর কাপড় হবেই, আর, ভাল কাপড়ই হবে।”

পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গল্প ১২০ কিন্তু মাধবের বিশ্বাস হয়না। জেদ ধরিযা বসিল, “কে দেবে শুনি? টাকা ত সব তুমি উড়িযেই দিলে”... বলিযা একসঙ্গে তুড়ি দিবার ও পাখী উড়িবাব মুদ্রা দেখাইল। তারপর বলিল—“আব জিজ্ঞেস করবে ত আমাকে। আমিই ত ওব মাথায় সিদুর পরিয়েছিলাম। তুমি ত অমনি খালাস। তােমাব কি।” বলিযা মাধব চিন্তার ভারে মাথা নােযাইল। ঘীর মেজাজ আবাব বিগড়াইয়া গেল। সে চীৎকাব কবিয়া বলিল, “হারামজাদা, আমি বলছি কাপড় ও পাবেই, ফেব তুই বলিস পাবেনা?” ক্রোধ শান্ত করিবার জন্য একমুঠা চানা চিবাইতে হইল। মেটুলি আর ছিলনা আঁধাৰ ঘনাইতেছে , ক্রমে ঝাড়া উন্মাদেব মেলায় পরিণত হইতেছে। কেহ কাঠফাটা গলায় গান ধরিযাছে, কেহ দাড়াইযা উঠিযা হাত মুখ নাডিযা বক্তৃতা দিতেছে। কেহ সঙ্গীর গলা জড়াইযা ধবি অকপাত করিতে করিতে প্রেমনিবেদন করিতেছে এবং প্রেমের প্রমাণস্বরূপ মদের গেলাস প্রেমাস্পদের মুখে তুলি ধরিতেছে। সেখানকাব হাওয নেশা ধরায়। সেই সব অপ্রকৃতিস্থ মানুষ দেখিতে দেখিতে যেন সুস্থ লােকেরও মাথার মধ্যে উনপঞ্চাশ পবন নৃত্য করিতে থাকে। কেহ কেহ দুই এক চুমুক পান করিযাই পুরদস্তুর মাতাল। মধুশালা—জীবন ও মৃত্যুর মাঝামাঝি এক বিচিত্র জাযগা•••মত্তাবস্থা-জীবন-মৃত্যুর মিশ্রণ। ঘীর চীৎকারে সকলের দৃষ্টি উহাদের উপর আকৃষ্ট হইযাছিল। শচক্ষুর সম্মিলিত দৃষ্টিতে যেন যাদু আছে। পিতাপুত্র আবাব শান্ত হইয়া বারুণী স্নান করিতে লাগিল। বােতলবাহিনী ক্ষীণধারা হইয়া আসিতে আসিতে শেষকালে উভবের উদয়-সাগর-সঙ্গমে বিলুপ্ত হইয়া গেলেন। পেট ভরিয়া খাইবার পরে পুরীর যা কিছু অবশিষ্ট রহিল, মাধব পাত সমেত তা উঠাইষা, রাস্তার ধারে সহননে-অপেক্ষমান जएकाच এক ভিখারীকে দিয়া দিল। আজ তাহারা শুধু নিজেই তৃপ্ত হয় নাই, অন্যকে আনন্দের ভাগ দিয়া প্রথমবার দানের পুণ্য অর্জন করিল। ঘী পুরী দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এক বক্তৃতাও দিল। “খুব খা বাওয়া, আর পেট ভরে আশীর্বাদ কর। টাকা যে কামালে, সেত আর নেই কিন্তু তাের আশীৰ্বাদ একেবারে মােক্ষমস্থানে, এখানে পৌঁছে যাবে- বলিয়া উপরের দিকে অঙ্গুলী নির্দেশ করিল। তারপরে এক পুনশ্চ জুড়িয়া দিল—“ভারী মেহনতের কামাই বাওয়া।” মাধব অনেকক্ষণ হইতেই আকাশের দিকে তাকাইবার চেষ্টায় ছিল। কিন্তু মাথা ঝুকিয়া পড়িয়া যায়। অবাধ্য শিরকে জোর ঝাকুনি দিয়া ঊর্ধনেত্র হইয়া কহিল, “ও নিশ্চয় বৈকুণ্ঠে যাবে, এ নির্ঘাৎ বলে দিলাম। বৈকুণ্ঠে রাণী হবে।” এবার মাধবের সঙ্গে বীর পুরামতাে মিল হইল। সােল্লাসে বলিতে লাগিল, “হ বেটা, বৈকুণ্ঠে ত যাবেই। তার আর কথা কি। কাউকে কষ্ট দেয়নি, কাউকে ঠকায়নি। মরণের পরেও আমাদের এতদিনের অতৃপ্ত ইচ্ছা পুরাে করে গেল। ও বৈকুণ্ঠে যাবে না ত কি বিশমুনে লালারা যাবে, যারা বসে বসে পরের পয়সায় ভুড়ি বাগাচ্ছে। পাপ ধােবার জন্য ওরা গঙ্গা নয় ; মন্দিরে মন্দিরে ভেট চড়ায়, কিন্তু ওতে কি আর পাপ যায় ?” পিতা-পুত্রে সহসা মিল হইয়া গেল। দুইজনে দুইজনকে জড়াইয়া শিশুর মতন কাঁদিয়া উঠিল মাধবের কান্না আর থামে না। ঘী নিজের অশ্রু সম্বরণ করিয়া মাধবকে সান্ত্বনা দেয়। “আরে, সে -তো মরে বেঁচে গেল।”

পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গল্প ১২২ মাধব চকিতে বুঝিতে পারে, সেই যুক্তির পরম সার্থকতা। কান্ন থামিয়া যায়। পরিবর্তে সে গান গাহিযা উঠে, ঠগিণী কিউ নয়না ধমকাবে••ঠগিণী। গান গাহিতে গাহিতে সে উঠিযা দাঁড়াইল। গানের ভাষা আর নাই••শুধু সুর••সেই সুরে সুরে সে নৃত্য আরম্ভ করিযা দিল। বসুও তাহার সহিত যােগদান করিল। কিছুক্ষণ পরে মাটী তাহাদের খুইজনকেই একসঙ্গে আকর্ষণ করিয়া লইল। আর কোন শব্দ নাই। আজ্ঞাধারীরা শােকা পিতা-পুত্রকে টানিযা একধারে শােযাইয়া দিল। বারুণী-প্রসাদ-পুষ্ট নিদ্রার অতল গভীরে তাহারা ভুলিয়া গেল, হতভাগিণী বুধিযার মৃতদেহ তাহাদের অপেক্ষায় রহিয়াছে।

লও এ নগর ; পৃথিবীতে এমন লোেক আছে যারা নিজের জন্য পরের চাকরী করে না, অথচ বিনা পয়সায় দুনিয়া -শুদ্ধ সকলের স্বেচ্ছাবৃত দাসত্ব করে। নিজের কোন কাজ নাই, তাই মাথা তুলিবার ফুসৎ নাই। পরােপকার ব্যাপারটা শিক্ষিত সাধারণের দৈনন্দিন কর্মতালিকার মধ্যে পড়ে না বলিযা এমনিতেই পরােপকারীকে লােকে সন্দেহের চক্ষে দেখে, কেহ ভাবে লােকটার কোন গূঢ় উদ্দেশ্য আছে ; কেহ ব্যঙ্গ বিদ্রুপ করে ; কেহ অহেতুক গাত্র- জ্বালা অনুভব করে। যদি লােকটির নিজের অবস্থা সচ্ছল হয়, তবে তাহার পরসেবা তেমন দৃষ্টিকটু হয় না। যাহার নিজের অন্নবস্ত্রের ভাবনা নাই, সে যদি পরের ভাবনা লইযা দিন কাটায়, তবে তাহার ধরন-ধারণ ক্রমে লােকের গা-সহা হইয়া যায়। কিন্তু জামিদের ব্যাপারটা সত্যই অদ্ভুত। তিন কুলে কেহ নাই। ভাঙ্গা এক কুড়ে ঘরে যেন-তেন করিয়া পড়িয়া থাকে। যা জোয়ান চেহারা ; কাজকৰ্ম্ম করিলে পাঁচজনের সংসার একেলা চালাইবার ক্ষমতা রাখে। খাটেও খুব। অনবরত দৌড়াদৌড়িতে লাগিয়াই আছে। কিন্তু ঐ এক দোষ-উপার্জনের দিকে মন নাই। বুঝাইয়া সমঝাইয়া ঘরসংসার বসাইয়া দিবে, এমন কোন আত্মীয়ও নাই। সুতরাং বনের মহিষ তাড়াইতেই পরমানন্দে লাগিয়া থাকে। তবে ঘরের খাইয়া নহে। এ বিষয়ে একান্ত পরনির্ভর। দুটি মিষ্ট কথার বিনিময়ে যাহারা ভূতের মত খাটাইয়া লয, তাহারাই যাহােক কিছু সামনে ধরিষা দেয় এবং সে পরমহংসের মত নির্বিচারে গলাধঃকরণ করিয়া যায় । অশিক্ষিত গ্রামের লােক অতশত মনৰ বােঝে না; সুতরাং জামিন হয়ত উক্তরূপ সৃষ্টি-বহির্ভূত আচরণ করিয়া সমস্ত জীবন কাটাইয়া দিতে ;

পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গল্প ১২৪ পারিত। কিন্তু মুসকিল বাঁধাইযাছে তাহার ক্ষত্রিয প্রকৃতি। মধ্যযুগীয় নাইটদের মত, সে যে শুধু পীড়িতের পীড়া নিবারণে অগ্রসর তাহাই নহে, পীড়কের সন্ধান পাইলে, তাহার সঙ্গে তৎক্ষণাৎ বােঝাপড়া করিতেও প্রস্তুত। ডাক্তার ডাকিয়া আনিতে, বােগীর শয্যাপাশ্বে সারাত্রি জাগিতে যেমন ওস্তাদ, কনেষ্টবলের ও জমীদারের পাইক পেযাদার সঙ্গে হাতাহাতি করিতেও তেমনি পারদর্শী। সে বঝেনা যে যে লােক অত্যাচার সহিতে অভ্যস্ত, সে তাহার সাহায্যদানকে অনেক সময় উৎপাত মনে করে। দুই-চারিবার এই রকম হাঙ্গামা হুজ্জতে লিপ্ত হইবার পর, গ্রামের লােক একজোট হইয়া তাহাকে উপদেশ দিতে লাগিল। তাহার সংক্ষিপ্তসার এই যে জামিদের নিজের ভালর জন্যই এবাব উপার্জনের জন্য কোথাও বাহির হওয়া উচিত। এখন না হয গাযে জোব আছে, অসুখ বিকও হয় না, কিন্তু চিরকাল কিছু যৌবনের তেজবীৰ্য্য থাকিবে না; তখন কি করিবে? ভবিষ্যৎ ভাবি এখন হইতেই টাকাকড়ি কিছু কিছু উপার্জন ও সঞ্চয কবা দরকার। লােকের উপদেশের ফলেই হউক, অথবা খামখেয়ালী স্বভাবের বশেই হৌক, জামি একদিন গ্রাম ছাড়িযা সহরের পথ ধরিল। সহবে পৌছিয তাহার চক্ষে পলক পড়িতে চায় না। বিস্মযেব অবধি নাই। যে দিকে দৃষ্টি পড়ে, হা করিয়া তাকাইয়া আছে। অতি বড় বড় বাড়ী, বড় বড় পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাস্তা, গাড়ী-ঘােড়, অবিচ্ছিন্ন জনস্রোত, বিচিত্রবেশ নর- এক সঙ্গে যেন দশটা থেলা বসিয়াছে। কত রকমের শব্দই যে হইতেছে, তার ইয়ত্তা নাই। কিন্তু জামিদের সর্বাধিক বিস্ময় লাগিল মন্দির মসজিদের সংখ্যা দেখিয়া। সেবাপরায়ণ লােকের মন সহজেই ধর্মের দিকে আকৃষ্ট হয়। অগণিত দেবস্থান দেখিয়া আমিদের মন প্রসন্ন হইয়া উঠিল। তাহার গ্রামে না ছিল মন্দির, না ছিল নারী।

১২৫ শও এ নগর মসজিদ। হিন্দুরা এক বৃক্ষমূলে ফুল জল নিবেদন করিত, রামলীলার সময় তাহারই চারপাশে উৎসব হইত। মুসলমানেরা এক খােড়ােঘরে একত্রিত হইযা নমাজ পড়িয়া লইত। এখানে দু-পা যাইতে না যাইতেই বিপুলকায় দেবাযতন। জামীদের মনে হইল, সেই অগণিত অপরিচিত জনতার মধ্যে। গগনচুম্বী হৰ্ম্মরাজির মধ্যে চির পরিচিত আশ্রয়স্থল বিদ্যমান রহিয়াছে। ভাবিয়া তাহার আনন্দ ধরে না। এদিক ওদিক নানা স্থান, নানা দৃশ্য দেখিতে দেখিতে সন্ধ্যা হইয়া আসিল। রাত্রির জন্য মনে মনে আশ্রয়স্থল অম্বেষণ করিতেছে, সামনে দেখে মন্দির। একে ত গ্রামে শিক্ষা দীক্ষার অভাব, দ্বিতীয়তঃ মন্দির মসজিদের অব। সুতরাং হিন্দু মুসলমানে ভেদ-বুদ্ধি সাম্প্রদায়িক জটলা এমনিতেই গ্রামে কম। পরােপকারী বলিয়া জামিদের গ্রামে সব হিন্দু গৃহে অবাধ গতিবিধি ছিল। তাই জামিদ বিনা সঙ্কোচে রাস্তা হইতে মন্দিরের চাতালে উঠিযা আসিল। আলাে জালিয়া পূজারী হয়ত কোথাও গিযাছেন। লােকজন নাই। শুধু তাই নয়। মন্দিরের চাতাল নংরা যতদূর হইতে পারে। এখানে ওখানে গােবরের তাল শুখাইয়া আছে, ধূলা, খড়-কুটায় সমস্ত রােযাক ভর্তি। জামিদ কিছুক্ষণ চুপচাপ বসিয়া বিশ্রাম করিল। তারপর ইতস্তত চাহিয়া দেখিতে লাগিল কোথাও একগাছ কতু পায় কি না। ঠাকুরজীর মন্দির, কিন্তু কি দুরবস্থা। ঋতু না পাইযা সে নিজের কাপড়ের খুট দিয়া মােয়াক ঝাড়িতে লাগিল। আস্তে আস্তে দু-একজন করিয়া ভক্ত সমাগম হইতেছে। অল্পক্ষণ পরে সন্ধ্যারতি হইবে। জামিদের উপর একজনের দৃষ্টি পড়াতে তিনি নিজে পার্শ্ববর্তীকে বলিলেন, —এ আবার কে? দেখে ত মুসলমান মনে হচ্ছে। মেথর হতেও পারে।

পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গল্প
মেথর কি নিজের কাপড় দিয়ে ঝটি দেয়? আমার মনে হচ্ছে
কোন পাগল।
কে জানে পুলিশের টিকটিকি কি না।
-না না, দেখছ না কি রকম দীন হীন মনে হচ্ছে।
-তা হলে বােধ হয হাসান নিজমীর কোন চেলা।
-তুমিও যেমন! গােবর কুড়িয়ে নিচ্ছে। ইটের ভাটায় কাজ
করে হত। (জামিদের প্রতি) এই শােন, গােবর নিযে যাসনে যেন।
জামিদ-“আমি ভিদেশী মুসাফি, গােবর নিযে কর কি।
ঠাকুরজীর মন্দির দেখে এসে বসেছি। চারদিক নােঙবা হয়ে আছে।
তাই পরিষ্কার কচ্ছিলাম।”
-তুমি মুসলমান না ?
—ঈশ্বর সবাকারই ঈশ্বব,—হিন্দু কি আব মুসলমান কি।
-তুমি ঠাকুরজীকে মান ?
-মানি বই কি! কে মানে না। আমায যিনি সৃষ্টি করেছেন,
তাকে মানব না? ভক্তেরা নিজেদের মধ্যে ঠারে ঠোরে কথাবার্তা বলিতে
লাগিলেন।
—গাঁ থেকে আনকোরা উজবুক এসেছে মনে হচ্ছে। যেচে যখন ধরা
‘দিয়েছে, যেতে না পায়।
জামিদ ফান্দে পড়িল। তাহার আদর আপ্যায়নের বহর দেখিযা সে নিজেই
অবাক। গাঁযের লােক তাহাকে নির্বোধ,বলিত। একবার আসিয়া
দেথিয়া যাক না। ভক্তেরা তাহাকে চমৎকার এক ঘরে থাকিতে দিছে।

১২৭ ও ও নগর দুবেলা চৰ্ব্ব-চোষের ব্যবস্থা। জামিদ ভাল কীৰ্ত্তন গাহিতে শিখিয়াছিল। আদর সম্মানে অত্যন্ত খুশী হইয়া একদিন কীৰ্ত্তন শােনাইয়া দিল। তার পরে আর তাহাকে পায় কে। আশে পাশে সর্বত্র প্রচারিত হইয়া গেল যে এক পরম ভক্ত বিদ্বান মৌলবী স্বেচ্ছায় শুদ্ধি গ্রহণ করিযা হিন্দু হইবেন। শত শত লোেক তাহাকে দর্শন করিতে আসিতে লাগিল। জামিদের ত রকম সকম দেখিয়া তাক লাগিয়া গিয়াছে। তাহার একমাত্র আফশােষ গ্রামের লােক দেখিতে পাইল না। গ্রামে যখন ফিরিয়া গিয়া গল্প করিবে, কেহ বিশ্বাস করিবে কি না কে জানে। দু'চার জন লােক সব সময় তাহাকে ঘিরিয়া থাকে, যেন সে গ্রামের জমীদার। একদিন জামিদ জন কয়েক ভক্তের সঙ্গে বসিয়া পুরাণ পাঠ শুনিতেছে, এমন সময় দেখিল, এক বলবান শিখা তিলকধারী যুবক এক বৃদ্ধকে রাস্তায় ধরিয়া বেদম প্রহার করিতেছে। বেচাৰ বুড়া হাতে পায়ে ধরিয়া, অনবরত ক্ষমা চাহিয়া কিছুতেই যুবকের ক্রোধ শান্ত করিতে পারিতেছে না। তিলকধারীর রাগ আর পড়ে না। জামিদ তৎক্ষণাৎ তিন লাফে রাস্তায় আসিয়া বুড়াকে আড়াল করিয়া দাঁড়াইল। যথাসম্ভব শান্তস্বরে বলিল, বুড়াে মানুষের উপর হাত তুলছ যে? হয়েছে কি?” —মেরে মেরে আমি ওর হাড় গুড়া করে তবে ছাড়ব। তুমি সরে যাও বলছি। -কি হয়েছে বল না ? ওর দোষটা ত শুনি। –ও ব্যাটার মুর্গী আমার ঘরে ঢুকে সমস্ত ঘর নােঙরা করে এসেছে। সর, সামনে থেকে সর। —তত বুড়াে কি মুগীকে শিখিয়ে দিয়েছিল ? অবােধ জানােয়ার অজানতে দোষ করেছে, তার জন্যে তুমি তার মালিককে ধরে ঠেঙ্গাচ্ছ? তাও আবার ষাট বছরের এক বুড়ে। তােমার লজ্জা হওয়া উচিত।

আজ ভুলে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গল্প ১২৮ বৃদ্ধ বেদনায় কাতরাইতে কাতয়াইতে চোখের জল মুছিতে মুছিতে বলিল-“য়ােজ খাঁচায় বন্ধ করে রাখি, হুজুর। খাচার দরজা খােল পড়েছিল। হাতজোড় করে পায়ে ধরে মাপ চাইছি কিন্তু পণ্ডিতজীর দয়া হল না। মেরে মেরে আধমরা করে ফেলেছেন হুজুর।” যুবক—“এখনই তাের হযেছে কি। আজ তােকে মাটীতে না পুতে আমি ছাড়ব না।” জামিদ—“পণ্ডিতজী মহারজ মাটীতে পুতে ফেলতে ওস্তাদ কি তুমি একাই। ফের যদি তুমি ওর গাযে হাত তােল, তবে ভাল হবে না বলে দিচ্ছি।” উহার কথা শেষ হইতে না হইতেই তিলকধারী আবার বৃদ্ধকে চপেটাঘাত করিল। জামিদ লাফাইয়া তাহার উপর পড়িযা কিল চড় ধুসী বর্ষণ করিতে লাগিল। তারপর দুজনের মল্লযুদ্ধ। ভক্তেরা দাড়াইয়া দাড়াইয়া তামাসা দেখিতেছিলেন। এখন নামি আসিষা পণ্ডিতের পক্ষ লইলেন ও জামিদকে একজোট হইযা মারিতে লাগিলেন। এবার জামিদের আর এক প্রস্থ অবাক হইবার পালা। এই ত ইহারা তাহাকে মাথায় তুলি নাচিতেছিল, এরই মধ্যে কি হইতে কি হইয়া গেল। চোখের সামনে বৃদ্ধের উপর এই কাপুরুষােচিত আক্রমণ দেখিয়া কেহ কিছু বলে নাই। ন্যায়ধর্মের মর্যাদা রক্ষা করিয়া যেই সে বৃদ্ধকে রক্ষা করিতে অগ্রসর হইল, অমনি উহাদের হইল কি? কিন্তু অবাক হইয়া দাড়াইয়া থাকিবার অবসর কোথায়! ৬৭ জন লােক একজনকে আক্রমণ করিয়াছে। বৃদ্ধ মুসলমান গােলমালের মধ্যে প্রাণ লইয়া পলাইয়াছিল। আমি একা লড়িতে লড়িতে মার খাইতে খাইতে শেষ কালে অজ্ঞান হইয়া রাস্তার ধারে নর্দমার কিনারে গফিয়া গেল।

১২৯ লও এ নগর ভক্তেরা এতক্ষণে দম লইবার অবকাশ পাইলেন। মন্দিরে ফিরিয়া বলাবলি করিতে লাগিলেন, “নাহােক এতগুলাে টাকা গচ্ছা গেল । কি আর কখনও আদর আপ্যায়নে আপন হয় ! দুধকলা দিয়ে সাপ পােষা। যখন জামিদের চেতনা হইল রাস্তা তখন জনশূন্য। গাযে তাহার এমন ব্যথা যে উঠিতে পারে না। চোখের উপরটা ভীষণ ফুলিযাছে । ঠোট দু জায়গায় কাটিয়া গিয়াছে, নাকের কাছটায় রক্তের চাপ জমিয়া আছে। মাথা ফাটে নাই, তবে এখানে ওখানে সুপারীর সমান উচু হইয়া আছে। জামিদ একটু সরিয়া সেখানেই পড়িয়া রহিল। সারারাত্রি ভূমিশয্যায় মৃতবৎ পড়িয়া থাকিয়া প্রভাতের দিকে যখন ঘুম ভাঙ্গিল, গায়ের ব্যাথা তখন কিছু কমিয়াছে। মুখে মাথায় টাটানি সমানই আছে। জামিদ কষ্টেসৃষ্টে উঠিয়া রাস্তার কলে হাত মুখ ধুইল। শীতল জল স্পর্শে, প্রভাতের স্নিগ্ধ হাওয়ায় অবসাদ খানিকটা দূর হইলে জামিদ খোড়াইতে খোঁড়াইতে রাস্তা বাহিয়া চলিল। কিছুদূর যাইতেই দেখিল এক মসজিদ। ভিতরে যাইবে কি না ভাবিতেছে ; দেখে গত সন্ধ্যার সেই প্রহৃত বৃদ্ধ, তাহার দিকেই আগাইয়া আসিতেছে। নিকটে আসিযাই আস্ফালন করিয়া বলিতে লাগিল—“কসম খুদা পাক্কী, ধন্য তােমার সাহস। সাবাস বাহাদুর। তুমি কাল আমার জান বাঁচিয়েছ। কাফের ব্যাটার তােমায় নাকি খুব মেরেছে শুনলাম। আমি ত ভীড়ের মাঝে বেমালুম সরে পড়েছিলাম। এতক্ষণ ছিলে কোথায়? এখানে সব লোেক তােমার সঙ্গে দেখা করার জন্য উদগ্রীব হয়ে আছেন। চলাে চলাে, ভেতরে যাই। কাজী সাহেব রাত্তিরেই তােমার খোঁজে বেরােবেন স্থির করেছিলেন কিন্তু পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গল্প লােকজন তেমন ছিল না, আর একেলা বেরুতে সাহস পেলেন না। তখন সব নমাজ পড়ে ঘরে চলে গিয়েছে। যখন আমাদের ওরা মারধাের কচ্ছিল, ঠিক সেই সময়ে খবর পৌছে গেলে হাজার লাঠিয়াল পৌছে যেত। আল্লার কসম, আমি আজ থেকে ছ’টা নতুন মুগী পালব। দেখি কাফের ব্যাটা কি করে।” জামিদকে লইযা বুড়া, কাজী জোরাবর হুসেনের ঘরে পৌছিল। কাজী উওজু করিতেছিলেন , জামিদকে দেখিয়াই বদনা রাখিয়া দৌড়ি আসিলেন, “রাতভাের তােমারই জন্য ছটফট করছিলাম। একলা এতগুলাে কাফেরের মােহড়া নিয়েছ, বাহাদুর বটে! আর হাবই বা না কেন? মােমিনের রক্ত যে। কাফির ব্যাটাদের সাধ্য কি ? শুনছিলাম ব্যাটারা তােমায শুদ্ধি করতে যাচ্ছিল। ভুল হল, আরাে কিছুদিন অপেক্ষা করলে না। বিয়ে দিয়ে দিলেই, নাজনীন সঙ্গে করে এখানে এসে উঠতে।” খবর চারিদিকে রাষ্ট্র হইয়া গেল। যেমন মন্দিরে, তেমনি এখানেও দলে দলে দর্শনার্থী আসিতে লাগিল। সকলের মুখেই এক কথা : ‘বারে হিম্মৎ, বারে মেরে বাহাদুর শের! লাহৌল বিল কুবৎ! আবার সেই রকম আদর আপ্যায়নে দিন কাটিতে লাগিল। কাজী সাহেবের পাশের কামরা খালি করিযা জামিদের বাসস্থান নির্দিষ্ট হইল। এক প্রহর রাত হইয়াছে। রাস্তাষ লােক চলাচল তেমন নাই। জামিদ কাজী সাহেবের নিকট পাঠ লইয়া আসিয়া ধর্মগ্রন্থে মনননিবেশ করিতেছিল। সহসা তাহার ঘরের পাশের দরজার সামনে টাঙ্গা থামিবার শব্দ হইল। কাজীর কোন চেলা আসিয়াছে বােধ হয়—প্রায়ই আসে যায়। কাফিরদের কি ভাবে, কোথায় কখন জব করিতে হইবে, ও এ নগর --তাহার সলা পরামর্শ লাগিয়াই আছে। কিন্তু কি জানি কেন কৌতুহল হইল,—সে জানালা দিয়া মাথা গলাইয়া রাস্তার দিকে চাহিল। একজন খ্রীলােক টাঙ্গা হইতে নামিয়া বারান্দায় দাঁড়াইয়া আছেন। টাঙ্গাওয়ালা তাহার জিনিষপত্র নামাইতেছে। মহিলা এদিকে ওদিকে দৃষ্টিপাত করিয়া কহিলেন, “না, এবাড়ী ত নয়। তুমি ভূল করেছ মনে হচ্ছে।” টাঙ্গাওয়ালা, “হুজুরের ত বিশ্বাসই হচ্ছে না। বল্লাম যে বাবুর্জী বাড়ী বদলে এখানে এসে উঠেছেন। এক্ষনি দেখতে পাবেন। উপরে 0 চলুন।” মহিলা কিঞ্চিৎ বিরক্ত, কিঞ্চিৎ সন্ধিগ্ধ হইযা বলিলেন, “বাবুকেই ডেকে দাও না। হাঁক লাগাও।” টাঙ্গাওয়ালা আশ্বাস দিয়া, বলিল, “বলেন কি হুজুর? এত রাতে হক লাগাব কি? খামােখা চেঁচিযে কি লাভ? জানা কথা, বাবুজী শুয়ে পড়েছেন। আপনি নিঃসঙ্কোচে উপরে চলে যান। ।” মহিলা সিড়ি বাহিয়া উপরে উঠিতে লাগিলেন। টাঙ্গাওয়ালা জিনিষ পত্র লইয়া পিছনে পিছনে আসিতে লাগিল। এদিকে কাজী টাঙ্গার শব্দ শুনিয়াই ছাতে চড়িয়া এদিক ওদিক দেখিতে ছিলেন। এক স্ত্রীলােক একলা টাঙ্গাওয়ালার সঙ্গে আসিতেছে দেখিয়া তৎক্ষণাৎ ব্যাপার বুঝিলেন। এ রকম ঘটনা মাঝে মাঝে এখানে ঘটে। তিনি তৎক্ষণাৎ নিজের কামরায় নামিয়া আসিয়া চারিদিকের জানালা বন্ধ করিয়া দিলেন ও দেয়ালে লটকানাে তলােয়ার পাড়িয়া লইয়া দরজার আড়ালে প্রস্তুত হইয়া দাড়াইলেন। মহিলাটি সিড়ি অতিক্রম করিয়া, কামরার সম্মুখে আসিয়া প্রবেশ করিবেন কি না ইতস্ততঃ করিতেছেন। টাঙ্গাওয়ালা বিছানাপত্র লইয়া পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গল্প ভিতরে চলিয়া গেল। সহসা কাজী দরজার আড়াল হইতে বাহির হইয়া আসিয়া বা হতে তাহার হাত ধরিয়া হ্যাচকা টান দিলেন। ঘরে টানিয়া লইয়া দরজা বন্ধ করিবেন, এমন সময় জামিদ আসিয়া উপস্থিত। তাহাকে সানন্দে আব্বান করিয়া বলিলেন-“এসাে এসাে মিঞা, ভেতরে এসাে ; তােমার বরাতের জোর খুব-তা মানতেই হবে।” জামিদও ঘরে ঢুকিল, কাজীও দরজা বন্ধ করিলেন। জামিদ আহম্মকের মত একবার এর একবার ওর মুখের দিকে চাহিতে লাগিল। মহিলা টাঙ্গাওয়ালার দিকে ক্রুদ্ধ দৃষ্টিক্ষেপ করিযা কহিলেন, “তুই আমায় কোথায় নিয়ে এলি ?” কাজী তলােয়ার ঘুরাইয়া জবাব দিলেন, “সব বুঝতে পারবে। চুপ চাপ ওখানে বসে পড়।” -চেহারায় মনে হচ্ছে তুমি কোন মৌলবী। তােমার ধর্ম, তােমায কি অন্যের অসহায় স্ত্রী-কন্যার সর্বনাশ করতে শিখিযেছে ? -খুদার এই হুকুম যে কাফিরদের যেভাবে হৌক সত্যধৰ্ম্ম গ্রহণ করাতে হবে। ইচ্ছা করে না আসে ত বলে আনতে হবে। -এই রকম তােমাদের স্ত্রী-কন্যাকে যদি কেউ ধরে নিয়ে বেইজ্জত করে, তাে ? -তােবা, তােবা, কাফিরদের এমন হিম্মৎ কোনদিন হবে? হিন্দুর মধ্যে আবার সাহস আছে নাকি? আমাদের একটি মেয়ের গায়ে হাত ভুললে আমরা দশ হিন্দুর মাথা কেটে নিই। হিন্দুর মেয়ে ত আমরা আকছার ধরে এনে মুসলমান কচ্ছি। কেউ টু শব্দটি করতে শুনেছ কখনন? আর বেইজ্জতির কথা কি বলছ। হিন্দুসমাজে ত তুমি বাক্স পেটয়ার সামিল। মুসলমান হয়ে প্রথমবার পুরুষের সমান অধিকার পাবে। আমরা বেইজ্জত করি না তােমাদের ইজ্জত বাড়াই।

==
১৩৩
নও এ নগর
ভাবছ কি হিন্দু চিরকাল মার খেতেই থাকবে? সেও জাগলাে
বলে। সুদে আসলে সব ফিরে পাবে তােমরা, কাণাকড়িটি মারা যাবে
। এত কালের পাপের শাস্তি তােমাদের ভােলা আছে।
—কিন্তু বিবিজান, এত রাগছই বা কেন? এই যে জোয়ান পুরুষটিকে
দেখছ ওরই সঙ্গে তােমার নিকে করে দেব। তারপর রাণী হয়ে
থাকবে।
-আমি তােমাকে আর তােমার ধর্মকে ঘৃণা করি। তুমি কুকুরেরও
অধম। ভাল চাও ত আমায় ছেড়ে দাও। নইলে আমি চেঁচিযে হাট
বসাব।
-যদি টু শব্দটি কর, তবে এই তলােয়ার দিয়ে তােমার জিভ কেটে
ফেলবাে। বুঝে সুজে চল।
-ধর্মের তুলনায় প্রাণ তুচ্ছ। তুমি আমার প্রাণ নিতে পার, আমার
সতী-ধৰ্ম্ম নষ্ট করতে পারবে না।
-কেন সেধে মৃত্যুকে ডেকে আনছ, বিবিজান ?
মহিলা দরজার পাশে গিয়া বলিলেন, “দরজা খােল বলছি।”
কাজী উহার হাত ধরিয়া টান দিতেই জামিদের স্বচ্ছন্ন ভাব কাটিয়া
গেল। সে দু’জনের মাঝে আসিয়া দাঁড়াইয়া তৎক্ষণাৎ দরজা খুলিয়া
দিল। কাজীকে ধীর স্বরে বলিল, “একে ছেড়ে দিন।”
—কি বকছিস? মাথা খারাপ হয়ে গেছে নাকি তাের? যার জন্যে
চুরি করে, সেই বলে চোর! লহ নেমকহারাম বেইমান দেখছি।
—মাখার কথা পরে ভেবে। ভাল চাও তাে একে ছেড়ে দাও।
কিন্তু কাজী হাত ছাড়িল না। এদিকে টাঙ্গাওয়ালাও কাজীর
সাহায্যার্থে অগ্রসর হই। জামিদ ক্ষিপ্রগতিতে টাঙ্গাওয়ালাকে হাত দিয়া
ধাক্কা মারিয়া ফেলিয়া দিল এবং সঙ্গে সঙ্গে কাজীর পেটে এক লাথি

পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গল্প ১৩৪ মারিল। চক্ষের পলক ফেলিতে না ফেলিতে মহিলাকে লইয়া রাস্তায় নামিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “তােমার বাড়ী কোন মােহল্লায়, বােন?* -আহিয়াগঞ্জে -এসস, আমি পৌছে দিচ্ছি। কোন ভয় নেই। -আপনি আজ আমার ধর্ম রক্ষা করেছেন। এখন বুঝলাম, ভাল মন্দ সব জাতে সব সমাজে আছে। আমার স্বামীর নাম পণ্ডিত রাজকুমার শাস্ত্রী। ঐ মহল্লাতে পৌঁছে জিজ্ঞাসা করলেই হবে। —জিজ্ঞাসা করব কাকে? কাউকে দেখতে পেলে ত! রাত ত কম হয় নি। আর তুমি একেলা আসছিলে যে? পণ্ডিতজী ষ্টেশনে যাবেন কথা ছিল। কেন যে গেলেন না জানি নে। এ সহরে এতকাল থেকে আছি। এ রকম বিপদ যে ঘটতে পারে তা মনে হয় নি। আজকাল মেয়েরা একা একা বেলে মােটরে চড়ে। আমিও এলাহাবাদ থেকে গাড়ীতে একাই এসেছি। পণ্ডিতজীকে না দেখে ভাবলুম, টাঙ্গা করে বাড়ী যাই। বেছে বেছে বুড়াে দেখে টাঙ্গাওয়ালা খুঁজে বার করলুম, শেষে হল হিতে বিপরীত। জামিদের হঠাৎ যেন বুদ্ধি খুলিযা গেল। মাথা নাড়িযা বিজ্ঞের মত বলিল—“অত লােকের সঙ্গে রেলে চড় আর একা একা টাঙ্গায় চড়া কি এক?” মােড়ে একখানা পানের দোকান খােলা ছিল। সেখানেই খোজ খবর লইয়া তাহারা রাজকুমার শাস্ত্রীর বাড়ী যখন পৌছিল, তখন রাত সাড়ে বারােটা। জামিদ নাম ধরিয়া হাঁক দিতেই, শাস্ত্রী আন্তে ব্যন্তে ৰাহিরে আসিলেন। স্ত্রীকে এক অপরিচিত মুরকের সঙ্গে দেখিয়া কিয়ৎক্ষণ অবাক হইয়া চাহিয়া রহিলেন। বিয়ের ভাব কাটিলে বলিলেন, “তুমি ছিলে কোথায় হীরা? তােমার ভাই ও আমি ষ্টেশনে ১৩৫ ও এ নগর গিয়ে কত খোঁজাখুজি। শেষকালে মনে হল, তুমি আস নি। শুদ্ধির ব্যাপার নিয়ে সহরে দাঙ্গাহাঙ্গামা হবার উপক্রম। এইমাত্র আমরা ফিরে এসে দারুণ দুশ্চিন্তায় মুখ চুণ করে বসে আছি। তারপর, এ লােকটি কে?” —বলছি সব। আপাততঃ এই জেনে রাখ যে ইনি আজ আমার প্রাণ বাঁচিয়েছেন, তারচেয়ে বড় কথা ধর্ম বাঁচিয়েছেন। পণ্ডিত জিজ্ঞাসা করিলেন, “আপনার নাম জানতে পারি?” জামিদ। ততক্ষণে হীরার ভাই আসিয়া জুটিয়াছে। সে আসিয়া জামিদকে দেখিয়াই লাফাইয়া উঠিল। “এই দেড়ে ব্যাটা এখানে এল কি করতে ? মরবার আর জায়গা পেলে না বুঝি? যথেষ্ট শিক্ষা হয় নি বুঝি?” বলিয়াই ঘুসি বাগাইয়া অগ্রসর হইল। হীরা তাড়াতাড়ি তাহার সামনে আসিয়া তাহার পথ রােধ করিল। “কর কি, কর কি দাদা? তুমি জান ইনি কে?” --জানিনে আবার? একে নিয়েই ত যত গােল। সেদিন মেরে মেরে হাড় গুড়ো করে দিয়েছিলাম। -না জেনে তুমি মহা অধৰ্ম্ম করেছ, দাদা। ইনি আমার প্রাণদাতা, মানরক্ষক। এর কাছে মাপ চাও। বলিয়া সে নিজেই অগ্রসর হইয়া আসিয়া সজল চক্ষে জামিদের পদধূলি লইল। পরদিন জামিদ সহরের খুরে প্রাতঃপ্রণাম করিয়া তাহার মন্দির- মসজিদ হীন, শিক্ষাদীক্ষা শুৎ, গ্রামে ফিরিয়া গেল।

বনিয়াদের ইট মুসলমান আমলে সাহারাণপুর জেলায় এক গ্রাম ছিল। নাম বহেড়া। আজ লােকের নিকট উহা সন্দল সিং-এর বহেড়া নামে পরিচিত। কে এই সন্দল সিং ? সে ছিল এক অতি সাধারণ চাষী গৃহস্থ। কিন্তু অনেক দান ধ্যান পুণ্য করিয়াও সম্পন্ন গৃহস্থের ভাগ্যে যে খ্যাতি ঘটে না, সন্দল সিং তাহা পাইল। এবং শুধু মৃত্যুর পরে নহে, তাহার জীবিতকালেই সমস্ত জেলাম, গ্রামের নামের সঙ্গে তাহার নাম যুক্ত হইয়া গেল। গ্রামের জমিদার মনে করিতেন সকল সিং তাহাকে ফাকি দিয়াছে , তাহার প্রাপ্য সম্মান হইতে বঞ্চিত করিযাছে। গ্রামের ভূস্বামী তিনি, লােকে বলে কি না সন্দল সিং-এর বহেড়া। সত্য সত্যই ভিন্ন গ্রামের লােক সন্দল সিংকেই গ্রামের জমিদার মনে করিত। এই সব কারণে জমিদার মর্মান্তিক কুদ্ধ ছিলেন এবং গ্রামের অন্য সকলে তাহার এই মহৎ ক্রোধের অংশীদার ছিল। সকলেই মনে মনে জ্বলে, এবং নিজের মধ্যে প্রকাশ্য ভাবে বিষােদগার করিয়া মনের জ্বালা মিটায়। মুখিয়া লম্বরদার বলাবলি করিতেন-“বাবু সাহেবের নিজের দু’বিঘে জমী নেই, হয়ে বসেছেন সারা গাঁয়ের মালিক। আর বলিহারি চেহারার জলুম সাক্ষাৎ চামার।” গ্রামের চাষীরাও সন্তুষ্ট ছিল না। বলিত—“আছে ত দু’খানা মাত্র লাঙ্গল-ফে কোন চাষীর অবস্থা ওর চেয়ে ভাল। তবু ওঁর নামখানিতে এমন কি মধু আছে যে গায়ের নাম আটার মত ওঁরই নামের সঙ্গে জুড়ে যাবে।” যারা অল্পভাষী, কথা কম বলে বলেই যে কম জলে তা ; বনিয়াদের হট নয়। ভাবে—লােকটার বরাত বলতে হবে। রায়ত হয়ে রাজার মান। সন্দল সিং এসব বিরুদ্ধতার কথা অবগত ছিল ; তবে ভাবখানা এমন ধরিত যেন কিছুই জানে না। সকলের সঙ্গে হাসিমুখে কথা কয়, সুখেদুঃখে বুক দিয়া পড়ে,—কোন নালিশ কাহারও বিরুদ্ধে তাহার নাই। একদিন কিন্তু সে চুপ করিয়া থাকিতে পারিল না। শীতের রাত। শীত বেশ চাপিয়া পড়িয়াছে। ক্ষেতের কাজকর্ম প্রায় শেষ। মুখিয়ার বৈঠকখানায় মজলিস বসিযাছিল। গ্রামের সব মাতব্বরই উপস্থিত ছিলেন। হু’কা হাতে হাতে ফিরিতেছে; চিলিম ক্ষণে ক্ষণে বদলাইতেছে। এ-কথা সে-কথার পর সন্দল সিং-এর প্রসঙ্গ উঠল। সন্দল সিং-এর উপস্থিতিতে কেহ মুখ ফুটিযা ঈর্ষা প্রকাশ করিত মুথি মনের জ্বালা ক্রুর হাসিতে যথাসম্ভব ঢাকিয়া বলিলেন, “ভাগ্যবান লােক ত সন্দল সিং। যেখানে যাও, ওর নাম। আমি ত শুধু নামেই প্রধান। আমাকে চেনে কে ?” খক খক্ করিয়া কাশিতে কাশিতে লম্বাদার বলিলেন-“আরে ভাই, যদি সন্দল সিং-এর নাম বাড়ে, তবে আমাদেরই নাম। সে ত আর পর নর্য। ধন দৌলত যেমন, মানও তেমনি বরাতের কথা। দ্বিতীয় লম্বাদার ধনের প্রসঙ্গে এক টিপ্পনী কাটিলেন। তাহার এক আত্মীয় বহু টাকা গভর্ণমেন্টকে দান করিয়া রায় সাহেব হইয়াছিলেন কিন্তু স্বভাবের গুণে লােকে তার উপর হাড়ে হাড়ে চটা ছিল। তিনি বলিলেন—“কত ধনী নাম কিনবার আশায় লাখ লাখ খরচ করে ফতুর হয়েও যেই সেই। সলের ভাগ্য এমনি যে বিনি পয়সায় লাখপতিকে হারিয়ে দিয়েছে।” মুখিয়া আর এক পােছ ভার্নিস লাগাইতে গাইতে বলিলেন, না।

পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গল্প ১৩৮ “সন্দল সিং-এর কাছ থেকে নিখরচায় নাম করার রহস্যটা শিখতে ঝিলা চৌধুরী চুপচাপ এক কোণে বসিয়া ঝিমাইতে ঝিমাইতে সব শুনিতেছিল। সন্দল সিং-এর বিরুদ্ধে এই ব্যঙ্গ বিপ মন্দ লাগিতেছিল , তবে তাহার আশ মিটিতেছিল না। এত ঘুরাইয়া ফিরাইয়া বলিবার দরকার কি? জুতা মারিতে গিয়া মখমলে মুড়িয়া মারিতে হইবে না কি ? নিধন চাষী হইয়া যে খ্যাতি প্রতিপত্তিতে অপ্রতিদ্বন্দ্বী হইয়া উঠিয়াছে, তাহার অনধিকার চর্চার শান্তি এত সুকোমল হইলে চলিবে কেন? সন্দল সিং চুপ করিয়া সব শুনিতেছিল। প্রশংসার পাতে মােড়া বিষ জর্জর ঈর্ষাকে চিনিতে তাহার ভুল হয় নাই। এই ভাবে রাত দশটা বাজিয়া গেল। সন্দল সিং যেন কিসের প্রতীক্ষায় আছে। সকলে আসর ভাঙিবার উদ্যোগ করিতেছে, সন্দল করজোড়ে বলিল,- “আপনারা সকলে আর একটু বসুন।” বলিয়া জজুর দিকে ফিরিয়া বলিল-“নাপতের পাে, মুখিয়াজীর বাড়ী একবার হয়ে এসাে। জন সাতেক অতিথ এসেছেন। খাবার তৈরী চাই। আর শােন। মােকমায় যে সত্য বলে তার হয় হার। পঞ্চের সামনে যে মিথ্যা বলে, তার হয় পরম সর্বনাশ! এই কথা মনে রেখে, মুখিয়ানী যা বলেন, ঠিক ঠিক এসে বলবে।” দু ভাবিতে ভাবিতে চলিয়া গেল। অাসরের অন্য সকলে পরস্পর মুখ চাওয়া-চাওয়ি করিতে লাগিল। সকলের মতলবখানা কি? সন্দলের দিকে সকলের দৃষ্টি এক সঙ্গে পড়িল। দৃষ্টিতে প্রশ্ন বুঝিয়া সন্দল বলিল- “আপনারা নােজ জানতে চান, এ অধীনের এত নাম কেন ? জন্ধু তার জবাব এনে দেবে।” কুট বুদ্ধি মাতবরগণের শকুনি-দৃষ্টি সন্দলের মুখে রহস্য ভেদের সঙ্কেত বলবে ।

বনিয়াদের হট খুজিয়া ফিরিতে লাগিল কিন্তু অভেদ্য সে আবরণ। সন্দলের মুখে কোন ভাব পরিবর্তন নাই। কৌতুহল প্রতিহত হইয়া ফিরিয়া আসে। জলু ফিরিল। ঘুম নেই। মুথিয়ানী বলেছেন—“অতিথ এসেছেন ত কেতাখ করেছেন আমায়। সারাদিন আগুন তাতে পুড়ে কোথায় এখন একটু জিরােব, না অতিথ এসেছেন। আবার গিয়ে পিণ্ডি চটকাতে হবে। মুখিয়াকে বলগে যা নিজে এসে সেকে দিক খান কয়েক টিকর। আমাকে ত মুখিয়াগিরি করতে হবে না যে দশের কাছে সুনাম কুড়িয়ে ফিরতে হবে।” জন্ধু এবার দলের অনুরােধে প্রথম লম্বাদারের গৃহে গেল। মিনিট পনেরাের অস্বস্তিকর প্রতীক্ষার পর ফিরিল। লম্বাদারনী বলেছেন, “আদ্ধেক রাত কাবার হয়ে এল। বনের শেয়ালগুলােও শুয়ে পড়েছে । শুধু লম্বৰদারের অতিথি মহাপ্রভুদের চোখেই এখনও রাস্তায় রাস্তায় টহল দিচ্ছেন বিনি পয়সায় পেট পুরাবার ফিকিরে। যত সব আপদ সব কি আমারই কপালে ? বলবি ওবেলার পাঁচ ছ’থানা খনন রুটি রয়েছে। খায় ত থাক। তরকারী টরকারী কিছু নেই ! মুন লঙ্কা দিয়ে পারে ত খাক।” দ্বিতীয় লম্বারদারের ঘর হইতেও জঙ্গু আশানুরূপ মধুর বচনরাশি বহিয়া আনিল—“কথায় বলে, আপনি শুতে ঠাই পায় না, শঙ্করাকে ডাকে। ঘরে নেই অন্ত্রের একটি দানা, বাবু সাহেব অতিথ নিয়ে আসছেন ফৌজ কে ফৌজ। বলবি দুধ আছে কিছু। আধ আধ বাটি খাইয়ে দিক।” সদল সিং বলিল—“জঙ্গু ভাই, আর একটিবার শুধু। আমার ঘরে যা। বলবি ভি দেশ থেকে অতিথ এসেছেন। বেশী রাত হয়ে গেছে বলে মুথিয়াজী ওদের খাওয়া দাওয়ার কথা বলেন নি। ঘরে কি কিছু দুধ হবে

পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গল্প
১৪০
জন্ধু এবার বড় তাড়াতাড়ি ফিরিল। এক হাতে এক দলা তামাক,
অন্য হাতে দু'খানা ঘুটে।
—“চৌধুরানী কি বল্লেন জন্ধু?”
-বলবি, অতিথ দেবতার সমান। না খেয়ে পাকলে অধৰ্ম্ম হবে।
একটু পরেই যেন সকলকে নিয়ে আসেন ! আমি এখুনি উনুন ধরিয়ে
দিচ্ছি। ততক্ষণে এই তামাক নিয়ে যা, আর ঘুটে। চিলিম সাজিয়ে
দিবি।
সঙ্গতিপয় গৃহস্থেরা লজ্জায় আর মাথা তুলিতে পারিতেছিলেন না।
সতীসাধ্বী অতিথি-পষণা গৃহলক্ষ্মীর কল্যাণে সন্দল সিং সিং আজও
লোকের স্মৃতিতে অমর।

এক পরুণাম কে ওয়াতে একদা এক সংসার-বিরাগী যতী মাত্র একখানা কৌপীন কে ওয়ান্তে যােগভ্রষ্ট হইয়াছিলেন ; আমাদের ব্যোমকেশ বৰ্মণ ওরফে বেয়াড়া বৰ্মণ ওরফে খপ্তী উস্তাদ এক পণাম কে ওয়াস্তে যােগ ও ভােগ দুইই এক কোপে হারাইল। তাহা হইলে গােড়া হইতেই আরম্ভ করিতে হয়। বার বৎসর আগে ব্যোমকেশ কৰ্ম্মের সন্ধানে পশ্চিমের দু’চারটি সহরে কিছুকাল ঘরাঘুরি করিবার পর শেষকালে একদিন বিনা টিকিটে গাড়ী চাপিয়া বসিল। বিনা টিকিটে কেন? এইজন্য, যে ভাগ্যের উপর সম্পূর্ণ বকলমা দিতে হইবে। ভাগ্যান্বেষণে যখন বাহির হইয়াছে। তখন নিজের বুদ্ধি খাটাইযা স্থান নির্ণয়পূৰ্ব্বক কৰ্ম্ম সন্ধান করা উচিত কি? কিছু পরিমাণে আত্মনির্ভরতা থাকিয়া যায় না কি? তাই সে অদিস্থিত হৃষিকেশের দ্বারা নিযুক্ত হইবার আধুনিক উপায় খুঁজিতেছিল। হনুমান বুক চিরিয়া রাম-সীতার মূর্তি দেখাইয়াছিলেন ; আজকাল ত হৃদয় একেবারে হৃৎপিণ্ডে পরিণত হইয়াছে। বুক চিরিলে উক্ত পিণ্ড ফুসফুস্ প্রভৃতি ছাড়া আর বড় একটা কিছু পাওয়ার সম্ভাবনা নাই। সুতরাং হৃদস্থিতের সন্ধানে খামােখা হয়রাণ না হইয়া তাহার বহিস্থিত কোন এজেন্ট পাকড়াও করিতে হইবে। কয়েকদিন ধরিয়াই একমনে এজেন্টের ধ্যান করিতেছিল; একরাত্রে ধর্মশালার ছাপােকা অধ্যুষিত চার পাই হইতে তড়াক করিয়া লাফাইয়া উঠিল এবং পুটুলী বগলে তৎক্ষণাৎ ষ্টেশনের দিকে রওয়ানা হইয়া গেল। গাড়ীর গার্ড ও টিকেট * হিলী শব্দের প্রতিবর্ণীকরণ (transliteration) কালে অক্ষরের আনুরূপ্য অপেক্ষা উচ্চারণের যথাতথ্যের দিকে অধিক দৃষ্টি দেওয়া হইয়াছে।

; পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গল্প ১০২ চেকার থাকিতে এজেন্টের অভাব? বিশ্বব্রহ্মাণ্ড চালায় না বটে কিন্তু গাড়ী ত চালায়। তাহারা যেখানে নামাইয়া দিবে, সেখানেই ‘যথা- নিযুক্তোহস্মি’র উপযুক্ত ক্ষেত্র মানিতে হইবে। প্লাটফৰ্ম্ম-টিকিট কাটিয়া ব্যোমকেশ অপেক্ষমান একখানা গাড়ীতে আসন গ্রহণ করিল। ক্ষণ পরেই গাড়ী ছাড়িযা দিলে, ব্যোমকেশ আশান্বিত মুখে তীর্থের কাকের মত গাড়ীস্থিত হৃষীকেশের পথ চাহিযা ঘন্টার পর ঘণ্টা কাটাইতে লাগিল। কিন্তু সেই যে বলে কাকস্য পরিবেদনা, অর্থাৎ কাকের ব্যথায় তীর্থযাত্রীর কি আসে যায়। ভাগ্য এমন বেড়া বস্তু যে বিপদ যদি চাও, তবে তাহা তােমার ত্রিসীমানায় ঘেষিবে না। নিরাশ চিত্তে ব্যোমকেশ ঘুমাইয়া পড়িয়াছিল। হঠাৎ এক প্রবল ধাক্কায় জাগি। উঠিয়া দেখে গাড়ী যাত্রীশূন্য ; কিন্তু একের বদলে তিনজন হৃষীকেশ হাজির হইয়াছেন, (১) গাড়ীর ঝাড়ুদার, (২) এক কুলী, (৩) একজন সসুরা। ব্যামকেশের টিকস্ নাই বুঝি তাহারা একজন চেকাব ডাকিয়া আনিল। চেকার পকেট হইতে রসিদ বহি বাহির করিতে করিতে বলিল, “নিকালে কিরাযা। আউর জুম্মানা ভী।” ব্যোমকেশের হঠাৎ এক বুদ্ধি জোগাইল। এদিকে ত হৃষীকেশ নিরাশ করিয়াছেন, দ্বিতীয ফাদে পা দিতেও পারেন। যেন তেন করিযা ঘটনা পরম্পরার হাতে নিজেকে সপিয়া দেওয়া চাই ই। ভাবিয়া চিন্তিয়া তাহার এক প্রাক্তন অধ্যাপকের উক্তির প্রতিধ্বনি করিয়া বলিল, “টাকা আছে, তবে দিবে না।” এইবার চালাকি সফল। সসুরা তাহাকে ষ্টেশন হইতে সােজ। মন্দিরে নিয়া তুলিল। তারপর•••না এত গােড়ায় আরম্ভ করিয়া ভাল করি নাই। এইখানে সিনেমার ধরণে এক বিরাট কাট না দিলে নয়।

১৪৩ এক পাম কে ওয়ান্তে স্থান উত্তর পশ্চিমের সেই হৃষীকেশ পন্থায় নির্বাচিত নাতি সহর। সময় যাহাকে বলে একেবারে সময়ের সার অর্থাৎ বর্তমান। হৃষীকেশ পর্বের পর নানা অবস্থান্তরের মধ্যে দিয়া পুরা একযুগ কাটিয়া গিয়াছে। ব্যোমকেশ শেষ পর্যন্ত প্রাইভেট টুইশনিকেই জীবিকা করিয়া- ছিল। যে অল্প সংখ্যক বাঙালী ওখানে আছেন, তাহারা তাহার খাপছাড়া চালচলন কথাবার্তা ও বদ মেজাজের জন্য তাহাকে বেয়াড়া বৰ্মণ আখ্যা দিয়াছেন। নামকরণে অবাঙালীরাও পিছনে পড়িয়া নাই তাহাদের মধ্যে ব্যোমকেশ খপ্তী উস্তাদ নামে পরিচিত। বার বৎসরে খপ্তী উস্তাদের শিষ্য-শিষ্যার এক বিরাট বাহিনী সৃষ্টি হইয়াছে। তাহাদের মধ্যে জন কয়েক মােহন্ত ও আছেন। সবই উদাসীন সম্প্রদায়ের। উত্তর পশ্চিমে উদাসী সাধুদের অন দুই হাজার দেবস্থান, মঠ, মন্দির, দরবার, আখাড়া ইত্যাদি আছে। প্রত্যেক জায়গায় একজন করিয়া সেবাইত থাকেন—যাহার প্রধান কর্তব্য সম্প্রদায় ভুক্ত রতা সাধুদের ভরণপােষণ। আজকাল ইহা গৌণ হইয়া পড়িয়াছে জমীদারী মহাজনী, মামলা মােকদ্দমা ও অন্য অনেক অনির্বচনীয়’ কাৰ্যেই ইহাদের দিন কাটে। উদাসীনদের মধ্যে, কি জানি কেন, সত্যকার ধৰ্ম্মপিপাসু এমনিতেই কম। মােহন্তগণ ত সম্পূর্ণভাবে ভােগমত্ত গৃহী। তবে অধিকাংশকেই অবিবাহিত থাকিতে হয় এবং নানা অর্থহীন নিত্যক্রিয়া কলের পুতুলের মত করিয়া যাইতে হয়। সাধারণতঃ মােহন্তগণ নিজ নিজ উত্তরাধিকারী নির্বাচন অর্থাৎ কাহাকেও শিষত্বে বরণ করিয়া যান। অশিষ্যক অবস্থায় দেহপাত হইলে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গল্প ১৪৪ সাধুমণ্ডলী পরবর্তী স্থানধারী নির্বাচন করেন। কোন মােহন্ত পরলােক- গমন করিলে, তাহার স্থলবৰ্ত্তীর অভিষেক খুব ঘটা করিয়াই হয়। যত বিত্তশালী মঠ, নব মঠাধীশের অভিষেকে তত বেশী সমারােহ। বক্ষ্যমান ঘটনার সূত্রপাত হয় ব্যামকেশের শেষতম মােহন্ত ছাত্রের অভিষেক কা। এই ছাত্রটির ইতিহাস একাধিক কারণে চমকপ্রদ। তিন লাখ টাকা আযের যে গুরুদরবারে বড় মােহন্তজীর দেহাবসানে সে সদ্য গুরু পদবীতে আরূঢ় হইয়াছে, এখানেই দশবৎসর আগে সে ছিল ৪৫০ জন আশ্রিত ছাত্রের অন্যতম। দরবার হইতে অন্য অনেক দরিদ্র ছাত্রের সঙ্গে অন্ন বস্ত্র ও স্কুলের ফীস দান লইয়া পড়া শােন করিত। এই অবস্থায় একদিন স্বৰ্গত মােহস্তের দৃষ্টি তাহার উপর পড়ে। বাকী জীবন সে ভুড়ি, দাড়ী সােনার বালা ও যাবার দলের ধরণের পােষাক পরিযা, দুধ পুকুরে, ধৃত কুণ্ডে নাহিয়া এবং কৃপাপ্রত্যাশীদিগকে কিঞ্চিৎ অর্থ ও প্রচুর পদধুলি বিতরণ করিয়া কাটাইতে পারিত। কিন্তু মােহন্ত সমাজে অঘটন ঘটাইযা, সকলের বিস্ময় বিস্ফারিত নেত্রের সামনেই সে জোঁকের মত যুঙ্গী পুথি আকড়াইয়া রহিল এবং স্বচেষ্টায় ম্যাট্রিক পাশ করিয়া ফেলিল। তখন কর্তারা কৃপা, ও কৌতুহলপরবশ হইযা ব্যোমকেশকে গৃহশিক্ষক নিযুক্ত করিয়া দিলেন। ব্যোমকেশের হাতে প্রাইভেটে ইন্টার পাশ করিয়া সে বিশ্ববিদ্যালয়ে যােগদান করিল। এবং সকলকে আর এক প্রস্থ হতভম্ব করিযা দিয়া কিছুদিন পরে আগষ্ট আন্দোলনের বিদ্যুৎ প্রবাহে ভাসিয়া জেলে গিয়া উঠিল। কমলার কৃপায় কালেভদ্রে দু একজন কাঙালীচরণকে মহারাজ কুবের চন্দ হইতে দেখা যায়। কিন্তু এমন ভাবে অযত্নপ্রাপ্ত হাতের লক্ষ্মীকে পায়ে ঠেলিতে বড় একটা কেহ দেখে নাই । এই সব গুরুরবার এমন কঠিন নিগঢ়ে গভর্ণমেন্টের কাছে বাঁধা যে এই ১৪৫ এক পরুণাম কে ওয়ান্তে দৈত্যকুলোদ্ভব প্রহলাদটি কারা প্রাচীরের অন্তরালে থাকিতেই তাহার বাজ্যচ্যুতি ঘটিবার উপক্রম হইযাছিল। শেষ পর্যন্ত কেন যে তাহা ঘটিল ইহা এক দুজ্ঞে য রহস্য। যাই হােক ভাগ্যলক্ষ্মী বীরকে ত্যাগ কবিলেন না। বৎসর কাল অবরুদ্ধ থাকি সে মুক্তি পাইযাছিল। তাবপর তিন বৎসবে এম-এ, পাশ করিযা ফিবিযাছে। আইন পরীক্ষা দিতে দিতেই বড় মহাবাজ দেহ রাখিলেন। তাহাব এক মাসের মধ্যেই তাহাব রাজ-তিলক হইল। ছাত্রগর্বে বব্যামকেশেব অস্তব পূর্ণ। হতদবিদ্র বালকেব মনে এই যে দেশাত্মবােধ ধনলােভেব উপস্ট জযী হইল-ইহাতে সে পবম আত্ম- প্রসাদ লাভ কবিয়াছে। সে ভাবে ইহাতে তাহার কিছু না কিছু হাত আছেই। তবু সে অভিষেকের দিন শিষ্য প্রববের সম্মুখীন হইবার সাহস পায নাই। সামনে গেলেই পরম্পরাগত প্রথানুসাবে অন্য সকলের সঙ্গে স্বীয় ছাত্রের পাদ বন্দনা কবি ভেট দিতে হইত। ভেট সে লইযাও গিযা- একজোড়া খদ্দবেব ধুতি। কিন্তু পাযে মাথা রাখিযা প্রণাম করাব কল্পনায় আতঙ্কগ্রস্থ হইযা অমনি ফিরিয়া আসিল। দু’চাব দিন পবে যখন ভীড থাকিবে না, তখন একসময় আসিযা দিলেই হইবে। ছিল , তিনদিন পরের কথা। ভীড় অনেক কমিছে। সহরের লােক- জনের যাতায়াত তেমন বেশী নাই, কিন্তু বাহিব হইতে যাহারা আসিযাছেন তাহাদের ভীড়েই এতবড় বাড়ীটা যেন পা ফেলিবার স্থান নাই। যে- দিকে তাকাও, ছ’ ছ’ ফিট লম্বা দুশমন চেহারার ইযা জোযান সব মােহন্ত ও সাধুর দল। সজটা, নির্জটা, গৈবিকধারী, ও শ্বেতাম্বর ; কৌপীন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গল্প ১৪৬ মাত্র সম্বল, আবার লম্বসাট পটাবৃত। এখন সকলে বাক্স পেটরা গুছাই- তেছে এবং নিজেদের পাওনা গণ্ডা, প্রণামী, ইত্যাদি লইযা নিরন্তর কলহ কোলাহল করিতেছে। পাঞ্জাবীই বেশী। নূতন মােহন্তকে ঘিরিযা এতলােক বসিয়াছিল যে সহজে নিকটে পৌছিবার উপায় নাই। ঘরের মধ্যে এক অবর্ণনীয় সুবাস প্রবাহিত হইতেছে। বাবাজীরা ঘড় ঘড়া লসসী (ঘােল ), ঠাণ্ডাই ও সদাই মৃৎভাণ্ড হইতে উদরভাণ্ডে ঢালিতেছেন ও তাহা দেহছিদ্রপথে বাহিরে আসিয়া স্বভাব-শুস্ক গরম হাওয়াকে ধৰ্ম্ম-বাসিত ও লবণা করিতেছে। পাঞ্চালবাসীরা এমনিতেই মান-বিমুখ। তাহার উপর সাধুত্বের কল্যাণে সব রকম নোঙরামিতে জন্মসিদ্ধ অধিকার ও সুতরাং ভূতপ্রেত ছাড়া তাহা- দের পূণ্যসঙ্গ কেহ সহ করিতে পারে না। ব্যোমকেশ এক ঝলক দেখিয়া ও কিয়া দরজা হইতেই ফিরিতেছিল ; অমনি ভিতর হইতে কে একজন বলিল—“ইয়হী ত মাষ্টার সাহব হঁায়, জিনকে জিক অভী অভী মহন্তজী কর রহে থে। বােলাও বােলাও, অন্দর বােলা লাে।” ব্যোমকেশ গলার আওয়াজ চিনিল। দরবারের ম্যানেজার কথা বলিতেছিলেন। লােকটি বেশ দলু, পরােপকারী কিন্তু হাড়ে হাড়ে সব (snob)। তাই ব্যোমকেশের সঙ্গে মৌখিক ভাল বনিবনা ছিল । আজ এই প্রকাশ্য অভ্যর্থনার বহরে সে বিস্মত হইল। ব্যাপার কি ? ভীড়ের মধ্যে পথ হইল। ব্যোমকেশ সামনে গিয়া বসিল। নূতন মােহন্ত কক্ষান্তরে গিয়াছিলেন। ফিরিয়া আসিযা, সকলকে বিস্মিত ও অধিকাংশকে ক্ষুব্ধ করিযা স্বয়ং ব্যোমকেশকে নমস্কার করিলেন। ব্যোম- কেশ প্রতি নমস্কার করিয়া খদ্দর জোড়া আগাইয়া দিতেই ম্যানেজারের কুঞ্চিত হইল। কহিলেন-“ফের ক্যা জেল ভেজওয়ানা হতে হয় আপ? ;

১৪৭
এক পরুণাম কে ওয়ান্তে
মােহন্ত হাসিমুখে বলিলেন—“জানে ভী দে।”
তারপর সকলের দিকে চাহিয়া-“হাঁ, তাে, জো ম্যয় কহ, রহা হা।
আপ আগর উদাসীন সম্প্রদায় কো উচা উঠানা চাহতে হাে, তত হমে ইন
জ্যায়সে বিওয়ান কী জরুরৎ হ্যায়। ত্যাগ তপস্যা কে জানে দীজিয়ে
হারে বীচ কোই আচ্ছা পঢ়া লিখা আদমী ভী নছী হ্যায়। জমান।
পলট রহা হ্যায। আপকো চাহিয়ে কি নয়ে মহন্ত বনাতে সময অকূল
সে কাম লে।”
••
ব্যোমকেশ বলিল, “বাত ক্যা হায় ?”
ম্যানেজার জবাব দিলেন, “এক জগহ, কে মােহন্তাই খালি হয়।
উদাসীনমণ্ডলী মহন্ত চুনেঙ্গে। মারে মহন্তজী করতে হয়, আপকো
চুনা জায়।”
মুঝকো চুনা জায় ? ক্যা মতলব ?
মতলব ইয়হ, কি আপ মহন্ত বনে। হমে কিসীকে তত বানানা
হী হায়। আপসে আচ্ছা কোই মিলনে কা নই। আগর আপ মান জয়,
তাে। পর, এতরাজ ক্যা হােসকতা হয়? উস আস্থান কা বিশ হাজার
পয়ে সালানা আমদানী হায়। টুইশনকে লিয়ে আপকো মারা মারা
ফিরনা পড়তা যায়। অব জিন্দগী ভরকে লিয়ে আরাম হী আরাম।
আউর ইজ্জত কিতনী। সব আকর চরণ পুজেঙ্গে।
হম আপকো লেনে
কি লিয়ে তৈয়ার হ্যায়। অব আপ সােচ লিজীয়ে। মগর এক বাত
যায়। শাদী নহী কর সকতে। অব তত ইচ্ছা ভী নী রহী হােগী।
কাফী উমর আপকী বীত চুকী।
কেঁদো বাঘের মত একজন বাবাজী দাড়ী চুমাইতে চুমাইতে
বলিলেন—“আউর ইচ্ছা ভী হা, তাে ক্যা। শাদী কা কা ঘাটা।
রাখেলী রাখ লেনা।”

পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গল্প ১৪৮ বলিযা অশ্বহা করিয়া উঠিলেন। অন্যেরা চোখ টেপাটিপি গা টেপাটিপি করিয়া মৃদুমৃদু হাসিতে লাগিলেন। রাখেলী শব্দের অর্থ রক্ষিতা। ব্যামকেশ স্বাচ্ছন্নের মত বসিযা বিশ হাজারের কথাই ভাবিতেছিল। তাহাকে ভাবিবার সময় দিবার জন্য ম্যানেজার ততক্ষণে অন্যদের সঙ্গে কথাবার্তায় মননানিবেশ করিয়াছেন। ব্যোমকেশ রুদ্ধনিঃশ্বাসে ভাবিতেছিল, বিশ হাজার টাকা আয় । বার বৎসর সে দারুণ সংগ্রাম করিযা অল্প যাহা কিছু সঞ্চয় করিছিল, বেশী লাভের আশায় ব্যবসাযে নিযােগ করিয়া তাহার সব খােয়াইয়াছে। এখন হাতে কিছু নাই, এদিকে না আছে প্রথম যৌবনের কর্মশক্তি, না উৎসাহ। পরিশ্রম ইতিমধ্যেই দুঃসহ হইযা আসিযাছে। এখনই হাতে বাতের ব্যথা আরম্ভ হইযাছে। দেশে ফিরিবার মত আশ্রয় নাই ; বিদেশেও কোন আশ্রয় সৃষ্টি কবিতে পারে নাই। জীবন সায়াহ্নে কিসেব বা কাহার উপর নির্ভর করিবে, এই দুর্ভাবনা এখন হইতেই মাথা চাগা দিয়া উঠিযাছে। এমন অবস্থায় কুল-কিনাবাহীন সাগরে ভাসিতে সিতে হঠাৎ যেন জীবন-তরণী সােনা পাহাড়ে ঠেকিযা গেল। এইবাব সকল মুস্কিল আসান। বার্ধক্যেব ভয় আর নাই, নিরাশ হইবার ভয় নাই। ভাবিতে ভাবিতে চিন্তার জমজমাট বিস্ময-প্রগাঢ়ভাব কিছু কমিল ; তাহার স্বাভাবিক তারল্য ফিরিতে লাগিল।••••••কোঠিতে তাহাব দৈবধন প্রাপ্তি যােগ আছে বটে। এই ত দৈবধন, অযত্নলব্ধ অতুল সম্পদ ; তবে কোষ্ঠির অনেকটাই মিলে নাই। এই যেমন, সাহিত্যিক খ্যাতির কথা। আর মিলে নাই বিবাহযােগ। কোষ্ঠিতে, হাতে, মাথায় সব চিহ্ন মিলাইয়া দুই দুইটি বিবাহ হইয়াব কথা। অথচ এদিকে ব্যস ১৪৯ এক পরুণাম কে ওয়াস্তে ভাটাইয়া গেল। একটিও•••••• এতটুকু আসিতেই ব্যোমকেশের ভাবনার নোয় হঠাৎ ধাক্কা লাগিল। আকস্মিক ধাক্কায় নিজের অজ্ঞাত সারে তাহার মুখ দিয়া বাংলা কথা বাহির হইয়া পড়িল, “তাহলে ঘন্টির কি হবে ? ম্যানেজার সচকিত হইয়া বলিলেন-“ক্যা কহ রহে হে, বর্মন- সাহব।” ব্যোমকেশ লক্ষ্য করে নাই--চেহারায় চিনিবার উপায়ও ছিল নাভীড়ের মধ্যে একজন বাঙালী মােহন্তও আছেন। খুব দামী খদ্দর পরণে। আজকাল এইসব জরদগব জো হুকুম স্থান-কাল-বিস্মৃত তালকান দলের মধ্যেও দুই একজন করিয়া যুগ-সচেতন মানুষের আবির্ভাব ঘটিতেছে। বাবাজী বহু টাকার মালিক। ত্রিশ লাখ টাকার শুধু লগ্নী কারবারই তাহাদের আখাড়ার আছে। জন্মস্থান বাঁকুড়ায়। একেবারে মােম স্থানেই পেছাইয়া গিয়াছেন বলিতে হয়। তিনি বলিলেন—“উত্তহ পুছ রহে হায় কি ঘণ্টিকা ক্যা হােগা।” ম্যানেজার বুঝলাইয়া উঠিলেন—“ঘন্টি ? ক্যায়সী ঘন্টি ? ইসী লিয়ে জী তে ইনকো লােক খপ্তী বাতাতে হয়। ভােজন কী ঘন্টি কে যােচ রহে হে ক্যা? আজ ত দের হােগী, তিন বাজ জায়েঙ্গে।” ব্যোমকেশ তাড়াতাড়ি উঠিয়া পড়িয়া বলিল—'নহী নহী, উত্তহ বাত নহী । ময় অব চলতা হু। পাঁচ সাতদিন সােচ কর জবাব দুঙ্গা।” সকলে বলিলেন—“হা , জরুর সােচিয়ে। কোই জলদী নহী।” বাঁকুড়াবাসী বাঙালী বাবা ও অন্য সকলের প্রতিধ্বনি করিয়া, বাংলা হিন্দী মিশাইয়া বলিলেন—“হাঁ হাঁ সােচে দেখুন। বিশ হাজার পয়ে দিল্লগী নয়। জনম ভাের পায়ের উপর পা তুলে আরাম করবেন।”

পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গল্প ঘন্টি হইতেছে ব্যোমকেশের এক ছাত্রীর নাম। গণিতে হালে এম-এ পাশ করিয়া স্বাধীন জেনানা হইয়াছে। এ দেশে মেয়েদের নাম এক তাজ্জব ব্যাপার। ঘন্টির এক খুড়তুতো বােনের নাম কটোরী (অর্থাৎ বাটা)। পেস্তা বাদাম প্রভৃতি যে কোন শব্দের সঙ্গে বালা বা দেবী লাগাইয়া দাও—মেযেলী নাম হইয়া গেল। আজকাল দু'চারটা বাংলা নাম চলিতেছে—তার ফলে মেয়ে স্কুলের প্রতি ক্লাসে অন্ততঃ আধ ডঞ্জন করি শান্তি, শীলা, লীলা, সাবিত্রী ও শকুন্তলা মিলিবে। তবে বিদঘুটে নামের ত্রুটী স্বাস্থ্য সৌন্দৰ্য্য সুষমায় দেহবর্ণে শতগুণ পােবাইয়া যায়। আমাদের অনুপমা, অপরাজিতা, অরূণা, অপর্ণা প্রভৃতি আহামরি নামের অধিকারিণীগণ স্বাস্থ্যে হাড়গিলা, বর্ণে সাক্ষাৎ রক্ষাকালীর বাচ্ছ। হা- হুতাশ, দীর্ঘশ্বাস ও পাকা পাকা বচনবিন্যাসের বহর এমন যে মনে হয় পােভাকাঠে জল পড়িয়াছে, আর অবিরত ধেযাইতেছে। ঘন্টি কাশ্মিরী মেয়ে। কাশ্মিরের তুলনায় কালাে ; তবে বিদ্যা, বুদ্ধি, স্বাস্থ্যে স্বাভাবিকতায় আলাে। আর তাহার নামটি নেহাৎ নিরর্থক নহে। বরং একটু বেশীই বাজে বলিতে হয়। আজকাল বড় করুণবে বাজিতেছে। দূরাগত মৃদু রােদনধ্বনির মত মনকে উতলা করি তােল। তাহার আকুলি-বিকুলি বিদেশী ভাষার ব্যুহ ভেদ করিব। ব্যোমকেশের হৃদযের নিভৃত গহনে অনায়াসে প্রবেশ লাভ করিয়াছে। মাতৃভাষাও বুঝি এমন মর্মস্পশী হয় না। কালই ত তাহার আসিয়াছে—যেন হৃদয়ের ক্ষতমুখে উৎসারিত শশানিত দিয়া লেখা একখানা অকাব্য। ••••••“চার চার চিঠঠী ম্যয়নে তুমকো লিখী স্থায় ; পর ;

১৫১ এক পরুণাম কে ওয়ান্তে অরে নিষ্ঠুর, নির্দয়ী, আউর ক্যা ক্যানী, লিখা নহী তাে লিখা হী নী! অব ময় ক্যা ক।••• ব্যোমকেশ বার বৎসরের নানা অভিজ্ঞতার কথা ভাবিয়া চলিল। বার বৎসরে অন্ততঃ পাঁচবার ষাটটি মাযারূপিণীকে সে পড়াইয়াছে। দেশে গৃহশিক্ষককে অমুকদা বলিয়া ডাকিবার রেওয়াজ না থাকায়, কোন শিক্ষাগুরুর পক্ষেই যাহা কালে পতি পরমগুরু হইয়া উঠিবার সম্ভাবনা প্রায় নাই। ব্যোমকেশের মত হাদা লােকের কথা কি ; অতিশয় ঘুঘু গুরুরাও,সুবিধা করিতে পারেন না। ব্যোমকেশের ত এইসব ব্যাপারে সামান্য মাত্রও সাহস ছিল না। জীবিকার জন্য সাত ঘাটের জল খাইয়া শেষকালে সে তৃণখণ্ড আশ্রয় করিয়াছে, পাছে তাহা হস্তচ্যুত হয় এই ভয় যেন কিছুতেই যাইতে চায় না। এ হেন মেযে-পূর্ণ অথচ মায়াশূন্য জীবনে ঘণ্টির আবির্ভাব। বিনা আয়াসে, উভযের অজ্ঞাতসারেই, নিত্যনৈকট্য ক্রমে আন্তরিক ঘনিষ্ঠতায় পরিণত হইল। বালিকা ক্ৰমে কিশােরী হইল; অলক্ষ্যে বয়স ও বিদ্যা বাড়িয়া চলিল : ম্যাটিক, আই-এ, বি-এ, এম-এ পাশ করিল। এখন সে পরিণত যৌবনা, পরিণত বুদ্ধি। মােদ্দা কথা এখন এই দাড়াইয়াছে যে ঘন্টি ব্যামকেশের ভার লইতে প্রস্তুত। এম-এটা যখন হইয়া গিয়াছে, আর কিছু না হােক, মাষ্টারণীগিরি জুটিবেই। সুতরাং আট বৎসর পূৰ্বের ছাত্রীকে বিবাহ করিবার অপরাধে অতঃপর যদি ব্যোমকেশের আর ছাত্রী নাও জুটে, কুছপরােয়া নাই। ঘটি রােজগার করিবে ; এখানকার পাট তুলিয়া দিয়া, অন্যত্র ঘর বাঁধিবে; এমনকি বাপের মত করাইবার ভারও সে লইবে। ব্যোমকেশ শুধু বলুক, হাঁ। হাঁ, সে এখনও বলে নাই। বলি বলি করিয়াও বলে নাই। প্রৌঢ়, বয়সে বিবাহ করার নানা ঝঞ্জাট ত আছেই; তাহা ছাড়া এতদিন সে ঘটি ;

পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গল্প ১৫২ নিকট তাহার অতীত জীবনের একটি ব্যাপার গােপন রাখিয়াছিল। ঘটির আকুলতায় বিচলিত হইয়া মনস্থির করিয়া কালই তাহাকে তাহা জানাইয়া দিয়াছে। যদি ঘটি এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয় তবে আর তাহার অমত নাই। কিন্তু কোন মেয়েই যে এই পরীক্ষায় পাশ হইবে, তাহা ত মনে হয় না। এমন সময় এই কাণ্ড। এমনিতেই সে দোমনা ছিল, এখন বিশ হাজারের বিপর্যয় ধাক্কায় বিবাহের নৌকা বুঝি বানচাল হয। যাহা হৌক ঘন্টির জবাব না পাওয়া পর্যন্ত সে এখন ওদিকে আর অগ্রসর হইতে পারে না। আচ্ছা, দু’দিক রক্ষা হয় না? বাঘা বাবাজী ত বলিয়াই দিয়াছেন । ‘রাথেলী রাখলে না। ঘন্টি অনেক দূর অগ্রসর হইয়াছে সন্দেহ নাই কিন্তু বিবাহের চেয়ে বড় অবস্থায় পৌছাইতে পারিবে কি? আধুনিক যুগ- মানবগণ রেঙ্গুণের নন্দ মিস্ত্রীর মতই বিশ্ববিখ্যাত সন্দেহ নাই কিন্তু পরমাশ্চর্যের বিষয় তাঁহাদের মতামত উহার নিকট সম্পূর্ণ অজ্ঞাতই রহিয়া গেছে। বাড়ী আসিয়া ব্যোমকেশ রান্না করিতে বসিল। টুইশনের চাপ থাকিলে সে তাহার নিজের উদ্ভাবিত টিনের কুকারে কাজ সারে। আর কিছু নয়, গােটা দুই তিন মাটির হড়ী, টিনের মধ্যে জল দিয়া বসাইয়া দেয়, উপরে খাজকাটা একখানা কাঠ চাপা দেয়। মাপ মত কয়লা চুলায় দিয়া ঐ টিন চড়াইয়া যেথায় প্রয়ােজন চলিয়া যায়। অনেকক্ষণ পর্যন্ত খাবার গরম থাকে। তাছাড়া সর্বাপেক্ষা বড় সুবিধা, মাটির হাড়ী মাজিবার হাঙ্গামা নাই। এখন মে মাসের প্রথম ভাগ। টুইশন প্রায় নাই। তবু আজ এক রকমের প্রান্তি যেন সর্বাঙ্গ ব্যাপিয়াছে। তাই ক্যানো-কুকার এক পরুণাম কে ওয়াতে চড়াইয়া রাখিয়া সে পড়িবার ঘরে আসিয়া ঢুকিল। তিন আলমারী ভরা বই। অধ্যয়ন কক্ষে প্রবেশ করিতেই তাহার ভাবনার মােড় ঘুরিযা গেল। স্কুল সঙ্গে এতক্ষণ স্কুল বস্তুর কথাই মনে হইতেছিল ; এখন অধ্যয়ন কক্ষের সূক্ষ্ম ভাবাচ্ছন্ন আকাশ তাহার চিত্তকে ঔচিত্য অনৌচিত্য, পাপ পূণ্যের বিচারের খাতে বহাইয়া দিল। কিন্তু বেশী পড়াশােনার একই মাত্র পরিণাম। প্রতি প্রশ্নের সপক্ষে বিপক্ষে মনের ভাণ্ডারে বিস্তর কথা জমি উঠে ; মনে আর কোন বিষযেই কোনকালে দ্বিধাহীন নিসংশষ হইতে পারে না। এদিকে বাহিরের দৈনন্দিন ঘটনা পরম্পরা ত কাহারও অপেক্ষায় বসিযা নাই ; পণ্ডিত ভাবিতে ভাবিতে যতক্ষণ গলদঘর্ম হইতেছেন, ততক্ষণে জগতের কৰ্ম্ম- প্রবাহ অনেক আগাইয়া গেছে। ফলে এই হয় যে চিন্তাশীল লােকের নিত্য-নৈমিত্তিক কাজকর্ম তাহার চিন্তা বা অধ্যযনের দ্বারা বিন্দুমাত্র প্রভাবিত না হইয়া শুদ্ধ অবস্থার চাপে যন্ত্রবৎ এমনি অগ্রসর হইয়া চলে। পাপ-পূণ্য, ধর্মাধর্ম সম্বন্ধে যতবাব ব্যোমকেশ ভাবিয়াছে, পরস্পর বিপরীত কথার ঝাকুনিতে চিন্তার চালুনীর ছিদ্রপথে সবগুলি ভাবনার দানা নিঃশেষে গলি গিযাছে। আজও তাহার ব্যতিক্রম হইল না। সব তালগােল পাকাইযা খেই হারাইয়া গেল। আবার সেই চিরন্তন পরিণাম : ঘটনা প্রবাহ যে দিকে নিয়া যায় যাক। কোন আদর্শকেই ত সে শেষ পর্যন্ত আঁকড়াইযা ধরিয়া থাকিতে পারে নাই। এই ক্ষেত্রেও যা হইবার হউক। কিন্তু চিন্তাক্ষেত্রে যেমন অরাজকতাই হউক না কেন, ব্যোমকেশের দৈনন্দিন আচরণে একটা সুনির্দিষ্ট মতামত কিছুকাল হইতে স্পষ্ট হইযা উঠিতেছিল। ভাল মন্দের মােটামুটি সন্তোষজনক একটা মাপকাঠি খুজিযা পাইয়াছে। স্ত্রীপুত্র কন্যা বিষয়-আশয় প্রভৃতি নিজস্ব কোন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গল্প ১৫% মানসিক আশ্রয় না থাকায় এবং ধ্যান জপ প্রভৃতির দিকে ঝোক না থাকায়, ব্যোমকেশ যুগধর্মের প্রভাবে রাষ্ট্র চিন্তাকে অবসরের সঙ্গীরূপে আশ্রয় করিয়াছিল। দেশের স্বাধীনতার চিন্তা কোন প্রকার সূক্ষ্ম মানসিকতা দাবী করে না ; অথচ সব মিলাইয়া মনে একটা মহৎ আদর্শ নিষ্ঠার উত্তেজনা সব সময়ে সঞ্চার করিয়া রাখে। তার উপর আছে, বাধা নিষেধের, বিপদের আকর্ষণ। সুতরাং ইংরেজ বিরােধের মধ্যে শ্রেয় প্রেম মিলিয়া গিয়াছে এবং উভযে দুঃসাহসিকতার ইন্দ্রধনুবর্ণে উদ্ভাসিত হইয়া উঠিযাছে। নিরন্তর ভাবিতে ভাবিতে ও বলিতে বলিতে দেশের স্বাধীনতার প্রশ্ন তাহার কাছে ব্যক্তিগত ব্যাপারের অধিক হইয়া দাড়াইয়াছিল। ব্রিটিশ বিরােধই পূণ্য ; তাহার বিপরীত ব্যবহার অধর্ম। যে ইংরেজের কোপভাজন, সে অতিশয় ঘৃণিত চরিত্রের লােক হইলেও বাপের ঠাকুর। আর কিছু না হােক ইংরেজকে ত ক্ষ্যাপাইতেছে । তাহা হইলেই হইল। এই নুতন নীতির মাপকাঠিতে যত সব কুচুটে কমিউনিষ্ট, সােস্যালিষ্ট, র্যাডিক্যাল প্রভৃতি আধুনিক লিঙ্গায়েতী বামাচারী ও বৌদ্ধ ( Intellectual) সম্প্রদায়সমুহও তাহার কাছে পার পাযা যাইত। তারপরে আসিল জাতীয় জীবনের অবিস্মরনীয় অধ্যায় আগষ্টের বিপৰ্যয়। ঠিক একই কারণে এখন এই সব বিশ্বাসহন্তা দেশদ্রোহীদের সম্বন্ধে তাহার মনােভাব অবর্ণনীয়। পারিলে চিবাইয়া খায়। ধর্মাধম্মের এই মাপকাঠিতে মােহন্তগিরি মন বােধ হইল না। সে দেশ সেবকদের শক্তি বৃদ্ধি করিতে পারিবে—অবশ্য যদি টাকা হাতে পাইয়া মাথা বিগড়াইয়া না যায়। কিন্তু আত্মসম্মান ? বিনা উপার্জনে ধনের অধিকারী হওয়ার মধ্যে কোথায় যেন এক বিষম গ্লানি নিহিত আছে। তারপর ধর্মাচরণের কথা। কিশাের বয়সে এক সন্ন্যাসীর নিকট মন্ত্র নিয়াছিল কিন্তু বরং এক পরুণাম কে ওয়াক্তে অস্থিরচিত্ততার জন্য বেশীদিন ধ্যান জপ চালাইতে পারে নাই। তাছাড়া সাধুবাবা নিজ সম্প্রদায় প্ৰবৰ্ত্তকের অবতারত্বখ্যাপক মন্ত্র দিয়াছিলেন- ইহা তাহার তেমন ভাল লাগে নাই। সে শুনিয়াছিল শক্তিমান সাধু ধ্যানবলে শিষ্যের ভূত ভবিষ্যৎ অবগত হইযা তাহার অবস্থার উপযােগী মন্ত্র দেন। সে রােমাঞ্চকর কোন কিছুর আশা ছিল। কিন্তু বাবাজী অজস্র সাকার নিরাকার দেবতা থাকিতে বাছি বাছিয়া নিজের দেবতাটিকে তাহার উপর চালাইয়া দিলেন।••••••কিন্তু দিলেন।••••••কিন্তু এখন যে তাহার চেয়ে অনেক বেশী আপত্তিজনক এক গড্ডালিকা প্রবাহে যােগ দিতে হইবে, অর্থহীন কতকগুলি ক্রিয়াকর্ম নিত্য করিয়া যাইতে হইবে। এতকাল পরে আবার সেই সৌম্যমূর্তি সাধুবাবার কথা মনে পড়িতে লাগিল। ধ্যানী বুদ্ধের মত তাহার প্রসন্ন স্মিত প্রেমােঙাসিত মুখচ্ছবি মানসপটে ফুটি উঠিল। অন্তবের অস্থলে এক আবাহন ধ্বনি যেন শােনা যায :-যােগী হে যােগী হে, কে তুমি হৃদি আসনে। নাঃ,—ব্যোমকেশ আর পারে না। চিন্তার নরক হইতে কৰ্ম্ম ভাল। কর্মের ইজিতের প্রতীক্ষা করিতে হইবে। ইঙ্গিত আসিল তিনদিন পরে, ঘন্টির পিতার রূপ ধরি। ব্যস্থা কন্যার প্রবল অনুরাগের কথা তাহার অবিদিত ছিল না। বােধহয় অনিচ্ছাসত্ত্বেও সম্মতি দিতেন, কিন্তু ব্যোমকেশেব চিঠি পড়বি ত পড় একেবারে বুড়াের হাতে। ব্যোমকেশ ঘন্টিকে চিঠিপত্র বড় একটা লিখিত না। এখন লিখিল ত, খোঁড়াব পা একেবারে খানায পডিয়া গেল। দৈবের যােগাযােগ ত একেই বলে। তিনি কাতরকণ্ঠে দীন ভাবে বলিতে লাগিলেন, “মুঝে মালুম হা বেটা, ঘন্টি তুম পর জান দে দেগী। উসে কিসী বাতকী পরােযা নহী। পর, ময পিতা হােকর ক্যায়সে মেরী এক লােভী বেটী কো উনবাতো কে জানতে হয়ে ভী, ।

পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গল্প বলিদান কর দু। ময় হাত ফযলাকর ভিখ মাংতা হু বেটা, তুম উসসে না তােড় দো। সাল দোসালমে আপনে আপ সম্ভল জায়গী। লেকিন তুম খুদ জব তক উসসে মুহ, ন মােড় লােগে, তব তক উসকী নশা কাটেগী।” বলিতে বলিতে বৃদ্ধের চক্ষু অশ্রুসজল হইয়া উঠিল। অবরুদ্ধ কণ্ঠে তিনি শুনাইতে লাগিলেন, কি করিয়া মা-মরা মেয়েকে কোলে পিঠে করিয়া মানুষ করিয়াছেন, তাহার কোন ইচ্ছার, কোন আকারে বাধা দেন নাই, পাছে অভিমানহত কন্যা মায়ের অভাব অনুভব করে। এ ক্ষেত্রেও তাহার জেদ জযী হইবে, যদি ব্যোমকেশ স্বয়ং ধৰ্ম্মবুদ্ধি ও নিঃস্বার্থ প্ৰেমবশে সরিয়া না দাড়ায়। ব্যোমকেশ দ্বিধা সংশয়ে কাতর ত ছিলই ; এখন পিতৃ সমান বৃদ্ধের অন্তরােৎসারিত আবেগধারায় তৃণখণ্ডের মত ভাসিয়া গেল। প্রথম যৌবনে দুর্দম ইন্দ্রিয়বেগের সঙ্গে রােমান্সের নেশা মিলিয়া যে অন্ধ উন্মাদনা সৃষ্টি করে, যাহার খরস্রোতে সমাজ, সংসার, কর্তব্যবুদ্ধি, সংযম, শালীনতা সব ভাসিয়া যায়, সেই মান-মও অবস্থা ব্যোমকেশ কোনদিন অনুভব কবে নাই, অথবা অজ্ঞাতসারে অনেকদিন আগে পার হইয়া আসিযাছে। ঘন্টির কল্যাণ হউক। সে যদি তাহাকে বিস্মৃত হইয়াও স্বদেশ স্বজাতি বিস্মৃত না হয়, তবেই তাহার শিক্ষাদান সার্থক। পিতাকে আশ্বস্ত করিয়া তাহার অজস্র অশ্রুজলভিষিক্ত আশীর্বাদ গ্রহণ করিয়া ব্যোমকেশ ষ্টেশন হইতে যখন বাড়ী ফিরিল, তখন সন্ধ্যা অনেকক্ষণ উত্তীর্ণ হইয়াছে। শুক্লা এয়ােদশীর রাত্রি। জ্যোৎস্নাধারায় সব যেন ভিজিয়া উঠিয়াছে। বহুদিন বিস্মৃত মন্দাক্রান্তা ছন্দের একচরণ মনের মধ্যে আনাগােনা করিতে লাগিল। কোথায় শুনিয়াছিল মনে নাই, শব্দগুলিও এই কিনা স্মরণ হয় না কিন্তু নিস্তব্ধ রাত্রে অগ্ধজা গ্রত ১৫৭ এক পরুণাম কে ওমান্তে অবস্থায় এত মৃদু মঞ্জীর নিক্কণের ন্যায় সুরের রেশ অনুরণিত হইয়া চলিল : মুছিতৈব স্বপিতি বসুধা চন্দ্রিকামৃত পান। ক্রমে রাত্রি গভীর হইল। ক্রমে ব্যোমকেশের চিত্তে এক উদার পরম বৈরাগ্যময়, শান্তিময় শ্রান্তি নামিয়া আসিল। সে যে এক সম্পত্তির মালিক হইতে যাইতেছে, ইহা আর তার মনে গ্লানি উৎপন্ন করিতে পারিল না; বরং মনে হইল সে যেন সত্য সত্যই ত্যাগের পথ ধরিয়াছে। ; এর পরের ব্যাপার সংক্ষিপ্ত। একমাস পরের কথা। ব্যোমকেশ তাহার আস্থানে পৌছিয়া গিয়াছে। পৌছিয়া গিয়াছে। কাল বুদ্ধ-পূর্ণিমায সাধুমণ্ডলী তাহাকে গদীতে বসাইবেন। মণ্ডলীর মধ্য হইতে একজন,-এখানকার পরলােকগত স্থানধারীর গুরুভাই, তাহাকে দীক্ষিত করিবেন। তিনি এখনও আসিয়া পেীছেন নাই । । কাল সকালে অভিষেকের প্রাক্কালে পৌছিবেন। তাহার সম্বন্ধে ব্যামকেশের কোন কৌতুহলই ছিল না। দুইশতের অধিক সাধু-সন্ত-মােহন্ত আসিয়া জুটিয়াছেন; ব্যোমকেশের এখনও প্রায় কাহারও সঙ্গে পরিচয় হয় নাই। যাহা কিছু করণীয়, তাহ পুরােহিত ও স্থানীয় সাধুদের নির্দেশক্রমে সে কলের পুতুলের মত করিয়া যাইতেছিল। মন যেন অসাড় হইয়া গেছে। শুধু একবার কিছু বিচলিত হইয়া উঠিয়াছিল,-গুরুর পা ধুইয়া চরণামৃত পান করিতে হইবে শুনিয়া। তারপরে আবার সেই অবসাদগ্রস্ত অবস্থা! দুই তিন ঘণ্টার ত মামলা; এই ন্যক্কারজনক প্রহসন শেষ হইতে বেশ বিলম্ব হইবে না এই যা ভরসা।

পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গল্প ১৫৮ অভিষেকের প্রভাত। রাত্রি শেষ হইবার আগেই ব্রাহ্মণ ও সাধু- মণ্ডলী তাহাকে স্নান করাইয়া মস্তক মুণ্ডন করাইয়াছেন। তার পর ধূনি অলিল। এক কিনারে ব্যোমকেশের আসন, তাহার পাশেই তাহার হবু- গুরুব জন্য স্থান নির্দিষ্ট হইযাছে। সুললিত কণ্ঠে বিশুদ্ধ উচ্চারণে বেদ মন্ত্র পাঠ ও অগ্নিতে আহুতি প্রদান চলিতে লাগিল। মধুর সঙ্গীতের মত নেশা ধরাইযা পৃথিবীর প্রাচীনতম ছন্দোবদ্ধ পদাবলী সেই নিস্তব্ধ প্রভাত সমীবণে প্রতিধ্বনিত তরঙ্গ তুলিতে লাগিল : ওঁ ভু ভুবঃ স্ব তৎসবিতুর্বরেণ্য ভাগে।দেবস্য ধীমাহি, ধিযয যযা নঃ প্রচোদয়াৎ•••••• সঙ্গে সঙ্গে আর একদল গুরু “মাত্রা” পাঠ করিতেছেন : ‘কিসনে মুণ্ডা, কিন মুণ্ডা, কিসকা ভেজা নগরী আযা, (১) সত গুরু মুণ্ডা লেক মুণ্ডা, গুরুকা ভেজা নগরী আয়া চেতে নগরী, তাবে গাঁও, সিমরে। অলখ, পুরুখ, কা নাও (৩) গুৰু আধনাশী খেল রচাষা, আগম নিগম কা পন্থ চলায়া ( ৪ ) ব্যোমকেশ আসিযা আসন গ্রহণ করিল। ক্ষণপরে রব উঠিল, “বাবাজী আগযে, অভী পধার রহে হ্যায়। হবনরত সকলে দাড়াইয়া উঠিয়া তাহাকে সম্মান দেখাইলেন। তিনি আসন পরিগ্রহ করিলে সকলে আবাব বসিলেন। কিন্তু ব্যোমকেশ সেই ঠায় দাঁড়াইয়া আছে। বিস্মযে, ক্রোধে, ঘৃণায়, উত্তেজনায তাহার মুখ দিযা কথা সরিতেছিল না। বাবাজী তাহার পরিচিত। যখন সে গৃহ শিক্ষকরূপে অল্পদিন পূর্বে গদী-প্রাপ্ত পূৰ্বোল্লিখিত মােহন্তের সঙ্গে বাস করিত, তখন লােকটি নিজের আস্থান হায়দরাবাদ হইতে আসিযা কখন কখন সেই গুরু দরবারে দর্শন দিতেন। অপূর্ব সুন্দর চেহারা, কিন্তু প্রাণমনােহারী সৌন্দর্যের অন্তরালে খল সর্পের বাস। এমন ইতর ধরণের চাটুকার ব্যোমকেশ আর কোথাও দেখে নাই। তােমােদকে ইনি সারাজীবনের চেষ্টায় এক আর্টে পরিণত করিয়া এক পরণাম কে ওয়াতে ছিলেন। কিন্তু তাহার রাগের আসল কারণ অন্য। সেই সময় আর্য- সমাজীরা হায়দরাবাদে সত্যাগ্রহ চালাইতেছিলেন। ইতিহাসে এই প্রথম- বার সমগ্র ভারতের হিন্দু সমাজ একজোট হইয়া স্বধৰ্ম্ম রক্ষায় প্রাণদান- তৎপর এই বীর দলকে অভিনন্দিত করিতেছে। জাতীয় জীবনের এমন সঙ্কট সময়ে ইনি দরবারে আসিয়া অনবরত বলিতেন : “অৰ্য্য সমাজ তাে হিন্দু নষ্টী হায়। উয়ে লােগ দেবতায়োকো নহী মানতে। আউর, হায়দরবাদ মে তত রামরাজ হায়।” স্বদেশ-স্বজাতি-ধৰ্ম্ম-দ্রোহিতা করিয়া ইনি প্রচুর পুরস্কার পাইযাছিলেন। আর একরকম পুরস্কার ঐ সহরের লােকেরা দিতে উদ্যত হইয়াছিল। কিন্তু সদ্য-স্বৰ্গত বড়মােহন্তজীর বাধা দানে তাহার ব্যবস্থা আর হইতে পারে নাই। তার পরে আসিল আগষ্ট আন্দোলন ও সেই ছেলেটির উহাতে যােগান। তাহাকে স্থানচ্যুত করিতে যে সব লােক চেষ্টা করিযাছিল ইনি ছিলেন তাহাদের অগ্রণী। শােনা যায় স্বযং সেই স্থান লইতে ইচ্ছুক ছিলেন। স্বাভাবিক অবস্থায়ই ইহাকে দেখিলে ব্যোমকেশের শরীরে জ্বালা ধরিত। আজ ত শরীর মন তাহার মরিয়া হইয়া উঠিয়াছে। এমন এক অবস্থায় আসিয়া পৌছিয়াছে যে কোন কিছুই যেন আর তাহার পক্ষে অসম্ভব মনে হইতেছে না। ব্যোমকেশের সম্বিৎ ফিরিতেই শুনিতে পাইল, সকলে বলিতেছেন, “আপ ভী বয়ঠ জাইয়ে মহারাজ। খড়ে কিউ।” হবু গুরুও কণ্ঠে মধু ঢালিযা বলিতেছেন, “বয়ঠ জা বেটা।” ব্যামকেশ দুই চক্ষে অগ্নিবর্ষণ করতে করিতে জিজ্ঞাসা করিল—“তাে আপহী মুঝে দীক্ষিত করেঙ্গে ?” -হঁ বেটা। -আউর আপকা হী পয়ের ধাের মুঝে পীনা পড়ে গা ?

খৃষীয় শ্রেষ্ঠ গল্প --, ইয়হী নিজম (নিয়ম) যায়। -তাে সুনলে সব লােগ। ময় আপকো সাপসে ভী গয়াবী নীচ সমঝতা ই। আপ হমারে সামনে সে অভী নিকল জাইয়ে। ম্যয় আপকা পয়ের কভী নহী ছু সাক। জান বচনে কে লিয়ে ভী নহী। সকলে বজ্রাহতবৎ এই অপূৰ্ব স্বামী-শিষ্য সংবাদ শুনিতেছিল। মুহূর্তে বিস্ময়ের ভাব কাটিয়া গেল, শত শত কণ্ঠে বজ্রগর্জন উঠিল—“তুহী নিকল জা ইয়হ সে, সালা ভুখা বাঙালী।” পুলিশ উপস্থিত ছিল। ভীড়ের চাপ হইতে তাহাকে রক্ষা করিয়া পথে বাহির করিয়া দিল। একবস্ত্রে নেতা মাথায় ব্যোমকেশ স্টেশনের পথ ধরিল। আবার বিনা টিকিটেই ভ্রমণ করিতে হইবে। খবর ছড়াইয়া পড়িতে বিলম্ব হয় নাই। যেই তাহাকে দেখে বলে—“শালা বাঙ্গালী বড় পাগল নিল। এক পরণাম কে ওয়াস্তে সব কুছ থাে দিয়া।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Prithibir Shrestha Galpo Vol. 5

Author
Naresh Chandra Pal
Title
Prithibir Shrestha Galpo Vol. 5
File name
Prithibir Shrestha Galpo Vol. 5
Text
OCR done
Citation
1946
Published
2009/10/14
Publisher
Sumath Nath Ghosh, Kolkata
Language
Sanskrit
Pages
176
Library
Bally Sadharan Granthagar
Classification
Bengali Fiction
Keywords
Kumury Poka
DLI number
513108
Barcode
4990010020117.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
MRAb8xiQ9oW
Download PDF

Prithibir Shrestha Galpo Vol. 5