Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Mesamerijam
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
মেমেরিজম শক্তি চালনা। হােমিওপ্যাথিক্-ঔষধের-সম্বন্ধনির্ণয় প্রতিকার, সংক্ষিপ্ত-ভৈষজ্য-রত্ন, হােমিওপ্যাথিকৃ-ঔষধের-সাদৃশ্য, পকেট-ভৈষজ্য-সোপান, টাইফয়েড়-ফিবার-চিকিৎসা, বৃহৎ-নিউমােনিয়া- সভ, ওলউঠা-বিজয়, পকেট রিপার্টরি, বসন্ত ও হাম চিকিৎসা, প্লেগ - চিকিৎসা, চিকিৎসা-সেতু, এপেণ্ডি- সাইটী, প্রসূতি-সহায়, ইত্যাদি প্রণেত- শ্ৰীমহেন্দ্ৰনাথ ভট্টাচার্য প্রণীত ও প্রকাশিত। হাং সাং বৈঁচি জেলা হুগলি। ১৩৩৯ সাল। মূল্য , এক টাকা মাত্র।
১৬২নং বহুবাজার স্ট্রীট, কলিকাতা শ্রীরাম প্রেস” হইতে শ্রীদেবেন্দ্রনাথ বাচস্পতি দ্বারা মুদ্রিত।
ভূমিকা।
আমাদের দেশে পূৰ্বকালে এই মেমেরিক বিষয় লইয়া
বহু বহু রােগের চিকিৎসা হইয়া গিয়াছে। আজকাল সে
সকল কথা অলীক ও গল্প হইয়া উঠিয়াছে। মশললাকের
দুরভিসন্ধিতে ইহা ভারতে প্রায় লােপ হইয়া গিয়াছে।
অশিক্ষিত মহলে আজও কিছু কিছু আছে। যাহারা উচ্চ
শিক্ষিত তাহাদের কাছে থাকিলেও এরূপ পুস্তক না
থাকায় নির্বাণ প্রায় হইয়া আছে। সেই অভাব পূরণ জন্য
আজ মেসূমেরিজম্ নামক পুস্তক বাহির করিতে ইচ্ছা
করিয়া বহু গ্রন্থ কর্তার সাহায্য ইয়াছি, তজ্জন্য তাহাদের
নিকট আমি চিরকৃতজ্ঞ, বাধ্য ও ঋণী থাকিলাম।
এমন কি আজ ভারতবাসীও তঁাহাদের কাছে কৃতজ্ঞ;
তাহার সন্দেহ নাই।• ইতি-
১৩৩৯ সাল।
১৮ই জ্যৈষ্ঠ,
গ্রন্থকর্তা।
১লা জুন,
No text on this page.
মেসমেরিজম
শক্তিচালনা।
প্রথম পরিচ্ছেদ।
44,
জীব মাত্রের শরীরে জগদীশ্বর এমন একটা শক্তি
দিয়াছেন; যাহার দ্বারা আমরা আপনাপনি বিনা চেষ্টায়
রােগমুক্ত হইতে পারি ।
সমস্ত জীব জন্তু নীচ জাতি বিনা চিকিৎসায় বিনা
ঔষধে সেই শক্তি দ্বারা রােগমুক্ত হইয়া থাকে।
প্রকৃত পক্ষে ঔষধ সাক্ষ্যাৎ সম্বন্ধে রােগ আরােগ্য
করে না। যেখানে বা যে যন্ত্রে রােগ হইয়াছে; রােগ
আরােগ্যকারিণী-জীবনীশক্তি তথায় সেই রােগ
আরোগ্যের চেষ্টা করিতে থাকে। সেই জীবনীশক্তি
অপেক্ষা রোগের ক্রিয়া ক্ষীণ বা দুর্বল হইলে ঐ জীবনী
শক্তির দ্বারাই রােগ আরােগ্য হইয়া যায় ; ঔষধের অপেক্ষা
করে
করে না বা ঔষধের প্রয়ােজন হয় না, কিন্তু যদি সেই
মােগ-আরােগ্য-কারিণী-জীবনীশক্তির ক্ষমতা রােগ
অপেক্ষা ক্ষীণ বা দুর্বল হয়, তবে সেই রােগ আরােগ্য
করিতে তাহার ক্ষমতায় কুলায় না। কাজেই
মেসূমেরিজম বা শক্তি চালনা তখন আর সে আরােগ্য করিতে পারে না; তখন ঔষধের প্রয়ােজন হইয়া পড়ে। ঔষধ তখন রােগ-আবােগ্য- কারিণী জীবনীশক্তির উপর কাৰ্ষ্য করিয়া তাহার ক্ষমতাকে বৃদ্ধি করিয়া দিয়া তাহার দ্বারা রোগ আরােগ্য করিয়া লয় । তৎকালে ঔষধ সাক্ষাৎ সম্বন্ধে না হইয়া পরম্পরা সম্বন্ধে রোগ আরােগ্য করিয়া থাকে, সুতরাং ঔষধেও রাগ আরােগ্য করে, কিন্তু যেখানে ঐ রােগ- আবােগ্য-কারিণী-জীবনীশক্তি একেবারে লােপ হইয়াছে, যাহার শরীর হইতে সেই শক্তি একেবারে চলিয়া গিয়াছে, তাহাকে আর সুনিৰ্বাচিত ঔষধেও তারােগ্য করিতে পারে , সুতরাং তখন তাহার মৃত্যু অনিবার্য। এই জন্যই মানব ঔষধ দ্বারা চিরজীবি হইতে পারে না। এক্ষণে আর একটা ভাবিবার কথা—যে যন্ত্রে রােগ হইয়াছে, জীবনীশক্তি সেই যন্ত্রের পীড়া আরােগ্য জন্ত প্রাণপণে চেষ্টা করিতেছে, সদৃশ মতে ঔষধ সেই স্থানের জীবনীশক্তিকে বৃদ্ধি করিয়া বা তাহার চৈতন্য সম্পাদন করিয়া ক্রিয়াশীল হইয়া থাকে, কিন্তু যেখানে রােগ নাই; রােগ আরােগ্য-কারিণী-জীবনীশক্তি সেখানে আরোগ্যের চেষ্টা কেন করিবে , সুতরাং সুস্থ যন্ত্রে রােগ আরোগ্য কারিণী-শক্তির কোন প্রকার চেষ্টা বা ক্রিয়া না থাকায়
প্রথম পরিচ্ছেদ।
সদৃশ মতের ঔষধও তথায় ক্রিয়াশীল নহে। তথায় যখন
রােগ আরােগ্য-কারিণী-শক্তির চেষ্টা নাই, তখন,
ঔষধ কাহার সাহায্য জন্য তথায় সচেষ্ট বা ক্রিয়াশীল
হইবে ? কাজেই সুস্থ যন্ত্রে ঔষধের সূক্ষ্ম মাত্র। ক্রিয়া করে
অর্থাৎ সুস্থ যন্ত্রে ডাইলুটেড বা শক্তিকৃত ঔষধ
নিষ্ক্রিয়। তথায় কোন অনিষ্ট করে না, সত্য কথা; কিন্তু
যেখানে রােগ আছে ; রােগ-আরােগ্য-কারিণী-জীবনীশক্তি
রােগ আরােগ্যের চেষ্টা করিতেছে; অথচ সাধ্যমত চেষ্টা
করিয়া ও ক্ষমতায় কুলাইয়া উঠিতেছে না, সেখানে প্রকৃত
সুনির্বাচিত ঔষধে আরােগ্য-কারিণী-শক্তির বল বৃদ্ধি
করিয়া রােগ আরােগ্য করিতে পারে বা করিয়া থাকে।
তেমন স্থলে ঔষধ নির্বাচনে ভুল হইলে নিশ্চয়ই
অনিষ্ট করিয়া দিবে। তখন ঔষধের বিপরীত ক্রিয়া জনিত
আরোগ্য-কারিণী-শক্তি
নিৰ্ব্বাণ হইয়া
যাইবে, কিম্বা সেই শক্তিকে বিপথে চালিত করিয়া
রােগ আরােগ্যের প্রতিকুলে কার্য করিয়া ভীষণ অনিষ্ট
করিয়া দিবে। তখন তাহাকে বাঁচান কঠিন হইবে, বা
অসাধ্য হইবে, হিত করিতে গিয়া ভ্রম বশতঃ অহিত
করিয়া বসিবে। এক্ষণে বুঝা গেল, সদৃশ ঔষধ কোথায়
উপকার করে ; আর কোথায় অপকার করে।
৪ মেমেরিজম বা শক্তি চালনা। বুঝিলাম—যেখানে রােগ হইয়াছে , রােগ আরােগ্য- কারিণী-জীবনীশক্তি প্রাণপণে সেই রােগ আরােগ্যের চেষ্টা করিতেছে, সুনির্বাচিত ঔষধ তথায় অমৃততুল্য হইয়া জীবনীশক্তির রোগ বাগ্য করিয়া দেয়, কিন্তু যেখানে রােগ নাই, কাজেই আরােগ্য শক্তিও আরােগ্যের চেষ্টা করিতেছে না, তেমন স্থলে ঔষধ নিষ্ক্রিয়, যেখানে, রােগ আছে, আরােগ্য কারিণীশক্তি সচেষ্ট, তথায় কুব্যবস্থায় ভীষণ অনিষ্ট করিয়া দিবে, তাহার কোন সন্দেহ নাই, সুতরাং হােমিও- প্যাথি শক্তিকৃত ঔষধে রােগ আরােগ্য করে এবং পীড়িত অঙ্গে কুব্যবস্থায় দারুণ বা ভীষণ অনিষ্টকরে এবং সুস্থ যন্ত্রে অপকার করে না। এ সমস্তই সত্য কথা। আর যাহার জীবনীশক্তি নাই, তাহার পক্ষে কোন ঔষধই কাৰ্যকারী নহে, তাই মানুষ মাত্রেই কোন না কোন দিন মরিবেই মরিবে, অমর হইবে না; তাই ভগবান বলিয়াছেন— জাত ব্যক্তির মৃত্যু ধ্রুবসত্য। কেহ কেহ মনে করেন বা বলিয়া থাকেন, হোমিও- প্যাথিক ঔষধ দ্বারা নােগারােগ্য হওয়াটা ব উপকার হওয়াটা কেবল রােগীর বিশ্বাসের উপর নির্ভর করে।
প্রথম পরিচ্ছেদ।
শ
এই কথাটী মােটের উপর, সকল প্রকার চিকিৎসার উপরই
সত্য, কিন্তু তাই বলিয়া ঔষধের ক্রিয়ার উপর কিছু মাত্র
সন্দেহ হইতে পারে না।
দুগ্ধ পােষ্য শিশু বা পশুর উপর যখন ঔষধের ক্রিয়া
দেখা যায়, রোগ আরোগ্য হইতে দেখা যায় ; তখন কি
করিয়া বলিব যে, কেবল মাত্র বিশ্বাসেই রােগ আরােগ্য
হয় ? দুগ্ধ পােষ্য শিশু, ঘোড়া, গরু বা কুকুরের কি
বিশ্বাস বা অবিশ্বাস আছে। তবে একথাটা
যে সম্পূর্ণ মিথ্যা তা নয়, উড়াইয়া দিয়া হাঁসিবার কথা
নহে। কখন কখন দৃঢ়
বিশ্বাসের দ্বারা রেগারােগ্য না
এমন কথাই নহে। আমি নীরােগ
হইয়াছি, এই দৃঢ় বিশ্বাসেও রােগ আরােগ্য হইয়া
থাকে। ইহাকে মানসিক আরোগ্য (Mental
cure) কহিয়া থাকে। দেবতার নিকট বা দেবালয়ে ধন্না
বা হত্যায় অনেকের কঠিন রােগ আরােগ্য হইতেও তো
দেখা যায়, তন্মধ্যে মানসিক আরােগ্যই বেশী।
ইহা বাদে ইহার ভিতর আরও গুঢ় কথা আছে। সকলেরই
গুরু আছেন। যিনি দীক্ষিত হন নাই, তাঁহারও গুরু
আছেন, বলিয়া মনে করি ; সূক্ষ্ম ভাবে সেই সূক্ষ্ম শরীরি
গুরু,সদাই আমাদের বিপদ হইতে রক্ষা করিতে চাহেন ৰা
মেসমেরিজ বা শক্তি চালনা।
ইচ্ছা করেন, সাবধান হইতে বলেন, কিন্তু তিনি যে সূরে
বলেন, সে সূরে আমাদের কাণ বাঁধা নাই; তাই শুনিতে
পাই না; কখন কখন অনুভব করিয়াও তাহা অগ্রাহ্য
করিয়া বিপদে পড়ি। তাহার ঈঙ্গিত গ্রাহ্য না করিয়া
বিপদে পড়ি। তাহার ঈঙ্গিত গ্রাহ্য না করাই অসাবধান
হওয়ার হেতু হয়। সেই উপদেশ না শুনিয়াই বিপদাগ্নিতে
ঝাঁপ দিয়া কষ্ট পাইতে থাকি ।
যখন আমরা দেবালয়ে ধন্না বা হত্যা দিবাব কালিন
একাগ্ৰমনে নিজের মঙ্গল কামনায় কিম্বা সন্তান সন্ততির মঙ্গল
প্রার্থনায় নিদ্রিত হইয়া পড়ি , তখন শুরুর আদেশ শুনিতে
পাই, যেমন নিদ্রিতাবস্থায়, সুষুপ্তী অবস্থায় মৃত ব্যক্তির সঙ্গে
কথাবার্তা হইয়া থাকে, সুষুপ্তাবস্থায় সেই মৃত ব্যক্তির সূক্ষ্ম
বা অব্যক্ত ভাষা শুনিতে পাই, তদ্রুপ একাগ্রমনের
নিদ্রিতাবস্থায় গুরুর কথাও শুনিতে পাই। সেই সময়
রােগ আনােগ্য উপযোগী ব্যবস্থা ভিনি দিয়া থাকেন ।
আবার প্রত্যেক দেবালয়-স্থানে সময়
সময় সূম
শরীরি মহাত্মা থাকেন, তাহারা দয়া করিয়া রােগ
বােগ্য উপযােগী উপদেশ দিয়া থাকেন এবং তাহাতেই
cats আরােগ্য হইয়া থাকে । আরোগ্য
হইয়াছি, দৃঢ় বিশ্বাসে আরোগ্য হওয়া অসম্ভব নহে।
প্রথম পরিচ্ছেদ
৭
আরােগ্য হইয়া থাকে। তা বলিয়া ঔষধের ক্রিয়া নাই,
শিশু বাক্য বা প্রলাপ বাক্য মাত্র।
তবে ইহা ঠিক যে, বিশ্বাস দ্বারা ঔষধের ক্রিয়াকে স্থির
করে, বৃদ্ধি করে ও স্থায়ী করে। আমি আরােগ্য হইতেছি,
হইয়াছি বা এই ঔষধে নিশ্চয় আরােগ্য হইব, এই বিশ্বাসে
আরােগ্যকারিণী-জীবনীকে বৃদ্ধি করিতে
পারে।
পাঠকমহাশয়গণ অবগত আছেন যে, ঔষধের ক্রিয়া দুই
প্রকার, ঔষধ উদরস্থ হইবামাত্র যে ক্রিয়া প্রকাশ হয়
তাহাকে ঔষধের সাক্ষাৎ ক্রিয়া (Action) একুশ
এবং সাক্ষ্যাৎ ক্রিয়ার অবসানে আর একটা তাহার ঠিক
বিপরীত ক্রিয়া প্রকাশ হয়, তাহাকে পরম্পরিত
ক্রিয়া (Reaction) রিয়াশ কহে। যেমন মদ
খাইলে প্রথমে উত্তেজনা প্রকাশ হয়, পরে অবসাদ আসিয়া
পড়ে, ইহাকে মাতালের মদের খোয়ারি কহে। তদ্রুপ
সকল দ্রব্যেরই খোয়ারি আছে ; ইহাই তাহার পরম্পরিত
ক্রিয়া। এইটা প্রাকৃতিক নিয়ম।
প্রত্যেক দ্রব্যের এই দুইটা ক্রিয়া আছে। এমন কি
আমাদের দৈনিক খাদ্যেরও ঐ দুইটা ক্রিয়া আছে। খাদ্য
খাইলে ক্ষুধা নিবৃত্তি হয়,আবার না খাইলে ক্ষুধা হয় না,
৮
মেসমেরিজম্ বা শক্তি চালনা।
কঠিন রোগ আরােগ্যের পর না খাইলে আর ক্ষুধা ভাল হয়
না, এই যে জনরব আছে, এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা নয় ।
খাদ্যে ক্ষুধা নিবৃত্তি হয়, ইহাহ খাদ্যের সাক্ষাৎ ক্রিয়া। পরে
যখন সেই খাদ্য হজম হইয়া যায়, তখন পূৰ্ব্বাপেক্ষা একটু
বেশী ক্ষুধা হয়, সেইটা খাদ্যের পরম্পরিত ক্রিয়া বলিয়া মনে
হয়। আবারও দেখা যায়, যে খাদ্য যে না খায়, তাহা
খাইলে তাহার হজম হয় না বা তাহাতে রুচি হয় না।
আমাদের শরীর অসংখ্য জীবসমষ্টি । খাদ্যানুসারে
পৃথক পৃথক ব্যক্তির শরীরে ভিন্ন ভিন্ন জাতীয় জীবের
উৎপত্তি হয়।
অনেকক্ষণ অনাহারে থাকিলে সেই সব জীব
দুর্বল হইয়া পড়ে এবং সেই দ্য খাইবার জন্য ব্যস্ত হয়,
সুতরাং সেই খাদ্যে তাহার রুচি হয়। যাহা খায় নাই সে
জাতীয় জীব তাহার শরীরে না থাকায় তাহা খাইতে কুচি,
হয় না বা খাইলে অসুখ হয়। এসব বিবেচনা দ্বারা রােগীর
পথ্য নির্ণয় করতে হয়। যে খাদ্য, যে কখন খায় নাই,
তাহাকে তাহা খাইতে দিলে বমন হয় • শরীর অসুস্থ হয়।
তাই নূতন খাদ্য খাইতে আরম্ভ করিলে প্রথম প্রথম অসুখ
১;
যখন সেই জীব শরীরে জন্মাইয়া যায়, তখন তাহার
তাহা সহ্য হয়।
এই ব্যাপারটা জীব জন্তুদের প্রতি
তাকাইলে বেশ বুঝা যায়।
মাংসভোজী জীব শাকসজি
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ
খাইতে চাহে না, আবার শাকসজী ভােজী জীব কখনই
মাংস খায় না কিম্বা খাওয়াইলে অসুস্থ হইয়া পড়ে।
কাজেই রােগীর খাদ্য ব্যবস্থাকালে তাহার অভ্যন্ত ও
জাতিগত খাদ্যবিচার দরকার।
পুথীর গৎ আওড়াইলে
চলিবে না।
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ
যে জীবনীশক্তির দ্বারা জীব আপনাপনি রােগমুক্ত
হয় , সেই প্রকৃতি শক্তিকে শত সহস্র বার প্রণাম করি।
এই শক্তির বিষয় চিকিৎসকের খুব ভালরূপে জানা থাকা
দরকার এবং তাহা কেমন করয়া চালিত করিতে পারা
যায়, সবিশেষ জানা থাকা ও আয়ত্তাধীনে রাখা দরকার।
চিকিৎসকের মধ্যে যাহারা ঐ শক্তিকে নিজ শরীর হইতে
রােগীর শরীরে সুশৃঙ্খলে চালিত করিতে জানেন, তিনিই
অতি সুচিকিৎসক, নােগ্যায়ােগ্যে অন্য চিকিৎসক অপেক্ষা
ক্ষমত। বিশিষ্ট। যখন রােগীর জীবনী অতি ক্ষীণ, অতি দুর্বল,
হয়। ঔষধের দ্বারা ভালরূপে প্রতিক্রিয়া হইতেছে না, তখন
মেস মেরিজ বা শক্তি চালনা।
শক্তিচালন-বিদ্যা পারদর্শী চিকিৎসক নিজ শরীর হইতে
ঐ শক্তি রােগীর শরীরে চালিত করিয়া, রােগীর ক্ষীণ
জীবনীশক্তিকে উত্তেজিত করিয়া বা তাহার চৈতন্য সম্পাদন
করিয়া ঔষধকে তীব্র ক্রিয়ােপযোগী করিয়া লইতে পারেন।
ইহা আমার অলীক বা ঘরগড়া কথা নহে। কোন রােগীর
শরীরে রক্ত কমিয়া গেলে যেমন অপরের শরীর হইতে
রক্ত চালিত (ট্রানফিউজন,করিয়া সেই
রােগীকে বাঁচান যায়, তদ্রুপ নিজ শরীরস্থ তেজঃ বা জীবনী
শক্তি চালিত করিয়া রােগীর ক্ষীণ জীবনীশক্তির বল বৃদ্ধি
করিয়া তাহাকে আরােগ্য করা যায়।
মানব শীরে তিন জাতীয় শিরা
আছে।
১। এক প্রকার ফপি শিরা, তদ্বারা লাল রক্ত
সাঙ্গে পরিচালিত হইয়া থাকে ; ইহাদের ধমনী বা
( Artery) আরি কহে। ইহার রক্ত হৃদপিণ্ড হইতে
বাহির হইয়া সর্বাঙ্গে চালিত হয়।
২। আর এক জাতীয় কপি শিরার মধ্য দিয়া কাল
রক্ত ধীরে ধীরে হৃদপিণ্ডাভিমুখে যাইতে থাকে ; তাহাদের
শিরা বা (Viens) ভেইনস্ কহে।
;
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ।
৩। আর এক প্রকার সাদা নীরেট দড়ির মত শিরা
আছে, তাহাদের স্নায়ু বা ( Nerves ) নার্ভস কহে।
মেরুদণ্ড বা তাহার নিকটস্থ গ্রন্থি হইতে একপ্রকার
পদার্থ উৎপন্ন হইয়া মানব শরীরের উত্তাপ সম্পাদন করে,
এই পদার্থ ঐ স্নায়ুমণ্ডল দ্বারা চালিত হইয়া আমাদের
চৈতন্য সম্পাদন এবং সকল যন্ত্রকে ক্রিয়াশীল করায়। এই
সকল স্নায়ু দ্বারা আমাদের ঘ্রাণশক্তি, স্পর্শশক্তি, দৃষ্টিশক্তি,
আস্বাদন শক্তি, শ্রবণশক্তি জ্ঞানেন্দ্রিয়ের কাৰ্য্য এবং কথা,
হাত, পাদ, পায়ু ও উপস্থ কৰ্ম্মেন্দ্রিয়ের কার্য সম্পন্ন
করাইয়া থাকে। এই পদার্থকে ম্যাগনেতীক
শক্তি কহিয়া থাকে।
ইহাই জীবের এনিমেম্যাগনেটীজম
নামে বিখ্যাত।
মানবের খাদ্য তিন প্রকার অর্থাৎ তিন প্রকার প্রবৃত্তি
বিশিষ্ট। ১। সাত্ত্বিক খাদ্য। ২। রাজসিক খাদ্য।
তামসিক খাদ্য।
খাদ্যানুসারে মানবের প্রকৃতি গঠিত হয়। যাহার যেমন
স্বভাৰ বা যেমন প্রকৃতি এই এনিমেল-ম্যাগনেটীজ তাহার
সেই গুণবিশিষ্ট ; সুতরাং যাহার যেমন বুদ্ধি, যেমন স্বভাব
তাহারুএই এনিমেল-ম্যাগনেটীক শক্তিও সেই প্রকৃতি
১২
মেমেরিজ বা শক্তি চালনা।
বিশিষ্ট কেন ন হইবে ? এই এনিমেম্যাগনেটা শক্ত
বা তেজঃ সদাসর্বদা আমাদের শরীর হইতে বহির্গত হইয়া
নিয়ত চতুর্দিকে বিক্ষিপ্ত হইয়া থাকে, এবং অজ্ঞা সরে
অন্যের শরীরে প্রবিষ্ট হইয়া অন্যকে সেইরূপে
পরিণত কাবতে পারে বা করিয়া থাকে। এইজন্যই
হিন্দুশাস্ত্রে নাচ লোকের সংস্রবে থাকা, •ী ব্যক্তির স্পর্শিত
অন্নাদি আহারে নিষেধ আছে। মােটামুটি এই প্রবৃত্তিকে
বা বুদ্ধিকে তিন ভাগে বিভক্ত করা যায়। ১ম সত্ত্বগুণ।
রজঃগুণ ৩য়। তমঃগুণ। ভগবান বলিয়াছেন
-এই গুণানুসারে আমি মানবগণকে চারিভাগে বিভক্ত
করিয়াছি।
চাতুৰ্বর্ণ মসৃষ্টং গুণকৰ্ম্ম বিভাগঃ
আমি গুণ ও কর্মের দ্বারা চারি প্রকার বর্ণের সৃষ্টি
করিয়াছি,ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র।
আবার ইহার মধ্যে বুদ্ধি বিকৃতিজনিত নানাপ্রকার
হইয়া পড়িয়াছে ।
এই এনিমে-তেজঃ মানবের সর্বাঙ্গ দিয়া বাহির
হইলেও ওষ্ঠ ও অঙ্গুলির অগ্রভাগ দিয়া প্রচুর পরিমাণে
বাহির হইয়া থাকে। আবার অভ্যাস করিলে বেশী বেশী
বাহির করা যায়। কথা কহিবার কালে বা চর্বণ কালে
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ।
ঠোট দিয়া প্রচুর পরিমানে ইহা বাহির হইতে থাকে ।
এই জন্যই যােগশাস্ত্রে মৌনী হইবার ব্যবস্থা আছে। মস্তকে
ও দাড়িতে চুল থাকিলে মস্তক ও মুখমণ্ডল হইতে অল্প
বাহির হইতে থাকে। কারণ চুল যে অপরিচালক তাহা
পাঠকবর্গ জ্ঞাত আছেন। যে পদার্থের উত্তাপ পরিচালনের
শাক্ত চাই, তাহাদের অপরিচালক কহে। অপরি-
চালক দ্রব্যের মধ্যে কঁাচ, অভ্র ও চুল শ্রেষ্ঠ স্থানীয়। তাই
সকলেই দেখিয়াছেন ইলেকটাক্ তার বাঁধিতে বা বৈদূতিক
ব্যাটারিতে কাজ করিবার সময় কঁাচের উপর বসিয়া করিয়া
থাকে। ট্রাম-চালিত তারে কাজ করিতে কঁচের উপর
পঁড়াইয়া করিতে হয়; অন্যথায় মৃত্যু হইয়া যায়।
যে সকল দ্রব্য উত্তাপ চালিত করিতে পারে, তাহাদের
পরিচালক কহে। যেমন লৌহ, তাম্র ইত্যাদি,
এইজই ঐ সকল প্রব্যে তার প্রস্তুত করিয়া টেলিগ্রামের
তার হয়। চর্বণ কালে আমাদের শরীরস্থ তেজঃ ঠোট
দিয়া প্রচুর বাহির হয় বলিয়া আহারকালিন কথা কহার
নিযেধ আছে।
স্কুলের শিক্ষকগণকে বালকদের উপদেশ দিবার জন্য
অনেকক্ষণ কথা কহিতে হয় । সুতরাং এনিমেল-ম্যাগনে-
টা এত প্রচুর পরিমাণে ঠোট দিয়া বাহির হইয়া যাওয়ায়
১৪
মেমেরিজ বা শক্তি চালনা।
শিক্ষকদের শরীর খারাপ হয়, এই কারণে অল্প বয়সে
শিক্ষকদের মৃত্যু সংখ্যা বেশী।
ঐ তেজঃ ইচ্ছাশক্তির সহিত নিকটস্থ ব্যক্তির শরীর
মধ্যে চালিত করিয়া তাহাকে নিজ অধীনে আনিয়া কাজ
করান যায়। ইহাকে হিপনােটাইজ করা কহে।
হিপনােটাইজ, করিয়া ক্রিয়াপাত্রকে যাহা ইচ্ছা করাইতে
পারা যায়। আজকাল অনেক স্থলেই হিপনােটাইজ,
করিয়া অনেক কাজ করা হইতেছে। আবার ঐ ইচ্ছা-
শক্তির দ্বারা দুরস্থ ব্যক্তিকেও কাজ করা যায়। তাহার
প্রমাণ স্বরূপ একটি সত্য ঘটনার উল্লেখ করিতেছি।
অনেক দিনের কথা, কলিকাতা নিবাসী
জনৈক যুবক, বি, এল পাশ হইয়া ওকালতী করিবার
মানসে বিদেশে যাত্রা করিবার সময় তঁাহার নয় বৎসরের
বালিকা স্ত্রীর মুখে শুনিলেন—আমার সঙ্গে অার
দেখা হবে না, একথায় তিনি কর্ণপাত করিলেন
না, চলিয়া গেলেন। যথাস্থানে পৌছিয়াই তাহার জ্বরও
নিউমােনিয়া হইল, কয়েকদিন পরে ভাল হইলে সকলে
কহিল—উকিল বাবু! আপনার একখানি টেলিগ্রাফ
কয়েকদিন হইল আসিয়াছে, আপনি পীড়িতাবস্থায় ছিলেন,
তাই দেওয়া হয় নাই। তিনি টেলিগ্রাফ পড়িয়া দেখিলেন,
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ।
তঁাহার স্ত্রী কঠিন পীড়ায় পীড়িত। সকলের নিষেধ সত্ত্বেও
তিনি তৎক্ষণাৎ কলিকাতা যাত্রা করিলেন, বাড়ী পৌছিয়া
শুনিলেন, তাহার সেই বালিকা স্ত্রীর মৃত্যু হইয়াছে।
বালিকাকে তিনি অত্যন্ত ভাল বাসিতেন। স্ত্রীর মৃত্যুতে
তিনি অত্যন্ত কাতর হইয়া পড়িলেন, বিশেষতঃ যাত্রা
কালিন যে “আমার সহিত আর দেখা হইবে না শুনিয়া-
ছিলেন, তাহা তাঁহাকে পুনঃ পুনঃ যাতনা দিতে লাগিল।
ইহার কোন কিছু কারণ আছে কি না জানিবার জন্য ভাট
পাড়ার টোলে আসিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, কিন্তু দুঃখের
বিষয় টোল হইতে কোন বিশেষ সন্তোষজনক উত্তর না
পাইয়া, তিনি ঐ বিষয় জিজ্ঞাসু হইয়া কাশী যাইলেন, কিন্তু
কাশীতে কে কোথায় আছেন যে, ইহার প্রকৃত উত্তর
পাইবেন অজ্ঞাত থাকায় যথাতথা ভ্রমণ করিয়া বেড়ান।
একদিন গ্রাতে মণিকর্ণিকার ঘাটে দাঁড়াইয়া আছেন,
কতলােক ঘাটে নামিতেছে, স্নান করিতেছে, পূজা আত্মিক
করিতেছে, চলিয়া যাইতেছে। তিনি শূন্য হৃদয়ে দাঁড়াইয়া
সবই দেখিতেছেন, কিন্তু কিছুই দেখিতেছেন না, সবই
শুনিতেছেন, কিন্তু কিছুই শুনিতেছেন না, নিজ চিন্তায়
বিভাের হইয়া দাড়াইয়া আছেন, তঁাহার প্রতি কে তাকা-
ইবে? কে তাহার মনবেদন বুঝিবে? ধীর, গম্ভীর
মেমেরিজ বা শক্তি চালনা।
ভাবে দাঁড়াইয়া স্থির নেত্রে সবই দেখিতেছেন, অথচ কিছুই
দেখিতেছেন না। হায় হায় এই যুবার হৃদয়ের শেল কে
দেখিবে, কে বুঝিবে, মা বাপও যখন দেখেন নাই, তখন
আর কে দেখিবে? কেহই হতভাগ্যকে দেখিল না ;
তাঁহার হৃদয়ের ভার কেহ একটুকুও লইল না। মণিকর্ণি-
কার ঘাটে কত মৃতদেহ পুড়িয়া ছাই হইয়া যাইতেছে,
যুবারও মন মনাগুণে পুড়িতেছে, কিন্তু ছাই তো হলাে না।
হৃদয় পুড়ে যাচ্ছে, কিন্তু কই ছাই তাে হলাে না। যুবার
চক্ষে জল নাই। মনাগুণে পুড়িতেছে, কাজেই জল আর
কোথা থাকিবে,আগুণের উত্তাপে জল শুখাইয়া গিয়াছে। সে
যে কি যাতনা, যাহার সেই বুঝিতেছে, সে বিষের জ্বালা কে
বুঝিবে ? কিন্তু গুরুর দয়া অক্ষুঃ,তিনি দয়াময়, দয়ার সাগর।
যুবার হৃদয়ের বেদনা, তিনিই বুঝিলেন—যুবক স্পষ্টাক্ষরে
শুনিল—একব্যক্তি অন্য ব্যক্তিকে বলিল, “কাশীতে
কেন লক্ষ্মৌ যাও” যাহাকে তিনি বলিলেন তিনি
শুনিলেন না, উভয়েই চলিয়া গেলেন কথাটা বজ্রসম যুবার
হৃদয়ে প্রবিষ্ট হইল। কে কাহাকে বলিল ? কই আমার
প্রতি লক্ষ্য করিয়াও তাে বলেন নাই; তবে কাহাকে তিনি
বলিলেন—যাকে বলিলেন—তিনিও তো কই শুনিলে
, তবে কি আমাকে বলিলেন; তাই বা কি করিয়া
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ। ১৭ বুঝি। এইরূপ অনেকক্ষণ তর্ক বিতর্কের পর লক্ষ্মো যাওয়াই স্থির করিয়া সেই দিনই রাত্রির ট্রেণে লক্ষ্মৌ চলিয়া গেলেন, কিন্তু সেখানেই বা কে কোথায়? তখন যুবক দিশাহারা হইয়া নাবিকহীন সমুদ্রবক্ষে ভাসমান জাহাজের ন্যায় গন্তব্য নির্ণয়হীন হইয়া যথাতথা পাগলের মত বেড়াইতে লাগিলেন, কিন্তু কর্ণধার কর্ণধারের কাজ করিতেছেন। একদিন লক্ষ্মেী ঘাসিয়ারি মুণ্ডীর মােড় ফিরিতেছেন, দারুণ রৌদ্র, রাস্তায় জনপ্রাণী নাই। “লক্ষ্মৌ নয় ভিলেজে যাও অতিতীব্র আদেশ শুনিলেন। কে কাহাকে কোথা হইতে বলিল? যুবক ভাবিয়া আকুল হইলেন; উন্মত্তের ন্যায় চীৎ- কার করিয়া দৌড়াদৌড়ি করিতে লাগিলেনএবং কে এই কখা বলিলেন, দয়া করিয়া একবার আমায় দেখা দিউন, বলিয়া ব্যস্ত সমস্ত হইয়া কাতর হইয়া পড়িলেন। সমস্ত চেষ্টা বৃথা হইল। কেহই কোথাও নাই। স্তম্ভিত হইলেন। সৰ্বাঙ্গ দিয়া যেন আগুণের স্ফুলিঙ্গ বাহির হইতে লাগিল, কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইয়া যুদেচ্ছা চলিতে লাগিলেন, তাহার মনে হইতে লাগিল যেন তিনি কাহারও আজ্ঞাধীন হইয়া তাহার পশ্চাৎগামী হইয়াছেন। দ্রুতপদে, উৰ্দ্ধশ্বাসে চলিলেন, কোথায় যাইতেছেন, কিছুই জানেন না কিছুই জানেন না; যেন কাহারও অলঙ্ঘনীয় ১ মেসূমেরিজ বা শক্তি চালনা। আজ্ঞার বশবর্তী হইয়া চলিয়াছেন। ভয়ের লেশ মাত্র নাই, মনের উদ্বেগে, দ্বিগুণ উৎসাহে, অনাহারে চলিয়াছেন, ক্ষুৎ পিপাসার জ্ঞান নাই, কোন ইচ্ছা নাই, কোথায় যাইতেছেন, কেন যাইতেছেন, কিছুরই জ্ঞান নাই, কিছুই দেখিতেছেন না, কিছুই শুনিতেছেন না; কাহাকেও কিছু জিজ্ঞাসাও করিতেছেন না; আপন মনে ভীমবেগে চলিয়াছেন। যখন সন্ধ্যা হইল তখন চৈতন্য হইল কোথায় যাইতেছি; পথশ্রান্তি ও ক্ষুৎপিপাসার জ্ঞান হইল, আশ্রয় পাইবার জন্য লােকালয় পাইবার চেষ্টা আসল। দেখিলেন—সম্মুখে একটী কুটীর *একটী বৃদ্ধ” বসিয়া আছেন। বৃদ্ধ হইলেও তাহার রূপের ছটায় দিক আলো করিয়া রহিয়াছেন। তাহাকে দেখিয়া যেন তাহার মােহ কাটিয়া গেল,যেন কত পরিচিত, যেন কত আত্মীয়, যেন কতই হিতাকাঙ্ক্ষী বলিয়া মনে হইল। মনে বেশ একটু সাহস হইল। ভক্তি ভরে হৃদয় খানি গলিয়া গেল। কৃতাঞ্জলিপুটে গদগদ স্বরে কহিলেন- প্রভূ-আমি নিরাশ্রয়, আমি বিপন, ক্লান্ত পথশ্রান্ত, দয়া করিয়া একটু স্থান দিউন, কিছু চাহি না, কিছু খাইব না, কেবল শুইয়া থাকিব।
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ। ১৯ বৃদ্ধ সহাস্য বদনে মধূর বাক্যে বলিলেন-“এসাে বাবা এসাে, এসাে বেটা এসাে; বড়ই কষ্ট হয়েছে এই কথাগুলি যুবকের কাণে অমৃত বর্ষণ করিল, এমন হৃদয়গ্রাহী, এমন আত্মীয়তাপূর্ণ, এমন স্নেহময়, এমন মধুমাখা কথা তিনি যেন কখন শশানেন নাই। বাপ মাকে মনে পড়িল, তাহারা কোথায়, আর আমি কোথায়, ভাবিয়া মনে মনে উদ্দেশে প্রণাম করিলেন। ভক্তিভরে অদৃশ্যে বৃদ্ধকে প্রণাম করিয়া মনে মনে বলিলেন- আপনি কে? বৃদ্ধ যেন তাহার মনের ভাব বুঝিয়াই একটু হাসিয়া বলিলেন—ঐ ইদার হইতে জল তুলিয়া হাত, পা, মুখ ধুইয়া এসাে। যুবক তাহাই করিল? তখন বৃদ্ধ একটি বালককে কহিলেন একটু গুড় ও এক লােটা জল আনিয়া দাও। যুবককে খাইতে আদেশ দিলেন। যুবক জল খাইয়া বসিলে বৃদ্ধ জিজ্ঞাসা করিলেন—তুমি কোথায় যাইতেছ ? যুবক।--দেশ ভ্রমণে। বৃদ্ধ ।-আমার নিকট গোপন করিও , সব কথা বলিতেই হইবে।
মেস মেরিজম বা শক্তি চালনা।
যুবক। গােপন করি নাই, প্রকৃতই
দেখিস্লা বেড়ানই উদ্দেশ্য।
বৃদ্ধ।-কেন মিথ্যা কথা কহিতেছ, বাবা। আমার
নিকট তােমার কিছুই গোপন নাই। নয় বৎসরের
বালিকা বলিয়াছিল” “আমার সহিত আর দেখা
হইবে না” এই তো তােমার দেশ ভ্রমণের মূল। মণি-
কর্ণিকার ঘাটে আমিই তােমাকে “লক্ষে আসি
বার জন্য আদেশ দিই”।
লক্ষ্মৌ ঘাসিয়ারি মুণ্ডির মােড়ে আমিই তােমাকে
“ভিলেজে যাও বলিয়াছিলাম। বালিকার
নিজের কিছুই ছিল না, তাহার পিতা মাতার ক্ষমতায় সে
জানিতে পারিয়াছিল, সে আর বেশী দিন বাঁচিবে না।
তাহার মৃত্যু দিন তাহার জানা ছিল বলিয়াই, সে
বলিয়াছিল—আমার সঙ্গে তার দেখা হবে না।
ইহা কিছুই অদ্ভুত বা আশ্চর্য জনক
নহে। কাল তােমার দীক্ষার দিন। আজ আর
কিছু খাইতে পাইবে না। কাল প্রাতে তােমাকে
দীক্ষা দিব। পরে কাশীতে তোমার গুরুভাইয়ের
কাছে কিছু শিক্ষা করিতে হইবে। পরে বাড়ি যাইয়া
সংসারী হইবে। যুবক স্তম্ভিত, কাষ্ঠবৎ, আননে, ও
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ।
২১
নানা চিন্তায় রাত্রিতে আর ঘুম হইল না। প্রাতেঃ দীক্ষিত
হইলেন।
এই যে অন্যের মুখ দিয়া গুরুর আদেশ হয়, ইহাও
মানুষে করিতে পারে। এই আদেশকে মানসাঙ্ক
কহে সুতরাং দূর দুরান্তর হইতে ইচ্ছা শক্তি চালিত
করিয়া অন্যের দ্বারা কাজ করান যায়।
এইরূপে ইচ্ছাশক্তি চালনা করিয়া নিকটস্থ রােগী
ভাল করা তো সহজ। দূর দুরান্তর হইতেও রােগ অনেকে
আরােগ্য করিতে পারেন, ইহার প্রমাণ স্বরূপ একটা
ঘটনায় উল্লেখ করিতে বাধ্য হইলাম।
ঢাকার কোন ভদ্রলােকের দুইটা পরমা সুন্দরী কন্যা
ছিল। একটার বয়স ৮ বৎসর আর একটী ৫ বৎসরের ;
দুইটাই ঠিক একই প্রকারের দেখিতে। ইহারা সহে-
করা। হঠাৎ বড় মেয়েটী শৃগালে কামড়াইল বলিয়া চীৎকার
কমিয়া উঠিত। শৃগাল অন্য কেহই দেখিতে পাইত না।
ছােট মেয়েটী শৃগাল দেখিতে পাইত। বড় মেয়েটাকে
কড়াইত।
সকলেই শৃগালের কামড়ের দাগ এবং রক্তপাত দেখিতে
পাইত। তৎকালে ঢাকাতে একজন মহাত্মা হােমিওপ্যাথ,
ছিলেন। তিনি সেই দুইটা বােগিনীকে হাতে লইয়া
মেসূমেরিজম বা শক্তি চালনা।
শক্তি চালনা দ্বারা অনেক উপকার করিয়াছিলেন।
রােগের আক্রমণকাল বিলম্বে বিলম্বে হইতে লাগিল।
বালিকারা উভয়েই শৃগাল দেখে মাত্র, কামড়ায় না। কোন
দিন বা কামড়ায়। আবার কোন দিন কামড়ায় রক্তপাত
হয় না। এইরূপ হইতে লাগিল। এমন সময় তাহাদের
পিতা ও মাতা কাৰ্য্যগতিকে কাশী যাইলেন ; তাহাদেরও
লইয়া গেলেন, যদিও তাহার ভাল হয় নাই, কিন্তু যথেষ্ট
উপকার হইয়াছিল এবং ডাক্তার বাবুর নিতান্ত আয়ত্তাধীনে
আসিয়াছিল। তিনি তাহাদের একটা সময় নির্ধারিত
করিয়া দিলেন। ঠিক সেই সময়ে তাহারা দুই ভগনি একটা
নির্জন ঘরে স্থির হইয়া বসিয়া থাকিত। ঐ সময় ঢাকা
হইতে ডাক্তার বাৰু তাহাদের শরীরে ইচ্ছাশক্তি চালিত
করিয়া তাহাদের সম্পূর্ণ আরােগ্য করিয়াছিলেন। কাশীতে
যাইয়াও দু এক দিন দংশিত হইয়াছিল, ছােট মেয়েটা
প্রত্যহ শৃগাল দেখিতে পাইত কিন্তু একদিনও দংশিত হয়
নাই। বড় মেয়েটাকেই কামড়াইত। যখন বড় মেয়েটাকে
কামড়ান বন্ধ হইল অথচ দেখিতে পাইত, তখন ছোেট
মেয়েটী ভাল হইয়াছে অর্থাৎ সে তখন আর শৃগাল দেখিতে
পায় না। এরূপ রােগ বড় একটা দেখা বা শুনা যায়
না, এবং অনেক চিকিৎসকই এই নিজ শক্তি রােগীর
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ
শরীরে পরিচালিত করিয়া আরােগ্য করিতে জানেন না,
কিন্তু অজ্ঞাতসারে এ কাৰ্য্য আপনাপনি সাধিত হইয়া
থাকে। তাই বলি গৃহস্থের অসদ্ব্যবহারে চিকিৎসক যেন
রােগীর উপর অসন্তুষ্ট না হন। অসন্তুষ্ট বা বিরক্ত হইলে
রোগীর আরােগ্যের পথ সঙ্কীর্ণ হইয়া
আসিবে। কারণ যখন অজ্ঞাতসারে সেই ডাক্তারের
ম্যাগনেটীকৃ-শক্তি রােগীর শরীরে চালিত হয়। তখন
চিকিৎসক রােগীর উপর সদয়, স্নেহময়,মঙ্গল প্রার্থী থাকিলে
সেই শক্তির স্রোতে রােগীর রােগ-আরােগ্য-কারিণী-শক্তি
সুশৃঙ্খলে কাৰ্য্য করিতে থাকে। শরীরের কোন প্রকার
বিকৃত ভাব আনয়ন করে না। কাজেই ঔষধও সুনিয়মে
নিজ কাৰ্য্যদ্বারা জীবনীশক্তির বল বৃদ্ধি করিতে পারে।
ঔষধ সকল স্নায়ুমণ্ডলদ্বারা রােগের স্থানে নীত হইয়া
রােগ আরােগ্য-উৎযােগী-জীবনীশক্তি বা রােগ আরােগ্য
কারিণী শক্তির উপর নিজ নিজ কাৰ্য প্রকাশ করে। সেই
স্নায়ুমণ্ডল যদি সুনিয়মে আপন মতে কাৰ্য্য করিতে পায়,
তবেই ঔষধও সহজেই তাহার সাহায্য করিতে পারে ।
কিন্তু যদি চিকিৎসক রােগীর উপর বিরক্ত, ত্যক্ত, দ্বেষী,
অমঙ্গল প্রার্থী হন; তবে তাহার শরীরস্থ ম্যাগনেটিক
স্রোত যাহা তাহার অজ্ঞাতসারে রােগীর উপর পড়িতেছে ;
২৪ মেমেরিজ বা শক্তি চালনা। তাহাতে রােগীর স্নায়ুমণ্ডল বিশৃঙ্খল হইয়া পড়ে, কাজেই সেই বিশৃঙ্খল স্নায়ুমণ্ডলে পড়িয়া ঔষধও বিশৃঙ্খল কাৰ্য্য করিবে। কাজেই রােগীর আরোগ্যের পথ খাটো হইয়া যাইবে, শঙ্কীর্ণ হইয়া যাইবে। চিকিৎসক রােগীর উপর যতই অসন্তুষ্ট, বিরক্ত হইবেন, রােগী ততই অস্থির, উৎক- ঠিত, বিরক্ত হইতে থাকিবে। চিকিৎসকের যতই রােগীয় উপর ক্রোধ হইতে থাকিবে, রােগীও ততই খিটখিটে ও রাগী হইবে। তাহার স্নায়ুমণ্ডলের বিশৃঙ্খলতাই রােগীর এই অস্থিরতা, ক্রোধী ও খিটখিটে হইবার কারণ। চিকিৎ সক যতই রােগীকে ভালবাসিবেন, যতই তাহাকে মেহের চক্ষে দেখিবেন; রোগী ততই ধীর, স্থির, শান্ত হইবে। বােগী যতই স্থির, ধীর, সন্তুষ্ট হইবে, স্নায়ুমণ্ডল ততই শান্ত ভাব ধারণ করিবে, স্বায়ুমণ্ডল যতই শান্ত ভাবান্বিত হইবে; ততই ঔষধ সকল নিজ নিজ কাৰ্য্য করণে সক্ষম হইবে। রােগী সর্বদা রাগ করিলে তাহাকে আরােগ্য কঠিন হয় । এইজন্য হানিম্যান বলিয়াছেন, ক্রনিক রােগাক্রান্ত রােগী যদি না রাগিয়া থাকিতে না পারে; তবে তাহাকে ভাল করিতে পারিবে না। কারণ রাগ হইলে স্নায়ুমণ্ডল উত্তেজিত, উগ্র হইয়া উঠে ; ।
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ।
স্নায়ুমণ্ডল উগ্রভাব ধারণ করিলে ঔষধ সকল তাহার উপর
কাৰ্য্য করিবার অবসর পায় না।
সেস্থলে সুনির্বাচিত
ঔষধও ভষ্মে ঘৃতাহুতির ন্যায় হইয়া পড়ে। তাই বলি
ভাই, নির্বোধ, স্বার্থপর গৃহস্থের অযথা অপমানে কুষ্টিত
হইয়া রােগীর অনিষ্ট করিও না। তাহা হইলে তােমাতে
আর গৃহন্থে কি প্রভেদ হইল ? চিকিৎসক জীবন দাতা পিতা
ও মহৎ। গৃহস্থের মত বােকা স্বার্থপর হইলে আপনার
মহত্ব কোথা থাকে ? আপনি মহৎ, আপনি জগৎ পূজ্য,
জীবনদাতা, রক্ষাকর্তা, গুরু ও গরীয়ান। পটল, অচল
তবে স্থির থাকিয়া জগতের মঙ্গলময় মনুষ্য জীবন, রক্ষায়
দৃড় প্রতিজ্ঞ ও স্থির সংকল্পান্বিত হউন।
সকলের পূজা গ্রহণ করুন। জগদীশ্বরের কাৰ্য্যে সহায়তা
করিয়া তাহার প্রিয় পাত্র হউন, তাহায়
আশীর্বাদ গ্রহণ করুন।
এই শক্তি চালিত করিতে শিক্ষা করুন, অভ্যাস
করুন। নিজ শক্তি দানে মৃত্যুথ ব্যক্তির জীবন দান
করিয়া তাহার ও নিজের মঙ্গল সাধন করুন। এই জীবনী
শক্তি দানে মুত্যুমুখ ব্যক্তির রক্ষা বিষয়ে একটি প্রকৃত
ঘটনা বলিতে বাধ্য হইলাম ।
।
তৃতীয় পরিচ্ছেদ। মহাবিদ্যা হইতে সংক্ষেপে উদ্ধত। একজন ডাক্তার কর্তৃক বর্ণিত। আমার জীবনে সৰ্ব্বাপেক্ষা অদ্ভুত ঘটনা মনে করিয়া এতাবৎ গোপনে রাখিয়াছিলাম। যাহাকে লইয়া এই গল্প, তাহাকে জীবনে আমি তিনবার মাত্র দেখিয়াছি। তঁাহার নাম অনন্তরাম। অনন্তরাম মােটের উপর সুন্দর পুরুষ ছিলেন। এক সময়ে ইহার সঙ্গে মেডিকেল কলেজে পড়িতাম। এমন ভাব্যঞ্জক চক্ষু কাহারও দেখি নাই। তিনি গম্ভীর প্রকৃতির ছিলেন। বিজ্ঞানের আলোচনা লইয়াই বেশী সময় থাকিতেন। আমরা সকলেই অনন্ত- রামকে অসাধারণ বুদ্ধিমান বলিয়া মানিতাম। সাধারণ ডাক্তার যাহারা সকল বোগের চিকিৎসা করিয়া বেড়ান, তঁাহাদিগকে অনন্তরাম, সবজান্তা বলিয়া ঠাট্টা করিতেন। তিনি মস্তিষ্কের অালোচনাতেই সদাই অনুরক্ত থাকিতেন। সকলে তঁহাকে পরীক্ষার প্রথম স্থান অধিকার করিবেন, মনে করিতেন, কিন্তু ঠিক পরীক্ষার
তৃতীয় পরিচ্ছেদ।
২৭
চলিয়া গেলেন।
?
অব্যবহিত পূর্বেই অনন্তরাম সমস্ত দ্রব্যাদি লইয়া কোথায়
কেহই জানিতে পারিল না। আমি
পরীক্ষায় পাশ হইলাম। পরে মিরাটে চাকরি লইয়া
যাইবার সময় পথে এলাহাবাদে দিন কতক থাকিতে হইল।
একদিন নিস্কৰ্ম্মাভাবে পথে বেড়াইতেছি, এমন সময় হঠাৎ
সাম্না সানি অনন্তরামের সঙ্গে দেখা। আমি তাঁহার
নাম করিয়া ডাকিলাম, ডাক শুনিয়াই অতি আনন্দের
সহিত জিজ্ঞাসা করিলেন-কি জন্য এলাহাবাদে, পরে
তাহার বাসায় যাইবার অনুরােধে, তাহার বাসায় যাইবার
সময় জিজ্ঞাসা করিলাম। হঠাৎ নিরুদ্দেশের কারণ কি
উত্তর--কারণ ছিল, ওরকম ভাবে দিন কাটান ভাল
লাগিল না। খাটুনি আর খাটুনি, কেবল খাটুনি। যতই
পড়ি; দেখি পড়িয়া কোন জ্ঞানই হয় না।
আমি তার বাসায় গিয়া দেখিলাম, তাহাতে অবাক
হইলাম।
তাহার বাসা বাড়ি শহরের বাহিরে। বাড়ি নয়, একটী
প্রাসাদ বলিলেও বলা যায় । একটী যেন রাজ বাড়ি। অন্যান্য
বিষয়ও খাদ্যদি রাজ বাড়ির মত ।
তিনি আমাকে এঘর ওঘর করিয়া সব দেখাইয়া শেষে
যে ঘরে লইয়া গেলেন সে ঘরটা সর্বাপেক্ষা শােভা ও সজ্জার
২৮
মেসূমেরিজম, বা শক্তি চালনা।
প্রাচুর্যে পরিপূর্ণ।
দেখিলাম সেই ঘরের জানালার কাছে
একটী পরমাসুন্দরী যুবতী বসিয়া আছেন।
যেন দেবীমুর্তি, এমন রূপ তো কথন দেখি নাই
অনন্তরাম হুঁসিয়া বলিলেন-মিরণ, ইনি আমার
বাল্য বন্ধু, বাঙ্গালী।
অনন্তরাম আমাকে বাগান দেখাইতে লইয়া গেলেন।
তখন আমি বলিলাম, উনি আপনার স্ত্রী বোধ হয় ?
উত্তর করিলেন—ইনি আমার প্রাণ, আমার জীবন,
আমার সর্বস্বধন, কিন্তু আপনারা যাহাকে স্ত্রী বলেন, সেরূপ
স্ত্রী নহে।
আমি এলাহাবাদ হইতে চলিয়া আসিবার সময় তিনি
ষ্টেশন পর্যন্ত আসিয়াছিলেন, অনেক কথা হইয়াছিল।
আমি মিরাটে আসিয়া কাৰ্য্যে নিযুক্ত হইলাম, পরে
শরীর খারাপ হওয়ায় ছুটী লইয়া বাড়ি আসিবার সময়
এলাহাবাদে অনন্ত রামের খোজ লইয়া জানিলাম, সমস্ত
বিক্রয় করিয়া কোথায় চলিয়া গিয়াছেন, কেহ জানে না।
দুবৎসর পরে একটিনি লইয়া পশ্চিমাঞ্চলে গেলাম।
একদিন বৈকালে একজন হিন্দুস্থানী আমাকে বলিলেন
-কালিবাড়িতে একজন ভদ্র লােক আসিয়া দুদিন ছিলেন।
আজ তিনি মুষু অবস্থায়, আপনি অনুগ্ৰহ করিয়া তাহাকে
তৃতীয় পরিচ্ছেদ। ২৯ দেখলে ভাল হয়। আমি কালি বাড়িতে গেলাম। পূজারী ব্রাহ্মণ আমাকে সঙ্গে করিয়া রােগীর ঘরে লইয়া গেলেন এবং বলিলেন, যেরূপ অবস্থা রক্ষা পান বলিয়া মনে হয় না। ঘরের ভিতর যাইয়া যাহা দেখিলাম-- স্তম্ভিত হইলাম । অনন্ত রাম ছেড়া চটের উপর দীন- ভাবে মৃত্যু শয্যায় শায়িত। অনেক বার ভাকিলাম, কিন্তু কোন উত্তর পাইলাম না, তঁাহার এই অবস্থা দেখিয়া আমার সৰ্ব্ব শরীর শিহরিয়া উঠিল। তিনি আমাকে বেশ চিনিতে পারিলেন। বেশ জ্ঞান আছে। বলিলাম-অনন্তবাবু ভাই একি ? যখন এই কথা বলি, তখন আমার মনে হইল,এলাহাবাদে তিনি আমাকে বলিয়াছিলেন, শীঘ্রই তাহার মৃত্যু হইবে। অনেকবার ডাকিলাম, অনেক প্রশ্ন করিলাম, কিন্তু বাকরোধ, কথা কহিবার শক্তি নাই। অনেক পরীক্ষা করিয়াও কি রােগ হইয়াছে, ঠিক করিতে পারিলাম না। আমি তাহাকে একখানা খাটিয়াতে তুলিয়া কাহারের মেমেরিজ বা শক্তি চালনা। দ্বারা আমার বাসায় আনিয়া জনৈক হিন্দুস্থানীকে সেবার জন্য নিযুক্ত করিয়াদিলাম। কালীবাড়ী হইতে অনন্তরামের কাপড়দি আনিয়া- ছিলাম। তাহার ঠিকানা পাইবার আশায় কাপড়গুলি তন্ন তন্ন করিয়া খুজিলাম। তঁাহার কোন আত্মীয়ের নাম বা ঠিকানা পাইলাম না। এক টুকু চিঠী যাহা পাইলাম, তাহা স্ত্রীলােকের লেখা। তাহাতে লেখা ছিল “তুমি আমাকে পরিত্যাগ করিয়াই যাও, আর যেখানেই লুকাইয়া থাকে, ঠিক জেনাে সেই সময় উপস্থিত হলে,আমি তােমাকে খুঁজিয়া বাহির করিবই করিব। সেই কাল পর্যন্ত দাসী তােমার চরণে বিদায় মাগি লই- তেছে।” অনন্তরাম যেন মরিবার জন্যই এখানে আসিয়া পড়িয়াছে, কিন্তু ব্যাপার কিছুই যেন বুঝা যায় না; যে বলিবে, সে তো বাকরােধ অবস্থায় মৃত্যু শয্যায় শায়িত। তঁাহার সেবার জন্য যে লোক নিযুক্ত করিয়া ছিলাম, সে আর কিছুতেই থাকিতে চাহিল না। বলিল, বাবা খে চাহুনি। আর থাকবে না। অনেক চেষ্টাতেও
তৃতীয় পরিচ্ছেদ।
লােকটাকে কোন মতেই রাখিতে পারিলাম না। তখন
নিজে একখানি ইজিচেয়ার লইয়া অনন্তরামের কাছে গিয়া
বসিলাম। আস্তে আস্তে আমার নিদ্ৰা আসিতে লাগিল ।
তারপর এলােমেলাে স্বপ্ন দেখতে বাগলাম। যেন আমি
কাহারও বশীভূত হইয়া পড়িতেছি ; মনে হইতে লাগিল।
এমন সময় আমার যে ঘুম আসিতেছিল যেন ভাঙ্গিয়া গেল।
দেখিলাম অনন্তরামের উজ্জ্বল চক্ষু দুটী
আমার উপর নিক্ষিপ্ত।
তার পরই আমার ইচ্ছাশক্তি ও গতি
শক্তি লোপ হইয়া গেল, চক্ষুর পলক
ফেলিবারও ক্ষমতা আমার আর
রহিল না ; তার একটু
একটু পরেই
চিন্তাশক্তি কিছুমাত্র রহিল না। সব
অন্ধকারময়, খেন কোয়াসাত
বােধ হইল, কিন্তু সেই অন্ধকারের মধ্যে অনন্ত
রামের উজ্জ্বল হইতেও উজ্জ্বল চক্ষু
দুতী আমার সম্মুখে রহিল, আর
আমার ইচ্ছাশক্তি কিছু মাত্র ৱহিল
না।
পরক্ষণেই আমার মনে হইল, আমি পীড়িত হইয়া
D
৩২
মেস মেরিজ বা শক্তি চালনা।
;
}
বিদেশে সঙ্কটাপন্ন অবস্থায় রহিয়াছি। কোন স্ত্রীলােককে
যেন প্রাণের অধিক ভালবাসি। সে অনেক দুরে। তবে
আমার মৃত্যুর পূর্বে সে আমার কাছে আসিতে পারে।
তাকে চিটি লেখবার জন্য প্রবল ইচ্ছা হইতে লাগিল
আবার মনে মনে ধিক্কার হইতে লাগিল; যদি আমার
মৃত্যুর পূর্বে সে আমার কাছে আসিতে পারে; তবে
তাহার একটা ভয়ানক দুর্ঘটনা ঘটিবে। তার
পর আমি অজ্ঞান হইয়া রহিলাম। যখন জ্ঞান হলাে
দেখি, আমি ডাকঘরের কাছে দাঁড়াইয়া
আছি।
যেন একখানি চিতি ডাকবাক্সে
ফেলিয়াছি, মনে হইতে লাগিল। আমি কঁপিতে
লাগিলাম। পরে বাসায় আসিয়া একখানি খাটিয়ার উপর
চিৎ হইয়া পড়িয়া ভাবিতে লাগিলাম, “কি ভয়ঙ্কর
ব্যাপার।”
আমি অনন্তরামের অদ্ভুত
মানসিক
শক্তি চালনায় এইরূপ অভিভূত
হইয়াছিলাম। ভাবলাম ইহাই কি মেমেরিজম
নাকি ?
এতাে বড় প্রলয়ঙ্করী।
এইরূপে দশদিন কাটিয়া গেল, অনেক চেষ্টাতেও
তৃতীয় পরিচ্ছেদ । রােগের কোনই উপকার করিতে পারিলাম না। ক্রমেই খারাপ হইতে লাগিল, কিন্তু তাহার বুদ্ধিবৃত্তি ঠিক ছিল, কোন ব্যতিক্রম হয় নাই। কতদিন চলিয়া গেল, অনন্ত- রাম সেই নিৰ্বাক্ ও নিস্পন্দ ভাবে পড়িয়া আছেন। যখন ঘরের দরজা খােলা হয়, তখনই দেখি অনন্তরাম ভীত ভাবে উৎকণ্ঠার সহিত দরজার দিকে তাকাইয়া আছেন। আমাকে বা চাকবকে দেখিলে আশ্বস্থ হন। তাহার যদি আমাকে দিয়া পত্র লেখাইয়া স্ত্রী অনানই মত, তবে তাে তাহার ভরসাযুক্ত দৃষ্টি হওয়াই উচিত ছিল! কাতরভাব কেন ? ভয়ের ভাব কেন ? বুঝিতে পারি না। তার পরও অনন্তরাম আমাকে নিজ বশে আনিতে চেষ্টা করিয়াছিলেন এবং কতকটা পারিয়াছিলেন। একদিন তঁাহার দিকে তাকাইয়া আছি; যেন বশীভূত হই হই, এমন সময় চাকরটা আসিয়া আমার মােহ ভাঙ্গিয়া দিল। আর একদিন যেন মনে হইতে লাগিল, বেশী পরিমাণে লডেনম্ (আফিংয়ের আক) খাওয়াইয়া দিই। তখনি সাবধান হইলাম। বুঝিলাম, অনন্তরাম আমার দ্বারা আত্মহত্যার চেষ্টা করিতেছে। কেন হত্যার চেষ্টা তা তাে বুঝি না। মৃত্যু যন্ত্রণায় লােকে ৩৪ মেমেরিজ বা শক্তি চালনা। মরিতে চাহে, কিন্তু তাহার মৃত্যু যন্ত্রণা কিছু ছিল বলিয়া বােধ হয় না। তঁাহার কাছে নিজে একা তাে যাইতাম না; আর কাহাকেও যাইতে দিতাম না। ভয় হইত অনন্তরাম যাহাকেই একা পাইলে তাহারই দ্বারা অখ- হত্যার চেষ্টা করিবে। হয়রাণ হইয়া পড়িলাম। ক্রমে অনন্তরামের আর সময় নাই। ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই শেষ হইয়া যাইবে স্থির করিয়া অনেক রাত পর্যন্ত অনন্তরামের কাছে থাকিলাম। শেষ রাত্রিতে নিজের ঘরে আসিয়া শুইলাম। উঠিতে সেদিন বেলা হইয়াছে। চাকরটা কপাটে ধাক্কা দিয়া ডাকিল। উঠিয়া দেখি, তাহার পশ্চাতে একটা স্ত্রীলােক। সে সেই অনন্ত রামের-মিরণ। মিরণ আমার দিকে তাকাইলন, তখন তাহার ঠোট দুটা কাপিতেছিল। বলিলেন-এই বাড়ীতে কোন ভদ্রলােক মরণাপন্ন অবস্থায় আছে কি ? আমি বলিলাশ হা-অনস্করাম। বলিলেন আমি কি সময় মত পৌছিয়াছি? তিনি কি এখনও জীবিজ আছেন?
তৃতীয় পরিচ্ছেদ।
অবস্থা খুব খারাপ, কিন্তু এখনও বাঁচিয়া আছেন। ইহা
শুনিবা মাত্র তাহার মুখে আনন্দের চিহু প্রকাশ হইল।
হায়রে কেন এ আনন্দ ? এখনই সব নিবিয়া যাইবে।
তবে কিসের এ আনন্দ ? কিছুই তাে বুঝিলাম না।
তিনি উৰ্দ্ধ দৃষ্টিতে কৃতাঞ্জলিপুটে ইষ্টদেবতাকে ডাকি-
লেন। চক্ষু দিয়া দর দর ধারায় অশ্রুপাত হইতে লাগিল।
বলিলেন “আমাকে লইয়া চলুন”। আমি
বলিলাম আপনি একটু বিশ্রাম করুন এবং একটু জল খান।
তিনি অস্বীকার করিলেন, এবং বলিলেন এক মুহুর্তও
বিলম্ব করিতে পারিব না। তাহার পত্র পাইয়া দিবারাত্র
অবিশ্রামে আসিয়াছি। দেরী করিবেন না। দেরি হলে
হয় তো সব পরিশ্রম বৃথা হয়ে যাবে।
তিনি দুয়ার ঠেলিয়া আমার আগেই অনন্তরামের
কাছে গেলেন। অনন্তরামের দৃষ্টি দুয়ারের দিকেই ছিল।
মিরণকে দেখিয়া কোথায় তঁাহার আননের চিহ প্রকাশ
. হবে; না তৎ পরিবর্তে বিষম ক্লেশের চিহ্,
দারুণ মর্মাহতের চির মুখে প্রকাশ
হইতে লাগিল। মুখের চেহারা বিকৃত
হইয়া গেল। আমি ভাবিলাম, এইবার প্রাণবায়ু বাহির
হইয়া যায়।
মেস মেরিজ বা শক্তি চালনা। মিরণকে দেখিয়া তাহার মনের ভাব এমন হইবার কারণ কি? তিনি কি ইহার সহিত অসদ্ব্যবহার করিয়া- ছেন যে, তাহার মনে ভয়ের উদয় হইবে ? এই আসন্ন কালে মিরণ কি তাহাকে ভৎসনা করিতে আসিয়াছেন ? যদি তাই হয়, তবে কেন তিনি আমাকে বশীভূত, মােহ- গ্রস্থ করিয়া আমার দ্বারা পত্র লেখাইয়া বহু দূর হইতে তাহাকে আনাইলেন ? কিছুই বুঝিতে পারিলাম না। মিরণের প্রতি অসদ্ব্যবহার করুন, আর নাই করুন, মিরণ কিন্তু তাহাকে ভৎসনা করিতে আসেন নাই। ইহা অল্পক্ষণ মধ্যেই বুঝিতে পারিলাম। মিরণ শশাকেচ্ছাসে বিহ্বল হইয়া আত্মহারা হইয়া অনন্ত রামের শীর্ণ পদমুল বক্ষঃস্থলে লইয়া তদুপরি মস্তক রাখিয়া অশ্রুজলে পদদ্বয় প্লাবিত করিতে লাগিলেন তিনি কি ভাষায় কি কহিতে লাগিলেন, তাহা কখন শুনি নাই এবং তাহার এক বর্ণও বুঝিতে পারিলাম না। তবে শেষ অবস্থায় যে প্রাণেশ্বরের শ্রীচরণ দর্শন পাইয়াছেন, ইহাতেই তাহার পরম আনন্দ। , ইহাই বুঝিলাম। এই সময়ে অনন্তরামের মুখমণ্ডলে নিগৃহু প্রেম তৃতীয় পরিচ্ছেদ। ময়ও শান্তিময় ভাবের আভাস দেখা গেল। কিন্তু তাহা অল্পক্ষণের জন্য। পরক্ষণেই চক্ষু কঠোর ভাব ধারণ করিল । আমার বেশ বােধ হইতে লাগিল, যেন মিরণকে দুর হইতে বলিতেছেন। কিন্তু সে হুকুম মিরণ একেবারেই গ্রাহ্য করিল না। তখন আবার অনন্তরামের মুখে অনুনয় বিনয়ের ভাব প্রকাশ হইতে লাগিল, কিন্তু মিরণ কিছুতেই ছাড়িল না। মিরণ পদযুগল বক্ষঃস্থলে ধরিয়া বারার তদুপরি শিরোলুণ্ঠন করিতে লাগিলেন। শেষে অনন্ত- রাম যেন ক্লান্ত ও হতাশ হইয়া একটা দীর্ঘনিশ্বাস ছাড়িয়া চক্ষু বুঝিলেন, ভাবিলাম এই বুঝি শেষ। নিকটে গিয়া দেখি, মৃত্যু হয় নাই; শ্বাস বহি- তেছে, কিন্তু আর দেরী নাই, উৰ্দ্ধ সংখ্যা এক ঘণ্টা। মৃত্যু নিশ্চয়। তখন মিরণকে বলিলাম—আপনি ক্ষান্ত হউন মনের উদ্বেগে প্রাণবায়ু বাহির হইয়া যাইতে পারে। এই কথা শুনিবা মাত্র তিনি পদদলিত সর্পিণীর ন্যায় উন্নত হইয়া আমার প্রতি এমন ভাবে তাকাইলেন ; আমি শিহরিয়া উঠিলাম । তখন বিষম তেজের সহিত মিরণ বলিয়া উঠিলেন। আপনি এখান হইতে চলিয়া যান। ;
৩৮
মেমেরিজম্ বা শক্তি চালনা।
আমার স্বামীর নিকট আমি এক
থাকিব।
আমি একটু ইতস্ততঃ করিয়া চাকরটাকে সঙ্গে লইয়া
চলিয়া গেলাম। যাইবার সময় একবার শেষ দেখা দেখি-
লাম—অনন্তরাম অচৈতাবস্থায় পড়িয়া আছেন, মিরণ
তাহাকে টানিয়া লইয়া সেই রক্তশূন্য মুখখানি
নিজের সজীব বিম্বেস্তের নিকট
রাখিয়া বাহুলতা দ্বারা বেষ্টন করিয়া
ধরিয়াছেন, এই তপূৰ্ব্ব মিলন দেখিয়া মুগ্ধ হইলাম।
আমার চক্ষে জল আসিল। এখনই এক টুকু পরেই এই
প্রেম মুগ্ধ রমণীর কি দশা হইবে, ভাবিয়া মর্মাহত হইতে
লাগিলাম।
আমি আমার হস্পিটালে গেলাম এবং ভাবিলাম,
আসিয়া আর হয়তো অনন্তরামকে দেখিতে পাইব না।
হাসপাতালের কাজ তাড়াতাড়ি সারিয়া শী
আসিবার চেষ্টায় আছি। এমন সময় এক দুর্ঘটনা। পাদরী
সাহেব ঘােড় হইতে পড়িয়া গিয়া, তাহার হাত ভাঙ্গিয়া
গিয়াছে। তাহাকে দেখিবার জন্য মাজেষ্ট্রেট সাহেব পত্র
লিখিয়াছেন। পাদরী সাহেবের কুঠি হাসপাতাল হইতে
তুন মাইল। আমি ঘোড়ায় চলিয়া গেলাম। তঁাহার
জন্য
তৃতীয় পরিচ্ছেদ। ৩৯ { কুঠিরের কাছাকাছি হইতেই হঠাৎ ঘােড়র পা মচকাইয়া গেল। কাজেই পাদরী সাহেবের হাত বাধিয়া দিয়া আসিবার সময় পদব্রজেই আসিতে হইল। আমার যতদূর সাধ্য দ্রুতপদে অসিতে আসিতে দেখি পথের পার্শ্বে একটা লােক পড়িয়া ছটফট করিতেছে। প্রথমে নজরেই আসে নাই। পরে নিকটে আসিয়া দেখিতে পাইলাম। ভাবিলাম এটা কোন ছোট লোক মদ খাইয়া পড়িয়া, এমন করিতেছে, কিন্তু নিকটে আসিয়া দেখি, একটী ভদ্র- লােক পথের পার্শ্বস্থিত ঝোপের মধ্যে মুখ ও জিয়া উপুড় হইয়া পড়িয়া, এমন ভাবে কঁদিতেছে; যেন তাহার বুক ফাটিয়া যাইতেছে। নিতান্ত হতাশের ন্যায় এদিকে ওদিকে হাত ফেলিতেছে। মাটি কামড়াইতেছে। যেন অসহ যাতনায় ছটফট করিতেছে। ভয়ানক কষ্ট ভোগ করিতেছে ভাবিয়া, হেঁট হইয়া তাহার কাধে হাত দিয়া বলিলাম ; বাবা তােমার কি হয়েছে ? আমি ছুইতেই তিনি উঠিয়া দাড়াইলেন। দেখিয়া আমার আত্মাপুরুষ উঠিয়া গেল। কি ভয়ঙ্কর !! সে দৃশ্য এ জনমে ভুলিব না। দেখিলাম -অনন্তরাম সুস্থ শরীরে আমার সম্মুখে
৪
মেসমেরিজ বা শক্তি চালনা।
দাড়াইয়া! ছায়া নয়। সকল অঙ্গ প্রত্যঙ্গ বেশ সজীব
ও সবল। দুই গাল দিয়া চক্ষের জল পড়িতেছে। দারুণ
ক্লেশে দুই হাত রগড়াইতেছে।
কথা কহিব কি ; আমার জিব তালুতে লাগিয়া গেল।
সর্বাঙ্গের লােম খাড়া হইয়া উঠিল, দুটো কথা একত্র
করিবার ক্ষমতা রহিল না।
অনন্তরাম আমার কাছে আসিয়া আমার হাত জোরে
ধরিয়া কহিলেন—দেশে যাও, যদি আর
তােমাকে দেখিতে পাই, তবে নিশ্চয়
যেনাে আমার হাতে তোমার মরণ!
অনন্তরামের চেহারা ভাবভঙ্গি ও কথা শুনিয়া আমার
অন্তরাত্মা খাইয়া গেল। পিছন ফিরিয়া প্রাণের দায়ে
দৌড়িলাম। যখন আমার জ্ঞান হইল, দেখি বাসাতে
পড়িয়া আছি।
বাসাতে চাকর আদি জন প্রাণী নাই। আমার বোধ
হইতে লাগিল, আমি একটা কি ভয়ানক স্বপ্ন দেখিয়াছি।
যাই হউক, আমি তাড়াতাড়ি উঠিয়া কাপিতে কঁপিতে
অনন্তরামের ঘরের দুয়ার খুলিলাম।
দেখিলাম বিছানার উপর সাদা চাদরে আপাদমস্তক
অাবৃত একটা মানুষের দেহ পড়িয়া রহিয়াছে। মনে
তৃতীয় পরিচ্ছেদ।
৪১
করিলাম—অনন্তরামের মৃতদেহ। মিরণ ও বাসার সকলে
আমার অনুপস্থিতিতে মৃতদেহ ফেলিয়া পলাইয়াছে। আমি
যা স্বপ্ন বেলে মনে করিতেছিলাম, সে সব কথা আমার
সমস্ত বেশ মনে ছিল। কিছুক্ষণ স্থির হইয়া থাকিয়া মনে
মনে সাহস করিয়া লইয়া শেষে ঐ মৃত দেহের মুখের কাপড়
খুলিলাম। দেখিয়াই চীৎকার করিয়া উঠিলাম।
দেখিলাম সেই যুবতি মিরণ মৃতাবস্থায়
পড়িয়া আছে। তখনও অধরে হাসির ছটা
লাগিয়া রহিয়াছে।
তৎক্ষণাৎ নিজ ঘরে আসিয়া টাকাও দ্রব্যাদি যা ছিল
লইয়া বাসা ফেলিয়া মাঠে মাঠে হাঁটিয়া তিন জোশ দুরবর্তী
রেলওয়ে ষ্টেশনে আসিয়া হুগলির টিকিট
করিলাম।
পাঠক মহাশয়গণ এক্ষণে দেখুন ম্যাগনেটী-শক্তি দ্বারা
কি না করা যায়। এই শক্তি সুশৃস্থলে চালিত করিতে
অভ্যাস করুন। তাহার দ্বারা অমুল্য মনুষ্যজীবন রক্ষা
করিয়া নিজ জীবন স্বার্থক করুন। নিজের
স্বার্থবুদ্ধি একেবাবে ত্যাগ করিয়া পরো-
‘পকারে জীবন উৎসর্গ করুন। জগতে পূজনীয় হউন।
জগদীশ্বরের দয়ার পাত্র হউন। কতক্ষণের জন্য পৃথিবীতে
৪২ মেমেরিজ বা শক্তি চালনা। আসিয়াছি, আর কতক্ষণ থাকিব। এই টুকুর মধ্যে যদি পরের কিছু উপকার করিয়া মরিতে পারি, তবেই জীবন সার্থক হবে, তবেই মরণ সার্থক হবে, তবেই চিকিৎসা করিতে শিক্ষা সার্থক হবে। নতুবা গর্ভ যন্ত্রণা, পৃথিবীতে নরক যন্ত্রণা ভােগের পর, যম যন্ত্রণা মাত্র ভােগ, এই মাত্র লাভ হইবে । এই জীবনীশক্তি চালিত করিয়া ইচ্ছাশক্তির দ্বারা রােগীর আরােগ্য কারিণী শক্তিকে বাড়াইয়া দিয়া, তদু পরি ঔষধের ক্রিয়া দ্বারা রােগীর রোগের যাতনার নিবৃত্তি করিয়া জীবন দান দ্বারা পিতৃকাৰ্য সম্পন্ন করুন। প্রকৃত পিতৃস্থানীয় হউন। অর্থ পিশাচ মনুষ্য হত্যাকারী হইয়া চিকিৎসক পদবাচ্য হইতে ঘৃণা করিতে শিক্ষা করুন ; অভ্যাস করুন। অভ্যাস করিলে কি না করা যায় ? কি অভ্যাস দ্বারা মিরণ ও অনন্তরাম কি করিল! মিরণ কি অভ্যাস করিয়াছিল, কিরূপে নিজ জীবন দিয়া স্বামীর জীবন রক্ষা করিল। অনন্ত- রামই বা কি খেলা খেলিয়া চির জীবনটাকে দুঃখ সাগরে ভাসাইয়া দিল। ম্যাগনেটীক শক্তি চালিত করিতে .
তৃতীয় পরিচ্ছেদ।
৪৩
এবং ঐ শক্তিকে নিৰ্ম্মল করিতে অভ্যাস করুন।
নিজ জীবনকে নিৰ্ম্মল
পােপকারে
নিয়ােজিত করুন। ন্যায় পরায়ণ, দয়ালু ও বিনয়ী
হইয়া আদর্শ চিকিৎসক হইতে যত্ন করুন। মরিলে
আত্মীয় বন্ধু তাে কাদিবেই,যদি শত্ৰু কঁাদাইয়া মরিতে পারি,
তবেই তাে মরণে সুখ হইবে। যে ব্যক্তি যত শক্রতাই
করুন না কেন। পুনঃ পুনঃ তাহার উপকার
করিতে শিক্ষা ও অভ্যাস করুন। প্রাণদাতা বলিয়া
পৰিচয় দিয়া যেন হত্যাকারী হইতে না হয়।
কর্মেন্দ্রিয়ানি সংষম্য ঘ আস্তে
মনসা স্মরণ।
ইন্দ্রিয়াখান বিমুছাপ্পা মিথ্যাচার স
উচ্যতে।
মিথ্যাচারী হইতে না হয়। রােগী দেখিতে গিয়া
ব্যস্ত হইবেন না; তাড়াতাড়ি করিবেন না।
যতক্ষণ
ঔষধ ঠিক নির্বাচন না হইবে, ততক্ষণ ঔষধ দিবেন না।
ঔষধ নির্বাচনে নিজের মনে আনন্দ উদয় না হওয়া পর্যন্ত
জানিবেন, ঔষধ ঠিক হয় নাই।
ঔষধ ঠিক হইলে তাহাতে নিজ তেজঃ ও মাঙ্গলিক
ইচ্ছাশক্তি যােগ করিয়া ঔষধ দিবেন। ঐ ইচ্ছাশক্তি
৪৪
মেসূমেরিজম, বা শক্তি চালনা।
রােগীর শরীরে কেমন কোরে চালিত করিতে হয়, শিক্ষা
করিয়া চালিত করিবেন।
চতুর্থ পরিচ্ছেদ
চিকিৎকগণের মধ্যে অনেকের শক্তি চালনার বিষয়ে
বিশেষ জ্ঞান নাই। এ বিষয় জানা প্রয়োজন বলিয়াও
মনে করেন না। যদি কেহ বলে বা মনে হয়, তাহা
হইলেও কলেজে ইহার বিষয় কখন কাহারও নিকট
কর্ণগোচর না হওয়ায় বা আলোচনা না হওয়ায় নিয়ে-
জনীয় বলিয়া অবজ্ঞা করিয়া থাকেন; কিন্তু প্রকৃতপক্ষে
ইহা অবহেলার বা অবজ্ঞার বিষয় নহে, এবং অতি
প্রয়ােজনীয় ও চিকিৎসার সার বলিলেও অত্যুক্তি হয় না।
ইহার দ্বারা যে রোগ আরােগ্য করা যায় কিম্বা ঔষধের
ক্রিয়ার সফলতা বা তীব্রতা সম্পাদন করা যায় ; ইহা অতীব
মূল্যবান কথা।
কেহ কেহ বলিয়া থাকেন বা অনুমান অথবা সন্দেহ
করিয়া থাকেন যে, মেমেরিজ বা শক্তি চালাদ্বারা
চতুর্থ পরিচ্ছেদ।
৪৫
আরােগ্য হইলেও কখন কখন ইহার “ক্রিয়া স্থায়ী
হয় না ” একথা সকল সময় সত্য না হইলেও এক
কালিন মিথ্যা নহে।
যেমন সময় সময় ঔষধ দ্বারা আরােগ্যও স্থায়ী হয় না,
তদ্রুপ মেমেরিজম্ দ্বারা আরােগ্যও স্থায়ী না হইতে
পারে। তাহার অনেক কারণ আছে।
১। শক্তি-চালকের মনের একা-
গ্রতার তারতম্য।
২। শক্তি-চালকের বিশ্বাসের
দৃঢ়তার নুনাধিক্য।
৩। রােগীর রােগ প্রবণতার ইতর
বিশেষ।
৪। রােগীর রােগ আরােগ্যকারিণী
জীবনীশক্তির বিশৃঙ্খলতা।
৫। রােগীর রােগ উৎপত্তির
কারণ বর্তমান থাকা।
৬। রােগীর অত্যাচার, আহারের
অনিয়মিত।
৭। রোগীর ব্রহ্মচর্যের অভাব
কিম্বা ব্যভিচার দোষ ইত্যাদি
৪৬
মেসমেরিজ বা শক্তি চালনা।
কারণে ফল স্থায়ী হয় না। নতুবা
স্থায়ী না
হইবে কেন ? ক্রিয়া সাধক ক্রিয়া পাত্রের নাম বদলাইয়া
দিলে যখন সে সেই সাধক প্রদত্ত নামই দৃঢ় বিশ্বাসে মনে
রাখিয়া, তাহাই বলিয়া পরিচয় দেয়, বা সেই নামে না
ডাকিলে, তাহার প্রকৃত নাম ধরিয়া ডাকিলে উত্তর
দেয় না, তখন আরোগ্যতা স্থায়ী কেন না হইবে ?
পূৰ্বোল্লিখিত কারণে স্থায়ী না হইতে পারে।
কিন্তু ঐ সকল বিষয়ে সাবধানতায় অবশ্য আরোগ্য
স্থায়ী হইবে। যাহারা মেমেরিক আরােগ্য অস্থায়ী
বলিয়া থাকেন, তাহাদের কথা সত্য হইলেও এ সকল
বিষয়ে সাবধান হইয়া দেখিবেন ; মেমেরি আরোগ্য
স্থায়ী হইবেই হইবে।
পর পর কৃতকগুলি লােকের হাত একে একে লইয়া
চিৎ করিয়া রাখিয়া তােমার নিজের দক্ষিণ হাতের অঙ্গুলী
গুলির অগ্রভাগ, তাহার হাতে স্পর্শ না
করিয়া অথচ
খুব নিকট দিয়া কজি হইতে বরাবর নীচের দিকে ধীরে
ধীরে একমনে অর্থাৎ স্থির মনে চালাইতে থাকিলে অনেক
বারের পর সেই সকল লােকের মধ্যে কেহ কেই এক
প্রকার বিশেষ ভাব অনুভব করিতে থাকে। ঐ সক
অনুভব শক্তি এক প্রকার হয় না। কেহ অল্প গরম,
চতুর্থ পরিচ্ছেদ।
৪৭
কেহ অল্প ঠাণ্ডা, কেহ ঝিন ঝিন বা
কুট কুট করা ইত্যাদি অনুভব করিতে থাকেন।
ইহাদের মধ্যে যে ব্যক্তি ঐ প্রকার
অনুভব বেশী
বােধ করে, তাহাকে লইয়া তাহার চক্ষু বাঁধিয়া দিয়া
ঐরূপ করিলেও সে তাহা বলিতে পারে। আবার এমন
হইতেও পারে, চক্ষু বঁধিয়া দেওয়ায় মনের গােযােগে
বুঝিতে নাও পারে, কিন্তু প্রায়ই বুঝিতে পারে।
ইহাতে বুঝিতে পারা যায় যে অঙ্গুলীর অগ্রভাগ
দিয়া জান্তব শক্তি বাহির হইয়া থাকে
এবং তাহা ঐ ব্যক্তির হাতে ঐ প্রকার অনুভূতি
প্রদান করিতে থাকে।
মানব শরীরে জগদীশ্বর এমন কতকগুলি যন্ত্র দিয়াছেন,
যাহাতে শরীরের উত্তাপ ও ঐ উত্তাপের সামঞ্জস্য রক্ষা
করে; ঐ উত্তাপকে আমরা জান্তব উত্তাপ বা
এনিমেল, ম্যাগনেৰ্টিজাম, বলিয়া থাকি।
ইহার ক্রিয়া যেন কতকটা বিদ্যুতের মত, কিন্তু ঠিক তেমন
নয়, বর্ণ তফাৎ, কাৰ্যও তফাৎ, বিদ্যুতের আলাের বর্ণ
লাল কিন্তু ইহার বর্ণ সকল লােকের এক প্রকার না
হইতেও পারে। তবে প্রায়ই নীলাভ।
ইহা শরীরের সকল স্থান দিয়া সর্বদাই বাহির হইতেছে,
৪৮ মেসূমেরিজ বা শক্তি চালনা।
তন্মধ্যে অঙ্গুলির অগ্রভাগ ও ওষ্ঠের অগ্রভাগ দিয়া বেশী
বেশী বাহির হয়। ইহা পাঠক মহাশয়গণ অবগত আছেন।
পূৰ্বেও বলা হইয়াছে।
যে ব্যক্তি ঐ অনুভূতি বেশ অনুভব করিতে পারিবে
তাহাকে লইয়া কাৰ্যে নিযুক্ত হইবে, সেই ব্যক্তি সহজে
ও শীঘ্র তােমার আয়ত্তাধীনে আসিবে।
;
পাশদিবার নিয়ম।
প্রথম উপায় ।
পাশ দিবার সময় নিজের দু হাতের অঙ্গুলি গুলি ঐ
ব্যক্তির অভিমুখীন করিয়া উহাব মস্তকের উপর হইতে
আরম্ভ করিয়া ধীরে ধীরে মুখমণ্ডলের উপর দিয়া পেট
বা পা পর্যন্ত টানিয়া আনিবে, কিন্তু তাহার শরীর স্পর্শ
করিবে না অথচ শরীরের খুব নিকট দিয়া অঙ্গুলি চালাইতে
থাকিবে। এইরূপ করিবার সময় তােমার মনস্থির
সংযত, প্র ফুল্লিত ও একাগ্র হওয়া
চাই এবং ইচ্ছাশক্তিও খুব দৃড়
রাখিতে হইবে। মন যেন কদাচ কোন বিষয়ে
বিচলিত না হয় ; তজ্জন্য একাগ্রতা পূর্ব হইতে
অভ্যাস করিতে হয়।
;
চতুর্থ পরিচ্ছেদ।
৪৯
মনের একাগ্রতা।
মনের একাগ্রতার কথা বলিতে গেলে অনেক কথাই
বলিতে হয়। তত কথা বলিবার স্থানাভাব। তবে আমাদের
মনের কথা দুএকটী সংক্ষেপে বলিতে বাধ্য হইলাম ।
আমাদের মন পাঁচভাগে বিভক্ত।
১। ক্ষিপ্ত। ২। বিক্ষিপ্ত। ৩। মুহু ৪।
একাগ্র । নিরুদ্ধ। মেমোরি কাৰ্য্য সাধনে
প্রথম তিনটী অবস্থা রাখিলে কোন মতে কাৰ্যসিদ্ধি হইবে
না। ৪র্থ। একাগ্রতা নিতান্ত দরকার। একাগ্রতা
কাহাকে বলে ?
একাগ্রতা বা একতা একই কথা। মন যখন কোন
একটা বস্তু অবলম্বন করিয়া নিৰ্বাতস্থ নিশ্চল নিষ্কম্প
প্রদীপশিখার ন্যায় স্থির ভাব ধারণ করে, একটুও কঁপে
না, সেই ধ্যেয় বস্তুতে নিষ্কম্প ভাবে দীপশিখার ন্যায় স্থির
থাকে; তাহাকে একাগ্রতা কহে। এই একাগ্রতা
অভ্যাস করিবার উপায় যােগ শাস্ত্রে বিস্তর প্রকারে সাধনের
নিয়ম আছে। মনকে একাগ্র করিতে হইলে ধ্যান দরকার
হয়। ধান অর্থ যে কোন একটা ধ্যেয় বস্তুতে চিন্তাস্রোত
বাহিত করা। সেই বস্তুটী কি ? অনেক। তবে সাধকের
অভিমত হওয়া চাই। পাতঞ্জলি বলিয়াছেন।
মেসূমেরিজম, বা শক্তি-চালনা।
যথাভিমত ধ্যানীদ্বা।
অর্থাৎ নিজের মনােজ্ঞ এন্তু ধ্যান করবেন। যাহাতে
মনের প্রফুল্লতা আসে, তাহাই নিয়ত ধ্যান করিবেন।
একাগ্রতা অভ্যাসের এই উৎকৃষ্ট উপায়। তা বলিয়া স্ত্রীর
মূর্তি ভাবিও না। যাহাতে কোন কুভব না আসে অথচ
মন প্রফুল্ল, ধীর, স্থির হয়, তাহাই চিন্তা দ্বারা একাগ্রতা
আগে অভ্যাস করিবে, একাগ্রতা যাহার যত বেশী হয়,
তাহার ক্রিয়াপাধন শীঘ্র ও সুন্দর হয়। তাহার ক্রিয়াপাত্র
তত শীঘ্র মেসমেরাইজ, হস। তাহার কোন কষ্ট
হয় না। তিনি তত শীঘ্র রােগ আরোগ্য করিতে পারেন
এবং সেই আরােগ্য তত স্থায়ী হয় । ক্রিয়াপাত্রও নির্বিঘ্ন
হইয়া থাকে। এই একাগ্রতা অভ্যাসের জন্য আমি এক
উপায় বলি, করিয়া দেখিতে পারেন, সহজে হইবে।
একটা তামার পয়সা চেপ্তা করিয়া অর্থাৎ তাক্ষরগুলি
থাকে। তৎপার্শ্বে একটা ছিদ্র করিয়া সুতা বাধিবেন,
এবং নিজে সরলভাবেবসিয়া চক্ষের সমতলে দেয়ালের গায়ে
একটা পেরেক পুঁতিয়া তাহাতে সেই চাক্তিটা ঝােলাইবেন
এবং সাবকাশ মত তং সম্মুখে বসিয়া নিশ্চিন্ত মনে তাহার
প্রতি তাকাইয়া থাকিবেন। এক দৃষ্টে এক মনে তাকাইয়া
থাকিবার কালীন অন্য চিন্তা মনে আসিতে দিবে না। মন
চতুর্থ পরিচ্ছেদ।
যখনই অন্তচিন্তায় সরিয়া যাইবে; তৎক্ষণাৎ তাহাকে তাহা
হইতে লইয়া পুনৰ্ব্বার সেই তাম্র ফলকে নিয়ােজিত
করিবেন। ক্রমে ক্রমে অভ্যাস হইতে থাকিবে। ক্রমেই
অনেকক্ষণ মন রাখিবার শক্তি জন্মাইবে, একাগ্রতা বৃদ্ধি
হইবে। যাক একাগ্রতার কথা আর বলব না। ইহা
জানিবার যাঁহার দরকার হইবে, যােগশাস্ত্র অধ্যয়ন
করিবেন কিম্বা নিজের গুরুর নিকট শিক্ষা করিবেন।
এক্ষণে পাশ দিবার বিষয় দেখা যাউক।
ক্রিয়াপাত্র অর্থাৎ যাহার উপর পরীক্ষা হইতেছে, সে
সর্ববিষয়ে অনাসক্ত অর্থাৎ মনে কোন বিষয়ে আগ্রহ বা
চিন্তা না থাকে এবং কোন শব্দ দ্বারা তাহার শান্তিভঙ্গ না
হয়। তিনি ক্রিয়া সাধকের চক্ষের প্রতি স্থির দৃষ্টিতে
তাকাইয়া থাকিবেন এবং ক্রিয়া সাধকও ক্রিয়াপত্রের প্রতি
স্থিরনেত্রে, অচল, অটল নেত্রে তাকাইয়া থাকিবেন এবং
পাশ দিতে থাকিবেন। অবিচলিত ভাবে ধীর ও স্থির মনে
কিছুক্ষণ এইরূপ করিতে থাকিলে ক্রিয়া পাত্রের পূর্বো-
ল্লিখিত গরম, ঠাণ্ডা, সূড়সূড়ি, চিচিনি,
ঝিঝিনি ইত্যাদি যে কোন প্রকার অনুভব হইতে
থাকিবে। ইহা আবার সকলকার সমান হয় না।
কাহারও অল্প, কাহারও মধ্যম, কাহারও বা তীব্র
মেমেরিজম বা শক্তি-চালনা। প্রকারের অনুভব হইতে থাকে। যে যত তীব্র অনুভব করে, সে তত শীঘ্রই আয়ত্তাধীনে আসিয়া পড়ে। মধ্যম ব্যক্তি বিলম্বে, আর অধম ব্যক্তি বহুবারের পর, বহু বিলম্বে আয়ত্তাধীনে আসিয়া থাকে। ক্রিয়াশীল ব্যক্তি কদাচ হতাশ হইবেন না। হতাশ হইলে তিনি তাঁহাকে আর আয়ত্তাধীনে আনিতে পারিবেন না, কিম্বা বহু কষ্টে বহুবারে আনিতে পারিবেন। সুকায়, ধৈর্যশীল, বলবান, অধ্যব সায়ী, একাগ্রচিত্ত ব্যক্তি চেষ্টা করিলে অতি সহজে এবং শীঘ্র সককেই আয়ত্তাধীনে আনতে পারেন; এবং নিজ কাৰ্য্য সাধন করিতে পারেন। অধ্যবসায়ী প্রায় কখনই বিফল হয়েন না। তবে প্রথম প্রথম হয় তো একটু বিলম্ব হয়। পরে ক্রিয়াপাত্র যখন আয়ত্তাধীনে আসে, তখন দুচার মিনিটেই বিলক্ষণ আয়ত্ত হয় । পাশ দিবার দ্বিতীয় উপায়। ক্রিয়া পাত্রের খুব নিকটে সামনাসামনি বসিয়া তাহার দুই অঙ্গুষ্ঠ দুহাতে ধরিয়া, তাহার চক্ষের উপর নিজের চক্ষু রাখিবে এবং তাহাকেও ঐরূপ চক্ষুর উপর চক্ষু,রাখিতে কহিবে। এইরূপে তাহার প্রতি স্থির, ধীর, ও একাগ্র- ভাবে মন সংযত রাখিবে। ইহাতে পূর্ব প্রকারের পাশ
চতুর্থ পরিচ্ছেদ।
দেওয়া অপেক্ষা অতি সহজে কাৰ্য্য সিদ্ধি হয়, কিন্তু এই
উভয় প্রকার প্রণালীর মধ্যে কেহ কোন প্রকার সুবিধা
বােধ করেন, সুতরাং কোষ্টা যে সহজ, বলা যায় না।
যাহারা এই উভয় প্রকার প্রক্রিয়া পৰ্য্যায়ক্রমে একই
ব্যক্তিতে করিয়া থাকেন, তাহাতে অনেকে বেশ সুবিধা
বোধ করেন।
আবশ্যকীয় দুইটী বিষয়।
১ম।—পাত্রের মনে মেমেরিজম্ সম্বন্ধে বিশ্বাস থাকুক,
আর নাই থাকুক, তাহাতে কোন ক্ষতি বৃদ্ধি নাই, কিন্তু
তাহার মন অনাসক্ত এবং ইচ্ছুক ভাব থাকা নিতান্ত
দরকার। মনের মধ্যে কোন প্রকার বেগবতী গুরুতর
চিন্তা থাকিলে কিম্বা সাধকের ইচ্ছাব অধীন হইব না;
এইরূপ দৃঢ় জেদ থাকিলে তাহাকে আয়ত্তাধীনে আনা
অতীব কঠিন, কষ্ট সাধ্য কিম্বা অসম্ভব হয়। পাত্রের
মনে ইচ্ছাভাব থাকা • ও মন স্থির থাকা নিতান্তই
দরকার।
২য় সাধকের মনের একাগ্রতা যে বিশেষরূপে দরকার
তাহা পূর্বেও বলা হইয়াছে ; তজ্জন্য তথায় কোন
শোলমাল না হয়, কিম্বা ফুসফুস্ গুজ গাজ, কথা বার্তা
না হয়, অথবা বার বার বসা ও উঠা বা কাশী হাঁচি
৫৪ মেমেরিজ বা শক্তি-চালনা। আদি কোন বাধা না হয়, এরূপ হইলে মনের একাগ্রতা নষ্ট হইয়া যাওয়ায় কাৰ্য্য সাধনে ব্যাঘাত হয়। আরও বলি যে পাত্র বিশেষ অভিভাব্য ( Suseeptible ) অর্থাৎ সহজে কোন বাহ্যিক প্রভাবের অধীন হইয়া যায় অর্থাৎ কোমল প্রকৃতি, তাহারা অতি উৎকৃষ্ট পাত্র। সাধকের একাগ্রতার তীব্রতানুসারে দূব হইতেও পাত্রকে নিজের আয়ত্তাধীনে আনিতে পারেন। কিন্তু এইরূপে মায়ানিদ্রা বা হিপনােটাইজ করিতে একটু অসু- বিধা হয়। পাত্রের নিদ্রায় অবস্থা ছাড়াইয়া আর একটু বেশী সংজ্ঞা লোপের অবস্থা আনা কিছু কঠিন। এ সকলের প্রমাণ পূৰ্বে পাইয়াছেন। মেমেরিজম্ সম্বন্ধে যথেষ্ট বলা হইল। এক্ষণে এই সকল প্রক্রিয়া অধিকক্ষণ নিৰ্বাহিত হইলে আমরা যে সকল অলৌকিক বা আশ্চর্যজনক ঘটনা দেখিতে পাই, তাহা বলিব । ১। চকুপাতাগুলি স্পন্দিত হইয়া চক্ষু বুজিয়া আসিতে থাকে। যাহাদের চক্ষু খােলা থাকে, তাহাদের চক্ষ যেন একটা জাল পড়িয়া আসিতেছে, মনে হয়। তখন সে কোন বস্তু দেখিতে পায় না। তখন একটা হাভাৰ চতুর্থ পরিচ্ছেদ। আসিয়া হঠাং সংজ্ঞালোপ হইয়া ইচ্ছাশক্তি বা গতিশক্তি লােপ হয়। তবে সাধকের আজ্ঞা বা হুকুম পাইলে গতি- শক্তি হইয়া থাকে। তারপর জাগ্রত হইয়া কি কি ঘটনা ঘটিয়াছে, বলিতে পারে না। যেন ঐ সময়টা একটা ফকের মত চলিয়া যায়। দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলিয়া জাগিয়া উঠে । কতকক্ষণ ঘুমাইয়াছে, তাহাও বলিতে পারে না। ইহারই নাম মেমেরিক শ্লীপ, বা মােহ- নিদ্রা। অবস্থানুসাবে ইহার তীব্রতার তারতম্য হইতে পারে অর্থাৎ কম বেশী হয়। প্রথমে নানা রকম অনুভূতি, পরে নিদ্র। আসে। তারপর সংজ্ঞা লােপ হইয়া ইজাশক্তি ও গতিশক্তি নষ্ট হইয়া যায়। অাবার জ্ঞান বজাও রাখিয়াও অনেক সুন্দর সুন্দর ব্যাপার দেখাইতে পারা যায়। জ্ঞান বজায় রাখিয়া ঐ সকল করিতে হইলে একটু একটু বিশেষ প্রণালী সাধনা করিতে হয়। পূর্বের প্রণালী অনুসারে প্রায় নিদ্ৰাই আসিয়া থাকে। নিদ্রিতাবস্থাতেও ঐ সকল ব্যাপার উৎপন্ন করতে পারা না যায়, এমত নহে। যদি নিদ্রা আসিবার ঠিক পূৰ্ব্বে প্রক্রিয়া স্থগিত রাখা যায় ; তাহা হইলে ঐ অবস্থায় অর্থাৎ জ্ঞানাবস্থাতেই ঐ সকল ব্যাপার উৎপন্ন করা যাইতে পারে।
মেসমেরিজ বা শক্তি-চালনা।
নিদ্রিতাবস্থা।
পূৰ্ব্বে বলা হইয়াছে, মোহ নিদ্রা ভাঙ্গিয়া যাওয়ার পর
নিদ্রিতাবস্থার ঘটনা কিছুই মনে থাকে না। অতএব
বুঝা গেল যে, ঐ সময়টা তাহার নিজের ফাক বােধ হইয়া
থাকে, সুতরাং ঐ সময়টা যেন জড় বা জ্ঞান শূন্য হইয়া
পড়িয়া ঘুমাইতেছিল। সে সময়টায় সে যেন অজ্ঞান
ছিল, বলা যাইতে পারে, কিন্তু প্রকৃত পক্ষে অজ্ঞান
নহে। সেই সময়টা সে নানা প্রকার চিন্তায় নানাপ্রকার
কাৰ্য পৰ্যবেক্ষণ বা নানা প্রকার আলাপ করিতেছিল।
ইহাই অত্যন্ত আশ্চর্যের বিষয় ও অলৌ-
কিক ব্যাপার।
নিদ্রিতাবস্থার বিশিষ্টতা।
১। এই নিদ্রাকে জাগ্রত সুষুপ্তি বলা যায় । ইংরা-
জীতে ইহাকে শমন বুলিঙ্গম্ ( Sam nam
bulisvm) কহিয়া থাকে। ইহার প্রকৃত অর্থ নিদ্রিতা-
বস্থায় সচেতনেব ন্যায় কার্যাদি করিয়া বেড়ান। ইহাকে,
চলিত ভাষায় “নিশিতে পাওয়া কহে।
এই অবস্থাতে গর্ভীর ও প্রশান্ত নিদ্রাও বলা যায়।
কারণ এই নিদ্রার মধ্যে জ্ঞানের ক্ষণিক বিকাশওঁ হয়
; অথচ তাহাকে ক্রিয়া সাধক যে কথা জিজ্ঞাসা করেন,
চতুর্থ পরিচ্ছেদ।
৫৭
তৎক্ষণাৎ তাহার প্রকৃত উত্তর দেয় । কখনই বেহিসাবি
বা অপ্রকৃত উত্তর দেয় না। যদি কোন কথায় তাহার
সন্দেহ থাকে, তবে “জানি না” বলে ।
যে বিষয় তাহার নিশ্চয় জানা নাই , তাহাতে সে
খাঁ বা নাবলিতে নিতান্ত অনিচ্ছা ভাব প্রকাশ করে।
ক্রিয়া সাধক দৃঢ়তার সহিত কোন আদেশ করিলে
তৎক্ষণাৎ তাহা প্রতিপালন করে। বেড়াইতে বলিলে
উঠিয়া বেড়াইতে থাকে ; তৎকালে প্রায় তাহার চক্ষু
মুদ্রিত থাকে, অথবা তাকাইয়া থাকিলেও চক্ষে কিছু
দেখে না। চক্ষে আলোর স্পর্শ বােধ কিছু মাত্র থাকে
না। চক্ষু উল্টান থাকে। তাহার চলিবার পথে কোন
জিনিষ আছে কিনা, জানিবার অলৌকিক ক্ষমতা থাকে,
যাহা সাধারণের থাকে না।
ঐ সকল ভিন্ন ভিন্ন রকমের ঘটনা হইতে থাকে ।
একই ব্যক্তির ভিন্ন ভিন্ন অবস্থাতে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাপার
দেখিতে পাওয়া যায়। কোন কোন সময় বাহ্য ইন্দ্রিয়
সকল সম্পূর্ণ ক্রিয়াশূন্য দেখিতে পাওয়া যায়। যাহাদের
আপনাপনি নিশিতে পায়, তাহাদেরও এইরূপ ঘটে।
• মেমেৰিক্ নিদ্রা ও নিশিতে পাওয়া এই দুই প্রকা
রের অবস্থা প্রায় একই প্রকারের হইয়া থাকে।
৫৮ মেসূমেরিজম্ বা শক্তি-চালনা। কোন কোন স্থলে আবার শ্রবণ শক্তি অতীব তীব্র হয়। সকল স্থলে এরূপ হয় না। যেমন অন্ধের শ্রবণ- শক্তি ও প্রাণশক্তি স্বভাবত প্রবল হয় ; বোধ হয় চক্ষুর ক্রিয়া না থাকায় শ্রবণশক্তি, ঘ্রাণশক্তি ও অনুভব শক্তিপ্রবল হইয়া থাকে। এইজন্য পথের দ্রব্যের অনু- ভূতি মেমরি নিদ্রার অবস্থায় যেমন হইয়া থাকে, সম্ভবতঃ স্বপ্ন ভ্রমণকারীও তদ্রুপই হইয়া থাকে। স্বপ্ন ভ্রমণের সময় যত বেশী শব্দ হউক না কেন সে শুনিতে পায় না। খুব বেশী উচ্চ শব্দে যদি নিদ্রা ভঙ্গ হয়, তবে বিপদ আসিতে পারে, অল্প শব্দে নিদ্রাভঙ্গ হয় না। মেমেৰিক্ নিদ্রায় কোন শব্দই শুনতে পায় না, সম্পূর্ণ কালা হইয়া যায়। এমন কি কানের কাছে বন্দু কের আওয়াজও শুনতে পায় না। এই বধিরতা নিদ্রার অবস্থা বিশেষে হয়, আবার ক্রিয়া সাধকের ইচ্ছানুসারে সকল অবস্থাতেই হইতে পারে। &িয়। সাধক যদি বলিয়া দেন, তবে আর কিছুই শুনিতে পাইবে না। ২। প্রথম প্রথম নিদ্ৰা আসিবার সময় অত্যন্ত পরিশ্রমের কাজ করিয়া যেমন পরিশ্রান্ত হয় ৬প, হইয়া ঝিমাইতে রাত্রিতে যাত্ৰা আদি শুনিবার সময় যেমন ॥ কিম্বা মাতালের চতুর্থ পরিচ্ছেদ। তন্ময় হইয়া নিদ্রাকর্ষণের মত ঝিমায়, ঠিক সেই মত হইতে থাকে, কিন্তু তারপর যখন তাহার সহিত কথা কহা যায়, তখন বেশ চাঙ্গা হইয়া উঠে। যদিও চক্ষু মুদ্রিত থাকে, কিন্তু বেশ চালাকির ভাব দেখা যায়। খুব বেশী নিদ্রার সময়ও এই সকল পরিবর্তন বেশী রকমের হয়। তাহার জাগ্রতাবস্থার অপেক্ষাও তাহাকে উন্নত প্রকৃতির অন্য ব্যক্তি বলিয়া মনে হয়? যেন নিকৃষ্ট বৃত্তি গুলি অভিভূত হইয়া গিয়া বুদ্ধিবৃত্তি উচ্চ ও উৎকৃষ্ট ভাবগুলি বিকসিত ও প্রস্ফুটিত হইয়া উঠে। ফলতঃ মেমেরিক নিদ্রার উচ্চতম অবস্থায় মুখশ্রী পরম সৌন্দর্য্যভাব, যেন স্বর্গীয় ভাবের আভাস দেখা যায়। সহজ অবস্থায় সাধার- ণতঃ সে যে সুবে কথাবার্তা কহিত, মেমেৰিক্ নিদ্রাকালে সে, সেসুরে কথা কহে ন'। যেমন মুখের ভাব স্বর্গীয় হয়, কথার সুরও তেমনি সুমধুর ভাবযুক্ত হয়। কখন বা শোক প্রকাশক কাতর সুর হইতে থাকে। ইহা প্রায়ই যে স্থলে নিজের মৃত আত্মীয় ব্যক্তির আন্দোলন করে, সেই সময়েই ঐ কাতর ভাব সুর হইয়া থাকে। আবার যখন সর্বোচ্চ অবস্থা আসে; তখন মুখের ভাব স্বর্গীয় ভাবাক্রান্ত, মনের পবিত্র ভাৰ-ব্যঞ্জক হাঁসি প্রকাশ পায়। গলার সুর এক নূতন প্রকারেরহইয়া যায়। ;
মেসমেরিজম, বা শক্তি-চালনা।
মেমেরি নিদ্রিত ব্যক্তির সংজ্ঞা তাহার সাধারণ
সংজ্ঞা হইতে সম্পূর্ণ পৃথক।
সে অবস্থায় যেন তাহার
জীবনের ভিন্নাবস্থা মনে হয়। তাহার সাধারণ অবস্থাপেক্ষ।
শত সহস্রগুণে উন্নত মনে হয়।
মেসমেরিক নিদ্রাভঙ্গের পর সে নিদ্রিতাবস্থায় ঘ্রাণ,
আস্বাদন, শ্রবণ বা যা কিছু করিয়াছে বা বলিয়াছে, তাহার
কিছুই স্মরণ থাকে না। কিন্তু আবার যখন তাহাকে মেস্
মেরি নিদ্রায় অনিয়ন করা যায়, তখন সে পূৰ্ব্ব পূৰ্ব্ব যত
বার নিদ্রিত হইয়াছিল , সমস্ত বারের সমস্ত ঘটনাগুলি মনে
করিতে পারে। প্রায়ই ঠিক ঠিক মনে হয় ; কখন বা দুই
একটা তফাৎ হতেও পারে। প্রকৃত যেন সে অবস্থায়
তাহার একটা নতুন জীবন আসে, তাহার সংজ্ঞাও যেন
দুভাগে বিভক্ত, বেলে মনে হয়, অথচ সাধারণ অবস্থা।
হইতে যে বিশেষ বিভিন্ন হয়, তাও নয়।
নিদ্রিতাবস্থায় নিজের বিষয় সম্বন্ধে ঠিক্ ঠক্ বলে।
তাহার পরিচিত ব্যক্তির বিষয়ে ব্যাখ্যা করে, বর্ণনা করে
কিন্তু তাহার নাম উল্লেখ করে না বা পারে না। নাম
বলিলে সায় দেয়, কিন্তু নিজে বলে না।
তানেক সময় আত্মবিশ্বতি ঘটে। তাহার নিজের নাম
জিজ্ঞাসা করিলে বলিতে পারে না,কিম্বা ক্রিয়া সাধকের নাম
চতুর্থ পরিচ্ছেদ।
বলে,
অথচ আর আর সব ঠিক থাকে। বেহুস হয় না, ঠিক
ঠিক কথা কহে।
বেশী বেশী সময় ক্রিয়া সাধক বা অন্য ব্যক্তিকে অষণার্থ
নামে ডাকে, কিন্তু আশ্চর্য এই যতবার ডাকিবে, ঠিক
সেই নামেই ডাকিবে ; আর নাম পরিবর্তন হইবে না।
আয় একটা আশ্চর্য্য ও বিপদের কথা বলি, অনেকের
অনেক দিন যাবৎ দুটী বিভক্ত সংজ্ঞা থাকে। এমনও ঘটে
যে, বাল্যাবস্থায় যা কিছু শিখিছিল, সব ভুলিয়া যায়,
সুতরাং আবার শিখাইতে হয়। এ অবস্থা প্রায়ই
হয় না।
৩। নিদ্রিত ব্যক্তির চক্ষু মুদ্রিত থাকে, কিন্তু যদি
তাহার মনকে কোন বস্তুর প্রতি আকর্ষণ করা যায়, তবে
সে এমন ভাবে কথাবার্তা কহে, যেন ঠিক সেই বস্তুটীকে
দেখিতেছে। দেখিবার চেষ্টাও করে, বুঝা যায়। কিন্তু
দেখিবার যত বেশী চেষ্টা করে, ততই যেন তাহার চক্ষু
বুজিয়া আসে। কোন বস্তু হাতে দিলে হাত বুলাইয়া দেখে
এবং চক্ষে দেখার মত ঠিক ঠিক বলিতে পারে বা বলে।
ইহা তাহার স্পর্শবােধ আধিক্য জন্যই হউক বা অন্য কোন
উপায় দ্বারাই হউক, ঠিক ঠিক বলে। যদি কোন বস্তু
তাহার কালে বা মস্তকের পশ্চাতে স্পর্শ করা যায়, তাহা
মেস মেরিজ বা শক্তি-চালনা।
হইলেও তাহার ঠিক ঠিক বর্ণনা করিতে পারে। আবার
যদি ক্রিয়া সাধক কোন বস্তু তাহার চক্ষের সামনে ধরে,
তবে তাহা দেখিবার যত্ন করে, এবং তাহা বুঝিতে পারা
যায়। কখন বা কষ্টে অনুভব করে। এইটা নিদ্রার
প্রথমাবস্থায় প্রায়ই ঘটে। এই সময় তাহার দিব্যদৃষ্টি
( ক্লিয়ার ভয়েল Clair Voyance) হয়। পরে নিদ্রার
সর্বোচ্চ অবস্থায় বিশেষ দীপ্তি পায়। তবে বস্তুটাকে তাহার
খুব নিকটে রাখিতে হয়। দূরে রাখিলে সে বলিতে পারে না।
এই দিব্য দৃষ্টির এত প্রভেদ দেখা যায়, তজ্জ অনেক ক্ষুধা
বলিতে হয়। ইহা যেন একটা স্বতন্ত্র বিষয় মনে হয়। ইহা
এত ভিন্ন ভিন্ন প্রকারের হয় ; তাহার সীমা ঠিক করিয়া
বলা যায় না বা অসম্ভব। দিব্য দৃষ্টির অবস্থায় যে সকল
অলৌকিক বা আশ্চৰ্য্য ঘটনা সকল হয়, তখন প্রথমাবস্থার
ব্যাপারগুলিও থাকে, কিন্তু তাহা ঐ অদ্ভুত ঘটনার সহিত
জড়িত হওয়ায় তৎপ্রতি মন আকৃষ্ট হয় না বলিয়া, বুঝা
যায় না।
৪। নিদ্রিত ব্যক্তি কেবল ক্রিয়া সাধকের কথা শুনিতে
পায়, অন্য কাহারও কথা শুনিতে পায় না। কখন কখন
বা অন্যের কথাও শুনতে পায় এবং তাহাদের কথারও
উত্তর দেয়, কিন্তু সাধকের ইচ্ছাশক্তি দ্বারা অন্যের কথা
চতুথ’ পরিচ্ছেদ। শুনিতে পায় না কিম্বা ক্রিয়াসাধক যদি বলিয়া দেয়, কাহা- রও কথা শুনিতে পাইও না, তবে তার কাহারও উচ্চৈঃস্বরে কথাও শুনতে পায় না। তখন ক্রিয়াসাধক তাহার হাতের অঙ্গুলিতে মুখ দিয়া কথা কহিলে শুনিতে পায় ও প্রশ্নেব উত্তর দেয়। কখন কখন বা অন্তে বলিলেও শুনতে পায়। কখন ক্রিয়াধক যদি অন্যের সঙ্গে সম্বন্ধ স্থাপন করিয়া- দেন, তবে শুনতে পায়। অন্যথায় উচ্চশব্দ এমন কি পিস্তলের শব্দও কিছু মাত্র শুনিতে পায় না। তাহার আলাে- চিত বিষয় অবিরামে বলিয়া যায়। কখন কখন তাহার মাথার উপর বা পেটের উপর বলিলে শুনিতে পায় । অনেক সময়ই এমন ঘটে যে, নিদ্রিত ব্যক্তি প্রথম প্রথম অন্যের কথা বা গােলমাল শুনিতে থাকে ; সহজে নিদ্রিত হয় না; তৎকালে ক্ৰিয়াসাধক শুনিতে নিষেধ করিলে আর অন্যের কথা বা গোলমাল কিছুই শুনিতে পায় না এবং শীঘ্রই প্রকৃতনিদ্রা আনয়ন করিতে পারেন। যেখানে সাধক পাত্রের উপর বেশ আধিপত্য স্থাপন করিতে পারিয়াছেন, সেইখানেই তিনি এ কাৰ্যে সক্ষম হন। এক্ষণে আমি এক কথা বলিয়া রাখি, এইরূপ ক্রিয়া দ্বার যন্ত্রণাদির নিবারণ করা যায়, আর কোন যন্ত্রণা উপস্থিত হয় না। এইরূপে অনেকে হাত বুলাইয়া আধ- ৬৪ মেস মেরিজম বা শক্তি-চালনা। কপালে শিরঃপীড়া ইত্যাদি স্বায়বীয় বেদনা ভাল করিয়া থাকেন ও পারেন, তাহাতে নিদ্রা আনয়নের প্রয়ােজন হয় না। মেমেরি ক্রিয়া দ্বারা অনুভব শক্তির লােপ করিলে, তৎপরে তাহার কোন অসুখজনক লক্ষণ প্রকাশ হয় না। ৫। কদাচিৎ দেখা যায়, মেসমেৰিক্ নিদ্রাভঙ্গের পর অসুস্থকর যাতনা হইতে থাকে কিম্বা নিদ্রিত ব্যক্তিকে জাগ- রিত করিতে কষ্ট পাইতে হয়, সে কেবল আনাড়ী ক্রিয়া- সাধকের দোষেই হয়। মেমেরিক নিদ্রাভঙ্গ করিতে হইলে বেশ সুস্থ ও স্থির চিত্তে থাকিয়া, ব্যস্ত বা ভীত না হইয়া উল্টা পাশ অর্থাৎ নিম্ন হইতে উর্দ্ধমুখে পাশ দিতে হয়। তৎকালে ক্রিয়া- সাধক যদি ব্যতিব্যস্ত, চঞ্চল বা ভীত হইয়া হাবুডুবু খাইতে থাকেন বা রাগিয়া যান, তবেই বিপদ। তখন তাহার নিদ্রাভঙ্গ না হইয়া হয় তো আক্ষেপ বা তড়কা (ফিট) হইতে থাকে। তা দেখিয়া ক্রিয়াসাধক আরও ব্যাকুল হইয়া পড়েন, নিদ্রিত ব্যক্তি তখন আর শুনিতে পায় না। ক্রিয়াধক যতই ব্যাকুল ও উৎকন্ঠিত হইতে থাকেন, বিপদ ততই গুরুতর হইয়া উঠে। সুতরাং ক্রিয়াসক প্রথম প্রথম কাৰ্য্যে হাত দিবার সময় একজন বদর্শী বিজ্ঞ
চতুর্থ পরিচ্ছেদ।
সাধককে সঙ্গে রাখিয়া কাৰ্য্যে নামাই ভাল। অন্যথায় মেস্
মেরি চেষ্টা না করাই ভাল। কারণ বিপদ কাল উপস্থিত
হইলে রক্ষা করিবার লােক সঙ্গে থাকা মঙ্গলজনক
যদি বিপরীত বা উৰ্দ্ধমুখীন পাশ দিতে জানা না থাকে,
কেমন কোরে ঘুম ভাঙ্গাতে হয়, জানা না থাকে ; তবে
ব্যস্ত উৎকণ্ঠিত না হইয়া স্থির ভাবে থাকিবেন। পাত্রকে
অন্য কেহ স্পর্শ না করে। স্পর্শ করিলে ক্ৰস্{eross) বা
ব্যভিচার মেসমেরি দোষ ঘটিবে। তখন আরও অনিষ্টের
কারণ হইবে ।
যদি ক্ৰিয়াসাধক নিদ্রিতের ঘুম ভাঙ্গাইবার প্রণালী না
জানেন, তবে তাহাকে নিদ্রিতই রাখিবেন, আপনাপনি
নিদ্রাভঙ্গ হইবে, তাহাতে কোন ক্ষতি হইবে না। একটু
বিলম্বে আপনি জাগিবে। কদাচ তাহাকে নাড়াচাড়া
করিবেন না, স্পর্শ করিবেন, না। কোন রকমে তাহাকে
বিরক্ত করিবেন না। এই নিদ্রা কখনই এক দুই বা তিন
ঘণ্টার বেশী থাকে না। তাহাকে নাড়াচাড়া না করাই
উৎকৃষ্ট উপায় । তাহাতে কোন ক্ষতি বা কষ্ট হয় না।
সুনিদ্রারপর আপনাপনি নিদ্রাভঙ্গের ন্যায় হয়। নাড়ী ও
শ্বাস প্রশ্বাস ঠিক থাকে। তবে নাড়াচাড়া, বিরক্ত,
খোঁচাখুচি, করিলেই বিপদ! নানা গোলমাল হইবে ।
মেস মেরিজ বা শক্তি চালনা। বহুদশী, স্থিরচিত্ত, বিজ্ঞ ব্যক্তির হাতে কোন ভয় নাই বা বিপদের আশঙ্কা নাই । হাত পা ভাঙ্গা ইত্যাদি আঘাতিত ব্যক্তিকে সহজে অায়ত্তাধীনে আনা যায় না, কিন্তু যাহারা কাৰ্যদক্ষ তাঁহারা বেশ পারেন এবং তাঁহারা বহু মঙ্গল সাধন করিতে পারেন। এই ব্যাপার অল্প বয়স হইতে শিক্ষা বা অভ্যাস করিতে আরম্ভ করিলে অতি সহজ হয়। তৎকালে ব্রহ্ম- চর্য্য অবলম্বনে সহজে সুসাধ্য হয়। ৬। নিদ্রিতাবস্থায় প্রায় সকল অবস্থাতেই ক্রিয়া পাত্র ক্রিয়া সাধকের আয়ত্তাধীনে থাকে। ক্রিয়া সাধক তাহার নিদ্রার সময় নির্ণয় করিয়া দিলে ঠিক ততক্ষণ সে নিদ্রিত থাকে ; তাহার এক মিনিট তফাৎ হয় না। জাগিয়া উঠার পর তাহার শরীর পূর্বের মত বেশ সুস্থ থাকে। ক্রিয়া সাধকের ইচ্ছাধীন থাকিলে কিম্বা ক্রিয়া সাধকের ক্ষমতা থাকিলে, অনেক সময় বিশেষ উপকার হইয়া থাকে। অস্ত্র করিবার প্রয়ােজন হইলে বা কোন স্থানে দারুণ বেদনা ভাল করিতে হইলে বিশেষ নির্দিষ্ট সময় নিদ্রিত রাখিবার দরকার হয়। অনেক সময় বিপদ জনক ক্লোরােফরুমের দরকার হয় না, অর্থব্যয়ও হয় না।
চতুর্থ পরিচ্ছেদ।
যাতনা নিবারণের জন্য মফিয়া আদি বিষ খাওয়াতেও
হয় না।
ক্রিয়া সাধক নিদ্রাভঙ্গে সময় নির্দেশ করিয়া দিলে
নির্দিষ্ট সময়ে আপনাপনি নিদ্রাভঙ্গ হয়, তখন কোন ক্লেশ
বা যাতনা হয় না। ক্রিয়া পাত্রকে অনেক কথা কইলে
কখন কখন সে ক্লান্ত হওয়ায় জাগিতে চাহে ও বলে ।
তখন তাহাকে জাগাইয়া দেওয়াই ভাল
দেওয়াই ভাল ; নতুবা
পরিশ্রম জন্য মনের ঘূৰ্ত্তির বিঘ্ন ঘটে। এস্থলে একটী
কেস বলি-
৭। হুগলী জেলা পাটনা নিবাসী....
অতি ভীষণ রােগে আক্রাপ্ত প্রায় অজ্ঞান অবস্থায় দারুণ
যাতনা ভােগ হইতেছেন, জীবন আর বেশীক্ষণ নহে;
এমন অবস্থায় আমি আহুত হইয়া বিপন্ন হইলাম।
মেসমেরাইজ, না করিলে স্ত্রী হত্যা হয় , অন্যথায়
অন্যায় হয় ; কারণ স্ত্রীলােকের মধ্যে মাতা, ভগনি,
স্ত্রী ও কন্যা, ব্যতিত অন্যকে মেমেরইজ করা
নিষেধ। কি করি অগত্যা মেমেরাইজ, করিতেই হইল।
তৎকালে বলিয়া দিলাম, আমি তাঁহার পিতা। পরে
মেমরি নিদ্রায় নিদ্রিত করিয়া রাত্রি ১০টা হইতে
১টা ১০ মিনিট পর্যন্ত সুনিদ্রায় নিদ্রিত থাকিতে বলিয়া
বাবুর স্ত্রী
৬৮
মেসূমেরিজ বা শক্তি চালনা।
দিয়া পার্শ্বের ঘরে ( নিকটে ) রহিলাম। ঠিক সময়ে
নিদ্রাভঙ্গ হইয়াই বাবা বলিয়া আমার খোঁজ করিয়াছিলেন।
তিনি সম্পূর্ণ আরােগ্য হইলেন। আর কখন তঁাহার সে
রােগ হয় নাই। যতদিন তিনি জীবিত ছিলেন, আমাকে
পিতৃতুল্য ভক্তি করিতেন। বাবার সঙ্গে স্ত্রীলােকে যেমন
ভাবে কথা বার্তা কহে, সেই ভাবেই কথা কহিতেন ;
কোন প্রকারে কুণ্ঠিত হইতেন না।
৮। ক্রিয়া সাধক নিদ্রার সময় নির্দেশ করিয়া না
দিলে দু তিন ঘণ্টার বেশী নিদ্রিত থাকে না। আর একটা
আশ্চর্য ব্যাপার দেখা যায় ; তাহার ভবিষ্যৎ দর্শনশক্তি
জন্মে। যদি নিদ্রার সময় নির্দেশ না করিয়া দিয়া তাহাকে
জিজ্ঞাসা করা যায়, “তুমি কতক্ষণ ঘুমাইবে” তবে একটা
সময় নির্দেশ করিয়া বলে এবং যখনই যতবার জিজ্ঞাসা
করিবে; তাহার নিদ্রার সময়ের কত বাকী ঠিক করিয়া
বলিবে। সময়ের কত বাকী আছে হিসাব করিয়া মিনিট
পর্যন্ত বলিবে। একটুও হিসাবে
বা গণনায় ভুল
হইবে না।
এই অবস্থায় সে ভাবি বিষয় অনেক বলিঃত পারে।
যেন তাহার ভাবী দৃষ্টির স্ফুৰ্ত্তি দেখা যায়।
ফুর্তি দেখা যায়। তাহার শিজের
শরীরের ভাবী স্বাস্থ্য সম্বন্ধে কেহ কেহ বলিতেপারে।
চতুর্থ পরিচ্ছেদ।
পূৰ্বে বলা হইয়াছে, জাগ্রত হওয়ার পর তৎকালীন
ঘটনা কিছুই মনে থাকে না, কিন্তু কাহারও কাহারও
কতকাংশ, কাহারও সমস্তই মনে থাকে। যাহাদের কিছুই
মনে থাকে না; ক্রিয়া সাধকের আদেশানুসারে মনে
রাখিতে পারে। ক্রিয়া সাধক নিদ্রিতাবস্থায় আদেশ
করিলে, জাগিয়া সমস্ত বা আংশিক মনে রাখিতে পারে।
আবার ক্রিয়া সাধকের ইচ্ছায় নিদ্রিতাবস্থার কার্যকলাপ
সমস্ত কিম্বা আংশিক ভুলাইয়া দিতে পারেন। সময় সময়
ইহা অত্যন্ত দরকার হয়।
পূৰ্বে যতবার ক্রিয়াপাত্র নিদ্রিত হইয়াছে ; পর পত্ন
নিদ্রাকালীন পূর্ব পূৰ্ব বারের ঘটনাবলির সহিত যেন
সম্বন্ধ থাকে। তাহার নৈসর্গিক স্মৃতিশক্তি অনুসারে
পূর্ববারের ঘটনাবলি মনে করিতে পারে।
নিদ্রিতাবস্থাতে যে সকল ঘটনা ঘটিয়াছিল, তাহা
জাগ্রতাবস্থায় ভুলিয়া যায়, কিন্তু আবার নিদ্রিতাবস্থায়
সেই সেই পূৰ্ব নিদ্রিতাবস্থার ঘটনা সকল মনে করিতে
পারে। এই দুটী বিভক্ত ও দ্বিরূপ সংজ্ঞার ফল। তবে
ক্রিয়া সাধকের ইচ্ছাশক্তির দ্বারা উভয় অবস্থাতেই
তৎকালের জন্য স্মরণশক্তি লােপ হইতে পারে। উচ্চ
সাধক জ্ঞানাবস্থাতেও ক্রিয়া সাধকের ইচ্ছাশক্তির দ্বারা
মেসূমেরিজম্ বা শক্তি চালনা।
ক্রিয়াপত্রের স্মৃতিশক্তিকে সম্পূর্ণরূপে তাহার ইচ্ছার
বশীভূত করিতে পারেন ।
৯। ক্রিয়া পাত্রের নিদ্রিতাবস্থায় ক্রিয়া সাধকের ইচ্ছা
শক্তির দ্বারা স্মরণ রাখিবার উপযুক্ত ঘটনাও তিনি ভুলাইয়া
দিতে পারেন। ক্রিয়াপত্রের পূর্ব পূৰ্ব নিদ্রাকালীন
ঘটনাসকল তো ভুলাইয়া দিতে পারেনই, তাছাড়া তাহাকে
কখনও মেমােরাইজ করা হইয়াছে, তাহাও ভুলাইয়া
দেওয়া যায়। কখন কখন সে নিজেই নিজের নাম ভুলিয়া
যায়। নাম ভূলিয়া না গেলেও তাহার নাম ক্রিয়া সাধকের
ইচ্ছাশক্তি ও আদেশানুসারে ভুলিয়া যায়। আবারও
ক্রিয়া সাধকের ইচ্ছাশক্তি দ্বারা, (তিনি ইচ্ছা করিলে) ক্রিয়া
পাত্রের কোন অঙ্গ অচল করিয়া উঠিবার শক্তি লােপ বা
বাক্শক্তি লােপ করিতে পাবেন, আবার তাহা আরোগ্য
করিতেও পারেন। এক্ষণে বুঝা গেল যে, ক্রিয়া পাত্র
ক্রিয়া সাধকের সম্পূর্ণ ইচ্ছার অধীন। ফলতঃ ক্রিয়াপত্রের
সমস্ত ঐচ্ছিক পেশীগুলিও ক্রিয়া সাধকের
ক্রিয়া সাধকের ইচ্ছাধীনে
আসিয়া পড়ে।
১০। ক্রিয়া সাধক মনে করিলে পাত্রকে তাহার
প্রত্যেক অঙ্গ ভঙ্গি ও প্রত্যেক কথার নকল করাইতে
পারেন। সাধক ক্রিয়া পাত্রের অজ্ঞাত ভাষায় কথা
চতুর্থ পরিচ্ছেদ।
৭১
কহিলে পাত্রও সেই সেই সুরে ও সেই ভাষায় কথা
অবিকল কহিতে পারে। উচ্চারণের কিছুমাত্র ইতর বিশেষ
হইবে না। বিশেষ সতর্কতার সহিত মনােযােগ দিয়া
শুনিলেও কিছুমাত্র প্রভেদ বুঝিতে পারিবে না। সাধকের
অঙ্গ ভঙ্গি হাসি ঠিক ঠিক অনুকরণ করিবে। সাধক যেখানে
থাকিয়াই করুন; সেও তাহাই করিবে। তৎকালীন
পাত্রের চক্ষু মুদ্রিতই থাকিবে। ক্রিয়া পাত্র স্বাভাবিক
অবস্থায় কখনই এরূপ অনুকরণ করিতে পারে না।
১১। সাধক ভিন্ন নিদ্রিত ব্যক্তির সহিত যদি অন্য
কাহারও কথা কহিবার বা কাৰ্য্য করিবার দরকার হয়,
তবে সাধক তাহার সহিত সম্বন্ধ স্থাপন করিয়া দিতে
পারেন। তৃতীয় ব্যক্তির হস্ত স্পর্শ করাইয়া দিলেই উদ্দেশ্য
সাধিত হয়। কখন কখন নিদ্রিত ব্যক্তিকে অন্যের সহিত
আলাপ করিবার জন্য ক্রিয়া-সাধককে বলিয়া দিতে হয়।
তখন ক্রিয়া সাধকের যঙ্গে তার যে সম্বন্ধ স্থাপিত ছিল,
তৃতীয় ব্যক্তির সঙ্গেও তাহাই হয়। আবার এক মজার
কথা-কখন কখন এমনও ঘটে যে, যাহার সহিত সম্বন্ধ
বদ্ধ করিয়া দেওয়া হইয়াছে, তিনি আবার ক্রিয়া সাধকের
সঙ্গে সম্বন্ধ বদ্ধ করিয়া না দিলে ক্রিয়া পাত্র তার ক্রিয়া-
সাধকের সঙ্গে আলাপ করিতে পারে না। যখন ক্রিয়া
৭২
মেসূমেরিজম, বা শক্তি চালনা।
পাত্রের সঙ্গে অন্য ব্যক্তির সম্বন্ধ স্থাপন করিয়া দেওয়া যায়,
তখন প্রায়ই ক্রিয়াপাত্র চকিয়া উঠে, কিন্তু নিদ্রাভঙ্গ হয়
না, এবং তাহার পরই নিদ্রিত ব্যক্তির সঙ্গে তৃতীয় ব্যক্তির
সম্বন্ধ বদ্ধ হয়। আবার এইরূপে সাধকের আয়ত্তাধীনে
আনিতে হয়।
১২। সাধক মনে করিলে নিদ্রিত ব্যক্তির মনের
প্রত্যেক ভাবগতি প্রকাশ করাইতে পারেন। ইহার
অনেক প্রকার উপায় আছে। মস্তকের উপর হাত দিলেই
তাহার ক্রিানুযায়ী কাৰ্যগুলি প্রস্ফুটিত হইতে থাকে।
ইহাকে “ক্ষণো-মেমেরিজম” কহে । আমাদের
মস্তিষ্কে অনেকগুলি লোব (অংশ) আছে ; সেই সকল
ললাবের প্রত্যেকের ক্রিয়া পৃথক পৃথক। যাহার যে
লােবটী যত বড়, তাহার সেই প্রবৃত্তি তত বেশী। আবার
যাহার যে লোব যত ছোট, তাহার সেই প্রবৃত্ত তত অল্প
বা কম। মনের প্রত্যেক বৃত্তিগুলির “লােব”গুলিও পৃথক
পৃথক। সেই “লােব গুলি দেখিয়া মানবের প্রত্যেকের
প্রবৃত্তি বলা যায়। তাহার স্বভাব বলা যায়। ইহাকে
ফ্রেণােলজি (pirenlogy) কহে। ইহার সহিত
সংযােগদ্বারা যে মেমেরি ক্রিয়া উৎপন্ন করা যায় ।
তাহাকে ফ্রেণাে-মেসূমেরিক বিষয় ককে।
পঞ্চম পরিচ্ছেদ।
৭৩
১৩। সাধক ইচ্ছা করিলে পাত্রকে, উদ্ধত, বিনীত,
সুখী, দুঃখী, বিরক্ত, সন্তুষ্ট, যা ইচ্ছা করতে পারেন। যে
কোন কাজ করাইতে পারেন। ব্যায় হউক, অন্যায় হউক,
যাহা ইচ্ছা করাইতে পারেন।
পঞ্চম পরিচ্ছেদ।
১। ক্রিয়পাত্র ঠিক নিজের স্বভাবানুযায়ী কাৰ্য্য
করে। কখনই মিথ্যা কথা বলে না। যা জিজ্ঞাসা করা
যায়, সব সত্য কথা বলে এবং যাহা তাহার স্থির নিশ্চয়
জানা নাই, কিম্বা যাহাতে সন্দেহ আছে, তাহা সে
বলিতে চাহে না। আমি জানি না, বুঝিতে পারিতেছিনা,
দেখিতে পাইতেছি না; তা কেমন করিয়া বলিব, বলে।
আর যাহা জানে, তাহা ঠিক ঠাকু বলে।
নিদ্রিক ব্যক্তির নিকট গান বাজনা করিলে সেই গানের
ভাবানুযায়ী ভাব প্রকাশ করে। ভক্তি রসাত্মক গান
কমিলে ভক্তিতে বিভাের হইয়া যায় ও প্রার্থনা করে।
খেমটা বাজাইলে নাচিতে থাকে। এই জন্য তন্ত্রশাস্ত্রে
৭৪
মেমেরিজ বা শক্তি চালনা।
গীত, বাদ্য ও সুর আলােচনা এবং ধূপ, ধূনা, দীপাদি সুগন্ধ
দ্রব্যের ব্যবহার আছে। ঈশ্বরে তন্ময় হইবার সময় এ
সকলের সাহায্য পাওয়া যায়।
ক্রিয়া সাধকের, প্রথম ক্রিয়াপাত্রকে আয়ত্তাধীনে
আনিতে যতটা চেষ্টা, যত্ন, একাগ্রতা ও সময়ের দরকার
হয় ; দুচারিবার করার পর সে পাত্র তাহার অতি সহজ
সাধ্য হয়। এমন কি যাহাকে প্রথমে নিদ্রিতাবস্থায়
আনিতে একঘণ্টা লাগিয়াছে ; পরে দু'এক মিনিটেই সেই
কাৰ্য্য সাধিত হয়। অনেক সময় প্রথম প্রথম নিস্ফল হইতে
হয়, কিন্তু তজ্জন্য ভগগাদ্যম হওয়া উচিত নয়।
যে সকল ক্রিয়া-পাত্র অতি ধীরে ধীরে অভিভূত হয়,
তারা অতি সুপাত্র। তাহারা অতি উচ্চ অভিভাব্য
আবার দেখা যায়, উভয়ের মধ্যে প্রকৃতিগত অন্তনিহিত
বৈষম্য থাকিলে, একজন অন্যকে সহজে মেসূমেরাইজ,
করিতে পাবে। যেমন নীরস শুষ্ক প্রকৃতিগত ব্যক্তি, সরল
কোমল প্রকৃতি ব্যক্তিকে সহজে আয়ত্ত করিতে পারে।
বিপুল মস্তিষ্ক ও উদ্যমশীল ক্ৰিয়াসাধক উৎকৃষ্ট ও
অনুকুল লক্ষণযুক্ত। আর ক্রিয়া পাত্র যদি তেজস্বী ও
উদ্যমশীল বুদ্ধি সম্পন্ন হয় ; তাহা হইলে তাহারুমন সদাই
পঞ্চম পরিচ্ছেদ।
৭৫
ক্রিয়াশীল থাকায় মেমেরইজ হওয়ার প্রতিকুলে না
হইলেও সহজে মেমেরাইজ, হইতে চাহে না, কারণ
তাহার মস্তিষ্ক ও বুদ্ধি নানা চিন্তায় চিন্তিত থাকায় মেস্
মেরাইজ, হইবার একাগ্রতা হওয়ার প্রতি বাধা দেয় বা বাধা
পায়। মেমেরাইজ, হইবার জন্য একাগ্রতা থাকিলে ক্রিয়া
সাধকের সহায়তা হয়। যাহার মেসমেরাই, হইবার ইচ্ছা
যতটা বেশী থাকে, সে তত শীঘ্ন নিদ্রিত হইয়া থাকে।
যাহার যত কম তাহার তত বিলম্ব হয়। প্রত্যেক ব্যক্তি
প্রত্যেককে মেমেরাইজ, করিবার ক্ষমতা বিশিষ্ট। তবে
কম আর বেশী, এই মাত্র প্রভেদ।
২। বিনা চেষ্টাতেও আমরা পরস্পর পরস্পরকে
মেসূমেরাইজ, করিয়া থাকি ও হইয়া থাকি। পূর্বে বলা
হইয়াছে যে, আমাদের শরীর তেজঃ সৰ্বাঙ্গ দিয়া
বিশেষতঃ অঙ্গুলি ও ওষ্ঠ দিয়া বেশী ও নিয়ত বাহির
হইতেছে, তাহা নিকটস্থ ব্যক্তির শরীরে পড়িতেছে এবং
পরস্পর মেয়েরাইজ, হইতেছে, হইতেছি ও করিতেছি।
আমাদের সেই তেজঃ দ্বারা মনের চিন্তা সকল চতুর্দিকে
ছড়াইয়া পড়ে।
• আমাদের প্রত্যেক চিন্তার স্পন্দন (ভাইব্রেশন,
vibretien) নিকটস্থ প্রত্যেক ব্যক্তির উপর কাৰ্যকারী
মেস মেরিজ বা শক্তি চালনা। হইয়া থাকে । চিন্তার রূপ আছে, বর্ণ আছে এবং অন্যের উপর পড়িয়া তাহার উপর কাৰ্য্য করিবার শক্তি আছে। প্রত্যেক চিন্তা আপন আপন স্বজাতীয় প্রকৃতি অনুযায়ী পদার্থ লইয়া নিজের প্রকৃতি গঠন করে। নীচ চিন্তাসকল, নীচ ও ( ভুঃ ও ভুবঃ লোক) নিম্নস্তর হইতে নীচ উপাদান লইয়া গঠিত হয়। আর উচ্চ চিন্তা সকল তৎ উৰ্দ্ধ স্বলোক আদি উচ্চস্তর হইতে সূক্ষ্ম উপ- দান লইয়া নিজের গঠন উৎপন্ন করে বা গঠিত হয়। আমাদের মত হীন লােক সকল, নীচ লোকের সংসবে থাকিলে অজ্ঞাতসাবে, তাহাদের নীচ প্রবৃত্তির বা প্রকৃতির অধীন হইয়া, ক্রমে অজ্ঞাতসারে নীচ কাৰ্যে প্রবৃত্তি আসিয়া পড়ে। কাজেই তখন নীচ ও কুকাৰ্য্য করিতে থাকি। তাই নীচের সংসর্গ, একত্র শয়ন, একত্র বসন ও আহারের নিষেধ আছে। সেই সব চিন্তা অন্য ব্যক্তির উপর পতিত হইয়া স্বজাতীয় চিন্তার বল বৃদ্ধি করিতে পারে। নীচ লােকের নীচ চিন্তা সকল অন্যের উপর পড়িয়া অজ্ঞাতসারে নীচাশয় করিয়া দিতে পারে। তদ্রুপ উচ্চ ব্যক্তির উচ্চ চিন্তার স্পন্দনে উচ্চ ও সৎ ব্যক্তির উচ্চ ও সৎ চিন্তার বল বৃদ্ধি পঞ্চম পরিচ্ছেদ। ৭৭ ৩। কিন্তু উচ্চ ব্যক্তির উচ্চ চিন্তা থাকায়, নীচ ব্যক্তির নীচ চিন্তার স্পন্দন, তাহার উচ্চ চিন্তার স্পন্দনে পড়িয়া স্থান পায় না বা তাহাকে ভাইব্রেট বা স্পন্দিত করিতে পারে না, সুতরাং তাহার কোন ক্ষতি করতে পারে না। সেই সকল খুব উচ্চ ব্যক্তির হস্তস্থিত ধূলা বা ভস্মও ঔষধের কাৰ্য্য করে। যখন ইচ্ছা শক্তিযুক্ত হস্তস্থিত তেজঃ ভন্ম- মধ্যে প্রবিষ্ট হইয়া রােগ আরােগ্য করিতে পারে, তখন তােমার বিজ্ঞানসম্মত রােগ আরােগ্যকারী ঔষধে, সেই শক্তি নিয়ােজিত করিতে পারিলে সেই ঔষধ তীব্র ক্রিয়া- শীল বা অমৃততুল্য না হইবে কেন? আবার ঔষধ যখন স্নায়ুমণ্ডল দিয়া বাহিত হইয়া জীবনীশক্তি বা রােগ আরােগ্যকারিণী শক্তির সাহায্যে রােগ আরােগ্য করে, তখন রোগীতে স্ম্যাগনেটী বাহিত করিলে স্নায়ুমণ্ডল বিশৃঙ্খল ভাবাপন্ন হওয়ায় ঔষধ তাহাতে কাজ করিতে অক্ষম না হইবে কেন? এক্ষণে আমি যখন মূল বিষয় ছাড়িয়া একটু অন্য পথে এসেছি। তখন আরও কিছু বলিয়া আবার মূল বিষয়ের আলোচনা করিব। মােগ আনােগ্য করিতে নিদ্রা আনয়ন পর্যন্ত প্রায় প্রয়ােজন হয় না। তবে সময় সময় বা অস্ত্র চিকিৎসার জন্য হইতে পারে। পুৰ্বে বলা হইয়াছে, নিদ্রা আনয়নের
'৭৮
মেসমেরিজম্ বা শক্তি চালনা।
পূৰ্ব্বেও অনেক আশ্চর্য ব্যাপার দেখিতে পাওয়া যায় কিন্তু
দেখাইতে পারা যায়। ধৈৰ্য্য, অধ্যবসায়, একাগ্রতা, দৃঢ়
সংকল্প এবং তাহাতে আনন্দ, সরলতা ও মঙ্গলাকাঙ্ক্ষী
থাকা ক্রিয়া সাধকের প্রবল সহায় ও মস্ত গুণ।
যদি ক্ৰিয়াসাধকের এই বিষয়ে কোন স্বার্থ থাকে, তবে
কাৰ্য্য সুশৃঙ্খলে হয় না বা তাহার নিজের বিপদাশঙ্কাও
অসম্ভব নহে। মেমেরি ক্রিয়ায় অনাসক্ত ভাব হওয়া
অতীব দরকার, অর্থাৎ স্বার্থত্যাগী হইয়া পরােপকার ব্রতে
জীবন উৎসর্গ করিতে হইবে। এইজন্য এ বিষয় অতি
গােপনীয়। এমন কি নিজের একটু বাহাদুরী দেখানর
ইচ্ছা পৰ্যন্ত না থাকে। কোন প্রকার স্বার্থের বশীভূত
হইয়া এ কার্যে নিযুক্ত বা রত হইবেন না।
৪। এস্থলে একটা প্রকৃত ঘটনা প্রমাণস্বরূপ বলিতে
বাধ্য হইলাম। কলিকাতা বৃন্দাবন বসাকের গলিতে একজন
বড় দরের ডাক্তার ছিলেন। তিনি এলােপ্যাথ, হইলেও
হােমিওপ্যাথ, হইয়াছিলেন। তিনি প্রায়ই ঔষধ দিতেন
। রােগীতে নিজের শরীরস্থ তেজঃ (পাশ) জিয়া রােগ
আরোগ্য করিতেন, তাঁহার সুখ্যাতিতে হৈ হৈ রৈ রৈঃ
পড়িয়া গেল। ডাক্তার বাবুর হাতে গেলেই রোগ মুক্ত।
আশ্চর্য ব্যাপার ও আনন্দের বিষয়ও বটে, কিন্তু ইহার
পঞ্চম পরিচ্ছেদ।
৭৯
ভিতর তাহার স্বার্থ ছিল, আট টাকা ভিজিট লইতেন।
হঠাৎ একদিন হাঁটুতে খট করে লাগলো। ক্রমে বেদনা
অসহ্য। জ্বর হলে। চারি মাস শয্যাগত। একদিন বেলা
৯টার সময় তিন জন ভদ্রলোক আসিয়া তাহার খোঁজ করি-
লেন এবং কিছুক্ষণ পাশ দিয়া চলিয়া গেলেন। হাঁটু ভাল
হইল, কিন্তু চারি মাস পা গুটান থাকায় এ্যাঙ্কিলােসিস্
হইয়া চির দিনের জন্য একটু খোড়া হইলেন। তারপর
এ প্রণালী ছাড়িয়া হােমিওপ্যাথ হইলেন। তারপর হইতে
যদিও কোন রােগীতে পাশ দিতেন; নিঃস্বার্থভাবে।
তাঁহার রােগী আরােগ্যের প্রতি তাকাইয়া আশ্চৰ্য্য ও
স্তম্ভিত হইতাম।
৫। আমি যেন ঠিক পথ ছাড়িয়া বিপথে যাইতেছি,
মনে হয়; কিন্তু সংস্রব একেবারে তফাৎ হয় নাই।
এইরূপ অসংখ্য বা সমস্ত লােকের একই চিন্তার দ্বারা
দেশের স্থূল সূক্ষ্ম সকল পদার্থের উপর পতিত হইয়া কাল
পৰ্যন্ত পরিবর্তিত হইতে পারে। ইহাতে রাজধর্মের দরু-
৬। সকল ধর্মের শ্রেষ্ঠ রাজধৰ্ম। রাজধৰ্ম্ম দ্বারা
শাসিত হইয়া সকল ধর্ম অক্ষুন্ন থাকে, সুতরাং রাজা ভক্তির
পাত্র। রাজা ঈশ্বর সদৃশ।
৮০ মেমেরিজম্ বা শক্তি চালনা। ভগবান গীতার ১০ম অধ্যায়ের ২৭ শ্লোকে নিজমুখে বলিয়াছেন- নণাঞ্চ নরধিপম্ । মানবের মধ্যে রাজা অমি। আবার ভাগবতের ১১শ স্কন্ধের ১৬ অধ্যায়ে ১৫ শ্লোকে বলিয়াছেন- মনুষ্যাণাঞ্চ ভুপতি। সুতরাং রাজাই ভক্তির পত্র ও পূজ্য। কাজেই রাজ দ্রোহি, ঈশ্বরদ্রোহি। রাজাই যখন ঈশ্বরের তুল্য, তিনিই সকলের ধৰ্ম্ম রক্ষা করিবেন। মনে করুন--রাজা যদি সত্যনিষ্ট, ব্ৰহ্মজ্ঞান সম্পন্ন,সনা- তন ধৰ্ম্মাক্রান্ত হন ; সত্য, সরলতা, দয়া, স্নেহ, দণ্ডধারী ইত্যাদি সৎগুণ সম্পন্ন, সৎগুণে অলঙ্কৃত হন, তবে প্রজাও সৎগুণে বিভূষিত হইবে। হিংসা, দ্বেষ, পরশ্রীকাতর, পরধন হরণ, প্রতারণা, মিথ্যা, ইত্যাদি কোন কুকর্মের চিন্তা মাত্র, কাহারও না থাকে ; তথে. রাজাও সুস্থির, নিৰ্বিল্প হইতে পারেন, আর দুষ্ট লোক না থাকায় পুলিশের দরকার হয় না, বিচারকের দরকার হয় না। বিচারের দরকার নাই, জেলখানারও দরকার নাই। সকলেই সত্ৰুদ্ধি সম্পন্ন। দ্য নাই, ভয় নাই, সকলেই সকলের মঙ্গলাকাঙ্ক্ষী, পঞ্চম পরিচ্ছেদ । সুতরাং এই যে সময় তাহাকে কি বলিব ? সত্য- যুগ। আবার যখন রাজা ও প্রজার হৃদয়ে চতুর্থাংশ অধৰ্ম এলাে, তখন ত্রেতাযুগ। কাজেই অল্পস্বল্প বিচারের দরকার হলো, বিচারকের দরকার হলো, কিন্তু বাদী ও প্রতিবাদী সত্যবাদী, সুতরাং বিচারকার্য দুরূহ নয় বা অতি সহজ। আবার যখন রাজা প্রজার হৃদয়ে অর্ধেক পাপ এলে, তখন—সুতরাং দ্বাপর। তখন বিচারকার্য দুরূহ, কঠিন, জটিল হলাে। বিচারকগণ সুবিচারের জন্য হাবুডুবু খাইতে লাগিলেন। সময় সময় অবিচারও দুএকটা হতে লাগলো। তারপর যখন লােকের ও রাজার মনে তিনভাগ পাপ ও একভাগ মাত্র ক্ষীণ ধর্মের সঞ্চার হলাে, তখনই—কলি- কাল। তখন জেলায় জেলায়, গ্রামে গ্রামে, পাড়ায় পাড়ায় বিচারক ও পুলিশ ইত্যাদিতেও অবিচার। সুবিচা- রের অশামাত্র নাই। যার যত লােকবল, অর্থবল, বিচার তাহারই, তারই জয়। জেলখানায় তােক পরিপূর্ণ, স্থানাভাব সুতরাং মজা পৰ্যন্ত ব্যতিব্যস্ত ; সুতরাং রাজা ও প্রজার মনঃবৃত্তির উপর কাল নির্ভর করে। লােকের মনঃবৃত্তির ইতর বিশেষ কাল মহাত্ম উৎপন্ন হয় ; না বলিব কেন? ৬
মেসূমেরিজম্ বা শক্তি চালনা।
মানবের মনঃবৃত্তির স্পন্দন দ্বারা স্কুল, সূক্ষ্ম এবং সেই স্কুলের
( ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুং ও আকাশ) তন্মাত্র সকল
( শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস, ও গন্ধ ) সমস্ত তেজস্ততঃ পর্যন্ত
পরিবর্তিত হইয়া তাহা প্রস্ফুটিত হইয়া উঠে। ইহা হাড়ে
হাড়ে সত্য।
যতপ্রকার বস্তু দ্বারা ব্রহ্মাণ্ড গঠিত হইয়াছে, এক
মানবে তাহার সমস্ত দ্রব্যের কিছু না কিছু আছে ; তাই
মানব এত উচ্চ। মানব কত উচ্চ হইতে পারে, তাহা
আমার সামান্য বুদ্ধিতে আসে না,তাই মানবমণ্ডলীকে
নমস্কার করি।
সেই মানব হইতে কি কাৰ্য্য সাধিত না হইতে পারে ?
যদি আমরা যে কোন বিষয়ের একটা চিন্তা লইয়া তীব্র
আন্দোলনের শেষ সীমায় অর্থাৎ একাগ্রতায় উপস্থিত
হইতে পারি ; তবে তৎকালে, ঠিক সেই সময়ে দূর দূরান্তরে
কোন ব্যক্তি সেই চিন্তার অনুরূগ, ঠিক সেইরূপ চিন্তাস্রোত
উৎপন্ন করিয়া যদি তাহাতে ভাসমান হয় ; তবে ঐ পরস্পর
চিন্তিত ব্যক্তির চিন্তা পরস্পরের সাহায্য করে। মনে করুন,
ভারতে বসিয়া কোন ব্যক্তি কোন চিন্তার একাগ্রতা উৎপন্ন
করিয়াছেন, বা করিতে দৃঢ়তর
চেষ্টা করিতেছেন,
ঠিক সেই
সময়ে একজন বিলাতে বসিয়া সেই চিন্তায় চিন্তিত হইয়া
পঞ্চম পরিচ্ছেদ।
;
৩
দৃঢ়তর যত্ন করিতেছেন; তখন সেই চিন্তাস্রোত তেজস্ততঃ
( ইথার ) দ্বারা চালিত হইয়া উভয়ের মনে প্রতিফলিত
হইয়া পরস্পরের সাহায্য করিয়া থাকে অর্থাৎ মনের
ভাৰ উভয়ের মনে উদয় বা প্রতিফলিত হয়।
ঐ তেজস্ততঃ সর্বত্র সমভাবে ব্যাপ্ত থাকিতে পারে না।
পৃথিবীর নিম্নস্তরে ততটা নিৰ্ম্মল নহে, যতটা নিৰ্ম্মল উপরে।
পৃথিবীতে মানবের নানা প্রকার চিন্তার স্রোত দ্বারা কলুষিত
বা বর্ণশঙ্করত। উপস্থিত হওয়ায় সেই উভয় চিন্তিত ব্যক্তির
সঙ্গে সহজে, শীঘ্র বা সরল ভাবে সম্বন্ধ স্থাপিত হইতে পায়
না, একটু বিলম্ব হয়, কিন্তু উহারা যদি কিছু উচ্চ স্তরে
বসেন বা থাকেন, তবে অতি শীঘ্র, সহজে বা সরল ভাবে
সম্বন্ধ স্থাপন হয়। সহজে ও শীঘ্র পরস্পরের নিকট হইতে
পরস্পরের চিন্তার স্পন্দনে স্পন্দিত হইতে থাকেন।
কোন কোন সভার সভ্যদের এমন নিয়ম আছে যে,
একই সময়ে সকলে যিনি যেখানে থাকুন। একই
বিষয় পাঠ করিবেন, কারণ পরস্পর পরস্পরের ভাব সংগ্রহ
হইবে, মনের ভাব প্রতিফলিত হওয়ায় বােধের সুবিধা
হইবে। •
পাঠক মহাশয় সকলেই জ্ঞাত আছেন ; দূর দুরান্তরের
কথা বা গান বাজনা শুনিবার জন্য আজকাল রেডিয়ম যন্ত্র
৮৪
মেস মেরিজম্ বা শক্তি চালনা।
বাহির হইয়াছে, তাহাতে শব্দের ভাইব্রেশন লইবার জন্য
একটা তার কিছু উর্দ্ধে রাখিতে হয়।
রেডিয়ম একটা পাড়া গ্রামে খিয়া ঘবে বসিয়া
কলিকাতার থিয়েটার শোন। ইহাও ঐ (ইথর)
তেজস্ত দ্বারা চালিত হয়।
৮। এক্ষণে এসাে, আমরা সকলে মিলিয়া ঐ অলৌ-
কিক ম্যাগনেটী শক্তিকে এবং যিনি দিয়াছেন, তাহাকে
ভক্তিভাবে প্রণাম করি।
এই শক্তিকে আমরা মনের একাগ্রতা সহকারে বিপন্ন
পীড়িতের উপর পরিচালিত করিয়া তাহাকে আরোগ্য
করিয়া আনন্দিত হইতে পারি। আবার ইহার উপর
সুনির্বাচিত ঔষধের প্রক্রিয়াকে ঐ শত্তি দানে আরও সুগম
করিতে পারি।
যদি গৃহস্থের অসদ্ব্যবহারে বা নিজের স্বার্থের হানিতে
রােগীর উপর বিরক্ত হই, তাহা হইলে আর সে রােগী ভাল
করা যাইবে না। ইহা অনেকেই জাত আছেন।
যদি আমাদের ইচ্ছাশক্তি দ্বারা রােগী স্ হইতে
থাকে। তবে তাহার সেই জীবনীশক্তি এবং স্নায়ুমণ্ডল
বিশৃঙ্খল ভাবাপন্ন হওয়ায় সুনিৰ্বাচিত ঔষধেও শৃঙ্খলা সম্পা-
দন করিতে না পারায় বিপথে পতিত হইয়া উপযুক্ত কাৰ্যে
যষ্ঠ পরিচ্ছেদ। ৮৫ অক্ষম হইবে। সেরূপ স্থলে তঁাহার অপেক্ষা তীব্র ইচ্ছা- শক্তি চালক (পজেটীভ) চিকিৎসক ভাল করিতে পারেন, অন্যের ক্ষমতায় কুলাইবে না। ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ। যদি কাহারও সৰ্ব্বদা ও সর্বথা দৃঢ়তার সহিত আন্তরিক মঙ্গলচিন্তা করা যায় এবং তাকাইয়া দেখা যায়, তবে অনেক সময়ই দেখিতে পাওয়া যায়, ঐ ব্যক্তির ধীরে ধীরে মঙ্গল হইতেছে, যে সকল বিষয়ে তাহার বিশৃঙ্খলা ছিল, সেই সকল বিষয়ে সুশৃঙ্খলা হইতেছে, যাহ জটিল ছিল, তাহ। সরল হইতেছে ; যাহা দুর্গম ছিল, তাহা সুগম হই- তেছে ; যাহাতে ক্ষতি হইতেছিল, তাহাতে লাভ হইতেছে। আবার আরও দেখা যায়, তৎসঙ্গে নিজেরও মঙ্গল হইতেছে, হৃদয় সরস, আনন্দময় হইতেছে। আবার তদ্বিপরীতে যদি কাহারও নিয়ত অমঙ্গল চিন্তা করা যায়, তবে তাহাকে সদাই বিপন্ন হইতে, তাহার লােকশান হইতে, তাহার সুশৃঙ্খলা বিষয় বিশৃঙ্খলাতে পরিণত হইতে, তাহার
৮৬
মেস মেরিজম বা শক্তি চালনা।
সংসারে অশান্তি ও কলহ হইতে এবং আনন্দ নিরানন্দে
পরিণত হইতে, দেখা যায়। নিজেরও তৎ সঙ্গে সঙ্গে অনেক
অসুবিধা এবং মনকষ্ট আসিতে থাকে। এ সকল বিষয়
বিশেষ অনুধাবন না করিলে বুঝিতে পারা যায় না বা
দেখিতে পাওয়া যায় না। আমরা যতই উন্নতির পথে
যাইতে থাকি ; এই ক্ষমতাগুলি ততই আমাদেয় বাড়ীতে
থাকে।
অনেকেই জ্ঞাত আছেন—যিনি যে জন্তুদের হিংসা
করেন, সেই সকল জন্তু তাহাকে ডরায় এবং তাহারাও
হিংসা করে। যাহাদের হিংসাপ্রবৃত্তি নাই বা অতি কম,
তাহাদের জীবজন্তু ডরায় না, বরং ভাল বাসে। অনেক
স্ত্রীলােকের হিংসাপ্রবৃত্তি কম। দেখা যায়, তাহারা উচ্ছিষ্ট
বাসনাদি পরিষ্কার করিবার জন্য পুকুরে লইয়া যাইবার
সময়, কাক অথবা শালিক তাহার সেই বাসনের উপর
নির্ভয়ে বসিয়া খা খাইতে খাইতে যাইতে থাকে । আমি
দেখিয়াছি, তিনি তাড়াইলেও সহজে উড়িয়া যায় না কিম্বা
একটু উড়িয়াই আবার সেই বাসনে বসে। আবার তদ্বি-
পরীতে দেখা যায়, যাহারা যে জন্তুর হিংসা করে, তাহারা
কোন গ্রামে যাইলে সেই সকল জন্তু সে গ্রাম ছাড়িয়া অন্যত্র
পলায়ন করে কিম্বা তাহাদের হিংসা করে। এইজন্য একটা
ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ। ৮৭ প্রচলিত কথা আছে, “ভূতের রােজা ভূতের হাতেই মরে, “সাপের রােজা সর্পাঘাতেই মরে*। আমি দেখিয়াছি, কোন গ্রামে অসংখ্য বানর ছিল, হঠাৎ সমস্ত বানর গ্রাম ছাড়িয়া ভিন্ন গ্রামে চলিয়া গেল, পরে জানা গেল, কয়েকজন বানর মাংসভোজী সাঁওতাল জাতিকে বাবুরা আনিয়া গ্রামে বাস করাইয়াছেন। তাই তারা পলাইয়াছে কিন্তু উহারা তাহ- দের মারে নাই। ইহাতে বুঝা যায় যে, জীব জন্তুদের উপর মানবের ইচ্ছাশক্তি প্রবলরূপে কাৰ্য করে কিম্বা জীবের ঐ অনুভূতি মানব অপেক্ষাও বেশী। অনেকে জানেন, মানব- জাতি অপেক্ষা নীচ জীবের সাধারণ জ্ঞান বেশী। মানব পীড়িত হইলে চিকিৎসকের নিকট যাইয়া ঔষধ চাহিতে হয়, কিন্তু নীচ জীবের পীড়া হইলে তাহারা বনে প্রবিষ্ট হইয়া ঘ্রাণশক্তির সাহায্যে নিজের আরােগ্যকারী ঔষধ খুজিয়া লইতে পারে বা লইয়া থাকে এবং তাহা খাইয়া আরােগ্য হয়। এই ক্ষমতা মানবের নাই বা অতি কম, কি কম লােকের আছে। যাহাদের আছে, তাহাও অতি অল্প বা সন্দেহযুক্ত, কিন্তু জীবের কম নহে; সন্দেহ মাত্র নাই। • এ সকলও ইচ্ছাশক্তির বহিভূত নহে। জীবেরও ইচ্ছাশক্তি আছে,কিন্তু তাহারা সুনিয়মে পরিচালিত করিতে জানে না, অথচ তাহাদের ঐ শক্তি নিতান্ত ক্ষীণ নহে।
اط
মেসমেরিজম, বা শক্তি চালনা।
মেসসেরি সম্বন্ধে অনেক কথাই বলিয়াছি। রােগের
সম্বন্ধেও যে না বলিয়াছি, তাহা নহে। আর কিছু
বলিব।
১। পূর্বে বলিয়াছি যে, এই মেমেরিক, আমাদের
ইচ্ছাশক্তি বা উইল পাউয়ার ভিন্ন আর কিছুই নহে। এই
ইচ্ছাশক্তি চালিত করিতে অভ্যাস করিতে হয়। মনের
যতই একাগ্রতা অভ্যাস করিতে পারা যায় ; মনকে যতই
সংযত করিতে পারা যায়, মনের সংযমতা যতই অভ্যাস
করা যায়, কাৰ্য ততই সুগম ও সহজ হয়।
২। কাৰ্যকালে বা অন্যান্য সময় মনকে এমন করিয়া
গঠিত করিতে হয়, যেন কখনই পরের মঙ্গল চিন্তা ভিন্ন
অমঙ্গল চিন্তা মনমধ্যে স্থান না পায়। ইহা অভ্যাস জন্য
সদাই কুচিন্তা প্রত্যাহার পূর্বক মঙ্গলচিন্তাকে দৃঢ়রূপে মনে
আবদ্ধ করিতে হয়। মন যতই পরের মঙ্গল চিন্তায় কাল
কাটাইতে পারে, ততই কাৰ্যপটু ও দৃঢ় হয়।
রােগীর রােগ আরােগ্যের দৃঢ়তর চিন্তা কায়মনবাক্যে
সদাই জাগরুক থাকা চাই। “সারে সারুক” করিলে
হইবে না। “নিশ্চয়ই সারিবে” এই অকৃত্রিম, হৃদয়ের
অন্তনিহিত ভাব থাকা চাই এবং নিজের উপরও সম্পূর্ণ
বিশ্বাস থাকা চাই। প্রত্যুপকারের আশা বা স্বার্থের লেশ
যষ্ঠ পরিচ্ছেদ। মাত্র ভিতরে না থাকে ও মনের দৃঢ় একাগ্রতা থাকাও দরকার। নিজের ক্ষমতার উপর সন্দেহ থাকিলে একাগ্রতা ক্ষীণ হইয়া পড়ে, সুতরাং নিজের উপর সন্দেহ মাত্র না থাকে। এই মেমেরিক ও ইচ্ছাশক্তি একই জিনিষ, কিছু মাত্র ভিন্ন নহে। কেবল প্রক্রিয়া মাত্র ভিন্ন। ভিতরের জিনিষটা একই। তফাতের মধ্যে কখন কখন দেখা যায়, মেমেরাইজ, করিতে কাহারও কাহারও কখন কখন ক্লান্তি বোধ হয়, কিন্তু আরােগ্য করিবার জন্য যে রােগীর মঙ্গল কামনা ও ইচ্ছাশক্তি, যদ্বারা রােগী আরােগ্যের পথে দ্রুতবেগে অগ্রসর হইতে থাকে, তাহাতে কখনই কোন ক্লান্তি আসে না, বরং আননের স্রোতে হৃদয় প্রফুল্ল হওয়ায় আভ্যন্তরিক বল ও সুখ সঞ্চার হওয়ায় নিজেকে সুখময় করিয়া তােলে। ৩। ইতঃপূৰ্বে বলিগছি যে, যে চিকিৎসাই হউক না কেন, ঈশ্বরদত্ত রােগ-আরােগ্যকারিণী শক্তি রােগ আরােগ্য করে। অন্য যে কোন উপায় বা যে কোন চিকিৎসা সম- স্তই সেই অলৌকিক শক্তির সাহায্য করে মাত্র। মেস্ মেৰিক আবােগ্যও সেই শক্তির সাহায্য ভিন্ন অন্য কিছুই নহে। যে রােগীর এই শক্তির অত্যন্ত হীনাবস্থা বা মেমেরিজম বা শক্তি চালনা। ক্ষীণাবস্থা কিম্বা চিকিৎসকের উইল পাউয়ার (ইচ্ছাশক্তি) বা আরােগ্য বিষয়ে সাধক দৃঢ় ভরসাযুক্ত নহেন, সনেই যুক্ত ; সেইখানেই আরোগ্য হইতে বিলম্ব হয় কিম্বা আরােগ্যান্তে তাহা স্থায়ী হয় না, রিল্যাঙ্গ হয় ; নতুবা কখনই পুনঃ পীড়িত হইবার কথা নহে। ১। রােগীকে কেবল মাত্র শক্তি চালনা দ্বারা আরােগ্য করা যায়- ২। সুনিৰ্বাচিত ঔষধ সহ এই শক্তিষোগ বা ইচ্ছাশক্তি চালনা দ্বারাও আরােগ্য করা যায়। এই দুই প্রণালী অব- লম্বন দ্বারা আরােগ্যক্ৰিয়া আনিতে কতকগুলি নিয়মের অধীন হইতে হয়, সেগুলি চিকিৎসককে অগ্রে স্থির করিয়া লইতে হয়। অন্যথায় সময় সময় কিছু না কিছু গােযােগে পড়িতে হয়। ১। কৌতুহল পরিতৃপ্তির জন্য এ কাৰ্য্যে হাত দিবেন না। ২। অর্থোপার্জনের বাসনা না থাকে। ৩। বাহাদুরী দেখান কিম্বা নিজের প্রতিপত্তি লাভের কামনাও না থাকে। ৪। যাহারা এ বিষয়ে অবিশ্বাসী, তাহাদের
যষ্ঠ পরিচ্ছেদ।
বিশ্বাস জন্মাইবার জন্য, ইহাতে কখনই হাত দিবেন
।
দরকার হইলে অনেক দিন নিয়মিতরূপে
চিকিৎসা চালাইতে পারিবেন কি না দেখিবেন, না
পারিলে হাত দিবেন না।
৬। চিকিৎসাকালে রােগী বা রােগীর আত্মীয়-
স্বজন দ্বারা কোন ব্যাঘাত জন্মাইতে পারা সম্ভব
কি না, ইহা বিবেচ্য। যদি কোন বিপ্ন ঘটিবার সম্ভা-
বনা থাকে ; তবে হাত না দেওয়াই ভাল।
৭। তাঁহার নিজের, সেই রােগীর উপর কোন
প্রকার ঘৃণার ভাব, অনিচ্ছার ভাব বা তাহার উপর
বিরক্তির ভাব আছে কি না। যদি থাকে, তবে হাত
দিবেন না। তাহার উপর স্নেহ ও ভালবাসা থাকিলে
বড়ই সুবিধা হয়।
৮। রােগীর উপর তাহার বিশেষ অনুকম্পা,
দয়া, স্নেহ, মমতার ভাব ভালবাসা আছে কি না,
থাকিলে বড়ই সুবিধা হয়।
৯। তাহাকে রােগমুক্ত
রােগমুক্ত করিবার সম্পূর্ণ
৯২ মেমেরিজ বা শক্তি চালনা।
ইচ্ছা ও ভরসা আছে কি না ? না থাকে, হাত
দিবেন না।
১০। রােগীকে আরােগ্য করা ভিন্ন অন্য আর
কোন অভিসন্ধি বা মতলব না থাকে।
১১। নিজের যতই ক্ষতি হউক, তাহাতে ক্ষেপ
করিবেন না।
১২। আন্তরিক আনন্দসহ স্বীকার করিবেন।
১৩। মাতা, ভগনি, স্ত্রী ও কন্যা ভিন্ন অন্য
স্ত্রীলোককে মেসূমেরাইজ, করিবেন না।
১৪। ক্রিয়া
পাত্রকে কৌতুহলের বশবর্তী
হইয়া কোন অন্যায়, অসঙ্গত আদেশ করিবেন না।
১৫। ক্রিয়া পাত্রকে নিজের সন্তানবৎ জ্ঞান
করিবেন। তাহার মঙ্গলার্থে কায়মনবাক্যে মঙ্গল
কামনা করিবেন।
এই সব বিষয়ে পূর্ব হইতে প্রস্তুত হইতে হইবে। এই
সব যতই অভ্যাস করিতে থাকবেন, যতই পরের মঙ্গল
কামনায় হৃদয় গঠিত হইতে থাকিবে, ততই আপমাপনি
উৰ্দ্ধস্তর হইতে সাহায্য ও বল পাইতে থাকিবেন। নিম্নস্তরে
যতই মঙ্গল কামনা ছড়াইয়া দিতে পারিবেন বা দিতে
ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ।
থাকিবেন। উপর হইতে জলের ট্যাঙ্কের ডলবের মত ততই
নিজে বল পাইবেন। ততই মজবুৎ হইতে থাকিবেন।
যখনই পরের অমঙ্গল চিন্তা আসিবে, তখনই নিজের অনিষ্ট
হইতে থাকিবে। নিজের বলও কমিয়া যাইবে।
এক্ষণে আমরা যাহা বুঝিলাম, তাহাও ম্যাগনেটীক
শক্তির চালনা এবং মানসিক চিন্তাস্রোত চালনা ভিন্ন অন্য
কিছু নহে। এই দুই প্রকারেই রােগীর রােগ আরােগ্য
করা যায়। আর অনিষ্ট চিন্তা দ্বারা রােগীর অনিষ্ট হয় এবং
পরে তৎ প্রতিক্রিয়া দ্বারা নিজের অনিষ্ট সাধন হয়। সূৰ্য্য
নিজ উত্তাপ দানে পৃথিবীকে উত্তপ্ত করেন, আবার সেই
উত্তাপ সূৰ্যে ফিরিয়া গিয়া সূৰ্য্যকে স্বাভাবিক করিয়া দেয়,
তদ্রুপ আমরা পরের অনিষ্ট চিন্তা করিলে তাহার প্রতিক্রিয়া
দ্বারা আমাদের অনিষ্ট কেন না হইবে? আর মঙ্গল চিন্তায়
কেন মঙ্গল হইবে না?
এক্ষণে আর একটা কথা-রােগজশক্তি বা লােগজনক
বিষ রােগী শরীরে কিরূপে প্রবিষ্ট হয় ও কিরূপেই বা
বাহির হইয়া যায়। এইটা আমাদের জানা থাকা নিতান্তই
প্রয়ােজনীয়।
পাঠক মহাশয়গণ সকলেই জড় পদার্থের অন্ত
ৰ্বাহ ও বহিৰ্বাহ ক্রিয়া জ্ঞাত আছেন। মনে
৯৪ মেমেরিজ বা শক্তি চালনা। করুন, যদি একটা সূক্ষ্ম চৰ্ম্মের থলির মধ্যে লবণমিশ্রিত জল রাখিয়া তাহার মূখ বেশ করিয়া আবদ্ধ করা যায়, যাহাতে কোন প্রকারে বাহির হইতে না পারে এবং তদবস্থায় সেই থলি যদি কোন নির্মল, বিশুদ্ধ জলের পাত্রে ডুবাইয়া রাখা যায়, তাহা হইলে দেখা যায়, বাহিরের পাত্রস্থ জলে লবণের অংশ মিশ্রিত হইয়া সেই জল লবণাক্ত হইয়াছে। ইহাকে বহির্বাহ ক্রিয়া কহে। আর ইহার ঠিক বিপরীত ক্রিয়াকে অন্তর্বাহ কিয়া কহে। এই প্রকারে রােগ-শক্তি বাহির হইতে ভিতরের দিকে নীত হইয়া থাকে এবং তদ্বিপরীতে ভিতর হইতে বাহিরের দিকে নীত হয়, ইহাকে রোগের অন্তর্মুখীন ও বহির্মখীন গতি কহে। রােগের বহির্মুখীন অর্থাৎ রােগ ভিতর হইতে বাহিরের দিকে আসা, রােগীর মঙ্গল- দায়ক। আর রােগের অন্তর্মুখীন অর্থাৎ বাহিরের রােগ ভিতর দিকে যাওয়া নােগীর অমঙ্গলজনক জানিতে হইবে। আর একটা নিয়ম—যখন থােগ ভিতর হইতে বাহিরের দিকে আসে, তখন প্রায়ই নিম্নগামী হয়, আর যখন বাহির হইতে ভিতর দিকে যায়, তখনতাহাকে উর্ধ- গামী দেখা যায়। প্রমাণ স্বরূপ একটা কথা বলিতে হইল। কোন ভদ্রলোকের পৃষ্ঠ হইতে কোমর পর্যন্ত দুদি ছিল।
যষ্ঠ পরিচ্ছেদ।
আমি তৎ চিকিৎসা করিতে নিষেধ করিয়াছিলাম। তিনি
এক বৎসর পরে আমার নিকট আসিয়া বক্ষঃ পৰীক্ষা
করিতে বলিলেন। বক্ষ পরীক্ষা করিয়া বলিলাম, আমার
বােধ হয় “টিউবাকুলােসিস”। তিনি তাহাতে
সায় দিয়া কহিলেন—সিবি-সার্জনও ইহাই বলিয়াছেন
এবং চিকিৎসাও যথেষ্ট করিয়াছেন, পরে দার্জিলিং বায়ু
পরিবর্তনেও গিয়াছিলাম, কিছুই হয় নাই।” হােমিওপ্যাথি
চিকিৎসাতে কি কিছু হইবে ? তখন আমি তাহাকে
ভরসা দিয়া সেই দাদের কথা জিজ্ঞাসা করিলাম। শুনিলাম
কবিরাজী তৈল ব্যবহারে ভাল হইয়াছে ও তৎপরেই এই
রােগের আবির্ভাব। দেখুন এইটী দাদের অন্তৰ্ম্ম
গতি। তথন সফার ২০০ প্রয়োগে রােগী
রােগ মুক্ত হইয়াছিল এবং সঙ্গে সঙ্গে দাদ প্রকাশ
পাইয়াছিল। ইহার টিউবার্কলােসিসের
বহির্মুখীন গতি রলিতে হইবে অর্থাৎ দাদ ভিতরে
যাইয়া টিউৰ্কলােসিস্ হইয়া রােগীকে বিপদগ্রস্থ করিয়া-
ছিল, পরে আবার সেই টিউবার্কলােসিস্ বাহিরে দারূপে
আসিয়া রােগীকে বাঁচাইয়া দিল।
আমরা ঈশ্বরের নিকট রেগারােগ্য কারিণী শক্তি
যাহা পাইয়াছি, যারা আমরা রােগমুক্ত হইয়া থাকি,
খীন
মেস মেরিজ বা শক্তি চালনা।
রােগশক্তির সহিত সেই আরােগ্যকারিশীশক্তির একটা
ভীষণ সংঘর্ষণ হইতে থাকে। তাই রােগকালে অত
যাতনা হইতে থাকে। সেই যাতনা ঐ উভয়ের প্রতি-
দ্বন্দিতার ফল ভিন্ন অন্য কিছুই নহে। যখন সেই রােগ
দ্বারা আরোেগ্যকারিণী জীবনীশক্তি লােপ হয়, তখন আর
তুত যাতনা থাকে না ও তখন আরোগ্যের আশাও আর
থাকে না, তখন ঔষধও ক্রিয়া হীন হইয়া যায় অর্থাৎ
আরােগ্যকারিণী শক্তি না থাকায় ঔষধ কাহার দ্বারা ক্রিয়া-
শীল হইবে ? কাজেই তখন মৃত্যু অবধারিত। যখন
মৃত্যুই নিশ্চয়, তখন দেহ হইতে প্রাণ বায়ু সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন
হইবার সময় আবার নানা যাতনা হইতে থাকে। তাহা
দেহ হইতে প্রাণ বায়ু পৃথক হইবার সংঘর্ষণের যাতনা।
সে সকলের বর্ণনা এস্থলে নিষ্প্রয়ােজন।
রােগীর রােগ আরােগ্যকারিণী জীবনীশক্তির রােগ
দূরীকরণের যে চেষ্টা, তাহা প্রাকৃতিক নিয়মানুসারে
আপনাপনি হইয়া থাকে। তাহাতে রােগীর নিজের ঐ
জীবনীশক্তিকে রােগ আরােগ্য করাইবার জন্য জ্ঞান পূর্বক
কোন চেষ্টার দরকার হয় না। তবে এমন মহাত্মা জগতে
আছেন, যিনি ঐ অনৈচ্ছিক শক্তিকে নিজের সাধনা
দ্বারা ইচ্ছার অধীন করিয়াছেন। তিনি ইচ্ছা করিলে
সপ্তম পরিচ্ছেদ। ৯৭ নিজের ইচ্ছাধীনে আনিয়া তাহার স্ফুরণ দ্বারা রোগ শী আরােগ্য করিয়া নীরােগ হইতে পারেন, কিম্বা তাহাকে বিকিরণ দ্বারা নিজের দেহ ত্যাগ করিতেও পারেন। আবার নিজের সেই জীবনীশক্তি যদি একেবারে ক্ষীণ হইয়া থাকে, তবে অন্যের নিকট হইতে আকর্ষণ পূর্বক নিজ দেহকে সুস্থ ও নিরােগ করিতেও পারেন, কিন্তু নিজের জন্য করেন তবে জগতের মঙ্গলের জন্য এরূপ করা অসম্ভব নহে। আবার নিজের সেই শক্তি দানে মৃত্যুমুখ ব্যক্তিকে বাঁচাইয়া দিতেও পারেন। ইহার প্রমাণ স্বরূপ অনন্তরাম ও মিরণের বিষয় প্রমাণ ও স্মরণ যোগ্য। সপ্তম পরিচ্ছেদ। এক্ষণে শক্তি চালনার বিষয় কিছু বলিতে বাধ্য হই- লাম। পুৰ্বোল্লিখিত জীবনীশক্তি বা বােগ আরােগ্য কারিণী স্বাভাবিকশক্তি আপনাপনি রােগ আরােগ্যকরণে স্বত্তই মুিক্ত হয়। রােগীর সে বিষয়ে কোন ইচ্ছার প্রয়োজন হয় না, কিন্তু শক্তি চালক বা সাধকের ইচ্ছাশক্তি দ্বারা ঐ জীবনী শক্তির কাৰ্য্য হইতে পারে।
৯৮ মেমেরিজম বা শক্তি-চালনা। তাহার ইচ্ছাশক্তি প্রণােদিত হইয়া থােগারােগ্য শক্তি তীব্রভাবে কার্য করিয়া রােগীকে সত্বর আবোগ্য পথে দ্রুত চালিত করিয়া আরােগ্য করিয়া দেয়। রােগ আরোগ্য- কারিণী জীবনী শক্তি রােগীর ইচ্ছার অধীন থাকে না, কিন্তু সাধকের ইচ্ছার অধীন থাকে। ঔষধ যেমন থােগারােগ্য কারিণী জীবনী শক্তির উপর কাৰ্য্য করিয়া রােগ আরােগ্য করে, তেমনি শক্তি চালকের ইচ্ছা শক্তি এবং মেমেরিক শক্তি (তেজঃ) ঐ আরােগ্যকারিণী জীবনী শক্তির চৈতন্য সম্পাদন করিয়া রােগ আরােগ্য করিয়া দেয় । পশগুলিকে মােটের উপর দুই ভাগে বিভক্ত করা যায়। ১ ম। শক্তি-প্র বর্তক বা মেমেরা- ইজিং পাশ। ২য়। শক্তি-নিবর্তক বা ডিমেমে রাইজিং পাশ। শক্তি প্রবর্তক পাশের ঠিক বিপরীত ক্রিয়া, শক্তি- নিবৰ্ত্তক পাশ দ্বারা সাধিত হয়, সুতরাং শক্তি-নিবৰ্ত্তক পাশ চিকিৎসার জন্য প্রায় ব্যবহার বা দরকার হয় না, অতএব নিবর্তক পাশের বিশেষ বৃত্তান্ত প্রয়োজন নাই।
হয়।
সপ্তম পরিচ্ছেদ।
১। লম্বা পাশ।—উভয় হাত দ্বারা পাশ দিতে
এক হাতে ও দেওয়া যায়। হাত ও হাতের
অঙ্গুলিগুলির অগ্রভাগ রােগীর অভিমুখে রাখিয়া উপর
হইতে নীচের দিকে ধীরে ধীরে টানিয়া আনিতে থাকি।
বেন। তৎকালে রােগীর শরীর স্পর্শ করিবেন না। দুই হাত
বেশী দূরবর্তী না হয়। দুই হাতের অঙ্গুষ্ঠ উপরি উপরি
চেরার মত রাখিয়া পাশ দিলে যেন কিছু সুবিধা হয়, তখন
একটী অঙ্গুষ্ঠ দেখা যাইবে না এবং দুই হাতের তর্জনিদ্বয়ও
পরস্পর পাশাপাশি রাখিলে ভাল হয়। অঙ্গুলিগুলি সংযুক্ত
বা সামান্য ছাড়া ছাড়া ভাবে রাখিতে হয়। তবে বেশী
ফাক করা উচিত নয়। এইরূপে উপর হইতে শরীরের
এক ইঞ্চ দুর দিয়া একাগ্র মনে হাত ধীরে ধীরে
কোমর বা পা পর্যন্ত টানিয়া হাত মুষ্টিবদ্ধ করিবেন এবং
তাহার শরীরের উপর দিয়া উর্দ্ধে লইয়া যাইবেন না।
বক্ৰভাবে পার্শ্ব দিয়া মশুকের উপর উঠাইয়া মুষ্টি খুলিয়া
দুতিন বার হাত ঝাড়িয়া আবার পূর্ববৎ ক্রিয়ায়
প্রবৃত্ত হইবেন। হাত ঝাড়িয়া ফেলা বিশেষ প্রয়ো-
জনীয় জানিবেন। নিম্ন হইতে হাত ক্রিয়াপাত্রের উপর
দিয়া লইয়া যাইলে, নিবর্তক পাশ দেওয়া হইয়া
যায়।
মেমেরিজম বা শক্তি-চালনা।
যেটুকু উপকার হইয়াছিল, সেটুকু নষ্ট হইয়া যায়। হাত
ঝাড়িতে ভূলিয়া গেলে, রােগীর শরীরস্থ বেদনা বা রােগ
বেশী হওয়াও অসম্ভব নহে, সুতরাং হাত ঝাড়িতে
কখনই ভুলিবেন না। পাশ দিবার সময় পাত্রের গাত্র অনা-
বৃত রাখিবেন
কাপড়দি দ্বারা
আবৃত থাকিলে
সুবিধা হয় না; কারণ কাপড় অপরিচালক জনিত হাতের
তে, ক্রিয়া পাত্রের শরীর মধ্যে প্রবিষ্ট হইতে বাধা পায়,
কিন্তু অনাবৃত রাখা সকল সময় ঘটে না, কারণ স্ত্রীলােক বা
দুৰ্বল ব্যক্তির অনাবৃত রাখা অসম্ভব হয় ; সে স্থলে অতি
পাতলা কাপড় দ্বারা আবৃত রাখিতে হয়। রেশমী কাপড়
বা গরম প্রভৃতি পরিচালক কাপড় গাত্রে থাকিলে
রােগীর শরীরে, সেই করেন্ট বা সেই স্রোত প্রবিষ্ট হইতে
পারায় মেসমেরাইজ হইবে না। কাজেই পরিচালক
কাপড় আবৃত রাখিতে হয়, কিন্তু তার কাপড়ও অপরি
চালক ; তবে পশম, গরদ অপেক্ষ কিছু অল্প ।
২। পাশাপাশী পাশ।ইহাতে পূৰ্ব্ববৎ
করতলের দিক রােগীর দিকে রাখিয়া সাধকের উ
ও দক্ষিণ দিক হইতে আরম্ভ করিয়া অধঃ ও বাম দিকে
টানিয়া আনিতে হয়। অঙ্গুলিগুলি পূৰ্ব্ববৎ রাখিতে হইবে।
নিম্ন ও বাম দিকের শেষ সীমা পর্যন্ত টানিয়া আনিয়। পরে
সপ্তম পরিচ্ছেদ।
হাত মুষ্টিবদ্ধ করিয়া পাত্রের গাত্রের তফাৎ দিয়া পূৰ্ব্বস্থানে
লইয়া যাইয়া আবার পূৰ্ববং টানবেন। এই প্রকার পাশ
বক্ষঃস্থল, পৃষ্ঠ, উদর প্রভৃতি স্থানে দেওয়া যায়। অবশ্য স্মরণ
রাখিবেন, অবশ্যই ডানদিক হইতে বামদিকে
আনিবেন, কদাচ ভুল না হয়। যেন বাম হইতে ডান দিকে
আসে।
আবার যদি এই পাশ দূর পর্যন্ত দিতে হয় ; তবে
কদাচিৎ যেন নিম্ন হইতে উর্দ্ধে না আসে। উর্জ হইতে
নিম্নে ও ডান হইতে বামে আনিবেন। হাত
উঠাইবার সময় অবশ্য যেন মনে থাকে, হাতঝাড়িতে
হইবে, এবং মুষ্টিবদ্ধ করিয়া পুৰ্ব্বস্থানে হাত শরীরের তফাৎ
দিয়া লইয়া যাইতে হইবে। প্ৰবৰ্ত্তক পাশ দিতে যেন
নিবৰ্ত্তক পাশ দেওয়া না হইয়া যায় ; ইহা সর্বদা মনে
রাখিবেন।
৩। কুণ্ডলীপাশ।--নিজের দক্ষণ হস্তদ্বারা
রােগীর পীড়িত অঙ্গের বাম পার্শ্বে কোন একটা বিন্দু কল্পনা
করিয়া লইয়া, তাহা হইতে আরম্ভ করিয়া নিজের
বাম দিক অভিমুখে বৃত্তাকারে হস্ত সঞ্চালন করিয়া নিজের
ইন্তের একহাত পরিমাণ ব্যাস এরূপ একটী বৃত্ত ঐ পীড়িত
অঙ্গ বেষ্টন পূৰ্ব্বক (শূন্যোপরি ) অঙ্কিত করিয়া লইবেন।
মেস মেরিজম, বা শক্তি-চালনা। পরে ঐ প্রণালীতে ক্রমশঃ ছােট, তারপর তদপেক্ষা ছােট; এইরূপ করিয়া এক একটী বৃত্ত টানিতে থাকিবেন, যতক্ষণ একটী বিন্দু মাত্রে পরিণত না হয়। যখন একটী বিন্দু হইয়া গেল, তখন সেই বিন্দু হইতে লম্বমান রঞ্জুর ন্যায় সরল রেখা উ হইতে অধঃমুখে কিয়দ্দর পর্যন্ত টানিয়া জানিয়া পশ্চাৎ পূর্বের মত হাত ঝাড়িয়া ফেলিবে। শরীরের স্থানের তারতম্যানুসারে কুণ্ডলীপাশ অধঃ হইতে উর্দ্ধে কিম্বা অগ্ৰ পশ্চাৎ ভাবেও দিতে হয়। মস্তকের দিকে হইলে অধঃ হইতে উর্দ্ধে যায় কিন্তু জ্যায় কিন্তু বাহুর সম্মুখে দিতে হইলে নিজের সম্মুখ হইতে ক্রমশঃ নিকটে আসিবে। ৪। হিলিবিলি পাশ।—যদি বক্ষঃস্থলে পাশ দিতে হয়। তবে প্রথমতঃ দক্ষিণ হস্তের করতলকে মুষ্টিবদ্ধ ভাবে ঐ স্থানের উপর স্থাপিত করিবেন। পরে কিছুক্ষণ ঐরূপ ভাবে রাখিয়া সহসা সরায়া লইয়া সত্বর নিজের দক্ষিণাভিমুখে, অধােদিকে ঈষৎ বক্রভাবে সরল রেখা ক্রমে, সঞ্চালিত করতঃ, পরে আবার সেইখান হইতে নিজের বাম অভিমুখে ঐরূপ অপােদিকে ঈষৎ তির্যকভাবে সরলরেখা ক্রমে টানিয়া অানিতে হইবে, কিন্তু এই বারের রেখা পূর্ব- কারের রেখা অপেক্ষা দৈর্ঘ্যে কিছু কম বা ছােট হইবে।
সপ্তম পরিচ্ছেদ।
কতকটা যেন র মত হইবে। ইহার পর দক্ষিণাভিমুখে
ঐরূপ করিবেন। তবে ক্রমেই রেখার দৈর্ঘ্যতা কমাইবেন
এবং হস্ত নিম্নাভিমুখী হইতে থাকিবে। যথায় রেখা খুব
ছােট হইয়া আসিবে, তথায় হাত মুষ্টিবদ্ধ করিয়া লম্ব রেখা
ক্রমে কিছু দূর পর্যন্ত মুষ্টিবদ্ধ হাতকে টানিয়া আনিয়া
হাত ঝাড়িয়া ফেলিবেন।
৫। ফ্রিকশন বা ঘর্ষণ পাশ ।-ইহ।
আলগাভাবে, লঘুভাবে কি জোরে স্পর্শ করিয়া এই দুই
প্রকারেই দেওয়া যায়। এই দুই প্রকার পাশ দিতে শরীর
স্পর্শ করিতে হয়।
৬। শ্বাস বায়ু চালনা দ্বারা পাশ
দেওয়া।—ইহাও আবার দুই প্রকারে দেওয়া যায়।
ক। উষ্ণ। খ। শীতল ।
(ক) উষ্ণ শ্বাস-উষ্ণশ্বাস দ্বারা অনেক
রােগের চিকিৎসা করা যায়। উপকারও যথেষ্ট হয়।
পীড়িত অঙ্গের উপর এক খণ্ড পরিষ্কার টুকরা
বস্ত্র খণ্ড রাখিয়া, নাসিকার দ্বারা শ্বাস লইয়া এবং
অল্প মুখ হা করিয়া হাই দিবার মত গরম নিশ্বাস
উহার উপর দিতে থাকিবেন। বায়ু প্রয়ােগকালে মুখ দিয়া
দিবেন, কিন্তু কদাচ মুখ দিয়া নিশ্বাস বায়ু গ্রহণ করিবেন
মেমেরিজম বা শক্তি-চালনা। না। নাক দিয়া গ্রহণ করিবেন। অনেক দিন অভ্যাস না করিলে উষ্ণশ্বাস চালনা বেশীক্ষণ করিতে পারা যায় না। উষ্ণশ্বাস অনেকক্ষণ করিতে না পারিলে কঠিন রােগী আরােগ্য করা যায় না। মৃতবৎ কঠিন রােগীতে এক ঘণ্টা, দুঘণ্টা উষ্ণশ্বাস দিতে না পারিলে বিশেষ উপকার পাওয়া যায় না। পূৰ্ব্ব হইতে পূৰ্ব্ব হইতে বিশেষ অভ্যাস না করিলে কাৰ্যকালে ক্লান্ত হইয়া পড়িতে হয় ; তখন আর সে কাৰ্য্য হয় না। (খ)--শীতল শ্বাস-শীতল পাশ আবার দুই প্রকার। ১ম-যে কোন অল্প স্থানে ফু দিতে হয়। ঠোট সরু করিয়া জিম্বার অগ্রভাগ সরু করিয়া এবং জিহ্বার পিট দ্বারা দন্তগুলিকে চাপিয়া ধরিয়া উগ্ধ হইতে নিম্নে ও দক্ষিণ হইতে বামে ক্রমশ ফু দিতে হয়। ২য় --করতল দ্বারা পাখা দিয়া বাতাস করার মত দেওয়া। অঙ্গুলগুলি একটু তফাৎ ভাবে রাখিতে হয় । (গ)-করতলের মূল রােগীর উপর রাখিয়া অঙ্গুষ্ঠ- বাদে আর আটটা অঙ্গুলীর সাহায্যে উপর হতে চাপ দিয়া ক্ৰমশঃ নিম্নের দিকে নামাইয়া আনিতে হয়। (গ)—উভয় অঙ্গুষ্ঠের অগ্রভাগ মিলাইয়া 'অগ্রভাগের ।
সপ্তম পরিচ্ছেদ।
উপর ভর দিয়া অপর আটী অঙ্গুলীর সাহায্যে অগ্রসর
হইতে হয়।
(ঙ)-কেবল তজ্জনিদ্বয়ের উপর ভর দিয়া অগ্রসর
হওয়া। ইহাদের লিডিং পাশ কহে ।
(চ)—ষ্ট্রোকিং বা আঘাত করা।
তর্জনি অঙ্গুলী দ্বার: ঘা দেওয়া। তর্জনি, মধ্যমা, অনামিকা
দ্বারা ঘা দেওয়া কিম্বা তজ্জনি, মধ্যমা, অনামিকা, কনিষ্ঠ।
অঙ্গুলি দ্বারা ঘা দেওয়া।
সাধক কার্যকালে নিজ শরীর ম্যাগনেটীকৃ-শক্তি
( উষ্ণ শক্তি) অঙ্গুলি দ্বারা বাহিরের দিকে সঞ্চালিত করিয়া
অঙ্গুলির অগ্রভাগ দিয়া রােগীর শরীরস্থ রােগীরােগ্যকারিণী
জীবনী শক্তির সাহায্যে তাহার রােগ সমূলে নিৰ্ম্মল করিব বা
করিতেছি,এই কামনায় বিভোর থাকিয়া চালিত করিবেন।
(ঙ)—হাতের সমস্ত অঙ্গুলি একত্র করিয়া ঝাড়িয়াও
দেওয়া যাইতে পাবে।
এই সকল বাদে জলপড়া, তেলপড়া ইত্যাদি দেওয়াতে
অনেক সময় কিছু কিছু উপকার পাওয়া যায়; তবে তাহ
অতি কম পরিমাণে। জলপড়ার শক্তি অতি কম হইলেও
অনেক সময় শিশুদের জ্বর কমান, বাহ্যে করান, নিদ্রা
আয়তন প্রকৃতিতে বেশ উপকার পাওয়া যায় ।
;
মেমেরিজম বা শক্তি-চালনা। (জ) জল পড়িবার পদ্ধতি।-বাম হাত চিৎ করিয়া তাহার উপর জলের পাত্রটী বসাইয়া পাঁচটী অঙ্গুলিই উচ্চ করিয়া পাত্ৰকে চাপিয়া ধরিবে। পাত্রের বাম পাশ্বের কিনারায়, নিজের দক্ষিণ হস্তের অঙ্গুষ্ঠের অগ্রভাগ রাখিয়া, অল্পক্ষণ পরে সরল রেখাভাবে পাত্রের দক্ষিণ কিনারায় আনিয়া, আবার অল্পক্ষণ রাখিবেন। আবার পার হইবার সময় অঙ্গুষ্ঠ দ্বারা অতি সামান্য ভাবে জল স্পর্শ করিয়া যাইবেন। পাত্রের পার্শ্বদিয়া তলা পর্যন্ত যাইবেন। সেখানে অল্পক্ষণ বিশ্রামের পর বাহিরদিক দিয়া বৃত্তাকারে আবার বাম কিনারায় সেই পূৰ্ব্বস্থানে অঙ্গুষ্ঠ রাখিবেন। এইরূপ পাঁচ ছয় বার করিবেন, তারপর জলের উপর প্রক্ষেপ অর্থাৎ মুষ্টিবদ্ধহস্ত জলের উপরের নিকটে আনিয়া হঠাৎ খুলিয়া দিবেন,যেন নিজ তেজঃ জলে নিক্ষিপ্ত হইল। দুই চারি মিনিট এইরূপ করিতে হয়। বােতল বা সিসি হইলে তর্জনি অঙ্গুলি তন্মধ্যে প্রবিষ্ট করিয়া ঐ কাৰ্য্য করিতে হয়, অথবা ফু দিয়াও করা যাইতে পারে। নল হইলে ফুদিবার বেশ সুবিধা হয়। তর্জনি দ্বারা জলটা আলােড়িত করিয়া দিবেনও শেষে কুণ্ডলি পাশ দিয়া পাত্র আবৃত করিয়া দিবেন। এইরূপে তৈলপড়া, জলপড়া, ফ্লানেল পড়া, সুবিধামত সপ্তম পরিচ্ছেদ। ১০৭ দিতে হয়। ফ্লানেল পড়া বা তৈলপড়া জল পড়ার মতন। তৈল পড়াতে অনেক সময় সামান্য সামান্য ক্ষত, পােড়াক্ষত ছেচা আঘাত ও বেদনা, বাত আদি ভাল করা যায়। বােতল ও সিসিতে জল ম্যাগনেটাইজ করিতে কিছু অসু- বিধা হয়। এই সকলের মধ্যে যে প্রকারই হউক না কেন ; কাৰ্য্য করিবার সময় সাধকের একাগ্রতাসহ নিজ শক্তি পরিচালিত করিতেছি এবং তৎসহ রােগীর মঙ্গল- কামনার ইচ্ছা থাকা চাই। তৎকালে নিজের সাংসারিক অশান্তি জনিত মনস্তাপ, দুঃখ অথবা ক্রোধের লেশ মাত্র থাকিবে না। রােগীর মঙ্গলকামনায় আনন্দময় থাকিয়া তত্রস্থ বায়ুমণ্ডলকে পৰ্য্যন্ত আনন্দের হিল্লোলে স্পন্দিত করিতে থাকিবেন। যদি মনে ক্রুরতা, হিংসা বা পরের মঙ্গলের অনিচ্ছার বিন্দুমাত্র ভাব থাকে, তাহা হইলে কদাচ এ কাৰ্য্যে হাত দিবেন না। তাহাতে পরের অমঙ্গলের সঙ্গে সঙ্গে, অজ্ঞাতসারে নিজেরও অমঙ্গল আসিয়া পড়িবে ; সুতরাং যতক্ষণ নিজে উপযুক্ত হইতে না পারিবেন, যতক্ষণ নিজের মনে একটু কুভাব থাকিবে, যতক্ষণ মনে, একটু মাত্র সন্দেহ থাকিবে ; ততক্ষণ বা ততদিন কোন মতেই ইহশতে হাত দিবেন না। এ কথা যে কেবল মেমেরি চিকিৎসাতে বলিতেছি, ;
১০৮ মেস মেরিজম, বা শক্তি-চালনা। এমত নহে। ঔষধ দ্বারা চিকিৎসা করিতে গেলেও অজ্ঞাত সারে মেয়েরাইজ, করা না হয়, এমন নহে। সকল স্থলেই রোগীর মঙ্গলকামনা রাখিয়া রোগীতে হাত দিতে হয়। অন্যথায় রােগীর অমঙ্গল সহ অজ্ঞাতসারে নিজের অমঙ্গল করিয়া ফেলিবেন, ইহার কোনমতে অন্যথা হইবে না। কেহ কেহ মনে করেন, আমি যদি অপরের অনিষ্ট করি, তবে আমার কেন অনিষ্ট হইবে ? কেহ জানিতে না পারিলেই হইল। সেটা মস্ত ভুল। যা করা যায়, তা নিজের জই হয়। পরের জন্য মনে মনে যে সংকল্প করিবেন, বে বাণ প্রস্তুত করিবেন বা হইবে, তাহা তৎক্ষণাৎ বা কিছু বিলম্বে ফিরিয়া নিজের উপর কাৰ্য্য করিয়া তবে নির্বাণ হইবে। যতক্ষণ বা যতদিন তোমার চিন্তা তোমার উপর কাৰ্য্য করিতে পারিবে না বা সময় পাইবে না; ততক্ষণ বা ততদিন তাহা গুপ্তভাবে শূন্যমার্গে জাজ্বল্যমান থাকিবে। ইহাকে সাধারণ চিত্রগুপ্তের খাতা কহে । চিত্রগুপ্ত-গুপ্তত্তি। শূন্যমার্গে গুপ্তভাবে অদৃশ্য- ভাবে অঙ্কিত থাকে। চিন্তার যেমন ক্রিয়া আছে, তেমনি প্রতিক্রিয়াও আছে। ক্রিয়া প্রথমেই অন্যব্যক্তির উপর কাজ করে, আর প্রতিক্রিয়া নিজের উপর কাৰ্য্য করিয়া লয় প্রাপ্ত হয়।
সপ্তম পরিচ্ছেদ।
ঝ} ফ্লানেল পড়া--একখণ্ড নূতন ফ্লানেল
লইয়া তিন চারি ভাজ করিয়া নিজের বাম বগলে চারি পাঁচ
মিনিট রাখিয়া, পরে দক্ষিণ বগলে চারি পাঁচ মিনিট রাখিয়া
হস্ত-মুষ্টি মধ্যে কতকক্ষণ রাখিয়া ছাড়িয়া দিবেন।
( ) নুতন উঁকিও ম্যাগনেটাইজ করিয়া
দেওয়া যায়।
কোন্ কোন্ পাশে কি কি রােগ আরোগ্য করা যায়,
নিম্নে তাহার উল্লেখ করিলাম।
১1 ফ্লানেল পড়া-ফ্লানেল পড়াতে অনেক
স্থানের বেদনা আরােগ্য হয়।
২। জলপড়-জলপড়াতে শিশুদের জ্বরের
উত্তাপ কমান, নিদ্রা আনয়ন ও বাহে করা যায়।
৩। তৈলপড়া।তেলপড়াতে সামান্য সামান্য ক্ষত
আরােগ্য হয়। তেলের মধ্যে সরিষা বা তিলের তৈল প্রশস্ত।
৪। কুণ্ডলী পাশা-মস্তকের ভারবােধ ও
মশুকের রক্তাধিক্য নিবারণ করা যায়।
৫। হিলিবিলি পাশা-খাস কষ্ট ও বুকের
রক্তাধিক্য আরােগ্য হয়।
৬। লম্বা পাশ-১। নিদ্রিত করা। ২।
মস্তকের ভার ও রক্তাধিক্য নিবারণ করা। ৩। সর্বাঙ্গের
মেমেরিজম বা শক্তি-চালনা।
বেদনা বা বাতরােগ নিরাময় করা। ৪। জ্বর। ৫। হিষ্টিরিয়া
বা গুল্ম বায়ু ! ৬। আক্ষেপ বা কলশ। ৭। শিশু দড়ক।
৮। শিশুদের প্রবল জ্বর ইত্যাদি ভাল করা যায়।
৭। পাশাপাশী পাশ বুকে, পিঠে ও পেটের
বেদনাতে দেওয়া যায়।
৮। গাড় স্পর্শ পাশ।—যে বেদনা টিপিলে
উপশম হয়, বৃদ্ধি হয় না, লাগে না। অসাড় বা স্পর্শ বােধ
রহিত, শোথ, ঝিঝি ধরা ইত্যাদি স্থানে দেওয়া যায়,
এবং বিষাক্ত কীট দংশিত স্থানেও উপকার হয়।
লঘূস্পর্শ পাশ।-স্নায়বীয় বেদন',
মাথাধরা, জাল করা যাতনা ভাল হয়।
১০। ঘা মারা পাশ।—অবশতা, বাত বেদনা
বিশেষতঃ পৃষ্ঠের উপর বাতের ব্যথা, মেরুদণ্ডের উপর পাশ
দিয়া হাত ভাল হয়।
১১। ময়দা ছানাবুৎ পাশ।-বাত ও
জ্বরে গাত্র কামড়ন ইত্যাদি ভাল হয়।
১২। উষ্ণ শ্বাসমূমুষু রােগীর প্রাণ দান
করা যায়। অত্যন্ত রক্তস্রাব আদি দ্বারা নির্জীব রোগীকে
সজীব করা যায়।
১৩। শীতলশ্বাস পাশ।ইহাতে বেদনার
সপ্তম পরিচ্ছেদ। তীব্রতা কমাইয়া শান্তি দেওয়া যায়। দাহ নিবারণ ও স্নায়- বীয় বেদনা হ্রাস করা যায়। ১৪। কপত্র বীজন।-কোন স্থানের উপ- দাহের উগ্রতা কমায়। উহাকে ছড়াইয়া দেওয়া যায় এবং যাতনা কমান যায়। মেমেইজ, করিতে শিখিতে শিখিতে, অভ্যাস করিতে করিতে, পরে মেমেরাইজ, করিতে করিতে আবার মেয়েরাইজ, করিবার অনেক উপায় আপনাপনি উদ্ভাবিত হইয়া থাকে। তখন নিজের বড়ই আনন্দ হয়। যা হউক, নিদ্রিত করা তো হইল। আবার ক্রিয়াপত্রের জ্ঞানও আপনাপনি হইয়া থাকে, তাহা বলা হইয়াছে, কিন্তু যদি ক্রিয়াপাত্রের নিদ্রা সহজে ভঙ্গ না হয়, তবে ক্রিয়া সাধককে নিদ্রা ভাঙ্গাইয়া দিতে হয়। সেটাও শিক্ষা করা উচিত। সহজে নিদ্রাভঙ্গ না হইলে দু’তিন ঘণ্টা অপেক্ষা করিবেন। পরে বিপরীত পাশ বা নিবর্তক পাশ দিতে হয়। মস্তক ও মুখমণ্ডলের উপর শীতল শ্বাসপাশ বা করপত্র বীজন করিলেই জ্ঞান হইয়া থাকে। কখন কখন ক্রিয়াপাত্র তাকাইতে পারে না। তখন সাধককে অঙ্গুষ্টের অগ্রভাগ দ্বার নাকের
মেস মেরিজ বা শক্তি-চালনা।
উপরদেশ হইতে আরম্ভ করিয়া রগ পর্যন্ত ডলিয়া দিতে
হয়। শেষে করপত্র বীজন বা ফুৎকার প্রদান
দ্বারা সারিয়া যায়। সম্পূর্ণ সুস্থ না হইলে ছাড়িয়া
তাসিবেন না।
নিবৰ্ত্তক পাশের ক্রিয়া প্রবর্তক পাশের বিপরীত
সুতরাং যে ক্রিয়া প্রবর্তিত করা হইয়াছে, তাহার সংহার
করা বা নিবৃত্তি করা। প্রয়ােগ করা শক্তিকে প্রতিনিবৃত্ত
প্রবর্তক পাশ দিবার সময় নিজের করতল, ক্রিয়াপাত্রের
দিকে থাকে, নিবৰ্ত্তক পাশ দিবার সময় করতল তাহার
বিপরীতে করিতে হয়, অর্থাৎ হাতের পৃষ্ঠের দিক, ক্রিয়া-
পাত্রের দিকে ফিরান থাকিবে ! প্রবর্তক পাশ উপর
হইতে নীচের দিকে, এবং দক্ষিণ হইতে বামে আনিতে হয়,
আর নিবৰ্ত্তক পাশ নীচ হইতে উপরে এবং বাম হইতে
দক্ষিণে চালিত করিতে হইবে। ইচ্ছাশক্তি যেন জাগ্রত
থাকে, ইহা সদাই স্মরণযোগ্য। প্রবর্তক পাশ দিবার সময়ে
যেমন প্ৰবৰ্ত্তমান ক্রিয়ার সাধন জন্য ইচ্ছাশক্তি থাকিবে,
তেমনি নিবৰ্ত্তক পাশ দিবার সময়েও নিবৃত্তি সাধূন জন্য
ইচ্ছা প্রবল থাকা চাই। নিজের ইচ্ছাশক্তি জড়বৎ বা
নিদ্রিতবৎ রাখিয়া প্রবর্তক পাশ দেওয়া যেমন বৃথা,
সপ্তম পরিচ্ছেদ।
১১৩
তপ ইচ্ছাশক্তিকে জড়ীভূত রাখিয়া নিবৰ্ত্তক পাশ
দেওয়াও তেমনি বৃথা , সুতরাং সকল সময়েই সাধকের
সফল কামযুক্ত ও মঙ্গলময় ইচ্ছাশক্তি সম্পন্ন এবং ধীর
হওয়া দরকার। ব্যস্ত বাগীশ ব্যক্তির কাৰ্য নহে।
যতক্ষণ রােগীর বেশ নিদ্রাভঙ্গ না হইবে; ততক্ষণ
সাধক কখনই তাহাকে ত্যাগ করিয়া যাইবেন না। ভীত,
চঞ্চল, ব্যস্ত, উত্তেজিত বা ক্রোধান্বিত হইবেন না। স্থির,
ধীর, শান্ত ও আনন্দময় হইয়া তাহার কাছে বসিয়া থাকি-
বেন। কোন প্রকারে উত্তেজিত হইলেই বিপদ। অভিজ্ঞ
সাধক জানেন, কোন রােগীর নিকট কতক্ষণ থাকিতে
হইবে। যতক্ষণ বা যতদিন সে সম্পূর্ণ সুস্থ বা জ্ঞান প্রাপ্ত
না হয় ; ততক্ষণ বা ততদিন তাহাকে ছাড়িয়া যাইবেন
। ক্রিয়া সাধক অন্য কোন লােককে ক্রিয়া পাত্রকে
স্পর্শ করিতে দিবেন না। কেবল নিজে স্পর্শ করিবেন
মাত্র। কেন ? ইহা তিনি অবশ্য জানেন, আমাদের
পাঠক মহাশয়গণও জানেন যে, ক্ৰমেমেরাইজ, হইয়া
পড়িবে ।
এমন পাত্রও দেখা যায় যে, বহু দিন চেষ্টা করিয়াও
নিদ্রিত করা গেল না, হঠাৎ একদিন অল্প চেষ্টাতেই নিদ্রিত
হয়। কোন নির্দিষ্ট নিয়মে যদিও অনেক স্থলেই কৃতকাৰ্য
৮
।
১১৪ মেসমেরিম্ ৰা শক্তি চালনা। হওয়া যায় বটে, কিন্তু আবার লােকের প্রবৃত্তি অনুসারে ভিন্ন ভিন্ন উপায় অবলম্বন করিতে হয়, কিম্বা সাধারণ নিয়মের সঙ্গে সঙ্গে আনুসঙ্গিক উপায় সকলের আশ্রয় লইতে হয়। আবার অনেক সময় নিদ্রা আনয়ন না করিয়াও রােগীর রােগ আরােগ্য করা যায়। ন অষ্টম পরিচ্ছেদ। উইলস সাহেবের মতানুযায়ী মেমেরাইজ, করিবার প্রণালী। ১।—ক্রিয়া পাত্রের সম্মুখে বসিয়া পাত্রকে বলিবেন- যেন সে অনাসক্ত, প্রশান্ত ও স্থির চিত্তে বসিয়া সাধকের বশীভূত হইবার ইচ্ছা করে। কোন প্রকারে অন্য চিন্তা মনে উদয় হইতে না দেয়, এবং তাহার চক্ষু দুটা ক্রিয়া সাধকের চক্ষের উপর রাখিবে, কিম্বা চক্ষু বুজিয়া থাকিবে, অথবা ক্রিয়া সাধক একটা রৌপ্য বা তারে চাকতিকে মেমরাজ, করিয়া নিজ বক্ষের উপর বদ্ধ রাখিয়া, তাহাতে তাহাকে দৃষ্টি রাখিতে বলিবেন।
অষ্টম পরিচ্ছেদ। ১১৫ গ্রের উপর ক্রিয়া সাধক নিজে অঙ্গুষ্ঠদ্বয়ের অগ্রভাগ তাহার অঙ্গুষ্ঠা- সংযুক্ত করিবেন। নিজের বাম হস্ত তিক- ভাবে তাহার বামহস্ত ধরিবেন, এবং দক্ষিণ হস্তে দক্ষিণ হস্ত ধরিবেন। পাত্র নূতন হইলে তাহার মনে এমন ধারণা করিয়া দিতে হয় ; যাহাতে শীঘ্রই তাহার বশীভুত হইবার উপযুক্ত হয়। ২-পাত্রের মধ্যস্থলে স্থির, ধীরভাবে দৃষ্টি নিয়ো- জিত রাখিয়া একাগ্ৰমনে ক্রিয়া পাত্রকে নিদ্রাভিভূত করিবার ইচ্ছা করিতে থাকিবেন। ক্রিয়া পাত্রের ও নিজের হাতের উত্তাপ যতক্ষণ সমান না হয়, সে পর্যন্ত অঙ্গুলীতে অঙ্গুলি লাগাইয়া রাখিবেন। উভয়ের হস্তের তাপ সমান হইতে কতক্ষণ লাগিবে, বলা যায় না। ৩।—উভয়ের হাতের উত্তাপ সমান হইলে মেয়েরি ক্রিয়া আরম্ভ করিবেন। পাত্রের মস্তকের উপর লঘুভাবে হাতের তেলাে স্থাপনা করিবেন, যেন আপনার করতল দ্বারা তাহার ললাট আবৃত হয় এবং অঙ্গুলিসকলের অগ্রভাগ তাহার মস্তকের উপর ভর রাখিবেন, অথবা এমন ভাবে হস্ত স্থাপন করিবেন, যাহাতে করতল দ্বারা তাহার চক্ষের উপর আবরণ পড়ে এবং অঙ্গুলিগুলি তাহার মাথার চুলের সম্মুখ সীমা পর্যন্ত থাকে এবং উভয়ের
১১৬
মেমেরিজ বা শক্তি চালনা।
মন্তক নিকটবর্তী করিবেন।
হাতের কনুই দুটী
হাঁটুর উপর স্থাপন করিলে হাত শীঘ্র ভার হইয়া
আসে না।
৪।যতক্ষণ তাহারচক্ষু বুজিয়া না আসে বা পাতায়
পাতায় জোড়া লাগিয়া না যায়, ততক্ষণ ক্রমাগত ঐ প্রণা-
লীতে তাহার মস্তকের উপর শক্তি সঞ্চার করিতে থাকি
বেন। যদি নিজের নির্বন্ধ্যাতিশষ্য থাকে এবং ক্রিয়া
পাত্র যদি প্রতিকুলতাচরণ না করে, তবে বশীভূত হইবেই
হইবে। খুব বেশী হইলেও আধ ঘণ্টার বেশী লাগে না।
ফল কথা যতক্ষণ চক্ষু আবদ্ধ না হয়, ততক্ষণ
হইবেন না।
৫-যখন চক্ষু আবদ্ধ হইবে, তখন কপালের উপর
হইতে হাত তুলিয়া অঙ্গুলিগুলি বিস্তৃত করিয়া কিছুক্ষণ
ক্রমান্বয়ে উভয় চক্ষু, কপালে, মস্তকের শীর্ষ দেশে, মস্তকের
দুই পার্শ্বের এবং উহার পশ্চাৎ ভাগের অভিমুখ করিয়া
ধারণ করিবেন, তার পর মুখমণ্ডল, বক্ষঃস্থল ও উদরের
উপরও ঐ প্রকারে ধারণ করিবেন।
৬—এই সকল কাৰ্য্য যদি যথারীতি,একাগ্রতার সহিত
সম্পন্ন হয়, তবে মেসমেৱি কাৰ্য্য সুসম্পন্ন হইয়া থাকে।
৭—তার পর মেসমেরিক শক্তি পাত্রের উপর সঞ্চিত
অষ্টম পরিচ্ছেদ।
১১৭
করিয়া চালনা করিতে হইবে। সঞ্চিত শক্তি চালাইয়া
আনিবার সময় অগত্যা পাত্রের নিজ শক্তি ও কতকটা সেই
সঙ্গে আকৃষ্ট হইয়া থাকে।
৮-এই প্রক্রিয়া মস্তকের শীর্ষ স্থানের অল্প পশ্চাৎ
হইতে আরম্ভ করিয়া সম্মুখ ভাগের দুই বাহু দিয়া আস্তে
আস্তে নামাইয়া অঙ্গুলি পৰ্যন্ত আনিবেন। এক এক বার
সামনা সামনি কপাল হইতে মুখমণ্ডলের ও শরীরের উপর
দিয়া পেট ও হাঁটু পর্যন্ত আনিবেন, কিন্তু যেন মনে থাকে,
শরীরের একটু তফাৎ দিয়া হাত চালাইবেন।
৯।ইহাতেও যদি পাত্র নিদ্রাভিভূত না হয় বা আবার
তাহার চক্ষু তাকাইয়া যায়, তবে আধ ঘণ্টা পরে সমস্ত
ক্রিয়া বন্ধ করিয়া দিবেন; কিন্তু সাধক যদি তার পরও
শক্তি চালনা করেন, তবে ক্রিয়া পাত্রকে মেসমেরাইজ,
করিতে একটু বিলম্ব হইবে। প্রথম প্রথম স্বাভাবিক
নিদ্রার মতই দেখা যাইবে কিন্তু ক্রমাগত চালাইলে মে
মেরি অবস্থা পর পর বিকশিত হইতে থাকিবে। পাত্র
প্রথম নিদ্রিত হইলে তাহাকে কিছুক্ষণ ঘুমাইতে দিবেন।
কোন প্রকার বাধা দিবেন না। তাহার পর আকর্যণী,
প্রক্রিয়া চালাইবেন।
১০ -তৎপরে তাহাকে জিজ্ঞাসা করিবেন, সে কেমন
১১৮
মেসূমেরিজ বা শক্তি চালনা।
বােধ করিতেছে। তখন ক্রিয়া পাত্র আপনার প্রশ্নের
উত্তর দিবে, কিম্বা উত্তর না দিয়া ঘুমাইতে থাকিবে,
অথবা জাগিয়া উঠিবে । এই তিন অবস্থার এক অবস্থা
হইবে। যদি সে উত্তর দেয়, তবে বুঝিবে যে প্রকৃত মে
মেরি অবস্থা আসিয়াছে।
১১।—যদি উত্তর দিতে থাকে, তবে পর পর প্রশ্ন
করিবেন।
ক—তাহার এই প্রক্রিয়া ভাল লাগিছে কি না।
খ—ইহা অপেক্ষা কোন ভাল প্রণালী বলিয়া দিতে
পারে কি না।
গ—কোন গােপনীয় কথা বলিতে চাহে কিনা।
কোন উপদেশ দিতে চাহে কিনা।
ঘ-তাহার মাথার ভিতর কোন প্রকার আলাে
দেখিতেছে কিনা এবং সেই আলো সুসস্পষ্ট কি ছায়ার মত ?
—ক্রিয়া সাধককে দেখিতে পাইতেছ কিনা খা
দেখিতেছ, কোন স্থান দিয়া দেখিতেছ ? এবং কি,
করিলে আরও দৃষ্টি শক্তি স্পষ্ট হয় ?
চ-তােমার ও আমার শরীরের অভ্যন্তর ভাব
দেখিতে পাইতেছ কি না? আর সেই বিষয়ের জাৰী
কোন কথা তােমায় বলিবার কাছে কি না?
E
অষ্টম পরিচ্ছেদ।
ছ—দূর স্থানে যাইতে পার কি না ? এবং পরে
কি ঘটিবে, বলিতে পার কি না?
জকতদিনে তোমার মনের কথা আমি জানিতে
পারিব। এই সকল প্রশ্নের উত্তর যে ভাবে তাহার
নিকট পাইবেন; সেই ভাবে তার পর প্রশ্ন করিতে হইবে
অথবা যতক্ষণ দিব্য দৃষ্টি তাহার না হয়, ততক্ষণ নিস্তব্ধ
থাকিতে হইবে।
১২।যতক্ষণ নিদ্রিত থাকিবে, ততক্ষণ ঘুনাইতে
এদিবেন। যদি নিজে জাগিতে চাহে বা ক্লান্ত বোধ করে,
তবে জাগাইয়া দিবেন। জাগাইবার পূৰ্বে ঘুমের সময়ের
ঘটনাবলি জাগিবার পর ভুলিয়া যাইতে বলিয়া দিবেন।
১৩~-পাত্রকে জাগাইবার জন্য বিপরীত পাশ দিবার
উপায়। যথা--পাত্রের চেয়াবের পিছনদিকে বাড়াইয়া দুই
পাশ দিয়া তাহার হাঁটু হইতে আরম্ভ করিয়া দুই বাহুর উপর
মস্তক পর্যন্ত বিপরীত ভাবেপাশ দিবেন এবং মুখের
সম্মুখে দ্রুতগতিতে, হস্তাঙ্গুলি সমূহকে উর্ধদিকে চালিত
করিয়া জাগাইয়া দিবেন। কদাচ হঠাৎ জাগাইয়া দিবার
চেষ্টা করবেন না। দেরী হইতে থাকিলে সময় নির্ধারিত
করিয়া দিয়াও তাড়া লাগাইবেন না।
ক্রিয়া পাত্রের
সুবিধা মত জাগিতে দিবেন। তাড়াতাড়ি করিবেন না।
.
১২ মেস মেরিজম্ বা শক্তি চালনা। মেসমেরাইজ, করিবার আরও অনেক উপায় বা প্রক্রিয়া আছে ; তন্মধ্যে উইলস সাহেবের মতানুযায়ী পাশ দিবার নিয়ম বলিয়াছি। এক্ষণে নূতন সাধককে দু’চারিটী কথা বলিব। ১।মনের একাগ্রত দৃঢ় করিবার জন্য প্রত্যই কোন একটা নিয়মিত বস্তুতে ধ্যানপ্রবাহ অভ্যাস করিবেন। এইটাই অতিশয় প্রয়ােজনীয় ও কঠিন বিষয়। মনকে স্থির করা অতীব কঠিন কাৰ্য। ইহা যােগী ব্যক্তিরও কষ্টসাধ্য। অর্জুন শ্রীকৃষ্ণকে যখন কহিলেন-- চঞ্চলং হি মনঃ কৃষ্ণ প্রমাখি বলবদ্ছ। তসাহং নিগ্রহং মনে বায়ােরিব ‘সুদুরম্ ॥৬) হে কৃষ্ণ, মন সদাই চঞ্চল, অজেয় ও দৃঢ়। আমি তাহার রােধ করা বায়ুর নিবােধের ন্যায় দুস্কর মনে করিতেছি। তখন তিনি বলিলেন- অসংশয়ং মহাবাহো মনাে দুর্নিগ্রহং'চলম।
অষ্টম পরিচ্ছেদ
১২১
অভ্যাসেন তু কৌন্তেয় বৈরাগ্যেণ চ
গৃহাতে।৬৩৫
তখন তিনি কহিলেন--মন দুর্নিগ্রহ ও চঞ্চল তাহাতে
সন্দেহ মাত্র নাই, কিন্তু অভ্যাস ও বৈরাগ্য দ্বারা মনকে
বশীভূত করা যায় ।
এই মনকে বশীভূত করিবার জন্য হিন্দু ধর্ম গ্রন্থে বহু
বহু উপায় নির্ণীত হইয়াছে। সে সকল যাহারা জ্ঞাত
আছেন ; তাহাদের কোটী কোটী প্রণাম। তাহাদের
নিকট শিক্ষা করিতে হইবে।
ক্রিয়া পাত্রে শক্তি চালনা
দ্বারা নিজের
জীবনীশক্তি ক্ষীণ ও দুর্বল হইয়া পড়ে। তাহাতে নিজের
সমূহ ক্ষতি ও বিপদ আছে সুতরাং অনেক রােগীকে এক
দিনে নিদ্রিত করিবেন না। নিজের চিন্তাকে দৃঢ় রাখি-
বেন। স্বার্থবােধ একেবারে না থাকে। কোন প্রকার
থাকিলেই বিপদ + নিজের বাহাদুরী
নিজের বাহাদুরী দেখান বা
প্রতিপত্তির ইচ্ছা পৰ্যন্ত না থাকে
নবম পরিচ্ছেদ।
রোগী বৃত্তান্ত।
একদিন শীতকাল। শীতকাল হলেও শীত বেশী নয়।
কোন স্থানে যাইবার জন্য প্রত্যুষে বাহির হইলাম।
অত্যন্ত কোয়াসা হইয়াছে, কোলের মানুষও কষ্টে দেখা
যায়। একটু মাঠ পার হয়েই একটা পুকুর। পুকুরের
জলটুকু অতি পরিষ্কার, যেন কাকচক্ষু।
পুকুরের পাড়ে
কোন গাছ আদি নাই। পাড়ে কয়েকজন সাঁওতাল বাস
করে। তাহাদের ঘর গুলি তফাৎ তফাৎ। মধ্যে মধ্যে
ধান শুখাইবার খামার বা উঠন। খামারগুলি পরিষ্কার
নিকান।
আমি পুকুরের পাড়ে উঠিবামাত্র একটা বৃদ্ধ। সাঁওতানি।
আমার নিকট আসিয়া বলিল “ওরে বাবু দয়া কোরে
আমার ঘরকে আয় বােলে কেঁদে ফেললে। আমি তাহার
সঙ্গে সঙ্গে চলিলাম।
একটা কুড়ের নিকট গিয়া দেখি ; প্রায় ২০২২ জন
সাঁওতাল কঁড়ের বাহিরে পরিষ্কার মাটীতে বিষন্নতাবে বসিয়া
নবম পরিচ্ছেদ।
;
কি কথাবর্তা কহিতেছে। আমাকে দেখিয়া কথা বন্ধ
করিল। যাহা শুনিলাম, তাহার অর্থবােধ হইল না।
তবে রােগীর কথাই হইতেছে, বুঝিলাম।
তার পর কুটীর মধ্যে প্রবিষ্ট হইয়া দেখি, ঘরখানি অতি
পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ; লাল মাটিদিয়ে বেশ কোরে মেজে ও
দেওয়ালের গা পর্যন্ত নিকান। দেওয়ালের ঠিক মাঝখানে
এক বৃন্তে দুইটী পদ্মফুল আঁকা। মেজেতে দড়ি দিয়া ছাওয়া
একখানি বাঁশের খাটে ময়লা কঁাথার উপর ফরসা কাপড়
পাতা, তদুপরি ২• হইতে ২৫ বৎসরের একটি যুবা মৃত্যু
শষায় পড়িয়া শ্বাস টানিতেছে। চক্ষে জল পড়িতেছো,
উদ্ধ দৃষ্টি। শ্বাস প্রশ্বাস উভয় কালেই প্রচুর শ্লেষ্মার
ঘড়ঘড়ানি দূর হইতে শুনা যাইতেছে। নাড়ী আছে, কিন্তু
ভাল নয়, স্বল্প বিরাম বা সবিরাম। কপালে ও গলায় ঘাম
হইতেছে, জিজ্ঞাসা করায় কহিল, যে দিন অত্যন্ত কোয়াস।
ছল, তার পরদিন হইতে সর্দি ও জ্বর হয়েছে।
আজ রাত্রি (কাল রাত্রি ) হ'তে এইরূপ হয়েছে, আজ্ঞে ।
বৃদ্ধা কহিল—হরে বাবু তুই বলতে পারু? ছাে।
কি বে-খৈরে মারা যাবে ? কোন দেবতা পেয়েছে কি ?
আমি বলিলাম—আমি দাওয়াই বোে, দাম দিতে হবে
না, খায়াইবি কি?
১২৪
মেসূমেরিজম, বা শক্তি চালনা।
স্ত্রীলােকটী কহিল—দিবি? তুই আমাদের যখন যা
বুবি সব করবাে।
বলাবাহুল্য, যখন প্রথমে আমি ঘরে প্রবিষ্ট হই; তখন
বাহিরের পুরুষের মধ্যে দুতিন জন ঘরে ডুকিয়া আমার
পশ্চাতে দাড়াইয়াছিল। তন্মধ্যে
একজন সাঁওতালী
ভাষায় ; কি, কি ভাষায় ঐ স্ত্রীলােকটাকে কি বলিল।
তাহার এক বর্ণও বুঝিলাম না, কিন্তু স্ত্রীলােকটীর মত
বদলাইল। সে আমাকে কহিল দেখ বাবু! আমাদের
ওঝা বুলছে, “তারা দেখবে আমি তাের কাছে পরে
ষাবো। আমার হৃদয়টা ভাঙ্গিয়া গেল। হায় হায় এই
যুবা! কি আর করবে।
আমি যেখানে যাইতেছিলাম, তথাকার কাজ সেরে
ফেরৎ আসার সময় আমার সাধ্যমত দ্রুত আসতে
লাগলাম। আর ঐ যুবার ভাবনাই ভাবিতে ভাবিতে
আসিতে লাগিলাম, কিন্তু হায় হায় কি আর দেখ q11,
এতক্ষণ হয় তো সব লীলাখেলা মিটিয়া গিয়াছে। বড়ই,
প্রাণটা কেমন কোতে লাগলো। তখন বেলা ৯টা ১০টা
হয়েছে, কিন্তু মেঘ কোরে থাকার মত আছে।
আসিয়া দেখি--রােগীকে ঘর থেকে পরিষ্কার নিন
খামারে বাহির করিয়া একটা পরিস্কার মোটা লাল
নবম পরিচ্ছেদ।
পেড়ে কাপড় মাটিতে পাতিয়া শশাওয়াছে। একটা নূতন
মাটির ভাঁড়ে জল দিয়া পরিষ্কার একটা বেদীর উপর বসা-
ইয়া তাহাতে সিদুর দিয়াছে এবং বেদীর চারিদিকে সিদুর
ছড়াইয়াছে । একটী লাল জবাফুল ঘটেরমুখে ও তিন চারটা
চারিদিকে ছড়ান আছে। ঘট ও রােগী বেড়িয়া সিদুরের
ছড়া দিয়াছে। ঘটের সম্মুখে একটা গলাকাটা পায়রা,
পড়িয়া আছে। তাহার রক্তে মাটি কতদুর রক্তাক্ত
করিয়াছে।
সেই সব সাঁওতাল পুরুষগণ হাত ধরাধরি করিয়া, সেই
রােগী, ঘট ও মৃত পায়রাকে প্রদক্ষিণ করিয়া সুর করিয়া
মন্ত্র আওড়াইতেছে, আর ঘুরিয়া ঘুরিয়া নাচিতেছে। অপর
একজন সেই গানের সঙ্গে মাদল বাজাইতেছে ও নাচি-
তেছে। গানের বিরম নাই, নৃত্যেরও বিরাম নাই,
বাজনারও বিরাম নাই, মন্ত্রের অর্থ কিছুই বুঝাষায় না। তবে
কাছে কালী ও চণ্ডী, এই শব্দ মাত্র বুঝলাম।
আমি রােগীর নিকট যাইবার চেষ্টা করায়, তাহারা
নিষেধ করিল।
আমার বাসায় চলিয়া আসাবার সময়
দূর হইতে যেন রােগীর অবস্থা কিছু ভাল মনে করিলাম,
আরাদির পর কৌতুহল পরবশ হইয়া যাইয়া যাহা
দেখিলাম—আশ্চৰ্য্য হইলাম। ওঝারা সব তফাতে বসিয়া
মেসূমেরিজ বা শক্তি চালনা।
আমােদ প্রমোদ করিতেছে। তখন বেলা ১২টা কি ১টা
রােগী তাহাদের মাঝে নিয়ােগ সুস্থ ব্যক্তির মত বসিয়া
ভাত খাইতেছে। রােগী বলিতেছে, আর খাব না। ওঝরা
খাইতে বলছে।
আমি রােগী দেখিতে চাহিলাম। তাদের মত হলো
না। বলে কি দেখবি ও ভাল হয়েছে, কাল দেখুস্ ।
আশ্চৰ্য্য হইলাম ।
আমার বােধ হয়, ইহাও মেসমেরিকৃ ব্যাপার।
সমাপ্ত।
বৈঁচিগ্রাম, জেলা হুগলি,
সুপ্রসিদ্ধ হােমিওপ্যাথ ডাক্তার শ্রীমহেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য
পুস্তকাবলি
১। সংক্ষিপ্ত-ভৈষজ্য-রত্ন (রিপাট রি সহ )
২। পকেট-ভৈষজ্য-সােপান ঐ
৩। হােমিওপ্যাথিক ঔষধের সম্বন্ধনির্ণয় ও প্রতিকার ৩০
৪। বৃহৎ নিউমােনিয়া-সন্দর্ভ (রিপাটরি সহ)
৪। টাইফয়েড-ফিবায়-চিকিৎসা, সুপ্রসিদ্ধ ডাঃ ই, বি,
ন্যাসের, লিডার-ই-টাইফয়েডেরঅনুবাদ, বহু
রােগী বৃত্তান্ত ও (রিপাটিরি সহ) তৃতীয় সংস্করণ ১৩
৬। এলাউঠা-বিজয় ( রিপটরি সহ)
৭। হােমিওপ্যাথিক ঔষধের সাদৃশ্য
৮। প্লেগ-চিকিৎসা (রিপাট রি সহ )
৯। পকেট-রিপাটারি (হােমিওপ্যাথি ঔষধের
প্রসূতি-সহায়
১১। চিকিৎস'-সেতু (প্রাক টী) প্রথম ভাগ
১২। চিকিৎসা-সেতু দ্বিতীয় ভাগ
১৩। বসস্তু ও হাম চিকিৎসা
অর্শ-চিকিৎসা
১৫। এপেণ্ডিসাইটী”চিকিৎসা
১া
১৮০
৩
১৪।
( ২ )
১৬। আত্মনাত্ম বিবেকঃ (অনুবাদ সহ)
১৭। ধর্মের তিনটী পথ (উৎকৃষ্ট বঁাধান)
০
১৮। স্ত্রীর প্রতি উপদেশ
১৯। বাণ যুদ্ধ
মােহ-মুগর (তানুবাদ সহ )
২১। বিদ্যালয়
২২। শিশুযকৃৎ (যন্ত্রস্থ)
২৩। মেমেরিজ বা শক্তিচালনা
কি কবিরাজ, কি হােমিওপ্যাথ, কি এলােপ্যাথ, সকল
চিকিৎসকের ইহা অবশ্য পাঠ করা উচিত। যদি রােগী
আনােগ্য করিতে চাহেন, তবে অবশ্য পাঠ করিবেন। শিশু
লইয়া যাহারা সংসার করেন, তাহারা এই মেমেৰিমজ
শিক্ষা রাখিয়া দেখুন, কি উপকার পান।
২৪। চিকিৎসা বিজ্ঞান দর্শন
কোথায় রােগ হয়, কেমন করিয়া আরােগ্য হয়, সধ
কি এবং তাহাতে কেমন করিয়া রােগ আরােগ্য হয়।
হােমিওপ্যাথিক, এলোপ্যাথিকৃ, ও কবিরাজী চিকিৎসা
কি? জানা থাকা সকল চিকিৎসকের উচিত। কাহারও
উপর কাহারও বিদ্বেষ থাকা উচিত নয়। সকলের সুবিধার
জন্য মূল্য তিন আনা মাত্র।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.