Makardah Saraswat Library, Howrah

Nishi Padma Ed.1st

Sanyal, Probodh Kumar · 2009/07/14

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

সূচী
শিপদ্ম
প্রথম
রায়ণ
সাধন
ন্দোপতন
কামনা
তাস দিল দোল
১৪৩

উষারাণী বসু শ্রদ্ধাভাজনীয়া — নিশিপন্ন

ইহসটাপাধ্যায় :
ওসমপন্নপপ
১৯৯৭uংসদ ধাট
w.
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
এপম সংস্করণ
পৌষ ১৩৩৮
দেড় টাকা
EDIA
साउन धिन्दिाशार्वज
au som dowlon Firm.

নিশিপদ্ম

চি :
একটি চরিত্রহীন নারীর কামনা
ও মিথ্যাভাষণ নিয়ে এই গল্প।

কাশীধামে বিশ্বনাথের সঙ্কীর্ণ গলির পথে দু’জনে দেখা।
বিস্ময় ও আনন্দের মধ্যে দু’জনে দু'জনকে চিনতে পারল। কিন্তু
এ চেনার মধ্যে ছিল অনেকখানি বিস্মৃতি'ও অনেকটা ব্যবধান।
সে ব্যবধান বহুদিনের।
স্বামী আর স্ত্রী, শৈলেশ আর উমা। পথ দিয়ে তারা
চলেছিল। চলেছিল মন্দির-দর্শনে। অনেক দেশ ঘুরে তারা
কাশীতে এসে পৌঁছেছে।
মন্দিরে তখন রাত্রের দ্বিতীয় আরতির ঘণ্টা দিতে আর দেরী
নেই। চোখে-চোখে কিয়ৎক্ষণ তাকিয়ে উমা গিয়ে খ’, করে
তার একখানি হাত ধরে বলে উঠলো, পার্বতী ।
পাৰ্বতী থম্‌কে দাড়িয়ে একটা ঢোক গিলে বল, চিতে
পেরেছি। ভাল ত? এ দেশে যে ?
আনন্দের আবেগে উমা বলে উঠলো, পার্বতী, কোথা ছিলি
ভাই এতদিন ?
একটা দোকানের উগ্র আলাে এসে উমার মুখের ওপর
পড়েছিল। তার মাথায় সিদুর স্ব স্বল করছে। তার পিছনে ,
শৈলেশের সঙ্গে পার্বতীর একটিবার মাত্র চোখচােখি হ’ল। স্ত্রীর
অলক্ষ্যে শৈলেশ নি:শব্দে তাকে একটি নমস্কার করল, পাৰ্বতী উমার
সুমুখে সে নমস্কারের কোনাে প্রতুত্তরই দিল না, শুধু নিমেষত্র
কি যেন চিন্তা করে বল, স্বামীর সঙ্গে ঘুরতে বেরিয়েছিস?
s

নিশিপদ্ম
মাঝামাঝি খানিকটা ব্যবধান রেখে শৈলেশ এগিয়ে চলতে
লাগল। উমা বলল, হ্যা, দিল্লী আগৱা এলাহাবাদ সব হয়ে
এলাম-এবার ফেরবার মুখ। কিন্তু—উঃ কতদিন ধরে তােকে
যে স্বপ্ন দেখেছি পার্বতী, তাই ভাবি। এখন আর স্বপ্নেও তােকে
পাইনে। কেমন আছিস বল ? এ দেশে বিয়ে হয়েছে ? বেশ!
স্বামীর সঙ্গে বেরােসনি কেন? স্বাধীন হয়েছিস বুঝি খুব ?
নাম কি স্বামীর?
পার্বতী হেসে বলল, ঝড়ের চেয়ে ছুটছিস যে! বলি এ দেশে
কি জন্যে ? হাওয়া খাবার জায়গা কি আর জুটলাে না পৃথিবীতে ?
তীর্থ করতে নাকি রে ?
উমা হেসে বলল, হ্যা, বুড়াে হয়েছি, কবে বলতে কবে-
পাৰ্বতী বল্ল, চল, চলতে চলতে কথা বলি।
আরতি দেখা আর হল না, সবাই মিলে আস্তে আস্তে হেঁটে
চলল। পাৰ্বতী বল, আরতি, পূজো, গঙ্গা নাওয়া, ঠাকুরদের
পায়ে মাথা ঠোকা, এসব আমার আসে না ভাই, এদিকে
ভক্তি-ছো আমার বিশেষ নেই তা বলেই দিচ্ছি।
উমা চোখ বড় বড় করে বলল, সেই মেয়ে তুই, তাের কথা
ভাবলেই আমার হাসি পায়। পাড়ায় আমাদের সুনামের বহর
কি রকম ছিল বল ত? বাপরে, কি মিথ্যেবাদীই তুই ছিলি
ভাই!

নিশিপ পাৰ্বতী হা, হেসে বল্ল, তােদর বাড়ীতে সেই মনুয়া পাখীগুলাে আছে ? সেই জলি কুকুরটা? সেই লেজকাটা কোকিলটা ত মরেই গেল। তােদের সেই নেড়ি ঝি মুখপুড়ি বেঁচে আছে ? না ভাই, সে এই বছর দুই হ’ল- বাচা গেছে। হতভাগি আমাদের নামে কি লাগানই লাগাতো!—তারপর একটু থেমে পার্বতী আবার বলতে লাগল, বড় বড় ঘটনা আমার মনে থাকে না ভাই। আমি শুধু ভাবি আমাদের সেই বেলতলার ছাদ, শ্যাওলাপড়া পাচিল, অপরাজিতার চারা, আমি ভাবি ভিতের ফাটলে চামচিকের বাসা। কোন্ দিকে যে সবাই চলেছে তার কোনাে ঠিক নেই। পাৰ্বতী তার অতীত জীবনের দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে ধীরে ধীরে বলতে লাগল, সামনে যাদের কোনাে সম্বল নেই তারাই পিছন দিকে তাকায়। মনে পড়ে চিল-কোঠার মধ্যে আমরা বউ-বউ খেলতাম। দূরের মাঠে ঝ। ঝ। বােদ, সুপুরি গাছে ঘুঘু ডাক্ত। বর্ষাকালে মেঘ জমলে আমাদের বেলতলা অন্ধকার হয়ে আসত, ঝড় বইতে শুরু করলে আমরা গায়ের আঁচল উড়িয়ে ময়ুরের পেখম খেতাম ! উমা অবাক হয়ে শুনতে শুনতে পথ চলছিল। শৈলেশ আগে আগে চলেছে।

নিশিপদ্ম পাৰ্বতী এক সময় বল, তাের বর কি করেন উমা ? উনি ভাই ডাক্তার ! ডাক্তার ? হঁা, আচ্ছা কই তােমার স্বামীর কথা কিছু বললে না ত ? পাৰ্বতী হেসে বল, আমার উনিও ভাই ডাক্তার। পসার খুব—দিনে রাতে এতটুকু বাবুর সময় নেই। সবাই কিন্তু ভাল- বাসে, আমার কানের কাছে কেবলই বলে, অমন ডাক্তার আর হবে না। যেমন রূপে কার্তিক, তেমনি গুণ – উমা সলজ্জ ভাবে বলল, ওঁর কথা আর বলল না ভাই, এইটুকু শুধু জানি, মাসে একটি করে রুগী ও ওর কাছে আসে কিনা সন্দেহ। পার্বতী বলল, আমার এর কথা ছেড়েই দাও। বোম ভােলানাথ। আমাকে নৈলে এতটুকু চলে না। এই যে বেড়াতে এসেছি, ব্য-ফিরে গিয়ে দেখব হয়ত’ মাথায় হাত দিয়েই বসে আছেন। পুরুষ মানুষে একবার ভাল বাসলে আর রক্ষে নেই। পাছে অগ্রগামী শৈলেশ শুনতে পায়, উমা চট করে পার্বতীর গা টিপে দিল। পার্বতী আর একটু গলা নামিয়ে বলল, আজ ত’ দেখছ আমি এই অবস্থায় এসেছি, কিন্তু উনি যেদিন সঙ্গে নিয়ে বেরােবেন,—এই একেবারে ঠিক তােমাদের মতন ভাই.. সেজে গুজে রাস্তার লােকেরা পর্যন্ত তাকিয়ে থাকে। পুরুষরা অমনিই

নিশিe
উমা, ইনিই বল আর তিনিই বল, কেমন করে ভাল বাসছি
এ তাদের দেখানই চাই।
উমা বল, তার বয়েস বুঝি অল্প ?
হ্যা, এই আমার চেয়ে বছর পাঁচেকের বড় আর কি। যে
ভাই দেখাতে ইচ্ছে করে। ছিপছিপে, ফুস, চশমা চোখে, গো
কামানাে, চোখ দুটি সরল, হাসি-হাসি মুখটি, কালো-কা
কেঁাড়ান চুল—হঠাং উনার মঞ্চের দিকে চেয়ে পার্বতী বল
তােমার বরের সঙ্গে বেশ আদল আসে ভাই।
উমা বলল, ছেলেপুলে এখনাে হয়নি ত ?
ছেলে !–কস্মাৎ যেন পার্বতীর চমক ভালো। ছাড়
করে মাথা নেড়ে জানাল, হয়নি।
তাবার খানিকক্ষণ নিঃশব্দে দু’জনে চত লাগত।
খুজে না খেয়ে এক সময় উম , যতদিন না হয় ততদিন
ভাল, তা সে যে যাই বলুক ।
পাৰ্বতী শুধু বলল, হু।
উমা বলল, কালকেই আমাদের চলে যেতে হবে, নৈর
তােমার ওখানে একদিন বেড়াতে যেতাম ভাই।
কালকেই চলে যাবে ? :.ইস, আমিও ভাবছিলাম তােমা
একদিন নেমন্তন্ন করে নিয়ে যাবে, দেখতে তােমাৰ ভগ্নিপতি
কেমন সৌখীন। তার হাতে পড়ে আমার তাই। দু’?

নিশিপদ্ম মিলে দিনরাত কেবল ঘরই সাজাচ্ছি। ঘরটি আমাদের স্বপ্ন দিয়ে তৈরী। সামনে ফুলবাগান, দিনরাত গন্ধে ভুর ভুর করে। তার পাগলামি শুলে তুই হাসবি ভাই। রােজ একটি করে বকুলের মালা তার জন্যে গেঁথে রাখা চাই। বিছানা হবে রােজ ফুলশযয্য। এমন জায়গায় হবে ৫ন চাঁদের আলাে এসে পড়ে। জার ধারে নিমগাছ, তার তলায় রজনী- গন্ধার বন। মুখ টিপে হেসে উমা বলল, ডাক্তার মানুষের এমন কবিত্ব ! পাৰ্বতীনিজের মনেই তখন বলে চলেছে, তাই ঘরটির ওপর আমারাে ভাই মায়া পড়ে গেছে। ওটি আমাদের দু'জনের কষ্টি। আমাদের দুঃখের দিনে ও আমাদের কোলে করে রাখে। মিট- । মট করে আমাদের ঘরে যখন আলো জ্বলে, ভাবি, কাঙালিনী মা যন আলাে হাতে নিয়ে সন্তানের পথ চেয়ে বসে আছে। মাঝে ঝে মাটির সোঁদা গন্ধ পাই ; ভিজে হাওয়ার আমেজ চোখে মুখে গে, আনমনা ভােরের হাওয়া চলাচল করে, উমা, আমি সত্যিই 'খী ভাই ! তার আবেগ-বিহ্বল মুখখানির দিকে তাকিয়ে উমা বল, কি বুলি পাৰ্বতী ? সুখী ? হী, সুখী, কেন না আর আমাদের কোনাে দুরাশা নেই, মিরা আর কোথাও হাত পাতিনে, যের কাছেও না,

নিশিপদ্ম
মানুষ যার সৃষ্টি তার কাছেও না ! শুনবি তবে?-পাৰ্বতী
উজ্জ্বল হাসি হেসে কম্পিত দীপ্ত কণ্ঠে বলতে লাগল, হয়ত
তখন আমরা ঘুমের ঘােরে, মনে হয় আস্তে আস্তে আমাদের ঘর
খানি এই দুঃখের পৃথিবী থেকে বাধন খুলে নিয়ে শূন্যলােকে উড়ে
যেতে থাকে, চিত্রলেখার গল্প শুনেছিস ত.. ঠিক তেমনি, দুল
দুতে হেলতে হেতে মেঘ-লােকের ওপারে চলেছি: স্বর্গ
মর্ত্যের সন্ধিস্থল ; দুঃখ নেই, দাহ নেই শুধু আমরা উধাও হয়ে
চললাম. তারপর জেগে উঠে দেখি, ও হরি, তেমনিই আছি ।
সেই আলাে, সেই দক্ষিণের জাল্লা খােলা, তেমনি রজনীগন্ধা
গন্ধ, নিমগাছটি ঝির ঝির করছে,হয়ত বা বর্ষার জলাে হাওয়া
বিছানার একদিক ঠাণ্ডা হয়ে গেছে::
উমা বল্ল, আমরা চলেছি কতদূর? তাের বাড়ী কোন্‌নিবে
পাৰ্বতী ?
পার্বতীর যেন চমক ভালো, অন্ধকার পথে সে তার স্বপ্নম
দৃষ্টি প্রসারিত করে একবার চারিদিক তাকাল।
ভুলে গেছে।
পাৰ্বতী ?
কি রে ?
উমা অন্ধকারে তার মুখের দিকে হঠাৎ মুখ তুতে'। 'ব
কাদচিস নাকি ?
:

নিশি পদ্ম
f
পার্ধতী হেসে বলল, ও কিছু না, রাত হলেই আমার চোখে
জ' আসে।
উমা চুপ করে রইল।
গৰ্ব্বতী বলল, আচ্ছা ভাই, এবারের মতন তাহলে—এই
বে, মিশ্রিপুকুর ছেড়ে এসেছি, আর নয় । --একটু পথের পাশে
সরে এসে অকস্মাৎ সে উমাকে জঙিয়ে ধরে চুম্বন করে’
গঃ
বলল, মনে রাখিস, চললাঃ।
হাত ছাড়িয়ে নিয়ে সে পিছন ফি । যে পথে এতক্ষণ
এসেছিল, সেই পথ ধরেই তাকে আদালতে হবে। কিন্তু
ম
কয়েক ল গিয়ে সে একবার থমকে দাড়া, কিয়রে উনা ও
T:
শৈলের দু’টি অস্পষ্ট ১টি একত্র নিয়েছে, সেই দিকে তাকিয়ে
में
তার চোখ পলক যেন অার পড়ে না।
যঃ
সেইনে দাড়ি অপলক দৃষ্টি তার প্রসারিত হয়েই রইল ;
গে নে তার অৱিীম কান্তি ও নিরংহ জুড়িয়ে গেছে।
ন
এইখানে এই পথের ধারে দাঁড়িয়েই সেনা পারে পীরে তার চোখের
তবে সন্ধ্যার মত অবসন্ন তন্দ্রা নেমে আসে।
s
লি
fাম
দু’জনে অনেকক্ষণ বাসায় ফিরেছে। শৈলেশ সেই থেকে
চুপ করে বারান্দায় একটা চেয়ারে হেলান দিয়ে বসেছিল, এতগণ

নিশিপ
পৰ্যন্ত সে একটিও কথা কয়নি। দূর আকাশে কৃষ্ণপক্ষের চা
উঠেছে, আর একদিকের সমস্তটাই আবছা অন্ধকার। আকাঃ
তারা নেই, পশ্চিম দিকটায় মেঘ করেছে ; বােধ হয় ভাতি
রাতে বৃষ্টি নামবে।
পিছনে এসে উমা দাড়ালাে, জিজ্ঞেস্ করল, ব নেবাে ?
উত্তর না পেয়ে একটু বাদে উম আবার বলল, আজ ৫ ব
চুপ চাপ ?-পাৰ্বতীকে দেখলে ? কেমন মেয়ে বল ?
শৈলেশ শুধু বহু !
উমা পিছন থেকে ঝুকে মুখের কাছে মুখ এনে বক, ি
ভাবছো শুনি?
শৈলেশ বলল, তােমার পার্বতীর কথাই ভাবছি।
কি আশ্চর্য, তুমি যে তার কথা ভাবছিলে এও হ
ভাবছিলাম।
চমংকার মেয়ে পার্বতী।
হ্যা, চমংকার!—বলতে বলতে শৈলেশ উঠে দাড়াল, তার
বলল, কত গল্পই ত’ করে এলে। জিজ্ঞেস করলে না কেন
পাৰ্ব্বতী, তােমার দিন চলে কেমন করে ?
দুটি সরল দৃষ্টি তুলে উমা বলল, সে কি, সে যে মেয়েমানুষ,
আমার দিন চলে কেমন করে ?
শৈলেশ চট করে ঘাড় ফেরালে। বলল, মেয়েমানুষের স্বভ
চরিত্রের আলােচনা করতে আমার লজ্জা হয় উমা, জানে। ত’?
১১

নিশিপদ্ম
কিন্তু পাৰ্ব্বতী-ওর স্বামী যে-
স্বামী ?—হাঃ হাঃ করে’ শৈলেশ হেসে উঠলাে। হাসতে
হাসতেই বল, স্বামীই যদি থাকবে তবে ঘুরে বেড়ায় কেন যেখানে
সেখানে, মন্দিরের চত্বরে পড়ে থাকে কেন রাতের বেলা ?
মনে হ’ল কে যেন উমার টুটি টিপে ধরেছে।
শৈলেশ নিজের মনে আবার হাসতে লাগল,—স্বামী, স্বামী ও
যখন-তখন রাস্তায় কুড়িয়ে পায় ! সেবার আমার এক বন্ধুকে
নিয়ে ও কেমন করে’ ছিনিমিনি খেলেছে তা কি ভুলে গেছি ?
আকাশে দুর্যোগ ততক্ষণে আসন্ন হয়ে এসেছে।

নারায়ণ

চিয় :
একটি কৃপণ ও সঞ্চয়ী মেয়ের
চরিত-বনা এই গল্পের প্রতিপা।

. দরিদ্র বটে কিন্তু হতশ নয়। স্বচ্ছন্দ শৃঙ্খলায় দারিদ্রন মাঝে মাঝে কষ্টকর হয়ে ওঠে। ছোট্ট সাজানাে একখানি ঘর, পরিচ্ছন্ন একটুখানি জায়গা, দক্ষিণ দিকে রেলিং-বেরা এক ফালি বারান্দা, ও তু: আর কেষ্টকলির চারা বসানাে এক টুকরাে উঠান, ৫ : পা, ওদিকে একটি শিউলি লের গাছ। স্বামী আর স্ত্রী ! তা বাইরে ছােটখাটো একটু আই বিরােধ থাকলেও একটি বড় ঐক্য দুজনের মধ্যে দেখা, বিটিমিটি তাদের যদি বা বাবে সেটা নেবার জন্যই। কোথায় বড় একটা কাপড়ের দোকান তন হি* কালে বেরােয় আর বের ই নিরীহ বেচারা। কোনো রকমে টি করে বে; এক- ৫ন তার পরম সার্থকতা। অথ) এদিকেও সে শির কুrি বেরােখার সময় স্নান করে মাথা এড়াতে নে এই ৩রকারী আলুনি হলেও নিবািদে সে আহার ক':, কা".ড়র ওপর ময়লা জাম চড়িয়ে এম খালি 1. বোর * ড়েনিক পথ গিয়ে জুতার কথা মনে পড়ত । ' ' , আসে অবশ্য। বন্ধু-বান্ধবের কাছে আড্ডা দিতে *** ধরণার কথা তার মনেই থাকে না । ভামিনী অত্যন্ত সুনী।

নিশিপ
খরচের ভয়ে
কিন্তু কোথায় যেন একটা তার খুৎ আছে।
" "সর মধ্যে অন্তত দশদিন সে রাত্রে রাধে না। বলে ওবেলায়
যাওয়া হয়েছে—বাবা রে! পেট একেবারে হাঁসফাস !
.উ..... তােমারও ত পেট ভরা রয়েছে দেখছি, যাও শুয়ে
পড় গে। নয় ত থৈ এক মুঠো আছে, দেবে?
অনাথ ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে বলে—থৈ ? এক মুঠো ?
থাক গে, দাও তবে এক ঘটি জলই দাও।
মেয়েটি এমনিই। নায্য খরচ বাঁচানােটা যেন তার তপস্যা।
মীর অজ্ঞাতে এক একটি আলা জমিয়ে সে নাকি দশ টাকা
করে তুলেছে। নানা উপায়ে সংসার থেকে আধলা-পয়সা
বাচিয়ে সে আপন গৃহসজ্জার হরেক রকমের সৌখীন জিনিস
কিনে আনায়।
এবং আনয় অত্যন্ত বিশ্বাসী লােককে
*য়ে—যে তার পয়সা চুরি করবে না। স্ত্রীলােককে সে সম্পূর্ণ
বিশ্বাস করে চলে। স্বামী যতক্ষণ বাড়া না থাকে ততক্ষণ
আজে-বাজে ছেড়া-ময়লা কাপড় পরে বেড়ায়। পাছে ময়লা
লে’ সাবান খরচ হয় এ জন্য গায়ে সেমিজ পরে না,-আবরু
দি একটু ক্ষুন্ন হয়..তা হােক, কে আর তার দিকে হা করে
য়ে আছে!
বলে—যার জমা কিছু নেই তার লক্ষ্মীও নেই! কিছু
কলে তবে কিছু আসে। বুঝলে?

নিশিপদ্ম মৃদু বিনীত কণ্ঠ অনাথ বলে—তা বলে’ উপােস করে’ পয়সা জমানােটা- ওই ত! উপপটাই তােমার কাছে বড় হয়ে উঠলাে ; কই দেখাও দেখি মচ্চি-মনোহরা খেয়ে ফতুর হওয়াটা কোন্ শাস্তরে লেখা আছে ? তুমি বড় পেটুক, তা তুমি যাই বল। অথচ পেটুক লােকের চেহারা ভাল হয়। তোমাকে এত খাওয়াই অথচ দিনকে দিন- এমনি তার সব তা'তেই। বলে—এই নতুন বর্ষায় জুতোটা যে গেল। নতুন জুতো! এবার প্রতিবাদ করতেই হয়। অনাথ বলে-নতুন ? গেল বছর ঠিক এমনি সময়- হা গাে হঁ্যা, কবে কি খরচ করচি সে আমার বেশ মনে আছে। মােট ত এক বছর হয়েছে, আড়াই টাকার জুতা আড়াই বছর চলে না? দোকান আর বাড়ী, বাড়ী আব দোকান -এই ত খাটুনি। বিষ্টির দিনে আমি তুলে রেখে দেবে তা বলে রাখছি। আর ভাঙা রাস্তায় যদি খয়া দিয়ে থাকে ত হাতে করে নিয়ে ওইটুকু পার হয়ে যেও-বুঝলে? স্বামীর প্রত্যেকটি খরচ সম্বন্ধে এমনি তার কৃপণতা এবং এতখানি তার আধিপত্য। কিন্তু তার সখ নেই এত বড় অপবাদ শত্রুতেও দেবে না। ১৭ নিশি ঘরের ভিতর ঢুকলে ঠিক তাই মনে হয়। ঝক্ঝকে দেরাজ- আলমারি এবং সুবিন্যস্ত খাট বিছানার দিকে তাকালে তার সুন্দর পেলব দুটি করতলের পরিচ্ছন্নতার পরিচয় দেয়। আসবাব- পত্রগুলি সে পরিষ্কার রাখে। কিন্তু ব্যহার করে না। বিছানা পেতে রাখে কিন্তু মাটীত শােয়। নতুন তােয়ালে গামছা টাঙানাে রয়েছে, সে কিন্তু হেড়া কাপড়েই থামােছে। এসেন্স, পমে, মাথার সুগন্ধী তেল, পাউডার, প্লে, ল্যাভেণ্ডার ওয়াটার, আয়না চিরুণী বুরুশ—সমস্তই আনকোরা এ ব্যবহৃত অবস্থায় চারিদিকে সাজানাে রয়েছে। ভাল কোনরূপ ছবি সে রাখে কারণ কোনাে নিষ্প গােজনের বস্তু উ:গ করবার মত স্পৃহা তার নেই। দু’গত দিয়ে সে া া তাই তার একান্ত আপনার। এবং এই অধিকারের আনন্দে সে মাঝে মাঝে এসে এদিক ওদিক চেয়ে তার এই সাজানাে গানের মধ্যে পায়চারি করে’হেসে চলে যায়। যৌবনের প্রাচুর্য তার সর্বাঙ্গে ঢল করে। হাজার হােক বয়স খুব কাচা। রা তার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে অনাথের যদি একটু নেশা ধরে ত অমনি সে সুবিধা নেয়। ভূমিকা করে প্রথমে বলেঘটে আজ চমৎকার সিদুর কৌটো দেখে এলাম। অনেক দান। জায়ান সিল্ভার। বলেচার আনা।

নিশিপদ্ম এত অল্প আয় থেকে হট করে চার আনা দামের কিছু কেনা চলে না। অনাথ চুপ করে থাকে। একটু পরে হাসিমুখে তাকে কাছে টেনে নিয়ে বলেনা কিনলেই চলবে না ? ভামিনী মুখ ফিরিয়ে একটু সরে গিয়ে বল—যখন তখন বুঝি আজকাল তােমার ওসব চলবে না ! আগে বল অনি একটি কৌটো কিনে দেবে ? কৌটো ত তােনার অনেক গুলাে আছে । তা হােক। আর একটি থাকতে নেই? আমি ; আর ব্যাভার করে নষ্ট করবাে না ! অমনি সাজিয়ে রেখে দেবো। বল দেবে ? আচ্ছা আচ্ছা, দেবাে।বলে হেসে অনাথ তাকে পর কাছে টেনে নেয়। একটু পরে নিজেকে মুক্ত করে উঠে গিয়ে সে অনাথের পকেট থেকে চার আনার পয়সা বার করে আনে। অবাক হয়ে অনাথ বলে—সত্যিই নিলে? বিক্রি ? আঁচলে পয়সা বাধতে বাঁধতে ভামিনী মৃদু মৃদু হাসে। অর্থ- গৃপ্ততাই যে ভালবাসাকে সব চেয়ে বেশী আবাত করে এ জ্ঞান বুঝি মেয়েটির নেই ! অনাথ বলে—বেশ ত তুমি! কড়ি না ফেলে বুঝি তেল মাখতে দেবে না ?

নিশিপদ্ধ
ভামিনী বলে--তা কি! আমি বাপু মেয়ে মানুষ। সঞ্চয়
করা আমাদের অভ্যেস। কাউকে ফাকি দিয়ে ত আর কিছু
জমাচ্ছিনে।
অনাথ বলে -াইরের লােকে কিছু মনে কর্তে পারে। এই ত
কিরণ আসহে একদিনের জন্যে, আজ দোকানে বসে চিঠি
পেলাম--
ভামিনী বলে তোমার কুটুথদের অতিথি হওয়ার জ্বালায়
আমি কি আর চিনে।
অনাথ একটু বলে—অতিথি যে নারায়ণ! তা ছাড়া
তাতে তােমার লাভই হয় !
-কি করে মাও সে ফেলে,-ত হয়। কিছু দেয়
বৈ নেয় না। সেই সবার মাগি শর কদিনের জন্য এসে আমার
মুখ দেখার নাম ক' কত কি িিস ,--আচ্ছা, তােমার
কিৰণ ভাইকে সেই বিয়ের সময় দেখলাম, না ?
কথা ওইতেই শেষ হয়ে গিয়েছিল। পরের দিন কি
একটা পর্ব উপলা চুটি। রান্না বান্না ড়াবার চেষ্টা চলছে।
টিপে টিপে হিসেব করে খুটিনাটি সব দিয়ে ভানি স্বামীকে
বাজারে পাঠালাে। এ বাজার থেকে অনাথ যখন ফিরে এল
সে তখন আবার কিসের এ নি, বসে গেল। বলমেছুনি

নিশিপ
ফড়েনি মাগিরা ভাল মানুষ পেয়ে ঠকায়, আমি কিছু বুঝিনে ?
বরং পুরুষ মানুষে ঠকালে সহ্য হয় কিন্তু মেয়েমানুষে-কে ?
ওই তােমার কিরণ-ভাই এল বুঝি, উঠে গিয়ে দেখাে দেখি ?
সুকেশ হাতে করে একটি বক উঠোন পেরিয়ে ভিতরে
এসে দাড়ালাে। বঙ্গ—বৌদি, প্ৰণান হই। ভাল আছ ত?
ঘাড় নেড়ে ভামিনী বলল -তুমি ?
হ্যা, ভাল আছি। তারপর অনাথ দা ? পর কি? বেশ
গুছিয়ে সংসার করছ দেখছি ; সুন্দরী বৌ পেতে কি আত্মীয়-
স্বজনকে ত্যাগ করতে হয় ?
অনাথ হেসে বলল--আর। বলে গুজনে দরে গিয়ে তো।
অনেকদিন অদর্শনের পর অনেক এল্পই দুজনের মধ্যে চলল।
হঠাৎ আসবার কারণ জিজ্ঞাসা করাতে কিরণ বলল—কাজ কৰ্ম্ম
বড় মন্দা পড়েছে ভাই, অর্ডার সাপ্লাই করেছি, এদিকে টাকা
আদায় করতে এসেছিলাম । আবার কালকেই
তারপর বিষয়ক সম্বন্ধে খানিকটা আলােচনা হল।
ভামিনী দরজার কাছে এসে দাড়ালাে। এল—মান
:ল-করে’
করে’
নাও ভাই, বেলা অনেক হয়েছে।-ব্যাগের মধ্যে কি আছে
তােমার ?
কিরণ হেসে বলল--ভয় নেই বৌদি, তােমার মােগ্য উপহার
ওতে কিছুই নেই।
২১

নিশিপদ্ম
, সে কথা আমি বলছিনে। আমি কি এতই হ্যাংলা ?
ভামিনী মুখ ফিরিয়ে অন্য দিকে চলে গেল।
উঠে দাড়িয়ে কিরণ বলল—এখান থেকে হয়ে আমাকে
একবার বর্ধমান যেতে হবে অনাথদা। ব্যাগ থেকে আর কাপড়
বা’র করবাে না,—এই যে কাপড় এখানে রয়েছে একখানা,
এইখানা পরেই স্নান করে আসি। কেমন ?
সাবান কাচা পরিষ্কার ধুতি আনলায় টাঙানাে ছিল, হাছ
করে সেখান পেড়ে নিয়ে কিরণ কাপড় ছাড়তে লাগলাে। ফস।
তােয়ালে খানাও টেনে নিল। জান্তার পাশ থেকে গলা বাড়িয়ে
সেদিকে একবার তাকিয়ে মেঘের মত মুখ নিয়ে ভামিনী আবার
রাঁধতে লাগলাে। গালে যেন কে তার চড় মেরেছে।
তােমার আবার বাগান করবার সখ আছে দেখছি অনাথদা।
কি কি গাছ বসিয়েছ দেখি ?—বারে, শীতের হাওয়া না পেয়েও
গাঁদা ফুল ধরেছে !
আর ওটা কিসের চারা ?
/অন্য দরজা দিয়ে কিরণ বেরিয়ে যেতেই তীরবেগে ভামিনী
এসে ভিতরে ঢুকে চুপি চুপি বল—এই জন্যেই কি কাপড়গুলাে
ফস করে রেখেছিলাম? তুমি থােকার মতন অনি হাঁ করে’
ওরে আমার ভাই রে। 'অমন ধধবে আমার
তােয়ালোেনা
পায়ের শব্দ পেয়েই আবার সে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে যাচ্ছিল,
ইলে ?
२२

নিশিপদ্ম
পিছন থেকে হেসে কিরণ বল্ল-আরে শােনাে বৌদি শােনন,
না হয় মানলাম তােমার মতন সুন্দর মুখ আমার চোখে পড়েনি,
তা বলে চোখ দিয়ে কি ভাল করে দেখতেও পাবে না ?
অনাথদা, তুমি কিন্তু যাই বল ভাই, এত সুন্দর মেয়ে বিয়ে করা
তােমার উচিত হয়নি।
নিজের নির্বোধ রসিকতায় সে নিজেই হেসে উঠলাে।
মিনিট খানেক নির্বাক হয়ে থেকে যাবার সময় ভামিনী বলে
গেল—এ তােমার ঠাট্টা না মনের কথ ঠাকুরপাে ?
কৈফিয়ৎ দেবার প্রয়ােজন কির মনেই করে না। সে ভাবে
তার কথা সে ছাড়া আর কারাে বােঝবার শক্তি নেই।
একটু হেসে সে বল—এই যে, ভাল মাথার তেল রয়েছে
দেখছি, অনেক দিন খােসবাই তেল মাখা হয়নি—বলতে বলতেই
সে নতুন তেলের শিশিটা খুলে ফেলে ঢক ঢক করে হাতে
ঢালতে লাগলাে।
—কি সাবান এখানা ? বাঃ ‘গড়রে দেখছি। আচ্ছা
ভালাে কথা, নতুন জিনিস, আমার হাত দিয়েই বউনি হক,
কি বল অনাথদা ?
অনাথ একটু হাসলাে। সাবান-তােয়ালে হাতে নিয়ে কিরণ
বেরিয়ে গেল।
ভিতরে ঢুকে নিশ্বাস রােধ করে ভামিনী ব-কেমন ?

নিশিপদ্ম
হল’ত? বলেছিলাম তখন ? এইবার নেপােয় এসে দই মেরে
গেল ! এমন সব্বনাশ আমার হবে না ত কা’র হবে!ছছলে
দুটি চোখে ক্ষোভ ও অভিমান নিয়ে সে আবার তেমনি
তাড়াতাড়ি ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
কিরণ তখন পরমানলে স্নান করছে। মুখ বাড়িয়ে একবার
ভামিনী দেখলাে, চােখে মেখে সাবানান। এরই মধ্যে একেবারে
এতটুকু হয়ে গেছে! সাবানটির দাম সাড়ে পাঁচ আনা !
'অনাথ তখন অতি কষ্টে হাসি চেপে দেয়ালের দিকে
মুখ ফিরিয়ে চুপ করে বলে অাছে। বসে আছে ঠিক
চোরের মত।
স্নান করে ঘরে ঢুকে কিরণ বল—ক গে, এমন হয়েই
থাকে। অনাথদার দিনকাল আজকাল ভালই যাচ্ছে। কি
বল অনাথদা ?
একটু হেসে অনাথ বল্ল-কি হল রে ?
উত্তর শােনবার জন্য জালার পাশে কান খাড়া করে ভামিনী
তখন তীব্র দৃষ্টিতে চেয়ে রয়েছে।
কিরণ অত্যন্ত তাচ্ছিল্য কাঠ বল-বালতির কানায় লেগে
এই কাপড়খানা খানিকটা ছিড়ে গেল ভাই। কাপড়খানা নতুন
মনে হচ্ছে।
মুহূর্তের জন্য স্বামী স্ত্রীতে চোখচোখি হল। তারপর ভামিনী

নিশিপদ্ম
নিজেই সরে গেল। মনে হল, কাপড়ের সঙ্গে তার গায়ের
খানিকটা মাংসও কে যেন ছিড়ে নিয়েছে।
তবু থালায় করে সাজিয়ে সেই অতিথিকে ভাত বেড়েও
দিতে হল।
অনাথও স্নান করে ফিরে আছি, এমন সময় ৭ !ং করে
ঘরের মধ্যে শব্দ হতেই ভানিনা তাড়াতাড়ি উঠে এসে দরজার
কাছে দাড়ালাে। হত্যন্ত অপ্রস্তুত হয়ে কি -জ
কি যে আমার হয়েছে কে জানে !
নতুন আরনি,
ছি ছি !
পুরু কাচের দার্ণী আরসিখানি তন টুকরাে হয়ে না
ঘরময় ছড়িয়ে পড়েছে।
ভামিনীর পায়ের তলাকার মাটী তখন সরে যাচে। :::খের
সামনে ঘরখানা দুলছে। তবুও এক হাতে চোকাঠ ধরে
গলাটা পরিষ্কার করে কোনাে মত বলল -আহা, কি বুদ্ধি
ছেলের! বিছানা থেকে ফস। চাদর তুলে নিয়ে বুঝি অমনি
করে মাথা মুছতে হয় ? মা বাপের দম্বেলে ছেলে ছিলে, না
ঠাকুরপাে?
কিরণ বল—এখন মনে হচ্ছে বৌদি, দাম্বেলে দেওয়ও বটে।
অনাথ তখন খেতে বসবে কি বাড়া ছেড়ে পালিয়ে যাবে তাই
ভাবছিল।
২৬

নিশিপদ্ম
ভামিনী বাইরে এসে দাতের ওপর দাত দিয়ে কঠিন কণ্ঠে
বলল—ঘাড় গুজে বসে রইলে কেন? পেটুকের আবার খাওয়ায়
অরুচি আছে নাকি?
: এই যে !—বলে স্ত্রীর মৃদু তীক্ষ্ণ ধমকের উত্তরে ঈষৎ হেসে
অনাথ বৰ্ণ-কিরণ, আয় রে ।
যাই।—বলে’ চাদরানা জড়সড় করে এক পাশে রেখে
কিরণ এসে খেতে বসলাে। বলল--চিরুণীখানা কিন্তু কিনতে
গিয়ে তুমি ঠকেছিলে অনাথদা। নৈলে নতুন চিরুণীর দাড়া
অত সহজে ভাঙে না। আচ্ছা, ঐ পমেডটার দাম কত নিয়েছিল ?
এতখানি মাথায় মাখলাম তবুও চুল গুলাে তেমন যুৎসই
হল না।
অতি কষ্টে ভামিনী বল্ল-আর মুখে ? মুখে কোষ্টা
মা হল ।
মুখে তােমার ওই স্নো’ দিলাম ; দাড়ি কামিয়েছি কিনা।
তা ছাড়া আমাদের মুখে ওসৰ মাখা দরকার বৌদি, নৈলে তােমার
মতন সুন্দর মুখখানি পেলে আমরাও
সমস্ত গা-টা যেন গর্মিনীর রি রি করে কেবলই জ্বলছিল।
বলল- যা বলেছ, সে একশােবা’র! তবে বাজারের দামের
চেয়ে গরীব লােকের ‘স্নাে’য়ের দামটা আর একটু বেশি।
তাছাড়া ভগবান যাকে রূপ দেননি সে হাজার চেষ্টা কল্লেও

নিশিপদ্ম
হয়নি।
এটা বােঝ ত বুদ্ধিমান ছেলে?—বলে’ আগুনের মত এক ঝলক
হেসে সে সরে গেল।
দুজনে খেতে বসলে ভামিনী একবার শােবার ঘরের মধ্যে
এসে দাড়াল। কোনােদিকে আর ফিরে তাকাবার উলয় নেই।
চারিদিকে যেমন বিশৃঙ্খলা তেমনি ছন্নছাড়া। নতুন চাদর আর
কাপড় মাত্র সেদিন কেনা হয়েছে, এখনাে তার দেন শােধ
বড় সাধের পরিষ্কার সাড়ী কাপড়পানি সে বাধাষ্টমীর
দিন পরবে বলে’ তুলে রেখে দিয়েছিল, সেখানি ধূলােয় টোপুটি
খাচ্ছে। চুল বাঁধবার সরঞ্জাম গুলির ওপর যেন এর মধ্যে পাশবিক
অত্যাচার হয়ে গেছে। তার বড় আদরের কাঠের ফ্রেমে আঁটা
আয়নাটি—উহু, ইস্!
}
পা বাড়াতেই ভাঙা আয়নার এক কুচি কঁচ কেমন করে
হঠাৎ পায়ের তলায় ফুটে যেতেই সে পা ধরে মাটীতে বসে
পড়লাে। ক্ষতস্থানটা দিয়ে তখন গল গল করে রক্ত বেরিয়ে
এসেছে।
কিরণ বাইরে থেকে তখন ডাক্‌ছে—বৌদি, তরকারি ফুরিয়ে
গেল। এই মাছের ছ্যাচড়াটা ভারি চমৎকার হয়েছে। যদি
আর একটুখানি
দাতে দাত চেপে ভামিনী বল—যাচ্ছি ভাই।
তরকারি এনে যখন সে কিরণের পাতে ঢেলে দিল, অনাথ
२१

নিশিপ
তখন বিস্ময়ে একেবারে নির্বাক। সে ঠিক জানে, মাথা গুণে
ভামিনী তরকারি রাঁধে। দুবার করে কোনাে জিনিস চেয়ে
খাওয়া এ সংসারে একেবারে নিষেধ। সে যে নিজের ভাগটুকুই
এনে দিয়েছে, এ কথা বুঝতে অনাথের এতটুকু বিলম্ব হল না।
আবার ঘরের মধ্যে ফিরে এসে ভামিনী যখন ভাঙা কাচের
যুটিগুলি ঝাঁটা দিয়ে একত্র করতে লাগল তখন তার আয়ত
দুটি চোখ অতিরিক্ত রাগে হু হু করে জ্বালা করছে। বিনা
দোরে বন্দী করে কে যেন তাকে চাবুকের বাড়ি সপাসপ প্রহার
করতে শুরু করে দিয়েছে।
বিকাল বেলা অতিথি-নারায়ণ বিশ্রাম করে উঠলেন। বাইরে
তখন একটু একটু মেঘ করে এসেছে। শীঘ্রই বৃষ্টি নামবে।
দেরের চৌকাঠের কাছে নিঃশব্দে মাথা হেঁট করে’ ভামিনী
ব’ে ছিল । আজ সমস্ত দিন সে জল গ্রহণ করেনি। নিজের
ভাতগুলাে সে আঁস্তাকুড়ে কুকুরের মুখে দিয়ে এসেছে। জীবের
প্রতি তার দয়ার এই বােধ করি প্রথম প্রকাশ।
হাসতে হাসতে কাছে সরে এসে কিরণ বলল–বর্ষার দিনে
নটা বুঝি আনা হয়ে উঠেছে বৌদি ?
কোনাে উত্তর না পেয়ে কিরণ কাছে এসে উবু হয়ে বসলাে।
ব—এমন থমথমে কেন? প্রাণেশ্বর-দাদা গেল কোথায় ?
২৮

নিশিদ্ম
;
মুখ তুলে ভামিনী বঙ্গ—আর কোনাে কাজ নেই বুঝি
তােমার ?
না, তােমার কাছে বসলে কোনাে কাজ করতেন খায় না।
বৌদি, সত্যি কথা ব? তােমাকে বেশ লাগে কিন্তু!
কুটুম্বের ছেলে ; কিছু বলাও চলে না। মাত্র এক দিনের
জন্য এসেছে। ভামিনা মুখ তুলে একবার চেয়ে তক্ষক :-
সত্যি নাকি ?
এবং উত্তরের অপেক্ষা না করে সে নিজেই উঠে চ..
গেল
যাই, ভারি গরম লাগছে, চান্ করে আবার বেরাে: হবে
-বলে’ উঠে শিষ, দিতে দিতে কিরণ সরে গেল।
টিপ্ টি করে তখন বৃষ্টি পড়ছে। অনাথ কখন এর মধ্যে
ফিরে এসেছে।
তার নিরীহ মুখখানার দিকে চেয়ে ভামিনী
উত্তেজিত হয়ে হাত পা নেড়ে চাপা কণ্ঠ কি সব বলা হল।
স্নান সেরে ঘরের মধ্যে কিরণ এল • ঢুকতেই সে চুপ করে সরে
দাড়াল।
কিরণ বল—বেশ বেশ, বিষ্টির দিনে এ ত’ শে নই।
স্বামী-স্ত্রীতে মিলন হবে এতে বাইরের লোকের হিংসে কর কি
আছে! অনাথদা, তুমি কিন্তু একটু স্ত্রৈণ হয়ে পড়েই ভাই,
বৌদিকে ছেড়ে তুমি থাকতেই পারে না!

নিশিপদ্ম
দূর গাধা!—বলে হাসতে হাসতে ভামিনীর দিকে চেয়ে
অনাথ আবার বলল—কথাবার্তা কিন্তু কিরণের চমৎকার
দেখেছ ? ছছাট বেলা থেকেই ও এমনি!
স্বামীর প্রতি একটা কটুক্তি ভামিনীর মুখে এসে আবার ফিরে
গেল।
কাপড় জামা পরে’ কিরণ বল্ল দেখি, বৌদির এই এসেন্সটা
কেমন দেখি এবার। বেশ দামী এসেন্স, দেখছি।
পাকট থেকে ছােট একটি ছুরি বা’র করে’ শিশির ছিপিটা
খুলে সে সকলের সুমুখেই একটু একটু করে জামায়, কাপড়ে,
মাল, মাথার চুলে, ওপরকার ঠোটে দিব্যি সপ্রতিভ ভাবে
মাখতে লাগলাে। বা—বেশ, সত্যিই গন্ধটা ভাল !–পরে
শিশিটা হঠাং মুখের কাছে তুলে ধরে বল—আরে, একটু
: মাথতেই অর্ধেকের ওপর খরচ হয়ে গেল ! সব জিনিস বেশী
খরচ করা আমার স্বভাব হয়ে গেছে দেখছি।
তারপর সে তুলে নিল পাউডারের কোটোটা। পাউডার
মাখলে নাকি ঘাম-এর দাগ লাগে না।
এ দৃশ্য সহ্য করবার মত ধৈৰ্য ভামিনীর ছিল না। জ্বলন্ত
দৃষ্টিতে তার দিকে একবার তাকিয়ে সে ধীরে ধীরে ঘর থেকে
| বেরিয়ে গেল।
জুতােটা পায়ে দিয়ে এদিক ওদিক চেয়ে কিরণ বল—তাই ত,

নিশিপদ্ম
;
বিষ্টিটা এখন ধরবে বলে ত মনে হচ্ছে না। তুমি এখন ঘরেই
থাকবে ত অনাথদা?
অনাথ বলল—হ্যাঁ, কেন বল্ ত ?
তােমার ওই ছাতিটা নিয়ে তাহলে একবার ঘুরে আসি
এবং উত্তরের অপেক্ষা না করেই ছাতাটা দেয়ালের হুক থেকে পেড়ে
নিয়ে কিরণ মম্ মম্ করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল ।
ফিরতে তার একটুখানি রাত হয়ে গিয়েছিল। ভিতরে ঢুকে
দেখলাে, আলােটা তখনও জ্বালা হয়নি। রাত্রে ভামিনী চরাচর
আনাে জালে না ; রাস্তা থেকে গ্যাসের আলাে খানিকটা এসে
তার ঘরের মধ্যে পড়ে, তাইতেই এক বকন কাজ নে' য়
আজ কিন্তু একটি হারিকেন্ আলাে সে তৈরী করে দরজার কাছে
রেখেছিল। তাড়াতাড়ি এসে অন্ধকারে পা বাড়াতেই ঠোকা
লেগে আলােটা কাং হয়ে গেল। কঁচটা ভাঙেনি বটে কিন্তু
আলাে জ্বেলে কিরণ দেখলাে, বগ বগ করে কেরােসিন তেল পড়ে
মেঝেটা ভেসে গেছে।
ভামিনী এসে দাড়িয়েছিল, সে বল—আমার ভাই দোষ
নেই, তুমিই পায়ের কাছে রেখেছিলে! যাক গে, কাগ সকালে
ওখানটা পরিষ্কার করলেই চলবে !—এই যে অনাথ দা, আজ ভাই
একটা বড় অন্যায় করে ফেলাম ! আমায় ক্ষমা করো।
দূর পাগলা, কি হয়েছে বল্ শুনি।

নিশি'দ্ম ছাতিটা তােনার নিয়ে গিছলাম জান ত ? বিষ্ট ধরে’ যাবার পর সেটার কথা আর মনেই নেই, কোথায় যে ফেলে এলাম কে জানে! পুরােনাে হলেও এ কথা ছিল, কিন্তু নতুন জিনিস- হারিয়ে গেল? তা, হ, ওটা এই কদিন আগে তিন টাকা দিয়ে, যখন গেছে তখন আর- নিনী তার দিকে চেয়েছিল, তানাথের মনে হল যেন সে বরফের সমুদ্রের মধ্যে ডুবে যাচ্ছে ! কে যেন তার গলা টিপে রেছে। কোনাে রকমে কাটা শেষ করে সদর দরজার দিকে সে তাড়াতাড়ি চলে গেল। ক্রনে রাত হল। খাওয়া দাওয়া শেষ হতে বেশ বিলম্ব হয় না। শােবার জায়গা কিরণের বেশ যত্নহকারেই করা হয়েছিল। খাট বিছানা সমেত বড় ঘরটিই তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। খাটের ওপর মশারি টানে।। বল—এমন বোদি আর হবে না, বুঝলে 'অনাথ দা?—একটু হেরে আবার বাণট। মার, গুণটা কিন্তু আমাদের। তা সে যাই হোক, আমার দিকে র; জশষ্যে, তোমাদের কি ব্যবস্থা ? ভামিনী আর চুপ করে থাকতে পারল না। মুখে একটু নিশিপদ্ম হাসি টেনে এনে বল--পরের সুবিধে অসুবিধে দেখার অভ্যেস তােমার আছে নাকি ঠাকুরপাে? ঠাকুরপােও হাসলাে। হেসে বল—তা নেই। কিন্তু তােমাকে পর বলে যে মনেই হয় না বৌদি। তাই জন্যেই ত- অনাথ এগিয়ে এসে বল—ওই দেখ। কিরণ সে রকম ছেলেই নয়। তােমাকে ও কি কম ভালবাসে? ছোট বেলা থেকে আমি ওকে দেখে আসছি যে- কিন্তু স্ত্রীর মুখের দিকে তাকিয়ে তার আর কথা বল না, হঠাৎ ভয়ে নির্বাক হয়ে বােকার মত সে হাঁ করে দাড়িয়ে গেল। খানিক রাতে চোরের মত পা টিপে টিপে সে এসে দেখলাে, রাঁধবার জায়গায় মুড়ি দিয়ে ভামিনী শুয়ে আছে। ঘুমােয়নি। খাবার জন্য সাধাসাধি করতে অনাথের কেমন যেন ভয় হল। বলল, আমিও এখানে শুয়ে পড়ি, একটা রাত বৈত বালিশ একটা যদি ওঘর থেকে—ওকি, কাচ কেন ফুপিয়ে ফুপিয়ে ? ক্লিষ্ট রুদ্ধকণ্ঠে ভামিনী ব—আর আমি পাচ্ছিনে। কাল সকালেই ওকে তাড়িও। তিনটাকা দামের ছাতিটা-ইচ্ছে হচ্ছে নয়।

নিশিপদ্ম
ছুটে গিয়ে যেখান থেকে হােক নিয়ে আসি! আমাকে ধরে
মারলে আমার এত দুঃখ হতাে না।
ছাতার শােক চলে প্রায় দুঘন্টা।
কিন্তু সকাল বেলার ব্যাপারটা সত্যিই করুণ ।
মাথা চুলকোতে চুলকোতে ঘর থেকে বেরিয়ে এসে কিরণ
বলছি ছি, এবার আর আমাকে ক্ষমা করা উচিত নয়।
রকম অত্যাচার করলে কি কোনাে গেরস্থ ঠাঁই দেয় ?
কেন রে? কি হল ?
কিরণ হেসে নিজেই বল—এসসা, দেখে যাও তােমার গুণধর
অতিথির কীর্তি।—বলে’ অনাথকে ডেকে নিয়ে সে ঘরে ঢুকলাে।
খাটের ওপর মশারিটা টাঙানােই ছিল, সেটার একটা ধার
কেমন করে পুড়ে ফাক হয়ে গেছে! বিছানার চাদরটাতেও
জায়গায় জায়গায় পােড়ার দাগ। অনাথ হঠাৎ ভামিনীর দিকে
তাকিয়ে ভয়ব্যাকুল কণ্ঠে বলে উঠল—এ কি করে’ হল’ রে ?
কিরণ বল—বােধ হয় দোেলাই আবার পর জ্বলন্ত
কাঠিটা
অনাথ মাথা হেঁট করে রইল! দেখলাে, মেঝেতে পােড়
সিগারেটের কয়েকটা কুচি, আর বিছানার ওপর সিগারেটের ছাই
ছড়াননা !

নিশিপদ্ম
ভামিনী হয়ত এবার ভয়ানক চীৎকার করে উঠবে—এমনি
তার মুখ-চোখের চেহারা !
টতে টতে অনাথ ঘর ছেড়ে বেরিয়ে চলে গেল। তার
মনে হল, শুধু মশারিই পােড়েনি, ভামিনীর বুকের ভিতরটাও
সঙ্গে সঙ্গে জ্বলে পুড়ে একাকার হয়ে গেছে।
তারপর অতিথির বিদায়ের পালা। সকালের গাড়ী, খেয়ে
যাবার সময় নেই। কিরণ বল—তা হােক, এখান থেকে এইটুকু
বর্ধমান। সেখানে গিয়েই,কই, অনাথদা কোথায় গেলাে ?
বলতে বলতে কিরণ বাইরে এসে দেখে, অনাথ চুপ করে’
এক জায়গায় বসে আছে। মুখ ফিরিয়ে বল্ল-এ কি, চলি
নাকি রে? জামা কাপড় পরা হয়ে গেছে দেখছি যে ?
একটু আমতা আন্তা করে কিরণ বলল-একটা কথা
তােমায় বলছিলাম অনাথদা। তাগাদা করতে গিয়ে কাল শুধু
‘চে’ পেলাম। খুচরাে গাড়ীভাড়ার খরচ কিন্তু কিছুই নেই।
গােটা পাঁচেক টাকা তুমি দিতে পারাে?
কত, আচ্ছ-তা তুই বােস না ঘকে গিয়ে। দেখি
আমাসের শেষ কি না তাই
অন্দরে না ঢুকে রাস্তায় গিয়ে নামলাে।
। বলল-বৌদি, এবার বিদায় নেব।

নিশিপদ্ম ভামিনী আচ্ছন্নের মত মাথা তুলে তার দিকে তাকাল। অনাথের এখন এদিকে আসার সম্ভাবনা নেই। এদিক ওদিক চেয়ে কাছে সরে গিয়ে কিরণ মৃদু মধুর হেসে বলল—কাল যে অনাথদা বলছিল, গেমায় আমি ভালবাসি, তা বুঝি বিশ্বাস করনি? শুধু মাত্র একটা কিছু জবাব দেবার জন্যেই ভামিনী তাচ্ছিল্য কণ্ঠে বল–করেছি। কিরণের গা কেঁপে উঠলাে। আর একটু ঘেষে দাড়িয়ে ব, -- সেটা কি করে, বুঝবাে ? রাগে তখন ভামির সৰ্ব্বশরীর থর থর করে কাঁপছে। বল্ল -কি করবো বল ভাই, বােঝার সন্ধত নয় ! তা হলেও না হয় কিন্তু দ্যাখাে?-লে’ হঠাৎ একটু থেমে সে আবার বল্ল- কাল থেকে তােমাকে িকরবার জন্যে অনেক সহ্য করেছি। এর ভাই তুমি যাও। ছেলে মানুষ, এত সব শিখলে কাখেকে ? বলে সে নিজেই একদিকে চলে গেল। প্রনাথ ফিরে এল। টাকা ধার পাওয়া গেল না। হতাশ হয়ে অত্যন্ত ভয়ে ভয়ে রান্নাঘরের কাছে এসে বল্ল-তা হলে ত কিরণের যাওয়া হয় না দেখছি। কেন ?-ভামিনী বল।

নিশিপদ্ম গােটা পাঁচেক টাকা চায়। তাহলেই, কিন্তু আমার কাছে ত— আচ্ছা, আমি দিচ্ছি।-বলে’ ভামিনী হন হন করে নিয়ে ঘরে ঢুকে একটু পরে বেরিয়ে এসে অনাথের হাতে পাঁচ টাকার একখানি নােট গুজে দিল। বলল-দাও গে যাও। ও না গেলে আমি জল খাবাে না ! কিন্তু এমন বিস্মিত অনাথ আর জীবনে হয়নি। একার শুধু ফ্যা ফ্যা করে তাকিয়ে একখণ্ড পাথরের মত গড়াতে গড়াতে সে কিরণের দিকে এগিয়ে গেল । বিদায়টা আর জাে না; যেন সুর কেটে গিয়েছিল । প্রণাম করতে এলে ভামিনী বল্ল-না না থাক্‌, ছুতে হবে । পায়ের ধূলাে আমি কাউকেই ইিনে ভাই। এমনিই আশীৰ্বাদ কচ্ছি, তােমার সুবুদ্ধি হোক। শুনাে ক্লান্ত হাসি হেসে কিরণ বেরিয়ে গেল। যাবার সময় অবশ্য বক্স-অনাথদা, চললাম। আ5 মাসে এই পথে আর একবার বােধ হয় আসতে হবে। যদি আসি ত তােমার কাছেই দিন দুই- অনাথ বল নিশ্চয়! তাহলে তাের বৌদিও খুব খু িহবে ! ব্যাগটা হাতে নিয়ে শিব, দিতে দিতে কিরণ পথে নেমে চলতে লাগল। ৩৭

No text on this page.

গভীর

পরিচয় :
একটি কিশোর ফেরিওয়ালার জীবনের একমাত্র রাত্রির
ঘটনা।
বিচিত্র আনল ও সোনার ভিতর দিয়ে সে রাত্রে
সে যে সারাজীবনের গৌরব ও পাথেয় সঞ্চয় করেছিল

নিশিপদ্ম
পুতুলটা ফিরিয়ে দেবে ! সমবয়সী ছেলেকে জব্দ করতে তার
ভারি ভাল লাগে ।
মুখের হাসি তার মিলিয়ে গেল। চাচার দিকে একবার
তাকিয়ে দরজার একটা পাল্লা টেনে বাইরে সে মুখ বাড়িয়ে
দেখল, দেয়ালে মাথা হেলা দিয়ে অকাতরে ছেলেটি ঘুমিয়ে
পড়েছে, ঝাঁপিশুদ্ধ চুরি গেলেও তার লাে ঘুম হয়ত ভাত না।
সমস্ত দিন পরিশ্রমের একটি করুণ ক্লান্তির ছায়া তার নিদ্রিত
মুখের ওপর ফুটে উঠেছে।
এ অবস্থায় কেউ যে এমন করে ঘুমাতে পারে মেয়েটির তা
ধারণায় এল না। হেট হয়ে সে তার স্বাভাবিক অপরূপ কোমল
কণ্ঠে ডাকল, “ইয়ারা ?
ফেরিওয়ালা জেগে তাড়াতাড়ি সােজা হয়ে বসতেই সে বলল,
-তোমার জিনিস যদি চুরি হয়ে যেত এণি ?
ছেলেটি তার মাতৃভাষায় বল, চুরি ? এ মাথা ভেঙে
দেব না ?
তারপরই সে একটা রবারের পাখী তুলে তার পেট টিপে
বশী বাজিয়ে বলল, লেও, ছে প্যায়সা !
মেয়েটি একটু হেসে পায়জামাটা গুটিয়ে ঝাপির কাছে উবু
হয়ে বসে’ বল—তােমার সব জিনিস ঠিক-ঠিক আছে ? দেখ
দেখি ?

নিশিপদ্ম ছেলেটি একবার সেদিকে চোখ বুলিয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে বল,- তুমি নাও না কি চাও, এই নাও ‘মণি ব্যাগ’—দো আনা ! -ও আমার চাইনে। -আচ্ছা, এই নাও জরুদার কৌটো—এক আনা। জরির ফিতা নেবে? সাত আনা গজ! তবে এই লাট্ট আছে, লাউ, দে দো প্যায়সা। লাউ, আমার কি হবে,—মেয়ে মানুষ ! তােবে কি লেবে? ‘সিসা চাই ? মুখ দেখবার জন্যে ? তােমার মুখ সুন্দোর আছে! মেয়েটি তার বার ভঙ্গী দেখে মুখের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেল্ল। বল্ল,—চাইনে—তুমি দেখাে তােমার মুখ, দুষ্ট। নতুন ‘লাইসেন্স পেয়ে ছেলেটি প্রথম কারবার সুরু করেছে, ক্রেতা চেম্বার অভিজ্ঞতা এখনও তার ভাল করে হয়নি। ব, তবে ত’ হয়রাণি, তােমার কাছে কত পয়সা আছে বল, সেই মত জিনিস বেছে দিচ্ছি। পয়সা? পয়সা আমি পাব কোথায় ? ছেলেটি তার মুখের দিকে তাকাল, তারপর শ্লেষের হাসি হেসে অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে বল, যাও গিয়ে ঘুমােওগে। মিছামিছি এতক্ষণ- মেয়েটি নড়ল না, নানা রকমের চকচকে ঝলমলে খে

নিশিপদ্ম
এবং নানা সৌখীন জিনিসের মধ্যে তার দৃষ্টি গিয়েছিল হারিয়ে।
বা হাতের মুঠোর মধ্যে কাচের পুতুলটি সে বুকের কাছে চেপে
ধরেছিল। হয়ত ভাবছিল, চুরির জিনিস ফিরিয়ে দেবার লজ্জা
সে কেমন করে সালাবে!
ছেলেটি আবার মুখ ফিরােল। এত বড় অবজ্ঞা সয়েও যে
এমন করে বসে থাকতে পারে তার প্রতি কেমন যেন একটু মায়া
হ’ল। দু’জনেই প্রায় সমবয়সী। একজনের কাছে এই বিশাল
পৃথিবী শুধুই রূপকের কল্পলােক, আনন্দের মােহমন্দির, স্বপনের
অমরাবতী ; আর একজন ধূলিকণ্টকাকীর্ণ রূঢ় বাস্তবের পথচারী,
জীবন-সংগ্রামের অসহায় পদাতিক,—এ পৃথিবী তার কাছে ।
অপরিসীম দুঃখের, অসহনীয় অভিজ্ঞতার, অনন্ত বেদনার।
দুজনে প্রায় পাশাপাশি বল। একটি নদী যেন এক বিস্তৃত
মরুভূমির প্রান্ত সীমায় এসে থেমেছে। তার সেই সুন্দর চোখের
ভিতর তাকিয়ে ছেলেটি জিজ্ঞাসা কল,-নাম কি ?
নাম? শুবে ? শেয়ান্তি দেবী। তােমার নাম ?
ছেলেটি সেই নির্জন ষ্টেশন .আর অন্ধকার রেলপথের দিকে
একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে ঈষৎ হেসে বল্ল কি হবে আমার
নাম শুনে ? তােমার ত’ মনে থাকবে না।
শান্তি বল,-আমার নাম তবে জেনে নিলে কেন ? বল
শিগগির।
৪৭

নিশিপদ্ম
ছেলেটি এড়িয়ে গেল। নাম ব’লে এই নিভৃত আলাপের
যবনিকা সে টাতে চাইল না। বল,—মি কিছু কিন্লে না,
আমার কেমন করে চলে বল ত? আজ সারাদিনে বলতে গেলে
কিছুই তােমার মুলুক কোথায় ?
শান্তি বল—পান্জাব ; অমিত।
এদিকে এলে যে ?
শান্তি এবার মুখ রা টা করে মাথা হেট করল। যে প্রশ্নটা
ছেলেটি উত্থাপন করে বল, সে প্রশ্ন যেন কোনাে নিকটাত্মীয়ের।
ছােট মেয়ে, ইতিমধ্যে ভুলেই গেছে ছেলেটি পথের একটি সামান্য
ফেরিওয়ালা, পূৰ্ব্ব-পরিচয় তার সঙ্গে একবি ও নেই !
-চুপ করে রইলে যে?
শাও বল—আমি এই প্রথম এলাম এ মুলুকে চাচার সঙ্গে।
—যার এই ছেলেটা, 'ওই , গা গা করে নাক ডাক্‌ছে—ও-ও
যাচ্ছে আমাদের সঙ্গে।-বলে’ সে দরজার ভিতর দিয়ে নিদ্রিত
যুবকটিকে দেখাল।
-ওকে তােমার ? আবার যে চুপ করলে? বলবে না ?
শান্তি শেষ পর্যন্ত স্বীকার করতে বাধ্য হ’ল, যুবকটির সঙ্গে
তার বিবাহ হয়েছে। কাকা ওই ছেলেটার চাকুরী দিয়ে সংসার
পেতে দেবার জন্য নিয়ে যাচ্ছেন কালীমাটাতে। চাচা তার টাটা-
কোম্পানীর বড় চাকুরে কি না।

নিশিপদ্ম
ছেলেটি তার জিনিসগুলির দিকে তাকিয়ে কিয়ৎক্ষণ কি যেন
চিন্তা করল, তারপর একটি ছােট্ট অলক্ষ্য নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
এবার আমাকে যেতে হবে, ও-লাইনে গাড়ী আবে এখুনি। আর
শােন, নাম জাতে চাইছিলে না তখন ? আমার নাম বদরি।
এই কথা ক’টি বলে সে ওঠবার চেষ্টা করতেই শান্তি বল্ল,
এত রাতে কেউ তােমার জিনিস কিবে না। আমিই বা এখানে
একলা বসে বসে কি করব ?
এ একেবারে অদ্ভুত প্রশ্ন ! সামান্য আধঘণ্টার পরিচয়ে এত
বড় দাবি যে খাটানাে যেতে পারে একথা বদরির জানা ছিল না।
তার মনে হল, শান্তি ত কম স্বার্থপর নয়! খেয়ালের খেলার
মত তাকে খানিকক্ষণ নাড়াচাড়া করে গাড়ী এলেই ত সে স্বামীর
সঙ্গে পালিয়ে যাবে ! তার জন্য শুধু রেখে যাবে নির্জন উদাসীন
ষ্টেশন, ক্রেতার জন্য ব্যর্থ খোজাখুঁজি, এবং একটি নিঃশ্বাস !
আর একদিনের কি একটা গল্প তার মনে পড়ল। না, এ হতেই
পারে না ! ক্ষুব্ধ অভিমানের সঙ্গে সে বল,-তুমি যাও ভাই
তােমার চাচার কাছে।
-যাব না, কি করবে তুমি? এই আমি বসে রইলাম।
বলে’ শান্তি খোর ঝাঁপির একটা কানা হাতে চেপে বসে
রইল।
বরি বল, আমার লােকান দেবে কে?

নিশিপদ্ম শা িব --তােমার জিনিস, তুমিই দেবে ? বরি আবার তাকাল তার মুখের দিকে। বিদেশিনীর দুটি দীর্ঘায়ত গভীর কালাে চোখে এক নিসিপ 5.। মাথার বেণী তার কুলে পড়েছে কোলের মধ্যে। নধর সুপুষ্ট ইণিতে একগাছি চিকচিকে সােনার চুড়ি, ক'ড়ে আসে টি ছােট্ট আং, হনি ধুলাে-বালি মেখে আরও হনর ই উঠছে। শত: দেশের নেরে ব'লে খতি রক্তের : স্পষ্টরূপে দেখ ৮ি। বত গ. ৭রি ( 9. মেয়েকেই দেহে, ন্থি এত কাছাকাছি এমন # বা তার কোলেনিন র ড়নি। এ কিশে' ছাড়িয়ে চ’ এবার কি দৃঢ়ত সে হরি যেছিল। বদ ি: বি ১াখে তাকিয়ে বল,-আমি তােমাকে চিনি। দর, কোনোদিন দেখছ • • ? অতি বর বল,- 'নি, শিশু নি, আমি তােমাকে দেহে এর অগে। -কোথায় দেখেছিলে? বড় fিa বরি একবার রেল পথের দিকে তাকা। কোথা দেখেছ : সে কে ক' : ? :ণের পরাণ পর্যন্ত সে একবার হাতড়ে দে। সাঃ সঃ র ন এ-

নিশিপদ্ম
খচিত অনন্ত অাকাশ সে মনে মনে তােলগড় করে ।
তারপর ঘাড় বেকিয়ে বলল, হু, ঠিক আমি চি: তো-
দেখেছি যে আগে।
তার দৃঢ় আত্মবিশ্বাসের নি তাকিয়ে শক্তি হল। হেসে
বল,-তাহল এ জমে না !
দুজনে বসে গল্প 5::ত । শনি , : বাড়ি
অমৃতরে ‘জয়ি; বাব’ কাছেই, তার একটু গেলেই
‘দণ্টাবর,--ওই দেন নয়: সরে : ক
মনির। পিতা তার রেশমের কার ৫ন ।
কবে সে ল র গিয়ে হে" এতছি!--
বল,-তাদের বাড়ি এই কাছই গোল মহায়।
দুধ বিক্রী করে। তার মামা হশার' Fান ।
একবার বাড়ে তাদের বাড়ি পড়ে ছিল। মা তার গলি।
চম্পা নদীতে তারা প্রায়ই মাছ ধরত হয়।
একজন গুনে মার একজন বলে, এনি কই দল :-
কাহিনী গড়িয়ে গডি: ১
:। যে বন্ধু নতুন এসে ..: সে
আনে নন স্মিয় ! তব হৃদয়কে আণ্ডিার কার জন্য
সমস্ত মনের কৌতুহলের আর থাকে না ! মুখােমুখী দু'জনে
বসে' নিজ নিজ অন্তরের কােট লে পরস্পরকে অ -নিত
করল। পথচারী ও গৃহবপুর মাঝি কোনাে পাই আর

নিশিপ
রইল না।
সমবয়সের নিঃসঙ্কোচ আলাপের ভিতর দিয়ে এমনি
করেই তাদের হ’ল গভীর পরিচয়, প্রতি, সখ্যতা এবং ভাবের
'আদান-প্রদান।
হঠাৎ তাদের আলাপে বাধা পড়ল একটি কুকুরের প্রাণপণ
করুণ চীংকারে। বেচারা বােধ হয় আহার সংগ্রহ করতে
নেমেছিল লাইনের ধারে, একখানা চলন্ত মালংড়র চাকায়
লেগে গেল ধাক্কা। কুকুরটা চীৎকার করতে করতে একদিকের
প্রাটফরমে যখন উঠে এল, শান্তি দেখল, একটি পা সে উঁচু করে
খুড়িয়ে খুড়িয়ে বিকৃত আৰ্তনাদ করতে করতে পাচ্ছি, ঝর ঝর
করে রক্ত পড়ছে তার সেই পা খানি বেয়ে।
ভয়ে উত্তেজনায় বিবর্ণ আহত ::খে সে বদলির দিকে তাকাল।
সৰ্বাঙ্গ তখন তার থর থর করে কঁপছে। কিন্তু এত বড় একটা
দুর্ঘটনা ঘটেও মাল গাড়ীর গতি এতটুকু ক্ষুম হ’ল না, আগের মতই
মন্থরগতিতে নিজের পথে চলতে লাগল।
বদরি তার দিকে তাকিয়ে একটু হাল।
দুবেলাই হচ্ছে। কত কুকুর এমনি সেদিন একটা কুলী মােট
নিয়ে পার হবার সময়-বাদ, দেখতে দেখতেই একটি পা তার
আটকে গেল চাকার তলায়।
শান্তি সাড়া দিল না। দূরে কোথায় গিয়ে থেকে থেকে
কুকুরটা তখনও আর্তনাদ করছিল, সেইদিকে সে তাকিয়ে
বল্ল, এ ত’

নিশিপ
রইল। মনে হল, নিষ্ঠুর পৃথিবী! একটি অসহায় প্রাণী
চিরজীবনের জন্য যে পঙ্গু হয়ে গেল, কেউ একবার সেদিকে
ফিরেও তাকাল না ! যে প্রতিবাদ করতে পারে না, যার
বেদনার কোনাে ভাষা নেই; তার জীবন কি এত তাচ্ছিল্যের,
এতখানি অনাদরের ?
অশ্রুতে শান্তির চোখ দুটি পরিপূর্ণ হয়ে এল। এ শাস্তি নে
তাকেই সইল, এ আঘাত যেন তারই বুকে বাজল। পরের ব্যথা
যে বুঝতে পারে সে চিরদিনই দুঃখ পায়। শাহি জীবনে সুখী
হতে পারবে না !
বদরি বল—আরও আছে, তুমি ত জানে না, কীই বা
দেখেছ। আমরা ওদিকে আর ফিরেও তাকাইনে।
ওড়না দিয়ে চোখ মুছে যােজা হয়ে বসতেই বদরি তাকে
বােঝতে লাগ্ল, এ দুনিয়ার কত দিকে কত করুণ দৃশ্যই প্রতিদিন
দেখা যায়। এর চেয়ে তারা আরও নিব, আর ও ভীষণ, আরও
মর্মান্তিক !–দরি হেসে বলল, তােমার মতন দুৰ্বল হ'লে দুনিয়ায়
আমাদের ঠাঁই হ'ত না।
বদরি বােধ হয় আপন বিদ্যাবুদ্ধি অনুয়ায়ী আরও কিছু বক্তৃতা
দেবার চেষ্টা কচ্ছিল, সহসা চাচাকে শান্তির পাশে এসে দাড়াতে
দেখেই তার কথা বন্ধ হয়ে গেল।
চাচা শান্তির হাত ধরে তুলে বলেন, এবার গাড়ী আসছে ।

নিশিপদ্ম
‘কাপড় বদল কর সেও জদি। সােহন সিকো উঠায়
দেও।
শান্তি গিয়ে নিদিত সােহন সিংকে একটা খোচা :ি জাগিয়ে
কাপড়চোপড় নিয়ে গােসলখানায় ঢু। সে , বেদে ফেলেছে
এ জন্যে তার বাচ্চার আর সীমা রইল না। ছেলেটা শিঃই তাকে
হেনস্তা করবে !
চা5া বলেন, আবার ঝি তিনি শিা করতে এসেছিলি
আমার মেয়ের কাছে ? বদনা !
বরি বল, গরীব আমা সার, এমনি করে আমার
রােজগার!—এই বলে সে তার ঝ িনিয়ে উঠে রি ১লে’
গেল। চাচা নে তাকে মনে করিয়ে নিলে, শ!ি ১ঙ্গ তার
অবস্থার কী তাং, কতখানি সে করি পাত্র !
জিনিসপত্র হাতে নিয়ে ১বাই এখন আবার প্লাটুনের ওপর
বেরিয়ে এল, । ৩ন শে{ হয়ে হে।
শান্তিক নেগে বদরি অবাক হয়ে গেল। তিন. “রিচ্ছদ
বল করেছে। পর তার বেশী সময়ের পর সোনালী
জবির বিচিত্র কাজ করা পায়জা, ওয়ে গরম পাঞ্জাবী,
মাস এবার নীল রংয়ের ওড়ন, *য়ে জবির 'তা। শান্তি
একবার চারিদিকে তাকালাে। ববির দিকে তার দৃষ্টি পড়ল
না। কেনই বা পড়বে। ব্যবধান যে তার সঙ্গে অনেকখানি।

নিশিপদ্ম
বদরি ভাবলল, এই মহীয়সীর সঙ্গে একটু আগে তার অধিকার
ঘনিষ্ঠতার কি কোনাে যুক্তি আছে ? অখ্যাত নং তার
জীবনে শান্তি শুধু ভিক্ষার মত দিয়ে গেল না রে
যৎসামান্য গৌরব, কিঞ্চিং সৌভাগ্য । তার তার
লজ্জা ওই মেয়েটি যে তার গায়ে মেপে নি, এ যে কোবে
কেমন করে ?' বদরি কাঙাল, কিন্তু নিজের স্পর্ধকে সে
মানা করতে পারল না। কন্যার সঙ্গে ব র খল
বালকের? এ যে মিথ্যা,
এ যে মিথ্যা, এ যে অস,
বিশ্বাস করতে চাইবে না !
কাঠের সাঁকোটা পার হয়ে ধীরে ধীরে সে দিকে চলে'।
ছােট লাইনের গাড়ীটা এনি ছাড়বে। বরি গুরই **,
যাত্রীদের কাছে মিনতি জানিয়ে তার খনন ও গণিী বিক্রি
করবার আর রচি ছিল । দাড়িয়ে দাড়িয়ে কিংক্ষ রে
তার চোখের সুখ দিয়েই গাভাখানা ছেড়ে ধরে ধরে ১'গল।
এক জায়গায় সে এসে বসল।
ফুরিয়ে গেছে। তার কোনাে উৎসাহ নেই; সে কী ?
কদৰ্য্য ফেরিওয়ালাগিরিবেশনি সে হয়ত আর কত রবে
না। বরির মনে হ'ল, এইখানে কিছুক্ষণ শুয়ে , তে
পারলে সে নে বাচে।
ওদিকের লাইনে ততক্ষণে ডাকগাড়ী এসে গেছে।

নিশিপ
তিন মিনিট মাত্র দাঁড়াবে। ওঠো বদরি, সময় নেই।
তােমার এই অকারণ অবসাদের মূল্য কি ! কে বুঝবে এক পলকে
কা’র জীবন কখন ব্যর্থ হয়ে গেল! তােমার গােয়ালা পিতার
নির্দয় শাসনকে স্মরণ করে উঠে দাড়াও! কে বলেছে ?মি ক্লান্ত?
বদরি ঝাপি নিয়ে আবার তাড়াতাড়ি ছুটুল।
কাঠের সাঁকো বেয়ে দ্রুতবেগে সে নেমে আসছিল, যাঃ-
গেল তার কপি একেবারে কাং হয়ে ! ছড়, ছড়,
ছড়, ছড় করে তার
মণিহারীগুলি সিড়ির ওপরেই ছড়িয়ে পড়ল। এছন থেকে
যারা আসছিল তারা কেউ গেল সে গুলি মাড়িয়ে, পা দিয়ে কেউ
দিলে ঠিকরে, কেউ দিল গালি, কেউ বলে গেল, আঃ !
একে একে সেগুলি কুড়িয়ে সে যখন সবগুলি একত্র করল
তখন ঘণ্টা পড়ে গেছে। কাছিটি গলার সঙ্গে ভাল করে
জড়িয়ে সে আবার নীচে নেমে এল। গাড়ীর কাছে আসতেই
একজন তাকে দাড় করিয়ে এক প্যাকেট সিগারেট কি।
তারপর নিল একটা দেশালাই।
–পয়সা দাও জলদি বাঙালী বাবু?
আরে দাড়া বেটা, একদম লায়েব।—ব'লে বাবুটি
প্যাকেট খুলে সন্বয়ে একটি সিগারেট বার করে দেশলাই জ্বেলে
ধরিয়ে বললেন, কত?
-তেৰাে পয়সা।

নিশিপদ্ম
—ভাগ, সবাই দেয় এগারাে পয়সা আর তুই...সবসুদ্ধ তিন
আনা দেবাে।
—বেশ তাই দাও।
বাবুটি একটি টাকা বার করলেন। বােধ হয় টাকাটি
ভাঙাবার উদ্দেশ্যই তার ছিল। বদবিকে আবার বগলি বার
করে টাকার ভাঙানি গুণে গুণে দিতে হ’ল। একটা নিকি
অচল বলে বাবুটি আবার সেটি বলে চারিটি কেতানি নিতেন।
আবার কয়েক পা এগােতেই হার এক লােক তাকে বাধা
দিয়ে বল্ল, এনামেলের চা5 কত করে ?
শান্তি যে তাকে ও গাড়ী থেকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে
বদবির তা দৃষ্টি এড়ায়নি। সেদিকে একবার তাকিযে নিঃশ্বাস
রােধ করে সে বলল, 'আ, নেবেন ?
বেশ টকসই হবে ত? ছ' গত পাবি।
তখন বশী বেজেছে। বার কাছে চাচেনি রেখেই
সে দৌড়াে শান্তির দিকে, পয় নেবার আর সময় হয় না।
গাড়ী তখন খুলে দিয়েছে।
কিন্তু শান্তির কাছে পেছন সে অনেক দেরীতে। আর
কিই বা তার বলবার ছিল ! কাছাকাছি পৌছ:তই বিত
এবং বিপন্ন হয়ে শান্তি হাত বাড়িয়ে কাৰে পুলটি তার **পির
মধ্যে ফেলে দিল। তারপর হেসে বল, চুরি করেছিলাম ।
৫৭,

নিশিপদ্ম
- পথের ওপরেই নামিয়ে কি জানি কেন দর ছুটতে
গণ গড় র ৫ স—তিন্ত শিশুর মত, তর মত।
* : বাড়ির বেশী ছিলে এতগণ...হ , পড়ে
ব, থ থ শে . ? নন, ..
গাঙ ৩ন চুইই। শি; নেট :: দিয়ে
তাখানি দে বাড়িয়ে হে, পা হাত কেন তাকে
জানা বিদায়-হা বাণ! .খার • • • দীর্ঘ
হয়ে গেছে !
ফিরে এসে বলিটির কি এর তকাল। শান্তির
হাতের ে•ও হা ও উষ্ণ । ::: {3
করল, এটি হয় সে রিক্র করে না, তার তার রের কারির
এর মধ্যে গু রেখে দেবে। ৫. • জানত না পারে
এ পু; ; তার নিয়ে এ ব্যত? হি !
ও গে অশ্য হয়ে গেছে, লি. 1 পর্যন্ত
সে একবার তাক। কিছুই দেখা গে না; কেবল সেই
পর 'পরে বাবার মন ভর • নয় রে আকাশ
একটু : ক'রে রা। হয় উঠছিল।
• সিসের কিরি করার ৫ এরি মনি তুলে নিয়ে
একবার জার চেষ্টা করল, কিন্তু কে হই তার কাল,
মনিট ৩৭ হল ।

প্রসাধন

পরিচয় :
একটি বিহ-যৌবন ও আরেক প্রাপ্ত মহিলার
অঙ্গসজ্জা এবং মনোবৃত্তি-এই গল্পের কথা।

বালীগঞ্জ এভেমুর ধারে একখানি ট্রামগাড়ী এসে দাড়াল। রাত
তখনও আটটা বাজেনি।
অতি সাবধানে এবং সন্তর্পণে ছাতিটি বঁ হাতে চেপে ডান
হাতে হাতটি ধরে একটি একাকিনী মহিলা গাড়ী থেকে নেমে
পড়লেন। ঘণ্টা বাজিয়ে গাড়ীখানি আবার ছেড়ে দিল।
বিস্তৃত দীর্ঘ পথ তখন প্রায় জনবিল, কচিং এক একখানি
মােটর দ্রুতগতিতে এদিকে ওদিকে পার হয়ে চলেছে। মহিলাটি
কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে বাঁ হাতি আর একটা চওড়। গুলির মধ্যে
চুলেন। কিয়র গিয়ে তিনি একবার থমকে দাড়ালেন।
দাড়িয়ে একবার হেট হয়ে দরের সরকারি গ্যাসের আলােতে
নিজের দিকে তাকালেন, তারপর আঁচলের তলায় হাত গলিয়ে
ট্যাকের ভিতর থেকে একটি ময়লা রুমাল বের করে তাড়াতাড়ি
পায়ের জুতাে জোড়াটি মুছে নিলেন, পরে ব্লাউসের ভিতর থেকে
আর একখানি রুমাল বের করে অতি মৃদুভাবে থুপে গুপে মুখের
উপর বুলিয়ে নিলেন, বা-হাতে ঝোলানাে 'সাচেলটি খুলে
ভিতরের দিকে তাকিয়ে মাথা হেলিয়ে কি যেন একবার মিষ্টি
দৃষ্টিতে দেখলেন, তারপরে আবার যেন নিজেকে দৃঢ় এবং সহজ
করবার জন্য সােজা হয়ে দাড়ালেন।
করবার
পল্লীটি অভিজাতগণের।
একটি প্রাসাদসী
অট্টালিকায় আজ প্রীতি-ভােজর উৎসব।

নিশিপদ্ম
উৎসবটি সম্ভবত একটি বিবাহকে উপলক্ষ্য করে। প্রথম
ঢুকতেই ফটকের মাথায় অত্যুজ্জ্বল আলাে ; রর দু'দিকে
বাগান—বাগানের গাছগুলি বিং-
দীলোকে দৃশ্য করা
হয়েছে। মশে একটা উস্নােত ফোরা। প্রাসাদের
চারিদিকের সমস্ত কাশ ও বাদা ও লাল (’ সহ রংয়ের
ধি অপকলা ও লতা পত। ফুল এবং পরে তাত
হয়ে কির দুষ্টতে গৃহহ হল ঐ জম্ ও
করছিল।
ফটকের মাথার উপর মাচা তৈী ক'রে শই বসেছে।
আজ দু'কি'রে তাদের বাজনার এ বি ছিল না। নীচে
দিয়ে অভ্য, শিন্ত্রিত এবং কর্মকাণের অত খাতায়াত
ত চলছেই।
পরে । সরু গলির নাকে তাে বসে মহিলাটি
অনেক ধ’ দড়ির দাড়িয়ে স” লক্ষ্য করুন। একটি
অড় সঙ্গে কেন নে ৫ : বড় পাপ দিচ্ছিল।
ঔt ভেদর এতনি আর হা এ হা. ৩র নাে হিস
, কি এনে ত পারে এক মা তার নিত।
অনেক ভেবে চিন্তে, অনেক দিন ধ, কটিয় এ অনেকখানি
ইস্ত করে প্রায় মিনিট কু; পরে তিনি হাং এক সম
তাড়াতাড়ি এসে ফকের ব্য প্ৰশ ক।ে তিনি এমনিই

নিশিপদ্ম
হাঁপাচ্ছিলেন যে, মনে হল, এই প্রাণ সহাট :: ::
তঁাকে অনেকটা পরিশ্রম করতে হয়।
এদিক ওদিক তাকাণৰ : , কে ?
দেখতে পে : কোনাে প্রশ্ন করতে । বয়:
ভে বার উঠে তিনি অদ?? কি । এক
থেকে থা: এসে তার ৫ ' * . -
ভিতর থে: একটি tি :: :::... '
নিলেন। তার এ কে :: :: :: : • ১ এই
তার প্রথম নয়। প্র:-:;;;:;: একর ... :
তণীর সমক: ২' গান।
দোতলায় উঠে ৬ হাতি একটি বে : *
বলেছিল। ভিতর মেয়ে এক...র ;; 2 সি। বহু ::
পরিবার থেকে মেয়ে ওলি: 5: ২'; • হার: : ?
কঙ্গটির প্রদীপ্ত এ উঃ :: ::; তার এ
'অসশগ্ন হাতি, কলক), কোস: ৫ :তর "..
.
বিরাট অট্টালিকাটি সারা :: : : হ... :
শিটি মন ছন, আ''।
উল্লিতি মহিলাটি দর কাছ :::: দড়ান। :::
পাদমস্তক দের দিক একর এক কর :: ::
একবাটি ও হয়ে গেল, কিন্তু সে শুধু মুহুর্তের জন্য, ক্ষণেই
একথাটি

.
নিশিপদ্ম
নিতান্ত উপেক্ষায় তারা আবার আগেকার অসংহত গণ্ডগােলের
সুত্র ধরে আপন আপন রুচিতে এগিয়ে চললাে।
ভিতর থেকে একটি মেয়ে তাঁকে নমস্কার জানিয়ে বলল,
‘আসুন ছোেটমাসিমা, অনেকদিন পরে—
ছােটমাসিমা হেসে তার উত্তর দিয়ে বললেন,-গল ত সব ?
প্রশ্নটি যে অত্যন্ত মৌখিক ভদ্রতার, তা তিনি নিজেই বুঝলেন।
জুতােটি ছেড়ে ছাতিটি হাতে নিয়ে তিনি টেবিল ল্যাম্পটির কাছ
ঘেবে সেই তরুণীটির পাশে গিয়ে দাড়ালেন। নকে বসেছে
কোচে, কুশন্ চেয়ারে, কিন্তু টেবিলের ধারে হেলান দিয়ে
—কিন্তু তিনি বলেন আহাের দিকে মুখ ফিরিয়ে মেঝের
কার্পেটের ওপর। এটি তার নিয়ে। তার ভদ্র এবং সুষ্ঠু হবার
চেষ্টাটা সর্বজনবিদিত। বহু শান্ত পরিবারেই তাঁর যাতায়াত
আছে।
মজলিশের মধ্যে প্রথম যার সঙ্গে আলাপ হয় তার সঙ্গেই হয়
না। সেই মেয়েটির সঙ্গে তিনি চুপি চুপি কথা শুরু করলেন।
—সুনীতি, তােমাকে অনেকদিন দেখিনি। আচ্ছা, তােমার
স্বামীর বিরুদ্ধে সেই মানহানির মামলাটা এখনাে চলছে ?
প্রশ্নটি বি, এর মধ্যে সুনীতির কোথায় যেন একটি গােপন
লজ্জা ছিল। সে তার রক্তাভ মুখখানি হেঁট করে শুধু বল, না,
কতিপূরণ দিয়ে শেষ হয়ে গেছে ।

নিশিপদ্ম
কথাটা বলেই তার আর এখানে বসবার প্রবৃত্তি রইল না,
উঠে যেতে পারলে সে তখন বাচে। মানুষের লজ্জাকে নিয়ে
ঘাটাঘাটি করাটা ছােটমাসির চিরদিনের অভ্যাস। বয়স তার
চল্লিশ কবে ডিঙিয়ে গেছে, কিন্তু ঠিক যে কত তা তিনিও হিসাব
করেন না, অন্যেও জানে না। তাকে দেখে প্রথমেই মনে হবে
শারীরিক গঠন তার একটুও আগা হয়নি, এটি নাকি তার
প্রসাধনের কৌশল, এমন কি পিছন থেকে দেখলে তাকে ঈষৎ স্কুল
বলেও মনে হতে পারে; কিন্তু যে তাকে জানে, একই বাড়ীতে
যে তঁার সঙ্গে বাস করেছে, সেই বলবে, তার রূপ নেই, দেহখানি
তাঁর কদাকার কঙ্কাল, জরা এসে তার সাঙ্গের ডালপালাগুলিকে
শ্ৰহীন ও রসহীন করে ফেলেছে।
আসরে যারা উপস্থিত ছিলেন তাদের প্রায় সবাই যােব,
পচিশ এবং বড় জোর তিরিশ বছরের মধ্যে। যারা বয়স্কা,
প্রবীণা—তাদের বৈঠক বসেছিল পাশের ঘরে। ছােটমাসিমা
সে ঘরে যাননি, তার কারণ বাৰ্ধক্যকে তিনি অতিরিক্ত অপছন্দ
করেন। যে নদী বহুদূর পথ অতিক্রম করে এসে শুকিয়ে যাচ্ছে'
তার জল তিনি স্পর্শও করেন না।
সুনীতির একখানি হাত টেনে নিয়ে তিনি বললেন, কতদিন
তােমাদের নিয়ে এক সঙ্গে থেকেছি আজ ভাবলেও আনন্দ হয়।
সত্যি, তােমাদের ছেড়ে আমার চলেও না,তা ছাড়া তুমি ত

নিশিপদ্ম
৬ নাে সুনীতি, সবাই আমাকে কত ভালবাসে ! সবাই কত
আদর করে আমাকে বল ?
সুনীতি জানে তিনি শ্রদ্ধা চান্ না, কারণ অন্যের শ্রদ্ধা এবং
ভক্তি তার বয়সটাকে স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে। কেউ যদি তার
পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম না করে কোলাকুলি করে তাতে তিনি
বেশ আনন্দ পান। তিনি চান আদর, ভালবাসা, স্নেই—তিনি
চান তাঁকে নিয়ে অল্পস্বল্প মেয়েলি হাস্য-কৌতুক।-ব্যঙ্গ নয়,
রসালাপ।
কোলাহল এবং কলকাকলীর মধ্যে এক সময় এল সরবং,
পান, গােলাপজল ও একরাশি ৩াঙ্গা ফুল। সবাই সবাইকে
ভাগ বাটোয়ারা করে দিল, এদিকে তার কিছুই এল না। একটি
ধর থেকে এতক্ষণ ছােটমাসিমাকে তা করছিল,
এইবার গােলমালের মধ্যে উঠে এসে সুনীতির হাত ধ'রে তুলে
নিয়ে গেল। সস্নেহ তিরস্কার করে বল, আমাদের ছেড়ে বুঝি
একপাশে বসে আড্ডা দেবে? শেষকালে যে কাক ও ময়ূরপুচ্ছের
অবস্থা হবে!
এমন কিছু রসিকতা নয়, তবু ছােটমাসি সলজ্জ কুণ্ঠাটিকে
যথাসম্ভব বজায় রেখে খিল খিল করে হাসবার চেষ্টা করলেন।
তিনি যেন এই হাসি দিয়েই তরুণীদের সঙ্গে একাকার হয়ে যেতে
চান।
কণ তিনি অনেকের সঙ্গেই বলতে পারতেন, অনেকেই

নিশিপদ্ম
ঠার পরিচিত ; শৈবলিনী, বাবলি, সুললিতা, ব্যারিষ্টার মি:
লাহার বড় মেয়ে মেরী, সুর চৌধুরীর ছােট বােন নিরি—
অনেকেই ত ইতিমধ্যে তার দিকে একবার করে তাকিয়ে চুপ
করে গেল !
প্রথম সুযোগ ত্যাগ করে শেষকালে গায়ে
পড়ে আলাপ করা তার রুচিতে বাধে। অবশ্য সব সময়ে
বাধে না।
যে মেয়েটি টেবিলের ওপর অসাবধান হয়ে বসে একটি ল
তুলে দিয়ে হাসাহাসি করছিল, ছােটমাসিমা তার মুখ ও পায়ের
খানিকটা নিরাবরণ অংশের দিকে তাকালেন। केमिक्षा
কেউই সেদিকে দেখেনি, কিন্তু তিনি লক্ষ্য করে দেখলেন যে,
পা খানির যৌবন অপরিমিত। তার নিজের পা কোনােদিনই
এমন সুন্দর ছিল না। লুকিয়ে দেখতে দেখতে এক সময় তিনি
ইঙ্গিত করে তাকে ডাকলেন, শােনাে বলি বীথিকা?
একটু বােধ করি উচ্চকণ্ঠেই ডেকেছিলেন, অনেকেই মুখ
ফেরালাে, তাড়াতাড়ি পায়ের ওপর কাপড় নামিয়ে দিয়ে তার
কাছে এসে বীথিকা হেট হয়ে বল, কি ছােটমাসিমা ?
পিঠের ওপর হাত বুলিয়ে ছােটমাসি বললেন, তােমার সঙ্গে
আমার কেবলই কথা বলতে ইচ্ছে করে, তুমি ভারি সুন্দর ; আজ
যে পায়ে আলতা পরেনি ?
দর, আমার কি বিয়ে নাকি যে আলতা পরবাে?

নিশিপদ্ম
পাউডার ?
কি বলছেন—মাগাে, আপনি কি মেখেছেন মুখে ছােটমাসিমা ?
একেবারে পুরু হয়ে উঠেছে যে !
অকস্মাৎ লজ্জায় আর অপমানে ছোটমাসিমার কান দু'টো
কা কা করে উঠলাে। মুহূর্তের জন্য তিনি চারিদিকে তাকিয়ে
অনুভব করে নিলেন, বীথিকার উক্তি কেউ শুনতে পেয়েছে কি
। তারপরই তিনি বিবর্ণ মুখে বললেন, বসাে না গল্প করি -
একা একা ঠেছে যে !
ঠার গল্প শােনা বীথিকার অভ্যাস ছিল। পৃথিবীতে তিনি
সকলেরই কিছু না কিছু উপকার করেছেন এবং এখন তার দিকে
কেউ ফিরেও তাকায় না, সবাইকেই তিনি চিনেছেন, এখন কে
এবং কে তার যেখানে সেখানে নিন্দা করে বেড়ায়, কোন
নিকটাত্মীয় এখনাে অর্থাৎ এ বসেও কার সঙ্গে তার অবৈধ
প্রণয়াসক্তি রটনা করে—এই ছিল তার গল্পের প্রতিপাদ্য বিষয়।
তিনি আলােক প্রাপ্তা নারী, পরনিন্দা এবং পরচর্চা তিনি ঘৃণা
করেন, একথাও তিনি বলতে ছাড়েন না। ার কাছে খানিক
ক্ষণ বসলে যেন দম আটকায়।
আসছি ছােটমাসিমা-ব’লে বীথিকা তাড়াতাড়ি উঠে দাড়াল
এবং সেখান থেকে সরে গিয়ে এই কক্ষের সর্বসম্মত এবং
সৰ্বশ্রেষ্ঠ সুন্দরীটির কাছে বসে পড়লাে। বসলাে ছােটমাসির
দিকে পিছন ফিরে এবং বসে পড়ে এমন ভাবেই সে পর

নিশিপদ্ম জুড়ে’ দিল যে তার ওঠবার আপাতত কোনাে লক্ষণই দেখা গেল না। ছােটমাসিমা তার পুরু দু’টি ঠোটের প্রান্তে আবার একটু স্নিগ্ধ হাসি টেনে বসে রইলেন। হাসি ফুটে থাকলে তার মুখের চেহারা তবু লােকের চক্ষে এক রকম মানিয়ে যায়, কিন্তু তাঁর গাম্ভীৰ্য্যতা যেমন পীড়াদায়ক তেমনি শ্ৰহীন। ওদিকে তখন কক্ষের একান্তে বসে দুটি মেয়ে তার দিকে তাকিয়ে কানাকানি করছিল- -সত্যি বলছি ভাই, বিশ্বাস কর মাথার সুমুখের দিকে একেবারে চুল নেই, ছেড়া চুল কুড়িয়ে বুনে শুনে মাথায় আটকে রেখেছে। ঘােমটা থাকলে ধরবার যে আছে? আর শেমিজের তলায় কি কি পরেন শুনবি? দু’জনে খানিকটা হাসলাে, তারপর ফিকিস কল এবং তারপর দু'জনেই লজ্জায় মুখ রাঙা করে মাথা হেট করল। মাথা তুলে প্রথমটি আবার বল, হ্য। বিয়ে ওঁর হয়েছিল, স্বামীও আছেন শুনেছি। দ্বিতীয়টি মাথা তুলে তার দিকে তাকাতেই সে পুনরায় এল, বিয়ের পর দু’বছর দু'জনে বনিবনা ছিল, কিন্তু তারপর কে যে কা’কে ত্যাগ করেছে আজও তা জানা যায় নি। ত্যাগ ? কেন ? ৬৯

নিশিপদ্ম
তা জানাজানি হলে ওঁর সঙ্গে লােকের মেলামেশা থাকবে
কি করে ?
তুমি এত জানলে কোথায় ?
প্রথম মেয়েটি । বলল, এ রেম কোনাে মেয়ে
নেই যার সঙ্গে উনি 'একদিন কানি। ৪থ সবাই ওর
কাছে আদর পায়, তারপর দু'দিনেই এক এক তারা ওঁর
কাছে পুরো হয়ে যায়, তার : ভালে; ; • • •
ওই ত নি: 6ি দেবীর স েউনি গিছি দা, লি.,
দু’দিন ৭ নিকণি: নলেন, ৫েটর ( 1,1:বর সঙ্গে
তিনি নিজে কি পুণাক্ত। দিন দিন শিণিী
দেবী কঁাত কাদতে ককাত' : এহন। ছাসিম।
তক। কছল ন!
নর ছে;'র নামে
এমন ক ন , ( বেচক দেশ ও পালাতে
এম ১ম ?' তিনটি ৫ণী ও একজন করে এসে
চুই সনে প্রায় iক': 'উ)।
সঙ্গ এসে ৮::
লাকে বিশেফ 'লো।
পাের। সে সেই পতি।
এমণে কিশন হবার • ক':, খা: 'যে লাে।
নববধূর নাম 'ল।। ব, কিন্তু এর সকলের
৭০

নিশিপদ্ম অপরিচিত মেয়ে সে নয়। বিবাহের আগে থেকেই কবে সঙ্গে তার আলাপ। বড় লােকের মেয়ে। আগে দর ছিল বন্ধু এবং বান্ধবী, এখন তারা স্থাণী এর স্ত্রী। সবাই ধরে বসলাে পােবালার গান শুনতে হবে। গ্রন সে সুন্দর গায়। হারমােনিয়মটা টেনে এনে মেয়েরা নিজেদের মধ্যে আসর তাকিয়ে তােবালার গান শুনতে বসলাে। ওকি, পালাচ্ছে সে বীরেন ? যুবকটির হাত ধরে এনে নিজেদের ভিড়ের মধ্যে ) টক করে রাখল। বলল, তাই 'ল অনি, এ 5) অর কবে তুড়ে করলে ? গান শেষ হবার পর উঠে দাড়াতেই হেটমার কে বীরেনের দুষ্ট পড়ল। যে সমারোহ এতক্ষণ হ'য়ে , এত তার কোনাে স্থানই ছিল না, অত উপেন্তি হ'; }কর এক প্রান্তে বসে তিনি এতক্ষণ কি-ন গভীর ভ', করছিলেন। দু’জনে চোখ5োখি হ'ই বীরেন ব': উ:, ছােট- মাসিমা, এসেছেন আপনি? সত্যি ; হল : অন্যায় হয়ে গেছে, আপনাকে মেঃ ওরা ?" । যে. তাড়াতাড়ি ভস্থ সবাই অকস্মাৎ স্তব্ধ এব’ হওকত !': ছাট- ৭১ নিশিপদ্ম মাসিমার দিকে তাকালাে। সুমুখে যেন তাদের বজ্রাঘাত হয়েছে। একটি মেয়ে ত মুখের অস্ফুট শব্দ করে প্রায় হতচেতন হবার উপক্রম করল। অনিমন্ত্রিত হয়ে ভদ্র সমাজে আসা ? বিশেষ করে এই প্রতিভোজের আসরে ? নিমন্ত্রণ করা হয়নি, আসরে ব'সে এ কথা শােনার চেয়ে মৃত্যুও ভালাে। তবু ছােটমাসিমার মুখারুতি দেখে মনে হ’ল তাঁর এ অভিজ্ঞতা হয়ত নূতন নয়! যথাসম্ভব মৃদু এবং কোমল কণ্ঠে তিনি বললেন, তােমার নেমন্তন্নর অপেক্ষা রাখবে কেন ভাই, এ ত আর পরের বাড়ী নয়। বয়সে বড় বলে সবাই তাকে প্রকাশ্যে সমীহ করে, নৈলে তার এই উক্তির ওপর এক-আধটা মন্তব্য কোন কোন মেয়ের মুখে এসেছিল। বীরেন সকলের দিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে বল, আমাদের বিয়ের গোড়ায় ছােট মাসিমার কতখানি হাত ছিল তা বােধ হয় এখানে সকলেই জানেন। অনেকে এবার খানিকটা সুস্থ বোধ করল। সুললিতা বলে উঠল, এমন ঘটকালি তিনি করলেন, তাকে নেমন্তন্ন করলেন না? ঘটকালি ত নয়, ভাৰী স্বামী স্ত্রীকে নিয়ে কলঙ্ক রটনা ! ঘােট মাসিনা হেঁট মুখে বসে রইলেন। নিজের হাতটা মুখের কাছে ধীরে অলক্ষ্যে একবার ছােট- ৭২

নিশিপদ্ম
মাসির দিকে তাকিয়ে ঈষৎ গম্ভীর হয়ে বীরেন বল্ল, ভুল হয়ে
গিয়েছিল !—কথাটা বলেই সে আর দাড়াল না, কি একটা
কাজের ছুতাে করে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে চলে গেল।
আহারের আয়ােজন হয়েছিল যথারীতি। বাইরে থেকে
আহ্বান এবং অনুরােধ আসতেই মেয়েরা উঠে দাড়াল। নাচে
অনেকের মােটর এবং অন্যান্য যানবাহন অপেক্ষা করছে। রাত
প্রায় দশটা বাজে।
একে একে সবাই বেরিয়ে যেতেই ছােটমাসি পড়লেন একা।
তাকে কেউ ডাকলাে না, তিনি যে পিছনে রইলেন সেদিকে কেউ
ফিরেও তাকালাে না। অনেকক্ষণ এমনি করে কাটার
আহত অপমানে এক সময়ে তিনি উঠে দাড়ালেন।
হাতে ছি
তার একটি স্যাটে—এটি তিনি যে কোনাে জায়গায় যাবার
সময় হাতে ঝুলিয়ে যা। পালা করে যোর্থীন চশমা
একবার খুলে তিনি মুছে নিলেন তারপর স্যাচেলটি খুলে ভিতর
একবার দেখলেন, তাতে আছে ছােট একটি আয়না, কিছু পয়স
ও একখানি নােট-বই। পরে সেটি আবার বন্ধ করে তি!ি
বাইরে এলেন। বকের মত তার চলনের ভী!
এদিকের সমস্তটাই মেয়ে মহল। সারি সারি ঘর গুলিতে এ
ওদিকে ফেরঙ্গ-কায়দা অনুসারে টেবিল এবং চেয়ার সাজি।
প্রচুর পরিমাণে হিন্দু মুসলমান সম্মত আহারের আয়ােঃ
৭৩
,

নিশিপ হয়েছিল। চারিদিকে এত আলাে যে মুখ লুকোবার কোথাও গােপন স্থান ছিল না! ছােটমাসি এদিকের খােলা ছাতটার ওপর এসে দাড়ালেন। এর মধ্যে তার আদর কেন নেই তা তিনি মনে মনে ঠাওরাতে লাগলেন। যে মেয়েদের দীপ্ত যৌবন- ঐ, অপরিমিত যাদের প্রাণ-প্রাচুর্য, অপরিসীম যাদের সেই লাবণ্য -এ বাড়ীর সবাই যেন সর্বাগ্রে তাদের সমাদর কবই ব্যস্ত। বিগতযৌবনা নারীর ঠাই এখানে নেই। সুন্দরী দেহের পদতলে আজো সত্য হ5ং গড়াগড়ি দিচ্ছে। ছে: নাসিমার মনে হলাে, পৃথিবীর সবাই তাকে বাতিল করে দিয়েছে । -একটু সরুন ?— না, ওইকি গিয়ে দাঁড়ান। এটা আমাদের যাতায়াতের পথ কি না! সরে’ দা: এক ছেলে এক চার বার নিয়ে মনের দিকে ;:; গেল। ছোটমাসিশা যে হয়ে নিজের আপাদক একাণ তাকিয়ে লে’ এবার ১৪ই করছিলেন, সিরি কাছাক আসতেই কেবারে তপোবা তার সঙ্গে মুখো:খি দে। সে চলেছিল : বান্দাদের দুভার্থনা। চলালেন? খাওয়া হলাে না ছোমামা? ছােটমাসিমা একটু হেসে তার একটি হাত ধনে। মান তিনি হাতে এসেছিলেন, পােবলার হাতটি পরে তিনি ৭৯

নিশিপ
সে গৌরব
পুনরায় অর্জন করে নিলেন। কিন্তু নিমন্ত্রণ করার
আলা তখনাে বের হয় তার মধ্যে রি রি করছি। लिनि
বললেন, শােন বলি, কতদিন তোমাকে দেখিনি বলত
তাপােবাল ?
পােবালার কবি হাত রেখে তিনি '। এগিয়ে এনে ।
তারপর বললেন, ত । ওরা হানার সয় না সে মরা
জানই.. 5'ই মি,
আর ? গেম না।
"
ই
তাবাস।
ভিতর থেকে :::. শার • ডাক হল।
তবু
আকর এই মন: ৫, ২: কেস প্রান
করতে পারল । তার স * এ; * ক ভয় ‘য় এসে
দাঁড়ায়।
ছো, বলন, হত, ৫. বেশ মানি ই।
তুমি । এক ক ) ::.।
আমার এ গান ।:-এই ' : ন পােব ?কব
ওপর ডান ৩ : এখন সে অ'
ছাে। স্বা: আএর স্বামী এনে সই শ্বাস ক" উ5 ত
নয়, তা :মি যাই বল “বস।
বােলার এ কি তা করার সময়

নিশিপদ্ম
ছিল না, সে উত্যক্ত ত’ হলােই, সমস্ত মনটা তার বিতৃষ্ণায়
কুঞ্চিত হয়ে উঠলাে।
ছােটমাসি বললেন, হ্যা তােমার স্বামীর কথাই বলছি-
বীরেন সব দিকেই ভালো ছেলে, চেহারাও চমৎকার......কিন্তু
ওর দোষ কি বল, ছেলেমানুষ বৈত নয়, তােমার এত ভালোবাসা
এখনাে ভাল করে’ ও বােঝে না।
স্থির হয়ে পােবালা দাড়িয়ে তার মুখের দিকে তাকালাে।
বতে আমার ইচ্ছেই ছিল না তােবালা.••• এই তােমার
* এই ধরাে পাঁচ মিনিট আগে—আমি ওই অন্ধকারায় দাড়িয়ে
ছিলাম কি না, দেখলাম ছাতের পাচিলের কাছে এসে কারা
যেন দাড়ালাে ছায়ার মতন। অবিশ্যি বারেন আর সুললিতাকে
চিতে আমার একটুও দেয়া হলো নাকি কা কান্না
সুললিতার! বীরেনই বা কী করবে বল, সুলাল কে ও যে
সত্যিই ভালােবাসে। অন্ধকারে দেখলাম ভাই তােমার স্বামী,
চুপি চুপি তিনি বললেন,—সুললিতাকে জাপটে বুকের মধ্যে
টেনে নিয়ে
ছােটমাসি, ছিঃ!
ছােটমাসির চমক ভাঙলাে। তাএকণ্ঠে পােবাল বল,
আপনার অনেক অন্যায় সয়েছি কিন্তু মিথ্যে বদনাম সইবােব
না!—এই বলে সে হাল, হেসে বল, আপনার শর সন্ধান

নিশিপদ্ম
ব্যর্থ হলে ছােটমাসিমা। সুললিত আধ ঘণ্টা ধরে খেতে
বসেছে, আর উনি গেছেন তালতলায় পিসিমাকে পৌছে
দিতে। তারপর দুপায় নাকুঞ্চিত করে তপােবা আবার
বল, বুঝতে পেরেছি, আপনি আজকের এই উৎসবে বিষ
ঢেলে দিয়ে যেতে চান্। এই জন্যে আমিই বারণ করেছিলাম
আপনাকে নেমন্তন্ন করতে। যা আপনি।
তপােবা নিজেই সেখান থেকে দ্রুতপদে চলে গেল।
ছােটমাসির সাঙ্গ তখন থর থর করে কাপাছে। তবু তিনি
অতি কষ্টে ছাতাটি ও ‘স্যাচেলটি হাতে চেপে ধরে’ সি ড়ি দিয়ে
নামতে লাগলেন। কিন্তু মাথাটা বােধ হয় তার ঝিম্ ঝিম্‌
করছিল। নামতে নামতে শেষের সিড়িত হোঁচট খেয়ে পড়লেন।
আছাড় খেলেন না বটে কিন্তু হঠাৎ চাড় লাগতেই মুখের ভিতর
থেকে তার নকল একপাটি দাত খুলে প্রায় ছিটকে বাইরে
পড়েছিল আর কি, তাড়াতাড়ি এদিক ওদিক তাকিয়ে দাতের
পাটিটাকে আবার যথাস্থানে সংযােগ করে দিয়ে তিনি
বাইরে এলেন।
বাগানটা পার হয়ে যাবার সময় অন্ধকারে তিনি একবার
থমকে দাড়ালেন। আলােয় হাসিতে আননে গানে ও সুন্দর
তরুণীগণের অপরিমিত প্রাণচাঞ্চল্যে এই বিস্তৃত প্রাসাদ অভিন
জীবনের রসে তখনাে টন্ টন্ করছে। একবার মাত্র সেদিকে
૧૨

নিশিপদ্ম
তাকিয়েই ছােটমাসিমা ফটক পার হয়ে পথে নেমে ডান দিকের
গলির পথ ধরলেন।
অনেকদূর থেকে একটা গ্যাসের আলাে এসে পথের ওপর
পড়েছিল। জনহীন পথ। চলতে চলতে তিনি একটা জলের
কলের কাছে এসে দাড়ালেন। অঃ তৃষ্ণা র ভিতরটা
একেবারে মরুভূমি হয়ে গেছে। গলাটা একটুখানি ভিজিয়ে
নেবার জন্য তিনি কল টিপলেন কিন্তু জল পড়লাে না। কলের
জল তখন চলে গিয়েছিল।
কলের লৌহ দেহের ওপর ভর দিয়ে তিনি নিশ্চল হয়ে
দাড়িয়ে রইলেন। দেখতে দেখতে কাচের চশমার নীচে দিয়ে
তার অবারণ অশ্রুর ধারা গালের ওপর গড়িয়ে এল। সে-অফ
কেবল অপমানের এবং উপেক্ষাই নয়, বিগত যৌবনের করুণ
ব্যর্থতারই নয়, কিম্বা যে কলঙ্ক রটনার জঘন্য কৌশল একটু আগে
তার নির্মম ভাবে মিথ্যা হয়ে গেছে তার জন্যও নয়,আপনার
শূন্য জীবনের সকল দৈন্যকে তিনি আজ স্পষ্ট দেখতে পেয়েছেন,
এ অশ্রুতে তার বেদনাও হয়ত নিহিত ছিল।
৭৮

مزململا

পরিচয় :
সামাজিক ও সংস্কারবদ্ধ মানুষের তথাকথিত নৈতিক
চেতনার সঙ্গে দু'টি জনপ্রিয় স্ত্রী-পুরুষের সংঘাত ও লাইন।
-তাই নিয়ে এই গল্প।

প্রকাণ্ড কৃষি-শিক্ষা-কেন্দ্রটিকে আশ্রয় করে বেশ একটি সুশৃঙ্খল সমাজ গড়ে উঠেছিল। চাকুরে ছিল জাতি-বর্ণ- নিৰ্বিশেষে, কিন্তু বাঙালীৰ সংখ্যাই বেশী। বাঙালী-অঞ্চল একটু দূরে ; আলাদা হাল চাল, ভিন্ন রীতি- নীতি। তবে সুসংবাদ এই, স্বল্প সংখ্যক বাঙালীর মধ্যে বন্ধুতা এবং সহানুভূতির অভাব দেখা যেত না। সবাই হিল উদার এবং পরস্পরের শুভাকাঙ্ক্ষী ; অতঃ, বাইরে থেকে তাই মনে হতাে। চাকুরে বটে, কিন্তু সবাই কেরাণী নয়। কেউ ডাক্তার, কেউ ইঞ্জিনিয়ার, কেউ ফটোগ্রাফার, কেউ বা ওভারসিয়ার। তা বলে’ কেরাণী কি আর কেউ ছিল না ? ছিল। যে ছােৱা-ডাক্তারটি নতুন এসেছেন, তিনি খুব সেখান লােক। নিজের কোয়ার্টারটিকে এরই মধ্যে আশ্চৰ্য্য রকম তিনি আকর্ষণীয় করে তুলেছেন। কিছুদিন আগে পর্যন্ত এ নিকটা সন্ধ্যার পর থেকে একরকম নিশুতিই থাকতাে, এখন এখানে নিত্য অতিথি-অভ্যাগতের নিয়মিত যাতায়াত, হাসি তামাসা, কলধ্বনি, গান-বাজনা ;—এবং এই গান-বাজনাই ছিল ডাক্তারের প্রিয় বস্তু। শুধু তাই নয় ; ডাক্তারের স্ত্রীটিও ছিলেন বিশেষ সঙ্গীতানুরাগিনী। নাম পদ্মা। গানের গলাও যেমন তার

নিশিপদ্ম
আশ্চৰ্য্য, বেহালার হাতও তেমনি চমৎকার। দুপুর বেলায়
বাঙালীর মেয়েরা সবাই পদ্মর গান শুনতে আসেন।
কোলে এক বছরের একটি ছেলে। সারা দুবে, দালানে,
উঠোনে, হামাগুড়ি দিয়ে বেড়ায়।–কি দুরন্ত ছেলেরে বাবা,
কাজ-কৰ্ম্ম অমনি সব ভণ্ডুল করে দেয় !
দুষ্ট!—চোখ পাকিয়ে হেসে " বলে—কার্পেটের ফুল যদি
আজ শেষ করতে না দাও তাহলে যে--
ছেলের মুখটি মুখের কাছে এনে পদ্মা পুনরায় বলে—তােমার
বাবা যে রাগ করবেন ! নাঃ বাবা রে বাবা, সব ছিড়ে-খুঁড়ে
এশা করে দিল। আমি কঁদি?
কৃত্রিম অভিমানে মাকে কাঁদতে দেখে ভােঙ্গলের ঠোট দুটি
ফুলে ওঠে।
ছেলেটিকে কেন্দ্র করে পদ্মার ত অশান্তি, ত উচ্ছলতা।
নদী যেমন আবর্তে ঘুরে ঘুরে চলে, ছােট শিশুর দুরন্তপনায় পাক
খেয়ে পদ্মা তেমনি সারাদিন ছুটে চত।
স্বামী তার স্ত্রী—নে হর-পার্লতার মিলন।
কেউ বলত—ক্ষ্মী! রূপে-গুণে। গান-বাজনা জানে,
সেলাই-ফেঁাড়াইয়ের
জানে,
কিন্তু গেরস্থালীতেও
যে এমন পাকা গিন্নি—বাঃ, হিংসে করতে গেলেও
গেলেও লজ্জা
হয় !

নিশিপদ্ম
ইঞ্জিনিয়ারের স্ত্রী চশমাটি চোখে তুলে দিয়ে সুন্দরী হেমাঙ্গিনীর
প্রতি কটাক্ষ করে’ বলতেন—আর রূপ ?
ধীরে ধীরে হেমাঙ্গিনীর মাথা হেঁট হয়ে আত।
বাঙালী মেয়েদের সমাজে পদ্মার ছিল সর্বশ্রেষ্ঠ আসন।
পুরুষরা কাজে বেরিয়ে গেলে মেয়েদের একটি জটলা বসে। কোনাে
না কোনাে রূপে পদ্মাই তঁাদের আলােচনার কেন্দ্র।
হক, সদ্ব্যবহারের প্রশ্ন হােক, শিক্ষা দীক্ষার প্রশ্নই কে—পদ্মার
মধ্যে এ গুলির সুসমম্বয় লক্ষ্য করে মেয়ে: অবাক্ হয়ে থাকে।
ললিতা রােজ সেতার শিখতে আসে। আগামী বাঢ়ে
তার বিয়ে। পাত্র প্রস্তুত। যােল সতেরাে বছরের মেয়েটি যেমন
ভদ্র তেমনি মাধুৰ্যময়ী।
—বৌদি, আজ তােমার বাড়ী ঢুকতে ভারি লক্ষা করছে।
তবে তােদর বাড়ী আনায় নিয়ে চল্ ?—প বলে ।
সত্যি, কাল তােমার নতুন সেতারের বড় তারটা ছিড়ে
ফেললাম ! কি অন্যায় বল ত ?
পদ্মা বলে—তার ছিড়েছি, সুর কাটতে ত আর পারিনি।
ললিতা হাসতে হাসতে গিয়ে ভােম্বলকে বুকের ওর তুলে
নেয়। পদ্মা চোখ রাঙিয়ে বলে—ছেলেকে নিয়ে যে তুমি যন্তরে
হাত দেবে না, এ-রকম ফাকি দিলে চলবে না কিন্তু, আমি এখন
মাষ্টার মশাই!

নিশিপন
ললিতা বলে—আজ আমার পেট কামড়াচ্ছে মাষ্টার মশাই !
মাষ্টার মশাই একটু হেসে বলেন-ভাবী স্বামীর প্রেমে পড়েছ
নাকি ?
দূর !–বলে’ ছেলেটিকে ধুপ করে মাটিতে নামিয়ে দিয়ে
দ্রুতপদে একেবারে সটান্ ললিতা নিজেদের বাড়ী পালায়।
মুখে আগুন বৌদির !
কিছুক্ষণ পরে বড়-পিসীমা এসে এক পা ঘরের মধ্যে দিয়ে
বলেন-কই গাে, মাথার মণি কই ?
ভিতর থেকে পদ্ম বলে—মাথার মণি ধূলােয় লুটোচ্ছে পিসিমা।
ষাট ষাট, কেন গাে?
আর কেন ! দেখুন না !
পিসিমা এসে দেখেন, পদ্মা উঠোন ঝাঁট দিচ্ছে। চোখ
টিপে হেসে তিনি বললেন—ওমা কি হবে গাে ! কোথা যাবাে ।
ঝিয়ের আসনটা কি তুই অদল-বদল করে’ নিলি ?
পিসিমার রসিকতার একটি চমৎকার উত্তর পদ্মার মুখে
এসেছিল, কিন্তু কথাটা ঘুরিয়ে নিয়ে সে বা—মি আর কত
পারবে বলুন, বুড়াে মানুষের একার সাধ্যে কুলােয় না !
ডােম্বল কোথা গেল ?
তার কথা আর বলবেন না ! দাইয়ের কঁাধে চড়ে দেশ জয়ে
বেরিয়েছে।
৮ঃ

নিশিপদ্ম
বসবার একটি আসন দিয়ে পদ্মা বলে—আজ তােমাকে একটি
ভাল জিনিস খাওয়াবাে পিসিমা।
পিসিমা বলেন—সেই জন্যেই ত এলাম ! তাের বাড়ীতে ভাল
ভাল জিনিস খেতেই আসি, তা বুঝি এদ্দিনে তুই?
মুখে তাঁর হাত চাপা দিয়ে পদ্ম বলল—মানুষকে লজ্জায়
ফেলতে তুমি একটি ! আমি কি তাই বললাম ?
বাইরে কার ছায়া দেখা গেল। মুখ বাড়িয়ে পর। দেখল
হাঁ, হেমাঙ্গিনীই বটে।
এসাে ভাই হেমাদি’? এই বেতের চেয়ারটা নিয়ে বসে।
চায়ের জল চড়িয়ে তােমাদের ডাকতে যাবাে ভাবছিলাম।
হেমাঙ্গিনী বিবাহিত মেয়ে । বয়স বছর পঁচিশ। সন্তানাদি
নেই। বহুদিন থেকে স্বামীর সঙ্গে কি জানি কি কারণে
মনােমালিন্য,শ্বশুর-বাড়ী যায় না !
কথাবার্তা হেমাঙ্গিনী একটু অল্পই বলে। মুখে হাসি তার
সহজে আসে না।
পদ্মা বল—গান শুনবে হেমাদি’?
হেমাঙ্গিনী ঘাড় নেড়ে বল—তাই ত এলাম !
এজাজের একটা সুর ধরে’ পদ্মা একটি চমৎকার গান সুর
করে দিল। গানের আওয়াজ পেয়ে সবাই ছুটে এসে হাজির
ললিতা, মনােরমা, ইঞ্জিনিয়ারের স্ত্রী, হারাধন ডাক্তারের স্ত্রী

নিশিপদ্ম
E
সরস্বতী, রায় বাহাদুরের বােন—সবাই এলেন। ইঞ্জিনিয়ারের
স্ত্রী চশমাটা ভাল করে একবার মুছে নিয়ে আবার চোখে লাগিয়ে
হেমাঙ্গিনীকে কিছুক্ষণ স্পষ্ট করে দেখে নিন।
গান শেষ করে পদ্ম বা—বেশ, আজ থেকে এই নিয়মই
হাল রইল, ঢায়ের জল চড়িয়ে ডাকতে যাবার চেয়ে এক টা করে’
গর্দভ-রাগিণী ধরব, সবাই এসে হাজির হবে।
সবাই হাসল। ভাল যাকে বাসা যায়, সকল কথাই তার
ভাল লাগে। পদ্মা সবার কাছে নারী-জাতির গৌরবের ধন !
বড় পিলিমা এত চুপ করে ছিলেন। এবার বললেন :
—সবাই রয়েছে তবুও বলি, ও-হাতে কাটা আর ধরিনো পদ্ম !
একটু সলজ হেসে উঠে যাবার তাগে পদ্মা বহমাদি,
গান কেমন লাগল ?
হেমাঙ্গিনীর হয়ে ইঞ্জিনিয়ার-প। উত্তর দিতেন—এ কি আবার
জিজ্ঞেস করবার কথা মা ?
পদ্মা সবাইকে পেয়ালা করে’ চা ও রেকাবি করে জলখাবার
এনে দিল। সবাই সাননে হাত বাড়িয়ে সেগুলি এহণ করলেন।
শুধু সেগুলি অহাৰ্য বস্তু বলে’ নয়—এই মেয়েটির যৎসামান্য
প্রীতির দানকেও তারা শ্রদ্ধার সঙ্গে, রেহের সঙ্গে, গৌরবের সঙ্গে
গ্রহণ করে’ অপরিসীম তৃপ্তি পেতেন।
রায়বাহাদুরের ছােট বােন সরােজিনী আজ দিন তিনেক

নিশিপদ্ম
হলো শ্বশুর-বাড়ী থেকে এখানে এসেছেন, আপাততঃ চলে যাবার
ইচ্ছে তার নেই। পদ্মা একবার তার দিকে তাকিয়ে মনােৱমাকে
বল-উনি যে খেতেই পাচ্ছেন না !
সরস্বতী চট্ করে’ মুখ ফিরিয়ে বললেন— করে’ পেও না
ভাই, এ বাংলা দেশ নয় ; জল-হাওয়ার গুণ এমনিই যে লজ্জা
করে খেলে ঠকতে হয়।
ইঞ্জিনিয়ার-পত্নী এবার চশমাটা চােখ থেকে নামিয়ে সত্যিই
হেসে উঠলেন। শেষ একটি হাসির পর সাধারণতঃ সভা ভাঙ।
পরিপূর্ণ দিনের আলােয় যেমন একটি আনন্দের বার্তা ,
নিবিড় রাত্রির একটি নিঃশব্দ মাধুৰ্য্যও তেমনি স্বামী স্ত্রীর কাছে
সমান আনন্দ বহন করে আনে। দুজনের প্রেমের মধ্যে একটি
সুন্দর মিগ্ধতা ছিল। তার মধ্যে যেটুকু উচ্ছ্বাস, যেটুকু ফেনা,
যেটুকু অকারণ—সেটুকু মিলিয়ে গিয়েছিল এবং যেটু হির,
শিল্পসম্মত এবং সৌন্দৰ্য্যময়, সেইটুকুই প্রকাশ পেয়েছিল।
সেদিন যতীন ব“তুমি ত সব পারাে?
ত সব পারাে ? এত মেয়ে ভক্ত
জোটালে কোত্থেকে বল ত’ ?
পদ্ম হেসে বল্ল-তােমার ভক্তের দল ত আমার চেয়েও
বেশী ।
আমরা বােধ হয় মন্তর জানি! কি বল ?
৮৭

নিশিপদ্ম মন দিলে মন্তরের দরকার হয় না ! যতীন বল—আচ্ছা, সত্যিই কি সবাই আমাদের ভালবাসে পদ্মা ? পদ্মা স্বামীর মুখের দিকে একবার তাকালাে। পরে ক্ষুব্ধকণ্ঠে ব—ছি ছি, মানুষকে সন্দেহ করবার প্রবৃত্তি আমার যেন না আসে ! কি বললে তুমি? স্বামী-স্ত্রীর অতিথি-বাৎসল্য এবং বন্ধু-প্রীতি পাড়া প্রতিবেশীদের অন্তরের অতি সন্নিকটে এনে রেখেছে। কাজে কর্মে, উৎসবে- আয়ােজনে, পালপাৰ্বণে সর্বাগ্রে তাই পদ্মা ও যতীনকেই তাদের মনে পড়ে। সধবার মাথায় সিদূর দিয়ে কোনাে বার ব্রত করতে গেলে একে একে সবাই পদ্মার কাছে আসে। পদ্মা ছিল তাদের সমস্ত কৰ্ম্মজীবনকে 'আচ্ছন্ন করে। যতীন কোনাে কোনাে পূজার মন্ত্র জাতে। পুরােহিতের প্রয়ােজন কোথাও হলে তাকেই ডেকে নিয়ে গিয়ে অনেকে মন্ত্র পড়িয়ে পূজা সেরে নিত। তা ছাড়া ‘ভেট’ ‘তত্ব’ ‘সিধে’-এ সব ত তার ঘরে প্রায় নিত্যই এসে জমা হতাে। প্রতিদিন সকাল থেকে সুরু করে রাত্রি পর্যন্ত স্নেহভাজন এবং শ্রদ্ধাভাজনের ভিড়ও যেমন তাদের ঘরে লেগে থাকত, তেমনি এই সময়টুকুর মধ্যে স্নেহের ও শ্রদ্ধার অর্ঘ্য হিসাবে নানারূপ ভােজ্য, উপভােগ্য, এবং পরিধেয় বস্তু তার ঘরের মধ্যে তূপীকৃত হয়ে উঠতাে। ৮৮

নিশিপদ্ম
পদ্মা বল–বিপদে পড়লাম।
যতীন বল্ল-তাই ত, এত জিনিস রাখি কোথায় ?
ভালবাসার এ উচ্ছ্বাসকে এড়াই কি করে ?
পদ্মা একবার তাকিয়ে দেখলাে, প্রতিবেশীর প্রীতির দানে
ঘর-দোর একেবারে প্লাবিত হয়ে গেছে, আর তারই মাঝখানে
বসে’ ডােম্বল পরমানন্দে সমস্ত ওলােট-পালট করতে সুরু করেছে।
করুণ দৃষ্টিতে সেগুলির দিকে একবার তাকিয়ে পদ্ম বলে—
এত নষ্ট আমি বাপু সহ্য করতে পারিনে, বড় পিসিমাকে ডেকে
হয় কাল একবার
যতীন তাড়াতাড়ি এসে তার সেই সুন্দর আরক্ত অধরের ওপর
একটা হাত চাপা দিয়ে ব–চুপ, ও-কথা মনেও এনাে না !
যে জনসাধারণের ভালবাসা,এ যেমন অন্ধ, তেমনি
বিবেচনাহীন। ওদের ভালবাসাকে সংযত করতে গেলে গালাগাল
দিয়ে উঠবে ! আজও একথা বুঝতে পারেনি ?
পদ্ম শিক্ষিতা, বুদ্ধিমতী, সুন্দরী—কিন্তু স্বামীর এ মন্তব্যের
পর তার দুটি আয়ত সরল দৃষ্টি দেখে মনে হতাে, সত্যি–স্বামীর
অনুপাতে সে যে কিছুই জানে না।
মনে হতাে, স্বামীর কোনাে বেদনাময় অভিজ্ঞতার মধ্যে সে
নিতান্ত শিশুর মত আত্মদান করেছে।
সাপ্তাহিক ছুটির দিনে অপরাহু-বেলায় সবাই বেড়াতে

নিশিপদ্ম
•
বেরােয়। স্ত্রী-পুরুষ ছেলে-মেয়ে সবাই এক সঙ্গে। কাছেই
একটা ছােট জঙ্গল ! সেটা পার হয়ে গেলে ক্ষুদ্র একটা নদীর
বক পাওয়া যায়। বিকাল বেলা এই বাকের ধারে এসে সবাই
জড়াে হয় ; ছেলে-মেয়েরা খেলা করে ; মেয়েরা কেউ কেউ হয় ত
গানও গায়, পুরুষেরা কাজের সংক্রান্ত কথাবার্তা বলে। পদ্মা
ছিল এই মেয়ের দলের সভানেত্রী। মেয়েদের মনে? ত ভাল
গল গল্প বলতে পারতো সে চমংকার ।
সন্ধ্যা হতে সবাই ফেরে। আগে মেয়েরা, ছি, পুরুশরা।
একটু একটু অন্ধকার হয়ে আসছি। পাশ থেকে আওয়াজ
এল—তানের গলা না ?
নিঃার রায় ও যতীন একসঙ্গে আসছিল। ওখ ফিরিয়ে
বন আজ্ঞে হ্যা, আপনারা যে দলছাড়া হয়ে পড়েছেন
শালিমা ?
এই আমার মেয়ের সঙ্গে একটু কথা বলছি, আজ ন ল এসেছে
কি না! এর মধ্যেই তারা বাসায় ফিরতে যে? আজ ভাবছিলাম
তোমার ওখানে গান শুনতে যাবাে আমার মেয়েকে নিয়ে !
নিষ্টার রায় বললেন--মাসিমা, গুড়, ইভনিং।
মামা বললেন—বেঁচে থাকো বা !
মেয়েটি মায়ের পাশ থেকে এতক্ষণ তীনের প্রতি তাকাচ্ছিল,
এবার একটু সরে এসে বিস্মিত কণ্ঠে বঙ্গ—আপনি এখানে?

নিশিপদ্ম
হঠাৎ একটু থতিয়ে গিয়ে যতীন বল্প—কেন বলুন ত ?
আমায় চেনেন নাকি ?
খুব ভাল করেই চিনি! কলকাতায় আমার শ্বশুরবাড়ীতে
'আপনি ভাড়াটে ছিলেন, মনে নেই ? চলে আসতে কেন হয়েছিল
তাও নিশ্চয় আপনার মনে আছে !
ওরে বাবা, এ কি কণ্ঠস্বর । মেয়ের গলার হওয়া
শুনে সবাই হতচকিত হয়ে চুপ করে রইল।
সে পুণ:য় ব–আনার সঙ্গে এখনও তাই । সেই
ছুড়ি ? সে কে আপনার শুনি?
আমার সঙ্গে? আমার স্ত্রীর কথা বলছেন?
স্ত্রী? ও মাগিটা স্ত্রী 'আপনার ?
নিশ্চয়ই। এ ত’ সবাই জানে।
মেয়েটি মুখ বিকৃত করে বলমিথ্যে কথা! বাইক
আপনি তাই জানিয়েছেন! ও হ’ল কায়হর মেয়ে, আর আনি
বামুন ! অামাকে আর বাজে কথা বলে' ভেবেন না, আমি
একটু চালাক মেয়ে ! বিয়ে না করা বউকে ভদ্রনাড়ে চালিয়ে
দিতে লজ্জা হল’ না আপনার ?
মিষ্টার রায় হঠাৎ এগিয়ে চলতে শুরু করে নিতেন। তার
পিছনে যেন বজ্রাঘাত হয়েছে !
অবশ্য ওইটুকুই যথেষ্ট ! মায়ের হাত ধরে তাঁর তেজস্বিনী

নিশিপদ্ম
কন্যাও ক্ষুব্ধ রােষে ও মৃদু গর্জন সহকারে এগিয়ে চলতে
লাগলাে ।
পিছন থেকে যতীন একবার ডাক্তােমাসিমা ?
মাসিমা কোনাে উত্তর না দিয়ে এগিয়ে গেলেন ; এবং এমন
ভাবেই চলতে লাগলেন যে, মনে হয়, তারা কোনাে দর হাত
থেকে আত্মরক্ষা করছেন।
বেদনার বিবর্ণতায় সমস্ত দিনমান জ্ঞান হয়ে আছে। আনন্দ
করেছে আত্মহত্যা! স্নেহ, প্রাতি, বন্ধু , সহানুভূতি—যেন কোন
কঠিন আঘাতে অকস্মাৎ মূৰ্ছা গেছে।
ললিতা গান শিখতে আর আসে না। পিসিমার স্নেহের
শাসন নীরব। ইঞ্জিনিয়ারের বাড়ীর সুমুখের জানা গুলি বন্ধ
করে দেওয়া হয়েছে। পদ্মার গান শােনবার আগ্রহ আর
কারাে নেই।
গলা বাড়িয়ে পদ্মা একবার পাশের বাড়ীর মনােরমাকে
ডেকেছিল, কিন্তু সাড়া পাওয়া যায়নি। সরস্বতীকে খুজতে
গিয়েছিল, তিনি পত্মাকে দেখেই শােবার ঘরের দরজা বন্ধ করে
নাক ডাকাতে সুরু করেছিলেন।
সমস্ত দিন এখন পদ্মার একা কাটে। বন্ধুত্ব না পাওয়া এক রকম,
কিন্তু পেয়ে হারানাে 'আর এক রকম! পদ্মার চোখে জল আসে

নিশিপদ্ম
একাকী ভােম্বল আজকাল আর খেলাধূলা করতে পারে
! এ-কোল থেকে ও-কোলে যাবার লােক এখন আর
নেই। খানিকক্ষণ দুরন্তপনা করেই সে ঘুমিয়ে পড়ে। ঘুমােয়
একেবারে অকাতরে ! শিশুর মনেও যেন একটি অবসন্নতা
এসেছে।
এ কি হল গাে, এ যে দম আটুকায় ?
যতীন বলে—দম আটকালে টবে কেন পদ্ম
পাপের শাস্তি।
পাপ!
নয় ত কি ? তােমাকে বিয়ে করিনি এর চেয়ে বড় পাপ
আর কি হতে পারে ?
উত্তেজিত কণ্ঠে পদ্মা বলে—চুলােয় যাক্, উে না আসুক
আমরা বেশ আছি।
করুণ একটুখানি হেসে যতীন বেরিয়ে চলে যায়।
কিন্তু সবাইকে ত্যাগ করলে মানুষের চলে না। কারো সঙ্গে
কিছু সম্বন্ধ প্রতিষ্টিত না করলে ব্যক্তিগত প্রেমের জীবন মানুষের
কাছে নিতান্তই অসহায় হয়ে পড়ে। জনসমাজকে ত্যাগ করা
মানে আত্মহত্যা করা !
সবাই যারা আজ দূরে সরে গেছে, তাদের সকলের জন্য
পদ্মার অন্তর ক্রমে ব্যাকুল হয়ে ওঠে। ত্যাগ করে ত’

নিশিপ
চলবে না ! সকলকে যে আপন করে নিতে হবে। তারা স্বামী-স্ত্রী
হয়ে সকলের মধ্যে যে বাঁচতে চায়।
পদ্মা বলল—সকল জায়গায়ই কি আমায় এমনি লাঞ্ছনা
সইতে হবে ?
যতীন বলল—সকল জায়গায় এবং সমস্ত জীবন ধবে ।
স্বামীর বুকের মধ্যে মুখ লুকিয়ে পদ্মা ব—এত আঘাত কি
তুমি সইতে পারবে?
যতীন তাকে দু'হাতে জড়িয়ে ধরে বল্‌-আমি তােমার
কথাই ভাবি না।
এমনি করে এই বিচ্ছিন্ন, একক, বঞ্চিত দুটি নরনারীর
নিরানন্দ দিন কাটতে থাকে । বিবাহিত স্বামী স্ত্রী নয়
এইটুকুই যথেষ্ট—আর কিছু তাদের
কিছু তাদের শােনবার প্রয়ােজন
ছিল না। তার মধ্যে না ছিল ধৈৰ্য, না ছিল ক্ষমা, না
সহানুভূতি।
বিবাহিত নারী নয়—এর চেয়ে বড় অকল্যাণ সমাজে আর
কি থাকতে পারে ।
সিংহাসন চুরমার হয়ে গেল! মাথার মণি ধূলােয় লুটোলাে ;
আন্তরিকতা পদদলিত ও বিধ্বস্ত হয়ে গেল! এতদিনের এত যত্ন,
এত আদর, এত আত্মীয়তা, এত ঐকান্তিকতা—আজ ওরা তার
কোন মূল্যই দিল না !

নিশিপদ্ম
হঠাৎ মুখে-চোখে কাপড় চাপা দিয়ে পদ্মা উচ্ছ্বসিত হয়ে
কেঁদে উঠল ।
যতীন ব–অনেক চোখের জল পড়েছে—বুঝানে, কিন্তু এ
ভিত, টলেনি! তুমি টলাতে চাও তাকে?
কান্নায় পদ্মার সর্বাঙ্গ কঁপছিল। বল-না, তা আমি
চাইনে, শুধু এদের সবাইকে আমি ভালবাসতে চেয়েছিলাম।
তার দাম ত পেলে, আবার কি চাও?
পদা মুখ-চোখ মুছল ; উত্তেজনায় সে একেবারে অস্থির রে
উঠেছিল। চুল গুলি ঠিক করে নিয়ে মাথা উচু করে বল—বশ,
তবে আর একবার দেখেই আসি !—বলে তাড়াতাড়ি সে একটা
চাদর টেনে গায়ে জড়িয়ে বেরিয়ে গেল। ওদের কাছে গিয়ে সে
কৈফিয়তের দাবি করবে !
সুমুখেই বড় পিসীমার বাড়ী। ভিতরের দালানে সবাই জটা
বসে ছিল। পদ্মাকে দেখেই একজন তাড়াতাড়ি এসে আদনান
মাটি থেকে তুলে নিয়ে চলে গেল। অপমানে পদ্মার খ
একেবারে কালি হয়ে এল। যা বলতে এসেছিল সমস্তই সে তাে
গেল। তবু একটু থমকে বা—পিসিমা, আমি কি অন্যায় করেছি
যে এম্‌নি করে তােমরা?
হেমাঙ্গিনী কোনােদিন বেশী কথা কয়না। আজ হঠাৎ ফেটে
উঠে বলল - এটা লেকচার দেবার জায়গা নয়, গেরস্থর বাড়ী।

নিশিপদ্ম পিসিমা মুখ ফিরিয়েই রইলেন, কোনাে কথা বলেন না। ইঞ্জিনিয়ারের স্ত্রী চশমাটা ভাল করে চোখে লাগিয়ে বললেন-গেরস্থ বাড়ীতেও লেক্চার দেওয়া যায়, কিন্তু তুমি তার যােগ্য নও। আমি জানিনে তুমি আজও লােকের কাছে মুখ দেখাচ্ছ কেমন করে ? অপরাধীর মত পদ্মার মাথা হেঁট হয়ে গেল। কি প্রতিবাদ সে করতে পারে! সরস্বতী একটি কথা সেলাই করছিলেন। বললে—এখানে দাড়িয়ে থেকে আর লাভ কি!“ওরে বাপ রে, এত জানতাম না । কথায় বলে—‘মরবে নারী উড়বে ছাই, তবেই নারীর গুণ গাই ! ভাগ্যি সময় থাকতে ধরা পড়েছিলে ভাই । তবুও দাড়িয়ে আছে দেখে হেমাঙ্গিনী অধীর হয়ে বলল- ব্যবসাটা খুলেছ বেশ, গান-বাজনাও ত জানাে! শহরে গিয়ে দোকান একটা পাতলেই ত হয় । সবাই খিল খিল করে হেসে উঠে হেমাঙ্গিনীর কথায় সায় দিল। সুস্পষ্ট এই ভয়ানক অপমানকর ইঙ্গিতটা শুনে পদ্মা একেবারে শিউরে উঠলাে; পরে নিজেকে দমন করে সহজ গলায় বল্ল- মাথা পেতেই নিলাম। প্রার্থনা করি পরের জন্মে নেন ঠিক এই কারণেই আবার তােমাদের কাছ থেকে ঠিক এমনি অপমানই মাথা পেতে নিয়ে যেতে পারি !

নিশিপদ্ম
বলতে বলতে লাঞ্ছিতা, আহতা, উপেক্ষিত পদ্মা সিংহিনীর
মত মাথা উচু করে আবার বেরিয়ে চলে গেল।
সেদিনের পর থেকে কিন্তু পালিশ করা ভব্যতাকে ছিন্নভিন্ন
করে’ পাড়ার লােকের আসল রূপটি প্রকাশ পেতে লাগলাে।
যে লােকটি গাড়ী করে শাক-সৰ্জী আনতে, জানা গেল এ
বাড়ীতে সে আর জিনিসপত্র বিক্রী করবে না। বােপা কাপড়
দিয়ে গেল, কিন্তু দামও নিল না, কাপড়ও আর নিয়ে গেল না।
দুধওয়ালা আর দুধ দেয় না। মুদি জিনিসপত্র বন্ধ করেছে ।
এমনি করে সমস্ত মহাজনগুলি একে একে যতীনকে পরিত্যাগ
করে চলে গেল।
একটা চাকর বাসন মেজে দিত, কিন্তু কাল মাইনে নিয়ে
যাবার পর থেকে আর তার দেখা নেই। হিন্দুস্থানী ঝিয়ের শরীর
খারাপ—সে বাড়ী যেতে চায়, মাহিনা চুকিয়ে দাও।
শুধু তাই নয়, আশপাশের ঘােট ঘােট বাড়ীগুলি থেকে সময়ে-
অসময়ে হাসি-টিটকারি আসতে শুরু করেছে ! পদ্মর কণ্ঠের
বিদ্রুপাত্মক নকল করে’ কে একজন আবার সঙ্গীত চর্চাও করে।
সরস্বতী সদর দরজার কাছে দাড়িয়ে সবাইকে শুনিয়ে একদিন
স্পষ্টই বললেন—পাড়ায় সব বিয়ের যুগ্যি ছেলে মেয়ে রয়েছে, এ
ঢলানিপানা দেখলে তাদের মন কি ভাল থাকবে ! গলা ধাক্কা
দিয়ে তাড়ানাে উচিত।
৯৭

নিশিপদ্ম
বাড়ীর কর্তারা সেদিন প্রকাশ্য সভা করে প্রস্তাব পাশ
করলেন -আমরা বেশীদিন আর অশান্তি ভােগ করতে রাজী নই।
এতকাল দিব্যি আরামে ছিলাম, আপদটা এসে আমাদের সমস্ত
সুর লণ্ডভণ্ড করে দিল। ওকে তাড়াতেই হবে।
পদ্মা সে কথা শুনে বল—আমরা কি অশান্তির সৃষ্টি করছি ?
যতীন বল—নিশ্চয়ই, তুমি ইচ্ছামত স্বামী নিৰ্বাচন করে ঘর
করবে, তার মানে তুমি ত দেশ শুদ্ধ লােকের মনে আগুন লাগাতে
পারাে! তােমার আদর্শ থেকে ওরা আত্মরক্ষা করবে না?
পদ্মা খানিকক্ষণ পরে বল-এর উত্তরে তুমি কি কেবল চুপ
করেই থাকবে ?
যতীন একটু হাল্স ; বল—তুমি কি বলতে চাও আমি গিয়ে
ওদের বােঝাবাে যে, ওগাে না—বিয়ের চেয়ে প্রেম বড়, মন্ত্রের চেয়ে
মিলন বড়?
তা কেন? তুমি গিয়ে বলবে যে আমরা অন্যায় করিনি।
কাকে বলব?
কেন, ওদের ?
সর্বনাশ, তাহলে আমার মাথায় একগাছি চুলও থাকবে
মনে কর ?
পদ্মা চুপ করে রইল। যতীন তখন বল—আর নয়, এ বন্দর
থেকে নােঙর তুলে নিয়ে আমাদের আবার ভাসতে হবে পদ্ম।
১৮

নিশিপদ্ম
নিয়তিই ওই মেয়েটাকে এখানে পাঠিয়েছিল,কারাে দোষ
নেই, —ও কি, ই, বাইরে ছেলেটা অমন কেঁদে উঠলাে
কেন ?
পদ্মা দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে উঠোনে গিয়ে দেখে, ডােম্বল
হয়ে পড়ে চীৎকার করছে ; কপাল ফেটে রক্ত
গড়াচ্ছে !
যতীনও বেরিয়ে আসছিল, হঠাৎ কোথা থেকে একটা ইটের
ঢেলা এসে তার পায়ের কাছে ছিটকে পড়ল। গেল কাল থেকে
এনি মাঝে মাঝে ইট-পাটকেল এসে পড়ছিল বটে ।
আঁচল দিয়ে পদ্মা ছেলের মাথার রক্ত মুছিয়ে দিয়ে তাকে
কোলে তুলে নিল। পরে বিদীর্ণ কণ্ঠে স্বামীর দিকে চেয়ে বলে
উঠলাে—এখনাে চুপ করে থাকবে? তুমি কি পাথর ?
এতবড় আঘাত পেয়েও যতীন শুধু খানিকক্ষণ চোখ বুজে
রইল। পরে ভারি গলায় মৃদুকণ্ঠে ধীরে ধীরে শুধু ব—এ রকম
অবস্থায় পড়া ত তােমার-আমার এই প্রথম নয়, পদ্মা ? সেবার
ভাগলপুরে গিয়ে কি হয়েছিল মনে নেই ! সে ত এই এক
বছরের কথা !
ছেলেকে বুকের মধ্যে নিয়ে পদ্মা তখন ফুপিয়ে ফুপিয়ে
কঁদছিল !

নিশিপদ্ম অবশেষে একদিন সকলের মিলিত অপমানে, জঘন্য বিজপে, কুৎসিত মন্তব্যে ও সহানুভূতিহীন অলজ্জ ব্যবহারে জরিত হয়ে যতীনকে এখানকার চাকরিটি ছাড়তে হল। মানুষের কাছে মানুষের যে একটি স্বাভাবিক পাওনা, এতদিন একসঙ্গে থাকার দরুণ অন্তরে অন্তরে যে একটি সহজ প্রীতির সঞ্চারণ-আজ নিতান্ত অকরুণের মত তারা সমস্তই অস্বীকার কল। সংস্কারের কাছে প্রেম ও মনুষ্যত্বকে তারা অকুণ্ঠায় অপমান করে তাড়িয়ে দিল। নিভৃত রাত্রে অসহায় দুটি নরনারী কণ্টক-শয্যার মধ্যে বােধ করি নিঃশব্দে অশ্রুত্যাগ করছিল, হঠাৎ জানার কাছে টোকা পড়তেই পদ্মা বল—কে ? মৃদু কণ্ঠস্বরে উত্তর এল—আমি, দরজাটা একবার খােল ত বৌদি ? তাড়াতাড়ি উঠে এসে দরজাটা খুলে দিয়ে পদ্মা বল্ল- ললিতা, এত রাতে কেন ভাই? তুইও বুঝি এবার বাড়ী বয়ে’ অপমান করতে এলি ?—পদ্মর কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে এল। ললিতা চুপি চুপি ভিতরে এসে দাড়ালাে। তারপর বল্ল- শুতে যাচ্ছিলাম, লুকিয়ে তাই একবার শুনলাম তােমরা কালকেই

নিশিপ
চলে যাবে। আমি একবার দেখা করতে এলাম বৌদি।
সেই ভালাে, তােমরা আর এখানে থেকোনা ভাই।
বলতে বলতে হেঁট হয়ে নির্বাক পদ্মার পায়ের ধূলাে ললিতা
মাথায় তুলে নিল। পরে বএবার যাই, কেউ হয়ত আবার...
যে সব লােক।
দু পা গিয়ে আবার সে ফিরে এল। হেঁট হয়ে যতীনের
পায়ের ধূলাে নিয়ে বল—দাদা, আমি আপনার ছােট বােন,
কিছু বলা ভাল দেখায় না। তবু—তবু আমার মনে হয় আপনারা
কোনাে অন্যায় করেননি।
ললিতা মুখ ফিরিয়ে তাড়াতাড়ি ঘর থেকে বেরিয়ে অন্ধকারে
মিশিয়ে গেল।
2

No text on this page.

মৰ্ম্মকামনা

পরিচয় :
সুন্দর ও মহৎ জীবনের পিপাসায় একটি নিপীড়িত নারী
ব্যাকুলতা—এই গল্পের ভাবাপ।

গৃহস্থ ঘরে ঘােট খাটো ব্যাপার এমন ঘটেই থাকে। সংসার করতে গেলে এত সব খুটিনাটির দিকে নজর দিলে কি আর শান্তি থাকে। —তােমরা যেন কী বাছা, তিন ঘর ভাড়াটে রয়েছে পাশে, ঘরের বউয়ের নিলে শাঁখ বাজিয়ে না বললে আর তােমাদের চলে না ! ছাদ থেকে গলা বাড়িয়ে যিনি হক কথা শােনালেন তিনিও ভাড়াটে। অনেকদিনের পুরােনাে এবং মুরুবিয়ানার জোরে ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন। নীচে তখনও চেঁচামেচির বিরাম নেই। একজনকে কেন্দ্র করে’ কতকগুলি মেয়ে-পুরুষের বিকৃত সঙ্কীর্ণ মনােভাবের অজস্র বর্ষণ চলছিল। ননদের গলার আওয়াজটিই বেশি চড়ে। বঙ্গ-নিন্দে শুনে শুনে ত’ বউয়ের তিন অঙ্গ ক্ষয়ে গেল ! তা বলে ঘরের বউ চুরি করে খাবে গা? তুমি কি বল পাচুর মা? পাচুর মা বল্ল-তাই কি আর বলি বাছা? তা বলিনে। ছােট মেয়ে, সারাদিন চকির মতন ঘােরে, মুখে জলটুকু নেই না বলে মিছরি এক ড্যালা যদি গালে দিয়েই থাকে তাতে আর এমন কি মহাভারত অশুদ্ধ- গগ করে’ ননদ বলে উঠলােপােক পড়বে, মুখ খসে ।

নিশিপ
যাবে। চুরি করে যে খায় তার, ওকালতি যে করে তারও।
রাগের মুখে বাকি কথাটাও ভুনা। ব—রাঙা এলাে !
রূপের অংশারে পা পড়ে না,- রূপ কি আর থাকবে গা ?
ছাদের আসে থেকে সরে যাবার সময় পাচুর মা বলে
গেল-ননদের চোখে ভাজের রূপ চক্ষুশূল, এ বাছা চিরকেলে
কথা !
ননদ আবার চেঁচিয়ে উঠলাে—আচ্ছা, হয়েছে গাে হয়েছে ।
বলে, “পর লাগে না পরে’, নিজের চরকায় তুমি তেল দাও গে।
আমাদের ছাগল আমরা ন্যাজে কাটবাে-তুমি যাও।
বাঁ-দিকে কাঠের বেড়ার ফুটো দিয়ে আর একটি তরুণী
এতগণ এদের কলহ শুনছিল–ছাগলের নাম শুনেই সে খিলখিল
কয়ে হেসে লুটোপুটি খেয়ে নিজের ঘরে চলে গেল। মেয়েটি
আইন-কলেজের একটি ছাত্রের স্ত্রী-নব্য বিবাহিতা। স্বামী-
ঘাতে দুটি ঘর ভাড়া করে আছে। যুবকটি আইনও পড়ে
মধ্যাপনাও করে।
তা’ বাপের অহঙ্কার থাকলে বেমানান হত না।
বছর বাইশ
রসের বউটি এতক্ষণ সিড়ির পাশে দাড়িয়ে নিজের সম্বন্ধে এই
ঘন্য কলহ শুনছিল। জঘন্য বটে কিন্তু মিথ্যা নয়। হাতের
ঠায় আধখানা মিছরির খণ্ড তখনও রয়েছে। ক্রোধান্বিত তীব্র
ষ্টিতে সে নিঃশব্দে সেইদিকে তাকিয়ে ছিল। মুখখানি যেন

নিশিপদ্ম
ঠিক উদয়াস্তের সােনালি মেঘ। যেমনি ভাসা-ভাসা, তেমনি
আরক্ত!
সিড়ি দিয়ে ননদ উঠছিল। বল—দাড়িয়ে রইলিগে ?
বউ বল্ল-খুসী ! তােমার কি ?
আ মর! মুখ দ্যাখাে রাক্কসির। বলি মাছ কুটতে হবে না?
বউ নেমে যাচ্ছিল—খপ করে তার গায়ের আঁচলটা ধরে
প্রবীণা ননদ
বব তােকে বললেই হবে, চুরি করেছিস
কিনা বল্।
আঁচলটা ছাড়িয়ে নিয়ে মিছরির ডেটা পায়ের কাছে কেন
দিয়ে বউ বলে’ গেল—খেয়েছি বেশ করেছি, তােমার বরে পাসায়
ত খাইনি !
আবহাওয়াটাই মন্দ। দিন রাত এই অন্ধকার পরিতে
থাকা ; বাইরের আলাে-হাওয়ার চলাচল নেই। এর
ওপর
নিন্দা কলহ ও কুসংস্কারের গ্লানিতে অবরুদ্ধ বাতাস : ঝে
পঙ্কিল হয়ে উঠে
অতি বৃদ্ধা শাশুড়ী চোখে দেখতে পায় না কিন্তু কা দুটো
তা’র ভারি তীক্ষ্ণ। মুখখানা আবার তীক্ষ্মতর। বলে—মক,
অমন বউ নিপাত যাক—হে ভগবান!
কিন্তু বউয়ের সেবা নৈলে তার দিন চলা ভার।
১০৭

নিশিপদ্ম ভাই-বােন দুজনেই পঞ্চাশের কোঠায়। দুজনেই এক জাতের। বােন কঁদো কাঁদো হয়ে বলে—দেখলে দাদা, তােমার একরত্তি বউয়ের রকম দেখলে ? দাদা বলে-হলে কি কাত্যায়নী ? কাত্যায়নী চোখে কাপড় ঘষে’ বলে—বিধপা বলে' বীণা-বৌ যখন তখন আমায় গোটা দেয়। এমন করলে কোথায় যাই বল ত ? আরক্ত চোখে চেয়ে দাদা বলে—মুড়াে ঝাঁটা দিয়ে হারাম- জাদির মুখখানা ভাে, দিতে পারিস নে ? মারধাের অনেকদিন খেয়ে ভারি তেল হয়েছে—বুঝ লি কা?? কাত্যায়নী বলে কি জানি দাদা, তােমার দ্বিতীয় পক্ষের বউ- গলা উচিয়ে দাদা বলে—তা বলে আমি কাউকে রেয়াং করিনে। ভাল মানুষের মতন থাকো—বাপের ঠাকুর। নৈলে আমি- তারপর যা বলে তা অন্তত সহােদর বােনের কাছে স্ত্রীর সম্বন্ধে বলা চলে না। জাত কারবারি। তিসি আর সরষে পিষে তেল বার করে। সারা জীবন জেনেছে শুধু পেষণ। মানুষকে নিষ্পেষণ করতেও তার এতটুকু বাধে না। তা ছাড়া লােককে টাকা ধার দিয়ে সুদও খাটায়। তেজারতি! ১০৮

নিশিপদ্ম
প্রথম পক্ষের তিনটে ছেলে-মেয়ে। একটা ছেলে দুশ্চরিত্র,
আর একটা থিয়েটার করে বেড়ায়। মেয়েটা আজও বেঁচে
আছে বটে কিন্তু তার ইতিহাস বলতে গেলে লজ্জায় অপমানে
কণ্টকিত হতে হয়।
তা হাে’। এতে বাপের কোনাে দুঃখ নেই। ---
গে যাক্, বয়ে গেল ! খাওয়াবো কনি ? চরের' ক
গে যেখানে খুসি! বাপ বলে’ ত আর মাথা বিক্ৰী করিনি?
কথা শুনে অবাক হওয়া বীণার ভাল হয়ে গেছে। ৪
দিনের ছােটখাটো নাচতা, শঠ, অন্যায়, স্বার্থপরতা, তু হানতা
একেবারে যেন তার রক্তের সঙ্গে মিশে গিয়ে নি
করে ফেলেছে।
স্বামী-স্ত্রীর সম্বন্ধটিও তথৈবচ। কি একটা ভয়ানক করণে
ক্রোধােন্মত্ত স্বামী সেদিন ঘরের মধ্যে গমন কছিল। কাত্যায়নী
কাছে বসে বিনিয়ে বিনিয়ে এতক্ষণ কি বলছিল কে জানে।
কেষ্টকান্ত-স্বামীর নাম—গল বাড়িযে সকলকে শুনিয়ে খার
করে’ বল—ডাক্ দেখি, গুগের বেটিকে ডাক একবা, ওপরে
আসতে ব,বাপের নাম যদি ওর না নিয়ে দিই ত ইমার
নাম হারামজাদি ভাইবােনের নামে এমনি করেছি ছি..
কিন্তু ডাকতে হল না। পায়ের শব্দ করতে করতে বীণা
ওপরেই উঠে আসছিলাে। কিন্তু উকি মেরে তাকে দেখেই কি

নিশিপদ্ম পরের মধ্যে একটা কাজের ছুতো করে কাত্যায়নী চট করে ঘরের বার হয়ে এল। বল—যাই, এখনও আহ্নিক করা হয়নি। সিড়ির সঙ্কীর্ণ পথে পরস্পরের গা ঘেঁষা হতেই বীণা বল্ল- ভায়ের কাণে এতক্ষণ আমার নামে বুঝি বীজমন্তর দেওয়া হচ্ছিল ? কম করে তার দিকে একবার তাকিয়ে কাত্যায়নী নীচে নেমে গেল। কেকান্তর গন একটু কমলেও বিষ মরেনি। ‘ঢুকে অন্য দিকে শুয়ে বীণা বল—কেন ডাকা হচ্ছে শুনি? ঘাড় ফিরিয়ে বেকায় তার আপাদমস্তক একবার ভাল করে’ দেখল। পরে উচ্চকণ্ঠে বলল—কেন জানাে না ? । কিন্তু তার এই ঘাড় দুলিয়ে ‘না’ বলার সঙ্গে সঙ্গেই যেন একটা বিপ্লব ঘটে গেল। ঘটুলাে কেউকান্তর মুখে-চোখে। মুখের সেই কদৰ্য্য ভঙ্গী আর চাহনির রুক্ষ কৰশতার পরিবর্তে যেন একটা লেন্স ও আপিষ্ট দৃষ্টি ফুটে উঠলো। বীণার রিপূর্ণ ও নিটোল দেহখানির প্রতি অলক্ষ্যে তার একবার দেখে নিয়ে সে বলল—আমার মুখের দিকে চেয়ে কথা বলতে বুঝি তােমার ঘেন্না হয় ? দুষ্ট, কোথাকার! বীণা কোনাে দিনই এসব কথার উত্তর দেয় না। একটুখানি গলা নামিয়ে একটু হেসে কেষ্টকান্ত বল—তুমি আমার কাছে

নিশিপ
এসে দাড়ালেই তােমার ওপর আমার সব রাগ পড়ে যায়। -
কাতুর সঙ্গে রােজ রােজ এমন ঝগড়া হয় কেন?
জানিনা ক'। এসব শােনবার সময় আমার নেই।
কথা বলতে গিয়েও মেয়েটির সর্বাঙ্গে নেন তরঙ্গ খেলে ;
যাবার পথটা একটুখানি আড়াল করে দাড়িয়ে কেকান্ত বন—
রাগলেই তােমাকে যেন বেশি ভাল দেখা—যেন বল ?
বলতে বলতেই জানোয়ারের মত ধাতুর দাত পার করে সে
হাসতে লাগলাে। কিন্তু তার এই জ তােমাদের অর্থ
বীণার অপরিচিত নয়। তার দৃষ্টিতে তার দিকে একর করে
সে বেরিয়ে আসছিল—
ওকি, ছাড়ােঙ, করবার সময় এ নয়।—নিজেকে ছাড়িয়ে
নিয়ে সে তাড়াতাড়ি চলে গেল।
বন্ধুত্বটা এক পক্ষ থেকেই যেন জমে ওঠে বেশি—এবং ছাদে
উঠলে আর দেখাশুনােই হয় না। ঘুলঘুলির ফাকে খ
বাড়িয়ে চিত্রা বলে-একদিকে চেয়ে অমন করে দাড়িয়ে থাকে।
কেন ভাই ?
বীণা তার মুখের দিকে তাকায় কিন্তু কোনাে উত্তর দেয় না।
সারা দিনের বােঝা বয়ে অবকাশের সময়টিতে বন্ধুত্বে আর কচি
১১১

নিশিপদ্ম
থাকে না। একটুখানি ক্লান্ত হাসি হাসবার চেষ্টা করে বলে—
এমনি।
চিত্রার পরণে একখানি নতুন সৌখিন সাড়ী। গা জরির
কাজ করা গরদের ব্লাউস। কাণে হারের দুল দু’টি এই অবেলার
'আলােয় ঝক্ঝক্ করছে। হাতে হাল-ফ্যাসানের দুগাছি টিকটিকে
সােনার চুড়ি। মুখের ওপর লাল রােদের আভা গেছে।
সমবয়সী।
চিত্রা বলে—সবই ভাই শুনতে পাই, এমন শ্বশুরবা কোথাও
দেখিনি।
কিন্তু সবটাই নে শ্বশুরবাড়ীর দোষ নয়—এ কথা ও চিত্রা
জানে। এ মেয়েটি যে চুরি করে, মিথ্যা ও অভব্য কথা বলে,
গুরুজনকে অশ্রদ্ধা করে-এ সমস্ত চিত্রার অবিদিত । কিন্তু
সমবয়সে বন্ধুত্ব কোনাে বাধার 'অপেক্ষা রাখে না। বলে-দোষ
সকলেরই আছে কিন্তু তাই জন্যে ভাই, আমার কিছু বলা
উচিত নয়।
বন হরিণীর মত চিত্রা একদিকে ছুটে পালায়।
তার সেই লীলায়িত গতিভঙ্গীর দিকে চুপ করে তাকিয়ে বীণ।
কি ভাবে কে জানে! মেয়েটি প্রতি কথায় যেন একটি সুগন্ধের
‘আভাস দিয়ে যায়। তার সেই সুসজ্জিত ঘরখানির দিকে
বীণা তাকিয়ে থাকে। ঘরের মধ্যে কয়েকখানি সুদৃশ্য ছবি, দুটি

নিশিপদ্ম মেহগনি কাঠের ঝকঝকে দেরাজ, প্রসাধনের টেবিল সংলগ্ন বড় একখানি আয়না, বিছানাগুলি ধবধবে পরিষ্কার, সুশৃঙ্খল অন্যান্য কতকগুলি গৃহসজ্জা যেন সুনিবিড় মমতার মত ঘরখানিকে ঘিরে রয়েছে। দু’টি জীবনের ছন্দকে আশ্রয় করে একটি অপূৰ্ব ভাব- ব্যঞ্জনা ঘরখানির মধ্যে আত্মপ্রকাশ করেছে। কাঙালের মত সেইদিকে চেয়ে চেয়ে কোন্ এক সময় বীণার চোখ দুটো যেন হিংসায় জর্জরিত হয়ে ওঠে। বুকের ভিতর থেকে যেন একটা প্রচণ্ড আত্মদাহী অকারণ দীর্ঘশ্বাস সুকঠিন জ্বালা নিয়ে বেরিয়ে আসে। দিনের আলাে তখন আর থাকে না। চিত্রার যুবক স্বামিটি সাড়াশব্দ করে ওপরে উঠে আসে। সুন্দর যুবকটির চোখে মুখে যেমন তারুণ্য, তেমনি যৌবনের পুলকোচ্ছাস। অকারণে হাে হাে করে হাসে, প্রচুর কথাবার্তা বলে, নিজেই হারমােনিয়ম টেনে নিয়ে লােককে গান শােনায়, পর্যাপ্ত পরিমাণে আহার করে, অপরিমিত পরিশ্রম করতে পারে এবং নিজেদের স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য যথেষ্ট অথব্যয় করতে দ্বিধা করে না। এমন ভাবে আর দাড়িয়ে থাকা উচিত নয় ভেবে বীণা চলে যাবার চেষ্টা করে কিন্তু যেতে পারে না। দাড়িয়ে তাকে থাকতেই হয়। দেখে—সারাদিন বাদে স্বামিটি ফিরে এসে চিত্রাকে কাছে টেনে নিয়ে একটু আদর করে, তার দেহ এবং রূপসজ্জার প্রতি ১১৩

নিশিপদ্ম
তাকিয়ে বেশ সরস প্রশংসা করে, দেয়ালে টাঙানাে কোন্ এক
বিদেশী শিল্পীর আঁকা একখানি চিত্রের সঙ্গে চিত্রার তুলনা করে’
তাকে রাগায়, প্রতিদিনের মত বেড়াতে যাবার লােভ দেখিয়ে স্ত্রীর
কাছে আবার একটু তিরস্কারও শুনে নেয়।
ছােটখাটো দৃশ্য, কিন্তু সব জড়িয়ে এ যে কতখানি তার হয়
ত সীমা নেই। কি যেন একটা ভয়ানক হৃদয়াবেগে বীণার গলা
বুজে আসে।
খানিক পরে স্বামিটি বাইরে যায়—মুখ-হাত ধুয়ে আসে।
চিত্রা খাবার এনে সযত্নে খাওয়ায়। পরে বারান্দার ধারে বসে
প্রতিদিনের মতই অবসান দিনের পাণ্ডুর আভাসের দিকে চেয়ে
চেয়ে দুটিতে কি যেন প্রার্থনা করে। দুজনের মুখেই স্তবগানের
মৃদু গুঞ্জন শােনা যায়।
আকাশে তখন প্রথম সন্ধ্যা-তারাটি ঝক্ঝক্ করে ।
এতক্ষণে বীণার সেই ঈর্ষা জর্জর দুটি চোখে হু হু করে জল
এসে পড়ে। অন্ধদৃষ্টিতে হাতড়াতে হাতড়াতে তখন সে নীচে
নেমে আসে।
আসে বটে কিন্তু ভাল লাগে না। গােধূলিমলিন মুম্ষু
আকাশের দিকে চেয়ে ভাবে ওদের ঐ প্রার্থনা কার কাছে
চলেছে! অনেক রকমে সে ভাববার চেষ্টা করে কিন্তু তার
সেই চিন্তারই ফাকে ফাকে যুবকটির উচ্চ হাসি আর
১১৪

নিশিপদ্ম অসংলগ্ন কথাগুলি ধারালাে কাটার মত তার ভিতরে গিয়ে বিধতে থাকে। দোকান থেকে দুপুর বেলা ফিরে এসে কেষ্টকান্ত হিসাব- নিকাশ করছিল। দিনে-রাতে বারকয়েক তহবিল না মিলিয়ে দেখলে তার ঘুম হয় না। জমা-খরচের খাতার সঙ্গে তহবিলের সামঞ্জস্য না দেখতে পেয়ে হঠাৎ তার সব গােলমাল গেল। পাশের ঘরে বসে কাত্যায়নী তখন তার সখের বানেশ্বর শিব- লিঙ্গের সেবায় ব্যস্ত ছিল। হঠাৎ ভায়ের অস্বাভাবিক গলার আওয়াজ শুনে বলে উঠলাে—কি হলাে কি দাদা? দাদা বল-শিগগির আয়—সৰ্ব্বনাশ। কাত্যায়নী ছুটে এসে দেখল, উন্মাদ হয়ে যেতে কেষ্ট আর বিলম্ব নেই। পরণের কাপড় চোপড়ের অবস্থার দিকে আর চেয়ে থাকা চলে না। বিকৃত কণ্ঠে কেষ্টকান্ত বতবিল চুরি হয়ে গেছে কাতু, কে করলে? ও:—এই কথা ! আমি বলি কি না কি। কে করলে ? কে করলে? তুমি কি ন্যাকা?—পরে ঠোট উটে একটু হেসে কাত্যায়নী পুনরায় বল—বােধ হয় আমিই করেছি দাদা। ১১৫

নিশিপদ্ম
ইঙ্গিতটা বুঝতে পেরে কেষ্টকান্ত এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে
ব—কিন্তু বৌ ত’ কোনদিন টাকা চুরি করেনি কাকু ?
মুখ ঝাষ্টা দিয়ে অকস্মাৎ কাত্যায়নী বলে উঠলাে—তবে
আমিই করেছি, এই ত তােমার বিশ্বাস ? তা আমায় জেলে
দিও?—ফফর করে সে আবার নিজের ঘরে গিয়ে ঢুকলাে।
বাড়ীতে সেদিন একটা মহা হৈ চৈ পড়ে গেল।
ঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে এসে কেষ্টকান্ত বল—সত্যি বলছিস
কাতু, বৌ নিয়েছে ?
কাত্যায়নী বলল—আর কি শিব চুয়ে বলবাে দাদা? মরণ
হলেই বাঁচি।
ততক্ষণে কেষ্টকান্ত সিড়ি দিয়ে নেমে এসেছে। বীণা তখন
অকর্মণ্য শ্বাশুড়ীর মুখে ভাতের গ্রাস তুলে দিচ্ছিল। আর
কোনাে কথা নয়—কেষ্টকান্ত এসেই তার চুলের মুঠি ধরে’ হিচড়ে
দাড় করিয়ে বলল-ওপরে আয়।
কেন, কি—আ: ছাড় লাগছে-বাবারে
স্বামী ততক্ষণে টাতে টাতে ওপরে তুলে এনেছে।
ভিতর ঢুকিয়ে দরজা বন্ধ করে’ বল্ট-টাকা চুরি করেছিস কেন?
বাঘের মত তখন কেষ্টকান্তর চোখ দুটো জ্বলছে।
অবাক হয়ে বীণা বল—টাকা? আমি নিয়েছি ? সে কি
ঠাস করে গালে একটা চড় মেরে কেষ্টকান্ত বলল—আবার

নিশিপ
মিথ্যে কথা? হারামজাদি—ছেনাল ! টাকা বার করে দে নৈলে
খুন করবাে।
এক চড়েতেই চোখে জল এসেছিল। বীণা বলল—মাইরি
আমি নিইনি, তােমার দিব্যি করে বলছি, আমি কোনােদিন
আবার চড়। চড়ের পর চাপড়। তদুপরি কিল এবং
পুরুষােচিত ঘুসি। বীণা চীৎকার করে উঠলাে।
কিন্তু বাইশ বছরের যুবতীকে কাবু করতে হলে হ, এইবার
ঠিক হয়েছে! সেই আদিম কাল থেকে পুরুষের কাছে নারী-
জাতি যে সম্মান-চিহ্ন পেয়ে এসেছে—পদাঘাত! পদাঘাত্রের
পরেই পুতুন। কিন্তু মুচ্ছ নয় ! চীৎকার করবার শক্তিও আর
নেই—পেটে যে ব্যথা ধরেছে।
তা ধরুক—গলার আওয়াজ এখনও আছে। মাটিতে
লুটিয়ে পড়ে’ অবরুদ্ধ কণ্ঠে বীণা ব-বড়ড় লেগেছে, উ:—আর
, তােমার দিব্যি করে বলছি আমি চুরি করিনি,—এই তােমার
পা ছুয়ে—হাত বাড়িয়ে সে কেষ্টকান্তর একটা পা জড়িয়ে ধরে
আবার বলল—নিলে এতক্ষণ আমি ফেরৎ দিতাম..সত্যি
বলছি তােমাকে।
দরজা ঠেলে সবেগে কাত্যায়নীর প্রবেশ। বলল—নিসনি?
এত মার খেয়ে আবার মিথ্যেকথা ? ছেলে যদি তাের থাকতে
তবে তার মাথায় হাত দিয়ে দিব্যি করাতাম। টাকা নিয়ে
১১৭

নিশিপন
ভায়ের হাত দিয়ে তুই বাপের বাড়ী পাঠাসনি? চল্ দেখি
আমার বানেশ্বর ছুয়ে ববি ?
চল--আস্তে আস্তে বীণা উঠে এ ঘরে এল। ক্লান্ত হয়ে
কেষ্টকান্ত তখন দরজার কাছে বসে পড়েছে।
সিংহাসনের ওপর থেকে শিবলিঙ্গটি হঠাৎ হাতে করে তুলে
এনে বীণা সজল চোখে বল—নিইনি নিইনি, চুরি আমি
করিনি-ইল’ ?
তারপর শিবটি যথাস্থানে ছুড়ে দিয়ে ননদের দিকে একবার
চেয়ে কি যেন বলতে গেল কিন্তু অশ্রুতে তার চোখ দুটি তখন
অন্ধকার হয়ে এসেছে-তাড়াতাড়ি মুখ ফিরিয়ে সিড়ি দিয়ে
নীচে নেমে গেল।
ভাই বােনেই যেন এতক্ষণ মূৰ্ছা গিয়েছিল। ঘাের কাটবার
পর কাত্যায়নী বলল—কালকেই আমার দেওরের কাছে আমায়
পাঠিয়ে দিও দাদা।
দাদা শুধু বল—এতদিন যাব যাবাে কচ্ছিলে, এবার সত্যিই
যেও ভাই।
চিত্রা সবই শুনতে পেয়েছিল। পাছে মুখােমুখি হলে’ বীণা
লজ্জিত হয়—এজন্যে সুমুখে আসতে সে নিজেই লজ্জা বােধ কচ্ছিল।
১১৮

নিশিপদ্ম
ছাদের পাঁচিলের কাছেই বীণা দাড়িয়েছিল। চিত্রাকে ডেকে
ব—শােনন না ! দু’তিনদিন দেখিনি বে ?
কাছে এসে ওপাশে দাড়িয়ে চিত্রা ব-র ছুটি ছিল কি
, তাই জন্যে ভাই সময় পাই না।
ও। আচ্ছা, একটা কথা তােমায় বলছিলাম।
একটু হেসে চিত্র। বলল—বল না ভাই ?
বীণা বল—সেদিন তুমি চমৎকার সাড়ীখানি পরেছিলে।
ব্লাউসটিও তেমনি। তােমার কাণের ওই দুল দুটোর অনেক
দাম-না ?
চিত্রা বল—খুব বেশি নয়।
আচ্ছা যে এসেন্সটা মেখেছিলে সেটা গােলাপের বােধ হয়,
না রজনীগন্ধার ? ভাল পাউডার আর পমেটমও তুমি মাখােনা ?
চিত্রা কি একটা হাসির কথা বলতে যাচ্ছিল কিন্তু রসিকতা
করা উচিত হবে না ভেবে চুপ করে গেল !
তাই বলছিলাম, আচ্ছা, ওইগুলাে আমায় আনিয়ে দিতে
পায়রা ভাই ?
কি ?
ওই রকম সাড়ী, ব্লাউস আর দুল ! আর সেদিন মুখে
তুমি যা যা মেখেছিলে! এই নাও ভাই, তােমার স্বামী যেন দয়া
করে এনে দে।-বলেই সেই আসন্ন সন্ধ্যার অন্ধকারে খানকয়েক
১১৯

নিশিপদ্ম
টাকার নােট চিত্রার হাতে গুজে দিয়েই বীণা তাড়াতাড়ি নীচে
নেমে এল। এমন ভাবে হাঁপাচ্ছিল যেন সে অতিরিক্ত পরিশ্রম
করেছে।
পরদিন ঠিক সেই সময়টিতে দুজনে আবার দেখা। চিত্রা
একটু হেসে বল—তােমার ফর্দ মতই সবগুলি এসেছে ভাই,
কিছুই ত্রুটি হয়নি।—বলে’ খবরের কাগজের একটা বাধা মােড়ক
সে বীণার হাতে তুলে দিল।
চিত্রার স্বামীটি বােধ হয় বেরােচ্ছিল, হঠাৎ চোখাচোখি হতেই
মৃদু হেসে ছােট একটি নমস্কার জানিয়ে বলল—এবার থেকে যখন
যা দরকার হবে বলে পাঠাবেন, এনে দেবাে।
চিত্রা বলল—আর কি! এবার থেকে তাহলে-বলে হাসতে
হাসতে সে ছুটে পালালাে ।
মােড়কটা হাতে নিয়ে বীণাও নীচে নেমে এল।
ঘরের মধ্যে বসে আলােটা জেলে মােড়কটা খুলে দেখতে
দেখতে সে চমকে উঠলাে। সাড়ার একটা ভাঁজের মধ্যে সেই
নােট ক’খানা আবার ফিরে এসেছে !
একথা কাউকে বলবার নয়। ফেরৎ দেওয়ার পথটুকু ধরে
কত বড় অনুগ্রহ যে আজ এসেছে তার আর সীমা নেই। দেয়াও
যেমন নির্দয়তাও তেমনি। ঘৃণা ও করুণা, অবহেলা ও যত্ন
যেন এর মধ্যে জড়িয়ে আছে। এ কি বন্ধুত্বের পুরস্কার, না

নিশিপদ্ম
করুণার দান ? মনে পড়ে গেল যুবকটির সস্নেহ মৃদু হাসি,
চোখ দুটির সরলতা, কথা বলবার অপূৰ্ব্ব ভঙ্গী,—সমস্ত মিলে
তার জর্জরিত বুকের মধ্যে ধারাল ছুরির
মধ্যে ধারাল ছুরির মত কাটতে
লাগলাে। তার ভদ্রতা, মহত্ত্ব এবং বিনয় যেন অপাত্রে পড়ে
বিষাক্ত হয়ে উঠেছে। রাগে এবং ঘৃণায় সে বসে বসে কাপতে
লাগলাে। ভগবানের প্রতি শয়তানের যেমন ক্ষুব্ধ আক্রোশ !
রাতের বেলা পাশে শুয়ে কেষ্টকান্ত বলল—কেন আমােক
চোখের জল ফেস্ট ?
হঠাৎ বীণার মাথায় যেন ভূত চেপে গেল। চোখ মুছে উঠে বসে
ব—কেন তা তুমি কি জানবে? কোন্ খবরটা রাখে শুনি?
কি হল’ কি ?
কিছুই না! আমাকে লােকে যদি অপমান করে তাতে
তােমার আর কি।
অপমান? কে করলে? কাতু ত চলে গেছে।
কাতু ছাড়া কি পৃথিবীতে অপমান করবার লােক নেই ?
কেষ্টান্তও উঠে বসলাে। বলল-তবে?

নিশিপদ্ম
বীণা একটুখানি চুপ করে রইলাে। পরে বলল-ও যে ভাল
লােক নয় এ আমি আগে থেকেই জানি।
ওই যে ওপাশের সুরেনটা ! বাইস লােক !
বদমাইস লােক! একলা ছাদে
গিছলাম, অত এদিক ওদিক দেখিনি। ও এসে ওদিক থেকে কি
সব বলতে লাগলাে, ছুটে পালিয়ে এলাম তাই-- বীণা
একটুখানি থেমে আবার বল্ট—বলতে গেলে এখন অনেক
কথা। ওই ছুড়িটাই কি কম ? ও ত’ বেরিয়ে এসেছে
ওই লােকটার সঙ্গে। ছেনালী করে’ আবার সি দূর
পরা হয় !
কেষ্টকান্ত নিঃশব্দে খানিকক্ষণ তাকিয়ে রইল। পারে বা
কিন্তু ওকে যে ভালাে ছেলে বলেই জানি।
ভালাে সবাই, আমিই শুধু মন্দ—এই ত? তা বেশ, আর
যদি কোনদিন কোনাে কথা বলি তাহলে’-
হিংসা জর্জর দৃষ্টিতে তাকিয়ে কেষ্টকান্ত চুপ করে বসে রইল।
মনে হল’ আগুনের একটা শিখা তা’র নাড়িতে নাড়িতে পাক খেয়ে
রি রি করে জলছে।
পরদিন প্রাতঃকালে উঠেই সকল কাজের আগে কেষ্টকান্ত
বাইরে গেল। গম্ভীর ভাবে ছােকরাটিকে ডেকে বল্ল-তােমাকে
একটি কথা বলছিলাম, সুরেন ভায়া।

নিশিপদ্ম সুরেন বল্ল-বেশ ত, বলুন না ? গলা পরিষ্কার করে কেষ্টকান্ত বল্ল-দু' একদিনের মধ্যে আমার ভাই পাে এখানে আসছে, তার থাকবার মতন ঘর ত আর নেই। তা তুমি যদি ভায়া বাড়ী ছেড়ে দিতে হবে নাকি ? হেঁ হেঁ, বুদ্ধিমান ছেলে, বুঝতে পেরেছ দেখছি। সুরেন হেসে বল—বুঝতে পেরেছি অনেক দিন আগেই। আপনি সেদিনও চেঁচিয়ে কি একটা কথা বলছিলেন।--সুরেন আবার হাসলাে, হেসে বলবেশ, তাই যাবে। যদিও এত তাড়াতাড়ি না গেলে আপনি কিছুই করতে পারেন না। কালকেই যাবে কি ভায়া? না পরশু ? সুরেন আবার হাসলো। বল্ল-না, কাল নয়, ওবেলায়ই যাবাে। এর পর রাত্রিবাসও আর করব না। আমি সত্যিই একটু বুদ্ধিমান-বুঝলেন দাদা? কিছু মনে করাে না ভায়া, নিতান্ত দায়ে পড়েই—মাথা হেঁট করে কেষ্টকান্ত ভিতরে গেল। যাবার সময় চিত্রা একবার বীণার সঙ্গে দেখা করতে চাইল- হল না। হয়ত বলতে—ভাই, তােমার কুৎসিত জীবন সুন্দর হয়ে উঠুক, এই কামনা করি।

নিশিপদ্ম
স্বামীটি হয়ত বলতাে—দেবি, আপনার সতীত্বের পায়ে প্রণাম
জানাচ্ছি।
কিন্তু ওরা যখন চলে গেল বীণা তখন কোথায় ? বীণা তখন
ঘরের দরজা বন্ধ করে জানলার সম্মুখে চুল বাঁধতে বসেছে। কোলের
কাছে খােলা একখানি আয়না। আয়নার ভিতরে তার মুখের
পাশে আসন্ন সন্ধ্যার আকাশের এক টুকরাে প্রতিফলিত হয়েছে।
সে বিস্মিত হয়ে দেখলে তার চোখের জল দুটি ধারায়
গালের ওপর দিয়ে নেমে এসেছে ! কেন ? ভদ্র দু’টি নরনারীর
নামে মিথ্যা দুর্ণাম দিয়েছে,-এ অশ্রু কি সেই কারণে? সুন্দর
ও আদর্শ জীবনের প্রতি তার এই অস্বাভাবিক আক্রোশ কেন?
জীবনে তার পরম প্রয়ােজন কী? কী সে পায়নি ?
তার চোখের জল ধীরে ধীরে গড়িয়ে পড়ল আয়নার ওপর।
সে জলে আয়নার ভিতারের আকাশ হ’ল সিক্ত।

কঙ্কাল

পরিচয় :
পূৰ্ব্ব-পুরুষ ছিল বনেদী, এ পুরুদে তার অবশেষ কতটুকু
আছে এবং কতটুকু নেই—তাই এ গল্পের অবলম্বন।

প্রথম পুরুষ ছিল জমিদার। জমিদার বলতে তার পুরাে অর্থ যা ববাঝায়। ক্ষেত-খামার চাষ-বাস, গােয়ালে গরু, গােলায় ধান, বাগানে শাক-সজী, পুকুরে মাছ। এর ওপর ছিল তালুকের খাজনা, অস্থাবর সম্পত্তি এবং জমা টাকা। সংসারে অভাব- অনটনের নাম-গন্ধও ছিল না ! সুখের ঘর। বাঘে-গরুতে জল এক সাথে না খেলেও লােক-প্রশংসায় চারিদিক ছিল মুখর। বামুন-বােষ্টমের পাত পড়তে, দান- খয়রাৎ ছিল অজস্র, বারাে মাসে তেরােটি পার্বণের ভিড় লেগেই থাকতাে ! প্রথম পুরুষ কাটে সগৌরবে । একদিন সেই বংশের ছেলের হলাে সহরে যাবার সাধ। কালের হাওয়াকে দ্বিতীয় পুরুষ এড়াতে পারল না। সহরের মাটিতে তার পাকা ভিত বলে। ইংরেজি লেখাপড়া শিখে সভ্য-সমাজে মেলা-মেশা শুরু হয়ে গেল। সহরের যে আদব- কায়দা, মৌখিক ভদ্রতা, রীতি-নীতি, রুচি, কেতাদুরস্ত পােষাক পরিচ্ছদ—তার আবহাওয়ায় পাড়াগাঁয়ের মানুষ নিশ্বাস নিতে লাগল। ঘরে জ্বলাে বিজলীর আলাে, মাথায় ঘুরলাে বিদ্যুতের পাখা, কাচের গেলাসে খে’ল কলের জল, ভ্রমণের বাহন হল’ হাওয়া গাড়ী। কসির জল গড়াতে গড়াতেই ফুরােয়। আয় নেই, ব্যয় ১২৭ নিশিপ আছে। দ্বিতীয় পুরুষের হাতে ঐশ্বৰ্য্য উড়ে যেতে লাগল ধূলাের মত। পাল-পাৰ্বণ একটু একটু করে বন্ধ হল, পাঁচজনকে দান- খয়রাৎ করা আর চলে না, চাষবাসে আগেই এসেছে অরুচি, পাড়াগাঁয়ের একঘেয়ে জীবনে ফিরে যেতে কি আর কেউ চায় ? এই হলাে ভূমিকা ! তারপর তৃতীয় পুরুষ। জমিদার ও জমিদারী এখন স্বপ্নবৎ। দুটোই ভেঙে ভেঙে এখন একটি ছোেট্ট সংসারে এসে দাড়িয়েছে। নিজের বলতে এখন আর কিছুই নেই। সহরের এক সঙ্কীর্ণ পল্লীতে অতীত এবং পতিত জমিদার-বংশ ঘর ভাড়া করে থাকে। অতি কষ্টে দিন চলে । বামুন-পণ্ডিতের ছেলে এখন আর জ্ঞানচর্চার জন্য লেখাপড়া শেখে না, মুখস্থ করে। জ্ঞানের প্রয়ােজনও আর নেই, আহরণের সময়ও নেই। মুখস্থ করলে তবে একটি চাকরি জুটবে। কিন্তু চাকরি একটি আর অবিনাশের কোথাও জুটলাে না।

নিশিপ
বড় ভাই সদাগরী আপিসে কাজ করে। তাইতে গ্রাসাচ্ছাদন
চলে কিনা সন্দেহ। দারিদ্র ঢুকে ছােট্ট সংসারটিকে শ্ৰহীন
করেছে। নিত্য অভাবের ফিরিস্তি নিরুপায়ের মত শুনে যেতে
হয়। বড় বংশের নামটা ভাঙিয়ে পরিচয়টা চলে কিন্তু সহরের
খরচ চলে না।
অথচ সভ্যতার কাঠামােটা বজায় রাখতে চেষ্টার আর ক্রটি
নেই।
-ও কি হল ? বার বার কাপড়ে সাবান দিচ্ছিস, রঙ
খুলবে কেন ?
অবিনাশ একটু হেসে বল্ল-ফস করা চাই ত !
হরিহর বলল—ফর্সা করা চাই। এদিকে যে ছেড়া কুটি কুটি !
ও-কাপড় কি আর পরা চলবে?
অবিনাশ বল্লকেঁাচার দিকে রেখে ঢেকে পরবােখন।
তাঁতের কাপড় বে!
হরিহর খানিকক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর
ব—জামা বুঝি তাের নেই অবিনাশ ?
লজ্জার হাসি হেসে মুখ লাল করে’ অবিনাশ বল—সেই
সেবার পূজোর দরুণ একটা মটকার জামা ছিল, তাই চলছে।
বলে’ নিজের মনেই সে আবার কাপড়ে সাবান ঘষতে লাগল।
বড় ভাইকে বিবাহ করতে হয়েছে, কিন্তু যে পরিমাণ আয়,

নিশিপদ্ম
তাতে স্ত্রীকে আর বাপের বাড়ী থেকে আনা চলে না। হরিহর
মাঝে মাঝে শ্বশুরবাড়ী যায়।
বেকার অবিনাশের যত-খরচ চলে অতি কষ্টে। চার আনার
বাজার করতে গেলে অন্তত তিনটি পয়সা তাকে বা-দিকের
টাকে সরিয়ে রাখতেই হয়। মুদীর দোকানের হিসেব মেলাতে
গিয়ে চার আনা আট আনা গোঁজামিল না দিলেই চলে না। চুল
ঘটার পয়সা আদায় করে নিয়ে বাড়ীতেই সে লুকিয়ে আয়নার
সুমুখে দাঁড়িয়ে চুল কাটে। সেবার অসুখে পড়ে’ দিন কয়েক
গয়লার দুধ খেতে হয়েছিল, কিন্তু তার পয়সা শােধ করবার সময়ে
অবিনাশ ধরে’ বল, দুধে জল মেশানাে ছিল অত্যধিক পরিমাণে,
দাম সে কাটবেই।
গয়লা যাবার সময় যে গালাগালটা দিয়ে গেল, অবিনাশ সেটা
নিঃশব্দেই দাড়িয়ে দাড়িয়ে শুলাে।—সাদা দুধ খেয়ে যে দাম দেয়
, তার গায়ে সাদা রােগ বেরােয়।
এমনি করে এই বনেদী বংশের ছেলেটির জীবনে যে ঘােট
ছােট ত্রুটিগুলি প্রবেশ করেছিল তাকে আর কোনক্রমেই
গােপন করা চলে না। রক্ত দুষিত হলে মাঝে মাঝে ঘা
ফুটে বেরােয়।
এই দারিদ্র্য গ্রস্ত গৃহস্থটির সংসারে পূর্ব মহত্বের এক-আধখানি
কঙ্কাল মাঝে মাঝে দৃষ্টিগােচর হতো। মেহগনি কাঠের আলমারীটা

নিশিপদ্ম জীর্ণ অবস্থায় পড়ে থেকে পােকামাকড় ও আরশােলর বাসস্থান হয়েছে। আগে এটিতে বই ঠাসা ছিল কিন্তু সেগুলি সমস্তই গেছে পুরাতন পুস্তকের দোকানে। ছেড়া গদি-আঁটা সােফার মচে-ধরা প্রীংটা মাথা চাড়া দিয়ে উঠে মহাকালের ইচ্ছার স্বপক্ষে সাক্ষী দিচ্ছে। চীনে মাটির দু একটা ফ্যান্সী পুতুলের কবন্ধ-দেহ আজও কোথাও কোথাও গড়াগড়ি অবস্থায় দেখতে পাওয়া যায়। লক্ষ্মীর কৌটোয় সিদুরটুকুই আছে কিন্তু সিদুর মাখা টাকা গুলি গেছে কবে কোন্ মুদীর দোকানের হিসাব শােধ করতে। ভাঙা এক- আধটা আলাের শেজ, শাল ও মখমলের ছেড়া চাপানের টুকুররা, ঝড়ের পরকলা, একপাটি জীর্ণ জরির জুতাে—এরাও অন্ধকারের ভিতর থেকে করুণ নেত্রে মুখ বাড়িয়ে অতীত ইতিহাসের কথা জানাতে কসুর করে না। সকাল বেলা একদিন একটি লােক অবিনাশকে ডাকতে এল। এ সময়টা সবাই বাড়ীতে থাকে। ডাকতেই হরিহর এল বেরিয়ে,-কা’কে চান ? —অবিনাশ বাবু বলে’ কেউ থাকেন এ পাড়ায়? অবিনাশ চৌধুরী। কদিন ধরে তাকে খুঁজে বেড়াচ্ছি মশাই, বিশেষ হরিহর বল–কি দরকার? দরকার! তা আপনাকে কেনই বা বলব না বলুন। বলে লােকটি একটু কেসে গলা পরিষ্কার করে বল্ল-ওই যে বড়

নিশিপম
গেট্‌অলা বাড়ীটা দেখছেন রাস্তার মােড়ে, জানতাম ওখানেই
তিনি থাকেন কিন্তু
হরিহর তার মুখের দিকে তাকাল।
—হ্যা, আমার সঙ্গে একটু আধটু পরিচয়ও ছিল, তা বলে
বন্ধুত্ব নয়, বড়লােকের ছেলে অথচ কেমন গরিবানা চালে থাকেন,
দেখে আমার ভারি শ্রদ্ধা হয়েছিল—
—ব্যাপারটা কি বলুন না !
-আজ্ঞে হ্যা বলি, অনেকটা তিনি এই আপনারই মতন
দেখতে আর তা ছাড়া কি অপরাধ করেছি বলুন, লােকের
অসময়ে টাকা ধার দেওয়াটা ত আর অন্যায় নয়। দিলাম
অতি কষ্টে সঞ্চে-বঞ্চে তিরিশটি টাকা—বা, আর তাঁর
দেখা নেই।
তারপর এই আর কি! জিজ্ঞেস করলাম ওখানে গিয়ে।
বল্লে, এ বাড়ীতে অবিনাশ বলে কেউ নেই ! সে কি কথা।
এত বড় জমিদারের ছেলে, এত বড় পরিচয়, তার কথা কি আর
অবিশ্বাস করা চলে? আপনিই বলুন না !
এখন কি করবেন ?
খুঁজি ! খুজতেই হবে ! চায়ের দোকান দেবব বলে’ টাকা
জমিয়েছিলাম মশাই, আমি বড় গরীব।
লােকটির চোখে জল না এলেও স্বরটা কেমন যেন গভীর হয়ে

নিশিপদ্ম
উলাে। শুধু বল—জানেন এখানে অবিনাশ বাবু বলে’ কেউ
কোথাও থাকেন?
হরিহর শুধু বল্ল-না! দেখুন ওই রাস্তায় কোথাও যদি
লােকটি নমস্কার করে চলে গেল।
বন্ধুরা প্রায়ই আসে। অবিনাশের বন্ধু-ভাগ্য খুব।
বলে—তােমার এই বাইরের ঘরটি বেশ অবিনাশ! ছবিগুলাের
অনেক দাম।
চীনে-বাজার থেকে ছবিগুলি কিনে এনে অবিনাশ ঘর
সাজিয়েছে। বলেও আর এমন কি ভাই। বাবা যা খুদ কুঁড়াে
রেখে গেছেন তাই,—ও ছবিখানা আনা হয়েছিল প্যারিসের
একজিবিশন্ থেকে। নিলামে কেনা, হাজার আড়াই টাকা
মাত্র লেগেছিল।
চক্ষু বিস্ফারিত করে বন্ধু বলে—আড়াই হাজার ? আড়াই
হাজারে একখানি ছবি ? উঃ, সে কি কম টাকা হে!
অবিনাশ সলজ্জ একটু হেসে চুপ করে যায়।
অবনী বলে—চা খাওয়াও অবিনাশ, তােমার বাড়ীতে
এসে অনি মুখে ফিরব না।
ত তােমার
দিরিয়া !
অবিনাশ হঠাৎ বলে উঠলাে –ওই যা, ছি ছি, দাদা বেরিয়ে

নিশিপদ্ম
গেলেন একটু আগে, যদি চাবিটা ভাই নিয়ে রাখতাম। আমার
মতন অসাবধান আর দুনিয়ায় নেই।
কেন, কি হল?
আর ভাই, সমস্তই ভাড়ার ঘরে। ষ্টোরের চাবিটা দাদার
কাছেই থাকে কি না ?
চল তবে দোকানে গিয়ে খাওয়াবে চল।
অবিনাশ যেন হেসে একেবারে লুটিয়ে পড়ল। বল
নসেন্স, ! যে-বংশের একটু প্রেষ্টিজ, আছে তাদের বাড়ীর ছেলে
কক্ষণাে নিজের কাছে পয়সাকড়ি রাখে না। ওটা ডিগনিটিতে
লাগে, জানি না বুঝি ?
ক্ষুধাতুর বন্ধু অপ্রস্তুত হয়ে চুপ করে গেল। বনেদী
বংশের কায়দা-কানুন তার বােধ করি জানা ছিল না।
দরিদ্র সে।
এমনি করে’ শাঠ্য ও দৈন্য যেমন অবিনাশকে ধীরে
ধীরে অধিকার করেছিল, দিনও কাটতাে তার তেমনি নানা
মিথ্যার আবরণে নিজেকে ঢেকে। ভাণ, ভাবন, ভণিত এরাই
হল তার সম্বল। উচ্ছে ভেজে তাকে পটল বলে চালিয়ে দিতে
সে এতটুকু দ্বিধা করে না।
অথচ এইটুকুই তার শেষ পরিচয় নয়। মাঝে মাঝে তার
শিরার রক্তের মধ্যে একজন উচ্ছল জমিদার নড়ে চড়ে বেড়াত।

নিশিপদ্ম নানা দৈন্য ও দুর্বলতার ভিতরেও তার মন ভুলতে পারত না যে সে এক বিশিষ্ট বনেদী বংশের সন্তান। তার দারিদ্র্য ছিল কিন্তু তাই বলে তার ব্যয়-কুণ্ঠতা ছিল না। অভাবকে, অর্থ- হীনতার লজ্জাকে নানারূপ জোড়াতালি দিয়ে গােপন করে’ নিজেকে ধনী বলে’ চালাবার স্বাভাবিক স্পৃহা তার ছিল, কিন্তু একবার তার হাতে কিছু অর্থাগম হলেই সে পিতা এবং পিতা- মহকে অনুসরণ না করে পারত না। একটা একটা অযত অমিত ব্যয়িতার নেশায় সে পথ থেকে যে-কোনাে স্বল্প পরিচিত অথবা যে-কোনো বন্ধুকে নিয়ে কোনো এক লােজনাগারে কিম্বা প্রমােদাগারে বসে যেত। বন্ধু-বান্ধবের আড়ায় তার উচ্চ আসন না থাকলেও একটি বিশিষ্ট আসন ছিল। সবাই তাকে সমীহ করত কিন্তু এড়াতেও পারত না। যে-কোনাে ব্যাপারের ওপর তার একটা টিকা- টিপ্পনীর জন্য সবাইকে তার মুখ চেয়ে থাকতে হত। সে শান্ত এবং মৃদুস্বভাব হলেও নিজের অবস্থাটাকে কঠিন ভাবে স্পষ্ট করে’ সবার মুখের ওপর জানিয়ে দেওয়াই ছিল তার অভ্যাস। সবার আগে গলা বাড়িয়ে নিজের ঐশ্বর্যের কথাটা বলে দিয়ে তবে সে 'অন্য কথা পাড়বার অবকাশ দিত। অনেকের কাণে এগুলাে ফুটুলেও একটি ভীরু শ্ৰদ্ধা তাকে না দিয়ে কেউই থাকতে পারত না।

নিশিপম
D
•০
কিছুকাল পরে তার একটা মাষ্টারী জুটে গেল। এবার
সে বাঁচল। বলা বাহুল্য, মাষ্টারী সে গােপনেই করবে।
পঞ্চম শ্রেণীর একটি ছেলেকে পড়াতে হবে। মাইনে মাসে
দশ টাকা। নেই মামার চেয়ে কাণা মামা ভাল ।
ছেলেটি, এক শৌণ্ডিক-পুত্র। নাম—মদন। মদনের বাপের
এক মদের দোকান আছে রাধাবাজারে। দোকানের অবস্থা
আজ-কাল পিকেটিং-এর ব্যাপারে তেমন সুবিধে নয়।
মদন এখন ইংরেজি শিশুশিক্ষা পড়ে। অর্থাৎ, সেই সদা সত্য ।
কথা বলিবে’ ; এবং পরের বস্তু কদাচ চুরি করিবে না !
কিন্তু সে যাই হােক, দশটা টাকা অনেক টাকা। সংসারের
অনটনের মধ্যে এই দশটা টাকা মাসিক আশীর্বাদের মত এসে
পড়ে। অবিনাশ পড়াতে যায় লুকিয়ে লুকিয়ে। কোনাে একটা
কিছু কাজের বদলে টাকা পাবে—এটার মধ্যে একটা অত্যন্ত
ব্যক্তিগত অপমান আত্মগােপন করে আছে, সে মনে করে।
আভিজাত্যকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা তার দুর্দমনীয়!
কিন্তু পড়াতে লাগল সে অক্লান্ত পরিশ্রম করে। হােক
অপমান, হােক না কেন দুরবস্থার আনুসঙ্গিক—যথা সময়ের আগে
এসে সে মদনকে পড়াতে বসে। শুড়ির ছেলেকে পড়াতে হচ্ছে

নিশিপদ্ম
বলে তার জাত্যাভিমানে আঘাত করলেও সে এ মনােবিকারকে
আমল দিত না। টাকার প্রয়ােজন তার অতিরিক্ত।
জীবনে অনেক গোজামিলই তাকে দিতে হতো! যতগুলি
ছিদ্র ছিল তার চরিত্রের মধ্যে, সমস্ত গুলিই তাকে ভরিয়ে তুলতে
হতাে নানারূপ কদৰ্য্য হৃদয়বৃত্তির জোড়াতালি দিয়ে। অন্যের
কাছে সম্মান আদায় করতে সে ভালবাসত, তাই জন্যে নিজের
প্রতি সম্মান দিতে হয় কেমন করে’–এ তাকে ভুলতে হয়েছিল।
একদিন কোনাে একটি পরিচিত লােকের বাড়ী বিয়েতে সে
গেল নিমন্ত্রণে। তার পরদিন সকালে হরিহর বাইরে যাবার
আগে বল-জুতাে জোড়াটি ত চমৎকার ! কত দিয়ে কিনেছিস্ ।
রে? জুতাে বুঝি তাের ছিল না অবিনাশ ?
একটা ঢোক গিলে অবিনাশ বল্ল- নিয়েছে দশটাকা দাম।
ওই মাষ্টারীর টাকায় ?
হঠাৎ অবিনাশ বহা !
পুরােনাে জুতােটা তাের গেল কোথায় ?
তাের গেল কোথায় ? আমাকে দে, তবু
পরে পরে’ বাজার-হাট করা চলবে।
থতমত খেয়ে অবিনাশ বল—পুরােনাে জুতােটা নেই দাদা।
ফেলে দিয়েছি।
হরিহর বলল—সে কি! তুই ত নষ্ট করবার ছেলে নয় ।
!
সেটা ত বেশ পরা চলতাে !
১৩৭

নিশিপদ্ম অবিনাশ সরে গেল সেখান থেকে। আড়ালে গিয়ে নিজের পায়ের দিকে একবার তাকাল। এ জুতােটা তার পায়ে একটু বড় হয় বটে! যাক গে । একমাস পরে অবিনাশ একদিন বল—মদন, তােমার বাবাকে 'আমার টাকাটা দিতে বলল। মদন ব–বাবা দিয়ে রেখেছেন, দাড়া আপনাকে বের করে দিচ্ছি।—বলে’ সে উঠে গিয়ে তার ডেস্কটা খুললাে। খানিকক্ষণ এটা-ওটা কাগজ পত্র নাড়াচাড়া করে বল্ল- নেই ত, এর মধ্যেই যে ছিল মাষ্টার মশাই। তার বিবর্ণ কালাে মুখখানার দিকে তাকিয়ে অবিনাশ বল্ল -কি হল ? মদন বল্ল-দশ টাকার একখানা নােট..... বাবা অনেক কষ্ট, এই কালকে রেখেছিলাম এর মধ্যে। চুরি গেছে ! ছি ছি, করলে কি ? ছি, ছি, করলে কি? ওখানে কি কখনাে রাখে? যে-সে আছে, খুলছে: কি হবে বল ত ? টাকা ত আমার আজকেই চাই..... কপাল, কপাল ! এমন বরাৎ নৈলে কি আর...এখন তবে কি করবে? অবিনাশ হাঁপাতে লাগল। কর্তা শুনে বেরিয়ে এলেন। বললেন—ইত’ মাষ্টার মশাই, ১৩৮

নিশিপদ্ম
এই দুঃসময়ে ভারি বিপদে পড়লাম। এখন আমার দোকান এক
রকম বন্ধই যাচ্ছে।—আর তা ছাড়া মদনকে কি দোষ দেবাে
বলুন, ছেলে মানুষ ত বটে!
অবিনাশ মাথা হেঁট করে ভাবতে লাগল। চিন্তার যেন
তার আর কুল-কিনারা নেই। শুধু বল্ল—আশ্চর্য !
কর্তা খানিকক্ষণ ভেবে চিন্তে বললেন—দয়া করে আজ
একবার আমার দোকানে যাবেন, দেখি যদি কিছু.কর্তে পারি ।
সমস্ত মাস আপনি ব্রাহ্মণের ছেলে পরিশ্রম করেছেন, সময় মত
টাকা না পেলে কি আপনার চলবে? কিছু মনে করবেন না,
যদি আপনাকে একটু কষ্ট দিই।
কষ্ট আর কি !—বলতে বলতে অবিনাশ তাড়াতাড়ি ঘর
ছেড়ে রাস্তায় নেমে চলে গেল।
দৃষ্টির আড়ালে যেতে পারলে সে বাঁচে ! চুরি করা বড় পাপ।
বিকাল বেলা দোকানে গিয়ে সে দাড়াল। কৰ্ত্তা ডেকে
"আদর করে বসালেন। সমস্ত ঘরে প্রায় কড়িকাঠ পৰ্য্যন্ত বিলাতী
মদের বােতল সাজানাে। মন্দিরের মধ্যে ঢুকতে গেলে অবিনাশের
সঙ্কোচ আসে কারণ কেউ দেখে ফেলে পৌত্তলিক বলে’ তাচ্ছিল্য
করতে পারে, কিন্তু মদের দোকানে ঢুকে সে আনন্দিতই হলাে-
এর মধ্যে একটি চমৎকার আভিজাত্য আছে। মদ খেয়ে সৰ্ব্বস্বান্ত
হওয়ার মধ্যে একটি উচুদরের আনন্দ!

নিশিপদ্ম অনেকক্ষণ বসে বসেও একটি খদ্দের সে দেখতে পেল না। জনকয়েক পাওনাদার এসে জটলা করে চেঁচামেচি করছিল। কর্তা লজ্জায় ঘৃণায় একবার মুখ তুলে বললেন—দেখছেন ত জাত- ব্যবসা, কিন্তু এ আর আমার ভাল লাগছে না। কদিন থেকে একটি টাকাও বিক্রি নেই। মদের দোকান বন্ধ করে এবার ভাবছি কংগ্রেসে নাম লেখাবাে। কি বলেন ? অবিনাশএকটু হাসল। বিকাল ছেড়ে সন্ধ্যা হল’—টাকা পাবার কোনাে আশা পাওয়া গেল না। আর একটু পরেই দোকান বন্ধ করতে হবে । আতা আন্তা করে কি একবার বলবার চেষ্টা করতেই কর্তা তার মুখের দিকে তাকালেন। অবিনাশ গলা পরিষ্কার করে বলল—দাম কত এক একটা বােতলের ? ওই যে ওই চৌকো বােতলটার ? কৰ্ত্তা বললেন-“ছ’ টাকা বারাে আনা। ও, আচ্ছা এক কাজ করলে হয় না ? কি? ধরুন যদি আমি গােটা দুই বােতল বিক্রি করে’-- পারবেন? লুকিয়ে করতে হবে যে! আজ-কাল পিকেটিংএর দিনে অনেককেই এ রকম কৰ্তে হয়। একটা কোনাে মাতালকে যদি ধরতে পারেন তা হলেই

নিশিপদ্ম
দেখি কি হয়, কাগজ মুড়ে দিন আমার হাতে।
বােতল দুটি হাতে করে নিয়ে সে রাস্তায় নামল
সহরের রাস্তায় তখন সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে
'আপিস থেকে ফিরে এই কিছুক্ষণ আগে হরিহর রান্না
চড়িয়েছে। রান্নাটা তাকেই করতে হয়।
বাইরের দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হল। রাত তখন প্রায়
দশটা বাজে।
আলােটা হাতে করে বাইরে এসে হরিহর বলল—কে ?
একটি লােক এগিয়ে এসে বল্ল-আপনি কি অবিনাশ
চৌধুরীর দাদা?
কেন ?
আমি আসছি পুলিশ আপিস থেকে। । অবিনাশবাবু
আছেন হাজতে।
হাজতে ? কি রকম?
লােকটা বলল—ভারি অন্যায় করেছেন তিনি, লাইসেন্স,
নেই, লুকিয়ে একটা বস্তির ভেতর বিলিতি মদ বিক্রি করতে
গিয়েছিলেন। ভদ্রলােকের ছেলে হয়ে
মদ? বস্তির ভেতর ?
১৪১

নিশিপ
আজ্ঞে হঁ্যা, পয়সার জন্য মানুষ এর চেয়েও,আপনি কি
যাবেন তাকে জামিনে খালাস করে আনতে ?
আলাের দিকে তাকিয়ে হরিহর বলনা !
হাজতে বসে তিনি কিন্তু কঁদছেন।
একটুখানি হেসে হরিহর ব–তা হােক, আজ সেখানে
তার থাকা দরকার।
লােকটি নমস্কার করে চলে গেল।
পথের দিকে কিয়ংক্ষণ তাকিয়ে থেকে হরিহর ভিতরে এল।
আজকের রাতে অবিনাশ আর ফিরবে না, দরজাটা সে ধীরে ধীরে
বন্ধ করে দিল। আলাে হাতে সে যখন আবার রান্নাঘরে এসে
ঢুকলাে, পােড়া তরকারীর ধোয়ায় ঘরটা তখন অন্ধকার। একা এই
বাড়ীখানায় একটা যেন বুকচাপা নিশ্বাস গুমরে গুমরে উঠছে।
নীচের তলায় একটি ভয়াবহ নির্জনতার রূপ যেন হাঁ করে আছে।
রাগ হলাে না, ছােট ভাইটির প্রতি গভীর বিতৃষ্ণাও তার
এল না বরং একটি অপরিসীম মমতায় ও সহানুভূতিতে হরিহরের
দু’টি সেতুর চোখ জলে ভরে এল। মনে হলাে যে-অন্যায় ও
যে-পাপ অবিনাশ আজ কল, এতে তাকে দোষ দেওয়া ত চলে
নিরপরাধ, নিরুপায়, নিরবলম্বন সন্তান যে-শান্তি আজ
মাথায় তুলে নিয়ে গেল—সে তার উজ্জ্বল ও অসচ্চরিত্র পিতার
অপরাধের, অমিতব্যয়ী ও অদূরদর্শী পিতামহের অন্যায়ের !
!

বাতাস দিল দোল

পরিচয় : ভাড়াটে বাড়ী। ভাড়াটে আসে আর চলে যায়। চলে
যায় একটি বিধবা কিশােরীর মনে দাগ কেটে কেটে।
ভীর মেয়েটির রােমাঞ্চ আবেগ—এই গল্পের বিষয়বস্তু।

সকাল থেকেই যাবার আয়ােজন চছিল! স্থান যাদের নেই
তাদের প্রায়ই স্থান পরিবর্তন করতে হয়।
আসন্ন-বিচ্ছেদের বিষন্নতায় অপরিসর অন্ধকার ঘরখানির
আবহাওয়া কেমন যেন করুণ হয়ে উঠেছে। সহবাসী দুটি পরস্পর
অপরিচিত গৃহস্থের মধ্যে এতকালের আলাপে একটি আত্মীয়তা
ঘনিয়ে এসেছিল বলতে হবে বৈ কি।
এই একটু আগেও উভয়পক্ষের ভারাক্রান্ত অবসন্ন মনের
ক্ষোভ ও বেদনা বারকয়েক প্রকাশ করা হয়ে গেছে, তবুও বিদায়
নেবার সময় বড়-বৌয়ের চোখ দুটি ছল্ছল করে’ এল। একটি
করুণ গভীর নিশ্বাস ত্যাগ করে তিনি বললেন—মনেই ছিল না
মা যে আমরা ভাড়াটে! এতকাল একসঙ্গে ছিলাম, একটি উচু
কথা কোনদিন ওঠেনি। আপনার লােক যে পথেও গেলে
একথা কি জান্তাম?
বিচ্ছেদ-কাতর ও নিঃশব্দ ঘরগুলির মধ্যে তাঁর কথলি নে
তলিয়ে গেল। চারিদিক এমনই ম্লান, আচ্ছন্ন এবং কনিন।
ভানুর-পাে’টি বিদায়-সজ্জা করে এতক্ষণ কন্তর কাজ
দাড়িয়েছিল—এবার অন্দরের দিকে একটু এগিয়ে গেল। একবার
এদিক-ওদিক তাকালাে, পরে মৃদুকণ্ঠে বলল-ঘােম কোনো
উপকার আমি করতে পারিনি, যাবার সময় কেবল
আমার মনে হয়ে।

নিশিপদ্ম
অল্পবয়সী একটি বিধবা মেয়ে এতক্ষণ থামের আড়ালে মাথা
হেঁট করে’ কি ভাবছিল কে জানে, ছেলেটির কথায় আচমকা
মুখ তুলে চেয়ে মাথাটি তার আরও হেঁট হয়ে গেল। বােধ হয়
কি একটি উত্তর দেবার চেষ্টা করেছিল কিন্তু ঠোটদুটি কেঁপে
আবার স্থির হয়ে রইল।
বিদায়ের বেলায় স্বল্পপরিচিত। বিধবা কিশােরীকে এর চেয়ে
বেশি আর কি বলা চলে !
ছেলেটি কিয়ৎক্ষণ একটি অস্বস্তিকর নীরবতা কাটিয়ে শুকনাে
একটুখানি হেসে বল্ল কি বলতে এসেছিলাম ভুলেই গেছি ।
থাগে।
বেড়ার ওধারে বড় বৌয়ের ক্ষোভ প্রকাশ তখনও চলছে।
মন্দা ভয়ে ভয়ে ভিতরের দিকে আর একটুখানি সরে’
গেল ; সামান্য দু’চারদিন যৎসামান্য হালকা আলাপ তাদের হয়ে
গেছে, কিন্তু এ কথাটির উত্তর দেবার মত জ্ঞান-বুদ্ধি তার কিছুই
ছিল না। শঙ্কার দুটি বড় বড় চোখে সে একবার শুধু
তাকালাে।
যুবকটি বুলে, বুঝে নিজেকে সামলে নিয়ে গলাটা পরিষ্কার
করে সহজভাবে বদাদা কোথায় তােমার ?
মুখ তুলে এদিক-ওদিক তাকিয়ে মন্দা বল্ল-নেই। বােধ

নিশিপদ্ম যাবার সময় একবার তার সঙ্গে দেখা হলে, তারপর কোনাে কথাই আর খুঁজে পাওয়া গেল না। মুখ ফিরিয়ে চলে যাবার সময় আর একবার ছেলেটি কেবল বল- আলাপ ত রইল, কিন্তু দেখা বােধ হয় আর হবে না। আসি তাহলে কেমন ? বুকের সমস্ত রক্ত তােলপাড় করে মন্দার শুধু একটি কথাই বেরিয়ে এল—আচ্ছা !—এবং পরমুহূর্তেই আসন্ন অন্ধকারে সে মিশিয়ে গেল। বড়-বৌ আর একবার এধারে এলেন। বলেন-এবার তবে আসি মা ? পায়ের ধূলাে নিয়ে ঘাড় নেড়ে মন্দা এবার সম্মতি জানাতেই বড়-বৌ ডান হাতে তার চিবুকটি তুলে ধরে বলেন—আর একটি কথা বলে যাই, তেরাে বছর বয়েসে শাদা থান্ পরে জাতটার মুখে আর কালি দিনে মা; নরুপেড়ে ধুতি পরি, তবে যদি দূরে থেকেও বুক ধরতে পারি। তারপর হঠাৎ চোখে আঁচল দিয়ে তিনি বেরিয়ে গেলেন। ০ অবিচ্ছিন্ন অবসাদের ভার কাঁধে নিয়ে এক-একটি দিন আবার পার হয়ে চলতে থাকে। ওদিকের ঘরগুলি খালিই পড়ে রয়েছে। শােনা যাচ্ছে, ভাড়াটে নাকি আবার একঘর আসবে। ১৪৭

নিশিপ
ফাকা ঘরগুলি যেন মন্দার মুক্তি-তীর্থ। সারাদিনের কাজের
বন্ধন থেকে এক-একবার ছাড়া নিয়ে সে এই নির্জন ঘরগুলিতে
এসে নিজেকে বিলিয়ে দেয়। কড়ি-কাঠের কোণে কয়েকটা
চড়াই পাখী বাসা বেঁধেছে ; তাদের সঙ্গে মন্দার গভীর বন্ধুত্ব।
তাদের অবিশ্রান্ত কোলাহল শুতে শুতে তার নিজের অন্তরও
সেই সঙ্গে কল গুঞ্জন করে ওঠে। একটি কালাে সাদা রঙের
বিড়াল প্রায়ই বেড়াতে আসে ; খাদ্যাভাবের দৈন্য তার মুখে
সৰ্ব্বদা যেন লেগেই আছে ; চোখদুটি শান্ত ও আয় সমাহিত ;
বৈষ্ণবদের মত মদালসও বলা যেতে পারে। বেচারি চিরকালই
আশ্রয়হীন। গায়ে বড় বড় লােম—যেন রেশমের গােছা।
লেজটি তুলে মন্দার পায়ের মধ্যে ঘুরে ঘুরে সােহাগ
জানায়।
—আচ্ছা রাণি, তােকে এত গালাগাল দেয়, তবু ওদের
রান্নাঘরে ঢুকিস্ কেন বল ত?
—মেউ ?
—একদিনও মার খাসনি, এই বাহাদুরি কচ্ছিস ত ? কিন্তু
ধরা পড়লে মারা যাবি যে !—ওকি, তােমার নজর অত উচুতে
:কেন? ওরা কাঠি-কুটি দিয়ে দিব্যি ঘর বাধছে, তােমার ওদিকে
চেয়ে অত হিংসে কি জন্যে ?
মেউ !
১৪৮

নিশিপদ্ম মন্দা তখন হেসে বিড়ালটিকে কোলে তুলে নেয়। কাধে ফেলে আদর করে। বুকের ওপর চেপে ধরে’ ঘুম পাড়ায়। একজোড়া গােলা পায়রা সম্প্রতি কার্ণিশের তলায় একটু স্থান সঙ্কুলান করে নিয়েছে। যখন-তখন তাদের কণ্ঠধ্বনি শুতে পাওয়া যায়। মন্দা লুকিয়ে লুকিয়ে কার্ণিশের তলায় এসে দাড়িয়ে গাল ফুলিয়ে ঠোট বেঁকিয়ে এক চমৎকার ভঙ্গীতে তাদের কণ্ঠস্বরের অনুকরণ করতে থাকে। সন্ধ্যার সময় গােটা- দুই চামচিকে ছুটোছুটি করে তাদের দেখলেই মন্দা ভয়ে ভয়ে অন্যদিকে চলে যায় । আর সবার শেষে আসে একটি শান্ত ভদ্র কুকুর। অনেক দেরিতে এসে একপাশে আশ্রয় নিয়ে রাত কাটিয়ে যায়। ধম্মরাজ, তােমার ভাত নিয়ে রাত অবধি কে বসে থাকবে বল ত? আমার বাপু সন্ধ্যে হলেই ঘুম পায়। উঠোনের একপাশে কতকগুলি ভাত দিয়ে কুকুরটার গায়ে একটি ঠোনা মেরে স্নেহের মৃদু হাসি হেসে মা চলে যায়। বাপের সংসারে সব কাজই করতে হয়। মাও নেই, একটি বােনও নেই। দাদা আছেন। গরীবের ঘর, তাই বছরে এক- আধটি দিন ছাড়া কোনাে দিনের কোনাে বৈচিত্রই দেখা যায়না। একান্ত একঘেয়ে পুরাতন জীবনের বােঝ টেনে চলতে চলতে ছােট গৃহস্থটির যেন অকাল বার্ধক্য ঘনিয়ে এসেছে। বাপ থেকেও ১৪৯

নিশিপদ্ম
•
;
*
নেই; একেবারে নিস্পৃহ ব্যক্তি। তামাক খাবার নাম করে
বেরিয়ে যান, আবার তামাক কিনে বাড়ীতে ঢুকে কোণের
ঘরটিতে তার দিন কাটে। বােবা বৃহৎ পৃথিবী তার দরজায়
নিঃশব্দে হানা দিয়ে থাকে। দাদার দুবেলা মাষ্টারী–সময় বড়
অল্প ; পড়াশােনাও আছে। তার আবার একটু চোখের দোষ
ছিল। কাছের চেয়ে দূরের বস্তু তিনি যেন ভালই দেখতে
পান্।
-আঃ দাদা যেন কি! কালাে কাপড় আর ফস। জামা
রাস্তার লােকে হাসবে যে! দাড়াও, আমি কাপড় বা’র
করে দিই।
দাদার তখন আর তর সয় না,--ঠিক বলেছিস রে, সত্যি
কথা—আমি ত এতক্ষণ বুঝতেই পারিনি। এসব দিকে নজর
তােদের ভারি ধারালাে। দে’ তবে, দে’ ভাই একটু তাড়াতাড়ি
কই, কোথা গেলি? কাপড় একখানা আতে এত দেরি হচ্ছে
তুই কোনাে কাজের নয়, মুখপুড়ি। আর একটু হলেই লােকে
বােকা বলতে আর কি ! মন্দা, কই রে ?
মন্দাকিনী কাপড় এনে দেয়। কাপড় বদল করে দাদা
বলেন—সময় কম, সময় বড় অল্প !
দাদাকে মন্দা একটু আধটু তিরস্কার করতে ছাড়ে না।
পৈতেপােড় বেম্মচারীর মতন তাড়াতাড়ি কোথায় যাওয়া হচ্ছে

নিশিপদ্ম
--
শুনি ? তােমার ধমক খাবার বয়েস এখনও পার হয়নি, এ কথা
মনে রেখাে দাদা।
দাদা বলেন—তাহলে একটু বসি, ধমকটা কি ধরণের শুনে
ই—কি বলিস? কাজকম্ম কোথাও কিছু নেই, শুধু বেড়াতে
বেরােচ্ছিলাম।
মন্দা হেসে তখন একেবারে লুটোপুটি,-তবে যে দৌড়চ্ছিলে
দাদা? তবে যে সময় কম বলে আমায় ছুটোছুটি করালে ? বেশ
তুমি লােক যা হােক।
—ওই ত আমার দোষ ! কাজের চেয়ে কাজের ইচ্ছেটা
আমায় ছােটায়।
মন্দা কাছে সরে এসে দাদার হাতটি ধরে’ বলে—আচ্ছা দাদা?
-ওকি, কথা বলবার আগেই যে অনি চােখ ছল্ ছল্ করে
এল ! কি শুনি ?
—তুমি বেথা বুঝি করবে না? আমি আর একলা থাকতে
পাচ্ছি না কিন্তু।
বিয়ে ! তাইত-ওই যা, আজ আবার সভায় যেতে হবে;
‘সারদা বিল পাশ হচ্ছে—চোদ্দ বছরের আগে মেয়ের বিয়ে হতে
দেব না !দে ভাই, পান দে মন্দা।
পান হাতে নিয়ে মুখে দেবার আগেই তিনি ছুটতে থাকেন।
দরজার কাছে গিয়ে একবার ফিরে দাড়িয়ে বলেন--এ হে

নিশিপ
হে, পান থেকে চুণ খসে গেল। , মন্দাটা
কাজের নয় !
রাস্তায় ছুটতে ছুটতে পানটি মুখে দেবার সময় আর তিনি
পা না। সময় বড় অল্প !
মন্দাকিনী দরজায় দাড়িয়ে দাড়িয়ে দাদার ওই দ্রুত গতিটি
দিকে চেয়ে মৃদু মৃদু হাসে।
এমনি করেই দিন চলে।
সেই যে বলে গিয়েছিল “দেখ বােধ হয় আর হবে না’--তার
স্মৃতি মনের কোন গভীর অতলে ডুবে গেছে। ডুবেছে একটু
একটু করে। ডুবে মরতে কি কেউ চায়? বাচবার চেষ্টায়
মাঝে মাঝে মনটা তােলপাড় করেছে, নিদ্রাহীন কোনাে কোনাে
রাত্রে ক্ষণে ক্ষণে ক্লিষ্ট ক্ষীণ কণ্ঠে আর্তনাদ করে উঠেছে, একাদশীর
রৌদ্রোজ্জ্বল নিস্তব্ধ দুপুরে মাঝে মাঝে ছােট্ট এক-একটি নিশ্বাস
ফেলে গেছে। পুরাতন স্মৃতি মানুষকে বিপন্ন করে।
মন্দা দিব্যি করে বলতে পারে, তার কথা এখন আর মনেই
পড়ে না।
আবার একদিন এক ঘর ভাড়াটে এল বটে।
খানিকক্ষণ সােরগােল চলল, জিনিসপত্র গােছাবার সাড়াশব্দ
হতে লাগলাে, দু একটি নর নারীর অশান্ত কণ্ঠ শােনা গেল,
১৫২

নিশিপদ্ম একটি শিশুর কান্নার আওয়াজ কানে এল। তারপর ক্রমে ক্রমে আবার নিত্য নিয়মিত জীবন-যাত্রা শুরু হয়ে গেল। একটি স্বচ্ছন্দ সুশৃঙ্খল গৃহস্থালী সকাল থেকে রাত্রি পর্যন্ত এক সুরে বাধা থাকে। কোনো কিছুর সম্বন্ধে উদ্বেগ প্রকাশ করা নাকি বিধবার রীতি বিবােধী। মন্দার তাই কোনাে কৌতূহল নেই। সে বরং আত্মগােপন করে দুনিয়া থেকে মুছে যাবে, কিন্তু অযৌক্তিক আত্মপ্রকাশ করে মিথ্যা প্রাধান্য নেবার মত দুৰ্বলতা তার ছিল না। নিরুদ্বেগ । আত্মহ মনটুকু আপনার মধ্যেই বিস্তার করে সংসারের কাজ নেন তার সারাদিনে ফুরােতেই চায় না। সে যেন এই সংসার লুক্কায়িত আত্মা-বাসুকীর মত অলক্ষ্যে ভার বহন করেই আনার অস্তিত্বের প্রমাণ দেয়। বোটির কিন্তু বয়স বেশী নয়। টুলটুলে দুটি চোখ, এলাে-অগােছালাে মাথার খো, শাদ শাদা দাত, মাথায় এয়ােতির চিহ্ন—ইস্, একেবারে যেন আগুনের মত অল্ জ্বল করতে থাকে ! মাগাে, এত সি দূর মানুষে মাথায় নেয়? কিন্তু পা দুখানিতে আন্ত পরে সে যখন এসে দাড়ায় —আহা, যেন লক্ষ্মী ঠাকরুণটি ! নিবিড় আনন্দের উচ্ছ্বাসে মন্দার দুটি দীর্ঘায়ত কালাে চোখ এক মুহুর্তেই অশ্রুসজল হয়ে ওঠে। আহা !

নিশিপ
;
পরিচয় সহজে হয় না। মানুষের সঙ্গে মানুষের স্বাভাবিক
যােগসুত্র যেখানে এক হয়ে মেলে, সেখানে কেমন একটি অভাব
চোখে পড়ে। হঠাৎ মুখােমুখি হয়ে গেলে বৌটি একটু গম্ভীর
হয়ে যায়—বিধবা মেয়ের মুখ ঘন ঘন দেখাটা তার হন ঠিক
কাম্য নয়। মাথার সি দূরের ওপর ঘােমটা টেনে ঢাকা দেবার
চেষ্টা করে, হাতে সােনার চুড়িগুলি ও নােয়াটি লুকোয়। শুধু
তাই নয় ; হঠাৎ একদিন অসময়ে মন্দার সঙ্গে চোখচোখি হতেই সে
চোখের একটি পালক ছিড়ে ফেলেছিল। কোলের ছেলেটিকে
সে একটু সাবধানেই রাখে; বিশেষ করে ছেলেকে খাওয়াবার
সময় সে দরজাটা বন্ধই করে দেয়। কেন দেবে না ? ছেলের যদি
নজর লাগে ত মন্ত্ৰপড়া জল আনতে আবার ছুটবে কে ?
অনেক বিবেচনা, অনেক অবহেলা এবং অনেক দিনের পর
একদিন সামান্য একটুখানি আলাপ হ’ল বটে। কাছাকাছি
এসে অথচ ইচ্ছাকৃত খানিকটা ফাক রেখে কপাল এবং কালাে
দুটি ভুরু যথাসম্ভব কুঞ্চন করে বোটি এল—বয়স ত বেশি নয়
দেখছি, কপাল পুড়লাে কদ্দিন ?
কথার মধ্যে তার যেন চাবুক। প্রথমে গলার ভিতর মন্দার
কথা প্রায় আটুকে গেল। সে অনেক আশা করেছিল গােপনে
এই সমবয়সী বোটির সঙ্গে ‘সখি’ পাতাবে। ভয়ে ভয়ে মাথা
হেঁট করে’ বিবর্ণ মুখে মৃদু কণ্ঠে বল্ল - এই দু’বছর!
১৫৪

নিশিপদ্ম
বৌটি বল—এত শান্ত কেন ? অন্য কেউ হলে বলতে
‘চুপপা ডান্।—ঘর করেছিলে ?
হঠাৎ এক ঝলক রক্ত মন্দার মুখেচোখে ছড়িয়ে গেল । ছি
ছি—এ কি লজ্জাকর শ্রীহীন প্রশ্ন। হেটমাথা তার আর ও হেঁট
হয়ে গেল।
—যাই হােক, সে বুঝতেই পাচ্ছি। একাদশী কর ? ত
করতেই হবে—বামুনের ঘর। পেড়ে কাপড় পরেছ কেন, তােকে
যে নিন্দে করবে !—রাধে কে ?
ঘাড় নেড়ে মন্দা জানালাে, সেই রাধে।
—তা ত হবেই, একটা কিছু কাজ চাই ত ! তা ছাড়া বিধবা
মেয়ে গলায় পড়লে ঝি-রাঁধুনী লােকে ছাড়িয়েই দেয়, সেজন্য
কাউকে দোষ দেওয়া চলে না। কিন্তু অত ক'রে ছায়া লাটা
ভাল নয় ; সবারই অমঙ্গল। গেরস্থর কল্যেণ করা কি ভাল?
প্রথম আলাপেই এমনি একটা উচ্চ-নীচ সম্বন্ধ প্রতিষ্ঠিত হয়ে
গেল । সহজ বন্ধুত্বের মাঝখানে যদি ছােট-বড় প্রশ্ন আসে ত
তার চেয়ে করুণ আর কিছুই নেই। মনের কথাগুলি প্রকাশ
করবার পথ থাকে না, করতে গেলেই কেমন একটি ঘা খেয়ে ফিরে
আসতে হয়। দেখা হয়ে গেলে মা তাই মনে মনে ভয় পেয়ে
লুকোবার চেষ্টা করে, আর নয় ত কোনাে কথাই খুজে পায় ।
একটি অস্বাভাবিক ক্ষুদ্রতা বৌটিকে সদা সর্বদা যেন আচ্ছন্ন

নিশিপদ্ম করে থাকে। নিতান্তই সাধারণ মনােভাবের মেয়ে। (म কারো ভালতেও নেই, মন্দতেও নেই। নিজেদের স্বার্থ ছাড়া অন্য কারাে সুবিধা-অসুবিধার প্রতি দৃষ্টি দেবার প্রয়োজন সে এতটুকু মনে করে না। -অনেক ? না করলে বছরে আর পচিশটে একাদশী করতে হয় না। বিধবার মরণ ত আর নেই ; আকন্দর ডাল মুড়ি দিয়ে সেই একশাে বছর অবধি টারে। ছি ! কিন্তু এই প্রচণ্ড অবজ্ঞাও মন্দার মনে রেখাপাত করে না, এ যেন তার সয়ে গেছে। এ ত ঠিক কথাই ! এত বড় একটা অভিশপ নিয়ে যদি বংতেই হয়, তবে অন্যের প্রতি পাবে সে কোন্ অধিকারে? সপ্রশংস দৃষ্টিতে বৌটির দিকে চেয়ে মন্দা ভাবে, অপরের তুলনায় নিজে সে কত ছােট। ভাবে, বোটির কতক গুলি দুর্বলতার তলায় একটি বিচক্ষণ বুদ্ধিমত্তা আত্মগােপন কারে রয়েছে। স্বামী স্ত্রীর ঘরকন্নার মধ্যে একটি চমৎকার ছন্দ এবং সৌন্দর্য্য নার চোখে পড়ে। টুকরাে টাৱা এক আধটি কথা, একটুখানি হাসির আওয়াজ এদিকে যা ছিটকে আসে—তাই নিয়ে মন্দা মালা গাঁথে। বৌটির বয়স অল্প, অতএব প্রণয় নিবেদনের ইঙ্গিত-আভাস এখনাে চলে। একটু জোরে কথা কইলেই এদিক- ওদিক সব একাকার হয়ে যায়। কিন্তু লক্ষাটি যেন মন্দারই বেশী।

নিশিপদ্ম
ওদিকে ওরা দুজনে যদি হাসি-তামাসা করে ত এদিকে রান্নাঘরে
বসে’ মন্দার মুখখানি রাঙা হয়ে ওঠে ; কানদুটো ঝ। ঝ। কর।
কিন্তু দেখা গেল বেটি বােকা নয়। মাঝামাঝি কাঠের বেড়া
দিয়ে এর আগেই দুদিক আড়াল করা ছিল, হাং সেদিন নজরে
পড়লাে—বেড়ার সমস্ত হিত্র গুলি বন্ধ করে দেবার জন্য কাপড়ের
কুটি গুজে দেওয়া হয়েছে। মন্দার সকল দৃষ্টিকে এড়াবার একটি
প্রবল আকাঙ্ক্ষা ক্রমশঃ নিদারুণভাবে প্রকাশ হয়ে পড়ছিল।
একটি কঠিন এবং সুতীব্র অসন্তোষ বার বার তাকে ন বিদ্ধ
করবার চেষ্টা করছে।
-ধানের ভাত খাই, সবই বুঝতে পারি গো।
ৰে গােয়েন্দা হয় তা বাপু জানতাম না। লুকিয়ে লুকিয়ে *
প্যাট্‌ করে চেয়ে দেখা—কেমন ? বয়েস কালের বিধবা, কারো
কত গুণ বেরােবে তা কে জানে ! ভালয় ভালয় এখন আমাদের
দিন-ক্ষণ গেলে হয়।
করুণ একটুখানি ম্লান হাসি মন্দার মুখে ফুটে ওঠে। কিন্তু
এ ত’ তার বৈধব্যের প্রতি শাস্তি নয়-এ যে ঘৃণা ! তা হোক
সখির ছােট্ট ছেলেটি সবে হামাগুড়ি দিতে শিখেছে। কচি
কচি আঙুল চুষে সে নিজের মনেই খেলা করে। ওধারে বাসে’
১৫৭

নিশিপদ্ম
বেড়ার ওপর হাত চাপড়ে বােধ করি সময় সময় বাধাকে অতিক্রম
করতে চায়। মন্দার মনটা তৎক্ষণাৎ একেবারে উত্তাল হয়ে
ওঠে। ছেলের এই দুষ্টমির শব্দ শুনে রান্নাঘরে বসে’ হাসতে
হাসতে তার পেটে খিল ধরে যায়। ভাবে—কি বােকা !
হােক না ছােট ছেলে, কিন্তু পুরুষ মানুষ এত বােকা হয়? ওধার
থেকে একবারটি হামাগুড়ি দিয়ে ঘুরে এলেই ত তাকে দেখে
যেতে পারে। মন্দার ইচ্ছা করে, শিশুটির কানে কানে গিয়ে
বলে’ আসে-তুমি আর একটু বড় হলে তােমার মাকে লুকিয়ে
আমরা লুকোচুরি খেল্ব!—মন্দার উন্মুখ এবং ব্যাকুল মন
পাগলের মত কেবলই ভাবে, ছেলেটির মত কিছু দৌরাত্ম তার
কাছে আসবার জন্যেই ।
সন্তানহীনা নারীর এ কোনাে সাধারণ বাংসল্য নয়, শিশুটিকে
কোলে নিয়ে আপনার অন্তরকে সুশীতল করবার এ কোন সুলভ
উচ্ছাস নয়,—মন্দা যেন ছেলেটির মধ্যে নিজের মনকে খুজে
পায়। দুজনের মধ্যে কোথায় যেন একটি নিবিড় বন্ধুত্বের
যােগাযােগ আছে। ছেলেটির আহারে, নিদ্রায়, কান্নায়,
হাসিতে, খেলায়, দুষ্টামীর মধ্যে মা নিজেকে বেশ অনুভব
করতে পারে। ছেলেটির হাস্যোজ্জ্বল মুখখানি যেন মন্দারই
অন্তরের আত্মপ্রকাশ!
কিন্তু তারপর একদিন যে ব্যাপারটি ঘটলে তাতে
১৮
।

নিশিপদ্ম
যেন সমস্তটাই ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন, বিধ্বস্ত ও পদদলিত
গেল।
মেঝে থেকে প্রায় এক বিঘত, উচু করে কাঠের বেড়া বাঁধা।
সে দিন দুপুর বেলা চকিত দৃষ্টিতে মন্দা বেড়ার নীচে চেয়ে দেখলল,
ছােট ছােট আঙুলগুলি মাটিতে চেপে ছেলেটি বসে রয়েছে।
লােভ আর মন্দা সাম্লাতে পারল না। বেড়ার এধারে বসে
হেঁট হয়ে হাতটি গলিয়ে সে ছেলেটির পায়ে হাত বুলিয়ে একটু
আদর করতে লাগলাে। অবােধ শিশুটি খেলাচ্ছলে মন্দার দুটি
আঙুল আঁকড়ে ধরে মুখে পুরে দিল।
এই ত ঘটনা!
সখি হঠাৎ কোথা থেকে বিদীর্ণ কণ্ঠে চীৎকার করে উঠলাে।
মন্দা তাড়াতাড়ি হাত সরিয়ে একেবারে রান্নাঘরে দে ছুট।
ভয়ানক হাঁপাচ্ছিল। একটি মস্ত বড় অপরাধ যেন অকস্মাৎ
ধরা পড়ে গেছে।
বাড়ীতে তখন কেউ ছিল না। সখি এদিকে এসে দাড়িয়ে
উচ্চকণ্ঠে চীৎকার করে বল—ছেলেকে আমার কি খাওয়াচ্ছিলি
বেড়ার ফাক দিয়ে ?
ভয়ে ভয়ে মন্দা বেরিয়ে এসে কম্পিত কণ্ঠে বলল—কিছু ত
খাওয়াইনি দিদি ?
—দিদি বলে’ আর সােয়াগ কাড়াতে হবে না। রাকুসি, কি

নিশিপদ্ম খাওয়াচ্ছিলি শিগগির বল্ ; নৈলে এখুনি পুলিশ খবর দেবাে । মন্দা ঠক্ ঠক্ করে কেঁপে উঠলাে। এক মুহূর্তে সজল চক্ষে বিকৃত কণ্ঠে বল—আর কখনাে এমন করবাে না, এবার মাপ করুন। —মাপ? দাড়া তাের ন্যাকামি আমি বার কচ্ছি হারাম- জাদি। সােয়ামির ঘর পুড়িয়ে খেয়েচিস্, ছেলের সখ কেন আবার? তা বলে আমার ছেলেকে হিংসে ? আবাগি ছােটলােক। সেদিন সমস্ত ধরে নানারকম টোটকা ঔষধ খাইয়ে সখি ' তার ছেলের পেট থেকে বিষটুকু অবশ্য নামিয়ে দিয়েছিল। অতিরিক্ত মমতার অত্যাচারে রাত্রে ছেলেটার জ্বর এল। পুলিশে খবর দিল না বটে, কিন্তু তার চেয়ে অনেক বড় শাস্তি মন্দাকে মাথা পেতে নিতে হল। দিন তিনেক পরে দেখা গেল, সকাল বেলা গরুর গাড়ীর ওপর মালপত্র চালা যাচ্ছে। বাড়ীতে থাকা সখির পক্ষে বিপজ্জনক। বিষবৃক্ষের গােড়ায় কি কেউ বাসা বাধে ? , কেউ বাধে না ! সুমুখে একটি জামগাছ উত্তপ্ত হাওয়ায় শুধু সির সির করতে লাগলাে, একটি ঘুঘুপাখীর পাখার শব্দ দূর থেকে দূরে ক্রমশ মলিয়ে যেতে লাগলাে।

নিশিপদ্ম মন্দা সেইদিকে অনিমেষ দৃষ্টিতে তাকিয়ে নিঃশব্দে বসে রইল। নববর্ষার আকাশ আবার মেঘে মেঘে আকুল হয়ে ওঠে। দিক- দিগন্ত আচ্ছন্ন করে মানুষের নীড়গুলির মাথায় অন্ধকার নেমে আসে। কেতকীকদম্বের বনে বনে দীর্ঘ তীব্র কেকারব শােনা গায়। চারিদিক একাকার করে অবিশ্রান্ত জলধারা নামে। তারপর ক্রমে ক্রমে দেখা যায়, অধৌত দিগন্তের মুখখানি ধীরে ধীরে জ্যোতিমান হয়ে উঠেছে। রৌদ্রের হাসিতে তার সব্বা বর্ষার পরে শরতের প্রবেশ। শহরের বাড়ী খালি পড়ে থাকে না। আবার ভাড়াটে এল। একটি সুন্দরী মহিলা আর একটি সুন্দর কিশাের। মহিলাটি কোথাকার কোন্ জমিদার রাজার স্ত্রী। রাজার এক রক্ষিতাব দুর্ব্যবহারে তিনি ছেলেটিকে নিয়ে স্থান ত্যাগ করেছেন। একটিই সন্তান। রাজকোষ থেকে যৎসামান্য মাসহারা আসে। ছেলেটিকে যেমন করেই হােক মানুষ করে তুলতে হবে। ১১

নিশিপদ্ম
টকটকে রঙ, কালাে কালাে ঝাপ-ঝাঁপা চুল, ডালিমের
দানার মত দাত,—দীর্ঘবিস্তৃত দুটি চোখ। কালাের চেয়ে নীলের
আভা সে চোখে বেশি খেলে যায়। কণ্ঠস্বরের মধ্যে তার যেন
একটি সঙ্গীত আছে! একবার শুনলে আর একবার শােনবার
জন্য কান পেতে রাখতে হয়। চৌদ্দ বছরের ছেলের গায়ে হস্তীর
মত শক্তি। নাম গােরা। গােরাই বটে! দুরন্ত দুৰ্বার ছেলে
কারাে হাঁকডা মানে না। সে যেন সত্যিই রূপকথার সেই
রাজপুত্র ; চোখে তার সেই তেপান্তরের আভাস, বুকে তার
সাত সমুদ্র তেরাে নদী পার হবার দুর্জয় সাহস।
দুদিন না যেতেই সমস্ত বাড়াটা তার কলকণ্ঠের মুখরতায়
একেবারে ক্লান্ত হয়ে উঠলাে। এইটুকুর মধ্যে তাকে যেন ধরে না।
উদার আকাশ আর দিগন্তজোড়া প্রান্তর ভিন্ন দেওয়াল ঘেরা
ছােট্ট গণ্ডীর মধ্যে তাকে বাধা বড় কঠিন।
কিন্তু মন্দাকে আর সহজে খুজে পাওয়া যায় না। কখনও
খাটের তলায়, জালার পাশে, দরজার আড়ালে ; কখনও রান্না-
ঘরের নির্জনতায় ; কখনও বা ছাদের কোণে তাকে আবিষ্কার
করতে হয়। গােরাকে তার ভয়ানক ভয় করে! গােরা যখন
মাঝখানের কাঠের বেড়াটা এক-একবার হাত দিয়ে নেড়ে এর
অস্তিত্বের অপ্রয়ােজনের কথা জানিয়ে যায়, মন্দার বুকের ভিতরটা
তখনই গুয় গুর করে ওঠে গােরার গলার আওয়াজ শুনলে

নিশিপদ্ম
।
কিম্বা তার সঙ্গে দেখা হয়ে যাবার সম্ভাবনায় শঙ্কাতুর হরিণীর
মত সে ওই রকম কোনাে গােপন স্থানে গিয়ে লুকোয়। গােরা
যেন তার প্রাণ-দেবতার নিভৃত মণিকোঠার সংবাদ রাখে।
আত্মগােপন করে আর কতদিন চলে।
ছাদের সিড়ির কাছে দাড়িয়ে গােরা বলে’ উঠলল-আরে
বাঃ! দেখলে মা, দেখলে মজা ? এদিকে আছিল, আমাকে
দেখেই পালিয়ে গেল! শু—আমি বাঘ না ভালুক? বলি
ওই, ও-বাড়ীর মেয়ে !
নিজের কথায় নিজেই সে উচ্চকণ্ঠে হাে হাে করে হেসে
উঠলাে।
মা বললেন—লজ্জা কি। ভায়ের মতন, -তুই বাপু অত করে
চেঁচামেচি করিসনে। ছেলেমানুষ ভড়কে যায়।
মেয়েটা খুব শান্ত, না মা?
শান্ত সবাই, তােমার মতন কেউ না !
রান্নাঘরে বসে’ মন্দা সবই শুনছিল। একটি উন্মত্ত মন্থন তার
ভিতরে তখন তােলপাড় করছে। মনে হচ্ছিল, উত্তেজনায় এখুনি
তার দম বন্ধ হয়ে যাবে !
কাজ যখন কিছু থাকে না, গােরা তখন শিস দিয়ে দিয়ে
সমস্ত বাড়ীটায় পায়চারি করে বেড়ায়। ঠুকঠা দুদাম্ শব্দ ত
তার জন্য লেগেই আছে। আকাশে উড়ন্ত পাখীর দিকে চিল

নিশিপদ্ম
ছােড় তার একটি কাজ। সন্ধ্যার পর পড়ার সময় দেখা যায়,
রাণী আর ধৰ্ম্মরাজ তার দুই পাশে শান্তশিষ্ট হয়ে বসে রয়েছে।
কতলায় জল আনতে এসে আবার হঠাৎ সেদিন দুজনে
দেখা।
-এবার ? এবার কি হয় ? পালাচ্ছিলে যে? এলেই
তােমাকে ভয় পাইয়ে দেবাে তাই লুকিয়ে বসেছিলাম ! ;মি বুঝি
ভেবেছিলে আমি বাড়ীতে নেই ?
ঠকঠক করে কেঁপে মন্দার হাত থেকে বালতিটা পড়ে গেল।
মা এসে সুমুখে দাড়িয়ে মৃদু মৃদু হাসছিলেন। বললেন—মন্দা,
এসাে মা তুমি আমার কাছে। হতভাগা অমনি সবাইকে
চমকে দেয়।
গােরা বলল-মন্দ? মন্দা তােমার নাম ? এ মেয়ে ও মন্দ
নয় মা ?
মা বলিলেন—চুপ কর তুই গাধা। মন্দা মানে মার্কিনী।
স্বর্গের নদী ।
মন্দা ইতিমধ্যে বালতিটা তুলে নিয়ে কোনমতে পাশ কাটিয়ে
ওদিকে চলে গেল।
তার গতির দিকে চেয়ে হঠাৎ মা ও ছেলে
দুজনের মুখেই কথা বন্ধ হয়ে রইল। মন্দাকিনী কি আঘাত
পেয়েছে ?
আঘাত সে কোথায় পেল কেউ জালাে না! আঘাতকে
১৬ঃ

নিশিপদ্ম
বিশ্লেষণ করে’ বােঝাবার শক্তি ত তার নেই! আড়ালে গিয়ে
ভয়ব্যাকুল হয়ে মন্দা হঠাৎ ঝর ঝর করে কেঁদে ফেললাে।
গােরা তখন ছাদে বসে আকাশের দিকে চেয়ে ভাবছিল
স্বর্গের নদী! স্বর্গে কি নদী বয় ? ওই আকাশে ?
মা এবারে এলেন। মন্দা চোখ মুছে উঠে এসে তার কোলের
কাছে দাড়ালাে। মা বললেন—এ কি, চুল যে ভিজে ! জল
বসে’ অসুখ করলে কেউ ত দেখবার নেই মা !
তার কোলের মধ্যে মুখ লুকিয়ে মন্দা মৃদু কণ্ঠে বল্ল-অসুখ
করে না ।
পালি কোথাকার!—বলে’ মা তার চুল ফিরিয়ে দিলেন।
তারপর বললেন—মুখটি যে শুকিয়ে গেছে মা! খাওয়া হয়নি
এখনও ?
ঘাড় নেড়ে মন্দা জানালাে, না।
সে কি, বেলা যে গড়িয়ে গেল ; চিলের ছাদে গিয়ে বােদ
উঠেছে,
এত বেলায়
চুপি চুপি মন্দা বল—আজ খেতে নেই মা !
—ও। তাই বটে! আমার ত মনে থাকবার কথা নয় ;
কিছু মনে করিনে মা।
কিয়ৎক্ষণ পরে গােরার পায়ের শব্দ হঠাৎ ওধারে শােনা
যেতেই ব্যাকুল হয়ে মায়ের হাত ছাড়িয়ে মন্দা পালাবার চেষ্টা

নিশিপম করল—মা কিন্তু ছাড়লেন না। গােরা এধারে আসতেই তিনি সজল কণ্ঠে বলে উঠলেন—যা তুই, যা এখান থেকে । এধারে আসিনে—যা। তার কোলের মধ্যে মন্দার দেহখানি তখন থর থর করছে। আচ্ছা, এর শােধ আমি নেবে, এই বলে রাখলাম !--বলে’ গােরা আবার দুপদাপ করে চলে গেল। পরিচয় হয় না, আলাপ হয় না—কিন্তু ভয় মন্দার একটুখানি কমে গেছে। ইতিমধ্যে নিজের নামটি হয়েছে নিজের কাছে বিপজ্জনক। কারণ নেই, কৈফিয়ং নেই, প্রয়ােজন নেই—যখন- তখন ওদিক থেকে গাের। তার নামটি ধরে ডেকে ওঠে,--সে তার কী কণ্ঠস্বর । নামের এই দীর্ঘ কারান্তটি : বাইরে চারিদিকে ঘা খেয়ে খেয়ে মন্দার অন্তরের মধ্যে এসে ডুবে যায়। নিজের নাম অন্য কারাে মুখ থেকে শােনার মধ্যে একটি স্থাও যেমন আছে, একটি অপরিসীম তৃপ্তিও তেমনি রয়েছে। সাড়া দেয় না বটে, কিন্তু তার সমস্ত দেহ মন নিজের নামটিকে নিয়ে বীণার তারের মত ঝঙ্কত হতে থাকে। মুখখানি তার দেখতে দেখতে টকটকে রাঙা হয়ে ওঠে। কণ্ঠও বােধ হয়ে আসে। গােরা কিন্তু নাছোড়বান্দা। চীৎকার করে সে মন্দার নাম ১৬৬ নিশিপদ্ম ধরে ডাকবে, চীৎকার করে সে মন্দার বিরুদ্ধে অভিযােগ জানবে, চীৎকার করে সে মন্দার সঙ্গে বন্ধুত্ব পাবে। মা দাড়িয়েছিলেন। চট্ করে’ মুখ ফিরিয়ে গােরা বলল—ও কি, পালাচ্ছ যে ? একটু পাবার জল আমাকে দাও মন্দা। মন্দা জল এনে মাটিতে নামিয়ে রাখলাে। গোরা বল- হাতে দিলে জাত যায় বুঝি? দেখছ না, দেখছ? এ রকম করলে আমি কিন্তু গিয়ে হাঁড়িকুঁড়ি সব ভেঙে দিয়ে আম্ব তা বলে দিচ্ছি। মা বললেন—ওই বীরত্বটুকু দেখানাে বাকি আছে বটে। কিন্তু গােরার আর সবুর সইল না। সেদিন সবাই বেরিয়ে যাবার পর মায়ের বারণ অগ্রাহ্য করে সে দু হাতের প্রচণ্ড শক্তি দিয়ে কাঠের বেড়াটা সরিয়ে দিল। মন্দা এই কাণ্ড দেখে ভয় অংকে উঠে ঘরে গিয়ে দরজাটা বন্ধ করবার চেষ্টা করল । দরজা ঠেলে দিয়ে গোরা বল—এবার নিরুপায়, কোথা যাবে যাও? ওমা, এ ছেলে যে আগল ভেঙে ঘরে ছুটে আসে গাে ! চন্দা ভয়ে কাঠ হয়ে তার পায়ের দিকে চেয়ে রইল। ঘরে ঢুকে এটা-ওটা নাড়াচাড়া করতে করতে গােরা বল--- অনেক ভুগিয়েছ তুমি মন্দা, কদিন থেকে আমার ভারি রাগ হচ্ছিল। একটা লাঠিসোঁটা কিছু পেলে তােমাকে দু এক এ- ১৬৭

নিশিপদ্ম
এই যে, একটা ছড়ি পেয়ে গেছি ; ভালই হল।-নাও, হাত
পাতাে দেখি ?
সৰ্ব্বনাশ, ঘরে যে ঝড় লেগেছে! সব ওলােটপালট করে’
দিতে এমন সর্বনেশে ডাকাত এল কোথা থেকে ?
এ যে প্লাবন! এ যে বানের জল ! সব টেনে বার করে’
ভাসিয়ে নিয়ে যাবে নাকি ?
মন্দা হাত পাতছিল ! মা এসে বললেন—ই, ভারি শাসন
তাের ! ইস্কুলে মার খেয়ে এসে তার শােপ বুঝি আমার মেয়ের
ওপর তুলতে হবে ? যা গােরা, তুই ঘর থেকে।
ছড়িটা একপাশে রেখে দিয়ে নিৰ্ম্মল হাসিতে মুখখানি উন্নাসি
ক’ে গােরা বেরিয়ে চলে গেল।
দাদা এলেন সন্ধ্যাবেলা। এদিক ওদিক উকি মেরে অকস্মাৎ
ছাদের সিড়ির দিকে চেয়ে বললেন-ওখানে দাড়িয়ে কি হচ্ছে
রে? না: মাকে নিয়ে আর পারা গেল না।
তাই , অকারণে এই গােপন আবছা আলােয় সে এমন
দাড়িয়ে কেন ? সে কি আড়াল থেকে ওই রাজরাণী আর রা
পুত্রের দিকে চেয়ে কল্পনার জাল বুনছিল? কিন্তু তাদের যে বড়
জীবনের বড়-কথা, বড়-অভাব, বড়-ব্যর্থতা, বড় অনাদর ! রাজ
পরিবারের বড় বেদনার সঙ্গে পথ প্রান্তবাসিনীর ছােট্ট জীবনের দুঃখ
ও কোথাও মেলে না !

নিশিপম
জামা-কাপড় ছাড়তে ছাড়তে দাদা বললেন---অন্ধকার হয়ে এল
যে মন্দা, আলাে জাতে হবে না রে ?
হঠাৎ একবার স্তব্ধ হয়ে মন্দা চারিদিকে তাকালো। অন্ধকার
হয়ে এসেছে, কই এতক্ষণ সে ত বুঝতে পারেনি। দাদা ডাকছেন
"আলাে জ্বালাতে ?
তা বটে--
এবার আলাে জ্বর সময়ই হয়েছে !
মন্দা সিড়ি থেকে নীচে নেমে এল । চোখের জলে তখন
সন্ধ্যার প্লান অন্ধকার আরও অবিল হয়ে এসেছে।
আলাে জ্বলবার পর দাদা বললেন-বাপ রে, তাের দাঁড়াবার
কি ভঙ্গী, দেখে আমার ভয় হয়ে গিয়েছিল। মন হল যেন পাথর
হয়ে গেছিস্ ! গােরা বুঝি তােকে অমনি করে দাড় করিয়ে শা
দিয়েছিল ?
মন্দা বল—কি যে বল দাদা! তার বুঝি আর কাজ নেই ?
দাদা খেয়ে-দেয়ে ঘরে উঠে বই কাগজ নিয়ে বসলেন।
তা’র আগেই কাজ সেরে গড়গড়ার নল মুখে দিয়ে বিছানা
উঠেছেন। নিস্পৃহ ব্যক্তি।
একাকিনী অন্ধকার রাত্রি আর একাকিনী না—দুটি ৩০
এক হয়ে যায়। 'আলাে নিবে গেলেও মন্দার আর ভয় করে না ।
রাত্রির সঙ্গে তার বন্ধুত্ব বহুদিনের। ঘুম তার চোখে সহজে আঃ

নিশিপ
। প্রতিদিন প্রাতঃকালে নিজেকে সে কোনাে বিচিত্র স্থান
থেকে আবিষ্কার করে আনে। কখনাে উঠানে, দালানে ; কখনও
ছাদের সিড়িতে কিম্বা কতলার ধারে ; কখনও বা সদর দরজার
পথে কিম্বা শশাবার ঘরের একটি কোণে। এলােমেলাে পালা-
বালিমাখা মাথার চুল, গায়ে ব্যথা, চোখে ক্লান্তি—কেমন একটি
আনন্দহীন অবসন্নতা!
কে রে ? মন্দা ?
মন্দা ? এসো মা এসো। এত রাতে কে
বুঝি মনে পড়লাে ?
মন্দা গিয়ে মায়ের কাছে বসলো। মা বললেন-এই ঠিকানা
পড়ছিলাম মা, ওঁর কাছ থেকে এসেছে। পড়ে’ অবাক হয়ে
আমার কাছে ক্ষমা চেয়েছেন ; গিগিরই তােকে
দেখতে আসবেন—এই সব ! তুমি এত রাত অবধি জেগে
রয়েছ ?
মন্দা বলতে যাচ্ছিলাম তাই একবার
মা বললেন—পাগলি, এদিক-ওদিক চাইছিস থে?
রে ভয় নেই, সে ও-ঘরে ঘুমিয়ে পড়েছে। ভয় কি ?ই সঙ্গে
এনেছিস মুখপুড়ি ?
ভয় ত নয় মা!-বলে’ নন্দা একটু হেসে তখনই আবার উঠে
দাড়ালো। বলল-দাদাকে পান দিয়ে আসতে ভুলে গেছি।
মন্দা চলে যাবার কিয়ৎক্ষণ পরে মায়ের চোখে বােধ করি
নাচ্ছি।
১৭০

নিশিপদ্ম
তন্দ্রা এসেছিল। অকস্মাৎ গােরার চীৎকার শুনে পুন :
ধড়মড় করে উঠে বসলেন। আলাে ইতিমধ্যে নিবে গিয়েছিল ।
ছাদের পাঁচিল পার হয়ে কেবল এক ঝলক চাদের আলো এসে
বারান্দায় পড়েছিল।
মা উঠে এসে গােরাকে ধরে ফেলে বললেন—কি হয়েছে রে ?
স্বপ্ন দেখলি বুঝি ?
ভয়ে আর বিয়ে গােৱার তখন কণ্ঠরোধ হয়ে এসেছিল।
এদিক-ওদিক ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে বল স্বপ্ন নয় ।
ঘুমােচ্ছিলাম কে যেন—আমি কি ঠিক দেখেzি ম..
বিছানার ধারে এসে...আমি আর একা শুতে
কিন্তু।
মা বললেন-এক্লা থাকার বড়াই করতিস গে—5 - 1
কাছে। ডরিয়ে উঠেছিলি বুঝতে পাচ্ছি।
গােরা একটি দীর্ঘনিশ্বাস ফে। মনে হ’ল রহস্য
কাছে রহস্যই রয়ে গেল। কিন্তু মন তার হাকা; হং ধু-
চোখে মায়ের হাত ধরে একটু হেসে বল্ল---মন্দা জেগে থাকলে
আমার মজা দেখে হাসতা, না মা? আমার কিন্তু সত্যি ।
লেগে গেছল !
মা বললেন-সেদিনও বলি, ঘুমের ঘোরে কে যেন তার
গায়ে হাত দিয়ে দূর হােক গে ছাই, আজ থেকে আর আমার
।
১৭১

নিশিপন
কাছ ছাড়া হোেসনে। অনেক লােকের আনাগােনা এ বাড়ীতে
হয়ে গেছে কি না, তাই জন্যে-
অন্ধকারে চোরের মত মন্দা আলুথালু হয়ে পা টিপে টিপে
নিজের ঘরে গিয়ে তুললাে। সৰ্বাঙ্গ তার থর থর করছিল।
তারপর একদিন রাজা এলেন। গাড়ী-ঘােড়া এল, লােকজনের
হাঁকডাক পড়ে গেল। উৎসবে, আয়ােজনে, আন, ওদিকটা
যেন উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলাে। কান্নার পর হাসি, দুঃখের পর সুখ,
রাবির পর দিন।
ছেলে ও মায়ের নাগাল আর সহজে পাওয়া গেল না। আ৮
তা? রাতু-পরিবারের অন্তর্গত। সাধারণ গৃহস্থের জীবনাত্রার
সঙ্গে কাজ আর তাদের সমশ্রেণীভুক্ত করা চলে না। পাতির
চেয়ে আজ শ্ৰন্ধা বেশি, ভয়ের চেয়ে ভক্তি,বন্ধুত্বের চেয়ে
আত্মসান !
রাঙ্গার আগমনে আজ সবার ছােটখাটো সুখ-দুঃখ চাপা
পড়ে গেছে।
বাধা-ছাদা এর আগে থেকেই চলছিল—রাণী-মা বিলি-
ব্যবস্থা করছিলেন। গােরা তখন একবার এধারে এল। পিছন
১৭২

নিশিপ
থেকে গলা বাড়িয়ে বল্টওকি, চুচে সুতাে পরানে নেই,
কাপড় সেলাই হচ্ছে কি করে ?
ছি, ছি, তাই ত—এ কি ভুল! মন্দা সেটা তাড়াতাড়ি
কোলের মধ্যে লুকিয়ে ফেল্ল। গােরা বল—বাবা আমাদের
নিতে এসেছেন, আমরা চললাম মন্দা।
কাঙালিনী মুখ তুলে রাজপুত্রের দিকে তাকালো।
রাজপুত্রের মাথায় মখমলের টুপি, গায়ে জরির কাজ-করা গামা,
পরণে রেশমি ধুতি—সর্বাঙ্গে
ধুতি—সর্বাঙ্গে সুগন্ধি দ্রব্যের আভাস। প্রবল
একটি আঘাতকে গােপন করে আজ এই প্রথম নিতান্ত
লজ্জাহীনার মত হঠাৎ মন্দা বলল—চলে যাবে ? এ বাড়ী ছেড়ে
দিয়ে ?
তার সেই অন্তর্ভেদী, উজ্জ্বল, সুস্পষ্ট, করুণ দুটি বিশাক চক্ষুর
দিকে চেয়ে রাজপুত্রের এতদিনের সমস্ত চঞ্চলত থেমে গেল।
মাথা হেঁট করে’ শান্তকণ্ঠে শুধু বল—্যা, তাই যাচ্ছি ;--আবার
এ বাড়ীতে নতুন ভাড়াটে আসবে—কি বল ?
মন্দার মুখ দিয়ে আর কোনাে কথা বোেল ।
কিই-বা বলবে! • রাজপরিবারের সঙ্গে এক-আধদিনের জন্য
ঘনিষ্ঠতা হয়েছিল, এইটুকুই তার জীবনে যথেষ্ট
পথবাসিনীর ইতিহাসে এইটুকুই ত স্বর্ণাক্ষরে লিখে
রাখা উচিত।
নয়।
কি ?
.

নিশিপদ্ম
বিদায়-বেলার ভাষা আর কিছু খুঁজে না পেয়ে রাজপুত্র
চলে গেল, দূর পথের দিকে তাকিয়ে কাঙালিনীর দৃষ্টি কঁপতে
লাগলাে।
চিরজীবনের একটি অশান্তি দিয়ে গেছে! চিরকালের
কাটা !
দৈনন্দিন জীবনযাত্রার উৎসাহ এবং প্রাণধারণের স্পৃহা যে-
শিকড় থেকে আপনার রসসঞ্চয় করে তা হচ্ছে নারী-জীবনের
একটি বড় ব্যর্থতার সুর। সে সুমহান্ ব্যর্থতার মধ্যে ছােটখাটো
স্মৃতি, বিক্ষোভ, গ্লানি, পাওয়া-না-পাওয়া, কোনােটাই ঠাই
পার না !
শুধু কেবল অশােক আর শিমুলের বনে বনে যখন আগুন
লাগে, রজনীগন্ধার সকরুণ ইঙ্গিত যখন চালােকের দিকে
উক্কায়িত হয়ে ওঠে, বনমৰ্ম্মর যখন ছায়াপথে সঙ্গীত রচনা করে
আর দিশাহারা দক্ষিণের হাওয়া যখন ঘরের ভিতর সকল কোণ
বিশৃঙ্খল করে’ যায়—
মধ্যরাত্রে পক্ষিরাজের আগমন-সংবাদে চকিতা ও ত্রস্তা
রাজকন্যার ঘুম ভাঙে !
১৭৪

নিশিপদ্ম
-
মন্দা ধড়মড় করে জেগে ওঠে। নিৰ্বাপিত প্রায় প্রদীপটিকে
একটুখানি উজ্জ্বল করে দেয়। আর ঘুমােলে যেন তার চলবে না--
কেউ যদি এসে ফিরে যায় ?
তাড়াতাড়ি উঠে সে বাইরে আসে। পাশের ঘরে ঢুকে
দাদার গা ঠেলে বলে—ওঠো দাদা, ওঠো শিগগির একবার।
ওঠো--
দাদা ঘুম ভেঙে হকচকিয়ে বিছানার ওপর উঠে বসেন
কেন রে মন্দা ? চোর এসেছে ?
দেখে এসসা দিকি,
একটু আগে কে যেন কড়া
নাড়লল, ঘুমের ঘােরে সাড়া দিতে পারিনি। দেখে এসাে
ত দাদা!
দাদা চোখ রগড়ে কি যেন একটা আপত্তি করতে যান্।
দাদা, , সত্যি বলছি, আমি যে শুনলাম ! আমার
নাম ধরে ডেকে ডেকে—ঠিক যেন সেই চেনা গলা—আমি
ঘুমােইনি দাদা, জেগেই ছিলাম !—ওই শশানো, আবার শব্দ
হচ্ছে!—উত্তপ্ত দুই ফোটা অশ্রু ততক্ষণে তার চোখের কোলে
নেমে এসেছে।
দাদা সেই দিকে উৎকর্ণ হয়ে তাকিয়ে বলেন—ও যে হাওয়া
রে, ও যে বাতাস:
উত্তেজিত মুখ আর চঞ্চল চোখ এদিক ওদিক ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে
১৭৫

নিশিপদ্ম
নদা বকে—বাতাস! কিছুতেই না—এত জায়গা থাকতে হওয়া-
তা কি শুধু এই বাড়ীতেই দাদা?
--এটা যে ফাকা বাড়ী রে! ওদিকটা যে হু হু করছে ।
একটি বেদনাক্লিষ্ট অভারার গভীর নিশ্বাস ত্যাগ করে’
' শুধু বল—ও—তাই বটে ! ফাকা বাড়ী কিনা, তাইজন্যে
ই ই করে’
আরও কি যেন বলতে গিয়ে তার মুখের কথা মুখেই রয়ে
গে!
১৭৬

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Nishi Padma Ed.1st

Author
Sanyal, Probodh Kumar
Title
Nishi Padma Ed.1st
File name
Nishi Padma Ed.1st
Text
OCR done
Citation
1931
Published
2009/07/14
Publisher
Gurudas Chatterjee And Sons, Kolkata
Language
Sanskrit
Pages
182
Library
Makardah Saraswat Library, Howrah
Classification
Fiction, Prose Narrative
Keywords
Short stories
DLI number
551241
Barcode
4990010021118.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
MTmox41bXeH
Download PDF

Nishi Padma Ed.1st