Belgaria Sudha Smriti Pathagar

Mukut

Thakur, Rabindranath · 2010/03/19

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

शुकले
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
.
623
নন
বিশ্বভারতী গ্রন্থালয়
২ বঙ্কিম চাটুজ্যে স্ট্রীট, কলিকাতা

প্রথম প্রকাশ
১৯০৮
১৩৩৩
পৌষ ১৩৩৬
চতুর্থ পুনর্মুদ্রণ
পঞ্চম পুনর্মুদ্রণ
ষষ্ঠ পুনর্মুদ্রণ
সপ্তম পুনর্মুদ্রণ
অষ্টম পুনর্মুদ্রণ
ফাল্গুন ১৩৪৪
আষাঢ় ১৩৫ ৩
পৌষ ১৩৫২
প্রকাশক শ্রীপুলিনবিহারী সেন
বিশ্বভারতী, ৬৩ দ্বারকানাথ ঠাকুর লেন, কলিকাতা
মুদ্রাকর দেবেন্দ্রনাথ বাগ
ৰাহ্মমিশন প্রেস, ২১ কর্নওয়ালিস ঐট, কলিকাতা

বােলপুর ব্রহ্মচর্যাশ্রমের বালকদের দ্বারা অভিনীত
হইবার উদ্দেশে বালক’ পত্রে প্রকাশিত ‘মুকুট
নামক ক্ষুদ্র উপন্যাস হইতে নাট্যীকৃত

নাটকের পাত্রগণ
১ অমরমাণিক্য। মহারাজ
২ চন্দ্ৰমাণিক্য। যুবরাজ
- ইন্দ্রকুমার। মধ্যম রাজকুমার
রাজধর ॥ কনিষ্ঠ রাজকুমার
: ধুরন্ধর । ঐ মামাতো ভাই
ইশা খা॥ সেনাপতি
} আরাকানরাজ
প্রতাপ
নিশনধারী, ভাট, দুত, সৈনিক প্রভৃতি

প্রথম অঙ্ক
প্রথম দৃশ্য
ত্রিপুরার সেনাপতি ইশা খাঁর কক্ষ। ত্রিপুরার
কনিষ্ঠ রাজকুমার রাজধর ও ইশা খা।
ইশা খাঁ অস্ব পরিষ্কার করিতে নিযুক্ত
।
রাজধর। দেখে। সেনাপতি, আমি বারবার বলছি,
তুমি আমার নাম ধরে ডেকো না।
ইশা খুঁ।' তবে কী ধরে ডাকব? চুল ধরে, না কাঃ
ধরে?
রাজধর। আমি বলে রাখছি, অমর সম্মান যদি
তুমি না রাখ তােমার সম্মানও আমি রাখব না।
ইশ। খ।। আমার সম্মান যদি তােমার হাতে থাকবার
ভার থাকত তবে কানাকড়ার দরে তাকে হাটে বিকিয়ে
আসতুম। নিজের সম্মান আমি নিজেই রাখতে পারব।
রাজধর। তাই যদি রাখতে চাও তাহলে ভবিষ্যতে
মামার নাম ধরে ডেকো না।

ইশা খাঁ। বটে !
রাজধর। হা।
হা হা হা হা। মহারাজাধিরাজকে
কী বলে ডাকতে হবে ? হুজুর, জনাব, জাহাপনা।
রাজধর। আমি তােমার ছাত্র বটে কিন্তু আমি
রাজকুমার সে-কথা তুমি ভুলে যাও।
ইশা খাঁ। সহজে ভুলি নি, তুমি যে রাজকুমার
সে-কথা মনে রাখা শক্ত করে তুলেছ।
রাজধর। তুমি আমার ওস্তাদ সে-কথাও মনে
রাখতে দিলে না দেখছি।
ইশা খ।। বস্। চুপ।
.
দ্বিতীয় রাজকুমার ইন্দ্রকুমারের প্রবেশ
ইন্দ্রকুমার। খাঁ সাহেব, ব্যাপারখানা কী।
ইশা খাঁ। শােননা তাে বাবা। বড়াে তামাশার
কথা। তােমাদের মধ্যে এই যে ব্যক্তিটি সকলের কনিষ্ঠ
একে জাহাপনা, শাহানশা বলেনা ভাকলে ওর আর
সম্মান থাকে না- ওঁর সম্মানের এত টানাটানি।
ইন্দ্রকুমার। বল কী। সত্যি নাকি। হা হা হা হা।
চপ বা ud।

মুকুট
ইন্দ্রকুমার। তােমাকে কী বলে ডাকতে হবে।
জাহাপনা। হা হা হা হা। শাহানশা।
রাজধর। দাদা, চুপ করে বলছি।
ইন্দ্রকুমার। জনাব, চুপ করে থাকা বড়াে শক্ত
হাসিতে যে পেট ফেটে যায় হুজুর।
রাজধর। তুমি অত্যন্ত নির্বোধ।
ইন্দ্রকুমার। ঠাণ্ডা হও ভাই, ঠাণ্ডা হও। তোমার
বুদ্ধি তােমারই থাক, তার প্রতি আমার কোনাে লােক
নেই।
ইশা খা। ওঁর বুদ্ধিটা সম্প্রতি বড়ােই বেড়ে উঠেছে।
ইন্দ্রকুমার। নাগাল পাওয়া যাচ্ছে না- মই লাগাতে
হবে।
অনুচরসহ যুবরাজ চন্দ্ৰমাণিক্য ও মহারাজ অমরমাণিক্যে প্রবেশ
রাজধর।
মহারাজের কাছে আমার নালিশ আছে।
/মহারাজ। কী হয়েছে।
রাজধর। ইশা, পুনঃপুন নিষেধসত্বে আমার
অসম্মান করেন। এর বিচার করতে হবে।
ইশা খা অসম্মান কেউ করে না- সমান
তুমি করাও। আরও তত রাজকুমার আছেন তারাও

মুকুট
মনে রাখেন আমি তাঁদের গুরু, আমিও মনে রাখি
তাঁরা আমার ছাত্র- সম্মান-অসম্মানের কোনাে কথাই
ওঠে না।
মহারাজ। সেনাপতি সাহেব, কুমারদের
এখন
বয়স হয়েছে, এখন ওঁদের মান রক্ষা করে চলতে হবে
বই কি।
ইশ। খা। মহারাজ যখন আমার কাছে যুদ্ধ শিক্ষা
করেছেন তখন মহারাজকে যে-রকম সম্মান করেছি
রাজকুমারদের তা অপেক্ষা কম করি নে।
রাজধর। অন্য কুমারদের কথা বলতে চাই নে,
কিন্তু
ইশা খাঁ। চুপ করে বৎস। আমি তােমার পিতার
সঙ্গে কথা কচ্ছি। মহারাজ, মাপ করবেন, রাজবংশের
এই কনিষ্ঠ পুত্রটি বড়ো হলে মুনশির মতো কলম চালাতে
পারবে কিন্তু তলােয়ার এর হাতে শােভা পাবে না
(যুবরাজ এবং ইন্দ্রকুমারকে দেখাইয়া) চেয়ে দেখুন
মহারাজ, এরাই তো রাজপুত্র, রাজগৃহ আলাে করে
আছেন।
মহারাজ। রাজধর, খাঁ সাহেব কী বলছেন। তুমি
অশয় ওঁকে সন্তুষ্ট করতে পার নি ?

মুকুট
রাজধর। সে আমার ভাগ্যের দোষ, অস্ত্রশিক্ষার
দোষ নয়। মহারাজ নিজে আমাদের ধনুর্বিদ্যার পরীক্ষা
গ্রহণ করুন, এই আমার প্রার্থনা।
মহারাজ। আচ্ছা উত্তম। কাল আমাদের অবসর
আছে, কালই পরীক্ষা হবে।
তােমাদের মধ্যে যে জিতবে
তাকে আমার এই হীরেবাঁধানাে তলােয়ার পুরস্কার দেব ।
[ প্রহান
ইশা খাঁ। শাবাশ রাজধর, শাবাশ । আজ তুমি
ক্ষত্রিয়সন্তানের মতাে কথা বলেছ। অস্ত্ৰপরীক্ষায় যদি
তুমি হারাে তাতেও তােমার গৌরব নষ্ট হবেনারজিত
তাে আল্লার ইচ্ছা, কিন্তু ক্ষত্রিয়ের মনে স্পর্ধা থাকা চাই।
রাজধর। থাক্ সেনাপতি, তোমার বাহবা অন্য
রাজকুমারদের জন্য জমা থাক্ ; এতদিন তা না পেয়েও
যদি চলে গিয়ে থাকে তবে আজও আমার কাজ নেই।
যুবরাজ। রাগ কোরাে না ভাই রাজধর। সেনাপতি
সাহেবের সরল ভৎসনা ওঁর সাদা দাড়ির মতো সমস্তই
' কেবল ওঁর মুখে। কোনাে একটি গুণ দেখলেই তৎক্ষণাৎ
উনি সব ভুলে যান। অস্ত্রপরীক্ষায় যদি তােমার জিত
হয় তাহলে দেখবে, খাঁ সাহেব তােমাকে যেমন মনের
সঙ্গে পুরস্কৃত করবেন এমন আর কেউ নয় ।

মুকুট
।
রাজধর। দাদা, আজ পূর্ণিমা আছে, আজ রাত্রে
যখন গােমতী নদীতে বাঘে জল খেতে আসবে তখন
শিকার করতে গেলে হয় না?
যুবরাজ। বেশ কথা। তােমার যদি ইচ্ছে হয়ে
থাকে তে যাওয়া যাবে।
ইন্দ্রকুমার। কী আশ্চর্য । রাজধরের যে শিকারে
প্রবৃত্তি হল। এমন তো কখনও দেখা যায় নি।
ইশা খাঁ। ওঁর আবার শিকারে প্রবৃত্তি নেই। উনি
সকলের চেয়ে বড়ো জীব শিকার করে বেড়ান। রাজসভায়
দুই-পা-ওয়ালা এমন একটি জীব নেই যিনি ওঁর কোনাে
কোনাে ফাঁদে আটকা না পড়েছেন।
যুবরাজ। তােমার তলােয়ারও যেমন তােমার জিহ্বাও
তেমনি, দুই-ই খরধার- যার উপর গিয়ে পড়ে তার
একেবারে মর্মচ্ছেদ না করে ফেরে না ।
রাজধর। দাদা, তুমি আমার জন্যে ভেবাে না। খ
সাহেব জিহ্বায় যতই শান দিন না কেন আমার মর্মে
আঁচড় কাটতে পারবেন না।
ইশা খা। তােমার মর্ম পায় কে বাবা। বড়াে শক্ত।
ইন্দ্রকুমার। যেমন, হঠাৎ আজ রাত্রে তােমার
শিকারে যাবার শখ হল এর মর্ম ভালাে বােঝা যাচ্ছে না।

যুবরাজ।
আহা ইন্দ্রকুমার, প্রত্যেক কথাতেই
রাজধরকে আঘাত করাটা তােমার অভ্যাস হয়ে যাচ্ছে।
রাজধর। সে-আঘাতে বেদনা না পাওয়াও আমার
অভ্যাস হয়ে গেছে।
ইন্দ্রকুমার । দাদা, আজ রাত্রে শিকারে যাওয়াই
তােমার মত না কি?
যুবরাজ।
তােমার সঙ্গে,
ভাই, শিকার করতে
যাওয়াই বিড়ম্বনা। নিতান্ত নিরামিষ শিকার করতে হয়।
তুমি বনে গিয়ে বড়াে বড়ো জন্তু মেরে আন, আর আমরা
কেবল লাউ কুমড়ো কচু কঁঠাল শিকার করেই মরি ।
ইশা খাঁ। ( ইন্দ্রকুমারের পিঠ চাপড়াইয়া) যুবরাজ
ঠিক বলেছেন, পুত্র। তােমার তীর সকলের আগে
ছােটে এবং নির্ঘাত গিয়ে লাগে - তােমার সঙ্গে পেরে
উঠবে কে।
ইন্দ্রকুমার। না দাদা, ঠাট্টা নয়। তুমি না গেলে
কে শিকার করতে যাবে।
যুবরাজ। আচ্ছা চলো । আজ রাজধরের ইচ্ছে
হয়েছে, ওঁকে নিরাশ করব না ।
ইন্দ্রকুমার। কেন দাদা, আমার ইচ্ছে হয়েছে বলে কি
যেতে নেই।

মুকুট
যুবরাজ।
সে কী কথা ভাই, তােমার সঙ্গে তো
রােজই যাচ্ছি।
ইন্দ্রকুমার। তাই বুঝি পুরােনো হয়ে গেছে ।
যুবরাজ । আমার কথা অমন উলটো বুঝলে বড়ো
ব্যথা লাগে।
ইন্দ্রকুমার। না দাদা, ঠাট্টা করছিলুম, চলাে প্রস্তুত
হই গে।
ইশা খাঁ। ইন্দ্রকুমার বুকে দশটা বাণ সহতে পারে
কিন্তু দাদার সামান্য অনাদরটুকু সইতে পারে না।
[ অনুচরগণ ব্যতীত সকলের প্রস্থান
প্রথম।
অনুচরগণ
কথাটা তো ভালাে ঠেকছে না হে।
আমাদের ছােটো কুমারের ধনুর্বিদ্যার দৌড় ততসকলেরই
জানা আছে- উনি মধ্যম কুমারের সঙ্গে অস্ত্ৰপরীক্ষায়
এগােতে চান এর মানে কী?
দ্বিতীয়। কেউ বা তীর দিয়ে লক্ষ্য ভেদ করে,
কেউ বা বুদ্ধি দিয়ে ।
প্রথম। সেই তাে ভয়ের কথা। অস্ত্ৰপরীক্ষায়
অস্ত্র না চালিয়ে যদি বুদ্ধি চালাও সেটা যে দুষ্টবুদ্ধি ।
তৃতীয়। দেখাে, বংশী, অস্ত্রই চলুক আর বুদ্ধিই

।
মুকুট
চলুক মাঝের থেকে তােমার ঐ জিভটিকে চালিও ,
আমার এই পরামর্শ। যদি টিকে থাকতে চাও তত চুপ
করে থাকো।
দ্বিতীয়। বনমালী ঠিক কথাই বলেছে।ঐ ছােটো
কুমারের কথা উঠলেই তুমি যা মুখে জ্বাসে তাই বলে
ফেল। রাজার ছেলে কে ভালো কে মন্দ সে-বিচারের
ভার আমাদের উপর নেই। তবে
তরে কিনা, আমাদের
যুবরাজ বেঁচে থাকুন আর আসৃপদের মধ্যম কুমার ভাই
লক্ষ্মণের মতো সর্বদা তঁার সুঙ্গে সঙ্গে থেকে তাকে রক্ষে
করুন, ভগবানের কাছে এই প্রার্থনা করাে। ছোটো
কুমারের কথা মুখে না নাই ভালো
প্রথম। ইচ্ছে করে তাে আনি নে। আমাদের
মধ্যম কুমার সরল মানুষ মনে তার ভয়ডরও নেই,
পাকচক্রও নেই! সর্বদাই ভয় হয়, ঐ যার নামটা করছি
নে তিনি কন তঁাকে কী ফোদে ফেলেন।
“কি। চল্ চল, ঐ আসছেন।
প্রথম। ঐ যে সঙ্গে ওঁর মামাতো ভাই ধুরন্ধরটি ও
আছেন, শনির সঙ্গে মঙ্গল এসে জুটেছেন।
[ প্রস্থান

মুকুট
রাজধর ও ধুরন্ধর
রাজধর। অসহ্য হয়েছে।
ধুরন্ধর। কিন্তু সহ্য করতেও তাে কসুর নেই।
ইন্দ্রকুমারের সঙ্গে তো প্রায় জন্মাবধিই এইরকম চলছে,
কিন্তু অসহ্য হয়েছে এমন তাে লক্ষণ দেখি নে।
রাজধর। লক্ষণ দেখিয়ে লাভ হবে কী। যখন
দেখাব একেবারে কাজে দেখাব। একটা সুযােগ এসেছে ।
এইবার অস্ত্রপরীক্ষায় আমি লক্ষ্য ভেদ করব ।
ধুরন্ধর। ইন্দ্রকুমারের পক্ষে না কি।
রাজধর। বক্ষে নয়, তার হৃদয়ে। এবারকার
পরীক্ষায় আমি জিতব, ওঁর অহংকারটাকে বিধে এফেঁড়
ওফোড় করব।
ধুরন্ধর। অস্ত্রপরীক্ষায় ইন্দ্রকুমারকে ৩ জিতবে,
এইটেকেই সুযোেগ বল ?
রাজধর। সুযােগ কি তীরের মুখে থাকে। সুযােগ
বুদ্ধির ডগায়। তােমাকে কিন্তু একটি কাজ করতে হবে।
ধুরন্ধর। কাজ তাে তােমার বরাবরই করে আসছি,
ফল তাে কিছু পাই নে।
রাজধর। ফল সবুরে পাওয়া যায়। কোনােরকম
লিতে ইন্দ্রকুমার-দাদার অস্ত্রশালায় ঢুকে তার তূণেরু :

মুকুট প্রথম ধােপটি থেকে তার নামলেখা তীরটি তুলে নিয়ে আমার নামলেখা তীর বসিয়ে আসতে হবে। তাঁর সঙ্গে আমার তীর বদল করতে হবে, ভাগ্যও বদল হবে। ধুরন্ধর। সবই যেন বুঝলুম কিন্তু আমার প্রাণটি ? সেটি গেলে তাে কারও সঙ্গে বদল চলবে না। রাজধর। তােমার কোনো ভয় নেই, আমি আছি। ধুরন্ধর। তুমি তাে বরাবরই আছি, কিন্তু ভয়ও আছে। সেই যখন ইন্দ্রকুমারের রুপাের পাত দেওয়া । ধনুকটার উপরে তুমি লােভ করলে আমিই তাে সেটি সংগ্রহ করে তােমার ঘরে এনে লুকিয়ে রেখেছিলুম- শেষকালে যখন ধরা পড়লে, ইন্দ্রকুমার ঘৃণা করে সে-ধনুকটা তােমাকে দান করলেন কিন্তু আমার যে-অপমানটা করলেন সে আমার জীবন গেলেও যাবে না। তখনাে তাে, ভাই, তুমি ছিলে রক্ষা যত করেছিলে সে আমার মনে আছে। রাজধর। এবার তােমার সময় এসেছে সেই অপমানের শােধ দেবার জোগাড় করাে। সময় কখন কার আসে সেটা যে পরিষ্কার বােঝা যায় না। দুর্বল লােকের পক্ষে অপমান পরিপাক করবার শক্তিটাই ভালাে ; শােধ তােলবার শখটা তার ধুরন্ধর।

মুকুট
পক্ষে নিরাপদ নয়। ঐ যে ওঁরা সব আসছেন। আমি
পালাই। তােমার সঙ্গে আমাকে একত্রে দেখলেই
ইন্দ্রকুমার যে কথাগুলি বলবেন তাতে মধুবর্ষণ করবে না
-আর ইশা খাও যে তােমার চেয়ে আমার প্রতি বেশি
ভালােবাসা প্রকাশ করবেন এমন ভরসা আমার নেই।
[ প্রস্থান

কী, হে
কৃতীয় দৃশ্য
ইন্দ্রকুমারের অস্ত্রশালার দ্বার
ইন্দ্রকুমার।
প্রতাপ, ব্যাপারখানা কী।
আমাকে হঠাৎ অস্ত্রশালার দ্বারে যে ডাক পড়ল?
প্রতাপ। মধ্যম, বৌরানীমা আপনাকে খবর দিতে
বললেন যে, আপনার অস্ত্রশালার মধ্যে একটি জ্যান্ত
অস্ত্র ঢুকেছেন, তিনি বায়ু-অস্ত্র, না নাগপাশ, না কী,
সেটা সন্ধান নেওয়া উচিত।
ইন্দ্রকুমার। বল কী প্রতাপ, কলিযুগেও এমন
ব্যাপার ঘটে নাকি ।
প্রতাপ। আজ্ঞে, কুমার, কলিযুগেই ঘটে, সত্যযুগে
নয়। দরজাটা খুললেই সমস্ত বুঝতে পারবেন।
ইন্দ্রকুমার। তাই তাে বটে, পায়ের শব্দ শুনি যে।
[ দ্বার খুলিতেই রাজধরের নিমণ
এ কী! রাজধর যে। হা হা হা হা, তােমাকে অন্ত্র বলে
কেউ
ভুল
করেছিল নাকি। হা হা হা হা।
রাজধর। মেজবৌরানী তামাশা করে আমাকে
এখানে বন্ধ করে রেখেছিলেন।
ইন্দ্রকুমার । এ ঘরটা তো সহজ তামাশার ঘর না-

১৪
মুকুট
এখানকার তামাশা যে ভয়ংকর ধারালাে তামাশা
এখানে তোমার আগমন হল যে?
রাজধর। আজ রাত্রে শিকারে যাব বলে অ
খুজতে গিয়ে দেখলুম আমার অস্ত্রগুলােতে সব মরচে
পড়ে রয়েছে। কালকের অস্ত্রপরীক্ষার জন্যে সেগুলােকে
সমস্ত সাফ করতে দিয়ে এসেছি। তাই বৌরানীর কাছে
এসেছিলুম তােমার কিছু অস্ত্র ধার নেবার জন্যে।
ইন্দ্রকুমার। তাই তিনি বুঝি সমস্ত অস্ত্রশালামুদ্ধই
তােমাকে ধার দিয়ে বসে আছেন। হা হা হা হা।
তা বেরিয়ে এলে কেন । যাও, ঢুকে পড়াে।
মেয়াদ ফুরিয়েছে নাকি। হা হা হা হা।
রাজধর। হাসাে, হাসাে। তামাশায় আমিও
হাসব। কিন্তু, এখন নয়। চললুম দাদা, আজ আর
শিকারে যাচ্ছি নে।
[ প্রস্থান
প্রতাপ। ছােটোকুমারকে নিয়ে আপনাদের
এ-সমস্ত ঠাট্টা আমার ভালাে বােধ হয় না।
ইন্দ্রকুমার। ঠাটা নিয়ে ভয় কিসের। উনিও ঠাট্টা
করেন না।
প্রতাপ। ওর ঠাট্টা বড়াে সহজ হবে না।

মুকুট
পরীক্ষাভূমি
রাজা, রাজকুমারগণ, ইশা খাঁ, নিশানধারী ও ভাট
ইন্দ্রকুমার। দাদা, আজ তােমাকে জিততেই হবে,
নইলে চলবে না।
যুবরাজ। চলবে না তো কী। আমার তীরটা
লক্ষ্যভ্রষ্ট হলেও জগৎসংসার যেমন চলছিল ঠিক তেমনি
চলবে। আর, যদিবা নাই চলত তবু আমার জেতবার
কোনাে সম্ভাবনা দেখছি নে।
ইন্দ্রকুমার। দাদা, তুমি যদি হারাে তবে আমি
ইচ্ছাপূর্বক লক্ষ্যভ্রষ্ট হব।
যুবরাজ। না ভাই, ছেলেমানুষি কোরাে না।
'ওস্তাদের নাম রাখতে হবে।
ইশা খা।
যুবরাজ, সময় হয়েছে- ধনুক গ্রহণ
করে। মনােযােগ কোরো। দেখাে, হাত ঠিক থাকে যেন।
যুবরাজের তীর নিক্ষেপ
ইশা খা। যাঃ ফসকে গেল।
যুবরাজ।
মনােযােগ করেছিলুম খাঁ সাহেব,
তীয়যােগ করতেই পারঘুম না।

মুকুট
ইন্দ্রকুমার। কখনো না। মন দিলে তুমি নিশ্চয়ই
পারতে। দাদা, তুমি কেবল উদাসীন হয়ে সব জিনিস
ঠেলে ফেলে দাও, এতে আমার ভারি কষ্ট হয়।
ইশা খাঁ। তােমার দাদার বুদ্ধি তীরের মুখে কেন
খেলে না, তা জান? বুদ্ধিটা তেমন সূক্ষ্ম নয়।
ইন্দ্রকুমার। সেনাপতি সাহেব, তুমি অন্যায় বলছ।
ইশা খ।। ( রাজধরের প্রতি) কুমার, এবার তুমি
লক্ষ্য ভেদ করাে, মহারাজ দেখুন।
রাজধর। আগে দাদার হােক।
ইশা খাঁ। এখন উত্তর করবার সময় নয়, আমার
আদেশ পালন করে।
রাজধরের তীর নিক্ষেপ
ইশা খা। যাক, তােমার তীরও তােমায় দাদার
তীরেরই অনুসরণ করেছে— লক্ষ্যের দিকে লক্ষ্যও
করে নি।
যুবরাজ। ভাই, তােমার
তােমার বাণ অনেকটা নিকট
দিয়েই গেছে, আর একটু
আর একটু হলেই লক্ষ্য বিদ্ধ করতে
পারত।
রাজধর। লক্ষ্য বিদ্ধ তাে হয়েছে। দূর থেকে
হােমরা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছ না। ঐ যে বিদ্ধ হয়েছে ।

মুকুট
যুবরাজ।
রাজধর, তােমার দৃষ্টির ভ্রম হয়েছে –
লক্ষ্য বিদ্ধ হয় নি।
রাজধর। আমার ধনুর্বিদ্যার প্রতি তােমাদের বিশ্বাস
নেই বলেই তােমরা দেখেও দেখতে পাচ্ছ না। আচ্ছা,
কাছে গেলেই প্রমাণ হবে।
ইন্দ্রকুমারের ধনুক গ্রহণ
যুবরাজ। (ইন্দ্রকুমারের প্রতি) ভাই, আমি অক্ষম,
সেজন্যে আমার উপর তােমার রাগ করা উচিত না।
তুমি যদি লক্ষ্যভ্রষ্ট হও তাহলে তােমার ভ্ৰষ্টলক্ষ্য তীর
আমার হৃদয় বিদীর্ণ করবে, এ তুমি নিশ্চয় জেনে।।
ইন্দ্রকুমারের তীরনিক্ষেপ
নেপথ্যে জনতা। জয়, কুমার ইন্দ্রকুমারের জয়।
বাদ্য বাজিয়া উঠিল। যুবরাজ ইন্দ্রকুমারকে আলিঙ্গন করিলেন ।
ইশা খাঁ। পুত্র, আল্লার কৃপায় তুমি দীর্ঘজীবী হয়ে
থাকো। মহারাজ, মধ্যমকুমার পুরস্কারের পাত্র। যেরূপ
প্রতিশ্রুত আছেন তা পালন করুন।
রাজধর। মহারাজ, পুরস্কার আমারই প্রাপ্য।
আমারই তীর লক্ষ্যভেদ করেছে।
মহারাজ। কখনােই না।

১৮
মুকুট
রাজধর। সেনাপতি সাহেব পরীক্ষা করে আসুন
কার তীর লক্ষ্যে বিধে আছে।
ইশা খাঁ। আচ্ছা, আমি দেখে আসি।
[ প্রস্থান
তীর হাতে লইয়া ইশা খাঁর পুনঃপ্রবেশ
ইশা খাঁ। (ইন্দ্রকুমারের প্রতি) বাবা, আমি বুড়াে-
মানুষ, চোখে তাে ভুল দেখছি নে? এই তীরের ফলায়
যেন রাজধরের নাম দেখা যাচ্ছে।
ইন্দ্রকুমার। হাঁ, রাজধরেরই নাম।
মহারাজ। দেখি। তাই তো। একসঙ্গে আমাদের
সকলেরই
রাজধর। আজ নয় মহারাজ, আমার প্রতি বরাবরই
ভুল হয়ে আসছে।
ইশা খাঁ। কিছু বােঝা যাচ্ছে না।
ইন্দ্রকুমার। আমি বুঝেছি।
রাজধর। মহারাজ, আজ বিচার করুন।
ইন্দ্রকুমার। ( জনান্তিকে) বিচার! তুমি বিচার
চাও! তাহলে যে মুখে চুনকালি পড়বে। বংশের লজ্জা
প্রকাশ করব না- অন্তর্যামী তােমার বিচার করবেন।
ইশা খা। কী হয়েছে, বাবা। এর মধ্যে একটা
ভুল হল।

মুকুট
রহস্য আছে। শিলা কখনাে জলে ভাসে না, বানরে
কখনাে সংগীত গায় না। বাবা ইন্দ্রকুমার, ঠিক কথা
বলাে তাে, কী হয়েছে। তৃণ বদল হয় নি তাে?
রাজধর। কখনােই না। পরীক্ষা করে দেখাে ।
ইশা খাঁ। তাই তাে দেখছি-তূর্ণ তাে ঠিকই আছে।
আচ্ছা, বাবা ইন্দ্রকুমার, সত্য করে বলল, এর মধ্যে
তােমার অস্ত্রশালায় কেউ কি প্রবেশ করেছিল।
ইন্দ্রকুমার। সে-কথায় প্রয়ােজন নেই, খাঁ সাহেব।
ইশা খাঁ। ঠিক করে বলে, বাবা- তুমি নিশ্চয়
জান, কেউ তােমার অস্ত্রশালায় গিয়ে তােমার সঙ্গে তীর
বদল করেছে।
ইন্দ্রকুমার। চুপ করে, খাঁ সাহেব। ও কথা থাক্।
ইশা খাঁ। তাহলে তুমি হার মানছ ?
ইন্দ্রকুমার। হাঁ, আমি হার মানছি।
ইশা খাঁ। শাবাশ, বাবা, শাবাশ। তুমি রাজার ছেলে
বটে। মহারাজ, কোথাও একটা কিছু অন্যায় হয়ে
গেছে, সে কথাটা প্রকাশ হচ্ছে না। আর-একবার
পরীক্ষা না হলে ঠিকমতাে মীমাংসা হতে পারবে না।
রাজধর। খাঁ সাহেব, অন্যায় আর কিছু নয়, আমার
জেতাই অন্যায় হয়েছে। কিন্তু, তাই বলে আবার পরীক্ষার

২০ মুকুট অপমান আমি স্বীকার করতে পারব না। আমার জিত হওয়া যদি অন্যায় হয়ে থাকে, সে অন্যায়ের সহজ প্রতিকার আছে। আমি পুরস্কার চাই নে, মধ্যমকুমারকেই পুরস্কার দেওয়া হােক। মহারাজ। সে কথা আমি বলতে পারি নে তীরে যখন তােমার নাম লেখা আছে তখন তােমাকে পুরস্কার দিতেই আমি বাধ্য। এই তুমি না ও। [ তলােয়ার প্রদান রাজধর। পুরস্কার আমি শিরােধার্য করে নিচ্ছি। কিন্তু আমার এই সৌভাগ্যে কারো মন যখন প্রসন্ন হচ্ছে না তখন এই তলােয়ার আমি দাদ। ইন্দ্রকুমারকেই দিলুম। [ ইন্দ্রকুমারের দিকে তলােয়ার অগ্রসরকরণ ইন্দ্রকুমার। (তলােয়ার মাটিতে নিক্ষেপ করিয়া ) ধিক্। ! তােমার হাত থেকে এ পুরস্কারের অপমান গ্রহণ করবে কে। ইশা খাঁ। (ইন্দ্রকুমারের হাত ধরিয়া) কী! ইন্দ্র- কুমার, মহারাজের দত্ত তলােয়ার তুমি মাটিতে ফেলে দিতে সাহস কর। তােমার এই অপরাধের সমুচিত শাস্তি হওয়া চাই।

মুকুট ইন্দ্রকুমার। (হাত ছাড়াইয়া লইয়া) বৃদ্ধ, আমাকে স্পর্শ কোরাে না। ইশা খাঁ। পুত্র, এ কী, পুত্র! তুমি আজ আত্ম- বিস্মৃত হয়েছ। ইন্দ্রকুমার। সেনাপতি সাহেব, আমাকে ক্ষমা করাে। আমি যথার্থই আত্মবিস্মৃত হয়েছি। আমাকে শান্তি দাও। যুবরাজ। ক্ষান্ত হও, ভাই, ঘরে ফিরে চলাে। ইন্দ্রকুমার। ( মহারাজের পদধূলি লইয়া পিতা, অপরাধ মার্জনা করুন। আজ সকল রকমেই আমার হার হয়েছে। ইশা খাঁ। মহারাজ, আমার একটি নিবেদন আছে। খেলার পরীক্ষা তো চুকেছে এবার কাজের পরীক্ষা হােক। দেখা যাবে, তাতে আপনার কোন্ পুত্র পুরস্কার আনতে পারে। মহারাজ। কোন্ কাজের কথা বলছ, সেনাপতি। ইশা খা। আরাকানরাজের সঙ্গে মহারাজের যুদ্ধের মতলব আছে। সৈন্যও তো কুমারদের সেই যুদ্ধে মহারাজ। ভালো কথাই বলেছ, সেনাপতি। পাঠানাে হােক।

মুকুট
পেয়েছি, আরাকানের রাজা চট্টগ্রামের সীমানার কাছে
এসেছেন। বারবার শিক্ষা দিয়েছি কিন্তু মূর্থের শিক্ষার
শেষ তাে কিছুতেই হয় না, যমরাজের পাঠশালায় না
পাঠালে গতি নেই। কী বল, বৎসগণ। আমাদের সেই
চিরশত্রুর সঙ্গে লড়াইয়ে যাত্রা করে কাত্ৰচর্যে দীক্ষা গ্রহণ
করতে রাজি কি।
ইন্দ্রকুমার। আছি। দাদাও যাবেন।
রাজধর। আমিও যাব না, মনে করছ নাকি।
মহারাজ। তবে, ইশা খাঁ, তুমি সৈন্যাধ্যক্ষ হয়ে
এদের সকলকে শত্ৰুবিজয়ে নিয়ে যাও। ত্রিপুরেশ্বরী
তােমাদের সহায় হােন।

দ্বিতীয় অঙ্ক
প্রথম দৃশ্য
রাজধরের শিবির
রাজধর ও ধুরন্ধর
ধুরন্ধর। তুমি পাঁচ হাজার সৈন্য নিয়ে তাতে
থাকবে নাকি।
রাজধর। হাঁ, ইশা খাঁর কাছে আমি এই প্রস্তাব
পাঠিয়েছিলুম।
ধুরন্ধর।
সে তাে আমি জানি ; আমি তখন সেখানে
উপস্থিত ছিলুম। তাই নিয়ে অনেক কথাবার্তা হয়ে
গেল।
রাজধর। কিরকম।
ধুরন্ধর। প্রথমেই তাে ইন্দ্রকুমার অট্টহাস্য করে
উঠলেন- তিনি বললেন, রাজথরের বুকটা
রকম- যুদ্ধক্ষেত্র থেকে বহুদূরে থেকেই তিনি যুদ্ধ করতে
ভালােবাসেন।

২৪
ধুরন্ধর।
মুকুট
রাজধর। সে-কথা ঠিক।
ক্ষেত্র হতে যুদ্ধ করে
মজুররা দূরে থেকে যে যুদ্ধ করতে পারে সেই যােদ্ধা।
ইশা খা কী বললেন।
তােমার উপর তার বিশ্বাস কিরকম সে
তাে তুমি জানই-- তুমি যদি পায়ে ধরতে যাও তাহলেও
তিনি সন্দেহ করেন নিশ্চয় জুতােজোড়াটা তােমার
সরাবার মতলব আছে। তাই ইশা খাঁ বললেন, ‘যুদ্ধক্ষেত্র
থেকে রাজধর তফাতে থাকতে চান সেটা তার পক্ষে
আশ্চর্য নয় কিন্তু পাঁচ হাজার সৈন্য সঙ্গে রাখতে চান
সেইটে আমার ভালো ঠেকছে না।
রাজধর। যুবরাজ কিছু বললেন না?
ধুরন্ধর। যুবরাজ কাউকে যে সন্দেহ করবেন সে-
পরিমাণ বুদ্ধি ভগবান তাকে দেন নি এমন কি, তুমি
যে তুমি, তােমার উপরে তার সন্দেহ হয় না।
রাজধর। দেখাে, ধুরন্ধর, দাদার কথা তুমি অমন
করে বােলাে না।
ধুরন্ধর। ও, ঐ জায়গাটা
ঐ জায়গাটা তােমার একটু নরম
আছে, সেটা মাঝে মাঝে ভুলে যাই। যা হােক, তিনি
বললেন, “না না, রাজধরের প্রতি তােমরা অন্যায় অবিচার
করছ, তাঁর প্রস্তাবটা তো আমার ভালােই ঠেকছে।

মুকুট
যুদ্ধে যদি সংকট উপস্থিত হয় তাহলে তিনি তার সৈন্য
নিয়ে আমাদের সাহায্য করতে পারবেন। যুবরাজের
অনুরােধেই তো ইশা খা তােমার প্রস্তাবে রাজি হলেন,
নইলে তার বড় ইচ্ছে ছিল না। যাই হােক, কিন্তু
আমি তােমার আলাদা থাকবার মতলব ভালাে বুঝতে
পারছি নে।
রাজধর। ওঁদের সঙ্গে একত্রে মিলে যুদ্ধ করে
আমার লাভ কী- জিত হলে সে-জিতকে কেউ আমার
জিত বলবে না তাে।
ধুরন্ধর।
তবু ভুলেও কেউ তােমার নাম করতে
পারে। কিন্তু তফাতে বসে থাকলে যুদ্ধে জয় হলেও
তােমার অপযশ, হারলে তো কথাই নেই।
রাজধর।
আমার এই পাঁচ হাজার সৈন্য নিয়েই
আমি
যুদ্ধে
জিতব এবং আমি একলাই জিতব।
,,
দূতের প্রবেশ
রাজধর। কী রে, যুদ্ধের খবর কী ?
• দূত। আজ্ঞে, লড়াই তাে সমস্তদিন ধরেই চলছে
কিন্তু এ পর্যন্ত এর। শত্রুদের ব্যুহ ভেদ করতে পারেন নি।
সূর্য অস্ত যাবার আর তত বেশি দেরি নেই— অন্ধায়
হয়ে এলে বােধ হয় যুদ্ধ আজকের মতাে বন্ধ রাখতে হবে।

মুকুট
-
দ্বিতীয় দূতের প্রবেশ
রাজধর। কে তুমি।
। দ্বিতীয় দূত। আজ্ঞে আমি ব্যোমকেশ- যুবরাজ
আমাকে পাঠিয়ে দিয়েছেন সেও প্রায় দুই প্রহর হয়ে
গেল আপনার যেখানে সৈন্য নিয়ে থাকবার কথা ছিল
সেখানে আপনার কোনাে চিহ্ন না পেয়ে বহু সন্ধানে
এখানে এসেছি।
রাজধর। যুবরাজের আদেশ কী।
দূত। শত্রুসৈন্যর সংখ্যা আমরা যে-রকম অনুমান
করেছিলুম তার চেয়ে অনেক বেশি দেখা যাচ্ছে- যুদ্ধ
খুব কঠিন হয়ে এসেছে।
কুমার ইন্দ্রকুমার তাঁর
অশ্বারােহীদল নিয়ে শত্রুসৈন্যের উত্তর দিক আক্রমণ
করেছিলেন, আর কিছুক্ষণ সময় পেলেই তিনি সেদিক
থেকে শত্রুসৈন্যকে একেবারে নদীর কিনারা পর্যন্ত হঠিয়ে
আনতে পারতেন।
রাজধর। সত্যি নাকি। সময় পেলে কী করতে
পারতেন সে-কথা কল্পনা করে বিশেষ লাভ দেখি নে-
কিন্তু সময় পান নি ব'লেই বােধ হচ্ছে।
২ দূত। শত্রুসৈন্যকে যখন প্রায় টলিয়ে এনেছেন
এমনসময় খবর পেলেন যে, যুবরাজ সংকটে পড়েছেন,

মুকুট
শত্রু তঁাকে ঘিরে ফেলেছে ইশা খাঁ তখন অন্যদিকে যুদ্ধে
নিযুক্ত ছিলেন, তিনি খবর পেয়ে বললেন, যুবরাজকে
উদ্ধার করবার জন্যে আমি এখানে আসি নি, আমাকে
যুদ্ধে জিততে হবে ; আমি এখান থেকে নড়তে গেলেই
শত্রুরা সুবিধা পাবে।
রাজধর। দাদা কি তবে-
দূত। না, তার কোনাে বিপদ এখনাে ঘটে নি।
ইন্দ্রকুমার সৈন্য নিয়ে তাকে উদ্ধার করেছেন কিন্তু এই
গােলেমালে যুদ্ধে আমাদের অসুবিধা ঘটল। আপনাকে
সন্ধান করবার জন্যে নানা দিকে দূত গিয়েছে আপনার
সাহায্য না হলে বিপদ ঘটতেও পারে, অতএব আপনি
আর কিছুমাত্র বিলম্ব করবেন না।
রাজধর। , কিছুমাত্র বিলম্ব করব না। যাও
তুমি বিশ্রাম করে গে যাও আমি প্রস্তুত হচ্ছি।
[
দুপ্রস্থান
ধুরন্ধর। তুমি যাচ্ছ নাকি।
রাজধর। যাচ্ছি বটে, কিন্তু ওদিকে নয়, অন্যদিকে।
ধুরন্ধর। বাড়ির দিকে ?
রাজধর। তুমিও কি ইশা খার কাছ থেকে বিদ্রুপ
অভ্যেস করেছ। বীরত্ব যার খুশি তিনি দেখান কিন্তু

২৮
মুকুট
যুদ্ধে জয় করে যদি কেউ বাড়ি ফেরে তাে সে রাজধর।
ধুরন্ধর, যাও তুমি দেখাে গে আমার শিবিরে কোথাও
যেন কেউ আগুন না জ্বলে, একটি প্রদীপও যেন না
জ্বালাতে পায়।
ধুরন্ধর। আচ্ছা,
আচ্ছা, আমি সকলকে সতর্ক করে
দিচ্ছি- কিন্তু, কী তােমার অভিপ্রায় খুলেই বলল না
তুমি যদি আমাকে আর আমি যদি তােমাকে সন্দেহ করি
তাহলে পৃথিবীতে আমাদের দুটির তাে কোথাও ভর
দেবার জায়গা থাকবে না ।
রাজধর। আজ রাত্রের অন্ধকারে আমি সৈন্য নিয়ে
গােপনে নদী পার হয়ে যাব। হঠাৎ আরাকানরাজের
শিবিরে উপস্থিত হয়ে তাকে বন্দী করতে হবে।
ধুরন্ধর। এখানে কোথায় পার হবে , ঘাট তো নেই।
রাজধর। পথঘাট আমি সমস্তই সন্ধান করে ঠিক
করে রেখেছি। সূর্য তাে অস্ত গেল। আজ আড়াই
প্রহর রাত্রে চাদ উঠবে, তার পূর্বেই আমাদের কাজ শেষ
করতে হবে, অতএব আর বড় বেশি দেরি নেই তুমি
যাও, প্রস্তুত হও গে । আর-একটি কাজ করাে-
যুবরাজের দূত যেন ফিরে যেতে না পারে, তাকে বন্দী
করে রাখাে।

মুকুট
দ্বিতীয়
দৃশ্য
ইশা খাঁর শিবির
ইন্দ্রকুমার ওইশা খা
ইন্দ্রকুমার। সেনাপতি সাহেব, আপনি দাদার উপর
রাগ করবেন না। আজ রাত্রে সৈন্যেরা বিশ্রাম করুক,
কাল আমরা যুদ্ধে জয়লাভ করব।
ইশা খাঁ। দেখাে ইন্দ্রকুমার, আগুন
যত শীঘ্র
নেবানাে যায় ততই মঙ্গল— তাকে সময় দিলে কিসের
থেকে কী ঘটে কিছুই বলা যায় না। আজই আমরা জিতে
আসতুম- কেবল তােমার দাদা নিতান্ত নির্বোধের
মতাে শত্রুদের মাঝখানে নিজেকে খামকা জড়িয়ে বসলেন,
আমাদের সমস্ত পণ্ড হয়ে গেল।
ইন্দ্রকুমার। নির্বোধের মতাে কেন বলছ, খাঁ সাহেব,
বলল, বীরের মতাে তিনি সামান্য কয়জন সৈন্য নিয়ে
ইশা খাঁ। যেখানে গিয়ে পড়েছিলেন সেখানে কেবল
নির্বোধই যেতে পারে-
ইন্দ্রকুমার। ( উত্তেজিতস্বরে) না, সেখানে বীর না
হলে কেউ প্রবেশ করতে সাহস করতে পারে না।
ইশা খাঁ। আচ্ছা, বাবা, তােমার কথা মানছি।

মুকুট
কিন্তু শুধু বীর নয়, নির্বোধ-বীর না হলে সেদিকে কেউ
যেত না।
ইন্দ্রকুমার। কিন্তু, তাতে তােমার লড়াইয়ের তাে
কোনো ব্যাঘাত হয় নি।
ইশা খাঁ। খুব ব্যাঘাত হয়েছিল ।
আমার সৈন্যেরা
খবর পেয়ে সকলেই চঞ্চল হয়ে উঠল, তাদের কি আর
লড়াইয়ে মন ছিল। আমাদের সৈন্যের মধ্যে একজনও
নেই যুবরাজের বিপদের খবর শুনে যে স্থির থাকতে
পারে।
ইন্দ্রকুমার। কিন্তু, সেনাপতি সাহেব, আমাদের
রাজধরের খবর কী।
ইশা খা। আমি চারদিকেই দূত পাঠিয়েছিলুম,
একজন ছাড়া সব দূতই ফিরে এসেছে, কোথাও তার
কোনাে সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না।
ইন্দ্রকুমার। হা হা হা হা, সে নিশ্চয় পালিয়েছে।
ইশা খা। হাসির কথা নয়, বাবা।
ইন্দ্রকুমার। তা কী করব, সেনাপতি সাহেব,
আমি খুশি হয়েছি। আমরা যুদ্ধ করে মরতুম আর
ও যে আমাদের খ্যাতিতে, ভাগ বসাত, সে আমার
কিছুতে সহ হত না; তার চেয়ে ও ভেগে গেছে, সে

মুকুট
ভালােই হয়েছে। এবারকার অস্ত্রপরীক্ষায় তো ফাঁকি
চলবে না।
ইশা খাঁ। কিন্তু, সেবার কী হয়েছিল তুমি আমার
কাছে বল নি।
ইন্দ্রকুমার। সে বলবার কথা না, খাঁ সাহেব সে
আমাকে কিছু জিজ্ঞাসা কোরাে না, সেবার আমি
হেরেছিলুম।
ইশা খাঁ। তীর ছুড়ে হার নি, বাবা, রাগ করে
হেরেছিলে।

৩২
মুকুট
তৃতীয় দৃশ্য
আরাকানরাজের শিবির
আরাকানরাজ ও রাজধর
.
আরাকান। দেখুন, রাজকুমার, আমাকে বন্দী করে
আপনাদের কোন লাভ নেই।
রাজধর। কেন লাভ নেই,
কেন লাভ নেই, রাজ। এই যুদ্ধের মধ্যে
আপনাকে লাভ করাই তো সবচেয়ে বড় লাভ।
আরাকান। তাতে যুদ্ধের অবসান হবে না। আমার
ভাই হামচু রয়েছে, সৈন্যেরা তাকেই রাজা করবে, যুদ্ধ
যেমন চলছিল তেমনি চলবে।
রাজধর। আপনাকে মুক্তিই দেব, কিন্তু সেটা তাে
একেবারে বিনামূল্যে দেওয়া চলবে না।
আরাকান।
সে আমি জানি, মূল্য দিতে হবে।
আমি আপনার কাছে পরাজয় স্বীকার করে সন্ধিপত্র
লিখে দিতে রাজি আছি।
রাজধর। শুধু সন্ধিপত্র দিলে তাে হবে না, মহারাজ।
আপনি যে পরাজয় স্বীকার করলেন তার কিছু নিদর্শন
তো দেশে নিয়ে যেতে হবে।
আরাকান। আপনাকে পাঁচশত ব্ৰহ্মদেশের ঘােড়
ও তিনটি হাতি উপহার দেব।

মুকুট
৩৩
রাজধর। সে-উপহারে আমার প্রয়ােজন নেই
মহারাজের মাথার মুকুট আমাকে দিতে হবে।
আরাকান। তার চেয়ে প্রাণ দেওয়া সহজ ছিল ।
রাজধর। প্রাণ দিলেও মুকুটটি তত বাঁচাতে পারবেন
না, মাঝের থেকে প্রাণটাই বৃথা যাবে।
আরাকান। তবে মুকুট নিন কিন্তু এই মুকুটের
সহিত আরাকানের চিরস্থায়ী শত্রুতা আপনি ঘরে নিয়ে
যাচ্ছেন। এই মুকুট যতদিন না আবার ফিরে পাব
ততদিন আমার রাজবংশে শান্তি থাকবে না।
রাজধর। এই তো রাজার মতাে কথা। আমরাও
তাে শান্তি চাইনে মহারাজ, আমরা ক্ষত্রিয়। আর-একটি
কর্তব্য বাকি আছে। শীঘ্র যুদ্ধ নিবারণ করে
আদেশপত্র আপনার সেনাপতির নিকট পাঠিয়ে দিন,
ওপারে এতক্ষণ যুদ্ধের উদ্যােগ হচ্ছে।
আরাকান। এখনই আমার আদেশ নিয়ে দূত যাবে।
রাজধর। তবে চলুন, সন্ধিপত্র লেখার ব্যবস্থা করা
যাক।

মুকুট
চতুর্থ দৃশ্য
রণক্ষেত্র
যুবরাজ ও ইন্দ্রকুমার
যুবরাজ। আজকের যুদ্ধে গতিকটা ভালাে বােঝ
যাচ্ছে না। আমার মনে হচ্ছে, আমাদের সৈন্যেরা
কালকের ব্যাপারে আজও নিরুৎসাহ হয়ে রয়েছে— ওরা
যেন ভালাে করে পড়ছে না। ইশা খাঁ কোন্ দিকে।
ইন্দ্রকুমার। ঐ যে পূর্বকোণ তার নিশান দেখা
যাচ্ছে।
যুবরাজ। ভাই, তুমি কেন আজ আমার সঙ্গে সঙ্গে
রয়েছ। মার বােধ হয় ঐ উত্তরের দিকে যাওয়াই
কর্তব্য।
ইন্দ্রকুমার। না, আমার এই জায়গাই ভালাে।
যুবরাজ। ইন্দ্রকুমার, তুমি তােমার দাদাকে আজ
নিবুদ্ধিতা থেকে বাঁচাবার জন্যে সতর্ক হয়ে কাছে কাছে
ফিরছ। সাহেব যে আবার কোনাে সুযােগে আমার
বুদ্ধির দোষ ধরবেন এটা তােমার ভালো লাগছে না।
কিন্তু ভাই, আমার নির্বুদ্ধিতার সীমা আছে আমি
আজ বােধ হয় সাবধানে কাজ করতে পারব। ঐ দেখো,
তােমার

মুকুট
!
ঘটল।
চেয়ে দেখাে, আমার কিন্তু ভালো বােধ হচ্ছে না।
ঐ দেখাে, ঐ পাশে আমাদের সৈন্যেরা যেন টলেছে, এখনই
পালাতে আরম্ভ করবে- তুমি না হলে কেউ ওদের ঠেকাতে
পারবে না। ইন্দ্রকুমার, দেরি কোরাে না, আমার জন্যে
তােমার কোনাে ভয় নেই। এ কী ! এ কী! এ কী!
ইন্দ্রকুমার। তাই তাে, এ কী! শত্রুসৈন্যেরা হঠাৎ
যুদ্ধ বন্ধ করলে যেন।
যুবরাজ। ঐ যে সন্ধির নিশান উড়িয়েছে। ওদের
তো পরাজয়ের কোনাে লক্ষণ ছিল না, তবে কেন এমন
আমার তো মনে হচ্ছিল, আজকের যুদ্ধে
আমাদের সৈন্যেরাই টম করছে।
দূতের প্রবেশ
দূত। যুবরাজ, শত্রুপক্ষ যুদ্ধে ক্ষান্ত হয়েছে।
যুবরাজ। সে তাে দেখতে পাচ্ছি। এর কারণ কী।
৮ দূত। কারণ এখনও জানতে পারি নি কিন্তু শুনতে
পেয়েছি, আরাকানরাজ আর আমাদের সঙ্গে যুদ্ধ করবেন
বলে সংবাদ পাঠিয়েছেন।
যুবরাজ। সুসংবাদ। আমার কেবল মনে একটি
বেদনা বাজছে।
ইন্দ্রকুমার। কিসের বেদনা, দাদা।

মুকুট = যুবরাজ। রাজধর কেন সৈন্য নিয়ে চলে গেল। সে যদি থাকত তাহলে কী আনন্দের সঙ্গে আমরা তিন ভাই জয়ােৎসব করতে পারতুম। আজকের আমাদের জয়গৌরবের মধ্যে এই একটি মস্ত অভাব রয়ে গেল রাজধর যুদ্ধে যােগ না দিয়ে আমাকে বড়ো দুঃখ দিয়েছে। ইন্দ্রকুমার। জয়ের ভাগ না নিয়েই সে যদি পালিয়ে থাকে তাতে এমনি কী ক্ষতি হয়েছে দাদা। যুবরাজ। না ভাই, আমরা তিন ভাই একত্রে বেরিয়েছি, বিজয়লক্ষ্মীর প্রসাদ আমরা ভাগ করে ভােগ করতে পারলে আমার তাে মনে দুঃখ থেকে যাবে। রাজধর যদি মাথা হেঁট করে বাড়ি ফেরে, আমাদের সৌভাগ্যে যদি তার মুখ বিমর্ষ হয়, তাহলে এই কীর্তি আমাকে কিছুমাত্র মুখ দেবে না। ঐ যে ঘােড়া ছুটিয়ে সেনাপতি সাহেব আসছেন। ইশা খার প্রবেশ ইন্দ্রকুমার। খাঁ সাহেব, শত্রুসৈন্য হঠাৎ যুদ্ধ থামিয়ে দিলে কেন তার কোনাে খবর পেয়েছ? ইশা খা। পেয়েছি বই কি। রাধর আরাকান- আজকে বন্দী করেছে।

মুকুট ১৭ ইন্দ্রকুমার। রাজধর! মিথ্যা কথা। ইশা খাঁ। যা মিথ্যা হওয়া উচিত ছিল এক-এক সময় তাও সত্য হয়ে ওঠে। আমি দেখতে পাচ্ছি, আল্লার দূতেরা এক-এক সময় ঘুমিয়ে পড়ে, শয়তান তখন সমস্ত হিসাব উলটো করে দিয়ে যায়। ইন্দ্রকুমার। শয়তানও কি রাজধরকে জিতিয়ে দিতে পারে। ইশা খাঁ। একবার তাে জিতিয়েছিল সেই অস্ত্র- পরীক্ষার সময় এবারও সেই শয়তান জিতিয়েছে যুবরাজ। সেনাপতি সাহেব, তুমি রাজরের উপর রাগ কোরাে না। সে যদি জিতে থাকে তাতে তো আমাদের জিত। কখন সে যুদ্ধ করলে, কখন বা বন্দী করলে, আমরা তাে জানতে পারিনি। ইশা খা। কাল সন্ধ্যার পরে আমরা যখন যুদ্ধে ক্ষান্ত দিয়ে শিবিরে ফিরে এলেম তখন সে অন্ধকারে গােপনে নদী পার হয়ে হঠাৎ আরাকানরাজের শিবির আক্রমণ করে তাকে বন্দী করেছে। আমাদের সাহায্য করবার জন্যে আমি তাকে যেখানে প্রস্তুত থাকতে বলেছিলুম সেখানে সে ছিলই না। আমি সেনাপতি, আমার আদেশ সে মান্যই করেনি।

৩৮
মুকুট
ইন্দ্রকুমার। অসহ্য।
এ জন্যে তার শাস্তি পাওয়া
উচিত।
ইশা খাঁ। শুধু তাই! যুবরাজ উপস্থিত থাকতে
সে কিনা নিজের ইচ্ছামতাে সন্ধিপত্র রচনা করেছে।
ইন্দ্রকুমার। এর শাস্তি না দিলে অন্যায় হবে।
ইশা খা। তােমার দাদাকে এই সহজ কথাটি
বুঝিয়ে দাও দেখি।
রাজধরের প্রবেশ
ইন্দ্রকুমার। রাজধর! তুমি কাপুরুষতা প্রকাশ
করেছ।
রাজধর। তােমার মতাে যুদ্ধে ভঙ্গ দিয়ে পুরুষকার
প্রকাশ করতে আমি এতদূরে আসিনি
আমি যুদ্ধ জয়
করতে এসেছিলুম।
ইন্দ্রকুমার। তুমি যুদ্ধ করেছ। এবং জয় করেছ।
জয়লক্ষ্মীর মুখ যে লজ্জায় লাল করে তুলেছ।
মারধর। তা হতে পারে, সেটা প্রণয়ের লজা।
কিন্তু, তিনি যে আমাকে বরণ করেছেন তার সাক্ষী এই।
ইত্ৰকুমার। এ মুকুট কার।
রাধর। এ মুকুট আমার। এ আমার হয়ে
পুর।

৩৯
ইন্দ্রকুমার। যুদ্ধ থেকে পালিয়েছ তুমি - তুমি
পুরস্কার পাবে কিসের। এ মুকুট যুবরাজ পরবেন।
রাজধর। আমি জিতে এনেছি, আমিই পরব।
যুবরাজ।
রাজধর ঠিক কথাই বলছেন। ওঁর জয়ের
ধন তো উনিই পরবেন।
ইশা খা। সেনাপতির আদেশ লঙ্ঘন করে উনি
অন্ধকারে শৃগালবৃত্তি অবলম্বন করলেন -
আর উনি
পরবেন মুকুট! ভাঙা হাঁড়ির কান প'রে যদি দেশে
যান তবেই ওঁকে সাজবে।
রাজধর। আমি যদি না থাকতুম ভাঙা হাঁড়ির
কানা তােমাদের পরতে
এতক্ষণ থাকতে
কোথায়।
ইন্দ্রকুমার। যেখানেই থাকি তােমার মতো পালিয়ে
থাকতুম না।
যুবরাজ। ইন্দ্রকুমার, তুমি অন্যায় বলছ, ভাই।
সত্য বলতে কী, রাজধর না থাকলে আজ আমাদের
বিপদ হত।
ইন্দ্রকুমার। কিছু বিপদ হত না।
রাজধ সৈন্য
লুকিয়ে রেখেই আমাদের বিপদে ফেলবার চেষ্টা
করেছিল। রাজধর না থাকলে এ মুকুট আমি যুদ্ধ

•
মুকুট
করে আনতুম। রাজধর চুরি করে এনেছে। দাদা,
এ মুকুট এনে আমি তােমাকেই
তােমাকেই পরাম, নিজে
পরতুম না।
যুবরাজ। ( রাজধরের প্রতি ) ভাই, তুমিই আজ
জিতেছ। তুমি না থাকলে অল্প সৈন্য নিয়ে আমাদের
কী বিপদ হত বলা যায় না। এ মুকুট আমি তােমাকেই
পরিয়ে দিচ্ছি।
ইন্দ্রকুমার। (রুদ্ধকণ্ঠে ) রাজধর ক্ষাত্রধর্ম লঙ্ঘন
করেছে বলে তােমার কাছ থেকে আজ পুরস্কার পেলে -
আর আমি যে প্রাণকে তুচ্ছ করে বিপদের মুখে দাঁড়িয়ে
যুদ্ধ করলুম, তোমার মুখ থেকে একটা প্রশংসার কথাও
শুনতে পেলুম না। এমন কথা তােমার মুখ থেকে আজ
শুনতে হল যে, রাজধর না থাকলে কেউ তােমাকে
বিপদ হতে উদ্ধার করতে পারত না। কেন দাদা,
আমি কি প্রত্যুষ থেকে, আর সন্ধ্যা পর্যন্ত, তােমার
চোখের সামনে দাড়িয়ে লড়াই করিনি। আমি কি
রণক্ষেত্র ছেড়ে পালিয়েছিলুম। আমি কি শত্রুসৈন্যের
বেষ্টন ছিন্ন করে তােমার সাহায্যের জন্য আসিনি। কী
দেখে তুমি বললে, তােমার স্নেহের রাজধর ছাড়া কেউ
তােমাকে বিপদ থেকে উর করতে পারত না।

মুকুট
যুবরাজ। ভাই, আমি নিজের বিপদের কথা বলছিনে।
ইন্দ্রকুমার। থাক্ দাদা, থাক্। আর কিছুই
বলতে হবে না। রাজধরের মতাে এমন অসাধারণ
বীরকে যখন তুমি
সহায় পেয়েছ তখন আমার আর
প্রয়ােজন নেই
আমি চললেম।
যুবরাজ। ভাই, আবার! আবার তুমি আত্মবিস্মৃত
ইন্দ্রকুমার। যেখানে আমার প্রয়ােজন নেই সেখানে
আমার পক্ষে থাকাই অপমান।
[ প্রস্থান
ইশা খাঁ। যুবরাজ, এ মুকুট তােমার
দেবার অধিকার নেই। আমি সেনাপতি, আমি যাকে
দেব এ তারই হবে।
রাজধরের মাথা হইতে মুকুট লইয়া যুবরাজকে পরাইয়া
দিতে উদ্যত হইলেন
যুবরাজ। (সরিয়া গিয়া) না, এ মুকুট আমি
নিতে পারিনে।
ইশা খা। তবে থাক্। এ মুকুট কেউ পাবে না।
এ কর্ণফুলির জলে যাক। ( মুকুট নিক্ষেপ ) রাজধর
যুদ্ধের নিয়ম লঘন করেছেন, উনি শাস্তির যােগ্য।

রাজধর। দাদা, তুমি সাক্ষী রইলে।
এ আমি
ভুলব না।
যুবরাজ। এইটেই কি সকলের চেয়ে মনে রাখবার
কথা। মুকুটটাও যদি জলে গিয়ে থাকে তবে
সমস্ত লাঞ্ছনাও যাক। তােমারও যা ভােলবার ভােলাে,
আমাদেরও যা ভােলবার ভুলে যাই। দেখি, ইন্দ্রকুমার
সত্যই রাগ করে আমাদের ছেড়ে চলে গেল কিনা।

মুকুট
পঞ্চম দৃশ্য
শিবির
রাজধর ও ধুরন্ধর
রাজধর। ধুরন্ধর, আমার মুকুট যেখানে গিয়েছে
আমাদের যুদ্ধজয়কেও সেই কর্ণফুলির জলে জলাঞ্জলি
দেব।
ধুরন্ধর।
ধুরন্ধর। আবার হারবে নাকি।
রাজধর। হাঁ, এবার হেরে জিতব। ইন্দ্রকুমারের
অহংকারকে ধুলােয় না লুটিয়ে দিয়ে আমি ফিরব না।
আমার হাতের জিতকে তিনি গ্রহণ করবেন না! দেখি,
এবার নিজে তিনি কেমন জিততে পারেন।
অত বেশি নিশ্চিন্ত হােয়াে না দৈবাৎ
জিতে যেতেও পারে। সত্যি কথায় রাগ করলে চলবে
, যুদ্ধবিদ্যাটা ইন্দ্রকুমার একটু শিখেছে।
রাজধর। আহা, সে-সব তর্ক পরে হবে।
এখন তােমাকে একটি কাজ করতে হবে। আরাকানরাজ
সৈন্য নিয়ে কাল প্রাতেই যাত্রা করবেন। কথা
আছে, যতদিন না তিনি চট্টগ্রামের সীমানা পেরিয়ে
যাবেন ততদিন তার সেনাপতিরা আমার শিবিরে বী

:
মুকুট
থাকবেন। তিনি শিবির তােলবার পূর্বেই আজ
রাত্রে গােপনে তাঁর কাছে তুমি আমার এই চিঠিখানি
নিয়ে যাবে।
ধুরন্ধর। চিঠিতে কী আছে সেটা তো আমার
জানা ভালাে। কেননা, যদি দুটো-একটা কথা বলবার
দরকার হয় তাহলে ব’লে কাজটা চুকিয়ে আসতে
পারব।
রাজধর। আমি লিখেছি, আমি অপমানিত হয়েছি।
এইজন্য আমার ভাইদের কাছ থেকে আমি অবসর
নিলুম। আমার পাঁচ হাজার সৈন্য নিয়ে আমি গৃহে
ফেরবার ছলে দূরে চলে যাব। ইন্দ্রকুমারও দাদার
উপর অভিমান করে চলে গেছে। সৈন্যেরাও যুদ্ধ শেষ
হয়ে গেছে জেনে ফেরবার জন্যে প্রস্তুত হচ্ছে এই
অবকাশে যদি আরাকানরাজ সহসা আক্রমণ করেন,
তাহলে ত্রিপুরার সৈন্যদের নিশ্চয় হার হবে।
ধুরন্ধর।
হার তো হবে। তার পরে? তুমি সুদ্ধ
শেষে হায়-হায় করে মরবে না তো! আগুন যদি
লাগাতে হয় তাে নিজের ঘরের চালটা সামলে লাগাতে
হবে।
রাবর।
আমাকে সাবধান করে দেবার জন্যে

মুকুট
আর কারও বুদ্ধির প্রয়ােজন হবে না। তুমি প্রস্তুত
হওগে দেখে, কেউ যেন জানতে না পারে। আমার
সৈন্যেরা যদি কোনােমতে সন্দেহ করে তাহলে সমস্তই
পণ্ড হবে।
ধুরন্ধর । দেখে রাজধর, আমাকে সাবধান করে
দেবার জন্যেও আর কারও বুদ্ধির প্রয়ােজন হবে না
তুমি নিশ্চিন্ত থাকো।

৪৬
ষষ্ঠ
দৃশ্য
রণক্ষেত্র
ইশা খা ও যুবরাজ
ইশা খাঁ। যুবরাজ, আল্লাকে স্মরণ করে। আজ
বড়াে শক্ত সময় এসেছে।
যুবরাজ।
শক্তটা
কিসের, খাঁ সাহেব। ভগবানের
যখন ইচ্ছা হয় তখন মরাও শক্ত নয়, বাঁচাও শক্ত নয়,
সবই সহজ।
ইশা খা। মহারাজ আমার হাতে তােমাদের দিয়ে
নিশ্চিন্ত ছিলেন, সেইজন্যেই মনে আক্ষেপ হচ্ছে, নইলে
যুদ্ধক্ষেত্রে মৃত্যু তাে বিবাহশয্যায় নিদ্রা। যুবরাজ, তুমি
পালাবার চেষ্টা করাে যুদ্ধের ভার আমার উপর রইল।
যুবরাজ। তুমি আমাদের অস্ত্রগুরু, তােমার মুখে
এ উপদেশ সাজে না। তা ছাড়া পথই বা কোথায়।
আজ মরবার যেমন চমৎকার সুযােগ হয়েছে পালাবার
তেমন নয়।
ইশা খাঁ। কিন্তু বাবা, মনের মধ্যে একটা আগুন
এলছে। ইন্দ্রকুমার যে অভিমান করে দূরে চলে গেল
আর সেকি দেবার জন্যে আমি হয়তো
বেঁচে থাকব না।
-

মুকুট
৪।
যুবরাজ। যদি বেঁচে না থাক সেনাপতি, তাহলে
তার শাস্তি আরও ঢের বেশি হবে। সে যে তােমাকে
পিতার মতাে জানে।
ইশা খাঁ। আল্লা! সে-কথা সত্য। বাবা, আজ
বুঝছি, আমার সময় হবে না। কিন্তু, যদি তােমার সুযােগ
হয় তবে তাকে বােললা, যদি ইশা খাঁ বেঁচে থাকত তবে
তাকে শাস্তি দিত কিন্তু মরবার আগে তাকে ক্ষমা করে
মরেছে। বাস্, আর সময় নেই চললুম, বাবা। এসাে,
একবার আলিঙ্গন করে যাই। আল্লার হাতে দিয়ে
গেলুম, তিনি তােমাকে রক্ষা করবেন।
যুবরাজ। খাঁ সাহেব, কতদিন কত অপরাধ করেছি,
আজ সমস্ত মার্জনা করে যাও ।
ইশা খাঁ। বাবা, জন্মকাল থেকে তােমাকে দেখছি,
কোনােদিন কোনাে অপরাধ তুমি জমতে দাওনি,
হাতে হাতে সমস্তই নিকাশ করে দিয়েছ আজ মার্জনা
করব এমন তাে কিছুই রাখনি। তােমার নির্মল
প্রাণ আজ আল্লা যদি নেন তবে তার স্বগােদ্যানের কোনাে
ফুলের কাছেই সে ম্লান হবে না।
-

তৃতীয় অঙ্ক
প্রথম দৃশ্য
রণক্ষেত্র
সৈন্যদল
কে বললে বেকে
প্রথম সৈনিক।
এ কি সত্যি।
দ্বিতীয় সৈনিক। কী জানি ভাই, শুনছি তাে ।
প্রথম। তবে তো সর্বনাশ হবে।
দ্রুত প্রস্থান
দ্বিতীয় দলের প্রবেশ
প্রথম । কে বললে রে,কে বললে।
দ্বিতীয়। আমাদের উমেশ বললে।
তৃতীয়। কী জানি ভাই, শুনে যে মাথায় বজ্রাঘাত
হল, ভালাে করে কথা জিজ্ঞাসা করতে পারলুম না।
দ্বিতীয়। চল, ভালাে করে খোঁজ করে আসিগে।
[ প্রবান'
তৃতীয় দলের প্রবেশ
*খেন। পাখা তার হাতিকে দেখেছি, হাওদা খালি,
ছত নেই। প্রভুকে হারিয়ে সে ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

মুকুট
৯
দ্বিতীয়। আমাদেরও যে সেই দশা হয়েছে।
তৃতীয়। কোন্ দিকে পড়েছেন, কেউ দেখের্নি ?
প্রথম। তা তাে কেউ বলতে পারে না।
দ্বিতীয়। আমাদের শিবু
আমাদের শিবু বলছিল, যুবরাজকে যখন
বাণ এসে লাগল তখন মাহুত ভঁর হাতি নিয়ে
যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালাচ্ছিল- পালাবার সময় মাহুত মারা
যায় তার পরে যুবরাজ যে সেই হাতির উপর থেকে
কোন্‌খানে পড়ে গিয়েছেন তা তো কেউ বলতে পারে না।
আর-এক দলের প্রবেশ
চতুর্থ। ওরে, সর্বনাশ হয়ে গেল যে রে, কুমার
ইন্দ্রকুমারকে কি কেউ খবর দিতে ছােটেনি।
তৃতীয়। অনেকক্ষণ গিয়েছে আরাকানের ফৌজ
আমাদের কঁকি দিয়ে আক্রমণ করতেই তখনই লােক
গেছে- তাকে খুঁজে পেলে তো হয়।
দ্বিতীয়। কুমার রাজধর কি এখনও খবর পাননি।
চতুর্থ।/তিনি কোথায় আছেন খবরই পাওয়া গেল
না বােধ করি ত্রিপুরার দিকে চলে গেছেন। যুবরাজের
সংবা জানতে পেলে এতক্ষণে তিনিও দৌড়ে
যতেন।
প্রথম। আমরা কোন্ মুখে দেশে ফিরব।
সংবাদ

০
মুকুট
তৃতীয়। ফিরব কেন, মরা যাক।
চতুর্থ। যুদ্ধই ফুরিয়ে গেল তাে মরব কী করে
অপর ব্যক্তির প্রবেশ
অপর। ওরে, করছিস কী। সর্বনাশ হল যে—
একবার খোঁজ করবি চল।
চতুর্থ। হাঁ রে চল আমরা ভাগ করে ভিন্ন ভিন্ন
দিকে যাই।
তৃতীয়। আমাদের ভাগ্যে তিনি কি বেঁচে আছেন।
দ্বিতীয়। আমি ভাবছি, ইন্দ্রকুমার যখন এ খবর
শুনলেন তখন তিনি কি প্রাণ রাখতে পারবেন।

মুকুট
দ্বিতীয় দৃশ্য
রণক্ষেত্র
ইন্দ্রকুমার ও সৈনিক
ইন্দ্রকুমার। কোথায় কোথায় কোথায়। ওরে,
দাদা কোথায়।
সৈনিক। তাকেই তো খুজছি, প্রভু।
ইন্দ্রকুমার। আর, ইশা খা?
প্রকাসৈনিক। আজ বেলা চার প্রহরের সময় যুবরাজ
স্বহস্তে ইশা খাঁর কবরে মাটি দিয়েছেন সেই মাটিতে
তার নিজেরও রক্ত তখন মিশছিল।
ইন্দ্রকুমার। ধিক্ ধিক্ ধিক্ ইন্দ্রকুমার। ধিক্‌
তােকে। ধিক্ তাের চণ্ডাল রাগকে। দাদা। দাদা।
এই নরাধমকে একবার মাপ চাইতেও সময় দেবে না ?
( উচ্চৈঃস্বরে ) দাদা। সাড়া দাও। কেবল এক মুহুর্তের
জন্যেও সাড়া দাও। ওরে, আর কেউ নেই নাকি।
যে যেখানে আছিস সকলে মিলে তাকে খোঁজ, আজ
' আমার দাদাকে চাইই যে।
দ্বিতীয় সৈনিকের প্রবেশ
রি। এইদিকে চলুন, কুমার। তাঁর দেখা
পেয়েছি।

.
ইন্দ্রকুমার। কোথায়। কোথায়।
দিলর। কর্ণফুলির তীরে সেই অজু নগাছের
তলায়।
ইন্দ্রকুমার। সত্য করে বল, তিনি কি
ছি। তিনি বেঁচে আছেন- তােমার জন্যেই
অপেক্ষা করে রয়েছেন।
[ প্রস্থান

মুকুট
৪৯৮
তৃতীয় দৃশ্য
কর্ণফুলির তীর। তরুতলে জ্যোৎস্নার ক্ষীণাললাকে
যুবরাজ। ওরে, সরিয়ে দে রে, একটু সরিয়ে দে-
গাছের ডালগুলাে একটু সরিয়ে দে, আজ আকাশের
চাদকে একটু দেখে নিই। কেউ নেই। এ কি গাছেরই
ছায়া না আমার চোখের উপরে ছায়া পড়ে আসছে।
এখনও কর্ণফুলির স্রোতের শব্দ তাে শুনতে পাচ্ছি
এই শব্দটিতেই কি পৃথিবীর শেষ বিদায়সম্ভাষণ শুনব
ইন্দ্রকুমার। ভাই ইন্দ্রকুমার। এখনও তােমার রাগ
গেল না !
--
ইন্দ্রকুমারের প্রবেশ
ইন্দ্রকুমার। দাদা। দাদা।
যুবরাজ। আঃ, বাঁচলুম, ভাই। তুমি আসবে জেনেই
এত দেরি করেই বেঁচেছিলুম। তুমি অভিমান করে
গিয়েছিলে বলেই আমি যেতে পাচ্ছিলুম না। কিন্তু
অনেক রাত হয়ে গেছে, ভাই, এবার তবে ঘুমােই মা
ফেল পেতেছেন।
ইন্দ্রকুমার। দাদা, মার্জনা করলে কি।

মুকুট
যুবরাজ। সমস্তই, এখানকার যা-কিছু ছিল এই
রক্ত দিয়ে মার্জনা করে গেলুম। কিছুই বাকি রাখিনি।
কেবল একটি দুঃখ রইল, মহারাজের কাছে খবর
পাঠাতে হবে, আমার পরাজয় হয়েছে।
ইন্দ্রকুমার। পরাজয় তােমার হয়নি, দাদা আমারই
পরাজয় হয়েছে।
সৈনিকের প্রবেশ
' সৈনিক। কুমার রাজধর যুবরাজের পদধূলি নেবার
জন্যে প্রার্থনা জানিয়ে পাঠিয়েছেন।
ইন্দ্রকুমার। কখনও না। কিছুতেই না।
যুবরাজ। ডাকো, ডাকো, তাকে ডাকো।
ইন্দ্রকুমার। ( রাগিয়া) দাদা, রাজধরকে-
যুবরাজ। আবার, ভাই। আবার, ভাই।
ইন্দ্রকুমার। না না না, আর নয়। আমার আর
রাগ নেই।
Centre By
রাজধরের প্রবেশ ও প্রণাম
রাজধর। আমি নরাধম। এ মুকুট তােমার পায়ে
রাখলুম। এ তােমারই।

যুবরাজ। আমার সময় নেই। ইন্দ্রকুমারকে দাও,
ভাই।
রাজধর। দাদার আদেশ মাথায় করলেম। এ
মুকুট তুমি নাও।
ইন্দ্রকুমার। আমি পরাজিত- এ মুকুট আমার
নয়। এ আমি তােমাকেই পরিয়ে দিলুম। দাদা।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Mukut

Author
Thakur, Rabindranath
Title
Mukut
File name
Mukut
Text
OCR done
Citation
1908
Published
2010/03/19
Publisher
Biswabharati Granthalay, Kolkata
Language
Sanskrit
Pages
66
Library
Belgaria Sudha Smriti Pathagar
Classification
Bengali Plays
Keywords
Drama
DLI number
511227
Barcode
4990010018394.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
MTnKHSd4eFY
Download PDF

Mukut