Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Tirthadarshan (ditiya Angsha)
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
তীর্থদর্শন।
( দ্বিতীয় অংশ।)
শ্ৰীযুক্ত বরদাপ্রসাদ বসু কুতুক
সঙ্কলিত
শ্রীহরিচরণ বসু কর্তৃক সম্পাদিত।
কলিকাতা।
৭১ নং পাথুরিয়াঘাটা ঠুট ;
রামনারায়ণযন্ত্রে ঐকালীপ্রসন্ন বস্তু দ্বারা মুদ্রিত ও
প্রকাশিত।
শক ১৮১৩।
PRINTED BY
K, P. BASU, AT THE RAMNARAYAN PRESS
71, PATHURIAGDATTA STREET
CALCUTTA,
সূচিপত্র
t
•••
১৪
বেঙ্গলুর
মহিনুর
শ্রীরঙ্গপত্তন
তিরুপতি
৫ . .
৫৮
•••
বিরিঞ্চিপুর
পল্লিকোৈ
তিবিম
৯০
•
০ ০ ০
:
শােলিঙ্গ
তিরুনি
কালহী
নারায়ণবন
০ ০ ০
•;
৫ ।
১২০
৬ WAL
No text on this page.
ভূমিকা তীর্থদর্শনের দ্বিতীয়াংশ প্রকাশিত হইল ; ইহাতে দক্ষিণদেশের মহিসুররাজ্যের অন্তর্গত বেঙ্গলুর, মহিসুর ও শ্রীরঙ্গপত্তনের বিবরণ, উত্তর অরুকদু জেলার অন্তগত সুপ্রসিদ্ধ তিরুপতি, বেলুর, বিরিঞ্চিপুর, পল্লিকোণ্ডৈ, তিরুবি, অরুকদু, শােলিঙ্গ, তিরুনি, কালহস্তী ও নারা- য়ণবনের বিবরণ বর্ণিত হইয়াছে ; তন্মধ্যে বেঙ্গ- লুর ও অরুকদু হিন্দুদিগের তীর্থস্থান না হইলেও তাহাদিগের ঐতিহাসিক বিবরণ এইস্থানে প্রদত্ত হইল। সকল স্থানেরই পুরাবৃত্ত যথাসাধ্য সং- হীত হইয়াছে। মহােদয়গণ ! তীর্থদর্শনের প্রথ- মাংশের ন্যায় দ্বিতীয়াংশ অনুগ্রহ করিয়া পাঠ করিলে শ্রম সফল জ্ঞান করিব।
No text on this page.
তীর্থদর্শন। (দ্বিতীয় অংশ) বেঙ্গলুর। ১৮৯০ খৃঃ জুনমাসে দক্ষিণ-অরুকদু হইতে উত্তর-অরুক যাত্রাকালে আমরা পুদিচারী, মাদ্রাজ, বেঙ্গলুর, মহীসুর ও রঙ্গপত্তন দেখিয়াছিলাম। পুদিচারী ও মাদ্রাজ সহরের বৃত্তান্ত প্রথমাংশে দেওয়া হইয়াছে ; এস্থলে? তাহার পুনরুল্লেখ নিষ্প্রয়ােজন বিবেচনায় বেঙ্গলুর, মহীসুর ও রঙ্গপত্তনের সক্ষেপ বিবরণ প্রদত্ত হইল। ২রা জুন অপরাহ্নে বেঙ্গলুর যাইবার মানসে মাদ্রাজ সেন্টাল ষ্টেশনে উপস্থিত হই ; ইহাম্মাদ্রাজ রেলওয়ের টামিনস্ ষ্টেশন এবং ইহার গঠনপ্রণালী সৰ্ব্ব প্রকারে উৎকৃষ্ট। এই মাদ্রাজ রেলওয়ের যে দক্ষিণ-পশ্চিম লাইন আছে বেঙ্গলুর যাইতে হইলে ঐ লাইন দিয়া যাইতে হয়। আমরা ষ্টেশনে আসিয়া নির্দিষ্ট স্থানে গিয়া বসিলাম। ৫৪৫ মিনিটের সময় মেট্রেন ছাড়িয়া দিল এবং আমরাও প্রকৃতির শােভা দেখিতে দেখিতে চলিলাম। ৭১৭ মিনিটের সময় আকোন ষ্টেশনে পৌছি- २ তীর্থদর্শন। ; লাম ; ইহা একটি জংসন ষ্টেশন, এই স্থান হইতে মান্দ্রাজ দক্ষিণ-পশ্চিম এবং উত্তর-পশ্চিম লাইন দ্বয় পৃথক হইয়াছে এবং এস, আই, আর, কর্ডলাইন কাঞ্চীপুর হইয়া চিঙ্গলপুত গিয়াছে। কাঞ্চীপুর যাইতে হইলে আবৃকোন ষ্টেশনে নামিতে হয়। আরূকোনম্ জংসন ষ্টেশন বলিয়া এই স্থানে গাড়ী প্রায় অর্ধ ঘণ্টা থাকে। আকোনম্ হইতে রাত্রি ৭৪৭ মিনিটে গাড়ী ছাড়িয়া ১২৭ মিনিটের সময় জলারপেট নামক জংসন ষ্টেশনে গিয়া পৌছিল। এই ষ্টেশন হইতে বেঙ্গলুরের লাইন আরম্ভ হই- আছে। এই স্থানে গাড়ী বদল করিবে মনে করিয়া অনতি- জ্ঞতা বশতঃ আমরা নামিবার জন্য প্রস্তুত হইয়াছিলাম, কিন্তু ষ্টেশনে আসিয়া আমাদিগের সে ভ্ৰম ভাঙ্গিল ; প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর গাড়ী মেইন হইতে বেঙ্গলুর লাইনের সাইডিঙে লইয়া গেল এবং তৃতীয় শ্রেণীর যাত্রাগণ গাড়ী বদলাইয়া বেঙ্গ- লুর লাইনের গাড়ীতে উঠিল এখান হইতে মহীসুরের অধি- ত্যকা আরম্ভ হইয়াছে বলিয়া রেলরাস্তাও ক্রমশঃ ঢাল হই- য়াছে। এমন কি, কোন স্থানে ৬৮ ফুটে ১ ফুট চড়িয়াছে ; রাত্রিকাল বলিয়া আমরা প্রকৃতির শােভা কিছুই দেখিতে পাইলাম না, অতএব সুখে নিদ্রা যাইতে যাইতে বেঙ্গলুর গিয়া পেছিলাম। বেঙ্গলু নামে এক প্রকার লম্বা শিফল প্রচুর পরিমাণে জন্মিয়া থাকে বলিয়া বােধ হয়, বেঙ্গলুরু এই নাম হইয়াছে ;
বেঙ্গলুর।
এবং উহার অপভ্রংশ বেঙ্গলুর; এই স্থানের নাম হইতে জিলারও
নামকরণ হইয়াছে।
এই প্রফেশটি অতি পুরাকাল হইতেই ঐতিহাসিক বিষয়ে
প্রসিদ্ধ ; এমন কি, ইহা খৃষ্টীয় প্রথম শতাব্দী হইতে নবম
শতাব্দী পর্যন্ত গঙ্গাবংশীয় রাজাদিগের অধীনে ছিল। তাহারা
মল-মুগন্ধ-পত্তন নামক স্থানে বাস করিতেন। নবম শতাব্দীর
কোন সময়ে চোল রাজবংশীয় কোন বীরপুরুষ বেঙ্গলুর প্রদেশ
অধিকার ও এই চোল-রাজবংশের প্রতিষ্ঠা করিয়া উক্ত প্রদেশ
শাসন করিয়াছিলেন। বল্লালবংশীয় কোন রাজা খৃষ্টীয় দ্বাদশ
শতাব্দীর মধ্যভাগে চোলুরাজদিগের নিকট হইতে, বেঙ্গলুর
অধিকার করিয়াছিলেন।বীর বল্লাল নামক জনৈক রাজা ১১৯১
খৃঃ হইতে ১২০১ খৃঃ পর্যন্ত রাজত্ব করিয়াছিলেন। কিংবদন্তী
যে, তিনিই বেঙ্গলুর সহর স্থাপন করেন ; তাহার বংশধরেরা
খৃঃ
পৰ্য্যন্ত এই প্রদেশে রাজত্ব করিয়াছিলেন এবং এই
বংশের শেষ রাজা মুসলমানদিগের দ্বারা পরাজিত হইয়া মৃত্যু
মুখে পতিত হইয়াছিলেন। তৎকালে বিজয়নগরের রাজগণ
প্ৰৰল হইয়া উঠেন। গণ্ডানামে মরসুদকোল-বংশীয় এক ব্যক্তি
তৎকালে মগধ নামক স্থানে থাকিয়া বেলুর প্রভৃতি স্থান
সকল শাসন করিতেন। ইহার পূর্বপুরুষগণ তৈলঙ্গদেশ হইতে
•আসিয়াছিলেন। ইনি বিজয়নগরের রাজার বশ্যতা স্বীকার
করিয়া সম্ভবতঃ ১৫৩ খৃঃ একটি দুর্গ নির্মাণ করেন। ১৬৩৮
খৃঃ বিজাপুরের আদি সাহি রাজাদিগের পক্ষ হইতে মহা-
;
১৩৬৪
; ৪ তীর্থদর্শন। রাষ্ট্রীয় বীর শাহজী কর্তৃক বেঙ্গলুর প্রদেশ অধিকৃত হয়। শাহজীর যত্নে কর্ণাটদেশ জয় হইয়াছিল বলিয়া বিজাপুরের সুলতান তাঁহাকে বেঙ্গলুরের নায়েক গবর্ণপদে নিযুক্ত করেন, এবং তৎপ্রদেশের দুর্গ ও বেঙ্গলুর জেলাটি জায়গীর স্বরূপ অর্পণ করেন। শাহজী তাহার জীবনের শেষভাগ তথায় অতিবাহিত করেন। ১৬৬৪ খৃঃ তাহার মৃত্যু হইলে, তাহার দ্বিতীয় পুত্র তুকোজী পিতৃপদে অভিষিক্ত হইয়া তৎপ্রদেশ সকল শাসন করিতে থ্রাকেন। ১৬৭২ খৃঃ দ্বিতীয় আলী-আদিলশার আদেশ অনুসারে তুকোজী তঞ্জাবুরাভিমুখে যাত্রা করেন, এবং যেরূপে তথায় তিনি আপন আধিপত্য স্থাপন করিয়া মহারাষ্ট্রীয় বংশের প্রতিষ্ঠা করিয়াছিলেন, তাহা তীর্থদর্শনের প্রথম অংশে তঞ্জা- বুরের বিবরণে প্রদত্ত হইয়াছে। তঞ্জাবুরে থাকিয়া দূরস্থিত বেঙ্গলুর প্রদেশ শাসন করা কঠিন বিবেচনায় উহা মহীসুর- রাজকে তিন লক্ষ টাকায় দিতে প্রতিশ্রুত হইয়াছিলেন। কিন্তু ১৬৮৭ খৃঃ দিল্লীর সম্রাট অরংজিব বাদশাহের সেনানায়ক কাসিম খ। উহা অধিকার করিয়া তিন লক্ষ টাকা মূল্যে মহীশুর • রাজকে অর্পণ করিয়াছিলেন। সেই অবধি, সনন্দ্রগ ও দিবন- ইল্লা দুর্গ দুইটি এবং অপর কয়েকটি প্রদেশ ব্যতীত বেঙ্গলুর, মহীশুর রাজ্যের অন্তর্গত হইয়াছিল। ১৭৪৯ খৃঃ হাইদারআলি মহীশুর রাজের পক্ষ হইতে দিবনহল্লীর যুদ্ধে আপন বীরত্ব প্রকাশ এবং দিবনহল্লীও সনগ দুর্গ অধিকার করিয়াছিলেন। ১৭৫৮ খৃঃ মহীশুররাজ উহা তাহাকে জায়গীর স্বরূপ প্রদান বেঙ্গলুর। ৫ করেন। ১৭৬১ খৃঃ হাইদারআলি স্বয়ং উক্ত দুর্গের সংস্কার ও বহিঃপ্রাচীর নির্মাণ করেন। তাহার ও তাহার পুত্রের পরি- বারের দুর্গন্থ রাজভবনে বাস করিতেন। ১৭৯১ খৃঃ, লর্ড কর্ণওয়ালিস্ টিপুসুলতানের নিকট হইতে ঐ দুৰ্গ কাড়িয়া লয়েন। ১৭৯৯ খৃঃ, শ্রীরঙ্গপত্তনে টিপুর মৃত্যু হইলে লর্ড হারিস্ উহ মহাসুরের উদৈয়ার রাজাকে প্রত্যর্পণ করেন, এবং তৎপরে যাহা ঘটিয়াছিল তাহা শ্রীরঙ্গপত্তনের বিবরণে দেওয়া হইবে। ১৮১১ খৃঃ, শ্রীরঙ্গপত্তনের জল বায়ু দূষিত হইলে বেঙ্গলুর ইংরাজদিগের সৈন্যনিবাসের হেডকোয়াটর রূপে পরিণত হয়। ১৮৩১ খৃঃ মহিসুর রাজ্যের কাৰ্য্য ইংরাজদিগের হস্তগত হইলে বেঙ্গলুর মহিমুররাজ্যের রাজধানীরূপে পরিণত হইয়া- ছিল। ১৮৮১ খৃঃ পৰ্যন্ত উহা তথাকার রাজধানী ছিল বলিলেও অত্যুক্তি হয় না। ১১ই জুন বৈকালে থিয়সফিক্যাল সােসাইটির প্রেসিডেন্ট ও প্রতিষ্ঠাতা মহাত্মা কর্ণেল অলক সাহেবের সহিত সাক্ষাৎ করিতে গিয়াছিলাম। মান্দ্রাজ অদিয়ার উক্ত সােসাইটির লাইব্রেরীতে পৌঁছয়। দেখিলাম, মহীপুর মহারাজের মন্ত্রীবর অনরেবল কে, শেষাদ্রি আয়ার বি, এ, সি, আই, ই, মাষ্টার ফসেটের সহিত সম্মুখের হলে বসিয়া বেদান্ত বিষয়ের কূট তর্ক বিতর্ক করিতেছিলেন, এবং কর্ণেল সাহেব তাহাদিগের নিকট বসিয়া উহা শ্রবণ তীর্থদর্শন। করিতেছিলেন। হলের সম্মুখে আমাদের গাড়ী পৌছিবামাত্র কর্ণেল সাহেব আমাদিগকে দেখিয়া,তথা হইতে উঠিয়া আসিয়া সাদরে আলিঙ্গনপূৰুৱক অভ্যর্থনা করিলেন, এবং শেষাদ্রি আয়ার মহাশয়ের সহিত আমার পরিচয় করাইয়া দিলেন। মন্ত্রী- বর শরীর অসুস্থতাবশতঃ ১০ দিনের অবকাশ লইয়া জল, বায়ু পরিবর্তনের জন্য মান্দ্রাজ আসিয়াছেন। পরে আমাদের বেঙ্গ- লুর যাইবার উদ্দেশ্য শ্রবণ করিয়া মন্ত্রীবর, বেঙ্গলুরের অণ্ডর সেক্রেটরী শ্ৰীনিবাস আচাৰ্য্য ও মহীশুর রাজবাটীর দরবার বক্সী শ্ৰীযুক্ত নরসিংহ অভর্গল রায়বাহাদুর মহাশয় দ্বয়কে দুই খানি পবিচায়ক পত্র লিখিয়া দিলেন। মান্দ্রাজ হইতে বেঙ্গলুরের অণ্ডার সেক্রেটারী মহাশয়কে আমাদের পৌঁছিবার সময় তারযােগে জ্ঞাপন করিয়াছিলাম। ষ্টেশনে ট্রেন আসিবামাত্ৰ আচাৰ্য মহাশয়ের প্রেরিত শ্ৰীযুক্ত গােবিন্দ আচাৰ্য নামক জনৈক ভদ্রলােক আমাদের গাড়ীর নিকট আসিয়া আমাদের প্রেরিত তারের সংবাদপত্র হাতে করিয়া আমাকে কহিওলন, আমি আপনাদিগকে লইতে আসিয়াছি। তিনি অণ্ডর সেক্রেটরী মহাশয়ের নিকট সম্পর্কীয় আত্মীয় ও বেঙ্গলুর মিউনিপাল স্কুলের শিক্ষক। তৎপরে তিনি আরও কহিলে, বেঙ্গলুর সহর ষ্টেশনে আপনাদের জন্য গাড়ী অপেক্ষা করিতেছে; সহর এখান হইতে দূর, অতএব সহর ষ্টেশনে নামিলে সুবিধা হইবে । সুতরাং তাহার কথায় আমরা ৬৫৭ মিনিটের সময় বেঙ্গলুর সহর ষ্টেশনে আসিয়া পৌঁছিলাম, বেঙ্গলুর। ৭ ; তথা হইতে আমাদের থাকিবার জন্য নির্দিষ্ট, বাটীতে আসিয়া দেখিলাম উহা একটি বাগানবাটী ; উহা রােসেনবাগ নামে খ্যাত ও সহরের প্রান্তভাগে পথের ধারে অবস্থিত। হিন্দুদিগের পাকিবার জন্য উদ্যানের মধ্যে বৈঠকখানা বাটী নিৰ্ম্মিত আছে, ঐ উদ্যান নানাবিধ বৃক্ষলতায় পরিপূর্ণ; এবং উহাতে জল সেচনের নিমিত্ত ৩টি কূপ আছে। আমরা এই নির্জন বাগান- বাটী পাইয়া বড়ই প্রীত হইলাম। কিঞ্চিৎ বিশ্রামের পর আমরা অণ্ডর সেক্রেটরী মহাশয়ের সহিত সাক্ষাৎ করিতে যাই, তাহার বাটীতে পৌঁছিয়া দেখি- লাম তিনি নিত্যপূজাদিতে নিরত রহিয়াছেন। সন্ধ্যাহিক সমাপনান্তে তিনি বহির্বাটীতে আসিয়া, সাদর সম্ভাষণপূর্বক আমাদের সহিত বিবিধ প্রকার কথাবার্তা কহিতে লাগিলেন। তথায় আমাদের থাকিবার সময় অল্প জানিয়া, বেঙ্গলুরের দেখিবার উপযুক্ত স্থান সকল দেখাইবার জন্য গােবিন্দ আচার্য্য মহাশয়কে পরিদর্শকরূপে নিযুক্ত করিয়া দিলেন। আমরা প্রথমে লালবাগ দেখতে যাই; ইহা হাইদার, আলীর দ্বারা নির্মিত হইয়াছিল। এই উদ্যানটি অতি বৃহৎ এবং নানাবিধ দেশীয় ও বিদেশীয় লতা, গুল, ফল, পুষ্পদি দ্বারা সুশোভিত। ইহার মধ্যস্থিত পথ সকল প্রশস্ত ও পরিষ্কৃত এবং উহার উভয় পার্শ্বে নানাবিধ রঙ্গের হােট ছােট লতা, গুল্ম ও ঘাসদ্বারা সজ্জিত, হঠাৎ দেখিলে বােধ হয় যেন বিবিধ বর্ণের গালিচা বিছান রহিয়াছে। জল সেচনের নিমিত্ত তীর্থদর্শন। ক্ষুদ্র জলনালিক পথের পার্শ্বে রহিয়াছে। উদ্যানটি জয়পুর মহারাজের উদ্যান হইতে কোন অংশে নিকৃষ্ট নহে, আমরা দুই ঘন্টা ভ্রমণ করিয়া উদ্যানের সকল স্থান দেখিয়া উঠিতে পারিলাম না। রীতিমত সকল স্থান বেড়াইয়া দেখিতে হইলে প্রায় ৬ ৭ ঘণ্টা সময় লাগে। স্থানে স্থানে বিশ্রামস্থান ও ইংরাজদিগের জন্য এক স্থানে টিপিনের ও বন্দোবস্ত আছে। উদ্যানের এক অংশে পশুশালা তাহার এক স্থানে নানাবিধ বানর ; অন্য স্থানে বড় বাঘ চিতাবাঘ ও গােবাঘা ; তৃতীয় স্থানে গণ্ডার প্রভৃতি নানাবিধ পশু; অপর স্থানে পায়রা, ময়ুর, তােতা, কাকাতুয়া, চিড়িয়া শ্বেতকাক ইত্যাদি পক্ষী সকল অতি যত্নের সহিত রক্ষিত হইতেছে। এই লালবাগ দেখিয়া পরম সন্তোষ লাভ করিলাম। আমাদের সময় অল্প এবং বেল। অধিক হইল দেখিয়া দর্শনে তৃপ্তিৰােধ না হইলেও মিউসিয়ম্ (অর্থাৎ আশ্চৰ্য্য দ্রব্যের আলয়) দেখিতে গিয়াছিলাম। ইহা একটী প্রকাণ্ড অট্টালিকা, দেওয়ান আফিসের ঠিক সম্মুখস্থিত । ভূতবিভাগের দৃশ্য অতি চমৎকার, তথায় সৰ্ব্ব প্রকার প্রাণী সজ্জিত রহিয়াছে। অস্ত্রবিভাগে ভারতীয় এবং অন্য প্রদেশীয় বিবিধ প্রকার অস্ত্র, ছােরা, ছুরী, হাতিয়ার ; বস্ত্ৰবিভাগে নানা- বিধ রেশমী, পশমী বস্ত্রের আদর্শ ; শস্যবিভাগে বিবিধ প্রকার ধান্ত, গম, সরিষা আদির নমুনা; তৎপরে খনিজবিভাগে নানা প্রকার প্রস্তর রীতিমত সজ্জিত রহিয়াছে। মহীশুর বিভাগের অন্তর্গত কোলার নামক স্থানে একটি স্বর্ণের খনি আছে, তাহা বেঙ্গনূর। ; বোধ হয় অনেকেই অবগত আছেন; তথায় ইংরাজবণি কোম্পানী স্টিম ইঞ্জিনের সাহায্যে খনি হইতে স্ব সংগ্রহ করিতেছেন যে প্রস্তরে স্বর্ণ পাওয়া যায়, সেই প্রস্তরের নানা- বিব নমুনা রহিয়াছে। অতঃপর আমরা হস্তিদন্ত নির্মিত আগ- রার তাজ, দিল্লীর জুম্বা মজিদ, শ্রীরঙ্গমের রঙ্গনাথ স্বামীর, মন্দির, তঞ্জাবুরের বৃহতীশ্বৰ মহাদেবের মূর্তি দেখিয়াছিলাম। নিম্ন তলায় একদিকে পুরাণ ৰুদ্ধ, জৈন ও পৌরাণিক মূর্তি সকল সংগ্রহ করিয়া রাখা হইয়াছে। এই সমস্ত ভাল করিয়া দেখিতে হইলে এক সপ্তাহ সময় আবশ্যক, কিন্তু আমরা দেড় ঘণ্টার মধ্যে কোন প্রকারে দর্শন সমাধা করিয়া বেঙ্গলুর হাইকোর্ট ও কলেজবাটী সন্দর্শনপুৰ্ব্বক নির্দিষ্ট বাসাবাটীতে উপস্থিত হইলাম। আহারান্তে কিয়ৎকাল বিশ্রামের পর পুনরায় দেওয়ান আফিসের দিকে আসিলাম। এই বৃহৎ দ্বিতল অট্টালিকা চীফ ইঞ্জিনিয়ার জেনেবল সেনকীর সময় ৫ লক্ষ টাকা ব্যয়ে গ্রীনিয়ানু ষ্টাইলের অনুকরণে নিৰ্ম্মিত হইয়াছিল। এই নৃহৎ বাটীতে মহীশুর গবর্ণমেন্টের প্রায় সমস্ত আফিসই আছে। এখান হইতে মহারাজের নূতন প্রাসাদ দেখিতে যাই ; উহা সম্প্রতি নির্শিত হইয়াছে ও এখনও সম্পূর্ণ কার্য শেষ হয় নাই। রন্ধনশালা হইতে প্রাসাদে আসিবার আচ্ছাদিত পথটি নির্মাণ হইতেছে। এই প্রাসাদ অতি প্রকাণ্ড, পরিষ্কৃত ও দেখিতে অতি সুন্দর ; উহার প্রাঙ্গণ এবং উদ্যান এক তৃতীয় বর্গমাইল হইবে। ৫ তীর্থদর্শন। . । ভূতপূৰ্ব্ব মহারাজ কখন বেঙ্গলুরে আসিতেন না। বর্তমান মহারাজ । অনেকটা ইংরেজী অনুকরণে চলিয়া থাকেন। বেঙ্গ- লুরে সময়ে সময়ে আসিয়া থাকিবার জন্য এই প্রাসাদটি নির্মিত হইয়াছে। আমরা এই রাজভবনের প্রত্যেক ঘর দেখিয়া পরম আহলাদিত হইয়াছিলাম। প্রাসাদ ও দেওয়ান আফিসের সম্মুখে যে বৃহৎ পার্ক আছে, তাহ কুবন পার্ক নামে খ্যাত। চীফকমিসনর কুবন সাহেব উক্ত পার্ক প্রতিষ্ঠিত করিয়াছিলেন। উহার মধ্যে রেসিডেন্ট সাহেবের বাঙ্গলা বাটী ; কুৰন সাহেবের প্রস্তর নির্মিত মূৰ্ত্তিও এখানে বিরাজমান রহিয়াছে। এই পার্কটি দেখিবার উপযুক্ত বটে ; প্রাসাদের কিঞ্চিৎ দূরে দেওয়ান বাটী এবং ইহার পূৰ্বোত্তরদিকে দেওয়ান আফিস। বেঙ্গলুর সমুদ্র-সমতল হইতে ৩১১৩ ফুট উচ্চ। এখানে শীতের ভাগই অধিক, গ্রীষ্ম অতি অল্প। আমরা জুনমাসে গিয়াছিলাম, তখনও শীতল বলিয়া ৰােধ হইতে লাগিল, অর্থাৎ বঙ্গদেশে অগ্রহায়ণ, মাসের ন্যায় শীত ৰােধ হইতে লাগিল। শীত ঋতুতে কলিকাতায় যে সমস্ত শাকসবুজি পাওয়া যায়, এখানে তৎসমুদয় বার মাসই প্রাপ্য ; কপি, আলু, শাল- গম, গাজোর, শিম, মটরশুটী ইত্যাদি প্রচুর। বঙ্গদেশে শীত ভিন্ন অন্য সময়ে আলু জন্মায় না, কিন্তু এখানে যে জমী হইতে আলু তুলিতেছে, আবার ২৪ দিনের মধ্যে সেই জমী মেরামত করিয়া পুনরায় আলু পাতিতেছে। আম্র কোন বৃক্ষে পাকিয়াছে, ।
বেঙ্গলুর।
কোন বৃক্ষে কঁচা, আবার কোন বৃক্ষে কুল ধরিয়াছে। কমলা-
লেবু, আঙ্গুর, আপেল, নাশপাতি, দাড়িম্ব, খর্জুর, পেয়ারা,
পেঁপে, আনারস, কাঠাল, কদলী ইত্যাদি সকল ঋতুতেই সৰ্ব্বদাই
পাওয়া যায়। লাউ, উচ্ছে, বেগুণ, মূলা, কপি (বাধা, ফুল ও
ওল ), ওল, কঁচা লঙ্কা, পেয়াজ, রসুন সমস্তই বারমাসই পাওয়া
যায়, কেবল পটল দেখিলাম না।
এখানকার জল বায়ু অতি উত্তম বলিয়া, অনেক ইংরেজ
বেঙ্গলুরে আসিয়া অবস্থিতি করিয়া থাকেন।
প্রতি নবেম্বর মাসে এখানে ঘােড়দৌড় হইয়া থাকে এবং
সেই উপলক্ষে মহারাজ এখানে আইসেন, তজ্জন্য উপরােক্ত
প্রাসাদটি নির্মিত হইয়াছে। প্রাসাদের চারিদিকে রাজোদ্যান
প্রস্তুত হইতেছে, নূতন নূতন বৃক্ষ সকল রােপিত হইয়াছে ও
হইতেছে। ৫৭ বৎসর পরে উহাও লালবাগ সদৃশ মনােহর
হইয়া উঠিবে তাহার সন্দেহ নাই। রাজভবন দেখা হইলে
আমরা বেঙ্গলুর ক্যান্টনমেন্ট দেখিতে গিয়াছিলাম।
মাদ্রাজ বিভাগের মধ্যে বেঙ্গলুর ক্যান্টমেন্ট সর্ব শ্রেষ্ঠ ও
ও মহীশুর ডিবিসনের হেড কোয়াটার। বেঙ্গলুর ক্যান্টনমেন্ট
মহীশুর গবর্ণমেন্টের ভিতর হইলেও ইংরেই শাসনের অধীন।
মহীশুরের রেসিডেন্ট ক্যান্টনমেন্টের প্রধান সিবিল কর্মকর্তা।
এখানে অনেকগুলি পদাতিক অশ্বারােহী ও গোলন্দাজ, রেজি,
মেন্ট আছে।
পর দিবস ১৪ই জুলাই শনিবার প্রাতে তুলা এবং পশমের
৬
১২
তীর্থদর্শন।
s
কলবাটী দেখিতে গিয়াছিলাম ; এই কলের একাংশে ভেড়ার
ললামের নানাবিধ কম্বল প্রস্তুত হইতেছে; একটা লম্বা লৌহের
চৌবাচ্চায় গরম জল আসিবার বনুেশবন্ত রহিয়াছে, এক জন
ক্রমাগত উহাতে ভেড়ার নােম দিতেছে, কলের দ্বারা লােম
সকল পরিস্কৃত হইয়া উপরে আসিয়া পড়িতেছে এবং উক্ত
লােহার চৌবাচ্চার ময়লা জল এক পা দিয়া বাহির হইয়া
যাইতেছে, জল কমিলেই আবার গরম জল আসিতেছে ; এই
রূপে লােম ধুইয়া পরিস্কৃত হইলে তাহা রৌদ্রে শুকাইয়া কলে
ফেলিয়া দেওয়া হয়, তথা হইতে পিজিবার মত হইয়া ক্রমে
সুতা হইয়া অন্য এক স্থানে তাতে চড়ান হইলে ক্রমে টানা
পড়েন দ্বারা কাপড় বােনার মত হইয়া.কল প্রস্তুত হইতেছে।
কোন কোন তঁাতে এবং কোথাও একেবারে ৪ খানি প্রস্তুত
হইতেছে। কল হইতে বাহির হইয়া আসিলে তাহা এক এক
পণ্ড করিয়া কাপড়ের গাঁইট সদৃশ বান্ধাই হইতেছে।
উপরােক্ত এক কলেই অন্যদিকে তুলা পেঁজাই হইয়া স্কুল
পাজ হইতেছে, ক্রমে সূক্ষ্ম সূতা প্রস্তুত হইতেছে এবং তাহা
ওজন হিসাবে মােড়ক বদ্ধ হইতেছে, পরে তাহাতে নম্বর আঁটিয়া
প্যাক্ হইয়া রপ্তানি হইতেছে; এক কলে দুই কাৰ্য্য চলিতেছে।
মহারাজের আর একটি কল আছে, তাহার একদিকে
গম্ পেসাই হইয়া ১নং ২নং প্রভৃতি ময়দা এবং সুজী প্রস্তুত
হইতেছে ; অপর দিকে তুলা পেঁজাইয়া সূতা প্রস্তুত হইয়া
রপ্তানি হইতেছে। এই কলটীর অপর দিকে একটি নূতন
বেঙ্গলুর।
বাটী নিৰ্ম্মিত হইতেছে, তাহাতে দেশী কাপড় বুনিবার কল
বসিবে, সত্বর কল আসিয়া পৌঁছিবে।
তুলা এবং কাপড়ের কল যত বৃদ্ধি হইবে ততই আমাদের
দেশের মঙ্গল। এই জেলার প্রায় সকল স্থানেই দেশীয় জোলার।
কম্বল প্রস্তুত করিয়া থাকে। বেঙ্গলুরের কম্বল অতি প্রসিদ্ধ ।
কাগজের একটি কল হইবার কল্পনা হইতেছে, কল্পনাটি যদি
কার্যে পরিণত হয়, তাহা হইলে,বড় সুখের বিষয়।
হইতে নগর পরিদর্শন করিয়া আবাসে আসিলাম ; আহারান্তে
কিঞ্চিৎ বিশ্রামের পর মহিসুর যাত্রা করিবার জন্য প্রস্তুত
হইলাম।
আমরা এখানে ৩২ ঘণ্টা মাত্র ছিলাম ; অতএব এত অল্প
সময়ের মধ্যে এই সুবৃহৎ নগর উত্তমরূপে দেখা সম্ভবপর নহে।
উত্তমরূপ দেখিতে হইলে অন্তত ১৫ দিন সময় লাগে। কিন্তু
আমাদের সময় অতি অল্প ; এক্ষণে আমরা মহিমুর রাজধানী
দেখিবার উদ্দেশে ১৩০ মিনিটের ট্রেণে যাইতে উদ্যত হইলাম।
মহিসুর মহিসুব গমনেচ্ছায় বেঙ্গলুর সহর রেলওয়ে ষ্টেশনে যাইয়া জানিলাম পূর্নদিবস রায়বাহাদুর শ্রীনিবাস আচাৰ্য মহাশয় আমাদের মহিসুর যাইৰার বিষয় মহিসুরের রাজদরবার বক্সী শ্ৰীযুক্ত নরসিংহ অভর্গল রায়বাহাদুর মহাশয়কে লিখিয়াছিলেন । শ্ৰীযুত গােবিন্দ আচাৰ্য মহাশর আমাদের সহিত পরিদর্শক রূপে যাইতে স্বীকৃত হইলেন। রেলওয়ে ষ্টেশনে আসিয়া শুনিলাম, পুনা হইতে ট্রেণ আসিতে সে দিবস ১ ঘণ্টা বিলম্ব হইবে। বেঙ্গলুর হইতে মহি- সুর পর্যন্ত যে রেলপথ আছে, উহা মহিসুররাজষ্টেট রেলওয়ে হইলেও দক্ষিণ মহারাট্টা রেলওয়ে কোম্পানির দ্বারা উহার কাৰ্য্য নিৰ্বাহ হইয়া থাকে। দক্ষিণ মহারাট্রারেলওয়ের উত্তর পশ্চিম টারমিনাস পুন হইতে লণ্ডা ও হুলি জংসন হইয়া হরিহর জংসনে লাইসে। এই স্থান হইতে মহিসুর রেলওয়ে আরম্ভ হইয়াছে; পুন হইতে মেলট্রেণ হরিহর ও বেঙ্গলুর হইয়া বরাবর মহিসুর আসিয়া থাকে। পুনা হইতে মহিসুর আসিতে ৪৮ ঘণ্টা সময় লাগে। মেট্রেণ বেঙ্গলুরে বেলা ১১৫ মিনিটে আসিবার নির্ধারিত সময় কিন্তু অনেক সময়ে বিলম্ব হইয়া ।
মহিসুর। ১৫ থাকে। সে দিবস গাড়ী আসিতে এক ঘণ্টা বিলম্ব হইবে শুনিয়া আমরা রেলওয়ে ষ্টেশনের বিশ্রাম গৃহের আশ্রয় গ্রহণ করিতে বাধ্য হইয়াছিলাম। টে আসিলে উঠিয়া বসিলাম, পরে বেলা ২৫৬ মিনিটে গাড়ী বেঙ্গলুর হইতে ছাড়িয়া দিলে, হুহু শব্দে চলিতে লাগিল এবং আমরা প্রকৃতির শোভা দেখিতে দেখিতে চলিলাম। বেঙ্গলুর ষ্টেশন পার হইয়া আর বসতি দেখিতে পাইলাম না। রেলপথ জঙ্গল ও পাহাড়ের মধ্য দিয়া গিয়াছে। কোঙ্গারি ও বিজাড়ি ষ্টেশন দ্বয় ঘনমধ্যস্থিত। বিজাড়ি হইতে মদ্দর পর্যন্ত লােকের বসতি এবং জমীর আবাদ আদি দেখা গেল। অপরাহ্ন’ ৬ টার সময় গাড়ী মরে আসিয়া পোঁছিল , ইহা একটি প্রধান ষ্টেশন। এখান হইতে ৩০ মাইল দূরে কাৰেৰী নদীর জলপ্রপাত এবং তথায় যাইবার জন্য, পাকা রাস্তা আছে। দেশীয় গরুর গাড়ী করিয়া ষ্টেশন হইতে ঐ জলপ্রপাত দেখিতে যাইতে হয় ; এখানকার জলপ্রপাত অতি মনােহর, এমন কি ভারতবর্ষের মধ্যে এরূপ দৃশ্য আর নাই,বলিলেও অত্যুক্তি হয় । ইচ্ছা থাকিলে ও এ দৃশ্য দর্শন আমাদের ঘটিয়া উঠে নাই । গাড়ী যথা সময়ে চলিতে লাগিল, অপরাহ্ন হইলে প্রকৃতির . মূর্তি ধীরে ধীরে অন্ধ-তমসাচ্ছন্ন হইল এবং আমরা ভগবানের নাম করিতে করিতে চলিলাম। রাত্রি ৮২০ মিনিটের সময় গাড়ী মহিসুর ষ্টেশনে আসিয়া পৌঁছিবার পরে একটি ভদ্রলােক আমাদের সম্মুখে আসিয়া সদালাপের পর কহিলেন “দরবার বক্কী শ্ৰীযুক্ত নরসিংহ আয়াঙ্গার রায় বাহাদুর মহাশয়ের তীর্থদর্শন। আদেশক্রমে আমি আপনাদিগকে লইবার জন্য আসিয়াছি, এবং বাহিরে রাজকীয় শকট অপেক্ষা করিতেছে। আমরা তাহার কথায় রেলগাড়ী হইতে নামিয়া রাজকীয় শকটে আরােহণ পূৰ্ব্বক নির্দিষ্ট স্থানে গিয়া পৌছিলাম। দুইটি নূতন ছত্রবাটী একাবয়বে যুক্ত নন্দরাজ-মুর নামক কোন রাজবংশীয় ব্যক্তির ব্যয়ে এবং মহারাজের ষ্টেটের তত্ত্বাবধানে সম্প্রতি নিৰ্ম্মিত হই- যাছে। বাটী দুইটির নির্মাণ কৌশল বঙ্গদেশের সদরবাটীর সদৃশ। আমাদের থাকিবার জন্য যে বর পাইয়াছিলাম, তাহার দুইদিকে বা রাণ্ডা, জানালা ও দরজায় খড়খড়ী সাশী দেওয়া ; এরূপ ঘর ফটকের দুই পার্শ্বে দুইটি আছে এবং ভদ্রলােকদিগের ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত হইয়াছে। অন্যান্য ঘরগুলির সম্মুখদিকে বারাণ্ডা ও প্রত্যেক ঘরে বন্ধন করিবার বন্দোবস্ত আছে; সাধারণ লােকে তথায় থাকে। বাটীর প্রাঙ্গণ ক্রোট এবং দেশীয় পুষ্প বৃক্ষে সুশশাভিত রহিয়াছে। বাটীর চতুর্দিকে নূতন পুষ্পেদ্যান প্রস্তুত হইতেছে। উপরি তলে সম্মুখদিকে যে দুইটি ঘর আছে, তাহা এ পর্যন্ত কাহাকেও ব্যবহার, করিতে দেওয়া হয় নাই। অপর বাটীতে মহিসুরের জজ মহাশয় তৎকালে বাস করিতে ছিলেন। এই বাই দ্বয়ের প্রত্যেকটির নির্মাণ ব্যয় ২০ হাজার টাকার কম হইবে না। আমরা পৌঁছিয়া বিশ্রাম করিতেছি, এমন সময় আয়াঙ্গার, মহাশয় আমাদের সহিত সাক্ষাৎ করিতে আসিলেন। অনেক ক্ষণ আলাপ পরিচয়ের পর বিদায় গ্রহণ করিবার সময় বলিয়া মহিসুর । ১৭ গেলেন যে পর দিবস প্রাতে আপনাদের জন্য দরবার-আন্দালী রাজকীয় শকট লইয়া আসিবে ও সে আপনাদের ক্রমণকাল পৰ্যন্ত সঙ্গে সঙ্গে থাকিবে। পর দিবস রবিবার প্রাতে একজন দরবার পিয়ন্ শকট আসিয়াছে বলিয়া সংবাদ দিলে, আমরা অনতিবিলম্বে মহিসুরের চামুণ্ডাপাহাড়স্থিত চামুণ্ডাদেবী দ- নার্থে ৰহির্গত হইলাম। গাড়ী দুর্গের ভিতর হইয়া চামুণ্ডা পাহাড়ের দিকে অগ্রসর হইতে লাগিল, আমরা এই সুযােগে নগর দেখিতে দেখিতে চলিলাম । এখানে মহিসুর দেশ ও নগরের সেক্ষেপ বিবরণ দেওয়া আবশ্যক ৰােধে তাহা প্রদত্ত হইতেছে। পৌরাণিক মহিষাসুঞ্জের বিবরণ অনেকেই জ্ঞাত আছেন। মার্কণ্ডেয়পুরাণে চণ্ডীমাহাত্ম্যে ও দেবীভাগবতের পঞ্চমস্কন্ধে ইহা বিস্তারিতরূপে বর্ণিত আছে। দক্ষিণপ্রদেশে প্রবাদ এই যে, মহিসুরপ্রদেশে পৌরাণিক মহিষাসুরের রাজত্ব ছিল। আবার কেহ কেহ অনুমান করিয়া থাকেন, যে বাল্মীকি কথিত সুগ্রীবরাজ মহিমুর প্রদেশে রাজত্ব,করিতেন ; কিন্তু এখানে আমরা সুগ্রীবরাজের কোন বিবরণ শুনিলাম না। খৃঃ ৩০০ বৎসরের পূর্বে কোন সময়ে সম্ভবতঃ অশােক- রাজের রাজত্বকালে এই প্রদেশে ৰৌদ্ধেরা একটি আবাস স্থাপন করিয়াছিলেন ; তদনন্তর জৈনেরা আসিয়া অনেক দিন পর্যন্ত আধিপত্য করিয়াছিল।এ প্রদেশে তাহাদের কৃত গুহা-মন্দির ও মূর্তি পাহাড়ের গায়ে অনেক দেখিতে পাওয়া যায়। কদম্ববংশীয় তীর্থদর্শন। রাজগণ মহিসুরের উত্তরদিকে বনবাসী নামক স্থানে রাজধানী স্থাপন করিয়া ৰহু শতাব্দী রাজত্ব করিয়াছিলেন। মহিমুর অধি- ত্যকার দক্ষিণদিকে গঙ্গাবংশীয় রাজগণ বহুকাল মাজত্ব করিয়া- ছিলেন, তাহাদিগের যে সকল অনুশাসন-লিপি পাওয়া যায় তাহাতে তাহার জৈনমতাবলম্বী বলিয়া প্রতীয়মান হয়। তাহারা ক্রমে হীনবল হইলে, জৈনমতাবলম্বী বল্লালবংশীয় রাজগণ প্রবল হইয়া উঠেন ; এই জৈনরাজগণ রামানুজাচার্যের নিকট বৈষ্ণব ধৰ্ম্মে দীক্ষিত হয়েন ; প্রথমে ইহাদের রাজধানী যাদবপুরীতে ছিল, পরে তদ্বংশীয় কোন বীরপুরুষ তথা হইতে দ্বারসমুদ্ৰনামক স্থানে আসিয়া আপন রাজধানী স্থাপন করেন। ১৩১০ খৃঃ আলাউদ্দীনের সেনানায়ক মালিক কাফুর কর্তৃক ঐ বল্লালবংশীয় দ্বারসমুদ্রের রাজা পরাভূত হইয়া বন্দীরূপে দিল্লীতে প্রেরিত হওয়া অবধি বল্লালবংশ লােপ পাইয়াছে, কথিত আছে, ১৩৯৯ খৃঃ যাদববংশীয় বিজয়রাজনামক কোন বীরপুরুষ তৎকনিষ্ঠ কৃষ্ণ- রাজের সহিত দ্বারকা হইতে দক্ষিণাভিমুখে আসিয়া মহিসুরের সন্নিকটে হদরনারু নামক স্থানে ‘আধিপত্য স্থাপন করিয়া- ছিলেন। সম্ভবতঃ ১৫২৪খৃঃ তদ্বংশীয় রাজগণ মহিসুরনামক স্থানে আসিয়া প্রথমে বাস করেন; পরে দুর্গ নির্মাণ করিয়া সেইস্থান রাজধানীতে পরিণত করেন। রাজা উদৈয়ার পূর্বোক্তবিজয়- রাজ হইতে নবম পুরুষ অন্তর বলিয়া ৰােধ হয়। তিনি মহিসু পরিত্যাগ করিয়া শ্রীরঙ্গপত্তনে রাজধানী স্থাপন করিয়াছিলেন। উদৈয়ার রাজাদিগের বিবরণ শ্রীরঙ্গপত্তনে দেওয়া হইবে।
মহিসুর । মহিসুর নগরের আয়তন প্রায় ৩ বর্গমাইল হইবে, ১৮৮১ খৃ লোকসংখ্যা তালিকায় উক্ত সহরের অধিবাসীর সংখ্য ২৮,৯৭৯ জন হইয়াছিল। নগরটি চামুণ্ডা পাহাড়ের পদদেশে অবস্থিত, দুর্গটি সহরের দক্ষিণদিকে, দীর্ঘ্যে ও প্রস্থে ৪৫০ গজ হইবে; ইহার প্রাচীর এখনও পরিষ্কৃত রহিয়াছে, কিন্তু বাহিরের পরিখা ভরাট করিয়া পুষ্পোদ্যানে পরিণত করা হইতেছে। দুর্গমধ্যস্থ পথগুলি অপ্রশস্ত, কিন্তু নগরের পথগুলি সুপ্রশস্ত এবং উত্তম পরিষ্কৃত। এখানকার বাটীগুলি কালাচ্ছাদিত কিন্তু খাপরেলের নীচে ছাদ থাকাপ্রযুক্ত গৃহের অভ্যন্তর বিশেষ উষ্ণ হইতে পারে না, যাহা হউক, নগরটি অতি পরিষ্কার এবং সমৃদ্ধিশালী। এখানে মিউনিসিপালিটির বিশেষ সুবন্দোবস্ত আছে। নগরের দক্ষিণদিকে দুর্গ এবং তন্মধ্যে অনেক ব্রাহ্মণের বাস। দুর্গের মধ্যভাগে প্রাসাদ এবং রাজবংশীয় আত্মীয়গণের ভবন। আমরা দুর্গের মধ্য দিয়া চামুণ্ডা পাহাড়ের পাদদেশে পৌছিলাম, ইহা নগর হইতে প্রায় ২ মাইল দূরে হইবে। আমরা গাড়ী হইতে নামিয়া ক্ৰমে পাহাড়ে উঠিতে লাগিলাম ; উহাতে উঠিবার যে সােপান আছে তাহা অতি পুরাকালে পাথর কাটিয়ী নির্মিত হইয়াছিল। সেই সােপান দিয়া অনেক কষ্টে ১ ঘণ্টায় উপরে উঠিলাম ; উপরে এক পার্শ্বে চামুণ্ডাদেবীর মন্দির, তন্নিকটে অর্ডকদিগের বাস ; অপর পার্শ্বে মন্দিরের’সমতল হইতে ২০০ ফুট উপরে মহারাজের বিশ্রাম ভবন। ইহার পার্শ্ব দিয়া,নিম্ন হইতে গাড়ীর পথ আঙ্গি • ২০ তীর্থদর্শন। ছে, উক্ত রাস্তার এক শাখা মহারাজের বিশ্রাম ভবন দিকে এবং অপর শাখা মন্দিরের দিকে আসিয়াছে। গাড়ীর রাস্তা পৰ্বতের পাদদেশ হইতে ৫ মাইল এবং সােপানের পথ প্রায় ১৷ মাইল হইবে। ভূমির সমতল হইতে পাহাড়ের উচ্চতা ১০০০ ফুটের কম নহে; তথা হইতে চারিদিকের দৃশ্য অতি মনােহর, যিনি এমপরূপ দৃশ্য দেখিয়াছেন তিনিই তাহা অনুমান করিতে পারেন। এখান হইতে মহিসুর রাজ্য সমস্তই দৃষ্টিগােচর হয়, এক দিকে দুর্গ মধ্যস্থ রাজভবন, অপর দিকে শ্রীরঙ্গপত্তন, এবং অন্য দিকে অতি দূরে কাবেরীনদীর জলপ্রপাত দেখা যায়। কিয়ৎক্ষণ পরে মন্দিরের প্রধান ধর্মযাজক, যে স্থানে দেবী কর্তৃক মহিষাসুর নিহত হইয়াছিল, অঙ্গুলি নির্দেশ করিয়া আমাদিগকে সেই স্থান দেখাইয়া দিলেন। উহা পাহাড়ের পদিদেশ হইতে এক মাইল দূর হইবে। চামুণ্ডাদেবী মহিষাসুরকে বধ করিয়া পৰ্বতে আসিয়া বিশ্রাম করিছিলেন এবং তাঁহারই আদেশক্রমে পৰ্ব্বতের উপর হয়, পরে মন্দির নির্মিত হইয়াছে। উক্ত দেবী মহিসুর রাজ্যের অধিষ্ঠাত্রী দেবী, এবং মহিসুর রাজাদিগের কুলদেবী; অতএব এই মন্দির মহিসুরের রাজ- গণ কর্তৃক নির্মিত হইয়াছে, তাহাতে কোন সন্দেহ নাই। কোন সময়ে এবং কোন্ মহাত্মার দ্বারা নির্মিত হইয়াছিল তাহার বিবরণ পাওয়া সুকঠিন। মন্দিরের অবস্থা দৃষ্টে 'অনু- মূল স্থান নির্দিষ্ট মহিসুর। ; মান হয় যে, ইহা ৪৫ শত বৎসরের হইবে। গঠনপ্রণালী দক্ষিণদেশের অন্যান্য দেবালয়ের সদৃশ ; মন্দিরটি ৭টি প্রকোষ্ঠে বিভক্ত ; মুন্নিস্তৃত অঙ্গণ এবং চতুর্দিক প্রস্তরের উচ্চ প্রাচীর দ্বারা বেষ্টিত, সম্মুখে গােপুর নামে প্রকাণ্ড সিংহদ্বার, উহার উর্ধদিকে নানা দেবদেবীর মূর্তি রহিয়াছে। শুনিলাম, মহিমুর রাজৱংশের নিয়মানুসারে এই মন্দিরে রাজকুমার এবং রাজকুমারীদিগের নামকরণ হইয়া থাকে। দেবীর দর্শন এবং অর্চনার নিমিত্ত আমরা সপ্তম প্রকোষ্ঠদ্বারে গিয়া ঈড়াইলাম; পূজক আসিয়া আমাদের প্রতিনিধিরূপে কুঙ্কুম দ্বারা সহস্র নামের অর্চনা করিয়া কপূরালােকে আরতি করণান্তর দেবীমূর্তি দেখাইলেন। দেবী প্রস্তরময়ী, অষ্টভুজা, সিংহবাহিনী ( সিংহের উপর দণ্ডায়মান) সুরের মহিষাকৃতি দেহ, সিংহের দিকে পৃষ্ঠ হইলেও নরকৃতি মস্তক ফুরাইয়া দেবীর দিকে দৃষ্টি করিয়া রহিয়াছে ; দেবী দক্ষিণ হস্তে ত্রিশূল দ্বারা অসুরের বক্ষঃস্থল ৰিদ্ধ ও বামহন্তে নাগপাশ দ্বারা উহাকে দৃঢ় বন্ধন করিয়াছেন, আর অন্যান্য, হন্তে অন্যান্য আয়ুধ, যথা তরবারী, তীর, ধনুক ইত্যাদি ধারণ করিয়া রহিয়াছেন। চালের উপর চিত্রে, দেবর্ষি, মহর্ষি; যক্ষ, রক্ষাদি সকলেই দেবীর স্তৰ করিতেছেন। বঙ্গদেশে দশভুজার প্রতিমায় দেবীর দক্ষিণে লক্ষ্মী, গণপতি এবং বামদিকে সরস্বতী ও ময়ূরবাহনে ষড়ানন ; দেবীর দক্ষিণপদ সিংহােপরি ও বামপদ অসুর স্কন্ধে প্রদত্ত হইয়া থাকে। ' সিংহ গণপতিকে, পেছনে করিয়া অসুরের ২২ তীর্থদর্শন। ০ সম্মুখীন হইয়া তাহার হস্ত দংশন করিয়া থাকে। এখানে গণপতি লক্ষ্মী, ষড়ানন, সরস্বতী নাই,এবং দেবীর উভয় পদই সিংহোপরি, সিংহের পৃষ্ঠদেশ অনুরের দিকে হইলেও মস্তক ঘুরাইয়া অসুরকে ধরিয়া রহিয়াছে। দেবমূর্তি দর্শনে পুলকিত হইয়া প্রসাদ গ্ৰহণান্তর বাহিরে আসিয়া শারদীয় পূজার কথা জিজ্ঞাসা করিয়া অবগত হইলাম যে, সেই সময়ে শতাবধি বেদপারগ ৰাহ্মণ সমবেত হইয়া যায়, হােম, শ্রীসূক্ত, ভূক্ত, মসূক্ত, পুরুষসূক্ত, পঞ্চ অক্ষর জপ নয় দিন করিয়া থাকেন ; সপ্তশতী চণ্ডীও পাঠ হইয়া থাকে। নৈবেদ্যের ছড়াছড়ি শুনিলাম না, তবে অন্নব্যঞ্জনের মহানৈবেদ্য হয়, তাহাই ৰাহ্মণগণ রজনীতে প্রসাদ পাইয়া থাকেন। আমরা বিশেষরূপ জ্ঞাত হইলাম যে, দেবীর সম্মুখে পশু বলি হয় না, তবে পৰ্ব্বতের নিয়ে পথের পার্শ্বে শূদ্রজাতিগণ দেবীর উদ্দেশে পশু হনন করিয়া থাকে, কিন্তু তাহাতে মন্ত্রপাঠ হয় না। এখানে শারদীয় পূজার পরিবর্তে, নবরাত্ৰব্ৰত কহে ; দেবীর মন্দিরে এইরূপে উক্ত ব্ৰত সমাধা হইয়া থাকে। রাজভবনে মহারাজ যেরূপে নবরাত্ৰব্ৰত করিয়া থাকেন, তাহ। পরে বিকৃত করিতেছি। হেম, জপ ও সপ্তশতী বেদপাঠ এ প্রদেশে পূজার প্রধান অঙ্গ। পশু বলির নাম গন্ধও নাই, ইহাই সাত্বিকপূজা। বঙ্গদেশে পূজার প্রধান অঙ্গ পশুবলি ও নৈবেদ্য তাহা রাজসিক ও তামসিক পূজা। দেবীর মন্দিরের সন্নিকটে নৃসিংহদেবের মন্দির আছে, মহিসুর। ৰােধ হয় চিক্যদেবরাজের সময় এই মন্দির প্রতিষ্ঠিত হইয়া থাকিবে; তাঁহার পূর্ববর্তী রাজগণ শিবমন্ত্রে দীক্ষিত হইতেন, কিন্তু তিনি ধিষ্ণুমন্ত্রে দীক্ষিত হইয়াছিলেন ও তদবধি মহিসু রাজবংশীয়েরা বিষ্ণুমন্ত্রে দীক্ষিত হইতেন ; রাজপ্রাসাদেও আর এক নৃসিংহদেবের মূত্তি আছে, তাহারও প্রত্যহ পূজা হইয়া থাকে। উক্ত চিক্কদেবরাজ ১৬৭০ খৃঃ হইতে ১৭০০ খৃঃ পর্যন্ত রাজত্ব করেন; অতএব এ মন্দির৩০ শত বৎসরের অধিক হইবে। মন্দিরের গঠনপ্রণালী অতি উত্তম ; আমরা তথায় যাইয়া বিষ্ণুর অৰ্চনাদি করিয়া মহারাজের বিশ্রামাগারে যাইলাম। এই ৰহৎ অট্টালিকা দেবীর মন্দির হইতে অর্ধ মাইল দূরে পাহাড়ের সর্ব্বোচ্চ স্থানে অবস্থিত। তথায় সৰ্ব্বদাই শীতল বায়ু বহিয়া স্থানটিকে শীতল করিয়া রাখিয়াছে। তথা হইতে চতুর্দিকের দৃশ্য অতি রমণীয়। রাজপরিবারবর্গ দেবীর পূজা করিতে আসিয়া উক্ত বাটীতে বিশ্রাম করিয়া থাকেন। আমরা তথায় কিয়ৎকাল বিশ্রাম করিয়া দেবীর কিঞ্চিৎ প্রসাদ ভক্ষণ করণান্তর পূর্ব গন্তব্যপথ দিয়া পাহাড়ের নীচে নামিলাম। বাসায় প্রত্যাবর্তন করিবার সময় দেবরাজ নামক হ্রদের নীচে এবং পথের পার্শ্বে স্বগীয় রাজাদিগের সমাধিস্থান দেখিতে যাইলাম। ভূতপূর্ব মহারাজ কৃষ্ণরায়ার সমাধির উপর যে অট্টালিক তাহা অতি উৎকৃষ্ট ; মহারাজ যে বৃহৎ কূর্মাসনের উপর বসিয়া জপ করি- তেন, তাহা সমাধির উপর স্থাপিত হইয়াছে ও সেই কূর্মাসনের উপর মহারাজের প্রস্তর-নির্মিত মুর্তি রহিয়াছে। তাহার পূর্ব- ২৪ তীর্থদর্শন। বর্তী রাজাদিগের এবং অপর রাজপরিবারগণেরও সমাধি দেখি- লাম। রাজগণ যে প্রস্তরাসনে বসিয়া জপ করিতেন, সেই প্রস্তর সকল সমাধির উপর রহিয়াছে। রাজাদিগের যে প্রস্তরময় মূর্তি আছে, তাহা প্রত্যহ পূজা হইয়া থাকে; অপর রাজপরিবারদিগের মূর্তি-পূজা হয় না। এই সমাধি প্রাঙ্গণের সন্নিকটে এক বৃহৎ ছত্র আছে, সেই ছত্রে অভ্যাগত সন্ন্যাসী, সাধু বৈষ্ণবগণ আশ্রয় পাইয়া থাকেন। উক্ত দিবসে কোন পরমহংস সাধু অনেকগুলি শিষ্যের সহিত উক্ত ছত্রে অবস্থিতি করিতেছিলেন। অতঃপর আমরা তথা হইতে আবাসে প্রত্যাবৃত্ত হইলাম। অপরাহ্নে রাজভবন দেখিতে গিয়াছিলাম। ১৭৯৯ খৃঃ টিপুসুলতানের মৃত্যুর পর শ্রীরঙ্গপত্তন ইংরাজ- দিগের অধিকারভুক্ত হইলে, ইংরাজ বাহাদুর মহিসুর-রাজ- বংশের একমাত্র প্রকৃত উত্তরাধিকারী বন্দী নাবালক রাজা কৃষ্ণরায়ার উদেয়ারকে মুক্ত করিয়া মহিমুর রাজসিংহাসনে বসাইয়া রাজ্য প্রদান করিলে পর, মন্ত্রির পূর্ণিয়ার যত্নে ১৮০০ খৃঃ শ্রীরঙ্গপত্তনের টিপুর রাজবাটী ধ্বংস করিয়া মহি- সুরের রাজবাটী নিৰ্ম্মিত হইয়াছে। রাজবাটীর সম্মুখে বৃহৎ প্রাঙ্গণ, প্রাঙ্গণের সম্মুখে নানাবিধ চিত্রে চিত্রিত চারিটী কাঠের খুটার দ্বারা সুরক্ষিত এক প্রকাণ্ড দ্বিতল প্রাসাদ। এই প্রাসাদের নাম নবরাত্র মহল ; আমরা এই মহলের নিয়- (১) যধায় শবদাহ বা শব প্রােথিত হয়, সেই স্থানকে সমাধিক্ষেত্র কহে।
মহিসুর। ২৫ ; ভাগে প্রবেশ করিয়া বামদিগের সােপান দিয়া উপরে উঠিয়া দেখিলাম, ভিতরে অনেক গুলি ভিন্ন ভিন্ন মহল এবং ভিতর দেওয়াল সর্বত্র নানাবিধ চিত্রে চিত্রিত রহিয়াছে। প্রথম মহলের সুদীর্ঘ প্রকোষ্ঠ প্রাসাদ অতিক্রম করিয়া অন্য মহলে উপনীত হইলাম ; এখানে এক রৌপ্যনির্মিত বৃহৎ সিংহাসন, কয়েকখানি বহু মূল্যের চেয়ার, টেবিল, সােফা এবং অয়েল পেটিং আলেখ্যাদির দ্বারা সজ্জিত রহিয়াছে, উক্ত গৃহের কপাট চন্দনকাষ্ঠে নির্মিত এবং তাহা গজদন্তের কারুকার্যে সুশােভিত ; এইটি মহারাজের বসিবার গুপ্তগৃহ। ইহার পরে দরবারবক্সীর দপ্তরখানা, তথা হইতে এক প্রকাণ্ড প্রাসাদে যাইলাম, উহাকে ড্রয়িংরুম কহে, উহা নানাবিধ ঝাড় লণ্ঠন সােফা, চেয়ারাদিতে সুসজ্জিত রহিয়াছে। সকল ঘরই অয়েল- পেন্টিং প্রভৃতি দ্বারা সুশােভিত। অনন্তর দেবালয় মহলে যাইয়া দেখিলাম চামুণ্ডাদেবীর নকল মূর্তি একটি সামান্য গৃহে বিদ্য- মান তথায় তাহার নিত্য পূজা হইয়া থাকে। সে গৃহ চাবি বদ্ধ ও তাহাতে মােহর করা, প্রত্যহ পূজার সময় মােহর ভাঙ্গিয়া দরজা খােলা হয়, এবং পূজান্তে দরজা বন্ধ করিয়া পুনরায় মােহর করা হয়। চামুণ্ডীদেবীর বহু মূল্য আভরণাদি রক্ষার নিমিত্ত প্রত্যহ দরজায় মােহরাঙ্কিত হইয়া থাকে। এই মহলের অব্যবহিত পরেই নৃসিংহদেবের মহল, তথাকার দরজাও বদ্ধ এবং মােহর করা, কিন্তু দরজা গুলিতে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গবাক্ষ থাকা- প্রযুক্ত আমাদের দেবদর্শনের কোন অনিষ্ট ঘটে নাই। মহা- তীর্থদর্শন। রাজের বিশ্রামাগার, আলেখ্য গৃহ ও সঙ্গীতাগার পার হইয়া তােষাখানা এবং রাজকর্মচারিদিগের দপ্তর মহল ও নৃত্যশালা দর্শন করােন্তর একটি অপ্রশস্ত পথ পার হইয়া রাজকুমারগণের পড়িবার গৃহ সন্দর্শন করিয়া মহারাজের সুসজ্জিত মন্ত্রণাগৃহে উপনীত হইলাম; তথা হইতে নবরাত্রমহলে গমন করিলাম, এই মহলটি ভারতমাতা ভারতেশ্বরী, ভারত প্রতিনিধি লর্ড ক্লাইব, র্ড ওয়েলিংটন্ ও দেশীয় কয়েকটি প্রধান প্রধান রাজাদিগের অয়েলপেন্টিংএর পূর্ণাকৃতিতে সুশশাভিত রহিয়াছে। ইহার পার্শ্ব গৃহে একখানি রত্নসিংহাসন আছে,১৬৯৯খৃঃ চিক্কদেবরাজ দিল্লীর বাদশাহের নিকট হইতে উক্ত রত্নসিংহাসন উপহার পাইয়াছিলেন। কিন্তু প্রবাদ যে, হস্তিনাপুরের পাণ্ডবরাঙ্গণ উক্ত সিংহাসনে উপবেশন করিতেন ; পাণ্ডববংশের অবনতি হইলে তদ্বংশীয় শেষ রাজা পেন্নিকোণ্ড নামক স্থানে উক্ত সিংহাসন ভূমিতে প্রােথিত করিয়া রাখেন। বিজয়নগরের রাজ্য- স্থাপক কোন এক সিদ্ধপুরুষের নিকট তদ্বিষয় অবগত হইয়া উক্ত সিংহাসন ভূমি হইতে উত্তোলন করেন, এবং তদবধি উহা বিজয়নগরের রাজাদিগের অধিকারে থাকে। বিজয়নগরের ধ্বংসের পর উহা মহিসুরের উদৈয়ার ‘রাজাদিগের হস্তগত হয়। উক্ত বিষয় কতদূর সত্য তাহা বলিতে পারি না। কিন্তু ইহা স্থির যে চিক্যদেবরাজ এবং তাহার পরবর্তী রাজগণ টিপুসুল- তানের সিংহাসনারােহণ কাল পর্যন্ত উক্ত সিংহাসন ব্যবহার করিয়া আসিয়াছিলেন। শ্রীরঙ্গপত্তনের ধ্বংসের পর, অকর্মণ্য মহিসুর । २१ দ্রব্যাদির সহিত এক ঘরের মধ্যে উহা পাওয়া গিয়াছিল। বৰ্ত্ত, মান মহারাজের পিতা কৃষ্ণরায়ার উদেয়ারের রাজ্যাভিষেক সময় হইতে উক্ত সিংহাসন ব্যবহার করিয়া আসিতেছেন। পূর্বের ন্যায় সিংহাসনের প্রকৃত শােভা নাই। হস্তিদন্তনির্মিত সুচারু কারুকার্য্যের উপর স্বর্ণ ও রৌপ্যপত্র মণ্ডিত ও তাহাতে পৌরাণিক মূর্তি সকল অঙ্কিত রহিয়াছে। উপরে রাজছত্রের ঝালের মণি মুক্তা এবং হীরকাদিতে সুশােভিত ; মহারাজ নবরাত্র মহলে এই সিংহাসনে বসিয়া নয় দিবস ব্রত পালন করেন, অপর সময়ে ইহা পার্শ্বের ঘরে আবদ্ধ থাকে। দশেরা উৎসব আমাদের দেখা ঘটে নাই, কিন্তু যেরূপ শুনি- লাম সেইরূপে বিবৃত করিতেছি। তৎ সময়ে বহু প্রদেশ হইতে বহুলোকের সমাগম হইয়া থাকে ; সম্মুখের বিস্তৃত প্রাঙ্গণে অশ্বারােহী সেনা সকল শ্রেণীৰদ্ধ হইয়া দাঁড়ায়, তৎপরে চিত্রিত সঙীন হস্তে পাইক সকল, তাহার পশ্চাতে পদাতিক সেনা এবং সৰ্ব্ব শেষে নকীব এবং ধ্বজা বাহকেরা দণ্ডায়মান থাকে। তৎপরে মহারাজ ৰং মূল্য মণি মুক্তাদি হীরক খচিত পােষাকে ভূষিত হইয়া উক্ত সিংহাসনে উপবেশন করিলে সম্মুখের আবরণ তুলিয়া দেওয়া হয়, তখন তােপধ্বনি হইতে থাকে; তদনন্তর বৈদিক ৰাহ্মণগণ রাজার চতুঃপার্শ্বে দণ্ডায়মান হইয়া বেদগান করিতে করিতে রাজাকে আশীর্বাদ করিলে ব্যাণ্ড বাজিতে থাকে সেনাগণ জয়ােচ্চারণ করে ও সেই সঙ্গে সঙ্গে অশ্বের হ্রেষারবে ও অশ্বারােহীদিগের সড়ীনের ঝন্ঝন্ শব্দে এক • ২৮ তীর্থদর্শন। অপূর্ব দৃশ্য হইয়া উঠে; ইংরাজ রাজপ্রতিনিধি আসিয়া উপ- স্থিত হইলে তােপধ্বনি দ্বারা তার আগমন বার্তা ঘােষণা করা হয়। ইংরাজ রাজপ্রতিনিধি ও অন্যান্য আমন্ত্রিত উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারী ও সন্ত্রান্ত ব্যক্তিগণের সম্মানার্থে মহারাজের প্রধান সৈন্যাধ্যক্ষ তােরণের সম্মুখে উপস্থিত থাকেন ও তাঁহা- দিগকে সমাদরে দরবার মহলে আনয়ন করেন। ইংরাজ রাজ প্রতিনিধি হইতে অধস্তন সকলেই রাজাকে সম্মান প্রদর্শনার্থ রাজসিংহাসনের সম্মুখে উপস্থিত হইয়া নত- শির হইলে, মহারাজ মস্তক ঈষৎ হেলন ও দক্ষিণ হস্তের অঙ্গুলী দ্বারা চিবুক স্পর্শ করিয়া সম্মান গ্রহণ করেন। অতঃপর হস্তির খেলা ও জিষ্টিক প্রভৃতি খেলা হইয়া থাকে। তৎপরে মহারাজ স্বয়ং সমরবেশে সেনা-পরিবেষ্টিত হইয়া এক নির্দিষ্ট স্থানে যাইয়া একটি শমীবৃক্ষে শর ত্যাগ করিলে তােপধ্বনি হয়, তদনন্তর সকলে বিজয়ােল্লাসে মত্ত হইয়া রাজভবনে প্রত্যা- বৃত্ত হন। প্রথানুসারে পান ও সুপারি বিতরণের পর সভা ভঙ্গ হইলে মহারাজ উক্ত সিংহাসন প্রদক্ষিণ, পূজা এবং প্রণাম করণানন্তর অন্দরমহলে গমন করেন। ইহাই মহারাজের নবরাত্ৰব্ৰত। রাজভবন্ত পূৰ্ব্বাপেক্ষা অনেকাংশে উন্নত ও সুসজ্জিত। সমস্ত রাজভবন মধ্যে বৈদ্যুতিক আলােক দিবার বন্দোবস্ত আছে। প্রাসাদ হইতে ফিরিবার সময় অস্ত্রাগার ও পুস্তকালয় দেখিয়া রাজভবন-সম্মুখস্থ উদ্যানাভিমুখে আসিতে আসিতে শুনিলাম, t মহিসুর। ২৯ মহারাজ বায়ুসেবাের্থ এই পথ দিয়া যাইবেন। তাহার নিমিত্ত তােরণের সম্মুখে এক জুড়ি ফিটন অপেক্ষা করিতেছে। ক্ষণকাল পরে মহারাজ অপর এক ব্যক্তির সহিত আসিয়া ফিটনে চড়িয়া নিজে অশ্বচালনা করিতে লাগিলেন, মহারাজের বেশ ভূষা কোট, পেণ্টলেন ও মস্তকে জরির উষ্ণীষ । শুনিলাম, দ্বিতীয় ব্যক্তি তাহার সহােদর, ইনি ৫০০ পাঁচশত টাকা মাসিক বৃত্তি পাইয়া থাকেন ও অধিকাংশ সময়ই মহারাজের সহিত যাপন করিয়া থাকেন। অতঃপর আমরা উদ্যান দেখিয়া মহা- রাজের গ্রীষ্মভবন দেখিতে যাই, ইহা মৃত মহারাজ কর্তৃক নিৰ্ম্মিত হইয়া ছিল। এই প্রাসাদের সম্মুখে অশ্বশালা, তাহাতে সম্প্রতি ৮০ আশীটি অশ্ব আছে, সময়ে সময়ে এক শত কুড়িটী উহার এক পার্শ্বে ভিন্ন ভিন্ন প্রকারের গাড়ী সকল সজ্জিত রহিয়াছে। মহারাজ বিলাত হইতে কয়েক খানি নুতন গাড়ী আনাইয়াছেন; মৃত মহারাজ যে সকল গাড়ী ব্যবহার করিতেন বর্তমান মহারাজ সেসকল গাড়ী ব্যবহার করেন না; এই গাড়ীগুলি যত্নের সহিত এক পার্শ্বে সজ্জিত রহিয়াছে। পর দিবস প্রাতঃকলে জগন্মােহন রাজপ্রাসাদ দেখিতে যাইলাম। ইহা একটি চমৎকার অত্যুৎকৃষ্ট আদর্শ প্রাসাদ দুর্গের পশ্চিম দিকে অবস্থিত। ইহা ভূতপূর্ব রাজার বিশ্রাম- ভবন ছিল। সম্মুখস্থ প্রাঙ্গণ নানাবিধ পুষ্প লতা এবং ছায়াত দ্বারা সুশােভিত। উপরতলায় নানাবিধ দুষ্প্রাপ্য এবং পুরাতন পৰ্য্যন্ত থাকে। ;
তীর্থদর্শন। ঐতিহাসিক দ্রব্যাদি যত্নের সহিত রক্ষিত হইয়াছে। দেওয়ালে ঐতিহাসিক ঘটনার অয়েলপেন্টিং সুচিত্রিত মূর্তি সকল সজ্জিত রহিয়াছে। এক দিকে শ্রীরঙ্গপত্তনের শেষ অধিকারের ঘটনাবলী অঙ্কিত রহিয়াছে। সুলতান টিপু শরবিদ্ধ হইয়া মৃত্যুমুখে পতিত, এবং তাহার কয়েকটি বিশ্বাসী অনুচর নতশিরে অনুতাপ করি- তেছে ; জেনের হেরিস্ সাহেব আপন অনুচরের সহিত শত্রুর মৃতদেহ সন্দর্শন করিতেছেন, এদৃশ্য অতীব শশাচনীয়। অপর পার্শ্বে মৃত্ব দেওয়ান রঙ্গাচাৰ্যালুর পূর্ণাকৃতির অয়েলপেন্টিং বিরাজমান। অন্য একস্থানে ভূতপূৰু মহারাজের কেলিচিত্র, তন্মধ্যে কতকগুলি অশ্লীল মূর্তি ও রহিয়াছে। অতি আশ্চর্যের বিষয় এই যে, বর্তমান মহারাজের সময়ও এরূপ অশ্লীল চিত্র তথায় স্থান পাইয়াছে। অপর এক দিকে বর্তমান মহারাজের কোষ্ঠী দোলায়মান রহিয়াছে ভূতপূৰ্ব মহারাজা কতকগুলি ব্যাঘ্র ও বন্যপশু যেরূপে শিকার করিয়াছিলেন, তাহার আদর্শ চিত্র অয়েলপেন্টিঙে চিত্রিত রহিয়াছে; ডুয়িংহ, তসবিরাদি ও বহুমূল্যের পল্যঙ্ক সােফাদিতে সজ্জিত পার্শ্বস্থিত একটি ঘরে অত্যুৎকৃষ্ট স্বর্ণের কলধৌত পল্যঙ্কে বহুমূল্য সাটিন বস্ত্রে আবৃত একটি শয্যা রহিয়াছে। নিম্নতলে একটি হলে বিলিয়ার্ড খেলিবার সুবন্দোবস্ত রহিয়াছে। অপরাপর ঘরে সােফা, চেয়ার, অয়েলপেণ্টিং, ঘটীযন্ত্র, হারমনিয়ম্ প্রভৃতি বাদ্যযন্ত্র সকল সজ্জিত রহিয়াছে। বর্তমান মহারাজ কখন কখন এই প্রাসাদে আসিয়া থাকেন।
মহিসুর । ৩১ পূর্বোক্ত প্রাসাদের দক্ষিণদিকে গােশালা, তথায় ভিন্ন ভিন্ন জাতীয় ন্যূনাধিক ৩০০ তিন শত গাভী রহিয়াছে। গাভীগুলি দেখিতে অতিশয় হৃষ্ট-পুষ্ট, তন্মধ্যে অনেকগুলি বিলাতী গাভী ও আছে। গােশালার জন্য একজন তত্ত্বাবধারক বা পরিদর্শক নিযুক্ত আছে। মহারাজ স্বয়ং সপ্তাহে দুইবার ইহা পরিদর্শন করিতে আসিয়া থাকেন। এখান হইতে বালিকা বিদ্যালয় দর্শন করিতে যাইলাম। ইহ জগন্মােহন প্রাসাদের উত্তর-পশ্চিম কোণে স্থিত। আমরা স্কুলে আসিলে, স্কুলের অধ্যক্ষ এবং মেনেজার মাননীয় শ্ৰীযুক্ত নরসিংহ আয়াঙ্গার মহাশয় ইহারা দুই জনে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। অয়াঙ্গার মহাশয় সর্বনিম্ন শ্রেণী হইতে আরম্ভ করিয়া একে একে সমুদয় শ্রেণীগুলি, আমাদিগকে যত্নের সহিত দেখা ইয়া দিলেন। কএকটী শিক্ষিতা স্ত্রীলোক নিম্ন কএকটী শ্রেণীতে শিক্ষা দিতেছেন, মুখে মুখে পাঠাভ্যাস করাইতেছেন ও বুক্- বাের্ডে লিখিয়া দেখাইয়া শিখাইতেছেন! কারী এবং সংস্কৃত কবিতাভ্যাস কবাইতেছেন। প্রত্যেক শ্রেণীর বালিকারা সংস্কৃত এবং কাণারী কবিতা আবৃত্তি করিয়া আমাদিগকে শুনাইয়া দিলেন, উপর শ্রেণীর বালিকাদিগকে ইংরেজি সাহিত্য গণিত, ইতিহাস, ভূগােল, রাসায়নিক, পদার্থবিদ্যা প্রভৃতি শিক্ষা দেওয়া হইয়া থাকে। দুইজন ইয়ুরােপীয় শ্বেতাঙ্গিণী শিক্ষয়িত্রী কেবল উপরের কয়েকটী শ্রেণীতে শিল্পাদি এবং চিত্ৰকাৰ্য্য শিক্ষা দিয়া থাকেন। ৰালিকাগণ যে চিত্র অঙ্কিত করিয়াছেন, তাহার ৩২ তীর্থদর্শন। একখানি অতি চমৎকার হইয়াছে। ৰালিকাদিগকে চিত্র- কার্যের উৎসাহ দিবার জন্য পুরস্কার ধাৰ্য্য আছে। বিলাতী দুইটী শ্বেতাঙ্গিনী ও দেশীয় ১৩টী শিক্ষায়ত্রী ব্যতীত রাসায়নিক পদার্থবিদ্যাদি শিক্ষা দিবার জন্য কয়েকটি দেশীয় কৃতবিদ্য শিক্ষক আছেন। অনন্তর সৰ্ব্বোচ্চ শ্রেণীতে যাইয়া দেখিলাম, একটী বিধবা রমণী কারী হইতে সংস্কৃত ভাষায় অনুবাদ করিতেছেন। সেই শ্রেণীর পণ্ডিত মহাশয়ের মুখে শুনিলাম যে, উক্ত রমণী ভগ- বদগীতা কণ্ঠস্থ করিয়াছেন ও কয়েকখানি উপনিষদ্ পাঠ করি- আছেন। পণ্ডিতবর আমাদিগের কথামত, সেই ছাত্রীকে ভগ- বদগীতার কোন অংশ আবৃত্তি করিতে, বলিলে, প্রথমে কিঞ্চিৎ ইতস্ততঃ করিয়া অম্লানবদনে এক নধ্যায় আবৃত্তি করিলেন ; আরও শুনিলাম যে, ভবিষ্যতে ইনি এই বিদ্যালয়ের শিক্ষ- য়িত্রীর পদ প্রাপ্ত হইবেন। তাহার আর একটী সহাধ্যায়িনী আছেন, তিনি সে দিবস উপস্থিত ছিলেন না। ৰালিকাদিগকে সকল প্রকার গার্হস্থ্য কাৰ্যও শিক্ষা দেওয়া হইয়া থাকে ; সূচের কাৰ্য অর্থাৎ কারূপেট বােনা, কাটাকাপড় সেলাই প্রভৃতি কাৰ্য্য এবং রন্ধনাদির প্রকরণও শিক্ষা দেওয়া হইয়া থাকে। গান বাদ্য শিক্ষা দিবার জন্য ২ জন শিক্ষক নিযুক্ত আছেন, প্রতি দিন ১ ঘণ্টা করিয়া গান শিক্ষা দেওয়া হয় ; এতদ্ব্যতীত সপ্তাহে ৩ দিবস ১টা হইতে ২টা পর্যন্ত বীণাবাদ ও গান মহিসুর শিক্ষা দেওয়া হইয়া থাকে। আমরা সে দিবস গিয়াছিলাম সেই দিবস অপরাহ্নে বীণা বাদ্যের দিবস ছিল। রায় বাহাদুর মহা- শয় আমাদের বীণা শুনাই'বার বন্দোবস্ত করিয়াছিলেন, আমরা বেলা ১টার সময় আসিয়া দেখিলাম ৮১ বৎসরের বালিকা হইতে ২০২২ বৎসরের রমণীগণ আসিয়া বীণা বাদ্য ও গান শিক্ষা করিতেছেন। আমরা ভিন্ন শ্রেণীর বালিকাগণের বীণা বাদ্য ও গান শ্রবণ করিয়া পরম সন্তোষ লাভ করিলাম। প্রথমে দুই টী বালিকা লইয়া এই বিদ্যালয় স্থাপিত হয়। এইক্ষণে ৬০০ শত ৰালিকা বিনা বেতনে শিক্ষা পাইতেছেন। টাকা হইতে ১০ টাকা পর্যন্ত কয়েকটা মাসিক বৃত্তি নির্দিষ্ট আছে। রাজসরকারের গাড়ী করিয়া বালিকাদিগকে স্কুলে আনা হইয়া থাকে। এই ৰালিকাবিদ্যালয়টী রায় বাহাদুর শ্রীযুক্ত নরসিংহ আয়াঙ্গার মহাশয়ের বিশেষ যত্নে, উন্নতি লাভ করিয়াছে। অতঃপর আমরা মােরিমল্লাপ্পা নামক হাইস্কুল দেখিতে যাই। স্কুলটী দেওয়ান বাটীর সন্নিকট, মৃত রাজদরবার বক্সী মরিমাল্লা কর্তৃক স্থাপিত বলিয়া উক্ত নামে স্কুলের নামকরণ হইয়াছে। বাটীটি বৃহৎ এবং দৈর্ঘ্যে প্রস্থে ১২০ ফুট হবে ; উহার প্রাঙ্গ- ণের মধ্যস্থলে নানাবিধ পুষ্প ও লতা সকল সুশােভিত রহিয়াছে। এই বাটীটি ত্রিশ হাজার টাকা ব্যয়ে নির্মিত হইয়াছিল। মােরিমল্লাপ্পা হাইস্কুলের পূর্বদিকে নরসিংহন্না সংস্কৃত বিদ্যা- লয় বাটী, নসিংহন্না নামে কোন কাষ্ঠবিক্রেতা ১২ বার হাজার ;
{
৩৪
তীর্থদর্শন।
টাকা ব্যয়ে এই বাটী নিৰ্মাণ করিয়া বিদ্যালয় স্থাপন করিয়া-
ছেন। উহা দৈর্ঘ্যে ৮০ ফুট প্রস্থে ৬০ ফুট ; অনেকগুলি ৰালক
এই স্কুলে সংস্কৃত শিক্ষা পাইয়া থাকে।
মহিসুরে অনেকগুলি নূতন বাটী ও রথ্যা প্রস্তুত হইতেছে
ও হইয়াছে। নূতন দেওয়ান-আফিস ও জেনেবল হস্পিটাল
প্রায় সম্পূর্ণ হইয়াছে। একটি বৃহৎ বাজার স্থাপিত হইতেছে।
মহিসুর একটি আদর্শ করদরাজ্য, রাজস্ব ক্রমে বৃদ্ধি পাইতেছে,
শত পূৰ্ব্ব ব্লৎসর ১৩০ লক্ষ টাকা আয় ছিল ; গত বৎসর হইতে
১৪ লক্ষ ৭৫ হাজার টাকা বৃদ্ধি পাইয়া ১৪৪ লক্ষ ৭৫ হাজার
টাকা আয় হইয়াছে।
শ্রীরঙ্গপত্তন। ১৮৯০ সালে ১৭ই জুন মঙ্গলবার প্রাতে ৭৩০ মিনিটের ট্রেণে মহিমুর হইতে যাত্রা করিয়া ৮১০ মিনিটের সময় শ্রীরঙ্গ- পত্তনে পৌছিলাম। এই স্থানের আমিলদার ও এপথিক্যারি, আমাদিগের জন্য রেলষ্টেশনে অপেক্ষা করিতেছিলেন। গাড়ী আসিয়া পৌছিলে তাহারা সমাদরের সহিত আমাদিগকে অভ্য- র্থনা করিলেন; এবং আমাদের সময় অল্প জানিয়া এই স্থানের ঐতিহাসিক প্রসিদ্ধ স্থান সকল দেখাইবার নিমিত্ত সত্বরে লইয়া গেলেন। আমরা এখানে পুণ্যভূমি শ্রীরঙ্গপত্তনের পুরাবৃত কিঞ্চিৎ বৰ্ণনা করিব। শ্রীরঙ্গপত্তন কাবেরীনদীর চরদ্বীপ; ইহা দীর্ঘ প্রায় ৩ মাইল, প্রস্থে ১০ মাইল এবং সমুদ্র সমতল হইতে ২৩৩৪ ফুট উচ্চ হইবে। ত্রিশিরাপল্লীর সন্নিকটে কাবেরী নদীর যে চরদ্বীপ আছে তাহার নাম অন্তরঙ্গ এবং ইহা আদির নামে বিখ্যাত। শ্রীরঙ্গপত্তনের ঐতিহাসিক বিবরণ নাই। কেহ কেহ মনে করেন, এক হাজার বৎসর পূর্বে এই চরদ্বীপ জঙ্গলময় ছিল। অতি পুরাকালে এই চরদ্বীপ হােসহল্লী এবং অল্লারহল্লী নামে দুইটি পল্লী ছিল। গৌতম মহামুনির তিন্ন নামক জনৈক শিষ্য তীর্থদর্শন। অঙ্গারহল্লী পল্লীস্থ কোন অঙ্গারবৃক্ষের নিকট বৃহৎ বল্মীক স্তপের ভিতর শ্রীরঙ্গনাথ স্বামীর মূর্তি প্রাপ্ত হরেন; তিনি উক্ত মূর্তির উপর মূলস্থান বা গর্ভগৃহ নির্মাণ করাইয়া পূজার বন্দোবস্ত করেন। ৮৯৪ খৃঃ এই ঘটনা ঘটিয়াছিল, তৎকালে বল্লালবংশীয় রাজগণ যাদবপুরীতে থাকিয়া শ্রীরঙ্গপত্তনাদি শাসন করতেন। তাহারা জৈনমতাবলম্বী ছিলেন। '১০৫০ খৃঃ বিশিষ্টাদ্বৈত মত- প্ৰবৰ্ত্তক বিখ্যাত রামানুজাচাৰ্য্য করিকাল চোলের ভয়ে যাদব পুরীর বাল রাজের আশ্রয় গ্রহণ করিয়া, মন্ত্রবলে রাজকন্যাকে ৰহ্মদৈত্য হইতে রক্ষা করায় রাজা তাহাকে গুরুত্বে বরণ করিয়া তাঁহার নিকট বিষ্ণুমন্ত্রে দীক্ষিত হইয়া বিষ্ণুবর্ধন নাম গ্রহণ করেন। আচাৰ্য শিষ্যদিগকে কাবেরীর চরভূমি দেবসেবার নিমিত্ত অৰ্পণ করিয়াছিলেন, তারা উক্ত চরভূমি চারিশত বৎসর ভােগ করিয়াছিলেন। সম্ভবতঃ পূর্বোক্ত তিন্ন স্থাপিত শ্রীরঙ্গনাথ স্বামীকে আশ্রয় করিয়া বৃহৎ মন্দির নির্মিত হইয়া থাকিবে এবং ক্রমে উহা সামান্য পল্লী হইতে একটি সমৃদ্ধিশালী নগরে পরিণত হয়। শ্রীরস্বামীর নাম হইতেই সমস্ত চরভূমি শ্রীরঙ্গপত্তন নামে অভিহিত হইতেছে। ১৫৩০ খৃঃ বিজয়নগরের সুবিখ্যাত রাজা কৃষ্ণরায়ালু শ্রীরঙ্গপত্তন আপন অধিকার ভুক্ত করিয়া প্রতিনিধি শাসনকর্তা নিযুক্ত করিয়াছিলেন ; তাহা- দিগের শাসনকালে প্রথম দুর্গ নির্মিত হইয়াছিল। ১৫৬৪ খৃঃ বিজয়নগরের রাজা রামরায়ালু বিজাপুরের সুলতান্ কর্তৃক পরা- ভূত হইলে ও বিজয়নগর তাহাদিগের দ্বারা ধ্বংসপ্রাপ্ত হইলেও শ্রীরঙ্গপত্তন। ৩৭ শ্রীরঙ্গপত্তনের রাজ প্রতিনিধিগণ ১৬১০ খৃঃ পৰ্যন্ত তথায় থাকিয়া স্বাধীনতা রক্ষা করিতে সমর্থ হইয়াছিলেন। তথাকার শেষ শাসনকর্তা তিরুমল রায়ালু ওরফে শ্রীরঙ্গরায়ালু, আপন কোন উত্তরাধিকারী না থাকায়, বৃদ্ধাবস্থায় রাজ্যভার পরিত্যাগ করিয়া জীবনের অবশিষ্টাংশ তালক নামক স্থানে যাইয়া অতিবাহিত এই সুযােগে মহিনুরের উদৈয়ার রাজা শ্রীরঙ্গপত্তনের চরভূমি আপন অধিকারভুক্ত করিয়া তথায় রাজধানী স্থাপন করেন। তৎকালে তিনি বত্রিশটি পল্লীর শাসনকর্তা ছিলন। ১৬১৮ খৃষ্টাব্দে পিতার মৃত্যু হইলে চামরাজ উদৈয়ার রাজ্যাভিষিক্ত হয়েন। তিনি দুর্গের জীর্ণ-সংস্কার, রাজ্যবিস্তার ও শ্রীরঙ্গনাথ স্বামীর মন্দিরে উন্নতি করিয়াছিলেন। ১৬৩৮ খৃঃ কান্তিরব-নরাশ রাজা হইয়া দুর্গের অনেক উন্নতি সাধন, নরসিংহ স্বামীর মন্দির নির্মাণ ও প্রতিষ্ঠা এবং নূতন রাজবাটী নিৰ্মাণ করিয়াছিলেন, তাহার পূর্ববর্তী রাজগণ চণ্ডী- উপাসক ছিলেন, কিন্তু তিনি বিষ্ণুমন্ত্রে দীক্ষিত হন। বিজাপুরের আদিলশাহি-বংশীয় সুলতানের সেনানায়ক বঙ্গদুলাল খাঁ শ্রীরঙ্গ- পত্তন আক্রমণ করিতে আইসেন, কিন্তু পরাস্ত হইয়া প্রত্যাবর্তন করেন। নরাশরাজ অপরিসীম সাহসী ছিলেন। তিনি মধ্যগিরি, হা, বেল্পর, উসূর, বেঙ্গলুর প্রভৃতি প্রদেশ কয়েকটি আপন অধিকার ভুক্ত করিয়াছিলেন। কথিত আছে যে, তিনি দ্বন্দ্বযুদ্ধে ত্রিশিরপল্লীর শাসনকর্তাকে পরাভূত করিয়া- ছিলেন। ৪ .
তীর্থদর্শন। ১৬৫৯ খৃঃ দদ্দদেব উদৈয়ার পিতৃপদে অভিষিক্ত হন, ইনিও রাজ্যের অনেক সুবন্দোবস্ত ও উন্নতি করেন। ১৮৭০ খৃঃ চিকদেব উদৈয়ার রাজপদ গ্রহণ করেন, তিনি অতিশয় সাহসী পুরুষ ছিলেন। এক দিবসে নয়টি দুর্গ অধিকার করিয়া এত রত্ন পাইয়াছিলেন যে নবকোটিনারায়ণ নামে খ্যাত হইতেন। তিনি কদুর ও বস্তার নামক স্থান আপন রাজ্যভুক্ত করিয়াছিলেন। ১৬৯০ খৃঃ চিসাগর-নালা নামক জলসেচন- খাত খৰন ও কাবেরীর দক্ষিণ শাখার উপর সেতু নির্মাণ করেন এবং দিল্লীর বাদশাহের নিকট হইতে জগগদেব উপাধি প্রাপ্ত হয়েন, ১৬৯৮ খৃঃ মহারাষ্ট্রীয় বাহিনীনায়ক ঘটকে শ্রীরঙ্গপত্তন অবরােধ করিতে আসিলে দলবায়পুত্র দৈবৈরা তাহাকে পৱা- ভূত করিয়া প্রত্যাবর্তন করিতে বাধ্য করেন। ১৭০৪ খৃঃ তাঁহার মৃত্যু হয়, মধুরাপুরীতে তাঁহার মৃত্যু সম্বন্ধে একটী গল্প আছে । মঙ্গলমার মৃত্যুর পূর্বে দওপরের অনুচরেরা শ্রীরঙ্গপত্তনের কোন এক ব্যক্তিকে ভুলক্রমে যমপুরীতে লইয়া যায়, কিন্তু চিত্রগুপ্তের হিসাবে তাহা প্রকাশ পাইলে দণ্ডথরের আজ্ঞায় সে ব্যক্তিকে শ্রীরঙ্গপত্তনে পুনৰ্ব্বার পাঠাইয়া দেওয়া হয় ; চিক্কদেবরাজ তৎ- কালে যমপুরীতে বাস করিতেছিলেন; তিনি উক্ত ব্যক্তির দ্বারা সংবাদ দেন যে তিনি ধন সঞ্চয় করিয়া একটি নিভৃত কক্ষে রাখিয়া আসিয়াছেন,কোন সৎকার্যে ব্যবহার করেন নাই, সেই নিমিত্ত নরক-যন্ত্রণাভােগ করিতেছেন; অর মধুরাপুরীর মঙ্গলমা সদ্ব্যয় করিয়াছিলেন বলিয়া, তাহার মৃত্যুকাল সন্নিকট হওয়ায় } ' শ্রীরঙ্গপত্তন। তাহাকে সাদরে স্বর্গে লইয়া আসিবার কারণ স্বথের বন্দোবস্ত হইয়াছে ; অতএব আমার হাবা পুত্র ও বিশ্বাসী দলবায়কে কহিবে গুপ্তধন লইয়া আমার উদ্ধারের জন্য ব্যয় করেন, এই- রূপ বলিয়া, মঙ্গলমার মৃত্যুর সময় ও নিভৃত ধনের নিদর্শন বলিয়া দেন। সে ব্যক্তিও মৃত রাজাপালন করিয়া দলবায়কে সমস্ত কহিয়াছিলেন, ও কথিত আছে যে নির্দিষ্ট সময়ে মঙ্গল। মার মৃত্যু হইয়াছিল। চিক্কদেবের পুত্র কান্তির উদৈয়ার হাব। কালা হইলেও দলবায় তঁাহাকে রাজ্যাভিষিক্ত করিয়া তাহার নামে বার বৎসর রাজ্যশাসন করেন। তৎপরে দন্দ-কৃষ্ণ উদৈ- য়ার ১৭১৬ হইতে ১৭৩৩ খৃঃ পর্যন্ত রাজত্ব করেন ; তাহার সময়ে দলবায় দেবরাজ অস রাজ্যের সর্বেসর্বা ছিলেন। ১৭৩৩ হইতে ১৭৩৬ খৃঃ পর্যন্ত চামরাজ উদৈয়ার নামে রাজা ছিলেন, দলবায় দেবরাজ অর্সই পূৰ্ব্বমত সমস্ত রাজকাৰ্য্য করিতেন। অধিকন্তু তিনি রাজার উপর অসস্তুষ্ট হইয়া তাহাকে কারা- রুদ্ধ করিয়া রাখেন, পরে কোপলগ নামক স্থানে অনেক যন্ত্রণা দিয়া নিহত করেন; ও তৎপরে চিক-কৃষ্ণ উদেয়ারকে তৎপদে প্রতিষ্ঠিত করেন ও আপন কনিষ্ঠ নন্দরাজ-অর্সকে সৰ্বাধিকার ( প্রধান সেনাপতির) পদে নিযুক্ত করিয়া উভয়ে রাজকার্য পৰ্যালােচনা করিতে থাকেন। ১৭৫৭ খৃঃ বালার্জী- রাও পেশােয়া শ্রীরঙ্গপত্তন অবরােধ করিয়া দলবয় দেবরাজ- অর্সকে পরাভূত করণানন্তর একটি জেলা কাড়িয়া লইয়া- ছিলেন।
৪ ০ তীর্থদর্শন। ১৭৬১খৃঃ, সৰ্বাধিকার নন্দরাজঅর্স দিলিগুল ও দেবনহল্লী দুর্গদ্বয় হিমুর রাজ্যভুক্ত করিয়াছিলেন। ইহার পর হাইদার- আলিখা বাহাদুরের সহিত তাহার মনান্তর উপস্থিত হইয়াছিল। হাইদার আলি কোলার নামক স্থানে মেষপালকের কার্য্য করিতেন, পরে সে কাৰ্য, ত্যাগ করিয়া, সৰ্বাধিকার নন্দরাজ- অর্সের অধীনে সামান্য অশ্বারােহীর কার্যে নিযুক্ত হয়েন। দেবনহল্লী দখলের সময় হাইদার-আলি আপন ক্ষমতা ও বীরত্ব প্রকাশ করিলে ক্রমে অশ্বারােহীর দলপতির পদ প্রাপ্ত হয়েন, পরে অপর কয়েকটি দুর্গ অধিকার করিলে বেঙ্গলুর প্রদেশ জায়গীর স্বরূপ প্রাপ্ত হইয়া তথাকার দুর্গ সংস্কার করিয়া আপন ক্ষমতা দৃঢ়ীভূত করিতে আরম্ভ করিলে, সৰ্বাধিকার নন্দ- রাজ ও মন্ত্রী খাণ্ডেরাওর বিষনয়নে পতিত হন। তঁাহারা তাহার নিধনের ষড়যন্ত্র করিয়া গুপ্তচর পাঠাইলে হাইদার-আলি তাহা জানিতে পারিয়া, গােপন শ্রীরঙ্গপত্তন হইতে বাহির হইয়া ছদ্মবেশে পথ অতিবাহিত করিয়া বেঙ্গলুরের দুর্গে আশ্রয় গ্রহণ করেন। তৎপরে আপন অধীনস্থ সমস্ত পদাতি ও অশ্বারােহী সেন এক করিয়া মন্ত্রী বালাজীরাও ও জলবায় দেবরাজ- অর্সের বিরুদ্ধে যাত্রা করেন, শ্রীরঙ্গপত্তন অবরােধ করিয়া তাহাদের উভয়কে বন্দী করেন। বৃদ্ধ চিক্ক-কৃষ্ণ উদৈয়ারকে নজরৰন্দী করিয়া তাহার নামে রাজ্যশাসন করিতে লাগিলেন। এই ঘটনা হইয়াছিল। ১৭৬৬ খৃঃ বৃদ্ধ রাজার মৃত্যু হইলে, হাইদার-আলি রাজ- ১৭৬১ খৃঃ শ্রীরঙ্গপত্তন। ৪১ কুমার নন্দ উদৈয়ারকে রাজপদে প্রতিষ্ঠিত করিয়া পিতার ন্যায় নজরবন্দীতে রাখেন। এই অদূরদর্শী বন্দীরাঙ্গা, কোন দুষ্ট লােকের পরামর্শে হাইদার-আলির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করিতে প্রবৃত্ত হইলে হাইদার-আলি তাহা অবগত হইয়া বন্দী রাজাকে নিহত করিয়া, তাহার ভ্রাতা চামরাজ উদৈয়ারকে ১৭৯১ খৃঃ তৎপদে অভিষিক্ত করেন। ইহার অব্যবহিত পরেই মহারাষ্ট্রীয় সেনানায়ক তিস্বরাও-মন্নর মহিসুর প্রদেশ আক্রমণ করিয়া- ছিল। শ্রীরঙ্গপত্তনের ১২ মাইল দূরে চির্কলি নামক স্থানে হাইদার-আলিকে পরাভূত করিয়া শ্রীরঙ্গপত্তন অবরােধ করিলে, হাইদার-আলি তাহাকে বহুসংখ্যক নগদটাকা ও রাজ্যের কিয়- দংশ ছাড়িয়া দিতে বাধ্য হইয়াছিল। ১৭৭৫ খৃঃ উক্ত চাম- রাজের মৃত্যু হয় ; তাহার কোন সন্তানাদি না থাকায় হাইদার- আলি সমস্ত রাজবংশীয় বালকদিগকে দরবার গৃহে একত্র করিয়াছিলেন, পূৰ্বেই সেই গৃহে নানাবিধ খাদ্যসামগ্রী ফল, মূল, খেলনা ও অস্ত্রশস্ত্র রাখিয়াছিলেন ;•ৰালকদিগকে তথায় ছাড়িয়া দিয়া তাহারা কি করে তাহা আপনি দেখিতে লাগি- লেন। দেখিলেন তন্মধ্যে অধিকাংশ ৰালকই মিষ্টান্ন খাইতে লাগিল, কতকগুলি লক খেলনা লইয়া খেলা করিতে লাগিল, কেবল চামনামে একটি বালক দক্ষিণহস্তে একখানি উজ্জ্বল তরবারি লইয়া এবং বামহন্তে একটি লেবু উঠাইয়া লইয়া দেখিতে থাকিলে হাইকার-আলি ঐ বালককে রাজোপযুক্ত বিবেচনা করিয়া তাহাকে রাজ্যাভিষিক্ত করিলেন ।
82 তীর্থদর্শন। ১৭৮ খৃঃ হাইদার-আলি কাঞ্চীপুরের নিকট কর্ণেল বেলি সাহেবকে আক্রমণ করিয়াছিলেন ; বেলি সাহেব অনেকক্ষণ যুদ্ধের পর পরাস্ত হইয়া, ২৪ জন ইংরেজ অফিসার ও ৪১৭ জন গােরা সৈন্যের সহিত বন্দীরূপে শ্রীরঙ্গপত্তনে নীত হয়েন। পরে ১৭৮৪ খৃঃ সন্ধিতে তাহারা মুক্তি পাইয়াছিলেন। হাইদার-আলি পৃষ্ঠব্ৰণে অনেক দিন কষ্ট পাইতেছিলেন। ১৭৮২ খৃঃ ডিসেম্বর মাসে ৮০ বৎসর বয়সে তাহার মৃত্যু হইলে তাহার প্রথম পুত্র টিপু সুলতান্ তাহার পদে অভিষিক্ত হয়েন। ১৭৪০ খৃঃ দেবনহল্লী নগরে টিপু জন্মগ্রহণ করেন। অরু- কদু নিবাসী টিপু আলিয়ার নামক কোন সিদ্ধপুরুষের নাম হইতে হাইদার-আলি আপন পুত্রের নাম টিপু রাখিয়াছিলেন। টিপুর স্বভাব অতি ক্রুর ছিল, “রাজ্যাভিষিক্ত হইবার পরই চামরাজ উদৈয়ারকে কারারুদ্ধ করিয়া রাখেন এবং তাহার প্রতি অযথা অত্যাচার করিতে ত্রুটি করেন নাই। টিপু সুলতান শ্রীরঙ্গপত্তন দুর্গের পুনঃসংস্কার করেন। তৃতীয় র্যামপার্ট দেওয়াটী প্রস্তুত হইলে চতুর্থ র্যামপার্ট দেওয়াল প্রস্তুত করিয়া দুর্গের চারিদিকে কামান বসান; তৎ- পরে মহিমুর রাজবাটী ভাঙ্গিয়া সেই মাল মসলাতে শ্রীরঙ্গপত্তনে আপন রাজবাটী নিৰ্মাণ করিয়াছিলেন। ১৭৮২ খৃঃ ১৭ ফেব্রুয়ারী তারিখে কোলরুণতীরস্থ পান্ত- ললারে কর্ণেল ভেট ওয়েটের সৈন্যকে আক্রমণ করিয়া পরাভূত করেন ও শ্রীরঙ্গপত্তনের দুর্গে বন্দী করিয়া রাখেন। ৫) শ্রীরঙ্গপত্তন। ৪৩ ১৭৮৪ খৃঃ নানা কারণ বশতঃ তিনি ইংরাজদিগের সহিত সন্ধি করিতে বাধ্য হয়েন, উহা মাঙ্গলাের-সন্ধি বলিয়া খ্যাত এবং সেই সন্ধিতে সমস্ত ইংরাজসেনা ও কর্মচারী মুক্ত হইয়াছিল। ১৭৯২ খৃঃ লর্ড কর্ণওয়ালিশ সসৈন্যে আসিয়া শ্রীরঙ্গপত্তন আক্রমণ করিয়াছিলেন। ৫ই ফেব্রুয়ারী তারিখে ইংরাজবাহিনী, এখানে আসিয়া উপস্থিত হয় এবং ৭ই তারিখের যুদ্ধে টিপু পরাজিত হয় ; ঐ তারিখে সন্ধ্যার সময় ইংরাজসেনা ৭২টী তােপের সহিত গঞ্জাম সহর দখল করিয়া লইলে ৮ই তারিখে টিপুসুলতান আপন সৈন্য সমস্ত দুর্গের ভিতর আনয়ন করেন এবং সতর্কের সহিত দুর্গ রক্ষা করিতে থাকেন। ২৪শে তারিখে বেগতিক দেখিয়া টিপু সন্ধির প্রার্থনা করিয়া পাঠান; সেই সন্ধিতে তিনি ইংরাজরাজকে তিন ক্রোর ত্রিশলক্ষ টাকা ও অর্ধেক রাজ্য দিতে বাধ্য হয়েন। ২৬শে তারিখে সন্ধিপূরণের জামীন স্বরূপ আপন দুই পুত্রকে লর্ড কর্ণওয়ালিশ সাহেবের নিকট পাঠাইতে বাধ্য হইয়াছিলেন। পুত্র দুইটীর মধ্যে বউটীর নাম আব্দুল খলিফ বয়স দশ বৎসর, ছােটটীর নাম মৈজুদ্দীন বয়স ৮ বৎসর। সুলতানের পুত্রদ্বয় ইংরাজরাজ প্রতিনিধির তাবুতে পৌছিলে লড় কর্ণ- ওয়ালিশ তাহাদিগকে সমাদরের সহিত গ্রহণ করিয়া আপনার পার্শ্বে স্থান দিয়া বসাইয়াছিলেন, তৎপরে টিপু সুলতানের উকীল গােলাম আলিসাহেব লর্ড কর্ণওয়ালিশের সম্মুখে করযােড়ে কহিলেন; মহারাজ! এই দুইটী বালক আমার প্রভু সুলতান ।
৪৪ তীর্থদর্শন। সাহেবের সন্তান। অদ্য প্রাতঃকাল পর্যন্ত পিতৃষত্নে পালিত হইতেছিল, এখন তাহাদের অবস্থা পরিবর্তন হইয়াছে ; উহারা এখন হইতে আপনাকে পিতা বলিয়া জানিবে। লড’ কর্ণওয়া- লিশ উক্ত সুলতান-পুত্রদ্বয়কে রাজোচিত সম্মান প্রদর্শন করি- ছিলেন। প্রথমে তাহাদিগকে উত্তর অরুকদুর অন্তর্গত বেল্প- রের দুর্গে প্রেরণ করেন, পরে কলিকাতা রাজধানিস্থ টালিগঞ্জ নামক স্থানে তাহাদের বাস নির্দিষ্ট করিয়া দেন ; তাহাদের বংশধরের অদ্যাপি বর্তমান আছেন ও নবাব নামে খ্যাত হইতেছেন। এই সন্ধির পর হইতে ১৭৯৯ খৃঃ পর্যন্ত সুলতান, আপন ক্ষতিপূরণের যথেষ্ট চেষ্টা করিয়াছিলেন। য়ুরােপে ফরাসী বিপ্লব উপস্থিত হওয়ায় নেপােলিয়ন বােনাপাটী য়ুরােপে তুমূল হুলস্থূল বাধাইয়া দেন। কুক্ষণে ইংরেজরাজের অজ্ঞাতে টিপু তাহার নিকট আপন বাহিনী সুশিক্ষার কারণ ফরাসী রণসচিব চাহিয়া পাঠাইয়াছিলেন। কোর্ট অব্ ডাইরেক্ট এই সংবাদ অবগত হইয়া সন্ধিচুত করেন, টিপুসুলতানের বিরুদ্ধে গবর্নর জেনারেলকে যুদ্ধযাত্রা ঘোষণা করিতে আদেশপত্র পাঠান। গবর্নর জেনারেল কোর্ট অব্ ডাইরেক্টরদিগের অনুমতিপত্র প্রাপ্ত হইবা মাত্র, জেনারেল হেরিশ সাহেবকে টিপুর বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্ৰা করিতে আদেশ দেন। জেনারেল হেরিশ ইতিপূৰ্বে ৬ই মার্চ তারিখে বেলুর হইতে রওনা হইয়াছিলেন। ২৬শে মার্চ তারিখে টিপুসুলতান শ্রীরঙ্গপত্তন। ৪৫ মল্লির নিকট জেনারেল হেরিশের গতিরােধ করিবার চেষ্টা করেন, এইখানে এক তুমুল সংগ্রাম হইয়া যায়, তাহাতে টিপুর অনেকগুলি দক্ষ ও সাহসী সর্দার নিহত হইয়াছিল। টিপু সুলতান পরাজিত হইয়া আপন রাজধানী অভিমুখে পলায়ন করেন। ৩০শে মার্চ তারিখে জেনারেল হেরিশ কাবেরী পার হইয়া শ্রীরঙ্গপত্তনের দক্ষিণ ভাগে স-সিলী নামক স্থানে ছাউনি স্থাপন করেন ৫ই এপ্রেল রাত্রে কর্ণেল ওয়েলেলি সুলতান- পেট আক্রমণ করেন ও ৬ই তারিখে দুর্গের উপর কামান ছুড়িতে থাকেন। ৯ই এপ্রেল তারিখে টিপুসুলতান জেনারেল হেরিশকে এই মর্মে পত্র লিখেন যে, তিনি সন্ধিস্থাপন করিতে প্রস্তুত আছেন। ২০শে এপ্রেল তারিখে জেনারেল হেরিশ বঙ্গার দিদ্দীলি নালার সন্নিকটস্থ থাকার অধিকার করেন। ২৪শে এপ্ৰেল জেনারেল হেরিশ টিপুসুলতানকে সন্ধি প্রস্তাবের খসড়া পাঠাইয়া ২৪ ঘণ্টার মধ্যে উক্ত খসড়ার প্রত্যুত্তর চাহিলেন, কিন্তু ঠিক সময়ে প্রত্যুত্তর না আসিলে, ২৬শে তারিখে বঙ্গার দিদিলা নালার উত্তরদিকের প্রকার অধিকার করিয়া লয়েন। ২৮শে তারিখে টিপুসুলতান জেনারেল হেরিশকে পুনরায় এই লিখেন যে তিনি সন্ধিস্থাপনের কারণ দুইজন উকীল পাঠাইবেন। ৪ঠা মে তারিখে বেলা ১২ বারটার সময়ে মেজর জেনারেল বেয়ার্ড প্রথমে শ্রীরঙ্গপত্তনের কেল্লা আক্রমণ করেন, এই সময়ে ৪৬ তীর্থদর্শন। গােলন্দাজ সৈন্যাধ্যক্ষ সৈয়দ আবদুল গফুর আট হাজার গোল- দাজ সেমা লইয়া দুর্গ রক্ষা করিতে ছিলেন, এমন সময়ে হঠাৎ একটা গুলির আঘাতে তিনি নিহত হইলে, সুলতানের সমস্ত সেনা ভয়ে ছোড় ভঙ্গ হইয়া পড়ে। সুলতান আহার করিতে যাইতেছিলেন, এমন সময় তাহার নিকট এই কুসংবাদ পৌছিলে অতি সত্বর আহার সমাধা করিয়া স্বয়ং যুদ্ধার্থে বাহির হইয়া রাজবাটীর পূৰ্ব্বদিকে হােলিদিদিলী নামক ছােট দরজা দিয়া বাহির হইয়া র্যামপাটের উপর দিয়া অগ্রসর হইতে থাকিলেন। কিন্তু গােল দ্বারা ভগ্ন দেওয়ালের (রামপার্টনিকট) পৌছিয়া দেখিলেন, তাহার সমস্ত সৈন্য হটিয়া আসিতেছে, তখন সে অবস্থায় ইংরেজদিগকে বাধ্য দিবার চেষ্টা নিষ্ফল হইবে মনে করিয়া ভিতরের র্যামপাটে গিয়া তথা হইতে ইংরেজদিগকে বাধা দিবার অভিপ্রায়ে প্রত্যাবৃত্ত হইলেন। কিন্তু পূর্বোক্ত দরজার নিকট আসিয়া দেখেন দরজা ভিতর হইতে বন্ধ। এদিকে যখন সৈয়দ আবদুল গফুরের মৃত্যু হয়, তখন জেনারেল বেয়ার্ড আপন সৈন্যদিগকে দুই দলে বিভক্ত করিয়া একদল দক্ষিণদিকে আর এক দল বামদিকের রামপাটে পাঠান। টিপুসুলতান বামদিকের দেওয়াল হইয়া আসিতে- ছিলেন, তথায় ইংরেজসৈন্য দেখিয়া ফিরিয়া আসিলেন। দক্ষিণ দিক দিয় যে সকল ইংরেজসৈন্ত আসিয়াছিল, তাহারা আসিতে আসিতে দেখিতে পাইল বাহিরের রামপাট হইতে ভিতরের র্যামপাটে আসিবার জন্য একখানি তক্তা লাগান শ্রীরঙ্গপত্তন। ৪৭ আছে, তাহার সাহায্যে •একটা একটী করিয়া সকল সৈন্য ভিতর র্যামপার্টে আসিতে লাগিল। টিপু যে সময়ে দরজার নিকট আসিয়া পৌছেন তৎকালে দক্ষিণ দিকস্থ ইংরেজসেনা সেই দরজার রামপার্টের নিকট পৌছিয়াছিল। সুতরাং টিপু- সুলতান সম্মুখে ও পশ্চাতে ইংরেজসেনা দ্বারা বেষ্টিত হইয়া সামান্য সৈনিকের ন্যায় যুদ্ধ করিতে করিতে কালের করাল- কবলে পতিত হয়েন। তাহার অন্যান্য সৈনিকেরা আলামসজি- দের ভিতর যাইয়া আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছিল, জেনারেল বেয়াড তাহাদের পশ্চাৎ পচাৎ যাইয়া মসজিদের ভিতর প্রবেশ করিয়া তাহাদিগকে সমূলে বিনাশ করেন এবং তৎপরে মেজর এলেন দ্বারা রাজটীতে সংবাদ পাঠান যে, যদি সকল রাজপরিবার তাহার বশে আসেন, তবে তাহাদের জীবন রক্ষা হইবে। সেই সংবাদে রাজবাটীর সুলতান পরিবারের। তাঁহার বশে আসিলে টিপুসুলতানকে পাওয়’গেলনা, তখন চারিদিকে অন্বেষণ হইতে লাগিল। কিয়ৎক্ষণ পরে পূর্বোক্ত হােলিদিদিলী বালু দ্বারের নিকট অন্যান্য মৃত সৈন্যদিগের মধ্যে সুলতান সাহেবের মৃত দেহ পাওয়া গিয়াছিল। তখন জেনারেল বেয়াড় সুলতানের মৃতদেহ রাজভবনে প্রেরণ করেন। পর দিবস প্রাতে সমারােহের সহিত লালবাগ নামক স্থানে সুলতানের সমাধি হইয়াছিল । ১৭৮৪ খৃঃ, টিপু উক্তনালবাগ নিৰ্মাণ করিয়াছিলেন; পিতা, মাতা ও আপনি নিজে তথায় চিরনিদ্রার নিদ্রিত রহিয়াছেন।
৪৮
তীর্থদর্শন।
০
এই জেনারেল বেয়ার্ড ১৭৮০ খৃঃ টিপু কর্তৃক পরাজিত
হইয়া অন্যান্য ইংরেজ সৈনিকদিগের সহিত শ্রীরঙ্গপত্তনের
দুর্গের ভিতরে চারি বৎসর বন্দীরূপে ছিলেন ; এক্ষণে লােকে
দেখান, যে স্থানে টিপুসুলতান সমরে পতিত হইয়াছিলেন,
তথা হইতে এক হাজর ফুটের মধ্যে বেয়াড সাহেবের কারাগৃহ
ছিল। টিপু সুলতানের মৃত্যুর পর মেজার এলেন রাজপুরী
হইতে টিপুর পুত্রদিগকে জেনারেল সাহেবের নিকট আনয়ন
করিলে, জেনারেল সাহেব আপন পূর্ব অবস্থা বিস্মৃত হইয়া মহৎ
লোকের মত রাজপুত্রদিগকে আদরের সহিত গ্রহণ করেন ও
তাহাদের অভয় দিয়া কহেন যে, কেহ তাহাদিগের উপর
অত্যাচার করিবে না। তৎপরে রাজপুত্রদিগকে হেডকোয়া-
টার ক্যাম্পে লইয়া যাইবার জন্য কর্মচারী নিযুক্ত করিয়া দেন,
আর যৎকালে তঁাহারা ইংরেজ সৈন্য পরিবেষ্ঠিত হইয়া তাবুতে
যাইতেছিলেন, তৎকালে ইংরেজবাহিনী সম্মান চিনুস্বরূপ অস্ত্র
বাড়াইয়াছিল।
১৭৯৫ খৃঃ বন্দী বৃদ্ধ চামরাজ উদেয়ারের বসন্তরােগে মৃত্যু
হইলে, টিপু সুলতান রাজবাটী লুট করিয়া সমস্ত রাণীদিগকে
বন্দী করিয়া রাখেন। টিপু সুলতান জানিত না যে রাণীদিগের
নিকট একটী দুই বৎসরের শিশু জীবিত ছিল, টিপুসুলতান
তাহা জানিতে পারিলে অবশ্যই তাহাকে বধ করিয়া ফেলিত।
মন্ত্রির পুণিয়ার সাহায্যে বিধবা রাণী ' রাজপুত্রকে লুকাইয়া
রাখিতে সমর্থ হইয়াছিল। টিপু সুলতানের মৃত্যুকাল পর্যন্ত
শ্রীরঙ্গপত্তন। ৪৯ বরণ করেন। সেই ৰালক রাণীদিগের নিকট গুপ্তভাবে বন্দী অবস্থায় ছিল ; টিপুর মৃত্যুর পরদিবস পূর্ণিয়া উক্ত রাজপুত্রকে লইয়া জেনারেল হেরিশের তাবুতে উপস্থিত হয়েন, ও সেই রাজপুত্রই যে হিন্দু- রাজ্যের একমাত্র উত্তরাধিকারী এই বলিয়া পরিচয় দেন। জেনারেল হেরিশ ও তাহার কথায় বিশ্বাস করিয়া, সেই. রাজকুমারকে রাজপদে অভিষিক্ত করেন ও পূর্ণিয়াকে মন্ত্রিত্বে এই মন্ত্রী পূর্ণিয়া হইতে মহিসুর-হিন্দুরাজ- বংশের পুনরুদ্ধার বলিতে হইবেক। এই রাজার নামহারাজ কৃষ্ণরায়ালু উদেয়ার বাহাদুর। পূর্ণিয়া শ্রীরঙ্গপত্তন হইতে রাজ- ধানী মহিসুরে উঠাইয়া লইয়া যান এবং টিপুসুলতানের রাজ- বাটী ধ্বংস করিয়া সেই মাল মসলাতে মহিসুররাজ কৃষ্ণরায়ালু উদেয়ার বাহাদুরের রাজবাটী নির্মাণ করেন। ১৮১০ খৃঃ উক্ত মহারাজ সাবালক হইয়া স্বয়ং রাজ্যশাসন করিতে প্রবৃত্ত হইলেন। পূর্ণিয় অবসর গ্রহণ করিয়া জীবনের অবশিষ্ট দিন শ্রীরঙ্গপত্তনে অতিবাহিত করিয়াছিলেন। তাঁহার দশ বৎসর মন্ত্রিত্বকালে রাজ্যের অনেক উন্নতি হইয়াছিল। তিনি যে এক অসাধারণ গুণসম্পন্ন উদ্যমশীল রাজপুরুষ ছিলেন, তাহার সন্দেহ নাই। এখন যে মহিসুররাজ্য সুখসমৃদ্ধিশালী হইয়াছে, তাহাকেই ইহার মূলাধার বলিতে হইবেক। হইতে ১৭৯৯ খৃঃ পর্যন্ত হাইদার-আলি ও তাহার পুত্র টিপুসুলতান মহিসুরে রাজত্ব করিয়াছিলেন। শ্রীরঙ্গপত্তনের পুরাবৃত্ত ইংরাজী অনভিজ্ঞ পাঠকদিগের ১৭৬১
তীর্থদর্শন।
জন্য দেওয়া হইল। অতঃপর আমরা যাহা যাহা দেখিয়াছি
তাহার বিবরণ সংক্ষেপে লিখিতেছি।
১ম। টিপুসুলতানের বৃহৎ রাজবাটীর দালানের ভগ্নাবশিষ্ট
একাংশ মাত্র রহিয়াছে ; উহার খিলান সকল গাঁথাইয়া, উহা
এক্ষণে চন্দনকাঠের গুদামরূপে পরিণত হইয়াছে।
২য়। হােলিদিদ্দিলী বালু নামক গুপ্তদ্বারের নিকট
যাইলাম। এইস্থানে টিপুসুলতান যুদ্ধ করিতে করিতে কালের
করালকলে পতিত হইয়াছিলেন। ইহার নিকট গঙ্গাধর
স্বামীর মন্দির। এই মন্দিরের ব্যয়-কারণ মহিপুর-রাজসরকার
হইতে বাৎসরিক দুই হাজার ছাব্বিশ টাকা নির্দিষ্ট আছে।
এই মন্দিরের নিকট ভূতপূর্ব রাজা একটি ছােট প্রাসাদ
নিৰ্মাণ করিয়াছিলেন ।
৩য়। এখান হইতে ‘আলা মসজিদ দেখিতে যাই। ইহা
গঞ্জমগেটের নিকট টিপু কর্তৃক নির্মিত হইয়াছিল, পূৰ্বে এই
স্থানে আঞ্জনেয়দেবের মন্দির ছিল।
যৎকালে হাইদার-আলি, প্রধান সৈনিক নন্দরাজ আর্সের
ষড়যন্ত্র হইতে রক্ষা পাইবার নিমিত্ত
বেঙ্গলুরে পলায়ন করেন ;
সেই সময়ে নন্দরাজ আর্স টিপু এবং তাহার মাতাকে এইস্থানে
নজরবন্দী করিয়া রাখেন। তখন টিপু সাত বৎসরের বালক
মাত্র। টিপু হিন্দুৰালকদিগের সহিত ঐ দেবালয়ের অঙ্গনে
খেলা করিত। এক দিবস কোন এক ফকির সেই পথ দিয়া
যাইতে যাইতে টিপুকে দেখিয়া চমকিয়া দাঁড়াইয়া সম্বােধন
শ্রীরঙ্গপত্তন। মত, করিয়া কহিল ; যখন তুমি এই দেশের রাজা হইবে, এই হিন্দু- দেবালয় ভাঙ্গিয়া উহার উপর মজিদ নির্মাণ করিকে, তাহা হইলে ঐ কীৰ্ত্তি তােমার স্মরণ চিহ্নস্বরূপ থাকিবে ও ভবিষ্যতে সকলেই তােমার সম্মান করিবে । টিপু তৎশ্রবণে হাসিতে হাসিতে সেই ফকিরকে কহিয়াছিল আপনার আশীর্বাদে যদি রাজা হইতে পারি, তবে আপনার আদেশ অবশ্য পালন করিব। বলা বাহুল্য, টিপু রাজা হইলে উক্ত হিন্দুদেবালয় ধ্বংস করিয়া তদুপরি উক্ত ‘আলা’মসজিদ নির্মাণ করেন। ১৯০ খৃঃ ইহার নিৰ্ম্মাণকার্য শেষ হয়। ইহার গঠন প্রণালী অতি উত্তম। দিল্লীর জুম্বা মসজিদের উৎকৃষ্ট না হইলেও দৈখিবার যােগ্য বটে। জুম্বা মজিদ শুৰ মাৰ্ব্বলে নির্মিত এবং আলা মসজিদ হিন্দুদেবালয়ের ধ্বংসাবশিষ্ট মালমসলায় নির্মিত হইয়াছে। মজিদের দেওয়া লের পঙ্কের কাজ অতি উত্তম। আমরা উহা দেখিতে দেখিতে ভাবিয়াছিলাম কোথায় বা সেই আঞ্জনে দেবের হিন্দুমন্দির, আর কোথায় বা সেই রঙ্গপত্তনের, টিপুসুলতান। এই মজিদ উক্ত স্মৃতি জাগরূক করিয়া দিতেছে ; ইহাও একদিন কালের বশে ধ্বংশ হইবে। এই সংসার সৰ্ব্বদাই পরিবর্তনশীল। পরম প্রভু পরমেশ্বরের নাম করিতে করিতে তথা হইতে প্রত্যাবৃত্ত হইয়া গঞ্জম অভিমুখে অগ্রসর হইলাম। ৪র্থ। গঞ্জম শ্রীরঙ্গপত্তন দুর্গ হইতে ৩ মাইল দূরে অবস্থিত। এইস্থান পূর্বে টিপুর সময়ে সমৃদ্ধিশালী সহর ছিল, এবং অন্ততঃ তীর্থদর্শন। ত্রিশ হাজার লোক বাস করিত। কিন্তু এক্ষণে ইহা একটা পল্লীতে পরিণত হইয়া রহিয়াছে। বােধহয় দুইহাজার লােকের বাসের অধিক নাই। আমরা তথা হইতে লালবাগ নামক বাগানে হাইদার আলি তৎপত্নী, ও তাহার পুত্র টিপুসুলতানের সমাধি দেখিতে যাইলাম। এই মসজিদ ১৭৮৪ খৃঃ নির্মিত হইয়া- ছিল। ইহা প্রকাণ্ড সমচতুৰ্ব্বাহুবিশিষ্ট জমকালো সেরাসনিক অনুকরণে নির্মিত ; ইহার থাম সকল সিমার অন্তর্গত তরু- বেকেরে কাল প্রন্তরে নির্মিত। উপরের ডােম ও চূড়ার গঠন অতি উত্তম। ইহার দরজা চন্দনকাছে নির্মিত এবং তাহার উপর হস্তিদন্তের সুচারু কাৰ্য্য বিদ্যমান রহিয়াছে। ১৮৫৫ খৃঃ লড ডেলহাউস ইহা দেখিতে আসেন, তখন দরজার অবস্থা বড় ভাল ছিল না; তাহার অনুমতিক্রমে পূৰ্ব্ববৎ নূতন দরজা প্রস্তুত হইয়াছে। মেও সােলিয়মের সন্নিকটে নেমাজ পড়িবার মসজি আছে ও অপরদিকে ফকিরদিগের থাকিবার আশ্রম আছে। প্রত্যহ হিন্দু মুসলমান গরীব, আগন্তুক সমভাবে অর্ধসের আটা পাইয়া থাকে, দূর হইতে ফকির বা হিন্দুভিক্ষার্থী আসিলে দুই আনা হিসাবে দেওয়া হয়। ইহার ব্যয় নির্বাহাৰ্থ মহিসুররাজ হইতে মাসিক সাতশত টাকা নির্দিষ্ট আছে। ইহার উদ্যান প্রশস্ত, উত্তম্ উত্তম ফল ও ফুল বৃক্ষে সুশােভিত, রাস্তাও বেশ পরিষ্কৃত ও পরিচ্ছন্ন। ৫ম। আমরা তথা হইতে বেলি সাহেবের সমাধি দেখিতে যাইলাম। ইহা মেওসেলিয়ুমের বাহিরের সন্নিকটে একটি শ্রীরঙ্গপত্তন। সামান্য প্রাঙ্গণ মধ্যে অবস্থিত। ১৭৮০ খৃঃ জানুয়ারী মাসে বেলি সাহেব শ্রীরঙ্গপত্তনে আসিয়া পোঁছেন। ১৭৮২ খৃঃ ১৩ই নবেম্বর তারিখে বন্দী অবস্থাতেই মানবলীলা সম্বরণ করিয়াছিলেন, সম্ভবতঃ এই স্তম্ভ তাহার সমাধির উপরই প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে। যখন তাহার ভ্রাতষ্পত্র কর্ণেল বেলি লক্ষৌসহরের রেসিডেন্ট ছিলেন, তৎকালে তাহারই ব্যয়ে ইহা নির্মিত হইয়াছিল। ৬। আমরা প্রত্যাবৃত্ত হইয়া দরিয়া-লৌলৎ বাগ নামক টিপুর প্রমােদোদ্যান দেখিতে যাইলাম। ইহা দুর্গের বহির্ভাগে মহানবমী মণ্ডপের উপর ১৭৮৪ খৃঃ টিপু কর্তৃক নির্মিত হইয়া- ছিল। তিনি ইহাতে গ্রীষ্মকালে বাস করিতেন বলিয়া ইহা গ্রীষ্মভবন নামে প্রসিদ্ধ হইতেছে। ইহার তিন দেওয়ালে কর্ণেল বেলির সহিত পল্লীলােরে হাইদার আলির ও টিপুর যুদ্ধের চিত্র আছে। টিপুর মৃত্যুর পর কর্ণেল ওয়েলেসলি এই বাটীতে দুই বৎসর কাল বাস করিয়াছিলেন। ইহার উদ্যান প্রশস্ত ও নানাবিধ ফলফুলে সুশােভিত। লড’ ডেলহাউসের অনুমতিক্রমে এই প্রমােদ ভবনের পুনঃ সংস্কার হইয়া গিয়াছে। এই উদ্যানের পার্শ্বে কাবেরী নদী বহিতেছে। সম্প্রতি মহিসুর- রাজের ব্যয়ে বাগানবাটী হইতে কাবেরীনদী পর্যন্ত একটী ঘাট প্রস্তুত হইয়াছে। ৭ম। আমরা তথা হইতে দুর্গের ভিতর ফিরিয়া আসিতে আসিতে দেখিলাম, বিজয়নগরের রাজা ও মহিসুররাজদিগের বাসভবনের ভগ্ন চিহ্ন সকল রহিয়াছে। নরসিংহ স্বামীর ৫৪ তীর্থদর্শন। t মন্দির বাহির হইতে দেখিলাম, সময়াভাবে ভিতরে প্রবেশ করিতে পারি নাই। ইহা ১৬৩৮ খৃঃ হইতে ১৬৫৯ খৃঃ মধ্যে কান্তির নরশ কর্তৃক নির্মিত ও প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল। মন্দি- রের বাৎসরিক ব্যয় কারণ ১৭৩৯ টাকা নির্দিষ্ট আছে। ৮ম। দুর্গের উত্তর দেওয়ালে কৃষ্ণদিদী নামে যে দরজা আছে, তাহার নিকটে জমীর ভিতর কয়েকটী খিলান ঘর আমরা দেখিতে গিয়াছিলাম। এই দেওয়ালে কয়েকটী গৰ্ত্ত অছে। বন্দী ইংরেজ সৈন্যদিগের মধ্যে অধিকাংশই ঐ ঘরের ভিতরে শৃঙ্খলবদ্ধ হইয়া থাকিত। মৃত্তিকার ভিতরেও ঐরূপ এ কয়েকটী খিলান ঘর ছিল ; সেখানে ইংরেজ কয়েদীদিগকে বন্ধন করিয়া রাখা হইত। ৯ম। আমরা সৰ্বশেষে শ্রীরঙ্গনাথ স্বামীর মন্দিরে যাই। পূৰ্বেই বলিয়াছি অতি পুরাকালে এই মন্দিরের মূলপত্তন হইয়াছিল। ক্রমে ক্রমে আকার বৃদ্ধি পাইয়া উহা প্রস্তর নির্মিত মুদৃঢ় উচ্চ দেওয়াল দ্বারা রক্ষিত হইতেছে। সম্মুখের দরজায় বৃহৎ গােপুর, গোপুরের চূড়ায় ৫ পাঁচ পিত্তলের কলসীর নিকট নৃসিংহমূৰ্ত্তি বিরাজ করিতেছেন। মূলস্থানে আদি শেষ- নাগের উপর একপার্শ্বে শয়ন অবস্থায় প্রকাণ্ড বিষ্ণুমূর্তি বিরাজ- মান। অবশ্য উহা একখণ্ড প্রস্তর হইতে কাটা; ইহা পুরাতন বলিয়া বোধ হয় না। সম্ভবতঃ উহা পুরাতন মূর্তির উপর স্থাপিত হইয়া থাকিবে। আমরা যথারীতি ষ্টৈাত্তর শত নাম দ্বারা এবং পরাহিত মন্ত্রপাঠে আরতি অন্তে কপূরলোকে মহা- ।
শ্রীরঙ্গপতন। বিষ্ণুর মূর্তি দর্শন করিলাম। মন্দিরের সম্মুখে উৎসবমণ্ডপ, এই দেবালয়ের ব্যয়-কারণ, মহিসুররাজসরকার হইতে বাৎসরিক সাত হাজার একশত আশি টাকা নির্দিষ্ট আছে। এই দেবালয়ে পৌষমাসে শুক্ল সপ্তমীতে রথোৎসব হইয়া থাকে, সেই রাত্রে গজেন্দ্র মােক্ষপণাৎসব হয়। কার্তিকী বা তুলা অমাবস্যায় কাবেরী স্নান উৎসব হইয়া থাকে, সেই দিবসে বহু লােক কাবেরীতে স্নান করিয়া শ্রীরঙ্গ- নাথ স্বামী দর্শন করিয়া থাকেন। কার্তিকী পূর্ণিমায় বৃন্দাবনােৎসব হইয়া থাকে, এবং সেই সময় শ্রীরঙ্গনাথ স্বামীর ভােগমূর্তি বাহক স্কন্ধে রাত্রিকালে সহর পরিদর্শন করেন। ১০। শ্রীরঙ্গনাথ স্বামীর মন্দির হইতে আসিতে আসিতে দি-হােলিল্যাণ্ডের খিলান দেখি। কাপ্তেন দি-হােলিল্যাণ্ড ১৮০৮ হইতে ১৮১০ খৃঃ পৰ্যন্ত শ্রীরঙ্গপত্তনে ছিলেন। মন্ত্রির পূর্ণিয়ার আদেশে এই খিলান তৈয়ার হয়। উহা দীর্ঘে ১১২ ফুট, প্রস্থে ৪ ফুট, মধ্যের গভীরতা ৫ ফুট এবং উর্দ্ধে ১১ ফুট ১১ ইঞ্চি। কাবেরী নদীতে সেতু নির্মাণের কল্পনা হইয়াছিল, তজ্জন্য নমুনা স্বরূপ এই খিলান তৈয়ার হইয়াছিল। ইহা দর্শন করিয়া রেলষ্টেশনে প্রত্যাবর্তন করিয়া গাড়ীর জন্য প্রতীক্ষা করি। এখান হইতে ১১ মাইল পশ্চিম উত্তরে যাদবপুরী বা তন্ন- রের ভগ্নাবশেষ দৃষ্ট হয়, উহা বল্লালরাজাদিগের রাজধানী ছিল। এইস্থানে গােপালকৃষ্ণ স্বামী ও নারায়ণ স্বামীর বৃহৎ মন্দির ৫৬ তীর্থদর্শন। । বিদ্যমান রহিয়াছে, রামানুজাচার্য যাদবপুরীতে অবস্থানের সময়, তথাকার জৈনমন্দির ভগ্ন করিয়া, সেই মালমসলায় নাৰায়ণ স্বামীর মন্দির নির্মাণ করিয়াছিলেন। উক্ত মন্দিরের নিত্য সেবার কারণ মহিসুররাজ হইতে বাৎসরিক ১২২ এক হাজার দুইশত কুড়ি টাকা নির্দিষ্ট আছে। তথায় মতিলাও নামে এক বৃহৎ হ্রদ আছে, তাহার বেড় ১৫ মাইলের কম নহে। যাদব নদী দুইটি পাহাড়ের মধ্য দিয়া প্রবাহিত হইত; সেই নদী রােঃ করিয়া উক্ত হ্রদ নির্মিত হইয়াছিল। যে বাদটী দেওয়া হইয়াছে, তাহা দৈর্ঘ্যে ২২৫ ফুট, প্রস্থে ৩৭৫ ফুট এবং উচ্চ ২৮ ফুট। রামানুজাচার্য্যের উৎসাহে ও আগ্রহে রাজা বল্লাল বিষ্ণুবর্ধনরাজ-কর্তৃক উক্ত হ্রদ প্রস্তুত হইয়াছিল। ফরাসী পাহাড়ের উত্তর-পশ্চিম ১৫ মাইল দূরে ও যাদব- পুরীর ৮ মাইল উত্তরে পাহাড়ের উপর যাদবগিরি নামে শ্রীবৈষ্ণবদিগের প্রসিদ্ধ তীর্থ, উহা দক্ষিণ বদরীকাশী নামে কথিত হইয়া থাকে। এই স্থানে পৰ্ব্বতের সর্বোচ্চ শৃঙ্গে যােগী নরসিংহ স্বামী বিরাজ করিতেছেন। তাহার নিত্যসেবার জন্য মহিসুররাজ-দরবার হইতে বাৎসরিক এক হাজার ছয়- শত পঁচিশ টাকা নির্দিষ্ট আছে। ২য়। পৰ্ব্বতের মধ্যদেশে প্রসিদ্ধ শ্ৰীনারায়ণ স্বামীর মন্দিরে শ্রীকৃষ্ণের চল-পিল্লরায় বা চলুভরায়ের মূৰ্ত্তি বিরাজমান। প্রবাদানুসারে চল্ল-পিল্লরায় দিল্লীর সেনানায়ক কর্তৃক দিল্লী- সহরে আনীত হইয়াছিল। রামানুজাচাৰ্য দিল্লীতে গমন করিয়া শ্রীরঙ্গপত্তন। তাহাকে এই স্থানে আনয়ণ করিয়া স্থাপন করিয়াছিলেন। এই মন্দির অতি বৃহৎ, ইহার চারিদিকে প্রশস্ত বারান্দা। এখানকার প্রধান উৎসব বৈরমুড়ী নামে খ্যাত। উক্ত উৎসব শুক্ল ফাল্গুন পঞ্চমীতে আরম্ভহইয়া পূর্ণিমাতে সমাপ্ত হয়। সেই সময়ে তথায় প্রায় বিশহাজার লােক উপস্থিত হইয়া থাকে। চলুভ রায়ের মন্দিরের সন্নিকট একটা জলাশয়ের ধারে অনেকগুলি মণ্ডপ বা ছত্র আছে, তথায় আগন্তুক ও সন্ন্যাসীগণ বিশ্রাম করিতে স্থান পাইয়া থাকে। চলুভ রায় স্বামীর নিত্যসেবার কারণ, বাৎসরিক বিশ হাজার দুইশত পঁচানব্বই টাকা নির্দিষ্ট আছে। শ্রীরঙ্গপত্তনের দক্ষিণ-পূৰ্ব্বকোণে ২০ মাইল দূরে সােমনাথ- পুর নামে অতি পুরাতন ও প্রসিদ্ধ পুণ্যক্ষেত্রে প্রসন্ন-চন্ন-কেশ- বের প্রসিদ্ধ দেবালয় রহিয়াছে। তাহার গঠন-প্রণালী অতি উৎকৃষ্ট। ইহাও বিশিষ্টাদ্বৈতবাদিদিগের তীর্থস্থান। সময়াভাবে আমরা পূর্বোক্ত তিনটী তীর্থস্থান সন্দর্শন করিতে পারি নাই। উপসংহার। মহিসুরের চামুণ্ডা পাহাড়ে মহিষমর্দিনী ও নরসিংহ স্বামীর ও শ্রীরঙ্গপত্তনের রঙ্গনাথ স্বামীর অর্চনার সময়ে অর্শকগণ কর্তৃক প্রপীড়িত হইতে হয় নাই ; অতএব উভয় স্থানের ভগ- বানের পূজা ও অর্চনা করিয়া মনের তৃপ্তিলাভ হইয়া থাকে।
তিরুপতি। ১৮৯০ খৃঃ ১লা জুলাই তারিখে পতল-পেট হইতে তিরুপতি দর্শনাভিলাষে যাত্রা করি। ইহা অরুকদু জেলার প্রধান বৈষ্ণব- তীর্থ। আমরা কতক রাস্তা আটকা যােগে অতিবাহিত করিয়া বিবপুর গুন্টাকুল রেলের পাকাল জংসন শাখা রেলের ব্যালেষ্ট ট্রেনের সাহায্যে তিরুপতি-রেলষ্টেশনে আসিয়া পৌছি। ষ্টেশনটি নিম্ন তিরুপতি সহর হইতে এক মাইল দূরে অবস্থিত। পূর্বে মাদ্ৰাজরেলের রাণিগুণ্ডা নামক ষ্টেশন হইতে মিটর-গেজুরেল তিরুপতিতে প্রস্তুত হইয়াছিল, এক্ষণে বিশ্বপুর গুন্টাকুল রেলের পাকাল জংসন হইতে শাখা রেলযােগ হওয়ায় দক্ষিণ দিক্ হইতে তথায় আসিবার সুবিধা হইয়াছে। আমরা সন্ধ্যার প্রাক্কালে রেলঘরে রাত্রি যাপন করিয়া পর দিবস প্রাতে শ্রীনিবাস ব্যঙ্ক স্বামী দর্শনে বহির্গত হই। যে পাহাড়ের উপর নিবাসদেবের মন্দির, তাহা সাধারণের নিকট তিরুমলয় নামে পরিচিত, উহা নিম্ন তিরুপতি হইতে ৬ মাইল পূৰ্বদিকে হইবে। তিরুমলয়ে উঠিবার চারিটী প্রধান বত্ম আছে, ১মটি নিম্ন তিরুপতি হইতে উত্তরাভিমুখে, ২য়টি চন্দ্র গিরির দিক হইতে পূৰ্বোত্তরাভিমুখে, ৩য়টি নাগপটু হইতে তিরুপতি। ৫৯ পশ্চিমদিকে ও ৪র্থটি বালপট্ট হইতে পূৰ্ব্বদিকে। এতদ্ব্যতীত উপরে উঠিবার আরও অনেক গুলি সুড়িপথ আছে। আজকাল রেলপথে যাতায়াতে সুবিধা প্রযুক্ত অনেকেই নিম্ন তিরুপতির দিক্ হইতে পৰ্ব্বতে উঠিয়া থাকেন। আমরাও সেই দিক্ দিয়া উঠিয়াছিলাম। উঠিবার সিঁড়ি নিম্ন তিরুপতি হইতে ১ মাইল দূরে হইবে। তিরুপতি পাহাড়শ্রেণীতে ৭টি প্রধান শৃঙ্গ আছে, প্রত্যেকটি পুণ্যভূমি বলিয়া ও ভিন্ন ভিন্ন নামে প্রসিদ্ধ, যে শৃঙ্গটি শেষাচল নামে কথিত, তাহারই উপরে শ্রীনিবাসরাজের মন্দির প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে। সেই কারণে কখন কখন সমস্ত পাহাড়কেও শেষাচল নামে কথিত হইয়া থাকে। এই গিরির অপর নাম ব্যঙ্কট। স্কন্দপুরাণ মতে ব্যঙ্কটগিরি মেরুর অংশ, যেরূপে মেরু-সন্নিধান হইতে তিরুপতিতে আসিয়াছিল, নিমে তদ্বিবরণ দেওয়া গেল ; কোন সময়ে বিষ্ণু রমার সহিত অন্তঃপুরে ক্রীড়া করিতে- ছিলেন, শেষনাগ পুরদ্বারে বসিয়া দ্বার রক্ষা করিতেছিল। বায়ু তথায় আসিয়া উপস্থিত হইয়া ভিতরে প্রবেশ করিতে উদ্যত হইলে, শেষ নিষেধ করিয়া কহিল, তুমি ভিতরে যাইওনা, এই স্থানে থাক। তৎশ্রবণে বায়ু কহিল, অহহ, তুমি ভৃত্য তােমার কথা মানিতে পারি না ; অবশ্য ভিতরে যাইব। ক্রমে পরস্পর বচসা করিতে লাগিল। বায়ু বলপ্রয়ােগে ভিতরে যাইবার চেষ্টা করিলে শেষ বিরক্ত হইয়া উঠিল ও কহিল তুমি বলপ্রয়ােগে ভিতরে যাইতে পারিবে না, অথবা বৃথা বাকবিতণ্ডার প্রয়াে- তীর্থদর্শন। জন কি, আমাদের মধ্যে কে বলবান্ পরীক্ষা করিয়া দেখিলেই হয়। ভগবান্ বিষ্ণু দ্বারদেশে কলহশব্দ শুনিয়া বহির্ভাগে আসিয়া কহিল তােমরা কিসের বচসা করিতেছ? বচসার কারণ অবগত হইয়া ভগবান্ বিষ্ণু শেষকে কহিলেন, বায়ু সমস্ত লোকের অন্তরাত্মা ও প্রাণ, অতএব তুমি উহাকে আম হইতে অধিক বলবন্ত জানিবে, তৎশ্রবণে শেষ গর্বিত স্বরে কহিল, ভগবন্! বায়ু ও আমার মধ্যে কে বলবান্ আজ তাহা স্বচক্ষে দেখুন। * জাম্বুনটে মেরুপুত্র ব্যঙ্কটগিরি আছে, আমি তাহার শীর্ষ বেষ্টন করিয়া থাকিব, বায়ু যদি আমাকে তথা হইতে অপসারিত করিতে পারে, তবে জানিব বায়ু আমা হইতে বলবান্। শেষ, হৃষিকেশকে এইরূপ কহিয়া কালবিলম্ব করিয়া ব্যঙ্কটগিরি বেষ্টন করিয়া অবস্থিতি করিতে লাগি লেন। তখন বায়ু প্রচণ্ড ঝড় উৎপাদন করিয়া স্থাবর জঙ্গম কাপাইতে কঁপাইতে শেষ সহিত পৰ্বতশৃঙ্গ উৎপাটন ও উড়া- ইয়া অর্ধলক্ষ যােজন দূরে দক্ষিণ সমুদ্র হইতে ৩২ যােজন উত্তরে ও পূর্ব সমুদ্র হইতে পশ্চিম ভাগে সুবর্ণমুখী নদীর বামতটে ফেলিয়া দিল। শেষ, পতন জন্য বিশীর্ণ দেহ ও লজ্জায় ম্রিয়মান হইয়া আপনাকে অবমানিত বােধে ব্যঙ্কট গিরি আশ্রয় করিয়া স্বামী পুষ্করিণীর বায়ুদিকে মনোহর নাগ- তীর্থে গমন করিলেন। নাগতীর্থে গমন করিয়। সহস্র বৎসর ধরিয়া ভগবান্ বিষ্ণুর তপস্যা করিতে থাকিলেন। ভগবান্ বিষ্ণু তাহার তপস্যায় তুষ্ট হইয়া প্রত্যক্ষ হইয়া কহিলেন, বৎস .
তিরুপতি। । শেষ ! তােমার তপে তুষ্ট হইয়াছি, এক্ষণে বর প্রার্থনা কর। শেষ তৎশ্রবণে প্রণিতপূর্বক কহিলেন, ভগব! যদি আমার প্রতি আপনি প্রসন্ন হইয়াছেন, তবে এই বর দিন, যেমন বৈকুণ্ঠে আমার কুন্তলে আপনি বাস করেন, তদ্রুপ ব্যঙ্কটস্থিত শৈলরূপ মৎদেহে আপনি নিত্য বাস করুন ভগবান্ হরি তথাস্তু বলিয়া, তদবধি শঙ্খচক্র হস্তে শেষ- শৈলে বাস করিতেছেন। ব্যঙ্কটগিরির উপস্থিত বলিয়া তিনি ব্যঙ্কটেশ বা ব্যঙ্কটপতি নামেও অভিহিত হয়েন। কোন্ সময়ে এই ঘটনা হয়, তাহা জানা যায় নাই। কিন্তু ব্যঙ্কটপতি বর্তমান অষ্টাবিংশ কলির পূর্ব হইতে এই স্থানে অবস্থিত করিতেছেন বলিয়া প্রসিদ্ধ। বরাহপুরাণে দেখা যায় যে, ত্রেতাযুগে শ্রীরামচন্দ্র লঙ্কাতি- যানকালে সদলে এই স্থানে আসিয়া স্বামীতীর্থে স্নান করি- ছিলেন। উক্ত পুরাণে একচত্বারিংশৎ অধ্যায়ে দেখা যায়, পাণ্ডবগণ বনবাসকালে শ্রীকৃষ্ণের অনুমতিক্রমে ব্যঙ্কটশৈলে আসিয়া এক বৎসর কাল তথায় বাস করিয়াছিলেন ও যে তীর্থতটে তাহারা ছিলেন, তাহা পাণ্ডবতীর্থ নামে অভিহিত হইতেছে। স্কন্দপুরাণে ব্যঙ্কটাচল-মাহাত্ম্যে দেখা যায়, শ্রীরামানুজা- চাৰ্য ব্যঙ্কটশৈলে আসিয়া আকাশগঙ্গা নামক তীর্থের ধারে পঞ্চ অক্ষর মন্ত্র দ্বারা বিষ্ণুর ধ্যান করিয়াছিলেন ; বিষ্ণু তাহার তপে সন্তুষ্ট হইয়া প্রত্যক্ষ হইয়াছিলেন। রামানুজ কলির ৪১১৮ তীর্থদর্শন। অব্দে জন্মগ্রহণ করেন। অতএব প্রায় ৯০০ শত বৎসর পূৰ্ব্বেও এই মহাতীর্থ প্রসিদ্ধ ছিল। পৰ্বত-শ্রেণীর ভিন্ন ভিন্ন স্থানে ঝরণা ও তাহার নিকট ছোট বড় জলাশয় আছে, তাহারা সকলেই পুণ্যতীর্থ বলিয়া বিখ্যাত। তাহাদিগের মধ্যে ৭টি প্রধান। ১ম স্বামীতীর্থ, ২য় বিয়ৎগঙ্গা বা আকাশগঙ্গা, ৩য় পাপবিনাশিনী, ৪র্থ পাণ্ডব- তীর্থ, ৫ম তুম্বীরকোনা, ৬ম কুমারবারিকা, ৭ম গােগৰ্ভ। স্বামীতীর্থ লম্বা ১০০ গজ ও প্রস্থে ৫০ গজ, চারিদিকে শ্ৰেনাইট প্রস্তর দ্বারা সােপান বাধান। এই তীর্থ দেবালয়ের নিকট, ইহাতে যাত্রীগণ অবগাহন করিয়া থাকে। পাপবিনা- শিনী-তীর্থ দেবালয় হইতে ৩ মাইল দূরে, একটি সামান্য জল- প্রপাতের নীচে অবস্থিত ; এই জলপ্রপাতের নীচে দাঁড়াইয়া স্নান করিলে ব্ৰহ্মহত্যারূপ গুরুতর পাপ বিনষ্ট হয়। এমন কি প্রবাদ এইরূপ যে, স্নান করিবার সময়ে পাপের তারতম্য হেতু জলের বর্ণ পৰ্য্যন্ত ময়লা হইয়া থাকে। পাহাড়ের পূর্বদিকে যে জলপ্রপাত তাহাই তুম্বিকোণা নামে পরিচিত। পূর্বে এই স্থানে ঋষিগণ বাস করিতেন, এক্ষণে জঙ্গলে পরিপূর্ণ হওয়ায় বন্যপশ্বাদির আবাস স্থান হইয়াছে। আমরা প্রথমে রেল-ষ্টেশন হইতে জাযােগে কহিদাস নামক কোবিলতীর্থে (কপিলতীর্থ) আসিয়া পৌছি। এই তীর্থে অনেক যাত্রীগণ পূজা দিয়া আপন আপন মানসিক ব্যঙ্কটেশ- কাটা গলে ধারণ করিয়া উপরে গমন করে, উক্ত কাটা স্বর্ণ তিরুপতি। অথবা রৌপ্য নির্মিত। আমরা যৎকালে তথায় আসিয়া পৌছি, দেখিলাম একটী স্ত্রীলোক পূর্বোক্ত রৌপ্যনির্মিত বঁটা ধারণ করিতেছে, পরে পদযােগে তিরুমলয়ে গিয়া স্বামীতীর্থে স্নান করিবে। আরও শুনিলাম যে কাটাধারী বা ধারিণী স্বামীতীর্থে স্নান করিলে ঐ কঁাটা তাহার কপােলদেশ হইতে খুলিয়া পড়ে,, কিন্তু আমরা তাহা দেখি নাই। নর্মদানন্দ স্বামী নামে কোন সাধু দুই মাস তিরুমলয়ে বাস করিয়াছিলেন। তিনি তৎকালে কুড়িজন কাটারিকে স্নান করিবার কালে কপােল হইতে কঁাটা খুলিয়া যাইতে দেখিয়াছিলেন; কিন্তু কিরূপে খুলিয়া পড়ে তাহা বুঝিলাম না, তবে তাহা ব্যঙ্কটের ভিক্ষার ঝুলিতে অর্পণ করা হইয়া থাকে। কহিদাস কোবিলের পশ্চাতে যে বৃহৎ গোপুর আছে, তাহা অলিপিলি নামে খ্যাত। এই গোপুরের দ্বার পর্যন্ত সকল শ্রেণীর লােক আসিতে পারে, ইহার পর কেবল ৰাহ্মণ, বৈশ্য ও সৎশূদ্রগণ মাত্র অগ্রসর হইতে পারে ; এই স্থান হইতে উপরে উঠিবার পাকা সিঁড়ি আরম্ভ হইয়াছে। অনেকেই পদব্রজে গমন করে, কিন্তু যাহার সিঁড়ি পার হইতে অক্ষম, তাহারা ডুলিতে চাপিয়া উঠিয়া থাকেন। এই সিঁড়ি প্রায় এক মাইল লম্বা ও জমীর সমতল হইতে নূনাধিক এক হাজার ফুট উচ্চ হইবে। উহা অনেকগুলি ছােট ছােট মণ্ডপের ভিতর হইয়া গিয়াছে। অতএব যাত্রীগণ ক্লান্ত হইলে বিশ্রাম করিবার স্থান পায় । সিড়ির সর্বোচ্চ স্থানে একটি ৰহঃ গােপুর আছে, তাহা গালি
৬৪
তীর্থদর্শন।
গগাপুর নামে খ্যাত; এই গোপুরের পশ্চাতে বৈকুণ্ঠ নামক
কোবিল" রামকৃষ্ণের মূর্তি বিরাজমান এবং ইহার সন্নিকটে
বিশ্রামের স্থানও আছে, অনেক যাত্রী পদব্রজে উঠিয়া ক্লান্ত
হইলে এই স্থানে বিশ্রাম করেন ও রামকৃষ্ণের পূজা করিয়া
থাকেন। এই মন্দিরের ঈশানকোণে বৈকুণ্ঠগুহা নামে এক
গুহা আছে, পুরাণমতে শ্রীরামচন্দ্রের ঐশৈলে আগমনকালে
তাহার অনুচরগণ উক্ত গুহায় আশ্রয় লইয়া ছিল। এই স্থান
হইতে বঙ্কিটেশ মন্দিরে যাইবার পাকা রাস্তা আছে ; আমরা,
পর্বতের উপরিস্থ গহ্বরের ভিতর হইয়া মধ্য মণ্ডপ ও গােপুরের
মধ্য দিয়া ভুলিযােগে বেলা সাড়ে নয় ঘটিকার সময়ে উপরে
পৌছিলাম।
তিরুমলয় গিরিস্থ নগরটি সামান্য ; ইহা স্বামীতীর্থের ব্যঙ্কট
স্বামী ও বরাহস্বামীর মন্দিরের চতুঃপার্শ্বে অবস্থিত। ১৮৮১
সালের লােকসংখ্যার তালিকা অনুসারে এখানে ১৫১৭ জন
মাত্র লােক বাস করিত; তাহাদিগের মধ্যে সমস্তই হিন্দু অপর
জাতি বাস করিতে পায় না।
এখানে যাত্রীদিগের থাকিবার জন্য অনেক গুলি ছত্র আছে,
উহা মহিসুর ও কোচিনের রাজা ও কালহস্তীর ব্যঙ্কটগিরির
জমিদারগণ নিৰ্মাণ করিয়া দিয়াছেন। মন্দিরের সম্মুখে পথের
পার্শ্বে কয়েকখানি দোকান আছে, তাহাতে পিস্তলের বাসন,
ব্যঙ্কটেশ স্বামীর মূর্তি ও আহাৰ্য্য দ্রব্যাদি বিক্রয় হইতেছে ।
অপর দিকে উচ্চ জমীর উপর মহান্তের আখড়া, বৈরাগীগণ
;
;
*:
তিরুপতি। ; ঐ স্থানে আহার পাইয়া থাকে ; তাহার পার্শ্বে হস্ৰস্তম্ভমণ্ডপ, এই স্তম্ভের কাৰ্য্য অতি পরিপাটী, ইহা প্রায় এক সহস্র গ্রেনা- ইট প্রস্তরের স্তম্ভের উপর বিস্তৃত রহিয়াছে। যে সকল স্তম্ভ রাস্তার দিকে, তাহার প্রত্যেকটিতে বড় বড় মূর্তি খােদিত রহি- আছে, ভিতর দিকের স্তম্ভ সাদা; এই মণ্ডপের একাংশ পড়িয়া, গিয়াছিল, ১ লক্ষ টাকা ব্যয়ে ইহার জীর্ণ সংস্কার হইয়াছে। মন্দিরের পার্শ্ব দিয়া যে পথ গিয়াছে, তাহার এক পার্শ্বে এক খানি অপূৰৱ পাথর পড়িয়া রহিয়াছে। শুনিলাম উহা প্রস্তরময়ী রথের চক্র মাত্র ; অৰ্চকগণ কহিয়া থাকেন যে, চন্দ্রচোল নামে কোন রাজা একখানি প্রস্তবময়ী রথ নিৰ্মাণ করিয়া দিয়া- ছিলেন’ ও পূৰ্বে সেই রথে ভগবান্ ব্যঙ্কটেশের রথােৎসব ক্রীড়া হইত; এক্ষণে সে রথ নাই, ঐ পাথরখানি তাহার চিহ্নস্বরূপ পড়িয়া আছে। আমরা মহান্তের আখড়ায় বিশ্রাম করিয়া স্বামীর দর্শন অভিলাষে দেবালয়ের দিকে আসিলাম; পথপ্রদর্শক প্রথমে আমাদিগকে স্বামীতীর্থে লইয়া গেলেন ; এই তীর্থের জল অপরিষ্কার হইলেও অনেকে তাহাতে অবগাহন করিতে দেখি- লাম। যাহারা চুল রাখিবার ব্রতপালন করিতেছিলেন, তাহারা স্বামীতীর্থের এক, পার্শ্বে মস্তক মুণ্ডন করিয়া পরে অব- গাহন করিতেছেন। আমরা স্নান না করিয়া তীর্থ-বারিস্পর্শে (১) হামিণসহুরেও বিথলদেবের মন্দিরের সম্মুখে একটি প্রস্তরময়ী রথ আছে।
তীর্থদর্শন। ৩০ t তৎকাৰ্য্য সম্পাদনপুরঃসর মন্দিরের অভ্যন্তরে গমন করিলাম মন্দিরের বহির্ভাগ হইতে অভ্যন্তর দেখিবার উপায় নাই। কোন খৃষ্টান্ বা মুসলমানকে ৰহির্ভাগেও আসিতে দেওয়া হয় না। ১৮৭০ সালে কোন ইংরাজ মাজিষ্ট্রেট খুন অনুসন্ধান করিতে আসিয়া প্রথম গােপুর পর্যন্ত আসিতে পারিয়াছিলেন। গত বৎসর মহান্তের বিরুদ্ধে দেবালয়ের সঞ্চিত ধন অপচয়ের অভি- যােগ উপস্থিত হইলে পুনরায় ইংরাজ মাজিষ্ট্রেট আসিয়া- ছিলেন; তিনিও ধ্বজস্তম্ভের নিকট পর্যন্ত অগ্রসর হইতে সমর্থ হইয়াছিলেন। দেবালয় তিনটি ভিন্ন ভিন্ন প্রাচীর দ্বারা বেষ্টিত; বাহিরের প্রাচীর কৃষ্ণবর্ণ গ্রেনাইট প্রস্তর দ্বারা নির্মিত, তাহার এক পার্শ্বে একটি বৃহৎ অনুশাসন খােদা এবং ইহার দরজায় একটি সামান্য গােপুর আছে; এই প্রাচীর ১৩৭ গজ লম্বা ও ৮৭ গজ প্রশস্ত। দেবালয়টি অতি বৃহৎ নহে, ইহার মূলস্থানের উপর যে গম্বুজ (ডােম) আছে, তাহার উপরিভাগ কলধৌত সুবর্ণপত্রী দ্বারা মণ্ডিত, মূলগৃহ অতি ক্ষুদ্র তাহাতে বায়ু প্রবেশের পথ নাই; তাহার মধ্যস্থলে সাত ফুট উচ্চ প্রস্তরময় চতুভুজ বিষ্ণুমূর্তি দণ্ডায়মান ; তাহার দক্ষিণের এক হস্তে চক্র, অপর হস্ত পৃথি- বীর দিকে দৰ্শাইয়া ভক্তদিগকে তিরুমলয়ের অসামান্য উৎপত্তির বিষয় স্মরণ করাইয়া দিতেছেন ও বামদিকের এক হস্তে শঙ্খ, অপর হন্তে পদ্ম বিরাজ করিতেছে। এই স্থানের দেবদর্শন করিতে হইলে কিছু দর্শনী দিতে হয়, তিরুপতি। ১১ যদি কেই দেবের দুগ্ধয়ান দর্শন করিতে বাসনা করেন, তাহা হইলে তাহাকে ১৩০ টাকা দিতে হইবে। এই সময়ে দেবের গাত্র হইতে অলঙ্কারাদি মােচন করিয়া পুৰুষক্ত বেদপাঠ করিতে করিতে তৈল ব্ৰক্ষণ করাইয়া দুগ্ধ ও অন্যান্য তীর্থ- জলে স্নান করাইয়া, মাল্য চন্দন বসন ও আভরণ দ্বারা অলঙ্কত করাইয়া থাকে। অতএব সে সময়ে প্রকৃত প্রস্তরময় দেবমূর্তি দেখিতে পাওয়া যায়। তুলসী দ্বারা সহস্র নামের অর্চনার সময়ে কেই দেবদর্শনে অভিলাষ করিলে, তাঁহাকে টাকা দিতে হয়। আর কেবল কপূরালােকে দেবদর্শন করিলে দর্শনী টাকা মাত্র দিতে হয় ; বেলা ১২টা হইতে ২ ঘটিকা পর্যন্ত অর্চনা ও নিত্য রাজভােগাদি কাৰ্য্য হইয়া থাকে । তৎপরে বিনা দর্শনীতে সাধারণের দর্শনের জন্য অর্ধ ঘণ্টা দ্বার খােলা থাকে। দর্শনী হিসাবে দেকালয়ের অনেক টাকা আয় হইয়া থাকে। অরুকদু প্রদেশ ইংরাজ-শাসনাধীন হওয়া অবিধ ১৮৪৩ সাল পর্যন্ত এই দেবালয় বর্ণমেন্টের তত্ত্বাবধানে ছিল, সে সময়ে খরচখরচ বাদে অনেক টাকা উদ্বৃত্ত হইত, এমন কি প্রথম ছয় বৎসর দুই লক্ষ টাকার অধিক আয় হইয়াছিল। ক্রমে সেই আয় কমিয়া আসিতেছে ; পুরাণমতে এই দেবের মাহাত্ম্য কলির পাঁচহাজার বৎসর পর্যন্ত থাকিবে ও ক্রমে যে মাহাত্ম্য কমিবে তাহা আয়েতে জানা যাইবে ; পূর্বে বাৎসরিক উৎসব উপলক্ষে অনেক লােকের সমাগম হইত; কথিত আছে যে, ১৭৭২ খৃঃ বাৎসরিক উৎসব সময়ে প্রথম বিশুচিকার উৎপত্তি হয়।
তীর্থদর্শন। . ১৮৪৩ সালে দেবালয়ের তত্ত্বাবধানের ভার মহান্তের উপর অর্পিত হয় ; সেই অৰধি দেবালয়ের অধনতির আরম্ভ হইয়াছে বলিলেও অত্যুক্তি হয় না। বর্তমান মহান্ত স্বয়ং বিলাসী, কাজেই দেবালয়ের দিকে দৃষ্টি রাখেন না, তিনি দেবসম্পত্তির বিস্তর টাকা অপচয় করিয়াছেন; সেই অপরাধে তিনি তিন বৎসর কারাবাসে যাইতে বাধ্য হইয়াছেন। তিনি, অভিযােগের সময় বেগতিক দেখিয়া আপন পদে এক শিষ্যকে নিযুক্ত করেন; তাঁহার মুক্তির কারণ শেসজজের বিরুদ্ধে প্রমে হাইকোর্টে পরে মাদ্রাজ গবর্ণরের নিকট আবেদন করা হইয়াছিল; কিন্তু হাইকোর্ট কিম্বা মান্দ্রাজ গবর্ণর তাহা গ্রাহ করেন নাই। এখন দেবালয়ের বাৎসরিক আয় একুশ হাজার টাকা ও ব্যয় চৌদ্দ হইতে পনর হাজার টাকা হইয়া ছয় সাত হাজার টাকা জমা থাকে। অন্যান্য দেবালয় সদৃশ এই দেবালয়ে দেবাঙ্গনা নাই, এমন কি পূর্বে কোনও কুলটা এই পুণ্যময় পাহাড়ে পদার্পণ করিতে পারিত না ; এক্ষণে সে কাল গিয়াছে, অনেক অর্চক, বৈরাগী ও পুরােহিত আপন আপন উপপত্নী সঙ্গে লইয়া গমন করিয়া থাকেন। ৬০ বৎসর পূর্বে বলরাম দাস নামে মহান্তের চরিত্রের উপর সংশয় উপস্থিত হইলে, তাঁহার শিষ্যগণ তাহাকে পদচ্যুত করিয়া আপনাদিগের মধ্যে গােবন দাস নামে এক ব্যক্তিকে । (১) তিনি সম্প্রতি কারাগার হইতে নিষ্কৃতি পাইয়া প্রায়শ্চিত্ত করিয়া, কারাগৃহবাস-জনিত পাপ হইতে মুক্ত হইয়া আপন গদীর ভার লইয়াছেন।
তিরুপতি। ৬৯ তৎপদে প্রতিষ্ঠিত করেন। কথিত আছে যে এই বর্তমান দেবালয় কলির প্রথমেই নির্মিত হইয়াছিল। যে সকল মহাত্মগণ এই দেবালয়ের উন্নতি করিয়াছিলেন, তাঁহাদিগের নাম অদ্যাপি মন্ত্ৰপুষ্পের সহিত উচ্চারিত হইয়া থাকে ও দেবালয়ের হস্তলিপি গ্রন্থে তাহাদিগের বিবরণ পাওয়া, যায়, সেই বিবরণে জ্ঞাত হওয়া যায় যে, করিও মহারাজ প্রাঙ্গণের দ্বিতীয় প্রাচীর ও তাঁহার পুত্র জনমেজয় ৰহির্ভাগের প্রাচীর নির্মাণ করিয়া দেন। কিন্তু ইহারা কোসময়ে ও কোথাকার রাজা ছিলেন এবং কোথায় প্রাদুর্ভূত হইয়াছিলেন, তাহা জানিবার উপায় নাই। তাহাদিগের পরে বিক্রম মহা- রাঙ্ক নামে অপর কোন রাজা বর্তমান মন্দিরের সংস্কার করিয়াছেন। কেহ কেহ কহিয়া থাকেন যে, তণ্ডীমন চক্রবর্তী মহারাজ বর্তমান মূলমন্দির নিৰ্মাণ করেন, সেই হিসাবে বর্তমান মূল মন্দির সাতশত বৎসরের অধিক হইবে না; কাঞ্চি- পুরে উক্ত রাজার রাজধানী ছিল, তাহা পূৰ্ব্বে কাঞ্চিপুরের বিবরণে দেখাইয়াছি। ৰহ্মাণ্ডপুরাণেও এতদ্বিষয়ের অস্পষ্ট উল্লেখ দেখিতে পাওয়া যায়। উক্ত পুরাণের এক স্থানে কথিত আছে যে, নারদ কোন সময়ে পৃথিবী পর্যটন করিয়া ভগবান বৈকুণ্ঠনাথের দর্শন করিতে গিয়া কহিয়াছিলেন যে, গঙ্গার দক্ষিণ এক সহস্র ক্রোশ অন্তরে ও পূর্ব সাগরের পঁচিশ ক্রোশ পশ্চিমে এক মনােহর গিরি বিদ্যমান আছে। তৎশ্রবণে বিষ্ণু কহিলেন যে, আমি কলিযুগে চোলরাজপুত্র চক্রবর্তী কর্তৃক ৭০ তীর্থদর্শন। প্রতিষ্ঠিত হইয়ণ পূজা গ্রহণ করি। তাহাতে কোন কোন ইতিহাসবভাগণ মনে করেন যে, পূর্বে এই স্থান শৈবদিগের অধিকারে ছিল, যে মূর্তি অদ্যাপি বিষ্ণুমূর্তি বলিয়া কথিত তাহা সুহ্মণ্য স্বামীর মূর্তি। তৎসম্বন্ধে একটি প্রবাদ আছে যে, কোন সময়ে রামানুজাচাৰ্য্য এই স্থানে আসিয়া দেখেন যে, মূর্তির হস্তে শঙ্খচক্র নাই এবং তিনি সুৰহ্মণ্য স্বামী নামে পূজা পাইয়া থাকেন; তাহার পর বিয়ৎগঙ্গা নামক তীর্থে বিষ্ণুর উপাসনা করােন্তর প্রকাশ করেন যে, এই প্রস্তরময়ী মূর্তি সুহ্মণ্য স্বামীর নহে, বিষ্ণুর প্রকৃত মূর্তি। দেবের সম্মুখে যদি শঙ্খ চক্র রাখা যায়, দেব তাহা অবশ্যই গ্রহণ করিবেন। পরে শঙ্খ চক্র আনয়ন করিয়া দেবের সম্মুখে রাখিয়া দ্বার বন্ধ করিতে আজ্ঞা দেন; পর দিবস দরজা খােলা হইলে দেখা গেল যে, পূৰ্বোক্ত শঙ্খ চক্র দেবের হস্তে বিরাজিত রহিয়াছে, তদৃষ্টে আপামর সকলেই উহা বিষ্ণুর প্রকৃত মূর্তি বলিয়া বিশ্বাস করিল ও তদবধি এই মূর্তি বিষ্ণু বলিয়া পূজা পাইতেছেন। অর্শকগণ কহেন যে, আমরা স্মার্ত হইলেও নামন অর্থাৎ শ্রীবৈষ্ণবদিগের তিলক ধারণ করিয়া থাকি। তাহারা শ্রীরামানুজা- চাৰ্য কর্তৃক বিষ্ণুপূজার নিয়মানুসারে পূজা করিতেছেন। আরও একটি কথা এই এখানে লক্ষ্মীদেবীর প্রস্তরময়ী মূর্তি নাই, কিন্তু কথিত আছে যে ব্যঙ্কটেশ নারায়ণবন নামক স্থানে মৃগয়া করিতে গিয়া তথাকার রাজকন্যা পদ্মাবতীকে বিবাহ করেন ও সেই স্থানে কল্যাণব্যঙ্কটেশ নামে অভিহিত হইতে- তিরুপতি। ৭১ ছেন। এতদ্বিষয়ের বিবরণনারায়ণবনের বিবরণে বিশেষরূপে বলা যাইবে। এখানকার প্রধান উৎসব আশ্বিন মাসের ১০ দিন ব্যাপিয়া হইয়া থাকে। উৎসবের পঞ্চম দিবসে গরুড়ােৎসব ও দশম দিবসে নারায়ণবনে পদ্মাবতীর সহিত বাৎসরিক কল্যাণোৎসব হইয়া থাকে। মূলস্থানের সম্মুখে একটি অপেক্ষাকৃত বৃহৎ গৃহ ও তাহার সম্মুখে প্রস্তরময় স্তম্ভের উপর একটি মণ্ডপ আছে, এই মণ্ড- পের এক স্থানে একটি পিত্তলের বড়ার মুখে এক বৃহৎ গুলি কড়িকাট হইতে ঝুলিতেছে। যাত্রীগণ সাধ্যানুসারে উক্ত থলিতে স্বর্ণ, রৌপ্য, মণি, মুক্তা, পয়সা আদি দান করে, এতৎ সম্বন্ধে একটি প্রবাদ আছে যে, ভগবান্ ব্যঙ্কটেশ পদ্মাবতীর কর প্রার্থী হইলে, আকাশরাজ নারায়ণবনে কন্যা সম্প্রদান করিতে স্বীকৃত হন, তখন ভগবান্ ধ্যঙ্কটেশ যাত্রীগণকে তথায় লইয়া যাইবার ব্যয়ের কারণ কুবেরের নিকট হইতে অনেক টাকা ঋণ করিতে বাধ্য হন, কিন্তু আজ পর্যন্তও সে টাকা পরিশােধ হয় নাই। অতএব ভিক্ষার ঝুলি রাখিয়া দিয়াছেন, ভক্তগণ ঋণ পরিশােধের কারণ ঝুলিতে যথাসাধ্য দিয়া থাকেন, দিনান্তে সেই থলি একবার খােলা হয় ও তাহাতে যাহা পাওয়া যায় তাহা হিসাবে জমা হয়। ব্যঙ্কটেশ স্বামীর মন্দিরের বহির্ভাগে স্বামী পুষ্করিণীতীরে একটি সামান্য মন্দিরে বরাহস্বামীর মূৰ্ত্তি বিদ্যমান আছে।
৭২ তীর্থদর্শন। কেহ কেহ কহিয়া থাকেন যে, কোন সময়ে যজ্ঞবাহ বিচরণ করিতে করিতে এই স্থানে আসিয়াছিলেন, অতএব ইনি ঐ শৃঙ্গের অধিষ্ঠাত্রী দেবতা। অনন্তর ব্যঙ্কটেশ স্বামী যখন তথায় বাসস্থান নিরূপণ করিয়া অবস্থিতি করিতে আইসেন, বরাহ স্বামী তাহাতে প্রতিবাদ করেন ; তখন ব্যঙ্কটেশস্বামী তাহাকে এই বলিয়া সন্তোষ করেন যে, সকল যাত্রীগণ অগ্রে তােমার পূজা করিয়া পরে আমার পূজা দিবে। সেই অবধি সকল যাত্রীই অগ্রে স্বামীপুষ্করিণীতে স্নান করিয়া বহিস্বামীর মন্দিরে গমন করিয়া তাহার অর্চনাদি করােন্তর ব্যঙ্কটেশস্বামীর মন্দির প্রাঙ্গণে গমন করেন। ব্যঙ্কটেশ স্বামীর মন্দিরের সন্নিকটে প্রসিদ্ধ গােগৰ্ভতীর্থের নিকট ত্রি-বাল-গুণ্ড নামে এক প্রস্তরময় স্তম্ভ রহিয়াছে। কথিত আছে যে, এই স্তম্ভ পূর্বে মন্দিরের প্রাঙ্গণে দরজার স্তম্ভের নিকট থাকিত ও প্রতি রাত্রে আভরণ সিন্ধুকের চাবি তাহাতে রাখা হইত ; • এই স্তম্ভ প্রত্যহ দেবালয়ের চতুর্দিকে পরিভ্রমণ করিয়া বেড়াইত। এক দিবস কোন অর্চকের পুত্র দেবালয়ের প্রাঙ্গণের ভিতর নিদ্রা গিয়াছিল, অপর অর্চকের তাহা না জানিয়া দেবালয়ের সম্মুখের দরজা বন্ধ করিয়া চলিয়া যায়। উক্ত স্তন্ত যথারীতি পরিভ্রমণ করিতে করিতে নিদ্রিত অর্ফকপুত্রকে তস্কর ভাবিয়া হত্যা করে। সেই অবধি উক্ত স্তম্ভ প্রাঙ্গণের বহির্দেশে গাে-গর্ভ তীর্থের সম্মুখে রাখা হইয়াছে। কেহ এ পর্যন্ত এই স্তম্ভের সম্মুখে মিথ্যা শপথ করিতে সাহসী তিরুপতি। হয় না। এমন কি অনেক অভিযােগ যাহা মুসেফও নিষ্পত্তি করিতে পারে না, তাহা এইস্থানে নিষ্পত্তি হইয়া গিয়াছে। দী ও প্রতিবাদী গােগৰ্ভতীর্থে স্নান করিয়া ভিজা কাপড়ে ঐ স্তম্ভের নিকট আসিয়া এবং উহা স্পর্শ করিয়া ব্যঙ্কটেশ স্বামীর নামে শপথ করিয়া আপন বক্তব্য প্রকাশ করিলে তাহা সত্য, বলিয়া গৃহীত হয়। স্তম্ভ স্পর্শ করিয়া শপথ করিবার পূর্বে বাদী ও প্রতিবাদীকে ফি হিসাবে সাত টাকা দিতে হয়, ইহাতেও দেবালয়ের আয় আছে। যে সকল লােক রােগে কষ্ট পায় অথবা যাহাদিগের সন্তান জন্মে নাই, তঁাহারাও তিরুপতির ব্যঙ্কটেশস্বামীর মানসিক করিয়া ব্ৰতধারণ করে ও ব্ৰতগ্রহণে ফলপ্রাপ্ত হইলে ব্রত উদযাপন করিয়া থাকে। কথিত আছে যে, দেবের উপর লােকের এতদূর বিশ্বাস যে ব্রত গ্রহণ করিয়া কেহ ব্ৰত উদ্- যাপন করিতে বিস্মৃত হয় নাই ; এমন কি যদি কেহ ব্রত উদ- যাপন করিবার পূর্বে মানবলীলা, সম্বরণ করেন, তাহা হইলে তাহার পুত্র বা অপর কোন নিকট সম্বন্ধীয় তাহা উদ্যাপন করিয়া থাকে। ব্ৰত দুই প্রকারে হইয়া থাকে, ১ম ব্যঙ্কটেশ কাটা ধারণ তাহা পূর্বে বলা হইয়াছে। ২য় চুল রাখা, যাহারা চুল রাখে, তাহার স্বামীতীর্থের তীরে আসিয়া মস্তক মুণ্ডন করাইয়া পুষ্করিণীতে স্নান করে। দক্ষিণ দেশের প্রায় সকল লােকই উপরােক্ত ব্ৰত আবশ্যক মত লইয়া থাকে। বম্বে করাচি, পঞ্জাব, { ;
৭৪ তীর্থদর্শন। মধ্যভারত এবং পশ্চিম ও উত্তর ভারতের লােকও স্বামী সন্দশ নার্থ আইসে! পুরুষােত্তমের পাণ্ডার অত তিরুপতির ব্যঙ্কটেশ স্বামীর পাণ্ডারা মহান্তের নিকট সনন্দ পাইয়া ও মহান্তের নামাঙ্কিত ধ্বজা হস্তে করিয়া যাত্রী সংগ্রহের কারণ সৰ্ব্ব স্থানে বিচরণ করিয়া থাকে। আমরা, তুলসী অর্চনা দর্শনাভিলাষে দেবালয়ের ভিতরে আসিয়া ৭ টাকা জমা দিলে, কর্মচারী আমাদিগের নাম ধাম লিখিয়া একখানি রসিদপত্র প্রদান করিয়া কহিলেন যে, তুলসী অৰ্চনার সময় সংবাদ দেওয়া হইবে এবং ঐ রসিদ দরজার নিকট দিলে ভিতরে প্রবেশ করিতে পাওয়া যাইবে। আমরা অনুসন্ধানে আরও জানিলান যে, তৎকালে দুগ্ধ-অর্চনার সময় উপস্থিত হইয়াছে, তাহাতে দেড় ঘণ্টা সময় লাগিবে । অতএব কোন প্রকারে সময় অতিবাহিত করিবার উদ্দেশে মণ্ডপের বাহিরে কতকগুলি নীলবানর সন্দর্শন করিতে থাকিলাম। ইতিমধ্যে এক ব্যক্তি আসিয়া আমাদিগকে কহিল যে, মহান্তের নিকট হইতে অনুজ্ঞা আসিয়াছে যে, শুল্ক' না লইয়া আপনা- দিগকে দুগ্ধ স্নানাভিষেকাদি সন্দর্শন করিতে দেওয়া হইবে। এস্থানে বলা বাহুল্য যে, আমরা দেবমন্দিরে আসিবার পূর্বে তিরুপতির ষ্টেশনমাষ্টার দেবালয়ের পেস্কারের নিকট আমা- দিগের দেবদর্শনের সুবিধার জন্য সংবাদ পাঠাইয়াছিলেন বােধ হয় মহান্ত পেস্কারের নিকট হইতে আমাদিগের আসি- বার সংবাদ পাইয়া পূর্বোক্ত অনুজ্ঞা পাঠাইয়া থাকিবেন। • তিরুপতি। ৭৫ যাহা হউক, এক্ষণে দেবালয়ের কর্মচারীগণ নাভিষেক দর্শন করাইবার জন্য আমাদিগকে অতি সমাদরে ভিতরে লইয়া যাইলেন। ভিতরে যাইয়া,দেখিলাম যে, দেবগাত্র হইতে আভ- রণাদি খােলা হইয়াছে ও কয়েকটি ৰাহ্মণ পুরুষশূক্ত মন্ত্র পাঠ করিতেছে, অর্চক দেবগাত্রে তৈল মর্দন ও হরিদ্রা ক্ষণ করিয়া দুগ্ধ দ্বারা দেবকে, স্নান করাইলেন। তৎপরে জলে তীর্থস্নান, পঞ্চামৃতমান, তাহার পর দুগ্ধমান হইলে অঙ্গ প্রত্যঙ্গাদি মুছাইয়া বস্ত্র পরিধান করিয়া শ্রীরামানুজতাবলম্বী নামন অর্থাৎ তিলক পরাণ হইল। তৎপরে কপূর, চন্দন, কলী, কেশরী ইত্যাদি পদযুগলে অনুলেপন করা হইল। অতঃপর স্বর্ণ অলঙ্কারাদি যথা স্থানে বিন্যস্ত হইলে দেব, পুষ্প- মালা দ্বারা সুশােভিত হইতে লাগিলেন, এতাবৎকাল বৈদিক কএকটি পুরুষতাধি মন্ত্র পাঠ করিতেছিলেন। বেশ বিন্যাস হইলে পর ভিন্ন ভিন্ন পাত্রে ভিন্ন সংখ্যার আলােকে আরতি এবং পরে কপূরালােকে আরতি হইল। অতঃপর কিছুকাল পরে তুলসী দ্বারা সহস্র নামাৰ্চ্চা হইলে মন্ত্ৰপুষ্প দেওয়া হইল ; মন্ত্ৰস্তোত্র পাঠের পর অন্যান্য রাজাদিগের নামের সহিত আমাদিগের নামও উচ্চারিত হইয়া মন্ত্ৰপুষ্প প্রদান করা হইল। আবুও দেখিলাম যে সকল আগন্তুক যাত্রীর নামে দেবের অর্চনা হয় না, তবে যাহারা অর্চনা সন্দর্শনের জন্য সাত টাকা ফি জমা দেন, অর্চনান্তে মন্ত্র পুষ্প প্রদানের সময় তাহাদিগের নাম গােত্র ও নক্ষত্র উচ্চারিত হইয়া থাকে, তদন- তীর্থদর্শন। স্তর আমরা মূস্থান হইতে বহির্দেশে আসিয়া শুনিলাম বে, স্বামীজী ভােগমূর্তিতে বহিঃমণ্ডপে আসিয়া দিনপঞ্জিকা শ্রবণ করিয়া, পূৰ্বদিনের আয় ব্যয়ের হিসাব লইয়া, ৰাহ্মণ- দিগকে নিত্য ভিক্ষা প্রদান করিয়া এবং পূজা লইয়া প্রস্থান করিবেন। আমরা তাহা দর্শন করিবার অভিপ্রায়ে তথায় দণ্ডায়- মান থাকিলাম। পরে দেখিলাম মণ্ডপে একখানি সিংহাসন পাতা হইল, চারি জন ব্রাহ্মণবাহক স্কন্ধে কাঠাসনে পিত্তল- ময়ী ভােস মূৰ্ত্তি আনিয়া উপস্থিত হইলেন; পরে সেই মূর্তি কাষ্ঠা- সনহইতে সিংহাসন বসান হইল। তৎপরে অভিষেকাদি কাৰ্য্য সম্পন্ন হইলে একজন ব্রাহ্মণ পঞ্জিকা হস্তে আসিয়া পাঠ করিয়া শুনাইলে আর একজন ৰাহ্মণ আয় ব্যয়ের হিসাব পাঠ করিয়া শুনাইলেন; তাহার পর অন্য এক ৰাহ্মণ একটি ধামায় করিয়া সের পনর আন্দাজ তণ্ডুল আনিয়া দেবের সম্মুখে রাখিয়া কয়েকটি মন্ত্র পাঠ করিয়া উপস্থিত কয়েকটি ব্রাহ্মণকে এক এক হাত উঠাইয়া দিলেন, অমনি আর একজন ব্রাহ্মণ একটি পাত্রে করিয়া কিছু তিলের মিষ্টান্ন আনিয়া ভােগ অর্পণ করিলেন ও সেই মিষ্টান্ন উপস্থিত লােকদিগকে বিতরণ করি- লেন। তদনন্তর ব্রাহ্মণবাহক আসিয়া দেবকে পূৰ্বৰৎ কাষ্ঠা- সনে উপবেশন করাইয়া ভিতরে লইয়া গেলেন, শুনিলাম তাহার পর নিত্য খিচুড়ী ভােগ হইবে। প্রাতে দেবের খিচুড়ী ভােগ হইয়া থাকে, তৎপরে পূজার পর খিচুড়ী, পুরী, অন্ন ও দুধিকঙীর ভােগ হইয়া থাকে।
তিরুপতি। ৭৭ বৈরাগীগণ উক্ত ভােগাঃ প্রাপ্ত হয় ও তাহাদিগের সংখ্যানু- সারে ভােগ সামগ্রীর কম বেশ হইয়া থাকে। আমরা দেবের শ্রীপাদপদ্মরেণু ও পিষ্টক প্রসাদ পাইয়া- ছিলাম ; বলা বাহুল্য যে, শ্রীপাদপদ্মরেণুর মােড়ায় দেবালয়ের শীল অঙ্কিত ছিল। সময় অভাবে অপর কিছুই দেখিতে সক্ষম , হই নাই। সেই দিবসেই তিরুমলয় হইতে মিম তিরুপতিতে ফিরিয়া আসিতে বাধ্য হইয়াছিলাম। শাস্ত্রানুসারে সমস্ততীর্থ পরিদর্শন ও তথায় স্নান করা সময় সাপেক্ষ, কিন্তু আমাদিগের তাহা ঘটে নাই। নিম্ন তিরুপতি নগরী কখন কখন স্বামীজী গােবিন্দপত্তম নামে অভিহিত হইয়া থাকে ; এই সহর হইতে চারিদিকের দৃশ্য অতি মনােহর, ৩ মাইল দক্ষিণে সুবর্ণমুখী-নদী প্রবাহিত হইতেছে। উত্তরে ১ মাইল দূরে তিরুমলয় পৰ্বতশ্রেণীর মনােহর শােভা ; দক্ষিণ ও পশ্চিমদিকৈ ৰহুদূর ব্যাপিয়া অগণন ছােট ঘােট পর্বতশ্রেণী বিরাজ করিতেছে ; পূর্বদিকের দৃশ্য আরও মনােহর, বহু দূরে পর্বতশ্রেণী দৃষ্ট হইয়া থাকে। সহরের উত্তরদিকে ১ মাইলের মধ্যে তিরুমলয় শ্রেণীর গায়ে কপিল- তীর্থ নামে জলপ্রপাত রহিয়াছে, বর্ষাকালে এই প্রপাত হইতে যখন জল পড়িতে থাকে, তখন তাহার দৃশ্য যে কি অদ্ভুত হয়, তাহা বর্ণনাতীত, একটির নিম্নে আর একটি, এইরূপে কয়েকটি রহিয়াছে ; প্রত্যেক প্রপাত প্রায় ৪৫৯ ফুট গভীর হইবে। শেষের প্রপাত একটি পুষ্করিণীতে পড়ে ; তাহার একদিকে ;
৭৮ তীর্থদর্শন। পর্বতশ্রেণী ও অপর ধারে গ্ৰেনাইট পাথরের দ্বারা বাধান। প্রত্যেক যাত্রীই তিরুমলয়ে উঠিবার পূর্কে এই তীর্থে অবগাহন করিয়া থাকে। পৰ্বতের পার্শ্বে একটি প্রস্তরময় হনুমানের মূর্তি আছে, তাহাতে প্রপাতের জল পতিত হয়। যে সকল যাত্রীগণ সন্তরণে দক্ষ তাহারা সন্তরণপূর্বক হনুমানের উপর যাইয়া বসে ও প্রপাতের জলে স্নান করে ; এতদ্ব্যতীত আরও কতকগুলি দেখিবার উপযুক্ত প্রপাত আছে। এইসহর অতি প্রাচীন, ইহার পথগুলি অপ্রশস্ত। ১৮৮১ সালের লােকসংখ্যা অনুসারে এখানকার বাসিন্দার ১৩২৩২ জন মাত্র। এখানে ডিপুটী তহসিলদার ও ডিষ্ট্ৰীক্ট মুনসেফের আফিস আছে ; এ স্থানে সৰ্ব্বশুদ্ধ ৩১টি দেবালয় বিদ্যমান আছে, তন্মধ্যে গােবিন্দস্বামী ও রামস্বামীর দেবালয় প্রসিদ্ধ। আমরা উভয় দেবালয়েই যাইয়া দেবদর্শন করিয়াছিলাম। রামস্বামীর মন্দিরের ' গােপুর অতি উচ্চ ও পরিষ্কার। লােকে কহিয়া থাকে যে, গােবিন্দস্বামী ব্যঙ্কটেশস্বামীর জ্যেষ্ঠ সহােদর, কিন্তু ইহার অর্থ বুঝিতে পারিলাম না। তবে এইমাত্র দেখিলাম যে, বিষ্ণুমূর্তিটি বৃহৎ ও শেষশয্যায় অশায়িত। নিম তিরুপতি হইতে ছয় মাইল পশ্চিমে চন্দ্রগিরি নামক একটী প্রাচীন শহর ; চোলরাজগণ এক সময়ে একাদশ হইতে পঞ্চদশ শতাব্দী পর্যন্ত তথায় রাজত্ব করিয়াছিলেন। তৎপরে উহা বিজয়নগরের রাজাদিগের অধীনে আইসে। ১৬৪৯ খৃঃ পূৰ্বভারত-সমিতি, চন্দ্রগিরির রাজা শ্রীরঙ্গরায়ালুর নিকট হইতে
তিরুপতি।
৭৯
মাদ্রাজের বন্দর স্থাপনের সনদ পাইয়াছিলেন, তাহাতে স্পষ্ট
প্রতীয়মান হইতেছে যে, তখনও চন্দ্রগিরির রাজগণ স্বাধীনভাবে
রাজত্ব করিতেছিলেন ও তাহাদিগের রাজত্ব বর্তমান মান্দ্রাজ
সহর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এখন আর সে রাজাও নাই, আর সে
রাজধানীও নাই। রাজভবনের এক অংশ মাত্র বিদ্যমান রহি-
য়াছে, তাহাও দেখিবার উপযুক্ত। এই চগিরিতে বিল্বপুর
গুন্টাকুল রেলের একটি ষ্টেশন হইয়াছে।
আমরা রেলষ্টেশনে রাত্রিযাপন করিয়া পর দিক প্রাতে
ব্যালেষ্টট্রেণে স্বস্থানে প্রত্যাবৃত্ত হই।
বেলুর। , ১৮৯০ সালে ৩১শে জুলাই অপরাহ্নে বেল্পর দর্শনাভিপ্রায়ে যাত্রা করি। ইহার অপর নাম রায়বেলুর। ইহা অরুকদু জেলার একটি প্রধান নগর ও মাদ্রাজ রেলওয়ের কাটপাডি ষ্টেশন হইতে ৪ মাইল দূরে অবস্থিত। এখানকার দুর্গ ও দুর্গ- স্থিত দেবালয় দেখিবার উপযুক্ত, এতদ্ভিন্ন আর দেখিবার উপ- যুক্ত কিছুই নাই। প্রবাদানুসারে বােমিরেড্ডী নামক জনৈক, ১১৯৫ খৃঃ দেবালয়ের নির্মাণ-কাৰ্য্য আরম্ভ করিয়া ১২০৪ খৃঃ সম্পন্ন করেন। গােদাবরীতীরস্থ ভদ্ৰাচল নামক স্থানে তাহার পূর্ব- নিবাস ছিল ; তাহার পিতার নাম যাদবরেডী। বােমি ও তাহার ভ্রাতা তিন্নীরেন্ডী বৈমাত্রেয় ভ্রাতাদিগের ষড়যন্ত্র হইতে রক্ষা পাইবার জন্য দেশত্যাগ করিয়া রামেশ্বরাভিমুখে যাইতে ছিলেন। পদব্রজে আসিতে আসিতে তঁাহার ক্লান্তিবোধ হইলে, বিশ্রাম করিবার জন্য বেলপদি নামক স্থানে অবস্থিতি করি- লেন; তাহারা উক্ত স্থান উর্বর দেখিয়া কৈলাপত্তন নামক স্থানের শাসনকর্তা করিকাল চোলের অনুমতি লইয়া গৃহ- নিৰ্মাণপূর্বক তথায় বাস করিতে থাকেন।
বেলুর । ৮১ তাহারা প্রথমে পশুপালকের কার্যে নিযুক্ত হইয়া ক্রমে বর্ধিষ্ঠ হইয়া উঠেন। বােমিরেড্ডীর একটা গাভীর পাঁচটী বাট ছিল, সেই গাভী প্রত্যহ একটি জলবেষ্টিত দ্বীপ মধ্যে বল্মীক ঢিপির নিকট যাইত এবং তথায় পঞ্চমুখবিশিষ্ট একটি সর্প সেই গাভীর দুগ্ধ পান করিত ; সুতরাং উক্ত গাভী ফিরিয়া আসিয়া আর পুনরায় দুগ্ধ দিত না।• বােম্নিরেন্ডী উহার কারণ জানি- বার জন্য এক দিবস সেই গাভীর পশ্চাৎ পশ্চাৎ গমন করে, পরে স্বয়ং উক্ত ব্যাপার দেখে ; সেই রাত্রিতেই সর্বব্যাপী মহাদেব তাহাকে স্বপ্নে দেখা দেন ও আদেশ করেন যে, নিকটবর্তী পাহাড়ের কোন নির্দিষ্ট স্থানে গুপ্তধন আছে, তুমি তাহা লইয়া দেবালয় নির্মাণ করিয়া দাও। পর দিবস বােমি- রেড্ডী নির্দিষ্ট স্থানে গিয়া প্রভূত ধন ও একটি লিঙ্গ দেখিতে পান, তখন আকাশবাণী হইল যে, তিনি দৈনিক খরচ মত প্রত্যহ ধন লইবেন। তাহার সঙ্গে একটি কুকুর ছিল, তথা হইতে ফিরিবার সময়ে উক্ত কুকুর একটি খরগােসকে তাড়া করিলে, খরগােস স্বভাববশতঃ পলাইবার চেষ্টায় দ্বীপস্থ বল্মীক চিপির চতুর্দিকে পরিক্রমণ করিতেছিল, তৎকালে আকাশবাণী হইল যে, যে স্থান দিয়া খরগােস গিয়াছে সেই স্থান পরিমাণে দেবালয় নির্মাণ হউক। বােম্নিরেন্ডী ভগবানের আদেশমত ৯ বৎসরে দেবালয়ের কার্য শেষ করিয়া, তথায় সেই লিঙ্গ স্থাপন করিলেন, সেই বিগ্রহ জলকান্তীশ্বর নামে অভিহিত হইল। যে ব্যক্তির তত্ত্বাবধানে উক্ত মন্দিরের নির্মাণ কাৰ্য্য হইয়া- তীর্থদর্শন। পরে ছিল, তাহার পুত্র পিতার অন্বেষণে তথায় আসিয়া উপস্থিত হয়; সে ব্যক্তি দেবালয়ের কাৰ্য্য দেখিয়া সন্তুষ্ট হইয়াছিল, আর কহিয়াছিল যে, কুলগ্নে দেবালয়ের পত্তন হইয়াছে, অতএব দেবালয়ের অনিষ্ট হইবে ও দেবসেবার বাধা পড়িবে। তৎপরে শুভলগ্ন দেখিয়া দেবালয়ের পত্তন হইল। ১২৬১ খৃঃ, দেবালয়ের কার্য সম্পন্ন হইলে জলকান্তীশ্বর ৰােমিরেড্ডীকে স্বপ্নে আদেশ করেন যে, “তুমি সত্বর দেবালয় ও দুর্গস্থানীয় রাজাকে সম- পণ করু।” বােমি দেবের আদেশমত দুর্গ ও মন্দির স্থানীয় রাজা ব্যঙ্কটদেব রায়ালুকে সমর্পণ করিলেন। স্থানীয় হস্তলিপিপাঠে জানা যায় যে, পূর্বোক্ত রাজার বংশধরগণ ১৫৭৬ খৃঃ পর্যন্ত এই স্থানে রাজত্ব করেন। বিজয়নগরের কৃষ্ণরায়ালু উক্ত দুর্গ অধিকার করিয়া দুর্গ শিবালয়ের কল্যাণমণ্ডপ নিৰ্মাণ করিয়া দেন। ১৬৪৬ খৃঃ, তালি- কোটের যুদ্ধে বিজয়নগরের ধ্বংস হইলে রায়বংশীয় রাজগণ প্রথমে পেন্নকন্দ থাকিয়া পরে বেলুরে আসিয়া রাজত্ব করিতে থাকেন। নরসিংহ রায়ানু রাজপদে অভিষিক্ত হইলে জিঞ্জী, তঞ্জাবুর, মধুরাপুরী ও মহিসুরের হিন্দুরাজগণ তাহার সাৰ্ব্ব- ভৌমত্ব নামমাত্র স্বীকার করিতেন। ১৬৫৩ খৃঃ মধুরার তিরু- মল নায়কের বড় যন্ত্রে গোলকলার সুলতান আবদুল বাদশা তাহাকে পরাভূত করিলে প্রথম তিনি তঞ্জাবুর-রাজের সাহায্য প্রার্থনা করেন; কিন্তু তাহাতে অকৃতকার্য হইয়া মহিমুর- রাজের আশ্রয় গ্রহণ করেন এবং মহিসুর-রাজের সাহায্যে বেলুর A কর্ণাটিক প্রত্যাবর্তন করিয়া বেলুর প্রভৃতি কয়েকটি স্থান অধিকার করিয়া গােলকদার সুবাদার সেনাকে পরাভূত করেন। কিছু দিন পরে তিরুমলের উত্তেজনায় গােলকদার সুবাদার মহিনুর আক্রমণ করিয়া মহিসুর-রাজকে পরাজয় করিয়া রায়ার বংশীয় নরসিংহ রায়াকে বেলুর হইতে দূর করিয়া উহা মুসল- মান শাসনভুক্ত করেন। তদবধি বেঙ্কুরের হিন্দুশাসন একে- বারে লুপ্ত হয় ও জলকান্তীশ্বর অন্তত হয়েন। ১৭৭৬ খৃঃ পর্যন্ত গােলকদার অধীন মুসলমান শাসনকর্তা বেল্লরে থাকিতেন। ১৬৭৮ খৃঃ মহারাষ্ট্রীয় বীর শিবজী ১২ মাস অবরােধের পর দুর্গ অধিকার করিয়া দেবের পুনঃস্থাপনের জন্য বিশেষ চেষ্টা করিয়াছিলেন, কিন্তু বিগ্রহের, দর্শন পান নাই। শিবজী প্রস্থান করিলে গােলকনার সুলতান্ পুনরায় উহা দখল করিয়া লয়েন। ১৭৪০ খৃঃ রঘুজী ভংশৈবেলুরের নিকট আলিকে পরাভূত করেন, কিন্তু তাহার পুত্রের নিকট নগদ টাকা লইয়া প্রস্থান করেন। সেই অবধি বেল্লর-কখন মহারাষ্ট্রীয় ও কখন বা মুসলমান নবাবদিগের অধীনে থাকে। হাইদার আলির সময়ে উহা মহিসুর-রাজ্যভুক্ত হইয়াছিল। হাইদারের নিকট হইতে ইংরাজরাজ তাহা কাড়িয়া লয়েন ও সেই অবধি উহা ইংরাজ- শাসনাধীনে আছে। আমি বরাবর দুর্গ ভিতরে যাইয়া দেখিলাম যে, দুস্থ প্রাঙ্গণের পূর্ব-উত্তর দিকে দেবালয় অবস্থিত, সম্মুখে উত্তম সুবৃহৎ গোপুর, গােপুরের ভিতর দিয়া দেবালয় প্রাঙ্গণে ৮৪ তীর্থদর্শন। আসিতে হয়। প্রাঙ্গণের দক্ষিণ-পশ্চিমদিকে কল্যাণ (বিবাহ)- মণ্ডপ, এই সুন্দর মণ্ডপ কৃষ্ণদেব রায়ালু কর্তৃক নির্মিত হয়। এই মণ্ডপের কাৰ্য্য অতি উত্তম ও পরিষ্কৃত ; ইহার থামে উত্তম উত্তম মূর্তি খােদিত আছে, কার্ণিশ ও ছাদ আবরণ প্রন্ত- রের উপর অতি পরিপাটী সুচারু কারুকার্য, এমন অন্যত্র প্রায় দেখা যায় না। ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোং এই কল্যাণমণ্ডপ ভাঙ্গিয়া বিলাতে পাঠাইবার কল্পনা করিয়াছিলেন, কিন্তু তাহা কাৰ্য্যে পরিণত হয় নাই। প্রাঙ্গণের উত্তর-পশ্চিম কোণে সভা- মণ্ডপ, পূৰ্ব্ব-উত্তর কোণে যাত্ৰামণ্ডপ, মধ্যস্থলে দেবালয় ; কল্যাণমণ্ডপের ন্যায় দেবালয়ের কাৰ্য্য তত পরিষ্কার না হইলেও উহা দেখিবার উপযুক্ত। ইংরাজরাজ, হাইদার আলির নিকট হইতে দুর্গ দখল করিয়া লওয়া অবধি বেরে সৈন্যনিবাস স্থাপন করিয়া ছিলেন, এমন কি মহিসুর-যুদ্ধের সময় মান্দ্রাজের পরই বেল্পর ইংরাজ সৈন্যনিবাসের প্রধান আভা ছিল ; এক্ষণে এখানে সৈন্য না থাকিলেও সেনা থাকিবার পুরাতন বাটী সকল দৃষ্ট হইয়া থাকে। এখানকার জলবায়ু বড় স্বাস্থ্যকর ; অনেক পে- শভােগ্নী য়ুরােপীয় ও সিপাহী এই সহরে বাস করিতেছে। দুর্গের চারিদিকে সুগভীর প্রশস্ত গড়খাই; গড়খাই পালার নদীর সহিত ভূগর্ভস্থ জলপ্রণালী দ্বারা সংযােজিত। অতএব পালার নদীর জল বাড়িলে গড়খাইয়ের জল বাড়িয়া থাকে, আবার গড়খাই দেবালয়ের মূলস্থানের সহিত যােগ থাকায় বেলুর। ৮৫ ; গড়খাইর জল বাড়িলে দেবালয়ের অঙ্গণে জল আসিয়া থাকে। মূলস্থানের সহিত ৩ দিকে ৩টি পাকা জলপ্রণালী দৃষ্ট হইয়া থাকে। ১মটি গড়খাই দিয়া পূর্বোক্ত পালার নদীতে গিয়াছে, ২য়টি বিরিঞ্চিপুরের মন্দিরের সহিত যােগ আছে বলিয়া কথিত হয় ; ৩য়টি সূৰ্যগুন্টা নামে বৃহৎ পুষ্করিণীর সহিত যােগ আছে, দক্ষিণদেশে যতগুলি দুর্গ ছিল, তাহার মধ্যে এই দুর্গ সুদৃঢ়তম বলিয়া কথিত হইয়া থাকে। এখানকার সেরেস্তাদার ব্যঙ্কট রায় আইয়ার মহাশয় স্বয়ং আমাদিগের সঙ্গে থাকিয়া দুর্গ ও দেবালয়ের সমস্ত স্থান দেখাইয়া ছিলেন। গত ১৮৮১ খৃঃ লােকসংখ্যার তালিকায় জানা যায় এখানে ৩৭ হাজার লোেক বাস করিত। পূর্বে এই দেবালয়ের প্রাঙ্গণে কমিসেরিয়েট গুদাম ছিল; মাদ্রাজ গবর্ণর ডিউক অব বকিংহাম সাহেব এই মন্দিরের কাৰ্য্য দেখিয়া চুমৎকৃত হন ও তথা হইতে গুদাম উঠাইয়া দিয়া প্রাঙ্গণ পরিষ্কার করিয়া, আদর্শ স্থানস্বরূপ রাখিতে আদেশ দেন; সেই অবধি প্রাঙ্গণ পরিষ্কৃত আছে। হাইদার আলির অধিকার সময়ে দুর্গ মধ্যে অনেকগুলি বাটা নির্মাণ হইয়াছিল। ১৭৮২ খৃঃ টিপুর সহিত সন্ধি হইলে, তাহার সন্তানদিগকে এই স্থানে রাখা হয়। ১৭৯৯ খৃঃ টিপুর মৃত্যু হইলে তাহার অন্যান্য পুত্র ও বেগদিগকে এই স্থানে নজরবন্দী করিয়া রাখা হয়। ১৮০৬ খৃঃ দেশীয় সিপাহীগণ বিদ্রোহী হইলে টিপুর বংশধরদিগকে কলিকাতা রাজধানীর টালিগঞ্জ নামক স্থানে পাঠান হইয়াছিল। ১৮৩৮ খৃঃ বেঙ্কুরে ;
তীর্থদর্শন। ৫ আর একবার সৈন্যবিপ্লব হইয়াছিল, কিন্তু সহজে থামিয়া যায়। ১৮৬৯ খৃঃ ওহাবিগণ কর্তৃক পুনরায় আর একটি সৈন্যবিপ্লব হইবার উপক্রম হইয়া উঠে, কিন্তু তাহাও সহজে মিটিয়া যায়। এক্ষণে দুর্গন্থ রাজপ্রাসাদে কয়েকটী সিংহলী ও অন্যান্য রাজপরিবার বাস করিতেছে। বেঙ্কুর, বিবপুর-গন্টাকুল রেল- ওয়ের একটি ষ্টেশন, দুর্গ ষ্টেশনের সন্নিকটে হইয়াছে। মাদ্রাজ রেলওয়ের কাটপাড়ী ষ্টেশনে গাড়ী বদল করিয়া এই স্থানে নামিতে হইবে। ।
বিরিঞ্চিপুর ১৮৯০ সালের ১লা অক্টোবর শুক্রবার প্রাতে জুটকা, করিয়া বিরিঞ্চিপুরাভিমুখে যাই, ইহাও পালার নদীর দক্ষিণ তীরে। মান্দ্রাজ রেলওয়ের বিরিঞ্চিপুর ষ্টেশন হইতে সহর ৩ মাইল দূরে অবস্থিত। এখানে ভগবান্ মহাদেব মুরগেধারী- শ্বরের মন্দির বিরাজমান, এই সহর বিরিঞ্চিপুর নামে অভিহিত হইলেও এখানে ৰহ্মার কোন মন্দির নাই; তবে ৰহ্মা পুরা- কালে কাঞ্চীপুরে অশ্বমেধ যজ্ঞ করিয়াছিলেন, সেই যজ্ঞশালার উত্তর সীমা নারায়ণবন, দক্ষিণ সীমা টিওীবন, পশ্চিম সীমা বিরিঞ্চিপুর, পূর্ব সীমা চিঙ্গলপুতের দুর্গ হইতে ১৮ মাইল সমুদ্রতীর মহাবলীপুর নামক স্থান নির্দিষ্ট হইয়াছিল ; পিতামহ যজ্ঞের চতুঃসীমা রক্ষাৰ্থ শক্তিদেবীর সাহায্য প্রার্থনা করিয়া- ছিলেন, অতএব পদ্মযােনর প্রার্থনানুসারে শক্তিদেবী আসিয়া বিরিঞ্চিপুরের সীমা রক্ষা করিয়াছিলেন বলিয়া প্রবাদ থাকি- লেও এখানে শক্তিদেবীর মন্দির বা পূজাপদ্ধতি কিছুই দেখি- লাম না । পূর্বোক্ত মন্দিরের বিষয় যত দূর জানিতে পারা যায়, তাহাতে বােধ হয় মন্দিরটি অতি পুরাকাল হইতে বিদ্যমান আছে। মূলস্থান চোলরাজাদিগের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত বলিয়া ৮৮ তীর্থদর্শন। প্রবাদ আছে। বল্লীকুম্ভ রায়ার নামে কোন রাজা ভিতরের প্রাঙ্গণ ও মহামণ্ডপ নিৰ্মাণ করিয়া দেন। বীরগম্ভীর রায়ার নামে অন্য কোন রাজা শতস্তম্ভ মণ্ডপ ও পূর্বদিকের গােপুর নিৰ্মাণ করিয়া দেন। বেলুরের বােমিরেড্ডী ও তাহার পুত্রদ্বয় যে তিনটী মণ্ডপ নিৰ্মাণ করিয়া দেন, তাহা অদ্যাপি তাহাদের নামে অভিহিত হইয়া আসিতেছে। বােমিমণ্ডপ পূর্ব দ্বারের নিকট, আক্কাল্পমণ্ডপ প্রাঙ্গণের দক্ষিণদিকে ও লিঙ্গপ্পমণ্ডপ প্রাঙ্গণের উত্তর দিকে অবস্থিত। বাহির প্রকোষ্ঠের প্রাচীর-নিৰ্মাণ সম্বন্ধে একটি প্রবাদ আছে, ধনপালুকোটী নামে কোন বণিক মরিচ বিক্রয় করিবার জন্য কাঞ্চীপুরে যাইতে যাইতে মানসিক ফরেন যে, তিনি নিরা- পদে গন্তব্য স্থানে পৌছিতে পারিলে দশবন্তা মরিচের মূল্যে বিরিঞ্চিপুরস্থিত মহাদেবের মন্দিরের সংস্কার করিয়া দিবেন, পথিমধ্যে একদল লুণ্ঠনকারী আসিয়া উক্ত বণিককে আক্রমণ করিলে মহাদেব অশ্বারূঢ় হইয়া তাহাকে রক্ষা করিয়াছিলেন, কাঞ্চীপুরে পৌছিলে তাহার প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করিবার বাসনা হইয়াছিল। পরে বস্তা খুলিয়া দেখিল, মরিচের পরিবর্তে ছােলা রহিয়াছে, তখন ধূর্ত বণিক ' অনুতাপ করিয়া পুনঃ মানসিক করিলে তাহা পুনরায় মরিচৰূপে পরিণত হইল। উক্ত বণিক প্রত্যাবর্তনকালে বিরিঞ্চিপুরে আসিয়া মহা- দেবের মন্দিরের বহিঃপ্রাঙ্গণের প্রাচীর তৈয়ার করিয়া দেন, ইহাতে তিনটি দরজা ও একটি গােপুর আছে, পূৰ্ব্বদিগের বিরিঞ্চিপুর। ৮৯ গগাপুর সর্বাপেক্ষা উচ্চ, বিজয়নগরের রাজা, অচ্যুত রায়ালু উক্ত গােপুর নির্মাণ করিয়াছেন। পশ্চিম দিকের গােপুর তদপেক্ষা ছােট। উক্ত দিকের দরজার সম্মুখে ভিতরের দেও- য়ালের যে স্থান আছে, তথায় বসন্ত উৎসব হইয়া থাকে। প্রাঙ্গ- ণের পূর্ব-দক্ষিণ কোণে একটি তীর্থ আছে ; যে সকল স্ত্রী বন্ধ্যা অথবা ব্ৰহ্মদৈত্য দ্বারা আক্রান্ত হইয়া থাকে, • প্রবাদ এইরূপ তাহারা ঐ তীর্থে স্নান করিলে আরােগ্য লাভ করেন। উত্তর দিকে যে তীর্থ আছে, তাহা সাধারণ-তীর্থ নামে অভিহিত হইয়া থাকে। শতস্তম্ভ মণ্ডপে মহাদেবের বাৎসরিক কল্যাণ উৎসব হইয়া থাকে। মন্দিরের ব্যয় কারণ কলেক্টর হইতে বাৎসরিক ১৬ শত টাকা ধার্য আছে, আমরা মন্দির দর্শনানন্তর ঈশ্বরের অর্চনাদি কাৰ্য্য সমাপন করি। আগন্তুকদিগের থাকিবার নিমিত্ত এই স্থানে অনেক গুলি ছত্র বা ধর্মশালা আছে। এখানকার জল বায়ু অতি স্বাস্থ্য- কর এবং ৰাহ্মণেরা স্মাৰ্ত্ত, এখানে চৈত্রমাস ৰহ্মোৎসব কালীন অনেক লােক সমবেত হইয়া থাকে। হাইদার-আলি কর্তৃক বেল্পর অবরুদ্ধ হইবার সময় ইহা মহিমুর সেনাদিগের একটি আউট-পােষ্ট ছিল। এই সহরে তিন হাজার লােকের বাস। তদনন্তর আমরা বিরিঞ্চিপুর হইতে আহারাদি সমাপন করিয়া পল্লিকোণ্ডের দিকে অগ্রসর হই।
পল্লিকোণ্ড। t উত্তর অরুকদু জেলার বেলুর তালুকের অন্তর্গত বিরিঞ্চিপুর সহরের ১৩ মাইল পশ্চিমে বেল্পর-বেঙ্গলুর-গ্ৰেণ্ডট্রাঙ্ক রােডের এক মাইল উত্তর দিকে পালার নদীর চরদ্বীপে পল্লিকেণ্ডৈ নামে সংর, ইহার নাম আদিরঙ্গম। এখানে ভগবান বিষ্ণু রঙ্গনায়ক স্বামী নামে অভিহিত হইতেছেন। পুরাকালে ৰহ্মা কাঞ্চীপুরে একটি যজ্ঞ আরম্ভ করিলেন। যজ্ঞ দর্শনে নিমন্ত্রিত অসুরেরা অসন্তুষ্ট হইয়া সরস্বতীদেবীকে সেই সংবাদ দেন, তখন সরস্বতীদেবী ক্রুদ্ধ হইয়া নদীরূপে যজ্ঞাগ্নি নষ্ট করিবার মানসে যজ্ঞশালার দিকে অগ্রসর হইতে থাকেন। ব্রহ্মা তাহা জানিতে পারিয়া বিষ্ণুর সাহায্য প্রার্থনা করেন। বিষ্ণু জলরােধ করিবার মানসে নদীরূপিণী সরস্বতী দেবীর সম্মুখে শয়ন করেন, নদীরূপিণী সরস্বতী দেবীও অন্য দিক্ দিয়া বহিতে থাকেন। তাহা হইতেই সেই স্থানের নাম পল্লিকোণ্ডৈ (অর্থাৎ তুমি শয়ন করিয়া থাক। হইছে। রঙ্গম্ অর্থাৎ জলবেষ্টিত দ্বীপ হইতে এই দ্বীপ আদি- রঙ্গম্ নামে কথিত হইয়া থাকে, সেই কারণে ভগবান্ বিষ্ণু রঙ্গনায়ক স্বামী নামে অভিহিত হইতেছেন। বিষ্ণু জলরােধ করিলে সরস্বতী দেবী অন্তঃশিলা হইয়া কাবেরী পাকের সন্নি- পল্লিকোণ্ডৈ । কটে আবির্ভূত হইয়া যজ্ঞ নাশের উদ্দেশে রহিতে থাকেন। বিষ্ণুও সেই স্থানে যাইয়া জলরােধ করিয়া দেন, তথায় তিনি রঙ্গনাথ স্বামী নামে খ্যাত হইয়াছেন। আমার পথপ্রদর্শক কহিলেন কাঞ্চীপুরের নিকটে বেগবতী নদীর ধারে যে উলঙ্গ মূৰ্ত্তি আছে, তাহাই অন্তঃরঙ্গনাথ স্বামী জানিবে। এ সম্বন্ধে আর একটি প্রবাদ আছে যে, পল্লিকোণ্ডৈর নিকটে বিজয়াচলে অম্বরীষ নামক রাজা মােক্ষপ্রাপ্তির উদ্দেশে অনেক দিন ধরিয়া তপস্যা করিলে আকাশবাণী হইয়াছিল যে, বিষ্ণু সরস্বতীদেবীর বেগ বােধ করিবার জন্য বিজয়ালের সন্নিকটে শেষশায়ী হইলে তদ্দর্শনে তােমার মুক্তি হইবে। তিনিও বিজয়াচলে থাকিয়া বিষ্ণু দর্শন প্রতীক্ষা করিতেছিলেন ও বিষ্ণুকে শেষশায়ী দেখিয়া মুক্তিলাভ করেন, এই নদী পালার নামে অভিহিত পাল = দুগ্ধ অর=নদী অর্থাৎ দুগ্ধ নদী। এই নদীর জল অতি পরিষ্কার ও সুমিষ্ট বােধ হয় এই কারণেই দুগ্ধ নদী বলিয়া নাম হইয়াছে। এখানকার মন্দিরটি নিতান্ত ছোট নহে। বাহিরের প্রাচীরে যে গােপুর আছে, তাহাতে দুই একটি কদাকার ও কুৎসিত মূর্তি দেখিতে পাওয়া যায়। বােধ হয়, চোলরাজদিগের সময়ে স্থাপিত হয় ও বিজয়নগরের রাজগণ দ্বারা এই মন্দিরের উন্নতিও সংস্কার হইয়া থাকিবে। ইহা শ্রীরামানুজ মতাবলম্বী শ্রীবৈষ্ণব- দিগের মন্দির। মন্দিরের যে ভূসম্পত্তি ছিল, তাহার পরিবর্তে ব্যয় জন্য সরকার হইতে হাজার টাকা নির্দিষ্ট আছে। মন্দি- ৯২ তীর্থদর্শন। রের মনিগার সঙ্গে থাকিয়া সমস্ত দেখাইয়াছিলেন এবং তিনি অৰ্চনাদির বন্দোবস্ত করিয়া দেন। ১৮৮১ খৃঃ লােক সংখ্যার তালিকার হিসাবে এখানে ২৪৫ লােকের বাস। এখান হইতে ৪ মাইল পশ্চিমে বটার-বন নামক স্থানে হল্লাম্মা নামক দেবীর মন্দিরে প্রতি শুক্রবার বহুলােক সমবেত হইয়া মন্দিরের সম্মুখে অন্নপাক করিয়া দেবীকে অর্চনাদি ও ভােগ দানের পর আহারাদি করিয়া থাকে, হল্লাম্মার মন্দির দর্শন ও স্বামীর অর্চনাদি করিয়া পুনরায় বেঙ্কুরে ফিরিয়া আসিয়া রাত্রিযাপন করিলাম।
তিবিম।
পর দিবস শনিবার প্রাতে তিরুবিহু নামক স্থানাভিমুখে
গমন করি, প্রথম জুট কাযােগে কাটপাদী-রেলষ্টেশনে আসি।
তথা হইতে রেলগাড়ীযােগে তিরুবি ষ্টেশনে আসিয়া পৌছি।
এই রেলষ্টেশন হইতে দেবালয় এক মাইল দূরে অবস্থিত।
এখানে ভগবান্ বিশ্বনাথের নামে স্বয়ম্ভু অনাদি মহাদেব
বিরাজ করিতেছেন। কথিত আছে যে, সত্যযুগে গৌরীদেবী,
ত্রে হায় মহাবিষ্ণু ও দ্বাপরে বিরিঞ্চি এইস্থানে বিশ্বনাথেশ্বরের
পূজা করিয়াছিলেন। লােকের বিশ্বাস যে, কলিযুগে মতিজনক
নামে কোন ঋষি ঐ লিঙ্গের পূজা করিতেন। এই মন্দির
হইতে চার মাইল দূরে কামিলয় নামে এক পাহাড়ে একটি
উৎকৃষ্ট জলাশয় আছে। পুরাকালে উক্ত জলাশয় ভিন্ন অন্য
কোন জলাশয় নিকটে ছিল না। তখন পন্নীনদীর উৎপত্তিও
হয় নাই। পূর্বোক্ত জলাশয়ের সন্নিকটে পণজ্ঞী নামে এক
রাক্ষস বাস করিত। মুনিবর মতিজনক তথায় প্রত্যহ জল
আনিতে যাইতেন,, রাক্ষস তাহার প্রতি বিরক্ত হইয়া কান
প্রকারে মুনিবরের অনিষ্ট করিতে ইচ্ছুক হইল। বিশ্বনাথের
তাহা জানিতে পারিয়া, ঐ রাক্ষস বধ করিতে নন্দীকে অনুমতি
দেন। নন্দী ও তথায় যাইয়া ঐ রাক্ষসকে বধ করে। তদবধি
৯৪ তীর্থদর্শন। । নন্দী বিশ্বনাথেশ্বরের দিকে পিছন হইয়া পৰ্ব্বতের দিকে চাহিয়া দেখিতেছেন, যেন অন্য কোন রাক্ষস আসিয়া উপস্থিত না হয়। প্রত্যহ ৪ মাইল দূরে যাইয়া পূজার নিমিত্ত জল আনা মতিজনক- ভক্তের পক্ষে কষ্টকর বুঝিয়া বিনাথের দেবালয়ের সম্মুখ দিয়া পােন্নী অর্থাৎ “তুমি এই স্থান দিয়া প্রবাহ হইতে থাক, এই নামে নদীর উৎপত্তি করিয়া দিয়াছেন। এই মন্দির কোন্ সময়ে স্থাপিত হয়, তাহার নিগূঢ়তত্ব জানিবার উপায় নাই। এখানকার গুরুকুল এ বিষয়ে অনভিজ্ঞ, তাঁহারা কহেন যে, এই স্থানে বিল্বন ছিল। সেই বিল্ববন হইতেই বিনাথের নামের উৎপত্তি হইয়াছে। তাহারা আরও কহেন যে, উক্ত ঋষি অদ্যাবধি পূর্বোক্ত কাঞ্চিমলয়ে বাস করিতেছেন। সময়ে সময়ে রাত্রিকালে বিশ্বনাথেশ্বরকে পূজা করিতে আসেন। মন্দিরের সম্মুখে কোন বিল্ববৃক্ষ দেখিতে পাইলাম না। একটি পুরাতন কাঠাল বৃক্ষ আছে, গুরুকুলগণ কহেন ইহা দুইশত বৎসরের বৃক্ষ। মন্দির দৃষ্টে পুরাতন বলিয়া বােধ হয়, মন্দিরের চারিদিকে প্রাচীর, দক্ষিণ প্রাচীরের সম্মুখ অপেক্ষাকৃত নূতন, আর একটি প্রাচীর, এই উভয় প্রাচীরেই সুবৃহৎ গােপুর আছে। প্রথম গাের পার হইয়া দক্ষিণদিকে গৌরীতীর্থ নামে চতুঃসােম পুষ্করিণী আছে, উহার চারিদিকে ঘেণইট প্রস্তরের বাঁধা সিঁড়ি ; বামদিকে পুষ্পোদ্যান, দ্বিতীয় গােপুর পার হইলে মন্দির সম্মুখে আসিয়া পোঁছান যায়।
তিরূবিল্বম্। মন্দিরের পূর্বদিকে যে মূলমণ্ডপ আছে, তাহা অপেক্ষাকৃত নুতন, প্রাঙ্গণের দক্ষিকোণে রন্ধনশালা, উত্তর পূর্বকোণে সভাপতির বসন্তমণ্ডপ। পশ্চিম উত্তরকোণে কল্যাণ (বিবাহ- মণ্ডপ। অনুশাসন দৃষ্টে জানা যায় যে, উক্ত কল্যাণমণ্ডপ ৪২ বৎসর পূর্বে বেঙ্কুরের সুৰহ্মণ্য নামক কোন ব্যক্তি কর্তৃক নিৰ্ম্মিত হইয়াছে। বেদশাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিত সোমশাস্ত্রী এখানে ছাত্রদিগকে মণ্ডপে বসিয়া বেদ অধ্যয়ন করান, তিনি মন্দিরের আয় হইতে মাসিক পাঁচ টাকা হিসাবে বেতন পান। ইনি সঙ্গে থাকিয়া মন্দির দেখাইয়া পূজা ও অর্চনার বন্দোবস্ত করিয়া দেন। দেবীর মন্দির মূলমন্দিরের পার্শ্বে, দেবীর নাম থানু- মুদিল।
অৰুক।
২রা অক্টোবর শনিবার অপরাহ্নে শােলিঙ্গম যাইবার
উদ্দেশে তিনি রেল-ষ্টেশনে প্রত্যাবৃত্ত হইয়া রেলযােগে
অরুকদু ষ্টেশনে অবতরণ করিয়াছিলাম।
তামিল ভাষায় অরুকদু নামের উৎপত্তি, অরু == ছয়,
কদু = বন সংস্কৃত ষড়ারণ্য ক্ষেত্র, এক্ষণে তাহার অপভ্রংশ
অর্কট।
পুরাকালে এই প্রদেশ জঙ্গলময় ছিল। কাঞ্চীপুরে ব্রহ্মার
মহাশ্বমেধযজ্ঞ সমাপন হইলে, ভরদ্বাজ প্রভৃতি ষষ্ঠ ঋষি উক্ত
ষষ্ঠীবনে বাস করিতে থাকেন এবং আপন আপন আশ্রমে ঈশ্বর
প্রতিষ্ঠা করেন ; পরে তাহাদের আপন আপন নামানুসারে
মহাদেবেরও নাম হইয়াছে। সেই পুণ্যস্থানও অরুকদু বা
ষড়ারণ্য নামে খ্যাত হইফেছে।
(১) যে স্থানে পালার নদীর আনিকট হইয়াছে, তাহার
সন্নিধানে পুবনকা (পুষ্পরণ্য) গ্রামে ভরদ্বাজ মুনির আশ্রম
ছিল উক্ত মুনি আপন আশ্রমে লিঙ্গের প্রতিষ্ঠা করিয়ছিলেন,
সেই লিঙ্গ এক্ষণে তাহারই নামে অভিহিত হইতেছেন।
(২) বেপুর (অর্থাৎ নিদারণ্য) গ্রামে বশিষ্ঠদেবের আশ্রম
ছিল; উক্ত মুনিবর আপন আশ্রমে লিঙ্গের প্রতিষ্ঠা করিয়া
=
অরুকদু। ৯৭ তপস্যা করিয়াছিলেন, তাহারই নামানুসারে মহাদেব বশিষ্ঠেশ্বর নামে অভিহিত হইতেছেন। এখানে রথযাত্রা ও ৰহ্মোৎসব মহাসমারােহের সহিত সমাধা হইয়া থাকে। এই স্থানের দেবােত্তর ভূসম্পত্তির আয় প্রায় এক হাজার টাকা হইবে। (৩) অরুকদু ও বেলুরের মধ্যস্থলে মেল-বিষরণ গ্রামে বাল্মীকি মুনির আশ্রম ছিল। এ স্থানটি অতিপবিত্র, এইরূপ প্রবাদ যে, এই স্থানে মৃত ব্যক্তির অস্থি জলে দিলে তাহা পুষ্প- রূপে পরিণত হইত। এক্ষণে অনেকে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার পরে এখানকার অস্থি জলে নিক্ষেপ করিয়া থাকে। (৪) বালা-জাপেটু তালুকের অন্তর্গত বল্লিবে গ্রামের নিকট অগস্ত্যেশ্বর মহাদেবের মন্দির। অগস্ত্যমুনি আপন আশ্রমে ঈশ্বরপ্রতিষ্ঠা করিয়া তপস্যা করিয়াছিলেন। ৫/৬ পালার নদীর ধারে যে স্থানে নবলক্ষ, বন বা বৃক্ষ আছে, তথায় বিশ্বামিত্র ও গৌতম মুনিদ্বয়ের আশ্রম। উক্ত বনে মহাদেবের ২টি মন্দির ছিল, অরকদুর নবাবেরা যখন নবলক্ষ উদ্যানের পত্তন করেন, তখন উক্ত মন্দিরদ্বয় তাহা- দিগের স্পর্শে অপবিত্র হয়। এখন বিশ্বামিত্ৰেশ্বরের কোন চিহ্ন পাওয়া যায় না, কিন্তু গৌতমেশ্বরের মন্দিরের ভগ্নাবশেষ এখনও দেখিতে পাওয়া যায়। এই বিভাগকে অরুকদু কহিত, স্পষ্ট প্রতীয়মান হইতেছে যে, পূর্বে ইহা হইতেই সহরের নাম ও অরুকদু বা অনূকট হইয়াছে। ।
তীর্থদর্শন। খৃঃ ১১শ শতাব্দিতে তঞ্জাবুরের কুলােঙ্গ চোলরাজের জারজ পুত্র তীমান রাজচক্রবর্তী অরুকদু আপন রাজ্যভুক্ত করিয়া জঙ্গল পরিষ্কার করাইয়া আবাদোপযােগী করিয়াছিলেন। যৎকালে বেঘ্নিরেন্ডী বেলুরের দুর্গ প্রস্তুত করিতেছিলেন, তৎকালে তাহার ভ্রাতা তিমিরেডীও অরুকদুর দুর্গ প্রস্তুত করিয়াছিল। এতদ্ভিন্ন অরুকদু সম্বন্ধে অন্য কোন বিবরণ পাওয়া যায় না। খৃষ্টীয় অষ্টাদশ শতাব্দির মধ্যভাগে জিঞ্জী নামক দুর্গে মারী- ভয় উপস্থিত হয়। কর্ণাটিকের নবাবেরা জিঞ্জী পরিত্যাগ করিয়া অরুকদুতে আসিয়া রাজধানী স্থাপন করেন, তথায় তাহারা নবাব মহম্মদ আলির সময় পর্যন্ত বাস করিয়াছিল। লর্ড ক্লাইব প্রথমে এই স্থানেই আপন বলবিক্ৰম প্ৰকাশ করিয়াছিলেন। এক্ষণে অরুকদুর পূর্ব গৌরব বা সৌন্দৰ্য্য নাই। উহা একটি সামান্য সররূপে পরিণত হইয়াছে। পূৰ্বে এখানে ৩৬০ টি মসজিদ ছিল, তৎকালীন নবাবগণ তাহাদের ব্যয় নির্বাহ করি- তেন। সহরের চারিদিকে য়ে উচ্চ প্রাচীর ছিল, তাহা ৫ মাইলের কম নহে; উক্ত প্রাচীর সহরপণা নামে অভিহিত হইত, উহার ভিত্তি ২৪ ফুট চওড়া এবং ক্রমে কমিয়া ১২ফুট প্রশস্ত ছিল, উক্ত প্রবের ৫টি দরজা ছিল, পালার নদীর উপরে যে দরজা তাহা দিল্লীদরজা নামে অভিহিত, এবং এখনাে বর্তমান আছে। দরজার উপর হইতে পালার নদীর দৃশ্য অতি চমৎকার দেখায়, ক্লাব সাহেব উক্ত দরজার উপর প্রায়ই উঠিতেন। প্রত্যক
অরুকদু ।
৯৯
৫ম বৎসরে পূর্তবিভাগ হইতে উহার মেরামত হইয়া থাকে।
পালার নদী হইতে অন্ধ মাইল দূরে ও সহরের মধ্যস্থলে দুর্গ
ছিল। ১৭৫১ খৃঃ, উহা লর্ড ক্লাইব কর্তৃক রক্ষিত হইয়াছিল।
দুর্গ এবং সহরপণা ভাঙ্গিয়া দেওয়া হইয়াছে, দুর্গের সাক্ষী-
স্বরূপ একটি মসজিদ বিদ্যমান আছে। এই মসজিদের ২০০ শত
গজ অন্তরে নবাবদিগের রাজভবনের ভগ্নাবশেষ রহিয়াছে ।
পুরাণ দরবার-গৃহে তালুক কাছারী বসিত, এখন তাহাতে
সিবিল ডিস্পেন্সারি হইয়াছে, রাজভবন ও জুম্মা-মজিদের
ভিতরে নবাব সাহদৎ-আলিখার কবর বিদ্যমান রহিয়াছে,
এই কবর গ্ৰেণাইট প্রস্তরে প্রস্তুত হইলেও গাঁথুনি ও পালিস
যাহা আছে তাহা দেখিবার উপযুক্ত বটে। এই স্থানে টিপু
আলিয়ার নামে কোন ফকিরের কবর আছে'; নবাবেরা উক্ত
ফকিরকে বিশেষ মান্য করিতেন। মহিসুরের হাইদার-আলি
উক্ত ফকিরের নাম হইতে আপন প্ৰিয়পুত্র টিপুসুলতানের
নামকরণ করিয়াছিলেন।
বাৎসরিক মহরম উপলক্ষে মান্দ্রাজ ত্রিপিকোলনের নবাব
বংশীয়েরা অরুকদুতে আসিয়া টিপু আলিয়ারের কবরের নিকট
বাইয়া সম্মান প্রদর্শন করেন। মসজিদের ব্যয় নির্বাহাৰ্থ ইংরেজ
সরকার হইতে বাৎসরিক টাকা বরাদ্য আছে।
অরুকদুর পূর্ব গৌরব না থাকিলেও ঐতিহাসিক গৌরবের
জন্য সকলেরই আসিয়া দেখা উচিত।
শােলিঙ্গম। শােলিঙ্গম্ বাজাপেট তালুকের অন্তর্গত অরুকদু রেল- ষ্টেশন হইতে ১৫ মাইল দূরে অবস্থিত। আমরা অরুকঃ হইতে জুকাযােগে শােলিঙ্গম্ যাইয়া পৌছি। এই সহরটি নিতান্ত ছােট নহে। এখানে ৫ পাঁচ হাজার লােকের বাস আছে, চোললিঙ্গপুর হইতে শােলিঙ্গম্ শব্দের উৎপত্তি। কথিত আছে যে, পূর্বে এই স্থান জঙ্গলময় ছিল। চোল- বংশীয় কোন রাজা মৃগয়া করিতে করিতে এই জঙ্গলমধ্যে অনাদি স্বয়ম্ভুলিঙ্গ দেখিতে পান। পরে লিঙ্গের উপরে এই মন্দির নির্মাণ করাইয়া উক্ত লিঙ্গকে চোলেশ্বর নামে অভিহিত করেন। তিনি জল কাটাইয়া জমী সকল আবাদ করান ও ৰাহ্মণদিগের বাসের নিমিত্ত বাটী নিৰ্মাণ করিয়া দেন। এই মন্দিরটি সহরের মধ্যস্থলে ও পুরাতন বলিয়া বােধ হইল। সহরের অপরদিকে ভক্তবৎসল নামে একটি বিষ্ণু মন্দিরও আছে। স্থানীয় প্রবাদানুসারে কাঞ্চীপুরের শ্রীবরদারাজেশ্বর স্বামী এই স্থানের দণ্ড্যাচাৰ্য্য নামে কোন সিদ্ধপুরুষকে প্রতাক্ষ হইয়া পূর্বোক্ত বিষ্ণুমন্দির নির্মাণের আদেশ করেন। উক্ত শােলিঙ্গ। সিদ্ধপুরুষ বিজয়নগরের রাজাদিগের নিকট ভগবানের আদেশ জ্ঞাপন করিলে, তথাকার রাজা কৃষ্ণরায়ালু ভঁহার প্রার্থনামতে এই মন্দির নির্মাণ করিয়া দেন। দণ্ড্যাচার্য্যের ৩০ বৎসর বয়সের সময়ে ভগবান্ বিষ্ণু তাহাকে প্রত্যক্ষ হইয়াছিলেন। ৫৭ বৎসর বয়ঃক্রমকালে তঁাহার মৃত্যু হয়। তাঁহার বংশধরেরা অদ্যাপি বিদ্যমান আছেন। তাঁহাদের প্রমুখাৎ শুনিলাম ৩৭০ বৎসর পূর্বে তাহার মৃত্যু হইয়াছে, সেই হিসাবে ভক্তবৎসলের বয়স ৩৭০ বৎসরের উপর হইতেছে। সহর হইতে ১ মাইল দূরে পাহাড়ের উপর দুইটি দেবালয় আছে, একটিতে ভগবান্ নৃসিংহস্বামী বিরাজমান, অপরটিতে আঞ্জনেয় স্বামীর মূর্তি বিদ্যমান। প্রবাদ আছে, ভগবান নৃসিংহস্বামীর মন্দিরের সন্নিকটে কশ্যপ, অত্রি, গৌতম, জমদগ্নি, ভরদ্বাজ, বশিষ্ঠ, বিশ্বামিত্র ও সপ্তর্ষিগণ তপস্যা করিয়াছিলেন। ভগবান্ নৃসিংহস্বামী ঋষি- দিগের তপে সন্তুষ্ট হইয়া তাহাদিগকে নৃসিংহ মূর্তিতে প্রত্যক্ষ দেখা দেন। ভগবান বিষ্ণু তাহাদের প্রার্থনায় তদবধি উক্ত পৰ্ব্বতে নৃসিংহমূর্তিতে অবস্থান করিতেছেন। পৰ্ব্বতটি উচ্চ, মন্দিরে উঠিবার কারণ পরিষ্কার সিঁড়ি আছে, অরুকদুর নবাব মহম্মদ আলির মন্ত্রী রাওজী উক্ত পৰ্বতের সিঁড়ি নির্মাণ করিয়া দেন; অতএব এক্ষঙে, মন্দিরে উঠিতে বিশেষ কষ্ট হয় না, পাহাড়ের দশ আনা ভাগ উঠিলে রাস্তার দক্ষিণ ভাগে একটি তীর্থদর্শন। ; মন্দির আছে, তাহা অমৃত বল্লীর মন্দির নামে খ্যাত ; কিন্তু এক্ষণে ঈশ্বরীমাতার মূর্তি নৃসিংহদেবের মন্দিরের এক পার্শ্বে রহিয়াছে, বােধ হয়, মুসলমান অত্যাচারের ভয়ে সর্বোচ্চ স্থানে রাখা হইয়াছে। মন্দিরটি আপাততঃ অতি অপরিষ্কার, পরিষ্কার করাইয়া রাখিলে উত্তম বিশ্রামের স্থান হইতে পারে। এখানে ছয়টি তীর্থ আছে, তাহাদের জল অতি পরিষ্কার বলিয়া ৰােধ হইল পাহাড়ের সর্বোচ্চ স্থানে নৃসিংহদেবের মন্দির। এখন হইতে চারি দিকে বহুদূর পর্যন্ত দেখিতে পাওয়া যায়, দৃশ্য ও বড় সুন্দর, তথায় সৰ্ব্বদা শীতল বায়ু বহিতেছে, মন্দিরের গােপুরের সম্মুখে একটি তীর্থ আছে, তাহা হংসকুণ্ড নামে প্রসিদ্ধ। মন্দিরের অপরপার্শ্বে, আর একটি কুণ্ড আছে, তাহার জল অতি সুমিষ্ট। নৃসিংহমূর্তির অবয়ব মনুষ্যাকৃতি মুখ সিংহাকৃতি চতুৰ্হস্ত, দুই হস্তে শঙ্খ-চক্র অপর দুই হস্তে গদা-পদ্ম, যােগাসনে উপবিষ্ট, নৃসিংহদেবের মন্দিরের পার্শ্বে একটি ছােট প্রকোষ্ঠে অমৃতবল্লী: স্মদেবী বিরাজ করিয়েছেন। অমৃতবল্লীম্মাদেবীর নাম সম্বন্ধে এইরূপ কথিত হইয়া থাকে যে, কোন সময় কুবেরের নবনিধি অপহৃত হয়, কুবের তাহার পুনরুদ্ধারের নিমিত্ত উক্ত শৈলে আসিয়া মহালক্ষ্মীর তপস্যা করিতে থাকেন। যে স্থানে তপস্যা করিয়াছিলেন, তাহার নিকট একটি অমৃতবল্লীর গাছ ছিল। লক্ষ্মীদেবী তাহার (কুবেরের) দুঃখে দুঃখিত হইয়া উক্ত বৃক্ষ শােলিঙ্গ। হইতে কুবেরকে দর্শন দিয়াছিলেন। কুবের সেই নিমিত্ত অমৃতবল্লী বৃক্ষের উপর মন্দির নির্মাণ করাইয়া মন্দিরে লক্ষ্মী- দেবীর মূর্তি প্রতিষ্ঠা করিয়া উক্ত অমৃতবল্লীবৃক্ষ হইতে মাতার নামকরণ ও পূজার বন্দোবস্ত করিয়া দেন। নৃসিংহদেবের মন্দির অতি প্রসিদ্ধ, যাহারা কাঞ্চীপুর ও তিরুপতি আসিয়া দেবদর্শন করেন, তাহারা শােলিঙ্গম্ আসিয়া নৃসিংহদেবের মূর্তি দেখিয়া চরিতার্থ হয়েন। পৰ্ব্বতের নীচে যে বৃহৎ প্রস্তরে পাকা বাধান পুষ্করিণী আছে, তাহা নৃসিংহতীর্থ নামে খ্যাত, এই তীর্থের পূৱ ভাগে অন্নদান ছত্র আছে। এই ছত্রটি পূর্বোক্ত রায়জীর দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল। এই ধৰ্ম্মশালার ব্যর্থ তিনি যে ভূমিদান করিয়াছিলেন; ইংরাজ-গবর্নমেন্ট হইতে তাহার পরিবর্তে টাকা নির্ধারিত আছে। লােক্যালফণ্ডের তত্ত্বাবধানে এই টাকা হইতে অগিন্তুক ৰাহ্মণদিগকে আহার দেওয়া হয়। আঞ্জনেয়স্বামীর মন্দিরে যাইবার কারণ ছত্রের নিকট দিয়া নূতন পথ প্রস্তুত হইয়াছে। আঞ্জনেয় পাহাড়ের পাদদেশে একটি চতুষ্কোণ বাঁধান পুষ্করিণী ; ইহার একধারে রামস্বামীর মন্দির। এই পুষ্করিণীর ধার দিয়া আঞ্জনেয় পাহাড়ে উঠিতে হয়, পাহাড়ের উপর আঞ্জনেয়স্বামীর মন্দির। পাহাড় (১) মন্দিরের আভরণাদির মূল্য কম নহে। দুইমাস পরে শুনিলাম যে ৪০ চালিশহাজার টাকা মুল্যের অলঙ্কার তস্করেরা রাত্রিযােগে দরজা ভাঙ্গিয়া হরণ করিয়া লইয়া গিয়াছে। বাৎসরিক ১২৮১ ১০৪ তীর্থদর্শন। স্থিত নৃসিংহস্বামীর মন্দির হইতে ইহা অর্ধমাইল দূরে অবস্থিত এবং ইহাতে উঠিবার সিঁড়ি পূৱ হইতেই কতক ছিল, অবশিষ্ট গুলি মঞ্জিবর রায়জী উত্তমরূপে নিৰ্মাণ করিয়া দেন। আঞ্জনেয়- স্বামীর মূর্তি নৃসিংহদেবের মূর্তির সদৃশ চতুর্হস্ত-বিশিষ্ট, হস্তে শঙ্খ- চক্র বিরাজমান। প্রবাদ আছে যে, শ্রীরামচন্দ্রের স্বর্গারােহণের পর আঞ্জনেয় এই শৈলে আসিয়া নৃসিংহদেবের তপস্যায় রত থাকেন, সেই সময়ে মান্দারপুরের রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন একদিবস মৃগয়া করিতে যান, তিনি জাতিস্মর ছিলেন। বনে যাইতে যাইতে শুনিতে পাইলেন, পশু গণ পরস্পর কহিতেছে যে দেখ, মহারাজ ইন্দ্রদ্যুম্ন আমাদের রক্ষাকর্তা হইলেও আমাদিগকে সংহার করিতে আসিতেছেন, এখন আমরা কোথায় যাই ও কাহার বা আশ্রয় লই ; অহহ কি দুভাগ্য! যিনি রক্ষক তিনিই ভক্ষক। পশুদিগের সেই কাতরােক্তি শ্রবণে রাজার মনে দয়ার উদ্রেক হইল। তখন তিনি মনে মনে কহিতে লাগিলেন, কোথায় রাজা হইয়া সকলের কষ্টদূর করিব, না প্রাণীহিংসা করিতে প্রবৃত্ত হই- ছি। প্রায়শ্চিত্ত কি ? এইরূপ ভাবিতে ভাবিতে প্রতিনিবৃত্ত হইয়া রাজ্যত্যাগ করার সন্ন্যাসগ্রহণের নিমিত্ত বামদেব ঋষির নিকট উপস্থিত হইয়া বনে মৃগয়াকালীন যাহা যাহা ঘটিয়া- ছিল, তৎসমস্ত বিবৃত করিয়া কহিলেন; প্রভাে! আমার এই পাপের প্রায়শ্চিত্ত কি? তৎবিষয়ে উপদেশ দিন। তৎশ্রবণে ঋষিবর তাহাকে বিষ্ণুমন্ত্রে দীক্ষিত করিয়া আদেশ করিলেন, যে তুমি শােলিঙ্গপাহাড়ে যাইয়া নৃসিংহদেবের আরাধনা করিলে শােলিঙ্গ। তােমার মানস পূর্ণ হইবে। এই সময় কালকেয়াদি কয়েকটি দৈত্য ঋষিদিগের তপের বিঘ্ন করিতেছিল, ঋষিগণ নৃসিংহ- দেবকে আপন আপন দুঃখ জানাইলেন। রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন ঐ সময় সেই পৰ্বতে প্লেসিয়া পৌছেন। রাজা আসিয়া পেছিলে নৃসিংহদেব তাহাকে কালকেয় দৈত্যদিগকে বধ করিতে অনুমতি দিলেন। তৎশ্রবণে রাজা প্রণিপাতপূৰ্ব্বক কহিলেন, পশুহিংসা পাপে লিপ্ত হইয়া প্রায়শ্চিত্ত জন্য রাজ্য ত্যাগ করিয়াছি ও আপনার তপস্যাৰ্থ এইস্থানে আসিতেছি। আমার রথ বা সৈন্য-সামন্ত আর কিছু নাই, কেমন করিয়া দৈত্যদিগের সহিত যুদ্ধ করিব। দেব ! আমি পরহিংসা করিতে ইচ্ছুক নহি। তখন নৃসিংহদেব নিষ্কাম ধৰ্ম্মের উপদেশ দিয়া রাজাকে কহিলেন, তুমি ঋষিদিগের মঙ্গল কামনায় ও আমার আদেশে এই কাৰ্য্য সম্পন্ন করিলে প্রাণীহিংসাজনিত পাপ তােমায় স্পর্শ করিতে পরিবে না। দেবের রথ তােমার নিকট আসিবে ; সেই রথে আরােহণপূর্বক যুদ্ধে গমন কর। আঞ্জনেকেও বলিয়া দিতেছি, তােমার সঙ্গে যাইয়া সাহায্য করিরে। নৃসিংহদেব তখন আঞ্জ- নেয়কে কহিলেন যে, তুমি মহারাজ ইন্দ্রদ্যুম্নের সহিত যাইয়া দৈত্যদমনের সাহায্য কর। আঞ্জনেয় কহিলেন, প্রভাে! এক্ষণে আমার বৃদ্ধাবস্থা উপস্থিত, আমার ৰল-বিক্রম প্রভু শ্রীরামচন্দ্রের সহিত সকলই গিয়াছে; এই অবস্থায় কি করিয়া যুদ্ধ করিতে সমর্থ হইব, তদ্বিষয়ে আদেশ করুন। নৃসিংহদেব কহিলেন, বৎস আঞ্জনেয় ! যাহা কহিতেছ তাহা সকলই সত্য, কিছুই ; ;
তীর্থদর্শন। আমার অগােচর নাই, দৈত্যগণ বড় 'উপদ্রব আরম্ভ করিয়াছে ; ৰাহ্মণেরা হােমগাদি কাৰ্য্য করিতে সমর্থ হইতেছেন না; তাহাদিগকে দমন করা একান্ত আবশ্যক হইয়াছে। অতএব তুমি আমার শঙ্খ চক্র লইয়া যুদ্ধে গমন কর ; আমার কৃপায় তুমি যুদ্ধ করিতে সমর্থ হইবে। তথন আঞ্জনেয় হৃষ্টচিত্তে শঙ্খ চক্ৰধারণে বলবান হইয়া মহারাজ ইন্দ্রদ্যুম্নের অনুসরণ করি- লেন; রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন ও আঞ্জনেয় উভয়ে দৈত্যদিগকে আক্রমণ করিয়া তাহাদিগের প্রধান কয়েকটিকে সংহার করিলে সকল দৈহ ভরে পাতালে প্রবেশ করিল। তখন আঞ্জনেয় একটি বৃহৎ পৰ্বত লইয়া পাতালগমনের দ্বারে রাখিয়া দিল। এই রূপে ঋষিদিগের আশ্রমে উপদ্ৰ বশূন্য হইলে, আঞ্জনেয় শঙ্খচক্র প্রত্যার্পণ মানসে নৃসিংহদেব স্বামীর সকাশে গমন করিলেন ; নৃসিংহদেব তাহাকে আগত দেখিয়া প্রফুল্লমনে কহিলেন, বৎস আঞ্জনের! তুমি আমার পরম ভক্ত, আমি তােমার কাৰ্য্যে পরম পরিতুষ্ট হইলাম রা অবতারে সীতার উদ্ধারের জন্য প্রধান সহায়তা করিয়াছিলে, তদনন্তর বহু দিবস পৰ্য্যন্ত আমার তপস্যা করিয়াছ, “এখন আমার এই প্রীতিকর কাৰ্য্য করিলে। পূর্বে ই তুমি অমরত্ব লাভ করিয়াছ ; এক্ষণে আমার স্বারপ্য মূৰ্ত্তি লাভ করিয়া শঙ্খচক্রধারী হইয়া বিরাজমান থাক। তােমাকে আর উক্ত শঙ্খচক্র আমাকে অর্পণ করিতে হইবে না। তখন আঞ্জনেয় নৃসিংহদেবের কৃপায় তঁাহার স্বরূপ মূর্তি পাই য়া, পূর্বে যেখানে তপস্যা করিয়াছিলেন, নৃসিংহদেবের • শােলিঙ্গ। ১০৭ অনুমতিক্রমে তথায় যােগানে বিরাজ করিতেছেন, রাজা ইন্দ্র- দ্যুম্ন নৃসিংহদেবের কৃপায় মুক্তিলাভ করিয়াছেন। প্রতি রবিবারে আঞ্জনেয়দেবের মন্দিরে অভিষেক হইয়া থাকে। অনেক দূর দেশান্তর হইতে যাত্রীগণ আসিয়া অর্চনাদি করে। যে সকল স্ত্রীলােক ৰহ্মদৈত্য দ্বারা আক্রান্ত হয়, তাহারা, ঐ মন্দিরের প্রাঙ্গণে যাইয়া মধ্যস্থলের কুণ্ডে স্নান করিয়া মন্দি- রের মণ্ডপে যাইয়া আঞ্জনেয় দেবকে প্রদক্ষিণ করিতে থাকে। তদনন্তর আঞ্জনেয়দেবের সম্মুখীন হইয়া মণ্ডপে বসিয়া তাহার নামে মন্ত্র উচ্চারণ করিতে করিতে দুই হাঁটুর উপর ভর দিয়া উপবেশন করে, তৎপরে মস্তক একবার ভূমির কাছে নত করিয়া পরক্ষণে সমাম হইয়া কোমরের উপরাংশ দোলাইতে থাকে, এইরূপে এক ঘণ্টা হইতে দুই ঘণ্টা পর্যন্ত ক্রমাগত দোলাইতে দোলাইতে অচেতন হইয়া অর্ধ ঘন্টা হইতে এক ঘণ্টা পর্যন্ত নিশ্চেষ্টভাবে মস্তক অবনত করিয়া পড়িয়া থাকে ; তৎপরে অর্চকগণ আঞ্জনেয়দেবের চরণামৃত আনিয়া তাহাদের গাত্রে ছিটাইয়া দিলে তাহার সংজ্ঞালাভ করিয়া সুস্থ হয়। ব্ৰহ্মদৈতত্যর হস্ত হইতে নিষ্কৃতি পাঁইয়া স্বগৃহে প্রত্যাগমন করে। আরও শুনা যায় যে, অন্যান্য দুঃসাধ্য পীড়া হইতেও অনেকে আরােগ্য লাভ করিয়া থাকে। রবিবার প্রাতে ৯টার সময় আঞ্জনেয়দেব দর্শন করিতে গিয়া দেখিলাম ৩টী স্ত্রীলােক আঞ্জনেয় স্বামীর নামােচ্চারণ করিতে করিতে দুলিতেছে, আর কয়েকটী প্রদক্ষিণ করিতেছে।
১০৮ তীর্থদর্শন। বন্ধু শােলিঙ্গম্ কাবেথ জমিদারির অন্তর্গত জমিদারের নিকট হইতে দেবসেবার নিমিত্ত ১২০০ টাকা আছে এবং দেবােত্তর ভূসম্পত্তি হইতে ১ হাজার টাকা বরাদ, আছে। শােলিঙ্গম্ ষ্টেশন হইতে যে পাকা রাস্তা আসিয়াছে, তাহার বাম ভাগে উচ্চ পাহাড়ের উপরে নৃসিংহস্বামীর মন্দির; উক্ত রাস্তার পার্শ্বে এক পৰ্বতের নিকট একটা বৃহৎ বাঁধান পুষ্করিণী আছে, তাহা ৰহ্মতীর্থ নামে খ্যাত। লােকপ্রবাদ এই যে, ৰহ্মা পুরা- কালে এই তীর্থের ধারে নৃসিংহদেবের তপস্যা করিয়াছিলেন, উক্ত পুষ্করিণীর পাড়ে এক পুরাতন মন্দিরে শ্রীবরদারাজস্বামীর মূর্তি বিরাজমান রহিয়াছে। লােকে বলিয়া থাকে যে, দণ্ড্যাচাৰ্য্য ঐ স্থানে ভগবানের তপস্যা করিয়াছিলেন, তাহার তপস্যায় সন্তুষ্ট হইয়া ভগবান্ তাহাকে প্রত্যক্ষ দেখা দিয়াছিলেন। তৎপরে দণ্ড্যাচাৰ্য ঐ স্থানে মন্দির নির্মাণ করিয়া শ্রীবরদারাজ স্বামীর মূর্তি স্থাপন করিয়াছিলেন। পূর্বোক্ত ৰহ্মতীর্থ সহরের মধ্যস্থলে। ১৭৮১ খৃঃ স আয়াকুট সাহেবের সহিত হাইদার- আলির এক তুমুল সংগ্রাম, হইয়াছিল, ইহাতে হাইদার-আলি পরাজিত হয়। যে সকল মুসলমান সৈন্য ঐ যুদ্ধে মারা পড়িয়া- ছিল, তাহাদের মৃতদেহ দুইটি গর্তে প্রোথিত হয় তদুপরি চিহ্ন স্বরূণ দুই মেওসােলিয়ম নির্মিত হইয়াছে। উহা অদ্যাপি বিদ্যমান থাকিয়া হাইদার আলির পরাজয়ের পরিচয় দিতেছে। বেলা ১১টার সময়ে মন্দিরের র্শনাদি কার্য সমাধ। করিয়া বেলা ৩টার সময়ে তিরুনির দিকে অগ্রসর হই।
তিনি। তিরুনি শােলিঙ্গম্ হইতে ১৫ মাইল দূরে অবস্থিত । ইহা 'কাবেথ নগরের জমিদারীর অন্তর্গত। অপরাহ্ন ৬টার সময় এখানে পৌছিয়া শুনিলাম যে, ৭টা হইতে ৯টা পর্যন্ত এই মন্দিরের অভিষেক কার্য সম্পন্ন হইয়া থাকে। আমি দেব- দর্শনাভিলাষে তৎপর হইয়া মন্দিরাভিমুখে চলিলাম। দেবের উৎপত্তি বিষয়ে স্থানীয় প্রবাদ এই যে, পুরাকালে সুহ্মণ্য- স্বামী, তারকাসুর, সিংহবাসুর, সুর পদ্মার প্রভৃতি অসুরদিগকে বধ করিয়া এই স্থানে আসিয়া বিশ্রাম করেন ; অতএব “তিরুনিগৌ” অর্থ সুবিশ্রাম, তাহা হইতে নাম উৎপন্ন হইয়াছে ও তাহারই অপভ্রংশ তিরুনি। ইন্দ্র, স্বর্গে পুনঃ প্রতিষ্ঠিত হইলে সুহ্মণ্যস্বামীকে পরি- তুষ্ট করিবার মানসে আপন কন্যা দেবসেনাকে অর্পণ করেন । সুহ্মণ্যস্বামী তাহার পাণিপীড়ন করিয়া তথায় বাস করিতে থাকেন ; তদনন্তর বল্লীম্মা নাম্নী অপরকোন রমণীরও পাণি- গ্রহণ করেন, এই বিষয়ে দুইটি প্রবাদ আছে। ১ম ;-ল্লীস্মা কোন ব্রাহ্মণের ঔরসে চণ্ডালকন্যার গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন ; তাহার মাতা আপন স্বামীর নিকট প্রতিজ্ঞা করিয়াছিলেন যে, সদ্যজাত শিশুকে কনে ফেলিয়া পতির অনুসরণ করিবেন। সুতরাং বল্লীর জন্ম হইবামাত্র তাহার মাতা তাহাকে বনে তার্থদর্শন। ত্যাগ করিয়া, স্বামীর অনুগামিনী হইয়াছিলেন। কোন অস্পৃশ্য 'জাতি উক্ত কন্যাকে বনে প্রাপ্ত হইয়া লালন পালন করিয়াছিল ; বল্পী ক্রমে শশিকলা সদৃশ বাড়িয়া যৌবনে পদার্পণ করিলে তিনি রূপ-লাবণ্য-সম্পন্না বলিয়া সৰ্ব্ব সমীপে আদরণীয় হইতে লাগিলেন। বল্লীম্মা পাহাড়ে বসিয়া পিতার শস্যক্ষেত্র রক্ষা করিতেন। এক দিবস সুহ্মণ্যস্বামী মৃগয়া উপলক্ষে তথায় উপস্থিত হইয়া তাহাকে দেখিতে পান এবং তঁাহার রূপে মােহিত হইয়া বিবাহ করিবার উদ্দেশে তিরু- তানি হইতে এক সুড়ঙ্গ খনন করিয়া তদ্বারা প্রত্যহ যাতায়াত করিতে করিতে ক্রমে বল্লীম্মার মন আকর্ষণ করিয়াছিলেন, পরে বল্লীকে বিবাহ করিয়া, সেই স্থানে বাস করিতে লাগিলেন এবং কিছুকাল পরে তাহাকে তিরুনিতে লইয়া যাইয়া আপন আলয়ের এক স্থানে রাখিয়া দেন। উত্তর-অরুকদুর অস্তগত চিতুর তালুকের মেলপদি গ্রামে বল্লীর পালিত পিতার বাস ছিল; এই গ্রামের ১ মাইল পশ্চিমে যে স্থানে তাহাদের প্রথম সাক্ষাৎ, পরে মিলন ও বিবাহ হয়, অদ্যাপি তথায় একটি মন্দিরে সুহ্মণ্যস্বামী ও বল্লীম্মার মূর্তি বিরাজমান রহিয়াছে। ফল কথা, বল্লীর মাতা কোন অস্পৃশ্য জাতির কন্যা ছিল ; কেহ কেহ কহেন যে, বল্লীর মাতা সুপ্রসিদ্ধ তামিলকবি তিরুবন্ধুরের ভগিনী ভিন্ন অপর কেহ নহে। ২য়- এবাৰ এই যে, কোন সময়েষ্মী ও নারায়ণ হরিণ ও হরিণীরূপে কৌতুকক্রীড়া করিয়াছিলেন। হরিণরূপিণী লক্ষ্মী, তিরুনি। ১১১ • তাহার ফলস্বরূপ এক কর্তা প্রসবপূৰ্ব্বক বনে, ত্যাগ করিয়া যান ; সপতীক। নগরীর কুরব নামে কোন রাজা বল্লীমলম নামক পৰ্বতে ঐ কন্যাকে কুড়াইয়া পাইয়া লালন পালন করেন এবং তাঁহাকে বল্লীমলয়ের নিকট পাইয়াছিলেন বলিয়া তাহার নাম বল্লীশ্ন রাখেন। কোন সময়ে সুহ্মণ্যস্বামী মৃগয়ার্থ বিচরণ করিতে করিতে রূপ-যৌবন-সম্পন্ন। উক্ত কন্যা দেখিতে পাইয়া রাজার নিকট কন্যার কর প্রার্থ হইলে রাজা তাহাকে কন্যা সম্প্রদান করেন। সুহ্মণ্য স্বামী নব বিবাহিত। পত্নী কে আপন অলিয়ে আনয়নপূর্বক পৃথক স্থানে রাখিয়া দেন। তিরুনির মন্দির পুরাতন বলিয়া প্রতীয়মান হইল। একাদশ শতাব্দীতে চোলরাজাদিগের সময় ইহার মূল পত্তন হইয়া থাকিবে ও বিজয়নগরের রাজগণ কর্তৃক উহার সংস্কার বর্ধিত করিয়া থাকিবে। ইহা একটী উচ্চ, পাহাড়ের উপর অবস্থিত, তথা হইতে চতুর্দিকের দৃশ্য অতি মনোহর, পাহাড়ে উঠিবার নিমিত্ত দুইটি পথ আছে ও উভয় পথেই উত্তম সােপান আছে ; যাত্রীদিগের থাকিবার জন্য রাস্তার ধারে অনেক গুলি ছত্র আছে। মন্দিরের পার্শ্বে কুমার, ৰক্ষ, অগস্ত্য, ইন্দ্র, শেষ, রাম, বিষ্ণু, নারদ ও সপ্তর্ষি নামে ছােট বড় নয়টি তীর্থ আছে । প্রত্যেক তীর্থের মাহাত্ম সম্বন্ধে স্বতন্ত্র ইতিহাস আছে। মন্দিরের সম্মুখে যে পুষ্করিণী আছে, তাহাকে পুণ্যতম কৈলাসতীর্থ কহে। সুব্রহ্মণ্যস্বামীর দণ্ডায়মান প্রস্তরময় মুর্তি, ১১২ তীর্থদর্শন। ; প্রমাণ মনুষ্যাকৃতি ও চতুভুজ; তিনি শৈশবে কৃত্তিকা দ্বারা পরিবর্ধিত হইয়াছিলেন বলিয়া প্রত্যেক কৃত্তিকানক্ষত্রে এই মন্দিরে তাহার উৎসব হইয়া থাকে। কিন্তু প্রতিবৎসর কাৰ্ত্তি কী কৃত্তিকায় মহাসমারােহে উৎসব হইয়া থাকে ও সেই সমর দূরদেশ হইতে বহুলােকের সমাগম হয়। দেবসেনা ও বল্লীমাতার মন্দির পৃথকরূপে নির্দিষ্ট আছে এবং পূজাদিও পৃথকরূপে হইয়া থাকে। তিরুনি চারি অংশে বিভক্ত। ১ম, খাস তিরুনি ; ইহা পৰ্ব্বতের উপরে ও দেবালয়ের পার্শ্বে ; এখানে অধিকাংশ বৈদিক অৰ্চক বাস করেন। ২য়, মটগ্রাম ; এখানে ৩০টি মঠ, ১০টি ছত্র ও ২৩টি মণ্ডপ আছে বলিয়া ইহাকে মটটগ্রাম কহে। ৩য়, নল্লীগুন্টা; ‘নল্লীন নামে কোন রাজা ৯০ বৎসর পূর্কে এক বৃহৎ পুষ্করিণী খনন করিয়া পাহাড়ের চতুর্দিকে ৰাহ্মণ- দিগের বাসের নিমিত্ত পাকা বাটী নিৰ্মাণ করিয়া দেন। তদবধি রাজার নামে উক্ত গ্রাম অভিহিত হইতেছে। ৪র্থ, অমৃতপুর ; এই স্থান সম্বন্ধে একটি প্রবাদ আছে। এখানকার বর্তমান জমিদারের পিতামহ বেঙ্কট পেমরাজু কোন সময়ে অতিশয় রােগাক্রান্ত হইয়া এই স্থানে উপস্থিত হন, তদনন্তর দুগ্ধ ও ঘোল পানে স্বাস্থ্যলাভ করিয়া উক্ত গ্রাম অমৃতপুর নামে অভিহিত করিয়াছিলেন। দেবালয়ের দক্ষিণদিকে ১ মাইল দূঞ্জ এডুবন নামে একটি কাননে সাতটি কুণ্ড আছে, উক্ত কুণ্ডের নিকট সপ্তকুমারী-
কালহস্তী।
দিগের মন্দির, কিন্তু এখন তাহা ভগ্নাবস্থায় আছে। কারুবে-
নগরের জমীদার এখনকার মন্দিরের ব্যয় নির্বাহ করিয়া
থাকেন।
কালহস্তী।
৪ঠা অক্টোবর সােমবার প্রাতে আহারাদি সমাপনান্তে
রেলযােগে কালহস্তী যাত্ৰা করি ; অপরাহ্নে ৩টার সময় তথায়
পৌছিয়াছিলাম।
কালহস্তী তন্নাম জমিদারীর প্রধান নগর এবং সুবর্ণমুখী
নদীর দক্ষিণতীরে অবস্থিত। তিরুপতি-নেল্লুর ষ্টেট-রেলওয়ের
ষ্টেশন হইতে ১ মাইল দূরে অবস্থিত।
এখানকার জমিদারদিগের আদিপুরুষের নাম দামার-জবি-
রয়া-নিবাৰু ; জমীদারের পুস্তকাগারে যে সকল সনন্দ আছে,
তন্মধ্যে আরঙ্গজেব বাদশাহ যে সনন্দ দেন, তাহাতে অবগত
হওয়া যায় যে, বর্তমান জমিদারের পূর্বপুরুষ পলিগার নামে
অভিহিত হইতেন ও ৫ হাজার সৈন্যের অধিনায়ক ছিলেন,
অরুকদুর নবাবের অধীনে আবশ্যকমতে উক্ত ৫ হাজার সৈন্য
লইয়া যুদ্ধে যাইতেন।
সপ্তদশ শতাব্দীর মধ্যে কালহস্তীর পলিগারগণ আপন
ক্ষমতা অনেক দূর বিস্তার করিয়াছিল । এমন কি পূর্বদিকে
;
১১৪
তীর্থদর্শন।
"
মদ্র ও কাঞ্চীপুর দক্ষিণদিকে বন্দীবাস পর্যন্ত আপন বশে
আনিয়াছিলেন এবং অনেক সময় তাঁহারা স্বাধীনভাবে চলি-
তেন। কর্ণাটিক যুদ্ধের সময় তাহার হাইদার-আলি ও টিপু-
সুলতানের বশবর্তী হইতে বাধ্য হইয়াছিলেন।
১৭৯৯ খৃঃ টিপুসুলতানের মৃত্যু হইলে, ইংরাজ গবর্ণমেন্ট
কালহস্তীর পলিগরকে বশীভূত করিবার চেষ্টা করেন ও ১৮০১
খৃঃ বশে আনিয়া সমস্ত সৈন্যসামন্ত ছাড়াইয়া দিতে বাধ্য করেন
ও চিরস্থায়ী সনদ দিয়া জমীদার নামে অভিহিত করেন ; সেই
অবধি কালহস্তীর পলিগারগণ জমীদাররূপে পরিণত হইয়াছে।
এই জমীদারীর আয় ৬ লক্ষ টাকা। বর্তমান জমীদার সি,
আই, ই, ও রাজা উপাধিতে সম্মানিত হইয়াছেন। এই সহরে
৬৭ হাজার লোকে বাস করে।
এখানকার শিবমন্দিরই প্রধান তীর্থ, স্মার্ত-ৰাহ্মণগণ ইহাকে
দ্বিতীয় বারাণসী সদৃশ পুণ্যভূমি মনে করেন। মন্দিরটি অতি
পুরাতন, সম্মুখের গােপর উত্তম ও বৃহৎ ; ইহা কৈলাস নামক
পৰ্ব্বতের পদতলে ও শহরের পশ্চিম-দক্ষিণকোণে অবস্থিত।
কথিত আছে যে, ব্ৰহ্মাএই স্থানে তপস্যা করিতে আসিবার
সময়ে কৈলাসের শৃঙ্গের একাংশ আনিয়া এই স্থানে স্থাপন
করেন, তদবধি এই পৰ্বত দক্ষিণ কৈলাস নামে অভিহিত।
প্রবাদানুসারে ৰক্ষা স্বয়ং এই মন্দিরের মূল স্থাপন করেন,
কিন্তু অপরাপর অংশ চোলরাজা ও বিজয়নগরের কৃষ্ণরায়ালু
নিৰ্মাণ করিয়া দেন।
L
কালহস্তী। মহাদেবের পাঞ্চভৌতিক মূর্তির অন্যতম অনাদি বায়ুমূক্তি এখানে বিরাজমান। কালহস্তী নামের উৎপত্তি বিষয়ে যে বিবরণ কথিত আছে তাহা এই ; এক নাগ ও এক হস্থী উভয়ে মহাদেবের আরাধনা করিতে থাকে; নাগ আপন মণি মহাদেবের মস্তকে রাখিয়া আরাধনা করিত, হন্তী জলাভিষেকের দ্বারা আরাধনা করিত। কোন এক দিবস হন্তী জলাভিষেক করিতেছে, এমন সময়ে হঠাৎ নাগের গাত্রে জল লাগিয়াছিল, নাগরাজ তাহাতে ক্রুদ্ধ হইয়া হস্তীর শুণ্ডে দংশন করিলে হস্তী দংশন জালায় উন্মত্ত হইয়া দৌড়িয়া এমন জোরে নাগাঙ্গে আঘাত করিল যে, সেই আঘাতে নাগ ও হস্তী,উভয়েই পঞ্চত্ব প্রাপ্ত হইল। মহাদেব পূর্ব হইতে তাহাদের উপর সন্তুষ্ট ছিলেন, এই ঘটনা দেখিয়া মহাদেব তাহাদের পুনরায় জীবন দান করিয়া আপন আলয় তাহাদের নামে অভিহিত করিলেন। তখন হইতে এই দেবালয়ের নাম কালহস্তী হইয়াছে। কাল অর্থে সর্প, হস্তীর অপভ্রংশ হস্ত্রী, কালহী বাকালহস্তী। কন্নপন নামে কোন ব্যাধ কৈলাশ পর্বতের উপরে বাস করিত ; উক্ত ব্যাধ প্রত্যহ আহার করিবার পূর্বে উপর হইতে নামিয়া আসিয়া আহাৰ্য্য দ্রব্য মহাদেবকে অর্পণ করিয়া পরে প্রসাদ পাইত। কিছু কাল এইরূপ করিতে করিতে তাহার মনে ধারণা হল যে, মহাদেবের একটি চক্ষু নষ্ট হই- য়াছে, তাহাতে দেখিতে পান না; পরে ব্যাধ আপন একটি ০ তীর্থদর্শন। চক্ষু উৎপাটন করিয়া মহাদেবের নষ্ট চক্ষুতে বসাইয়া দিল। আবার কিছু দিন পরে তাহার প্রতীয়মান হইল যে, ভগবানের অপর চক্ষুটিও নষ্ট হইয়াছে, তখন পুনরায় আপন অবশিষ্ট চক্ষু দিয়া মহাদেবের চক্ষু ভাল করিয়া দেয়। আপন অবশিষ্ট চক্ষু উৎপাটন করিলে অন্ধ হইব, এই আশঙ্কায় মহাদেবের চক্ষুর স্থানে আপন পা রাখিয়া দুই হন্তে চক্ষু উৎপাটন করিয়া মহা- দেবের চক্ষুতে বসাইয়া দিল। অদ্যাপিও মহাদেবের চক্ষে ভক্ত পদচিহ্ন দৃষ্ট হইয়া থাকে। ভগবান্ ব্যাধের উপর পরম সন্তুষ্ট হইয়া তাহাকে সালােক্যমুক্তি দান করেন। ব্যাধ হইলেও সেই অবধি লিঙ্গ- রূপী হইয়া মহাদেবের সন্নিকটে থাকিয়া পূজা পাইতেছেন। তাহার অপর এক মূর্তি কৈলাসপৰ্বতের শিখরদেশে আপন বাসস্থানে এবং তৃতীয় মূর্তি পাহাড়ে উঠিতে 'পথের মধ্যস্থানে বিদ্যমান রহিয়াছে এবং উক্ত দুই স্থানেও পূজা পাইতেছেন। এখানকার পার্বতীদেবীর নাম জ্ঞান-প্রসন্ন। উক্ত নামে অভিহিত হইবার কারণ একটি প্রবাদ আছে। ভগবান্ কোন সময়ে দেবীর প্রতি অসন্তুষ্ট হইয়া তাহাকে অভিশাপ দেন যে, নরলোকে জন্মগ্রহণ করিতে হইবে। তদনন্তর দেবী নরযােনি প্রাপ্ত হইয়া প্রভূত জ্ঞানসঞ্চয় করিয়া দেবাদিদেব মহাদেবকে সস্তুষ্ট করিবার নিমিত্ত তপস্যা করিলে মহাদেব তাহার প্রতি সন্তুষ্ট হইয়া তাহাকে মুক্তি দিয়া জ্ঞানপ্রশন নামে অভিহিত করিয়াছিলেন।
কালহস্তী। ১১৭ দুর্গাদেবীর তপস্যার সময়ে দুর্গাম্মা নামে কোন মহিলা তাঁহার সহগামিনী হইয়াছিল। মহাদেব তাহারও উপর সন্তুষ্ট হইয়া তাহাকেও দেবত্ব দেন। তদবধি দুর্গা দেবী-মন্দিরের উত্তরদিকে পাহাড়ের উপর প্রতিষ্ঠিত হইয়া অদ্যাপিও পূজা পাইতেছেন। শিবালয়ের দক্ষিণদিকে পাহাড়ের পার্শ্বের একটি শিবা- লয় আছে ; ভগবানের নাম মণিকুণ্ডেশ্বর স্বামী। কোন মহিলা ব্ৰহ্মজ্ঞান পাইবার প্রত্যাশায় এই স্থানে মহাদেবের তপস্থা করিয়াছিলেন । মহাদেব তাহার তপস্যায় সন্তুষ্ট হইয়া কর্ণে তারকব্রহ্ম মন্ত্র প্রদান করেন ও তাহাতে তাঁহার মুক্তি হয়, সেই আশয়ে এখনও মুমূষুব্যক্তিদিগকে এই স্থানে আনা হইয়া থাকে, তাহাদিগকে দক্ষিণপাশ্বে কর্ণ রাখিয়া শয়ন করাইয়া দেওয়া হয়। বিশ্বাস যে মৃত্যুর সময় সেই মুম্ষুব্যক্তি দক্ষিণ- পার্শ্ব পরিবর্তন করিয়া বামপার্শ্ব হইলে দক্ষিণকর্ণ দিয়া অন্তু- রাত্ম বাহির হইবে ও সেই ব্যক্তির আত্মা চিরান ভোগ করিবে। এই মন্দিরের দক্ষিণপাশ্বে চতুমুথ ব্রহ্মার মন্দির ও মূর্তি প্রতিষ্ঠিত রহিয়াছে। এই মন্দিরের মূল স্থান দ্বিতল, ইহা পাহাড়ের পাদদেশে নির্মিত হইয়াছে ও তাহার গায়ে নানা প্রকার মূর্তি খােদিত আছে ; পুরাকালে ব্রহ্মা কৈলাস পর্বতের একাংশ এই স্থানে আনিয়া স্থাপন করিয়াছিলেন। আরও প্রবাদ আছে যে, ব্রহ্মা যে স্থানে বসিয়া তপস্যা করিয়া- ১১৮ তীর্থদর্শন। ছিলেন, উক্ত মন্দির সেই স্থানে স্থাপন করা হইয়াছে। দক্ষিণ- দেশে আর কোথাও ৰহ্মার মন্দির দেখি নাই। চতুরানন ব্রহ্মার মন্দিরের দক্ষিণদিকে ও পাহাড়ের উপত্য- কায় চতুর্দিক প্রস্তর নির্মিত পাকা ঘাট বাঁধান একটি প্রশস্ত পুষ্করিণী আছে; পূর্বে এই পুষ্করিণীতে স্বামীর জলক্রীড়া উৎসব হইত, প্রায় ত্রিশ বৎসর হইল তাহা বন্ধ হইয়াছে। পুষ্করিণীর সন্নিকটে পাহাড়ের উপর ভরদ্বাজ স্বামী নামে ঈশ্বর মূর্তি আছে, এই উপত্যকা ভরদ্বাজমুনির আশ্রম বলিয়া খ্যাত। এখান হইতে ৫ মাইল দক্ষিণে বিয়ালিঙ্গকোন নামে এক পাহাড় আছে, তথায় সহস্র লিঙ্গ বিদ্যমান থাকায় পাহাড় উক্ত মামে কথিত হয়। দেবদর্শনে যাইয়া দেখিলাম,বায়ুরূপী ঈশ্বর সচরাচর লিঙ্গের সদৃশ নহে; লিঙ্গ মাত্রেই দণ্ডগােলাকৃতি হইয়া থাকে, কিন্তু ইহা চতুষ্কোণাকৃতি। আমি সন্ধ্যার পর ঈশ্বর দর্শনে যাই, তৎকালে জলাভিসে ক হইতেছিল ; কাজেই লিঙ্গ অন- বৃত, সুতরাং লিঙ্গাবেশ স্পষ্টরূপে দেখিলাম । দ্বারের সম্মুখে যে দৃশ্য তাহাতে গজ, নাগ ও উর্ণনাভির মূর্তি অঙ্কিত রহিয়াছে মূল স্থানের কোন দিক দিয়া বাতাস প্রবে- শেরপথ নাই, কিন্তু লিঙ্গের মাথার উপর যে দীপালােক ঝুলান আছে, তাহা সর্বদাই ঈষৎ দুলিতেছে। অন্য শত শত দীপ গর্ভ- গৃহে থাকিলেও আন্দোলিত হইতেছে লং। শুনিলাম লিঙ্গের পশ্চাৎ ভাগে অপর একটি দীপ জ্বলিতে থাকে, কেহ কেহ কালহস্তী। কহেন উক্ত দীপের উত্তাপে উপস্থিত বায়ু, আন্দোলিত হয় ও তাহার সাহায্যে লিঙ্গের মস্তকোপরি প্রদীপ আপনা আপনি ঈষৎ দুলিতে থাকে, যাহা হউক এই কারণপ্রযুক্ত উক্ত লিঙ্গ বায়ুলিঙ্গ নামে অভিহিত হইতেছে। অভিষেকান্তে ভগবানের অৰ্চনাদি করিয়া স্বস্থানে ফিরিয়া আসিলাম। মাঘ মাসে এখানে ১০ দিন পর্যন্ত উৎসব হইয়া থাকে ; তদুপলক্ষে প্রায় ২০ বিশ হাজার লােক সমবেত হয়। উৎসবের পঞ্চম দিবসে সকলে উপবাস করিয়া রাত্রিকালে বেদপাঠ ও ধর্মালােচনায় সময় অতিবাহিত করিয়া থাকেন। অধিকন্তু যে সকল স্ত্রীলােক অপুত্রক ও ৰহ্মদৈত্যের দ্বারা আক্রান্ত হয়, তাঁহারা স্নান করিয়া জ্ঞান-প্রসন্নাদেবীর সম্মুখে ভিজা কাপড়ে অধােমুখ হইয়া পড়িয়া থাকেন। ঐ রূপ ক্রিয়ার নাম প্রাণাচার- ব্ৰত, যিনি যত সময় ধরিয়া একাগ্রচিত্তে দেবীকে ধ্যান করিতে সমর্থ হন, তাঁহার ততই মনস্কামনা সিদ্ধ হয়। উৎসবের অষ্টম দিবসে মহাদেবের •ভােগমূর্তি রথে করিয়া নগর পরিভ্রমণ করান হয়, সেই সময়ে জমীদারের হস্তী, ঘােড়, বর্ষাধারী অনুচরগণ সকলেই এই উৎসবে যােগ দিয়া থাকেন। এই দেবালয়ের আভরণাদির মূল্য কম নহে, এক বৎসর দুই মাস পুঝে যে আভরণ মণিমুক্তাদি অপহৃত হইয়াছে, তাহার মূল্য লক্ষ টাকার অধিক হইবে।
নারায়ণবন। ৫ই অক্টোবর মঙ্গলবার প্রাতে নারায়ণবন নামক স্থানে আসিয়া পৌছি; নায়ায়ণবন মান্দ্রাজ রেলওয়ের পর ষ্টেশন হইতে ৩ মাইল দূরে অরুণনদীর তীরে অবস্থিত। ১৮৮১ সালের লােকসংখ্যার তালিকায় জানা যায় এখানে ৩৯১৩ জন লোকের বাস। ইহা একটি পুরাতন প্রসিদ্ধ তীর্থ- স্থান.এবং কাবেথ নগরের জমিদারী ভুক্ত। চতুরানন ৰহ্ম। এক সময়ে সুপ্রসিদ্ধ কাঞ্চিপুরে অশ্বমেধ যজ্ঞ করিয়াছিলেন, যজ্ঞের সীমাস্বরূপ এই স্থান নির্ণীত হইয়াছিল। এই স্থানে অমনার। চৈরম্মা বা মহিষাসুরমর্দিনী আসিয়া যজ্ঞস্থলের সীমা রক্ষা করিয়াছিলেন। মহিষাসুরমর্দিনী সেই অবধি এই স্থানে অব- স্থান করিতেছেন। নারায়ণবন শব্দে পষ্ট বুঝা যাইতেছে যে, পূর্বে এখানে বন ছিল ও সেই বনে ‘ভগবান নারায়ণ বিচরণ করিতেন। অতএব ইহা অতি পবিত্র স্থান বােধে ব্রহ্মার যজ্ঞশালার সীমা- রূপে নির্দিষ্ট হইয়া থাকিবে। স্থানীয় হস্তলিপিতে জানা যায় যে, তঞ্জাবুরের মহারাজ কুলাঙ্গ চোলের জারজপুত্র তণ্ডীমান মহারাজ চক্রবর্তী এই স্থান আপন অধিকার ভুক্ত করেন ; এবং তাহার বংশধর গণ ক্রমান্বয়ে চারি পুরুষ রাজত্ব করেন। তাহার প্রপোজ .
নারায়ণবন। ১২১'. রাজা নারায়ণদেবের রাজত্বকালে গবাসম্বন নামক জনৈক মিথিলার রাজা তিরুপতির তীর্থদর্শনে আসেন। তিনি দেশের অবস্থা দর্শনে সন্তুষ্ট হইয়া কিছু কাল তিরুপতির ব্যঙ্কটেশ্বরের আরাধনা করিয়াছিলেন, তদনন্তর ব্যঙ্কটেশস্বামী মিথিলাপতির স্তবে সন্তুষ্ট হইয়া সদয় হইলে, রাজা প্রার্থনা করেন যে, তিরুপতির সন্নিকটে ভাঁহাকে রাজত্ব করিতে অনুজ্ঞা দেওয়া হয়। তখন ব্যঙ্কটেশস্বামী তাহাকে নারায়ণদেব রাজার নিকট যাইয়া মনােরথ ব্যক্ত করিতে আদেশ করেন, গবাসন রাজা সত্বর হইয়া নারায়ণ মহারাজের নিকট গমন করিয়া তাহাকে আপন অভিপ্রায় ব্যক্ত করিলে মহারাজ তাঁহাকে অপম রাজত্বের অর্ধেক অর্পণ করেন। গরাসম্বন রাজ্যের অর্ধাংশ গ্রহণ করিয়া নারায়ণবনে আপন রাজধানী স্থাপন করেন। গবাসন রাজার চারি পুত্র ছিল; ১ম আকাশরাজ, ২য় উজ্জ্বলজ, ৩য় ব্যঙ্কটেশরাজ ও ৪র্থ বৰ্ম্মরাজ। পিতার মৃত্যু হইলে প্রথম পুত্র রাজ্যাভিষিক্ত হন, ইনি আপন নামে নূতন রাজধানী স্থাপন করেন ও তাহা রক্ষা করিবার নিমিত্ত দুইটি দুর্গ নির্মাণ করেন। বর্তমান শহর হইতে আকাশরাজপুর ৩ মাইল দূরে ছিল; তিনি যে দুইটি দুর্গ নির্মাণ করেন, তাহা আকাশ- রাজকোটাই নামে অভিহিত। ইহার সীমার মধ্যে অগস্ত্যেশ্বর মহাদেবের মন্দির বিদ্যমান রহিয়াছে ; কোম্পালিয়ম্ নগরে অপরটির ভগ্নাবশেষ এখনও দেখিতে পাওয়া যায়।
•১২২
তীর্থদর্শন।
আকাশজের পুত্রকন্যা না হওয়ায়, শাস্ত্রানুসারে তিনি
পুত্রেষ্টিযাগ করিতে কৃতসঙ্কল্প হন। যজ্ঞস্থলের সীমা নির্ধারিত
করিবার নিমিত্ত স্বর্ণলঙ্গলে জমী খনন করিতে করিতে
জমীর মধ্যে এক স্বর্ণপদ্ম দেখিতে পান ও তাহা কুড়াইয়া
লইয়া দেখিলেন যে, তাহার পাবড়ীতে একটী স্বর্ণবর্ণের কন্যা
রহিয়াছে। তাহার অমাত্যগণ তদৃষ্টে কহিল যে, এই কন্যা
লক্ষ্মীর অবতার ভিন্ন আর কিছুই নহে। তখন তিনি সেই
কন্যাটীকে ঘরে লইয়া যান এবং অপত্যনির্বিশেষে লালন
পালন করিতে থাকেন। পদ্ম হইতে পাইয়াছিলেন বলিয়া তাহার
নাম পদ্মাবতী রাখিয়াছিলেন। যজ্ঞসম্পন্ন হইলে যথাসময়ে
রাজার একটি পুত্র জন্মিয়াছিল। পদ্মাবতী বয়ঃপ্রাপ্ত হইলে
নারায়ণবনে বিচরণ করিয়া বেড়াইতেন। লােকে কহিয়া থাকে
যে, নারায়ণবনের পশ্চিম দিকে যে বৃহৎ বন আছে, তাহার
সন্নিকটে রাজা উক্ত কন্যাকে পাইয়াছিলেন।
একদা ব্যঙ্কটেশস্বামী মৃগয়া উপলক্ষে নারায়ণবনে বিচরণ
করিতে করিতে পদ্মাবতীকে দেখিতে পাইলেন; তখন তিনি
তাহার রূপে মুগ্ধ হইয়। কর প্রার্থনা করেন, কন্যা তাহাকে
প্রত্যুত্তরে বলেন যে, পিতার আদেশ ব্যতীত বিৰাহ হইতে
পারে না। অনন্তর তিনি আকাশরাজের নিকট পদ্মাবতীর
কর প্রার্থনা করেন, রাজাও শাস্ত্রানুসারে আপন কন্যাকে
সম্প্রদানে স্বীকৃত হইলে, ব্যঙ্কটেশস্বামী নারায়ণৰনে যাইয়া
পদ্মাবতীর পাণিগ্রহণ করেন । অনন্তর তিনি আকাশজের
নারায়ণবন। ১২৩.. • প্রার্থনানুসারে পদ্মাবতীর সহিত নারায়ণবনে অবস্থিতি করিয়া সুখসম্ভোগ করিতে লাগিলেন। রাজাও তাহাদের বাসের নিমিত্ত মন্দির নির্মাণ করিয়া দেন। দেব অধ্যাপি তথায় কল্যাণব্যঙ্ক টেশ নামে পূজিত হইতেছেন। আকাশরাজের মৃত্যু হইলে তাহার পুত্র সম্বর্ণ রাজপদে অভিষিক্ত হইয়াছিলেন। অপুত্রক অবস্থায় তাহার মৃত্যু হইলে পিতৃব্য ব্যঙ্কটেশরাজ রাজ্যাভিষিক্ত হইয়াছিলেন। তাহার বংশধরেরা সপ্তম পুরুষ পৰ্যন্ত তথায় রাজত্ব করিয়াছিলেন । শেষ রাজার নাম রিবন্ধ ; তিনি রামরাজ নামক কোন রাজ- কর্তৃক রাজ্যচ্যুত হন। রামরাজের বংশধরেরা এই স্থানে একাদশ পুরুষ পর্যন্ত রাজস্ব করিয়াছিলেন। পরে বিজয়নগরের নৃপতি কর্তৃক পরাজিত হন। অতঃপর কারবেথ নগরের পলিগারেরা এই স্থান অধি- কার করে ও সেই অবধি তাহাদিগের দখলেই আছে। পলি- গারদিগকে এখন জমীদার নামে অভিহিত করা হইয়াছে, এই জমীদারীর আয়তন ৯৪৩ বর্গ মাইল। ইহাতে ২,৯৪০০০ দুই লক্ষ চোরানব্বই হাজার লােকের বাস। জমীদারেরা করবেথনগরে বাস করিয়া থাকেন। তাঁহা- দিগের কোন আত্মীয় নারায়ণবনে বাস করিতেন; এই আবাসবাটী পুরাতন ও মেরামতাদিও নাই। কল্যাণব্যঙ্কটে শরের মন্দিরটি অতি বৃহৎ, ইহাতে দুইটি প্রাচীর ও দুইটি (১) পলিগার ৫ হাজার সৈন্তের অধিনায়ক।
১২৪ জীর্থদর্শন। প্রাচীরে দুইটি গােপুর আছে। ভিতর অঙ্গনের পূর্ব-দক্ষিণ- কোণে বােহনমণ্ডপ ও পূর্ব-উত্তর কোণে আর একটি কৈকাল নামে মণ্ডপ আছে, প্রাঙ্গণের দক্ষিণােত্তর কোণে পদ্মাবতী দেবীর কোবি-হ বিদ্যমান আছে, ইহা একটি স্বতন্ত্র মন্দির। প্রাঙ্গণের পশ্চিমােত্তর কোণে থামার কোবি-হ। ব্যঙ্কটেশ্বরস্বামী থামার পাণিগ্রহণ বিষয়ে একটি প্রচ- লিত প্রবাদ আছে। তেনিবল্লী জেলার অন্তর্গত শ্রীবিল্লীপত্র নামক স্থানে পেরিওয়াল বিষ্ণু পেটীয়ার নামে কোন বণিক বাস করিত। তাহার থানু নামে একটী কন্যা ছিল। থানু ক্রমে তপস্থায় রত হইয়া বহু দিবস পৰ্য্যন্ত রঙ্গনাথ স্বামীর তপস্যা করেন, রঙ্গনাথ তাহার তপস্যায় সন্তুষ্ট হইয়া প্রত্যক্ষ হইলে আনুমা তাহাকে পতিত্বে বরণ করেন। তাঁহাদের বিবাহের পর তাহারা নারায়ণবনে বাস করিতে থাকেন। তদবধি ঐ কন্যা থানুমা নামে উক্ত হইতেছেন ও পূজাও পাইতেছেন। পদ্মবতী কোবি-হ ও থানুমার মন্দিরের মধ্যস্থলে কল্যাণ মণ্ডপ, এই মণ্ডপ উক্ত দুই মন্দির অপেক্ষা পুরাতন বলিয়া ৰােধ হয়। যতদূর জানিতে পারা যায়, তাহাতে ৰােধ হয়, মন্দিরের মূলস্থান আকাশরাজ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত হইয়া থাকিবে। পরে বিজয়নগরের রাজারা ভিতরের প্রাচীর ও করবেথ নগরের জমীদারের বাহিরের প্রাচীর এবং গােপুর নিৰ্মাণ করিয়া দেন। (১) কোবি হল-মন্দির।
নারায়ণবর্গ। ১২৫ বিগ্রহের মূৰ্ত্তি তিরুপতির বিগ্রহের সদৃশ, কিন্তু অপেক্ষাকৃত বড়। শ্রীরামানুজমতাবলম্বী শ্রীবৈষ্ণবেরা এই বিগ্রহের পূজা করিয়া থাকেন। কারবেথ নগরের জমীদারেরা পূজার খ্যয়- নিৰ্বাহ করিতেছেন, দেবসেবার্থ কয়েকখানি গ্রাম প্রদত্ত হইয়াছে। আয় ব্যয় হিসাব মন্দিরের লােকেরাই রাখেন। বেদপাঠের চর্চা বিলক্ষণ আছে। পূর্বোক্ত অগস্ত্যেশ্বর মন্দির এখান হইতে দেড় মাইল দূরে অবস্থিত, এই মন্দির দেখিতে অতি পুরাতন, নীল (মরকত) পাথর দ্বারা নির্মিত, পাথরে অতি পরিষ্কার খােদিত কারুকাৰ্য্য আছে দেবীর মন্দির পৃথক ও সাধারণ গ্ৰেনাইট প্রস্তরে প্রস্তুত। অগস্ত্যেশ্বর-মন্দিরের খােদিত অনুশাসনপাঠে জানা যায় বে, কুলােঙ্গ চোলরাজার একাদশ বৎসর রাজত্ব কালে ৮২৬ শকাব্দে বেলুরপঙ্ক মনিবাশ নাগদেব নামক জনৈক অগস্ত্যেশ্বর- দেবের ব্যয়নিৰ্বাহাৰ্থ চালুকপুর নামে একখানি গ্রাম প্রদান করেন। অপর একটি অনুশাসনে জানা যায় ১০৭৮ শকে ত্রিভুবনমলদেব নামে জনৈক রাজা সেবার ব্যয়ার্থ কতক গুলি জমী প্রদান করেন। উপরোক্ত দুই অনুশাসনে বেশ প্রমাণ হইতেছে যে, মন্দির অতি পুরাকাল হইতে বিদ্যমান আছে। এখানকার পূজাপদ্ধতি অন্যান্য শিবালয়ের সদৃশ। গুরুকুল বা অচ্কু যিনি আমাদের অর্চনার কারণ পৌর হিত্য করিয়াছিলেন, সংস্কৃত অনভিজ্ঞ হইলেও মন্ত্রাদি পরিষ্কার- তীর্থদর্শন। রূপে উচ্চারণ করিয়াছিলেন। এই মন্দির হইতে প্রায় ১২ শত ফুট অন্তর পূর্বোক্ত মহিষাসুরমর্দিনীর মন্দির কেমপুলা- পালিয়ম্ নামক স্থানে অবস্থিত রহিয়াছে। দেবীর মূর্তি অষ্টভুজা এক পদ সিংহের উপর অপর পদ সােমকাসুরের উপর। মূর্তি প্রায় ৮ ফুট উচ্চ হইবে। পূজারিরা ৰাহ্মণ নহে, তক-শ্ৰেত্রীয় নীচ জাতি শূদ্র। প্রতি শুক্রবারে অভিষেকাদি উৎসব হইয়া থাকে। শ্রাবণমাসে ১৫ দিন ধরিয়া উৎসব হয়। উৎসবের সময় একটি মহিষকে সজ্জিত করিয়া গ্রামে গ্রামে ঘুরাণ হয়, পরে দ্বাদশ দিবসে মন্দিরের সম্মুখে উক্ত মহিষকে ছাড়িয়া দেওয়া হয়। বিশ্বাস যে, শক্তিদেবীর প্রভাবে উক্ত মহিষ কোনও না কোন সময়ে বলির স্থানে আসিয়া নির্দিষ্ট প্রস্তরের উপর মস্তক রাখিয়া শয়ন করিলে, পূজারি বলির খাঁড়া মন্ত্রপূত করিয়া হত্যাকারীর হস্তে প্রদান করে, হত্যাকারী তাহাকে এক কোপে দ্বিখণ্ড করিয়া ফেলে। অনন্তর উক্ত মহিষের রক্ত আহাৰ্য্য দ্রব্যের সহিক্তি মিশ্রিত করিয়া মন্দিরের চতুর্দিকে ছড়াইয়া দেয়। উক্ত মহিষের দেহ নির্দিষ্ট স্থানে পুতিবার প্রথা আছে। উক্ত দিবস প্রাতে পূৱ বৎসরের পােতা মহিষকে উঠাইয়া জমীদারের বাটীতে পাঠাইয়া দেওয়া হয়, কারণ জমী- দার পূর্বপ্রথানুসারে তাহা দেখিয়া আগামী বৎসরের শুভা- শুভ বুঝিতে পারেন। মাংস অবশ্য পচে, কিন্তু পেটের মল কোন বৎসর পচে, কোন বৎসর পচে না, জমীদার পেটের মল নারায়ণবন। ১২৭ সন্দর্শন করেন। যদি মল না পচিয়া থাকে, তবেই জমীদারের মঙ্গল, অর্থাৎ সুবৃষ্টি ও সুফসল হইবে। আর যদি পচিয়া থাকে, তবে অনাবৃষ্টি, অজন্মা ও দুর্ভিক্ষ ইত্যাদির সম্ভাবনা এবং যদি মলেতে সাদা সাদা ছেদে পড়িয়া থাকে, তবে দেশে মৃত্যুভয় উপস্থিত হইবে। এতদঞ্চলে প্রায়ই দেখা যায় যে, ১ বৎসর, অনাবৃষ্টি হইলে পর বৎসর অতিবৃষ্টি হইয়া থাকে। সুতরাং যে স্থানে মহিষকে পােতা হয়, অনাবৃষ্টি হইলে সেই স্থান শুষ্ক থাকে ও মহিষের দেহস্থ মল শুষ্ক থাকে, পচে না। অতিবৃষ্টি হইলে সেই স্থান অর্জ হয়, সুতরাং মল ও পচিয়া যায়; অবিকৃত অবস্থাতে থাকিলে পর বৎসর সুবৃষ্টি হইবার সম্ভাবনা। যাহা হউক, জমীদার উহা পরিদর্শন করিয়া আপন জমীদারীর শুভাশুভ বুঝিতে পারেন, এই কারণে শক্তিদেবীর প্রতি তাহাদিগের বিশেষ শ্রদ্ধা আছে। এই অমনায়াচৈদাদেবীকে ব্রাহ্মণেরাও সমভাবে পূজা করিয়া থাকেন। এখানকার শূদ্রঅকগণ অর্চনাকালীন ৰাহ্মণদিগেরও পৌরহিত্য করিয়া থানে; তাহারা তামিল- কম্বি কম্বলের বংশধর বলিয়া পরিচয় দিয়া থাকেন। এখানকার এই শূদ্র পূজারীগণ পূজার সময় কেবল যজ্ঞাে- পবীত ব্যবহার করেন মাত্র, সংস্কৃত না জানিলেও তাঁহারা বেশ পরিষ্কার মন্ত্রোচ্চারণ করিয়া থাকেন। মদ্য মাংস যথেষ্ট পরি- মাণ ব্যবহার করিয়া থাকে, তাহাদিগের মধ্যে মৃতদেহ দাহ করা প্রথা নাই, সমাধি দিবার নিয়ম আছে।
তীর্থদর্শন। মন্দিরের মূলস্থান সর্বাপেক্ষ। পুতিন, সম্মুখের মণ্ডপ পৰে নির্মিত বলিয়া বােধ হয়। দ্বারের উপরের গােপুর অসম্পূর্ণ অবস্থায় বিদ্যমান আছে। মন্দিরের চতুঃপার্শ্বস্থ প্রাচীর কার- বেথ নগরের জমীদারদিগের দ্বারা প্রস্তুত হইয়াছিল।
t উপসংহার । আমরা উত্তর অরুকদু জেলায় যে কয়েক দেবালয় দর্শন করিয়াছিলাম, তাহার প্রত্যেক দেবালয়েই ভগবানের পূজা, অর্চনাদি দর্শন করিয়া পরিতুষ্ট হইয়াছিলাম। পূজার কারণ নৈবেদ্যের গােলযােগ নাই। প্রত্যেক দেবের নিকট নারিকেল- কদলী-সুপারিভােগ দেওয়া হইয়া থাকে ও কপূরালোকে আরতি হইয়া থাকে, পূজার প্রধান অঙ্গ অভিষেককাৰ্য শৈব- মন্দিরে যজুর্বেদীয় নমকং চমকং মন্ত্রপাঠে জলাভিষেক হইয়া থাকে ও বিষ্ণুমন্দিরে চিত্তি উপনিষদের পুরুষক্ত মন্ত্রপাঠে পুষ্পাভিষেক হইয়া থাকে। দেবীমন্দিরে ঋগ্বেদীয় শ্ৰীসূক্ত ও ভূক্তপাঠে পুষ্পভিষেক হইয়া থাকে। ঈশ্বর অর্চনায় বিদ্বদল, বিষ্ণু অর্চনায় তুলসী ও পারিজাত এবং দেবী-অর্চনায় কুঙ্কুম প্রশস্ত; অর্চনান্তে ধূপ, দীপ ও পূৰ্ব্বোক্ত নৈবেদ্য তাল দিবাব পর পরাহিত বেদপাঠ করিতে করিতে কপূরালােকে আরতি হয়, পরে সেই আলােকে দেবদর্শনও তাহার আঘ্রাণ লওয়া হয়। যজুৰ্বেদীয় মন্ত্ৰপুষ্পপাঠে পুষ্প প্রদানের সঙ্গে সঙ্গে চারি আনা হইতে এক টাকা দক্ষিণা দিলেই যথেষ্ট হইয়া থাকে। অর্চকগণ বৈদিক-ৰাহ্মণ, পালাক্রমে প্রত্যহ পূজা করিয়া থাকে। কোন সঙ্গতিপন্ন আগন্তুক দেবদর্শনে উপস্থিত হইলে অপর বৈদিক অৰ্চকগণ সমবেত হইয়া পূর্বোক্ত অভিষেক মন্ত্র ও মন্ত্ৰপুষ্প সমস্বরে গাহিয়া থাকে ; প্রত্যেকে অর্ধ মানা হইতে দুই আনা পর্যন্ত পাইলেই পরম আহলাদিত হন। বৈদ্যনাথ, গয়া, কাশী, প্রয়াগ, অযোধ্যা ও হরিদ্বারের ন্যায় পাণ্ডার ও অর্চকগণের, উৎপীড়ন এ প্রদেশে নাই বলিলেও অত্যুক্তি হয় না। যদি কেহ দেবদর্শন ও পূজা করিয়া আত্ম- সন্তোষ লাভ করিতে ইচ্ছা করেন, আমি তাহাদের সকলকেই দক্ষিণদেশের তীর্থদর্শন করিতে অনুরােধ করি। দ্বিতীয়াংশ সমাপ্ত।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.