Dipsikha Library, Howrah

Animal Farm

Orwell,george · 2010/04/28

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

ঝ্যানিম্যাল ফার্ম
জর্জ অরওয়েল
অনুবাদকঃ
গৌরীশঙ্কর ভট্টাচার্য
মিত্র ও ঘােষ
১০, শ্যামাচরণ দে খ্রীট, কলিকাতা-১২

দুই টাকা
IBRARY
supid
Dit townsh
BENGALI TRANSLATION OF
ANIMAL FARM
BY
GEORGE ORWELL
Original Titlo in English Published
DY
HARCOURT, BRACE AND COMPANY, NEWYORK
COPYRIGHT, 1946, BY
HARCOURT BRACE AND COMPANY.
৪৭3
}
মিত্র ও ঘােষ, ১০, শ্যামাচরণ দে ষ্ট্রীট, কলিকাতা-১২ হইতে শীতানু রায় কতৃ
প্রকাশিত ও নিউ সরস্বতী প্রেস, ১৭, ভীম ঘােষ লেন, কলিকাতা হইতে
ক্ষীরােচন্দ্র পান কতৃক মুদ্রিত।

৮ । . . . * * spics Dest Houaph E, S10 ! ৫, ‘ম্যানর ফার্ম’-এর শ্ৰীযুক্ত জো রাতের মত মুরগীঘরগুলােয় তালা দিয়ে দিলেন। নেশার মাত্রাটা তার এতই চড়ে গিয়েছিল যে, খুপরীর ফোকরগুলাে ঢাকা দেওয়ার কথাটা আদৌ মনে পড়ল না। টতে টতে তিনি বারান্দা দিয়ে চললেন, হাতের লণ্ঠনটি এপাশ-ওপাশ দুলছে, দুলুনীর ঝেকে লণ্ঠনের আলাে নাচছে, ঘুরপাক খাচ্ছে। জোন্স খিড়কির দরজার পাশে জুতাে-জোড়া পা থেকে ছুড়ে ফেলে দিয়ে কোনাে রকমে রান্নাঘরের পিপে থেকে শেষপাত্র বীয়ার ঢেলে নিয়ে বিছানার সন্ধানে এগুলেন। এদিকে তখন বিছানাতে জোন-গৃহিণী নাক ডাকাতে শুরু করে দিয়েছেন। শশাবার ঘরের আলাে নিভে যেতে না যেতেই খামারবাড়িময় একটা ঝটাপটি হুড়ােহুড়ির সাড়া পড়ে গেল। আসলে হয়েছে কি, সারা দিন ধরেই আজ রটেছে যে বুড়ােমাতব্বর মেজর বরাহ কাল রাতে এক অদ্ভুত স্বপ্ন দেখেছেন। বুড়াে শূয়োরটার দেহের ঠিক মাঝবরাবর দুধ-শাদা রং, ইনি পুরস্কার পেয়েছিলেন পশুপ্রদর্শনীতে। এহেন বুড়াে মাতব্বরের ইচ্ছে যে, সেই অদ্ভুত স্বপ্নের কথা অন্যান্য পশুবৰ্গকে আজই রাতে নিজে বলবেন। তাই স্থির হয়েছিল যে, শ্রীযুক্ত জো নিশ্চিন্ত হয়ে শুতে চলে গেলে পরই রাত্রিবেলা বড় গােলাবাড়ির প্রাঙ্গনে সবাই জমায়েৎ হবে। বুড়াে মেজর (পশুরা সব আঁকে এই-নামেই ডাকে, যদিচ প্রদর্শনীতে দেখাবার সময় তাঁর নাম দেওয়া হয়েছিল ‘উইলিংডন য়্যানিম্যাল ফার্ম বিউটি') এই কৃষিভবনে এতই সম্মানাই যে তাঁর বক্তব্য শােনবার জন্য ঘণ্টাখানেক রাতের ঘুম নষ্ট করতে সবাই খুব রাজি। বড় গােলাবাড়ির একান্তে, মঞ্চের মত উচু খড়ের গাদায়, বুড়াে মেজর জমিয়ে বসেছেন আগেভাগে। ঠিক তার মাথার ওপর কড়িকাঠে ঝুলােনাে একটি লণ্ঠন জছে। মেজরের বয়স বছর বারাে, ইদানীং তিনি একটু মুটিয়েছেন, তবে এখনও তাকে রীতিমত সৌন্দর্য- •মহিমাভূষিত জোয়ান শূকরের মতই দেখায়, চেহারায় তার বুদ্ধি আর ঔদার্যের ছাপ সুস্পষ্ট। যদিচ তার সামনের বড় দাত দুটো এখনও বেবােয়নি—তাতে কিছু এসে যায় না। অল্প কালের মধ্যেই আর আর জানােয়ারেরা এসে জমতে শুরু করল এবং যে যার নিজের সুবিধেমত ভঙ্গীতে আরামে জমিয়ে বসতে লাগল। সর্বাগ্রে এল রুবেল, জেসি আর পিচার–তিন কুকুর, তারপর হাজির হল শূয়রের দল, তারা দখল করল মঞ্চের সম্মুখের খড়ের গাদাটুকু; মুরগীর পাল জানলার মাথায় চড়ে বসল, আর পায়রারা ডানার ঝাপট মেরে একেবারে বর্গার ওপর উঠে গেল, ভেড়া আর গরুর দল শূয়রদের পিছনে বসে বসে জাবর কাটতে লাগল। গাড়িটানা দুই ঘােড় বক্সার আর ক্লোভার দু’জনে একসঙ্গে প্রবেশ করল ধীর মন্থর গতিতে, তারা খুব হুশিয়ার ভাবে তাদের লােমশ চওড়া ক্ষুরের থাবা ফেলে—কী জানি যদি খড়ের তলায় আনাচে কানাচে কোনাে ক্ষুদে জানােয়ার লুকিয়ে থাকে— ভারী ক্ষুরের চাপেই মরবে। ক্লোভারের চেহারা মধ্য-বয়সী মায়ের মত, চতুর্থ সন্তান প্রসবের পর আর সে আগেকার তরুণী ঘােটকীর চেহারা ফিরে পায় নি। আর বক্সার হচ্ছে সা-জোয়ান জানােয়ার, আঠারাে বিঘৎ উচু, গায়ের জোরের কথা যদি বলেন ত বলব সাধারণ যে-কোনাে য়্যানিম্যাল ফার্ম দুটো ঘােড়ার সমান শক্তি সে একাই ধারণ করে। বক্সারের নাকের নীচে এক ছিটে শাদা দাগ থাকাতে তাকে কেমন বােক-বােকা দেখায়, অবিশ্যি সে যে পয়লা নম্বরের চালাক তাও নয়, তবে হ্যা তার চরিত্রের দৃঢ়তা এবং বিপুল কর্মক্ষমতার জন্য সবাই তাকে বেশ সন্ত্ৰমের চোখেই দেখে থাকে। অশ্বদ্বয়ের পর এল শাদা ছাগল মুরিয়েল আর গর্দভপ্রবর বেঞ্জামিন। কৃষিভবনের প্রবীণতম জানােয়ার এই বেঞ্জামিন সবচেয়ে বদমেজাজী। সে মােটেই কথা বলে না, শুধু তিক্তবিদ্বিষ্ট মন্তব্য প্রকাশের জন্য কখন- সখনও মুখ খােলে। এই যেমন ধরুন না, সে হয়ত বললে যে, মাছি তাড়াবার জন্যেই ভগবান তার দেহে লেজ জুড়ে দিয়েছেন, কিন্তু তার মাছিতেও দরকার নেই—লেজেতেও না! কৃষিভবনের পশুসমাজের মধ্যে সে-ই একমাত্র প্রাণী যে নাকি জীবনে কখনও ফিক্‌ করেও হাসে নি। কেন সে হাসে না, এ প্রশ্নের উত্তরে সে বলে যে, হাসবার মত তেমন কিছু সে দ্যাখে নি। সে কথা যাক, বেঞ্জামিন হচ্ছে বক্সারের ভক্ত। অবিশ্যি সে কথা কখনও মুখে স্বীকার করে না। তবে তারা দু’জনে রবিবার দিন একসঙ্গে ঘােরাফেরা করে, ফলবাগানের পিছনে আস্তাবলের ছােট্ট মাঠে পাশাপাশি চরে, ঘাস খায়, যদিও একটি কথাও কখনও কেউ উচ্চারণ করে না। ঘােড়া দুটি গুছিয়ে বসতে না বসতে এক ঝাঁক হাঁসের বাচ্ছা সারিবেঁধে গােলাবাড়িতে ঢুকল, হালে ওদের মাতৃবিয়ােগ ঘটেছে। ওরা মৃদু গুঞ্জন করতে করতে এপাশ-ওপাশ ঘুরে নিরাপদে বসবার জায়গা খুজছে—যেখানে বসলে আর কেউ মাড়িয়ে নিতে পারবে না এমন ঠাই চাই ওদের। ক্লোভার তার লম্বা সামনের পা দুটো দিয়ে খানিকটা য়্যানিম্যাল ফার্ম জায়গা ঘিরে ফেল—ওরা নিশ্চিন্ত হয়ে সেই খাঁজে এসে আশ্রয় নিলে, যেন পাঁচিলের বেষ্টনীর আড়ালে বসতে পেল ওরা। আর সেখানে বসেই কচি বাচ্ছাগুলাে টুক করে ঘুমিয়ে পড়ল। শেষ মুহূর্তে হাজির হ’ল বােকা মলি, শাদা ফুটফুটে বাহারী চেহারার মাদি ঘােড়া। খুবসুরৎ চালে এক ঢেলা চিনি খেতে খেতে ও এসে সামনের দিকে বসল। মলি জো সাহেবের নিজস্ব ঘােড়া। সভাতে বসেই মলি খুব কায়দা করে ঘাড়ের ধবধবে লােমগুলাে এধার- ওধারে ঘােরাতে লাগল—সকলের নজর গিয়ে পড়ুক ওর গলার লাল- টুকটুকে ফিতের দিকে, ও তাই চায়। সর্বশেষে এল বেড়াল, এসেই আপন স্বভাবসিদ্ধ অভ্যাসমত চারিদিকে চোখ ঘুরিয়ে সে দেখে নিল সবচেয়ে গরম আয়টা কোথায়—পরিশেষে, ক্লোভার আর বক্সারের দেহের অন্তবর্তী খাঁজে কোনাে রকমে নিজেকে গুজে দিয়ে খুশি মনে ঘব-ঘর করতে লাগল পরম আরামে। বুড়াে মেজর কি বলছে-না- বছে সেদিকে ও কানই দিল না। আর সব জানােয়ারই এসে গেছে, কেবল বাদ রয়েছে মােজেস, সে হচ্ছে পােষ দাড়কাক, সে ঘুমােচ্ছ খিড়কীদরজার পিছনের এক দাড়ে। মেজর দেখলেন, সবাই বেশ জুত, হয়ে বসে গিয়েছে এবং সাগ্রহে তাঁর কথা শােনার জন্য প্রতীক্ষা করছে। এবার তিনি গলাটা ঝেড়ে পরিষ্কার করে নিয়ে, শুরু করলেন। কমরেডগণ, তােমরা নিশ্চয় ইতিমধ্যেই শুনেছ যে, কাল রাতে আমি এক বিচিত্র স্বপ্ন দেখেছি। কিন্তু সে কথা পরে হবে, তার আগে আমার অন্য একটি বক্তব্য রয়েছে। আমার মনে হয় না যে আমি আর খুব বেশিদিন তােমাদের মধ্যে থাকব, অতএব মরবার আগে, আমার হ্যানিম্যাল ফার্ম জ্ঞানভাণ্ডারের সঞ্চয় তােমাদের হাতে তুলে দেওয়াটা বড় কর্তব্য বলে মনে হচ্ছে। আমার এই সুদীর্ঘ জীবনে চিন্তা করবার মত প্রচুর অবসর পেয়েছি কারণ আমার আস্তাবলে আমি একাই থাকি। আমি মনে করি যে, পার্থিব জীবনের গুহ্যতত্ত্ব তথা এই জীবজগতে বর্তমানে যত প্রাণী বসবাস করে তাদের প্রত্যেকের সম্বন্ধে আমার সুস্পষ্ট ধারণা হয়েছে, একথা আমি বতে পারি। এই সম্পর্কেই তােমাদের দু-চার কথা বলতে চাই। ‘এখন কথা হচ্ছে, কমরেডগণ, আমাদের জীবনের ধরনটা কিরকম? সােজাসুজি বলতে গেলে, আমাদের আয়ু অল্প, প্রচণ্ড খাটুনী, দুর্দশার অন্ত নেই। আমরা জন্মালাম, তারপর আমাদের জন্যে যে খাদ্য বরাদ্দ হয় তাতে কোনােরকমে ধড়ের সঙ্গে প্রাণটুকু ধু-ধু করে টিকে থাকতে পারে। সেই আহার্যের জোরে যারা বেঁচে থাকে তাদের জোর করে খাটিয়ে নেওয়া হয়। আর যে মুহূর্তে আমরা অকেজো হয়ে পড়ি সেই মুহূর্তে নিষ্ঠুর ভাবে আমাদের হত্যা করা হয়। কী ভয়ঙ্কর কথা! ইংলণ্ডের কোনাে পশু জানে না আনন্দ মানে কী, অবসর বলতে কি বােঝায়—জন্মের পর বছর ঘুরতে না ঘুরতে জীবনের সব কিছু সুখ ঘুচে যায়। ইংলণ্ডের কোনাে পশু স্বাধীন নয়। পশুর জীবন মানেই দাসত্ব আর দুর্দশা : এই হচ্ছে খাঁটি কথা। ‘কিন্তু তাই বলে কি, এটা প্রকৃতির নিয়মের মধ্যে পড়ে ? আমাদের এই দেশ কি এতই দীন, অনুর্বর যে এখানকার বাসিন্দাদের স্বচ্ছল ভাবে ভরণপােষণ করতে পারে না? না, তা নয় কমরেডগণ, হাজারবার বলতে পায়রা সে ধারণা ভুল। ইংলণ্ডের মাটি উর্বর, আবহাওয়া চমৎকার, এখন এদেশে যত জানােয়ার রয়েছে তার চেয়ে ঢের বেশি প্রাণীকে অঢেল পরিমাণে খাওয়াবার হিমং এই দেশের জমির আছে।

য়্যানিম্যাল ফার্ম আমাদের এই একটি আবাদ থেকেই অনায়াসে এক ডজন ঘােড়া, এক কুড়ি গরু, কত শত ভেড়া প্রতিপালিত হতে পারে—সকলে তােক আরামে থাকতে পারে, রীতিমত মর্যাদা বজায় রেখেই থাকতে পারে, যা আমরা এখন কল্পনাই করতে পারি না। তবে কেন আমাদের এই দুর্দশা পােয়াতে হচ্ছে? তার কারণ, আমাদের মেহনতের প্রায় সবটুকু ফসলই মানুষ আমাদের কাছ থেকে চুরি করে নিচ্ছে। এই হচ্ছে আমাদের সকল সমস্যার মূল, বুঝলে বন্ধুসকল। একটি মাত্র শব্দের মধ্যে সবটুকু নিহিত রয়েছে। সেই শব্দটি—মানুষ। আমাদের সত্যিকার শত্রু-একমাত্র শক্ত-মানুষ। ওই মানুষকে থেকে হটিয়ে দাও, দেখবে আমাদের অনাহারের কষ্ট, অনাহারের কারণ, হাড়ভাঙা খাটুনী সব কিছু ঘুচে যাবে, চিরকালের মত ঘুচবে। ‘এই মানুষই একমাত্র জীব যে নাকি কিছু উৎপাদন না করে স্রেফ খরচ করে, ভােগ করে। দ্যাখাে সে দুধ দেয় না, সে ডিম পাড়ে না, তার গায়ে এতটুকু জোর নেই যে লাঙল টানবে, এমন কি একটু ছুটে যে একটা খরগােস ধরবে তেমন জোরে দৌড়তে পারে না মানুষ। হচ্ছে সকল পশুকুলের হর্তাকর্তা। মানুষ তাদের খাটিয়ে নেয়, আর তার বদলে কি দেয়, না, খেতে দেয়, মানে পিত্তিরফের মত খাওয়া। আর বাদবাকী সবটুকু মানুষ আত্মসাৎ করে। আমাদের মেহনতে জমি চাষ হ’ল, আমাদের নাদের সারে উর্বর হ’ল অথচ আমাদের নিজের বলতে এই গায়ের চামড়াটুকু ছাড়া কিছু নেই। আমার সামনে যে সব গরু বসে আছ দেখছি, আচ্ছা বলতে, গত এক বছরে তােমরা কত হাজার গ্যালন দুধ দিয়েছ? আর সেই বিপুল পরিমাণ দুধ কোথায় গেল—যে দুধ দিয়ে তােমাদের বাছুরগুলো তেজালাে হয়ে উঠতে অথচ সে য়্যানিম্যাল ফার্ম পারত? জানাে, সেই দুধের প্রতিটি ফোটা আমাদের ওই শক্ররা গিলেছে ? আর এই যে মুরগীর পাল, তােমরা এক বছরে কত ডিম পেড়েছ? সেই ডিম থেকে তা দিয়ে ক’টা বাচ্ছা ফোটাতে পেরেছ? সব ত হাটে চলে গিয়েছে? কেন ; না, ওই জোন্স আর তার লােকদের টাকা চাই—ডিম বেচে দেয় ওরা টাকার জন্যে, বুঝলে! এই যে ক্লোভার, বলতে পারাে কি, তুমি যে চার-চারটে বাচ্ছা পেটে ধরেছিলে তারা আজ কোথায় ? তােমার এই বুড়াে বয়সে যারা বল ভরসা, যাদের নিয়ে সাধ আহলাদে কাটাতে পারতে—তাদের কিনা এক বছর বয়স হতে না হতে বেচে দিয়েছে। জীবনে কখনও আর তাদের মুখ দেখতে পাবে না। তােমার চারবারের গর্ভযন্ত্রণা আর দৈনন্দিন মেঠো খাটুনীর বিনিময়ে তুমি পাও মাপা দানা আর মাথা গোঁজবার জায়গা-ব্যস! ‘তাও আবার কী, আমাদের এই দুর্দশায়ভরা জীবনটুকুও পূরে বাঁচবার সুযােগ আমাদের দেওয়া হয় না। আমার নিজের জন্যে কোনাে আক্ষেপ নেই, আমি ভাগ্যবান। আমার বয়স বারাে বছর হ’লমােটমাট আমার সন্তান সন্ততি হয়েছে—তা শ চারেক। শূয়ােরের জীবনের এটাই সহজ পরিণতি। কিন্তু কোনাে পশুরই অন্তিমের সেই নিষ্ঠুর চুরির হাত থেকে রেহাই নেই। এই যে চ্যাংড়া শূয়ােরের বাচ্ছারা আমার সামনে বসে আছ, বছর খানেকের মধ্যে তােমাদের জীবনটুকু সেই হাড়ি কাঠের ওপর চেঁচাতে চেঁচাতে চুকে যাবে। সেই ভয়ঙ্কর পরিণাম আমাদের সকলেরই কপালে—গরু, শূয়াের, মুরগী, ভেড়া, কেউ বাদ যাবে । এমন কি ঘােড়া আর কুকুরের ভাগ্যও এর চেয়ে ভালাে কিছু নয়। দ্যাখাে বক্সার, যেদিন তােমার এই বিরাট পেশীগুলাে অকেজো হয়ে পড়বে সেইদিনই জো তােমায় বেচে দেবে বুড়াে ঘােড় যারা কেনে ৮ ফ্ল্যানিম্যাল ফার্ম তাদের কাছে, তারা তােমার গলাটি কাটবে, দেহটা সেদ্ধ করে শিকারী-কুকুরদের মুখের মুখের খােরাক বানাবে। আর বুড়াে কুকুরদের ব্যবস্থা ? যখন তারা ফোলা হয়ে যায় তখন জোন্স করে কি, কুকুরদের গলায় ইট বেঁধে এই কাছের পুকুরেই ডুবিয়ে দেয়। ‘এখনও কি, কমরেডগণ, ব্যাপারটা জলের মত পরিষ্কার হল না, যে আমাদের যা কিছু অমঙ্গল তার মূলে রয়েছে মানুষের অত্যাচার ? কোনাে রকমে মানুষের হাত থেকে মুক্ত হও, দেখবে আমাদের মেহনতের সব ফসল যােলআনা আমাদের নিজের হয়ে যাবে। প্রায় রাতারাতিই আমরা স্বাধীন হতে পারি, বড়লােক হতে পারি। তাহলে এখন আমরা কী করব ? কেন, দিনরাত দেহ মন এক করে কাজ করব ; মানুষকে উচ্ছেদ করবার জন্য, আমাদের খাটতে হবে। তােমাদের কাছে এই আমার বাণী বন্ধুগণ-বিদ্রোহ ! আমি জানিনা কবে সেই বিদ্রোহের দিন আসবে, হয়ত সাত দিনের মধ্যেই বিদ্রোহ আসতে পারে, আবার একশ’ বছরও লাগতে পারে, তবে আমি নিশ্চিত দেখতে পাচ্ছি যে একদিন সেই চরম বিচারের দিনটি আসবেই আসবে। আমার পায়ের তলায় এই খড়গুলাে যেমন দেখতে পাচ্ছি, তেমনিই সুস্পষ্ট আমার সামনে সেই বিদ্রোহ—আজ হােক অথবা কাল হােক, সুবিচার আসবেই। তােমাদের প্রত্যেকের লক্ষ্য সেই দিকে রাখাে, তােমাদের স্বল্পায়ু জীবনের বাকীটুকু সেই দিকে দিয়ে দাও। আর, আমার এই বাণী তােমাদের পরে যারা আসবে তাদের কাছে পৌছে দিও-যাতে তারা এই সংগ্রাম চালিয়ে যেতে পারে। ‘কমরেড়গণ, সংকল্প সাধনের পথে যেন কথন দ্বিধা সংশয় না আসে। কোনাে যুক্তির ধোঁকাবাজীতে ভুল করে ব’স না। মানুষ আর পশুর স্বার্থ একসঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে, একের সুদিনের মানে অন্যের সৌভাগ্য য়্যানিম্যাল ফার্ম ১ এসব কথা যদি ওরা বােঝাতে আসে ত তাতে বিলকুল কান দিয়ে না। ওকথা ডাহা স্কুটো। মােন্দা, মানুষ নিজের স্বার্থ ছাড়া আর কিছুই তাবেদারী করে না। তাই এই সংগ্রামের জন্য আমাদের পশুসমাজের মধ্যে পূর্ণ একতা কায়েম হােক, খাঁটি বন্ধুত্ব বহাল থােক। মানুষ মাত্রেই শত্রু। আর পশুমাত্রেই বন্ধু। ঠিক এই মুহূর্তে একটা প্রচণ্ড গণ্ডগােল বেধে গেল। মেজরের বক্তৃতার মধ্যে কখন চারটে ইদুর গর্ত থেকে চুপিসাড়ে বেরিয়ে পিছনের দিকে বসে বক্তৃতা শুনছিল। কুকুরগুলাের সেদিকে হঠাৎ নজর পড়ে যায় আর বেগতিক দেখে ইদুররা চটপট গর্তের দিকে পালাতে গিয়ে গােলমাল বাধিয়ে বসে-অবিশ্যি যথাসময়ে ওরা গর্তে ঢুকে পড়ে পরিত্রাণ পেল। গােলমাল থামাবার জন্য মেজর থাবা তুলে ইশারা করলেন। তিনি বললেন-‘বন্ধুগণ, একটা ব্যাপার এখনই ফয়সালা হওয়া চাই। বুনাে জীবেরা মানে ইদুর, খরগােশ এরা সব, আমাদের বন্ধু, না, শত্রু? আচ্ছা এটা ‘ভােট’ নিয়ে ঠিক করা যাক। এই সভার সমক্ষেই এই জিজ্ঞাস্যটি তুলতে চাই: ইদুরেরা কি বন্ধু ? সঙ্গে সঙ্গে ভােট নেওয়া হ’লএবং দেখা গেল যে বিপুল ভােটাধিক্যে ইদুরেরা বন্ধু বলে গৃহীত হয়েছে। মাত্র চারজন বিপক্ষে ছিল, তিন কুকুর আর ওই বেড়ালটা। অবশ্য পরে টের পাওয়া গিয়েছিল যে বেড়ালটা দু তরফেই ভােট দিয়েছিল। মেজর বলে যেতে লাগলেন : ‘আমার আর সামান্য ক’টি কথা বাকী আছে। তােমরা সবসময়ে স্মরণ রেখাে যে, মানুষ এবং মানুষের আচার আচরণের প্রতি শত্রুর মনােভাব বজায় রাখাই তােমাদের কর্তব্য। দু-পায়ে ভর করে যারাই ১০ য়্যানিম্যাল ফার্ম চলাফেরা করে তারাই হচ্ছে শত্রু। আর চারপায়ে হেঁটে চলে যারা, যাদের ডানা আছে-তারা সবাই বন্ধু। বন্ধু। দ্যাখাে আমরা মানুষের সঙ্গে লড়াই করতে গিয়ে যদি তার নকল করি সেটাও অসহযেন কখনই তেমন হয়। মানুষকে জয় করবার পরও যেন তাদের মত বদ অভ্যাসগুলাে নিজেরা না নকল করি। কস্মিনকালে কোনাে জানােয়ার বাড়িঘরে বসবাস করবে না, অথবা বিছানায় ঘুমােবে না, কিম্বা জামাকাপড় পরবে না, ভুলেও মদ ছোবে না, তামাক ফুকবে না কেউ, বিষয় কারবার পয়সা- কড়ির ধারে-কাছে ঘেঁষবে না কখনও। মানুষের যা কিছু অভ্যেস সবই খারাপ। আর হাঁ, কোনােদিন যেন কোনাে জানােয়ার তার স্বজাতির ওপর জুলুম না করে সেটা মনে রাখা সব চেয়ে বেশি দরকার। দুর্বল হােক সবল হােক, চালাক কিম্বা নির্বোধ যেমনই হােক না কেন, পশুরা সবাই ভাই-ভাই। জানােয়ার সমাজের কেউ কাউকে কখনও খুন করতে পারবে না। জানােয়ারেরা সবাই সমান। এইবারে আমি তােমাদের কাছে আমার গত রাতের স্বপ্নের কথা বলি কমরেডগণ ! সেই স্বপ্নটা গুছিয়ে সাজিয়ে বলি এমন ভাষা আমার নেই। সেটা ঠিক বলে বােঝানাে যায় না। মানুষ যখন পৃথিবী থেকে লােপ পেয়ে যাবে তখনকার পৃথিবীর ঠিক কেমন চেহারা হবে, আমার স্বপ্নে সেই ছবিটাই ফুটে উঠেছিল। কিন্তু আশ্চর্য এক কাণ্ড হয়েছে- অনেককাল আগে আমার মন থেকে হারিয়ে যাওয়া একটি কথা স্বপ্নের মধ্যে আমি ফিরে পেয়েছি। অনেক দিন আগে, আমার মা আর তাঁর সখী শূকরীরা সেকেলে এক গান গাইতেন। তারা শুধু গানের সুরটুকু জাতেন আর তাদের জানা ছিল সেই গানের প্রথম তিনটি কথাব্যস! শৈশবে আমি সেই সুরটুকু শিখেছিলাম, কিন্তু তারপর দীর্ঘকাল হ’ল সে য়্যানিম্যাল ফার্ম সব আমার মন থেকে মুছে গিয়েছিল। আশ্চর্য ব্যাপার, কাল রাতে স্বপ্নের মধ্যে কি করে সেই পুরনাে ভুলে যাওয়া সুরটা আমার কাছে ধরা দিল ! এবং আরও মার কথা কি জানাে, সেই গানের বাণীগুলিও ফিরে পেয়েছি-এ গানের বাণী আমি নিঃসন্দেহে বলতে পারি-যে গান বহু-বহু পুরুষ আগেকার পশুরা গাইতেন, যে গান কোন পূর্বপুরুষের আমল থেকে পশুরা ভুলে গিয়েছে, সেই গানের বাণী। এখন আমি তােমাদের সেই গানটি গেয়ে শােনাচ্ছি বন্ধুগণ। বুড়াে হয়েছি, আমার গলাও ভাঙা। তবে গানের সুরটা আমি শিখিয়ে দিলে পরে তােমরা নিজেরা এর চেয়ে ভালাে ভাবে গাইতে পারবে। গানটি হচ্ছে-“ইংলণ্ডের পশুকুল।” বুড়ো মাতবর গলা ঝেড়ে পরিষ্কার করে গাইতে লাগলেন। তার গলাটা ভাঙা-ভাঙা ঠিকই, তবুও তিনি রীতিমত ভালাে গাইছেন বই কি। আর সুরটিও বেশ উদ্দীপনামূলক। কতকটা ক্লেমেন্টাইন’ আর ‘লা কুকুরাম’ গানের মাঝামাঝি একটা সুর। তার বাণী হচ্ছে এই ইংলণ্ডের পশুরা, সবাই শােননা, আইরিশ পশু, ভাই সব, শােনাে শােননা, বিশ্বের পশু যত আগামী দিনের সােনালী স্বপ্ন, আশার বার শােনন। অজ, নয়, কাল আসবেই সেই দিন, গদি ছেড়ে দিয়ে পালাবেই মানুষেরা, স্বৈরাচারীর পতন হবেই হবে! ইংলণ্ডের সুফলা ভূমিতে শুধু পশুরাই রবে ।

১২
ফ্ল্যানিম্যাল ফার্ম
নাকে আমাদের কড়া থাকবে না কারাে,
পিঠ থেকে সাজ কোথা পড়ে যাবে খসে,
লাগামে রেকাবে মরচে ধরবে শুধু,
কঠিন চাবুকও পড়বে না পিঠে আর ।
মিলবে সেদিন কত দৌলত ভাবতে পারিনে ভাই।
যব, গম, জই ম্যাঙ্গেল বীট সব হবে আমাদের
ক্লোভার, ঘাসের ফসল, কলাই, শুকনাে খড়ের পাঁজা
আমাদের--শুধু আমাদেরি হবে সব।
ইংলণ্ডের ঘাট-বাট-মাঠ হবে আলাে-ঝলােমল,
আরাে নির্মল আরাে পবিত্র হবে তৃষ্ণার জল,
বাতাস আরাে মধুর,
বিশ্বের যত পশুরা যেদিন সবাই স্বাধীন হবে ।
সেদিনের লাগি খেটে যাব মােরা সবে,
যদি আগে মরি, ক্ষতি নাই খেদ নাই।
গােরু, ঘােড়া, মােষ,রাজহাঁস, মােরগেরা
মুক্তির তরে খেটে যাব তবু একমনে এক প্রাণে।
ইংলণ্ডের পশুরা, সবাই শােননা,
আইরিশ পশু, ভাই সব, শােনো শােনাে,
বিশ্বের পশু যত
সােনালী দিনের সুখের স্বপন শােনাে ও শােনাও সবে ।
গান শুনতে শুনূতে পশুরা ভয়ঙ্কর উত্তেজিত হয়ে পড়ল। মেজরের

য়্যানিম্যাল ফার্ম গান থামতে তারা সবাই গাইতে শুরু করে দিল। ওদের মধ্যে সবচেয়ে হদা পশুটি পৰ্যন্ত এ গানের সুরটুকু গলায় তুলে নিয়ে বসে আছে, চাই কী বাণীর দু-চারটে কলিও মুখস্থ করে ফেলেছে এরই মধ্যে। আর যারা একটু বেশি বুদ্ধি ধরে, যেমন ক্লোভার, শূয়াের আর কুকুরেরা সবাই কয়েক মিনিটের মধ্যে গােটা গানখানাই অন্তরে গেঁথে নিল। এবং এরপর বারকয়েক মহলা দিয়ে কৃষি ভবনের তামাম পশুরা সমস্বরে ঐকতান জুড়ে দিল—“ইংলণ্ডের পশুগণ’ গানের প্রবল সুর-বিক্ষেপে গােটা খামার বাড়ীখানা ফেটে যাবার দাখিল। গরুর গলা খাদে চলে, কুকুরের ঘেউ ঘেউ কিছু তীক্ষ্ণ, ভেড়ার ভ্যা-ভ্যা, ঘােড়ার চি-হি-হি, হাঁসের প্যাক্‌-পাকানীতে গান জমায়ে। ওরা সবাই আনন্দে এতই বিভাের হয়ে গিয়েছিল সে, একটানা পাঁচ বার পরপর পুরাে গানখানা গেয়ে গেল -যদি বাধা না পেত তাহলে হয়ত সারা রাত ধরেই ওদের গান চত। দুর্ভাগ্যবশতঃ ওদের গানের হট্টগােলের চোটে জোসের ঘুম ভেঙে যায়, তিনি চমকে বিছানা থেকে লাফিয়ে পড়লেন। তার যেন সন্দেহ হচ্ছে আঙিনায় শেয়াল এসেছে। ব্যস, চট, ক'রে বন্দুকটা হাতে তুলে নিলেন—শােবার ঘরের কোণেই সর্বক্ষণ এই বন্দুকটা দাঁড় করানাে থাকে। তারপর বেরিয়ে এই একটা ছ-নম্বর টোটা ভরে অন্ধকারে হাওয়ায় বন্দুক ছাড়লেন জো। ছররাগুলাে গােলাবাড়ির দেয়ালের মধ্যে সেদিয়ে গেল। আর সভাও খুব ত্বরিতে ভঙ্গ হল। যে যার নিজের ঘুমের জায়গায় সরে পড়ল। পাখীরা নিজের সাড়ে চড়ল, পশুরা খড়ের শয্যায় ক্লান্ত দেহ মেলে শুল—নিমেষের মধ্যে গােটা কষি-ভবনটি ঘুমে অচেতন ১৪ যানিম্যাল ফার্ম (২) তেত্তির পেরুলাে না, বুড়ােমেজর শেষনিঃশ্বাস ফেলে, শান্তিতে সাধনােচিত ধামে রওনা হলেন-তার নশ্বর দেহটা সমাধি, দেওয়া হ’ল ফলবাগানে। এ ঘটনাটা মার্চ মাসের প্রথম দিকে ঘটে। এরপর তিন মাস ধরে হরদম চোরা বৈঠক, আর কাজ চল। মেজরের সেদিনের বক্তৃতা অপেক্ষাকৃত বুদ্ধিমান জন্তুজানােয়ারদের জীবন সম্বন্ধে ধারণা বদলে নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে। ওরা জানে না যে, মেজরের ‘ভবিষ্যদ্বাণীর বিদ্রোহ কবে আসবে, তারা বেঁচে থেকে সেই বিদ্রোহ দেখে যেতে পারবে কি না তাও তারা জানে না, তবে এটা তারা পরিষ্কার বুঝে নিয়েছে যে বিদ্রোহের জন্য জমি তৈরী করা তাদের কর্তব্য। আর সব প্রাণীদের শিক্ষা দেওয়া, মণ্ডলীবদ্ধ করার কাজ শূকরদের ওপরই ক্রমে পড়ল—কারণ, পশুদের মধ্যে তারাই সবচেয়ে বুদ্ধিমান বলে বিবেচিত হয়ে আসছে। এখানকার শূকর সমাজের নেতা হচ্ছে দুটি তরুণ দাতাল শূয়র—যােবল আর নেপােলিয়ন। এদের দু’টিকেই জোস্ সাহেব বাজারে বিক্রী করবার মতলবে খাইয়ে-দাইয়ে মানুষ করছেন। নেপােলিয়ন আকারে প্রকারে হিংস্র এবং বলিষ্ঠ বার্কশায়ারের শূকর—বিশেষ কথাবার্তার ধার ধারে না, নিজের গোঁ ধরে চলে সে। আর মােবল বাকচাতুর্যের জন্য বিখ্যাত, ছােরা মত, ফন্দীফিকিরেও খুব ওস্তাদ—কিন্তু নেপােলিয়নের মত গভীরতা তার নেই, সবাইকার তাই বিশ্বাস। এখানকার বাকী সব করদের পালন করা হচ্ছে বাজারে তাদের মাংস বিক্রী করার জন্য। এদের মধ্যে স্কুইলার হচ্ছে সবার সেরা—ছােট্ট-খাটো, গােলগাল চেহারা, হ্যানিম্যাল ফার্ম ১৫ পিটপিটে চোখ, চটপটে চলন, কণ্ঠস্বরটা একটু বেশি চাছাছােলা কিন্তু সে খুব ভালাে বক্তৃতা করতে পারে। যখন কোনাে দুরূহ সমস্যা নিয়ে সে আলােচনা করতে যায় তখন ঘনঘন এপাশ-ওপাশ দোলে আর লেজ নাড়ে এতে শ্রোতাদের মনে ওর যুক্তির প্রতি বেশ আস্থার সঞ্চার হয়। স্কুইলার সম্বন্ধে সাধারণের এমন একটা বিশ্বাস হয়েছে, অনেকে বলে যে, স্কুইলার দিনকে রাত বানিয়ে দিতে পারে। এরা তিনজনে মিলে বুড়াে মেজরের তত্ত্বকে একটা দার্শনিক পদ্ধতিতে রূপায়িত করল, নাম দিল তার ‘পশুবাদ’। জোনস্ সাহেব রাত্রে শুয়ে পড়লেই ওরা গােলাবাড়িতে গােপন বৈঠকে জমায়েৎ হয়ে পশুবাদের বিভিন্ন সূত্র, নিয়মাদি সাধারণের কাছে ব্যাখ্যা করে শােনায় প্রথম দিকে অনেকে বােকার মত প্রশ্ন তুলত, আপত্তি করত,-কেউ হয়ত বলে ‘জো আমাদের মনিব, সে খেতে দিচ্ছে, সে যদি চলে যায় তাহলে আমরা যে অনাহারে মরব তার কী? তা ছাড়া প্রভুভক্তির প্রশ্ন তুলেও কেউ কেউ বলে বল—“আমরা মরে যাবার পর কি হবে-না-হবে তা নিয়ে মাথা ঘামিয়ে মরি কেন?’ নয়ত বলে—যদি বিপ্লব আসাটা অনিবার্যই হয়, তাহলে আমরা কিছু করি বা না করি, তা আসবেই ! তার জন্যে শুধু শুধু খেটে মরবার দরকার কি! এইসব অবুঝদের মগজে পশুবাদের সারমর্মটুকু সঠিক ঢুকিয়ে দেওয়া বড় সহজ কাজ নয়-তবু শূকরনেতারা হাল ছাড়ল না, যথেষ্ট কষ্ট করতে লাগল। তারা বলে যে, এসব প্রশ্ন পৃথিবীতে পশুবাদ প্রতিষ্ঠা করার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। সবচেয়ে হাঁদার মত কথা বলত সেই শাদা মাদী ঘােড়া মলি, সবার আগে সে জিজ্ঞেস করল মােবলকে—আচ্ছা, বিপ্লবের পরেও আমরা চিনি পাবাে ত ?

হ্যানিম্যাল ফার্ম কঠিন দৃঢ়কণ্ঠে জবাব দিল মােবল—না, আমাদের এই খামারে চিনি তৈরীর বন্দোবস্ত নেই। চিনির ত দরকার নেই। কেন, ঘাস-খড় জই সবই ত যত ইচ্ছে তত পাবে। -“ইয়ে, লাল ফিতে গলায় পরে থাকতে দেবে ত আমাকে?” মলি বলে। ‘বন্ধু ! গােবল জবাব দিল—“ওই যে ফিতে, যার ওপর তােমার এত দরদ, সেটা ত দাসত্বের চিহ্ন। তুমি কি জানাে না যে ওই হেঁদো এক টুকরাে ফিতের চেয়ে স্বাধীনতার মূল্য ঢের বেশি ? মলি সেকথা মেনে নিল, কিন্তু যােবলের কথাটা আন্তরিকভাবে গ্রহণ করেছে বলে মনে হল না। এর চেয়েও মুস্কিল হ’ল পােষ দাড়কাক মােজেসকে নিয়ে। ব্যাটা আবার জোসের খুব পেয়ারের পাখী, সম্ভবতঃ গুপ্তচর। এছাড়া আর একটা ক্ষতিকর কাজ মােজস করে থাকে—যতসব আজগুবী গল্প আমদানী করে সে। সব মিথ্যে। কিন্তু হতভাগা ধড়িবাজ গাল্পিক, তার কথা অনেক আহাম্মক বিশ্বাস করে বসে। মােজেস দাবী করে যে, ভারি মজার এক দেশ সে দেখে এসেছে। ওই যে আকাশের ওপর মেঘগুলাে উড়ে বেড়াচ্ছে—ওই মেঘগুলাে পেরিয়ে একটু উচুতে ভেতর দিকে গেলেই সেই দেশ সে দেশে মিছরীর মস্ত পাহাড় রয়েছে, তামাম দুনিয়ার জন্তুজানােয়ারেরা মরে সেই পাহাড় গিয়ে হাজির হয়- হা! ওই মিছরির পাহাড়ে সপ্তাহের সাতটা দিনই বিস্কুল রবিবার। বাবােমাস সেখানে তাজা ক্লোভার ঘাসে জমি ভর্তি হয়ে থাকে, ঝােপে- কাড়ে বিস্তর মিছরির ভ্যালা আর মনের খইল ধরে রয়েছে। এইসব মিছেকথা বলে মােজেস, আর একদম কাজ করে না সে—তাই সবাই য়্যানিম্যাল ফার্ম ১৭ ওকে ঘৃণা করে; তবে কেউ কেউ এই মিছরি পাহাড়ের কথাটা যেন বিশ্বাস করছে। অনেক কষ্টে যুক্তিতর্ক দিয়ে এইসব বােকা জানােয়ারদের ভ্রান্তপথ থেকে ঠিক রাস্তায় আনে শূকর-নেতারা। এদের খাঁটি মন্ত্রশিষ্য বলতে গাড়িটানা ঘােড়াজোড়াবার আর ক্লোভার। এরা নিজে নিজে কোনাে কিছু ভাবতে গেলেই খেই হারিয়ে ফ্যালে, পারে না বলাই ঠিক। তাই শূকরদের একবার যখন শিক্ষক বলে মেনে নিল তখন থেকে শুকরদের সব কথাই ওরা হুবহু গিলতে লাগল, এবং আর পাঁচজন পশুর কাছে প্রচার করতে থাকল। গােলাবাড়ির প্রত্যেক গােপন সভাতে ওরা নিয়মিত হাজির হয়, ‘ইংলণ্ডের পশুগণ’ গানেও ওরাই অগ্রণী। এই গান গেয়েই নিয়মিত সভার কাজ শেষ হয়। এদিকে ঘটনাচক্রে বিদ্রোহের সুযােগটা আশাতীতভাবে দ্রুত এসে পড়ল। শুধু যে তাড়াতাড়িই বিপ্লবের সুযােগ মিল তা-ই নয়, এত সহজে বিপ্লবে জয়লাভ হল যা কেউ ভাবতে পারে নি। এমনিতে জোস খুব কড়া মনিব, চাষী হিসেবেও সে খুব পাকাপােক্ত লােক—কিন্তু সম্প্রতি কিছুদিন যাবৎ তার খুব দুঃসময় যাচ্ছিল। কতকগুলাে মামলা-মােকদ্দমাতে প্রচুর টাকা লােকসান খেয়ে সে মদের নেশায় চুর হয়ে থাকে। দিনমানটা রান্নাশালে আরাম-চেয়ারে পড়ে থাকে, খবরের কাগজ পড়ে আর দফায় দফায় মদ খায় সে। মাঝে মাঝে মােজেসকে দু-একটুকরাে রুটি মদে চুবিয়ে খাওয়ানাে ছাড়া আর কিছু করে না জোনস্। ওদিকে তার কর্মচারীরা কাজে ফাকি মারে— ক্ষেতের মধ্যে আগাছার জঙ্গল হয়েছে, ছাদে ছাউনীর দরকার, বেড়াগুলাে ভেঙে পড়ছে আর জজানােয়ারগুলাে পেটপুরে খেতেও পায় না।

১৮ য়্যানিম্যাল ফার্ম জুন মাস এল, ক্ষেতের ঘাস কাটার সময় এসে গেছে। ভরাগ্রীষ্মের কাছাকাছি, এক শনিবাৰে জোন্স উইলিংডন শহরের ‘রেড লায়ন’-এ গিয়ে বেহেড মাতাল হয়ে পড়ল। ফলে রবিবার দুপুরের আগে সে খামারে ফিরতে পারল না। আর তার কর্মচারীরা সাতসকালে গােরুগুলাে দুয়ে দুধ নিয়ে কোন চুলােয় যে গিয়েছে—হয়ত বা খরগােশ ধরতেই বেরিয়েছে—এদিকে জানােয়ারগুলাের খাওয়া-দাওয়ার যে কি হবে তার ঠিক নেই। জোনসবাবু এসেই বৈঠকখানার সােফাতে ‘পৃথিবীর খবর’ কাগজখানা মুখে চাপা দিয়ে দিব্যি ঘুমিয়ে পড়লেন। ফলে সন্ধ্যে পর্যন্ত পশুগুলাে নিবন্ধু উপবাসী রইল। কিন্তু সন্ধ্যে হয় হয় এমন সময়ে ওরা আর সহ্য করতে পারল না—একটি গরু করল কি ভাণ্ডারের চালাঘরের আগলটা শিং-এর গুতাে মেরে ভেঙে ঢুকে পড়ল, আর তার পিছু পিছু বাকী সব জানােয়ারেরা ঢুকে শেষ করতে লাগল যা কিছু সামনে পেল তাই। ঠিক সেই সময়ে জোসের ঘুম ভেঙেছে। পরমুহূর্তে জোন্স আর তার চার মাইনদার চাবুক হাতে ভাণ্ডারশালায় পৌছে যদিচ্ছা চাবুক মারতে শুরু করে দিল। ব্যস, আর যায় কোথা—ক্ষুধার্ত পশুরা ক্ষেপে গেল। যদিও তারা আগে থেকে কিছু মতলব ভেঁজে রাখে নি, তবু আপনাআপনিই আক্রমণকারীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। হঠাৎ জোন্স দেখল যে, সে আর তার লােকেরা হরদম জানােয়ারদের গুতাে- ধাক্কা খাচ্ছে চারিদিক থেকে। অবস্থা এখন তাদের আয়ত্তের বাইরে চলে গেছে। এর আগে তারা কস্মিনকালে এমন কাণ্ড দ্যাখে নি। চিরকালই ত জানােয়ারদের খুশিমত মারধর করে এসেছে তারা আজ হঠাৎ এ কী কাণ্ড। ব্যাপার দেখে তারা রীতিমত ঘাবড়ে গেল।

য়্যানিম্যাল ফার্ম ১৯ বুদ্ধিসুদ্ধি যেন আর হাতড়ে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। মাত্র কয়েক মুহূর্ত তারা আত্মরক্ষার চেষ্টা করল বটে কিন্তু তারপর ভয়ের চোটে তারা পাঁচজনে মিলে পুরােদমে দৌড়তে শুরু করল প্রাণের দায়ে। মিনিট- খানেকের মধ্যে দেখা গেল খামারের গাড়িচলা পথ দিয়ে তারা সােজা বড় শড়কের দিকে দৌড়াচ্ছে। আর তাদের পিছু পিছু ধাওয়া করেছে জন্তুর দল, বীরের দল যেন। জোন্স গিন্নী শােবার ঘরের জানালা দিয়ে এইসব কাণ্ড দেখে, চটপট একটা থলের মধ্যে হাতের কাছে যা জিনিসপত্তর পেল তা-ই ভতি করে নিয়ে আর-এক দরজা দিয়ে সটকে পড়ল। আর মােজেসও দাড় থেকে লাফিয়ে মনিবগিন্নীর পিছু পিছু কা-কা ডাক ছেড়ে উড়ে চল। এদিকে ততক্ষণে পশুরা তাদের মনিব আর মনিবের চাকরদের সদর রাস্তা পর্যন্ত খেদিয়ে দিয়ে, খামারবাড়ির পাঁচগরাদ দেওয়া বড় দরজাটা বন্ধ দিয়েছে। মােন্দা দেখা গেল যে, তারা ভালাে করে বােঝবার আগেই বিদ্রোহ সাফল্য সহকারে জয়যুক্ত হয়ে গেছে : জোন্স বিতাড়িত হয়েছে, এখন এই কৃষিভবন তাদের খাস দখলে এসেছে। এই পরম সৌভাগ্যটা সত্যিই যে হাতের মুঠোয় তারা পেয়ে গেছে- এই কথাটা ভালাে করে ভাবতে ভাবতেই কিছুক্ষণ কেটে যায়। তারপর ওদের প্রাথমিক কাজ হ’ল খামারবাড়ির চৌহদ্দিটা সদলবলে ঘুরে ঘুরে পর্যবেক্ষণ করা। কোথাও কোনাে মানুষ লুকিয়ে আছে কি না সেটা আগে দেখা দরকার। দেখা দরকার। তারপর ওরা ছুটে চল জোনসের খামার বাড়িতে। এখান থেকে ঘৃণিত জোসের সাম্রাজ্যের শেষ চিহ্নটুকু ঘুচিয়ে দিতে হবে। আস্তাবলের পাশের লাগামঘর থেকে য়্যানিম্যাল ফার্ম এগুলাে কুকুরের গলায় বাঁধার শেকল, ঘােড়ার নাকে আটকাবার আংটা, যে মারাত্মক ছুরি দিয়ে জোনস ভেড়া আর শূয়ােরদের এতাবৎকাল খাসী করেছে সেই কলঙ্কিত ছুরিটা, এমনি আরও যা-যা কাছাকাছি পাওয়া গেল সবগুলাে কুয়াের মধ্যে ফেলে দিল। লাগাম, ফাস, নাকের জাল, চোখের ইলি, সব জড়াে করে যেখানে জঞ্জালের গাদায় আগুন জ্বলছিল তার মধ্যে ফেলে দেওয়া হল। চাবুকগুলাে অগ্নিতে আহুতি দিয়ে দিল। এইভাবে সব চাবুক পুড়ছে দেখে পশুরা আনন্দে তুড়িলাফ দিয়ে নাচতে শুরু করল। মােবল করল কি, রঙীন বিবগুলােও আগুনে ফেলে দিল—হাটের দিনে জোস ঘােড়ার গলায় আর লেজের বালাচিতে এই ফিতের বাহার দিয়ে হাটে যেত। মােবল বললে ‘ফিতেটিতে-কেও কাপড় জামার সামিল বিবেচনা করতে হবে। মানুষের কথা মনে করিয়ে দেয়। আর, প্রত্যেক পশু উলঙ্গ হয়ে থাকবে। বক্সারের কানে একথাটা যেতেই সে চট করে ছােট্ট একটা খড়ের টুপি এগিয়ে দিল আগুনের মুখে। গরমকালে মাছির উপদ্রব থেকে বাঁচবার জন্য বক্সার এই টুপীটা ব্যবহার করত। এমনি করে খুব অল্পকালের মধ্যেই পশুরা সব নষ্ট করে ফেল— যেসব জিনিস মানুষের কথা মনে করিয়ে দেয় তার কিছুই ওরা রাখবে না। তারপর নেপােলিয়ান ওদের নিয়ে ভাণ্ডারশালাতে এল এবং প্রত্যেককে দুগুণ খাদ্যশস্য বিলিয়ে দিল। কুকুরদের বাড়তি দুখানা বিস্কুট দেওয়া হল। এবং ইংলণ্ডের পশুগণ’ গানখানি আগাগােড়া সাতবার তারস্বরে গেয়ে ওরা রাতের মত ক্ষান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। এমন ঘুম এর আগে ওরা জীবনে ঘুমােয় নি।

য়্যানিম্যাল ফার্ম ভােরের আলাে ফুটতে না ফুটতেই ওরা না ফুটতেই ওরা জেগে উঠল যথারীতি। ঘুম ভেঙেই সহসা মনে পড়ে যায় গতরাত্রের গৌরবময় ঘটনাবলী। খুব উৎসাহভরে সবাই মিলে ছুটল চারণভূমিতে। এই মাঠখানা পেরিয়েই একটা উচু ঢিপি আছে, সেখান থেকে কৃষিভূমির সবদিক বেশ দেখা যায়। সেই ঢিপির ওপর ঠেলাঠেলি করে জানােয়ারের সবাই মিলে উঠে ভােরের স্পষ্ট আলােতে চারিদিক ভালাে করে দেখতে লাগল। দু’চোখ ভরে যা দেখছে ওরা—সবই ওদের নিজেদের। হ্যা, একেবারে নিজস্ব বলতে যা বােঝায় তা-ই। এই কথাটা যতই ভাবছে ওদের আনন্দ ততই বাড়ছে। দেখতে দেখতে উৎসাহের চোটে লাফালাফি, ছুটোছুটি জুড়ে দিল পশুরা। হাওয়াতে যেন নিজেদের নিয়ে লােফালুফি খেলছে ওরা। কখনও কেউ শিশির- ভেজা ঘাসের ওপর গড়াগড়ি দিচ্ছে, কেউ বা মিষ্টিঘাস চারটি চিবিয়ে খাচ্ছে, পায়ের ঠোকর দিয়ে কেউ মাটির চটা উঠিয়ে ফেলছে, সোঁদা গন্ধ শুকছে। পুনরপি খামারবাড়ি এক চক্কর ঘুরে বেড়াল সবাই। চোখে ওদের বিস্ময়, মুখে কোন ভাষা জোগাচ্ছে না এতই অবাক হয়ে গেছে ওরা। চষাক্ষেত, ঘাসে ঢাকা ভূই, পুকুর, ফলবাগান, ঝােপঝাড় -কত কী! এর আগে কখনও যেন ওরা এসব কিছুই দ্যাখে নি। এইসব এত সম্পদ,-সব ওদের নিজের! বিশ্বাস করতে সাহসে কুলােচ্ছে না যে! এবারে ওরা কৃষিভবনের বসতবাড়ির দরজার সামনে এসে দাড়াল। চুপ করে রয়েছে সবাই। এটিও ওদের সম্পত্তি। তবু ভেতরে ঢুকতে ভরসা হচ্ছে না। যাই হােক অবশেষে স্নােবল আর নেপােলিয়ন ঘাড়ের ধাক্কা দিয়ে দরজাটা খুলে ফেলল। তাদের পিছনে বাকী সকলে ২২ য়্যানিম্যাল ফার্ম একে-একে খুব সন্তর্পণে ভেতরে ঢুকল। পাছে গায়ে ধাক্কা লেগে কোনাে কিছু ভেঙে-চুরে নষ্ট হয় এই আশঙ্কায় সকলেই খুব হুশিয়ার হয়ে এগুচ্ছে, ফিস্ ফিস্ করে কথা কইছে আর অভাবনীয় সব বিলাস- বস্তুর দিকে ড্যাব-ডেবে অবাক চাউনী মেলে দু-চোখ ভরে তাকাচ্ছে। আয়না, কার্পেট, মহারাণী ভিক্টোরিয়ার একখানা লিথাে করা ছবি, ঘােড়ার বালামচিতে বানানাে সােফা, পাখীদের পাল দিয়ে তৈরী গদীসব কিছু দিকেই ওরা তাকাচ্ছে সন্ত্রমভরা দৃষ্টিতে। ফেরবার পথে সিড়ির কাছে এসে ওরা দেখল মলি নিখোঁজ হয়েছে। ওরা তখন ফিরে খুঁজতে গিয়ে দেখে সবার সেরা শােবার ঘরের পিছনে জোন্স গিন্নীর সাজগােজের টেবল থেকে মলি একটা নীল ফিতে তুলে নিয়ে ঘাড়ে লাগিয়েছে আর আয়নার সামনে দাড়িয়ে বিমুগ্ধ নয়নে নিজেকে বার বার দেখছে। ওর এই আদেখলেপনার জন্যে সবাই খুব ধমক দিল। রান্নাঘরে খানিকটা শূয়ােরের মাংস ঝােলানাে ছিল, সেটা সংগ্রহ করে নিয়ে ওরা কবর দেবে ঠিক করল। মদের পিপেটার ওপর বক্সার একটা চাট মেরে দিল। এ ছাড়া আর কোনাে কিছুতে ওরা হাত দেয় নি। সর্বসম্মতিক্রমে প্রস্তাব গৃহীত হল যে, বাস্তুবাড়িটা জাদুঘরের মত রক্ষা করা হবে। সবাই এ বিষয়ে একমত যে, কোনাে পশু ওই বাড়িতে বসবাস করবে না। পশুরা সব প্রাতরাশ সেরে নেওয়ার পর স্নােবল এবং নেপােলিয়ন তাদের একত্র জমায়েৎ করল । ‘কমরেডগণ ! গােল সম্বােধন করল—এখন সকাল সাড়ে ছটা, আমাদের হাতে গােটা দিনমান কাজ করার সময় পাচ্ছি। আজ আমরা যানিম্যাল ফার্ম ২৩ ক্ষেতের কাটা-ঘাস তুলতে শুরু করব। কিন্তু তার আগে একটা জরুরী কাজ রয়েছে, সেটা আগে সারা দরকার। এইবার প্রথম শূকরেরা জানালাে যে, এই দীর্ঘ তিন মাস ধরে তারা নিজেরা মানে শূকরবর্গ লেখাপড়া শিখেছে। জোনসের ছেলের একটি প্রথমভাগ জঞ্জালের গাদাতে ফেলে দেওয়া হয়েছিল, সেই বইখানি উদ্ধার করে তবে এই শিক্ষাব্যাপার সম্ভব হয়েছে। নেপােলিয়নের ফরমাসে শাদা এবং কালাে রং-এর পাত্র এবং তুলি নিয়ে তারা চল সেই পাঁচ গরাদের বড় দরজার দিকে। সেখানে গিয়ে মােবল এক তাজ্জব কাজ করল। বড় রাস্তার দিকে দরজার গায়ে লটকানাে একটা বিজ্ঞাপনের তকমাতে লেখা ছিল—ম্যানার ফার্ম বা কৃষিভবন। মােবল তার সামনের পায়ের থাবা দুটোতে তুলি ধরে শাদা রং-এর পোঁচড়া দিয়ে আগের ম্যানার’ শব্দটি মুছে দিল, তার ওপর কালাে হরফে লিখে ফেল—য়্যানিম্যাল’। এখন থেকে এ খামারের এই নাম হ’ল—“য়্যানিম্যাল ফার্ম বা পশুদের খামার বাড়ী। এরপর ওরা চল খামারের পাকা বাড়িতে, সেখানে পৌছেই নেপােলিয়ন হুকুম দিল ‘মই আনন। মই এল। গােলাবাড়ির দেয়ালে মইটাকে দাঁড় করানাে হ’ল। তারপর শূকরেরা বুঝিয়ে দিল যে, গত দীর্ঘ তিন মাসের গভীর গবেষণা এবং চিন্তার সাহায্যে পশুবাদ’-এর সমুদয় নীতি সাতটি নির্দেশের মধ্যে দাঁড় করানাে হয়েছে। এখন সেই সাতটি নীতি-নির্দেশ এই দেয়ালে লিখে দেওয়া হবে। এইগুলিই পশুদের কৃষিভবনের আইন বা অনুজ্ঞা বলে বিবেচিত হবে। এই আইন কোনাে কালেই এতটুকু অদলবদল হতে পারবে না। এখানকার পশুসমাজকে এই আইন মেনে চলতে হবে।

২৪
হ্যানিম্যাল ফার্ম
নােবল অতি কষ্টে মই-এর ওপর চড়ল। কারণ চারপেয়ে শূকরের
পক্ষে মইএর ওপর দেহের ভারসাম্য বজায় রাখা বেশ কঠিন। এবং
তার পিছু পিছু স্কুইলার উঠল রং-এর পাত্র নিয়ে। আলকাতরা
মাখাননা দেয়ালের ওপরে বিরাট বিরাট অক্ষরে শাদা রং-এ সপ্তঅনুজ্ঞা
লিখিত হল এই ভাবে :
ও অনু
১। যা কিছু দু পায়ে হাঁটে তা-ই শত্রু।
যা কিছু চার পায়ে চলে, কিম্বা যার পাখা আছে, তা-ই বন্ধু।
৩। কোনাে পশু কোন কাপড়-চোপড় পরবে না।
৪। কোনাে পশু বিছানায় শয়ন করবে না।
৫। কোনো প মদ খাবে না।
৬। কোনাে পত্র অন্য কোনাে পশুকে হত্যা করবে না।
৭। সব পশুই সমান।
দু-একটি তুচ্ছ ভুল ছাড়া মােটামুটি লেখাগুলি নির্ভুলই হয়েছে।
লেখা শেষ করে মােবল সাধারণের সুবিধার্থে জোরে জোরে সেগুলাে
পড়তে গেল। সবাই খুব খুশি হয়ে নির্দেশগুলিতে সায় দিল, আর
যারা ওরই মধ্যে চালাক তারা তখনই ‘অনুজ্ঞাগুলি’ মুখস্থ করতে শুরু
করে দিল।
হাতের রং-মাখা বুরুশটা ফেলে দিয়ে গােবল বলে—এবারে বন্ধুগণ
আমরা ক্ষেতে যাই চল। আমাদের এই পণ করতে হবে যে, জোনসের
ললাকেদের চেয়ে তাড়াতাড়ি ফসল তুলব আমরা।

যানিম্যাল ফার্ম কিন্তু সেই মুহূর্তে এক কাণ্ড হয়ে গেল। তিনটি গরু কিছুক্ষণ যাবৎ অন্তি বােধ করছিল এখন তারা হালাতে শুরু করল-চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে তাদের দুধ দেওয়া হয় নি, সেই যন্ত্রণায় তাদের বাট টাটিয়ে উঠেছে। একটু ভেবে নিয়ে শূকরেরা বালতি আগিয়ে, সামনের থাবা দিয়ে বেশ পটুতা সহকারে দুধ দুয়ে নিল। কিছুক্ষণের মধ্যে পাচ-পাঁচটা বাতি স-ফেন দুধে ভর্তি হয়ে গেল। বােধ করি, সব পশুরই লােলুপ দৃষ্টি সেখানে পড়ে কিছু চাঞ্চল্যের উদ্রেক করেছে। কে যেন বলল-“এত দুধ কি হবে? একটা মুৰ্গী বলে—“জো ত মাঝে মাঝে আমাদের খাবারের সঙ্গে খানিকটা করে দুধ মাখিয়ে দিত। বাতিগুলাে আগলে দাড়িয়ে নেপােলিয়ন গভীরভাবে বলল- ‘কমরেডগণ ! দুধ নিয়ে মাথা ঘামাতে হবে না তােমাদের, এর ব্যবস্থা হয়ে যাবে ঠিক। ফসলটা এখন জরুরী ব্যাপার। কমরেড স্নোবল তােমাদের নিয়ে যাচ্ছেন, তােমরা রওনা হয়ে পড়। আমি এই কয়েক মিনিটের মধ্যেই যাচ্ছি। এগিয়ে যাও-বন্ধুগণ! ওদিকে ঘাসগুলাে পড়ে রয়েছে-যাও।” অতএব পণ্ডদল চল ক্ষেতের ফসল তুলতে। সন্ধ্যেবেলা যখন তারা ক্ষেত থেকে ফিরল তখন দেখল এক ফোটা দুধও পড়ে নেই। রহস্যজনকভাবে সব দুধটুকু উধাও হয়েছে। (৩) পশুরা সবাই ঘাসের ফসল ক্ষেত থেকে তােলবার জন্য গলদঘর্ম পরিশ্রম করল। তবে মেহনতের প্রতিদানও পেল রীতিমত, এবারে ফসল খুব হ্যানিম্যাল ফার্ম ভালাে হয়েছে-ওরা যতটা আশা করেছিল তার চেয়েও বেশী পরিমাণ ফসল হয়েছে। কখনও কখনও ওদের কাজ করা খুব দুষ্কর হয়ে পড়ে। খামারের হাতিয়ার সবই হচ্ছে মানুষের কাজের উপযুক্ত, জন্তুজানােয়ারের জন্য নয়—যেসব যন্ত্রপাতি ব্যবহার করতে পিছনের পায়ের ওপর ভর করতে হয়, সবচেয়ে মুস্কিল বাধে সেই ধরনের হাতিয়ার নিয়ে। তবে শূয়ােরেরা জাতচালাক জীব, তারা ভেবে চিন্তে অবশেষে একটা কিছু সমাধান করে ফ্যালে। এমনি করেই ওরা প্রত্যেক ব্যাপারে মাথা খাটিয়ে কাজ হাসিল করে চলেছে। আর ঘােড়ারা ক্ষেতের কাজে খুব পটু, ওরা ফসল জড়াে করা, আঁটি বাঁধা এসব কাজ ওই জোন্সদের চেয়ে ঢের ভালােভাবেই করতে পারে। শূয়ােরেরা নিজে হাতে কাজ করে না বটে, তবে তারা সকলকে পরিচালনা করে, কাজের তদবির তদারক তারাই করে। আর তাদের ওই অসাধারণ বুদ্ধিবৃত্তির দরুন স্বভাবতই নেতৃত্ব তাদের হাতে এসে পড়বে এ ত জানা কথা। বক্সার আর ক্লোভার নিজে নিজেই লাগাম পরে, ঘােড়ার গাড়িতে নিজেদের জুতে নিয়ে প্রয়ােজনমত ক্ষেতময় ঘােরাফেরা করে (এখন আর তাদের নাকের বিদে কড়া লাগাতে হয় না। তাদের পিছনে একটি শূকর চলে, সে কেবল হুকুম করে—এগিয়ে চলল কমরেড কিম্বা বলে—“আচ্ছা এবার রুখে যাও কমরেড!'যখন যেমন দরকার। খড় তােলার কাজে ক্ষুদে জানােয়ারেরাও যথাসাধ্য সহায়তা করছে। এমন কি মুরগী হাঁসেরাও ওই নােদের মধ্যে ব্যন্তভাবে কাজ করছে, হয় ত ঠোঁটের ডগায় করে বয়ে নিয়ে চল একটুকরাে খড়। অবশেষে দেখা গেল যে জোসের আমলে যা সময় লাগত ওরা তার চেয়ে দু’দিন আগেই খড় তুলে শেষ করেছে; ক্ষেত হ্যানিম্যাল ফার্ম ২৭ পরিষ্কার। বলাবাহুল্য যে, এই খামারবাড়ির ইতিহাসে এত বেশি খড় এর আগে কোনােদিন কেউ চোখেই দ্যাখে নি। কোনােরকম অপচয়ও হয়নি কিনা, হাঁস-মুরগীরা তাদের কড়া নজর দিয়ে খুঁটে-খুটে প্রতিটি কুটো পর্যন্ত এনে জমা দিয়েছে। তা ছাড়া এবার চুরি করে কেউ একগালও খড় খায় নি। সারাটা গ্রীষ্মকাল খামারের কাজ চলল ঘড়ির কাঁটার মত। সবাই খুব খুশি। ওরা আদৌ ধারণা করতে পারে নি এত সুন্দর ওদের জীবন চলবে। প্রতিগ্রাস আহার্যের মধ্যেই প্রচুর আনন্দের খােরাক পাচ্ছে যেন-এ যে সত্যিসত্যিই নিজের খাবার, ওরা নিজেরা এই ফসল ফলিয়েছে, নিজেদের জন্যই সবকিছু। এ ত আর সেই হিংসুটে মনিবের হেলাভরে দু-মুঠো মুখের কাছে ফেলে দেওয়া ভিক্ষের দান নয়। সেই পরগাছার মত মানুষগুলাে দূর হয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই এদের প্রত্যেকের ভাগে প্রচুর খাবার জুটছে। আর বিশ্রামের অবসরও যথেষ্ট মিলছে—যদিও পশুরা এসব কাজে অনভিজ্ঞ তাতে কী এসে যায় ! অবিশ্যি এক-একটা ব্যাপারে বেশ মুস্কিল হয়, যেমন, শস্য মাড়াই-এর সময়ে একেবারে সেকেলে কায়দায় রীতিমত গা-দিয়ে মাড়িয়ে মাড়িয়ে তুষগুলাে আলগা করে ছাড়িয়ে ফেলতে হচ্ছে। তারপর ফু দিয়ে ভূষিগুলাে উড়িয়ে ফেলতে হচ্ছে। খামার বাড়িতে ত মাড়াইকল নেই, কী করা যাবে। তবে ভাবনাই বা কী, বক্সারের কর্মঠ পেশীর জোর থাকতে। তার কাজের বহর দেখে সবাই বাহবা দেয়, তারিফ করে। অবিশ্যি বক্সার বরাবরই খুব খাটিয়ে, জোসের আমলেও সে খুব মেহনত, করত কিন্তু এখন তাকে দেখলে মনে হয় যেন সে একাই তিনটে ঘােড়র কাজ করছে। এক একদিন এমন হয় যে গােটা খামারবাড়ির ২৮ য়্যানিম্যাল ফার্ম সব কাজই ওই বক্সারের সবল ঘাড়ের ওপর নির্ভর করে থাকে যেন। যেখানে যত কঠিন কাজ সেখানেই সে ছুটে গিয়ে ঘাড় পেতে দেয়। একটি মােরগকে বক্সার বলে রেখে দিয়েছে যে, আর সবাই ওঠবার অন্ততঃ আধ ঘণ্টা আগে যেন মােরগটি তার ঘুম ভাঙিয়ে দেয়। সকাল বেলায় দিনের কাজ শুরু হওয়ার আগে এই বাড়তি সময়টুকু বক্সার স্বেচ্ছায় খেটে দেয়। যেদিন যেটি সবচেয়ে জরুরী বলে সে মনে করে সেদিন সেই কাজেই এ মেহনত টুকু খরচ করে। যে কোন সমস্যার সম্মুখীন হ'লে সে আপন মনে বলে আমাকে আরও বেশি কাজ করতে হবে। এটা সে নিজের আদর্শ বলে মেনে নিয়েছে। আর সকলেও নিজের সাধ্যমত কাজ করছে। এই যে মুরগী আর হাঁসের। ঠোঁট দিয়ে খুটে খুটে এধার ওধারে ছিটোনাে শস্য সংগ্রহ করেছে তাও কম করে এক মণ সাড়ে সাত সের হবে। এগুলি আগে আগে নষ্টই হত। এখন আর কেউ চুরি করে না। খাদ্য বরাদ্দ নিয়ে কেউ গজ, গজ করে না। ঝগড়াঝাটি, হিংসাদ্বেষ, কামড়াকাড়ি এসব স্রেফ বন্ধ হয়ে গিয়েছে। অথচ আগে ত এ গুলাে ছিল প্রতিদিনের ঘটনা। কেউ কাজে ফাকি দেয় না–হ্যা, অবিশ্যি একমাত্র মলি ছাড়া আর কেউ কাজ এড়াবার চেষ্টা করে না। একে ওর সকালে উঠতে দেরী হয়, আবার রােজই তাড়াতাড়ি মাঠ থেকে সরে পড়ে একটা ছুতাে করে -প্রায়ই বলে যে খুরের মধ্যে পাথর ঢুকে গেছে, যন্ত্রণা হচ্ছে। আর ওই বেড়ালটার আচরণ কিছু বিচিত্র। কাজের সময় কোথাও তাকে খুঁজে পাওয়া যায় না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা সে উধাও হয়ে থাকে, আবার ঠিক খাওয়ার সময়টিতে হাজির হয়, কিম্বা দিনের কাজ চুকে গেলে সন্ধ্যের সময় গুটি-গুটি সে ফিরে আসে, যেন কিছুই হয় নি ম্যানিম্যাল ফার্ম এমন একটা সপ্রতিভ ভাব তার চোখে মুখে। আর মজা হচ্ছে এই যে, সে এ্যাইসা সব লাগসই অজুহাত দেখায়, আর এমন মিষ্টিভাবে ঘৰু-ঘর করে ঘুরঘুর করে যে ওর সদিচ্ছা সম্বন্ধে মােটেই সন্দেহ করতে পারে না কেউ। একমাত্র বুড়াে বেঞ্জামিনের কোনাে পরিবর্তন হয় নি। বিপ্লবের কোনাে প্রভাব তার ওপর পড়েছে এমন কথা কেউ বলতে পারবে না। আগে জোনসের আমলে যেমন মন্থর এবং অবাধ্য ছিল এখনও ঠিক তেমনিই রয়ে গিয়েছে সে। বেঞ্জামিন নিজের হিস্যে মত কাজ করে যায়, না ফাকি দেয়, না স্বেচ্ছায় বেশি কাজ করে। বিপ্লবের ব্যাপারে সে কোনাে অভিমত প্রকাশ করতে নারাজ। যদি কেউ প্রশ্ন করে, “আচ্ছা জোন্স চলে যাওয়াতে তুমি কি খুশি নও? তার জবাবে শুধু এই কথা বলে—“গাধা অনেক দিন বাঁচে। তােমাদের মধ্যে কেউ কোনাে দিন গাধাকে মরতে দ্যাখােনি। তার এই রহস্যময় জবাবেই খুশি থাকতে হয়, কারণ এর বেশি একটি কথাও বেঞ্জামিন বলবে না। রবিবার কোনাে কাজ থাকে না। অন্যদিনের চেয়ে দেরীতে প্রাতরাশ হয় সেদিন। এরপর প্রতি সপ্তাহে নিয়মিত একটা উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। প্রথমে পতাকা উত্তোলন পর্ব। জোগিন্নীর ঘর থেকে মােবল একখানা সবুজ টেবিল-ক্লথ সংগ্রহ করে এনে তার ওপর শাদা রং দিয়ে একটা খুব আর একটি শিং একে নিশান বানিয়েছে। প্রতি রবিবার কৃষিভবনের উদ্যানে এই পতাকা উত্তোলন করা হয়। সে বলে যে, সবুজ রং হচ্ছে ইংলণ্ডের সবুজ শস্যেভরা জমির প্রতীক চিহ্ন। মানবজাতি যেদিন সম্পূর্ণ পরাভূত হবে এবং তার ফলে ভবিষ্যতে যে পশু-গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা হবে তারই প্রতীক হচ্ছে শিং আর খুর। পতাকা উত্তোলনের পর সমগ্র পণ্ডদল বড় গােলাবাড়ির সামনে জমায়েৎ হয়—এই মিলনকে বলা হয় হ্যানিম্যাল ফার্ম সভা। এখানে আগামী সপ্তাহের কাজের ফিরিস্তি তৈরী হয়। সভার সামনে প্রস্তাব উপস্থাপিত করা হয়, তা নিয়ে তর্ক-বিতর্ক চলে। একমাত্র শূকরেরাই যা কিছু প্রস্তাবপত্র পেশ করে, বাকী সবাই কেবল জানে যে, কেমন করে ‘ভােট’ দিতে হয়। তারা নিজের মন থেকে কোনাে প্রস্তাব বা আলােচনার বিষয় বাৎলাতে পারে না। বিতর্কসভায় সবচেয়ে জবরদস্ত তার্কিক হচ্ছে মােবল আর নেপােলিয়ন। আর একটা জিনিস লক্ষ্য করবার আছে যে, তারা দুজনে কখনও কোনাে ব্যাপারে একমত হয় না। এটা ধরে নেওয়া যেতে পারে যে মােবল কোনাে কিছু প্রস্তাব করলেই নেপােলিয়ন তার প্রতিবাদ করবে। একবার হ’ল কি, অবসরপ্রাপ্ত পশুদের চারণভূমি হিসেবে আস্তাবলের পিছনের খানিকটা জমি আলাদা করে রাখা হবে, কি হবে না, এই ব্যাপারটা 'সর্বসম্মতিক্রমে মীমাংসা হয়ে গেল। একবার কোনাে বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়ে গেলে পর আর সে সম্বন্ধে কেউ কোন কথা বলতে পারে না তাই তর্কটা অন্য খাতে ওদের মধ্যে তখন তুমুল তর্ক বেধে গেল কোন্ কোন্ পশু কি বয়সে কাজ থেকে অবসর গ্রহণ করবে, তাই নিয়ে। মােদ্দা তর্কটা চল। চাই-ই। সভা শেষ হয় ইংলণ্ডের পশুগণ’ গানটি গীত হবার পর। এই নিয়মই বরাবর চলে আসছে। রবিবারের বিকেলটা স্রেফ আমােদ- প্রমােদের জন্য ছুটি থাকে। লাগামঘরখানা শূকরদের সদরমােকাম হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে ইদানীং। ' এখানে তারা প্রত্যহ সন্ধ্যেবেলা ছুতাের, কামারের কাজ শেখে বা অন্যান্য প্রয়ােজনীয় কাজ শেখে বই পড়ে পড়ে। এসব বই ওরা বার করে এনেছে বসতবাড়ির মধ্যে থেকে। মােবল আবার এর ওপর পশুসমিতি য়্যানিম্যাল ফার্ম গঠনের কাজে উঠে পড়ে লেগে গেল। এসব ব্যাপারে তার অদম্য উৎসাহ। মুরগীদের জন্য সে বানালাে ‘ডিম উৎপাদন কমিটি’, গরুদের বেলাতে তৈরী করল ‘লেজ পরিষ্কার কমিটি’, ইদুর খরগােশদের হিতার্থে সে স্থাপন করল ‘বন্যবন্ধু পুনঃশিক্ষাপ্যৎ, ভেড়াদের জন্য শুরু করল ‘শুভ্রতর পশম আন্দোলন। এছাড়া আরও বিবিধ প্রকারের সমিতি-টমিতি গড়ল পােবল, তার ওপর লেখাপড়া শেখানাের ব্যাপার ত রয়েছেই। অবশ্য শেষ পর্যন্ত দেখা গেল যে এগুলাে সবই অঙ্কুরে বিনষ্ট হয়েছে। বিশেষ করে ইদুরদের সুশিক্ষার ব্যাপারটা আদৌ কার্যকরী হয় নি, তারা পূর্ববৎ অনিষ্টকর কাজেই ব্যাপৃত রইল। সুবিধা পেলে পশুদের উদারতাটুকুর পুরাে সদ্ব্যবহার করতে ছাড়েনা—এইটুকুই শুদের উপরি লাভ। বিড়ালটি পুনঃশিক্ষাপতে কিছুদিন খুব নিয়মিত হাজিরা দিতে শুরু সে যেন সক্রিয় অংশ গ্রহণে বিশেষ তৎপর। একদিন শােনা গেল যে বিড়ালটি নাগালের বাইরের একটি চড়াই পাখীর সঙ্গে খুব গল্প করছে। গল্প আর কিছুই নয়, সে বলছে,—“অত দূরে কেন বসে রয়েছ ? এখন ত আমরা সবাই কমরেড। এখন যে কোনাে চড়ুই আমার হাতের ওপর বসলেও কিছু এসে যায় না। তবুও চড়াইটি দূরত্ব বজায় রেখে ছাদের ওপরই বসে রইল। একমাত্র পড়া-লেখার কাজটা খুব সফল প্রমাণ হয়েছে। শরৎকাল যখন এল তখন খামারবাড়ির সব জন্তু কিছু পরিমাণে শিক্ষিত হয়েছে একথা মানতেই হয় । শূকরেরা পুরােদস্তুর লেখাপড়া শিখে ফেলেছে আগেভাগেই। কুকুরেরাও বেশ ভালােই পড়তে পারে, তবে তারা ওই সপ্তঅজ্ঞা ছাড়া রু করল।

য়্যানিম্যাল ফার্ম আর কোন কিছু পড়তে বস পায় না। ছাগল মুরিয়েলটা কুকুরদের চেয়ে কিছু বেশি বিদ্বান হয়েছে, সে মাঝে সাঝে জঞ্জালের গাদা থেকে খবরের কাগজের টুকরাে যােগাড় করে এনে অন্যান্য পশুদের কাছে পড়ে শােনায়। বুড়াে বেঞ্জামিন শুয়ােরদের চেয়ে লেখাপড়ায় কম যায় না, তবে এসব ব্যাপারে মগজ খরচে অনিচ্ছুক। তার মত হচ্ছে এই যে, পড়বার মত কিছুই নেই। ক্লোভার বর্ণমালা আয়ত্ত করেছে, কিন্তু পর পর অক্ষর চিনে কথা পড়তে পারে না মােটেই। আর বক্সার প্রথম চারটি অক্ষর পেরিয়ে পঞ্চমে পৌছতে পারে নি। মাটির ওপর A, B, G, D লিখে ফ্যালে ধূলাের ওপর, তার চওড়া থাবা দিয়ে। সেদিকে তাকিয়ে অনেক কসরৎ করে, পরবর্তী বর্ণগুলাে স্মরণপথে আনবার জন্য। কিন্তু সেটি হবার উপায় নেই। যদি E, F, G, H শেখে তাহলে আবার প্রথমের চারটি বর্ণ হারিয়ে যায়—এরকম দু-একবার হয়েছে। শেষকালে ও ঠিক করল গােড়ার চারটে অক্ষরই ভালাে। বােজ সে দু-চারবার এই আদি বর্ণ ক’টি লিখত-স্মরণশক্তিটায় শান দেবার জন্য। মলি হতভাগী শিখল সেই ছ’টি অক্ষর যে ক’টি ওর নাম লিখতে দরকার। এর বাইরে আর কিছু ও শিখতে নারাজ। এ ছাড়া বাকীসব জানােয়ার ওই আদি অক্ষর ‘A’কে ডিঙিয়ে ওপারে যেতে পারে নি। আরও দেখা গেল যে, অপেক্ষাকৃত নির্বোধ জন্তু যেমন ভেড়া, হাঁস, মুরগী এরা ওই সপ্তঅনুজ্ঞাটুকুও মুখস্থ করতে পারে নি। বিস্তর চিন্তার পর খােবল ঘােষণা করল যে সপ্তঅনুজ্ঞাকে এক সরল সংক্ষিপ্ত সারমন্ত্রের মধ্যে আনা যায়, সে মন্ত্রটি এই-চার পা ভালাে দু-পা খারাপ। এতে পশুবাদের মূল তত্ত্বটি নিহিত রয়েছে। এই যানিম্যাল ফার্ম পরম কথাটি যে প্রাণী অনুধাবন করবে সে-ই মানুষের অপপ্রভাবের হাত থেকে রক্ষা পাবে। প্রথমে পাখীরা আপত্তি তুলেছিল এই বলে যে, তাদেরও ত দু’টো- পানতুন মন্ত্রে দু-পাকে খারাপ বলে পাখীদেরও অসম্মান করা হয়েছে। মােবল তখন ব্যাপারটা বুঝিয়ে দিল—তা কি করে হয় ? তােমাদের দু-দুটো পাখা নেই? পাখা দিয়ে হাওয়া কেটে এগিয়ে যেতে পারাে, মানুষের হাতের মত মতলববাজী ত পাখার কাজ নয়। অতএব পাখা আর পা-তে কোনােই ফারাক নেই। যে মন্ত্র দিয়ে মানুষ তার যাবতীয় শয়তানী হাসিল করে সেই ‘হাত-ই হচ্ছে তার প্রতীক চিহ্ন। পাখীরা গােবলের এই দীর্ঘ বক্তৃতার মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝল না, তবে ওরা গােবলের এই ব্যাখ্যা মেনে নিল। তারপর থেকে যত ইতরবুদ্ধি প্রাণী নতুন অনুজ্ঞা মুখস্থ করতে লাগল। গােলাবাড়ির দেওয়ালপ্রান্তে সপ্তঅনুজ্ঞার মাথার ওপরে আরও বড় বড় হরপে লেখা হয়ে গেল—চার- পা ভালাে, দু-পা খারাপ। একবার যখন কথা ক’টা মুখস্থ হয়ে গেল তখন থেকে ভেড়ার পাল এই নতুন মন্ত্রটির ভক্ত হয়ে পড়ল। মাঠে বসে থাকতে থাকতে অতর্কিতে তারা যখন তখন চীৎকার করে ওঠে-চার পা ভালাে, দু-পা খারাপ। আর একবার এই উদাত্তকণ্ঠে মন্ত্রপাঠ শুরু হলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা একভাবে চত—ওরা ক্লান্ত হয়ে থেমে যাবে এমন কোনাে লক্ষণ পাওয়া যেত না। মােবলের সমিতি-কমিটির কারবারে নেপােলিয়নের বিন্দুমাত্র আস্থা নেই। সে বলে যে ছােটদের শিক্ষাদীক্ষাটা অনেক বেশী দরকারী, যদি কিছু করতেই হয় ত তাদের জন্যেই করা উচিত—আর আগেই যারা বড় হয়ে গিয়েছে তাদের কিছু হবে না। * ৩৪ য়্যানিম্যাল ফার্ম খড়ের ফসল ঘরে ওঠবার পর-পরই জেসি আর রুবেল দু'জনে মিলে ন’টি নধর বাচ্ছা প্রসব করল। তারা মাই-এর দুধ ছাড়বামাত্র নেপােলিয়ন তাদের মায়ের কাছ থেকে নিয়ে চলে গেল, বলে যে, এদের শিক্ষাদীক্ষার দায়িত্ব সে নিজেই গ্রহণ করছে। ওদের নিয়ে গিয়ে নেপােলিয়ন উচু এক টং-এ রেখে দিল। লাগামঘরের ওপরে মইতে চ’ড়ে তবে সে ঘরে যাওয়া যায়। একেবারে সকলের লক্ষ্যের বাইরে নেপােলিয়ন এই কুকুর-বাচ্ছাদের রাখল। তার ফলে কিছুদিনের মধ্যে কৃষিভবনের সকলে ওদের ভুলেই গেল। বােজ-রােজ গরুর দুধগুলাে কোথায় উবে যায় সে রহস্যও টের পেতে বেশি দেরি হয় না। জানা গেল যে, শূয়ােরদের খাবারের সঙ্গে দুধ মাখানাে হয় প্রত্যহ নিয়মিতভাবে। ওদিকে আবার হালী আপেল পাকতে শুরু হয়ে গেছে-বাগানের ঘাসের ওপর ঝড়াে হাওয়াতে অজস্ৰ আপেল পড়ে মাটি ছেয়ে যায়। পশুরা মনে মনে ধরে নিয়েছিল যে, সকলে সমানভাবে এই আপেলের ভাগ পাবে, কিন্তু একদিন হুকুম এল যে, ঝরে পড়া সব আপেল লাগাম-ঘরে পৌছে দিতে হবে। ওগুলাে কেবলমাত্র শূকরেরা ব্যবহার করবে। এতে কোনাে কোনাে জানােয়ার ক্ষীণ প্রতিবাদ জানায়, কিন্তু তাতে কোনাে ফলােদয় হয় নি কারণ, দেখা গেল যে—এ বিষয়ে শূকরেরা সকলেই একমত, এমন কি নােবল এবং নেপােলিয়নের মধ্যেও মতানৈক্য ঘটল না। সর্বসাধারণের কাছে ব্যাপারটা পরিষ্কার করে ব্যাখ্যার জন্য স্কুইলারকে পাঠানাে হল। সে চীৎকার করে নিবেদন করল—কমরেগণ! আমি আশাকরি যে, তােমরা একথা মনে করাে না যে, আমরা, শুকরেরা শুধু স্বার্থপরতার য়্যানিম্যাল ফার্ম বশবর্তী হয়ে, বা আমাদের বিশেষ অবস্থার সুযােগ নিয়ে এই আপেলগুলাে আত্মসাৎ করছি। সত্যি কথা বলতে কি, আমাদের, মানে শূকদের মধ্যে অনেকেই আপেল বা দুধ কিম্বা দুটোই বরদাস্ত করতে পারে না। আমি নিজে ত একেবারেই পছন্দ করি না এ দুটো বস্তু। কিন্তু তবু নিরুপায় হয়েই আমরা এসব ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছি। আমাদের ধ্রুব লক্ষ্য স্বাস্থ্যটা বজায় রাখা। বিজ্ঞানের চর্চাতে এটা প্রমাণিত হয়েছে যে, আপেল আর দুধ এ দুটোই শূকরদের স্বাস্থ্য সতেজ রাখার পক্ষে অপরিহার্য, বুঝলে করেগণ! আসলে শূকরেরা কী—তারা মগজের কাজ করে, বুদ্ধিজীবী তারা। একথা তােমরা অবশ্যই জানাে যে, এই খামারবাড়ির তাবৎ ব্যবস্থা-বন্দোবস্ত এবং পরিচালনার যােল আনা ঝক্কি আমাদের ঘাড়ের ওপর পড়েছে। কিবা দিন, কিবা রাত্রি, আমরা সর্বক্ষণ তােমাদের সুখসুবিধার দিকে দস্তুরমত নজর রাখছি। কাজেই তােমাদের কল্যাণের দিকে লক্ষ্য রাখবার জন্যই আমরা আপেল আর দুধ খেতে বাধ্য হচ্ছি। ‘আজ যদি আমরা শূকরের। ঠিক-ঠিক সবদিক সামলে চলতে না পারি, তাহলে কি ঘটবে তা তােমরা কেউ ভেবে দেখেছ? জোন্স ফিরে আসবে? হ্যা, জোস্ নিশ্চয়ই ফিরে আসবে। এখন কথা হচ্ছে যে, তােমরা কেউ নিশ্চয় চাওনা যে জো ফিরে আসুক! বল্‌তে বলতে স্কুইলার বেঁটে মােটা দেহটা এপাশ-ওপাশে দোলায় আর লেজের ঝাপট মারে-তােমাদের মধ্যে নিশ্চয় এমন কেউ নেই যে জোন্সকে এখানে ফিরে পেতে চাও। আর যাই হােক, পশুরা কেউই আর জোনসের ফিরে আসাটা যে চায় না, এ বিষয়ে কোনাে সন্দেহই নেই। যখন স্কুইলার ব্যাপারটা হ্যানিম্যাল ফার্ম এইভাবে বুঝিয়ে দিল তখন সবাই চুপ—আর কিছু বলবার নেই কারুর। সত্যিই ত, শূকদের স্বাস্থ্য অটুট রাখাটা খুব দরকার। অতএব বিনা প্রতিবাদে এই প্রস্তাব গৃহীত হ’ল যে বাতাসে ঝরে পড়া আপেল ( এবং নাবী আপেল যখন পাকবে তখন সেগুলােও) আর দুধ সবটাই শূকরদের জন্য আলাদা বন্দোবস্ত থাকবে। ( ৪ ) গ্রীষ্মের শেষের দিকে পশু কৃষিভবনের’ খবর দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ল। প্রতিদিন নেপােলিয়ন আর মােবল ঝাঁকে ঝাঁকে পায়রা উড়িয়ে দিত, পায়রাদের কাজ হচ্ছে আশপাশের ক্ষেতখামারে গিয়ে সেখানকার জজানােয়ারদের সঙ্গে মেলামেশা করা, আর তাদের কাছে বিপ্লবের বিবরণ জানান, আর সুবিধে পেলে ‘ইংলণ্ডের পশুরা’ গান খানা অবিকৃত সুরে শিখিয়ে দেওয়া। এইভাবে পশুরা যখন বিপুল উৎসাহভরে নিজেদের কাজে মন ঢেলে দিয়েছে, তখন শ্ৰীযুক্ত জোনস কি করছেন? উইলিংডন শহরের ‘রেডলায়ন’এর পানশালাতে বুদ হয়ে বসে আছেন। আর কাউকে দেখলেই পশুদের অমানুষিক অত্যাচারের কাহিনী সবিস্তারে বলতে শুরু করছেন। এ যে ঘােতর অবিচারকয়েকটা অপােগও জানােয়ারে মিলে তাকে মেরে ধরে তাড়িয়ে দিয়ে কি না তাঁর যাবতীয় ভূসম্পত্তি বেমালুম দখল করে বসল! আর সব চাষী জোতদারেরা নীতিগতভাবে যথেষ্ট সমবেদনা প্রকাশ করে কিন্তু আসল ব্যাপারে কেউ সাহায্য করতে চায় না। মনে মনে বরং সবাই মতলৰ ভঁজে, কি করে জোসের এই দুর্দশার সুযােগে নিজের ম্যানিম্যাল ফার্ম আখের গুছিয়ে নেওয়া যায়। এই লােকটির জমিজমাগুলাে হাতিয়ে নেওয়ার ইচ্ছেটাই প্রত্যেকের মনের অভিলাষ। জোনসের প্রতিবেশী দু’টো খামারের মালিকের মধ্যেও চিরকালের ঝগড়া আছে তাই বাঁচোয়া। জোসের খামারের একদিকে হচ্ছে ‘ফক্সউড’, সেকেলে ধরনের বিরাট জোতজমা, কিন্তু অযত্নের দরুন এর কোনাে ছাদ নেই। ফক্সউডের মালিক পিকিংটন সাহেব আরাম- প্রিয় মানুষ। সে কেবল শিকার করে আর মাছ ধরেই দিন কাটায়। ওদিকে যে জমিতে আগাছা জন্মাচ্ছে, বেড়াগুলাে ভেঙেচুরে যাচ্ছে সেদিকে তার মােটেই নজর নেই। আর একদিকে হচ্ছে ‘পিঞ্চফিল্ড খামার। পিঞ্চফিল্ডের কর্তা ফ্রেডরিক সাহেব হুশিয়ার, শক্ত মানুষ। তার ছােট্ট খামারখানিতে খুব ভালো চাষ-আবাদ হয়। মামলাবাজ খলিফা বলে ফ্রেডরিকের দুর্ণাম আছে। পিকিংটন আর ফ্রেডরিকের মধ্যে বিবােধ এতই বেশি যে নিজেদের স্বার্থের খাতিরেও ওরা হাতে হাত মেলাতে নারাজ। সে যাই হােক, ওরা দু’জনেই ‘পশুভবনের’ বিপ্লবে খুব ভয় পেয়ে গেছে। ওদের এখন কড়া নজর খামারের জন্তুজানােয়ারদের ওপর। যাতে ওই খামারের খবরাখবর নিজেদের ঘরের পশুরা বিশেষ না পায় সেই চেষ্টা করছে ওরা। প্রথম প্রথম তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে হেসে উড়িয়ে দেবার ভান করত-বলত, “হ্যাঃ, জানােয়ারেরা আবার খামার চালাবে। তাহলে আর ভাবনা ছিল না! দাড়াও না দু-সপ্তাহ যেতে দাও, দেখবে সব ওলট-পালট হয়ে যাবে। ওরা বলে বেড়ায় যে ‘ম্যানর ফার্মের পশুরা (এখনও ওরা ওটিকে ম্যান ফার্মই বলে, ম্যানিম্যাল ফার্ম আদৌ বরদাস্ত করতে চায় না) হরদম নিজেদের ফ্ল্যানিম্যাল ফার্ম মধ্যে খেয়ােখেয়ি’ শুরু করে দিয়েছে। আর দু’চার দিনের মধ্যেই শুকিয়ে মরবে ওরা। এমনি করে বেশ কিছুদিন কেটে গেল, কিন্তু দেখা গেল যে বিপ্লবী খামারের পশুরা অনাহারে মরল না। এবারে ফ্রেডরিক আর পিকিংটন সুর পাল্টে বলতে শুরু করল যে পশুদের কৃষিভবনে ভয়াবহ কাণ্ডকারখানা চলছে। ওখানকার জানােয়ারদের মধ্যে যারা প্রবল তারা দুর্বলদের ওপর নৃশংস অত্যাচার চালিয়েছে, এমনও দেখা গেছে যে ছােট-ছােট। নিরীহ প্রাণীদের বড়রা গিলে খাচ্ছে, সবাই মিলে স্ত্রীজাতির সঙ্গে যথেচ্ছভাবে যৌনক্রিয়ায় লিপ্ত হচ্ছে, সামান্য কারণেই ঘােড়ার নাল আগুনে তাতিয়ে পরস্পরকে ছ্যাকা দিয়ে হিংস্রতা চরিতার্থ করছে। প্রকৃতির নিয়মকে সজঘন করতে গেলে তার ফল এছাড়া আর কী হবে! ক্রেডরিক আর পিকিংটন এইসব কথা রটিয়ে দিল। তবুও এসব গল্প সকলে সবটুকু বিশ্বাস করে না। চারিদিকে রাষ্ট্র হয়ে গেছে, তাজ্জব একটা খামার বাড়ি আছে, সেখানকার জানােয়াররা মানুষকে ভাগিয়ে দিয়েছে, জানােয়ারেরা সেখানকার সবকিছু কাজ নিজেরাই চালাচ্ছে। সত্যমিথ্যায় মিলে বিচিত্র খবরটা দেশময় ছড়িয়ে পড়ল। আর তার ফলে গ্রামাঞ্চলে বিদ্রোহের ঢেউ বয়ে গেল সারাবছর ধরে। এতকাল ধরে যেসব বলদেরা পােব মেনে এসেছে তারা সব হঠাৎ ক্ষেপে গিয়ে বন্যের মত আচরণ শুরু করে দিল। ভেড়ার দল বেড়াভেঙে ক্লোভার ঘাস মুড়িয়ে খেতে লাগল। গরুর দুধের বালতিতে পায়ের তাে মেরে : উল্টে দিতে লাগলাে না। ঘোড়ার পিঠ থেকে সওয়াকে স্বচ্ছন্দে উল্টে ফেলে দিচ্ছে, আর সবচেয়ে তাজব ব্যাপার হয়েছে-‘ইংলণ্ডের পশুরা গানটির সুর, বাণী অভাবনীয় ফ্যানিম্যাল ফার্ম গতিতে চারিদিকের পশুসমাজে ছড়িয়ে পড়েছে। এই গানখানা কানে গেলে মানুষেরা রাগ চেপে রাখতে পারে না, যতই তারা এটাকে ঠাট্টা তামাসা করুক না কেন। মানুষেরা বলে, পশুরা যে এত নির্বোধ তা কে জান্ত! নইলে অমন ওঁছা গান কেউ গায়। যারা এ গান গায় বুঝতে হবে যে তাদের ঘটে এতটুকু পশুবুন্ধিও নেই। এ গান কোনাে পশুকে গাইতে দেখলে মানুষেরা তৎক্ষণাৎ তাকে আচ্ছাসে ঠ্যাঙানী দেয়। তবুও এই সঙ্গীতের প্রচারকে দাবিয়ে রাখা যাচ্ছে না। ব্ল্যাকবার্ডের ঝােপে-ঝাড়ে এই গান গায়, উচু গাছে বসে পায়রারা গাইছে এই গান, কামারের হাতুড়ির ঘায়ে এই সুর বাজে, গির্জার ঘণ্টায় এই সুর ধ্বনিত হয়ে ওঠে--আর মানুষের বুক কেঁপে ওঠে ভয়ে। তাদের ভবিষ্যৎদশার দৈববাণী শুনে শিউরে ওঠে মানুষ। অক্টোবরের গােড়ার দিকে, শস্য কেটে গাদা করে রাখা হয়েছে- কিছু কিছু মাড়াইও চুকেছে। এক ঝাঁক পায়রা পশুদের খামারে উড়ে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে খবর দিল, জোন্স আসছে। তার সঙ্গে ফক্সউড আর পিঞ্চফিল্ডের জনা ছয়ত লােক জুটেছে, আর তার কর্মচারীরা ত স্বয়েছেই। ওরা পাঁচগাদের ফটক দিয়ে ঢুকে পড়েছে, গাড়িচলার পথ ধরে অনেকদূর এগিয়ে এসেছে। মানুষগুলাের হাতে লাঠি আছে, কেবল জোসের হাতে বন্দুক। সকলের আগে আগে জোন্স আসছে বন্দুক নিয়ে বলাবাহুল্য যে ওরা খামারবাড়ি আবার দখল করবার মতলবেই আসছে।

৪ হ্যানিম্যাল ফার্ম এ ধরনের একটা কিছু যে হতে পারে তা অনেকদিন আগেই অনুমান করে পশুরা তােড়জোড় করে তৈরী হয়ে বসেছিল। মােবল করেছিল কি বসতবাড়ি থেকে জুলিয়স সিজারের অভিযান সম্পর্কে লেখা একখানি বই এনে অভিনিবেশ সহকারে পড়েছিল। কাজেই আজকের এই আত্মরক্ষামূলক সংগ্রামে সে অধিনায়কত্ব গ্রহণ করল। অত্যন্ত দ্রুত সে তার হুকুম জারি করল, মিনিট দুয়ের মধ্যে পশুরা যে যার নির্দিষ্ট জায়গায় মােতায়েন হয়ে গেল। মানুষরা খামারবাড়ির অভিমুখে অগ্রসর হচ্ছে দেখে স্নােবল প্রথম আক্রমণ শুরু করল। সবগুলাে পায়রা এদিক-ওদিক উড়ে উড়ে মানুষের মাথার ওপর বিষ্ঠাত্যাগ করতে লাগল—ওরা সংখ্যায় অন্ততঃ পঁয়ত্রিশ জন হবে। মানুষগুলাে যখন মাথা পরিষ্কার করতে ব্যস্ত তখন ঝােপের আড়াল থেকে রাজহাঁসের বেরিয়ে পড়ে (এতক্ষণ ওরা ঝােপের মধ্যে আত্মগােপন করে বসেছিল) মানুষের পায়ে সজোরে ঠোঁটের ঠোকর মারতে শুরু করল। অবিশ্যি এ হচ্ছে প্রাথমিক ব্যবস্থা কেবলমাত্র মানুষদের মধ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির জন্য এই ফন্দী। লাঠির ঘায়ে রাজহাসেদের খেদিয়ে দিল মানুষরা। এবার মােবলের দ্বিতীয় পর্যায়ের আক্রমণ। মুরিয়েল, বেঞ্জামিন আর তার সঙ্গে ভেড়ার পাল নিয়ে গােবল বীরবিক্রমে সামনে এগিয়ে চল। তারপর চারদিক থেকে গুতাে মারতে লাগল মানুষগুলােকে—আর বেঞ্জামিন ঘুরে ফিরে লাথি ছুড়ে চলল। কিন্তু এবারও মানুষেরা লাঠির ঘায়ে, নাললাগানন জুতাের ঠোকরে ওদের বেকায়দা করে তােলে। এমন সময়ে মােবল সাঙ্কেতিক চীৎকার করতেই জানােয়ারেয়া সরাসরি খামারবাড়ির খােলা দরজা দিয়ে ভেতরে পশ্চাদপসরণ করে চলে গেল।

ফ্ল্যানিম্যাল ফার্ম ৪১ মানুষেরা জয়ােল্লাস করে উঠল। ওরা মনে করল জানােখারেরা বুঝি পালাচ্ছে। আর সেই ভেবে এলােমেলােভাবে পদের তাড়া করে চল। মােবল ঠিক এইটাই মােবল ঠিক এইটাই চেয়েছিল। যে মুহূর্তে ‘মানুষগুলাে দুদ্দাড়িয়ে ভেতরের আঙিনায় ঢুকল তথনই তিনটে ঘােড়, গরু তিনটি এবং বাদবাকী সব শূয়ােরেরা কোথা থেকে এসে জুটে পড়ে মানুষদের বিচ্ছিন্ন করে দিল। এতক্ষণ এরা সব গােয়াল ঘরে লুকিয়ে অপেক্ষা করছিল। এবারে স্নােবল আক্রমণের সঙ্কেত করতেই যে যার কাজে লেগে গেল। গােবা নিজে ধেয়ে চল্প জোনসের দিকে। তাকে দেখেই জোন্স বন্দুক উচিয়ে গুলী চুড়ল। গােবলের পিঠ দিয়ে রক্ত ঝরতে লাগল, আর একটি ভেড়া নিহত হয়ে মাটিতে পড়ে গেল। কিন্তু মােবল তাতে পযােয়া করল না, সে তার আড়াইমণী দেহের ওজন সংহত করে জোনসের পায়ে প্রচণ্ড ধাক্কা মারল। সেই ধাক্কাতে জোন গােবর গাদায় ছিটকে পড়ল আর বন্দুকও হাত থেকে খসে পড়ল। কিন্তু তার চেয়েও মারাত্মক আক্রমণ বক্সারের, পিছনের দু-পায়ে ভর দিয়ে বক্সার সােজা হয়ে দাড়িয়ে ও সামনের নালােগানাে ভারী পায়ে এমন চাই ছুড়তে লাগল যে পয়লা চাটেই ফক্সউডের সহিস ছােকরা কাদার মধ্যে মুখ গুজে পড়ল! নির্ঘাৎ ব্যাটা অক্কা পেয়েছে। এই কাণ্ড দেখে কয়েকটা লােক হাতের লাঠি ফেলে দিয়ে পালাবার পথ খুঁজতে লাগল। ভয়ে তাদের মুখ শুকিয়ে গেছে। জানােয়াররা সবাই মিলে মানুষগুলােকে আঙিনার চারদিকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে। তাদের লাথি মারছে, গুতােচ্ছ, মাড়িয়ে দিচ্ছে। খামারবাড়ির সব বাসিন্দা এসে জুটেছে। যে যার নিজের কায়দামাফিক লড়াই করছে। প্রতিহিংসা। হঠাৎ ছাদ থেকে বেড়ালটা লাফিয়ে পড়ে ওদের রাখালটার ঘাড়ে জোরসে আঁচড়াতে ৪২ যানিম্যাল ফার্ম লাগল, লােকটা ঘাবড়ে গিয়ে পরিত্রাহি ডাক ছাড়ল।•••এক ফাকে পালাবার পথ পরিষ্কার পেয়ে লােকগুলাে ছুটতে শুরু করল। সােজাজি বড় শড়কের দিকে ছুটল তারা। যে পথ দিয়ে পাঁচ মিনিট আগে মানুষ এসেছিল জবরদখলের মতলবে, এখন সেই পথ ধরেই পরাজয়ের কলঙ্ক মেখে পালিয়ে বাঁচল। ওদের পিছু পিছু হাঁসেরা টিটকারি দিতে দিতে চলেছে, ঠোকর মারছে-হেনস্থার শেষ নেই। সব ব্যাটা মানুষ পালিয়েছে, কেবল একজন আর ফিরতে পারল না। বক্সার অনেক চেষ্টা করছে সহিস ছােকরাকে তােলবার, কিন্তু সে একদম নড়ছে না। দুঃখিত বক্সার দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বলে—‘বেচারী মরে গেছে। কিন্তু আমি সত্যিই ওকে মেরে কেতে চাই নি। আমার পায়ে যে লােহার জুতাে আছে সে কথা একদম মনে ছিল না। কিন্তু এখন কি কেউ বিশ্বাস করবে যে, আমি ইচ্ছে করে ওকে মেরে ফেলি নি। মোবল গর্জে উঠল-“ওসব আবেগ উচ্ছ্বাস রাখ কমরেড়। এখনও তার পিঠের ক্ষতস্থান থেকে রক্ত ঝরছে—“যুদ্ধ যুদ্ধই। সব মানুষের মধ্যে মরা মানুষই একমাত্র ভাল । ‘আমি হত্যা চাই না। মানুষের জীবনও হরণ করতে আমার মন সরে না। বন্দুতে বলতে বক্সারের দুচোখে অশ্রু ভরে গেল। কে যেন হেঁকে বলে—মলি কোথায় ? সত্যিই মলি নিখোঁজ হয়েছে। সবাই আশঙ্কা করছে যে মানুষেরা নিশ্চয় তাকে জখম করেছে, কিম্বা নিয়ে পালিয়ে গিয়ে থাকতে পারে। অবশ্য, অনেক খোঁজাখুজির পর দেখা গেল যে, মলি তার আস্তাবলে গামলাতে মাখা জানার মধ্যে মুখ লুকিয়ে বসে রয়েছে। বন্দুকের ফ্ল্যানিম্যাল ফার্ম ৪৩ আওয়াজ পেয়েই ও নাকি পালিয়ে এসেছিল। এদিকে মলিকে খুঁজে বার করে ফিরে এসে ওরা দেখল যে মরা সহিসটা পালিয়েছে। তাহলে সে মরে নি, ভয়ে সিটিয়ে পড়ে ছিল। এবার ওরা জমায়েৎ হয়ে হৈ-হল্লা লাগিয়ে দিল। যে যার আপন- আপন বীরত্বের বিবরণ জোর গলায় জাহির করতে ব্যস্ত। তখনকার মত বিজয়ােৎসবের একটা আয়ােজন হ’ল। পতাকা উড়িয়ে বার কয়েক ‘ইংলণ্ডের পশুৱা গীত হল। তারপর যুদ্ধে নিহত ভেড়াটিকে সমাধিস্থ করা হ’ল সসম্মানে। তার কবরের ওপর একটি গােলাপী কাটাবহুল ফুলগাছের চারা রােপণ করা হ’ল। সমাধিস্থানে দাড়িয়ে মােবল একটি নাতিদীর্ঘ বক্তৃতা করল, তার প্রধান বক্তব্য এই যে, পশুডবনের কল্যাণের জন্য সকলেরই জীবনপণ করে সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত থাকা উচিত। পশুগণ সর্বসম্মতিক্রমে এই সিদ্ধান্ত করল যে, এই যুদ্ধের বীরত্ব প্রদর্শনের জন্য একটা সামরিক সম্মানচিহ্ন দেওয়ার ব্যবস্থা হবে। কাজে কাজেই মােবলকে প্রথম শ্রেণীর পশুবীর’ এই সম্মানে ভূষিত করা হ’ল। এই পুরস্কারটি আসলে একটি পিতলের ফলক (ঘােড়াদের লাগাম ঘরে কুড়িয়ে পাওয়া পেতলের একটি চাকৃতি) রবিবার এবং অন্যান্য ছুটির দিনে এটি পরে মােবল বেরুবে। আর এই মৃত ভেড়াটিকে ‘দ্বিতীয় শ্রেণীর পশুবীর’ স্মারকে ভূষিত করা হল। এই যুদ্ধের কি নাম হবে এই নিয়ে অনেক কথা খরচ হ’ল। অবশেষে স্থির হ’ল যে এই যুদ্ধকে ‘গােশালার যুদ্ধ’ নামে অভিহিত করা হবে কারণ গােয়ালঘরেই চরম সংঘর্ষ শুরু হয়। জোসের পরিত্যক্ত বন্দুকটি কাদার মধ্যে পড়ে ছিল। এদিকে শােনা গেল যে বসতবাড়িতে কিছু কাজ আছে। পরিশেষে এই B ফ্ল্যানিম্যাল ফার্ম সিদ্ধান্ত হ’ল যে, পতাকাদণ্ডের পাদদেশে বন্দুকটিকে তোপের মত খাড়া রাখা হবে, বছরে দু-বার এই বন্দুক ছাড়া হবে—একবার হবে ১২ই অক্টোবর, গােশালার যুদ্ধ স্মরণে ; আর একবার বিপ্লবের স্মরণে •• ২৪শে জুন। (৫) শীত পডল আর মলির গাফিলতীও বাডল। ওকে নিয়ে মহা মুস্কিল হয়েছে। আজকাল ও রােজই দেরী করে কাজে আসে, কেউ কিছু বললেই ও জবাব দেয়, ঘুম ভাঙে নি। ওর নাকি শরীরে কি একটা যন্ত্রণা হচ্ছে। অথচ আহারে খাশ রুচি রয়েছে। যে কোনাে অজুহাতে মলি কাজ ফাকি দিয়ে পুকুরধারে চলে যায়। সেখানে জলের ধারে দাড়িয়ে, পরিষ্কার জলে নিজের প্রতিবিম্বের দিকে চেয়ে হাঁ করে বােকার মত কী যে দ্যাখে তা ও-ই জানে। তবু এসব ত তেমন কিছু মারাত্মক নয়, এর চেয়েও গুরুতর কিছু করছে এরকম গুজব শােনা যাচ্ছে। একদিন হয়েছে কি মলি ঘাস চিবােতে চিবােতে আঙিনাতে বেশ খুশি মনে ওর লম্বা লেজটা দুলিয়ে দুলিয়ে বেড়াচ্ছে, ক্লোভার ওর পাশে গিয়ে হাজির হল। ক্লোভার বল-তােমাকে একটা কথা বলব মলি—খুব গুরুতর আজ সকালে তােমাকে বেড়ার ওপারে উকি দিতে দেখেছি। ওই যে যেখানে আমাদের খামার শেষ হয়ে ফক্সউড শুরু হয়েছে সেখানে। বেড়ার ওপারে পিকিংটনের একটা চাকর দাড়িয়ে ছিল। অবিশ্যি অনেক দূর থেকেই লক্ষ্য করছিলাম-তবে ঠিকই ফ্ল্যানিম্যাল ফার্ম ৪৫ দেখেছি যে ও লােকটা তােমাকে কি যেন বলছিল—আর তুমি নাকটা এগিয়ে দিয়ে ওর আদর খাচ্ছিলে। এ সবের অর্থ কি মলি ?” না না, তা হবে কেন, সে কিছু বলেনি। আমি ওদিকে যাই নি। , না, এ কথা মিথ্যে! মলি চেঁচিয়ে উঠল। পা দিয়ে মাটি আঁচড়াতে লাগল মলি। ‘মলি! তাকাও দেখি আমার মুখের দিকে। আর শােনন, নিজের দিব্যি গেলে সত্যি কথা বলাে দেখি, লােকটা তােমার নাকে হাত দিয়ে আদর করেনি? ‘না, একথা সত্যি নয়। ব’লে বটে মলি, কিন্তু ক্লোভারের দিকে চোখ তুলে চাইতে পারল না। পর-মুহূর্তে ছুটে মাঠে পালিয়ে গেল মলি। কি একটা ভেবে নিয়ে, ক্লোভার সােজা মলির আস্তাবলে চলে গেল। সেখানে গিয়েই পায়ের খুর দিয়ে মলির শয্যা, মানে, খডের গাদা বেশ করে উল্টে পাল্টে দেখতে দেখতে খুঁজে পেল কয়েক টুকরাে মিশ্রর ডালা আর কয়েকটি ফিতে, হরেকরকম রঙের সব ফিতে ! এর পর তিন দিনের দিন মলি উধাও হয়ে গেল। কয়েক সপ্তাহ ওর আর কোনাে খোঁজখবর পাওয়া যায়নি, তারপর একদা পায়রা সংবাদ দিল যে, তারা নাকি মলিকে দেখেছে। উইলিংডন ছাড়িয়ে একটা তড়িবাড়ির সামনে মলিকে দেখা গিয়েছে। একটা খুব মােটা লােক ওকে চিনি খাওয়াচ্ছে, আর আদর করছে। ওর ঘাঙে নতুন লাল- টুকটুকে বাহারী ফিতে কানাে, হালফিল গায়ের লােম ছাঁটাই হয়েছে-গােলা পায়রাদের অভিমত এই যে মলিকে দেখে শুনে মনে হয় ৪৬ য়্যানিম্যাল ফার্ম খুব মৌজে রয়েছে ও। এরপর আর ম্যানিম্যাল ফার্মের কোনাে পত মলির নাম কখনও উচ্চারণ করে নি। জানুয়ারীতে আবহাওয়া খুব প্রতিকুল হয়ে পড়ল। মাটি যেন লােহার মত কঠিন হয়ে গেল, আর মাঠে-ঘাটে কোনাে কাজ করার উপায় নেই। বড় গােলাবাড়িতে বিস্তর সভার বৈঠক হতে লাগল। শূকরেরা আগামী মরশুমের জল্পনা কল্পনার খসড়া করতে খুব ব্যস্ত। এটা সবাই মেনে নিয়েছে যে শূকরেরা অন্যান্য পশুদের চেয়ে বহু গুণে বুদ্ধিমান, অতএব কৃষিভবনের সর্বপ্রকার কর্মধারা তারাই স্থির করবে, অবশ্য তাদের এইসকল সিদ্ধান্ত অধিকাংশের ভােট দ্বারা অনুমােদিত করা হবে। স্নােবল আর নেপােলিয়নে যদি বিবােধ না থাকত তাহলে এই বন্দোবন্তে কাজ বেশ সুশৃঙ্খলভাবেই চলত। কিন্তু এরা দু’জনে প্রতিপদে ফাক পেলেই দ্বিমত হয়ে যায়। এ যদি বলে যে, জমির বেশি অংশে যব রােপণ করালে ভালো হবে—তখন ও বলবে, না, জই চাষ করে। এ যদি বলে যে, এই ধরনের জমি হচ্ছে কপি চাষের খুব উপযােগী তখন ও স্রেফ নাক কুঁচকে বলে বসবে যে, মুলাে ছাড়া এ জমিতে আর কিছু হতেই পারে না। এদের প্রত্যেকেরই নিজের দলবল রয়েছে, আর বাকবিতণ্ডারও কামাই নেই, ফুলে কখনও কখনও অর্কের চেহারা ভয়াবহ হয়ে ওঠে। সাধারণ সভাতে প্রায়শই পােবল তার উচ্চাঙ্গের বক্তৃতার জোরে জিতে যায় ঠিকই। কিন্তু নেপােলিয়ন তবিরের কাজে খুব পটু। যথাসময়ে নিজের দলে টেনে আনবার কৌশলটুকু তার খুব রপ্ত। বিশেষ করে ভেড়ার পালে তার খুব প্রতিপত্তি। সম্প্রতি ভেড়াদের এক হুজুগ হয়েছে যখন তখন ‘চার পা ভালাে, দু পা খারাপ। জিগির হ্যানিম্যাল ফার্ম ৪৭ ভােলা। হঠাৎ ওরা চীৎকার জুড়ে দেয়-“চার পা ভালাে, দু পা খারাপ। এই জাতীয় মন্ত্রটি উচ্চারণ করে অনেক সময় ওরা সভার বিঘ্ন ঘটায়। মােবল যখন সভাতে কোনাে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আললাচনা করে তখনই যেন ওদের এই জিগির দেওয়ার ধুম পড়ে যায়। বসতবাড়িতে ‘চাষী ও পশুপালক’ পত্রিকার পুরনাে একটি সংখ্যা কুড়িয়ে পেয়ে, মোবল সেটি গভীর মনােনিবেশ সহকারে অধ্যয়ন করেছে, এখন তার মগজে উন্নয়ন পরিকল্পনার বিস্তর মতলব গজগজ করছে। জমির জল নিকাশের ব্যবস্থা, পশুদের ভােজ্যাদি গর্তে মজুত রাখার উপায়, এবং বিবিধ নব্যপ্রথা সম্পর্কে সে পাণ্ডিত্যপূর্ণ বক্তৃতা করল। এবার থেকে পশুদের সরাসরি মাঠের বিভিন্ন জায়গায় প্রত্যহ মলত্যাগ করবার ব্যবস্থা হ’ল, তাতে করে আপনাআপনি জমিতে সার দেওয়ার কাজ হাসিল হবে—গাড়ি করে বয়ে নিয়ে যাওয়ার মেহন বাঁচাননার অভিনব পন্থা এটা। নেপােলিয়নের নিজস্ব কোনাে পরিকল্পনা নেই—সে শুধু বলল যে মােবলের এইসব আজগুবি মতলবে কিছু কাজ হবে না। নেপােলিয়ন নীরবে প্রতীক্ষা করছে, কবে তার নিজের দিন আসবে। অবশেষে ওদের মধ্যে প্রচণ্ডতম বিরােধ বাধল ‘হাওয়া কল’ নিয়ে এরকম তিক্ত, তীব্র গণ্ডগােল আর কখনও হয় নি। খামারশালার কাছাকাছি একটা মাটির ঢিবি আছে। এই অংশটি হচ্ছে খামারের সবচেয়ে উচু জমি। একদা মােবল এই ঢিবিটা পর্যবেক্ষণ করে’ বললে যে, ‘হাওয়া কল’ বানানাের এটাই হচ্ছে উপযুক্ত জায়গা। এই হাওয়া কলে যে ডায়নামাে চলবে, তাতে উৎপন্ন বৈদ্যুতিক শক্তি সমগ্র কৃষিভবনে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারবে। তার ফলে শীতের সময়ে পশুদের থাকবার জায়গা গরম রাখা যাবে, আলাে জ্বলবে, 8 য়্যানিম্যাল ফার্ম করাত চলবে, খড় কাটবার যন্ত্র চালানাে হবে, বিদ্যুৎচালিত দুধ দুইবার যন্ত্র ব্যবহার করা যাবে—আরও বহুতর সুবিধে সুযােগ পাওয়া যাবে হাওয়া কল চালাতে পারলে। এর আগে এখানকার জানােয়াররা এসব কথা কস্মিন্ কালে শােনে নি, কি করেই বা শুনবে? জোসের খামারবাড়ি ত মান্ধাতার আমলের চালচলনেই এতদিন চলে এসেছে। তাই, মােবল যখন এইসব অদ্ভুতকর্মা যন্ত্রপাতির কথা বলে তখন এরা সবাই হা করে শশানে। সত্যি ভারি অবাক লাগে, ওরা সবাই নিজের খুশিমত মাঠে চরবে অথবা লেখা পড়ার আর আলাপ আলােচনার মধ্যে নিজেদের নিয়ােগ করে যখন মানসিক উন্নতি করতে থাকবে তখন কিনা যন্ত্রগুলাে ওদের যাবতীয় কাজ করে দেবে। অল্প কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই মাের্বলের হাওয়া কল’ (উইণ্ড মিল ) বসানাের নক্সাপত্র তৈরী হয়ে গেল। জোসের খান তিনেক বই থেকে যন্ত্রপাতির খুঁটিনাটি আবিষ্কার করা হল। এককালে যে চালাতে কৃত্রিম উপায়ে ডিমফোটানাে হত সেটি এখন বেলের গবেষণার ঘর। 'এই ঘরখানাতে কাঠের মেঝে থাকার দরুন আঁক-জোক করার খুব সুবিধে। মােবল এই ঘরে এক নাগাডে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাজে ব্যস্ত থাকে। তার সামনে বইগুলাে খােলা রয়েছে, বইএর পাতায় পাথর চাপানাে, আর সে নিজে সামনের পায়ের থাবাতে মুঠো করে চক খডি ধরে এপাশ ওপাশ ঘােরাঘুরি করছে, খড়ির আঁচড় টানছে, উত্তেজিত মুহূর্ডে অর্ধস্ফুট হু-হু” আওয়াজ ছাড়ছে। দেখতে দেখতে নষ্মা হয়ে উঠল জটিল বাকাচোরা দাতালে রেখার মিছিলের মত। মেঝেখানার বেশিরভাগ অংশ এই নক্সার বিচিত্র চিত্রে ঢেকে গিয়েছে। অপরাপর জরা এসব দেখে কিছুই বুঝতে পারল না, তবে তারা মুগ্ধ হ’ল বৈকি।

য়্যানিম্যাল ফার্ম ৪ ওরা প্রত্যেকে দিনে অন্তত একবার করে যােবলের নক্সা দেখতে আসে। এমন কি হাঁস মুর্গীরাও বাদ যায় না, ওদের কেবলই ভয় এই যে, পাছে পা দিয়ে নক্সাগুলাে মাড়িয়ে ফ্যালে, তার জন্যে রীতিমত কসরৎ করে চলাফেরার দরকার হয়। কেবলমাত্র নেপােলিয়ন নিজে এ ব্যাপারটা পরিহার করে চলছে। অবশ্য ‘হাওয়াকল’ পরিকল্পনার প্রথম উন্মেষেই নেপােলিয়ন জানিয়ে দিয়েছিল যে, সে এর বিপক্ষে। হঠাৎ একদিন সে হাজির হ’ল নক্সাগুলাে পরীক্ষা করে দেখবার জন্য। এটা কেউ আশা করে নি। ঘরময় গম্ভীর ভাবে পায়চারী করতে করতে সে নক্সার প্রত্যেকটা খুঁটিনাটি খুঁটিয়ে দেখল, দু-একবার না বাড়িয়ে কে পরখ করল, খানিকটা স্থির হয়ে দাড়িয়ে নক্সার দিকে তির্যক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বিচার বিশ্লেষণ করল যেন, এরপর অতর্কিতে একটা পা উচু করে নক্সার ছকের ওপর প্রস্রাব ত্যাগ করে বেরিয়ে গেল গভীর ভাবে, একটি কথাও বলে। হাওয়া কলের ব্যাপারকে কেন্দ্র করে কৃষিভবনে সম্পূর্ণ দুটো দল গড়ে উঠল। মােবল অবশ্য স্বীকার করল যে, হাওয়া কল বানানাে খুবই শক্ত কাজ। দেয়াল তৈরীর জন্যে খুঁড়ে পাথর যােগাড় করতে হবে, দেয়াল গেঁথে তুলতে হবে, হাওয়া ধরবার জন্য পাখা তৈরী করতে হবে, তারপর চাই তার আর ভায়নামাে। কি করে যে এগুলাে সংগ্রহ করা যাবে সে কথা পােবল জানালাে না। কিন্তু এ সব ব্যবস্থা এক বছরের মধ্যেই হয়ে যেতে পারে এটা স্নােবল দৃঢ়কণ্ঠে ঘােষণা করল। এবং পরিশেষে সে এও প্রক্ষণ করল যে, এই নব্য ব্যবস্থার দরুন পশুদের মেহনৎ এত কমে যাবে যে সপ্তাহে মাত্র তিন দিন তাদের কাজ করতে হবে-বাকী সময়টা সম্পূর্ণ তাদের নিজস্ব হয়ে যাবে; অপর পক্ষে নেপােলিয়নের ৪ হ্যানিম্যাল ফার্ম যুক্তি হচ্ছে এই যে, বর্তমানে শুধু খাদ্যের উৎপাদন বাড়িয়ে যাওয়াটাই জরুরী প্রয়ােজন। এই সময়ে যদি তারা হাওয়া কলের পিছনে সময় অপচয় করে তাহলে অচিরে অনাহারে মরতে হবে তাদের সকলকে। জানােয়ারদের মধ্যে দুটি বিবােধী দল দাড়িয়ে গেল এক দলের বুলি হ’ল-স্নােবলকে ভােট দাও—সপ্তাহে তিন দিন খাটো, আর এক দলের জিগির হচ্ছে—‘নেপােলিয়ানকে ভােট দাও—পেট পুরে খাও। একমাত্র বেঞ্জামিন কোনাে দলেই যােগ দিল না। খাবার যে আরও বেশি পরিমাণে পাওয়া যাবে একথাও সে বিশ্বাস করে না—আবার, হাওয়া কল হ'লে খাটুনী বাঁচবে সেকথাও সে মানতে রাজী নয়। হাওয়া কল হােক আর না-ই হােক জীবন যেমন চিরকাল চলে এসেছে মেনিই, অর্থাৎ দুর্দশাগ্রস্ত ভাবেই চলবে। হাওয়া কল নিয়ে মতানৈক্য ছাড়াও আর একটি বিষয় চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে—কৃষিভবন রক্ষার ব্যাপারটা কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। এটা বেশ বােঝা যাচ্ছে যে, মানুষেরা গােশালার যুদ্ধে একবার পরাস্ত হয়ে চুপচাপ বসে থাকবে না। তারা আরও লােকজন হাতিয়ারপাতি নিয়ে দৃঢ়তর সংকল্পের সঙ্গে আক্রমণ করবে, তাতে কোন সন্দেহ নেই। এবার তারা জোনসকে পুনঃ প্রতিষ্ঠিত করবার চরম চেষ্টা করবে। মানুষের আক্রমণের আশঙ্কাটা আরও প্রবল হওয়ার হেতু এই যে, গােশালার যুদ্ধের খবর চারিদিকে ছড়িয়ে যাওয়ার ফলে আশপাশের সব খামারের পশুরা ক্ষেপে গিয়ে মানুষের বিরুদ্ধাচারণ করছে। যথারীতি খামার রক্ষার ব্যাপারেও নেপােলিয়ন আর মােবলে বিবােধ বাধল। নেপােলিয়নের মত হচ্ছে, যে উপায়েই হােক আগ্নেয়াস্ত্র সংগ্রহ করতে হবে, নিজেদের আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের কৌশল শিখতে হবে।

য়্যানিম্যাল ফার্ম আর নােবল এই মত প্রকাশ করল যে, দিকে দিকে আরও পারাবতদূত পাঠিয়ে বাকী সব খামারের জন্তু জানােয়ারদের বিপ্লবের দিকে অগ্রসারী করা প্রয়ােজন। এ বলে যে, আমরা যদি আত্মরক্ষাই করতে না পারি তাহলে হেরে যাবাে নির্ঘাৎ। আর ও বললে, চারদিকে যদি বিপ্লব শুরু হয়ে যায় তাহলে আর আত্মরক্ষার দরকারই হবে না। পশুরা প্রথমে নেপােলিয়নের বক্তৃতা শুনল, আবার তারপর মােবলের কথা বল- তার ফলে কিছুতেই বুঝে উঠতে পারল না যে কার কথা ঠিক। ওদের মনটা এমনই যে, যখন যার কথা শােনে সেইমুহূর্তে তারই সঙ্গে একমত হয়ে যায়। অবশেষে একদিন সত্যিই স্নোবলের হাওয়া-কুলের ছক-না সব তৈরী হয়ে গেল। সামনের রবিবারের সভাতে ভােটের দ্বারা সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে যে, হাওয়া কলের কাজ বর্তমানে শুরু হবে কিনা। একে একে সব পশু সমবেত হ’ল। স্নােবল উঠল বক্তৃতা দিতে। মাঝে মাঝে ভেড়ার পাল ‘চার পা ভালাে—দু-পা খারাপ জিগির দিয়ে বাধা সৃষ্টি করছে, কিন্তু মোবল সে সব গ্রাহ না করে হাওয়া কল বানানাের প্রয়ােজনীয়তার স্বপক্ষে যুক্তিজাল বিস্তার করে চল। নেপােলিয়ন উঠল জবাব দিতে। সে পরিষ্কার বলে দিল যে হাওয়া- কল হচ্ছে আস্ত বুজরুকী। পশুদের কাছে তার সৎপরামর্শ—কেউ হাওয়া কলের স্বপক্ষে ভােট দিও না। এই বলে সে গম্ভীরভাবে বসে পড়ল। বােধ হয় আধমিনিটও সে বলেনিএবং তার বলার ফলাফল নিয়ে তাকে বিন্দুমাত্রও চিন্তিত দেখা গেল না। এরপর মােবল উঠে পঁড়াল। তাকে উঠতে দেখেই ভেড়ার পাল আবার জিগির জুড়ে দিয়েছে—তাদের প্রচণ্ড এক ধমক দিয়ে মােবল হাওয়া কলের স্বপক্ষে ভােট আদায়ের ৫২ ফ্যানিম্যাল ফার্ম উদ্দেশ্যে আবেগময় হৃদয়স্পর্শী ভাষায় ভাষায় এদের কাছে আবেন জলি। এতক্ষণ পর্যন্ত পশুদের সহানুভূতি দুই নেতার দিকেই প্রায় সমভাবে বিভক্ত ছিল। কিন্তু স্নােবলের বাগ্মিতার উচ্ছ্বাসে তাদের মন ভিজে গেল। মােবল দৃপ্ত ভঙ্গীতে বলছে, “আমাদের এই পশু ভবনের সবচেয়ে বড় কাজ হচ্ছে পশুদের ঘাড় থেকে গুরুভার মেহনতের বােঝা নামিয়ে দেওয়া। তার কল্পনা বহুদূরপ্রসারী। -বিদ্যুতের সাহায্যে শুধু যে খড় কাটাই হবে তা নয়, তার চেয়ে ঢের বড় বড় কাজ হবে, যেমন ক্ষেতে লাঙল দেওয়া, কাটাই, মাড়াই, আঁটি বাঁধা—সব হবে বিদ্যুৎ-চালিত যন্ত্রের সাহায্যে। এ ছাড়া পশুদের বাসের জায়গায় আলল, ঠাণ্ডা জল, গরম জল, বৈদ্যুতিক উনুন সবরকম ব্যবস্থা হবে। স্নােবল যখন বক্তৃতা শেষ করল তখন আর বুঝতে বাকী রইল না যে কোন পক্ষের জয় হবে ভােটে। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই নেপােলিয়ন উঠে দাঁড়িয়ে তির্যক দৃষ্টিতে মােবলের দিকে বিচিত্র ভঙ্গিতে তাকাল—তারপর অদ্ভুত একটা গলার আওয়াজ করে চেঁচিয়ে উঠল। ইতিপূর্বে তাকে এমন আওয়াজ করতে কেউ দ্যাখে নি। এই শব্দ থামতে-না-থামতে সভার বাইরে কুকুরের ঘেউ-ঘেউ শােনা গেল। আর ন’টি বিপুলকায় কুকুর তীর বেগে ছুটে এল গােলাবাড়িতে। তারা সরাসরি গােবলের দিকে ধেয়ে চল। মােবল কোনােক্ৰমে ওদের ওই তীক্ষ্ণ দাতের আক্রমণ বাঁচিয়ে দৌড়তে লাগল। নিমেষের মধ্যে সে দরজার বাইরে পৌছে গেল—কুকুরগুলােও চলল ওকে তাড়া করে। গােল দৌড়চ্ছে লম্বা মাঠের ওপর দিয়ে সােজা বড় সড়কের দিকে। তার দৌড় ত শূয়ােরের দৌড়, কুকুরগুলাে তার কাছাকাছি গিয়ে পড়ল যানিম্যাল ফার্ম বলে। হঠাৎ একবার তার পা পিছলে গেল—সবাই ভাবল, এবারে কুকুরের কবলে পড়ল মােবল। কিন্তু চট করে সামলে নিয়ে সে আরও জোরে ছুট মারল—কিন্তু কুকুর ওকে ধরল বলে, আর ও কাছিয়ে গিয়েছে ওরা। একটা কুকুর ওর লেজে এক কামড় মেরেছিল আর কি, এমন সময়ে মােবল এক ঝাপটায় লেজটা সরিয়ে নিয়ে প্রাণপণে ছুটতে লাগল—ওদের মধ্যে মাত্র কয়েক ইঞ্চি তফাৎ! হঠাৎ মােল বেড়ার ফাক দিয়ে টুক করে গলে বেরিয়ে গেল। তারপর আর তার পাতা পাওয়া গেল না। পশুরা ভয়ে মুখ শুকিয়ে, চুপচাপ গােলাবাড়িতে গুটিগুটি ফিরে এল। লহমার মধ্যে কুকুরগুলােও লাফাতে লাফাতে হাজির হল। প্রথমে ওরা কেউ ধারণাই করতে পারে নি, এই কুত্তরা কোথা থেকে এসেছে, অবশ্য সে রহস্য উদঘাটিত হতেও সময় লাগল না। নেপােলিয়ন যে ন’টি কুকুৰবাচ্ছাকে মানুষ করবার দায়িত্ব নিয়ে তাদের মায়েদের কাছ থেকে সরিয়ে জনান্তিকে পালন করছিল—এরা তারাই। যদিও এরা পূর্ণযুবক হয়ে ওঠে নি, তবু এখনই রীতিমত বড়সড় দেখাচ্ছে এদের। আর কী ভয়ঙ্কর চেহারা—যেন নেকড়ে বাঘ এক একটা! এরা সর্বক্ষণ নেপােলিয়নের পায়ে পায়ে রয়েছে, সেই সে-আমলে জোন্সকে দেখে কুকুরগুলাে যেমন করে লেজ নাড়ত, এরা নেপােলিয়নকে দেখে অবিকল তেমনি ভাবে লেজ নাড়ছে ! একদা যেখানে দাড়িয়ে বুড়াে মাতব্বর প্রথম বক্তৃতা করেছিল নেপােলিয়ন সেই উচু জায়গাতে উঠে দাঁড়াল—তার পিছনে কুকুরগুলাে ঘিরে দাড়িয়ে। সে ঘােষণা করল যে, এরপর আর রবিবারে কোনাে সভা হবে না। এর কোনাে প্রয়ােজন নেই, মিছে সময় নষ্ট হয় এতে।

৫৪ য়্যানিম্যাল ফার্ম এখন থেকে খামারের কার্য নির্বাহের জন্য বিশেষ একটি সমিতি গঠিত হবে, কেবলমাত্র শূকরেরা এই সমিতির সদস্য থাকবে—আর নেপােলিয়ন স্বয়ং হবে সেই সমিতির সভাপতি। সমিতির বৈঠক সাধারণের সমক্ষে বসবে না—অবশ্য বৈঠকের পর সমিতির সিদ্ধান্তগুলি সকলকে জানিয়ে দেওয়া হবে। প্রতি রবিবার সকালে পশুগণ মিলিত হয়ে পতাকা নমস্কার সেরে ‘ইংলণ্ডের পশুরা গাইবে, তারপর যার-যার সপ্তাহের বুঝে নিয়ে সরে পড়বে। কোন রকম তর্কবিতর্ক একদম চলবে না। স্নােবলকে তাড়িয়ে দেওয়ায় সবাই মনে মনে আঘাত পেয়েছিল। এর ওপর এই আচা ঘােষণা শুনে যেন সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ল সবাই। ঠিকমত যুক্তি খুঁজে পেলে কেউ কেউ হয়ত প্রতিবাদও করতে প্রস্তুত ছিল। বক্সার পর্যন্ত বিচলিত হয়ে পড়ল। সে একবার কান দুটো পিছনে ঠেলে দিলে, তারপর কপালের চুলে নাড়া দিল, এমনিভাবে সে ছড়ানাে ভাবগুলােকে চিন্তাসূত্রে গাঁথতে খুব চেষ্টা করল, কিন্তু বলার মত কিছুই খুঁজে পেল না শেষ পর্যন্ত। অবশ্য শূকরদের মধ্যে কেউ কেউ এদিক দিয়ে কৃতী। সামনের সারির চারজন অল্পবয়স্ক শূকর তী কণ্ঠে চেঁচিয়ে নিজেদের প্রতিবাদ জানালাে। তারা চার জনে এক সঙ্গে লাফিয়ে উঠল এবং বক্তৃতা জুড়ে দিল সমবেতভাবে। কিন্তু সহসা নেপােলিয়নের পার্শ্বচর কুকুরগুলাে ভারী গলায় ভয়ঙ্কর গর্জন করতেই শূয়াের বাচ্ছারা থেমে গেল, এবং গুটি গুটি নিজের জায়গায় গিয়ে বসে পড়ল। এরপর শুরু হয়ে গেল ভেড়ার পালের জিগির—‘চার পা ভালাে—দু পা খারাপ। পনের মিনিট ধরে এক নাগাড়ে এই চলল। তার ফলে আর কোনাে আলােচনার প্রশ্নই উঠল না।

} য়্যানিম্যাল ফার্ম এই নৰবিধানের আসল উদ্দেশ্য এবং সার্থকতা সম্বন্ধে বিশদ ব্যাখ্যার জন্য স্কুইলারকে পশুদের কাছে পাঠানাে হয়েছিল, কিছুক্ষণ পরে। বন্ধুগণ! সে বললে—“আমি বিশ্বাস করি যে বন্ধু নেপােলিয়ন এই যে বাড়তি মেহনৎ নিজের ঘাড়ে নিয়ে ত্যাগের আদর্শ স্থাপন করেছেন, এর মর্ম তোমরা বুঝতে পারছ। তােমরা যদি মনে করে থাকে যে, নেতা হওয়ায় সুখ কিছু আছে তাহলে ভুল করবে। ঠিক তার উল্টো ব্যাপার-নেতৃত্ব হচ্ছে গভীর এবং গুরুভার দায়িত্বের বােঝ। সব পশুই সমান একথাটা কমরেড নেপােলিয়ন যতখানি বিশ্বাস করেন, তােমরা কেউ ততটা পারাে না। তােমরা নিজেরা বিচার বুদ্ধি দিয়ে ঠিক পথটা বেছে নিতে পারে—এ দেখলে তিনি খুবই আনন্দিত হবেন। কিন্তু কি জাননা! তােমরা হয়ত ভুল পথ ধরে বসবে। তখন বন্ধু আমাদের কি দশা হবে? মনে কৰাে যদি তােমরা ােেবলকে অনুসরণ করতে, তার ওই হাওয়া কলের মত ভূয়াে একটা জিনিসকে সত্যি মনে করে তার পিছনে ছুটতে তাহলে মােবল যে একটা আস্ত বদমায়েস ছাড়া কিছু নয় আমরা ত তা এখন সবাই জানি! কে যেন বলল-“কিন্তু সে গােশালার যুদ্ধে বীরের মত লড়াই করেছিল। ‘বীরত্বই সব নয়। স্কুইলার জবাব দিল—“আনুগত্য, বাধ্যতা এগুলাে আরও প্রয়ােজন। আর গােশালার যুদ্ধের কথা বলছ, দেখবে আমরা ক্রমশঃ বুঝতে পারব যে তার মধ্যে মােবল যেটুকু করেছে তার চেয়ে ঢের বেশি বাড়িয়ে বলা হয়েছে। নিয়মানুবর্তিতা, বুঝলে কমরেছগণ, লৌহ-কঠিন নিয়মানুবর্তিতাই হচ্ছে আজকের একমাত্র কথা।

৫৬ স্ক্যানিম্যাল ফার্ম কদম আমরা ভুল পথে পা বাড়িয়েছি কী আমাদের দুশমনেরা ঝাঁপিয়ে পড়বে আমাদের ঘাড়ে। তােমরা নিশ্চয় চাও না যে কােন আবার ফিরে আসুক ? এই অকাট্য যুক্তির আর কোন জবাব নেই। সত্যিই, পশুরা ত কেউ চায় না যে জোস ফিরে আসুক। যদি রবিবারে সকালের বিতর্ক সভাই জোসের ফিরে আসার কারণ হয়ে দাড়ায় তবে সে সভাই বন্ধু হােক। বক্সার এতক্ষণ ধরে ভেবে ফেলেছে, কাজেই সাধারণের মুখপাত্র হয়ে বললে—“যদি কমরেড নেপােলিয়ন একথা বলে থাকে ত এটাই ঠিক। এবং এর পর থেকে বক্সার এই সার বলে গ্রহণ করল- নেপােলিয়ন সর্বদা নিতুল। তার প্রাক্তন ‘আমি আরও বেশি মেনেৎ করব। নীতির সঙ্গে এই নূতন নীতিটিও যুক্ত হয়ে গেল। এদিকে বসন্তের সঙ্গে সঙ্গে জমিতে লাঙল পড়ল। যে ঘরে মােবল তার নক্সার ছক একে রেখেছিল সে ঘরখানা বন্ধ রাখা হয়েছে। সবাই ধরে নিয়েছে যে তার নক্সার আঁকিবুকি সব মুছে ফেলা হয়েছে মেঝে থেকে। আজকাল প্রতি রবিবার পর সকালে বড় গােলাবাড়িতে জমায়েৎ হয়ে সাপ্তাহিক কাজের নির্দেশাদি গ্রহণ করে। বুড়াে মাতব্বরের মাথার খুলি থেকে মাংস-চামড়া সব খসে গিয়ে সেটা বেশ পরিষ্কার হয়েছে এখন সে খুলিটা ফলবাগানের সমাধি থেকে উঠিয়ে এনে পতাকাদণ্ডের নীচে বন্দুকটির পাশে আর একটি দণ্ডে আটকে রাখা হয়েছে। পতাকা ওড়ানাের পর, সবাই গােলাবাড়িতে যাবার আগে, ওই খুলিকে সম্মান প্রদর্শনের জন্য সারি বেঁধে খুলির সম্মুখ দিয়ে সন্ত্রমভরে চলে যায়।

য়্যানিম্যাল ফার্ম আজকাল আর আগের মত ওরা সবাই এক সঙ্গে বসে না। নেপােলিয়ন আর স্কুইলার, তার সঙ্গে মিনিমাস নামক আর একটি বিশিষ্ট বরাহ উচু মঞ্চে বসে থাকে-ওদের পাশে অৰ্দ্ধচাকারে সেই নটি কুকুরও মঞ্চের ওপর থাকে। মিনিমাস হচ্ছে একজন কবি, সে গানও বাঁধতে পারে—অসাধারণ গুণসম্পন্ন প্রাণী। মঞ্চের ওপর, পিছন দিকে থাকে আর সব শূয়ােরেরা। অন্যান্য পশুরা মঞ্চের দিকে মুখ করে গােলাবাড়ীর প্রাঙ্গণ দখল করে বসে। নেপােলিয়ন সামরিক কাঠখােটা কায়দায় কর্কশকঠে আগামী সপ্তাহের কর্মপদ্ধতি পড়ে যায়। এরপর মাত্র একবার ‘ইংলণ্ডের পশুরা গেছে পদের চলে যেতে হয়। সােবল বিতাড়িত হবার পর যেটা তৃতীয় রবিবার পড়ল, সেদিন হঠাৎ নেপােলিয়ন ঘােষণা করল, শেষ পর্যন্ত হাওয়া কল বানানােই হবে। একথা শুনে সবাই ত অবাক। নেপােলিয়ন যে কেন মত বদলেছে একথা সে প্রকাশ করল না। সে শুধু সংক্ষেপে জানিয়ে দিল যে, এই বাড়তি কাজের দরুন সবার ঘাড়ে আরও পরিশ্রমের চাপ পড়বে। হয়ত খাদ্য বরাদ্দের পরিমাণও কমিয়ে দেওয়ার প্রয়ােজন হতে পারে। ওদিকে কাজের ছক-নক্সার যাবতীয় খুটিনাটি সব তৈরী হয়ে গেছে। এই কাজের জন্য গত তিন-সপ্তাহকাল ব্যাপী শূকরদের এক বিশেষ কমিটিকে অজস্র শ্রম স্বীকার করতে হয়েছে। হাওয়া কলের গঠন কার্য এবং অন্যান্য উন্নয়নমূলক সব পরিকল্পনা কাজে রূপায়িত করতে হয়ত বছর দুই সময় লাগবে। সেদিন সন্ধ্যাতে স্কুইলার পশুদের কাছে গােপনে বুঝিয়ে দিল যে বস্তুতঃ নেপােলিয়ন কোনােকালেই হাওয়া কলের বিপক্ষে ছিল না।

ম্যানিম্যাল ফার্ম বরং হাওয়াকল বানানোর মতলবটা গােড়াগুড়ি নেপােলিয়নেরই ছিল, খােবল ডিম ফোটাবার ঘরের মেঝেতে যেসব নক্সা একেছিল সেগুলোও ত নেপােলিয়নের নিজস্ব। মােবল চুরি করে এনেছিল নেপােলিয়নের কাগজপত্র থেকে। আসলে হাওয়া-কলটা নেপােলিয়নেরই নিজের সৃষ্টি। 'কে একজন প্রশ্ন করলে—“তাই যদি হবে, তাহলে সে এর বিরুদ্ধে এত কথা বললে কেন ? স্কুইলার ধূর্তভাবে একবার তাকিয়ে বলল—এটা হচ্ছে কমরেড নেপােলিয়নের চালাকি। আসলে মােলকে তাড়াবার জন্যেই নেপােলিয়ন বাইরে-বাইরে হাওয়া-কল গড়ার বিরােধিতা দেখাচ্ছিল। স্নোবল দুষ্ট চরিত্রের জীব, তার প্রভাব আমাদের সর্বনাশের দিকে নিয়ে যেতে পারত। এখন মােবল দূর হয়েছে, কাজ অগ্রসর হয়ে যাবে, সে আর বাগড়া দিতে পারবে না। একেই বলে কৌশল। স্কুইলার হেসে জানাল। সে বার কয়েক এই কথাটারই পুনরাবৃত্তি করল-কৌশল, কমরেডগণ, কৌশল! লেজ দোলাতে দোলাতে সে খুশির হাসি হাসল। পশুরা ঠিক বুঝতে পারে না স্কুইলারের এ কথার অশ্যার্থ। কিন্তু তবু তার বলার ভঙ্গীতে এমন যুক্তির ভাব ফুটে উঠল আর ওর সঙ্গে তিনটে কুকুর ছিল, তারা এমন ভীষণভাবে গজরাতে লাগল যে স্কুইলারের ব্যাখ্যা সবাই বিনা বাক্যব্যয়ে মেনে নিল-বাকবিতণ্ডার মধ্যে সাহস করে কেউ আর গেল না। (৬) সারা বছর ধরে পশুরা সব ক্রীতদাসের মত মেহনৎ করল। কেউই ত্যাগস্বীকারে কিছুমাত্র কুষ্ঠিত নয়। কারণ তারা ভালাে করেই জানে গ্যানিম্যাল ফার্ম যে, যা কিছু করছে তা সবই ত তাদের নিজেদের জন্যে আর যেসব পশু উত্তৰকালে আসবে তাদের জন্যে। ওইসব অলস, তস্কর মানুষগুলাের জন্যে তাদের পরিশ্রম করতে হচ্ছে না। গােটা বসন্তকাল আর গ্রীষ্মে ওরা সপ্তাহে ষাট ঘণ্টা মেহনৎ করেছে। এর ওপর আগস্ট মাসে নেপােলিয়ন ঘােষণা করল যে রবিবারের অপরাত্নেও কাজ হবে। এই কাজটা অবশ্যই সম্পূর্ণ কর্মীদের স্বেচ্ছাধীন, তবে যদি কোনাে পশু এই স্বেচ্ছাধীন কাজে গরহাজির হয় তাহলে তার খাদ্যবরাদ্দ কমে গিয়ে অর্ধেক হবে । এত করেও দেখা গেল যে কতকগুলি কাজে মােটেই হাত দেওয়া গেল না। এবারে ফসল কিছু কম হয়েছে গতবারের তুলনায়। আর গ্রীষ্মের গােড়াতে যে দুটি ক্ষেতে ‘ক’ রােপণ করা উচিত ছিল সে দুটি ক্ষেত ঠিক সময়ে লাঙল দিয়ে তৈরী করা গেল না বলে ‘ক’ মােটে রােপণ করাই হ’ল না। কাজেই সামনের শীতটা যে বেশ কষ্টে কাটাতে হবে এটা বেশ বােঝা যাচ্ছে। হাওরাকলের কাজে এমন-এমন সব অসুবিধে দেখা দিচ্ছে যা আগে থেকে অনুমান করে নি কেউ। খামারের এলাকার ভেতরেই চুনাে- পাথরের ভালাে জমি রয়েছে, বাইরের বাড়িতে মজুত ছিল প্রচুর বালি আর সিমেন্ট। কাজেই, গাঁথনীর জন্যে যেসব মালমশলা দরকার সরই হাতে রয়েছে। কিন্তু পয়লা নম্বর সমস্যা দাড়াল, পাথরগুলােকে ঠিক- ঠিক মাপে ভেঙে টুকরাে করা যায় কি করে তাই নিয়ে। গাঁইতি আর লােহার ছেনি ছাড়া এ কাজ হয় না। অথচ কোনাে পশুই ত শুধুমাত্র পিছনের পায়ে ভর করে দাড়াতে পারে না, আর পিছনের পায়ে সােজা হয়ে না দাড়াতে পারলে এসব যন্ত্রপাতি ব্যবহারও করা যায় না। এই সমস্যা নিয়ে মাথা ঘামাতে ঘামাতে সপ্তাহ কয়েক পরে একজনের মাথায় ৬০ য়্যানিম্যাল ফার্ম আসল মতলবটা এল—এর জন্য মাধ্যাকর্ষণ শক্তিকে প্রয়ােগই হচ্ছে যথার্থ উপায়। খাদের চারিদিকে প্রকাণ্ড-প্রকাণ্ড পাথর পড়ে রয়েছে। ওরা করলে কি, সেই সব বৃহৎ পাথরকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়ি দিয়ে বাঁধল। তারপর সবাই মিলে, ঘােড়া, গরু, ভেড়া, যারা কায়দা করে দড়ি আঁকড়ে ধরতে পারে তারা সবাই একসঙ্গে মিলিতশক্তির বলে ধীরে ধীরে চড়াইয়ের উপর দিয়ে সে পাথরকে টিলার মাথায় তুলল। সেই উচু জায়গা থেকে আবার সজোরে পাথরকে টিলার কিনারা থেকে একেবারে ঠেলে নীচে ফেলে দিল। সময়ে সময়ে তেমন সঙ্কটে পড়লে শূকরেরাও ওদের সঙ্গে কাজে যােগ দিতে লাগল। ওই উচু থেকে নীচে আছড়ে পড়ে পাথর ভেঙ্গে টুকরাে টুকরাে হয়ে যায়। একবার ভেঙে টুকরাে হয়ে গেলে অবশ্য তারপর সেগুলাে বয়ে ওপরে ভােলাটা সহজ। ঘােড়ারা গাড়ি বােঝাই দিয়ে সেগুলাে বইল, ভেড়ারা এক-এক খণ্ড করে ঠেলেঠুলে নিয়ে গেল, এমন কি মুরিয়েল আর বেঞ্জামিন দুজনে মিলে একটা সেকেলে গাড়িতে নিজেদের জুতে নিয়ে ভাগের মেহনৎ পুজিয়ে দিতে লাগল। এমনি করে গ্রীষ্মের শেষের দিকে যথেষ্ট পাথর জমা হয়ে গেল, তারপর শুরু হয়ে গেল ইমারত তৈরীর কাজ। তবির- তদারকীর দায়িত্ব নিল শূককূল। কিন্তু এই পদ্ধতিতে কাজ খুব পরিশ্রম সাপেক্ষ, সময়ও প্রচুর খরচ হচ্ছে। প্রায়ই এমন হয় যে, একখণ্ড বড় পাথর খাদ থেকে ওপরে তুলতে তামাম দিনটা লেগে গেল, তারপর যখন কিনার দিয়ে নীচে ফেলা হ’ল তখন হয় ত আন্ত পাথরটা আর ভাঙলই না। বক্সারকে বাদ দিয়ে কোনাে কাজই উদ্ধার হতে পারত না। এক এক সময়ে এমন মনে হয় যে, তার একার যা ক্ষমতা, খামারের আর ম্যানিম্যাল ফার্ম বাকী সকলের মিলিত শক্তি যেন তার চেয়ে বেশি নয়। অনেক সময় এমন হত যে ওপর দিকে ভারী পাথর তুলতে তুলতে হঠাৎ পাথরটা নীচের দিকে গড়াতে শুরু করল আর সেই সঙ্গে জানােয়ারদেরও হিড়হিড় করে নামিয়ে নিয়ে চলল। এই সময়ে বক্সার একাই পাথরের দড়ি আঁকড়ে প্রাণপণে গড়ানন ঠেকিয়ে রাখে। তার এই অমিত কর্মক্ষমতা দেখে সবাই সাবাস দেয়। একটু একটু করে সেই খাড়া চড়াই পথ বিপুল শক্তি দিয়ে সে যখন চলে, ঘন-ঘন নিশ্বাস পড়তে থাকে, ক্ষুর দিয়ে মাটিকে যেন সেটে ধরেছে সে, চওড়া পিঠের দু-পাশ দিয়ে দর-দর ঘাম ঝরে- তখন সবাই তারিফ করে বক্সারের। কখনও কখনও ক্লোভার তাকে এত বেশি মেহনত করতে বারণ করে। কিন্তু বক্সার গ্রাহ্য করে না। ‘আমি আরও বেশি খাটব। আর, নেপােলিয়ন সর্বদা নিতুল। এই দুটো নীতিকথা যেন সকল সমস্যার সমাধান মন্ত্র। আজকাল সে মুরগীর সঙ্গে নতুন ব্যবস্থা করে আর সকলের চেয়ে পৌনে একঘণ্টা আগে ঘুম থেকে ওঠে,আগের মত আধঘণ্টা আগে ওঠাতেও সে খুশি নয়। এছাড়া, ফালতু অবসরে (আজকাল এরকম ফাকা সময় বড় বেশি পায় সে। সে একাই খাদে চলে গিয়ে, কারুর সাহায্য ছাড়াই পাথরের টুকরাে গাড়িতে বােঝাই করে হাওয়াকল তৈরীর জায়গায় টেনে নিয়ে গিয়ে জমা করে। এত মেহনং সত্ত্বেও এবছর গরমকালে জানােয়ারদের অবস্থা এমন কিছু খারাপ গেল বলে মনে হয় না। জোসের আমলে ওরা যা খেতে পেত তার চেয়ে যদি বেশি না পেয়ে থাকে তাই কী—তার চেয়ে কমও ত পাচ্ছে না। এখন ত ওদের শুধু নিজেদেরই খাওয়া-দাওয়ার ভার বইতে হচ্ছে। এর ওপর পাচ পাঁচটা ফোতাে মানুষকে পুষতে হচ্ছে ফ্যানিম্যাল ফার্ম না—এই আনন্দেই ওরা বেশ খুশি আছে। সে খুশির তুলনায় ওদের ব্যর্থতা যেন কিছুই নয়। আর, কতকগুলাে কাজে মানুষের চেয়ে তাদের পদ্ধতি সহজতর এবং তাতে ওদের মেহনও বেঁচে যায়। যেমন ধরুন না, নিড়ানাের কাজটা ওরা এমন নিখুতভাবে করতে পারে যা মানুষের পক্ষে আদৌ সম্ভব হত না। আজকাল ত চুরিচাপাটির বালাই নেই, সেজন্ঠে চারণ- ভূমির থেকে আলাদা চাষের জমি ঘিরে রাখার দরকার হয় না। এতে করে কত মেহৎ বেঁচে গেছে—বেড়া মজবুত রাখা, গতায়াতের দরজা বনাননা, কিছু দরকার নেই। তবু গ্রীষ্ম যত এগুতে লাগল ততই কতকগুলাে অভাব হঠাৎ গজিয়ে ওদের ভাবিয়ে তুলল। এখন চাই মেটে তেল, কাটা পেরেক, সূতলী দডি, কুকুরেব বিস্কুট, ঘােডার নাল লাগাবাব লােহা-এগুলাের মধ্যে একটাও খামার বাডিতে ফলানাে যাবে না। এরপর আরও দরকার হয়ে পড়বে—বীজ, কৃত্রিম সার, এছাড়া হরেকরকম হাতিয়ারপাতি এবং হাওয়ালের জন্য কলকা। এগুলো কি উপায়ে সংগ্রহ করা যাবে, কেউ তা বাৎলাতে পারে না। এক রবিবার সকালে জানােয়ারের কাজের ফরমাস নিতে গিয়ে শুল যে, নেপােলিয়ন এক নূতন নীতি গ্রহণ করবে বলে স্থির করেছে। এখন থেকে য্যানিম্যাল ফার্ম প্রতিবেশী ফার্মগুলির সঙ্গে ব্যবসায়সুত্রে আবদ্ধ হবে। অবশ্য এর পেছনে কোনাে কারবারী মতলব নেই। শুধু কতকগুলি জরুরী দরকারী জিনিসপত্র সংগ্রহই আসল উদ্দেশ্য। নেপােলিয়ন, বল, যাবতীয় অন্যান্য দরকাবের চেয়ে হাওয়ালের প্রয়ােজনীয় জিনিসের গুরুত্ব ঢের বেশি একথা বিবেচনা করতে হবে।

যানিম্যাল ফার্ম অতএব সে একটা খড়ের গাদা বিক্রীর বন্দোবস্ত করছে, এ-বছয়ের উপর গমেরও কিছুটা অংশ বিক্রীর ব্যবস্থা করেছে। এবং এরপর যদি আরও বেশি টাকার দরকার হয় তাহলে সেটা তুলতে হবে ডিম বেচে। উইলিংডনে ডিমের চাহিদা সব সময়ই রয়েছে কাজেই ডিম বেচে টাকা সংগ্রহ করা শক্ত হবে না। এই প্রসঙ্গে নেপােলিয়ন বলল যে, এই মহৎ ত্যাগ স্বীকারের সুযােগে মুরগীদের খুশি হওয়া উচিত। হাওয়াল তৈরীর কাজে কেবলমাত্র তারাই এই বিশেষ সুযােগ পাচ্ছে-এ কি কম কথা ! আর একবার জানােয়ারদের মধ্যে একটা আবছা অস্বস্তির হাওয়া বয়ে গেল। মানুষের সঙ্গে কস্মিনকালে কোনাে সম্পর্ক রাখব না, ব্যবসায় বাণিজ্য কিছুতেই করব না, টাকা পয়সা স্পর্শ করব না—এগুলােই ত প্রাথমিক সভার মূল প্রস্তাব ছিল। যখন জোনসকে ওরা তাড়িয়ে দিল তখন প্রথমে এই সংকল্পই ত ওরা গ্রহণ করেছিল। সব জানােয়ারেরই মনে পড়ছে সেই শপথ গ্রহণের কথা, অথবা একথা বলা যায় যে, যেন এইরকম একটা কিছু হয়েছিল বলে ওদের মনে হচ্ছে। নেপােলিয়ন যেদিন সভা রদ করেছিল সেদিনের সভায় যে চারটে চ্যাংড়া শূয়াের প্রতিবাদ করতে উঠেছিল—আজও তারা ক্ষীণকঠে কি কি যেন বলতে গেল। কিন্তু তৎক্ষণাৎ কুকুরগুলাের প্রচণ্ড গর্জনের ধমকে তাদের কথা কোথায় ডুবে অতলে তলিয়ে গেল। তারপর যথারীতি ভেড়াদের চার পা ভালাে--দু পা খারাপ’ চীৎকার আরম্ভ হল। এইভাবে মুহূর্তের বেসামাল ভাবটা মেরামত হয়ে গেল। পরিশেষে নেপােলিয়ন তার সামনের থাবা উচিয়ে সবাইকে নির্দেশ দিল, তারপর সে ঘােষণা করল যে, ইতিমধ্যে ব্যবস্থা-বন্দোবস্ত সে সবই করে ফেলেছে। মানুষের সংস্পর্শে আসাটা পশুদের পক্ষে নিশ্চয়ই অগৌরব, চুপ করতে ৬৪ যানিম্যাল ফার্ম অতএব নেপােলিয়ন এমন ব্যবস্থা করেছে যাতে কোনাে জানােয়ারকে মানুষের কাছে যেতে হবে না। সে নিজেই এর যাবতীয় ব্যকি-ঝামেলা বইবে। উইলিংডনের বাসিদে এক ফ্ল্যাটনী—তার নাম ‘হােয়াইমপার, রাজী হয়েছেন, তিনি ফ্যানিম্যাল ফার্মের সঙ্গে বাইরের যােগাযােগ স্থাপন করে দেবেন। তিনি প্রতি মােমবার সকালে এখানে হাজির হয়ে যথাকৰ্তব্য’ জেনে যাবেন। বক্তৃতার উপসংহারে নেপােলিয়ন তার বরাবরের অভ্যাসমত ‘য়্যানিম্যাল ফার্ম দীর্ঘজীবী হােক’ জিগির দিল, এবং ইংলণ্ডের পশুরা’ গীত হয়ে সভাভঙ্গ হ’ল। পরে স্কুইলার যথারীতি ফার্মে ঘুরে ঘুরে পশুদের মনে স্বস্তি আনবার কাজে ব্যাপৃত হ’ল। সে বােঝালে যে, ব্যবসায় না-করা বা পয়সা কড়ি স্পর্শ-না-করার সংকল্প মােটেই গৃহীত হয় নি, এমন কি ও ধরনের কোন আলােচনাই কস্মিনকালে হয় নি, ওটা সর্বৈব কল্পনা- মনে হচ্ছে যেন সােবলের টানাে কোনাে মিথ্যা চক্রান্ত এর পিছনে রয়েছে। কিন্তু তবু কোন কোন পশুর মন থেকে সন্দেহটা পুরােপুরি ঘােচে না-তখন চতুর স্কুইলার তাদের খুব কায়দামাফিক জেরা শুরু করল—তােমরা কি নিশ্চিত বলতে পারে যে এটা তােমাদের স্বপ্ন কল্পনা নয়, বন্ধুগণ ? তােমাদের কাছে কি এই প্রস্তাবের কোন নজির আছে? যা বলছ তােমরা তা কি কোথাও লিখিত রয়েছে, দেখাতে পারে? যেহেতু এমন কথা কোথাও লিখিত নেই সেহেতু জন্তুরা নিশ্চিন্ত মনে মেনে নিল যে, তাদেরই ভুল হয়েছে। নির্দিষ্ট বন্দোবস্তৰত শ্ৰীযুক্ত হােয়াইম্পার প্রতি সােমবার ফার্মে হাজিরা দেয়—ছােট্টখাট্ট মানুষটি, গালে গালপাটা, চোখের চাউনীতে ফ্ল্যানিম্যাল ফার্ম ধূর্ততা ফুটে আছে যেন। এমনিতে কাজ কারবার সামান্য—তবে আর কেউ অনুমান করবার আগেই সে আন্দাজ করেছিল যে যানিম্যাল ফার্মের কাজে একজন দালাল দরকার হবেই—সে দালালীর মুনাফাটা খুব হেলাফেলার মত হবে না এটাও হােয়াইম্পার বুঝতে পেরেছিল। তার এই গতায়াতটা পশুরা কেমন যেন ভয়ের চোখেই দেখত, যতটা পারত এড়িয়ে চত্ত তাকে। কিন্তু যখনই ওরা দেখত যে নেপােলিয়ন তার চারপায়ে দাড়িয়ে হােয়াইম্পারকে কাজের অর্ডার দিচ্ছে আর সামনে দু’পায়ে লােকটি দাড়িয়ে রয়েছে, তখন গর্বে ওদের বুক যেন ফুলে উঠত! কতকটা সেই কারণেই ওরা এই নতুন বন্দোবস্ত মেনে নিয়েছে। এখন ওদের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কটা আগের মত নেই। যানিম্যাল ফার্মের উন্নতির দরুন মানুষগুলাে আগের চেয়ে যে ওদের কম ঘৃণা করে তা নয়, বরং ওদের হিংসে যেন আরও বেড়ে গিয়েছে। মানুষ মাত্রেরই বদ্ধমূল ধারণা হয়েছে যে, আজই হােক আর কালই থােক, য়্যানিম্যাল ফার্ম দেউলে হয়ে ভেঙে পড়বে। আর হাওয়া কলের ব্যাপার যে ফকা হয়ে যাবে তাতে আর কোন সন্দেহ নেই। পানশালাতে বসে বসে ওরা ছক কেটে একে অপরের কাছে প্রমাণ করে দেয় যে, হাওয়া কলটা নির্ঘাৎ উল্টে পড়বে, আর যদি বা খাড়া হয়ে দাড়িয়েও থাকে তবে অচল অকেজো হয়েই থাকবে। এত সব বিদ্বেষ সত্ত্বেও মানুষগুলাের মনের মধ্যে পশুদের প্রতি একটা সন্ত্রম জন্মেছে—পশুরা কৃতিত্ব সহকারে নিজেদের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে দেখে। এই সন্ত্ৰমের একটা লক্ষণ এই যে, ওরা আজকাল যানিম্যাল ফার্মকে য্যানিম্যাল ফার্ম বলেই উল্লেখ করে, আগের মত ম্যানর ফার্ম বলে না। ওরা জোসের হয়ে ওকালতী করাও ছেড়ে দিয়েছে। আর জোও ফার্ম ফিরে পাওয়ার আশা ফ্যানিম্যাল ফার্ম ৫ ছড়ে দিয়ে এ অঞ্চল থেকে দেশের অন্য কোথাও গিয়ে বসবাস করছে। এখনও পর্যন্ত কেবলমাত্র হােয়াইম্পার ছাড়া মানব সমাজের আর কোন প্রাণীর সঙ্গে যানিম্যাল ফার্মের প্রত্যক্ষ কোনাে যােগাযােগ নেই। কিন্তু প্রায়ই গুজব শােনা যাচ্ছে যে, নেপােলিয়ন নাকি খুব শীগগিরই ফউডের পিকিংটন কিম্বা পিঞ্চফিল্ডের ফ্রেডরিকের সঙ্গে ব্যবসায় সূত্রে আবদ্ধ হবে। তবে একই সঙ্গে দুজনের সঙ্গে সম্পর্ক গড়া যে সম্ভব নয় এটা সুনিশ্চিত। এই সময়ে একদিন দেখা গেল যে শূকরেরা হঠাৎ বসতবাড়িতে ঢুকে পড়েছে এবং সেখানেই বসবাস শুরু করেছে। এবারও পশুদের মনে পড়ল যে, এর বিরােধী একটা প্রস্তাব যেন আগের আমলে গৃহীত হয়েছিল। কিন্তু এবারেও স্কুইলার তাদের প্রত্যয় করালে যে, ব্যাপারটা ঠিক তা নয়। সে বলে যে, যেহেতু শূকরের ফার্মের বুদ্ধি যােগানাে মস্তিষ্ক, তাদের কাজের জন্য একটু নিরিবিলি জায়গার দরকার। তা ছাড়া নেতার মান- মর্যাদার দিক দিয়ে বিবেচনা করলে শূয়ােরের খােয়াড়ের চেয়ে তার কোন বাড়িতে থাকাই শােভন। (ইদানীং স্কুইলার নেপােলিয়নকে ‘নেতা’ বলে উল্লেখ করে)। কিন্তু যখন জানা গেল যে শূকরেরা রান্নাঘরে খাওয়া দাওয়া ত করেই, উপরন্তু বৈঠকখানা ঘরে আমোদপ্রমােদও করে, আবার বিছানাতে ঘুমােতে আরম্ভ করেছে -তখন কেউ কেউ বিচলিত হয়ে উঠল। বক্সায় শুধু এই বলে নিশ্চিন্ত হ’ল যে ‘নেপােলিয়ন সর্বদা নিভুল’, কিন্তু ক্লোভারের বিশ্বাস যে ওর বেশ মনে পড়ছে, বিছানায় শশয়ার বিরুদ্ধে স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। ক্লোভার গােলাবাড়ির কোণে গিয়ে স্ক্যানিম্যাল ফার্ম সপ্তঅনুজ্ঞা পড়ে নিজের ধারণাটা যাচাই করবার জন্য চেষ্টা করল। যখন বুঝতে পারলে যে, ও শুধু অক্ষরগুলাে আলাদা আলাদা পড়তে পারে এবং কিছুতেই পদগুলো পুরােপুরি পড়তে পারলে না, তখন ও মুরিয়েলকে ডেকে আনলে। ও মুরিয়েলকে বললে—“চার নম্বর অনুজ্ঞাটা পড়ে দাও ত ! আচ্ছা, ওতে এমন কথা লিখছে না যে, বিছানায় শােবে না কখনও? খানিকটা কসরৎ করে মুরিয়েল বানান করে পড়ল, এই ত লিখছে, কোনো পশু বিছানাতে শশাবে না, চাদর পেতে। মুরিয়েলের পড়া চুকল। আশ্চর্যের ব্যাপার, ক্লোভার কিছুতেই মনে করতে পারল না যে চতুর্থ অনুজ্ঞাতে চাদরের উল্লেখ ছিল কিনা। কিন্তু দেওয়ালের ওপর যখন স্পষ্টাক্ষরে চাদরের কথা রয়েছে তখন অবশ্য সেটাই ঠিক। আর ঠিক এই সময়েই স্কুইলার গােটা দুই তিন কুকুর সঙ্গে করে ওইধার দিয়ে কোথায় যেন যাচ্ছিল-সে সমস্ত ব্যাপারটা যথােচিত পরিপ্রেক্ষিতে দেখিয়ে দিল। সে বলে—কমরেডগণ, তােমরা তাহলে শুনেছ যে আমরা শুয়ােরেরা বসতবাড়ির বিছানাতে ঘুমােই? কিন্তু কেন শােবাে না বল? তােমরা নিশ্চয় মনে করাে না যে, বিছানায় শোয়ার উপর কোনাে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে? বিছানা বলতে কি বােঝায়, যাতে শুয়ে ঘুমােনাে হয় তাই বিছানা। আস্তাবল বা খোয়াড়ের মত জায়গায় খড়ের গাদাকেই আমরা বিছানা বলি। আপত্তি রয়েছে ওই চাদরের বেলাতে-যেহেতু চার হচ্ছে মানুষের আবিষ্কত। আমরা বসতবাড়ির বিছানা থেকে চাদর দূর করে দিয়ে শুধু কম্বল মুড়ি দিয়ে ঘুমােই। তাও বেশ আরামের।

৬৮ হ্যানিম্যাল ফার্ম কিন্তু মাথা খাটানাের কাজে যাদের সব সময় ব্যস্ত থাকতে হয় সেই শূকর- সমাজের যতটুকু প্রয়ােজন, একথা আমি বলতে পারি যে সে বিছানা তার চেয়ে মােটেই বেশি আরামদায়ক নয়। কৰেডগণ, তােমরা নিশ্চয় আমাদের এই বিশ্রাম থেকে বঞ্চিত করতে চাও না, চাও কি? তােমরা নিশ্চয় চাও না যে আমরা এমন প্রান্ত হয়ে পড়ি যার দরুন আমাদের কর্তব্য সমাধা করতে পারব না? নিশ্চয় তােমরা চাওনা যে জোন ফিরে আসুক আবার ? তৎক্ষণাৎ পশুরা তার শেষ কথায় সমর্থন জানাল। এরপর আর শূকরদের বিছানায় শােয়া নিয়ে কেউ কোনাে কথা কয় নি। এবং এর কিছুদিন পরে যখন ঘােষণা করা হ’ল যে, খামারের আর সব পশুরা শয্যা ত্যাগ করার এক ঘণ্টা পরে শূকরেরা সকালে উঠবে তখনও কেউ কোননা অভিযােগ করল না। শরৎকাল এল। পশুরা পরিশ্রান্ত তবু তারা খুশি। এ বছরটা ওদের খুব কষ্টে কেটেছে, খড় আর শস্যের অনেকখানি বেচে দেওয়ার দরুন শীতের সঞ্চয় হিসাবে খুব বেশি কিছু অবশিষ্ট ছিল না—কিন্তু হাওয়া কলের আশাই যাবতীয় ক্ষতি পূরণ করেছে। ওটা তৈরীর কাজ প্রায় আধাআধি এগিয়ে গেছে। ফসল তােলার পর বেশ কিছুদিন শুনাে খটখটে গেল, সেই সময়ে পশুরা আরও বেশি পরিশ্রম করে কাজ এগিয়ে দেবার চেষ্টা করে। যদি দেওয়ালের গাঁথনীটা, একফুট বেশি ভােলা যায় তাহলে ততটাই এগিয়ে রইল—অতএব সারাদিন ব্যস্তভাবে পাথর যােগান দেওয়ার আর কামাই নেই। বক্সার আবার চাঁদের আলােতে রাত্তিরবেলা দু-একঘণ্টা কাজ করে একা-একা। অবসর সময়ে পশুরা অর্ধসমাপ্ত হাওয়া কলের চারধারে ঘুরে বেড়ায় আর অবাক হয়ে দ্যাখে—কি ম্যানিম্যাল ফার্ম করে ওরা এমন বিরাট আর চমৎকার দেয়াল তুলতে পারল, কেমন খাড়া হয়ে মাথা তুলে হাওয়া কলটা দাড়িয়ে রয়েছে। একমাত্র বেঞ্জামিনই এসব ব্যাপারে উৎসাহ দেখাতে নারাজ। অবিশ্যি স্বভাবসিদ্ধ দু-একটা বাঁকা মন্তব্য ছাড়া সে বিশেষ কিছু বলে না, সে হয়ত বলে—“গাধারা অনেক দিন বাঁচে। নভেম্বর সঙ্গে নিয়ে এল নৈঋতের গর্জনমুখর প্রবল বায়ুবেগ। সব ভিজে যাচ্ছে, সিমেন্ট ধরিয়ে রাখা যাচ্ছে না—অতএব গাঁথনীর কাজ বন্ধ করতে হ’ল। অবশেষে একদিন রাত্রে ঝড়ের প্রখরতা এত বাড়ল যে খামার বাড়ির বনিয়াদগুলাে পর্যন্ত কঁপতে লাগল, গােলাবাড়ির ছাদের মাথা থেকে গােটাকয়েক টালি উড়ে গেল। মুরগীগুলাের ঘুম ভেঙে গিয়ে তারা ভয়ের চোটে চেঁচামেচি জুড়ে দিল—ওরা সবাই নাকি দুঃস্বপ্ন দেখেছে, দূরে কোথায় কামানের গর্জন হচ্ছে। পরদিন সকালে জানােয়ারেরা ঘুম ভেঙে বাইরে বেরিয়ে দেখল পতাকা-দণ্ড ধরাশায়ী হয়েছে, বাগানের একটি দেবদারু গাছ মূলাে ভােলার মত উপড়ে পড়ে রয়েছে। এর পরমুহূর্তে যে দৃশ্য ওরা দেখল তাতে প্রত্যেকের কণ্ঠ থেকে হতাশ করুণ স্বর বেরিয়ে এল—চোখের সামনে এ কী ভয়াবহ দৃশ্য হাওয়া কল ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়ে গেছে। নিমেষে সবাই দৌড়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে হাজির হ’ল। নেপােলিয়ন সাধারণতঃ ধীরে ধীরে ছাড়া চলে না, সে-ই সকলের আগে ছুটে হাওয়া কলে পৌছল। এই ত তাদের সম্মুখে হাওয়া কলের বনিয়াদ ভূমিসাৎ হয়ে পড়ে রয়েছে, তাদের এতদিনের পরিশ্রমের ফল মাটিতে মিশে গেল—কী কষ্ট করে ওরা সব পাথর জড়ো করে ইমার গড়বার জন্যে প্রাণপাত করেছে, সেই সব পাথরের টুকরাে মাটিতে ফ্ল্যানিম্যাল ফার্ম ছড়িয়ে পড়েছে হাওয়া কলের গাঁথনী আর নেই। প্রথমটা কাবাের মুখেই কথা সল না—শুধু শােকার্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। নেপােলিয়ন অস্থিরভাবে পায়চারী করছে, মাঝে মাঝে মাটি শুকে কী যেন পরখ করছে। লেজটা শক্ত হয়ে একবার এপাশ একবার ওপাশ ঘােরাচ্ছে সে। এটা মানসিক চঞ্চলতার লক্ষণ। সহসা সে থমকে দাঁড়াল, যেন মন স্থির করে ফেলেছে। করে গণ’, সে শান্তকণ্ঠে বল—তােমরা জান, এর জন্য কে দায়ী ? তােমরা কি আন্দাজ করতে পারাে রাতারাতি আমাদের হাওয়া কলের সর্বনাশ করবার জন্যে কোন শত্রু এসেছিল ? মােবল! সে হঠাৎ গর্জন করে উঠল--মোবল এই কাণ্ড করেছে। আমাদের পরিকল্পনাকে বানচাল করবার জন্যেই সে আক্রোশবশে এই শত্রুতা করেছে। তাকে তাড়িয়ে দিয়েছ তােমরা, সেই অপমানের প্রতিশোেধ নেবার উদ্দেশ্যে ওই বিশ্বাসঘাতকটা রাত্রের অন্ধকারে গা-ঢাকা দিয়ে এসে আমাদের পুরাে একটি বছরের মেহনৎকে এইভাবে ব্যর্থ করে দিয়েছে। করেগণ, আমি এখনই এইখানে পঁড়িয়ে মােবলের মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিলাম। আর যে তাকে জীবন্ত ধরে নিয়ে আসতে পারবে, তাকে পুরাে এক বুশেল আপেল পুরস্কার দেওয়া হবে। যে কেউ তার অপরাধের শাস্তি দিতে পারবে, তাকে “দ্বিতীয় শ্রেণীর পশুবীর উপাধিভূষিত করা হবে এবং তাকে আধ বুশেল আপেল উপহার দেওয়া হবে। এমন কি নােবলও যে এই ধরনের অপরাধ করতে পারে একথা জেনে সবাই যৎপরােনান্তি ক্ষুন্ন হ’ল ! ক্ষুব্ধ গর্জনধ্বনি শােনা গেল চারদিকে। এবং সকলেই ভাবতে লাগল পুনরায় যদি গােল এখানে আসে তাহলে ফ্যানিম্যাল ফার্ম ৭১ কীভাবে তাকে ফাদে ফেলবে?••••••এর অল্পকালের মধ্যেই টিলার নীচে ঘাসের ওপর একটি শূকরের পায়ের ছাপ আবিষ্কৃত হ’ল। অবশ্য সে দাগটা কয়েক গজ গিয়েই নিশ্চিহ্ন হয়েছে। তবে অনুমান করা যাচ্ছে যে, বেড়ার কাছাকাছি একটা গর্তে গিয়ে দাগটা মিলিয়েছে। নেপােলিয়ন কে কে বলে দিল যে, এ পায়ের দাগ নির্ঘাৎ পােবলের। সে আরও বললে যে, তার বিশ্বাস স্নােবল ওই ফউভের দিক দিয়েই খুব সম্ভব খামারে ঢুকেছিল। পায়ের ছাপ পরখ শেষ হয়ে যাবামাত্র নেপােলিয়ন হাঁক দিল- কমরেডগণ ! আর সময় নষ্ট করলে চলবে না! কাজ পড়ে রয়েছে। আজই সকালে আমরা নতুন করে হাওয়াল গড়তে শুরু করব। সারাটা শীতকাল, আমরা একাজ করব—বােদই হােক বা বৃষ্টি ঝরুক তাতে কিছু এসে যায় না। এই বিশ্বাসঘাতককে দেখিয়ে দেবাে যে আমাদের পরিকল্পনাতে এতটুকু রদবদল হবে না, পূর্বপরিকল্পনামত দিনেই আমরা হাওয়াল শেষ করব। এগিয়ে চলাে কমরেড ! হাওয়াকল দীর্ঘজীবী হােক। য্যানিম্যাল ফার্ম দীর্ঘজীবী হােক! (1) তীব্ৰ কঠিন হাড় কাঁপানাে শীত। ঝড়াে হাওয়ার মাতুনীর পর তুষার এবং শিলাবৃষ্টি চলে। তারপর চারদিক বরফে জমে গেল। অবস্থা কাটতে কাটতে ফেব্রুয়ারী মাস কাবার হ’ল। পশুরা চরম ক্লেশসহকারে এই প্রতিকূল আবহাওয়ায় যথাসম্ভব গাঁথুনীর কাজ করছে এবং একথা ওরা ভালাে করেই জানে যে বাইরের মানুষগুলাে খুব কৌতুহলী হয়ে গুদের সবকিছু নজর রাখছে। এও ঠিক যে, পশুর ৭২ হ্যানিম্যাল ফার্ম যথাসময়ে হাওয়াল গড়ে তুলতে না পারলে মানুষগুলাে বিজয়ােল্লাসে মেতে উঠবে। এতে বিদ্বেষবশেই বােধকরি মানুষের বিশ্বাস করতে চায় না যে মােবল হাওয়াকল ভেঙে দিয়েছে, ওরা বলছে যে, দেয়ালটা খুব পাতলা হয়েছিল বলেই গাঁথনী ভেঙে গিয়েছে। কিন্তু জানােয়ারের ত জানে যে আসল ব্যাপারটা তা নয়। তবু, ওরা ঠিক করল যে এবারে আর দেড় ফুট গাঁথনীর দেয়াল করে একেবারে তিনফুট চওড়া করবে। অবশ্য আরও অনেক পাথর যােগাড় করতে হবে। দীর্ঘকাল যাবৎ খাদটা বরফে বােঝাই হয়ে রইল, সেজন্য কিছুই কাজ করা গেল না। তারপর যখন শুনাে কন্কনে তুষার ঝড় চলল তখনই কিছু কিছু কাজ চালু হ’ল। আর এই শীতে কাজ করাও খুব কঠিন। আগের মত উদ্দীপনা আর নেই, পশুরা কেমন যেন ভেঙে পড়েছে। কিরকম ঠাণ্ডা। আর ক্ষিধেটাও সর্বক্ষণ লেগে থাকে। কেবল বক্সার আর ক্লোভারই সব সময় চাঙ্গা। আর স্কুইলার সর্বদা খাশা বক্তৃতা ঝাড়ছে এমের মর্যাদা, ত্যাগের আনন্দ এইসব তার বিষয়বস্তু। কিন্তু বক্তৃতার চেয়ে ঢের বেশী উৎসাহ পায় ওরা বক্সারকে কাজ করতে দেখে, তার শক্তির বহর দেখে আর তার আরও বেশি কাজ করব’ জিগির শুনে! জানুয়ারীতে খাদ্যের ঘাটতি হল! শস্যের বরাদ্দ ঝট করে অর্ধেক হয়ে গেল, এবং ঘােষণা করা হ’ল যে তার বদলে বাড়তি আলু দিয়ে এই অভাব পূরণ করা হবে। এরপর দেখা গেল যে ভালোভাবে ঢেকে না রাখার দরুন আলুগুলাে বেশির ভাগ জমাট বেঁধে নষ্ট হয়ে গেছে, আলুগুলাে কিরকম নরম আর ব রং মেরে গেছে, তা থেকে খুব সামান্যই যানিম্যাল ফার্ম খাবার মত পাওয়া গেল। ওরা কিছুদিন শুধু তুষি আর বটিপালং খেয়ে কাটাল। অনশনের কঠিন চেহারা ওদের সামনে কুটি করে তাকিয়ে রয়েছে। এখন এই ব্যাপারটা বাইরের কেউ যাতে টের না পায় সেদিকে কড়া নজর রাখা খুব দরকার। হাওয়াকলের পতনের পর থেকে মানুষগুলাে যানিম্যাল ফার্মের সম্বন্ধে নিত্য নতুন মিথ্যে আবিষ্কারে উঠে পড়ে লেগেছে। আবার তারা রটাচ্ছে যে, দুর্ভিক্ষে আর মড়কে পশুগুলাে উজাড় হয়ে যাচ্ছে, নিজেদের মধ্যে ঝগড়া-মারামারি, আর শিশুহত্যায় পশুরা ধ্বংস হচ্ছে। এই অবস্থায় যদি এখানকার শশাচনীয় খাদ্যপরিস্থিতির কথা বাইরে প্রকাশ হয়ে পড়ে তাহলে তার শশাচনীয় পরিণাম যে কী হবে নেপােলিয়ন তা বেশ ভালাে করেই বুঝেছে। তাই সে হােয়াইপারের সাহায্যে ঠিক উল্টো খবর বাইরে বঁটাতে লাগল। এতকাল হােয়াইম্পারের সাপ্তাহিক পরিদর্শনের সঙ্গে জানােয়ারদের আদৌ কোনাে যােগাযােগ ছিল না। এবার হ’ল কি, কয়েকটি পশুকে বাছাই করে নির্দেশ দেওয়া হ’ল যে, হােয়াইম্পারকে দেখলেই ওরা নিজেদের মধ্যে আলােচনা করবে, খাদ্যবরাদ্দ বেড়ে গিয়েছে। একাজের জন্য ভেড়ারাই নিযুক্ত হ’ল। এছাড়া নেপােলিয়ন হুকুম দিল যে ভাণ্ডারশালার খালি পাত্রগুলির প্রায় পুরােপুরিটা বালি ভর্তি করে তার ওপর বাকীটা খাদ্য ও শস্য দিয়ে সাজিয়ে রাখতে হবে। সুবিধে সুযােগ মাফিক একদিন এক অছিলায় হােয়াইম্পারকে ভাণ্ডারে নিয়ে যাওয়া হল। তারপর অবশ্য সে দেখল শস্য বােঝাই পাত্রগুলি। সে খুব ঠকে গেল। এবং সে বাইরে বলে বেড়াতে লাগল যে হ্যানিম্যাল ফার্মে মােটেই খাদ্যাভাব ঘটে নি।

৭৪ য়্যানিম্যাল ফার্ম এত করেও কিন্তু জানুয়ারীর শেষে বােঝা গেল যে বাইরে থেকে আরও কিছু খাদ্যশস্য সংগ্রহ না করলেই নয়। আজকাল নেপােলিয়নকে সাধারণের সামনে বিশেষ দেখা যায় না। সে সর্বদাই খামারবাড়ী থাকে। বাড়ির প্রত্যেক দরজায় সেই ভীষণদর্শন কুকুরগুলাে পাহারায় মােতায়েন। আর যদি কখনও সে বাইরে বেরােয় তাহলে আনুষ্ঠানিকভাবে রীতিমত জাঁকজমক করে, চারপাশে ছ-টা দেহরক্ষী কুকুর নিয়ে চলে। কুকুরগুলাে কাউকে কাছে ঘেঁষতে দেখলেই প্রচণ্ড চীৎকার করে হঠিয়ে দেয়। আজকাল রবিবার সকালেও নেপোলিয়ন বিশেষ যেবােয় না, অন্য শূকর মারফতে তার হুকুম জারি করে। প্রায়ই স্কুইলার এই লাভিষিক্তের কাজ করে থাকে। এক রবিবার সকালে স্কুইলার ঘােষণা করল যে, যে সব মুরগীদের আবার ডিম পাড়বার সময় হয়েছে তাদের ডিম দিয়ে দিতে হবে। হােয়াইম্পারের মারফতে নেপােলিয়ন প্রতি সপ্তাহে চার শ’ ডিম সরবরাহের ঠিকা নিয়েছে। ডিম বেচা টাকা দিয়ে শস্য এবং খাবার কিনে গ্রীষ্মকাল পর্যন্ত খামারের রসদ চালানাে যাবে। তারপর অবশ্য পরিস্থিতি সহজ হবে। একথা কানে যেতেই মুরগীরা প্রচণ্ড গােলমাল লাগিয়ে দিল। এরকম একটা প্রয়ােজনের সম্ভাবনা হতে পারে, সেকথা ওরা এর আগে শুনে ছিল বটে, তবে বিশ্বাস করে নি যে এটা আদৌ কার্যে পরিণত হবে। ওরা এই সবে বসন্তে ডিমে তা দেবার জন্যে তৈরী হচ্ছিল। এই সময়ে ওদের কাছ থেকে ডিম কেড়ে নেওয়া মানে হত্যাকাণ্ড-ওরা এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ শুরু করল। জোন্সকে তাড়াবার পর আজ প্রথম এমন একটা ব্যাপার ঘটল যা নাকি কতকটা বিদ্রোহেরই মত। তিনটে বাচ্ছা কালাে মিনকা মুরগীর নেতৃত্বে মুরগী নেপােলিয়নকে হ্যানিম্যাল ফার্ম বিফল মনােরথ করবার জন্য উঠে পড়ে লাগল। ওরা কড়িকাঠের খাঁজের ওপর উঠে ডিম পাড়বার চেষ্টা করল-সেখান থেকে ডিমগুলাে আছড়ে মেঝেতে পড়ে নষ্ট হ’ল। তার জবাবে নেপােলিয়ন চটপট যে ব্যবস্থা করল সেটা খুব নির্মম। মুরগীদের খাবার দেওয়া একেবারে বন্ধ হ’ল- আর নেপােলিয়ন হুকুম জারি করল এই মর্মে, যদি কোনাে প্রাণী কোনাে মুরগীকে একটি দানাও খাবার দেয় তাহলে সে প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত হবে। এই আইন বলবৎ থাকছে কিনা সেটা দেখবার জন্য কুকুরের কড়া নজর রাখতে লাগল। দীর্ঘ পাঁচদিন ধরে মুরগীরা নিজেদের জেদ বজায় রাখল কিন্তু তারপর নতি স্বীকার করে যে-যার ডিম পাড়বার খাচায় গিয়ে বসল। ইতিমধ্যে ন’টি মুরগী ফতে হয়ে গেছে। তাদের বাগানে গাের দেওয়া হ’ল এবং এবং প্রচার করে দেওয়া হ’ল যে তারা কক্কাইডায়ােসিস রােগে মারা গিয়েছে। হােয়াইম্পারের কানে এসব কোনাে খবরই পৌছলাে না। এবং যথারীতি ডিম সরবরাহ করা হল। এরপর হপ্তায় একদিন খামারে পশারীর গাড়ি এসে ডিম নিয়ে যেতে লাগল। এর মধ্যে আর বেলের দেখা কেউ পায় নি। গুজব শােনা যায় যে, মােবল হয় পিঞ্চফিল্ড, নয় ফক্সউড-এর কাছাকাছি কোন খামারে আত্মগােপন করে রয়েছে। ইতিমধ্যে আশেপাশের খামারগুলাের সঙ্গে আগের চেয়ে কিছুটা খাতির জমিয়ে নিয়েছে। বছর দশেক আগে একবার বীচগাছের জঙ্গল কেটে ফেলা হয়েছিল—সেই জঙ্গলা কাঠের একটা স্তুপ মজুত রয়েছে আঙিনাতে। কাঠগুলাে এতদিন ধরে রােদে জলে বেশ কাজের উপযােগ হয়ে রয়েছে। আর বােয়াইম্পার কাঠগুলাে বেচবার পরামর্শ দিল নেপােলয়নকে। পিকিংটন আর ফ্রেডরিক, দু’জনেই ওগুলােকিনতে ৭৬ য়্যানিম্যাল ফার্ম চায়। এখন নেপােলিয়ন ঠিক করতে পারছে না দু’জনের মধ্যে কাকে দেবে, তাই একটু ইতস্তত করছে। একটা মজার ব্যাপার লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, যখন ফ্রেডরিকের সঙ্গে দরদপ্তরে খানিকটা তার বনিবনা হচ্ছে তখন শােনা যায় যে স্নােবল ফক্সউডে আত্মগােপন করে রয়েছে। আর যখন পিকিংটনের দিকে নেপােলিয়ন একটু ঝুকে পড়ে তখন প্রচার হয় যে মােবল নাকি পিঞ্চফিল্ডে আত্মগােপন করে রয়েছে। বসন্তের প্রথম দিকে হঠাৎ একটি দারুণ খবর পাওয়া গেল-স্নােবল নাকি খামারে ঘন-ঘন যাতায়াত শুরু করেছে রাত্তির বেলা ; দুঃসংবাদে পশুরা খুব বিচলিত হয়ে পড়ল-রাত্তিরের ঘুম ঘুচে গেল তাদের। বােজ রাত্তিরে সে গা-ঢাকা দিয়ে চুপি চুপি এসে যতেক প্রকার দুস্কার্য করে যাচ্ছে। সে শস্য পাচার করে, দুধের বালতি উল্টে দিয়ে যায়, ডিমগুলাে ভেঙে তচনচ করে, বীজবােনা ক্ষেত মাড়িয়ে দিচ্ছে, ফলের গাছগুলাে থেকে বাখলা ছিড়ে নষ্ট করছে সে। খামারে যতকিছু ক্ষয়- ক্ষতি বা গােলমাল হচ্ছে তা সবই স্নােবলের নামে চলে যাচ্ছে। যদি একটা জানালা ভাঙে কি নর্দমা বন্ধ হয়ে যায় তাহলে যে কেউ চোখ বুজে বলে দেবে যে মােবলই রাত্রে এসে এই অকর্ম করে গেছে। একদিন হ’ল কি ভাণ্ডারশালার চাবীটা হারালাে-সবাই তখন বুঝে ফেলল মােলই চাবীটা চুরি করে নির্ঘাৎ সেটা কুয়াতে ফেলে দিয়ে গেছে। মজার কথা হচ্ছে এই যে, যখন সেই হারানাে চাবীটা একটা ছাতুর বস্তার তলা থেকে পাওয়া গেল তখনও সকলের পূর্ব ধারণা পাল্টালাে না। গরুগুলাে সমস্বরে ঘােষণা করল যে, ওরা যখন ঘুমিয়ে থাকে সেই সময়ে মােবল গােয়াল ঘরে ঢুকে ওদের দুধ দুয়ে নিয়ে পালায়। আরও জানা ফ্ল্যানিম্যাল ফার্ম গেল যে, সে বহুৰে ইদুরগুলাে শীতে বিস্তর উপদ্রব করেছে, তারাও নােবলের সঙ্গে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। নেপােলিয়ন ফতােয়া দিল যে, মাের্বলের এবংবিধ কার্যকলাপের একটা পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুসন্ধানের প্রয়ােজন হয়ে পড়েছে। অতএব সে তার কুকুরদল পরিবৃত হয়ে খামারের ঘরদোর সমস্ত ঘুরে ফিরে পরখ করতে লাগল—অন্যান্য জানােয়ারেরাও যথােচিত দূরত্ব বজায় রেখে পিছু পিছু চলল। কয়েক পা করে সে চলে আর মাটি শুকে-শুকে যােবলের পায়ের ছাপ খুঁজে দ্যাখে, নেপােলিয়ন নাকি মাটির গন্ধ থেকে টের পায় এটা। খামারের আনাচে-কানাচে গন্ধ শুকে বেড়াল নেপােলিয়ন, গােয়ালে, মুরগী ঘরে, শজী বাগানে, এক কথায় খামারের সর্বত্রই মােবলের পায়ের ছাপ সে আবিষ্কার করল। মাটিতে লম্বা মুখটা লাগিয়ে ঘন-ঘন নাক ঝাড়া দিয়ে সে বিকট গর্জন করে ওঠে‘মােবল । সে এখানে এসেছিল। পরিষ্কার তার গন্ধ পাচ্ছি। হু। আর ‘শােবল’ উচ্চারণ শুনলেই কুকুরগুলাে এমন ভীষণ গর্জন করে দাত খিচোয় যে তাতে ভয়ে জানােয়ারগুলাের রক্ত হিম হয়ে আসে। জানােয়ারেরা রীতিমত আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। ওদের মনে হচ্ছে যেন স্নােবল একটা অদৃশ্য দুষ্ট শক্তি। এই দুষ্ট শক্তিটা ওদের চারিপাশের বাতাসের সঙ্গে যেন মিশে থেকে যত রকম সর্বনাশের ভয় দেখাচ্ছে। সেদিন সন্ধ্যের সময় স্কুইলার ওদের সকলকে এক জায়গায় জড়াে করে ভয়ত্রস্ত মুখে জানালো যে, একটা গুরুতর খবর দেবার ভার তার ওপর পড়েছে। করেগণ! ব’লে সে কয়েকটা ছােট্ট লাফ দিয়ে বিচলিত ভাবটা সামলাতে সামলাতে বলল—একটা ভয়ঙ্কর মারাত্মক ব্যাপার ধরা ফ্ল্যানিম্যাল ফার্ম এ সবই পড়েছে। স্নােবল পিঞ্চফিরে ফ্রেডরিকের কাছে আত্মবিক্রয় করেছে। ফ্রেডরিক নাকি এখনও আমাদের আক্রমণ করে খামারখানা কেড়ে নেবার মতলব চালাচ্ছে! যখন আক্রমণ শুরু হবে তখন মােবল ওদের পথ দেখিয়ে আনবে, এই মতলব। দাড়াও, এর চেয়েও মারাত্মক খবর আছে। আমরা মনে করেছিলাম যে, মােবলের বিদ্রোহের মূল কারণ ছিল তার উচ্চাশা আর অহংকার। কিন্তু সেটা সর্বৈব ভুল কমরেড। আসল ব্যাপার কি জানাে, গােড়াগুড়ি থেকেই মানে যখন আমরা জোনকে তাড়াই তখন থেকেই মােবল জোসের সঙ্গে ষড়যন্ত্রে জড়িত। বরাবর সে জোসের গুপ্তচরের কাজ করে এসেছে। নথীপত্র থেকে প্রমাণিত হয়েছে। মোবল পালাবার সময় যে সব কাগজপত্র ফেলে গিয়েছিল সেগুলােতেই এসব প্রমাণ রয়েছে—এই নথীপত্রগুলি আজই সবেমাত্র আবিষ্কৃত হয়েছে। আমার কাছে সব জিনিসটা এখন বেশ পরিষ্কার হয়ে গেছে কমরেডগণ ! সে যে কীভাবে গােশালা যুদ্ধে আমাদের হারিয়ে সর্বনাশ করে দেবার জন্য ফাদ পেতেছিল সেকথা তােমাদের মনে আছে। অবিশ্যি খুব বরাত জোর যে তার মতলব বানচাল হয়েছিল তাই আমরা রক্ষে পেয়ে গেছি। কেমন, তােমাদের মনে পড়ছে না সেকথা ? জানােয়ারেরা ত অবাক! মােবল যেদিন হাওয়াল ধ্বংস করেছিল সেদিনের তুলনায় আজকের এই দুবৃত্ত দুবৃর্তত হাজার গুণ বেশি। কিছুক্ষণ কেটে গেল, খবরটা যেন ওরা পুরােপুরি বিশ্বাস করতে পারে । ওদের বেশ পরিষ্কার মনে পড়ছে, গােশালার সংগ্রামে মােবল কিভাবে সকলের আগে তেড়ে গিয়েছিল আক্রমণ করতে, প্রতিপদে কিভাবে খােবল ওদের উৎসাহিত করেছিল, জোসের গুলীতে জখম ম্যানিম্যাল ফার্ম ৭১ । হয়েও সেদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে সে কিভাবে লড়াই চালিয়েছিল, এসবই ওদের মনে রয়েছে, অন্ততঃ ওদের যেন মনে হচ্ছে যে ব্যাপারটা এইরকমই ঘটেছিল। প্রথমটা ওরা কিছুতেই বুঝতে পারে না, কীভাবে বেলের সঙ্গে জোসের যােগামােগটা ঘটল ! এমন কি বক্সারও কথাটার থেই ধরতে পারে না। সচরাচর সে বিনা প্রশ্নে সব কিছু মেনে নেয়। সে কিছুক্ষণের জন্য সামনের পা দুটো মুড়ে চোখ বুজে চিন্তাসূত্রগুলি পরপর সাজিয়ে ব্যাপারটা বােঝবার চেষ্টা করে। সে বললে—“আমি একথা বিশ্বাস করি না। গােশালার যুদ্ধে মােবল বীরত্ব সহকারে লড়াই করেছিল। আমি নিজে তাকে দেখেছি। আর এই যুদ্ধের পরেই আমরা কি তাকে প্রথম শ্রেণীর পশুবীর উপাধি দিই নি ? কমরেড, সেটা আমাদের ভুল হয়েছিল। কারণ আমরা এখন জেনেছি, যে কাগজগুলাে আমরা পেয়েছি—তার সেই গুপ্ত নথীপত্রে লেখা রয়েছে যে, সে আমাদের ডােবাবার তালেই ছিল— বক্সার বললে—“কিন্তু সে আহত হয়েছিল—আমরা সবাই তার গা দিয়ে রক্ত ঝরতে দেখেছি—সেই অবস্থায় সে ছুটোছুটি করছিল। ‘আহা সেটাও তার চক্রান্তের একটা অঙ্গ—সুইলার চেঁচিয়ে উঠল-জোনস গুলী ছুড়েছিল শুধু ওর গায়ে আঁচড় লাগাবার জন্যে। তােমরা পড়তে জানলে দেখিয়ে দিতে পারতুম, একথাও সে নিজেই লিখে রেখেছে। মােবলের মতলব ছিল, ঠিক সঙ্কটমুহূর্তে আমাদের সকলকে পালাবার সঙ্কেত করবে—তারপর শত্রুর হাতে সবকিছুই গিয়ে পড়ত। সে প্রায় কাজ হাসিল করে এনেছিল। আমি একথাও জোর দিয়ে বলতে পারি যে, মােবল শেষ পর্যন্ত কৃতকার্য হত—শুধুমাত্র আমাদের নেতা, বীর নেপােলিয়নের জন্যই সে পারে নি।

धानिमान काम তােমাদের কি মনে পড়ে, যখন জো তার লােকজন নিয়ে আঙিনার মধ্যে ঢুকে পড়ল তখন হঠাৎ মােবল উল্টোদিকে পালাতে শুরু করেছিল। আর তার পিছু পিছু অনেকগুলাে জানােয়ারও তাকে অনুসরণ করেছিল। আচ্ছা তােমাদের কি মনে পড়ছে না, যে, যখন সবাই ভয় পেয়ে গেল, মনে হ’ল যেন সব গেল-গেল ঠিক সেই সময়ে কমরেড নেপােলিয়ন লাফিয়ে উঠে হাঁক দিলাে-“মাবাে--মানুষকে মানাে ?” আর জোসের পায়ে ক্যাক করে দাত বসিয়ে দিল নেপােলিয়ন ? তােমাদের নিশ্চয় সেকথা মনে আছে কমরেডগণ ! ব’লে স্কুইলার ঘন ঘন দুলতে লাগল এপাশ-ওপাশে। স্কুইলার এমন নিখুতভাবে বিবরণ দিয়ে গেল যে জানােয়ারদের মনে হ’ল যেন, সত্যিই ওদের সেসব কথা মনে পড়ছে। সে যাই হােক, ওদের মনে পড়ল যে সংকটকালে মােবল সত্যিই পালাবার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু এতেও বক্সারের অস্বস্তি কাটল না। ‘খােবল যে গােড়ার দিকে বিশ্বাসঘাতকতা করত একথা আমি বিশ্বাস করি না। সে বলল-পরে সে যা করেছে তা অন্যকথা। কিন্তু গােশালার যুদ্ধের সময় সে যে সং কমরেড ছিল এ আমি বিশ্বাস করি। ‘আমাদের নেতা কমরেড নেপােলিয়ন স্পষ্টই বলে দিয়েছে একেবারে পরিষ্কার বলে দিয়েছে, বন্ধুগণ—যে স্নােবল একেবারে আদিকাল থেকেই জোসের চর ছিল—'স্কুইলার দৃঢ় অথচ ধীরকণ্ঠে বলল—একেবারে সেই আমল থেকে, যখন আমরা কেউ বিপ্লবের কথা কল্পনা করি নি তখন থেকে গােল জোসের চর। ‘অবিশ্যি, সে আলাদা কথা, বক্সার বলল—“যদি কমরেড নেপােলিয়ন একথা বলে থাকে তবে তাই ঠিক।

হ্যানিম্যাল ফার্ম ৮১ এই হ’ল সচ্চা মেজাজ, কমরেড স্কুইলার সজোরে ঘােষণা করল। কিন্তু দেখা গেল যে সে বক্সারের দিকে বিশ্রীভাবে পিট-পিটে চোখে একবার তাকাল। তারপর চলে যাবার জন্যে ঘুরে দাড়িয়ে একটু থেমে বলল—“আমি এখানকার সব পশুকে সতর্ক করে দিচ্ছি- প্রত্যেকে বেশ হুশিয়ার হয়ে চলাে। কারণ আমাদের ধারণা হচ্ছে- সেরকম ধারণা করবার কারণও রয়েছে যে যােবলের দলের গুপ্তচর আমাদের আশপাশেই এই এখানেই—হয়ত এখনই ঘােরাফেরা করছে। স্কুইলারের কণ্ঠস্বরে যথেষ্ট গুরুত্বের আভাস রয়েছে। চারদিন পরে, বিকেল গড়িয়ে তখন সন্ধ্যের দিকে চলেছে, এমন সময়ে নেপােলিয়ন হুকুম দিল—সব জানােয়ারকে আঙিনাতে সমবেত হতে হবে এখনই। যখন ওরা সবাই এসে জড়াে হ’ল তখন নেপােলিয়ন বসতবাড়ি থেকে বেরুলাে~তার চারপাশে ন’টি কুকুর আর অংগে দুটো মেডেল। ইদানীং সে নিজেকেই প্রথম শ্রেণীর পশুবীর’ এবং ‘দ্বিতীয় শ্রেণীর পশুবীর’ খেতাব দিয়ে দিয়েছে—মেডেল দুটি সেই খেতাবের স্মারকচিহ্ন। কুকুরগুলাের গর্জনে পশুদের পাঁজরায় খিল ধরে যাচ্ছে ভয়ের চোটে। ওরা সবাই যে যার নিজের ঠায়ে চুপ করে গুটিসুটি বসে আছে। কি জানি কেন মনে হচ্ছে, আজ একটা ভীষণ কাণ্ড হয়ে যাবে। নেপােলিয়ন উঠে দাড়িয়ে তার শ্রোতাদের দিকে কঠিন দৃষ্টিতে নজর বুলিয়ে নিল। তারপর চডগলায় আওয়াজ ছাড়ল সে। তৎক্ষণাৎ কুকুরগুলাে লাফিয়ে এগিয়ে গেল, চারটে শূয়াের বাচ্ছার কান কামড়ে ধরে হিড়হিড় করে এনে হাজির করল নেপােলিয়নের পদতলে। ওদিকে শুয়াের বাচ্ছাগুলাে যন্ত্রণায়, ভয়ে কাঁদতে শুরু করেছে।

ফ্যানিম্যাল ফার্ম ওদের কান দিয়ে রক্ত ঝরছে। কুকুরগুলাে একবার রক্তের স্বাদ পেয়ে যেন পাগল হয়ে গিয়েছে। সমবেত পৰু সমাজের বিস্ময়ের অবধি রইল না, যখন তারা দেখল যে তিনটে কুকুর গিয়ে বক্সারের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে। বক্সার ওদের আসতে দেখেই তার সামনের পা দুটো উচুতে তুলে একটা কুকুরকে শূন্যে লুফে নিল, তারপর মাটিতে ঠেসে ধরল পা দিয়ে। কুকুরটা কেঁউ-কেঁউ করে মাপ চাইতে লাগল, বাকী দুটো লেজ গুটিয়ে পালাল। বক্সার নেপােলিয়নের দিকে তাকিয়ে যেন জিজ্ঞাসা করল—“কুকুরটাকে টিপে মেরে ফেলব—না, ছেড়ে দেব ? নেপােলিয়নের মুখের চেহারা যেন হঠাৎ পাল্টে গিয়েছে। সে বক্সারকে তিরস্কারের ভংগিতে কুকুরটাকে ছেড়ে দিতে বলল। বক্সার সংগে সংগে পা উঠিয়ে নিল, কুকুরটা সুড়ুৎ করে পালাল—তার দু-এক জায়গা আঁচড়ে গেছে, কেউ কেউ করে ডাকছে। অল্পক্ষণের মধ্যেই গােলমাল থেমে যায়। শুয়াের ক’টা দাড়িয়ে ঠক্ঠক্ করে কাঁপছে, ওদের মুখের প্রতিটি রেখায় যেন অপরাধের ছাপ পড়ে রয়েছে। নেপােলিয়ন এবারে ওদের স্বীকারােক্তি করতে আদেশ দিল। এই চারটে শূয়াের বাচ্ছাই রবিবারের সভা বন্ধ করার বিরুদ্ধে বক্তৃতা করেছিল। বিনা প্ররােচনাতেই তারা স্বীকার করল যে, যেদিন মােবলকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে সেদিন থেকে তারা গােপনে মাের্বলের সঙ্গে যােগাযােগ রেখে থাকে। ওরাই গােবলের সঙ্গে মিলেমিশে হাওয়াল ধবংস করেছে। ওরা ফ্রেডরিকের হাতে হ্যানিম্যাল ফার্ম তুলে দেবে এরকম একটা গােপন চুক্তিও ওদের মধ্যে হয়েছে। তারা একথাও হ্যানিম্যাল ফার্ম বলল যে, মাের্বল তাদের কাছে স্বীকার করেছিল যে, সে দীর্ঘকাল জোসের গুপ্তচর ছিল। শূয়ােরদের স্বীকাৰােক্তি শেষ হতেই কুকুরের তাদের টুটি ছিড়ে ফেলল। এরপর ভয়ংকর কণ্ঠে নেপােলিয়ন জানতে চাইল, আর কোনাে জানােয়ার কিছু স্বীকারােক্তি করতে চায় কি না! সেই যে তিনটি মুরগী ডিম-না-দেবার দলে সর্দারী করে বিপ্লব বাধাতে চেষ্টা করেছিল, তারা এগিয়ে এল। এবং বলল যে, মাের্বল তাদের স্বপ্নের মধ্যে দেখা দিয়েছিল এবং নেপােলিয়নের আদেশ অমান্য করতে প্ররােচিত করেছিল। এদেরও হত্যা করা হ’ল। এরপর একটি রাজহাঁস এগিয়ে এসে স্বীকার করল যে, সে গতবছরের ফসল থেকে ছ’টি শস্যের শিষ, চুরি করে, সেগুলো সে রাত্রিতে খেয়ে ফেলেছিল। তারপর একটি ভেড়া বলল যে, সে খাবার জলের পুকুরে প্রস্রাব করে ফেলেছে। তার এই কুকাজের পেছনেও নাকি স্নােবলের প্রেরণা রয়েছে—একথা সে স্বীকার করল। আরও দু-টি ভেড়া স্বীকার করল যে, তারা একটা বুড়াে মেষকে জঞ্জালের আগুনের চারপাশে তাড়িয়ে তাড়িয়ে ছুটিয়ে মেরে ফেলেছে—এই মেষটি নেপােলিয়নের গোড়া ভক্ত, অবিশ্যি কাশিতে ভুগছিল, বুড়ােও হয়েছিল। এদের সকলকে তৎক্ষণাৎ হত্যা করা হল ঐখানেই। এমনিতর স্বীকাবােক্তির কাহিনী আর বিচারের জের চলল—দেখতে দেখতে নেপােলিয়নের পায়ের সামনে মৃতদেহের স্তুপ জমে গেল, রক্তের গন্ধে বাতাস ভারী হয়ে উঠল। জোসের নির্বাসনের পর আজ পর্যন্ত এরকম কাণ্ড কেউ চোখে দেখে নি, কল্পনাও করতে পারে নি। বিচারপর্ব চুকে গেলে পর শুকর আর কুকুরেরা ছাড়া আর সব জন্তুই একসঙ্গে গুটিগুটি চলে এল। ওদের মন খারাপ—সবকিছু যেন ওলট- ৮৪ ফ্যানিম্যাল ফার্ম পালট হয়ে গেছে। ওরা বুঝে উঠতে পারছে না কোন ব্যাপারটা বেশি বীভৎস—যে পশুরা মাের্বলের সঙ্গে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছিল তাদের বিশ্বাসঘাতকতা ; না সেই অপরাধের প্রতিশােধের যে নমুনা ওরা চোখে দেখে এল সেইটে। অতীতের ইতিহাসে ঠিক এইরকম ভয়াবহ রক্ততাণ্ডবের নমুনা খুঁজলে মেলে—কিন্তু আজকের এই বীভৎস কাণ্ড যা ওদের নিজেদের মধ্যে ঘটেছে, এটা আরও অনেক বেশি পাশবিক বােধ ' হচ্ছে। জো চলে যাবার পর থেকে আজ পর্যন্ত কোনাে পশুই অন্য পশুকে খুন করেনি। এমন কি একটা ইদুরও কেউ মারে নি। ওরা সবাই মিলে সেই টিলাটার ওপরে গিয়ে অর্ধসমাপ্ত হাওয়ালের ধারে বসে পড়ল, সবাই কেমন মিইয়ে গেছে, একটু বােদের তাপে গা গরম করার জন্য সবাই গা-ঘেষাঘেষি করে বসল ক্লোভার, মুরিয়েল, বেঞ্জামিন, গরুগুলাে, ভেড়ার পাল, রাজহাঁস আর মুরগীর পাল। সব্বাই। শুধু বাদ রয়েছে কেবল বেড়ালটা, নেপােলিয়ন পশুদের জমায়েৎ হ’তে নির্দেশ দেবার আগেই সে হঠাৎ উধাও হয়েছে। ওরা কেউ কোনাে কথা বলে না কিছুক্ষণ। বক্সারই কেবল বসে নি, পায়চারি করছে আর কালাে লেজটা মাঝে মাঝে পিঠের ওপর বুলিয়ে সে মৃদু চিহি রব করছে—অবাক হয়ে গেছে সে। শেষকালে সে বললে—“আমি এটা বুঝতে পারছি না। আমাদের খামারে যে এমন কোন ব্যাপার ঘটতে পারে—এটা মন কিছুতেই মানতে চায় না। নিশ্চয়ই আমাদের কোনাে দোষ আছেনইলে এটা ঘটত না। এ থেকে বাঁচতে হলে, আমি দেখছি, আরও বেশি কাজ করতে হবে।

হ্যানিম্যাল ফার্ম এরপর থেকে আমি রােজ সকালে সকলের চেয়ে পুরাে একঘণ্টা আগে উঠব। তারপর সে কদমচালে আওয়াজ করতে করতে পাথরের খাদের দিকে চলে গেল। সেখানে পৌছে, পর পর দু ভার পাথর বােঝাই করে একাই টেনে নিয়ে হাওয়ালের কাছে জমা করে রেখে তবে রাত্রের মত বিশ্রাম নিল। আর সব পশু ক্লোভারকে ঘিরে চুপ করে বসে রইল। এই ঢিবিতে বসে ওরা চৌদিকের পল্পীর পরিবেশ দেখতে পায়। যানিম্যাল ফার্মের প্রায় সবটাই দেখা যাচ্ছে। সামনের বিস্তৃত মাঠখানা গিয়ে মিশেছে বড় শড়কে, খড়ের ক্ষেত, ঝােপ-ঝাড়, জলাশয়, গমের ভূয়ে ঘন সবুজ কচি কচি শিষগুলাে আগামী ফসলের আশা নিয়ে বাড়ছে, আরও দূরে খামার বাড়ির ছাদের লাল টালিগুলাের মাথায় চিমনীর ধূমপুঞ্জ। বসন্তের নির্মল একটি সন্ধ্যা। মাঠের ঘাসে, ঝােপের গায়ে, দিবাশেষের রােখানি নুয়ে পড়ে ঝলমল করছে। আজকের মত এমন গভীরভাবে অনুভব করে নি ওরা কেউ-এ সবই ওদের আপন, এর প্রতিটি রেণুতে ওদের একান্ত অধিকার যেন পরম বিস্ময়ে প্রিয়তম হয়ে উঠল আজকের এই সন্ধ্যায়। জলভরা চোখে ক্লোভার চেয়ে থাকে পাহাড়ের খাদের ও যদি মনের কথাটি গুছিয়ে বলতে পারত তাহলে এই কথাই বলত যে, কয়েক বছর আগে মানুষকে পরাস্ত করবার সংকল্পে যেদিন শপথ নিয়েছিল ওরা, সেদিন যে লক্ষ্য ছিল তার সঙ্গে আজকের এই ব্যাপারের মিল নেই। আজ ওরা যা পেয়েছে ঠিক তা চায় নি। মেজর যেদিন ওদের রক্তে বিপ্লবের প্রথম উদ্দীপনা জাগিয়েছিল সে রাত্রে ওর। আজকের এই হত্যাবিভীষিকার ভবিষ্যৎ ছবি দেখতে চায় নি । দিকে।

য়্যানিম্যাল ফার্ম ক্লোভার নিজের মনে যে ভবিষ্যতের ছবি কল্পনা করত, তাতে ছিল পাশমুক্ত পশুসমাজ—যে সমাজে চাবুকের শাসন নেই, ক্ষুধার তাড়না নেই, যে সমাজে সবাই সমান, যেখানে সবাই নিজের সাধ্যমত মেহন করবে, দুর্বলকে যেখানে শক্তিমানেরা রক্ষা করবে সেই সমাজের ছবিই ক্লোভারের সামনে ছিল। যেমন করে বুড়াে মেজরের বক্তৃতা-সভাতে ক্লোভার নিজের পায়ের ঘেরা দেয়ালে হাঁসের ছানাগুলােকে আশ্রয় দিয়েছিল, সেইভাবে দুর্বলকে বাঁচিয়ে রাখার কথাই ও ভেবেছে। কিন্তু তা না হয়ে এমন দুঃসময় এল কেন—যেখানে কেউ মন খুলে কথা কইতে ভরসা পায় না—চারিদিকে হিংস্র কুকুরের তর্জনগর্জন করে ঘুরে ঘুরে খবরদারী করে বেড়াচ্ছে। যখন তােমার চোখের সামনেই, তােমারই কোনাে কমরেড় মারাত্মক অপরাধের স্বীকারােক্তি করে, কুকুরের কামড়ে টুকরাে টুকরাে হয়ে ছিন্নবিচ্ছিন্নভাবে মরবে—এ কত দুর্দিন তা তুমি জানন না। ক্লোরের মনে কোনাে বিদ্রোহের ভাব নেই, নেই কোনাে অবাধ্যতার সুর। ও বেশ ভালাে করেই জানে যে, এখন এই অবস্থাতেও ওরা মানুষের আমলের চেয়ে ঢের ভালাে আছে। এবং আর সবকিছু ছেড়ে দিয়ে সেই চেষ্টাই করতে হবে যাতে মানুষ ফিরে আসতে না পারে। যা-ঘটুক না কেন, ওকে বিশ্বস্ত থাকতে হবে, কঠিন মেহন করতে হবে, ওর ওপর যে হুকুমজারি হােক-নাকেন, ওকে তা-ই করতে হবে—এবং নেপােলিয়নের নেতৃত্ব মেনে চলতে হবে। তবু এও ঠিক যে ওরা কখনই এইভাবে বাঁচবার জন্য এতদিন এত মেহনৎ করে নি, এই ধরনের জীবন ও কল্পনাও করে নি। এইজন্য কি তারা জোসের গুলির সামনে রুখে দাড়িয়েছিল, এইজন্য কি হাওয়াল গড়তে এত য়্যানিম্যাল ফার্ম ৭ মেহনৎ করেছিল? ক্লোভাৱের মনের চিন্তাধারা এই খাতেই বইছে। ও বলে বােঝাতে পারছে না, ভাষা নেই বলে ! অবশেষে আর কিছু খুঁজে না পেয়ে ক্লোভার ‘ইংলণ্ডের পশুরা’ গাইতে শুরু করল—যেন এই গানের মধ্যেই ওর বক্তব্যের কিছুটা ছায়াপাত ঘটবে, এই গানই বুঝি ওর মনােভাবের বাহন। ওর আশপাশে যারা বসেছিল তারাও ধরল সুর। ওরা তিনবার গাইল।—আজকের ঐকতানে দীর্ঘায়ত বিষন্ন মন্থরতা বড় করুণ। এর আগে কখনও এমনভাবে ওরা গান গায় নি। ওদের তৃতীয় দফা গান শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে স্কুইলার হাজির হল- তার দুপাশে দু’টি কুকুর। সে এমনভাবে এসে পঁড়াল যেন খুব জরুরী কিছু বলতে চায় সে। তারপর স্কুইলার ঘােষণা করল কমরেড নেপােলিয়নের বিশেষ বিধানানুসারে ‘ইংলণ্ডে পশুরা নিষিদ্ধ হয়েছে। অতঃপর কেউ আর এ গান গাইতে পারবে না। জানােয়ারেরা সবাই স্তম্ভিত হয়ে গেল। মুরিয়েল চেঁচিয়ে উঠল—কেন ? স্কুইলার কঠিন ভঙ্গীতে বলল—এর আর কোন প্রয়ােজন নেই কমরেড, এ গানটি ছিল বিপ্লবের গান। কিন্তু বিপ্লবের দিন শেষ হয়ে গেছে। আজ বিকেলে বিশ্বাসঘাতকদের শান্তি দিয়ে বিপ্লবের চরম নিষ্পত্তি হয়েছে। বহির্জগতের আর অভ্যন্তরের শত্রুরা পরাভূত। ইংলণ্ডে পশুরা’ গানে আমরা আমাদের সমাজের আরও ভালাে অবস্থা কামনার প্রকাশ করি। কিন্তু সে সমাজ ত প্রতিষ্ঠিত হয়েই গেছে। এখন তাহলে আর ও গানের কোনই সার্থকতা নেই, তা বেশ বােঝা যাচ্ছে।

ম্যানিম্যাল ফার্ম যদিও পশুরা ভীতসন্ত্রস্ত তবু ওদের মধ্যে থেকে কেউ কেউ একথায় প্রতিবাদ করতে উদ্যত হয়েছিল। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে ভেড়ার দল হক জুড়ে দিল—চার পা ভালল—দু’পা খারাপ। ওরা আর থামতেই চায় না, একনাড়া কয়েক মিনিট ধরে ওই ধুয়াে চালিয়ে গেল—তাতে বিতণ্ডা বা আলােচনার সম্ভাবনা ঘুচে গেল । অতএব ইংলণ্ডের পশুরা’ গান আর কেউ শােনে নি। এর বদলে কবি মিনিমাস রচিত নূতন একটি সঙ্গীত প্রবর্তিত হয়, গানটার শুরু ‘ম্যানিম্যাল ফার্ম, যানিম্যাল ফার্ম আমি তােমার ক্ষতি করব না—দেব আরাম। এই গানটাই প্রতি রবিবার পতাকা উত্তোলনের পর পশুরা গাইতে লাগল। কিন্তু নতুন গানখানার বাণী বা সু কোন কিছুই ওদের মনঃপূত নয়—ইংলণ্ডের পশুরা’ গানের কাছে এটা কিছু নয়। (৮) দিন কয়েক পরের কথা। বিচারের বিভীষিকার আতঙ্ক যখন থিতিয়ে গেছে, তখন পশুদের মধ্যে কয়েকজনের যেন মনে পড়ে গেল কিম্বা তাদের স্মরণ আছে বলে মনে হচ্ছে যে, ছয় নম্বর অনুজ্ঞাতে স্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে : কোনাে পশুই অপর কোনাে পশুকে হত্যা করবে না। যদিচ ওরা কোনাে শূয়াের বা কুকুরের সামনে এ নিয়ে কোনাে উল্লেখ করল তবে এটা বেশ বুঝে নিল যে হত্যাকাণ্ডে অনুজ্ঞার কোনাে সমর্থন নেই। ক্লোভার অনুরােধ করল বেঞ্জামিনকে, অনুজ্ঞাটা পড়ে শােনাবার জন্য। বেয়ামিন যথারীতি সাফ জবাব দিয়ে দিল—এসব ব্যাপারের মধ্যে সে নাক গলাবে না। তখন মুরিয়েলকে নিয়ে চলল ক্লোভার। মুরিয়েল হ্যানিম্যাল ফার্ম পড়ে শােনাল, ষষ্ঠ অনুজ্ঞাতে লেখা রয়েছে—কোনাে পত আর কোনাে পশুকে হত্যা করবে না “বিনা কারণে”। কি করে যেন শেষের দুটি কথা পশুদের স্মরণপথ থেকে বেমালুম মুছে গিয়েছে। এখন ওরা দেখতে পাচ্ছে যে, সত্যি অনুজ্ঞাকে অমান্য করা হয় নি। কারণ, বিশ্বাসঘাতককে খুন করাটা অত্যন্ত ন্যায়সঙ্গত ব্যাপার, বিশেষ করে যারা স্নােবলের সঙ্গে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে তারা ত সােজা ঘুঘু নয়। সেবার ওরা সারাটা বছর প্রচণ্ড পরিশ্রম করল—গত বৎসরের চেয়েও বেশি পরিশ্রম করে গেল ওরা। আগের চেয়ে দ্বিগুণ চওড়া দেয়াল গেঁথে হাওয়া কলট। নতুন করে গাঁথা-যে তারিখে শেষ করবার কথা ছিল ঠিক সেই দিনের মধ্যেই কাজ চুকোনাে–এর ওপর খামারের নিত্য নৈমিত্তিক কাজ বজায় রাখা বিপুল পরিশ্রমের ধাক্কা। এক এক সময়ে পশুদের এমনও মনে হতে লাগল যে জোসের আমলে যে পরিশ্রম করত তারা এখন তার চেয়ে ঢের বেশি খাটনী বেড়েছে অথচ খাওয়া-দাওয়ার অবস্থা খারাপ। এদিকে প্রতি রবিবার সকালে স্কুইলার তার সামনের পা দুটোর সাহায্যে ঢাউস লম্বা একখানা কাগজ মেলে ধরে ওদের কাছে হিসেবের বড় বড় ফিরিস্তি শােনায়। সে দেখিয়ে দেয় আগের তুলনায় প্রত্যেকটি ইতরবিশেষে সব ফসলই শতকরা ২০০, ৩০০ কিম্বা ৫০০ হিসেবে বেড়েছে এবছরে। স্কুইলারকে অবিশ্বাস করবার কোনাে হেতু খুজে পায় না ওরা। বিশেষ করে যখন ওরা স্মরণেই আনতে পারছে না যে বিপ্লবের আগে কোনাে ফসল কি হারে উৎপন্ন হত, তখন আর উপায় কী! কিন্তু এক একদিন ওদের বলতে ইচ্ছে করে যে, অবিলম্বে অঙ্কের সংখ্যার কমিয়ে খাবারটা কিছু বেশি পেতে চায় ওরা।

য়্যানিম্যাল ফার্ম আজকাল সব হুকুম পরােয়ানাই স্কুইলার কিম্বা অন্য শূকর মারফতে জারি হয়ে থাকে। নেপােলিয়নকে আজ কাল কালেভদ্রে জনসাধারণের সমক্ষে দেখা যায়-বড় জোর মাসে দু’দিন সে বাইরে দর্শন দেয়। আর আজকাল যখন সে বোেয় তখন যে কেবলমাত্র দেহরক্ষী কুকুরদল সঙ্গে থাকে তা নয়, একটা মুরগী সবার আগে তালে তালে পা পেলে চলে। আর নেপােলিয়ন বক্তৃতা দিতে ওঠবার আগে মুরগীটা ঘােষণা করে ‘ক-কর, --, কে যেন তূর্য-নিনাদ করছে। একথাও শােনা যাচ্ছে যে, বসতবাড়ির মধ্যে নেপােলিয়নের নাকি নিজস্ব আলাদা সব প্রকোষ্ঠ রয়েছে। সে কারও সঙ্গে বসবাস করে না। সে আলাদা খাওয়া-দাওয়া করে, তার খাওয়ার সময়ে দু-দুটো কুকুর পরিবেশন করে থাকে। তাকে খেতে দেওয়ার সময় ক্রাউন ডার্বি মার্কা বাসনপত্র বার করা হয়—এগুলাে বৈঠকখানা ঘরে কাচের আলমারীতে ভােলা ছিল। একথাও ঘােষণা করা হয়েছে যে, প্রতি বছর নেপােলিয়নের জন্মদিনে তােপধ্বনি করা হবে, মানে, জোসের বন্দুক ছোঁড়া হবে। আরও দুটি স্মরণীয় তিথিতে যেমন তােপধ্বনি করার ব্যবস্থা হয়েছে, তেমনি আর কি। এখন আর নেপােলিয়নের ন্যাড়া নাম উচ্চারণ করা হয় না-যখনই তার কথা উল্লেখ হবে তখনই কেতা মাফিক—“আমাদের নে, কমরেড নেপােলিয়ন’ বলতে হবে। এর ওপর আবার শূকরেরা খেয়াল খুশি মতাে নেপােলিয়নকে বিবিধ খেতাবে ভূষিত করে থাকে, যেমন পশুকুলের পিতা, মানবদর্পহারী, মেষসমাজ-ত্রা, হংসমিত্র, এমনই আরও সব। আজকাল নেপােলিয়নের প্রসঙ্গে কথা বলতে গেলেই স্কুইলারের দু-চোখ বেয়ে ভক্তি-অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। নেপােলিয়নের অসামান্য পাণ্ডিত্য, তার উদার অকপট হৃদয়ের পরিচয়, বিশ্ববাসী সমস্ত পশু য়্যানিম্যাল ফার্ম সমাজের প্রতি তার গভীর প্রেমভাব, বিশেষ করে যে সব অবােধ অজ্ঞ পশু যারা আজও অজ্ঞ অবস্থায় দুঃখে কষ্টে অন্যান্য খামারে দাসত্বের বিষয় জীবন যাপন করছে তাদের জন্য নেপােলিয়নের দরদের অন্ত নেই—এই সব কথা বলতে বলতে স্কুইলার কেঁদে ফ্যালে। এখনকার রেওয়াজ দাড়িয়ে গেছে, কথায় কথায় নেপােলিয়নের তারিফ দেওয়া—যা কিছু সৌভাগ্য, যা কিছু গৌরব সবই নেপােলিয়নের কৃতিত্বের দরুন ওরা ভােগ করছে, এটা সবাই বলতে শুরু করেছে। হয়ত শােনা গেল যে একটি মুরগীর আরেকটি মুরগীর কাছে বছে—“আমাদের নেতা কমরেড নেপােলিয়নের খেদমতে আমি ভাই ছদিনে পাঁচটা ডিম পেড়েছি।' কিম্বা দুটো গরু পুকুরে জল পান করতে করতে বলে ফেলল –‘কমরেড নেপােলিয়নের নেতৃত্বের কুৎকে বহুৎ বহুৎ সেলাম, তার দৌলতে জলটা কেমন মিঠে লাগছে। কৃষিভবনের সাধারণ মনােভাব একটি গানের মধ্যে অতি চমৎকার ভাবে ব্যক্ত হতে দেখা যাচ্ছে। গানখানির রচয়িতা কবিবর মিনিমাস, আর শিরােনাম কমরেড নেপােলিয়ন’ : পিতৃহীন অনাথের বন্ধু তুমি—একথা আমরা জানি আনন্দের ঝর্ণা তুমি-তুমি তার উৎসভূমি হে বরাহ-বীর, বীর শিরােমণি ! তােমার ও-দুটি চক্ষু জালায় হৃদয়মাঝে উদ্দীপ্ত ভাস্বর মহানল- তােমার ও চোখে আছে শান্ত, স্থির, শাসনের মহাবীর হে কমরেড নেপােলিয়ন-নেতা আমাদের।

৯২
ফ্যানিম্যাল ফার্ম
তােমার প্রশান্ত হস্ত, বিতরিছে অকৃপণ দান
পশুদের দুটি বেলা খাদ্য দাও পেটভরা
বিছাইয়া বিচালির স্তুপ, আরামের শয্যা পেতে দাও।
ভেদাভেদ নাহি রাখাে, ক্ষুদ্র আর বিরাট পশুতে।
তােমার বিনিদ্র দৃষ্টি ব্যাপ্ত রয় দিকে দিকে
সবাকার কল্যাণ রক্ষণে,
হে কমরেড নেপােলিয়ন নেতা আমাদের ।
যদি কোন বংশধর জন্ম নিত ঔরসে আমার
আকারেতে ক্ষুদ্র বােতলের প্রায় অথবা বেলুন সদৃশ আকার হইলে তার
হতে সে তােমার ভক্ত সুনিশ্চিত-নিষ্ঠা, সত্যে দৃঢ়
তাহার মুখের প্রথম বাণীটি জানি নিশ্চয় হ’ত
প্রিয় কমরেড নেপোলিয়ন, প্রিয় নেতা আমাদের।
নেপােলিয়ন এই গাথাটি অনুমােন করল এবং এর অনুলিপি বড়
গােলাবাড়ির দেয়ালে লিখবার ব্যবস্থাও করল। সপ্ত অনুজ্ঞার ঠিক
অপর প্রান্তে এই গানটি বিজ্ঞাপিত হ’ল। এই লেখার মাথাতে স্কুইলার
আঁকল নেপােলিয়নের প্রতিকৃতি। ছবিটা আঁকা হ’ল সাদা রঙে।
নেপােলিয়ন কিছুদিন ধরে ফ্রেডরিক আর পিকিংটনের সঙ্গে
কারবারের ব্যাপারে বেশ জড়িয়ে পড়েছে-বলা বাহুল্য যে হােয়াইম্পার
মধ্যস্থতা করছে। সেই কাঠের পাঁজাটা কিন্তু এখনও বিক্রী করা হয় নি।
মনে হচ্ছে ফ্রেডরিকই যেন কাঠের পাঁজাটা হাতিয়ে নেবার জন্য বেশি
গরজ দেখাচ্ছে, কিন্তু ন্যায্য দাম দিতে সে নারাজ। আবার এই সঙ্গে
এমন গুজবও শােনা যাচ্ছে যে, ফ্রেডরিক সদলবলে যানিম্যাল ফার্ম

য়্যানিম্যাল ফার্ম আক্রমণের মতলব আঁটছে, সে নাকি হাওয়া কল ভেঙ্গে দেবে, এখানে হাওয়া কল তৈরী হতে দেখে ফ্রেডরিক নাকি হিংসেয় ফেটে পড়ছে। আর খােবল যে পিঋফিডেই এখনও গা-ঢাকা দিয়ে রয়েছে, তা আর কে জানে। এর ওপর হ’ল কি, এর ওপর হ’ল কি, গরমের ঠিক মাঝামাঝি সময়ে, তিনটে মুরগী হঠাৎ একদিন স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে স্বীকারােক্তি করল যে ওরা নেপােলিয়নকে খুন করবে বলে মােবলের সঙ্গে চক্রান্ত পাকাচ্ছিল। অবিলম্বে তাদের শাস্তিবিধান হয়ে গেল। আর নেপােলিয়নের নিরাপত্তার ব্যবস্থাও হ’ল সেই সঙ্গে, চারটে কুকুর রাতে তার বিছানা পাহারা দেবে—এক-একজন এক-এক কোণে। পিকে নামে একটা বাচ্ছা শূকর করবে কি, নেপােলিয়নকে যে সব খাদ্য খেতে দেওয়া হবে সেগুলাে আগে খেয়ে পরখ করবে, তারপর নেতা সেটা খাবে। পাছে খাবারে বিষ মেশানাে থাকে। এর কাছাকাছি সময়ে একদিন প্রকাশ করা হ’ল যে, নেপােলিয়ন কাঠের পাজাটা পিকিংটনের কাছে বিক্রী করবে বলে স্থির করেছে। এবং খুব শীগগিরই হ্যানিম্যাল ফার্ম এবং ফক্সউডের মধ্যে উৎপন্ন দ্রব্য আদান প্রদানের বিনিময় বন্দোবস্ত করা হবে এও জানা গেল। নেপােলিয়ন আর পিকিংটনের মধ্যে একটা বেশ হৃদ্যতার সম্পর্ক গড়ে উঠেছে- হােয়াইম্পারের মারফতেই সব কিছু কথাবার্তা হচ্ছে বটে কিন্তু তাতে কিছু এসে যায় না! অবশ্য পিকিংটনকে এরা সবাই সুনজরে দ্যাখে না কারণ ও লােকটা মানুষ, তবে ফ্রেডরিককে ওরা যেমন ভয় করে, ঘেন্নার চোখে দ্যাখে, পিকিংটন সম্বন্ধে তেমন কোনো বিদ্বেষ ওদের নেই। বরং সেদিক দিয়ে দেখতে গেলে পিকিংটনকে ওরা পছন্দই করে।

য়্যানিম্যাল ফার্ম গরম কাল যাই-যাই করছে। হাওয়া কলের গাঁথনী শেষ হবার সময় কাছিয়ে আসছে। আর একটা গুজব খুব চাউর হয়ে গেছে কবে কখন চক্রান্তকারী বিশ্বাসঘাতকরা আক্রমণ করে বসবে কেউ তা বলতে পারে না। তবে, আক্রমণের দিনটা ঘনিয়ে আসছে। ফ্রেডরিক নাকি এবারে বিশজন বন্দুকধারী মানুষ নিয়ে চড়াও হবে, পুলিশ আর ম্যাজিস্ট্রেটকে ঘুষ খাইয়ে রেখেছে। কোনাে রকমে সে একবার যানিম্যাল ফার্মের স্বত্বের দলিলপত্র হস্তগত করতে পারলেই হল- পুলিশ বা ম্যাজিষ্ট্রেট তার অধিকার সম্বন্ধে কোনাে কথাই তুলবে না। এ ছাড়াও পিঋফিল্ডে পশুদের ওপর বীভৎস অত্যাচার চালাচ্ছে ফ্রেডরিক-সে সব কাহিনী চোর গােপ্তাভাবে এখানে পৌছচ্ছে। সে নাকি একটা বুড়াে ঘােড়াকে ঠেঙিয়ে মেরে ফেলেছে, গরুদের খেতে দেয় না, একটা কুকুরকে সে নাকি জ্যান্ত আগুনে পুড়িয়ে সাবাড় করেছে, সে নাকি সন্ধ্যেবেলা মুরগীদের পায়ে ছুরি বেঁধে দিয়ে মুরগীর লড়াই লাগিয়ে দিয়ে মজা দ্যাখে। এই সব অত্যাচারের কাহিনী শুনে ওদের মাথায় খুন চেপে যায়, তাদেরই সমাজের আর সব জাতভাইদের ওপর মানুষ এই ভাবে জুলুমবাজী করবে। এমনও অনেক সময়ে কেউ কেউ রব তোলে আমাদের অনুমতি দেওয়া হােক, আমরা সদলবলে পিঞ্চফিল্ড আক্রমণ করি, মানুষদের তাড়িয়ে দিয়ে পশুদের মুক্ত করি- তখন স্কুইলার ওদের নিরস্ত করে, বলে হঠকারিতা না করে কমরেড নেপােলিয়নের কৌশল বুদ্ধির ওপর আস্থা রাখা উচিত। কিন্তু ফ্রেডরিকের প্রতি ওদের বিদ্বেষ দিন দিন বেড়ে চল, সেটা কেউ ঠেকিয়ে রাখতে পারছে না। এক রবিবার সকালে নেপােলিয়ন গােলাবাড়িতে উপস্থিত হয়ে সকলকে বুঝিয়ে বলল যে, কস্মিনকালেও } যানিম্যাল ফার্ম ফ্রেডরিকের মত নীচ ব্যক্তির কাছে কাঠ বিক্রীর কথা সে মনেও ঠাঁই দেয় নি, ওরকম পাজী, কুচক্রী মানুষের সঙ্গে কোনাে সম্পর্কের কথা ভাবা মানেই আত্ম-অবমাননা করা। পায়রারা এখনও বাইরে যায় বিপ্লবের বাণী প্রচারের জন্য। তাদের ওপর হুকুম জারি হ’ল, ফক্সউডের ত্রিসীমানায় যাওয়া নিষেধ। আর তাদের পুরনাে জিগির মানুষরা সব নিপাত যাক’ বলে, বলা হ’ল যে, তারা সর্বত্র বলে বেড়াবে-ফ্রেডরিক ধ্বংস হােক। গরম কালের শেষে স্নােবলের আর একটি দুস্কার্যের কাহিনী প্রকাশ হ’ল। এবছরের গমের ফসলের সঙ্গে বিস্তর আগাছা জন্মেছে। আবিষ্কার হ’ল যে, ব্যাপারটা আর কিছুই নয়, স্নােবল তার কোনো নৈশ অভিযানের সময় নিশ্চয় এই আগাছার বীজ গমের ক্ষেতে ছড়িয়ে দিয়ে গিয়েছিল। যে রাজহাঁসটি স্নােবলকে এই চক্রান্তে সহায়তা করেছিল, সে স্কুইলারের কাছে অপরাধ স্বীকার করল এবং বেলেডােনার বিষাক্ত ফল খেয়ে তৎক্ষণাৎ আত্মহত্যা করল। এরপর জাননায়ারেরা শুনল যে কস্মিনকালে স্নােবলকে প্রথম শ্রেণীর পশুবীর’ খেতাব দেওয়া ওদের মধ্যে অনেকে মনে করেছিল যে সত্যই বুঝি ওই রকম একটা খাতিরের খেতাব মােবলকে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সে ধারণাটা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। আসলে হয়েছিল কী, গােশালার যুদ্ধের পর গােবল নিজেই ওই রকম একটা গুজব রটিয়ে বেড়িয়েছিল। অভিনন্দন দেওয়া দূরের কথা বরং তার কাপুরুষতার জন্য রীতিমত তিরস্কার করা হয়েছিল তাকে। এই খবর শুনে পশুরা আর এক দফা হকচকিয়ে গেল। কিন্তু স্কুইলার অত্যন্ত তৎপর ভাবে ওদের বুঝিয়ে দিল যে, সে ঠিকই বলছে, কারণ পশুদের স্মরণশক্তি মােটেই নেই, য়্যানিম্যাল ফার্ম কাজেই ওরা কিছু মনে রাখতে পারে না। ওরা সুইলারের কথা মেনে নিল। শরৎকালের মধ্যেই, ওদের প্রচণ্ড ও প্রাণপাত পরিশ্রমের ফলে কারণ এর মধ্যেই আবার ফসল তােলার কাজও করতে হ’ল-হাওয়াকল তৈরী হয়ে গেল। এখনও অবশ্য এর যন্ত্রপাতি বসানাের কাজ বাকী রয়েছে। হােয়াইম্পার সে সব কেনাকাটার বন্দোবস্ত করছে। যাক, গাঁথনীটা ত চুকে গেছে! ওদের অভিজ্ঞতা, মােবলের নিয়ত চক্রান্ত, হাতিয়ার পত্রের অভাব—এতগুলাে বাধা এবং অসুবিধে সত্ত্বেও ঠিক যেদিন হাওয়া কলের গাঁথনী শেষ করবার কথা সেই তারিখেই ওরা কাজ শেষ করতে পেরেছে ! ওরা পরিশ্রান্ত হয়েছে কিন্তু এই পরমসুন্দর শিল্পনিদর্শন হাওয়াকলটি ওদের সকলের গৌরব! কাজ শেষ করে ওরা সবাই গর্বিতভাবে হাওয়া কলের চারদিকে চক্কর দিতে লাগল প্রথমদিকে যেটা তৈরী হচ্ছিল সেটার চেয়ে বর্তমান এই হাওয়া কলটা কত বেশি সুন্দর দেখাচ্ছে। তাছাড়া, এর দেয়ালটা হয়েছে দ্বিগুণ চওড়া। এটা এত মজবুত হয়েছে যে, বিস্ফোরক ছাড়া আর কিছু দিয়ে একে ধ্বংস করা অসম্ভব। ওরা কী বিপুল ওরা কী বিপুল পরিশ্রম করে এটা গড়ে তুলেছে, কত বাধাবিপত্তি এসে পথ আগলে দাঁড়িয়েছে ! এরপর যখন এই চাকা ঘুরবে, ডায়নামাে চলবে, তখন ওদের জীবনধারা কিরকম পাল্টে যাবে—কত তফাৎ হয়ে যাবে! এইসব ভেবে ওরা খুশিতে মশগুল হয়ে গেল, সব প্রান্তি ঘুচে গেল ওদের। বিজয়গর্বে উল্লাসধ্বনি করতে করতে ওরা হাওয়া কলের পাশে হরদম ঘুরপাক খেতে লাগল। নেপােলিয়ন স্বয়ং তার রক্ষী কুকুরদল আর মােরগ সমভিব্যাহারে এসে উপস্থিত হ’ল,হাওয়াকল পরিদর্শন করতে এসেছে সে। পশুদের এই যানিম্যাল ফার্ম ৯৭ সাফল্যের জন্য নেপােলিয়ন নিজে তাদের অভিনন্দন জ্ঞাপন করল। পরিশেষে সে ঘােষণা করল যে, হাওয়া কলটির নাম দেওয়া হবে ‘নেপােলিয়ন মিল। এর দুদিন পরে বিশেষ একটি সভার অধিবেশনে সব পশুদের গােলাবাড়িতে আহ্বান করা হ’ল। সেখানে নেপােলিয়ন ঘােষণা করল যে, কাঠের পাঁজাটা সে ফ্রেডরিকের কাছে বিক্রী করেছে। ওরা এ সংবাদে স্তম্ভিত হয়ে গেল। আগামী কাল নাকি ফ্রেডরিকের গাড়ি আসবে মাল নিয়ে যাবার জন্য। এই দীর্ঘকাল যাবৎ নেপােলিয়ন বাইরে- বাইরে পিকিংটনের সঙ্গে সখ্য দেখিয়ে এসেছে কিন্তু আসলে সে ফ্রেডরিকের সঙ্গেই গােপনে চুক্তিবদ্ধ ছিল। ফক্সউডের সঙ্গে সব সম্পর্ক কাটান-ছিড়েন করে দেওয়া হল। পিকিংটনকে অপমানসূচক পত্রাদি পাঠানাে হ’ল। পায়রাদের নির্দেশ দেওয়া হ’ল তারা যেন আর পিঞ্চফিল্ড ফার্মে না যায়। আর তাদের প্রাক্তন জিগির পাল্টে দিয়ে বলা হ’ল, এখন থেকে তারা ফ্রেডরিক ধ্বংস হােক’ এর বদলে বলবে—“পিকিংটন ধ্বংস হােক। এই সঙ্গে নেপােলিয়ন আরও বলে যে, ফ্ল্যানিম্যাল ফার্মের ওপর আক্রমণের কোনাে আশঙ্কা নেই, এ সম্পর্কে সব গুজবই ভিত্তিহীন। ফ্রেডরিকের খামারে পশুদের ওপর অত্যাচারের যে কাহিনী প্রচারিত হয়ে এসেছে সেটার মধ্যেও বিশেষ সত্য নেই। খুব সম্ভব, স্নােবল আর তার অনুচরেরাই এসব গুজব রটিয়ে বেড়িয়েছে। এখন এটাও বেশ বােঝা যাচ্ছে যে গােল পিফিল্ডে আত্মগােপন করে নেই, সে কোনাে দিনই সেখানে যায় নি। সে আছে ফক্সউডে, খুব আরামেই নাকি আছে, আসলে সে কয়েক বছর ধরেই পিকিংটনের মাসােহাৱা খাচ্ছে।

হ্যানিম্যাল ফার্ম নেপােলিয়নের অসাধারণ ধূর্ততায় শূকদের খুশীর শেষ নেই ! পিকিংটনের সঙ্গে আগা বন্ধুত্ব দেখিয়ে নেপােলিয়ন ফ্রেডরিকের কাছে কাঠের দাম বারাে পাউণ্ড বাড়িয়ে নিয়েছে। কিন্তু নেপােলিয়নের অসাধারণ বুদ্ধিমত্তার চরম পরিচয় এতে নয়—সে যে কাউকেই বিশ্বাস করে না, এমন কি ফ্রেডরিককেও নয়, এটাই নেপােলিয়নের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য, বললে স্কুইলার। ফ্রেডরিক কি কাঠের দাম শােধ করবার সময় চেক কেটে দিতে চেয়েছিল, চেক মানে আর কিছুই নয়, একটা কাগজের চিরকুট—তাতে যে পরিমাণ টাকার অঙ্ক লেখা থাকে সেই টাকাই নাকি পাওয়া যায়। কিন্তু নেপােলিয়নের কাছে ওসব চালাকী চলে না। একেবারে নগদ পাঁচ পাউণ্ডের আসল ককরে নােট দাবী করে বসেছিল আর বলেছিল যে টাকা আগে জমা দিলে তবে ফ্রেডরিক কাঠ ছুতে পারবে। ফ্রেডরিক টাকা পয়সা সব মিটিয়ে দিয়ে বসে আছে। সে যা টাকা দিয়েছে তাতে হাওয়া কলের আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতিগুলাে কিনে ফেলা যাবে। ওদিকে গাড়ী বােঝাই দিয়ে কাঠগুলাে নিয়ে যাচ্ছে ফ্রেডরিকের লােক। খুব তাড়াহুড়াে করেই নিয়ে যাচ্ছে। কাঠগুলাে চলে গেলে পর আর একটি জরুরী সভা আহূত হ’ল। গােলাবাড়িতে এসে সবাই ফ্রেডরিকের দেওয়া নােটের কেতা দেখুক, সে জন্যেই এই সভা। নেপােলিয়নের ঠোঁটের ডগায় কল্যাণবর্ষী হাসি, তার বুকে মেডেল দুটি শশাভা পাচ্ছে, বেদীর ওপর বিচালীর গাদায় আরাম করে বসে রয়েছে সে। তার পাশে বসতবাড়ির রান্নাঘর থেকে আমদানী করা একটি চীনেমাটির পিরিচে থাক দিয়ে নােটগুলো সাজানাে। প্রত্যেকটি জানােয়ার একে একে আস্তে আস্তে এসে দু-চোখ ভরে নােটর গােছাট।

য়্যানিম্যাল ফার্ম দেখে যাচ্ছে। বক্সার আবার নাক বাড়িয়ে শুকে দেখল, নােটগুলাে তার নিঃশ্বাসের হাওয়ায় একটু ফ ফ করে উঠল। এর তিনদিন পরে তুমুল হৈ-চৈ পড়ে গেল। হােয়াইপার সাইকেল ছুটিয়ে এল। মুখ তার মড়ার মত ফ্যাকাশে। সাইকেলখানা আঙিনাতে কোনােরকমে ফেলে দিয়ে, সে সােজা বসতবাড়ির মধ্যে ঢুকে গেল। পরমুহূর্তেই নেপােলিয়নের ঘর থেকে রুষ্টকণ্ঠে একটা চীৎকার উঠল। আসল কথাটা দাবানলের মত নিমেষের মধ্যে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ল। নােটগুলাে জাল-স্রেফ জোচ্চুরী। ফ্রেডরিক স্রেফ, মুফতে কাঠগুলাে পেয়ে গেছে। অবিলম্বে পশুদের আহ্বান করে সেই সভাতে নেপােলিয়ন ভয়ঙ্কর হুঙ্কারে ফ্রেডরিকের প্রাণদণ্ড দিয়ে দিল। ফ্রেন্ড রিককে বন্দী করতে পারলে, তাকে জ্যান্ত অবস্থায় আগুনে সেদ্ধ করা হবে। এই সঙ্গে সে আরও বলল যে, সাবধান হওয়া দরকার--কারণ এই বিশ্বাসঘাতকার পর চরম আশঙ্কাটাও সত্যি হতে পারে। এখন যে কোনাে মুহূর্তে ফ্রেডরিক আর তার দলবল এদের আক্রমণ করতে পারে। খামারবাড়ির সব কটি প্রবেশদ্বারে পাহারা বসিয়ে দেওয়া হল। এ ছাড়া আর একটি কাজ করা হ’ল, ফক্সউডে চারটি পায়রাকে পাঠানাে হ’ল সন্ধি-সূচক বাণী দিয়ে। অাশা করা যাচ্ছে এতেই হয়ত মিটমাট হয়ে গিয়ে, পুনরায় পিকিংটনের সঙ্গে বন্ধুত্ব হতে পারে। এর পর দিনই আক্রমণ শুরু হয়ে গেল। পশুরা সবাই তখন সকালবেলাকার জলখাবার খাচ্ছিল, এমন সময় প্রহরীরা ছুটতে ছুটতে এসে খবর দিল-ফ্রেডরিক তার দলবল নিয়ে পাঁচগরাদের দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়েছে। পশুরা সবাই রীতিমত সাহসের সঙ্গে মানুষকে য়্যানিম্যাল ফাম রুখে গেল—কিন্তু এবারে আর গােশালার সংগ্রামের মত সহজে ওরা জিততে পারল না। বিপক্ষে পনের জন মানুষ, তাদের কাছে ছ-ছটা বন্দুক, তারা পঞ্চাশ গজের মধ্যে আসতে-না-আসতে গুলী ছুড়তে শুরু করল। সে মারাত্মক অগ্নিবর্ষণের সামনে সােজা হয়ে দাড়াতে পারল না পশুরা, নেপােলিয়ন আর বার অনেক চেষ্টা করেও পশুদের সাম্লাতে পারল না। ওরা দ্রুত হঠে আসতে বাধ্য হ’ল। ইতিমধ্যেই অনেকে জখম হয়ে পড়েছে। বেগতিক দেখে ওরা খামারের ঘরে আশ্রয় নিল এবং চিকের ফাক দিয়ে খুব সন্তর্পণে উকি মেরে ব্যাপার-স্যাপার দেখতে লাগল। গােটা মাঠখানা, মায় হাওয়া কলটা সুদ্ধ শত্রুরা অধিকার করে ফেলেছে। সেই মুহূর্তে স্বয়ং নেপােলিয়ন পর্যন্ত দিশেহারা হয়ে গেছে বলে মনে হল। সে নির্বাক ভাবে ঘন-ঘন এপাশ-ওপাশে পায়চারী করছে, লেজটা তার খাড়া, মাঝে-মাঝে ঈষৎ দুলছে। আর ফউডের দিকে সাগ্রহ দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে সে-যদি পিকিংটন তার লােকজন নিয়ে সাহায্য করে, তাহলে এখনও জয়লাভের সম্ভাবনা আছে। কিন্তু এইসময়ে পায়রাগুলাে ফিরে এল, তাদের গতকাল ফউডে পাঠানাে হয়েছিল—ওদের চারজনের মধ্যে একজনের কাছে পিকিংটনের লেখা এক-টুকরাে কাগজ, তাতে লেখা রয়েছে-‘যেমন কর্ম, তেমনি ফল। এদিকে, ফ্রেডরিক আর তার লােকেরা হাওয়া কলের কাছে এসে দাড়িয়ে গেছে। সেদিকে চেয়ে পশুদের কণ্ঠ থেকে একযােগে একটা অস্ফুট হতাশার ধ্বনি বেরিয়ে এল। ওদের মধ্যে দু’টো লােক হাতুড়ি আর শাবল বার করেছে-ওরা শেষে হাওয়া কলটাকে ভেঙ্গে হ্যানিম্যাল ফার্ম নেপােলিয়ন চেঁচিয়ে উঠল, ‘অসম্ভব! আমরা যেরকম মজবুত আর চওড়া করেছি দেয়ালটা, তাতে ওদের সাধ্যি নেই, সাতদিন ধরে চেষ্টা করলেও ওরা কিছু করতে পারবে না। কমরেডগণ, তােমরা একটু ধৈর্য ধরাে কিন্তু বেঞ্জামিন মানুষগুলাের গতিবিধি খুব মন দিয়ে লক্ষ্য করছিল মানুষ দুটো, একেবারে হাওয়া-কলের ভিতের নীচে গর্ত খুঁড়ছে। বেঞ্জামিন আস্তে আস্তে ওর লম্বা নাকটা নাড়তে লাগল, ও যেন খুব মজা পেয়ে গেছে। সে বলে—“যা ভেবেছি ঠিক তাই! ওরা কি করছে, বুঝতে পারছ না? দেখাে, এর পরই ওখানে ওরা বিস্ফোরক-পাউডার ঠেসে দেবে, ওই গর্তে। জানােয়ারগুলাে সন্ত্রস্ত হয়ে প্রতীক্ষা করতে লাগল। ওরা নিরুপায় । এখন এই খামারবাড়ির নিরাপদ আশ্রয় ছেড়ে এগিয়ে যাওয়া অসম্ভব। এর কয়েক মিনিট পরে দেখা গেল, লােকগুলাে যে যেদিকে পারল ছুটে পালাচ্ছে। হঠাৎ একটা প্রচণ্ড আওয়াজ হ’লসে শব্দের ধাক্কায় কানের পর্দা ফেটে যাবার মত অবস্থা। পায়রাগুলাে হাওয়ায় উড়ে ডানা ঝাপটাচ্ছে, নেপােলিয়ন ছাড়া আর সব জানােয়ার মাটিতে উবু হয়ে শুয়ে পড়ে মুখ গুজে রইল। তারপর ওরা যখন উঠল, তখন হাওয়া কলের শুন্য জায়গাটা কালাে ধোঁয়াতে ঢেকে গেছে—ক্রমশঃ হাওয়ায় ধোঁয়াগুলাে ভেসে গেল, দেখা গেল হাওয়া কলটা আর নেই। এই দৃশ্য চোখের সামনে দেখে জানােয়ারগুলো কেপে উঠল— কিছুক্ষণ আগেকার হতাশা, ভয় সব কিছু এই রাগের উত্তেজনায় যানিম্যাল ফার্ম উপে গেল। এত বড় অন্যায়, নিন্দনীয় কাণ্ড ওরা সহ্য করতে নারাজ। প্রতিহিংসার জিগির দিয়ে ওরা স্বতঃপ্রবৃত্তভাবে এগিয়ে চকোনাে আদেশ নির্দেশের অপেক্ষা না রেখে, সরাসরি শত্রুকে আক্রমণ করতে চল ওরা। এবারে আর গুলীবর্ষণের ভয়ে ওরা পিছিয়ে থাকল না, শিলাবৃষ্টির মত ওদের ওপর গুলী এসে পড়ছে অবিশ্রাম। ভয়ঙ্কর, তিক্ত তীব্র লড়াই চলল। মানুষেরা বার বার গুলী বর্ষণ করছে, আর পশুগুলাে তাদের কাছাকাছি গিয়ে পড়লে লাঠিপেটা করছে, ভারী জুতাের ঠোক্কর মারছে। একটি গরু, তিনটি ভেড়া, দুটি রাজহাঁস নিহত হয়েছে, আর প্রায় সকলেই অল্পবিস্তর আহত। এমন কি নেপােলিয়ন, যে নাকি সকলের পিছনে থেকে যুদ্ধ পরিচালনা করছে, তারও লেজের খানিকটা উড়ে গেছে গুলী লেগে! তবে মানুষের গায়ে যে একেবারে আঁচড় লাগে নি তা নয়। বক্সারের ক্ষুরের চোট লেগে তিনটে মানুষের মাথা ফেটে গেছে, গরুর শিং-এর গুতােয় একজনের পেট ফুটো হয়েছে, জেসি আর রুবেলের আক্রমণে একজনের প্যান্ট ছিড়ে টুকরাে-টুকরাে হবার দাখিল। ওদিকে হয়েছে কি, নেপােলিয়ন তার দেহরক্ষী কুকুর দলকে মতলব দিয়েছে, লুকিয়ে ঝােপের আড়ালে আড়ালে গিয়ে লােকগুলাের পিছন থেকে আক্রমণ করতে। যখন কুকুরগুলাে মানুষের পিছনে গিয়ে হিংস্রভাবে চীৎকার আরম্ভ করল তখন মানুষগুলাের প্রাণে ভয় ঢুকে গেল। তারা এবারে চারদিক থেকে ঘেরাও হবার আশঙ্কায় শঙ্কিত হয়ে পড়ল। ফ্রেডরিকও হেঁকে জানিয়ে দিলে সময় সুযােগ থাকতে থাকতে দৌড়ে চলে যাওয়াই ভালাে। পরমুহূর্তে দেখা গেল কাপুরুষের দল তাদের প্রিয় প্রাণটুকু নিয়ে পরিত্রাহি দৌড় লাগিয়েছে। পশুরা ওদের তাড়িয়ে মাঠের শেষ পর্যন্ত ধাওয়া করল, য়্যানিম্যাল ফার্ম ওরা যখন কাঁটা ঝােপের মধ্যে দিয়ে ঠেলাঠেলি করে পালালাে তখন শেষমেশ দু-চারটে লাথি-চাটও দিতে ছাড়ল না। পশুদের জয় হল। কিন্তু ওরা বড় শান্ত। সবারই অঙ্গে রক্ত ঝরছে। কোননারকম নেচে নেচে ওরা খামারবাড়ির দিকে ফিরে চল। ঘাসের ওপর ওদের কমরেডদের মৃতদেহগুলাে পড়ে থাকতে দেখে কারুর বা চোখ সজল হয়ে এল। ওরা সবাই বেদনার্ত মনে হাওয়া কলটা যেখানে ছিল সেখানে কিছুক্ষণ দাড়াল, নীরবেই দাড়িয়ে রইল ওরা। হাওয়া কলটা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে-ওদের এত মেহনতের ধনটুকু একেবারে ঘুচে গেছে। বনেদটা পর্যন্ত আস্ত নেই। এবারে যদি ওটা নতুন করে গড়তে হয় তাহলে আগের মত পাথরগুলাে আর পাবে না, সেগুলাে বিস্ফোরণের ধাক্কায় নিশ্চিহ্ন হয়ে উড়ে গেছে, কয়েক শ গজ দূরে। মনে হচ্ছে যেন, এখানে কোনােকালে হাওয়াল বলে কিছু ছিল না। ওরা যখন খামার বাড়ির দিকে ফিরছে তখন স্কুইলারকে দেখা গেল, সে খুশিতে ঝলমল করছে, তার লেজটা সেইমত দুলছে। লড়াই-এর সময় সে যে কোথায় এবং কেন নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিল তা কেউ জানে না। এরপর খামারবাড়ির ওই দিক থেকে বন্দুকের গম্ভীর শব্দ ভেসে এল। বক্সর বলল—‘বন্দুক ছোঁড়া হ’ল কেন? স্কুইলার চেঁচিয়ে উত্তর দিল—এটা আমাদের বিজয় ঘােষণা? ‘জয় কিসের? বক্সার প্রশ্ন করে, তার হাঁটু দিয়ে রক্ত ঝরছে, তার একটি নাল খুলে গেছে এবং ক্ষুর ভেঙে গেছে আর তার পিছনের পায়ে কম করে বাবােটা গুলী তখনও ঢুকে রয়েছে।

১ঃ হ্যানিম্যাল ফার্ম ‘তুমি বলছ জয় কিসের? কেন কমরেড, আমরা কি শত্রুদের তাড়িয়ে দিই নি আমাদের এলাকা থেকে—যানিম্যাল ফার্মের পবিত্র ভূমি আমরা দখলে রেখেছি। ‘কিন্তু ওরা যে হাওয়াকল উড়িয়ে দিল । যার পিছনে আমরা গােটা দু-টি বৎসর প্রাণঢেলে খেটেছি, সেই হাওয়াকল— তাতে কি হয়েছে, আমরা আর একটা হাওয়াল বানাবাে। আমরা ইচ্ছে করলে অমন ছ'টা হাওয়াকল তৈরী করতে পারি। আমরা যে কতবড় বিরাট কাজ করেছি তা তুমি বুঝতে পারছ না কমরেড। এখন যেখানে দাড়িয়ে আছি, শত্রুরা সেই জমিটুকু পর্যন্ত দখল করেছিল। আর এখন আমাদের নেতা কমরেড নেপােলিয়নের নেতৃত্বের দৌলতে আবার এর প্রতিটি ইঞ্চি জয় করে নিয়েছি। বক্সার বলল--তাহলে, আমাদের যা ছিল তা আবার জয় করে নিয়েছি। -হ্যা, এই আমাদের জয় স্কুইলার বলল। ওরা নেংচে ঢুকল আঙিনাতে। বক্সারের চামড়ার ভেতরে গুলীগুলাে অসহ যন্ত্রণাদায়ক হয়ে উঠেছে। ও দেখছে, সামনে তার বিপুল গুরুভার পরিশ্রম জমে রয়েছে, হাওয়াকলটা বনেদ থেকে গেঁথে তুলতে হবে—সে মনে মনে এখন থেকেই হাওয়াকল তৈরীর কাজে লেগে গেছে কল্পনা করছে। কিন্তু জীবনে এই প্রথমবার তার মনে পড়ল যে, তার এগারাে বছর বয়স হয়েছে, তার অমিত-শক্তিধর বিরাট পেশীগুলাে যেন আগেকার মত আর কর্মঠ নেই। আবার সবুজ নিশান উড়ল, বন্দুকের তােপধ্বনি বাজল সাতবার, নেপােলিয়ন তাদের সকলকে অভিনন্দন জানিয়ে বক্তৃতা করল—তাদের যানিম্যাল ফার্ম ১ সকলের বীরত্বকে প্রশংসা করল—এইসব দেখে-শুনে পশুদের মনে হল সত্যিই ওরা একটা মস্তবড় যুদ্ধে বিজয়ী হয়েছে। যুদ্ধে নিহত পশুদের সম্মান সহকারে সমাহিত করা হ’ল। বক্সার আর ক্লোভার তাদের মৃতদেহবাহী গাড়িখানা টেনে নিয়ে চল। শশাভাযাত্রার আগে আগে চলল নেপােলিয়ন স্বয়ং। পুরাে দুটো দিন ধরে উৎসব চলে। গান, বক্তৃতা, আরও তােপনি এবং প্রত্যেক পশুকে এই উৎসব উপলক্ষ্যে একটি করে আপেল বিতরণ করা হ’লপাখীদের দু-আউন্স করে শস্য, আর কুকুরদের প্রত্যেককে তিনখানা করে বিস্কুট দেওয়া হল। ঘােষণা করা হ’লএই যুদ্ধের নাম হবে হাওয়া কলের যুদ্ধ। আর নেপােলিয়ন একটি বিশেষ সম্মানচিহ্ন এই উপলক্ষ্যে সৃষ্টি করল, সেই খেতাবের নাম হ’ল—“অর্ডার অব দি গ্রিন ব্যানার। এই খেতাবটি নেপােলিয়ন নিজেকেই দিল। এত আনন্দ- উৎসবের আতিশয্যে সবাই সেই জাল-নােটের দুঃখময় ব্যাপারটা স্রেফ ভুলে গেল। এর কিছুদিন পরে, একদা শুয়ারের একবাক্স হুইস্কি দেখতে পেল বসতবাড়ির মদের ভাণ্ডারে। বাড়িখানা যখন প্রথম দখল করা হয় তখন এটা ওদের নজরে পড়ে নি। যেদিন ওরা এই বাক্সটা দেখল, সেই রাত্রে বসতবাড়ির মধ্যে থেকে গানের সুর ভেসে আসতে লাগল, আর সবচেয়ে অবাক কাণ্ড, ইংলণ্ডের পশুরা' গানের সুরও তাতে মিশে গেছে— রাত সাড়ে নটার সময়ে নেপােলিয়নকে বসতবাড়ির খিড়কীদরজা দিয়ে আসতে দেখা গেল, তার মাথাতে জোসের পুনাে টুপি, এটা জো মদ-পানের সময় পরত। সকলে বেশ স্পষ্টই দেখল, নেপােলিয়ন আঙিনাতে লাফিয়ে চক্কর দিয়ে আবার ভেতরে চলে গেল। কিন্তু য়্যানিম্যাল ফার্ম পরদিন সকালে বসতবাড়িটা একেবারে নিঝুম। একটি শূকরকেও নড়ে ফিরে বেড়াতে দেখল না কেউ। বেলা যখন ন'টা বাজে তখন স্কুইলার বেরুলল, ধীমন্থর তার চলন, মুখে বিরক্তির ছাপ, চোখ- দুটো বােকার মতাে নিষ্প্রভ, তাকে দেখেই বােঝা যাচ্ছে যে সে বেশ সে পশুদের ডেকে একত্র করে বলল যে, একটা সাংঘাতিক দুঃসংবাদ সে জানাতে এসেছে। কমরেড নেপােলিয়ন মৃত্যুশয্যায়। বিলাপের কান্না, হাহাকার উঠল। বসতবাড়ির বাইরে বিচালি বিছিয়ে দেওয়া হ’লপশুরা সব পা টিপেটিপে চলা-ফেরা করতে লাগল। অশ্রুভরা চোখে ওরা পরস্পর বলাবলি করতে লাগল, যদি তাদের নেতা সত্যিই চলে যায় তবে তাদের কী উপায় হবে! চারদিকে গুজব ছড়িয়ে গেল যে, মােবল কোন্ বন্ধু দিয়ে নেপােলিয়নের খাবারে বিষ মাখিয়ে দিয়েছে। আবার বেলা এগারােটা নাগাদ স্কুইলার বেরিয়ে এল আর একটি বার্তা দেবার জন্য। কমরেড নেপােলিয়ন মৃত্যুর আগে তার শেষ নির্দেশ-বাণী উচ্চারণ করেছে : মদ পান করার সাজা হবে প্রাণদণ্ড। সন্ধ্যের দিকে অবশ্য নেপােলিয়নের অবস্থা অনেকটা ভালাের দিকে গেল, এবং পরদিন সকালে স্কুইলার জানালাে যে নেপােলিয়ন আবােগ্য লাভের দিকে এগিয়ে চলেছে। সেদিন সন্ধ্যেয় নেপােলিয়ন নিজের কাজে বেরুলােলা। তারপর দিন শােনা গেল যে সে হােয়াইম্পারকে মদচোলাই আর পরিশ্রবণ-সম্পর্কিত বই কেনবার জন্য উইলিংডনে পাঠিয়েছে। সপ্তাহ খানেক পরে নেপােলিয়ন হুকুম দিল, ফল-বাগানের পাশে যে ছােট্ট মাঠখানা পড়ে রয়েছে সেটায় লাঙল দিতে হবে। অবশ্য এই মাঠখানা মজুত ছিল অবসরপ্রাপ্ত বুড়াে পশুদের চারণভূমি হিসেবে।

ফ্যানিম্যাল ফার্ম ১০৭ জমিটা নাকি একেবারে অজন্ম, অকেজো হয়ে পড়ে আছে সেজন্যে চযে, ফেলে তাজা বীজ লাগানাে হবে। কিন্তু শীগগিরই খবর পাওয়া গেল যে, নেপােলিয়ন এ জমিতে যব বপন করতে চায়। এই সময়ে একদিন তাজ্জব কাণ্ড হ’ল—যার পূর্বাপর কোনাে অর্থ বুঝতে পারল না পশুরা। রাত তখন বাবােটা হবে, এমন সময়ে আঙিনাতে ভারী একটা কিছু উল্টে পড়ার জোরালাে শব্দে চমকে উঠে পশুরা ঘুম ভেঙ্গে বেরিয়ে এল । জ্যোৎস্নার আলােতে ঝলমলে রাত। বড় খামার বাড়ির দেয়ালে যেখানে সপ্ত অনুজ্ঞা লেখা রয়েছে, ঠিক তার নীচে একখানা মই ভেঙে দু-টুকরাে হয়ে পড়ে আছে। আর তার পাশে স্কুইলার ভ্যাবাচাকা খেয়ে চিৎপটাং হয়েছে, তার কাছেই একটা লণ্ঠন, রং-মাখানাে বুরুশ, আর একটা শাদা রং-এর পাত্র উল্টে পড়ে রয়েছে। ত্বরিতে কুকুররা স্কুইলারের চারধারে চক্রাকারে দাড়িয়ে পড়ল। তারপর স্কুইলার উঠে চলৎশক্তি ফিরে পাওয়া মাত্র তাকে সঙ্গে নিয়ে বসতবাড়িতে চলে গেল। একমাত্র বুড়ো বেঞ্জামিন ছাড়া আর কেউ এ ব্যাপারের রহস্য টের পেল না। বেঞ্জামিন তার লম্বা নাকটা বিজ্ঞভাবে বারকতক দোলাল কিন্তু একটি কথাও বলল না। কিন্তু এর দিন কয়েক পড়ে মুরিয়েল নিজের স্মরণ শক্তিকে ঝালাবার জন্য সপ্ত-অনুজ্ঞা পড়তে গিয়ে দেখল যে, আবার একটা নতুন নির্দেশ লেখা রয়েছে যেটা এর আগে দেখেছে বলে পশুরা কেউ মনে করতে পারছে না-ভুলে বসে আছে আর কি। ওদের মনে হচ্ছে যে পঞ্চম অনুজ্ঞাতে লেখা ছিল-‘কোননা জানােয়ার মদ খাবে না। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে যে ওরা দুটো কথা স্রেফ ভুলে গেছে। আসলে পঞ্চম অনুজতে লেখা রয়েছে-‘কোনাে জানােয়ার মদ খাবে না অতিমাত্রায়।

য়্যানিম্যাল ফার্ম (৯) বক্সারের ভাঙা ক্ষুর সারতে বেশ সময় লাগল। ওরা বিজয় উৎসব শেষ করে তার পরদিন থেকেই নতুন করে হাওয়া কল বানাতে লেগে যায়। বক্সার দিনেকের তরেও ছুটি নিতে নারাজ। পাছে কেউ বুঝতে পারে যে বক্সার যন্ত্রণায় কাতর হয়ে পড়েছে এই আশঙ্কায় সে দেখাতে লাগল যে তার কিছু হয় নি। কিন্তু সন্ধ্যে বেলা ক্লোরের কাছে সে স্বীকার করে যে, পায়ের যন্ত্রণায় তার খুব কষ্ট হচ্ছে। ক্লোভার কতকগুলাে লতাপাতা চিবিয়ে পুর্ণিশ তৈরী করে ক্ষত স্থানে প্রলেপ দিল। আর বেঞ্জামিন, ক্লোভার দুজনেই বক্সারকে একটু হাল্কা কাজ করতে অনুরােধ করল। ক্লোভার বলল—ঘােডার কলিজা অমরও নয—অক্ষয়ও নয়। কিন্তু বক্সার সে সব কথা গ্রাহ করে না। সে বলল যে, কাজ থেকে অবসর নেবার বয়স পড়বার আগে সে দেখে যেতে যায় যে হাওয়া কল তৈরী শেষ হবােহবাে হয়েছে। এটাই এখন তার একমাত্র কামনা। ম্যানিম্যাল ফার্ম পত্তনের গােডাতে আইনকানুন তৈরীর সময় ঠিক হয়েছিল যে শূকর আর ঘােড়ারা বাবাে বছর বয়সে কাজ থেকে অবসর নেবে, গরুর অবসর নেবার বয়স হবে চৌদ্দ, কুকুরদের ন’বছর, ভেড়াদের সাত বছর, আর হাঁস-মুরগীদের পাঁচ বছর বয়সে কাজ থেকে অবসর দেওয়া হবে। বুড়াে বয়সে অবসর বৃত্তির ব্যবস্থায় বেশ উদারতা দেখাননা হয়েছে। এখনও পর্যন্ত কার্যত কেউ অবসর বৃত্তি পায় নি, তবে ইদানীং এ বিষয় নিয়ে খুব আলােচনা শুরু হয়েছে। অবসর প্রাপ্তদের জন্য পৃথকভাবে যে মাঠখানা জমা ছিল তাতে এখন ত যব বােনা হয়ে গেল। অতএব গুজব শােনা যাচ্ছে বড় মাঠের খানিকটা জমি আলাদা করে বেড়া দিয়ে বৃদ্ধদের চারণভূমি বানানাে হবে। আরও শােনা যাচ্ছে যে ম্যানিম্যাল ফার্ম অবসরপ্রাপ্ত ঘােড়াদের প্রত্যেককে দৈনিক আন্দাজ আড়াই সের শস্য বরাদ্দ করা হবে, আর শীতকালে তাদের সাড়ে সাত সের খড় আর তার সঙ্গে একটি গাজর অথবা আপেল দেওয়া হবে ছুটির দিনে। আগামী গ্রীষ্মের শেষের দিকে বক্সারের দ্বাদশ জন্মতিথি পড়ছে। এদিকে দিন যাপনের অবস্থা আরও কষ্টকর হয়ে পড়ল। এবারের শীত গতবারের মতই তীব্র, এর ওপর খাদ্য-খাবার আরও কমে গেছে। আবার একবার খাদ্য বরাদ্দ কমে গেল। অবশ্য কুকুর আর শূকরদের কমল না। স্কুইলার ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে দিল যে খাদ্য-খাবারের চুলচেরা সমতা বজায় রাখাটা পশুবাদের নীতির প্রতিকূল। আর খাদ্য-খাবারের অবস্থা আপাতদৃষ্টিতে খারাপ মনে হলেও আসলে যে তা নয়, সেটা প্রমাণ করতে স্কুইলারের কিছুমাত্র অসুবিধে হল না। সে অন্যান্য পশুদের বুঝিয়ে দিল যে সাময়িক দরকার হিসেবে খাদ্য-খাবারের নতুন বন্দোবস্ত’ চালু করা হয়েছে, (খাদ্য বরাদ্দ কমিয়ে দেওয়া কথাটা স্কুইলার কিছুতেই উচ্চারণ করে না, সে ‘নতুন বন্দোবস্ত বলে)। কিন্তু জোসের আমলের তুলনায় এখনকার বরাদ্দ অনেক উন্নত। মিহি গলায় সে তাড়াতাড়ি করে হিসেবের অঙ্কগুলাে পড়ে গিয়ে বিস্তারিত ভাবে দেখিয়ে দিল যে এখন তারা ঢের বেশি জৈ, খড়, শালগম উৎপন্ন করছে, আর জোসের আমলের চেয়ে মেহনতের সময়ও তাদের কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। তা ছাড়া খাবার জলও আগের চেয়ে পরিষ্কার আর উন্নত ধরনের পাওয়া যায়, শিশুমৃত্যুর হার কমে গেছে। আর শশাবার জায়গাতে খড় বরাদ্দ বেশি করা হয়েছে, মাছির উপদ্রবও কমে গেছে আগের চেয়ে। পশুরা সবাই এর প্রত্যেকটি কথা বিশ্বাস করল। সত্যি কথা, জোন্স আর তার আমলের সবকিছুই ওদের স্মৃতি- য়্যানিম্যাল ফার্ম পটে আবছা মােছ-মােছা অবস্থায় পড়ে গিয়েছে। ওরা জানে যে আজকাল কষ্টেসৃষ্টে দিন কাটছে, প্রায়ই ওদের পেটে ক্ষিধে থাকে, সব সময় শীতে কষ্ট হয়, আর ওরা যতক্ষণ জেগে থাকে ততক্ষণই ওরা কাজ করে, বিশ্রাম সেই ঘুমােবার সময়ে। কিন্তু কোনাে সন্দেহ নেই যে সেকালে ওদের এর চেয়ে আরও দুরবস্থা ছিল। একথা মনে করেই ওরা খুশি। তাছাড়া, সে আমলে ওরা ছিল দাস, আর এখন স্বাধীন। স্কুইলার ঠিকই বলেছে যে, দুটো অবস্থার মধ্যে যে কত তফাৎ তা’ত এই স্বাধীনতা দিয়েই টের পাওয়া যাচ্ছে। আগের চেয়ে এখন অনেক বেশি সংখ্যক মুখে খাবার জোগাতে হচ্ছে। শরৎকালে একসঙ্গে চার চারটে শূকরীতে শূকরীতে মিলে একত্রিশটি শাবক প্রসব করল। ছানাগুলো বিচিত্ৰ-বৰ্ণ। যেহেতু গােটা খামার বাড়িতে নেপােলিয়নই একমাত্র পুরুষ বরাহ, সেহেতু এই শাবকগুলির জনক যে কে তা সহজেই বােঝা গেল। এরপর কাঠ এবং ইট কেনা হয়ে গেলে পর ঘােষিত হ’ল যে বসত বাড়ির বাগানে শূয়াের বাচ্ছাদের পড়ার ঘর তৈরী হবে। আপাততঃ রান্নাশালেতেই নেপােলিয়ন নিজে তাদের শিক্ষাদীক্ষা দিতে লাগল। তারা বাড়ির বাগানেই ব্যায়ামাদি করে থাকে, খামারের অন্যান্য পশু শাবকদের সঙ্গে মেলামেশা তাদের বারণ। এই সময়ে একদিন নিয়ম হয়ে গেল যে, যদি পথিমধ্যে কোনও শূকরের সঙ্গে অন্য কোনাে জানােয়ারের দেখাসাক্ষাৎ ঘটে তাহলে শূকরেতর জন্তুটি সরে দাড়িয়ে শূকরকে পথ ছেড়ে দেবে। আরও নিয়ম হ’ল যে শূকরমাত্রেই রবিবার তার লেজে সবুজ ফিতের বাহার দিয়ে বেড়াবার সুযােগ ফ্যানিম্যাল ফার্ম ১১১ সালতামামীতে বােঝা যায় সে ফসলের অবস্থা বেশ স্বচ্ছল, কিন্তু এখনও ওদের টাকার টানাটানি রয়েছে। কারণ আরও ইট, বালি, চুন না কিলে পড়ার ঘর তৈরী শেষ হবে না। আবার ওদিকে হাওয়ালের খাতে যন্ত্রপাতি কেনার জন্যে টাকা জমাননা শুরু করতে হবে। এছাড়া পিদিমের জ্বালানী তেল চাই, মােমবাতি চাই বাড়ির জন্য, নেপোলিয়নের খাস টেবিলের জন্য চিনি দরকার ( চিনি খেলে মেদ জমে বলে নেপােলিয়ন আর সব শূকরদের চিনি খেতে দেয় না)। আর নিতনৈমিত্তিক প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র যেমন দড়ি, কয়লা, পেরেক, তার, কুকুরের বিস্কুট, হাতিয়ার-পাতি—এ সবেরও ব্যবস্থা করতে হবে। কাজেই একটা খড়ের গাদা আর ফসলের কিছু আলু বেচে দেওয়া হ’ল, আর ডিমের ঠিকাটা সপ্তাহে চার’শ থেকে বাড়িয়ে ছ'শাে করা হ’ল। তার ফলে মুরগী বেচারাদের মৃত্যুহারের তুলনায় সমান সমান বাচ্ছা ফুটিয়ে নিজেদের গুণতির হিসেব পােজাতেই প্রাণান্ত। ডিসেম্বর মাসে যেমন একবার খাদ্য বরাদ্দ কমে গিয়েছিল, তেমনি আবার ফেব্রুয়ারীতেও কমল। তেলের খরচ বাঁচাবার উদ্দেশ্যে পশুদের শােবার জায়গাতে লণ্ঠন জালালাে নিষিদ্ধ হ’ল। কিন্তু শূকরদের দেখলে মনে হয়ে যেন তারা তােফ আরামে কাটাচ্ছে, আর কিছু না হােক তাদের গায়ে হরদম গত্তি লাগছে। ফেব্রুয়ারীর শেষের দিকে একদিন বিকেলে হঠাৎ একটা ভারি লােভনীয় গন্ধ পশুদের নাকে এসে লাগল, এরকম গন্ধ এর আগে কেউ কখনও পায় নি। গন্ধটা ভেসে আসছে জোসের রান্নাঘরের পিছনে মদের ভাটি-খানা থেকে। ভাটিটা জো চলে যাবার পর থেকে অব্যবহৃত অবস্থায়ই পড়ে ছিল। কে যেন বলল, বালি রান্নার গন্ধ এটা।

১১২ য়্যানিম্যাল ফার্ম নাক বাড়িয়ে পশু কুধার্ত ভাবে বাতাসে গন্ধ শুকতে লাগল। ওরা নিজেদের মনেই ভাবতে লাগল হয়ত বা রাত্রে ওদের খাবার জন্য আজ বার্লি সেদ্ধ করা হচ্ছে। কিন্তু গরম বালির কোন চিহ্নই পেল না ওরা। এবং এর পরের রবিবারে ঘােষণা করা হ’ল যে, এরপর থেকে যাবতীয় যব কেবলমাত্র শূকরদের জন্যই বরাদ্দ হ’ল। বাগানের ও-পাশের জমিতে এর আগেই যব বােনা হয়েছে। একদিন কী করে এ খবরটাও ফাস হয়ে গেল যে প্রত্যেক শুকর রােজ এক পাইট করে বিয়ার খেতে পায়, আর নেপােলিয়নের নিজের জন্য •আধ-গ্যালন বরাদ নেপােলিয়নের মদ সরবরাহ করা হয়ে থাকে ক্রাউন ডার্বি মার্কা সুরুয়ার পাত্রে। যদিও আজকাল ওদের অনেক বেশি কষ্ট করে বেঁচে থাকতে হচ্ছে, তবে একথাও ঠিক যে ওদের জীবনের মর্যাদাও অনেক বেড়েছে—এই মনে করে ওদের কষ্ট খানিকটা লাঘব হয়। এখন অনেক অনেক গান হয়, বক্তৃতাও হচ্ছে খুব, আর শশাভাযাত্রাও যথেষ্ট হয়ে থাকে। নেপােলিয়ন হুকুমজারি করেছে যে, সপ্তাহে অন্তত একটি করে স্বেচ্ছা- মিছিল বেরুবে—মূলত: এই মিছিল হচ্ছে হ্যানিম্যাল ফার্মের সংগ্রাম এবং জয়লাভকে অভিনন্দিত করার উৎসব। ঠিক নির্দিষ্ট সময়ে পশুরা যে-যার কাজ থেকে বেরিয়ে খামারের চারধারে ঘুরবে সামরিক কায়দায় : সব আগে যাবে শূকরব, তারপর ঘােড়ারা—গরু, ভেড়া, হাঁস, মুরগীরা তারপর চলবে। কুকুরেরা মিছিলের পাশে-পাশে চলবে—আর শােভা- যাত্রার পুরােভাগে যাবে নেপােলিয়নের কালাে মােগ। বক্সার আর ক্লেভার দুজনে মিলে একটা সবুজ পতাকা বহন করে চলে, পতাকাতে একটি ক্ষুর আর শিং উৎকীর্ণ রয়েছে, আর লেখা রয়েছে-‘কমরেড য়্যানিম্যাল ফার্ম নেপােলিয়ন দীর্ঘজীবী হােক। শােভাযাত্রার পর, নেপােলিয়নের সম্মানার্থে রচিত কবিতা আবৃত্তি হয়—স্কুইলার বক্তৃতা দেয় খাদ্যশস্য উৎপাদনের সর্বাধুনিক উন্নতির হিসাব দেয় সে। মাঝে মাঝে তােপধ্বনি হয়। এই স্বেচ্ছামিছিলের সবচেয়ে গোঁড়াভক্ত হচ্ছে ভেড়ার দল। যদি কখনও কেউ কোনাে অভিযােগ করতে যায় (কাছাকাছি কোনাে শূকর বা কুকুর না থাকলে অনেক সময়ে পশুরা অভিযােগ করে থাকে) যে, এইভাবে শীতের মধ্যে এতক্ষণ দাঁড়িয়ে মিথ্যে সময় নষ্ট করা হচ্ছে, তাহলেই ভেড়ারা হক পাড়তে শুরু করে চার পা ভালো, দু’পা খারাপ। এতেই সব গােলমাল ঠাণ্ডা হয়ে যায়। অবশ্য পশুদের মধ্যে অধিকাংশই এই উৎসবে ফুর্তি পায়। ওরা যে সত্যিই নিজেদের মালিক, আর তাদের যতকিছু মেহন সবই নিজেদের সুবিধে-বাবদে, এই কথাটা মনে করিয়ে দিলেই ওরা খুশি। অতএব এই গান, মিছিল, স্কুইলারের অঙ্কবােঝাই বক্তৃতা, তােপের গর্জন, মােরগের ডাক, পতাকা ওড়ানাে, এইসব কিছুর মধ্যে দিয়ে ওরা কিছুক্ষণের জন্যে ভুলে থাকে যে, ক্ষিধেয় ওদের পেট চুই চুই করছে। এটুকুই লাভ। এপ্রিল মাসে হ্যানিম্যাল ফার্মকে রিপাবলিক বলে প্রচার করা হল। কাজেই এখন এর প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনিবার্য প্রয়ােজন। একজনই মাত্র প্রার্থী, নেপােলিয়ন—সে সর্বসম্মতিক্রমে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হল। সেই দিনই প্রকাশ করা হ’ল যে, জোসের সঙ্গে সােবলের যােগজসের সম্পর্কে আরও কতকগুলি নতুন কাগজপত্র আবিষ্কৃত হয়েছে। এখন দেখা যাচ্ছে যে, মােবল শুধু কায়দা করে গােশালার যুদ্ধে পশুদের পরাজয়ের মুখে এগিয়ে দিয়েছিল তা-ই নয়, সে একেবারে খােলাখুলি জোসের পক্ষ নিয়েই লড়াই করেছিল। আসলে মােবলই ছিল মানুষের ১১৪ হ্যানিম্যাল ফার্ম দলের নেতা, এবং সে মানুষ দীর্ঘজীবী হােক এই ধ্বনি করে আক্রমণ আরম্ভ করে ছিল। লড়াইতে পােবলের পিঠের খানিকটা অংশে ক্ষত হয়েছিল, যে কথা এখনও অনেক পশু ভােলেনি সেটা বস্তুত নেপোলিয়নের পাতের কামড় খেয়েই হয়েছিল। সেবার গ্রীষ্মের মাঝামাঝি সময়ে দাঁড়কাক মােজেস হঠাৎ এসে হাজির কয়েক বছর তার কোনাে খােজখবরই ছিল না। সে আগেকার মতই রয়েছে, এখনও কোনাে কাজে তাকে পাওয়া যায় না, আগের মতই সে মিছরীর পাহাড়ের আজগুবি কাহিনী বলে। একটা খুঁটিতে বসে সে কালাে ডানা ঝটপট করে, এবং যদি কেউ তার কথায় কান দেয় তাহলে অনায়াসে ঘণ্টাখানেক একনাগাড়ে বকে যায়। তার লম্বা ঠোটটা আকাশের দিকে উচু করে দিয়ে সে গভীরভাবে বলবে—“ওই ওপরে কমরেড! ওই কালাে অন্ধকার মেঘের উল্টো দিকে, বুঝলে, সেই মিছরীর পাহাড়। সেই সেখানে আমরা এই হতভাগা পশুরা মরবার পর মেহনতের হাত থেকে মুক্ত হয়ে বিশ্রাম করব। সে দাবী করে যে, একবার অনেক উচুতে উড়ে নাকি সেখানে সে গিয়ে পড়েছিল। সত্যি সেখানে অসংখ্য ঝােপেঝাড়ে মিছরী ঝুলে রয়েছে, তিসির খইল, আর ক্লোভার ঘাসের ছড়াছড়ি-মােজেস স্বচক্ষে দেখে এসেছে। তার কথা অনেকেই বিশ্বাস করে। ওদের জীবন এখন ক্ষুধার তাড়না আর মেহনতের বােঝতে ভরপুর, অতএব ওরা নিজেদের বােয় এখানকার এই জীবনের চেয়ে সুন্দরতর জীবন কোথাও থাকা খুব উচিত। এখন মুস্কিল হয়েছে এই যে, মােজেসের কথাগুলাে শূকরেরা একেবারে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে উড়িয়ে দেয়। তারা বলে যে মিছরীর পাহাড়-টাহাড় ডাহা মিথ্যে। ডাহা মিথ্যে। অথচ মােজেসকে ওরা ত তাড়িয়েও নিম্যাল ফার্ম দেয় না। উল্টে আবার আধপােয়া করে মদও দেয় মােজেকে। কোনাে কাজই করে না, তবে কেন এত খাতির। ক্ষুরের ঘাটা সেরে যাবার পর বক্সার আবার পুরাদমে খাটতে লাগল--বরং বলা যায় যে এত বেশি খাটুনী সেও কখনও খাটে নি। এ বছরে সত্য সব পশুই কেনা গােলামের মত প্রাণপাত পরিশ্রম করল। খামারের নিত্যকার কাজ আর নতুন করে হাওয়া কল বানানাে ত ছিলই তার ওপর আবার শূয়াের বাচ্ছাদের পাঠগৃহ বানানাের কাজ শুরু হয়েছে মার্চ মাস থেকে। এক এক সময়ে হাড়ভাঙ্গা খাটুনি আর আধপেটা খাওয়া পশুদের দুঃসহ মনে হত, কিন্তু বক্সার কিছুতেই কাতর হয় না। সে কিছুতেই বুঝতে দেয় না যে এখন আর তার আগের মত শক্তি নেই। তবে তার চেহারা দেখলে টের পাওয়া যায়, গায়ের চামড়ার চাকচিক্য আগের চেয়ে বেশ কমেছে, তার পিছন দিকটায় কিরকম খােন্দল হয়েছে। আর সবাই বলাবলি করে--‘বসন্তে নতুন ঘাস হলে বক্সারের শরীর সেরে উঠবে। বসন্তও এল কিন্তু বক্সারের গায়ে আর গত্তি লাগল না। এক এক সময়ে খাদ থেকে ওপরে সে যখন ভারী চাই নিয়ে ওঠে তখন তার অবস্থা দেখলে যে-কেউ বুঝতে পারে যে কেবলমাত্র প্রবল ইচ্ছাশক্তি ওই চওড়া পেশীগুলাের সাধ্য ছিল না যে ওই খাড়াইতে এই গুরুভারের বােঝা নিয়ে ও পা ঠিক রেখে উঠতে পারে। এই সঙ্কট মুহূর্তে শুধু তার মুখ নড়া দেখলে বােঝা যেত যে সে বলছে—“আমি মারও কঠিন পরিশ্রম করব’, যদিও কোনাে শব্দ তার কণ্ঠ থেকে বেরুতে না। আবার একবার ক্লোভার আর বেঞ্জামিন তার স্বাস্থ্যের ম্বিন্ধে সতর্ক করে দিল। কিন্তু বক্সার সেদিকে মােটেই নজর দেয় না। এদিকে তার বারাে বছরের জন্মদিন কাছে আসছে। তার একমাত্র লক্ষ্য নাহলে শুধু ১১৬ য়্যানিম্যাল ফার্ম হচ্ছে, সে অবসর নেবার আগে যেন প্রচুর পাথর জড়াে করে জমিয়ে রেখে যেতে পারে। গ্রীষ্মের সময় একদিন সন্ধ্যের শেষদিকে খামারে অনেককে বলতে শােনা গেল যে, বক্সারের কিছু হয়েছে। সে একাই বেরিয়ে গিয়েছিল হাওয়ালের পাথর বইবার জন্য । তার কিছুক্ষণ পরে দুটি পায়রা ছুটতে ছুটতে এসে খবর দিল, বক্সার পড়ে গেছে। সে কাৎ হয়ে পড়ে রয়েছে। কিছুতেই উঠতে পারছে না। খামারের প্রায় অর্ধেক জানােয়ার তখনই ছুটে গেল সেই হাওয়ালের টিলার ওপর। বােম আর গাড়ীর মধ্যে বক্সার পড়ে রয়েছে, তার গলাটা লম্বা অবস্থায় আছে, এমন কি মাথাটা তােলবার মত শক্তিও তার নেই। চোখ দুটো তার চক-চক্ করে জ্বলছে যেন, পিঠ দিয়ে দরদর করে ঘাম ঝড়ছে, মুখের কষ বেয়ে ফিকি দিয়ে রক্ত ছুটছে। ক্লোভার হাঁটু গেড়ে তার পাশে বসে পড়ল। তারপর চেঁচিয়ে বল-বক্সার কেমন আছছা ? বক্সার ক্ষীণ কণ্ঠে সাড়া দিল-বুকে বড় যন্ত্রণা। সে যাক গে, আমি না থাকলেও তােমরা নিশ্চয় হাওয়া শেষ করতে পারবে। আমার ত তাই মনে হয়। অনেক পাথর মজুত করা হয়ে গেছে—আর মাস খানেক কাজ করতে পারলেই আমি মেরে দিতে পারতাম। সত্যি বলতে কি, শুধু আমার অবসর গ্রহণের দিকেই তাকিয়ে ছিলাম। বেঞ্জামিনেরও ত ঢের বয়েস হল, এবার তাকেও যদি ওরা একই সময়ে অবসর দেয় ত, তাহলে আমরা দুজনে সঙ্গী হয়ে যেতাম। ক্লোভার বললে-তােমরা কেউ ছুটে গিয়ে স্কুইলারকে খবর দাও। এখনই একটা ব্যবস্থা হওয়া চাই। যাও- যানিম্যাল ফার্ম ১১৭ সব জানােয়ারই একসঙ্গে চলল বসতবাড়িতে, স্কুইলারকে খবর দিতে। কেবল ক্লোভার রইল, আর বেঞ্জামিন যেমন বক্সারের পাশে বসে ছিল চুপ করে তেমনই রইল—মাঝে মাঝে লম্বা লেজ দিয়ে মাছি তাড়াচ্ছে সে। প্রায় পনেরাে মিনিট পরে স্কুইলার এলাে, কণ্ঠে তার সহানুভূতি এবং উদ্বেগ ভর্তি। সে জানালে যে কমরেড নেপােলিয়ন তার ফার্মের এমন একনিষ্ঠ কর্মীর এই দুঃসংবাদ শুনে গভীরতম কষ্ট বােধ করছে। এবং বক্সারকে উইলিংডনের হাসপাতালে পাঠিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থাও করা হয়ে গেছে। হাসপাতালের কথায় সবাই একটু অস্বস্তি বােধ করে। একমাত্র মলি আর স্নােবল ছাড়া এ ফার্মের আর কেউ বাইরে যায় নি। ওদের অসুস্থ কমরেডকে মানুষের হাতে গিয়ে পড়তে হবে একথা ভাবতেও ওদের বিশ্রী লাগে। অবশ্য স্কুইলার খুব সহজেই বুঝিয়ে দিল যে উইলিং- ডনের পশু চিকিৎসকের কাছে বক্সারের চিকিৎসা এখানকার চেয়ে অনেক ভালােভাবেই হবে। আধঘণ্টাখানেক পরে বক্সার অতিকষ্টে উঠে দাড়াতে পারল, তখন কোনােরকমে নিজের আস্তাবলে সে হেঁটেই এল, মানে, খোঁড়াতে খোড়াতে গিয়ে ক্লোভার আর বেঞ্জামিনের বানানাে আরামের বিচালি-শয্যায় শুয়ে পড়ল। এরপর দুদিন ধরে বক্সার তার আস্তাবলেই বইল। শূকরেরা তার জন্য পাটকিলে রং-এর বােতলে ওষুধ পাঠিয়ে দিল—এটা ওরা জোসের স্নানের ঘরে রাখা ওষুধের বাক্সতে খুঁজে পেয়েছিল। ক্লোভার তাকে নিয়মিত দু বেলা আহারের পর ওষুধ খাওয়াতে লাগল। সন্ধ্যাবেলা ক্লোভার আজকাল বক্সারের আস্তাবলে তার পাশে বসে গল্প করে, আর বেঞ্জামিন মুখ বুজে মাছি তাড়ায়। বক্সার বলে যে, যা ঘটেছে তার জন্য সে মােটেই কাতর নয়। যদি সে এ যাত্রা ভালােভাবে সেরে ওঠে ১১৮ হ্যানিম্যাল ফার্ম তাহলে আরও তিনবছর বাঁচবে আশা করে। তারপর সে বড় মাঠের এককোণে শান্তিতে দিন কাটাবে, সেই দিনের আশায় সে তাকিয়ে আছে। তখন সে পড়াশুনাের মত অবকাশ পাবে, জীবনে সেটাই তার মানসিক উন্নতির প্রথম সুযােগ হবে। সে জীবনের বাকী সময়টা বর্ণ- মালার অবশিষ্ট বাইশটি অক্ষর শিক্ষার চেষ্টা করবে। ক্লোভার আর বেঞ্জামিন তাদের সারাদিনের কাজের পর শুধু সেই সন্ধ্যের সময় বক্সারের কাছে আসতে পারে। সেদিন হ’ল কি, ঠিক দুপুর বেলাতে বক্সারকে নিয়ে যাবার জন্য গাড়ী এল। জানােয়ারেরা সবাই তখন এক শূকরের তাঁবে থেকে শালগমের ভূই নিড়ােচ্ছিল—এমন সময় বেঞ্জামিনকে খামারের দিক থেকে ছুটে আসতে দেখে ওরা সবাই অবাক হয়ে গেল। বেঞ্জামিন একেবারে তারস্বরে চিল্লাচ্ছে কেন! বেঞ্জামিনকে কেউ এর আগে উত্তেজিত হতে দেখেনি—আর, বেঞ্জামিনকে জীবনে এই প্রথম ছুটতে দেখল ওরা। সে চীৎকার করে বল—‘শীগগির। শীগগির! এখুনি চলে এস। ওরা বক্সারকে নিয়ে পালাচ্ছে। শূকরের অনুমতি না নিয়েই পশুরা সব কাজ ছেড়ে খামারের দিকে দৌড়লো। সত্যিই ত, উঠোনের ওপর একটা মস্ত ঢাকাগাড়ি দাঁড়িয়ে আছে, গাড়িটার গায়ে কী সব লেখা রয়েছে। দুটো ঘােড় গাড়ির সামনে বােমের সঙ্গে লাগাম লাগানাে অবস্থায় পঁড়িয়ে-আর গাড়ােয়ানের আসনে একটা ধূর্ত লােক মাথায় টুপী দিয়ে বসে রয়েছে। এদিকে বক্সারের আস্তাবলটা ফাকা। পশুরা সব গাড়ি ঘিরে সমস্বরে বললে—‘বিদায় করে বার! বিদায়। বেঞ্জামিন চেঁচিয়ে উঠল ‘সব কটা বােকা! বােকা কোথাকার! ওদের চারপাশে অশান্তভাবে ছটফটিয়ে পাক খাচ্ছে বেঞ্জামিন, তার ছােট্ট য়্যানিম্যাল ফার্ম পা দুটো মাটিতে ঠুকে সে বলছে-‘হা রে বুদ্ধ! গাড়ির গায়ে কি লেখা রয়েছে দেখতে পাচ্ছ না।” এ কথায় পশুরা সবাই থমকে গেল। সব চুপচাপ। মুরিয়েল বানান করে পড়তে লাগল। বেঞ্জামিন তাকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে, লেখাটি পশুদের পড়ে শােনাতে লাগল—আলফ্রেড, সিম, অশ্বঘাতক এবং শিরীষ প্রস্তুতকারক—উইলিংডন। চামড়া ও অস্থিচুর্ণ ব্যবসায়ী। কুকুর- শালার খাদ্য সরবরাহকারী! বুঝলে, এর মানে কি? ওরা বক্সারকে কসাইখানাতে নিয়ে যাচ্ছে। ক্লোভার প্রচণ্ড চীৎকার করে উঠল— ‘বক্সার? বক্সার। বেরিয়ে এস ! শীগগির চলে এস ! ওরা তােমায় মারবে বলে নিয়ে যাচ্ছে। এই সময়ে বক্সারের মাথাটা, নাকের ডগায় সাদা দাগটা সুদ্ধ গাড়ীর ছােট্ট জানলাতে দেখা গেল। পশুরা সবাই চেঁচাতে শুরু করল, বক্সার, চলে এস, চলে এস। এদিকে গাড়িটা ততক্ষণে চতে শুরু করেছে, ক্রমশঃ দ্রুত গতিতে সেটা ওদের নাগালের বাইরে যাচ্ছে। ক্লোরের কথাটা বক্সার ঠিক বুঝতে পেরেছে কি না—ওরা অনুমান করতে পারে না। কিন্তু পরমুহূর্তে ওরা আর বক্সারকে গাড়ীর জানালাতে দেখতে পেলে না। গাড়ির মধ্যে ঘােড়র পায়ের ক্ষুরের ঠকা-ঠক খটখট আওয়াজ শােনা যাচ্ছে, সে শব্দ ক্রমশঃ বাড়ছে। বক্সার লাথি মেরে গাড়ির দরজা ভেঙে বেরুবার চেষ্টা করছে নিশ্চয়। কিন্তু হায়! তার সে শক্তি আর নেই। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে ক্ষুর ঠোকার শব্দটা আস্তে আস্তে মিইয়ে যেতে যেতে মিলিয়ে গেল। অবশেষে পশুরা সবাই মিলে ওই গাড়ীর বাহক ঘােড়াদুটির কাছে মরীয়া হয়ে গাড়ী থামাবার জন্য অনুনয় বিনয় করতে লাগল। ওরা চেঁচিয়ে ১২ য়্যানিম্যাল ফার্ম বল, ফরেভ। তােমাদের জাত ভাইকে খুন কববার জন্যে নিয়ে যেয়ে —দোহাই কমরেড! কিন্তু নীরেট পাষণ্ড দুটো বুঝতেই পারে না যে কী কাণ্ড হতে চলেছে, বােকর মতাে কান গুটিয়ে আরও জোরে ছুটতে শুরু করল ঘােড়া দুটো। জানলাতে আর বক্সারের মুখ কেউ দেখতে পেল না। এতক্ষণে একজনের মনে পড়ল পাঁচগরাদের দরজা যদি ছুটে গিয়ে বন্ধ করে দিতে পারত ওরা তাহলেই হ'ত-কিন্তু এখন আর সে সময়ও নেই, বডড দেরী হয়ে গেছে। গাড়ীখানা দরজা পেরিয়ে বড় শড়কে অদৃশ্য হয়ে গেল। বক্সারকে এরপর আর কেউ কোনাে দিন দেখতে পায় নি। এর তিনদিন পরে ঘােষিত হ’ল যে উইলিংডনের হাসপাতালে বক্সার মারা গেছে। একটি ঘােড়াকে বাঁচার জন্য যতরকম চেষ্টা করা যায় তা সবই বক্সারের জন্য করা হয়েছিল, তবু তাকে বাঁচানো গেল না। স্কুইলারই জন্তু সমাজের সামনে এসে এই সংবাদ দিল। সে বলে যে, বক্সারের অন্তিম সময়ে সে নিজে সেখানে উপস্থিত ছিল । জীবনের এমন মর্মান্তিক দৃশ্য আমি আর কখনও দেখিনি!' বলে স্কুইলার তার সামনের পায়ের থাবা তুলে একফোটা চোখের জল মুছল, ‘তার শেষ নিঃশ্বাসের সময়ে আমি তার বিছানার পাশে ছিলাম। অন্তিমকালে, তখন সে এতই দুর্বল হয়ে পড়েছিল যে কথা বলতে পারছিল না, তবু আমার কানের কাছে ফিফিস করে নিজের মনের খেদের কথা বলেছিল—তার একমাত্র আশা ছিল হাওয়া কলের শেষ দেখে যাবে তা ত হ’ল না! সে অস্ফুট স্বরে বলে গিয়েছে-“এগিয়ে যাও কমরেডগণ! বিপ্লব স্মরণ করে এগিয়ে যাও। হ্যানিম্যাল ফার্ম দীর্ঘজীবী হােক! কমরেড নেপােলিয়ন দীর্ঘজীবী হােক। নেপােলিয়ন য়্যানিম্যাল ফার্ম সর্বদা নির্ভুল?” এই হচ্ছে তার শেষ বাণী, বুঝলে তাের, কমরেড। এর পর সহসা স্কুইলারের হাবভাব পাল্টে যায়। আর কিছু বলার আগে সে এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে ছােট্ট কুটুরে চোখদুটো ঘুরিয়ে ফিরিয়ে চারিদিকে সন্দিগ্ধভাবে চেয়ে দেখল। সে বলে চলল যে, সে জানতে পেরেছে বক্সারকে নিয়ে যাবার সময় একটা বাজে গুজব রটে ছিল। কোনাে কোনাে পশু লক্ষ্য করে যে, বক্সারকে যে গাড়িতে করে নিয়ে যাওয়া হয় তার গায়ে লেখাছিল ‘অশ্বঘাতক। আর সঙ্গে সঙ্গে সবাই সিদ্ধান্ত করে বসল যে বক্সারকে কষাইখানাতে পাঠানাে হচ্ছে। কোনাে জানােয়ার যে এত বেহেভ বুদ্ধ হতে পারে স্কুইলার কোনােদিন কল্পনাও করতে পারে নি। দুইলার তর্জন-গর্জন করে সেজের ঝাপট মেরে রুষ্ট কণ্ঠে বলে যে, তারা ত নেতা করে নেপােলিয়নকে ভালাে বলেই জানে নিশ্চয় ! তবে কি করে এমন একটা উদ্ভট, খারাপ কথা ওরা ভাবতে পারল। আসল কারণটা অত্যন্ত সাধারণ, সরল ! ওই গাড়িখানা আগে একজন কষাই- এর ছিল, তারপর পশুচিকিৎসকটি সেটা কিনে নিয়েছেন, এখনও পর্যন্ত তিনি এই পুরাণাে নামধামগুলাে রং লাগিয়ে মুছে দেবার ফুরসৎ করে উঠতে পারেন নি। এই জন্যেই ওদের ভুল ধারণা হয়েছে। একথা শুনে পশুরা পরম শান্তির নিশ্বাস ফেলে বাঁচল। এবং তারপর স্কুইলার পুখানুপুঙ্খভাবে ৰক্সারের চিকিৎসা এবং শুশ্রুষার নিখুত বিবরণ দিতে লাগল। সে কতখানি সেবাযত্ন পেয়েছে তা জানালাে! তার চিকিৎসার জন্য কত দামী দামী ওষুধ কিনে দিতে হয়েছে এবং য়্যানিম্যাল ফার্ম নেপােলিয়ন দু-হাতে তার জন্য খরচপত্র করেছে, এ সবই স্কুইলার বলল। বল্পারের মৃত্যুশয্যার একটি নিখুত ছবিও সে কথার মধ্যে দিয়ে ফুটিয়ে তুলল। স্কুইলারের এত কথা শুনে ওদের মনের ওদের মনের শেষ সন্দেহটুকু নিমূলভাবে ঘুচে গেল। করেডের মৃত্যুতে তারা যে বেদনা পেয়েছে তার মধ্যে খানিকটা সান্ত্বনা এই যে, অন্তত সুখেই শেষ নিঃশ্বাস ফেলেছে সে। এর পর রবিবার সকালের সভাতে নেপােলিয়ন উপস্থিত হয়ে বক্সারের সম্মানে একটি নাতিদীর্ঘ অভিভাষণ দিল। সে বলে যে, পরলােকগত কমরেড, বক্সারের শবদেহ খামারে এনে সমাধিস্থ করা সম্ভবপর হয় নি বটে, কিন্তু সে নির্দেশ দিয়েছে যে, খামারের বাগানের লরেল দিয়ে একটি মালা গেঁথে বক্সারের সমাধির ওপর সাজিয়ে দেওয়া হােক। এবং শূকরেরা খুব শীগগিরই বক্সারের স্মৃতির সম্মানে একটি ভােজ দেবে। নেপােলিয়নের অভিভাষণের পরিশেযে পশুদের স্মরণ করিয়ে দিল বক্সারের দুটি প্রিয় নীতিমন্ত্র, ‘আমি আরও বেশি পরিশ্রম করব’ আর ‘কমরেড, নেপােলিয়ন সর্বদা অভ্রান্ত’! নেপােলিয়ন এই বলে শেষ করল যে, প্রত্যেক পশুরই নিজের জীবনে এই দুটি মন্ত্রবাক্য মেনে চলা উচিত, তাতে মঙ্গল হবে। ভােজের নির্দিষ্ট দিনে উইলিংডন থেকে একখানা গাড়ী এলাে এবং একটা কাঠের বাক্স বসতবাড়িতে নামিয়ে দিয়ে চলে গেল। সে রাত্রে বাড়ির ভেতরে উন্মত্ত গানের সােরগােল চল। এত জোর চেচামেচি শুরু হ’ল শেষটাতে যেন মনে হল খুব ঝগড়াঝাঁটি লেগে গিয়েছে। রাত এগাৱােটা নাগাদ কঁচভাঙ্গার ঝন্‌ঝন্ শব্দ হয়ে হঠাৎ হৈ-চৈ থেমে গেল।

ফ্যানিম্যাল ফার্ম পরদিন সকালে আর বসতবাড়ি থেকে কাউকে বেরুতে দেখা যায় না, একেবারে দুপুর বেলায় ও বাড়ির সাড়াশব্দ পাওয়া গেল। খবর বটে গেল যে, কোথা থেকে যেন কি ভাবে টাকা যােগাড় করে শূকরেরা আর এক বাক্স মদ কিনেছে। (১০) বছরের পর বছর কেটে যায় । একের পর একটি করে ঋতু আসে আর যায়। স্বল্পায়ু পশুদের জীবনও নিঃশেষ হয়ে উড়ে যায়। এমনি করে, এমন দিন এল যখন সবাই বিপ্লবের আগের আমলের কথা ভুলে গেল কারণ সে কথা মনে রাখবার মত আর কেউ বেঁচে নেই। পুরনাে আমলের থাকবার মধ্যে রয়েছে ক্লোভার, বেঞ্জামিন, দাড়কাক মােজেস আর জনকয়েক শূয়ার। মুরিয়েল মারা গেছে, রুবেল, জেসি, পিঞ্চার সবাই মরে গেছে। এমন কি জোও মরে গেছে। এই দেশেরই অন্য এক অঞ্চলের কোননা শুড়ি বাড়িতে মরেছে। সােবলের কথা সবাই ভুলেছে। বক্সারের কথাও কারুর মনে নেই,দু-চারজন যারা তাকে দেখেছিল তারাই কেবল মনে রেখেছে। ক্লোভার এখন বুড়ো হয়েছে, ওর গায়ে মেদ জমে গেজে, গাঁটে-গাঁটে আড়ষ্টতা আর চোখ দুটোয় পিচুটি জমে থাকে দুবছর হয়ে গেল ওর অবসর নেবার সময় পেরিয়ে গেছে কিন্তু কার্যতঃ আজ পর্যন্ত কোনো জন্তুই কাজ থেকে অবসর গ্রহণ করতে পারে এর অনেক আগেই বৃদ্ধ পশুদের জন্য আলাদা চারণ ভূমির প্রস্তাব চাপা পড়ে গিয়েছে। নেপােলিয়ন এখন পূর্ণবয়স্ক বরাহ, তার ওজন পাকা চার মণ। আর স্কুইলার এত মােটা হয়েছে যে, অতিকষ্টে চোখ ১২৪ য়্যানিম্যাল ফার্ম দুটো দিয়ে দেখতে পায় সে। একমাত্র বুড়াে বেঞ্জামিনের বিশেষ কোনো পরিবর্তন হয় নি। তফাতের মধ্যে তার মুখখানা আগের চেয়ে বেশি শাদাটে হয়েছে, আর বক্সারের মৃত্যুর পর থেকে তাকে আরও বিষয় দেখায়, মেজাজটা আরও তিরিক্ষি হয়েছে। এখন খামার বাড়িতে পশুর সংখ্যা অনেক বেড়েছে। অবশ্য গােড়ার দিকে যেমন পশুদের বংশ বৃদ্ধি শুরু হয়েছিল সেই হারে এখন আর হয় না। হালআমলের অনেকের কাছেই বিপ্লব পুরনাে আমলের আবছা একটা সংস্কারের মত হয়ে দাড়িয়েছে। মুখে মুখে গল্প কাহিনীর মতই বিপ্লব বেঁচে আছে। আবার এমন অনেক পশু আছে যাদের বাইরে থেকে কিনে আনা হয়েছে, তারা ত এখানে আসবার আগে এসব কথা কিছুই শশানে নি। এখন কৃষি ভবনে ক্লোভার ছাড়া আরও তিনটি ঘােড়া রয়েছে। তাদের চেহারা খাশা, কাজেও তাদের খুব মন, এবং তারা বেশ ভালাে করে। কিন্তু বুদ্ধির দিক দিয়ে তারা আন্ত গবেট। তারা কেউ বর্ণমালার দ্বিতীয় অক্ষর ‘B’-র ওপারে বিদ্যে আয়ত্ত করতে পারে নি। পশুবাদের আদর্শ এবং বিপ্লব সম্বন্ধে ওদের যা বলা হয় তা-ই ওরা বিশ্বাস করে—বিশেষ করে ক্লোভার যা বলে তা ত বটেই, ওর ওপর ওদের অচলাভক্তি। কিন্তু কথা হচ্ছে যে এ বিষয়ে ওরা আদৌ কিছু বােঝে কি-না সেটাই ঘােতর সন্দেহের ব্যাপার। খামারের অবস্থা আজকাল খুব ভালাে হয়েছে, আর বন্দোবস্তও আগের চেয়ে ঢের বেশি শৃঙ্খলিত। কৃষিভবনের এলাকা আগের চেয়ে বড় হয়েছে, পিকিংটনের কাছ থেকে দুটো জমি কেনা হয়েছে কিনা। হােয়াইপার নিজের জন্য একখানা গাড়ি কিনেছে। অবশেষে হাওয়াল তৈরী নির্বিয়ে সম্পন্ন হয়ে গেছে। এখন খামারের নিজস্ব শস্য মাড়াই- যানিম্যাল ফার্ম এর কল কেনা হয়েছে, খড় তােলবার যন্ত্র হয়েছে, তাছাড়া বাড়িঘর অনেক বেড়ে গেছে। অবশ্য বৈদ্যুতিক শক্তি উৎপাদনের কাজে হাওয়া কলটা লাগানাে হয় নি। ওটা শস্য গুড়ো করার কাজে লাগানাে হয়েছে, তাতে বেশ লাভও হচ্ছে। পশুরা আরও একটা হাওয়াল বানাবার জন্য খুব উঠে পড়ে লেগেছে। শোনা যাচ্ছে যে ওটা শেষ হলে ওইটের সাহায্যে ডায়নামাে চালানাে হবে। কিন্তু আজকাল আর কেউ পােবলের শােনানাে আশ্বাস আরামের কথা মুখেও আনে না--সপ্তাহে তিন দিন কাজ, শশাবার জায়গায় বৈদ্যুতিক আলো, ঠাণ্ডা গরম জলের ব্যবস্থা, এসব স্বপ্ন গুরা আর দেখে না। ওসব কল্পনা পশুবাদের আদর্শবিরােধী বলে নেপােলিয়ন নিন্দাবাদ করে বাতিল করেছে। সে বলেছে যে, যথার্থ সুখ এবং আনন্দ হচ্ছে প্রচুর মেহনৎ করা আর মিতব্যয়ী হয়ে থাকাতে । আজকাল কেন যেন মনে হয় যে, পশুদের অভাবঅনটন আগের চেয়ে কমে নি বটে তবে ফার্মের আর্থিক অবস্থা বেশ ভালাে হয়েছে। অবশ্য শূকর আর কুকুরদের কথা আলাদা। বােধ করি ওরা সংখ্যায় এত বেশি বলেই ওদের অবস্থা ভালাে। তবে ওরা যে কাজ করে না তা নয়, ওদের মত কাজই করে ওরা। এই ত স্কুইলার, দিনরাত তার ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের অন্ত নেই, তার ক্লান্তি নেই—অনবরত তদবির-তদারক, খামারের সব ব্যবস্থা নিয়েই সে রয়েছে। এসব এমন ধরনের কাজ যার বেশির ভাগই জানােয়ারেরা একেবারে বােঝে না। স্কুইলার বলে যে শুকরদের দিনের বেশির ভাগ সময় খামার নিয়ে হরদম মাথা ঘামাতে হয়, ওই ফাইল’ ‘রিপাের্ট’ ‘সভাবিবরণী’ ‘স্মারকলিপি এই সব নিয়ে থাকতে হয়। পশুরা এসবের মর্ম কিছুই বােঝে না। এগুলাে হচ্ছে ১২৬ য়্যানিম্যাল ফার্ম বড় বড় কাগজ, ঘেব-ঘেব লেখা দিরে ঠেসে ভর্তি করতে হয়, তারপর সেগুলাে উনুনে পুড়িয়ে ফেলা হয়। এই হচ্ছে ফার্মের সবচেয়ে জরুরী কাজ, স্কুইলার সেকথা বলে। অবশ্য দেখা যাচ্ছে যে, কি শূকর, কি কুকুর কেউ নিজেরা মেহন করে কোনাে খাদ্য উৎপাদন করে না। আর তাদের সংখ্যা এত বেশি। তাদের আহারে রুচিও বড় মন্দ নয়। আর সবার জীবনযাত্রা আগের মতই চলছে, এই তাদের বিশ্বাস। তারা সাধারণতঃ পেটপুরে খেতে পায় না, খড়ের ওপর শুয়ে থাকে, পুকুর থেকে জল খায়, মাঠে মেহনং করে, শীতকালে তারা ঠাণ্ডায় কষ্টভােগ করে আর গরমে মাছির উপদ্রবে উদ্ব্যস্ত থাকে। কখনও কখনও বয়ােজ্যেষ্ঠরা মনে করবার চেষ্টা করে, বিপ্লব করে ওরা যখন জোকে তাড়িয়ে দেয় তাড়িয়ে দেয় তখন প্রথম প্রথম ওদের অবস্থা এখনকার চেয়ে ভালাে ছিল কি খারাপ ছিল। কিন্তু কিছুতেই পরিষ্কার মনে পড়ে না। আজকের এই জীবনের সঙ্গে তুলনা করবার মত কিছুই তারা খুজে পায় না। একমাত্র স্কুইলারের অঙ্কের সংখ্যাগুলাে ছাড়া ওদের অবলম্বন বলে কিছু নেই—আর সেই সংখ্যাগুলােতে স্পষ্টই দেখানাে হয়ে থাকে সে প্রত্যেক দিক দিয়ে ক্রমশঃ তাদের অবস্থা উন্নত হয়ে এগিয়ে চলেছে। পশুরা এ সমস্যার কোনাে সমাধান দেখতে পায় । আর তা ছাড়া এসব নিয়ে মাথা ঘামাবার সময়ও তারা তেমন পায় না। একমাত্র বুড়াে বেঞ্জামিন বলে যে তার দীর্ঘ জীবনের প্রত্যেকটি খুটিনাটি তার মনে আছে। সে ভালাে করেই জানে যে, জীবন যেমন চলে এসেছে তেমনই চলবে—আগের চেয়ে খুব ভালােও যেমন কিছু হবে , তেমনি খুব যে খারাপ কিছু হবে তাও নয়। ক্ষুধা, পরিশ্রম, হতাশা এ সবই ত জীবনের অলঘ্য নিয়ম, একথাও বেঞ্জামিন বলে।

ফ্যানিম্যাল ফার্ম তবুও পশুরা আশা ছাড়তে পারে না। অধিকন্তু ম্যানিম্যাল ফার্মের সভ্য হওয়াটা যে গৌববের, সে কথাটা কোনাে পশুই মুহূর্তে তরেও ভােলে না। তারা এই পরম সৌভাগ্যে নিজেদের জীবনকে ধন্য মনে করে। তাদের ফার্মই এই অঞ্চলের মধ্যে একমাত্র ফার্ম—সারা ইংলণ্ডের মধ্যেও বটে—যেখানে পশুরাই মালিক, পশুরাই কর্মী। ছােট থেকে বড়, সবাই—এমনকি যাদের বিশ মাইল দূর থেকে আনা হয়েছে সেই নবাগতরা পর্যন্ত প্রত্যেকে এই কথা ভেবে বিস্মিত না-হয়ে পারে না। এর ওপর, যখন তাদের কানে তােপের আওয়াজ পৌছয়, চোখের সামনে সবুজ পতাকা দণ্ডের মাথায় পতপত, করে উড়তে দ্যাখে, ওদের বুক গর্বে ভরে ওঠে। তারপরই শুরু হয়ে যায় পুরনােকালের বীরত্বকাহিনী, জোসের নির্বাসনের কথা, সপ্তঅনুজ্ঞা রচনার ইতিহাস, সেই মহাযুদ্ধের কথা যে যুদ্ধে অভিযানকারী মানবজাতি হেরে ভূত হয়ে গিয়েছিল। সেইসব গল্প চলে। পুরনাে আশা- স্বপ্নগুলাের একটিও হারিয়ে যায় নি, অম্লান রয়েছে। এখনও ওরা বিশ্বাস করে যে, বুড়াে মেজরের সেই ভবিষ্যদ্বাণী সত্য হবে—একদিন আসবে যখন ইংলণ্ডের মাটিতে মানুষের পদচিহ্ন আর পড়বে না। এটা ওরা এখনও বিশ্বাস করে। সেদিন নিশ্চয়ই আসবে। সেটা হয়ত খুব শীগগির না আসতে পারে, হয়ত যারা বেঁচে আছে তাদের জীবদ্দশাতে না এলেও একদিন আসবেই! গােপনে কেউ কেউ আড়ালে বসে চুপিচুপি ‘ইংলণ্ডের পশুরা এখনও গেয়ে থাকে। এ গানটা খামারের সবাই জানে, অবশ্য গলা ছেড়ে জোরে গাইতে কেউ সাহস করে না। এটা হয়ত ঠিক যে, ওদের দিনযাপন করতে হয় কায়ক্লেশে, হয় ত ওদের সব সাধ পূর্ণ হয় নি, তবু যে বাইরের অন্য ১২৮ য়্যানিম্যাল ফার্ম জানােয়ারদের মত ওদের জীবন নয়—এ সম্বন্ধে ওরা খুব সচেতন। ও আধপেট খেয়ে ক্ষুধার তাড়নায় কষ্ট পায়, কিন্তু সে খাদ্যের অভাব অত্যাচারী মানুষদের খাওয়ার জন্য হয় না। ওরা যে মেহনৎ করে তা যতই বেশি হােক না কেন, সবই তাদের নিজেদের জন্য করে। ওদের মধ্যে কোন প্রাণী দু-পায়ে হাঁটে না। কোনাে পশুকে মনিব’ বলতে হয় না। সব পশুই সমান। প্রথম গরমের দিকে একদিন স্কুইলার ভেড়ার দলকে সঙ্গে নিয়ে খামারের একপ্রান্তে যে পােড়ড়া জমিটা ছিল সেখানে গেল। জমিটার চারধারে বিস্তর বার্চের চারাগাছ গজিয়ে উঠেছে। ওরা সারা দিনমানটা স্কুইলারের তত্ত্বাবধানে থেকে বার্ডের পাতা খেয়ে কাটাল। সন্ধ্যেবেলা সে নিজে বাড়ি ফিরে এল। আর ভেড়াদের বলল যে, যেহেতু বেশ গরম পড়েছে তারা ওই খােলা জায়গাতেই থাকুক। এইভাবে ভেড়ার পাল এক সপ্তাহ সেখানে কাটিয়ে দিল। এই সময়ে অন্যান্য পশুরা ভেড়াদের কোনাে খোঁজ খবরই পায় নি। যােজই দিনের বেশির ভাগ সময় স্কুইলার ভেড়াদের কাছে থাকে। সে বলে যে, সে ভেড়াদের একটা নতুন গান শেখাচ্ছে। সেজন্য একটু নিরিবিলির দরকার। ভেড়ার দল নির্জনবাসের পর নিজেদের জায়গায় ফিরে আসবার ঠিক পরেই, এক মনােরম সন্ধ্যায় জানােয়ারেরা কাজ করে ঘরে ফিরছে— হঠাৎ ভীত একটি ঘােড়ার চিৎকারে ওরা চমকে গেল। আঙিনার দিক থেকে : ঘােড়ার ডাকটা ভেসে আসছে। পশুরা সবাই থমকে দাড়াল। এ যে ক্লোভারের কণ্ঠস্বর । ক্লোভার আবার চেঁচিয়ে উঠল। এবারে পশুরা সব ছুটতে ছুটতে আঙিনায় গিয়ে হাজির হল। তারপর, ক্লোভার যা দেখেছে, তাদেরও চোখে তা পড়ল।

য়্যানিম্যাল ফার্ম একটি শূকর তার পেছনের দুটি পায়ে ভর দিয়ে হাঁটছে। হ্যা, স্কুইলার হাঁটছে। একটু বেমানান দেখাচ্ছে তাকে। তার ওই বিপুল দেহভার ওই ভাবে বহন করা অভ্যাস না থাকাতে বােধহয় একটু অসুবিধে হচ্ছে। কিন্তু বেশ ভারসাম্য বজায় রেখেই স্কুইলার আঙিনাতে পায়চারী করছে। এর কয়েক মুহূর্ত পরেই দেখা গেল যে বসতবাড়ির দরজা দিয়ে বেশ লম্বা সারি বেঁধে, একে-একে শূকরেরা বেরিয়ে আসছে, দিব্যি পিছনের দু’পায়ে ভর দিয়ে হাঁটছে তারা। কেউ হয় ত অপরের চেয়ে ভালােভাবে হাঁটছে, কেউ হয় ত একটু টলমল করছে যেন একখানা লাঠির ভর পেলে ভালাে হয় তার, কিন্তু মােটামুটি সবাই আঙিনাতে হেঁটে ঘুরে চক্কর দিয়ে এল। অবশেষে কুকুরের প্রচণ্ড ঘেউ-ঘেউ শব্দ শােনা গেল। তার সঙ্গে সেই কালাে মােরগের ডাক—সরু অথচ জোরালাে শব্দ তার। এরপর বেরিয়ে এল স্বয়ং নেপােলিয়ন, রাজোচিত ঋজু ভাবভঙ্গী তার, এপাশ- ওপাশে উদ্ধত কটাক্ষ ক্ষেপণ করছে সে, আর তার আশপাশে কুকুরগুলাে আহলাদে লাফালাফি করছে। ওর সামনের থাবাতে একটা চাবুক ধরা রয়েছে। চারিদিকে একটা অটুট স্তব্ধতা। বিস্ময় বিমুঢ়, ভীত পশুরা পরস্পরের গা-ঘেষে দাড়িয়ে লক্ষ্য করছে, কেমন সারি দিয়ে শূকরেরা আঙিনার চারপাশে আস্তে আস্তে ঘুরছে। এমন কাণ্ড কেউ কখনও দেখেছে! দুনিয়াটা যেন হঠাৎ উল্টে গেছে। বিস্ময়ের ধাক্কার প্রথম ঘােরটা কেটে যেতেই পশুরা সবাই প্রতিবাদ করতে উদ্যত হ’ল। ওরা জানে যে কুকুরের ভয় রয়েছে, ওদের দীর্ঘ দিনের অভ্যেস দাড়িয়ে গেছে যা-ই ঘটুক না কেন কোনাে অভিযােগ বা সমালােচনা না করা।

য়্যানিম্যাল ফার্ম
।
তবু আজকের এই ব্যাপার দেখে হয়ত ওরা প্রতিবাদ করত। কিন্তু
ঠিক সেই সময়ে যেন কোনাে একটা সঙ্কেত পেয়েই সব কটা
ভেড়া একসঙ্গে হক জুড়ে দিল—কী তাদের গলার জোর-চার
পা ভাললা, দু-পা আরও ভালাে! চার পা ভালাে, দু-পা আরও
ভালাে!
পাঁচ মিনিট ধরে এক নাগাড়ে একেবারে না-থেমে ওরা চেঁচিয়ে
গেল। এবং ভেড়ার দল যখন চুপ করল তখন প্রতিবাদের সুযােগও
পার হয়ে গিয়েছে কারণ, ততক্ষণে শূকরেরা আবার বসতবাড়ির মধ্যে
ঢুকে পড়েছে।
বেঞ্জামিন টের পেল তার ঘাড়ের ওপর কে যেন নাক ঘষছে।
ফিরে চাইল। ক্লোভার। ক্লোভারের বার্ধক্য-স্তিমিত চোখ দুটো যেন
আরও নিস্তেজ, নিষ্প্রভ হয়ে গেছে। কোনাে কথা উচ্চারণ না করে ও
বেঞ্জামিনের চুল ধরে টাল একবার—তারপর তাকে নিয়ে বড়
গােলাবাড়ির প্রান্তে চলে গেল—যেখানে সপ্ত অনুজ্ঞা লিপিবদ্ধ রয়েছে,
সেইখানে— মিনিট খানেক কি দুয়েক ওরা আলকাতরা মাখানাে
দেয়ালের ওপরের শাদা হরফগুলাের দিকে তাকিয়ে রইল।
শেষে ক্লোভার বল—আমার চোখে ভাল দেখতে পাচ্ছি না।
বয়সকালেও আমি ঠিক পড়তে পারতাম না ওখানে কি লেখা রয়েছে।
কিন্তু আজ যেন মনে হচ্ছে যে দেয়ালের ভাে বদলে অন্যরকম হয়ে
গেছে। আচ্ছা বেঞ্জামিন তুমি বলল ত, সপ্ত অনুজ্ঞা আগে যেমন
ছিল এখনও ঠিক তেমনি আছে ?
জীবনে এই প্রথম বেঞ্জামিন তার নিয়ম ভঙ্গ করল, সে
দেয়ালে যা যা লেখা আছে সব পড়ে ক্লোভারকে শােনালাে।

গ্যানিম্যাল ফার্ম ১৩১ সারা দেয়ালে একটিমাত্র অনুজ্ঞা ছাড়া আর কিছুই নেই। সেটি হচ্ছে : সব পশুই সমান কিন্তু কয়েকরকম পশু অন্যদের থেকে স্বতন্ত্র ও পরস্পরের বেশি সমান। এই ঘটনার পর যখন পরদিন সকালে শূকরেরা থাবাতে চাবুক নিয়ে খামারের অন্যান্য পশুদের কাজের তদারক করতে এল তখন আর কেউ অবাক হ’ল না তা দেখে। এমন কি যখন ওরা শুক্ল যে শূকরেরা একটি বেতার যন্ত্র কিনেছে তখনও আর বিস্ময়ের কিছু রইল না। যখন ওরা আরও খবর পেল যে শূকরেরা নিজেদের জন্য টেলিফোন আনাবার ব্যবস্থা করছে এবং চঁাদা পাঠিয়েছে ‘ডেলি মিরর’, ‘জবুল’ এবং টিবিট পত্রিকা আনাবার জন্য তখনও বিস্মিত হ’ল না। এরপর নেপােলিয়নকে বসতবাড়ির বাগানে তামাকের পাইপ ঠোটে লাগিয়ে ঘুরে বেড়াতে দেখেও কেউ আর অবাক হ’ল না। এমন কি শূকরেরা যখন জোসের পােশাক-আশাক আলমারী থেকে বার করে পরে চলাফেরা শুরু করল তখনও ওরা সেটা সহজভাবেই দেখল, যেন বিস্ময়ের আর কিছু বাকী নেই। নেপােলিয়ন নিজে একটা কালাে কোট গায়ে দিয়ে বেরুলল, তার পরনে ইদুর ধরার ব্রিচে, পায়ে চামড়ার পট্টি, আর তার প্রিয়তমা শূকরীর গায়ে জোনস গৃহিণীর ব্যবহার্য জলের মত স্বচ্ছ এবং রেশমী জামা। এর সপ্তাহখানেক পরে হঠাৎ একদিন কতকগুলি গাড়ি এসে থামল খামারে। আশপাশের সব কৃষিভবনের প্রতিনিধিদের নিমন্ত্রণ করা হয়েছে, স্যানিম্যাল ফার্ম পরিদর্শন করার জন্য। তাদের গােটা খামারের হ্যানিম্যাল ফার্ম সব কিছু ঘুরিয়ে দেখানাে হ’ল, এবং তারা যা দেখল তারই উচ্ছসিত প্রশংসা করল,হাওয়া কলের সম্বন্ধে বিশেষ করে। পশুরা সব শালগমের জমিতে নিড়ান দিচ্ছিল। ওরা সবাই খুব খাটছে, মাটি থেকে মুখ তুলে ওপর দিকে দেখছে না বলেই হয়-ওরা ঠিক বুঝতে পারছে না যে আগন্তুক মানুষদেরই বেশি ভয় করা উচিত কি শূকরদেরই বেশী সমীহ করা কর্তব্য। সেদিন সন্ধ্যাতেও হাসির উচ্চবােল আর গানের উদ্দামধ্বনি ভেসে আসে বসতবাড়ির মধ্যে থেকে। হঠাৎ এক সময়ে মিশ্রিত কণ্ঠস্বরের একটা হৈ-চৈ হট্টগােলের হিড়িকে পশুরা সবাই কৌতূহলী হয়ে উঠল। ওখানে কী হচ্ছে? মানুষ আর জানােয়ারদের সমান মর্যাদায় মিলন আজই এই প্রথম—আজ কী ঘটেছে? ওরা সবাই মিলে গুটি গুটি বসতবাড়ির বাগানের দিকে এগিয়ে গেল। প্রথমটা দরজার কাছে একটু থমকে দাড়ায় ওরা, ভেতরে এগিয়ে যাবে-কি-যাবে না এই ভেবে। কিন্তু ক্লোভার সবার আগে ঢুকে পড়ল। বাড়ি পর্যন্ত ওরা পা টিপে টিপে গেল। ওদের মধ্যে যারা ঢ্যাঙ্গা তারা খাবার ঘরের জানালা দিয়ে উকি মেরে দেখতে লাগল। রান্না ঘরের বড় টেবিলটা ঘিরে জনাকয়েক চাষী আর শূকরদের মধ্যে অগ্রণী ছ’জন বসে রয়েছে। টেবিলের মাথাতে সবচেয়ে সম্মানজনক জায়গায় বসেছে নেপােলিয়ন নিজে। আশ্চর্য, শূয়ারগুলাে ত বেশ সহজেই চেয়ার দখল করে বসে রয়েছে ! ওরা সবাই তাসখেলাতে মশগুল। কেৰল মাঝে একবার খেলাটা একটু বন্ধ রইল। খুব সম্ভব কারুর সম্মানার্থে ওরা একটু মদ খাবে ! খুব বড় এক ‘জগ’ হাতে হাতে ঘুরছে এবং যে-যার ‘মগে’ মদ ঢেলে আবার পূর্ণ করে নিচ্ছে। জানালা হ্যানিম্যাল ফার্ম ১ দিয়ে যে জানােয়ারেরা অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে রয়েছে—সেদিকে কারুর নজরই পড়ল না। ফক্সউডের এপিকিংটন তার মগটা হাতে করে উঠে দাঁড়ালেন। তিনি বলেন যে, এখনি তিনি উপস্থিত সকলের কল্যাণকামনার্থে মদ্যপান করতে অনুরােধ করবেন, অবিশ্যি তার আগে কয়েকটি কথা বলা বিশেষ কর্তব্য মনে করছেন। তিনি বললেন যে, দীর্ঘকাল যাবৎ যে একটা অবিশ্বাস এবং ভুল বােঝাবুঝি চলে আসছিল আজ তার অবসান ঘটল, এতে তিনি খুবই আনন্দিত এবং তার বিশ্বাস যে এতে নিশ্চয় উপস্থিত সকলেই আনন্দিত। তিনি নিজে এবং যারা উপস্থিত রয়েছেন তাদের মধ্যে অনেকেই কোন-না-কোন সময়ে হ্যানিম্যাল ফার্মের সম্মানিত মালিকদের প্রতি বিরূপ মনােভাব পােষণ করে এসেছেন, শুধু তাই নয় বিরুদ্ধাচরণও করেছে প্রতিবেশী মানুষেরা অকারণ আশঙ্কার বশবর্তী হয়ে। তার ফলে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে, ভ্রান্ত ধারণার দরুন। একটি কৃষিভবন যে শূকদের মালিকানাতে পরিচালিত হতে পারে এটা আশপাশের মানুষদের কাছে যেমন অস্বাভাবিক তেমনি অস্বস্তিকর হয়ে দাড়িয়েছিল। কৃষকদের মধ্যে প্রায় সকলেই কোনাে খোঁজখবর না নিয়ে ধরে নিয়েছিল যে এরকম খামারে যথেচ্ছাচার এবং অরাজকতা চলবে। এবং তারা আশঙ্কা করেছিল এই খামারের দৃষ্টান্ত অন্যান্য খামারের পশুদের মধ্যে অপপ্রভাব বিস্তার করবে, এমন কি সেইসব খামারের মানুষ কর্মচারীদের ওপরও এখানকার অনাচারের প্রতিক্রিয়া হবে,—সেই আশঙ্কায় তারা ঘাবড়ে গিয়েছিল। কিন্তু এখন সেইসব আশঙ্কা সমূলে ঘুচে গেছে। আজ তিনি এবং তাঁর বন্ধুবর্গ ম্যানিম্যাল ফার্মের প্রতিটি ইঞ্চি পরিদর্শন ১৩০ য়্যানিম্যাল ফার্ম এবং পর্যবেক্ষণ করেছেন; করে কি দেখেছেন? কেবলমাত্র যে সবচেয়ে আধুনিক উপায়েই এখানকার কাজ এখানকার কাজ চলে তা-ই নয়, এখানকার নিয়মানুবর্তিতা, সুব্যবস্থা, পৃথিবীর যে কোনও চাষীর কাছে অবশ্য অনুকরণীয়। তিনি মনে করেন, এবং কথাটাও ঠিক যে য়্যানিম্যাল ফার্মের ইতর জানােয়ারগুলো এই দেশের যে কোনও খামারের পশুদের চেয়ে ঢের বেশি কাজ করে আর সে তুলনায় সবচেয়ে কম খেতে পায়। আজ তিনি এবং তার সঙ্গী পরিদর্শকেরা এখানে যা-যা বৈশিষ্ট্য দেখে গেলেন তার অনেকগুলিই নিজেদের খামারে অবিলম্বেই চালু করতে ইচ্ছা করেন। পরিশেষে আর একবার বর্তমান প্রীতিপূর্ণ মনােভাবের উপর আস্থা জ্ঞাপন করে, পিকিংটন এই কথা বললেন যে, ভবিষ্যতেও যেন হ্যানিম্যাল ফার্মের সঙ্গে প্রতিবেশী খামারগুলির এই সৌহার্দ্য বজায় থাকে। শূকর আর মানুষের মধ্যে কোনাে স্বার্থজনিত সংঘর্ষ থাকা উচিত নয়, প্রয়ােজনও নেই। তাদের দু-তরফের সংগ্রাম এবং অসুবিধে ত পৃথক নয়। শ্রমিক সমস্যা কি সবজায়গাতেই একরকম নয়? মনে হচ্ছিল যেন এরপরই মিষ্টার পিকিংটন একটি সূক্ষ্ম, সযত্বরচিত রসিকতার অবতারণা করবেন কিন্তু আর কিছু বলবার আগে তিনি নিজেই কৌতুকের ঢেউ-এ ভেসে গেলেন। অনেকবার ঢােক গিলে, থুৎত্রী এবং গালের পরতে পরতে লালের আভায় রাঙা হয়ে গিয়ে, কোনােরকমে তিনি বললেন—তােমাদের যেমন ইতর জানােয়ারদের সঙ্গে লড়তে হয় আমাদেরও তেমনি নিম্নশ্রেণীর সঙ্গে এই খাশা রসিকতায় টেবিলের সবাই হেসে গড়িয়ে পড়ল। এবং মিঃ পিকিংটন আর একদফা শূকরদের অভিনন্দন জানালেন কম খাবার দেওয়া, বেশি খাটানাের য়্যানিম্যাল ফার্ম ১৫ ব্যাপারে। ম্যানিম্যাল ফার্মে আদর দেওয়ার ভাব যে মােটেই নেই তা লক্ষ্য করেও তিনি খুশি হয়েছেন। এবার তিনি সকলকে উঠে দাঁড়াতে অনুরােধ জানিয়ে বললেন আপন-আপন গেলাস বেশ ভতি আছে কি না পরখ করে নিন। তারপর সর্বশেষে সে বলভদ্রমহােদয়গণ ! আসুন আমরা এই হ্যানিম্যাল ফামের শুভ কামনায় পান করি। এরপর খুশি-হাসি হুল্লোড় আর মেঝেতে পা ঠোকাঠুকির পালা। নেপােলিয়ন এত খুশি হয়েছিল যে, সে তার আসন ছেড়ে উঠে গিয়ে মিঃ পিকিংটনের মগের সঙ্গে নিজের পাত্রটা ঠেকিয়ে নিয়ে তারপর সেটা নিঃশেষ করল। আনন্দের বেটা আনন্দের বেগটা একটু কমে যেতেই, নেপােলিয়ন জানালো যে তারও কয়েকটি কথা বলবার রয়েছে। নেপােলিয়নের অন্যান্য বক্তৃতার মতই এটিও সংক্ষিপ্ত এবং বাহুল্য। বর্জিত। অবশেষে ভুল বােঝাবুঝির পালাটা চুকে যাওয়াতে সেও খুশি হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে নানা গুজব রটনার ফলে—এ গুজব যে চক্রান্তকারী শত্রুর দ্বারাই রটেছিল, সেরকম বিশ্বাসের কারণও তার যথেষ্ট রয়েছে—অনেকের ধারণা হয়েছিল যে, নেপােলিয়ন এবং তার সহকর্মীদের দৃষ্টিভঙ্গী শুধু ধ্বংসাত্মকই নয়, বিপ্লবমুখীও বটে। তারা নাকি আশপাশের খামারের পশুদের মধ্যে বিদ্রোহের বীজ ছড়িয়েছে এমন দুর্ণামও রটেছে। এরচেয়ে বড় মিথ্যা আর কী হতে পারে! অতীতে এবং বর্তমানে তাদের একমাত্র লক্ষ্য হচ্ছে আশপাশের প্রতিবেশীদের সঙ্গে শান্তিতে বসবাস করা এবং স্বাভাবিক লেন-দেন বজায় রাখা। এই খামারটি পরিচালনার গৌরব নেপোলিয়নের নিজের উপর অর্পিত হলেও আসলে এটি সমবায় প্রতিষ্ঠান। এর যানিম্যাল ফার্ম মালিক হচ্ছে শূকরেরা সবাই—স্বত্বের দলিলটি নেপােলিয়নের কাছেই রয়েছে। সে বলে যে, তার বিশ্বাস এখন আর সেই পুরনাে সন্দেহের জড় নিশ্চয়ই বেঁচে নেই তবে সম্প্রতি খামারের দৈনন্দিন কাজের মধ্যে যে কতকগুলির বিশেষ অদলবদল হয়েছে, সেগুলির থেকে এই বিশ্বাস আরও দৃঢ় প্রতিপন্ন হবে; এতাবৎকাল যানিম্যাল ফামের পশুরা পরস্পরকে ‘কমরেড’ বলে ডাকত, সেটা খুব বাজে রেওয়াজ। এটা অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। আরও একটা বিদঘুটে নিয়ম এতদিন চলে এসেছে যার কোনাে মাথামুণ্ডু খুজে পাওয়া যায় না। প্রতি রবিবারের সকালে কুচকাওয়াজ করে বাগানের মধ্যে একটি খুটিতে লটকানাে বুনাে-শুয়ােরের মাথাকে সম্মান দেখানাে হয়ে থাকে। এটাও বন্ধ করতে হবে, সে খুলিটা ত গাের দেওয়া হয়েই গিয়েছে। উপস্থিত দর্শকেরা নিশ্চয় পতাকাদণ্ডে উড়ন্ত সবুজ নিশানটি দেখেছেন! তা যদি দেখে থাকেন তাঁরা, তাহলে, এটাও লক্ষ্য করেছেন নিশ্চয় যে, আগেকার সেই শাদা রং-এ আঁকা ঘােড়র খুর আর শিং-এর চিহ্নগুলাে মুছে ফেলা হয়েছে। এখন থেকে নিশানখানাতে খালি সবুজ রং ছাড়া আর কিছুই থাকবে না। সে বলল যে, মিঃ পিকিংটনের পড়শীসুলভ অতি নােম বক্তৃতার সম্পর্কে মাত্র একটি সমালােচনা সে করবে। মিঃ পিকিংটন তার বক্তৃতার মধ্যে আগাগােড়া ‘য়্যানিম্যাল ফার্ম বলেই উল্লেখ করে এসেছেন এই খামারকে। পিকিংটন অবশ্য জানতেন না, আর তিনি আনবেনই বা কি করে, যেহেতু নেপােলিয়ন নিজেই এই সর্বপ্রথম ঘােষণা করছে যে, “য়ানিমাল ফার্ম’ নাম আজ থেকে উঠে গেল।

য়্যানিম্যাল ফার্ম এরপর থেকে এই ফার্মকে সবাই ‘ম্যানর ফার্ম বলেই জানবে। কারণ এটাই হচ্ছে আদি এবং ন্যায়সঙ্গত নাম। ‘ভদ্রমণ্ডলী! সে বল—এবারে আমিও আগের মতই আপনাদের শুভকামনার জন্য অনুরােধ করব, তবে অন্য কায়দায়। আপনারা প্লাস বেশ ভর্তি করে নিন। ভদ্রমণ্ডলী, এই আমার কামনা-ম্যানর ফার্মের জয় হােক! আগের মতই আনন্দের ধুম পড়ে গেল। মগগুলােও চটপট ফাক হয়ে গেল। কিন্তু বাইরে থেকে এই ব্যাপার দেখে পশুগুলাে একেবারে স্তম্ভিত হয়ে গেছে। ওদের মনে হচ্ছে যেন, কী একটা অদ্ভুত অভাবনীয় কাণ্ড দেখেছে। হঠাৎ কেন শূকরদের মুখের চেহারা বদলে গেল। কিসের দরুন এমনভাবে এদের হাবভাব পাল্টে গেল? ক্লোভারের নিষ্প্রভ বুড়াে চোখজোড়া প্রত্যেকের মুখের ওপর দিয়ে বুলিয়ে গেল । ওদের যে থুনীতে কারুর চারটে, কারুর পাঁচটা, কারুর বা তিনটে করে ভাঁজ পড়েছে। কিন্তু হঠাৎ কেন ওরা পাল্টে গেল ? আস্তে আস্তে হৈ-চৈ থামল, বৈঠকের সবাই নিজের নিজের তাস তুলে নিল এবং স্থগিত খেলাটা আবার শুরু করে দিল। পশুরাও সবাই চুপিসাড়ে ফিরে চল। ওরা তখনও বিশগজ গিয়েছে কিনা সন্দেহ, এমন সময়ে থমকে দাড়াল। বাড়ির ভেতর থেকে খুব জোর গােলমালের আওয়াজ আসছে—খুব চেল্লা-চিল্পী লেগে গিয়েছে। ওরা আবার ছুটে ধাওয়া করল, এবং জানালা দিয়ে উকি মেরে দেখল যে—খুব জোর ঝগড়া আরম্ভ হয়ে গিয়েছে। খুব গলাবাজি হচ্ছে, টেবিল চাপড়ানাে চলছে, বাদ-প্রতিবাদ, সন্দিগ্ধ তীব্র কটাক্ষেরও বিরাম নেই আসল ১. য়্যানিম্যাল ফার্ম গােলমালের মূলটা সম্ভবত এই যে, মিস্টার পিকিংটন এবং নেপােলিয়ন দু’জনে একই দানে একটি করে ইস্কাপনের টেকা খেলে বসেছে। বানােটি কণ্ঠের সমবেত ক্রুদ্ধ চীৎকার প্রত্যেকে একই ভঙ্গীতে চেঁচিয়ে চলেছে। এখন আর এ প্রশ্ন নয় যে শূকরদের মুখগুলাের কোথায় কী হ’লল । বাইরের পশুগুলো একবার শূকরের মুখের দিক থেকে মানুষের মুখের পানে তাকায়-আবার মানুষ থেকে শূকরের দিকে—পুনরায় শূকরের দিক থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ে মানুষকে দ্যাখে—কিন্তু এখন আর ওদের পক্ষে বুঝে ওঠা অসম্ভব যে কোটি কি ?

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Animal Farm

Author
Orwell,george
Title
Animal Farm
File name
Animal Farm
Text
OCR done
Citation
1946
Published
2010/04/28
Publisher
Mitra O Ghosh, Kolkata
Language
Sanskrit
Pages
149
Library
Dipsikha Library, Howrah
Classification
Farming
Keywords
Orwell,George
DLI number
514280
Barcode
4990010016727.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
MmKGw6VLrW3
Download PDF

Animal Farm