Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Kaminikishore

Ray,narayan Das · 2009/11/26

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

কামিনীকিশাের
বিখিরা নিবাসী
শ্রীনারায়ণদাস রায় কর্তৃক
প্রণীত।
শ্রীকেদারনাথ গােস্বর
সংশােধিত
কলিকাতা
শ্রীনলকৃষ্ণ সরকার দ্বারা
গণেশ যন্ত্রে-মুদ্রিত।
সন ১২৮৫ সাল।

No text on this page.

কামিনীকিশাের।
১৯®
ছিল এক নৃপবর অবন্তী নগরে।
নরেশ্বর গুণাকর পৃথিবী ভিতরে
প্রজার পালনে রাম বুদ্ধে বৃহস্পতি
ধৰ্ম্মেতে তৎপর যেন পাণ্ডবের পতি।
জিতেন্দ্রিয় অরিন্দম দয়ার সাগর।
দীন হীনে ধন দানে না হন কাতর।
বিদ্যোৎসাহী পরাক্রান্ত নাহি হেরি দুটি।
ধনেতে ধনেশ সম রণেতে কিরিটী ।
সভা শােভিত করেন সদা বুধগণ।
পৌরাণিক তর্ক-বেআদি যত জন ।
অদৃষ্টে লিখিত যাহা কে করে খণ্ডন।
পুত্ৰ হেতু সর্বক্ষণ দুঃখিত রাজন ।
পুত্র যার নাহি তার কি ফল জীবনে।
সদত ভাবেন ভূপ বসিয়া নিৰ্জ্জুনে ॥
এই সব রাজ্যধন কে ভােগ করিবে।
মরণান্তে পঞ্চভূতে লুটিয়া লইবে।
রাজ কাৰ্যে বিসর্জন দিয়া নরপতি।
সদ নির্জুনে স্থিতি বিষাদিত মতি ।

কামিনীকিশাের।
উন্মনা হেরিয়া তারে সচিব সুজন।
উপদেশ দেন কত হয়ে স্থির মন ।
অনিত্য সংসার রাজা কিছু স্থির নয়।
ভব ঘােরে বদ্ধ হলে কালে করে লয় ।
সে যাহা হউক শুন স্থির কর মতি।
যে রূপ করিলে পাবে দুঃখে অব্যাহতি।
দীন হীন দুঃখি জনে কর বিতরণ।
ব্রাহ্মণ পণ্ডিতে দেহ যে চাহে যেমন ॥
হর্ষিত হইয়া সবে হর সন্নিধানে।
প্রার্থনা করিবে পুত্র তােমার কারণে।
দৈব বল সম বল নাহেরি সংসারে।
অবশ্য হইবে তব নন্দন অচিরে ॥
শুনিয়া মন্ত্রীর বাণী কহিছে রাজন।
কোষাধক্ষে শীঘ্রগতি অনাও এখন ।
আজ্ঞা মাত্রে মন্ত্রীবর তারে আনাইল ।
আসিয়া সে কর যােড়ে সম্মুখে ধাইল।
রাজা বলে কোষাধক্ষ্য করহ শ্রবণ।
বিতরণ কর ধন যে চাহে যেমন ।
সকলেরে এই মাত্র বলিয়া যে দিবে।
রাজার কারণে পুল ঈশ্বরে যাচিবে ।
নৃপতির অনুমতি পাইয়া তখন।
ভাণ্ডার লুটায়ে দিল কে করে বর্ণন।
কানা খোঁড়া কুঁজো আদি যথায় যে ছিল
শ্ৰত মাত্র রাজবাটী আসি উত্তরিল।

কামিনীকিশাের।
দরিদ্র ব্রাহ্মণ ভাট আর যত জন।
ক্রমে সবে রাজবাটী করিছে গমন ।
অবশ্য পাইব ধন করি বিবেচনা ।
পথি মধ্যে নানাবিধ করয়ে কল্পনা ॥
ইথে যদি ধন পাই ভাৰ্যার করাণ।
ক্রয় করি লয়ে যাব বসন ভূষণ।
হেন মতে নানাবিধ ভাবিতে ভাবিতে।
উপস্থিত হল শেষে রাজার বাটীতে ।
মনমত ধন পেয়ে মস্তকে লইয়া।
প্রস্থান করিল সবে সন্তোয় হইয়া ।
পথি মধ্যে বলা বলি করে সকলেতে।
ভূপতির পুত্র হবে কি সন্দেহ তাতে ॥
মন দিয়া শুন সবে আমার ভারতি।
কিছু দিন পরে হল রাণী গর্ভবতী
দশ মাস দশ দিনে প্রসব, হইল।
শুভ দিন শুভক্ষণে নন্দন জন্মিল।
দাসী আসি মহারাজে কহে বিবরণ।
মহারাণী প্রসবিল সন্তান রতন।
শ্রবণে শ্রবণ মাত্র লয়ে হেম হার।
মহারাজ দাসীরে দিলেন পুরস্কার।
ডাকাইয়া ভাণ্ডারিরে কহে ফেনীপাণী।
দীন হীনে ধন দেহ শুন মম রাণী ।
জ্যোতিষে পণ্ডিত যারা সভার মধ্যেতে।
কুমারের শুভাশুভ লাগিল গণিতে ।

৪
কামিনীকিশাের।
আর আর অন্য জনে দিয়া অনুমতি।
অন্দরে প্রবেশে রাজা, মন্ত্রী মহামতি ।
নন্দনের শােভা হেরে কহেন রাজন।
এত দিনে পূর্ণ হল মম আকিঞ্চন।
দাসী আসি পুনরায় করে নিবেদন।
মহারাজ হইয়াছে মন্ত্রীর নন্দন ।
পূলকে পূর্ণিত হয়ে মালা মুকুতার।
দাসীরে সংবাদ হেতু দেন পুরস্কার।
অতঃপরে মন্ত্রীবরে লইয়া রাজন।
নানাবিধ হাস্যালাপে চলিল তখন।
সচিব মন্দিরে গিয়া মনুজোেরায়।
মন্ত্রী পুত্ৰ হেরি রাজা হরষিত কায় ।
ধন্য তুমি মন্ত্রীবর এমহীমণ্ডলে।
তােমার সদৃশ আর নাহিক ভূতলে।
অনুমানে বুঝি শশী ত্যজিয়া আকাশে।
আশ্রয় লয়েছে আসি তােমার আবাশে।
এত বলি বহুক্ষণ নিরখি রাজন।
মন্ত্রীবরে রাখি আইল আপন ভবন।
নরেন্দ্র নরেন্দ্ররায় আসিয়া ভবনে।
জিজ্ঞাসেন কুমারের শুভ বুধগণে।
পণ্ডিতগণেতে বলে শুন নরপতি।
শুভক্ষণে জন্মিয়াছে তােমার সন্ততি
বহু বিদ্যা শিখিবেক নাহিক সন্দেহ।
হইবে শাস্ত্রে কহে হেন যােদ্ধা কেহ।

কামিনীকিশাের।
৫
তবে রাজা সভা ভঙ্গ করিয়া মন্দিরে।
প্রবেশ করেন শুভ বলিতে রাণীরে।
শুন প্রিয়ে মন দিয়া কহি বিবরণ।
কুমারের শুভক্ষণে হয়েছে জনম।
এত বলি নন্দনেরে ক্রোড়েতে করিয়া ।
স্নেহ ভাবে দেখিছেন নয়ন ভরিয়া ।
কামিনীকিশাের নাম রাখিলেন ভূপ।
কামিনীর মন লােভা কামের স্বরূপ।
ক্রমেতে নরেন্দ্র সুত পঞ্চম বৎসর।
মন্ত্রীর তনয় হল উহার সােসর।
শুভদিন দেখি পরে সচিব রাজন।
দুজনারে বিদ্যালয়ে করেন প্রেরণ ॥
হিন্দি উর্দ, আদি ইংরাজি পারসী।
সংস্কৃত হিব্ধ ভাষায় হল বহুদশী ।
ক্রমে ক্রমে যত বিদ্যা সকলি শিখিল।
পণ্ডিতেরা শুনি সবে আশ্চৰ্য্য মানিল ।
আল্লাদিত হয়ে রাজা সভায় আসিয়া।
রাজ কাৰ্য করে সদা প্রেমেতে মজিয়া।
একদিন সভা মধ্যে আছেন রাজন।
কামিনীকিশাের আসি দিল দরশন।
প্রণমিয়া যােড় হস্তে কহে নৃপবরে।
মৃগয়া করিতে যাব কানন ভিতরে।
প্রসন্ন হইয়া মােরে দেহ অনুমতি।
স্বভাবের শােভা হেরি মনে পাব প্রীতি

৬
কামিনীকিশাের।
সহচর লয়ে কোন প্রয়ােজন নাই।
সচিব তনুজ বন্ধু আর আমি যাই ।
যাও বাপু মৃগয়ায় সর্তকে ভ্রমিবে।
বিলম্ব না হয় যেন ত্বরায় আসিবে।
পিতৃ অনুমতি পেয়ে মাতার ভবনে।
প্রবেশ করেন তবে কুতুহল মনে।
মায়ের নিকটে গিয়া কহে যােড় করে।
মৃগয়াতে অনুমতি দেহ গাে আমারে ।
শুনিয়াত মহারাণী চমকি উঠিল।
ধীরে ধীরে পুত্র প্রতি কহিতে লাগিল।
কাননেতে গিয়া বাছা কি ফল হইবে।
মৃগয়া করিতে গিয়া আমারে বধিবে ।
পুত্র বিনা সব শূন্য ভাবিয়ারে মনে।
পাগলিনী প্রায় আমি ছিনুরে ভবনে।
নিরন্তর ভাবি আমি কিসে পুত্র পাব।
এ তাপিত প্রাণ আমি কেমনে জুড়াব।
এইরূপ বহু ক্লেশে কাটি বহু কাল ।
পুত্র হেতু পূজিনু যােগী মহাকাল।
কত কষ্টে যাের্গীন্দ্র দিয়াছেন তােরে ।
বনে যেতে বলি বাছা কেমনে তােমারে।
নিতান্তই বনে যদি যেতে চাও তুমি।
তােমার অগ্রেতে প্রাণ ত্যজি আগে আমি
মায়ের বচন শুনি মহীন্দ্র নন্দন।
আশা ভঙ্গ ভাবি মনে মলিন বদন।

কামিনীকিশাের ।
প্রবােধিতে মায়েরে করিয়া স্থির মন।
নানাবিধ কহে মায়ে অমিয়া বচন।
বীর কন্যা, বীর মাতা, বীরের গৃহিণী।
তবে কেন কহ মাতা ভয়াতুর বাণী ।
স্থির হয়ে থাক মাতা আপন ভবনে।
তােমার প্রসাদে মাগােনা উরি শমনে ।
অল্প দিনেই হইব গৃহে প্রত্যাগত।
আশীৰ্বাদ কর মাতা স্থির কর চিত।
একবার দেহ মাতা দেহ অনুমতি।
মানস হয়েছে অতি বনে করি গতি।
কুমারের বাঞ্ছা বুঝি মহীন্দ্র গৃহিণী।
বাধা দেওয়া অনুচিত মনে মনে গণি।
কাতরে দুঃখিত স্বরে কহিছে তখন।
সাবধানে কাননে ভ্রমিবে বাছাধন।
এতেক বলিয়া অনুমতি দিল তারে।
কুমার প্রণাম করি শুভ যাত্রা করে ।
মন্ত্রীবরে প্রণমিয়া রঞ্জন তখ
তখন'।
মায়ের নিকটে গিয়া দিল দরশন।
অনুমতি দেহ মাতা মৃগয়াতে যাব ।
প্রকৃতির শােভা আমি নয়নে হেরিব ।
কুমার আমার জন্য আছেন বসিয়া।
কেমনে থাকিব আমি উদাস হইয়া
মাতা বলে তবে বাছা যাও সাবধানে।
দেখ যেন দুঃখিনীরে বধনা পরাণে।

কামিনীকিশাের।
রঞ্জন প্রণাম করি মায়ের চরণে।
তুরঙ্গ লইল এক বাহির ভবনে।
নানাবিধ অস্ত্র শস্ত্র লইয়া তখন।
রাজার ভবনে আসি দিল দরশন।
হিরা চুনি পান্না আদি বহুবিধ ধন।
অল্পে বহু হয় যাহা লইল নন্দন।
অস্ত্র শস্ত্র নানা বিধ লইল বাছিয়া ।
পুনৰ্ব্বার মহারাজে প্রণাম করিয়া ।
ভূবন বিখ্যাত অশ্বে করি আরােহণ।
তুর্ণ বেগেতে দোহে করিল গমন।
কামিনীকিশাের ও রঞ্জনের অরণ্যে প্রবেশ
তরুগণ,
প্রবেশি নিবিড় বনে,
আশ্চৰ্য্য গণিয়া মনে,,
বন শােভা করে দরশন।
শাখী পরে পাখীগণ, স্ব স্ব স্বরে আলাপন,
প্রকৃতিরে করয়ে বর্ণন।
ফলে ফুলে তা
শােভিতেছে অনুক্ষণ,
ভাবুক জনের মন ধায়।
হিংস্র জন্তু কত শত, ভ্রমিতেছে অবিরত,
যাহা দেখি ভয়ে কাপে কায়।
কোন স্থানে নদ নদী, বহিতেছে নিরবধি,
হেরিলে হরিষ হয় মন।
আসে যত জন্তুগণে,
তৃষিত হইয়া প্রাণে,
খাইবারে নির্মল জীবন।

কামিনীকিশাের।
৯
যত সব মৃগগণ,
করিতেছে বিচরণ,
নব নব তৃণ অন্বেষিয়া ।
খায় যত আকিঞ্চন, কভু নাহি নিবারণ,
ভ্রমিতেছে নির্ভয় হইয়া ।
এইরূপ হেরে রায়, ভ্রমিতেছে পুনরায়,
ক্রমে এল নিবিড় কাননে।
দেখে এক তরুবরে,
সুশােভিত ফলভরে,
কুমারের বাসনা ভক্ষণে।
শুন ওহে প্রিয়জন, সধি এক প্রয়ােজন,
তােমা বিনে কেবা সহকারী।
পাড়ি দেহ এইফল, ক্ষুধাতে দেহ বিকল,
প্রাণে দুঃখ সহিতে না পারি ।
রঞ্জন শুনিয়া কয়,
ব্যস্ত কেন মহােদ
আনি দিব অন্যথা না হবে।
এত বলি শান্ত মতি, উঠিলেন শীঘ্রগতি,
মনে করি ফল আহরিবে ।
বৃক্ষেতে ভল্লুক ছিল, রঞ্জনে গ্রাসিতে এল,
তরুবর শাখার উপরে।
বিষম বিপদে পড়ি, বৃক্ষের শাখায় চড়ি,
ভল্লুকের সহ যুদ্ধ করে।
নানাবিধ রণ করি, সহিতে না আর পারি,
অচৈতন্যে পড়ে মহীতলে।
ভল্লুক সে ক্রোধকরি, বধিতে আপন অরি,
নামিলেক তরুবর তলে।

কামিনীকিশাের।
মুখ করি প্রসারণ,
গ্রাসিতে মন্ত্রীনন্দন,
কালান্তক কাল যেন ধায়।
(রায়) ভাবে উভয় বিপদে, বাঁচাইবে কি সুহৃদে,
কিম্বা রক্ষা করে স্বীয় কায় ।
শেষে করি মহারণ, ভল্লুকে করে নিধন,
খরশান অসি প্রহারণে।
কোলেতে করিয়া পরে, প্রাণ সম বন্ধুবরে,
তাধারা বহে দুনয়নে ॥
আসিয়া নিবিড় বনে, আমা হেন মূঢ় সনে,
বিপাকে হারালে জীবন হে।
কোথা গেলে প্রিয়জন, কেন আছ অচেতন,
বারেক সুধা ভাষে ডাক হে।
মেনেতে তােমা ধনে, ছাড়িয়া এঘাের বনে,
একাকী যাইব স্বদেশে হে।
কি কহিব তব মায়,
কহ তার সদুপায়,
যবে দেবী চাহিবে তােমায় হে।
হেরি সব অন্ধকার,
প্রিয়জন বিনে আর,
কি ফল জীবনে বাঁচিয়ে হে।
এই দণ্ডে তােমা সনে, ত্যজিব এছার প্রাণে,
স্বহস্তে প্রহার অসির হে।
হায় বিধি নিদারুণ, হরিলি অমূল্য ধন,
মােরে বনে করিয়া বঞ্চিত।
মরি মরি হায় হায়, জ্ঞান শূন্য হয়ে রায়
ধরাশনে হলেন পতিত।

কামিনীকিশাের।
পরে যাহা হয় তাহা করহ শ্রবণ।
এইরূপে দুই জনে আছে অচেতন ।
আইলেন সেই স্থানে ঋষি একজন।
জটাধারী মহাশয় ধাৰ্মিক সুজন।
হেরিয়া দোহারে তার দয়া উপজিল।
বারম্বার উচ্চস্বরে অনেক ডাকিল ।
অবশেষে তাহাদের না পেয়ে উত্তর।
আইলেন ঋষিবর নিকটে স্বত্বর ॥
অচৈতন্য হেরে দোহে সেই মহাজন।
ব্ৰহ্ম মন্ত্রে বারি দানে করায় চেতন ।
যােগ বলে যােগীবর খাদ্য আনি দিল।
সূধাসম খাদ্য দোঁহে ভােজন করিল।
অতঃপর মুনিবর জিজ্ঞাসে তখন।
কিবা নাম কি কারণে আইলে কানন ।
রাজার কুমার হবে হেন মনে হয়।
নতুবা হইবে কোন সাধুর তনয় ।
ঘােড় করে সবিনয়ে কহেন কুমার।
ক্ষিতিলে বিখ্যাত যে অবন্তী নগর ॥
সদানন্দ নামে থাকার মহীপতি।
আমি তার এক পুত্র শুন মহামতি ।
এই সেই মহারাজ মন্ত্রীর নন্দন।
অসীম সাহসে যার প্রবেশি কানন।
ঋষিবর হইল দয়া দোঁহাকার প্রতি।
বলে বাপু মাগবর দিবরে সম্প্রতি ।

১২
কামিনীকিশাের।
করযােড়ে দাণ্ডাইয়া কহে মুনিবরে।
যদি বর কিঙ্করে দিবেন দয়া করে।
রণ জয়ী হই যেন পৃথিবী মধ্যেতে।
তথাস্থ বলিয়া ঋষি প্রবেশে বনেতে ।
ঋষিবর বর পেয়ে নির্ভয় হইয়া ।
পুনশ্চ ভ্রমণ করে মৃগ অন্বেষিয়া ।
নয়নে হেরিল এক পৰ্বত শিখর।
ক্রমে আসি উত্তরিল তাহার উপর।
ভয়ঙ্কর অজাগর সর্ধেতে ভূষিত।
সিংহ ব্যাঘ্র গণ্ডারাদি চরে অবিরত।
ভয়েতে ব্যাকুল হয়ে রাজার নন্দন।
রঞ্জনের প্রতি তৰে কহিছে তখন।
যদি এ সঙ্কটে রক্ষা করেন গােসা।
তবেত সে জন্ম ভূমি হেরিবারে পাই।
ছাড়ি রাজ্য ধন নিধি অরণ্যেতে এসে।
হিংস্রক প্রাণীর ভক্ষ হতে হল শেষে।
রঞ্জন বলেন বন্ধু কি ভয় তােমার।
শ্রম শ্রান্তি কর বসি ভূপাল কুমার ।
অজানুলম্বিত বাহু ধরি কি কারণ ।
ইহা কি ভােজন লাগি বিধির গটন ।
এই নিষ্কাশিত অসি করেতে আমার ।
তিলার্ধে করিতে পারি বিজয় সংসার।
দেখিল পরেতে এক মন্দির সুন্দর।
শােভিত হতেছে সেই পৰ্বত উপর।
*

কামিনীকিশোর।
কি কব মন্দির শােভা না যায় বর্ণন
হেরিলে হরি হয় জুড়ায় জীবন ॥:. .
স্ফটিকে নির্মিত কিবা অপরূপ শােভা
দীপ্তমান সদা যিনি প্রভাকর প্রভা।
অমূল্য প্রস্তর কত প্রাচীরে খচিত।
নীল চন্দ্র স্বর্ণকান্ত মণিতে রচিত।
কৈলাশ শিখরে যেন ত্রিলােক ঈশ্বর।
বিরাজিছে শূলপাণি তাহার ভিতর
সাষ্টাঙ্গেতে প্ৰণিপাত করি মহেশ্বরে।
ভক্তিভাবে কত মতে দোঁহে স্তব করে।
আদি ব্ৰহ্ম নিরঞ্জন তুমি সনাতন।
সৃষ্টি স্থিতি প্রলয়ের তুমি সে কারণ
তুমি ব্ৰহ্মা তুমি বিষ্ণু তুমি মহেশ্বর।
তুমি চন্দ্র তুমি সূৰ্য্য তুমি চরাচর
সকলের আদি তুমি অনাদি কারণ।
ব্রহ্মাণ্ড তােমাতে লয় হয় সে কারণ।
দিনান্তে যেলােক তােমা করয়ে স্মরণ ।
যম ভয় হতে তারেকরহতারণ ।
মায়া মুক্ত যেই জীব হয় নিজগুণে।
অবশেষে স্থান পায় তোমার চরণে ।
কৃপাসিন্ধু কৃপা দানে করহ কটাক্ষ।
ভব ভয় হতে তারে তার বিরুপাক্ষ ।
নানা মত স্তব করি ভবানী প্রাণেশে।
প্রাণাম করিতে বাধ্য করে অবশেষে ॥

১৪
কামিনীকিশাের।
হেন কালে সৈন্য ধ্বনি শুনিয়া শ্রবনে।
ভয়েতে আকুল হয়ে ভাবে মনে মনে।
মৃগয়া করিতে কোন মহান রাজন।
আসিয়াছে বুঝি এই নিবিড় কানন ॥
এমত ভাবিয়া কহেকুমার রঞ্জনে।
আসিতেছে কোন দিকে দেখহ এক্ষণে।
কুমারের শুনে বাণী রঞ্জন তখন।
নিরখিয়া দেখিবারে করিল গমন।
মন্দিরের ছাদে উঠি লুক্কায়িত হয়ে ।
দেখেন বৃতান্ত সব বিশেষ করিয়ে ।
অশ্বারােহী পদাতিক গনণা না যায়।
মাতঙ্গে চড়িয়া কেহ মুকুট মাথায় ।
যােড়শী বয়স্কা কতৃ কামিনী বেষ্টিত।
নিরুপমা মােহিনী এক চতুর্দোলে স্থিত
কুমারীরে হেরিয়া সে সত্বর রঞ্জন।
কহিতে লাগিল আসি যথা বিবরণ
শুন শুন প্রাণ সখা করি নিবেদন।
আসিতেছে এক ধনী সহ সেনাগণ।
রূপের বর্ণনা তার কি কহিতে পারি।
সাধ্য মতে বলি তুবে যাহা কিছু পারি।
কামিনীর রূপ বর্ণনা।
কিবা সুঠামে বেণী বিনায়েছে ধনী।
সাপিনী বেনীরে হেরে গহ্বর বাসিনী ।

কামিনীকিশাের।
* *
বদন তুলনা কিবা কহিব বলনা।
অদ্যাবধি ভয়ে শশী ভূতলে আসে না।
জরুর ভঙ্গিমা হেরে কাদম্বিনী ধনু।
বিমানে আশ্রয় নিল যথা আছে ভানু
নয়নের শােভা যেবা না হেরে নয়নে।
সেই সে প্রশংসা করে মৃগের নয়নে।
অঞ্জন খঞ্জন আঁখি বিবাদ ভঞ্জনে।
বিধি গঠেছেন নাসা স্থির করি মনে।
তিলফুল জিনিয়া সে রাজিত বদনে।
গৃধিনী পাইয়া লজ্জা ভ্ৰময়ে গগণে ॥
অধর রঙ্গিমা হেরে চপলা চপলা।
দন্তের মাধুরী জিনি মুকুত্তার মালা ।
কনক কলসে কেবা প্রশংসা করিবে।
কুচদ্বয় যেই জন নয়নে হেরিবে ।
বাহুর বর্ণিমা তার বর্ণিবারে নারি।
পৃথিবী ভিতরে হেন তুল্য নাহি হেরি ।
অঙ্গুলি চম্পক কলি তাহে নখচন্দ্র।
সিন্দুর মাঝারে যেন মুকুতার বৃন্দ ।
কোটি কোটি হেরিয়াছি কেশরীর কোটি।
তার সম কভু আর হেরি নাই দুটি।
উপমায় তুল্য নহে কামের কামিনী।
উরুর যুগল শােভে রাম রম্ভা যিনি ।
মাতঙ্গ আতঙ্গে হেরি তাহার গমনে'।
ভ্রমিতেছি অদ্যাবধি নিবিড় বিপিনে ।

১৬
কামিনীকিশাের।
স্বরূপ সে রূপ বর্ণ হেরি না ভূবনে।
বিদ্যুৎ অস্থির সদা দেখে সে বরণে ॥
কুমারেরে এইরূপে কহিছে রঞ্জন।
ক্রমে সৈন্য এল সব মন্দির সদন।
ভতে আকুল হয়ে কুমার ও রঞ্জন।
ছাদের উপরে দেহে করিল গমন।
অপমান করে যদি জানিতে না পারি ।
মনে ভাবি লুকাইলেন ছাদের উপরি।
হেনকালে তথা এক সন্যাসী সুজন।
শিব দরশন হেতু
উপস্থিত হন।
তাহারে হেরিয়া সেই রাজার কুমারী।
নামিয়া প্রণাম করে পদযুগ ধরি ।
সন্যাসী জিজ্ঞাসে বাছা তুমি কোন জন।
কাহার ঔরসে তব জনম গ্রহণ।
কিবা নাম ধরে এই সঙ্গিনী তােমার ।
শ্রবণ করিতে বাঞ্ছা হয়েছে আমার।
শুন তবেম্মহাশয় করি নিবেদন।
আমার পিতার নাম অনঙ্গমােহন।
বিশাল নগর হয় তাঁর রাজধানী।
হৈমবতী নাম ধরি তাহার নন্দিনী ।
অনঙ্গমােহন মন্ত্রী যেই গুণধাম।
তাহার তনয়া এই বিনােদিনী নাম।
বিবরণ শুনি সব সন্যাসী রতন।
শিববরে প্রণাম করি করিল গমন।

কামিনীকিশাের।
১৭
গুপ্তভাবে থাকি তথা কুমার রঞ্জন।
পরিচয় পেয়ে হল আনন্দিত মন।
বিশাল নগরাধীপ কন্যা এবং মন্ত্রি কন্যার
শিবারাধনা।
কুমারী আসিয়া শেষে শিবের ভবন।
স্থির হয়ে বসি পূজা কৈল আরম্ভন।
প্রণমিয়া মহেশেরে,
আয়ােজন করি পরে,
হৈমবতী পূজাতে বসিল ।
আর যত সখীগণ, পূজিবারে পঞ্চানন,
গলবস্ত্রে সবে দাণ্ডাইল ॥
পুলকিত হয়ে ধনী, পূজিছেন শূলপাণি,
সচন্দন বিল্লদল দিয়া।
অঞ্জলি পুরিয়া বারি, মহেশ মস্তোকপরি,
ভক্তিভাবে দিতেছে তুলিয়া ।
পাদ্য অর্ঘ আদি করি, নৈবেদদি আর বারি,
ক্রমে সব নবেদি মহেশে।
পূজা করি বিধিমতে,
আঁখি মুদি যােড়হাতে,
স্তব করে অশেষ বিশেষে।
জয় জয় পাপ হর,
বিপদেতে ত্রাণ কর,
ভক্তিভাবে যে তােমায় ডাকে।
হরহে কলুষ হর,
মনইঃখ নাশ কর,
তার তাত সঙ্কটে আমাকে।

কামিনীকিশাের।
স্তব করি
অনাদি কারণ তুমি, গুণ কি বর্ণিৰ আমি,
তুব গুণ বেদে অগােচর।
অতর্কিতৈশ্চৰ্য্য তব,
বােধাতীত গুণ ভব,
বর্ণিবারে শকতি কাহার।
করিতে তােমার স্তুতি, অবসন্ন হয় শ্রুতি,
তব গুণ অপার অসীমা।
চন্দ্র সূৰ্য্য আদি যত, জমিতেছে অবিরত,
প্রচারিয়া তােমার মহিমা।
আমিত অবলা নারী, গুণ কি বর্ণিতে পারি,
নিজগুণে গুদয় কর।
ইত্যাদি অনেক রূপে,
ভূত ভূপে,
প্রদক্ষিণ করে ততঃপর ।
আর কর দিয়া গালে, বম বম্ শিব বলে,
গালবাদ্য করে কুতুহলে।
মন্ত্রী কন্যা আদি করি, আর যত সহচরী,
মহেশে প্রনমে সবে মিলে।
এইরূপে রাজসুতা, হইয়া বিনয়যুতা,
পূজা আদি সমাপ্ত করিল ।
সেইরূপে রামাগণ,
পূজিয়া ভূতভাবন,
ক্রমে সবে বাহিরে আইল ।
পুনৰ্বার চতুর্দোলে, আবােহন কর বলে,
শিবালয় বদ্ধ করিবারে।
পেয়ে তার অনুমতি, দাসী এক শীঘ্রগতি,
লাগাইল তালক বাহিরে।
L

কামিনীকিশাের।
নানাবিধ রঙ্গে ভঙ্গে,
আইলেন সখী সঙ্গে,
সৈন্য সব পশ্চাতে ধাইল।
রাজবাটী উত্তরিয়া, আপন মন্দিরে গিয়া,
ভােজনান্তে শয়ন করিল।
কামিনীকিশাের ও রঞ্জনের শিবালয়ে রুদ্ধ ও
রাজ সৈন্য কর্তৃক ধৃত।
ক্ষিতিপতি সুত তবে কহিছে রঞ্জনে।
এ হেন সুন্দরী নারী না হেরি নয়নে।
পতি যেই হবে সেই ধন্য মহীতলে।
পাইবে এই বিধুমুখী কত পূণ্যফলে ।
যেবা রূপ হেরিয়াছি ভুলিতে নারিব।
হৃদয় মাঝারে রূপ গাথিয়া রাখিব ।
স্বদেশেতে আর নাহি করিব গমন।
বিদ্বেষ করিয়া দেশে ভ্রমি কানন।
ফিরে যাও তুমি ঘরে কি ফল থাকিয়া।
বনে বনে ভ্রমি আমি কাঁদিয়া কাঁদিয়া ।
শেষেতে হতাশ হয়ে বিমলা কারণে।
নিবারিব সব দুঃখ সরসী জীবনে।
রঞ্জন কহেন তবে মহীন্দ্র নন্দনে।
যত্ন না করিলে রত্ন মিলে কি ভূবনে।
জ্ঞানী হয়ে কর কেন অজ্ঞানের কার্য।
একথা শুনিলে লােকে দিবে অতি লাজ।
শান্ত দান্ত জ্ঞানবন্ত সকলেতে বলে।
সে সকল গুণ তব গেল কি হে জলে

২০
কামিনীকিশাের।
নানা মতে মন্ত্রী সুত তারে আশ্বাসিয়া।
পুনৰ্বার কহিতেছে বিনয় করিয়া ।
অশেষ প্রকারে আগে চেষ্টা যে করিব।
অবশেষ গিয়া তব পিতারে কহিব ।
তােমার বাসনা জ্ঞাত হইয়ে রাজন।
অনঙ্গ মােহনে সব করিবে জ্ঞাপন।
বিশাল ভূপতি যদি অস্বীকার করে।
অপমান ভাবি ধ্রুব আসিবে সমরে।
ঘােরর রণ করি বিজয়ী হইয়া।
প্রমদায় দিবে ভূপ তােমারে আনিয়া।
হেন মতে বুঝাইয়া ভূপাল কুমারে।
ছাদ হতে আইলেন যাইতে বাহিরে।
কপাট হয়েছে বদ্ধ দেখিয়া রাজন
কুমারের প্রতি তবে কহিছে তখন।
বাহিরে যাইয়া আজি নাহি প্রয়ােজন
ঘাের নিশি ভয়ঙ্কর চরে জন্তুগণ।
সিংহ ব্যাঘ্র ভল্লুকের শুনি মহা নাদ।
অবিরত গণিতেছি মনেতে প্রমাদ।
সে কারণে শিবালয়ে রজনী বঞ্চিব।
প্রভাত হইলে দেহে নগরে যাইব।
কুমার কহিছে যদি যাবে না একান্ত ।
জলাভাবে অবিলম্বে হইবে প্রাণান্ত ॥
রঞ্জন কহিছে বন্ধু কি ভাবনা তাতে।
শিবের চরণামৃত আছে হে গর্তেতে ।

কামিনীকিশাের।
এই মতে গিয়া দেহে অঞ্জলি পুরিয়া ।
পান করে সুধামৃত উদর ভরিয়া ।
তৃষা কৃশা করি, দোহে বিশ্রাম কারণ।
শিবের সম্মুখে তবে করিল শয়ন।
রজনী প্রভাতে দোহে গাত্রোখান করে।
কুমার কহিছে তখন যাইতে বাহিরে।
দরজা ধরিয়া দোহে টানিতে লাগিল।
বহু শ্রমে কোন ক্রমে খুলিতে নারিল।
রঞ্জন কহেন বন্ধু কি ভাবনা তাতে।
অবশ্য আসিবে কেহ মন্দির ধুইতে।
মিনতি করিব তারে বিশেষ করিয়া ।
দয়া হইয়া দিতে পারে সে ছাড়িয়া।
তাহে যদি অসম্মত হয় সেই জন।
প্রকাশিয়া বাহুবল করিব গমন।
এই রূপ পরম্পর করে বলাবলি।
হেন কালে শুনিলেক সৈন্য কোলাহলি ও
পুনৰ্ব্বার ছাদে দেহে করিল গমন।
সৈন্যচয় আসি তথা দিল দরশন।
মন্ত্রীর নন্দন অগ্রে কোমর বান্ধিল।
পঞ্চ অস্ত্র শস্ত্র লয়ে সজ্জিত হইল ।
কুমারে কহিছে তবে করি আস্ফালন।
সমরে সজ্জিত হও ভাব কি এখন।
বিশিষ্ট প্রকারে আগে মিনতি করিব।
যেতে যদি নাহি দেয় সমরে মজিব। *

२२
কামিনীকিশাের।
কুমার কহেন বাঞ্ছা শুন হে আমার ।
বিশেষিয়া মন মধ্যে করিয়া বিচার।
এই সব সন্যগণ লয়ে দোহাকারে।
নিশ্চয় দিবেক সেই রাজার গােচরে !
দেখিব সে ভূপালের বিচার কেমন।
বিশেষিয়া আর তার সভাসদগণ।
সেই হেতু যুদ্ধে আর নাহি প্রয়ােজন।
ভাগ্যে যাহা আছে তাহা ঘটিবে তখন।
ছাদের উপরে যখন আছে দুই জন।
দরজা খুলিল আসি দাসীক এ জন।
হিংস্র জন্তু ভয়ে শস্ত্রপাণি লোেক সঙ্গে।
এসেছিল মন্দির ধুইতে ধনী ধঙ্গে ॥
নিত্য কাৰ্য্য সমাপন করি সেই ধনী।
ছাদ পরিস্কার হেতু উঠিল তখনি ।
অকস্মাৎ হেরিয়া সে কুমার রঞ্জনে।
সিহরিয়া উচ্চৈঃস্বরে ডাকে সেনাগণে।
নিষ্কাশিত অসি হস্তে করি সেনাচয়।
প্রবেশ করিল বেগে শিবের আলয় ॥
ছাদের উপরে তবে করিয়া গমন।
সঅস্ত্রে সজ্জিত কায় দেখিল দুজন এ
সেনাপতি উপস্থিত হয়ে সেই স্থলে।
মারিতে নিষেধ করি ধীরে ধীরে বলে ।
কে তােমরা কি কারণে আইলে এখানে
পরিচয় নাহি দিলে বধিব পরাণে।

কামিনীকিশাের।
দ্য যদি হও বাপু যাবে যমালয়।
নতুবা ছাড়িয়া দিবে রাজা মহাশয়
মন্ত্রীর নন্দন তবে কহিতে লাগিল।
আবদ্ধ যে রূপে হয় সব জানাইল ॥
ক্রমে ক্রমে সমুদায় শুনি সেনাপতি।
কহিল ছাড়িতে মােৰ নাহি অনুমতি ॥
যে হুও সে হও আমি ছাড়িতে নারিব।
রাজার সভাতে দেহে লইয়া যাইব।
এত বলে দুজনার সঙ্গেতে লইয়া।
মহারাজে সমর্পিল বিশেষ বলিয়া ॥
রাজা অনঙ্গমােহনের সভা বর্ণন।
ভূ-ভূষণ সিংহাসনে,
বসিয়া আনন্দে মনে;
করিছেন শাস্ত্র আলাপন।
বিবিধ কথা প্রসঙ্গে,
জ্ঞানী মানী বুধ সঙ্গে,
সুখেতে মজিয়া অনুক্ষণ।
যেমন ইন্দ্র ভূবনে,
বেষ্টিত অমরগণে,
সচীপতি রাজিত সভায়।
যেমন শশিসেখর,
কৈলাশ রম্য ভূধর,
তাহাতে বসিয়া শােভা পায় ।
যেমন নক্ষত্র মাঝে, শশাঙ্ক সদা বিরাজে,
অন্ধকার হরিবারে আসে।
তথা অনঙ্গমােহন,
বেষ্টিত পণ্ডিতগণ,
রত্নময় সিংহাসনে বসে ।

২৪ কামিনীকিশাের। রাজমুকুট শিরােপর, শােভিতেছে মনােহর, পক্সস্নাগ মণিতে খচিত। যেন গিরি হিমালয়ে, নব সূর্যের উদয়ে, তুষায়েতে রাগ বিরাজিত। গলে দোলে হেম হার, কি কব তার বাহার, দীপ্ত যিনি প্রভাকর প্রভা। পট্টবস্ত্র পরিধানে, তরবারি খরসানে, নৃপবর পাইতেছে শােভা । উজ্জল কুণ্ডল বারী, ছত্র ধরে ছত্রধারী, মহারাজ মস্তক উপরে। পার্শ্বে থাকি দুই নারী, রূপে যেন বিদ্যাধরী, চামর ব্যজন সদন করে। সচিব সুধীর অতি, বুদ্ধে যেন বৃহস্পতি, মন্ত্রণায় কে তাহারে পারে। আর পারিষদ যত, বসিয়াছে শত শত, কাগচ কলম নিয়া করে। চন্দ্রাতপ মনােহর, শােভিতেছে শিরােপ, আচ্ছাদন করি সভাস্থলে। বহুমুল্য মুক্তা সারি, ঝালরে ঝুলিছে তরি, দুলিতেছে পবন হিল্লোলে । মর কুত নীলমণি, দীপ্ত যেন দিনমণি, প্রাচীরে জড়িত অগণন। বিচিত্র চিত্রিত কত, দেলে ছবি শত শত, মন প্রাণ করয়ে হরণ । .

কামিনীকিশাের। ভূপাল ডাকি দুজনে, কহিছেন সুবচনে, কিহেতু প্রবেশ শিবালয়ে। সত্য যদি নাহি কবে, এখনি মশানে লবে, সত্বর পাঠাবে যমালয়ে। রঞ্জন কহে তখন, এসেছি তব ভবন, শ্রবণ করিয়া তব খ্যাতি। পথে না আশ্রয় পেয়ে, মন্দিরে ছিলাম শুয়ে, তাহে তব কিবা আছে ক্ষতি । ক্ষণেক ভাবিয়া রায়, কহিছেন পুনরায়, পরিচয় দেহ হে আমারে। এসেছ কি মনে করি, বল সব সত্য করি, বাসনা হয়েছে শুনিবারে । (কহে সুত) “দক্ষিণ দেশেতে বাড়ি, আসিয়াছি দেশ ছাড়ি, স্বভাবের শােভা হেরিবারে। সম্প্রতি বাসনা মনে, থাকিব তব আশ্রমে, বৎসরেক হরিষ অন্তরে।” শুনিয়া নরেন্দ্র রায়, সম্মত হইয়া তায়, কহিছেন সচিবে ডাকিয়া। লয়ে এই দুজনারে, বাসা দেহত নগরে, মনােহর বাটী অন্বেষিয়া । রাজ আজ্ঞা শিরে ধরি, ভূপালে প্রণাম করি, মন্ত্রী দেহে লইয়া চলিল। রম্য বাটী অন্বেষিয়া, তথায় দোহে রাখিয়া, রাজবাটী প্রস্থান করিল।

কামিনীকিশাের।
বন্ধুদ্বয় স্নান করি,
পরে ভোজনাদি সারি,
নিদ্রা যােগে শ্রম দূর
করি।
কুমার কহে রঞ্জনে, যাই চল হে ভ্রমণে,
নয়নে নগর শােভা হেরি ।
কামিনীকিশাের ও রঞ্জনের নগর ভ্রমন
ও স্বপ্ন দর্শন।
বাসা হতে বহির্গত হয়ে দুইজন।
অদ্ভুত নগর শােভা করে দরশন,
বিস্তৃত নগর বৰ্ম্ম প্রস্তরে নিৰ্ম্মিত।
ধূলি হীন করিয়াছে জলেতে সিঞ্চিত।
সারি সারি দেবদারু শােভে ধারে ধারে।
তপন তাপিত জনে ছায়া দান করে এ
• অট্টালিকা শ্রেণী যত শােভে দুই ধারে।
ধনবান লােক সব তাহে বাস করে । :
স্থানে স্থানে সদাব্রত ভূপাল স্থাপিত।
দরিদ্র পাল তাহে হয় শত শত ।
অবারিত দ্বার কভু নিবারণ নহে।
নিয়ত ভােজন করে দুঃখীলােক তাহে।
কাণ খোড়া কুজ আদি অকর্মণ্য যত।
তাহাতে নিশ্চিন্ত ভাবে থাকয়ে সদত ।
ধনবান লােক যার ধর্মে আছে মন।
চিকিৎসা মালয় কত করেছে স্থাপন।
দীন হীন দুঃখি যার নাহি প্রিয়জন।
অনাথের গতি সেই চিকিৎসা ভবন।

কামিনীকিশাের ।
২৭
স্থানে স্থানে বিব্যালয় বিদ্যা দান হেতু।
মূঢ় হতে বিদ্য। গ্রামে যাইবার সেতু।
নাগৰ্য্য বালক যত তথা নানা জাতি।
পাঠ পাঠালয়ে করে গতাগতি।
পণ্ডিত তাহাতে কত আছেন নিযুক্ত।
উপদেশ দেন সবে না হয়ে বিরক্ত।
কোন স্থানে দেবালয় বিচিত্র নির্মাণ।
উজ্জ্বল করেছে দেশ হয়ে জ্যোতিখান ।
পূজারি ব্রাহ্মণ সব পূজার কারণ।
নিযুক্ত আছয়ে তথা সদা সর্বক্ষণ।
ভক্তি ভাবে পূজে কেহ যতন করিয়া।
নানাবিধ ফল মূল মিষ্টান্নাদি দিয়া।
কেহ সচন্দন বিৰে পূজিছে দেবেরে ।
নিত্যধামে যাইবারে হরিষ অন্তরে।
স্থানে স্থানে রহিয়াছে উত্তম বাজার।
ব্যবসা কারণ লােক আসে অনিবার।
রেশমী পশমী আর কাপড় না মত।
ভাগ্যবান লােক জনে কেন মনমত ।
হিরা পান্না মরত মণি নানাজাতি।
মণিকারে রাখিয়াছে যতনেতে অতি ।
প্রবাল প্রস্থর মুক্তা ঘড়ি মনােহর।
সাজায়েছে যত আলমায়রা ভিতর।
অস্ত্র শস্ত্র স্থানে স্থানে করে ঝিকমিক।
সামরিক লােকজনে কেমে যা অধিক।

২৮
কামিনীকিশাের।
ধাতুতে নির্মিত আর পাত্র আছে যত।
বিশেষ করিয়া তার নাম কব কত।
কোথাও সৌচিকগণ সুচ নিয়া হাতে।
বসন সেলাই করে নানাবিধ মতে ।
কোন স্থানে নানাবিধ সুপক্ক ফল মূল।
সাজায়ে রেখেছে সব যতনে অতুল ।
আবাল বণিতা যত আসে সেই স্থান।
সাধ্যমত কিনে তারা করতে প্রস্থান।
স্থানে স্থানে বিশুদ্ধ আমােদ বাদ্য গীত।
হইতেছে নিরন্তর শাস্ত্রের বিহিত।
কোন স্থানে গণিকালয় আছে অগণন ।
তাদের কথায় আর নাহি প্রয়ােজন।
স্থানে স্থানে আছে কত রম্য উপবন।
ভাগ্যবান বিলাসীর কেলীর কারণ ॥
মনােহর ফল ফুলে শােভিত কানন।
সৌরভেতে সুশীতল হয় যে জীবন ।
নানাজাতি পক্ষী সব শাখাতে বসিয়া।
গান করে অবিরত সুখেতে মজিয়া।
মন্দ মন্দ সমীরণ বহিতেছে তায়।
মধুর বসন্ত যেন বিরাজে তথায়।
স্থানে স্থানে শোেকর সরােবর কত।
নানাবিধ প্রস্তরেতে সােপান রচিত ।
নিৰ্ম্মল সরসী-জলে কুমুদ কল্পার।
বায়ুর হিল্লোলে সচঞ্চল অনিবার।
*.

কামিনীকিশাের।
অলিকুল গুঞ্জরব করি ফুলে ফুলে।
আস্বাদন বুঝি মধু খায় কুতুহলে।
অপূৰ্ব যে রাজবাটী প্ৰস্তরে নির্মিত।
ইন্দ্রপুরী তুচ্ছ করি পুরী বিরাজিত ।
চৌদিকে ফটক চারি স্ফটিকে রচিত।
বর্ণনাতীত শােভা তার বর্ণিব বা কত।
কাঞ্চন কপাট তাহে অতি সুশােভন।
খচিত আছয়ে তাহে অমূল্য রতন।
রক্ষক আছয়ে কত দ্বারে দ্বারে খাড়া।
স্থির ভাবে থাকি তারা দিতেছে পাহারা।
নগরের শােভা হেরি কুমার রঞ্জন।
হরিষ অন্তরে করে বাসায় গমন।
'ভােজনান্তে বসিরা ভাবেন মনে মন।
কিসে রাজকন্যা সহ হইবে মিলন ।
কুমার কহেন বন্ধু”কি ফল জীবনে।
কামিনী বিহনে প্রাণ ত্যজিব জীবনে।
যদি সেই প্রমদায় একবার পাই।
হৃদয় মন্দিরে রাখি জীবন জুড়াই।
মন্ত্রীর নন্দন তবে কহিছে নন্দনে।
বিনােদিনী বিনে বারি ঝরে দুনয়নে ॥
যে দিন অবধি তারে নয়নে হেরেছি।
হৃদয় মাঝারে রূপ গাথির রেখেছি।
সেই রূপ মনে মনে ভাবি দিবা নিশি।
তােমার দুঃখের হেতু নাহিক প্রকাশি।

কামিনীকশাের।
দুইজনে পাছে হই উন্মত্তর প্রায়।
সেই হেতু অদ্যাবধি বলিনি তােমায় ।
এই মতে নানা দুঃখ করি দুইজনে।
শয়ন করিল তবে নিদ্রার কারণে।
ক্রমে নিদ্রা দেৰি দোহে করি আক্রমণ।
চেতনা হরণ করি করিল স্তম্ভন।
যখন গভীর নিশি অতি ভয়ঙ্কর।
দিবাচরগণ যত ঘুমেতে কাতর.
যখন বিমানে শশী সহিত স্বগণ।
পৃথিবীতে স্নিগ্ধকর করে বিতরণ
যখন উন্মত্ত শশী সহ কুমদিনী।
আনন্দ সাগরে ভাষে হয়ে কৌতুকিনী।
যখন ভানু বিরহে উন্মত্তা পদ্মিনী।
দুঃখের সাগরে ভাষে হইয়া দুঃখিনী ।
যবে নিশাচরগণ সুখেতে চরিছে ।
আপনার খাদ্য সব বাছিয়া লইছে ।
তখন নৃপজ আর মন্ত্রীর নন্দন।
নিদ্রার আবেশে দেহে আছে অচেতন।
হেনকালে নৃপসুত দেখিল স্বপন।
যেন কেহ আসি দ্বার করে উদঘাটন ।
ধীরে ধীরে আসি শেষে কহে কাণে কাণে।
রাজার নন্দিনী প্রিয়া শ্লোকের শ্রবণে ।
নূতন রচনা যদি লয়ে যেতে পার।
অবশ্য নন্দিনী দোঁহে দিবে পুরস্কার।

কামিনীকিশাের ।
এই ছলে হবে তার সঙ্গে দরশন।
নতুবা
উপায় আর না হেরি নন্দন।
শ্রবণে শ্রবণ করি এইমত বাণী।
গলে হতে হেমাের লইয়া তখনি।
তারে সম্বােধিয়া তবে কহিছে কুমার।
উপহার লহ এই রত্নময় হার।
তাহারে দিবেন বলি রাজার নন্দন।
হস্ত প্রসারণ করি কহিছে তখন ॥
লই এই হেম হার লহ লে এখন।
কাৰ্য্য সিদ্ধি হলে দিব বহু রত্ন ধন।
কিন্তু তার উত্তর না পাইয়া কুমার।
ভাবেতে ব্যাকুল হয়ে করেন চীৎকার।
তদন্তর নৃপজ না হেরি কোন জনে।
অচৈতন্য হইয়া রহেন ধরাসনে ॥
মন্ত্রীর তনয় তথা দেখিয়া স্বপন।
চীৎকার করিয়া সেও হল অচেতন
তদন্তর নিদ্রাবেসে দেখেছে যেরূপ ।
আদ্য প্রান্ত সবিশেষ কহিল তদ্রপ ।
রঞ্জন কহেন কিবা আশ্চয্য ঘটন।
আমিও ঘুমের ঘােরে দেখেছি স্বপন।
সেরূপ কহিলে তুমি রাত্র বিবরণ।
তদ্রপ দেখেছি আমি হয়ে অচেতন .
নিশ্চয় হইবে সত্য হেন মনে হয়।
নতুবা দেখিব কেন একই বিষয়।

কামিনীকিপাের।
কুমার বলেন বন্ধু বৃথা আর ভাব।
মন মত ধন দোহে অবশ্য পাইব।
ক্রমেতে হইল তবে রাত্র অবসান।
সুখময়ী উষা আসি হল অধিষ্ঠান।
তাহার প্রভায় তবে শশাঙ্ক কিরণ।
ক্রমেতে মলিন হয়ে হল নিমিলন।
সৰ্বরী ভূষণাকাশে অগণন তারা।
বিধুর দুঃখেতে হল স্থানান্তর তারা।
পতির বিচ্ছেদানলে কুমদিনী ধনী।
নাথের স্বভাব ভেবে যেন উন্মাদিনী ।
শাখি পরে সুখে শিখী করিতেছে রব।
নীড় ছাড়ি নীড় বাণী প্রফুল্লিত সব।
অলিকুল গুঞ্জব করি ক্ষণে ক্ষণে।
প্রস্থান করিছে তারা মধু অন্বেষণে।
মন্দ মন্দ সমীরণ স্পর্শে যেন উষা।
মদনে মাতিয়া করে কান্তের ভরসা ।
ঘােমটা খুলিয়া ধনী ভাবেতে ভরিয়া।
দিবাকরে ডাকিছেন হস্ত প্রসারিয়া।
কামিনীর মন ভাব কে বুঝিতে পারে।
অন্তরের ভাব সদা রাখয়ে অন্তরে।
হাসি হাসি কথা কয় ভাবেতে সরল ।
সুধা বরিষয়ে মুখে অন্তরে গরল।
দেখ উষা দেবীর আশা পাইয়া তখন।
পুলকে পর্ণিত হয়ে উদিত তপন ।

কামিনীকিশাের।
হেরে নয়নে তবে আশা লভ্য ধন।
আরক্ত হইয়া করে কর প্রসারণ ।
রাজ কন্যাকে শ্লোক দেখান।
বাজার নন্দন,
নূতন রচন,
রচিতে মনন করি।
স্থির করি মন, ভাবিছে তখন,
কেমনে সে ধন হরি।
রাজকুমার স্থির চিত্ত ও বহু যত্ন সহকারে এক শ্লোক রচনা
করিলেন, তাহার মৰ্ম্ম এই যে “হে রূপবতী রাজ-বালা!
তােমার অসীম রূপ গুণ শ্রবণ করিয়া পিতা মাতা বন্ধু ও
স্বদেশ ত্যাগ করিয়া এই অপূৰ্ব বিশাল নগরীতে আসিয়াছি।
এক্ষণে আশ্রম না পাইয়া বাসনা করি, যে আপনার আশ্রয়ে
কিছু দিন সুখে বাস করি। এই প্রকৃতি দর্শনেচ্ছুক স্বদেশ-দ্বেষী
জনের অভিলষিত বিষয় গ্রাহ হইলে, চরিতার্থ হই”। সচিবাত্মজ
ঐরূপ এক শ্লোক রচনা করিলেন। নৃপজনু মন্ত্রী তনয়কে
সম্বােধিয়া কহিলেন, হে প্রিয়বর! এক্ষণে তাে শ্লোক রচনা
হইল, কিন্তু কিরূপে সেই হৃদয়বিলাষিণী চিত্তহরা মােহিনীকে
এই শ্লোক অৰ্পণ করি ? রঞ্জন কহিলেন বন্ধো! যখন সেই
মনমােহিনী মহীন্দ্র নন্দিনী দেবাদিদেব অনাথনাথ মহাদেবের
মন্দিরে অর্চনা করিতে যাইবেন, সেই সময়ে আমরা তাহাকে
শ্লোক অর্পণ করিব। বােধ করি গমনে কেহ বাধা দিবে না,
কারণ রাজকন্যা শ্লোক প্রিয়া, শ্লোক দিব, বলিলে নিরুদ্বেগে
যাইতে পারিব। রাজকুমার বলিলেন, এই সময়ে রাজকন্যা

৩৪ কামিনীকিশাের। শিবালয়ে যান, আইস তাহারে শ্লোক অর্পণ করিতে যাই। এই বলিয়া বন্ধুদ্বয় সন্যাসী বেশ ধারণ করিয়া কুমারীর গমন পথে আগমন প্রতীক্ষা করিতে লাগিলেন, বহুক্ষণ অপেক্ষা করিয়া উৎকণ্ঠিত চিত্তে উন্মাদের ন্যায় যাহাকে সম্মুখে দেখেন তাহাকে জিজ্ঞাসা করেন, রাজকন্যা কি আজি এই পথে আসি- বেন না? এইরূপে জিজ্ঞাসা করিতে করিতে কিছুকাল পরে এক জন প্রহরী তথায় উপস্থিত হইল, তাহারে জিজ্ঞাসা করাতে সে কহিল, অদ্যাবধি তিন দিন রাজকন্যা শিবালয়ে যাইবেন না। তােমর কে, কি নিমিত্ত তার সাক্ষাৎ কারণ প্রার্থনা করিতেছ? তাহাতে তাহারা কহিলেন, আমরা কবি, তাঁহাকে নূতন কবিতা দেখাইতে ইচ্ছা করি, তাহাতে সেই সৈনিক কহিল যদি শ্লোক দিবার ইচ্ছা থাকে তাহা হইলে তিন দিবস পরে আইস, যাহাতে তােমরা রাজকন্যাকে কবিতা দিতে পার, আমি সে বিষয়ে বিশেষ সাহায্য করিব। এই বলিয়া সে চলিয়া গেল। রাজকুমার, হা প্রমদে! বলিয়া, ঝটিকা পতিত তরুবরের ন্যায় সংজ্ঞা হীন হইয়া পৃথী তলে পতিত হইলেন। তাহা দেখিয়া, রঞ্জন শশব্যস্ত হইয়া নিকটস্থ জলাশয় হইতে নিৰ্ম্মল জল আনয়ন করিয়া তাহার বদনে সেচন করিলে, কুমার চেতনা পাইয়া, হা প্রিয়ে ! হা হৃদয় বিলাষিণী। হা রূপ গুণ যশ সম্পন্নে ! এইরূপ বলিতে বলিতে পুনরায় অচৈতন্য হইলেন। রঞ্জন বহু যত্ন সহকারে তাহার চেতনা সঞ্চার করা- ইলেন, রাজকুমার চেতনা পাইয়া, হা চারুরূপিনী! হা মৃদু হালিনী! হা অনঙ্গ হৃদয়নন্দিনী! হা কুরঙ্গ নয়নে! হা শিব- গত প্রাণে! এই নরাধম কি পুনরায় তােমার চন্দ্র বদন দর্শনে কামিনীকিশোর । ৩৫ সক্ষম হইবে ? আমি তােমায় দর্শন দিনাবধি তােমার রূপ গুণাদি হৃদয় মধ্যে রাখিয়া উপাসনা করিতেছি ; আজি রজ- নীতে স্বপ্ন দর্শন করিয়া পুলকে পূর্ণিত হইয়া শ্লোক দেখাইবার ছলে তােমার চারুরূপ পুনৰ্ব্বার দর্শনে নয়ন সার্থক করিব ভাবিয়াছিলাম ; কিন্তু আমার দুরদৃষ্ট বশতঃ ও বিধির বিড়ম্বনা ক্রমে আমায় সে আশায় নৈরাশ হইতে হইল। পরে সচিব তনয় অতীব যত্নে সান্ত্বনা করিয়া বিবিধ উপদেশ দিতে আরম্ভ করিলেন। বন্ধো! ধৈৰ্য্যাবলম্বন কর, এই দেখ মহারাজের কএক জন সেনানী আসিতেছে, উহারা যদি তোমার রাজ- কন্যার প্রতি আশক্তি বাক্য, শ্রবণ করে তাহা হইলে কষ্টের আর ইয়ত্তা থাকিবেক না, অতএব এক্ষণে স্থির হও তােমায় যে লােকে ধৈয্যশাল বলিত সে কেবল তােষামােদ বলিয়া বােধ হইতেছে, কারণ এক্ষণে তার অণুমাত্রও তােমাতে দেখিতে পাইতেছি না। আরও অনেকানেক গ্রন্থে লিখিয়াছে, প্রম অমূল্য ধন ইহা সহজে পাওয়া কঠিন, এমন কি প্রম ধন উপার্জন করতে গেলে প্রাণ পৰ্য্যন্তও সংকল্প করিতে হয়। অতএব স্থির হও, ব্যস্ত হইবার কাৰ্য্য নয়, অগ্রে তাহারমন পরীক্ষা করা কত্তব্য, এই বলিয়া তাহার হস্ত ধারণ করিয়া উত্তোলন পূর্বক বাসস্থানে লইয়া গেলেন। ক্রমে ক্রমে তিন দিবস অতিবাহিত হইলে রাজকুমারও भबौ পুত্র রচনা হস্তে করিয়া শয়ম্ভু মন্দিরে গমনপূৰ্ব্বক নৃপজা ও সচিব তনয়ার অপেক্ষা করিতে লাগিলেন, ক্ষণকাল পরে সৈন্য কোলাহল ধ্বনি উহাদের শ্রবণ পথের পান্থ হইলে, রাজকুমার আল্লাদে পূর্ণ হইয়া এক দৃষ্টে সেই দিক নিরী- ক্ষণ করিতে লাগিলেন। ক্রমে রাজদুহিতা স্বগণ সমভিব্যাহারে কামিনীকিশাের । ত্রৈলক্যনাথ বিশ্বেশ্বরের মন্দিরে উপস্থিত হইলেন। রাজনন্দন ও সচিবাত্মজ করপুটে দণ্ডায়মান আছেন এবম্বিধ সময়ে রাজ, দুহিতা এক সহচরী সম্বােধিয়া কহিলেন, এই সন্নাসীদ্বয় কি অভি- লাষে দণ্ডায়মান রহিয়াছেন, জিজ্ঞাসা কর ? নৃপজানুজ্ঞায় সহচরী জিজ্ঞাসা করিলে বন্ধুদ্বয় কহিলেন আমরা সন্যাসী, এই বিশাল নগরীতে রাজকন্যার রূপ গুণ শ্রবণ করিয়া আসিয়াছি, এবং আমরা এক এক শ্লোক আনয়ন করিয়াছি তাহা গ্রাহ্য হইলে সন্তুষ্ট হই। সহচরী রাজকন্যাকে এই সমস্ত বিবরণ কহিলে তিনি উহাদিগকে সম্মুখে আনিতে আদেশ করিলেন। সন্নাসীদ্বয় অগ্রে আশুতােষ পঞ্চাননকে সাষ্টাঙ্গে প্রণিপাত করিয়া ভূপাল- কুমারীকে আশীর্বাদ করতঃ শ্লোক অর্পণ করিলে, রাজনন্দিনী হস্তে করিয়া সংজ্ঞা হীন পুত্তলিকার ন্যায় স্থির নয়নে উহাদের মনােহর কান্তি নিরীক্ষণ করিতে লাগিলেন। ক্ষণকাল পরে চমকিত হইয়া মনে মনে কহিতে লাগিলেন, আমি কি লজ্জা হীনা যে, এই দুই যুবা তাপসদ্বয়কে দেখিয়া আমার মনের চাঞ্চ- তা প্রকাশ করিলাম। আর ইহারাই বা কি মনে করিবেন এই ভাবিয়া শ্লোক দেখিতে আরম্ভ করিলেন। কিন্তু যার মন অনঙ্গশরে বিমােহিত হইয়াছে, সে কি আর ধৈৰ্য্যাবলম্বন করিতে পারে ? সে কি আর মন স্থির করিতে পারে ? পরে বহু যত্ন সহকারে স্থির হইয়া শ্লোক পাঠে সন্তোষ প্রকাশ করনান্তর উহাদিগকে কিছু পুরস্কার দিয়া, বিদায় ও মনে মনে রাজনন্দনকে আপনার যৌবন ধন অৰ্পণ করিলেন। কুমার প্রস্থান করিলে কুরঙ্গ নয়ন রাজবালা বিচ্ছেদানলে বনদগ্ধা হরিণীর ন্যায় অধীর হইয়া কান্তের গমন নিরীক্ষণ করিতে লাগিলেন ও নয়ন কামিনীকিশাের । জলে বক্ষস্থল অভিষিক্ত হইতে লাগিল। পরে রাজদুহিতা ও সচিবতনয়া পূজাদি সমাপ্ত করিলে শয়ষ্ণু মন্দিরের অন্তরাল হইতে এক দৈববাণী হইল যে,“রাজকন্যা ! তোমার আর পূজার প্রয়ােজন নাই আমি সন্তুষ্ট হইয়া তােমার ও মন্ত্রী তনয়ার নিমিত্ত এই সন্ত্রান্ত তনয় বীরপুরুষদ্বয়কে আনাইয়াছি বিবাহ করিও” কন্যাদ্বয় এইরূপ শ্রবণে সুখ সাগরে মগ্ন হইয়া পিনাক, ধারি ভূতনাথকে কোটি কোটি প্রণাম করিয়া দুই জনে দুই জনার রূপ ভাবিতে ভাবিতে রাজধানী উত্তরিয়া স্বীয় মন্দিরে প্রবেশ করিলেন। পরে দোঁহে ভােজন করিয়া অপূৰ্ব্ব সিংহা- সনােপার উপবেশন করােন্তর প্রাণকান্তের বিষয় কথােপকথনে প্রবৃত্ত হইলেন। ক্রমে সায়ংকাল উপস্থিত হইলে, মলয় মারুত মন মন্দ বহিতে ও বিহঙ্গগণ স্ব স্ব কুলায় গমন করিতে, মধুপ- কুল আল্লাদে গুণ গুণ স্বরে স্বস্থানে প্রস্থান করিতে, কোকিল কোকিলা মুখে মুখ দিয়া কুহু রব করিতে, লাগিল। মদন সময় পাইয়া বিরহীগণকে উৎপীড়ন আরম্ভ করিলেন, হৈমবতী আকুল হইয়া নাথ অদর্শনে ভূতলে ক্ষিপ্তের ন্যায় পতিত হইলে, মন্ত্রী সুতা তাহাকে বিশিষ্ট রূপত্ন করিয়া পালঙ্কো- পরি বসাইলেন। রাজকন্যা ও মন্ত্রী তনয়ার খেদ উক্তি। রাজকন্যা কয়, দহিছে হৃদয়, বিনে সেই মনচোর। ওলল সহচরী, উহু মরি মরি, সহেনা যাতনা ধাের কামিনীকিশাের। উহু প্রাণ যায়, দুখ কব কায়, প্রাণ-ধন বিরহে লো। শরীরে যাতনা, সহেনা সহেনা, রহেনা বুঝি প্রাণ লাে॥ যেরূপ হেরেছি, হৃদয়ে রেখেছি, ভুলিতে নারিব আর। কিবা চারু রূপ, হেরিনা স্বরূপ, অপরূপ রূপ তার । নয়ন সুন্দর, শােভে মুখােপর, সুরঙ্গ কুরঙ্গ যিনি। সে চারু বদন, নয়ন রঞ্জন, তাহে সুধা সম বাণী। বাঁধি প্রেম ডােরে, হৃদি কারাগারে, রাখি যদি পাই তারে। দিয়া এ যােবন, বেঁধে রাখি মন চোরে। অঞ্জন খঞ্জন, আঁখি বিচক্ষণ, প্রহরী তায় রাখিব। জভঙ্গিশ্মরে, ধরি নিজ করে, অনঙ্গ তাপ নাশিব। এ শয্যা কোমল, অতি নীরমল, যেমন কণ্টক দল। ফুটিতেছে কায়, মরি প্রাণ যায়, করি কি উপায় বল । করিয়া যতন, কামিনীকিশাের। এই মাথে মণি, দংশে যেন ফণি, আমার হৃদয়ে সই। গলে রত্নহার, জ্বলিত অঙ্গার, দেহ দহে কারে কই। কিঙ্কিণি কঙ্কণ, আর অলিগণ, নিজ রবে জ্বালায় লাে। নুপুর বাজনা, মদন যাতনা, সহেনা আর প্রাণে লাে । রাজার নন্দিনী, যেন পাগলিনী, কহে সখী সম্বােধিয়া। কে আছে আপন, করিয়ে যতন, দিবে মােহনে আনিয়া। বিনােদিনী ধনী, শুনি তার বাণী, কহে রাজকন্যা প্রতি। আনি দিব তায়, ভাবনা কি তায়, মনে পাইবেন প্রীতি। যদি তার মন, হয় উচাটন, তব প্রম অভিলাষে। নিশ্চয় পাইবে, অন্যথা না হবে, প্রাণ ধন বসি বাসে। সন্যাসীর সনে, সদা অনশনে, বনে ভ্রমিতে হইবে। ভষ্ম মাখি অঙ্গে, ভ্রমি পতি সঙ্গে, বনােপবন হেরিবে ।

৪ ০
কামিনীকিশাের ।
অতি খরশান,
তার সখা বিনে,
ত্যজিব জীবনে,
দীর্ঘিকা সলিলে সই
অনঙ্গের বাণ,
হানে হৃদে কত সই ।
আহা মরি মরি, সেরূপ মাধুরী,
কেমনে ভুলিব হায়।
ওলাে সহচরী, লাজ পরিহরি,
নিশ্চয় ভজিব তায়।
রায় বলে শুনি, ভেবনা লাে ধনী,
উথলার কাৰ্য নয় ।
ধৰ্য্য বুদ্ধি বলে,
গাম্ভীৰ্য কৌশলে,
অসাধ্য সাধন হয়।
কামিনীকিশাের ও রঞ্জনের গুপ্ত উদ্যানে ভ্রমণ ও
রাজ কন্যা ও মন্ত্রী তনয়ার সহিত মিলন।
আবাসে আসিয়া তবে কুমার ও রঞ্জন।
ত্যাগ করিলেন দেহে সন্যাসী বসন |
বিশ্রাম করিয়া তবে রাজার কুমার।
রঞ্জনে সম্বােধিয়া কহে আর বার ।
কিমতে তাহার আমি মন ভাব পাব।
তাহার বিরহানল হইতে জুড়াব।
কামের কামিনী যিনি সে শশী বদনী।
কি কব তাহার গুণ গুণে সমা বাণী।

কামিনীকিশোর।
৪১
কেমনে হইবে তার সনে দরশন।
বিশেষ উপায় তার কর অন্বেষণ |
রঞ্জন কহেন তবে রাজার নন্দনে।
সন্যাসীর বেশে তার যাইব উদ্যানে ।
সন্ধ্যার সময়ে তথা আসেন কামিনী।
শ্রবণে শুনেছি আমি এমত কাহিনী ।
নগরের লােক যত আসে সেই স্থানে।
মনােহর শােভা তার হেরিতে নয়নে।
সবে মাত্র আছে এক রাজার নিয়ম।
সন্ধ্যার সময়ে যাবে যে যার আশ্রম ॥
যদি কেহ রাজ অজ্ঞা অন্যথা করিবে।
বিশাল ভূপতি তার জীবন নাশিবে ।
আরামে আসিবে কন্যা আরাম কারণ।
লুকাইয়া রব দেহে কায়া যতন।
ভাবে কি না ভাবে সে তােমার লাগিয়া।
বিশেষিয়া নিরখিব গােপনে বসিয়া।
পরে যাহা হয় তাহা করিব তখন।
তারিণী পদ তরণী করিয়া স্মরণ
হেন মতে আশ্বাসিয়া রাজার নন্দনে।
ক্ষুধা শান্তি করিলেন জলাদি ভক্ষণে।
কোমল শয্যায় দোঁহে করিয়া শয়ন।
নিদ্রায় মুখে করেন যামিনী যাপন।
প্রভাতে উঠিয়া তবে বন্ধু দুই জন।
প্রভাতিক ক্রিয়া সব করে সমাপল ॥

৪২
কামিনীকিশাের।
1
কামিনী বিরহে দেহে হইয়া তাপিত।
সরসীর কুলে তবে হল উপনীত।
স্নান করি সুশীতল সরসী জীবনে।
আশ্রমে আইল দেহে উৎকণ্ঠিত মনে ॥
ভােঙ্গন করিয়া পরে রাজার কুমার।
রঞ্জনের প্রতি সেই কহে আর বার।
শুভ কার্য সম্পাদনে বিলম্বে কি ফল।
নিশ্চয় সফল হবে না হবে বিফল ॥
জটাভার মস্তকেতে করিয়া বারণ।
সৰ্ব্বাঙ্গে করেন পরে বিভূতি লেপন ॥
ঈশ্বরেরে শত শত প্রণাম করিয়া।
শুভ যাত্রা করিলেন আশা পথ দিয়া।
ক্রমে দোহে উত্তরিল উদ্যান ভিতরে।
অপূৰ্ব উদ্যান শােভা নয়নেতে হেরে ।
শাখী পরে পাখীগণ হরিষে বসিয়া।
বিভূ গুণ গায় তারা উন্মত্ত হইয়া ।
খাবার অভাব নাই প্রার্থনা না করে।
উদর পােষণ করে উদ্যান ভিতরে ॥
নানাবিধ ফল ভরে শােভে তরুগণ।
মনের হরিষে তাহা করয়ে ভক্ষণ ।
মনোহর সরােবরে তৃষা কৃশা করে।
সােপাণ নির্মিত যার অমূল্য প্রস্তরে ॥
শতদল শতদলে চারু শােভা পায়।
মধু লােভে অলিকুল সদা আসে যায়।

কামিনীকিশাের।
৪৩
মদন বাণেতে অলি হইয়া পিত।
কমল বনেতে সব হয় উপনীত ॥
শীতল হইবে এই করিয়া মনন।
গুণ গুণ স্বরে করে মানস জ্ঞাপন ॥
হেলে দুলে ভয় ছলে জানায় নলিনী।
হের রে অবােধ ভৃঙ্গ হের দিনমণি।
হেরিলে করিবে ভষ্ম এখনি তপন।
যাও এবে কালে তব পুরিবে মনন ।
মিছে কেন ভষ্ম হব মদনের বাণে।
মৃত্যু হয় সেও ভাল তব আলিঙ্গনে।
এতেক বলিয়া যেন ভৃঙ্গ রসরাজ।
বল প্রকাশিয়া করে মদনের কাষ।
কোকিল কাকলি রবে ধ্বনিত কানন।
অনুমানে হয় যেন সুধা বরিষণ।
মলয় মারুত সদা বহে মন্দ মন্দ।
হরণ করিয়া সব কুশমের গন্ধ।
দস্ফেতে বসন্তরাজ উদ্যান ভিতরে।
দল বলে বিরাজিছে হরিষ অন্তরে।
খরশান পঞ্চবাণ করেতে করিয়া ।
মদন আছেন তথা সন্ধান পুরিয়া ।
এই রূপে নিরখিয়া ভ্ৰমিছে নন্দন।
অতঃপরে হেরে এক অপূৰ্ব্ব ভবন।
পাগ্লুজ কহে প্রিয় মন্ত্রীর কুমারে।
নিশ্চয় রাজার কন্যা আসেন মন্দিরে।

৪৪
কামিনীকিশোর।
স্ফটিকে নিৰ্ম্মিত তার কপাট সুন্দর।
খচিত আছয়ে তাহে প্রবাল প্রস্তর ।
দনিমণি প্রভা যিনি তাহার কিরণ।
হেরিলে হরিষ হয় সার্থক জীবন।
বাগান দেখিতে যত লােক এসেছিল।
সন্ধ্যাগত দেখে সবে প্রস্থান করিল।
সবে মাত্র কুমার ও রঞ্জন সুধীর।
লুকায়ে রহিল দেহে না হয়ে বাহির।
দুই দণ্ড নিশা যবে আকাশে চন্দ্রিমা।
উদ্যানে আইল এক সখী নিরুপমা।
মন্দিরে প্রবেশ করি বাতি জালাইয়া।
কর পুটে দাণ্ডাইল ফটকে আসিয়া ।
বেষ্টিত হইয়া কন্যা সহচরী গণ ।
ক্ষণ কাল পরে তথা দিল দরশন ॥
বিননাদিনী সঙ্গে লয়ে ভূপাল দুহিতা।
প্রবেশে উদ্যান মাঝে হয়ে স্নানযুল্লা।
সখীণে সম্বােধিয়া কহে বরাণনে।
অপেক্ষা করি রবে সবে এই স্থানে
এতেক বলিয়া দহে উদ্যানেতে গিয়া।
পরস্পর দুঃখ করে কাদিয়া কাঁদিয়া ।
অতি খেদে হৈমবতী কহেন সখীরে।
কেমনে বাচিব সখী বলনা আমারে ।
অবলা সরলা একে কুলের কামিনী।
বিচ্ছেদ অনলে বুঝি রহেনা পরাণী ।

কামিনীকিশাের।
৪৫
মদনের বাণ কত প্রাণে সব সই।
পাষাণ অবলা দেহ তাই এত সই ।
প্রাণকান্ত বিনে শান্ত হইব কেমনে।
জীবন যৌবন ধন সেঁপেছি যে জনে ।
নবীন সন্যাসী বেশে দেব কোন জন।
এসেছিল ছলিবারে অবলার নন।
আর কি হেরিব তার সে চারু বদন।
সুধাংশু জিনিয়া যার সুঠাম গঠন ।
কত মত খেদ করে সখী করে ধরি।
কি হবে বলনা সখী উহু মরি মরি ।
বিনােদিনী বলে সই মরমেতে রই।
কান্তের বিরহ জ্বালা প্রাণে কত সই ।
তার লাগি নিরবধি ঝরে দুনয়ন।
আপন বলিয়া সখী করি যে জ্ঞাপন।
কালী যদি করে কৃপা কাঙ্গালী বলিয়া।
রতন সদৃশ নাথে দেন মিলাইয়া ।
নানা মতে দুঃখ করি সখী দুই জন
কোমল তৃণের পরে করেন শয়ন ।
কামিনীকিশাের আর চতুর রঞ্জন।
গগাপনে থাকিয়া সব করে দরশন।
প্রেম রসে মুগ্ধ হয়ে ভূপতি কুমার।
ঈশ্বরে ধন্য দিয়া কহে আর বার।
ধন্য আমি মহীতলে ধন্যরে পরাণী।
হৃদয়ে ধরিবি তার চরণ নলিনী।

কামিনীকিশাের।
রঞ্জন কহেন বন্ধু মম দেহ ধন্য ।
আমা সম পূন্যবান নাহি দেখি অন্য ।
এত বলি দুই জনে আহলাদিত হয়ে।
স খীদ্বয় সন্নিকটে দাণ্ডাইল গিয়ে।
অকস্মাৎ হরিণাক্ষী হেরিয়া দুজনে।
লজ্জিত হইয়া তবে ভাবে মনে মনে।
অনুমানে বুঝি সব করেছে শ্রবণ।
গোপনে থাকিয়া দুই সন্যাসী সুজন।
এমত ভাবিয়া মনে রাজার নন্দিনী।
কোপ প্রকাশিয়া কহে এই মত বাণী।
নিশিতে উদ্যান মাঝে আছ কি কারণ।
জাননা কি সন্যাসী হে রাজার নিয়ম ॥
প্রহরীরে শীঘ্র করি ডাক সহচরী।
কারাগারে রুদ্ধ রাখে যাবত সৰ্বরী ॥
কুমার কহেন শুন প্রাণের সুন্দরী।
তেজস্বী তাপস বরে কারে নাহি ডরি ।
প্রম সুধা, আস্বাদনে অমর যে জন।
সূৰ্য্যাত্মজে ভয় সে কি করে লাে কখন।
সবে মাত্র এক ভয় জাগিছে মানসে।
অঙ্গ ভঙ্গ কর পাছে ভুজল পাশে ।
পাছে হে কটাক্ষবাণ হান লাে সুন্দরী।
ক্ষমাকর ক্ষেমঙ্করী চরণেতে ধরি।
ঈষৎ হাসিয়া ধনী কহেন সখীরে।
পরিচয় লহ দুই সন্যাসী গােচরে।

কামিনীকিশাের।
৪৭
মন্ত্রী কন্যা কহিছেন কামিনীকিশােরে।
সত্য পরিচয় দিবে অন্যথা না করে ॥
আমরা অবলা বালা কি জানি ছলনা।
ছলনা করিয়া তব কি হবে বলনা ।
কামিনীকিশাের কহে ওলাে বরাণনে।
সত্য পরিচয় দিব তব বিদ্যমানে ॥
অবন্তী নায়ী নগরী খ্যাত মহীতলে।
রাজ্য করে মহীপাল ইন্দ্র সম বলে।
আমি তার এক মাত্র আনন্দের ধন।
হেরিতে স্বভাব শােভা ছেড়েছি ভবন।
এই সেই ভূপতির সচিব নন্দন।
প্রাণের অধিক যারে করিলাে যতন।
বহু দেশ এড়াইয়া আছি এই স্থানে।
যা হয় বিহিত ধনী করলে এক্ষণে।
লজ্জিতা হইয়া রামা ঘােমটা বারিয়া।
ধীরে ধীরে কহিছেন বিনয় করিয়া ।
জানিয়া তব তত্ব মহীন্দ্র কুমার।
করেছি অনেক দোষ পদে তােমার ॥
অবলা অজ্ঞান জাতি না জেনে মহিমা।
বলেছি কুবাক্য যত করিবেন ক্ষমা ।
ক্ষমা কি করিব ধনী ক্ষমিতে নারিব।
ভুজ পাশে বেঁধে হৃদে হৃদ প্রহারব।
মৃদু হাস্ত আস্তে ধনী কহেন নন্দনে।
অধীনা হলাম তব সরােজ চরণে ॥

কামিনীকিশাের ।
৪৮
পুলকে পূর্ণিত হয়ে বিনােদিনী ধনী।
হাসিয়া হাসিয়া তবে কহে হেন বাণী ।
বিলম্বে কি কাজ আর কহলাে সুন্দরী
তােমার শুভ বিবাহ নয়নেতে হেরি।
রায় বলে ওলাে ধনী বিলম্ব হবেনা।
সত্তর বিবাহ হবে কি তার ভাবনা।
কামিনী কিশোর ও রঞ্জনের গন্ধর্ব বিবাহ।
মদনের পঞ্চবাণ, পঞ্চত্ৰয়াে অধিষ্ঠান,
বিচক্ষণা কার্য সম্পাদনে।
প্রেমাশ্রুতে স্নান করি, প্রেম ডুরি হাতে পরি,
বিবাহের উৎসব উদ্যানে।
কিঙ্কিণী কঙ্কণ ধ্বনি,
নপুর চরণে ধনী,
বাদ্য কর হইল প্রচুর।
সহচর সহচরী,
কৰ্ত্তা পক্ষ উভয়েরি,
পুরােহিত মদন ঠাকুর।
আসর নিকুঞ্জবন, ঝাড় বিধু তারাগণ,
চন্দ্রাতপ গগণ মণ্ডল।
পণ্ডিত বিহগ গণ শাস্ত্র তর্ক অগণন,
করিতেছে কুঞ্জে দলে দল।
পলকে দীর্ঘ নিশ্বাস, আতস বাজি হুতাশ,
তাহে কটাক্ষ তারা বাজি।
বিছক্ষণ সহচরী, মনে অনুভব করি,
আনি দিল কুশমের সাজী।

কামিনীকিশাের।
৪৯
সাজী হতে মালা লয়ে, দোহাকার গলে দিয়ে,
দেহ বদ্ধ হল প্রেম ভােরে।
কামিনী যৌবন ধন, করিলেন সমর্পণ,
যৌতুক সদৃশ প্রাণেশ্বরে ।
যেমন হর সন্যাসী, অঙ্গে মাখে ভষ্মরাশি
মস্তক মগুলে জটা জুট।
সেই মত রাজসুত, শােভিতেছে অবিরত,
যেন সেই ভুক্ত কালকুট।
যেমন রাজ নন্দিনী, ভব আরাধ্য ঈশানী,
হর বামে কৈলাশে বিরাজে।
সেই মত রাজবালা, শােভা পায় চন্দ্রকলা,
বর বামে বামারাম মাঝে।
পুলকে পূর্ণিত হয়ে, হেলে দুলে বৃক্ষ চয়ে,
জয় ধ্বনি দেয় অনিবার।
অনুমান মনে হেন,
পত্ৰ দুৰ্ব্বা ধান্যে যেন,
আশীর্বাদ করিছে আবার ।
মন্দ মন্দ গন্ধ বহ,
বহিতেছে অহরহ,
উদ্যান হতে না হয় অন্তর।
সে সুন্দর শােভা হেরে, সুকোমল শব্দ করে,
হয়ে যেন হরিষ অন্তর।
বদ্ধ হয়ে প্রেম ডােরে, বিবাহ দিলেন পরে,
বিনােদিনী রঞ্জন সহিত।
দেহে দোহা ধরি করে, উদ্যানের শােভা হেরে,
স্মর শরে হইয়া মােহিত।

কামিনীকিশাের।
চমকিত হয়ে ধনী, কহিছেন হেন বাণী,
সম্বােধিয়া আপন সখী।
দেখ ওলাে প্রাণ সই, প্রভাত যে হইল ঐ,
তপন উদয় গিরিবরে।
প্রিয় সহচরী কয়,
উথলা সময় নয়,
করেছি লো উত্তম মন্ত্রণা।
পরায়ে তাপসী বেশ, সঙ্গে লয়ে যাব শেষ,
তাহে কেহ বাধা লাে দিবে না।
হেন মতে সাজাইয়া সন্যাসিনী বেশ।
ক্রমে আইলেন যথা উদ্যান প্রবেশ
সখীচয়ে ডাক দিয়া কহেন নন্দিনী।
কাননে পেয়েছি এই দুই তাপসিনী ।
অন্য মনে কুশম বনে ভ্রমি লাে যখন।
অকস্মাৎ সােপানে দেহে করি দরশন।
সম্মুখেতে গিয়া দেহে ডাকিলাম যত।
বিফল হইল সব না হল মন মত ।
মনে মনে নানা মত ভাবিয়া তখন।
বুঝিলাম করেছেন মৌনাবলম্বন ।
নানাবিধ অনুনয় করি দুইজনে।
এনেছি যতন করি রাখিতে ভবনে।
সখীচয়ে সায় দিল সুন্দরীর মতে।
প্রবেশে অন্দরে কন্যা সখার সহিতে।
আপনার গৃহে আনি রাখেন দুজনে।
অন্য কারে নাহি দেন যাইতে সেখানে।

কামিনীকিশাের।
কেবল আপনি আর মন্ত্রীর তনয়া ।
কথােপকথনে থাকে আনন্দে মজিয়া।
ক্রমে শশী নিজ স্থানে করেন গমন।
দিন পেয়ে দিবাকর উঠেন তখন।
প্রভাতের ক্রিয়া তবে করি চারিজন।
সবে বসি একাসনে করেন ভােজন।
তাম্বুল গুবাক তবে করিয়া ভক্ষণে।
নানাবিধ হাস্যালাপে থাকে অন্য মনে।
অবসন্ন সূৰ্য্যে দেখি কোকিল কোকিলা।
নির্বাণ করিবে ভাবি মদনের জ্বালা।
হরিষে মানস সিন্ধু উদ্বেজিত হল।
ধবের বিচ্ছেদে কিন্তু দিবা মলিনিল।
প্রভাকর প্রভা দেখি ক্রোধে শশধর।
রণে যেন দেখা দিল করে লয়ে শর ॥
প্রকাশিলে স্নিগ্ধ কর ভয়ে দিবাকর।
সহ্য না করিতে পারি হইল কাতর ।
লাজ ভয়ে তপন পলায় রসাতলে।
চন্দ্রমা স্বগণে উঠে আকাশ মণ্ডলে ।
দুঃসময় হয় যদা দেখ সমাগত।
ক্ষীণের নিকটে বীর হয় পরাজিত ।
সিংহাসন অধিকার করিয়া সম্প্রতি।
রাজ্য যবে করিছেন স্নিগ্ধ নিশাপতি।
হরিষে হইয়া মগ্ন কুমার, রঞ্জন।
কোমল শয্যার পরে করেন শয়ন ।

কামিনীকিশাের । রায় বলে মদনে স্মর এই বার। স্মরণ করিয়া তার কর প্রতিকার । রাজকুমার ও রঞ্জন, এই রূপে প্রমদার মােহিনী জালে বদ্ধ হইয়া, পিতা মাতা রাজ্যধন সকলই বিস্মরণে মুখে কালা- তিপাত করিতেছেন। এক দিন দিবাকর অস্তাচল অবলম্বন করিলে, রাজনন্দন উদ্যান শােভা দর্শনে উৎসুক হইয়া, প্রিয়া সম্বােধ ন করতঃ কহিলেন প্রিয়ে। চল উদ্যান শােভা দর্শন করিয়া চিত্ত চঞ্চলতা দূরীভূত করি, কুমারী নায়ক মতে সম্মত হইয়া সখী ও রঞ্জন সমভিব্যাহারে গুপ্ত দ্বার উদঘাটন করতঃ উদ্যান মাঝে প্রবেশ করিলেন। নায়ক, নায়িকা কর ধারণ করিয়া উদ্যান শােভা দর্শন করিতে করিতে সরসী তীরে উপ- নীত হইয়া সােপানােপরি উপবেশন করিলে, রঞ্জন কহিলেন বন্ধো! ঐ দেখ কমলিনী রাজনন্দিনীর কমনীয় কান্তি দর্শনে লজ্জিতা হইয়া সরােবরে ঘােমটা বারিয়া রহিয়াছে। কুমার কহিলেন সখে! ঐ দেখ যেন কুমদিনী সুধাকর মিলনে আলাদিত হইয়া হাস্য বদনে কর প্রসারণ করতঃ নায়কে আলিঙ্গন প্রদান করিতেছে, ও মদনে মত্ত হইয়া চাঞ্চলতা ভাব প্রকাশ করিতেছে, এবং কভু মান ছলে নায়কে পরিত্যাগ করিয়া পলায়ন চেষ্টা করিতেছে, কিন্তু যে ধনী প্রেম রূপ মৃণাল সূত্রে আবদ্ধ সে কি পলায়ণ করিতে পারে? সে কি প্রাণনাথের অদশনে ক্ষণকালের নিমিত্ত স্থির থাকিতে পারে ; আহা! কুমদিনী সরােবরে এরূপ হাব ভাব প্রকাশ করিয়া কি অপূৰ্ব্ব শােভা ধারণ করিয়াছে। এই শােভা সন্দর্শন করিতে করিতে কুমার, প্রিয়া সঙ্গে আরাম ভবনে উপস্থিত হইলেন।

কামিনীকিশাের। রঞ্জন ও মন্ত্রীতনয়ার কর ধারণ করিয়া কুঞ্জবনস্থিত বিহঙ্গগণের মনােহারিণী স্বর শ্রবণান্তর ভ্রমণ করিতে করিতে শ্রম দূরীকরণার্থ তৃণাসনে উপবেশন করিলেন। রাজকুমার প্রিয়া সুমভিব্যাহারে সিংহাসনােপরি উপবেশন করিয়া মদনের পর- ক্রমের বিষয় বর্ণনা করিতে করিতে কহিলেন প্রিয়ে। যদ্যপি মহারাজ আমাদের গােপন পরিণয়ের বিষয় জ্ঞাত হইয়া কোন ভয়ানক দণ্ড প্রদান করেন, তাহাহইলে নিশ্চয়ই আমাদের অসহায়তা প্রযুক্ত প্রাণ নষ্ট হইবার সম্ভাবনা। রাজতনয়। রূপ শ্রবণ করিয়া কহিলেন, প্রাণেশ্বর ! আমি তােমার অম- ঈল সন্দর্শনে কখন জীবিত থাকিতে পারিব না, অগ্নিকুণ্ডে না হয় জীবনে জীবন ত্যাগ করিব। কুমার কহিলেন, প্রিয়ে। অদৃষ্টে যাহা আছে তাহাই হইবে, ভাবি দুঃখ চিন্তা করিয়া মনে কষ্ট পাওয়া বৃথা, এক্ষণে চল, কুশম কাননে যাই, এই বলিয়া দোঁহে দোঁহাকার হস্ত ধারণ করিয়া ভ্রমণ করিতে করিতে পুস্পােদ্যানে উপস্থিত হইয়া দেখিলেন মহারাজ বসন্ত স্বগণে উপবনে বিরাজমান করিতেছেন, মলয়মারুত মন্দ মন্দ বহিতেছে, বিহগগণ শাখীপরে বসিয়া স্ব স্ব স্বরে গান, কোকিল কোলিলা মুখে মুখ দিয়া কুহু কহু ধ্বনি করিয়া বিরহীগণের মন বিমােহিত করিতেছে, মহাবীর মদন কুশম শরাসনে শর সন্ধান করিয়া যেন শত্রু আক্রমণের অপেক্ষা করিতেছেন। পুষ্পোপরি মুক্তা সদৃশ শিশির বিন্দু পতিত হওয়াতে বােধ হইল যেন তাহারা ঈশ্ব- রের গুণ কীৰ্ত্তন করিয়া প্রেপাত করিতেছে। শশধরের শুভ্র স্নিগ্ধকর বিস্তারিত হওয়াতে মধুপচয় উষা ভ্রমে গুণ গুণ স্বরে আসিয়া পুষ্পে পুষ্পে কভু রাজনন্দিনীর ২দনে সরজ জ্ঞানে ৫৪ কামিনীকিশাের। বসিয়া তাহারে বিরক্তি প্রদান করিতেছে, ভূপালকুমার কৌতুহলাক্রান্ত হইয়া প্রিয়া সম্বােধন করতঃ কহিলেন, প্রিয়ে বসন্তকালে তরু, লতা, নবপল্লবাদি কুশম সকল পরিবর্ধিত হইয়া থাকে, মনুষ্যগণের কান্তি সুকান্তি যুক্ত হয়, কোকিল ও অলিকুল ইচ্ছানুসারে ইতস্ততঃ বিচরণ করিয়া স্ব স্ব স্বরে ঈশ্বরের গুণানুবাদ করিয়া থাকে, মলয় মারুত মন্দ মন্দ প্রবা- হিত হইয়া থাকে, অনঙ্গ আবার অঙ্গ যুক্ত হইয়া, করে বিজয় কুশম শরাসন ধারণ করতঃ সংযােগীগণের মনমৃগী সন্ধানে শর ক্ষেপণ করিয়া থাকেন, যে তীক্ষ্ণ শরাগ্রে, প্রমানল, স্বেদ, ঘৰ্ম্ম, কম্প, রােমাঞ্চ, সদত বিরাজমান করিতেছে, অদ্য সেই শর আমার হৃদয় বিদীর্ণ করিয়া বিষাক্ত করিয়াছে, উহুঃ কি প্রচণ্ড প্রতাপ ! আর সহ্য হয় না ! এইরূপ নানাবিধ হাস্যালাপে ইতস্ততঃ ভ্রমণ করােন্তর সরসী তটে উপস্থিত হইয়া দেখিলেন, রঞ্জন ও মন্ত্রী তনয়া শ্রান্তি দুরীকরণার্থ সােপানােপরি শয়নে গাঢ় নিদ্রায় অভিভূত রহিয়াছেন, এবম্বিধ সময়ে, নৃপাত্মজ ও ভূপাল কুমারী তথায় উপস্থিত হইয়া এই রূপ দেখিলে পর, কুমার কহিলেন, হৃদয়বিলাশিনী! জগদীশ্বরের কি অনির্বচনীয় কৌশল, এক প্রমধন সৃষ্টি করিয়া পৃথিবীস্থ সমস্ত প্রাণীকে আবদ্ধ করিয়াছেন, দেখুন, এই দম্পতির ঈদৃশ ভারই এক প্রধান দৃষ্টান্ত। এই রূপ কথােপকন ও কৌতুক করিতেছেন, এমন সময়ে রঞ্জন ও মন্ত্রীসুত জাগ্রত ও লজ্জিত হইয়া দেহে দোহাকার কর ধারণ করিয়া সকলে রাজ ভবনে প্রস্থান করিলেন। এই রূপে কিছু দিন অবসান হইলে, রাজকন্যার গর্ভ লক্ষণ কামিনীকিশাের। প্রকাশ পাইল । তখন সহচরীগণ আপনাদের দোষ খ্যালনার্থ পরস্পর মন্ত্রণা করিয়া, রাজ্ঞীরে নিবেদন যুক্তিযুক্ত জ্ঞান কুরিয়া, তাহার মন্দিরে প্রবেশ করােন্তর করপুটে দণ্ডায়মান হইয়া লক্ষণ বৃত্তান্ত বৰ্ণন করিলে মহিষী তৎশ্রবণে রােমাঞ্চ কলেবরে প্রস্তরময়ী পুত্তলিকার ন্যায় সংজ্ঞাহীন হইয়া বাতাবিহতা কদলী বৃক্ষের সদৃশ পৃথীতলে পতিত হইলেন। সখীগণ যত্ন সহকারে তাঁহার চেতনা সঞ্চার করাইয়া সিংহাসনােপরি বসা- ইলে, তখন রাজ্ঞীর নয়ন যুগল হইতে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ বহির্গত হইতে লাগিল। কোপে সৰ্ব্ব শরীর কম্পিত হইতে লাগিল, তদশনে সহচরীগণ ভীত চিত্তে অবনত শিরে অবস্থান করিতে লাগিল। মহিষী আলুলায়িত কেশে উন্মাদিনীর ন্যায় করে প্রখর তরবারি ধারণ করিয়া, কন্যার মন্দিরাভিমুখে বেগে প্রস্থান করিলেন। রাজকন্যা সখীগণের মনােগত ভাৰ জ্ঞাত হইয়া, প্রাণ কান্তে নিবেদন করিলে, কামিনীকিশাের ও রঞ্জন কামিনীর বিচ্ছেদানলে অপূর্ণ লােচনে গুপ্ত দ্বার উদঘাটন করত যথা স্থানে গমন করিলেন। রাজকন্যা দুঃখিতান্তঃকরণে অঞ্চললাপরি শয়নে প্রাণ সখার গমন বিষয়ে প্রগাঢ় চিন্তায় অভিভূত রহিয়াছেন, এবম্বিধ সময়ে মহারাণী, কুমারীর কুলক্ষণ দর্শন করােন্তর সখীগণে সম্বােধিয়া, কহিলেন, তােত সদত কন্যার সেবার্থ এই স্থানে অবস্থান কর; কিন্তু কি রূপে এরূপ ভাব উপস্থিত হইল তাহা আমায় আনুপূৰ্বীক সবিস্তার বর্ণন কর, নচেৎ এই তরবারি প্রহারে সকলের মস্তকচ্ছেদন করিয়া এই কলঙ্কানল নির্বাণ করিব। সখীগণ তৎশ্রবণে তাহারে সম্বােধিয়া কহিল, রাজ্ঞী। আমরা যাহা জ্ঞাত আছি

কামিনীকিশাের ।
তাহা আপনার নিকট সবিস্তর কীৰ্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ
করুণ; একদা কুমারী ভ্রমণে সমুৎসুক হইয়া সন্ধাগত সময়
বিননাদিনী সমভিব্যাহারে উদ্যান মধ্যে প্রবেশ করােন্তর
ইতস্ততঃ ভ্রমণ করিছেন,এবম্বিধ সময়ে সােপানােপরি মৌনব্রত
ধারিণী দুই তাপস তনয়া তাহার নয়ন পথে পতিত হইল।
রাজকুমারী তাহাদিগকে আপন অলিয়ে আনিয়াছিলেন, কিন্তু
এক্ষণে সেই কন্যাদ্বয় কোথায় তাহা আমারা বিশেষ জ্ঞাত
নহি।
এতেক শুনিয়া রাণী করেন গমন।
আপন মন্দিরে আসি ভাবে মনে মন ॥
কেমনে গোপনে রবে কলঙ্কের দায় ।
ভাবিয়া বিশেষ রাণী না দেখে উপায় ।
ক্ষণেক নিস্তব্ধ থাকি ডাকেন দাসীরে।
মহারাজে শীঘ্র গিয়া আনহ অন্দরে ॥
আজ্ঞ মাত্রে দাসী ধায় রাজার গােচরে।
করপুটে দাপ্তাইয়া কহে অতঃপরে ।
মহারাজ নিবেদন আপন চরণে।
মহিষীর বার্তা এক আছে তব স্থানে।
শুনিয়া নরেন্দ্ররায় কহেন দাসীরে।
প্রাণ প্রিয়া কিবা আজ্ঞ কহ ধীরে ধীরে।
দাসী কহে মহারাজ চলুন অন্দরে।
যথায় আছেন রাণী বিষাদ অন্তরে ৪
শ্রবণে শ্রবণ করি এই মত বাণী।
প্রবেশে অন্দরে রাজা যথা মহারাণী ॥

কামিনীকিশাের।
মােহন্ মােহন রূপ করি দরশন।
সম্ভাষিয়া নৃপে রাণী দেন সিংহাসন ॥
আজি কেন প্রিয়ে তব মলিন বদন।
দুনয়নে বহে ধারা কহ কি কারণ ।
কহ প্রিয়ে কেবা দিলে অন্তরে বেদনা।
মলিন হেরিয়া দুঃখ সহেনা সহেনা।
তৃষিত চকোরে কর সুধা বরিষণ।
সুধাংশু বদনী মম দহিতেছে মন।
রাণী কহে কিবা তােমায় কব মহারাজ।
কহিতে সে সব কথা বড় হয় লাজ।
কলঙ্ক ঘােষিল এবে এ তিন সংসারে।
উচ্চ মাথা হেট হল এত দিন পরে ।
যােড়শী যৌবনা ঘরে এত বড় মেয়ে।
বারেক দেখিতে হয় তার মুখ চেয়ে।
প্রখরতা, ত্যজি রাণী স্থির করি মন।
যেরূপ হয়েছে তাহা করিল বর্ণন।
এতেক শুনিয়া তবে মােহন ভূপাল।
অসি হস্তে যান যেন কালান্তের কাল ।
বাহির দেওয়ানে আসি মােহন রাজন।
* কৈ আদমি হয় রে ” বলি ডাকে ঘনে ঘন।
রাজার পাইয়া সাড়া নকিব ধাইল।
ছেলাম করি হুজুরেতে হাজির হইল।
“ক্যা হুকুম মহারাজ কিঙ্করের প্রতি।
“রাজা বলে খােজা কো বােলাও শীঘ্রগতি।”

৫৮
কামিনীকিশাের।
রাজ আজ্ঞা শিরে ধরি আইল বাহিরে ।
খোজা সঙ্গে পুনরায় প্রবেশে হুজুরে ।
রাজা কহে প্রহরীরে আনরে ত্বরায়।
একে আজ্ঞা পায় তারা শত শত ধায় ॥
হুহুঙ্কার সিংহনাদে কম্পিত মেদিনী।
কিল নাথি খেয়ে কার উড়িল পরাণী ।
মল্লগণ মালসাটে কাণে লাগে তালি।
কেহবা প্রহরীরে দিতেছে গালাগালি ।
কেহ বলে টিকি ধরে আনিব বেটায়।
কেহ বলে প্রয়ােজন নাহিক সেটায় ।
কিল পদাঘাত চড় কেহ মারে বাড়ি।
মার খেয়ে প্রহরীর চর্ম গেল উড়ি ।
এইরূপে আধমরা করিয়া তাহায়।
হাতে পায়ে বেঁধে নিয়ে ফেলিল সভায় ।
কণেকে চেতন পেয়ে, করযােড় রহে চেয়ে,
মহারাজে করিয়া প্রণতি।
অঙ্গ কাঁপে থর থর, ঘৰ্ম্মে তিতে কলেবর,
ভয়ে যেন মরার আকৃতি ।
রাজা কহে হারাজাদ,
যান বাচ্ছা এক খাদ,
করি আজি হেন মনে হয়।
পুরী রক্ষা দিয়া তােরে, পুরী দিলি ছারখারে,
লুটে পুটে কর সব লয়।

কামিনীকিশাের ।
স্পর্ধা হয়েছে তাের, বল কার পেয়ে জোর;
মুণ্ড তার খণ্ড খণ্ড করি ।
তােরে যদি কাটি বেটা, রক্ষা তায় করে কেটা,
জাননারে আমি শক্ত অরি
হেনকালে দ্বারী গিয়া, মহারাজে প্রণমিয়া,
করপুটে করে নিবেদন।
দূত এক পত্ৰ লয়ে, দ্বারে আছে দাপ্তাইয়ে,
আসিয়াছে আপন ‘সদন ।
যদি কিঙ্করের প্রতি, হয় তব অনুমতি,
শীঘ্রগতি আনিগে হুজুরে।
রাজা কহে আন তারে, কিবা আবেদন করে,
ওনিবারে বাসনা অন্তরে ।
রাজ আজ্ঞা শিরে ধরি,
দূত সঙ্গে করে দ্বারী,
সভা মধ্যে আইল তখন।
প্রণমিয়া নরেশ্বরে, দাপ্তাইয়া ঘােড় করে,
দেয় দূত পত্র ততক্ষণ ।
পত্র পাঠে নারায়,
ক্ষণেক নিস্তব্ধে হয়,
অতঃপর কহে মন্ত্রীবরে।
সচিব কি হল দায়, ভেবে না দেখি উপায়,
প্রাণ যায় বুঝি কন্যা তরে।
স্বর্ণপুর অধিপতি, নরেন্দ্ৰসিংহ ভূপতি,
করেছেন জ্ঞাপন পত্রেতে।
“মম জেষ্ঠ পুত্র সহ, তব কন্যার উদ্বাহ,
দিব বাঞ্ছা আছে বিধিমতে।

কামিনীকিশাের।
ইথে অন্যথা না করে,
পত্র লিখি
দূত করে,
মম বাঞ্ছা কর হে পূরণ।
দেহে আত্মীয়তা করে, মজিয়ে সুখ সাগরে,
দিনপাত করি নিবেদন।”
শুনি মন্ত্রীবর কয়,
কেমনে বিবাহ হয়,
গর্ভবতী হৈমবতী সনে।
অবশ্য প্রকাশ হবে, কখন না ছাপা রবে,
লজ্জা পাবে স্বর্ণাধিপ স্থানে।
এত শুনি ক্ষৌণীপাণি, বক্ষে করাঘাত হানি,
মন্ত্রীবরে কহেন সত্বর।
এতে তব আছে ভার, বিশেষ করি বিচার,
পত্র লিখি পাঠাও উত্তর।
এত বলি নরপতি, হয়ে বিষাদিত অতি,
ধীরে ধীরে অন্তঃপুরে গেল।
মহিষী হেরে রাজনে, অসুভ ভাবিয়া মনে,
মৃদুস্বরে কহিতে লাগিল।
কহ নাথ বিবরণ,
মলিন কেন বদন,
বিশেষিয়া অধিনীর প্রতি।
কেবা দিলে মনে ব্যথা, কহ নাথ সত্য কথা,
শুনিতে হয়েছে মম মতি।
ওনি কহে মহীপাল, কন্যা মম হল কাল,
কি জঞ্জাল ঘটালে প্রেয়সী।
ভেবে অঙ্গ হল কালি, কেমনে কুলের কালি,
ছাপা রবে ভাবি দিবা নিশি ।

কামিনীকিশাের।
সেশাদেশ হবে খ্যাত, খ্যাতি সব হবে হত,
মৃতবৎ বেচে কিবা কাজ।
অনলে তজি জীবনে, কিম্বা সরসী জীবনে,
অনুচিত করা কাল ব্যাজ ।
যেই রূপে নারায়,
পত্র লিখিয়াছে তায়,
সমুদায় কহেন রাণীরে।
শুনি রাণী কহোয়, করেছ কি তার উপায়,
বিশেষিয়া কহ অধিনীরে।
মহারাজ, কহে প্রিয়ে,
মন্ত্রীবরে ভার দিয়ে,
আসিয়াছি তৰ সন্নিধানে।
ৰাহে রহে কুল মান, এমত করি বিধান,
পত্র সে লিখিবে বরাণনে।
রাণী কহে প্রাণনাথ,
যিনি অনাথের নাথ,
তারে চিন্তা কর অনিবার।
তাহার চরণ স্মরি, বল নাথ হরি হরি,
তাহে তব হইবে মুসার ।
রাজসভা ভঙ্গ হইলে সচিব, দুত সমভিব্যাহারে স্বীয় মন্দিরে
উপস্থিত হইয়া স্থির চিত্তে মনে মনে ভাবিতে লাগিলেন। যদি
বিবাহ অসম্মতি পত্র পাঠান যায় তাহা হইলে স্বর্ণপুরাধিপতি
নরেন্দ্ৰসিংহ অবমাননা জ্ঞানে অবশ্য সমর ক্ষেত্রে অবতীর্ণ
হইবেন, সন্দেহ নাই, আর যদি বিবাহ দেওয়া হয় তাহা হইলে
এ বিষম কলঙ্কানল অবশ্য প্রকাশ হইবে, তাহা হইলে মহারাজ
কখনই এ পৃথীতলে ক্ষণকালের নিমিত্ত অবস্থিতি করিবেন না
জলে কিম্বা অনলে জীবন পরিত্যাগ করিবেন; যাহা হউক

৬২ কামিনীকিশাের । ক্ষত্রিয় পক্ষে সমরে প্রাণত্যাগ সৰ্ব্বতােভাবে উৎকৃষ্ট। এই স্থির করিয়া এক পত্র লিখিলেন, যে রাজকন্যার বিবাহ হইয়াছে অতএব পুনরায় কিরূপে বিবাহ হয়। পরদিন মন্ত্রীবর রাজ- ভবনে উপস্থিত হইলে, মহারাজ অনঙ্গমােহন তাহাকে সঙ্গে লইয়া মন্ত্র ভবনে প্রবেশ করতঃ কহিলেন সখে, সচিব ; তুমি কিদৃশ লিপি প্রেরণ করিলে এক্ষণে তাহা বৰ্ণন করিয়া আমার মনের চঞ্চলতা দূরীভূত কর। সচিব আদ্য প্রান্ত লিপি বৃত্তান্ত বর্ণনা করিলে ভূপাল পুলকে পূর্ণিত হইয়া আপনার কণ্ঠ হইতে মণিময় হার গ্রহণ করিয়া তাহাকে পুরস্কার দিলেন। মন্ত্রী কহিলেন, মহারাজ! নরেন্দ্ৰসিংহ অবমাননা জ্ঞানে অবশ্যই সমরক্ষেত্রে দর্শন দিবেন সন্দেহ নাই, তন্নিমিত্ত অগ্রেই আমাদের সজ্জিত হওয়া বিধেয়। রাজা কহিলেন, উচিত, তবে বীরশ্রেষ্ট সেনাধ্যক্ষ বিজয়সিংহকে রাজ সভায় আসিতে একপত্র প্রেরণ কর। মন্ত্রী তৎক্ষণাৎ এক পত্র পাঠাইলেন, কিয়ৎক্ষণ পরে মন্ত্রী প্রস্থান করিলে, মহিষী আপনার দুই প্রিয় সহচরী সঙ্গে দুঃখ বৃত্তান্ত বর্ণনা করিতে করিতে মহারাজ সমীপে উপস্থিত হইলেন। রাজা ভাৰ্য্যায় সম্ভাষণ ককিয়া কর ধারণে সিংহাসনােপরি বসাইলেন, পরে সঙ্গিনীদ্বয়কে বসিতে অনুমতি করিয়া আপনি উপবেশন করিলেন। লৈংহিকের গ্রাসিত চন্দ্র বৎ জ্যোতি হীন হইয়া রাজ্ঞী বিষন্ন বদনে মহারাজের কর ধারণ করিয়া কহিলেন নাথ ? জন্মান্তরে যেন তােমার চরণ সেবা করিতে পাই, আমি অবিলম্বেই প্রাণত্যাগ করিব, আমার এ কলঙ্ক বিভূষিত দেহ ধারণে ফল কি ? লােক নিন্দাই বা কেন শ্রবণ করি ? সেই পাপিনীকে গর্ভে ধারণ করিয়া আমায় এতদূর পর্যন্ত সহ্য ন কামিনীকিশাের। করিতে হচ্চে; পুরবাসিগণের বিষম নিন্দা,সহস্র সহস্র কাল ভূজ ঙ্গের ন্যায় ফণা বিস্তারিত করে আমার দেহ কলুষিত করিলেও প্রাণ বহির্ভ ত হচ্চে না; হা হত বিধে! তােমার মনে কি এই ছিল ; যে অবশেষে এই হতভাগিনীকে কলঙ্ক রূপ শেলাঘাত করে প্রাণধন হরণ করিলে; প্রাণ! অৰসর হও আর এ নিন্দিত দেহ-পিঞ্জরে অবস্থান করা তােমার উচিত হয় না। এই বলিয়া মূচ্ছিত হইলেন। মহারাজ আপন বাহু প্রসারণ দ্বারা মহিষীকে ধারণ করিয়া আকুল স্বরে কহিতে লাগিলেন, সহ- চরী বারি আনয়ন কর, ব্যজন কর ; একজন সখী বারি আন- য়ন করিয়া তাহার বদনে প্রদান করােন্তর ব্যজন করিলে, রাজ্ঞী কিয়ৎক্ষণ পরে চেতনা পাইয়া দীর্ঘ নিশ্বাস পরিত্যাগ পূৰ্ব্বক মৃদুস্বরে কহিলেন, নাথ! পৌরগণ আপনার নিন্দা করিতেছে, অদ্য সখী প্রমুখাৎ শ্ৰৰণ করিয়া মন অত্যন্ত চঞ্চল হইতেছে, ক্ষণকালের নিমিত্ত স্থির হচ্চে না; আর পতি নিন্দা শ্রবণে পতি প্রাণা কামিনীর জীবনে ফল কি? ভূপাল কহিলেন প্রিয়ে। ও কথার প্রসঙ্গ করায় প্রয়ােজন নাই, আর অনলে ঘৃতাহুতি দিওনা ; ঈশ্বর কৃপায় অগ্রে এ বিপদ হইতে মুক্ত হই, তৎপরে ইহার প্রচারক অনুসন্ধান করিয়া, এই খরশান অলি, তার রক্তে অভিষিক্ত করিব। এইরূপ নানাবিধ শান্তনা বাক্যে সন্তুষ্ট ও তাহার কর ধারণ করিয়া অন্দরে প্রবেশ করিলেন। পরদিন মহারাজ, সচিব ও অমাত্যগণ পরিবেষ্টিত হইয়া রাজ- সভায় সিংহাসনােপরি উপবেশনে সূরপতির ন্যায় শােভা পাই- তেছেন, এবম্বিধ সময়ে নানাবিধ সুচিক্কণ সমরাস্ত্রে সুসজ্জিত মহাবীর সেনানী বিজয়সিংহ সভা মণ্ডপে উপস্থিত হইয়া মহা- ৬৪ কামিনীকিশাের। রাজকে করপুটে প্রণাম করতঃ দণ্ডায়মান হইলে, রাজা তাহাকে সম্ভাষণ করিয়া বসিতে অনুমতি দিলেন, এবং ক্ষণকাল পরে কহিলেন, হে বীরশ্রেষ্ট; অনুমান করি স্বর্ণপুরাধিপতি নরেন্দ্র সিংহের সহিত যুদ্ধ হইবার সম্ভাবনা। অতএব বিশিষ্ট রূপে সজ্জিত থাকিবে। আর তােমারই প্রতাপে এই অসীম রাজ্যের এক ছত্রধর হইয়া আমি রাজ্য শাসন করিতেছি। অধিক কি, যদ্যপি তােমরা না থাকিতে তাহা হইলে আমায় এতদিন রাজ্য- চ্যুত হইয়া পৰ্ণ কুটীর আশ্রয়ে ফলমূলাদি ভক্ষণ করিয়া বনে বনে ভ্রমণ করিতে হইত। এই বলিয়া তাহাকে আপনার কস্থিত অমূল্য অঙ্গুরী প্রসাদ চিনু স্বরূপ দিয়া বিদায় করিলেন। পরে রাজ কার্যাদি সমাপন করতঃ সভা ভঙ্গ করিয়া রাজা ভাবিতে ভাবিতে মহিষী মন্দিরে প্রবেশ করিলেন। এই রূপে ভূপাল প্রত্যহ রাজ সভায় আসিয়া মন্ত্রী সঙ্গে নানাবিধ মন্ত্রণা করিতেছেন। এদিকে নরেন্দ্ৰসিংহের দূত সপ্তম দিবসে স্বর্ণপুরে উত্তীর্ণ হইয়া রাজ সভা প্রবেশ করতঃ ভূপালের নিকট নতশির হইয়া লিপি প্রদান করিলে, রাজা তাহা আদ্যপ্রান্ত পাঠ করিয়া ক্রোধে তাহার নয়ন যুগলে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ প্রকটিত হইতে লাগিল এবং জলন্ত অনল সদৃশ প্রদীপ্ত হইয়া কহিলেন, আমি কল্য ভাট মুখে শ্রবণ করিলাম, তাহার কন্যার বিবাহ হয় নাই, তবে আমার পুত্রের সহিত বিবাহ না দেয়, ভালই, কিন্তু এরূপ ছলনা পত্র লিখিয়াছে কেন ? কিআশ্চৰ্য্য? এত বড় স্পর্ধা ? আমার অপমান? অহ- স্কারে কালভুজঙ্গের মস্তকে পদাঘাত? আমার বাক্য অবহেলন ? মন্ত্রীবর! অবিলম্বে রণসজ্জা কর, আর অপমান সহ্য হয় না, সেই কামিনীকিশাের। দুরাচার নরাধমের শােণিতে তরবারি অভিষিক্ত করে পরিতৃপ্ত হই। মন্ত্রী, তৎক্ষণাৎ সৈনাধ্যক্ষকে আহ্বান করতঃ সমর সজ্জার আদেশ করিলেন। সেনাধ্যক্ষ, মন্ত্রীর আজ্ঞা প্রাপ্ত মাত্র রাজ সভা হইতে বহিষ্কৃত হইলেন। এবং আপন অনুচর গণকে আজ্ঞা বিজ্ঞাপন কৰিলে, দুর্গস্থিত অসঙ্খ্য সৈন্য “মহারাজের জয় ধ্বনি করিয়া বহির্গত হইল, আকাশ মণ্ডল তাহাদের পদ- রেণুতে আচ্ছন্ন হইয়া উঠিল, পৃথিবী পদ ভরে কম্পিত হইতে লাগিল, নানাবিধ রণ বাদ্য ও ভূয়ােভূয়ঃ শঙ্খনাদে ভুচর ও খেচর প্রাণী সকল মুহুর্মুহুঃ মােহ প্রাপ্ত হইতে লাগিল। অশ্বারােহী, পদাতিক ও করী পৃষ্ঠস্থিত যােদ্ধাগণ স্ব স্ব বাহুবল প্রকাশে আস্ফালন করিতে করিতে রাজভবনে উত্তীর্ণ হইলে, রাজা, মণিময় দূষণাদিতে অলঙ্কৃত হইয়া দ্বিতীয় কালের ন্যায় প্রখর তরবারি ধারণ পূৰ্ব্বক মাতঙ্গ পৃষ্ঠে আরােহণ করিয়া, যােদ্ধাগণে উৎসাহ প্রদান করিতে করিতে রণ যাত্রা করিলেন । মন্ত্রী, অমাত্যগণ ও অন্যান্য অধীন রাজারা তাহার পশ্চাৎ ধাবমান হইলেন। নরেন্দ্ৰসিংহ সমরেচ্ছায় সাত দিবসের পথ তিন দিবসে উত্তীর্ণ হইয়া শিবির স্থাপন করিলে, ভূপালগণ স্বীয় স্বীয় সৈন্য লইয়া উপদুর্গ রচনা করিতে লাগিল, মন্ত্রীগণ বীরবেশ ধারণ করিয়া ভল্ল হস্তে, করী পৃষ্ঠে বুহ রক্ষা করিতে লাগিল, অন্য অন্য যােদ্ধাগণ ঘন ঘন হুঙ্কার ও সিংহনাদ করিতে লাগিল, বাদ্যকরগণ দলে দলে পুনঃ পুনঃ রণােৎসাহ বাদ্য বাদন করিতে লাগিল। সহস্র সহস্র লােহিত বৈজয়ন্তী উডঙীন হইলে আকাশমণ্ডল যেন লােহিত বর্ণ ধারণ করিল এবং সৈন্যের ষণ কোলাহল ধ্বনি যেন প্রলয় কালের কোলাহলের ন্যায় কামিনীকিশাের। বােধ হইতে লাগিল। এই রূপে মহারাজ ভূপালগণ পরিবেষ্টিত হইয়া ভূবন বিখ্যাত কুরুক্ষেত্রে সেই বিস্তীর্ণ রঙ্গভূমে মহাবীর পাপতির ন্যায় অলৌকিক শােভা পাইতে লাগ্নিলেন। এদিকে মহারাজ অনঙ্গমােহন, চর মুখে নরেন্দ্র সিংহের আগমন বার্তা শ্রবণে স্ব সৈন্যে রণ ক্ষেত্রে উপস্থিত হইলেন। সেনা- ধ্যক্ষ মহাবীর বিজয়সিংহ তরবারি হস্তে অকুতােভয়ে ইতস্ততঃ সঞ্চরণ করিতে লাগিলেন। বুদ্ধিমান মন্ত্রীবর অপূৰ্ব্ব বুহ রচনা করিয়া স্বয়ং রক্ষা করিতে লাগিলেন। অন্য প্রবল পরাক্রম- শালী যােদ্ধাগণ শত শত সৈন্যের অধ্যক্ষ ভার গ্রহণ করিয়া অগ্রসর হইতে লাগিল। ক্রমে উভয় দল সম্মুখীন হইয়া তুমুল সংগ্রাম উপস্থিত হইলে উভয় দলের লক্ষ লক্ষ সৈন্য সমরসাহী হইল, অশ্ব ও মাতঙ্গগণ যােদ্ধাগণের মস্তক হীন দেহ পৃষ্ঠে করিয়া বেগে পলায়ন করিতে লাগিল, রণ-ভূমি শােণিতাভিষিক্ত হইয়া অপূৰ্ব শােভা ধারণ করিল। সেনাধ্যক্ষ বিজয়সিংই আপনার সৈন্য সমরসাহী হইতেছে দেখিয়া ক্রোধে কৃপাণ হস্তে রণ মধ্যে প্রবেশ করিয়া কদলী বৃক্ষের ন্যায় শত্রুসৈনন্যর মস্তক ছেদন করিয়া যমালয়ে প্রেরণ করিতে লাগিলেন। তৎদর্শনে নরেন্দ্র সিংহের মন্ত্রী ও ভূপালগণ সৈন্য রক্ষার্থে বেগে অগ্রসর হইয়া তাহার প্রতি অস্ত্র প্রহরণ করিতে লাগিল। অনঙ্গমােহনের মন্ত্রী ও যােদ্ধাগণ সেনাধ্যক্ষের সাহাৰ্য্যার্থে উপস্থিত হইলে উভয় পক্ষে ঘােরর সংগ্রাম হইল। বিজয়সিংহ কৃপাণাঘাতে শত্রু পক্ষীয় রাজাদ্বয়ের মস্তক ছেদন করিলেন। নরেন্দ্ৰসিংহের মন্ত্রী ক্রোধে বিজয়সিংহের উপরে ভল্ল প্রহার করিলে, তিনি সমর কৌশলে উহা ব্যর্থ করিয়া কামিনীকিপাের। সিংহনাদ করিতে লাগিলেন। কিন্তু নরেন্দ্ৰসিংহের অসন্ধ্য পদাতিক অশ্বারােহী ও করী পৃষ্ঠস্থিত যােদ্ধাগণ এক কালীন যুদ্ধে প্রবৃত্ত হইলেশত্রু সৈন্যগণ ভয়ে পলায়ন করিতে লাগিল। বিজয়সিংহ ও মন্ত্রী, রণ মধ্যে অবস্থিতি করিতে অসমর্থ হইয়া দোহে তাহাদের অনুসরণ করিলেন। শত্রু সৈন্য মধ্যে জয়ধ্বনি ও ভুয়ােভুয়ঃ শঙ্খনাদ হইতে লাগিল এবম্বিধ সময়ে সূৰ্য্যদেব অস্তাচল অবলম্বন করিলে, চতুর্দিক অন্ধকারাচ্ছন্ন দর্শনে সৈন্যগণ শিবির মধ্যে প্রবেশ করিল। এদিকে কামিনী- কিশাের ও রঞ্জন, মহারাজের পরাজয় শ্রবণে পরস্পরে কহিতে লাগিলেন; “আমরা থাকিতে যদি নরেন্দ্র সিংহ সেই প্রমদাদ্বয়ে হরণ করে, তাহা হইলে ইহলােক ও পরলােকে পাপ সাগরে মগ্ন হইতে হইবে, আর সেই অবলাদ্বয়ে ঈদৃশ দুঃখে পতিত করে যে জীবন ধারণ করিতে পারিব তা কখনই না, মনুষ্য পক্ষে পত্নী রক্ষা করা এক প্রধান ধৰ্ম্ম, কল্য প্রভাতে দোহে রাজ সৈন্য মধ্যে মিলিয়া সমরে প্রবৃত্ত হইব” এই স্থির করিয়া, দেহে শয়ন করিলেন। পরদিন প্রভাতে মহারাজ অমঙ্গমােহন সৈন্য আহরণ করিয়া সমরক্ষেত্রে উপস্থিত হইলে, বন্ধুদ্বয় বীর বেশ ধারণ করিয়া রণস্থলে উপস্থিত হইলেন। ক্রমে শত্রু সৈন্য অগ্রসর হইয়া সমর আরম্ভ করিলে, বন্ধুদ্বয় অসীম সাহসে রণ মধ্যে প্রবেশ করিয়া শত্রু পক্ষীয় সেনাধ্যক্ষ, মন্ত্রী, অন্যান্য রাজা ও অসঙ্খ্য সৈন্যগণের রক্তে পৃথিবী প্লাবিত করিলেন। উক্ত যােদ্ধাগণের কুণ্ডল সুশশাভিত মস্তক পৃথ্বীতলে সৰ্বরী ভূষণ তারা গণের ন্যায় শােভা পাইতে লাগিল। তৎদর্শনে কামিনীকিপাের। শত্রু সৈন্যগণ পলায়ন করিতে লাগিল। কামিনীকিশোের ও রঞ্জন তাহাদের পশ্চাৎ ধাবমান হইলে, নরেন্দ্র সিংহ ক্রোধে অসিহস্তে সম্মুখীন হইয়া তাহাদের গমন রােধ করিলেন। বন্ধুদ্বয় অসীম সাহসে তাহাকে বেষ্টন করিয়া অস্ত্র প্রহার করিতে লাগিল, রাজা আর সহ্য করিতে না পারিয়া মৃচ্ছিত হইয়া পড়িলেন। রঞ্জন থাঘাতে তাহার মস্তক দ্বিখণ্ডিত করিয়া সিংহনাদে রণেন্মত্ত হইয়া সমর ক্ষেত্রে ইতস্ততঃ সঞ্চরণ করিতে লাগিলেন। মহারাজ অনঙ্গমােহন বিদেশীদ্বয়ের ঈদৃশ রণ কৌশল দর্শনে চমৎকৃত হইলেন। মন্ত্রীবর দুইজনকে নিরস্ত করিয়া বিশিষ্টরূপ সম্ভাষণে মহারাজ সমীপে আনয়ন করিলে, বন্ধুদ্বয় রাজ মান্য রক্ষা জন্য করপুটে দণ্ডায়মান হইলেন। রাজা দোহার মনােহর কান্তি দর্শনে মনে মনে কহিতে লাগিলেন, যে ইহারা অবশ্য কোন সম্রান্ত বংশজ হইবে সন্দেহ নাই। এই স্থির করিয়া দোহে আলিঙ্গন প্রদান করতঃ লক্ষ লক্ষ শির চুম্বন করিলেন। পরে মহারাজ বীরদ্বয় সমভিব্যাহারে রাজবাটী উত্তীর্ণ হইয়া পরিচয় জিজ্ঞাসা করিলে, বন্ধুদ্বয় আত্ম বৃতান্তবর্ণনা করিল। রাজা তৎশ্রবণে হর্ষোৎ- ফুল নয়নে কহিলেন, বৎস! আমার জীবন চরিতার্থ ও আলয় পবিত্র হইল ? আমি স্বপ্নেও জানিতাম না, যে ভবৎ সদৃশ মহাত্মা রাজকুমার ও মন্ত্রী তনয় আমার উপকারার্থে সমরে প্রবৃত্ত হইবেন। আপনারা আমার যে কতদূর পর্যন্ত উপকার করি- লেন তাহা এক মুখে বর্ণনা করা যায় না, আমি চির দিনের নিমিত্ত আপনাদের নিকট ঋণী রহিলাম, প্রস্তুপকারার্থে রাজ্য- ঘন অৰ্পণ করিলেও প্রতিশােধ করা কঠিন। কামিনীকিশাের কামিনীকিশাের। করযােড়ে দণ্ডায়মান হইয়া কহিলেন তাত! আমরা কি আপ নার উপকার করিতে পারি, আপনি জগৎপিতা ঈশ্বর কর্তৃক উপকৃত হইয়াছেন, তাহা যদি না হইবে তবে কেন আমরা পিতা, মাতা ও রাজ্যধন ত্যাগ করিয়া নানা দেশ, বন, পর্বতাদি অতিক্রম করিয়া আপনার রাজ্য মধ্যে উপস্থিত হইব। মহারাজ তাহার ঈদৃশ বাক্য শ্রবণে সন্তুষ্ট হইয়া পুত্রবৎ মেহ পাশে আবদ্ধ হইলেন এবং দেহে সমভিব্যাহারে লইয়া থাকিবার নিমিত্ত পুরীমধ্যে এক অপূর্ব মনােহর বাটী প্রদান ও শত শত দাস দাসী নিযুক্ত করিয়া দিলেন। মহারাজ অনঙ্গমােহন জঙ্গলা দ্বীপ জয় কালে রাজভবন লুট করিয়া যে দুই নিরুপমা কামিনী লাভ করিয়াছিলেন, এক্ষণে তাহাদিগকে দোহার তাম্বুলকরঙ্কবাহিনী পদে নিযুক্ত করিলেন। বন্ধুদ্বয় তাঁহার এবম্বিধ সদাচার দর্শন করিয়া ক্ষণকাল নিস্তব্ধের পর, রঞ্জন কহিলেন, বন্ধো! ভূপালের এবম্প্রকার সদ্ব্যবহার ও বাৎসল্য ভাব দশনে আমার মানস হরণী তাহার প্রম পাশে বদ্ধ হইয়াছে। আহা! মহারাজের কি করুণ স্বর ; বােধ হয় শশী ইহার মুখ-সুধা পান করিয়া শুধাকরু নাম ধারণ করিয়া- ছেন; বােধ হয় কোকিল ও অলিকুল ইহারই মিষ্ট স্বর শ্রবণ করিয়া স্বর শিক্ষা করিয়াছে। যদি ইনি সমরে প্রাণত্যাগ করিতেন, তাহা হইলে শশী আর স্বগণ সহিত আকাশ মণ্ডলে উদয় হইতেন না, প্রভাকরের আর ঈদৃশ প্রভা থাকিত না, কোকিল ও মধুপকুল আর মিষ্ট স্বরে ঈশ্বরের গুণ কীৰ্ত্তন করিত না, বৃক্ষ, পৰ্বত প্রভৃতি আর মন্তোক উত্তোলন করিয়া পরমেশ্বরের মহিমা প্রকাশ করিত না । প্রজাগণত এমন সৎ

৭৮
কামিনীকিশোর।
স্বভাব বিশিষ্ট রাজার বিরহে ক্ষণকালের নিমিত্ত এ ধরাতলে
অবস্থান করিতে পারিত না। এইরূপ নৃপের গুণ কীর্তণ
করিতে করিতে যামিনী উপস্থিত হইলে, কামিনীকিশাের ও
রঞ্জন আহারান্তে রত্ন পালঙ্কোপরি শঘন করিয়া সুখে নিদ্রা-
ভিভূত হইলেন।
রাজা, মহিষী মন্দিরে প্রবেশ করিয়া, ঐ যুদ্ধাদ্বয়ের
সদ্বংশােৎপন্নত্ব, বীরত্ব, ও নীতির বিষয় বর্ণনা করিলে, রাণী
তংশ্রবণে চমৎকৃত হইয়া কহিলেন, নাথ। যদ্যপি
বিশিষ্টরূপ যত্ন করিয়া এই যুবাদ্বয়কে আপনার ও মন্ত্রী দুহিতার
উদ্বাহ দেন তাহা হইলে এ বিষম কলঙ্কানল নিৰ্বাণ হয়।
রাজা কহিলেন, প্রিয়ে। আমি দর্শনাবধি স্থির করিয়াছি যে
এই যুবকদ্বয়কে কন্যাদ্বয় অৰ্পণ করিয়া এ কাল কলঙ্ক হইতে
মুক্ত হইব, কিন্তু গর্ভ লক্ষণ প্রকাশ হইলে, যৎপরােনাস্তি
লজ্জিত হইতে হইবে, যাহা হউক প্রকাশ হইলেও বিশিষ্টরূপ
যত্ন করিয়া বিবাহ দিব,এই রূপ নানাবিধ কথােপকথনে যামিনী
অবসান হইলে, পরদিন মহারাজ বীরদ্বয়কে আপন অভিষ্ট
জ্ঞাপন করিলেন। কামিনীতিশাের করপুটে দণ্ডায়মান হইয়া
কহিলেন, রাজন্ ! আমরা পিতা মাতার অনুজ্ঞা ব্যতিরেকে
বিবাহ করিতে সমর্থ নহি, যদি আপনি লিপি প্রেরণ করিয়া
মহারাজকে সম্মত করিতে পারেন; তাহা হইলে আপনার
দুহিতার পাণিগ্রহণ করিতে পারি। রাজা তৎশ্রবণে ক্ষণকাল
নিস্তব্ধ হইয়া কহিলেন, বৎস! অগ্রে বিবাহ হউক পশ্চাৎ আমি
তােমাদিগকে সঙ্গে করিয়া মহারাজ সদানন্দের রাজ্য মধ্যে
রাখিয়া আসিব, তাহাতে তিনি অসন্তুষ্ট না হইয়া বরং সন্তুষ্টই

কামিনীকিশাের।
হইবেন। রঞ্জন কহিলেন, রাজন! যদি একান্তই আপনার
বিবাহ দিবার ইচ্ছা, তবে দোহে একবার সেই কামিনীয়ে
দর্শন করিতে ইচ্ছা করি ? তৎশ্রবণে রাজা দেহে সঙ্গে
লইয়া কন্যার মন্দিরে প্রবেশ করিলেন। দাসী রাজকন্যায়
মহারাজের আগমন বার্তা জানাইলে, হৈমবতী জনককে
সম্ভাষণ করিবার নিমিত্ত ব্যস্তহইয়া করযােড়ে মহারাজের
আগমন প্রতীক্ষা করিতে লাগিলেন। ভূপাল যুবকদ্বয়কে
লইয়া উপস্থিত হইলে, রাজকন্যা মহারাজে প্রণাম করিয়া
বসিতে সিংহাসন প্রদান করিলেন, এবং যুবকদ্বয়কে চিনিতে
পারিয়া লজ্জায় অধােবদনে উপবেশনার্থে অন্য এক আসন
প্রদান করিলেন। ক্ষণ কাল অবস্থিতি করিয়া রাজনন্দন ও
রঞ্জন সভামণ্ডপে উপস্থিত হইলেন। পরে কুমার কহিলেন
ভূপতে ! আপনার এই যুবতী কন্যা ভূবনমােহিনী হইয়াও গর্ভ
উচ্চতা দোষে কিঞ্চিৎ দোষিত হইয়াছেন। যদি এই দোষটি
না থাকিত তাহা হইলে ইন্দ্রের সচী ইহার দাসীত্ব স্বীকার
করিত, আহা! বিধি এমন অমূল্য নিধি সৃষ্টি করিয়া কেবল
এই একটি দোষ রাখিয়াছেন। রঞ্জন, সখার ছলনা বাক্য
বুঝিতে পারিয়া, মহারাজে গােপন ভাবে কহিলেন, কুমার বিবাহ
করিবেন না, আপনার আর অনুরােধে প্রয়ােজন নাই।
এই বলিয়া রঞ্জন রাজকুমারের কর ধারণ করিয়া বাহিরে
যাইতে উদোেগ করিলে, রাজা বন্ধুদ্বয়ে অশেষবিধ মিনতি
করিলেন। সখায়ে পরে সম্মত হইলে, রাজা আনন্দে
পরিপূর্ণ হইয়া দোহে সঙ্গে লইয়া বাহির দেওয়ানে উপস্থিত
হইলেন। পরে কুলাচাৰ্য আনয়ন করিয়া বিবাহের দিন ধার্য

१२ কামিনীকিশাের। করিতে, তৎপরে দেশ বিদেশের রাজা দিগকে আমন্ত্রণ পত্র প্রেরণ করিতে, অনুমতি দিয়া, রাজা, মন্ত্রীবরে কহিলেন, রাজকুমার আপনার বাটী হইতে মদীয় ভবনে সমারােহে বিবাহ করিতে আসিবে অতএব তুমি বিশিষ্টরূপ উদেবাগ করিতে জটি করিও না। পরে তব তনয়ার সহিত মন্ত্রী নন্দনের বিবাহ দিব। তৎশ্রবণে মন্ত্রীবর আনন্দিত হৃদয়ে রাজসুতে সঙ্গে লইয়া, আপন ভবনে উপস্থিত হইলেন। পরে ভৃত্যগণকে বিবাহের উদ্যোগ করিতে আদেশ করিলে, তাহারা প্রাণপণে সমস্ত আয়ােজন করিতে লাগিল। এদিকে নিমন্ত্রিত রাজাগণ অসখ্য সৈন্য সহিত ক্রমে রাজবাটা উত্তির্ণ হইল। মহা রাজ সকলে বহু সমার পূর্বক অপুর্ব শােভনীয়া বাস বাদ প্রদান করিলেন। এবং রাজ্য মধ্যে ঘােষণা করিয়া দিলেন, যে প্রজাগণ সাত দিবস বাদ্য-গীতাদিতে প্রবৃত্ত থাকিবে, তাহাতে যাহার যত ব্যয়, তাহা রা-ভাণ্ডার হইতে প্রাপ্ত হইবে। তৎশ্রবণে প্রজাগণ আনন্দে পরিপৰ্ণ হইয়া অহােরাত্র বাদ্য গীত নৃত্যাদিতে প্রবৃত্ত হইল। আহত ও অনাহুত জন- গণের আগমনে ক্রমে নগর আচ্ছন্ন ও তাহাদের কোলাহল ধ্বনিতে চতুর্দিক প্রতিধ্বনিত হইতে লাগিল। পরে অৰ- ধারিত শুভ দিনে মন্ত্রীবর রাজকুমারকে নানাবিধ বহুমূল্য ভুষণা- দিতে অলঙ্কত ও রত্নময় চতুর্দোলে বসাইয়া রাজভবনাভিমুখে শুভ যাত্রা করিলেন। অশ্বারােহী সৈন্যগণ নিষ্কাশিত খরশান অসি হস্তে অগ্র পশ্চাৎ ধাবমান ও দাসগণ পীতান্থর পরিধান করিয়া লােহিত পতাকা উড্ডীন করিয়া অগ্রসর হইতে লাগিল। নানা দিদেশীয় প্রশংসিত বাদ্যকরেরা সুমধুর স্বরে বাদ্য বাদন কামিনীকিশাের। ৭৩ করিতে লাগিল। এবং বিবিধ আতসবাজি ও স্থানে স্থানে কণক স্তভোপরি ভূরি ভূরি আলােক প্রজ্জ্বলিত হইলে, যামিনী মণিময় অলঙ্কার ভূষিতা কামিনীর ন্যায় শশাভা পাইতে লাগিল। এইরূপে মন্ত্রীবর স্বগণ সহিত কুমারকে লইয়া রাজবাটী উত্তীর্ণ হইলে, মহারাজ, রাজনন্দন মন্ত্রী ও অন্যান্য সভ্য- গণকে সম্ভাষণ করিয়া যােগ্যাসনে বসিতে অনুমতি করিলেন। তৎপরে নিরূপিত শুভলগ্নে বিবাহ হইলে, রাজা সভ্যগণ ও অন্যান্য জনগণকে বিশিষ্ট যত্নে বিবিধ মিষ্টান্ন দ্বারা পরিতােষ করিয়া, মন্ত্রী সহিতে নানাবিধ রহস্য করিতে করিতে অন্দরে প্রবেশ করিলেন। ( কামিনীর শিরােমণি হয় পতিধন। তাঁহার চরণ সেবা কর রামাগণ।) এই বিস্তীর্ণ ধরণীমণ্ডলে যেমন দেবদেব শ্রীবৎসলাঞ্ছিত ভগবান নারায়ণ, দেবতা ও মুনিগণের আরাধ্য ; যেমন বৃহস্পতি সুরগণের, শুক্রাচাৰ্য দৈতগণের, দ্রুণাচাৰ্য কুরু- পাণ্ডবের, অগস্ত্য পরুশরামের, বশিষ্ট ঘুকুলােব শ্রীরাম চন্দ্রের, গুরু; যুধিষ্ঠীর যেমন ধাৰ্মিক গণের, অর্জুন যেমন বীর- গণের, অগ্রগণ্য; সূরহস্তি ঐরাবৎ যেমন মাতঙ্গগণের, সিংহ যেমন বনচর পশুগণের, বিনতা নন্দন গরুড় যেমন বিহগগণের, বাসুকী যেমন নাগগণের, শ্রেষ্ট ; তদ্রুপ পতি, কামিনীগণের আরাধ্য, গুরু, অগ্রগণ্য, শ্রেষ্ঠ, পূজনীয় ও শিরােভূষণ স্বরূপ। যাহার পদ সেবা ও আজ্ঞা প্রতিপালন, যাহার সুখে সুখানুভব, দুঃখে দুঃখানুভব করিলে, পতিপ্রাণা কামিনীগণে, ৭ ৭৪ কামিনীকিশাের। আর পতি বিচ্ছেদ যন্ত্রণা সহ করিতে হয় না, অন্তে অনন্তকাল পৰ্যন্ত বৈকুণ্ঠ ধামে পতি সহবাসে সুখে কালাতিপাত করিতে পারে। এক্ষণে পতি-সােহাগিণী সতী রাজনন্দিনী, সেই, মুক্তিপ্রদ ধন, প্রাপ্ত হইয়া আনন্দাশ্রু বর্ষণে তদগত চিত্তে, প্রাণনাথে সম্বােধন করতঃ কহিলেন, নাথ ? উদ্যান মাঝে যে দিনাবধি তােমায় গান্ধৰ্বানুসারে মাল্য প্রদানে, জীবন, যৌবন, ও আত্মারে সমৰ্পণ করিয়াছিলাম, সেই দিন পর্যন্ত যে কত সুখানুভবে দিনপাত হইয়াছিল, আহা! তার পর যখন বিচ্ছেদ রাহু আসিয়া সুখভানু গ্রাস কল্লে, তখন চতুর্দিক ঘােতর অন্ধকারাচ্ছন্ন বােধ হইল, যেন কেহ পৰ্বত শিখর হতে আমায় ভূতলে নিক্ষেপ কল্পে। উঃ।তখন আমি অচৈতন্য, ক্ষণ- কাল পরে চক্ষু উন্মিলন করে দেখি, এই অট্টালিকা শম্মান ভূমির ন্যায়, এই শয্যা কণ্ঠকাকীণ বনের ন্যায়, এই নীলাম্বর, এই কঙ্কণাদি মণিময় ভূষণ সকল, ভষ্মের ন্যায় এবং এই বেণী সাপিনীর ন্যায়, বােধ হইতে লাগিল। তখন পলকে প্রলয় জ্ঞান, ধুলী অঙ্গেয় অভরণ, ভূমি বিচিত্র সিংহাসন, অঞ্চল সু-কোমল শয্যা, বােধ হইতে লাগিল। আহা! সে সময়ে আমার দুঃখে দুঃখিত হয়, এমন আর কেহই ছিলনা; কেবল, কোকিল ও অলিকুল স্ব স্ব স্বরে আমায় যেন প্রবােধ বাক্যে বৱে, “অই! পতি বিরহিনী কেঁদনা, স্থির হও, অচিরে পতি- ধন প্রাপ্ত হবে’ উঃ- সেই দিন

কামিনীকিশাের।
৭৫
বাসর পালা।
হেন রূপে খেদ করে যখন।
এল সখীরা বাসর ভবন ।
কেহ বাঁশরী, কেহ বেয়ালা।
কেহ তাণপুরা, কেহ পিয়ালা।
কেহ পাখােয়াজ, কেহ সেতার।
কেহ সপ্তসার, কেহ আহার ।
কেহ এসরাজ, কেহ মৃদঙ্গ।
করে করি এল করিয়া রঙ্গ।
দেখে সবে ধনী ঈশৎ হেসে।
লাজে ঢাকি মুখ বসেন পাশে।
পরে সবারে করি সমাদর।
বসাইল ধনী আসরােপর
রসিকার সার ধনী সরলা।
অপরূপ রূপ যিনি চপলা।
মৃগাক্ষী আসিয়া কামিনী পাশ।
হেসে হেসে ধনী কহে সরসে ।
বরের কেন লাে সরেনা বাক।
কি ভাবে ভাবি হয়েছে অবাক,
দেখে কামিনী বদন কমল।
হয়েছে বুঝি মানস বিকল ।
নৃপসুত হাসি কহেন তারে।
বিকল হয়েছি কটাক্ষ শরে।

কামিনীকিশাের।
অধীনে করুণা না করি ধনী।
অাখি শরে মম বিদরে প্রাণী
বিদ্ধ হয়ে তার নয়ন শরে।
জ্বর জ্বর দেহ বাক্ না সরে ।
আশ্চয্য আরও হেরিয়ে প্রিয়ে।
চিন্তানলে দগ্ধ হতেছে হিয়ে।
চকে বিমানে করে ভ্রমণ।
মত্যে আজি শত করি দর্শন।
কিছার দীপে কোন প্রয়ােজন।
শত বিধু যথা করে আগমন
সুধাকরে সুধা করে বর্ষণ।
তাপিত জনরে স্নিগ্ধ কারণ।
এ সুধা কেমন বুঝিতে নারি।
দহিছে দেহ উহু মরি মরি।
বাকই কৌশল হইলে পরে।
কহিছেন ধনী অখির ঠারে ॥
ওশে। প্রাণ সই বাজা বাঁশরী ।
বিফলে যায় লাে সুখ সৰ্বরী ।
কন্যার পাইয়া আজ যত সখীগণ।
যন্ত্রেতে মিলায়ে সুর বাজায় বাজন
নিরুপমা মনােরমা হরিণ নয়নী।
বীণা যন্ত্রে গীতারম্ভ করিলেন ধনী ৪

কামিনীকিশাের। ; করিতেছেন। ধিক! আমি একটা সামান্যা কামিনীর প্রণয় পাশে বদ্ধ হইয়া চিরারাধ্য পিতা মাতাকে বিস্মরণ হইয়াছি। রে মন! তােয় ধিক! তুই আরাধ্য ধন ত্যাগ করিয়া বিলাষ ইচ্ছা করিতেছি; তুই এই অনর্থের মূল, এখন স্বপথে আয়, না হইলে কৃপাণ আঘাতে তাের গৰ্ব খর্ব করিব; পদ ! তােরে প্রণতি করি, এখন সেই অরণ্যে চল; রে কর ! খরশান অসি গ্রহণ করে, যে দুর্দান্ত নরাধম রাজ্যপহরণ করিয়াছে, তাহার শিরচ্ছেদন করিয়া শােণিতে পৃথিবী প্লাবিত কর; এই রূপ বিলাপ করিতে করিতে মূচ্ছ। হইলেন। রাজকুমার কিঙ্কৰ্তব্য বিমূঢ় হইয়া সঙ্গাহীন পুত্তলিকার ন্যায় তাহার গল- দেশ ধারণ করতঃ অশ্রুপূর্ণ লােচনে নিরীক্ষণ করিতেছেন, এক- দ্বিধ সময়ে মহারাজ অনঙ্গমােহন, সচিব সহিতে উপস্থিত হইয়া বিশিষ্টরূপ যত্নে তাহার চেতন সঞ্চার করাইয়া দুঃখ বৃত্তান্ত জিজ্ঞাসা করিলে, রঞ্জন কহিলেন, রাজন! আজি প্রত্যুষ সময়ে স্বপ্ন দর্শন করিয়াছি, যেন কোন্ প্রবল পরাক্রমশালী মহীপাল অবন্তী নগরাধিপতি সদানন্দে রাজ্যচ্যুত করিয়া সিংহাসন অধিকারে রাজ্য শাসন করিতেছে। মহারাজ সস্ত্রীক হইয়া প্রাণ ভয়ে মন্ত্রী সহিত বনে বনে ভ্রমণ করিতেছেন, মাতা তাহাদের সহিত অরণ্যােত ফল মূলাদি ভক্ষণে প্রাণ রক্ষা করি- তেছেন। রাজা, তৎশ্রবণে কহিলেন, বৎস! স্বপ্ন কখন সত্য হয় না,এ সমস্ত অলিক, কেবল তাহাদের প্রতি তােমার প্রগাঢ় স্নেহ নিবন্ধন এইরূপ দর্শন করিয়াছ, এক্ষণে স্থির হও, আমি স্বসৈন্যে তােমাদিগে সঙ্গে লইয়া সেই গুণনিধান সদানন্দ মহীপালের রাজ্যে রাখিয়া আসিব, আর যদি স্বপ্ন বৃত্তান্তই সত্য কামিনীকিশোর। হয়, তাহা হইলে সেই রাজ্যাপহরণ-কারক পামরকে দূরীভূত করিয়া বনচারী রাজকে পুনরায় সিংহাসনােপরি প্রতিষ্টিত করিব, সন্দেহ নাই। রঞ্জন কহিলেন, যদি সেই স্বপ্নই সত্য হবে, তবে কেন আমার মন এত উদ্বিগ্নতা ধারণ করিবে, তবে কেন ধৈৰ্য্য হইতেছে না। ভুপাল কহিলেন, বৎস্য! মনন মধ্যে কোন কুচিন্তা উপস্থিত হইলেই এইরূপ চঞ্চলতা হইয়া থাকে। ক্ষণকাল পরে রঞ্জন, শান্তি লাভ করিলে মহী নন্দন প্রিয় সখায় সঙ্গে লইয়া কুশম উদ্যানের মনােহর শােভা দর্শন করিতে প্রস্থান করিলেন। মহারাজ মন্ত্রীবরে বিবাহ উদেবাগ করিতে আদেশ করিয়া মহিষী মন্দিরে প্রবেশ করি লেন। ক্রমে দিবা অবসান হইলে রাজা মহাসমারােহে মন্ত্রী কন্যার সহিত তাহার বিবাহ দিলেন। পরদিন রাজা স্বর্ণকান্তমণি, নীলকান্তমণি, অয়সকান্তমণি, প্রবালাদি বহুবিধ বহুমূল্য প্রস্তর, ও আরব্য দেশীয় প্রশংসিত শত ঘােটক, বিংশতি শেত মাতঙ্গ, সহস্র অশ্বারােহী সৈন্য, প্রবল পরাক্রমশালী শত খােজা এবং নানা দিদেশীয় উৎকৃষ্ট পণ্য দ্রব্যাদি, যৌতুক স্বরূপ প্রদান করিয়া, অঙ্গীকার রক্ষার্থে বন্ধুদ্বয়ে সস্ত্রীকে লইয়া অবন্তী নগরা ভিমুখে শুভযাত্রা করিলেন। অষ্টাদশ দিবসে নিরুদ্বেগে অবন্তী নগরে উত্তীর্ণ হইয়া শ্রবণ করিলেন, যে কাবুল দেশীয় দুর্দান্ত পাঠান রাজা, মহারাজ সদানন্দকে রাজ্যচ্যুত করিয়া সিংহাসন অধিকার করিয়া রাজ্য শাসন করিতেছে। তৎশ্রবণে অনঙ্গ মােহন ক্রোধে অধীর হইয়া সৈন্যগণে রণসজ্জা করিতে আদেশ করিলেন। কামিনীকিশাের ও রঞ্জন বীরবেশ ধারণ করিয়া সেনানীত্ব ভার গ্রহণ করিলেন। রাজ্য মধ্যেধনাঢ্য ব্যক্তিগণ

কামিনীকিশাের।
৭৭
নৃপসুত, গুণ যুত, কহেন তাহারে।
তব তুলা, নাহি মিলা, ভ্ৰমিয়া সংসারে।
বাবাণী, নারায়ণী, ত্যাজি স্বর্গ আশা।
তবাণনে, স্বর্গ জ্ঞানে, লইলেন বাসা ॥
গুণান্বিত, মম তাত, অন্বেষণ করি।
আনি পঞ্চ, যিনি পঞ্চ,-শর প্রিয়া নারী ॥
ভাবি ভূপ, পুত্র সুখ, উৎপাদন করে।
নিরুপমা, পঞ্চজনা, দিলেন আমারে।
প্রশংসিতা, গুণযুতা, সেই রামাগণ।
তব মান্য, ভাবি গণ্য, গৃধিনী যেমন
কহে ধনী, সুবদনী, চাহি তার পানে।
কিবা জানি, গুণমণি, পুরুষের স্থানে।
কৃপা করি, ওহে হরি, বাজাও বাঁশরী।
গােপীগণ, উচাটন, আর তব প্যারি।
প্রাণ সখা, তব রাধা, হয়েছে কাতর।
ওহে হরি, বংশীধারী, বাজাও সত্বর।
কহে রায়, প্রমদায়, না জানি সঙ্গীত।
বেঁধে মােরে, প্রম ভােরে, কর যা বিহিত ॥
তব পাশে, যেবা ভাষে, আশা করি সুখে।
যেই ভাষে, সেই ভাসে, মহার্ণব দুঃখে ।
কহে ধনী, সুবদনী, যোড় করি কর।
তব গীত, শুনিবারে, মানস কাতর।
শুনি রায় প্রমদায় ভাবিয়া অন্তরে।
রাখিতে রমণী মন গীতারম্ভ করে।

৭৮
কামিনীকিশাের ।
সপ্তপুর মিলাইয়া বাজান সেতার ।
অবলা সরলা বালা কি জানে সে তার ।
প্রসংসা করয়ে সবে মহীন্দ্র নন্দনে।
রায় বলে কিবা জানি তােমাদের স্থানে ॥
এইরূপে বাদ্য গীতে পােহল রজনী।
শেষ হল বাসর পালা বল হরি ধ্বনি।
রঞ্জনের বিবাহান্তে দোহার সস্ত্রীকে
পিতৃ রাজ্যে গমন।
রজনী অবসান হইলে, রাজকুমার সুখ বাসর-ভবন ত্যাগ
করিয়া, প্রাণ সখার উদ্দেশে প্রিয়তমার নিকট হইতে বিদায়
লইয়া বাহির ভবনে উপস্থিত হইলেন। দেখিলেন, রঞ্জন,
পালঙ্কোপরি উপবেশনে করতলে কপােল বিনাশ করিয়া প্রগাঢ়
চিন্তায় কভু রােদন ও কভু শিরে করাঘাত করিতেছেন।
তাম্বুল-করঙ্ক-বাহিনী এক পার্শ্বে ম্লান বদনে দণ্ডায়মান হইয়া
ব্যজন করিতেছে। দাস দাসী গণ কর পুটে অবস্থান করি-
তেছে। নৃপসুত হচরের এবম্বিধ ভাব দর্শনে চমৎকৃত হইয়া
তাহার গলদেশ ধারণ করিয়া পুনঃ পুনঃ বিলাপ বৃত্তান্ত জিজ্ঞাসা
করিলে, রঞ্জন, হা তাত ! হা মাত গর্ভধারিণী ! হা রাজ।
হা মহিষী স্নেহাস্পদী! পরিণামে কি তােমাদের এই দশা হইল,
যে জীবন রক্ষার্থে বনে বনে ভ্রমণ করিয়া পর্ণকুটীর ও গিরি
গুহা আশ্রয়ে বন্য ফলমূল আহরণে জীবিকা নির্বাহ করিতে
যে মহিষীকে, প্রভাকর কখন দর্শন করিতে পা
, তিনি এক্ষণে তাহার প্রজ্জ্বলিত কিরণে অরণ্য মধ্যে ভ্রমণ
হইল ?।

কামিনীকিশাের। রাজকুমারের আগমন বার্তা শ্রবণে তাঁহার সহায়তা করিতে প্রবৃত্ত হইল। পাঠান রাজ স্বীয় সৈন্যগণ সহিত সমরক্ষেত্রে উপস্থিত হইলে উভয় দলে ঘােরর সংগ্রাম হইল, পাঠান সৈন্যগণ অকুতােভয়ে এতাদৃশ সংগ্রাম করিল, যে অনঙ্গমােহন ও রাজকুমারের লক্ষ লক্ষ সৈন্য ভয়ে ইতস্ততঃ পলায়ন করিতে লাগিল। রাজকুমার যত্ন সহকারে পুনশ্চ্য সৈন্য আহরণ করি লেন। কিন্তু সেই দিবস দিনাবসান হেতু সমরানল আর প্রজ্জ্ব লিত হইল না। পরদিন পৃথী কুজঝটিকাচ্ছন্ন হইলে, মহারাজ স্বীয় তেজস্বী অশ্বারােহী ও পদাতিক যােদ্ধাগণ সহিত অকস্মাৎ পাঠান রাজের শিবির আক্রমণ করিলে, পাটানরাজ জয় আশা ত্যাগে যুদ্ধে পরাঙ্মুখ হইয়া আপন কএক জন প্রধান সেনানী ও পরিবার সহিত স্বদেশাভিমুখে পলায়ন করিলেন। তখন ভুয়োভুয়ঃ সঙ্খ্য- নাদ ও তুরি ভেরি মৃদঙ্গাদি নানাবিধ বিজয় বাদ্য বাদন হইতে লাগিল। সৈন্যগণ মুক্তকণ্ঠে রাজকুমারের জয়ধ্বনি করিতে লাগিল। নগরবাসী আবাল বৃদ্ধ স্ত্রী পুরুষগণ বিজয় বার্তা শ্রবণে রাজকুমারের মঙ্গলাচরণে দেবার্চনা করতঃ সঁহার অভিনন্দনাথে রাজ বক্স সুশােভিত করিতে লাগিল। যুবতী স্ত্রীগণ পূর্ণ জল- কুম্ভ কক্ষে, দ্বিজগণ ধান্য দুৰ্ব্বাদল হস্তে,তাহার অপেক্ষা করিতে লাগিল। দিনাবসান প্রায় রাজকুমার, মহারাজ অনঙ্গমােহন, প্রিয় বন্ধু ও সৈন্যগণ সহিত শুভ যাত্রা করতঃ নগরবাসীগণের সৌহৃদ্য দর্শনে চমৎকৃত হইয়া দীন দুঃখীকে ধন বিতরণ করিতে করিতে রাজভবনে উত্তীর্ণ হইলেন। কিন্তু পিতা মাতা বিহনে মণিময় রচিত রাজভবন শশ্মান ভূমির ন্যায় বােধ হইতে কামিনীকিশাের। লাগিল। তখন কুমার দীর্ঘ নিশ্বাস পরিত্যাগ করতঃ, হা তাত! হাত! বলিয়া উচ্চৈঃস্বরে রােদন করিতে লাগিলেন। মহারাজ অনঙ্গমােহন, কুমারকে অবােধ দিয়া পরদিন ভূপালের অন্বেষণে দিদেশে চর প্রেরণ করিলে, কতদিন পরে অবন্তী নগরাধিপতি স্বরাজ্যে প্রত্যাগমন করতঃ পুত্র ও পুত্রবধু ক্রোড়ে লইয়া আনন্দাশ্রু বর্ষণে অনঙ্গমােহন সহিত বৈবাহিক সুত্রে বদ্ধ হইয়া নানাবিধ কৌশলে দিনপাত করিতে লাগিলেন ৷ কিছু দিন পরে অনঙ্গমােহন বিদায় লইয়া স্বরাজ্য প্রত্যাগমন করিলে, ভূপতি পুত্রে রাজ্যভার দিয়া মহিষী সমভিব্যাহারে নির্জনে কালাতিপাত করিতে লাগিলেন। সমাপ্ত।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Kaminikishore

Author
Ray,narayan Das
Title
Kaminikishore
File name
Kaminikishore
Text
OCR done
Citation
1878
Published
2009/11/26
Publisher
N.a
Language
Sanskrit
Pages
94
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Poetry
Keywords
Ray,Narayan Das
DLI number
512794
Barcode
4990010019834.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
MnJXEm3O0jv
Download PDF

Kaminikishore