Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

San-eyath- Sen

Chattapadhyya, Nripendrakrishna · 2010/01/30

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

সান-ইয়াৎ-সেন
শ্রীনুপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়
মােসলেম পলিশিং হাউস
৩, কলেজ স্কয়ার ; কলিকাতা

প্রকাশক- মােহাম্মদ আফজা-উল হক ৩, কলেজ স্কয়ার ; কলিকাতা এক টাকা প্রিন্টার ক্ষেত্রমােহন দালাল কালিকা প্রেস ২১, নন্দকুমার চৌধুরী লেন, কলিকাতা উপহার ===== ==========

********
—টপু সুলতান
মহীশুর রাজ্যের শেষ স্বাধীন
নরপতি মহাবীর টপু সুলতানের
সচিত্র জীবন-কাহিনী
কবিবর মােজাম্মেল হক
প্রণীত
মূল্য এক টাকা
পস
********

নির্বীৰ্য্যতার প্রাণহীন অন্ধকারে, জড়ত্বের
মরু-প্রান্তরে, লাঞ্ছনার বদ্ধ-কারাগারে,
বাণী-হীন কুণ্ঠার অবগুণ্ঠিত জীবনে,
যে আদি-শক্তি যুগে যুগে জ্বালিয়ে তােলে
শঙ্কা-হরণ অভয়-প্রদীপ, নিয়ে আসে
পাহাড়-ভাঙা প্রাণের পাগলা-ঝােরা,
জাগিয়ে দেয় অভয়-বাণীর মাভৈঃ-মন্ত্র,
সেই আদি-শক্তিকে স্মরণ করে শারদীয়
অর্ঘ্যস্বরূপ এই পুস্তক সমর্পণ করলাম।
দেবী পক্ষ
১৩৩

No text on this page.

No text on this page.

ডাঃ সানইয়াৎ-সেন
(১৮৬৬-১৯২৫)
চীন গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রথম সভাপতি

সান-ই-সে
চীনের নব-জন্মদাতা সান-ইয়াৎ-সেন তাহার মৃত্যুর তিন
দিন পূর্বে চীন জাতির আত্ম-সম্মান-বােধের উপর নির্ভর
করিয়া তাহার অন্তিম বাসনাকে উইলের আকারে রূপ
দিয়া যান। উইলটী এইরূপ
“চীনের পূর্ণ স্বাধীনতা ও সাম্যস্থাপনের উদ্দেশ্যে চল্লিশ
বৎসর ধরিয়া গণ-বিপ্লব চালাইয়া আসিয়াছি। সে দীর্ঘ দিনের
অভিজ্ঞতার ফলে বুঝিয়াছি যে, জনগণকে জাগাইতে না
পারিলে এ সংগ্রাম বৃথা এবং তাহার জন্য যে-সমস্ত জাতি
আমাদের সহকর্মী হিসাবে সমকক্ষ মনে করে, তাহাদের সহিত
মৈত্রী স্থাপন করিতে হইবে।
“যে-সংগ্রাম আরম্ভ হইয়াছে, তাহার জয়যুক্ত সমাপ্তি
আজও বহু দূরে। যে-পদ্ধতি অনুসারে সেই সংগ্রাম চালাইতে
হইবে, তাহা আমার পুস্তকে লিখিয়া রাখিয়া গেলাম।'
যত দিন না জয় সম্পূর্ণভাবে করতলগত হয়, তত দিন পর্যন্ত
যেন বিরামবিহীন সাধনা জাতির প্রত্যেকের মধ্যে সজাগ
হইয়া থাকে।
“বহু দিনের বহু চিন্তার পর আমি আমার অন্তিম বাসনা

সান-ইয়াৎ-সেন
জানাইয়া যাইতেছি, যেন জাতীয় মহাসভা শীঘ্রই গঠিত হয়
এবং যে-সমস্ত অন্যায় শর্তের বন্ধনে চীন জর্জরিত, তাহা যেন
অচিরে তিরােহিত হয়। এই আমি উইল করিয়া গেলাম।”
জীবনের প্রতি রক্ত-বিন্দু দিয়া যে মহাপুরুষ চীন জাতিকে
জাগাইয়া গিয়াছিলেন, জীবনের পরেও তিনি আপনার
বাসনাকে জাগ্রত প্রেরণারূপে জাতির নিকট রাখিয়া গেলেন।
সান-ইয়াৎ-সেনের চীন অন্তর্বিপ্লব হইতে মুক্ত ও মিলিত
হইয়াই জগতের শক্তি-সভায় উদয়ারুণ রাগদীপ্ত তাহাদের
বাণীকে পাঠাইয়া দিয়াছে,
“অতীতে জাতির দুর্বলতার সহায়তা লইয়া বিদেশীরা
চীনের উপর যে অন্যায় শর্তের বন্ধন চাপাইয়াছিল, নবীন
চীন তাহা স্বীকার করে না। নবীন চীন চায়, সেই সব
শর্তের পুনর্বিচার।”
বৰ্তমান চীনের সকল কথার মূলে এই সব শর্তের কথা
রহিয়াছে। চোয়-হা গ্রামের অলস জীবনের মধ্যে যখন একটা
কিশাের চারিদিকের অসাড় জীবনের দিকে চাহিয়া সরল
কৌতূহলে গ্রাম-বৃদ্ধদের নিকট রাজা, রাজ্য, ধৰ্ম্ম ও শিক্ষা
লইয়া যত সব উদ্ভট প্রশ্ন করিত, তখন তাহার অজ্ঞাতে
তাহার গ্রামের বাহিরে বিদেশীরা আসিয়া নানা উপায়ে
চীনকে বাঁধিয়া ফেলিতেছিল। সে-গ্রামের তখন কেহই
জানিত না, যে, এক দিন এই কিশােরই সেই সমস্ত বন্ধনের
নাগপাশ ছিন্ন করিয়া চীনকে নব-জন্ম দিবে।
২

ক্যান্টনের এক নিভৃত পল্লীতে যখন সন্ধ্যা নামিয়া আসিত,
ভগবান তথাগতের মন্দির-চূড়া হইতে সায়ংসন্ধ্যা বিঘােষিত
হইত, একটী শিশু তখন এক বৃদ্ধার কোলের উপর বসিয়া
বিস্মিত-নেত্রে গল্প শুনিত—সুদূর সমুদ্রের পরপারে কোথায়
এক দেশ আছে, তাহার মাটীতে সােনা, সেখানে গেলে
আর নাকি ফিরিয়া কেউ আসে না।
সাগরের শেষে সেই সােনার দেশে শিশুর মন কল্পনার
মায়ারথে চলিয়া যাইত। বালক স্বপ্নে দেখিত—এক
বিরাট নৌকা করিয়া মহাসাগরের ঢেউএর মধ্য দিয়া সে
চলিয়াছে অজানা কূলের দিকে। বালকের সমস্ত শৈশবকে
ঘিরিয়া ছিল এক বৃহত্তর জগতের ছায়ারূপ। গ্রামের বাহিরের
জগৎ নিত্য হাতছানি দিয়া ছেলেটীকে ডাকিত।
তখন কালিফোর্ণিয়ায় সােনার খনি আবিষ্কৃত হইয়াছিল।
প্রচুর অর্থ-লােভ দিয়াও তখন কালিফোর্নিয়ায় খনিতে কাজ
করিবার জন্য কুলী পাওয়া যাইত না। শ্বেতাঙ্গদের মধ্যে
যাহারা প্রথম প্রথম কুলীর কাজ করিত, অচিরকালের মধ্যেই
তাহারা মালিক সাজিয়া বসিয়া যাইত। সেই জন্য সেই সময়
আড়কাঠির সহায়তায় বিদেশী ধনিকরা চীনের গ্রাম হইতে
লােক ধরিয়া লইয়া কালিফোর্নিয়াতে পাঠাইয়া দিত। গ্রামের

সান-ইয়াৎ-সেন
লােকেরা দেখিত, গ্রাম হইতে সহসা লােক অন্তর্হিত হইয়া
যায় আর জীবনে তাহাকে কেহই দেখিতে পায় না। তাই
গ্রামের বাহিরের জগৎ সম্বন্ধে একটা বিশেষ ভয়ের স্মৃতি
গ্রামবাসীদের মনে জাগরূক থাকিত।
কচিৎ কেহ ফিরিয়া আসিত। বালক খবর পাইলেই
উৎসুক হইয়া তাহার নিকটে গিয়া তাহার ভ্রমণকাহিনী
শুনিত—অপরূপ দেশ, অপরূপ লােক।
গ্রামের অন্য ছেলেদের সঙ্গে মিশিয়া বালক তৃপ্ত হইত
না। গ্রামের অলস জীবন বালকের ভাল লাগিত না।
চীনাদের মত ধৰ্ম্ম-প্রবণ ও অতীত-প্রাণ জাতি জগতে
বিরল বলিলেই হয়। দুই হাজার বছর আগে যে রীতি-নীতি
তাহার ধর্মগুরুরা রাখিয়া গিয়াছে, তাহার উপর নানা
লৌকিক কুসংস্কারের বােঝা চাপাইয়া চীন তাহা অক্ষরে
অক্ষরে মানিয়া আসিতেছিল। তাহারা ভাবিত যে, রাজা
• ভগবানের সাক্ষাৎ সন্তান; শাস্ত্র মুখস্থ করা ব্যতীত অন্য সব
জিনিসই পাপ ; চীনই জগতের কেন্দ্র ; চীনের বাহিরে শুধু
বর্বরেরা থাকে। চীনের বাহিরে মহাকাল যখন পরিবর্তনের
অসমমাত্রিক ছন্দে রূপ হইতে রূপান্তরে চলিয়াছিল, চীন
তখন স্থিরভাবে তাহার সভ্যতার শ্মশান-ভূমিতে পড়িয়া ছিল।
ঊনবিংশ শতাব্দীর সমুদ্রের মধ্যে চীন ছিল যেন দূর খৃষ্টপূর্ব
কোনও এক শতাব্দীর দ্বীপ।
চোয়-হাঙ গ্রামের (যে গ্রামে বালকটী জন্মগ্রহণ করিয়া-
••
৪

সান-ইয়াৎ-সেন
ছিল ) জীবনের কোথাও সময়ের পরিবর্তনশীলতার কোনও
চিহ্ন ছিল না। সেই মন্দিরের প্রাঙ্গণে পাঠশালায় সারি
বাঁধিয়া দাড়াইয়া গুরু মহাশয়ের বেতের দোর্দণ্ড প্রতাপের
নিয়ে ছাত্রেরা তারস্বরে চীৎকার করিয়া দুর্বোধ্য জিনিস
সব মুখস্থ করিত। সেই তেমনি সন্ধ্যাবেলায় গ্রাম-দেবতার
মন্দির-প্রাঙ্গণে লুটাইয়া
পড়িয়া দিনের ধৰ্ম্মকাৰ্য সকলে
সমাপ্ত করিত। নিশীথ-রাত্রে সহসা কোথা হইতে মশালের
আলােয় সারা গ্রাম রাঙা হইয়া উঠিত, দস্যর দল আসিয়া
গ্রাম লুটপাট করিয়া সুস্থদেহে ফিরিয়া যাইত। বালক
ওয়েন (গ্রামের লােকে তাহাকে ঐ নামে চিনিত—জগতের
লােকে তাহাকে সান-ইয়াৎ-সেন নামে চিনে) স্তব্ধ বিস্ময়ে
সেই সমস্ত লক্ষ্য করিত। অতীতের মােহ তাহারও রক্তের
অণুতে অণুতে হয় ত তেমনি ছিল; কিন্তু মাঝে মাঝে
বালকের আত্মমগ্নতার সাগরে চেতনার ঘূর্ণাবর্ত জাগিত।
বালকের মনে প্রশ্ন জাগিত—যে-সব প্রশ্ন হাজার বছর ধরিয়া
কাহারও মনে জাগে নাই—জাগিলেও পাপ হিসাবে তাহাকে
তৎক্ষণাৎ অঙ্কুরে বিনষ্ট করা হইত।
বিদেশ-প্রত্যাগত লােকদের মুখে ওয়েন যে সমস্ত গল্প
শুনিত, তাহার সহিত তাহার আশে পাশের জীবনের কোথাও
কোন মিল ছিল না। বালকের অস্ফুট চেতনায় মনে হইত
যে, তাহাদের চোয়-হাঙ গ্রাম ও সেই সুদূর কালিফোর্ণিয়ার
মধ্যে যেন কি একটা বিরাট রহস্যময় জিনিস পড়িয়া
৬।
৫

সান-ইয়াৎ-সেন রহিয়াছে—যাহাকে না জানিতে পারিলে কিছুই জানিতে পারা যাইবে না। কয়েক বৎসর পরেই ওয়েন তাহার পরিচয় পাইল। আমরা অনেকেই তাহার সহিত পরিচিত। তাহার নাম ঊনবিংশ শতাব্দী। পরবর্তী জীবনে সান তাহার জীবন দিয়া চীনের এই আত্মঘাতী নির্লিপ্ততার বাঁধ ভাঙ্গিয়া ঊনবিংশ শতাব্দীর সর্ব- ; একাকার-করা জল-কল্লোলধারাকে লইয়া আসেন এবং তাহারই ফলে নবীন চীন নব-কলেবরে জাগিয়া উঠে। এখন বালক ওয়েনের কথাই বলা যাক। এক দিন পাঠ- শালায় গুরু মহাশয় পড়াইতেছিলেন। একটা ছেলে মুখস্থ করিতে না পারায় প্রচুর বেত্রাঘাত চলিতেছিল। সহসা পাঠশালার এক কোণ হইতে গুরু মহাশয়ের শ্রবণে একটী রূঢ় প্রশ্ন আসিল, এ সমস্ত মুখস্থ করে কি হবে ? যার মানে বুঝি না, তা মুখস্থ করে কি লাভ ?” গুরু মহাশয় বিস্মিত হইয়া উঠিলেন—এই প্রশ্ন যে হইতে পারে, তাহা তিনি কল্পনা করিতে পারেন না। ধমক খাইয়া বালক ওয়েন চুপ করিল। আর এক দিন। পাঠশালায় ছেলেরা পড়িতেছে, এমন সময় ঝড়ের মত মানুষের আর্ত-ধ্বনি চারিদিক ছাইয়া ফেলিল ছেলে, বুড়া, মেয়ে যে-যার প্রাণ লইয়া মন্দিরে আসিয়া কোন রকমে আত্মরক্ষা করিল। চারিদিক আগুনের ধোঁয়ায় ভরিয়া গিয়াছে। গ্রামে দ পড়িয়াছে। ;

সান-ইয়াৎ-সেন সমস্ত দিন গণ্ডগােল চলিল। সন্ধ্যার সময় বালক ওয়েন ঘরের নিভৃত কোণে ফিরিয়া আসিয়া নানা রকমের কথা ভাবিতে লাগিল। কাহারা এই দস্তুর দল ? দেশের রাজা কেন তাহাদের শাস্তি দেয় না ? চিরকালই কি এমনি উৎপাত চলিয়া আসিতেছে—চিরকালই কি এমনি উৎপাত চলিবে ? যে সমস্ত প্রশ্ন এক দিন নিদারুণ বিপ্লবের ভীম- মূর্তিতে জাগিয়া উঠিয়াছিল—গ্রাম্য জীবনের অসামঞ্জস্য ও অরাজকতার মধ্যে তাহা কিশাের-চিত্তে সে দিন প্রথম জন্মগ্রহণ করে। সানের বাড়ীর কাছেই এক জনের বাড়ী ছিল। সান তাহাদের বাগানে গিয়া খেলা করিত এবং তাহাদেরই পরি- বারের অন্তর্ভুক্ত হইয়া গিয়াছিল। এক দিন সহসা গ্রামময় এই সংবাদ রটিয়া গেল যে, মাঞ্চু-রাজের পুলিশ আসিয়া সেই বাড়ীর সকলকে ধরিয়া লইয়া গিয়াছে এবং এখন সেখানে মাথু-রাজের লােকেরা আছে। ধৃত লােকদের মধ্যে এক জনের ফাঁসী হইল। এই আকস্মিক ব্যাপার কেন ঘটিল, তাহা গ্রামের লােক কেহই জানিত না। আপনাদের ঘরে বসিয়া সকলে এই কাৰ্যের তীব্র প্রতিবাদ করিতে লাগিল, কিন্তু কেহই তাহার বেশী আর কিছুই করিল না। বালক ওয়েনের মনে কিন্তু শান্তি নাই। তাহার মনে শুধু প্রশ্ন জাগিতেছিল, কি অধি- কারে এই সব লােক হত্যা করিয়া তাহাদের বাড়ী দখল করিয়া বসিয়া আছে ? ৭

সান-ইয়াৎ-সেন
এক দিন একান্ত সাহসে ভর করিয়া বালকটী বাগানের
ভাঙ্গা প্রাচীরের ভিতর দিয়া ঢুকিয়া পড়িল। সম্মুখেই এক জন
সৈনিকের সঙ্গে দেখা—হাতে খােলা তলােয়ার। বালককে
দেখিয়াই সৈনিকটী মুখ বিকৃত করিয়া জিজ্ঞাসা করিল,-
“এখানে কিসের জন্যে এসেছিস্?”
বালক নির্ভয়ে উত্তর দিল,—“এ আমার বন্ধুর বাগান।
আমি জানতে চাই, কেন তাদের তাড়িয়ে দিয়েছ তােমরা
কে তােমরা ?”
সৈনিক-পুঙ্গব তলােয়ার নাড়া দিয়া উত্তর দিল, “ভাল
করেই জানাচ্ছি।”
অন্তরে পরাজয়ের সর্বব-গ্লানি বহন করিয়া ওয়েন বাগান
হইতে পলাইয়া আসিল। বিদ্রোহের বীজ অঙ্কুরােদগমের
দিকে চলিল।
ওয়েনের মনে সদাসর্বদাই নানা রকমের প্রশ্ন জাগিত
কেহ তাহার কোনও উত্তর দিতে পারি না। এক দিন
সন্দেহাকুল বালক মাতাকে প্রশ্ন করিল,—“আচ্ছা মা, দেশের
রাজা এ সব অত্যাচার দমন করতে পারে না ?”
মা উত্তর দিয়াছিলেন, “তারা বিদেশী, তারা চীনাদের
ঘৃণা করে।”
আজীবন সান মাতার এই উত্তরটুকু স্মরণ করিয়া রাখিয়া-
ছিলেন এবং এই উত্তরটুকুর মধ্যে বালক যেন তাহার সকল
প্রশ্নের একটা সমাধান খুঁজিয়া পাইল।
-

বালক সানের মনে কিশােরকালের নানা স্বপ্নের সহিত
একটা কথা সর্বদাই জাগিয়া উঠিত যে, হয় ত তাহার সকল
প্রশ্নের উত্তর তাহাদের গ্রামের বাহিরে কোথাও তাহার জন্য
অপেক্ষা করিতেছে। একবার কোনও রকমে গ্রাম ছাড়াইয়া
যাইতে পারিলেই যেন তাহার সকল প্রশ্নের উত্তর মিলিয়া
যাইবে।
চীনের গ্রামে গ্রামে যে-সমস্ত বিদ্যালয়ে গ্রাম্য শিশুদের
শিক্ষা দেওয়া হইত, সেখানে ভূগােলের কোনও স্থান ছিল
। মাথুজের নিষেধ ছিল যে, চীন-বালকদের ভূগােল
শিক্ষা দেওয়া হইবে না। তৎপরিবর্তে তাহাদের কাণে
আশৈশব এই কথাগুলি ঢালিয়া দেওয়া হইত যে, চীনই সমগ্র ।
পৃথিবী—বিশ্বব্রহ্মাণ্ড; চীনের বাহিরে অগাধ অসীম জল-রাশি
তাহারই উপরে আকাশের উর্দ্ধে দেবতার বিচরণ-ভূমি।
চীনের সম্রাট সেই উদ্ধলােকবাসী স্বয়ং শ্রীভগবানের দেহস্যুত
ধরাধামের ভগবান্। চীনে ছেলেরা তাহাই শুনিত ; চীনে
যুবকরা তাহাই বুঝিত ; চীনে বুড়ােরা তাহাই মানিত।
এই রকম অবস্থায় এক দিন সানের এক সহপাঠী বন্ধু
পিতার সঙ্গে দূরদেশে বেড়াইতে গিয়া যে-সমস্ত অদ্ভুত জিনিস
সেই অদ্ভুত গ্রামে দেখিয়া আসিয়াছে, তাহারই গল্প করিতে-
৯

সান-ইয়াৎ-সেন ছিল। সকলের চেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার যে, সে সেখানকার গির্জায় এক বিচিত্র ছবি দেখিয়া আসিয়াছে—সমস্ত জগৎ নাকি সেই ছবির মধ্যে লেখা আছে। সেখানকার পাদ্রী তাহাকে বুঝাইয়া দিয়াছে যে, চীনই সমগ্র পৃথিবী নয়—চীনের বাহিরেও এই রকম মানুষ আছে, দেশ আছে, মাটী আছে। নানা দেশে আছে নানা রকমের লােক, নানা তাহাদের ভাষা, নানা তাহাদের রূপ। সেই চিত্রকে ধরণীর মানচিত্র বলে।... চোয়-হাঙের নির্জন পথে যেমনি নিত্য সন্ধ্যা নামিয়া আসে তেমনি সন্ধ্যা নামিয়া আসিল, ভগবান্ তথাগতের মন্দির হইতে ঘণ্টার শব্দ পল্লীর অন্ধকার আকাশকে ক্ষণ- কালের জন্য শব্দের ঝঙ্কারে পরিপূর্ণ করিয়া পুনরায় নিস্তব্ধ হইয়া গেল। একটী কুটীরের বাতায়নে বসিয়া একটী বালক আপন-মনে সেই সন্ধ্যায় প্রান্তরের দিকে চাহিয়া ছিল— তাহার কল্পনায় তখন লক্ষ প্রদীপ জ্বলিয়া উঠিয়াছে—তাহারই আলােকে কোথাকার কোন্ অভিনব দেশ সব উদ্ভাসিত হইয়া উঠে, অভিনব নর-নারী তাহাকে হাতছানি দিয়া ডাকে।

বালক সানের মনে বিদেশে যাইবার আকাঙ্ক্ষা বদ্ধমূল
হইয়া বসিল। সানের আর দুই ভাই বাড়ীর অনুশাসন না।
মানিয়াই হনলুলু বলিয়া কোথায় চলিয়া যায় আর ফিরিয়া
আসে নাই , সেই জন্য সানেদের পরিবারে বিদেশ যাওয়ার
ব্যাপার একেবারে নিষিদ্ধ হইয়া গিয়াছিল। বাড়ীর লােকেরা
যখন তাহাদের ফিরিয়া আসার আশা একেবারে ত্যাগ
করিয়াছিল, সেই সময় সহসা সানের বড় ভাই বিদেশ হইতে
গ্রামে ফিরিয়া আসিল। প্রবাসগত পুত্রের বাড়ী ফিরিয়া
আসার দরুণ বাড়ীর লােকেরা আনন্দিত হইল, কিন্তু কিছুদিন
যাইতে না যাইতেই বড় ভাই পুনরায় হনলুলু যাত্রা করিবে
জানাইল এবং সেই সঙ্গে সানও আবেদন জানাইল যে,
তাহাকেও যাইতে হইবে। কোনও মতে বালক কাহারও কথা
শুনিবে না।
সে যাইবেই।
অগত্যা ১৮৭৯ সালে চতুর্দশ বৎসর বয়সে পিতামাতার
অশ্রুজলের মধ্য দিয়া সান বিদেশে যাত্রা করিল। গ্রাম
হইতে পথ যত দূরে বালককে লইয়া যায়—বালকের মন ততই
আনন্দ-রসে আপ্লুত হইয়া উঠে। দূর চক্ৰবালের দিকে চাহিয়া
বালক সবিস্ময়ভাবে রহিল—কোথায় তাহার জিজ্ঞাসার
উত্তর-লােক ?•••
১১

সান-ইয়াৎ-সেন
হনলুলুতে আসিয়া সান সর্বপ্রথম বাহিরের জগতের বৃহত্তর
জীবনের সংস্পর্শে আসিলেন। হনলুলুর চীনামাটীর উপর
তখন বিলাতী-মাটীর কাজ ভাল রকম সুরু হইয়া গিয়াছে।
হনলুলুর এক দিকে চীন, অপর দিকে আমেরিকা। এই
বিচিত্র সংমিশ্রণের দরুণ হনলুলু সানের মনকে বেশী করিয়া
আকর্ষণ করিল। চোয়-হাঙের জীবনধারার বর্ণ-বৈচিত্র্যহীন
স্থবিরতা হইতে আমেরিকার জীবনধারার চলমান স্বর্ণাভা
বালকের মনকে মুগ্ধ করিল। হনলুলুর গির্জা, স্কুল, অফিস
ও সেখানকার বিদেশীদের বাহিরের জীবন-যাত্রার পদ্ধতি
দেখিয়া সানের মনে পশ্চিমের প্রতি একটা প্রগাঢ় শ্রদ্ধার
ভাব জাগিয়া উঠিল। সানের ইংরাজী ভাষা শিখিবার বাসনা
দাদাকে জানাইতেই,
তিনি সানকে হনলুলুর
মিশনারী স্কুলে ভর্তি করিয়া দিলেন।
ক্লাসে বালক কাহারও কথা বুঝিতে পারিত না। এই
মিশনারী স্কুল হইতেই সানের মনে পাশ্চাত্য শিক্ষা-দীক্ষার
প্রভাব গভীর ভাবে অনুপ্রবিষ্ট হয়।
অনুপ্রবিষ্ট হয়। যখন সান এই স্কুল
পরিত্যাগ করিয়া যান, তখন তিনি ইংরাজী ভাষা এবং
সাহিত্য বেশ ভাল রকম আয়ত্ত করিয়াছেন। তঁাহার
মনে তঁাহার বালককালের প্রশ্নগুলির উত্তর যেন তৈয়ারী
হইয়া আসিতেছিল। যে-দীক্ষা আজ তাঁহার মন হনলুলুর
এই মিশনারী স্কুলের মধ্য দিয়া পাইতেছে—চোয়-হাঙ
গ্রামেও সে দীক্ষার প্রয়ােজনীয়তা আছে। সান দাদাকে
হইল ।
১২

সান-ইয়াৎ-সেন
কলেজে ভর্তি হইবার কথা জানাইলে তাহার ভ্রাতা ভীত
হইয়া উঠিলেন। অত্যধিক পাশ্চাত্য শিক্ষা নিশ্চয়ই সানের
মস্তিষ্কবিকৃতি ঘটাইবে। ইতিমধ্যেই সান যে সমস্ত কথা
বলে, তাহার সঙ্গে চোয়-হাঙের জীবন-যাত্রার যে খুব সম্ভাব
আছে, তাহা মনে হয় না। অতএব ভ্রাতা ঠিক করিলেন
যে, হনলুলুতে সানের আর থাকা ঠিক নহে। তাহাকে যত
শীঘ্র গ্রামে রাখিয়া আসা যায়, ততই ভাল।
এই ব্যবস্থার কথা শুনিয়া সানের মন এক দম ভাঙ্গিয়া
পড়িল। আবার সেই গ্রামের অলস জীবনের মধ্যে ফিরিয়া
যাইতে হইবে ! জীবনের জাগরণের সমস্ত সম্ভাবনাকে
জলাঞ্জলি দিয়া সেই গ্রামের বদ্ধ জীবনের মধ্যে ফিরিয়া যাইতে
মন চাহিতেছিল না। কিন্তু দাদার যখন ইচ্ছা হইয়াছে, তখন
ফিরিয়া যাইতেই হইল। চোয়-হাঙ গ্রামে যে দিন পুনরায়
সান প্রবেশ করিলেন, সে দিন হইতে তাহার মন চোয়-হাঙ ও
তাহার জীবন-পদ্ধতি, তাহার ধৰ্ম্ম-কৰ্ম্ম সমস্ত কিছুর উপর
ভয়ানক ক্রুদ্ধ হইয়া রহিল, যেন সেই সমস্ত জিনিসই আজ
সানকে তাহার মহা-ভবিষ্যতের রাজপথ হইতে এই নির্জন,
অলস প্রাণহীন প্রেতপুরীতে টানিয়া লইয়া আসিয়াছে।
হনলুলু হইতে চোয়-হাঙে ফিরিয়া আসিয়া এই দুই
জীবন-ধারার বৈষম্য সানের চোখের উপর খুব বড় হইয়া
উঠিল। সান দেখিল যে, চোয়-হাঙ এবং তাহার মত চীনের
শত সহস্র গ্রাম এক বিরাট অজ্ঞতার আবরণে নিশ্চিন্তভাবে

সান-ইয়াৎ-সেন ঢাকা। পাঠশালায় পাঠশালায় যে শিক্ষা দেওয়া হয়, সে শুধু শিক্ষার অভিনয় মাত্র। বৃহত্তর জীবনের ধারার সহিত একান্তভাবে বিচ্ছিন্ন হইয়া শুধু কতকগুলি জরাজীর্ণ পুরাতন সংস্কারকে ধৰ্ম্মের সম্মান দিয়া মানব অম্লানবদনে চলিয়াছে। যে পারিবারিক সম্বন্ধ-বােধ সমগ্র চীন-চরিত্রের উপর বিপুল মধুরতা আনিয়া দিয়াছিল, আজ তাহার অধিনায়কত্ব প্রজ্ঞা- হীন হওয়ার দরুণ শুধু প্রভু-ভৃত্যের সম্বন্ধে আসিয়া দাঁড়াই- য়াছে। গ্রাম-বৃদ্ধরা শুধু বয়সের দাবী লইয়া অবাধে অজ্ঞতার মহা-অহমিকার সিংহাসনে বসিয়া গ্রাম শাসন করিতেছে। ছেলেরা নতমস্তকে কনফুসিয়াসের বাণী মুখস্থ করিয়া চলিয়াছে, মেয়েরা খালি দেখিতেছে পা ছােট হইল কি না—আর বাহিরে বিপুল জগৎ নব নব রূপ লইয়া বিক- শিত হইয়া উঠিতেছে। গ্রামে ফিরিয়া আসিয়া সানের মন বিদ্রোহী হইয়া উঠিল। গ্রামের সকল কাজের মধ্যে নিয়ত তাহার একটী বিরাট অসঙ্গতি বােধ হইতে লাগিল। সেই সঙ্গে সঙ্গে কিশােরের মনে এক বৃহত্তর চীনের ছায়া-মূৰ্ত্তি আভাসে উদ্ভাসিত হইয়া উঠিত—এই চোয়-হাঙ, এইখানে নূতনতর স্কুল স্থাপনা করা ১৪

সান-ইয়াৎ-সেন
হইয়াছে—এই দীন দরিদ্র জীবন, তাহার পরিবর্তে এক
আলােকোজ্জ্বল মায়াপুরী জাগিয়া উঠিয়াছে আর তাহার
পুরােভাগে সংস্কারক-রূপে বিরাজ করিতেছেন সান।
সান মনস্থ করিলেন যে, গ্রামের ছেলেদের মনের
কথা খুলিয়া বলিবেন। যে আশা আজ তাহার বুকে বাসা
বাঁধিয়াছে, সকল যুবকের বুকে সে তাহার নীড় রচনা করুক।
মাঠের মাঝখানে ক্রীড়ারত বালকদের একত্রিত করিয়া সান
গল্প বলে এবং কথাশেষে প্রত্যেককে জিজ্ঞাসা করে, কোন্
নিয়মের বশে তাহারা এই রকম প্রশ্নহীনভাবে অজ্ঞতার একাধি-
পত্যকে মানিয়া চলিয়াছে ? গ্রামের বাহিরের বৃহত্তর জীবনের
পথে যাত্রা করিতে কে তাহাদের আটকাইয়া রাখিয়াছে ?
গ্রাম-বৃদ্ধরা পুত্রদের নিকট হইতে সানের এই সমস্ত কথা
শুনিয়া সচকিত হইয়া উঠিলেন। তবে তাঁহারা সান্তকে
ভালবাসিতেন বলিয়া প্রথম প্রথম কিছু বলার প্রয়ােজন মনে
করিলেন না।
ছেলেরা মজা পাইয়া সানের চারিদিকে ঘুরিয়া বেড়ায়।
এক দিন সান সহসা প্রশ্ন করিলেন, “তােমরা জান, তােমাদের
রাজা কে ?”
“কেন, দেবদূত স্বয়ং মাঞ্চু-রাজ!”
“সেই
দেবদূত
কি তােমাদেরই স্বজাতীয় ?”
“নিশ্চয়ই! চীনা ব্যতীত কেহই আর ভগবানের সন্তান
হইতে পারেন না।”

;
সান-ইয়াৎ-সেন
সান তৎক্ষণাৎ পকেট হইতে একটী মুদ্রা বাহির করিয়া
সকলকে দেখাইয়া বলিলেন, “যদি সে চীনা হয়, তবে সে
কেন চীনা ভাষা ব্যবহার করিবে না? মুদ্রার উপরে এই
দেখ মাঞ্চু ভাষার হরফ। তােমরা জান না, যে,
তােমরা জান না, যে, মাঞ্চুরা চীনা
নয়--তাহারা বিদেশী আর বিদেশী বলিয়াই আমাদের
এমনই অন্ধকারে ডুবাইয়া রাখিয়াছে।”
গ্রাম-বৃদ্ধরা সানের সহিত মিশিতে পুত্রদের বারণ
করিয়া দিলেন।
এইরূপে ব্যাহত হইয়া সান অন্তরে অন্তরে বিদ্রোহী
হইয়া উঠিল। সেই গ্রামের সীমান্তে এক ভগ্নপ্রায় মন্দিরে
গ্রামের অধিষ্ঠাতা দেবতার একটী মুৰ্ত্তি ছিল। মন্দিরে বড়
একটা কেহ প্রবেশ করিত না; শুধু পথিক যাইবার সময় নতি
করিয়া যাইত। এক দিন গ্রামের ছেলেদের সঙ্গে লইয়া সান
তাহাদের কিছু না বলিয়া মন্দিরের নিকট উপস্থিত হইলেন।
দ্বাররক্ষী সে সময় অনুপস্থিত ছিল। সান মন্দিরে প্রবেশ
করিয়া ছেলেদের ডাকিয়া বলিলেন, “তােমরা কি ভাব, এই
মূর্তি তােমাদের জীবন-মরণের হর্তা-কর্তা ?”
সানের ব্যাপার দেখিয়া ছেলেরা সন্ত্রস্ত হইয়া উঠিল।
“আমি আজ তােমাদেরই সম্মুখে এই মূর্তিকে ভাঙ্গিয়া
ফেলিব।”—বলিতে না বলিতেই সান জীর্ণ মুর্তিটীকে ভাঙ্গিয়া
ফেলিলেন।
ছেলেরা ভীত হইয়া যে যাহার বাড়ীতে গিয়া এই কাহিনী

সান-ইয়াৎ-সেন সবিস্তারে বলিল। গ্রাম-বৃদ্ধরা বুঝিলেন যে, আর সহ্য করা ঠিক হইবে না। পর দিন সানের পিতাকে ডাকিয়া আনিয়া গ্রাম-বৃদ্ধরা পরামর্শ সভায় স্থির করিলেন যে, এক সপ্তাহের মধ্যে সানকে চোয়-হাঙ পরিত্যাগ করিয়া চলিয়া যাইতে হইবে। নির্বাসনই এই অপরাধের ন্যূনতম শাস্তি। সানের জীবনে একখানি বই বিশেষভাবে প্রভাব বিস্তার করে—সেখানি বাইবেল। হনলুলুর স্কুল হইতে সান বাইবেল- খানি সংগ্রহ করেন এবং সেই দিন হইতে সেই পুস্তকখানি সর্বদাই আপনার কাছে কাছে রাখিয়া দিতেন। প্যালে- স্টাইনের সেই নির্যাতিত মানবটীর বেদনার মহা-জীবন সানকে তীব্রভাবে আকর্ষণ করে। চোয়-হাঙ ছাড়িয়া চলিয়া আসিবার সময় সেই বইখানিও সান সঙ্গে লইয়াছিলেন। পথে চলিতে চলিতে সানের বিক্ষুব্ধ মনে আর এক অতীত দিনের ছবি ফুটিয়া উঠিল—সেখানেও দেখিলেন এক দীর্ঘকায় পুরুষ মূক মানবের বেদনার ও অপমানের বােঝা স্বীয় স্কন্ধে লইয়া গ্যালিলি পরিত্যাগ করিয়া চলিয়াছে। বৃহত্তর বেদনার মধ্যে এত বড় একটা উদার আত্মম্ভরিতা আছে যে, তাহা এক নিমেষে মানুষের মনে জাগাইয়া তােলে আদি-স্রষ্টার অহমিকা। সেই বেদনার অঙ্কুশাঘাতে সানের মনে এক মহা-কৰ্ত্তব্যের বীজ মাথা তুলিয়া জাগিয়া উঠিল। আজ যাহারা তাহাকে ফিরাইয়া দিল, তাহাদেরই মধ্যে ফিরিয়া আসিতে হইবে—আজ যে-বৃহত্তর জগতের সুবিপুল জীবনের ১৭ সান-ইয়াৎ-সেন দিত। দিকে সে একা চলিয়াছে, সকলকে টানিয়া লইয়া এক দিন সেই পথেই দাড়াইতে হইবে। এই সঙ্কল্প লইয়া সান সােজাসুজি হংকংএ আসিয়া উপস্থিত হইলেন। হংকং বৃটশ উপনিবেশ। হংকংএ আসিয়া এক মিশনারীর সাহায্যে সান Queen's College ভৰ্ত্তি হইলেন। সেই সময় চীনের বন্দরে বন্দরে প্রায়ই কামানের রক্ত- আঁখি জ্বলিয়া উঠিত ; তাহার ধূমােগার মাঞ্চু-রাজের রাজপ্রাসাদের উপরের আকাশকে ক্ষণে ক্ষণে বিমলিন করিয়া দুর্বল মাথু-রাজ সন্ধির সােপান বাহিয়া বিদেশীদের সহিত আপােষ রফা করিয়া ধীরে ধীরে নামিয়া চলিয়াছিল। জনসাধারণ ক্রুদ্ধ অভিশাপ দিত, কিন্তু তাহাতে কোনও ফল ফলিত না। জনসাধারণের মনে বিপ্লবের বাসনা যে জাগে নাই তাহা নয়, তবে পশ্চিমের বৈজ্ঞানিক মৃত্যু-যন্ত্রগুলিকে তাহারা ভয় করিত এবং সেই সঙ্গে নিজেদের নিতান্ত অসহায় ভাবিত। সান যখন Queen's Collegeএ পড়িতেছিলেন, সেই সময় চীনাদের সহিত ফরাসীর যুদ্ধ চলিতেছিল। অবশ্য ফলাফল প্রতিবারেই যেরূপ হয়, এবারেও তাহা হইতেছিল। সেই সময় হংকংএর এক কারখানায় একখানি ফরাসী জাহাজ ভগ্নাবস্থায় মেরামতের জন্য আসে। এমনি বিড়ম্বনা যে, সে কারখানার সমস্ত কুলী চীনা। তাহারা এক জোটে কাজ ১৮

সান-ইয়াৎ-সেন
ছাড়িয়া দিল-বলিল, “ও জাহাজ কোন চীনা মেরামত
করিবে না।”
এই ঘটনা বিশ বৎসরের যুবকের বুকে একটা নূতন পথ
যেন খুলিয়া দিল। গ্যালিলিতে ফিরিবার পথে ইহারা ত
একমাত্র সঙ্গী—ভবিষ্যৎ চীনের ইহারাই তাে কারিকর।
সেই দিন হইতে দিবারাত্র সানের মনে নানা প্রকারের অদ্ভুত
কল্পনা নিত্য আসা-যাওয়া করিতে লাগিল—কোন্ পথে
কোথায় স্বদেশের মুক্তি-মন্ত্রের স্বর্ণমন্দির রহিয়াছে ?
যে-ভাবে কবি সহসা অনিৰ্দেশ্য লােক হইতে আপনার
অজ্ঞাতসারে সৃষ্টির ইঙ্গিত পায়, ঠিক সেই একইভাবে
কোন্ অন্তগূঢ় রহস্য-লােক হইতে জাতির জাগরণের
দীক্ষা-মন্ত্র বিপ্লবীর হৃদয়ে, মনে, মস্তিষ্কে আসিয়া প্রবেশ
করে এবং যত দিন তাহা কৰ্ম্মের বিপুল ছন্দে রূপ না ধরিয়া
উঠে, তত দিন এক বেদনার বাষ্প মনকে ছাইয়া থাকে।
সান ঠিক করিলেন যে, জাতির অন্তরের সহিত ঘনিষ্ঠভাবে
পরিচিত হইতে হইবে এবং সেইখানে বিদ্রোহের বাণীকে
জাগাইয়া তুলিতে হইবে।
সেই সময় ক্যান্টনে আমেরিকানরা নূতন হাসপাতাল ও
ডাক্তারীর কলেজ খুলিতেছিল। সান ঠিক করিলেন যে,
জনসাধারণের সঙ্গে অন্তরঙ্গভাবে মিশিতে হইলে ডাক্তারের
বহিরাবরণ সব চেয়ে কম সন্দেহজনক ও বেশী প্রয়ােজনীয়।
এই স্থির করিয়া তিনি ক্যান্টনে Pak Tasi Medical

সান-ইয়াৎ-সেন Schoolএ ভর্তি হইলেন। সেই সঙ্গে সঙ্গেই কয়েকজন মাত্র চীন যুবককে লইয়া “নবীন চীন সঙঘ” গড়িলেন। এই সময় হইতেই সান বিপ্লবের কাৰ্যে পূর্ণভাবে আত্ম- নিয়ােগ করেন। দিনের বেলা স্কুলে কাটিত ; রাত্রিতে এই সভার অধিবেশন হইত। ক্রমশঃ এই দলটী যখন পাকা হইয়া উঠিতে লাগিল এবং তাহার উদ্দেশ্য ও কার্যপদ্ধতিও সুস্পষ্ট হইয়া উঠিল, তখন সান কাৰ্য্যের সুবিধার জন্য হংকংএর মেডিক্যাল কলেজে আসিয়া ভর্তি হইলেন এবং আড়াটীকেও হংকং তুলিয়া আনিলেন। ১৮৯২ সালে এই কলেজ হইতে ডাক্তারী পাশ করিয়া সান ম্যাকাও শহরে আসিয়া ডাক্তারখানা খুলিয়া বসিলেন। ইতিমধ্যে তিনি ক্যান্টন, হংকং ও ম্যাকাও শহরে বহু শাখা-সমিতি গড়িয়া তুলিয়াছিলেন। এই সমস্ত সমিতির কেন্দ্র হইল, সানের ডাক্তারখানা। সানের ডাক্তার- খানা হইতে রােগীরা শুধু দেহের রােগের ঔষধ লইয়া ফিরিত । এই অদ্ভুত ডাক্তারটী রােগীদের মনে এক নূতন ধরণের বাণী জাগাইয়া তুলিত। কৃতজ্ঞ রােগী ডাক্তারের কথার সত্যতা অন্তরে উপলব্ধি করিয়া ঘরে ফিরিয়া যাইত সানের সেই ডাক্তারখানা প্রতিষ্ঠা হইতে মাঞ্চ-রাজবংশ ধ্বংসের সময় পর্যন্ত যে ভয়াবহ ও কঠোর জীবন সানকে যাপন করিতে হইয়াছিল, তাহা সান স্বয়ং আমাদের জানাইয়াছেন। অতএব এই সমস্ত স্থলে তাহার আত্মকথার আশ্রয় গ্রহণ করা সব চেয়ে সুবিধাজনক। ২০ সান-ইয়াৎ-সেন যে দিন হইতে মনে বিপ্লবের কল্পনা রূপ লইয়া জাগিয়া উঠিল, সেই দিন হইতেই আমি সেই-সাধনায় মগ্ন হইলাম তাই সেই সময়কার ঘটনা আমার অন্তরে আজও জাগরূক রহিয়াছে। তাহার পর যখন কোয়ামিঙটাঙ দল প্রতিষ্ঠিত হইল, তখন চীনের রাজনৈতিক জীবন আরও জটিল ও ঘন- ঘটাচ্ছন্ন হইয়া উঠিয়াছে ; সেই সময়কার বহু প্রবাসী স্বদেশ- প্রেমিকদের সাধনার কথা যদিও স্মরণে আছে, কিন্তু তাহাদের নাম-ধামের যথার্থতা বিস্মৃত হইয়া গিয়াছি। আজ আমি যে সকল কথা লিখিয়া রাখিয়া যাইতেছি—কোয়ামিঙটাঙের ভবিষ্যৎ ইতিহাস-লেখক তাহার মধ্যে তাহার সকল উপাদান পাইবেন। ১৮৮৫ সালে যখন আমরা ফরাসীদের কাছে ভীষণ ভাবে পরাজিত হই, সেই সময় হইতে তাই-সিঙ বংশ ধ্বংস করিয়া চীনে নব-গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করিবার আদর্শ মনকে প্রবলভাবে অধিকার করিয়া বসে। আমার প্রথম রাজনৈতিক প্রচেষ্টা আমার কলেজের ঘরে কলেজ-জীবন হইতেই শুরু হয় এবং ডাক্তারীর আঁচল ধরিয়া রাজনীতির মহলায় ছদ্মবেশে প্রবেশ করিব—এই ছিল বাসনা। দশটী বৎসর কোথা দিয়া কি রকমভাবে কাটিয়া গেল দশটী বৎসর নয়—যেন একটা দিন। ক্যান্টনের মেডিক্যাল স্কুলে আমার সহিত চেন-সি-লিয়াঙ-এর বন্ধুত্ব হয়। ক্যান্টনের বহু ধনী ও সন্ত্রান্ত লােকের সহিত চেনের খুব ঘনিষ্ঠ পরিচয় ২১

সান-ইয়াৎ-সেন
ছিল।
এক দিন বন্ধুর নিকট অন্তরের সকল কথা নিঃশেষে
বলিলাম। দিনের পর দিন চীনের মুক্তির কল্পনায় দুইটী
যুবকের সকল সময় কাটিয়া যায়। এক দিন চেন প্রস্তাব
করিল যে, সে বিপ্লবীর দল গড়িয়া তুলিতে আমাকে সাহায্য
করিতে পারে—যদি আমি তাহার নেতা হই! এক বৎসর
কাল ক্যান্টনের স্কুলে পড়িবার পর শুনিলাম, হংকংএ একটী
বড় রকমের কলেজ খােলা হইয়াছে এবং সেইখানে কাজের
সুবিধা হইতে পারে এই সম্ভাবনায় ক্যান্টনের স্কুল পরিত্যাগ
করিয়া হংকংএ আসিলাম। কলেজের অবসর সময়ে আমি
বিপ্লবের আয়ােজনের কাজে ঘুরিয়া বেড়াইতাম। চার
বৎসর ধরিয়া নিয়মিত ভাবে হংকং ও এময়-এর মধ্যে
যাতায়াত করিতে হইয়াছিল। সেই সময় হংকংএ আমার
সঙ্গী ও সমর্থকরূপে মাত্র তিনটী লােক ছিলেন—চেন-সাও-বু,
উ-সাও-টী, ইয়াং-সাে-লিন এবং সাংহাই-এ লুকো-টুঙ বলিয়া
মাত্র এক জন ছিলেন। অন্য সমস্ত পরিচিত বন্ধু-বান্ধব
বিপ্লবী বলিয়া আমার নিকট হইতে দূরে দূরে থাকিতেন ;
লােকে প্লেগকে যেমন ভয় করে, আমার সহপাঠীরা ক্রমশঃ
আমাকে সেই রকম ভাবে ভয় করিতে লাগিল। হংকং-এর
তিনটী বন্ধুকে লইয়া নিশিদিন বিপ্লবের সম্বন্ধে জল্পনা-কল্পনা
চলিত। কি করিয়া চীনে মাঞ্চু-রাজের বিরুদ্ধে এই বিপ্লবকে
জাগাইয়া ভােলা যায়, তাহাই আমাদের সমস্ত চিন্তাকে
আচ্ছন্ন করিয়া রাখিত। নানা স্থান হইতে পুস্তক সংগ্রহ
২২

সান-ইয়াৎ-সেন
করিয়া জগতের বিপ্লবের ইতিহাস তন্ন তন্ন করিয়া পড়িতাম।
এই সমস্ত কথাবার্তা ও আলাপ-আলােচনা আমাদের নেশার
মত হইয়া উঠিল। যখনই চার বন্ধুতে দেখা হইত, তখনই সেই
একই ভাব ও ভাবনা, সেই একই কথা; যে দিন অন্য কথা
আলােচিত হইত, সে দিন যেন আলােচনাও তেমন জমিয়া
উঠিত না। ক্রমশঃ আমাদের এই চার-ইয়ারের দলটী কলেজে
বিশেষ খ্যাতি অর্জন করিল। আমাদের দেখিলেই লােকে
ঘৃণায় সরিয়া গিয়া বলিত, “চারটে বদমায়েশের দল”। আমার
আজ মনে হয়, সেই ঘৃণা ও অনাদরের মধ্যে আমার রাজনৈতিক
জীবনের ভিত্তি আরও দৃঢ় হইয়া পড়িয়া উঠিয়াছিল।
কলেজ ত্যাগ করিবার পর আমি দুইটী জায়গা ঠিক
করিলাম—একটা এ্যময়, আর একটা ওয়াঙ চেনবাহ্যত
ডাক্তারখানা করিবার জন্য, কিন্তু আসলে বিপ্লবী দলটীকে
প্রতিষ্ঠিত করিবার জন্যই এই দুইটী জায়গা ঠিক করিলাম।
সেই সময় চেন দলের লোেক যােগাড় করিতে লাগিল এবং
ময়তে সেই জন্য রহিয়া গেল। আমি আর লুকো উত্তর
চীনের রাজধানীর দিকে রওয়ানা হইলাম-উদ্দেশ্য
রাজধানীতে অবস্থান করিয়া জনসাধারণের উপর মাঞ্চু-রাজের
প্রভাবের একটা যথার্থ নিরিখ নির্ধারণ করা।
১৮৯৪ সালে মনে হইল বিপ্লবের কাজ আরম্ভ করিবার
সময় আসিয়াছে ; সেই জন্য আমরা ফিলিপাইন দ্বীপে গিয়া
চীনের নবজীবন লাভের জন্য এক সমিতি স্থাপন করিলাম ;

সান-ইয়াৎ-সেন ফিলিপাইন দ্বীপে এই সমিতি স্থাপনের আমাদের উদ্দেশ্য ছিল যে, সেইখানকার ধনী প্রবাসী চীনদের নিকট হইতে যে সাহায্য পাওয়া যাইতে পারে, তাহার দ্বারা চীনের আভ্যন্তরিক প্রচার-কার্যের সুবিধা হইতে পারে। কিন্তু সু-সময় যে তখনও আসে নাই, আমরা সেদিন তাহা বুঝিতে পারি নাই। ফিলিপাইন দ্বীপে আমাদের সহায়ক মিলিল না—মাত্র টেন- ইন-নান ও টেন-টে-চাঙ নামক দুই ভাই সত্যসত্যই আমাদের প্রভূত সাহায্য করিবার জন্য অঙ্গীকৃত হইলেন। এই সময় চীনের সৈন্যদল বিদেশী শক্তির বিরুদ্ধে এক যুদ্ধের পর আর এক যুদ্ধে পরাজিত হইতেছিল। কোরিয়ার পরাজয়ের পর হইতেই মাঞ্চু-রাজের দৈব-শক্তি সম্বন্ধে লােকের মনে ধীরে ধীরে সন্দেহ জাগিতে লাগিল। সেই সময় সাংহাই-স্থ বন্ধু মুন লিখিয়া পাঠাইলেন যে, এই সময় চীনের বাহিরে না থাকিয়া চীনে আসিয়া প্রচারকাৰ্য্য আরম্ভ করা সর্বতােভাবে বিধেয়। ইনূ-ইন-নান এবং আরও তিন জন সঙ্গীকে সঙ্গে লইয়া আমি ক্যান্টনে প্রকাশ্য বিপ্লবের আয়ােজন করিবার কাৰ্য্যে আত্মনিয়ােগ করিলাম। আমাদের সমিতির প্রধান কেন্দ্র হংকংএ হইল এবং ইয়াংচেনে একটী শাখা-সমিতি রহিল। হংকংএ আমাদের দলে কয়েকজন সৈন্যবিভাগের অফিসার আসিয়া যােগদান করিলেন এবং আমেরিকা হইতেও সাহায্য আসিতে লাগিল। আমাকে তখন প্রতিনিয়ত হংকং ও ক্যান্টনের মধ্যে যাতায়াত করিতে ২৪

গেল।
সান-ইয়াৎ-সেন
হইত। এই সময় আমাদের কর্মপদ্ধতি সম্বন্ধে আমাদের
মনে বেশ একটা পরিষ্কার ধারণাও হইয়া গিয়াছিল—প্রকাশ্য
বিপ্লবের সমস্ত আয়ােজনই সার্থক হইয়া উঠিতেছিল। বাহির
হইতে আমরা প্রচারকার্য দ্বারা যথেষ্ট রসদও সংগ্রহ করিয়া
উঠিয়াছিলাম। সৈন্য-বিভাগে প্রচারকার্যের ফলে অনেক
সৈন্যাধ্যক্ষকেও দলে অন্তর্ভুক্ত করা হইয়াছিল। যখন
বিপ্লবের সমস্ত আয়ােজন সম্পূর্ণ হইয়া আসিতেছিল, সেই
সময় এক দুর্ঘটনায় এত দিনের সমস্ত প্রচেষ্টা বিনষ্ট হইয়া
যে নৌকা করিয়া পাঁচ শত রিভলভার আসিতেছিল,
তাহা ধরা পড়িয়া যায় এবং সেই সঙ্গে প্রিয়তম বন্ধু ও সহচর
লু-কো-টুঙ ধরা পড়েন। বিচারে লুকো-টুঙের ফাঁসী হইল।
নবীন চীনের স্বাধীনতার সংগ্রামের বেদীতে লুকো সর্বপ্রথম
আত্মদান করেন। সেই সময়ে ভীষণ ধরপাকড় আরম্ভ হয়
এবং আরও দুই জনের ফাঁসী হয়। যে সৈন্যাধ্যক্ষের উপর
আমরা নির্ভর করিয়াছিলাম তিনিও ধৃত হন এবং সেই সঙ্গে
সঙ্গে আরও সত্তর জন কারাগারের পথে রওয়ানা হয়।
১৮৯৫ সালের ৯ই সেপ্টেম্বর, সেই আমার প্রথম পরাজয়ের
দিন। শহরে যখন ধর-পাকড় আরম্ভ হইয়া গিয়াছে, তখনও
আমি ছদ্মবেশে ক্যান্টনে আছি। তিন দিন পরে চেন-সি-লাঙ
ও চেন-ও-বােকে সঙ্গে লইয়া ছদ্মবেশে নানা পথ ঘুরিয়া
পায়ে হাঁটিয়া আমরা হংকংএ আসিয়া পৌছিলাম। পিছনে
পুলিশ ক্ষিপ্ত হইয়া ঘুরিয়া ফিরিতেছে। আমরা ঠিক করিলাম
২৫

সান-ইয়াৎ-সেন
যে, চীন ত্যাগ করিয়া কোনও উপায়ে এখন জাপানে গিয়া
আশ্রয় লইতে হইবে। আমি টিকি কাটিয়া ফেলিয়া
একেবারে পুরাদস্তুর ইয়ােরােপীয়ান সাজিলাম। পথে ঠিক
হইল, আমরা তিন জনে তিন দিকে যাইব। আমি ফিলিপাইন
দ্বীপে চলিয়া গেলাম, চেন-সি-লাঙ পুনরায় চীনেই প্রত্যাবর্তন
করিল আর চেন-সাও-ববা জাপানে দলগঠন করিবার জন্য
জাপানের দিকে রওয়ানা হইল।
ফিলিপাইন দ্বীপে আসিয়া আমি পুনরায় সেখানকার
দলটীকে গড়িয়া তুলিবার জন্য সম্পূর্ণভাবে আত্মনিয়ােগ
করিলাম। আমাদের পরাজয়ের কথা শুনিয়া আমাদের সহায়ক
সমস্ত লােকই হতাশ হইয়া পড়িয়াছিল। কেহই আর এই
সাধনাকে সাধ্য বলিয়া গ্রহণ করিতে চায় না-অসম্ভব বলিয়া
সকলেই সে দিন আমাকে ফিরাইয়া দিয়াছিল। তাই মনস্থ
করিলাম যে, আমেরিকা যাইব—সেখানকার প্রবাসী চীনদের
নিকট হইতে হয় ত সাহায্য পাওয়া যাইতে পারে। আমে-
রিকায় যাইবার দিন ছদ্মবেশে আমি বন্দরের ধারে বেড়াইতেছি,
এমন সময় দূরে দেখি আমার শিক্ষক ডাক্তার কান্টাইল ও
তাহার পত্নী একটী গাড়ী করিয়া বেড়াইতেছেন। তাড়াতাড়ি
ছুটিয়া গিয়া গাড়ীর পা-দানির উপর উঠিয়া পড়িতেই উভয়েই
ভয়ে সচকিত হইয়া চীৎকার করিয়া উঠিলেন। তাহারা
আমাকে আদৌ চিনিতে পারেন নাই। তখন আমি পরিচয়
দিলাম। আনন্দে তাহারা আমাকে গাড়ীর ভিতর তুলিয়া
২৬

সান-ইয়াৎ-সেন
লইলেন। তাহারা চীন হইতে ইংলণ্ডে ফিরিয়া যাইতেছেন ;
পথে এইখানে ভ্রমণের উদ্দেশ্যে নামিয়াছিলেন। আমার পৃথিবী
পৰ্য্যটনের ব্যাপার তাহাদিগকে বলিলাম এবং লণ্ডনে গিয়া যে
তাহাদের অতিথি হইব, তাহাও স্থির করিয়া রাখিলাম।
ফিলিপাইন দ্বীপের চীনাদের অবস্থা দেখিয়া মন একেবারে
ভাঙ্গিয়া পড়িল। দেখিলাম তাহারা ঘুমাইতেছে। সেখান
হইতে আমেরিকায় রওয়ানা হইলাম। পথে নানা স্থানে
নামিয়া চীনের মুক্তিসংগ্রামের বাণী প্রচার করিয়া বেড়াইতে
লাগিলাম এবং বিপ্লবের আয়ােজনের জন্য অর্থ-সংগ্রহও
চলিতে লাগিল। আমেরিকায় আসিয়া দেখিলাম, সেখানেও
প্রবাসী চীনারা ঘুমাইয়া পড়িয়াছে, মাধুাজ-বংশকে উচ্ছেদ
করিয়া চীনে নব গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করিবার প্রয়াসকে তাহারা
অসম্ভব বলিয়া উড়াইয়া দেয়।
আমেরিকার প্রবাসী চীনগণ দেশ হইতে দূরে সরিয়া
আসিয়া দেশের প্রকৃত অবস্থার কথা ভুলিয়া গিয়াছিল।
আমেরিকায় চীনা প্রবাসীরা সকলেই হুং-মেন দলের সভ্য,
কিন্তু আজ হুং-মেন দল নামেই শুধু বিপ্লবাত্মক ; আসলে এই
নামের অন্তরালে বিপ্লবের কোনও অস্তিত্ব ছিল না। এই হুং-

সান-ইয়াৎ-সেন মেন দলের ইতিহাসের সহিত চীনের ইতিহাস শত শত বর্ষ ধরিয়া বিজড়িত। যে দিন হইতে (১৬৪৪) মাঞ্চু-রাজগণ চীন মিং-বংশকে ধ্বংস করিয়া চীনে মাথু-প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠিত করিল, সেই দিন হইতে এক দল লােক মিং-বংশকে ফিরাইয়া আনিবার জন্য প্রচলিত রাজ্যশাসনের বিরুদ্ধে মাথা তােলে। এই গুপ্ত বিপ্লবীদের দলকেই হুং-মেন বলা হয়। কিন্তু বারে বারে ইহাদের সমস্ত বিপ্লব-প্রচেষ্টা ব্যর্থ হইয়া যায়। মাঞ্চ-রাজের সৈন্যদের তরবারির আঘাতে বহু বিপ্লবী এমনি যুগের পর যুগ প্রাণ দিয়া আসিয়াছে। এই হুং-মেন দলের সৰ্ব্ব-প্রধান উদ্দেশ্য ছিল যে, মাঞ্চু রাজবংশকে ধ্বংস করিয়া পুনরায় মিং-রাজত্ব ফিরাইয়া আনা। কিন্তু বারে বারে বিফলমনােরথ হইয়া ক্রমশঃ এই দলের বিপ্লবাত্মক প্রচেষ্টা স্তিমিত হইয়া আসে। কিন্তু এই দলটী বিলুপ্ত হইয়া গেল ; শুধু তাহাদের কার্যপদ্ধতি বদলাইয়া গেল। বিপ্লব ছাড়িয়া তাহারা জাতীয়তার ভাব-প্রচারে লাগিয়া গেল। অবশ্য যে সময় এই দল জাতীয়তার বাণী প্রচার করিতে লাগিল, তখনও তাহা রাজ-রাষের পরিধির অন্তর্ভুক্ত ছিল। জাতীয়তার বাণী প্রচার করিবার জন্য ইহার এক অভিনব সাহিত্য সৃষ্টি করিল। চীন প্রজাদের মনে প্রচলিত শাসন- বিধি ও জীবন-যাত্রার প্রতি একটা বিতৃষ্ণা জাগাইয়া ভােলা, সমাজের অন্যায় ভেদ-বিচারের বিষয় জনসাধারণকে সজাগ করাই এই সমস্ত সাহিত্যের মুখ্য বিষয় হইল এবং তাহারা ২৮

সান-ইয়াৎ-সেন
প্রচারের জন্য নাটকেরই আশ্রয় গ্রহণ করিল। এই সমস্ত
নাটক জনসাধারণের কথ্য ভাষায় লেখা হইত এবং অনেক সময়
অনেক কুৎসিত ভাষাও নাট্যকারকে প্রয়ােগ করিতে হইত।
সেই জন্য চীনা শিক্ষিত লােকেরা ক্রমশঃ এই সমস্ত নাটককে
ঘৃণা করিতে আরম্ভ করিল এবং তাহারাও হুং-মেন দল হইতে
সরিয়া আসিতে লাগিল। কিন্তু তৎসত্ত্বেও চীনে এই জাতীয়
দল রহিয়া গেল। চীনের বাহিরে যেখানে যেখানে চীনা-
পল্লী আছে, সেইখানে সেইখানে হুং-মেন দল প্রতিষ্ঠিত হইল।
চীনের বাহিরে থাকিয়া এই দল বহু দিন ধরিয়া অনেক
নির্বাসিত চীনাকে আশ্রয় দিয়াছে, অর্থ দিয়াছে, অভয় দিয়াছে;
কিন্তু প্রবাসীদের মধ্যেও ক্রমশঃ এই দলের রাজনৈতিক সত্তা
বিলুপ্ত হইয়া আসিতে লাগিল।
যে-দল এক দিন বিপ্লবের বাণী লইয়া জাগিয়া উঠিয়াছিল,
তাহা ক্রমশঃ সাহায্য-বিতরণী সভা হইয়া দাঁড়াইল। দরিদ্র
দুঃস্থ চীনাদের অর্থ সাহায্য কর, তত্ত্বাবধান করা এই দলের
সর্বপ্রথম ও সর্বশেষ কাজ হইল ; ইহার বাহিরে এই দলের
আর কোনও সার্থকতা রহিল না। এমন কি এই দলের
অনেক সভ্যও জানেন না যে, এই দল এক দিন বিপ্লবাত্মক
ছিল—দেশকে শাসকদের হাত হইতে মুক্ত করিবার বৃহত্তর
আদর্শই ইহার একমাত্র মূলমন্ত্র ছিল ।
আমেরিকার প্রবাসী চীনদের যখন আমি দেশের কোনও
কথা জিজ্ঞাসা করিতাম, তাহারা কিছুই বলিতে পারিত না।
;
২৯

সান-ইয়াৎ-সেন
মাধু-রাজবংশকে উচ্ছেদ করিয়া কেন যে নূতন শাসনতন্ত্র
প্রবর্তন করিতে হইবে, তাহারা তাহা বুঝিয়া উঠিতে পারিত
। তাহারা যে দলের সভ্য, সে দলের উৎপত্তির কথাও
তাহারা জানিত না। আমেরিকায় বহু দিন ধরিয়া প্রচার
করিবার পর হুং-মেন দলের প্রবাসী চীনের বুঝিতে পারিল
যে, তাহারা তাহাদের মধ্য দিয়া এক অতীত কালের বিপ্লবের
বাণীকেই বহন করিয়া আসিতেছে ।
যদিও আমার আমেরিকা-বাস সাক্ষাৎ ভাবে চীন-বিপ্লবকে
খুব কমই সহায়তা করিতে পারিয়াছিল, তথাপি চীনা গভর্ণমেন্ট
আমার গতিবিধি লক্ষ্য করিয়া রীতিমত শঙ্কান্বিত হইয়া
উঠিয়াছিল। [ এই সময় চীন সরকার সানের মস্তকের জন্য
প্রচুর অর্থ ঘােষণ করিয়াছিল এবং সানের পদাঙ্ক অনুসরণ
করিয়া চীন গভর্ণমেন্টের গুপ্তচর নিশিদিন ঘুরিয়া ফিরিতেছিল।]
আমেরিকা হইতে আমি লণ্ডন অভিমুখে যাত্রা করিলাম।
লণ্ডনে আসিয়া আমি আমার অবস্থা সঙ্কটাপন্ন বুঝিতে পারি-
লাম এবং কিছুকাল যাইতে না যাইতেই লণ্ডনস্থ চীন
রাজপ্রতিনিধিদের আবাসমণ্ডলের মধ্যে ধরা পড়িয়া গেলাম।
লণ্ডনের পথ হইতে আমাকে বন্দী করিয়া তাহারা সরাইয়া
ফেলিল। আমার পূর্বতন শিক্ষক ডাঃ ক্যানটাইল এই
ভীষণ বিপদ হইতে আমাকে রক্ষা করেন।
[ ডাঃ ক্যানটাইল তাহার পুস্তকে এই ব্যাপার বর্ণনা
করিয়াছেন। যে বাড়ীতে সানকে বন্দী করিয়া রাখা হয়,

সান-ইয়াৎ-সেন সেখানকার এক ঝির সহিত ক্যানটাইলের স্ত্রীর পরিচয় ছিল। সেই ঝিটী চীনা বাড়ীতে কাজ করিবার সময় বুঝিয়াছিল যে, তাহারা এক জন চীনাম্যানকে বন্দী করিয়াছে এবং সে শুনি- য়াছে যে, তাহাকে ফাঁসী দেওয়া হইবে। সে এই গল্প ডাঃ ক্যানটাইলের স্ত্রীর নিকট করে । ডাঃ ক্যানটাইল সানের কথা স্মরণ করিয়া এই ঝির মারফৎ বন্দীর নামটী সংগ্রহ, করেন। প্রিয়তম ছাত্রের জীবন রক্ষা করিবার নিমিত্ত ডাঃ ক্যানটাইল কালবিলম্ব না করিয়া লর্ড স্যালিস্ব্যারীকে ধরিলেন। কোনও অতিথির স্বাধীনতাকে বিনা কারণে এইরূপ ভাবে বিনষ্ট হইতে দেওয়া জাতির পক্ষে অশােভন। লর্ড স্যালিব্যারীর মধ্যস্থতায় এবং ডাঃ ক্যানটাইলের প্রচেষ্টায় সান চীন রাজপ্রতিনিধিদের হাত হইতে মুক্ত হইলেন। ইংলণ্ডে তখন কেহই ভাবে নাই যে, এই সামান্য চীনাম্যান এক দিন সমগ্র জগতের বিরুদ্ধে দাড়াইয়া চীন-জাতির আত্ম- প্রতিষ্ঠার বাণীকে জাগ্রত করিয়া তুলিবে।] লণ্ডনে চীন রাজপ্রতিনিধিদের হাত হইতে মুক্ত হইয়া আর কালবিলম্ব না করিয়াই আমি লওন পরিত্যাগ করিয়া ইয়ােররাপের দিকে যাত্রা করিলাম। ইয়ােরােপের বিভিন্ন জাতির রাষ্ট্রজীবনের ও তাহার নানা রূপ প্রতিক্রিয়ার সহিত সাক্ষাৎভাবে পরিচিত হইবার জন্যই আমি ইয়ােরােপে রওয়ানা হই। ইয়ােরােপের বিভিন্ন দেশ পৰ্যটন করিয়া একটা জিনিস আমার মনে স্পষ্ট রূপ-ধারণ করিয়া উঠিল যে, ইয়ােরােপ রাজ- সান-ইয়াৎ-সেন নৈতিক দিক দিয়া যতই অগ্রসর হউক না কেন, তাহার রাজনীতি তাহার জাতিকে শান্তি ও সুখ আনিয়া দিতে পারে নাই। তাই ইয়ােরােপীয় বিপ্লবীরা রাজনৈতিক বিপ্লব অপেক্ষা সামাজিক বিপ্লবকে বেশী উচ্চ স্থান দেয়। সেই সঙ্গে সঙ্গে বিপ্লবের তিনটী মূৰ্ত্তি আমার মনে জাগরূক হইয়া উঠে। জাতির অর্থনীতি, স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার উপর ভিত্তি করিয়াই আমার মনে সেই প্রথম আমার Sen-min-chu অর্থাৎ তিনটী আদর্শমূলক স্বাধীনতার স্বরূপ জাগিয়া উঠে। বিপ্লবই আমার জীবনের সর্বপ্রথম কাম্য বলিয়া বেশী দিন আর ইয়ােরােপে থাকা হইল না। তখন প্রত্যেক মুহূর্তই প্রয়ােজনীয়। জাপানে থাকিলে চীনের নিকটেই থাকা যাইবে এবং চীনের অভ্যন্তরে বিপ্লবের কাৰ্যের সুবিধা হইবে বিবেচনা করিয়া ইয়ােরােপ হইতে জাপানে আসিয়া পৌছিলাম। ইয়ােকোহামায় আসিয়া জাপানের পপুলার পার্টির দুই জন নেতার সহিত আলাপ হইল। তাহাদের সকল কথা খুলিয়া বলিলাম এবং তাঁহারা বন্ধুর মত আমার কাৰ্য্যে সহায়তা করিবেন বলিয়া প্রতিশ্রুত হইলেন। [ ইয়ােকোহামাতে আসিয়া সান বাছিয়া বাছিয়া চীন রাজপ্রতিনিধিদের আবাসস্থলের সম্মুখস্থ একটী জীর্ণ সরাই- খানাতে আশ্রয় গ্রহণ করেন এবং চীন রাজপ্রতিনিধিদের চোখের সম্মুখে থাকিয়াই বিপ্লবের আয়ােজন করিতে লাগিলেন। চীনে নবগণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হইয়া যাইবার পর সান-ইয়াৎ-সেন সেই জীর্ণ সরাইখানাকে চীনজাতি স্মারক-ফলক দিয়া চিহ্নিত করিয়া রাখিয়াছে। লেনিন যে সরাইখানায় থাকিয়া সুইজারল্যাণ্ডে বিপ্লবের কাজ করিতেন, সােভিয়েট গভর্ণমেন্টও সেই স্থানটীকে লেনিনের প্রতিমূর্তি দিয়া চিহ্নিত করিয়া রাখিয়াছে ; ডােবারের কর্মকারের হাপরখানাকে ইটালীর যুবকরা আজ মুসােলিনীর জন্মস্থান বলিয়া মৰ্ম্মরমণ্ডিত করিয়াছে। যে জাতি বাঁচিয়া থাকে, সে এমনই করিয়া তাহার চারিদিককে বাঁচাইয়া তােলে ; যে জাতির শুধু মরিবার অধিকার, তাহারই স্মৃতি-মন্দিরে-মন্দিরে শুধু ফাটল ধরে তাহার ফাঁকে ফাঁকে অশ্বথের জঙ্গল জাগিয়া উঠে; বন-শকুনির বীভৎস চীৎকার শুধু সে স্থানগুলিকে সজীব করিয়া রাখে।] জাপানে তখন প্রায় দশ হাজার চীনা প্রবাসী বাস করিত, কিন্তু তাহারাও নিশ্চিন্ত মনে ঘুমাইতেছিল। অন্যান্য দেশের প্রবাসী চীনারা বিপ্লবের নাম শুনিলেই যেমন ভীত ও শঙ্কিত হইয়া উঠিত, ইহারাও ঠিক সেই রকম বিপ্লবের নামেই শঙ্কিত। আমার দলের অন্যান্য কর্মীবন্ধুরা বহু দিন ধরিয়া জাপানে প্রচারকার্য করিয়া মাত্র এক শত জনকে বিপ্লব-দলভুক্ত করিতে পারিয়াছিলেন। বাহিরের চীনাদের অবস্থা এইরূপ, স্বদেশেও আরও বিপদ। সেখানে চীনারা বিপ্লবের নাম শুনিলে ভীত হয় না বটে; মাথুরাজবংশকে উচ্ছেদ করিতেও তাহারা চায়, কিন্তু কেহই অগ্রসর হইয়া কোনও কাজ করিতে চাহে না। কোনও মতে তাহাদের একটা সুদৃঢ় সঙ্ঘবদ্ধতায় সান-ইয়াৎ-সেন আনা যায় না—বিপ্লবের কাৰ্য্যে তাহারা শুধু মৌন সম্মতি দিতে পারে-সহযােগিতা দিতে পারে না। ১৮৯৫ সাল হইতে ১৯০০ সাল পর্যন্ত এই প্রকারের নানা রকমের প্রতি বন্ধক ও সহায়হীনতার মধ্য দিয়া কোনও রকমে আগাইয়া চলিতে লাগিল। ক্রমান্বয়ে দশ বৎসর ধরিয়া আমার সহযাত্রী বন্ধুগণ ও আমি যে বিপ্লবের সাধনা করিয়া আসিতেছিলাম, তাহার কোনও আশাপ্রদ ফল ফলিল না। বাহিরের প্রচার- কাৰ্যেও বিশেষ কোন সুবিধা হইল না। অন্য দিকে দেশের অভ্যন্তরে মাথুরাজতন্ত্র ধীরে ধীরে বেশ সজাগ ও সুদৃঢ় হইয়া উঠিতেছিল। আমাদের সকল আশাও নিষ্প্রভ হইয়া আসিতে লাগিল। কিন্তু পার্শ্বচর বন্ধুরা সেই নিরাশা-দুর্গম পথে দীপ্ত আননে সম্মুখের দিকে চাহিয়া তেমনি চলিতে লাগিল। হংকং-এ একখানি বিপ্লবাত্মক কাগজ প্রকাশ করিবার ভার দিয়া আমি চেন-শাও-বােকে হংকংএ পাঠাইলাম এবং চিকি- যাঙ প্রদেশের সৈন্যদের মধ্যে প্রচার-কাৰ্য চালাইবার জন্য লি-কিয়াঙ-জোকে পাঠাইলাম। শাও-বাের সঙ্গে চেন- শি-লিয়াকেও পাঠাইলাম ;-উদ্দেশ্য হংকংএ বিপ্লব-কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা। এই সময় চীনের অভ্যন্তরে প্রচারকার্যের ফলে চীনের প্রধান প্রধান শহরে যে সমস্ত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিচ্ছিন্ন বিপ্লবের দল প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল, তাহারা সকলে এক হইয়া আমাদের দলে মিলিত হইল। এই সময় বিদেশীদের অত্যাচারের ফলে T ৩৪ সান-ইয়াৎ-সেন চীনে বক্সার-বিদ্রোহ (১৯০০) জাগিয়া উঠিল। মাঞ্চুরাজবংশের সহায়তাতেই এই বক্সার-অভ্যুত্থান সম্ভব হয়। আটটী বিদেশীয় শক্তি সঙ্ঘবদ্ধ হইয়া বক্সার-অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে চীনে সৈন্য পাঠাইল। আমার মনে হইল, মাথুরাজবংশ উচ্ছেদের এই সময় ; সুতরাং আর কালবিলম্ব না করিয়া দুই জন সঙ্গীকে দুইটী প্রধান কেন্দ্রে মাঞ্চু-রাজসৈন্যের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য যুদ্ধ- আয়ােজনের জন্য পাঠাইলাম। যখন সমস্ত চীন সহসা এই রকম বিপর্যস্ত হইয়া পড়িল, আমি বিদেশী কর্মচারীদের সঙ্গে মিশিয়া ছদ্মবেশে হংকং আসিয়া উপস্থিত হইলাম। এই সময় স্বয়ং উপস্থিত থাকিয়া বিপ্লবের কাৰ্য্যকে পরিচালনা করিবার উদ্দেশ্যে আমি স্থির করিলাম যে, হংকং হইতে জল- পথে চীনের অভ্যন্তরে প্রবেশ করিব। কিন্তু আমারই বিশ্বস্ত এক লােক সহসা বিশ্বাসঘাতকতা করিয়া সমস্ত বিষয় বলিয়া দিল ; তখন কোনও রকমে কালবিলম্ব না করিয়া পুনরায় হংকং পরিত্যাগ করিয়া ফরমােসা.দ্বীপে গিয়া উঠিলাম। এখানে বক্সার-অভ্যুত্থান উপলক্ষে কিছু বলা প্রয়ােজন। চীনের রাজনৈতিক অভ্যুত্থানকে দুইটী দিক দিয়া দেখা যায়- প্রথম চীনের জনসাধারণের সহিত মাথুরাজের সম্বন্ধ ; দ্বিতীয়টী চীনের সহিত বিদেশীয় শক্তিদের সম্বন্ধ। এক সময় চীন জগতের সমস্ত জাতি হইতে সম্পূর্ণ পৃথক থাকিয়া আপনার সীমারেখার মধ্যে আপনি সম্পূর্ণ ছিল। ইংলণ্ডের রাজা তৃতীয় জর্জ যে দিন জেনারেল ম্যাকক-টনীকে চীন-রাজ ৮ ৩৫ সান-ইয়াৎ-সেন দরবারে বাণিজ্যের প্রস্তাব-সমেত উপঢৌকন দিয়া পাঠাইয়া- ছিলেন, সে দিনও চীন-সম্রাট আপনার শক্তির অন্ধ দাম্ভিকতায় ইংরাজ-রাজদূতকে সমুদ্রপারস্থিত বর্বর জাতির প্রতিনিধি বলিয়াই বিবেচনা করিয়াছিলেন। কিন্তু বিদেশীদের কলকার- খানায় প্রস্তুত নানা রকমের সুন্দর উপঢৌকন দেখিয়া সন্তুষ্ট হইয়া চীন-সম্রাট চীনের বন্দরে ইংরাজদের বাণিজ্য করিবার অধিকার দিয়াছিলেন। ইয়ােররাপে তখন বিজ্ঞানের নব-অভ- স্থানের ফলে কলকারখানার প্রসার রীতিমত-ভাবে বাড়িয়া গিয়াছিল। ইয়ােরােপের কল-কারখানায় যে সমস্ত জিনিস প্রস্তুত হয়, তাহার খরিদ্দার চাই এবং কলকারখানা চালাইতে হইলে খরিদ্দার ব্যতীত আর একটী জিনিসও চাই—তাহা কঁচা মাল। অথচ ইয়ােররাপের উৎপন্ন এত কাচা মাল নাই, যাহাতে ইয়ােরােপের কলকারখানা চলিতে পারে। সেই জন্য কলকার- খানার যুগের প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সাম্রাজ্যবাদী ইয়ােররাপের জয়- লিম্পা তীব্র হইয়া উঠিল এবং এই জয়লিষ্পর প্রেরণাতেই তাহার নাবিকরা দুর্গম সাগর পার হইয়া নূতন দেশের সন্ধানে বাহির হইল—নূতন বাজার খুঁজিয়া বাহির করিবার জন্য। অষ্টাদশ শতাব্দীর নিশীথ-অন্ধকারে ইয়ােরােপ বণিকের বেশে এশিয়ার দ্বারে আসিয়া করাঘাত করে। ব্যবসায় ও বাণিজ্যের মধ্য দিয়া ইয়ােরােপ ও এশিয়ার রাজনৈতিক সম্বন্ধ গড়িয়া উঠে। সে দিন যাহারা চীনের বন্দরে পণ্য দ্রব্যের জাহাজ লইয়া গিয়াছিল, তাহাদেরও অঙ্গে ছিল বণিকের বেশ।

সান-ইয়াৎ-সেন প্রথমে চা লইয়া ব্যবসায় আরম্ভ হয়—শেষে গিয়া দাড়া- ইল, আফিঙে। যাঁহারা কমলাকান্ত শৰ্ম্মার তুরীয় লােকের প্রতিবাসী, তাহারা জানিয়া রাখুন যে, চীনের এই সমস্ত গণ্ড- গােলের মুলে রহিয়াছে—অহিফেন ! বহু প্রাচীন কাল হইতে চীনে আফিঙ ব্যবহৃত হইত, কিন্তু সে সম্পূর্ণ ঔষধ হিসাবে। জাভার ওলন্দাজ উপনিবেশ হইতে ১৬৬০ খৃষ্টাব্দ নাগাদ অহিফেন ঔষধের প্রয়ােজনীয়তার ক্ষুদ্র গণ্ডী অতিক্রম করিয়া নেশার অনন্ত রূপ ধারণ করিয়া চীনে প্রবেশ করে এবং ইহার জন্য পর্তুগীজরাই প্রথমতঃ দায়ী। তাহারাই সর্বপ্রথম চীনে আফিঙ আমদানী করে। ১৭৭৩ সাল হইতে ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর ইংরাজ ব্যবসায়ী দের নজর এই দিকে পড়িল এবং ধীরে ধীরে তাহারা ভারত- বর্ষ হইতে চীনে আফিঙ চালাইতে সুরু করিলেন। অতি অল্প কালের মধ্যে আফিঙের ব্যবসায় ইংরাজ ব্যবসায়িগণ অন্যান্য জাতিদের অতিক্রম করিয়া গেলেন। ১৮৩৯ সালে এক বৎসরে ৩৩,২৩,০০০ লক্ষ পাউণ্ড আফিঙ ইংরাজ ব্যব- সায়ী কর্তৃক চীনে আমদানী করা হয় (Cf. Wongs China and the Nations)। অবশ্য এই আফিঙের ব্যবসায় চীনা-রাজকর্মচারীরাই বিদেশীদের সব চেয়ে বেশী সহায়তা করিয়াছে। চীন রাজকর্মচারীরা অতি শীঘ্রই ঘুষের দ্বারা বশীভূত হইতেন। ক্রমশঃ এই অহিফেন সমস্ত চীনকে মােহাচ্ছন্ন করিয়া ফেলিল। চীন জাতি সমগ্রভাবে অহি-

সান-ইয়াৎ-সেন
ফেনের নেশায় ঝিমাইয়া পড়িল। ১৮৩৯ সালে মাথুরাজের
অনুজ্ঞায় লিন-সে-সু অহিফেন তদন্তকারী এক সভা গঠিত
করিয়া মতামত প্রকাশ করেন যে, যদি অচিরে যে কোন
উপায়ে হউক চীনে অহিফেনের আমদানী বন্ধ না করা যায়,
তাহা হইলে আর কয়েক বৎসরের মধ্যে চীন জাতির মস্তিষ্ক ও
কর্মশক্তি একেবারে বিলুপ্ত হইয়া যাইবে।
চীন-সম্রাট সমস্ত বিদেশীয় জাহাজ আটক করিয়া রাখিয়া
সমস্ত আফিঙ সাগরের জলে ফেলিয়া দিবার হুকুম দিলেন।
এই সূত্রে নানা গণ্ডগােলের মধ্য দিয়া এক বিরাট সংঘর্ষ
উপস্থিত হয়। চীনের ইতিহাসে ইহা অহিফেন-যুদ্ধ বলিয়া
খ্যাত। এই অহিফেন-যুদ্ধে সর্বপ্রথমে চীন বিদেশীদের
নিকট পরাজিত হইয়া বিদেশীদের ইচ্ছা অনুযায়ী শর্তে স্বাক্ষর
করে। যে সমস্ত শর্তের বন্ধন হইতে মুক্ত হইবার জন্য
গণতান্ত্রিক নব্য চীন জগতের রাষ্ট্র-সভায় ঘােষণা প্রেরণ
করিয়াছে, তাহার সূত্রপাত এই অহিফেন-যুদ্ধ হইতেই। এই
শর্তের নাম নানকিং সন্ধি (Nanking Treaty)। এই
শর্তের ফলে ইংরাজ, ফরাসী ও আমেরিকান চীনের ভূমিতে
স্ব স্ব অধিকার প্রতিষ্ঠা করিল।
এই নানকিং সন্ধি চীনের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটা
সবিশেষ পরিবর্তন আনিয়া দেয়। এই শর্তের ফলে
(১) চীনের প্রথম অঙ্গচ্যুতি ঘটিল।
হংকং দ্বীপ
ইংরাজদের অধিকারভুক্ত হইল।

সান-ইয়াৎ-সেন
(২) চীন সাগরে ইংরাজ রণ-তরীর স্থায়ী অস্তিত্বের বন্দবস্ত।
এই যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ স্বরূপ চীনকে ২১,০০০,০০০ ডলার
ইংলণ্ডকে দিতে হইবে। যত ক্ষণ পর্যন্ত ঋণ শােধ না হইতেছে,
তত ক্ষণ পৰ্যন্ত ইংরাজ রণ-তরী চীনের জল ছাড়িয়া যাইবে না।
(৩) চীনের বন্দরে অবাধ বাণিজ্যের অধিকার। ইহাকেই
Open Door Policy বলা হয়। এই সমস্ত বন্দর Treaty
Ports বলিয়া খ্যাত।
(৪) বিদেশীদের জন্য ঔপনিবেশিক অধিকার-ইহাকেই
Extra-territoriality বলা হয়। Treaty Port সমূহে
বিদেশীরা আপনাদের আইন-আদালত গড়িয়া তুলিল,
এই সমস্ত বন্দরে তাহারা তাহাদের আদালতের আইনই
মানিয়া চলিবে। এই Treaty Port সমূহে ক্রমশঃ তাহারা
একটা পরিধি চিহ্নিত করিয়া লইয়া তাহারই ভিতরে
আপনাদের প্রভাব-কেন্দ্র গড়িয়া তুলিতে লাগিল। এই
স্থানগুলিকেই Legation Quarters বলা হয়।
এই সমস্ত শর্তের সুড়ঙ্গপথ দিয়া বিদেশীরা ক্রমশঃ চীনের
উপকূল সমস্তই আপনাদের অধিকারভুক্ত করিয়া লইতে
ছিল। মাঝে মাঝে যুদ্ধ হয়—মিলিত বিদেশী শক্তি ও
জাপানের নিকট পরাজিত হইয়া নূতন নূতন শর্তে চীনকে
বারে বারে নত হইতে হয়। এই সমস্ত আন্দোলন ও শর্তের
ব্যাপার অন্যত্র বলিব। এখানে শুধু এই বলিলেই হইবে
যে, চীনে বিদেশী শক্তিদের ক্রমশঃ যতই শক্তি বাড়িতে

সান-ইয়াৎ-সেন
লাগিল, তাহারা ততই পরস্পর পরস্পরের প্রতি ঈর্ষান্বিত
হইয়া উঠিতে লাগিল। এমন কি চীনে বিদেশীদের মধ্যেই
সংঘর্ষ হইবার উপক্রম হইল। এই সময় আমেরিকা ফিলি-
পাইন দ্বীপ নিজের হস্তগত করিয়া লইয়া চীনের দিকে নজর
দিতেছিল। ১৮৯৯ সালে আমেরিকার যুক্ত রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট
ঘােষণা করিলেন যে, চীনে শুধু কোনও একটা জাতির অবাধ
বাণিজ্যের অধিকার থাকিতে পারে না—সকল জাতিরই চীনে
অবাধ বাণিজ্যে অধিকার আছে। এই ঘােষণার ফলে চীনে
বিদেশীদের প্রভাব আরও উদগ্র হইয়া উঠিল ; মাথুরাজ
স্তিমিত বিস্ময়ে দেখিতে লাগিলেন, চীনের ব্যবসা-বাণিজ্য
বিলুপ্ত হইতে চলিয়াছে ; বারে বারে পরাস্ত হইয়া চীন
সৈন্যের আর মর্যাদা নাই; সমগ্র চীনের অর্থনৈতিক
জীবনের উপর বিদেশীদের পূরা অধিকার আসিয়া পড়িয়াছে।
এই সময় রাজ-শক্তির প্ররােচনায় চীন-জনসাধারণের মধ্যে
এক বিরাট অভুত্থান হয়—ইহারই নাম Boxer Rebellion.
বিদেশীদের শুধু ঘুষির জোরে চীন হইতে বিতাড়িত করিবার
পণ লইয়া এই জাগরণ সমুস্থিত হয় বলিয়া ইহার নাম Boxer
Rebellion হইয়াছে।
৪০

বক্সার-বিদ্রোহের কথা হইতে পুনরায় সানের আত্ম-চরিতে
ফিরিয়া আসা যাক। সানের আত্ম-চরিত ব্যতীত চীনের
বিদ্রোহের আভ্যন্তরিক ব্যাপার আর কোথাও জানিবার
কোন উপায় আপাতত নাই। সানের আত্মচরিত অর্থই
চীনের জাতীয় দলের জাগরণের ইতিহাস।
চীনে প্রবেশ করিবার আর কোনও পন্থা না পাইয়া
আমি ফরমােস দ্বীপে চলিয়া আসিলাম। ফরমােসায়
আসিয়া ভাবিতে লাগিলাম যে, কি উপায়ে পুনরায় চীনে
প্রবেশ করা যায়। সেই সময় ফরমােসা দ্বীপের গভর্ণর
জেনারেল যিনি ছিলেন, তাহার নাম কোদামা। কোদামা চীন
বিপ্লবের প্রয়ােজনীয়তাকে স্বীকার করিয়াছিলেন এবং গােপনে
তিনি আমার নিকট এক দূত পাঠাইয়া জানাইলেন যে, চীনে
বিপ্লব উপস্থিত হইলে তিনি সাক্ষাৎভাবে আমাদের সাহায্য
করিতে পারেন।
সেই সময় আমি আমাদের দলে যাহাতে সমর-বিদ্যায়
নিপুণ লােকদের সহায়তা বেশী পাওয়া যায়, তাহার চেষ্টা
করিতেছিলাম। লােক মারফৎ চেন-শি-লিয়াকে চীনে
খবর পাঠাইলাম যে, প্রধান প্রধান নগর আক্রমণ না করিয়া
৪১

সান-ইয়াৎ-সেন
আমি,
এখন যেন তাহারা বন্দরগুলির দিকে বেশী ঝোঁক দেয় এবং
বন্দরে বন্দরে আমাদের দলকে যেন দৃঢ় করিয়া রাখা হয়।
আমার আদেশ-মত চেন-শি-লিয়াঙ নব-গঠিত কৃষক
সৈন্যদল লইয়া সিনইয়াঙ, লুংগেন প্রভৃতি জায়গার সরকারী
সৈন্যদের উপর আক্রমণ করিল। তাহার আক্রমণের ফলে
প্রত্যেক জায়গায় সরকারী সৈন্যদল বিধ্বস্ত হইতে লাগিল ;
ক্রমশঃ চেন-শির বিজয়-বাহিনী সিনইয়াঙ হইতে হুচাউ
পৰ্যন্ত সমস্ত বন্দর অধিকার করিয়া লইল। চেন আমার
আগমন অপেক্ষা করিতে লাগিল; কারণ কথা ছিল,
ফরমােসা হইতে সৈন্য ও যুদ্ধের রসদ লইয়া যাইব। কিন্তু
এদিকে আমাদের বিপ্লব ঘােষণার সঙ্গে সঙ্গে ফরমােসায়
নূতন মন্ত্রী নিয়ােজিত হইল এবং তিনি ফরমােসা হইতে
চীন-বিপ্লবের সমস্ত আয়ােজনকে উচ্ছেদ করিবার জন্য কৃত
সঙ্কল্প হইলেন। আমার সমস্ত আয়ােজন ব্যর্থ হইয়া গেল।
নিরুপায় হইয়া ফরমােসার এক জন জাপানী সঙ্গীকে
অবস্থানুযায়ী সমস্ত আদেশ দিয়া চেন-শির নিকট পাঠাইলাম।
অন্য দিকে চেনশি দশ হাজার লােক লইয়া সৈন্য ও উপযুক্ত
সেনাপতির অপেক্ষা করিয়া বিফলমনােরথ হইয়া সৈন্যদল
ভাঙ্গিয়া দিতে বাধ্য হইল। জাপানী বন্ধুটী যখন চেন-শির
নিকট পৌছিল, তখন প্রায় এক মাস অতিবাহিত হইয়া
গিয়াছে। চেনশি মাত্র দুই এক শত সৈন্য লইয়া হংকংএফিরিয়া
গিয়াছিল। জাপানী বন্ধুটী ফরমােসায় ফিরিবার সময় পথ
৪২

সান-ইয়াৎ-সেন
হারাইয়া গিয়া সরকারী সৈন্যদের হাতে গিয়া পড়ে এবং
তাহার ফঁাসী হয়। চীনের বিপ্লবের কাজে বিদেশীর এই
প্রথম আত্মদান।
যখন চেন-শি যুদ্ধে নিরত ছিল, তখন ক্যান্টন হইতে
লি-কিয়াঙ-জো তাহার সহিত মিলিত হইবার চেষ্টা করিয়া-
ছিল, কিন্তু তাহার অভিযান ব্যর্থ হইয়া যায়। ব্যর্থমনােরথ
হইয়া লি-কিয়াঙ একাকী দুইটী বােমা লইয়া কোয়াটুঙ ও
কোয়াঙসি এই প্রদেশের শাসনকর্তাকে তাহাদের বাড়ীতেই
হত্যা করিতে যায়। দুর্ভাগ্যবশতঃ নিক্ষিপ্ত বােমা ফাটিল
এবং লি-কিয়াঙ ধরা পড়িল। বিচারে লি-কিয়াঙের ফাসী
হইল। চীন গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় লি-কিয়াঙ দ্বিতীয় শহীদ।
লি-কিয়াঙ ও লো-কু-টাঙের মৃত্যুতে চীনের বিপ্লবের কাৰ্য্যে
যে ক্ষতি হইয়াছিল, তাহা সত্যই পরিপূরণ হইল। এমন
দুইটী নিভীক সত্য-তেজদীপ্ত দেশ-সেবক আমরা হারাইলাম
বটে, কিন্তু তাহাদের অমর আত্মা আমাদের কাজে নব-শক্তির
প্রেরণা আনিয়া দিল। আমার স্মরণে তাহারা দুইটী বন্ধু
চিরজাগ্রত হইয়া আছে ; যদিও তাহারা আজ আর আমার
পাশে নাই, তবুও তাহাদের স্মৃতি আমার বুকের চারিদিকে
ঘুরিয়া বেড়াইতেছে।
১৯০০ সালে এই আমাদের দ্বিতীয় পরাজয়। কিন্তু
আমাদের এই দ্বিতীয় পরাজয়ের ফলে আমরা দেশবাসীর
নিকট নুতন রূপে দেখা দিলাম। আমরা প্রথম বারে যখন
;
৪৩

সান-ইয়াৎ-সেন বিপ্লব ঘােষণা করি, তখন লােকে আমাদের লুণ্ঠনকারী দস্যু বলিয়া জানিত। তাহার অধিক সম্মান দেশবাসী আমাদের দেয় নাই। আমাদের লােকে অভিশাপ দিয়াছে, দেবতার নিকট আমাদের মৃত্যু-কামনা করিয়াছে—বিষধর কালকূটের মত আমাদের সঙ্গ পরিত্যাগ করিয়াছে। কিন্তু আমাদের এই দ্বিতীয় পরাজয়ের সময় দেখা গেল যে, আগেকার মত এক দল লােক অবশ্য আমাদের তেমনই অভিশাপ দিতে লাগিল, কিন্তু এক দল শিক্ষিত চীন আমাদের পরাজয়ে দুঃখিত হইয়া আমাদের সহানুভূতি জ্ঞাপন করিল। তাহাদের সহানুভূতির মধ্য দিয়া আমি স্পষ্ট বুঝিতে পারিলাম, গভীর তন্দ্রা হইতে চীন যে ধীরে ধীরে জাগিতেছে—ইহা তাহারই লক্ষণ। দিন বিজয়ীর বেশে জগতের আটটী সর্বশ্রেষ্ঠ শক্তি পিকিঙে প্রবেশ করিল, রাজ-প্রতিনিধি এবং রাজ-পরিবারের সকল লােক যখন ভয়ে আত্মগােপন করিল, সেই দিন হইতেই চীন- সাধারণ স্পষ্টই বুঝিতে পারিল যে, মাঞ্চু সম্রাট সত্যই বিশ্ব- সম্রাট নয়। মাঞ্চু-রাজশক্তির শূন্যগর্ভ শক্তির পরিচয় চীন- সাধারণ ধীরে ধীরে বুঝিতে আরম্ভ করিল। মাঞ্চু-সম্রাট দশ কোটী চীন-মুদ্রা ক্ষতিপূরণ দিয়া বিদেশীদের সহিত সন্ধি- স্থাপন করিতে বাধ্য হইল। এদিকে চীনের জনসাধারণের অবস্থা প্রতিদিনই শােচনীয় হইয়া উঠিতেছিল। দেশ- মাতৃকার আকাশকে ছাইয়া দুর্ভিক্ষ ও দুর্দিনের কাল ছায়া ফুটিয়া উঠিল। শিক্ষিত চীনেরা স্পষ্টই বুঝিতে পারিলেন যে ৪৪ সান-ইয়াৎ-সেন যে, চীন অধঃপতনের শেষ সীমায় আসিয়া পৌছিয়াছে। এই- খান হইতে চীনে বিপ্লবের এক নূতন প্রবাহ দেখা দিল। এই সময় চীনের প্রত্যেক প্রদেশ হইতে দলে দলে ছাত্ররা জাপানে পড়িতে আসিতেছিল। টোকিওতে যে-সমস্ত যুবক- ছাত্র আসিয়া পড়িতেছিল, তাহাদের মধ্যে অনেকেই পুরাতন চীনের সংস্কারের বােঝা হইতে মুক্ত ছিল এবং তাহারা অতি অল্প সময়ের মধ্যে বিপ্লবের প্রয়ােজনীয়তাকে স্বীকার করিয়া লইয়া আমাদের দলে যােগদান করিল। জাপানে সমস্ত প্রবাসী চীনা ছাত্রদের মন বিপ্লবের নিকট পূর্ণভাবে আত্ম- নিবেদন করিয়াছিল। নব-উৎসবে প্রবাসী ছাত্রদের বাৎসরিক সম্মেলনে লু-চেন-উই নামে এক ছাত্র মাঞ্চু রাজবংশকে উচ্ছেদ করিবার জন্য প্রকাশ্য ভাবে বিপ্লবের কথা আলােচনা করে। তাহার ফলে তাহাকে টোকিও বিশ্ববিদ্যালয় হইতে তাড়াইয়া দেওয়া হয়। প্রবাসী চীনা ছাত্ররা খবরের কাগজ বাহির করিয়া বিপ্লবের মন্ত্র প্রচার করিতে লাগিল। প্রবাসী ছাত্রদের এই বিপ্লব আন্দোলনের সংক্রামক প্রভাব স্বদেশের ছাত্রদের মধ্যে গিয়া পড়িল। স্যাংহাইতে ছাত্ররা খৃষ্টান কাগজগুলির মারফৎ বিপ্লবের বাণী প্রচার করিতে লাগিল এবং তাহার ফলে বিদেশী দূতাবাসের মধ্যে থাকিয়াও চীন-সরকারের অনুরােধে তাহারা ধৃত ও কারারুদ্ধ হইতে লাগিল। ফরমােস হইতে আমি পুনরায় জাপানে প্রবেশ ৪৫

সান-ইয়াৎ-সেন
করিলাম এবং সেখানে দলগুলি সঙঘবদ্ধ করিয়া মনস্থ
করিলাম যে, পুনরায় আমেরিকা ও ইয়ােরােপ প্রদক্ষিণ করিয়া
আসিব।
১৯০৫ সালের বসন্তকালে আমি আবার ইয়ােররাপে
পদার্পণ করিলাম। এবার ইয়ােরােপের প্রবাসী ছাত্রদের মধ্যে
আসিয়া দেখি, বিপ্লবের ঢেউ বহু পূর্বে আসিয়া লাগিয়াছে।
ইয়ােরােপের প্রবাসী চীনা-ছাত্রদের লইয়া আমি সে
শহরে প্রথম সভা আহ্বান করি। জাপানে থাকিবার সময়
আমি “United League"—“মিলিত দল” নাম দিয়া নূতন
করিয়া একটা দল গঠন করি ; ইয়ােরাপের বিভিন্ন শহরে
সেই লীগের শাখা-সমিতি স্থাপন করিতে লাগিলাম।”
United League প্রতিষ্ঠা করিবার সঙ্গে সঙ্গেই আমার
মনে চীনের ভবিষ্যৎ বিপ্লবপন্থার সম্বন্ধে নূতনতর আশার
স্পন্দন জাগিয়া উঠে। ইহার পূর্বে জীবন বারে বারে বিপদের
ভারে নুইয়া পড়িয়াছে—দেশে বিদেশে লােকে আমাকে শুধু
গ্লানি আর তীব্র অপমানের পুরস্কার দিয়াছে। আমার
আশাকে স্বপ্ন বলিয়া লােকে হাসিয়া উড়াইয়া দিয়াছে। বারে
বারে ব্যর্থ ও পরাজিত হইয়াছি, তবুও বিপ্লবের লক্ষ্য স্থির
৪৬

;
সান-ইয়াৎ-সেন
রাখিয়া ক্রমান্বয় চলিয়াছি; কিন্তু তবুও এত দিন পর্যন্ত মনে
সত্য সত্যই কোনও দিন ভাবিতে পারি নাই যে, জীবনে মাঞ্চু-
রাজবংশকে সিংহাসনচ্যুত দেখিয়া যাইতে পারি। কিন্তু
১৯০৫ সালে United League প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে আমার
মনে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মিল যে, আমার জীবনের মধ্যেই এই কাজ
সমাপ্ত করিয়া যাইতে পারিব। সেই সময় এক গণতান্ত্রিক
চীনের বস্তু-রূপ আমার মনে গড়িয়া উঠে এবং আমাদের
দলের প্রত্যেক সভ্যকে আমি সেই গণতান্ত্রিক চীনের স্বরূপ
বুঝাইতে লাগিলাম। তাহাদিগকে বলিয়া দেওয়া হইল যে,
তাহারা চীনের যে-কোনও প্রদেশে ফিরিয়া যাক না কেন,
এই নূতন চীনের কথা যেন প্রচার করিয়া বেড়ায়।
এক বৎসর যাইতে না যাইতেই আমাদের United
League-এ দশ হাজার সভ্য হইয়া উঠিল । চীনের প্রত্যেক
প্রদেশে শাখা-সমিতি প্রতিষ্ঠিত হইল এবং ইহার পর হইতে
এই সমস্ত শাখা-সমিতির মধ্য দিয়া চীনের অভ্যন্তরে
বিদ্রোহের কাজ দ্রুতবেগে চলিতে লাগিল।
এই সময় আমাদের সৌভাগ্যবশতঃ বিদেশীরাও আমাদের
ভাল চোখে দেখিতে লাগিল। একবার যখন আমি উ-সুঙ
প্রদেশের মধ্য দিয়া জাপানে যাইতেছিলাম, সেই সময় আমার
সহিত এক ফরাসী সৈন্যাধ্যক্ষের আলাপ হয়। চীন-বিপ্লবীদের
শ্রদ্ধা জানাইয়া তিনি আমাকে জানাইলেন যে, প্রয়ােজন হইলে
সৈন্য ও উপযুক্ত সেনাপতি দিয়া তাহারা চীন বিপ্লবের কাজে
৪৭

সান-ইয়াৎ-সেন
সম্পূর্ণ সহায়তা করিতে স্বীকৃত আছেন। তাহার সহিত
পরামর্শ করার পর তিনি আমাকে কয়েকজন সমর-দক্ষ সেনা-
পতি দিতে স্বীকৃত হইলেন। সেই সময় চীনের বিভিন্ন প্রদেশে
বিদ্রোহের জন্য নূতন করিয়া সৈন্যদল গড়িয়া তােহইতেছিল।
Tientsin-এর এক গির্জায় ফরাসী সেনাপতিদের সহিত
আমাদের দলের এক গােপন-সভা বসিল এবং সেই সভায়
স্থিরীকৃত হইল যে, নূতন সৈন্যদের গঠন করিবার জন্য প্রদেশে
প্রদেশে ফরাসী সেনাপতিদের পাঠান হউক। ফরাসী সেনা-
পতিরা তাহাতে রাজী হইলেন।
এই সমস্ত ব্যাপার ক্রমশঃ জানাজানি হইয়া গেল। চীন
সরকার ফরাসী সেনাপতিদের পিছনে এক এক জন বিদেশী
গােয়েন্দা নিয়ােগ করিলেন। এই সব লােক চীন-বিপ্লবের বন্ধু
সাজিয়া ফরাসী সেনাপতিদের সঙ্গে আসিয়া জুটিল। বিদেশী
মনে করিয়া ফরাসী সেনাপতিরা লােকটীকে ভিতরের ব্যাপার
সমস্ত জানাইয়া ফেলে। চীনা-সরকার সমস্ত ব্যাপার জানিতে
পারিয়া তৎক্ষণাৎ ফরাসী গভর্ণমেন্টের প্রতিনিধির কাছে
এই ব্যাপারের প্রকারের জন্য লিখিয়া পাঠাইলেন। ফরাসী
গভর্ণমেন্টের প্রতিনিধি এ সমস্ত ব্যাপার কিছুই জানিতেন না।
তিনি যখন এই সমস্ত ব্যাপার জানিতে পারিলেন, তখন তিনি
ব্যাপারটাকে চাপাচুপি দিবার জন্য ফরাসী সেনাপতিদের
ডাকিয়া লইলেন। এই সময় আমাদের দলের কয়েকজন
নেতা ধরা পড়ে এবং তাহাদের প্রত্যেকের ফাসী হয়।
৪৮

সান-ইয়াৎ-সেন
United League হইতে চীনের প্রত্যেক প্রদেশে নূতন
নূতন কাগজ বাহির হইতে লাগিল। এই সমস্ত কাগজের মধ্য
দিয়া গণতান্ত্রিক চীনের গঠন-মুলক আমার “তিনটী নীতি” এবং
“পাঁচ স্তরে বিভক্ত শাসন-তন্ত্রের কথা চীনের সর্বত্র প্রচারিত
হইতে লাগিল। একটা নূতন ভাবের বিপুল প্রবাহ চীনের
মুহ্যমান্ অন্তরকে আবার আলােড়িত করিয়া তুলিল। এই সময়
চীন-বিপ্লবের অন্যান্য বিভাগের নেতারাও আমাদের সহিত
যােগদান করিলেন। ভাষা, সাহিত্য, রাজনীতি, সমাজনীতি, এই
সমস্ত ব্যাপারে এক তুমুল বিপর্যয় আসিয়া উপস্থিত হইল।
১৯০৭ সালে তখন আমি জাপানে টোকিও শহরে। সেই
সময় চীনে পিনলিতে আবার বিদ্রোহ ঘােষণা করা হইল।
United League-এর সভ্যদের মধ্য হইতে সৈন্যদল গড়িয়া
তােলা হইয়াছিল এবং তাহারা বাহিরের সহায়শূন্য হইয়াই
চীন সরকারের সৈন্যদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘােষণা করে। চীনে
যখন আমাদের দলের সভ্যরা অস্ত্র হাতে বিপ্লব ঘঘাষণা করিল,
তখন টোকিওতে আমাদের দলের সভ্যরা উত্তেজিত হইয়া
উঠিল। প্রতিদিন তাহারা আসিয়া কোনও উপায়ে তাহাদের
পিনলিতে পৌছাইয়া দিবার ব্যবস্থা করিবার জন্য আমাকে
রীতিমত পীড়াপীড়ি করিতে লাগিল। আমার বেশ মনে আছে,
যুদ্ধ-স্থলে যাইতে পারিল না বলিয়া আমাদের দলের অনেক
লােক তখন শিশুর মত কাঁদিয়া উঠিয়াছিল।
দুঃখের বিষয়, আমি যখন পিনলির বিদ্রোহের যথাযথ
৪৯
৪

সান-ইয়াৎ-সেন খবর পাইলাম, তখন বাহির হইতে সাহায্য পাঠাইয়া যুদ্ধে জয়লাভ করিবার সময় ও সুবিধা চলিয়া গিয়াছে। পিনলিতে আমরা হারিয়া গেলাম এবং অধিকাংশ নেতাই ধরা পড়িলেন এবং তাহাদের সকলেরই ফাসী হয়। United Leagueএর এই প্রথম যুদ্ধ ঘােষণা। সেই সময় আমার গতিবিধির বিষয় জানিতে পারিয়া চীন- সরকার জাপান গভর্ণমেন্টকে লিখিয়া পাঠাইলেন যে, আমাকে ও আমার পার্শ্বচর সকলকে যেন অবিলম্বে জাপান হইতে নির্বাসিত করিয়া দেওয়া হয়। দুই জন সঙ্গীকে লইয়া আমি জাপান পরিত্যাগ করিয়া আনামে আসিয়া উপস্থিত হইলাম। সেইখানে নূতন করিয়া সৈন্যদল গঠন করিয়া চাও-চাউতে দ্বিতীয়বার যুদ্ধ-ঘােষণা করিলাম। কিন্তু এবারেও পরাজিত হইলাম। সেখান হইতে সরিয়া গিয়া হুচাওতে পুনরায় যুদ্ধ-ঘােষণা করিয়া চতুর্থবার পরাজিত হইলাম। সেই সময় লিয়ান ও সিয়ান প্রদেশে কর-দেওয়া-বন্ধ উপলক্ষ্য করিয়া বিদ্রোহ দেখা দিল। দুই জন সেনাপতির অধীনে চার হাজার চীন সৈনিক এই বিদ্রোহ দমন করিবার জন্য পাঠান হয়। আমি সেই সময় আমার দুই জন পার্শ্বচরকে উক্ত দুই সেনাপতির শিবিরে পাঠাইলাম, নির্ভয়ে প্রস্তাব করিতে যে, তাহারা যেন তাহাদের সৈন্যবল লইয়া বিপ্লবীদের সহিত যােগদান করেন। ইহার ফলে এই দুই সেনাপতি আমাদের সাহায্য করিতে রাজী হইলেন এই ৫০ সান-ইয়াৎ-সেন শর্তে যে, যদি আমরা একটা স্থায়ী বিদ্রোহী সৈন্যদল গড়িয়া তুলিতে পারি। উক্ত দুই প্রদেশে একটা ভালরকম সৈন্যদল গঠন করিবার জন্য আমি দুই জন লােককে পাঠাইলাম এবং জাপান হইতে অস্ত্রশস্ত্র কিনিবার জন্যও একটী দল পাঠাইলাম। সেই সময় আনাম হইতে কয়েকজন ফরাসী সেনাপতি আসিয়া আমাদের সহিত যােগদান করেন এবং আমাদের সৈন্যদল গড়িয়া তুলি- বার জন্য প্রভূত সহায়তা করেন। আমাদের ইচ্ছা ছিল, দক্ষিণ চীনের সীমান্ত প্রদেশের বন্দরগুলি দখল করিয়া লইয়া সেই- খান হইতে চীনে প্রবেশ করা। প্রায় দুই হাজার লােকের জন্য অস্ত্রশস্ত্র আসিয়া পড়িল এবং আরও দুই হাজার লােকের জন্য পুনরায় জাপানে লােক পাঠান হইল। অন্ত্রের আগমন আশায় এই দুই হাজার লােকই ফানচেন আক্রমণ করিল, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশতঃ অস্ত্র আসিয়া পড়িল না। যে দুই জন চীন সেনাপতি আমাদের সৈন্যদলে যােগদান করিবেন বলিয়া প্রতিশ্রুত ছিলেন, তাহারা আমাদের সৈন্যবল দেখিয়া ভরসা পাইলেন না এবং আমরা পরাজিত হইলে তাহাদের যে রাজশক্তির নিকট প্রচুর নির্যাতন সহিতে হইবে, সেই আশঙ্কায় তাহারা আমাদের দলে যােগদান করিলেন না। এই সমস্ত কারণে এবারেও আমাদের সৈন্যদল বিপর্যস্ত হইয়া প্রত্যাবর্তন করিল। ইহাই আমাদের পঞ্চম পরাজয়।

সান-ইয়াৎ-সেন
সিয়ান প্রদেশে আমাদের অভ্যুত্থান ব্যর্থ হওয়ায় আমি
স্বয়ং কয়েকজন ফরাসী সেনাপতির সহিত মাত্র এক শত সৈন্য
লইয়া চেন-নান-কুয়াং প্রদেশের তিনটী দুর্গের উপর আক্রমণ
করিলাম এবং আমাদের এই অতর্কিত আক্রমণের ফলে এই
তিনটী দুর্গই আমাদের করতলগত হয়। সেখানকার সমস্ত
সৈন্য আমাদের দলভুক্ত হয়। আমি ভাবিয়াছিলাম যে, আমা-
দের পরাজিত সৈন্যদল চেন-নান-কুয়াং প্রদেশের নিকটেই
আছে। যদি কোনও রকমে চেন-নান-কুয়া দুর্গ আমি
অধিকার করিয়াছি শুনিতে পায়, তাহা হইলে তাহারা তৎক্ষণাৎ
আমার সহিত যােগদান করিবে; কিন্তু আমাদের পরাজিত
সৈন্যদল এত দূরে ছিল যে, সরকারী সৈন্য আসিয়া পড়িবার
আগে তাহারা আমাদের সহিত যােগদান করিতে পারিল
। সাত দিন ধরিয়া মাত্র এক শত সৈন্য লইয়া যুঝিলাম।
কিন্তু
অবশেষে বিধ্বস্ত
হইয়া আমি ছদ্মবেশে আনামে
পলাইয়া আসিলাম। আনাম হইতে হানুই দ্বীপে যাইবার
পরে এক জন গুপ্তচর আমাকে চিনিয়া ফেলে এবং চীন
গভর্ণমেন্টের তরফ হইতে ফরাসী সরকারকে জানান হইল,
আমাকে যেন হামুই হইতে নির্বাসিত করা হয়। হাই
হইতেও আমি নির্বাসিত হইলাম। এই আমাদের ষষ্ঠ
পরাজয়।
৫২

হাই হইতে চলিয়া আসিবার পর পুনরায় লিয়ান ও সিয়ান প্রদেশ আক্রমণ করিবার জন্য নূতন করিয়া বন্দবস্ত করিতে লাগিলাম। সেই সময় হুকাউ প্রদেশ অধিকার করিয়া য়ুনানের দিকে অগ্রসর হইবার জন্য আমি হুয়াং-মিং- টাঙকে ভার দিয়া পাঠাইলাম! আনাম হইতে হুয়াং-কাই- সিয়াঙ দলবল লইয়া হুয়াং-মিং-টাঙকে সাহায্য করিতে চলিল। হুয়াং-কাই-সিয়া তাহার অপূর্ব সামরিক প্রতিভার সাহায্যে এই সময় যে অসামান্য বীরত্ব দেখান, তাহা চীনের স্বাধীনতার ইতিহাসে চিরসমুজ্জ্বল থাকিবে। কিন্তু বেশী দূর অগ্রসর হওয়া সম্ভবপর হইল না। লােক ও রসদের অভাবে হুয়াং-কাই-সিয়াকে বাধ্য হইয়া প্রত্যাবর্তন করিতে হইল। এই আমাদের সপ্তম পরাজয়। আমি যখন সিনচাউ আসিয়া পৌছিলাম, তখন হুয়াং-মিং টাঙ মাত্র এক শত জন সৈন্য লইয়া হুকাউ দখল করিয়া লয়। সেখানকার সরকারী কর্মচারীদের গুলি করিয়া মারিয়া ফেলা হয় এবং সেখানকার এক হাজার সৈন্য আমাদের দলে আসিয়া যােগদান করে। আমার যােগদানের আশায় সে যখন অপেক্ষা করিতেছিল, তখন আমি ছদ্মবেশে ফরাসী অধিকারভুক্ত প্রদেশগুলির মধ্য দিয়া চীনে প্রবেশ করিতে সান-ইয়াৎ-সেন চেষ্টা করিতেছিলাম। সে চেষ্টা অসম্ভব মনে হওয়ায় আমি আমার স্থলে হুয়াঙ-কাই-সিয়াঙকে পাঠাইলাম। হুয়াঙ-কাই-সিয়াঙ কিছু দূর অগ্রসর হইতে না হইতে চীন- সরকারের আদেশে ফরাসী সরকার হুয়াঙকে চীনে প্রবেশ করিতে বাধা দিল। অন্য দিকে হুকাউতে এক মাস ধরিয়া সরকারী সৈন্যদের সঙ্গে অনবরত যুদ্ধ করিয়া হুয়াং-মিং-টাং শ্রান্ত হইয়া আসিতেছিল। বাহির হইতে তাহার সহিত যােগদান করিতে না পারার ফলে হুয়াং-মিং-টাঙকে বাধ্য হইয়া আনামে পলাইয়া আসিতে হইল। এই আমাদের অষ্টম পরাজয়। হুয়াং-মিং-টাঙের সহিত দুই শত চীন বিপ্লবীও আনামে আসিয়াছিল, কিন্তু পিকিঙ সরকারের কথামত ফরাসী সরকার এই বিপ্লবীদের আনাম হইতে নির্বাসিত করিয়া দেয়। ফরাসী গভর্ণমেন্ট চীন-বিপ্লবীদের অনেক সময় তাহাদের অধিকৃত প্রদেশ হইতে নির্বাসিত করিতে বাধ্য হইয়াছিলেন । কিন্তু তাহা বলিয়া তাহারা চীন বিপ্লবীদের দ্য বলিয়া ঘােষণা করেন নাই। আনাম হইতে নির্বাসিত হইয়া এই দুই শত চীন-বিপ্লবী সিঙ্গাপুরে যায়। সেখানকার ইংরাজ শাসনকর্তা তাহাদের সাধারণ দ্য আখ্যা দিয়া নামিতে দেয় নাই। সেই সময় সেখানকার ফরাসী প্রতিনিধির মধ্যস্থতায় অবশেষে তাহাদের সিঙ্গাপুরে নামিতে দেওয়া হয়। এই সময় এই সমস্ত উপযুপরি পরাজয়ে একান্ত হতাশ ৫৪ সান-ইয়াৎ-সেন হইয়া চিঙ-উই মাত্র কয়েকজন সঙ্গী লইয়া পিকিঙে রওয়ানা হয়। তাহার বাসনা ছিল, পিকিং সরকারের রাজ-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা। পিকিঙে কিন্তু চিঙ-উই ধরা পড়ে এবং কারারুদ্ধ হয়। United League প্রতিষ্ঠার আগে পর্যন্ত আমাদের কেইই বড় একটা অর্থ দিয়া সাহায্য করে নাই। যাহারা সাহায্য করিয়াছিলেন, তাঁহারা সকলেই আমার বন্ধু এবং ব্যক্তিগতভাবে তঁাহারা আমাকেই দান করিয়াছিলেন। তখন আমাদের সাহায্য করিতে লােকে ভয় পাইত। কিন্তু United League প্রতিষ্ঠার পর হইতে আমরা বাহির হইতে সাহায্য পাইতে লাগিলাম। সেই সময় বাহির হইতে চীন- বিপ্লবের কার্যের জন্য যাহারা সাহায্য করিয়াছিলেন, তাহাদের মধ্যে প্যারিসে অবস্থিত চাঙ-সিন-সিয়াঙের নাম সর্বপ্রথম উল্লেখ করিতে হয়। চীনের জাতীয় আন্দোলনের সহায়তার জন্য তিনি তাহার সমস্ত কলকারখানা বিক্রয় করিয়া আমাদের সত্তর হাজার ডলার দান করেন। আনাম হইতে হুয়াঙ-সিন-না তাঁহার ব্যবসায় সঞ্চিত সমস্ত অর্থ আমাদের দান করেন। ক্রমশঃ আমার অবস্থা অত্যন্ত বিপদসঙ্কুল হইয়া উঠিতে লাগিল। চীনের কাছাকাছি থাকিয়া আন্দোলনের কাৰ্য পরিচালনা করা অসম্ভব হইয়া উঠিল। হংকং, আনাম, জাপান প্রত্যেক জায়গায় আমার বিরুদ্ধে নির্বাসন-দণ্ডাজ্ঞা প্রচারিত হইল। নিরুপায় হইয়া আমি পুনরায় চীন সান-ইয়াৎ-সেন বিপ্লবের অর্থ ও রসদ-সংগ্রহের জন্য বিশ্ব-পরিভ্রমণে বাহির হইয়া পড়িলাম। হুয়াংকাই-সিয়াঙের উপর দলের নেতৃত্বের ভার ন্যস্ত হইল। [ সানের এই সমস্ত ভ্রমণের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল, অর্থ- সংগ্রহ করা। সান একা এই ভাবে প্রায় তিন কোটী পঁচাত্তর লক্ষ টাকা সংগ্রহ করেন। অথচ তাহার নিজের পােষাক কিনিবার মত টাকা তাহার নিকট থাকিত না।] সেই সময় হুয়াংকাই-সিয়াঙ হংকংএ নূতন করিয়া সমস্ত দল সংগ্রহ করিয়া পুনরায় কোয়াংটুঙ প্রদেশে যুদ্ধ-ঘােষণা করে। এই যুদ্ধে আমাদের ভীষণ পরাজয় হয় এবং আমাদের দলের অনেক প্রধান ব্যক্তি এই যুদ্ধে আত্মদান করেন। এই আমাদের নবম পরাজয়। আমি সানফ্রানসিসকোতে পৌছিয়া এই পরাজয়ের খবর পাইলাম। এই অবস্থায় বাহিরে আর থাকা উচিত নয় ভাবিয়া আমি চীনে ছদ্মবেশে প্রবেশ করিবার জন্য ফিলিপাইন দ্বীপ হইয়া জাপানে প্রবেশ করিলাম। কিন্তু জাপানে প্রবেশ করিতে না করিতেই আমাকে গােয়েন্দারা চিনিয়া ফেলিয়া আমার অনুসরণ করিতে লাগিল। মুহূৰ্ত মাত্র বিলম্ব না করিয়া জাপান ছাড়িয়া আনামে আসিলাম। সেখানে আসিয়া হুয়াঙ-কাই-সিয়াঙ এবং দলের অবশিষ্ট নেতাদের সহিত দেখা হইল। তাহাদের অবস্থা দেখিয়া আমি শঙ্কিত হইয়া উঠিলাম। বারংবার পরাজয়ে তাহাদের সকল আশা একে- ৫৬

সান-ইয়াৎ-সেন
বারে শূন্যে মিশাইয়া গিয়াছে ; সমস্ত দল ছত্রভঙ্গ হইয়া
গিয়াছে। সিচুয়ান প্রদেশে অবশিষ্ট বিপ্লবী সৈন্যদল অনশনে
দিন কাটাইতেছে, সমুচিত অর্থ না পাঠাইলে তাহারাও ছত্রভঙ্গ
হইয়া পড়িবে। সকলেই নিরুৎসাহ হইয়া একবাক্যে
বলিল, “আমাদের আহার জুটিতেছে না, কি করিয়া এত
বড় বিদ্রোহের খােরাক জুটিবে ?” শেষ-শক্তি-সংগ্রহ
করিয়া সকলের
অন্তরের নির্বাপিত শিখাকে পুনরায়
জ্বালাইয়া ধরিয়া বলিলাম, “বন্ধু, এই পথে এমনি চলিতে
হইবে, ভবিষ্যতের সমস্ত অর্থ ও রসদ আমি সংগ্রহ করিতেছি।”
সেই দিন প্রবাসী চীনাদের সহিত দেখা করিয়া তাহাদের
আহ্বান করিলাম। সেই সভাতেই ষাট হাজার ডলার
সংগৃহীত হইল। দলের সকলের মনে আবার আশার সঞ্চার
দুঃস্থ সৈন্যদের তৎক্ষণাৎ অর্থ পাঠান হইল এবং
ছত্রভঙ্গ দল পুনরায় গড়িয়া উঠিতে লাগিল।
এই সময় এক নূতন ভাবে আক্রমণের পন্থা চিন্তা করিয়া
আমি ডাচ উপনিবেশে গমন করিলাম। কিন্তু তাহারাও আমাকে
নামিতে দিল না। তখন আমার চারিদিকে চীন সরকারের
নিয়ােজিত গােয়েন্দার দল আহার নিদ্রা ত্যাগ করিয়া ঘুরিয়া
বেড়াইতেছিল। কোথাও নিরাপদে নামিবার পথ না পাইয়া
পুনরায় আমেরিকা রওয়ানা হইলাম। আমেরিকার এক
প্রান্ত হইতে আর এক প্রান্ত পর্যন্ত চীন বিপ্লবের বাণী
বহন করিয়া ঘুরিয়া বেড়াইতে লাগিলাম।
এই সময়
হইল।

সান-ইয়াৎ-সেন
আমেরিকার প্রবাসী চীনরা প্রভূতভাবে চীন বিপ্লবের জন্য
তার্থ সাহায্য করেন।
এই সময় সৈন্য-সহায়-শূন্য হইয়া মাত্র বাহাত্তর জন মৃত্যু
পণকারী দুর্জয় সাহসী চীন যুবক কোয়াঙটুঙে প্রকাশ্য বিদ্রোহ
ঘঘাষণা করিল। তাহারা পরাজিত হইয়াছিল, কিন্তু এই
বাহাত্তর জন বীরের অসমসাহসিকতা চীন জনগণের মনে সে
দিন যে অভিনব আশার স্পন্দন আনিয়া দিয়াছিল, তাহারই
প্রেরণায় অচিরেই চীনে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু তাহা
হইলেও এই আমাদের দশম পরাজয়।
এই পরাজয়ের পর ঠিক হইল যে,অন্য দিক দিয়া আক্রমণ
করিতে হইবে। তখন হানাউতে চীন সরকার নূতন
করিয়া সৈন্যদল গঠন করিতেছিল। এই সৈন্যদের মধ্যে
প্রচারকাৰ্য্য আরম্ভ করা হইল। ইতিমধ্যে এই সমস্ত
বিপ্লবের ফলে চীন জনসাধারণের মনে চীন-বিপ্লবীদের
সম্বন্ধে ধারণা একেবারে বদলাইয়া গিয়াছিল এবং লােকে
প্রকাশ্য ভাবে তখন বিপ্লবীদের সাহায্য করিতে লাগিল।
ক্রমশঃ চীন-সাধারণের মধ্যে বিদ্রোহের বীজ এত দূর সংক্রমিত
হইয়া উঠিল যে, চীন-সরকার সত্য সত্যই ভীত হইয়া
উঠিলেন।
চীনের দক্ষিণের প্রধান প্রধান সৈন্যদের আডডাস্থলে
প্রচারকার্যের ফলে চীন সৈন্যদের মধ্যেও পরিপূর্ণ ভাবে
বিদ্রোহের বীজ ছড়াইয়া পড়িল। চীন-সরকার আপনার

সান-ইয়াৎ-সেন
সৈন্যদের অবিশ্বাস করিতে লাগিলেন এবং উচাং প্রদেশে
সৈন্যদের জাগরণ আশঙ্কায় দক্ষিণ-চীনের প্রতিনিধি “কোন
বিদেশী” উপনিবেশের কর্তার সহিত বন্দবস্ত করেন যে,
যদি সৈন্যরা বিদ্রোহী হইয়া উঠে তিনি যেন তাহার সৈন্যদল
লইয়া এই নগর আক্রমণ করেন।
এই সময় দুর্ভাগ্যক্রমে আমাদের আড্ডাস্থল সরকারী
পুলিশ জানিয়া ফেলে এবং ত্রিশ জন নেতা ধরা পড়েন।
সেই সঙ্গে সঙ্গে দলের সমস্ত কাগজপত্রও চীন-সরকারের হাতে
গিয়া পড়ে। এই সমস্ত কাগজে চীন রাজসৈন্যদের গতিবিধি
ও নামধাম সমস্তই ছিল। সমস্তই নষ্ট হইয়া যায় দেখিয়া
সেই দিনই অবশিষ্ট নেতারা বিদ্রোহ ঘােষণা করিয়া দেন এবং
প্রথমেই স্থানীয় শাসনকর্তার বাড়ী আক্রমণ করা হয়। গভর্ণর
জুই-চেন কামানের অকস্মাৎ গর্জন শুনিয়া ভীত হইয়া পলা-
য়ন করিয়া সেই “বিদেশী” রাজপ্রতিনিধির আশ্রয় গ্রহণ
করিয়া তাহাকে নগর আক্রমণ করিতে বলেন। কিন্তু এই
সময় এক আন্তর্জাতিক আইন চীন-বিপ্লবকে রক্ষা করে।
১৯০০ সালের শর্ত অনুযায়ী কোনও বিদেশী শক্তি একভাবে
চীনের আভ্যন্তরিক কোনও ব্যাপারে যােগদান করিতে পারে
। তাহার জন্য প্রয়ােজন সমস্ত বিদেশী রাজপ্ৰতিনিধি-
দের মিলিত ইচ্ছা। কাৰ্যবিধি ঠিক করিবার জন্য বিদেশী
প্রতিনিধিদের এক সভা বসিল। এই সময় আমি আমার
পুরাতন বন্ধু ফরাসী রাজপ্রতিনিধিকে গুপ্তভাবে প্রভাবান্বিত

সান-ইয়াৎ-সেন করি। সেই সভায় শুধু আমার নয়, চীন বিপ্লবের এই বন্ধুটী, সভাসমক্ষে প্রথম ঘােষণা করেন যে, সান-ইয়াৎ-সেনের এই বিপ্লবের সহিত বিদেশীদের কোনও যােগ নাই ; ইহার আপনাদের আভ্যন্তরিক সংগ্রামে লিপ্ত ; সেই জন্য বিদেশীদের এই যুদ্ধে কোনও পক্ষ অবলম্বন করা আন্তর্জাতিকতার দিক হইতে অন্যায়। এই সভায় অবশেষে স্থিরীকৃত হয় যে, এই ব্যাপারে কোন বিদেশী শক্তি কোনও পক্ষ অবলম্বন করিতে পারে না, করিবেও না। বিদেশী রাজপ্রতিনিধি চীন-শাসনকর্তাকে প্রতিশ্রুত সাহায্য- দানে বিমুখ হইলেন। তাহার ফলে দক্ষিণ চীনের শাসনকর্তা জিউ-চেন প্রাণভয়ে পলায়ন করিলেন। তাঁহার দেখাদেখি অন্যান্য কর্মচারীরাও পলায়ন করিল। বিদ্রোহী সৈন্যদল কালবিলম্ব না করিয়া এক প্রদেশ হইতে আর এক প্রদেশ দখল করিয়া চলিল। অতি অল্প সময়ের মধ্যে পনেরােটী প্রদেশ বিপ্লবীরা দখল করিয়া লইল। জিউ-চেন যদি প্রাণভয়ে না পলাইতেন, তাহা হইলে হয় ত চীন-বিপ্লবীরা অত সহজে চীনের অভ্যন্তরে প্রবেশ লাভ করিতে পারিতেন । তাই মনে হয়, চীন বিপ্লবের কাৰ্য্যে এই “দৈব সহায়”- টুকু অনেকখানি কাজ আগাইয়া দিল।

সান-ইয়াৎ-সেন যখন উ-চাউ প্রদেশে বিদ্রোহী দল প্রবেশ করিয়াছে, তখন আমি কলম্বিয়া আসিয়া পৌছিয়াছি। ইহার দশ দিন পূর্বে আমি গুপ্ত হরফে একখানি টেলিগ্রাম পাই। গুপ্ত হরফের অভিজ্ঞানলিপিগুলি আমার বিছানাপত্রের সঙ্গে থাকার দরুণ টেলিগ্রামটী পথে পড়িতে পারি নাই। হুয়ানসিয়া জানাই- আছে যে, নূতন সরকারী সৈন্যদলকে ভাঙ্গিয়া লইবার জন্য শীঘ্রই অর্থের প্রয়ােজন এবং অর্থের অপেক্ষায় তাহারা আপা- ততঃ বিদ্রোহ স্থগিত রাখিয়াছে। আমিও আপাততঃ উচাঙ প্রদেশে বিদ্রোহ স্থগিত রাখিবার জন্য এক টেলিগ্রাম পাঠাই- বার বন্দবস্ত করিলাম। তখন রাত্রি হইয়া আসিতেছিল, আর সমস্ত দেহও অবসন্ন হইয়াছিল। কলম্বিয়ার এক হােটেলে সে রাত্রি ঘুমাইয়া পড়িলাম। পরের দিন সকাল বেলা ঘুম ভাঙ্গিতেই দেখি, খবরের কাগজে বড় বড় অক্ষরে লেখা- বিপ্লবী সৈন্যদল বিজয়ী হইয়া উ-চাঙ প্রদেশে প্রবেশ করিয়াছে। কালবিলম্ব না করিয়া চীন-বিপ্লবের আভ্যন্তরিক কাৰ্য্য সাক্ষাৎভাবে পরিচালনা করিবার জন্য আমি সাংহাই-এ আসিয়া পৌছিলাম এবং এই নবীন দলের রাজনৈতিক জীবনের ভিত্তি-সংস্থাপনের জন্য আন্তর্জাতিক সুবিধাগুলির সুযােগ গ্রহণ করিবার মনস্থ করিলাম। এইখানে জগতের অন্যান্য জাতিদের সহিত বিদ্রোহী চীনের কিরূপ রাজনৈতিক সম্বন্ধ ছিল, তাহার আলােচনা সান-ইয়াৎ-সেন করা অপ্রাসঙ্গিক হইবে না। আমেরিকা চীন রাজসরকারকে মিত্র হিসাবে স্বীকার করিয়াছিল, এই শর্তে যে চীনে সমস্ত বিদেশীর বাণিজ্য করিবার সমান অধিকার থাকিবে। চীন বিপ্লবী দল সম্বন্ধে তখনও আমেরিকার কোনও মনােভাব গড়িয়া উঠে নাই। তবে আমেরিকার জনসাধারণ চীন বিপ্লবীদের যথেষ্ট শ্রদ্ধা করিত। ফরাসী গভর্ণমেন্ট এবং ফরাসীরা বরাবরই চীন-বিপ্লবকে সহানুভূতি দেখাইয়া আসিয়া- ছেন। ইংলণ্ডের জনসাধারণের এক অংশ চীন বিপ্লবকে ভাল চোখেই দেখিত, কিন্তু ইংরাজ সরকার সাক্ষাৎভাবে চীন- বিপ্লবীদের বিপক্ষে ছিল। জৰ্ম্মানী ও রুষিয়া চীন বিপ্লবীদের ভাল চোখে দেখিত না, বরং তাহারা মাঞ্চুরাজপরিবারের মিত্র হিসাবেই পরিগণিত হইত। একমাত্র প্রতিবেশী-শক্তি জাপানের উপর নবীন বিপ্লবী দলের সকল আশা-ভরসা গিয়া পড়িল। জাপানের বহু শক্তিশালী লােক আপনাদের জীবন দিয়া চীন- বিপ্লবের কাৰ্য্যে সহায়তা করিয়াছেন, কিন্তু জাপানী সরকারের মনােভাব তখনও স্পষ্ট কিছুই বােঝা যায় নাই। জাপানী সরকার একবার সানকে জাপান হইতে নির্বাসিত করিয়া দেন, আর একবার তাঁহাকে জাপানে নামিতে দেন নাই। ১৯২০ সালের শর্ত অনুযায়ী যে ছয়টী শক্তি সেই শর্তে স্বাক্ষরদান করে, তাহাদের কাহারও এককভাবে চীনে কোনও কাজ করিবার অধিকার ছিল না। এই ছয়টী শক্তির মিলিত মনােভাবের উপর তখন চীনের ভবিষ্যৎ নির্ভর করিতেছিল।

;
সান-ইয়াৎ-সেন
ফ্রান্স ও আমেরিকা চীন-বিপ্লবের দলে ছিল ; একমাত্র
ইংলণ্ডের মনােভাবের উপর তখন চীন বিপ্লবীদের সমস্ত আশা-
ভরসা নির্ভর করিতেছিল কারণ ইংলণ্ড চীন বিপ্লবীদের
সহায়তা করিলে জাপান ইংলণ্ডের অনুগামী হইবে। ইংরাজ
সরকারের সহিত সাক্ষাৎভাবে কথাবার্তা বলিবার জন্য সান
পুনরায় ইংলণ্ড যাইবার জন্য মনস্থ করিলেন।
ইংলণ্ডের পথে সেন্ট লুই-এর মধ্য দিয়া যাইবার সময়
এক খবরের কাগজে দেখিলাম, সা-ইয়াৎ-সেনের নেতৃত্বে
সমস্ত দক্ষিণ চীনে বিদ্রোহী সৈন্যদল জয়ী হইয়া উঠিতেছে।
উ-চুঙ প্রদেশ বিপ্লবীদের অধিকারভুক্ত হইয়াছে এবং দক্ষিণ
চীনে এক নূতন গণতন্ত্র গড়িয়া উঠিতেছেসান-ইয়াৎ-সেন এই
গণতন্ত্রের প্রথম সভাপতি নির্বাচিত হইয়াছেন। অবশ্য
আমি জানি যে, খবরের কাগজওয়ালারা আসল ব্যাপারের
অনেকখানিই আগাইয়া গিয়াছেন, তবুও তখন প্রেসওয়ালাদের
চোখ এড়াইবার জন্য আমাকে রীতিমত গােপনে চলাফেরা
করিতে হইত। নিউইয়র্কে আসিয়া খবর পাইলাম, ক্যান্টন
শহর আক্রমণ করিবার বন্দবস্ত চলিতেছে। নিউইয়র্ক হইতে
আমি ক্যান্টন শহরের শাসক চাঙ-নি-ইসির নিকট এক
টেলিগ্রাম পাঠাইয়া জানাইয়া দিলাম যে, যদি তিনি স্বেচ্ছায়
বিপ্লবীদের দলে আসিয়া যােগদান করেন, তাহা হইলে বহু
অনর্থক রক্তপাত রক্ষা পায় এবং তাহার এই কার্যের ফলে
তাঁহার জীবন ও মর্যাদা রক্ষা হইতে পারে। চা-নি-

সান-ইয়াৎ-সেন ইসি বিপ্লবীদের নিকট আত্মসমর্পণ করেন এবং বিপ্লবীরাও তাঁহার প্রাণরক্ষা করিয়াছিল । ইংলণ্ডে আসিয়া আমার ইংরাজি বন্ধুর (ডাক্তার ক্যানটাইল) সাহায্যে আন্তর্জাতিক ব্যাঙ্ক-সম্বের সহিত কথাবার্তা চালাইতে লাগাইলাম। সেই সময় ইংলণ্ড চীন- সরকারকে এক কোটী পাউণ্ড ধার দিয়াছিল এবং শীঘ্রই আর এক কোটী দিবার প্রতিশ্রুতি দিয়াছিল। আমার সর্বপ্রথম চেষ্টা হইল, এই ঋণ বন্ধ করিয়া দিবার বন্দবস্ত করা। বৈদেশিক রাষ্ট্র সচিবের সহিত তিনটী বিষয়ে কথাবার্তা চালাইতে লাগাইলাম। (১) মাঞ্চু-রাজশক্তিকে ঋণ দেওয়া বন্ধ করিতে হইবে। (২) জাপানকেও সাহায্যদানে বিরত করাইতে হইবে। (৩) ইংরাজ-অধিকৃত প্রদেশে আমার প্রবেশ সম্বন্ধে যে নিষেধাজ্ঞা আছে, তাহা তুলিয়া লইতে হইবে। এই তিনটী ব্যাপারেই বৃটীশ গবর্ণমেন্টের নিকট হইতে অনুকূল উত্তর পাইয়া আমাদের নূতন গণতন্ত্রকে ঋণ প্রদান করিবার জন্য আমি ব্যাঙ্ক-সম্বের কাছে আমার চতুর্থ আবেদন জানাইলাম। কিছুদিন পরে ব্যাঙ্ক-সঙ্ঘের পক্ষ হইতে উত্তর পাইলাম যে, “গবর্ণমেণ্ট মাঞ্চু-রাজ-সরকারকে ঋণ-প্রদান বন্ধ করিয়াছেন কিন্তু যত ক্ষণ পর্যন্ত তােমার গণতন্ত্র প্রকৃতপক্ষে প্রতিষ্ঠিত না হইতেছে, ততক্ষণ পর্যন্ত ঋণ-প্রদান স্থগিত থাকিবে।” ৬৪ তখন সান তঁাহার বন্ধু ডাঃ কান্টাইলের বাড়ীতে একটা ছােট ছেলের সঙ্গে খেলা করিতেছিলেন; এমন সময় ডাঃ কান্টাইল ছুটিয়া আসিয়া একখানি টেলিগ্রাম সানের হাতে দিলেন। “সতেরােটা প্রদেশের সম্মিলিত বিপ্লবী সঙ্ঘ (The Revolutionary Assembly of Seventeen Provinces”) তাহাদের বিজয়ের সংবাদ জানাইয়া গণতন্ত্রের প্রথম সভাপতিরূপে ডাঃ সানকে পুনরায় চীনে প্রত্যাবর্তনের জন্য আহ্বান করিয়াছেন। সান স্থির হইয়া টেলিগ্রামটী পড়িয়া নীরবে তাহা পুনরায় ডাঃ কাণ্টাইলের হাতে দিলেন। তাহার পর ছেলেটীর পিঠ চাপড়াইতে চাপড়াইতে যেন আপনার মনে বলিলেন,-“চীনে আছে আমার লক্ষ লক্ষ সহচর। আমার আদেশ তারা আজ পর্যন্ত যেমন প্রাণ-মন দিয়ে পালন করে এসেছে, আমি জানি মৃত্যুর দ্বার পর্যন্ত তারা আমাকে তেমনি অনুসরণ করবে।” ইংলণ্ডের কাজ শেষ করিয়া ফ্রান্সের মধ্য দিয়া স্বদেশের দিকে পুনরায় যাত্রা করিলাম। ফ্রান্সে অবস্থান কালে প্রধান মন্ত্রী ক্লেমসসা ব্যক্তিগতভাবে আমার ও আমাদের বিপ্লব- প্রচেষ্টার প্রতি প্রচুর সহানুভূতি জ্ঞাপন করিলেন। ফ্রান্স ৬৫ সান-ইয়াৎ-সেন ছাড়িবার ঠিক এক মাস পরে আমি সাংহাইতে আসিয়া উপস্থিত হইলাম। আমার গৃহ-প্রত্যাবর্তন ব্যাপার লইয়া তখন সমস্ত চীন কাগজ নানা প্রকারের সত্য-মিথ্যা গল্প রটাইতেছিল। সকলেরই ধারণা ছিল যে, আমি বিদেশ হইতে প্রচুর অর্থ লইয়া আসিতেছি এবং সাংহাইতে যখন খবরের কাগজের প্রতি নিধিরা সত্যসত্যই আমাকে সেই প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিলেন তখন আমি বলিয়াছিলাম,—“আমি বিদেশ হইতে একটী কাণ কড়িও সংগ্রহ করিয়া আনি নাই; তবে আমি আমার অন্তর ভরিয়া বিপ্লবের প্রবুদ্ধ চেতনাকে আহরণ করিয়া আনি- য়াছি। যত দিন না প্রকৃত চীন গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়, তত দিন পৰ্যন্ত অন্তর রিক্ত করিয়া এই আজন্মের সঞ্চয় আমার স্বদেশবাসীকে দিয়া যাইব।” সান হংকংএ উপস্থিত হইলে সেখানকার বিপ্লবী দল তাহাদের প্রবাসী নেতার গৃহাগমন উপলক্ষে এক বিরাট অভিনন্দনের আয়ােজন করে। এই স্থানে সানের আর এক জন বিদেশী বন্ধুর কথা উল্লেখ করা প্রয়ােজন। তাহার নাম হােমার লী। পলাতকরূপে যখন সান কালিফোর্ণিয়াতে উপস্থিত হন, তখন এক ভােজ- সভায় এক জন খর্বাকৃতি লােকের সঙ্গে তাহার পরিচয় হয়। লােকটী আপনি অগ্রসর হইয়া সানের করমর্দন করিয়া বলে, “আমি তােমাকে সাহায্য করিতে পারি।” ডাঃ সান পরিচয়ে জানিলেন যে, এই ব্যক্তির নাম হােমার লী, সামরিক-নীতিতে

সান-ইয়াৎ-সেন
জগতের অন্যতম সর্বশ্রেষ্ঠ বিশেষজ্ঞ। এই হােমার লীর
নিকট হইতেই ডাঃ সান সামরিক নীতির বহু শিক্ষা গ্রহণ
করেন এবং ইহারই সহায়তায় কালিফোর্নিয়ার সমুদ্র-উপকূলে
প্রবাসী চীনা-ছাত্রদের সামরিক বিদ্যায় পারদর্শী করিয়া তিনি
চীনে পাঠাইতেন।
হংকংএ উপস্থিত হইয়া সান দেখিলেন, আজ বিজয়ের
শুভ লগ্নে হোেমার লী তাঁহাকে অভিনন্দন করিবার জন্য
উপস্থিত। হােমার লীকে প্রধান পার্শ্বচর করিয়া চীনগণতন্ত্রের
প্রথম সভাপতি নানকিনের দিকে অগ্রসর হইলেন।
ডাঃ সান সভাপতি হইয়া পুরাতন দিনের জড়ত্বের বিনাশের
প্রতীকরূপে এবং নব-নবীনের-আগমন-তিথিকে স্মরণাতীত
কালের জন্য অক্ষয় করিবার উদ্দেশ্যে প্রথম আদেশ দিলেন
যে, চান্দ্র-তিথি ধরিয়া খ্রীষ্টপূর্ব আড়াই হাজার বৎসর
ধরিয়া যে পঞ্জিকা চলিয়া আসিতেছে, তাহার পরিবর্তে
বর্তমান ইয়ােরােপীয় সৌর-চক্র অনুসারে নূতন পঞ্জিকা
গণনা হইবে এবং আজ হইতে নূতন করিয়া বর্ষ গণনা হইবে
এই বৎসর হইল বিজয়াব্দের প্রথম বৎসর।
জাপানে য্যামাগাটা, রুষিয়ায় লেনিন, তুরস্কে কামাল
পাশাও ঠিক এইরূপ ভাবে সর্ব প্রথম পঞ্জিকা পরিবর্তন
করেন।
সান-ইয়াৎ-সেন জাতীয় দলের সকল নেতার সহিত
নানকিং শহরের বাহিরে চীন মিং-বংশের প্রতিষ্ঠাতা মহামান্য

সান-ইয়াৎ-সেন
সম্রাট চুয়ুয়ান-চাঙের কবরে গিয়া অতীতকালের মুক্তিকামী
চীন মহাত্মাদিগের স্মরণে এক প্রার্থনা করেন।
চীনের শেষ স্বাধীন সম্রাট চুয়ুয়ান চাঙের কবরে দাঁড়াইয়া
সমগ্র জাগ্রত চীনের পক্ষ হইতে সান-ইয়াৎ-সেন প্রার্থনা
করিলেন,-“যে দিন সুঙ বংশ অদৃশ্য হইয়া গেল, দুর্দান্ত
তাতাররা আসিয়া সমগ্র চীনকে বিধ্বস্ত করিয়া ফেলিল, সে
দিন হে সম্রাট,হে আমাদের আদি-জনক,কালের তিমিরান্তরাল
হইতেসমুদিত হইয়া তুমি চীনকে আবার মুক্তি দিয়াছিলে।......
তাহার পর বহু কাল চলিয়া গিয়াছে ; বিদেশী মাথুরা আসিয়া
চীনকে নিব্বীৰ্য্য করিয়া ফেলিয়াছে। আজ যেখানে আপনি
অন্তিমগৌরবে শায়িত আছেন, তাহারই চারিদিকে চীনের কত
মুক্তিদাতা অনন্ত-বিশ্রামে নিমগ্ন রহিয়াছেন। আজ যাহারা
চীনে নূতন করিয়া মুক্তির দাবী করিতেছে, এই সমাধি-প্রান্তর
তাহাদের অন্তরে নিত্য অভিনব প্রেরণা জোগাইয়াছে। এই
প্রান্তরের আকাশের দিকে চাহিয়া, এই প্রান্তরের নদী-মৰ্ম্মর
শুনিয়া, বিদেশীর প্রভুত্ব তাহাদের বুকে শৃঙ্খল হইয়া বাজিয়া
উঠিয়াছে; কিন্তু আজ তাহারা শৃঙ্খলমুক্ত। আজ তাহাদের
সকল দুঃখ সুখে পরিণত হইয়াছে। তােমার সুপ্ত ড্রাগন
আবার গর্জিয়া উঠিয়াছে—তােমার সিংহ আবার তােমার
সিংহাসন বহন করিতেছে। আজ তাই তােমার জাতি তােমাকে
সে আনন্দসংবাদ পৌছাইয়া দিতে আসিয়াছে। হে স্বর্গগত
আত্মা। জাতির জাগরণের আনন্দ-উপহার গ্রহণ কর।”

সান-ইয়াৎ-সেন অন্য দিকে মাঞ্চু-রাজবংশের মধ্যে মহা-আতঙ্ক দেখা দিয়াছে। সৈন্যরা ছত্রভঙ্গ হইয়া গিয়াছে, অথবা আসিয়া জাতীয় দলে যােগদান করিতেছে। রাজকোষে অর্থ নাই; বিদেশীরাও সাহায্য করিতে বিমুখ হইয়াছে। নিতান্ত নিরুপায় দেখিয়া ১২ই ফেব্রুয়ারী মাঞ্চু-রাজ সমস্ত রাজ্যভার প্রধানতম সেনাপতি য়ুয়ান-কাই-এর উপর দিয়া স্বেচ্ছায় সিংহাসন ত্যাগ করিল। পিকিংএ য়ুয়াশি-কাই চীন-সম্রাটের সিংহাসনে বসিয়া উত্তর-চীনে আধিপত্য করিতেছিলেন। তিনি প্রথমে নূতন গণতন্ত্রকে স্বীকার করিতে অসম্মত হইলেন। নানকিং হইতে তাহার বিরুদ্ধে সৈন্য প্রেরিত হইল, কূট রাজতন্ত্র- বিশারদ য়ুয়ানশিকাই সানের সমরায়ােজন দেখিয়া তাহাকে জানাইলেন যে, যুদ্ধের আর প্রয়ােজন নাই, কারণ তিনি বহু বিবেচনার পর সানের আদর্শই গ্রহণ করিয়া নানকিং-এর প্রাধান্য স্বীকার করিতেছেন। চিরকাল পলাতক বিপ্লবীর জীবনেই ছিলেন সান অভ্যস্ত। রাজনীতির কূট-বিদ্যা তাঁহার ভাব-উদার অন্তরে স্থান পায় নাই। য়ুয়ান-শি-কাই-এর এই পরিবর্তনে সান পরম আনন্দিত হইয়া ভাবিলেন যে, অতঃপর এক জন সত্যকার শক্তিশালী অনুচর পাওয়া গেল। কিন্তু এই বশ্যতা স্বীকারের পরিবর্তে য়ুয়ান চীন গণতন্ত্রের সভাপতি হইবার জন্য বাসনা জ্ঞাপন করিলেন। তখন গণতন্ত্রের সান-ইয়াৎ-সেন আভ্যন্তরিক ব্যাপারে এত বিশৃঙ্খলা যে, বিদেশী শক্তির অর্থ- সাহায্য ব্যতীত সে সমস্ত সমস্যার সমাধান অসম্ভব ছিল। বিদেশী শক্তিরা, বিশেষ করিয়া ইংরাজ, য়ুয়াশি-কাই-এর উপরই বেশী আস্থা স্থাপন করিত। কারণ য়ুয়ান-শি-কাই বহু দিন ধরিয়া শাসন-কাৰ্য চালাইয়াছেন এবং সে বিষয়ে বিশেষ দক্ষতার পরিচয় দিয়াছেন। বিদেশী শক্তিদের মনােভাব বিশ্লেষণ করিয়া সান বুঝিলেন যে, য়ুয়ান-শি- কাইকে সভাপতি করিলে অনায়াসে বাহির হইতে ঋণস্বরূপ অর্থ-সাহায্য আসিতে পারে। ডাঃ সানের হাতে আপত্তি ছিল না। সিংহাসনের মােহ কি, তাহা তিনি জানিতেন না, সিংহাসনের মােহ কোনও দিন তাহাকে প্রলুব্ধও করে নাই। মুক্তকাম সন্ন্যাসীর মত তিনি চাহিয়াছিলেন, তাঁহার জাতিকে জগৎ- সভায় বরেণ্য করিয়া তুলিতে। মাধু-রাজবংশধ্বংস ও চীন-গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে সে আদর্শের এক অংশ পরিপূরিত হইয়াছে ; কিন্তু তখনও আর এক বৃহৎ অংশ, আর এক বৃহত্তর দায়িত্ব অপরিপূর্ণ অবস্থাতেই পড়িয়া ছিল। জাতির শক্তির উপর যদি জাতির স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠিত না হয়, তাহা হইলে সে স্বাধীনতাকে বাঁচাইয়া রাখা সম্ভবপর নয়। য়ুয়ান- শি-কাইকে গণতন্ত্র পরিচালনের সমস্ত ভার সমর্পণ করিয়া এবং স্বয়ং তাঁহাকে সভাপতি ঘােষণা করিয়া ডাঃ সান রাজর্ষির মত সিংহাসনের সমস্ত মােহ পরিত্যাগ করিয়া জাতির ; । ৭

সান-ইয়াৎ-সেন
আভ্যন্তরিক কল্যাণ বৃদ্ধির জন্য সমগ্র সময় ও শক্তি নিয়াে-
জিত করিলেন। ভাব-প্রবণ বিপ্লবী আপনার অন্তরের
অন্তরতম প্রদেশে নিশিদিন এক বৃহত্তর চীনের স্বপ্ন দেখি-
তেন—যেখানে এই কোটী কোটী লােক জড়ত্ব ত্যাগ করিয়া
অবিরাম শ্রমে জাতির ঐশ্বৰ্য্য বাড়াইয়া চলিয়াছে, নূতন পথ
তৈয়ারী হইতেছে, নূতন মানুষ আসিতেছে, নূতন কলকজা
আকাশে মাথা তুলিয়া উঠিতেছে, চারিদিকে পাথরের আর
লােহার আর আগুনের এক বিচিত্র শব্দে তাহার স্বপ্নময়
চীন ভরিয়া থাকিত। এত দিন পরে সান সেই স্বপ্নকে সত্য
করিয়া তুলিবার জন্য রাজনীতিক্ষেত্র হইতে পাশে সরিয়া
দাড়াইয়া জাতির আভ্যন্তরিক কল্যাণ বৃদ্ধির জন্য এক নূতন
স্কীম রচনা করিলেন।
য়ুয়ান-শি-কাই কিন্তু নানকিংএ আসিলেন না। কোয়া-
মিংটাং দলের পক্ষ হইতে বলা হইল যে, নানকিংকেই
নূতন চীন গণতন্ত্রের রাজধানী করা উচিত। কিন্তু য়ুয়ানশিকাই,
আপত্তি তুলিলেন।
পিকিংএ বিদেশী দূতগণের যে বাসস্থান আছে, তাহা
নানকিংএর অপেক্ষা অধিকতর সুরক্ষিত এবং জাপানের
অতর্কিত আক্রমণের সম্ভাবনা হইতে আত্মরক্ষা করিতে হইলে
উত্তর-চীনে শক্তি সংহত করিয়া রাখিতে হইবে। ডাঃ সান
এবং তাঁহার সহচরগণ তাহাতেও রাজী হইলেন।
ডাঃ সান তাহার নূতন কার্যের জন্য ক্যান্টনকেই কেন্দ্র
৭১

সান-ইয়াৎ-সেন
করিলেন। এই নগরের সহিত তাহার জীবনের বহু ঘটনা
বিজড়িত বহু বার এই ক্যান্টন শহর হইতে তিনি বিতাড়িত
হইয়াছেন। আবার সেই ক্যান্টন শহরে তিনি তাহার
নূতন কৰ্ম্মশক্তির কেন্দ্র স্থাপনা করিলেন।
এই স্থানে বহু দিন পরে রণশ্রান্ত বিপ্লবী প্রথম শান্তির
স্পর্শ পাইলেন। তাহার নূতন আবাসভূমিকে ঘিরিয়া
নিশিদিন জাতির নবীন আশা যেন ভ্রমর-গুঞ্জনের মত ঘুরিয়া
ফিরিতে লাগিল। তাহার গৃহ জাতির তরুণ-তরুণীদের মন্দির
হইয়া উঠিল ।
বিপ্লবীর মনে ঘরের মায়া আসিয়া স্পর্শ করিল। সানের
বাসনা হইল,-এই পরিপূর্ণতার মধ্যে, অন্তরের এই বিকশিত
ঐশ্বর্য্যের মধ্যে তিনি তাহার জীবন-পথের প্রথম সঙ্গিনীকে
লইয়া আসিবেন। সে-নারী দূর গ্রামে সনাতন চীন গ্রাম্য
বধূর জীবন যাপন করিতেছিলেন। সান স্থির করিলেন,
এই নব-নবীনের যাত্রা-সমারােহে তিনি তাঁহার ঘরণীকে
পথের সঙ্গিনী করিয়া লইবেন।
পুরাতন বেশভূষা পরিত্যাগ করিয়া স্বামীর আদেশে তিনি
ক্যান্টনে আসিলেন। এ যেন অন্ধকার গহ্বর হইতে একেবারে
দ্বিপ্রহরের মুক্ত-প্রান্তরে আগমন। সহসা এই মুক্তি তিনি সহ
করিতে পারিলেন না—চারিদিকে তাঁহার সমস্তই বিসদৃশ বােধ
হইতে লাগিল। নব-জীবনের এই নবীন সমারােহের মধ্যে
স্থানচ্যুত লতার মত তিনি অনাবশ্যকতার বিড়ম্বনা নিজেও
৭২

সান-ইয়াৎ-সেন ভােগ করিতে লাগিলেন এবং পারিপার্শ্বিককেও বিড়ম্বিত করিয়া তুলিলেন। ক্রমশঃ অবস্থা এইরূপ হইল যে, ক্যান্টন পরিত্যাগ করিয়া তাহাকে পুনরায় স্বগ্রামে ফিরিয়া যাইতে হইল। অন্ধকারের আত্মীয়তা অনেক সময় এমন সুতীব্র হয় যে, ইচ্ছা করিলেই তাহা ত্যাগ করা যায় না। সান ভাবিয়া- ছিলেন, লেনিনের পার্শ্বে থাকিয়া নাজেলা যেমন শক্তিরূপা হইয়া বােলশেভিক আন্দোলনে প্রাণ-সঞ্চার করিয়াছিলেন, তেমনি তাহারও সহধর্মিণী তাহার পার্শ্বে দাড়াইয়া চীন-নারীর অন্তরে বিকাশের বাসনাকে জাগাইয়া তুলিবে! সে আশা আরও কয়েক দিন পরে সফল হয় এবং সানের সেই বাসনা পরিপূরণ করেন আর এক মহীয়সী নারী। ক্রমশঃ সান বুঝিতে লাগিলেন যে, য়ুয়ান-শি-কাইকে সভাপতি করিয়া ভুল করা হইয়াছে। তিনি দেখিলেন, য়ুয়ান- শি-কাই তাহার বিশ্বাসের সুবিধা লইয়া কোয়ামিংটাং দলের উচ্ছেদ সাধনে পােপনে রত হইয়াছেন। সান স্থির করিলেন যে, আগামী নির্বাচনে য়ুয়ান-শি-কাইকে পদচ্যুত করিতে হইবে এবং এই নির্বাচনের আয়ােজনের ভার পড়িল কোয়ামিংটাঙ দলের নেতা মুংচাও রেনের উপর। য়ুয়ান- শি-কাই সুংচাও রেনকে হত্যা করিবার জন্য গুপ্তঘাতক নিযুক্ত করিলেন এবং জাতীয় সভার অধিবেশনের মধ্যেই সুংচাও নিহত হইলেন। কোয়ামিংটাঙ দল বুঝিল, চীন গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার এখনও বিলম্ব আছে। १७ সান-ইয়াৎ-সেন সান দূর হইতে এই সমস্ত রাজনৈতিক গতিবিধি লক্ষ্য করিতেছিলেন, কিন্তু তাহার নূতন স্কীম লইয়াই ব্যস্ত ছিলেন। এই স্কীম ইংরাজীতে “The International Development of China” নামে প্রকাশিত হয়। ইহাতে স্থির হয় যে, চীনে এক লক্ষ মাইল রেল-লাইন, দশ লক্ষ মাইল নূতন রাস্তা, নূতন খাল-খনন, তিনটী নূতন বন্দর, টেলিফোন লাইনের বিস্তার প্রভৃতি ব্যবস্থা করিতে হইবে। কিন্তু এই সমস্ত কার্যের জন্য অর্থের প্রয়ােজন এবং বিদেশীর নিকট ঋণ-গ্রহণ করা ব্যতীত তখন অর্থ-প্রাপ্তির আর কোনও পথ ছিল না। বিদেশী ধনিকরা কিন্তু সানকে সাহায্য করা অপেক্ষা যাহার হাতে সাক্ষাৎভাবে শাসন-ভার, তাহাকে সাহায্য করিতে সম্মত হইল। য়ুয়ান-শি-কাইও গােপনে বিদেশী ধনিকদের হাত করিতে লাগিয়াছিলেন। সান ক্রমশঃ আপনার ভুল বুঝিতে পারিলেন। কালবিলম্ব করিয়া এই মারাত্মক ভুল সংশােধন করিবার জন্য সানের বিপ্লবী চিত্ত আবার জাগিয়া উঠিল। ঘরের মায়া ত্যাগ করিয়া আবার তিনি বাহির হইলেন—রুদ্রের কঠোর আহ্বানে। য়ুয়ানশিকাই সানকে বিপ্লবী বলিয়া ঘােষণা করিলেন। গােপনে ক্যান্টন ত্যাগ করিয়া তিনি সাংহাইতে এক জাহাজে গিয়া আশ্রয় গ্রহণ করিলেন এবং সেখান হইতে নূতন করিয়া আবার সমরায়ােজন করিতে লাগিলেন। নূতন সৈন্যদল গঠন করিয়া বিশ্বস্ত অনুচর লি লি চুন ও হুয়াং ৭৪

সান-ইয়াৎ-সেন
সিংএর নেতৃত্বে ইয়াং শি উপত্যকার দিকে অভিযান প্রেরণ
করিলেন; কিন্তু অল্পকালের মধ্যে শুনিলেন, য়ুয়ানশিকাই-এর
স্বর্ণ তাহাদের কিনিয়া লইয়াছে। সানের মাথায় বজ ভাঙ্গিয়া
পড়িল। যে লক্ষ লক্ষ অনুচরদের ভরসা করিয়া তিনি
লগুনের গুপ্তাবাস ত্যাগ করিয়া চীনে পদার্পণ করিয়াছিলেন,
এক বৎসরের মধ্যেই
দেখেন, সে জনতা আবার স্তিমিত
হইয়া পড়িয়াছে। এত দিন তাহার অঙ্গুলী-সঙ্কেতে যাহারা
জীবন-মরণ তুচ্ছ করিয়া যুঝিয়াছে, তাহারা যেন সকলেই
রণক্লান্ত-অবসর চায়। য়ুয়ানশিকাই-এর সামরিক শাসনে
দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য আবার ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায়
প্রত্যাবর্তন করিতেছিল, সেই জন্য জনসাধারণও আর কোনও
রাজনৈতিক কারণে উত্তেজিত হইতে চাহিতেছিল না। বিজয়ের
এক বৎসরের মধ্যেই সান দেখিলেন, তাহার এত দিনের
সংগ্রাম সমস্তই ব্যর্থ হইতে চলিয়াছে। দেশের লােকে
আর সংগ্রাম চাহে না, বিদেশী শক্তিরা শক্তি-চ্যুত বিপ্লবীকে
কোনও মৰ্য্যাদা দেয় না; নিজের দলের লােকেরাও শ্রান্ত
সন্ধিগ্ধচিত্ত। জীবনের মধ্যাহ্ন লয়ে অতি রােমাঞ্চকর বিজয়ের
পর এ কি নির্মম পরাজয়। এক দিন জীবনের প্রারম্ভে যেমন
এককভাবে তিনি বিপ্লবের পথে বাহির হইয়াছিলেন, আজ
আবার পরিণত প্রৌঢ়ত্বে তিনি ঠিক সেইরূপ একক অর্থহীন
ভাবে বাহির হইলেন—পরাজয়কে অস্বীকার করিবার জন্য,
অপহৃত বিজয়-লক্ষীকে আবার ফিরাইয়া আনিবার জন্য ।
৭৫

সান-ইয়াৎ-সেন চীন পরিত্যাগ করিয়া সানকে আবার জাপানে আত্ম- গােপন করিয়া রহিতে হইল। এই সময় তাহার মন এক একবার পূরামাত্রায় ভাঙ্গিয়া পড়িবার উপক্রম হইত। এত দিন ধরিয়া যে স্পর্শের জন্য তাঁহার বিপ্লবী চিত্ত সঙ্গোপনে অপেক্ষা করিয়াছিল, সেই নিদারুণ নৈরাশ্য ও নিঃসঙ্গতার মধ্যে সহসা স্বর্গের কল্যাণ-আশিসের মত তাহা এক অপরূপ সুন্দরী মৰ্ত্তবাসিনীর রূপ ধরিয়া দেখা দিল। বিপ্লবীর ক্লান্ত অন্তর অমৃত-ধারায় অবগাহন করিয়া যেন মৃত্যু-জয়ী শক্তি অর্জন করিল। এই মর্ত্যবাসিনীর নাম সুংচিঙ লিং। জগতে আজ তিনি চীন গণতন্ত্রের ধাত্রী ম্যাডাম সান-ইয়াৎ-সেন নামে পরিচিত। যখন প্রথম যৌবনে এই বিপ্লবী ডাক্তারটী রােগীর সেবার অন্তরালে বিপ্লবী দল সংগঠনে ব্যস্ত ছিলেন, তখন এই মেয়েটা তাহার দুই শিশু ভ্রাতার সঙ্গে ডাক্তারখানায় প্রবেশ করিয়া শিশু-সুলভ চপলতায় ডাক্তারীকে প্রায়ই উদ্ব্যস্ত করিত। চিঙলিংএর পিতা তখনই এই ডাক্তারটীর সবিশেষ পরিচয় জানিতেন এবং প্রায়ই তাহাদের বাড়ীতে বৃদ্ধ সুঙ ও যুবক ডাক্তারী নিভৃতে নানা রকমের আলাপ করিতেন। বৃদ্ধ সুঙ এই তরুণ ডাক্তারটীকে মনে মনে শ্রদ্ধা করিতেন এবং তাহার দৃষ্টান্তে বাড়ীর সমস্ত ছেলেমেয়ে এই রহস্যজনক লােকটীকে মনে মনে বিশেষ ভালবাসিত। চিঙলিঙ ও তাহার ভগ্নী পাশ্চাত্য-শিক্ষায় শিক্ষিত হন। ৭৬ সান-ইয়াৎ-সেন আমেরিকার ওয়েলীয়া কলেজে চিলি ভর্তি হন এবং তাঁহার ভগ্নী ওয়েলেস্লী কলেজে শিক্ষাপ্রাপ্ত হন। চিঙ- লিঙের ভগ্নীই পরে সেনাপতি এবং বর্তমান চীন গণতন্ত্রের সভাপতি চ্যাংকাইশেকের পত্নী হন। আমেরিকায় কলেজে চিঙলুঙের নাম হয় রােজামণ্ড। আমেরিকার অধ্যয়ন শেষ করিয়া জাপান হইয়া রোেজামণ্ড চীনে প্রত্যাবর্তন করেন। সানের বয়স তখন ঊনপঞ্চাশ, চিঙলুঙের বয়স তখন মাত্র একুশ। কিন্তু এই নারী একান্ত গােপনে চীনের এই উদ্ধার-কর্তাটীকে তাহার অন্তরে স্বামীকে বরণ করিয়া লইয়াছিলেন। এই বিপ্লবীর পার্শ্বে দাড়াইয়া তাহার সকল সুখ-দুঃখ আশা-আকাঙক্ষার ভাগী হইয়া চীনের নবজন্মলাভের গৌরবের শরীক হইবার জন্য এই অপূর্ব সুন্দরী নারী স্বেচ্ছায় সেই নিঃসঙ্গ বিপ্লবীকে স্বামীত্বে বরণ করিয়া লইলেন। চিঙ-লিঙ বিপ্লবীর সেক্রেটারীরূপে তাহার সকল কাৰ্য্যে সহায়তা করিতে লাগিলেন এবং তাহার ভগ্নপ্রায় চিত্তে এক অভিনব আশার ও শক্তির শিখা জ্বালাইয়া তুলিলেন। ধীরে ধীরে সান আবার চীনের উপকূলে উপকূলে প্রচার-কাৰ্য্য চালাইতে লাগিলেন। অন্যত্র চীনের অভ্যন্তরে বিদেশী শক্তির সহায়তার উপর নির্ভর করিয়া য়ুয়ানশিকাই কোয়ামিংটাং দলের উচ্ছেদ সাধনায় দ্বিধাহীনভাবে চেষ্টা করিতে লাগিলেন। গণতন্ত্রের উচ্ছেদ কামনায় এবং একচ্ছত্র-সম্রাটত্বের আকাঙক্ষায় তিনি ৭৭ সান-ইয়াৎ-সেন কোয়ামিংটাংকে বিপ্লবী সঙ্ঘ বলিয়া ঘােষণা করিলেন এবং জাতীয় পার্লামেন্টে যে সমস্ত জাতীয় দলের সভ্য ছিলেন, তাহাদের সদস্যপদচ্যুত করা হইল। জাতীয় দলের সদস্যদের লইয়াই নূতন জাতীয় ব্যবস্থা পরিষদ বা পার্লামেন্ট গঠিত হইয়াছিল। এখন সদস্যহীন হওয়ায় য়ুয়ানকাইশেক পালা- মেন্টের দরজা বন্ধ করিয়া দিয়া আপনাকে সর্বময় কর্তা ও সম্রাট বলিয়া ঘােষণা করিলেন। য়ুয়ানকাইশেকের এই আচরণে জনসাধারণ বিক্ষুব্ধ হইল এবং ক্রমশঃ তাহারা বুঝিতে আরম্ভ করিল যে, সেই নির্বাসিত ডাক্তার সানের আদর্শ, যে আদর্শের জন্য তাহার মাথুরাজ- বংশের উচ্ছেদ সাধন করিয়াছিল, তাহা আবার বিলুপ্ত হইতে চলিয়াছে। ধীরে ধীরে জনগণের মধ্যে খণ্ড বিদ্রোহ দেখা দিতে লাগিল এবং এই অবস্থার সুবিধা লইয়া সান পুনরায় সকল শক্তি প্রয়ােগ করিয়া গণতন্ত্রের পুনঃ প্রবর্তনের জন্য প্রচার- কাৰ্য করিতে লাগিলেন। ছত্রভঙ্গ জাতীয় দল পুনরায় ডাঃ সানকে আহ্বান করিল এবং অনুতপ্ত সহচরদের আহ্বানে সান গােপনে পুনরায় সাংহাইতে আসিয়া জাতীয় সৈন্যদল গঠন করিতে লাগিলেন। জাতীয় দল ক্ৰমশঃ সম্ববদ্ধ হইয়া স্থানে স্থানে বিদ্রোহ ঘােষণা করিল এবং য়ুয়াংনএর দলের বহু লোেক ক্রমশঃ আবার জাতীয় দলে আসিয়া যােগদান করিতে লাগিল। কিন্তু দৈব এবারেও সানকে আর এক বিচিত্র উপায়ে ৭ সান-ইয়াৎ-সেন পরাজিত করিল। যে শত্রুকে তিনি নিধন করিতে আসিয়া- ছিলেন, দৈব তাহাকে অপহরণ করিয়া লইয়া বিজয়ের গৌরব হইতে তাহাকে বঞ্চিত করিল। ১৯১৬ সালের ৬ই জুন উন্মাদ অবস্থায় য়ুয়াংনকাইশেক সহসা দেহত্যাগ করেন। ঝুয়াংনকাইশেকের এই অকস্মাৎ মৃত্যুতে সানের রাজনৈতিক অবস্থা পুনরায় জলিল হইয়া উঠিল। য়ুয়াংনএর মৃত্যুতে বিগত পার্লামেন্টের সহকারী সভাপতি লি য়ুয়াং হাং আপনাকে গণ- তন্ত্রের সভাপতি বলিয়া ঘােষণা করিয়া গণতন্ত্রের পুনঃ প্রবর্তন করিলেন এবং তাহার উপরে সৈন্য-বিভাগের ভার থাকায় কেহই আর আপত্তি করিল না। দৈবের চক্রান্তে সান দেখিতে পাইলেন যে, পুনরায় জাতির নিকট তিনি নিস্প্রয়ােজনীয় হইয়া পড়িয়াছেন। চীন গণতন্ত্রের যিনি প্রতিষ্ঠাতা, চীন দেশের মধ্যে তাহার উপযুক্ত কোনও স্থান হইল না। জনসাধারণ তাহাকেই সম্মান করে, যাহার হাতে দেখে বিজয়ীর তরবারী। সান ভগ্ন-মনােরথ হইয়া ক্যান্টনে প্রত্যাবর্তন করিলেন। তাহার পর কয়েক বৎসর ধরিয়া চীনে যে গৃহ-বিপ্লবের ও অরাজকতার সৃষ্টি হয়, তাহার কাহিনী যেমনই জার্ল, তেমনি রাজনৈতিক দিক দিয়া চীনের অকারণ বলক্ষয়কারক হয়। যে কেহই কিছু সৈন্য সংগ্রহ করিতে সমর্থ হইয়াছে, তিনিই আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টায় লুণ্ঠন, হত্যা ও বর্বরতার অনুষ্ঠান করিয়াছেন। এই সময় বিভিন্ন প্রাদেশিক শাসনকর্তারা স্ব স্ব প্রধান হইয়া উঠিল । ৭৯ সান-ইয়াৎ-সেন ক্যান্টনে অবস্থান-কালে এই সমস্ত অরাজকতা ও গৃহ- বিপ্লবের মধ্যে সান কিছুমাত্র ভগ্নোদ্যম না হইয়া নূতন করিয়া জাতীয়তার আদর্শ প্রচারের জন্য আত্মনিয়ােগ করিলেন। এক নূতনতর ও সহজ ভাষার সৃষ্টি করিয়া তিনি জনসাধারণের নিকট তাহার আদর্শের কথা উপস্থিত করিতে লাগিলেন। এই সময় দিবারাত্র তিনি লেখনী পরিচালনা করেন। নানা রকমের ষড়যন্ত্রের হাত হইতে আত্মরক্ষা করিবার জন্য তিনি এই সময় ফরাসী রাজদূতের জন্য নির্দিষ্ট এলাকার মধ্যে বাস করিতেন। এই স্থানে গােপনে সােভিয়েট রুযিয়ার পক্ষ হইতে এব্রাহাম জোফে আসিয়া তাহার সহিত সাক্ষাৎ করেন। জোফে আসিয়া সানকে নূতন আশার কথা শুনাই- লেন। সােভিয়েট রুষিয়া চীনের এই জাতীয় আন্দোলনে সকল দিক দিয়া চীনকে সহায়তা করিবে এবং ইহা শুধু স্তোকবাক্য নহে। সান জোফের কথায় আশ্বস্ত হইয়া সাহায্য গ্রহণ করিতে স্বীকৃত হইলেন। কালবিলম্ব না করিয়া জোফে সামরিক পরামর্শদাতা-রূপে মাইকেল বরােদীন নামক এক জন রুষ বিপ্লবী নেতাকে সানের পাশ্বচররূপে নিযুক্ত করিলেন এবং গালিন নামক এক জন অবসরপ্রাপ্ত অষ্ট্রিয়ান্ সেনাপতির অধীনে সত্তর জন সােভিয়েট অফিসার চীনের জাতীয় সৈন্যদল গঠনের ভার গ্রহণ করিল। এই সময় আর এক জন লােক আসিয়া সানের সহিত যােগদান করেন। তাহার নাম চ্যাংকাইশেক। চ্যাংকাইশেক সান-ইয়াৎ-সেন জাপানের সামরিক বিদ্যালয় হইতে কৃতিত্বের সহিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইয়া জাতীয় আন্দোলনে সহায়তা করিবার জন্য ডাঃ সানের সহিত যােগদান করেন। প্রথমে তিনি ডাঃ সানের সেক্রেটারীর কাজ করেন; পরে চীনের জাতীয় দলের সেনাপতি হন এবং সমস্ত বিদ্রোহী উপদলকে দমন করিয়া তিনিই বর্তমানে চীন গণতন্ত্রের সভাপতি। চ্যাংকাইশেক সান-ইয়াৎ-সেনকে গুরু বলিয়া গ্রহণ করেন, যদিও পরে তিনি সানের সাম্যবাদী আদর্শ হইতে দূরে সরিয়া যান। সানকে পুনরায় জাতীয় দলের নেতা-হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করিবার জন্য এবং জাতীয় দলের সামরিক শক্তি অব্যাহত রাখিবার আদর্শে চ্যাংকাইশেক নূতন ভাবে সৈন্যদল গঠন করিতে লাগিলেন এবং অচিরে দক্ষিণ চীনে তিনি সামরিক নেতা চেনকে পরাজিত করিয়া জাতীয় দলের আদর্শে গণ- তান্ত্রিক পার্লামেন্টের প্রতিষ্ঠা করিলেন। উত্তর চীনে সামরিক নেতাদের মধ্যে তখন অবিরাম সংঘর্ষ চলিতেছে, তাহার মধ্যে সান দক্ষিণ চীনে তাহার জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ ব্রত গ্রহণ করিলেন—এই পুরাতন জড়ত্ব- প্রাপ্ত জাতির চিত্তকে নূতন ভাব-তন্ত্রের সঙ্গে পরিচিত করিয়া তােলা; নতুবা তিনি স্পষ্টই বুঝিতে পারিতেছিলেন, এই অন্তর্বিপ্লব ও অকারণ শক্তি-ক্ষয় কখনই প্রশমিত হইবে না। চীনা ভাষা অত্যন্ত দুরূহ। সাধারণ লােক ভাষায় ব্যবহৃত অধিকাংশ শব্দের সঙ্গে পরিচিত নয়। সাধারণের ব্যবহৃত ৮১

সান-ইয়াৎ-সেন
শব্দ বাছিয়া বাছিয়া সান শুধু সেই সব শব্দ লইয়া জাতীয়তার
প্রথম ভাগ রচনা করিতে লাগিলেন। ছােট ছেলেদের যেভাবে
কিণ্ডারগার্টেন পদ্ধতিতে শিক্ষা দেওয়া হয়, সেই ভাবে সান
তেরোখানি বিরাট গ্রন্থ রচনা করেন। কনফুসিয়াসের বাণী
অপেক্ষা চীনদেশে সানের এই সমস্ত লেখা অধিকতর পঠিত ও
প্রচারিত হয়।
এই সময় তাহার উদরে ভয়ানক একটী রােগের সৃষ্টি হয়।
কিন্তু সেদিকে কোনও ভ্রুক্ষেপ না করিয়া তিনি সারা রাত্রি
জাগিয়া অনাগত চীন যুবকদের জন্য নব-জীবনের এই সমস্ত বাণী
লিপিবদ্ধ করিয়া যান। মাঝে মাঝে যখন অবসাদ আসিত,
তখন চাহিয়া দেখিতেন, সম্মুখে সহাস্যমুখে অনিদ্ৰ আঁখি
লইয়া চুঙলিঙ বসিয়া আছে—তাঁহার তাড়াতাড়িতে-লেখা
আবার পরিষ্কার করিয়া লিখিয়া দিবেন বলিয়া। কোথা
হইতে শ্লথ অঙ্গুলীতে আবার শক্তি আসে, সান লিখিয়া
চলেন—নব্য চীনের মৃত-সঞ্জীবনী বাণী।
প্রতি সপ্তাহে এক দিন তিনি ক্যান্টন ক্রিশ্চান কলেজে,
—তখন নাম হইয়াছে লিংনাম বিশ্ববিদ্যালয়, ছাত্রদের সম্মুখে
বক্তৃতা দেন। প্রতিদিন সাধারণ সভায় শ্রমিক ও কুলীদের
তাহাদেরই মতন ভাষায় জাতীয়তার নব-মন্ত্রে দীক্ষা দিতে
লাগিলেন। সমগ্র চীন দেখিল, এত দিন পরে পরম-দেবতার মত
সত্যই তাহাদের মুক্তিদাতা আসিয়াছে। কনফুসিয়াসের ছবির
পাশে ঘরে ঘরে সান-ইয়াৎ-সেনের ছবি বিরাজ করিতে লাগিল।
৮২

সান-ইয়াৎ-সেন
চীনে তখন সামরিক-নেতাদের মধ্যে অন্তদ্বন্দ্ব তেমনি
চলিয়াছিল। হােনান প্রদেশের উ-পি-ফু ও মাঞ্চুরিয়ার
চ্যাংসসালিনের মধ্যে যুদ্ধ চলিতেছিল। উ-পি-ফু-র বিরুদ্ধে
সামরিক অভিযান পাঠাইবার জন্য সান মনস্থ করিলেন।
কিন্তু ইতিমধ্যে উ-পি-ফু-র অধীন সেনাপতি ফেং উশিয়াং
উ-পি-ফু-র বিরুদ্ধেই বিদ্রোহ ঘােষণা করিল এবং সৈন্যদল
লইয়া তাহাকে ছাড়িয়া গেল।
এই সময় উত্তর চীনের প্রাদেশিক শাসনকর্তাগণ আর
একটী অভিনব পন্থার আশ্রয় গ্রহণ করিলেন। তাহারা
দেখিলেন যে, তাহারা প্রত্যেকেই তখন রণশ্রান্ত । এক্ষেত্রে
তাহাদের পরাজিত করা জাতীয় সৈন্যদলের অসম্ভব নয়।
নানারূপ জল্পনা-কল্পনা করিবার পর তাঁহারা সকলে মিলিয়া
ডাঃ সানকে তাঁহাদের প্রদেশে নিমন্ত্রণ করিয়া পাঠাইলেন—
তাহার আদর্শে তাঁহাদের বিশৃঙ্খল রাজত্বে শৃঙ্খলা আনিয়া
দিবার জন্য।
যে-কোনও পাশ্চাত্য রাজনৈতিক এই নিমন্ত্রণ সহজে
গ্রহণ করিতে চাহিতেন না। কিন্তু সরল-বিশ্বাসী সান শত্ৰু-
পক্ষের এই নিমন্ত্রণকে মনে করিলেন বশ্যতা স্বীকার এবং
পরম আত্মতৃপ্তির সহিত তিনি এই নিমন্ত্রণ গ্রহণ করিলেন।
সান উত্তর চীনের দিকে অগ্রসর হইলেন। শত্রুর
আবাস-ভূমির মধ্যে গিয়া তাহাদেরই কর-প্রসারিত অর্ঘ্য
গ্রহণ করিবার এক গােপন-গর্বে তাহার কল্পনাপ্রবণ চিত্ত

সান-ইয়াৎ-সেন
ভরিয়া উঠিতে লাগিল। যে-পথ দিয়া যান, সেই পথেই
ফুল ফুটিয়া উঠে। যে হংকং ত্রিশ বৎসর ধরিয়া তাহাকে শত্রু
হিসাবে দূরে সরাইয়া রাখিয়াছিল, সেখানে উপস্থিত হইয়া
বিপুল অভিনন্দনের মধ্যে সান চীনের জাতীয় আদর্শ সম্বন্ধে
বক্তৃতা দিলেন। হংকংএ সানের বক্তৃতা শুনিয়া বিদেশী
শক্তিরা চমকাইয়া উঠিল। সান ঘােষণা করেন যে, প্রাচ্য
আর কোন মতেই পশ্চিমের বােঝা বহিয়া বেড়াইবে না।
কোনও পাশ্চাত্য জাতির স্বার্থের ইন্ধন যােগাইবার জন্য
চীন আর মাথা নত করিয়া থাকিবে না। সানের বক্তৃতা
শুনিয়া যে সমস্ত পাশ্চাত্য শক্তি এক দিন তাহাকে সাহায্য
করিয়াছিল, তাহারা হতাশ হইয়া গেল।
উত্তর চীনের প্রাদেশিক শাসনকর্তাগণ সবিস্ময়ে
দেখেন যে, সান যত দূর অগ্রসর হইয়া আসিতেছেন, তত দূর
পৰ্যন্ত জনতার হৃদয় হরণ করিয়া চলিয়াছেন এবং সান
যে ভাবে নিজের পরিচয় দিতেছেন তাহাতে যেন মনে হয়,
চীনের সর্বময় কর্তা তিনি। সানের শেষােক্ত ব্যবহারে
তাহার নিমন্ত্রণ-কর্তাগণ মনে মনে বিশেষ ক্রুদ্ধ ও ক্ষুব্ধ
হইলেন। ক্রমশঃ নানা দিক দিয়া তাহারা ধীরে ধীরে নিজেদের
ভিতরের মনােভাব প্রকাশ করিতে লাগিলেন। সান সমস্তই
বুঝিতেছিলেন, কিন্তু কোনও পরাজয়ের বা বিপদের লক্ষণকে
তিনি প্রতিবন্ধক হিসাবে গ্রহণ করিতে পারিতেন না। ১৯২৪
সালের ৩১শে ডিসেম্বর তিনি পিকিং শহরে প্রবেশ করিলেন
v
৮৪

সান-ইয়াৎ-সেন কিন্তু নিতান্ত শাদাসিধে ভাবে তাহাকে অভ্যর্থনা করা হইল। সান তাহাদের আতিথ্য স্বীকার না করিয়া পাশ্চাত্য ভ্রমণ- কারীদের জন্য যে ইয়ােরােপীয় হােটেল ছিল, সেখানে গিয়া উঠিলেন। সানের জীবন-নাট্যের এই অপরূপ সন্ধিক্ষণে সহসা এই শত্ৰুপুরীর মধ্যে মৃত্যু আসিয়া তাহার ঘটনাবহুল জীবনের শেষ-বনিকা টানিয়া দিল। হােটেলে আসিয়াই সান পীড়িত হইয়া পড়িলেন। পেটের যে ব্যথাকে তিনি এত দিন উপেক্ষা করিয়া আসিয়াছিলেন, আজ বিষম যন্ত্রণারূপে সে আবার দেখা দিল। ছায়াসম অনুসারিণী চিঙ-লুঙ কালবিলম্ব না করিয়া রকফেলার হাসপাতালে ডাঃ সানের অচৈতন্য দেহকে লইয়া উপস্থিত হইলেন। যে বিপ্লবী ভবঘুরেকে তিনটী মহাদেশ ঘুরিয়া কেহ সন্ধান লইতে পারে নাই—নির্বাক মৌনতায় সে আজ শয্যাশায়ী। সানের এই অসুস্থতার সংবাদ দাবানলের মত চারিদিকে ছড়াইয়া পড়িল। চারিদিক হইতে লােক আসিয়া মিংরাজের নিষিদ্ধ নগরীতে প্রবেশ করিতে লাগিল। চিঙ-লুঙ সারা দিন সারা রাত স্বামীর পার্শ্বে বসিয়া কলম কাগজ হাতে বসিয়া আছেন। তিনি যাহা বলিতেছেন, তখনই তাহা লিখিয়া লইতেছেন। তাহার সুন্দর আননে উদ্বেগের কোনও চিহ্ন নাই। তাহার বিশ্বাস যে তাহার স্বামী অমর। ১৫

সান-ইয়াৎ-সেন
হাসপাতালের ডাক্তাররা কিছু দিন পরে জানাইলেন যে,
ব্যাধি দুরারােগ্য। তাহারা কিছু করিতে পারিবেন বলিয়া
মনে হয় না। অস্ত্রোপচার করিতে হইবে, তবে তাহাও
মারাত্মক হইতে পারে। ডাক্তারদের কথা শুনিয়া সান রাগে
উঠিয়া বসিলেন এবং তাহাদের প্রত্যেককে ভৎসনা করিয়া
রাগের মাথায় হাসপাতাল ত্যাগ করিয়া ওয়েলিংটন কুর
বাড়ীতে আসিয়া ঘােষণা করিলেন, তিনি জীবিত আছেন
এবং জীবিত থাকিবেন। যে ব্যক্তি চীনে সর্বপ্রথম পাশ্চাত্য
ডাক্তারী শিক্ষার ডিপ্লোমা গ্রহণ করেন, জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে
সেই ব্যক্তি পুনরায় আবার হাতুড়ের
নিকট নিজেকে সমর্পণ
করিলেন।
কিন্তু ক্রমশঃ সান বুঝিলেন, কেহই আর তাহাকে ধরিয়া
রাখিতে পারিবে না। এক দিন সহসা মধ্যরাত্রে জাগিয়া
উঠিয়া দেখেন, মাথার শিয়রে চিঙ-লুঙ তাঁহার মুখের দিকে
চাহিয়া জাগিয়া আছে—বাহিরে ভীষণ ঝড় বহিতেছে।
হাসিয়া সান তুলি আর কাগজ চাহিলেন। কম্পিত-হস্তে
মৃত্যুর আগমন-ধ্বনির ছন্দে সান রুষিয়ায় সােভিয়েটের হর্তা-
কৰ্ত্তা বিধাতার নিকট পত্র লিখিতে বসিলেন,
“আজ সাম্রাজ্যবাদীদের প্রভাবের ফলে চীন আধা-
উপনিবেশে পরিণত হইয়াছে। যত দিন না চীন স্বাধীন
হয়, তত দিন পর্যন্ত আমি এই আদেশ দিয়া যাইতেছি, চীন
এই বিপ্লব-আন্দোলন চালাইবে। এই আন্দোলনে আপনা-

সান-ইয়াৎ-সেন দের সহিত সদাসর্বদা যােগ রাখিবার জন্য আমি আমার অনুচরদের আদেশ দিয়া যাইতেছি। আজ আমি নিশ্চিন্ত অন্তঃকরণে বিশ্বাস করিতে পারি যে, এত দিন ধরিয়া যে সাহায্য আপনাদের নিকট হইতে পাইয়াছি, তাহা হইতে এই নবীন চীন জাতি কখনই বঞ্চিত হইবে না। আজ বিদায়ের শেষ- মুহূর্তে, হে কমরেডগণ, এই আমার অন্তরের শেষ আশা জ্ঞাপন করিয়া যাইতেছি যে, অদূর ভবিষ্যতে এক দিন সােভি- য়েট রুষিয়া স্বাধীন চীনকে তাহার অন্তরের মিতা রূপে পাইবে এবং এই দুই মিলিত শক্তি জগতের নির্যাতিত জাতীয়- তার পুনরুদ্ধারের জন্য এক দিন পাশাপাশি দাড়াইবে।” তার পর ডাঃ সান জাতির নিকট তাহার শেষ আদেশ তাহার শেষ উইলের আকারে কম্পিতহস্তে লিপিবদ্ধ করিয়া চিঙলুঙের হাতে দিলেন। হাসিয়া বলিলেন, এই আমার উইল! “জাতির বিপ্লব-আন্দোলনে জীবনের সুদীর্ঘ চল্লিশ বৎসর সম্পূর্ণভাবে দান করিয়াছি, আমার উদ্দেশ্য চীনের স্বাধীনতা ও বিশ্বসভায় তাহার গৌরবকে ফিরাইয়া আনা। এই চল্লিশ বৎসরের অভিজ্ঞতায় আমার এই স্পষ্ট বিশ্বাস হইয়াছে যে, জনসাধারণকে না জাগাইলে সে উদ্দেশ্য সফল হইবে না এবং বাহিরের সাহায্যও আমাদের লইতে হইবে। যে-সব-জাতি আমাদের সমানচক্ষে দেখিতে পারিবে ( Treat-us-equal nations), তাহাদেরই সাহায্য গ্রহণ করা উচিত। “বিপ্লব এখনও শেষ হয় নাই, আমার মতাবলম্বী যাহারা ৮৭ সান-ইয়াৎ-সেন তাহাদের নিকট আমার আদেশ যে, আমার নির্দিষ্ট পন্থা অনুসরণ করিয়া যেন তাহার চলেন। আমি সেপন্থা লিপিবদ্ধ করিয়া গিয়াছি। বিশেষ করিয়া একটী কথা—জাতীয় আন্দো- লনের সহায়ক যে কোনও সুবিধা গ্রহণ করিতে যেন ইস্ততঃ করা হয় এবং যাত্রা যখন করিতে হইতেছে, তখন তাহার গতি যেন দ্রুত তালে হয়। এই আমার শেষ আদেশ।” শেষ উইলটী লিখিয়া তিনি প্রিয়তমা পত্নীকে একবার পড়িয়া শুনাইতে বলিলেন। পড়া শেষ হইলে বলিলেন, “এটা তুমি পরিষ্কার করে লিখে দাও, আমার হাতের লেখা বড় খারাপ হয়ে গেছে, আমি তলায় সই করে দেবাে।” তার পর অবস্থা আরও খারাপ হইয়া উঠিতে লাগিল। শয্যাপাশ্বে পুত্র ও প্রিয় শিষ্যদের আহ্বান করিয়া অন্তিম বাসনাস্বরূপ জানাইলেন, যে নানকিং শহরে এক দিন তিনি এই জাতির শাসনের ভার গ্রহণ করিয়াছিলেন, সেইখানেই রক্ত-রাঙা (Purple Mountain) পৰ্বতের পাদমূলে যেখানে মি-রাজারা ঘুমাইতেছে, তাহারই পাশ্বে যেন তাহার শেষ- শয্যা রচনা করা হয়। ১৯২৫ সালের ১২ই মার্চ। মৃত্যুপথযাত্রীর চারিদিকে সমগ্র কোয়ামিংটাঙ দল সমবেত । ডাঃ সানের মুখ হইতে শেষ-বাণী উচ্চারিত হইল—“Struggle, Peace. Save China !” সমগ্র জগৎ শুনিল, চীনের বিপ্লবী নেতা ডাঃ সান পর- লােক গমন করিয়াছেন। ৮৮ LI ম্যাডাম সানইয়া

No text on this page.

সান-ইয়াৎ-সেন ডাঃ সানের মৃত্যুর পর কোয়ামিঙটাং দলে দুইটী স্পষ্ট ভাগ হইয়া যায়—এক দলের নেতা হইলেন ম্যাডাম সান-ইয়াৎ- সেন তাহার কমিউনিষ্ট অনুচরদের লইয়া, আর এক দলের নেতা হইলেন সেনাপতি চ্যাংকাইশেক। চ্যাংকাইশেক রুষ প্রভাব হইতে কোয়ামিঙটাং দলকে মুক্ত রাখিবার পক্ষপাতী এবং তিনি ক্রমশঃ চীন হইতে কমিউনিষ্ট প্রভাব দূর করিবার জন্য রুদ্রমূৰ্ত্তি পরিগ্রহ করিলেন। ম্যাডাম সান-ইয়াৎ-সেন সান-ইয়াৎ-সেনের চীন হইতে নির্বাসিত হইয়া রুযিয়ায় আশ্রয় গ্রহণ করিলেন। অন্য দিকে উত্তর চীনে চ্যাংসসালিন ক্রিশ্চান সেনাপতি ফেঙ্গকে পরাজিত করিয়া পিকিংএ সম্রাট সাজিয়া বসিলেন। সেনাপতি উ-পি-ফু ধীরে ধীরে হাংকাউতে বসিয়া আবার শক্তি সংগ্রহ করিতেছিলেন। চ্যাংকাইশেক উ-পি-ফুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘােষণা করিয়া তাহাকে একেবারে বিপর্যস্ত করিয়া ফেলি- লেন। উ-পি-ফু সৈনিকের ব্যবসায় ত্যাগ করিয়া এক নিভৃত নিকুঞ্জভবনে গিয়া কাব্য ও চিত্রকলার সাধনায় মনােনিবেশ করিলেন। উহার কয়েক দিন পরে চ্যাংকাইশেক চ্যাংসসালিনের বিরুদ্ধে পিকিং অভিমুখে যাত্রা করিলেন এবং পরাজিত চ্যাংসসালিন পলাইয়া যাইবার সময় বােমার বিস্ফোরণে নিহত হন। চ্যাংকাইশেক সম্মিলিত চীন গণতন্ত্রের বাণী জগতে বিঘােষিত করিলেন। ১৯২৮ সালের কয়েক দিন অগ্রে চীন গণতন্ত্রকে স্বীকার করিয়া চীনের সমুদ্র-উপকূলে ছিল। সান-ইয়াৎ-সেন দাঁড়াইয়া ইংরাজ রণতরী হইতে সম্মানসূচক একুশটী তােপ ধ্বনি করা হইল। এই এক জায়গা হইতেই ১৮৩২ সালে এবং ১৯২৬ সালে ইংরাজ ও আমেরিকানের তােপ অন্য ভাবে বিক্ষিপ্ত হইয়াছিল। সান-ইয়াৎ-সেনের মৃতদেহ এত দিন পিকিং শহরে রক্ষিত ১৯২৯ সালের ৯ই মার্চ চীন গণতন্ত্রের সভাপতি চ্যাংকাইশেকের আদেশে মহাসমারােহে পিকিং হইতে মহা- প্ৰস্থিতের শবাধার নানকিংএ আনা হইল। সেখানে রক্ত- রাঙা পর্বতের পাদমূলে শতদল-সরােবরের (Lotus Lake) তীরে নবীন চীনের সকল শিল্পী মিলিয়া জাতির নব-জীবন- দাতার অক্ষয় স্মৃতিরক্ষার উদ্দেশ্যে এক বিরাট স্মৃতিসৌধ রচনা করিল। সেখানে মিং রাজাদের সঙ্গে রাজকীয় সমারােহের মধ্যে এশিয়ার মুক্তির প্রথম স্বপ্নদ্রষ্টা কোটী কোটী ভক্তের শ্রদ্ধার অর্ঘ্যে অন্তিম-শয়ন রচনা করিয়া লইলেন। শব-দেহকে সংরক্ষিত করিবার জন্য যখন তাঁহাকে শয্যা হইতে তােলা হইল, তখন দেখা গেল যে, তাহার বালিশের তলায় তাহার প্রিয়তমা পত্নী চ্যাঙ-লুঙকে উদ্দেশ্য করিয়া একটা কাগজে লেখা রহিয়াছে, “হে বন্ধু, হে প্রিয়তমা, হে আমার জীবন-পথের অমৃত- সঙ্গিনী, আমার এই বইগুলো, এই আমার পুরাননা পােষাকগুলাে তােমাকে আমি দিয়ে গেলাম—সম্পত্তি সান-ইয়াৎ-সেন হিসেবে নয়—একে তাে আর সম্পত্তি বলা চলে না—এ শুধু আমার বাসনা, এরা যেন তােমার কাছেই থাকে—তা হলে আমিও রইবাে তােমার কাছে।” যে সান-ইয়াৎ-সেন চীনকে মুক্ত করিয়াছে এ সে সান- ইয়াৎ-সেন নয়—এ এক কবি, এ এক প্রেমিক, এ এক চির- বুভুক্ষিত অশ্রান্তহৃদয়, বিপ্লবীর অন্তরে কারারুদ্ধ এ এক ক্ষুধাতুর আত্মা, যাহার কথা জগতের খুব অল্প লােকই জানে। ৯

পরিশিষ্ট
চীনের প্রথম জাতীয় কংগ্রেস
১৯২৩ সালের অক্টোবর মাসে সাইয়াৎ-সেন স্থির করেন,
যে, ১৯২৪ সালের প্রথম দিনে তিনি প্রথম চীন জাতীয় কংগ্রেস
আহ্বান করিবেন। এই কংগ্রেস আহ্বানের সর্বপ্রধান
উদ্দেশ্য—কোয়ামিংটাঙের আদর্শ ও দলের গঠনপদ্ধতি সম্বন্ধে
একটা স্থির সিদ্ধান্তে উপস্থিত হওয়া। তখনও পর্যন্ত কোয়া-
মিংটাঙ দলের মধ্যে আদর্শ ও পদ্ধতি লইয়া অনেক ভেদাভেদ
ছিল এবং এই ভেদাভেদের ফলে জাতীয় দল কোনও কেন্দ্রী-
শক্তি অর্জন করিতে পারিতেছিল না। সান বুঝিয়া-
ছিলেন যে, এক আদর্শ ও এক শাসন-পদ্ধতির মধ্যে
এই সমস্ত বিক্ষিপ্ত শক্তিকে সংহত না করিলে চীন জাতীয়
আন্দোলনের কাৰ্য অতীতেও যেমন বিফল হইয়াছে,
ভবিষ্যতেও তেমনই বিফল হইবে।
এই সম্পর্কে প্রথম জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতিরূপে সান
বলেন,—“অতীতে আমরা যে বারবার পরাজিত হইয়াছি,
৯২

সান-ইয়াৎ-সেন
তাহার কারণ এই নয় যে, আমাদের বিপক্ষ দল ছিল আমাদের
চেয়েও শক্তিশালী ; আমাদের এই সমস্ত পরাজয়ের একমাত্র
কারণ, আমাদের নিজেদের মনকে তখনও আমরা চিনি নাই।
তাহার ফলে আমাদের মধ্যে নিত্যই দলাদলি হইত এবং এই
দলাদলির ফলে কোনও দিন মিলিত-শক্তি-প্ৰয়ােগ সম্ভব হয়
নাই। আমাদের শত্রুরা আমাদের ধ্বংস করে নাই, আমরা
নিজেরাই ধ্বংস করিয়াছি নিজেদের। সেই জন্য যদি আজ
আমরা সত্যই এই সংগ্রামে জয়ী হইতে চাই, তাহা হইলে
আমাদের সঙ্ঘবদ্ধ হইতে হইবে—ব্যক্তিত্বের সমস্ত মােহ
ত্যাগ করিয়া সঙেঘর শক্তি ও মৰ্যাদা রক্ষা করিতে হইবে।”
এই শশাচনীয় আত্মকলহ ও আত্মঘাতী বিচ্ছিন্নতা দূর
করিবার জন্য সান-ইয়াৎ-সেন প্রথম জাতীয় কংগ্রেস আহ্বান
করেন এবং এই প্রথম জাতীয় কংগ্রেসই সর্বপ্রথম দৃঢ়ভাবে
চীনের মাটীতে জাতীয়তার বিরাট সৌধের আসল ভিত্তি
স্থাপনা করে।
চীন গণতন্ত্রের গঠন-পদ্ধতি
এই কংগ্রেসের বাহত দুইটী প্রধান উদ্দেশ্য ছিল। একটী,
গণতান্ত্রিক চীনের আদর্শ নিরূপণ করা এবং দ্বিতীয়টী দলের
স্থায়ী শাসন-নীতি ও গঠন-পদ্ধতি ঠিক করা। তখনও পর্যন্ত
দলের আভ্যন্তরিক শাপন-ব্যাপারে নিয়ম-কানুন অপেক্ষা

সান-ইয়াৎ-সেন ব্যক্তিত্বেরই প্রাধান্য ছিল বেশী এবং সেই জন্য জাতীয় দলের মধ্যে দলাদলির কখনও বিরাম ঘটে নাই। এই কংগ্রেসে সর্বপ্রথম চীন জাতীয় দলের অথবা শাসন-তন্ত্রের গঠন-পদ্ধতি নিরূপিত হয়। স্থির হয় যে, যে-কোন জায়গায় প্রত্যেক পাঁচ জনকে লইয়া একটী দল গঠিত হইবে। পাঁচ জনকে লইয়া এই দল সাব-ডিষ্ট্রিক্ট কমিটীর অধীন থাকিবে। প্রত্যেক মাসে সাব- ডিষ্ট্ৰিক কমিটীর অধীন এই পাঁচজনকে-লইয়া-দল হইতে এক এক জন প্রতিনিধি লইয়া সভা হইবে। এই সমস্ত সাব- কমিটীর উপরে থাকিবে ডিস্ট্রিক্ট কমিটী এবং প্রতি তিন মাস অন্তর ইহার অধিবেশন হইবে। ডিষ্ট্ৰিক কমিটীর উপরে থাকিবে প্রভিন্সিয়াল কমিটী—প্রত্যেক বৎসরে দুইবার ইহার অধিবেশন হইবে। এই প্রভিন্সিয়াল কমিটী হইতে নির্বাচিত সদস্যদের লইয়া কেন্দ্রীয় শাসন-পরিষদ গঠিত হইবে। কেন্দ্রীয় শাসন-পরিষদ দুই অংশে বিভক্ত হইবে—একটী হইবে কেন্দ্রীয় কার্যকরী সংসদ। (Central Executive); অপরটী হইবে পরিদর্শক সংসদ (SupervisoryCommittee) কেন্দ্রীয় কাৰ্যকরী সংসদের কর্তব্য—দল-সংগঠন, দলের আভ্যন্তরিক শৃঙ্খলা রক্ষা, শাসন-ব্যবস্থা পরিচালন এবং প্রচারকার্য্য। পরিদর্শক কমিটীর কর্তব্য—হিসাব-পত্র পরীক্ষা করা এবং দলের আভ্যন্তরিক শৃঙ্খলা নষ্ট করা বা দলের অনুজ্ঞা অব- মাননা করার শাস্তি-বিধান। কেন্দ্রীয় শাসন-পরিষদের ৯৪ সান-ইয়াৎ-সেন তত্ত্বাবধানে প্রত্যেক বৎসর জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশন হইবে এবং এই জাতীয় কংগ্রেসই জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ শাসন- প্রতিষ্ঠান। কেন্দ্রীয় শাসন-পরিষদকে এই কংগ্রেসের অনুজ্ঞা মানিয়া চলিতে হইবে। ইহাই হইল নবীন চীন গণতন্ত্রের মূল শাসন-পদ্ধতি। ডাঃ সানের তিনটী নীতি ১৯২৪ সালের ২০শে জুন চীন জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম অধিবেশন হয়। এই কংগ্রেসে যে ম্যানিফেষ্টো (Manifesto) গঠিত হয়, তাহাই হইল চীন জাতীয় আন্দোলনের ভিত্তি এবং জাতীয়তাবাদী চীনের গীতা। সানের আদর্শ লইয়াই উহা গঠিত হয়, কিন্তু লিপিবদ্ধ করেন ওয়াং-চিঙ-উই। অনেকের ধারণা যে, ইহা বরােদীনের তৈয়ারী, কিন্তু তাহা সত্য নহে। (Tang Leang li). এখানে ওয়াং-চিঙ- উই-এর সামান্য পরিচয় দেওয়া প্রয়ােজন। সানের যৌবনের বিপ্লব-প্রচেষ্টার দিন হইতে ওয়াং বন্ধু, পার্শ্বচর ও পরামর্শদাতারূপে সানের সঙ্গে সঙ্গে থাকেন। সত্য- নিষ্ঠা, জাতিপ্রেম ও নির্ভীকতার দিক দিয়া একমাত্র ডাঃ সান ব্যতীত জাতীয় দলে তাহার সমকক্ষ আর কেহ নাই। ১৯২৫ হইতে ১৯২৭ সাল পর্যন্ত ইনি কেন্দ্রীয় কার্যকরী সংসদের সভাপতির কাজ করেন এবং কোয়ামিংটাঙ দলের লেফট পাটীর (Left Party) নেতা ছিলেন।

সান-ইয়াৎ-সেন এই ঐতিহাসিক ম্যানিফেষ্টো তিন ভাগে বিভক্ত। প্রথম T*T*152772--The Present Situation in China. og অংশে চীন জাতীয় শাসন-পরিষদ এবং তাহার সহিত চীনের অন্যান্য অংশ ও বিদেশী শক্তিদের সম্পর্কের কথা আলােচনা করা হইয়াছে। এই অংশের পরিশেষে চীনের জাতীয় আন্দোলনের উদ্দেশ্য ও আদর্শ সম্বন্ধে বলা হইয়াছে, চীনের বিভিন্ন সামরিক শাসন-তন্ত্র ও সাম্রাজ্যবাদের উচ্ছেদ সাধন করিয়া ডাঃ সান:প্রদর্শিত “জাতীয় শাসন-তন্ত্রের তিনটী নীতি” (Three People's Principles ) অনুসরণ করিয়া চীন গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা করা। দ্বিতীয় অংশে চীন গণতন্ত্রের ভিত্তিস্বরূপ ডাঃ সানের এই তিনটী নীতির ব্যাখ্যা করা হই- আছে। এই তিনটী নীতিই চীন জাতীয় আন্দোলনের প্রাণ। ১৯০৫ সালে সর্বপ্রথম ডাঃ সান এই “তিনটী নীতির” কথা প্রচার করেন। সাধারণত এই তিনটী নীতি Nationality জাতীয়তা, Popular Sovereignty—শাসনতন্ত্রের গণসম্মত রূপ, People's Livelihood—জাতির অর্থনৈতিক সমস্যা, এইরূপ ভাবে বিভক্ত করা হয়। এই নীতিতে “জাতীয়তা” কথাটীর একটী নূতন সংজ্ঞা আছে। জাতীয়তা সংশ্লিষ্ট নীতির ব্যাখ্যা এইরূপ। সালের পূর্ব পর্যন্ত এই নীতির অর্থ ছিল—মাথুরাজের বিরুদ্ধে চীন জনসাধারণকে এই আদর্শে সঙ্গবদ্ধ করা যে, শাসক মাধুরা এক জাতির আর শাসিতগণ অন্য জাতির। চীনের ১৯১১ ৯৬ সান-ইয়াৎ-সেন জাতীয় মৰ্যাদা রক্ষা করিতে হইলে মাথুরাজের উচ্ছেদ করিতে হইবে—কারণ তাহারা বিদেশী। কিন্তু মাথুরাজ- বংশের ধ্বংসের পর এই নীতির অর্থ হয় যে, বিদেশী শক্তির শশাষণ-নীতির বিরুদ্ধে চীনের সমস্ত উপজাতির সম্মেলন। এখন এই নীতির অর্থ হয়, (১) সাম্রাজ্যবাদের কবল হইতে চীন জাতির সম্মিলিত মুক্তি-সাধনা। (২) চীন-গণতন্ত্রের অধীন সংখ্যাল্প সমস্ত উপজাতির সংখ্যাগুরু জাতি বা উপজাতির সহিত সমান অধিকার বা মৰ্যাদা স্বীকার। শাসনতন্ত্র সম্বন্ধে দ্বিতীয় নীতিতে শাসন-যন্ত্রের সহিত জনসাধারণের সম্পর্কের কথা স্থিরীকৃত হইয়াছে। এই নীতি অনুসারে জনসাধারণকে ভােটর অধিকার প্রভৃতি গণতান্ত্রিক সুবিধা দেওয়া হইয়াছে এবং শাসন-ব্যাপারে এত দিন ধরিয়া যে তিনটী বিভাগ ছিল, তাহার পরিবর্তে পাঁচটী বিভাগের প্রবর্তন করা হইল—Legislative, Executive, Judiciary, Examinatory andCensorial. এই নূতন নাগরিক অধিকার সম্পর্কে বলা হয় যে, “The Kuo-Min-Tong shall see to it that the privileges of citizenship do not fall to those who are opposed to the Revolutionary State, to be used as an instrument against it.

সান-ইয়াৎ-সেন
তৃতীয় নীতি সম্বন্ধে ডাঃ সান তাহার অনুচরদের নিকট
হইতেই প্রথমত যথেষ্ট বাধা পান। People's Livelihood
তিনি সাম্যবাদ অর্থে ব্যবহার করেন। চীনের অভ্যন্তরে
কারখানা ও সেই সঙ্গে শ্রমিকদের দুরবস্থা, ধনতান্ত্রিকতা এবং
সেই সঙ্গে শশাষণ-নীতির প্রসার প্রতিরােধ করিবার জন্য সান
কৃষকদের জমির স্বত্বাধিকার ও তাহাদের মধ্যে নূতন করিয়া
ভূমি-বিতরণ এবং যে সমস্ত ব্যবসায় ব্যক্তিগত ধনপুষ্ট হইয়া
পরােক্ষভাবে শুধু জাতির রক্ত-মােক্ষণ করে, তাহা ধীরে ধীরে
স্টেটের অধীনে আনিবার জন্য এই নীতির প্রবর্তন করেন।
এই নীতিকে কার্যকরী করিয়া তুলিবার জন্য প্রথমত
নিম্নলিখিত বিষয়গুলির প্রবর্তন করা হয়, ভূমিহীন কৃষকদের
ভূমি-প্রদান, সেচ-কার্য্যের উন্নতি, ষ্টেট কর্তৃক কৃষিঋণের
বন্দবস্ত, আইন দ্বারা শ্রমিকদের দুরবস্থা লাঘব, বেকার
শ্রমিকদের দায়িত্বগ্রহণ।
ম্যানিফেষ্টোর তৃতীয় অংশে চীন গণতন্ত্রের সহিত বিদেশী
শক্তির সম্পর্কের কথা আলােচিত হয়। এই অংশে নির্ধারিত
হয় যে, মাঞ্চু-রাজগণের দুর্বলতার সুবিধা লইয়া বিদেশী
শক্তিদের সহিত চীন যে সমস্ত অমৰ্যাদাকর শর্তে আবদ্ধ,
গণতান্ত্রিক চীন তাহা অস্বীকার করে এবং এত দিন
ধরিয়া বিদেশীরা সাধারণ চীনা আইনের অতিরিক্ত যে
সমস্ত সুবিধা ভােগ করিয়া আসিতেছিলেন, তাহা রহিত
হইবে।
ab

সান-ইয়াৎ-সেন সােভিয়েট রুষিয়ার সহিত চীন-গণতন্ত্রের বিচ্ছেদ এই কংগ্রেসের প্রস্তাব অনুসারেই চীন-গণতন্ত্রের সহিত সােভিয়েট রুষিয়ার বন্ধুত্বের সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয় এবং চীন জাতীয় আন্দোলনের ইতিহাসে ইহা অন্যতম সর্বপ্রধান ঘটনা। এই ব্যাপার লইয়া নানা প্রচারকার্যের মধ্য দিয়া নানা সমস্যা ও জটিলতা মাথা তুলিয়া উঠে এবং আজও যে তাহার অবসান হইয়াছে, তাহা বলা যায় না। এখানে সংক্ষেপে শুধু এই সম্পর্কের ইতিহাসটুকু লিপিবদ্ধ হইল। স্বয়ং ডাঃ সান প্রথম জাতীয় কংগ্রেসে এই প্রস্তাব উত্থাপন করেন। এই প্রস্তাব উপস্থিত করিবার সময় রুষপ্রতিনিধি জোফে এবং তাঁহার মিলিত স্বাক্ষরে মিলনের যে শর্ত স্বীকৃত হইয়াছিল, তাহা সান পাঠ করেন। এই অঙ্গীকার-পত্রে লিখিত ছিল,—“ডাঃ সানের দৃঢ় বিশ্বাস যে, সােভিয়েট শাসন-পদ্ধতি বা কমিউনিজম রুষিয়াতে যে ভাবে প্রবর্তিত হইয়াছে, চীন দেশে সেই ভাবে তাহা কখনই হইতে পারে না; কারণ যে সমস্ত লক্ষণ বা অবস্থা উক্ত নীতির অনুকূল, চীনে তাহা বর্তমান নাই। মিঃ জোফেও এই বিষয়ে ডাঃ সানের সহিত একমত এবং মিঃ জোফে বিশ্বাস করেন যে, চীনের এখন সব চেয়ে বড় কর্তব্য হইতেছে, জাতীয় ঐক্য সংঘটন এবং পূর্ণ স্বাধীনতা অর্জন করা। এই ব্যাপারে মিঃ জোফে আশ্বাস দিতেছেন যে,

সান-ইয়াৎ-সেন
চীন রুষ জনসাধারণের পূর্ণ সহযােগিতার উপর নির্ভর
করিতে পারে।”
এই অঙ্গীকার-পত্র পাঠ করার পর ডাঃ সান বলেন, “ইহা
হইতে স্পষ্টই বােঝা যায় যে, চীনের উপর জোর করিয়া
সােভিয়েট-তন্ত্র প্রতিষ্ঠিত করিবার অথবা চীনে কমিউনিজমের
প্রচার কার্য করিবার কোনও ইচ্ছা রুষিয়ার নাই। আমাদের
জাতীয় দলে কমিউনিষ্ট দল হইতে সভ্য লওয়া হইতেছে শুধু
এই কারণে যে, তাঁহারা আমাদের জাতীয় আন্দোলনে
সহায়তা করিবেন। যদি কোন কারণে দেখা যায় যে,
কমিউনিষ্টরা কোয়ামিং-টাঙের নীতির বিরুদ্ধাচরণ করিতেছেন,
তাহা হইলে সর্বপ্রথম আমিই তাহাদের বহিষ্করণের প্রস্তাব
আনিব।”
এই প্রস্তাব হয় ১৯২৪ সালের জানুয়ারী মাসে। ইহার
তিন বৎসর পরে ১৯২৭ সালে কোয়ামিং-টাঙ দলের
সহিত কমিউনিষ্ট দলের সংঘর্ষ বাধিল। চীনের জাতীয়
আন্দোলনকে সহায়তা করিবার শর্তেই বরােদীনকে
কোয়ামিং-টাঙের পরামর্শদাতারূপে গ্রহণ করা হয়।
কিন্তু ক্রমশঃ কোয়ামিং-টাঙ দলের নেতাগণ দেখিলেন যে,
বরােদীনের প্রচারের ফলে কমিউনিষ্ট দল কোয়ামিং-টাঙের
সমকক্ষ শক্তি অর্জন করিয়া তাহার উপর প্রভুত্ব করিতে
চায়। জাতীয় দল তখন বিভক্ত—সেই অবসরে কমিউনিস্ট
দল রীতিমত শক্তি সংগ্রহ করে। ক্রমশঃ কোয়ামিং-টাঙের

সান-ইয়াৎ-সেন সহিত তাহার রুষ-পরামর্শদাতার সম্পর্ক শিথিল হইয়া উঠিতেছিল এবং স্থানে স্থানে জাতীয় দলের সহিত প্রকাশ্য সংঘর্ষও চলিতে লাগিল। ১৯২৭ সালের ১লা জুন সােভিয়েট রুষিয়ার প্রতিনিধি- রূপে মিঃ এম. এন. রায় কোয়ামিং-টাঙের কাৰ্যকরী সংসদের সভাপতি ওয়াং-চিঙ-উই-এর সহিত সাক্ষাৎ করিবার জন্য আসিলেন। বিশেষ প্রয়ােজনে মিঃ রায় ওয়াংকে তঁাহার আবাস- স্থলে নিমন্ত্রণ করিয়া পাঠাইলেন। উভয়ের সাক্ষাৎ হইলে মিঃ রায় বলিলেন,-“আমার এবং বরােদীনের নামে স্টালিনের কাছ থেকে একখানা টেলিগ্রাম এসেছে—বরােদীন কি আপ- নাকে সে টেলিগ্রামের কথা জানিয়েছেন ?” ওয়াং জানাইলেন যে, কোনও টেলিগ্রামের খবর তিনি জানেন না। মিঃ রায়—বরােদীনের ইচ্ছা নয় যে, আপনাকে এখন এই টেলিগ্রাম দেখান। কিন্তু আমি মনে করি, আপনার এই টেলিগ্রামের ব্যাপার জানা বিশেষ প্রয়ােজন। সেই সময় কোয়ামিং-টাঙের সহিত কমিউনিষ্টদের উহান প্রদেশে ভূমি অধিকার লইয়া তুমুল সংঘর্ষ চলিতেছিল। কমিউ- নিষ্টরা চাহিতেছিলেন জোর করিয়া সমস্ত ভূমি দখল করিয়া লইতে। মিঃ রায় দেখাইলেন যে, স্টালিন টেলিগ্রামে চীন কমিউনিষ্ট পার্টির নিকট আদেশ পাঠাইয়াছেন যে, অবিলম্বে যেন উহান প্রদেশে সমস্ত ভূমি অধিকার করিয়া লওয়া হয়, এমন ভাবে কোয়ামিং টাঙের পুনর্গঠন করা যাহাতে “বিশ্বাসী” ১০১ সান-ইয়াৎ-সেন করে, আজ তাহাদের অনেককে জাতীয় শাসন-তন্ত্রের অন্তর্ভুক্ত করা হইয়াছে ; যেসমস্ত লােক জাতীয় আন্দোলনের শত্রু, তাহাদেরও দলভুক্ত করিয়া লওয়া হইয়াছে ; অথচ যাহারা ডাঃ সানের প্রবর্তিত তিনটী নীতি ও চীন-বিপ্লবের জন্য জীবন- মরণ পণ করিয়াছে, তাহাদের অনেকেই আজ শাসনযন্ত্রের বাহিরে অবস্থান করিতে বাধ্য হইয়াছে। চীনের কৃষকদের স্বার্থের দিকে না চাহিয়া, শুধু ব্যবসায়ী ও ধনিকদের লক্ষ্য করিয়াই চ্যাং তাহার নূতন শাসন-নীতি প্রবর্তন করিয়াছেন। সেই জন্য অনেকের ধারণা যে, সান-ইয়াৎ-সেন যে আন্দো- লনের ধারা চীনে লইয়া আসেন, তাহা এখনও পরিপূর্ণ রূপ পরিগ্রহ করে নাই এবং চীনের আভ্যন্তরিক অশান্তি প্রশমিত হইতে হয় তাে এখনও অনেক বিলম্ব আছে। ১০৪ অধ্যাপক কাজী আব্দুল ওদুদ, এম্-এ প্রণীত -রবীন্দ্রকাব্যপাঠ- ( মনােবিকাশের ধারা অনুসরণ—মূল্য ১• সিকা) “আমার রচনা এমন সরস বিচারপূর্ণ সমাদর আর কারাে হাতে লাভ করেছে বলে মনে পড়ে না। এর মধ্যে যে সূক্ষ্ম অনুভূতি ও ভাষানৈপুণ্য প্রকাশ পেয়েছে তা বিস্ময়কর। তােমার মতাে পাঠক পাওয়া কবির পক্ষে সৌভাগ্যের বিষয়।......”-রবীন্দ্রনাথ “কাজী সাহেব সুপ্রতিষ্ঠ সাহিত্যিক। তাহার রসবােধ ও সাহিত্য-প্রতিভার সহিত বহুদিনই পরিচিত ছিলাম, তাই যখন সাময়িক পত্রে তাহার রবীন্দ্রকাব্যপাঠ পড়িয়াছিলাম, তখনই মুগ্ধ হইয়া- ছিলাম। এখন সেই লেখাগুলি একত্র সংগৃহীত এবং সংশােধিত হইয়া পুস্তকাকারে প্রকাশিত হইয়াছে। বাঙ্গলার সমালােচনা-সাহিত্যে এই গ্রন্থখানি স্থায়ী আসন পাইবে সন্দেহ নাই। কাজী সাহেব রবীন্দ্রনাথের বিভিন্ন সময়ের লেখা কবিতাগুলির ভাবধারা অনুসরণ করিয়া কবি- অন্তর্লোকের যে বিকাশ নিপুণভাবে চিত্রিত করিয়াছেন, তাহাতে তাহার রবীন্দ্রকাব্যপাঠ তাে সার্থক হইয়াছেই—আরও অনেক পাঠক রবীন্দ্র- নাথের কবিতার মধ্যে যে অতুলনীয় অধ্যাত্ম সম্পদ নানা বিচিত্র রসে অভিষিক্ত হইয়া রহিয়াছে, তাহার রসাস্বাদ করিতে পারিবেন। কাজী সাহেবের কাব্যপাঠ সার্থক হইয়াছে।”-আনন্দবাজার পত্রিকা নব পৰ্য্যায়- (কয়েকটা প্রবন্ধের সমষ্টি–১ম ও ২য় খণ্ড, প্রতি খণ্ড • আনা ) এতে মনের জোর, বুদ্ধির জোর, কলমের জোর এক সঙ্গে মিশেছে। গোড়ামীর নিবিড় বিভীষিকার ভিতর দিয়ে কুঠার হাতে তুমি......পথ কাটতে বেরিয়েছ তােমাকে ধন্থ *রবীন্দ্রনাথ কাজী নজরুল ইসলামের ব্যথার দান- “ব্যথার দান গদ্যে লিখিত গল্প পুস্তক হইলেও সাধারণ গল্প পুস্তক হইতে ইহার প্রভেদ আছে। ভাষার স্বচ্ছন্দ গতি, বর্ণনা-চাতুর্য, কল্পনার বর্ণমাধুরী সমস্ত বই খানির চারিদিকে কবিত্বের স্বপ্নজাল বুনিয়া দিয়াছে। যে-হিসাবে ‘উদ্ভ্রান্ত প্রেম’ ও ‘বসন্ত-প্ৰয়াণ’ বাংলা-সাহিত্যে গদ্যকাব্য, সেই হিসাবে ব্যথার দান’কেও গদ্যকাব্য বলা যাইতে পারে।” “বাংলার নবযুগের কবি কাজী নজরুল ইস্লামের নাম আজ বাংলার ঘরে ঘরে। ব্যথার দান’ একখানি গদ্যকাব্য। তরুণ কবির ব্যথা- ভারাতুর, যৌবনের অর্ধনগ্ন স্মৃতির রাগ-রক্তে অনুরঞ্জিত কাহিনী এই কাব্যের কথা-বস্তু। সমস্ত কাহিনীগুলির রঙ্গমঞ্চ যুদ্ধক্ষেত্র—যেখানে জীবন চলিয়াছে প্রত্যক্ষ ভাবে মৃত্যুর আলিঙ্গনে বদ্ধ হইয়া। সমস্ত কাহিনীগুলির উপর মৃত্যুর মসীগাঢ় ছায়া নিদারুণ ভবিতব্যতার মত রহিয়াছে। তাই সেই ছায়ার অবগুণ্ঠনে প্রেম-করুণ হৃয়য়ের ব্যথা-ক্রন্দন আপনি করুণ হইয়া উঠিয়াছে।”—আনন্দবাজার পত্রিকা *প্রেমের এবং বিরহের, আবেগের এবং আশঙ্কার, নায়ক এবং নায়িকার নানারূপ বিচিত্র মনােভঙ্গী রঙ্গিল তুলিকায় চিত্রিত। প্রেমােন্মাদ এবং ভাববাদের বিচিত্র ভঙ্গীর ন্যায় ভাষাও ইহার বিচিত্রীভঙ্গিশালিনী। রবীন্দ্র-সাহিত্যের অনুরণনে অনুরঞ্জিনী। প্রেম ও বিরহ ভাবের ভাৰুক ‘ব্যথার দানে অনেক সান্ত্বনা পাইতে পারিবেন।”—বঙ্গবাসী মূল্য দেড় টাকা

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

San-eyath- Sen

Author
Chattapadhyya, Nripendrakrishna
Title
San-eyath- Sen
File name
San-eyath- Sen
Text
OCR done
Citation
1931
Published
2010/01/30
Publisher
Moslem Publishing House ,kolkata
Language
Sanskrit
Pages
124
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Biography
Keywords
Chattapadhyya, Nripendrakrishna
DLI number
513212
Barcode
4990010020212.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
MpwiTJ7h638
Download PDF

San-eyath- Sen