Garh Bhawanipur R.p. Institute, Howrah
Cheleder Bhaktamal Ed.4
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
GAR UNW2:}{!'
টলমের গন্তুকপূতOw8 -
ছেলেদের ভক্তমাল
রক্টর বাহাদুর কর্তৃক বঙ্গদেশের যাবতীয় স্কুলের জন্য
প্রাইজ ও লাইব্রেরী পুস্তকরূপে অনুমােদিত
[ কলিকাত গেলেই মে, ১৯৪০ )
UBIASIS
শ্রীদুর্গামােহন মুখােপাধ্যায়
मीन
wa*
১৭
আট আল
প্রকাশক
বৃন্দাবন ধর য়্যাণ্ড সন্স, লিঃ
স্বত্বাধিকারী—আশুতোেষ লাইব্রেরী
৫নং কলেজ স্কোয়ার-কলিকাতা
৩৮নং জনসন রােড-ঢাকা
চতুর্থ সংস্করণ
১৩৪৭
মুদ্রাকর
শ্রীপরেশনাথ ব্যানার্জী
মীনারসিংহ প্রেস
৫নং কলেজ স্কোয়ার
কলিকাতা
TUE. HOWiki
।
'B3A:
:
নিবেদন
বাংলার নরনারীর চিরসমাদৃত ভক্তমাল গ্রন্থ
অবলম্বনে “ছেলেদের ভক্তমাল” রচিত। ইহার
কতকগুলি গল্প বিভিন্ন সময়ে “শিশু-সাথীতে প্রকাশিত
হইয়াছিল। যাদের কল্যাণ-কল্পে এই পুস্তক লিখিত,
তারা ইহা পাঠ করিয়া যদি নিজেদের মন একটুও
সরল, শুভ্র ও সুন্দর করিয়া তুলিতে পারে তবেই
নিজেকে কৃতার্থ মনে করিব। ইতি
কলিকাতা
দুর্গামােহন মুখােপাধ্যায়
জন্মাষ্টমী,
No text on this page.
সূচীপত্র বিষয় পাঙ্ক ১। নর-নারায়ণ ২। আচার-বিচার ••• ৮ প্রেমের যাদু ৪। বিশ্বাসের জয় ভক্তের ভগবান ০ ০ ০ २६ R ৬। পাপের ভােগ । • ১ : ৩৪ ৭। রাখেন কৃষ্ণ মারে ৫৫ ০২ ৮। চন্দ্রহাস ৪৬ #s. বােবা রাজপুত্র ••• ৫২ ১০। সাক্ষীগােপাল ডাকাত ব্রাহ্মণ ০ ০ ০ se ১২। বিপদের বন্ধু ••• ১৩। দেবতার দরদ ১৪। মায়ার ফাস মনের সাধ ০ ০ ০ ৭৮ ১৬। স্পর্শমণি ১৭। অগতির গতি ৮৭
No text on this page.
son
RAH
ছেলেদের ভক্তমাল
od
• ২
নর-নারায়ণ
ত্রিলােচন বণিকের যথেষ্ট টাকা-পয়সা ছিল ;
তিনি আর তার স্ত্রী ছাড়া ঘরে আর কেউই ছিল না।
ছেলে-মেয়ে কেউ না থাকায় ঘরটা যেন একেবারে ফাকা-
ফঁাকা মনে হইত। বাড়ীতে সাধু, সন্ন্যাসী বা অতিথি আসিলে
তাঁরা দুইজনেই তাঁকে দেবতার মত সেবা করিতেন। বাকী
সময় সংসারের কাজকর্ম এবং ভগবানের
নাম লইয়া
কাটিত। এমনি করিয়া তাদের দিন যাইতেছিল।
একদিন তাদের দরজায় আসিয়া উপস্থিত হইল—অতি
দরিদ্র এক বালক। বালকের কাপড় হেঁড়া-ফেঁড়া, মুখখানা
২
ছেলেদের ভক্ত
অতি মলিন—বিষ, যেন কতদিন তার না হইয়াছে নাওয়া,
আর না হইয়াছে খাওয়া,। তাকে দাড়াইয়া থাকিতে দেখিয়া
“এখানে দাড়িয়ে কেন বাবা?”
ত্রিলােচন গিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন,—“এখানে দাড়িয়ে কেন
বাবা? কিছু চাই কি তােমার ?”
–“আমার বাপ-মা কেউ নেই, আমি বড়ই দুঃখী।
আপনি একটু দয়া ককূলে আমি বেঁচে যাই।”
নর-নারায়ণ
-“তােমার কি নাম বাবা?”
-“আজ্ঞে আমার নাম অন্তর্যামী।”
বালকের নিতান্ত দুঃখের দশা দেখিয়া বণিকের মন
গলিয়া গেল। খুব স্নেহের স্বরে তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন,
কোন কাজটাজ করতে পার কি?”
-“আজ্ঞে পারি।”
-“কি কাজ করূতে পার ?”
—“যা হুকুম কবেন।”
-“বেশ কথা। কত মাইনে চাও ?”
-“মাইনে আমায় কিছুই দিতে হবে না। টাকা নিয়ে
কি করব? আমার ত কেউই নেই। আমি পেটে-ভাতেই
খুব খুশী হয়ে থাকব’খন।”
—“বেশ! তুমি আমার এখানেই থাক। আমার ঘরে
অতিথি আসেন, বহু সাধু পায়ের ধূলাে দেন, তুমি তাদেরই
সেবা-যত্ন করবে।
কেমন?”
-“আজ্ঞে আচ্ছা।”
কিছুদিন যায়। সে সকলের সেবা করে। সাধুরা
আসেন, তার ব্যবহার ও যত্নে মুগ্ধ হন। তার স্বভাবটি
যেমন ঠাণ্ডা, চালচলনও তেমনি নেহাৎ সাদাসিদে।
ত্রিলােচনও তাকে ঘরের ছেলেই মনে করিতে লাগিলেন।
৪
ছেলেদের ভক্তমাল
ক্রমে তার প্রতি এতই ভালবাসা জন্মিল যে, খানিকক্ষণ
দেখিলেই ত্রিলােচনের মনটা বড়ই অস্থির হইয়া
পড়িত। পুত্র ছিল না, এই বালকের প্রতি অসীম হেই
তার শূন্য বুক পূর্ণ করিয়া দিল।
ত্রিলােচনের স্ত্রীও যে অন্তর্যামীকে খুব ভালবাসিতেন না
তা নয়; কিন্তু সে খুব বেশী খাইত বলিয়া একটু বিরক্ত
হইতেন। এক এক দিন সে এতই বেশী ভাত খাইয়া
ফেলিত যে, আর কিছুই থাকিত না। কাজেই ত্রিলােচনের
স্ত্রীকে প্রায়ই না খাইয়া থাকিতে হইত।
একদিন বিকালবেলা ত্রিলােচনের স্ত্রী পাড়ার এক
বাড়ীতে বেড়াইতে গিয়াছেন। সেখানে এবাড়ীর ও-বাড়ীর
স্ত্রীলােকেরা আসিয়াছেন। তাদের সঙ্গে নানা কথায় তিনি
বলিলেন,—“কি বলবাে দিদি, আমার বাড়ীতে এক অদ্ভুত
ছেলে এসেচে। ছেলেটি এদিকে খুব ভালই বটে, কিন্তু খায়
যেন রাক্ষসের মত। বেশী খায় বলে চালও বেশী নেই;
কিন্তু এক-একদিন তিন-চার জনের ভাত-ডাল-তরকারী সে
একলাই খেয়ে ফেলে। প্রায়ই খেতে পাই নে—আবার
রাঁধূতেও ইচ্ছে করে না।”
পাড়ার স্ত্রীলােকেরা এই খাওয়া লইয়া নানাভাবে নানা
কথা কহিতে লাগিল।
MAR BH'WAMPU
{{ " .. ৫ • !.187AY
{{:} . 19
০,
CHIHASE:PUR.
HOWRAH
ন
U
পাড়ার স্ত্রীলােকেরা নানাভাবে নানা কথা কহিতে লাগিল
ছেলেদের ভক্তমাল
হইল।
অন্তর্যামী বাড়ীতে নাই, কোথায় চলিয়া গিয়াছে।
দিন শেষ হইল, রাত্রি আসিল। কিন্তু কোথায় সে?
ত্রিলােচনের মন অস্থির কি এক ব্যথা তার সমস্ত
বুকে বাজিয়া উঠিল। তাঁর স্ত্রীরও খুবই দুঃখ হইল,
ভাবিলেন—“তাই ত ! না হয় দুটো বেশীই সে খেয়েছে,
না হয় মাঝে মাঝে আমি খেতেই পাই নি। কিন্তু ওর
অভাবে আজ যে সমস্ত বাড়ীটাই একেবারে কঁকা-ফঁাকা
ঠেছে।
তিনিও মনে মনে খুবই ব্যথা অনুভব করিলেন।
ত্রিলােচন অত্যন্ত শােকাকুল হইয়া পড়িলেন। রাত্রি
বেশী হইল। অনেক সাধ্যসাধনা করিয়াও তাকে খাওয়ানাে
গেল না। সে রাত্রি ত তার অনাহারে অনিদ্রায়ই কাটিয়া
গেল। তার পরদিনও তিনি উঠিলেন না, কিছু খাইলেনও
তার পরদিনও এমনি করিয়াই কাটিয়া গেল।
স্ত্রীও না খাইয়া পড়িয়া রহিলেন। স্বামীর অবস্থা দেখিয়া
তার বড়ই ভয় হইল।
তিন দিনের দিন রাত্রে ত্রিলােচনের সবেমাত্র একটু
তার ভাব আসিয়াছে, এমন সময় তিনি এক দৈববাণী
শুনিতে পাইলেন। ভগবান যেন তাকে বলিতেছেন,-“দুঃখ
করাে না ত্রিলােচন, আমিই তােমার কাছে ঐ অন্নহীন
অনাথের বেশে গিয়েছিলুম। জেনে রেখাে-অনাথ, আতুর,
নর-নারায়ণ
অন্ধ, অসহায়ের সঙ্গেই আমি থাকি, তাদের সেবাই আমার
সেবা।”
ত্রিলােচন বলিলেন,-“আমি ত তােমার সেবা করতে
পারি নি। আমার অপরাধ মাপ কর ঠাকুর।”
উত্তর হইল,-“না, তােমার কোন অপরাধই হয় নি,
আমি খুশীই হয়েছি।”
-“তবে দয়া করে আমায় একবার দেখা দাও তােমায়
দেখে আমার জীবন ধন্য করি।”
উত্তর হইল,-“আমি তােমার অন্তরেই আছি। যখনই
আমায় নিবিষ্টচিত্তে ভাববে তখন তােমার ভিতরেই দেখতে
পাবে।”
ত্রিলােচনের অন্তরটি
পুলকে
ভরিয়া গেল
তিনি উঠিয়া
বসিলেন। তাঁর দুই চক্ষু
চক্ষু দিয়া অঝােরে জল ঝরিতে
লাগিল।
।
৫। t" *. Ift: 1.1.1PS,
P, ০, CHir,
{{? [0:5 | 0! LIBRAY
{ " "
} Hr.
আর-বিচার
মাতােয়ার দেশ। বেলা দুপুর। এক পথিক চলিয়াছেন
অতি বিস্তীর্ণ প্রান্তরের ভিতর দিয়া। গায়ে তার গেরুয়া
কাপড়, গলায় মালা। সর্বাঙ্গে ঘাম আর ধূলা। বিশ্রাম,
আর কিছু আহারের তাঁর নিতান্তই দরকার হইয়াছে।
চলিতে চলিতে তিনি দূরে এক মন্দির দেখিতে পাইলেন।
মন্দিরের দাওয়ায় বসিয়া তিনি একটু সুস্থ হইলেন।
মন্দিরে শ্রীশ্রীজগন্নাথ দেবের বিগ্রহ রহিয়াছেন। পূজাও
শেষ হইয়া গিয়াছে, কিন্তু পূজারী সেখানে নাই। আশে-
পাশের লােক তাকে দেখিয়া বুঝিল—তিনি একজন সাধু।
তারাও কাছে আসিয়া দাঁড়াইল। তাদের কাছেই তিনি
শুনিলেন যে, কমাবাঈ নামে এক নারী সেই মন্দিরে
ঠাকুরের সেবা করেন, তাঁর ভক্তির কথা মাড়ােয়ার দেশের
সকল লােকেই জানে। একটু পরেই করমাবাঈ স্নান
করিয়া ভিজা কাপড়েই ফিরিয়া আসিলেন। সাধুকে দেখিয়া
সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করিয়া দাড়াইতেই সাধু জিজ্ঞাসা করিলেন,
—“মা, মনে হচ্ছে তােমার পূজো হয়ে গেছে, এখন নেয়ে এলে
কেন? তবে কি তুমি এখন ভােগ রেধে দেবে ?”
।
আচার-বিচার করমাবাঈ বলিলেন,-“না বাবা, ভােগ দেওয়া হয়ে গেছে।” সাধু জিজ্ঞাসা করিলেন,—“তবে কি তুমি পূজো হয়ে গেলে আবার স্নান কর ?” করমাবাঈ উত্তর দিলেন,—“না বাবা, আমি একবারই স্নান করি। সকালে উঠেই রেধে ঠাকুরকে খাওয়াই।” সাধু দুই চোখ কপালে তুলিয়া বলিলেন,-“এ! তুমি কাপড় না ছেড়েই ঠাকুরের জন্য রান্না কর?” করমাবাঈ বলিলেন,—“হ্যা বাবা, আমার জগন্নাথ যে ক্ষিদেয় বড় কষ্ট পান, তার কষ্ট মােটেই সহ্য করতে পারিনে ; তাই কাপড় না ছেড়েই তাড়াতাড়ি রেধে তাকে খাইয়ে সুস্থ করি।” সাধু বলিলেন,-“এ যে ঘাের অনাচার ! ছি ছি ! এমনি করে কি ঠাকুরের সেবা করতে আছে ?” বড়ই অপরাধ করিয়াছেন মনে করিয়া করমাবাঈ অতি কাতরভাবে বলিলেন,—“আমি জ্ঞানহীনা নারী, আচার- বিচারের কিছুই জানি নে। আমার অপরাধ হয়েছে, আপনি দয়া করে আমায় ক্ষমা করুন। আর আমি স্নান করে ঠাকুরের সেবা কতে যাব না। আপনারও বড়ই কষ্ট হচ্ছে, এই দারুণ বােদ্দরে এতটা পথ চলে এসেছেন। এখন দয়া করে স্নান সেরে আসুন, আমার ঠাকুরের প্রসাদ নিয়ে যেতে পারবেন না।”
ছেলেদের ভক্তমাল
সাধুর পেটে তখন আগুন জ্বলিতেছে। যদিও এই অনাচার
দেখিয়া তার মনটা কি রকম হইয়া গিয়াছিল, তবু তিনি স্নান
করিতে গেলেন। এদিকে করমাবাঈ তাড়াতাড়ি সাধুর জন্য
ভােগ প্রস্তুত করিলেন। সাধু তা গ্রহণ করিয়া অত্যন্ত পরিতৃপ্ত
হইলেন।
কি করিয়া ঠাকুরের সেবা করিতে হয়, আচার-বিচার কাকে
বলে, নানা শাস্ত্র থেকে বহু শ্লোক উদ্ধার করিয়া করমাবাঈকে
বুঝাইয়া দিয়া সাধু বিদায় লইলেন।
কিছুদিন যায়। করমাবাঈ আর ভােরে উঠিয়াই ঠাকুরের
ভােগ রধিতে যান না। এখন তিনি ঘরের সব কাজ সারিয়া
স্নান করিয়া আসিয়া ঠাকুরের সেবায় মন দেন, কাজেই ঠাকুরের
সেবা এখন খুব বেলায় হয়। সাধুর উপদেশ তিনি অক্ষরে
অক্ষরে পালন করেন, আচার-বিচারের দিকে এখন তার নজর
খুব বেশী। বেলা হয় আর ভাবেন—ঠাকুরের বুঝি বড়ই কষ্ট
হইতেছে। তিনি যে ঠাকুরকে নিজের ছেলের মতই প্রাণ দিয়া
ভালবাসিতেন, কিন্তু আচার-বিচার রক্ষার জন্য তাঁকে বাধ্য
হইয়াই দেরী করিতে হইত।
সাধু মাড়ােয়ার থেকে শ্রীক্ষেত্রে গিয়া উপস্থিত হইলেন;
মন্দিরের কাছে পড়িয়া থাকিয়া কেবল ভগবানেরই চিন্তা
করিতে লাগিলেন।
আচার-বিচার এদিকে একদিন জগন্নাথদেবের সেবাইত রাত্রে স্বপ্নে দেখিলেন যে, স্বয়ং জগন্নাথ কাছে আসিয়া তাকে বলিতেছেন— “দেখ, তাের দেওয়া ভােগ খেতে আমার বড় দেরী হয়ে যায়। আমার খাওয়াই হয় না। মাড়ােয়ার দেশে করমাবাঈ আমায় যে ভােগ বেঁধে দেয়, তা না খেয়ে আমি আসতে পারি নে, সে যে আমায় ছেলের মত ভালবাসে। সে সকালে উঠেই তাড়াতাড়ি আমায় বেঁধে দিত, তাই খেয়ে আমার ক্ষিদে মিত। আজকাল সে বড় দেরী কচ্ছে। আমার ভারি কষ্ট হয়।” এই কথা বলিয়াই ঠাকুর অদৃশ্য হইলেন। সেবাইতের তন্দ্রা ছুটিয়া গেল। তিনি কঁদিতে লাগিলেন। একটি ভাবনাই তঁার বুকের ভিতরটা তােলপাড় করিতে লাগিল- হায় রে ! ঠাকুর আমার ক্ষুধায় কষ্ট পান। সমস্ত রাত্রি তিনি কাঁদিয়া কঁদিয়া ঠাকুরের কাছে ক্ষমা চাহিলেন। ভাের হইতেই কথাটা চারিদিকে রটনা হইয়া পড়িল। সেই সাধুর কানে কথাটা যাইতেই তাঁর হৃৎপিণ্ডটা ধরিয়া কে যেন খুব জোরে একটা মােচড় দিয়া দিল। তিনিই যে আচার-বিচারের কত শুষ্ক উপদেশ কমাবাঈকে দিয়া আসিয়াছিলেন। তাঁর দুই চোখ দিয়া ঝ-ঝক্ করিয়া জল পড়িতে লাগিল। তিনি উঠিয়া গিয়া সেবাইতকে সব কথা বলিলেন। ২
ছেলেদের ভক্তমাল
প্রায় একমাস পরে একদিন কমাবাঈ ঠাকুরের সেবা
করিয়া মন্দির হইতে বাহির হইবেন—এমন সময়েই দেখিলেন,
সেই সাধু মন্দিরের সামনে দাঁড়াইয়া আছেন, আর তার গালের
উপর দিয়া চোখ থেকে জল গড়াইয়া পড়িতেছে।
করমাবাঈ তাড়াতাড়ি আসিয়া প্রণাম করিয়া জিজ্ঞাসা
করিলেন,—“কি হয়েছে বাবা? আমি কি আবার কোন
অপরাধ করেছি ?”
সাধু কঁদিতে দিতে ঘটনাটি বর্ণনা করিয়া বলিলেন,
“মা, তুমি যে ঠাকুরকে কি রকম ভালবাস, তােমার অন্তর
যে কত পবিত্র, তুমি যে সত্যই দেবী, তা বুঝতে না পেরে
তােমাকে আচার-বিচার মাতে উপদেশ দিয়ে আমি মহাপাপ
করেচি।
তােমার কাছে ক্ষমা চাই মা। তুমিই প্রকৃত
জ্ঞানী, আমিই অবােধ। কালকে থেকে আগের মতই ভােরে
উঠে’ ঠাকুরকে রেধে দিও। কি ভাগ্যবতী তুমি মা। তােমার
হাতে না খেয়ে ঠাকুর শ্রীক্ষেত্রের ভােগও গ্রহণ করেন না।
আজ বুঝেছি
অন্তর যার ও তাহারবা আচার মিছে।”
CAR BH'WAF!!!
Fi PUR. 110)
Witt
| 1377
(1; {::::
-
ধনী গৃহস্থও
এক পল্লীগ্রামে বহু লোেক বাস করে।
সেখানে কম নয়। একদিন এক গৃহস্থ ব্যবসা করিয়া বহু টাকা
লইয়া ঘরে আসিল। সে একটা থলেতে করিয়া টাকাগুলি
খুব গােপনে এক জায়গায় রাখিয়া দিল।
সেই গ্রামের এক চোর গােপনে গােপনে ইহা লক্ষ্য করিল।
রাত্রে যখন সকলে ঘুমে অচেতন হইয়া আছে, ঠিক সেই সময়ে
সেই চোর প্রাচীর টপকাইয়া বাড়ীর মধ্যে প্রবেশ করিল এবং
টাকার থলেটি লইয়া চম্পট দিল।
ভােরে টাকার থলে দেখিতে না পাইয়া গৃহস্থ রাজদরবারে
খবর দিল। রাজকর্মচারীরা গ্রামের দাগী চোরদের ধরিয়া
লইয়া গেল, তাদের বাড়ী খুঁজিয়া দেখিল, কিন্তু টাকা ত
পাওয়াই গেল না, আর তারা যে চুরি করিয়াছে এমন কোন
প্রমাণও পাওয়া গেল না। কাজেই কাকেও ধমকাইয়া আর
কাকেও বা দুই-এক ঘা বেত মারিয়া ছাড়িয়া দেওয়া হইল।
প্রকৃত চোর ধরিবার জন্য রাজা গােয়েন্দা নিযুক্ত করিলেন।
গােয়েন্দাপুলিশ ছদ্মবেশে নানা জায়গায় চোরের অনুসন্ধান
করিতে লাগিল।
১৪
ছেলেদের ভক্তমাল
চোর ভাবিল, যখন গােয়েন্দা পিছনে লাগিয়াছে, আর তার
উপর যখন রাজকর্মচারীদের একটু সন্দেহও আছে, তখন
একদিন না একদিন সে ধরা পড়িবেই। তার বড়ই ভয় হইল,
কিন্তু কি যে করিবে কিছু ঠিক করিতেও পারিল না।
এমনি করিয়া দুই-এক দিন ত কাটিয়া গেল। একদিন
এক জায়গায় এক কথক ঠাকুর কথকতা করিতেছেন, আর
কথক ঠাকুর কথকতা করিতেছেন
অনেক পুরুষ ও নারী সেখানে বসিয়া একমনে ভক্তির কথা
শুনিতেছে। চোর ভাবিল,-“এত লােক ত কথা শুচে, গিয়ে
হয় আমিও একটু শুনি। সেখানে গিয়া শুনিল, কথক
ঠাকুর বলিতেছেন,—“যত মানুষ আমরা দেখি এদের অনেকেই
কিন্তু প্রকৃত মানুষ নয়। মানুষের অন্তরে যখন ভক্তির
সঞ্চার হয়, সব ভুলে গিয়ে সে যখন ভগবানকেই চায়, তখনই
প্রেমের যাদু
তার অন্তরে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মায়। অতএব মানুষের উচিত
প্রকৃত মানুষের কাছে দীক্ষা নিয়ে ভগবানে মন-প্রাণ অর্পণ
করা, তবেই সে নতুন মানুষ হয়ে উঠবে, তার পুনর্জন্ম হবে।”
চোর ভাবিল,—“আমিও যদি ভক্তি-মন্ত্রে দীক্ষা নেই তবে
আমারও ত সব পাপ-তাপ দূর হয়ে যাবে, আমিও ত নতুন
মানুষ হব, আমারও ত পুনর্জন্ম হবে। তবে আর কেন? সব
ছেড়ে দিয়ে আমি এখুনি দীক্ষা নেব।
আর একটু কালও দেরী না করিয়া সে বাহির হইয়া
পড়িল। খুজিতে খুজিতে এক সাধু পুরুষের দর্শন মিলিল।
তাঁকে প্রণাম করিয়া সে বলিল,-“ঠাকুর, ভগবানের অসীম
দয়ায় আজ আপনার শ্রীচরণ দর্শন করলুম। আমার বড়ই
ইচ্ছে যে, আপনার শিষ্য হয়ে জীবন ধন্য করি। দয়া করে
আমায় এখুনি দীক্ষা দিন।”
সাধু বলিলেন,-বেশ। তােমার যদি একান্তই ইচ্ছে
হয়ে থাকে তবে কালকে এসস, আজ আর থাক।”
চোর বলিল,-“না ঠাকুর, মন্তর আমি আজই চাই।
আমি আর এক মুহূর্ত দেরী করূতে পারি নে। যতক্ষণ না
দেবেন আমি আপনার পা ছাড়ব না।”
সাধু আর কি করেন? মন্ত্র দিলেন। চোর মনে
করিল তার নূতন জন্ম হইয়াছে, সে নূতন মানুষ হইয়াছে।
সে সব ভুলিয়া একমনে একপ্রাণে ভগবানের চিন্তাই
করিতে লাগিল।
ছেলেদের ভক্তমাল
এদিকে গােয়েন্দাপুলিশ ত সন্ধান করিতে করিতে সেই
চোরকেই ধরিল। চোর কোন আপত্তি করিল না। তাকে
রাজার কাছে হাজির করা হইল। রাজা বিচার করিয়া
বলিলেন,—“আমার রাজ্যে চোরের সংখ্যা বড় বেশী হয়েছে,
চুরি কিছুতেই বন্ধ করতে পাচ্ছি নে। কাজেই এই চোরকে
এমন শাস্তি দেব যাতে সব চোরের ভয় হয়। আমি একে
প্রাণদণ্ডের আদেশ দিলুম।”
এই বলিয়াই তিনি জল্লাদদের হুকুম দিলেন,-“এই
চোরকে নিয়ে গিয়ে শূলে চড়াও।”
চোর বলিল,-“মহারাজ, যদি হুকুম হয়, আমি একটা
কথা বলি।”
রাজা বলিলেন,-“বল।”
চোর বলিল,-“মহারাজ, আমি এজন্মে চুরি করি নি।
যদি আপনার ইচ্ছা হয় পরীক্ষা করে দেখুন।”
শূল ত হইবেই, একবার না হয় পরীক্ষা করিয়াই দেখা
যাক, এই ভাবিয়া রাজা বলিলেন,-কি পরীক্ষা দিতে চাও ?”
চোর বলিল,-“যা বলবেন মহারাজ।”
রাজা তার কর্মচারীদের হুকুম দিলেন,-“একটা লােহার
ভাণ্ডা পুড়িয়ে লাল করে নিয়ে এসাে ত।”
অমনি কয়েকজন লােক ছুটিয়া গিয়া কামারশালা থেকে
লােহা পােড়াইয়া লইয়া আসিল।
প্রেমের যাদু
১৭
রাজা চোরকে বলিলেন,—“ধর দেখি এই লাল টকটকে
১
সে লােহার ডাণ্ডাটা ধরিল...
লােহাটা। যদি হাত না পােড়ে তবে তােমার কথাই সত্যি।
১৮
ছেলেদের ভক্তমাল
একবার মনে-প্রাণে শ্রীকৃষ্ণকে স্মরণ করিয়া সে লােহার
ডাণ্ডাটা ধরিল, কিন্তু কি আশ্চর্য্য! তার হাত পুড়িল না।
সমস্ত লােক বিস্ময়ে স্তব্ধ হইল।
রাজা ভাবিলেন,—“এ লােক ত চোর হতেই পারে না,
এ যে মহাপুরুষ! এমন মানুষকেও গােয়েন্দা চোর বলে
ধরে এনেচে। যদি একে শূলে দেওয়া হত, তবে কি
সর্বনাশই হত।
রাজার যত রাগ গিয়া পড়িল গােয়েন্দার উপর। তিনি
শেষে গােয়েন্দারই প্রাণদণ্ডের হুকুম দিলেন।
চোর তখন করজোড়ে রাজাকে
রাজাকে বলিল,-“মহারাজ,
গােয়েন্দার কোন অপরাধ হয় নি। সত্যই আমি চুরি
করেছিলুম, তবে এজন্মে নয়, পূর্বজন্মে।”
তারপর কি করিয়া তার পুনর্জন্ম হইল, কি করিয়া সে
নূতন মানুষ হইয়াছে, সকলই সে একে একে বলিল।
রাজা সন্তুষ্ট হইয়া গােয়েন্দাকে ক্ষমা করিলেন।
চোর সেই থেকে হইল মহাসাধু।
“এমনি হরির অহেতু করুণা-প্রেমের এমনি যাদু,
কয়লা-হৃদয় গলি’ হীরা হয়, তস্করও হয় সাধু।”
A} BHws
(Hirr:SENPUR. HOWRA
* * ' । BAY
{{ ? :
9
%
f
O,
বিশ্বাসের জয়
জুনাগড় নগরে একজন লােক বাস করিতেন।
নাম নরসী। তঁার স্বভাব-চরিত্র খুবই ভাল ছিল, কিন্তু
টাকা-পয়সা রােজগারের ক্ষমতা একেবারেই ছিল না। ভাই
তাকে খাইতে দিতেন, কিন্তু জ্বালা-যন্ত্রণাও কম দিতেন না;
বিশেষতঃ ভাইয়ের স্ত্রী তাকে যখন তখনই যা-তা বলিতেন।
একদিন নরসীর বড়ই পিপাসা পাইয়াছে, তাড়াতাড়ি
বৌদির কাছে গিয়া জল চাহিলেন। বৌদি জল ত দিলেনই
, অধিকন্তু যা-তা বলিয়া গালাগালি দিলেন। তার প্রাণে
বড়ই লাগিল, ভাবিলেন—এর চেয়ে বনে গিয়া প্রাণ ত্যাগ
করাও ঢের ভাল। এই ভাবিয়া তিনি এক বনে চলিয়া
গেলেন।
গভীর বন, সূর্যের আলাে সেখানে প্রবেশ করে না।
চলিতে চলিতে দূরে একটি শিবমন্দির দেখিতে পাইলেন ;
সেখানে গিয়া সাতদিন ধরিয়া কিছু না খাইয়া পড়িয়া
রহিলেন। সাতদিন পরে মহাদেব
মহাদেব সন্তুষ্ট হইয়া কাছে
আসিয়া বর দিতে চাহিলেন। কি বর
কি বর চাহিবেন—নরসী
ছেলেদের ভক্তমাল
প্রথমে তাহা ঠিক করিতেই পারিলেন না; শেষে অনেক
ভাবিয়া চিন্তিয়া বলিলেন,-ঠাকুর, যদি দয়াই ককূলে, তবে
আমার অন্তরে ভক্তি দাও।”
মহাদেব খুব খুশী হইয়া সেই বরই দিলেন।
এবার নরসী শ্ৰীবৃন্দাবনে গেলেন। সেখানে কুঞ্জে কুঞ্জে
ভ্রমণ করিয়া, মন্দিরে মন্দিরে ঠাকুর দর্শন করিয়া তার মন
মােহিত হইয়া গেল। শ্রীরাধা-কৃষ্ণের যুগলরূপ দেখিয়া ভাবের
আবেগে তিনি উন্মত্ত হইয়া গেলেন। কিছু দিন গেল। নরসী
দেশে ফিরিয়া আসিলেন। তার ভাব-গতিক দেখিয়া সকলে
তাকে পাগল বলিয়া উপহাস করিতে লাগিল। তিনি তাতে
মনই দিলেন না।
নরসীর সংসারে তার মাত্র দুইটি কন্যা—আর বড় কন্যার
এক পুত্র। একদিন তাঁর বড় কন্যাটি বলিল,-“বাবা, আমার
বড় ইচ্ছা যে, এখন তুমি তােমার নাতির বিয়ে দাও। নাত-বৌ
আসবে, তােমার সেবা কবে। তুমি একটি মেয়ে দেখে
বিবাহ স্থির কর।”
নরসী বলিলেন,—“মা, আমি কি
করতে পারি ? সবই
শ্রীকৃষ্ণ করূবেন। তাকে ডাকা ছাড়া আর যে কিছুই আমি
জানি না মা।”
মেয়ে তখন আর কি করিবে ? সে মনে করিল এমন
বাপের উপর নির্ভর করিয়া থাকায় কোন ফল হইবে না।
কাজেই সে নিজেই এক মেয়ে দেখিয়া বিবাহ স্থির করিল।
বিশ্বাসের জয়
বিবাহের মাত্র দুই দিন বাকী আছে। কনের আত্মীয়স্বজনরা
বলাবলি করিতে লাগিল--নরসীর ঘরে না আছে অন্ন, না আছে
বস্ত্র, তার ঘরে আবার বিবাহ। নরসীর মেয়ে এসব শুনিয়া
কাদিয়া ফেলিল, নরসীর কাছে গিয়া বলিল,-“বাবা, বিয়ের ত
মােটে দুই দিন বাকী, তুমি এখনও যা হােক একটা কিছু
ব্যবস্থা কর, নইলে যে আর মুখ দেখানাে যাবে না।”
নরসীর তবুও খেয়াল নাই। তিনি ভগবানের উপরেই
সম্পূর্ণ নির্ভর করিয়া রহিলেন।
দুইটি দিন কাটিয়া গেল। বিবাহের দিন আসিল-নরসী
নির্বিকার। তার মেয়ে হাহাকার করিতে লাগিল। এদিকে
হইল কি?—স্বয়ং শ্রীহরি মানুষের বেশে আসিয়া বিবাহের
সমস্ত আয়ােজন করিতে লাগিলেন। লােকজন তিনিই লইয়া
আসিলেন। সকলে মনে করিল যে, নরসীই সমস্ত আয়ােজন
করিতেছে। নরসীকে কন্যাকৰ্ত্তার বাড়ীতে লইয়া যাইবার জন্য
কয়েকজন লােক একটি হাতী সাজাইয়া লইয়া আসিল। নরসী
একটি কথাও না বলিয়া হাতীর পিঠে চাপিয়া হরিনাম গাহিতে
গাহিতে চলিলেন এবং মহাসমারােহে কন্যাকৰ্ত্তার গৃহে যাইয়া
উপস্থিত হইলেন।
যারা তাকে নিতান্ত দরিদ্র বলিয়া উপহাস করিয়াছিল,
তারা এখন বরের জাঁকজমক দেখিয়া অবাক্ হইয়া রহিল।
বিবাহের আসরে নরসী কেবল হরিনাম গান করিতে
লাগিলেন। বিবাহ হইয়া গেল। পরদিন বর-বধু লইয়া
২২
ছেলেদের ভক্তমাল
অবিরাম হরিনাম করিতে করিতে নরসী বাড়ী ফিরিয়া
আসিলেন।
পুত্রের বিবাহ দিয়া নরসীর বড় মেয়ে শ্বশুরবাড়ী গেল।
শ্বশুরের অবস্থা অত্যন্ত খারাপ। সংসার চলে না। তাই
শ্বশুর-শাশুড়ী বলিল,-“বৌমা, তুমি ত সবই বুঝতে পাচ্ছ,
তােমার বাবাকে একটু বলে দেখ, তিনি কিছু সাহায্য করতে
পারেন কি না।”
বৌ-মা ত তার বাপের কথা খুব ভাল রকমই জানে।
তবু শ্বশুর-শাশুড়ীর তাড়নায় বাপের কাছে লােক পাঠাইল।
নরসী শুনিয়াও শশানেন না। মেয়ের কাছ থেকে আবার
লােক আসিল, কিছুই হইল না। আবারও লােক আসিল,
বলিল,-“কিছু দিতে পারুন বা না-ই পারুন একবার গিয়ে
আপনার মেয়েকে দেখে আসবেনই।”
এই কথা শুনিয়া নরসী করতাল বাজাইয়া কীর্তন গাহিতে
গাহিতে মেয়ের বাড়ী চলিলেন। তিনি যেভাবে হেঁড়া কাপড়
পরিয়া হরিনামে বিভাের হইয়া উম্মত্তের মত মেয়ের বাড়ীতে
উপস্থিত হইলেন, তাতে মেয়ের শ্বশুর-শাশুড়ী অত্যন্ত হতাশ
হইল। তারা তাকে একটা ভাঙা চালা-ঘরে থাকিতে দিল।
সেখানে তুলসীপাতা আর ফুল লইয়া নরসী পূজা করিতে
বসিলেন। এমন সময় ভয়ানক বৃষ্টি আরম্ভ হইল, ফুল ও
বিশ্বাসের জয়
!
তুলসীপাতা ভাসিয়া যাইতে লাগিল। নরসীর প্রার্থনায় তার
ঘরে জলপড়া বন্ধ হইল, ভক্তের কষ্ট ভগবান সহ্য করিতে পারেন
। বাইরে কিন্তু বৃষ্টি হইতে লাগিল! নরসীর মেয়ে আসিয়া
শ্বশুর-শাশুড়ীর কথা বলিল। শুনিয়া তিনি বলিলেন,—“তাদের
জিজ্ঞেস করে দেখ—কি চায়।”
মেয়ে গিয়া তাদের কাছে জিজ্ঞাসা করিল। তারা
চটিয়া উঠিল, বলিল,-“তােমার বাবাকে বলগে দুটো পাথর
দিতে।”
একেই ত নরসীকে তারা নিতান্ত অবহেলা করিতেছিল।
তাতেই তাঁর মেয়ে লজ্জায়, দুঃখে, ক্ষোভে মরিয়া যাইতেছিল,
এর উপর এই জবাব বাপকে গিয়া সে কি করিয়া বলিবে ?
যাই হােক সে গিয়া বলিল,-“বাবা, আমার শ্বশুর-শাশুড়ী
দুটো পাথর চেয়েছেন আর পাড়াপড়শীদের প্রত্যেককে এক
একখানা কাপড় দিতে বলেছেন।”
কাপড় দেওয়ার কথাটা
থেকে
বলিয়াছিল।
নরসী বলিলেন,-“তাই দেব, এ আর বেশী কথা কি।”
ভগবানে যার পূর্ণ বিশ্বাস আছে, তাকে যিনি মনপ্রাণ
সমস্ত দিয়াছেন, তাঁর বাসনা অপূর্ণ থাকে না, ভগবানের দয়া
তিনি নিশ্চয়ই পান।
ভগবানেরই অনুগ্রহে নরসীর সঙ্গে সেখানেই বৃন্দাবনের
শ্যামল সাহা নামে এক ধনী ব্যবসায়ীর সাক্ষাৎ হইল।
নিজের মন
১h
Wad
•
at
২৪
ছেলেদের ভাল
শ্যামল সাহা একজন ভক্ত বৈষ্ণব। নরসী তাকে সব কথা
জানাইলেন। শ্যামল সাহা বৃন্দাবন থেকে গাড়ী বােঝাই
করিয়া একটি সােনা দিয়া মােড়া ও একটি রূপা দিয়া মােড়া
পাথর আর কতকগুলি খুব ভাল ভাল কাপড় পাঠাইয়া
দিলেন।
মেয়ের ইচ্ছামত নরসী পাড়ার প্রত্যেককে এক একখানা
কাপড় ও মেয়ের শ্বশুর-শাশুড়ীকে সেই পাথর দুইটি দিলেন।
সকলে শ্রদ্ধায় ও ভক্তিতে তার কাছে মাথা নােয়াইল
তারপর মেয়েকে লইয়া নরসী নিজের বাড়ীতে ফিরিয়া
আসিলেন। মেয়েও তখন থেকে বাপের কাছে থাকিয়া একমাত্র
সাধন-ভজনে মন দিল।
Old
P.. ৫ ৯,
대교원업)
ভক্তের ভগবান বামদেব দরিদ্র গৃহস্থ। কাপড়ে ফুল, কঙ্কা, লতাপাতার ছাপ দেওয়া ছিল তার ব্যবসায়। এতে যা কিছু সামান্য আয় হইত, তাই দিয়া তিনি সংসার চালাইতেন। কিন্তু টাকা-পয়সা ছিল না বলিয়া তার মনে কোন দুঃখ ছিল না, মনে মনে সব সময়ে সকল কাজের মধ্যেই তিনি ভগবানের চিন্তা করিতেন, আর এই চিন্তায় মহা-আনন্দের মধ্যে তাঁর জীবন কাটিতেছিল। সংসারে তার এক বিধবা মেয়ে আর মেয়ের একটিমাত্র ছেলে। ছেলেটির নাম নামদেব। বাড়ীতে শ্যামসুন্দরের বিগ্রহ আছেন। বামদেব পূজা করেন আর নামদেব চাহিয়া থাকে, তারও পূজা করিবার ভারি সাধ হইল। একদিন সে বলিল,-“দাদা মশাই, আমি পুজো কব। আমায় পূজো কতে দাও না কেন?” বামদেব বলিলেন,-তুমি এখনও ছােট, এখন তােমার পূজো করবার দরকার নেই ভাই।” নামদেব চুপ করিয়া রহিল। কিছুদিনের মধ্যেই এক জরুরী কাজে বামদেবকে দুই- তিন দিনের জন্য বাড়ী ছাড়িয়া যাইতে হইল। তখন বাধ্য
২৬
ছেলেদের ভক্তমাল,
হইয়াই তিনি নামদেবের উপর পূজার ভার দিলেন। নামদেবের
মনে আনন্দ আর ধরে না। সে এতদিন যা চাহিয়াছে
অথচ পায় নাই, আজ অযাচিতভাবেই তা পাইয়াছে ; কাজেই
আহ্লাদে আটখানা হইয়া সে পূজা করিবার জন্য প্রস্তুত
হইল।
তার মা পূজার আয়ােজন করিয়া দিলেন, আর সে নিজেই
গিয়া দুধ জ্বাল দিয়া আনিয়া ঠাকুরের সামনে রাখিয়া পূজায়
বসিল। কিন্তু সে না জানে মন্ত্র, না জানে পূজার কোন নিয়ম।
পূজায় বসিয়া বলিল,-“ঠাকুর, আর ত কিছুই নেই, যা
এনেছি খাও।”
ঠাকুর যেমন ছিলেন তেমনি রহিলেন, একটু নড়িলেনও
। নামদেবের বড়ই দুঃখ হইল। অনেকক্ষণ ধরিয়া কত
কাকুতি-মিনতি করিল, ঠাকুর তবু নড়িলেন না। সরল বালক
তখন এক একবার রাগ করে, এক একবার অভিমান করে।
কি যে করিবে কিছুই ঠিক করিতে পারিল না। তার প্রাণ
যেন জ্বলিয়া পুড়িয়া যাইতেছিল। বড় দুঃখেই সে তখন
বলিল,-“ঠাকুর, দাদু তােমাকে বােজ খাবার দেয়, তুমি খাও,
আর আমি দিলেই বুঝি তুমি খেতে পার না? তােমাকে
বলে দিচ্ছি—এবার যদি না খাও তােমার সামনেই আত্মহত্যা
কব।”
ঠাকুর তবু নড়িলেন না। এবার নামদেব সত্য সত্যই
যেমন আত্মহত্যা করিতে প্রস্তুত হইল, অমনি বিগ্রহ জীবন্ত
GAB BH WAIS:
।
.
1.{
BAC}
*9
HARP.H
* --
আত্মহত্যা করিতে প্রস্তুত হইল
৩
ছেলেদের ভক্তমাল হইয়া খাইতে আরম্ভ করিলেন। নামদেবের কি আনন্দ ! দাদা মহাশয়ের জন্য প্রসাদ রাখিয়া দিয়া নিজে প্রসাদ লইল, আর মাকেও দিল। দুই-তিন দিন এমনি করিয়া কাটিয়া গেল। ফিরিয়া আসিয়া সব শুনিলেন, কিন্তু বিশ্বাস করিলেন না। নামদেব তখন বলিল,-“দাদু, আমি কেন তােমায় মিছে কথা বলব ? সত্যই ঠাকুর আমার হাতে খেয়েছেন।” বামদেব জিজ্ঞাসা করিলেন,-“তুই আমাকে দেখাতে পারি ?” নামদেব বলিল,-“হঁ দাদু, আমি তােমায় দেখাতে পারি। কালকেই তােমায় দেখাব।” পরদিন বামদেব দেখিলেন সত্য সত্যই শ্যামসুন্দর হাসি- মুখে খাইতেছেন। বামদেব নিশ্চল নিস্তব্ধ। খানিক পরে উঠিয়া নামদেবকে বুকে জড়াইয়া ধরিয়া বলিলেন,—“আজ আমার জীবন ধন্য, কত জন্মের কত পুণ্যের ফলে তােমায় পেয়েছি ভাই! আজ থেকে তুমিই আমার গুরু। দেশময় কথাটা রাষ্ট্র হইয়া গেল। দলে দলে মােক নামদেবকে রােজ দেখিতে আসিতে লাগিল। নামদেবের কথাটা ক্রমে ক্রমে বাদশার কানে গেল। তিনি ভাবিলেন—তাকে এনেই দেখা যাক না কথাটা কত-
ভক্তের ভগবান
যদি সাধু
দূর সত্য। তাই তিনি নামদেবকে লইয়া যাইবার জন্য
কয়েকজন লােক পাঠাইলেন। তারা ত নামদেবের কাছে
আসিয়া উপস্থিত হইল। নামদেব বলিল,-“আমার মত
লােকের কি আর বাদশার কাছে যাওয়া সাজে?”
বাদশার লােকেরা বলিল,-“আমরা যদি তােমাকে না
নিয়ে যেতে পারি আমাদের বিপদ ঘটবে।”
নামদেব কাজেই তাদের সঙ্গে গিয়া বাদশার দরবারে
হাজির হইল।
হইল। বাদশা তাকে বলিলেন,-
পাচ্ছি
তুমি বালক হয়েও মস্ত সাধু পুরুষ হয়েচ।
পুরুষই হয়ে থাক, তবে আমার সামনে কিছু কেরাম
দেখাও দেখি।”
নামদেব বলিল—“জাহাপনা, আমি সাধু পুরুষ নই,
কেরামৎ কি করে দেখায় তাও জানি নে। যদি জানতুম,
তা হলে কি আমরা কাপড়ে ছাপ দিয়ে পেট চালাই?”
বাদশা বলিলেন,-“আমার আদেশ—তােমাকে কেরাম
দেখাতেই হবে।”
নামদেব বলিল,-“আমি পাব না, জাঁহাপনা।”
তখন বাদশা হুকুম দিলেন,—“ওকে বন্দী কর।”
বালক নামদেব বন্দী হইয়া কয়েদখানায় রহিল, আর
একমনে ভগবানকে ডাকিতে লাগিল। এমনি করিয়া কয়েক
দিন গেল। বাদশার বাড়ীর একটি বাছুর মারা গেল।
বাদশা তখন কয়েদখানা থেকে নামদেবকে আনাইয়া
ছেলেদের ভক্তমাল
বলিলেন,—“দেখ, গাভী তােমার পূজ্য। এই দেখ, বাছুরটি
মারা গেছে, এতে গাভীটির বড়ই কষ্ট হচ্ছে। এখন
বাছুরটিকে বাঁচিয়ে দিয়ে গাভীর দুঃখ দূর কর দেখি।”
নামদেব আর কি করে ? মনে মনে ঠাকুরকে স্মরণ
করিয়া সে বাছুরটির গায়ে হাত বুলাইল, বাছুরের দেহে প্রাণ
ফিরিয়া আসিল।
এইবার বাদশা খুব খুশী হইলেন এবং পুরস্কার দিতে
চাহিলেন, কিন্তু নামদেব পুরস্কার লইল না।
অনেক বলিয়া
কহিয়া বাদশা তাকে খুব মূল্যবান্ একটি পালঙ্ক এবং একটা
বিছানা দিয়া বলিলেন,-তুমি প্রকৃতই সাধু, তুমি যদি এই
বিছানায় শােও, তা হলেও আমার সাধুসেবা হবে।”
বাদশার প্রাসাদ হইতে নামদেব বিদায় লইল। পথে
এক নদীর কাছে গিয়া পালঙ্ক, বিছানা ইত্যাদি এক টান
মারিয়া নদীতে ফেলিয়া দিল। প্রবল স্রোতে সব ভাসাইয়া
লইয়া চলিল। বাদশার লােকেরা তাকে বাদশার কাছে
লইয়া গেল। সব শুনিয়া বাদশা তাকে বলিলেন,-“সাধু,
তুমি এমনি করে আমার অপমান করলে কেন?”
নামদেব কহিল,-“না জাহাপনা, আমি আপনার অপমান
করি নি। দয়া করে আমার সঙ্গে লােক দিন, আপনার
সমস্ত জিনিস তুলে দিচ্ছি, কিন্তু আমি কিছুই নেব না।”
বহু লােকজন তার সঙ্গে গেল। সত্য , সত্যই নদীর
যেখানটায় সে সব জিনিস ফেলিয়াছিল, ঠিক সেইখান থেকেই
৩১
ভক্তের ভগবান
তুলিয়া দিল। সকলে বিস্ময়ে অবাক হইয়া রহিল
নামদেব সেখান থেকে বাড়ীতে চলিয়া গেল।
খুব দূরদেশ থেকে এক বণিক একদিন নামদেবের কাছে
আসিয়া বলিল,-“সাধু, আমি তুলাদান করব ইচ্ছা করেছি,
আর এই উপলক্ষে সাধুদের কিছু সােনা দান করব স্থির করে
আপনার কাছে এসেছি। আপনার মত
মত মহাপুরুষ যদি
আমার দান গ্রহণ না করেন, তবে আমার তুলাদানই
ব্যর্থ হবে।”
নামদেব অনেক অনুনয়-বিনয়ের পর দান গ্রহণ করিতে
স্বীকার করিয়া বলিল,-“আমি একটা সর্তে আপনার দান
নেব। একটা তুলসীপাতার ওজনের একটু সোনা আমি
নিতে পারি।”
বণিক তার দেশে চলিয়া গেলেন। যথাসময়ে নামদেব
সেখানে গেল। মানদণ্ড আনিয়া এক দিকে একটি তুলসীপাতা
আর একদিকে দুই-তিন রতি সােনা দেওয়া হইল, কিন্তু
তুলসীপাতার ওজন বেশী হইল। আরও সােনা দেওয়া
হইল, আরও—তবুও তুলসীপাতার ওজনই বেশী হইল।
শেষে বাড়ীর মেয়েদের গয়না, এমন কি প্রতিবাসীদের ঘরে
যে সােনা ছিল তাও আনিয়া দেওয়া হইল, কিন্তু কিছুতেই
তুলসীপাতার সমান ওজন
বণিক
হইল না।
ছেলেদের ভক্তমাল
নামদেবের পায়ে পড়িয়া ক্ষমা চাহিলেন, এবং কারণ
জিজ্ঞাসা করিলেন।
নামদেব বলিল,-“কোটি কোটি জগৎ ভগবানেরই এক
একটি ক্ষুদ্র অংশবিশেষ, অভিমানে তাকে পাওয়া যায় না,
পৃথিবীর ঐশ্বর্য্যে তাকে মিলে না। তুমি পাঁচ পাঁচ মণ
সােনা এনেছ, এ সােনায় কি হবে ? এ দ্বারা কি তাকে
পাওয়া যাবে? ভুল-ভুল—এ সবই ভুল
|
বণিকের মন ফিরিয়া গেল। পৃথিবীর এ ঐশ্বর্যের শক্তি
যে কিছুই নয়, তিনি তা ভাল করিয়া বুঝিলেন এবং সেই দিন
হইতে বৈষ্ণব হইয়া শ্রীকৃষ্ণের পাদপদ্মে মন-প্রাণ সমর্পণ
করিলেন।
-৪
শ্রীরঙ্গনাথজীর মন্দির। রােজ পূজা হয়। কাঁসর-ঘণ্টা
বাজে, আরতি হয়, কত লােক দেখে। কীৰ্ত্তন হয়, কত লােক
শশানে। নামদেবও প্রত্যহ আরতির সময় এই মন্দিরে যায়।
একদিন মন্দিরে খুব ভীড় হইয়াছে। নামদেব তার জুতা
জোড়া কাপড় দিয়া কোমরে বাঁধিয়া রাখিল। তা জানিয়া
পূজারী ব্রাহ্মণগণ ও অন্য সেবকগণ ভয়ানক রাগিয়া উঠিল
মন্দিরে এত বড় অনাচার ! তারা নামদেবকে গলাধাক্কা
দিয়া মন্দিরের বাহির করিয়া দিল। নামদেব রাগ করিল না,
মন্দিরের পিছনে গিয়া বসিল, আর একমনে হরিনাম
ভক্তের ভগবান
গান করিতে লাগিল। একটু কালের মধ্যেই দেখা গেল,
শ্রীরঙ্গনাথজীর মূর্তি নামদেবের দিকেই ফিরিয়া আছে।
দেখিয়া সকলেই বিস্মিত হইল।
সন্ধিরের পিছনে
{
এবার
ব্রাহ্মণগণ ও অন্য সকলে বুঝিল যে,
বাইরের আচার-বিচার মিথ্যা, অন্তরের সরল শুদ্ধ ভক্তি
দিয়াই ভগবানকে পাওয়া যায়; তাই চিরদিনই ভক্তের
ভগবান।
পাপের ভােগ
তখন বর্ধমান জেলার মানকর গ্রামে বহু ব্রাহ্মণের বাস
ছিল। মানকরের শিবরাম বাঁড়ুয্যেই ছিলেন সেখানকার
ব্রাহ্মণ-সমাজের নেতা। তার বিনা সম্মতিতে ব্রাহ্মণেরা
সেখানে কোনও বিশেষ কাজ করিতে পারিতেন না, সুতরাং
তার গৃহে সকল সময়েই গ্রামের ব্রাহ্মণগণ আসিতেন এবং
সমাজ ও ধর্মবিষয়ে নানা আলােচনা করিতেন।
তখন মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যদেবের প্রেম-ধৰ্ম্ম সারা বাংলায়
এক বিরাট বিপ্লবের সৃষ্টি করিয়াছে। একদিন এই
প্রেম-ধৰ্ম্ম লইয়াই শিবরাম বড়য্যের গৃহে ব্রাহ্মণগণ নানা
আলােচনা আরম্ভ করিলেন। ক্রমে ক্রমে আলােচনা চরমে
উঠিল এবং
প্রায় সকলেই বৈষ্ণবধৰ্ম্মের নিন্দা করিতে
লাগিলেন।
ঘটনাক্রমে ঠিক এই সময়েই এক বৈষ্ণব গিয়া সেখানে
উপস্থিত হইলেন। অতিথি দেবতাস্বরূপ, তার যত্ন না করিলে
মহাপাপ, কাজেই শিবরাম তাকে খুব সমাদর করিয়া
বসাইলেন।
বৈষ্ণবকে দেখিয়া অন্য ব্রাহ্মণগণ চুপ করিলেন বটে,
কিন্তু দুইটি যুবক তার সঙ্গে তর্ক জুড়িয়া দিল। প্রথমে
পাপের ভােগ
যে সব প্রশ্ন করা হইল, বৈষ্ণব খুব বিনীতভাবে হাসিমুখে
তার উত্তর দিলেন। কিন্তু যারা ধর্ম কাকে বলে জানে না
সত্য সত্যই ভগবানকে ভালবাসে না, তারা শুধু তর্কের জন্যই
তর্ক করে, আর তারাই যে সকলের চেয়ে বেশী জানে ও বােঝে
—এইটি জাহির করিতে চায়। বাজে তর্কে নহে, ভগবানকে
পাওয়া যায়-ভক্তিতে—প্রাণের টানে। এ টান যার নাই, সে
শুধু তর্কই করে, তার অন্তরে কোন দিনই দেবতার স্থান হয়
। এক্ষেত্রেও তাই হইল।
যুবক দুইটি বেয়াড়া তর্ক জুড়িয়া দিল। বৈষ্ণবটি কথা
কাটাকাটি না করিয়া চুপ করিয়াই রহিলেন। শেষে তারা সেই
বৈষ্ণবকেই যা তা বলিয়া গালাগালি দিতে লাগিল। কিন্তু
তিনি দুঃখিতও হইলেন না, তাদের উপর রাগও করিলেন না।
তা সত্ত্বেও উদ্ধত যুবক দুইটি থামিল না। তখন তারা মহাপ্রভু
চৈতন্যদেবেরই নিন্দা করিতে লাগিল। বৈষ্ণবের বহু অনুনয়
সত্ত্বেও তারা থামিল না ।
সহ করিবারও একটা সীমা আছে। বৈষ্ণব অনেক সহ
করিয়াছিলেন; কিন্তু মহাপ্রভুর নিন্দা সহ্য করিতে পারিলেন
, তঁার প্রাণে বড়ই লাগিল। তিনি সেখান হইতে বাহির
হইয়া আসিলেন। তাতে সেখানকার অন্য ব্রাহ্মণেরাও অত্যন্ত
দুঃখিত হইলেন। বাড়ীর কর্তা শিবরাম বড়য্যে বাহির হইয়া
চারিদিকে চাহিয়া দেখিলেন—বৈষ্ণবকে কোন খানে দেখা
;
গেল না।
ছেলেদের ভক্তমাল
তখন এক অদ্ভুত কাণ্ড ঘটিল। অতিথি বৈষ্ণবটি
যেমনই বাহির হইয়া গেলেন অমনি দেখা গেল, অবিশ্বাসী
ব্রাহ্মণ দুইটি••••••নিশ্চল হইয়া গেল
তার্কিক ব্রাহ্মণ দুইটি একেবারে পাথরের মত নিশ্চল
Old
o
R.P
পাপের ভােগ
..
७ कि
হইয়া গিয়াছে, ফারbাযেল্পজোত,
ও মুখ নাড়িয়া
কথা কহিতেছিল ঠিক সেই ভাবেই হিয়াছে।
হিয়াছে। তাদের
অবস্থা দেখিয়া সকই একেবারে
ভয়ানক কাণ্ড! তারা না পারতেছে নড়িতে, না পারিতেছে
কোন কথা কহিতে ।
মুহূৰ্তমধ্যেই গ্রামময় এই অদ্ভুত ঘটনার কথা প্রকাশিত
হইয়া পড়িল। যে শশানে সে-ই ছুটিয়া দেখিতে আসে।
আসিয়া একেবারে অবাক্ হইয়া তাকাইয়া থাকে।
কথাটা ক্রমে যুবক দুইটির বাপ-মা’র কানেও গেল।
তারা বাড়ী থেকে হাঁপাইতে হাঁপাইতে সেখানে আসিয়া
উপস্থিত হইলেন। ছেলেদের গলা জড়াইয়া ধরিয়া তাঁরা
ডাকিতে লাগিলেন, ছেলেরা শুধু ফ্যালফ্যাল করিয়া
চাহিয়া থাকে।
এই অবস্থা দেখিয়া বাপ-মা’র বুক যেন ফাটিয়া যাইতে-
ছিল, তাদের চোখ দিয়া জল গড়াইয়া পড়িতে লাগিল।
ছেলেরা তাদের অবাধ্য হইয়াছিল। অনর্থক তর্ক করিয়া,
গালাগালি দিয়া মানুষের মনে—সাধুপুরুষদের প্রাণে ব্যথা
দিতে কতবারই না বারণ করিয়াছেন, কিন্তু তারা কোন দিনই
সে সব কথা শােনে নাই। সেই পাপেরই এই প্রায়শ্চিত্ত !
বাপ-মা এই সব ভাবিয়া কঁদিয়া আকুল। তখন সকলেই
বলিল যে, সেই বৈষ্ণবের অনুগ্রহ ছাড়া ইহার আর কোন
প্রতীকার নাই।
৩৮
ছেলেদের ভক্তশাল
গেল।
একে
বৈষ্ণবের খোঁজে নানা দিকে নানা লােক ছুটিল ।
খুঁজিতে খুঁজিতে অনেক দূরে এক গাঁয়ে তাঁর দেখা পাওয়া
একে সকলেই তার পায়ে ধরিয়া ক্ষমা
চাহিল। বৈষ্ণব তত ক্ষমার অবতার, ক্ষমা না করিলে
ব্রাহ্মণ যুবক দুইটি যে মারা যায়। তাদের বাপ-মা’র
কান্নার কথা শুনিয়া তার প্রাণ দয়ায়
গলিয়া গেল।
তিনি বলিলেন,—“ভয় নাই, এর উপায় আছে। প্রেমের
অবতার পতিতপাবন শ্রীচৈতন্যদেবের চরণে শরণ নিলেই
—ভগবানকে ভালবাসতে শিখলেই, তারই অনুগ্রহে সকল
পাপ-তাপ, সব দুঃখ-যন্ত্রণা দূর হয়ে যাবে। আপনারা
এখন এক কাজ করুন। আপনাদের গায়ের কাছে যে
তালপুকুর আছে, সেই পুকুরের পাড়ে এক বৈষ্ণব আছেন,
তার কাছে যান। আমার কি শক্তি আছে বলুন ত ?
তার চরণামৃত খাওয়ালে ব্রাহ্মণ দু’টি এখনই ভাল হয়ে
যাবে। আপনারা সেখানেই যান, উদ্বেগের কোন কারণ
নাই।”
ব্রাহ্মণেরা সেই কথা শুনিয়া একেবারে আঁকাইয়া
উঠিলেন, বলিলেন,-“সে কি ! সেই বৈষ্ণব যে জাতিতে
ডােম! আমরা যে তার ছোঁয়া জলটুকুও ছুই না, তারই
চরণামৃত খাওয়াতে হবে।”
পাপের ভােগ বৈষ্ণব কানে আঙ্গুল দিয়া জিভ, কাটিয়া বলিলেন,- “অমন কথা বলবেন না, ওকথা বলাও পাপ। ব্রাহ্মণ হয়ে আপনারা শাস্ত্রবিরুদ্ধ, বিবেক-বিরুদ্ধ কথা কইচেন ! আপনাদের জ্ঞানী এবং উদার হওয়াই উচিত। দেখুন- চণ্ডাল হইয়া যদি বিষ্ণু-ভক্ত হয়, বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণ হৈতে শ্রেষ্ঠ বেদে কয়। শুধু বেদ জালেই, শাস্ত্র জালেই ত শ্রেষ্ঠ হওয়া যায় না। তাতে বিদ্বান হওয়া যায় বটে; কিন্তু ভক্তি ছাড়া, জ্ঞান ছাড়া, অন্তরের উদারতা ছাড়া, মানুষ কি কখনও বড় হ'তে পারে? প্রকৃত জ্ঞান লাভ হ'লে তখন যে ভেদাভেদ-জ্ঞান একেবারেই চলে যায়।” অনেকক্ষণ ধরিয়া বৈষ্ণব খুব বিনয়ের সহিত—মিষ্ট কথায় নানা উদাহরণ দিয়া ব্রাহ্মণদিগকে এই মহাসত্য বুঝাইলেন। ব্রাহ্মণগণ তখন বুঝিতে পারিলেন যে, সত্যই ত যার অন্তর পবিত্র নয়, ভগবানের প্রতি যার প্রাণের টান নাই, সে তাে মানুষই নয়—হােক না তার ব্রাহ্মণবংশে জন্ম ; আর যদি নীচবংশে জন্মিয়াও কেউ পবিত্রচিত্ত হয়, তার অন্তর যদি ভক্তিতে পরিপূর্ণ কেন উচ্চ হইবে না? সে তাে ব্রাহ্মণের চেয়ে শ্রেষ্ঠই বটে! ব্রাহ্মণদের মনেও তখন ভক্তির উদয় হইল।
৪০ ছেলেদের ভক্তমাল ৪- বৈষ্ণবকে প্রণাম করিয়া ব্রাহ্মণগণ চলিলেন সেই তাল- পুকুরের পাড়ে। গিয়া দেখিলেন পুকুরপাড়ের বৈষ্ণব তার ahili . '। utta Visu {c! TildHLY Wall Boncedia , বৈষ্ণব একমনে হরিনাম জপ করিতেছেন কুটীরে বসিয়া একমনে হরিনাম জপ করিতেছেন। মুখখানা তার আনন্দে যেন জ্বলজ্বল করিতেছে। কুটীরের পাশেই
পাপের ভােগ
৪১
একটি তালগাছ, সেই গাছের আড়ালে দাড়াইয়া ব্রাহ্মণেরা
পরামর্শ করিতে লাগিলেন,-কে সাধুর সামনে যাইবে।
একজন অপরকে বলিলেন,—“সাধুর চরণামৃত নিয়ে এসাে,
আমরা এখানে দাড়িয়ে থাকি।”
কিন্তু কেহই আর তার সামনে যাইতে চায় না।
শেষে একজন বলিলেন,-সাধু বৈষ্ণবের কাছে যেতে ভয়ের
কোন কারণ থাকতে পারে না, আমিই যাচ্ছি।” বলিয়াই
তিনি গিয়া বৈষ্ণবের চরণামৃত লইয়া আসিলেন। বৈষ্ণব তখন
শ্রীকৃষ্ণের ধ্যানে তন্ময়।
চরণামৃত আনিয়া যেমন অপরাধী ব্রাহ্মণ যুবক দুইটিকে
দেওয়া হইল, তারা তৎক্ষণাৎ পূর্বের মত সুস্থ হইয়া
উঠিল। গ্রামশুদ্ধ লােকের একেবারে তাক লাগিয়া গেল।
তারপর সেই গ্রামের সকল লােক বৈষ্ণবধর্ম গ্রহণ করিল।
যেখানে এক দিন মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যদেবের নিন্দা হইয়া-
ছিল, সেইখানেই আজ সকলে সর্বদা তার গুণ-বর্ণন ও
নাম-কীৰ্ত্তন করিয়া ধন্য হইতে লাগিল। বাড়ীতে বাড়ীতে
মহােৎসবের ধূম পড়িয়া গেল। সকলেই বুঝিতে পারিল
যে, প্রকৃত বৈষ্ণব কাহারও নিগ্রহ করেন না, নিগ্রহের
ছলে অনুগ্রহই করিয়া থাকেন, মঙ্গল সাধনই করেন।
যে বৈষ্ণবের কৃপায় এই ব্যাপার ঘটিল তিনিই চিরবিখ্যাত
মহাপুরুষ হরিদাস ঠাকুর।
'৪"AY
।
.
59
C, ১
রাখেন
HOWRAH
মারে কে ?
Hir,
এক রাজা। তার ছিল এক জমাদার, নাম ভুবন চৌহান।
ভূবনকে
তিনি
খুব বিশ্বাস করিতেন।
একদিন ভুবনকে সঙ্গে লইয়া তিনি মৃগয়ায় গেলেন।
বনের মধ্য দিয়া পালে পালে হরিণ ও অন্যান্য জানােয়ার
ছুটাছুটি করিতেছে। রাজা পশুশিকার করিতে লাগিলেন।
ভুবনেরও শিকার করিতে বড়ই ইচ্ছা হইল। সে তার
সামনে দেখিল এক হরিণী, অমনি তরােয়াল বাহির করিয়া
মারিল খুব জোরে এক কোপ। হরিণীর পেটটা কাটিয়া
গেল ; তার পেটের ভিতরে ছিল একটা বাচ্ছা, সেই
বাচ্ছাটাও দুই টুকরা হইয়া গেল। রক্তে সেখানটা
ভাসিয়া গেল। ভুবনের বড়ই দুঃখ হইল। একটা নিরীহ
জীবকে এমনি করিয়া সে কাটিয়া ফেলিল ! আর সেই
বাচ্ছাটা! আহা! কেন সে এমন নিষ্ঠুর কাজ করিল! দুঃখে
তার বুক যেন ভাঙ্গিয়া যাইতে লাগিল। তখনই সে প্রতিজ্ঞা
করিল জীবনে আর কোনও দিন তরােয়াল ধরিবে না।
কিন্তু প্রতিজ্ঞা করিলে কি হইবে? সে ত রাজার
জমাদার, চাকরী ত তাকে করিতেই হইবে, নইলে তার স্ত্রী-
পুত্র বাঁচিবে কি খাইয়া? অনেক ভাবিয়া-চিন্তিয়া সে স্থির
রাখেন কৃষ্ণ মারে কে ? g সে একটা করিল যে, তার তরােয়ালের খাপের মধ্যে একটি কাঠের তরােয়াল রাখিয়া দিবে। কাউকে কিছু না বলিয়া সত্যই কাঠের তরােয়াল তৈয়ারী করিয়া খাপের মধ্যে রাখিয়া দিল। কিছুই চিরকাল গােপন থাকে না। একজন টের পাইয়া রাজাকে গিয়া বলিল। রাজা শুনিয়া বড়ই অসন্তুষ্ট হইলেন, বলিলেন,—“আমার জমাদার হয়ে কাঠের তরােয়াল ব্যবহার করাও যা, আমাকে অপমান করাও তা। আমার কিন্তু এখনও সত্যি বলে মনে হচ্ছে না।” —“আজ্ঞে হ্যা মহারাজ, এ একেবারে সত্যি কথা, বিশ্বাস হয় পরীক্ষা করুন।” রাজা বলিলেন,-“আচ্ছা তাই করব ।” রাজা এক কৌশল করিলেন। পাত্র-মিত্র, জমাদারগণ ও ভুবনকে লইয়া তিনি গেলেন তার বাগান-বাড়ীতে। সকল জমাদারের কোমরেই তরােয়াল ঝুলিতেছে, রৌদ্রে একেবারে ঝকঝক্ চকু-চক্ করিতেছে। এমন সময় রাজা হাসিতে হাসিতে তাদের বলিলেন,-“তােমাদের তরােয়াল- গুলাে খুলে দেখাও তত একবার, কার তরােয়ালটা কেমন একবার দেখি।” ৪
৪৪
ছেলেদের ভক্তমাল
রাজার এই হুকুম শুনিয়াই ভুবনের মুখ ত একেবারে
এতটুকু হইয়া গেল। এখন উপায়? চাকরী ত যাইবেই,
লজ্জারও সীমা থাকিবে না। এবিপদে ভগবান ছাড়া রক্ষা
করিবার আর কেউ নাই, তাই সে মনে-প্রাণে ভগবানকেই
ডাকিতে লাগিল।
একে একে সকলে খাপ থেকে তরােয়াল খুলিয়া
দেখাইতে লাগিল। এবার ভুবনের পালা। যা করেন
ভগবান, তিনি মারিলে কেউ রক্ষা করিতে পারে না, আর
তিনি রক্ষা করিলে কেউ মারিতে পারে না। এই বিশ্বাসের
বলেই সে খাপ থেকে তরােয়াল বাহির করিল। কিন্তু কি
আশ্চৰ্য্য! কোথায় গেল সেই কাঠের তরােয়াল । দেখা
গেল তার হাতে ইস্পাতের খুব ভাল তরােয়াল ঝক-ঝক্
করিতেছে।
রাজা ভাবিলেন,—“তাই ত! একে অবিশ্বাস করে খুবই
অন্যায় করেছি। যে এর বিরুদ্ধে আমায় এসে বলেছে, আমি
একে ভালবাসি বলে তার বড় ঈর্ষা হয়েছে। আচ্ছা,
তাকে দেখাচ্ছি।
তারপর রাজা তাকে বলিলেন,-“তুমি ঘাের মিথ্যাবাদী,
তােমার অসাধ্য কিছু নেই। আমি তােমার প্রাণদণ্ডের আদেশ
দিলুম। জল্লাদ
জল্লাদ আসিয়া সেলাম করিয়া দাঁড়াইল।
রাজা বলিলেন,-একে বধ্যস্থানে নিয়ে গিয়ে বধ কর।”
রাখেন কৃষ্ণ মারে কে ?
৪৫
ভুবন দেখিল শুধু শুধু একটা লােকের প্রাণদণ্ড হইতেছে,
অথচ এ লােকটা ত মিথ্যা বলে নাই। স্থির থাকিতে না
পারিয়া করযােড়ে সে বলিল,-“মহারাজ, এ লােকটি মিথ্যে
বলে নি, একে শাস্তি দেবেন না। আমার সত্যিই কাঠের
তরােয়াল ছিল।”
রাজা বলিলেন,-“সে কি!”
ভুবন বলিল,-“মহারাজ, দয়া করে আমার সব কথা
শুনুন।”
ভুবন সমস্ত ঘটনা বলিল।
রাজা শুনিয়া সন্তুষ্ট হইলেন, বলিলেন,-“তুমি ভগবানের
অনুগ্রহ পেয়েচ, ভুবন। তােমার মত ভাগ্যবান আর কে
আছে ? তােমাকে আর চাকরী কতে হবে না। বাড়ীতে
গিয়ে জীবনের বাকী ক’টি দিন ভগবানের নাম করেই কাটিয়ে
দাও। আমি রাজকোষ থেকেই তােমার সংসারের সকল
খরচের ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।”
ভুবন চাকরী ছাড়িয়া চলিয়া গেল।
চন্দ্রহাস
শত্রু আসিয়া এক রাজার রাজ্য আক্রমণ করিল, রাজ্যে
মহা হুলুস্থুল পড়িয়া গেল। রাজা যুদ্ধে হারিয়া গেলেন।
রাজপুরী রক্ষা করাও শেষে অসম্ভব হইয়া পড়িল। সেই সময়ে
শিশু রাজপুত্রকে অন্য এক দেশে পাঠাইয়া দেওয়া হইল।
এই শিশুর নাম চন্দ্রহাস।
চন্দ্রহাস অন্য দেশে এখানে সেখানে, এর কাছে তার
কাছে মহা দুঃখের মধ্যেই মানুষ হইতে লাগিল। একদিন
সেই দেশের রাজার দেওয়ান চন্দ্ৰহাসকে নিয়া রাজাকে
ভেট দিলেন। তখনকার দিনে ভেটের সঙ্গে মানুষও
দেওয়া হইত। রাজবাড়ীর ঝি-চাকরদের ছেলেপুলেদের
সঙ্গে নানা লাঞ্ছনার মধ্যে চন্দ্রহাস দিন কাটাইতে লাগিল।
রাজা এবং রাজকর্মচারীরা সকলেই তাকে দাসীর ছেলে
বলিয়া জানিত।
একদিন এক উৎসব উপলক্ষে রাজবাড়ীতে বহু ব্রাহ্মণ
আসিলেন। তারা যেখানে বসিয়াছিলেন, সেখানে তাদের
দেখিবার একান্ত আগ্রহে ঝি-চাকরদের ছেলেমেয়েরাও ছুটিয়া
আসিল, চন্দ্ৰহাসও তাদের সঙ্গে তাকে দেখিয়া
এক ব্রাহ্মণ বলিয়া উঠিলেন,—“কি সুন্দর এই ছেলেটি।
ছিল।
চন্দ্রহাস
৪৭
এর এমন একটি সুলক্ষণ আছে যে, কোন রাজকন্যার সঙ্গে
নিশ্চয়ই এর বিয়ে হবে।”
আর এক ব্রাহ্মণ বলিলেন,-“শুধু রাজকন্যার সঙ্গে বিয়েই
নয়, এ রাজাও হবে নিশ্চয়।”
রাজা কাছেই ছিলেন,—শুনিয়া চমকিয়া উঠিলেন।
ভাবিলেন,—“চন্দ্রহাস ত আমার বাড়ীতেই থাকে, তবে কি
আমার মেয়ের সঙ্গেই ওর বিয়ে হবে নাকি! ছি ছি !
একটা ঝিয়ের ছেলে রাজকন্যাকে বিয়ে কবে আর রাজা
হবে! ব্রাহ্মণরা লক্ষণ দেখে যা বলেচে ল ত সহজে ব্যর্থ
হবার নয়। এর প্রতীকার কি? ওকে একেবারে সাবাড়
কলে হয় না? তাই করা যাক।
মনের কথা মনেই রাখিয়া তিনি জল্লাদদের ডাকিয়া
বলিয়া দিলেন,—“চন্দ্ৰহাসকে মশানে নিয়ে গিয়ে বধ করে
একটা চিহ্ন নিয়ে আসা চাই। খবরদার কেউ যেন কিছু
টের না পায়।”
জল্লাদরা ত নানা কথায় ভুলাইয়া চন্দ্ৰহাসকে মশানে লইয়া
গেল। সরল বালককে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হইতে বলা হইল।
চন্দ্রহাস বলিল,-“আমি মরুতে প্রস্তুত আছি জল্লাদ।
কিন্তু মরুবার পূর্বে আমায় একটু সময় দাও, একবার জন্মের
মত ভগবানকে ডেকে নেই।”
জল্লাদদের মনও খুব নরম হইয়া পড়িল। আহা! এমন
সুন্দর ছেলে-একে কি করিয়া হত্যা করা যায় ?
০৮
ছেলেদের ভক্তমাল
দেই।
চন্দ্রহাস হাতজোড় করিয়া চক্ষু বুজিয়া ভগবানের নাম
করিতে লাগিল।
প্রথম জল্লাদ দ্বিতীয় জল্লাদকে বলিল,-“ভাই, একে বধ
করে কাজ নেই, বড় মায়া হচ্ছে।”
দ্বিতীয় জল্লাদ বলিল,-“আমারও বড় মায়া হচ্ছে।
কাজ করা যাক, এর হাতে ছয়টা আঙ্গুল আছে। এসস আমরা
একটা আঙ্গুল কেটে নিয়ে রাজাকে দেখাই; আর ওকে ছেড়ে
ও এক দিকে পালিয়ে যা।”
চন্দ্ৰহাসকে ছাড়িয়া দেওয়া হইল। সে গিয়া এক গভীর
বনে প্রবেশ করিল।
যে বনে চন্দ্রহাস ছিল এক রাজা মৃগয়া করিতে আসিয়া
সেই বন ঘিরিয়া ফেলিলেন। বনের মধ্যে চন্দ্ৰহাসকে দেখিতে
পাইয়া রাজা আশ্চর্য হইয়া গেলেন ; ভাবিলেন,—এমন সুন্দর
ছেলেটিকে ভেট দিলে খুব ভাল হয়। যে রাজা চন্দ্ৰহাসকে
বধ করিতে পাঠাইয়াছিলেন, সেই রাজার কাছেই এই রাজা
অনেক দাসদাসী সহ চন্দ্ৰহাসকে ভেট পাঠাইলেন।
রাজা ত চন্দ্ৰহাসকে দেখিয়াই শিহরিয়া উঠিলেন। যাকে
বধ করিয়া জল্লাদরা আঙ্গুল কাটিয়া আনিয়া দেখাইয়াছে এ যে
সেই চন্দ্রহাস! তিনি বুঝিলেন জল্লাদরা তাঁকে প্রবঞ্চনা
করিয়াছে। তিনি না পারেন কিছু বলিতে, না পারেন সইতে,
এমন বিপদেই পড়িলেন। তবু চন্দ্ৰহাসকে বধ করিবার এক
নূতন ফন্দী আঁটিলেন।
হাস ৪১ রাজবাড়ী থেকে অনেকদূরে এক সুন্দর বাগান-বাড়ীতে রাজপুত্র থাকেন। রাজকন্যাও ভাইয়ের সঙ্গেই সেখানে থাকেন। বােনকে ছাড়া ভাই থাকিতে পারেন না, আর ভাইকে ছাড়া বােনও থাকিতে পারেন না। রাজকন্যার নাম বিষয়া, কিন্তু আদর করিয়া সকলে তাকে “বিষে” বলিয়া ডাকে। এদিকে রাজা রাজপুত্রকে একখানি চিঠি লিখিলেন। চিঠি- খানি খামে পুরিয়া আটকাইয়া চন্দ্ৰহাসকে ডাকিয়া বলিলেন, —“তুমি এক্ষুণি যাও এই চিঠি নিয়ে রাজপুত্রের কাছে।” রাজা চিঠিতে লিখিয়াছিলেন,—“পত্র পাওয়া মাত্র এই বালককে বিষ দিবে।” চন্দ্ৰহাস ত চলিয়া চলিয়া রাজপুত্রের কাছে গিয়া উপস্থিত হইল। তার চেহারা দেখিয়া রাজ- পুত্রের বড়ই ভাল লাগিল। চিঠি পড়িয়া তিনি ভাবিলেন যে, রাজা এই বালকের সঙ্গে এখনই বিষয়াকে বিবাহ দিতে আদেশ করিয়াছেন। তাঁর সরল মন, ‘বিষ’ দেখিতে তিনি দেখিলেন ‘বিষে’ লেখা আছে। তিনি বুঝিলেন চন্দ্রহাসের সঙ্গে বিষয়ার বিবাহ হইলে বেশ ভালই হয়, তাই রাজা তখনই বিবাহের আদেশ দিয়াছেন। রাজার আদেশ, বিলম্ব করিবার উপায় নাই। রাজপুত্র তখনই পুরােহিত ডাকাইয়া আনিলেন। বিবাহের আয়ােজন বেলা গেল, সন্ধ্যা হইল। চন্দ্রহাসের সঙ্গে রাজকন্যার বিবাহ হইয়া গেল। হইল।
ছেলেদের ভক্তমাল।
এদিকে রাজা বসিয়া ভাবিতেছেন যে, এতক্ষণে চন্দ্রহাস
নিশ্চয়ই মারা গিয়াছে। যাওয়া মাত্রই ত তাকে বিষ দেওয়া
হইয়াছে, কাজেই মরিতে আর কতক্ষণ লাগে ?
বিবাহের পর রাজপুত্র বর-কনে লইয়া রাজবাড়ীতে
ফিরিলেন। রাজার ত চক্ষু স্থির। রাগে, দুঃখে, ক্ষোভে তিনি
যেন ফাটিয়া যাইতে লাগিলেন। এ কি হইল ! কি সর্বনাশ !
শেষে ব্রাহ্মণের কথাই সত্য হইল
রাজার চক্রান্ত রাজবাড়ীর কেউই জানিত না, কাজেই
সকলে আমােদ-আহলাদ করিয়া বর-কনেকে ঘরে তুলিল।
মেয়ের বিবাহ হওয়া সত্ত্বেও কিন্তু রাজার মন টলিল
। মেয়ে বিধবা হয় হােক, তবু চন্দ্ৰহাসকে বধ করাই
চাই। এবার তিনি আর এক ফন্দী করিলেন। পরদিন
চন্দ্ৰহাসকে ডাকিয়া চুপি চুপি বলিলেন,-“দেখ বাবা, আমাদের
প্রথা আছে সন্ধ্যার পর নতুন জামাইকে আমাদেরই দেবমন্দিরে
গিয়ে মা কালীকে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করতে হয়। তােমাকে
আজ যেতে হবে।”
রাজী হইয়া চন্দ্রহাস বাহির হইয়া আসিল। আর
রাজাও এদিকে জল্লাদকে ডাকিয়া আনিয়া বলিয়া দিলেন,
“খড়গ নিয়ে মন্দিরের ভিতর লুকিয়ে থাকবে, চন্দ্রহাস যেমনি
কালীকে প্রণাম কবে অমনি খাড়া দিয়ে ঘা মারবে। এক
কোপেই সাবাড় করা চাই।”
জল্লাদ খড়গ লইয়া গিয়া মন্দিরের মধ্যে লুকাইয়া রহিল।
চন্দ্রহাস
এদিকে বেলা গেল। চন্দ্রহাস মন্দিরের দিকে চলিলেন।
রাজপুত্রও সঙ্গে সঙ্গে গেলেন। চন্দ্রহাস বলিল,-“ভাই,
সাষ্টাঙ্গে প্রণাম কি করে করতে হয় আমি ত জানি নে।”
রাজপুত্র বলিলেন,-“আচ্ছা, আমি তােমায় দেখিয়ে দেব।”
দু’জনেই মন্দিরে প্রবেশ করিল। সামনে রাজপুত্র, পিছনে
চন্দ্রহাস। দেবীর সামনে একটি মাটির প্রদীপ টি-টিম্ করিয়া
জ্বলিতেছে। আর কোথাও কোন আলাে নাই। অন্ধকারের
মধ্য দিয়া গিয়া সেই অস্পষ্ট আলােকের সামনে কালীমূর্তির
দিকে চন্দ্রহাস চাহিয়া রহিল। রাজপুত্র উপুড় হইয়া যেমনি
প্রণাম করিলেন, অমনি জল্লাদের ভীষণ খঙ্গ আসিয়া পড়িল
চক্ষের নিমিষে তার মুণ্ডটি দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন
হইয়া গেল।
রক্তে মন্দিরের মেঝে লাল হইয়া উঠিল।
জল্লাদ রাজার কাছে ছুটিয়া গিয়া খুব উল্লাসের সহিত
বলিল,-“মহারাজ, কাজ সাবাড় করে এসেছি।”
রাজার মনে খুবই আনন্দ হইল। খুব উৎসাহের সহিত
তিনি জল্লাদের সঙ্গে মন্দিরে চলিলেন, কিন্তু গিয়া যা দেখিলেন
তাতে তার জ্ঞান লােপ পাইল। “হায় হায় করিয়া একবার
তিনি বুকফাটা আর্তনাদ করিয়া উঠিলেন, তারপরেই ছেলের
লুটাইয়া পড়িয়া গেলেন, আর উঠিলেন না।
রাজবাড়ীতে কান্নার রােল উঠিল।
ব্রাহ্মণের ভবিষ্যদ্বাণী সফল হইল।
তারই ঘাড়ে।
বুকের উপর
বােবা রাজপুত্র
এক রাজা। তার রাজ্য ছিল যেমন বিশাল, ধন-দৌলতও
ছিল তেমনই অসীম। কিন্তু সন্তান ছিল না বলিয়া তার
দুঃখেরও সীমা ছিল না। বহু আরাধনার পর ভগবানের
দয়া হইল, রাজার একটি পুত্র হইল। রাজবাড়ীতে মহা-
আনন্দের কোলাহল উঠিল। রাজপুত্রকে দেবদূত মনে
করিয়া সকলেই তাকে অত্যন্ত আদর করিতে লাগিলেন।
রাজা তাকে না দেখিয়া একটু কালও থাকিতে পারেন না,
আর রাণী তাকে এক মুহূর্ত দেখিতে না পাইলে চোখে
অন্ধকার দেখেন।
কিছু দিন যায়। রাজপুত্র অনেকটা বড় হইয়াছেন,
কিন্তু একটি কথাও ক’ন না, কোন শব্দই তার মুখ থেকে
বাহির হয় না। রাজা বড়ই বিমর্ষ হইলেন। রাণীর দুঃখের
আর সীমা নাই; ছেলের মুখের ‘মা’ ডাক একবার শুনিতে
পাইলেন না। ছেলেকে বুকে জড়াইয়া এক একবার চোখের
জল ফেলেন। ভাবেন—ভগবান দয়া করিয়া একটি ছেলে
দিলেনই যদি, কোন্ অপরাধে তাকে বােবা করিয়া
রাখিলেন !
বােৰা রাজপুত্র
একদিন মন্ত্রী রাজাকে বলিলেন,-“মহারাজ, রাজকুমার
কোন কথাই বলছেন না বটে, কিন্তু আমি খুব ভাল করে
দেখেচি বােবার কোন লক্ষণই তার নেই।”
রাজা বলিলেন,-“লক্ষণ থাক্ আর নাই থাক্ একই কথা।
ভগবানেরই ইচ্ছা রাজকুমার বােরা হয়ে থাকবে, আমাদের
আর কি করবার আছে বলুন।”
অনেক ভাবিয়া-চিন্তিয়া মন্ত্রী এক মৎলব ঠাওরাইলেন ;
বলিলেন,—“মহারাজ, আমাদের সৈন্যেরা দুই-একদিনের মধ্যেই
মৃগয়ায় যাচ্ছে। তাদের সঙ্গে রাজপুত্রকে পাঠিয়ে দিলে
ভাল হয়, সেখানে যদি কোন কারণে কথা বলে ফেলেন।
একবার পরীক্ষা করেই দেখা যাক না।”
রাজা বলিলেন,—“তাই যদি ভাল মনে করেন, পাঠিয়ে
দিন। আমার কোন আপত্তি নেই।”
বন-বনের পর বন। ছােট বড় কত রকমের জানােয়ার
বনে বনে খেলা করিয়া বেড়াইতেছে। কেমন সুন্দর তাদের
দেখিতে। চারিদিকের দৃশ্য দেখিয়া রাজকুমারের মনে
আনন্দ আর ধরে না। তিনি বনের মধ্যে একবার এদিকে,
একবার সেদিকে যাইতে লাগিলেন। তার সঙ্গে সঙ্গে
থাকিবার জন্য রাজা এক জমাদারকে পাঠাইয়াছিলেন।
রাজকুমারের আনন্দ দেখিয়া তারও খুব আনন্দ হইতেছিল।
৫৪
ছেলেদের ভক্তমাল
এদিকে এক হরিণী দেখিয়া এক সেপাই অস্ত্র চুড়িয়া
মারিল। হরিণীর পেটটা কাটিয়া গেল, আর পেটের ভিতর
থেকে একটা বাচ্ছা মাটিতে পড়িয়া ছটফটু করিতে লাগিল।
এই ভীষণ দৃশ্য দেখিয়া রাজপুত্র আর স্থির থাকিতে
পারিলেন না। হঠাৎ তিনি সেপাইকে বলিয়া উঠিলেন,
“হায় অবােধ ! তুমি কি নিষ্ঠুর! কি দোষে তুমি এমনি করে
একে মারলে?”
রাজপুত্র আর কথা কহিলেন না। তাঁর দুই চোখ থেকে
দরদর ধারে জল গড়াইয়া পড়িতে লাগিল।
তিনি কথা কহিয়াছেন দেখিয়া জমাদারের বড়ই আনন্দ
হইল। আর বিলম্ব না করিয়া রাজপুত্রকে লইয়া সে
রাজবাড়ীতে তাড়াতাড়ি ফিরিয়া আসিল। তাড়াতাড়ি
রাজার কাছে ছুটিয়া গিয়া বলিল,-“মহারাজ, রাজপুত্র কথা
কয়েচেন।”
বিস্মিত হইয়া রাজা বলিলেন,—“বল কি!”
জমাদার বলিল,-“আজ্ঞে হ্যা, মহারাজ। একটা হরিণীর
মৃত্যু দেখে স্থির থাকতে না পেরে রাজপুত্র কথা কয়ে
ফেলেচেন।”
রাজা বলিলেন,-“বটে। ওরে কে আছিস, রাজপুত্রকে
ডেকে নিয়ে আয় ত।”
হুকুম শুনিয়াই একজন রাজকর্মচারী গিয়া রাজপুত্রকে
লইয়া আসিল।
বােবা রাজপুত্র
তাকে বুকে জড়াইয়া ধরিয়া রাজা বলিলেন, “তুমি কথা
কয়েচ—একথায় বড়ই আনন্দ হয়েছে। আমায় একটা কথা
শােনাও বাবা, আমার প্রাণটা ঠাণ্ডা হােক।”
রাজপুত্র চুপ করিয়াই রহিলেন। রাজা আবার বলিলেন।
রাজপুত্র তবু চুপ। কত আদর, কত কাকুতি-মিনতি—তবু
তিনি কথা কহিলেন না।
রাজা এবার চটিয়া গেলেন—জমাদারের উপরে। ভাবিলেন
জমাদার মিথ্যাকথা বলিয়াছে এবং মজা দেখিবার জন্য তাকে
অনর্থক দুঃখ দিয়া উপহাস করিয়াছে। জমাদারকে বলিলেন,-
“মিথ্যাবাদী কোথাকার! তােমার এত আস্পর্ধা যে তুমি
আমার সঙ্গে চালাকী মারুতে এসেচ !”
সে যে সত্যই বলিয়াছে—ইহা বুঝাইবার জন্য জমাদার
অনেক চেষ্টা করিল বটে, কিন্তু রাজা বিশ্বাস করিলেন না।
তিনি তার প্রাণদণ্ডের হুকুম দিলেন।
হুকুম শুনিয়াই জল্লাদ আসিয়া উপস্থিত হইল। প্রাণরক্ষার
আর কোনও উপায় নাই দেখিয়া জমাদার রাজপুত্রকে বলিল,-
“কুমার, তুমি দয়া করে কথা না কইলে যে আমার প্রাণ যায়।
শুধু শুধু একজনের প্রাণদণ্ড হবে, আর তুমি চুপ করে থাকবে?
হরিণীকে যখন বধ করা হ’ল তখন ত চুপ করে থাকতে
পার নি। চুপ করে থাকবে মানুষের বেলায়?”
রাজপুত্র আর স্থির থাকতে না পারিয়া শুধু এইটুকু
বলিলেন,-“আমি ত কথা কয়েচি।”
ছেলেদের ভক্তমাল
রাজা শুনিলেন। জমাদারকে প্রাণদণ্ডের আদেশ
দিয়াছিলেন বলিয়া লজ্জিত ও দুঃখিত হইলেন, তাকে মুক্তির
আদেশ দিলেন। রাজপুত্রকে বুকের কাছে টানিয়া আনিয়া
খুব আদর করিয়া বলিলেন,-বাবা, যদি কথা কইলেই তবে
আর কেন চুপ করে থাক?”
কত অনুনয়-বিনয়, তবু রাজপুত্র কথা কহিলেন না।
তখন দেশের নামকরা পণ্ডিতদের ডাকিয়া আনিয়া কারণ
জিজ্ঞাসা করিলেন।
তারা ভাবিয়া-চিন্তিয়া বলিলেন,-মহারাজ, রাজপুত্র
জাতিস্মর, পূর্বজন্মের সমস্ত কথাই তার মনে আছে। কথা
কওয়ার জন্যে তপস্যায় বড়ই দাগা পেয়েছিলেন, এজন্মে তাই
তিনি নৈষ্ঠিক মৌনী হয়ে আছেন। তিনি আর কথা
কইবেন না।”
সাক্ষীগােপাল
দুই ব্রাহ্মণ। একজন ছােট আর একজন বড়। ছােটটি
বড়টির শিষ্য। শিষ্য গুরুর কাছে শাস্ত্রের কথা, ধর্মের কথা
শােনেন, আর গুরুকে দেবতার মত ভক্তি করেন।
একদিন গুরু শিষ্যকে বলিলেন,-সংসার ত আর ভাল
লাগে না, একবার তীর্থভ্রমণ করে আসি চল।”
—“যে আজ্ঞে। কোন্ তীর্থে যেতে ইচ্ছা হয়?”
-“আমার ত ইচ্ছে একবার শ্রীবৃন্দাবন যাব।”
—“আজ্ঞে, তাই চলুন।”
দুই-একদিনের মধ্যেই পােটলা-পুটুলি বাঁধিয়া গুরু-শিষ্য
বাহির হইয়া পড়িলেন দিনের পর দিন চলিতেছেন।
গুরুর বয়স বেশী, কাজেই তিনি একটু বেশী দুর্বল হইয়া
পড়িলেন। পথে তার বড়ই কষ্ট হইতে লাগিল। শিষ্য
প্রাণপণে তার সেবা করিতে লাগিলেন। শেষে অতি কষ্টে
তাঁরা বৃন্দাবনে পেীছিলেন। এতদিন পথ-চলার সমস্ত কষ্ট
যেন এক মুহূর্তেই দূর হইয়া গেল, আনন্দে প্রাণ ভরিয়া
গেল। শ্ৰীগােপালের মন্দিরে গিয়া তারা আনন্দে আত্মহারা
হইলেন।
;
৫৮
ছেলেদের ভক্তমাল
।
খানিক পরে শিষ্যকে গুরু বলিলেন,-“দেখ, আমি একটা
কথা ভাচি। তোমার সেবায় ও যত্নে এতই খুশী হয়েছি যে,
আমার মেয়েকে তােমার সঙ্গে বিয়ে দিতে চাই।”
শিষ্য বলিলেন,—“তা কি হয় গুরুদেব ? আপনি কুলে
মানে আমার চেয়ে ঢের ওপরে।”
—“কুল-মান বলে কিছুই নেই। তােমাকেই যােগ্য
মনে করেছি, তােমাকেই কন্যা দেব। এই ত ঠাকুর রয়েছেন,
ঠাকুরের সামনেই এই কথা বললুম।”
কিছুদিন যায়। তীর্থভ্রমণ করিয়া গুরু-শিষ্য বাড়ী ফিরিয়া
আসিলেন।
গুরু তার পরিবারের সকলকে মেয়ের বিয়ের কথা বলিলেন।
সকলেই বড় অসন্তুষ্ট হইল। গুরুর পুত্র ত মহা রাগিয়া বলিয়া
উঠিল,—“যদি এমন অপাত্রেই আমার ভগ্নীকে বিয়ে দেওয়া
হয়, তবে আত্মহত্যা কব।”
মহা বিপদ ! ঠাকুরের সামনে তিনি যে কথা দিয়াছেন,
রক্ষা করিতে না পারিলে যে ঘাের অধৰ্ম্ম হয়। কি করা
অনেক ভাবিয়া-চিন্তিয়া তিনি গাঁয়ের সমস্ত বিশিষ্ট
ভদ্রলােকদের ডাকিয়া আনিলেন। তারাও গুরুপুত্রকে
অনেক বুঝাইতে চেষ্টা করিলেন, কিন্তু পুত্রটি ত বুঝিলই না,
উল্টা বলিয়া বসিল,—“বাবার এই শিষ্যটি বাবাকে সিদ্ধি খাইয়ে
সব টাকা চুরি করে নিয়েছে, আর সেই অজ্ঞান অবস্থায়ই
বিয়ের কথাটিও বের করে নিয়েছে।”
যায় ?
সাক্ষীগােপাল
শিষ্য বলিলেন,-চুরির কথা একদম মিথ্যে, আর বিয়ের
কথারও সাক্ষী ছিলেন স্বয়ং শ্রীগােপাল। মানুষ কেউ সেখানে
ছিল না—একথা ঠিক, কিন্তু ঠাকুর ত ছিলেন সেখানে।”
গুরুপুত্র বলিল,-“বেশ কথা, যদি স্বয়ং গােপাল বলেন
যে, বাবা বিয়ের কথা দিয়েছিলেন, তবে আমি রাজী হব।”
গুরুপুত্র মনে করিয়াছিল যে, গােপালকে দিয়া সাক্ষ্য
দেওয়ানাে ত আর সম্ভব নয়, সুতরাং শিষ্য এবার জব্দ
হইবেন।
শিষ্যের মনে কিন্তু একটা জীবন্ত বিশ্বাস ছিল যে, ঠাকুরের
সামনে যখন কথা হইয়াছে তখন একথা ঠাকুরই সকলকে
শুনাইয়া দিবেন। এদিকে গুরুও একমনে একপ্রাণে ঠাকুরকে
ডাকিতে লাগিলেন, এ বিপদে তিনি যদি রক্ষা না করেন তবে
যে কথা রক্ষা হয় না--ধর্ম রক্ষা হয় না।
শিষ চলিয়াছেন, মনে মনে শুধু গোপালকেই চিন্তা
করিতেছেন। কয়েকদিন পরেই বৃন্দাবনের যােগপীঠে গিয়া
গােপালের মন্দিরে উপস্থিত হইলেন—ঠাকুরের সামনে বসিয়া
কতই না দিলেন।
গভীর রাত্রি । শ্যি চোখের
চোখের জলে ভাসিতেছেন।
এমন সময় তিনি শুনিতে পাইলেন, গােপাল বলিতেছেন,
---
ছেলেদের ভক্তমাল
“আমি তােমার সঙ্গে সাক্ষী হয়ে যেতে রাজী আছি, কিন্তু
একটি কথা মনে রেখাে। পথে যেতে যেতে যদি কখনও পেছন
দিকে তাকাও তবে আমি আর এক পাও নড়ব না, ঠিক
সেখানেই থেকে যাব।”
শিষ্য জিজ্ঞাসা করিলেন,—“ঠাকুর, তুমি যে আমার পেছন
পেছন আসচ তা আমি বুঝব কি করে?”
ঠাকুর বলিলেন,-তুমি নূপুরের শব্দ শুনতে পাবে।”
শিষ্য এইবার দেশের দিকে চলিলেন। ঠাকুর যে চলিয়া
আসিতেছেন তার পেছনে নূপুরের শব্দেই বুঝিতে পারিলেন।
তিনি যখন নিজের গ্রামের কাছাকাছি আসিয়াছেন, তখন
নূপুরের ছিদ্রের মধ্যে বালি ঢুকিয়া শব্দ বন্ধ হইল। শব্দ
শুনিতে না পাইয়া তার সন্দেহ হইল, তিনি পেছনে
তাকাইলেন।
ব্যস, ঠাকুরও সেখানেই থামিলেন। তখন নিরুপায়
হইয়া শিষ্য নিজের গ্রামে ফিরিয়া গেলেন এবং গুরু ও
গুরুপুত্রকে কাঁদিতে কঁদিতে ব্যাপারটি বলিলেন।
কথাটা খুব অল্প সময়ের মধ্যেই চারিদিকে ছড়াইয়া
পড়িল। গ্রাম থেকে বহু লােক সেখানে ছুটিয়া আসিল।
মাঠের মাঝখানে গােপালের বিগ্রহ দেখিয়া গ্রামবাসী সকলে
বিস্ময়ে অবাক হইয়া গেল।
ঠিক তখনই এক দৈববাণী হইল,—“বিবাহের কথা সত্যি,
আমিই সাক্ষী।”
সাক্ষীগােপাল
গুরু তারই
সকলেই তখন শিষ্যের কথা বিশ্বাস করিল।
সঙ্গে কন্যার বিবাহ দিলেন।
গােপালের মূর্তি যেখানে রহিল সেইখানে উড়িষ্যার রাজা
এক মন্দির তৈয়ারী করিয়া দিলেন। সাক্ষী হইয়া আসিয়াছিলেন
বলিয়া গােপালের নাম হইল সাক্ষীগােপাল।
এখনও পুরীর কাছে সাক্ষীগােপালের মন্দির আছে।
কলিকাতা থেকে বি. এন. রেলে গেলে পুরীর আগে যে
ষ্টেশনটিতে পৌছিতে পারা যায়, সেই ষ্টেশনটিরও নাম
হইয়াছে সাক্ষীগােপাল। এই ষ্টেশন থেকেই সাক্ষীগােপালের
মন্দিরে খুব সহজে পৌছানাে যায়।
ডাকাত ব্রাহ্মণ
এক ব্রাহ্মণ, নাম নিষ্কিঞ্চন। যত অসহায়, অন্ধ, আতুর
তার কাছে আসে, যত অতিথি আসে, সে সকলেরই সেবা
করে। বিষয়-আশয় যা-কিছু ছিল, তার সবই গেছে। শেষে
এমন অবস্থাই তার হইল যে, আর কাউকে সাহায্য করিবার
মত তার আর কিছু রহিল না। সে ত মহা দুশ্চিন্তায় পড়িয়া
গেল। দুই-তিন দিন ধরিয়া নানা জায়গায় অনেক চেষ্টা
করিয়াও কিছু জোগাড় করিতে পারিল না। শেষে স্থির করিল
যে, পথিকদের সর্বস্ব লুট করিয়াও সে দুঃন্থের সেবা করিবেই
করিবে।
তার গ্রাম থেকে খানিকদূরে পথের পাশে ঝোপের আড়ালে
নিফিঞ্চন লুকাইয়া থাকে। কত পথিক নিশ্চিন্তমনে চলিয়া
যার কাছে কিছু আছে বলিয়া সে মনে করে, একটু
সুযােগ পাইলেই তাকে ধরে আর সব কাড়িয়া লয়।
এখন দম্য।
ইহা দেখিয়া স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ তার কাছে যাইতে ইচ্ছা
করিলেন। রুক্মিণী ঠাকুরাণীও তাঁর সঙ্গে যাইতে চাহিলেন।
দুই জনেই সাধারণ গৃহস্থের বেশে সেই পথ দিয়া চলিলেন।
দূর থেকে তাদের দেখিয়াই নিষ্কিঞ্চনও ঝোপের আড়ালে
বসিল।
কাছে আসিতেই ঠাকুর ত হঠাৎ পেছন থেকে
যায়।
ডাকাত ব্রাহ্মণ
বনের মধ্যে গিয়া সুকাইলেন, আর সুযােগ বুঝিয়া দস্যও
ঝোপের আড়াল থেকে বাহির হইয়া আসিয়া ঠাকুরাণীর
।
হাতখানি খপ করিয়া ধরিল এবং মুহুৰ্ত্ত মধ্যেই তার বহুমূল্য
অলঙ্কার খুলিয়া লইল। ঠাকুরাণী পেছনদিকে ফিরিয়া
৬৪
ছেলেদের ভক্তমাল
দেখিলেন ঠাকুর নাই, তখন তিনি চীৎকার করিয়া উঠিলেন।
চীৎকার শুনিয়া ঠাকুর ত বন থেকে বাহির হইয়া হাসিতে
হাসিতে সেখানে উপস্থিত হইলেন। ঠাকুরাণী তখন রাগ
করিয়া বলিলেন,—“
দর হাতে ফেলে এমনি করে কি
পালিয়ে যেতে হয় ? ছি! ছি!”
ঠাকুর বলিলেন,-দ বলচ কাকে? এ ত দ নয়, এ
যে আমার পরম ভক্ত।”
ঠাকুরাণী বলিলেন,-বেশ ত তােমার ভক্ত ! অসহায়
স্ত্রীলােকের গয়না পর্যন্ত জোর করে কেড়ে নেয় !”
ঠাকুর বলিলেন,—“পরের উপকার করার জন্য, দুঃস্থের
সেবার জন্য চুরি করে, নিজের জন্য চুরি করে না। এই
সেবাই আমার সেবা।”
এই কথা শুনিয়া নিষ্কিঞ্চনের মনের ভাব বদলাইয়া গেল।
কঁদিয়া আকুল হইয়া সে বলিল,-“তােমার এত দয়া ঠাকুর।
আমার মত পাতকীর কাছেই এসে থাক যদি, তােমার সেই
শ্যামসুন্দর মূর্তি আমায় একবার দেখাও, আমি ধন্য হই।”
ঠাকুর তখন শ্যামসুন্দর মূর্তি ধারণ করিলেন। নিফিঞ্চন
প্রাণ ভরিয়া সেই মূর্তি দেখিতে লাগিল। কিন্তু দেখিতে
দেখিতেই মূর্তি অদৃশ্য হইয়া গেল ; কোথায়ই বা ঠাকুর আর
কোথায়ই বা ঠাকুরাণী !
নিষ্কিঞ্চন আর বাড়ী ফিরিল না।
* 1 0};"। 0 BF W! ।'' B3Y '৭ - OWRAH বপদের বন্ধু দক্ষিণ ভারতের এক বিশাল দেবমন্দিরে বহুদূর থেকেও হাজার হাজার নরনারী আসে ঠাকুর দর্শন করিতে। সকলেরই বিশ্বাস যে, মন্দিরের পূজারী একজন ভক্ত। পূজারী একজন ভক্ত। সন্ধ্যার সময় কাঁসর-ঘণ্টা বাজিয়া উঠে, আরতি হয়, আর সারি সারি লােক করজোড়ে দাড়াইয়া থাকে। একদিন এক রাজপুত রাজার ইচ্ছা হইল ঠাকুর দর্শন করিতে। রাজার প্রবল প্রতাপ। চারিদিকে হৈ-হৈ রৈরৈ পড়িয়া গেল। সন্ধ্যা হইয়াছে, আরতির শঙ্খ-ঘণ্টা বাজিয়া উঠিয়াছে। পাত্র-মিত্রসহ রাজা মন্দিরে আসিলেন, সকলেই তটস্থ হইয়া রাজার দিকে তাকাইল। পূজারী একমনে আরতিই করিতে লাগিলেন। আরতির পর ঠাকুরকে প্রণাম করিয়া রাজা চলিয়া যাইবার উপক্রম করিয়াছেন, এমন সময়ে ঠাকুরের গলা থেকে একটি ফুলের মালা আনিয়া পূজারী রাজার গলায় পরাইয়া দিলেন। কিন্তু মালার দিকে তাকাইতেই রাজা দেখিলেন যে, তাতে একটা চুল লাগিয়া আছে, কাজেই অত্যন্ত রাগিয়া উঠিয়া পূজারীকে বলিলেন,-“এই চুল-
৬৬
ছেলেদের ভক্তমাল।
লাগানাে অপবিত্র মালা ঠাকুরের গলায় কি করে
পরিয়েছিলে হে? পূজা করূতে এসে কেবল চা’ল, কলা আর
পয়সার দিকে নজর, নয়? তােমার' মত পূজারী দ্বারা মন্দির
অপবিত্র হয়।”
পূজারীর বড় ভয় হইল। তিনি বুঝিতেই পারিলেন
নামালায় চুল আসিল কি করিয়া। থতমত খাইয়া বলিলেন,
—“মহারাজ, অপরাধ নেবেন না, ঠাকুরের মাথার চুল লেগে
গেছে।”
রাজা মুখ ভ্যাংচাইয়া বলিলেন,-ঠাকুরের মাথার চুল !
ইয়াকি মার বুঝি আর জায়গা পাও নি! দেখাও দেখি
ঠাকুরের মাথায় চুল।”
পূজারী বলিলেন, -“মহারাজ, ঠাকুরের মাথায় ফুল রয়েছে,
আজ রাত্তিরে আর তা ফেলব না।”
রাজা বলিলেন,-“বেশ, কাল দিনে আমায় দেখাতে হবে।
যদি দেখাতে না পার তবে তােমাকে এখান থেকে দূর করে
দেব, বুঝলে ?”
রাজা মন্দির থেকে চলিয়া আসিলেন।
সমস্ত রাত্রি পূজারী মনে প্রাণে ঠাকুরকে ডাকিলেন।
তাড়াইয়া দিলে আর যে ঠাকুরের সেবা করিতে পারিবেন না,
এই দুঃখই তার বুক যেন ভাঙ্গিয়া দিতেছিল।
বিপদের বন্ধু
ভাের হইল। রাজা সেপাই পাঠাইয়া দিলেন পূজারীকে
ধরিয়া আনিবার জন্য। এদিকে পূজারী দেখিয়া বিস্মিত
হইলেন যে, ঠাকুরের মাথায় চুল গজাইয়াছে।
ভক্তের ইচ্ছা
পূর্ণ করিবার জন্য ভগবান কত রকম খেলাই খেলেন ! আমরা
যা অসম্ভব মনে করি, তাও তিনি চক্ষের নিমেষে সম্ভব করিয়া
তােলেন।
পূজারী সেপাইদের বলিলেন,—“রাজাকে আমি উপহাস
করি নি। তােমরা বিশ্বেস না কর দেখে যাও ঠাকুরের মাথা-
ভরা চুল।”
এক রাত্রির মধ্যেই ঠাকুরের মাথায় চুল গজাইয়াছে
দেখিয়া সেপাইরা ত অবাক্! তাড়াতাড়ি গিয়া তারা রাজাকে
খবর দিল ।
রাজা হাসিয়া বলিলেন,—“তােমরা মূখ, যে যা বলে তা-ই
তােমর বিশ্বেস কর। চল দেখি আমার সঙ্গে, পুরুত ঠাকুরের
চালাকি ভেঙ্গে দিচ্ছি।”
রাজা মন্দিরে আসিলেন। পূজারী নমস্কার করিয়া তাঁকে
অভ্যর্থনা করিলেন।
রাজা বলিলেন,-“দেখি তােমার বুজরুকিটা একবার।”
পূজারী বলিলেন,-“না মহারাজ, বুজরুকি নয়, সকলই
তার ইচ্ছা।”
রাজা ঠাকুরের মাথায় চুল দেখিলেন বটে, কিন্তু তার মনে
বড়ই সন্দেহ হইল, তাই তিনি ঠাকুরের কাছে গিয়া একটি
ছেলেদের ভক্তমাল
চুল ধরিয়া টান মারিলেন। যেই টান মারা অমনি ঠাকুরের
মাথা থেকে ফিনকি দিয়া রক্ত পড়িতে লাগিল।
কি সর্বনাশ! রাজার ত চক্ষু স্থির। ভয়ে তার বুক
কঁপিয়া উঠিল। পূজারীর পায়ে পড়িয়া তখন তিনি ক্ষমা
চাহিতে লাগিলেন।
পূজারী তাকে ক্ষমা করিলেন বটে, কিন্তু সেই থেকে এই
রাজার বংশধরগণের যিনিই এই ঠাকুর দর্শন করিতে গিয়াছেন,
তিনিই আর বেশী দিন বাঁচিতে পারেন নাই।
আজ পর্যন্তও সেই রাজার বংশধর কেউ আর সে মন্দিরে
যান না।
দেবতার দরদ
রাজকন্যার বিবাহ। রাজ্যে মহা হৈ-চৈ পড়িয়া গিয়াছে।
'রাজা বলিলেন,-মেয়ের বিয়েতে আমি খুব সুন্দর
দুটি সােনার কলসী দিতে চাই।
খুব ভাল স্যাকরা কে
আছে হে ?”
পাত্র-মিত্র বলিলেন,-মহারাজ, ত্রিলােক খুব ভাল
স্যারা।
সােনার কলসী সে ছাড়া আর কেউ তৈরী করুতে
পাবে না। আদেশ দিলে তাকেই খবর দেই।”
রাজার মত হইল। ত্রিলােকও রাজবাড়ী আসিল।
দুইটি কলসীতে যত সােনার দরকার ততখানি সােনা তাকে
ওজন করিয়া দেওয়া হইল। বিবাহের অন্ততঃ ঠিক তিন দিন
পূর্বে রাজবাড়ীতে সােনার কলসী দিয়া যাইতে হইবে ঠিক
হইল।
এদিকে হইল কি—ত্রিলােক সেই সােনা বিক্রয় করিয়া
বহু গরীব-দুঃখী, সাধু-বৈষ্ণবকে খুব ধুমধাম করিয়া খাওয়াইতে
লাগিল; রাজকন্যার বিবাহের কথা ভুলিয়াই গেল।
বিবাহের ঠিক তিন দিন পূর্বে রাজবাড়ী থেকে লােক
গিয়া কলসী চাহিল। ত্রিলােকের মাথায় যেন আকাশ
ছেলেদের ভক্তমাল
ভাঙ্গিয়া পড়িল। কি করে ? বলিল,-“কলসী তৈরী এখনও
শেষ হয় নি। হলেই গিয়ে দিয়ে আসব’খন, চিন্তা কি ?”
রাজার লােক ত তখনকার মত ফিরিয়া গেল। ত্রিলােকের
বড়ই ভয় হইল। কিন্তু উপায় ত নাই। শেষে নিতান্ত
বেগতিক দেখিয়া বাড়ী-ঘর ছাড়িয়া সে এক গভীর বনে
পলাইয়া গেল।
বিবাহের আগের দিন রাজা আবার লােক পাঠাইলেন।
লােক গিয়া ত্রিলােককে পাইল না।
রাজা ভয়ানক চটিয়া গেলেন, লােজন পাঠাইয়া হুকুম
দিলেন,—“যেখানে পাও ত্রিলোেককে ধরে নিয়ে এস।”
লােকজন গিয়া ত্রিলােকের বাড়ী ঘিরিয়া রাখিল, চারিদিকে
খুঁজিতে লাগিল, কিন্তু কোথাও তাকে পাওয়া গেল না।
এদিকে ঠিক ত্রিলােকের চেহারার একটি লােক দুইটি
সুন্দর সােনার কলসী লইয়া রাজবাড়ীতে উপস্থিত হইল।
রাজা ত চক্ষু লাল করিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন,—“এত দেরী হ’ল
কেন? বিয়ের তিন দিন আগে দিতে হবে জানতে না?”
-“আজ্ঞে হ্যা, মহারাজ, জানা ছিল, কিন্তু তখনও এতটা
সুন্দর করে তুলতে পারি নি।”
রাজা বলিলেন,—“তা হলে বাড়ী থেকে পালিয়ে গিয়েছিলে
কেন?”
দেবতার দরদ
=
-“না মহারাজ, পালাই নি। বিশেষ ভাল করে তৈরী
করবার জন্যেই বাড়ী থেকে চলে গিয়েছিলুম। পালিয়েচি
মনে করে আপনার লােকজন আমার বাড়ীতে খুব অত্যাচার
কচ্ছে। অপরাধ হয়ে থাকে ক্ষমা করুন মহারাজ। একবার
দয়া করে দেখুন।
রাজা কলসী দুইটি দেখিলেন। এত সুন্দর হইয়াছিল
যে, তিনি খুশী না হইয়া পারিলেন না। ত্রিলােকের বাড়ী
থেকে চলিয়া আসিবার জন্য তিনি লােকজনদের হুকুম দিলেন,
আর তাকে প্রচুর বশিস্ দিলেন।
সেই লােকটি রাজবাড়ী থেকে বাহির হইল। পথে অন্য
এক লােকের চেহারা ধরিয়া ত্রিলােকের বাড়ী ঢুকিয়া বশিস
রাখিয়া আসিল। তারপর কিছু খাবার লইয়া গভীর বনে
ত্রিলােকের কাছে গেল। তাকে দেখিয়াই ত ত্রিলােকের
ভয়ানক ভয় হইল ; ভাবিল, বােধ হয় রাজবাড়ী থেকে কেউ
তাকে গ্রেপ্তার করিতে আসিয়াছে। তার অন্তরের এই কথা
বুঝিতে পারিয়াই সেই লােকটি তাকে বলিল,-“ভয় নেই ভাই,
ভয় নেই। আমি তােমায় ধরে নিয়ে যেতে আসি নি।
তুমি না খেয়ে এখানে এসে বসে আছ, তাই তােমার জন্য
খাবার নিয়ে এসেছি।”
তারপর রাজাকে কলসী দেওয়া, বশিস্ পাওয়া, তার
বাড়ীতে তা রাখিয়া আসার কথা একে একে সে সব বলিল।
সব কথা শুনিতে শুনিতে ত্রিলােকের ভয় আর রহিল না।
૧ર
ছেলেদের ভক্তমাল
চমকিত হইয়া সে জিজ্ঞাসা করিল,—“তােমার এত দয়া ! তুমি
ক? এ কি বিরাট রহস্য ? তুমিই কি আমার দেবতা ?”
*•••তােমার জন্য খাবার নিয়ে এসেচি”
দেবতা তখন অদৃশ্য হইলেন। ত্রিলােক এতক্ষণে সব স্পষ্ট
বুঝিতে পারিয়া দিতে দিতে বাড়ী ফিরিয়া আসিল।
মায়ার ফাস
এক সাধুপুরুষ, নাম মীননাথ। তার চেহারাটি কার্তিকের
মত সুন্দর, আর বয়সও খুব কম। তাঁর ছিল এক শিষ,
নাম গােরখনাথ। শিষ্যও গুরুরই মত সর্বস্ব ত্যাগ করিয়া
সাধন-ভজন করেন।
একবার গুরু আর শিষ্য দেশভ্রমণে বাহির হইয়াছেন।
চলিতে চলিতে অনেক দূরে এক রাজবাড়ীতে গিয়া তারা অতিথি
হইলেন। সাধুপুরুষ দেখিয়া রাজা মহাসমাদর করিলেন।
তারাও রাজার ব্যবহারে অত্যন্ত মুগ্ধ হইলেন।
সেদিন কাটিয়া গেল, পরদিনও গেল। রাজা আর
ছাড়েন না, তাঁরাও আর যান না। একে একে কয়েকদিন
কাটিয়া গেল।
গােরখনাথ বলেন,-“গুরুদেব, আর ত থাকা
উচিত নয়, রাজবাড়ীর আদরে আর রাজভােগে ভুলে থাকলে
ত চলবে না।”
মীননাথ কিন্তু আর যাইতে চান না। গােরখনাথও বেশী
কিছু বলিতে পারেন না। গুরুকে কি বেশী কিছু বলা যায় ?
মীননাথ বলেন,—“বিশেষ ব্যস্ত হ’য়াে না, গােরখনাথ।
দেখ না, রাজা বিষয়ে একেবারে মত্ত হয়ে আছেন।
কয়েক দিন থেকে দেখা যাক তাকে ঠিক পথে আনতে পারা
৭৪ ছেলেদের ভক্তমাল যায় কিনা। তাঁকে ভক্তির পথে আবার চেষ্টা করা কি আমাদের কর্তব্য নয় ? গােরখনাথ আর কি বলিবেন? বুঝিলেন গুরুদেবের কিছুদিন সেখানে থাকিতে নিতান্তই ইচ্ছা হইয়াছে। কিন্তু গােরখনাথের আর সেখানে মন টিকিল না। যদি সবই ছাড়িয়া দিয়া আসিলেন, যদি সমস্ত মায়ার বন্ধনই ছিন্ন করিলেন, তবে আর কেন এই আদর-আপ্যায়ন, খাওয়া- দাওয়ায় ভুলিয়া থাকা? রাজার চিন্তা রাজাই করুন না। তাকে ভক্তি শিক্ষা দিতে আসিয়া যদি ক্রমে ক্রমে আবার এই সংসারের প্রতি, বিষয়-আশয়ের প্রতিই মন যায়। এই ভাবিয়া গােরখনাথ একদিন সেখান থেকে চুপি চুপি সরিয়া পড়িলেন। রাজা মীননাথকে বড়ই ভালবাসেন। তাঁর চেহারা, তার উজ্জ্বল মুখখানি, তাঁর স্বভাব-চরিত্র রাজাকে মুগ্ধ করিল। তিনি এখন সব জায়গায়—সব কাজেই মীননাথকে সঙ্গে লইয়া যান, এমন কি তাস-পাশা খেলিবার সময়ও তঁাকে লইয়াই খেলা করেন। এমনি করিয়াই সংসর্গের ফলে মীননাথ আবার মায়ায় আবদ্ধ হইলেন। তার ধর্ম- কৰ্ম্ম, জীবনের লক্ষ্য, সবই তিনি ভুলিয়া গেলেন। বন্ধন কাটিতে আসিয়া তিনি নিজেই আবদ্ধ হইলেন।
মায়ার ফাস
রাজার পুত্র ছিল না। তার বড়ই ইচ্ছা হইল যে,
তার একমাত্র কন্যাকে এই মীননাথের সঙ্গে বিবাহ দেন।
মীননাথও বিবাহে প্রথমে না না করিয়া—শেষে রাজী
হইলেন। রাজকন্যাকে বিবাহ করিয়া মীননাথ রাজার জামাই
হইয়া বসিলেন।
কিছুদিন
যায়। রাজার মৃত্যু হইল। মীননাথই
সিংহাসনে বসিয়া রাজত্ব চালাইতে লাগিলেন।
ক্রমে তঁার
এক পুত্র সন্তান হইল। তিনি এখন হইলেন ঘাের
সংসারী।
এদিকে গােরখনাথ নানা স্থানে ঘুরিয়া বেড়ান, কিন্তু
গুরুর কথা ভুলিতে পারেন না। কি করিয়া গুরুকে মায়া
থেকে মুক্ত করিয়া আনা যায়, এই চিন্তাই করেন। শেষে
অনেক ভাবিয়া-চিন্তিয়া একদিন তিনি সেই রাজবাড়ীতেই
আসিলেন।
সিংহদ্বারে গালপাট্টাওলা বিরাট চেহারার দরােয়ান
গােরখনাথকে বাড়ীতে ঢুকিতেই দিল না। নিতান্ত নিরুপায়
হইয়া সেইখানে দাড়াইয়াই তিনি এক গান ধরিলেন।
সেই গানের সুর মীননাথের কানে গেল। তার মনটা কি
রকম করিয়া উঠিল। সুর শুনিয়া গােরখনাথের কথা তার
মনে হইল। তঁাকে ডাকাইয়া তিনি বাড়ীর মধ্যে নিলেন।
ছেলেদের ভক্তমাল
বাড়ীর মধ্যে যাইতেই মহাসমাদরে মীননাথ তাকে অভ্যর্থনা
করিলেন।
গেল সেদিন। পরদিন গােরখনাথ বলিলেন,—“গুরুদেব,
আপনি আমায় যে উপদেশ দিয়েছিলেন, তা ঠিক মনে
আছে কিনা জানি না, আমি বলে যাই, শুনুন ত।”
গুরুকে তিনি উপদেশ দিতে পারেন না, কাজেই এই
কৌশল করিয়া নানা ভাবে ধৰ্ম্মের কথাই বলিতে লাগিলেন।
এইসব শুনিয়া মীননাথের জ্ঞানচক্ষু আবার ফুটিল। পথের
মাঝখানে তার পদস্খলন হইয়াছিল, এজন্য তার আর
আক্ষেপের সীমা রহিল না। তিনি কঁদিয়া ফেলিলেন।
একদিন কাকেও কিছু না বলিয়া দুজনেই আবার
চুপি চুপি বাহির হইয়া গেলেন। স্ত্রী, পুত্র ও রাজত্বের
মায়া আর মীননাথকে বাঁধিয়া রাখিতে পারিল না। কিন্তু
সব ত্যাগ করিলেও, পথের কষ্টের কথা ভুলিতে না পারিয়া
তিনি সঙ্গে একটি পুটুলিতে করিয়া কতকগুলি মণিমুক্তা
লইয়াছিলেন। গােরখনাথ বিস্মিত হইয়া ভাবিলেন,
হায়রে মানুষের লােভ! রাজত্ব যিনি ত্যাগ করিলেন, স্ত্রী-
পুত্র যিনি অনায়াসে ছাড়িয়া আসিলেন, তিনি এই মুক্তার
লােভ দমন:করিতে পারিলেন না। তিনি গুরুকে বলিলেন,
—“গুরুদেব, পুটুলিটা আমার কাছে দিন। আমি থাকতে
আপনি কেন বােঝা বইবেন ? দিন আমার কাছে।”
মীননাথ দিলেন।
দিলেন। গােরখনাথ বােঝা ঘাড়ে করিয়া
মায়ার ফঁাস
৭৭
পিছনে পিছনে চলিলেন। যাইতে যাইতে এক নদীর পাশে
গিয়া তিনি মুক্তার পুটুলি নদীর জলে ছুড়িয়া ফেলিলেন !
মীননাথ ‘হায় হায় করিয়া উঠিলেন।
গােরখনাথ বলিলেন,—“গুরুদেব, আপনিই ত শিখিয়েছেন
যে, সর্বস্ব বিসর্জন দিয়ে ভগবানে পূর্ণ নির্ভর না করলে
তাকে পাওয়া যায় না। যে মােহের বাঁধন ছিড়ে ফেলে
এসেছেন, আবার পেছন ফিরে সেদিকে তাকান কেন?”
মীননাথ কিছুক্ষণ স্থির থাকিয়া বলিলেন,—“ঠিকই বলে
গােরখনাথ। এতক্ষণে সত্যই সমস্ত বন্ধন ছিন্ন হয়ে গেল।
চল আমরা এগিয়ে যাই।”
৫. ৩
মনের সাধ • রায় সেন নামে এক রাজা। তাঁর সেনাপতির নাম অঙ্গদ। ইনি সম্পর্কে রাজার খুড়ো হইতেন। সেনাপতি সব কাজেই রাজার একেবারে ডান হাত ছিলেন। রাজ্যে তার প্রবল প্রতাপ, যুদ্ধে তাঁর অসীম বীরত্ব। এক একটা যুদ্ধ হয়, বহু লােক ক্ষয় হয়, রক্তের স্রোত বয়, আর সেনাপতি যুদ্ধ থেকে ফিরিয়া আসিয়া তার বিবরণ সব জায়গায় বলেন। সকল লােকেই তাকে খুব মান্যগণ্য করে। সেনাপতির স্ত্রী অত্যন্ত দয়াশীল। এই সব কাহিনী শুনিয়া তিনি চোখের জলে ভাসেন। মনে করেন তার স্বামী অত্যন্ত নিষ্ঠুর ; যদি তিনি এই নরহত্যা ত্যাগ করিয়া মানুষকে ভালবাসিতে পারিতেন। তিনি সেনাপতিকে কত করিয়া বুঝাইবার চেষ্টা করিতেন, কিন্তু তার লাভ হইত শুধু অত্যাচার। একদিন পায়ে ধরিয়া অনেক কাকুতি-মিনতি করিবার পর সেনাপতির মন ফিরিল। তিনি প্রতিজ্ঞা করিলেন আর হিংসা করিবেন না, যুদ্ধে যাইবেন না, বাকী জীবন ভগবানের নাম করিয়াই কাটাইবেন। এতদিন পর যুদ্ধ- ক্ষেত্রের আহত ও মুমূর আর্তনাদ স্মরণ করিয়া তিনি নিজেই শিহরিয়া উঠিলেন। রাজকার্য্যে আর ইচ্ছা নাই, ।
মনের সাধ
কিন্তু চাকরীর মায়াও হঠাৎ ত্যাগ করিতে পারেন না।
কোনও রকমে চাকরীটি বজায় রাখিলেন।
এদিকে রাজার ইচ্ছা হইল প্রতিবাসী এক রাজার রাজ্য
আক্রমণ করিতে। সেনাপতি অঙ্গদ তাকে বুঝাইলেন,
“বেশ ত আছেন মহারাজ, শুধু শুধু যুদ্ধ করূবেন কেন? রাজ্য
কি কেবল বাড়াতেই হবে ? যুদ্ধ করলেই নিরর্থক লােকয়
ও অর্থক্ষয় হবেই, তাতে রাজ্যের অকল্যাণ ছাড়া কল্যাণ
হবে না।”
রাজা কোন পরামর্শই শুনিলেন না, যুদ্ধ করাই স্থির
করিলেন। রাজ্যের মধ্যে খুব উৎসাহের সহিত যুদ্ধের
আয়ােজন চলিতে লাগিল। দুই-এক দিনের মধ্যেই রাজা
সেনাপতিকে সসৈন্যে যুদ্ধযাত্রা করিতে হুকুম দিলেন।
অনেক আপত্তি করিয়াও যখন রেহাই পাইলেন না, তখন
নিতান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেই সেনাপতিকে যুদ্ধযাত্রা করিতে
হইল।
যুদ্ধে গেলেন বটে, কিন্তু তিনি যুদ্ধ করিলেন না। কাজেই
প্রতিবাসী রাজার জয় হইল। জয় হওয়ায় তিনি অত্যন্ত
সন্তুষ্ট হইয়া সেনাপতি অঙ্গদকে একটি বহুমূল্য পাগড়ী
উপহার দিলেন। পাগড়ীতে একটা খুব বেশী দামী হীরক
ছিল। অঙ্গদ ফিরিয়া আসিয়া রাজাকে সব কথা খুলিয়া
বলিলেন এবং সেনাপতির পদ ত্যাগ করিলেন। উপহার
পাওয়া পাগড়ীটি তিনি রাজাকেই দিয়া আসিলেন।
৮০
ছেলেদের ভক্তমাল
নাই।
;
রাজা যে অঙ্গদের উপর অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হইলেন তা না
বলিলেও চলে।
তা ছাড়া তিনি জানিতে পারিলেন যে,
পাগড়ীতে যে বহুমূল্য হীরকটি ছিল, তা অঙ্গদ তাকে দেন
অঙ্গদ মনে করিয়াছিলেন যে, এমন মূল্যবান জিনিস
যদি জগন্নাথদেবের গলায় পরাইয়া দেওয়া যায়, তবে মনের
সাধ মেটে। এই ভাবিয়া তিনি হীরকটি নিজের কাছেই
রাখিয়া দিয়াছিলেন।
রাজা বড়ই রাগিয়া গেলেন ; হীরকটি আনিবার জন্য
লােক পাঠাইলেন। তারা গিয়া অঙ্গদকে বাড়ীতে পাইল না।
এবার রাজার ধৈৰ্য্যচ্যুতি ঘটিল। অঙ্গদের বাড়ী ঘিরিয়া
রাখিবার জন্য সৈন্য-সামন্তদের হুকুম দিলেন। তৎক্ষণাৎ দলে
দলে সৈন্য ছুটিল।
এদিকে - অঙ্গদ একটু পূর্বেই সব টের পাইয়া হীরক
লইয়া বাড়ী থেকে পলাইয়া গেলেন। সৈন্যরা ইহা জানিতে
পারিয়া তখনই রাজাকে খবর দিল। রাজা তখনই পাঁচশত
ঘােড়-সওয়ার পাঠাইলেন তাকে ধরিয়া আনিতে। যদি
তিনি স্বেচ্ছায় হীরক না দেন, তবে যেন তাঁকে বধ করা হয়,
রাজা এ হুকুমও দিলেন।
অঙ্গদ যদিও অনেক দূরে গিয়া পড়িয়াছিলেন, তবু ঘােড়
সওয়াররা তাকে ধরিয়া ফেলিল। তিনি বুঝিলেন যে,
জগন্নাথের গলায় হীরক পরাইবার সাধ আর তার মিটিল
মনের সাধ
৮১
। কিন্তু কি করিবেন ? অনেক ভাবিয়া
অনেক ভাবিয়া তিনি ঘােড়-
সওয়ারদের বলিলেন,-“তােমরা একটু অপেক্ষা কর ভাই,
Syemaple
আমি ঐ সামনের পুকুরটা থেকে ডুব দিয়ে আসি, তােমাদের
কোন চিন্তা নাই।”
ছেলেদের ভক্তমাল
তারা রাজী হইল, কিন্তু তাঁর সঙ্গে সঙ্গে পুকুর পর্যন্ত
গেল। তিনি পুকুরের মধ্যে খানিকটা নামিয়াই হীরকটি গভীর
জলে নিক্ষেপ করিলেন। সওয়াররা হায় হায় করিয়া উঠিল।
অনেকে তখনই জলে ঝাঁপাইয়া পড়িল এবং ডুব দিয়া দিয়া
খুজিতে লাগিল। পুকুরের জল তােলপাড় হইল বটে, কিন্তু
হীরক আর পাওয়া গেল না।
সওয়াররা ফিরিয়া গিয়া রাজাকে সংবাদ দিল। সংবাদ
শুনিয়া রাজা অত্যন্ত রাগিয়া গেলেন।
এদিকে অঙ্গদ সেখান থেকেই শ্রীক্ষেত্রের দিকে চলিলেন।
ঠাকুরকে হীরক পরানাে হইল না বলিয়া তার বুক যেন
ভাঙ্গিয়া যাইতে লাগিল। কয়েকদিন পর তিনি শ্রীক্ষেত্রে
গিয়া উপস্থিত হইলেন। শুদ্ধ-স্নাত হইয়া জগন্নাথদেবের
মন্দিরে প্রবেশ করিয়া চাহিতেই তিনি দেখিলেন যে, ঠাকুরের
গলায় সেই হীরকটিই ঝুলিতেছে। তিনি মুগ্ধবিস্ময়ে চাহিয়া
রহিলেন, চোখের জলে যে বুক ভিজিয়া গেল তা টেরও
পাইলেন না।
স্পর্শমণি
বৃন্দাবনে যমুনার তীরে বসিয়া শ্রীসনাতন গােস্বামী একমনে
ধ্যান করেন। একদিন যমুনায় স্নান করিতে নামিয়াছেন,
তাঁর পায়ে একটি স্পর্শমণি ঠেকিল। সেটি হাতে করিয়া
তিনি ভাবিলেন,—“ভগবানের এ কি ছলনা! জগতের সমস্ত
ঐশ্বর্যের মায়া কাটিয়ে এসেছি, তবে আবার এ স্পর্শমণি তিনি
আমায় দিলেন কেন? এ বোধ হয় তাঁরই পরীক্ষা। যাক্,
ফেলে দিয়ে আর কি করব, যদি কোন দীন-দুঃখীর উপকারে
লাগে।
এই ভাবিয়া তিনি নদীতীরের বালির মধ্যে স্পর্শমণি
পুতিয়া রাখিলেন ; তারপর স্নান শেষ করিয়া আবার ধ্যানে
বসিলেন।
এদিকে বর্ধমান জিলায় মানকর নামে এক গ্রামে জীবন
নামে এক ব্রাহ্মণ বাস করেন। তিনি বড়ই দরিদ্র, অথচ তার
বহু পরিজন। কিছুতেই যখন তার দুঃখ আর দূর হইল না,
তখন তিনি স্থির করিলেন যে, কাশীতে গিয়া শিবের আরাধনা
করিবেন। যদি দেবতা সন্তুষ্ট হইয়া তার দুঃখ দূর করেন,
তবেই তিনি ফিরিবেন, নইলে পরিজন প্রতিপালনের আর যে
কোন উপায় নাই।
৮৪
ছেলেদের ভক্তমাল
কাশীতে আসিয়া তিনি একমনে শিবের আরাধনা করিতে
লাগিলেন। দেবতা তার তপস্যায় প্রীত হইয়া স্বপ্নে দেখা দিয়া
তাকে বলিলেন,-
“যাও যমুনার তীর,
সনাতন গােস্বামীর
ধর দুটি পায়।
তারে পিতা বলি’ মেননা, তারি কাছে আছে জেনাে
ধনের উপায়।
এই স্বপ্নাদেশ পাইয়াই জীবন বৃন্দাবন যাত্রা করিলেন
এবং যমুনার তীরে গিয়া সনাতন গােস্বামীকে সাষ্টাঙ্গ প্রণাম
করিলেন।
সনাতন জিজ্ঞাসা করিলেন,—“তোমার কি নাম? কোথা
থেকে কিসের জন্যে আমার কাছে এসেচ ?”
জীবন সব বলিলেন।
সনাতন বলিলেন,-আমার কি আছে ? কি করে তােমার
দুঃখ দূর করতে পারি ?
জীবন বলিলেন,-“দেবতা আমায় স্বপ্নে বলেচেন আপনিই
আমার দুঃখ দূর করতে পাবেন। এ কি মিথ্যা ?”
একটু পরেই হঠাৎ সেই স্পর্শমণির কথা সনাতনের মনে
পড়িয়া গেল, তিনি বলিলেন,-ঠিক বটে ঠিক। একদিন
স্নান কতে গিয়ে স্পর্শমণি পেয়েছি। যদি কারু দুঃখ দূর
হয় এই মনে করে নদীতীরেই বালির মধ্যে পুতে রেখেচি ।
স্পর্শমণি
তােমায় জায়গাটা বলে দিচ্ছি, খুড়ে নিয়ে দুঃখ দূর
করগে।”
জীবন গিয়া বালি খুঁড়িয়া মণিটি তুলিতে না তুলিতেই
তাঁর লােহার মাদুলি দুটি সােনা হইয়া উঠিল। বিস্ময়ে অবাক
হইয়া তিনি ভাবিলেন,—এমন মণিকে যিনি তুচ্ছ মনে করে
ফেলে দিতে পারেন তিনিই দেবতা।
স্পর্শমণিটি লইয়া জীবন চলিয়া আসিলেন সনাতনের
কাছে ; বলিলেন,—“ঠাকুর, দয়া করে আমায় দীক্ষা দাও,
তােমার দীক্ষায় আমার জীবন ধন্য হােক্।”
সনাতন বলিলেন,-তােমার এ পথ নয়। এ পথে আসতে
হলে যে সবই ত্যাগ করতে হয় ! তােমার হাতের
স্পর্শমণি যদি অনায়াসে ফেলতে পার, তবে তােমাকে আমার
পথে নেব।”
জীবন তখন
“যে ধনে হইয়া ধনী
মণিরে মান না মণি
তাহারি খানিক
মাগি আমি নতশিরে!” -এত বলি’ নদীনীরে
ফেন্সিল মাণিক।
এই স্পর্শমণির কথা ক্রমে ক্রমে বাদশাহের কানেও
গেল। তিনি কতকগুলি লােক দিয়া একটি হাতী বৃন্দাবনে
৮৬
ছেলেদের ভক্তমাল
পাঠাইয়া দিলেন। সনাতন যেখানে বসিয়াছিলেন সেইখানে
আসিয়া তারা যমুনার জলে হাতী নামাইয়া দিয়া স্পর্শমণি
খোঁজ করিতে লাগিল। নদীর জল তােলপাড় হইয়া গেল,
কিন্তু মণি আর মিলিল না। হাতীটা যখন উঠিয়া আসিল
তখন দেখা গেল তার পায়ের লােহার বেড়ী সােনা হইয়া
গিয়াছে। বাদশাহের লােকেরা দীর্ঘশ্বাস ছাড়িয়া ফিরিয়া
গেল।
old
..
nepur R.
অগতির গতি
এক ব্রাহ্মণ গঙ্গায় ঝাঁপ দিয়া প্রাণত্যাগ করিতে যেমনি
উপক্রম করিয়াছে, অমনি দূর থেকে এক সন্ন্যাসী ছুটিয়া আসিয়া
তাকে ধরিলেন। ব্রাহ্মণ জোর করিয়া হাত ছাড়াইয়া নদীতে
পড়িতে চায়, আর সন্ন্যাসী ক্রমাগত তাকে বাধা দেন। এমনি
করিয়া কিছুক্ষণ চলিল।
সন্ন্যাসী জিজ্ঞাসা করিলেন,—“ব্রাহ্মণ, তুমি কি পাগল
হয়েচ? জান না অত্মিহত্যা মহাপাপ ?”
ব্রাহ্মণ বলিল,-“আমার জীবনে ভয়ানক ঘেন্না ধরে গেছে।
আমায় সকলে ঘেন্না করে । রাস্তায় বেরুলে সকলে সরে যায়,
আর আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়ে বলাবলি করে, আমি ঘৃণিত
পশু। আমি ব্রাহ্মণের ছেলে, কিন্তু আমায় কেউ হেয় না,
আমার সঙ্গে কথা কয় না। সমাজ বা মানুষের মধ্যে আমার
স্থান নেই। এ জীবন রেখে আর কি হবে ? ছাড়ুন, ছাড়ুন,
আমায় মরুতে
দিন।”
সন্ন্যাসী বলিলেন,-থাম না ব্রাহ্মণ, ব্যাপারটা কি একবার
শুনি। দেখা যাক কোন প্রতীকার করা যায় কিনা।”
ব্রাহ্মণ বলিল,-“মানুষের কিছু দোষ নেই ঠাকুর, আমিই
মহাপাতকী। আমার কথা শুনলে আপনিও আমায় ঘেন্না
কবেন। এমন কোন অপকর্ম নেই যা আমি করি নি,
৮৮ ছেলেদের ভক্তমাল নরহত্যা, গােহত্যা, ব্রহ্মহত্যা, কিছুই বাকী নেই। আমার জীবন সত্যিই পশুর জীবন, বােধ হয় পশুও আমার চেয়ে সন্ন্যাসী জিজ্ঞাসা করিলেন,—“তােমার তা হলে খুব অনুশােনা হচ্ছে বল। পাপকে পূর্বে পাপ বলে বুঝতে পার নি, এখন বুঝতে পাচ্ছ বলেই এই অনুশােচনা হচ্ছে। তুমি জীবনে হতাশ হয়েচ। আমার কথা শােন। তুমি ভগবানে মনপ্রাণ দাও, তােমার সব পাপতাপ ধুয়ে মুছে যাবে। শােন নি দস্যু রত্নাকর সাধনা করে বাল্মীকি হয়েছিলেন। জগতে চিরকাল ধরে তিনি পূজো পাচ্ছেন। ভয় নেই ব্রাহ্মণ, ভয় নেই। হতাশ হয়াে না। আমার সঙ্গে এস। আমি তােমায় আশ্রয় দেব, তােমায় আনন্দের পথ দেখিয়ে দেব।” ঘাের অন্ধকারের মধ্যে ব্রাহ্মণ যেন আশার ক্ষীণ আলােকরশ্মি দেখিতে পাইল,নূতন আশায় বুক বাঁধিয়া সন্ন্যাসীর সঙ্গে সঙ্গে চলিল। এই সন্ন্যাসীই জগদ্বরেণ্য মহাপুরুষ তুলসীদাস। মহাপুরুষ যারা তাদের কাছে সব মানুষই সমান—ছােট- বড়, ভালমন্দ নাই, সকলকেই তাঁরা সমান ভালবাসেন। ভগবান পতিতকে উদ্ধার করেন বলিয়া তার নাম পতিত-
অগতির গতি
৮৯
সে যেন এক
পাবন। তাঁর প্রকৃত ভক্ত যাঁরা, তাঁরা পাপীকে ঘৃণা করেন না,
বরং ভালবাসিয়া পাপ-পথ থেকে ফিরাইয়া আনিয়া প্রকৃত
মানুষ করিয়া তােলেন। মহাত্মা তুলসীদাসও ব্রাহ্মণকে
সঙ্গে সঙ্গে রাখিয়া এমন করিয়া তুলিলেন যে, সে তুলসীদাসকে
ছাড়া এক মুহূর্তও থাকিতে পারে না।
নূতন মানুষ হইয়া গিয়াছে। এক ঈশ্বরচিন্তা ছাড়া আর
কোনও চিন্তা তার মনে স্থান পায় না। স্পর্শমণি যেমন
লােহাকে সােনা করিয়া দেয়, তুলসীদাসও তেমনি তার অন্তর
সৌন্দর্য্যে পূর্ণ করিয়া দিলেন।
তুলসীদাস তাকে লইয়া কাশীতে আসিয়াছেন। এদিকে
কাশীর ব্রাহ্মণ-মহলে সােরগােল পড়িয়া গেল। তুলসীদাস
চণ্ডালকেও কোল দেন, সুতরাং তিনিও অস্পৃশ্য, ইহা মনে
করিয়া সমাজপতি ব্রাহ্মণগণ তঁাকে অবজ্ঞার চক্ষে দেখিতেন,
তার উপর এই পাতকী ব্রাহ্মণটিকে লইয়া তিনি বিশ্বনাথের
মন্দিরে যান; কাজেই সমাজপতিরা টিয়া লাল। তাঁরা
বলিলেন,-“এই ব্রাহ্মণ যে রােজ নৈবেদ্য নিয়ে মন্দিরে গিয়ে
পূজো দেয়, যদি তার নৈবেদ্য বিশ্বনাথের বড় খায়, তবে
ব্রাহ্মণকে আর তুলসীদাসকে মন্দিরে ঢুকতে দেব, নইলে
কিছুতেই ঢুকতে দেব না।”
ব্রাহ্মণগণ মনে করিয়াছিলেন বিশ্বনাথের ষাঁড় পাথরের
তৈয়ারী, সুতরাং পাথরের ষাঁড় নৈবেদ্য খাইবে কি করিয়া ?
তুলসীদাস এইবার জব্দ!
GAR BHWA 10:
ছেলেদের ভক্তমাল
পরদিন তুলসীদাস ও সেই ব্রাহ্মণ নৈবেদ্য লইয়া মন্দিরে
প্রবেশ করিলেন। ব্রাহ্মণের ভয় হইল। তুলসীদাস
বলিলেন,—“ভয় কি? রঘুনাথের কথা মিথ্যা হতে পারে
। তিনি আমায় বলেচেন এই পাথরের বড়ই জীবন্ত
হ'য়ে নৈবেদ্য খাবে।”
ব্রাহ্মণ নৈবেদ্যের থালা যাঁড়ের সামনে ধরিল, আর
সকলে বিস্ময়ে স্তম্ভিত হইয়া দেখিল যে, পাথরের বড়ই
জিত বাহির করিয়া নৈবেদ্য চাটিয়া খাইল।
ব্রাহ্মণগণ তখন তুলসীদাসের পায়ে পড়িয়া ক্ষমা
চাহিতে লাগিলেন। তিনি তাদের সঙ্গে কোলাকুলি করিলেন।
তারপর কাশীর ব্রাহ্মণ ও সমাজপতিগণ তুলসীদাসের শিষ্যত্ব
গ্রহণ করিলেন।
'o d
HERAH
6C3; ১৮
{{: {3'!BA?
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.