Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Sreebatsho Chinta

Sen,jibonkrishna · 2009/10/6

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

বংস-চিন্তা।
(পৌরাণিক দৃশ্যকাব্য।)
খান (খগের ভু! হ।
dীবন শন প্রতি।
1}{• • • বিন স্থাকে
* গ্রাম থিয়েটার কোম্পানির দ্বারা
প্রকাশিত।
কলিকা
গ্রেট ইডি প্রেস,
১৩ নং রামনারায়ণ ভট্টাচার্য্যের লেন,
অমূহলাল মুখোপাধ্যায় থানা মুদ্রিত।

No text on this page.

উপহার। : বন্ধুবর ! শ্রীযুক্ত বাবু ধর্মদাস সুর। সদাশয় সুহৃৎ! মাতৃ-ভাষায় মিশ্র-ছন্দে “শ্রীবৎস-চিন্তা” নাটক লিখিয়াছি। গুণগ্রাহীর নিকট এইরূপ ছন্দে লিখিত নাটকাদির আদর হয় কি না হয়—জানি না—সুতরাং নিরাশ্রয় “শ্রীবৎস- চিন্তা” যে আদর ও আশ্রয় পাইবে তাহাও বলিতে পারি না। আপনার প্রশস্ত হৃদয়- অনেক ভাবার্থের আধার জানিয়া এই ক্ষুদ্র পুস্তকখানি আপনার করে উৎসর্গ করি- লাম। আপনি যে চক্ষে আমায় দেখেন- ভাল বাসেন—যদি সেই চক্ষে আমার শ্রীবৎস-চিন্তাকে দেখেন তাহা দেখেন তাহা হইলেই আমার শ্রম সফল। ডায়মণ্ড হারব। আপনার নিতাড়া ১৮ই জ্যৈষ্ঠ, ১২৯১। শ্রীজীবনকৃষ্ণ সেন -

শ্রীবংস-চিন্তা।
(পৌরাণিক দৃশ্য-কাব্য।)
প্রস্তাবনা।
দৃশ্য—ব্যোপথ।
( শনি ও লক্ষ্মী।)
লক্ষ্মী।
খৰ্ব্বতায় গৰ্ব কেন ?
গৌরব-সমীরে বয় সৌরভ যেমন,
সঠতার সখ্য ভাল নয় ;
ধৰ্ম্মনিষ্ঠা-ব্ৰতফল, চরম সম্বল,
চরমের পূর্ণ আয়ােজন
অকারণ কিসে?
বিধিমতে বুঝ,
বিজ্ঞ তুমি অযােগ্য ত নও।
যােগ্যতায় শ্রেষ্ঠ আমি চরাচরে জানে,
প্রাচীন গৌরবে আমি খ্যাত চিরকাল,
বহুকাল আছে এ সম;
কেন তব মতিভ্রম।
শনি।

ঐবৎস-চিন্তা।
লক্ষ্মী।
পেনি।
অযােগ্য আলাপ;
যােগ তুমি কোন গুণে,
মিত্র জ্ঞানে কে পূজে তােমায়।
বিধিজ্ঞান বিপরীত তব,
অন্যায় আশার কথা শাস্ত্রে অসঙ্গত,
অশারে যা কয়, সদাশয় না শুনে সে সব।
আমি শ্রেষ্ঠ দেবের সমাজে,
অগ্রগণ্য মান্য তিনলােক,
দেবলােক, দেবেন্দ্র স্বয়ং
নারায়ণ বৈকুণ্ঠ-বিহারি
শনি নামে শঙ্কা পায় সদা।
গন্ধর্ব, কিন্নর, নাগ, যক্ষ, রক্ষ আদি
কে বাদি আমার ।
দুরাচর রাবণের দশা,
রামের সন্তাপ,
সীতা তুমিও তখন
স্মর কথা—প্রম কর দূর।
ধৰ্ম্মের আসন উচ্চ নারায়ণ যায়,
শনি পাবে তা কোথায়!
পাপ ম-কাম তব দক্ষ অনাচারে ;
রাজ দ্বারে,
সঙ্গত বিচারে কভু শ্রেষ্ঠ নহ তুমি ;
তােমা হতে শ্রেষ্ঠ আমি, শ্রেষ্ঠ শত বার
লক্ষ্মী।
দেবতার আরাধ্য যেন।

ঐবৎস-চিন্তা। লক্ষ্মী। শনি। সম্পদদম্বিনী নাম সর্বলোকে জানে, ভাগ্য আমি সৌভাগ্য-আধার, মান সুবিচার। কে যােগ্য বিচারপতি, কারে মন তুমি ? আমি মানি শ্রীবৎস রাজায়। আমিও সে রাজে মানি সুবিচার পতি; আশু গতি চল মৰ্ত্তবাসে, হের দেবলােক হাসে। ত্রিলােক হাসিবে তব অযােগ্য আশায়। মধ্যমের মদগৰ্ব্ব প্রাণে নাহি সয়, চল ত্বরা দেখি আজ বিচারে কি হয়। জয় তব ভাগ্যে নাই- জয় তব ভাগ্যে নাই। [ উভয়ের প্রস্থান লক্ষ্মী। শনি। লক্ষ্মী। প্রথম অঙ্ক। প্রথম গর্ভাঙ্ক। প্রাগনগর-রাজসভা। শৰৎস। ( শ্রীবৎস, মন্ত্রী ও সভাসদগণ।) অকস্মাৎ হৃদকম্প বিচঞ্চল মতি, কি হেতু এ হেনতি বুঝিতে না পারি ।

ঐবৎস চিন্তা।
।
ক্ষুঃ চারিদিক, যেন শূন্য রাজ্য হেরি,
সে মাধুরী এ সভায় না দেখি এখন ?
কোন্ চক্ষে দেখি, একি বিপরীত দৃশ্য।
কোথা আমি কেন এ বঞ্চনা ;
কোথা কৰ্ম্ম নিষ্ঠা মম কোথা একমন,
ভিন্ন মতি কি জন্য আমার !
অর্চনায় হ’ল কি ব্যাঘাত!
মহারাজ! কি চিন্তায় রত ?
কর্তব্য সম্মুখে, শুন বগিণ গায়
শুভাশুভ রাজোর সংবাদ।
রাজকার্যে ব্ৰতি আমি-
কহ মন্ত্রি কর্তব্য আমার ?
রাজ্যের কুশল শুন মানব ঈশ্বর।
মন্ত্রী।
শ্রীবৎস।
মন্ত্রী।
(রাজভট্টদ্বয়ের প্রবেশ ।)
ভট্টগণ।
সিন্ধুড়া-ধামার।
পশ্চিমে পাহাড়ী জাতি আনন্দে মগন,
রাজ! অানন্দে মগন ।
দক্ষিণে দোকান বাট কৃষি কীৰ্ত্তিবান,
সরলতা সনে গায় রাজ্যের কল্যাণ।
দীনদল ক্ষীণ কায়,
দিনান্তে আহার পায়,

শ্রীবৎস-চিন্তা।
কৰ্ম্মফল মানি তারা আনন্দে মগন।
উত্তরে উন্মাদজাতি,
নাচে গায় দিবা রাতি,
আনন্দে মগন রাজা আনন্দে মগন ।
পুরবে পণ্ডিত বাস, সবে খ্যাত রাজদাস ;
বারমাসি তপ জপে আনন্দে মগন।
[ রাজভট্টদ্বয়ের প্রস্থান।
ঐবৎস।
কুশল কাহিনী আহা! তুষিল আমায়,
কোথা ধায় মন আবার!
আমি কার কার অনুগত,
কোন্ ব্ৰত সম্মুখে আমার ;
একি বিড়ম্বনা!
দশ দিক্ অন্ধকার হেরি।
হের যােগ্যপাত্রগণ সুনীল গগণ,
শ্যাম শান্তি চারিদিকে,
কে আসে দুর্জয় রিপু কাল বায়ু ভরে।
মন্ত্রী। পরিষ্কার শূন্য দেশ,
করি
দূর দরশন,
নিদর্শন কিছুমাত্র নাই।
(শনি ও লক্ষীর প্রবেশ।)
*.
।
শ্রীবৎস।
দেখ সম্মুখে তোমার
দেবতার উগ্ৰতেজ-রাশি।

ঐবৎসস্তি। শনি। ঐবৎস। শনি। ( স্তব) দীন-তরণ মুক্তি মূলাধার, ভূভার সংহারী ভীম ভীমাকার ভীম গরজন কালপতি, রক্ষ রক্ষ দীনে দীনগতি। শিষ্টাচারে তুষ্ট রাজা, যােগ্য তুমি সুবিচার পতি, সসাগরু পৃথিবীর ভার তব, এবে. দেবতার ভার নৃপ ধর একবার। সামান্য কিঙ্কর, কোন্ অপরাধে অপরাধী আমি ! অপরাধ তব রাজ্যে নাই ; সত্যব্রত, সৌদানি তুমি নরনাথ। সুবিচার কর দোহাকার। অনুমতি কি দাসে এখন ? চিন্তা নাই চিন্তাপতি যােগ্যতায় দেহ পরিচয়, শ্রেষ্ঠ কে দোহার মাঝে কহ সদাশয় ? বিধাতার অখণ্ড রচন! মমভাগ্যে সুবিস্তার, কাল পূর্ণ কাৰ্য-অঙ্ক শেষ ; মহাক্লেশ মহা মনস্তাপ, শ্রীবৎসের তরে বিধি রেখেছে গােপন। মোন কেন! কর সুবিচার । শ্রীবৎস। লক্ষ্মী। তবৎস।

এবংস-চিন্তা। c. ঐবৎস। দেব, দেবী ! নিদয় কি লাগি ? মানব-সামান্য রাজা নর-সিংহাসনে লক্ষ্মী। শ্রীবৎস । সুর-ভার কেমনে ধরিব । সামান্য মানব নহ শ্রীবৎস রাজন, মহাজন মহাজ্ঞানী তুমি। মহত্বের পরিচয় মহতের কাছে, মহাশয়। রাখ নিজ মান। দেবি, দীনতা বারিণী। দেব, দিগ্বিজয় পতি! ভূপতির পতি নাথ, পথ-বান্ধব হও দিব্য জ্ঞান দানি। দিব্যজ্ঞান লভিয়াছ দেব দরশনে। ভিক্ষা চাহি আজিকার দিন, প্রভাতে সভায় হবে সুবিচার যাহা। (স্বগত) ছিল স্বপনের অগোচর গােপন-লট-লিপী প্রকাশিবে কালি। ভাল, বিদায় হইনু- প্রভাতে আসিব দেহে সুবিচার তরে। শ্রীবৎস । শনি। [ শনি ও লক্ষীর প্রস্থান । बदम। কহ মন্ত্রি ! কি উপায় করি : সঙ্গত বিচার যুক্তি দেহ মিলকর, ঐবৎ-চিন্তা। মন্ত্রী। শ্রীবৎস। মন্ত্রী। কাঁপিছে অন্তর, সংসার আঁধার হেরি সর্বনাশ কালি। মহারাজ! যুক্তি যােগ্যতায় নাই ; শনি লক্ষ্মী সনে বাদ-প্রমাদ বিষম, এ সম্ভ্রম কিসে রক্ষা হয় ; কে দেব সহায় হবে কালি প্রাতঃকালে রাজভালে না জানি কি আছে। যুক্তিদানে যােগ্য নও বিজ্ঞ মন্ত্রী তুমি, রাজসেবা করিলে বিস্তর, রাজনীতি কণ্ঠে তব, কুষ্ঠিত কি লাগি ? প্রভু! দেব সেবা হয়নি জীবনে, দেব-নীতি, দেবের সম্মান কি জানে মানব ; দেবের গৌরব রাখি আছে কি গৌরব। চিন্তা পরিহর, নিরন্তর ভাব সার, যুক্তি পাবে পরিষ্কার। দেবতার দ্বন্দ্বে মন মানবের বটে, দৈব বলে পাব পরিত্রাণ, রবে দেবতার মান। বিৰ্য্যবান তুমি নরপাল, বিজ্ঞতায় বৃহস্পতী সম ; রাখ মান রাজ্যের কল্যাণ। মৰে মানচল সার পথে। [ সকলের প্রস্থান। ঐবৎস। মন্ত্রী। ঐবৎস।

বংস-চিন্তা।
দ্বিতীয় গভাঙ্ক।
কুসুম-কুঞ্জ।
( চিন্তা ও সখীত্রয়।)
সখিগণ।
খাম্বাজ-যৎ।
বন-সঙ্গিনী রঙ্গিনী, কুঞ্জ-বিহারিণী,
প্রেম-সােহাগিনী লাে ।
হের সখি অলিকুল মুকুলে করে আকুল,
ব্যাকুল বালিকা মরি মানিনী লাে॥
উথলে অধরে সুধা, কেন প্রাণে প্রেমক্ষুধা,
বাসনা কলিকা সুধা-দায়িনী লাে।
১ম, সখী।
২য়, সখী।
পুরুষ কঠিন, হের কঠিন ভ্রমর
মননাচোর কুসুম-বান্ধব ;
উথলে অধরে সুধা, সুধা আসে ধায়,
প্রেম চায় ছি! ছি! কলিকায়!
আমরি বালিকা হের লজ্জায় লজ্জায়
আভা।
মধুকর কেন নাহি জায় ;
কে কোথায় দেখেছে এমন।
সে ত থাকে না অরণ, সে ত থাকে না। স্মরণ,
বিকাসে মধুর
৩ সখী।

বংস-চিন্তা।
সরমের সনে নব নব আলিঙ্গন
গােপন চুম্বন সখি গােপন চুম্বন।
চিন্তা। শিখেছ সঙ্গিনী কত নব-রস কথা,
সুধা-গাথা বচন তােমার ;
কহ সত্য কার মনে করিছ বিহার?
৩য় সখী।
সমীরে সােহাগ পাই, সমীরের সনে যাই,
সমীরে জানাই সখি মনের বেদন,
স্বভাব মাধুরী হেরে সুখি অনুক্ষণ।
চিন্তা।
কুসুম-মাধুরী হের বিবিধ বরণ,
সন্ধ্যার গগণে যেন রঞ্জিত নীরদ ;
সরােবরে শ্যাম-ছায় অপরূপরাশি,
এ কুকানন ভাইস সি।
রাজা যদি কুঞ্জে রয়,
ভালবাসা ভাল হয়,
নিকুঞ্জ-আসন সখি থাকে দিবারাতি,
আমরাও হেসে খেলে কত ছল পাতি।
সখিগণ ।
পিলু-থেষ্টা।
নিকুঞ্জ কুসুমহার ধর ধরলাে।
অনুরাগে গাঁথা সখি পর পর লল।
নিশির সুগন্ধ কলি, নটবেশে বাসে অলি,
ফুটিলে যৌবন কলি, জ্বর জ্বর লল,
নাগর আসিছে হের সর সর লো।
[ সখিগণের প্রস্থান
১ম, সখী।

ঐবৎস-চিন্তা।
শ্রীবৎস।
(শ্রীবৎসর প্রবেশ।)
শান্তি রমণীর কাছে,
শান্তি বিপিনে স্বাধীন,
হেন দিন কার ।
অসার সংসার মায়া মানব ভূষণ।
নিকুঞ্জ মাধুরী হেরি বিষন্ন অন্তর !
নিরন্তর আনন্দ যাহায়,
গগণের চারু শােভা সন্ধ্যা-সমীরণ,
মনের বেদন গায়,
পাছে প্রিয়াকে জানায়,
যাই গথ। আনন্দ দায়িনী।
"নাথ!
প্রসন্ন বদন কেন বিষয় এখন,
কি কারণ মুখে হাসি নাই ;
কহ প্রভু! দাসি আমি চরণে জানাই।
আদরিণি আকুলা কি লাগি ।
রাজ্যের কুশল চিন্তা করি অনুক্ষণ,
ক্ষুন্ন কভু প্রসন্ন কখন ;
চিন্তাকুল মানব প্রকৃতি,
কভু দেখ নাই সতি।
সরলতা সহাস্য বদন,
রাখ প্রিয়ে জীবনসঙ্গিনী ।
কোথায় আনন্দ নাখ,
কোথা হাসি আর ?
ঐবৎস।
চিন্তা।

বৎস-চিন্তা।
শ্রীবৎস ।
অধিকার কি আছে কালার,
সতীর পতিই সব অঙ্গ আভরণ,
সঙ্গের জীবন সুখ-দুঃখ আদি যায়,
“কেন
কেন তায় এ গোপন ;
কাতর না হবে প্রভু,
কর সত্য বিষাদ কিত্তন।
কঠিনের কোমল সঙ্গীত,
নারী প্রাণে সয় কি না সয়।
শুন সতী অপরূপ কথা !
শনি লক্ষ্মী দ্বন্দ্ব করি আইলা সভায়;
সভয়ে রাখিনু মান ।
আমায় মধস্থ রাখ ক দেবী,
কে শ্রেষ্ঠ দোহার মাঝে কহ মহাশয় ;
অবাক হইনু, শেষে বিবেচনা মতে,
ভিক্ষা মাগি আজিকার দিন,
বিদায় করিনু দেহে।
কবে সে বিচার প্রভু ?
আগামী প্রভাত ;
বজ্রপাত ভীম গরজন,
শুনেছ সুন্দরী,
তাহতে অধিক তেজ দেবতার, কোপ,
সত্যাশ্রয় মােক্ষের সােপান,
মুক্তি আছে চিন্তা নাহি রাণী,
এস ত্বরা,
চিন্তা।
ঐবৎস।

শ্রীবৎস:চিন্তা।
চিন্তা।
শ্রীবৎস।
অবসান প্রভা হের ঘাের আয়োজন
কোপা সখী সব?
কুসুম চয়নে গেছে আসিবে এখনি।
এসো সবে, বিলম্ব করােনা।
[ প্রস্থান।
আনন্দ প্রতিমা কেন বিষঃ এখন ।
উথলে বিষাদ রাশি অন্তরে আমার,
অন্ধকার ঘাের ঘটা—চমকিল প্রাণ ;
একি! কোথা ধায় বিচঞ্চল মতি।
চিন্তা।
খাম্বাজ-মধ্যমান।
কার তরে"উদাসিনী, বিষাদ সঙ্গিনী কায় ।
কিলাগি সরল তারে, মনের বেদন গায় ।
মমতায় মুগ্ধ প্রাণ, মনন দুখ করে গান,
কি হেন প্রমাদ হবে, কি করি উপায়।
হায় রে অন্তরে কেন বাসনা বিদায় ।
( সখীত্রয়ের পুনঃ প্রবেশ )
১ম-সখী। একি! প্রাণসখি, কহ কঁাদ কার তরে
কি মনােবেদন তব সম দুখি মোরা।
চিন্তা। কি আর কহিব সখি ! বিদরে হৃদয়,
প্রাণেশ্বরে-ৰিষঃ-'হেরি,
একুঞ্জ কণ্টক মম চল ত্বর করি,

শ্রীবৎস-চিন্তা।
১ম,
সখী।
প্রাণ, ধরি হেরি প্রাণ-পতি।
চল সতি, চল যাই পুরে।
[ সকলের প্রস্থান
তৃতীয় গভাঙ্ক।
শয়ন-কক্ষ।
( শ্রীবৎস ও চিন্তা।)
শ্রীবৎস ।
চিন্তা।
ভাগ্য মান্য—ভাগ্য গণ্যভাগে ভাগ্যধর,
ভাগ্যে ভাগ্যহীন
চিরদিন ভাগ্যাধীন জীব ;
সজীব প্রতিমা জাগে অন্তরে আমার,
বহুভার ভাগ্য-গুণে মাের,
লক্ষ্মীরে করিব শ্রেষ্ঠ যা থাকে কপালে ।
শনি-কোপে সন্দেহ আমার,
বুঝি ছারখার হবে রাজ্য ।
কাৰ্য্য না ভুলিব যদি যায় রাজ্য-বাস,
বিশ্বাস অটল মাের—সত্য সার পথে
অন্যমতে নহি আমি,
সন্ত্যস্বামি-
অনুক্ষণ জাগে হৃদে বিলক্ষণ জানি;
আদরিণি।
ঐবৎস।

শ্রীবৎস চিন্তা।
চিন্তা।
বৎস।
চিন্তা।
সত্যের মহত্ব যদি থাকে ইহকালে,
দৈববলে পাব পরিত্রাণ,
ক্ষুন্ন প্রাণ কেন ফুল্লমুখি ?
বিরস বদন হেরি ক্ষুন্ন প্রাণ প্রতু।
সােহাগ-সৰ্ব্ব রী প্রিয়ে বিষাদে পােহায়,
মন্দ পথে গ্রহচক্র প্রকাশিবে কালি,
আজি কেন গাই অমঙ্গল।
দেব-দ্বন্দ্ব ভঞ্জিবার শক্তি কি নরের ।
কে রাখিবে দেবতার মান
কৰ্ম্মফল-সকলি বিফল মম।
কোন্ দেব রুষ্ট মাের প্রতি।
প্রাণপতি কি হবে উপায় ?
কি হবে উপায় চিন্তা! চিন্তা কি এখন,
বিপদ বারণ হরি রক্ষিবে আমায়,
ভাবি তায় কায়মনে।
প্রসন্ন হইবে শনি—ক্ষ্মী নারায়ণী
নারায়ণ পক্ষ যার।
প্রিয়ে সুখ দুঃখে এ জীবন।
বুঝ তত্ব—রাখিতে মহত্ব ভবে
ঐবৎস।
দেব-দ্বন্দ্বে মধ্যস্থ মানব।
দেব-দ্বন্দ্বে মধ্যস্থ মানব
অসম্ভব এ ঘটন।
দৈব বিড়ম্বন প্রভু, দৈব বিড়ম্বন।
দৈব বিড়ম্বন-দৈবাধীন সব,
ঐৰৎস।.

শ্রীবৎস-চিন্তা। চিন্তা। শ্রীবৎস । চিন্তা। ঐবৎস। কৰ্ম্ম ফল অবশ্য ফলিবে, কেন তায় বিষাদ ভাবনা। প্রাণ কঁাদে—নারী আমি নরনাথ ? সরলতা-নবীন মমতা নারী কাছে বহু দিন রয়। আকুল অন্তর, নিরন্তর কত মনে হয়, যেন সুখদিন ফুরায় ফুরায়। চিরদিন সমান না যায়। কভু ভাগ্যবান-কভু দীনতা-নিশান, খেদ কি তাহায় প্রিয়ে। শান্ত কর মন, সারাৎসার ভাব সদ, দীননাথ রাখিবে এ দিনে। নিরব যামিনী কঁাদে—কাঁদে ঝিল্পি রব, নিৰ্ম্মল গগণে কঁাদে তারা শশধর। মদগতি কাদে সমীরণ, আরত্ত বরণ হের নিশা অবসান কোকিলের গান মধুর সুতান কেন বিষাদ জানায়। দীননাথ উদিবে সত্বর, প্রমাদ-প্রভাত প্রভু আসিবে এখনি। বুদ্ধিমতি হও স্থিরমতি। প্রজাপতি যা লিখেছে ভালে অবশ্য ফলিবে প্রিয়ে কালি প্রাতঃকালে এ রিচারে মুক্তি নাহি, চিন্তা। শ্রীবৎস।

ঐবৎস-চিন্তা। ১৭ মুক্তি নাহি কভু দেব-শক্তি বিনে। চন্দ্রাননে! শান্ত হও কাৰ্যকাল সন্নিকট মম, হের অবসান বিভা। প্রাণপতি! রাখ দাসীর মিনতি চিন্তা। শ্রীবৎস। অন্যে দেই ভার ; রাজ-কার্যে কাৰ্য নাহি আর এ বিচার ছারখার তরে। যুক্তিমতে হইবে সকলি, কাত্যায়ণী ব্ৰত তব- ভাব তারা কুদিন-বারিণী। আদরিণি ! যাই সভাস্থলে এ আদর রবে চিরদিন। [ শ্রীবৎসের প্রস্থান। চিন্তা। অবােধ অন্তর রাখ দাসীর মিনতি প্রাণপতি আদেশিল যাহা। গৌরী-ঢিমা তৃতাল। শুম্ভ-সােহাগিনী। সারদে-বরদে-বামা, বি-বিনাশিনী। রাখ মা দেবের মান, কর মা দীনে কল্যাণ, কাতরে করুণাময়ী হের হর ভাবিনী। শঙ্কটে রাখ শঙ্করী, গিরিসুতা শুভঙ্করী,

১৮
বৎস-চিন্তা।
আতঙ্গে অম্বিকে মরি, রক্ষ নগেন্দ্র-নন্দিনী।
অসময় কোথা শিবে, সদা শিব-সিমন্তিনী।
চতুর্থ গর্ভাঙ্ক।
রাজসভা।
( সিংহাসনের উভয় পাশ্বে স্বর্ণ ও রজসন স্থাপিত,
শ্রীবৎস, মন্ত্রী ও অমাত্যগণ।)
ঐবৎস।
শুন পাত্রগণ !
আয়োজন হয়েছে সকল ?
নীরবে বিচার হবে ;
কনক আসন শ্রেষ্ঠ, নিকৃষ্ট রজত,
মন্ত্রী।
এক মত হও সবে,
কন্তব্য নিকট বুঝ।.
দেব! যুক্তি মানি শির পাতি।
(শনি ও লমীর প্রবেশ)
( স্তব।)
ঐ বৎস।
উচ্চ সমাগম, তুচ্ছ নিবাসে,
কাল পূর্ণ কাল, ভাগ্য করতাল
কিরণে বাজিবে, কি ফল আশে।
জয় সুৰ্য্যসুত, শনি শক্তিধর,

শ্রীবৎস-চিন্তা। লক্ষ্মী। জয় সিন্ধুসুতা, বালা বিঘ্ন হর, সম্পদদায়িনী, শান্তি প্ৰদায়িনী, রঙ্গ নারায়ণী দীন দাসে। কাতর কিঙ্কর, কম্পিত কলেবর, কম্পিত ধরাধর, শঙ্কা-পটে। ঘাের দরশন, ঘন ঘন গরজন, কাল-সমীরণ, কাল রটে। জয় পূর্ণ তেজঃরাশি, গোলক-নিবাসী, আলােক দেহি দীনহীন জনে। দীনবন্ধু দুঃখ নিবারণে। অনুকূল দেবকুল কীৰ্ত্তিবান তুমি, কীৰ্ত্তি রাখ কর সুবিচার। ঐবৎস। অভয় আশ্রয় দানে রাখ রাজা- বাস, যোগ্যাসন- যথা যােগ্য স্থান লভ কৃপা করি দীনে। (সুবর্ণাসনে লক্ষ্মী ও রজতাসনে শনির উপবেশন।) শনি। মহারাজ ! অঙ্গীকার বদ্ধ তুমি, শ্রেষ্ঠ কে নিকৃষ্ট কেবা কহ নরপল ? সাক্ষ দেব দামােদর, সাক্ষ শূলপাণি, সাক্ষ মা ভবানী, সাক্ষ চন্দ্র সূৰ্য্য তারা; গ্রহ অষ্টবসু, দিকপাল দিগ্বিজয়-পতি, প্রজাপতি, দেবের সমাজ সাক্ষ, সাক্ষ ইষ্টদেব,

২৭
এবংস-চিন্তা
শনি।
দেব দেবী হও সদয় এ দীনে,
যথাযােগ্য জ্ঞানে কহি
দক্ষিণে প্রধান বাস, বামে সাধারণ,
স্বর্ণাসন শ্রেষ্ঠ জন পায়।
কি! নিকৃষ্ট করিলি মােরে,
এত অপমান,
দেবের সম্মান না রাখিলি দুরাশয় ;
শ্রেষ্ঠ লক্ষ্মী তোর,
শ্রেষ্ঠাসন সুবর্ণে তােমার,
ছারখার হবে রাজ্য ;
শনির প্রতাপ পূর্ণ তেজঃরাশি,
এখনি দেখব তােরে ;
মহাজ্ঞানী জ্ঞানে বরিনু তােমায়
সুবিচার পতি ;
কুমতি হইল তাের,
দুষ্ট। লক্ষ্মী করিলি সহায়,
থাক—থাকরে দুৰ্ম্মতি,
দীনগতি করিব সত্বর,
প্রতিফল—কোপানলে দিব,
সংহার। সংহার বেশ হের নিচাশয়।
[ কোপাগ্নি উদগারি শনির প্রস্থান।
অভয় অভঙ্গ রাজা দানি তােমায়,
ছায়া সম রব সাথে যাবৎ জীবন।
. লক্ষীর প্রস্থান।
ল মী।

ঐবৎস-চিন্তা।
( কতিপয় প্রজার প্রবেশ )
১ম, প্রজা।
সর্বনাশ হ’ল মহারাজ!
জ্বলে অগ্নি চারিদিকে,
ছারখার হইল সংসার।
ওহে, পুড়ে গেছি রাজা।
২য়, প্রজা।
পুড়েছে সংসার মম,
দ্বারা-সুত পুড়েছে অনলে।
৩য়, প্রজা।
শ্রীবৎস।
গেল রাজ্য ভষ্ম হ’ল দেশ,
পিপাসায় প্রাণ ফেটে যায়।
কি দেখ অমাত্যগণ,
বিধাতার নিবন্ধন,
গােপন ললাট লিপি প্রকাশিল এবে ;
কি হবে উপায়, কোথা যাই-হে মধুসূদন !
বিপদ-ভঞ্জন হরি কোথা এ সময় ।
কে সদয় আছে ?
প্রজাগণে বারি দান কর কৃপা করি।
মন্ত্রী।
প্রভু ! কর সদুপায়,
ঐবৎস
হের রাজ্য ছারখার !
উপায় ঈশ্বরের হাত,
যাও সবে, সময়ে কহিব কথা।

২২
ঐ বৎস-চিন্তা।
পঞ্চম গভঙ্কি।
শয়ন কক্ষ।
( শ্রীবৎস ও চিন্তা।)
প্রিয় হের সৰ্ব্বনাশ !
ধূধূ জলে প্রজা-বাস
হতাস হইনু আমি
নিৰ্ব্বাসিত হ’ল দেশ,
শনি কোপে মহা ক্লেশ,
দীনবেশ পরিব সত্বর ।
যাও প্রিয়ে, পিত্রালয়ে
সমাদরে রবে তথা,
দেখা হবে যদি রয় প্রাণ।
চিন্তা।
প্রাণনাথ ! কোন্ প্রাণে কও,
নিদয় কি হেতু প্রভু! কোথা যাব আমি
ত্যেজিয়ে তােমায়,
এ কথায় ব্যথা না পাইলে,
পাষাণে বাঁধিলে বুক কার মুখ চেয়ে ?
প্রাণ কঁাদে হে জীবন-সখা,
দাসী আমি ধরি দুটি পায়।
ঐবংস।
সতি।
এত্যে যদি থাকে মন,

ঐবৎস-চিন্তা। ২৬ ** চিন্তা। রক্ষিবেন নায়ায়ণ, রণে বনে দুর্গমে বান্ধব। বৈভব বিহীন আমি দীনবেশে দেশান্তরী হবো, কখন নগরে কভু বনে বিচরণ, দুৰ্বল জীবন হবে ক্ষুধায় তৃষায়, অনাহারে যাবে কতদিন । বন-ক্লেশ, ভিখারীর তরে। ভিখারিণী আমি, সঙ্গে রব, চরণ সেবিব, মন ব্যথা অঞ্চলে রাখিব সদা মুছিয়া নয়ন। আহা! জীবনসঙ্গিনী মম, সঙ্গে রবে- বিপাকে পড়িবে সর্তী ভিখারীর সনে। মহেশ ভিখারী সনে মন সুখে রবো, পভিসেবা ব্ৰত মাের রবে চিরদিন। প্রিয়ে। অনেক যন্ত্রণা আছে শ্রীবৎসের তালে, কেন তায় সমভাগী হবে ? ঐ বংস। চিন্তা। ঐবৎস। চিন্তা। তব সনে কাননে আনন্দ পাব চরণ সেবায়, ক্ষুধার তৃষায়, কাতর না হবে প্রভু! বনতা- বনের মমতা দানে তুষিবে আমায়,

শ্ৰীৰংস-চিন্তা।
শ্রীবৎস।
দেবতায় হবে অনুকূল।
প্রতিকূল শনি-কোপে রাজ্য ছারখার,
এ সংসার সুখ-নিকেতন,
রােদনের ঠাই এবে,
কোথা যাই—কোথায় জুড়াই প্রাণ।
রুদ্ধপথ হেরি চারিদিকে।
( দৈববাণী )
সম্বর রােদন রাজা।
আমি লক্ষ্মী,
ছায়া সম রব সাথে,
শনি কোপে কষ্ট কিছু দিন ।
সুদিন আসিবে পুনঃ
রাজ রাজেশ্বর আমি করিব তােমায়।
শুন প্রিয়ে দৈববাণী,
নারায়ণী দানিলা অভয়।
চলনাথ, দেশান্তরে যাই
হেন রাজ্যে কাজ নাই,
কাজ নাই এ ছার সম্পদ,
মুক্তিপদ-আসে চল ভ্রমি বনে বনে।
চন্দ্রাননে! চায় প্রাণ,
হৃদি মাঝে রাখি সদা হৃদি-বিলাসিনী,
রে কঠিন প্রণ! পাষাণে গঠন তব,
সঙ্গে যায় রাণী ভিখারিনী।
[ প্রস্থান।
চিন্তা।
ঐবৎস।

ঐ বংস-চিন্তা।
২৫
দ্বিতীয় অঙ্ক।
প্রথম গর্ভাঙ্ক।
ঐ বৎস।
চিন্তা।
কানন, সম্মুখে মায়া-নদী।
শ্রীবৎস ও চিন্তা। )
কত রত্ন আনিয়াছ সার রত্ন তুমি
বহু ভার হয়েছে আসন,
রেখেছ কি রজত কাঞ্চন ?
রাজ আজ্ঞা পালিয়াছি প্রভু!
মাণিক-অঙ্গুরী,
রাজমতি তব কণ্ঠহার,
প্রবাল পরশমণি বহু মূল্য যাহ।
রেখেছি আসনে,
অন্য ধনে স্পর্শি নই আমি,
চিন্তামণি, অমূল্য রতন
পথের সম্বল আছ তুমি প্রাণ-পতি।
শ্রীবৎস ।
প্রিয়ে !
হের বিজন কানন,
তরঙ্গিণী অকূল পাথর,
হের উন্মাদ তরঙ্গমালা
ঘাের গরজনে
নাচিছে অনন্ত কায় উন্মাদিনীবেশে ;

বৎস-চিন্তা।
কি উপায় করি ।
নাহি তরী কেমনে হইব পার,
নাহি কর্ণধার অপার কাণ্ডারী।
অপার কাণ্ডারী প্রভু, শ্রীমধুসূদন,
বিপদ ভঞ্জন হরি রক্ষিবে ভকতে,
হের নাথ ! আসে কর্ণধার ।
চিন্তা।
( ভগ্নতরী লইয়া নাবিকবেশে শনি উপস্থিত।)
ঐবৎস।
নাবিক।
হে নাবিক।
বহু পুণ্যফলে পেয়েছি তােমায়,
ক্ষুধায় কাতর প্রাণ, পার কর আশু।
আমার সঙ্গে চালাকি,
দিতে চাও আমায় ফাকি ?
রও--চেনা চেনা দেখছি কার মত ;
ওঃ! বােঝা গেছে, বাহাদুরি,
পরের নারী করে চুরি
রাতারাতি পার হচ্চো নদী,
তোমায় এবার ধরি যদি ?
শুন প্রিয়ে !
উচ্চ ভাষে অধম নাবিক,
কুদিনের কার্য্য এই মত।
অধমের অন্ধ দুনমুন,
মধুর বচনে তােষ অজ্ঞান নাবিকে,
রবে মান, হবাে নদী পার।
শ্রীবৎস।
চিন্তা।

শ্রীবৎস চিন্তা।
নাবিক।
ঐবৎস।
করছ কি কাণাকাণি,
হাটা দিবে বেয়ে পাণী ?
অগাধ পাণী জলে কুমীর ভাসে
দুজনে কেও না হাসে ।
দেখ, ভাল মানষের কাল নাই,
পরিচয় জানতে চাই,
সাদা কথায় সত্য কওনা ভাই।
আমি না হয় এগিয়ে যাই ;
কথা যদি খাটি কও,
সচ্ছদে পার হও,
আপন দোষে বাচ কিম্বা মর।
শুন সুজন নাবিক।
অধিক কি কব আর !
এ সংসার বিষাদের ঠাই মম,
ছিনু পৃথিবীর প্রতি,
এ দুর্গতি দৈব বিড়ম্বনে,
শ্রীবৎস আমার নাম চিন্তারাণী এই।
তাল বেতাল সিদ্ধ ছিল কোথা তারা সব ?
কোথা মন্ত্রিগণ তব কোথা বা বান্ধব,
এমন বিপদে তারা রহিল কোথায়।
এমন বিপদে তারা না হ’ল সহায় ?
কেহ কারাে নয় ভাই, কেহ কারো নয়,
দিন ক্ষয়-
উদয় পতন নিতি হেরি দীমতায় ;
নাবিক।
শ্রীবৎস।

শ্রীবৎস-চিন্তা। ভবের বিভ্রম লীলা হলে অবসান, দিব্যজ্ঞান পায় জীব ; জীর্ণতায় গেল এ জীবন, হে সুজন। নাবিক পার কর কাতর হয়েছি দেহে। হের ভগ্নতরী, কেমনে করিব পার, একা তুমি নও, সঙ্গে বাঁধা নারী। আবার একটা কথা সাথে। ওটা না হয় যাবে হাতে, একসারে না পর্বে ভাই, হাতে ত যাবে কাণা ; বেশি ভারি নয়, তােমার কথায় বিশ্বাস হয়, না হয় তুলে দেখে যাই। ও মশাই। এটা যে বিষম ভারি, এক বারে মেযেতে নারি, পারি যদি একে একে যাও; আমার ঘাড়ে কঁাথা দাও। ইচ্ছা হয় চল- না হয় খুলে বল ? ভাল, লও কাথা চল ত্বরা ক্ষুধায় কাতর প্রাণ। আর কোথা যাবে—কথাটি কি পাবে। নাবিক। এ চলে ।

শ্রীবৎস-চিন্তা।
২৯
ভাটা হলে দেরি পড়বে ভারি,
সার ভাটায় নিয়ে যাবে।
উন্ট ঝিকে মারি।
চল সাধু দুব্বল বান্ধব।
ঐবৎস।
( শনিকর্তৃক কঁাথা হরণ ও মায়ানদী অদৃশ্য।)
একি! জাগ্রত স্বপন,
কোথা সে কাণ্ডারী,
কোথা নদী
অকূল পাথার,
স্বভাব চাতুরী হেরি নূতন কৌতুক
ছায়াবাজি প্রায় !
কোথায় এখন আমি !
কহ প্রিয়ে, হে জীবন-সখি?
শনি করতলে প্রভু, দৈব-মায়াজাল।
হা! নিদয় বিধি,
কাদিতে না পারি আর,
অনাহার, পথশ্রম ভার
যন্ত্রণার একশেষ জীবন সংশয়।
রে কঠিন! •
এখন বঞ্চন সাধ,
কৃতকল্পে বিনাশিবে ভিখারীর প্রাণ।
রে পাষাণ ।
হের প্রাণপতি মম,
সাগরা পৃথিবীর পতি,

ঐবৎস-চিন্তা।
দীনগতি বান্ধববিহীন,
অনশনে ক্ষীণ কায়
কোথা যায়, দেখরে নির্দয় ।
ঐবৎস।
প্রিয়ে।
মায়াঘার ভাঙ্গিল আমার,
মায়াজাল স্বচক্ষে দেখিলে সতী।
সত্যে রাখ মন,
সত্য নারায়ণ, করিবে কল্যাণ ;
অনাহারি আছি দোহ,
তৃষায় আকুল প্রাণ,
চল ধীরে ধীরে
বনে যাই জীবন-ভিখারী।
[ উভয়ের প্রস্থান
দ্বিতীয় গভাঙ্ক।
দৃশ্য—চিত্ৰধ্বজ বন।
( ধীবরদ্বয়ের প্রবেশ ।)
১ম, ধীবর।
কপাল পােড়া, ওরে ছোড়া,
অনামুখাে হলি তুই।
নূতন জালের ধলকটে আজ
পালিয়ে গেল রুই। };-

বৎস-চিতা।
না যদি তাের বােনাই হতেম,
ন্যাড়া মাথা চিবিয়ে খেতেম,
পাকা ফুয়ের দেখা হয় সার।
সত্যি তুই অনামুকে,
দেখলে দিন যায় শুকো,
বাদর মুখের গড়ন চমৎকার।
২য়, ধীবর। দ্যাখ, বাড়াবাড়ি ঢেকে রাখ,
বসিয়ে দিব মাথায় টাক,
এক চাপড়ে ভাঙব দাত পাটা।
জানিস—পেট টি আমার মদের ভাটি।
১ম, ধীবর।
রাগিস্ কেন মকর মুকো,
ফষ্টি নাষ্ঠি বোেঝ।
২র, ধীবর । রেখে দেও ফষ্টি নাষ্ঠি,
দিতে চাও গলায় ফাঁশটা,
লােকের কাছে অনামুকো হ'লে,
মুক, দেখাবো কি বলে?
১ম, ধীবর। নারে ভাই সােণর চাদ,
পায়ে গরল কঁাদে দাদ,
বাদাদি হাসিখুসি হল,
এখন বাড়ি চল।
[ উভয়ের প্রস্থান।
(শ্রীবৎস ও চিন্তার প্রবেশ ।)
চিন্তা।
প্রভু! চলিতে না পারি আর
ধূল্প কাতর প্রাণ;';';

৩২
এবংস-চিন্তা।
ঐবৎস।
হের সরােবর—সুশীতল বাৰি,
শতদল শােভিছে সুনদর ;
বনমাঝে কুসুম কানন,
পাখী করে গান,
রম্য স্থান এই ;
প্রভু ! কর অনুমতি,
বিশ্রাম করিব হেথা।
প্রিয়ে! ভাগ্যহীন আমি,
ভিখারিণী করিনু তােমায় ;
ক্ষুধায়, তৃষায়,
বনমাঝে কাতর হইলে সতী
হে মধুসূদন
রাথ প্রাণ বিপদ-বান্ধৰ।
এই তরুতল,
সভাবের শীতল আসনে,
বিশ্রাম করই ক্ষণ,
আসিব এখনি, বারি, বনফুল লয় ।
[ প্রস্থান।
গৌর সারঙ্গ—আড়াঠেকা।
হে বিন্ধ্যবাসিনী, বিঘ্নবিনাসিনী,
তাপহরা তারা কালিকে।
হের মা বিজনবাসী, তৃষাতুর উপবাসী,
অক্ষদে অভয় দে মা, নগ-বালিকে।

শ্রীবৎস-চিন্তা।
চিন্তা।
অবশ হ’ল রসন, রহিল মনোবাসনা,
দেখ মা দুর্গতি দুখ নাশিকে।
কোথা পতি।
কতদূর গেলে প্রভু,
একাকিনী বনমাঝে আমি,
প্রাণ কঁাদে এস প্রাণনাথ।
( শ্রীবৎসর প্রবেশ ।)
শ্রীবৎস ।
বিচঞ্চল মতি মাের,
পদ্মপত্রে বিচঞ্চল বারি;
নারিনু আনিতে সতী ;
নিকট তটিনী তীরে আছে বন ফল,
সুশীতল বারি তথা ।
চল প্রাণেশ্বরী,
পাষাণপতির সনে।
[ উভয়ের প্রস্থান।
তৃতীয় গর্ভাঙ্ক।
দৃশ্য-কানন।
( ধীবরদ্বয়ের পুনঃ প্রবেশ ।)
১ম, ধীবর।
সাধে বলি তুই অনামুকে,
এই দাখ-ফেল যাচ্ছি গাজার হুকো।

'বৎস-চিন্তা।
২য়, ধীবর ।
অবাক কল্লি মাের,
কেমন করে ভাই, পড় লৈ ইকো
জাল থেকে সরে।
তুই যে খখরে ;
১ম, ধীবর।
(শ্রীবৎসর প্রবেশ।)
ঐবৎস।
মৎস্যজীবীগণ।
অাছি অনশন,
জীবন সংশয় হের ক্ষুধায় তৃষায়,
ক্ষীণকায় দীনগতি মাের,
মীনদানে প্রাণদান দেহ কৃপা করি।
১ম, ধীবর । হরি-হরিহরি !
মােরা কি ডাঙ্গায় মাচ ধরি,
আমরা জলের পােকা,
অগাদ জলে ভাসি,
জাল-যুদ্ধে গেল দিন,
একটী ও না পাই মীন,
ফিরে যাচ্ছি ঘরে দাদা,
হেসে দেতোর হাসি।
শ্রীবৎস ।
ভাল, যাও পুনর্বার,
এইবার পাবে বহু মীন,
মনে রেখো আমি দীনহীন।
১ম, ধীবর। লােটার কথা ভাল,
আবার চল—অগাধ জলে ঘাই,

ঐবৎস-চিন্তা।
৩
ফিরে আসবো ভাই।
কিছু যদি তিনখেপে না পাই।
[ ধীবরদ্বয়ের প্রস্থান ।
কোথা তালবেতাল মিত্র এস এ সময়,
দীনবেশে অঙ্গীকার বদ্ধ আমি
শ্রীবৎস।
(তালবেতালের প্রবেশ)
তাল।
রাজ আজ্ঞা পালি দিবারাতি,
কহ রাজা কোন কাৰ্য ভার।
নাহি অন্য কাৰ্য্য আর,
ঐবৎস।
রাখ মোর বাক্য,
মৎস্যজীবীগণে দেও রাশি রাশি মীন।
বেতাল।
প্রভু !
• তব আজ্ঞা এখনি পালিব মাের।।
[ উভয়ের প্রস্থান ।
নীরব কানন গায় বিষাদ-কাহিনী,
আদরিণী মানস-মােহিনী সনে,
বনে বনে যায় দিন হে দীনবান্ধব।
শ্রীবৎস।
( ধীবরদ্বয়ের পুনঃ প্রবেশ।)
১ম, ধীবর ।
দ্যাখ!..
ব্যাটা ভাই যাদুকর,
চেহারা, কি ভয়ঙ্কর,

ঐবৎস-চিন্তা।
৯, ধীবর।
২৪, ধীবর।
ঐবৎস।
আগুণ যেন জ্বলছে গায় ?
কে বাবা ওর কাছে যায়।
যাদুকর নয়রে বোকা যাদুকর নয়,
মাখাল ঠাকুর বলে মাের হতেছে পেও।
তবে আমি এগিয়ে যাই,
পায়ের ধূলা চেটে খাই,
দোহাই বাবা মাখালঠাকুর,
চিনেছি তােমায়,
কি দিয়ে আর পূজা করূবে।
শকুল রাখি পায়।
মীন দানে রাখিলে জীবন,
সুখি হও মৎস্যজীবীগণ ।
বর দেও বাবা ঠাকুর, যেন রােজ মাছ পাই,
তুলে দাও মাথায় পা,
ভাল হােক কুঠে গ,
নাচতে নাচতে ঘরে যাই।
আমি বুঝি অম্‌নি যাবাে,
ঘাড়ের দা ভাল কৰ্ব্বো,
মার ঠাকুর কসে এক লাখি,
রসো বাবা, ঘাড় পাতি।
অজ্ঞান ধীরজাতি সরল অন্তর,
কোথা হরি রাখ মান দেব পিতাম্বর,
১ম, ধীবর ।
২য়, ধীবর ।
বৎস।
স্বাধীন জীবনে রও সুধি চিরদিন

শ্রীবৎস-চিন্তা।
৩৭
ম, ধীবর।
দীনহীন আমি।
বাৰা, আবার কাল পূজো দিব
নমস্কার করি।
[ ধীবরদ্বয়ের প্রস্থান।
দগ্ধ করি এ শকুল রাখিব জীবন
বহুক্ষণ আছি হেথা,
দেখি কোথা বিষাদ-সঙ্গিনী।
[ প্রস্থান।
চতুর্থ গর্ভাঙ্ক।
দৃশ্য—বন-কুঞ্জ।
চিন্তাদেবী।
চিন্তা।
আহা! সুন্দর কানন,
শ্যাম তরুরাজি,
ফল ফুলে ভাগ্যবতী সবে ;
সুশীতল স্বচ্ছ নীরে সারসীর কেলি,
সরোবরে শােভে শতদল
বনফুল বিবিধ বরণ,
কার এ বিহার-কুঞ্জ বিরামের ঠাই।
ছিনু সঙ্গিনীর সনে নিকুঞ্জ আমার
পড়ে মনে এইরূপ সীরীরকেলি

৩৭
বৎস-চিন্তা।
পড়ে মনে পতির সােহাগ,
শ্ৰীৰৎস।
চিন্তা।
প্রসন্ন বদন অনুক্ষণ পড়ে মনে,
জীবনের সার আলিঙ্গন
বিদায় করেছি বনে প্রবেশি যখন।
(শ্রীবৎসের প্রবেশ ।)
প্রিয়ে! নিদ্রিতা কি ছিলে এতক্ষণ?
নাহি জানি বাঞ্ছিত বিরাম নিদ্রা ;
নিত্য কাম,
নয়নের বারী মুছি অঞ্চলে আমার,
ললাটের বিষাদ কীৰ্ত্তন
নির্জনে বসিয়া শুনি,
চিন্তামণি, অন্য চিন্তা নাই।
সতি! ক্ষুধাতুর আমি,
ধর এ শকুল মৎস্য দগ্ধ করি দেও।
প্রভু! ভক্ষিলে শকুল দগ্ধ শনি-দৃষ্টি যায়,
ভাল হ’লআনি মীন দগ্ধ করে।
(স্বগত) হা মধুসূদন,
দগ্ধ মীন দিব রাজ-করে।
[ চিন্তার প্রস্থান ।
উদ্বেলিত প্রাণে কি উদয় আজি পুন।
কেন উথলে বিষাদ-সিন্ধু উগ্ৰতেজ ধরি।
রে পাষাণ প্রাণ।
অচল হইয়ে ক্ষণে ক্ষণে দগ্ধ হও।
শ্রীবৎস ।
চিন্তা।
শ্রীবৎস ।

শ্রীবৎস-চিন্তা।
৩৯
অস্থির সাগর হবে এখনি সুস্থির
স্বভাবে বিভিন্ন ভাব ধরিবে সত্বর ;
সুমন সমীর সবে সুস্থির করিবে
হেন দিন নাহি রবে মাের,
শান্তি দেহ হে হৃদয়পতি।
( চিন্তার পুনঃ প্রবেশ ।)
চিন্তা।
দগ্ধ মীন জীবন পাইল জলে,
শনি-ছলে এত বিড়ম্বনা।
ক্ষুধাতুর প্রাণপতি,
কি কহিব কি দিব রাজার করে !
দগ্ধ মীন পেয়েছে জীবন।
শ্রীবৎস।
পাষাণ বিদরে কেন আদরি তােমায় ;
এ বিষাদ লীলা—
বিজনে ফুরায় যদি যায় এ জীবন।
সতি! কেন অপরূপ ক্ষুন্নমতি হেরি,
কেন হেন ভাব, কহ বিষাদিনী ?
হে মধুসূদন! লজ্জানিবারণ হরি,
রসনায় না সরে বচন,
রাখ মান এ দাসীর। (মূচ্ছ।।)
অকস্মাৎ কেন প্রিয়ে বিজনে লুটাও!
উঠ চাননে পাষাণে বাঁধিয়া বুক
চিন্তা।
শ্রীবৎস।

ঐবৎস-চিন্তা।
চিন্তা।
পাষাণ হয়েছি আমি,
মনটদুখ গগণে জানাও।
প্রভু! কি কহিব আর,
ক্ষীর, সর, অমৃত আহার
রাজ করে দিয়াছিনু প্রেম-কর দান ;
সেই রাজ করে, বিষাদ অন্তরে,
দগ্ধ মন দিব সাধ,
সে সাধ ফুরাল
জলে গেছে দগ্ধ মীন নূতন জীবনে।
(শূন্যে শনি)
শনি।
A
রাজা! এত দিন পরে, কহি তােরে
পরিচয় লভ মাের।
আমি শনি-অধম করিলি যায়
কমলায় উচ্চাসন দিয়ে।
রাজ্য, ধন হরিয়াছি কাণ্ডারীরবেশে,
হরেছি
অমূল্য কঁাথা মায়ানদী নীরে।
করেছি বিপিনবাসী ভিখারীরবেশ,
বনক্লেশ এ হতে অধিক আছে।
বিচ্ছেদ ঘটাব দেহে যত শীঘ্র পারি,
দুরাচারি।
সুপণ্ডিত জ্ঞানে বনুি তোমায়
সুবিচার দুরে,
মুচ্ছিন্ন হল তোর

বৎস-চিন্তা।
লক্ষ্মীরে করিলি শ্রেষ্ঠ স্বর্ণাসন দানি।
চক্রপাণি চিনে মােরে রাম অবতারে,
রাক্ষস সংহার ভার আছিল যখন ;
বাকল বসনে, বিজন কাননে,
রাম নির্বাসনে আমার ভার ;
জানকী হরণ, রাক্ষ নিধন,
ঘাের দরশন, করম যার ;
নহে সে প্রধান।
এত অপমান করিলি মাের।
প্রতিফল শনি কোপানলে
দগ্ধিব তােমায় প্রাণে দহি আমি যত।
( অন্তর্ধান।)
শনি-কোপ ভীম গরজন,
শুনিলে দুঃখিনী!
চল ভিন্ন দেশে যাই,
বনে আর বনফল নাই।
বিৎস।
[ উভয়ের প্রস্থান।

শ্রীবৎস-চিন্তা।
তীয় অঙ্ক
প্রথম গর্ভাঙ্ক।
দৃশ্য-বন।
কাঠুরিয়াগণ।
১ম, কাঠু।
২য়, কাঠু।
৩য়, কাঠু।
ঐ লাফিয়ে আছে বাঘ ;
বলিস কি, রস কত,
কটা আবে সেটার মত ?
আজ আকাট বনে যাবো,
বাঘের বাপের শ্রাদ্ধ খাবাে।
ঐ জন্যে না আসি বনে,
এরা কি মাের কথা শােনে,
ছেলেমানুষ শক্তি নাই গায়,
যদি আমায় ধরে খায় !
দেখ! তাের খানিক এগিয়ে যা,
আমি পাছে থাকি;
বাঘে কি করবে মাের,
আমার গায় নতুন জোর,
কিন্তু সাহস নাইরে ভাই,
কি করি বল দেখি?
তাে ত খুব সাহস ছিল,
এত শিগগির কিসে গেল?
১ম, কাঠু।

ঐবৎস-চিন্তা।
}
৩য়, কাই।
বল বুদ্ধি ভঙ্গ :: :..
দাত পড়লেই ফা!
১ম, কাঠু। ওঃ! পড়েগেছে সঁতের পাটি,
এইবার হয়েছিস মাটি।
৩য়, কাঠু। চোকের দোষ হয়নি ভাই,
এখনাে সব দেখতে পাই,
এইটে চোক, এইটে নাক, এইটে তাের হাত,
কেমন বলেদিনু হাতে হাত !
১ম, কাঠু। ঐ, পেছনে তাের আসছে তেড়ে
মন্ত বুননাশাের,
সরে আয়, সরে আয়, বুড়ো নেশাখাের।
৩য়, কাঠু।
হাত ধরে নেযারে ভাই,
ভয়ে কিছু দেখতে না পাই,
এবার বাঁচলে রাখবো বাপের নাম ।
২য়, কাঠু। ওরে থাম, থাম, থাম!
বাপের নাম সবাই রাখে,
বাপ পিতমাে কদিন থাকে,
এগিয়ে আয় বুড়াে,
তুই মাের আদ্দিকেলে খুড়ে।
৩য়, কাঠু। দ্যাখ, ভয়ে তবু কথা কই,
বয়স হয়েছে সই সই,
আধা বুড়ো তোরা যেমন,
তেমন আমি নই।
২য়, কাঠু। বন্ধু! আকাট বনে যাবে,

থসচিত। ৩য়, কাঠু। না হেথা খাবি খাবে? আগে ভাই তােমরা যাও কাট গরান খুটি, আমি ততক্ষণ গাছে উঠি। যদি বাধ ভেড়ে আসে মায়ূব, ভেগে ঘুসি, কেমন ভাই, তুই ত খুসি। ( শ্রীবৎস ও চিন্তার প্রবেশ ) ঐবৎস। চিন্তা। ১ম, কাঠু। প্রিয়ে। হের কাষ্টজীবীগণ, আনন্দে মগন সবে, দীনজাতি স্বাধীন সদাই। প্রভু! তব সনে কাননে আনন্দ পাই, দুঃখ নাই চরণ সেবায়। ওরে, এরা আবার কারা। চক্ষের জলে বইছে ধারা; দেখতে শুতে দিব্য ভাই, চলনা এগিয়ে যাই। বুঝি কে ছতে এলো আমি ত পালাই থানা বুড়াে, আহা! হর-গৌরী আসছে কেমন আলাে করে দেশ ! আয়ু কি দিয়ে দীনহীন জনে ? ৩য়, কাঠু। ২য়, কাঠু। শ্রীবৎস।

বংস-চিন্তা। ৪৫ ১ম, কাই। চিন্তা। শ্রীবৎস । অনশনে ক্ষীণকায়, পতিপত্তি জমি বনে বনে। দাদা! চিনেছি তোমায়, কাঙ্গালির দেশে এলে কাঙ্গালিরবেশে। নিয়ে চল লক্ষ্মী ঘরে লক্ষীবন্ত হবে, চিরদিন সুখে রবে, দাদা! হেসে খেলে যায় দিন, কষ্ট নাহি হেথা। প্রভু! চল কাষ্টজীবী-বাসে যাই, বিজনে কাটাই দিন দীনহীমবেশে। কি আর কহিব, চিরদিন সমাম না যায়। মিতা! কাদ কেন? কাঙ্গালির দেশে চল, সুখে যাবে দিন। আহা, পুণ্যবান মীচজাতি উচ্চ আচরণ, এ যতন তুলিব না কভু। স্বাধীনতা কাননে সদাই, কুঃ আমি মুখে হাসি নাই তাই সজিগণ কয়। বিয়দের হামি, কেমনে হাসি, কেমনে কহিব কথা, মনােব্যথা, এখনি বুঝিবে, সব নব সহচর ভর শক্তিপূর্ণ বিন-দেশ। ২য়, কাঠু। এবংস।

৪৬
শ্রীবৎস-চিন্তা।
১ম, কাঠু।
সবে দুঃখ হীন,
কেন কাঁদিবে আমার তরে ।
কেন ভাই, কঁাদ তুমি
ভয় কর কি বনে?
আরা আছি তােমার সনে,
এসাে মিতা, এসো যাই মােরা।
[ শ্রীবৎস ব্যতীত সকলের প্রস্থান।
শ্রীবৎস ।
নববেশ--
স্বভাবে দেখাতে পুনঃ আইনু কাননে,
কাষ্টজীবী সনে বিপিনে কাটাব দিন।
শুনেছি বিপিনবাসে অরণ্য-দেবের বাস।
অরণ্য রক্ষক যিনি,
নাহি জানি কোথা সে ঈশ্বর।
কাননে শুনাই মম বিষাদ সঙ্গীত।
ভীত নহি আমি, কণ্টকিত বনে
কথাগত প্রাণ মাের, কণ্টকে কি ভয়!
সহিতে পারি জ্বালা এ হ’তে অধিক,
মুমূর্ষ যেমন সয় অবসান কালে।
তরুবর ! সবল আছ কি গুণে,
বহুরূপ কি গুণে তােমার।
নবীন পল্লব পাও নব নব পাতা,
উষা-হাসি হাস অনুক্ষণ,
প্রভাতে সুন্দর হেরি বাসস্তিকবেশ।

শ্রীবৎস-চিন্তা।
৪৭
হীরা-হার পর প্রতিদিন,
দীনহীন মম সম নও!
যামিনীর অভিমান,
বিমান ঢাকিয়া আসে ঢাকিতে তােমায়।
পাতায় পাতায় রাখ কথা নাহি কও,
উষা-হাসি না হেরে বারেক।
সেই হাসি আমারে হাসার যদি,
সন্ন্যাসীরবেশে
বনে যাই জনমের তরে।
[ শ্রীবৎসের প্রস্থান
দ্বিতীয় গভঙ্ক।
দৃশ্য-সাগরকুল সাগর-বক্ষে বাণিজ্য-তরী ।
(ব্যোমপথে শনি।)
শনি।
প্রজ্জ্বলিত কোপানল, ব্রহ্মাণ্ড দহিবে
যদি না সম্বরি রােষ।
শ্রীবৎসের তরে কোপ সম্বরিব কেন ?
আসে তরী বায়ুবেগে, এই কূলে যাবে,
শ্রীবৎসের ভাগ্য ফল দানি কিছু দিন ।
( অন্তর্ধান )

৪৮
শ্রীবৎস চিন্তা।
(কর্ণধারগণের গীত)
মিশ্র-কাফা।
পবনবেগে পানি ধায়রে পবনবেগে পানি।
সাত সাগরের মকর মােরা হােভহর জলে টানি।
নালা খালা সােতা সুতি হাে-
জানি ভাল মােচড়-ঘােগের ঘানি।
ঐ ঠেলে কি কসে, তরী কেন যায় বসে,
বালির চড়ে চড়েছে রাণী।
মারণ ঠেলা হৈয়া—ঠেলা মারণ হৈয়া
উপায় নাইরে ভাই, আর উপায় নাইরে ভাই,
বলবুদ্ধি ফুরিয়ে গেল আর কিছু না জানি।
মােরা আর কিছু না জানি।
(বণিকের কূলে অবতরণ )
বনিক।
শুন কর্ণধারগণ !
অন্বেষণ কর লােক,
বদ্ধ তরী বালুকা আড়নে।
নিকট নগরে যাও,
কাষ্টজীবী আছে বহুতর।
( গ্রহাচাৰ্যবেশে সাগরকূলে শনি উপস্থিত।)
গ্রহ।
বণিক, মঙ্গল হউক তাের,

ঐবৎসু-চিন্তা।
বণিক।
গ্রহ।
গনণায় সুপণ্ডিত আমি
পরিচিত সৰ্ব্ব ঠাই!
অমঙ্গল হের দ্বিজ !
বাণিজ্য-তরণি মাের
পঞ্জর বালুকাবদ্ধ হয়েছে পাথারে।
আশীষ করেছি, মঙ্গল হইবে তাের,
স্থির হও, গণি আমি।
চন্দ্রপক্ষ, তারপক্ষ, পক্ষ দৈববল,
কাৰ্য্য হইবে সফল।
বাপু হয়েছে নির্ণয়,
যদি মনে লয়,
অদূরে কাঠুরাবাস জনপূর্ণ স্থান,
যাও ত্বরা,
প্রকারে আগে যত কাঠুরিয়া-নারী,
মাদল স্পর্শিলে তরণি,
তখনি ভাসিবে জলে।
আশীৰ্বাদ করি,
বিদায় হইমু আমি,
দীনদ্বিজ ভ্ৰমি এইরূপে।
পুরষ্কার কি দিব তােমায়,
ঘে উপায় দেখালে গোসাই,
মণি-কণ্ঠহার মম যৌতুকের ধন,
যথাযােগ্য জ্ঞানে লও আশীষি এ দাসে।
নাহি প্রয়ােজন কিছু;
বণিক।
গ্রহ।

৫০
শ্রীবৎস-চিন্তা।
ভুল না,
এ আচাৰ্য অর্থলােভি নয়,
দীনদ্বিজ ভ্রমি দিন দিন,
দিনান্তে আহার পাই,
অন্য সাধ মাের নাই;
যাও ভূরা,
কথাটি
দেখো! ছােট বড় কাহারে ছেড়ােনা।
[ গ্রহাচার্যের প্রস্থান
তেজপুঞ্জ কায়, আচার্যের আরক্ত লােচন,
ভীষণ ললাট-ধারী ভীম দরশন,
মহাজন, মহাজ্ঞানী দ্বিজ ।
চল সবে ।
কাৰ্য আছে নগরে যাইব।
বণিক।
[ সকলের প্রস্থান।
তৃতীয় গর্ভাঙ্ক।
দৃশ্য—কাঠুরিয়া পলি, কাঠুরিয়া পল্লিগণ
( বণিকের প্রবেশ ।)
একে একে পরীক্ষিনু সব নীচ-নারী,
বদ্ধ-তরী উদ্ধার না হলে,
বণিক।

শ্রীবৎস-চিন্তা।
৫১
তেজরশি আচার্যের বাক্য অমূলক।
সন্ধ হয়, নানা, মহাশয় দ্বিজ ;
আছে সতী অন্য কেহ কাঠুরিয়া বাসে,
যাই পুনৰ্ব্বার করি মিনতি অশেষ
আনি সতী মঙ্গলদায়িনী।
আছে অন্য নারী হেথা,
সতী সেই দেহ তারে,
দিব বহুমূল্য ধন, মহাজন আমি,
এখনি আসিবে ফিরে পরশিয়া তরী।
১ম, কাই স্ত্রী। ন্যাকামাে রাখখা,
মূলো দাতটী ঢাকো,
আবার সতী কোথা!
খেয়েছ কি চোকের মাথা ?
২য়, কাই স্ত্রী। ডাকসাইটে সতী মােরা জানে দেশে দেশে,
আবার কে এল সতী বানের জলে ভেসে ?
৩য়, কাই স্ত্রী। ড্যাক পনা ছেড়ে দেও,
সতীসাধ্বী বেছে নেও,
শিষ্ট হয়ে মিষ্ট কথা বল,
হয় আমায় নে চল।
১ম, কাঠু স্ত্রী। ওলো! উনি সতী ভাগ্যবতী ভাসিয়ে দেবে তরী,
ন্যাকামাে দেখে মরি।
আমরা সব ফিরে এলেম সতীসাধ্বী নারী,
দিকে রাত ক’তে পারি।
যেতে পারনি মােদের সাথে,

৫২
শ্রীবৎস-চিন্তা।
বণিক।
ফলটা পেতে হাতে হাতে,
কলঙ্কিনী সতী হতে চায়,
ওলো, দড়ি দে গলায়।
৩য়, কাঠু স্ত্রী। তবে রে মড়িপােড়ানির ঝি,
আমায় বলিস কি!
গলায় দড়ি দিয়ে তােরা আঘাট জলে মর,
দেশ-ঢলানী হেতা হ’তে সৰু সৰু সহ্।
১ম, কাই স্ত্রী। ডাকিনীর মত মাগী কেন ডাকছাড়ে,
বুঝি ভুত চেপেছে ঘাড়ে।
বিবাদে কি প্রয়ােজন,
উপায় একটা কর,
ওগাে, কোথা যাচ্ছ খর খর।
৩য়, কাই স্ত্রী। থাম ঠাকুর! নেয়ের কুকুর কঁদে উঠতে চায়,
রসে ডেকে আছি মায়।
স্ত্রীর প্রস্থান।
১ম, কাঠু স্ত্রী। চল ভাই ঘরে যাই,
ঢং দেখে আর কাজ নাই,
আস্ব না আর ছি! ছি! ছি!
[ বণিক ব্যতীত সকলের প্রস্থান।
বণিক। বিবাদ করে গেল সবে,
এখন উপায় কি হবে।
(তৃতীয় কাঠুরিয়া স্ত্রী ও চিন্তার প্রবেশ।
৩য়, কাঠু স্ত্রী। ভাবছ কি বণিক।
[ তৃতীয়

শ্রীবৎস-চিন্তা।
বণিক।
ধিকধিধিক্‌,
কালামুখিরা কোথা গেল
লজ্জার মাথা খেয়ে ?
তুমি যেমন নেয়ে,
দেখ দেখি চেয়ে
লক্ষ্মী এলাে, চল সাধু সাগরকূলে যাই,
আর তােমার ভাবুন। নাই।
প্রণমি, জননী তুমি আজি হতে মাের,
আমি তাের পথিক সস্তান,
রাখ মান বিরাজমােহিনী।
চিনেছি তােমায় দেবী, সাগরনন্দিনী,
সাগরের কূলে চল,
বদ্ধতরী উদ্ধারিতে মাের।
মহাশয় ! এ বিনয় কেন?
ভিখারি-বনিতা আমি ভিন্ন দেশবাসি,
পরবাসে পরাধীনা নারী,
তব কাৰ্য্য কি করিতে পারি ।
রাজ রাজেশ্বরী তুমি চল মা জননী,
পরশিয়া তরী মাের আসিবে এখনি।
স্বামী নাহি হেতা-
কাষ্টজীবী সনে কাননে প্রাণেশ,
অনুমতি বিনা কেমনে যাইব,
কি কহিব প্রভু যদি জিজ্ঞাসে আমায় ;
একতায় অনৈক্য হইবে,
চিন্তা।
বণিক।
চিন্তা।

শ্রীবৎস-চিন্তা।
ক্ষম মােরে দ্বীনহীনা. আমি।
মাগো! প্রাণ দিব তাের পায়
যদি না বাঁচাও তরী ;
হে ঈশ্বরী, কেন এ বঞ্চনা দাসে।
চিন্তা।
পরােপকার পরম যে ধৰ্ম্ম
কেন হেলায় হারাই।
সাক্ষ্য সূর্যদেব, শনি সর্বত্র সমান,
সতী মান রাখ শূলপাণি !
৩য়, কাঠু স্ত্রী। মশাই, তুমি এগিয়ে চল,
লােকজনকে সতে বল,
কুলের বৌ যাবে সাগরকূলে,
আমি মার সঙ্গে যাবে,
যদি যায় পথ ভুলে।
বণিক। ভাল, অগ্রে যাই আমি,
এস তুমি জননীর সাথে ।
[ বণিকের প্রস্থান
৩য়, কাই স্ত্রী। চল্ ত মা সঙ্গে যাই,
পথে কিছু ভয় নাই,
যদি জলে ভাসে তরি,
দেখবে তখন কি করি !
চিন্তা। চল সঙ্গিনী আমার,
পরােপকার দেবধৰ্ম্ম পালি।
[ উভয়ের প্রস্থান

শ্রীবৎস-চিন্তা।
চতুর্থ গভাঙ্ক।
দৃশ্য—সাগর-কূল।
বণিক ও কর্ণধারগণ।
বণিক।
১ম-কর্ণ ।
বণিক।
হের, আসে লক্ষ্মী দূরে,
সফল জনম আজি
যদি ধরে রাখতে পার মায়,
কি করবে আর বালুকায়,
ডাঙ্গায় ভাসবে তরি,
ঐ আছে পাটেশ্বরী।
সরে যাও সবে,
নয় কার্য নষ্ট হবে,
দূরে থেকে দেখগে সবাই,
আমি একটু এগিয়ে যাই।
বোঝাগেছে মনের কথা,
কেবল আপন টা টানে,
আর আপন গণ্ডা জানো।
১ম, কর্ণ ।
*,
[ কর্ণধারগণের প্রস্থান
( কাঠুরিয়া পত্নীসহ চিন্তার প্রবেশ।)
অপার জলধীকূলে আইনু আবার,
মায়া-পারাবার, শনি কর্ণধার ।
চিত।

শ্রীবৎস-চিন্তা।
পড়ে মনে অণুক্ষণ ।
ঘাের গরজন,
কলকল তরঙ্গের ডাক,
সেইরূপ সব !
বণিক।
পুন কি শনির মায়া বিস্তারিল হেথা!
নাহি জানি দীনস্বামি রক্ষিবে আমায়।
( কর্ণধারগণের প্রতি বণিকের কোপদৃষ্টি।)
৩য়, কাই স্ত্রী। মাগো! কটকটিয়ে চায় সওদাগর,
চো দুটি কি ভয়ঙ্কর,
চল্ মা তরী ছুয়ে যাই,
দেরি করে কাজ নাই।
এসো মা আনন্দময়ী, পরশ’ এ তরী,
রাজরাজেশ্বরী মাগো চিনেছি তোমায়।
চিন্তা।
লজ্জা রাখ রত্নাকর,
দেব দিগম্বর, হরি হে মধুসূদন,
রাখ মান এ দাসীর।
( চিন্তার করস্পর্শে তরী ভাসমান।)
(কর্ণধারগণের গান করিতে করিতে প্রবেশ।)
মিশ্র-কারুফা।
ঐ ভেসেছে রাণী, তলে ঠেকেছে পানী,
হেলে দুলে যাচ্ছে জলের ঝি।
তাের ধন্ কাছি টানি।
ধৰু কাছি টানি-

শ্রীবৎস-চিন্তা।
৫৭
বণিক।
কর্ণধার যা কহিলা কাণে,
যদি তরী লাগে অন্য স্থানে,
কি হবে উপায় তবে !
ভাগ্য যদি দানিলা বিধাতা,
কেন বা হারাই।
কেন যাই রাজলক্ষ্মী ছেড়ে ;
রাখি লক্ষ্মী বাণিজ্য-ভাণ্ডারে।
(বণিক কর্তৃক চিন্তা-হরণ।)
দেবি! ছাড়িব না আর,
চরণ পূজিব নিতি বাসনা আমার।
নেপথ্যে শনি। চালাও চালাও তরী বেগে কর্ণধার,
চিন্তা।
কি কর,
কি কর,
ছেড়ে দেও দীনহীনা আমি।
কোথা প্রাণনাথ!
বিপাকে পড়েছি প্রভু, এস এ সময়,
দয়াময় কে আছ এখানে,
বার্তা দেয় প্রাণেশ্বরে।
রক্ষ দিবাকর,
হর রূপ, জরাগ্রস্থ। কমােরে
যত দিন সুদিন না হয় ।
রাখ দেব ঘৃণিত এ দেহ।
নেপথ্যে লক্ষ্মী। চিন্তা নাই চিন্তা।
আছি আমি রক্ষিব তােমায়।

৫৮
শ্রীবৎস-চিন্তা।
চিন্তা।
হা মধুসূদন, বিপদ-তঞ্জন হরি,
রক্ষ নাথ অবলার প্রাণ।
[ তরীসহ বণিক প্রভৃতির প্রস্থান।
৩য়, কাই স্ত্রী। পালাই বাবা ঘরে,
যদি তেড়ে আমায় ধরে।
[ প্রস্থান
শ্রীবৎসের প্রবেশ।)
ঐবৎস।
কৈ! কৈ সে তরণী ! কৈ প্রাণেশ্বরী।
কোথা গেলে বিষাদসঙ্গিনী মাের।
রত্নাকর! বহু রত্নে ভাগ্যধর তুমি,
ভিখারীর হৃদয় রতন, কেন হরিলে সাগর ?
ফিরে দাও দরিদ্রের ধন,
দরিদ্র জীবন কেন বাঞ্ছ’ জলপতি ;
দীনগতি দীনহীনবেশে
দেশে দেশে ভ্রমি আমি,
পতি-প্রাণ ভিখারিণী সনে।
ওহো, প্রাণ ফেটে যায়,
জলাশয় না দেও উত্তর ?
কাতর হয়েছি দেখ কথাগত প্রাণ,
অবসান সম্মুখে তােমার।
তরঙ্গে উন্মাদ তুমি, মহােৎসব তব,
শব দেই,

শ্রীবৎস-চিন্তা।
৯
কেমনে ধরিবে সিন্ধু তরল হৃদয়ে ;
সৌভাগ্য তোমার,
তাই ভাগ্যহীন-জনে বচনে তুষিতে নার।
নেপথ্যে লক্ষ্মী। শান্ত হও রাজা,
রবি তােমার নারী,
দীনদশা আছে কিছু দিন।
রক্ষা কর অনুকূল দেব
যে আছ যেখানে,
প্রাণপাখী প্রাণ ছেড়ে গেল।
[ শ্রীবৎসের প্রস্থান।
শ্রীবৎস ।
পঞ্চম গভাঙ্ক।
দৃশ্য—সুরভি আশ্রম।
( শনির প্রবেশ।)
শনি।
বজ্রকীট ভীষণ দংশন
নারায়ণ জানে,
নরপ্রাণে কতবা সহিবে আর;
কদাকার করেছি দোহায়,
একতায় অনৈক্য হয়েছে,
প্রাণ মাত্র বাকি ;

৬৯
শ্রীবৎকা-চিন্তা।
নানা, প্রাণে না মারিব,
পরীক্ষা করিব রাজা কত পূণ্যবান।
দুষ্টা লক্ষ্মী যুক্তি দেয় কাণে,
ধনে প্রাণে মজিল নরেশ,
এখনও না হয় চেতন,
দেখি কত দিন সয়,
সদয় হইব শেষে ;
পর বাস,
পরাধীনবেশে আসে ঐ দীনেশ্বর।
[ শনির প্রস্থান
(শ্রীবৎসের প্রবেশ ।)
শান্তি সাগরেরকুল,
জলধী-হিল্লোলে ভাসে
ক্ষণে হাসে ক্ষণেক লুকায়,
তরঙ্গে নাচায়,
দূরে যায় জলবিহু রাশি ;
আর কত দূর যাবে।
দীনগতি না চলে চরণ,
এই কুলে বসি যদি শান্তি দেখা পাই।
একি! কেন নিত্ৰাবেশ হেন দীনতায় ;
ফিরে যাও, ফিরে যাও স্বরগ-সুন্দরী,
স্বপনের খেলা দেবী বিলাসীর তরে
মম ভাগ্যে নাই,
বৎস।

ঐবৎস-চিন্তা।
৬১
ভাগ্যহীন যত দিন আমি।
আসে দূরে বাণিজ্য-তরণী
তরঙ্গে নাচায় তরী,
অকূল-পাথারে ভাসে,
আসে এই কূল চেপে,
যাবে ভিন্ন দেশে, যাবে। আমি স্থানান্তরে
লয়ে এই সুবর্ণ ইষ্টকগুলি,
শ্রীবৎস-চিন্তার নাম অঙ্কিত করেছি যায় ;
সুরভি কৃপায় পেয়েছি রতন।
( সাগরকূলে
বাণিজ্যতরী উপস্থিত—বণিক ও
কর্ণধারগণের অবতরণ।
বণিক।
সুন্দর কানন,
শ্রীবৎস।
মিষ্ট-ফল এখানে বিস্তর,
দুইজনে রহ হেথা তরী রক্ষা হেতু,
অন্য সবে এস মাের সাথে,
হাতে হাতে আনি বন ফল।
[ বণিকাদির প্রস্থান।
কোথা যায় সাধু, যাই আমি পাছে পাছে।
শ্রীবৎসের প্রস্থান।
ওরে, অামায় ধরেছে জলােবাত,
নড়ছে দুটো কসের দাত,
বনের ফটা কেমন করে খাবো,
যা থাকে কপালে আজ নদীর জলে নাবো।
১ম কর্ণ ।

শ্রীবৎস-চিন্তা। ২য় কর্ণ । ১ম কর্ণ। কসের দাতে কিসের বাত, দেখি তাের মুলো হাত, ও, পিত্তি চটকে জ্বর হয়েছে গায়, এতে কি আজ কিছু খায়। তুই যেমন কবিরাজ, তাের মাথায় পড়ুক বাজ, জ্বর আবার কোন্ গায় মাের, তুই বেটা কি নেশাখাের। নেশা ত সবাই খায়, আমার নেশা গায় গায়, ত্বরিৎ ধরে ত্বরিৎ ছাড়ে গাঁজা পঞ্চানন, ২য় কর্ণ। আমায় কে করে বারণ ; ১ম কর্ণ। এলা মায়ের এক্লা ছেলে গাজার দমে চলি, তুই যে অবাক হলি! অবাক কি সাধে হই, তাের মুখে যে ফুটছে খই, কথায় দড় বর্ণচোরা হলি ; তােকে আর কি বলি। আমি কি কম ছেলে, দেনা তুই আমায় হেলে, বাতাস ঠেলে আটা গােড়ে যাই, এক ঝিকেতে জল খাই। চেপে থাক চেপে থাক্‌, ক্ষেপে যাবি ভাই, ২য়, কর্ণ । ১ম, কর্ণ ।

শ্রীবৎস-চিন্তা।
এখন বল দেখি কি খাই ?
ঐ আসছে সওদাগর ;
বাহব-ভাগর ডাগর ফল,
বাগিয়ে রাখি বদনকল,
হাতে মাথে দেদার দেদার,
স’রে যা তাের পেটটা আছে ভার।
(বন-ফল লইয়া বণিকাদির প্রবেশ।)
বণিক।
ঐবৎস।
আহারাদি কর সবে, লও মিষ্ট-ফল,
বিলম্ব করেন আশু যাবাে স্থানান্তর ।
কে আসে ভিখারীবেশে সুন্দর পুরুষ!
বহুক্ষণ দেখেছি তােমায়,
অনুনয়-অনুগত আমি,
আছে এ ইষ্টকগুলি সুবর্ণে গঠন,
ভিখারীর ধন
যদি কৃপা করি লয়ে যাও সাধু,
তব সনে দেশান্তরে যাই,
বিক্রীত হইলে পাট যে মূল্য পাইব,
অর্ধেক তােমার, অর্থে অধিকারী আমি।
সুবর্ণ ইষ্টক।
তুমি কি বঞ্চক !
ভিখারীর করে বিশুদ্ধ কাঞ্চন ;
বহু ভারবহু মূল্যবান,
ভাল, দেখি এক খান।
বণিক।

শ্রীবৎস-চিন্তা।
লবৎস।
এ যে আসল সুবর্ণ।
কহ, কোন্ মহাজন তুমি
ছদ্মবেশে কোন ছলে এলে ?
সত্য ধনে মহাজন যেই, সেই গুরু,
শিষ্য আমি তার,
ভিখারীর বেশ ছদ্মবেশ নয়।
এত রত্ন পাইলে কোথায় ?
ভাগ্যফল আছিল যথায়।
ভাল, চল মোর সাথে,
অঙ্গীকার বদ্ধ তুমি।
বণিক।
ঐবৎস।
বণিক।
( সকলের নৌকারােহণ।)
১ম,
কর্ণ ।
বণিক।
মাথা চেপে বস রাজা, তুফান হবে ভারি,
কেমন—লা ছাড়তে পারি ?
সুবাতাস, শুভদিন আজ
স্বচ্ছন্দে চাও তরী ।
এতো ধন যদি অদৃষ্টে, আমার
তবে কণ্টক রাখিব কেন।
পরিষ্কার করি গম্যপথ ;
ব্যাটা বসে আছে ধারে,
অগ্রে যাই দূর জলে,
সাগরে ভাসাবো তোমা জনমের মজ।
[ সকলের নৌকা-যাত্রা।

শ্রীবৎস-চিন্তা।
লক্ষ্মী।
(শূন্যে লক্ষনী।)
বৃথা ধরি সৌভাগ্যদায়িনী নাম,
বৃথা। মমর রতনে সঞ্চার,
শ্রীবৎস রাজার যদি হেন দশা রয়।
উহহ! নিষ্ঠুর বণিক
ফেলে দিল সাধুরাজে সাগরের জলে,
রত্নাকর ! দেখাে, রেখো রাজার জীবন,
যাই আমি তরঙ্গে মিশায়ে কায় ।
[ অন্তর্ধান।
( সাগরবক্ষে শ্রীবৎস ভাসমান।)
ঐবৎস।
রক্ষা করা দেবতায়, বিনা দোষে প্রাণ যায়;
কে কোথায় আছ অনুকূল
রক্ষা কর আসি,
এস! তাল বেতাল মিত্র হের এ দুর্গতি,
আগুগতি উদ্ধার আমায়,
ই চিন্তা! কোথা তুমি।

গ্রীবৎস-চিন্তা।
চতুর্থ অঙ্ক।
প্রথম গর্ভাঙ্ক।
শ্রীবৎস।
।
দৃশ্য—সৌতিপুর, রাজোদ্যান।
তরুমূলে শ্রীবৎস উপবিষ্ট।
ললাটের কোন অঙ্ক:শেষ!
পুন কোন অঙ্কে, আমি, নাহি জানি
কতই আঘাতে লীলা হবে অবসান।
যবনিক। বিভীষিকা কত দূরে আছে,
পাছে পাছে শনি, ওহাে! পাছে পাছে শনি-
নাহি ধরে ক্ষুদ্র প্রাণে সে ভীষণ ছায়া,
কাল-ছায়া-
কত দিন রবে অার অঙ্গার অন্তরে।
ওহো, পড়ে মনে চিন্তার দুর্বল গতি, ,
পতি:প্রাণ অনশনে আনন্দদায়িনী।
বিষদিনি! কি সাধে-বিজনে এলে,
কোথা পাইলে পরাধীনাবেশে!
কোথায় আবার আমি !
সুগন্ধ প্রদেশ, শান্তি কি এখানে।
কে আসে রমণী ঐ প্রফুল্ল বদন,
চঞ্চল নয়ন দুটি স্বর্গে মর্তে চায়,,
আমি কি ময়া পুন আছি নিমগন ।
-

ঐবৎস-চিন্তা।
৬৭
রে নিদয় শনি।
শান্ত না হইবে আর,
সংহার-প্রতিজ্ঞা পাল চরম সন্ধানী,
নাহি জানি কত মায়ণ ধর।
(মালিনীর প্রবেশ।)
সালিনী।
ফল ফুল
নূতন আনন্দে মাতি,
কোন লীলা প্রকাশিল অপরূপ সব; :
আহা মরি শুভক্ষণ পেয়েছে উদ্যান,
পুন পাখী করে গান,
বিবিধ
বরণ,
এক দিনে ভিন্নভাব কার ভাগ্যফলে।
দলে দলে আসে অলি;
ফুটেছে বিবিধ কলি;
ওমা! মল্লিকায় ধরেছে মুকুল!
কোন দেব অনুকূল
আহা! হেরে যুড়াল জীবন,
শ্মশান উদ্যান হবে কার মনে ছিল।
শুষ্ক তরু মুঞ্জরিল স্বপ্ন অগােচর,
মনােহর হেরি, চারিদিকে।
কহ দিবাকর,
কোন্ মায়াধর অজি, বিস্তারিল মায়া,
ছায়া কায় নাহি হেরি বিজন প্রদেশ ;
সােহাৰেবেশ মৰি চৌদিকে আমার'।
ম

৬৮ শ্রীবৎস-চিন্তা। ঐবৎস। সালিনী। ওকি! নরাকার উজ্জ্বল বরণ, স্থির নেত্র বিরস বদন, কে এ সুন্দর যুবা কোন চিত্রধর। ওগাে! কে তুমি মা বনদেবী রক্ষা কর দীনে বিপাকে পড়েছি মাগো, বিপদবারিণী হও বিজনে আমার । আহা! মা বলে কে ডাকিল আমায়, ঐ কথা হৃদয়ে জাগায়, প্রাণ কঁদিবে এখনি, যাদুমনি ছেড়ে গেছে বহু দিন মোর। অন্য কথা শুনিব সদাই, সন্তানের আর সাধ নাই, কাছে যাই জিজ্ঞাসি কে হন। আহা, দুটি আঁখি পলকে ঝরিছে; প্রাণ আছে কে তুমি বিজনে, কহ-কঁাদ কার করে ? মাগাে! চিরদুঃখি আমি ভাগ্যহীন, পতিপত্নী জমি দেশে দেশে ; দীনবেশে ভিক্ষাজীবী ছি, হারায়েছি প্রাণ-পাখী, রাখি ছার প্রাণ, অবসান হয়েও হ’ল না; বজ্রে বাধা বুকমাের ভগ্নদেহ পজি। ছা। কাদালে আমায়, প্রাণ চায় কোলে কফি তোরে বাছা! ঐবৎস। মালিনী।

শ্রীবৎস-চিতা।
চল ঘরে যাদুমনি। ভাগীনেয় ভাবে
ঐবংস।
মালিনী।
সমাদর পাবে,
সুখি হবে বাৎসল্য মায়ায়,
মমতায় ভুবনমােহন তুমি।
কোন্ দেশে আছি আমি এবা কোন স্থান ।
সৌতিপুর বাজার উদ্যান,
রক্ষা ভার মাের প্রতি,
হের, অদূরে দুঃখিনী বাস ;
জাতি মালাকার,
শুদ্ধাচার ব্রত পালি,
রাজপুরে ধরি ডালি,
গেল বেলা চা বাছাধন।
ওঁৰৎস।
মাগো, বাক্যে যে যতন,
বহুক্ষণ চিনেছি তােমায়,
দেবতা রাখিল জীবন,
নব প্রাণ বিজনে আমার।
অন্ধকার হেরি তেজস্বীন,
আশা-চাদ উদিবে কি পুন !
আবার আনন্দ পাবে নিরানন-জদে।
কি বলিলে, মালাকার-জায়া তুমি,
গণেশজননী হও, কুদিনে আমার;
মাগো, অনাহারী আমি।
চুল কাছা প্রদানে বঁাচাঝে তোমায়।
[ উভয়ের প্রস্থান ।
মালিনী।

শ্রীবৎস-চিন্তা।
দ্বিতীয় গর্ভাঙ্ক।
দৃশ্য—সোঁতিপুর, অরণ্য-মন্দির।
(ভদ্রাবতীর শিব-স্তব।)
ভদ্রাবতী।
জয় শুম্ভ সােমনাথ, প্রমথমােহন,
পঞ্চানন ভোলা ভূতবর।
জয় দেব দিগম্বর, ভকত ভাজন,
নিরঞ্জন নমি ফণীধর ॥
জস্ব সাধু সদাশিব, শশাঙ্ক শেখর,
বাবার হাড় মালাধারী।
জয় জীব জটাধারী বিভূতী ভূষণ,
সাধুজন প্রিয় প্রেমাচারী ও
জম যােগ-যাগপতি, যােগী-জীবন,
জগন্নাথ হর মন জ্বালা।
জয় শ্বেত সনাতন, ভুবনমােহন,
হের, হর কঁাদে দীনাবাল।
বিল্বমালা ধর বিনিবাসী,
ফুল্ল হাসি শিব করুণারাশি।
বিশ্বেশ্বর বম, বব বম্ বাজে,
দেহি বর হর শ্রীবৎসরাজে।
( দৈববাণী।)
প্রসন্ন পরেশনাথ গুন সুলোচনে,
স্বয়ম্বরে পতি পাবে এবংস রাজনে।

শ্রীবৎস-চিন্তা।
ভদ্রাবতী।
.
বাঞ্ছা-বাঞ্ছাপূর্ণ এতদিনে,
আশুতোেষ আশু তুষ্ট হলে,
বর দিলে পতি হবে শ্রীবৎস ভুপাল,
চিরকাল আশুতােষ গুণে।
দয়াময়!
মানসমােহন-রূপে দেখা দেও আসি,
দয়ারাশি দেখি এক ঠাই,
চরণে জানাই,
পুন ভােলানাথে কই,
ভােলামন পাছে ভুলে যায়,
বর যেন পাই হর শ্রীবৎস রাজায়।
(পুনঃ দৈববাণী ।
ভদ্রা।
পবিত্র কুমারী শ্রেষ্ঠ। নারী তুমি
ত্বরায় পাইবে পতি শ্রীবৎস রাজায়,
যাও, শুভদিন সন্মুথে তােমার।
হাস, হাস উপবন,
বিজন কানন হাস পাখিকুল সনে,
সমীরণ গাও সুমঙ্গল ;
মগতি যাও যথা, প্রাণপতি মাের,
প্রেম ভাের কুসুম সৌরভ লয়ে,
বলােনাথে, স্বয়ম্বরে যেন দেখা পাই।
কুহুকণ্ঠ-দল,
অনর্গল গাও প্রেমগান,

ঐবৎস-চিন্তা।
১ম, সখী।
২য়, সখী।
উজানে চলিয়া যাও যথা প্রাণপতি,
করিও মিনতি যেন আসে বর ত্বরা।
একি সখি ।
একাকিনী হাস কার সনে?
চন্দ্রবদনে মরি শত চাঁদখেলে,
দেখা পেলে কোন্ ভাগ্যধরে।
সখি আর হাসি হাস, সখি আর হাসি হাস,
বিজন কাননে কহ কারে ভালবাস?
দিগম্বর দানিলা যে বর,
ভালবাসি সেই প্রাণেশ্বর,
যতনে রতন পাবো ভাবিয়াছি সার,
প্রাণ আমার দিবানিশি চায়,
প্রাণপতি শ্রীবৎস রাজায়।
সখীদ্বয়।
খাম্বাজ-তৃতাল।
খেল কুরঙ্গিনী সনে বালা।
কুরঙ্গ-সঙ্গিনী নাহি প্রাণে জ্বালা।
অনুরাগে পায় পায়, ঐ দেখ নেচে যায়,
নাগর নাগরী ধায়, খেলে বন-খেলা।
চল সখি বনে যাই, কুরঙ্গিনী সনে ধাই,
সমীরে সােহাগ চাই, পরি বনমালা।
[সকলের প্রস্থান।

শ্রীবৎস-চিন্তা।
( শ্রীবৎস রাজার প্রবেশ।)
গ্রীবৎস।
পবিত্র কানন হেরি সৌতিপুর মাঝে,
ভ্ৰমিলাম কয় দিন,,
কোথাও না শান্তি পাই।
আহা! শান্তি কি এখানে।
বিদ্যমান হেরি বিশ্বেশর,
যােগীশ্বর অন্তর্যামী তুমি,
কহ নাথ,
কোথা মাের চিন্তা-ভিখারিণী ?
একাকিনী আছে কি জীবিতা,
পতিব্রতা,
পরহস্তগত নারী কতক্ষণ বাঁচে ;
পাছে যার কালবেশে শনি।
নাহি জানি,
কোথা শান্তি ডুবিল অতলে।
হেরি সমাধি-আসন,
ধ্যান জ্ঞান কি আছে আমার,
কেমনে ভাবিব হরে,
হরেছে অন্তর-কাল, কালিমায় রাখি।
দিগম্বর দেহি বর দীনে,
কঠিন পরাণে কঁদি,
বুক বাঁধিয়াছি প্রেমে নবীন যখন,
নহে হৃদি ফেটে যেত তখনি তখন।

শ্রীবৎস-চিন্তা।
কান্তায় আবার পাই,
অন্য সাধ কিছু নাই,
দীনবেশে রব মুখে অনশন কায়,
যতক্ষণ প্রাণ নাহি যায়।
দয়াময়, হে দীন-পালন,
সনাতনরূপে শান্তি দেহ দীনেশ্বর।
( দৈববাণী।)
শ্রীবৎস।
চিন্তা পরিহর রাজা পাবে চিন্তা ত্বরা,
দেবতা প্রসন্ন, যাও-ক্রমে শুভদিন।
শুভদিন সপ্ন অগােচর
ভগ্নদেহে যত্ন হবে পুন;
প্রাণ আশ্বাসিত হও,
শুভদিন হইবে আমার।
মৃদু-মায়া কণ্ঠস্বর এ বিজন বনে,
যােগাসনে আসিবে কে সাধু,
স্থানান্তরে যাই, দেখি আর কিবা আছে।
[ প্রস্থান।
(ভদ্রা ও সখীদ্বয়ের পুনঃ প্রবেশ।)
ভদ্রা।
চমকিল প্রাণ,
কে গেল চপলাভরে আঁধারি কানন।
বন মাঝে কি দেখিলে বনবিহারিনী ?
ভৈরব কানন হেথা সিদ্ধ-যােগাসন,
১ম, সখী।
২, সখী।

শ্রীবৎস-চিন্তা।
মহাজন আসিবে অনেক,
চল সখি রাজপুরে যাই,
বনে আর মন-পাখী নাই ।
[ সকলের প্রস্থান।
তৃতীয় গর্ভাঙ্ক।
দৃশ্য—স্বয়ম্বর সভা।
ভূপতিগণ ও শ্রীবৎস।
শ্রীবৎস ।
লােকপাল সমবেত সভা,
রাশি রাশি মান বিদ্যমান এক ঠাই,
দীন আমি কোথা যাই,
দৈবাদেশ পালি হেথা মালাকারবেশে
দেশে দেশে দেখি অপরূপ,
বহুরূপ ভাগ্যে মাের,
ললাটের ঘােরঘটা কত দিন রয়,
কত আর ক্ষীণ প্রাণে সয় ;
আছি মালিনীর ঘরে,
সমাদরে স্বপ্ন আঁগােচর।
নিরন্তর কঁদি,
গাঁথি কুসুমের হার,
মালাকার কাৰ্য্যে সুনিপুণ,

৭৬
ঐবৎস-চিন্তা।
কভু বনে যাই,
বিপীনে জানাই ব্যথা মহেশের কাছে,
পাছে পাছে শনি দেখা দেয় ;
যথা তথা রােষ-অগ্নি বিভীষিকা হেরি।
অন্য সাধ নাই,
যদি চিন্ত। পাই,
নিশ্চিন্তে কাটাই কাল ;
বিষাদে আনন্দ লাভ হয় অভাগার।
স্বপ্ন সম দৈববাণী ! ·
ভদ্ৰা ভাৰ্য্যা হবে মাের
মালাকারে মাল্যদান করিবে সুন্দরী,
রাজবালা রাজগণ ত্যজি।
ভবিতব্য দৈব-নিবন্ধন,
না হয় খণ্ডন কভু প্রাচীন-প্রস্তাব ;
মনােভাব অন্যে কি বুঝিবে,
মনে রাখি,
আসে বালা বরমাল্য লয়ে।
বাহুরাজ ও আচাৰ্য্য সমভিব্যাহারে বরমাল্য
ও চন্দন পাত্রসহ ভদ্রাবতীর প্রবেশ
পশ্চাৎ রাণী ও সখিগণ।
বাহুরাজ।
শুন নিমন্ত্রিত ভুপাল সমাজ!
কন্যা মাের ইচ্ছাবরী,
ইচ্ছা বরে করিবে বরণ,
;

শ্রীবৎস-চিন্তা। ৭৭ নিবেদন অন্য কিছু নাই, অনুমতি, ভিক্ষা চাই। ভূপতিগণ। অন্যমত নহে কেহ, মান্যলােক এক মত সবে। জনান্তিকে। আচাৰ্য্য। এস বালা-রূপরাশি দক্ষিণে তােমার। হের, কলিঙ্গ ঈশ্বর রূপে কলপ সমান, মতিমান রাজচক্রবর্তী। শাও প্রশান্ত হের সুন্দর গঠন, মহাজন তৈলঙ্গ ভূপাল। হের, সৌরাষ্ট্র দ্রাবীড়পতি তেজপুঞ্জ কায়, মহাশয় উভয় সমান, কুলমানে মহামানি ভূপ। হের, মগধ কর্ণাটপতি, রতিপতি সম রূপে বিরাজে দক্ষিণে, দানশীল ন্যায় পরায়ণ। হের, গুজরাট পাঞ্চালাদি ন্যায় চূড়ামণি, মহাজ্ঞানী মহা পুণ্যশীল, জনে জনে ইন্দ্রসম অতুল কোথা উমানাথ ! অনাথ বান্ধব কোথা দেব দিগম্বর, দেহি বর শ্রীবৎস রাজায়, সােমেশ্বর, কাতর হয়েছে প্রাণ, নাহি জানি কোথা প্রাণপতি। ঈশ্বর।

৭৮
শ্রীবৎস-চিন্তা
( দৈববাণী।)
শুন সুলোচনে! শুভক্ষণে পূজিলে শঙ্কর,
হের প্রাণেশ্বর তব শ্রীবৎস রাজন,
দীনহীন মালাকারবেশে।
যার আশে
বিজনে পূজিলে হরে দ্বাদশ বৎসর
সেই নরেশ্বর হের বৃক্ষতলে বসি,
ভাগ্যহীন ক্ষীণকায়, শনির শাসনে।
ভাগ্যবতী! যাও ত্বরা
পৃথিবীর পতি গলে দেহ বরমালা।
সাক্ষ্য লােকনাথ,
শ্রীনাথ শ্রীধর সাক্ষ্য,
সাক্ষ্য সূৰ্যদেব,
দিগম্বর, এই বর শ্রীবৎস রাজন।
( শ্রীবৎসের গলে বরমাল্য দান।)
ভূপতিগণ। ছি! ছি! কন্যা কি কাজ করিলে,
কারে বরিলে সুন্দরী।
মালাকার পতি হ’ল হরি-হরিহরি।
মহারাজ।
জামাতা হয়েছে ভাল ভাগ্যধৰ মালী।
[ ভূপতিগণের প্রস্থান।
দ্বাণী । প্রাণ ফেটে যায়, দেখিতে না পারি আর,
অঙ্গার আছিল ভালে রে ভদ্র। তাের।
[ রাণীর প্রস্থান।

শ্রীবৎস-চিন্তা।
বাহুরাজ।
রাজকুলে কালি,
ধিক্ মাের-ধিক্ রাজ্য মান,
এত অপমান শেষে এক কন্যা হ'তে!
ঘৃণা—ঘৃণিত হইনু আমি,
নীচগামী হইল নন্দিনী।
[ বাহরাজার প্রস্থান।
শ্রীবৎস।
শ্রীবৎস।
.
দীনবন্ধু দেখ দীনদশা,
ভাৰ্য্যা হারা পুন ভাৰ্য্যা দিলে,
কাঙ্গালিনী করিলে ভদ্রায়।
প্রভু! কাতর কি হেতু,
দাসী আমি চরণে তােমার।
প্রাণামার আনন্দে মগন,
পঞ্চানন পঞ্চমুখে গাইল সুযশ।
সতি! পৃথিবীর পতি
শ্রীবৎস আমার নাম,
বিধি বাম তাই হেন দশা।
রাজ্য হারা
প্রাণের সঙ্গিনী ভাৰ্য্যা চিন্তা গুণবতী ;
সতী নারী হারায়েছি বনে।
অনশনে ক্ষীণ কায়,
তায় শনির শাসন,
নির্বাসন দ্বাদশ বৎসর। ...।
প্রাণেশ্বর ! আকুল অন্তর মম,
ভদ্রা।

শ্রীবৎস-চিন্তা।
শ্রীবৎস।
শান্ত হও প্রভু! নারী আমি,
আনন্দের দিন মাের।
ওহে! তুমিও প্রাণের সখী সম দুঃখী হ'লে
( রাজপরিচারকের প্রবেশ।)
পরিচারক। মহাশয় ! নিজালয় অদূরে তােমার,
রাজ আজ্ঞা,
বাহির মহলে রবে নুতন
জামাই ।
শ্রীবৎস ।
প্রিয়ে ! শুন কথা—পতিব্রতা তুমি,
'ঘৃণিতা হইলে সতী ভি থারীর সনে ।
ভদ্রা। ঘৃণিত-পূজিত যেই,
অজ্ঞানের কথা, চল প্রভু! আনন্দ বান্ধব।
আহা, দিব্যজ্ঞানে গুণবতী নারী,
চল সতী দীনপতি সনে।
[ প্রস্থান
ঐবৎস।
চতুর্থ গর্ভাঙ্ক
দৃশ্য—ক্ষীরােদ-সাগরকূল, সাগর-গর্ভে বাণিজ্যতরী
বণিক ও কর্ণধারগণ।
বণিক। শুন কণধরগণ
বহু ভার হয়েছে তরণী,
তল্লাস লইবে রাজা আসে কর্মচারী
সেই লােক।

শ্রীবৎস-চিন্তা। ৮১ ১ম, কর্ণ । বণিক। ১ম, কর্ণ । ঘরে সবে সমুদ্রে ফেলি, হরিনু কাঞ্চন পাট রাশি রাশি যার, তারি করতলে মােরা, বাবা সেরেছে এবার, একসবার চালাকি কি খাটে, সাধে কি মাের করে ভয়, গে। গোঁ শব্দ মিছে নয় । ওরে বাতুল নাবিক শতধীক সাহসে তােমার, সৌতিপুরে সৰ্ব্বনাশ হেরি। তবে দেরি কেন—চড় লায়, বেরিয়ে যাই এক ঘায়, মাঝ দরিয়ায় গেলে আবার ধরে কোন্ ভাই। কি বল মশাই ? রাজনীতি বিপর্জয় কাজ তায় লােক লাজ মহাজন আমি, নিস্তার না পাবো—কেন বৃথা। আকিঞ্চন। মশাই, সাবধানে বিনাশ নাই, চল ভেসে যাই, বাবা-জলে কুমীর ডাঙ্গায় বাঘ! অবাক হলেম বাবা, বাক নাহি সরে, যদি আমায় ধরে। চলে আয় হদাপেটা ডহর জলে যাই, বাক্ চাতুৰি কাষ নাই। বণিক। ১ম, কর্ণ। ২য়, কর্ণ। ১ম, কর্ণ।

৮২ শ্রীবৎস-চিন্তা। বণিক। স্থির হও সবে, শ্রীবৎস। * হবে যা আছে কপালে, রক্ষা নাহি পাবাে কভু গােপনে পলালে । ১ম, কর্ণ। আপনি যাবে শালে সাধু সঙ্গে চাও দল, এখনও মাের আছে বল, চরে ভাই চল। (রক্ষীগণসহ শ্রীবৎসের প্রবেশ । ) রাজ্য হারা দীনদশা বন্দর রক্ষক আমি রাজার প্রসাদে, এ বিষাদ দিনে, কেন মাের আনন্দ উদয় মাহি জানি ভবিষ্য ললাট-লিপি কি আছে এ ভালে! এই সেই তরী; সেই মহাজন, সেই কর্ণধার সব, অসম্ভব হেরি এ মিলন, বুঝি দৈব অনুকূল, আকুল শ্রীবৎস তরে। ( প্রকাশ্যে ) কোথা যাও সবে, রহ হেথা--তল্লাস লইব তরী। ১ম, কর্ণ । বুঝি চিনেছে আমায়, এক ঘায় ফেলে দিছি জলে, দেখি ব্যাটা কি বলে। *..

শ্রীবৎস-চিন্তা। @বৎস। ১ম, কর্ণ । শ্রীবৎস। বণিক। গ্রীবৎস । শুন বণিক তনয়, সন্দ’ হয় হেরে তব তরী। সাধু, চেন কি আমায় ? ঐ ধরেছে রে বাপ, জলে ঝাঁপ দেবার যােটি নাই, কিসে রক্ষা পাই। রক্ষিগণ, বন্ধন করহ সবে, প্রলাইলে দায় তােমাদের! মহাশয়! নিদয় কি হেতু, অকারণ কেন এ বন্ধন, কোন্ দোষে দোষী কর্ণধার ? মনে কি পড়েনা সাধু, তােমা হতে নিদয় কি আমি, পতিপ্রাণা, প্রাণের সঙ্গিনী মাের, চিন্তা-ভিখারিণী ; হরিলে পামর, কহ কোন্ অপরাধে ! কোন অপরাধে পুন বাঁধিলে আমায়, প্রহার করিলে কত, শেষে, হরিয়া সুবর্ণ পাট লম্পট বণিক, ধন লােভে উন্মত্ত হইলে, সাগরে ভাষালে মােরে সহায় বিহীন। রে নিদয় ! নিদয় অধম তুই। কি কঠিন প্রাণে, শুনিলি বিষাদ গাঁথা অনাথিনী মুখে, **

ঐবৎসু-চিন্তা।
সিন্ধুবুকে বিন্দু নাই মায়া!
মূঢ় তুই কি আর কহিব,
কহ, আছে কি জীবিত নারী তােমার পীড়নে
শুন রক্ষিগণ ।
আন যত ধন আছে বণিক ভাণ্ডারে ;
দেখ কোথা নারী এক,
আন আগে সুবর্ণ ইষ্টকরাশি।
রক্ষিগণ কর্তৃক তরী অন্বেষণ ও স্বর্ণপাট আনয়ন
রক্ষিগণ।
বড় ভারি ইট, সােণার মত রঙ,
মশাই, আর একটা মাগি বসে আছে ;
অতি কদাকার,
কে যায় তার কাছে
প্রাণে বেঁচে আছে।
প্রাণে বেঁচে আছে।
ভাল, পুরষ্কার দিব সবে,
বন্ধন খুলিয়ে দেও,
স্বাধীন হইয়ে চল সাধু সম্প্রদায়,
রাজদ্বারে এ বিচার হবে।
শ্রীবৎস।

শ্রীবৎস-চিন্তা।
পঞ্চম
গর্ভাঙ্ক।
বহু রাজ।
দৃশ্য-রাজসভা।
বাহুরাজ, মন্ত্রী ও সভাসদগণ।
কপালে কলঙ্ক মাের রবে চিরদিন,
ছি, ছি! দীন মালাকারে বরিল নন্দিনী।
শূলপাণি পূজিল তনয়া,
বিজনে দ্বাদশ বর্ষ একাধি-মনন।
পঞ্চানন প্রসন্ন হইল,
শেষে, এই কি ভদ্রার ভালে শঙ্করের বর !
নিরন্তর নীচবাসে রবে বালা মালাকার সনে।
*5
মন্ত্রী।
মহারাজ।
ভবিতব্য অব্যর্থ লিখন
না হয় খণ্ডন কভু,
সােমনাথ অনাথ-বান্ধব,
অবশ্য দানিলা বর ভবিষ্য মঙ্গল।
শান্ত হও নৃপমণি,
রাজরাণী হবে ভদ্রাবতী।
অসম্ভব কথা মন্ত্রি শুনি তব মুখে,
মন দুঃখে এ হেন মন্ত্রণা
মানে না অন্তর।
নীচজাতি মালাকার,
নাহি তার রাজ্য ভার,
বাহু।

واسط বৎস-চিন্তা। রাজরাণী কেমনে হইবে বালা! মন-জালা রবে চিরদিন। (সুবর্ণ পাটসহ শ্রীবৎস, বণিক, নাবিক ও রক্ষিগণের প্রবেশ) শ্রীবৎস। বাহু ঐবৎস। মহারাজ! এই সাধু বঞ্চকের চূড়া, সুবৰ্ণ ইষ্টকগুলি হরে ছিল মাের। স্বর্ণপাট বহুমূল্য ধন, কেমনে সম্ভবে তোমা, নীচজাতি মালাকার তুমি। সুবিচার কর, নীচগামী লক্ষ্মী, প্রমাণে দেখাব রাজা অধিকারী কে । ভাল-কহ সাধু, কি উত্তর তব ? নিরুত্তর নহি, সুবৰ্ণ ইষ্টকগুলি আমার বিষয়। আছে পাট পরস্পর যােড়া, দ্বিখণ্ড করিয়া দেও সহজে বণিক, অধিক না চাহি আমি, একখণ্ডে পরিচয় পাবাে। বাহু। বণিক। ঐবৎস। বাহু। ভাল কথা, সহজ উপায়ে রাখ আপনার মান। ( বণিক কর্তৃক স্বর্ণপাঠ দ্বিখণ্ড করণ চেষ্টা ।)

শ্রীবৎস-চিন্তা।
গ্রীবৎস।
এবংস।
মহারাজ! নারিল বণিক দ্বিখণ্ড করিতে পাট ;
আমি পারি যদি আজ্ঞা হয়।
বাহু। সাধু, অসাধ্য তোমার।
ভাল, মালাকার!
প্রত্যক্ষ প্রমাণ দেহ তুমি।
দেখ তাল বেতাল মিত্র—সাহায্য সময় ।
( শ্রীবৎস কর্তৃক স্বর্ণপাঠ দ্বিখণ্ড করণ।)
মহারাজ! অধিকারী আমি,
হের নাম অঙ্কিত কাহার ।
বাহু। একি! শ্রীবৎস চিন্তার নাম স্বর্ণপাটে হেরি,
নাহি পারি চিনিতে তােমায়,
কোন্ ভাগ্যধর তুমি,
কে অমর ছলিছ আমায়।
প্রভু!
শ্রীবৎস আমার নাম দীন-মালাকার,
ভদ্র। যার বিষাদ-সঙ্গিনী,
শনি কোপে রাজ্য হারা দ্বাদশ বৎসর
ভ্ৰমিম বনে বনে।
এই সে বঞ্চক সাধু হরিল চিন্তায়,
চিন্তায় আকুল আমি কি আর কহিব,
দীনহীন মম সম নাই।
বাহ।
কি শুনিনু !
শ্রীবৎস জামাতা মােয় ভদ্র। রাজরাণী,
নৃপমণি ! ক্ষম মােরে,
অন্ধ আমি চিনিতে নারিনু।
শ্রীবৎস।

শ্রীবৎস-চিন্তা।
শ্রীবৎস।
বাহু।
দীনপাল! অপরাধি আছি পদে,
সম্পদ-বিহীন আমি,
জীবন সম্বল বাঁধা ক্ষীরােদে এখন।
সাধুর তরীতে বঁধা চিন্তা রাজরাণী,
নাহি জানি,
কেন এ বঞ্চন বিধি শ্রীবৎসের ভালে।
চল সবে,
মুক্ত করি আনি লক্ষ্মী নারায়ণ পাশে ।
[ শ্রীবৎস ব্যতীত সকলের প্রস্থান।
( ভদ্রাবতীর প্রবেশ।)
ভদ্রা।
কোথ। নাথ, কোথা তব বিজন-সঙ্গিনী,
বন-সখী আমি না হইনু প্রভু ?
শ্রীবৎস ।
অধিক যন্ত্রণা তায়,
আদরিণী ! আনন্দ সঙ্গিনী তুমি,
আসিবে এখনি চিন্তা কাঙ্গালিনীবেশে,
প্রাণ পাবো রাজার কৃপায়।
ভদ্রা। আমি প্রাণ বিকায়েছি পায় ।
( বাহুদেব, মন্ত্রী, চিন্তা, বণিক, নাবিক
ও রক্ষীগণ প্রভৃতির প্রবেশ।)
বাহু।
বৎস! ভূপতির পতি তুমি,
ধন্য ভদ্রা নন্দিনী আমার,
সার্থক জীবন ধরি,
রাজ রাজেশ্বরী হের রাজ রাজেশ্বর।

শ্রীকৎস-চিন্তা।
শ্রীবৎস।
চিন্তা।
কাতর অন্তর,
কৃপাময় কি আর কহিব,
পিতা তুমি চিন্তা দানে মাের ।
দিদি! কাঁদিব না আমি,
আনন্দের দিন মাের ধরি দুটি পায়।
ভগিনী আমার,
জন্ম জন্ম থাক সুখে,
তােমা হতে পতি পাই,
লক্ষ্মী তুমি প্রাণপতি ভালে।
বাহু। দীনবেশ দেখিতে না পারি আর,
রাণী ! কোথা তুমি,
লয়ে যাও রাজরাণী রাজ রাজেশ্বরে।
( রাণী ও সখিগণের প্রবেশ । )
রাণী । চল বাছ। জীবনের সার,
হেন বেশ দেখিতে না পারি ।
[ শ্রীবৎস, চিন্তা, ভদ্রা, রাণী ও সখিগণের প্রস্থান।
বাহু।
বণিক।
বঞ্চক ! পাষাণ-হৃদয় তোর,
কেমনে দেখিলি দীন শ্রীবৎস রাজায়।
অজ্ঞান আছি আমি,
নরনাথ, ক্ষমা কর মােরে!
ক্ষমা-ঈশ্বরের হাত,
বাহু।
ক্ষমা চাও কোন্ মুখ্য গুণে,
কি কাজ করিলি দুষ্ট ইষ্টক হরণে।

ঐ বৎস-চিন্তা।
অনশনে ক্ষীণ কায়,
ভাসালি রাজায় জলে,
লক্ষ্মী-স্বরূপিণী চিন্তা পতিপ্রাণ। নারী,
কেমনে হরিলি দুষ্ট ;
লােকান্তরে বহু কষ্ট তাের,
চরম সংশয় কাল দেখিৰি পামর।
উচিত—উচিত দণ্ড রাজনীতি কয়,
দণ্ডাদেশ দেহ নরনাথ।
বাহু।
মন্ত্রি। মন্ত্রণা সঙ্গত
কিন্তু কাল অন্য মত হের,
শ্রীবৎস ভিখারীবেশে চিন্তার হরণ !
দৈব বিড়ম্বন মাত্র আর কিছু নয় ।
১ন, নাবিক। আমায় যদি ছেড়ে দেয় ভিক্ষা মেগে খাই,
বণিকের কাছে ও না যাই।
দ পর! তবে কোন্ দণ্ড বণিকের প্রতি
দণ্ডে অধিকারী নহি আর,
দণ্ডধর আসিবে এখনি,
হের, পৃথিবীর-পতি আসে বন্দিগণ গায় !
আনন্দ উৎসব গুন প্রতি ঘরে ঘরে।
মন্ত্রী।
গীত।)
(নেপথ্যে
সাহান-আড়াঠেকা।
(রাজে) উথলিল সুখ-সিন্ধু আনন্দ অপার।
শ্রীবৎস ভূপাল করে পুন রাজ্যভার ।

শ্রীবৎস-চিন্তা।
মৃদু মন্দ সমীরণ, উল্লাসে পাখী মগন,
বিবিধ বন-কূজন, মধুর ভাণ্ডার।
শিখি-পুচ্ছ উচ্চকায়, মানস মঙ্গল গায়,
কুসুমে সােহাগ পায়, অলি আনাগণা ;
রাজ্যের কুশল রাখে ভাগ্য মূলাধার।
( রাজবেশে শ্রীবৎস, চিন্তা, ভদ্রা ও পশ্চাৎ
সখিগণের প্রবেশ।)
শ্রীবৎস।
বাহ।
রাজবেশ
আবার জগতে পুন দেখিল আমার।
চিন্তার উদ্ধার হবে কার মনে ছিল ;
ভদ্রা হবে সম সােহাগিনী,
পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইব,
দৈব-বল চরম সম্বল মাের।
বৎস! বাঞ্ছিত রতন তুমি,
সসাগরা পৃথিবীর সার,
সুবিচার কর, সাধু রাজদণ্ড পায় ।
মহারাজ! দৈব বিড়ম্বনে দুঃখ সহিং অশেষ।
নিমিত্তের ভাগী সাধু কি দোষ উহার,
বিনা দণ্ডে করুন বিদায়।
সফল জীবন মম,
বহু পুণ্যফলে, শ্রীবৎস জামাতা মাের,
সুবিচার শুনিলে হে সাধু!
ঐবৎস।
বাহু।

ঐবৎস-চিন্তা।
বিনা দওে মুক্তিলাভ কর দুরাচার,
যাও স্থানান্তরে, রেখ মনে এ ঘটন,
ধৰ্ম্মের শাসন সূক্ষ্ম সত্য রাজনীতি।
রাজ আজ্ঞা শিরে ধরি,
প্রাণদান আজি মাের।
বণিক।
[ বণিক প্রভৃতির প্রস্থান
শুন মন্ত্রি-মিত্রগণ !
বাহু।
আনলে মগন সবে,
রাজ্যে মহোৎসব,
আনন্দের দিন মাের,
শ্রীবৎস।
চল সবে আনন্দ আশ্রমে।
[ বাহুরাজ, মন্ত্রী ও সভাসগণের প্রস্থান
(পূর্ণমূৰ্ত্তি শনির আবির্ভাব।)
(স্তব )
জয় পূর্ণ তেজঃরাশি, তপত কাঞ্চন।
নীলাঞ্জন পিত আভাময়।
জয় রক্ত-বাসধারী, দরপ দমন
দণ্ডধর দেব দিগ্বিজয় ।
জয় নব, গ্রহরূণী, পিঙ্গল বরণ।
জনার্দন জীব সৰ্ব্ব জীবে ।
জয় সঞ্চার সংহার, সূরজ নন্দন,
নিরঞ্জন নমি ইষ্টদেবে ।

শ্রীবৎস-চিন্তা।
-
ন; শ্রীবৎস রাজন।
নিৰ্বাসন মূলাধার আমি।
ত্রিলােকের পূজ্য, পূজ্য তব ইষ্টদেব,
শ্রেষ্ঠ আমি চৈতন্য গোচর,
অনাদর করি মােরে এত দুঃখ পেলে ;
কান্তারে হারালে--বনে বঞ্চিলে নরেশ
দীনবেশে দ্বাদশ বৎসর।
এবে, প্রসন্ন হইমু আমি লভ রাজ্যপদ,
সম্পদ থাকিবে চিরশত পুত্র পাবে,
অন্তে রবে বৈকুণ্ঠ নিবাসে।
যে সবে তোমার নাম,
আমি তারে নহি বাম ;
সিদ্ধ মনষ্কাম তব শ্রীবৎস
ভূপাল।
পরীক্ষায় পূর্ণ ফল লভিলে নরেশ,
যাও নিজ দেশ,
দশ হাজার বর্ষ, সুখে পাল প্রজাগণে।
সসাগরা পৃথিবীর ভার তব,
চিন্তা, ভদ্রাসনে, বস সিংহাসনে,
কায়মনে পূজ মােরে যাবত জীবন,
শুভ আমি—সুখে থাক শ্রীবৎস রাজন।
[ শনির অন্তর্ধান।
সৌভাগ্য তপম আজি উদিল আমার,
অবতার পূজিব সদাই,
কায়মনে প্রণমি হে দেব ।
বৎস।

* *
শ্রীবৎস-চিন্তা।
বাহু!
( বাহুরাজার প্রবেশ।)
কি দিব ভূপাল, ধর সৌতিপুর নিধি,
এ রতন যােগ্য করে দানি।
[ সকলের প্রণাম ও বাহুরাজার প্রস্থান
সখিগণ। পাহাড়ী-পিলু-কারুফা।
মধু বিতর মধুকর মনফুলে।
মধু বিতর মধুকর যেওনা ভুলে।
সমীরে সােহাগ পাই,
সৌরভে প্রাণ যুড়াই,
যুগল কামিনী মরি প্রেমতরু মূলে ।
প্রমােদ মুঞ্জরী, প্রেমে বিকাসে লো,
প্রেমিক পুরাণ, বিলাসে হাসে লো;
চারু-বিনােদবেশে হেরি প্রাণ খুলে।
যবনিকা পতন

নাট্যোলিখিত ব্যক্তিগণ
পুরুষগণ।
স্ত্রীগণ।
শ্রীবৎস ।
শনি।
মন্ত্রী।
চিন্তা।
লক্ষী ।
মালিনী।
বাহুরাজ।
মহিষী।
বণিক।
ভদ্রাবতী।
আচাৰ্য্য।
সখিগণ, কাঠুরিয়া
গ্রহাচাৰ্য্য (ছদ্মবেশী শনি)। স্ত্রীগণ ইত্যাদি
সভাসদগণ, রাজভট্টদ্বয়, ধীবরদ্বয়, কাঠুরিয়াগণ,
পরিচারক, কর্ণধারগণ ইত্যাদি ।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Sreebatsho Chinta

Author
Sen,jibonkrishna
Title
Pouranik Drishyakabya
File name
Sreebatsho Chinta
Text
OCR done
Citation
1884
Published
2009/10/6
Publisher
National Thiyatar Co.,calcutta
Language
Sanskrit
Pages
104
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Plays
Keywords
Chinta
DLI number
513322
Barcode
4990010020311.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
N8sxcZSzQ9p
Download PDF

Sreebatsho Chinta