Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Raja Rammohan
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
illrul i।। ।।
in usli
। Iণ ।
রাজা রামমােহন
ভটু শু সf
*
No text on this page.
রাজা ব্রামমােহন
সম্রাট পঞ্চম জর্জ, বিদ্যাসাগর, মধুসূদন, বঙ্কিমচন্দ্র প্রভৃতি প্রণেতা
শ্রীদেবেন্দ্রনাথ ভট্টাচাৰ্য প্রণীত
কলিকাতা
৬৫ নং কলেজ স্ট্রীট, ভট্টাচার্য্য এণ্ড সন্এর পুস্তকালয় হইতে
গ্রন্থকার কর্তৃক প্রকাশিত
১৩৪
মূল্য তিন আনা
কলিকাতা
•৭ নং মেছুয়াবাজার স্ট্রীট, স্বর্ণপ্রেসে
দ্বিজেন্দ্রনাথ দে কর্তৃক মুদ্রিত
=
No text on this page.
中。 রাজা রামমােহন প্রথম পরিচ্ছেদ গাছটিতে কেমন ফল হইবে, অঙ্কুর দেখিয়া তাহা যেমন বুঝিতে পার যায় না, তেমনি, কেহ কখনও স্বপ্নেও ভাবে নাই যে, পরম হিন্দু- বৈষ্ণব চূড়ামণি—শান্তস্বভাব কৃষ্ণচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের বংশে ভবিষ্যতে একজন বিদ্যোৎসাহী ধৰ্ম্ম-সংস্কারক জন্মিয়া-তৎকালীন হিন্দু-সমাজের কুসংস্কার ও সঙ্কীর্ণতার সীমা-গণ্ডি মুছিয়া ফেলিয়া—ভারতবর্ষ হইতে বিলাতপৰ্যন্ত মাতাইয়া তুলিবে? কিন্তু ভগবানের ইচ্ছা কে বুঝিতে পারে ? কৃষ্ণচন্দ্রের পূর্ব-পুরুষেরা বাঙ্গালী ছিলেন না—তাহাদের বাস পশ্চিমে কনৌজ প্রদেশে। তাহারা প্রথমে সেখান হইতে পূর্ববঙ্গে আসেন, তারপরে আবার কর্মোপলক্ষে সেখান হইতে মুর্শিদাবাদ ও তথা হইতে ক্রমে হুগলি জেলায় আসিয়া বাস করেন। বাংলা দেশের জল, হাওয়া ও মাটীর গুণে দুই চার পুরুষেই সেই পশ্চিমদেশবাসিগণ ক্রমশ বাঙ্গালী হইয়া উঠিলেন এবং হুগলি জেলার ‘খানাকুল কৃষ্ণনগরের কাছে ‘রাধানগর’ নামক স্থানে ঘর বাড়ী বাঁধিলেন। ক্রমশঃ দেশের সঙ্গে তাহাদের সম্পর্ক একেবারে উঠিয়া গেল—সকলেই পূরাদস্তুর বাঙ্গালী হইয়া পড়িলেন, রাধানগর পৈত্রিক বাস্তুভিটা হইয়া উঠিল। তখন এদেশের রাজা-মুসলমান। নবাব-সরকারে বিস্তর হিন্দু চাকরি করিতেন এবং নিজ নিজ কাৰ্যদক্ষতা দেখাইয়া বড় বড় পদ পাইতেন। রাজপুরুষেরাও তাঁহাদের গুণে মুগ্ধ হইয়া তাহাদিগকে রাজা রামমােহন নানারকম খেতাব দিয়া রাজসম্মানে ভূষিত করিতেন। খেতাবের সঙ্গে সঙ্গে অর্থ এবং ক্ষমতা লাভ করিয়া তাহারা দেশের মধ্যে মা, গণ্য, সম্রান্ত হইতেন। এইরূপে অনেকে তখন ‘চৌধুরী’ ‘রায়’ ‘খ’ প্রভৃতি হইয়া নামজাদা বড়লােক হইয়াছিলেন—এখন পর্যন্ত তাহাদের বংশ সেই সকল গৌরবসুচক উপাধিতেই পরিচিত হইয়া থাকেন। কৃষ্ণচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয় ও এইরূপে নবাব সরকারে চাকরি করিয়া নিজগুণে উচ্চপদ লাভ করেন এবং রায়’ উপাধি প্রাপ্ত হইয়া মন্ত-বড় মানুষ হইয়া উঠেন। সেই হইতেই তাহার বংশে ‘বন্দ্যোপাধ্যায়’ উপাধি লােপ পাইয়া ‘রায়’ উপাধি হইল এবং তারপর হইতে তাহার বংশধরেরা রায়বংশ বলিয়া পরিচিত ও প্রসিদ্ধ হইয়া উঠিলেন। কৃষ্ণচন্দ্র শৈশব হইতেই বড় সাধু-বড় নিষ্ঠাবান বিষ্ণুভক্ত ব্রাহ্মণ ছিলেন, তার বাড়ী ছিল মুর্শিদাবাদের ‘শাকাস’ গ্রামে। যেমন বিষ্ণুভক্ত আবার লেখাপড়াতেও তেমনি পণ্ডিত, স্বভাবেও—পরম ধাৰ্ম্মিক, ন্যায়বান, সত্যনিষ্ঠ সাধুপুরুষ! সুতরাং ভগবান তার গুণের পুরস্কার দিলেন। পাতার আড়ালে ফুলটি গােপনে ফুটিয়া থাকিলেও যেমন তাহার গন্ধ তাহাকে ধরাইয়া দেয়, তেমনি গরীব গৃহস্থ কৃষ্ণচন্দ্রের গুণের কথাও রাজপুরুষেরা শীঘ্রই জানিতে পারিলেন এবং তাহাকে আনিয়া নবাব সরকারে চাকরি দিলেন। সেই হইতেই তাঁহার সৌভাগ্যের সূত্রপাত হইল। চাকরিতে প্রবেশ করিয়া কৃষ্ণচন্দ্র শীঘ্রই আপনার গুণ এবং কাৰ্যদক্ষতার পরিচয় দিলেন, তাহার ফলে তাহার খুব পদোন্নতি হইল এবং ‘রায়’ উপাধি পাইলেন, সঙ্গে সঙ্গে উপার্জনও যথেষ্ট হইতে লাগিল কিন্তু তাহাতে সেই ধার্মিকের স্বভাব বিগড়াইল না—তিনি পূর্বের মতই শান্ত, নম্র, ন্যায়বান এবং সত্যবাদী রহিলেন। সেই সময়ে রাজ প্রথম পরিচ্ছেদ সরকার হইতে যথেষ্ট ক্ষমতা দিয়া তাহাকে ‘খানাকুল কৃষ্ণনগরে বদলি করা হইল। ভগবানের দয়ায় এত উচ্চপদ, ক্ষমতা ও অর্থলাভ করিয়া কৃষ্ণ- চন্দ্র দিবারাত্রি কায়মনােপ্রাণে ভগবানের আরাধনায় নিযুক্ত রহিলেন। তাহার ফলে এইখানেই তিনি ইষ্টদেবতা ‘গােপীনাথ জীউ’কে চাক্ষুস দর্শন লাভ করিলেন। তাহার প্রাণ-মন ভক্তিরসে ডুবিয়া গেল, সেই স্থান তাহার কাছে বৃন্দাবনের মত হইয়া উঠিল—সে স্থান ছাড়িয়া এক পদ ও অন্য কোথাও যাইতে আর তাহার মন সরিল না, তিনি সেইখানেই ‘রাধানগর’ নামক স্থানে বাড়ী করিয়া বাস করিতে লাগিলেন। সেই হইতেই তাঁহার বংশের বাস হইল -রাধানগরে। কৃষ্ণচন্দ্রের তিন পুত্র ছিল, তাহাদের সকলের ছােট ‘ব্রজ- বিনােদ। ব্রজবিনােদও পিতার ন্যায় ধাৰ্ম্মিক, পণ্ডিত এবং গুণবান ছিলেন। তিনি পিতার মত নবাব-সরকারে চাকরি করিয়া উচ্চপদ লাভ করিলেন এবং যথেষ্ট উপাৰ্জন করিয়া পৈত্রিক ধনভাণ্ডার বৃদ্ধি করিতে লাগিলেন। তখন হুগলি জেলাটাময় রায়বংশের সুখ্যাতি ছাইয়া পড়িল, তাহারা সকলের কাছে অত্যন্ত মান্য গণ্য সম্রান্ত জমীদার হইয়া উঠিলেন। ব্রজবিননাদের সাতটি পুত্র হইল -সকলেই রায়বংশের উপযুক্ত বংশধর। তাহাদের মধ্যে পঞ্চম যিনি তাহার নাম রামকান্ত রায়। রামকান্ত রায় রায়বংশের গৌরব-স্বরূপ হইয়া উঠিলেন। কি লেখাপড়ায়, কি স্বভাবচরিত্রে, কি বুদ্ধি-বিবেচনায়, কি আচার-ব্যবহারে, তিনি সকল ভাইয়ের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করিলেন। বিশেষ তাহার অপূর্ব পিতৃভক্তি-শ্রীরামচন্দ্রের পিতৃভক্তির মত—দেশের মধ্যে প্রবাদ-বাক্য হইয়া উঠিল। তিনি পিতৃসত্য পালন করিবার জন্য নিজের ‘কুল’ ভঙ্গ পুৰ্ব্বক নীচু ঘরে বিবাহ করিয়া পিতার বাক্য রক্ষা করিলেন।
রাজা রামমােহন তখন রামকান্তের পিতা ব্রজবিনােদ রায়ের আসন্নকাল উপ- স্থিত—তিনি মৃত্যুশয্যায় শুইয়া হরিনাম করিতেছিলেন। সেই সময়ে শ্রীরামপুরের ‘চাতুরা গ্রামের শ্যাম ভট্টাচাৰ্য্য আসিয়া কিছু প্রার্থনা করিলেন। মৃত্যুপথ যাত্রী ব্রজবিনােদ তাহার মনের কথা বুঝিতে পারি- লেন না, জিজ্ঞাসা করিলেন-“বলুন আপনি কি চান ?” শ্যাম ভট্টাচাৰ্য চালাক লােক, তিনি উত্তর দিলেন,-“আগে সত্য করুন যে আমি যা চাহিব—দিবেন।” “যদি আমার ক্ষমতায় কুলায়।” “অব।” ব্রজবিনােদ-সরল, উদার, মহৎ, দানশীল-অত কথার মার- প্যাছ বুঝিতেন না, বিশেষ সেই শেষ সময়ে সংসারের প্রতি আকর্ষণ কমিয়া আসিয়াছিল, তিনি কিছুমাত্র ভাবনা-চিন্তা না করিয়া কহিলেন—“সত্য করিতেছি, যাহা চাহিবেন—দিব।” তখন শ্যাম ভট্টাচাৰ্য যেন হাত বাড়াইয়া স্বর্গ পাইলেন, কহিলেন -“আমার কন্যার সঙ্গে আপনার এক পুত্রের বিবাহ দিতে হইবে-আমি ইহাই চাই।” ভট্টাচাৰ্য মহাশয়ের কথা শুনিয়া সকলেই স্তব্ধ হইয়া পড়িল রায়বংশ একে স্বভাব কুলীন, তায় পরমবৈষ্ণব, আর ভট্টাচাৰ্য্য মহাশয় ভঙ্গ এবং শাক্ত সুতরাং রায়বংশের পুত্রের সহিত তাহার কন্যার বিবাহ অসম্ভব। কিন্তু ব্রজবিনােদ যে সত্য করিয়া ফেলিয়াছেন, তার উপায় কি ? বংশ-গৌরব যতই ম্লান হউক—লােকে যতই নিন্দা করুক—সমাজ যতই ঘৃণা করুক—এ বিবাহ ত দিতেই হইবে, নহিলে যে তাঁহাকে সত্য-ভঙ্গ করিতে হয়। সত্য-ভঙ্গ করা মহাপাপ -এই মৃত্যুকালে কি তাহাকে সেই পাপের ভাগী হইয়া নরক হইতে হইবে ? = প্রথম পরিচ্ছেদ ব্রজবিনােদ পুত্রগণকে ডাকিয়া একে একে সকলকেই ভট্টা- চার্যের কন্যাকে বিবাহ করিতে বলিলেন, কিন্তু কুলভঙ্গ এবং সামাজিক অপমান ও ‘একঘরে’ হইবার ভয়ে কেহই তাহাতে সম্মত হইল না। তিনি মহাফাঁপরে পড়িয়া চতুর্দিক অন্ধকার দেখিলেন—সত্যভঙ্গ হইবার ভয়ে চক্ষু দুটি জলে ভরিয়া আসিল। রামকান্ত এতক্ষণ চুপ করিয়া সকল দেখিতেছিলেন এবং শুনিতেছিলেন। পিতার অবস্থা ভাবিয়া—তাহার চক্ষে জল দেখিয়া পিতৃভক্ত-পুত্রের প্রাণে যেন শেল বিধিল—তাহার কাছে সমাজ, লােক- লজ্জা প্রভৃতি অতি তুচ্ছ বােধ হইল, তিনি সকলের সম্মুখে দাঁড়াইয়া দৃঢ়স্বরে কহিলেন- “আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন বাবা, আমি ভট্টাচাৰ্য মহাশয়ের কন্যাকে বিবাহ করিব।” ব্রজবিনােদ যেন অকূলে কূল পাইলেন—প্রাণ খুলিয়া রাম- কান্তকে ঐকান্তিক শেষ আশীৰ্ব্বাদ করিলেন। যথাসময়ে রামকান্ত রায় শ্যাম ভট্টাচার্যের কন্যা ‘তারিণী দেবী’কে বিবাহ করিয়া গৃহে আনিলেন। তারিণীদেবী সেকালের নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণের মেয়ে। ব্রাহ্মণের ঘরে যত রকমের পূজা-অর্চনা, ব্ৰত-নিয়ম, আচার-অনুষ্ঠান হওয়া উচিত, সে সকলই তার বাপের বাড়ীতে যােল আনা রকম হইত। ছেলেবেলা হইতে সেই সব দেখিয়া—সেই রকমে চরিত্র গড়িয়া, তিনি পরম ভক্তি- মতী, পবিত্ৰহৃদয়া ধাৰ্ম্মিকা হইয়াছিলেন। সুতরাং রামকান্ত রায়ের সহিত তারিণীদেবীর মিলন—হর-পার্বতীর মিলনের মত—রায়বংশের ভবিষ্যৎ গৌরববৃদ্ধির কারণ হইল। ইহাদের পুত্র হইল, নাম রাখিলেন—রামমােহন। ইনিই ভবিষ্যতে ‘রাজা রামমােহন রায় নামে পরিচিত হইয়া দেশে অমর কীর্তি রাখিয়া গিয়াছেন।
রাজা রামমােহন রামমােহন জমীদারের পুত্র, সুতরাং তিনি সেই রকম ভাবেই প্রতিপালিত হইতে লাগিলেন। শৈশবে কখনাে মামার বাড়ীতে, কখনাে বাপের কাছে থাকিয়া সকলের নয়নের মণি হইয়া উঠিলেন। একবার তিনি মায়ের সঙ্গে মামার বাড়ীতে গিয়াছিলেন। বৃদ্ধ শ্যাম ভট্টাচাৰ্য নাতিটাকে কোলে পিঠে করিয়া বেড়াইতেন, নাতিও সকল সময়ে ঠাকুরদাদার সঙ্গী হইয়া শৈশবের নানারকম উপদ্রবে তাহার আনন্দ বর্ধন করিত। কি পূজার সময়ে, কি বেড়াইবার কালে, কি আহারের সময়ে সৰ্ব্বদাই সে ঠাকুরদাদার সঙ্গে সঙ্গে থাকিত। সেদিন ঠাকুরদাদা পূজায় বসিয়াছিলেন-নাতিটি কাছে বসিয়া দেখিতেছিল। পূজা শেষ করিয়া যেমন তিনি উঠিলেন অমনি সে গিয়া তাহার হাত ধরিল। ভট্টাচাৰ্য মহাশয় ঠাকুরের প্রসাদী বেলপাতা নাতির হাতে দিয়া আশীৰ্বাদ করিলেন। নাতি কিন্তু সে আশীৰ্বাদের মৰ্ম্ম বুঝিল না, বেলপাতাটি ভক্তি- ভরে মাথায় না রাখিয়া তৎক্ষণাৎ গালে পূরিয়া দিয়া চিবাইতে লাগিল। রামমােহনের মা সেইখান দিয়া যাইতে এ দৃশ্য দেখিলেন এবং তখনি তাড়াতাড়ি আসিয়া পুত্রের মুখে আঙ্গুল দিয়া বেলপাতা বাহির করিয়া ফেলিয়া দিলেন। তারপর পিতাকে কহিলেন—“এ কি করিতেছেন বাৰ ? রামমােহন পরম বৈষ্ণব বংশের সন্তান, আপনি তাহাকে বেলপাতা খাওয়াইলেন—এ বড় অন্যায়।” ব্রাহ্মণদের স্বভাব—একটুতেই চটিয়া আগুন হইয়া উঠেন, আবার একটুতেই শীতল হন। কন্যার কথা শুনিয়া—তাহার ধর্মের গোঁড়ামী দেখিয়া ভট্টাচাৰ্য মহাশয় হঠাৎ অত্যন্ত রাগিয়া উঠিলেন এবং সঙ্গে সঙ্গে অভিশাপ দিলেন—“তাের এই সন্তান বিধর্মী হইবে।” এই তুচ্ছ ব্যাপার যে এতদূর গড়াইবে তাহা তারিণীদেবী স্বপ্নেও ভাবেন নাই। পিতার অভিসম্পাৎ শুনিয়া তাহার বুক কঁপিয়া দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ । উঠিল, তিনি আর স্থির থাকিতে পারিলেন না—কঁদিতে আরম্ভ করিলেন। তাহা দেখিয়া বাপের মনে দয়া হইল, অত্যন্ত অনুতাপ জন্মিল, তিনি কন্যাকে নানারকম প্রবােধ দিয়া বুঝাইয়া শান্ত করিলেন, কহিলেন- “আমি যা বলিয়াছি, বিফল হইবে না, কিন্তু চিন্তা নাই- ভাবিও না—তােমার এই পুত্র সংসারে অসাধারণ লােক হইবেন, দেশ- বিদেশে সকলের পূজা পাইবেন, উচ্চ রাজ-সম্মান লাভ করিয়া অমর নাম ও কীৰ্ত্তি স্থাপন করিবেন।” ঠাকুরদাদার সেই অভিসম্পাৎ এবং সেই আশীৰ্বাদ রাম- মােহনের ভবিষ্যৎ জীবনে অক্ষরে অক্ষরে ফলিয়াছিল। দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ শৈশবে বিদ্যাশিক্ষার সময় হইতেই মানুষ তার ভবিষ্যতের জীবন গড়িয়া তুলে। রামমােহনের ভবিষ্যৎ গৌরবের অঙ্কুরও তাহার শৈশব-জীবনে বিদ্যাশিক্ষার সময় হইতেই ফুটিয়া উঠিল। পাঁচ বৎসর বয়সে ‘হাতে খড়ি হইবার পর হইতেই তাহার স্মরণশক্তি এবং প্রতিভা আপনিই প্রকাশিত হইয়া পড়িল। ইহার পূৰ্বে অতি শৈশবে-কখন কোথায় কি নূতন কথাটি শুনিয়া শিখিয়া ফেলিতেন, ‘বেঙ্গমা-বেঙ্গমীর কথা একবার শুনিয়া জিজ্ঞাসামাত্রেই বলিতে পারিতেন, কোথায় কি নূতন জিনিষ দেখিতেন—সে কথা মনে জাগিত, এ সব দেখিয়া শুনিয়া লােকে চমৎকৃত হইলেও, যত বিস্মিত হউক, হাতে-খড়ির পর হইতে তাহার স্মরণশক্তি ও প্রতিভার পরিচয় পাইয়া সকলেই অবাক হইলেন।
রাজা রামমােহন বঙ্কিমচন্দ্রের মত হাতেখড়ির দিনেই একবার দেখিয়া সমস্ত বাঙ্গালা বর্ণমালা শিখিতে না পারিলেও, তিনি আর এক প্রকারে তাহার অদ্ভুত শক্তির পরিচয় দিলেন। হাতেখড়ির দিন হইতে যেমন পাঠশালে গিয়া বাঙ্গালা শিখিতে লাগিলেন—সেই সময়ে—সেই পাঁচ বৎসর বয়সে সেই সঙ্গে-বাড়ীতে আসিয়া আবার পার্সী ভাষা শিখিতে আরম্ভ করি- লেন। এক সঙ্গে এই দুইটি বিভিন্ন ভাষা শিক্ষা করিতে সেই পাঁচ বৎসরের শিশু যে অদ্ভুত শক্তির পরিচয় দিল—জগতের ইতিছাসে তাহার আর দ্বিতীয় মিলে কি না সন্দেহ। সারাদিন পাঠশালে আটক থাকিয়া ছেলেদের প্রাণ যেন হাঁপা- ইয়া উঠে, তাই ছুটি হইবামাত্রই তাহারা গৃহে ফিরিয়া খেলায় মাতে ; অনেকে বই, শ্লেট, দপ্তর পর্যন্ত গুছাইয়া তুলিয়া রাখিতে সময় পায় না। কিন্তু রামমােহন সে রকম হইলেন না, তাহার প্রকৃতি ভগবান যেন পৃথক্ বসিয়া পড়িয়াছিলেন। পাঠশালা হইতে ফিরিয়া-খেলা দূরের কথা—অনেকদিন হয়ত খাবার পর্যন্ত না খাইয়া অমনি অন্য বই লইয়া বসিতেন। সারাদিন পাঠশালে বাঙ্গালা পড়িয়া আসিয়া তখন তাহার পাসী পড়িবার ধূম পড়িয়া যাইত। অভিভাবকেরা খেলাইতে-বেড়াইতে কহিলে, তিনি সে কথা শুনিতেন না। বড় বড় বই গুলির রাশীকৃত পাতার মধ্যে কি যে স্বপ্নে- গড়া অনন্ত রহস্য লুকাইয়া আছে, তাহা জানিবার জন্য তাঁহার মন ছটফট করিত, এবং কবে শীঘ্র শীঘ্র ছােট ঘােট বইগুলি শেষ করিয়া বড় বড় বই পড়িতে পারিবেন কেবল সেই কথাই ভাবিতেন। এক দিনেই যেন সেগুলি আয়ত্ত করিতে পারিলে তার প্রাণ ঠাণ্ডা হয়—এইরূপ সাগ্রহ দৃষ্টিতে তিনি পুস্তকগুলি দেখিতেন। সুতরাং তাহার লেখাপড়ায় মনােযােগও সেইরূপ আকর্ষিত হইল। যেটা প্রাণ চাহে বালকেরা তাহাই করে, ভবিষ্যতে তাহাদের দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ স্বভাবও সেই প্রকার হইয়া দাঁড়ায়। লেখাপড়ায় সেইরূপ আশ্চৰ্য্য মনােযােগের ফলে তাহার ঐকান্তিকতা বাড়িল, তাহাতে স্মরণশক্তি বৃদ্ধি পাইল, সঙ্গে সঙ্গে পরিশ্রম করিবার ক্ষমতাও অত্যন্ত বাড়িতে লাগিল। ক্রমে তাহা হইতে অধ্যবসায় জন্মিল। সুতরাং মানুষ হইতে হইলে শৈশবে যে সকল সাধনার আবশ্যক-মনােযােগ, পরিশ্রম, স্মরণশক্তি, ঐকান্তিকতা ও অধ্যবসায় প্রভৃতি সমস্ত গুণরাশিই লাভ করিয়া তিনি ভবিষ্যতের মহা উন্নতির পথে চলিবার জন্য পা বাড়াইলেন। ইহার ফলে, পাঁচ বৎসর হইতে আট বৎসর বয়স পর্যন্ত—তিন বছরের মধ্যে তিনি বাঙ্গালা ও পারসী উত্তমরূপ শিখিয়া ফেলিলেন। তাহার এই অদ্ভুত শক্তি দেখিয়া কি হিন্দু কি মুসলমান পণ্ডিতগণ সকলেই অবাক হইয়া একবাক্যে ধন্য ধন্য করিতে লাগিলেন। তখনকার দিনে পারসী এবং আরবী ভাষাই এ দেশের রাজভাষা ছিল—ইংরাজীর সেই সবে সূচনা বলিলেও হয়। ঐ দুই ভাষাতেই অধিকাংশ কাষকৰ্ম্ম হইত। সুতরাং আরবী এবং পারসী ভাষা উত্তমরূপ শিখিতে না পারিলে কেহ কাহাকেও বিদ্বান্ বলিত না এবং ভাল রকম কর্মকাও জুটিত না। বালক রামমােহন যখন সেই অল্প বয়সে উত্তমরূপ পারসী শিখিয়া ফেলিলেন, তখন সকলেই তাঁহার পিতাকে কহিল-এ ছেলে ভবিষ্যতে একটি উজ্জ্বল রত্ন হইবে, এরূপ অমানুষিক শক্তি সচরাচর দেখিতে পাওয়া যায় না, সুতরাং ইহার ভবিষ্যৎ নষ্ট না করিয়া, শীঘ্রই ‘আরবী শিখিবার ব্যবস্থা করিয়া দিন।” কিন্তু আরবী শিক্ষার পক্ষে একটা মহা বাধা ছিল। পাটনার মৌলবীগণই সেই বিদ্যায় পণ্ডিত ছিলেন, অন্য কোন দেশে সেরূপ শিক্ষক মিলিত না। সুতরাং আরবী শিখিতে হইলে পাটনায় গিয়া শিক্ষা করিতে হইত।
রাজা রামমােহন রামমােহনের বয়স মাত্র নয় বৎসর। তাঁহার পিতামাতা বা অভিভাবকগণ সকলেই বাঙ্গালাবাসী—কর্মোপলক্ষে বাঙ্গালাতেই থাকিতে হয়, পাটনায় আপনার বলিতে কেহই নাই। ঐ টুকু বালককে একাকী কেমন করিয়া সেই বিদেশে রাখিয়া আরবী ভাষা শিখাইবেন? এদিকে এমন অদ্ভুত ক্ষমতাসম্পন্ন প্রতিভাশালী বালকের শিক্ষার বন্দোবস্ত না করিয়া দিলে তাহার ভবিষ্যৎ নষ্ট হইয়া যাইবে। কে বলিতে পারে—হয়ত সেই প্রতিভা, সেই শক্তি বিপথে চালিত হইয়া সংসারের কণ্টক স্বরূপ হইয়া উঠিতে পারে। অতএব যেমন করিয়াই হউক বালকের উত্তমরূপ বিদ্যাশিক্ষার বন্দোবস্ত করিয়া দিতেই হইবে। তাহার উপর আবার বালকের নিজের ঝোঁক ! একখানি নূতন কাপড় কিম্বা একটি নূতন খো পাইবার প্রত্যাশায় বালকেরা যেমন অস্থির হইয়া ছটফট করে—আরবী শিখিবার কথা উত্থাপন হওয়া অবধি রামমােহন তেমনি ছটফট করিতে ছিলেন। কতদিনে পাটনায় যাইবেন— কবে হইতে সেই নূতন ভাষা আরবী শিখিবেন—তাহার জন্য বালক অস্থির হইয়া উঠিল। আহার নাই—নিদ্ৰা নাই—খেলা নাই-কেবল ঐ এক কথা। সকলেই বুঝিল বালকের এ আগ্রহ—এ উৎসাহ ভঙ্গ হইয়া গেলে সে মনে দারুণ নিরাশার কষ্ট পাইবে এবং হয়ত একেবারে বিগড়াইয়া অধঃপাতে যাইবে; যেমন করিয়া হউক, রামমােহনের আরবী শিখিবার বন্দোবস্ত করিয়া দেওয়া সর্বাগ্রে আবশ্যক। সুতরাং রামকান্তকে তাহাই করিতে হইল। বিস্তর ভাবিয়া চিন্তিয়া তিনি বালককে পাটনায় রাখিয়া আরবী শিখিবার বন্দোবস্ত করিয়া দিলেন। নয় বৎসর বয়সে বালক রামমােহন পাটনায় গিয়া একজন বিখ্যাত মৌলবীর অধীনে থাকিয়া আরবী শিখিতে আরম্ভ করিলেন। এইখানে বাস করিবার সময় হইতেই রামমােহনের জীবনে একটা প্রধান পরিবর্তন ঘটিতে আরম্ভ হইল।
তৃতীয় পরিচ্ছেদ নয় বৎসর হইতে বার বৎসর বয়স পর্যন্ত তিনি পাটনায় মৌলবীর অধীনে থাকিয়া যেমন উত্তমরূপ ‘আরবী ভাষা শিখিলেন, তেমনি আর একদিকেও তাহার মতি গতি ধাবিত হইল। মুসলমানের পুস্তক পাঠে—অনবরত মুসলমানদের সঙ্গে থাকিয়া—তাহাদের সহিত আচার ব্যবহারে তিনি ক্রমে হিন্দুদের প্রতিমা পূজায় দোষ দেখিতে শিখিলেন এবং তাহার ফলে অবশেষে একমাত্র নিরাকার ঈশ্বরের আরাধনার সাপেক্ষ হইয়া প্রতিমা পূজার ঘােতর বিরােধী হইয়া উঠিলেন। তাহার প্রতিভা অদ্ভুত, সেই প্রতিভার বলে বার বৎসর বয়সের মধ্যেই বাঙ্গালা, পারসী এবং আরবীতে পণ্ডিত হইয়া তাহার যেমন জ্ঞানবৃদ্ধি হইল, সঙ্গে সঙ্গে যুক্তি দেখাইয়া তর্ক করিবার শক্তিও তেমনি বাড়িল। তার উপর বক্তৃতা করিবার শক্তি অভ্যাস করাতে তাহার পক্ষে যেন সােনায়-সােহাগা হইল। সুতরাং যখন তিনি প্রতিমাপূজার বিপক্ষে দাঁড়াইয়া একমাত্র নিরাকার ঈশ্বরবাদী হইলেন, তখন কেহ তর্ক-যুক্তি কিম্বা কথাবার্তায় হারাইয়া তাহাকে আর হিন্দুদের দেব-দেবী পূজার পক্ষ করিতে পারিল না। সেই অবস্থায় আরবী পড়া শেষ করিয়া তিনি কাশীতে সংস্কৃত শিক্ষা করিবার জন্য গমন করিলেন। তৃতীয় পরিচ্ছেদ বার বৎসর বয়সে কাশীতে আসিয়া রামমােহন, অক্লান্ত পরিশ্রম, ঐকান্তিক মনোেযােগ এবং বিপুল অধ্যবসায়ের সহিত সংস্কৃত পড়িতে আরম্ভ করিলেন এবং অতি শীঘ্রই সেই ভাষা উত্তমরূপে শিখিয়া ফেলিলেন।
রাজা রামমােহন করা পাটনায় বাস করিবার সময়ে কি ক্ষণে যে তাহার মনে প্রতিমা পূজার প্রতি অভক্তি এবং বিদ্বেষ জন্মিয়াছিল—সেই হইতে তিনি কেবল ধর্মচর্চায় মন দিলেন। কোন্ ধৰ্ম্ম ঠিক—কোন্ ধৰ্ম্ম খাঁটি কেমন ভাবে আরাধনা করিলে ঈশ্বরের কৃপালাভ হয়—কোন্ ভ্রমপূর্ণ ধৰ্ম্ম-পথে চলিয়া মানুষ কষ্ট পায়,-কোন্ ভাবে, কিরূপে ধর্মচর্চা উচিত—ইত্যাদি ব্যাপারের আলােচনার জন্য তিনি কাব্য, সাহিত্য, অলঙ্কার, ব্যাকরণ প্রভৃতি ছাড়াও সংস্কৃত শাস্ত্রগ্রন্থসকল—পুরাণ, উপনিষদ, বেদ, বেদান্ত প্রভৃতি পড়িতে মন দিলেন। তাহার প্রতিভা অদ্ভুত, পরিশ্রমের শক্তি—অসীম, সুতরাং অল্পকাল মধ্যেই ঐ সকল কঠিন কঠিন বিষয়গুলিতেও তিনি পরম পণ্ডিত হইয়া উঠিলেন। ইহার ফলে তাঁহার অন্তরে সেই পূৰ্বভাব আরও দৃঢ়তর হইয়া বসিল। বেদান্ত পড়িবার ফলে প্রতিমাপূজার উপর দৃঢ় অশ্রদ্ধা স্থায়ী ভাবে জন্মিল, উপনিষদ প্রভৃতি পাঠে চক্ষের সম্মুখে যেন নূতন আলাে জ্বলিয়া উঠিল, সেই আলােকে তাহার অন্তরে ব্রহ্ম-জ্ঞান জাগিল। এই সময়ে কাশীর ব্রাহ্মণগণের গোঁড়ামি এবং অত্যাচার প্রভৃতি দেখিয়া তিনি আরাে হাড়ে হাড়ে চটিয়া উঠিলেন। তাহাতে উপনিষদ এবং বেদান্ত পাঠের ফল তাহার অন্তরে পূর্ণমাত্রায় আপনার আধিপত্য বিস্তার করিয়া বসিবার সুবিধা পাইল। প্রকৃত হিন্দুত্ব কি? যথার্থ হিন্দুর কি রকম হওয়া উচিত? বৈদিক হিন্দুধৰ্ম্ম যে শ্রেষ্ঠ ও সর্বোচ্চ ধৰ্ম্ম, এই সকল যতই তিনি আলােচনা করিয়া স্থির করিতে লাগিলেন, ততই সেই কালের হিন্দু-সমাজের সঙ্কীর্ণতা ও কুসংস্কারের প্রতি দৃষ্টি পড়িয়া-তাহাকে ভয়ানক সমাজবিদ্বেষী করিয়া তুলিল। এদিকে তিনি অত্যন্ত স্পষ্টবাদী এবং নির্ভীক প্রকৃতির লােক। সুতরাং অতিশয় বয়ােবৃদ্ধের দোষ দেখিলেও তাহা উপেক্ষা করিতে পারিলেন না, তাহাদের অন্যায় সহ-হইল না। তিনি সামান্য বালক তৃতীয় পরিচ্ছেদ হইয়াও তাহাদের মুখের উপর স্পষ্ট কথা বলিয়া তর্ক করিতে আরম্ভ করিলেন। অল্পবয়স্ক বালককে কাশীর মত স্থানে বড় বড় ব্রাহ্মণ-পণ্ডিতের সঙ্গে তাহাদের দোষ ধরিয়া তর্ক করিতে দেখিয়া ব্রাহ্মণ-পণ্ডিতগণ সকলেই মনে মনে রামমােহনের উপর ভারি চটিয়া গেলেন ; সকলেরই ইচ্ছা হইল যে তাহাকে সেখান হইতে দূর করিয়া দেন। কিন্তু সেই সকল বড় বড় মহামহােপাধ্যায় পণ্ডিতদের মধ্যে এমন বিদ্যা বুদ্ধি পাণ্ডিত্য ও শক্তি কাহারও ছিল না, যে ন্যায়মত, শাস্ত্রমত যুক্তিতর্কদ্বারা হারাইয়া তাহাকে নিরস্ত করেন। সুতরাং তাঁহারা কীল খাইয়া কীল চুরি করিতে লাগিলেন। মনে মনে বালকের অদ্ভুত পাণ্ডিত্য ও শক্তির প্রশংসা করিয়া, বাহিরে তাহাকে ‘নাস্তিক’ বলিয়া, যেন অগ্রাহ্য করিয়া তাঁহার কথা উড়াইয়া দিয়া, মনের আপশােষ মিটাইতে লাগিলেন। রামমােহন পণ্ডিতবর্গের এই রকম অবস্থা দেখিয়া মনে মনে হাসিলেন, কিন্তু তাহাদের অন্যায় অত্যাচার কিছুতেই চুপ করিয়া সহিতে পারিলেন না। তাহার প্রাণের মধ্যে ভগবান্ যে ব্ৰহ্মজ্ঞানের উজ্জ্বল আলােক জ্বলিয়া দিয়াছিলেন সেই আলােকের সাহায্যে তিনি প্রকৃত ধৰ্ম্মরক্ষার জন্য নূতন পথ ধরিলেন। তিনি দেখিলেন যে কেবল দুই চারি জায়গায় পাঁচজনকে জড় করিয়া হিন্দুদের দোষ দেখাইয়া মুখখামুখী তর্ক করিলে ফল হইবে না— সমস্ত দেশে দেশে এ বিষয় লইয়া আন্দোলন করিতে হইবে—তবে যদি হিন্দুদের এ কুসংস্কার দূর হয়। এই সব ভাবিয়া তিনি প্রতিমাপূজা উঠাইয়া দিবার জন্য—তাহার বিরুদ্ধে নানাপ্রকার যুক্তিতর্ক দেখাইয়া একখানি পুস্তক লিখিলেন। তখন তাহার বয়স ষােল বৎসর মাত্র। পুস্তকে তাঁহার অসীম বিদ্যা, তীক্ষ্ণ বুদ্ধি, গভীর পাণ্ডিত্য এবং সূক্ষ্ম ও জটিল ধর্মতত্ত্বের সরল যুক্তিতর্কসকল প্রকাশ পাইল।
১৪ রাজা রামমােহন বড়মানুষের সন্তান--অর্থের অভাব বা অনাটন নাই—সেই প্রথম পুস্তক লিখিয়া তিনি প্রচার করিলেন। তাহাতে চারিদিকে একটা মহা আন্দোলন পড়িয়া গেল-রামমােহনকে ‘নাস্তিক’ ‘বিধর্মী বলিয়া অনেকেই নিন্দা করিতে আরম্ভ করিল। তাহার পর সংস্কৃত পড়া শেষ করিয়া রামমােহন কাশী হইতে দেশে আসিলেন, এবং নিজের পুস্তক প্রচার ও তাহার মত চালাইবার জন্য চেষ্টা আরম্ভ করিলেন। তখন সকলেই তাঁহার নিন্দা আরম্ভ করিয়া নানা কথা কহিতে লাগিল। বাপ-মা এবং আত্মীয়স্বজনগণের প্রাণে তাহার নিন্দা সহিল না, তাঁহারা তাঁহাকে বিস্তর বুঝাইয়া সে সকল আলােচনা ত্যাগ করিতে কহিলেন এবং তাহার পুস্তকগুলি নষ্ট করিতে বলিলেন। কিন্তু রামমােহন তাহাদের কোন কথা শুনিলেন না। তখন তাহাকে শাসন করিয়া বশীভূত করিবার আশায় পিতা ভয় দেখাইলেন, কহিলেন, তিনি ধৰ্ম্মের তর্ক সকল না ছাড়িলে তাঁহারা বাড়ী হইতে তাঁহাকে দূর করিয়া দিবেন। কিন্তু নির্ভীক, স্বাধীনচিত্ত, পণ্ডিত বালক রামমােহনের প্রাণে সে ভয় স্থান পাইল না। তিনি কাহারও কথায় কাণ না দিয়া আপনার কৰ্তব্য করিয়া যাইতে লাগিলেন। ইহা দেখিয়া পরম বৈষ্ণব, গোঁড়া হিন্দু রামকান্ত রায় অত্যন্ত রাগিয়া গেলেন, এবং পুত্রের মায়া কাটাইয়া তাহাকে বাড়ী হইতে বিদায় করিয়া দিলেন। রামমােহন তাহাতেও টলিলেন না। যােল বৎসরের বালক গৃহ হইতে তাড়িত হইয়া-বন্ধুবান্ধবের স্নেহ হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া কাতর হইল না, ভয় পাই না বরং আপনার উপর নির্ভর করা শিখিবার জন্য পরম উৎসাহে বুক ফুলাইয়া নিজের পায়ে ভর দিয়া দাড়াইল। সেই আত্ম-নির্ভরতাই ভবিষ্যতে রামমােহনকে যশের উচ্চ-সিংহাসনে বসাইয়া তাহার নাম ও কীৰ্ত্তি ইতিহাসে অমর করিয়া রাখিল।
তৃতীয় পরিচ্ছেদ তখনকার দিনে এমন সব ভাল ভাল পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাজপথ ছিল না, রেলওয়ে-স্টীমারেরও ছড়াছড়ি হয় নাই, গােৰু বা ঘােড়ার গাড়ীও বেশী মিলিত না। অধিকাংশ রাস্তাই জঙ্গলপূর্ণ সুতরাং ভয়সঙ্কুল ছিল। সেই সকল রাস্তায় আবার দস্যু তস্করের উপদ্রবও কম ছিল না। কাযেই দেশ-দেশান্তরে ভ্রমণ করা বড়ই কষ্টকর এবং বিপজ্জনক ছিল। কিন্তু যােল বৎসরের বালক রামমােহন সে সকল কিছুই গ্রাহ করিলেন না। গৃহ হইতে তাড়িত হইয়া তিনি কেবল মাত্র নিজের শক্তির উপরে নির্ভর করিয়া পায়ে হাঁটিয়া দেশদেশান্তরে ভ্রমণ করিতে লাগিলেন। এই ভ্রমণের ফলে তাহার জ্ঞান বৃদ্ধি হইতে লাগিল, এবং সমাজের কোথায় কোন্ কোণে আবর্জনা রহিয়াছে, কি কারণে হিন্দু- সমাজ অবনতির পথে চলিয়াছে—সে সকল স্পষ্ট দেখিতে পাইলেন। এই বহুদর্শিতা এবং বিজ্ঞতা অবলম্বন করিয়া তিনি নিজের ভবিষ্যৎ পথ ঠিক করিয়া লইলেন। রামমােহন জমীদারের সন্তান—আজন্ম সুখের ক্রোড়ে পালিত, তথাপি সে দশায় পড়িয়া বিন্দুমাত্র বিচলিত হইলেন না। শারীরিক সকল কষ্টই নীরবে সহ্য করিতে শিখিলেন। আপনার সুখস্বাচ্ছন্দ্য ও বিলাসিতার দিকে কিছুমাত্র দৃষ্টিপাত করিলেন না, মহাযােগীর মত নশ্বর সংসারের সকল বিষয়ে উপেক্ষা করিয়া কেবলমাত্র আপনার কর্তব্য সাধনের উপায় করিতে লাগিলেন। এইরূপে ভ্রমণ করিতে করিতে সেই বালক বয়সেই তিনি সুদূর তিব্বতে গিয়া উপস্থিত হইলেন। দিনকতক সেখানে বাস করিবার পরেই তাহার তীক্ষ্ণদৃষ্টি সমাজের এবং ধর্মের সকল ভ্রমপূর্ণ কুসংস্কারগুলি দেখিতে পাইল। তখন তিনি সে সকল নিবারণ করিবার জন্য উঠিয়া পড়িয়া লাগিলেন। প্রতিমা পূজা, মানুষকে দেবতাজ্ঞানে পূজা, প্রভৃতি ব্যাপার রাজা রামমােহন লইয়া, সেই সকল রীতি-নীতির বিরুদ্ধে সেখানকার লােকেদের মধ্যে মহা আন্দোলন বাধাইয়া বক্তৃতা দিতে লাগিলেন। তখন সেখানকার সকলেই তাহার ঘােরর শত্রু হইয়া উঠিল, এমন কি তাহার প্রাণ সংশয় উপস্থিত হইল। কেবল কতকগুলি স্নেহপূর্ণ কোমলপ্ৰাণা রমণীর সাহায্যে সেবার প্রাণে বাঁচিয়া গেলেন। সেই হইতেই নারী জাতির প্রতি তাঁহার প্রাণে অত্যন্ত ভক্তি-শ্রদ্ধা ও সম্মান বদ্ধমূল হইয়া গেল। রমণীগণের দয়ায় তাহার প্রাণ রক্ষা হইল বটে কিন্তু সেখানে সকলেই শত্রু, সুতরাং কষ্টের একশেষ হইতে লাগিল; কিন্তু-অটলহৃদয়, নির্ভীক ও দৃঢ়-চিত্ত রামমােহন তাহাতেও একটুমাত্র বিচলিত হইলেন না, প্রাণের মায়া, দেহের কষ্ট, দেশবাসীর শত্রুতা—সমস্ত উপেক্ষা করিয়া দিবারাত্রি কেবল আপনার কর্তব্য সাধন করিতে লাগিলেন। এদিকে রামমােহনের পিতা পুত্রের দুরবস্থার কথা শুনিতে পাই- লেন, তখন বাপের প্রাণ কাঁদিয়া উঠিল, তিনি আর নিশ্চিন্ত থাকিতে পারিলেন না—তাহাকে বহুযত্নে তিব্বত হইতে গৃহে ফিরাইয়া আনিলেন। তখন তাঁহার বয়ঃক্রম কুড়ি বৎসর। দেশে ফিরিয়া আসিয়া রামমােহন ইংরাজী পড়িতে আরম্ভ করিলেন এবং পূৰ্ব্ববৎ পরিশ্রম, ঐকান্তিকতা এবং চেষ্টা ও অধ্যবসায়ের ফলে অতি শীঘ্র ইংরাজী ভাষায় পরম পণ্ডিত হইয়া উঠিলেন। তখন একে একে হিব্রু, গ্রীক, লাটিন, ফ্রেঞ্চ, উদ্ প্রভৃতি পড়িতে আরম্ভ করি- লেন, এবং দেখিতে দেখিতে অতি অল্প দিনের মধ্যেই তিনি দশটা ভাষা শিখিয়া প্রত্যেক ভাষাতেই পরম পণ্ডিত হইয়া উঠিলেন। তখনকার কালে ঐরূপ সকল ভাষাতেই পরম পণ্ডিত এক রামমােহন ভিন্ন আর দ্বিতীয় ব্যক্তি ছিলেন না। লােকে জীবনপাত করিয়াও একটা ভাষাতে পণ্ডিত হইতে পারে না—কিন্তু যুবক রামমােহন যৌবন কালের মধ্যেই দশটা ভাষাতে চতুর্থ পরিচ্ছেদ মহা পণ্ডিত হইয়া উঠিলেন। এমন কি বড় বড় বিদ্বান্ সাহেবেরাও তাহাকে একবাক্যে অদ্বিতীয় পণ্ডিত বলিয়া স্বীকার করিয়া তাহার কাছে মস্তক নত করিতেন। ইহা বাঙ্গালীর ছেলের পক্ষে কম সৌভাগ্যের কথা নহে। ধন্য তাহার চেষ্টা, যত্ন, পরিশ্রম ও অধ্যবসায়। সাধনার অসাধ্য কি থাকিতে পারে ? চতুর্থ পরিচ্ছেদ দেশে ফিরিয়া রামমােহন যেমন নানা ভাষা শিখিতে লাগিলেন, সেই সঙ্গে সঙ্গে সেই সকল ভাষার—সেই সকল জাতির ধর্ম পুস্তকসকল পড়িয়া তাহার ভিতর হইতে প্রকৃত ও পবিত্র ধৰ্ম্মের তথ্য সকল সংগ্রহ করিতে লাগিলেন। জ্ঞান উপার্জনে তাহার এমন প্রবল লালসা—প্রকৃত ধর্মের সত্য ও তত্ত্ব আবিষ্কার করিতে এমন আকুল আগ্রহ, যে তিনি আহার-বিহার, আরাম-বিরাম ভুলিয়া গেলেন—দিবারাত্রি পুস্তকে মগ্ন হইয়া রহিলেন। তাঁহার পাঠের শক্তি, অধ্যবসায়, চেষ্টা, পরিশ্রম, ঐকান্তিকতা প্রভৃতি গল্পের মত প্রবাদ বাক্য হইয়া দাঁড়াইল। বাল্যকাল হইতে মানুষ যে রকম ভাবে চলে, বয়সকালে তাহাই তাহার স্বভাব হইয়া দাঁড়ায়। রামমােহন বাল্যকাল হইতেই খেলা-ধূলা, গল্প-গুজব করা ছাড়িয়া, কেবল বিদ্যা-শিক্ষা এবং জ্ঞান-উপার্জনেই মন দিয়াছিলেন, সুতরাং বয়সের সঙ্গে সঙ্গে তাহার স্বভাবও ঠিক সেইরূপ হইয়া দাঁড়াইল। তাহার পড়িবার স্পৃহা, পরিশ্রম করিবার শক্তি, ঐকান্তিকতা, আগ্রহ, চেষ্টা, যত্ন ও অধ্যবসায় এরূপ বাড়িল যে ঠিক তাহা উপকথার গল্পের মত, শুনিয়া লােকে অবাক্ হইয়া চাহিয়া রহিল, আশ্চর্য হইয়া মনে মনে ভাবিল-মানুষ কি এ রকম হইতে পারে ?
১৮ রাজা রামমােহন বৃহৎ সাতকাণ্ড রামায়ণ রামমােহন এক দিনে শেষ করিলেন। তাও শুধু গল্পের ছলে পড়া নয়—প্রত্যেক শ্লোকের মর্ম বুঝিয়া, ভাব গ্রহণ করিয়া, ভাষার দোষগুণ ও সৌন্দর্য নির্ণয় করিয়া একেবারে অন্তরে গাঁথিয়া ফেলা! সকাল হইতে রামায়ণ লইয়া সেই যে দরজা বন্ধ করিয়া পড়িতে বসিলেন, এক মুহূর্তের জন্যও উঠিলেন না,-আহার, নিদ্রা, বিশ্রাম ভুলিয়া গেলেন। বই শেষ করিয়া যখন বাহিরে আসিলেন, তখন বেলা শেষ হইয়া গিয়াছে। এরূপ অক্লান্ত অধ্যবসায়, বিদ্যাভাসে এরূপ যত্ন ও আগ্রহ না থাকিলে কেহ কি তাহার মত ভুবনবিখ্যাত পণ্ডিত হইতে পারে ? এরূপভাবে যিনি দেবী সরস্বতীর সাধনা করেন, দেবী কি তাহাকে জয়মালো ভূষিত না করিয়া থাকিতে পারেন ? এইরূপ সাধনাতেই রামমােহন মায়ের পূর্ণ দয়া-ভগবানের বিশেষ অনুগ্রহ লাভ করিলেন। তাহার পাণ্ডিত্যের কথা দেশ-বিদেশে রাষ্ট্র হইয়া পড়িল, তখন স্বদেশেও তাহার কথা আর সহজে উড়াইয়া দিবার যাে রহিল না। বিশেষ যখন তিনি ধর্ম ও সমাজ-সংস্কার করিবার চেষ্টায়ই ফিরিতেছেন, তখন তাঁহাকে শাস্ত্রালাপে হারাইয়া নিরস্ত করিবার জন্য হিন্দু- সমাজের অনেকের আগ্রহ জন্মিল। বিস্তর বড় বড় মহামহােপাধ্যায় পণ্ডিত আসিয়া তাহার সহিত শাস্ত্রের তর্ক করিতে আরম্ভ করিলেন, কিন্তু সকলেই চমৎকৃত হইয়া দেখিলেন যে রামমােহনের বিদ্যা বুদ্ধি পাণ্ডিত্যের কাছে তাহারা বালকমাত্র ; কেহই তাহাকে পরাস্ত করিতে পারিলেন না, সকলেই হারিয়া গিয়া মনে মনে তাহার শ্রেষ্ঠত্ব মানিয়া লইতে লাগিলেন। এইরূপে একজন পণ্ডিত আসিয়া হারিয়া গেলে, আবার আর একজন আসিলেন। মধ্যে মধ্যে প্রায়ই এইরূপ চলিতে লাগিল। একবার একজন পণ্ডিত আসিয়া তাহার সহিত তন্ত্র-সম্বন্ধে আলােচনা চতুর্থ পরিচ্ছেদ এবং তর্ক করিতে চাহিলেন। রামমােহন শাস্ত্র-গ্রন্থ সকলই পড়িয়া- ছিলেন কিন্তু তন্ত্র পড়েন নাই—সুতরাং তিনি তন্ত্র-সম্বন্ধে কিছুই জানিতেন বা বুঝিতেন না। পণ্ডিত আসিয়া যখন সেই তন্ত্র-সম্বন্ধে আলােচনা এবং তর্ক করিতে চাহিলেন—তখন তিনি হটিলেন না—মনে মনে ঠিক করিলেন এই নূতন বিষয়টি পড়িয়া তর্ক করিবেন। এই স্থির করিয়া পণ্ডিতকে পরদিন আসিতে বলিলেন, এবং সেই দিনই শােভাবাজারের স্বর্গীয় রাজা রাধাকান্ত দেব বাহাদুরের বাটী হইতে একখানি শ্রেষ্ঠ তন্ত্র চাহিয়া আনিলেন। তঁাহার এরূপ আশ্চৰ্য্য মনের বল এবং আত্মনির্ভরের শক্তি যে একদিনের মধ্যে সেই সম্পূর্ণ অজ্ঞাত কঠিন তন্ত্রখানি আগাগােড়া চমৎকার রূপ আয়ত্ত করিয়া ফেলিলেন। পরদিন পণ্ডিত আসিলে তিনি অনায়াসে তাহার সহিত তর্ক আরম্ভ করিয়া দিলেন। কঠিন কঠিন সূক্ষ্ম-তত্ব সকল এরূপ চমৎকার ভাবে আলােচনা পূৰ্ব্বক তর্ক করিতে লাগিলেন যে তন্ত্রে রামমােহনের অসাধারণ ব্যুৎপত্তি দেখিয়া পণ্ডিত অবাক্ হইলেন এবং শেষে পরাস্ত হইয়া প্রস্থান করিলেন। এদিকে এই সকল ঘটনায় বিদ্যা বুদ্ধি পাণ্ডিত্যে সকলকে যতই হারাইতে লাগিলেন, ততই তাহার মনে সমাজের ও ধর্মের কুসংস্কার সকল দূর করিবার জন্য ঐকান্তিক আগ্রহ জন্মিল, তিনি যেখানে সেখানে যার তার সঙ্গে তর্ক করিয়া সমাজের ও ধর্মের দোষ দেখাইতে আরম্ভ করিলেন। দেশে যেটা যুগ-যুগান্তর হইতে পুরুষানুক্রমে লােকের হাড়ে হাড়ে গাঁথিয়া গিয়াছে—সে সংস্কার সহসা দূর করা বড় সহজ কথা নয়। বাপ-ঠাকুরদাদা যাহা চিরকাল করিয়া গিয়াছেন—যে পথে চলিয়া গিয়া- ছেন—লােকে তাহাই করিতে চায়, সেই পথেই চলে। যদি কেহ কখনো রাজা রামমােহন সেই সকলের মধ্যে দোষ দেখাইয়া দেয়, অমনি লােকের মনে বড় আঘাত লাগে, পূর্ব পুরুষের নিন্দা ও অপমান করিতেছে ভাবিয়া সকলেই তাহার উপর অত্যন্ত চটিয়া যায় এবং তাহাকে দমন করিতে চেষ্টা করে। রামমােহনের ভাগ্যেও সেইরূপ ঘটিল। প্রতিমাপূজার বিরুদ্ধে তিনি যখন বিস্তর দোষ দেখাইয়া তর্ক আরম্ভ করিলেন, লােকে তাঁহাকে নাস্তিক বলিয়া ঘৃণা করিল ; কোন মনুষকে দেবতাজ্ঞানে পূজা করিতে যখন নিষেধ করিলেন, তখন লােকে তাহাকে বিধর্মী ম্লেচ্ছ বলিয়া দূর করিয়া দিতে লাগিল; তার উপর সতী- দাহ নিবারণের জন্য যখন তিনি বক্তৃতা আরম্ভ করিলেন তখন সকলেই তাহাকে সমাজের মহা অনিষ্টকারী শত্রু ভাবিয়া দমন করিতে চেষ্টা ; পাইল। ক্রমে দেশে সকলেই রামমােহনের ধৰ্ম্ম ও সমাজ-সংস্কারের চেষ্টায় উত্ত্যক্ত হইয়া তাহার ঘােরতর শত্রু হইয়া দাড়াইল। তাঁহার পিতা রামকান্ত রায়ের কাছে প্রত্যহ নালিশের উপর নালিশ আরম্ভ হইল। শেষে এমন ঘটিল যে পুত্রের জন্য অত বড় সন্ত্রান্ত জমীদারকেও বুঝি একঘরে হইতে হয়। তিব্বত হইতে পুত্রকে যখন ঘরে ফিরাইয়া আনেন, তখন রামকান্ত রায় মনে ভাবিয়াছিলেন যে, বিদেশে অশেষ দুঃখ, কষ্ট ও লাঞ্ছনা সহ্য করিয়া রামমােহন সাবধান হইয়াছেন, আর কখনও সেরূপ করিবেন না, কিন্তু এখন দেখিলেন—তাহা নহে, তিনি ছাই চাপা আগুন। দেশের সমস্ত লােকের শত্রুতা, পিতা-মাতা আত্মীয় বন্ধু-বান্ধবের বিরাগ, অবিরত ঘৃণা, নিন্দা, লাঞ্ছনা-সমস্ত উপেক্ষা করিয়া বীরের মত—তিনি যখন সমান ভাবে নিজের পথ ধরিয়া চলিয়াছেন, তখন কেহই আর কোন রকমে তাহাকে সে পথ হইতে ফিরাইতে পারিবেন না। অমন অদ্বিতীয় গুণবান সন্তান যে এমন হইয়া যাইবেন, তাহাতে তিনি যত না দুঃখিত চতুর্থ পরিচ্ছেদ হইলেন, পাছে সমাজচ্যুত হইতে হয় সেই ভয়ে ততােধিক ভীত হইয়া পড়িলেন। পুত্রকে আর ঘরে রাখা চলে না, সে যখন কিছুতেই তাহার নিজের গোঁ ছাড়িবে না, কাহারও কথা মানিবে না, দেশের সমস্ত লােকের বিরুদ্ধে এক বুক ফুলাইয়া চলিবে, তখন আর উপায় কি? কাযেই তিনি অমন পুত্রকে গৃহ হইতে আবার তাড়াইয়া দিতে বাধ্য হইলেন এবং একদিন লােক ডাকাইয়া সকলের সম্মুখে রামমােহনকে দ্বিতীয়বার বিদায় করিয়া দিলেন। এতদিন বাপ-মা, আত্মীয়-স্বজন প্রভৃতির ভয়ে রামমােহন বরং অনেকটা চাপিয়া চলিতেছিলেন, এক্ষণে—সকলের সম্মুখে দূরীভূত হইয়া তাঁহার সে ভয়, সে সঙ্কোচ ঘুচিয়া গেল, আপনার উদ্দেশ্য সিদ্ধি করিবার পথ করিতে লাগিলেন। মহাবীরের মত সকলের বিপক্ষে একাকী সমাজের সম্মুখে দাঁড়াইয়া দিবারাত্রি উচ্চকণ্ঠে তাহাদের দোষ ঘােষণা করিতে লাগিলেন, সতীদাহ নিবারণ করিবার জন্য নানা প্রকার চেষ্টা আরম্ভ করিলেন। বইয়ের উপর বই লিখিয়া নিজব্যয়ে ছাপাইয়া প্রচার করিতে লাগিলেন। ইহার ফলে দেশের লােক তাহার এমন শক্ত হইয়া উঠিল যে তাহাকে টিপিয়া মারিতে পারিলে তবে তাহাদের রাগ যায়। তবুও রামমােহন এক পদ টলিলেন না কিম্বা ভীত বা নিরাশ হইলেন না। ভগবানের উপর অটুট বিশ্বাস এবং আত্ম-শক্তির উপর ঐকান্তিক নির্ভর করিয়া চলিলেন—কে তাহার উন্নতির পথে বাধা জন্মাইতে পারে ? যাহারা ঈশ্বরে বিশ্বাস রাখিয়া আত্মশক্তির উপর সম্পূর্ণ নির্ভর করিয়া চলিতে পারে, ভগবান পদে পদে তাহাদের সহায় হন। রাম- মােহনেরও তাহাই হইল । দেশের লােক শত্রু হইয়া তাহার নিন্দা রটাইতে লাগিল বটে, কিন্তু বিদেশী পণ্ডিতগণ, বড় বড় রাজপুরুষ এবং রাজা রামমােহন Y পণ্ডিত সাহেবগণ তাহার অদ্ভুত শক্তির পরিচয় পাইয়া তাহার অন্তরঙ্গ বন্ধু হইয়া উঠিতে লাগিলেন এবং তাহার অদ্বিতীয় প্রতিভার যথেষ্ট আদর ও সম্মান করিতে আরম্ভ করিলেন। ইহাতে রামমােহনের বল যেন দশগুণ বাড়িয়া গেল। পঞ্চম পরিচ্ছেদ ১২২০ সালে রামমােহনের পিতা রামকান্ত রায়ের মৃত্যু হইল। রাম- মােহন সমাজচ্যুত-গৃহতাড়িত হইলেও মনে মনে বড়ই পিতৃভক্ত ছিলেন, স্বাধীন হইয়াও পিতার সম্মান রক্ষার্থ সম্পূর্ণরূপে ইচ্ছামত আপনার কৰ্ত্তব্য-পথে চলিতে পারেন নাই। এতদিনে তিনি যেন সকল বন্ধন কাটাইয়া উঠিলেন। মধ্যাহ্নের সূর্যের মত প্রখর প্রভাবে, বিপুল অধ্যব- সায়ের বলে সৰ্ব্বরকমে ধৰ্ম্ম ও সমাজের সংস্কারে মন দিলেন। অষ্টপ্রহর চারিদিকে বক্তৃতা করিতে লাগিলেন এবং নানাপ্রকার পুস্তক লিখিয়া নানাভাষায় ছাপাইয়া বিলাইতে আরম্ভ করিলেন। এতদিন যদিও বা দুই একজন আত্মীয় এবং অন্তরঙ্গ বন্ধু সহায় ছিলেন—এখন সকলেই তাঁহার বিপক্ষ হইয়া উঠিলেন এমন কি তাহার মাতা পৰ্য্যন্ত পুত্রের বিরােধী হইয়া দাঁড়াই- রামমােহন যেমন পিতৃভক্ত ছিলেন, মনে মনে মাতাকেও তেমনি মহাদেবী জ্ঞানে ভক্তি, সম্মান ও পূজা করিতেন। মা বিপক্ষ হইলে তাহার মনে বড় ঘা লাগিল, কিন্তু ভগবানের উপর বিশ্বাস ও আত্ম- নির্ভরের ফলে তিনি শীঘ্রই শান্ত হইলেন। ভাবিলেন-জননীর এই ভ্রমপূর্ণ কুসংস্কার শীঘ্রই ঘুচিবে, তখন তিনি আবার তাহার স্নেহের ক্রোড়ে স্থান পাইবেন। পিতার মৃত্যু হইলে রামমােহন যখন মহাপ্রতাপে সমাজের নেন।
পঞ্চম পরিচ্ছেদ সহিত সম্মুখযুদ্ধে দাঁড়াইলেন, তখন পাছে পৈতৃক অতুল বিষয়-সম্পত্তি বিধর্মী পুত্র দখল করিয়া নষ্ট করে সেই ভয়ে আত্মীয় স্বজন বড়ই ভীত হইলেন, এবং রামমােহনের মাতাকে দিয়া পুত্রের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে নালিশ রুজু করাইলেন-পুত্র বিধর্মী, সে যেন পৈত্রিক বিষয়-সম্পত্তি পায়। মাতা-পুত্রে মােকদ্দমা !—এ এক বিচিত্র ব্যাপার। কিছুদিন ধরিয়া সে মােকদ্দমা চলিল। প্রথমতঃ মনে মনে দারুণ ঘৃণায় রাম- মােহন ভাবিয়াছিলেন যে এ মােকদ্দমায় দাড়াইবেন না—বিষয়-সম্পত্তি তাহার প্রয়ােজন নাই। কিন্তু তারপরে ভাবিয়া দেখিলেন, যদি তিনি সেরূপ করেন, এ মােকদ্দমায় হারিয়া যান, তাহা হইলে তাহার খ্যাতি- প্রতিপত্তি একেবারে লােপ পাইবে, কেহ আর তাহাকে মানিতে চাহিবে না। তাহাতে তাহার ইষ্টসিদ্ধির পথে বড় বাধা হইবে। তখন তিনি মােকদ্দমায় দাড়াইলেন। অবশেষে আদালতের বিচারে মাতা হারিলেন, তাহারই জয় হইল—তিনি সমস্ত বিষয়-সম্পত্তির অধিকার পাইলেন। কিন্তু রামমােহন বিষয়-সম্পত্তি ভােগ করিবার জন্য সংসারে আসেন নাই। যে মহাব্ৰত লইয়া—যে সাধনার জন্য তিনি জন্মিয়াছিলেন, তাহাতে বিষয়-সম্পদ, ভােগ-বিলাসের প্রতি তাঁহার মােটেই লালসা বা ইচ্ছা ছিল না। তিনি সংসারের মঙ্গলসাধন করিতে আসিয়াছেন, একনিষ্ঠ যােগীর মত সকল উপেক্ষা করিয়া তাহাই সাধন করিয়া যাইবেন, ইহাই তাহার একমাত্র উচ্চ অভিলাষ। তিনি অর্থ-সম্পদ, বিষয়-বিভব লইয়া কি করিবেন ? রামমােহন মােকদ্দমায় জিতিয়া সমস্ত পৈতৃক বিষয়ের অধিকার লাভ করিলেন বটে, কিন্তু নিজে তাহা লইলেন না, সমস্তই ভক্তিভরে মাতার চরণে অৰ্পণ করিয়া প্রণাম করিলেন। তখন সকলেই তাঁহার মহত্ত্ব বুঝিতে পারিয়া তাহার প্রশংসা করিতে লাগিল।
২৪ রাজা রামমােহন তিনি দেখিলেন যে সংসারে খুব মান্য গণ্য সন্ত্রান্ত হইতে না পারিলে, উচ্চ-রাজপদে না বসিতে পারিলে, সহজে লােকে বশীভূত হইবে না। আর লােকে বশীভূত না হইলে তিনি কিছুতেই ধৰ্ম্ম ও সমাজের সংস্কার করিতে পারিবেন না। শুধু বিদ্যাবুদ্ধি ও পাণ্ডিত্যে এ কায হইবার নয়, তাহার সঙ্গে সঙ্গে উচ্চপদ ও সম্মান লাভ করা আবশ্যক। এই ভাবিয়া তিনি কোন উচ্চ রকমের রাজকার্যে ভত্তি হইবার ইচ্ছা করিলেন। তখন ‘ডিগবী সাহেব রংপুরের কালেক্টার। রামমােহনের সহিত বিস্তর বড় বড় সাহেব সুবাের পরিচয় ছিল—তাহারা তাহাকে যথেষ্ট আদর ভক্তি ও সম্মান করিতেন। ডিগবী সাহেবও তাহাকে ভালরকম চিনিতেন ও জানিতেন। রামমােহন চাকরি করিবার ইচ্ছায় ডিগবী সাহেবের কাছে দরখাস্ত করিলেন। কিন্তু সে দরখাস্তে লিখিলেন যে—চাকরি স্বীকার করিলেও—তিনি উপরওয়ালাদের কাহারও কাছে হীনতা স্বীকার করিবেন না, সকলের সঙ্গে তাহাকেও বসিবার জন্য সমানভাবে চেয়ার দিতে হইবে, তিনি কাহারও সম্মুখে সেলাম ঠুকিয়া ঘাড় নীচু করিয়া দাড়াইতে পারিবেন না। এই দরখাস্ত পড়িয়া সাহেব আশ্চৰ্য্য হইলেন। রামমােহনের বয়স তখন চব্বিশ বৎসর। সেই যুবকের নির্ভীকতা, তেজস্বিতা, আত্মসন্ত্রম- বােধ দেখিয়া অত্যন্ত সন্তুষ্ট হইলেন এবং তখনই তাহাকে এক উচ্চ সম্মানের কার্য দিলেন। চব্বিশ বৎসর বয়সে রামমােহন রাজকার্যে ভর্তি হইলেন। তাঁহার বিদ্যা, বুদ্ধি, পাণ্ডিত্য, সত্যনিষ্ঠা, মনের বল, সৎসাহস সকলই অদ্ভুত রকমের। সেই সকলের সাহায্যে তিনি এমনভাবে কাৰ্য্য করিতে লাগিলেন, যে বৃদ্ধ বহুদর্শী-রাজকর্মচারিগণও সেরূপ পারেন না, সুতরাং পঞ্চম পরিচ্ছেদ সরকার বাহাদুর শীঘ্রই তাহার গুণ বুঝিয়া—দিন দিন তাঁহার পদোন্নতির ব্যবস্থা করিতে লাগিলেন। তাঁহার গুণে গবর্ণমেন্ট আফিস সকলে ঘুষ লওয়া বন্ধ হইল, অত্যাচার অবিচার পলাইল, প্রজারা ধৰ্ম্মসঙ্গত ন্যায় বিচার লাভ করিয়া পরম সন্তুষ্ট হইল, চারিদিকে গবর্ণমেন্টের সুখ্যাতি রটিল, নানাদিক হইতে বিনাপীড়নে, অতি সহজে গবর্ণমেন্টের বিস্তর আয় বাড়িল, সুতরাং সরকার বাহাদুর তাহার গুণের পুরস্কার দিতে লাগিলেন। ক্রমে ক্রমে পদোন্নত হইয়া তিনি গবর্ণমেন্টের দেওয়ানের পদ পাইলেন। ইহাপেক্ষা উচ্চ ও সম্মানের পদ তখনকার দিনে আর ছিল না। আর ‘ডিগবী' সাহেব তখন তাহার অকপট পরম বন্ধু হইয়া উঠিলেন—এক দণ্ড তাঁহাকে কাছছাড়া করিতে চাহিতেন না, সৰ্ব্বদা সকল বিষয়েই তাহার পরামর্শ লইয়া কার্য করিতে লাগিলেন। তিনি রামমােহনের এতই ভক্ত ও অনুরক্ত হইয়া উঠিলেন যে তাহার লিখিত অনেক গুলি পুস্তকে নিজে ভূমিকা লিখিয়া দিয়া সে সকলের গৌরব বৃদ্ধি করিলেন। এই সময়ে রামমােহন অনেকগুলি পুস্তক লিখিয়া- ছিলেন, এবং দুইখানি উপনিষদের ইংরাজী অনুবাদ করিয়াছিলেন। গবর্ণমেন্টের দেওয়ান হইয়া রামমােহন রামগড়, ভাগলপুর, রংপুর প্রভৃতি স্থানে রাজকার্যের জন্য বদলি হইয়া ঘুরিতে লাগিলেন। প্রত্যেক স্থানেই থাকিয়া তিনি যেমন অক্লান্ত পরিশ্রমে রাজসেবা করিতে লাগিলেন, সঙ্গে সঙ্গে দেশের এবং লােকের সেবা করিতেও ছাড়িলেন না। প্রত্যেক স্থানে বাস-কালেই তিনি একটা করিয়া ধৰ্ম্মসভা স্থাপন পূর্বক লােকের ভ্রান্ত সংস্কার দূর করিবার চেষ্টা করিতে লাগিলেন। অনেকে যেমন তাহার বিপক্ষ ছিল—এই উচ্চ রাজপদ লাভের ফলে এবং ধৰ্ম্মসভার স্থাপনে দুই এক জন করিয়া পণ্ডিত জ্ঞানী ব্যক্তি তেমনি তাহার দলে আসিয়া মিশিতে লাগিলেন।
রাজা রামমােহন এইরূপে তের বৎসর পর্যন্ত রাজকাৰ্য্য করিয়া তিনি ৩৭৩৮ বৎসর বয়সে তাহা পরিত্যাগ করিলেন এবং দেশের, লােকের, সমাজের এবং ধর্মের সেবায় কায়মননাপ্রাণ ঢালিয়া আপনার কর্তব্য সাধন করিবার জন্য গৃহে ফিরিয়া আসিলেন। ব্ৰহ্মজ্ঞানের যে আলােক কিশাের বয়সে তাহার প্রাণের মধ্যে প্রথম জ্বলিয়াছিল—এক্ষণে সেই আলােকে দেশের অজ্ঞান অন্ধকার দূর করিয়া সত্য ধর্মের বিমল জ্যোতিতে হিন্দু-সমাজকে উজ্জ্বল করিবার জন্য তিনি আপনার জীবন উৎসর্গ করিলেন। কর্মবীর রামমােহন এইবারে প্রকৃত প্রস্তাবে সংসারের কর্মক্ষেত্রে নামিলেন। দেশে আসিয়া এবার যখন তিনি সমাজ ও ধৰ্ম্মের যুদ্ধক্ষেত্রে নামিলেন, তখন চারিদিকে মহা হৈ চৈ পড়িয়া গেল। পূৰ্ব্ব হইতে তাঁহার শত্রুর অভাব ছিল না—ববং মিত্রেরই সম্পূর্ণ অভাব ছিল, তবু তিনি কখনাে বিচলিত হন নাই। এবার সেই সকল শত্রু একযােগে মিলিয়া চারিদিক হইতে আক্রমণপূৰ্ব্বক তাহাকে ব্যতিব্যস্ত করিয়া তুলিল, তথাপি তিনি মহাবীর ভীষ্মের মত অচল অটল ভাবে আপনার কর্তব্য- পথে চলিলেন। সকল ধৰ্ম্মই মূলে এক—এই কথাটা বুঝাইয়া লােকের মন হইতে সঙ্কীর্ণতা, অন্ধকার ও ভ্রান্তি ঘুচাইয়া দেশের লােককে যতই উদার, ধার্মিক ও উন্নতিশীল করিবার চেষ্টা করিতে লাগিলেন—ততই শত্রুরা বিধিমত প্রকারে তাহাকে বাধা দিতে লাগিল। তিনি যতই সভা-সমিতি স্থাপন করিয়া বই লিখিয়া আপনার আদর্শ দেখাইয়া সকলের ভালর চেষ্টা আরম্ভ করিলেন, লােকে ততই ক্ষেপিয়া উঠিতে লাগিল। রামজয় বটব্যাল নামে এক ব্যক্তি প্রায় পাঁচ হাজার লােক জুটাইয়া তাহার বিরুদ্ধে একটা মস্ত দল বাঁধিল, এবং প্রত্যহ তাঁহার বাটীর চারিদিকে গাে-হাড়, ময়লা প্রভৃতি ফেলিতে লাগিল, কাঁটা যষ্ঠ পরিচ্ছেদ २१ ছড়াইতে লাগিল, মুরগী ছাড়িয়া দিতে লাগিল এবং আরাে নানা প্রকারে জ্বালাতন আরম্ভ করিল। শেষে কিছুতেই না পারিয়া তাহার বিরুদ্ধে চক্রান্ত পূর্বক একটা ভয়ানক মিথ্যা মােকদ্দমা উপস্থিত করিয়া তাহাকে একেবারে চিরকালের জন্য নষ্ট করিবার ব্যবস্থা করিল। কিন্তু সত্য—চিরকালই সত্য, ধৰ্ম্ম-চিরদিনই বলবান, সৎ- উদ্দেশ্য ও নিষ্কাম পরহিতব্রত-চিরকালই জয়ী হইয়া থাকে। সুতরাং সে সবে রামমােহনের কিছুমাত্র ক্ষতি করিতে পারিল না। ধর্মের বলে— সত্যের বলে—আত্মত্যাগের বলে তিনি আনায়াসে সে সকল কাটাইয়া উঠিলেন। কিন্তু তাহার মা অত্যন্ত ভয় পাইলেন এবং পুত্র, পুত্রবধূ এবং পৌত্র-পৌত্রী সঙ্গে আর এক বাটীতে একত্রে বাস করিতে সাহস পাইলেন । রামমােহন জননীর সে অবস্থা বুঝিয়া মনে মনে বড় দুঃখিত হই- লেন এবং তাহাকে নিশ্চিন্ত ও নিরুপদ্রব করিবার জন্য পৈতৃক বাটী ছাড়িয়া-রঘুনাথপুরে আসিয়া বাড়ী করিলেন, এবং সেইখানে একটি বেদী প্রস্তুত করাইয়া তাহার সম্মুখে লিখিয়া দিলেন—“ওঁ তৎসৎ, এক- মেবাদ্বিতীয়ং”। সেই খানে বসিয়া তিনি উপাসনা ও ধৰ্ম্ম-প্রচার করিতে লাগি- লেন। বর্তমান ব্রাহ্মধৰ্ম্মের’ সেই সৰ্ব্বপ্রথম প্রতিষ্ঠা হইল। ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ চল্লিশ বৎসর বয়সে রামমােহন কলিকাতায় আসিয়া মাণিকতলা সারকুলার রােডে বাড়ী কিনিয়া বাস করিতে আরম্ভ করিলেন। সেই সময়ে নিজের বাড়ীতেই ‘আত্মীয়-সভা’ নাম দিয়া একটি সভা স্থাপন করিলেন—সেই সভায় বেদপাঠ, পূর্ণব্রহ্মের উপাসনা এবং ভগবানের স্তুতি-গান হইতে রাজা রামমােহন - ! লাগিল। রামমােহন নিজে কতকগুলি পরম ভক্তিপূর্ণ ঈশ্বরতত্ত্বের গান রচনা করিয়া গান করিতে লাগিলেন। সেই গানগুলিই সর্বপ্রথম ‘ব্রহ্মসঙ্গীত। রামমােহন রায়ের মত মহাক্ষমতাশালী, মহাপণ্ডিত, পরমসম্মান- ভাজন, উচ্চরাজ-সম্মান-প্রাপ্ত ধনী ব্যক্তি যখন কলিকাতার মত রাজধানীর বুকের উপরে সেই ধর্মসভা স্থাপন করিয়া পবিত্র হিন্দু-ধর্মের প্রকৃত সত্য তত্ত্ব বুঝাইতে ও বেদান্তের মতে ধৰ্ম্ম-প্রচার আরম্ভ করিলেন, তখন চির- কালের কুসংস্কারাবদ্ধ গোঁড়া হিন্দু-সমাজ আর নিশ্চিন্ত থাকিতে পারিল না। তাহারাও তাহার মত খণ্ডন করিয়া সমাজের গোঁড়ামী বজায় রাখিবার জন্য এবং তাহার নব-প্রচারিত ধর্মের মূল উৎপাটিত করিবার জন্য এক মস্ত সভা করিল। রাজা রাধাকান্ত দেব বাহাদুর সেই সভার সভাপতি হইলেন এবং দেশ-বিদেশ হইতে মহামহা পণ্ডিত সকলকে আনাইয়া, রাম- মােহনকে তর্কে হারাইয়া, তাঁহাকে নিজেদের অধীন করিবার চেষ্টা পাই- লেন। সুব্রহ্মণ্য শাস্ত্রী প্রভৃতি সেই সময়ের দেশবিখ্যাত পণ্ডিতমণ্ডলী রামমােহনকে শাস্ত্ৰতর্কে হারাইবার জন্য কোমর বাঁধিয়া লাগিলেন। দুই দলে ভয়ানক শাস্ত্ৰবিচার এবং মহা তর্কযুদ্ধ চলিল। একদিকে একা রামমােহন এবং তাহার পক্ষের জন দুইচার নগণ্য ব্যক্তি, অন্যদিকে সমস্ত ভারতের বিখ্যাত পণ্ডিতমণ্ডলী! তবু কেহই তাহাকে হারাইতে পারিল না–অবশেষে তাহারই জয় হইল। সেই শুভক্ষণ হইতে ব্রাহ্মধর্মের বিজয় পতাকা সৰ্ব্বপ্রথম কলিকাতায় উড়িল। এই ব্যাপারে জয়ী হইবার পর তখনকার দেশমান্য অনেক সম্রান্ত ও বিদ্বান্ ব্যক্তি রামমােহনের ধর্মমতের সত্য তত্ত্ব বুঝিলেন এবং গোঁড়ামী ছাড়িয়া—প্রকৃত হিন্দুধর্মের পােষণ করিবার জন্য তাহারা তাহার দলে মিশিলেন। ইহাদের মধ্যে দ্বারকানাথ ঠাকুর, গােপীমােহন ঠাকুর, প্রসন্নকুমার ঠাকুর, অন্নদাপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়, ব্রজমোহন যষ্ঠ পরিচ্ছেদ মজুমদার, নন্দকিশাের বসু, কালীনাথ মুন্সী, ভৈরবচন্দ্র দত্ত, কালীনাথ মল্লিক, তারাচঁাদ চক্রবর্তী প্রভৃতিই প্রধান। হঁহারা সকলেই বিদ্বান্, সম্রান্ত, ধনী, গণ্য মান্য, পূজনীয় ব্যক্তি -সকলেই দেশের ও সমাজের নেতা। সুতরাং রামমােহনের নব-ধৰ্ম্মের ভিত্তি খুব দৃঢ় হইল। তখন আনন্দে ও উৎসাহে মাতিয়া প্রথমে একটি ভাড়াটিয়া বাড়ীতে, পরে চীৎপুর রােডের উপর বাড়ী করিয়া রামমােহন ব্রাহ্মধর্মের উপাসনা-মন্দির স্থাপন করিলেন। উহাই ‘আদি ব্রাহ্ম- সমাজ। রামমােহন রায় যখন রংপুরে ছিলেন, তখন ‘হরিহরানন্দ স্বামী নামে এক পরমজ্ঞানী সন্ন্যাসীর সহিত তাহার অত্যন্ত বন্ধুত্ব হইয়াছিল। তিনি আসিয়া সেই আদি ব্রাহ্মসমাজে যােগ দিলেন, এবং তাহার ভ্রাতা পণ্ডিতশ্রেষ্ঠ রামচন্দ্র বিদ্যাবাগীশ মহাশয়কে আনাইয়া ব্রাহ্মসমাজের আচার্য্যের পদে নিযুক্ত করিলেন। এই বিদ্যাবাগীশ মহাশয়ই আদি ব্রাহ্ম- সমাজের সর্ব প্রথম আচাৰ্য্য। ইহা করিয়াই রামমােহন নিশ্চিন্ত রহিলেন না। যাহাতে দেশ হইতে প্রতিমাপূজা উঠিয়া যায়—সকলেই নবধর্ম গ্রহণ করিয়া একমাত্র ঈশ্বরের আরাধনা করিতে চাহে—এই উদ্দেশ্যে সর্বদা চারিদিকে সভাসমিতি করিতে লাগিলেন, সঙ্গে সঙ্গে যাহাতে এ দেশের লােকের ইংরাজী শিখিবার সুবিধা হয়, চারিদিকে উত্তমরূপ শিক্ষা বিস্তার হয়, তাহার জন্যও প্রাণপণে চেষ্টা করিতে লাগিলেন। সাহেব সুবাে সকলেই রামমােহনকে সম্মান করিতেন, তাহার এই মহত্ত্ব এবং পরহিতব্রত দেখিয়া অনেকে আপন ইচ্ছায় আসিয়া তাহার সঙ্গে যােগ দিলেন। সুবিখ্যাত ডেভিড় হেয়ার সাহেব এই রকম একটি সভায়, বিনা নিমন্ত্রণে আসিয়া উপস্থিত হইয়াছিলেন। সেই হইতে রামমােহনের সঙ্গে তাহার অন্তরঙ্গ মিত্রত হইয়া গিয়াছিল।
রাজা রামমােহন মানুষ একটা কাৰ্যই জীবনে সম্পূর্ণ করিয়া যাইতে পারে না, কিন্তু রামমােহন একসঙ্গে অনেকগুলি কার্যে হাত দিয়াছিলেন। যাহাতে দেশের লােক ভালরকম লেখাপড়া শিখিয়া মানুষ হয়, যাহাতে সমাজের কলঙ্ক সকল মুছিয়া যায়, যাহাতে প্রাচীন কালের পাপজনক কুপ্রথা সকল নষ্ট হয়, যাহাতে লােকে বড় বড় সরকারী চাকরি পাইয়া সুখে স্বচ্ছন্দে ও সম্মানের সহিত জীবনযাত্রা নির্বাহ করিতে পারে, যাহাতে কঠোর ধর্মতত্ত্ব অতি সহজ সরল ভাবে আবালবৃদ্ধবনিতা বুঝিতে পারে, যাহাতে দেশের লােক স্বাধীনচিত্ত, ধাৰ্মিক, আত্মনির্ভরসম্পন্ন এবং উন্নতিশীল হয়, তাহার প্রত্যেকটির জন্য তিনি আমরণ অক্লান্তভাবে প্রাণপাত পরিশ্রম করিয়া গিয়াছেন। এরূপ পরহিতব্রতধারী, এরূপ নিষ্কাম আত্মত্যাগী, এরূপ পরের দুঃখে কাতর, এরূপ পরচিন্তাপরায়ণ সাধুপুরুষ অতি অল্পই দেখা যায়। অনেক লােকের স্বভাব কাহারও ভাল দেখিলেই হিংসা হয়। সে ব্যক্তি উপকার করিতেছে—এ কথা মনে মনে বুঝিতে পারিলেও তাহা মুখে স্বীকার না করিয়া বরং তাহার নিন্দা রটনা করে। রাম- মােহন যখন সহস্র বাধা বিঘ্ন শত্রুতা কাটাইয়া ধীরে ধীরে আপন কৰ্ত্তব্য সাধিয়া যাইতে লাগিলেন, যখন তাহার প্রভাব লােকসমাজে কতকটা আধিপত্য চালাইল, তখন এই শ্রেণীর কতক গুলি লােক ‘নাস্তিক’, ‘তন ধৰ্ম্ম-স্থাপক প্রভৃতি বলিয়া তাহার নিন্দা বটাইতে আরম্ভ করিল। তখন তিনি পুস্তক লিখিয়া এবং প্রকাশ্য সভায় দাড়াইয়া উচ্চকণ্ঠে সরলভাবে কহিলেন যে তিনি—পরম হিন্দু, বিধৰ্ম্মী বা নূতন-ধৰ্ম্ম প্রচারক নহেন। পবিত্র, আদি, সনাতন হিন্দুধৰ্ম্ম, যাহা দেবর্ষি নারদ, রাজর্ষি জনক, ব্যাসদেব, বশিষ্ঠ, শুকদেব প্রভৃতি মহাত্মগণ বুঝিয়া এবং অনুষ্ঠান করিয়া ধন্য হইয়াছেন—তিনি তাহাই সকলকে সরল ভাবে বুঝাইয়া কুসংস্কার সকল নষ্ট করিবার চেষ্টা করিতেছেন—সকলকে ‘বিধৰ্ম্মী, যষ্ঠ পরিচ্ছেদ ৩১ সেই পূতধৰ্ম্ম পথে চালাইয়া সংসারে পুণ্যের প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করিতেছেন-- ইতরভদ্র, ছােটবড় সকলকেই সেই ধৰ্ম্মের গৃঢ় মৰ্ম্ম ও উপাসনার সহজ উপায় বুঝাইয়া এবং শিখাইয়া দেশের লােকের এবং সমাজের মঙ্গল সাধন করিবার চেষ্টা করিতেছেন মাত্র। এই উদ্দেশ্য সিদ্ধির জন্য রামমােহন যতগুলি পুস্তক লিখিলেন কেবলমাত্র সেইগুলি একত্র করিলেই একটা লাইব্রেরী হইতে পারে। দর্শন, বিজ্ঞান, ইতিহাস এবং সাহিত্য প্রভৃতি, ধর্মগ্রন্থের ভিতর দিয়া চালাইয়া তিনি বাঙ্গালা পুস্তক লিখিলেন বত্রিশখানা এবং ইংরাজী পুস্তক লিখিলেন আটত্রিশখানা—মােট সত্তর খানা পুস্তক। এরূপ ব্যাপার আর কেহ কখনও করিতে পারিয়াছেন কি? সাহিত্য, বিজ্ঞান, ইতিহাস, ভূগােল, দর্শনশাস্ত্র, রাজনীতি, ধৰ্ম্মনীতি, সমাজনীতি প্রভৃতি সকল বিষয়েই তাঁহার আশ্চর্য রকম অধিকার ; তিনি সকল বিষয়েই রাশিরাশি চমৎকার চমৎকার রত্নবিশেষ পুস্তক লিখিয়া দেশের, দশের ও ভাষার উন্নতির সূচনা করিয়া দিয়াছেন। একাধারে এরূপ সৰ্বশক্তিমান ক্ষণজন্মা মহাপুরুষ কোন দেশে আর কয় জন জন্মিয়াছেন বলিতে পারি না। শ্রীরামপুরে তখন পাদরি সাহেবদের প্রধান আড্ডা ছিল। সেইস্থান হইতে তাহারা সমাচার-চন্দ্রিকা নামে সংবাদপত্র প্রচার করিতেন। সেই সংবাদপত্রে রামমােহনের নামে নানারূপ অন্যায় কথা প্রায়ই লিখিত হইত। তিনি তখন নিজের নাম গােপনপূৰ্ব্বক ‘শিবপ্রসাদ শৰ্মা নাম দিয়া লিখিত ‘ব্রাহ্মণ-পত্রিকা’ নামক এক পত্রিকা প্রচার করিলেন। তাহাতে ‘সমাচার-চন্দ্রিকা’র নিন্দাপূর্ণ ভ্রান্ত মত সকল খণ্ডন করিতে লাগিলেন। তারপর সমাচার চন্দ্রিকা যখন হিন্দুদের দোষ দেখাইয়া কুৎসা করিলেন, ব্রাহ্মণপত্রিকাও অমনি খৃষ্টাদের অধিক দোষ দেখাইয়া দিতে রাজা রামমােহন লাগিল—এইরূপে দুই পত্রিকায় অনবরত ধৰ্ম্ম ও সমাজনীতি লইয়া ঘােতর যুদ্ধ চলিল—সকল যুদ্ধেই দশভাষায় পণ্ডিত ব্রাহ্মণ-পত্রিকাই জিতিতে লাগিল। তখন সকলেই বুঝিল যে-নকল শিবপ্রসাদ শৰ্মা স্বয়ং রামমােহন! তখন হইতে অনেক খৃষ্টধর্মপ্রচারক রামমােহনের বিরুদ্ধে খড়গহস্ত হইয়া উঠিলেন। তথাপি, তিনি যথার্থ বীরের মত অচল অটল ভাবে আপন কৰ্তব্য করিয়া যাইতে লাগিলেন। এইরূপ ধর্মতত্ত্ব, সমাজতত্ত্ব, শাস্ত্রের দোষগুণ নির্ণয়পূর্বক কাগজে লেখার যুদ্ধে জয়ী হইয়া রামমােহনের নাম বিলাতে পর্যন্ত বিখ্যাত হইয়া পড়িল। গোঁড়া হিন্দুদের মত যেমন অনেক গোঁড়া খৃষ্টান সাহেব তাহার বিপক্ষ হইলেন, তেমনি আবার প্রকৃত খৃষ্টান, যথার্থ পণ্ডিত অনেক ধর্ম প্রচারক সাহেব রামমােহনের গুণ ও শক্তিতে মুগ্ধ হইয়া তাহার বন্ধু হইলেন। ইংরাজী সুবিখ্যাত সংবাদপত্র “ইষ্ট-ইণ্ডিয়া গেজেট-” এর সম্পাদক লিখিলেন যে-“ধৰ্ম্মযুদ্ধে, ধৰ্ম্ম-সংস্কারে, এবং সমাজের সংস্কারে রামমােহনের মত ব্যক্তি আর কেহ এ পর্যন্ত এদেশে জন্মগ্রহণ করেন নাই।” রামমােহনের সুখ্যাতি কিছুদিন ধরিয়া সেই পত্রিকায় যথানিয়মে বাহির হইতে লাগিল। সেই পত্রিকা, ইংলণ্ড, আমেরিকা প্রভৃতি দেশেও বিস্তর যাইত—সুতরাং সেই সব দেশবাসিগণও—চক্ষে না দেখিয়াও-রাম- মােহনের শক্তি ও গুণগ্রামে মােহিত হইয়া তাঁহার বন্ধু হইয়া উঠিলেন শুধু কি তাহাই ? তখনকার কলিকাতার ‘ব্যাপটিষ্ট, মিশন নামক খৃষ্ট-ধর্মসভার সর্ব প্রধান ‘এ্যাডাম সাহেব রামমােহনের কাছে দীক্ষা লইয়া তাহার শিষ্যত্ব গ্রহণ করিলেন। বাঙ্গালীর ইতিহাসে এ ঘটনা-অপূৰ্ব্ব এবং অদ্বিতীয়।
সপ্তম পরিচ্ছেদ তিব্বতে বাসের কালে রামমােহনের প্রাণে স্ত্রীলােকদিগের প্রতি অশেষ শ্রদ্ধা, ভক্তি ও সম্মান জাগিয়া উঠিয়াছিল। ধর্ম-সংস্কার করিবার পরে তিনি সমাজ-সংস্কার ব্রতে লাগিলেন। স্ত্রীলােকদের দুঃখ দূর করিবার জন্য বদ্ধপরিকর হইলেন। সেই সময়ে হিন্দুদিগের প্রাচীন ভ্রান্ত-সংস্কারপূর্ণ সামাজিক কু-প্রথা ‘সতীদাহ’ তাঁহার প্রাণে বিষম শেলাঘাত করিল। তিনি সেই প্রথা উঠাইয়া দিবার জন্য প্রাণপাত চেষ্টা ও পরিশ্রম করিতে লাগিলেন। যে সকল সতী সাধ্বী মহিমময়ী রমণী স্বামীর মৃত্যুতে ইচ্ছা- পূর্বক আপন জীবন বলি দিতে চাহেন—তাহাদের কথা স্বতন্ত্র। কিন্তু অধিকাংশ স্থলেই—অনিচ্ছা স্বত্ত্বেও স্বামীর মৃত্যুর পরে স্ত্রীকে জোর করিয়া বাধিয়া জীবন্ত দগ্ধ করা হইত। এ ব্যাপারে রামমােহন শিহরিয়া উঠিলেন। তিনি বুঝিলেন যে ধর্মের দোহাই দিয়া হিন্দু সমাজের ভিতর এত বড় একটা পৈশাচিক নৃশংস কাৰ্য্য অনায়াসে চলিয়া যাইতেছে, ইহা নরহত্যা ভিন্ন আর কিছুই নহে। কি ইংরাজ, কি ফরাসী, ওলন্দাজ, গ্রীক, পর্তুগিজ প্রভৃতি সমস্ত বিদেশবাসী হিন্দুদের এই কু-প্রথা দেখিয়া মনে মনে শিহরিয়া চক্ষু বুজিয়াছেন—এ সম্বন্ধে নিন্দাবাদ করিয়া বিস্তর পুস্তক লিখিয়াছেন, কিন্তু কিছুতেই কিছু হয় নাই। পাছে হিন্দুদের ধর্মে এবং সমাজ-প্রথার উপর হস্তক্ষেপ করা হয় সেই ভাবিয়া মহামতি ইংরাজরাজ এ বিষয়টা গ্রাহ করেন নাই। সুতরাং ধর্মের নামে এই ভয়ানক পৈশাচিক নারীহতা সমানভাবে চলিয়া আসিতেছিল।
৩ঃ রাজা রামমােহন রামমােহন দেখিলেন যে জোর করিয়া পােড়াইয়া খুন করার চেয়ে তাহাকে বাঁচাইয়া রাখিলে, সে বিধবা ব্রহ্মচর্য অবলম্বন পূর্বক ধর্মাচরণে থাকিয়া অধিক উন্নতি করিতে পারে—অথচ এমন একটা নারীহত্যা ব্যাপার দেশ হইতে দূর হইয়া যায় । এ প্রথা রক্ষা করা ধৰ্ম্ম নহে—ইহা তুলিয়া দেওয়াই ধৰ্ম্ম ও কর্তব্য। তখন তিনি এই বিষয় লইয়া লাট সাহেবদের নিকটে আন্দোলন আরম্ভ করিলেন। সতীদাহ যে কি নৃশংস ব্যাপার, কি অধৰ্ম্মের ব্যাপার, সে সম্বন্ধে তিনখানি বই লিখিয়া ছাপাইয়া সেই সময়ের লাট সাহেবের পত্নী লেডি হেষ্টিংস্’কে উৎসর্গ করিলেন। তৎপরে সেই সকল পুস্তক প্রচার পূর্বক দেশে মহা আন্দোলন বাধাইয়া দিলেন। তাহা ছাড়া সেই বিষয় লইয়া তিনি সর্বদা কাগজে লিখিতে লাগিলেন এবং যেখানে সেখানে বক্তৃতা করিতে আরম্ভ করিলেন। তখন সে বিষয়ে রাজপুরুষদিগের দৃষ্টি পড়িল, বড়লাট হেষ্টিংস্ বাহাদুর এ বিষয়ের প্রতিকার করিবেন বলিয়া আশা দিলেন। কিন্তু হেষ্টিংস্ সাহেব কিছুই করিয়া যাইতে পারিলেন না, সুতরাং রামমােহনও নিশ্চিন্ত হইলেন না। চারিদিক হইতে অসহায় বিধবাদের আর্তনাদে তাহার বুক কাপিতে লাগিল, চক্ষে ধারা বহিতে লাগিল, আহার নিদ্রা দূরে গেল। দিনরাত্রি অক্লান্ত পরিশ্রমে সতীদাহ উঠাইবার চেষ্টা পাইতে লাগিলেন। ‘হেষ্টিংস্ সাহেবের পরে লর্ড উইলিয়াম বেন্টিক বাহাদুর এদেশের লাট হইয়া আসিলেন। দেশে থাকিতেই তিনি খবরের কাগজে রামমােহনের শক্তি ও গুণের কথা পড়িয়াছিলেন এবং তাহার ইংরাজী পুস্তক সকল পড়িয়া তাহার প্রতি অত্যন্ত আকর্ষিত হইয়া- ছিলেন। তিনি এদেশে আসিয়া রামমােহনকে দেখিবার জন্য—তাহার সহিত পরিচয় করিবার জন্য-ডাকাইয়া আনিলেন।
সপ্তম পরিচ্ছেদ রামমােহন এ সুযােগ ছাড়িলেন না, তিনি বেন্টিক’ বাহাদুরকে সতীদাহের নৃশংসতা, অধাৰ্মিকতা, অত্যাচার প্রভৃতি সুন্দররূপে বুঝাইয়া প্রতিকার চাহিলেন। বেন্টিক বাহাদুর তখন আইন করিয়া চিরকালের জন্য সেই পাশবিক অত্যাচারের প্রথা বন্ধ করিয়া দিলেন। রামমােহন রায় তখন এক বিরাট সভা করে—দেশের সকল লােকের পক্ষ হয়ে লাট সাহেববাহাদুরকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই- লেন। যতদিন এ দেশে ইতিহাস থাকিবে ততদিন রাজা রামমােহন রায়ের এই অক্ষয় কীৰ্ত্তি চিরস্মরণীয় হইয়া থাকিবে। কেবল তাহাই নহে-রমণী-পীড়নকারী কৌলিন্য প্রথা, বালিকা- বিবাহ প্রথা, কুলীন কন্যাগণকে চিরকুমারী করিয়া রাখিবার প্রথা প্রভৃতি নানা প্রকার নিষ্ঠুর প্রথাসকল হিন্দুসমাজের বুক হইতে একেবারে তুলিয়া দিবার জন্যও তিনি প্রাণপাত চেষ্টা ও অক্লান্ত পরিশ্রম করিতে লাগিলেন। তাঁহার সেই চেষ্টা, পরিশ্রম, স্বার্থত্যাগের ও লােক-হিতাকাঙ্ক্ষার গুণে হিন্দুরমণীগণের বহুকষ্ট চিরকালের জন্য দূরীভূত হইল। ধন্য রামমােহন! যাহা দশজন লােক দশটা জীবন লইয়া করিতে পারেন না—তাহা তিনি এক জীবনেই সমাধা করিলেন। তারপর রামমােহন এ দেশে শিক্ষা বিস্তার কাৰ্যে মনযােগ দিলেন। তিনি বুঝিলেন যে পাশ্চাত্য শিক্ষা ভিন্ন এ দেশের লােকের উন্নতি হইবে না, তখন এই বিষয় লইয়া রাজপুরুষদের কাছে অবিরত লেখা-লিখি ও আন্দোলন শুরু করিয়া দিলেন। মহামতি ভারতবন্ধু ডেভিড় হেয়ার সাহেব—রামমােহনের পরম বন্ধু ছিলেন। তিনি এই মহৎ উদ্দেশ্যে রামমােহনের সঙ্গে যােগ দিলেন, এই দুই মহাপুরুষের চেষ্টায় এদেশে ইংরাজী শিক্ষার পথ প্রসারিত হইল। কিন্তু তখনও দেশবাসী রামমােহনকে চিনিতে পারেন নাই, রাজা রামমােহন তখনও বিধর্মী বলিয়া দেশের লক্ষ লক্ষ মান্যগণ্য সম্ভান্ত লােক তাঁহার বিপক্ষ। তাই যখন রামমােহন এবং হেয়ার সাহেবের চেষ্টায় এদেশে সর্বপ্রথম ‘হিন্দুকালেজ স্থাপিত হইল তখন,-বিধর্মী বলিয়া তিনি যােগ দিলে পাছে দেশের অন্য কেহ এই বিদ্যামন্দির স্থাপনে যােগদান করেন সেই ভয়ে—রামমােহন প্রকাশ্যে সে দিক ছাড়িয়া দিলেন, কিন্তু ভিতরে ভিতরে, গােপনে গােপনে হিন্দুকালেজ স্থাপন করিবার জন্য প্রাণপাত চেষ্টা পরিশ্রম ও অর্থব্যয় করিতে লাগিলেন। এরূপ নিঃস্বার্থ পরহিতব্রতধারী মহাপুরুষ কোন্ দেশে কয় জন জন্মগ্রহণ করিয়াছেন ? তাহা ভিন্ন তিনি সম্পূর্ণ নিজব্যয়ে আর একটি ইংরাজী স্কুল স্থাপন করিলেন। ৮০ জন ছাত্র এ স্কুলে বিদ্যাভ্যাস করিতে লাগিল। তারপর ডফসাহেব এদেশে আসিয়া একটি ইংরাজী স্কুল স্থাপন করিবার চেষ্টায় রামমােহনের সাহায্য চাহিলেন। রামমােহন, কায়মনােপ্রাণে সাহেবের সে মহৎ কার্যের সাহায্য করিতে লাগিলেন। আপনাদের ব্রাহ্মসমাজের গৃহ স্কুলের জন্য ছাড়িয়া দিলেন ‘ডফস্কুল প্রতিষ্ঠিত হইল। তখন তিনি আর্থিক এবং শারীরিক সাহায্যে সৰ্ব্বপ্রকারে সেই স্কুলের উন্নতি সাধন করিতে লাগিলেন। এইরূপে রামমােহনের গুণে, চেষ্টায় ও সহায়তায় এ দেশে ইংরাজী শিক্ষার পথ প্রথম প্রসারিত হইল। তদ্ভিন্ন তিনি এদেশে এক নূতন ব্যাপার—বেদ-বিদ্যালয় স্থাপন করিয়া ছাত্রদিগকে বেদান্ত-দর্শনশাস্ত্র পড়াইবার বন্দোবস্ত করিলেন। লােকে যাহাতে সৰ্ব্ব প্রকারে উচ্চশিক্ষিত হইয়া মানুষ হইতে পারে তদ্বিষয়ে তিনি আত্মােৎসর্গ করিলেন । এমন মহাপুরুষ আর কে আছে ? তখন দেশে পরসী ভাষাই প্রচলিত, সুতরাং লােক শিক্ষার জন্য পারসী ভাষার আলােচনাই আবশ্যক। এই ভাবিয়া রামমােহন ‘আকবরী v সপ্তম পরিচ্ছেদ ৩৭ নাম দিয়া নিজে এক পারসী সংবাদপত্র প্রচার করিলেন—তাহাতে সাহিত্য, বিজ্ঞান, ইতিহাস, ভূগােল, ধর্মতত্ত্ব, সমাজতত্ত্ব, রাজনীতি প্রভৃতি সকল বিষয়েরই প্রবন্ধ বাহির হইতে লাগিল,। সুতরাং যে যে উপায়ে দেশের লােকের উন্নতি হওয়া সম্ভব একা রামমােহন সেই সকল বিষয়েরই অনুষ্ঠান করিয়া দিলেন। লর্ড হেষ্টিংস্ পদত্যাগ করিলেন, লর্ড আমহাষ্ট এদেশে আসিবার পূৰ্ব্বে, লর্ড এ্যাড়া কিছু দিনের জন্য লাটের পদে নিযুক্ত হইলেন। তাহাতে সেই সময়ের ‘হরকরা' নামক সংবাদপত্র বিস্তর কটু মন্তব্য প্রকাশ করিয়া অসন্তোষ প্রকাশ করিয়াছিল। তাহার ফলে সে কাগজ বন্ধ হইয়া গেল, তাহার সহকারী সম্পাদককে পলাইয়া জেলের দায়ে আত্মরক্ষা করিতে হইল এবং মুদ্রান্ত্রের স্বাধীনতা লােপ পাইল। লাট- সাহেবের সভা হইতে আদেশ হইল যে গবর্ণমেন্টের হুকুম ভিন্ন কেহ আর কোন প্রকার সংবাপদপত্র বাহির করিতে পারিবে না। রামমােহন দেখিলেন ইহাতে দেশবাসীর সৰ্ব্বনাশ হইল, শিক্ষা- বিস্তারের মূল নষ্ট হইল এবং স্বাধীন চিন্তা এবং লেখার স্রোত বন্ধ হইল। তিনি তখন এই বিষয়ের বিরুদ্ধে প্রধান বিচারপতির নিকটে আবেদন করিলেন, কিন্তু তাহাতেও ফল না পাইয়া শেষে সম্রাট চতুর্থ জর্জের কাছে পর্যন্ত দরখাস্ত করিয়া, প্রাণপণে চেষ্টা করিতে লাগিলেন। তখনকার দিনে আদালতে ইংরাজ আর খৃষ্টিয়ান ভিন্ন অন্য কেহ জুরী হইতে পারিত না। ইহাতে দেশের লােকের বড় অসুবিধা হইল, বিস্তর বিচার-বিভ্রাট ঘটিতে লাগিল। রামমােহন এই বিষয় লইয়া বিলা- তের মন্ত্রীসভা পার্লামেন্টে পৰ্য্যন্ত দরখাস্ত ও আন্দোলন আরম্ভ করিলেন। তাহার ফলে অবশেষে এদেশের বিচারালয় সমূহে দেশীয় উপযুক্ত লােকেরা জুরী হইবার অধিকার পাইলেন। ইহা ছাড়াও দরিদ্র কৃষকদের জন্য গবর্ণমেন্টে বিস্তর আন্দোলন ৩৮ রাজা রামমােহন ও লেখালেখি করিয়া রামমােহন অনেক বিষয়ে তাহাদের অনেক রকমের সুবিধা করিয়া দিলেন। তাহার মত দরিদ্রের বন্ধু, দেশের বন্ধু, লোকহিতব্রতধারী, উদারচরিত্র, মহাপ্রাণ মহাপুরুষ আর কয়জন আছেন ? অষ্টম পরিচ্ছেদ বিলাত ভারতবাসীর পক্ষে একটা স্বপ্নরাজ্য। ঠাকুরমার মুখে শুন উপকথার মত--এদেশের লােকের মনে, তাহার শিল্প বাণিজ্য, শিক্ষা, ধন, ঐশ্বৰ্য্য, সম্পদ, সৌন্দর্য প্রভৃতি একটা গৌরবময় অজ্ঞাত সৌন্দর্য্যে আচ্ছাদিত বােধ হইত। তখন পর্যন্ত এদেশবাসী কেহ–সুদূর সমুদ্র- পারের সেই সােনার স্বপ্ন-রাজ্যে যাইবার কল্পনাও মনে স্থান দিতে পারে নাই। রামমােহন সর্ব প্রথমে সেই সােনার স্বপ্ন-রাজ্যে গমন করিতে ইচ্ছুক হইয়া উঠিলেন। বিলাত রাজার দেশ, সেখানে এদেশের সম্রাট থাকেন, এ দেশের ভাগ্য-বিধাতারা সেই দেশে থাকিয়া এখানকার শাসন-পালন কাৰ্য পরিচালনা করেন। সেখানে যাইতে পারিলে প্রত্যক্ষভাবে তাহাদের সঙ্গে পরিচিত হইয়া, দরিদ্র ভারতের দুঃখের কাহিনী জানাইতে পারিলে নিশ্চয়ই এদেশের বিস্তর উপকার হইবে । দেশের দুঃখে কাতর-হৃদয়, পরহিতে আত্মত্যাগী মহাত্মা রামমােহন এই কারণে বিলাতে যাইবার মুযােগ খুজিতে লাগিলেন। যাহার যেমন সাধনা—সিদ্ধিও তেমনই হয়। যিনি ঐকান্তিক চিত্তে যাহা চাহেন দয়াল ভগবান তঁাহাকে তাহাই প্রদান করেন। রাম- শােহনেরও বিলাত গমনের সুযােগ মিলিল।
অষ্টম পরিচ্ছেদ সেই সময়ে দিল্লীর বাদসাহের সঙ্গে ‘ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর কতকগুলি বিষয় লইয়া অত্যন্ত গােলােযােগ চলিতেছিল। সেই সকল বিষয় মন্ত্রীসভায় উত্তমরূপে বুঝাইয়া দিয়া তাহার মীমাংসা করাইবার জন্য বাদসাহ একজন সৰ্ববিষয়ে উপযুক্ত লােক খুঁজিতেছিলেন। তখন রাম- মােহনের মত সৰ্ববিদ্যাবিশারদ সর্ববিষয়ে সর্বতােভাবে যােগ্য ব্যক্তি এদেশে আর দুটি ছিল না। সুতরাং বাদসাহ রামমােহন রায়কে তাহার পক্ষ হইতে বিলাতে পাঠাইবার ইচ্ছা করিলেন। রামমােহনও আনন্দে বাহের সেই আদেশ গ্রহণ করিলেন । বাদসাহ তখন অত্যন্ত সন্তুষ্ট হইয়া রামমােহনকে ‘রাজা’ উপাধি দিলেন এবং তাঁহার সর্বপ্রকার সুখস্বাচ্ছন্দ্যের বন্দোবস্ত করিয়া দিয়া বিলাতে পাঠাইলেন। ইংরাজী ১৮৩০ সালের ১৫ই নবেম্বর তারিখে ‘আবিয়ন’ নামক জাহাজে রাজা রামমােহন সর্ব প্রথম বিলাত-যাত্রা করিলেন । পূৰ্ব্ব হইতেই বিলাতের ললাকে রাজা রামমােহনের নাম শুনিয়া- ছিল এবং তাহার অশেষ গুণ ও শক্তির পরিচয় পাইয়া তাহার প্রতি আকৃষ্ট হইয়াছিল। রাজা বিলাতে পৌছিলে বিস্তর সম্ভ্রান্ত সাহেব মেম তাহাকে অভ্যর্থনা করিবার জন্য আসিলেন এবং অনেকে তাঁহাদের নিজ নিজ গৃহে তাঁহাকে অতিথি স্বরূপে বাস করিতে অনুরােধ করিলেন। কিন্তু স্বাধীনতাপ্রিয় রাজা সকলকে ধন্যবাদ দিয়া, একটি হােটেলে গিয়া উঠিলেন। সেই সময়ে সেই দেশের অনেক বড় বড় পণ্ডিত তাহার সহিত পরিচয় করিয়া আনন্দিত হইলেন; বিস্তর সম্রান্ত বড় লােক আপনাদিগকে ধন্য ভাবিলেন, দেখিতে দেখিতে রাজা রামমােহনের যশের গাথায় বিলাত ভরিয়া উঠিল । সেই সময়ে বিলাতের মন্ত্রীসভায় ‘রিফর্ম বিল’ (সংস্কার আইন ) ৪০ রাজা রামমােহন এর আন্দোলন চলিতেছিল। রাজা সেই মহাসভায় সেই সম্বন্ধে ইংরাজীতে এমন চমৎকার যুক্তিপূর্ণ বক্তৃতা করিলেন যে বিলাতবাসী সকলেই তাহার প্রতিভা দেখিয়া অবাক হইয়া গেল। তৎপরে রাজা রামমােহনের আন্দোলন আলােচনা ও মন্ত্রীসভায় বহু তর্ক-বিতর্ক ও বাদানুবাদের ফলে সেই ‘সংস্কার আইন পাশ হইল—তাহাতে এদেশের শ্রমজীবীদের অনেক দুঃখ কষ্ট দূর হইল—রাজা আপনাকে ধন্য জ্ঞান করিয়া আনন্দিত হইলেন। শুধু সেই কাৰ্য্য করিয়াই বিলাতে তিনি নিরস্ত হইলেন না। যাহাতে এদেশের প্রজাদের উপর বেশী রাজকর না চাপিয়া বসে, যাহাতে প্রজাসাধারণ জমীদারদের অত্যাচারের হস্ত হইতে রক্ষা পায়, যাহাতে এদেশের লােক উচ্চশিক্ষিত হইয়া হাকিম হইতে পারে, যাহাতে এদেশের লােককে বেশী বেতনের বড় বড় রাজকার্যে নিযুক্ত করা হয়, সেই বিষয়ে চেষ্টা করিতে লাগিলেন। তাহার দয়ায়, তাহার শক্তিতে, তঁাহার চেষ্টায় ভারতবাসী এক্ষণে সেই সমস্ত অধিকারই পাইয়াছে। এইরূপে ধৰ্ম্মনীতিজ্ঞ, রাজনীতিজ্ঞ, পরম রাজনীতিজ্ঞ, পরম পণ্ডিত বলিয়া সমস্ত ইউরােপে রাজা রামমােহনের গৌরব প্রচারিত হইয়া পড়িল। তখন সম্রাট স্বয়ং মন্ত্রীসভা হইতে তাহার বাদশাহ প্রদত্ত ‘রাজা’ উপাধি —আপনাদের প্রদত্ত উপাধি বলিয়া মঞ্জুর করিলেন। এই সময় হইতে রামমােহন যথার্থ ই বিলাতের ঘর ঘর হইতে রাজ-পূজা লাভ করিতে লাগিলেন। এমন কি সেখানে সম্রাটের অভিষেক কালে—অভি- যেক স্থলে বসিবার জন্য তিনি মহা সম্মান ও গৌরবের আসন প্রাপ্ত হইলেন। তাহার পরে তিনি ফ্রান্স দেশে বেড়াইতে গেলেন। তাঁহার পরম বন্ধু ডেভিড় হেয়ার সাহেবের ভাতাও তাহার সঙ্গে সহচর হইয়া গমন করিলেন। সেখানে তৎকালের ফরাসী-সম্রাট ‘লুইফিলিপ স্বয়ং অষ্টম পরিচ্ছেদ ৪১ তাঁহার পরম আদর অভ্যর্থনা করিয়া একত্রে আহার করিলেন। মহা সম্মান অদ্যাবধি আর কোন বাঙ্গালীর ভাগ্যে ঘটে নাই। এইখানে ফরাসী মহাকবি ‘টমাস মুরের সঙ্গে তাহার পরিচয় ও বন্ধুত্ব হইল। কবিবর আপনার ডায়েরীতে রাজা রামমােহনের অশেষ পাণ্ডিত্য, শক্তি, প্রতিভা এবং গুণগ্রামের বিষয় লিখিলেন। সেখান হইতে আবার বিলাতে ফিরিয়া আসিয়া রাজা হেয়ার সাহেবের বাড়ীতে রহিলেন। সেই সময়ে বিলাতের খৃষ্টীয় ধৰ্ম্ম-সমাজে একটা ভ্রান্ত সংস্কার ছিল যে, মানুষ মাত্রেই পাপ লইয়া জন্মগ্রহণ করে। রাজা তাঁহার অদ্ভুত প্রতিভার বলে, বিদেশী ধৰ্ম্ম-সমাজের সেই মত খণ্ডন করিয়া দিলেন, তাহাতে বিখ্যাত বিখ্যাত পাদরীগণ তাঁহার একান্ত অনুরক্ত হইয়া পড়িলেন। তাহাদের মধ্যে রেভারেণ্ড, ডেভিডসনের সঙ্গে রাজার এমন বন্ধুত্ব হইল, পাদরী সাহেব তাহাকে এমন ভক্তি ও শ্রদ্ধার চক্ষে দেখিলেন, যে তাঁহার পুত্রের নামকরণ’-উৎসবের সময়ে রাজাকে নিমন্ত্রণ করিলেন এবং সর্বসমক্ষে আপন পুত্রের নাম রাখিলেন—“রামমােহন। বিলাতে থাকিবার কালে বিস্তর সম্ভ্রান্ত ধনী বংশের সহিত রাজার প্রগাঢ় বন্ধুত্ব হইয়াছিল। ব্রিষ্টলের ‘ক্যাসেল’ বংশের সহিতও তাঁহার সেইরূপ বন্ধুত্ব হয়। ‘ক্যাসেল’ মস্ত ধনী সদাগর ছিলেন—তিনি বিস্তর ধন-সম্পত্তি, অট্টালিকা এবং কুমারী কন্যা রাখিয়া মারা গেলেন। কুমারী ক্যাসেলের এবং ডাক্তার কার্পেন্টারের অনুরােধে কিছুদিনের জন্য বিশ্রাম লাভের কারণে তিনি ব্রিষ্টলেকুমারী ক্যাসেলের বাড়ীতে গিয়া রহিলেন। ‘ব্রিষ্টল’ লণ্ডনের প্রান্তবর্তী মনােহর পল্লীগ্রাম—সেখানকার প্রাকৃতিক দৃশ্য বড়ই সুন্দর। রাজা রামমােহন সেখানে গিয়া যেন নবজীবন লাভ করিলেন। সেখানেও তাঁহার বিস্তর বন্ধু মিলিল।
82 রাজা রামমােহন } সকলকে অমায়িক ব্যবহারে তিনি আপ্যায়িত করিলেন। এমন কি সেই পল্লীগ্রামের দরিদ্র কৃষকমণ্ডলীও রাজার বন্ধুত্বলাভে বঞ্চিত হইল । রাজা পরমানন্দে কৃষকদের কুটীরে কুটীরে বেড়াইয়া তাহাদিগকে ধন্য করিতে লাগিলেন। সেইখানেই কার্পেন্টারের কন্যা কুমারী মেরী কার্পেন্টারের সঙ্গে রাজার পরিচয় ও বন্ধুত্ব হইল। তিনিই কুমারীর প্রাণে লােকহিত- ব্রতের বীজ বপন করিয়া দিলেন। তাহার ফল ভােগ করিয়া এক সময়ে ভারতবাসী ধন্য হইয়াছেন। সেইখানে, রাজা রামমােহনের বক্তৃতা শুনিবার জন্য, একদিন এক বৃহৎ সভা হইল—সেই সভায় দেশের সমস্ত ছােট-বড়, ইতর- ভদ্র, স্ত্রী-পুরুষ, বালক-বৃদ্ধ সমবেত হইয়া রাজার বক্তৃতা শুনিল। সকলেই মুগ্ধ হইয়া ধন্য ধন্য করিতে করিতে গৃহে গেল—চিরদিনের মত তাহাদের হৃদয়ে রাজার পুণ্যমূৰ্ত্তি অঙ্কিত হইয়া রহিল। কিন্তু হায়! রাজা রামমােহনের ভাগ্যে উহাই শেষ সভা হইল। পরদিন হইতে তাহার জ্বর হইল এবং দিনে দিনে সেই জ্বর বাড়িয়া সাংঘাতিক হইয়া দাড়াইল এবং শেষে জীবন-সঙ্কট উপস্থিত হইল। কুমারী ক্যাসেল, কুমারী কার্পেন্টার, কুমারী হেয়ার প্রভৃতি মহিলারা মাতার মত মেহে, কন্যার মত যত্নে অহােরাত্র অক্লান্ত পরি- শ্রমে তঁাহার সেবা শুশ্রুষা করিতে লাগিলেন, অকাতরে অর্থব্যয় করিয়া বড় বড় ডাক্তার দেখাইলেন, ভাল ভাল ঔষধ-পথ্যের ব্যবস্থা করিলেন। কিন্তু হায়! কোন ফল হইল না। ২৭শে সেপ্টেম্বর রাত্রি প্রায় দেড়টার সময়ে তাঁহার মৃত্যু-লক্ষণ দেখা দিল। তৎপরে রাত্রি ২টা ২৫ মিনিটের সময় মহাপুরুষ এ জন্মের মত চক্ষু বুজিলেন। দেশৰাণী আবালবৃদ্ধবনিতা যেন পিতৃ-শােক পাইয়া কঁদিতে লাগিল। সেইখানে
অষ্টম পরিচ্ছেদ।
৪৩
কুমারী ক্যাসেলের একটি সুন্দর উদ্যানে তাহাকে পরম শ্রদ্ধা ও সমা-
রােহের সহিত সমাধিস্থ করা হইল।
তৎপরে স্বর্গীয় দ্বারকানাথ ঠাকুর যখন বিলাতে গেলেন, তখন
তিনি রাজার পুণ্যময় দেহ সেখান হইতে নভেল’ নামক স্থানে আনিয়া
সমাধিস্থ করিলেন এবং সেই সমাধিক্ষেত্রের উপরে একটি সুন্দর মন্দির
নিৰ্মাণ করিয়া দিলেন।
আমরা অধম বাঙ্গালী-জাতি, দাত থাকিতে দাঁতের মর্যাদা
বুঝি না, হাতে পাইয়াও রত্ন চিনি না, কাছে থাকিয়াও দেবতার পূজা
করিতে পারি না। তারপরে চিরদিন অনুতপ্ত হৃদয়ে তাঁহার স্মৃতির সম্মান
করিয়া ধন্য হই।
সম্পূর্ণ
ܝ ܙ {.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.