Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Shashthibata Prahashan
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
ষষ্ঠবাটা প্রহসণ।
শ্ৰীমতী প্রফুল্লনলিনী দাসী
কর্তৃক প্রণীত।
২০৮ নং কর্ণওয়ালিস ধ্রুট
কালিচরণ রায় কর্তৃক
প্রকাশিত
কলিকাতা।
৬৬ নং শিমুলিয়া ষ্ট্রীট রামায়ণ যন্ত্রে
শ্ৰীক্ষীরােদনাথ ঘােষ দ্বাৰা
মুদ্রিত।
১২৯৪ সাল।
No text on this page.
বিজ্ঞাপন। আজকাল নাটকের নাম শ্রবণ মাত্রেই অনেকের আন্তরিক বিতৃষ্ণা জন্মে, সেটা লেখকের দোষ, কি কালমাহাত্ম্য, এস্থলে তাহা স্থির করিবার প্রয়ােজন করে না। সম্প্রতি একটা সামা- জিক ঘটনাকে অবলম্বন করিয়া আমি এই ষষ্ঠিবাটা প্রহসণ খনি লিখিলাম, যদিও এ ধরনের দুই এক খনি প্রহসণ প্রচলিত হইয়া থাকে, তথ্য প্রকৃতি গত বিষয়ে অনেক পার্থক্য থাকায় পাঠ কগণ যে উপেক্ষা করিবেন না, এই সাহসে প্রহসণ খানি জনসমাজে প্রচার করিলাম। এক্ষণে সহৃদয় ব্যক্তিগণ এক একবার পাঠ করিলে পরিশ্রম সার্থক হইবে। আর এই পুস্তক পানি নব যুবক ও যুবতীগণের মনােরঞ্জন হইলে আপ- নাকে কৃতার্থ জ্ঞান করিব। শ্ৰীমতী প্রফুল্লনলিনী দাসী।
নাট্রোল্লিখিত ব্যক্তিগণ।
পুরুষ।
হরনাথ মুখােপাধ্যায়-কুমুদিনীর পিতা।
কুমার বন্দোপাধ্যায়-হরনাথের জামা।
শরৎচন্দ্র ন্যায়রত্ন
ঐ প্রতিবেশীগণ
রাধামোহন চট্টোপাধ্যায়
হরেন্দ্র নাথ চট্টোপাধ্যায়-জনৈক ভদ্রলােক।
ভােলা
}ঐ
ঐ ভৃত্য।
স্ত্রী।
}
রাজকুমারী-কুমুদিনীর মাতা।
কুমুদিনী ।
হয়না
চারুশীলা :
হরনাথের কন্যাগণ।
নিরদবালা—চারুশীলর সহচরী।
নলিনীকুমুদিনীর সহচরী।
বসন্তকুমারী
গিরিবালা
প্রতিবেশিনীগণ।
চুপ
বিনােদিনী
কামিনী নাপ্তিনী।
বাম।
দাসী।
মুষ্ঠিবাঁটা প্রসঙ্গ।
প্রথম অ
প্রথম দৃশ্য
কুমুদিনীর শয়ন গৃহ।
নলিনী ও কুমুদিনী আমিন।
নলিনী। হ্যা ভাই কুমুদিনী ? মেয়ে মানুষ হয়ে লেখা পড়ায়
এত যত্ন কেন? রেজুকার, তো আর করতে হবে না?
কুম। যদিই বা তাই করতে হয়, তখন কি করব?, তখন কি
তাের, স্বামির কাছে ধার, করব?
নলিনী। আমার স্বামির কাছে ধার করবে কেন? তােমার ।
স্বামি নাকি একজন কেলেভার, লােক, সে থাকতে আমার
কত্তাকে টান্ কেন ? কেন ভাই একজনে কি আশা মেটে
? তােমার হাতে ওখানা কি কাগজ ভাই ?
কুমু। বঙ্গবাসী, কেমন মজা শুনেছি ভাই? এখন ব্রাহ্মর।
কেমন চলাটা ঢলাচ্ছে ?
নলিনী। তাই তো ভাই, এরা যে খ্রীষ্টাদের চেয়ে চলাতে
আরম্ভ করেছে। আচাৰ্য মশাই অমন লােক হয়েও এরূপ
যষ্ঠিটা
কেলেঙ্কার, কোচ্চেন কেন ? কৈ ভাই, দেওয়াজি মশাই
তাে এমন কখন করেন, নি?
কুমু। ক্যান কোর্বেন,? তিনিতাে আর মার বিয়ে দিবেন,
বলে তো খ্যাপেন্নি? আর বিধবা মাসিকে বাবুকোরে এনে
বিয়েও দ্যান নি ?
নলিনী। সত্যি ভাই, মিন্সেদের কাণ্ড শুনলে লজ্জায় মরে
যেতে হয়। ধৰ্ম্মের মধ্যে এ সব কেন? এরা এমি সব
ধাৰ্ম্মি, যে বাপ মাকে ভাত্ দ্যায় না।
নলিনী। যকৃগে ভাই, আর ও সব পােড়ারমুখাে মিলেদের নাম
কব্রিসূনে? ওদের নাম করলে পাপ হয়, ওরা আর না
মােলে আমাদের দেশের উপকার হবে না।
কুমু। না ভাই, তা বলতে পার না, ওর মধ্যে অনেক ভাল
লােকও আছে।
নলিনী। ওলাে ভালই থাকুক, আর মন্দই থাকুক, সব বিদেশী।
কলকেতার মধ্যে যারা আছে, হয় তাদের যেতে কোন
দোষ, নয় তাে সমাজচ্যুত। কাজেই খ্ৰীষ্টান, না হেয়ে ব্রাহ্ম
হয়েছে। আগে ভাই, মনে করতে এ ধৰ্ম্মটা ভাল, কিন্তু
কাগজে পড়ে আর লােকের মুখে শুনে সে সংস্কারটুকু
একেবারে গেছে।
ও
কুমু। ভাই, সেটা তাের, ভুল, ধৰ্ম্মকে যে ভাবেই নাও না কেন,
তাতে সেই ঈশ্বর বুঝাবে।
নলিনী। কেন ভাই! আমাদের প্রহলাদ, ধ্রুব, যুধিষ্টির এরা
কি হরি সাধন করে উদ্ধার হয়নি ? আমাদের ওসব কথায়
দরকার নাই, আমরা যেমন ব্রত নেম্ করে থাকি তেমনি,
যঠিবাটা।
ত
যেন করি, সেই ভাবেই যেন আমাদের এ জীবন কেটে
যায়। হরি যেন আমাদের অন্যমতি না দেন।
কুমু। তা নয়তো কি ভাই? আমরা পর পুরুষের সঙ্গে বেড়া
তেও চাই না, যেমন আছি এই রকম করেই এ ইন্মটা
কেটে গেলে বাঁচি ?
নলিনী। হঁা ভাল কথা মনে পড়ে গেল, বলি বেল ফুল।
ষষ্টীর বাঁটা তে এল, এবার তাের, ভাতার, আৰে না?
এতক্ষণ যে কথা এনেছিলে! তাই জিজ্ঞাসা করতে
পারিনে।
কুমু। (স্বলজ) কি জানি নে, শুনেছিলাম বাবা তো কাল
সকালে ভােলাকে পাঠিয়ে দেবেন, তা এখন তার ইচ্ছা।
নলিনী। (কুমুদিনীর প্রতি দৃষ্টি করত) হ্যা ভাই! তুই অত
ভাবচি কেন ? তোর তাে ভাই ভাব্বার, কারণ নাই,
তাের, বাপ, যখন ভােলাকে পাঠাবে বলেছে, তখন নিশ্চয়
পাঠাবে, তবে যদি তাের, ভাতার, না আসে সেই ভয়।
কুমু। যাই ভাই মা আমাকে ডেকেছেন, আবার কাল একবার
আসিস, লাে।
নলিনী। হ্যা ভাই, আমিও যাই ব্যালাটা গেল, এখনও অনেক
কাজ ক’ত্তে বাকি আছে।
( উভয়ের ভিন্ন ভিন্ন দিক দিয়া স্থান।)
প্রথম অঙ্ক। দ্বিতীয় দৃশ্য। চন্দ্রকুমারের বাটীর নিকটস্থ উদ্যান। চন্দ্রকুমারের প্রবেশ । চন্দ্র। (স্বগত) আহা! সন্ধ্যার প্রাক্কাল কি রমণীয়। कि সুমধুর! এই সময়ে প্রণয়ি ও প্রণয়িণীর অন্তঃকরণে যে কি অপূৰ্ব আনন্দের উদয় হচ্ছে তা আর বলা যায় না। পিককুল কুলায় বসে কুহু কুহু রবে কেমন সুমধুর স্বরে গান করতঃ বিরহি ও বিরহিণীর মনপ্রাণ হরণ কচে। মলয়পুষ্পের গন্ধবিস্তার আশয়ে মৃদুমন্দ-সমীরণে আঘ্রাণ- কারীকে বিভ্রান্ত কচে। মধুকর ও মধুকরীগণ কমলিনীর মধুপানশায় চতুর্দিক হতে গুন রবে ধাবিত হচ্ছে, কিন্তু অরসি পবনদেব, নববিবাহিতা কামিনীর লজ্জার ন্যায় প্রণয়িণীর প্রিয়সমাগম হতে বিচ্ছিন্ন করচে। বিহঙ্গমগণ বৃক্ষের শাখায় বসে অস্পষ্ট স্বরে সুললিত গান কচে। আহা! প্রকৃতি দেবী কি অপুৰ্ব্ব চিত্তরঞ্জনীয় শােভায় সুশােভিত হয়েছেন, এ সময়ে সকলেরই কি মনে আমার ন্যায় নব নব ভাবের আবির্ভাব হচ্চে? না আমার ন্যায় সকল বিরহি জনের হৃদয় বিরহানলে দগ্ধ হচ্চে? না, তা কখনই নয়। তাইত আমি কোথায় উদ্যানে মনের দুঃখ লাঘবের জন্য এলাম, তা মা হােয়ে আজ, আমার মনে এ
ষষ্ঠিবাটা।
৫
প্রকার ভাব উদয় হােচ্চে কেন ? যেন মনে হচ্ছে এখনি
সেই চন্দ্র বদনার চন্দ্রানন নিরীক্ষণ করে এ বিরহ তাপিত
দেহশীতল করি। এখন যদি পিতার বিনা অনুমতিতে যাই,
তাহলে তার অপমান হয়, তায় আবার কাল ষষ্টিবাটা
শুনেছি। আজ যদি যাই তাতে আমারও অপমান। বােধ
করি এখনই হােক বা কিঞ্চিং বলিম্বেই হােক, কেহ না কেহ
অবশ্যই আমাকে নিতে আসবে। দেখা যাক, এখন কি
হয়, যাহােক ক্ষণেককাল সােবরের ঘাটের সােপানাে:
পরি উপবেশন কোরে প্রাকৃতিক শােভা দর্শন করি।
( উপবেশন )
নেপথ্য হইতে।
•
গীত।
“দেখা দিয়ে প্রাণ প্রিয়ে জীবন কর শীতল।
হেরে বিধু বদন সতত চিত চঞ্চল ।
হেরিয়ে সে বদন, সদা মন উচাটন,
দিয়ে প্রিয়ে দরশন, নিভাও বিরহানল।
হেরিলে ও মুখশশি, সুখের সাগরে ভাসি,
হৃদি মাঝে অহর্নিশি, জাগিছে মুখ কমল ॥”
চন্দ্র বা বেস, গীতটী তাে, ঠিক আমার মনের ভাব কেড়ে
নিয়ে গাচ্চে, কে আমার ন্যায় উভয় সঙ্কটে পড়ে গাছে,
গলার স্বর যেন চেনা বলে বােধ হচ্ছে, তবে একটু মনাে-
যাৈগের সহিত শুনতে হােল।
নেপথ্য হইতে
যষ্ঠিবাটা।
গীত।
-
কঁদিছে প্রান আমার কেন সখে তারি তরে।
আদর্শনে দুঃখানল দহিতেছে এ অন্তরে
গিয়া সেখানে কেন, অরণ্যে করি রােদন,
কি করি প্রাণের বন্ধু, উপায় বলে দাও আমারে।
যদি যাই তার কাছে, পিতারুষ্ট হন, পাছে,
কেমনে বাঢ়ি আস্কাষে, উপায় বলে দাও আমারে।
৮। কে তুমি! আমার ন্যায় দুঃখে পােড় রোদন কোচ্চ, এস
ভাই, তুমিও আমার ন্যায় প্রিয়া বিরহে দুঃখিত হয়েছ, এস
দেথা দাও, তােমার সহিত বাক্যালাপ করে সন্তাপিত হৃদয়
শীতল করি। কই কেহ যে এলনা, তবে আর কেন বুথ।
, এখানে থাকি। নিশাপতি ! তুমি আমার দুঃখে সন্তুষ্ট
হয়েই বুঝি শিঘ্র ২ উদিত হবার উদ্যোগ, কোচ্চ ? যাই
গৃহে গমন করি।
(নেপথ্যে)
কোথায় গো জামাই বাবু ?
হুস নাই কান্ হবে কাবু!
চ! এ না আমার শ্বশুর বাড়ীর সেই পাগলা ভােলা, তার
গলার স্বর শুনতে পাচ্চি ? (নেপথ্যে অবলােকন করতঃ )
হ্যা তাই এই দিকেই যে আচে।
(ভােলার প্রবেশ)
সঠিবাটা।
৭
ভাে। (বলি) আমি ব্যাটা খুঁজেমরি।
(তুমি) হেথা করচ বাবু গিরি ?
দণ্ডবৎ জামাই বাবু। (প্রণাম )
চল। কি ভােলানাথ যে! ভাল তো, বাড়ীর মঙ্গল ?
বার মঙ্গল সবাই খোঁজে সেই কথাটা বল।
বাজে কথা মিছে কেন আমার কানে তোল •
চন্দ্র। ভোলানাথ। বাড়ীর খবর নেওয়া কি বাজে কথা ?
ভে। সব ভাল, তার সঙ্গে ২ আমিও ভাল।
চন্দ্র। তবে ভােলানাথ! এখন কি মনে করে আসাহয়েছে ?
ভো। জামে না কাল, তিথিটা কি।
ভােলা তাই এখানে আজ, অতিথি।
চন্দ্র। হা, এখন বুঝেছি, বাড়ী চল, বাগানে বসে রাত করি
কেন? চল ঘরে গিয়ে সব শুনিগে।
ভো। আমি বাড়িতে বলে এসেছি, অনেক্ষণ আপনার জন্য
সেখানে বসেছিলাম, সেষে গিন্নি মা বল্লেন্ যে, তােমাদের
জামাই বাবু বুঝি এই বাগানে বেড়াচ্ছেন, তাই এদিকে
এলাম।
চন্দ্র। অাচ্ছা, ভাল হয়েছে, তবে চল এখন ঘরেগিয়ে শুনিগে।
ভোলা। আর না বাবু ঢের, হােয়েছে,
এই নিন আপনার চিঠি।
কাল, না গেলে টেরটী পাবে,
থাকবেনা তােমার কান, দুটী ।
(পত্ৰ দিয়া দ্রুতবেগে প্রস্থান)
যষ্ঠিবাটা
চন্দ্র। (স্বগত) পাগলেরা কেমন সরল, কত কি ঠাট্টা তামাশা
কোরে পালাল, যাইহােক অন্ধকার হয়ে এসেছে, এখন
বাড়ী গে পঞ্জ থানা কি লিখেছে পড়া যাকগে।
(চন্দ্র কুমারের প্রস্থান )
যবনিকা পতন।
দ্বিতীয় অঙ্ক।
প্রথম দৃশ্য।
হরনাথ মুখােপাধ্যায়ের বৈটকখানা
হরনাথ রাধামােহন ও শরচ্চন্দ্ৰ আসিন।
}
শরৎ। তামাক খাইতে খাইতে) তবে ভায়া ! সম্বন্ধটা ভাল
হােয়েছে আঁ?
হর। আজ্ঞে সে কথা আর কেন জিজ্ঞাসা করেন। সম্বন্ধ যার
নাম! যা হােক, আমার মেয়ের কপালে যে এতটা সুখ
ছিল, এ আমি স্বপ্নেও ভাধি নাই।
শরৎ। হঁ্যা, বলি এদিকের বিষয় আশয় কেমন ?
হর। আজ্ঞে সে কথা আর কি বােল্বব! বিষয় অগাদ, তা
বিষয় আশয়ের কথা আর কেন জিজ্ঞেস করেন? দিন
গেলে বাড়ীতে আধমােন ত্রিসসের, চাল রান্না হয়, নিত্য
ক্রিয়াক, এমন দিন নাই যে, দশ বারজন অতিথি
না হয়।
শরৎ। আজ পাত্রী দেখতে আসবার, কথাছিল না?
হর। আজ্ঞে হ্যা, পাত্রের খুড়ােই স্বয়ং আবেন বোধ হােচ্ছে।
শরৎ। পাত্রটা তুমি স্বচক্ষে দেখেছ তাে?
হর। ( অপ্রতিভ রূপে স্বগত) কি সর্বনাশ! পাত্রটা তো
দেখিনি। এখন কি বলি এদের ? হায় হায় তখন
কেন একবার চোক্ষে দেখে এলেম না। ওটা একবারে
ষষ্ঠিবাটা
-
বিস্মৃতই হয়েছিলাম। আর সত্য সত্যই কান খোড়া
যদি হয় ! লােকের কথায় বিশ্বাষ কি? এরা আমায়
বড় আহাম্মেক ভাববেন দেখচি। যাহােক ব্রাহ্মণকে
যেরকম বোলেছি, এদের কাছেও সেই রকম বােতে
হোলাে।
শরৎ। কি হে, চুপ কোরে রইলে যে ? পাত্র কি স্বয়ং দেখে
আসনি?
হর। (চকিৎ ভাবে) আজ্ঞে, পাত্রের কথা বােলচেন ? আমি
শুনতে পাইনি, অন্যমনস্ক ছিলাম। তা--তা-
শরৎ। কৈ হে আজ মেয়ে দেখতে আসবার কথা ছিল, এখনও
কেউ এলেননা কেন ? ( উর্ধে অবলােকন করিয়া)
সন্ধ্যেওহয়ে এলো।
রাধা। হা হে ভায়া, তােমার মেয়েটা নাকি বেস লিখাপড়া
শিখেছে ?
র। আজ্ঞে হ্যা, সে উত্তম পড়তে পারে।
শরৎ। তুমি এমন দূৰ্ম্ম কোল্পে কেন? তুমি কি জাননা, মেয়ে
লেখা পড়া শিখলে তার ইংরাজি পড়া বর, নইলে পছন্দ
হয় না? তা যিনি তােমার জামাই হবেন, তিনি ব্যাক
রণ পোড়,চেন, তা কেমন করে তিনি তােমার কন্যার
মনােমত হবেন ?
হর। আজ্ঞে সে ব্রাহ্মণীর দোষেই হেয়েছে। তিনি অত্যন্ত
অভিমানিনী, যা বলেন, তার অন্যথা হােলে অত্যন্ত কষ্ট
হন। আমি কি কোরি, জেনে শুনেই এ কুকর্মে সম্মতি
দিয়েছি।
ষষ্ঠিবাটা। রাধা। আরে রেখেদ্যাওহে, মনােমত হবে না। মেয়ে-তার আবার মনােমত আর অমনােমত। যাতে তাতে ঘর- থেকে বাকোত্তে পাল্পেই হোলাে। ওগুলো জন্মে। কেবল চিরকালটা বাপ, মাকে জ্বলিয়ে পুড়িয়ে মারে বৈত নয়। ওদের দ্বারা বাপ, মায়ের কি উপকার হতে পারে ? রাতদিন কেবল দ্যাওরে দ্যাওরে। ওদের সঙ্গে কেবল খাওয়ার আর নেওয়ার সম্পর্ক। বেটারে শ্বশুর বাড়ী যাবার সময় বাপের বাড়ীর বঁটা গাছটা নিয়ে যেতে পাল্পেও ছাড়ে না। তা ওর ভাগ্য ভাল, যে এমন ঘরে গিয়ে পােল্লা। মেয়ের বিয়ে দেওয়া কুটুম্ব ঘরটা ভাল হলেই হােল, যাতে লােকের কাছে মুখ উজ্জ্বল হয়, (নেপথ্যে পদশব্দ ) সুরেন্দ্র । মহাশয় ! চুপ, করুন, তারা আচেন বুরি। (হরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রবেশ সকলে । ( গাত্রোখান করিয়া) আসতে আজ্ঞা হউক। আসতে আজ্ঞা হউক। হরেন্দ্র ( সমীপে উপস্থিত হইয়া) ব্রাহ্মণে ভ্যো নমঃ। ( নমস্কার ) সকলে। ব্রাহ্মণায় নমঃ (প্রতি নমস্কার) বােতে আজ্ঞা হউক। হরেন্দ্র। আজ্ঞে হ্যা, আপনারা বসুন। ( সকলের উপবেশন) রাধা । ( জনান্তিকে) ওরে ভােলা আ-আ। (নেপথ্যে আজ্ঞা যাই ই ই)
১২
ষষ্ঠিবাটা।
রাধা। ওরে শীঘ্র তামাক সেজে আন্।
হর। সেখানকার সমস্ত মঙ্গল ?
হরেন্দ্র। আজ্ঞে হ্যা, আপনাদের আশির্বাদে সমস্তই মঙ্গল।
হর। আপনার স্বয়ং আসাতে যে আমি কি পৰ্যন্ত আহলাদিত
হােয়েছি, তা বলা যায় না।
( তামাক, লইয়া ভােলার প্রবেশ)
ভোলা। তামাক, ইচ্ছে করুন। (হরেলের হস্তে হুকা প্রদান
ও সেইস্থানে দণ্ডায়মান।)
হরেন্দ্র। মহাশয় ! আমার ইচ্ছা পাত্রীটীকে এই সময়ে দেখি
কারণ, এক্ষণেই আবার যেতেহবে।
হয়। যেআজ্ঞা, বাধা কি ?
রাধা। ওরে ভােলা দ্যাখতাে চারুশীলার অাসার বিল
হচ্চেকেন ?
৫
( তোলার প্রস্থান)
(নেপথ্যে মলের শব্দ)
হর। চারুশীলা বুঝি আসছে।
( বামার সহিত চারুশীলার প্রবেশ )
শরৎ। (চারুশীলার প্রতি। এদিকে এস।
(চারুশীলার নিকটে গমন)
হরেন্দ্র। (স্বগত) আহা! কি অপরূপ রূপলাবণ্য! যেন স্বয়ং
ভগবতী কৈলাস পুরী পরিত্যাগ করে এসে দাড়ালেন।
আহা! এমন অমূল্য রত্নকে বিধাতা কি মরণ্যে নিক্ষেপ
কোরূচে!
ষষ্ঠিবাটা।
১৩
শরৎ। (হাস্য মুখে) মহাশয়। মেয়ে আর দেখতে হবে না।
ওর ঐ চো দুটো দেখুন না, দুটোর দাম দুলা টাকা
কবে। এই আমিযে এত বুড়াে হােয়েছি, ঐ চোখ দুটো
দেখ লে আমারও মনটা কেমন কেমন করে।
রে। আজে যথার্থ, এমন সৌন্দর্য্য তাে কখন দেখিনে।
আহা! সহস্র বৎসর কুমিক দেখলেও নয়নের তৃপ্তি
জন্মে না। আমাদের পরম সৌভাগ্য বলতে হবে, এমন
রাজলক্ষ্মী আমাদের কুল বধু হবেন।
শরৎ। রূপ দেখলেন, একবার গুণও দেখুন, লেখা পড়ার কথা
কিছু জিজ্ঞাসা করুণ।
হরেন্দ্র। (সহর্ষে) লেখা পড়াও জানেন? আহা! তা হােলে
তো সােণায় হােয়াগা হােলাে। তা আর বড় জিজ্ঞেস
কোত্তে হবে না, দেখেই বুঝতে পারা যাচ্চে। চন্দ্রে
যে সুধা আছে কেহ না বোলেদিলেও আপ না হােতে
জানা যায়।
শরৎ। না, তবু জিজ্ঞাসা কোত্তে হয়, এ একটা প্রথাই আছে।
হবে। মা! তােমার নাম কি ?
চাকুশল।। (স্বগত) পৃথিবী। তুমি আমায় একটু হান দাও,
আমি তোমার মধ্যে প্রবেশ করি। আর আমার এ যন্ত্রণা
সহ হয় না। হায়! আমার হৃদয়ে দিবানিশি আগুন
কােচে, কেহ কি তা অনুভব কোত্তে পারে না? কেই
কি আমার দুঃখে দুঃখিত হবে না? অথবা আমি কার,
দোষ দিব, সকলি আমার অদৃষ্টের দোষ, নতুবা বঙ্গ
দেশে নারী জন্ম গ্রহণ কোবো কেন? যা হােক এখন
১৪ যষ্ঠিবাটা। আমি কি করি? আমার তাে কোন ক্রমেই বাক্য সরে , আর আমার কথা কইতে ইচ্ছাও নাই। হরে। (স্বগত) একি। মেয়েটা বােবা না কালা? হবেও বা! তা নইলে আর এমন কুসুমকলী কি কখন কেউ নিগুণ ভেকের সেবায় দেয়? যাহােক শেষটা এ বুঝি মাখাল, ফল হয়ে দাড়াল। ধা। নাম জিজ্ঞেস, কোল্লেন বলে না, চুপ করে রইলে কেন? চারু।( মৃদুস্বরে) আমার নাম চারুশীলা। হরেন্দ্র.। (সহর্ষে স্বগত) না, না, এ কামিনী: কুসুম পরিমল- বিহিন নয়। আহা! কি মধুর স্বর ! একি কোকিল। রব কোলে ? না ৰীণার ধ্বনি শুনলাম ? হায়! আমি জেনে শুনে শারিকারে চিরকাল পেচকের সহবাসিনী কোরব? আমার পাপের সীমা থাকবে না। কি করি জ্যেষ্ঠের অনুমতিক্রমেই আমায় এই মহাপাপ, কোত্তে হােচ্চে। দেব দিবাপতে! আমি আপন ইচ্ছায় এ মধুবরীকে বিষবৃক্ষে আরােপিত কোত্তে উদ্যত হােই- নাই। ইহাতে আমার কোন অপরাধ নাই। শরৎ। কেমন, কন্যা মনােনিত হােয়েছে তাে? হরেন্দ্র। সে কি মহাশয়! সুধা কাহার না মনােমত হােয়ে থাকে ? রাধা। তবে ১৩ই আষাঢ়ে বিবাহের দিনস্থির হােলা। হরেন্দ্র। আজ্ঞে হ্যাঁ, এ শুভ কর্মে আর বিলম্বে প্রয়ােজন নাই। চারুশীল। (স্বগত) হা হতাস্মি ! সত্য সত্যই পিতা আমায় সমুদ্রে নিক্ষেপ কোল্লেন ? হে প্রাণবল্লভ! পৃথিবীতে
ষষ্ঠিবাটা।
আমার স্থান হােলাে না? ইহলোকে তােমার চানন
দেখতে পাবাে না! দেখি পরলােকে গিয়ে জন্মান্তরে
যদি তােমার সহিত মিলিত হােতে পারি। (মুচ্ছিতা)।
সকলে। ( সসম্রমে ) হায় ! একি! একি! কি সর্বনাশ ।-
যবনিকা পতন।
তৃতীয় অঙ্ক। E প্রথম দৃশ্য। হরনাথের বৈটকখানা। হরনাথ ও শরৎ আসিন। (চন্দ্রকুমারের প্রবেশ ও সকলকে প্রণাম ) র। এস বাবা এস, ভাল আছ তাে? পড়া শুনা বেস, হোচে তাে? চন্দ্র। আজ্ঞে হঁ্যা। শরৎ। কোন স্কুলে বাবাজির, পড়া হয় ? চন্দ্র। প্রেসিডেন্সি কলেজে। শরৎ। আচ্ছা! যখন সেই ওয়েব সাহেব, কোন ছেলেকে অপ- মান্ করে, তখন তো সব বেরিয়ে গেলে না কেন? চন্দ্র। সকলের মন তাে সমান নয় মহাশয়! শরৎ। তা বটে, কিন্তু দেখ, দোষ কোল্লে ওয়েব, সাজা দিলে ছেলেদের, বাঙ্গালির, ছেলে বােলে তাই সব সহ কোলে, কিন্তু ইংরেজের ছেলে হলে কি সহ করতো ? চত্র। মহাশয় ! ওদের কথা ছেড়ে দিন। (ভােলার প্রবেশ।
ধষ্ঠিবাটা।
১৭
ভােলা। জামাই বাবু! আপনি বাড়ীর মধ্যে চলুন।
চল। তুমি বাড়ীতে বলগে আমি যাচ্ছি।
হর। (জামায়ের প্রতি) যাও বাবা! জল খাবার, তােইরী
হােয়েছে জলখেয়ে এস।
শরৎ। যাই হে বেলাও অধিক হােলো, আহারাদি করা যাগগে ?
র। আমরাও চলু।
( সকলের প্রস্থান।
তৃতীয় অঙ্ক।
দ্বিতীয় দৃশ্য'।
চারুশীলার শয়ন গৃহ।
চারুশীলা আসিন।
A
চারু । (স্বগত) পিতা মাতাই অর্থের লােভেই কেবল আমাকে
দুঃখনিরে নিক্ষেপ করতে উদ্যত হােয়েছেন। আমি যখন
মনে মনে এক জনকে পতিত্বে বরণ কোরেছি ;-যখন
আমি দেহ, মন, জীবন, যৌবন সমস্তই সেই চরণে সমর্পণ
কোরেছি, তখন কিরূপে আবার অপর পুরুষকে পতিত্বে
বরণ কোর্বো? হৃদয় বিদীর্ণ হও;—আর আমায় দগ্ধ
কোরো না। আমি সহস্র বর্ষ দুঃখ ভােগ, কোতে সম্মত
আছি, কিন্তু এক দিনের জন্যে ধর্ম লােপ কোতে পারবে।
না। আমি বঙ্গনারী, পর পুরুষের মুখাবলােকন করা আমার
পক্ষে নিতান্ত ন্যায় বিরুদ্ধ ও ধৰ্ম্ম বহিভূত কৰ্ম্ম। অতএব
তুমি ক্ষান্ত হও, এতদিন যে ধৈৰ্য্যপাশে মনকে বন্ধ কোরে
রেখেছ, তাহা ছিন্ন কোরো না। আমার কাত্যায়নী ব্রত
কি বিফল হােলো? আমি পতিত্ব লাভায় গৌরি পুজা
কোরেছি, সমস্তই কি অলিক ? হায়! তবে আমি মনােমত
পতি লাভ কোত্তে পাল্লেম্ না? হে মা ভগবতী! ম স
ষষ্ঠিবাটা।
মঙ্গলে! মাগাে! দাসীর প্রতি প্রসন্ন হও। মনােমত পতি
লাভে প্রতিকূল হয় না। মাগাে! যেন তােমার কৃপায়
এ দুঃখিনী চির অকুল দুঃখ-জলধী হতে উত্তীর্ণ হয়।
গীত।
*
হরমা এতাপ ত্ৰিতাপ হারিণী।
নিদয়া হয়ােনা, ত্রিগুণ ধারিণী।
দুখের সাগরে, অকুল পাথারে,
ভাসিছে আসারে, দুঃখিনী তাপিনী।
করুণা বিকাশ, ভাবনা বিনাশ,
পুরাও মানস, মহেশ মােহিনী ।
হৃদয় আসনে, রাখিয়ে যতনে,
কোরেছি যে ধনে, সেঁপেছি পরাণি।
সেধন বিরহে, এ প্রাণ না রহে,
অপারে না চাহে, তব এ দুঃখিনী।
৫
---
তৃতীয় অঙ্ক। তৃতীয় দৃশ্য । ৫ হরনাথের অন্তপুরস্থ গৃহ। বার্মা ও রাজকুমারী গৃহকর্মে নিযুক্তা। বামা। হ্যা মা! একে কি খাবার, বলে গা ? আমি তাে আপ- নাদের এখানে থাক্বার, আগে কল্কেতায়, একজন, বড় জমিদারের বাড়ীতে ছিলাম। কিন্তু কৈ কখন তাে তাদের বাড়ী জামাই আসবার সময় এমন উদ্যোগ কোকে দেখিনে ? রাজ। সকলে কি সব জানে বাছা ? বা। তাদের বাড়িতে জামাই এলে বাজারের খাবার, খেতে দিত। রাজ। কলকেতার, মেয়েরা বড় সুখী, তারা বেসি কষ্ট সহ কোত্তে পারে না। বামা। হ্যা মা, তবে কি তুমি কল্কেতার, মেয়ে নও। রাজ। আমি বাছা কলকেতার, বৌ, কিন্তু কলকেতার, মেয়ে নই, আমার জন্মস্থান কি না পল্লিগ্রাম তাই বছি। ৰামা। তা দে মা, অনেক পাড়াগেঁয়ে-নেয়ে কলকেতায়, গিয়ে তারা একেবারে সহুরে হােয়ে পড়ে।
ষষ্ঠিবাঁটা
?
!
রাজ। সে সব, বাছা বড় মানুষী জানান হয়, যাদের কিছু নাই,
সেই সব, ঘরের মেয়েরাই বড় মানুষের বাড়ী বিয়ে হোলে
অহঙ্কারে মাটীতে আর পা দেয় না, তারাই কলকেতার
মেয়েদের ন্যায় ব্যবহার শেখেন ও পাড়াগাঁর দিলে
করেন। ভাল কথা মনে পড়ল, ও ঝি? নাপ্তিনীকে কি
কামাতে আসতে বলে আসা হয়েছে। যদি না বােলে
আসি, একবার তাকে ডেকে আন্। কুমুদিনীকে যে
আতা পরাবে।
রাজ। (নেপথ্যে দেথিয়া) একটু দাড়ানাধিনী আসচে বুঝি
( কামিনীনাধিনীর প্রবেশ)
কামি। থর, কি গো মা ঠাকরুণ।
বাজ। কামিনী! তাের আক্কেল, কি বল দেখি? তােকে কাল,
বলে পাঠান হয়েছে যে একটু সকাল সকাল এসে কামিয়ে
দিবি, তা যাহােক তুই খুব, এলি ?
(কুমুদিনীর প্রবেশ)
কুমু। (নাধিনীকে চিনিতে না পারিবার ছলে) কেরে?
কামি। এখন চিনতে পারবে কেন? বড় মানষের, মাগ,
হয়েছ। যাক ওসব, এখন কামাবে ?
কুমু। ওঃ তুই ? আমি বলি আর কে বুঝি। তা তুই দাড়িয়ে
বইলি যে? ঐ গুণ খানা টেনে নিয়ে বােনা?
কামি। বোসবো কি দিদিবাবু, আমার ঘরে ঢের, কাজ, তৰে
তােমার গুণে একটু বলি, তােমার কথা কি ঠেলতে পারি
বােন? তুমি আমাকে যে আয়ত্তি যত্ন কর।
( কামিনীর উপবেশন)
ষষ্ঠিবাটা।
বৌ কৈ ?
রাজ। ক্যান এত ব্যাস্ত ক্যান? বাড়ীতে কি কাকোয় বসিয়ে
রেখে এসেছি।
কামি। আমি নিজেই বসে গেচি। তা অপরূকে বসাব কি ?
কৈ তােমার নুতুন
রাজ। তার বাপের বাড়ি গেছে, আবার, আৰে।
কামি। হা গা মাঠাকরু? ছােট দিদিবাবুর বের, কি ঠিক
হােলাে ?
রাজ। না বাছা, ঠিক হয়েও হােছেন, চারুশীলার মনের
মতন বর, হয়নি বােলে হােচ্চে না। বিয়ের সব ঠিক
হয়েছিল, কেবল ওর অনিষ্কায় হােল না।
কামি। সে ভালই, মেয়ের অনিচ্ছায় বে দিলে মনে চিরকালের
জন্যে কষ্ট পাবে। আর অমন মেয়ের
বে কি যেমন
তেক ছেলের সঙ্গে সাজে? যেমন মেয়ে তেমন ছেলে
চাই।
রাজ। বাছা! সেই জন্যই হচ্ছে না। কিন্তু ছেলের অনেক
বিষয় আছে। বােধ হয় ঐ খানেই হবে। এখন তুই কুমু-
দিনীকে কামিয়ে দে, আমি একবার আচি।
(রাজকুমারীর প্রস্থান)
কামি। দিদিবাবু কামাবে তো এস।
কুমু। কামাব কিলো? তুই আলতায় জল দিয়ে বড় ফিকে
কোরে ফেলিস্ এত জল দিস্ কেন লা?
কামি। আমার জল দেওয়া অভ্যাস বোন! আলতায় কি-
এমন যৌবন তাতেই জল, দে বসে আছি। বলি দিদিবাৰু ?
তুমি আমার আলতার নিন্দে কর ?
ষষ্ঠিরাটা।
আমার আল তার গুণ জান নালাে ধনি।
মনের মতন নাগর পেলে খড়ি পেতে আনি।
যে পুরুষ থাকে সদা পর নারীর বশে ।
এনে দিতে পারি কে নিজ নারীর পাশে ।
আমার আলতার গুণ আর হীরে মালিনীর ফুলের গুণ
দুই সমান দিদিবাবু।
কুমু। ওলল তুই তাে খুব, মেয়ে দেখছি ?
কামি। দিদিবাবু! আমি মেয়ে হোয়ে কত পুরুষকে নাকানি
চোপানি খাইয়ে দিতে পারি। তা কি কামাবে ?
কুমু। কামাব বৈকি। তাে মতন এমন নাপ্তিনী আর কোথায়
পাব বল? তা যাচ্চি দাড়ানা, তাের, সেই বঁধুর গাটা
একবার গা
কামি। দিদি বাবু! সে আছ, নয়; আর এক দিন হবে, আজ
বেলা নাই।
কুম। ওলল আমার মাথা খাস।
কামি। আহা ওকি দিদিবাবু! অমন কথা কি বলতে আছে ?
তা গাইচি গাইচি-
গীত।
‘রসের নাপ্তিনী আমি সদাই থাকি রঙ্গে রস।
তাইতে যত রসিক নাগ থাকে সদাই আমার বাসে।
যুবতীরে আলতা পরাই, যুবক বশীভূত করাই,
আমার আলতার খোলতা দেখে,
লােভে ভ্রমর উড়ে সে।”
২৪
যষ্ঠিবাটা।
কুমু। হালা! তুই কি এমন কাজে ব্যাস্ত যে একটু বসতে
পার না?
কামি। ভাই আমি একলা, ঘরের সব কাজ কর্ম আছে, এ
সওয়ায়, আবার, আলতা পরাণ আছে। হাগা ভাল
মনে---আমার দক্ষিণেটা কবে হবে?
কুমু। হবে এক দিন ।
কামি। (হাস্য করিয়া) কি, দক্ষিণ পাড়ায় না গেলে বুঝি আর
দক্ষিণেটা দিচ্চ না ?
কুমু। নাতাে? এই দুই এক দিনের মধ্যেই পাবি।
কামি। বনি এসনাগো, আর বলা নাই, সূখ্য যে পাটে বসে।
মু। চল তবে যাই।
{ উভয়ের প্রস্থান)
চতুথ অঙ্ক।
প্রথম দৃশ্য।
চারুশীলার শয়ন গৃহ।
নিরদবালা ও চারুশীলা আসীন।
নিরদ। ভাই চারুশীলা। তুমি যেন আমায় পর পর, ভাব,
সকল কথা খুলে বলল না। তা ভাই, বিবেচনা করে দেখ
দেখি, আমার কাছে মনের কথা গোপন কোলে তােমার,
কি হবে ?/মনের বেদনা মনে রাখলে ক্রমে তার বৃদ্ধিই
হােয়ে থাকে। তা প্রকাশ করে বলো, মনোহুঃখ নিবা-
রণের যদি কোন উপায় থাকে, আমি এখনিই তার চেষ্টা
পাবো।
চারু। (দীর্ঘ নিশ্বাস ত্যাগ করিয়া) ভাই, তোমায় কাছে
আমার কিছুই গোপনীয় নাই। কিন্তু আমার সে কথা
বলা কেবল তােমাকে দুঃখিত করা মাত্র। ভাই সে
রোগের ঔষধ নাই, মৃত্যু ব্যতীত তার উপসমের অন্য
উপায় নাই। (অশ্রু বিসর্জন)
নিরদ। ছিঃ ভাই! একেবারে অধীর হওয়া কি উচিত?
অবশ্যই তার কোন উপায় হবে। আর যদি নাও হয়, তবু
মনের দুঃখ অন্যের কাছে প্রকাশ কেন্দ্রে ও তার অনেক
লাঘব হােতে পারে।
/
ষষ্ঠিবাটা। চারু। (অমার্জন করিতে করিতে) প্রিয়সখি! যে দিন অবধি সেই মনােমােহন কে দর্শন কোরেছি, সে দিন অবধি আমার চিত্ত আর আমার নাই। আমি দিবানিশি সেই মহিনী মূর্তির ধ্যান করি, আমার চিত্ত একালে হর্ষ ও বিষাদে অভিভূত হয়ে পড়ে। যখন ভাবি, তাহার সৌন্দৰ্য্য আলােক সামান্য, তখন আমার মন বিমল আনন্দ নীরে অভিষিক্ত হােতে থাকে। যখন চিন্তাকরি, তিনি আমার পক্ষে একান্ত দুর্লভ, তখন দুস্তর বিষাদপঙ্কে মগ্ন হয়ে যায়। সখি!'আমি হৃদয়ক্ষেত্রে দুরাশা-লতা রােপন কোরেছি, তার ফল মৃত্যু বই আর কিছুই নয়। (রােদন) নিরদ। ভাই! স্থির হও, অবশ্যই তােমার মনােরথ পূর্ণ হবে। তুমি নৈরাশ কণ্টককে মনহোতে উন্মুলিত কর ; হৃদয়ক্ষেত্রে আশা-লতা রােপণ কর, নিত্য তার সুখময় কল- ভােগ কোরবে। আমি তােমার সেই চিত্তচোরকে ঘােরে দিব। চারু। দীর্ঘ নিশ্বাস ত্যাগ করিয়া প্রিয়সখি! আর কেন আমায় বৃথা আশ্বাস দাও ? যখন দুরাশা-রাক্ষসী আমার মনাে-মন্দিরে প্রবেশ করেছে, তখন আর আমার আশ্বস্ত হবার বিষয় নাই। বিধাতা চিরদিন দুঃখভােগ করাবার, জন্যেই আমাকে সেই রূপ মােহে মােহিত কোরেছেন। সথি! তিনি দেব দুলভ মহারত্ন, আমি মানবী হয়ে কি রূপে তা লাভ কোরবে ? (নােদন) নিরদ। ভাই চারুশীলে! আমি যথার্থ বােল চি তােমার সেই চিত্ত চোরকে ঘােরে দিব। আমি তাঁর নাম্ ধম্ কলি যষ্ঠিবাটা। ! / জানি। সে চোর দিবা ভাগেই তােমার চিত্তহরণ কোরে মন রাজের কারাগৃহে বন্ধু হােয়েছে। এখন তুমি অনুগ্রহ না কোকিছুতে নিষ্কৃতি পাবে না। চারু। ( অমার্জন করিতে করিতে) প্রাণসখি! তুমি সে চিত্তচোরকে ধরে দিয়েই বা কি কোরবে? আমি কার কাছে অভিযােগ, কোরবাে? যখন দুর্ভাগা বঙ্গনারী হয়ে জন্মগ্রহণ কোরেছি, তখন কে আমার দুঃখে দুঃখিত হবে? প্রিয়সখি! শমন ব্যতীত আমাদের সহায় আর কেহ নাই, আমি তারই শরণাপন্ন হবে, তিনিই আমার দুঃখ দূর কোরবেন। নিরদ। (স্বখেদে স্বগত) হায়! প্রিয়সখির হৃদয়ক্ষেত্রে অনুরাগ তরু বদ্ধমূল হােয়েছে। এখন কিরূপে তার উলন করি? কিরূপে নৈরাশ ভুজঙ্গকে তার কোঠর হােতে বহিস্কৃত করি? কি বােলেই বা আশ্বাস প্রদান করি? নিষ্ঠুর দেশ- চার সকল পথ রােধ করেছে। এখন কি করি? ইহার জীবনে আর কিছু মাত্র আস্থা আছে এমন বােধ হয় না। ( প্রকাশ্যে) প্রিয়দখি ! স্থির হও। আমি তােমার মনােবেদনার কারণ পূৰ্ব্বে জানতাম্ না এমন নয় ; যে দিন অবধি সেই মহাভাগ তােমার মনোেমন্দিরে প্রবেশ কোরেছেন, সে দিন অবধিই আমি তার পূজোপকরণ আহরণ করবার চেষ্টা কচ্চি। সখি! কেবল তিনিই যে তােমায় রূপ মােহে মােহিত কোরেছেন এমন নয়, তুমিও তাকে লাবণ্যশরে আহত কোত্তে ক্রটি কর নাই। আমি শুনেছি, তিনি তােমা অপেক্ষা শতগুণ অধিক কাতর হয়ে ।
২৮
ষষ্ঠিবাটা।
ছেন। অতএব স্থির হও, অবশ্যই তোমার বাসনা পূর্ণ
হবে।
"
চারু। (দীর্ঘ নিশ্বাস ত্যাগ করিয়া প্রিয়সখি ? নৈরাশ বহ্নি
নির্জন দেশে আমার মনোমন্দির দপ্ত কোচ্চে, আমি কি
বােলে আশ্বস্তহই ?/প্রবল ঝটিকা কালে আমি মহার্ণবে মগ্ন
হােয়েছি, কিরূপে তাহার কুললাভের আশা করি ? প্রান্তর
মধ্যে হিংস্র শাদ্দল গ্রাস, কোত্তে আচে, আনি কার,
শরণাপন্ন হই ? প্রিয়সখি ! আমি যে দিকে দৃষ্টিপাত কোরি,
দু:খ পুঞ্জ ব্যতীত আর কিছুই দেখতে পাইনে। আমার
অনুৰ্বর মানসক্ষেত্রে আশালতা অঙ্কুরিত হয়েই শুষ্ক হয়ে
যায়, কিরূপে তার ফলভােগ করবো? (রোদন )
নিরদ। সখি চারুশীলে! আশ্বস্ত হও, আমি তােমার মনে-
রথ সিদ্ধির উপায় স্থির কোরেছি।
চারু। অমার্জন করিতে করিতে) সখি! তুমি বারম্বার
আমায় আশ্বস্ত করবার জন্য বৃথা যত্ন কোচ্চো, আমার
বহু ছিদ্র চিত্তপাত্র তােমার প্রবােধবারি কিছুতেই ধারণ
কোত্তে পাচ্ছে না। প্রিয়সখি! পিতা আমায় হস্ত পদ বদ্ধ
করে সমুদ্রে নিক্ষেপ কোচ্চেন, তুমি এখন আমার জন্যে
সুরম্য অট্টালিকা প্রস্তুত কোরেই বা কিকোরবে? সখি !
আমরা যথার্থই অবলা, আমাদের কিছু মাত্র সামর্থ নাই,
আমরা নিতান্ত পরাধীন। আমাদের স্বাধীনতার লেশমাত্র
নাই। পিতা আমায় ভুজঙ্গ বিবরে প্রবেশ কোত্তে আদেশ
কোচ্চোন, তাই কোতে হবে, কিছুতেই তার প্রতিরােধ
কোতে পারবে না। সখি! আমার জঙ্গলপূর্ণ হৃদয়ক্ষত্রে
ষষ্টিবাটা। ২৯ => বাসনালতা সুমুদগত হােয়ে কেবল বিষাদ সর্পের আশ্রয় হােয়েছে, কখন সুফল প্রসব কোরবে না। রোদন) নিরদ। ভাই! বৃথা আক্ষেপ, কোরােনা তােমার চিত্ত চোকে অবশ্যই আমি এনে দিব। স্থির হও উতলা হােয়ে। না, এখন ধৈর্ষ অবলম্বন ব্যতিত আর কোন উপায় নাই। ধৈৰ্য্য ধর, মনো আসা পূর্ণ হবে। সখি ! তােমার দুঃখনিশা অবসানের আর কিছুমাত্র বিলম্ব নাই; আশা- বীজ শীঘ্রই অঙ্কুরিত হবে। দিবা অবসান, প্রায়, ঐ দেখ প্রভাকর ক্ষীণ প্রভা হােয়ে অস্তাচল শিখর অবলম্বন কোচেচন, আমি এখন তবে বিদায় হই। ( নিরদ বালার প্রস্থান) চারু। (বিষাক্ত দ্রব্য হস্তে করিয়া) হৃদয়! এত কালেব পর আজি তােমার একটু উল্লাস দেখচি কেন ? পরলোকে যাবে সেই আহলাদে কি এমন হােয়েছ ? না কি প্রাণে শরের দর্শন পাবে ? হৃদয়! আমি তােমায় বারংবার অনু- রােধ কোচ্চি, তুমি এ দুরাশা পরিত্যাগ করে। তা হােলে আমি নিরুদ্বেগে পরলােকে গমন করি। কি বল ? আশা তােমার প্রিয়সী,তুমি তাকে পরিত্যাগ কোত্তে পারবে না ? আচ্ছা হৃদয়! একি তােমার অসঙ্গত অভি লাষ নয় ? তুমি মানবী হােয়ে কিরূপে সেই দেব সুনুর দর্শন পাবে ? আমি অনেক ভেবে স্থির কোরেছি, তিনি কখনই মানব নন, তা হলে এত দুর্লভ হবেন কেন? অত- এব তুমি ক্ষান্ত হও, আর আমায় বিরক্ত কোরাে না। মন।
ষষ্ঠিবাটা। তুমি কি চিরকালই পরের উপাসনা কোরবে? এক দিনও আমার কথা শুনবে না? আমি তােমার কাছে আর কিছু চাই না, এই মাত্র ভিক্ষা, তুমি আমার পরলােক গমনের প্রতিবন্ধক হােয়য় না। কি বল ? জীবন থাকতে নয় ? আচ্ছা, আমি এখনি জীবন পরিত্যাগ কোচ্চি। (হস্তস্থিত বিষাক্ত দ্রব্যের প্রতি ) হে হলাহল ! তুমি যে উদ্দেশে আমার সঙ্গে এসেছে, তা সম্পন্ন কর, আমার শমন সদনের পথ দেখিয়ে দাও। আমি নিরুদ্বেগে এ পাপ ভূমণ্ডল ত্যাগ করে তথায় গমন করি। (বিষ ভক্ষণ) হা পিতঃ। আপনার মনােরথ সফল হােল না! মা ? এখন তুমি কোথায়। এক- বার তােমর আদরের ধন চারুশীলর অবস্থা দেখে যাও। হায় প্রাণেশ্বর ! তােম। বর্তমানে তােমার প্রণয়িনীর এই শােচনীয় অবস্থা! তা তােমার দোষ কি? সকলি আমার ললাটের লিপি, যাহােক মরি তায় ক্ষতি নাই, কিন্তু মনে এই দুঃখ রহিল যে মৃত্যুকালে তােমার চরণ যুগল দেখতে পেলেম্ না? হা নাথ ! দাসীর শেষ আক্ষেপ এই রহিল যে, তােমার মুখ দর্শন করে সমস্ত মনের জ্বালা নিবারণ কোত্তে পাল্লেম না। আশা ছিল তােমার প্রণয়িনী হয়ে সকল সুখে সুখী হব, কিন্তু সে আশা নিরাশ হােললা । তােমার চারুশীলার নাম আজ থেকে চির দিনের জন্যে পৃথিবী হােতে উঠল। শরীর অবসন্নতা ও মনের চাঞ্চল্য হেতু অধিক আর কিছুই প্রকাশ করতে পাল্লেম্ না। সভ্য মহােদয়গণ! আমার এই বর্তমান অবস্থা দেখে সতর্ক হােতে যত্নবান হবেন, যেন কেহ কন্যাকে অর্থের লােভে
ষষ্ঠিবাটা।
৩১
অসৎ পাত্রে প্রদান না করেন। উঃ! প্রাণ যায়-আঃ-
( অবসন্ন ও প্রাণত্যাগ)
ববনীকা পতন।
পঞ্চম অঙ্ক।
প্রথম দৃশ্য।
( হরনাথ মুখােপাধ্যায়ের বাটীর সম্মুখবর্তী পথ )
বিননাদিনী ও বসন্তকুমারীর প্রবেশ।
}
বিনো। ওলে বসন্ত ! তােকে যে আর দেখতে পাওয়া যায়
•লো? তুই যে দিন দিন ডুমুরের ফুলহচ্ছিস, তাের,
ভাতার, তােকে কি, না দেখলে থাকৃতে পারে না লা?
বসন্ত। কেন ভাই, এত ঠাট্টা কেন ? যৌবনকাল হােলেই ওলে।
সকলেই ডুমুরের ফুল, হয়ে থাকে, এ বয়সে কি ছেলে
বেলার মত খেলিয়ে বেড়াব ? তুই আপনার গায়ে হাত,
দিয়ে কথা কস্ না? এইটে আমার বড় দুঃখ হয়, কেন
তাের, ভাতার, কি তােকে ভাল বাসে না?
বিননা! ভাল কেন বাস্বে না? তা বলে কি দিন রাত ভাল
বাসতে হবে, ভাল বাসার সময়েই ভাল বেসে থাকে, সে
যাহােক ভাই, তুই এখন কেমন আছিস্ বল, দেখি ?
বসন্ত। ভাই মনের কথা। আমার থাকা থাকি কি বল, ওকে
মরিণী মা, এখন তুই কেমন আছি বল, দেখি ?
বিনো। হালা, আমার কথা আবার জিজ্ঞাসা কোত্তে হয় ?
তুই যদি খা ভাড়ে, তাে আমি খাই ঘাটে, যে ভাতারের
হাতে পড়েছি বােন্, এতে কি আর মনের আমােদ আছে ?
ষষ্ঠিবাটা।
বসন্ত। ওলাে মনের কথা! তােমাতে আমাতে এক যায়গায়,
বসে তপস্যা করেছিল তা না হােলে এমন পতি মিলবে
কেন বল ? আমাদের এ অন্ধের করে দর্পণ দেওয়া হয়েছে,
এ জন্মে মনের দুঃখ মনেই রৈল, সে যাহােক ভাই, এখন
শুনেচি-
বিনাে। না ভাই, কি বল দেখি।
বসন্ত। মুকুজ্যেদের কুমুদিনীর নাকি আজ ভাতার, আবে?
জামাইটা নাকি খুব ভাল, বয়েসও অল্প, লেখাপড়া বেস
জানে, যাহােক কুমুদিনীর কপাল ভাল।
বিননা। (দীর্ঘ নিশ্বাস পরিত্যাগ,করে) ভাই! কপাল সকলে-
রই ভাল, কেবল আমাদের মন্দ।
বসন্ত। আজ ওদের নূতন জামাই আসূবে, বড় ধুমধা হােচ্ছে।
বিননা। ওলো মনের কথা ! তুই জামিইকে দেখতে জাবিনে ?
বসন্ত। না ভাই আমার যাওয়া হবে না, যে পােড়র মুখে
ভাতারের হাতে পড়েছি, তাতে আমার কি আর আলাদ
আমােদ কর বার, যাে আছে ?
বিনে। ওলো সে কথা এখন ছেড়ে দে, মুকুজেদের জামা-
ইকে আজ দেখতে যাবার কি হবে বল দেখি?
বসন্ত। ভাই সে কথা এখন তাের, সঙ্গে সত্যি কোত্তে পারিনে,
একে আমি পরাধীন, স্বাধীন হলেও একদিন সাহস কোত্তে
পাত্তেম, হুকুম, না পেলে তো যেতে পারব না ?
বিনাে। ভাই এই তাের কেমন অন্যায় কথা, একবার খানিক,
ক্ষণ থেকে আলা আমােদ কোরে আসবি, এতে কি
তাের, ভাতার, নিষেধ, কর্ধ্বে ?
৩৪
ষষ্ঠিবাটা।
ওলো, তা তো জানিনে বোন্ । এখনকার,
পুরুষ মানুষের মন ভারি অশুদ্ধ, তাদের আপনাদের
মন যেমন, স্ত্রীলােকের মন ও তেমনি দেখে।
বিনো। ভাই, যা বলি তা বড় মিথ্যা নয়, এখন এই রকমই
চাল, চলেছে বটে, কাটা কেমন করে হােয়ে পড়েছে
যে, কুকর্মেই সকলের মতি হয়ে থাকে, আর কেবল পুরু-
ষের, দোষই দাও কেন বল, স্ত্রীলোকেই হচ্চে কু, আর
পুরুষে হােচ্চে, কর্ম, এই দুয়ে যােগ, কোরে কু-কর্ম হয়,
তা ভাই এক হাতে কখন তালি বাজে না।
বসন্ত। পেরিহাস পূৰ্ব্বক) ভাই এক হাতে তালি বাজে না
বটে, কিন্তু তালি না পেলে ত আর কেহ বাজাতে পারে
না (উভয়ের হাস্য)
বিননা। দেখ, দেকিন, গায়ে পেড়ে না নিলে কি কথার উত্তর
হয়ে থাকে ? পূর্বদিকে উত্তর বল্পে কি কথম উত্তর হয়ে
থাকে ?
বসন্ত। ভাই সে যাহােক, আমি অনেক্ষণ এসেছি, এখন
তবে যাই, যদি বেঁচে থাকি তবে আবার দেখা হবে।
( উভয়ের প্রস্থান)
পঞ্চম অঙ্ক।
দ্বিতীয় দৃশ্য।
কুমুদিনীর শয়ন গৃহ,
কুমুদিনী ও চন্দ্রকুমার আসীন্।
নলিনী, বসন্তকুমারী, গিরিবালা, চপলা
ও বিনােদিনীর প্রবেশ।
নলিনী। (হাস্যমুখে) আহা! আজ এখানে কি শােভা
হয়েছে, যেন সব, চাঁদের হাট বসেছে, রতিপতি স্বধাম
পরিত্যাগ করে, যেন আমাদের কুমুদিনীর গৃহে এসে উদয়
হয়েছে, আ মরি মরি ।
বসন্ত। হালো নলিনী! তাের, এত বিলম্ব হলো কেন ?
কত্তাকে কি ঘুম পাড়িয়ে এলি নাকি ?
নলিনী। হ্যা ভাই! ঘুম পাড়িয়ে এলাম বটে, ঘুম না
পাড়ালে কি আমায় ? কেন এই তােমরা কি তোমাদের
কত্তাকে ঘুম পাড়িয়ে আসলে না?
গিরিবালা। ওলো। আমরা নিজে ঘুম পাড়াইনে, আমাদের
ঘুম পাড়াবার লােক আছে।
চপলা। (জামায়ের নিকট গিয়া) কিহে ভাই পুরুষ মানুষ,
বলি তােমার নাম কি বল দেখি?
ষষ্ঠিবাটা।
চন্দ্র। একবারেই নষ্টা কি বলে ফেলব ? নাম না বল্লে কি
আমার সঙ্গে আলাপ কবেন না কি ?
চপ। ওহে ভাই নাম না বল্লে, কেমন করে তােমার সঙ্গে
আলাপ করব বল? আগে নাম জেনে রাখা ভাল, জানি
কি সময়টা বড় খারাপ, পড়েছে, ছেড়ে দিয়ে তেড়ে ধরায়
কি ফল আছে বল ?
চন্দ্র। দেখ ভাই তােমরা যার আশঙ্কা করছ তেমন কাপুরুষ
আমি নই।
বিনে!। ওহে প্রথমে অমন কথা অনেকে বলে থাবে, কিন্তু
শেষকালে শেষ করে ছেড়ে দেয়।
চন্দ্র। শেটা উভয় পক্ষেই, সে যাহােক, তবে আমার নাম
একান্তই বলতে হবে ? আমার নাম চন্দ্র ।
বিননা। (স্বহস্যে) ভাই! তােমার নামটা অতি উত্তম, কুমু
দিনীর পতি চন্দ্র, ঐ যে একটা কথায় আছে, উত্তমে উত্তম
মিলে অধম অধমে। কোথায় মিলন হয় অধম উত্তমে ।
সে যাহােক ভাই, এখন তুমি একটা নূতন গান, গাও দেখি
শােনা যাক।
চন্দ্র। দেখ ভাই আমি ভাল গাইতে পারিনে, আর বিশেষ
আমি তােমাদের কাছে, এসেছি আজকে তােমরা অর্থে
একটা গান গাও।
গিরি। সে কি হে ভাই, মেয়ে মানুষে কি কখন গান গাইতে
জানে, কে কোথায় শুনেছে বল ?
চন্দ্র। ভাই অমন্ কথাটা বলাে না, আর মেয়ে মানুষই হােচ্চে,
গাওনার অঙ্গ। মেয়ে মানুষ না থাকলে গাওনার এখন
যষ্ঠিবাটা।
* ৩৭
।
সৃষ্টি হােত না, মেয়ে মানুষ হাতেই পুরুষ গান শিখে
থাকে, তা ভাই তোমরা অগ্রে একটী গাও।
বসন্ত। ওলো গিরিবালা ! বুঝতে পাচিনে, আমাদের সাম্নে
গাইতে লজ্জা হােলো। তা ভাই এক কাজ কর , না হয়
ততারাই আগে একটা গা ।
নীত।
“আমার গেরা থেলিতে ইচ্ছা নাহি হয়।
পড়ত তেমন আর, হয় না সই আমার,
আগে গােলাম থাকতে গােল হােসে,
এখন সে না কথা কয় ।.
রংয়ের,জোর ছিল যখন, ফিহাতে গােলাম্ আস্ততা তখন,
এখন রংয়েতে বদ রং হয়েছে, তাইতে মনে দারূন ভয়।
ইস্ত বিন্তি কাবার কোরে, পদে পদে হর ধােরে,
সহজে করেছি পাঞ্জা প্রান সইলাে ।
আর নাই তুরুপের, জোর, হাতে নাই হর,
এখন সাত আটায়, করে মাটী কেরাই ফোরায় অসময় ।
চপল। ভাই বসন্ত, ভাল গীতটী গেয়েছিস, আর সে রংয়ে
রংনাই, কেরাই ও এখন কেয়ার হয়েছে। গােলামু আগে-
মতন, গোলাম হয়ে থাকে না, কাযেই আমাদের দুর্দশা
বেন।
বসন্ত। দুজনের হাড়ে হাড়ে গানের ভাব, বিদেছে না কি লো?
বিননা। গিরিবালা ! তুই চুপ করে যে আচিল,। কিছু বল না
ভাই।
।
।
যষ্ঠিবাটা।
বসন্ত। ওটা কেবল, তাের, তামাসাই।
গিরি। তাস খেলবিত আয়না সবাই?
বসন্ত। একটা কথা বলনা ভাই ?
গিরি। কি বলবিতে বল, এই বেলা?
বসন্ত। গেরাবুতে কড়ি খেলা?
রংয়ের নওলা টেকা কত ?
ভাই! বুঝিনে অত সত।
সাহেব বিবি কত গুনি?
তবে খেলবাে আগে শুনি।
চপলা।-( অবিষাদে )
গীত।
গেরাবু যৌবনের খেলা সমান নহে কখন।
সতীর সমান ভাব বেশ্যার সার রােদন।
গেরাবুতে সমুদয়, খেললো সাতকুড়ি ছয়,
আমাদের নাহিসয়, কুড়িতে হয় পতন।
কুড়িধরে লো গােলাম, যদি রংধরে নাম,
বদ রংয়ে একধরে, আর না করে গণন।
টেক্কা মুকুল উমে, একাদশে আদর ক্রমে,
আঠারাে নহলা ভ্রমে, গােলাম হয় পতন।
সাহেব লাে তিনে পাই, বিবী বাগান গেলেই সাই,
হয়ে বিবী নিচু তাই, গাউন অবল যখন।”
বিননা। ওলাে! তােরাকি সকলে এখানে তাস, খেতে এলি
আহাদ আমােদ কোত্তে এলি ? তােরা কিলো নিজেই
গােমাল,কৰি, না নূতন পুরুষ মানসের গান্ টন্ গুন্ ব ?
যষ্ঠিবাটা।
.
স। ওলাে! আমাদের সামনে চন্দ্রবাবু গান, গাইবেন না,
বােধ হয় গাইতে লজ্জা হােচ্চে।
বিনাে। আমরা আগে গাই তার কিছুই ক্ষতি নাই, কিন্তু ভাই
পুরুষ মানসের লজ্জা করা তাে ভাল নয়।
চপ। ওলো সকল পুরুষ,কি সমান হয়? ভাই! আর একটা
কথা বলি, আমাদের সানে লজ্জা হােতেও পারে, এখানে
যদি লজ্জা না করবে তবে আর কোথায় কোৱে ?
নলিনী। কে জানে ভাই কেমন লজ্জা, (চন্দ্রকুমারের প্রতি)
তবে আই আগে একটা গাই; কিন্তু ভাই আমি পূৰ্ব্বে
একটা কথা বলে রাখি, আমার গাওনা বড় ভাল নয় যেন
শুনে ঠাট্টা কোরো না।
চন্দ্র । ( লজ্জিতে) তবেই বুঝেছি। তুমি বেস, গাইতে জান,
তা ভাই একটা গাও, আর বিলম্ব করে না।
গীত।
‘সখি। সেকি তা জানে।
আমি যে কাতরা তারি বিরহ বানে।
নয়নেরি বারি, নয়নে নিবারি,
পাগরিতে নাৰি সে জনে।
দেহে মম প্রাণ আছে,
সতত তাহারি ধ্যানে ”
চন্দ্র। আহা! কি চমৎকার গীতটী শুনে আমার হৃদয় যেন
আনন্দ সাগরে মগ্ন হােল, বসন্তকালে কোকিলের পর যেমন
সুমধুর, তােমার গীতও অাজ তদ্রুপ এৰণ-বিবরে যেন
৪০
ষষ্ঠিবাঃ।।
সুধা বর্ষণ হােল, ভাই তােমাকে আবার আর একটী আদি-
রস ঘটিত গীত গাইতে হবে, তারপর আমি গাইব।
নলিনী। কিহে মিষ্টি কুল, পেয়ে কি আঁটা গুদ্ধ খাবে নাকি ?
আমি আর একটী না গাইলে তুমি গাইবে না, আচ্ছা ভাই,
তবে আর একটী গীত গাই।
গীত।
গুলাে ও সখি, যায় বুঝি প্রাণ কোকিলের স্বারে।
ত্বরায় এনে দেলো তোরা প্রাণ পতিরে।
একে তো যৌবন ভা, সহিতে না পারি আর,
তাহে মদনেরি শর, দহে অবলারে।
নলিনী। ভাই! এই আমার গাওয়া সাঙ্গ ভােলা, এখন তুমি
একটা গাও দেখি নি।
চন্দ্র। আচ্ছা ভাই, তবে আমাকে একটা গাইতে হেলো।
গীত।
“তােমারি তুলনা তুমি প্রাণ, এ মহীমণ্ডলে।
আকাশে গগনের শশি, দুষী সে কলচ্ছলে।
সৌরভে কি গৌরবে, কে তব সদৃশ হবে,
এ কেবল তােমায় সম্ভবে, যেমন গঙ্গা পূজে গঙ্গাজলে ।
বিননা। আহা! দেখ দেকিন, গীতটা শুন্তে কেমন লাগলো।
যেমন পুরুষ মানুষের মুখে গীত শুন্তে মিষ্টি লাগে, তেমন
স্ত্রীলােকের মুখে কখনই ভাল লাগে না, তােমরা কত স্থানে
বেড়াও, ভাল ভাল গীত শিখে এস, আমরা তো আর তা
}
ষষ্ঠিবাটা।
৪১
পারিনে, তবে ভাই আর গুটী কত গাও, যদি আমাদের
সৌভাগ্য ক্ৰমে তােমার আজ দেখা পেয়েছি, আর ভাগ্যে
আমাদের কুমুদিনীর বিবাহ তােমার সঙ্গে হয়েছিল, তাই
এই আমােদ আলাদ হােল, নৈলে কি আর হােতো ?
আবার তুমি কত দুিনে আবে, বেঁচে যদি থাকি তো দেখা
হবে, নয় তাে এই পর্যন্তই শেষ দেখা হােলাে।
চ। দেখ ভাই, তুমি যখন কথাগুলি প্রয়ােগ কর, আমার শ্রবণ
বিবরে যেন অমৃত বর্ষণ হয়, আমি আর কিছুই ভাবি না,
তােমাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ হওয়াতে আমি অত্যন্ত দুঃখিত
হলেম, কারণ আমি তােমাদের অদর্শন হয়ে কেমন কোরে
এ দেহ ধারণ করব তাই ভাবচি, ভাই ! তােমাদের সঙ্গে
আমার দেখা না হওয়াই ভাল ছিল, যেমন পতঙ্গল
অন্ধকারে থাকলে তাদের কোন কষ্ট হয় না, কিন্তু আলােক
দেখলেই অম্নি স্বীয় জীবন সমর্পন করে, তা আমার তাই
ঘটেছে।
বিননা। (সুচকিতে। রাত্রিও যে প্রভাত প্রায়, গগনের নক্ষত্র
গুলি যেন পরিশুদ্ধ কুসুমের ন্যায় দেখাচ্চে (চন্দ্রকুমারের
প্রতি) ওহে ভাই, এইবার আমাদের বিদায় দাও, আমরা
তবে স্বস্থানে প্রস্থান করি। যদি বেঁচে থাকি, তাহোলে
পুনরায় আবার দেখা হবে ? আর এটা গীত গেয়ে
আমরা বিদায় হই।
৪২
ষষ্ঠিবাটা।
গীত।
কুমুদিনী সনে শশি বিহরে আনন্দ মনে।
না পুৱাতে আশা ভানু প্রশিল গগনে।
তরুণ অরুণ কর, হেরি ম্লান নিশাকর,
ধরি করে প্রিয় শীরে, বিদায় চার সে ক্ষুন্ন মণে।
শশী প্রিয়া কুমুদিনী, অন্তরে হেমি যামিনী,
নাগর বচন দুখে ধান, বহে দুনয়নে।
ও সখ। ধরি পায়, দেখা দিও পুনরায়,
নতুবা চির বিদায়, দাসীরে রাখিও মনে
কামিমীগণ। ওহে ভাই! আর। তবে বিদায় হলেম; এখন
দেখাে ভাই! যেন তােমার বিরহে তোমার এটাতা
কুমুদিনী মুদিত না হয়। তবে এখন তােমরা উভয়ে মনের
সুখে প্রণয়-বারি শিঞ্চন কর।
বসন্তকুমারী, নলিনী,
গিরীবালা, চপলা
ও বিনােদিনীর প্রস্থান।
চন্দ্র । প্রিয়ে। সুখের রজনী অল্পক্ষণ স্থায়ী, ঐ দেখ দেখতে
দেখতে যামিনী ও অবসান হয়ে এলাে, তবে আমাকে
এখন বিদায় দাও? (কুমুদিনীয় হয় ধারণ করে) প্রিয়-
তমে! তােমায় অনেক কষ্ট দিয়েছি, অতএব নিজগুনে
ক্ষমা করে বিদায় দাও। যদ্যপি এ দাসের প্রতি অনুগ্রহ
থাকে, তবে পুনরায় এই শশিমুখ, খানি দেখে হৃদয়কে
শীতল কব।
কুমু! ( স্বামীর গলদেশ বাহুতে বেষ্টন করত) হৃদয়েশ, কি
ষষ্ঠিবাটা
৪৩
প্রকারে তােমায় বিদায় দিব ? তােমার তিলেক অদর্শন
যে আমার যুগান্তর বলে বােধ হয়? হৃদয়নাথ ! তোমার
বিচ্ছেদ আমি কখন সহ করতে পারব না, (ক্ষনেক নিস্তব্ধ ।
প্রাণের ! দাসীর জীবন তােমার নিকট রহিল, বিস্মৃত
হইও না। (রােদন)',
বিষাদে-
গীত।
3
মরি প্রাণ যায়, হায় আমি তায় পাব কেমনে।
ফুটিল প্রণয়-ফুল ত্যাজ, কটকের কাননে ॥
যেদুঃখ জীবনে সহি, সে বিনে আর কারে কাহ,
দুধানলে সদা দহি, সুখি হব মরনে।
কামিনী-কুসুমবন, যৌবনেতে সুশােভন,
তাহে বিরাজ মদন, অনুক্ষন শরাসনে
যবনিকা পতন।
সমাপ্ত।
No text on this page.
-
No text on this page.
No text on this page.