Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Kajjwala Ed.1
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
কজ্জল
শ্রীনরেন্দ্রনারায়ণ রায় চৌধুরী
প্রণীত
প্রথম সংস্করণ
মূল্য ১১ এক টাকা
প্রকাশক
দেবেচন্দ্র ঘােষ—পার্শনে এসিষ্টেন্ট,
ইষ্ট, এণ্ড, হাউস্, উয়ারী, ঢাকা ।
ঢাকা-নবাবপুর, নারায়ণ-মেশিন-প্রেস,
রাধাবল্লভ বসাকদ্বারা মুদ্রিত।
১৪
শ্ৰীমতী টুনু
চিরমেহের
ong
ORDERRORS
DRDPR.
No text on this page.
নাট্যোলিখিত ব্যক্তিগণ পুৱষপণ ) হরিরাজ কাশ্মীরের সম্ভ্রান্ত যুবক ঐ বন্ধু দণ্ডভৃৎ তুঙ্গপদ মন্দার বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ নৌকার মাঝি কাশ্মীরের জনৈক দরিদ্র লােক রাজকর্মচারী ঐ সেনাপতি ০ ০ ০ কিরক হরাদ্রি দর্শন er অভ্যাগত ঐ ক্রতু ভৃত্য ও সৈন্যগণ কজ্জ্বল। = = কঙ্কা (শ্রীগণ) পিতৃ মাতৃ হীনা দরিদ্র কন্যা ধনী সম্রান্ত-বংশীয়া যুবতী মুক্তিকার আত্মীয় হরিরাজের মাতা কুম্ভের মাতা-কজ্বলার পালয়িত্রী অভ্যাগতা মুক্তিকা শীলা আর্জ।
= = = প্রথম রজনী 'ঢাকা, উয়ারী, ইষ্ট এণ্ড হাউস। ১লা বৈশাখ, ১৩৩৫ সন । ( অভিনেতা ও অভিনেত্রীগণ।) হরিরাজ শ্ৰীমতী রাজলক্ষী দগুভূৎ শ্ৰীমতী কুসুম কুমারী 'তুঙ্গপদ শ্ৰীমতী সুরবালা কুম্ভ শ্ৰী ত্রিপুরা চরণ বন্দ্যোপাধ্যায় শ্ৰীমতী শরৎকুমারী (ভুবি) শ্রীসত্য চরণ ভড় কিরক শ্ৰীমতী রাণী সুন্দরী (বর্ধমান) হরাদ্রি শীনিত্যানন্দ দাস দর্শন পুলিন বিহারী বসু ক্রতু শ্ৰীব্রজ রাখাল ধর শ্রীমধুসূদন গােপ কঙ্খলা শ্ৰীমতী কামাখ্যা সুন্দরী (টেন শ্ৰীমতী মৃণালিণী (ফেী) মুক্তিকা শ্ৰীমতী মলিনা বালা শীলা শ্ৰীমতী গিরিবালা আর্জা ,
প্রস্তাবনা।
গাব আজি মােরা মিলন গান।
গাব প্রণয়, গাব পরিণয় গান !
গাব সােহাগ, প্রেম অনুরাগ !
প্রাণের পিয়াসা, আকুল, আবেগ ?
গাব কত আশা--কত ভালবাসা,
আঁখির নীরব লাজ মরম ভাষা।
গাব বিরাগ-মরম যাতনা ।
ব্যর্থ প্রেমের মরণ সাধনা !
হাসিব-নাচিব -মাতাব প্রাণ,
গাব: আজি মােরা মিলন গান।
No text on this page.
কলা
প্রথম অঙ্ক।
প্রথম দৃশ্য।
( রাত্রি ) অঞ্জনা নামক হ্রদের তীরবর্তী “লাল পাহাড়ের
উপর বিপুল প্রাসাদ—হরিরাজের আবাস বাটী।
( ভিতর হইতে হরিরাজের প্রবেশ )
হরিরাজ। ( অগ্রসর হইয়া চাপা গলায়) কুম্ভ, আছিস্ এখানে ?
কুন্ত।
( পিছন হইতে কুম্ভের প্রবেশ )
ডালে কি রাজা ?
হরিরাজ। নৌকা প্রস্তুত ?
কুন্ত। “লাল পাহাড়ের নীচে বাঁধা আছে ।
২ কঙ্খলা হরিরাজ। কজ্বলা কি আজও আমাকে দেখার আশায় আছে ? আশা ? এইতত এক চিঠি দিয়েছে। তুমি চলে এলে রাজা, তার আর ধড়ে প্রাণ থাকে না। চেয়ে দেখ রাজা, ঐ দূরে আলাে জ্বলছে, দেখতে পাচ্ছ- নীল পাহাড়ের গায় ছােট্ট একটি তারার মত মিট মিন্টু কচ্ছে ? হরিরাজ। হাঁ, কজ্জ্বলা আমাদের কক্ষে এই দীপের আহ্বানটি জ্বালিয়ে রাখে, জানি। সারারাত সে বাতির পাশে জেগে কাটায়। হরিরাজ। কজ্জ্বলা, কজ্জ্বলা, প্রিয়া আমার ! সকলে ঘুমুলে যাব, যাব--যাব তােমার কাছে। আমার বাতায়ন দিয়ে নিষ্ক্রান্ত হয়ে হ্রদ পার হয়ে আমি তােমার কাছেই উপনীত হব। কুম্ভ। ( খুঁজিয়া) চিঠিটা কোথায় রাখলুম ? ( ভিতর হইতে দণ্ডভূতের প্রবেশ দণ্ডভৃৎ। হরিরাজ, তােমার সঙ্গে কে ? হরিরাজ। ও কুম্ভ, আমার মাঝি । দণ্ডভৃৎ। ও দেখছি তােমার ছায়ার মতন। আমার মত লােক আবার রাজার ছায়া হবে কি
Web
দণ্ডভৃৎ। তোমার সঙ্গ ছাড়ে না—সেই কথা বছি।
হরিরাজ। আর ছাড়বেও না। দশ বছর আগে আমরা শিশু
ছিলুম—এক সঙ্গে থেকেছি, খেলেছি। একদিন
পাহাড়ের চূড়া থেকে তাকে গড়িয়ে ফেলে দিসে
জীবনের মত পঙ্গু হয়ে গেল।
কুন্ত। তারপর মাসের পর মাস যত্ন করে আমার পাশে
ব’সে কেঁদে কেঁদে জোর করে আমাকে যমের হাত
থেকে টেনে এনেছে, সে কথা কি ভুলতে পারি ।
হরিরাজ। যা-য এখন, কুম্ভ।
চলুম।
(দৌড়িয়া পাহাড় বাহিয়া নীচে নামিতে লাগিল।)
দণ্ডভৃৎ। হরি, তােমার সঙ্গে কথা আছে। কঙ্কাকে কি তুমি
ভালবাস?
হরিরাজ। কেন জিজ্ঞেস করছ ?
দণ্ডভৃৎ। জিজ্ঞেস্ করছি—কারণ আমরা বহুদিনের বন্ধু ; পাঁচ
বৎসর বিদেশে ঘুরেও এ বন্ধুত্ব কিছুমাত্র ম্লান হয়নি।
( তার হাত ধরিল )
( ভিতর হইতে মুক্তিকার প্রবেশ।)
হরিরাজ। আমার দিক দিয়েও সেই একই কথা। তুমি আমার
সেই প্রাণের বন্ধুই আছ। কঙ্কাকে ভালবাসি কি
জিজ্ঞেস্ করছ ?
৪
খতে
•
মুক্তিকা। (দু’জনের মাঝে আসিয়া দাঁড়াইয়া) আমিই তােমার কথার
উত্তর দেব, দণ্ডভৃৎ।
হরিরাজ। মা !
মুক্তিকা। আমার পুত্র এবং কঙ্কার বাদান হয়ে গেছে।
দণ্ডভৃৎ, আমাকে ক্ষমা করাে। কঙ্কার প্রতি তােমার
ভালবাসা আমি অত্যন্ত দুঃখের সহিত লক্ষ্য করে
এসেছি ;
আশা করি তুমি এ কাটিয়ে উঠতে
পারবে।
দণ্ডভৃৎ। আপনি কি নিশ্চয় জানেন যে কঙ্কা হরিরাজকে
ভালবাসে ?
মুক্তিকা। সন্দেহের কি কারণ আছে ?
দণ্ডভূৎ। কিন্তু, যদিই আপনার ভুল হয়ে থাকে—
হরিরাজ। আমার বিশ্বাস কঙ্কা আমাকে কিছুমাত্র ভালবাসে না ;
দণ্ডভৃৎকে তার চাইতে অনেক বেশী ভালবাসে।
মুক্তিকা। তুমি হরির পুরােণাে বন্ধু। তোমাকে বলতে দোষ
নেই, আমার স্বামীর অমিতব্যয়িতায় আজকে
আমার সম্পত্তি ঋণগ্রস্ত। কঙ্কার সঙ্গে বিয়ে হলে
দুই বড় ঘর এক হবে—পূর্ব সম্মান আবার ফিরে
আসবে। হরি ও কঙ্কা এক সঙ্গেই লালিত পালিত
উভয়ের প্রতি উভয়ের মনের ভাব এখনাে টের
পায়নি।
হরিরাজ। থামাে, মা! আমাকে কঙ্কা ভাল না বাসলে
কাশ্মীরের রাণী হলেও তাকে আমি বিয়ে করতে
পারি না।
মুক্তিকা। শুলে শত্রুজিতের বংশধরের গর্বিত উক্তি ?
হরিরাজ। দণ্ডভৃৎ, পার যদি তাকে তােমার করে নাও—আমি
তােমার সাহায্য করবে।
( ভিতর হইতে কঙ্কার প্রবেশ)
কঙ্কা। তা আমিও করব—কি বাজি রাখব ?
মুক্তিকা। চুপ, !
কঙ্কা। আমি দণ্ডভূতের উপর বাজি ধরতে রাজি আছি।
হরিরাজ। কঙ্কা, কি নিয়ে কথাবছি তােমাকে।
মুক্তিকা। হরিরাজ !
একদিকে সরে দাঁড়াও না, মাসীমা,ছােড়াটাকে বলতে
দাও।
হরিরাজ। দণ্ডভৃৎ জানতে চেয়েছিল তার উপর হরিরাজ কঙ্কার
বাজি জিতে নেবার সংকল্প করেছে কি না।
হােঃ ! হেঃ! হােঃ! আমি কি আবার একটা বাজি
নাকি! ওঃ ! ঘোড়া! বুঝেছি! তােমরা ঘোড়া
ডিঙ্গিয়ে ঘাস খেতে চাও, না ?
মুক্তিকা। নে—মা! মানুষের হৃদয় নিয়ে ছেলেখেলা করিসূনে।
!
কঙ্খলা
তো কখনাে
ছেলেখেলা !
কই, সেই জিনিষটি
হাতে পাইনি যে নিয়ে খেলা করব!
কঙ্কার পান।
আমি পাইনি যারে কেমন করে,
খেবাে তাকে নিয়ে !
আমি ফিরি তাহার খোঁজে,
সে যে থাকে মুখ লুকিয়ে !
সে তাে আমার মনের মতন,
আমি যে তার নই ।
আমার হাসি কান্না দুই আসে,
মনের কথা কারে কই
পেলে তারে দেবাে মােরে,
তারি হাতে সঁপিয়ে ।
র’বেনা কোন জ্বালা
ফেলে আপন হারা’য়ে !
( ভৃত্যের প্রবেশ।)
ভৃত্য। মা ঠাকরুণ, রাজকর্মচারী কিরক আপনার সঙ্গে
দেখা করতে চাচ্ছেন ।
মুক্তিকা। এই সময় ? লােকটা কি চায়? নিয়ে আয় এখানে।
( ভৃত্য নিষ্ক্রান্ত)
—লােকটাকে আমি ঘৃণা করি।
কঙ্খলা
কে
হরিরাজ। একটি আস্ত সয়তান ; মুখে আবার বেশ ভদ্রতা
আছে।
যেন একটি সিদ্ধ আলু খােসা ছাড়িয়ে দিও, হরি
দাদা। আসুন তাে, হরিরাজ-বন্ধু দণ্ডভৃৎ মহাশয় !
আসুন তাে আমার সঙ্গে! কি সুন্দর চন্দ্রালােকিত
রাত্রি-বাগানে একটু নৈশ ভ্রমণ করে আসি—বেশ
মজা হবে।
দণ্ডভৃৎ। মজা! আমার আশঙ্কা হয়—
কঙ্কা। কোন আশঙ্কা নেই—অত ভয় পাচ্ছেন কেন ?
আসুন।
(হাত ধরিয়া অগ্রসর )
দণ্ডভৃৎ। আপনার সঙ্গে হেঁটে চলা দায়।
হৃদয়-ভারে মন্থর লােকেরা হাঁটতেও যেমন পারে না
ঘোঁড়ায়ও তেমনি তারা অচল। আচ্ছা, কাকে
পরীক্ষা হবে। আমার নতুন কালাে ঘােড়াটায় চড়ে
পাহাড়ের পথে যখন নাবব তখন কিছুতেই আপনি
আমার সঙ্গে চলতে পাবেন না।
দণ্ডভৃৎ। সত্যি না কি।
( উভয়ে নিষ্ক্রান্ত।
হরিরাজ। সেনাপতি হলে কঙ্কাকে সাজতাে।
কজ্বলা CO) ( ভৃত্যসঙ্গে কিরকের প্রবেশ) কিরক। (মুক্তিকার প্রতি আপনার অনুগত ভৃত্য উপস্থিত। ( হরিরাজের প্রতি) কেমন আছেন, হরিরাজ ? চমৎকার রাত্রিটি আজ ! মুক্তিকা। কোন্ কাজে আপনার এখানে আগমন শুনতে পারি কি ? কিরক। (স্বগত) এখনাে সেই গর্ব। কাশ্মীরের রাণী হলে একে মানাতাে। (উচ্চে) বড় বিপদে পড়েছি, তাই আপনার দুয়ারে এসে হাজির হলুম। কালকেই আমাকে ৮০০ মুদ্রা দিতে হবে, নইলে আমার ধনসম্পত্তি সব জনরাজ শেঠ নিলামে চড়াবে। মুক্তিকা। আমি কি করবাে ? কিরক। আপনাকে বিরক্ত করতুম না মুক্তিকা। বিরক্ত ? কিরক। আমার পাওনাটা যদি দিয়ে দেন- মুক্তিকা। আগামী মাসে দেব। কিরক। হরিরাজ আর কঙ্কার বিয়ের মতলব করেছেন বুঝি ? হরিরাজ। ( অগ্রসর হইয়া) সাবধান কিরক! সকল কথা বলবার অধিকার সকলের নাই। মুক্তিকা। হরিরাজ, তুমি একটু সরে যাও এখন। (হরিরাজ
কজ্জ্বলা
b
চলিয়া গেল। এক কথায় বলুনতাে এখন, আপনি কি
চান ?
অদ্ভুত।
কিরক। আপনি কঙ্কার অর্থ দিয়ে আমার ঋণশােধ করূতে
চান, কিন্তু আপনার পুত্র তাে তাকে ভালবাসে না
আর ভালবাসলেও তা দেখাবার উপায়টি তার
অন্য একটি মেয়ে আছে তার হাতে—দুটির
মধ্যে খেলা খেলছে সে ভালােই।
মুক্তিকা। এ মিথ্যা—এ মিথ্যা কলঙ্ক রটনা হচ্ছে।
কিরক। তা যদি হ'ত তাে ভালােই ছিল। হ্রদের ওই পারে
ঐ আলােটি দেখছেন? আপনার পুত্রের দৃষ্টি
সেইখানেই নিবদ্ধ আছে। কঙ্কা যদি এ জাতে
পারে যে তার ভাবী স্বামীটি প্রতি রাত্রে সবাই
ঘুমুলে পর হ্রদ পার হয়ে অপর
একটি ভালবাসার
পাত্রীর নিকট যায় তবে সে
শুনি
মুক্তিকা। তাই কি এই বিয়েতে তার মত নেই ? নির্বোধ !
এমন সময়ে এই রকম পাগলামি!
কিরক। আমি তাে তাই বছি—এতে কোনাে মিথ্যা নেই।
মুক্তিকা। ঐ মেয়েটাকে তার ছাড়তেই হবে। আমি বলছি-
ছাড়তেই হবে।
কিরক। কিন্তু, আমি তাে শুধু কথায় বসে থাকতে পারি না।
আমি কালকের মধ্যেই হয় কঙ্কা তাকে বিয়ে করবে
কি ভাববে,
?
কজ্জলা
as
কঙ্কার এই লিখিত প্রতিজ্ঞা, নয় আমার প্রাপ্য দশ
হাজার মুদ্রা আমি চাই।
মুক্তিকা। অসম্ভব! আপনি আমাদের মাথায় বজ নিক্ষেপ
কচ্ছেন।
কিরক। আমাররা পৈত্রিক মাথাটি রক্ষা করবার প্রয়ােজনী
অস্বীকার কৰ্তে পারেন না।
মুক্তিকা। আপনি জানেন—যা চাচ্ছেন তা এখন আমাদের
সাধ্যাতীত। এ জেনেও কি গুপ্ত উদ্দেশ্যে এখানে
এলেন তাই ভাবি।
কিরক। সত্যি। আপনার সৌন্দৰ্য্য যেমন মনােমুগ্ধকর,
আপনার বুদ্ধিও তেমনি তীক্ষ্ণ।
মুক্তিকা। ব’লে যা।
কিরক। আমি একটা নির্বোধের কাজ করূতে যাচ্ছি।
বাস্তবিক! আপনি—আপনি নিজে যদি এর জন্যে
দায়ী হন তাহলে আমি অপেক্ষা করূতে রাজি আছি।
মুক্তিকা। কি
বলছেন আপনি নিজে দায়ী কি রকম ?
কিরক। অর্থাৎ সম্পত্তি বন্ধক না রেখে আপনি নিজেকে
যদি বন্ধক
মুক্তিকা। আপনি কি পাগল হয়েছেন ?
কিরক। আমি পাগলই হয়েছি—আপনার রূপে এই পনর,
বৎসর ধরে আমি পাগল হয়েই আছি-
?
কজ্জলা
O
কা। দুবৃত্ত ! আমার পুত্রের হাতে এর শাস্তি পাবে।
( ডাকিল) হরিরাজ।
হরিরাজ। (অগ্রসর হইয়া) না !
কি মা ?
| ০ ০ ০
(কঙ্কা ও দণ্ডভূতের প্রবেশ।)
কিরক। কঙ্কা!
হরিরাজ।
( একত্রে)
কি মশায় ?
মুক্তিকা। (স্বগত) পাজি! কঙ্কাকে সব বলে দিয়ে আমাদের
সর্বনাশ করবে! ( উচ্চে) কিছু নয়। (মুখ ফিরাইল)
কিরক। আপনার ভৃত্য।
ওঃ! ( দণ্ডভৃৎকে লইয়া নিষ্ক্রান্ত ) [ হরিরাজ সরিয়া গেল ]
কিরক। আপনি আমার মুঠোর মধ্যে। হরিরাজের গােপন
প্রেমের কথা আমি ছাড়া কেউ জানে না। আমি
আমার বুকের তলায় সেটিকে খুব গােপনেই রাখব,
যাদ—যদি আপনি শুধু মুখের
কথাটি
বলেন--
মুক্তিকা। ঘৃণ্য পশু ! আমি তােকে মনুষ্য নামের অযােগ্য মনে
করি।
কিরক।
সে তাে পনর বৎসর ধরেই জেনে আসাছ, কিন্তু সে
জানাতে তত আমার কিছু মনের বেদনা ঘুচেনি।
মুক্তিকা। এখন চাও তুমি আমার ঘৃণা এবং বিদ্বেষ কিনতে ?
ত
কিরক।
কঙ্কা যেমন চাচ্ছে আপনার পুত্রকে কিনতে।
সম্পত্তির মালিক যে মেয়েটাকে তাকে গিলতে বলা
হচ্ছে, তাকে সর্বান্তঃকরণে ঘৃণা না করে কি হরিরাজ
ওপারের মেয়েটাকে ভালবাসতে পারে ? কিন্তু
হরিরাজকে তত বিক্রী করবার চেষ্টায় আছেন।
বিক্রীত হওয়া যে কি কঠিন নিজের উপর পড়াতেই
বুঝি এখন তা টের পেলেন ?
মুক্তিকা। আপনি চলে যান এখান থেকে।
কিরক। হ-যাচ্ছি
-ভেবে দেখবেন সারারাত । কাল উত্তরের
জন্যে আবার আসবাে। যাই তবে।
(কিরকের গান।)
সছে বাঢ়িয়া হ্যায় মেরা পিয়ারা রূপিয়া।
আউর সব হ্যায় তামাম্ ঝুটা—ভেল হ্যায় এ দুনিয়া ॥
বেগর মৎলব দোস্ত কোয় নেই হ্যায় দুনিয়ামে,
পিয়ারী ভি বিগার যায় খাখা দো বামে ।
মগর রূপিয়া, কভি নেই বদতা সুরৎ তেরা,
যব লে যাও বাজারমে, মিতা ষােল আনা পূরা ;
দেগা ভুমে খানা, পিয়াসমে পানি,
দেগাসুরৎ আচ্ছি মজে কি জানি ;
দেউ তবিয়ৎ কি তনদুরস্তি আউর দেউ রূপিয়া।
তবহি ম্যায় সমঝেঙ্গে হম পায়া—সবকুচ পায় ।
( নিষ্ক্রান্ত)
কজ্জ্বলা
ত
মুক্তিকা। হরিরাজ ।
হরিরাজ। ( অগ্রসর হইয়া) লােকটা কি জন্যে এসেছিল ?
মুক্তিকা। নীল পাহাড়ের গায় ঐ যে আলােক জ্বলছে তার অর্থ
বলতে এসেছিল সে।
হরিরাজ। আঃ! জানাজানি হয়ে গেছে! মা, এখন জানলে
তাে কঙ্কাকে কেন আমি বিয়ে করূতে চাচ্ছি না।
মুক্তিকা। তাের কি বুদ্ধিলােপ হয়েছে, হরিরাজ ?
মেয়েটা কে ?
হরিরাজ। কজ্জ্বলা নাম—মা বাপ নেই।
মুক্তিকা। কৃষকের মেয়ে—ছােট জাত !
হরিরাজ। সে যেই হােক না কেন, প্রেমের চোখে সব সমান।
মুক্তিকা। এ বেশ, হরিরাজ। আমার মনে হচ্ছে তােমার
জীবন এবং সুখ দুঃখের উপর আমার কোনাে হাত
নেই। তুমি যেমন খুসিনা, বাবা, তােকে আমি
ব্যথা দিতে চাই না। ভগবান জানেন, তুইই আমার
সব। কিরক আমার কাছে এক প্রস্তাব করেছে।
তা মেনে নিলে কঙ্কার কাছে তুই নিজেকে বিক্রী না
করলেও পারি।
হরিরাজ। কি, মা? অবিশ্যি তুমি তা মেনে নিয়েছ ?
মুক্তিকা। না, কিন্তু তাই মেনে নেবতাের জন্যে—শুধু তাের
জন্যে তাই আমি মেনে নেব। আমাদের সম্পত্তির
.১৪
কঙ্খলা
50
উপর বন্ধক সে তুলে নিতে চায়, যদি আমি যদি
আমি—তার স্ত্রী হতে স্বীকৃত হই।
হরিরাজ। তুমি—তুমি, মা ? তার এত বড় সাহস হ’লাে-
মুক্তিকা। চুপ! সে ঠিকই বলেছে। আত্মত্যাগটা একদিক
দিয়ে করতে হবে—হয়ত তােকে নয় আমাকে দুঃখ
সইতে হবে। জীবন এখনাে তাের সামনে পড়ে
রয়েছে--আমার দিন অনেকটা পিছনে পড়েছে
তাের জন্যে, হরিরাজ—তাের জন্যে—তুই ই আমার
গর্ব-“তুই ই আমার আশা-তুই ই আমার সব—ওঃ!
জীবনের চেয়ে বেশী আমি তােরি জন্যে ত্যাগ করবাে।
হরিরাজ। কখখনাে নয়, কখ খনাে নয় ! যে তােমাকে এমন
অপমান করেছে সে কুকুরের জিভটাকে তার গলা
থেকে টেনে কেটে নিয়ে আসবে।
মুক্তিকা। বােকা ছেলে ! কালকে রাত হবার আগেই যে
আমরা রাস্তার ভিক্ষুক হয়ে যাব—এ বাড়ী-ঘর,
সম্পত্তি, মানসম্রম—সব ছেড়ে যেতে হবে। দারিদ্র্য
এবং অপমান যে দুয়ােরে দাড়িয়ে আছে, ঠেকাবি
কি করে ? তুই ছেলেমানুষ, নিজের সুখ ছাড়া কিছু
দেখবার শক্তি নেই তাের।
হরিরাজ। ওঃ! মা, মা, কি করা যায় ? কঙ্কার সহিত আমার
বিয়ে—অসম্ভব।
( পাহাড়ের উপর দিয়া উঠিতে উঠিতে কুম্ভের প্রবেশ
কুস্ত। ধীরে, রাজা—এতবড় গলায় বল্লে দিদিরাণী শুনতে
পাবে—এ দিকেই আসছে।
মুক্তিকা। লােকটা কি আমাদের কথা সব শুনেছে ?
হরিরাজ। শুনে থাকলেও কোন ক্ষতি নেই। গােপন কথা
দিয়ে আমার নিজের মনের চেয়ে তাকে বরং বেশী
বিশ্বাস করতে পারি।
মুক্তিকা। (অর্ধ স্বগত) কঙ্কার সঙ্গে আমি এখন দেখা করতে
পারবে না। রাত্রিটা ভাবি-হয় এম্পার, নয় ওপার
কাকে একটা হয়েই যাবে। তাসি বাবা
হরিরাজ!
( নিষ্ক্রান্ত)
রাজা, দিদিরাণী আসল কথাতাে জানেই না—জানে
যে তুমি কজ্জলাকে বিয়ে করেছ।
হরিরাজ। চুপ! সয়তান ! কোন্ সাহসে তুই আমার এই
বােকামির কথা আমার মুখের উপর বছিস ?
কুম্ভ। ঠিক, রাজা, আমি ভারি বদলােক—তােমাকে এ কথা
মনে করিয়ে দিলুম।
হরিরাজ। আমার রাণীর মত গর্বিত মা এ শুনলে কি বলবেন ?
কজ্বলাকে পুত্রবধু করে বাড়ীতে গ্রহণ করার কথাই
বা তাকে কি করে বলি ? কজ্বলা—কিছুই জানে
কজ্জ্বলা না সে ভদ্রসমাজের রীতিনীতি, জানে না সে ভদ্র- ভাবে কথা বলার এবং চলার ভঙ্গী! ওঃ! কি করিছি আমি ? কি করিছি আমি ? কুম্ভ। হায়! এই পুরােণাে বড়ঘরের শেষে কি এই দশা হ’লল! চাষার মেয়ে হবে কি না রাজার বাড়ীর বৌ। হরিরাজ। চুপ কর, পাজি ! আমার স্ত্রী সম্বন্ধে তুই অমন কথা বলছিস্ ! ঐ মুখ থেতাে করে দেব না !হায় ! আমার দরিদ্রা, সুন্দরী, পতিগত প্রাণা কজ্জ্বলা! কুন্ত। দরী বল্তে সুন্দরী ! এমন আয়না তৈরী হয়নি যা তার মুখের ছবি ঠিক ধরূতে পারে ! জলের উপর দিয়ে যখন তাকে নৌকা বেয়ে নিয়ে যাই তখন মাছগুলাে উপরে এসে উকি দেয় তাকে দেখতে আকাশের চন্দ্রতারাও সেই মুখের দিকে অবাক হয়ে চেয়ে থাকে। হরিরাজ। আমারি দোষ-একা আমারই—আমি একাই ভুগব সব। কুম্ভ। ওঃ ! দোষ আমাররা তাে—আমিও ভুগব না কেন, তােমার সঙ্গে, রাজা ? হরিরাজ। (কুম্ভের উপর হাত রাখিয়া ) কুম্ভ, যা নৌকায় যা— প্রস্তুত হয়ে থা—নীল পাহাড়ে যাব (পিছনে, আলােকের দিকে চাহিল) ( নিষ্ক্রান্ত )
কঙ্খলা
১৭
ভয় নেই, রাজা! ওই ব্যাটা কিরক, চায় এই
পুরােণণা ঘরের সর্বনাশ করতে। ছেড়ে দাও সব
কুম্ভের উপর। কুম্ভ একাই সব ঠেকাতে পারবে।
(চিঠিটা পাইল)—এই তাে কজ্জ্বলার চিঠি এতক্ষণ খুঁজে
পাচ্ছিলুন না; এ দিয়ে আর এখন কি হবে। দেখি
কি লিখেছে-“তােমার কজ্জ্বলার কাছে ফিরে এস,
তােমাকে দু'দিন দেখিনি, তােমাকে এক মুহূর্তও
ভুলতে পারি না। কষ্ফলা।” (আলােকর কাছে
গিয়া ঠেকিয়া ঠেকিয়া পড়িল )
( দণ্ডভৃৎ ও কঙ্কার প্রবেশ)
ওরা,চলে গেছে ?
দণ্ডভৃৎ। প্রায় মধ্য রাত্রি হয়ে এল।
কঙ্কা।
বাড়ীতে ঢুবার আগে জানতে চাই আনি, যে কোন্
সে মেয়ে আপনার হৃদয় অধিকার করে বসেছে।
স্বীকার কচ্ছেন তাে প্রেমে পড়েছেন—চোখেই তত
মালুম হয় যে প্রেমে একেবারে আকণ্ঠ নিমজ্জিত।
দণ্ডভৃৎ। তা স্বীকার কচ্ছি—কিন্তু আপনার ক্ষমতাও সেই
রহস্য আমার বুক থেকে টেনে বের করতে পাবে
। আমাকে জিজ্ঞেস্ করবেন না, কারণ মিথ্যা
কথা আমি বলতে পারবাে না, সত্য বল বার সাহসও
নেই আমার।
নিষ্ক্রান্ত)
২
১৮
কঙ্খলা
উনি আমাকে ভালবাসেন—ওঃ! ভালবাসেন—ছােট্ট
পাখীটা আমার বুকে নীড় বাঁধছে। ওঃ! আনন্দ
যে আর হৃদয়ে ধরে রাখতে পাচ্ছি না।
ককার গান
আজি যে আনন্দ ধরে না হৃদয়ে !
আমি তাে ফেলেছি আপনা হারায়ে ।
আমারি তরে সে:অধীর পাগল,
গেল মন-চোর সে কথা জানায়ে !
রমণীর প্রেম-কোমল পরাণে,
এসগাে তৃষিত চির-সুধা পানে!
আমােদে অধীরা, চপল মুখরা,
আমি আছি তব পথ চাহিয়ে।
( যেন দণ্ডভৃৎকে ডাকিতেছে) আজ্ঞে, আজ্ঞে ।
কুম্ভ।
কঙ্কা।
কঙ্কা।
কে ?
আমি মাঝি-নীচে দাড়িয়ে—ভদ্রলােকটির অপেক্ষা
করছি।
কোন্ ভদ্রলােকটি ?
এই যে এখ খনি গেলেন-তারি জন্যে।
দণ্ডভৃৎ কি এই সময়ে নৌকা করে বেরােন নাকি ?
আমার বলা ঠিক নয়—কিন্তু প্রতি রাত্রে নীল
কুম্ভ।
কঙ্খলা
১৯
পাহাড়ের গায় একটা আলাে জ্বলে—তা দেখে তিনি
হদ পার হয়ে সেখানে যান। এই যে এখানে এক
টুকরাে কাগজ ফেলেছেন—দরকারি নয়তো?
( কঙ্কাকে দিল)
আমি ফেলেছি! (আলােকের কাছে গিয়া পড়িল )
(স্বগত) ওরে ব্যাটা কিরক, তুই রাজার সর্বনাশ
কবি, না? দেখ, এখন কি করে সব উল্টিয়ে
কুম্ভ।
দিই।
কঙ্কা।
?
কুম্ভ।
দণ্ডভৃতের কাছে লেখা কোনো কৃষাণবালার প্রেম
লিপি; উনি যে প্রেমের কথা বলছিলেন তা এরি
জন্যে বােধ হয়! আমি কি তাহলে প্রবঞ্চিত হয়েছি
আমি যাই—ঐ তত সঙ্কেত জ্বলে উঠেছে।
সঙ্কেত ?
নীল পাহাড়ের গায় ঐ আলাে দেখতে পাচ্ছেন ?
একটি কুটীরের দরজায় এ জ্বালা হয়েছে—এই আলাে
তিন বার সরে যায় আর বেড়িয়ে আসে-যেন বলতে
চায়—“তুমি কি আসছ ?” তারপর উপরের ঘর
থেকে (উপরের দিকে ঘর দেখাইয়া দিল যদি ঐ বাতিটা
মিট মিট করতে থাকে তাহলে উত্তর বােঝা যাবে—
“না”, আর বাতিটা যদি নিবে যায়, তাহলে তিনি
জানালা দিয়ে লাফিয়ে পড়েন—আর আমরা নৌকা
কঙ্খলা
GSPO
ছেড়ে দি। দেখুন! (কুটীরের আলােক অন্তর্হিত হইল)
এই এক।
( আলাে আবিভূত হইল) এই আবার।
(অন্তর্হিত) এই দুই। (আবিভূত ) বলিনি আপনাকে ?
( অন্তর্হিত) দাড়ান, উত্তরটা এখনি দেখতে পাবেন।
( উপরের জানালা হইতে আলােক অন্তর্হিত হইল।) এই
আমার ভদ্রলোেকটি । বুঝলেন তাে’—উনি যাচ্ছেন।
যাই এখন।
দাঁড়াও, এই অর্থ নাও-দণ্ডভৃৎকে বললা না যে.আমি
একথা জানি।
কখ খনাে বলবাে না। (সরিয়া গেল )
আমি প্রবঞ্চিত হইনি ; উনি আমাকে ভালবাসেন
তাই আমাকে বুঝাতে চেয়েছেন। ওহ! কে যেন
বাগানে লাফিয়ে পড়ল।
{ পিছন দিকে চাহিয়া নিষ্ক্রান্ত)
( গায় কাপড় জড়াইয়া হরিরাজের প্রবেশ।)
( অগ্রসর হইয়া) আমি প্রস্তুত।
( হরিরাজ ভালাে করিয়া গায় কাপড়
মুড়ি দিয়া পাহাড় বাহিয়া নীচে নামিয়া গেল,
কুম্ভ পিছনে গেল )।
(লুকাইয়া থাকিয়া) সেই, সেই।
(হরিরাজকে দণ্ডতৃৎ বলিয়া ভুল করিল।)
কঙ্খলা
২১
য়ি দৃশ্য।
পাহাড়ের ভিতর দিয়া পথ গিয়াছে। সূর্যোদয়ের অল্প পূর্বে ।
(কিরকের প্রবেশ।)
কিরক। উপরের পাহাড় থেকে দেখেছি “লাল পাহাড়ের
নীচ থেকে নৌকা ছেড়ে চলে গেল। হ্রদ পার
হয়ে কুটীরে যাচ্ছে। কুটীরের এই মেয়েটা কে ?
যুবক হরিরাজের এই গােপন ভালবাসার পাত্রীটি
কে ? এ আমি বের করে ছাড়ব।
মন্দার। ( বাহিরে গান ধরিল )
মাৱেৱ গান।
মজা! মজা ! মজা!
আমিই শুধু বইনা বােঝা!
চেয়ে দেখ দুনিয়ার
ছােট বড় সবাকার
কত ভাবে কত বােঝ,
ঘুরছে সবাই কলুর বলদ
ঘানি গাছে চোখ-বােজা
মজা ! মজা ! মজা।
বােঝার জন্য সবাই পাগল,
বােঝা ছুটতে হয় বিকল ।
ভূতের বেগার খাটুতে সবাই
চলছে ছুটে সােজা।
মজা ! মজা! মজা।
২২
কজ্বলা
CO
করক।
একে ? ঐ ব্যাটা ঘােড় চোর মন্দার নয় কি ?
ঐ আসছে।
( গান গাহিতে গাহিতে কাধে বােঝা লইয়া মন্দারের প্রবেশ।)
–মন্দার নাকি ?
মন্দার। না ! আমি নই, আমার ভাই।
কিরক। আমি তােমাকে চিনি।
মন্দার। তাহলে “নাকি” বল্লে কেন ?
কিরক। একটু ভদ্রভাবে কথা বলতে ক্ষতি কি? ভদ্রতায়
তাে পয়সা খরচ হয় না।
মন্দার। বটে! হয় না নাকি ? রাজকর্মচারী, কিছু ঘুষ
দিয়েই যে “ভদ্রতা” করতে হয়।
কিরক। তােমার কাঁধে কি ?
মন্দার। সে দিয়ে দরকার ?
কিরক। আমি রাজকর্মচারী, উত্তর দিতে বাধ্য করূতে পারি।
মন্দার । এ আমার মার তােষকের জন্য তুলা।
কিরক। ভিতরে মদের বােতল আছে ?
মন্দার। ভিতরে কি আছে সে কে জানে—ভিতরে আর কারু
যেমন চোখ যায় না, আমারাে তত তেমনি চোখ
যায় না।
কিরক।
শােন মন্দার, যেমন খারাপ ভাব, আমি তেমন
খারাপ লােক নই।
২৩
C0
মন্দার।
সে শুনে এখন দরকার ?
কিরক। যেমন ভাব আমি তেমনি নই।
মন্দার। তাই নাকি ? আপনি তাে তাহলে বেশ সং সাজতে
পারেন।
কিরক। না, মন্দার। লােকে আমাকে যেমন বলে তেমন
খারাপ নই।
মন্দার। (কাধ হইতে বােঝ রাখিয়া তার উপর বসিয়া) ঠিকইতাে-
নিন্দা করাটাই হলাে মানুষের কাজ। আপনি সে
রকম হ’তে যাবেন কেন ?
কিরক। দেখবে আমি কেমন ভদ্রলোেক-খুব দয়ালু
তােমাকে আমি সব বিষয়েই রক্ষা করবাে।
মন্দার। বেঁচে থাকুন।
কিরক। মন্দার, কিছুদিন আগে তাে তুমি ঘােড়ার ব্যবসা
করূতে, এখন তাে সব ছেড়ে ছুড়ে ভবঘুরে হয়ে
ফিরছে।
মন্দার। বরাতে করে সব, বরাতে করে !
কিরক। না হে, কজ্জ্বলার প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছ, তাই—নীল
পাহাড়ের সুন্দরীটি তােমার হৃদয় হরণ করেছে সে
ততা আমি জানি—আর তারি জন্যে আজ তােমার
এই দশা।
মন্দার। হতে পারে।
২৪
কঙ্খলা
কিরক।
এ সত্যি। পাহাড়ের গর্তে বন্য পশুর মত তুমি
এখন বাস কর। রাত্রিতে ঘন ঘন তােমার বন্দুক
শােনা যায়। ঘুম নেই—সারারাত শিকারে কাটাও,
খারাপ রাত হলে পাহাড়ের গুহায় বসে বসে মদ
চালাও, কেমন ?
জানি আমি, এইতাে তােমার
জীবন।
মন্দার। তা অস্বীকার করবার যাে নেই।
কিরক। আচ্ছা, এখন যদি তুমি একটি বাড়ী পাও, গরু বাছুর
মহিষ পাও, চাষের জমি পাও, তাহলে কজ্জ্বলা খুসি
হয়ে তােমার কাছে চলে আসে, না ?
মন্দার। তা জানি না। তবে শুনিই না আমার গােহল রাত
পােহাতে না পােহাতে এমন গরু বাছুরে কি করে
ভরে উঠবে ?
কিরক। তুমি শুধু ঐ নীল পাহাড়ের কুটীরে কে থাকে
জেনে দিবে।
মন্দার। সে তাে জানি—কুন্ত থাকে আর তার মা শীলা।
কিরক। হাঁ, মন্দার, আর একটি মেয়ে কে থাকে এখানে
লুকিয়ে ?
মন্দার।
কিরক। সে শুধু রাত্রে বের হয়।
মন্দার। পেঁচার মত।
ওঃ !
কজ্জ্বল।
কিরক। সেই হরিরাজের উপপত্নী।
মন্দার। (কিরকের গলা ধরিয়া) এ! এ্যা।
কিরক। আরে—আরে—মন্দার—পাগল হয়েছ ?
মন্দার।
হয়েছে কি ; কেন—কেন—আপনি এমন
ভাবে আমার উপর হাত তুল্লেন ?
কিরক। কই, তুলিনি তাে!
মন্দার। আমি মনে করেছিলাম তুলেছেন। মাপ করবেন,
লাগেনি তাে ?
কিরক। বেশী নয়।
মন্দার। ঐ মেয়েটা কে জানতে চান ?
কিরক। এই নাও। (অর্থ দিল) আরাে সব দেব-খবর দিলে ।
মন্দার। বেঁচে থাকুন। (স্বগত) রাজকৰ্মচারীর কাছ থেকে
এই প্রথম কিছু পাওয়া গেল ; জীবন ভরেই তাে
দিয়ে এসেছি।
কিরক। আজকে রাত্রে পাহাড়া দেবে ?
মন্দার। একটু পরে সেই কুটীরেই থাকব আমি।
কিরক। তাই ত চাই—বেশ ব্যাটা!
মন্দার। (স্বগত) সেইখানেই তাে চলছিলুম।
কিরক। কাল সব খবর নিয়ে আমার বাড়ী যাবে ?
মন্দার। যাব।
কিরক। আসি তবে ।
( নিষ্ক্রান্ত।)
কঙ্খলা
মন্দার। ব্যাটা যখন বল্লে কঙ্খলা হরিরাজের উপপত্নী, তখন
আর আমি সইতে পারুলুম না। ইচ্ছে হয়ে ছিল,
গলা টিপে ওর ভবলীলা শেষ করে দি! হায় রে
কজ্বলা ! তাের উপর পাহাড়া ! প্রতি রাত্রে ঐ
তারাটি যেমন তাের কুটীরের ফাক দিয়ে তাের
মুখের উপর তাকিয়ে থাকে, তেম্নি যত দূরেই থাকি
না কেন আমি, আমার মন যে দিনরাত তােকে
পাহাড়াই দিচ্ছে রে !
মাৱেৱ গান।
দিনরাত আমার মন
পড়ে আছে তাের উপরে।
কথা তাের আমার কানে
সদাই যেন মধু রে ॥
সুধা মাখা মুখটি তাের,
সাধ মিটে না দেখে মাের।
যত পাই ততই চাই,
একি যাদু কলি মােরে।
কঙ্খলা
তৃতীয় দৃশ্য।
(নীল পাহাড়ে শীলার কুটীর ; বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ তুঙ্গপদ বসিয়া
ধূমপান করিতেছে। জানালা দিয়া কজ্জল হ্রদের
দিকে চাহিয়া আছে)।
কলাৱ গান ,
ওগাে, আমি যে তােমার
খেলার পুতুল !
আমায় স্মরিতে, আমা প্রাণ দিতে,
মিনতি যেন গাে হয় না ভুল।
তুমি সত্য সখা, আমি যে কল্পনা,
তুমি বর, আমি নীরব সাধনা।
তুমি কায়া, আমি ছায়া,
তােমারে লভিতে চির আকুল।
তুঙ্গপদ। আয় তত মা, কঙ্খলা। গা’ তত মা, আবার
গানখানা গা’তাে ।
কঙ্খলা। আচ্ছা, বাবাঠাকুর।
(গান)
০ ০ ০
ওগাে আমি যে.......
( ইত্যাদি)
তুঙ্গপদ। যা শীত তামাকে যেন শরীর গরম হচ্ছে না।
একটু মদ না হলে চলছে না। মন্দারটা এখনন
কঙ্খলা
ক
এলাে না কেন ? দেখিতাে কজ্জ্বলাকে জিজ্ঞেস্ করে ।
( ডাকিল) কলা!
কজ্বলা।
কেন, বাবাঠাকুর ?
তুঙ্গপদ।
ও কি এসেছে ?
কঙ্খলা। না, তার নৌকা এখনাে আধা মাইল দূরে আছে।
তুঙ্গপদ। আধা মাইল।
ও আসতে আসূতে আমার গলা
শুকিয়ে যাবে যে !
কঙ্খলা। তুমি কি হরিরাজের কথা বলছ ?
তুঙ্গপদ। না রে ! মন্দারের কথা।
( মন্দারের প্রবেশ।)
ভয় নেই—এইতাে এসেছি, বাবাঠাকুর।
(পাত্র লইয়া শীলার প্রবেশ।
তুঙ্গপদ। (এক চুমুক খাইয়া) বেশ বাবা, মন্দার ! কজ্জ্বল,
মা, এই ছােড়াটাকে দেখলে তাের কষ্ট হয় না?
কজ্জ্বল। না, বাবাঠাকুর। তাকে আর ততটা খারাপ মনে হয়
এখন অনেকটা কাটিয়ে উঠেছে বলে বােধ হয়।
মন্দার। হাঁ, ঝড় কেটে গেছে—ঠাণ্ডা হাওয়া এবং পিনপিনে
বৃষ্টিকে মাথায় নিয়েই আমি স্থির হয়ে বসেছি।
হয়ত সে তােনাকে স্ত্রী বলতে লজ্জিত হয়, তার চেয়ে
এই মন্দারকে বিয়ে কলেই তােমার হ’তত ভালাে।
কুজ্জ্বল। তিনি লজ্জিত নন্—তিনি আমাকে নিয়ে গর্বই
মন্দার।
তুঙ্গপদ।
কলা
বােধ করেন। চাষার মেয়ের মত কথা যখন আমার মুখ
দিয়ে বেরােয়, কিম্বা যখন কোনাে অন্যায় কাজ করি,
শুধু তখনি তার ব্যথা হয়। কিন্তু আমি ভদ্র কথা
বতে শিখছি, আর কোনাে অন্যায় কাজ ও কবাে
ঠিক করেছি—আমি সম্পূর্ণ অন্য রকম হয়ে
উঠবে।
মন্দার। হায় ! আসলটা আমার কাছে রেখে যদি শুধু তাের
উন্নতিটাই সে নিয়ে যেত! হায়! নইলে তুই যদি
যমজ হ’তি!—কি বকুছি পাগলের মত। প্রকৃতিও
তত এমন দুটি গড়ে তুলতে পারতাে না।
কচ্ছল। বেচারি মার, তুমি কি আমাকে এখনাে এতদূর
ভালবাস?
মন্দার। তাের জন্যে কি আমি সব ছেড়ে দিইনি রে ?
ততাকে দেখা অবধি আমার জীবনে দিন রাত আর
তফাৎ আছে কিরে ? উপরে পাহাড়ে পাহাড়ে
ঘুরি—গুহায় পড়ে থাকলেও সেখান থেকে এই
কুটীর পরিষ্কার দেখা যায়। ওরে! চোখের জল
যদি বিষ হত তাহলে ঐ পাহাড়ের গায় একটুকুন
সবুজ রংও আর দেখতে পেতি—সব পুড়ে ছাই
হয়ে যেতাে।
কঙ্খলা। কিন্তু তুমি তাে জানতে আমার বিয়ে হয়েছে।
মন্দার। কই আগে তাে জাম না। পরে বাবাঠাকুর বল্লে- “মন্দার, কজ্বলার কাছে যাও। ও তােমাকে একটি কথা বল্বে।” আমি এলুম, তুই বলি তুই হরিরাজের স্ত্রী। আমি ভাবলুম- -ঠিক হয়েছে—আমি কোথা- কার এক ভবঘুরে—আমি কি তাের উপযুক্ত। ( মদ পান।) শীলা। ও থাক্ এখন। কজ্বলা, এখন একটা গান গেয়ে দাদাঠাকুরকে একটু ফুৰ্ত্তি দিয়ে দে না। কজ্জ্বল। হরিরাজ আমাকে চাষার গান আর গাইতে মানা করেছেন। তিনি বলেন—এ ঘােট লােকের কথা। তুঙ্গপদ। এই কথাই তাে মনের কথা, মা! ভদ্র কথা তাে মনকে খুলে না রে, মনকে সব রকমে ঢেকে রাখতেই অন্তরে অন্তরে তুই চিরকাল চাষাই থাকি মা, এই আশীর্বাদ করি। এখন একটা খাটি মনের গান গা’তো, মা ! চেষ্টা করে। ( কজ্জ্বলার গান ; মন্দার মাঝে মাঝে কোরাসে যােগ দিল।) আমি কভু তােমা ছাড়া নই। মিলনে তােমায় পাইগাে হৃদয়ে, বিরহে তােমারি স্মৃতিময়ী । গড়ে নাও মােরে মনােমত করে, এ প্রেম-অঞ্জলি পড়ে যেন ঝড়ে, হৃদয়-দেবতা তব পায়ে অই।
কঙ্খলা
O
শীলা।
হরিরাজ। ( বাহির হইতে) শীলা—শীল।
শীল।
( উঠিয়া) চুপ ! রাজা এসেছে।
কজ্বলা। ( ভীত হইয়া) হরিরাজ।
ওঃ! এখানে আমাদেরে
দেখলে উনি কি বলবেন—দৌড়ে পালাও, মন্দার
শীগগীর, মাসী এই সব সরিয়ে নিয়ে যাও।
তুঙ্গপদ। তাড়াতাড়ি—নইলে কজ্বলাকে আমরা বিপদে
ফেলবাে।
( সকলে মদের পাত্র ইত্যাদি সরাইয়া ফেলিল।)
হরিরাজ। শীলা !
( তুঙ্গপদ, মন্দার দ্রুত নিষ্ক্রান্ত)
এস, রাজা।
( শীলা দ্রুত নিষ্ক্রান্ত।)
( দরজা খুলিয়া হরিরাজ ও কুম্ভের প্রবেশ ; কুম্ভ তখনি
বাহির হইয়া গেল।)
কষ্ফলা। ওঃ, হরিরাজ, এত রাতে এলে ?
হরিরাজ। এসব চাষাভূষাের কথা আমার মুখের উপর ব’লল না
বছি—কি হয়েছে ? ফঁাদে-পড়া পাখীর মত কাপছ
যে বড় ?
কঙ্খলা। ফঁালে-পড়–না–
নাকঁদে-পড়া পাখীর
কঁপছি—আমি ?
হরিরাজ। তামাকের আর মদের কি বিশ্রী গন্ধ বেরুচ্ছে! কে
ছিল এখানে ?
কজ্জ্বল
কজ্বলা। বাবাঠাকুর ছিল, আর মন্দার আইসে না না
এসেছিল।
হরিরাজ। আমার স্ত্রীর উপযুক্ত সঙ্গই বটে-একটা ভবঘুরে !
কজ্বলা। আঃ! কে তাকে কইরেছে ভবঘুরে? তােমাকে
দেখবার আগে তাে সেই আমাকে ভালবাসতাে,
আমিও তাকে স্নেহ কইতুম্ ।
হরিরাজ। থাম, কজ্বলা—আমার স্ত্রী যে এমন অবস্থায় ছিল,
সে আর আমাকে স্মরণ করিয়ে দিয়াে না।
কজ্বলা। তুমি রাগ কইরলে তাকে এখানে আসতে মানা
কইরে দেব।
সে আমাকে ভালবাসে, আমার কথা
শুইনে আর আসবে না।
হরিরাজ। আমার চেয়ে বেশী বাসে, না ?
কজ্বলা। না, তা কি বলছি আমি? ওঃ! তুমি তােমার
কজ্বলার সাথে এমন কইরে কথা কও কেন ?
হরিরাজ। “এমন কইরে”! তুমি করে বলতে পার না ?
কচ্ছলা। চেষ্টা করব—চেষ্টা কচ্ছি। বড় শক্ত—কিন্তু তােমার
জন্যে আমি কি না কইরতে পারি।
হরিরাজ। কইরতে’ নয়—“করুতে’—“করূতে’ ! বুঝলে ?
কষ্ফলা। হাঁ বুঝলুম—আর ভুল বােধ হয় হবে না।
হরিরাজ। (স্বগত) এ অসম্ভব! একে কি করে স্ত্রীরূপে নিজে
হাজির করি ? ওঃ! এর সঙ্গে নিজকে জড়িত করা
0
কি পাগলামিই হয়েছে—হােক না এ খুব ভালাে-
খুব সুন্দরী।
কজ্বলা। হরিরাজ, তােমাকে ভারি মলিন দেখাচ্ছে, কি
হয়েছে ?
হরিরাজ। কিছু নয়, শুনে সুখী হবে না এমন কিছু নয়।
কঙ্খলা। কি বইছ তুমি ?
হরিরাজ। বইছ’! ‘বছ’—‘বছ’!
কষ্ফলা। হ—মাপ কর আমাকে।
হরিরাজ। আমি বলছি যে আগামী কল্যের পর আর আমাদের
বিয়ের কথা গােপন রাখবার দরকার হবে না, কারণ
আমি তখন পথের ভিক্ষুক হব। শত্রুজিতের মহিষী-
আমার মা-হবেন পরের অনুগ্রহের ভিখারিণী
সেই লজ্জার মধ্যে শত্রুজিৎ-তনয় কাকে পত্নীরূপে
গ্রহণ করূলে সে খোঁজ আর কেউ নেবে না।
কঙ্খলা। তুমি কি ভাব তুমি আমার কাছে নেবে আস আমি
তা’ চাই ? তুমি আমাকে জানাে না। দেখ হরিরাজু,
তুমি আর আমাকে স্ত্রী বলে ডেকো না—কাউকে
জাতে দিও না যে আমাদের বিয়ে হয়েছে। আমি
দাসী হয়ে তােমার মার ঘরে যাব—তুমি যেতে
যেতে যে খুসির হাসি হাসবে সেই হবে আমার
একমাত্র পুরস্কার।
৩৪
কঙ্খলা
।
!
হরিরাজ। তুমি নির্বোধ ! আমি বলিছি তােমাকে—কাশ্মীরের
সব চেয়ে ধনী ঘরের উত্তরাধিকারিণীর সঙ্গে আমার
বিয়ের কথা ঠিক হয়েছে। তার অর্থ ই এখন আমাকে
আসন্ন সর্বনাশের হাত থেকে রক্ষা করতে পারে।
আজ রাত্রে মা জেনেছেন যে এখানে আমি এসে
থাকি,আর তুমি কে তাও নাকে বলিছি।
কজ্বলা। ওঃ! তিনি কি কইলেন ?
হরিরাজ । শুনে তার মন ভেঙ্গে গেল।
কঙ্খলা। হরিরাজ! কোনাে আশা কি নেই ?
হরিরাজ। নেই। আমার জানা আছে, এমন কিছুই নেই।
কজ্বলা। একটা আছে আমি দেখছি।
হরিরাজ। আছে। আমাদের যখন বিয়ে হয় তখন আমরা
একরূপ শিশু ছিলুম—গােপনে যে পুরােহিত
আমাদের বিবাহে বদ্ধ করেছিল সে নেই। কুম্ভ ছাড়া
এ বিয়ের কোনাে সাক্ষী নেই। তার কথা এবং
পুরােহিতের লেখা এক টুকরা কাগজ ছাড়া এ
বিবাহের আর কোনাে প্রমাণ নেই।
কজ্বলা । ( বুক হইতে কাগজ বাহির করিল) এই।
হরিরাজ। কজ্জ্বলা ! আমার চিরন্তন ভালবাসা সম্বন্ধে তােমার
যদি কোনাে সন্দেহ থেকে থাকে তাে এই প্রমাণ
তুমি রেখে দাও, এ দিয়ে তুমি আমার ঘরে আশ্রয়ের
কজ্জ্বল
rab
}
দাবী করতে পারূবে; কিন্তু হায়! আমার হৃদয়ে
আশ্রয়ের দাবী করেই যদি তুমি ক্ষান্ত থাকতে !
কলা। তাতে কি তােমার রক্ষা হবে ? তােমার মা কি
আমাকে ক্ষমা করূবেন ?
হরিরাজ। তিনি তােমাকে আশীর্বাদ করবেন—তিনি তােমাকে
বুকে তুলে নেবেন।
কজ্জ্বল। কিন্তু তুমি অন্য একজন এসে তােমাকে বুকে তুলে
নেবে।
হরিরাজ। ওঃ! কজ্জ্বলা ! প্রিয়ে ! তােমাকে কি আমি ভুলতে
পারি ? জীবন থেকে অধিক যে তুমি আমার জন্যে
ত্যাগ কছ তা কি আমি মনে না রেখে পারি ।
কঙ্খলা। ওগগা ! যখন তুমি অমন করে আমার কাছে কথা
কও তখন আমি সব দিয়ে দিতে পারি---আমার
জীবন, আমার হৃদয়—সব।
কলাৱ গান
অদেয় তােমায় কি আছে আমার।
আমার যা কিছু সকলি তােমার।
তােমারি জীবনে জীবন আমারি,
তােমা বিনে আমি প্রাণে যে মরি !
তুমি সুখী হ'লে আমারি সে সুখ,
তব দুঃখে মম ভেঙ্গে যায় বুক!
জেনাে কিছু নেই অধিক আমার,
তমা চেয়ে মম এজগতে আর ॥
ওঃ! হরিরাজ । আমি তােমাকে ভালবাসি,-বড়
ভালবাসি। নিয়ে যাও এই কাগজ ছিড়ে ফেল।
(হরিরাজ কাগজ লইল)
৫
(দরজা খুলিয়া মারের প্রবেশ
মন্দার।
। কখখনাে ছিড়তে পারবে না।
হরিরাজ। পাজি! তুই শুছিলি সব ?
মন্দার। সব কথা। দেখলুম কুম্ভ আছে দরজার ফাঁকে কান
দিয়ে, কাজেই জানালার অপর ফাঁকটির কাছে
আমাকে যেতে হ’ল। কজ্জ্বলা, কাগজ ফিরিয়ে নাও--
এ প্রমাণ নষ্ট হতে তুমি দিতে পার না। অপর
একটি মেয়েকে প্রবঞ্চিত করুক, তা’কে উপপত্নী
করে রাখুক এই কি তুমি চাও ? কারণ এ দেশের
আইনে এক স্ত্রী থাকতে দ্বিতীয় বার বিয়ে করা
নিষেধ। আর হরিরাজ অপর কাউকে বিয়ে কল্লেও
তােমার ভালবাসাতে শেষ হয়ে যাবে না—সে তাে
আমার নিজের হৃদয় দিয়েই বুঝছি ।
ভালবাসাটাই কি অন্যায় হবে না?
কজ্বলা। না, না,।
হরিরাজ। চোর! ভবঘুরে ! তুই আমাকে ন্যায় অন্যায়
শিখাবি ?
মন্দার। আমি চোর, আমি ভবঘুরে অতি ঠিক কথা। কিন্তু
আমার গলাটি ফাসী কাঠে থাকলেও এ অবস্থায়
আমি হরিরাজের মত বড় ঘরের যুবককে বতুম যে
তার এই কাজ চোর ভবঘুরের ঘৃণারও অযােগ্য।
( তুঙ্গপদ, শীলা এবং কুম্ভের প্রবেশ।)
(হরিরাজ কাগজ ছুড়িয়া ফেলিয়া দিল)
হরিরাজ। তাই হােক—কজ্বলা, বিদায়! তােমার ঘর থেকে
এসব জীব পরিষ্কার হয়ে না সরে যাওয়া পর্যন্ত
তুমি আমার আর মুখও দেখতে পাবে না।
( নিষ্ক্রান্ত-কুম্ভও পিছনে গেল )
কজ্বলা। হরিরাজ-হরিরাজ । ( অগ্রসর হইয়া ) আমাকে
ফেলে যেয়ো না, হরিরাজ ।
তুঙ্গপদ। (বাধা দিয়া) থাম, কজ্জ্বল। ( কুন্ত ফিরিয়া আসিয়া
শুনিতে লাগিল )
কঙ্খলা। চলে গেছে -ওগাে! চলে গেছে।
তুঙ্গপদ। দাও তাে আমাকে কাগজখানা, মন্দার ! ( মন্দার
কাগজ কুড়াইয়া দিল ) আমার সানে এখানে
জানু পেতে বসাে, কজ্বলা কাগজটি বুকে রাখ।
কলা। (জানু পাতিয়া ) ওঃ! কি
করব
আমি-কি
কব!
তুঙ্গপদ। তােমার হাত রাখ এখন এর উপর।
কজ্জ্বলা
কষ্ফলা।
ওঃ ! আমার বুক—আমার বুক যে
ফেটে
পড়ছে!
তুঙ্গপদ। চুপ। এখন আমি যা বলি বল—ভগবানের নাম
নিয়ে—
কঙ্খলা । ভগবানের নাম নিয়ে
তুঙ্গপদ। শপথ কচ্ছি-
কজ্বলা। শপথ কচ্ছি—
তুঙ্গপদ। কি ঘুমন্ত কি জাগ্রত অবস্থায়—
কঙ্খলা। কি ঘুমন্ত কি জাগ্রত অবস্থায়
ভুঙ্গপদ। আমি আমার জীবনের পবিত্রতার ও সত্যতার এই
প্রমাণ।
কলা। আমি আমার জীবনের পবিত্রতার ও সত্যতার এই
প্রমাণ—
তুঙ্গপদ। কখনাে আমি আমার বুক্ষোদেশ হ’তে ত্যাগ
করব না।
কচ্ছল।। কখনাে আমি আমার বক্ষোদেশ হতে ত্যাগ
( কজ্জ্বলা চীৎকার দিয়া মাটীতে পিড়য়া গেল।)
কজ্বলা
GPO
দ্বিতীয় অঙ্ক ।
প্রথম দৃশ্য।
পাহাড়ের মধ্যবর্তী পথ।
হরিরাজ ও কুম্ভের প্রবেশ।
হরিরাজের হাতে একটি রক্তদল ফুল।
হরিরাজ। ওঃ! কি বােকার কাজই করিছি! আমার
সৌভাগ্যের পথে আমার যে কাৰ্য্য কণ্টকস্বরূপ
দাড়িয়েছে তাকে ফিরাতে আমি সর্বস্ব ত্যাগ করতে
পারি।
তােমার মনে ভারি কষ্ট বুঝতে পারছি, রাজা।
তােমার কুম্ভ কি তােমার জন্যে কিছুই করূতে পারে
? একবার মুখের কথা ছাড়, রাজা, আমি
তারপর তােনার জন্যে প্রাণ দিতে পাব।
হরিরাজ। কুম্ভ, বাস্তবিক আমার বড় কষ্ট। সেই সােন্নার
মন্দিরে তাের কথা না শুনে আমি ভারি নির্বোধের
কাজই করিছি।
কুম্ভ। আমি বরাবর এ নিষেধ করিছি।
হরিরাজ। তাকে বিয়ে কতে আমি পাগল হয়ে গেছিলুম।
কুম্ভ। আমি জাম রাজা, সে তােমার স্ত্রী হবার যােগ্য নয়।
৪০ ভদ্রতা নেই, টাকা পয়সা নেই,লেখাপড়া জানে না এমন একটা চাষার মেয়ে হবে রাজার বৌ! এও কি হতে পারে ! আমি তােমাকে বলেইছি— তখন তাে শুলে না ! হরিরাজ। যা হবার হয়েছে—এখন তাে ফেরানাে যায় না। কুম্ভ। সে কি করে বলি। তুমি একবার বলেই দেখ না— পেঁয়ােটা সে নিজেই খুলে দেয় কি না। হরিরাজ! না। কুম্ভ। এই কি তােমার প্রতি তার ভালবাসা? যার জন্যে তুমি সর্বস্ব ত্যাগ করলে ? তােমার সব শেষের তুলনায় তার শেষটা কি ? শেষ—চুলােয় যাক— সেটা আবার শেষ ? ফুলটা তুলে কতক্ষণ হাতে রেখে গন্ধ শু*কি না, কতক্ষণ পর শুকিয়ে গেলে আবার ফেলে দিই না ছুড়ে ? ফু! ভারি তাে একটা প্রাণী। হরিরাজ। সে স্বীকার হতাে, কিন্তু কুম্ভ। খুব সহজ এখনন, বছি তােমাকে। একবার মুখের কথা বল, আমি তাকে কাশ্মীর পার করে উজ্জয়িনী পার করে, গুজ্জর পার করে জাহাজে তুলে সমুদ্র- পারে পাঠিয়ে দিচ্ছি। সে আমার উপর ছেড়ে দাও —দেখবে পথ পরিষ্কার হয়ে গেছে।
কঙ্খলা
৪১
হরিরাজ। আরে বোকা তার কাছে যে বিয়ের প্রমাণ রয়েছে,
অন্যকে কি করে বিয়ে করি ? দু’বার বিয়ে!
এরাজ্যের আইনে নেই। ছেলেপিলে যে জারজ
সাব্যস্ত হবে।
কুম্ভ।
সব পরিষ্কার হয়ে যায় কোসে না রেখে তলােয়ারটি
যদি হাতে তুলে নাও।
হরিরাজ। (তার দিকে ফিরিয়া) কি বলছিস্ তুই ?
কুম্ভ।
শুধু তুমি মুখের কথা বল, রাজা! আমি তারপর
তােমাকে কথা দিচ্ছি—কলা আর তােমার পথ
কখনাে মাড়াবে না। আর আমাকেও কোনাে কথা
তুমি জিজ্ঞেস্ করাে না। শুধু তােমার মত থাকলে
তােমার হাতের এই রক্তদল ফুলটি চিহ্নস্বরূপ
আমাকে দাও, সেই আমার পক্ষে যথেষ্ট হবে।
হরিরাজ। (গায়ের মুড়ি দেওয়া চাদর ছুড়িয়া ফেলিয়া কুম্ভের উপর
পড়িয়া তাকে মাটীতে ফেলিয়া দিয়া) পাজি। সেই
মেয়ের গায়ে তুই কখনাে হাত তুবি, কি কখনাে
তুলবার চিন্তা কবি, তাহলে তােকে—
ওঃ ! মেরে ফেল্লেওগাে, ছেড়ে দাও—আর
কখনাে-
হরিরাজ। যা! দূর হয়ে যা আমার সম্মুখ থেকে। আমি
আমার এই সর্বনাশ নিয়েছি বুক পেতে—সে আমাকে
৪২ কজ্জ্বল। বুকে করেই রাখতে হবে । যে বুকটি আমার জন্যেই দুরু দুরু কচ্ছে—যে প্রাণের প্রদীপটি আমার জন্যেই দিবারাত্রি জ্বলছে—তাকে বন্ধ করে দেব, তাকে ফুৎকারে নিবিয়ে দেব ? আমি কি রাক্ষস্ ? আমাকে এমন অধঃপতিতই তুই মনে করেছি যে আমাকে এই ইঙ্গিত দিতে পাের সাহস হলাে ? হতভাগা। পাজি! আমাকে ওই তলােয়ার দিয়ে কেটে ফেল, রাজ।। হরিরাজ। শােন্ আমার কথা ভালাে করে এখন। এ দেশের রাণীকে যেমন আমার স্ত্রীকেও তেমনি সম্মান কবি। আর একবার তাের মুখে এই রকম ইঙ্গিত শুব- আর তাের জীবন শেষ হবে। সাবধান করে দিচ্ছি—ভুলি না। ( নিষ্ক্রান্ত।) ( উঠিয়া হরিরাজের চাদর কুড়াইয়া লইল!) আঃ ! সেই কোমল সুন্দর মুখটি! কজ্জ্বলার একটি কেশও তাে কেউ ছুতে পারবে না। কেউ নয়-অবিশ্যি সেই রক্তদলটি না দিলে। তা যদি দাও, তাহলে তােমার জন্যেই আমি এও করতে পারি, রাজা। ( নিষ্ক্রান্ত।
কজ্জ্বলা
৩৩
দ্বিতীয়
দৃশ্য।
মুক্তিকার প্রাসাদের একটি কক্ষ।
(কঙ্কার প্রবেশ)
ঐ যে বাগানে ঘুরছে। (জানালা দিয়া বাহিরে চাহিয়া
ডাকিল )—দণ্ডভৃৎ!
দণ্ডভৃৎ। (বাহির হইতে) এই যে !
কঙ্কা। মুখে এই হাসি দেখে কে বিশ্বাস করবে যে এই
লােকটিই সারারাত কাল এমন করে কাটিয়েছে।
(উচ্চে। কাল রাত্রে ঘুম হয়েছিল ভালাে? (স্বগত)
এক নিমেষের জন্যেও হয়নি সে তাে জানাই আছে।
দণ্ডভৃৎ। বেশ হয়েছিল; টেরই পাইনি রাত কি করে কেটেছে।
কঙ্কা। (স্বগত) ক’সে বেত চালালে ঠিক হয়। (উচ্চে )
কখন ফিরে এসেছিলেন ?
দণ্ডভৃৎ। ফিরে এসেছিলুম ! বাইরে কোথাও তাে যাইনি।
কঙ্কা। (স্বগত) বাইরে যায় নি ! গােপনে প্রেম করে
এমনি সাফাই গাওয়াই পুরুষের রীতি। (উচ্চে) কি
করছেন ওখানে ?
( দণ্ডভৃতের প্রবেশ।)
দণ্ডভৃৎ। উল্টো বাতাস ঠেলে হরিরাজ নৌকায় করে নীল
পাহাড়ের দিক থেকে হ্রদ পার হয়ে আসছে—তাই
দেখছিলুম।
৪৪
কাল রাত্রে নীল পাহাড়ে যেতে অনুকূল বাতাসই
ছিল আশা করি ?
দণ্ডভৃৎ। ছিল নাকি ?
কঙ্কা। অনেক রাত জেগেছিলেন, না ?
দণ্ডভৃৎ। তা জেগেছিলুম। যাকে ভালবাসি তাকে ভেবে
ভেবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা জানালার কাছে বসে
কাটিয়েছি—তার পর চোখ ঘুমে জড়িয়ে এল, যে
সুখ কখনাে আশা করতে পারি না, সেই সুখের স্বপ্ন
দেখলুম।
আমার মুখের দিকে সােজা চান্ তাে ?
দণ্ডভৃৎ। হায়! যদি কোনাে দেবতা এখন আমাদিগকে
পাথরে পরিণত করে দিতেননীচে নীল হ্রদ,উপরে
নীল আকাশের মত উভয়ে উভয়ের মুখের দিকে
চেয়ে থাকতুম—তত বেশ হত ।
কঙ্কা। আচ্ছা, যে পুরুষের দুটি ভালবাসার পাত্রী আছে—
একটির কাছে রাত্রিতে আর একটিকে দিনে প্রেম
জানায়, তার সম্বন্ধে আপনার কি বক্তব্য আছে ?
দণ্ডভৃৎ। তার দুকুলই নষ্ট হবে।
কঙ্কা। চমৎকার উত্তর ! ভারি ধূৰ্ত্ত আপনি!
দগুভৃৎ। কঙ্কা! তুমি কি বলতে চাচ্ছ জানি না, কিন্তু এটুকু
আমি জানি যে আমি তােমাকে ভালবাসি । আর যে
কঙ্খলা
৪৫
দুঃখের সান্ত্বনা তুমি দিতে পার না তাই নিয়ে তুমি
ছেলেখেলা কচ্ছ। এতদিন এখানে থেকে আমি
ভালল করি নি, হরিরাজের প্রতি আমার বন্ধুতা
স্মরণ করেই আবার সাহস করিছি—এখন তামি
চলে যাব।
( হরিরাজের প্রবেশ।)
হরিরাজ। না, দণ্ডভৃৎ! তােমার থাকতে হবে।
(কার গান)
ওগাে, নারী যে পুরুষ-হৃদয় লইয়ে,
শুধু খেলা করে ভেবােনা !
সে যে তাই করে শুধু জেনে নিতে চায়,
তাকে তার প্রাণ চাহে কি চাহে না !
পুরুষের প্রেম—শুধু খেলা!
নারী যেন তার খেলার ঢেলা !
এই টেনে নেয়—এই ছুড়ে দেয়,
এ দুইয়ের প্রেমে তুলনা করাে না।
কঙ্কা, সে তােমাকে ভালবাসে—আর আমার মনে এই
বিশ্বাস আছে যে আমার থেকে তাকেই তুমি বেশী
পছন্দ কর। এই মুহূর্ত থেকে তুমি স্বাধীন ;
আমার সঙ্গে তােমার বিয়ের যে পাকা কথা হয়েছিল
৪৬ তা থেকে তােমাকে মুক্তি দিলুম। তবে সম্মুখে রেখেই তােমাকে এই কথা বলছি। হরিরাজ! হরিরাজ। আমাদের বিবাহে বাধা আছে, তা তােমাকে পূর্বেই জানানাে উচিত ছিল, কিন্তু আমার জানাবার সাহস হয়নি। আমাকে ক্ষমা কর, কঙ্কা! আমি তােমার উপযুক্ত নই। ( নিষ্ক্রান্ত।) বাধা আছে! কি বলছে ? দণ্ডভৃৎ। বলছে সে সর্বনাশের কিনারায় এসে দাড়িয়েছে ; কাল রাত্রির আগে এ কথা সে জাতে পারেনি। তার উন্নত মহৎ হৃদয় তােমার কাছ থেকে ভালবাসা ছাড়া আর কিছু নিতেই স্বীকৃত হতে পারে না। সে কি তাহলে মনে করে আমি কোনাে রকমে তার সর্বনাশ হতে দেব ? ছেলেবেলা হ’তে আমি তার সঙ্গে এক সঙ্গে লালিত পালিত ; মাসী তাহাকে যেমন আমাকেও তেমনি অন্তরের ভালবাসা ও সেবা- যত্ন দিয়ে পালন করেছেন। এখন আমি আমার ধন- সম্পত্তি থাকতে আমার চোখের সাম্নে সে ভিক্ষুক হবে তা দেখব ? দণ্ডভৃৎ। কঙ্কা!
কলা ৪৭ কি করব, উপায় নেই। আমি আমার সমস্ত ধন- সম্পত্তি ত্যাগ করব, নিশ্চয়। দণ্ডভৃৎ। পারবে না—তােমার অভিভাবক আছেন। তিনি এই ত্যাগে সম্মত হবেন না। আছেন নাকি? তাহলে আমি একটি স্বামী খুজে নেব-যে সম্মত হবে। দণ্ডভৃৎ। (স্বগত) আমার কথাই বলছে—ওর চোখে সে খবর পড়তে পাচ্ছি। কঙ্কা। (স্বগত) এ উদাসীনতার ভাণ কচ্ছে। (উচ্চে) দণ্ডভৃৎ, আপনি ধৰ্ম্ম সাক্ষী করে বলুন, আপনি কি আমাকে ভালবাসেন—আর কাউকে বাসেন না ? দণ্ডভৃৎ। আমার হৃদয়ে এই মূর্তির প্রতিচ্ছবি অন্য কোনাে তুচ্ছ ছাপ দিয়ে কি আমি স্নান করতে পারি ? কঙ্কা। তা পারেন বােধ হয়। দণ্ডভৃৎ। আপনি আমার প্রতি অবিচার কচ্ছেন। - আমি এক কথায় তা প্রমাণ করে দেব। সাবধান বলে ফেলুন। দণ্ডভৃৎ। বলুন। কঙ্কা। ( স্বগত) এখন তাকে বিস্মিত করে দেব। (উচ্চে) কজ্বলা। দণ্ডভৃৎ। সে আবার কি ?
৪৮
কঙ্খলা
C
নীল পাহাড়ের গায়
দণ্ডভৃৎ। কি ?
তিনবার মিট মিট করে—যেন ডাকতে থাকে—
“আসছেন কি ?” এখান থেকে এক নির্বাপিত
দীপ উত্তর দেয়—“হ”। দেখছেন তাে আমি
জানি সব।
দণ্ডভৃৎ। আমার চেয়ে বেশীই জানেন দেখছি।
কঙ্কা।
স্বীকার করুন—আমি আপনাকে ক্ষমা করব।
দণ্ডভৃৎ। কি স্বীকার করতে হবে তাও বলে দিন। আমি
স্বীকার কব—সে যাই হােক না কেন!
কঙ্কা। (স্বগত) চাক্ষুষ প্রমাণ না পেলে আমাকে তাে চুপ
করিয়েই দিত! কম ধূর্ত নয় তাে !
দণ্ডভৃৎ। আমি বুঝতে পারছি—এ চমক লাগিয়ে আমার গত
জীবনে গােপন কিছু আছে কি না জেনে নেবার
চেষ্টা! কিন্তু জানিয়ে দিচ্ছি, এ চেষ্টা সম্পূর্ণ
নিষ্ফল—আমার ভয়ের কিছুমাত্র কারণ নেই।
কঙ্কা। কারণ নেই ? বেশ, আপনাকে আমি যেমন পবিত্র
মনে করেছিলুম আপনি ঠিক যদি তাই হন, তাহলে
আমি আপনার ; তা নইলে আপনার আমি
কখনন
—এ কথাও জানিয়ে দিচ্ছি।
যান এখন।
কজ্বলা।
৪৯
দণ্ডভৃৎ। যাক্-আমার মনের ভার নেবে গেল।
( নিষ্ক্রান্ত )
কে আছ এখানে ?
( ভৃত্যের প্রবেশ )
—আমার ঘােড়াটা জিন্ পরিয়ে এখানে আতে বল্
“আমি বেরুব। ( ভৃত্য নিষ্ক্রান্ত )
নীল পাহাড়ে একবার যেতে হবে। সেই কুটীরের
রহস্য আবিষ্কার না করলে চলবে না। আমার তাে
কোনাে ভয় নেই—বলুক না যে যা বলবে—যাবই—
আত্মরক্ষার উপায় কৰ্ত্তেই হবে।
( নিষ্ক্রান্ত)
( মুক্তিকার এবং হরিরাজের প্রবেশ )
মুক্তিকা। কি বলিস্ তুই, হরিরাজ ?
হরিরাজ। আমি বলছি তােমাকে, মা, এর আর উপায় নেই।
মুক্তিকা। তাহলে আমাদের সৌভাগ্যের দিনের শেষ হলাে ?
হরিরাজ। উপায় নেই-দুঃখ বৃথা!
মুক্তিকা। হরিরাজ, আমি নিজের ভাবনা ভাবিনা-তাের
জন্যেই ভাবি। তাের এই চাষার মেয়েকে বিয়ে
করার চেয়ে তাের মৃত্যু আমার কাছে অনেক বেশী
বাঞ্ছনীয়। আর তােরই কি—প্রথম আবেগের
৪-
কঙ্খলা
C)
উন্মত্ততা কেটে গেলে তুই নিজেও তাকে স্ত্রী বলে
স্বীকার করতে লজ্জিত হবি। তার মুখের প্রত্যেকটি
কথা তাের গর্বে গিয়ে আঘাত করবে—তার চলা-
ফিরা তাের মনে সব সময় শঙ্কার ভাব জাগিয়ে
রাখবে--তার থেকে বিদ্বেষ এবং ঘৃণা জাগবে।
এমন সময় আসবে সে তাের দু’চক্ষের বিষ হয়ে
দাড়াবে।
হরিরাজ। মা ! মা! ( বসিয়া পড়িল)
মুক্তিকা। আর কঙ্কার প্রতি তুই কি হৃদয়হীন অবিচারের
কাজ করিছি, তাও ভেবে দেখ। সকলেই জানে—
সেও জানে যে তাের সঙ্গেই তার বিয়ে হবে।
এই ক’বছর যাবৎ তােদের নাম একত্র হয়েই
সকলের মুখে
উঠেছে যে রে!
(ভৃত্যের প্রবেশ।)
রাজকর্মচারী কিরক এসেছেন।
মুক্তিকা। সে তার উত্তরের জন্যে এসেছে। নিয়ে আয়।
( ভৃত্য নিষ্ক্রান্ত)
সময় এসেছে, হরিরাজ ! কি উত্তর দেব তাকে ?
হরিরাজ। অস্বীকার কর। যা করতে পারে—করুক সে।
মুক্তিকা। পথের ভিক্ষুক হব! কি খেয়ে জীবন রাখবে ?
ত
তা ছাড়া ঋণের জন্যে অসম্মান কারাগারে যাওয়া
সেও আছে। পারুবি মজুরের কাজ করূতে ? না !
আমাদের সব গেলরে—সৰ গেল ! এতদিনের
সম্মান প্রতিপত্তি সব গেল! নাঃ! আমি যাৰ
এই কিরকের সঙ্গেই যাব। তুই তাের বৌ নিয়ে
সুখে থাক্!
(তৃত্য কিরককে নিয়া প্রবেশ করিল।)
কিরক। ভালো আছেন ? আমি ঠিক সময়েই এসেছি,
দেখছেন।
মুক্তিকা। আমরা আপনার প্রস্তাব ভেবে দেখেছি। এখন অন্য
কোনাে উপায় না দেখে
কিরক। আসুন, আসুন শত্রুজিৎ-পত্নী ! আপনি আমার কাছে
সসম্মানে থাকবেন।
হরিরাজ। (গর্জন করিয়া উঠিয়া) যাও--যাও, বেরােও। একে
স্পর্শ করবে তাে তােমার মাথা গুড়িয়ে দেব।
কিরক। থামুন, শত্রুজিৎ-তনয়-থামুন, হরিরাজ ।
হরিরাজ। তার আগে তােমাকে এই জানালা দিয়ে পাহাড়ের
নীচে ছুড়ে ফেলে দেব ; দুর্বত্ত কোথাকার!
(দু’জন ভৃত্যের প্রবেশ।)
মুক্তিকা। হরিরাজ, বাবা আমার ! থাম, থাম্।
৫২ . কিরক। আসি এখন শত্রুজিৎ-পত্নী। আমি আমার উত্তর পেয়েছি। (তৃত্যের প্রতি) কঙ্কাঠাকরুণ কি ভেতরে আছেন ? ভৃত্য। , মশায়, তিনি ঘােড়ায় চড়ে বেড়াতে বেরিয়েছেন। কিরক। ব’লল আমি তার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলুম। কাকে ঠিক এই সময়েই আসব। ( মুক্তিকা ও হরিরাজের দিকে চাহিয়া ) কাকে! কাকে ! ( ভৃত্যগণ সহ কিরক নিষ্ক্রান্ত ) মুক্তিকা। কাকে আমরা থাক্ব কারাগারে—আর পুরুষানু- ক্রমিক এই সুবৃহৎ আবাস বাটী থাকবে রাজকৰ্ম্ম- চারীদের হাতে। হরিরাজ। মা ! ভগবান আমাকে রক্ষা করুন। আমি একটু বিশ্রাম করব। তুমি এখনাে এখনাে সব সব শােননি তােমাকে বলবার সাহসও নেই আমার। মুক্তিকা। তুই সঙ্গে থাকলে বাবা, আমি সৰু সইতে পারি- কিন্তু তাের অপমান, তাের দুঃখ আমি সতে পারব না হরিরাজ। সে জানি, মা, সে জানি। (নিষ্ক্রান্ত ( জানালার কাছে কুম্ভের আবির্ভাব ) মুক্তিকা। কে এখানে?
কজ্বলা
CO
কুম্ভ। আমি কুন্ত। যে বিপদ উপস্থিত, আমি সব জানি-
মুক্তিকা। জানিস্ তাহলে তুই যে -
কুম্ভ। সব—আমি বরাবর রাজাকে মানা করিছি।
মুক্তিকা। মেয়েটার সঙ্গে সে কি এতই জড়িত যে তাকে সে
ছাড়তেই পারে না ?
কুম্ভ। না, খারাপ অবস্থাটা ত রাজা কাটিয়ে উঠেছে,
কিন্তু মেয়েটা তাকে আঁকড়ে ধরে আছে। সেটাকে
কঠিন হয়ে অন্যে যেমন পারুতাে তেমন ভাবে ছুড়ে
ফেলতে পারছে না।
মুক্তিকা। সাহস পাচ্ছে না?
কুম্ভ। জাহাজে তুলে সমুদ্রপারে অনায়াসে পাঠিয়ে দেওয়া
-কে তার কথা জিজ্ঞেস করবে—অবিশ্যি রাজা
ছাড়া। রাজা শুনতে পেলে আমার মাথা কেটে
ফেলবে।
মুক্তিকা। কিন্তু সে কি যাবে ?
কুন্ত। সে তাকে একটু বুঝিয়ে বলে যাবে বৈ কি ? কিন্তু
আর এক উপায় আছে-রাজাকে দিয়ে যদি তার
হাতের রক্তদল ফুলটি পাঠিয়ে দিতে পারেন,
তাহলে ঠিক হয়ে যায় । সে চিহ্নের কি অর্থ রাজা
জানে—আমিও জানি।
মুক্তিকা। তার হাতের রক্তদল ফুলটি ?
কুম্ভ। তা’ যদি করাতে পারেন, তাহলে আর কোনাে দিন
কজ্বলার নাম আপনার কানেও আসবে না।
মুক্তকা। যাচ্ছি হরিরাজের কাছে।
( নিষ্ক্রান্ত)
দিদিরাণী-কঙ্কা নিশ্চয় নীল পাহাড়ের দিকে গেছে,
আমি দেখিছি লক্ষ্য করে—কড়া চোখ রেখেছিলুম।
কলার সঙ্গে দেখা করবে। পাহাড়ের পথে অনেক
ঘুরে যাবে। আমি নৌকায় আগেই যেতে পারব।
( অগ্রসর হইল।
কুম্ভ।
( রক্তদল ফুলটি লইয়া মুক্তিকার প্রবেশ ।)
মুক্তিকা। (স্বগত) রক্তদলটি
ওর বিছানায় পড়ে আছে
দেখলুম-নিয়ে এসেছি।
রাজা দিয়েছে—রাণী মা ?
মুক্তিকা। হাঁ, দিয়েছে। এই নাও।
মত তাহলে বদলেছে বন্দুতে হবে।
মুক্তিকা। সম্পূর্ণ।
এখন তাহলে—তাহলে--আমার-আমার-কাজ
কুম্ভ।
কবো?
মুক্তিকা। এইত তার চিহ্ন।
তা জানি—আমি আমার কথা রাখব।
মুক্তিকা। নিয়ে যাও। আর যেন না শুনতে হয় তার কথা।
(নিষ্ক্রান্ত)
সে ভয় করাে না, রাণী মা। (নিক্রান্ত)
তৃতীয় দৃশ্য।
কজ্বলার কুটীরের বহির্ভাগ।
( শীলা এবং কজ্জ্বলা সেলাই করিতেছে।)
(কজ্বলার পান)
কাদায়ে বলনা কি তােমার সুখ,
একি খেলা তব ভেঙ্গে দিয়ে বুক!
জীবনে মরণে তােমারি যে আমি,
সেকি অপরাধ বল দেখি শুনি।
আন আখি জল, হৃদয় যাতনা,
যদি হও সুখী, সে মাের সান্ত্বনা !
এস এস নাথ-জুড়াও এ বুক,
অনুগত জনে কেন গাে বিমুখ।
শীলা। কাঁদিস্ নে, মা, কাঁদিস্ নে।
কজ্বলা। উনি আর আমার কাছে আসবে না—আর দেখবাে
ওঁকে, পিসী।
শীলা। নিজের বিয়ে-করা স্ত্রীকে ছেড়ে যাবে ?
কজ্বলা। মন্দারকে দিয়ে একটা চিঠি দিয়েছি ওঁকে। মন্দারও
কঙ্খলা
০
শীলা।
ফিলে না—নিশ্চয় কোনাে জবাব দেন নিউনি
আর আমার সঙ্গে কথা কইবেন না—তার সৌভাগ্যের
বাধা হয়ে আমি আছি। তার চাইতে মরুলেও যে
আমার ভালাে ছিল।
শীলা।
চুপ! এমন কথা মুখে আনি নে। ভগবানের নাম
নে—উনিই সব দুঃখু দূর কইবেন।
কঙ্খলা। ভগবানের নাম মুখে আসে না-হরিরাজ ছাড়া অন্য
কোনাে নাম মুখে আসতে চায় না—চেষ্টা করে
দেখিছি।
তাের এমন ভালবাসার পুরস্কার ভগবান একদিন না
একদিন দিবেনই।
কজ্বলা। উনি আইবেন, নিশ্চয় বছি ফিরে আইসবেন—
সন্দেহ করা আমার অন্যায় হয়েছে।
শীলা।
এইতাে, মা, আবার তাের মুখে হাসি ফুটেছে।
কষ্ফলা। প্রথম যেদিন সকালে ওঁর সঙ্গে আমার দেখা হয়,
আজি সেই দিনের মত। দিনের চোখে তখন
শিশিরের জল ছিল, কিন্তু ঠোঁটে ফুটে উঠেছিল সুন্দর
হাসি। ওগাে, পিসী! হরিরাজ আবার আসবে, তার
কষ্ফলার কাছে আবার আসবে নিশ্চয় আসবে।
আমার মন বল্ছে—আসবে, আসবে। শােন একটা
গান গাই।
কজ্বলা
C)
(গান)
আমি সারা জীবনের
প্রেম ভােরে;
বেধেছি আমার
সকল-চোরে।
সে যে সেধে এসে
আমার হয়েছে,
আপনা দিয়ে যে
আমায় লভেছে !
আমি যে এখন
তাহাতেই বাঁচি,
এ জীবনে শুধু
তাহাকেই যাচি
আমি তার—সে আমার,
(আমি) এ ছাড়া ভাবিতে পারি না আর।
ভালবাসি আমি—ভালবাসে মােরে
এ বাঁধন কি গাে কখনাে ছিড়ে।
চুপ করে ডালে বসে তাের গান শােনে।
তাের গান শুনে গাছপালার কানাকানি বন্ধ হয়ে
যায়। তুই থামলে সব নিঝুম হয়ে থাকে—কেউ টু
শব্দটি করবার সাহস পায় না।
( শীলা কুটীরে নিষ্ক্রান্ত )
জুলা। গানের শেষ পদ আবার গাইল।
*)
•
শীলা।
মা, পাখীরা
৫৮
(কঙ্কার প্রবেশ।)
4-म
( কজ্জ্বলা, কঙ্কাকে না দেখা পর্যন্ত গাইতে লাগিল—তাকে
দেখিয়া থামিল। উভয়ে উভয়কে নিরীক্ষণ করিতে লাগিল।)
কঙ্কা। অমির নাম কঙ্কা।
কলা। আমার নাম কজ্জ্বল।
(স্বগত) বেশ সুন্দরী।
কজ্বল।। (স্বগত) কি চমৎকার দেখতে।
আমরা প্রতিদ্বন্দ্বী।
কঙ্খলা। আমি সে জন্যে খুব দুঃখিত।
আমিও। তােমাকে দেখে মনে হচ্ছে তােমাকে আমি
ভালবাসতে পারতুম।
কঙ্খলা। এই মতই দেখে আছি-সকলেই আমাকে
ভালবাসতে চায় কিন্তু দু’দিনেই কিসে সব গােল
হয়ে যায়।
(চিঠি দেখাইয়া ) এই লেখা চেন ?
কষ্ফলা। চিনি—কিন্তু তুমি কি করে পেলে বুঝি না।
কাল রাত্রে তােমার দীপের আহ্বান আমি দেখিছি-
তাকেও বেরিয়ে আসতে দেখলুম। আমার প্রতি সে
কত বড় মিথ্যাচরণ করেছে তার স্পষ্ট প্রমাণ জানতে
এলুম আমি। কিন্তু
এখন তােমার ভালােবাসার
কঙ্খলা
আর কোনাে প্রতিদ্বন্দ্বী নেই জেনাে, কারণ তাকে
আমি সর্বান্তঃকরণে ঘৃণা করি। তােমার মত এমন
সরলা এবং সুন্দরী মেয়েকে যে লজ্জা এবং অপমানের
পথে টেনে আনতে পারে সে আমার ঘৃণারও
অযােগ্য।
কষ্ফলা। কেন ? তিনি তাে আমাকে বিয়ে করেছেন।
ওঃ! কি বলে ফেল্লুম !
কি ?
কজ্বলা। ওঃ! আমি, বলতে চাইনি—ওগাে, চাইনি কিন্তু
তার সম্মান রাখতে গিয়ে আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে
পড়েছে।
কঙ্কা। তুমি তার স্ত্রী ?
(কুম্ভের প্রবেশ।)
( পিছনে স্বগত) যাঃ! এসে পড়েছে। আমার দেরী
হয়ে গেল ।
এ আমি বিশ্বাস করতে পারি না—প্রমাণ কি ?
কলা। এই—প্রমাণ আমার কাছেই রয়েছে।
( দু’জনের মাঝে পড়িয়া) তুমি বাবাঠাকুরের নিকট
প্রতিজ্ঞা করনি এ কখনাে তােমার বুক থেকে বের
করবে না ?
ওঃ! তুমি বুঝি সেই মাঝি ?
কুম্ভ।
কজ্বলা
;
হুঁ, দিদিরাণী।
কজ্বলা, তােমার সরলতা ও সত্যবাদিতায় অবিশ্বাস
করিছি—আমাকে ক্ষমা করাে; তােমার কথা আমি
সম্পূর্ণ বিশ্বাস কচ্ছি। দাও, বােন, তােমার হাতটি
দাও। ( গ্রহণ করিল)। যতদিন বেঁচে থাকব
আমাকে তােমার বন্ধু বলে জেনাে। শুধু তােমার
কাছে এইটুকু প্রার্থনা জানাচ্ছি আমার এখানে
আসার কথা দণ্ডভৃৎকে জানিয়াে না। আর তুমি
( কুম্ভের প্রতি) কুম্ভ ! এই লও ! (অর্থ দিল )
কাউকে বলল না। যাই এখন।
(নিষ্ক্রান্ত )
বেঁচে থাক, দিদিরাণী। (স্বগত), এর অর্থ কি ?
আমার চালাকি এখনাে টের পায়নি তবে ?
কজ্বলা। ওর আসার কথা দণ্ডভৃতের কাছে না বলতে কেন
বল্লে ? দণ্ডভৃৎ নামে তাে কাউকে জানি না।
তার কথা আগে কি তােমাকে বলেনি ?
কজ্বলা। কখখনাে না !
কুম্ভ।
হরিরাজের নামও কি করেনি ?
কষ্ফলা। তা জানি না। তার কথা বল্লে,
তার কথা বল্লে, আমি তাকে যে
চিঠি লিখেছি সেই কথা বল্লে—কিন্তু নাম বােধ হয়
বলেনি কখখননা।
কুম্ভ।
কণা
৬১
কুম্ভ।
(স্বগত) ও সব গােল পাকিয়ে দিয়েছে দেখছি।
( কুটীর হইতে শীলার প্রবেশ।)
শীলা।
আবার কেন ফিরে এলি, কুম্ভ ?
কুম্ভ।
অনি!
রাজা কজ্বলাকে একটা কথা
পাঠিয়েছে।
কলা। আমি মন্দারকে দিয়ে যে চিঠি দিয়েছি তার উত্তর
কি ?
কুম্ভ।
হাঁ, তার উত্তরেই একটা খবর দিয়ে আমাকে
পাঠিয়েছে।
শীলা।
খারাপ কিছু একটা হয়েছে। কুম্ভ, তাের চেহারা
এমন দেখাচ্ছে কেন? চোখ দুটো যেন রক্তে
লাল মদ খাচ্ছিলি ?
কুম্ভ। হয়ত খাচ্ছিলেম।
শীলা।
তুই কাঁপছি—আমার মুখের দিকে চেয়ে কথা
বলতে পাচ্ছি না। ওঃ! কুম্ভ, কি হয়েছে ?
কলা। বল, হরিরাজের কি কিছু হয়েছে ?
কুম্ভ। মা গেলে বলব।
শীলা।
আমি চলে যাই। (স্বগত) কুম্ভের আজ হ’লাে
কি ?
(কুটীরে নিন্ধান্ত)
৬২
কলা
কুম্ভ। রাজার সর্বনাশ উপস্থিত হয়েছে।
কজ্বলা। ওঃ, কুস্ত!
চুপ এখন! ঐ টঙ্কার দ্বীপে এক গােপন স্থানে
হরিরাজের সঙ্গে তােমাকে দেখা করতে বলেছে।
কোথায় যাচ্ছ কাউকে বলতে পারবে না। বুঝলে ?
কেউ যেন না দেখে এমনি করে চুপি চুপি গিয়ে
নৌকায় উঠে পড়াে—আমি অপেক্ষা করে থাকব।
কজ্বলা। কখন ?
কুম্ভ। সন্ধ্যার একটু পরই। আজ চাঁদ উঠবে না—নৌকায়
যাচ্ছি কেউ দেখতে পাবে না।
কজ্বলা। যাব—যাব।
( নিষ্ক্রান্ত )
আমার মাথা গরম আর শরীর যেন হিম হয়ে
আসছে ! আমার কি হ’ললা ? মা, মা।
( শীলার প্রবেশ।)
শীলা।
কি, কুম্ভ ?
( টলিতে টলিতে একটা কিছু ধরিয়া ফেলিয়া) একটু জল
দাও তাে!
( বসিয়া পড়িল।)
চতুর্থ দৃশ্য।
হ্রদের তীরবর্তী বন। (কঙ্কার প্রবেশ।)
কঙ্কা। বিয়ে হয়ে গেছে! হতভাগার! বিবেকের মধ্যে
সেই পাপের বােধ নিয়েও হাসি মুখে আর একটি
শিকারের সন্ধানে চলেছে!
মন্দার। (বাহিরে গান ধরিল )
(মন্দরের গান)
(ওরে) তাের মনটা আমায় দে না
তােকে যেন ভুলতে পারি ।
শিখিয়ে দে কেমন করে
আমি তাের কাছে হারি!
(আমি) তাের মতন গড়বাে মােরে,
তুই যেন হােস্ আমার মত ;
কেঁদে বেড়াস্ আমার প্রেমে,
(আর) আমি হাসি তােরি মত ।
সেটা কেমন-হবে তখন
বতে বুঝে ঠিক করি ।
আবার ভাবি এমন হলে,
আমিই বুঝি যাব হারি।
এই লােকটির অবস্থা দেখছি আমারি মত-প্রেমের
প্রতিদান পায়নি।
৪
( মন্দারের প্রবেশ)
মন্দার। “কি করব আর শুয়ে বিছানায়,
শুলেই যে স্বপন দেখি তায়,
ওগাে, তারি কথা চোখে ভাসে”
কঙ্কা। ওহে বন্ধু, শােন তাে ! তুমি আমার ঘােড়াটা কোথা
গেল দেখেছাে ?
মন্দার। কালাে একটা ঘােড়া-উপরে সাদা জিন আঁটা ?
কঙ্কা। আমি নেবে একটু আকাশের দিকে চেয়ে ভাবছিলুম
—তখন বজ্রের গর্জনে ভীত হয়ে দৌড়ে পালালাে।
মন্দার। এতক্ষণে সে প্রাসাদের ঘােড়াশালায় চলে গেছে।
কি সুন্দরই চলেছিল—দেখতে বেশ লাগছিল।
এখন আমি কি করে বাড়ী পৌছব ?
মন্দার। আমার যদি চা’রটা পা থাকত তাহলে পিঠে করে
নিয়ে যেতুম—আর এমন বােঝাটি নিয়ে খুব গর্বও
বােধ করতুম।
( বজ্রপাত )
ঐ তাে পাহাড়ে নেবে এল ! কাছে কি কোনাে
আশ্রয় নেই ?
মন্দার। এই ভাঙ্গা মন্দিরের একাধটা কোণে আশ্রয় নেওয়া
যায় হয়ত। এই ঝড়ঝড়িয়ে বৃষ্টি এল—সর্বনাশ !
আপনি যে একেবারে ভিজে যাবেন। (নিজের গা
হইতে একটা বড় কম্বল খুলিয়া দিল) এইটা জড়িয়ে নিন্।
So0 তাে ঠাণ্ডা ! তােমার উপায় কি হবে? তােমার লাগবে। (মদের বােতল দেখাইয়া) আমার ঠাণ্ডা ? (বজ্রপাত) উঃ ! কি ভয়ঙ্কর! এই দিকে আসুন। ( উভয়ে নিষ্ক্রান্ত) (কাপড় চোপড় জড়াইয়া কজ্জ্বলার প্রবেশ ) কজ্বলা। নৌকা নিয়ে কুম্ভের এখানেই থাকার কথা। ওঃ! এই তত। (কুম্ভের প্রবেশ) —তােমাকে কি ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে। বজের ডাকে আমার এই অবস্থা হয়েছে। কষ্ফলা। ঝড় না থামা পৰ্যন্ত অপেক্ষা করবে না ? বেশী হলে টঙ্কার দ্বীপের কোনাে কোনাে গুহায় গুহায় ঢুকে পড়বে। কঙ্খলা। তাঁর সঙ্গে দেখা করূতে যাচ্ছি, আমার কত সুখ । কিন্তু কোথেকে মনে একটা বােঝ চেপেছে বুঝি না। কঙ্খলাৱ গান কেন এমন—কেন এমন- কেনগাে বিষাদে ছেয়ে আসে মন! চলেছি আজিকে প্রিয়-মিলনে, সেকি তবে মাের ব্যথা দেবে প্রাণে।
৬৬ কজ্জ্বল। কেন গাে হৃদয় কাঁপিছে হেন, বামেতর আঁখি নাচিছে কেন? কি আছে নিয়তি, তুমি জান বিধি! ভরসা যে শুধু তােমারি চরণ। কেন এমন-কেন এমন- কুম্ভ। ( স্বগত) কেন এমন আমি বুঝি। (উচ্চে ) প্রস্তুত হয়েছ ? কচ্ছল।। হাঁ, চল। কুম্ভ। ( টলিতে টলিতে) আমার গলা শুকিয়ে গেছে। কঙ্খলা। পিসীতে তােমাকে একটা বােতল দিয়েছিল। ভুলে ফেলে এসেছি—নৌকায় তাে নেই। কষ্ফলা। এই বৃষ্টি এল—ভিজে যাব। কুম্ভ। ঐ নীচে রাজার গা-ঢাকার চাদরটা। কলা। এস, কুম্ভ ! আমার উপর ভর দিয়ে চল। তােমার মাথা ঠিক নেই, নৌকা চালাবে কি করে ? ঠিক নেই! মদ খেলে আমি আরো ভালাে কাজ করতে পারি । কজ্বলা। এস, কুম্ভ, এস। ( উভয়ে নিক্রান্ত) ( কঙ্কা ও মন্দারের প্রবেশ) মন্দার। এক পস্লা হয়ে গেল---ভিজে গেছেন কি ?
৬৭
কঙ্কা। না, ভিজিনি। ঐতাে আমার ঘােড়-সঙ্গে কে
আসছে। ( অগ্রসর হইল )
মন্দার। হরিরাজ নিজে।
হরিরাজ এখানে ?
নন্দার।
কষ্ফল আজ সকালে আমাকে দিয়ে তার কাছে
একটা চিঠি পাঠিয়েছিল।
( হরিরাজের প্রবেশ।)
হরিরাজ। কঙ্কা! কি হয়েছে ? তােমার ঘােড় ভীষণ ভাবে
দৌড়ে গিয়ে আস্তাবলে চুলে-আমরা ভালুম
তুমি ঘােড়া থেকে পড়ে গেছ।
মন্দার। (হুরির প্রতি) কজ্জ্বলা এই চিঠি আপনাকে দিতে
বলেছিল।
হরিরাজ। (স্বগত) কজ্জ্বল !
কঙ্কা। তুমি আমাকে যে সাহায্য করলে তার জন্যে কৃতজ্ঞ
রইলুম।
মন্দার।
এ অঞ্চলে দিদিরাণীর কাজ করতে কে সুখ না পায় ?
( নিম্ফান্ত)
হরিরাজ। (পড়িল, স্বগত) “আমিই তােমার সর্বনাশের কারণ ;
দিনরাত এই চিন্তা নিয়ে আমি বাঁচতে পাবে না।
রাত হবার আগে যদি তােমার দেখা না পাই তাহলে
এ হতভাগিনীকে নিয়ে তােমাকে আর কখনাে কষ্ট
পেতে হবে না।”—ছােট্ট বােকাটা আমার ! একটা
কিছু করে ফেলা ওকে দিয়ে আশ্চৰ্য্য নয়।
হরিরাজ ! আমি বরাবর ভারি অন্ধ এবং নির্বোধ
ছিলুম। আজকে আমি আমার হৃদয়ের কথা ঠিক
বুঝতে পেরেছি। এই ধর আমার হাত—আমাদের
অদৃষ্ট এমনি আজ থেকে জোড় বেঁধে গেল।
আমাদের বিয়ের বাদান থেকে তুমি কেন আমাকে
মুক্ত করে দিতে চেয়েছিলে তা আমি বুঝি। আমি
সেই মুক্তি গ্রহণ করূলুম না আমি তােমারই।
হরিরাজ। কঙ্কা, তুমি সব কথা জানাে না।
যা দরকার তার চেয়ে বেশীই আমি জানি সেই
এ বিষয়ে তােমাকে আর আমার কাছে
কথা তুলতে নিষেধ কচ্ছি।
হরিরাজ। তুমি আমার বিগত জীবনের কথা জানাে না।
আর জানতে চাইও না। বিগত জীবন জানা আমার
যথেষ্ট হয়ে গেছে। তুমি নিজে যা ভুলে যেতে
চাও তেমন কথা আমাকেও আর বলল না।
হরিরাজ। কঙ্কা! কঙ্কা! হায়! যদি ভুলতেই পাতুম ! চুপ,
করে থাকলেই যদি ভােলা যেত!
(উভয়ে নিষ্ক্রান্ত)
যথেষ্ট।
কজ্জ্বল
৬৯
পঞ্চম দৃশ্য।
একটি গুহা। পিছনে হ্রদ। চন্দ্র উঠিয়াছে, হ্রদে তার প্রতিবিম্ব পড়িয়াছে।
( * * গান গাহিতে গাহিতে একটা পাহাড়ের মাথায়
মন্দারের প্রবেশ।)
(মন্দাৱেৱ গান)
চাদ যে হাসে নীল আকাশে,
নীল জলে তার ছবি ভাসে ।
বল দেখি চাদ, আমি কোন চঁাদ
রেখেছি বুকেতে ধরিয়ে ?
নিশিদিন সদা কার ছবিখানি
হাসে মাের প্রাণে লুকায়ে ?
জীবন-রজনী কাটাব এমনি
এই হৃদি-াদে ভালবেসে ।
মন্দার। মাথাটা ঝিম্ ঝিম্ কচ্ছে। রাতটি এখন বেশ
করেছে—শিকারের রাতই বটে। ঐ নীচে পাহাড়ের
গায় ওটা কি ? আমার গলার আওয়াজে যেন
জেগে উঠেছে। যাই বন্দুকটা নিয়ে আসি।
(নিষ্ক্রান্ত )
( একটা ছােট নৌকায় কুম্ভ ও কলার প্রবেশ ।
কুম্ভ নৌকা বাহিয়া পাহাড়ের দিকে আনিতেছে।)
কজ্জ্বল। আমাকে এ কোন্ জায়গায় নিয়ে এলে ?
৭০
/
কুম্ভ।
ভয় নেই, কোথা যাচ্ছি আমি জানি। এই পাহাড়ে
নেবে পড়। দেখাে পা পিছলে পড়াে না, পথটা
পিচ্ছল।
কজ্বলা। এ জায়গা আমার ভালাে লাগছে না—কেমন
অন্ধকার আর ভয়ঙ্কর।
নেবে পড় বলছি-নৌকায় জল উঠছে। (কন্দ্রলা
নামিয়া পড়িল)
কঙ্খলা। তুমি আমাকে এমন নির্দয়ের মত কড়া কড়া কথা
বলছ কেন ?
কলা, তােমাকে একটা কথা বলার আছে,
আমার। শােন এখন আর অমন করে কেঁপােন।
কজ্জ্বল। কঁপ বৈ না—কুম্ভ, কঁপবাে না।
আমি খুব সুন্দর দেখতে ছিলুম । আমি এমন হলুম
কি করে জানাে ?
কচ্ছল। হ, হরিরাজ আমাকে বলেছে। .
সেই করেছে এ -কিন্তু তাকে আগেও ভালবাসতুম
পরেও বাসি। রাজার জন্যে আমি আমার শরীরের
প্রত্যেক রক্তবিন্দুটি পৰ্যন্ত পাত করতে পারি।
কষ্ফলা। কি জন্য বলছ এসব কথা তুমি ?
কুম্ভ। তুমি তার স্ত্রী হয়ে আমার চাইতে কি তাকে কম
ভালবাস যে সে তােমার কাছ থেকে যা চায় তুমি
কঙ্খলা
CO
৭১
দিতে পার না? আমার পিঠ ভেঙ্গে দিলে পরও
তা'কে আমার সব দিয়ে এসেছি--তােনার হৃদয়
ভেঙ্গে দিলে পরও কি তুমি তা পার না? এতটুকু
ভালবাস না তাকে তুমি ? আমার ভাঙ্গা হাড়
জোড়া দিতে কি তার নিজের উপর এবং তার
পরিবারের উপর সর্বনাশ ডেকে আনার কথা আমি
বলতে পারি ? না, তাকে ভালবাসি বলেই আমি
সে সব ভুলে গেছি !
কঙ্খলা। কুম্ভ, আমাকে দিয়ে কি করাতে চাও তুমি?
(কুম্ভ নৌকা হইতে পাহাড়ে লাফাইয়া পড়িল। নৌকা
ধীরে ধীরে ভাসিয়া গেল।)
কুম্ভ। আমাকে তােমার বুকের সেই কাগজখানা দাও।
কজ্জ্বল। তা পারবাে না—এ ছাড়বাে না আমি প্রতিজ্ঞা
করিছি ; তুমি তা জানাে৷
কুম্ভ। কলা, ঐ কাগজখানা হরিরাজের সৌভাগ্যের পথের
বাধা হয়ে আছে ; এই কাগজ খানাই
সর্বনাশের মূল।
তােমাকে বলছি—এ দিয়ে দাও।
কচ্ছল। বাবাঠাকুরের কাছে নিয়ে যাও আমাকে—এই
প্রতিজ্ঞা থেকে আমাকে মুক্ত করে দিতে বল। ওঃ ।
কুম্ভ, আমি ভগবানকে সাক্ষী করে যে প্রতিজ্ঞা
করিছি তুমি তা ভাঙ্গতে বল ?
কজ্জ্বলা
C0
কুম্ভ। (তার হাতে ধরিল) দিয়ে দাও বলছি—নইলে জোর
কৰ্ত্তে হবে।
কলা। ওঃ! আমি প্রতিজ্ঞা করিছি, কুন্ত—প্রতিজ্ঞা
করিছি। ছাড় কুম্ভ, ছাড়। আর যা’ বল সব
করবাে।
এ দিয়ে কি হবে বল ? আমি যত দিন
বেঁচে আছি তত দিন তার স্ত্রীই থাকব।
কুম্ভ। তাহলে আর বাঁচতে হবে না তােমাকে। সব শুদ্ধ
যাও তুমি হ্রদের তলায়। (হদে ফেলিয়া দিল ; কজ্জল
চীৎকার দিয়া জলের নীচ হইতে উপরে ভাসিয়া পাহাড়
ধরিতে চেষ্টা করিতে লাগিল।)
কুম্ভ।
কজ্বলা। না ! রক্ষা কর ! আমাকে মেরাে না—মেরে
, কুম্ভ, আমি সব করূবাে-শুধু আমাকে বাঁচতে
দাও।
সে তােমাকে মরতেই দেখতে চায়। কজ্জলাকে
ঠেলিয়া দিল।)
কচ্ছুলা। ওঃ! ভগবান, রক্ষা কর। কুম্ভকু-(ডুবিয়া
গেল।)
কুম্ভ।
(নীচের দিকে চাহিয়া ) এখন শেষ হয়েছে। আর নেই।
(উপরে বন্দুকের আওয়াজ শােনা গেল,
পর মুহূর্তে কুম্ভ পড়িয়া গিয়া নীচে জলে
গড়াইয়া পড়িল।)
৭৩ ( মন্দার বন্দুক লইয়া উপরে পাহাড়ে আবির্ভূত।) মন্দার। অন্ধকার হলে কি হয়—পরিষ্কার দেখেছি। নীচে পাথরের গায় নড় ছিল—ঠিক লেগেছে! এটা কি ? এ্যা? (নীচের দিকে চাহিল) একটা স্ত্রীলােকের মত দেখাচ্ছে না ? সাদা কাপড়টার মত—(নীচে নামিয়া আসিয়া টানিয়া) এা ! কজ্বলা ! আমার বুকের ধন কলা! (জলে নামিয়া টানিয়া তুলিল- পাহাড় ধরিয়া ধরিয়া কজ্জ্বলার অচেতন দেহ লইয়া উপরে উঠিতে লাগিল।)
৭৪
তৃতীয় অঙ্ক।
স!
প্রথম দৃশ্য।
একটি কুটীরের ভিতরের দৃশ্য।
(কুম্ভ একরূপ অচেতন অবস্থায় বিছানায় পড়িয়া আছে। পাশে
শীলা বসিয়া।)
কুত্ত। (ঘুমে থাকিয়া) কাগজটা দাও আমাকে – কালে ফল
হবে না—নীচে তলাতে হবেই। (জাগিয়া) মা,
শীলা। কি কুম্ভ ?
কুম্ভ। একটু জল দাও—পিপাসায়ই মারা গেলুন যে !
শীলা। (জলের পাত্র লইয়া) শক্ত জ্বর ।
কুম্ভ। (পান করিয়া বিছানায় পড়িয়া গিয়। চীৎকার করিয়া) ও ।
আমার ভেতরের আগুন কিছুতেই নিববে না।
কত দিন যাবৎ এ অবস্থায় আছি ?
শীলা। এই আজ দশ দিন হলাে।
কুম্ভ। দশ দিন। অচেতন হয়েই পড়ে ছিলুম ?
শীলা। হাঁ, কুম্ভ।
হাঁ, কুম্ভ। দশ দিন আগে সেই ঝড়ের রাতে তুই
হামাগুড়ি দিয়ে এসে ঘরে ঢুলি!
কুন্ত। হাঁ, এখন মনে হচ্ছে।
তুই বলছিলি কোন শিকারীর গুলি তাের পায়
লেগেছে।
শীলা।
কলা
Gab
৭:৫
শীলা।
কুম্ভ। বলিনি—কে বলছে ?
এ সম্বন্ধে কাউকে কোনো কথা না বলি আমাকে
প্রতিজ্ঞা করিয়েছিলি কেন ? কোনাে বৈদ্য
ডাকবাে, তাও মানা কলি।
কুম্ভ। কেউ কি আমার কোনাে খবর নিয়েছে ?
শীলা। হরিরাজ ছাড়া আর কেউ নেয়নি।
কুম্ভ। ভগবান তার মঙ্গল করুন।
শীলা। আমি তােকে দেখিনি বলিছি তাকে। তুই তাে
এখানে বিছানায় পড়ে গাোচ্ছি, ওদিকে তাে
কঙ্কার প্রাসাদে আজ কত কি হচ্ছে। কালকে তাে
রাজার সঙ্গে কঙ্কার বিয়ে ।
কুম্ভ। বিয়ে! কিন্তু
-এ্যা—তার--
শীলা। বেচারি কজ্জ্বলার কথা বলছিস্ ?
কুম্ভ। বাতিটা সরিয়ে রাখ—চোখে লাগে। তারপর, মা?
শীলা। হায়! বেচারি কজ্জ্বল ! জানতুম এই ভালবাসাই
তার একদিন কাল হবে। রাজা জানলে না কেমন
কোমল পবিত্র মনটি তার। না জেনে এমন নিষ্ঠুর
খবরটা পাঠালে ! হরে, কুম্ভ ! তােকে দিয়ে রাজা
কি খবর পাঠিয়েছিল তার কাছে ? আমার সামনে
তাে মুখ ফুটে বলতেই পারলি না ; ভারি নিষ্ঠুর,
ভারি নিষ্ঠুর তাের, কুম্ভ। সেই যে রাত্রে গেল সে
৭৬
কঙ্খলা
আর খোঁজ নেই তার। দুদিন পর হ্রদে তার একটা
কাপড় পাওয়া গেছে—আমি ছাড়া আর কেউ
চিনতে পারেনি এ কার। আমি মুখ ফিরিয়ে চলে
এলুম, একটি কথাও বললুম না। মেয়েটা ডুবে
মরেছেরে—কুন্ত, নিশ্চয় ডুবে মরেছে। ওর বাপ
নেই, মা নেই; কিছুদিন ধরে তো আমার কাছেই
আছে—ওযে আমার মেয়ের মতই হয়ে গেছে রে ।
( ফিরিয়া দেখিল কুম্ভ হঁপাইতেছে—তার চোখ তার মায়ের
উপর স্থির হইয়া আছে—কুম্ভ হাতে ভর করিয়া মাথা তুলিয়া
রাখিয়াছে।) কুম্ভ !
তাের কি হলাে ?
ওগাে কি হলাে ?
কে বল্লে ? তুই মিথ্যা কথা বলছি। আমি তাকে
কখ খনাে মারি নাই। রাজা আমাকে রক্তদল
ফুলটি পাঠিয়েছিল—কই সেটা, কই ?
শীলা। আবার প্রলাপ বক্ছে।
কুন্ত। রক্তদল ফুলটি পাঠিয়েছিল আমাকে রক্তের মত লাল।
রাজা !
সেই তত চিহ্ন! আমি তো
বলেছিলুম তােমাকে আমি তােমার পথ পরিষ্কার
ক'রে দেব।
শীলা।
কুম্ভ, কি বল
বলুছিস্ তুই ?
রাজা! কি করে করলুম বলবাে তােমাকে ? এই
কুম্ভ।
ওঃ !
কুম্ভ ।
৭৭
রকমে—তা হেসো না, রাজা! সে চাইলাে না
আমাকে কাগজ দিতে-কাজেই তাকে ডুবিয়ে দিয়েছি
কাগজ টাগজ শুদ্ধ ! একেবারে কোন্ অতলে তলিয়ে
গেছে। একবার ভেসে উঠেছিল, কিন্তু আবার।
ঠেলে দিলুম। আর ভয় নেই—আর তােমাকে
কষ্ট পেতে হবে না, রাজা—আর কখখনাে
নয়—কখখনাে নয়।— শুইয়া পড়িয়া বিড় বিড় করিতে
লাগিল ; আতঙ্কে শীলা ঈশ্বরের নাম লইতে লাগিল।)
শীলা।
ওগাে! সেই—সেই—আমার নিজের ছেলে-সেই
তাকে মেরেছে—আর এখন নিজেও মরূতে যাচ্ছে।
মহাপাপ! কুম্ভ ! কুম্ভ! বল,বল,।
কুন্ত।
বৈদ্যি ডাকবে না? আমি কি পশুর মত মরুবাে ?
যাই, দাদাঠাকুরকে নিয়ে আসি। ওঃ! কুম্ভ !
কি করলি ! এর জন্যেই তােক নিজের বুকের
দুধ খাইয়ে বড় করে তুলেছি ?—না, না, বাবা, ক্ষমা
কর। তাের মা আর তাের যন্ত্রণা বাড়াতে চায় না।
বাবা, বাবা, কথা ক'। আমি দাদাঠাকুরকে নিয়ে
( নিষ্ক্রান্ত)
( দরজার কাছে কিরকের প্রবেশ)
কিরক। শীলা! শীলা ! কেউ নেই এখানে ? ভারি মুস্কিলে
পড়া গেল। নীল পাহাড়ের কুটীর যে খালি-একটি
শীলা।
আসি ।
৭৮ কলা ; জন-প্রাণীও নেই। মন্দার অন্তর্হিত হয়েছে, কুম্ভেরও উদ্দেশ নেই—কোথায় গিয়েছে কেউ বল্তে পারে । এক শুধু শীলা আছে। কঙ্কার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলুম; আমাকে একরূপ লাথি মেরেই বের করে দেওয়া হয়েছে। আমি তাকে চিঠি লিখে পাঠালুম—চিঠি না খুলেই সে আমার কাছে ফেরৎ পাঠিয়েছে। তার অভিভাবক হরিরাজের সম্পত্তি বন্ধক থেকে মুক্ত করে দিয়েছে। (কুম্ভ গােঙরাইয়া একি কেউ ঘুমুচ্ছে এখানে ? কুন্তই তাে ! কুম্ভ। বৈচ্ছি—একজন বৈদ্যি ডাক। কিরক। কুম্ভ এখানে লুকিয়ে ! একটা কিছু হয়েছে । উকি দিয়ে দেখি ব্যাপারটা কি। কার পায়ের শব্দ শােনা যাচ্ছে না? একটু লুকোতে হচ্ছে। আমি রাজ- কর্মচারী, কি হচ্ছে এখানে খোঁজ নেওয়া আমার উচিত। এখানে লুকোই। (একটু আড়ালে লুকাইয়া রহিল )। উঠিল ) ? শীল। ( শীলা ও তুঙ্গপদের প্রবেশ।) ( কুম্ভের কাছে গিয়ে ) কুম্ভ ! কুম্ভ। তুমি, মা ? শীলা। বৈদ্যি এনেছি, বাবা । (কুম্ভ চাহিল )
কজ্জ্বল
C32
৭৯
.
কুম্ভ।
কুম্ভ। বাবাঠাকুর ।
শীলা। রাগ করিস্ না বাবা, মরবার সময় বাবাঠাকুরের কাছে
সব ব’লে যা-তাের আত্মার মঙ্গল হবে।
গায়ের তাে অসুখ নয়, অসুখ তাের মনের।
তুঙ্গপদ বাবা কুম্ভ, তােমাকে এ অবস্থায় দেখতে হবে-
ভাবিনি।
শীলা । আমার এমন ভালো ছেলে, দাদাঠাকুর !
এ ব’লল না—ব’লো না। ( মুখ লুকাইল)
শীলা। বল্বােবাবা-বলবাে-আমার আশীর্বাদ নিয়ে যা।
দেখ, কঁদছে।
তুঙ্গপদ। কুম্ভ ! মৃত্যুর বেশী দেরী নেই। এখন মনের বােঝ
নাবিয়ে যাও-বাবা, নাবিয়ে যাও। পাপের কিছু
প্রায়শ্চিত্ত হয় এমন কিছু কি এখনাে কর্তে পার না?
সে ভার তােমার আত্মীয় এবং বন্ধুদের উপর রেখে
যাও—আমার উপর রেখে যাও। বল,
বল, কারু
কাছে ক্ষমা চাইতে হবে কি না বল—তােমার হয়ে
আমরা চাইব।
কুম্ভ ।
(বাহুর উপর ভর দিয়া উঠিয়া আমি কজ্বলার প্রাণনাশ
করিছি।
(হাত দিয়া মুখ ঢাকিল) ওঃ ! 'ওঃ!
তুঙ্গপদ। কষ্ফলা তােমার কি করেছিল ?
শীলা।
কজ্জ্বলা
Gb0
( কিরক কাগজ লইয়া টুকিয়া রাখিতে লাগিল)।
কুম্ভ।
সে তার পথে বাধা হয়ে দাড়িয়েছিল—আর আমি তার
অনুগত ছায়ামাত্র।
তুঙ্গপদ। হরিরাজ ?
কুম্ভ। সেই ! চিহ্ন পাঠিয়ে দিলে আমি তার জন্যে এ
করূববা বলেছিলুম।
তুঙ্গপদ। হরিরাজ কি বালিকাটির প্রাণনাশ করবার জন্যে
তােমাকে নিযুক্ত করেছিল ?
কুন্ত।
আমাকে সে রক্তদল ফুলটি পাঠিয়ে দিলে তাকে
মেরে ফেলবার সেই চিহ্ন। আমি মেরেছি তাকে—
টঙ্কার দ্বীপে নিয়ে জলে ফেলে দিয়েছি ; তারপর
আমাকে গুলি করলে।
তুঙ্গপদ। . গুলি কলে ? কে ?
কুম্ভ। জানি না।
তুঙ্গপদ। (উঠিয়া সরিয়া গিয়া স্বগত) মন্দার এর মূলে আছে।
তার গুহায় মদের বােতল পড়ে আছে। আজ দশ
দিন যাবৎ তার দেখা নেই। (উচ্চে--কুম্ভের কাছে গিয়া)
কুম্ভ, তুমি পড়ে গেলে পর কি করে বাড়ী এলে ?
কুম্ভ। আমি জলে পড়ে যাই; স্রোতে আমাকে পাহাড়ের
দিকে টেনে নিয়ে এসেছে। আধা-ডুবা অবস্থায়
কতক্ষণ ছিলুম জানি না; কিন্তু যখন জেগে উঠেছি,
কজ্জ্বল
ত
দেখলুম আমার নৌকা নিকটেই আছে। কোনো
রকমে উঠে এখানে চলে এলুম—মাটীতে হামাগুড়ি
দিতে দিতে এসে ঘরে উঠেছি।
তুঙ্গপদ। (স্বগত) যাই—মন্দারকে গিয়ে বের করূতে হচ্ছে।
আরাে কিছু আছে ভিতরে।
শীলা। ছেলেটাকে একটু সান্ত্বনার কথা বলে যাবে না, দাদা-
ঠাকুর ? সে যে ভারি যন্ত্রণা পাচ্ছে।
তুঙ্গপদ। শীলা, একে শান্ত করে রাখ। আমি যাই, তার
জন্যে সান্ত্বনা নিয়ে আসব। কুম্ভ, তােমার সময়
আর বেশী নেই, ভগবানের নাম কর।। স্বগত) যাই
মন্দারের কাছে। ওঃ, হরিরাজ ! (সরিয়া গিয়া) তােমার
বিবাহ-রজনীটি কি ভীষণ হবে তাই ভাবছি।
( নিষ্ক্রান্ত )
কিরক। (এতক্ষণ কাগজে টুকিতে ছিল-বাহির হইয়া আসিল—
পিছন দিকে) যা বলেছে, তার প্রত্যেক কথাটি টুকে
নিয়েছি। এখন, হরিরাজ, তােমার বিবাহ উৎসবে
কি সব অতিথি গিয়ে দেখা দিবে, তা তুমি এখন
কল্পনাই করতে পাচ্ছ না।
( নিষ্ক্রান্ত )
কুম্ভ। (উঠিয়া) মা, মা ! ভারি যন্ত্রণা। জল-তাড়াতাড়ি-জল।
( শীলা দৌড়িয়া গিয়া জল আনিয়া দিল
সে পান করিল। শীলা পাত্রটি ফিরাইয়া
আনিল কুম্ভ যন্ত্রণায় ছটফট করিতে
লাগিল—বিছানায় পড়িয়া গেল।)
।
*
৮২
কন্দ্রলা
দ্বিতীয় দৃশ্য।
কঙ্কার প্রাসাদে একটি কক্ষ।
( দণ্ডতৃৎ ও ভৃত্যের প্রবেশ)
দণ্ডভৃৎ। রাণীমাকে বল্ আমি তার জন্যে অপেক্ষা করে
আছি।
( মুক্তিকার প্রবেশ।)
মুক্তিকা। তােমাকে দেখে খুসি হলুম, দণ্ডভৃৎ। (ভৃত্য নিষ্ক্রান্ত)
দণ্ডভৃৎ। আপনি আমাকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন
দ্রুতে আমার নৌকা প্রস্তুত হয়ে আছে।
জন্মভূমি ত্যাগ করে যাবার জন্যে যে আমার এতটা
ব্যাকুলতা উপস্থিত হবে তা জানতুম না।
মুক্তিকা। হরিরাজের সঙ্গে দেখা করে যাও এই আমার
ইচ্ছা। দশ দিন যাবৎ সে কঙ্কার সঙ্গে দেখাটি
পৰ্য্যন্ত করছে না! রাত্রিবেলায় একাকী নৌকায়
নৌকায় থাকে, দিনে এদিক সেদিক, পাহাড়ের
নির্জন পথে পথে ঘুরে বেড়ায়-তার মন ভেঙ্গে
গেছে।
দণ্ডভৃৎ। তার সঙ্গে দেখা করে যাবার জন্যে সে বলেছে কি ?
মুক্তিকা। কাল জিজ্ঞেস্ কছিল তুমি কোথায় আছ।
দগুভূৎ।
কঙ্কা যখন আমার সঙ্গে এমন অর্থহীন নির্দয় ব্যবহার
কঙ্খলা
করলেন, তখনই যে আমি আপনাদের বাড়ী ছেড়ে
গেছি সে কি তা জানে না ?
মুক্তিকা। হরিরাজকে গ্রহণ করা অবধি কঙ্কা আর সে মেয়ে
নেই। সব সময় ঝগড়া করে-কঁদে-মন-মরা
হয়ে থাকে—কিছু মাত্র হাসিখুসি নেই।
দণ্ডভৃৎ। হরিরাজের অবহেলা হয়ত খুব লেগেছে তার।
কঙ্কা। ( বাহিরে ) মুখের উপর জবাব দিস্ না। যা’ বাল তাই
কর । চুপ করে থাক্।
মুক্তিকা। শুলে ? কোনাে ভৃত্যকে শাসন কচ্ছে।
কঙ্কা। ( বাহিরে ) আর কথা নয়—এমন করে চাইতে হবে না
বলে দিচ্ছি।
( বিবাহের পাত্রীর বেশে সজ্জিতা মালা হাতে কঙ্কার প্রবেশ)-
– দরজা হইতে) এই রকম মালার কথা বলেছিলুম
আমি ? কোন্ সাহসে তুই বল্লি এ কথা ? (মালা
ছুড়িয়া ফেলিয়া দিল )
মুক্তিকা। কঙ্কা! (কঙ্কা দণ্ডভৃৎকে দেখিতে পাইল—লজ্জিত হইল।
দণ্ডভৃৎ। আপনার বাড়ীতে আমাকে দেখে আপনি বিস্মিত
হচ্ছেন বােধ হয় ?
কঙ্কা। আপনার আগমন এখানে অনভীতি নয় ।
দণ্ডভৃৎ। (স্বগত) ভারি ম্লান দেখাচ্ছে মুখখানা! ও সুখী
নয়—সেও কতকটা সান্ত্বনার কথা।
৮৪
কঙ্খলা
.
কঙ্কা। (স্বগতঃ ) ওকে তেমন খুসি দেখাচ্ছে না—তবু রক্ষা।
মুক্তিকা। হরিরাজকে খুজে দেখি।
(নিক্রান্ত)
দণ্ডভৃৎ। আমি আপনাদের বিরক্ত করতে চাই না। আমাকে
-আমাকে রাণীমা ডেকেছিলেন।
কঙ্কা। ( তীক্ষ্ণ ভাবে) আমাকে আপনি দেখতে এসেছেন
আমি তা ভাবিনি—আর আসূবেনই বা কেন ?
দণ্ডভৃৎ। কঙ্কা, তােমার মনে ব্যথা দিয়েছি সেজন্যে দুঃখিত
হলুম। আমি কি করিছি তা আমিই জানিনে, আর
তাতে কিছু যায় আসেও না।
কঙ্কা। মােটেই না।
দণ্ডভৃৎ। আমি তােমাদের
তােমাদের চোখ থেকে নিজকে সরিয়ে
রাখাটাই ভালাে মনে করলুম।
কঙ্কা। হাঁ, আপনাকে এবং আর একটিকে—আপনি এবং
সেই মেয়েটী দু’জনে এক সঙ্গেই সরে পড়েছেন।
দণ্ডভৃৎ। সেই মেয়ে।
কঙ্কা। বলে ফেলেছি ; কিছু মনে করবেন না।
দণ্ডভৃৎ। মনে না করে উপায় নেই। আমি হরিরাজকে
আপন ভাইয়ের মত ভালবাসি। আমি আশা করি
সে সময় আসবে, যখন তােমাকে নিজের বােনের
মতই ভালবাসতে পারবাে।
•
কঙ্কা। তাই নাকি ? আমি সে রকম আশা করি না।
দণ্ডভৃৎ। আমার এবং আমার বন্ধুর মধ্যে বিরােধ উপস্থিত
কবার জন্যে আমি আমার বন্ধুর স্ত্রীর বিরাগের
আকাঙক্ষা করি না।
কঙ্কা। কেনই বা ? আমি কে ?
দণ্ডভৃৎ। তুমি যদি আমার স্ত্রী হ’তে আর কাউকে ঘৃণা
করতে বল্তে, তাহলে আমি তাকে ঘৃণাই করতুম—
তা না করে পারতুম না ।
কঙ্কা। এমন সময় ছিল যখন আপনার মুখের এসব কথায়
আমি আস্থা স্থাপন করিছি ; কিন্তু এখন বেশ জানা
গেছে কি পৰ্য্যন্ত নীচ প্রতারণা আপনাকে দিয়ে
সম্ভব হতে পারে।
দণ্ডভৃৎ। কি করে জানা গেল ?
কঙ্কা। জানা গেল ?-আপনার স্ত্রীর কাছ থেকে।
দণ্ডভৃৎ। আমার কি ?
আপনার স্ত্রী—নীল পাহাড়ের কুটীরে যে মেয়েটিকে
আপনি লুকিয়ে রেখেছেন। থামুন, আর কথা
বতে হবে না। আমি তার সঙ্গে দেখা করিছি-
স্বীকার করেছে।
দণ্ডভৃৎ। স্বীকার করেছে যে সে আমার স্ত্রী ?
এক মুহূর্তেই সব খুলে বলে দিয়েছে।
৮৬
কন্দ্রলা
দণ্ডভৃৎ! কঙ্কা, শােন। . ভয়ঙ্কর এক ভুল হয়েছে মেয়েটি
এমন কথা বলতে পারে না।
তাকে নিয়ে আসুন আমার সামনে—সেই বলবে।
দণ্ডভৃৎ। সে কোথায় আছে কি করে জানবাে ?
তাহলে নিয়ে আসুন আপনার মাঝিকে—সেও
আমাকে এ কথা বলেছে।
দণ্ডভৃৎ। আমি তােমাকে বলছি এ সম্পূর্ণ মিথ্যা। আমি
মেয়েটি কে তা জানি না—তাকে কখন দেখিও নি!
দেখেন নি ? (কজ্জ্বলার চিঠি দেখাইল) এটা চিনেন ?
আপনি ফেলে গেছিলেন, আমি কুড়িয়ে পেয়েছি।
দণ্ডভৃৎ। ( চিঠি লইল) এটা। ( পড়িল)
(হরিরাজের প্রবেশ।)
হরিরাজ! (ফিরিয়া দাঁড়াইল)
দণ্ডভৃৎ। ওঃ! ( হঠাৎ বিষয়টা বুঝিতে পারিয়া কঙ্কার দিকে
চাহিল—অন্য দিকে সে চাহিয়া আছে দেখিয়া চিঠি হরিরাজকে
দিল) তুমি চিনতে পার
চিনতে পার এটা?
এটা ? তুমিই তাে
ফেলেছিলে ?
হরিরাজ। ( চিঠি লুকাইয়া) এল ?—ওঃ
দণ্ডভৃৎ। নিশ্চয় তুমি। (উভয়ের মুখের দিকে চাহিল ) কঙ্কা
আমাকেই অপরাধী সাব্যস্ত করেছে।
৮৭
?
'.
হরিরাজ। তােমাকে ভারি বিমর্ষ দেখাচ্ছে, দণ্ডভৃৎ। কঙ্কা,
হয়েছে কি
দণ্ডভৃৎ। কিছু নয়, হরিরাজ। যাতে কষ্ট হয় কঙ্কাকে আমি
তা’ ভুলে যেতে অনুরােধ কচ্ছিলুম, আর সে বিষয়
কারু কাছে—এমন কি তােমারও কাছে—উত্থাপন
করূতে মানা কচ্ছিলুম।
হরিরাজ। আমি নিশ্চয় জানি তােমার সব অনুরােধ সে রক্ষা
কবে।
আমি ভুলেই যাব। (স্বগত) কিন্তু ওকে আমি
কখখনাে ক্ষমা কতে পাবাে না-কখখনাে নয়।
দণ্ডভৃৎ। (স্বগত) কঙ্কা এখনাে আমাকে ভালবাসে-আর
হরিরাজ ভালবাসে অন্য এক মেয়েকে। হায়! কি
দুর্ভাগ্য আমি। ( নিকটে!গিয়া ) হরিরাজ, তােমার
সঙ্গে একটা কথা আছে।
( দণ্ডতৃৎ ও হরিরাজ সরিয়া গেল।)
কঙ্কা। এই আমার বিয়ের দিন। যে একটি মাত্র মানুষকে
আমি ভালবেসেছি সে ঐ চলে যাচ্ছে। সে যখন
কাছে থাকে তখন তার সঙ্গে যারপর নাই নির্দয়
ব্যবহার কর্তে পারি কিন্তু যখন চলে যায় তখন
সঙ্গে করে আমার সুখ শান্তি সব নিয়ে যায় আমার
শরীরে যেন প্রাণের শেষ স্পন্দনটিও থেমে আসে-
কলা
ওঃ !
}
আমার এই রকমই মনে হয়। বিয়ের পাত্রীর
উপযুক্ত মনের ভাবই বটে। তার যদি বিয়ে
হতাে—কিন্তু না, হয়ে গেছে। আর আমাকেও
বিয়ে করত—ওঃ! কি প্রবঞ্চক।
ওঃ। তাই
যদি কত, তাহলে তার শাস্তিটিও দিতুম নিজ হাতে
--সেই হ’তত আমার জীবনের সব চেয়ে সুখের
মুহূর্ত।
(কঙ্কাৱ গান )
ভালবাসার একি টান।
দূরে গেলে প্রাণ কাঁদে,
কাছে আলেই অভিমান।
ববাে মনে করি যত,
মুক হয়ে যাই তত।
রাগে আমার কান্না আসে,
বাচে কিসে নারীর মান।
( নিষ্ক্রান্ত )
কঙ্খলা
2
তৃতীয় দৃশ্য।
মন্দারের কুটীরের বহির্ভাগ।
( তুঙ্গপদের প্রবেশ)
তুঙ্গপদ। এইতাে মন্দারের কুটীর। পাহাড় ভেঙ্গে ভেঙ্গে
পা’ আর চলছে না। বাড়ী আছে কি না কে জানে!
হাঁ, ভেতর দিক থেকে দরজা বন্ধ। ( ঘা দিল) মন্দার
মন্দার, ঘরে আছ ?
মন্দার। (বাহির হইতে) না, আমি বাইরে। (মারের প্রবেশ)
—এ্যা! বাবাঠাকুর যে !
তুঙ্গপদ। চল ভেতরে যাই মন্দার, তােমার সঙ্গে কথা আছে।
মন্দার। আমি—আমি তাে চাবি হারিয়ে ফেলেছি।
তুঙ্গপদ। কেন, ভেতর থেকে যে বন্ধ ?
মন্দার। হাঁ, আমি—আমি ভেতর থেকেই তালা বন্ধ করি-
আর, আরপাছে হারিয়ে যায় তাই চাবিটা এখানেই
রেখে যাই।
তুঙ্গপদ। মন্দার, এখানে এস আমার কাছে। তুমি মিথ্যা
বছ। চাও তাে আমার মুখের দিকে। এই
দশ দিন তােমার কি হয়েছিল? তিনবার এসেছি,
এসে দেখেছি তােমার দরজা বন্ধ ; কিন্তু ভেতরে
তােমার নড়াচড়ার শব্দ শুনেছি।
কজ্জ্বল
.
মন্দার। ও বিড়ালটা।
তুঙ্গপদ। মন্দার, কুম্ভকে গুলি করেছিলে কেন ?
মন্দার। কে বল্লে তােমাকে ?
তুঙ্গপদ। সে নিজেই।
মন্দার। ওঃ! বাবাঠাকুর, তার সঙ্গে দেখা হয়েছে তােমার ?
তুঙ্গপদ। এই তাে তার কাছ থেকে আসছি।
মন্দার। ঐ নীচে থেকে আসছ কি ?
তুঙ্গপদ। কোথায় নীচ থেকে ?
মন্দার। নীচে, একজনকে খুন করার পর তার—তার—যেখানে
থাকবার কথা ?
তুঙ্গপদ। তুমি তা কি করে জানলে ?
মন্দার। কি করে—কি করে জালুম আমি ? শােন,
বাবাঠাকুর, তার ভূত
তুঙ্গপদ। সে মরেনি এখনাে—কিন্তু মরবার, আর দেরী নেই।
তােমার গুলিই তার কারণ।
মন্দার। এযে সে তা বলবার আগে আমি জান্তুম না।
তুঙ্গপদ। কে বল্লে তােমাকে ?
মন্দার। কে বলে ?
তুঙ্গপদ। কে ? কে ? কুম্ভ নয়—কারণ সে নিজেই জানে
কে তাকে গুলি করেছে।
মন্দার। দাঁড়াও বলছি। রাত্রি সেদিন দুপুর, আমি বাড়ী
কন্দ্রলা আসছিলুম—সময়টা ঠিক আমার মনে আছে—পথে চন্দনের বাড়ী উঠলুম—ঐ যে চন্দন, অনিন্দের বাবার খুড়াের মেসসা না কি হয়—জানাে না? খুব ভালাে লােক- তুঙ্গপদ। মন্দার, তুমি আমাকে প্রতারণা কচ্ছ। মন্দার। এ! কি বল ? তুঙ্গপদ। তােমার মুখ দেখেই বুঝি তুমি মিথ্যা কথা বলছ। তুমি কুম্ভকে মেরেছ কে বল্লে তােমাকে ? মন্দার। একটু আগে তুমিই তাে একথা বল্লে। তুঙ্গপদ। সে যে কুন্ত তা তােমাকে কে বল্লে ? মন্দার। তাই তাে বলছি, শােন—গেলুম তাে অনিন্দের বাড়ীতে, সেখানে চন্দন ছিল আর রামভদ্র-না, রামভদ্রই, চন্দন নয়। তা চন্দন বল্লে—কোথেকে এলি ? আমি বল্লুমবাড়ী থেকে। বল্লেকোথায় যাচ্ছ ? আমি বল্লুম—কেন বাড়ী যাচ্ছি। সে বলে উঠল—বাড়ী থেকে আসছ আবার বাড়ী যাচ্ছ কি রকম ? আমি বল্লুমবাড়ী থেকে না আসলে বাড়ী যায় কি করে লােক ! কি বল, বাবাঠাকুর-আমি ঠিক বলিনি ? আমি তাে একথাই বল্লম, বাড়ী থেকে বেরিয়ে না এলে বাড়ী যাওয়া যায় কি করে ? তা সে কিছুতেই বিশ্বাস করে না! তর্ক—ভীষণ তর্ক। সে কি আর থামে—চললাে-অনেকক্ষণ
৯২
কলা
তুঙ্গপদ। তারপর ?
মন্দার। চলাে-
তুঙ্গপদ। তারপর কি হলাে ?
মন্দার। তর্ক চলতে লাগলােতার কি শেষ আছে ?
চলােই চলাে-
তুঙ্গপদ। দেখ, মন্দার ! আমি ব্রাহ্মণ, আমার নিকট মিথ্যা
বললে-
মন্দার। শাপ দিও না, বাবাঠাকুর । শােন ঠিক কথা—
আমার বলতে নিষেধ আছে—প্রতিজ্ঞা করিছি
বলবাে না।
তুঙ্গপদ। আমি প্রতিজ্ঞা ভঙ্গের পাপ থেকে তােমাকে মুক্ত
করে দিচ্ছি। বল আমাকে। তুমি কি সেই
বেচারীকে খুঁজছিলে—সেই আমাদের আদরের
কঙ্খলাকে ? ওঃ! তুমি তাকে সেখানে একাকী
ফেলে এলে কি করে ?
(কজ্জ্বলার প্রবেশ।)
মন্দার। না, ফেলে আসিনি।
তুপদ। (ফিরিয়া কঙ্খলাকে দেখিয়া ) কজ্জ্বল ! তুই বেঁচে
আছি মা? -এা ?
-এ? ওঃ! কজ্বলা, আয় মা !
( আলিঙ্গন )
মন্দার। বাবাঠাকুর, ও বেঁচে না থাকলে আমিই কি বেঁচে
আছি দেখতে ? আমাকে তাহলে তুমি চেননি।
সে উপরে না এলে আমি যে এতদিনে হ্রদের তলায়
থাকতুম !
তুঙ্গপদ। মা, কথা বল্-শুনি তাের গলার মিষ্টি আওয়াজটি।
কষ্ফলা। ওঃ, বাবাঠাকুর ! আমাকে এখান থেকে নিয়ে যাও
দূরে বহুদূরে—অন্য দেশে।
তুঙ্গপদ। এমন করে লুকিয়ে ছিলে কেন এখানে ?
কজ্বলা। তিনি দেখবেন সেই ভয়ে।
তুঙ্গপদ। হরিরাজ ? তাহলে তুমি এ কথা জাতে যে হরিরাজই
কুম্ভকে তােকে সরিয়ে দিতে পাঠিয়েছিল ?
কচ্ছল। হায়! আমি মরলুম না কেন? আমাকে তিনি ঘৃণা
করবেন, বেঁচে থেকে আমার কি তাই দেখতে
হ’ললা ?
তুঙ্গপদ। জানিস্ মা, কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই অন্য একটি মেয়ের
সঙ্গে তার বিয়ে হবে ?
কঙ্খলা। জানি, মন্দার বলেছে। তাইতাে লুকিয়ে আছি।
ও কি বলছে ?
মন্দার। সে এখনাে তাকে ভালবাসে--তার কথার অর্থ
তাই।
তুঙ্গপদ। যে তাের প্রাণনাশ করতে চেয়েছিল কে ?
তুঙ্গপদ।
৯৪ কজ্বলা। এ প্রাণ কি তার নয়, বাবাঠাকুর? তাঁর ভালবাসা যদি আমার ভালবাসার মত স্থায়ী না হয়ে থাকে সে দোষ কি আমার নয় ? আমি চাষার মেয়ে, কোনাে মতেই তার উপযুক্ত নই। তিনি যদি আমাকে বল্তেন—“কজ্জ্বল, তােমার মৃত্যুতেই আমি সুখী হব”, তাহলে তাে আমি নিজেই হেসে হেসে মরতুম—সে মরণই তাে আমার সুখের মরণ হতাে। তুঙ্গপদ। তুই কি মা নিজে এমন করে লুকিয়ে থেকে তার অন্যায়ের অপরাধের আনন্দের প্রশ্রয় দিবি ? কল। আমি বেঁচে থাকলে তো তার লজ্জা, তাঁর সর্ব- নাশের কারণই হতুম—আমি কি এখন তাঁর পায়ের কাটার মত নই ? ভগবান আমাকে ক্ষমা করুন- আমি কেন আর তাকে কষ্ট দিতে যাবাে ? তিনি যখন আমাকে মারবার আদেশ দিলেন, ওঃ! না জানি তখন তিনি কি ভয়ঙ্কর যন্ত্রণাই পেয়েছেন—হায় ! সে কি আর আমি বুঝি না ? তুঙ্গপদ। তাহলে তুই মরে গেছিস্ তার মনে এই ধারণাই রাখতে চাস্? কজ্বলা। হাঁ, তাই তােক—তাহলে হয়ত আমার প্রতি তার ভালবাসা একদিন ফিরে আসতেও পারে ; তাহলে তিনি যে মাটীতে দাড়াতেন সেই মাটীকেও যে পূজা .
কলা
O
করতাে সেই কীটের অধম কীট যে কজ্জ্বল তার
প্রতিও তার একদিন একাধটুকু দয়া হতে পারে।
তুঙ্গপদ। কোথায় যাবি, মা, তুই ?
কজ্বলা। জানি না। যেদিকে চোখ যায়, একদিকে গেলেই
হ’লাে। শুধু জানি চলে যেতে হবে—দূরে—বহু
দূরে।
মন্দার। সকল জায়গাই সমান।
কজ্বলা। আমি এখন পৃথিবীতে একা।
(কলার গান)
ওগো, এ জগতে আমি একা
আমি একা !
আমি যারে চাই সে মােরে চাহেনা,
নিয়তি লেখা !
আমি হাসি মুখে, হৃদয়-দেবতা,
তব সুখ তরে মরিতে চাই
জীবনে ঠেলেছাে চরণে আমায়,
মরণে যদি গাে চরণ পাই ।
যাব দূরে যেথা ল’য়ে যায় আঁখি,
একা—শুধু একা !
মিটে গেছে সাধ—জেনেছি জীবন
আশা-মরিচীকা ।
তুঙ্গপদ। দুৰ্বত্ত রাক্ষস! সুখ-সৌভাগ্য ভােগের লােভে এমন
কাজ করলি তুই ! তুইও আবার মানুষ! আয় না,
কঙ্খলা
কঙ্খলা, আমার ঘরই আজ থেকে তাের ঘর। তুই
পৃথিবীতে একা নােস্—আর একজন আছে তাের,
পাশে-বাবাঠাকুর আর নয়, আজ থেকে সে তাের
বাবা।
মন্দার। একজন নয়—দু’জন। আমি ওর মা—আমিই তত
এই দ্বিতীয় বার ওকে পৃথিবীতে জন্ম দিয়েছি।
তুঙ্গপদ। ( অন্যদিকে চাহিয়া ) চুপ! চেয়ে দেখ ওদিকে,
মন্দার, রাস্তায় ও কি ?
মন্দার। (অগ্রসর হইয়া ) সৈন্য যে! অনেকগুলো! রাস্তায়,
আবার সৈন্য বেরুল কেন ? ওদের সঙ্গে কে ?
রাজকৰ্মচারী কিরক-তারা দিদিরাণীর প্রাসাদের
দিকে যাচ্ছে, একটা কিছু হয়েছে।
তুঙ্গপদ। স’রে এস, চুপ করে ভিতরে থাক, আমি যাই
প্রাসাদে, দেখে আসি কি ব্যাপার। ( অগ্রসর হইল)
কঙ্খলা। প্রতিজ্ঞা কর, বাবাঠাকুর, তুমি কিছু বলবে না—
তুমি এবং মন্দার যা জান তা কারু কাছে প্রকাশ
করূবে না—কারু কাছে প্রকাশ করূবে না যে আমি
বেঁচে আছি—যাবার আগে বলে যাও এটুকু।
তুঙ্গপদ। তাই বললুম, কজ্জ্বল, কাউকে কিছু বলবাে না এ
**
সম্বন্ধে।
( নিক্রান্ত)
৯৭ : কলা। ( কুটীরের ভিতর গিয়া) মন্দার, আমাকে বন্ধ করে রাখ—এইবার চাবি তােমার সঙ্গে নিয়ে যেয়ো ! ( ভিতরে নিষ্ক্রান্ত) মন্দার। ( দরজায় তালা লাগাইয়া) থাকে। এখন, ঝিনুকের মধ্যে যেমন মুক্তো থাকে তেমনি থাকে। আমি বরাবরের মত পাহাড়ের উপর আমার বিছানায় গিয়ে শুই- পাহাড়ই হবে আমার বালিশ—আর চারদিক ঘিরে আছে এমনি একখণ্ড মেঘ হবে আমার গায়ের কম্বল। ( নিষ্ক্রান্ত ) চতুর্থ দৃশ্য। কঙ্কার প্রাসাদের বহির্ভাগ। (কিরক ও সৈন্যগণের প্রবেশ।) ; কিরক। চুপি চুপি অগ্রসর হও, সৈন্যগণ; চারিদিকে, বনে, এখানে, সেখানে লুকিয়ে থাক—কেউ কেউ থাক বাহিরের ফটকের কাছে—আরাে দু’জন এদিকে জানালাগুলাে পাহাড়া দাও, যদি পালাতে চায় তাহলে জানালা দিয়ে লাফিয়ে পড়বে। হাঁ, এখন
১৮
বাড়ীটা ঘেরাও করা হয়েছে বটে। ( ভিতরে গান
বাজনার শব্দ ) ওঃ! তারা গান বাজনা কচ্ছে। খুব
ফুর্তি, খুব মজা লুঠছে ! জানে না চারিদিকে জাল
ছড়ানাে হয়েছে। এখন হরিরাজ ! আমাকে লাথি
মেরে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল—কেমন—না? কিন্তু
এবার যে প্রশ্ন নিয়ে এলুম তার জবাব আর পা দিয়ে
দিতে হবে না, মাথা দিয়েই দিতে হবে। আমার
চিঠি না খুলে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল; কিন্তু এ
কাগজটি তেমন সহজে ফিরিয়ে দেওয়া চলবে না
••
(সেনাপতির প্রবেশ।)
সেনাপতি। সব ঠিক হয়েছে।
কিরক। যেমন বলে দিয়েছিলুম, স্ত্রীলােকটিকে পেয়েছ ?
সেনাপতি। এই তাে সে।
(দুইজন সৈনিক শীলাকে ধরিয়া নিয়া আসিল।)
শীলা। (কাঁদিতে কাদিতে) এ আবার কি ? আমার প্রতি
এমন ব্যবহার কেন—আমি কি করিছি ?
কিরক। তােমাকে একটু দরকার আছে কিছু সময়ের জন্যে
তােমার সাক্ষ্যের প্রয়ােজন হবে এখানে। এদিকে
নিয়ে এস। আমার পিছনে এস।
( নিষ্ক্রান্ত )
৯৯
শীলা। ( ছাড়াইতে চেষ্টা করিয়া) আমার ছেলের কাছে আমাকে
ফিরে যেতে দাও। ওগাে ! আমাকে ছেড়ে দাও,
ভগবান তােমাদের মঙ্গল করুন। আমার ছেলের
কাছে যাই আমি, ছেড়ে দাও। (ছাড়াইতে চেষ্টা )
ওঃ! নরকের সয়তান তােরা! ছেড়ে দে আমাকে,
ছেড়ে দে।
( শীলাকে লইয়া সকলে নিষ্ক্রান্ত।)
পঞ্চম দৃশ্য।
কঙ্কার প্রাসাদের উৎসব ঘর। হরাত্রি, বল্লভ, দর্শন, কুতু,
আদ্রা প্রভৃতি অতিথি বরের সখা এবং পাত্রীর সখীগণ
সমবেত। গান-বাজনা চলিতেছে।
(সখিগণের গান।
হাসিছে মধুর উৎসবমুখরা নিশিথিনী!
গাও মিলন গান সবে হাস মধুর হাসিনী!
রত্নখচিত মুকুতাভরণ পর সখি গলে,
ফুল-ফুল-হার গাঁথি ল’য়ে সখি জড়াও কুন্তলে ;
প্রমােদ-কক্ষে স্ফটিক আধারে
হাসে দীপমালা !
C0
হাসে নীরবে সুনীল আকাশে
চারু তারা-মালা।
।
ফল ফুল সাজে স্তবকে স্তবকে,
বিশাল প্রমােদ-ভবন !
উঠে সঙ্গীত-লহরী, কল হাসি-রব
অপ্সরা-নুপুর নিক্কণ !
ছােটে মধুর কুসুম-গন্ধে
অন্ধ পাগল মলয়া !
জোছনা-পুলক কণ্ঠে গাহে
পিক-বধু পাপিয়া।
পিও প্যারী পিয়ালা ভরি, প্রেমে মাতহ সজনি ।
মিলাও আদরে উজলে মধুরে, আজিকে সােহাগ-রজনী !
ইরাদ্রি। দর্শন, আজকের উৎসবের কথা জীবনে ভুলবাে না।
কুতু।
হুঁ, তিন দিন ধরে সমানে চলেছে ;
বিয়ের লগ্ন
বােধ হয় এলো বলে।
দর্শন।
( বল্লভের প্রতি) কখন আরম্ভ হবে বিয়ের কাজ ?
বল্লভ। রাত্রি সাত দণ্ডের পর ফাঁসী, ঐ আঙ্গিনায় ফাঁসীকাঠ
প্রস্তুত হয়েছে শ্রীমান হরিরাজের ঝুলে পড়তে
আর বেশী দেরী নেই তােমরা যাকে উদ্ৰবাহ বল
আমি তাকে উদ্বন্ধন বলি।
হরাদ্রি। হরিরাজকে বাস্তবিক ফাঁসীর আসামীর মত দেখাচ্ছে।
আমি তাকে তিনবার দ্বন্দ্ব যুদ্ধে নামতে দেখেছি,
১০১
কিন্তু এমন মলিন ফ্যাকাশে মুখ তার কখনন
দেখিনি।
সে ভীষণ সুখের সম্মুখীন হয়ে ভীত হয়ে উঠেছে
বলে মনে হয়।
হরাদ্রি। দণ্ডভৃৎ কোথায় ?
( দঙভূতের প্রবেশ।)
দর্শন।
চুপ, !
ঐ
এসেছে সে।
দণ্ডভৃৎ। তার জন্যে চুপ করার দরকার নেই। কৃঙ্কার প্রতি
আমার ভালবাসা আমি গােপন করতে চাইনে, সেই
আমার গর্ব। তবে সে যদি আমার চেয়ে শ্রেষ্ঠতর
কাউকে পেয়ে থাকে সে আমার দোষ নয়।
হরাদ্রি। শ্রেষ্ঠতর সে নয়।
দণ্ডভূৎ। শ্রেষ্ঠতরই বটে-কঙ্কা তাই মনে করে, আর সে যা
মনে করে তাই ঠিক হয়।
(মুক্তিকার প্রবেশ।)
মুক্তিকা। কে বলে কাশ্মীরে প্রাচীন গৌরবের দিন আর নেই ?
আসুন ভদ্র মহােদয়গণ, মেয়ের সখীরা সব মেয়ের
সঙ্গে যাবে। অতিথিগণ নাটঘরে সমবেত হউন।
কঙ্খলা
( চিঠি লইয়া ভৃত্যের প্রবেশ।)
{ বল্লভের প্রতি ) এক জন ভদ্রলােক আপনাকে এই
চিঠি দিতে বল্লেন।
বলভ। এক জন ভদ্রলােক। এখানে কি দবকার ? ( চিঠি
পড়িল) এ! ভারি গুরুতর ব্যাপার যে !
হরাদ্রি। কি হয়েছে ?
একটি নরহত্যা হয়েছে।
সকলে। নরহত্যা ?
বল্লভ।
হত্যাকারীকে নাকি পাওয়া গেছে। তাকে ধরতে
আমার সইয়ের দরকার।
হরাদ্রি। ঝুলুক ব্যাটা ফাঁসীকাঠে। (দর্শনের কাছে গেল )
বলভ। বিয়ের উৎসবে এসেও আমার মত রাজকর্মচারীর
রক্ষা নেই।
মুক্তিকা। আপনার কর্তব্যপালন আপনি : সব জায়গায়ই
করবেন।
বলভ। কোনাে মেলায় কোনাে দাঙ্গা-হাঙ্গামা হয়েছে বােধ
হয়। কিরক কি নীচে আছেন ?
মুক্তিকা। ( চমকিয়া উঠিয়া ) কিরক ?
বল্লভ। নিয়ে চল তত তার কাছে।
( ভৃত্য ও বল্লভ নিষ্ক্রান্ত। অতিথিরা
চঞ্চল হইয়া সে দিকে অগ্রসর হইল)
GST
মুক্তিকা। কিরক এখানে ! তাকে কে এবাড়ীতে নিয়ে এল ?
(নিক্রান্ত)
( অন্য দিকে হরিরাজের প্রবেশ, তার মুখ মলিন।)
হরিরাজ। ( বসিল) বৃথা চেষ্টা—যে ভয় নিয়ে এই বিবাহ করতে
যাচ্ছি, তা কিছুতেই দমন করতে পাচ্ছি না—কিন্তু,
ভয় কিসেরই বা ? ওঃ! দুঃখে, ভয়ে আমার হৃদয়
ফেটে পড়বার যাে হয়েছে যে !
(কঙ্কার প্রবেশ।)
কঙ্কা। হরিরাজ ! তােমার হয়েছে কি ?
হরিরাজ। (উঠিয়া) তােমাকে ববােহ, তাতে আমার বুকের
বােঝ পাতলা হতে পারে। এক সময় ভাব তুম
তুমি আমার গােপন কথা জান ;-আমার ভুল
হয়েছিল। নীল পাহাড়ের কুটীরে যে মেয়েটাকে
দেখেছিলে—
কলা ?
হরিরাজ। সে আমার স্ত্রী ছিল।
তােনার স্ত্রী।
হরিরাজ । চুপ!
এই কাৰ্য্যের ফলে যে সব দুঃখের সৃষ্টি
হয়েছে, তাতে পাগল হয়ে আমি তার প্রতি অত্যন্ত
নির্দয় ব্যবহার করিছি-সে তাই আত্মহত্যা করেছে।
হায়! ভগবান !
১০৪
কজ্বলা
হরিরাজ। আমার কাছে চিরবিদায় নিয়ে সে আমাকে চিঠি
লিখেছিল ; পরদিন তার কাপড় চোপড় হ্রদে ভাসছে
দেখা যায়।—(কঙ্কা বসিয়া পড়িল) সে দিন থেকে
আমার সুখ শান্তি, স্নান আহার—সব চুকে গেছে।
দিবারাত্রি আমার একই চিন্তা—তার প্রতি আমার
ভালবাসা সহস্র গুণ হয়ে এখন ফিরে এসে প্রতি-
হিংসা নিচ্ছে।
( বাহিরে গােলমাল শােনা গেল )
ভগবান্ ! একি হ'লে! এ! বাইরে গােলমাল
কিসের ?
( ভীত শঙ্কিত অবস্থায় মুক্তিকার প্রবেশ।
প্রবেশ করিয়াই ভিতর হইতে দরজা লাগাইয়া দিল।)
মুক্তিকা। হরিরাজ ! বাবা আমার !
হরিরাজ। মা !
না, ওতাে এখানেই। তার দিকে চাও—তার সঙ্গে
কথা বল—এমন ক'রে হাঁ করে তাকিয়ে থেকো না।
ওঃ! মা, কথা বল—আমার বুক যে ফেটে পড়ছে।
মুক্তিকা। পালাও—পালাও! (হরিরাজ যাইতে উদ্যত ) এদিকে
নয় ! না--দরজায় দরজায় পাহাড়া। প্রত্যেক
প্রবেশদ্বারে সৈন্য ; তুই-তুই ধরা পড়িছি
কঙ্খলা
১০৫
ফাঁদে ধরা পড়িছি—কি করবা আমরা এখন ?
আমার ঘরের জানালা—আয়-আয়-তাড়াতাড়ি
তাড়াতাড়ি !
কি অভিযােগ তার বিরুদ্ধে ?
হরিরাজ। নরহত্যার। মুখ দেখেই বােঝা যাচ্ছে।
( বাহিরে গােলমাল)
মুক্তিকা। চুপ। আসছে তারা—পালা ! জানালার নীচেই
তাের নৌকা আছে। কথা বলি না! দেশ
ছেড়ে বহু দূরে থেকে—খবর জানাস্! তার আগে
কথা নয়।
(তাহাকে ঠেলিয়া বাহির করিয়া দিল
বাহিরে গােলমাল।)
৩০
নরহত্যা! না, সে নির্দোষ।
মুক্তিকা। তাের ঘরে যা! তাড়াতাড়ি যা-নইলে তুই সব
বের করে দিবি—তাের চেহারাতেই সব প্রকাশ
হয়ে যাবে।
না, না—হবে না। ( দৃঢ়তার সহিত )
মুক্তিকা। যা বলছি—তুই যে আমাকে পাগল করে তুলবি।
এমনি মাথা ঠিক নেই। ওঃ! ( বাহিরে গােলমাল)
কঙ্ক।। নাটঘরে যে গােলমাল !
মুক্তিকা। তারা আসছে! কঁপছিস্ তুই—যা; এখানে
১০৬
থেকে আর তার অনিষ্ট করিসনে—আমি একাই
বিপদের সম্মুখীন হব।
কঙ্কা। সে তাে দোষী নয়।
মুক্তিকা। তাতে আমার কি হয়েছে, ছুড়ী ! আমি তার না—
আমার সন্তানের রক্ত খুজছে তারা! ব’সে পড়,
ঐখানে—অন্যদিকে চেয়ে থাক।
পড়েছে !
তারা এসে
(দরজায় ভীষণ আঘাত-দরজা সশব্দে ভাঙ্গিয়া পড়িল। সেনাপতি
ও সৈন্যগণের প্রবেশ। ভদ্রলােকগণ মুক্ত তরবারিহস্তে
বাধা দিতে দিতে প্রবেশ—তাহাদের পিছনে স্ত্রীলােকগণ।
কিরকের প্রবেশদভূতের প্রবেশ।)
কিরক। ভদ্রমহােদয়গণ, আপনাদের তরবারি খাপে রাখুন--
বাড়ীটি বহু সৈন্য দ্বারা পরিবৃত—আমরা এখানে
রাজার আদেশ বহন করে এসেছি।
কঙ্কা। (একজনের হাত হইতে তরবারি ছিনাইয়া লইয়া সকলের
সামনে দাড়াইয়া) ভদ্রমহােদয়গণ, আসুন আমার সঙ্গে
—এমন এক সময় ছিল, যখন কাশ্মীরের রাজাও
এসে এই প্রাসাদে রক্তাক্ত অভ্যর্থনা ছাড়া আর
কিছুই পায়নি।
অতিথিগণ। বের করে দাও সকলকে।
দণ্ডভৃৎ। ( বাধা দিয়া) কঙ্কা, তুমি
কি পাগল হয়েছ ?
১০৭ . * তলােয়ার নামান আপনারা-সরে দাড়ান। বলুন তাে রাজকর্মচারী বল্লভ, এই উৎপাতের অর্থ কি ? (দুই দিকে দুইজন সরিয়া দাঁড়াইল ; বল্লভ অগ্রসর হইল।) বল্লভ। শত্রুজিৎ-পত্নী, আপনার বিরুদ্ধে এক ভীষণ অভিযােগ উপস্থিত। আমি জানি—আমি আশা করি—সে নির্দোষ। তাই আমি বছি, এ সম্বন্ধে এখনি এখানে অনুসন্ধান হউক। এখানে তার বন্ধুবান্ধব সকলি উপস্থিত রয়েছেন। এ কেলেঙ্কারীর এখানেই মুখ বন্ধ করে দেওয়া যাক। দণ্ডভৃৎ। হরিরাজ কোথায় ? কিরক। কোথায় সে? আমরা তাকে খুজছি ; সে পালিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে কেন ? তন্ন তন্ন করে খোঁজ বাড়ীটা (দুইজন সৈন্য নিষ্ক্রান্ত।) মুক্তিকা। (বল্লভের প্রতি) এও কি সইতে হবে আমাদিগকে ? আপনি প্রধান রাজকর্মচারী হয়ে কি অনুমতি দিচ্ছেন- বল্লভ। মাপ করবেন—যা রীতি আছে— মুক্তিকা। ব’লে যান। কিরক। (দরজায় দাঁড়াইয়া) এ কোন্ ঘর ? বদ্ধ দেখছি মুক্তিকা। এ আমার শােবার ঘর।
১০৮
কিরক। কৰ্তব্য যাতা’ পালন করতে হবে।
মুক্তিকা। ( মাটীতে চাবি ফেলিয়া দিয়া ) তাই হােকু।
কিরক। (চাবি কুড়াইয়া লইল-দরজা খুলিল) মায়ের কাছে চাবি
ছিল-ছেলে নিশ্চয়ই এখানে আছে।
( কিরক, সেনাপতি এবং দুইজন সৈন্য নিষ্ক্রান্ত।)
মুক্তিকা। (স্বগত) এতক্ষণে পালিয়েছে।
বল্লভ। অরিন্দম-তনয়া শ্ৰীমতী কঙ্কা আমাকে ক্ষমা করবেন।
এই ব্যাপারে আমার হাত না দিয়ে উপায় নেই–
কিন্তু বাস্তবিক আমি বড় দুঃখিত
কঙ্কা। আপনার দুঃখিত হওয়ার কথা আর আমাকে বলবেন
। আপনার যথাসাধ্য তো করছেনই। সুবিচারের
আশা হ’তে নয়, জঘন্য বিদ্বেষ হতেই হরিরাজের
বিরুদ্ধে এই অভিযােগের সৃষ্টি হয়েছে তার উপর
এই লজ্জার বােঝা চাপানাে হচ্ছে।
দণ্ডভৃৎ। কঙ্কা!
কঙ্কা। আপনি চুপ করুন। তার জীবন বিপদাপন্ন ; তাকে
ভালবাসতে পারি বা না পারি, তার হয়ে যুদ্ধ কতে
পাবদা তােআর সেটুকু আপনাদের পুরুষ দিয়ে
হবে না তা জানি। (বল্লভের প্রতি) আপনাদের
নীচ জঘন্য কাজ যা-তা করে যান।
মন্দ যা’
করবার, তা তাে করেইছেন-আমাদের অতিথি-
কঙ্খলা
১০৯
দিগকে আতঙ্কিত করে তুলেছেন, আমাদের উৎসব
লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছেন, আজকের রাত্রির স্মৃতিকে—
যা সুখস্মৃতি হওয়াই উচিত ছিল—চিরদিনের মত,
দুঃখ-লজ্জার কালিমায় ম্লান করে তুলেছেন।
মুক্তিকা। ঐ শােন । আমি শুনছি-তার গলার স্বর
শুনতে পাচ্ছি। এ হতে পারে না।
(কিরকের প্রবেশ।
কিরক। বন্দী এখানেই আছে।
মুক্তিকা। আঃ! ( চীৎকার করিয়া উঠিল। এখানে ! ওরে
রক্ত-পিপাসু ! তাকে পেয়ে ফেলেছিস্? যে জিভ
থেকে এই কথা বেরুলাে তা খসে যাক, যে চোখ
তা’কে প্রথম দেখতে পেয়েছে তা চিরদিনের মত
গ'লে—নিভে যাক।
দণ্ডভৃৎ। ওগােথামুন!
কঙ্কা। মা। যা !
মুক্তিকা। কি বলতে চাস তােরা ? (দুইজন সৈন্য হরিরাজকে
হাতে শৃঙ্খল দিয়া নিয়া আসিল --আমার মুখ বন্ধ হতে
পারে, কিন্তু আমার শরীরের প্রত্যেকটি ধমনী হতে
তার উপর অভিশাপ ফেটে পড়বে। (ফিরিয়া
হরিরাজকে দেখিতে পাইল ; তার বুকের উপর পড়িয়া।)
-বাবা। বাবা আমার !
১১০ কঙ্খলা হরিরাজ। মা, শান্ত হওশান্ত হও। ( অগ্রসর হইয়া গিয়া ) ভাই দণ্ডভৃৎ, এই দেখ আমার হাত। তুমি কি ভাবছ এই হাত রক্ত-মাখা? ( দৎ তার হাত চাপিয়া ধরল—ভদ্রলােকেরা তাহাকে চারিদিকে ঘিরিয়া দাড়াইল- তার হাত ধরিল।) ভদ্রমহােদয়গণ, আপনাদিগকে আমার কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি ; আপনারা আমার নির্দোষিতায় বিশ্বাস করেছেন। মা, শান্ত হও; ব’স এখানে। এখানে এস, হরিরাজ ; তােমার স্থান আমার পাশে। হরিরাজ। (বল্লভের প্রত) এখন আমি প্রস্তুত। কিরক। (বল্লভের প্রতি) যে সাক্ষ্যের জোরে হরিরাজের বিরুদ্ধে রাজাদেশ ঘােষণা করা হয়েছে তা আপনার সামনে উপস্থিত করছি। এই কুম্ভের উক্তি—এই কুম্ভ হরিরাজের অনুচর মৃত্যুশয্যায় শুয়ে সে এই কথা বলেছে। তার সাক্ষী কই ? কিরক। (একজন সৈন্যকে স্ত্রীলােকটিকে ডাক।—( দু’জন সৈন্য শীলাকে লইয়া প্রবেশ।)—আমার সাক্ষী আছে। যা যা দরকার তার কিছুরই অভাব নেই, সব ঠিক আছে। বল্লভ। কুম্ভের উক্তি পড়ুন।
কিরক। (পড়িল) “মৃত্যু শয্যায় শুইয়া তার মাতা শীলা এবং
ব্রাহ্মণ তুঙ্গপদের সম্মুখে হরিরাজের অনুচর কুম্ভ এই
উক্তি করিতেছে”-
(তুঙ্গপদের প্রবেশ।)
তুঙ্গপদ।
হাঁ,আপনি ঠিক সময়েই এসেছেন, ব্রাহ্মণ।
তুঙ্গপদ। আমারাে তাই বিশ্বাস।
কিরক। আপনার সাক্ষ্য গ্রহণ করার দরকার হতে পারে।
সে আমি নিয়েই এসেছি।
কিরক। “এই উক্তি করিতেছে যে—সেই উল্লেখিত কুম্ভ
কজ্জ্বলা নামীয় একটি মেয়েকে হত্যা করিয়াছে।
সে আরাে বলিল যে উক্ত কজ্জ্বলা হরিরাজ এবং
কঙ্কার বিবাহের বাধাস্বরূপ ছিল, তাই হরিরাজ
তাহাকে এই হত্যাকার্যে নিযুক্ত করিয়াছে।”
বল্লভ। শীলা, কুম্ভ কি এই হত্যাকাৰ্য্য স্বীকার করেছে?
শীলা। সয়তানী কথা—আগাগােড়া মিথ্যা। এই লােকটা
( কিরককে দেখাইয়া) কখখনাে আমার ঘরে যায়
নাই—সব বানিয়ে নিয়েছে। সব সয়তানী—সব
সয়তানী!
কিরক। তাই নাকি! আচ্ছ—আচ্ছা, ব্রাহ্মণ তুঙ্গপদ
কখখনাে এ কথা বলবে না। (তুঙ্গপদের প্রতি) কুম্ভ
১১২
কজ্বলা
আপনার সম্মুখে এই কথা স্বীকার করে নাই,
ব্রাহ্মণ ?
তুঙ্গপদ। আমি এই প্রশ্নের জবাব দিতে অস্বীকার কচ্ছি।
কিরক। সে দিতেই হবে! রাজার আইনে বাধ্য করবে।
তুঙ্গপদ। ব্রাহ্মণের বদ্ধ ঠোট
খুলতে পারে, সে আইনকে
আমি দেখতে চাই—ভগবান যা’ গােপন রেখেছেন
তা প্রকাশ কবার ক্ষমতা মানুষের নেই।
কঙ্কা। আপনার দুজন সাক্ষী তাে দেখা গেল। সখীগণ,
দাড়াও আমার পিছনে এসে। ভদ্র মহােদয়গণ,
একটু সরুন।
(তুঙ্গপদ নিষ্ক্রান্ত ),
কিরক। আমাদের প্রমাণ যথেষ্ট আছে--সারা দেশকে শূলে
দেবার মত প্রমাণ আছে। কুম্ভ এখনাে মরে নাই।
কুম্ভের সঙ্গে হরিরাজের এই কথা ছিল যে, এই
হত্যাকাৰ্য্য করাতে হলে তার আদেশ এবং অনুমতি
স্বরূপ হরিরাজ তার হাতের রক্তদল ফুলটি মাত্র
তাকে পাঠিয়ে দেবে।
মুক্তিকা। আঃ!
হরিরাজ। চুপ! আমি স্বীকার কচ্ছি কুম্ভ আমার কাছে
এই প্রস্তাব করেছিল, কিন্তু আমি এই ভীষণ প্রস্তাব
অগ্রাহ্য করিছি।
কিরক। কিন্তু রক্তদল ফুলটি পাঠিয়ে দিয়েছিলে। হরিরাজ। কখখনাে নয়। ভগবানের নাম নিয়ে বলছি- কখ খনাে নয়। মুক্তিকা। ( অগ্রসর হইয়া) আমি—আমি দিয়েছিলুম। ( সকলের বিস্ময়ের ভঙ্গী) আমি—তাের এই হতভাগিনী মা- আমিই তাকে তুই দিয়েছিস্ বলে দিয়েছিলুম- অপরাধী আমি। ওর হাতের ঐ শৃঙ্খল মােচন কর, আমার হাতে এনে লাগাও। হরিরাজ। এ মিথ্যা কথা। মা, তুমি তার উদ্দেশ্য জাতে —তােমার জানার তােত কোনাে কথাই নয়। (সেনাপতি শৃঙ্খল মােচন করিল ) মুক্তিকা। এ অপরাধের অভিযােগ আমার শিরােধার্য্য সর্বান্তঃকরণে বরণীয়। এর হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার ইচ্ছায় আমি একটি কথাও বলতে চাই না। ( মন্দারের প্রবেশ।) মৃন্দার। বলতে চান না আপনি ? বেশ, তিনি না বলেন, আমিই বলবাে। সকলে। মন্দার । মন্দার। আপনাদের অনুমতি হলে আমি একটি কথা বলি— একটি হত্যাকাৰ্য হয়েছে—সে আমিই করিছি। সকলে। তুমি !
১১৪
কলা
১৯)
মন্দার। আমি। কুম্ভ আমার হাতেই মরেছে। (কিরকের
প্রতি) আপনি কি তখন নিকটে ছিলেন কোথাও ?
কিরক। (তাড়াতাড়ি) না।
মন্দার। ( তাড়াতাড়ি) ভালাে কথা; তাহলে লিখে নি আমি
যা বলছি। আমিই তাকে গুলি মেরেছি—কিন্তু
তাকে মারতে আমি গুলি করিনি। তবে তাকে
তখন মেরে ভালােই করিছি—তার মন থেকে এক
ভীষণ পাপের বােঝ নেবে গেছে।
ও বলছে কি ?
মন্দার। আমি বলছি কি, কলার মৃত্যুর যদি একটি সাক্ষী
পেয়ে থাকেন, আমি আর একটি পেয়েছি যে এর
চাইতে একটু বেশী জানে—সে ঐ আসছে।
(কুম্ভ, কঙ্খলা ও তুঙ্গপদের প্রবেশ !)
সকলে। এT! কুম্ভ !
কুম্ভ। রাজা ! আবার বেঁচেছি, আবার এসেছি। ঐ দেখ
রাজা তােমার কজ্জ্বলা ফিরে এসেছে। তা’কে
বুকে নাও রাজা-প্রায়শ্চিত্ত কর।
সকলে। কলা।
মুক্তিকা। সেই
কজ্জ্বলা
Goo.
কঙ্খলা। হরিরাজ।
হরিরাজ। কজ্জ্বলা আমার ! স্ত্রী আমার ।
কজ্জ্বল। প্রিয়তম! এই লও কাগজ, যদি ইচ্ছা হয় ছিড়ে
ফেল। (কাগজ দিল)
হরিরাজ। কঙ্খলা, তােমাকে ছাড়া আমি বাঁচতে পারি না।
মুক্তিকা। কজ্জ্বলা! সে যদি কখনাে তােমার প্রতি খারাপ
ব্যবহার করে থাকে, তাহলে আমার বুদ্ধিহীন
অহঙ্কারই তার কঠিন কথার মধ্যে প্রকাশ পেয়েছে
জেনাে—সে তােমাকে সারা হৃদয় দিয়ে ভালবাসে।
আমাকে ক্ষমা কর মা!
ক্ষমা ?
কজ্বলা।
মুক্তিকা। হতােমার মাকে ক্ষমা কর, কজ্জ্বল।
কজ্বলা। (নিকটে গিয়া প্রণাম করিয়া) মা।
( মুক্তিকা, হরিরাজ, কজ্জ্বলা, তুঙ্গপদ
সকলে একত্র হইয়া দাঁড়াইল-অন্য
দিকে কঙ্কা, দণ্ডভৃৎ এবং অন্যান্য সব
দাড়াইল। কিরক কোনাে দিকে না
চাহিয়া চোরের মত কাগজপত্র
গুছাইয়া লইয়া জামার বােতা আঁটিয়া
নিষ্ক্রান্ত। মন্দার তাহার দিকে অঙ্গুলি
নির্দেশ করিয়া দেখাইল। কয়েকজন
ভদ্রলােক তার পিছনে ছুটিল।)
১১৬
কঙ্কা। কিন্তু আমার কি হবে এখন? এতটা আবেগ
উত্তেজনা, এত উৎসব গান মজলিস্, ফুলের পােষাক,
ফুলের মালা—সব কি বৃথা যাবে? স্বামী তাে
আমার চাই।
হরাত্রি এবং
আমাকে নিন্।
অন্যান্য কয়েক জন
বল্লভ। আমাকে নিন্।
কঙ্কা। সকলে সঙ্গে কথা বলবেন না। দণ্ডভৃৎ
কোথায় ?
দণ্ডভৃৎ। এই তাে, কঙ্কা!
কঙ্কা। দণ্ডভৃৎ,
দণ্ডভৃৎ, আসুন এখানে। আপনি বলেছিলেন
আপনি আমাকে ভালবাসেন-তা’ বােধ হয়
গত ৪}
বাসেন ।
দণ্ডভৃৎ। ওঃ!
প্রমাণ দেখান এখন—যদি চান আমাকে, আপনাকে
পাব ?
দণ্ডভৃৎ। কঙ্কাকে আলিঙ্গন করিয়া) কঙ্কা! ( বাহিরে চীৎকার )
সকলে। একি ?
মন্দার। (বাহিরের দিকে চাহিয়া ) অস্থির হবেন । কিছু
নয়।
ছেলেরা সব কিরকের পেছনে লেগেছে—সে
পরিখার পাঁকে পড়ে সারা গা কাদায় লেপেছে।
১১৭
দণ্ডভৃৎ। তাকে ডুবিয়ে মারূবে যে !
মন্দার। ভয় নেই, সে ডুববার জন্যে জন্মায়নি-ডুববে না
সে শূলে চড়ার চেয়ে বেশী উচুতে স্বর্গের প্রায়
কাছাকাছি উঠবে সে।
কলা। ( হরিরাজের প্রতি আমাকে নিয়ে তাে তুমি আর
লজ্জা পাবে না ?
কঙ্কা। তা যদি পায় তবে তারি জন্যে লজ্জিত হবাে আমি।
কজ্বলা। আর যখন আমি বলবাে-
তুঙ্গপদ। সেই ভয় আর নেই মা! দেখিস্ রাজরাণী হয়ে, যে
তােকে দুঃখের সময় ত্যাগ করেনি তাকে যেন
ভুলি না।
কজ্বলা। ওঃ, বাবাঠাকুর।
তুঙ্গপদ। না আমি নই।
কঙ্কা। না, ভবঘুরের কথা বলছেন ব্রাহ্মণ ! ঝড়ের সময়
আমাকে সেই বাঁচিয়েছিল। হে ভবঘুরে বন্ধু,
ঘােড়া দেব তােমাকে আমার
সঙ্গে ঘােড়া দৌড়িয়ে চলতে পারবে তাে?
মন্দার। না, দিদিমণি ! তােমার সঙ্গে এই পাহাড়ের পথে
ঘােড়ায় চলতে পারে এমন ঘােড়সােয়ার এদেশে
নেই।
তবে তােমার ঘােড়াকে আমি চালাতে
পারুবােতােমার সেই কাজই আমি নিলুম।
ঘুরবার জন্য একটি
১১৮.
কলা। মন্দার! তুমি ভাই আমার জীবন রক্ষা করেছ—এ
জীবন তােমারি।
মন্দার। (হরিরাজ ও কলার হাত, একত্র করিয়া) এ
তােমারি রাজা !
আমি চিরকালের ভবঘুরে
ভবঘুরেই থাকব। বাড়ী ঘর নেই, তবে সব বাড়ীই
আমার বাড়ী। এবাড়ীতেও অধিকার বল।
কলা। আমি সামান্য চাষার মেয়ে—চারদিকে এতলােক
দেখে ভয় হচ্ছে।
কঙ্কা। বন্ধুজন সব, বন্ধুজন।
কজ্বলা। হায়। তাই যদি মনে করতে পারি—যদি মনে
করতে পারি যে সকলে আমাকে তাদের মনের
কোণে একটু স্থান দিয়েছে, তাহলে কষ্ফলার জীবন
সার্থক হয়ে উঠবে।
(সখীদের প্রবেশ ও সকলের একত্রে মিলন-গান)
(সখীদের গান )
দেখ দেখ সখি, বন যূথিকা,
আদরে বেরেছে সহকারে !
জনম অবধি পেয়ে কত বাধা,
তটিনী মিশেছে আজি সাগরে !
প্রেমে চিরদিন আছে অভিশাপ,
পেতে হবে তাকে কত বাধা তাপ !
১১৯
তাতেই তাহার গৌরব মহিমা,
দুঃখেই তাহার নীরব সাধনা !
সে সাধনা তার বিফল হয়নি,
(আজ) বিজয়িনী প্রেম—চির-বিজয়িনী।
নাচ গাও আজি সাজ ফুল-হারে,
প্রেম-মিলন গাও প্রাণ ভরে।
যবনিকা
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.