Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Uththaner Path Vol. 3
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
উত্থানের পথ ।
ব্রহ্মচর্য্য শিক্ষা।
হিন্দু-সৎকৰ্ম্মমালা প্রভৃতি গ্রন্থ প্রণেতা-
শ্ৰীমন্মথনাথ স্মৃতি ভট্টাচাৰ্য কর্তৃক
প্রকাশিত।
তৃতীয় খণ্ড
রেজিষ্টরী কর।]
[ মুল্য ছয় আর্ন
প্রাপ্তিস্থান
শ্ৰীসতীশচন্দ্র শীল, (কাগজের দোকান)।
১০৫ নং অপার চিংপুর রােড, কলিকাত।।
কলিকাত।। বরাহনগর, “হিন্দু-সৎকৰ্ম্মমালা” প্রেসে
যুগলকিশাের দাস দ্বারা মুদ্রিত।
শ্ৰীযুক্ত মন্মথনাথ স্মৃতির কৃত গ্রন্থাবলী। উত্থানের পথ। অধুনা আমরা নানা বিষয়ের শিক্ষার উন্নতি চেষ্টা এবং ব্যায়ামাদি দ্বারা বললাভের চেষ্টা করিলেও আমাদের শারীরিক মানসিক যেন ক্রমশঃ অবনতিই ঘটিতেছে অর্থাৎ আয়ু বল বীৰ্য্য ও বুদ্ধি যেন ক্রমশঃ ক্ষীণ হইতেছে, হৃষ্ট পুষ্ট বলিষ্ঠ এবং মেধাবী লােক পূর্বের ন্যায় এদেশে আর জম্মিতেছে না। ইহার মূল কারণ অনুসন্ধানে বুঝা যাইতেছে যে, অসংযম ও অনাচার এবং অনাহারই আমাদের এই পতনের কারণ। ব্রহ্মচর্য সম্বন্ধে কয়েকখানি পুস্তক থাকিলেও ব্রহ্মচর্য রক্ষার উপায়টি বিশেষ কেহ বলেন নাই। ব্রহ্মচর্য্যে শক্তিশালী হইতে পারিলে কোন প্রকার নীচ অনাচারে প্রায় প্রবৃত্তি হয়না এবং ঈশ্বরে বিশ্বাস ও উদ্যোগ উৎসাহ বৃদ্ধি ঘটিয়া কৰ্মশক্তি জাগিয়া উঠে সুতরাং অনাহারের কারণ দারিদ্রতাও বিনষ্ট হয়। আভ্যন্তরীণশক্তি সংরক্ষিত না হইলে কেবল পূর্ণাহারে বা অনুশীলনেও বল বুদ্ধি খােলেনা, মূলে স্পাৎ থাকিলে কেবল ঘর্ষণে অস্ত্রে ধার হয়না। সেজন্য “উখানের পথ” পুস্তকের তৃতীয় সংখ্যায় ব্রহ্মচর্য শিক্ষা প্রকাশিত হইল। অপর আঁহাদের হৃদয়ে ঈশ্বরপ্রেম থাকে তাহারা প্রায় জীবপ্রেমিক ও দেশপ্রেমিক না হইয়া থাকিতে পারেন না, সেকারণ মহাত্মা বুদ্ধ চৈতন্য খ্ৰীষ্ট ও মহম্মদ প্রভৃতি এই পথেই অগতে মহাপ্রেমিক ও মহামান্য গণ্য হইয়াছিলেন সেজ প্রাথমিক জীবনেই ভগবদ্ভক্তি শিক্ষার আবশ্যকতা ( 7 ) বােধে আমরা এই খণ্ডে সংক্ষেপ কৃষ্ণচরিত্র এবং উপাসনার আবশ্যকতা প্রভৃতির ও কথঞ্চিৎ আলােচনা করিলাম। আমরা অশাকরি ভদ্রমহােদয়গণ এবং শিক্ষকগণ তরুণ। তরুণীদিগের মধ্যে ভগবত্তত্ব এবং যাহা মুখে বলা নিতান্ত অসুবিধা জনক সেই ব্রহ্মচৰ্যতত্ত্বের কথা এই পুস্তকদ্বারা শিক্ষা দিয়া নব্যসম্প্রদায়ের বিশেষ কল্যাণ সাধন করিবেন। বহু প্রচারার্থ সুলভ মূল্য: ছয় আনা মাত্ৰ ধাৰ্য্য হইল। “উখানের পথ” দ্বিতীয় সংখ্যা, নাম করণ করিয়া আর একটি খণ্ড প্রকাশ করা হইল, ইহা বিবাহিত যুবক যুবতীর অবশ্যপাঠ্য। ইহাতে এই তৃতীয় সংখ্যার সমস্ত বিষয় এবং দম্পতীর কর্তব্য, সতীধৰ্ম্ম, প্রেমতত্ত্ব, বিবাহিতের ব্রহ্মচর্য্য, সুসন্তান লাভােপায় ও স্ত্রীসম্ভোগবিধি এবং অমতত্ত্ব প্রভৃতি বহু প্রবন্ধ আছে। নব- বিবাহিত দম্পতিকে উপহার দিবার জন্য ইহাই সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ ও প্রয়ােজনীয় পুস্তক এজন্য ইহা যুক্তিপূর্ণ সরল ভাষায় লেখা হইয়াছে। উত্তম বাঁধাই মূল্য ১ এক টাকা মাত্র। “উত্থানের পথ” প্রথমভাগে, বিবাহের বয়স নির্ণয়, বিধবা- বিবাহের সুশ্চিমাংসা, চুক্তির বিবাহ ও হিন্দুর বিবাহের প্রভেদ ও শ্রেষ্ঠ বিচার, বিবাহের আবশ্যকতা, দ্বিৰ্বিবাহ, গর্ভ- নিরােধ এবং স্ত্রী স্বাধীনতা প্রভৃতি বহু প্রবন্ধের সহিত পূর্বোক্ত, দ্বিতীয় সংখ্যার যাবতীয় বিষয় ইহাতে সংযােজিত করা হইয়াছে। মূল্য ১• দেড় টাকা মাত্র। যিনি যাহা আবশ্যক বুঝিবেনা তিনি সেই সংখ্যাই লইবেন। ইহার দ্বিতীয় ভাগে-জাতিতত্ব ও দোষতত্ত্ব এবং সমাজতন্ত্র প্রতি ছাপা হইতেছে।
( 9 ) পরমেশ্বরের ইচ্ছায় হিন্দু-সৎকর্মমালা প্রথম ভাগ মশঃ এয়ােবিংশতিবার মুদ্রিত হইল। মূল্য প্রতিখণ্ড। চারি আন।। তমালা তিন খণ্ড সহিত প্রায় দুই সহস্র পৃষ্ঠায় লিখিত বাদশ খণ্ড ১৬। ডাঃ মাঃ • মােট ৩.। পঞ্চদশ সংস্করণ দ্বিতীয় ভাগে,-পানুবাদ স্তবসমূহ, শতনাম, দীপান্বিতা, সামুদ শিবরাত্রি, জন্মাষ্টমী, রামনবমী ও স্বস্ত্যয়নাদি। ১৪শ সং তৃতীয়ভাগে,পরলােক ও শ্রদ্ধতত্ত্ব, টাকা, ব্যবস্থা ও মন্ত্রানুবাদ সহ পাৰ্বণ, গয়াশ্রাদ্ধ, আভদয়িক ও একোষ্টিদ্ধাদি। চতুর্দশ সংস্করণ ৪র্থ ভাগে,-সানুবাদ মহিঃস্তব, আদিত্য- হৃদয়, শনিস্তব, রাহু ও শুক্রকবচ, গণেশস্তব, সপিণ্ডীকরণ, শ্রাদ্ধাধিকারি নির্ণয়, মুমুয়ুত্য, বৈতরণী, অন্তেষ্টিক্রিয়া, অশৌচের বিস্তৃত ব্যবস্থা, তিলকাঞ্চন এবং দশপিণ্ডাদি লেখা আছে। দ্বাদশ সংস্করণ পঞ্চমভাগে,-শাস্ত্রীয় ও বৈজ্ঞানিক বিবাহলক্ষণ, ব্যবস্থা ও মন্ত্রানুবাদসহ সাম ও যজুৰ্বেদীয় সম্প্রদানবিধি, স্ত্রীগমন, দ্রব্যশুদ্ধি, রাস, দোল, একাদশী, দান ও ভাগ্যলাভােপায়াদি। একাদশ সংস্করণ (ষষ্ঠভাগ হইতে পুথির আকার) ষষ্ঠভাগে, গগাহত্যাদি ঐহিক এবং জন্মান্তরীণ প্রায় যাবতীয় পাপের প্রায়- শ্চিত্ত, গাে সেবা নানা ব্যবস্থা ও ফাদিসহ কালীপূজাদি । দশম সংস্করণ সপ্তমভাগে,-সব্যবস্থা পুরশ্চরণ, মালাশােধন, জগদ্ধাত্রী, অন্নপূর্ণা, কার্তিক ও ব্যবস্থাদি সহ বিস্তারিত বৃহন্দিকেশ্বর পুরাণােক্ত দুর্গাপূজাদি, হিংসা ও মাংসভােনাদি বিচার আছে। দশম সংস্করণ অষ্টমভাগে,নানাকাব্যের ফাদি এবং গুন- বিষ্ণু টীকাসহ সাধারণ কুশণ্ডিকা ও বিবাহ হােমাদি।
( ) দশম সংস্করণ নমভাগে,-ব্যবস্থা ও গুণবিষ্ণু টাকাসহ গর্ভা- বানাদি সমস্ত সংস্কার, গৃহপ্রবেশ, বিদ্যারম্ভ, বটুক-ভৈরব, দরপখ ও বাল্মীকীকৃত গঙ্গাস্তব, নবগ্রহ, গায়ত্রী ও রামকবচাদি।' নবম সংস্করণ দশমভাগে বা হিন্দুৰ্বতমালা প্রথমভাগে, ব্ৰতপ্রতিষ্ঠা এবং ব্ৰত পূজাপ্রয়ােগ ও অনুবাদাদি সহ ব্রতকথা। ঐ (৯ম স) দ্বিতীয়ভাগে,-বাস্তুগ, পুষ্করিণী, মঠ ও বৃক্ষ- প্রতিষ্ঠাদি এবং সংক্রান্তিব্ৰতাদি আছে। ঐ ব্ৰতমালা (অষ্টম সংস্করণ) ৩য় ভাগে,সটীক সব্যবস্থা, বৃযােৎসর্গ, চন্দনধে, দেবপ্রতিষ্ঠা, শালগ্রাম ও বাণলিঙ্গ প্রকরণ এবং মন্ত্ৰবিচার সহ দীক্ষাপদ্ধতি ও বুধাষ্টমী ব্ৰতাদি আছে। বিরাটপর্ব (সপ্তম সং) অর্জুনমি কৃত টীকাদি ও দ্বিপাঠাদি সহ বিশুদ্ধরূপে তুলট পুথির আকারে মুদ্রিত • দশ আনা। সত্যনারায়ণ ব্রত। সব্যবস্থা বিস্তৃত পূজাপদ্ধতি, রেখণ্ডীয় মূল কথা, ঐ পদ্যানুবাদ, রামেশ্বরী ও শঙ্করাচার্যের কথা, এবং ভচনী কথা। চারি অনা। বৃহৎ হিন্দু-নিত্যকর্ম। (৫ম সং) স্ত্রীলােক ও শূদ্রদিগের জন্যই পৃথকভাবে লিখিত বহুতত্ত্ব ব্যাখ্যাদি সহ । আট আনা। সানুবাদ মার্কণ্ডেয় চণ্ডী (৪র্থ সং) মূল্য ॥ আট আনা। বিশেষ পরিবর্তিত ও পরিবর্ধিত এবং দেবীসুক্ত ও অর্গলা- কীলকাদির বিস্তৃত ব্যাখ্যা এবং তত্ত্ব ব্যাখ্যাদি সহিত। প্রাপ্তিস্থান, বরাহনগর, গ্রন্থকারের নিকট এবং মহেশ লাইব্রেরীতে ও শ্রীযুক্ত সতীশচন্দ্র শীলের কাগজের দোকান ১০৫ নং অপার চিৎপুর রােড।
[ I ] ব্রহ্মচর্য্যে বিভিন্ন জাতি মতামত। আমার জনৈক পণ্ডিত বন্ধু যৌনতত্ত্ব সম্বন্ধে পাশ্চাত্য বিখ্যাত মনীষীদিগের নিম্নলিখিত মতামত সংগ্রহ করিয়া দিয়া এই পুস্তকের বিশেষ সাহায্য করিয়াছেন। (a) “It is now generally held that the testes secrete substances which pass into the circulation and are of immense importance to the development of the organism"-Dr. Havelock Ellis, Psychology of sex Vol. V pp 110-II. (b) "There is not enough power to allow of bodily development and great reproductive use at the same time. All through life thc vigour and power of the male are maintained by the presence of the fertilising fluid. It is the greatest dynamic force of male life. It is capable conversion into other channels"-Margaret W. Morley, Love and Life p. 184. (c) "I was astonished to find in course of any special study of cases, some of the finest specimens of manhood live a practially or completely continent life"-W. J. Robinson M. D., Ph. G (America) Editor of Medical Critic and Guide, Oct. 1926. (d) অধূনা অনেক ডাক্তার ব্রহ্মচর্যের বিরােধী কিন্তু তাহারা কত দূর ভ্রান্ত তাহা নিম্নলিখিত উক্তিতে বুঝা যাইবে যথা :- "We are told that sex-repression is bad and parents and teachers are urged to teach children not to repress. Nothing could be more vicious or [ 2 ] absurd than this doctrine. Actual repression is the only salvation if civilisation is to continue and the ability to repress successfully is the greatest asset a human individual can have. The adolescent boy and girl need to have their attention drawn away from the surging desire of sex and turned into other directions. And it is just those features of the movies and other details of modern life which interfere with the repressions which are most deplorable"-Knight Dunlap in “Critic and Guide" (America) Nov. 1926. ২। প্রেমের (বা কামের) উত্তেজনায় (বা ওজধাতুর বৃদ্ধিতে) মানুষের সকলবৃত্তিই সাময়িক উৎকর্ষলাভ করে। ইহার ফলে কাব্য অলঙ্কার ও কলা শিল্পের অভ্যুদয় সাধিত হয়। এইরূপ দৃষ্টান্তে জগৎ ভরপুর। জগদ্বিখ্যাত জাৰ্মাণ কবি গ্যাটে ৭২ বৎসর বয়সে এক ২৯ বৎসরের যুবতীর প্রতি প্রেমাসক্ত হয়েন এবং সেই উত্তেজনা বশে Faust কাব্যের দ্বিতীয় ভাগ লিখিয়া অমরত্ব লাভ করিয়াছেন। এইরূপ যে হয়, তাহার বচন প্রমাণ আছে যথা :- (a) Under the influence of intense desire, the intellect sometimes rises to a degree of vigour of which none would believe it capable. Desire, love or fear render the most obtuse understanding lucid. --Schopenhauer. (b) Love should be regarded as the most precious and holy thing in life. It is undoubtedly the chief inspiration of humanity, all our highest [ 3 ] activities are associated with it--W. M. Gallichan, A tert-book of sex-education P. 74. ; ৩। কিন্তু সাধারণতঃ লােকে ইহা বিস্মরণ হয় যে দেহ সংযােগেই প্রেমের মধুরতা এবং সৃষ্টি করিবার ক্ষমতা হ্রাস হইয়া ক্রমশঃ লােপ পায়। আধুনিকেরা এই আসল কথাটা দেখিতে চাহেন না বলিয়াই যত গােলােযােগ বাধে। অর্থাৎ প্রেম মনােমধ্যেই বিকশিত হইয়া জগৎকে টলাইবার মত সৃষ্টি করিতেও সক্ষম কিন্তু কামের কাৰ্য্য আরম্ভ হইলেই প্রেম শুকাইয়া যায়। যৌনসম্ভোগ সাক্ষাৎ সম্বন্ধে কতকগুলি জীবের মৃত্যুর কারণও ঘটে। মানুষের মধ্যেও ইহা ক্রমে কোপ, বিরক্তি, বিতৃষ্ণা এবং ঘৃণা প্রভৃতি আনিয়া থাকে, যথা- (a) “The act once accomplished there is separation and oblivion. More than this, in some cases, there is not even indifference but hostility, the males of the queer-bes are put to death as useless and it is well know that the mate of the female spider (known in America as the Black Widow) very often runs the risk of being devoured-M. Ribot, Psychology of the Durations, P. 253. (b) The precocity and frequency of sexual pleasures deprivęs man of one of the most powerful factors of his civil character--the feeling of the conquest of the heart of woman, with the full development and perfection of his physical and moral qualities, a feeling which serves to enkindle youth and forms the most powerful spring to guide [ 4 ] man on the rcad of work and duty-Dr. A. Matro, La Puberta P. 300. (c) In man love after the act subsides completely, leaving him cool, indifferent, shocked at times, disturbed, alarmed or disgusted.-William Mc Dougale, Character and conduct of Life, P. 277. (d) Love is the only thing no normal man wants from a woman. He wants her consent and loyalty to his love or passion, but her own lovepassion terrifies and drives him away. Something in the deepest recesses of man's being still remembers shuddering by the embrace of the female spider (which devours the male just after the act]—Marian Cox, the dry rot of society (Critic and Guide, Aug. 1919.) ৪। পাশ্চাত্য দেশেও ব্রহ্মচর্য অনুশীলনের ফলে অনেক ব্যক্তি প্রতিভা সম্পন্ন হইয়া জগৎময় খ্যাতি লাভ করিয়াছেন, যথা :- (ক) মাধ্যাকর্ষণ শক্তির আবিষ্কর্তা Sir Isaac Newton তাঁহার পিতামাতা উভয়ের দুই বৎসর ব্যাপী সংযমের ফলে জন্ম ate pfautica (Cesare Lombroşo, Men of Genius p. 150) (খ) নিউটন ভিন্ন আরও অনেক প্রতিভাশালী ব্যক্তি জীবনে দার পরিগ্রহ না করিয়া ব্রহ্মচর্য পালন করেন যথা :- Kant ( দার্শনিক), Ritt, Fox (বাগ্মীও রাজনীতিবিশারদ ) [ 5 ] Beethoven (সঙ্গীতাচাৰ্য), Galiles, Descartes (বৈজ্ঞানিক) Locke, Spinoza ( ataffaq ) Leonardo La Vinci ( fog শিল্পি) Copernicus ( বৈজ্ঞানিক), Handel, Mendelssohn ( 157 15t6 ) Schopenhauer, Voltaire (atöffa7) Flaubert ( সাহিত্যিক) Cavour, Mazzini ( দেশপ্রেমিক) Pope (কবি) Adam Smith (অর্থ নৈতিক) Goldsmith(কবি) Macaulay ( grogifup in atffujp ) Herbert Spenser ( দার্শনিক ) ইত্যাদি। ইহারা সকলেই কামভাবের প্রভাবকে প্রেমের উচ্চ পরিণতি দান করিয়া (Sublimation) জগৎকে যাহা দান করিয়া গিয়াছেন তাহার তুলনা করা কঠিন। নর নারীর মনের মধ্যে যে প্রেম জাগ্রত হয় ইহা অতীন্দ্রিয় অপার্থিব মানুষ সুধু ভ্ৰমবশেই অথবা শিক্ষার অভাবেই প্রেমকে কামে পরিণত করিয়া সর্বোচ্চগামী বৃত্তিকে দাহে পরিণত করে, হাতক লছমী চরণ পর ডারসি করিয়া সকল সার্থকতা হইতে বঞ্চিত হয়। ফলকথা অমৃতের পরিবর্তে গরল প্রেম যে অপার্থিব বস্তু তাহা পাশ্চাত্যগণ অনেকে জানিতেন। তরুণ তরুণীর প্রেমাকর্ষণ বিষয়ে মহামতি Carpentier যাহা লিখিয়াছেন তাহা প্রত্যেক যুবক যুবতী এমন কি প্রত্যেক নর নারীর পাঠ করা কর্তব্য। তিনিই বলিয়াছেন, যেমন গো ছাগাদি জন্তুগণ সুগন্ধি গােলাপের সৌন্দৰ্য্য মাধুৰ্য্য না বুঝিয়া বিনা আয়াসে তাহা খাইয়া ফেলিয়া নিশ্চিন্ত হয় তদ্রুপ অধিকাংশ মানুষই প্রেমের স্নিগ্ধতা মাধুৰ্য কেবল নষ্ট করিবার জন্যই কামের মধ্যে তাহা উপভােগ করে। ইহার ফলে সুধু মনােকষ্ট, শারীরিক রােগ, অবসাদ ও ঘৃণাই লাভ হয়। তাহার ভক্ষণ করে।
[ 6 ] কথিত তরুণ তরুণীর প্রেম বর্ণনা উদ্ধৃত করা গেল। ইহার ভাব ভাষা অতুলনীয় (গ্রন্থকারের “প্রেমতত্ত্ব” মূল পুস্তকে দেখ)। "The youth sees the girl it may be a chance face, a chance outline, amid the most banal surroundings. But it gives the cue. There is a memory, a confused reminiscence. The mortal figure without penetrates the imınortal figure within, and there rises into consciousness-a shinning form, glorious, not belonging to this world, but vibrating with the agc-long life of humanity and the memory of a thousand lose-dreams. The waking of this. vision intoxicates the man, it grows and burns within him; a goddess (it may be Venus herself). stands in the sacred place of his temple--a sense of awe-struck splendour fills him and the world is. changed. . He sees something which in a sense is more real than the figures in the streets, for he sees some thing that has lived and moved hundreds. of years in the heart of the race [this is heredity and instinct); something which has been one of the great formative influences of his own life....He comes into touch with a very real Presence or Power...and feels the larger life within himself.. For it is evident that the mortal woman who excites his vision has some closest relation to it.. For she has within her, just as much as the man has, deep subconscious Powers working; and the: Ideal which has dawned so strangely on the mana ' [ 7 ] is closely related to that which has been working: most powerfully in the heredity of the woman, and which has contributed to mculd her form and outline. No wonder then that her form should remind him of it. The more than inortal in him beholds the more than inortal in her and the gods descend to meet"-Edward carpenter, the art of Creation, pp. 137, 186. ইহাই প্রেমের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা। “আনন্দ মঠে” মহাত্মা বঙ্কিমচন্দ্র এই আদর্শে দুইটী চরিত্র গঠন করিয়া আক্ষেপ করিয়া বলিতেছেন :—“আবার আসিবে কি মা? জীবানলের মত পুত্র শান্তির মত কন্যা কি আবার গর্ভে ধরিবে ?” কেন সংসারে এত বিরােধ, কেন এত অশান্তি কেন পিতাপুত্র, স্বামী স্ত্রী, ভাই বােন সংসার ছারে খার দিতেছে বুঝিবে কি ? ৬। কি প্রকারে সাধারণ প্রণয় (প্রেম ও প্রণয় এক নহে ) জন্ম লাভ করে তাহার বিষয় অদ্বিতীয় যৌনতত্ত্ববিদ Dr. Havelock Eilisএর মত এই :- Love springs up as a responsc to a number of stimuli to tumescence, the object that most adequately arouses tuinescence being that which evokes love ; the question of aesthetic beauty, although it develops on this basis, is not itself fundamental, and need not even be consciously present at all. When we look at these phenomena. in their broadest biological aspects, love, is to a. limited extent a response to beauty ; to a great. extent beauty is simply a name for the complexus.
[ ৪ ]. stimuli which most adequately arouses love.... When: a man or a woman experiences sexual love for one particular person from among the multitude by which he or she is surrounded, this is due to the. influence of a group of stimuli coming through the channels of one or more of these senses (Touch, smell, hearing and vision). The stimuli which influence tumescence and thus direct sexual choice come chiefly-indeed exclusively through the senses of Touch, smell, hearing and vision (Psychology of Sex IV pp. 1-2). Touch is the alpha and omega. of affection (Bain, Emotion and will) estros 1841 যায়, ব্রহ্মচর্য পালন করিতে হইলে ইন্দ্রিয়রােধ আবশ্যক কেন। ইহাতেই বুঝা যায় “অবাধ মেলামেশা করিলে তাহার অবশ্যম্ভাবী ফল কোথায় গিয়া পাড়ায়। ইহাতেই বেশ বুঝা যায় যে স্পর্শাত্মক ব্যবহার মেয়ে ছেলেদের মধ্যে কত মারাত্মক। ৭। জগতে সুধু বিদ্যুৎই আছে। আমরা বিদ্যুতের সমষ্টি মাত্র (গ্রন্থকারের উপাসনার আবশ্যকতা প্রবন্ধে দেখ)। যথা- (a) We and everything else in the universe are. made of Electricity, which is Energy-A. G. whyte, Our world and us. P. 67. (b) All matter both living and dead is Electricity. B. Hollander M. D., Old age deferred P. 38. ৮। মাতৃত্বের অবনতি হইতে জাতির অবনতি ও মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী অর্থাৎ যে জাতি ইচ্ছা করিয়া সন্তানের জন্মবােধ করিবে, মাতা সন্তানবতী হইয়াও সন্তান পালন করিবে না, শুধু [ 9 ] ফুর্তির ব্যাঘাত ঘটিবে বলিয়া অথবা যে জাতির নারীগণ বিলাস পরায়ণ ব্যভিচার দুষ্ট হইবে সে জাতির অবনতি ঘটিবার সম্ভাবনা অত্যন্ত অধিক। ইতিহাসে প্রাচীন রােম ও মিশর প্রভৃতির মধ্যে এইরূপ ব্যভিচার ঘটিয়াছিল এবং তাহারই জন্য নােম, মিশরের ধবংশের অন্যতম কারণ নারীর মধ্যে ব্যভিচার দোষ বলিয়াই উক্ত হয়। এই ভাব আমাদের মধ্যেও আসিয়া পড়িয়াছে। এখন চক্ষু বুঝিয়া থাকা বিপদ জনক দাড়াইয়াছে। গ্রন্থকারের লিখিত “জন্মনিরােধ ও স্ত্রীস্বাধীনতা, মূল পুস্তকের এই প্রবন্ধ দুইটি এস্থলে দ্রষ্টব্য। Since woman is the racial reservoir and the agency of evolution, hereditary decline of individuals as well as nations must have its source in the decline of mother-power. History confirms this view. It shows the progress and waxing supremacy of these powers to have been concurrent with the rising levels of woman's character and virtue, with high estimation of woman's function of Motherhood and of the Home. While neglect of the Home, contempt for or evasion of the duties of motherhood immorality and general license among their womeri characterised their downfall. A comparison with modern tendencies strikes one at once. In the decline of Rome, the Roman woman went to two extremes--a tendency that shows increasingly among our own modern womanhood. Woman's bent for novelty and strong sensation degenerated under the license granted [ 10 ] her in ancient Rome into the orgies of the: Bacchanalia, they not only attended gladiatorial fights but actually had mimic combats. Seneca. records that women were known by the number of their husbands, woman's higher attributes ceased to evolve, they cultivated masculine proclivities, they dominated the 'nern in whom visility had declined. This led the race to its doom. Dr. Arabella Kenealy M. D. (America) feminism and Sex Instruction.) (b) The Bishop of London recently wrote to. the Press under the caption "New Morality” as. follows: we must not forget that the declining days of Egypt and Rome were marked by much the same condition of sexual freedom. In Chicago. and other cities sex license goes hand in hand with crime and political corruption. ৯। অতিশিক্ষিতা হইলে (শক্তির অতিরিক্ত পরিশ্রমে ) নারী লাবণ্যহীনা হয় ও রুগ্ন সন্তান প্রসব করে এবং স্তন্যদানেও অসমর্থ হয়, যথা :- "High authorities are of opinion that the more refined a woman's education becomes , the weaker her children will be. The mothers of Bacon or Goethe, though both very remarkable women, could not have written the Novum Organum or Faust, but if they had cver so little weakened their generative powers by excessive intellectual ex- [ II ] penditure, they could not have had a Goethe or a Bacon as son" This diminution of reproductive power is not only shown by the greater frequency of absolute sterility, nor is it shown in the earlier cessation of chilld-bearing, but is also shown in the very frequent inability of such women to suckle their infants (Herbert Spencer, Principles of Biology.) Most of the flatchested girls who survive their high-pressure education are incompetent to do this (I. M. Gayan, Education and Heredity pp. 261-62) একসময় মহাত্মা মহম্মদের শিষ্যগণ শৌর্যে বীর্যে অর্ধ পৃথিবী জয় করিয়াছিলেন, শুনিয়াছি, কাবুলে ব্যভিচারে প্রাণদণ্ড হইত বা এখন হয়, মুসলমান সমাজের ন্যায় পর্দা বা আবরু রক্ষা অন্য কোন সমাজে নাই। বােধ হয় অবিবাহিত তরুণ দিগের কথঞ্চিৎ ব্ৰহ্মচর্যের আশায় মুসলমানি (ছেদ) প্রথা ঐসমাজে ধৰ্ম্মাঙ্গ হইয়াছে। [৮৪ পৃষ্ঠা] পূর্বে অনুন্নত সাওতালেরাও ব্যভিচারীকে বৃক্ষের সহিত তীরবিদ্ধ করিয়া রাখিত। অতএব এদেশে বিভিন্ন জাতিদিগের মধ্যেও ব্রহ্মচর্য এবং সতী ধৰ্ম্মরক্ষার জন্য কত আগ্রহ ও কত কঠোর দণ্ডের ব্যবস্থা ছিল বুঝুন; হিন্দু সমাজের কথা এই পুস্তকেই বিস্তারিত বলিব। সেই দেশের মানুষ হিন্দু মুসলমান আমরা স্ত্রীশিক্ষাদির ব্যপদেশে এখন কোনপথে যাইতেছি এবং অসভ্য বর্বর বলিয়া স্বীয় পূর্বপুরুষ দিগকে প্রগলভা নারীদ্বারাও গালি খাওয়াইয়া পৌরুষ দেখাইতেছি কিন্তু প্রাচীন সভ্যতার মর্ম বুঝিয়া এবং নারীসমাজের প্রগতি [ 12 ] দেখিয়া পাশ্চাত্য পণ্ডিতেরা এখন ভীত হইয়াছেন। সম্প্রতি জাৰ্মাণ পুরুষসিংহ হিটলারের হুহুঙ্কারে ঐ দেশের উদ্ধত মহিলাকুল ব্যাকুল প্রায় হইয়াছেন সুতরাং এখন আমাদের ও বুঝিয়া চলা উচিত। বড়ই দুঃখের বিষয় পাশ্চাত্য পণ্ডিতেরাও এখন যে সকল কাযের নিন্দা করিতেছেন, আমরা তাহাই অতি সাদরে গ্রহণ করিতেছি। মহাত্মা বুদ্ধ, চৈতন্য, শঙ্কর, নানক, গুরুগােবিন্দ ও, যীশুখ্রীষ্ট প্রভৃতি মহামানবগণ প্রধানতঃ ব্রহ্মচর্য্যে ও জীবপ্রেমে এবং ভগবদ্ভক্তিতেই জগতে ধর্মগুরু ও কৰ্ম্মগুরু রূপে চিরপূজ্য এবং মহাপুরুষ নামে যখন চিরস্মরণীয় হইয়া রহিয়াছেন, তখন “মহাজনাে যেন গতঃ স পন্থা” উহাই “উত্থানের পথ।” সমস্ত পুস্তকে ঐ পথই আমরা বিশেষভাবে দেখাইয়াছি।
উত্থানের পথ।
ব্রহ্মচর্য শিক্ষা।
আপদাং কথিতঃ পন্থা ইন্দ্রিয়াণা-মসংযমঃ।
তঞ্জয়ঃ
সম্পদাং মার্গে। যেনেষ্টং তেন গম্যতা।
বিষ্ণুশর্মা।
মানবের যত আপদ বিপদের প্রধান পথ বা কারণই
হইতেছে কাম ক্রোধাদি ইন্দ্রিয়বর্গের অসংযম অর্থাৎ
অপরিমিত বা অবৈধ ভাবে ইন্দ্রিয় সেবা।
যে ব্যক্তি
সেই ইন্দ্রিয় কুলকে বশে আয়ত্ত করিতে বা জয় করিতে
পারেন তিনি সকল সম্পদের পথই সহজে আয়ত্ত করিতে
পারিবেন। অতএব যে পথ দ্বারা তুমি প্রকৃত ইষ্ট বা
মঙ্গল লাভ করিতে পারিবে সেই পন্থাই অবলম্বন করা
তােমার পক্ষে কর্তব্য। পাশ্চাত্য শিক্ষা ও অনুকরণে
আমরা কিন্তু ক্রমশঃ অসংযমের বা স্বেচ্ছাচারের পথেই অগ্রসর
হইয়া ভ্রমবশতঃ অবসন্নভাবে উন্নতি লাভই মনে করিতেছি।
শজোতীহৈব যঃ সোঢ় প্রাক্
শরীর-বিমােক্ষণাৎ।
কাম-ক্রোধোদ্ভবং বেগং স যুক্ত: স সুখী নরঃ।
৫২৩ গীতা।
২
উখানের পথ।
শরীর ত্যাগের বা মৃত্যুর পূর্বকাল পর্যন্ত অর্থাৎ
আজীবন যে ব্যক্তি কাম এবং ক্রোধের অযথা বেগ সম্বরণ
ও সহ্য করিতে পারেন অর্থাৎ বিবেক দ্বারা কাম ক্রোধকে
দমন রাখিতে পারেন, সেই ব্যক্তিই জগতে মহাযােগী এবং
মহাসুখী, কারণ ইন্দ্রিয়াশক্ত ব্যক্তি ইন্দ্রিয়ের প্ররােচনায় সর্বদা
অস্থির চিত্ত সেজন্য তাহার অন্তরে সুখ শান্তি থাকে না।
অতএব সদাচারে ব্রহ্মনিষ্ঠ থাকিয়া যথাশক্তি ইন্দ্রিয় বেগ ধারণ
করাই মানবের কর্তব্য।
ধৰ্মার্থ-কামমােক্ষাণা-মারােগ্যং মূলমুত্তমং।
শাস্ত্র বলিতেছেন, ধৰ্ম্ম, অর্থ, কাম বা কামনা জনিত
ভােগ সুখ এবং মােক্ষ বা মুক্তি ইহার মূলই হইতেছে
আরােগ্য বা স্বাস্থ্য। দেহ সুস্থ সবল না থাকিলে মন ও
সুস্থ সবল থাকিতে পারে না, অতুল ঐশ্বৰ্য্য বা সুন্দরী
রমণী সম্ভোগ স্বাস্থ্যহীনের পক্ষে এসকল কিছুই ভাল লাগে
। রােগী হইয়া পরে আরােগ্যের চেষ্টা করা অপেক্ষা রােখ না
হইবার চেষ্টাই সৰ্বথা বাঞ্ছনীয়। এই আরােগ্য বা শরীর ও
মন সুস্থ থাকিবার মূল বা আদি কারণ হইতেছে সংযম বা
ইন্দ্রিয় নিহ, কর কারণ ইন্দ্রিয় নিগ্রহ বা ইন্দ্রিয় সংযত
থাকিলে দেহেরও মনের বল রক্ষা হয় সেজন্য রােগ নিবারণী
শক্তি এবং স্বাস্থ্য রক্ষা স্বাভাবিকভাবেই ঘটে।
বিহিতস্যাননুষ্ঠানাৎ নিন্দিতস্য চ সেবনা।
অনিগ্রহাচ্চেন্দ্রিয়ানাং নরঃ পতন-মৃচ্ছতি। স্মৃতি।
ব্রহ্মচর্য শিক্ষা। শাস্ত্র বিহিত কর্তব্য কার্যের অনুষ্ঠান না করা অর্থাৎ সদাচার পালন বা উপাসনাদি না করিয়া জড়বৎ আলস্য বা মােহে অভিভূত থাকা কিম্বা শাস্ত্র নিষিদ্ধ বা সমাজ নিষিদ্ধ কাৰ্য্যের সেবা করা অথবা কাম ক্রোধ লােভ প্রভৃতি ইন্দ্রিয় বর্গকে দমন না করা অর্থাৎ ঐ সকল ইন্দ্রিয়ের বশীভূত হইয়া অপরিমিত বা যথেচ্ছা ব্যবহার করা, এই সকল কাৰ্য্য দ্বারা মানবের শারীরিক ও মানসিক পতন হইয়া থাকে সুতরাং ইহার বিপরীত ভাব সংযত আচরণকেই উত্থানের পথ” বলিয়া জানিবে। এই ইন্দ্রিয় নিগ্রহ বা ব্রহ্মচর্য দ্বারা শক্তিশালী ব্যক্তিরই চতুৰ্বর্গলাভ এবং আরােগ্যলাভাদি সমস্তই স্বল্পায়াস লভ্য বা করায়ত্ত হইয়া থাকে। আর্যজাতি যে সর্ববিষয়ে এত উন্নত হইয়াছিলেন তাহার মূল কারণই হইতেছে তাহাদের সর্ববিষয়ে সংযম বা মিতাচার এবং ব্রহ্মচর্য পালন অভ্যাস। ভারতের মানুষ ব্রাহ্মণ একদিন ভগবান বিষ্ণুর বক্ষে (আবদার করিয়া শিশুপুত্রের ন্যায়) পদাঘাত করিতে পারিয়াছিলেন এবং ক্ষত্রিয় রাজগণ মধ্যে কেহ কেহ ইন্দ্রের ইন্দ্ৰত্বও কাড়িয়া লইতে পারিয়াছিলেন কেবল তপঃ এভাবে সেই তপ স্যার মূলই হইতেছে একমাত্র ব্রহ্মচর্য বা দেহের শক্তিক্ষা। অহং দেবো নচান্যোহস্মি হ্মৈবাহং ন শােকভাক। সচ্চিদানন্দরূপােহহং নিত্য মুক্ত স্বভাববান। আমি দেবতা আমি অন্য কেহই নহি আমিই সেই নিত্য মুক্ত স্বভাব বিশিষ্ট সচ্চিদানন্দ স্বরূপ ব্ৰহ্ম। এইরূপ আপনাকে
S
উত্থানের পথ।
সর্বশক্তিমান, ব্ৰহ্মতুল্য ভাবনায় ভাবিত হইয়া মনে প্রাণে শক্তি
লাভ করিয়া প্রত্যহ প্রত্যুষে গাত্রোখান করা ব্রহ্মচর্য বলে
বলিয়া ব্যক্তি ব্যতীত অন্যে পারেন।
একমাত্র কাম জয় করিতে পারিলেই ক্রোধাদি জয়ও সহজ
হয়। মানুষ ইচ্ছা করিলে এক ব্রহ্মচর্য্য বলেই সাহসী হইয়া
দেবতার দেবত্ব আয়ত্ত করিতে পারে এ বিশ্বাস তাহার
আছে বা থাকা উচিত, এজন্য আপনাকে হীন দীন ক্ষীণ ও
পরাধীন ভাবিয়া হতাশ্বাস হওয়া কাহারও উচিত নহে।
পুনশ্চ অসংযত মানুষ স্ত্রৈণ হইলে কিম্বা নেশা বেশ্যা প্রভৃতিতে
অত্যাশক্ত হইলে নরকের কীট হইয়া পশু অপেক্ষাও হীন
এবং চিররােগী হইতে পারে, “ভােগে রােগভয়ং।” ভাগেই
রােগের ভয়, এই সকল কথা আমরা ক্রমশঃ বুঝাইতেছি।
আমরা ইতিপূর্বে এই পুস্তকে যে সকল প্রবন্ধ লিখিয়াছি
তাহাতে দেখান হইয়াছে, সংযমের পথেই ভারতের প্রাধান্য
ছিল, কোন কালেই কোন দেশের লােকের অসংযম বা
উচ্ছঙ্খলতার পথ ভাল নহে, একথা বহুভাবে বুঝাইয়াছি,,
তাহাতে মানব সমাজের অবনতিই ঘটে, পাশ্চাত্য সভ্যতা হইতে
আৰ্য সভ্যতা অনেক উন্নত কারণ ইহাই, সংশের পথে
এবং সর্বপ্রকার আত্মােন্নতির পক্ষে বিশেষ অনুকূল এবং
আধ্যাত্মিক বিজ্ঞান সম্মত এজন্য এই পথে থাকিলেই
মানবের ব্রহ্মচর্য রক্ষা এবং তজ্জন্য যথেষ্ট কল্যাণ . হয়।
আৰ্যশাস্ত্রে দেশাচারের মধ্যে সংযমের কথা এবং অসংযমের
পথেও সংযমের কথা অনেক আছে, এমন কি বিবাহিতেরও
ৰহ্মচর্য রক্ষার কথা আৰ্য্যশাস্ত্রেই বিস্তারিত আছে, ইহা
ব্রহ্মচর্য শিক্ষা। এবং পরবর্তী প্রবন্ধে (মূল পুস্তকে) আমরা ক্রমশঃ বাহুল্য ভাবেই দেখাইয়াছি। অসাধারণ ব্রহ্মচর্য পালনের ফলে শৌর্ষে বীর্যে ধৈর্য্যে সৰ্ব্বাপেক্ষ। শ্রেষ্ঠত্ব লাভ শ্রেষ্ঠত্ব লাভ এবং সর্বগুণ সম্পন্ন হইয়া আদর্শ পুরুষ শ্রীরামচন্দ্র প্রভৃতি পঞ্চ পাণ্ডবগণ জগতে মহাপুরুষ মহাজন বলিয়া বিখ্যাত হইয়াছিলেন। উক্ত মহাত্মাগণ প্রথম যৌবনে সুদীর্ঘকাল বনবাসে নির্জন পর্ণ কুটীরে স্ত্রী সান্নিধ্যে সর্বদা বাস বাস করিয়াও আহারে বিহারে মহাসংযম বা কঠোর ব্রহ্মচর্য পালন করিয়াছিলেন এবং অবৈধ ক্রোধ ও রাজ্যলােভাদি ত্যাগ করিতে সক্ষম হইয়াছিলেন সেজন্য তাঁহারা মানুষ হইয়াও দেব পদবাচ্য হইয়াছিলেন । যথাসময়ে স্বরাজ্যে আসিবার পরে তাঁহাদের সেই চিরসঙ্গিনী সতী স্ত্রীর গর্ভে সন্তানগুলিও জন্মিয়াছিল। সুর সুন্দরীদিগের বিলাস স্থল হিমালয়ের সুরম্য প্রদেশে মরণ ভয়ে ভীত ব্রহ্মচারী নব যুবক পতির সঙ্গে সৰ্ব্বদা অবস্থান করিয়াও যুবতী সতী কুন্তী ও মাদ্রী সুদীর্ঘকাল ব্রহ্মচর্য পালন করিয়াছিলেন, তাহাদের সেই নিষ্কাম তপঃ প্রভাব-পূত গর্ভেই দেবাংশসভূত পবিত্ৰাত্মা : মহাশক্তিশালী পঞ্চপাণ্ডবের জন্ম হইয়াছিল। পূর্বোক্ত মহাত্মাগণ রক্ত মাংসের সুবিশাল শক্তিশালী দেহ ধারণ করিয়া ও কঠোর ধৈৰ্য্যাবলম্বনে কাম ও ক্রোধাদির অসহ্য বেগ ধারণ করিতে পারিতেন সেজন্য তাহারা অসাধারণ শৌর্য বীৰ্য্য ন্যায় নিষ্ঠা ও সত্যে জগৎকে বিমুগ্ধ করিতে পারিয়াছিলেন। পাণ্ডবদিগের অলৌকিক গুণে বিমুগ্ধ হইয়াই
উত্থানের পথ।
অন্য
ভগবান্ শ্রীকৃষ্ণ তাহাদের সহিত সখ্যতা সূত্রে চির আবদ্ধ
হইয়াছিলেন। ঐ সকল নর নারীর অসাধারণ ধৈৰ্য্যধারণ ও
ব্রহ্মচর্য পালনের এরূপ দৃষ্টান্ত কথা ভারত ব্যতীত
কোন দেশে এত বাহুল্য শুনিয়াছেন কি?
বিকার হেতো সতি বিক্ৰীয়ন্তে
যেং ন চেতা:সি তএব ধীরা। কুমারঃ
বিকারের হেতু সকল সন্নিকটে বিদ্যমান থাকলেও যাহাদের
চিত্তের বিকার উপস্থিত না হয় সেইসকল ব্যক্তিই মহা-
পণ্ডিত এবং মহা ধৈৰ্যশালী হেতু ধীর বলা যায়।
জন মানব শূন্য নির্জন স্থানে ফল মূল ভােজী মুনি
ঋষি অপেক্ষা পূর্বোক্ত, ক্ষত্রিয় দম্পতীদিগের ব্রহ্মচর্য পালন
অতি ঘাের তপস্যা ও সুকঠিন কাৰ্য্য বলা যায় ।
দ্বাদশ বর্ষকাল (কোনকারণে) ব্রহ্মচর্য পালন করিয়া
ক্ষত্রিয় যুবকবীর অর্জুন ইন্দ্রলােকে বহু অস্ত্রলাভ এবং
মহাসুন্দরী উর্বশীকেও প্রত্যাখ্যান করিতে পারিয়াছিলেন।
চতুর্দশ বর্ষ নারীমুখ দর্শন না করিয়াই আৰ্য লক্ষণ মহাবীর
ইন্দ্রজিৎকে বধ করিতে সমর্থ হইয়াছিলেন। মহাত্মা ভীষ্ম,
ও হনুমান আকুমার ব্রহ্মচর্যের ফলেই জগতে ইচ্ছামৃত্যু
লাভ এবং অদ্বিতীয় বীর হইয়াছিলেন। মহাত্মা বুদ্ধের
নাম মার (কাম) জিৎ। সৰ্ব্বপ্রকার, কামাদি নীচ মনন
বৃত্তিকে জয় পার্শ্বনাথের নাম জিন, যাঁহার
সম্প্রদায়ের নাম জৈন বলে। দেহ
মনের সর্বপ্রকার
শক্তি বৃদ্ধির জন্যই ব্রহ্মচর্য। পূর্বোক্ত ব্যক্তিরা এই
ব্রহ্মচর্য শিক্ষা। ৰচৰ্য্য বলেই বিশেষ বিখ্যাত ও মহাশক্তিশালী হইয়া- ছিলেন। এরূপ মহাসংযম ও ত্যাগের আদর্শ খর্ব হওয়াতেই ভারতের এখন ঘাের পতন ঘটিয়াছে। ব্রহ্মচর্যাশ্রমে বাস করিবার ফলে কুসঙ্গ না ঘটায় মহাজ্ঞানী ও তপস্বী ঋষ্যশৃঙ্গ মুনি পূর্ণ যৌবনেও বেশ্যাদিগের রূপ লাবণ্য হাব ভান দেখিয়াও কাম ভাব বুঝিতে পারেন নাই; তিনি ঐ সকল কথা বালকের ন্যায় সরল ভাবে বৃদ্ধ পিতার নিকট বর্ণনা করিয়াছিলেন এবং পিতার কথায় উহা রাক্ষসী মায়া বা মায়া বলিয়াই বিশ্বাস করিয়াছিলেন। হায় এদেশে সেরূপ ব্রহ্মচারী কি আর জন্মাইবে; এখন কুসঙ্গে পড়িয়াই সাত আট বৎসরের বালক কুকথা বলে এবং দেওয়ালে লিখে। ইতর ভদ্র জাতির শিক্ষালয়ের পার্থক্য ব্যতীত এখন সেরূপ ভাবের ব্রহ্মচারী জন্মইতে পারা দুঃসাধ্য। প্রাচীন আর্যজাতির উক্ত আদর্শ গুলি স্মরণ করিয়া এখনকার অবিবাহিত বা বিবাহিত যুবক যুবতীগণ কায়: মন বাক্যে যথাপ্রয়ােজন ব্রহ্মচর্য পালন অভ্যাস করিবেন এবং সর্বদা মনে রাখিবেন মানুষের অসাধ্য কাৰ্য্য কিছুই নাই। পূর্বোক্ত ব্যক্তিগণ নির্জন বনবাসে ঈশ্বরের ধ্যান ঋরণ ও সমাধিতে আনন্দে মগ্ন থাকিয়াই সময় অতিবাহিত করিতেন সেজন্য সৰ্বেন্দ্রিয় জয়ে সক্ষম হইয়াছিলেন। পূর্বে উপনয়নের পরেই ব্রাহ্মণ দ্বাদশ বর্ষাধিক কাল এবং ক্ষত্রিয় বৈশ্যগণ অন্যূন আট বৎসর কালও গুরু- গৃহে বাস করিয়া কায় মন বাক্যে ব্রহ্মচর্য পালন . ও বেদাদি শাস্ত্র অভ্যাস করিতেন এবং নানাপ্রকারে পাঞ্চ- উত্থানের পথ। ভৌতিক সংঘর্ষণে কষ্ট সহিষ্ণু থাকিয়া গুরুসেবা করিতেন। তঁাহারা ব্রহ্মচর্য্য বলে এবং ধ্যান ধারণ সমাধিতে শারীরিক মানসিক বিশেষ শক্তিশালী হইলে পরে গুরুর আদেশে গৃহে আসিয়া বিবাহ করিতেন। অতএব পাঠাভ্যাস এবং ব্রহ্মচর্য শিক্ষা দ্বারা আত্মােন্নতির পক্ষে প্রধান সময় হইতেছে কৈশাের কাল বা প্রথম যৌবন। অর্ধ প্রস্ফুটীত কুসুমে যেমন গন্ধের বিকাশ ক্রমশঃ অনুভব হয়, সেইরূপ যৌবনের প্রারম্ভকাল হইতে শুক্র এবং ওজধাতুর প্রবৃদ্ধিতেই মানব হৃদয়ে শ্রদ্ধা ভক্তি প্রেম এবং কাম প্রভৃতি মানবীয় সর্বপ্রকার প্রবৃত্তি গুলির ক্রমশঃ বিকাশ ও পরিপুষ্টি হয়, শুক্রের অব্যক্ত অবস্থার মানবকে কুমার বা কুমারী বলে, অর্থাৎ মার বা কাম বৃত্তি তখন কু বা কদৰ্য্য কিম্বা স্তব্ধ ভাবে থাকে। পুনশ্চ শুক্রের ক্ষীণ অবস্থায় বার্ধক্যে ও পূর্বোক্ত ভাব গুলি শুষ্কবং বা মান হইয়া পড়ে, এজন্য বুঝা যায় শুক্র বা বীৰ্যই সকলের মূলশক্তি, ইহাই প্রেম বা ভক্তি প্রভৃতি সকল প্রকার গুণেরই আধার। একমাত্ৰ বীৰ্য্য ধারণের নামই ব্রহ্মচর্য সুতরাং প্রথম বয়স হইতে এই ব্রহ্মচর্য পালনই মানবের “উখানের (বা উন্নতির ) পথ” সেইজন্য অতঃপর আমরা সর্বশক্তির আধার ব্রহ্মচর্য তত্ত্ব লিখিতে প্রবৃত্ত হইলাম। “পতিসেবা গুরো বাসঃ।” শাস্ত্র বলিতেছেন যে বয়সে নারী পতিসেবার ( বিবাহের ) জন্য প্রস্তুত হইবে,, পুরুষ সেই বয়সে ব্রহ্মচর্য অভ্যাসের জন্য
ব্রহ্মচর্য শিক্ষা।
*
গুরুকুলে বাস করিবেন।
এখন নারীর বিবাহকাল যেমন
{ মূল পুস্তকে) দ্বাদশ বর্ষ ধার্য করা হইয়াছে, সেইরূপ
বয়সেই বা কিছু পূর্বে বিদ্যা শিক্ষা এবং ব্রহ্মচর্য পালনের
জন্য ব্রাহ্মণাদি তিন জাতীয় পুরুষেরাই ব্রহ্মচর্যাশ্রমে কিম্বা
মঠে গিয়া বাস করিবেন, এজন্য পূর্বের ন্যায় এদেশে স্থানে স্থানে
ব্রহ্মচর্যাশ্রম প্রতিষ্ঠা হওয়া এখন বড়ই প্রয়ােজনীয়।
ন তপস্তপ ইত্যাহু-ব্রহ্মচর্যং তপােত্তম।
উদ্ধরেতা ভবে বস্তু স দেবে নতু মানুযঃ ॥
সাধারণ তপস্যাকে তপস্যাই বলিনা ব্রহ্মচর্যই উত্তম
তপস্যা, যিনি উৰ্দ্ধরেতা হইতে পারেন তিনি দেবতুল্য অর্থাৎ ,
দেবতার ন্যায় উত্তম চরিত্র ও শক্তিশালী হইয়া কায় মন ও
বাক্যের বিশেষ উন্নতি সাধন করিতে পারেন, তিনি সাধারণ
মনুষ্যের ন্যায় স্বার্থপর ও নীচমনা কখনই হয়েন না, ব্রহ্মচর্য
হীন ভােগ লম্পট হওয়াতেই এখনকার মানুষের চরিত্র এত
দূষিত ও নীচ হইয়াছে।
সাধারণতঃ বীৰ্য্য ধারণে জীবনী শক্তির বা চেতনার বৃদ্ধি
হইয়া থাকে অর্থাৎ যিনি যে পরিমাণে বীৰ্য্য রক্ষা করিতে
পারিবেন তাহার সেই পরিমাণে হৃদয় প্রফুল, মস্তিষ্ক সবল,
চক্ষু কর্ণাদি ইন্দ্রিয় বর্গ এবং দেহ বলশালী, বর্ণ উজল এবং মুখশ্রী
স্নিগ্ধ ও সুন্দর ও সরলভাব হইয়া উঠে এবং মন ও স্বভাব ক্রমশ
বিশেষ সত্যনিষ্ঠ ও সতেজ হইয়া উঠিবে ।
।
)
“কঃ শূরে। বিজিতেন্দ্রিয়ঃ ।”
v•
উখানের পথ।
এই পৃথিবীতে শ্রেষ্ঠ বলবান্ কে ; ইহার উত্তরে বলিয়াছেন,
যিনি কাম, ক্রোধ ও লেভাদি ইন্দ্রিয় বর্গকে জয় বা বশীভূত
করিয়াছেন। পক্ষান্তরে আবার তিনিই সর্বাপেক্ষা দুর্বল
যিনি ইন্দ্রিয়ের প্ররােচনায় সর্বদা অবশ প্রায় ভাসিয়া বেড়ান,
তাঁহাকে স্বেচ্ছাচারীও বলা যায়। ঐরূপ স্বেচ্ছাচারী ব্যক্তির
ধৈৰ্য ক্ষমা তিতিক্ষাদি সদগুণ কিছুই থাকে না, অধিকন্তু
তঁাহারা মিথ্যা কথা বলিতে বা
বলিতে বা প্রতারণা করিতে
সঙ্কুচিত হয়েন না, কপটতা তাহাদের অঙ্গভূষণ হয়।
কৰ্ম্মণ মনসা বাচা সর্বাবস্থা সৰ্ব্বদা।
সৰ্বত্ৰ মৈথুনত্যাগে। ব্ৰহ্মচৰ্যং প্রচক্ষতে।
সর্বাবস্থায় সর্বত্র কোনরূপ কৰ্ম্ম বিশেষ দ্বারা বা মনদ্বারা
কিম্বা বাক্য
প্রসঙ্গেও মৈথুন ত্যাগের নামই ব্রহ্মচর্য্য।
স্মরণং কীৰ্ত্তনং কেলিঃ প্রেক্ষণং গুহ'ভাষণং।
সংকল্লোহধ্যবসায়শ্চ ক্রিয়া নিষ্পত্তিরেব চ।
এতস্মৈথুন-মষ্টাঙ্গং বদন্তি মনীষিণঃ।
বিপরীতং ব্রহ্মচর্য-মনুষ্ঠেয়ং মুমুক্ষুভি।
পণ্ডিতেরা কুভাবে নারীর স্মরণ, নারী প্রসঙ্গ কীর্তন,
গােপনে বাক্যালাপ, কামদৃষ্টিতে দর্শন প্রভৃতি আটপ্রকার
কাৰ্য্যকেই মৈথুন বলিয়া গণ্য করিয়াছেন। এই সকল
কার্য্যের বিপরীতচরণকে ব্রহ্মচর্য বলে। এজন্য প্রকৃত
পক্ষে যিনি ব্রহ্মচারী থাকিবেন তিনি অন্য স্ত্রীলােক দুরে
থাকুক মাতা বা যুবতী ভগ্নি প্রভৃতি কিম্বা আত্মীয়া,
ব্রহ্মচর্য শিক্ষা।
স্ত্রীলােকেরও মুখের দিকে চাহিয়া নির্জমে কথা কহিবেন না,
কথা কহিবার বিশেষ প্রয়ােজন হইলেও যিনি নিজের
পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠের প্রতি দৃষ্টি স্থির রাখা অভ্যাস করিতে
পারেন, তিনি সহজেই ব্রহ্মচর্য রক্ষা
করিতে পারেন,
এটী প্রত্যক্ষ ও সহজ সত্য। এরূপ কোন যুবতীও যুবক
পুত্র বা যুবক ভ্রাতাদির মুখের দিকে না চাহিয়া এবং
পদাঙ্গুষ্ঠে দৃষ্টি রাখিয়া তাহাদের সহিত কথা বলা অভ্যাস
করিবেন। পরস্পরের মুখাবলােকন রােধ দ্বারা মনােবিকার
রক্ষার জন্যই ভারতে হিন্দু মুসলমানের মধ্যে অবগুণ্ঠন
প্রথা অনুমােদিত হইয়াছিল।
জঘন্য গুণবৃত্তিস্থ অধােগচ্ছন্তি তামসাঃ
তমাে গুণান্বিত মানব অধিকাংশ সময় কামাচ্ছন্ন ভাবেই
থাকেন সেজন্য কামিনীর মনােরঞ্জন কাৰ্যেই তিনি ব্যস্ত
থাকেন, সেইহেতু উক্ত নর নারী জঘন্য গুণবৃত্তি পােষণ
করেন। জঘন্য শবে উরুদ্বয়ের সন্ধিস্থান, তৎ সম্বন্ধীয়
{ বা সন্নিহিত ) অঙ্গ প্রত্যঙ্গকে জঘন্য বলা যায়
ব্রহ্মচর্য অবস্থায় যুবক যুবতী দিগের পক্ষে পরস্পরের
অঙ্গের বা জঘন্য স্থানের দিকে না চাহিয়া নিজ পদাঙ্গুষ্ঠে
দৃষ্টি রাখা অভ্যাস করাই ভাল কারণ কোন প্রকারে
মনে
ভাবের উদয় না হয় সেই পথে চলাই
ব্রহ্মচারীর কর্তব্য। ভারতীয় আচার ব্যবহারের মধ্যে
সাবধানতার বাহুল্য থাকাতেই ঐ পথে এদেশে বহু সতী ও
ব্রহ্মচারী এবং যােগী সন্ন্যাসী জন্মিয়া ধর্মগুরু ও কৰ্ম্মগুরু
১২ উত্থানের পথ। রূপে জগৎকে শিক্ষা দিয়া এবং অধ্যাত্মিকতায় মানৰ জীবনের চরমোন্নতি (জীবমুক্তি ও নির্বাণ) লাভ করিবার পথ দেখাইয়া গিয়াছেন, অন্য দেশে এত ধর্মগুরু ছিল না। পূর্বোক্ত “স্মরণ কীৰ্ত্তনং কেলিঃ—“শ্লোকে কাম স্বৰথকেও মৈথুন (বা মন্থন) বলিয়াছেন, ইহার কারণ হইতেছে যে, দুগ্ধের সহিত যেমন ধৃত মিশ্রিত থাকে মন বং আলােড়নেই সেই মাখন বা ননী যেমন পৃথক হইতে থাকে এবং ঐ নবনী পৃথক হইলে যেমন তাহা আর দুগ্ধে কোনরূপে মিশ্রিত হয় না, সেইরূপ কাম চিন্তায় বা কামভাব উদয়ে উদান বায়ু দ্বারা রস রক্তাদি সপ্ত ধাতুতে আশ্রিত শুক্রও ক্রমশঃ কামাগ্নি সন্তাপে পৃথক ও হইয়া যায় এবং ঐ কাম চিন্তার গাঢ়তায় অধিক শুক্র সঞ্চয়ে কাম প্রবৃত্তিকে উত্তেজিত করিয়া তুলে, তখন কামবেগে নর বা নারীর বিবেক অবসন্ন ও মুগ্ধ হইয়া পড়িতে পারে এবং কাম চরিতার্থতার জন্য তখন মানব ব্যাকুল হইয়াও পড়ে সুতরাং ব্রহ্মচারী বা সন্ন্যাসীর পক্ষে যুবতী নারীর মুখ দর্শনও উচিত নহে উহাদের প্রথম হইতেই সাবধান হওয়া আবশ্যক, ইহাই বুঝান অৰ্য্য শাস্ত্রকারদিগের অভিপ্রায়। অষয় ব্রহ্মচারী থাকিবার থাকিবার প্রয়ােজন বা বলবৎ সময়ের জন্য যুবক বা যুবতীর পক্ষে অগত্যা কাৰগন্ধও ত্যাগ করিতে হইবে নচেৎ মনের অজ্ঞাতসারেও ব্রহ্মচর্যের নানারূপে বাধা বিঘ্ন ঘটিতে পারে। নাটক নভেল পড়িতে যুবক যুবতীদিগের কোন কোন যে ব্রহ্মচর্য শিক্ষা। সময় হয়ত এমন ঘটে যে, দিবা রাৱির মধ্যে পুস্তক ফেলিয়া উঠিবার ইচ্ছা বা অবসরই হয় না, এত আগ্রহের কারণ হইতেছে, ঐকান্তিক ভাবে যুবক বা যুবতীর সৌন্দর্য ও প্রেমালাপ এবং চরিত্র আলােচনায় বা গাঢ় অরণে মৈথুনের কাৰ্য্য ঘটে অর্থাৎ কামভাবের চিন্তায় কামাগ্নি সন্তপ্ত হওয়ায় তঁাহার দেহস্থ সপ্তধাতু হইতে শুক্ৰ পৃথক্ হইতে থাকে, হয়ত অজ্ঞাত ভাবে শুক্র ক্ষরণও হইয়া যায় সেজন্য কঞ্চিৎ সুখ- বােধে ঐ পাঠে এত অশক্তি জন্মে সুতরাং ঐ সকল পুস্তক পাঠ বা অশ্লীল টপ্পাদি সংগীত শবণ এবং অশ্লীল চিত্ৰ ৰা মূর্তি দর্শন প্রভৃতি কাৰ্য্য ব্রহ্মচারীর পক্ষে কিম্বা তরুণ কিশাের বয়ৰু বালক বালিকার পক্ষে সর্বখা নিষিদ্ধ, কারণ মনের সহিত চক্ষু কর্ণাদি সকল ইন্দ্রিয়কেই সংযত না রাখিতে পারিলে ব্রহ্মচর্য রক্ষার ব্যাঘাত ঘটে। চোয়ের দোষে বিরক্ত হইয়াই এক সময় প্রবীণ মানুষ বিশ্বমঙ্গল ঠাকুর স্বেচ্ছায় অন্ধ হইয়াছিলেন। হিন্দুরা তাহাকেই শাস্ত্র বলেন,-যাহা দ্বারা আমরা শাসিত বা সংযত হইতে পারি অর্থাৎ বহির্মুখ ইন্দ্রিয়বর্গকে অম্মুখী করিতে পারি, শ্রীগীতা ও ভাগবত প্রভৃতি শান্ত্র হইতেছে বহির্মুখ কামকে অন্তর্মুখ প্রেমে পরিণত করিবার পন্থ প্রদর্শক। প্রাচীন নাটক নভেল ছিল দাম্পত্য প্রেম বর্ধক কিন্তু আধুনিক নাটকাদি হইতেছে কাম ও ব্যভিচারের পােক তা প্রায়শঃ দুর্নীতি মূলক। বড়ই দুঃখের বিষয়; এদেশে বালক হইতে বৃদ্ধ পর্যন্ত এখন অনেকে মনের দুর্বলতায় ক্রমশ আধুনিক নাটক নভেল পড়িতে বড়ই আশক্ত হইয়া পড়িতেছেন, শিক্ষা বিস্তারের সহিত পুস্তকালয় বা লাইব্রেরীর বৃদ্ধি হইতেছে [ ২ আ ]
১৪
উত্থানের পথ।
বটে কিন্তু দুর্ভাগ্য বশতঃ তাহাতে বােধ হয় শত করা নব্বই
খানি ইংরাজী বাঙ্গালা নভেল। অবিবাহিত তরুণ যুবক
যুবতীদিগের পক্ষে ঐ (বিকৃত ভাবের কামমূর্তি) নাটক নভেল
পাঠে পলে পলে ব্রহ্মচর্য ক্ষয়ে অধিক ক্ষতি অজ্ঞাতসারেও
হইয়া থাকে, তাহার ফলে উহাদের সাত্ত্বিক ও রাজসিক ভাব
অর্থাৎ দেবত্ব ও মনুষ্যত্ব বা বীরত্ব ভাব ক্ষয় হওয়ায় ক্রমশঃ
উহারা তামসিক ভাবে পশু অপেক্ষা হীন বুদ্ধি ও ক্ষীণশক্তি হইয়া
আলস্য অবসাদে জড়বৎ হইয়া পড়েন। বিশেষতঃ এদেশের
পল্লীবাসী নিষ্কর্মা যুবকদিগের এই ভাব বৃদ্ধি এবং চরিত্র ও
মতিগতির ক্রমশঃ বিকৃতি ঘটিতেছে। নভেল পুনঃ পুনঃ
পাঠে তীক্ষ্ণ বুদ্ধি যুবকেরও বুদ্ধি যেন ম্লান বা ভোতা হইয়া
যাইতেছে, দর্শন বা বিজ্ঞান চর্চা আর ভালাে লাগে না,
চিন্তাশীল মহাশয়েরা একটু ভাবিয়া দেখিবেন যে, এখন
কুশিক্ষায় দেশের ক্রমশঃ কি সর্বনাশ ঘটিতেছে, শীঘ্রই ইহার
প্রতিকার প্রয়ােজন।
তরুণ ব্রহ্মচারীর জন্য চাণক্য শ্লোক, হিতােপদেশ,
মৎশঙ্করাচার্যের বৈরাগ্যবর্ধক গ্রন্থনিচয় এবং শ্রীগীতা ও
উপনিষদ এবং রামায়ণ, মহাভারত ও ইংরাজী বাঙ্গালা বিজ্ঞান
এবং দর্শন শাস্ত্রাদি পাঠের প্রবৃত্তি জন্মান এখন বড়ই প্রয়ােজন
হইয়াছে। পূৰ্বে গুরুজনের ভয়ে নাটক নভেল গােপনে
পড়িতে হইত, আর এখন বাপ বেটায় নভেল পড়ে ও শুনে।
পাশ্চাত্য দেশে শুনিয়াছি পিতা পুত্রে প্রেমালাপ লইয়া হাস্য
কৌতুক করা হয় সেজন্য কি ? আমরাও ঐ পথে অগ্রসর
হইতেছি। এদেশে নবদম্পতী দিবসে লজ্জায় পরম্পরে
ব্রহ্মচর্য শিক্ষা। বাক্যালাপ করিত না উহা ব্রহ্মচর্য বা সংযম রক্ষার জন্য কিন্তু এখন উহা বর্বরতা দাড়াইয়াছে, কাল ও দেশ এবং আদর্শ ভেদে কচি ভেদ। অতএব পাশ্চাত্য ভাবে ডুবিয়া আমরা মরণের পথেই যাইতেছি কি না একটু ভাবিয়া দেখুন । আরও গভীর দুঃখের বিষয় (একে মনসা তাহে ধুনার গন্ধ ) এদেশের যুবকেরা ব্ৰহ্মচর্যের পরিবর্তে বিপরীতাচরণ অর্থাৎ অধিক কাম সেবার পথে বিলাসিতায় এখন (তমােগুণে) আলস্যে ঘাের অবসন্ন হওয়ায় জগতের মধ্যে সর্বাপেক্ষা সর্ববিষয়ে হীন দীন ও ক্ষীণ হইয়া পড়িয়াছেন সেজন্য দুর্বলের লােগ বীজানু সংগ্রহের ন্যায় তাহারা পাশ্চাত্যের দোষ গুলিই ক্রমশঃ সংগ্রহ করিতেছেন। দেশের এই দুরবস্থার সময় মক্ষিকা বা মশকের মৃদু বিষ প্রসারণের ন্যায় দেশের পণ্ডিভিমানী লােকেরা পাশ্চাত্য নাটক নভেলের ছায়াবলম্বনে নিজের বিদ্যা বুদ্ধি পরিচালনায় উহার ( বিকৃত ভাবে কামবৰ্ধক) কায়া দানে দেশের ভাবি আশ। স্থল তরুণ তরুণীর মধ্যে কাম চর্চারই শ্রীবৃদ্ধি করিয়া মুমুষু জাতির মরণের পথ প্রশস্ত করিতেছেন। হায়! অর্থসৰ্বস্ব ! তােমাদের বিদ্যা বুদ্ধিতে ধিক্ ; তােমাদের শিক্ষা দীক্ষার পরিণাম ফল কি দাড়াইতেছে ; তােমাদের চক্ষু লজ্জাও কি হয় না। আজ বায়স্কোপে মা বিশালাক্ষীর অনুগৃহীত রামমণি বা রামী ধােপানীর সূক্ষ্ম- বস্ত্রাবৃতা নগ্ন চিত্রে আমরা কি দেখিতেছি ; প্রেমের আসনে কামকে বসাইয়া আমরা পানীয় ঔষধে বিষ মিশাইতেছি। আজ মাড়বারীর ভেজাল বিষে দেহ মন জীর্ণ হইতেছে ; তাহার উপর অশ্নীলপ্রায় পুস্তক প্রচারে বিদ্যাবাগীশের ;
উখানের পথ। দল তরল কাম বিষে আচ্ছন্ন করিয়া আমাদের তরুণ তরুণীরু মাথা গুলি অধিকতর চর্বণ করিতেছেন। দেহ গেল, মাথা গেল, এখন বল মা তারা দাড়াই কোথায় ; চিন্তাশীল বিজ্ঞ মহাশয়েরা এখনও প্রতিকারের চেষ্টা করুন ; নচেৎ কোন কালে আর বুঝি হতভাগ্য আমরা “উত্থানের পথ দেখিতে পাইব না। অশ্লীল প্রায় নাটক নভেল পড়া ভোতা বৃদ্ধিতে যখন দর্শন বিজ্ঞানের চর্চাই ভাল লাগে না, তখন সে মাথায়। আধ্যাত্মিক বা প্রেম ভক্তির কথা কটু লাগিবে না কি? এখন সেজন্য ঐগীতা বা ভাগবতাদি আলােচনা স্থান এবং হরি সংকীৰ্ত্তন পৰ্যন্ত গ্রাজুয়েট দল ত্যাগ বা বয়কট করেন। শ্রীচৈতন্য ভাগবতামৃতে আছে,অতি ভক্তিমতী" বিধবার নিকট হইতে তণ্ডুল ভিক্ষা করিয়া আনায় পরম ভক্ত ছােট হরিদাস ঠাকুরের প্রতি স্বগত ভাবে কোপ করিয়া মহাপ্রভু একদা তাঁহার আশম প্রবেশ নিষেধ করিয়াছিলেন। যাঁহারা এখনকার সাম্যবাদী তাহারা ইহার তত্ত্ব বুঝিবেন কি? ইহার কাৰ্য কারণ আধ্যাত্মিক বাদী ব্যতীত কোন বৈজ্ঞানিক বা সূক্ষ্ম হােমিওপ্যাথিক ডাক্তার কেহই বুঝিবেন না কিন্তু মহাব্রহ্মচারী মহাপ্রভু এই আচরণে নারী সম্ভাষণে এবং নারী প্রদত্ত দ্রব্যেও যে নারীর প্রভাব থাকে এবং তাহাও, কামিনী কাঞ্চন ত্যাগীর পক্ষে যে অগ্রাহ্য তাহাই বুঝাইয়াছেন। হিন্দুশাস্ত্রেও এই প্রকার (সাম্যভাব বা ততুল্যতা প্রাপ্তির উয়ে) কর্ম পতিত বা জাতি পতিত নীচ বা পাপী ব্যক্তির জান গ্রহণ ৰা স্পর্শ দুষ্ট অন্নাদি ভক্ষণ বারণ করা হইয়াছে।
ব্রহ্মচর্য শিক্ষা। ১৭ পূৰ্বে বলিয়াছি, নারীর সহিত গুহভাষণকেও মৈথুন বিশেষ বলে, সেজন্য মহাপ্রভু চরিতামৃতে বলিয়াছিলেন, প্রকৃতি হইয়া করে প্রকৃতি সম্ভাষণ। সেজনার মুখ মুই না করি দরশন। ব্রহ্মচর্য সতীত্ব এবং ব্রহ্মণ্য ও জাতি ধর্ম কত সন্তর্পণে বা কেন রক্ষা করিতে হয় বুঝুন ; সংসারে ব্রহ্মচর্য ও সতীত্ব এবং ব্ৰহ্মণ্য অতি শ্রেষ্ঠ বস্তু কিন্তু এই তিনটি ক্ষণভঙ্গুর বা বড়ই ঠুনকো জিনিষ, ইহা নিৰ্মল ভাবে রক্ষা করা বড়ই কঠিন কাৰ্য সেজন্য বিধবার প্রদত্ত বস্তুতেও নারীপ্রসঙ্গ বা নারীত্বের প্রভাব মহাপ্রভু জ্ঞান চক্ষে দেখিয়া বিরক্ত হইয়াছিলেন কারণ শাস্ত্র বলেন “মনসা ন স্ত্রিয়ং স্মরেৎ।” ব্ৰহ্মচারীগণ মনদ্বারাও নারীকে স্মরণ করিবেন না সে স্থলে প্রকৃতি সম্ভাষণ মহাদোষের বিষয়। ঠাকুর লক্ষণ সীতাদেবীর পায়ের নূপুর ব্যতীত গাত্রের বা মুখের অন্য অলঙ্কার না চিনিবার কথা শ্রীরাম চন্দ্রকে বলিয়াছিলেন ; ঐরূপ যে সতীগণ পরপুরুষকে মন দ্বারাও কুভাবে স্মরণ না করেন তাহার ফলে তাহারাই কেবল সহমরণ বা ইচ্ছা মৃত্যুকেও আয়ত্ত করিয়া থাকেন। বর্তমান কালেও সতীর ইচ্ছা মৃত্যুর কয়েকটি সংবাদ “সতীধৰ্ম প্রবন্ধে” দেখাইয়াছি। পাপ বা পুণ্যের এবং মনঃ প্রবৃত্তির সর্বপ্রকার সদসৎ প্রভাব দাতার প্রদত্ত বস্তুতেও সংক্রমিত হয় সেজন্য শাস্ত্রোক্ত কুলটা ক্লীব ও শত্রু প্রভৃতির প্রদত্ত বস্তু গ্রহণে দোষ ঘটে। শাস্ত্র বলেন, চাণ্ডাল অন্ত্যজ প্রভৃতির স্ত্রীগমন, অন্নভােজন এবং দান গ্রহণ ইত্যাদি কাৰ্যে তাহাদের প্রভাব বা পাপাদি দোষ সংক্রম ; উখানে। 1 *। . হওয়ায় শীঘ্ন ৰা বিলম্বে তজ্জালিত্ব বা তদ্ভাবক্রান্ত হইতে হয় এজন্য পূর্বোক্ত সকল কার্যে ব্রহ্মচাদির এবং জাতির হানি হওয়া স্বাভাবিক। শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত পুস্তকে এবং মহাত্মা রামকৃষ্ণ পরমহংস দেবের জীবনীতে ও স্বামী সারদানন্দ প্রণীত “শ্রীরামকৃষ্ণ লীলা প্রসঙ্গ” পুস্তকে ঠাকুরের সংসর্গ দোষ ত্যাগের বহু দৃষ্টান্ত, কথা লিখিত আছে কিন্তু ইহা দেখিয়াও ঐ সকল সম্প্রদায় মধ্যে জাতি বা সংসৰ্গদোষ এবং স্পর্শ দোষ অনেকে গ্রাহ করেন না। তােমার নীচ জাতির মৃত প্রবৃত্তি বা চরিত্র গঠিত করিবার ইচ্ছা না থাকিলে নীচের সহিত সর্ববিধ গুরুতৱ সংরই তােমাকে ছাড়িতে হয়। পক্ষান্তরে শিক্ষা দীক্ষায় বড়ই সুসভ্য সুবুদ্ধি পাশ্চাত্য সমাজে এখন, ব্রহ্মচর্যেরই হানিজনক বহুপ্রকার কুপ্রথায় ঐ সকল দেশের যে চরম দুর্দশা ঘটিতেছে সেই সকল কথা পূর্বোক্ত দেশাচার প্রবন্ধে আমরা (এই পুস্তকে) বহু ভাবে দেখাইয়াছি। পাঠ্য অবস্থায় এ দেশের ব্যবস্থা ছিল, কঠোর ব্রহ্মচর্য, কারণ একাগ্রতা না থাকিলে বেদ বেদান্তাদি শাস্ত্রে মনােহভিনিবেশ করা যায় না। এখন পাশ্চাত্য দেশের ব্যবস্থা হইতেছে, তরুণ তরুণী পাশাপাক বা একাসনে গায়ে গা দিয়া লা, ইহার ফলে উদ্দাষ বয়সে অন্য বিদ্যা যাহাই হউক কিন্তু, চরিত্র দোষ যাহা ঘটিবার তাহা ঘটিতেছে। সম্প্রতি জানিলাম যে, সুন্দরী নারী দ্বারা প্রলুব্ধ করিয়া অনেক তরুণ বয়স্ক ধনী পুত্রকে চুক্তির বিবাহে বদ্ধ করাইয়া পুনশ্চ ঐ শিকারী নারী দ্বারা বিচ্ছেদ ঘটাইয়া খেসাতের ঈাকা আদায় করা ঐ দেশের একটা বড় ব্যবস্তায় দাঁড়াইয়াছে। *
১৯
ব্ৰচয় শিক্ষা।
জন্ম নিরােধকরিতে গিয়া বহু নারী; উৎকট... রােগাক্রান্তা
হইতেছেন, অথচ শতকরা দশ, জনও সফল কাম হইতেছেন
কিনা সন্দেহ।
এই প্রকার বহু সংবাদ প্রায় প্রত্যহ আমরা
বাদ পত্রে পড়িতেছি, তথাপি আশ্চর্যের বিষয় এখনও
আমরা মােহান্ধ মহামূর্থের ন্যায় ঐ আদর্শের জন্য আইন পাশেও
লালায়িত হইতেছি।
বীৰ্য্য ধারণং ব্রহ্মচর্যং।” বীর্য ধারণ করিবার শক্তির
নামই ব্রহ্মচর্য। কেবল হবিষ্য করিলে বা গৈরিক বস্ত্র ধারণ
করিলে ব্রহ্মচারী হওয়া যায় না, এই জন্য শুক্রক্ষয়ে সকলেরই
দুঃখিত হওয়া উচিত।
ব্রহ্মচর্য প্রতিষ্ঠায়াং বীৰ্য্য লাভঃ ।
কাম চিন্তাবিহীন ব্রহ্মচর্যের প্রতিষ্ঠা ব্যতীত স্বল্পকাল মধ্যে
ৰীষ্য বা শক্তিলাভ হয় না। ধৃতবীর্যের চক্ষু কর্ণাদির শক্তি,
'স্মরণ শক্তি, দৈহিক শক্তি সমস্তই বৃদ্ধি প্রাপ্ত হয় এবং দেহ
মন সুস্থ ও সবল থাকিলে কোন রােগও হলৎ তাঁহাকে আক্রমণ
করিতে পারে না, মন সর্বদা প্রফুল্লই থাকে, তাহাদের ফুর্তির
অ অপর কাৰ্য্য বা মাদক সেবন করিতে হয় না। মদ্যাদি
পানের নেশার শেষে 'ঘাের অবসাদ জন্মে কিন্তু ব্রহ্মচারী
যুবকের দেহ বা মনের অবসাদ প্রায় কখনই হইবে না, বরং
সর্বদা বালকের ন্যায় আনন্দে প্রফুল্ল থাকিবে। বৃদ্ধাবস্থায়
দেহ ইন্দ্রিয় সকলই শিথিল ও দুর্বল হয় কিন্তু সংযমী বৃদ্ধের
দুরদপতা বৃদ্ধি ও বুদ্ধি সুতীক্ষ্ণ এবং সুস্থির হয় এজন্যই বৃদ্ধের
উপদেশ গ্রাহ বলা হয়। : : :
উখানের পথ।
যথা পয়সি সর্পিস্তু গুড়শ্চেক্ষুরসে যথা।
এবং হি সকলে কায়ে শুক্রং তিষ্ঠতি দেহিনাম।
দুগ্ধে যেমন ধৃত বা মাখম এবং ইক্ষুরসে যেমন গুড়ের
সত্ত্বা বিদ্যমান থাকে, সেইরূপ শুক্রও রক্তের সহিত মিশিয়া
জীবের সৰ্ব্বদেহ ব্যাপিয়া অবস্থান করে। মনে কাম ভাবের
উদয় হইলে মস্তিষ্ক পরিচালিত তাড়িৎশক্তির বলে শুক্র
( ভাণ্ড স্বরূপ) অণ্ডদেশে সঞ্চিত হয়, সামান্য কাম চিন্তাতেও :
রক্ত হইতে শুক্র পৃথক্ এবং তরল হইতে পারে, একথা
পূর্বেও বলিয়াছি।
রসামৃঙমাংস-মেদাস্থি-মজ্জঃ শুক্রাণি ধাতবঃ।
রসাদ্ৰক্তং ততো মাংসং মাংসম্মেদঃ প্ৰজায়তে।
মেদসােহস্থি ততো মজ্জা মজ্জঃ শুক্র সম্ভব।
আহারীয় দ্রব্য হইতে প্রথমতঃ রস ধাতু, রস হইতে রক্ত,
রক্ত হইতে মাংস, মাংস হইতে মেদ বা বসা, মেদ বা বসা
হইতে অস্থি, অস্থি হইতে (তন্মধ্যে সংস্থিত) মজ্জা, সেই
মজ্জা হইতে শুক্র ধাতুর উৎপত্তি হয়। চিকিৎসকেরা বলেন
যাইট ফোটা রক্তে এক ফোটা শুক্র জন্মে, পূর্বোক্ত সাতটি
পদার্থকে সপ্ত ধাতু বলে, তাহা হইলে বুঝা যাইতেছে কত
আহারীয় বস্তুর সারের সারাংশ এবং সৰ্ব্ব ধাতুর সারাংশ শুক্র।
তত্র রসাদীনাং শুক্রান্তানাং ধানাং যৎ
পরং তেজ-স্তৎ খদ্বোজ-শুদেব বলং
ইত্যুচ্যতে সিদ্ধান্তা।
ব্রহ্মচর্য শিক্ষা।
পুনশ্চ শুক্রান্ত এই রস রক্তাদি সপ্ত ধাতুর যাহা সারাংশ
তাহারই নাম তেজ, তাহাকেই ওজ বলে এবং উহারই নাম বল।
“ওজো বলে স্থিরাংশে-চেত্যমর*।
মরকোষ বলেন, ওজ বল, এবং স্থিরাংশ, এই তিনটিই
শক্তি বা ওজ ধাতুর নাম। সপ্তধাতুর পরমাণু পুঞ্জ ওজ ধাতুতে
পরিণত ও স্থির ভাব হয় বলিয়া ওজধাতুর নাম স্থিরাংশ, এই
ওজধাতু স্থির বা প্রতিষ্ঠিত হইলে বুদ্ধি স্থির হয়, দীর্ঘকাল
চৰ্যে এই ওজকে প্রথম যৌবনে স্থির করিয়া ফেলিতে
পাৰিলে মানবের হলৎ পতনের আশঙ্কা কমিয়া যায় এবং পূর্ণ
যত্ব বা দেবত্ব লাভও ঘটে।
যস্য বৃদ্ধৌ দেহস্য তুষ্টি পুষ্টি বললদয়াঃ।
যশে নিয়তো নাশশা যস্মিং-স্তিষ্ঠতি জীবনং।
যে ওজঃ ধাতুরই প্রবৃদ্ধিতে তুষ্টি পুষ্টি এবং বলের উদয়
হইয়া থাকে, যাহার নাশে ক্রমশঃ আমাদের ক্ষয় বা মৃত্যু ঘটে।
এক যাহার অবস্থানে জীবনীশক্তি ধ্বংস হয় না, সেই ওজ
তুই জীবনের সার বস্তু জানিবে।
নিম্পাদ্যন্তে যতােবা বিবিধ দেহসংশ্রয়া।
উৎসাহ প্রতিভা-ধৈৰ্য-লাবণ্য-সুকুমারতাঃ।
যাহা হইতে দেহীর সর্ববিধ শ্রদ্ধা ভক্তি ও মােদি
নানাপ্রকার ভাবের বিকাশ হয় এবং উৎসাহ প্রতিভা ধৈৰ্য্য
লাবণ্য ও সৌকুমাৰ্য্য প্রভৃতি ফুটিয়া উঠে, সৰ্ব্ব ধাতুর
২২ উত্থানের পথ। শুক্র- সারভূত সেই ওজঃ যাহার দেহে সমধিক থাকে তিনি অলৌকিক শক্তি সম্পন্ন এবং নানাগুণ সম্পন্ন হইয়া থাকেন। ইহা দ্বারা মানবের পূর্বোক্ত দয়া ধৰ্ম ভক্তি ও শ্রদ্ধা প্রেম প্রভৃতি উৰ্দ্ধস্রোতস্বিনী দৈবী বৃত্তি গুলি প্রবল ও প্রস্ফুটিত এবং সুস্থির হয় সুতরাং উহার বিপরীত ভাব কাম ক্রোধাদি অধস্রোতস্বিনী বৃত্তি অর্থাৎ পশুভাব ক্ষীণ হইয়া যায় । ধাতুকে এই ওজতে পরিণত করাই ব্রহ্মচর্য্য। পূর্বোক্ত আয়ুৰ্বেদ এবং সুশ্রুত কথিত বাক্য গুলি সকল নরনারীর বিশেষ রূপে বুঝিয়া হৃদয়ঙ্গম করা এবং কার্যে পরিণত করা উচিত। শাস্ত্র বলেন এই ওজ ধাতুর বৃদ্ধিতে ব্রাহ্মণদেহে ব্ৰহ্মণ্য ও নারীদেহে সতীত্বের এবং ক্ষত্রিয়ের ক্ষাত্রশক্তি ও শূদ্রের দাক্ষিণ্য গুণ প্রভৃতি বিকাশ হয়। ব্রহ্মচর্য পালনে যাহার। যখন দেহ মন ঐরূপ সতেজ হইয়া উঠে তখন তিনি সত্য- নিষ্ঠ হয়েন, তঁাহার কোন বিষয়েই মনের দৌর্বল্য থাকে না এবং তাহার পতনের আশঙ্কাও কমিয়া যায়। এই ওজঃ বা তেজ আশ্রয় করিয়াই চেতনারূপে ব্ৰহ্ম অবস্থান করেন, শাস্ত্র বলিতেছেন, তিলমধ্যে যথা তৈলং ক্ষী রমধ্যে যথা ঘৃতং। পুষ্প মধ্যে যথা গন্ধ ফলমধ্যে যথা রস। তথা সৰ্বগতো। আত্মা দেহ মধ্যে ব্যবস্থিতঃ । তিল মধ্যে তৈল, দুগ্ধে ঘৃত, পুষ্প মধ্যে গন্ধ এবং ফল মধ্যে রস, যেমন অবস্থিত সেইরূপ সর্বব্যাপী চেতনা বা ব্রহ্মচর্য শিক্ষা। ২৩ আত্মারূপী ঈশ্বর সর্বজীবের দেহমধ্যে (সপ্তধাতু বা বসরূপেও) অবস্থিত আছেন। আত্মা বা চেতনারূপী ঈশ্বর প্রধানতঃ ওজ বা তৈজস সত্ত্বাবলম্বনেও অবস্থিত থাকেন, তাড়িৎ শক্তিও ঐ তেজে অবস্থিত সুতরাং ঐ ওজই ব্ৰহ্ম । অতএব ব্রহ্মচারী শব্দে যিনি ঐরূপ দেহস্থ ওজরূপ ব্ৰহ্মভাবে বিচরণ করেন এরূপ অর্থও বুঝা যায়। মানব দেহ যখন ঐরূপ নিৰ্ম্মল ও তেজোময় হয় তখন তাহার ব্ৰহ্ম চিন্তায় স্বাভাবিক প্রবৃত্তি জন্মে, তখন ব্রহ্মজ্ঞ হওয়ায় তিনি নারায়ণ স্বরূপ হন, ঐ ভাব দেখিয়া লােকে ব্রাহ্মণকে নারায়ণ বলিত এবং ঠাকুর বলিয়া ডাকিয়া ভক্তি সহকারে প্রণাম করিত। সৰ্বজাতীয় ওজস্বী মানবেরই হৃদয় প্রেমে ভরিয়া যাওয়ায় তিনি বিশ্বপ্রেমিক হয়েন, তখন তাহার ভগবৎপ্রেম, দেশপ্রেম সমস্ত উজ্জ্বল হইয়া উঠে। স্বয়মন্তবহিবাপ্য ভাসয়ন্নখিলং জগৎ। ব্ৰহ্ম প্রকাশতে বহিঃ প্রতপ্তায় পিণ্ডবৎ। এই অখিল জগৎকে উদ্ভাসিত এবং মানবের অন্তর্দেশ এবং বহির্দেশ ব্যাপ্ত করিয়া সেই অনন্ত শক্তি ব্ৰহ্মবস্তু সদা প্রকাশিত হইতেছেন, যেমন লৌহপিণ্ড প্রতপ্ত হইলে তাহার বহিরন্তর পরিব্যাপ্ত হইয়া বহি সুপ্রকাশিত ও প্রদীপ্ত ভাবে অবস্থান করেন। অতএব মানব ব্রহ্মচর্য বলে সত্ত্বগুণ প্রধান হইলে তাহার বাহাভ্যন্তর ভাগ ব্ৰহ্মতেজে পূর্ণ ও উজ্জ্বল হইয়া উঠে, তখন তাঁহাকে তেজঃ পুঞ্জ কলেবর দেখা যায় । পাশ্চাত্য পণ্ডিতদিগের মতামত সংগ্রহ প্রবন্ধের সপ্তম ২৪ উখানের পথ। জফায় লিখিত রহিয়াছে যে, জগতে কেবল বিদ্যুৎই আছে আমরা বিদ্যুৎতের সমষ্টি মাত্র। এই কথা আমরা পাল্লিখিত উপাসনার আবশ্যকতা প্রবন্ধে সপ্রমাণ বিস্তারিত ভাবে বলিয়াছি এখানেও বলিতেছি যে, যুবক যুবতীর দর্শন শর্শনেই হউক অথবা নীচ জাতির সহিত দর্শন স্পৰ্শন বা সম্ভাষণ আনা হউক তড়িৎ বা বৈদ্যুতিক শক্তির আদান প্রদান ঘটায় মানবের দেহের এবং মনের স্বাভাবিক ভাবেই ক্ষতি বৃদ্ধি ঘটে। ইহার জন্যই হিন্দুর স্পর্শ দোষ বা ছুৎ মার্গ লইয়া এত ৰাখি আৰ্যশাস্ত্রে দেখান হইয়াছে। জাতিতত্ত্ব ও স্পর্শদোষ হতে বিস্তৃত আলােচনা “উখানের পথ” দ্বিতীয় ভাগে প্রবন্ধকারে দেখান হইয়াছে। এখানে বক্তব্য যুবক যুবতীগণ পরস্পরের দর্শন স্পর্শনে সতর্ক না থাকিলে তাহাদের ব্রহ্মচর্য ক্ষণের বিশেষ ব্যাঘা ঘটিবে। উপনিষদ বলিয়াছেন,-“নায়মাত্মা বলহীনেন লভ্য। এই আত্মারূপী ব্ৰহ্ম দুর্বল বা ব্রহ্মচর্য বিহীন মানবের যন্ত নহে। ভােগ বিলাসিতার পক্ষে লক্ষ্য না রাখিয়া কান্ত মন বাক্যে নারী প্রসঙ্গ বা অবৈধ কাম চিন্তা ছাড়িয়া, অল্প অনুত্তেজক সাত্ত্বিক দ্রব্য আহার, যৎসামান্য মােটামুটী অথচ পবিত্র ও পরিষ্কার পােষাক পরিচ্ছদ ব্যবহার করিয়া সর্বদা সুস্থির চিতে বল রক্ষার চেষ্টা করিলে বলবীৰ্য লাভ এবং আধ্যাত্মিক তত্ত্বজ্ঞান লাভ হইবে। ব্রহ্মচর্য বলে বলীয়ান্ এবং সংযত হইলে চিত্তস্থির করা যায় না, যেমন স্থির জলে সূৰ্যবি দর্শন ঘটে এবং নিৰ্বাতলে দীপশিখা অকম্পিত খাকে সেইরূপ সংযত ব্যক্তির স্থিরচিত্তেই ব্ৰহ্মজ্ঞান স্থির ভাবে
ব্রহ্মচর্য শিক্ষা।
..২৫
প্রতিভাত হইয়া থাকে। অতএব ব্রহ্মচর্য রক্ষা করিতে
পারিলেই পুনশ্চ ব্রাহ্মণ্য ধর্মের প্রাধান্ত লাভও সর্বপ্রকার
শক্তি লাভ এবং ভক্তি ও প্রেমলাভ নিশ্চয়
ঘটিৰে।
ক্ষত্রিয়
বৈশ্যেরাও পূর্বকালে ঐরূপ ধনুর্বেদাদি পাঠের জন্য উপনয়নের
পর গুরুগৃহে ব্রহ্মচারী হইয়া অবস্থান পূর্বক শৌর্য বীৰ্য্য ও ধৈর্য্য
লাভ করিয়া থাকিতেন।
সৰ্বদ। কর্মে অশক্ত এবং পূর্ণাহারে বীৰ্য্যবান্ হেতু আলস্য
হীন হওয়ায় পাশ্চাত্য জাতি ভারতীয় ক্ষীণশুক্র নিস্তেজ
মানব অপেক্ষা অনেকাংশে ব্রহ্মচারী এজন্য তাঁহারা ঘড়ী ধরিয়া
কথা কহেন এবং দেশের গুণে ও পরিপুষ্ট ও বলিষ্ঠ দেহ বলিয়া
তাহারা দশজনের কাৰ্য একজনেও করিতে পারেন, বলিষ্ঠ
লােকের পক্ষে কিছু অত্যাচারেও বিশেষ ক্ষতি হয় না।
তেজিয়সাং ন দোষায়।” তেজস্বী ব্যক্তির পক্ষে অনাশক্ত
ভাবের অল্পদোষে দোষ বলিয়া গণ্য হয় না সেজন্য দীর্ঘকান
ব্রহ্মচারী থাকায় মুনি ঋষিদের সময় বিশেষে পদস্খলনেও
বিশেষ দোষ বলিয়া গণ্য হয় নাই।
ব্ৰহ্মবিদ হ্মৈব ভবতি।
* *
শাস্ত্র বলেন, যিনি ব্রহ্মকে ভাবিবেন বা জানিবেন তিনি
ব্ৰহ্মই হইবেন, সেজন্য সােহহং কথা এদেশে প্রচলিত হইয়াছে।
যিনি চিরকুমার বা ব্রহ্মচারী থাকিতে ইচ্ছা করিবেন তিনি এই
সােহই ভাবে সৰ্ব্বদা ভগবানের ধ্যানে মগ্ন থাকিবেন। তুমি
মদনমােহনের ভাব লইয়া থাকিলে তােমার নিকট আর মদনের
প্রভাব থাকিতে পারিবে না, মদন তখন তােয়ই নিকট মূল্প
( ৩ই )
খানের । হইয়া থাকিবেন, এজন্য বলিয়াছি ব্ৰহ্মচৰ্য্য রহিহ বুলহীনের আত্মলাভ হয় না সূতৱাং ব্রহ্মবিদ হইতে হইলে ব্রহ্মচারী হইয়া বললাহ আগে প্রয়ােজন। অসংযমে সর্ববিষয়ে দুর্বল বলিয়াই বাঙ্গালীর এত দুর্গতি। “নায়মাত্মা প্রবচনেন লভ্যঃ।” এই আত্মা কেবল বাক্য বা ৰাচাতুরী দ্বারাও লাভ হয় না। ব্রহ্মচর্য ব্যতীত বাকসংযম করা বা সত্য প্রতিজ্ঞ হওয়া ৰা সত্য রক্ষা করা যায়না এবং বুদ্ধিও. নিৰ্ম্মল হয় না। যেমন মেঘ মুক্ত সুর্যের আলােকেই সূৰ্য্য দর্শন ঘটে সেইরূপ নিৰ্ম্মল বুদ্ধিদ্বারাই আত্মদর্শন ঘটে। গীতা বলেন বুদ্ধেঃ পরতন্তু স। বুদ্ধির পরেই আত্মা। ঈশ্বর প্রাপ্তির দুইটি পথ, জ্ঞানপথে অর্থাৎ অগ্নিকণিকাকে কম্মেন্ধন সংযােগে বৃহদগ্নি করণের ন্যায় সােহহং জ্ঞানে তন্ময় হইতে পারিলে তাহাকে শীঘ্র পাওয়া যায় বটে কিন্তু ইহা হওয়া বা পক্ষীগতি দুর্বলের পক্ষে কঠিন। ঈশ্বরের কৃপা প্রার্থী হইয়া ভক্তির পথে দুর্বলের পক্ষে পিপীলিকা গতিদ্বারা ভজনা করাই সুবিধা অথবা সােহহং ভাবে থাকিয়া ভক্তি মিশ্রিত জ্ঞানপথই শ্রেষ্ঠ পথ। তিনি আমাকে ধরিয়া রাখিলেও আমারও তঁাহাকে ধরিয়া থাকা উচিত তবে আমি নিশ্চিন্ত, থাকিতে পারিব। ভগবদ্ভাবে থাকিলেই মন স্থির থাকিবে। বােধ হয় এখন অনেকেই বুঝিয়াছেন যে, সপ্তধাতুর সারাংশ ওজ ধাতুই মানবদেহের শ্রেষ্ঠ বস্তু। কোন প্রকারে মনের চাঞ্চল্যে শুক্র বিচলিত বা উত্তপ্ত হইলে এই দেহস্থ শুধাতু ওজ ধাতুতে পরিণত হইবার পক্ষে বিশেষ ব্যাঘা ঘটে, সেজন্য কায়মন বাক্যে কঠোর ভাবে শুক্র সুস্থির রাখিয়া ওজতে ব্রহ্মচর্য রক্ষার উপায়। পরিণত করিবার চেষ্টার নামই ব্রহ্মচর্য শিক্ষা। স্পর্শেন্দ্রিয়কেই একরূপ ছুৎমার্গ বলা যায়, ( ছুইলেই মজিবে) ইহারই প্রভাব বিশেষ ভাবে আৰ্যেরা বুঝিতেন। প্রথম যৌবনে তরুণ তরুণীর মধ্যে কামের নব অভ্যুদয়ের মত্ততা হইতে রক্ষার জন্য ( ছুৎমার্গ রোধে) প্রথম বয়সেই এই ব্রহ্মচর্য শিক্ষা করিতে হয় এবং হিন্দু-শাস্ত্রের বহু বিধি বিধান প্রায় এজন্য ব্যবহার করা হইয়া থাকে। শরীরে ওজধাতু সুস্থির হইলে মানুষের স্বল্পাহারে বা উপবাসেও দেহের বিশেষ ক্ষতি হয় না। অধিকন্তু মনের বল ক্রমশঃ যেন বৃদ্ধি হয় সেজন্য দেশের বহু রাজবন্দী এবং মহাত্মা গান্ধিজী ইহার দৃষ্টান্ত স্থল ! গান্ধিজী এই বৃদ্ধ বয়সে বহু উপবাসে এবং স্বল্পাহারে থাকিয়াও যথেষ্ট পরিশ্রম এবং বুদ্ধি বিবেচনার পরিচয় দিতেছেন। ব্রহ্মচর্য রক্ষার উপায়। পশুগণ প্রকৃতির দাস সেজন্য সে কখন মরণের পথে স্বেচ্ছায় যাইতে চাহে না। মানুষও চাহে সৰ্ব্বদা বাঁচিতে কিন্তু সে সর্বদা ইন্দ্রিয়বশে পথ ভুলিয়া মরণের পথেই যাইতেছে। “মরণং বিন্দু-পাতেন।” শাস্ত্র বলিতেছেন, বিন্দু বা শুক্রের পাতন বা ক্ষয়েই চেতনার ক্ষয় সেজন্য ইহাকেই মরণ বলে কিন্তু ক্ষণিক মােহজনিত আনন্দ মাত্ৰ বুঝিয়াও মানুষ সেই মরণের পথেই ( অতিমাত্রায় ব্যস্ত ভাবে। যাইয়া থাকে। শাস্ত্র বলিতেছেন, সর্বপ্রকার কাম বা কামনার (ভােগের) পথই মৃত্যুর পথ, = উত্থানের পথ। প্রেমের (বা নিবৃত্তির পথই আঁচিবার পথ। অতএক যদি দীর্ঘজীবী হইয়া যাচিয়া থাকিতে চাও তবে জিতেন্দ্রিয় ৰা মিচারী হইয়া প্রেমের পথে সেই প্রেমময়কে হৃদয়ে ধারণ, করিয়া শ্রীপুত্র লইয়া অনাশক্ত ভাবে সংসার ভােগ কর, তাহা হইলে তােমার যােগ ও ভােগ এক সঙ্গেই হইয়া অস্তিমে; অমরত্ব বা ( অমরণ) মুক্তি লাভ ঘটিতে পারিবে। মুনি ঋষিরাও এই পথে এই ভাবে সংসার করিতেন। বিবাহিতের ব্ৰহ্মচর্ষে এসকল কথা পরে বিশেষ বিস্তারিত বলিব। এক্ষণে এই গুজ রক্ষার জন্য ব্রহ্মচারীদের স্বাভাবিক ও সহজ উপায় কি হইতে পারে এবং কি আছে সেই গুলি যথাজ্ঞান আমরা ক্রমশঃ বলিতেছি। আমাদের মস্তকের দুইটি বিভাগ, ইহার সম্মুখে বৃহন্মস্তিষ্ক এবং পশ্চাদভাগে ক্ষুদ্র মস্তিষ্ক। বৃহন্মস্তিষ্কই ধৰ্ম্মপ্রবৃত্তি বা সৎপ্রবৃত্তির আধার, দয়া ক্ষমা শ্রদ্ধা ভক্তি প্রেম বিবেক বা বিবেচনা শক্তি এই মস্তিষ্ক হইতেই বিকাশ হয়, ঐ দয়া ক্ষমাদি ধর্ম প্রবৃত্তি গুলিকে উস্রোতস্বিনী বৃত্তি বলে। -যুগল মধ্যস্থলে আজ্ঞাচক্রে মনের স্থান, মনে দয়া ভক্তি প্রভৃতির উদয় হইলে নিম্নাঙ্গ হইতে রক্তপ্রবাহ উদিকে অর্থাৎ বৃহন্মস্তিষ্কের দিকে সূক্ষ্মানুসূক্ষ্ম শিরা পথে প্রবাহিত হইয়া থাকে। সেজন্য উক্ত সৎপ্রবৃত্তি গুলি বিকশিত হইয়া উঠে ধৰ্ম্ম প্রবৃত্তির শূরণে দেহে পুলক (রােমাঞ্চ) এবং নেত্র-প্রান্তভাগ: হইতে অশ্রুপাত (শােকা নেত্র মূল দেশ হইতে পতন ) হইয়া থাকে এবং মানবের প্রকৃতি ধীর ও সুস্থির ভাব হয়। মন্তকের পশ্চাঙাগে যে ক্ষুদ্র মস্তিষ্ক, ইহা কাম ক্রোধ । *) ।
ব্রহ্মচর্য রক্ষার উপায়। লােভ প্রভৃতি ইন্দ্রিয় বর্গের এবং নীচ প্রবৃত্তির অধিষ্ঠান স্থান বা অধঃস্রোতস্বিনী বৃত্তির আশ্রয় এবং ইহা দেহস্থ স্নায়ু (শিরা) পুঞ্জেরও • মূল বা কেন্দ্র স্থান। মনে কাম বা ক্রোধের উদয় হইলে তখন দেহের রক্তপ্রবাহ অধােঅঙ্গের দিকে প্রধাবিত হইয়া থাকে অর্থাৎ ক্রোধের উদয়ে ঘাড়ের শিরা ফুলে বাঁকিয়া যায়, দেহ চঞ্চল বা স্পন্দিত হয় এবং হস্ত মুষ্টি বদ্ধ ও কম্পিত হইতে থাকে। লােভের উদয়ে জিহবায় রস সঞ্চার হয়। কামের উদয়ে জিহ্বা, উপস্থ এবং স্ত্রী জাতির যােনি ও স্তনাগ্রে তাড়িৎ বলে রক্তস্রোত প্রবাহিত হওয়ায় ঐ সকল অঙ্গের স্ফুরণ হইতে থাকে। ঐ সকল বৃত্তি প্রস্ফুরিত হইয়া উঠিলে উহার ভােগের ইচ্ছাও জন্মে সেজন্য ক্রুদ্ধ ব্যক্তি হটাৎ প্রহার এবং খুন জখমও করিয়া ফেলে। কামী ব্যক্তিরা কামাদির সম্ভোগ না করিয়া প্রায় স্থির থাকিতে পারে না। কাম বা ক্রোধের:অযথা ভাক উদয় হইলে মানুষ দীর্ঘসূত্রীর ন্যায় স্থিরও আলস্য ভাবে সময় কাটাইবার চেষ্টা করিবে। চিন্তাশীল, বুদ্ধিমান বা ধার্মিক লােকদিগের মস্তকের সম্মুখের অংশ স্কুল এবং দীর্ঘায়তন ও ললাটদেশ প্রায়শঃ প্রশস্ত দেখা যায়। দয়ার সাগর বিদ্যাসাগর মহাশয় প্রভৃতির মুখশ্র এই প্রকার ছিল। সাধারণতঃ ব্রাহ্মণের মুখাবয়ব এই প্রকার হইত। সম্মুখ ও পশ্চাৎ উভয়দিক সমান দীর্ঘায়তন ও পরিপুষ্ট মস্তকের লােকেরা তেজস্বী সুচতুর বলিষ্ঠ ও ক্ষাত্র ভাবাপন্ন দেখা যায়। মুখ ও মস্তক গােলাকার দৃশ্য বা পাশ্বায়তন বিস্তার হইলে বৈশ্য ভাবাপন্ন বা ব্যবসায় বুদ্ধি সম্পন্ন বুঝা যায়। সম্মুখ অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র এবং মস্তকের উখানের পথ। পশ্চাৎ ভাগ স্কুল ও পরিপুষ্ট লােকেরা প্রায় শূদ্রভাবাপন্ন বুঝা যায়, ঐ লােকেরা অধিক কামুক এবং দ্বেষ হিংসা ও ক্রোধ পরায়ণ দেখা যায়। বানর, নরবানর এবং সাধারণতঃ : পশুদিগের সম্মুখের মস্তক ও কপালের গঠন ক্ষুদ্র ও অপ্রশস্ত কিন্তু মস্তকের পশ্চাৎ ভাগ স্কুল ও পরিপুষ্ট এজন্য উহাদের স্নায়বিক শক্তি প্রখর, অর্থাৎ উহারা প্রায় মনুষ্য অপেক্ষা অধিক হসিার এবং উহাদের চক্ষু কর্ণাদির শক্তি অধিক ও ক্রোধ হিংসাদি পশুবৃত্তি প্রবল দেখা যায়। অন্যান্য কথা জ্যোতিষ শাস্ত্রে আছে। কোন কোন পণ্ডিত বলেন, যেমন : কলি বৃক্ষের ত্বকের মধ্যে বা মধুচক্রের মধ্যে বহু ছিদ্র দেখা যায় সেই প্রকার মস্তিষ্কাভ্যন্তরে প্রবৃত্তির স্থান আছে। যেমন মনুষ্যদিগের হন্তের কাৰ্য নৌকা চালনা প্রভৃতি। এবং পায়ের কাৰ্য হাঁটাহাঁটি প্রভৃতি অধিক করায় হস্ত বা পদের পেশীর শক্তি অধিক, বাড়ে এবং ঐ সকল অঙ্গ ক্রমশঃ পরিপুষ্ট হয় সেইরূপ কাম ক্রোধাদির বেগ সংযত না করিয়া অধিক পরিচালনা বা ব্যবহার করিলে ঐ সকল স্নায়ুর এবং প্রবৃত্তির শক্তিই বাড়িতে থাকে। সেই প্রকার দয়া প্রেম প্রভৃতি সৎপ্রবৃত্তি গুলিরও বারম্বার অনুশীলনে ঐ সকল বৃত্তির মস্তকস্থ স্থান গুলি পরিপুষ্ট এবং ক্রমশঃ বিস্তারও প্রশস্ত হয়। যেমন জল না চলিলে ক্রমশঃ ড্রেন বা জলপথ রােধ হয় বা বুজিয়া যায় তদ্রুপ কামাদি প্রবৃত্তিরও ব্যবহার না ঘটিলে। কতকটা প্রায় সেই ভাব হওয়ায় ব্রহ্মচারী বা বিধবাদেয়” আত্মরক্ষা ঘটে। ব্ৰহ্মচর্ষে দেহে মাংস বসা বাড়িলেও শুক্র-- তেক্ত বা বেগ কমিয়া যায়।
ব্রহ্মচর্য রক্ষার উপায়।
অতএব ক্ষুদ্রমস্তিষ্কে অবস্থিত এই কাম ক্রোধাদি নীচ
এবৃত্তি গুলিকে দমন রাখিতে হইলে সর্বদা সৎপ্রবৃত্তি গুলিকে
পরিচালনা দ্বারা জাগাইয়া রাখিতে হইবে সেজন্য তিনবার।
সন্ধ্যা, পাঁচ ওক্ত নেমাজ প্রভৃতি করিতে হয়। নীচ প্রবৃত্তির
অন্যায় বা অসাময়িক বেগ উপস্থিত হইলে জন সন্নিধানে কিম্বা
গুরুজন বা সাধুলােকের নিকট উপস্থিত হইবে বা ক্রীড়ন
শীল শিদিগের সহিত ক্রীড়া করিবে এবং হাস্য রস সম্ভোগ বা
হাসির চেষ্টা করিবে। দেহের রক্ত প্রবাহ কোন প্রকারে
অন্য পৰে বা উচ্চাঙ্গে প্রধাবিত করিতে পারিলেই তৎক্ষণাৎ .
নীচাঙ্গের বেগ স্বাভাবিক প্রশমিত হইয়া থাকে। ইহাই
কাম বা ক্রোধাদি দমনের প্রথম পথ বা প্রধান পথ কিন্তু
এই উচ্চ নীচ প্রবৃত্তি বর্গের পরিচালক হইতেছেন সর্বত্র মন।
মনকে এক দিকে কোন প্রকারে সংলগ্ন করিতে পারিলেই
সেসময় অন্য পথে ঐ মন যাইবার, অবসর পায় না এবং
মাসযােগ ব্যতীত কোন প্রবৃত্তিও তােমার তখন কাৰ্যকরী ।
হইতে পারে না।
হান্দোগ্য উপনিষদে বলিয়াছেন,-অনু-মশিতং
বিধীয়তে। তস্য যঃ স্থবিষ্ঠো ধাতু-স্তৎ পুরীষং ভবতি, যাে
মধ্যমসং যােহন্বিষ্ঠ-স্তন্মনঃ।
ভুক্ত অল্প জঠরাগ্নিতে পরিপাক হইয়া যেটি স্কুল অংশ
তাঁহ বিষ্ঠারূপে এবং যাহা মধ্যমাংশ তাহা মাংসাদি অর্থাৎ
সতু রূপে এবং যাহা অবশিষ্ট সূক্ষ্ম সারাংশ তাহা মনের
পােষণ বা গঠন করে।
শান্তরে আছে, সাত্ত্বিক সারাংশে মন এবং রাজসিক
উখানের পথ। সারাংশে ইন্দ্রিয়বর্গ ও তামসিক সারাংশে অহং ভাব আমিত্ব বা: অহঙ্কারের উদ্ভব হইয়া থাকে। কাম ক্রোধাদি ইন্দ্রিয় বর্গও. আবার মন হইতেই উদ্ভব হয় সেজন্য কামের নাম মনসিজ।. ইন্দ্রিয়গণ পরিমিত ব্যবহারে মিত্রের ন্যায় তােমার সুখ সমৃদ্ধি দায়কই হয় কিন্তু ইহার অপরিমিত সম্ভোগে রিপু বা মহাশত্রুর ন্যায় অপকারী হইয়া তােমার দেহও মনের ক্ষতি করে। ঐরূপ প্রচুর পূর্বোক্ত প্রমাণে বুঝা যাইতেছে, সাত্ত্বিক (হবিষ্যান্নাদি ) বস্তু ভােজনে মনের পুষ্টি হওয়ায় মনেরই বল বৃদ্ধি হয় সুতরাং ব্রহ্মচারীর পক্ষে অনুত্তেজক এবং স্নিগ্ধ গুণ বলিয়া সাত্ত্বিক আহারের প্রয়ােজন। হিন্দুর সর্ববিধ ধৰ্ম্মকাৰ্য্য করিবার পূৰ্বদিন হবিষ্যান্ন ভােজন করিয়া ব্রহ্মচর্য পালন করিতে হয় । তাহার ফলে পরদিন পূৰ্বাহ্নে বা মধ্যাহ্বে দৈব বা পৈত্র কাৰ্য্য করিবার সময় মানবের মনের বল অনবসন্ন বা অক্ষুন্ন থাকে এবং সদ্ভাবেরও উদয় হইয়া থাকে। মৎস্য মাংসাদি রাজসিক ভােজনের প্রায় চব্বিশ ঘণ্টা পরে কাম ক্রোধাদির বেগে মনের অস্থিরতা ও অন্য মনস্কতা হওয়া বুঝা যায় এবং তামসিক দ্রব্য উচ্ছিষ্ট বাসী পচা ও মদ্যাদি পানের চব্বিশ ঘণ্টা পরে (খােয়ারির ভাব) আলস্য অবসাদও নিদ্রাকর্ষণ এবং কুভাবের উদয় প্রভৃতি অতএব আহার বিশেষ দ্বারাও সাত্ত্বিকাদি ভাবে, মনের গঠন করা যায় এবং ব্যবহার ভেদে এবং সঙ্গ গুণেও মনের পরিবর্তন বা উচ্চতা নীচতা ঘটান যায়, ঐ সকল, কথা বিস্তারিত ক্রমশঃ আলােচনা করা যাইতেছে। ঘটে।
ব্রহ্মচর্য রক্ষার উপায় । যমিং তিরসং পূতি পষুষিতঞ্চ যৎ। উচ্ছিষ্টমপি চামেধ্য ভােজনং মসয়িং। গীতা পচা কি শুষ্ক, দুর্গন্ধ, বাসি, অপরের উচ্ছিষ্ট অর্থাৎ ভােজন কালে বা ভােজনাবশিষ্ট দ্রব্য এবং নীচু লােকের দৃষ্ট ও অপবিত্র এব্য বা অভোক্ষ্য (পেয়াজ রসুন মদ্যাদি) যে সকল ভােজন সামগ্রী তাহাই তমােগুণ বর্ধক ও তামস লােকদিগের প্রীতিকর। যক্ষ বা কুঠাদি রােগগ্রস্ত লােকের কেবল স্পর্শেই যখন রােগাক্রান্ত হইবার বিশেষ ভয় দেখা যায় তখন যাহার তাহার লােভ দৃষ্ট বা স্পষ্ট বা উচ্ছিষ্ট দ্রব্য বিশেষতঃ অন্নাদি ভােজনে বহুবরাগ বা দোষ ঘটার কথা তরুণদিগের না বুঝা ঘাের মুখত নহে কি? সহস্র বিশ্লেষণে (বা ডাউলেসনে) হােমিওপ্যাথিক ঔষধের গুণ যখন নষ্ট হয় না প্রত্যুতঃ বাড়িয়াই যায় তখন সাক্ষাৎ মুখের লালা মিশ্ৰিত উচ্ছিষ্টে রােগাদির বীজানু প্রবেশাদি জন্য দোষ না ঘটিবে কেন? পশুত্ব বৃদ্ধি, আলস্য, বহু নিদ্রা, স্তব্ধভাব রােগস্বভাব ইত্যাদি তামসিক- গুণ (গীতায় বিশেষ দেখ ) আমাদের ক্রমশঃ বৃদ্ধি হইয়া আমরা পশুর অধম হইতেছি। বেশ্যার ও লম্পটের এবং মাতালের শৃষ্টান্ন ভােজনে সংসর্গ দোষই ঘটে সেজন্য তাহাদের ন্যায়, মতি গতি হইলে তােমরা ব্রহ্মচারী থাকিবে কি রূপে ? যখন অকপট ব্রহ্মচারী প্রকৃত যােগী সাধু সন্ন্যাসীর উচ্ছিষ্টাদি ভােজনে তাঁহাদেরই গুণের ভাগী হওয়া যায় তখন নীচের সংসর্গেও নীচ হইতে হয় ইত্যাদি বুঝিয়া আত্মােন্নতির চেষ্টা কর; উচ্ছিষ্টাদি খাইয়া ভদ্র জাতি তােমরা উচ্ছন্ন যাইবে কেন?
৩৪ উখানের পথ। জাতিবিচার ও স্পর্শদাষ এবং খাদ্যবিচার “উখানের পথ দ্বিতীয় ভাগে দেখ। । আহায় শুদ্দৌ সত্ত্বশুদ্ধি সশুদ্ধৌ বা স্মৃতি। স্মৃতি লাভে সৰ্বগ্ৰন্থীনং বিপ্রমােক্ষ। সাত্ত্বিক ভােজনে মনের বল বাড়ে একথা পূর্বে বলিয়াছি। এই আহার শুদ্ধি হইলেই সত্ত্বশুদ্ধি জন্মে, সত্ত্বশুদ্ধি হইলে স্মৃতি বা সৎবুদ্ধি লাভ বা চিত্তশুদ্ধি হয়, সৎবুদ্ধি বা সদ্ভাবের উদয়ে, জীবের কামক্রোধাদির মায়িক বন্ধন হইতে মুক্তিও শীঘ্র লাভ ঘটে সুতরাং ব্রহ্মচারীদিগের সাত্ত্বিক আহারের বিশেষ প্রয়ােজন। আহার শুদ্ধিতে কাম ব্যতীত ক্রোধাদিরও উপশম হয়, উত্তেজক আহারেই যবনাদির সর্বদা রূক্ষ স্বভাব দেখা যায়। একাদশী ও অমাবস্যা পূর্ণিমায় অন্ন ত্যাগ করিয়া স্বল্পাহারী হইবে বা উপবাস করিবে। এ সকল বিষয় বিধবার ব্রহ্মচর্য্যে যাহা যাহা বলা হইয়াছে সেই সকল নিয়মই পালন করিবে। ব্রহ্মচারী কেবল ক্ষুধা নিবৃত্তির জন্যই সুলভও পবিত্র বস্তু খাইবে,.. রসনা তৃপ্তির জন্য ভালাে খাইতে চেষ্টা করিবে না। ভূমিরাপােহনলো বায়ুঃ খং মনো বুদ্ধিরেব চ। গীতার ঐ শ্লোকদ্বয়ে পরা প্রকৃতি জীবাত্মা ব্যতীত পঞ্চভূতের সহিত মন বুদ্ধিকেও দেহের অংশ বলিয়াছেন সুতরাং দেহের পুষ্টিতে মনের ও বুদ্ধির পুষ্টি এবং দেহের সুস্থতায় মনের ও বুদ্ধির সুস্থতা উপলব্ধি করা যায় সেজন্য আহার শুদ্ধিতে সত্বশুদ্ধি ঘটায় সৎপ্রবৃত্তির উদয় ও মনের পুষ্টি লাভ ঘটে এবং তামসিক ব্রহ্মচর্য রক্ষার উপায় । আহাৱেই রুচি বৃত্তি মল ক্রমশঃ হয় এবং ভদ্রলােকের পক্ষে অতএর এই মনুকে সবল সুস্থ এবং সাত্ত্বিক ভাবে রাখিতে হইলে আহার শুদ্ধির প্রয়ােজন। সত্ত্বগুণে, মন সুস্থ এবং সবল থাকিলে কাম ক্রোধাদি ইন্দ্রিয় বর্গ ঐ মনের উপর আর বিশেষরূপ আধিপত্য করিতে পারে না বরং তাহারা তখন মনের অধীন ও অনুগতই হইয়া থাকে এ সকল কথা পরেও বলিতেছি, শ্ৰগীতায় কথিত রাজসিক আহারে শোৰ্য্য বীৰ্য দম্ভ ক্রোধ জয়লি উদ্যম উৎসাহ বাড়ে, যাহা পাশ্চাত্যে বহু দেখা যায়, জাৰ্মাণের নাজিদলের রজোগুণ বা ক্ষাত্রশক্তি বৃদ্ধি হওয়ায় তাহারা এখন কোন অংশেই জগতে হীন হইয়া থাকিতে আর চাহেন না। এদেশে ছাগ এবং মেষ মাংস ও মৃগ মাংস এবং হংসডি ও ডাউল রুটি ঘূত ভােজনই রজোগুণ বৃদ্ধির পক্ষে যথেষ্ট, কালে ভদ্রে বা দৈবাৎ মাংস জুটিলে না খাওয়াই ভাল, দেশ কাল পাত্র হিসাবে গাে শূকর কুক্কুটাদির মাংস এবং মদ্যদি এদেশে অখাদ্য ও দুম্পাচ্য এবং দেহ মনের পীড়াদায়ক ও তমােগুণ বর্ধক হইয়া থাকে। কাস কফ বিষ্ঠা ক্রীমি কটাদি কুককুটের খায় সেজন্য গ্রাম্য কুককুট ভােজন শাস্ত্র নিষিদ্ধ, উহা যক্ষ্মারও নিদান। পাশ্চাত্যে শীতে রক্ত জমিয়া যাইবার ন্যায় হয় সেখানে উষ্ম জনক চা দোক্তা বা যাঁড়ের ডাল্লা বা অন্য মাংস ব্রাণ্ডি হিতকর কিন্তু এদেশে গ্রীষ্মে সরবৎ এবং আমাদি ফল ও শস্য ভােজনই স্বাস্থ্যকর। নিরামিষ ভােজী হইয়াও শিখ ও গুখারা গত মহাযুদ্ধে জাৰ্মাণ জাতির প্রবলবেগকে .
উখানের পথ। প্রতিহত করিতে পারিয়াছিলেন। নিরামিষাশী ভীমৰানী রামমূর্তি বাঙ্গালায় আধুনিক হইয়াও প্রসিদ্ধ বলিষ্ঠ হইয়াছিলেন। গত গােলটেবিলে ছাগদুগ্ধসেবী মহাত্মা গান্ধীজি ইংলণ্ডের মহামনীষী মহামন্ত্রীদলকে প্রায় মাসাধিক কালের রাজনৈতিক যুদ্ধেও একাকী পরাস্ত করিতে পারিয়াছিলেন। মাংসাশী জীবগণ হজৎ বল দেখাইয়াই শান্ত হয় কিন্তু শস্যভােজী মনৰ এবং ঘাস খড় ভােজী গাে মহিষ দীর্ঘকাল পরিশ্রমেও ক্লান্ত হয় না। সামান্য শাক ভাতভােজী দস্যুর কিম্বা চাষার ও বলবীৰ্য যথেষ্ট দেখা যায়, অতএব বৃথা অখাদ্য কুখাদ্য খাইয়া বলবৃদ্ধির চেষ্টার জন্য পেটুক হইওনা হয়ত বিপরীত ফল রুগ্ন হইবে। অন্নভোজী চীন ও জাপান এখন দুর্বল নহে, ভাতের পিণ্ডই উহাদের যুদ্ধের প্রধান রসদ। 'ব্রহ্মচর্য পালনে এবং স্বত দুগ্ধ ও ডাল রুটি লুচী অধিক খাইবার চেষ্টা কর। মৈথনপ্রিয় বলিয়াই শূকর হংস কুককুট পারাবত প্রভৃতির মাংস বা ডিম্ব অত্যন্ত উগ্র এবং ছাগমাংসও শুক্রের বিশেষ উত্তেজক সুতরাং উহা সৰ্বজাতীয় ব্রহ্মচারী বা ব্রহ্মচারিণীর পক্ষে নিষিদ্ধ। নিরামিষ ভােজন স্নিগ্ধকর এবং মনের বল- পুষ্টিদায়ক এজন্য উহাই অবিবাহিতের পক্ষে হিতকর। মৎস্য অত্যন্ত কামবর্ধক ও সৰ্বভুক বলিয়া মােগজনক সেজন্য উহা অধিক মাত্রায় ভোজন অহিতকর। সদাচার বলিয়া যাহা হিন্দুধর্মে গণ্য তাহাই ব্ৰহ্মচর্যের জন্য প্রায় এদেশে অনুকুল। ভােজনান্তে স্নান বা অবগাহন নিষিদ্ধ স্নানের পূর্বে কোনরূপ আহারই অস্বাস্থ্য কর, অভুক্ত অবস্থায় স্নান ও উপাসনা কর্তব্য। দেড়প্রহর প্রায় দশ বা সাড়ে দশটা রাত্রির পরে মহানিশা
ব্রহ্মচারউপায়।
সকলেরই ভােজন নিষেধ। রাত্রি জাগরণ ও রাত্রিকালে
গুরুতর ভােজন ব্রহ্মচারীর নিষিদ্ধ। জিহ্বাকে কেবল সংযত
রাখিতে পারিলেই উপস্থ সংযত ' প্রায় সহজেই করা যায় এবং
শুক্র সুস্থির থাকিলেই ওজ ধাতু বর্ধিত হইয়া মনের বল ও
সদ্ভাব গুলি সতেজ পরিপুষ্ট ও বর্ধিত হয়, মনের বল থাকিলে
কোন বিষয়ে তােমার কোন প্রকার ভয়ের ও কারণ থাকে না
সুতরাং মনকেই বলিষ্ঠ ও বিশুদ্ধ কর।
“যাদৃশীভাবনা যস্য সিদ্ধির্ভবতি তাদৃশী।”
সাহস করিয়া উচ্চ কণ্ঠে এবং উচ্চ শিরেই বলা যায় যে,
যাহার যে বিষয়ের জন্যই হউক প্রকৃত ভাবে অর্থাৎ কায় মন
বাক্যে ভাবনা বা চেষ্টা হইবে তাহার সেই ঐকান্তিক ও বিশুদ্ধ
মনের বলেই সে কার্যে নিশ্চয়ই সিদ্ধি লাভ ঘটিবে। অতএব
ব্রহ্মচর্য রক্ষার চেষ্টা করিলেই তুমি তাহা রক্ষা করিতে পার
কারণ তােমার মন তােমারই হাতে তােমার মনকে তুমি
‘বশ না করিলে অন্যে আর কে করিতে পারিবে।
যে ভাবে
যে নিয়মে চলিলে তােমার চরিত্র রক্ষা হয় তাহার সম্পূর্ণ
ক্ষমতা তােমার নিজেরই হস্তে। একথা তুমি সর্বদা ভাবিবে
যে, তুমি কোন বিষয়ে দুর্বল নতু, ইন্দ্রিয় মনের অধীন কিন্তু
মন তােমার মনেরই অধীন।
মন এব সমর্থ: স্যাৎ মনসাে দৃঢ়নিগ্রহে।
অরাজা কঃ সমর্থঃ স্যাদ্রাজ্ঞো রাঘব নিগ্রহে।
যােগবাশিষ্ঠ।
মনকে দৃঢ়রূপে দমন করিতে একমাত্র মনই (ইচ্ছাই)
( ৪ )
*, মায়ের গু}; সমর্থ হইয়া থাকেন, রাজা না হইলে অরাজা কখন রাজাকে দমন করিতে সমর্থ হইতে পারেন না। মন দ্বারাই ইন্দ্রিয়কুলকে বশ করা যায়, ইন্দ্রিয় দ্বারা মন বশ হয় না। মন ইন্দ্রিয়কুলের শ্রেষ্ঠ, বুদ্ধি মন হইতে শ্রেষ্ঠ। আবার সকল ইন্দ্রিয়ের অধিপতি বলিয়াই ঈশ্বরের নাম হৃষীকেশ। উদ্ধৱেদাত্মনাত্মানং নাত্মান-মবসাদয়েৎ। আত্মৈব হাত্মননা বন্ধু-রাত্মৈব রিপুরাত্মনঃ। গীতা আত্মা (বা মন) দ্বারা আত্মার ( জীবাত্মার) উদ্ধার করিবে, আত্মাকে ( জীবাত্মাকে) কোন প্রকারে অবসাদ- গ্রস্ত করিবে না। আত্মাই (বা মনই) আত্মার বন্ধু এবং আত্মাই (বা মনই কাৰ্য গতিকে) আত্মার (জীবের) পরম মন ইন্দ্রিয় দ্বারা বিষয় সকল ভােগ করে, মনই নারীর রূপ দেখে বাক্যালাপ শুনে সুতরাং চক্ষু কর্ণাদি কেবল গবাক্ষ বা দ্বার স্বরূপ মাত্র। “ইন্দ্রিয়ানাং মনস্টাম্মি” এই গীতা বাক্যে মনকেও ঈশ্বর বলা হইয়াছে। প্রজ্জ্বলিত অঙ্গার ও অগ্নির প্রভেদ নাই, অর্থাৎ সবই তিনি। পূর্বোক্ত গীতা বাক্যে স্পষ্টই বলিতেছেন, মন দ্বারাই মনকে বশ করিতে হইবে, “কণ্টকেনৈব কন্টকং।” কাটা দ্বারাই কাটা তুলিতে হয় সুতরাং মনকেই সুগঠিত কর। সাত্ত্বিক আহার দ্বারা এবং উপবাস ও অভ্যাস যােগ এবং প্রাণায়ামাদি দ্বারা দেহস্থ বায়ুকে বশ প্রভৃতি কাৰ্য্য করিয়াও মনকে বলবান্ করিতে পারা যায় এবং মন বলিষ্ঠ হইয়া উঠিলেই বিবেক বা বুদ্ধি সতেজ হয় তখন ইন্দ্রিয় কুল সহজে মনের বশেই
ব্রহ্মচর্য উপায়।
চলিয়া থাকে, এই মনকেই সুগঠিত করিবার নানাকথা পূর্বেও
লিখিয়াছি এবং পরেও লিখিতেছি। কামের একটি নাম “মনসিজ”
অর্থাৎ মনই কামের জন্মস্থান ও বাসভবন। ঐ কামের আর
এক নাম “অনঙ্গ” যাহার এত প্রতাপ, তঁাহার অঙ্গ বা দেহই
নাই, দেহ থাকিলে নাজানি তিনি কি করিতেন। মনােময়
কোষের বা মনের পরেই বুদ্ধি বা বিজ্ঞানময় কোষ এবং এই
বুদ্ধির পরেই আত্মা।
আপ্তে-রামৃতেঃ কালং নয়েৎ বেদান্তচিন্তয়া
দদ্যান্নাবসরং কঞ্চিৎ কামাদীনাং মনাপি।
যাবৎকাল নিদ্রা না আসিবে এবং যাবৎ মৃত্যুকাল উপস্থিত
হইবে, তাবৎকাল সংসারিক চিন্তার মধ্যেও যথাসময়ে
বেদান্ত বা তত্ত্বচিন্তাসহ ভগবৎ চিন্তা ও উপাসনা করিবে।
ব্রহ্মচারী কামাদি চিন্তার কিছুমাত্র অবসর মনকে দিবে না।
সৰ্ব্বদা কাৰ্যে ব্যাপৃত থাকায় কৃষকেরা এবং দরিদ্র বিধবাগণ
অনায়াসে ব্রহ্মচর্য পালন করিতে পারেন কিন্তু পল্লীবাসী
নিষ্কর্মা বা বিলাসী: গৃহস্থ বা ধনীর ঘরেই যত অনাচার ও
উত্তেজনা ঘটে। কর্মবীর পাশ্চাত্য জাতিরা সর্বদা কর্মে লিপ্ত
থাকাতেই তাহারা অপেক্ষাকৃত জিতেন্দ্রিয় হয়েম।
সর্বদা কাৰ্যে ব্যাপৃত থাকিলে আর অন্য দিকে কুচিন্তায়
মন প্ৰধাবিত হইতে পারে না, বোধ হয় এজন্য কিছুকাল
পূৰ্বে এদেশে যাহাদের যখন কার্যের অবসর হইত তখন
তাঁহারা বসিয়া চরকা কাটিতেন, রাজরাণীও ঐরূপ কিছু কাৰ্য্য
কৰিলে, কেহই বসিয়া থাকিতেন না। ঐ চরকার কাৰ্য্যে
উখানের পথ। একদিকে বিশ্রাম লাভ এবং ঐ সঙ্গে বস্তু সমস্যারও সমাধান হইত, অপরদিকে শরীর ও মনের অবসর থাকিত না কারণ অন্য মনস্ক হইলেই সুতা কাটিয়া যায়, উহাতে দেহ মনের মৃদু মৃদু ব্যায়ামও সমাধান হইয়া যাইত। মহাত্মাগান্ধির এই চরকার আদেশটি পালন করা সকল নরনারীর পক্ষে এখন অধিক প্রয়ােজন। ৰন্ত্র সমস্যা মিটিলে শস্য বিক্রয়ের অধিক প্রয়ােজন হয় না, তন্তুবায়কে সুতা এবং কিছু মজুরী দিলেই বস্ত্র মিলিবে সেজন্য অন্ন ও বস্ত্ররূপ দুইটি প্রধান বস্তু স্বায়ত্ত সুলভ হইবে সুতরাং স্বল্পায়াসেই অন্ন বস্তু সমস্যা মিটিলে অভাব না থাকায় গবাদি পশু বিক্রয় করিবার আবশ্যক না হওয়ায় ঘৃত দুগ্ধাদি উত্তম খাদ্য সচ্ছল হইবে। অর্থের প্রয়ােজন বা অভাব না থাকিলে বা কম হইলেও মহাজনের নিকটে ঋণ করিতে হইবে না, তখন সকলে স্বাবলম্বী হইয়া সহজে ও স্বাভাবিক ভাবে দেশের মঙ্গল চিন্তা করিতে পারিবে এবং শাস্ত্র চিন্তা ও ঈশ্বর চিন্তায়ও মনঃসংযােগ করিতে পারিবে। জীবিকা সুস্থির থাকিলে পুষ্টিকর আহারে, সদাচারে ও ব্রহ্মচর্যে এবং দাম্পত্যপ্রেমে সংসারধর্ম সুস্থির ও শামিয় থাকিবে, তাহা হইলে ভারতীয় লােকে ধৰ্মার্থ কাম মােক্ষ চতুৰ্বর্গ সাধনায় উত্থানের পথে, ক্রমশঃ স্বরাজ লাভ করিবে। হীয়তে হি মতি ভাত হীনৈঃ সহ সমাগম । সমৈশ্চ সমতা-মেতি বিশিষ্টশ্চ বিশিষ্টতাং। বিষ্ণুশর্মা ... হে ভাত! তুমি যদি হীন লােকের সহিত সংসর্গ কর,তাহ
ব্রহ্মচর্য রক্ষার উপায়।
হইলে তােমার বুদ্ধি ও প্রবৃত্তি হীন হইয়া যাইবে। তুমি
তােমার তুল্য চরিত্র সহচরের সহিত বেড়াইলে তোমার ক্ষতি
বৃদ্ধি হইবেনা কিন্তু তুমি যদি বিশিষ্ট অর্থাৎ শান্ত সুশীল ধার্মিক
সহচরের সহিত বেড়াও বা বসবাস কর তাহা হইলে তােমার
মনের বৈশিষ্ট্য অর্থাৎ গুণ বৃদ্ধি ঘটিবে।
অতএব যুবকগণ তােমরা সর্বাগ্রে সৎসহচর নির্বাচন
করিয়া তাহারই সহিত ক্রীড়াদি করিবে, তােমরা 'উপযাচক
হইয়াও সৎলােকের সহিত আলাপ পরিচয় করিবে। তােমরা
স্মরণ করিয়া দেখ তুমি প্রথমে মন্দ ছিলেন কোন দুষ্ট কামুক
বয়ােজ্যষ্ঠ বালক তােমাকে কুপথে নানা কুকাৰ্য্য শিক্ষা দিয়াছে
সুতরাং ক্লাসফ্রেণ্ড হইলেও কুচরিত্রকে ত্যাগ করা তােমার
বিশেষ কৰ্তব্য। সংসৰ্গদোষ মহাদোষ এবং সংসর্গ গুণই মহা
মঙ্গলজনক জানিবে। অভিভাবকগণ সর্বাগ্রে সুমিতির জন্য
বালকের সৎসহচর সংযােগ করিয়া দিবেন।
দুর্জনেন সমং সখ্য-মপ্রীতিঞ্চ ন কায়েৎ।
উষ্ণো দহতি চাঙ্গারঃ শীতঃ কৃষ্ণায়তে করং।
গুণবান্ হইলেও দুর্জন দুশ্চরিত্র ব্যক্তির সহিত কখন
সখ্যতাও করিবেনা এবং অপ্রণয়ও করিবেন অর্থাৎ তাহার
সহিত কোনরূপ সংস্রব বা সংসর্গই করিবেনা কারণ যেমন
অঙ্গার গুণবৎ অগ্নি সংযুক্ত থাকিলেও তাহার স্পর্শে হস্ত দগ্ধ
হয় এবং শীতল (বা নির্ণ) কয়লা হইলে তাহার স্পর্শেও
হস্ত মলিন হয় সেজন্য বহু বিদ্যা বুদ্ধি থাকিলেও মণি ভূষিত
সর্পের ন্যায় দুষ্ট বা হীন চরিত্রের লােক সৰ্বথা পরিত্য।
৪২
উখানের পথ।
দুষ্টের সহিত প্রীতি বা অপ্রীতি কিম্বা পরিচয় থাকিলেও
সময় বিশেষে অকারণ তাহার নিজের বিপদে কিম্বা দুনামেও
তােমাকে বিজড়িত ও বিপন্ন করিয়া দিতে পারে।
কাচঃ কাঞ্চনসংসর্গাৎ যত্তে মারকত-দ্যুতিং।
তথা সৎসন্নিধানেন মূখে যাতি প্রবীণতাং।
কাঞ্চন সংসর্গে অর্থাৎ সুবর্ণের পাশে বা গাত্রে সংলগ্ন
থাকিলে যেমন সামান্য কাচ খণ্ডও মরকত মণির ন্যায় জ্যোতি
ধারণ করে সেই প্রকার সৎব্যক্তির সন্নিধানে থাকিলে মুর্থ
ব্যক্তিও প্রবীণতা বা বিজ্ঞতা লাভ করিয়া থাকে। অতএব
যুবকগণ তােমরা সচ্চরিত্র বয়স্ক বা সাধু ও প্রবীণ ব্যক্তির
নিকটে অধিক সময় বাস করিবে, তাহা হইলেই মনে সদিচ্ছা,
জন্মিবে, অভাবে অপ্রাপ্ত বয়স্ক ভাই ভগিনী বা প্রতিবাসী
বালকদিগকে ক্রীড়া শিক্ষা দিয়াও ক্রীড়া করিবে, ইহাই
আত্মরক্ষার সহজ উপায়। এ সকল কথা হিতােপদেশে দেখ।
সৎসঙ্গে বাসনাত্যাগােহধ্যাত্মবিদ্যা-বিচারণং।
প্রাণস্পন্দ-নিরােধ-শ্চেত্যুপায়শ্চেতসাে জয়ে।
সাধু বা ধার্মিক লােকের সঙ্গ লাভ অর্থাৎ সর্বদা সাধু বা
গুরুজনের নিকটে থাকিবে। কামনা বা বাসনাকে সঙ্কোচ,
করিবে। অধ্যাত্মবিদ্যা অর্থাৎ বেদান্তাদি শাস্ত্রের আলােচনা
করিবে। প্রাণবায়ুর আস্পন্দন অর্থাৎ কুম্ভকাদি যথাসম্ভব
অভ্যাস করিবে। চিওজয়ের জন্য এই চারিটি প্রধান উপায়
শাস্ত্রে নির্দেশ করিয়াছেন। বায়ুরােধ অভ্যাস দ্বারা অতীক
ব্রহ্মচর্য রক্ষার উপায়। ৪ চল মনও স্থির হয় এবং বহুতর রােগ বীজানু বিনষ্ট হয় এ সকল কথা বহু স্থানে বলিয়াছি এজন্য প্রাণায়ামই সন্ধ্যা পূজার প্রধান অঙ্গ। পিত্ত পঙ্গু ওফঃ পুঃ পঙ্গবােমল ধাতবঃ। বায়ুনা নীয়মানে তু তত্র অতি মেঘবৎ ॥ শুশ্রুত দেহস্থ পিত্ত শ্লেষ্ম মল মূত্র এবং রস হইতে শুক্ৰ পৰ্য্যন্ত ধাতু সকল ইহারা পঙ্গু অর্থাৎ জড় বা অচল, এই সকলকে পরিচালিত করিয়া থাকেন শরীরস্থ প্রাণাদি পঞ্চপ্রকার বায়ু। এই বায়ুর সাহায্যে মল মুত্র ও শুক্রাদি পরিচালিত এবং সময় মত নিহত হইয়া থাকে পুনশ্চ প্রাণায়াম ও যােগাদি ক্রিয়া দ্বারা বায়ুরােধেও যােগীগণ মল মূত্র ও শুক্রাদি দেহ মধ্যে দীর্ঘকাল ৰক্ষা করিতেও পারেন, সেজন্য প্রাণায়ামাদি অভ্যাস করা সকলেরই প্রয়ােজন। যাঁহাদের জিতেন্দ্রিয় হইবার ইচ্ছা প্রবল তাহারা প্রথম যৌবন হইতেই ব্রহ্মচর্য পালনের চেষ্টা করিবেন, কারণ প্রথম যৌবনের বেগ যেমন অধিক সেইরূপ ইন্দ্রিয়দমনের শক্তিও এই বয়সেই অধিক অর্জন এবং বৃদ্ধি করা যায়। যেমন বর্ষার পূর্বে উপযুক্ত বাঁধ দিলে অতি বৃষ্টিতেও বাণের জল রক্ষা করা যায় সেইরূপ প্রথমেই চেষ্টা প্রয়ােজন সেজন্য প্রথম বয়সে ৰচৰ্য্যামে বাস করা কর্তব্য। পূর্ণ যৌবনে ভােগের আতিশয্যে দেহ মন বিবশপ্রায় হইলে তখন স্ববশে রাখা দুঃসাধ্য। যােগী হইতে গেলেও প্রথম যৌবনেই চেষ্টা করিতে হয় কারণ শেষে দোয়ের হাঁড়ীতে ৪৪ উখানের পথ। পলােয়া বঁধিতে গেলে হাড়ী প্রায় ফাসিয়া যায়। যাহারা মনে করেন যৌবনে যথেচ্ছভাবে ভােগ করিয়া শেষে সাবধান হইয়া যােগ যাগ সাধনা করা যাইবে তাহাদের তাহা ভুল ধারণা, শক্তি সামর্থ্য থাকিতেই সৰ্ব্ববিষয়ে চেষ্টা কর, জল চলিয়া গেলে তখন বাঁধে ফল কি হইবে। বাণের জলের উচ্ছাসের ন্যায় প্রথম যৌবনের প্রবল কামবেগ প্রথমতঃ অসহ বােধ হইলেও বয়ােবৃদ্ধিতে ঐ বেগ স্বাভাবিক ভাবেই খর্ব হয় কিন্তু ক্রোধ ও লােভের বেগ যেন ক্রমে বাড়ে কারণ মনের স্ফুর্তি কমিতে থাকিলেই বিরক্তি ও আশক্তি বৃদ্ধি ঘটে। বালক কালের আনন্দ ভােগ বিক্ষিপ্তচিত্ত চিন্তামগ্ন বৃদ্ধের পক্ষে দুষ্প্রাপ্য। অন্য কথা, যেমন গঙ্গা প্রভৃতি মহানদীর জল স্রোতকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র খাল পথ দ্বারা পরিচালিত করিয়া উহার জলবেগকে খর্ব করা হইয়া থাকে সেই প্রকার চক্ষু কর্ণাদি সকল ইন্দ্রিয়ের ভােগ্য বিষয়ের জন্য প্রবৃত্তি স্রোতকে যথাযােগ্য সৎ বিষয়ে পরিচালিত করিতে পারিলেই মনােবেগ খৰ্ব্ব ও দমিত রাখা যায়, তােমার সদিচ্ছা আন্তরিক থাকিলে কোনকালে সদুপায়ের জন্য অভাব প্রায় ঘটে না। সর্বত্রৈব মনঃপ্রভু। এই দেহ যন্ত্রের যাহা কিছু কাৰ্য সেই সকল কর্মের মূলই হইতেছেন মন, মনকে ঠিক্ সুগঠিত করিতে পারিলেই ব্ৰহ্মচয্য পালন প্রভৃতি কাৰ্য্য কঠিন হয় না। আমরা এ পর্যন্ত মনস্তত্ত্ব যাহা বলিলাম তাহাতে বুঝাইয়াছি, মন কি পদার্থ এবং তাহার
ব্রহ্মচর্য্য রক্ষার উপায়।
উৎপত্তি ও কি উপায়ে উহাকে বিশুদ্ধ ভাবে সুগঠিত এবং
বলিষ্ঠ ও বশীভূত করা যায় এবং উহার ফলাফলও ক্রমশঃ
বলি।
এক্ষণে বাল্যকাল হইতে চক্ষু কর্ণাদি ইন্দ্রিয় গ্রাহ
সৎ বিষয় গুলিতে সদ্ভাবে মনঃপ্রবৃত্তি পরিচালনা করিবার সুপথ
যাহা আছে যথাজন তাহার আলােচনা করা যাইতেছে।
ছাত্রানা-মধ্যয়নং তপঃ।
ছাত্রদিগের অধ্যয়ন করাই পরম তপস্যা। অতএব ছাত্রগণ ,
যদি অধ্যয়নের জন্য ঐকান্তিক ভাবে স্বকীয় পাঠ্যের প্রতি
কিম্বা সৎপুস্তকের পাঠ্যের প্রতি মনােযােগী থাকেন, তাহা হইলেও
কুচিন্তার অবসর স্বল্প হইয়া যাইবে, দর্শন বিজ্ঞান বা ধর্ম গ্রন্থ
পাঠ বা সৎচিন্তায় মন পূর্ণ থাকিলে কুভাব কুচিন্তা নষ্ট হইয়া
যায় বা উহা মনে স্থানই পায়না।
অলসাে মন্দবুদ্ধিশ্চ সুখী চ ব্যাধিপীড়িত।
নিদ্রালু কামুকশ্চৈব ষড়ড়তে বিদ্যাবর্জিতাঃ ।
আলস্যস্বভাব, স্কুলবুদ্ধি, সুখভােগী, ব্যাধিপীড়িত, নিদ্রানুরক্ত
এবং কামুক ইত্যাদি দোষ মধ্যে দুই একটি দোষ থাকিলেও:
বিদ্যালাভ দুঃসাধ্য হয়।
আলস্য মদমােহৌচ চাপল্যং গােষ্ঠরেব চ।
স্তব্ধতা চাভিমানিত্বং তথাইত্যাগি-মেব চ।
এতে বৈ সপ্তদোষাঃ স্বঃ সদা বিদ্যানিং মতাঃ ।
. আলস্য,,
.. অহঙ্কার, মােহ, চঞ্চলস্বভার, বহুলােকস,
উত্থানের পথ। (ইয়ার্কি দিয়া বহু সময় নষ্ট করা ) ' মূখতা, অভিমান, তিতীক্ষাবিহীনত্ব, এই সাতটি ব্যাপারই বিদ্যার্থীর পক্ষে সৰ্ব্বদা দোষজনক। আজকাল সৎসঙ্গ বা সাধুসঙ্গ বড়ই সুদুলভ সেজন্য গ্রন্থ সঙ্গ করাই প্রয়ােজন। মহর্ষি বেদব্যাস বা বাল্মীকি প্রভৃতি মুনি ঋষিদের সহিত সাক্ষাৎ না হইলেও মহাভারত, রামায়ণ ও ভাগবত প্রভৃতি গ্রন্থ ভক্তি শ্রদ্ধা সহকারে পাঠ করিলেই তাহাদের সঙ্গলাভ ঘটিবার ন্যায় কাৰ্য্য হইবে। বনে পৰ্বতে পল্লীতে এই সৎগ্রন্থই সৎসঙ্গ পণ্ডিত বা সন্মার্গগামী- দিগের ইহাই প্রধান অবলম্বন। ধন মান যশ আদি সকলি নশ্বর। কবিতা ( পুস্তক ) অমর আর কবিরা ( গ্রন্থকারেরা ) অমর। নবীন সেন। সংযতেন্দ্রিয় বা ব্রহ্মচর্য ব্যতীত ধর্মতত্ত্ব বা কঠিন গ্রন্থের সদর্থ গুলি গ্রহণই করা যায় না সেজন্য সংকল্পিত পুরাণাদি পাঠে পাঠকাদির পক্ষে ব্রহ্মচর্য্য ও হবিষ্যাদির অনুষ্ঠান করিতে হয় এবং পাঠ্য গ্রন্থের প্রতি শ্রদ্ধা ভক্তি ও অনুরাগ বৃদ্ধির জন্য ঐ গ্রন্থ ও গ্রন্থকারের পূজা করিতে হয়। . '। কাব্য শাস্ত্র বিনােদেন কালো গচ্ছতি-ধীমং। ব্যাসনেন চ মূখানাং নিদ্রয়া কলহেন চ। কাব্য কিম্বা দর্শন, বিজ্ঞান ও ধৰ্ম্ম শাস্ত্রাদির আলােচনা করিয়াই পণ্ডিত বা বুদ্ধিমান্ লােকের সময় অতিবাহিত করিয়া থাকেন কিন্তু মুখ দিগের সময় অতিবাহিত হয় তাস, দাবা, পাশা বা অন্যান্য ক্রীড়াদি ও সনদ্বারা কিম্বা নিবদ্বারা ব্রহ্মচর্য পায়। অথবা পরনিন্দা পরচর্চা বা বৃথা কলহ করিয়া, “পঠতে নাস্তি মূখ ত্বং।” সর্বদা পঠনশীল ব্যক্তির মুখ তাই থাকে না। অতএব ছাত্রগণ বৃথা সময় নষ্ট করিও না, অবকাশ কালে স্কুল পাঠ্য পুস্তক ব্যতীত অন্যান্য সগ্রন্থ না পড়িলে পরে সাবকাশের অভাবে উহা পড়াই হইবে না। সৰ্ব্বং পরবশং দুঃখং সৰ্বমাত্মবশং সুখং। এতজজ্ঞেয়ং সমাসেন লক্ষণং সুখ দুঃখময়াঃ। পরবশ বা পরের সাহায্য প্রার্থী হইয়া যাহা কিছু কর্ম করা যায় তাহাই দুঃখজনক এবং যে কৰ্ম আত্মবশ বা স্বাবলম্বন অর্থাৎ যাহার জন্য পরের মুখাপেক্ষী হইতে হয় না তাহাই সুখ জনক, পণ্ডিতেরা সংক্ষেপে সুখ দুঃখের কেবল দুই প্রকার লক্ষণই দেখাইয়াছেন। প্রায় সর্ববিষয়ে বিদেশীর সাহাৰ্য্য লওয়ায় ভারতবাসীর অনন্ত দুঃখ বাড়িয়া এখন প্রায় অনেক বিষয় হাত ছাড়া হইয়াও গিয়াছে। ব্রহ্মচারীরা প্রথম বয়স হইতে যথাসাধ্য নিজের কাৰ্য নিজে করিতে চেষ্টা ও অভ্যাস করিবেন, সহজে কাহার নিকট হইতে কিছু সাহায্য চাহিবেন না বরং পরকে সাহায্য করিবেন। অভিমান শূন্য হইয়া নিজের কাপড়কাচা, জলতােলা, পাককরা, এমন কি বাসনমাজা, এবং কাটকাটা অভ্যাস থাকা ভাল, পূৰ্ব্বকার ছাত্রজীবনে অভ্যাস থাকায় ঐ সকল কার্যে তাহাদের কষ্ট বােধই হইত না, সকল কাৰ্য্য অভ্যাস ও জানা থাকিলে দুরবস্থায় বা বিদেশে কষ্ট হয় না। শুনিয়াছি, পাশ্চাত্যদেশের মধ্যবিত্ত গৃহস্থের ছেলেরা পিতা
৪
উক্ষানখ।
মাতার অধীন থাকিয়াও সাবকাশ সময়ে কল কারখানায়
কাৰ্য্য করিয়া স্বকীয় পকেট খরচ চালাইয়া কিছু সঞ্চয়ও করিয়া
থাকেন। এদেশের ছাত্রজীবনে ঐ ভাব না থাকায় শিক্ষিত
এবং প্রাপ্ত বয়স্ক হইয়াও তাহার আলস্যে ও অভিমানে (বা
পরের স্কন্ধে থাকিয়া) বেকার হইতেছেন। এদেশে পশ্চিমা ও
মাড়য়ারিব ছেলেরা ছেলেবেলায় খেলার হিসাবেও কাপড়
বা অন্যদ্রব্য ফিবি করিযা কেনা বেচা শিখে ও নিজের খরচা
চালায় এবং প্রবীণ বয়সে বড় ব্যবসাদার হয়। পূর্বকার
ছাত্রগণ গুরুর গরুচরান প্রভৃতি সকল কাৰ্য্যই করিতেন,
সেখানে ধনী দরিদ্রে পার্থক্য ছিল না।
বিলাসিতায় আঘাত লাগায়
লাগায় এবং সর্বপ্রকারে পরবশ
হওযায অভাববােধে এদেশের যে হাহাকাব এটি কাঙ্গালের
ঘােড়ারােগের ন্যায পাশ্চাত্য আদর্শেবই ফল। পাশ্চাত্যের
ন্যায় এখন চুলের ফ্যাসান, বহু জামা কাপড় ঘড়ী ছড়ী ও
গাড়ীর ফ্যাসানের চিন্তায় ব্যাকুল থাকা এবং ইলেকটী আলাে
পাখার ব্যতিক্রমে অস্থিবতা এ সকল কি স্বাধীনতা না অনর্থক
পরাধীনত। সুতবা ব্রহ্মচারী ছাত্রগণ ঐ সকল বিষয়ে সতর্ক
থাকিবেন। ব্রহ্মচারীর পক্ষে পরিচ্ছদে বা আহারে যেন কোন
আড়ম্বর বা বাধ্যবাধকতা না থাকে, যাহা সহজ লভ্য বা
জুটিবে তাহাতেই পবিতুষ্ট থাকিবে।
যৌবনের প্রারম্ভেই উপনয়ন সংস্কার
সংস্কার সময়ে এতেক
ব্ৰহ্মচাৰীকে একটি প্রতিজ্ঞা করান হয়,
“মা দিবা স্বপ্নী” অর্থাৎ গুরু বলেন, ব্রহ্মচারী তুমি
দিবানিদ্র। যাইও না, ব্রহ্মচারী বলিয়া থাকেন “বাঢ়ং” অর্থাৎ
ব্রহ্মচর্য রক্ষার উপায়। ৪১ আমি এই প্রতিজ্ঞা বহন বা পালন করি। ইহা দ্বারা সাধারণতঃ বুঝা যায়, যেকোন জাতীয় ব্রহ্মচারীর বা ব্ৰহ্ম- চারিণীর পক্ষে দিবানিদ্ৰা বড়ই অনিষ্টকারক সেজন্যই উহা বারণ করা হইয়াছে। যাহারা সমস্তদিন অবিশ্রান্ত পরিশ্রম করেন, রাত্রি একপ্রহর বা দেড় প্রহর উত্তীর্ণ হইলে তাহাদের শয্যা- গ্রহণ করিলেই সহজে নিদ্রাকর্ষণ হয় ও রাত্রি চতুর্থ প্রহরের মধ্য সময়ে প্রত্যুষেই তাহাদের নিদ্রা ভঙ্গ হওয়াও স্বাভাবিক ভাবে ঘটে, পশুপক্ষীরাও প্রায় এই নিয়মে বাধ্য কিন্তু যাহারা দিবানিদ্রা ভােগ করেন, তাঁহাদের রাত্রিকালে শীঘ্র নিদ্রা হয় না, নিদ্র। না হইলেই যত কুপ্রবৃত্তি মনে জাগিয়া উঠে অর্থাৎ রাত্রিকাল তামসিক এইকালে আলস্য নিদ্রা তন্দ্রা ভয় অবসাদ প্রভৃতি তামসিক ভাবে দেহ মন আচ্ছন্ন থাকে ঐ অবস্থায় নিদ্রা না হইলে কামের উদ্রেক হওয়াও স্বাভাবিক, সুতরাং এই সকল কারণে ব্রহ্মচারী নর নারীর পক্ষে দিবানিদ্রা সৰ্ব্বথা বারণ করা হইয়াছে। দিবানিদ্রার আতিশয্যে এবং কৰ্ম্ম না থাকায় পল্লীবাসীরা ব ধনীগণ কামসেৰা অধিক মাত্রায় করেন, সেজন্য দুৰ্বলতায় তঁাহারা ম্যালেরিয়াদি রােগাভিভূত হইয়া পড়েন কিন্তু ঐস্থানে থাকিয়াও সংযমী বিধবারা অপেক্ষাকৃত সুস্থ শরীরে থাকেন এবং বহু পরিশ্রম করেন। আজ কাল যেন ধনীর প্রধান লক্ষণ বেলায় নিদ্রাভঙ্গ অর্থাৎ যিনি যত অধিক বেলায় উঠেন তিনি যেন তত বড় ধনী, এইটি যেন তাহাদের ধনের গৌরবের নিদর্শন, কিন্তু এটি তাহাদের চরিত্রহীনতারও বিশেষ নিদর্শন বলিয়া বুঝিতে ( ৫ উ )
উখানের পথ।
হইবে। দিবানিদ্রা অকাল মৃত্যুরও কারণ একথার প্রমাণ
স্থানান্তরেও বলিয়াছি।
গান্ধারীদেবী শ্রীকৃষ্ণকে বলিয়াছিলেন যে, হে কৃষ্ণ! আমার
পুত্রেরা কখনও দিবানিদ্রা যাইতনা, রাত্রিকালে দধিভােজন
করিত না, গর্ভবতী স্ত্রীগমন কিম্বা রজম্বলা স্ত্রীকে স্পর্শও করিত
, তথাপি তাহারা অকালে মরিল কিজন্য ? এই বাক্যে
দিবানিদ্রা প্রভৃতি কাৰ্যগুলি যে অকাল মৃত্যুর কারণ তাহা
স্পষ্ট বুঝা যাইতেছে। যাহা হউক এখন ইংরাজের কল্যাণে
ছাত্র ও কেরাণী প্রভৃতির কাৰ্য্যগতিকে প্রায় দিবানিদ্রা বােধ
হইয়াছে সেজন্য কামসেবা এবং আলস্য সাধারণতঃ উহাদের
মধ্যে এবং পল্লীবাসী বেকারদিগের অপেক্ষা অনেক কমিয়াছে।
এটি এদেশের পক্ষে সাঁপে বরের মত এখন বিশেষ মঙ্গলজনক
দাঁড়াইয়াছে। রাত্রে শীঘ্র নিদ্রা উপস্থিত হইলেই কাম
প্রবৃত্তির বেগ কেন শোক মােহাদির প্রবল বেগও কেবল
ঐ নিদ্রা দ্বারাই শীঘ্র প্রশমিত হইয়া থাকে। দিবানিদ্রায়
রাত্রিকালের সুনিদ্রার বিঘ্ন ঘটে। ব্রহ্মচারী বা যােগীদিগের
পক্ষে প্রত্যহ চারি পাঁচ ঘণ্টা এবং ভােগী গৃহস্থের পক্ষে
ছয় সাত ঘণ্টার অধিক রাত্রে নিদ্রা যাওয়া অস্বাস্থ্যকর।
যুক্তাহার-বিহারস্য যুক্তচেষ্টস্য কর্মসু।
যুক্ত-স্বপ্লাববােধস্ত যােগাে ভবতি দুঃখহ। গীতা
সকলের পক্ষেই আহার বিহার নি। ও জাগরণ এবং
কার্যের চেষ্টা ও বিশ্রামচেষ্টা পরিমিত হওয়া প্রয়ােজন,
বিশেষতঃ যােগীগণের পক্ষে মিতাচারী হইলে যোগ দুঃখ বা
ব্রহ্মচর্য রক্ষার উপায়।
ক্লেশ নাশক হইয়া থাকে। অতএব অধিক নিদ্রাদি সকল
অনিষ্টেরই কারণ হয়।
জপ্যেনৈব তু সংসিকে ব্রাহ্মণাে না সংশয়ঃ ।
কুৰ্যাদব কুৰ্যাৎ মৈত্র ব্রাহ্মণ উচ্যতে।
ব্রাহ্মণাদি বর্ণাশ্রমী নর নারীগণ প্রত্যহ যাঁহার যাহা জপ্য
সেই গায়ত্রী বা ইষ্টমন্ত্রাদি একমনে জপ করিবেন সেজন্য অন্য
পঞ্চযজ্ঞ ও পূজাদি নিত্যকর্ম সম্যক অনুষ্ঠান না করিতে পারিলেও
তাদৃশ ক্ষতি হইবেনা। জপ দ্বারা দেহ মন স্থির ও পবিত্র
থাকিলে রােগ থাকেন বা জন্মেনা। যেমন অগ্নিস্ফুলিঙ্গে তুলা
রাশী ভষ্ম হয় সেইরূপ মন্ত্রশক্তিতে পাপরাশী দগ্ধ হইয়া চিত্ত
শুদ্ধি হয় নিষ্পাপীর সাক্ষাৎ সহায় ভগবান্ সেজন্য ব্রহ্মচর্য্য
পালনের সময়ই ভগবদ্ভক্তি শিক্ষা এবং জপাদি উপাসনা অভ্যাস
দ্বারা নিস্পাপী হওয়া কৰ্তব্য ইহাই ইন্দ্রিয় জয়ের প্রধান পথ।
মহাত্মা যবন হরিদাস কেবল নামজপে নিজের সর্বাঙ্গীন
উন্নতি ও যবনত্ব পরিহার এবং অতীব পতিতা বেশ্যাকে
মহামহান্তী সন্ন্যাসিনী করিয়াছিলেন। ত্রিসন্ধ্যা প্রাণায়াম ও
জপাদি দ্বারা প্রত্যহ কিছু কিছু সময় করিয়াও মনকে স্থির
রাখিতে পারিলে মনের শান্তি ও বল বাড়ে।
জ্ঞানাং পরতরং গানং গানৎ পরতরং নহি।
গানাৎ পরতরং জ্ঞানং জ্ঞানাৎ পরতরং নহি।
কোন কোন পণ্ডিতেরা বলেন জ্ঞান অপেক্ষাও গান শ্রেষ্ঠ
গান অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ কিছুই নাই। কেহবা গান হইতে জ্ঞানকে
শ্রেষ্ঠ বলেন। যাহা হউক জ্ঞান বহু সাধনা সাপেক্ষ এবং
উথানের পথ। । সাধারণ বুদ্ধির কতকাংশে অগােচরও বটে এবং সকল সময় ঐ চর্চা ভালও লাগেনা কিন্তু গানের সুরলয় প্রায় যে কোন সময় ভাল লাগে এবং উহাতে পশু পক্ষীরাও মুগ্ধ হয়েন, জ্ঞানপিপাসু লােকের সংখ্যাও নিতান্ত বিরল সেজন্য সকল নর নারী এবং জ্ঞানী মানবগণও প্রত্যহ সন্ধ্যার পরে, গীত বা বাদ্যের আলােচনায় যােগদান করিবেন, ইহাদ্বারা বালক বৃদ্ধ যুবা সকলেরই পরিতৃপ্তি সাধন হওয়ায় গায়ক ও শ্রোতা গণ কুচৰ্চ্চা ও কুচিন্তা ছাড়িয়া সঙ্গীতেই মুগ্ধ থাকিবেন। এই সঙ্গীত দেহতত্ত্ব বা পারমার্থিক কিম্বা দেশপ্রেম সম্বন্ধীয়, হওয়া প্রয়ােজন। টপ্পা বিরহাদি সংগীত ব্রহ্মচারী বা বালক বালিকার পক্ষে অশ্রাব্য, স্বদেশী সঙ্গীতে দেশপ্রেম জাগে, রাজপুতনার চারণদিগের গানে এক সময় এদেশে ইংরাজের রণবাদের ন্যায় বীরমদ জাগাইত। আজকাল সৎসঙ্গীত কীৰ্ত্তনের সহিত মহাত্মা চণ্ডীদাসের নাম দিয়া পরবর্তী সহজিয়া ভাবের লােকেরা কুভাবের গান ও কথা অর্থাৎ ভগবানের নামে অশ্লীল কথাবার্তা যােগ করিয়া সমাজের ক্ষতি করিতেছেন, উহা শ্রবণে সাধারণ কামাচ্ছন্ন, অজ্ঞ লােকের পক্ষে ভগবৎপ্রেমের পরিবর্তে অশ্লীল ভাব বা কাম- ভাবেরই উদ্রেক করা হয় * অথচ উহার নিগুঢ় তত্ত্ব ঐ কথার পরিবর্তে যাহা আছে তাহা বুঝাইবার ক্ষমতা অনেকেরই নাই। চণ্ডীদাসের পরবর্তী কালের সহজিয়া দলের কল্পিত -- কুঞ্জভঙ্গ পালায় শ্রীকৃষ্ণ চন্দ্রাবলীর কুঞ্জে রাত্রিবাস করায় ললাটে সীমন্তের সিন্দুর চিঃ গণ্ডে তাম্বুলরাগ ও কজ্জল চিঃ
ব্রহ্মচর্য রক্ষার উপায়।
কথাগুলি পুথিগত থাকাই উচিত, কামাচ্ছন্ন মানবের রুচির
জন্য ব্যবসায়ীদের দ্বারা এখন কামে ও প্রেমে খেচরা প্রস্তুত
করা অনুচিত এবং ইহা কখন শাস্ত্রীয়ও হইতে পারে না ।
নিম্নলিখিত প্রমাণে বুঝা যায়, মহাভাবময়ী
মহাপ্রেমময়ী ও চিন্ময়ীর সহিত চিন্ময়ের গুণময়
ভাবদেহের কাৰ্য্য বৃন্দাবন ব্যতীত অন্যত্র ঘটে নাই
বা ঘটান উচিতও নহে। ঐ ভাব লইয়া কর্তাভজা দলের
“মেয়ে হিজড়ে পুরুষ খােজা তবে হবে কর্তা ভজা।” এ সকল
এবং পীতবসনের পরিবর্তে পাছাপেড়ে নীলশাটী পরিধানের
বিষয় এরূপ ভাবের স্পষ্ট কথায় বাকি থাকিল কি? এ গুলি
পরতত্ত্বে প্ৰেতত্ব দাড়াইয়াছে।
+ যথা শরীরে দেহানি স্থূলং সূক্ষ্মঞ্চ কারণ।
তথৈবন্যৎ দেহং জ্ঞেয়ং ভাবদেহং প্রকীর্তিতং ।
কৃপাল-মিদং দেহং সহজং জন্ম জন্মনি।
অথবা সাধনালব্ধং কদাপি বা মহেশ্বরি।
ন সগুণং নির্ণম্বা দেহমিদং পরাত্মিকে।
কুত্রাপি ন হি দ্রষ্টব্যংলােকে বৃন্দাটবীং বিনা।
মৈথুনং সহ কৃষ্ণেণ গােপিকাচরিতঞ্চ যৎ।
তন্ন কামাদ-কামাদ্বা ভাবদেহেন তৎকৃতং |
রসােল্লাস তন্ত্রে পঞ্চমােল্লাস।
শ্রীচৈতন্য চরিতামৃতে বলিয়াছেন,
পরকীয়া ভাবে অতি রসের উল্লাস।
ব্রজ বিনা ইহার অন্যত্র নাহি বাস।
*
৫৪
উখানের পথ।
।
অতএব
কথা বা ভৈরবীচক্রের, বিকৃতার্থ পঞ্চমকারের কথা আমরা
বিপদের পথই বুঝি। প্রেমভক্তির পথই ভদ্রসমাজে গ্রাহ
আছে ও উহা থাকা উচিত। ইন্দ্রিয়াতীত ঈশ্বরে ও মানুষে
বহু প্রভেদ বুঝিতে হয়। যিনি কামজনক বা কামের বাবা
এবং মদনমােহন তিনি কখন কামের অধীন নহেন।
প্রাণায়াম অভ্যাস থাকিলে বায়ুরােধাদি জন্য নাভিমূল,
বক্ষ এবং কণ্ঠ নালীর বল বাড়ে ও মন সুস্থির হয় সেজন্য যােগী
হইলে "প্রকৃত গায়কও হওয়া যায় না। শ্রেষ্ঠ গায়ক
তাসেনের বা হরিদাস স্বামীর গুরু বৃন্দাবনবাসী প্রসিদ্ধ
যােগী ছিলেন। সৰ্ব্ববিধ চিত্ত বৃত্তি নিরােধ করাকেই যােগ
বলে 'যােগশ্চিত্ত বৃত্তি নিরােধঃ।” পাতঞ্জলী।
সর্বপ্রকার কামাদি চিত্তবৃত্তি রােধে সংযত ব্রহ্মচারী না হইলে
যােগী বা সুগায়কও হওয়া যায় না। আবার সংগীত সাধনা দ্বার
ব্রহ্মচর্য সাধনার সুযােগও হয়। সঙ্গীতজ্ঞ লােক দিগের বাঙমন:
ও কর্ণে রাগ রাগিণীর সুর এবং বাদ্যের সুর লহরী এবং তাললয়,
সর্বদা খেলিতে থাকে এবং তাঁহাদের মনও সৰ্ব্বদা প্রফুল্ল থাকে ।
মন একপথে বিশেষ আনন্দভােগ করিতে থাকিলে আর অবৈধ
মৈথুন বা রমণীপ্রসঙ্গের আনন্দ উপভােগ জন্য তাহার সেরূপ
ব্যাকুলতা বা কাম পিপাসা জাগিয়া উঠে না। সংগীতে মন
থাকিলে চিত্তবৃত্তি আপনিই নিরুদ্ধ থাকে সুতরাং সৎসঙ্গীত
সাধারণের পক্ষে সহজ ভাবেরই যােগ সাধনা।
কাব্যেন হন্যতে শাস্ত্রং কাব্যংগীতেন হন্যতে।
গীতঞ্চ স্ত্রীবিলাসেন স্ত্রীবিলা। বুভুক্ষয়।
ব্রহ্মচর্য রক্ষার উপায় ।
বেদাদি দার্শনিক বা ধৰ্ম্ম শাস্ত্রীয় রস বা অন্যান্য বিজ্ঞানাদি
শাস্ত্ররস সকল কাব্য রসের উদয়েই বিনষ্ট হয় কিন্তু সংগীত
রসের উদয় হইলে ঐ কাব্য রস বা কালিদাসের কবিতাদিও
ভালাে লাগে না, আবার যদি স্ত্রী বিলাসিতা বা কাম রসের
অভ্যুদয় হয় তাহাহইলে ঐ সঙ্গীত রসও বিলয়, হইয়া যায়
কিন্তু এই সমস্ত রসই বিনষ্ট হইয়া যায় যদি বুভুক্ষা বা
জঠরানল জ্বলিয়া উঠে সুতরাং কাম দমনের : প্রধান উপায়
উপবাস, বােধ হয় কামুক নর নারীর দমনের জন্য এদেশে
ক্রমশঃ দুর্ভিক্ষ দাঁড়াইয়াছে।
দিবারাত্র পরিশ্রম করিয়াও এখনকার অনেক লােক পেটের
ভাতের সংস্থান করিতে পারিতেছে না, ইহা কশাঘাত তুল্য
হইলেও একপক্ষে ভগবানের দয়াই মনে হয়। এখন পেটেরদায়েই
ক্রমশঃ লােকের ভােগ বিলাস কমিতেছে ও কমিবে, এইজন্য
অনেক যুবকের সময়ে বিবাহ করিবার সাহস নাই সুতরাং
গতিকে অনেকে ব্রহ্মচারী এবং পাত্ৰাভাবে কুমারীকুলও
ব্ৰহ্মচারিণী হইতেছেন। এক্ষণে সুশিক্ষা পাইলে, অনেকে
প্রকৃত বা খাঁটি ব্রহ্মচর্য পালন করিতে পারেন এবং তাহারাই
দেশের ও দশের হিত সাধন আদর্শরূপেও করিতে পারেন।
সেই সুযােগের আশায় আমরা ব্রহ্মচর্য, শিক্ষার এই সকল
পুস্তক লিখিতেছি ও লিখিয়াছি।
কামভােগের কাৰ্যটা এককার বাতিক বা মােহ ব্যতীত
কিছুই নহে, সৃষ্টিপ্রবাহ বা জীবের বংশ রক্ষার জন্যই ঐ
বাতিক বা মােহজনিত ভগবৎপ্রেরণা বা কৌশলমাত্র সুতরাং
সন্তানের জন্মদান ব্যতীত বৃথা মৈথুন অগ্রাহ্য বা প্রায়ই অনিষ্ট
উত্থানের পথ । :. কর বলা যায় কারণ মানুষ ব্যতীত পশু পক্ষী, কেহই প্রায় বৃথা মৈথুন করেনা, একথা স্থানান্তরে বলিয়াছি। মাতাল যেমন মদের অশেষ দোষ জানিয়াও তাহা পান করে ইহাও সেইকার একটী বাতিক বা নেশা মাত্র অথচ জ্ঞানী বলিয়া মানবের অহঙ্কারটি ছােট নহে; কামাচ্ছন্নেরা নিজের মত্ততা বুঝিলে অন্যকে মাতাল বলিনা। ব্রহ্মচারীগণ এই সকল কথা মনে মনে তর্ক বিচার করিলে কামস্পৃহা তাহাদের অনেক খর্ব থাকিবে। যে কোনরূপে ভুলাইয়া মনের প্রবৃত্তি, স্রোতকে অন্যদিকে ফিরাইবে। বসন্তে ভ্রমণং পথ্যং অথবা নিম্বভােজনং। অথবা যুবতী নারী অথবা বহিসেবনং। পণ্ডিতেরা বলিয়াছেন, বসন্তকালে কামজয়ের জন্য সকলের পক্ষেই মুক্ত বায়ুতে ভ্ৰমণ পথ্য অথবা নিম্বভেজন কিম্বা যুবতী নারী সম্ভোগ অথবা অগ্নি সেবা করিবে। বসন্তকালে কামের প্রভাব বৃদ্ধি হয় এজন্য বসন্তকালেরই কথা নচেৎ সৰ্বকালেই ঐ চারিটি কাৰ্য্য কামনাশক। যাহাদের পক্ষে অন্যব্যায়ামের সুবিধা হয় না তাহারা সাংসারিক কার্যের জন্যও প্রত্যহ যথাসম্ভব ভ্রমণই করিবেন, স্বাস্থ্য বা সংসারের জন্য ব্যতীত “ন ব্ৰজেন্নিস্ফলং কশ্চিৎ। বৌদ্ধনীতি।” বৃথা ( এবাড়ী ওবাড়ী) ভ্রমণ করিয়া সময় নষ্ট করিবেন না এবং কোন প্রকার কাৰ্য্য না করিয়া বসিয়া থাকিবে না, বসিলেই সৎপুস্তকাদি পাঠ বা সৎপ্রসঙ্গ আলােচনা করিবেন। নিশ্চিন্ত থাকিলে বা দুর্বলের পক্ষে তাস দাবা পাসা, খেলাও ভাল। যুবকদিগের প্রত্যহ ভ্রমণের ন্যায় সন্তরণ ও ব্যায়াম কর্তব্য।
ব্রহ্মচর্য রক্ষার উপায়। নিষ হরিতকী প্রভৃতি তিক্তরস মাত্রই কাম সঙ্কোচক। 'অগ্নির উত্তাপে রন্ধনাদি দ্বারা বত্নিসেবনে নারীদিগের বিশেষ উপকার হয় এবং সকলেরই বহিসেবায় সৰ্ব্বকালেই কামশান্তি, হয় এজন্য সন্ন্যাসীরাও ধুনী জালাইয়া বহু সময় বহিসেবন করেন। ববিৎ সূৰ্য্যকর সেবনে প্রত্যহ কিঞ্চিৎ ঘর্মাক্ত হইলে কাম দমন ব্যতীত বহু রােগের উপশম হয়। পূৰ্ব্বে এদেশে সর্ষপ তৈলাড্ৰদেহ করাইয়া শিশুদিগকে প্রত্যহ কিছুকাল রৌদ্রে রাখা হইত স্ত্রীলােকেরাও কেশ শুষ্ক করিবার জন্য রৌদ্রে থাকিতেন। এখন এই সকল গ্রাহ্য না করায় রােগের বৃদ্ধি ঘটিতেছে কিন্তু পােলা বাসীরা সৌর স্নান আরম্ভ করিয়াছেন। শীতাতপ ও বর্ষার জল ভােগেই চাষার দেহ অপেক্ষাকৃত সুস্থ। শরদ্রৌদ্রং ন গৃহীয়াৎ গৃহীয়ান্মার্গ পৌষয়াের। নেক্ষিতেদন্ত-মাদিত্যং নাস্তং যাতং কদাচন। শরৎকালের রৌদ্রসেবা অধিক করিবে না কিন্তু অগ্রহায়ণ পৌষ মাসের রৌদ্রভােগে কিঞ্চিৎ ঘৰ্ম্মোদগম হইলেই ভাল হয়। সূর্যের উদয়াস্ত সন্নিহিত সময়ের রৌদ্র অগ্রাহ্য এবং উদয় ও অস্ত সময়ে সূৰ্য্য দর্শন করিতেও নাই বােধ হয় চক্ষু রােগাদি জন্মিতে পারে। পূর্বোক্ত ব্ৰহ্মচর্যের মহাত্মা এবং অশেষ গুণাবলি শ্রবণেও যদি ব্ৰহ্মচর্যের প্রতি অনুরাগ না আইসে তবে তত্ত্বজ্ঞানের এবং মৃত্যুর আলােচনা করিবে, তাহাতেও চৈতন্য না আসিলে জপে বা কুটীর শিল্পাদি কাৰ্যে মনােভিনিবেশ করিবে এবং প্রত্যহ সংগীত রসের আলােচনা করিবে। গীত বাদেও ৫৮ উত্থানের পথ। মন সংলগ্ন না হইলে, কাম বিলাসে ঘৃণা উৎপাদক কথার আলােচনায় মনে বিরক্তি আনিবে, তাহাতেও বিরক্তি না আসিলে শারীরিক ব্যায়াম এবং গােসেবাদি ও ভ্ৰমণাদি দ্বারা অঙ্গ প্রতঙ্গ পরিচালনা করিবে এবং সূর্যতাপে ও অগ্নিতাপে দেহ ঘর্মাক্ত করিবে এবং আহার শুদ্ধি দ্বারাও মনে সাত্ত্বিক ভাব আনয়ন করিবে, ইহাতেও মনে কামােদ্রেক হইতে থাকিলে কঠোর উপবাস দ্বারা দেহ এবং মনকে শুষ্ক প্রায় করিলেই কামের নেশা কমিবে। ক্ষয়রােগী ব্যতীত কিম্বা রােগাদি জন্য অতি কৃশ দেহ ব্যতীত প্রত্যেক সুস্থদেহ যুবক যুবতীর বিশেষতঃ ব্রহ্মচারী ও ব্রহ্মচারিণীর পক্ষে উপবাস মধ্যে মধ্যে প্রয়োজন। উপবাস নিতান্ত অসাধ্য কাৰ্য্য নহে এখনকার রাজনৈতিকেরাও তাহ বিশেষ দেখাইয়া থাকেন। উপবাস মহাতপস্যা এবং বিশেষ প্রায়শ্চিত্ত, অখাদ্য ভােজনাদি দোষে উপবাসাদিই মহৌষধি এবং প্রায়শ্চিত্ত। উহাদ্বারা দেহের সঞ্চিত দুষ্টরস ক্ষয় হয় এবং রক্তবিশুদ্ধি ঘটে ও মনে সাত্ত্বিকভাব উদয়ে মনের শক্তি বাড়ে সেজন্য পাপ মল বিনষ্ট হয়। একাদশ্যাদিতে উপবাসে জঠরাগ্নি সতেজ হওয়ায় উহাতেই কলের প্লেগ ও ম্যালেরিয়া প্রভৃতি রােগের জীবানু বিনষ্ট বা ভয় হয় এবং প্রত্যহ ভােজনজন্য অপরিণত দুষিত ও সঞ্চিত ধাতু মল বিনষ্ট হওয়ায় রক্ত বাহিকা সুক্ষ্মানুসূক্ষ্ম শিরাপথের কার্যকারিতা শক্তি অক্ষুন্ন থাকায় বাত কিম্বা জ্বর বা ব্লক প্রসার প্রভৃতি রােগ জন্মিতে পারে না। দুর্জয় কাম রিপু দমনের পক্ষে উপবাসই মহৌষধি। যেমন অগ্নির, উত্তাপে দুগ্ধ গাঢ় ক্ষীরে পরিণত হয় সেইরূপ উপবাস ব্রহ্মচর্য রক্ষার উপায়। দ্বারা জৱাগ্নিসেকে রস রক্তাদি ধাতু সকল ক্রমশঃ পরিবর্তিত ও সংশােধিত হয় এবং শুক্রের গাঢ়তায় ধারণাশক্তির বৃদ্ধি ঘটে সেজন্য শুক্র (ক্ষীরবৎ) সারস্বরূপ ওজ ধাতুতে পরিণত হওয়ায় কামবৃত্তির পরিবর্তনে মানব ক্রমশঃ দেবত্ব বা মনুষ্যত্ব লাভ প্রবল ইন্দ্রিয় বেগ রােধ জন্য বিধবার ও ব্রহ্মচারীর পক্ষে নিরন্থ উপবাসই কর্তব্য। মহাত্মা বুদ্ধ ও মহম্মদ দীর্ঘ উপবাসেই মহাজ্ঞানী হয়েন। চন্দ্রের গতিতে জল স্থল ও মানবদেহ সৰ্বত্র রমবৃদ্ধির আরম্ভ হয় সেজন্য একাদশী তিথিই উপবাসে বিশেষ প্রশস্ত । দৈহিক দুষিত রসাদি ও মানসিক মল ও পঞ্চ দশদিন অন্তর বিনষ্ট করিতে পারিলে রােগ ভয় নিবারণ ও চিত্ত নিৰ্ম্মল থাকে এজন্য একাদশীর পূর্ণ উপবাসে অশক্ত পক্ষে এবং অমাবস্যা পূর্ণিমায় অম্নেতর যথাশক্তি লঘুপাক দ্রব্য ভােজন দ্বারা আহারের পরিবর্তন করিলেও আর জ্বরাদি রােগ যাতনা সহ উপবাস করিতে হয় না। উপবাসের আদ্যন্তে লঘু ভােজনাদি সৰ্বব্যবস্থা হিন্দু-সৎকৰ্ম্মমালা পঞ্চম ভাগে দ্রষ্টব্য । মধ্যে মধ্যে উপবাস দ্বারা দেহ মনের যখন অবস্থার ক্রমশঃ পরিবর্তন ঘটিবে তখন কামের একেবারে প্রায় বিপরীত ভাব অর্থাৎ প্রেম ভক্তির চর্চা বা তত্ত্বালােচনা করিলেই ক্রমশঃ প্রবৃত্তি স্রোত উজান (বা উচ্চ) পথে প্রধাবিত হইবে, তখন কামশত্রু শির বা মদনমােহনের শরণাপন্ন হইলেই আর তােমার পতনের আশঙ্কা থাকিবে না। মামেব যে প্রপদ্যন্তে মায়ামমতাং তরন্তি তে ।
উত্থানের পথ। ভগবান গীতায় স্পষ্ট বলিয়াছেন, যাহারা আমার শরণাপন্ন বা আশ্রয় লইবে তাহারা দুস্ত্যজ্য যে কামাদির মােহ বা সাংসারিক মায়া মমতা তাহা হইতে অনায়াসে উত্তীর্ণ হইতে পারিবে। প্রেম ভক্তির উদয় হইলে কাম ক্রোধাদি মাথায় স্থানই পায়। । পূর্বোক্ত কাৰ্য কাৰ্য্য গুলির মধ্যে যখন যেরূপ ভাবের কাৰ্য্যের সুবিধা বা প্রয়ােজন বােধ হইবে তখনই সেই প্রকার কার্যের অনুষ্ঠান করিবে। নির্জনবাসে নিৰ্ম্মে এবং আলস্যে বা নিশ্চিন্ত ভাবে সময় নষ্ট করাই বিশেষ দোষের কারণ। পূর্বে উচ্চ নীচ প্রবৃত্তির জন্ম স্থান মস্তিষ্কের কথা বলিয়াছি, উহার সাধারণ কথা যে, যাহার উদয়ে রক্তের গতি উচ্চাঙ্গে প্রধাবিত হয় তাহাকে উচ্চ প্রবৃত্তি এবং যাহার উদয়ে রক্তপ্রবাহ নিম্নাঙ্গে প্রবাহিত হয় তাহাকে নীচ প্রবৃত্তি বলে, নীচ (বা নীচু) প্রবৃত্তির লােককেই ছােট লােক বলে, ছােট লােকের সঙ্গ এজন্য নিষিদ্ধ। উপবাসে উর্ধাঙ্গেই রক্ত প্রবাহিত হয়। ইহা বুঝিয়া ব্রহ্মচারীগণ প্রবৃত্তি গুলি যথা প্রয়ােজন পরিচালনা করিবেন। বিষয়া বিনিবৰ্ত্তন্তে নিরাহারস্য দেহিন। রসবর্জং রসােহপ্য পরং দৃষ্ট। নিবৰ্ত্ততে। গীতা নিরাহারী দেহীর ইন্দ্রিয়ের বিষয় গুলি রস বা অনুরাগ বর্জিত হইয়া সাময়িক কিঞ্চিৎ নিবৃত্তি হয় অর্থাৎ প্রবৃত্তি স্তিমিত বা সুসুপ্ত ভাবেই থাকে, তাহার বিষয়াশক্তি একেবারে নিবৃত্তি হয় না কিন্তু পরমাত্মা দর্শনেই বাসনা গুলি কৰ্মসূত্রের বা কৰ্ম্ম বীজের সহিত নিবৃত্তি বা ধ্বংস হয়।
ব্রহ্মচর্য রক্ষার উপায়। ১ গান্ধিজীর ব্রহ্মচর্য পুস্তকে উক্ত শ্লোকের অর্থে তিনিও স্বীকার করিয়াছেন, “উপবাস সত্ত্বেও ইন্দ্রিয় পুনঃ পুনঃ ফিরিয়া আসে কিন্তু পরমপদার্থ ভগবানকে দেখিলেই বিষয় (বা কামাদির) বাসনা চলিয়া যায় । ইহা অক্ষরে অক্ষরে সত্য।* এই বাক্যে মামেব যে প্রপদ্যন্তে মায়ামমতা তরন্তি' তে। ভগবানের ঐ ভাবের কথাই গান্ধিজী স্পষ্ট স্বীকার করিলেও মুখ তা বশতঃ তঁাহার বহু উদ্ধত সবজান্তা গ্রাজুয়েট শিষ্যগণ ও গুরুবাক্য গ্রাহ না করিয়া সন্ধ্যাদি উপাসনা ত্যাগ করিয়া থাকেন অথচ গান্ধিজীকে, তাহারা ঋষি বা মহামানব বলিয়াই মনে করেন। মহাত্মা গান্ধিজীর ঈশ্বরে বিশেষ ভাবে বিশ্বাস থাকাতেই তিনি প্রত্যহই উপাসনা করেন এবং দীর্ঘ উপবাসে পুনঃ পুনঃ সমর্থ * যেমন প্রেরিত বৈদ্যুতিক শক্তিতে গৃহের আলাে জলে পাখা চলে সেই প্রকার সূৰ্য্যমণ্ডলের ভূর্গাখ্য তেজ বা বৈদ্যুতিক শক্তিতে উপাসকের হৃদয় আলােকিত হইয়া বিবেক বুদ্ধি মার্জিত হইতে থাকিলে ক্রমশঃ কামাদি ইন্দ্রিয়ের মােহতিমির বিনষ্ট হইয়া থাকে। ধিয়াে য়াে নঃ প্রচোদয়াৎ। ত্রিসন্ধ্যায় হৃদয় গৃহের বর্তিকা (সুইজ টিপ) প্রজ্বলিত কর। মুসলমান ভ্রাতারা ঐজন্য পাচ ওজনেমাজ করেন। দড়ির উপর দাড়াইয়া কিম্বা তারের উপর সাইকেল চালাইয়া যাঁহারা খেলা করেন তাহাদের মন যেমন নিজ পদতলেই নিবদ্ধ থাকে সেইপ্রকার ভগবানের পদতলে মন রাখিয়া এই ভবের খেলা খেলিতে অভ্যাস কর, ভগবানে মন থাকিলেই তােমর সকল প্রবৃত্তিই সর্বদা বশীভূত থাকিবে। ( ৬ উ ) উত্থানের পথ। হয়েন। ঐ পুস্তকের একস্থানে তিনি দুঃখ প্রকাশ করিয়া স্বীকার করিয়াছেন যে, “একটু সাবধানে সাধারণ ভাবে ব্রহ্মচর্য পালন করিয়া শেষজীবনে আমি যে শক্তি লাভ করিয়াছি, জানিনা প্রথম বয়স হইতে বিশেষ ভাবে কৌমার্য রক্ষা করিতে পারিলে আমার কত শক্তি লাভ ঘটিত।” অতএব ব্রহ্মচর্য্যের পথে *ও ঈশ্বরবিশ্বাসেই গান্ধিজী এবং জগতের কর্মগুরু ও ধর্ম- গুরুগণ যখন বিশেষ শ্রেষ্ঠতা লাভ করিয়াছেন তখন ঐ দুই পথই শ্রেষ্ঠ পথ। ব্ৰহ্মচর্য্যে, ঈশ্বরবিশ্বাসে, নিরালস্যে ও খাদ্য- বিচারে এবং দেশপ্রেমে আজীবন দেশে বিদেশে বহুবার কারাবরণ স্বীকার করিয়াও যিনি নানা উপায়ে স্বদেশবাসীর দুঃখ নিবারণ ও মুক্তির চেষ্টা করেন ভারতবন্ধু সেই মহাত্মার ধর্ম মত যাহাই থাকুক গোঁড়ামী করিয়া তাহার নিন্দা করা কর্তব্য নহে। তুমি আত্মধৰ্ম্ম এবং সদাচার রক্ষা করিয়া চল ও গুণগ্রাহী হও; ভ্রান্তি বা দোষগুণ সকলেরই আছে। মহতের আভ্যন্তরীণ উদ্দেশ্য নিশ্চয়ই মহান্ হইয়া থাকে। ব্রহ্মচর্যে ত্রিগুণের কথা। যেন যেন হি ভাবেন য যানং প্রযচ্ছতি। তেন তেন হি ভাবেন আগ্নেতি প্রতিপূজিত। মনুঃ যেন যেন হি ভাবেন সাত্ত্বিক রাজস তামসাতমেন, তেন তেন হি ভাবেন দেব মানুষ পণ্ডভাবেন। উদ্বাহতত্ত্বঃ। উক্ত মনুবচনের অর্থে কন্যাদান প্রকরণে পূজ্যপাদ রঘুনন্দনের ব্যাখ্যায় সাত্ত্বিকভার দেবভাব, রাজসভাব মনুষ্যভাব এবং তামসভাব পশুভাব বুঝা যায়। আমরা উচ্ছখলবাদীদিগকে lic ব্রহ্মচর্য রক্ষার উপায়। সর্বকাৰ্যেই বলিতেছি যে, তােমরা দেবতা না হইতে পার তবে রজোগুণাশ্রয়ে তেজস্বী ও সত্যনিষ্ঠ মানুষের মত নরশ্রেষ্ঠ মানুষ হও; পশু হইবে কেন ; হিন্দু শাস্ত্রের যাহা কিছু বিধি বিধান তাহা প্রায় তমােগুণাশ্রিত ঐ পশুত্ব নিবারণের জন্য কিন্তু বর্তমানকালে দেখিতেছি যে, মুগ্ধতায় এবং শাস্ত্র কথা না শুনিয়া ও অনাচারে আমরা পশুরও অধম হইতেছি। স্থানারে বলিয়াছি, পশুরাই স্বাভাবিক ব্রহ্মচারী সেজন্য তাহাদের কুডেমী বা নেদাড়ে অবসন্ন ভাব প্রায় নাই, তাহারা দীর্ঘোদরের জন্য আহারান্বেষণে যথেষ্ট পরিশ্রম ও ভ্রমণ করে এবং শূরত্ব বীরত্ব ও বিপদে একতা আমাদের অপেক্ষা এখন তাহাদেরই স্বাভাবিক অনেক অধিক দেখা যায়। উক্ত মনুবচনের অর্থ হইতেছে, দাতা সাত্বিকাদি ভাবের যেমন যেমন ভাবে দানাদি কাৰ্য্য করিবেন, তাহার প্রতিদানে বা ফলে তিনি দেব মনুষ্য বা পশুভাব ইহ পরকালেও প্রাপ্ত হইবেন অর্থাৎ মানব যে ভাবের কৰ্ম্ম করিবেন তিনি সেইরূপই গুণকর্মের ফলভােগ করিবেন। অব্যক্তাদীনি ভূতানি ব্যক্ত-মধ্যানি ভারত। গীতা বলেন, জগতের বা জীবজগতের আদ্যন্ত প্রায় সমস্তই অব্যক্ত ভাব কেবল মধ্যভাগই ব্যক্ত বা সুপ্রকাশিত ভাব, ইহাই রাজসিক বা মধ্যভাব। সত্ত্বগুণ কেবল আনন্দময় সুশান্ত কিম্বা সুচঞ্চল বাল্যভাবের ন্যায়, ইহা মুমুক্ষু মানবেরই প্রার্থনীয় কিন্তু সুখ দুঃখ বিমিশ্রিত রাজসিক বা যৌবনভাবই
.উনের পূখ।
ভােগী সুংসারীজীরের প্রার্থনীয় কারণ রজোগুণেই কি
সৌন্দৰ্য্য মাধুৰ্য যাহা কিছু লােভনীয় বস্তু বা বর্তমান দৃশ্য।
রামকৃষ্ণদেব বলিয়াছিলেন, খাদ (ভেজাল) না থাকিতে
গঠনই হয় না, অংটি সােনা বা রূপায় গঠন করা যায় না
সুতরাং ত্রিগুণাতি না হইলে, আমাদের মানব জন্মই হইত না।
জোরাগাত্মকং বিদ্ধি তৃষ্ণা সঙ্গসমুদ্ভব।” অনুয়াগাত্মক
জোগুণেই কামনা বাসনা উদ্যম উৎসাহ তেজ দম্ভ ও শূরত্ব বা
বীরত্ব জন্মে।.. ৯৪ শ অঃ গীতা দ্রষ্টব্য। . ,, !
আমরা এখন, সত্ত্বগুণপ্রধান: রজোগুণ, বা মনুষ্যত্বকেই
জাগাইতে বলিতেছি। : গান্ধিজী; প্রমুখ শ্রেষ্ঠ নেতাদেক
অহিংসা মূলক স্বরাজের নামে যাহারা তমঃপ্রধান অতিনিই
হিংসার পথে গুপ্তহত্যা বা পরধন লুণ্ঠনাদি করে তাহারা
পর্বতে লােষ্ট্র নিক্ষেপের ন্যায় কেবল যে বৃথা রাজদ্রোহী তাহা
নহে, তাহারা দেশের সর্ববিধ উন্নতিনাশক বা দেশদ্রোহী দশ
সুতরাং দেশের পরমশ, দস্যকে কখন কোনদেশে কেহ'শর
বীর বলে না। তরুণগণ ঐ '
দদিগের সংশ্রব ত্যাগ করিবে।
যাহারা শিক্ষাদানে চক্ষু ফুটাইয়া স্বাবলম্বনের পথ দেখাইয়াছেন,
জগতের মধ্যে শ্রেষ্ঠ সুসভ্য সেই ইংরাজ জাতির অধীনে থাকিয়া,
অগ্রে সুশিক্ষার ও কৃষী শিল্প বাণিজ্যের উন্নতি কর; অনর্থক
রাজরােষে ক্ষতিগ্রস্ত হও কেন? তােমরা বুদ্ধিমান হইয়াও ভাটিয়া
মেড়য়া এ উড়িয়ার সহিত ব্যবসায়ক্ষেত্রে প্রতিয়ােগিতায়
পরাস্ত হইতেছ, অগ্রে তাহার প্রতি বিধান কর। **
জাপান সর্বাগ্রে, শিল্প বাণিজ্যের ? পথেই উন্নতি
করিয়া পরে, এখন ক্ষাত্রশক্তি দেখাইতেছেন। অতএব বিল্লা
G ব্রহ্মচর্য রক্ষার উপায়। ছাড়িয়া-অগ্রে শিল্প বাণিজ্যে ও স্বদেশী দ্রব্য ব্যবহারে স্বদেশের ধনবল বৃদ্ধি কর ; তাহা হইলে ক্রমশঃ একস্বার্থে হিন্দু মুসলমানের গৃহবিবাদ ঘুচিবে, ইহাই এখন প্রকৃত স্বরাজ সাধনা। মেরা কেবল সাত্ত্বিক দোহাই দেওয়া কুডেমীটি ছাড়িলেই সব পাইবে। পরাধীন বলিয়া আমাদের উন্নতির পথ প্রায় অনেক বিষয়ে অবরুদ্ধ বটে কিন্তু ব্রহ্মচর্য্যর পথ অবলম্বনে কোন বাধা নাই সেজন্য. এই ব্রহ্মচর্যের পথেও. বিনা বাধায় আমরা সর্ব বিষয়েই উন্নতি লাভ করিতে পারি। নিদ্রালস্য অবসাদ ভ্ৰম প্ৰমাদ দীর্ঘসূত্রতা ও দ্বেষ হিংসা অনৈক্যতা এবং শঠতা প্রভৃতি যাহা কিছু জঘন্য বা হীনতা উহা পৈত্রিক বা আত্মকৃত ব্রহ্মচর্য হানির জন্য প্রায় তমােণ্ডুণেরই ফল। পূর্ণাহারেই শক্তি বৃদ্ধিতে এবং অপেক্ষাকৃত ব্রহ্মচর্যে পাশ্চাত্য জাতি এখন বড়, ঐ ভাবে আমাদেরও দেহ মন সতেজ বা বলিষ্ঠ হইলেই এই নিদ্রালস্যাদি তামসিক জড়ভাব বা দোষ ক্রমশঃ বিনষ্ট হইয়া যাইবে। ব্রহ্মচারীর মৃত্যুভয়ও থাকে না। মৃত্যুকাল আসন্নবােধ হইলে তখন কাম বা কোন বিলাস ভাবই মনে উদয় হয় না, যাহারা খােদ্ধা বা, সৈনিক সেনানিবাসের আইন অনুসারে তাঁহাদের বিশেষভাবেই ব্রহ্মচারী ও সাহসী হইয়া থাকিতে হয়। শান্তির 'বেলা কিছু নিয়ম ঘটিলেও যুদ্ধের কালে দেহ ও মাথার বল (প্রাণের দায়েও) স্বেচ্ছায় অক্ষুন্ন রাখিতে হয় সেজন্য একাগ্রচিত্ত তেজস্বী যােদ্ধারা ..:সম্মুখসমরে কদলিবৃক্ষের ":.ায় মানুষ' রিয়া ভূপতিত হইতেছে দেখিয়া এবং নিজের ",: '; অসত্যুবুঝিয়াও' অকুতােভয়ে অগ্রসর হইয়া থাকেন, ইহা কেবল ব্ৰহ্মচর্যেরই প্রভাব।' ক্ষীণবীৰ্য্য ভােগী মানুষ ঐ সুযােগে উত্থানের পথ। যুদ্ধক্ষেত্র দেখিলেও ভয়ে মূচ্ছ। যাইবেন। সৈন্যগণ সংযমের অবস্থায় চিরাভ্যস্ত মদ্য মাংসাদি পরিমিত খাওয়ায় তাঁহাদের অবিশুদ্ধ রাজসিক ও তামসিক শক্তির উৎকর্ষ ঘটিয়া যুদ্ধকালের প্রয়ােজনীয় ক্রোধ হিংসা তেজ দম্ভ ও নিষ্ঠুরতা বৃত্তি প্রবল হইয়া উঠে, যুদ্ধকালে সাত্বিক বিবেক বা তামসিক অবস (নেদাড়ে) ভাব উপস্থিত হইলেই মরণ ঘটে। ভগবদিচ্ছায় এখন দেশের যুবকেরা রাজনৈতিক অপরাধে অনেকে কারাগারে কম্বল শয্যায় ও যৎসামান্য ডাউলের যু ও চৌদ্দশাকাদি ভােজনে এবং সর্ববিধ ভােগ বিলাস ও নারী প্রসঙ্গ বা নারীমুখ দর্শনাদি বর্জিত হওয়ায় তাঁহাদের পক্ষে সদ্য ব্রহ্মচারী হইবার কতকটা সুযােগ ঘটিয়াছে। নির্জন গৃহে উপাসনার পথে ব্ৰহ্মানন্দ ভােগ করিলে কারাক্লেশ শান্তি ও সবুদ্ধি জন্মিতে পারে। যত ছিল উলুবুনে সব হল কীৰ্ত্তনে। হজুকে পড়িয়া দেশের অনেক আলসে বকাটে ছেলেদেরও কাৰ্য্যগতিকে আলস্য কাটিয়া কতকটা রজোগুণ জাগিয়াছে। তাহারা এখন অহিংসার পথে সদাচারে থাকিয়া দেশের স্বাস্থ্য- বিধানে এবং কৃষি বাণিজ্য ও কুটীর শিল্পে মনোেযােগ করিলেই • প্রকৃত পক্ষে দেশের কল্যাণ হইবে। শিক্ষাবিস্তারে এবং ধর্মচর্চা ও উপাসনার পথে চলিলে তাহাদের সত্ত্বগুণও জাগিতে পারে। “অভয়ং সত্বসংশুদ্ধিঃ”—মানবের সত্ত্বগুণ শুদ্ধি হইলে অভয় বা সৎসাহস ও সংবুদ্ধি প্রভৃতি গুণ জন্মে অর্থাৎ অসংগত তেজ বা গােয়ারতুমি ভাৰ ৰা দুষ্টবুদ্ধি বিনষ্ট হয়। ।।
ব্রহ্মচর্য রক্ষার উপায়। ون ব্রহ্মচর্যে শুক্র স্থির হইলেই বায়ু স্থির হইয়া মন সুস্থির হওয়ায় ভাবতঃ সুবুদ্ধিরই উদয় হয়। প্রাণায়ামাদি যােগাঙ্গ: কৰ্শ বিশেষ দ্বারাও মনঃস্থির করা যায় । সামান্য শুক্রক্ষয়ে মনের অন্যমনস্কতা এবং অস্থিরতা বুঝা যায় সেজন্য অধিক শুক্রক্ষয়ে অনেককে ক্ষিপ্তপ্রায় কিম্বা খিট খিটে বা স্পষ্ট উন্মাদ ও স্তম্ভিত ভাবও দেখা গিয়া থাকে। স্বজনদোষে পক্ষাঘাত এবং কুষ্ঠাদি হইতেও দেখিয়াছি। দেশকাল পাত্র বিশেষেই শীঘ্ৰ ৰা বিলম্বে মানবের ইষ্টানিষ্ট ঘটে। ব্রহ্মচারীর নিত্যক । প্রত্যহ কিছু সময় শ্রীগীতাও চণ্ডী প্রভৃতি স্তব এবং প্রার্থনা সূচক সংপুস্তক পাঠ করা কর্তব্য। সুচরিত্র শিক্ষকেরা বালকের চরিত্র সম্বন্ধে গােপনে অনুসন্ধান রাখিবেন। শিক্ষিত হইলেও বেশ্যাপ্ৰায় বা কুচরিত্র মহিলাদ্বারা বালিকাদিগের শিক্ষা দেওয়াই উচিত কারণ (তাড়িদ্বিনিময়ে ) শিক্ষকের আদর্শ ও স্বভাব ছাত্রে শীঘ্র সংক্রমিত হয়। আট দশ বৎসরের পরেই পুত্র কন্যাকে পিতা মাতার গৃহ হইতে অন্যত্র পৃথক গৃকে শয়নের * ছােট নাগপুর। পুপুকী অযাচক ব্রহ্মচর্যাশ্রমের অধ্যক্ষ স্বামী স্বরূপানন্দজী মহাশয় বালকদিগকে ব্ৰহ্মচৰ্য্যসম্বন্ধে যােগশিক্ষা দিয়া থাকেন। “বায়ােরপ্লিঃ” অগ্নির আশ্রয় বায়ু সেজন্য বায়ু বলিয়া কামাদিকে বাতিক বলা যায় সুতরাং বায়ুকে বশ করিতে পারিলেই কাম ক্রোধ এবং জঠরাগ্নির বেগ বা উত্তাপও শতা রাখা সহজ হয়। এসকল বিষয় সাধন গম্য। { } ৬ উখানের পথ । ব্যবস্থা করা উচিত এবং কু আদর্শ, কুসঙ্গ ও কুপুস্তক পাঠ হইতে ছাত্র এবং ছাত্রীকে রক্ষা করা কর্তব্য। বালক বালিকাকে 'অনিয়ম বা যথেচ্ছভাবে কিম্বা নানা প্রকারের খাদ্য বা সুস্বাদু মিষ্টান্নাদি অধিক বা বারম্বার খাওয়াইয়া পেষ্টক করিবে না। পােষাক পরিচ্ছদের বাহুল্য বা কোন প্রকার বিলাসিতারও প্রশ্রয় দিবে না, হ্যাট কোট বুটজুতা পরাইলে সাহেবী মেজাজ হয়। খদ্দর পরিলে স্বদেশ- প্রেম বাডে, গৈরিকে ঔদাসিন্য এবং নামাবলিতে হরিপ্রেম ও লুঙ্গীতে যা বনিক ভাব বৃদ্ধি হয়। ছােট বড় চুল কাটা দাস মনােভাবেব পরিচায়ক কিন্তু পরিষ্কার পরিচ্ছন্নত। ও পবিত্রতা প্রযােজন। ইংরাজি ভাষায় পাশ্চাত্যভাব, ফারসিতে যাবনিকভাব এবং বৈদিক ভাষায় আৰ্যভাব জাগে, ঐ ভাষা বা মন্ত্রশক্তিতে অসাধ্য সাধন করা যায়, সাপের মন্ত্রের অপাষায়ও ফল দেখিয়াছি। খাদ্য বিশেষও প্রবৃত্তির দোয: গুণ ঘটে। ক্রীড়াচ্ছলেও ব্যায়াম এবং দেহের বলবৃদ্ধির প্রতিই বালককে অনুরাগী করাইবে। সুৰ্যোদয়ের অন্যূন দেড় ঘণ্টা পূর্বে প্রত্যুষে উঠা এবং শৌচ, ও দস্তাবনাদি বালক কাল হইতেই অভ্যাস জন্য বিশেষ চেষ্টা করিতে হইবে, আজীবন কেবল এই প্রত্যুষে উঠার গুণেই প্রায় সৰ্ব্বকাৰ্য্যে সিদ্ধি লাভ করা যায় । শাস্ত্রে প্রতিষ্টানের অশেষ গুণকীর্তন করিয়াছেন। আমি নিজে বৃদ্ধবয়সে ' প্রানের মহিমায় মুগ্ধ হইয়াছি। শীতকালেই অধিক উপকার পাইতেছি। তুলা করাজৈষুে'প্রাঙামং বিধীয়তে। হবিষ্যং ব্রহ্মচঞ্চ হাপাক নাশনং স্মৃতি । ক ব্রহ্মচর্য রক্ষার উপায়। বার মাস না পারিলেও কার্তিক মাঘ ও বৈশাখে প্রাতঃস্মান, বিষয় এবং ব্রহ্মচর্য পালনে মহাপাতকাদি পাপ বিনষ্ট হয়, ইহা বিশেষ স্বাস্থ্যকর। প্রাতঃস্নানে সংযমশক্তি বৃদ্ধি ও সাত্ত্বিক ভাব উদয় হয়, ইহাতে দেহের জড়তা ও আলস্য তৎক্ষণাৎ বিনষ্ট করে এবং মাথা শীতল ও পরিষ্কার হয়। যে কোনরূপে শুক্রক্ষয়ে প্রাতঃগানই বিশােধন। গ্রীষ্মকালে বৈশাখ মাসই শ্রাতান অভ্যাসের প্রশস্তও প্রাথমিক সময়। “নিত্যং ত্ৰিসবনং স্নায়াৎ।” ব্রহ্মচারী যুবা বা সন্নাসীগণ নিত্য ত্রিসন্ধ্যা স্নান করিবেন। মধ্যাহ্বে তৈল মাখিয়া, স্নানই উপকারী হয়, সার্ষপ ও ফুলেল তৈল নিষিদ্ধ দিনেও ব্যবহাৰ্য। প্রাতঃস্নানে তৈল মদ্য তুল্য বলিয়া নিষিদ্ধ, ঐ সময়, তৈলক্ষণে বাত, ও উদরী রােগ হইতে দেখিয়াছি। অপরাহু স্নানে শিয়ােমজ্জন (ডুব দেওয়া ) নিষেধ, এই আপরাকি স্নান ভােগী গৃহস্থের পক্ষে প্রায়ই সহ হয় না সুতরাং উহা 'গ্রীষ্মকাল ব্যতীত না করাই উচিত। প্রসিদ্ধ ম্যালেরিয়া স্থান যশাের জেলা, তন্মধ্যে ভােগীল হাটের, ভৈরব নদের পাটপচা জলে প্রাতঃস্নান করিয়াও প্রায় যষ্টিবর্ষীয় বনু মুখোপাধ্যায় বংশীয় একব্যক্তি আমাকে বলিলেন তাঁহার আটদশ বৎসর অন্তর কখন , দুই একদিন জ্বর হয় এতদানকারী তাঁহাদের দুই ভ্রাতারই দেহ' অতি কৃশ ৪ উক্ত ব্যক্তি, লিলেন, 'ঐদেশে যাহা প্রাতঃরাম করেন। আঁহাদের মধ্যে অনেক নরনারীর প্রায় কাহারই: বড় ম্যালেরিয়া : হয় না। ঐ ব্যক্তি, দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী পুত্র লইয়াই বাস করে উখানের পথ। সুতরাং ব্রহ্মচারীও নহেন। খুলনায় পুরণীতে বারমাস প্রাতঃস্নান করিয়াও সুস্থ শরীরে থাকিতে আমার এক উকীল আত্মীয়কে দেখিয়াছি। বৃদ্ধবয়সে নিজের ব্যবহারে এবং শাস্ত্রের অনুরােধের ন্যায় নানা বচনাবলি দেখিয়া আমার দৃঢ় বিশ্বাস যথাসময়ে প্রাতঃমন ম্যালেরিয়া নাশক এবং বহু রােগােৎপত্তি নিবারক। অনুদয়ে উত্থান ও প্রাতঃন এবং ঐ কালের বিশুদ্ধ বিমল মুক্ত বায়ুতে প্রাণায়াম দ্বারা বহু রােগেৎ- পত্তি নিবারণ ও রোেগ বিনাশ ঘটে এবং আলস্য ও জড়তা তৎক্ষণাৎ বিনষ্ট হয়, পুনশ্চ সর্বত্র আলস্য হীনেরই উদযােগ ও উৎসাহ ক্রমশঃ বাড়ে। উদযােগিনং পুরুষসিংহ-মুপৈতি লক্ষীং। লক্ষ্মী উদ্যোগী পুরুষকেই আশ্রয় করেন। আলস্যং যদি ন ভবেগত্যনর্থং। কোন সাহু-ধনকো বহুতো বা। আলাদিয়-মবনিঃ সাগরাস্তা। সম্পূর্ণ। নরপশুভিশ্চ নিধনৈশ্চ। পণ্ডিতেরা বলেন, মানবের সৰ্ব্ব অনর্থের মূলই হইতেছে কেবল আলস্য, ঐ আলস্য যদি না থাকিত তাহা হইলে কোন ব্যক্তি বহু বিত্তশালী বা অনেক বিদ্যালাভ এবং সুচরিত্রতা লাভ না. করিতে পারিত। আসমুদ্র এইযে অবনিমণ্ডল বহু কুকী: নরপশু এবং নিধনের দ্বারা পরিপূর্ণ দেখা যাইতেছে ইহা কেবল আলস্য.হইতেই প্রায় ঘটিয়াছে। আত্মকৃত বা পৈত্রিক শুক্র ধাতুর ক্ষীণভাতেই দেহে আলস্য.বা. জড়তা জন্মে। = ।
ব্ৰহ্মচর্য রক্ষার উপায়। ৭১ নাতি শীতােষ্ণ জলবায়ু এবং অযত্ন সুলভ প্রচুর আহাৰ্য্যে ও বহুভােগে এবং শুক্রক্ষয়ে এখন অলসতাই ভারতের পতনের কারণ, দেশের গুণও দোষে পরিণত হইয়াছে আমাদের কর্ম দোষে বা কেবল আলস্যে। ব্রহ্মচারী কেবল উপস্থ সংযম করিয়া বসিয়া থাকিলেও চলিবে না। কুরু পুণ্যমহােরাত্ৰং ভজ সাধুসমাগমং। ত্যজ দুর্জন-সংসর্গং স্মর নিত্যং জনার্দনং। অর্থাৎ অহােরাত্ৰ সৎকর্মে দানে ধ্যানে ও পরােপকারে যত্ন করা, সাধু ব্যক্তির সংসর্গ লাভ চেষ্টা এবং অসাধু দুৰ্জন সংসর্গ পরিত্যাগ ও জনার্দনকে ভজনা বা উপাসনা করিতে হইবে, এইরূপ কাৰ্যে ক্রমশঃ সৰ্বাঙ্গীন মঙ্গল হইবে। [ উপাসনার আবশ্যকতা প্রবন্ধ দেখ ] মানসক্ষেত্র পতিত থাকিলেই তাহাতে আগাছায় নানাপ্রকার কুবাসনা জন্মে। পথ্যাশিনঃ সধৰ্ম্মা য়ে সচ্ছিলাঢ্যা জিতেন্দ্ৰিয়াঃ । গুরুদেব-দ্বিজে ভক্ত-স্তেষা-মেবায়ুরীরিতং। যে ব্যক্তি সুস্থ অসুস্থ সকল অবস্থাতেই সুপথ্য বস্তু ভােজন করেন, স্বধৰ্ম্মানুরাগী ও সৎস্বভাবে থাকিয়া সদাচার পরায়ণ এবং জিতেন্দ্রিয় হয়েন, সর্বদা পিতা মাতা গুরু ও দেবতা এবং ব্ৰহ্মনিষ্ঠ-ব্রাহ্মণাদি উচ্চ ব্যক্তিকে যিনি বিশেষ সম্মানও ভক্তি করেন, সেই ব্যক্তিই দীর্ঘায়ু লাভ করিবেন।' ঔষধ এবং ঔষধালয় কেবল (বিদেশীর দোকান) না বাড়াইয়া: যাহাতে রােগেৎপত্তি না হয় এবং রােগেরপ্রারম্ভেই! যাহাতে রোগ- উখানের পথ। বীজা বিনষ্ট করা যায়, এদেশের উপযােগী সেই সকল শাস্ত্র মত সদাচার পালন বাল্যকাল হইতেই অভ্যাস কর, স্বাস্থ্য, পায়ু এবং ঐশ্বৰ্য্য সমস্তই পাইবে। প্রথমে নাজ্জিতা বিদ্যা দ্বিতীয়ে নাজ্জিতং যনং। তৃতীয়ে নাজ্জিতং পুণ্যং চতুর্থে কিং করিষ্যতি । শৈশবেহভ্যস্ত বিদ্যানং যৌবনে বিষয়ৈষিণাং। বার্ধক্যে মুনিবৃত্তীন যােগেনান্তে অনুত্যজাং। উল্লিখিত প্রমাণাদি দ্বারা বুঝা যায় যে, চতুৰ্দ্ধা বিভক্ত মানবজীবনের শৈশবকালে কেবল বিদ্যাচর্চা বা নানা বিষয়িণী শিক্ষা লাভ করিতে হয়, যৌবনে ধনােপাৰ্জন ও বৈষয়িক কৰ্ম অর্থাৎ কামিনী কাঞ্চনাদি বিষয় ভােগ কর্তব্য এবং তৃতীয় প্রৌঢ়কালে দান, ধ্যান অর্থাৎ পরােকারাৰ্থ সঞ্চিত ধনের সদ্ব্যয় এবং ভগবচ্চিন্তা অধিক পরিমাণে করিয়া পুণ্য সঞ্চয় করিবে। শেষকালে বা বার্ধক্যে পুত্ৰাদির প্রতি সংসারের ভার্পণ করিয়া যথাশক্তি ধর্ম সঞ্চয়ই করিবে, ইহাই ভারতীয় সাধন, ইহার কালব্যতিক্রমে জীবন প্রায় নিস্ফল হয়। অপরদিকে বাল্যকালে শূদ্ৰবৃত্তি অর্থাৎ মাতা পিতা ও শিক্ষক প্রভৃতি গুরুজনের (ভলন্টীয়ারী বা দাসবৎ বিনা আপত্তিতে) আজ্ঞা বা আদেশ পালন, যৌবনে বৈবৃক্তি দ্বারা ধন সঞ্চয়। পরে, প্রৌঢ়ে ক্ষাবৃত্তি দ্বারা আজ্ঞা প্রদান করিবার ক্ষমতা অর্জন করিবে। বার্ধক্যে ত্যাগের পরে ব্রাহ্মণের আদর্শে চলিবে। ইহাই ভারতীয় সমাজ ও ধৰ্ম্মনীতি সার ব্রহ্মচর্য রক্ষার উপায়। ৭ বুঝা যায়, ইহার ব্যতিক্রমে নিজের জীবন ও সমাজবিপ হইয়া থাকে। তরুণগণ এই ভাবে জীবন যাপন করিবেন। প্রাচীন মতে নিত্যকর্ম। ব্রহ্মচর্যাশ্রমে বা নিজ গৃহে থাকিয়া তরুণ যুবকগণ সূর্যোদয়ের দেড় ঘণ্টা পূর্বে উঠিয়া শৌচ ও দন্তধাবন করিয়া উপনয়নের পরেই বা ঐ বয়সে যথা- সময়ে প্রাতঃস্নান * অভ্যাসের পূর্বে অন্ততঃ নাভিজলে থাকিয়াও মাথা ধুইয়া গাত্র মার্জনাদি যথাশক্তি অভ্যাস করিবেন। তৎপরে, প্রাতঃকালীন উপাসনা সমাপন করিয়া যথাসম্ভব ধর্মগ্রন্থাদি পাঠ এবং গরুকে খাদ্যাদি দান দ্বাৱা সেবার ব্যবস্থা করিবেন। তৎপরে, ছাত্রগণ স্বকীয় পাঠ্য গ্রন্থাদি অমন আড়াই ঘণ্টা বা এক প্রহর বেলা পর্যন্ত অধ্যয়ন করিবেন এবং ঐকাল হইতেই প্রাপ্তবয়স্ক গৃহগণ কৃষি বাণিজ্য ও সেবা প্রভৃতি কাৰ্য্য দ্বারা অর্থাগমের চেষ্টা করিবেন। পরে, মধ্যাহ্ জ্ঞান ও উপাসনাদি শেষ করিবেন। বেলা এগারটা হইতে একটার মধ্যে অতিথি অভ্যাগত বালক বৃদ্ধ এবং নিজের ভােজন সমাধা করিয়া অন এক ঘণ্টা ছোট ভাই ভগিনী বা পুত্র কন্যাদিগকে লইয়া * সুনাঙ্গ গাত্রে জল মাটী মাখায় ‘হাইড্রোপ্যাথিক বা জল চিকিৎসার কাৰ্য্য হয় সুতরাং মৃত্তিকা জল রৌদ্র ও অগ্নিসেন এবং প্রাণায়াম বা দ্রুত ভ্রমণাদি দ্বারা বায়ুসেবন ও অধিক সময় আকাশের নীচে অর্থাৎ ফাকা স্থানে থাকা এই পাঁচটি কাৰ্য্য স্বাস্থ্যকর এবং বহুরােগ বিনাশক অর্থাৎ পাঞ্চভৌতিক দেহ পঞ্চভূতের সহিত অধিক মেলা মেশায় পরিপুষ্ট ও সুস্থ :-খাকে, একথা আমরা অন্যত্র ও বলিয়াছি। ( ৭ ॥ ) • ৭৪ উত্থানের পথ। বা সংবাদপত্রাদি পাঠ করিয়া বিশ্রাম করিবেন। পরে, গৃহস্থগণ যে কোন প্রকার জ্ঞানচর্চা ও পুনশ্চ অর্থাদির, চেষ্টা করিবেন এবং ছাত্রগণ বিদ্যালয়ে বিদ্যাচর্চা করিয়া আসিয়া ‘অপরায়ে ব্যায়াম বা ক্রীড়াদি করিবেন। তৎপরে, সায়ংকৃত্য উপাসনান্তে সঙ্গীত বা বাদ্যচর্চা বা দেশের মঙ্গলার্থে বন্ধুবান্ধব সহ সদালােচনা করা প্রয়ােজন এবং ছাত্রেরা স্বকীয় পাঠালােচনা করিবেন। রাত্রি এক প্রহর বা আটটার পর সাড়ে নয়টার মধ্যেই নৈশভােজন শেষ করিয়া অন্যূন অর্ধ ঘণ্টা পরে দশটার সময় নিদ্রা যাইবেন। এই সকল নিয়ম পালনে এদেশবাসীর মঙ্গল হইতে পারে। দেশকাল পাত্রাভিজ্ঞ প্রাচীনদিগের এই ব্যবস্থায় এদেশে চলা উচিত, সর্বদা স্মরণ রাখিতে হইবে ভারতবর্ষ: শীতপ্রধান • দেশ নহে সেজন্য খাদ্যাখাদ্যে আচারে ব্যবহারে ও সাধারণ মনােবৃত্তিতে অন্য দেশের সহিত প্রায় সর্ব- বিষয়ে মিল থাকিতে পারে না। গো-সেবা। নিত্যকর্মে যেমন শক্তিবৃদ্ধির জন্য প্রত্যহ উপাসনা এবং ব্রহ্মচর্য রক্ষার চেষ্টা করা ব্রহ্মচারীর কর্তব্য বলিয়াছি সেই প্রকার প্রত্যহ প্রচুর ধৃত দুঞ্চ সেবনে বললাভের জন্য পল্লীগ্রামে থাকিয়াও সকলের পক্ষেই গো-সেবার চেষ্টা বিশেষ প্রয়ােজন হইয়াছে কারণ পুষ্টিকর খাদ্যে বলিষ্ঠ থাকাতেই বহু অনাচার এবং ব্যভিচারেও পাশ্চাত্য জাতি আমাদের ন্যায় দুৰ্বল বা চিররুগ্ন নহেন। পাশ্চাত্য দেশের লােক প্রত্যহ যথেষ্ট মাখমমিশ্রিত রুটি খান এবং চায়ের সহিত এবং বাল্যকালেও
গো-সেবা।
৭৫
•
যথেষ্ট দুগ্ধ পান করেন সেজন্য তাঁহারা বহুযত্নে গােজাতিরও
উন্নতি করিতেছেন। দেড়শত বৎসর পূর্বে এদেশেই এক
পয়সায় অর্ধপােয়া ঘৃত খাইয়া গাে মহীষের ন্যায় জল ও জলা
ভূমিতেও মানুষ বলিষ্ঠ ও নিরােগী ছিল। বহু পূৰ্বকালে
এদেশে তিনকাহন বা বার আনায় সবৎসা বিশেষ দুগ্ধবতী
ধে এবং চারি আনায়, গাে মিলিত সেজন্য ঘােড়শদানে
ও প্রায়শ্চিত্তে গােমূল্য ঐ কড়িই এখনও ধার্য আছে। তখন
ধৃত দুগ্ধের মূল্য এদেশে যে কত সুলভ ছিল এবং লােকে উহা
কত খাইতে পাইত তাহা এখন ধারণা করাও দুঃসাধ্য। গাের
অঙ্গস্পর্শজনিত তাড়িৎশক্তির বলে স্বাস্থ্যবৃদ্ধি এবং বােগ
আরােগ্য হয় সেজন্য মহারােগীর এবং মহাপাপীর জন্য গো
সেবার বিশেষ ব্যবস্থা শাস্ত্রে আছে।
অনাহারী অমরেরাও হােমে, অমৃততুল্য; গব্যঘৃতের
লােভ টুকু ছাড়িতে পারেন নাই। একমাত্র দ্রব্য খাইয়া বাচিতে
হইলে “দুই” সেই শ্রেষ্ঠ ও সাত্ত্বিক দ্রব্য, দুগ্ধপােষ্য মানুষ ও
অন্যান্য স্তন্যপায়ী জীবগণ উহারই আদর্শ ও দৃষ্টান্ত। ঐ সকল
কারণে দুর্গম বনবাসে থাকিয়াও সৰ্বভােগত্যাগী তপস্বী
বশিষ্ঠাদি ঋষিগণ আশ্রমে গােসেবা করিতেন। গােনই
ভারতের শ্রেষ্ঠ ধন সেজন্য সুদুর দিল্লীনগর হইতে কুরুরাজ
বহু আয়াসে বঙ্গাধিপতি ধৃতরাষ্ট্রের কেবল গােধন গুলি হরণ
করিতেই বঙ্গে আসিয়াছিলেন। ভারতে গােসেবা, মহৎ
কাৰ্য বলিয়াই আদর্শ পুরুষ সেই পূর্ণব্রহ্ম শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং স্বহস্তেই
গােসেবা ও রাখালী পৰ্য্যন্ত করিয়া আদর্শ দেখাইয়া গিয়াছেন।
কোন প্রকারে গােজাতির অপালন জন্য মৃত্যু ঘটিলেই মহাপাপ
T
উত্থানের পথ। জানে মস্তক মুণ্ডন করিয়া হিন্দুরা প্রায়শ্চিত্ত করিত কিন্তু এখনকার হতভাগ্য হিন্দুরা পৃথিবীর মধ্যে সর্বাপেক্ষা অধিক কষ্ট দিয়া ক্রমশঃ গােহত্যাই করেন, আবার তাঁহারাই অন্য জাতিকে পােখাদক বলিয়া নিন্দা করেন। অতএব ভারতের সকল নরনারী এবং ব্রহ্মচারীগণ পল্লীগ্রামে থাকিয়া গাে-সেবা এবং পশু মনুষ্য সকলের জন্য কৃষিকাৰ্যে সর্বাগ্রে মনঃ সংযােগ করিয়া বলিষ্ঠ হও; প্রসিদ্ধ বুদ্ধিমান্ পণ্ডিত যজ আশুতােষ মুখােপাধ্যায় মহাশয় প্রত্যহ বৈকালে পুষ্টিকর মধ্যে শ্রেষ্ঠ মিষ্টান্ন সন্দেশই অর্ধশের জল খাইতেন সুতরাং খাওয়া চাই। ব্ৰহ্মচর্যের জন্য শেষ উপদেশ। 'যে ব্যক্তি আয়ের অবস্থায় যথাসম্ভব ধনসঞ্চয় করিতে পারেন তাহার অসময়ে এবং বংশ পরম্পরায় অর্থের জন্য কখন যেমন কষ্টভােগ প্রায় করিতে হয় না, সেইরূপ প্রথম যৌবনে যখন শরীর মন সবেগে পরিবর্ধিত হইতে থাকে সেইকালে যতদুর পার সংযম দ্বারা দেহে রস রক্তাদি ধাতু সঞ্চয় করিতে পারিলে এবং ব্যায়ামাদি কাৰ্য্যে এবং পাঞ্চভৌতিক সংঘর্ষণে অধিকতর কষ্ট সহিষ্ণুতা দ্বারা শ্রমজীবি কৃষকের ন্যায় দেহকে দৃঢ়তর এবং সবল করিতে পারিলে, দীর্ঘকাল নিজে ও তােমার সন্তানেরাও জরা এবং রােগশূন্য হইয়া' সুস্থদেহে জীবিত থাকিতে পারিবে (পূৰ্বে গুরুগৃহে ব্রহ্মচর্য পালনে ইহা ঘটিত)। জায়ের অবস্থায় অতিরিক্ত অপব্যয় ঘটিলেও তৎকালে বিশেষ তিবােধ হয় না বটে কিন্তু চিরদিন সমান যায় না, যৌবন শেষে ত্রিশ চল্লিশ বৎসর বয়সের পরে যখন 'দেহের ক্ষয় আর ব্রহ্মচর্যের জন্য শেষ উপদেশ । ৭৭ হইবে তখন শুক্রের অপব্যয়ের জন্য অবশ্যই রােগভােগ ও দুর্বলতা জন্য বিশেষ দুঃখ এবং অনুতাপ করিতে হইবে। অর্থাদি সঞ্চয় করাই কঠিন ব্যয় করা সর্বকালেই সহজ কিন্তু অতি কৃপণের ধনও অপব্যয় ঘটে। যিনি যত বড়ই বলিষ্ঠ বা স্বাস্থ্যবান হউন শুক্রের অপব্যয় সকলের পক্ষেই অনিষ্টদায়ক, মিতাচার ব্যতীত কাহারই ধন রক্ষা বা দেহ রক্ষা হয় না। যিনি যত বড় ধনী তাহার আয় এবং ব্যয় ও তত অধিক সেই প্রকার যাহার যত বড় দেহ তঁাহার দেহের শুক্রাদির ক্ষয় বা বৃদ্ধি সেই পরিমাণেই ঘটে সুতরাং অপব্যয়ে ক্ষতি ও সমান হইয়া থাকে। শুক্রাদি ধাতু সকলদেহে সমান থাকে না সেজন্য কৃশ ব্যক্তিরও বৃতিশক্তি বেশী থাকা আশ্চর্য নহে, এজন্য সিংহ অপেক্ষা পারাবতের রতিশক্তি অধিক দেখা যায় সুতরাং অন্যের দৃষ্টান্তে বা আদর্শে চলা উচিত নহে। অতএব যদি বলবান্ বুদ্ধিমান্ মেধাবী নিরােগী ও দীর্ঘজীবী হইয়া পৃথিবীতে বালকবৎ আনন্দভােগ এবং প্রফুল্লচিত্তে দেবতার মত স্থির যৌবনে সুখে সচ্ছন্দে থাকিতে চাও যদি পিতৃ মাতৃ হইতে প্রাপ্ত দুৰ্বল দেহ ও মনের পূর্ণতা লাভ দ্বারা হৃষ্টপুষ্ট বলিষ্ঠ হইয়া পূর্ণ মানুষ হইতে চাও, যদি অসংযম অত্যাচার জনিত দুর্বল দেহকে পুনশ্চ সবল করিতে চাও তবে মিতাচারী হও; ব্রহ্মচর্য্যে দেহ ও মস্তিষ্ক বিশুদ্ধ রক্তে পূর্ণ থাকিলে মনে স্বাভাবিকই আনন্দ থাকিবে, ব্রহ্মচারীর হৃদয় বালকের ন্যায় সদ। আনন্দে নৃত্য করে সেজন্য তাঁহাদের মাদক সেবনে স্ফুর্তির প্রয়ােজনই হয় না। সংযমে তুমি সুস্থ বলিষ্ঠ থাকিলে তােমার সন্তানও সুস্থ বলিষ্ঠ জন্মিবে। বাম্পপূর্ণ ব্যোম- ৭৮ উখানের পথ। যান যেমন উৰ্দ্ধ আকাশে উঠিতে চায় সেইরূপ ব্ৰহ্মচর্যে দেহ মন সুস্থ বলিষ্ঠ থাকিলে মানব স্বাভাবিক উন্নত চিত্ত হয়, তখন সে কখন জড়বৎ আলস্তে সময় নষ্ট করিতেই পারে না। মাদক সেবনই কর কিম্বা ঘৃত দুগ্ধ ছানা মাখম খাও অথবা উত্তম ঔষধ বা পথ্য ব্যবহার কর, তুমি ইন্দ্রিয় সেবায় অযথা শুক্রক্ষয়ে আশক্ত হইলে কখনই সুস্থ থাকিতে পারিবে না। বৃক্ষের মূলছেদ করিয়া কেবল পত্রাগ্রে জল সেচনে কি ফল হইবে। মৌখিক বীরত্ব দেখাইয়া তােমার পাপে তুমি মরিলে অন্তে তােমাকে কিরূপে বঁাচাইবে। বর্তমান রােগ শোেক দারিদ্রতা ও অনৈক্য প্রভৃতি দোষ সকল প্রায় আমাদের বহু পুরুষপরম্পরা ব্রহ্মচর্য হানিরই ফল জানিবে, অবশ্য দেহ বিশেষে ও সময় বিশেষেই ক্ষতি বৃদ্ধির তারতম্য ঘটে অস্বাভাবিক মৈথুন উত্থানের পথে অগ্রসর হইতে হইলে সংযমেরই প্রয়ােজন কিন্তু আজকাল অনেক যুবক বালককালাহইতেই যাবৎ বিবাহ না হয় তাবৎকাল প্রায় অস্বাভাবিক উপায়ে রেতঃপাত করিয়া পতনের পথে অধিকতর অগ্রসর হইয়া নিজের এবং ভবিষ্যৎ বংশের সর্বনাশ করিতেছেন। ইহাতে স্বল্পকাল’ মধ্যেই দেহ ও মনের বিশেষ অনিষ্ট সাধন যাহা হয় তাহা লিখিয়া ফুরায় না। ইহাকে ক্রমে ক্রমে সুস্পষ্ট আত্মহত্যাই বলা যায়। বহু ডাক্তারী পুস্তকের সারসংগ্রহ স্বরূপ ডাক্তার হরিশ্চন্দ্ৰ শৰ্মার জীবন রক্ষক” নামক পুস্তকে এবং অন্যান্য বহু পুস্তকে লেখা, ৭১ । অস্বাভাবিক মৈথুন। আছে যে, ঐ অবৈধ পাপে অবিচ্ছিন্ন পুরাতন জর ও যক্ষ্মাকাশ প্রভৃতি না হইতে পারে এমন রােগ নাই। ইহাতে দৈহিক যন্ত্রে এবং স্নায়ু মণ্ডলীতে গুরুতর আঘাত লাগায় শুক্রস্থ কীট সকল নির্জীব ও ছিন্ন ভিন্ন প্রায় হওয়ায় এবং দেহ নিস্তেজ হইয়া যাওয়ায় দেহ মন অবসন্ন ও স্বভাৰ খিট খিটে, হাত পা জালা এবং কোষ্টবদ্ধ ও বায়ু রােগ প্রভৃতি জন্মিতে থাকে, অধিকদিনের অভ্যাসে প্রমেহ ও স্বপ্নদোষ প্রভৃতি জন্মিয়া চিররোেগী হইতে হয়। উক্ত রােগীরা ক্রমশঃ এত আশক্ত হয় যে হবন্ধন করিয়া রাখিলেও ছিন্ন করিতে চেষ্টা করে। উক্ত কাৰ্যে অর্থবিকৃত শুক্র রক্তের সহিত মিশিয়া দেহ মন ক্ষুব্ধ ও স্তব্ধভাবে থাকে এবং অণ্ড পার্শ্বে দ রােগদিও জন্মে। উহাতে ক্রমশঃ যন্ত্র এত বিকৃত ও দুর্বল হয় যে স্ত্রীলােক দর্শনেও রেতঃপাত হইয়া থাকে, ঐরূপ দুরবস্থা ঘটিলে অনেকে ভয়ে বিবাহই করেননা। যেমন অ্যান্ড্রর মধ্যে কীট জন্মিয়া, অনুৰুে কীটবিষ্ঠায় পরিণত এবং বিস্বাদ ও বিকৃত করিয়া ফেলে যেমন পােকা ধরিলে বৃক্ষ অসার ও কৃমি বিষ্ঠায় ক্ষয় (দেড়) * দেহ দুৰ্বল হইতে লাগিলে যেমন নেশার মাত্রা বাড়াইয়া মানুষ নেশাখাের হয় সেইরূপ অতিরিক্ত বা অবৈধ কামভােগে দুৰ্বলতায় এবং তরলতায় মানুষ কামাচ্ছন্ন বা কামের নেশায় অভিভূত হইয়া মরণ বাচনের কথা ভুলিয়াই যায় সুতরাং প্রথম হইতেই সতর্ক ও সাবধান থাকিতে হয়। দেহ বলিষ্ঠ হইলেই পুনশ্চ মনও বলিষ্ঠ হয় এবং ধারণাশক্তিও বাড়ে।
৮০,
উত্থানের পথ।
।
হয় সেইরূপ মানবদেহ উক্ত কুকার্যে বিকৃত ও অসার হয়।
একটু বয়ােবৃদ্ধি ঘটিলেই উক্ত রােগীর হৃদরােগ ( বুক ধড়পড়
রােগ) জন্মে। উহারা ক্রমশঃ আপেক্ষিক অল্পভাষী কিম্বা
মুদুভাষী হইয়া থাকেন। উক্ত বালকেরা যেন অপরাধীর
গুরুজনের মুখের দিকে চাহিয়া কথা কহিতেও
সঙ্কুচিত হয়।
পূর্বোক্ত রােগলক্ষণাক্রান্ত বালকের
চিত্ত সঙ্কুচিত,
মৃদুভাবাপন্ন এবং গলার স্বর মােটা ও কঠোর (বয়সাধরা )
এবং কর্কশ হয়। ঐ অবৈধ পাপে লিপ্ত বালকের অন্য
মনস্কতাবৃদ্ধি ও স্মৃতিশক্তি এবং দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ হয়। উহাদের
কপালের ও গাত্রের চর্ম শিথিল এবং শুষ্ক ও লাবণ্যবিহীন
হয়। উহাদের মুখে ও নিশ্বাসে এবং গাত্রেও বিশেষ দুর্গন্ধ
প্রায় সর্বদা পাওয়া যায়। অধুনা সামাজিকেরা বিবাহের
বয়স বাড়াইতে
গিয়া এবং
সংযুম বা ব্রহ্মচর্য শিক্ষা
দেওয়ায় এই অবৈধমৈথুনের পথে দেশের অধিকতর
যুবকের সর্বনাশ ঘটাইতেছেন।
চিকিৎসা শাস্ত্রে আছে, ষাইট ফোটা রক্তে এক ফোটা
শুক্র জন্মায় সুতরাং তাহার অপব্যয়ে বিশেষ ক্ষতি সহজেই
বুঝা যায়। যােল বৎসরের নিম্নে কোন প্রকারেই শুক্র ক্ষয় হওয়া
উচিত নহে, কারণ একটি বড় গাছের শাখাচ্ছেদ করা অপেক্ষা
একটি চারা গাছের পত্র ছিন্ন করিলেও অধিক অনিষ্ট ঘটে।
..চিকিৎসকেরা বলেন, একরাত্রে দুই তিনবার স্ত্রীসহবাস
অপেক্ষাও একবার অবৈধ উপায়ে রেতঃপাতে বােধ হয়
অস্বাভাবিক মৈথুন। ১ অধিক অনিষ্ট ঘটে কারণ ইহা দ্বারা অত্যন্ত অধিক শুক্রক্ষয় হয় অথচ নারীসঙ্গমের ন্যায় প্রতিদান কিছুই পাওয়া যায় না। বয়ঃপ্রাপ্ত হইলে স্ত্রী ঋতুর ন্যায় মাসিক একবার সুপ্তিস্থলন প্রায় ঘটিয়া থাকে, ইহার আধিক্য ঘটিলেই পীড়া বিবেচনায় ঔযধাদি খাওয়া প্রয়ােজন। পূর্বোক্ত অত্যাচার জন্য ইন্দ্রিয় শিখিল হইয়া পড়িলেও যদি ভগবৎ কৃপায় ব্রহ্মচর্য পালনে পুনশ্চ সুষম বিশেষ ভাবে অভ্যাস করা যায় তাহা হইলেও ক্রমশঃ পুনঃ স্বাস্থ্য লাভ কতকটা হইতে পারে, অল্পদিনে চৈতন্য হইলে পূর্ণ স্বাস্থ্যও পাওয়া যায়। বালককাল হইতে বয়ােজ্যেষ্ঠ দুষ্ট বালকের নিকট হইতেই উক্ত কুকাৰ্য্য অভ্যাস হয়। চরিত্র হীন বয়স্য বা বয়স্থ ব্যক্তির মুখে কাম উত্তেজক গল্প, কামচর্চা, নাটক নভেল পাঠ, অশ্লীল সঙ্গীত শ্রবণ বা কীর্তন এবং থিয়েটার বা বায়স্কোপ প্রভৃতিতে কামকথা শ্রবণ এবং নগ্ন বা অর্ধনগ্ন চিত্রাদি দর্শন, যুবক যুবতীর প্রেমালাপ বা সহবাসাদি দর্শন ইত্যাদি কারণেই বালকদিগের মনে হটাৎ কামবৃত্তির ফুরণ হয়। উক্ত বালক বা তরুণ যুবকদিগের তৎকালে নারীসহবাস দুষ্প্রাপ্য বা সহজ প্রাপ্য হওয়ায় তাহারা উক্ত প্রকার অবৈধ মৈথুৱে প্রায় রত হয়। তের চৌদ্দবৎসর বয়স হইতেই বালক বালিকাদিগের কামেচ্ছার উদগম হয়, সেই সময় হইতেই অভিভাকেরা পূর্বোক্ত কুকাৰ্য্য এবং কামােত্তজক কারণ সমুহ হইতে বালক- দিগকে সর্বদা বিরত রাখিবার চেষ্টা করিবেন এবং সর্বদা সদুপদেশ দিবেন এবং উহাদিগকে দেহ মনের নানাবিধ কাৰ্য্য পরিচালনায় ব্যস্তরাখিবেন।
উত্থানের পথ। প্রায় পিতা মাতার অনবধানতা জন্যই বালকেরা কুপক্ষে যাইয়া চরিত্র হীন হয়। অভিভাবক এবং শিক্ষকের প্রকারান্তরে বা এই সকল পুস্তকাদি দ্বারা ছাত্রদিগকে বুঝাইয়া দিবেন যে, উক্ত কুকর্মে কি প্রকার সর্বনাশ ঘটে, ঐ কার্যে শুক্র মধ্যস্থ কীট সকল ছিন্ন ভিন্ন ও বিনষ্ট হওয়ায় যথাকালে উহাদের সন্তানই জন্মে না এবং জন্মিলেও রুগ্ন হইয়া পড়ে.অথবা ব্লছে না। পুমৈথ নাদিও ঐ প্রকার মহাপাপ এবং উহা উভয়ের পক্ষেই সবিশেষ অনিষ্টজনক হইয়া পুরুষত্বহীনতা বা ক্রমশঃ ধ্বজু ভঙ্গাদি উৎকট রােগ শীঘ্রই জন্মে। এই পুস্তকে আমরা যৌনতত্ত্ব অবিবাহিতের পক্ষেই সবিস্তার লিখিয়া ফলাফল দেখাইলাম, পাশ্চাত্য পণ্ডিতদিগেরও মতামত কিছু প্রকাশ করা হইল, বিবাহিতের ব্রহ্মচৰ্য্যাদি ও সুসন্তান লাভের কথা মূল পুস্তকে বিশেষ লিখিয়াছি। এই সকল কথা- নব্য যুবকদিগকে-মুখে বলা যায় না সেজন্য তাহাদিগকে এই পুস্তক এবং বিবাহিতের জন্য লিখিত পুস্তক বিবাহিতকে পড়িতে দিলেই বিশেষ উপকার হইবে, লজ্জা ছাড়িয়া এইসকল পুস্তক প্রদানই সর্বাপেক্ষা সুবিধা জনক। পুত্ৰাদির চরিত্রহীনতা জানিয়া যে উপায়েই হউক তাহাদিগকে বাঁচাইতে হইবে, এস্থলে লজ্জার অনুরােধ রাখা আত্মীয়ের পক্ষে ঘাের মূখ তা কারণ শত্রুকেও এরূপ সর্বনাশ হইতে রক্ষা করা বিশেষ উচিত। উক্ত, অত্যাচারে বা পৈতৃক দোষে মাসিক দুই দিনের অধিক স্বপ্নদোষ বারম্বার হইতে, থাকিলে ; সত্বর চিকিৎসা হওয়া বা শীঘ্র বিবাহ দেওয়া কর্তব্য নচেৎ তরুণ যুবকের সর্বনিষয়ে এবং দেহ মনের আজীবন অনিষ্ট ঘটিয়া
-
অস্বাভাবিক মৈথুন।
জীবন্ত হইয়া থাকিতে হইবে। স্ত্রীঋতুবং মাসিক বা
ততােধিক কাল ব্যবধানে সুপ্তিস্থলন যৌবনে অস্বাভাবিক নহে।
ব্রহ্মচর্য কি তাহার সুফল এবং ব্রহ্মচর্য রক্ষার উপায়
শিক্ষা ইত্যাদি বিষয় পূর্বের প্রবন্ধে যথেষ্ট বলা হইয়াছে,
সেইগুলি মনােযােগে পাঠ করিলে এবং আহার সংযম ও ব্যায়াম
অভ্যাস করিলে এবং সৎসঙ্গগুণেও ব্রহ্মচর্য রক্ষা সম্ভবমত
সহজেই করা যাইবে। অভিভাবকেরা বিশেষ চেষ্টা করিয়াও
যদি কু অভ্যাস ছাড়াইতে না পারেন তবে অগত্যা সত্বর বয়স্থা
কন্যার সহিত ঐ যুবকের বিবাহ দিবেন, এক্ষেত্রে একটু স্বল্প
বয়সে বিবাহ দেওয়াই বিশেষ প্রয়ােজন, কারণ সামান্য রূপ
শুক্রপীড়া কিছুদিন স্ত্রীসহবাসেই বিনষ্ট হয় উহাই মহৌষধ।
চিকিৎসকেরা বলেন,বেগ নিতান্ত অসহ হইলে কখন কদাচিৎ
(অভ্যাসে না দাড়ায়) পূর্ণ বয়স্ক অবিবাহিত বা স্ত্রীবিয়ােগী
ব্যক্তিগণ বেশ্যা গমনাদি না করিয়া অনাশক্ত ভাবে এই অবৈধ
ভাবেও যাইতে পারেন। যাহাদের বিবাহের সুবিধা নাই বা
বিবাহের বয়স নাই অথচ ব্রহ্মচর্য পালনেও নিতান্ত অক্ষম
তঁাহারা কখন কখন ঐ পথে যাইবেন তথাপি সাধারণ বেশ্যার
নিকট যাইয়া রােগগ্রস্ত হইবেন না কিন্তু যাহাদের সুপ্তিস্থলন
হয় তাহারা দুইপথে গেলে মরণ নিশ্চয়, যে কোনরূপে দেহ
দুৰ্বল হইলেই কামেচ্ছা বাড়িয়া থাকে। এই সকল বিষয়
বিশেষ বিবেচনা করিয়াই শাস্ত্রকারগণ আটচল্লিশ বৎসরের
মধ্যে সকল পুরুষকে গতিকে হয় বিবাহিত গৃহস্থ না হইলে
বাণপ্রস্থ আশ্রমেও থাকিতে হইবে বলিয়াছেন, ' কেহই
অনাশ্রমী থাকিবে না। এ সকল কথা পরে আশ্রম তত্ত্বেও
৮৪
উখানের পথ।
;
বলিয়াছি। অস্বাভাবিক শুক্ৰত্যাগের বিষময় ফলের ভয়েই
বােধ, হয় শাস্ত্রকারগণ পুরুষকে বিধবার ন্যায় থাকিতে না বলিয়া
বিবাহ করিবার জন্য শাস্ত্রবিধানে অনুরােধই করিয়াছেন।
উক্ত অবৈধ পাপের হস্ত হইতে কতকটা নিস্তার পাইবার
জন্য বােধ হয় মুসলমান ও যিহুদী সমাজে শৈশর অবস্থায়
“মুসলমানি করা হয়, উহাদ্বারা বায়ু উত্তাপ ও বন্ত্রের ঘর্ষণে
শিশুর মেঢ়ের কোমল ত্বক ক্রমশঃ কঠিন হইয়া যায় সেজন্য
যৌবনে তাহার কিছু ধারণাশক্তিও বাড়ে কিন্তু তাহার প্রবৃত্তি
মরে না ।
হিন্দু ও মুসলমান সমাজ ব্যতীত প্রায় অন্যান্য সমাজে
ব্যভিচারের কঠোরতাও স্বল্প সেজন্য তরুণের পক্ষে তরুণীর
বিশেষ অভাব না থাকায় তাহাদের পূর্বোক্ত অস্বাভাবিক
উপায়ের প্রয়ােজনই প্রায় হয় না। আমাদের মনে হয় ঐ সকল
কারণে অর্থাৎ উক্ত অবৈধ পাপকাৰ্য্য স্বল্প বা বিশেষ না
থাকায় ঐ সকল সমাজে পশুদিগের ন্যায় তাহাদের দেহের এবং
মনের তেজ স্বাভাবিক ভাবে রক্ষা হয় সেজন্য ঐ সকল জাতি
বর্তমান হিন্দুজাতি অপেক্ষা তেজস্বী ও বলিষ্ঠ দেখা যায়,
এই পাপ অপেক্ষা বাল্য বিবাহ শতগুণে ভাল। বর্তমান
হিন্দু সমাজে নানাকারণে নব্য যুবকের বিবাহরােধ হওয়ায়
শিক্ষিত অশিক্ষিত যুবকদিগের মধ্যে বাে হয় এখন শতকরা
* গ্র্যাণ্ড অ্যালেন সাহেবের ইংরাজি পুস্তকে আছে
য়িহুদী সমাজ হইতেই মুলমান সমাজে মুসলমানী” (ছেদ)
প্রথা প্রবর্তিত হইয়া আসিয়াছে।
৮ অস্বাভাবিক মৈথুন। আশিজনেরও অধিক অবিবাহিত লােক স্বল্প বিস্তর ঐ পাপে লিপ্ত হইয়া থাকেন সেজন্য প্রথম বয়সে বীজে আঘাত (পােকা) লাগায় ভবিষ্যৎ বংশধরেরা ক্রমশঃ দুর্বল ও খর্বাকৃতি এবং পৈত্রিক দোষে প্রায় ঐ কুম্বভাবই প্রাপ্ত হইতেছে, ইত্যাদি কারণে “বিবাহের বয়স নির্ণয়” প্রবন্ধে আঠার হইতে চব্বিশের মধ্যে পুরুষের বিবাহকাল আমরা ধার্য করিয়াছি। হিন্দুজাতির বােগবৃদ্ধি এবং অত্যধিক মরণ ও পুরুষের সংখ্যা কমিয়া যাইবার পক্ষে বংশগত এই পাপই প্রধান কারণ বলিয়া আমরা মনে করি। কন্যার অল্পতা ও দারিদ্রতা জন্য বিবাহ বহু ব্যয়সাধ্য বলিয়া নবশায়ক প্রভৃতি হিন্দুজাতির নিম্নস্তর প্রায় এই পাপেই নিৰ্বংশ হইয়া যাইতেছে যেজন্য ঐ সকল সমাজে পুত্ৰপণের ন্যায় কন্যাপণ উঠাইয়া দেওয়ার জন্য উহাদের স্বজাতীয় সমাজ ক্রমশঃ বিস্তার হওয়া বিশেষ প্রয়ােজন। এসকল কথা এবং বিবাহিতের ব্রহ্মচষ্য এবং সুসন্তান লাভেপায় ও দাম্পত্য ব্যবহার প্রভৃতি যৌনতত্ত্ব ও প্রেমতত্ত্ব সম্বন্ধীয় নানা- কথা “উত্থানের পথ” মূল পুস্তকে ভ্রষ্টব্য। অবৈধমৈথুন জন্য পাপ যে কেবল পুরুষের মধ্যেই প্রবেশ করিয়াছে তাহা নহে। স্ত্রীশিক্ষার বাহুল্য ও বয়ােবৃদ্ধি ঘটায় বহু তরুণীর মধ্যে পরস্পরের যে প্রণয়াধিক্য দেখা যায় ইহাও প্রায় যৌন ব্যাপার ঘটিত। কন্যাদিগের বিবাহ দিতে যত বিলম্ব হইতেছে ততই এদেশে নারী জাতির ঐ সকল বিকট পাপের বৃদ্ধি ঘটিতেছে সেজন্য যােনিরােগ এবং জরায়ু সংক্রান্ত স্ত্রীরােগ বন্ধ্যাত্ব ( টিউমার, ও ফিট) প্রভৃতি উৎকট রােগ জন্মিতেছে। ডাক্তার কেদারনাথ দাস মহাশয় i ta ৮৬ উখানের পথ। প্রভৃতির চিকিৎসা পুস্তকে এসকল কথা দেখিবেন। সামাজিক- গণ একট, দূরদর্শী হউন। বহুকথা মূল পুস্তকে পাইবেন। এদেশে পাঁচ ছয়টির অধিক মেয়ে কলেজ নাই, উচ্চ শিক্ষিত বহু মহিলারা কোথায় চাকুরী পাইবেন জানিনা। রূপ না থাকিলে ধনীরা পছন্দ করিবে না, অধিক বয়স্কা এবং গৃহকাৰ্য্য না জানায় গৃহস্থ লইবে না, উহাদের দ্বিতীয় পক্ষে বা ব্ৰহ্মসমাজে গতি হইতে পারে। অথবা চখের জলে পােড়া বাসন মাজিতে হইবে। অধিক শিক্ষায় নিজের ও সন্তানের স্বাস্থ্য নষ্ট করিয়া এখন এই বেকার বৃদ্ধির দেশে চাকরী মেলা দায়। অবশ্য ধনী কন্যার ও বিধবার পক্ষে উচ্চ শিক্ষায় কিছু সুবিধা ঘটিতে পারে, অশিক্ষিতা থাকাও মহাদোষ সুতরাং বাড়াবাড়ী করিও না। পূৰ্বে এদেশে ব্রাহ্মণাদি তিন জাতি যথাকালে ব্রহ্মচর্যা- এমে থাকিয়া সদগুরুর তত্ত্বাবধানে ব্রহ্মচর্য পালন শিক্ষা করিতেন এবং ঐ বয়সেই বিবাহিতা কন্যা শাশুড়ী বা শ্বশুরের নিকট শিক্ষা পাইতেন কিন্তু এখন আমরা না আৰ্য না অনাৰ্য উভয় ভ্রষ্ট হইয়া সৰ্ববিষয়ের বিপ্লবে পড়িয়া ক্রমশঃ হীন হইয়া পড়িতেছি, কন্যা ও পুত্রকে বিদ্যালয়ে পাঠাইয়া নিশ্চিন্ত মনে আমরা চক্ষু মুদ্রিত করিয়া থাকি, তাহার' চরিত্রের ভাবনা একবারও ভাবিনা বা দেখিনা। বাস্তুভিটা বাঁধা দিয়া ধর্ষক রােধ করিয়া টাকা পাঠাইতেছি, ঐ টাকা পুত্রের বিদ্যার্থে ব্যয় হইতেছে কি বায়স্কোপ বিয়েটারে কি। নেশা বেশ্যায় ' বা হােটেলে কুখাদ্য অখাদ্য ভােজনে ব্যয় হইয়া যাইতেছে তাহার সংবাদ অনেক পল্লীবাসী মাতা পিতা জানেন না বা
ক্লীবত্ব প্রাপ্তি।
৮৭
রাখেন না। এখন যে সকল যুবক যুবতী কৃপণ অথচ লজ্জাশীল
( মিট মিটে ভালাে মানুষ)। তাহারা অধিকাংশই ঐ পাপে
বা গুপ্ত পাপে লিপ্ত, সেজন্য ইহারা নিজে এবং ইহাদের
ভবিষ্যৎ বংশধরগণ উৎকট বােগী হইতেছে, এই সকল পাপে
ক্ষয় রােগীর সখ্যাও ক্রমশঃ বাড়িতেছে, বােধ হয় এইরূপ
পাপ কম থাকায় নারী জাতির মধ্যে ক্ষয়রােগ কম সুতরাং
পতন হইতে উত্থানের পথে বা মরণ হইতে বাঁচিবার পথে
আসিবার জন্য উপায় কি ? ব্রহ্মচর্য প্রবন্ধে লিখিত উপায়ে
ব্রহ্মচর্য শিক্ষা অথবা শীঘ্র বিবাহ দেওয়াই কর্তব্য নহে কি?
সৰ্বত্ৰ স্বভাব চরিত্র বুঝিয়া কাৰ্য করিতে হয়, সকল ছেলে মেয়ে
সমান চরিত্র না হওয়ায় ব্যক্তি বিশেষে বিদ্যা শিক্ষাবোেধ
করিয়াও কাৰ্য্য শিক্ষা দেও; কুচরিত্বকে শীঘ্র বিবাহ দেও;
ক্লীবহু প্রাপ্তি।
ন মূত্রং ফেনিলং যস্য বিষ্ঠা চানিমজ্জতি।
মেgং চেম্মিদ-শুক্রাভ্যাং হীনং ক্লীবঃ স উচ্যতে।
যাহার মূত্রে ফেনা হয় না, বিষ্ঠা জলে ডুবিয়া যায়, মে
(লিঙ্গ) উন্মাদনা বা উত্তেজনা রহিত এবং শুক্র হীন হয় সেই
মানবকে ক্লীব বলে।
পুরুষ ক্লীব দুই প্রকার ধরা যায়, এক ক্লীব জন্মাবধি থাকে
অপর অধিক শুক্রক্ষয়ের অত্যাচার : জনিত কাফলে উপরি
লিখিত দুর্দশাগ্রস্ত হয়।
জন্মাবধি ক্লীব ব্যক্তি পতিত,
তাহার ধর্ম কর্ম নাই ও পৈত্রিক সম্পত্তিতেও অধিকার নাই
কিন্তু তাহার দেহে শক্তি সামর্থ্য থাকায় বাঁচিয়া থাকার অযােগ্য
M
উখানের পথ।
হয়না কিন্তু যে ব্যক্তি অত্যাচারে ক্লীব হইয়াছে, স্ত্রীলােকের
মুখের দিকে চাহিতে পারে না, চাহিলেও যাহার শুক্রক্ষরণ হয়,
সে ব্যক্তি জীবন্মত এবং কর্মে অধিকার থাকিলেও অক্ষম এবং
অযােগ্য বিধায় অনধিকারী।
যাহারা কদভ্যাসে দীর্ঘকাল রত থাকেন তাহাদের বিবাহ
দিতে উপেক্ষা করিয়া বিলম্ব করিলে তাহাদের ধবজভঙ্গ রােগ
জন্মিতে পারে, ঐ রােগ
রােগ জন্মিলে পরে বিবাহ করিলে
উহাদের ঘাের বিপদ উপস্থিত হইবে। তখন যুবতী ভাৰ্য্যার
কোলে শুইয়া ঐ দম্পতীকে কাঁদিয়া রাত্রি কাটাইতে হইবে,
যুবক সাবধান ; উত্তরােগে ক্লীবত্ব ঘটিলে বিশেষ চিকিৎসায়
রােগ না সারিলে কদাচ বিবাহ করিবে না, নিজের পাপে
নিজে মর বা নিজেই উৎসন্ন যাও; নিরপরাধিনী পরের মেয়েকে
হাড়ে জালাইও না, বুঝিয়া যাহা ভালাে হয় করিবে। ঐপ্রকার
জীবের দুর্দশা কৰি বৰ্ণনা করিয়াছেন,
নাে বা দাতুম্ নােপ-ভােক্ত শক্লোতি কৃপণে ধনং।
কেবলং শৃশতি হস্তেন দিব্য-স্ত্রীমা- যথা নিশি।
(আন্ ক্লীবঃ)
অতি কৃপণেরা কতকগুলি ধন বা অর্থ লইয়া যেমন
বড়ই বিপন্ন হয়, অর্থাৎ তাহারা ধন কাহাকে কিছু দিতেও
পারেনা এবং নিজেও কিছু ভােগ করিতে পারে না কেবল
হন্ত দ্বারা বারম্বার স্পর্শ করে মাত্র, সেইরূপ ক্লীব ব্যক্তি রাত্রি
কালে সুন্দরী যুবতী লইয়া ভােগও করিতে পারেনা, কাহাকে
দিতেও পারেনা, কেবল হস্তদ্বারা (সৰ্বাঙ্গ) স্পর্শ করিয়া
ক্লীবত্ব প্রাপ্তি। ৮১ থাকে এবং উভয়পক্ষে চোর ও লম্পটের ভয়ে রাত্রি জাগরণই সার হয় কারণ দুই পক্ষেরই সর্বদা দুর্ভাবনা বা আশঙ্কা যে, দুষ্ট লােকেরা তাহাদের অবস্থার সন্ধান যেন না পায়। কদভ্যাসে শীঘ্র শী ধ্বজভঙ্গ রােগ হয়, তদ্ব্যতীত অত্যা- শক্তি ঘটিলে পরস্ত্রীগামী বা বেশ্যাগামীদিগেরও এই রােগ হইয়া থাকে বিশেষতঃ মদ্য মাংস ভােজনে রুক্ষদেহা অধিক শক্তিশালিনী ম্লেচ্ছানী বা যবনানী বিজাতীয় বিদেশিনী যেই হউক না কেন তাহাদের সংসর্গ অল্প দিন ঘটিলেও এদেশের দুৰ্বল ও বিরুদ্ধ প্রকৃতির ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয়াদি উচ্চবর্ণের ভদ্র জাতীয় যুবকেরা বিজাতীয় আকর্ষণে অত্যধিক ক্ষয়ে শীঘ্র শীঘ্র ঐ ধ্বজভঙ্গাদি রােগ এবং অন্যান্য কূট রােগ গ্রস্তও হইবেন। বাড়াবাড়ী করিলে স্বীয় স্ত্রীসম্ভোগেও ঐ সকল রােগ এবং প্রমেহ রোগ জন্মিতে পারে সুতরাং সকল স্থলেই অনাচারী বা অমিতাচারী হইলেই বিপদ অবশ্যম্ভাবী, পুরুষের যেমন পাপ উহাও তেমনই গুরুতর দণ্ড হইয়া থাকে। ঐরূপ দুর্দশাগ্রস্ত লােকেরা শীঘ্র শীঘ্র সুচিকিৎসা দ্বারা ঔষধ পথ্য সেবন করিলে এবং বিশেষ সংযমী হইলে রক্ষা পাইতেও পারেন। ধ্বজভঙ্গাদি রােগ জন্য পুরুষত্ব হীন লােককেই প্রায় (বয়স থাকিতেও) বৃদ্ধ বলা যায়। যাহার পুরুষত্ব বিনষ্ট হইয়াছে তাহার পৌরুষ বা পুরুষাকারও প্রায় ঠিক থাকেনা অর্থাৎ উদ্যোগ, উৎসাহ, বিজিগীষা, অনুসন্ধিৎসা প্রভৃতি সদ্গুণ গুলি প্রায় বিলীন হইয়া যায় এবং তৎপরিবর্তে আলস্য দ্বেষ হিংসা প্রতারণা চৌৰ্য্য ও মিথ্যাভাষণ প্রভৃতি তামসিক নীচভাবের প্রাদুর্ভাব ঘটে। .
উত্থানের পথ।
মহাবিদুষী এণিবেশান্ত কোন পুস্তকে বলিয়াছেন, ভারতের
লোক বিশেষ বাঙ্গালী ভদ্রলােকেরা প্রায় পঞ্চাশ বৎসর বয়স,
পূর্ণ না হইতেই পুরুষত্ব বিহীন হইয়া পড়েন, বহু ভােগ বিলাস
ও অনাচার এবং অনাহারই ইহার প্রধান কারণ। পাশ্চাত্যে
যাইট সত্তর বর্ষ বয়সেও কেহ কেহ বিবাহ করিয়া সন্তানের
জনক হইতে দেখা যায়। আমরাও দেখাইতেছি, সদাচারী
নিষ্ঠাবান্ পঞ্চব্রাহ্মণ এবং কায়স্থগণ প্রায় অব্যবহিত বৃদ্ধ বয়সে
আদিশূরের যজ্ঞে আসিয়া এদেশে বিবাহ করিয়া বহুপুত্রের
জনক হইয়াছিলেন, তাহাদের সেই দ্বিতীয় পক্ষের বংশেই এখন
প্রায় বঙ্গদেশ পরিপূর্ণ হইয়াছে।
অদৃশ্য মৈথুন।
মনের মথন কারী বলিয়া মন্মথ এবং মনেই উৎপত্তি বলিয়া
মনসিজ কামের নাম। দেহস্থ বায়ু আশ্রয় করিয়া ক্রোধাগ্নি-
বৎ এই কামাগ্নিরও উদ্ভব হয় এবং এই অদৃশ্য অগ্নিকে
দেহস্থ অদৃশ্য তাড়িৎ শক্তি (বা ইলেটিক পাওয়ারই)
বলা যায়; এসকল কথা স্থানান্তরে বলিয়াছি। আজকাল
অবিবাহিত তরুণ তরুণীর অবাধ মেলা মেশার ফলে
তাঁহাদের বিক্ষুব্ধ ভােগ লালসা দেহাভ্যন্তরে অদৃশ্য কামাগ্নিরূপে
পরিণত হয় এবং তাহার ফলে দেহাভ্যন্তরেই অদৃশ্য মৈথুনবৎ
ঘটিয়া নব্য যুবক যুবতীর অজ্ঞাত ভাবেও কামােমা
সঞ্চিত হইয়া ক্রমশঃ দেহ মনের বিকৃতি ও ক্ষয় হইয়া থাকে,
যেমন ভূগর্ভস্থ অদৃশ্য সঞ্চিত অগ্নির বিপুল তেজে সুস্থির।
ধরণীকে, অস্থির হইতে হয় সেইরূপ অভুক্ত ও অদৃশ্য
কামাগ্নির বেগে মানবের স্বল্প বিশুর মানসিক বিকার ঘটে এবং
। অদৃশ্য মৈথুন। বোধিক্য ঘটিলে মানুষ পাগল ও হইতে পারে, ইহাকেই বােধ হয় কামােন্মদ রােগ বলে এজন্য শিক্ষা ব্যপদেশেও নর এবং নারীর একত্র সমাবেশ নীতিবিগর্হিত কাৰ্য। ইহা বুঝিয়াই মহাত্মা অর্জুনের ন্যায় ব্যক্তিকে ও ক্লীবত্বের পরীক্ষা দিয়া বিরাট রাজার অন্তঃপুরে কুমারীকুলের নৃত্যগীত শিক্ষক হইতে হইয়াছিল। আজকাল এদেশে শিক্ষা ব্যপদেশে তরুণ তরুণীর অবাধ মেলামিশায় অতি আত্মীয়ের মধ্যেও ব্যভিচার ঘটিতেছে সুতরাং সাবধান হওয়া কর্তব্য। সুচরিত্রা নারী বা স্বামী ব্যতীত অন্য পুরুষদ্বারা দশম বর্ষাধিক মহিলাদের শিক্ষা দেওয়া পূর্বোক্ত কারণে প্রায় উচিত নহে। একটি দুর্ঘটনার কথা বলিতেছি। বরাহনগর নিয়োগী-পাড়া নিবাসী শ্ৰীযুক্ত বটুপ্রসাদ বন্দোপাধ্যায় মহাশয়ের উনবিংশ বর্ষ বয়স্ক অবিবাহিত পুত্র বিশ্বনাথ বন্দোপাধ্যায় পল্লীস্থ মেয়ে থিয়েটারে ছয়মাস মাত্র কুমারী কুলের সহিত অবাধ মেলামেশা করায় তাহার কামােন্মাদ রােগ জন্মিয়াছিল। স্বীয় অফিষেই মেয়েদের নাম করিয়া একদিন প্রলাপ বলায় তাহার পিতা সংবাদ পাইয়া তাহাকে বাটীতে আনিয়া বহু চিকিৎসা করাইয়া ছিলেন কিন্তু তথাপি মাসাধিক কাল রােগীর নিদ্রা হইতনা কেবল মেয়েদের নাম করিয়া মধ্যে মধ্যে বিলাপ ও প্রলাপ বকিত। গত তেরশ চল্লিশ সালের ৪টা আষাঢ় রাত্রিশেষে ঐরূপ প্রলাপের অবস্থায় সবেগে নীচে নামিবার সময় সােপানের উপর মুচ্ছিত হইয়া পড়িয়া, স্বল্প কাল মধ্যেই তিনি পঞ্চত্ব প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। এসকল কথা বটুবাবু আমাকে লেখাইয়া দিয়াছেন। দেহ ও মনের উত্থানের পথ। দুর্বলতা সকলের সমান না হইলেও স্বল্প বিস্তর ক্ষতি নিশ্চয়ই হয়, এসকল কথা বহুস্থানে বলিয়াছি। । ব্রহ্মচর্য্যের ফল। পূর্বোক্ত নানাপ্রকারের অবৈধ মৈথুন ব্যাপার পশু-সমাজে থাকায় ও উহার ঋতু ভিন্নকালে সহবাস না করায় এবং পাশবিক শক্তির বলেও মানুষের ন্যায় পশুর নানাবিধ উৎকট রােগভােগ প্রায় করেন এবং প্রায় অকালেও মরে না এবং আমােঘ বীৰ্যতায় একবারেই গর্ভেৎপাদন করে। পশুগণ বনে জঙ্গলে মহা অস্বাস্থ্যকর স্থানে থাকিয়াও কেবল স্বাভাবিক ব্রহ্মচর্য বলেই প্রায় ম্যালেরিয়া কলের প্রভৃতি রােগ হইতে আত্মরক্ষা করিতে পারে, সৰ্ব্বদা আবদ্ধ থাকায় এবং মানুষের সংস্রবেই গবাদি পশুজাতির মধ্যে এখন কোন কোন স্থানে স্বভাবের বিকৃতি ঘটে এবং ক্ষয় রােগাদিও দেখা যায় সুতরাং অত্যাচারী মানুষই সৰ্বজীবের পরম শত্রু। অতএব যুবকগণ বুঝ, তােমরা কেবল অবৈধ মৈথনাদি পাপেই পশুর অধম হইয়া কি সর্বনাশের পথে যাইতেছ। বিবাহিতের ব্রহ্মচর্য্যে মূল পুস্তকে এ সকল কথা বিস্তারিত বলিয়াছি। শীত গ্রীষ্ম বর্ষাদি সমভাবে ভােগ করায় প্রকৃতি সহনেও পশুদিগের, স্বাস্থ্য ভাল থাকে। আদম হবার ন্যায় সৃষ্টির প্রথমে মানুষও বৃক্ষতলে পর্ণকুটীরে বা পৰ্বত গুহায় বাস- এবং বল্কল পরিয়া থাকিয়া যখন পশুবৎ ব্রহ্মচর্য পালন করিত, তখন তাহারা এত রােগী ছিল না কিন্তু পাকা ঘরে বাস করিয়াও বহুবস্ত্র ব্যবহারে এবং নানাপ্রকার - পুষ্টিকর খাদ ব্ৰহ্মচর্যের ফল। পেট ভরিয়া খাইয়াও আমরা রােগাচ্ছন্ন হইতেছি কেবল অযথা ইন্দ্রিয়ভােগ করিয়াই মনে হয়। অতএব যুবকগণ তােমরা ব্রহ্মচারী থাকিয়া পাঞ্চভৌতিক সংঘর্ষণে চাষার ন্যায় বলিষ্ঠ ও সুদৃঢ় দেহ এবং ভদ্রলােকের ন্যায় সূক্ষ্ম বুদ্ধিটী পাইবার চেষ্টা কর। সুপ্রাচীন গান্ধিজীও প্রায় অনাবৃত স্থানেই রাত্রি বাস করেন শুনিয়াছি। পূর্বেও বলিয়াছি এবং পুনশ্চ বলিতেছি যে, প্রথম বয়সে একবার ধন সঞ্চয় যে করিতে পারে তাহার যেমন সুদের লাভে সচ্ছলতায় এবং সচ্ছন্দে সংসার চলে, সেইরূপ প্রথমে ব্ৰহ্মচর্যে দেহ দৃঢ় বলিষ্ঠ করিতে পারিলে সচ্ছন্দে দেহযাত্ৰা নিৰ্বাহ হয় কিঞ্চিৎ অপব্যয়েও আসলে হাত পড়ে না। কিন্তু ক্ষীণেরই ক্ষয় ঘটে, ইহাই ব্রহ্মচর্যের ফল। অপেক্ষাকৃত ব্ৰহ্মচৰ্য্যপালন এবং পাঞ্চভৌতিক শীতাতপাদি সহ করিবার ফলে মানুষের মধ্যেও যথেষ্ট ভেদাভেদ বুঝা যায়। পশ্চিমা ও গুখা প্রভৃতি বিদেশীরা কর্মস্থান হইতে দুই চারি বংস অন্তর দেশে স্ত্রীপুত্রের নিকট গমন করেন ; তাহাদের মধ্যে প্রায় অনেকেই অকৃত্রিম ব্রহ্মচর্য্যপালনে অপেক্ষাকৃত সক্ষম সেজন্য তাঁহারা প্রায় সৎসাহসী ও বিশ্বাসী এবং চরিত্রবান্ হওয়ায় এর বহু টাকা লইয়াও বেড়াইয়া থাকেন। তাহারা পাহাড়ে জঙ্গলে মহামারী ও ম্যালেরিয়া স্থানে ঘাটে মাঠে পথে বাস ও শয়ন করিয়াও সুস্থ থাকেন এবং স্বল্পাহারে বা কদা- হারেও সুস্থদেহে জীবন যাপন করিয়া বিদেশে যথেষ্ট দেন। পাওনা করিতেও ভীত হয়েন না কিন্তু এদেশের বিলাসী বাবুরা প্রায়ই ইন্দ্রিয়াশক্ত বলিয়াই দুর্বলচিত্ত এবং আলস্য পরায়ণ সেজন্য না খাটিয়া কেবল ফাকি দিয়া বিশ্বাস ঘাতকতায় উখানের পথ। কঞ্চিৎ উপার্জনের জন্য লােভী হইয়া দুর্দশাগ্রস্ত ও নিম্ন হইয়া পড়িতেছেন, কেহই আর এজাতিকে বিশ্বাস করেনা কিন্তু বিশ্বাসী ও স্বদেশীর ভাবেই বিদেশীরা এখন যেন বিশেষ মিলিয়া মিশিয়া ( অশিক্ষিত হইয়াও) ক্ৰমশঃ বাঙ্গলার সমস্ত কর্মক্ষেত্র দখল করিতেছেন। এখন বাঙ্গালীরা বিদেশীর অনুকরণে সর্ব- বিষয়ে চলিতে না পারিলে বাঁচিবার পথ নাই, এখন কেবল কলেজের উপাধিতে বৃথা নাম ছাড়া কোন কামই হইবে না। স্বল্পানা-মপি ব্যুনাং সংহতিঃ কাৰ্যসাধিকা। তৃণৈ-গুণত্ব-মাপন্নে বধ্যন্তে মত্তদন্তিনঃ। অতি স্বল্প এবং সামান্য বস্তুরও যে মিলন তাহাও মহৎ, কাৰ্যের সহায়ক হয়, অতি তুচ্ছ যে তৃণ তাহার মুষ্টিমেয় মিলাইয়াই গুণ বা রঞ্জু প্রস্তুত করিতে পারিলে তাহা দ্বারা মত্ত হস্তিকেও অনায়াসে বাঁধিয়া রাখা যায়। লঘূর্ণমপি বনাং (সত্ত্বানাং) সমবায়াে রিপুঞ্জয়ঃ । বর্ষাধারা ধরাে মেঘ-ণৈপি নিবাৰ্যতে। বিষ্ণুশর্মা অতি তুচ্ছ বস্তুরও যদি সমষ্টি বা মিলন ঘটে বা থাকে তাহা হইলে তাহারা প্রবল শক্তকেও নিবারণ করিতে পারে যেমন: অতি লঘু তৃণগুচ্ছ মিলিত (আচ্ছাদন খড়ােচাল) থাকিয়া। মেঘের প্রচণ্ড জলধারাকেও অনায়াসে নিবারণ করিয়া থাকে। অতএব যে সমাজের মানবগণ সুচরিত্রবলে মিলিয়া মিশিয়া : কাৰ্য্য করিতে পারেন তাহারাই জগতে অজেয় ও বড় হয়েন । যুবকগণ ! মহাত্মা গান্ধিজী হরিজনের দলে যাইয়া হীনভাবেও পরদার বা বেশ্যাগমন। ; যাহার অন্বেষণ করিতেছেন, তােমরা সংযমে পরােপকারে ও ঈশ্বর বিশ্বাসে উন্নত চরিত্র হইয়া সর্বাগ্রে সেই একতার জন্যই অভ্যাস বা চেষ্টা কর ; একতায় যৌথ কারবারে অগ্রে অন্তবাণিজ্য অভ্যাস করিয়া পরে বহির্বাণিজ্যে মনােযােগী হও; স্বার্থপরতার জন্য তােমরা স্বদেশবাসী ভাইকে বিশ্বাস করিতে পার না বরং শত্রুতা সাধন কর এবং কেবল দুর্বলতা ও স্বার্থপরতায় সামান্য মিউনিসিপ্যালটিও সুচারুরূপে চালাইতে পারিতেছ না সুতরাং তােমাদের উপর পঁয়ত্রিশ কোটি লােকের কর্তৃত্ব ভগবান্ ( বা রাজা) দিবেন কিরূপে বা কি বুঝিয়া অতএব মহামান্য সুসভ্য ভারত সম্রাটের অনুগত থাকিয়া অগ্রে দেশপ্রেমে একতা এবং যােগ্যতা অর্জন কর , মানুষের মত বিশ্বাসী মানুষ হও; পরে অন্য আশা করিও; নিশ্চয় ফল পাইবে। পরদার বা বেশ্যাগমন। নহীদৃশ-মনায়ুষ্যং লােকে কিঞ্চন বিদ্যতে। যাদৃশং পুরুষহে পরদারাভিমর্ষণং। মনু। সংসারে এইরূপ আয়ুনাশক এবং দুষ্কর্ম প্রায় অন্য কোন প্রকার আর নাই পুরুষের পক্ষে পরন্ত্রী এবং নারীর পক্ষে পর পুরুষ গমন যেরূপ দুৰ্ম্ম। ইহাতে বহু পূর্ব হইতে কাম- চিন্তা নিবন্ধন সঞ্চিত অপরিমিত শুক্রক্ষয় হইতে থাকায় দেহ মন অতি শীঘ্র জীর্ণ শীর্ণ ও দুর্বল এবং রুগ্ন হইয়া পড়ে সেজন্য উহাতে হল অকাল মৃত্যুও সামাজিক ক্ষতিও হইয়া থাকে । যেমন কুঠাদি রােগীর স্পর্শদোষ অপেক্ষা তাহার সংপৃষ্ট অল্প বা জল খাইলে উহার রােগ বীজাণু দেহে অধিক প্রবেশ উত্থানের পথ। করে এবং সেই জাতীয় স্ত্রী বা পুরুষের সঙ্গম ঘটিলে সর্বাপেক্ষা অধিক পরিমাণে এবং অতি শীঘ্রই উভয়কে সেই রােগগ্রস্ত হইতে হয়, সেইরূপ নানাপ্রকার পুরুষের শুক্ৰসংস্রবে দূষিতরক্ত বিষপুত্তলিকা তুল্যা সৰ্ব্বথ: অসদৃশী নীচপ্রবৃত্তিপ্রবলা মলতাও বিশেষ অশুচী বেশ্যাগমনে নিজের এবং ভবিষ্যৎ বংশধৰ পুত্ৰাদির পর্যন্ত স্বাস্থ্য চিরদিনের জন্য বিশেষরূপে বিনষ্ট হইয়া মনেরও বিকৃতি ঘটিয়া যায়। চিকিৎসকেরা বলেন নানা পুরুষের সহিত অতি সম্ভোগে এবং উপদংশাদি রােগ সংস্রবে প্রায় অধিকাংশ বেশ্যারই উপদংশ, বা গৰ্মী, গণােরিয়া বা প্রমেহাদি রােগ,কাহারও বা বাগী প্রভৃতি রােগ জন্মিয়া থাকে সুতরাং তাহাদের সহিত সংস্পর্শে বা সহবাসে যে সেই সকল রােগ শীঘ্র জন্মিবে এবং জীবন ঘণিত হইবে ইহা আর আশ্চৰ্য্য কি? তবে দেহ বিশেষে একটু শীঘ্র বা বিলম্বে কাৰ্য্য ফল ঘটে। সকল জাতির সংবাদের জন্য বেশ্যার জাতি নাই সেজন্য বেশ্যাগামীর ও জাতি তৎক্ষণাৎ নষ্ট হইয়া যায়। নেশা ও বেশ্যা সেবায় চরিত্র বিশেষরূপেই নষ্ট হয়, যাহার চরিত্র নাই তাহার কিছুই নাই, তাহার ইহকাল পরকাল কিছুই থাকেনা। অতএব যাহারা ব্রহ্মচর্য রক্ষায় নিতান্ত অসমর্থ তাহারা সজাতীয়া বয়ঃ কনিষ্ঠা সুলক্ষণা, কন্যাকে বিবাহ করিবেন। গুপ্ত ব্যভিচার ও বিশেষ অনিষ্টকর জানিবে, কোন প্রকারে চরিত্র একবার নষ্ট হইলে উদ্ধার পাওয়া কঠিন। এই সকল কথা মূল পুস্তকে বিস্তারিত আলােচনা করা হইয়াছে। : মাদক সেবন। অনেকের কুসংস্কার আছে যে, পরিমিত মাদক সেবন স্বাস্থ্য- প্রদ কিন্তু তাহা ভ্ৰম, মাদক সেবন অভ্যাস হওয়ায় পৰিশেৰে মাদক সেবন। ১৭ এই লাভ হয় যে, উহা ব্যতীত স্বাস্থ্যরক্ষাই হয় না; উহার প্রধান দোষ কোন কারণে দৈহিক দৌর্বল্যে ব্য বয়সের বৃদ্ধিতে যতই দেহ দুর্বল হয় ( অভ্যাসের ফলে 3) ক্রমেই তত মাত্রা বা পরিমাণ বাড়াইতে হয় কিন্তু কামের নেশা ক্রমে কমে। সামান্য তরল নেশা চা সেবনেও ঘাের আসক্তি ঘটে এবং ক্রমশ ক্ষুধামন্দা হইয়া মরণের পথে অগ্রসর করে, অতিবৃদ্ধেরও আহার থাকিলে লােকে বলে যখন আহার আছে তখন শীগ্র মরিবে না কিন্তু এখনকার চাখোর যুবকেরা শিশুর ন্যায় আহার করেন। বহু কষ্টের পয়সা লক্ষ লক্ষ টাকা বিদেশী চা ব্যবসায়ীকে দিয়া মন্দাগ্নি ও উদরাময়াদি রােগগ্রস্ত এবং মুমুর্ষদশা হওয়ার ন্যায় মূর্খতা কি হইতে পারে, ঐ পয়সায় ছােলা বা গুড় মুড়ী খাইলেও ক্ষুধা নিবারণ ও রক্তবৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্য বৃদ্ধি ঘটে। এদেশে গ্রীষ্মকালে নারিকেল জল এবং পােড়। অস্ত্রের সরবৎও উত্তম পানীয় কিন্তু শীত প্রধান দেশে শীতে দেহ অসাড় হয় বলিয়া উত্তপ্ত জল এবং চা ব্রাণ্ডি ও তামাকের ধুমই প্রয়ােজন। দেশ কাল পাত্রভেদ জ্ঞানও অনুকরণপ্রিয় দাস জাতির নাই। নন্য পর্যন্ত না লইয়াও সুস্থদেহে বৃদ্ধকালেও কোন অসুবিধা আমরা বুঝিনা। দোকানে হােটেলে যক্ষ্মা কুষ্ঠাদি রােগীর লালামিশ্রিত পদোষদুষ্ট ও উচ্ছিষ্ট পাত্রে চা পান এবং অন্নাদি ভােজন করায় উৎকট নানাবােগ ও ক্ষয়রােগের বৃদ্ধি হইতেছে। কাচা দোকা"সেবনে অম্লরােগ, হৃদযন্ত্রের পীড়া এবং উদরাময় ও ঘূণীয়ােগ জন্মিতে পারে। অপেক্ষাকৃত বিষদোৰ নিবারণের “জন্য হুকায় তামাকু সেবন বরং ভাল। সুরাপানে 'ধন মান জ্ঞান শেষে প্রাণ পৰ্য্যন্ত বিনষ্ট হইতে পারে। যেমন প্রতি দীপ- (৯ এ ) ;
উখানের পথ। শিখাকে বা বর্তিকাকে বারম্বার উত্তেজিত করিলে আপাতত ক্ষণিক আলােক বৃদ্ধি হয় বটে কিন্তু উহা কিঞ্চিৎ পরক্ষণেই পূৰ্ব্বাপেক্ষা ক্ষীণজ্যোতি হইয়া পড়ে এবং উহার জীবনীশক্তিরূপ বর্তিকা ক্রমে অত্যধিক পরিমাণে ক্ষয় হওয়ায় ক্ষতি হয়, সেইরূপ মাদকসেবনে রক্ত গরম হইয়া শরীরের যন্ত্রসমূহ ও মস্তিষ্ক বারম্বার উত্তেজিত হইয়া ক্ষণিক ফুৰ্ত্তি বা আনন্দ লাভ ঘটিলেও পরে ক্রমশঃ ঘাের অবসাদ হওয়ায় দীপের বর্তিকার ন্যায় তােমার জীবনীশক্তি ক্ষীণ হইতে হইতে তােমাকে মরণের পথেই লইয়া যায়, উত্তেজনার পরেই অবসাদ স্বাভাবিক নিয়ম। সামায় ফুর্তির জন্য এরূপে মরণে বা উন্মাদবৎ বা জড়বৎ হওয়াই যদি তােমার পরম সুখের কাৰ্য্য হয় তবে জগতে বৃক্ষাদি হওয়া বা উন্মাদ বােগগ্রস্ত হওয়াই প্রার্থনীয় কারণ উহাদের ইহ পরকাল আর নষ্ট হয় না। অতএব এদেশে ঔষধার্থে ব্যবহার ব্যতীত নেশার কোন প্রয়ােজনই নাই। কৈশাের বয়স হইতে একটু কঠোর ব্রহ্মচর্য পালন এবং ব্রহ্মানন্দ ভােগ করিতে পারিলে চিরজীবন অস্কায় এবং তােমার মনে বালকের ন্যায় আনন্দ স্বভাবতঃ সদা উথলিয়া উঠিবে। সাধনার জন্য বা স্বাস্থ্যের জন্য কিম্ব। আনন্দের জন্য নেশা করিতে গিয়া প্রায় সকল লােকই শেষে বেতাল বা নেশাখাের হইয়া যান সেজন্য ঋষিরা ব্ৰহ্মানন্দ ও দাম্পত্যপ্রেমসুখই ভােগ করিতেন। দুর্বলতা জন্য কলিতে “মমদেয়মপেয় মনিগ্রাহং।” নেশাখােরেরা ক্রমশঃ নেশা কমাইলে উহা ত্যাগও নিশ্চয় পারিবেন। সুতরাং সুচরিত্র হও; বৃত্তং যত্নেন সংরক্ষেৎ বিত্ত-মেতি চ যাতি চ। ন ক্ষীণে। বিত্ততঃ ক্ষীণে। বৃত্ততন্তু হতাহতঃ। মনুঃ। }
আৰ্য্য চরিত্র সংগীত।
চরিত্রকে অতি যত্নের সহিত রক্ষা করিবে কারণ বিত্ত
অর্থাৎ ধনহীনকে দরিদ্র বলা যায়না, যেব্যক্তি চরিত্রহীন
সেই যথার্থ সুদরিত্র এবং কপার পাত্র, যেহেতু তাহার দেহ মন
এবং ইহ পরকাল সমস্তই বিনষ্ট হইবার উপক্রম হইয়াছে।
চরিত্রবান্ দরিদ্র থাকিলেও তাহার কোন একটা সময় ধনাগম
হইতে পারে কিন্তু চরিত্রহীনেরা ধন পাইলেও রাখিতে পারে না।
উপাসনার বিশেষ আবশ্যকতা প্রধানতঃ এই চরিত্রের রক্ষার
জন্যই। ভগবান বলিয়াছেন, সুদুরাচার হইলেও সে ব্যক্তি যদি
আমার ভজনা করে তবে সে শীঘ্ৰ ধৰ্মাত্মা সুতরাং সুচরিত্র হইবে।
ভগবানই জীবের সর্বপ্রকারে গতি। গীতা ৯ অঃ ১৮৩০।
ভারতের যখন সুখ সৌভাগ্য উজ্জ্বল ছিল তখন উল্লিখিত
সুপথে চলিয়াই এদেশের মানুষের কত রীত্ব ও কষ্ট সহিষ্ণুতা ছিল
এবং তাহাদের চরিত্র বলও কতদুর উন্নত ছিল, দৃষ্টান্ত স্বরূপে
দুইটি সঙ্গীত এলে উদ্ধত করিয়া দেখান হইল ।
রাগিণী আলেয়া-একতালা।
এই কি সেই হিন্দু স্থান?
যাঁর কীর্তি যশােগান,
গাইতেছে অবিরত
(যত) ভারত পুরাণ।
বরাহনগর নিবাসী সুকবি গঙ্গাচরণ মুখােপাধ্যায়ের
রচিত গান দুইটি হিন্দু বালক বালিকার কণ্ঠস্থ থাকা উচিত।
উত্থানের পথ।
যথা সত্যব্রত করিতে পালন,
প্রাণ সম পুত্রে পিতা দিত বন, (১)
তুষিবারে যথা অতিথির মন,
পুত্রে দিত বলিদান (২)।
(যথা) পিতৃ-প্রিয়কাৰ্য্য করিতে সাধন,
আজন্ম কৌমা পুত্রে কত পণ,
প্রতিজ্ঞা শুনিয়ে স্তব্ধ ত্রিভুবন,
ভীষ্ম শান্তনু-সন্তান (৩)।
(যথা) প্রজার রঞ্জনে ভাৰ্য্যা দিয়ে বন,
সতীশােকে পতি করিত বরাদন,
ধর্মকর্মে জায়া, হলে প্রয়ােজন,
(তবু) সেই মূর্তি নিরমাণ। (৪)
;
(১) রাজা দশরথ বনগমন কথা মুখে স্পষ্ট বলিতে ন
পারিলেও পিতৃবৎসল রামচন্দ্র বাপের হইয়াও সেই পিতারই
সত্যরক্ষার জন্য বনবাসী হইয়াছিলেন। এস্থলে পিতা পুত্র
পরস্পর কি প্রকার সত্যপ্রিয় এবং প্রেমসম্পন্ন ছিলেন; (২) দাতা--
কর্ণ অতিথির জন্য একমাত্র পুত্রকে বলিদান দিয়াও সত্যরক্ষা
এবং অতিথি সেবার পরাকাষ্ঠা দেখাইয়া ছিলেন। (৩) ভীষ্মদেবের
সত্যে এবং আকুমার ব্রক্ষচৰ্যে জগৎ বিমুগ্ধ হইয়াছিল।
(৪) স্বর্ণ সি দ্বারাও সস্ত্রীক হইয়া রামচন্দ্র যজ্ঞ করেন,
কেবল রাজকৰ্ত্তব্য প্রজারঞ্জনের জন্য সম্রাট হইয়াও তিনি ত্যাগের
অসামান্য আদর্শ পুরুষ, সেজন্যই তিনি ঈশ্বর।
আৰ্য্য চরিত্র সংগীত ।
কাতর হইয়া নর-বাহু বলে,
দেবতা দাসত্ব করিত যে স্থলে,
মেঘের গর্জনে কঁপায়ে গগমে,
হানিত হিন্দুরা বাণ (৫)।
বাল্মিকীর বীণা অজস্র ধারায়,
কবিতা অমৃত ঢালিত যথায়,
ব্যাস তপােধন,
(যথা) করিত ভারত গান।
মােহিয়া ভুবন,
(যথা) নিজ-ভ্রাতৃসহ বিমাতৃ-নন্দন,
মায়ার কৌশলে হইলে নিধন,
আছে কি জগতে হেন মহাজন,
যাচে বিমাতৃ-পুত্রের প্রাণ (৬)
(যথা) “পতি অন্ধ’ এই শুনিয়া বচন,
শতবস্ত্রে সতী বাঁধিলা নয়ন,
(৫) রাজা দশরথের সংহারাষ্ট্র ভয়ে শনিগ্রহও ভীত এবং
কাতর হইয়াছিলেন। এক সময় রাবণাদি রাজার পরিচৰ্যাও
স্বর্গের দেবতারা করিতেন।
(৬) যুধিষ্ঠির অগ্রে নকুল সহদেবের প্রাণ প্রার্থনায় ভঁহাদের
মাতামহ কুলের জল পিণ্ডদানের ব্যবস্থা রক্ষা করিয়া বিশেষ
পরার্থপরতা দেখাইয়া ছিলেন।
উথানের পথ।
পতিনিন্দা সুধু শুনে একজন
পিতৃমুখে, ত্যজে প্রাণ (৭)।
(যথা) বালকে সহিয়া যন্ত্রণা অশেষ,
কাতরে ডাকিত ‘কোথা পরমেশ,
অমনি দয়াল হরি ধরি নিজবেশ,
করিতেন অভয় দান (৮)।
গাইতে এগীত চক্ষে আসে জল,
কাঁদে মন প্রাণ হৃদয় বিকল,
গল্পপ্রায় হায় হয়েছে সকল,
(যাহা) ছিল সদ্য বিদ্যমান (৯)।
(৭) গান্ধারী দেবী বলিয়াছিলেন, আমার পতি জগতের
যখন কিছুই দেখিতে পান না তখন আমার পক্ষে কিছু দেখাও
অনুচিত সুতরাং আমিও জগতের সৌন্দৰ্য্য দর্শনে আজীবন
বঞ্চিত থাকিব।
সতীশিরােমণি আদ্যা সতী পিতৃমুখে পতির নিন্দা
মাত্র নিয়া অসহ্য বােধেই দেহ ত্যাগ করিয়াছিলেন, এরূপ সতী
গণের আদর্শ অন্যত্র দেখা যায় না। (৮) ধ্রুব ও প্রহাদ।
(৯) কবির সহিত আমরাও বলিতেছি এসকল কথা স্মরণে
আমাদের বর্তমান দুর্দশায় কঁাদাই উচিত। কখলে দক্ষের
বাটীর চিঃ, মাদ্রাজে প্রহলাদের জন্মস্থান ও নরসিংহ মূর্তি
প্রভৃতির স্থান, এবং রাম ও কৃষ্ণের জন্মস্থান অযােধ্যা মথুরা
প্রভৃতি এখনও সদ্য বিদ্যমান রহিয়াছে সুতরাং গল্প কথা নহে।
আৰ্য্য চরিত্র সংগীত ।
রাগিণী আলেয়া-একতালা।
ভারত হ’ল ছার খার।
আৰ্য্যবংশ ধ্বংস বুঝি হ’লরে এবার,
সােণার ভারত হ’লরে দিনে অন্ধকার।
যে ভারত ভূমি ছিল পুণ্যস্থান,
বিদ্যা বুদ্ধি বলে সবারই প্রধান,
সমস্ত পৃথিবী হ’ত কম্প
নাম মাত্র শুনে যার(১)।
রত্নগর্ভা আঁরে বলিত সকলে,
(যিনি) রত্নাধিক পুত্ৰ ধরিতেন কোলে,
আজ কিনা তিনি ভাসেন অশ্রুজলে,
কোলে করে কুলাঙ্গার।
দেবাসুরে স্বর্গে হইলেরে রণ, ,
দেবতারা যার লইত শরণ,
সাহায্য করিত আৰ্যসুত গণ (২)।
নাহিরে সেদিন আর।
.
: (১) পূর্বে প্রায় প্রত্যেক চন্দ্র সূৰ্য্যবংশীয় রাজাদের স্বদেশে
এবং ভারতের বাহিরেও দিবিজয়ের ভয়ে লোক কম্পিত হইত।
অদ্যাপি সুদূর আফ্রিকা, মিসর এক আমেরিকার বলিভিয়া
প্রভৃতি স্থানেও আৰ্যকীর্তির চিহ্ন বহু মনিয়াদি দেখা যায়।
(২) রাজা দশরথ সখা ইন্দ্রের সাহায্যার্থ স্বর্গে অরদিগের
সহিত যুদ্ধে ক্ষতদেহ হওয়ায় রাণী কৈকেয়ীর ষায় এবং
উত্থানের পথ।
ভারতের ভাগ্যে সব বিপরীত,
(এখন) দেবেও ভুলেছে পূর্বের পীরিত,
বরুণ পবন আদি দেবগণ করে কত অত্যাচার।
কোথ। ভীষ্ম দ্রোণ কোথা কবীর,
(আজ) কোথা হরিশ্চন্দ্র কোথা যুধিষ্ঠির,
কোথ। কালিদাস বরাহ মিহির,
নরে দেব অবতার।
কোথা সে সাবিত্রী কোথা সীতা সতী,
(আজ) কোথ। বিদ্যাবতী খনা লীলাবতী,
কোথা সে পদ্মিনী কোথা দুর্গাবতী,
ভারতেরই কণ্ঠহার।
(এখন) গেছে ভারতের সে সব সন্তান,
স্বর্ণপ্রসূ ভারত (আজ) হয়েছে শ্মশান,
কারে কব দুঃখ, বিধাতা বিমুখ,
কে করিবে প্রতিকার।
।
আরোগ্য লাভে তুষ্ট হইয়া দুইটি বরদানে প্রতিশ্রুত হইয়াছিলেন।
মহাত্মা অৰ্জুনও স্বর্গে যাইয়া যুদ্ধ করিয়াছিলেন। কাবাহার
অতদূর না হউক বা না পায় কিন্তু সেই ভারতে জমিয়া তাের
এখন বিপরীত পথে অমানুষ হইতেছ কেন, “উখানে পশ”
পুনশ্চ উচ্চ আদর্শ মনুষ্যত্বের চেষ্টাও ত করতে পার।
শ্রীকৃষ্ণ চরিত্র (সংক্ষেপ)। প্ৰেমৰ সম্যক জানিতে হইলে সেই প্রেমময় এবং নাটের গুরু নটবরকে জানিতে হয়, তাহার করুণা ব্যতীত প্রেমিক হওয়া বা প্রেমের স্থায়ীত্ব রক্ষা করা সম্ভব হয় না। এখনকার অধিকাংশ অর্ধশিক্ষিত বা সুশিক্ষিত ( গ্রাজুয়েট ) নাম ধারী ভায়াদের মধ্যে যাহারা ভগবৎ ভাব বা প্রেমতত্বের বিশেষ কথা বুঝেন না এবং কৃষ্ণ চরিত্র সম্বন্ধে অশ্লীলভাবে সন্দিগ্ধ চিত্ত বা বিরুদ্ধবাদী সেই সুকুমার মতি কিশাের বা যুবক হিন্দু সন্তানদিগকে বুঝাইবার জন্য আবশ্যক বােধে অলৌকিক কৃষ্ণ কথা এখানে কিছু লৌকিক ভাবে আলােচনা করা হইল। যেমন গঙ্গা যমুন। প্রভৃতি নদীর নাম লােকে জানে সেইরূপ মথুরা বৃন্দাবন শ্রীকৃষ্ণের লীলা খেলার স্থান এবং জন্মস্থান বলিয়াই লােকে চিনে। গােবর্ধন পৰ্বত, কালীয় হ্রদ প্রভৃতি লীলা খেলার স্থানগুলি চির প্রসিদ্ধ হইয়া এখনও ইহার সাক্ষ্য দিতেছে। ঈশ্বর যদ্যপি হন মেরীর তনয়। ঘােযের তনয়ত দোষের নয়। গুপ্ত কবি। মেরীর তনয় যিশুখৃষ্টও যখন ঈশ্বরের পুত্র অথচ কুমারীর ছেলে হইয়াও অর্ধপৃথিবী ব্যাপিয়া ভক্তদ্বারা বিখ্যাত ও সম্মানিত এবং যাহার জন্ম কৰ্ম্ম অস্বাভাবিক ও অদ্ভুত, তখন স্বয়ং ভগবান্ শ্রীকৃষ্ণ রূপে দেবকীর দেহাবলম্বনে ক্ষণকাল মধ্যে জন্মিয়া এবং পুতনা বধাদি কাৰ্য্য দ্বারা প্রকট হওয়া ইত্যাদি শাস্ত্রীয় কথা আমাদের দোষাবহ বা সন্দেহ জনক হইতে পারেনা। যেমন অরণি কাষ্ট খ উত্থানের পথ। মধ্য হইতে অগ্নির উৎপত্তি হয় সেইপ্রকার দেবকী দেবীর দেহ মন হইতে অযযানিজ শ্রীকৃষ্ণের জন্মগ্রহণ হইয়াছিল। বহু ভক্ত বৈষ্ণব কবি এবং আধুনিক সুশিক্ষিত অমীয় নিমাই চরিত প্রণেতা শিশির কুমার ঘোষ এবং বঙ্কিম বাবু প্রভৃতি পণ্ডিত- গণ যে মহাপ্রভুকে অবতার এবং মহাত্যাগী বলিয়াই বর্ণনা করিয়াছেন, সেই মহা সন্ন্যাসী চৈতন্যদেব চিরজীবন হা কৃষ্ণ । হা কৃষ্ণ ! কাহা কৃষ্ণ কঁহা বৃন্দাবন বলিয়া কত বিলাপ ও রােদন করিয়াছিলেন। অকুমার ব্রহ্মচারী ভীষ্মদেব এবং শুকদেব গােস্বামী প্রভৃতি মহাপুরুষেরাও যে শ্রীকৃষ্ণকে পূর্ণ ব্ৰহ্ম সনাতন বলিয়াই স্বীকার করিয়াছেন। যিনি দুই পাঁচ দিন গুরু মহাশয়ের পাঠশালায় যাইয়া এবং বহুদিন রাখালি করিয়া অর্থাৎ না পড়িয়া পণ্ডিত হইয়াও সৰ্ব্বশাস্ত্রের সারগ্রন্থ গীতা প্রভৃতি শাস্ত্রের প্রবক্তা এবং মহাপণ্ডিত বলিয়া গণ্য হইয়াছিলেন। যিনি সপ্তম বৎসরের শৈশব অবস্থায় বস্ত্রহরণ এবং অষ্টম বৎসর বয়স হইতে একাদশ বর্ষ পৰ্যন্ত পোগণ্ড বয়সেই যুবজনাে- চিত অস্বাভাবিক ভাবে কাম গন্ধবিহীন রাসলীলাদি করিয়া- ছিলেন। যে শিশুর স্বর্গীয় প্রেমবর্ধক বংশীধ্বনি শ্রবণে গোপ বধুরা অধৈৰ্য্যভাবে কূল শীল লজ্জা মান ত্যাগ করিয়াছিলেন । রাস লীলার রাত্রে পতি পুত্রের বাধায় যে শিশু নাগরের নিকট যাইতে না পারিয়া তাহাকেই পতি ভাবিতে ভাবিতে বহু গােপিনী স্বগৃহেই জীবন ত্যাগ করিয়াছিলেন। যে রাসলীল। বর্ণনার প্রথমেই “কাম গন্ধ বিবর্জিতঃ।” কামগন্ধ বিহীন লীলা বলিয়া এবং “কৃষ্ণস্তু ভগবান্ স্বয়ং” বলিয়া "ব্যাপাে নারায়ণ স্বয়ং।” ব্যাসদেব বলিয়াছেন।
শ্রীকৃষ্ণ চরিত্র। প সেই অদ্ভুত চরিত্র বালকের এই সকল অলৌকিক কাণ্ড দেখিয়া আপনারা প্রেম না কাম কি বলিবেন? এই শ্রীকৃষ্ণের দ্বারকায় বহু স্ত্রীতে বহু সন্তান জন্মিয়াছিল, আবার স্ববংশের সহিত যদুবংশ ধ্বংস ও তিনি স্বেচ্ছায় করিয়াছিলেন। তাহারই কৌশলে ভারত যুদ্ধে অষ্টাদশ অক্ষৌহিণী বীর ধ্বংশ হইয়াছিল, মহাপ্রতাপী বীরবর কংস শিশুপাল বিনা যুদ্ধেই ( দর্শন স্পর্শনে) মরিয়াছিল। এসকল ব্যাপার ঈশ্বর ব্যতীত অন্য সম্ভব হয় কি? যদি আমাদের এই সকল প্রত্যক্ষ প্রায় ঐতিহাসিক শাস্ত্রীয় ঘটনা তােমরা না মান বা বিশ্বাস না কর; তাহা হইলে ইতিহাস প্রসিদ্ধ মহাপুরুষ- গণের এবং যিশুখ্রষ্ট প্রভৃতির কীর্তি কলাপের কথাই বা আমরা মানিব কেন? আধুনিক ভক্ত পণ্ডিত এবং বাগ্মীপ্রবর ও সাধক কেশব চন্দ্র সেন এবং বিজয়কৃষ্ণ গােস্বামী প্রভৃতি নিরাকার বাদী প্রসিদ্ধ ব্রাহ্ম নেতাগণও শেষজীবনে যে রাধা কৃষ্ণের প্রেমে মুগ্ধ হইয়া হরি নাম সঙ্কীর্তনে মূৰ্ছিত হইয়া পড়িতেন এবং প্রসিদ্ধ দেশনেতা সি, আর দাস এবং মতিলাল নেহরু যে হরি নাম এবং রাম নাম অন্তিমকালে উচ্চারণ করিয়া জীবন ত্যাগ করিয়াছিলেন, সেই রাম ও কৃষ্ণকে ভারতেরই “মানুষ অথচ ভগবান্” এখন তােমরা না বলিতে পারিবে কি যে ভগবান্ আমাদের ( জীবের) সুখের জন্য ষড়ঋতুর করিয়া সময়ােচিত ফল ফুল ভােক্ষ্য ভােজ্য আলাে বাতাস দানে নিয়ত সেব! দ্বারা সুখী করিতেছেন, সেই ঈশ্বর জীবশ্রেষ্ঠ মানবকে সৰ্বসুখের সামগ্রী বা অপূৰ্ব বস্তু প্রেমামৃত বিতরণার্থ ভূভার হরণ ছলে ( মানুষ ভগবান্ হইয়া) স্বয়ং রাধা কৃষ্ণ মূর্তিতে ভূতলে ?
উখাঁনের পথ। লীলা করিয়া গিয়াছিলেন কিন্তু কালক্রমে আমরা সেই লীলা খেলার প্রেমামৃত রসাস্বাদন ভুলিয়া গিয়া নিষ্ঠুর কাপালিক সংসর্গে এবং দার্শনিক বিজ্ঞান চর্চায় শুষ্ক হৃদয় হইয়া পড়িয়াছিলাম, তদ্দর্শনে দয়াময় হরি পুনশ্চ গৌরহরি হইয়া কিম্বা গৌর হরিকে পাঠাইয়া, বহু পল্লীর দ্বারে দ্বারে প্রেমাবতার মূর্তিতে মহাপণ্ডিত হইতে মূখ পর্যন্ত আচাণ্ডাল সৰ্বমানবকে প্রেমশিক্ষা দিয়া গিয়াছেন। ওগো! সেই গৌরচন্দ্র আমাদের বড়ই আপনার জন ছিলেন তিনি বাঙ্গালী ব্রাহ্মণের ও আমাদেরই ঘরের ছেলে, তাহার সুধামাখা হরি নাম সংস্কীৰ্ত্তন একমাত্র বাঙ্গলা ভাষার এবং বাঙ্গালীর নিজস্ব এবং সর্বশ্রেষ্ঠ সম্পত্তি। এই কীর্তনের ভাষা যাহার না বুঝে তাহারাও ইহা শুনিলে নাচে কঁদে এবং আকুল হৃদয়ে গলিয়া পড়ে। কিছু দিন পূর্বে পানিহাটীর উৎসবে সাহেবকেও নাচিতে দেখা গিয়াছে, সেই আমেরিকান্ সাহেব বলিয়া গিয়াছেন যে, আমরা বিপুল ঐশ্বৰ্য্যভােগ এবং জলে স্থলে শুন্যে মেরুদেশে যথেচ্ছা বিচরণাদি করিয়াও এরূপ সুখ সম্ভোগ কখন করিতে পাই নাই, আজ কীৰ্ত্তনানন্দে যে সুখ ঘটিল। তােমরা বিদেশী শিক্ষা দীক্ষায় যতই কঠোর নাস্তিক পাষাণ হৃদয় হও; একবার এই কীৰ্ত্তন যজ্ঞে যােগ দিয়া দেখ ; প্রেম বেগে তােমাদের হৃদয় প্লাবিত হইয়া যাইবে, নয়নের জল নয়নে আর রাখিতে পারিবেনা। ওগাে! এই গৌর চন্দ্র আমাদের অশিক্ষিত ভক্ত ছিলেন না, তৎকালিক ভারতের সর্বদেশের দার্শনিক দিগ্বিজয়ী প্রসিদ্ধ পণ্ডিতেরা তাহার নিকট বিচারে পরাস্ত হইয়া তাহার পদাবনত এবং মহাভক্ত শিষ্য হইয়াছিলেন। মহাপ্রভু বর্ণাশ্রম ধৰ্ম্মকে শ্রীকৃষ্ণ চরিত্র। সম্পূর্ণরূপে রক্ষা করিয়াছিলেন, তিনি বহুকষ্টে বহুদুরে যাহাকে দেখিতে মাদ্রাজে গিয়াছিলেন সেই কায়স্থ কুলতিলক গােদাবরী তীরবাসী মহাভক্ত রামানন্দ রায়ের বাটীতেও অন্নজল গ্রহণ তিনি করেন নাই। মহাপ্রভু ভাগবত শাস্ত্রকে সর্বশ্রেষ্ঠ ভক্তিশাস্ত্র বলিয়া এবং শ্রীকৃষ্ণকে পূর্ণ ব্ৰহ্ম বলিয়াই জগতে প্রচার করিয়া গিয়াছেন; তিনিই মহা ঘণবনাবৃত লুপ্তপ্রায় শ্রীবৃন্দাবনকে মহাতীর্থে প্ৰকট করিয়া গিয়াছেন। এখন তােমরা বুঝ ; এই দেশের এই ভাগবৎ প্রেম হৃদয়ে ধারণ করিয়া, দেশপ্রেম, দাম্পত্য- প্রেম ও জীবপ্রেম প্রভৃতি প্রেমের পথে সংসার করা সুখের হইবে; অথবা রুশিয়ার মতে ভগবান্ বয়কট করিয়া, সেদেশের সাইবে- রিয়া মরুর ন্যায় মরুময় হৃদয়ে সংসার কর। সুখের হইবে। তােমরাত অনেক পড়িয়াছ একবার ভক্তিভাবে ভাল করিয়া শ্ৰীমদ ভাগবত এবং গীতা গ্রন্থ সৎগুরুর নিকট হইতে কিছুকাল পড়িয়া দেখ ; এই শ্রীকৃষ্ণকে আমরা অন্ধ বিশ্বাস করিতেও বলিতেছিনা, দার্শনিক ভাবে বুঝিতে চাহিলেশু শ্ৰীজীব গােস্বামী কৃত ষট সন্দর্ভ প্রভৃতি একাধারে জ্ঞান ভক্তির পুস্তক এবং শ্রীরূপ সনাতনের দার্শনিক ভক্তির পুস্তক গুলি দেখুন। এই শ্রীকৃষ্ণকে তােমাদের ঈশ্বর বলিয়া স্বীকার করা বােধ হয় এখন বিশেষ ( দুভাগ্য না হইলে ) বাধা হইবে না। আমাদের ভাগ্য ক্রমে সেই ভগবান্ শ্রীকৃষ্ণ এদেশে এক এক সময় নানাভাবে আমাদের সহিত কত প্রকার লীলা খেলাও করিয়াছিলেন। ওগাে তিনি এখানে রথের সারথ্য এবং রাখালি পৰ্যন্ত করিয়া এবং এদেশের মানুষকে মাত। পিতা ভ্রাত। বলিয়া আমাদের সৌভাগ্য কত বৃদ্ধি করিয়া গিয়াছেন এবং কত ভাল ;
s
উত্থানের পথ।
বাসিয়া এদেশে পুনঃ পুনঃ ছােট বড় অসংখ্য অবতার হইয়া
স্বয়ং আসিয়াছেন কিন্তু অন্য দেশে কেবল প্রতিনিধি পুত্র
যিশুখ্রীষ্টকে এবং বন্ধু (দোস্ত) মহম্মদকে এক একবার মাত্র
পাঠাইয়াছিলেন। ওগো! আমরা সেই শ্রীকৃষ্ণেরই তাৎকালিক
লীলার সহচরদিগের বংশধর সুতরাং বিশেষ আত্মীয় হইয়াও
তাহাকে ভুলিয়া এখন একেবারে আমরা হতভাগ্য হইয়াছি।
এখন তােমরা মানুষের রচিত বিরুদ্ধ গ্রন্থের বা পাণ্ডিত্যের
বাজে তর্ক বিতর্ক কথা ছাড়িয়া সাক্ষাৎ সেই শ্রীকৃষ্ণ ঈশ্বরের
বাক্য গীতা বাক্যই শিরােধার্য কর ; উহাতে সব পাইবে
এবং ঐ বৃন্দাবন চন্দ্র ও নবদ্বীপ চন্দ্রের প্রদর্শিত প্রেম
ভক্তির আদর্শ পথে “গৌর হরি বােল, হরি হরি বােল”
বলিয়া আচাণ্ডাল মানবকে আলিঙ্গন কর, তাহা হইলে ক্রমশ
“প্রাণের মিলনে একতা” জন্মিবে। (এই প্রবন্ধ মৎ প্রণীত
বৃহৎ হিন্দু-নিত্যকর্মে দেখ ; উহাতে সপ্রমাণ লিখিয়াছি,
হরি সংকীৰ্ত্তনে কোনরূপ স্পর্শদোষ নাই)।
এই কৃষ্ণের কাৰ্য বড়ই অদ্ভুত ছিল তাঁহার
মিত্র বা ভক্ত অপেক্ষা শত্রুর প্রতিই যেন দয়া কিছু অধিক
দেখা যায়, বহু সহস্র বৎসরের তপস্যার ফল পাইলেও তাহার
মাতা পিতা আত্মীয় স্বজন এবং গােপ গােপিনীরা আজীবন
অনেক কঁদিয়া কঁাদিয়া পরিশেষে মুক্তি লাভ করিয়াছিলেন
বটে কিন্তু পুতনা হইতে কংস শিশুপাল পর্যন্ত শক্তবর্গ
হিংসার জন্য ক্রোধরক্ত নেত্রে (ভগবৎ স্পর্শ মাত্রেই )
মুক্তিলাভ করিয়াছিলেন, কারণ ভগবদ্বস্তু জলদগ্নিবৎ বিষ্ঠা চন্দন
যাহাই হউক অগ্নি স্পর্শেই অবিচারে ভস্ম হইয়া থাকে।
শ্রীকৃষ্ণ চরিত্র।
IS
শয়নে স্বপনে
আরও আশ্চাৰ্য, এই কলিতে যাগ যজ্ঞের প্রয়ােজন নাই,
ভক্ত অভক্ত যেই হও আমাদের ঠাকুর সেই কৃষ্ণ নামের
উচ্চারণ গুণেই মুক্তি পাইবে, নামেই অভক্ত লােক আপন
আপনিই ভক্ত হইয়া যাইবে। নাম করাও কঠিন কাৰ্য্য নহে
“মধুর মধুর-মেতৎ মঙ্গলং মঙ্গলানাং।”
এই নাম মধুর
হইতেও বড়ই সুমধুর এবং সকল প্রকার মঙ্গল অপেক্ষাও
অতি মঙ্গল জনক, তাই রাধারাণী বলিয়াছিলেন, “নাজানি
কতেক মধু শ্যাম নামে আছে গাে, বদন ছাড়িতে নাহি পারে।”
অতএব তােমরা এক কাৰ্য কর, কেহ জানিবেনা এবং
( গ্রাজুয়েট দলে ) মানহানিও হইবে না,
জাগরণে ঐ কৃষ্ণ নাম মনে মনে বলিয়া দেখ ; তােমাদের
মন শীঘ্র শীঘ্র বুঝিবে নামের কি মহিমা এবং নামে কত
মধু ঢালা আছে।
শ্ৰীমতী রাধারাণী প্রভৃতি হইতে অন্যান্য সকল ভক্তগণই
শ্রীভগবানকে পাইবার জন্য এত ব্যাকুল কেন জান? ইহার
উত্তরে বুঝা যায় যে, জীবমাত্রেই খণ্ড বা অপূর্ণা (শক্তি বা
প্রকৃতি, একমাত্র তিনিই সর্বশক্তিমান্ মহান্ পুরুষােত্তম সেজন্য
সকল খণ্ড প্রকৃতিই সেই মহাশক্তিশালী ও পূর্ণতম পুরুষে
মিলিতে বা মিশিতে চায়। যেমন সমুদ্র হইতে জল কণিকা
বাস্পরূপে আকাশমার্গে শূন্যে সৰ্বত্ৰ ভ্ৰমণ করিয়াও বৃষ্টিরূপে
ভূপতিত হইবামাত্রই নদীপথে পুনশ্চ সেই উৎপত্তি স্থান
মহাসমুদ্রে যাইবার জন্য ব্যাকুলভাবে দ্রুতগতিতে সাগর মুখে
ছুটতে থাকে, যেরূপ পিঞ্জরাবদ্ধ পশু ও পক্ষীগণ ( নানা
সুস্বাদু খাদ্য ও ফল জল খাইতে পাইলেও) জন্মস্থান বনপর্বত ?
উখানের পথ বা বৃক্ষকোটরে যাইবার জন্য সর্বদা পিঞ্জরের প্রত্যেক দ্বারে দ্বারে বহির্গমনের চেষ্টা করিতে থাকে, মুমুক্ষু মানব জাতিও সেই প্রকার স্বভাবেই উৎপত্তি স্থান সেই মহান্ ব্ৰহ্ম বা ভগবানে আত্ম সমর্পণ করিয়া নিৰ্ব্বাণ মুক্তি লাভ করিতে বা মিলিতে মিশিতে পারিলেই কৃতাৰ্থ বােধ করিয়া থাকে, উহাই মানবের পরমার্থ। মানব সেই মুক্তির বা প্রেমের পথ ভুলিয়া কামনা- পিঞ্জর এই সংসারে বদ্ধ হইলেই নানা অশান্তি ভােগ করে এবং ছট ফট করিয়া বেড়ায় মানব কেবল সৰ্ব্বদা সুখেরই অন্বেষণ করে বটে কিন্তু সংসারের ক্ষণিক বা খণ্ড সুখে সে পরিতৃপ্ত হয় না, তাই চিরসুখময় ভগবাকে পাইবার পথ শ্ৰীমতী রাধারাণী প্রমুখ ভক্তবৃন্দ প্রেমভক্তির পথে দেখাইয়া শিক্ষা দিয়া গিয়াছেন। প্রেমভক্তির পথই সৰ্বশ্রেষ্ঠ পথ অথচ নীচাধম ব্যক্তিও এই পথের অধিকারী। নিরাকার বাদীরা কি জ্ঞানমার্গের লােকেরা যে ভগবান্কে বহুকষ্টেও ধ্যান ধারণায় আয়ত্ত করিতে পারেন না, সেই সূক্ষ্মতম বস্তুকে চিৎঘণ শ্যামসুন্দর মূর্তিতে পাওয়ায় একবার ভাবিয়া দেখ ; আমাদের ভাগ্য তখন কত উজ্জল হইয়াছিল, ওগো ! আমাদের মত অন্যান্য কোন দেশের লােক এরূপ ভাবে সেই (পুর্ণব্রহ্ম সনাতন) মানুষ ভগবানকে কোলে পীঠে করা, দান করা এবং ভাই বন্ধু পতি বনিবার ভাগ্য পাইয়াছিল কি ? ভাব ভক্তি বিহীন চিনির বলদ আমি সাকার নিরাকারের কোন তত্ত্বই বুঝি না কিন্তু মহাযােগী সূক্ষ্মদর্শী ঋসিরাই শ্রীকৃষ্ণকে পুনঃ পুনঃ পুর্ণব্রহ্ম সনাতন বলিয়াছেন। গুন শ্রীকৃষ্ণ চরিত্র। যল্লব্ধ। নাপরং লাভং মন্ততে নাধিকং ততঃ। যস্মিন্ স্থিতে ন দুঃখেন গুরুণাপি বিচাল্যতে । গীতা। যে ভগবানকে পাইলে জগতের মধ্যে অপর কোন বস্তুর লাভকেই তােমার আর অধিক লাভ বলিয়া মনেই হইবে না এবং যাহাতে (আত্মরূপে ) মন অবস্থিত হইলে অতি গুরুতর দুঃখেও তােমার মন বিচলিত হইবে না, শ্ৰীকৃষ্ণই সেই একমাত্র পরমাত্মা ভগবান্। অতএব তঁাহার ভজনায় জীব তােমার কত লাভ বুঝিয়া দেখ ? ভগবানকে (ভজিলে বা) পাইলে কামিনী কাঞ্চন ভােগের নেশা তােমার একেবারে বিনষ্ট হইয়া যাইবে সুতরাং তখন জীবন্মুক্তও হইতে পারিবে। সেই পরমাত্মা ভগবান্ শ্রীকৃষ্ণের অনুপমরূপ ও সৌন্দৰ্য- রাশি ভক্তি ভাবে দিব্য চক্ষে দেখিতে পাইয়াই শ্ৰীমতী রাধারাণী তাহার জন্য এতই প্রেমের কাঙ্গালিনী ও উন্মাদিনী হইয়াছিলেন। ভগবৎ কৃপায় মহাবীর ও মহাভক্ত অৰ্জ্জুন একদিন মাত্র কেবল বিরাট মূর্তি দিব্য চক্ষুতে দেখিতে পাইয়াছিলেন। ভক্ত ব্যতীত তাঁহার প্রকৃত রূপ অভক্ত দেখিতে পায় না এবং দিব্যকর্ণ পাইলে তাঁহার বংশী ধ্বনিও শুনিতে পায় না সেজন্য কংস শিশুপাল শ্রীকৃষ্ণকে কেবল প্রকাশ্য নন্দ ঘােষের পুত্র বলিয়া বুঝিয়াছিলেন, তােমরা কি সেই অসুরের দল ছাড়িয়া এখন একবার এই দুর্দিনে মনে প্রাণে ভক্তের দলে আসিবে না। এইরূপ মায়ের রূপ দেখিবার জন্যই ঋষি শ্রীশ্রীচণ্ডীতে বারম্বার প্রার্থনা করিয়া বলিয়াছিলেন। রূপং দেহি জয়ং দেহি যশাে দেহি দ্বিষাে জহি।” মা ! যেরূপ দেখিলে আমাদের এ উত্থানের পথ। আর কোনরূপ দেখিতে ইচ্ছা হইবে না, রূপপিপাসা চিরদিনের জন্য মিটিয়া যাইবে। যেরূপের সৌন্দৰ্য্যচ্ছটা দর্শনে, সুকুমার কুমারের মুখ কিম্বা পরমা সুন্দরী যুবতী নারীর মুখ সুষমা অতি তুচ্ছ বলিয়া মনে হইবে, সেই পরম সুন্দর তােমার আত্মরূপ একবার দিব্য দৃষ্টিতে আমাকে দেখাইয়া রূপদর্শন লালসা আমার চিরদিনের জন্য পরিতৃপ্তি কর। জয়ং দেহি যশাে দেহি দ্বিষো জহি ইত্যাদির ব্যাখ্যা মৎপ্রণীত শ্ৰচণ্ডীর অর্গলা কীলকাদির ব্যাখ্যায় ঐ সকল কথা দেখুন । উপাসনার আবশ্যকতা। শ্রীকৃষ্ণকে কেবল ভগবান বলিয়া জানিলেই তােমার কাৰ্য্য হইবে না। প্রত্যহ ত্রিসন্ধ্যা তাহার উপাসনা এবং তাহার নিকট প্রার্থনা করা প্রয়ােজন, নচেৎ তাহাকে ভুলিয়া ৰাইবে, তাহাকে ভুলিলেই তুমি কাম ক্রোধাদি ইন্দ্রিয়বর্গের প্ররােচনায় মোহ সাগরে ডুবিয়া ইহকালে পরকালে বহু দুঃখ কষ্ট পাইবে। যেমন প্রত্যহ বারম্বার পান ভােজন দ্বারা তােমার স্কুল দেহের (পঞ্চভূত আমির) পুষ্টির জন্য চেষ্টা করা হয় সেই প্রকার উপাসনা দ্বারা চৈতন্য শক্তিকে প্রকৃত বা খাঁটি আমিকে) পরিপুষ্ট অর্থাৎ উদ্বুদ্ধ করা বা জাগাইয়া ভােলাও তােমার বিশেষ প্রয়ােজন। সৰ্ব্বতেজের আধার প্রত্যক্ষ ভগবান্ মূর্তি সূর্যদেবের ( সেই ভগাখ্য) তেজের বা চিৎশক্তির বারম্বার ভারূপ উপাসনা করিলেই ক্রমশঃ তােমার এই জড়-চৈতন্য মিশ্রিত দেহের জড়ত্বের হ্রাস এবং চেতনার বৃদ্ধি ঘটে, অর্থাৎ তােমার
উপাসনার আবশ্যকতা।
সূক্ষ্ম বা প্রকৃত আমির পরিপুষ্টি ঘটে।
ঈশ্বরের প্রতিমূর্তি
এই মানুষ সােহহং জ্ঞানে তন্ময় হইয়া উপাসনা দ্বার। ইচ্ছা
করিলে তিনি ক্রমশঃ চৈতন্যময় হইয়া ঈশ্বরত্ব লাভও করিতে
গারেন, পুনশ্চ ঈশ্বরকে ভুলিয় ইন্দ্রিয়ের প্ররোচনায় কামনা
বশে ভােগ্য বিষয় (জড়বস্তু) সকল ভাবিতে ভাবিতে ক্রমশ
তিনি জড়ভাবাপন্ন বা নরকের কীট ও হইতে পারেন। এই
উপাসনার শক্তি বা অধিকার জীবের মধ্যে কেবল মানবেরই
আছে। অতএব মানব জন্ম পাইয়া ভগবানকে ভুলিয়া তাহাকে
ডাকিলে তােমার মানবত্ব থাকে না এবং জন্মান্তরে পুনশ্চ
মানুষ না হইয়া বাক্শক্তি হীন পশু পক্ষী জন্ম লাভ হওয়াই
তােমার সম্ভব হয় এজন্য সকল মানবেরই উপাসনা করা প্রত্যহ
নিতান্ত কর্তব্য। ব্রাহ্মণ জাতি অধিকতর ঈশ্বর পরায়ণ ছিলেন।
সেজন্য, তাহারা ঐশী শক্তি সম্পন্ন হইয়াছিলেন তাহা দেখিয়া
তাঁহাকে লােকে ঠাকুর বলিয়া ডাকিত ও প্রণাম করিত।
যেমন গে। শরীরে ঘৃত থাকিলেও তাহা দ্বারা সেই গরুর
দেহ পুষ্ট হয় না সেইরূপ হৃদয়স্থ ঈশ্বরের উপাসনা ব্যতীত
তােমার হিত সাধন হয় না।
এক অগ্নি বা ব্রহ্মের তেজ তিনি অগ্নিমূর্তি, সূৰ্য্যমূৰ্ত্তি এবং
বিদ্যুৎমূৰ্ত্তি এই তিন মূর্তিতে (পরিবর্তিত হইয়া) জগৎ পালন
করিয়া থাকেন । আমাদের দেহে বিদ্যুৎ বা তাড়িৎমূর্তি
সূৰ্য্যাত্মন।
* একোহগ্নি-ন্ত্ৰিধ। ব্যবৰ্ত্ততে। অগ্ন্যাত্মনা
বিদ্যুদাত্মনা চেতি। হােমে গুণবিষ্ণুঃ।
যচ্চন্দ্র-মসি যশ্চাগ্নৌ তভেজে। বিদ্ধি মামকং ।
অহং বৈশ্বানররা ভূলা প্রাণীনাং দেহ-মাশ্রিত।
উখানের পথ। রূপেও ( আত্মা বা) ঈশ্বর অবস্থান করিতেছেন। এই তাড়িৎ শক্তিই চেতনা বা চৈতন্য, ইহাই চিৎশক্তি রূপে আমাদের দেহাভ্যন্তরে অঙ্গ প্রত্যঙ্গাদি পরিচালনা করিয়া থাকেন, এই বিদ্যুৎ বা তাড়িদগ্নিই অদৃশ্য উষ্ম এবং জঠরাগ্নি রূপে তােক্ষ্য দ্রব্য পরিপাক করেন দেহস্থ পঞ্চবায়ুও ঐ অগ্নির আধার, ( বায়াে-রগ্নিঃ ) বায়ু হইতে অগ্নির উৎপত্তি হয় সেজন্য বায়ুশূন্য স্থানে অগ্নি থাকিতে পারে না। যাঁহারা সৰ্ব্বদা চৈতন্যের বা দেবতার ভাবনা করেন, তাহাদের ব্ৰহ্মণ্য বা দেবত্বের বৃদ্ধি হয় সেজন্য সৰ্বগুণ সম্পন্ন ব্রহ্মের শক্তি ব্রাহ্মণেরা লাভ করিতেন। যাঁহারা প্রজা বা মানবের হিতাহিত ভাবেন তাহাদের ক্ষাবৃত্তি বা মানবত্বের হওয়ায় রাজশক্তি বা প্রভুত্ব লাভাদি ঘটে। যাহারা সজীব বৃক্ষাদি বা পশুকুলের ভাবনা করেন তাহাদের বৈশবৃত্তি অর্থাৎ জীবপুষ্টি বা জীব পােষণেচ্ছা প্রবল হয় কিন্তু যাঁহারা ইট কাট ধাতু পাথর জড়বস্তু ভাবেন তাহাদের জাড্যভাব বা শূদ্ৰত্বের পুষ্টি হয় সেজন্য ব্রাহ্মণের লৌহ ও চৰ্ম্মাদি বিয়ে বা ব্যবসায়ে পাতিত্য বা শূদ্রত্ব জন্মে এবং স্থাপত্য বিদ্যা বা শিলপ বৃত্তিও ব্রাহ্মণের পক্ষে হীনতা সূচক। রােগ ও রােগীর চিন্তা মাথায় থাকিলে ব্ৰহ্মচিন্তার বিঘ্ন ঘটে এজন্য চিকিৎসক ব্রাহ্মণও হীন । চৈতন্যময় ভগবানের চিন্তা বা ভজনায় জড়ত্বের হ্রাস ও চেতনার বৃদ্ধি ঘটে বলিয়া, আপৎকালে ব্রাহ্মণাদি জাতি হীন কর্মোপজীবিক হইলেও উপাসনা দ্বারা তাহাদের ঐ সকল দোষ ক্ষয় বা ক্ষালন হয় সুতরাং সকলের পক্ষেই কায়মনােবাক্যে সর্বকালে উপাসনা প্রয়ােজন।
উপাসনার আবশ্যকতা। G অতি নিকটের বস্তু হইলেও যেমন তােমার চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা বা তৎসমন্বিত মুখখানি তুমি দেখিতে পাওনা সেইরূপ হৃদয়ে থাকিলেও ঈশ্বরকে এই চৰ্ম্ম চক্ষে হটগৎ (তিনি দেখা না দিলে) দেখা যায় না, জ্ঞানরূপ দর্পণ প্রতিবিম্বে তাহাকে ভক্তিও যত্ন সহকারে দেখিতে হয়। “সূয্যকোটি প্রতিকাশং চন্দ্রকোটি সুশীতল।” তাহার অবিনশ্বর, অসীম ও অতুলনীয় রূপ কোটি সূৰ্যের ন্যায় প্রতিভা সম্পন্ন অথচ কোটি চন্দ্রের ন্যায় সুশীতল ও প্রফুল্ল এবং অতীব প্রতিদায়ক। তাহাকে জানিতে বা দেখিতে পাইলে তােমার আর কিছু জানার বা দেখার ইচ্ছা বা প্রয়ােজনই হয় না। ছিদ্যতে হৃদয়গ্রন্থি-চ্ছিদ্যন্তে সৰ্ব্বসংশয়াঃ। ক্ষীয়ন্তে চাস্ত কৰ্ম্মাণি তস্মিন্ দৃষ্টে পরাবরে। বাশিষ্ঠ। সেই পরাৎপর পরমেশ্বরকে জ্ঞাননেত্রে বা প্রত্যক্ষ দেখিতে পাইলে তােমার অহং মমরূপ হৃদয় গ্রন্থি অর্থাৎ আমি বা দেহাত্মবােধ এবং স্ত্রী পুত্র গৃহাদির প্রতি মমতা বা আমার বােধ এবং স্ত্রী পুরূষের মিথুনী ভাব ( চিরগ্রন্থি) সকল ভেদ বা বিনষ্ট হইয়া যায় এবং ইহ পরকালেৰ সৰ্ব্বপ্রকার কর্তব্যাকৰ্তব্যাদি জ্ঞানের সংশয় সকলও ছেদ বা ছিন্ন হইয়া যায় এবং ঐহিক বা পারত্রিক কৰ্ম্মফল যাহার দ্বারা জীব তুমি বদ্ধ সেই তােমার অদৃষ্ট বন্ধনও ক্ষয় হইয়া থাকে । অতএব যাহাতে সৰ্বসিদ্ধি হয় সেই ভগবানকে পাওয়ার জন্য অনুক্ষণ চেষ্টাই কর্তব্য এবং ইহাই মানবাত্মার পরমার্থ জানিবে। মহাত্মা রামকৃষ্ণদেব সুশিক্ষিত না হইয়াও পাষাণী কালীমাতাকে প্রত্যক্ষ দেখিয়া ০ উখানের পথ। এবং কথা বলিয়া মহাজ্ঞানের অধিকারী ও জীবন্মুক্ত হইয়া- ছিলেন এবং কত মানুষকে উদ্ধার করিয়াছিলেন। মহাত্মা শঙ্করাচাৰ্য বলিয়াছেন “ব্রহ্মাণ্ডে যে গুণাঃ সন্তি তে তিষ্ঠন্তি কলেবরে।” ব্রহ্মাণ্ডে যাহা কিছু গুণ আছে তাহ। সমস্তই মানবের এই ক্ষুদ্র কলেবর মধ্যেও প্রচ্ছন্ন ভাবে অবস্থিত আছে। তুমি যত্ন করিলেই ভগবানের সকল গুণেরই অধিকারী হইতে পার কিম্বা সৰ্বগুণ তুমি অনুশীলনেও বাড়াইতে পার। তুমি হীন দীন বা ক্ষীণ নহ ইহা ভাবিয়া সৰ্ব্বদা সদাচারে থাকিয়া উপাসনা দ্বারা আত্ম জাগরণে চিত্তশুদ্ধি কর। ভগবানের সকল প্রকার মুর্তিই এক এবং অভেদ জানিবে। হরিহরয়াের প্রকৃতি-স্তেকা প্রত্যয়-ভেদাৎ ভিন্ন বতি। ভেদ-জ্ঞানং জনয়তি বিনা-শা-স্ত্রং। বিশ্বনাথ চক্রবর্তী। হরি এবং হর উভয়েই এক ঈশ্বর, কেবল বিশ্বাসের প্রভেদ হেতুই ভিন্নের ন্যায় প্রকাশ (বা বােধ) হয় মাত্র কিন্তু শাস্ত্র ব্যতীত অর্থাৎ শাস্ত্র জ্ঞান না থাকিলেই এই ভেদ জ্ঞান জন্মায় এবং এই ভেদ জ্ঞানই মানবের বিনাশের অস্ত্র স্বরূপ ঘটে, অপর পক্ষে হরি এবং হর উভয়ের প্রকৃতি বা (হ) ধাতু এক (ইন্ এবং অণ এই ) প্রত্যয় (দুইটির) প্রভেদ হেতু কেবল পদ দুইটিরই পার্থক্য দেখা যায় মাত্র। আমরা রাধাকৃষ্ণের প্রেমতত্ত্ব যেমন বুঝাইয়াছি, হর- পার্বতীর ও সেই ভাব জানিবে এবং হরি হর ও এক বলিয়াছি “একমেবাদ্বিতীয়।” ঈশ্বর এক ব্যতীত দুই নহে একথা যেন উপাসনার আবশ্যকতা। ৭ সর্বদা স্মরণ থাকে অগ্নি এবং তাহার দাহিকা শক্তির যেমন মিলন এবং বাক্যের সহিত অর্থের যেরূপ মিলন সেইরূপ প্রকৃতির সহিত পুরুষের বা রাধাকৃষ্ণের মিলন জানিলে। শক্তি-শক্তিমতে-রভেদঃ।” ততে ব্ৰহ্মঘণে নিত্যে সম্ভবন্তি ন কল্পনা। বিচ্ছিত্তো হিপয়ে রাশো যথা রাম ঘণেইপিবা। বাশিষ্ঠ। সেই সৰ্বরূপী এবং সর্বব্যাপী নিত্য সত্য ব্ৰহ্মঘল বস্তু ভগবানের মূর্তির কল্পনা কথাও বলা যায় না, যেমন জল- রাশিকে বা মেঘ রাশিকে বিচ্ছেদ করিলেও বস্তুর পার্থক্য ঘটে না অর্থাৎ ভগবান সকল মূর্তিতে বা বস্তুতে আছেন বা সর্বপ্রকার রূপেই আবির্ভাব হইতে পারেন, পাষাণী মার সহিত তাই রামকৃষ্ণদেব কথা কহিতেন। ভগবন্ম,ঠির কলপনা করা না করা দুই প্রকারই হইতে পারে, “সাধকানাং হিতার্থায় ব্ৰহ্মণণা রূপ কলপনা।” সাধকের হিতার্থে বা উপাসনার সুবিধার জন্যই ভাব বিশেষে বা কাৰ্য্য বিশেষে মূর্তি। মানুষের যে মূর্তি গঠন ইহাই কলপনা বা কল্পিত বলা যায়, ইহা স্মারক চিহ্ন মাত্র কারণ গঠিত মূর্তিতে মানুষের আবির্ভাব তিরােভাব হয় না কিন্তু জীবন্ত মানুষে দেবতা বা ভূতযােনির আবির্ভাবও হইয়া থাকে। “সােইহং” জ্ঞানে তুমি জাগিয়া উঠ। অতএব সাধক তােমার এক দ্বারি হৃদয় মন্দিরে শিবলিঙ্গা- কার (স্থানে) বা প্রদীপ কলিকার ন্যায় ( আত্মজ্যোতি বা) তেজোময় মূর্তি অথবা অসীম অনন্ত জ্ঞানে চিৎ শ্যামসুন্দরাদি
উখানের পথ।
মূর্তির চিন্তা বা ধারণা ( সোহহং জ্ঞানে) করিয়া উপাসন।
করিবে, নিরাকারের ধারণ! উচ্চাধিকারীর পক্ষেই জানিবে।
ঈশ্বর আমাদের হৃদ্দেশে থাকিয়া জড়দেহকে যেমন
সঞ্চালিত করেন সেইরূপ চন্দ্র স র্যাদি জড় জগতের মধ্যে
থাকিয়াও তাহাদিগকে পরিচালনা করিয়া থাকেন,
জড় ও মহাশক্তির প্রতীক শবরূপ মহাকাল হৃদয়ে
মহাকালীর অধিষ্ঠান এবং প্রকৃতি পুরুষে মিলিয়া সৃষ্টি
স্থিতি লয়কারী ভগবানের প্রতিমূর্তি হইতেছে শ্ৰীশ্রীরাধা
কৃষ্ণের যুগল মিলন। ( বৃহৎ হিন্দু-নিত্যকর্মে, শিবলিঙ্গ
শ্যাম শ্যামাতত্ত্ব দেখ )
“তত্ত্বমসি” এই মহাবাক্যে বলিতেছেন, তুমিই সেই
( জীবাত্মারূপে ) ঈশ্বর, অর্থাৎ আমিই তিনি সুতরাং
আমার যথা সৰ্বম্ব আমি এতবড় যখন তখন আত্মা
আমি কিছুই নহি একথা মুখে বলা ব্যতীত ভাবিতে
পার কি ? অতএব আমিকে ধরিয়াও ঈশ্বর মানিতে
হইবে, নাস্তিকতা কেবল মুখের কথা মাত্র।
সহস্ৰশীর্ষ পুরুষঃ সহস্রাক্ষঃ সহস্রপাৎ।
স ভূমিং সৰ্ব্বতঃ স্পষ্ট। ( বৃত্ত্বা) অততিষ্ঠদ্দশাঙ্গুলং।
যে বিরাট পুরুষের বহু বা বহু সহস্র মস্তক ও বহু চক্ষু
এবং বহু পদ আছে, যিনি সকল ভূমি এবং দিকবিদিক্ ব্যাপিয়া
আছেন, সেই বিরাট মূৰ্ত্তি ঈশ্বর আমার হৃদয় মধ্যস্থ দশাঙ্গুল
মাত্র স্থান ব্যাপিয়াও তিনি (সুক্ষ্ম জীবাত্মারূপে) রহিয়াছেন ;
ইহা ভাবিয়া সেই আত্মারূপী নারায়ণের মাথায় ( চিন্তা করিয়া)
জল দিতে হয়। অতএব হিজড়ােপসক বা পৌত্তলিক নহেন,
উপাসনার আবশ্যকতা। থ হিন্দুরা গােলক দেখিয়া পৃথিবীর মানচিত্র ধারণ করেন মাত্র, গােলককে কখন পৃথিবী বুঝেন না। আরব প্রভৃতি পাশ্চাত্য দেশের লােকেরা পূর্বকালে (ভ্রমক্রমে ) মূৰ্ত্তিকেই ঈশ্বর বুঝিয়াছিল, মহাজ্ঞানী মহম্মদ উহা ভ্রম বুঝিয়া একেশ্বরবাদ প্রচার করেন, তাহার শিষ্যগণ সেই ভ্রম বিশ্বাসে ভারতের হিন্দুকেও মুখ পৌত্তলিক ভাবিয়া ছিলেন। মােক্ষেধী জ্ঞান-মন্যত্র বিজ্ঞানং শিল,পশায়াের। মুক্তি বিষয়ক আধ্যাত্মিক যে বুদ্ধি কেবল তাহাকেই প্রকৃত জ্ঞান বলে এবং শিল্পাদি বিষয়ক বা জড়বস্তুর কিম্বা দর্শন বা চিকিৎসাদি শাস্ত্রীয় অন্যান্য জ্ঞানকে বিজ্ঞান বলে, সুতরাং মুমুক্ষু ব্যতীত সকল মানুষই অজ্ঞান কিম্বা অপূর্ণ জ্ঞান। প্রেম বা ভক্তির পথে নিষ্কাম উপাসনা ব্যতীত এই মুক্তি জ্ঞান মানবের জন্মে না। কামনা থাকিলে ঈশ্বরকে চাওয়া হয় না। নাগ্নিঃ সৰ্ব্বকৰ্মাণি ভস্মসাৎ কুরুতেইৰ্জ্জুন। জন্ম জন্মান্তরের সর্বপ্রকার কৰ্ম্ম বা কৰ্ম্মফলবন্ধন তত্ত্বজ্ঞান- রূপ জ্ঞানাগ্নি দ্বারা ভস্ম হইয়া যায়। মুক্তিজ্ঞানের জন্য স্বজাতীয় সংস্কার মত উপাসনাই প্রয়ােজন “স্বধর্মে নিধনং শ্রেয়।” ঈশ্বরকে জানিয়া নির্দিষ্ট সময়ে ত্রিসন্ধ্যা উপাসনা করিলে পিপ বা কুকর্মে নিবৃত্তি এবং সৎকর্মে প্রবৃত্তি ও আনন্দ জন্মে সুতরাং ইহা দ্বারা সদ্ভাব বৃদ্ধিও ইন্দ্রিয় দমন অভ্যাস হয় সেজন্য ব্রহ্মচর্যাদি পালনের সুযােগও ঘটে অভ্যাস জন্মিলে যথাসময়ে উপাসনা না করিয়া স্থির মনে স্বস্তি পাওয়া যায় না, যে কোন প্রকার আধারে মন ভ্রমরকে বসাইয়া তাহাকে স্থির । উত্থানের পথ। কর। উপাসনায় দুঃখ নিবৃত্তি ও শক্তিবৃদ্ধি হয় এজন্য ঈশ্বর যাহাই বা যেরূপই হউন ক্ষতি নাই। বিপদে অধিক উপাসনা প্রয়ােজন। হিন্দুর প্রচলিত সন্ধ্যাদি উপাসনা দ্বারা প্রত্যক্ষ এই স্কুল দেহেরও যথেষ্ট উপকার হয়। কলিকাতার প্রসিদ্ধ ডাক্তার চূণীলাল বাবুর গ্রন্থে দেখিয়াছি এবং প্রসিদ্ধ হােমিওপ্যাথিক ডাক্তার শ্ৰীযুক্ত ইন্দু ভূষণ সান্যাল এ, বি, মহাশয় বলিলেন, এখনকার পাশ্চাত্য ডাক্তারের অনেকে বলেন যে, প্রত্যহ কিছু সময় বারম্বার ফুসফুসে বিশুদ্ধ বায়ু গ্রহণ, ধারণ এবং ধীর মন্থর গতিতে পরিত্যাগ করিলে ক্ষয় রােগের বীজাণু বিনিৰ্গত এবং বিনষ্ট হয়। শাস্ত্রে ইহাকে প্রাণায়াম বলিয়াছেন। শাস্ত্র বলেন, এই প্রাণায়াম (সন্ধ্যার অঙ্গ) দ্বারা সর্বপ্রকার রােগ বীজাণু এবং দৈহিক ও মানসিক মল বা পাপ বিনষ্ট হয়। যে কাৰ্য দ্বারা প্রাণ শক্তির আয়াম বা বিস্তার হয় অর্থাৎ আয়ুৰ্ব্ব দ্ধি ঘটে তাহাকে প্রাণায়াম বলে। দেহস্থ পঞ্চ বায়ুই জীবনীশক্তি, পিত্ত, শ্লেষ্ম ও শুক্রান্ত সপ্ত- ধাতু পঙ্গু বা জড়বৎ, ইহার। উক্ত বায়ু দ্বারা বিশােধিত এবং পরিচালিত হইয়া থাকে । প্রত্যহ তা স্পর্শ এবং তাম্রপাত্রস্থ (ইলেক্ট্রিময়) জল পানে প্রায় সৰ্ব্বরােগ বীজাণু বিনষ্ট হয় কারণ তাম্রই বৈদ্যুতিক শক্তির আধার। (কিউপ্রম মেটালিকাম ও অর্সেনিকাম) তা ঘটিত এবং ইহা কলেরা রােগের মহৌষধি। এই সকল কারণে তাম্রের মাদুলি ও অঙ্গুরী এবং সন্ধ্যা পূজায় তাম্র পাত্র এদেশে চিরপ্রচলিত। ত্রিসন্ধ্যা উপাসনার জন্য পবিত্রতা বা সদাচার স্বরূপ চক্ষু, মুখ ও উপাসনার আবশ্যকতা। ধ' হস্ত পদাদি প্রক্ষালন্ন, বস্ত্র ত্যাগ এবং গাত্র মার্জনাদি দ্বারা দেহ শীতল ও মন সুস্থির হয় এবং দুষ্ট বীজানু (পয়জেন ) হইতে আত্মরক্ষা ও স্বাস্থ্যবৃদ্ধি ঘটে, এসকল কথাও অদ্যাপি কোন শিক্ষিত ব্যক্তি অস্বীকার করেন না। অত । সন্ধ্যাদি উপাসনা দ্বারা দেহের বাহাভ্যন্তর ভাগের এবং মনের সর্ববিধ উন্নতি লাভ, রােগমুক্তি বা রােগ যাহাতে হয় তাহারও উপায় প্রাপ্তি ঘটে। যে কাৰ্য্য দ্বারা ঐহিক পারত্রিক এবং শারীরিক মানসিক সর্বপ্রকার মঙ্গলই লাভ হয় এবং যে কাৰ্যে কেবল মানবেরই অধিকার সেই সন্ধ্যা পূজাদি বা যে কোন প্রকার উপাসনা পরিত্যাগ করার ন্যায় মানুষের পক্ষে মূর্খতা এবং বিড়ম্বনা আর কি আছে। ভয়ে কাচপােকাকে ভাবিয়া ভাবিয়া আসুল পােক। যেন কাচপােকা হইয়া যায় সেইরূপ ব্রহ্মের ভাবনায় মানবের ব্ৰহ্মভাব বা ব্ৰহ্মত্ব জন্মায় এবং অপূর্ণ মানুষ সে আত্মশক্তি পূরণের জন্য সর্বদা পূর্ণ ব্রহ্মের সহিত স্বাভাবিকই মিলিতে চায়, এজন্য জগতের প্রায় সকল সভ্যজাতিই বহুকাল হইতে অনন্ত শক্তি বা ঈশ্বরকে মানেন এবং সর্ববিধ মঙ্গলার্থে তঁাহার উপাসনা করেন। দেবতা ব্রহ্মেরই শক্তি। স্বভাববাদী দুই চারিজন লােক তাঁহারাও অনন্তশক্তিকে মানেন। এই অনন্ত শক্তি বা প্রকৃতিও সেই একই ঈশ্বর শক্তি- শক্তিমতেরভেদঃ।” একথা পূর্কে বলিয়াছি। ঈশ্বরে অবিশ্বাসী নাস্তিকেরা অনর্থক আমার কেহ নাই ভাবিয়া সঙ্কীর্ণ এবং শুষ্ক ও হতাশ্বাস হৃদয়ে মুমুকালে বড়ই যাতনা পায়, তাই '
ন
উত্থানের পথ।
শেষকালেও মৃত্যু যন্ত্রণায় পড়িয়া ভগবান্ রক্ষা কর বা মা রক্ষা
কর একথা না বলিয়া প্রায় কেহ থাকিতে পারে না।
বর্তমান রুষিয়া প্রভৃতি ভােগভূমির পাশ্চাত্য জাতিরা
অনেকে নাস্তিকবৎ হইলেও তাহারা কর্মবীর সেজন্য জগতের
উন্নতিকর কর্মপুঞ্জ দ্বারা ব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টিকর্তা মহাকৰ্মী ঈশ্বরের
প্রকারান্তরে তুষ্টি সাধনই করিতেছেন কিন্তু তােমরা এই কর্ম
ভূমি বা আধ্যাত্মিক জ্ঞানক্ষেত্র ভারতে জন্মিয়া, পশুবৎ ধর্ম
এবং কৰ্ম ও আচার বিচার সকল ছাড়িয়া কি পাইতেছ বা
কি করিতেছ এবং কোন্ পথে নামিয়া যাইতেছ ইহা ভাবিলেও
হতাশ্বাস হইতে হয়। তােমরা ঠিক নাস্তিক নহ নাস্তিকতা
তােমাদের কুশিক্ষা ও কুসংস্কারের ফল কিম্বা জন্মদোষে ও কর্মদোষে
হীন বীৰ্য হওয়ায় তমােগুণের ফল। কিছুদিন পূর্বেও দেখিয়াছি,
হিন্দুরা কেহ কেহ ব্রাহ্ম বা খ্রশ্চান হইয়াও উপাসনা করিত কিন্তু,
এখন নিশ্চেষ্ট জড়বৎ তােমাদের না রাম না গঙ্গা কিছু না বলা
ইহা আলস্য ও মূর্খতা নহে কি? জড় বা নরপশু আর কাহাকে
বলে। উপাসনা ব্যতীত তােমাদের পশুত্ব ঘুচিবে কিরূপে।
ঈশ্বরে বিশ্বাস এবং পরকালে বিশ্বাস এই দুই বিশ্বাসের
মিলনকেই ধৰ্ম্ম বলে , অথবা যে আমাকে ধরে বা রক্ষা করে
কিম্বা আমি যাহাকে ধরি বা যে আমার আশ্রয় তাহাকেও
ধৰ্ম্ম বলে [ ধূ-ধাতু মন্ ধৰ্ম্ম ] এই ধৰ্ম্মের সদনুষ্ঠানকেই
সুকৰ্ম্ম বলে। ঈশ্বর পরায়ণ বা ধার্মিক হইয়া আধ্যাত্মিক
উন্নতির সহিত দেশের কাৰ্য্য করাই ভারতবাসী, হিন্দু বা
মুসলমান তােমাদের উচিত। কার্যের ইচ্ছা থাকিলে
সময়ের কিছুই অভাব হয় না। উপাসনা কেবল তােমা-
উপাসনার আবশ্যকতা।
কর,
দেরই প্রয়োজন, উহাতে ভগবানের বিশেষ লাভালাভ নাই।
অতএব বৃথাভ্রমণ, বচনামি ও কুড়েশি ছাড়, পরকাল ও
ভগবানে বিশ্বাস
বিশ্বাস রাখিয়া
ভগবান্ সহায়
হইবেন “যােগর ক্ষেমং বহাম্যহং। এই গীতাবাক্য মিথ্যা
হইবে না। মহাত্মাগান্ধি প্রত্যহ উপাসনা করেন। কিছু না
পার ভাই তবে নাম কীৰ্ত্তনাদি কর ক্রমশঃ তােমার ভ্রম
ঘুচিবে এবং রুচি প্রবৃত্তি ফিরিবে ।
য ইচ্ছতি হরিং স্মৰ্ত্ত ব্যাপারাস্তগতৈরপি।
সমুদ্রে শান্তকল্লোলে স্নানমিচ্ছতি দুৰ্ম্মতিঃ। বাশিষ্ঠ।
যে ব্যক্তি মনে করে ঝঞ্চাট মিটিয়া গেলে পরে হরি-
ভজন করা যাইবে সেই দুর্বদ্ধি লােকের পক্ষে সমুদ্রের
তরঙ্গ শান্তি হইলে স্নান করিবার বাসনার ন্যায় সময় নষ্টই
ঘটে, অর্থাৎ সমুদ্র তরঙ্গের ন্যায় এই সাংসারিক কার্যের
কখন বিরাম হইবেনা সুতরাং হরি ভজনও হইবে না।
অতএব বাল্যকাল হইতেই স্বল্প বিস্তর ভাবে উপাসনা ।
করা কর্তব্য। ইহা দ্বারা মনের বল বৃদ্ধি জন্য পাঠাভ্যাসাদি
সর্ব কাৰ্য্যের বিশেষ সুবিধাই হইয়া থাকে।
যে “দান ধ্যান করে তাহকে সৎলােক বলে। দান
তিন প্রকার, “পূজানুগ্রহ-কাময়া” গুরুজন বা মান্য
ব্যক্তিকে উপায়ন দ্রব্যাদি দ্বারা তুষ্টি সাধন বা তাহাদের সেবা
শুশ্রুষাকেও পূজা দান বলে। অন্ন বস্ত্র বা ঔষধ পথ্যাদি
দান ও শিক্ষা দ্বারা দরিদ্রের
সেবা কার্যকে
অনুগ্রহ
দান বলে। স্বৰ্গাদি কামনা বা নিজ মঙ্গলার্থে সুব্রাহ্মণ বা
ফ
উত্থানের পথ।
সাধু সন্ন্যাসীকে যে দান তাহা কাম্য দান কিন্তু ধনাদি
বস্তুর নিষ্কাম দানই শ্রেষ্ঠ। আধ্যাত্মিক চিন্তা বা ঈশ্বর
চিন্তাকে ধ্যান বলে। এই দান ধ্যান বিহীন নিষ্কর্মা
লােকই অসং বা পশুতুল্য। সেবাদি যে প্রকার দান
পার স্বল্পাধিক কর এবং ঈশ্বরকে ধ্যান বা উপাসনা কর ;
দুর্লভ মানব জন্ম বৃথা নষ্ট করিবে কেন? কেবল দরিদ্র
নারায়ণের সেবা করিলেও হয়না, পিত্রাদি গুরুজন হইতে
গােসেব। পৰ্যন্তও করিতে হয় নচেৎ মানববাচিত কর্তব্য
কাৰ্য্য সম্পূর্ণরূপে তােমার পালন করা হয় না।
বড়ই দুঃখের
বিষয় এখানকার অনেক গ্রাজুয়েট
বা শিক্ষিতাভিমানী লােক জাতি ধর্ম এবং উপাসনা,
ও যজ্ঞােপতি ত্যাগ করিবার কারণ দেখাইতেছেন যে,
যাহা বুঝিনা তাহা মিথ্যা বা তাহার প্রয়ােজনই নাই,
ইহার উত্তরে বলিতেছি, আমি সব জানি এই অহঙ্কারের
নামই মূখ। মহাত্মা নিউটন ফল কেন মাটিতে পড়ে
উপর দিকে যায় না
কেন, বহুকাল ভাবিয়া ভাবিয়া
মাধ্যাকর্ষণ বুঝিয়াছিলেন। তােমর প্রাণপণ চেষ্টায় বিশিষ্ট
অধ্যাপকের (মাষ্টারের ) সাহায্যে যে ভাবে গণিত
বিজ্ঞানাদি শিক্ষা করিয়া পাশ করিয়াছ, সে ভাবে কোন
শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিতের নিকট হইতে বিশেষ যতনে নিজের
জাতি ধর্ম ও শাস্ত্রকথা শিখিতে বা বুঝিতে চেষ্টা
করিয়াছ কি? অতএব না খুঁজিয়া না বুঝিয়া ত্রিকালজ্ঞ
মুনি ঋষি সেবিত জাতীয় ধৰ্ম্ম কৰ্ম্মকে ত্যাগ
ঘাের মুখ নহে কি ?
উপাসনার আবশ্যকতা। বিদেশী স্বার্থপর কুবুদ্ধি পণ্ডিতের কথায় নিজের কি সৰ্ব্বনাশ করিতেছ ইহা ভাবিবার ক্ষমতাও কি তােমাদের নাই! ভাল মন্দ বিচারের জন্য কিছু কাল অপেক্ষা করাওত তােমাদের উচিত ছিল। স্বকীয় সমস্ত জাতি ধর্ম কর্ম ছাড়িতেছ অথচ স্বরাজ চাহিয়া স্বদেশী হইতেছ কিরূপে ; ত্রিকালজ্ঞ ও অভ্রান্তবাদী যােগী না হইলে মুনি বা মহর্ষি হওয়া যায় না; কোটি কোটি লােকের মধ্যে সেরূপ মানুষ দুই একটি জন্মায়, সিদ্ধ পুরুষ বলিয়াই "মহাত্মা রামকৃষ্ণ দেবের ভাষ। বাক্য গুলিও অভ্রান্ত। ঐরূপ ঐশী শক্তি না থাকায় পাশ্চাত্য পণ্ডিত বা চিকিৎসকদিগের পুনঃ পুনঃ মত পুনঃ পুনঃ মত পরিবর্তন ঘটে কিন্তু অদ্যাপি ঋষিপ্রণীত আয়ুৰ্ব্বেদের বা শাস্ত্রের ভুল দেখা গেল না। অতএব ব্রহ্মচর্য্য বলে আলস্য ছাড়, কৰ্ম্মবী হও এবং স্বধর্মে ও ঈশ্বরে বিশ্বাস রাখ ; নিশ্চয় স্বাধীনতা পাইবে ও সুখী হইবে । তােমাদের বেতন মাষ্টার অপেক্ষা নিঃস্বার্থ মুনি ঋষিরা বহুগুণে যে বড় এজ্ঞান মূখ চাষারও আছে। সেই ঋষি সেই ঋষি বাক্য গুলি স্থিরমনে একদিনও কি তুমি বিচার বিবেচনা করিতে পারিলেন, ধিক্ তােমাদের বিদ্যা বুদ্ধিতে। আমরা বলিব, এ সকল ভাব তােমাদের জন্ম জন্মান্তরের আসুরিক দুর্বদ্ধি ও দুষ্কর্ম বা দুর্ভাগ্যের ফল; এখনও ফের ; ভগবানে আত্ম সমর্পণ কর , তাহার দয়ায় তােমাদের দুৰ্ব্বদ্ধি ঘুচিতে পারিবে । কৰ্ম্ম করিলে কোন কৰ্ম্মেরই ফলাফল বুঝা বা বুঝান যায় না, ঔষধ না খাইয়া কেবল নামে কাম হয় না, হয়ত তর্কে জিতিতে ভােগী স্কুল ৪
উত্থানের পথ।
পর সুতরাং অন্ধ বিশ্বাসেও কৰ্ম্ম কর, একদিন নিশ্চয়
সব বুঝিতে পারিবে । যে পথে সাধু মহাজনদিগের সর্বশ্রেষ্ঠ
উচ্চপদ প্রাপ্তি ঘটে এবং মুক্তি মিলে, হতভাগা ও মূৰ্ণ ভিন্ন সেই
আস্তিকতার পথ কে ত্যাগ করে।
কেহ কেহ বলেন, বর্তমান রুস ও জাপান প্রায়
নাস্তিকতার পথে থাকিয়াই যখন দেশের উন্নতি করিতেছেন
তখন স্বেচ্ছাচার
নাস্তিকতার পথই ভাল। ইহার
উত্তরে আমরা বলিতেছি যে, যদি দেশের স্বাধীনতা
এবং উন্নতির সহিত আত্মোন্নতি করা যায় সেই পথটীই
অবলম্বন করা সর্বাপেক্ষ। প্রশস্ত নহে কি? বনবাস
পশুরাওত স্বাধীন ও স্বাবলম্বী, আধ্যাত্মিক জ্ঞান হীন মানুষ
যতই উন্নত হউক তাহারা পশু অপেক্ষা কিছু বড় বা
তাঁহাদিগকে পশুশ্রেষ্ঠ বলা যায়। আধ্যাত্মিক জ্ঞানের
উন্নতিতে মানুষের মনুষ্যত্ব ও
দেবত্ব এবং ঈশ্বরত্ব লাভও
ঘটিতে পারে একথা বহু ভাবে বুঝাইয়াছি। 'অষ্যজাতি
একাধারে আধ্যাত্মিক জ্ঞান এবং ব্রহ্মচর্য্যে বল বীমের সাধনা
করিয়া যখন জগতে স্বাবলম্বী ও পূর্ণ স্বাধীনতা লাভে
সমর্থ হইয়াছিলেন তখন এই পথই সৰ্ব্ব শ্রেষ্ঠ পথ জানিবে ।
পূৰ্ব্বকালে এই পথে থাকিয়াই ভারতের রাজা বা সম্রাটের
দিগ্বিজয় করিতে গিয়া ভারতের বাহিরে অনেক রাজ্য জয়
এবং সূদুর আমেরিকায় পর্যন্ত উপনিবেশ স্থাপন করিয়াছিলেন
সুতরাং এই পথে থাকিয়া (বিপথে না যাইয়া) যুগপৎ আত্মো-
ন্নতি এবং দেশেন্নতি কর; ইহাই প্রকৃত “উত্থানের পথ ।”
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.