Bally Sadharan Granthagar
Saroju
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
সরযু।
শ্রীসুরেন্দ্র নাথ রায় প্রণীত।
__
Gupta PRESS.
CALCUTT.
সন'১৩০৪।
মূল্য ॥ দশ আনা মাত্র।
পুস্তক সংখ্যা
পরিগ্রহণ সংখ্যা 3৭১
PRINTED BY PROHILAD CHANDRA DAS,
GUPTA PRESS :
291, Cornwallis Street, C.27.227...
; ভূমিকা। জীবনস্রোত অনন্ত। অগণ্য মানব প্রতিক্ষণ এই জীবন- স্রোতে ভাসিতে ভাসিতে, অনন্ত সাগরাভিমুখে চলিতেছে। অসংখ্য ঘটনা অবিরত মানবগণকে উত্তেজিত করিতেছে। ভারতের নানাস্থানে, সময়স্রোতের অগণ্য তরঙ্গে, মানব চক্ষুর তীক্ষ দৃষ্টিতে, বিবিধ ঘটনা প্রতিনিয়ত সংঘটিত হইতেছে। পশ্চিম বঙ্গের রমণী। প্রতারণা, কুটিলতা ও খলতা তাহার হৃদয়ে স্থান পায় না। প্রণয় তাহার চক্ষে পবিত্র পদার্থ। সতীত্ব তাহার নিকট আদরণীয় দ্রব্য। সরসূ জানিত ভালবাসা কাহাকে বলে ; সে জানিত ভালবাসার পরিণাম কি ; জোনিত ভালবাসার বাসস্থান ত্রিদিব কানন ; সে জানিত যাহাকে সে বাল্যকাল অবধি ভালবাসিয়া আসিতেছে, যাহাকে সে প্রথম অবধি পতি ভাবিয়া আসিতেছে, কেন সে সেই সৰ্বস্ব ধন দেবেন্দ্রনাথকে ত্যাগ করিয়া অপর একজনকে পতিত্বে বরণ করিবে। সাংসারিক কাৰ্যে অনভিজ্ঞ, সরল সরযূবালা পাঠক পাঠিকাগণের নিকট সমাদৃত হইলে আমার শ্রম সফল জ্ঞান করিব। কৃতজ্ঞতার সহিত জানাইতেছি যে শ্রী যুক্ত মহাদেব ভট্টাচাৰ্য্য, শ্ৰীযুক্ত জগদীশ মুখােপাধ্যায় বি, এ, শ্রীযুক্ত হরিপ্রসন্ন ঘােষ, শ্রী যুক্ত ইন্দুভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রভৃতি বন্ধুবর্গের নিকট এই গ্রন্থ প্রণয়ন বিষয়ে বিশেষ সহায়তা প্রাপ্ত হইয়াছি, তজ্জন্ত তাহাদের নিকট চিরবাধিত রহিলাম। ইতি খটনগর, বর্ধমান। গ্রন্থকার। ১০।
No text on this page.
প্রথম পরিচ্ছেদ।
'তরু মূলে।
কৃতি দেব শীত ঋতুর বিষাদ-বেশ পরিত্যাগ করতঃ
বসন্তের মনােহর পরিচ্ছেদ ধারণ করিতে আরম্ভ
করিলেন। মধুমাসে মধুপান-লােলুপ মধুকর কুল
মন-মারুত-মুকুলিত পরাদ্ধ সৌরভ প্রমুন দলের
রিমল পানে বিচরণ করিতেছে। প্রভাতে প্রভাত ভানু
প্রশান্ত মূর্তি ধারণপুৰ্ব্বক উদয়গিরি হইতে উথিত হইয়া পতিপ্রাণ
দ্মিনীর প্ৰেমৰারিতে তরঙ্গমালা উদ্ভাবনার্থ মলয়-সমীরণের
হায়তা গ্রহণ করিলেন। নয়ন-রঞ্জন-নব-কিশলয়-দল-নিপতিত
ভ্রবর্ণ-শিশির নিচয় শােভাকর-করে প্রতিফলিতদীপ্তি হইয়া,
মনীয়া কামিনীর কণ্ঠন্তু মুক্তামালাবৎ মনােহর সৌন্দৰ্য ।
২ সরযূ। প্রদান করিতেছে। স্বচ্ছ-সলিলা স্রোতস্বতী-সমূহ সহস্রাংশুর সহস্রকর স্ব স্ব শরীরে সংব্যাপ্ত করতঃ, সন্দেশবহ সদৃশ, সুস্বরে সঙ্গীত করিতে করিতে সলিল-স্বামীর সমীপে গমন করি- তেছে। কুমুদিনী কান্ত কুমুদিনীকে কাত করিয়া কৌমুদীর সহিত পশ্চিমাকাশে অস্তাচল চূড়ায় অন্তর্হিত হইলেন। পিকবর সহকার শাখাসীন হইয়া কুহু কূজনে মানবের চিত্তাকর্ষণ করতে লাগিল। বিমানচারী বিহগবৃন্দ বৃক্ষশাখা পরিত্যাগপূর্বক 'বিশ্বপাতার মহিয়সী মহিমা কীর্তন করিতে করিতে উৎফুল্লাঃ- কণে গমন করিতেছে। পতিসুখােপভােগিনী, পতিপরায়ণ। রমণী মায়াবিনী নিদ্রাদেবীর মায়াজালাচ্ছনা হইয়া পড়ি শায়িতা ছিলেন, হঠাৎ নবু-চুত-মুকুল-ভুক্ষুণ-মনােহর-কণ্ঠ পুংস্কো- কিল শব্দ শ্রবণ করিয়া জাগ্রত হইয়া তল্লত্যাগ পূর্বক গৃহকাৰ্য্যে প্রবৃত্ত হইলেন। প্রােষিতভর্তৃকা যুবতী দীর্ঘ নিশ্বাস ত্যাগ করিতে করিতে এবং সেই সঙ্গে সঙ্গে পিকরাজকে ভৎসনা করিতে করিতে ধীরে ধীরে শয্যা ত্যাগ করলেন। রাখালগণ গোপাল লইয়া মদ মদ গতিতে গমন করিতেছে। সুকুমার মতি শিশুগণ প্রাতঃ ক্রিয়া সমাপন করিয়া আপন আপন পাঠে মনােনিবেশ করিল। এইরূপ বসন্ত-প্রভাত সময়ে একটী যুবক রতনপুর গ্রামের নিকটবর্তী একটী ক্ষুদ্র প্রান্তরস্থ বৃক্ষমূলে বসিয়া গণ্ডদেশের দক্ষিণ প্রান্ত দক্ষিণ পাণির উপর সংস্থাপিত করতঃ বিষন্ন মনে একাগ্র- চিত্তে ভাবিতেছেন। যুবকের বামহন্ত অঙ্কোপরি স্থাপিত রহিয়াছে। তাহার পরিধেয় বস্ত্রখানি মলিন। মস্তকের কেশ গুলি রুক্ষ্ম এবং জটিল। নেদ্বয় নিমীলিত। রুক্ষ্মত্ব বক্ষঃ উরুমূলে। স্থলের দক্ষিণাংশ দক্ষিণদিকে অবনত। নেত্রদ্বয়ের প্রান্তভাগে বিষাদের কালিমা রেখা অঙ্কিত রহিয়াছে। ফলকথা যুবক একজন উদাসীন ব্যক্তি। সংসারের কোন বস্তুতেই যেন তাহার স্পৃহা নাই। তিনি যেন নিরাশার অনন্তস্রোতে ভাসিতেছেন। মােহিনী আশাদেবী আসিয়া যে তঁাহাকে প্রবােধ বচন দ্বারা শাস্তি দান বিন ইহাও তাহার মনােমধ্যে স্থান পাইতেছে না। সমীরণ মধ্যে মধ্যে তাহার কেশরাশি আন্দোলিত করিয়া মন প্রাণ প্রফুল্ল করিতে গিয়া বিফল প্রযত্ন হইয়া প্রতিগমন করিতেছেন বায়ু চালিত পুষ্প-পরাগরাজি আসিয়া দুই একবার হয়, আঘাত করিতেছে কিন্তু তিনি তাহাতে বিচলিত হই- তেছেন না। তপন দেব ধীরে ধীরে গগন পথে অগ্রগামী হই- তেছেন এবং সেই সঙ্গে সঙ্গে তাহাকে উত্তেজিত করিতেছেন তথাপি তিনি স্থিরভাবে বসিয়া আছেন। যুবক এইরূপভাবে গাঢ় চিন্তায় নিমগ্ন আছেন, এমন সময়ে কে আসিয়া পশ্চাৎদিক হইতে তাহার চক্ষু দুইটী চাপিয়া ধরিল। ক্ষণকাল নিস্তব্ধভাবে থাকিয়া তিনি বলিয়া উঠিলেন “তুমি কে”? আগন্তুক তাহার কথার কোন উত্তর দিলনা। যুবক তখন তাহার হস্ত দুইটা নেত্রদ্বয় হইতে অপসারিত করিবার ইচ্ছা করিয়া যেমন তাহার হন্তে হস্ত দিলেন অমনি বুঝিলেন হন্ত দুইটা চির পরিচিত পরে বলিলেন কে সরযূ নাকি?” আগন্তুক চক্ষু ছাড়িয়া দিয়া তাঁহার সম্মুখে আসিয়া দাঁড়াইল। সরযু সকাল বেলা এখানে কেন? কি করেই বা এলে ? “কেন আমার কি আর এখানে আসিতে নাই ? আর কাল সন্ধ্যের সময়েইবা কি বলেছিলে ?”
৪
সরযূ।
ও ঠিক, ঠিক, আমিই যে ভুলে গিয়েছিলাম। সরযূ !
আমায় সেটা মনে ছিল না, এবং ভাবিনি যে সত্যি, সত্যি,
আমার কথামত তুমি এখানে আসবে। আর এক কথা আমার
মনের বেশ স্থিরতা নাই ; একবার যা মনে ভাবচি পরক্ষণেই তা
ভুলে যাচ্ছি। এজন্য তুমি দুঃখ করিও না, এখন বল দেখি তুমি
কি করে এলে ?”
যুবকের কথা শুনিয়া সরযূ কিয়ৎকাল চুপ করিয়া থাকিল
পরে বলিল “দেবেন আমি যে কি করে এলেম তকি তুমি
জাননা? কেন কাল আমায় কি বলিয়াছিলে মনে নাই কি ?
“সরােজ ওঠাও আমি ভুলেছিলাম।”
‘তা ভুলবে বৈ কি। এরপর আমাকেও যে ভুলে যাবে ?”
সরযুর কথা শুনিয়া দেবেন্দ্র নাথ একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ত্যাগ করি-
লেন।
সংযু
দরয সে দীর্ঘনিশ্বাসের ভাব কিছুই বুঝিতে পারিল
কেবল চিত্ৰপুত্তলিকার মত তাহার সম্মুখে দাড়াইয়া
থাকিল। তখন দেবেন্দ্রনাথ বলিলেন “রাজ কাল যে আমি
কি জন্য তােমায় এখানে আসিতে বলিয়াছিলাম তাহা বােধ হয়
তুমি জান না। আমি তোমাকে কতকগুলি উপদেশের কথা
বলিব। দেখ তােমার বিবাহের যখন এতদূর স্থিরতা হইয়াছে
এবং অদ্য রাত্রিতেই যখন তুমি অপরের হইতে যাইতেছ তখন
তুমি কেন আমার মত হতভাগাকে মনেমধ্যে স্থান দিতেছ,
আর কেন তুমি এ নির্বোধকে পাইবার ইচ্ছা করিতেছ। দেখ
সয়ােজ জনক জননীর প্রিয় আজ্ঞা প্রতিপালন করা সন্ততির
শ্রেষ্ঠধর্ম। মাতা সর্বাপেক্ষা গরিয়সী। পিতা পম গুরু।
অতএব তাহা যাহা বলেন তাহা করা তােমার একান্ত বিধি
০
।
তরুমূলে। সঙ্গত। তঁাহার যখন তােমার বিবাহ আমার সহিত না দিয়া অপরের সহিত দিবার প্রাব করিয়াছেন এবং দিতেও কৃতসংকল্প হইয়াছেন তখন তুমি আমাকে মনোেমধ্যে পতির স্থান দিতেছ কেন? তুমি যে আজ অবধি আমাকে একবারে ভাল বাসিবে না তাহা বলিতেছিনা তবে তুমি আমাকে পতির মত না ভাল বাসিয়া সখার মত ভাল বাসিবে, তােমার পতিকে মনের সহিত ভাল বাসিবে। পতির আজ্ঞা পালন করা সতী রমণীর কর্তব্য। স্বামীর বিরুদ্ধে যাওয়া কোন ক্রমে উচিত নয় পর তাহা অতীব গহিত কাৰ্য তাই বলি তুমি আর আমাকে তােমার স্বামীর মত দখিওনা।" দেবেন্দ্রনাথের কথা শুনিয়া রসূ যেন আকাশ হইতে পতিত হইল। সে যেন বাস্যজ্ঞান শূন্য হইয়া সর্বংসহ বসুধার প্রতি অনন্য দৃষ্টিতে চাহিয়া থাকিল। ক্ষণেকের জন্য। তাহার বাঙ-নিষ্পত্তি হইল না। কেবল এক একটা দীর্ঘ নিশ্বাস মধ্যে মধ্যে তাহার নাসিকার মধ্য হইতে বহির্গত হইয়া চতুর্দিক- বাহী আশুগের সহিত মিলিত হইতেছে। সে নীরবে বাষ্পবারি বিসর্জন করিতেছে। দেবেন্দ্রনাথ প্রথমে তাহা লক্ষ্য করেন নাই। কিন্তু অল্পক্ষণ পরেই দেখিতে পাইয়া বলিলেন “ সরোজ কঁদছ কেন ? কি হয়েছে ?” এইবার সমূর মুখ ফুটিল দেবেন। প্রাণের দেবেন! তুমি যে কঁদাবার কাজ করেছ। তুমি যে আমায় চিরকালের জন্য হতাশ করিতেছ ! তুমি যে আমায় মরুভূমিতে নিক্ষেপ করিয়া চলিয়া যাইতেছ ! ভেবে দেখ দেবেন। মনে পড়ে কি দেবেন ! যে দিন আমার সঙ্গে বাল্যখেলা করিতে, যে দিন অশমি তােমার গায় ধূলি ছুড়ে দিতাম তুমি আমায় কিছু বলিয়া ছেলে মানুষ বলে কত শিক্ষা দিতে, আদর করিয়া !
৬
সরযূ।
আমার পড়া বলে দিতে, যে দিন তুমি আমায় কত নুতন নূতন
গল্প বলিতে-সেই দিন দেবেন মনে পড়ে কি ? সেই
ভাল বাসার দিন মনে হয় কি ? দেবেন আমায় ছাড়িয়া কোত্থাও
যাইতে পারিবেনা, চল তুমি অগ্রে অথে চল আর আমি ছায়া
হইয়া তােমার পশ্চাৎ পশ্চাৎ যাই।
সরযুর কথা শ্রবণ করিয়া দেবেন্দ্রনাথের মনােভাব কি-
পরিবর্তিত হইল। কিন্তু তৎক্ষণাৎ তাহা প্রকাশ করিলেন না।
কি জানি কেন তিনি সে ভাব গােপন কমিলেন। পরে সযুকে
শান্ত করিবার জন্য বলিলেন “সমােজ আমি এখন তােমায়
কিছু বলিব না। তবে
একটা কথা বলিতেছি যে অদ্য সন্ধ!
পৰ্যন্ত তুমি আমার লিখিত কোন লিপির বা আমার দ্বারা
প্রেরিত কোন বিশ্বাসী লােকের অপেক্ষা করিবে। তাহা দ্বারা
যাহা বলিয়া পাঠাইব ৰা যাহা লিখিয়া পাঠাইব তদনুযায়ী কাৰ্য্য
করিবে। দেখ আমার কথায় অবিশ্বাস করিওনা। আমি যাহা যাহা
বলিলাম মনে রেখ। আমি কদাপি তােমায় ভুলিবনা। অধিকক্ষণ
এখানে থাকা উচিত নয় কারণ এস্থলে থাকিলে অনেকেরই নজরে
পড়িতে হইবে। এক্ষণে আমি একটী বিশ্বাসী বন্ধুর নিকট
যাইব। তুমি বাড়ী যাও; বেলা বাড়িতেছে। আমিও আসি।”,
“দেবেন এস, চিরকালই আমার কাছে এস। দেখ
যেন আমায় ভুলি না। কিন্তু দেবেন তুমি আমায় ছাড়িয়া
চলিলে।" এই বলিয়া আবার ক্রন্দন করিতে আরম্ভ
করিল। দেবেন্দ্র অনেক করিয়া তাহাকে শান্ত করিলেন।
শেষে বলিলেন ‘সরােজ তােমায় আর কাঁদিতে হবে না। বাড়ী
যাও আমি তােমায় মনে রাখিব।”
;
সর
তরুমূলে।
দেবেন্দ্রনাথ সরযূকে বিদায় দিয়া বরাবর উত্তরমুখ করিয়া
চলিলেন। সরযূ এক পা করিয়া যায় আর ফিরিয়া ফিরিয়া
দেবেন্দ্রের দিকে দৃষ্টিপাত করে। দেবেন্দ্র ও এক একবার তাহার
দিকে মুখ ফিরান। এইরূপে সরযূ যতক্ষণ দেবেন্দ্রকে দেখিতে
পাইল ততক্ষণ অনিমেষনয়নে তাহার দিকে চাইয়া থাকিল।
যখন তিনি তাহার দৃষ্টিপথ অতিক্রম করিয়া গেলেন তখন
সে অগত্যা অশ্রু বিসর্জন করিতে করিতে প্রতিগমন করিল।
পাঠক মহাশয় ! আসুন দেখি দেবেন্দ্রনাথ কোথায় যান।
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ আশায় নিরাশা প্রান্তরের অদূৰ সুদূরবাহিনী কলকলনাদিনী শুভ্রসলিল; ময়ুরাক্ষী নদী ধীরে ধীরে বহিয়া যাইতেছে। মলয় মারুত তাহার শীতল জলে অবগাহন করতঃ পুষ্পসৌরভ-ভার বহন করিতে করিতে মন মন্দ গতিতে বহিতেছে, এবং পথশ্রান্ত পথিকগণের পথক্ষোভ নিবারণ করিতেছে। তটের নিকটবর্তী কোন কোন বৃক্ষ স্ব স্ব শাখা অবনত করতঃ ময়ুরাক্ষী মাতার স্তন পান করি- তেছে। তীরের কোন কোন স্থানের মৃত্তিকা ভগ্ন হইয়া গিয়াছে। উপর দিয়া জল চলিয়া যাওয়াতে, কোথাও বালুকা রাজি তরঙ্গাকার ধারণ করিয়াছে। তাহার উপর তপন কিরণ পতিত হওয়াতে দূর হইতে বােধ হইতেছে যেন অম্বুরাশিই তরঙ্গ- বক্ষে প্রবাহিত হইতেছে। কোথাও কোথাও বা স্তুপাকার বালুকা, বৃক্ষলতাহীন শুভ্রনীহারমণ্ডিত গিরিবৎ প্রতীয়মান হইতেছে। দেবেন্দ্রনাথ ময়ূরাক্ষী তীরে গমন করতঃ মনে মনে কি ভাবিয়া ক্ষণকালের নিমিত্ত একস্থানে উপবেশন করিলেন। একি দেবেন্দ্রনাথ যে আবার ভাবিতেছেন ? না বােধ হয় নদীর
আশায় নিরাশা।
শোভা দর্শন করিতেছেন! না কৈ তাও ত নয় তাহা হইলে যে
তিনি নদীর দিকে মুখ ফিরাইতেন। তাঁহার মুখ ত নদীরদিকে
ফিরন নাই। তবে তিনি কি করিতেছেন! ঐ যে দেবেন্দ্র
নদীর জলে নামিলেন তবে বােধ হয় স্নান করিবেন, আসুন
পাঠক মহাশয় দেখি দেবেন্দ্র কি করেন।
•• •*ীজলে অবগাহন করতঃ দেবেন্দ্রনাথ সেই আবই পরিধান
করিয়া পূৰ্বমুখে চলিতে লাগিলেন। শেষে একটী গ্রামের নিকটে
আসিয়া পড়িলেন। গ্রামটীর নাম কাঞ্চনপুর, তথায় অনেকগুলি
ভদ্রলোকের বাস। দেবেন্দ্র যখন সেখানে গেলেন তখন বেলা,
দীস দুইপ্রহর হইয়াছে। সেই গ্রামে নগেন্দ্রনাথ দত্ত নামক
তাহার একটী বিশ্বস্ত বন্ধু বাস করেন। নগেন্দ্রনাথ দেবেন্দ্রকে
হঠাৎ সেইবেশে আসিতে দেখিয়া অতীব বিস্ময়ান্বিত হইলেন।
নগেন্দ্রকে দেখিয়া দেবেন্দ্র আহলাদিত হইলেন। তাহার দুঃখভার
যেন কিঞ্চিৎ লাঘব হইল। তঁাহার মন যেন একটু প্রফুল্ল হইল।
বিষাদের ভার যেনকিয়ৎকালের নিমিত্ত তিরােহিত হইল।
তৎপরে তিনি বন্ধুগৃহে গমনপূর্বক তথায় অাহাদি সমাপন
করিলেন। নগেন্দ্রনাথ তাঁহার তথায় আসিবার কারণ জিজ্ঞাসা
করিলেন।
“ভাই দেবেন এরূপ বেশ কেন ? কি জন্যই বা হঠাৎ
তুমি আসিয়াছ ?”
“তোমার এসব কথার উত্তর পরে দিব। আমি এখন
তােমার নিকট একটী বিশেষ কার্যের জন্য আসিয়াছি। তুমি
আমার প্রকৃত বন্ধু।
তােমার দ্বারাই তাহা নিপন্ন হইতে
পারিবে এই ভাবিয়া তােমার নিকট আসিয়াছি।”
সর। * কি কাৰ্য্য বলনা ভাই! তাহা করিতে আমি প্রাণপণে যত্ন ও পরিশ্রম করিব। আমায় এত অনুরােধ করিবার প্রয়াে- জন নাই। ” তুমি বােধ হয় সরযর বিবাহের কথাটা জান।” ‘জানি বৈকি। তােমার সহিত তাহার বিবাহ হইলনা কেন?” “কেন যে হইল না জানি না। সমস্তই বিধির ইচ্ছা “তবে এখন কি কৰ্বে মনে করেছ ?” “তােমাধ কোন বিশ্বাসী লােকদ্বারা আমি সরযকে এক- খান পত্র লিখিব। সেই পত্রখানি পড়িয়া অদ্য রাত্রিতে সরয় আমার সহিত নিশ্চয়ই সাক্ষাৎ করিবে, তাহার পর যা হইবে করিব। ফল কথা তুমি আমার সহায়তা করিও।” “ইহাত খুব সামান্য কাৰ্য্য ; ইহার জন্য তােমায় এত অনু রােধ করিতে হইবে কেন ? ‘‘আচ্ছা ভাই তবে তুমি একজন লােক দেখ। আমি পত্র লিখি।' “তুমি পত্র লেখ আমি লােক দেখিয়া আসি।” অল্পক্ষণ পরেই নগেন্দ্রনাথ একটী বৃদ্ধা সঙ্গে লইয়া প্রত্যাগত হইলেন। স্ত্রীলােকটীর বয়স অনুন যাটি বৎসর। শরীরের রংটী কৃষ্ণ বর্ণ, মুখের ভিতর দন্ত একটাও দৃষ্ট হয় না। মস্তকের কেশরাজি চিরকাল কৃষ্ণ হইয়া থাকিতে ভাল বাসে না বলিয়াই শুক্লবর্ণ হইয়াছে, হস্তপদাদির মাংসপেশী প্রভৃতি শিথিল হইয়া গিয়াছে, বৃদ্ধা সােজা হইয়া চলিতে পারে না চলিবার সময় তাহার শরীর প্রায় অর্ধ-বৃত্তাকার ধারণ করে, পৃষ্ঠদেশ উন্নত হইয়া গিয়াছে । তাহার হস্তে সর্বদাই একটী যষ্ঠি থাকে, তাহার উপর ভর দিয়া
আশয় নিরাশা।
চলিবার জন্য বৃদ্ধা তাহা ব্যবহার করে। কেবল নিদ্রার সময়
ব্যতীত সেইটা সর্বদাই তাহার সঙ্গে থাকে। বৃদ্ধার গুণ অনেক
সে বিশ্বাসী, সত্যবাদী, তাহার মন সরলতাপূর্ণ এবং অন্তকরণে
দয়া আছে। যাহা করিতে বলা যায় তাহার জন্য যথাসাধ্য যত্ন
করে। গ্রামের লোকে তাহাকে “শ্যামার মা” বলিয়া ডাকে।
তাহার নাম কি জানি না। বৃদ্ধা আসিয়া বলিল “কি কর্তে
হবে বাবা!” অনন্তর নগেন্দ্রনাথ বলিলেন “দ্যাখ, খামার মা
এই পত্রখানি নিয়ে তুই রতনপুরে বিশ্বাসদের বাড়ী যা, সেখানে
গিয়া জীবনকৃষ্ণ বাবুর কন্যা সরযূকে এইখানি গিবি। দেখি
যেন তাদের বাড়ীর আর কেউ না জানতে পারে ; আর তাকে
ববি যে দেবেন্দ্র আজ রাত্রে কোন্নগরের নিকটে রাস্তার উপর
তোমার সঙ্গে দেখা করিবেন।”
“তবে বাবা আমি আসি।”
“হ্যা বুড়ি তুই যা, ফিরে এলে তােকে বেশকরে বিদায়
করব।
শ্যামার মা” নগেন্দ্রনাথের নিকট হইতে বিদায় হইয়া
রতনপুর গ্রামাভিমুখে চলিতে লাগিল। কিয়ৎক্ষণ পরে জীবন
কৃষ্ণ বাবুর বাটীতে উপস্থিত হইল। জ বনকৃষ্ণু বাবুর বাড়ীতে
আজ বড় গােলমাল।
এদিকে একজন লােক যাইতেছে,
ও দিকে একজন লোেক যাইতেছে। এখানে বাদ্যকরগণ
বাদ্য করিতেছে ওখানে কেহবা গান করিতেছে। গাড়ি
করিয়া পাল্কি করিয়া সর্বদাই আত্মীয় কুটুম্ব আসিতেছে। সদর
দ্বারে লােক জনের বড় ভিড়। ভৃত্যপণ সর্বদাই ব্যস্ত। অপরি-
চিত কেহ আসিয়া কোন কথা জিজ্ঞাসা করিলে উত্তর পাওয়া
১২
সরয়
র।
দুরূহ ব্যাপার হইতেছে, বাটীর বাবুরা বীরবেশ ধারণ করিয়া
ইতস্ততঃ বিচরণ করিতেছেন। বৃদ্ধা গিয়া প্রথমে বড়ই বিপদে
পড়িল। শেষে সরযূকে একটা নির্জন স্থানে দেখিতে পাইয়া
বড় আনন্দিত হইল। নগেন্দ্রনাথ তাহাকে যাহা বলিতে বলিয়া-
ছিলেন সে সমস্তই একে একে সরযূর নিকট ব্যক্ত করিল শেষে
তাহার হস্তে পত্রখানি দিল। তাহাদিগকে এরূপ নির্জনস্থানে
দেখিয়া পাছে কেহ কোনরূপ সন্দেহ করে এই ভাবিয়া সরযু
শীঘ্রই বৃদ্ধাকে বিদায় দিয়া তথা হইতে চলিয়া গেল এবং একটী
নিভৃতস্থানে শিা পত্রখানি পাঠ করিতে লাগিল :—
[ প্রাণের সরােজ,
আমি যে তােমায় ওরূপভাবে উপদেশ দিয়াছিলাম
তাহার কোন গুপ্ত কারণ ছিল। যদিও আমি তাহার উল্লেখ
করিলামনা তথাপি তুমি মনে করিও না যে তােমায় আমাকে
ভুলিতে উপদেশ দিয়াছি। বলিতে কি সরােজ, আমি তােমাকে
কখনভুলিতে পারিব না। আমি তােমায় যাহা যাহা লিখি-
তেছি তুমি তদনুসারে কাৰ্য্য করিবে। অদ্য রাত্রিতে তুমি
ডাক্তারদের বাড়ীর পাশ দিয়া ঘুরিয়া গিয়া একটী অশ্বথ বৃক্ষের
মুলদেশে
উপনীত হইবে। তথা হইতে যে অপ্রশস্ত রাস্তাটা
গিয়াছে তাহা ধরিয়া কিছুদূর গেলে কোন্নগরে উপনীত হইবে।
আমি ও নগেন্দ্র রাস্তার উপর থাকিব ; ঐ রাস্তা ধরিয়া আসি-
লেই তুমি আমাদিগকে দেখিতে পাইবে। আর যদি না পাও
আমরা তােমায় খুঁজিয়া লইব। অধিক লিখিব না আমায়
ভুলিও না।
তােমারই সেই
@দেবেন্দ্র নাথ দাস।।
আশায় নিরাশা। ১৩ সরয় পত্রখানি পড়িয়া বড়ই আনন্দিত হইল। রাত্রিতে একাকিনী গমন করিলে বিপদ হইবে এবং হইতে পারে সে ইহা ভাবিল না। পথে সর্প ভয় আছে, শৃগাল কুকুরের ভয় আছে এবং মনুষ্যেরও ভয় আছে, কিন্তু সরযূ তাহা ভাবিল না। কেবল দেবেন্দ্রনাথের মূর্তিই ভাবিতে লাগিল। যতক্ষণ দেবেন্দ্রর মূৰ্ত্তি তাহার মনে থাকিবে, যতক্ষণ সে আপনাকে দেবেন্দ্ৰপত্নী বলিয়া ভাবিবে, ততক্ষণ কোন সৃষ্ট বস্তুই তাহার অনিষ্ট করিতে পারিবে না:-ইহাই তাহার মনে হইল । ক্রমে সন্ধ্যাদেবী মলিন কৃষ্ণবর্ণের বসন পরিধান পর্বত অঞ্চল' ধরা জগৎ সমাচ্ছন্ন করিলেন। জীবনকৃষ্ণ বাবুর বাড়ী অদ্য বিবাহবাড়ী, কিন্তু যাহার বিবাহ তাহার মনে আদৌ সুখ নাই। যাহার বিবাহ তাহার মনে হয় না যে অদ্য তাহার বিবাহ। রাত্রি ৪৫ দণ্ড হইলেই সরযু কি মনে করিয়া কোথায় যাইবার জন্য বাটী হইতে বাহির হইল। সরযু! তােমার কি পিতা মাতা নাই ? তুমি কি পিতা মাতার কথা মান না? তােমার কি ভ্রাতা ভগ্নি নাই ? ছাহাদের জন্য কি তােমার কিছুমাত্র দুঃখ হইল না? দেবেন্দ্রর জন্য বুঝি তুমি পাগলিনী হইয়াছ? সহৃদয় পাঠক! নায়ক নায়িকার ইচ্ছার উপর গ্রন্থকারের কোন হাতই নাই, অতএব এবিষয়ে ধৃষ্টতা মাপ করিবেন। সরযূ নির্দিষ্ট অশ্বথ বৃক্ষের নিকট যাইবার চেষ্টা করিল কিন্তু প্রকৃত পথ দিয়া যাইতে না পারিয়া অপর আর এক পথ- দিয়া গিয়া এক অজানিত স্থানে উপস্থিত হইল। কোথায় বা সেই অশ্বখ বৃক্ষ, কোথায় বা রাস্তা! সরযূ এক জঙ্গলে গিয়া
১৪
সরষু।
কেবল
উপনীত হইল। গভীর রজনী, সকলেই নিদ্রিত।
ঝিল্লিদল ঝিঝি করিয়া নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করিতেছে। সম্‘দেবেন্দ্র
দেবেন্দ্র’ বলিয়া কয়েকবার ডাকিল কিন্তু কে আর উত্তর দিবে ?
প্রতিধ্বনিই কেবল বলিল “দেবেন্দ্র”। বাতাস হাসিয়া উঠিয়া
প্রতিধ্বনির কথাই সপ্রমাণ করিল। তরুগণও বায়ুচালিত হইয়া
সেই কথাই বলিয়া দিল ; সরযূর পদ শব্দও সেই কথা বলিয়া
উঠিল। সরষ আবার ডাকিল “দেবেন্দ্র,” কিন্তু এবারও কোন
উত্তর পাইল না। এইবার সর উচ্চৈঃস্বরে “দেবে দেবেন্দ্র”
কুবি ডাকিতে লাগিল এবং ক্রন্দন আরম্ভ করিল। সহৃদয়
পাঠক! আপনিং'তবে সরষকে শান্ত করুন আমি দেখিয়ে আসি
রাস্তার উপর দেবেন্দ্রনাথ আছেন কি না। কিন্তু ইহারই নাম
“আশায় নিরাশা”।
তৃতীয় পরিচ্ছেদ। ন, হরিষে বিষাদ। দিন গত হইল। কেহ হাসিল, কেহ কঁদিল ; কেহ জন্মিল, কেহ মরিল, দিন তাহা দেখিল কিন্তু চলিয়া গেল। -দিন, কাহার দুঃখে দুঃখ প্রকাশ করিল না বা কাহারও সুখে হৃষ্টচিত হইলনা। কেবল অবিশ্রান্ত গতিতে উদাসীনের ন্যায় চলিয়া গেল। কত স্তব করিলাম, কত মিনতি করিলাম, তপনের উপর কত দোষারােপ করিলাম অবশেষে বলপূর্বক দিনকে রাখিব মনে করিলাম কিন্তু এক মুহূর্তের জন্যও আর রাখিতে পারিলাম । আমার আজ দিন গেল পাঠকের গেল কি না জানিনা। আমি দিনকে ধরিয়া রাখিতে চেষ্টা করিলাম, পাঠক করিলেন কি না জানি না। কেহ কেহ দিনকে শীঘ্র শীঘ্র তাড়াইয়া দিতে চেষ্টা করেন। দিন গত হইলে, সন্ধ্যা দেবী কৃষ্ণ বসন পরিধান করিলেই যিনি প্রিয়তমার সহিত সাক্ষাৎ করিয়া বিরহব্যথা দূর করিতে পারি- বেন মনে করেন তিনিই ইচ্ছা করেন দিন শীল্প শীঘ্র গত হউক। যে আশাজালসমাচ্ছন্ন যুবক রজনীর আগমনে কোন অসামান্ত- রূপলাবণবতী কামিনীর সহিত পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হইবেন মনে, করেন তাহার পক্ষেই দিনের শীঘ্র শী গত হওয়া আনন্দের সরযু। সরযূ কিন্তু অদ্য বিষয়। যে ভালবাসাঙ্খলাবদ্ধা রমণী নিশাগমনেই প্রিয়তমের সহিত সম্মিলিত হইবেন আশা করেন তিনিই প্রার্থনা করেন দিন সত্বর চলিয়া যাউক। অদ্য আশাসহচর জীবনকৃষ্ণ বাবু রজনী- যােগে সরযুর শুভ পরিণয় কার্য সমাধা করিবেন, তজ্জন্যই তিনি দিনকে শীঘ্র শীঘ্র তাড়াইয়া দিতে তৎপর। অপর এক কার্য সমাধা করিবার নিমিত্ত রাত্রির আমন, প্রতীক্ষা করিতেছে। এদিকে রাজপুর গ্রাম নিবাসী শ্ৰীযুক্ত কানাইলাল ঘােষ মহাশয়, স্বপুত্ৰ শ্ৰীমন্ মদনমােহন ঘােষের সহিত সরযুর বিবাহ দিবেন বলিয়া রাত্রির অপেক্ষা করিতেছেন। সুতরাং রজনীদেরী আজ অভিমানিনী, তজ্জন্যই তিনি যেন কিছু বিলম্ব করিয়া আসিলেন। রতনপুর গ্রাম হইতে রাজপুর গ্রামের দূরত্ব অল্প। রাজপুরে কানাই বাবুর বাড়ীতে খুব আনন্দকোলাহল উথিত হইতেছে। যেমন সন্ধ্যাগত হইল, অমনি ভৃত্যগণ মদনমােহনকে বর-সজ্জায় সজ্জিত করিতে প্রবৃত্ত হইল ; দেখিতে দেখিতে বর- সজ্জাকাৰ্য্য সমাধা হইল। বাদ্যকরগণ বাদ্য করিতে লাগিল। এবার বর বিবাহ করিবার নিমিত্ত বহির্গত হইবেন। কানাই বাবু ব্যস্ত হইয়া ইতস্ততঃ ঘুরিতে লাগিলেন। বরের মা, মাসি, পিসি, ইত্যাদি সকলেই বরকে কত আশীর্বাদ করিতে লাগি- লেন ! কেহ বলিলেন “বাবা স্বয়ের লক্ষ্মী ধরে অনি” কেহ বলিলেন “বৌমা অচিরে পুত্রবতী হউন আমরা এক মনে আশীর্বাদ করি।” কিন্তু তাহাদের এসমস্ত আশীর্বাদ কালনেমির লঙ্কাভা?” মাত্র। যাহা হউক মদনমােহন বিবাহ করিবার জন্য লােক হরিয়ে বিষাদ। ১৭ জন সমভিব্যাহারে বাটী হইতে বহির্গত হইলেন। রাত্রি প্রায় আট নয় ঘটিকার মধ্যেই তাঁহারা রতনপুর গ্রামে গিয়া পড়ি- লেন। তাহারা-তথায় গিয়াই আশ্চর্যান্বিত হইলেন; কারণ জীবনকৃষ্ণ বাবুর বাটী হইতে কেহই তাহাদিগকে আহ্বান করিয়া লইয়া যাইবার নিমিত্ত আসিলেন না। তাহারা অনেকক্ষণ অপেক্ষা করিলেন, কিন্তু কোন ফল দর্শিল না। অবশেষে গ্রামের কোন লােকের মুখে শুনিলেন “সরযূকে বাড়ীর মধ্যে পাওয়া যাইতেছে না।” তাকে খুঁজিবার জন্য চতুর্দিকে লােক পাঠান হইয়াছে, কিন্তু তাহার কোন সন্ধান পাওয়া যাই- তেছে না, কানাই বাবু পুত্রের বিবাহ দিতে গিয়া নিতান্ত অপ্রতীভ হইলেন। প্রথমে তিনি জীবনকৃষ্ণ বাবুর উপর কত দোষারােপ করিলেন। ভাবিলেন তিনি প্রতারক তিনি শঠ তিনিই কন্যাকে অপর কোন পাত্রের সহিত পৰিণতা করিবেন এই অভিপ্রায়ে তাহাকে কোথাও লুকাইয়া রাখিয়াছেন এবং লােকের নিকট বলিয়ঃ বেড়াইতেছেন “সরযূকে খুঁজিয়া পাওয়া যাইতেছে না” পরে তিনি যখন প্রকৃত বিষয় জবগত হইলেন, তখন তাহার সে ভাব মন হইতে তিরােহিত হইল। এক্ষণে নিরাশা ও বিষাদ আসিয়া ধীরে ধীরে সেস্থান অধিকার করিল। মদনমােহন মণিহারা ফণির মত নিপভাবে বসিয়া থাকিলেন। তাহার হস্তপদাদি যেন চলৎশক্তি রহিত হইয়া গেল। মনে মনে তিনি কেবল আপন দুরদৃষ্টকে তিরস্কার করিতে লাগিলেন। কিয়ৎক্ষণ পূর্বে তিনি আনন্দসাগরে ভাসিতেছিলেন ; এক্ষণে তিনি বিষাদের অনন্ত স্রোতে ভাসিতেছেন। কানাই বাবুর আর পূর্বের মত স্ফুর্তি নাই। তিনি কেবল ইতস্ততঃ ধাবিত راه সরযু । হইতেছেন। তাহার শরীর হইতে অবিরত স্বেদ নির্গত হই- তেছে। কাহারও সহিত কথা কহিতে তাহার প্রবৃত্তি হইতেছে । যদি কেহ প্রকৃত বিষয় না জানিয়া, অথবা জানাসত্বেও গােপন করিয়া তাহাকে জিজ্ঞাসা করিতেছেন ‘বিবাহের লগ্নটা কখন মহাশয় ?” তখন তিনি আরও বিরক্ত হইতেছেন। শেষে ক্রোধসহকারে উত্তর দিতেছেন “পাজি ব্যাটারা জেনেও যেন জানে না। দেখচে মেয়েটারই সন্ধান নেই, তাতেও জিজ্ঞাসা কচ্ছে লগ্ন কখন ?” কানাই বাবুকে দেখিলে বােধ হয় তিনি ক্রোধে এক্ষণে অগ্নিশর্মা হইয়াছেন। একজন লােক আসি। বলিল “কানাই বাবু, সরযুর কোন সংবাদ পাওয়া গেলনা।” কানাই বাবুর ধৈৰ্যশক্তি যেন এবার বিলুপ্তপ্রায় হইল। ক্ষণেক পরে আবার একজন লােক আসিয়া বলিল ‘‘কানাই বাবু সরযূর ত কোন তল্লাসই পেলেন না। এবার কানাই বাবু যে কি অবস্থা- প্রাপ্ত হইলেন তাহা লিখিতেও ভয় হয় ; কারণ পাছে তিনি আমার উপর খঙ্গখস্ত হন। তিনি এক্ষণ দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য। এদিকে জীবনকৃষ্ণ বাবুর বাড়ীর অবস্থাও অতীব শােচনীয়। বাদ্যকরগণের বাদ্যধ্বনি আর কর্ণগত হইতেছে না। কিয়ৎক্ষণ পূৰ্ব্ব ভৃত্যে যে আনন্দকোলাহল করিতেছিল তাহা এক্ষণে হাহাকারে পরিণত হইয়াছে। তাহারা আর পূর্বমত পূর্ণমনে ইতস্ততঃ ধাবিত হইতেছে না। তাহাদের মন এক্ষণে যে শূন্য ! “মন্ত্রীর কিস্তিমাত, গজের কিস্তিমাত, ঘানি,” ইত্যাদি শব্দও আর শ্রুতিবিবরে স্থান পাইতেছে না। “মার পাশা বােল, মার ছতিন নয়, চোকে অড়ি দাও” ইত্যাদি ক্রীড়াসক্ত ব্যক্তিগণের উচ্চ রব আর নিতে পাওয়া যাইতেছে না। “ছা, হরিষে বিষাদ। ১১ পঞ্জা, ব্যোম” ইত্যাদি শব্দও আর শ্রুত হইতেছে না। এক্ষণে সকলেই সরষুর অনুসন্ধানে ব্যস্ত। গাড়ি গাড়িপাল্কি পাল্কি আত্মীয় কুটুম্ব আসিতেছেন কিন্তু ভঁহারা দুঃখিত মনে প্রতিগমন করিতে বাধ্য হইতেছেন যে তাহাদের অভ্যর্থনা করিবে তাহার কিছু স্থিরতা নাই। কেহ কেহবা গ্রামের বাহির হইতেই পৃষ্ঠ প্রদর্শন করাইতেছেন। নৃত্য গীতাদির জন্য যে সমস্ত আয়ােজন করা হইয়াছিল তাহা কেবল ভস্মে ঘৃতাহুতি দেওয়া হইল। বিবাহ বাড়ীর সকলেরই আজ আনন্দে নিরানন্দ হইল । মদনমােহর বিষন্ন, কানাই বাবু বিষন্ন, জীবনকৃষ্ণ বাবুও তদ্রুপ। তাহার বাড়ীর অপর সকলেই সেইপ্রকার ! এদিকে দেবেন্দ্রনাথ ও নগেন্দ্রনাথ কোন্নগর গ্রামের সুমীপস্থ রাস্তার উপর অনেকক্ষণ অপেক্ষা করিলেন। রাত্রি অনেক হইল, নিৰ্ম্মল আকাশে চন্দ্র কিরণ দিতেছেন। তারকারাজি ক্ষীণ- জ্যোতিঃ য় মিট মিট করিয়া জ্বলিতেছে। তাহারা দুইজনে এক একবার আকাশের দিকে তাকাইতেছেন স্যার এক একবার সরযুর আগমন প্রতীক্ষায় দুই এক পদ অগ্রসর হইতেছেন। সামান্য শুল্কপর্ণধ্বনিতেও তঁাহারা সরযূর অভ্যর্থনা করিতে প্রবৃত্ত হইতেছেন! অল্পক্ষণ পরে দেবেন্দ্রনাথ নগেন্দ্রকে বলিলেন “চল নগেন একটু এগিয়ে দেখি স্যু আছে কি না।” ‘তবে চল বিলম্বের প্রয়ােজন নাই। রাত্রি অনেক হইল কিন্তু সরযূ কেন আসিল না?” তাহারা পশ্চিমমুখ রাস্তা ধরিয়া অনেক দূর গমন করিলেন কিন্তু কাহাকেও দেখিতে পাইলেন না। শেষে দেবেন্দ্রনাথ ॥
সরষু।
‘সরযু , সরযু” বলিয়া অনেক ডাকিলেন, কিন্তু কোন উত্তর
পাইলেন না। তাহার মনে ক্রমশঃ অনেক সন্দেহ উপস্থিত
হইল। একবার ভাবিলেন “স্যু বােধ হয় পত্র পায় নাই ;
বৃদ্ধা বােধ হয় আমায় প্রতারণা করিয়াছে।” কখনও
ভাবিলেন “বুঝি সরযূ পিতা মাতার কথা লঙ্ঘন করিতে পারে
নাই, বুঝি সে ভাবিয়াছিল তাহার জননী তাহার অভাবে
কত দুঃখ প্রকাশ করিবে, কত বিলাপ করিবে, তজ্জন্যই সে অদ্য
আমার সহিত সাক্ষাৎ করিতে পারিল না। পিতা মাতার হৃদয়ে
নিদারুণ যন্ত্রণা দিয়া সে কেবল আমার জন্য কেন পাগলিনী
হইবে ? আমি স্বার্থপর। সমাজ তাহাকে অপদস্থ করিবে,
সমবয়স্কা বালিকাগণ তাহাকে দোষ দিবে, কত লােক তাহার
বিষয় কত কথা বলিবে, এই সমস্ত বিষয় একদিকে আর আমার
উপর তাহার ভালবাসা একদিকে, ইহার মধ্যে কোন দিকে
অধিক ভার? তাই বলি সরযু আজ বােধ হয় মদনমােহনকে
বিবাহ করিতে বাধ্য হইয়াছে। তবে আর আমি সরফকে
ভালবাসিতে পাইব না! আজ অবধি সেত আর আমার নয়।
আজ সে পরের স্ত্রী হইল! আজ অবধি যদি আমি তাহাকে
ভালবাসি তবে আমি পরের স্ত্রীকে ভালবাসিব। সেত আর
আমার নয়।” দেবেন্দ্রনাথ আবার ভাবিলেন “বােধ হয় সরযূ
পথ ভুলিয়া অপর কোনদিকে চলিয়া গিয়াছে। বােধহয় সরয
আজ এখানে আসিতে না পারিয়া অপর কোন অজানিত স্থানে
উপনীত হইয়াছে। বােধ হয় সে কোন হিংস্র জন্তুর ভক্ষ্য
। বস্তুতে পরিণত হইয়াছে, কিম্বা কোন দুরাচার নৃশংস ব্যক্তি
অর্থলােভ রাত্রিতে তাহাকে হত্যা করিয়াছে অথবা কোন
হরিষে বিষাদ। পাশববৃতিচরিতার্থক রণব্যাকুল দুর্ব ও কামাতুর ব্যক্তি তাহার উপর কোন অচিন্তনীয় অত্যাচার করিয়াছে। অহে। আমি কি হতভাগ্য!! কি নিষ্ঠুর !! সেই নবকিশলয়-দল সদৃশ কোমলা- গীকে আজ আমি দুর্বিসহ যন্ত্রণাপথের পথিক করিলাম । সেই চারু দর্শনীয়া, মাধবী লতায় আজ আমি স্বহস্তে তীক্ষুধার কুঠার দ্বারা ছিন্ন করিতে মনেমধ্যে কোন দ্বিধা করিলাম না! সরােজ, আমার নির্দয়তার সীমা নাই !!! কিন্তু সরযূ কি লজ্জার ভয় করে ? সরযূ কি সমাজভয়ে ভীতা ? সে কি পিতা মাতার কথায় আমায় ভালবাসিতে বিস্মৃত হইবে? সে কি লােকের কথার ভয়ে..আমায় ভালবাসিবে না ? হিংস্র জন্তু তাহার অনিষ্ট করিতে পারিবে না। বােধ হয় সে পথ ভুলিয়া গিয়াছে, তবে আমি বড়ই হতভাগ্য! আজ আমায় আনন্দে নিরানন্দ হইল। হরিষে বিষাদ হইল! অতুল আনলাচল আজ অগাধ দুঃখসাগরে পরিণত হইল! সুবৃহৎ পারিজাতপুষ্পোদ্যান আজ পূতিগন্ধ- পূর্ণ ক্ষুদ্র নরককুণ্ডে পরিণত হইল! অনির্বচনীয় আনন্দোচ্ছাস আজ ক্ষণেকের মধ্যে বিষাদস্রোতে মিলিত হইল চতুর্থ পরিচ্ছেদ। আশা। . সৃষ্টিকর্তা মানব সৃজন করিয়াই কৃপা করিয়া তাহার শরীরে আশাবীজ বপন করিয়া দিয়াছেন। মানব যখন নিরাশার নিবিড় তিমিরে সমাচ্ছন্ন হইয়া সংসার-কাননে পথশ্রান্ত পথিকের ন্যায় মগতিতে ইতস্ততঃ পদচারণ করে ; যখন মানব সুবিশাল জীবন মরুভূমির প্রান্তরে, সূৰ্য্যদগ্ধ, বালুকাকণাসমন্বিত বেগবান সর্বগাহত, ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত ভ্রমণকারীর ন্যায় ক্ষুৎপিপাসায় ব্যাকুল হইয়া চতুর্দিকে দৃষ্টিক্ষেপ করে এবং কল্পনারূপ মৃগ- তৃষ্ণিকা দ্বারা প্রতারিত হইয়া ভগ্ন মনােরথ হয়, তখন কেবল স্বগীয়া আশাদেবীই তাহার হৃদয়াকাশে উদিত হইয়া নিরাশার গাঢ় অন্ধকার বিদূরিত করেন, তখন শান্তিদায়িনী আশাদেবীই আসিয়া সেই প্রতারণাময়ী মৃগতৃষ্ণিকাকে নির্মলসলিলবিশিষ্ট, সুস্বাদলসমন্বিত উর্বক্ষেত্রে পরিণত করেন। যখন ঘটনারূপ কুহেলি তিমির মানবজীবনের উচ্চাভি- লাষরূপ প্রাতঃসূৰ্য্যকে আবৃত করিয়া রাখে, তখন প্রভাতী আশাদেবীই, অলােকামান্যশক্তিসম্পন্ন ঐন্দ্রজালিকদণ্ডদ্বারা সেই কুটিকাদাল নিরাকৃত করতঃ তাহাকে আশ্বস্ত করেন, আশা। উদ্যমশীল হইতে শিক্ষা দেন, যত্ন পরিশ্রমের সহায়তা গ্রহণে উত্তেজিত করেন, সিদ্ধিলাভের উপায় বলিয়া দেন; কর্মক্ষেত্রে, স্থিরভাবে, গাভীৰ্য্যসহকারে সতর্কতার সহিত দণ্ডায়মান হইতে আদেশ করেন। মানবদাশরথি যখন মায়াবী প্রলােভন মারী- চের সুবর্ণমৃগরূপ ক্ষণস্থায়ী, ক্ষণবিচ্ছুরিত মধুর হাসিতে মােহিত হয় এবং তাহার লােভনীয় আকৃতি দর্শনে মলিনধী হইয়া, সামান্য অপ্রকৃত, অন্তঃসারশূন্য, সুখরূপ সীতার মনােরঞ্জনে উদ্যুক্ত হইয়া সশর কাৰ্ম্মক হন্তে তাহাকে বিনাশ করিব মনে করে, ও তজ্জন্যই বদ্ধপরিকর হয়, তখন পরিণামদর্শিনী আশা- দেবীই তাহাক সে কাৰ্য্য হইতে বিরত হইতে উপদেশ দেন। আশা কুহকিনী। তাহার কুহকেই জীবজন্তুগণ ভুলিয়া থাকে। আবার তাহার কুহকে পড়িয়াই লােকে কার্যসিদ্ধি করিতে পারে। আশা যদি না থাকিত তবে সংসার জীব- জন্তুগণ দুঃসহ দেহভার বহন করিয়া অবশেষে অপার ক্লান্তি সাগরে নীত হইত। আশা তােমায় চিরসঙ্গিনী। তুমি সম্রাট হইল স্ব সিংহা- সনে উপবেশন করতঃ নির্বিঘ্নে রাজসুখ উপভােগ কর, আশা, তােমার সঙ্গে থাকিবে। তুমি দরিদ্র হইয়া ভিক্ষুকের বেশে দ্বারে দ্বারে অন্ন প্রার্থনা করিয়া বেড়াও আশা তােমার সঙ্গে থাকিবে। তুমি কারারুদ্ধ হইয়া কারাবাসজনিত দুঃসহ যন্ত্রণা ভােগ কর, আশা তােমায় ত্যাগ করিতে পারিবে না। তুমি সন্ন্যাসী হইয়া, সংসার যাবতীয় বস্তুতে স্পৃহাশূন্য হও, শ্মশানে বসিয়া পরমাত্মার চিন্তা কয়, আশা তােমার সঙ্গে থাকিবে। তুমি গৃহবাসী হইয়া যুবতীর প্রেমে মােহিত হইয়া থাক আশা ২৪ সরযু। নল যখন তােমার চিরসহচরের কাৰ্য্য করিবে। তুমি কবি হইয়া গভীর। রজনীতে নক্ষত্ররাজিসমাচ্ছন্ন, সুধাংশু ভূষিত, নীল নভােমণ্ডলের দিকে দৃষ্টি করিয়া কল্পনাকৌতুকে নিযুক্ত থাক, আশা তােমার সঙ্গিনীর কাৰ্য্য করিবে। তুমি নিদ্রিতাবস্থায় স্বপ্নের স্বপ্নময়ী চিন্তায় আমােদ অনুভব কর, আশা তোমার সঙ্গে থাকিবে। তুমি কাঙ্ক্ষিতবস্তু লাভে নিরাশ হইয়া জীবন বিসর্জনে দৃঢ়- প্রতিজ্ঞ হও আশা তােমার বন্ধু হইয়া, তােমায় সে ঘােরা নারকীয়া আত্মহত্যা কাৰ্য্য হইতে নিবৃত্ত করিবে। ময়ন্তীকে কাননমধ্যে একাকিনী রাখিয়া চলিয়া যান, তখন আশাদেবীই কেবল তাহার সাথীর কাৰ্য্য করিয়া চিরবন্ধুত্বের পরিচয় দিয়াছিলেন। তাই বলি আশা মানবের চির সঙ্গিনী। সরযু এক্ষণে নিবিড় অরণ্যমধ্যে একাকিনী বিচরণ করি- তেছে। কেবল আশাই তাহার সহচমীর কাৰ্য্য করিতেছেন। পবনদেব এতক্ষণ প্রায় নিস্তব্ধ ছিলেন। সরযূ ক্রন্দন করিতেছে দেখিয়া তিনি আর মোনাবলম্বন করিয়া থাকিতে পারিলেন । তাহা হৃদয়ে সহানুভূতি উপস্থিত হইল। তিনি প্রবল- বেগে দীর্ঘনিশ্বাস ত্যাগ করিতে লাগিলেন। মনে করিলেন সরযুর বিলাপবাক্য দেবেন্দ্রনাথের কর্ণগােচর করিবেন কিন্তু কৃতকার্য হইলেন না। দেবেন্দ্রনাথ এক্ষণে আর রাস্তার উপর নাই। সমীরণ আর একবার তাহাকে খুঁজিতে গেলেন কিন্তু হতাশ হইয়া ফিরিয়া আসিলেন। চদেব এতক্ষণ নীল আকাশে থাকিয়া বৃক্ষপত্রাদির অন্তরাল হইতে সরযুর মুখ নিরীক্ষণ করিতেছিলেন। কিন্তু যখন তিনি দেখিলেন সরযর দুঃখ ক্রমশঃই বৃদ্ধি পাইতেছে তখন তিনি অর থাকিতে পারি- অশা। সরু একটী একটী বৃক্ষের লেন না। মেঘের মধ্যে লুক্কায়িত হইলেন। আর জ্যোৎস্না নাই। চতুর্দিক অন্ধকার। সরযূর মনে এবার বড় ভয় হইল, সে বসিয়া পড়িল । আকাশে চঁাদ নাই। নিকটে দেবেন্দ্র নাই। সমীপে জননী নাই। কাছে ভগিনী নাই। তবে সরযূকে এক্ষণে আর কে শান্ত করিবে ? কেবল আশাদেবীই মধ্যে মধ্যে তাহার মনে আবিভূত হইয়া ক্ষণপ্রভা চপলার ন্যায় ধৈর্য্যের চিহ্ন অঙ্কিত করিয়া দিতেছেন। নিম্নদেশে বসিয়াছিল। সেই তরুটী মধ্যে মধ্যে পত্র সঞ্চালন স্থলে সরযুর দুঃখে সহানুভূতি প্রকাশ পূর্বক দীর্ঘনিশ্বাস ত্যাগ করিতেছে। আশা ভিন্ন অপর কেহই সরযূকে প্রবােধ দিতে পারিবে না। আশা ছাড়া অপর কেহই তাহার সঙ্গে নাই। তাহার মনে আশা যদি,না থাকিত তবে যে মুহূর্তে সে সে পথ- ভ্রান্ত হইয়াছিল, সেই মুহূর্তেই সে জীবন বিসর্জন করিত। আশা আছে বলিয়াই সে এখনও স্থিরভাবে বসিয়া আছে। সে কেবল ভাবিতেছে দেবেন্দ্রনাথই তাহার একমাত্র পতি। দেবেন্দ্রই তাহার একমাত্র অবলম্বন। তিনিই কেবল তাহাকে এই বিষময় সংসারে একমাত্র অমৃতফল দান করিতে পারিবেন। দেবেন্দ্রনাথই তাঁহার সংসারমরুভূমির মধ্যস্থ একমাত্র উর্বর- ক্ষেত্র। জননীর নিকট যে কথা প্রকাশ করিতে লজ্জা হইল, জনকের নিকট যাহা ব্যক্ত করিতে ভয় হইল; ভগিনীগণের নিকট বাহা প্রকাশ করিতে অনিচ্ছা হইল ; দেবেন্দ্রনাথ যদি নিকটে থাকিতেন তবে কেবল তাহার নিকটই তাহা প্রকাশ করিয়া সরয মনের ক্ষোভ নিবারণ করিতে পারিত। যদি সে এক
সরযু।
দিন দেবেন্দ্রনাথের সাক্ষাৎ পায় তবে তাঁহার নিকট প্রাণ
ভরিয়া বলিতে পারে তাহার মন তাহার জন্য কত উৎকণ্ঠিত।
কিন্তু আশাই তাহার অবলম্বন। আশা থাকিল দেবেন্দ্রনাথকে
সব কথা খুলিয়া বলিবে। অহে! আশার কুহক কি
অসামান্য ?
পঞ্চম পরিচ্ছেদ।
অভাব।
রজনী প্রভাত হইল। উদ্বেগের রজনী, দুঃখের রজনী,
আনন্দের জনী, বিষাদের রজনী, নিরাশার রজনী, আশার
রজনী,প্রভাত হইল। সরয রাত্রির শেষভাগে একবার
নিদ্রিত হইয়াছিল কিন্তু তাহাও অধিকক্ষণের নিমিত্ত নহে।
সে যেরূপ ভাবে বসিয়াছিল সেইরূপ ভাবেই নিদ্রা গিয়াছিল।
ভাবিতে ভাবিতে শয়নের কথাটাও বিস্মৃত হইয়াছিল। তাহার
আলুলায়িতকেশসমন্বিত মন্তকের পশ্চাৎভাগ বৃক্ষের মূলদেশে
সংলগ্ন হইয়াছিল। দক্ষিণহন্ত দক্ষিণ অঙ্কের উপর ছিল।
বাম হটা কটিদেশের উপর ন্যস্ত ছিল।
নিশাদেবী যেমন চলিয়া গেলেন, অমনি রজনীকান্ত ম্লান
হইলেন। দেখিতে দেখিতে “পাখি সব করে রব—রাতি
পোহাইল।” পত্রগণের উপরস্থ শিশিরবিন্দু সমূহ অরুণকিরণ
পাইয়া হাসিতে হাসিতে পবনের সহিত ক্রীড়া করিতে লাগিল।
সমীরণ ধীরে ধীরে এক একটী কুসুম প্রস্ফুটিত করিল।
স্যু নিদ্ৰাযােগে দেবেন্দ্রনাথকে দর্শন করিতেছিল।
দেবেন্দ্রনাথের নিকট আপন কথা একে একে ব্যক্ত করিতে-
২৮ সরযু। ছিল। কিন্তু যেমন সে জাগিয়া উঠিল অমনি তাহার মন অসুস্থ হইল। কোথায় দেবেন্দ্র আর কোথায় এই দুর্গম বন ! সরসু অবাক! তাহার মনেমধ্যে আশাদেবী এতক্ষণ বিরাজ করিতেছিলেন। কিন্তু এইবার অভাব আসিয়া তাহাকে চঞ্চল করিয়া তুলিল। কিন্তু আশাদেবী-আশাই থাকিলেন। কোন ব্যক্তি যে তাহাকে স্বস্থানচ্যুত করিবেন তাহা তিনি সহ করিতে পারেন না। তবে অভাবও বড় প্রবল। আশা অভা- বের সঙ্গিনী। অভাবও আশার সঙ্গী। যাহার জন্য যে ব্যাকুল হয় তাহা না পাওয়ার নাম অভাব। যে শক্তি আম-- দের হৃদয়মধ্যে অবিরত উপস্থিত থাকিয়া আমাদিকে সংসারে থাকিতে বলে ও দুঃখের সময় আমাদিগকে প্রবােধ বচন দ্বারা শান্তি দান করে তাহার নামই আশা। যেখানে অভাব সেখানেই আশা। সমূ ভাবিতে ভাবিতে চতুর্দিকে দৃষ্টিনিক্ষেপ করিতেছে। একটী লতাবৃন্তে দুইটী প্রসূন প্রস্ফুটিত। দুইটীই পরস্পর পরস্পরের গল্প ঢলিয়া পড়িয়াছে। পবন আসিয়া একবার তাহাদিগকে বিচ্ছিন্ন করিব মনে করিতেছেন কিন্তু অকৃতকাৰ্য হইয়া প্রতিগমন করিতেছেন, আবায় একবার দুইটাকেই এক দিকে লইয়া যাইতেছেন। ইহা দেখিয়া সরযূর মনে ভগিনী গণের কথা একে একে উদয় হইল। হরিণালনাকুল তীব্র- গতিতে তাহার নিকট দিয়া গমন করিতেছে। সরযু তাহা- দিগকে দেখিয়া বা তাহাদের নয়ন দেখিয়া দুঃখে নীরবে অশ্রু বিসর্জন করিতেছে। সরযুর এক্ষণে অভাব হইয়াছে। অভাব—দেবেন্দ্রনাথের .
অভাব। ২৯ দর্শনাভাব। কি উপায়ে দেবেন্দ্রনাথকে দেখিতে পাইবে, কি উপায়ে সে এই নিবিড় বন হইতে বহির্গত হইবে, কি উপায়ে কোথায় যাইতে পারিবে,–এই সমস্ত বিষয় সরযূর মনে যুগপৎ উপস্থিত হইতেছে। উপায়ের অভাব হইতেছে। কিন্তু আশা তাহা হইতে দিবেন না বলিয়া আশ্বাস দিতেছেন। অভাব উপায়কে সঙ্গে লইয়া আসিতেছে। উপায়ের অভাব আবার সদুপায় সঙ্গে লইয়া সরযূর মনে প্রবেশ করিতেছে। বনের ভিতর হইতে বাহির হইবার ইচ্ছা সরযূর মনে বল যতী হইল । সরষু উঠিল। এক পা করিয়া অগ্রসর হয় আর ফিরিয়া ফেখে কোন পথ দিয়া যাইতেছে। এক পা করিয়া গিয়া এক একটী বৃক্ষ অতিক্রম করে আয় বৃদ্ধকে উদ্দেশ করিয়া জিজ্ঞাসা করে “রু বল এই পথে গেলে দেবেন্দ্রনাথের দেখা পাব কি না।” বাতাস কেবল তরুর আজ্ঞানুসারে সেই কথা গুলি অপরের নিকট লইয়া যাইতেছে কিন্তু বৃক্ষ স্বয়ং কিছুই বলিতেছে না—পবনও দীর্ঘনিশ্বাস ব্যতীত অপর কোন উত্তর দিলেন না। সহানুভূতি দেখান এই প্রকারেই হয় !! পরের দু:খে কুন্দন কয় কিন্তু তােমার সাধ্য থাকা সত্বেও কাহাকে একটা পয়সা দিবে না ! পবনের পরদুঃখকাত মতা এই প্রকৃতির অধীন ! সরযূর অভাব, হইয়াছে বলিয়াই সে পরের নিকট সহানুভূতি যজ্ঞা করিতে বাধ্য হইয়াছে অথবা দয়ালু ব্যক্তিগণ তাহার কাতরত অব- লােকন করিয়া তাহার দু:খে দুঃখ প্রকাশ করিতে বাধ্য হইতে ছেন। তবে কথা কি সংসারে অভাব কাহার নাই ? বােধহয় প্রত্যেকেই কোন না কোন প্রকার অভাবের অধীন। রাজ। বল, প্রজা বল, দীন বল, ধনবান বল, ভিক্ষুক বল, দানশীল
সরযু।
ক
r
বল, অভাব কাহার নাই ? যে দান করে তাহারও অভাব
আছে। যে গ্রহণ করে তাহার ত অভাব হইতেই পারে।
যিনি রাজা তাহারও অভাব আছে। যিনি প্রজা ভাহারও
আছে। তবে আমাদের মনে আর একটী বৃত্তি আছে যদ্দার।
আমরা অভাবকে কতক পরিমাণে দমনে রাখিতে পারি-
তাহা সন্তোষ । আশা অভাবের অভাবে জীবন ধারণ করিতে
পারে না। আবার অভাবের সহিত সন্তোষ যদি না থাকিত
তবে আমরাও যে কতদূর গহিত কাৰ্য প্রবৃত্ত হইতাম তাহা
কল্পনা মার্গে আনয়ন করিতেও সাহস হয় না।
সরযু এক্ষণে ভালবাসার দ্রব্যটী পাইতেছে না। তাহাকে
না পাওয়াই তাহার অভাব। আশা তাহাকে সান্ত্বনা করি-
তেছে। সন্তোষ তাহার হৃদয়ে কতক পরিমাণে শাস্তি দান
করিতেছে। কিন্তু সে চলিতেছে। স্থিরভাবে বসিয়া থাকি-
তেও তাহার ইচ্ছা নাই। কারণ অভাব তাহার মন চঞ্চল
করিয়াছে।
অবিশ্রান্ত গতিতে চলিয়া অনেক দূর অগ্রসর হইল ।
যে কোমলচরণ সরযূ একদিনের জন্যেও ভাবে নাই যে তাহাকে
বন্ধুর পথে গমন করিতে হইবে, যে সরযু একদিনের জন্যেও
চিন্তা করে নাই, এমন কি তাহার মনে একদণ্ডও ধারণা হয়
নাই যে তাহাকে তৃণকুশাঙ্কুরক্ষতচরণ হইয়া বনে বনে
পথহীন পথিকের ন্যায় ব্যাকুল হৃদয়ে বিচরণ করিতে হইবে;
যে সময় এক মুহূর্তের জন্যও ভাবে নাই যে এবম্বিধ অভাবনীয়
ঘটনার বশবর্তিণী হইয়া তাহাকে নিরাশামিশ্রিত আশাস্রোতে
ভাসিতে ভাসিতে জীবনের অনন্ত স্রোতে মিলিত হইতে
সরযু
e
অভাব
৩১
হইবে ; যে সরযূ ক্ষণেকের জন্যেও চিন্তা করে নাই যে এতাদৃশ
ভীষণমূর্তি অকাল মেঘরূপ দুর্ঘটনাবলী তাহার সুখতপন সমাচ্ছন্ন
করিয়া রাখিবে; সেই কোমল হৃদয়, মৃঙ্গী, সরল সরযু আজ
তাহা স্বচক্ষে দর্শন করিতেছে, কর্ণে শ্রবণ করিতেছে, আপন
অন্তঃকরণস্থ বৃতিনিচয় দ্বারা অনুভব করিতে বাধ্য হইতেছে।
কেন আজ সে এরূপ করিতেছে ? ইহার মূল কে? উৎপত্তি-
স্থান কি ? কেবল অভাবের বশবর্তিনী হইয়াই কি সে ইহা
করিতেছে? কিম্বা তাশার জালে পড়িয়া তাহার এরূপ অবস্থা
হইতেছে ? অথবা সে কি প্রেম পাগলিনী ? না কি সে
ভালবাসা শৃঙ্খলে বদ্ধ হইয়া প্রণয়কারাগারে অবস্থান করতঃ
ইহা করিতেছে ? উত্তর পাঠক মনােমত করিয়া লউন।
কারণ আমি যাহা বলিব তাহা আপনার মনে না ধরিতে পারে।
আমি যদি বলি সরযূ উপরােক্ত সমন্তেরই অধীন তবে
আপনি কি রাগ করেন ? সে কথা কি আপনার ভাল লাগে ?
৩৭১,
==
র
alling
ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ ।
LIHU
দুঃখ-কারাগারে।
বিশ্বসংসারস্থ জীব জন্তু মাহেই দুঃখ-কারাগারে সময়ের
সুদৃঢ় শৃঙ্খল দ্বারা নিবদ্ধ রহিয়াছে। দিন গত হইতেছে, মরুল
গত হইতেছে, দেখিতে দেখিতে বৎসর চলিয়া যাইতেছে
এবং আমাদের জীবিতকালের দিনও কম হইতেছে। কিন্তু
দুঃখের হ্রাস লক্ষিত হইতেছে না; বরং বৃদ্ধিই দৃষ্ট হয়।
মানবজাতির স্বভাবই এইপ্রকার। মানব মনে করে তাহার
বয়ঃক্রম যত বেশী হয় তাহার দুঃখও তত বৃদ্ধি পায়।
আমরা ভাবি দুঃখের হাত হইতে, কালের কঠিন নিগড় হইতে
বিমুক্ত হইব, কিন্তু পারি না।
আমরা দুঃখকে পরিত্যাগ
করিতে চাই কিন্তু দুঃখ আমাদিগকে ছাড়িবে কেন, দুষ্ট অলি
মধুর আস্বাদ একবার পাইলে কি সে আর কমল ত্যাগ করিয়া
সিমুল ফুলের নিকট যাইতে চায় ?
দু:খ নানাবিধ। যাহা আমাদের শরীর ও মনকে কষ্ট দেয়,
তাহাই দুঃখ বলিয়া অভিহিত হইল। যাহাদের প্রচুর অর্থ
আছে তাহাদের যে অর্থের অভাব হয় না এরূপ নহে, এবং
সেই অর্থাভাবজনিত কষ্ট দ্বারা যে তাহাদের শরীর ও মন
দুঃখকারাগারে। ; নিরাপদে থাকিতে পারে এরূপ কোন কারণ নাই। যাহার কাঙ্ক্ষিত বস্তু পায় না তাহাদের দুঃখ অপর একপ্রকার। তাহা- দের সে বস্তু নিকটে নাই অথচ তাহারা তাহার জন্য কাতর। ইহা একপ্রকার দুঃখ। তাহাদের মনে কষ্ট হয় ; তজ্জন্য তাহা- দের শরীরও কষ্ট পায় ; অতএব তাহাদের দুঃখ উত্তরােত্তর বৃদ্ধিই পাইতে থাকে। যে, যাহাকে পাইবার জন্য, দুর্গম বিপিনে প্রবেশ করিতে কুণ্ঠিত হয় না, প্রজ্বলিত হুতাশনে আত্ম সমৰ্পণ করিতে দ্বিধা করে না, সিংহব্যাঘ্ৰগজাদিনিষেবিত গিরিগহ্বরে গমন করিতে সঙ্কুচিত হয় না । উত্তালতরঙ্গমালা- পূর্ণ স্রোতস্বতীর সলিলে জীবন দান করিতে ভীত হয় না ; সে যখন তাহাকে পাইবার বিষয় প্রায় হতাশ হয়, তখন তাহার মনে যে দুঃখ হয় তাহা তাহার হৃদয়ের অন্তঃস্থলে গমন করে, সেই নিদারুণ ৰন্ত্রণা তাহাকে যেভাবে যেদিকে লইয়া যায় সে সেইভাবে সেইদিকেই যায়। যে ব্যক্তি যথার্থ ই দুঃখ- কারাগারে বন্ধ থাকে। সে সময়ের ক্রীড়নক হয়। দেবেন্দ্রনাথ এক্ষণে দুঃখ-কারাগারে বন্ধ। •উদ্ধারের উপায় অবলম্বন করিতেছেন কিন্তু উদ্ধার হইতে পারিবেন কি না এবিষয়ে সন্দিহান হইয়াছেন। সরযূ বাটী হইতে বহির্গত হইয়া দেবেন্দ্রনাথের নিকট গমন করিতে পারে নাই ইহা পূর্বেই বলা হইয়াছে। দেবেন্দ্রনাথ ও নগেন্দ্রনাথ অনেক রাত্রি পর্যন্ত সরযুর আগমন প্রতীক্ষা করিয়া থাকিলেন, কিন্তু সরষু আসিল না। কেন যে সে আসিতে পারিল না এবিষয় তাহাদের বিশেষ সন্দেহ উপস্থিত হইল। দেবেন্দ্রনাথ নগেন্দ্রনাথকে বলিলেন ‘ভাই নগেন, চল উভয়েই রতনপুর যাই।” “ইহা সৎযুক্তি সরযু। আমার বিবেচনায় জীবনকৃষ্ণ বাবুর বাড়ী পর্যন্ত যাওয়াই যুক্তি যুক্ত।” “অবশ্য, যখন রতনপুর যাইব, তখন সেখানে নিশ্চয়ই যাইব।” তদনন্তর তাহারা উভয়ে রতনপুরাভিমুখে গমন করিতে লাগিলেন। কিন্তু দেবেন্দ্র নাথ যে রত্নের উদ্দেশে রতনপুর যাইতেছেন, রতনপুর এক্ষণে তাহা কোথায় হারাইয়াছে। অতএব তাহারা গ্রামে প্রবেশ করিয়াই যেন সমস্ত অন্ধকারপূর্ণ দেখিতে লাগিলেন। যেন কোথাও কিছু নাই, সমস্ত দ্রব্যই যেন ফাকা। চতুর্দিক শূন্য ; গ্রামে যাহার মুখ দেখেন তাহা- কেই কোন কথা জিজ্ঞাসা করিব মনে করেন কিন্তু পারেন না। কে যেন তাহাদিগকে বাধা দিতেছে বােধ হইল। কারণ প্রায় সকলের মুখেই বিষাদ চিহু লক্ষিত হইতেছে। তখন তাহারা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইয়া একস্থানে দণ্ডায়মান থাকিলেন, অব- শেষে দেবেন্দ্রনাথের বন্ধু একটী যুবা পুরুষ সেই পথ দিয়া যাইতেছিলেন। নগেন্দ্রনাথ তাহার নিকট অবগত হইলেন যে “সরযূকে গ্রামে কোথাও পাওয়া যাইতেছে না।” যুবকের এই কথা শুনিয়া নগেন্দ্রনাথ তাহাকে আর কোন কথা জিজ্ঞাসা করিতে সাহসী হইলেন না। যুবক চলিয়া গেল। তঁাহারও জীবনকৃষ্ণ বাবুর গৃহাভিমুখে গমন করিতে লাগিলেন। রাত্রি তখন প্রায় সার্ক দুই প্রহর গত হইয়াছে। কিন্তু জীবন- কৃষ্ণ বাবুর বাড়ীর কাহারও নিদ্রা নাই। বােধ হইতেছিল যেন নিদ্রাদেবী অন্য রাগ করিয়া অপর কাহারও গৃহে লুক্কায়িতভাবে অবস্থান করিতেছেন। কারণ তাঁহার প্রিয় দুহিতা সরযূ অদ্য দুঃখ-কারাগারে। জীবনকৃষ্ণ বাবুর গৃহে নাই। তাহারা কাহাকেই যে জিজ্ঞাসা করেন তাহার স্থিরতা নাই। কেবল কয়েকজনের মুখপানে তাকাইয়া তাকাইয়া শেষে তাহারা তথা হইতে প্রস্থান করিলেন। বৈঠকখানায় ঝড় লণ্ঠনাদি প্রায় বিলুপ্তজ্যোতিঃ হইয়া নভাে- মণ্ডল তারকারাজির মত মিট মিট করিয়া জলিতেছে। গালিচা, সতরঞ্চ ইত্যাদি যাহা কিছু বিছানাদি পাতা হইয়াছিল তাহাদের উপর কেবল মনুষ্যপদরজঃ ভিন্ন অপর কোন পদার্থ দৃষ্ট হইল । কেহ কেহ শশব্যস্ত হইয়া বেগে চলিয়া যাওয়ায় গালিছার কোন কোন অংশ সরিয়া গিয়াছে। বরাদ্বানের নিমিত্ত যে সভা করা হইয়াছিল, তাহাতে কেহ উপবেশন করিয়াছিলেন কি না নির্ণয় করিবার ভার সুবিজ্ঞ বিজ্ঞানবিদের উপর সমর্পিত হইল। অন্তঃপুর মধ্যে কেহ য়ােদন করিতেছে, কেহ কেহ উচ্চৈঃস্বরে সরযূর নাম ধরিয়া ডাকিতেছে। সেই সমস্ত কথা যখন দেবেন্দ্রনাথের কর্ণকুহরে প্রবিষ্ট হইতেছে, তখন তিনি অধীর হইয়া পড়িতেছেন । নগেন্দ্রনাথ দেবেন্দ্রনাথের তাদৃশী অবস্থা সদৰ্শন করিয়া নিতান্ত মর্মাহত হইলেন। নগেন্দ্রনাথ দেবেন্দ্রনাথের যথার্থ বন্ধু। যেভাবে দেবেন্দ্রনাথ দাড়াইয়াছিলেন নগেন্দ্রনাথ তাহা বুঝিলেন। দেবেন্দ্রনাথের বাহিক অবস্থা পরিদর্শন করিয়া তিনি তাহার মনােভাব অবগত হইলেন। জীবনকৃষ্ণ বাবুর বাটী হইতে বহির্গত হইয়া একটা ক্ষুদ্র ও সংকীর্ণ পথ ধরিয়া তাহার পশ্চিমমুখে কিছুদূর গমন করি- লেন। যাইতে যাইতে নিশা প্রভাত হইল। রাস্তার উত্তর- দিকে একটা ক্ষুদ্র গ্রাম। তাহারা সেইগ্রামে প্রবেশ করিলেন ।
সরয।
গ্রামে ইষ্টক নির্মিত বাড়ী একটীও দৃষ্ট হয় না, সমস্ত বাড়ীই
তৃণচ্ছাদিত। কোন কোন গৃহের চালের উপর লতাবলি বিরাজ
করিতেছে। লতাগুলির মধ্যে কোনটাতে প্রস্ফুটিত এবং
কোনটীতে অর্ধ মুকুলিত দুই চারিটী পুষ্প দৃষ্ট হইতেছে ; আবার
কোনটীতে ফুলফল উভয়ই বর্তমান। গৃহস্থের অনবধানতা-
বশতঃই হউক, বা মমতাবশতঃই হউক, অথবা অপর কোন
কারণেই হউক ফলগুলির মধ্যে কোন কোনটী পৰু হইয়াছে
অথচ তাহাদিগকে লতা হইতে বিচ্ছিন্ন করা হয় নাই। কোন
কোন গৃহের চালের খড়ের মধ্যে এক একটী অপ্রশস্ত, স্বল্পগভীর
অনধিকনিম্ন পথ হইয়াছে। বৃষ্টির জল চালের মটকার উ’র
পড়িয়া সেই পথ দিয়া অনায়াসে অধােমুখে যাইতে পারে।
কারণ অধােগমনের পথ সর্বত্রই সুলভ। কুচিৎ দুই চাৰিটী
পক্ষী মটকার উপর বসিয়া কিচিরমিচির শব্দ করিতেছে এবং
সেই সঙ্গে সঙ্গে মটকাস্থিত বংশ খণ্ডের উপর চঞ্চু ঘর্ষণ করিতেছে।
নগেন্দ্রনাথ একটী গৃহে প্রবিষ্ট হইলেন।
দেবেন্দ্রনাথ
বাহিয়ে দাড়াইয়া থাকিলেন। নগেন্দ্রনাথ রামা রামা ”
বলিয়া কয়েকবার ডাকিলেন। সত্বর “মা” বাহিরে আসিল।
সে প্রথমতঃ যেন একটু স্তম্ভিত হইল। নগেন্দ্রনাথ তাহার
কারণ বুঝিয়া বলিলেন “ কিরে রামা আমায় বুঝি চিনতে
পারি নি।” তখন রামার মুখে কথা ফুটিল। সে বলিল
“হুজুর যে এখানে আসবেন তাত পূর্বে ভাবি নি। তবে
কি মনে করে এখানে আসা হ’ল শুনতে পাই কি? “সে কথা।
পরে হবে এখন তুই আমায় একটা আসন এনে দে “আজ্ঞে
আসন আনুচি” এই বলিয়া রাম আসন আনিবার জন্য গেল ।
দুঃখ-কারাগারে। ৩৭ অল্পক্ষণ পরেই একখানি শ্বেতবর্ণ কম্বল লইয়া প্রত্যাগমন করিল। কম্বলটীর স্থানে স্থানে দুই দশ অঙ্গুলি পরিমিত বিস্তার বিশিষ্ট দুই পাচটা ছিদ্র লক্ষিত হইতেছে। ছিদ্রগুলি বিশেষরূপে পরিদর্শন করিলে অনুমান করা যাইতে পারে যে, সেগুলি মূষিকাগ্রহসম্পাদিত। গৃহের বহি:স্থিত পরচালার গােয়াকে কম্বল খানি পাতা হইল। রােয়াক মৃত্তিকানিৰ্ম্মিত। তাহার উপরিভাগ দ্রব- গােময়ালিপ্ত। সম্মার্জনীহার বশতঃ দুই একটা ক্ষুদ্র রেখা অঙ্কিত হইয়া গিয়াছে। পরচালার খুঁটিগুলি বংশনির্মিত। রাম দক্ষিণ হস্তে একটী খুটি ধরিয়া পঁাড়াইয়া থাকিল। তাহার নাম রামচন্দ্র। জাতিতে সে সৎগােপ। বয়স আন্দাজ পঞ্চাশ বৎসরের কিছু বেশী। চৰ্ম্মের অনেকস্থান শিথিলীভূত হইয়াছে। মস্তকের কেশ প্রায় শুক্লবর্ণ হইয়াছে। দন্ত গুলি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র। আজ পর্যন্ত একটীও বিনষ্ট হয় নাই। কথিত আছে “রামা এখনও ছােলাভাজা খাইতে পারে। পাঠক রাগ করিও না। কারণ আজকাল আমরা গায় চত্বারিংশৎ বর্ষেই বৃদ্ধত্ব প্রাপ্ত হই অর্থাৎ বয়ােবৃদ্ধ হইয়া পড়ি। “রামার বক্ষে অনেকগুলি লােম দৃষ্ট হইতেছে। সেগুলি এখনও ঠিক সাদা হয় নাই। উচ্চতায় রামচন্দ্ৰ আপন হস্তের চৌদ্দ পােয়া কিন্তু অপরের হন্তের বােধ হয় সাড়ে এগার পােয়া। তাহার হন্ত পদাদি সুদৃঢ়। পদতলের স্থানে স্থানে ছােট ছােট গর্ত হইয়াছে। রমা কিছুক্ষণ থাকিয়া বলিল “বাবু পা খােবার জল আব কি ?
Obuv
সরযু ।
নগেন্দ্রনাথ উত্তর দিলেন “জল ত আবিই, আর সেই
সঙ্গে সঙ্গে দুই চারিটা বালিস আনিস, আমরা বড় ক্লান্ত হইয়াছি
একটু ইব।”
রামা চলিয়া গেল। দেবেন্দ্র ও নগেন্দ্র এইবার কথা
কহিবার অবকাশ পাইলেন। তাঁহারা বিশ্রাম লাভ করিতে-
ছেন। সুতরাং দেবেন্দ্রনাথের মনে গত রাত্রির ঘটনাবলি
একে একে উদয় হইতেছে। শরীরের ক্লান্তি বশতঃ পূর্বে যাহা
কিছু বিস্মৃতি সাগরে নীত হইয়াছিল, এক্ষণে বিশ্রাম লাভ করিয়া,
দেবেন্দ্রনাথ সেগুলি একে একে মনে আনয়ন করিতে লাগি
লেন, অথবা তাহারা মােহিনী প্রকৃতির বশবর্তিনী হইয়া
আপনা হইতেই তাহার স্মৃতিপথে আবিভূত হইতে লাগিল।
দেবেন্দ্রনাথ কি ভাবিয়া নগেন্দ্রনাথকে জিজ্ঞাসা করিলেন
“বল দেখি নগেন আমার সব কোথায় গেল?” “আমার
বােধ হয় সে তােমার পত্রানুযায়ী কাৰ্য্য করিতে গিয়া কোন
বিপদে পড়িয়াছে। হয়ত সে পথ ভুলিয়া কোথায় চলিয়া
গিয়াছে।” * *
“ভাই নগেন তবেত সরযূর বড় বিপদ হইয়াছে ! সে ত
। এক্ষণে একাকিনী। তবে সে কোথায় যাইবে ? সেত ইহার
পূর্বে অপর কোন গ্রামে যাইবার পথ জানিত না। হয়ত সে
রামপুরের জঙ্গলে গিয়া পড়িয়াছে। তবে নিশ্চয়ই কোন হিংস্র
জন্তু তাহার প্রাণবধ করিয়াছে। অথবা সে কোন দুষ্টলােকের
হন্তে পড়িয়া দুঃখকারাগারে বন্ধ আছে। তবে আমার আ
অনর্থক জীবন ধারণে প্রয়ােজন নাই। যাই আমিও তাহার
সঙ্গে যাই।”
দুঃখ-কারাগারে। “দেবে এতদূর উদ্বিগ্ন হইও না। সরযূ যদি জঙ্গলে গিয়া থাকে তবে হিংস্র জন্তুতেও তাহার অনিষ্ট করিবে না। (म হতাশ হইয়া জীবনও বিসৰ্জন করিবে না; কারণ সে তােমার জন্য ব্যাকুল। তুমি স্থির হও। আজ না পাও, দুদিন পরেও সমূকে পাইবে। পাইবে। ভালবাসায় অনেক বিঘ্ন আছে। তুমি জান “শেয়াংসি বহুবিদ্যানি” ভাল কাজ করিতে গেলেই তাহাতে কোন না কোন বিঘ্ন ঘটিবে। ইষ্টসাধনে অনেক প্রতিকূল ঘটনার আবির্ভাব হয় কিন্তু তাহা স্থিরপ্রতিজ্ঞ লােকের নিকট জলবিম্ববৎ প্রতীয়মান হয়। এই যে তােমার মনে এত কষ্ট হইতেছে, এই যে তুমি সরযুর জন্য আহার, নিদ্রা, বিশ্রাম ইত্যাদি ত্যাগ করিতে উদ্যত হইয়াছ, এসমস্ত তােমায় মঙ্গ- লের জন্ত, তদ্বিষয়ে অণুমাত্র সন্দেহ নাই। পরমেশ্বর যাহা করেন তাহা কি ভাল ভিন্ন মন্দ হয় ? যাহা আমাদের নিকট মন্দ বলিয়া বােধ হয় হয়ত তাহা ভাল। যাহা আমরা ভাল বলিয়া স্থিরসিন্ধান্ত করি, হয়ত তাহার ন্যায় মন্দ কাৰ্য্য আর নাই। বিচক্ষণ ব্যক্তির সমন্ত বুঝিতে পারেন হারা জানেন সংসারে দুঃখের ভাগ অধিক এবং মুখের ভাগ কম। দুঃখের অন্তই সুখ এবং সুখের শেষই দুঃখ। তুমি পুর্ব হইতে সরযুকে পাইব পাই আশা করিয়া আসিতেছিলে, তাহা যখন প্রায় শেষ সীমায় উঠিল, অর্থাৎ সেই সুখ যখন পরে শেষ সােপানে পদার্পণ করিল, তখনই দুঃখের প্রথম সােপানে তুমি পদক্ষেপ করিলে। তুমি যে সেই সুখতপনে ক্ষণেকের জন্য এই দুঃখচ্ছায়ারূপ মেঘাবরণ অবলােকন করিয়া এতদুর চিন্তিত হইয়াহ, ইহা নিতান্ত আশ্চর্যের বিষয়। আবার দেখ, তােমার সরযু। হঠাৎ এরূপ হওয়াও যুক্তিসঙ্গত নহে। তুমি বিশেষ করিয়া ভাবিয়া দেখ, তােমার চিন্তিত হইবার কোন কারণ নাই। তুমি দেখিবে তােমার এই দুঃখের শেষ সুখে পরিণত হইবে । মন স্থির কর। সহিষ্ণুতা দেবীর আশ্রয় গ্রহণ কর। ‘চক্রবৎ পরিবর্তন্তে দুঃখানি চ সুখানি চ”—এক সময় দুঃখ এক সময় সুখ—“চির- দিন কখনও সমানে যায় না। আবার দেখ, সংসারে যদি কেবল সুখই থাকিত, তবে দুঃখের মূল্য কেহ জানিতে পারিত । অথবা যদি কেবল দুঃখই থাকিত, তবে সুখের নামও কেহ জানিতে পারিত না। সংসার উভয়ের মধ্যস্থলে অবস্থিত। ইহাতে সুখও আছে দুঃখও আছে । কারণ সংসার মিশ্রিত দ্রব্যের আধার ; বিশুদ্ধ দ্রব্য এখানে পাইবার কোন উপায়ই নাই। দেখ কত লােক কতদিন কারাগারে জীবন যাপন করে। কত লােক নির্বাসিত হইয়া কালাতিপাত করে। আর তুমি কিছুদিনের জন্যে দুঃখকারাগারে বন্ধ থাকিবে, ইহাতেও তাের্মীর কষ্ট বােধ হইবে ? তুমি সময়ের নিকট অপরাধ করিয়াছিলে, তাই তােমার এত কষ্ট হইতেছে। কিন্তু জানিবে ইহা তােমার মঙ্গলের জন্যই হইয়াছে। তুমি দুঃখে না পড়িলে সুখের মুল্য জানিতে পারিবে না, ইহা জানিয়াই সময় তােমায় এঅবস্থায় পাতিত করিয়াছেন। বিচ্ছেদই প্রণয়ের পরীক্ষা। তুমি ভেবে দেখ, ইহা তােমার স্থিরতার পরীক্ষা মাত্র।” “নগেন তুমি যাহা বলিলে সমস্তই আমি বুঝিলাম। কিন্তু আমার আর কোন ক্ষমতা নাই। আমি যে কারারুদ্ধ। আমি দুঃখকারাগারে জীবন যাপন করিতেছি।”
দুঃখ-কারাগারে।
৪১
দেবেন্দ্রনাথ ও নগেন্দ্রনাথ কথাবার্তায় নিযুক্ত আছেন,
এরূপ সময় রমা জল আনিল । তাহার পুত্র কানাইলাল
কয়েকটী বালিস আমিয়া দিল। পাছে কম্বলের উপর শুইতে
কষ্ট হয়, এই ভাবিয়া রামা একখানি মাদুর কম্বলের উপর
পাতিয়া দিল, বালিসগুলি তাহার উপর রাখিল।
তদনন্তর নগেন্দ্রনাথ ও দেবেন্দ্রনাথ পল্লিগ্রামসুলভ কয়েকটা
ফল ও কিছু মিষ্টদ্রব্য ভক্ষণ করিয়া কথঞ্চিৎ সুস্থ হইলেন।
দেবেন্দ্রনাথ একটী দীর্ঘনিশ্বাস ত্যাগ করিতে করিতে বলিলেন
“নগেন আমিত কারারুদ্ধ। আমার আবার সুখ কি ? আমার
আবার আহার কি?”
রাম ইহার কিছুই জানি না। অগত্যা সে তাহাদের
আহারের সংস্থানর্থ স্থানান্তরে গমন করিল । নগেন্দ্রনাথ
শুইবামাত্ৰ নিদ্রিত হইলেন। দেবেন্দ্রনাথ শুইয়া শুইয়া ভাবিতে
লাগিলেন। ভাবনার কাৰ্য দুইটী। ভাবনাদ্বারা কখনও নিদ্রা-
দেবী দূরীকৃত হন, আবার কখনও বা ভাবনা নিদ্রাদেবীকে
ডাকিয়া আনেন। সুতরাং দেবেন্দ্রনাথ ভাবিতে ভাবিতে নিদ্রিত
হইলেন।
==
READING KO
।
sa:::
5188
DALLY
সপ্তম পরিচ্ছেদ স্বপ্ন। ।। ম. স্বপ্ন মানবজীবনে যাহা কিছু ঘটিয়া থাকে, মানবগণ যাহা কি ? করিয়া থাকে, যাহা কিছু মানব চিন্তা করে, মানবজীবনে যাই। কিছু উপভােগের দ্রব্য হয়, তাহার সমস্তই স্বপ্নের ক্রীড়', সমস্তই স্বপ্নময়, সকলই স্বপ্নসুখবৎ ক্ষণস্থায়ী। আমরা কত প্রকার নব নব আমোদ উপভােগ করি, সেই রূপ জীবনে জাগ্রত অবস্থাতেও আমরা নুতন নূতন পদা ইলিগ্ৰাহ, করিয়া থাকি। কিন্তু জিজ্ঞাসা করি, তাহার এক- টীও কি চিরস্থায়ী ? এক টীও কি আমাদিগকে যথার্থ সুখ দিতে পারে ? আমি দেখি সমস্তই স্বপ্নময়। এই যে জীমুত নদে মনপ্রাণ আকুল হয়, এই যে তপনের দারুণ উগ্ৰকরে প্রাণ ছটফট করিতে থাকে, এই যে সুধাকরের প্রফুল্লমুখে হাসি- সন্দর্শনে মনে মনে সামান্য বা ‘অতুল” প্রীতি লাভ হইয়া থাকে, এই যে সংসারে নিত্য নিত্য কত প্রাণ জন্মগ্রহণ করিতেছে কত জীব লয়প্রাপ্ত হইতেছে, এই যে মানব পরম্পরা পরস্পরে পরস্পরের উপর কত নিষ্ঠুর ব্যবহার করিতেছে, এই স্বপ্ন। ৪ হ যে দরিদ্র অন্নপ্রার্থী গণ প্রায় কঙ্কালাবশিষ্টদেহ হইয়া দ্বারে দারে মুষ্টিভিক্ষার নিমিও প্রতিনিয়ত বিচরণ করিতেছে, এসমস্ত কি ? ইহা কি স্বপ্নের খেলা ৰা মােহের মায়াক্রীড়া ভিন্ন অপর কিছু হইতে পারে ? জাগ্রত অবস্থায় আমরা যাহা যাহা মনােমধ্যে চিন্তা করি, যাহা যাহা আমাদের স্মৃতিপথে বার বার উদয় হয়, যাহা যাহ পাইতে আমাদের সর্বদাই ইচ্ছা হইয়া থাকে, স্বপ্নে অমর। তাহার অধিকাংশই ভোগ করিয়া থাকি। আবার স্বপ্নদৃষ্ট পদার্থ যদি প্রকৃতরূপে অনুভব করিতে পারি, তবে আমাদের দুইবার প্ন দেখা হয়, সেই আমোদ দুই প্রকারে ভাগ করিতে পারি । অর্থাৎ নিদিতাবস্থায় সপ্নযােগে সে যে বস্তু দর্শন ক,ি জাগ্রতা- বস্থায় সলজ্ঞ হইয়া ইন্দ্রিয়গণের পরিচালনা দ্বারা যদি তাহার অনুভূতি করিতে পারি, তবে আমাদের আনন্দ দিগুণিত হয়। দেবেন্দ্রনাথ এক্ষণে নিদ্রিত। নিদ্রিত হইলেই যে স্বপ্ন দেখিতে হইবে এরূপ কোন স্বতঃসিদ্ধ নিয়ম নাই। অর্থ সপ্ন যে কেবল নিদ্রিত হইলেই দেখা যায় এরূপ নহে। চিন্তাতুর ব্যক্তি নিদ্রিত হইলেই স্বপ্ন দেখিয়া থাকেন। স্বপ্নের ক্ষমতা অসাধারণ। যে ব্যক্তি জাগ্রতাবস্থায় চিন্তা জর্জরিত দেহে, বসিয়া বসিয়া আপন অদৃষ্টলিপির বিষয় ভাবেন, তিনি যদি একবার নিদ্রিতাবস্থায় স্বপ্ন রাজ্যে উপনীত হইতে পারেন তবে তাহার সকল কষ্ট দূর হয়। যে দরিদ্র ভিক্ষুক একমুষ্টি অল্পের জন্য কত শ্রম স্বীকার করিয়া থাকে, কত দুঃসহ বাক্য- যন্ত্রণা সহ্য করিয়া থাকে, সেই অন্নার্থ, ক্ষুধার্ত ব্যক্তি যদি ৪৪ সরযু। একবার নিদ্রাদেবীর কৃপায় স্বপ্নদেবের নিকট গমন করিতে পারে, তবে তাহার সমস্ত ক্লেশ আপনা হইতেই কোথায় পলায়ন করে জানিনা, সে তখন হয়ত রাজা হইয়া চিন্তা করে “কেমন করিয়া রাজ্য পালন করিব, কেমন করিয়া প্রজাগণের মনস্তুষ্টি সম্পাদন করিব, কেমন করিয়া এত নিঃস্ব ব্যক্তির আহার দানে সমর্থ হইব।” কিন্তু যখন সে জাগ্রত তখন তাহার সে সুখ কোথায় যায়? আমাদের জীবনের সুখও সেইপ্রকার। যতদিন বুঝিতে পারি না যে সংসার অনিত্য,সংসারস্থ যাবতীয় বস্তু অসার, সংসার মিশ্রিত বস্তুর নিবাস স্থান, ততদিন আমরা ভাল মন্দ বিচার না করিয়া ইচ্ছাধীন কাৰ্য্য করি—ততদিন আমরা মাতাকে গুরু বলিয়া মনে করি না, পিতার কথায় অবাধ্য হই,-ভ্রাতা ভগিনীদিগকে চরণে দলিত করি—ততদিন আমরা অবর্ণনীয় নৃশংস কাৰ্য্য করিতে বােধহয় কোন দ্বিধাই কিন্তু একবার যদি জানিতে পারি সংসারের কোন দ্রব্য থাকিবে—কোন দ্রব্য চিরকাল আমাদের সঙ্গে যাইবে— তবে হা লাভ করিতে যত্ন করি। আমরা জানি ভালবাসার বন্ধন চিরস্থায়ী। প্রকৃত ভালবাসার বাসস্থান স্বর্গ। দাম্পত্য প্রেম ইহার এক প্রধান অংশ ; সহ- ধর্মিণী ও সহধৰ্ম্মীই কেবল ইহা ভােগ করিতে পারেন। দেবেন্দ্রনাথ সেই মাদুরের উপর নিদ্রা যাইতেছেন। ভানু কর তীক্ষমুখ হইয়াছে। দেবেন্দ্রনাথ জাগিলেন না; পবনদেব দ্রুতগমনে যাইতেছেন, কখন কখনও তিনি বালুকাকণা লইয়া বিদ্ধপচ্ছলে তাহা দেবেন্দ্রনাথের শরীরে অৰ্পণ করিতেছেন। দেবেন্দ্রনাথের কিছুতেই দৃকপাত নাই। করি না ।
স্বপ্ন।
৪৫
ক্ষণেক পরে রামা আসিয়া নগেন্দ্রনাথকে জাগাইল, নগেন্দ্র
নাথ বলিল “কিরে খাবার যােগাড় হয়েছে নাকি?”
“হ্যা বাবু। আপনারা স্নান করিয়া গেলেই সমস্ত ঠিক
হইবে। চাটুজ্যে মশাই আপনাদের অপেক্ষায় বসে আছেন।”
“তবে তুই যা আমরা স্নান করিগে।”
রাম চলিয়া গেল। নগেন্দ্রনাথ দেবেন্দ্রনাথকে ডাকিলেন
“দেবেন্দ্র-দেবেন্দ্র” কিন্তু দেবেন্দ্রনাথ জাগিলেন না। শেষে
তিনি তাহার গায় হাত দিয়া তাহার নিদ্রাভঙ্গ করিলেন।
দেবেন্দ্রনাথ উঠিয়াই “সর সর” বলিয়া চীৎকার করিয়া উঠি-
লেন। নগেন্দ্রনাথ তাহাকে থামাইবার ইচ্ছায় যেমন তাহার হাত
ধরিতে গেলেন, অমনি দেবেন্দ্রনাথ চীৎকার করিয়া উঠিলেন ৷
‘সরযু—সরযু-সরােজ—আমার—সরােজ, আমায় ছাড়িয়া
কোথায় যাও ? দেখ আমিই সেই হতভাগ্য দেবেন্দ্রনাথ ;
আমিই তােমায় কষ্ট দিয়াছিলাম, কিন্তু আমায় ক্ষমা কর।
সরােজ আমায় রক্ষা কল্প।”
নগেন্দ্রনাথ যখন দেখিলেন দেবেন্দ্রনাথ পাগলা রিকি
বকিতেছেন, তখন তিনি বলিলেন “দেবেন অস্থির হইও না।
ধৈৰ্য্য অবলম্বন কর। তােমায় এইমাত্র এত উপদেশ দিলাম,
কিন্তু তুমি কিছুই বুঝিলে না? সরযূ আসিবে। সে হারায়
নাই।”
“না ভাই—আর আমি তােমার কথা শুনিব না। এইমাত্র
আমি সরযূকে দেখিলাম। দেখিলাম সরয় সমস্ত রাত্রি আমার
জন্যে কাঁদিয়া কঁাদিয়া বনে বনে বিচরণ করিতেছে, কিন্তু আমি
নিশ্চিন্তভাবে বসিয়া আছি। দেখিলাম সরযূ এক জনশূন্য
৪৬ সরয়। রযু হিংস্ৰজন্তুসমন্বিত জঙ্গলে একাকিনী বসিয়া বসিয়া আমার নাম করিতেছে ও আমায় পায় নাই বলিয়া অবিরত অশুট- বিসৰ্জন করিতেছে। আমি যাইতে যথাসাধ্য যত্ন করিতেছি, কিন্তু পারিতেছি না। মনে হইল দৌড়িয়া গিয়া সরযূকে আনি, কিন্তু দৌড়িতে পারিলাম না। কে যেন আমার পদ গতিশূন্য করিয়া দিল। মনে করিলাম ডাকিয়া সরযূকে সব কথা বলি, কিন্তু আমার বাশক্তি রুদ্ধপ্রায় হইল। ইচ্ছা হইল অপর কাহারও দ্বারা সরযূর উদ্ধার কাৰ্য নিষ্পন্ন করিব, কিন্তু তাহা হইল না, আমি চলিতেও পারিলাম না, কথা কহিতেও সমর্থ হইলাম না। ক্ষণেকের মধ্যে সে দৃশ্য পরিবর্তিত হইল। দেখি- লাম সরয দস্যুদল মধ্যে নিপতিতা। উদ্ধার করিব মনে করিলাম কিন্তু পারিলাম না। তাহারা সরযকে লইয়া কোথায় চলিয়া গেল। নগেন্, আর আমি কিছুই বলিতে পারি না। তুমি আমায় কেন জাগাইলে? আমি স্বপ্নে সরযুর দর্শন পাইতে- ছিলাম, এক্ষণে ত আর সরযূ নাই। স্বপ্ন সরযু আমার নিকটে ছিল, তুমিই তাহাকে দূরে পাঠাইলে ! তুমি আমায় আবার দুঃখসাগরে ভাসাইলে! তুমি বন্ধু হইয়া অবন্ধুর কাৰ্য কৰিলে। ?
| F অষ্টম পরিচ্ছেদ দুঃখের উপর দুঃখ। দেবেন্দ্রনাথ অনেক বিলাপ ও খেদোক্তি করিয়া নগেন্দ্র নাথের সহিত নিকটবর্তী একটা পুষ্করিণীতে স্নানকাৰ্য সমাধা করিলেন। তৎপরে উভয়েই আহার করিতে গেলেন। দেবে নাথের যাইবার ইচ্ছা নিতান্ত অল্প ছিল। নগেন্দ্রনাথের অনু- রােধ রক্ষাৰ্থ যৎকিঞ্চিৎ আহার করিলেন। অহরান্তে উভয়েই রামার গৃহের সেই পচালায় শয়ন করিলেন। নগেন্দ্রনাথ দেবেন্দ্রনাথের অবস্থা দর্শনে নিত। ক্ষুব্ধ হই- লেন। এদিকে দেবেন্দ্রনাথ শুইয়া শুইয়া ঊর্ধদিকে দৃষ্টি করিতেছেন, এবং কি ভাবিতেছেন। নগেন্দ্রনাথ নিদ্রিত হইলেন। দেবেন্দ্র ভাবিতে লাগিলেন। প্রায় একপ্রহর গত হইলে, নগেন্দ্র নাথ জাগিয়া উঠিলেন, উঠিয়া দেখেন দেবেন্দ্রনাথ তাহার পার্শ্বে নাই। তখন তিনি বিস্ময়ে আত্মহারা হইলেন। ভাবিলেন ‘বােধ হয় দেবেন্দ্র বাহিরে কোথায় গিয়াছে।” তিনি অনেক ক্ষণ অপেক্ষা করিলেন তথাপি দেবেন্দ্রনাথ ফিরিলেন না। তখন তাহার মনে ঘাের সন্দেহ উপস্থিত হইল। তিনি তাড়াতাড়ি ৪৮ সরষু। ; উঠিয়া বাহিরে ইতস্ততঃ অনেকক্ষণ অনুসন্ধান করিলেন, কিন্তু দেবেন্দ্রনাথকে দেখিতে পাইলেন না। গ্রামের বাহিরে গেলেন একটী রাস্তা ধরিলেন, পূর্বমুখে কিছুদূর গমন করিয়া, শেষে উত্তর মুখ করিলেন। তিনদিকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র, পাহাড়, কেবল উত্তরদিকে এক সুবৃহৎ জঙ্গল। আবার দক্ষিণদিকে যদিও একটা পাহাড় আছে তথাপি উহার অনেক অংশ ফাঁকা ; একটা ক্ষুদ্র মরুভূমিও দেখা যাইতেছে, মধ্যে মধ্যে দুই চারিটী বৃক্ষ ও যেন অন্ধকারের অনুকরণ করিতেছে, বােধ হইল। নগেন্দ্রনাথ কেবল উত্তরদিকেই চলিলেন। কোথায় যে যাইবেন তাহার কিছুই স্থিরতা নাই জঙ্গলে প্রবেশ করিয়া ‘দেবেন্দ্র দেবেন্দ্র বালা অনেক ডাকিলেন কিন্তু কোন উত্তর পাইলেননা। হতাশ হইলেন, তথাপি সাহস হীন হইলেন না, চলিতেও থামিলেন না, দেখিতে দেখিতে নিশাদেবীও আগমন করিলেন । এক্ষণে পাঠক বােধ হয় একটা কথা জিজ্ঞাসা করিবেন নগেন্দ্র নাথের কি ভয় নাই ?” ইহার উওর অতি সহজ। সুতরাং পাঠকই 'কনিয়া লইতে পারেন। তবে আমার মনে হয় যে প্রকৃত বন্ধু হয়, সে প্রকৃত বন্ধুর জন্যে প্রাণ পর্যন্ত বিসৰ্জন করিতে কুণ্ঠিত হয় না; বরং বন্ধু যাহাতে বিপদ হইতে নিষ্কৃতিলাভ করিতে পারেন এবিষয়ে সে দুরূহ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করিতেও সঙ্কুচিত হয় না, সুতরাং রজনীকে দেখিয়া নগেন্দ্রনাথের ভয় হইল না। বনে? প্রায় সমুদায় বস্তু নিস্তব্ধ ; কেবল ঝিলিদল “ঝি ঝি ” শকে সেই নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করিতেছে। আর মধ্যে মধ্যে সমীরণ পুষ্প সৌরভ বহন করিয়া বেড়াইতেছেন। নগেন্দ্রনাথ অবিশ্রান্তভাবে চলিতেছেন; দেখিতে দেখিতে বিভাগীয় বন কৃষ্ণ হইবে দুঃখের উপর দুঃখ। ৪৯ কৃষ্ণতর হইয়া আসিল। নভশ্চাতপস্থিত তারকারূপ জ্যোতি- ঘানগণ এতক্ষণ মিট মিট করিয়া জ্বলিয়া নগেন্দ্রনাথকে পথ দেখাইতেছিলেন। তাঁহারাও এক্ষণে অন্তর্হিত হইলেন। এতক্ষণ তাহারা সতর্কতার সহিত দর্শক ও রক্ষকের কাৰ্য্য করিতেছিলেন কিন্তু আর পারিলেন না, পশ্চাদ্বী হইতে বাধ্য হইলেন। বাতাসও একবার নিস্তব্ধপ্রায় হইল। একে পথভ্রমণের পরিশ্রম, তাহাতে মনে মনে ঘাের চিন্তা, তাহাতে আবার নিরাশার চিহ্রস্বরূপ নভােমণ্ডলে মেঘমণ্ডলের আবির্ভাব; সুতরাং নগেন্দ্রনাথের মনে দুঃখের উপর দুঃখ উপস্থিত ইহল। তাঁহার হস্তপদাদি ক্রমশঃ অবশ হইল। কাকাশে পয়াে- মুখনিচয় ধীরে ধীরে একত্র হইল। পবনদেবও ক্ষণ-জড়ভাব পরি- ত্যাগ করিলেন। নগেন্দ্রনাথের শরীরে দুই এক ফোটা বৃষ্টি পড়িল। দেখিতে দেখিতে রীতিমত বর্ষণ আরম্ভ হইল। বৃক্ষাদি সাঁ সাঁ শব্দে পত্ৰসঞ্চালনচ্ছলে উন্মত্ত ব্যক্তির ন্যায় জলদগণের নিকট কত মিনতি করিল; কিন্তু তাহারা আরও উদ্ধত হইয়া গুড়, গুড় গম্ভীর নিনাদে আপনাদের স্বরমাধুর্যের পরিচয় দান করিতে লাগিল। চপলাদেবীও মধ্যে মধ্যে মধুর অথবা বিকট হাসি হাসিতে লাগিলেন। একপক্ষে নগেন্দ্রনাথ সে হাসি ভাল ভাবি- লেন। আর একপক্ষে তাহাতে ভঁহার বিরক্তি বােধ হইল। ভাল ভাবিবার কারণ এই যে তিনি সৌদামিনীর হাসির ছটায় পথ দেখিতে পাইলেন। আবার তাহা তাহার পক্ষে বিরক্তিকর বােধ হইল, কেন না চপলার হাসি চঞ্চলা,ক্ষণস্থায়ী এবং বিদ্রুপ- ব্যঞ্জক, কারণ তিনি দুঃখিত, কিন্তু চপলাদেবী তাহার দুঃখে হাসি- তেছেন। বৃষ্টির প্রভাব ক্রমশঃই বৃদ্ধি হইতে লাগিল। পবনও ৫ সরষু। নিজমূর্তি পরিগ্রহণে বাধ্য হইলেন। এইবার তিনি দুর্বল প্রকৃতি- পুঞ্জ তরুরাজির উপর ভীষণ অত্যাচার করিতে লাগিলেন। কে ছিন্নবাহু হইল, কাহারও অঙ্গুলি কর্তিত হইল, কেহ কেহ সমুলে উৎপাটিত হইল, বােধ হয় কেহই নির্বিঘ্নে পরিত্রাণ পাইল না। নগেন্দ্রনাথ বড় কষ্টে পড়িলেন। একে মনে তাহার অনেক গুলি দুঃখ বিরাজ করিতেছিল, তাহাতে আবার রাত্রিতে বন- মধ্যে এত কষ্ট পাওয়ায় তাহার দুঃখে উপর ঘােতর দুঃখ উপ- স্থিত হইল। কিন্তু তাহা হইলে কি হইবে? ইহা যে প্রকৃতিদেবীর সাধারণ ধৰ্ম্ম তিনি দুঃখী ব্যক্তিকেই দুঃখ দেন—“ছিদ্রেধনুর্থ বহুলীভবন্তি।”
নবম পরিচ্ছেদ কাটা গাছে গােলাপ ফুল। সংসাররূপ তুলাদণ্ডের উভয় পার্শ্বস্থ অগ্রভাগয়ে সুখ দুঃখ- রূপ ভারদ্বয় প্রতিনিয়ত লম্বমান হইয়া আছে। দুঃখ চিরদিনই সুখের ভার অপেক্ষা গুরুতর। সুখ চিরদিনই দুঃখের সমান হইতে ইচ্ছা করিতেছে কিন্তু পারিতেছে না। সম্পদ বিপদ, মানবজীবনের নিত্যপ্রবৃত্তঘটনা মধ্যে পরিগণিত। দুঃখরূপ জনশূন্য বৃক্ষলতাদি বিহীন মরুভূমিতেও সুখের উর্বর ক্ষেত্র পাইতে ইচ্ছা হয়। দুঃখ কারাগারে বন্ধ থাকিয়া শীশমী পক্ষীরাজের পক্ষ পাইতে অভিলাষ হয়। অকুল সমুদ্রের মধ্যস্থলে উপনীত হইয়া, সে ভয়াবহ স্থানেও স্বদেশ পাইবার ইচ্ছা মনাে- মধ্যে উদিত হয়। সুবিশাল সাহারা মরুভূমিতেও ওয়েসিস আছে। চিরদুঃখপ্রপীড়িত মানবজীবনে ক্ষণকালের নিমিত্ত সুখের ক্ষণ। আবিভূত হইয়া তাহার হৃদয়স্থ দুঃখরূপ মেঘের মধ্যে থাকিয়া মধুর হাসি হাসিয়া থাকেন। কন্টকবৃক্ষপরিবৃত স্থানেও সৌরভা- ন্বিত পুষ্পবৃক্ষ থাকিতে পারে। সূর্যমুখীর কন্টকবৃক্ষেও ভবিষ্যতে চারু ও সুগন্ধবিশিষ্ট প্রমুন প্রস্ফুটিত হইয়াছিল। হিমাদ্রিদুহিত।
সরযু। উমাদেবীও কঠোর তপঃক্লেশ সহ করিয়া ভবিষ্যতে উমে- শের অঙ্কে স্থান পাইয়াছিলেন। প্রত্যাদেশযন্ত্রণাবিদগ্ধশরীয়া শকুন্তলা, দুষ্মন্তের সহিত নবপ্রণয়বিচ্ছেদরূপ কন্টকবৃক্ষেও সুগন্ধি গােলাপ ফুল ফুটিতে দেখিয়াছিলেন। সর্বগুণান্বিত শ্রীরামচন্দ্র দ্বারা বনবাস দণ্ডে দণ্ডিতা সীতা দেবীর কন্টকবৃক্ষেও গােলাপ ফুল ফুটিয়াছিল। তবে আজ নগেন্দ্রনাথের কাটা গাছে গােলাপ ফুল ফুটিবে না কেন? বৃষ্টিদ্বারা, বায়ুকর্তৃক, পন্থাস্থিত কন্টকবৃক্ষ দ্বারা, আহত ৪ ক্ষতশরীর হইয়া নগেন্দ্রনাথ অবশেষে একটী অপেক্ষাকৃত ফাকা স্থানে উপস্থিত হইলেন। অন্ধকারে কিছুই দৃষ্ট হইতেছে না, অথচ কেন, কি জানি নগেন্দ্রনাথের মনে একটু আনন্দ হই- তেছে। পরিধেয় বস্ত্রাদি সমস্তই আ হইয়াছে। গায়ে একটা কামিজ ছিল, সেটা খুলিয়া নগেনাথ হন্তে রাখিয়াছেন। ছাতা ছিলনা সুতরাং তিনি বৃষ্টিতে বিশেষ কষ্ট পাইয়াছেন। ধীরে ধীরে একপা একপ করিয়া অগ্রসর হইতে লাগিলেন। কিছুদূর গিয়া দেখিলেন খদ্যোতালােকর ন্যায় মিন্টু মিট করিয়া কি জ্বলিতেছে। আলােক দেখিয়া তাহার মনে একটী কি ভাবের উদয় হইল বলিতে পারি না। তাঁহার দক্ষিণ হস্ত ঘন ঘন স্পন্দিত হইতে লাগিল; অনুক্ষণ তাহার দক্ষিণ নেত্ৰ নৃত্য করিতে লাগিল। নগেন্দ্রনাথ ইহার কারণ জ্ঞাত হইলেন না। কেবল আলােক লক্ষ্য করিয়াই চলিতে লাগিলেন। আলোক যত নিকটবর্তী হইতে লাগিল ততই তাহার মনে হইতে লাগিল ‘আলােকটা আর একটু দূরে হইলে ভাল হইত।” আবার যখন দেখিলেন আলােকটা দূরে আছে, তখন
কাটা গাছে গােলাপ ফুল।
মে
তিনি ভাবিলেন “আলােকটা নিকটে থাকিলে বেশ হইত।”
নগেন্দ্রনাথ এইরূপভাবেই অনেক দূর গমন করিলেন।
সেই খাদ্যোতালেবৎ প্রতীয়মান অনুজ্জল বা স্বল্পোজ্জ্বল
দ্রব্যটা একটী উজ্জ্বল বড় দীপালােকে পরিবর্তিত হইল। নিকটে
গিয়া দেখিলেন একটী তৃণচ্ছাদিত কুটীর। কুটীরের ঘার ভিতর
হইতে রুদ্ধ। একপার্শ্বে একটী গবাক্ষ ছিল, সেই পক্ষের মধ্য
দিয়া আলােকের জ্যোতিঃ নির্গত হইতে ছিল।
নগেন্দ্রনাথ ক্ষণকাল কুটীরের দ্বারে দাঁড়াইয়া আকাশের দিকে
তাকাইয়া থাকিলেন, দেখিলেন আকাশ পরিষ্কার ; নীলাকাশে
নক্ষত্রনিচয় স্ব স্ব শরীরের গাত্রবরণ উন্মোচন, করিয়া গর্বের
সহিত দেহের কান্তি প্রকাশ করিতেছে। শশধর এতক্ষণ কোথা
হইতে আসিয়া মধ্যাকাশে দেখা দিলেন। বিহঙ্গগণ বৃষ্টির জ্বালায়
অস্থির হইয়াছিল এক্ষণে তাহারা একটু সুস্থ হইয়া দুই একবার
কিচিরমিচির করিয়া উঠিল, আর ঝিলিদল ত সর্বদা ঝি ঝি
করিয়াই থাকে। মওকগণও আনন্দে অধীর হইয়া গলা ছাড়িয়া
গীত ধরিল।
নগেন্দ্রনাথ দ্বারের নিকট দাড়াইয়া থাকিলেন। যেস্থানে
দাড়াইলেন সে স্থানের মৃত্তিকা অপেক্ষাকৃত কোমল,সুতরাং তিনি
সেখানে একটু স্বচ্ছলতা অনুভব করিতেছিলেন, কিছুক্ষণ
থাকিয়া একবার দ্বারে আঘাত করিলেন এবং বলিলেন “কে
আছ দ্বার খােল একটী অতিথি আসিয়াছে।”
প্রথমে তিনি কোন উত্তর পাইলেন না; পরে আবার দুই
একবার সেইরূপভাবে দ্বারে আঘাত করিলেন; এবারও কোন
উত্তর পাইলেন না। শেষে হতাশ হইয়া যেমন চলিয়া যাইবেন
সরযু।
;
অমনি ভিতর হইতে দ্বার খােলা হইল। পুর্বে তিনি ভাবিয়া
ছিলেন “বােধ হয় গৃহস্থ নিদ্রিত হইয়াছে অথবা হয় ত গৃহে
কোন লােক নাই ; কিম্বা বােধ হয় গৃহস্থ অন্যমনস্ক হইয়া
আছেন, তজ্জন্যই আমার কথা শুনিতে পান নাই।” এক্ষণে
দ্বার খােলা হইল। তাহার মনে একটু আশা হইল। গৃহস্থ
ডাকিলকে গা ভিতরে এস।”
নগেন্দ্রনাথ কথা শুনিয়া বুঝিলেন স্বয়টী ঠিক বামাকণ্ঠের
ন্যায়। আল কামিজটী বামহন্তে লইয়া তিনি গৃহের ভিতর
প্রবেশ করিলেন; দেখিলেন গৃহস্থের মধ্যে কেবল একটা
বালিকা। বালিকার বয়ঃক্রম প্রায় ত্রয়ােদশ বর্ষ। ৩
পাঠক এক্ষণে একটা কথা জিজ্ঞাসা করিতে পার ‘‘আমি
এই গৃহস্থটীকে বালিকা বলিব কি যুবতী বলিব?” পাঠক, আমার
ইচ্ছা ইহাকে বালিকা বলা। তােমার যদি ইচ্ছা হয় তুমি ইহাকে
যুবতী করিয়া লও আমার আপত্তি কি? কিন্তু আমি ইহাকে
বালিকা যুবতীর মাঝামাঝি কিছু বলিব মনে করিয়াছি।
এখনও ঠিকমৗবন সীমায় পদার্পণ করে নাই। দীপালােকের
জ্যোতিতে তাহার মুখকান্তি উজ্জ্বলতরা বােধ হইতেছে।
প্রত্যঙ্গাদির গঠন সুগােল ও সুন্দর, হস্তপদাদি সুচারু, চক্ষুদ্বয়
কিছু বিস্তৃত ও ঈষৎ চঞ্চল, মস্তকের কেশরাজি আলুলায়িত,
দেখিলে বােধ হয় যে কখনও বেণিবন্ধন করে নাই, অথবা তাহার
বেণিবন্ধন করিয়া দিবার কেহ নাই; গাত্রে স্বর্ণের বা রৌপ্যের
কোন অলঙ্কারাদি নাই বলিলেও চলে। বােধ হয় তাহার
স্বাভাবিক সৌন্দৰ্য্যই সর্বশ্রেষ্ঠ, অলঙ্কারের কোন প্রয়ােজন
নাই-ভাৰসুন্দর কমল, কেবল স্বচ্ছসরােবরে থাকিলেই
কাটা গাছে গােলপ ফুল। কি তাহা মনোহর হয় ? আর শৈবালযুক্ত জলাশয়ের মধ্যে কি তাহার চারুতার কিছুমাত্র হ্রাস হয়? যাহা সুন্দর তাহা সুন্দরই থাকে। যাহা মনােহর তাহা সর্বদাই মনােহর। নগেন্দ্রনাথ একবার বালিকাযুবতীর মুখপানে চাহিলেন। দেখিলেন তাহার মুখে দুঃখের চিহু লক্ষিত হইতেছে। অথচ একটী ক্ষীণ প্রফুল্লতার রেখা তাহার গণ্ডস্থলের নিম্নভাগ দিয়া গমন করিয়াছে। কারণ জগৎপতিই জানেন। বালিকা নগেন্দ্রনাথকে দেখিয়া যেন কিছু লজ্জিত হইল, এবং লজ্জাব্যঞ্জক স্বরে ধীরে ধীরে তাহাকে বলিল ‘মহাশয় এই খাটে উপশেন করুন।” “না আমি এইখানেই একটু দাড়াই, আমার কাপড় চোপড় ভিজে গিয়াছে।” “আচ্ছ। তবে আমি আপনাকে একখান শুল্ক বস্ত্র দিতেছি”, এই বলিয়া বালিকা ভঁহাকে একখান শুফ বস্ত্র দিয়া বলিল “অনুগ্রহপূর্বক আমায় আপনার কামিজটা ও আত্ৰ বস্ত্রখানা দিন আমি আলায় মেলিয়া দি।” নগেন্দ্রনাথ কাপড় ছাড়িয়া খাটের উপর বসিলেন। বসিয়া গৃহের অভ্যন্তরস্থ বস্তু সমুদায় দেখিতে লাগিলেন। সত্য বটে নগেন্দ্রনাথ ইহার পূর্বে আর কখনও এখানে আসেন নাই, তথাপি তাহার বােধ হইল, যেন গৃহের অধিকাংশ বস্তুই তাহার পরিচিত। কি জানি কেন তিনি সেই বালিকার মুখপানে এক দৃষ্টে চাহিয়া থাকিলেন। চালের কাষ্ঠখণ্ড হইতে কতকগুলি ঝুল অধোমুখে নগেন্দ্রনাথের দিকে তাকাইয়া আছে। দুই একটা পিতল কাঁসার তৈজস পত্র নগেন্দ্রনাথ ও সেই বালিকায় প্রতিমুর্তি সরয। আপন, আপনদেহে রক্ষা করিয়াছে। ২৫টা হাঁড়ি সাজান আছে, দুই একখানি চিত্রপট দেওয়ালের গায়ে বসান আছে, চালের ছিদ্রদিয়া দুই চারি ফোটা বৃষ্টির জল মেজের উপর পড়তে স্থানে স্থানে মৃত্তিকা উন্নত ও নিম্ন হইয়া গিয়াছে, দেওয়ালের নিম্নভাগ লােহিত বর্ণ মৃত্তিকা দ্বারা রঞ্জিত হইয়াছে। প্রদীপটা বেশ জ্বলিতেছিল, তথাপি বালিকা তাহাতে আরও তৈল দিল এবং বর্তিকাটাও বেশ যত্ন করিয়া যথাস্থানে স্থাপিত করিল। সুতরাং আলোক আরও উজ্জ্বলরূপে জ্বলিতে লাগিল। অভিপ্রায় কি জানি না; তবে এইমাত্র জানি যে রাত্রিতে দীপা- লােকে সচরাচ্য লােকের মুখকান্তি আরও ভাল দেখা যায়। অন্যদিকে তাকাইবার ছল করিয়া বালিকা নগেন্দ্রনাথের মুখ দেখিতে লাগিল। তিনি যখন এক একবার তাহা দেখিতে পান তখন সে লজ্জাবনতমুখী হইয়া অদেদিকে দৃষ্টিক্ষেপ করিতে থাকে। বালিকা কিছুক্ষণ থাকিয়া বলিল “বোধ হয় আজ আপ- নার আহার হয় নি—তবে অনুগ্রহপূর্বক আমার এ ক্ষুদ্র কুটীরে যাহা পাওয়া যায় তাহাই খাইয়া কথঞ্চিৎ সুস্থ হউন। এক্ষণে অপর কোন ভক্ষ্যবস্তু আপনাকে দিতে পারিব না,যে দুই চাবিটা ফল আছে তাহাই খাইয়া ক্ষুধার কিঞ্চিৎ নিবৃত্তি করুন। আমি জানি না এখানে কি কি দ্রব্য পাওয়া যায়।” “তােমার মধুর বাক্যেই আমার সমস্ত ক্লান্তি দূর হইয়াছে, এবং ক্ষুধারও নিবৃত্তি হইয়াছে। তবে একটু জল দাও, বড় পিপাসা হইয়াছে।” না দু জল কি খাওয়া হয়—” এই বলিয়া বালিকা একটা * কাটা গাছে গােলাপ ফুল। হাড়ি লক্ষ্য করিয়া যেমন সেইদিকে যাইবে অমনি তাহার কেশ- • গুচ্ছ দেওয়ালের গায় প্রােথিত একটী কাষ্ঠখণ্ডে জড়াইয়া গেল। বালিকা স্বয়ং তাহা ছাড়াইবার চেষ্টা করিল কিন্তু পারিল না। শেষে দুই হ দ্বারা যেমন বলপ্রকাশপূর্বক চুল ছাড়াইবার চেষ্টা করিল অমনি খাটের নিকটস্থ একটী লৌহদণ্ডে তাহার বক্ষের বস্তুশ সংলগ্ন হইল। বালিকা এইবার নিতান্ত অপ্রতীভ হইল। যদি বস্ত্র ছাড়াইতে যায় তবে চুল ছিন্ন হইবে, কাজেই এখন সে উভয়সঙ্কটে পড়িয়াছে। দাড়াইয়া দাঁড়াইয়া অনেক ক্ষণ ভাবিল। এতাদৃশ দুর্ভাগ্যের উপর বিশেষ দোষারােপ করিতে লাগিল। অবশেষে নগেন্দ্রনাথ আর থাকিতে। পারিলেন না, খাট হইতে উঠিয়া গিয়া আস্তে আস্তে বালিকার বস্ত্রখানি লৌহদণ্ড হইতে মুক্ত করিয়া তাহার গায়ে দিলেন। তদন্তর একটা একটা করিয়া তাহার চুলগুলি ছাড়াইতে লাগি- লেন, বালিকাও এবিষয় তাহার কিয়ৎপরিমাণে সহায়তা কলি। লজ্জা তাহাকে ধন্যবাদ দিবার অবসর দিল না। সে কিছুই করিতে না পারিয়া নগেন্দ্রনাথের পদযুগল দর্শন করতে লাগল, তাহাতেও তাহার ভয় হইল। একবার করিয়া দেখিতে লাগিল আর অপরদিকে নয়নের গতি ফিরাইতে লাগিল। কেশ পরিত্রাণ কার্য সমাপ্ত হইলে নগেন্দ্রনাথ খাটে বসি- লেন। বালিকা ব্যস্ত হইয়া যেমন হাঁড়ির নিকটে যাইবে অমনি পা লাগিয়া এক গ্লাস জল পড়িয়া গেল। অনন্তর সে একটা হাঁড়ির মধ্য হইতে কয়েকখান বাতাসা বাহির করিল ও অপর একটা স্থান হইতে কয়েকটা ফল বাহির করিয়া নগেন্দ্রনাথের সম্মুখে উপস্থিত করিল, নগেন্দ্রনাথ সেগুলি ভক্ষণ করিলেন।
সরষু। বালিকা এক গ্লাস জল লইয়া তাহার সম্মুখে ধরিল। নগেন্দ্রনাথ পিপাসাতুর ছিলেন, সুতরাং এই ত্রয়ােদশবর্ষীয়া বালিকাদত্ত এক গ্লাস জলপান করিয়া পিপাসার কথঞ্চিৎ উপশম করিলেন। বালিকা ইহা ছাড়া অপর কোন খাদ্যদ্রব্য নগেন্দ্রনাথকে দিতে পারিল না। নগেন্দ্রনাথও তাহাতে দুঃখিত হইলেন না। কারণ তিনি ভাবিলেন “এ বালিকা যাহা দিয়াছে ইহাই আমার পক্ষে যথেষ্ট। আর আমি যে ইহা পাইলাম ইহাও আমার সৌভাগ্য বলিতে হইবে।” শেষ বলিলেন “বালিকে, তুমিই অতিথিসৎকার শিক্ষা করিয়াছ। আজ আমি তােমার নিকট হইতে যাদৃশ সদ্ব্যবহার পাইলাম বােধহয় এরূপ ব্যবহার ও আতিথ্য ইহার পূর্বে কখনও পাই নাই। এবং এরূপ সরলা বালিকাও কোথাও দেখি নাই। তােমায় যে কি,বলিয়া প্রশংসা করিব আমি এরূপ শব্দ খুঁজিয়া পাইতেছি না। কি বলিয়া যে তােমায় ধন্যবাদ দিব এরূপ কথা আমার মনে আসিতেছে না। তবে এইমাত্ৰ বলি যে, তুমি দয়াবতী, গুণ- বতী, সরল, সাধ্বী ও অতিথিসেবাপরায়ণ-ইহা ছাড়া আর কিছু কথা আমি জানি না। আর তুমি সতী রমণী হইয়া পতির সহিত চিরকাল সুখে ও আনন্দে কালযাপন কর, এবং চির- দিন অতিথির প্রতি এইরূপ দয়া প্রদর্শন করিতে থাক। ইহাই আমার আশীর্বাদ। ইহাই আমার ইচ্ছা, ভবি- ষ্যতেও তুমি স্বর্গলােকে পতি লইয়া সুখে কালাতিপাত “পতি” এই কথা যখন নগেন্দ্রনাথের মুখ হইতে নিঃসৃত হইল তখন ৰালিকায় কোমল মন হইতে কয়েকটী গভীর অথচ
ফাটা গাছে গােলাপ ফুল।
৫৯
দুঃখব্যঞ্জক দীর্ঘনিশ্বাস বহির্গত হইল। হৃদয়ের দুঃখ যন্ত্র যখন
কোন কারণ বশত নিষ্কাশিত হয়, অথবা যখন অপর কোন
কথা দ্বারা দুঃখযন্ত্রের বায়ুর কিঞ্চিৎ হ্রাস হয়, তখন নাসিকা
হইতে যে বাতাস বহির্গত হইয়া থাকে তাহার নাম দীর্ঘনিশ্বাস।
যতক্ষণ দুঃখষ পূর্ণ থাকে, ততক্ষণ দুঃখিতব্যক্তি মনে মনে
আপনিই কষ্ট পায় ও নিজ কষ্ট নিজেই সহ করে। কিন্তু যখন
কোন কারণ বশতঃ অপর কেহ তাহার দুঃখের কথা জিজ্ঞাসা
করে তখন তাহার দুঃখ বায়ুর কতক অংশ নাসিকার ছিদ্র দিয়া
বহির্গত হয় এবং প্রশ্নকর্তার হৃদয়ে আঘাত করে। তাই বলি
বালিকার কোমল হৃদয় হইতে কঠিন দীর্ঘনিশ্বাস বহির্গত হইল।
বালিকা নিজ দুঃখ গােপন করিবার চেষ্টা করিল কিন্তু
পারিল না। আবার দুই চাৰিটা উষ্ণ নিশ্বাস তাহার নাসিকা
হইতে বাহির হইল। নগেন্দ্রনাথের হৃদয় আহত হইল। কিন্তু
তিনি তন্মুহুর্তেই তাহার কারণ জিজ্ঞাসা করিতে সাহস করি-
লেন না। বালিকা’ নগেন্দ্রনাথের নিমিত্ত খাটের উপর
বিছানাটা বেশ ভাল করিয়া পাতিয়া দিল।নিজে অপর
একটী ঘােট খাটে শয়ন করিল। প্রদীপ জ্বলিতে লাগিল।
নগেন্দ্রনাথের নিদ্রা হইল না। তিনি কেবল সেই বালিকার
বিষয় ভাবিতে লাগিলেন। কেবল এই বালিকার মূর্তি এক
একবার তাহার মনে হয়, আর তিনি সমস্তই ভুলিয়া গিয়া
কেবল তাহাই চিন্তা করেন।
তিনি ভাবেন “বালিকার এমন রূপ, এমন গুণ, এত অল্প
বয়স,
তবে সে বিজনে বনে কেন ? ইহার কারণ কি
নিশ্চয়ই ইহা কাটা গাছে গােলাপ ফুল !”
সরযু।
নগেন্দ্রনাথ এই ভাবিতে ভাবিতে রাত্রি সার্ধ তৃতীয় প্রহরের
সময় একবার নয়ন মুদ্রিত করিলেন ।
বালিকাও “কাটাগাছের গােলাপ ফুল” হইয়া শয়নমাতেই
নিদ্রিতা হইল না। কতক্ষণ ভাবিল। কয়েকটী দীর্ঘনিশ্বাস
ত্যাগ করিল। মনে মনে মনের সহিত কত পরামর্শ করিল
শেষে নিদ্রাদেবীর মােহিনী মায়ায় সমাচ্ছন্না হইল।
দশম পরিচ্ছেদ মা তুমি আর দ্বিধা করিও না। নিদ্রাদেবী বালিকাকে যেমন নিজ অঙ্কে স্থাপন করিলেন অমনি তাহাঙ্গসহচর স্বপ্নদেব আসিয়া তাহার মিকটে উপবিষ্ট হইলেন এবং তাহার আজ্ঞানুসারে বালিকার গায় হাত বুলাইতে লাগিলেন। বালিকাও ধীরে ধীরে তাহার বশ্যতা স্বীকার করিল। বালিকা দেখিল স্বপ্নরাজ্যের সীমা সুদূর গমন করিয়াছে। দেখিল কোথাও বা দিব্যাঙ্গনাগণ স্ব স্ব দেহে হৃদয়াকৰ্ষণ- কারী সৌন্দৰ্য্য ধারণ করিয়া মৃদুমন্দ গতিতে ইতস্তুত। পদচারণ করিতেছে। কোথাও বা খেত, পীত, নীল, ললাহি- তাদি নানা বর্ণের বিহগবৃন্দ মধুর স্বরে সঙ্গীত করিতেছে। তদনন্তর তাহার চক্ষু একটা মনােহর উদ্যানের দিকে আকৃষ্ট হইল। সে দেখিল উদ্যানস্থ বৃক্ষগণ ধনপল্পবাবৃত। পল্লব- গুলির মধ্যে একের বর্ণ অপরের বর্ণ হইতে সম্পূর্ণ কোথাও কোথাও বা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পুস্পবৃক্ষ খেত- বর্ণ কুনুমহন্তে স্বর্গীয় রূপসীগণকে আহ্বান করিতেছে। কোথাও বা কৃষ্ণবর্ণ ভ্রমরাজি উদ্যানস্থ সােবস্থিত বিকশিত বিভিন্ন।
সরযু। কেহ কমলের উপর উপবেশন করতঃ মনােসুখে মধুপান করিতেছে। কমলগুলি দেখিলে বােধহয়, তাহারা কখনও শুস্ক হয় না। এবং ভ্রমরগণ প্রত্যেকে এক একটী কুসুমের উপরই বসিয়া আছে। তাহার মধু নিঃশেষ হইতেছে তথাপি তাহাকে ত্যাগ করিতেছে না। সকলেই নিজ নিজ অবস্থায় সন্তুষ্ট। কাহারও উপর হিংসা করিতেছে না। কুচিৎ বা নবতৃণ- বিমণ্ডিত মৃৎখণ্ডে গাে, মেষ, ছাগাদি স্বস্ব ইচ্ছায় স্বস্ব স্থানে আহাৰ-কার্যে নিযুক্ত আছে। কেহ কাহাকেও উৎপীড়িত করিতেছে না। কেহ কাহারও উপর অত্যাচার করিতেছে না। সকলেই শান্ত।, দেখিলে বােধহয় শান্তিদেবী স্বমংই এখানে অবস্থিতি করিতেছেন। কোথাও বা নিবিড়পক্সসমাচ্ছন্ন লতাকুঞ্জের অভ্যন্তরে যুবক যুবতী বসিয়া বিশুদ্ধ প্রণয়ের পরিচয় প্রদান করিতেছে। কুচিৎ বা সিতশাশু, দীর্ঘকেশ, পিঙ্গলবর্ণ তপন্থীগণ অনন্তমনে ধ্যান কার্যে নিযুক্ত আছেন। বালিকা এস্থানের জ্যোতি দর্শন করিয়া উদ্যানের অপর পা সমরিল। তথায় দুই চাৰিটী সুবৃহৎ অট্টালিকা বর্তমান। দেখিল .এস্থানের সৌন্দৰ্য সকল স্থানের সৌন্দর্য অপেক্ষা মনােহর। এখানে সমস্ত পদার্থ ই শুভ্রবর্ণ। পবিত্রতা ও স্থিরতা স্বয়ং এখানে অবস্থিতি করিতেছেন। বসনা যশাে- দেবী ধীরে ধীরে ইতস্ততঃ পদক্ষেপ করিতেছেন। স্বভাবা- লঙ্কারভূষিতা, স্বভাবসুন্দরী, জ্যোতির্ময়ী, নিরভিমানিনী একটা রমণ অপর একটা অস্লার মদগর্বিতা রমণীকে সদুপদেশ দান করিতেছেন; এবং পরিশেষে তাহার মন হইভে অহঙ্কার, গর্ব, অভিমান, বৃথা তেজঃ ইত্যাদি কুবৃওিনিচয় বিদূরিত করি- মা তুমি আর দ্বিধা করিও না। ৫ তেছেন। তৎপরে বালিকা আরও একটু অগ্রসর হইল । সে ক্রমে ক্রমে একটা অপূর্ব পুরীর মধ্যে প্রবেশ করিতে লাগিল। এদিক ওদিক দেখিতে দেখিতে তাহার বােধ হইল যেন কে তাহাকে হাত নাড়িয়া ডাকিতেছে। তখন তাহার মনে যুগপৎ বিস্ময় ও আনন্দের উদ্রেক হইল। নিকটে গিয়া শুনিল কণ্ঠস্বর চিরপরিচিতের ন্যায় । তখন তাহার কৌতুহল আরও বৃদ্ধি হইল। দেখিল তাহার জননীর মত কে তাহাকে ডাকিতেছে “মা ইন্দুমুখী একবার আমার নিকটে এস। তােমায় একটী কথা বলি।” ইন্দুমুখী ক্রন্দন করিতে করিতে সেই স্থানে গেল। দেখিল তাহার জননীই তাহাকে ডাকিতেছেন। তাহার জননী বলিলেন:- “ইন্দুমুখি! তুমি আমার কথা শােন। আমি তােমায় এখানে লইয়া আসিব মনে করিতেছি, কিন্তু তুমি এখন এখানে আসিতে পারিবে না। তােমার পিতা ঠাকুর মহাশয়ও এখানে আছেন। এই দেখ আমি তােমায় কয়েকটা মূর্তি দেখাইতেছি; ইহার মধ্যে যে প্রথম মূর্তিটী দেখিতেছ, ইহা একটা পতি- ব্রতার মূর্তি। তুমি ইহার সাক্ষাৎ পাইবে। ইহাকে তুমি মনের- সহিত ভাল বাসিবে। আর এই দ্বিতীয়টা একটী সাধু পুরুষের মূর্তি। ইনি এই পতিব্রতার স্বামী, ইহাকে তুমি ভক্তি করিবে, এবং এই তৃতীয় মুর্তিটা তােমার স্বামীর মূর্তি। তুমি কোন দ্বিধা বা সন্দেহ না করিয়া ইহাকে বিবাহ করিবে। ইনি সুবিজ্ঞ ও সুরসিক, ইহার মন উন্নত ও সরল। তুমি এই ব্যক্তির আজ্ঞা কখনও লন করিও না।” ইন্দুমুখী ইহাতে বিশেষ লজ্জিত হইল, কারণ, নগেন্দ্রনাথের চেহারায় সহিত এই মুক্তির সম্পূর্ণ সাদৃশ্য
৬৪
সরযু।
আছে। জননীর কথা শেষ হইলে ইন্দুমুখী যেমন আর এক
পদ অগ্রসর হইতে যাইবে অমনি তাহার নিদ্রাভঙ্গ হইল।
দেখিল কোথাও কিছু নাই। যে কুটীর সেই কুটীর। দেখিল
সে যেখানে ছিল সেখানেই আছে।
।।
একাদশ পরিচ্ছেদ।
ঘন লতা।
ইন্দুমুখী শয্যা হইতে উঠিয়া দেখিল নগেন্দ্রনাথ বিছানায়
নাই। কুটীলের বাহিরে আসিয়া অনেকক্ষণ ভাবি। তাহার হাত
পা সমস্তই অবশ অবশ বােধ হইতেছে। সুতরাং সে ক্ষণকালের
নিমিত্ত একস্থানে বসিয়া থাকিল। তৎপরে কি মনে ভবিয়া
পশ্চিমদিকে কোথায় গেল। এস পাঠক দেখিয়া আসি ইন্দুমুখী
কোথায় যায়।
ইন্দুমুখী কিছু দূরে গমন করিয়া একটী উপবনে উপস্থিত
হইল। ইহার মধ্যে একটা ক্ষুদ্র পুষ্করিণী আছে।পুরিণীর
জল কৃষ্ণবর্ণ ও স্বচ্ছ। ধারে ধারে অনেকগুলি গাছ পালা
জন্মিয়াছে। দুই একটী বৃক্ষে দুই চাৰিটী ফুলও দেখা যাইতেছে।
লম্পট পবন কতকগুলি পুষ্পবৃন্ত চ্যুত করিয়া পুষ্করিণীর জলে
ভাসাইয়া দিতেছে। এই ক্ষুদ্র সরােবরে অনেকগুলি পদ্ম ফুল
ফুটিয়া আছে ; ভ্রমরগণ মধুলােভে ইতন্ততঃ ঘুরিতেছে। একটা
ভ্রমর নানাফুলে বেড়াইতেছে। একের নিকট তৃপ্তি না হওয়ায়
অপরের নিকট গমন করিতেছে। সেখানেও তৃপ্তি হইতেছে না,
কাজেই ঘুরিয়া বেড়াইতেছে; একস্থানে স্থির থাকিতে পারি-
সরষু।
তেছে না।
কেবল গুণ গুণ স্বরে দুঃখ প্রকাশ করিতেছে, এবং
আপন অদৃষ্টকে ধিক্কার দিতেছে।
ইন্দুমুখী একখণ্ড শিলার উপর বসিয়া পুষ্করিণীর শােভা
দর্শন করিতে লাগিল। দেখিতে দেখিতে তাহার দৃষ্টি
বিচরণকারী ভ্রমরগুলির উপর পড়িল। অমনি পূর্ব রাত্রির
স্বপ্নের কথা একে একে তাহার মনে উদয় হইতে লাগিল।
ইন্দুমুখী মনে মনে ভ্রমগণকে ভৎসনা করিল “ছি ভ্রমর
তােম কি আদত দ্রব্য চাওনা? না, 'তােমরা স্থিরচিত্ত নও?
না, তােমরা একের উপর ভালবাসা রাখিতে লজ্জিত হও ?
৮ এমন ঘুরিয়া বেড়াইবার প্রয়ােজন কি ?' ভ্রমরো শুনিল না।
কিন্তু ইন্দুমুখী ইহাদ্বারা কতক শিক্ষা পাইল।
সে ভাবিল
“আমিও আপন পতিকে শিক্ষা দিব যেন তিনি একফুলের মধু-
পামেই সন্তুষ্ট থাকেন।” ভাবিতে ভাবিতে ইন্দুমুখীর মনে
নগেন্দ্রনাথের মুর্তি আসিয়া উপস্থিত হইল। স্বপ্নদৃষ্ট মুর্তির
সহিত এই মূর্তির সম্যক্ সাদৃশ্য আছে। কিন্তু নগেন্দ্রনাথ এক্ষণে
বেথামাল রাত্রে সে যাহাকে দেখিয়া মনে মনে কত
পরামর্শ করিতেছিল, যাহাকে পাইবার ইচ্ছা তাহার হৃদয়ে বিশেষ
বলবতী হইয়াছিল, সেই নগেন্দ্রনাথকে পাইবার জন্য ইন্দুমুখী
কুটীরের বাহিরে আসিল। ইন্দুমুখী বসিয়া বসিয়া ভাবিতেছে
এমন সময় তাহার দৃষ্টি একটা পতঙ্গের দিকে পড়িল। পতঙ্গটা
পলায়ন করিতেছে এবং একটী পক্ষী তাহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ
ধাবিত হইতেছে। পক্ষীর ইচ্ছা তাহার দ্বারা আহার কাৰ্য্য
নিষ্পন্ন করে এবং পতঙ্গের ইচ্ছা তাহার হাত হইতে পরিত্রাণ
লাভ করে। বিপন্ন পতঙ্গটীর প্রতি ইন্দুমুখীর বড় দয়া হইল।
বন লতা। তাড়াতাড়ি পতঙ্গের নিকট গমন করিয়া দেখিল, পক্ষী ভয়ে উড়িয়া পলাইল এবং পতটা তাহার গায় বসিল। পতঙ্গটা একটী প্রজাপতি। গায় প্রজাপতি বসিলে নাকি শীঘ্র পতির সহিত মিলন হয় অথবা বিবাহ হয়। ইন্দুমুখী তাহা কতক জানিত তজ্জন্য যখন পতঙ্গটী তাহায় শরীরে উপবেশন করিল তখন সে তাহাকে তাড়াইয়া দিল না, পতঙ্গ আপন ইচ্ছায় চলিয়া গেল। তৎপরে সে ধীরে ধীরে একটী সহকার তরুর নিকট উপনীত হইল। দেখিল একটী মাধবীলতা প্রসবের সহিত সহকার তরুকে আলিঙ্গন করিয়া রহিয়াছে। তরুটী প্রাচীন, লতাও প্রাচীনা, কিন্তু উভয়েই উভয়কে যৌবন সুলঃ আনন্দ দানে, কুণ্ঠিত নহে। এই দৃশ্য দেখিয়া ইন্দুমুখী কয়েকটী দীর্ঘ নিশ্বাস ত্যাগ করিল। কিন্তু তাহার বাম চক্ষু নৃত্য করিয়া তাহার মনে কিছু শাস্তি দিল। আবার তাহার বাম হস্থিত শিরাগুলিও যেন কম্পিত হইল অথবা নৃত্য করিল। ইহাও সুলক্ষণসূচক, কাজেই তাহার মনে কি এক নুতন ভাবের আবির্ভাব হইল। কিন্তু সে নগেন্দ্রনাথের অনুসন্ধানে আরও একটু পর হইল। নগেন্দ্রনাথ এত নীচমনা নহেন, যে তিনি ইন্দুমুখীকে না বলিয়া অন্যত্র চলিয়া যাইবেন, তবে ইন্দুমুখী তাহার অনুসন্ধানে এত কাতরা কেন ? ইন্দুমুখী দুই এক পদ গিয়াই আশ্চর্যান্বিতা হইল। দেখিল তাহার সম্মুখে নগেন্দ্রনাথ। কি জানি কোন অভাবনীয় ঘটনার বশবর্তিনী হইয়া ইন্দুমুখী এক্ষণে নগেন্দ্রনাথকে সম্মুখে দেখিয়া নিতান্ত সুজিত হইল। কণেকের জন্য তাহার বাক্যর্তি হইল । সে অধােমুখে থাকিয়া মৃত্তিকার দিকেই চাহিতে লাগিল।
সরযু।
নগেন্দ্রনাথ তাহাকে সেরূপভাবে থাকিতে দেখিয়া জিজ্ঞাসা
করিলেন “সুশীলে ! তুমি এখন এখানে কেন?”
ইন্দুমুখীর মুখে কথা নাই। নগেন্দ্রনাথ যে আর অধিক কথা
তাহাকে জিজ্ঞাসা করিবেন তাহারও পথ নাই কারণ পরিচয়
অল্পক্ষণ মাত্র হইয়াছে। তবে তাহাদের মনদ্বয় চিরপরিচিত হইয়া
গিয়াছে। ভিতরে একভাব হয়, বাহিরে তাহা প্রকাশ করিতে
লজ্জা হয়, অথবা অনেক সময় তাহা প্রকাশ করিতে পারা যায়
না; তাই উভয়েই কিছুক্ষণ মৌনাবলম্বন করিয়া থাকিলেন।
কিন্তু নগেন্দ্রনাথ পুরুষ ইন্দুমুখী স্ত্রীলােক, কাজেই নগেন্দ্রনাথ
আবার জিজ্ঞাসা করিলেন “সুশীলে তুমি এখানে কেন ?”
“ইন্দুমুখী এইবার কথা কহিল। নগেন্দ্রনাথেরদিকে মুখ
ফিরাইতে সাহস হইল না। তথাপি অপােবদনে থাকিয়াই বলিল
“আপনাকে বিছানায় না দেখিতে পাইয়া বাহিরে খুঁজিতে
আসিয়াছিলাম, আর আমার শরীরটাও কেমন অবশ অবশ বােধ
হইতেছিল তাই একবার বাহিরে আসিলাম।”
“জাখুরি ! তােমার নামটা জানা হয় নাই, শুনতে
পাই কি?”
“অবশ্য ; আমার নাম হতভাগিনী ইন্দুমুখী।”
“তােমায় দুই একটা কথা জিজ্ঞাসা করিতে কি কোন দোষ
কি বাধা আছে?”
“আপনার দোষ গুণ বিচার করিবার প্রয়ােজন নাই, আপনি
যাহা ইচ্ছা জিজ্ঞাসা করিতে পারেন।”
“তােমার বয়স কত? তােমার পিতা কোথায় ?
“আমার বয়স প্রায় তের বৎসর হইল। আমার পিতা-
বন লতা। এই বলিয়া ইন্দুমুখী ক্রন্দন করিতে লাগিল। চক্ষুজলে গণ্ডস্থল ভাসিয়া গেল, নাসিকা হইতে ঘন ঘন নিশ্বাস বহিতে লাগিল। নগেন্দ্রনাথ তাহা দেখিয়া বড় দুঃখিত হইলেন। নিজ পরিধেয় বদ্বারা তাহার চক্ষু মুচিয়া দিলেন। ইন্দুমুখীকে বলিলেন ‘কাদ কেন ইন্দুমুখী, তােমার কি হয়েছে? পিতামাতার নামে এত ক্রন্দন কেন?” ‘মহাশয় আমি বড় হতভাগিনী। অল্প বয়সে পিতা মাতার মৃত্যু দেখিয়াছি। পিতা যে কখন স্বর্গলােকে গিয়াছেন তাহা আমার ভাল মনে হয় না। মাতাও অনেক দিন ইহলােক ত্যাগ করিয়া গিয়াছেন। তাহাদের উভয়ের মৃত্যুর পর আমি । মামার বাড়ী থাকি। হঠাৎ একদিন মামাদের বাড়ী বড় ডাকা- ইতি হয়। ডাকাইতেরা মামার যথাসর্বস্ব হরণ করে, ও তৎপরে আমাকে ধরিয়া লইয়া আসে। দস্থপতির অভিপ্রায় তাহার পুত্রের সহিত আমার বিবাহ দেওয়া; সেইজই সে আমায় আনিয়াছে। তবে তাহাদের এক নিয়ম আছে, যতদিন স্বয়ং না বলিব যে আমি তাহার পুত্রকে বিবাহ করব, ততদিন তাহারা বিবাহ জোর করিয়া দিতে পারিবে না। দ্য- পুত্রের সহিত বিবাহ করিতে আমার আদৌ ইচ্ছা নাই; সুতরাং আমি সে বিষয় অস্বীকার করি। সেই জন্য আমার এই দণ্ড হইয়াছে। আমি এই কুটীরে থাকি, মানুষের মুখ দেখিতে পাই । অনেকদিন পরে আজ আপনার দেখিয়া মনে একটু আনন্দ হইল; কারণ আমি প্রায় ৩ বৎসর দ্য ব্যতীত লােকালঘ্নের অপর কোন মনুষ্য দেখিতে পাই নাই। দপতি আমায় কখনও ছয় মাসের কখনও তিন মাসের মত খাদ্য- সরযু। দ্রব্য দিয়া যায়, আমি কি করিব অনাহারে প্রাণত্যাগ করিতে পারি না, কাজেই তাহা খাইয়া কেবল জগৎপতির উপর নির্ভর করিয়া থাকি, এবং সর্বদাই মনে মনে আপন অদৃষ্টের উপর দোষারােপ করি। এখান হইতে উদ্ধার হইবার কোন উপায় আছে কি না জানি না, এবং কখনও যে আমি মুক্তিলাভ করিতে পারিব ইহা আমার বিশ্বাস হয় না।” নগেন্দ্রনাথ আর নিস্তব্ধ থাকিতে পারিলেন না। বলিলেন “ইন্দুমুখি তােমার ইন্দুমুখ হইতে যে এতাদৃশ নিদারুণ বাক্য বিনির্গত হইবে তাহা আমি পূর্বে ভাবি নাই। ঈশ্বর জানেন আমি তােমার কথা শুনিয়া কতদুর মর্মাহত হইলাম। তােমার উদ্ধারের উপায় নিশ্চয়ই আছে, আমিই তােমায় সমস্ত বিপদ হইতে উদ্ধার করিব।” যখন নগেন্দ্রনাথ এই সমস্ত কথা বলিতেছিলেন তখন ইন্দুমুখী তাহার দিকে ঈষৎ কটাক্ষ করিতেছিল। কিন্তু অধিকক্ষণ সেভাবে থাকিতে পারিতেছিল না, কারণ নগেন্দ্র- নাথ পাছে দৈখিতে পান। কিন্তু জিজ্ঞাসা করি ইন্দুমুখীর লজ্জার কারণ কি? এখানেত অপর কেহ নাই। নগেন্দ্রনাথও তাহার কটাক্ষের প্রতিদান করিতে ক্রটি স্বীকার করিলেন না। অল্পক্ষণ পূর্বে ইমুখীর মনে নগেন্দ্রনাথকে দেখিবার ইচ্ছা হইয়াছিল। সে ইচ্ছ। ফলবতী হইল। তৎপরে সে কটাক্ষের যতদূর ক্ষমতা তাহা প্রকাশ করিল। তদনন্তর নয়ন ভরিয়া নগেন্দ্রনাথকে দেখিয়া লইল। দৃষ্টিদ্বারাই আপনার দেহ, মন, প্রাণ, যৌবন ইত্যাদি সমস্তই নগেন্দ্রনাথের পদতলে সমর্পণ করিল। নগেন্দ্রনাথও তাহাকে মনে মনে যথেষ্ট ভালবাসিলেন।
বন লতা।
৭১
অপর কথা সমই ভুলিয়া গেলেন। এক ইন্দুমুখীর কটাক্ষই
তাঁহার হৃদয়স্থ যাবতীয় বৃত্তি একদিকে আকর্ষণ করিল।
তাহার চক্ষু কেবল ইন্দুমুখীর উপরে অর্থাৎ ইন্দুমুখীকে সর্বদা
দর্শন করিবার নিমিত্ত নিযুক্ত থাকিল, কর্ণ কেবল তাহার মুখ
হইতে দুই একটী বা অনেকগুলি অথবা অনেকক্ষণ পরে একটা
কথা শুনিবার জন্যই নিয়ােজিত হইল। নাসিকা কেবল ইন্দু-
মুখী প্রদত্ত কুসুমাস্রাণেই ব্যাপৃত হইল। এইরূপে তাহার
বাহেন্দ্রিয়ের ও অন্তরিন্দ্রিয়ের বৃতিনিচয় এক ইন্দুমুখীর প্রতি
ধাবিত হইল। দেবেন্দ্রনাথের ভাবনা তিরােহিত হইল।
সংযুর কথা বিস্মৃতিসাগরে লীন হইল। দেবেন্দ্রনাথের সহিত
বন্ধুত্ব ক্ষণকালের জন্য কোথায় চলিয়া গেল। জানিনা সংসা-
রের গতি কি প্রকার। জানিনা ভালবাসার শৃঙ্খল কত দৃঢ়
জানিনা নবপ্রণয়ের কত অসীম প্রভাব।
ইন্দুমুখী নগেন্দ্রনাথের মনােভাব প্রায় সমস্তই জ্ঞাত হইল।
নগেন্দ্রনাথও তাহার অভিপ্রায় সমস্তই বুঝিলেন। ইন্দুমুখী যাহা
গােপন করিতে যায় তাহার সমস্তই নগেন্দ্রনাথ জানিতে পারেন।
ইন্দুমুখী বলিল ‘“আসুন, মহাশয়, এই রাস্তা দিয়া কুটীরে
যাই।”
‘চল তুমি যে পথে লইয়া যাইবে সেই পথেই যাইব।”
ইন্দুমুখীর বড় লজ্জা হইল। কিন্তু সে সাহসে বুক বাঁধিয়া
বলিল “আমি আপনাকে যেদিকে লইয়া যাইব, সেইদিকেই
যাইবেন ? আমি ছাড়া অপর কেহ যদি আপনাকে সেদিকে
লইয়া যায় আপনি যাইবেন না ত?”
“না-
অব”
৭২
সরষু।
“না” বলিয়াই নগেন্দ্রনাথ যেন মনে মনে ইমুখীকে ধরিতে
গেলেন কিন্তু লজ্জা হইল ; পারিলেন না।
‘‘মহাশয় তবে এই পথেই যাই চলুন।
পথেই যাই চলুন। কিন্তু আপনি
অর্থে অর্থে চলুন।”
“আমি অগ্রগামী হইলে তােমায় ত সহজে দেখিতে পাইব
। হয় তুমিই অগ্রে চল, আর নাহয় দুজনে হাত ধরাধরি
করিয়া যাই। তাহাহইলেই তােমাকে দেখিতে পাইব।”
ইন্দুমুখী অবনতমুখী হইল। সে ভাবিল “ঈশ্বর যদি নারী
জাতির মনে লজ্জা না দিতেন, অথবা এই সময় যদি আমার মন
হইতে লজ্জা অপসারিত করিয়া দেন তবে আমি মন ভরিয়া
নগেন্দ্রনাথের নিকট, অথবা এই আগন্তুকের নিকট সব কথা
প্রকাশ করিয়া বলিতে পারিতাম, অথবা পারি। কিন্তু বিধাতা
ত আমার কথা শুনিবেন না। তিনি যে নিষ্ঠুর।”
নগেন্দ্রনাথ তাহার হাত ধরিয়া আস্তে আস্তে চলিতে লাগি
লেন। কিয়দ্র গমন করিয়া ইন্দুমুখী বলিল “মহাশয় ! এই
যে সতাফুঞ্জটী দেখিতেছেন ইহাই আমার শান্তিভবন।
আমি যখন হতাশ হই তখন ইহা আমায় আশা দেয়। আমি
যখন দুঃখিত হই তখন এখানে আসিলেই শান্তি পাই। আর
কিন্তু আমার মনটা
“ইন্দুমুখি তােমার বুকের কাপড়টা যে ঐ কাটাগাছে
লাগচে এদিকে একটু সরে এস।” ইন্দুমুখী শরিয়
আসিল না। বরং নগেন্দ্রনাথের হাত ছাড়াইয়া চলিয়া গেল
কিন্তু তাহার অঞ্চল কটায় লাগিয়া গেল। কাজেই সে আর
অন্যত্র যাইতে পারিল না নগেন্দ্রনাথ তাহাকে ধরিলেন
বন লতা কাপড়খানি ছাড়ান হইলে উভয়েই লতাকুঞ্জের অভ্যন্তরে গমন করিলেন। ইন্দুমুখী এইসময় মনে মনে কি ভাবিয়া নগেন্দ্রনাথকে বলি- লেন “আপনি একটু বসুন আমি ওখান থেকে একটা জিনিস আনি।” “কোথায় যাবে? “দেখে আসি এই কয়েকটা গাছে আজকে ফুল ফুটেছে কি না।” “আচ্ছা যদি ফুল ফুটে থাকে— ৭) “তবে কি হবে ?” ‘তবে দিন দিন যেমন মালা গাঁথি তেমনি মালা গাঁথব, তবে আজ আর মালা গাছে তুলিয়া রাখিব না। জা- ‘‘আজ কি?” “তাহ পরে জানিধেন আমি এখন দেখে আসি।” ইন্দু- মুখীর মন, সে সব গােপন করে; কিন্তু আমরা সব জানিতে পারিতেছি। ইন্দুমুখী ক্ষণকাল পরে কতকগুলি ফুল ও একটী লতার কিয়দংশ লইয়া আসিল। নগেন্দ্রনাথ তাহা দেখিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন ‘ইন্দুমুখি এ ফুলে কি করিবে ?” “কেন মালা গাঁথিব।” ‘‘মালা গাঁথিয়া কি হইবে?” ‘কেনকেন-আমি পরব আর-আর- ৭৪ সরযূ। আর ইদুমুখী বলিতে পারিল না। যাহাহউক যাহা বলি- য়াছে তাহাই যথেষ্ট। সময় সময় দ্রব্যের অর্ধ তাহার সমস্ত অংশ অপেক্ষা প্রিয়তর হয়। পাঠক এখানে তাহাই স্বীকার করিতে হইবে। “আচ্ছ। ইন্দুমুখি এ লতা লইয়া কি করিবে ?” ‘আজ বনলতায় লােকালয়ের তরু বাঁধিব।” “তরু কৈ? কোন তরু বাঁধিবে ?” “আমার নিকট যে মানুষ'তরুটী পঁাড়াইয়া আছে।” নগেন্দ্রনাথ সমস্তই বুঝিতে পারিলেন, কিন্তু যেন কিছুই জানেন না এইরূপভাবে ইন্দুমুখীর কার্যকলাপৰ্শন করিতে লাগিলেন। ইন্দুমুখীর মালা গাঁথা শেষ হইল। সে দুইগাছি মালা লইয়া কেবল নাড়িতেছে। আর এক একবারণে দুটীকে লইয়া সেই লতাটীর উপর রাখিতেছে। নগেন্দ্রনাথ ইন্দুমুখীর মনােভাব বুঝিতে পারিয়া বলিলেন “ইন্দুমুখী চুপ করে বসে কেন ? কি করবে কর। বছিলে না তরু বাঁধিবে ?” “মহাশয় আমার চুপ করিতে ইচ্ছা নাই, কিন্তু কে যেন আমায় কথা কহিতে বাধা দিতেছে। নারীর মনে যদি এত লজ্জা না থাকিত তবে কি হইত - “তবে আজ—আপনার- “ইন্দুমুখি আর আমায় “আপনি কি আপনার” এসব কথা বলিয়া সম্বােধন করিও না। আজ অবধি তুমি আমায় তুমি- তােমার তােমায় তােমাকে” ইত্যাদি বলিবে।”
বন লতা। “না মহাশয়-আমি আজ অবধি আপনাকে—তােমাকে মহাশয় না বলিয়া-নগেন্দ্র বাবু-নাথ-নাথ-নগেন্দ্রনাথ নাথ বলিয়া ডাকিব।” ইন্দুমুখীর ইচ্ছা কিয়দংশ গােপন করা, কিন্তু তাহার সরল মন হইতে সমস্তই বাহির হইল। নগেন্দ্রনাথ সমই বুঝি- লেন। ইন্দুমুখীর হাত ধরিয়া তুলিলেন। ইন্দুমুখী যেন এবার একটু সাহস পাইল। সে তাড়াতাড়ি নগেন্দ্রনাথের গলায় দুইগাছি মালা একবারে পরাইয়া দিল। নগেন্দ্রনাথও অবসর পাইয়া একগাছি তাহার গলায় দিলেন এবং একটী আপন গলদেশে রাখলেন। ইন্দুমুখী তাহার হন্তে কয়েকটা প্রস্ফুটিত কুসুম দিয়া বলিল “দেখ আমার ফুল অনাদর করিও না।” “ইন্দু ! তােমার ফুল কি কখনও অবজ্ঞা করিতে পারি” এই বলিয়া নগেন্দ্রনাথ তাহার মুখচুম্বন করিলেন। ইন্দুমুখী লজ্জায় আর মুখ তুলিতে পারিল না। কিন্তু যেমন সে নিম্ন- দিকে দৃষ্টি করিল অমনি লতার দিকে তাহার দৃষ্টি পড়িল। তরু বাঁধিবার কথাটাও মনে হইল। তাড়াতাড়ি লটী ভুলিয়া লইয়া তদ্বারা নগেন্দ্রনাথের পদযুগল বন্ধন করিল, এবং ধীরে ধীরে অথচ ব্যর্থতার সহিত বলিল নগেন্দ্রনাথ-নাথ আজ তােমায় এই বনলতা দিয়া বাঁধিলাম। দেখ তুমি এবন্ধন ছিন্ন করিতে ৰা কাটিয়া পলায়ন করিতে পারিবে না।” “ইন্দু আমিত পূর্বেই তােমার নিকট বদ্ধ হইয়াছিলাম। এবন্ধন কেবল স্মরণের নিমিত্ত। কিন্তু আর স্মরণ করাইতে হইবে না। আমি কেবল তােমার রূপই সর্বত্র দেখিতেছি।” এদিকে বেলা হইয়া গেল। নগেন্দ্রনাথের সেদিকে দৃকপাত সরষু। নাই। ইন্দুমুখীও এতক্ষণ জানিতে পারে নাই। পরে জানিয়া যেন চমকিত হইল, এবং নগেন্দ্রনাথকে বলিল নগেন বাবু চল কুটীরে যাই অনেক বেলা হইয়াছে। তােমার কাল অবধি কিছুই খাওয়া হয়নি।” “বনলতে, চল তবে যাই।” এই বলিয়া নগেন্দ্রনাথ তাহার সহিত কুটীভিমুখে গমন করিলেন। পাঠক চল তবে আম- রাই বা কেন শূন্যকুঞ্জে থাকিব ? চল আমরাও অনুসরণ করি।
ITTll দ্বাদশ পরিচ্ছেদ। আমি এখানে কোথায় ? তদনন্তর নগেন্দ্রনাথ ইন্দুমুখীর সহিত কুটীরে আগমন করিলেন। ইন্দুমুখী তাহার আহারাদির মাে গাড় করিয়া দিল। তিনি আহার করিলেন। আহারান্তে ইন্দুমুখীর সহিত গল্প করিতে লাগিলেন। ইন্দুমুখীও আহারকার্য সম্পন করিয়া নগেন্দ্রনাথকে পূর্ব বৃত্তান্ত একে একে পরিচয় দিতে লাগিল। বেলা প্রায় দুই প্রহর গত হইয়াছে, কিন্তু রৌদ্রের প্রখরতা বিল- ক্ষণ আছে। পবনদেব সাঁ সাঁ করিয়া হাপাইতেছেন। বৃক্ষগণ ব্যাকুল হইয়া মধ্যে মধ্যে হস্তপদাদি সঞ্চালন করিতেছে। পক্ষিগণ রৌদ্রের তেজ হইতে পরিত্রাণ পাইবার নিমিত্ত বৃক্ষ- পত্রের অন্তরালে বসিয়া গান করিতেছে। কোকিলগণ কুহু কুহু স্বরে নব দম্পতির মনে নব আনন্দ দান করিতেছে। বিরহিণী- দিগের মন তাহাতে আরও ব্যাকুল হইতেছে। নগেন্দ্রনাথ কোকিলের সুর শুনিয়া আত্মহারা হইতেছেন। এক একবার তাহার মনে হইতেছে যেন তিনি কোন দ্রব্য হারাইয়াছেন, যেন তিনি কি ভুলিয়াছেন, তাহা মনে পড়িব পড়িব করিয়া পড়িতেছে
৭৮
সরযূ।
। কি যেন নাই, কি যেন আছে। কি যেন ছিল, কে যেন
তাহা লােপ করিয়া দিতেছে। তাহার মনে প্রায়ই এই প্রকার।
হইতেছে ; দুই এক বার তাহার স্মৃতিপথে পূর্বকথা আসিতেছে
কিন্তু যখন কারণ সন্ধান করিতেছেন তখন তাহা আবার কোথায়
চলিয়া যাইতেছে। তাহার মনে কত বিষয় আসিতেছে কিন্তু
তিনি কোনটাই স্থিরভাবে চিন্তা করিতে পারিতেছেন না, কেবল
একদৃষ্টে ইন্দুমুখীর মুখের দিকে তাকাইয়া আছেন।
যখন তিনি
কোন একটা বিষয় ভাবিতে যাইতেছেন, তখন ইন্দুমুখীর দিকে
একবার দৃষ্টি পড়িলেই সমস্ত বিস্মৃত হইতেছেন।
এইরূপে নগেন্দ্রনাথ প্রত্যহই দিবার মধ্যভাগ্নে কুটীরে বসিয়া
ভাবেন ও গল্প করেন। প্রাতঃকালে সেই লতা-কুঞ্জ, আর
অপরাহে সেই পুষ্করিণীর তটে বসিয়া ইদুমুখীর নিকট কত গল্প
শ্রবণ ক্লাবন। উপন্যাসগুলির একটীও নূতন নহে। কিন্তু
ইন্দুমুখীর মুখ হইতে বাহির হইলেই তাহার প্রত্যেক বর্ণ নূতন
হইয়া নগেন্দ্রনাথের কর্ণে অধিক বেগে আঘাত করে এবং
তাঁহান আরও নূতন নূতন চিন্তার বিষয় উপস্থিত হয়।
ইন্দুমুখী যখন “সুয়ােরাণী দুয়ােরাণীর গল্প বলে, তখন নগেন্দ্র
নাথের মনে একপ্রকার আনন্দ উপস্থিত হয়। সে যখন এক
রাজার সাত রাণী ছিল” ইত্যাদি উপন্যাস বলে, তখন নগেন্দ্র
নাথ ক্ষণে ক্ষণে তাহার মুখপানে একদৃষ্টে তাকাইয়া থাকেন।
নগেন্দ্রনাথ কেবল ‘দু” দিয়া থাকেন এবং ভাবেন। কি যে
ভাবেন জানি না।
এইরূপে প্রত্যহই ইন্দুমুখী ভঁহাকে কত প্রকার আনন্দিত
করে। মুখে, আমােদে, আহলাদে নগেন্দ্রনাথ ইন্দুমুখী
আমি এখানে কোথায়। } সহিত সেখানে অনেক দিন অতিবাহিত করিলেন। কিন্তু ভাবনা তাঁহাকে ত্যাগ করিল না। তিনি সর্বদাই ভাবেন; ইন্দুমুখী জিজ্ঞাসা করিলে তিনি কেবল বলেন “হু- একদিন কথায় কথায় ইন্দুমুখী জিজ্ঞাসা করিল “আচ্ছা আজ তােমাকে একটা কথা বলিতে হইবে।” “কি কথা ?” “তুমি যে কি করে এখানে এলে, তাত আমায় বল নি।” ইন্দুমুখী যেমন এই প্রশ্ন করিল, অমনি নগেন্দ্রনাথ স্তম্ভিত হইলেন। কে যেন হঠাৎ তাহার শরীর দিয়া তড়িৎপ্রবাহ, সঞ্চালিত করিয়া দিল। কে যেন সহসা কোন অলক্ষ্য তীক্ষুধায় অদ্বারা' তঁাহার হৃদয়ের কোমলতম স্থানে আঘাত করিল। যেন তাহার বাক্শক্তি রুদ্ধ হইল। তিনি আর বসিয়া থাকিতে পারিলেন না। ধীরে ধীরে ইন্দুমুখীর গায় ঢলিয়া পড়িলেন। তাহার মুখ চোক লোহিত বর্ণ হইল। ইন্দুমুখী দেখিল হিতে বিপরীত হইল। সে * ভাবিয়া জিজ্ঞাসা করিল, আর ঘটিল ঠিক তাহার বিপরীত। তৎপরে ইন্দুমুখী তাঁহার মুখে একটু জল দিল এবং একখানি পাখা লইয়া তাহাকে ব্যজন করিতে লাগিল। ধীরে ধীরে জিজ্ঞাসা করিল নগেন্দ্রনাথ তুমি এরূপ হইলে কেন ?” “ইন্দুমুখি-বলিতে কি আমি প্রত্যহই যাহা ভাবিয়া খুঁজিয়া পাইনা, আজ তাহাই পাই- আছি। আজ তুমি আমায় এমন একটা বিষয় মনে করিয়া দিয়াছ যদ্বারা আমি তােমার নিকট চিরকৃতজ্ঞতা রজ্জুতে বদ্ধ থাকিলাম। আমি বন্ধুহারা হইয়া তাহার অনুসন্ধানে এই ৮০ সরয। নিবিড় জঙ্গলে আসিয়া পড়ি। তদনন্তর তুমি আমায় যত্নসহকারে অতিথি সেবা করিয়াছ। আমি তােমার ভালবাসাতেই বন্ধু দেবেন্দ্রনাথকে বিস্মৃত হইয়াছিলাম, আবার অন্য তােমার দ্বারাই আমার সে কথা মনে হইল। তাই বলি তুমি আমার বড় উপ- কার করিয়াছ। আমি অনেকদিন অবধি কর্তব্যবিস্মৃত হইয়া- ছিলাম। দেখ ইদুমুখি, আজ বােধ হয় আমি তােমায় ছাড়িয়া অন্যত্র যাইব। কতদিন পরে যে ফিরিব তাহার কিছুমাত্র নিশ্চ- য়তা নাই। আমার বড় তৃষ্ণা হচ্চে একটু জল দাও। আজ্ঞামাত্র ইন্দুমুখী এক গ্লাস জল আনিল। জলপানে কিছু সুস্থ হইয়া নগেন্দ্রনাথ বলিলেন : “ইন্দুমুখি ! আমি বােধ হয় অদ্য কিম্বা কল্য প্রাতে দেবেন্দ্র নাথের অনুসন্ধানে বহির্গত হইব।” রেন্দ্রনাথ তােমার কে ?” তিনি আমার বিশেষ বন্ধু। তঁাহার হৃদয়ে একটী রত্ন ছিল সেটী হারাইয়াছিলেন, তাই তিনি তাহার অনুসন্ধানে আমাকে সঙ্গে লইবাটী হইতে বহির্গত হন। তদনন্তর তিনি আমায় না বলিয়া কোথায় চলিয়া যান। আমি তাহাকে খুঁজিতে খুজিতে এতদূর আসিয়াছি।” ‘তুমি আমায় একাকিনী রাখিয়া যাইবে? ইহা কি তােমার ন্যায়সঙ্গত কাৰ্য্য হইবে? তুমিই না আমার উদ্ধারের জন্য ব্যাকুল হইয়াছিলে? তবে আজ তােমার এরূপভা কেন ? চল আমিও তােমার সঙ্গে যাইব।” “তােমার যাইবার কোন প্রয়ােজন নাই।” “এয়ােজন তােমার না থাকিতে পারে—কিন্তু আমার প্রয়াে- ..
(আমি এখানে কোথায়।
৮১
জন আছে। তােমায় আমি বনলতা দিয়া বন্ধন করিয়াছি,
তবে তুমি কি করিয়া যাইবে ?”
“তবে তুমি আমার সঙ্গে চল কিন্তু তােমার ইহাতে বড়
কষ্ট হইবে। তােমার কোমল দেহে সে কষ্ট বড় গুরুতর
বােধ হইবে। হয়ত তাহাতে তােমায়, কিম্বা আমার, অথবা
উভয়ের ঘাের অনিষ্ট ঘটিতে পারে।”
“এখানে থাকিলেই বা আমার যে মঙ্গল হইবে তাহা তুমি
কি করিয়া জানিলে ? আমি জানি এখানে থাকাতে আমার
দুঃখ ভিন্ন সুখ নাই। প্রথমতঃ তােমায় দেখিতে পাইব না।
ইহাত আমার পক্ষে বড় দুঃসহ যন্ত্রণা। দ্বিতীয়তঃ আমায় ।
এখানে একাকিনী থাকিতে হইবে। একলা থাকার কত কষ্ট
তাহ ত তুমি জান না। কিন্তু যদি আমি তােমার সঙ্গে থাকি
আর ইহা অপেক্ষা শতগুণ অধিক কষ্ট আমায় সহ কার হয়
তবে তাহাও আমার পক্ষে মঙ্গলজনক। কারণ তাহা হইলে
আমি তােমার মুখ দেখিতে পাইব এবং সমস্ত কষ্ট ভুলিয়া যাইব।
তুমিই যে আমার সমস্ত যন্ত্রণার উপশম কর্তা। তােমায় দেখিলে
যে আমার সব কষ্ট দূরে যায়, তা কি তুমি জান না?”
নগেন্দ্রনাথ পরাস্ত হইলেন। কিন্তু ভাবিলেন “আমি
এখানে কোথায় ? এসব কি আমি স্বপ্ন দেখিতেছি ? দেবেন্দ্র
নাথের সন্ধান করিতে করিতে মােহের বশ হইয়া পথ ভুলিয়া
আমি এখানে কোথায় আসিলাম? আমি নিতান্ত হতভাগ্য।
হা দেবেন্দ্র ! হা সরযূ ! আমি তােমাদের সন্ধান করিতে পারি-
লাম না? 'মনের মধ্যে এক চির দুঃখ থাকিল যে বন্ধুর কর্তব্য
কৰ্ম অনেক দিন অবহেলা করিয়া নিষ্কর্মা হইয়া অনর্থক সময়
সরষু। লেন। ক্ষেপন করিলাম। অথবা সময় কিনা করিতে পারে? ইন্দুমুখী নগেন্দ্রনাথের মনের গতি সমস্তই বুঝিতে পারিল। পর দিন তাহারা দুইজনে আহারাতে পাথেয়াদি লইয়া কুটীর হইতে বহির্গত হইলেন। যাইবার কোন নির্দিষ্ট স্থান নাই। যে দিকে পথ দেখিতে পাইলেন সেই দিকেই চলি- নগেন্দ্রনাথ পথে যাইতে যাইতে কেবল ভাবেন “আমি কোথায় ? কোথায় যাইব ? কোথা গেলে দেবেন্দ্রনাথের দেখা পাইব? আমি বন্ধুত্বের কাৰ্য্য করিতে নিতান্ত অক্ষম।” ইন্দুমুখী বলিল নগেন্দ্রনাথ বৃথা কেন চিন্তা কর। দেবেন্দ্র- নাথকে পাইবে। তিনিও তােমার জন্য ব্যাকুল হইয়া ঘুরিতে ছেন। তুমি তাহার যথার্থ বন্ধু। জগৎপতি শীঘ্রই তাহাকে তোমার নিকট আনিয়া দিবেন।
ত্রয়োদশ পরিচ্ছেদ।
নৌকাযাত্রা।
নগেন্দ্রনাথ ও ইন্দুমুখী বনে বনে অনেক দূর গমন করিয়া
অবশেষে একটি ক্ষুদ্র পল্লিতে উপনীত হইলেন। গ্রামের নিকট
দিয়া একটী নদী বহিয়া গিয়াছে। বেলা তখন প্রায় শেষ
হইতেছে। সূৰ্য্যদেব পাটে বসিবার আয়ােজন করিতেছেন।
রাখালগণ গরু লইয়া চীৎকার করিতে করিতে গৃহে প্রতিমন
করিতেছে। কেহ কেহ বা এক একটী তালপত্রের বাঁশী বাজা-
ইতে বাজাইতে চলিতেছে। কেহ কেহ দুৰ্বল গরুগুলিকে
যষ্টি প্রহার করিতেছে, কারণ তাহারা পালের সনে যাইতে
পারিতেছে না।
গ্রামের স্ত্রীলােকদিগের মধ্যে কতকগুলি পূর্ণ কলস লইয়া
গৃহে প্ৰতিগমন করিতেছে আবার কতকগুলি কলসকৰুে জল
আনিবার জন্য পুষ্করিণীর দিকে চলিতেছে। পূর্ণ কলসক
স্ত্রীলােকগুলি হেলিয়া দুলিয়া কত কথা বলিতে বলিতে চলি-
কেহ বলিতেছেন “রামের মা বড় ঝগড়া কতে
পায়ে। দ্বিতীয়া তাহার উত্তরে বলিতেছেন ‘হ্যা তাই
' বটে মাগি গায় পড়ে গাল দেয়।” তৃতীয়া বলিলেন ‘হ্যা
৮৪
সরয।
ফেমি যা বল্লি সব সত্যি। মাগি যেন সাক্ষাৎ কুটিলে।”
চতুর্থ বলিলেন “মাগি যেন ভাট সব সময়েই বক বক কয়ে
বকে আর যা না তাই বলে গাল দেয়। যেন তার বাপের
চোদ্দ পুরুষের কেউ কিছু ধারে ?”
এইরূপে ‘‘য়ামের মা” অল্পক্ষণ মধ্যে কলহপ্রিয়া স্ত্রীলোক
বলিয়া প্রমাণিত হইলেন।
তৎপরে “রামী মাসীর” মেয়েটীর কথা উত্থাপিত হইল।
পাঠক, যদি সত্যকথা বলিতে, হয় তবে “রামী মাসীর” মেয়েটীর
নাম সুশীলা। বয়স ১৭১৮ বৎসর। রংটা যে খুব ফরসা
তাহাও নহে। তবে সুশীলা দেখিতে কুৎসিৎও নহে। তবে .
এই স্ত্রীলােক গুলি তাহার বিষয় কি বলে তাহা শােনা উচিত।
একজন বলিলেন “মীয় মেয়েটা বড় দুষ্ট। সকলকেই গাল
দেয়।” আর একজন তাহার কথাই ভাল করিয়া বলিলেন
কিটি সুশলীর নাক ত নেইই, চোক দুটো ত দুটো পুকুর।
চুল গুলাে যেন শণের মুড়ি। মুখখানা যেন পাঁচের আঁক।
আবার সেই মুখে লােককে গাল দেওয়া হয়। অপর একজন
বলিয়া উঠিল “সুশলী চলে যেন একটা কুকুর যাচ্ছে। চায়ত
বিড়ালের মত। চুড়ির গরবে মাটীতে পা পড়ে না। ওর
সােয়মী নাকি ক'খানা গয়না দিয়েছে তাই পরে আবার
লােকে দেখান হয়। ঘুড়ির লাজের গন্ধ নাই।” তাহারা
এইরূপে সুশীলার যথেচ্ছ কুৎসা করিয়া চলিয়া গেলেন।
এদিকে যাহারা জল আনিতে যাইতেছেন তাহারাও চুপ
করিয়া যান নাই। তাহাদের মধ্যে কেহ বলিতেছেন আমি
গিয়ে এর পর সন্ধ্যে দেব। তারপর ছেলে পিলের খাবার
নৌকাযাত্রা। যা গাড় কব।' কেহ বলিতেছেন ‘‘আমার জামাই এসেছেন। যাই সকাল সকাল তার খাবার উদ্যোগ করিগে।” সকলেই এক এক বিষয় কথা পড়িতেছেন। ইহার মধ্যে একটা স্ত্রীলােক অনেকক্ষণ চুপ করিয়া যাইতেছিলেন। তিনি আর থাকিতে পারিলেন না। বলিলেন “শান্তদিদি জানি নে সেদিন আমাদের এখানে একটা পাগল এসেছিল। সে কেবল ‘সময—সরযু” বলে ডেকে বেড়াচ্ছিল। এক একবার বল- ছিল নগেন্দ্রনাথ কোথায় রহিল। আবার বলিল ‘হা সরয! হা সর’! সৈটাকে দেখলে বােধ হয় সে সরযু সরযু করে। পাগল হয়েছে।” নগেন্দ্রনাথ সেই দিকেই যাইতেছিলেন। এ কথাটী তিনি বেশ মন দিয়া নিলেন। শেষে তাহাদের নিকট গিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন “আচ্ছা তােমরা সে সন্ন্যাসীটীকে কত দিন দেখেছ ? সে এখন কোথায় আছে?" স্ত্রীলােকেরা সকলেই প্রথমে তাহাকে দেখিয়া একটু লজ্জিত ও বিস্মিত হইলেন। শেষে এক বয়ােবৃদ্ধা উত্তর দিলে “তাহার বিশেষ খবর জানিনা। তবে ১০/১৫ দিন হ’ল আমি তাকে দেখেছিলাম। তার পর শুনলাম সে নৌকা ভাড়া করে। পশ্চিমে গিয়েছে।” নগেন্দ্রনাথ এই সমস্ত কথা শ্রবণ করিয়া বুঝিলেন দেবেন্দ্র নাথ এই দিকেই গিয়াছেন। তখন তার মনে একটু সামান্য আশা হইল। ইন্দুমুখীকে লইয়া তাড়াতাড়ি নদীর ঘাটে গমন করিলেন। “মাঝি মাঝি” বলিয়া অনেক ডাকাডাকির পর সরযু। একজন মাঝি আসিল। নগেন্দ্রনাথের কথা শুনিয়া সে বলিল বাবু আজ আর নৌকা যাবে না। সন্ধ্যা হয়েছে।” নগেন্দ্রনাথ তাহাকে অনেক জিদ করিতে লাগিলেন। মাঝি কিছুতেই সম্মত হইতে চায় না। শেষে তিনি তাহাকে অর্থের লােভ দেখাইলেন। তখন মাঝির মন টলিল। সে অপরাপর সঙ্গীদিগকে ডাকিয়া নৌকা সাজাইল। নগেন্দ্র- নাথ ও ইন্দুমুখী নৌকায় উঠিলেন। মাঝি নৌকা ছাড়িল । সন্ধ্যা হইয়াছে। সূৰ্য্যদেব এক্ষণে পরিশ্রান্ত ক্লান্ত ব্যক্তির ন্যায় অস্তাচল চূড়ায় নিদ্রা যাইতেছেন। নিশাদেবী চন্দ্রমার সহিত প্রেমালাপ করিবেন বলিয়া বেশভূষা করিতেছেন। নদীর জল শুভ্রবর্ণ রজত ধারার ন্যায় ধীরে ধীরে বহিয়া যাইতেছে। নীল চন্দ্রাতপ সদৃশ নভােমণ্ডলে অগণ্য তারকা- নিচয় মমি করিয়া জ্বলিতেছে, এবং মানবকে বিনয়ী হইতে শিক্ষা দিতেছে, ধৈৰ্য্যাবলম্বন করিতে উপদেশ দিতেছে। চন্দ্রদেব নক্ষত্রপরিবৃত হইয়া শীতশ্মি বিতরণ করিতেছেন। সেই চন্দ্রকিরণ যখন নদীজলে প্রতিফলিত হইতেছে তখন বােধ হইতেছুে যেন জলে সহস্র সহস্র চন্দ্র ভাসিতেছে। পবন আস্তে আস্তে চলিতেছেন। সময়টা বেশ মনােহর। মাঝিরা ঈাড় টানিতে টানিতে গীত গাইতে আরম্ভ করিল। সঁড়ের দ্বারা যে “ঝুপ ঝুপ’ শব্দ হইতেছিল তাহারাই তাহার গানের তাল রাখিতেছিল। নদীর দুই পার্শ্বে গ্রাম। গ্রামের লােকেরা নৌকার দিকে দৃষ্টি করিতেছে। কোন স্থানে গ্রামস্থ কুটীরের মধ্য হইতে, আলােকজ্যোতিঃ নির্গত হইয়া নগেন্দ্রনাথের মনে কত পুর্বকথা নৌকাযাত্রা। ৮৭ উদিত করিয়া দিতেছে। কোথাও বা গ্রামস্থ মাতালদল মধ্যে এলােমেলাে সুরের সঙ্গীত হইতেছে। নগেন্দ্রনাথ তাহাও উৎকর্ণ হইয়া শুনিতেছেন, যেন তাহাতেও কিছু মধুরতা আছে। কোথাও বা রাখালেরা রাত্রিতে বংশীবাদন করিতেছে, তাহাতে নগেন্দ্রনাথের মনে বাল্যকালের সুখের সময় ফিরিয়া আসি- তেছে। এইরূপে নদীর দুইপার্শ্বস্থ লােকালয় দর্শন করিতে করিতে নগেন্দ্রনাথ নৌকার সহিত পশ্চিম দিকে চলিতেছেন। ক্রমশঃ রাত্রি অধিক হইল। 'বাহাজগতের অধিকাংশ ব্য নিদ্রাদেবীর মায়াজালাচ্ছন্ন হইল। রাত্রি যত বেশী হইতে থাকে, ইন্দুমুখীর মন ততই কিসের ভয় হইতে থাকে। সে যেন কি দেখিতেছে, আর তাহার সর্ব- শরীর রােমাঞ্চিত হইতেছে। তাহার দক্ষিণ নেত্র নৃত্য করিতে লাগিল । কিন্তু সে নগেন্দ্রনাথকে এবিষয় কিছুই না। পাছে তিনি দুঃখিত হন। মনের কথা মনেই থাকিল। আকাশে দুই এক খণ্ড মেঘ দেখা দিল। তারকাগুলি একে একে বিলীন হইল। চাদের কিরণ ক্রমশঃ মলিন হইয়া আসিল। মাঝি বুঝিল “লক্ষণ ভাল নহে।” বলিল “বাবু গাে বোধহয় ঝড় কিম্বা বৃষ্টি হবে। নগেন্দ্রনাথ বলিলেন “আচ্ছা নৌকা কিনারায় কিনারায় নিয়ে চল।” মাঝি তাহাই করিল। কিন্তু সময় সকলেই কাৰ্য্যে বাধা দিতে চেষ্টা করে। আকাশ মলিন। চাদ লুকাইল। মেঘগুলি একত্র হইল। চতুর্দিক অন্ধকারপূর্ণ। মাঝি বলিল ‘‘বাবু নৌকা থামাতে হবে নাকি।” নগেন্দ্রনাথ বলিলেন “থামালে ভাল হয়।”
সর কিন্তু মাঝি অবসর পাইল না। প্রবলবেগে ঝড় আসিল। নৌকা টলমল করিতে লাগিল। মাঝিরা পঁাড় ধরিতেও অব- কাশ পাইল না। নৌকা উল্টিয়া পড়িল। নগেন্দ্রনাথ ইন্দুমুখীকে ধরিয়াছিলেন। কিন্তু মাঝি তাহাকে তাহার হাত হইতে লইল। কারণ তাহাহইলে ইন্দুমুখী বাঁচিতে পারে। কিন্তু যদি সে নগেন্দ্রনাথকে ধরিয়া থাকে তবে উভ- য়েরই প্রাণ যায়। নগেন্দ্রনাথ সন্তরণ জানেন। মাঝি জল কাটিয়া কাটিয়া ইন্দুমুখীকে লইয়া তীরে উঠিল । নগেন্দ্রনাথ যে কোথায় উঠিলেন জানিনা। ইন্দুমুখী তীরে উঠিয়া নগেন্দ্রনাথের নিমিত্ত দান করিতে করিতে মাঝির সঙ্গে চলিতে লাগিল।
. **** চতুর্দশপবিচ্ছে (y Eacher “আমার কি আর উপায় নাই ?” গ্রীষ্মকাল। বেলা প্রায় তিন প্রহর গত হইয়াছে ; তপনের তীক্ষক যেন একটু সহনীয় হইয়াছে তথাপি গ্রীষ্মে প্রাণ ছট- ফট্ করিতেছে। বাতাস একবার করিয়া সবলে বহিতেছে। আবার কিয়ৎক্ষণের জন্য একবারে যেন স্পন্দহীন হইতেছে। যখন বেগে বাতাস দিতেছে তখন মনে ইতেছে বাতল না দিলেই ভাল, কারণ বাতাসের সহিত এত অধিক ধূলিকণ। আসিতেছে যে তাহার। স্পর্শে মুখ হওয়া দূরে থাক বরং কষ্টই হইতেছে। আবার যখন বাতাস নিস্তব্ধ হইতেছে তখন, খ্রীষ্ম- ধিক্য প্রযুক্ত শরীর হইতে অত্যধিক স্বেদ নির্গত হইতেছে। কাজেই বাতাস দিলেও দোষ, না দিলেও দোষ। পিকরাজ বৃক্ষপত্রের অন্তরালে বসিয়া ডাকিতেছেন “কুহু কুহু” “কে হে পবন নাকি? অপরাপর দুই চারিটী পক্ষী ও চক্ষুদ্বয় বিস্তার করিয়' এক এক স্থানে বসিয়া বসিয়া হাপাইতেছে। বৃক্ষলতাদি রৌদ্রে দগ্ধকলেবর হইয়া একপ্রকার অবসন্ন হইয়াছে। নব নব কচি কচি পাতাগুলি উত্তাপে কণ্ঠাগত প্রাণ হইয়াছে, অনিচ্ছার সহিত পবনের সঙ্গে খেলা করিতেছে। এই সময় একটী বালিকা
সরযু।
ভীমপুর গ্রামের নিকটবর্তী নদীতীরে বসিয়া আছে। তাহার
কেশদাম আলুলায়িত, মুখমণ্ডল রৌদ্রতাপে ক্লান্ত হইয়া, অথবা
তপনের উপর ক্রুদ্ধ হইয়া রক্তবর্ণ হইয়াছে। তাহার হন্তপদাদি
ীণ হইয়াছে। সে মুখখানি নিম্নদিকে নত করিয়া মাটীর উপর কি
লিখিতেছে, তাহার পরিধেয় বস্ত্রখানি মলিন হইয়াছে। তাহাতে
আবার রৌদ্রতাপে তাহা উত্তপ্ত হওয়াতে বালিকা সে বস্ত্রখানি
শরীরে রাখিতে অক্ষম হইতেছে। আবার কখনও কখনও মুখের
উপর বস্ত্রাল ঘর্ষণ করিতেছে, অশ্রু কি ঘৰ্ম্ম মুছিতেছে ভাল
করিয়া বুঝিতে পারা যায় না। তাহার পদতল উত্তপ্ত মৃত্তিকায়
থাকিয়া আরও উত্তপ্ত হইতেছে। তাহার অপর কোন দিকে
কৃষ্টি নাই কেবল মাটীর উপর যাহা লিখিতেছে একদৃষ্টে তাহা
দেখিতেছে। নিকটে একখানি শিলা পড়িয়াছিল, বালিকা
একটি ফল লইয়া লিখিল “দেবেন্দ্রনাথ আমার কি আর
উপায় নাই ?” প্রস্তর লিখিত দেবেন্দ্রনাথকে ভৎসনা করিয়া
বলিল “দেবেন্দ্রনাথদেবে তুমি বড় নিষ্ঠুর, অথবা আমি বড়
হতভাগিনী আমায় অদৃষ্টের দোষ। তুমি ত সাধ্যমত চেষ্টা
করিয়াছিলে, কিন্তু আমার অদৃষ্ট যে মন।
বালিকা এইরূপভাবে বিলাপ করিতেছে এমন সময় একটা
বৃদ্ধা সেই স্থান দিয়া যাইতেছিল। বালিকার অবস্থা দেখিয়া
বােধ হয় তাহার মনে দয়া হইল। নিকটে গিয়া বলিল ‘বাছা
তুমি কাঁদছ কেন এস, আমার সঙ্গে এস।”
বালিকা উত্তর দিল “না আমি কোথাও না। আমি
আমি এখানেই থাকিব।”
বৃদ্ধা অনেক অনুনয় করিয়া, জিকরিয়া বলিতে লাগিল
আমার কি আর উপায় নাই।
৯১
বালিক। শেষে অনিচ্ছার সহিত তাহার প্রস্তাবে সম্মত হইল।
বৃদ্ধাও তাহাকে লইয়া ভীমপুর গ্রামভিমুখে চলিতে লাগিল।
বৃদ্ধা বলিল ‘া মা তােমার নাম কি ?”
আমার নাম হতভাগিনী
“না মা তুমি মিছে কথা বলছ, হতভাগিনী কি কাহারও
নাম হয় ?”
কাহারও না হতে পারে কিন্তু আমার নাম হতভাগিনী ।”
“না আমার বিশ্বাস হচ্ছে না। তুমি সত্যি করে বল তোমার
নাম কি ?”
“আমার নাম জানিয়া কিছু প্রয়ােজন আছে কি ? তোমার
দ্বারা কি আমার কোন উপকার হবে ?
“সংসারে উপকার না হয় কা থেকে ? তুমি তবে কি করে
জানলে যে আমার দ্বারা তােমার কোন উপকার হবে না?”
“তুমি কোথায় যাচ্ছিলে মা।”
“আমার যাবার কোন ঠিক নাই। দুই চক্ষু যে দিকে
যাবে আমিও সেই দিকে যাব।”
“তােমার কি হয়েছে যে তুমি এমন করে বেড়াচ্ছ ?”
‘আমার একটী রত্ন হারাইয়াছে, তাহা খুঁজিবার জন্য
ঘুরিতেছি।
সে রত্নটী কি শুনতে দোষ আছে কি?
সে আমার স্বামী রত্ন।”
“আচ্ছা তুমি কোথায় গেলে তাকে পাবে ? তােমার বাড়ী
কোথায় ? তায়ই বা বাড়ী কোথায় ? তােমার নাম কি ?”
এইবার বালিকা নাম ধাম বলিল।
সরযু।
“আমার নাম সরযু ।
আমার বাড়ী পূর্বদেশে। আমি
পশ্চিমদেশে যাব মনে করে এসেছি। যদি কোথাও আমার
স্বামীকে পাই তবে বাড়ী ফিরিব নতুবা রাস্তায় কোথাও প্রাণ
ত্যাগ করিব।”
“মা তুমি আজ কিছু ই খাওনি ?”
“না আজ আমি কিছুই খাইনি। কিন্তু ক্ষুধাও হয় না।
তবে বড় পিপাসা হয়েছে।”
‘চল মা আমার বাড়ী গিয়ে জল খাবে।”
তােমরা কি জাত ?”
“আমরা আহির গােয়ল। আমাদের বাড়ী জল খেলে
ওমর জাত যাবে না। আমরা ত আর নীচ জাত নই।
এই প্রকার কথাবার্তা কহিতে কহিতে সরযু বৃদ্ধার বাটাতে
উপস্থিত হইল। বৃদ্ধা তাহার রীতিমত যত্ন করিল। স্বয়ং স্বহস্তে
তাহার পদ ধৌত করিয়া দিল। সরসূ নিষেধ করিল, কিন্তু সে
শুনিল না, বলিল “মা তােমরাত আমার ছেলে, আর মা
তােমায় ফেখে আমার ছােট মেয়েটাকে মনে পড়িল” এই বলিতে
বলিন বৃদ্ধা কাদিতে লাগিল। চক্ষুজলে তাহার গণ্ডল প্লাবিত
হইল। সরযু তাহার চক্ষুজল মুছাইতে গেল কিন্তু বৃদ্ধা তাহাকে
বাধা দিল। এক হন্তে সরযুর বাম পদনি ধরিয়া থাকিল
অপর হস্তে নিজের বদ্বারা চক্ষুজল মুছিতে লাগিল । তৎপরে
বৃদ্ধা তাড়াতাড়ি সরযূর জন্য একবাটী দুগ্ধ, কতকটা মিষ্ট দ্রব্য ও
এক গ্লাস জল আনিল। সরযূ তাহা খাইয়া একটু সুস্থ হইল।
কিন্তু চিন্তায় তাহার শরীর জর্জরিত হইতে লাগিল। বৃ।
তাহাকে কত কথা বলিয়া প্রবােধ দিতে লাগিল।
আমার কি আর উপায় নাই। দেখিতে দেখিতে বেলা অবসান হইল ; সরযূর খাবার যােগাড় করিতে বৃদ্ধা ব্যস্ত হইল। কিন্তু সে বলিল “না মা আমি আজ রাত্রে কিছুই খাবনা।” “না বাছা সমস্ত দিন কিছুই খাওনি, রাধে কিছু না খেলে চলে ? এত বড় রাত্রিটা যাবে কেমন করে ? “না মা সত্যি বলছি, আমি কিছুই খেতে পারব না।” বৃন্ধার নির্বাতিশয় দর্শন করিয়া সংক্ষু অবশেষে বলিল তবে একটু দুধ খেয়ে থাকব।” বৃদ্ধা সন্তুষ্ট হইল এবং একবাটী দুগ্ধ অনিয়া তাহার নিকট রাখিল। সে বলিল ‘‘আমি এখন খেতে পাবে না, রাত্রিতে খাব।' বৃদ্ধা তাহার জন্য বিছানাদি ঠিক করিয়া অন্যত্র গমন করিল! সরসূ দুগ্ধের বাটিটা নিকটে রাখিয়া সেই শয্যায় শয়ন করিল। সন্ধ্যা হইল ; পিকবর তাড়াতাড়ি কুহু কুহু স্বরে সকলকে বলিতে লাগিল শোও রাত্রি হইল।” বায়সগণ কা কা রবে কর্ণ বধির করিতে যত্নবান হইল। ছােট ছােট পাখিগুলি কিচির- মচির শব্দ করিতে করিতে লােককে নিদ্রা যাইতে উপদেশ দিতে লাগিল। গ্রামস্থ সারমেয়কুল “ভেউ ভেউ” রবে চীৎকার করিয়া শব্দকারী জম্বুক দিগকে যথেচ্ছ। গালি দিতে লাগিল। আজ সরয কর্ণে এই সমস্ত শব্দ যেন কোন ভয়ের কারণ বলিয়া প্রতীয়মান হইল। সে যে গৃহে থাকিল বৃদ্ধা তথায় শুইল না, মুরণ জানি না। তবে একটা কথা আছে “অতি ভক্তি চোরের . ক্ষণ।” 'বৃদ্ধা কি তাহাই করিল ? পর বিছানার উপর শুইয়া হস্তপদাদি বার বার তাহাতে
সরযু।
আঘাত করিতে লাগিল এবং কেবল “দেবেন্দ্রনাথ দেবেন্দ্রনাথ”
বলিয়া ক্রন্দন করিতেছিল। মধ্যে মধ্যে এক একবার বলিয়া
উঠিতেছে “দেবেন আমার কি আর উপায় নাই ? ভাবিতে
ভাবিতে সরযূর মনে হইল ‘দুগ্ধ পান করিতে হইবে।
অমনি সে দুগ্ধের বাটিটা লইয়া মুখের নিকট ধরিল, ঘ্রাণে
জানিল দুগ্ধে অপর কোন দ্রব্য মিশ্রিত আছে। কিন্তু বৃদ্ধ। যে
তাহার উপর কোন অসদাচরণ করিবে তাহা ভাবিল না।
তবে দুগ্ধের অন্ধভাগও খাইতে তাহার সাহস হইল না।
সামান্যরূপ খাইয়া বাকি জানালা দিয়া ফেলিয়া দিল। তৎপরে
মনে করিল শুইয়া শুইয়া দেবেন্দ্রনাথের বিষয়, ভাবিবে কিন্তু
“তুগ্ধপানমাত্রেই সরষর শরীর অবশ হইল। সে ওইয়া নিদ্রা-
দেবীর মায়ায় আচ্ছন্ন হইল।
।।।।
পঞ্চদশ পরিচ্ছেদ
এ যেসবই নুতন ।
সরযু নিদ্রিত হইবার অল্পক্ষণ পরেই বৃদ্ধার গৃহদ্বারে কি শব্দ
হইল। দেখিতে দেখিতে কয়েকজন লােক তাহার বাড়ী,
প্রবেশ করিল। একজন বলিল “ওরে এ বাড়ীটা নয় বোধ
হচ্চে।” আর একজন বলিতেছে “আরে বুড়ি যে এইমাত্র
বাবুর কাছে বলে এল আমার বাড়ীর পাশে একটা বড় তালগাছ
আছে। এইত তাল গাছ আর এই বাড়ী তবে তুই কি করে
বছি যে এ বাড়ী নয়।”
তাহারা এইরূপ কথাবার্তা কহিতেছে এমন সময় বৃদ্ধা..
ৰাহিরে আসিয়া বলিল ‘কেরে—কে এসেছিস্?”
একজন উত্তর দিল “আমরা তিনজন এসেছি—আমি কালি-
দাস-হরিমঙ্গল—আর রাম সিং। কৈ বুড়ি এইমাত্র যা বলে
এলি তা কৈ ?”
“পঁাড়া, বাবা আঁড়া, আলােটা আলি তারপর দেখতে পাবি।
দেখবি একটী পুন্নিমের ছাদ ধরে রেখেচি” এই বলিয়া বৃদ্ধা
আলাে জালিল। সরষু যে গৃহে ছিল সেই গৃহে প্রবেশ করিয়া
তাহাদিগকে ডাকিল। সরযুর সৌন্দৰ্য্য দর্শন করিয়া
সরয। । তিনজনেই ক্ষণেকের জন্য হতবুদ্ধি হইয়া দণ্ডায়মান থাকিল। তাহাদের হস্ত যেন অবশ হইয়া গেল। কিন্তু অল্পক্ষণের মধ্যেই তাহাদের সে ভাব তিরােহিত হইল। বৃদ্ধার কথানুযায়ী রাম সিং সরযুর মুখে কাপড় বাঁধিল। তৎপরে হরি ও কালী তাহাকে স্কন্ধে লইয়া চলিয়া গেল। রাম সিং ও বৃদ্ধা, তাহাদের পশ্চাৎ পশ্চাৎ চলিতে লাগিল। বৃদ্ধে! তােমার যে মৃত্যুর সময় উপস্থিত! কুপ্রবৃত্তি এখনও পর্যন্ত তােমার অন্ত:করণ হইতে দূরীভূত হইল না ? ওঃ তুমি যে পাপিনী ! রাস্তায় সরযূর নিদ্রাভঙ্গ হইল। সে চক্ষু মিলিয়া চাহিল কিন্তু কথা কহিবার শক্তি নাই। বুঝিতে পারিল যে সে দস্য- কর্তৃক ধৃত হইয়াছে। তখন সে আপন অদৃষ্টকে ধিক্কার দিতে লাগিল। কথা কহিবার চেষ্টাও করিল না। কারণ সে ভাবিল “যাহা হইয়াছে তাই যথেষ্ট, কথা কহিবার চেষ্টা করে আর অধিক কষ্ট কেন পাই ? ইহার সমস্তই আমার নিকট নুতন বলিয়া প্রতীয়মান হইতেছে।” দেখিতে দেখিতে তাহারা এক বৃহৎ প্রাচীন অট্টালিকার মধ্যে প্রবিষ্ট হইল। সরযূ দেখিতে পাইল দ্বারে কয়েক- জন দ্বারবান রহিয়াছে। কেহ গাঁজা টিপিতেছে, কেহ নিদ্রাদেবীকে আহ্বান করিতেছে, কেহ দাড়াইয়া দাঁড়াইয়া বন্দুক ঘাড়ে করিয়াই নিদ্রা যাইতেছে। ক্রমে তাহারা ৪৫টী দ্বার পার হইয়া চলিয়া গেল। শেষে এক অন্ধকার পূর্ণ সিড়ি দিয়া যাইতে লাগিল। সিঁড়ি শেষ হইলে তারা একটা গৃহের ভিতর প্রবেশ করিল। বাহকগণ সর্বযুকে, একটা পর্যায়ের উপর নামাইয়া দিল। কে মায়ের সাথে
এ যে সবই নূতন।
১৭
প্রদীপ জ্বলিতেছে।
সরযুর মুখের কাপড় আস্তে আস্তে
খুলিয়া দিয়া রাম সিংহ ইত্যাদি বাহির হইতে গৃহের দ্বার
রুদ্ধ করিয়া চলিয়া গেল। সরযূ ভাবিল “আমি এখানে
কোথায় ? এ যে সবই নূতন । হা বিধাতঃ আমার কপালে কি
এই লিখেছিলে ! মানুষের কপালে অনেক কষ্ট থাকে ।
সংসারে আসিয়া একদিনের জন্যও সুখ পাইলাম না ? অহে।
সংসার কি প্রতারণার স্থান! যে বৃদ্ধা আমার কত যত্ন
কলি তাহা হইতেই আমার এ দুর্দশা !! ইহা চিন্তার অতীত
ঘটনা। আমি এক্ষণে হতাশ। ধৈৰ্য্যই আমার একমাত্র অব ।
লম্বন। দেখি জগৎপতি শেষ পর্যন্ত কি করন। আমার
মৃত্যুর ভয় নাই। তবে এই ভয় পাছে দেবেন্দ্রনাথকে দেখিতে
না পাই। আমার সতীত্ব আমিই রাখিব। প্রাণ দিব সতীত্ব
কাহাকেও দিব না। ভিক্ষা করিলেও একমাত্র সুর, ভিন্ন
অপর কাহাকেও ভিক্ষা দিব না। প্রতিজ্ঞা করিলাম আজ
অবধি সংসারে দেবেন্দ্র ছাড়া আর কাহাকেও মনের সহিত
বিশ্বাস করিব না। কিন্তু হায় দেবেন্দ্রনাথ কোথায় ?
নুতন স্থান, এখানে আমার ক্ষমতা কি?”
এদিকে বৃদ্ধা রামসিংহের সঙ্গে আসিতে না পারিয়া অনেক
পশ্চাতে পড়িয়াছিল। অবশেষে মন্থর গতিতে অট্টালিকার
সমীপে উপনীত হইল। দ্বারবাগণ নিদ্ৰাযােগেই দ্বার রক্ষা
করিতেছে।
বৃদ্ধা তাহাদিগকে জিজ্ঞাসা করিল “রাম সিং
কোনদিকে গেল ?”
--তাহারা কোন উত্তর দিল না। তখন বৃদ্ধা একে একে
পাঁচটী বার পার হইল, তথাপি কাহারও সহিত তাহার কথা
১৮
সরযূ।
হইল না। ষষ্ঠ দ্বারে গিয়া জিজ্ঞাসা করিল “হ্যা গা বাবু
কোথায় ?
পাঠক বলিয়া রাখি বাবুর নাম “শ্রী তারানাথ ঘােষাল।”
কেহ বৃদ্ধার কথার উত্তর দিল না ।
শেষে সে একটা
স্ত্রীলােককে দেখিতে পাইয়া আহলাদ সহকারে জিজ্ঞাসা করিল
“বাবু কোথায় আছেন গা।”
যাহাকে প্রশ্ন করা হইল সে এবাড়ীর গিন্নির প্রিয়তমা বি।
তাহার মুখে নম্রতা প্রায়ই দৃষ্ট হয় না। সে সর্বদাই সপ্তমের
উপর আছে। বৃদ্ধার প্রশ্ন তাহার কর্ণবিবরে প্রবেশ করিবামাত্র
সে একবারেই জ্বলিয়া উঠিল। বৃদ্ধাকে বলিল, “এত রাত্রে
বাবুর সঙ্গে তাের দরকার কি। বুড়ী মাগি! লােকের বুঝি খাবা
শােবার যাে নেই। বাবু আমাদের ওয়েছেন। বাবুকে নিয়ে
কি-- যা যা অন্য সময় আসি।”
“তােমার কথায় আমার কান্ত জুড়িয়ে গেল। বাবুর সঙ্গে
আমার দরকার আছে। তুমি তাকে একবার ডেকে দাও।”
‘‘আমি যেন তাের চাকরাণী আরকি।
বলতে একটু
লজ। করে না ?"
“তুমি এবাড়ীর কে গা ? তােমার কথার যে বড় তেজ
দেখছি।”
“দেখবি না ত কি ? তুই বুঝি বাবুর সাহস পেয়েছি, নয় ?
তাই তাের মুখে এত বড় বড় কথা।”
“বাবুর জোরে জোর কেন? সত্যি কথা জিজ্ঞাসা করুক।
তাতে আবার জোর আলাের কি ? তুমি জানত বল বাব
কোথায় আছেন?”
এ যে সবই নূতন।
“আমি ঠিক জানি না। তবে যদি তুই আমার সঙ্গে যেতে
পারি তাহলে তাের সঙ্গে বাবুর দেখা সাক্ষাৎ হয়।”
বৃদ্ধা তখন একটু নরম হইল । ধীরে ধীরে তাহার তােষা-
মমাদ করিতে করিতে তাহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ চলিতে
লাগিল । শেষে একটা গৃহে প্রবিষ্ট হইল। বৃদ্ধা অবাক !
কারণ দাসী তাহাকে গৃহিণীর সমীপে আনিয়াছে।
বৃদ্ধা ভাবিল “এখন আমার উভয় শঙ্কট—সত্যি কথা বললেও
নিস্তার নেই—আর মিচে কথা বলে পার পাবার ঘষা নেই-ই
যাহাহউক সত্যি কথাই বলা যাবে—“যেহেতু সত্যের সর্বত্র
জয়’ হায়! হায়! যদি রামসিংহের সঙ্গে আস্তাম তবে আর
আমাকে এমন কষ্ট পেতে হত না। কিন্তু তাই বা কি করে
আসব ।
আমার কি আর বয়েস অাছে ?”
বৃদ্ধার মনে যেন কি হুড় হড় দুড় দুড় শব্দ করিত জানি।
সে ভাবিল “হয়ত গৃহিণী তাহার পৃষ্ঠদেশে সম্মার্জনী প্রহার
করিবেন অথবা তাহাকে কোন গুরুতর শাস্তি দান করিবেন।”
সে ভয়ে কাপিতে লাগিল । গৃহিণী তাহাকে দেখিয়া
বলিলেন “কি বুড়ি কঁপূচিস কেন ? মনে কি কিছু পাপ
আছে ? কি হয়েছে বল?”
“গিন্নি মা, আমার জ্বর হয়েছে।”
যে দাসী বৃদ্ধাকে সঙ্গে করিয়া আনিল গৃহিণী তাহাকে
মনের সহিত ভালবাসেন। আদর করিয়া তাহাকে “গােপা-
লর মা” বলিয়া ডাকেন। “গােপালের মা নাকি সাত বৎসর
বয়সে বিধবা হয়। তাহার ছেলে পিলে কিছুই নাই তবে কি
জানি গৃহিণী তাহাকে কেন “গােপালের মা” বলিয়া ডাকেন।
সরযূ।
“গােপালের মা” বৃদ্ধাকে কম্পিতা দেখিয়া বলিল “কি বুড়ি
গিন্নিমাকে দেখে ভয় হচ্ছে বুঝি। তা’হবে বৈকি-চোরের
মনে সদাই সন্দেহ। গিন্নির কাছে এসে পড়েচি বলে ভয়ে
তাের প্রাণ কাপছে।”
“না মা গােপালের মা, তা নয় আমার শরীরটা কেমন
অসুখ অসুখ বােধ হচ্ছে।”
“তা হবে বৈকি। আরও কত কি হবে। এখন জ্বর
হয়েছে এরপর রবিকার পর্যন্ত হবে।”
গৃহিণী এতক্ষণ শয্যার উপর বসিয়া বিজ্ঞ বিচারকের ন্যায়
দাসী ও বৃদ্ধা এই দুই পক্ষের কথাবার্তা ও প্রমাণ প্রয়োেগ শ্রবণ
করিতেছিলেন, এক্ষণে তিনি রায় প্রকাশ করিলেন “গােপালের
মা” তুই যা আমি বুড়িকে জিজ্ঞাসা করি কেন ও এত রাত্রে
আয় বাড়ী এসেছে।”
গৃহিণীর বাক্যে “গােপালের মা” অন্যত্র গমন করিল।
বৃদ্ধা গৃহিণীকে এবং তৎসঙ্গে জগৎপতিকে ধন্যবাদ দিতে
লাগিল।
গৃহিণী বৃব্ধাকে ধীরে ধীরে অথচ গম্ভীর স্বরে জিজ্ঞাসা করি-
লেন “বুড়ি রাত্রে কিজন্য এখানে এসেছিস্?”
‘‘মা আমি মিচে কথা বলব না। আপনি বামুনের মেয়ে।
এই চুনের ঘর, তা'তে রাত্রিকাল। তা’মা আমি সত্যি কথা
বল্ব। এতে আমার যা হয় হবে।”
“হঁ্যা, বুড়ি তুই সত্যি কথা বল্ তােকে কিছুই বলব না।”
‘মা আমি বাবুর কাছে এসেছিলাম।”
“
কিরকার ছিল?”
এ যে সবই নূতন। “দরকার—রকার এমন কিছু নয় তবে বাবু আমায় আসতে বলেছিলেন।” ‘কি জন্যে ?” “আমার বাড়ী একটা মেয়ে এসেছিল তাকে” “বুড়ি বনা-আমি তোকে কিছু বলব না।” “তাকে বাবুর নিকট আবার জন্য গৃহিণী ইহা শ্রবণ করিয়া বৃদ্ধার অজ্ঞাতসারে কতকগুলি দীর্দ- নিশ্বাস পরিত্যাগ করিলেন। পাছে বৃদ্ধা তাহা জানিতে পারে এই আশঙ্কায় তিনি অধিকক্ষণ সেরূপ ভাবে থাকিতে পারিলেন না। বলিলেন-“বুড়ি তুই তাকে এনেছিলি ?” “না আপনাদের রাম সিং, হরিমঙ্গল ও কালিদাস তাহাকে আমার বাড়ী থেকে এনেছে।” “তবে তুই কিজন্যে এসেছিলি ?” “বাবু আমায় কিছু টাকা দেবেন বলেছিলেন তাই- "আচ্ছা তুই এখানে’থাক্। তুই সত্যি কথা বলেছি তাই তােকে কিছু বল্লাম না। তবে ভবিষ্যতে আর এমন কাষ করি না। আর এমন কাজ কখনও কব না-না-না-আর কখ- নও-এমন কাজ- চুপক বুড়ি ! তাের এই দণ্ড হ’ল যে তুই আর কখনও বাড়ী যেতে পাবিনে। আমার বাড়ী থাকতে হবে।” “তা—তা-থাক্ব বৈকি—এত-আমার ঘর।” তবে তুই বসে থাক আমি আসি” এই বলিয়া গৃহিণী গোপালের মার নিকট গমন করিলেন। গােপালের মা
আজ্ঞামাত্র তাহার সঙ্গে চলিল। তদনন্তর উভয়ে সেই গৃহের
নিকট গমন করিলেন। গৃহিণী গােপালের মাকে বলিলেন
“দ্যাখ, বাবুর কাণ্ডকারখানা দ্যাখ,। সেদিন একটী অবলাকে
কোথা থেকে ধরে এনেছিল, আজ আবার এই একটাকে আনি-
আছে। বাবুর জ্বালায় লােকের কি বৌএর বাহিরে যাইবার
যো নেই।
‘া মা, তাইনা বটে বাবু যেন কি হয়ে গিয়েছেন।
তদনন্তয় গৃহিণী দ্বার খুলিয়া সরযূর নিকটে গেলেন।
সরষু,
প্রথমে রাম সিং মনে করিয়া ভয় পাইয়াছিল। কিন্তু তাহার
বিনিময়ে এক্ষণে একটী স্নেহময়ী রমণীমুর্তি। উহাকে দেখিয়া
সরযু মনে করিল যেন সাক্ষাৎ লক্ষ্মীই তাহার নিকট আসিতে
স্নেহ যেন তাহার অনুপমেয় দেহকান্তি হইতে নির্গত
হইতেছে। কারুণ্য তাহার দৃষ্টির উপর প্রতিনিয়ত বিরাজ করি-
তেছে। দয়া যেন তাহার শমীর আবৃত করিয়া রাখিয়াছে। তাহার
আকৃতি মমতাব্যঞ্জক। সহানুভূতি নিত্যই যেন তাহার শরীরে
পূর্ণমাত্রায় বর্তমান আছে। কিন্তু ইহার সমস্তই তাহার নিকট
নুতন বলিয়া বােধ হইল। সে ভাবিল “পূর্বে কোথায় ছিলাম ?-
কয়েকদণ্ড পূর্বে কোথায় ছিলাম ?—এখনই বা কোথায় ?
এ যে সবই নূতন। সময় তােমার চরণে অসংখ্য প্রণাম !”
ছেন।
*
.
ষোড়শ পরিচ্ছেদ
লেন।
।
বিরহিনীতে
বিরহিনীতে।
সরযুর চেহারা দেথিয়া গৃহিণী ক্ষণকাল নিকভাবে থাকি-
পরে বলিলেন ‘মা তুমি কার কন্যা? তােমায় কে
থেকে ধরে এনেছে ? তুমি কাদছ কেন? তোমার কোন ভয়
নাই। আমি যতক্ষণ বাঁচিয়া থাকিব ততক্ষণ তােমার স্ত্রীরে
কেহই হস্তক্ষেপ করিতে পারিবে না।” গৃহিণীর আশ্বাস বচনে
আস্বস্তা ও প্রাপ্তোত্তেজনা হইয়া সরযূ আত্মবৃত্তান্ত একে একে
তাহার নিকট বিবৃত কলি। গৃহিণী অবাক হইয়া তাহার কথা
শুনিতে লাগিলেন। সরফুর কথা শেষ হইলে তিনি তাকে
নিজ কক্ষে লইয়া গিয়া বলিলেন “মা তুমি সমস্ত দিন কিছুই
খাওনি দুটী কিছু খাও।”
‘‘আমার খাবার ইচ্ছা আদতে নেই।” সয এই কথা
বলিতে বলিতে হঠাৎ বৃদ্ধাকে সেখানে দেখিয়া বলিল “তুই বুড়ী
এখানে কি করে এসেছি। তুই না আমায় ভুলিয়ে এনেছিলি,
তুই না আমার সর্বনাশ করিবার হেতু? বয়সের গাছপালা নেই
তবু তাের দুষ্টমি গেল না। দু'চার দিন পরে যে তােকে নরক
১০৪
সরয়।
সর
কুণ্ডে যেতে হবে, তার উপায় কিছু করেচি ? তুই মনে করে-
ছিলি আজ অনেক টাকা রােজগার কতে পাৰ্বি, কিন্তু বুড়ি
তাই যদি তাের ইচ্ছা ছিল, আমায় আগে বলিস নি কেন?
তোকে আমি টাকার ঘরে বসিয়ে রাখতেম।”
গৃহিণী সরযূকে বাধা দিয়া বলিলেন “সংযু— আর মা ওকে
ভৎসনা ক’র না। ওর যথেষ্ট শাস্তি হয়েছে। তুমি এখন
দুটী কিছু খাও।”
“না মা, আমি কিছুই খৈতে পারব না, তবে আমার ঘুম
পাচ্ছে।'
“এই আমার কোলে মাথাদিয়ে শোও।”
\ “না, মা, এতে আপনার কষ্ট হবে। আমি আর কোথাও
শােব।''
দনন্ত রুগৃহিণীর আজ্ঞানুসারে সাযু পৰ্যঙ্কের একপার্শ্বে শয়ন
করিল। রাত্রি ক্রমশঃ অধিক হইল। তাহারা সকলেই সে
রাত্রি সেই গৃহে নিদ্রা গেল।
পরদিন প্রভাতে উঠিয়া গৃহিণী সযকে বলিলেন “দখ
আযদের বাবু আর একটা বালিকাকে ধরে এনেছেন ।
তাকে দেখে আসি। সে একলা থাকতে ভাল বাসে। আমার
কাছে থাকতে চায় না। বলে আমি চিরকাল এল। ছিলাম,
ইহা আমার ভাল। কিন্তু সে দিন রাত কাঁদে।
‘চলুন আমি তাকে দেখব।”
গৃহিণী তাহাকে সেই গৃহের নিকট লইয়া গিয়া বলিলেন,
‘তুমি এখানে পঁড়িয়ে শােন ওকি বলে। আমি গােপালের
মাকে বলে আসি সে যেন বৃদ্ধাকে না যেতে দেয়।"
চল
বিরহিনীতে বিরহিনীতে।
D
গৃহিণী চলিয়া গেলেন। সরযূ শুনিতে লাগিল নগেন্দ্রনাথ
নগেন্দ্রনাথ ! আমায় অকুল পাথারে ফেলে কোথায় চলে গেলে?
তুমি যে কোথায় গেলে জানি না। আমিই যে কোথায় আছি
তাহাও জানি না। তুমি জীবিত আছ কি না তাহাও জানি
না। তুমি বন্ধুর জন্য আমায় ছেড়ে চলে গেলে এতে আমি
দুঃখিত নই। যে তােমার মত বন্ধু পেয়েছে সে আপনাকে শত
ধন্যবাদ দিবে।”
এই অপরিচিত বালিকার মুখ হইতে নগেন্দ্রনাথের নাম
শুনিয়া সরযূ বিস্মিত হইল। ভাবিল “এ অপর কোন নগেন্দ্র
নাথ হইবে।” পরে আবার ভাবিল “যখন এতদুর বন্ধুত্বের
কথা হইতেছে তখন সেই নগেন্দ্রনাথই বটে, ইহাতে আর সন্দেহ
নাই। তবে ত নগেন্দ্রনাথের সহিত দেবেন্দ্রনাথ ছিলেন।
দেবেন্দ্র! তবে কি তুমি জীবিত আছ? অথবা আমি বৃথা
বকিতেছি। আচ্ছ। এই বালিকাকে সমস্ত কথা জিজ্ঞাসা করিলেই
আমার সন্দেহ দূর হইবে। তবে ইহাকে দ্বার খুলিতে বলি।”
বালিকা ভিতর হইতে দ্বার উদঘাটন করিল। সে দ্বার
খুলিয়া যেমন সরযূকে দেখিল অমনি স্বপ্নের স্ত্রীমূর্তি তাহার মনে
হইল। ক্ষণকাল একদৃষ্টে তাহার মুখ পানে চাহিয়া থাকিল।
কোন কথা বলিতে পারিল না। এদিকে সরযুও তাহাকে দেখিয়া
বিস্ময়ের সহিত তাহার দিকে তাকাইতে লাগিল।
সরযু জিজ্ঞাসা করিল “তােমার নাম কি ?”
“আমার নাম হতভাগিনী ইন্দুমুখী।”
“তােমার বাড়ী কোথায়। তুমি এখানে কি করে এলে ?
তােমার বাপ মা কোথা?”
সরযূ। “আমার বাড়ী কোথায় ছিল জানি না। পিতা মাতা উভয়েই স্বর্গলােকে। আমি পথহারা আশ্রয় হীনা হইয়া নগেন্দ্রনাথকে হারাইয়া মাঝির সহিত এই গ্রামের নিকট দিয়া যাইতেছিলাম হঠাৎ এই গৃহিণীর স্বামী আমায় দেখিতে পাইয়া কয়েকজন দারােয়ান পাঠাইয়া দেন। তাহারা মাঝিকে যথেচ্ছা প্রহার করিয়া আমায় এখানে আনে। গৃহিণীর যত্নে বাবু আমায় কিছু বলিতে পারেন না। আমি সেইদিন অবধি গৃহিণীকে ধন্যবাদ দি, কিন্তু বাবুকে মনে মনে শাপ দি। আমি একাকিনী থাকিতে ভালবাসি।” ‘‘নগেন্দ্রনাথ তােমার কে ?” ইন্দুমুখী দীর্ঘ নিশ্বাস ত্যাগ করিতে করিতে উত্তর দিল “তিনি আমার স্বামী।” এই অবকাশে সরষর অজ্ঞাতসারে তাহার চঙ্গুনিয়া কয়েক ফোটা জল আসিল। কিন্তু সে তাহা গােপন করিল। ইন্দুমুখী বলিল “আমি বড় হতভাগিনী।” এই বলিয়া সে একে একে আত্ম বৃত্তান্ত সরযুর নিকট প্রকাশ করিল । নগেন্দ্র- *নাথের নাম শুনিয়া সরযু সমস্তই বুঝিতে পারিল। তদনন্তর ইন্দু- মুখী সরযূকে বলিল “তুমি কে ? গৃহিনীর সহিত কি তােমার কোন সম্পর্ক আছে ? না তুমি ইহাদের কোন প্রতিবেশীর কন্যা?” সরযূ এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়া—আপনার কথা সমস্তই বলিল। উভয়েই সমান অবস্থায় পতিতা; উভয়েই বিরহ কাতর, উভয়েই উভয়ের দুঃখ বিভাগ করিয়া লইব মনে করিল কিন্তু কাযে তাহার ঠিক বিপরীত ঘটিল। উভয়ের দুঃখ ক্ষণেকের জন্য চতুগুণ বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হইল। উভয়েই বিরহিণী।
বিরহিনীতে বিরহিনীতে।
১০৭
কমে বেলা অধিক হইল। গৃহিণী এতক্ষণ এক গােপনীয়
স্থানে থাকিয়া তাহাদের কথাবার্তা শ্রবণ করিতেছিলেন। এক্ষণে
তাহাদের নিকটে আসিলেন। তাহারা ইহাতে একটু লজ্জিত
হইল।
।
গৃহিণী সে বিষয়ে তাহাদিগকে কোন কথা না বলিয়া, কহি-
লেন “দেখ এত বেলা হ’ল তােমরা স্নান করবে না নাকি ?
সরযূ ও ইন্দুমুখী গৃহিনীর কথা শিরােধার্য্য করিয়া তাহার
পশ্চাৎ পশ্চাৎ চলিতে লাগিল।
স্নানাহার সমাপন করিয়া আবার সেই গৃহে সরযূ ও ইন্দুমুখী
বসিয়া বসিয়া গল্প করিতে লাগিল। এক্ষণে তাহাদের দুঃখের
যেন কিছু কিছু উপশম হইতেছে বােধ হইল।
কেমন করিয়া দেবেন্দ্রনাথ সংযুর সহিত বাল্য ক্রীড়া করি-
তেন, কেমন কয়িয়া দেবেন্দ্রনাথ তাহাকে লিখিতে পডিতে শিক্ষা
দিতেন সরয তাহা একে একে ইন্দুমুখীর নিকট ব্যক্ত করিতে
লাগিল।
ইন্দুমুখীও নগেন্দ্রনাথেয় রসিকতা, তাহার ভালবাসা ইত্যাদি
বর্ণনা করিতে ক্রটি করিল না। উভয়েরই কথার শেষ নাই
বলিলেও চলে। একবার সরযূ বলিতেছে ইন্দুমুখী গুনি-
তেছে, আবার পরক্ষণেই ইন্দুমুখী বলিতেছে সরযূ শুনিতেছে।
বেলা ক্রমশঃ অবসান হইয়া আসিল। কিন্তু বেলা যত কমি
তেছে তাহাদের কথা ততই বাড়িতেছে।
সরযু কিছুক্ষণ থাকিয়া দেওয়ালের গায় সমান কয়েকখান
চিত্রপট দেখিল। দেখিল একটীতে নামিয়ভীর চিত্র রহি-
য়াছে। নল দময়ন্তীকে নিদ্রিতা দেখিয়া ক্ষণকাল সভাস্থলে
,
১০৮ সরফু। বিচরণ করিতেছেন। আবার একটীতে লিখিত আছে সেই নল দময়ন্তীকে ত্যাগ করিয়া চলিয়া গিয়াছেন। দময়ন্তী জাগ্রত হইয়া নলের অনুসন্ধানে “হ। নল! হ নল!” বলিয়া মণিহারা ফণিনীর ন্যায় ব্যাকুল হইয়া বিচরণ করিতেছেন। দময়ন্তীর এই চিত খানি দেখিয়া সরযূ নীরবে অশ্রু বিসর্জন করিতে লাগিল। আর একখানি চিত্রে লিখিত আছে শকুন্তলা দুষ্মন্তের বিরহে কাতর হইয়া নবচ্যুতপল্লবশয্যায় শয়ন করিয়া আছেন, তাহার সখীদ্বয় তাহাকে ব্যজন করিতেছে। ইহা দেখিয়া সরযুর হৃদয়ে দেবেন্দ্রনাথের বিরহানল আরও জ্বলিয়া উঠিল। আবার একখানিতে লেখা আছে “সীতাদেবী অশােক নে বসিয়া একাকিনী ক্রন্দন করিতেছেন” ইহাতে সরযুর ঈদ- য়ের মর্মস্থল আহত হইল। সন্ধ্যা হইল । কিন্তু তাহারা সেই ছিপট দেখিতেছে ও গল্প করিতেছে। কথার যেন শেষ নাই !!
সপ্তদশ পরিচ্ছেদ। H প্রস্তাব। সান্ধ্যসমীরণ মৃদুমন্দগতিতে সঞ্চরণ করিতেছে। বিহগরাজি নিস্তব্ধ প্রায় হইয়াছে। ভূচরগণ লন্ধবিশ্রাম হইয়া এক এক স্থানে বসিয়া আছে। জলচরগণও আর ক্রীড়া করিতেছে না। সূৰ্য্যদেব মেঘের অন্তরালে লুক্কায়িত হইয়াছেন। দুই চারিটী তারকা গােধূলিমাতার সীমন্তে বিরাজ করিতেছে।• সরােব কুমুদিনীকুল তরঙ্গমালায় অঙ্গ বিধৌত করিতেছে। পবনদেব তাহাদের গাত্ৰমাৰ্জনির কাৰ্য্য করিতেছেন। তাহারাও পরিষ্কত এবং পবিত্র হইয়া কুমুদিনীকান্তের আগমন প্রতীক্ষা করি- তেছে। সুতরাং চন্দ্রদেব বিরহিনীর ব্যথা আর অধিকক্ষণ দেখিতে পারিলেন না। শীঘ্রই পূর্বদিকে বিশ্বস্তর মূর্তিতে দেখা দিলেন। পল্লীগ্রামবাসী গৃহস্থেরা দিবাভাগে স্ব স্ব কাৰ্য্যে ব্যাপৃত ছিলেন এক্ষণে তাহারাও অবসর পাইয়াছেন। সমস্ত দিন ক্ষেত্রে পরিশ্রম করিয়াছিল এক্ষণে সে ক্লান্ত হইয়া গৃহে প্রতিগমন করিল। গৃহিণীর গৃহেও প্রদীপ জ্বালা হইল। গৃহিণী একটী পিতলের প্রদীপে তৈল ও বর্তিকা দিয়া আলিয়া স্বহস্তে প্রদীপটা তুলসীতলায় লইয়া গেলেন। তথায় ক্ষণকাল কৃষক ১১০ সরযূ। প্রদীপটী নামাইয়া একটা প্রণাম করিলেন। তদনন্তর আবার প্রজ্বলিত প্রদীপটী গ্রহণ করিয়া কয়েকবার এদিক ওদিক দেখাইয়া যে গৃহে ‘লক্ষ্মী থাকেন সেই গৃহে লইয়া গেলেন। এদিকে শঙ্খ-ঘন্টা-কঁাসরি ইত্যাদির সুমধুর শব্দও ঠাকুর- বাড়ীতে শুনা যাইতেছে। পূজারী ব্রাহ্মণটাকে কয়েকটা বালক বড় পীড়াপীড়ি করিতেছে। ব্রাহ্মণ পূজা করিয়া যাহা কিছু মিষ্ট দ্রব্য পাইয়াছিলেন তাহার সমস্তই বালকদিগকে দিলেন। ব্রাহ্মণ তাহাতে কিছুমাত্র দুঃখিত বা ক্ষুব্ধ হইলেন না। বালক- দিগের মধ্যে কেহ বলিতেছে “পুরুতঠাকুর আমায় আজ অনেকটা পেসাদ দিয়েছে।” কেহ বলিতেছে কেহ বলিতেছে “বামুনঠাকুর আজকে আমায় অনেক সন্দেশ দিয়েছে।” আবার কেহ কিছুই প্রসাদ পায় নাই তথাপি বলিতেছে “ঠাকুরমহাশয় মায় খুক ভাল বাসেন।” ব্রাহ্মণ এই সমস্ত প্রশংসা বাক্য শ্রবণ করিতে করিতে পূজালন্ধ কতকগুলি দ্রব্য একটি গামছায় বাঁধিয়া গজেন্দ্রগমনে গৃহের উদ্দেশে চলিতেছেন। বালকগণের মধ্যে কেহ কেহ ভঁহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ গমন করিতেছে। বলিতেছে ঠাকুর মশায় কাল সকাল সকাল আসূবেন” ব্রাহ্মণ তাহাদের অভিপ্রায় বুঝিয়া উত্তর দিলেন “তোমাদের কালকে অনেকটা পেসাদ দেব।” বালকেরা সন্তুষ্টচিত্তে প্রতিগমন করিল। এদিকে সরযু ও ইন্দুমুখী সেই গৃহের ভিতর বসিয়া কি পরামর্শ করিতেছে। প্রদীপটী মিট মিট করিয়া জ্বলিতেছে। তৈলের অল্পতা হইয়াছে অথবা বর্তিকা নাই এরূপ নহে। তবে যত্নের অভাব। কারণ যত্ন করিতে যাহারা আছে, তাহারা কেই
প্রস্তাব।
১১১
এক্ষণে কি ভাবিতেছে। এবং মধ্যে মধ্যে দুই চারিটী কথা
বলাবলি করিতেছে। গৃহিণী তাহাদিগকে খাইবার জন্য জিদ
করাতে, তাহারা অনিচ্ছার সহিত কি খাইয়া তৎক্ষণাৎ আবার
সেইখানেই বসিল। অপর কোন বিষয়ই এক্ষণে তাহাদের মন
আকর্ষণ করিতে পারিবে না। সরযু একবার বলিল “না ইন্দু
মুখি ! আর একদণ্ডও এখানে থাকা উচিত নয়। আমাদের
দুই চক্ষু যেদিকে যাবে এক্ষণে সেইদিকে যাওয়াই কর্তব্য।
আমাদের আবার জীবনের
জীবনের উপর মমতা কি? জীবন ত
স্বামীর হাতে। স্বামী যদি জীবিত আছেন তবে আমরাও
জীবিত থাকব।
আর দেবেন্দ্রনাথ ও নগেন্দ্রনাথ যদি
জীবলােক, ত্যাগ করে থাকেন তবে আমরাও আর বাঁচব
আমার প্রাণত দেবেন্দ্রনাথের সঙ্গেই আছে। তিনি যদি জীবিত
আছেন তবে আমিও আছি। তাই বলি চল আর এখানে
থাকা উচিত নয়।
“তােমার কথা সবই সত্যি। আমারও যেতে ইচ্ছা হয়।
তবে কি জান কোথায় যাব? কোথায় গেলে তাহাদের পাব?”
“যেখানে তাহারা অাছেন।”
“তাহার কোথায় আছেন কি করে জানিব ?”
‘জগদীশ্বর দেখাইয়া দিবেন। চল পশ্চিম দিকে যাই।
তীর্থযাত্রাও হবে, আর যদি তঁাহাদিগকে পাই তবে ত সকল
• তীর্থের ফল এক স্থানেই পাব।”
যাব কিন্তু কি করে এখান থেকে বাহির হব ? কেমন
করে গৃহিণী মাতাকে ত্যাগ করে যাব ?
“এখান হতে বাহির হবার উপায় অবশ্য আছে। কিন্তু
1
সরঘু ।
গৃহিণীকে ছেড়ে যেতে হবে এই নিতান্ত দুঃখের বিষয় ।
কিন্তু এখানে থাকলে আমাদের মনঃকষ্ট আরও বৃদ্ধি হতে
পারে। এবং আমাদের উদ্দেশ্য সফল হবে না।
বাহির হইয়া তাহাদের অনুসন্ধান করিতে পারি ভাল । আর
যদি না পারি তবে তীর্থেই মরা ভাল।”
“রাস্তায় কিন্তু অনেক ভয় আছে। আমরা মেয়ে মানুষ
এবং আমাদের বয়সও কম। তবে কি করে যাব?
জানি রাস্তায় দস্যুভয় আছে। কিন্তু আমাদের নিকট ত
আর অলঙ্কারাদি থাকবে না। জানি পথে হিংস্ৰজন্তুর ভয়
আছে। কিন্তু তাহারা আমাদের অনিষ্ট করবে না। জানি
রাস্তায় দুষ্টলােকের ভয় আছে কিন্তু আমরা যদি পতিব্রত হই
তবে কেহই আমাদের অনিষ্ট করূতে পারূবে না।
“তবে যাব কিন্তু বাহির হবার উপায় কি ?
উপায় রাত্রির আশ্রয় গ্রহণ। গভীর রজনীকে সঙ্গিনী
করব। দাসদাসীদিগের নেত্রে ধূলি নিক্ষেপ করব। স্নেহময়ী
গৃহিণীকে প্রথমে অনুনয় করব। পরে তাহার অজ্ঞাতসারে
কৌশল করে চলে যাব।
‘সরযু ! তােমার কথায় আমার সমম্ভ ভয় দূরে গেল ।
তুমি পতিব্রতা !”
তাহাদের কথাবার্তা শেষ হইলে, গৃহিণী আসিয়া পড়ি-
লেন। গৃহিণীকে দেখিয়া তাহারা বিস্মিত হইল। কিন্তু তিনি
তাহাদিগকে নানারূপ উপদেশ দিতে লাগিলেন।
ফল হইল না। ১১৭ সরযু মনে সরযু মনে ০ দক্ষতার সহিত সরযু বহিদ্বারের অর্গল উন্মোচন করিল। দেখিতে দেখিতে তাহারা বাড়ী ছাড়িয়া অনেক দূরে পড়িল। নিকটের মানুষ পৰ্যন্ত দৃষ্ট হয় না। অন্ধকার বড় বেশী। নিকটে কোন বৃক্ষ কিম্বা অপর কোন দ্রব্য পড়িয়াছে তাহা দেখিয়া করিতেছে ‘বােধ হয় কোন লােক তাহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ আসিবে. বলিয়া পার্শ্বে দাড়াইয়া আছে। কোন স্থানে পায়ের আঘাতে শুস্ক পর্ণসমূহ ‘মড় মড়’ করিতেছে তাহাতে সর করিতেছে বুঝি কোন লােক ধীরে ধীরে তাহাদের অনুগমন করিতেছে। তাহারা যখন দুই একটী বৃক্ষের নিকট দিয়া যাই- তেছে তখন বৃস্থিত পঙ্কিগণ ভয়ে কিচির মিচির করিতেছে ও পাখা নাড়িতেছে, আবার কেহ কেহ উড়িয়া পলাইবার চেষ্টা করিতেছে ইহাতেও সরযূর মনে বড় ভয় হইতেছে। অন্ধকারে পথ দেখা যাইতেছে না, কাজেই তাহারা দুই একবার কণ্টক বনে গিয়া পড়িতেছে। বস্ত্র কন্টকলগ্ন হইতেছে কিন্তু ছাড়াইবার অবসর না থাকাতে সেই সকন্টক বস্ত্র লইয়া চলিতেছে। কখনও কখনও কোন বৃক্ষের মূলদেশে উপনত, হইতেছে। তাহারা যে কোথায় যাইবে তাহা জানি না। তবে এই মাত্র বলিতে পারি তাহারা তীর্থ ভ্রমণে বহির্গত হইয়াছে। গৃহিণীর উপদেশে কোন ফল হইল না। গৃহিণী ভস্মে ঘৃতাহুতি দিলেন !!
উনবিংশ পরিচ্ছেদ।
সরকার মহাশয়
এমন কি
রামপুর গ্রামখানি ভারতবর্ষের উত্তর পশ্চিম প্রদেশের
অন্তর্গত। এখানে হিন্দুস্থানীয় সংখ্যাই বেশী। বাঙ্গালা দেশের
লোক খুব অল্প। গ্রামস্থ লােকের মধ্যে অধিকাংশই ভদ্র,
সদ্বংশজাত, বদান্য, অতিথি সেবা পরায়ণ, পরদুঃখকাতর বিনয়ী,
নম্র, শিষ্টাচারী ও মহানুভাব। খলপ্রকৃতি, সুচতুর প্রতারণা
পরায়ণ বাঙ্গালী এখানে নিতান্ত বিরল। বরং তাহাদের খলতা,
চতুরতা, প্রতারণা ইত্যাদি অসদগুণাবলি এখানে—সরলতা
দয়ালুতা ইত্যাদি সৎপরিচ্ছদে ভূষিত হইয়াছে।
তাহাদের আচার ব্যবহার পর্যন্ত পরিবর্তিত হইয়াছে। হিংসা
প্রবৃত্তি দূরীভূত হইয়াছে। অবিশ্বাস প্রায়ই আর তাহাদের মনে
স্থান পায় না। বিলাসিতা ক্রমে ক্রমে তাহাদের মনে হইতে
বিদায় হইয়া ক্ষুন্নমনে দক্ষিণ পূর্ব দেশাভিমুখে গমন করিতেছে।
আলস্য অজ্ঞাতসারে তাহাদের দেহ পরিত্যাগ করিতেছে।
স্থিরতা তাহাদের মনে আবিভূত হইতেছে। তাহাদের ধীরতা
বৃদ্ধি পাইতেছে। হিন্দুত্বের প্রতি তাহাদের আস্থা জন্মিতেছে ।
দেশের পূর্ব গৌরব ধীরে কৃীরে তাহাদের স্মৃতিপথে উদিত
সরকার মহাশয়।
হইতেছে। বিপন্ন ব্যক্তিগণের প্রতি তাহাদের সহৃদয়তা বৃদ্ধি
হইতেছে।
তবে কেহ কেহ আবার এখানে আরও দুর্দান্ত, নির্দয়,
নৃশংস, দুরাচার, ও নরাধম হইতেছে। যেহেতু উর্বর ক্ষেত্রেও
ত কণ্টক বৃক্ষ জন্মিয়া থাকে। তবেই বলিতে হইল “সভাৰ
এবাত্ৰ তথাতিরিচ্যতে যথা প্রকৃত্যা মধুরং পং পয়ঃ।
এই গ্রামে নন্দকিশাের সিংহ নামক একজন সম্ভান্ত লােক
বাস করেন। লােকটীর জন্মস্থান বাঙ্গালায়। কিন্তু তিনি এখানে
বাস করিয়াছেন। তিনি জাতিতে কায়স্থ। ছেলে পিলের মধ্যে
তাহার দুইটী পুত্র ও দুইটী কন্যা। কন্যা দুইটীর, মধ্যে একটীর
বিবাহ দেশে দিয়াছেন এবং আর একটীর বিবাহ রামপুতেই
একটা ভদ্রলােকের পুত্রের সহিত দিয়াছেন। নন্দকিশাের বাবু
সদ্গুণ বিভূষিত। জমিদারীর আয় হইতেই তার পরিবার
বর্গের ভরণ পােষণ নিৰ্বাহিত হয়। পুত্রদ্বয় চাকুরী করিয়াও
কিছু কিছু উপার্জন করেন। ইহার বাটীতে হরেন্দ্রনাথ দত্ত
নামক এক ব্যক্তি জমিদারী সেরেস্তার কাৰ্য দেখেন। বাটার
লােকে তাঁহাকে সরকার মহাশয়” বলিয়া ডাকেন। ইনি-
যে তাহাতে বিশেষ দুঃখিত হন এরূপ নহে। তবে কিজানি
সরকার মহাশয় বলিলে ইনি যেন একটু চটেন।
নন্দকিশাের
বাবু ভাহাকে মনের সহিত ভালবাসেন।
কারণ লােকটী গুণবান, কাৰ্যদক্ষ, পটু, ক্ষিপ্রহস্ত ও বিনয়ী।
কাজেই গৃহিণী এবং বাড়ীর ছেলেরা পর্যন্তও লােকটীকে
ভালবাসে। না হইবেই বা কেন “গুণের আদর সর্বত্রই হয়।”
সরকার মহাশয় সকলেরই প্রিয়পাত্র। প্রয়ােজন হইলে
সরষু।
তিনি ছেলেদের সহিত অন্তঃপুরেও যাতায়াত করেন। সংসার
বড় ভয়ানক স্থান। একজন একভাবে এককাৰ্য্য করে, কিন্তু
লােকে তাহার ঠিক বিপরীত বুঝিয়া থাকে। ভাল মন্দ লােক
সকল স্থানেই আছে। দোষগুণ বিচার করা মানব প্রকৃতির
স্বভাবসিদ্ধ ধৰ্ম্ম। বিশেষতঃ স্ত্রীলােকগণের মধ্যে ইহার আধিক্য
দৃষ্ট হইয়া থাকে। সরকার সহাশয় অন্তঃপুরে গমন করিয়া
তথা হইতে ফিরিয়া আসিলে কতলােক তাহার বিষয় কত কথা
বলিয়া থাকেন। কিন্তু আমরা জানি ভঁহার চরিত্র ভাল।
কেহ কেহ বলেন “আহা সরকার মহাশয় দেখতে যেন
সাক্ষাৎ কার্তিক। শরীরের গঠন নিখুত। চোকগুলি যেন
প্রতু নীলপদ্ম।
হাতপা বেশ সুন্দর।” আবার একজন
বলেন “নাকটা যেন একটু চাপা চাপা, ভুরুগুলি ও দেখতে
নে ভাল নয়-মাথার চুল সর্বদাই এলােমেলাে ভাবে
থাকে।” বাস্তবিকই সরকার মহাশয় চুলের যত্ন করেন না।
এইরূপে তাহার বিষয় অনেকেই অনেক কথা বলেন।
চৈত্রমাস। গ্রীষ্মের আধিক্য যে অতিরিক্ত তাহাও নহে।
বাড়ী স্ত্রীলােকেরা দিবার মধ্যভাগে আহার করিতে বসেন।
অনেকেই প্রায় এক সঙ্গে বসেন। সাধারণত দেখিতে পাওয়া
যায় কয়েকটী স্ত্রীলােক একস্থানে থাকিলেই কোন না কোন
লােকের দোষগুণ সম্বন্ধে কথাবার্তা হয়। এখানেও তাহাই
হইতেছে। কেহ বিহারি সিংহদের বির বিষয় বর্ণনা করিতে-
ছেন। কেহ কৃষ্ণকুমারদের ছােট বউএর কথা বলিতেছেন।
কেহ বলিতেছেন “আলুর মত কোন তরকারিই নাই।” কেহ
ডাটি চর্বণ করিতে করিতে পুরাতন শতসহস্র ৱার কথিত দুই
সরকার মহাশয়।
১২১
চাৰিটা উপন্যাস বলিতেছেন। কেহ কেহবা হাতের গ্রাস
হাতে করিয়া গল্প শুনিতে শুনিতে তাহা
খাইতে ভুলিয়া
যাইতেছেন। আবার যখন গল্প থামিতেছে তখন তিনি
খাইতেছেন। কেহ কেহ বৈশাখ মাসের গ্রীষ্মধিক্য পূর্ব
হইতেই অনুমান করিয়া সূৰ্য্যদেবকে গালি দিতেছেন। ফেই
নিজের স্বামীর বিষয় বর্ণনা করিতেছেন। কেহবা তাহার
ছােট দেবরের হান্য পরিহাসের কথাটা বলিতেছেন। সুতরাং
আসর খুব গরম।
ইত্যবসরে একটী স্ত্রীলােক “সরকার মহাশয়ের কথা উখা-
পন করিলেন পাঠককে একটা কথা বলিতে ভুলিয়াছি-
নন্দকিশাের বাবুর ছােট মেয়ের নাম কুঞ্জকামিনী। তার
বয়ঃক্রম প্রায় সপ্তদশ বর্ষ। যখন সরকার মহাশয়ের কথা
উঠিল তখন কুঞ্জকামিনীর মুখে যেন একটু আলাদের লক্ষণ
লক্ষিত হইল। কেন জানিনা।
কেন জানিনা। যে রমণী তাহার কথা
কহিতেছিলেন তিনি যখন থামিলেন তখন কুঞ্জকামিনীর মুখ
আবার বিবর্ণ হইল। আবার যখন তিনি কথা কহিতেছেন
তখন কুঞ্জকামিনী প্রফুল্লবদনে সকলের সহিত কথাবার্তা-কহি,
তেছে। এবং পাছে অপর কেহ তাহা জানিতে পারে এই ভয়ে
অপরের সহিত অন্যান্য বাজে কথা কহিতে লাগিল। কিন্তু ইহার
মধ্যে কেহ কেহ তাহা বুঝিল কারণ কুঞ্জকামিনী প্রায়ই কি
ভাবিয়া থাকে। এবং সে যে কথা কহিতেছিল তাহাতেও
তাহার ভুল হইতেছিল। যাহা বলিতেছে তাহা ভাবিয়া বলি-
তেছিল না। পূর্বের কথার সহিত তাহার কোন সম্পর্ক আছে
কি না এবিষয়ে তাহার দৃষ্টি নাই। এইরূপে তাহাদের
সরসূ
আহার ব্যাপারে ২৩ দণ্ড কাটিয়া গেল। আহারান্তে তামুল
চর্বণ করিতে করিতে কুঞ্জকামিনী একস্থানে বসিয়া ভাবিতে
লাগিল।
সে রােয়াকের একস্থানে বসিয়া মুখখানি নিমদিকে রাখিয়া
অকুলপাথার চিন্তা করিতেছে। বামহন্তে বক্ষের বস্ত্রখানি
ধরিয়া আছে। দক্ষিণ হস্ত দ্বারা একটা চাবি লইয়া বােয়াকের
উপর মাথামুণ্ড কি লিখিতেছে। অনেকক্ষণ সেখানে বসিয়া
থাকিয়া পরে কোথায় চলিয়া গেল।
এস পাঠক দেখিয়া আসি কুঞ্জকামিনী কোথায় যায়।
কুঞ্জকামিনী রােয়াক হইতে উঠিয়া উপর তালায় গেল ।
তথায় একটা কুঠরীর মধ্যে প্রবেশ করিল। গৃহের মধ্যে গিয়া
দুই চারিবার এদিক ওদিক কি দেখিল। আবার একবার
দ্বামের নিকট গমন করিল, দেখিল কেহ আসিতেছে কি না।
শেষে একটা জানালার নিকট দাড়াইল। থাকিতে থাকিতে
হঠাৎ চমকিয়া উঠিল । কোন কারণ নাই তথাপি সে চমকিয়া
উঠিল। ইহা ভয়ের কারণ। তবে ভয় আবার কাহাকে ?
পাছে লােকে দেখিতে পায় । কেন সে কি মন্দকৰ্ম্ম করি-
তেছে ? কৈ সে ত কেবল দাড়াইয়া আছে। তবে তাহার
নয়নদ্বয় বৈঠকখানাবাড়ীর দিকে ফিরান কেন ? ইহা কিছু
সন্দেহের কারণ। বৈঠকখানায় ত অনেক লােক বসিয়া
আছেন তবে কুঞ্জকামিনী কাহার দিকে একদৃষ্টে চাহিয়া আছে ?
ভাল করিয়া দেখিলে উপলব্ধি হইবে সে সরকার মহাশয়ের
দিকে দৃষ্টিক্ষেপণ করিতেছে। কারণ সরকার মহাশয় যখন
যেদিকে যাইতেছেন কুকামিনীর চুক্ষের গতি তখন সেই
সরকার মহাশয় দিকেই ফিরিতেছে। সরকার মহাশয় বৈঠকখানা হইতে কোথায় যাইবার জন্য বহির্গত হইলেন। কুঞ্জকামিনীর নয়ন সেইদিকেই গেল। তাড়াতাড়ি অপর একটা জানালার নিকট দাড়াইল। তথহইতে যত দূর পর্যন্ত সরকার মহাশয়কে দেখিতে পাওয়া যায় কুঞ্জকামিনী তাহা দেখিল। যখন জানালা হইতে আর দেখা গেলনা, তখন সে ছাদে উঠিল। মনােসাধ পূর্ণ করিয়া এখান হইতে সরকার মহাশয়কে দেখিতে লাগিল। কুঞ্জ কামিনি! তুমি এত আগ্রহের সহিত সরকার মহাশয়কে দেখিতেছ কেন ? ইনিত তােমার স্বামী নহেন। কারণ আমরা জানি রামপুরেই অপর এক ব্যক্তির সহিত তোর বিবাহ হইয়াছে। তবে কি তুমি সরকার মহাশয়কে ভালবাস? যদি ভালবাস, তবে কি ভাবে ? তােমার মনে এত ভয় কেন? যখন সরকার মহাশয় দৃষ্টির বহিভূত হইলেন, তখন কুঞ্জ- কামিনী অগত্যা নীচে আসিয়া পালঙ্কের উপর ক্ষুন্নভাবে বসিয়া থাকিল । তথায় একাকিনী থাকিতে যেন তাহার কষ্ট বােধ হইল। তজ্জন্ত সে “রামী রামী” বলিয়া দাসীকে ভাকিয়া তাহার সহিত পরামর্শ করিতে লাগিল।
বিংশ পরিচ্ছেদ। “তুমি বড় বরসিক!” বেলা প্রায় শেষ হইতেছে। কুঞ্জকামিনী ও রামী সেই গৃহের ভিতর বসিয়া পরামর্শ করিতেছে। কুঞ্জকামিনী কি বলিল, রামী তাহাতে উত্তর দিল “না,” “না, তা আমি পারব -আমার থেকে সে কায হবে না।” কথা খুব আস্তে আস্তে হইতেছিল, কারণ ইহা অতীব গােপনীয় বিষয়। কুঞ্জ কামিনী যখন দেখিল মীর মন কিছুতেই নত হইতেছে , তখন সে এক কৌশল আবিষ্কার করিল-বাক্সের ভিতর হইতে কয়েকটী টাকা বাহির করিল। রামী দেখিল কুঞ্জকামিনীর হাতে, নগদ পাঁচটা টাকা। অর্থের লােভ বড় ভয়ানক তাহাতে বামী দাসী বৈত নয় । নগদ পাঁচ টাকা দেখিয়া তাহার মন নত হইল। লােভ বাড়িল, মন টলিল। ক্ষণেক পূর্বে কুঞ্জকামিনী যাহাকে অচল, অটল, হিমাচল মনে কয়িয়াছিল এক্ষণে তাহা চঞ্চল, তরল জলরাশিতে পরিণত হইল! পুৰ্ব্বে যাহা দুরারােহ, নীহারমণ্ডিত, অত্যুন্নত, কাঞ্চন- জঙ্ঘাবৎ বােধ হইতেছিল এক্ষণে তাহা সুগম সমতলক্ষেত্রে পরি- বর্তিত হইল! কয়েক মুহূর্তের মধ্যে তাহা নিম্নভূমি হইয়া গেল।
তুমি বড় বরসিক।
কিছুক্ষণ অগ্রে যে বস্তু সুদৃঢ়, লৌহদণ্ডবৎ বােধ হইতেছিল
এক্ষণে তাহা, নমনশীল, কোমল, মৃণালদণ্ডবৎ বােধ হইল !
ক্ষণেক পূর্বে যে বস্তু, দুর্ভেদ্য প্রাচীর বিশিষ্ট, ভীষণমূৰ্তিশত্রু
পরিরক্ষিত দুর্গ বলিয়া প্রতীয়মান হইতেছিল, এক্ষণে তাহা
অশক্ত ভঙ্গপ্রবণ কাচ প্রাচীর পরিবেষ্টিত, দুৰ্বল সৈন্যসমন্বিত
ক্ষুদ্র শিবির হইল! রামীর দৃঢ়তা কুঞ্জকামিনী বুঝিয়া লইল।
টাকাই তাহার সর্বস্ব হইল। টাকা পাইলে সে সমস্তই করিতে
পারে। টাকা পাইয়া সে কুঞ্জকামিনীর প্রার্থনায় স্বীকার করিল।
অহহ! অর্থের প্রভাব কি অলৌকিক । কিন্তু আমি কি বলিতে
কি বলিয়া ফেলিলাম-ধান ভাতে শিবের গীত কেন ?
কুঞ্জকামিনী বাক্স হইতে কাগজ কলম, বাহির করিয়া একখানি
চিঠি লিলি। পত্রখানি এইরূপ :-
[ প্রিয় সরকার মহাশয় ! (কুঞ্জকামিনী এইকথাটী লিথিয়া
কাটিয়া দিল ।)
প্রেমময় হরেন্দ্রনা (ইহাও তাহার মনে ধরিল না তাই
কাটিল।)
(শেষে লিখিল) সুরসিক প্রাণনাথ হরেন্দ্রনাথ।
আমি অনেকদিন অবধি আপনাকে আমাদের বাড়ীতে
দেখিতেছি অনেকদিন অবধি আপনাকে কি বলিব বলিব মনে
করিতেছিলাম আজ তাহার কতকটা প্রকাশ করিব মনে কয়ািছি
কুসুমশর স্মরদেব অনেকদিন অবধি আমায় আপনার বিরহানলে
দগ্ধ করিতেছেন। আমি আপনাকে বড় ভালবাসি। ইচ্ছা হয়
আমি সর্বদাই আপনার নিকট থাকি। কিন্তু সমাজ বড় দুষ্ট।
লজ্জা বিঘ্নকারিণী। বিশেষতঃ নারীকুলে তাহার খাতির কিছু
সরযু। যেমন উঠিয়া বেশী। কিন্তু আজ আর আমি লজ্জাদেবীর প্রতিপতি বজায় করিতে পারিলাম না। অধিক লিখিতে পারিলাম না। শরীর অবশ বােধ হইতেছে।” মনে রাখিবেন আপনারই শ্ৰীমতী কুঞ্জকামিনী দাসী।] পত্রখানি লিখিয়া কুঞ্জকামিনী রামীকে পড়িয়া শুনাইল । রামী শুনিয়া উত্তর দিল “বেশ লেখা হয়েছে। তবে আমি নিয়ে সরকার মহাশয়কে দি গে।” রামী পত্রখানি. ও টাকা পাঁচটী লইল। যাইবে দুষ্ট টিকটিকি শব্দ করিল। রামী বসিল। আবার উঠিল। আবার কে হাঁচিল। রামী আবার বসিল। এবার উঠিয়া “শ্রীশ্রীদুর্গা—দুর্গা-দুর্গা বলিতে বলিতে বৈঠক- খানায় গেল। দেখিল বৈঠকখানায় সরকার মহাশয় নাই। বাহিরে গিয়াছেন। রামী তাহার অনুসন্ধানে চলিল। রাস্তার বাহার দেখা পায় সরকার মহাশয়ের খবর জিজ্ঞাসা করে। তদনন্তর কিছু র গমন করিতে করিতে সরকার মহাশয়ের দেখা পাইল। কারণ সংসারে দেখাযায় যে যাহা খুজিয়া বেড়ায় সে প্রায়ই তাহা পায়। রামী তাহাকে দেখিতে পাইয়া তাড়া তাড়ি বলি সরকার মহাশয় কোথায় ছিলেন ?” ‘কেন তােমার তাতে প্রয়ােজন কি ?” ‘আপনার সঙ্গে একটু দরকার আছে।” ‘আমার সঙ্গে আবার তোমার কি দরকার ? বামী অন্যান্যদিন যেরূপ ভাবে তাঁহার সহিত কথা কহিয়া থাকে অদ্য আর সেরূপ ভাবে নহে। আজ তাহাতে যেন IP তুমি বড় বরসিক। ১২৭ একটু রসিকতা আছে। সরকার মহাশয় তাহা কতক কতক বুঝিলেন কিন্তু বিস্মিত হইলেন। পরে বলিলেন – “কেন কি দরকার ?” “কিছু দরকার না থাকলে কি আর রামী এসে ?" সরকার মহাশর বড় বিপদে পড়িলেন। ভাবিলেন রামীর এত বয়স হইল তবে তাহার মুখে আজ এমন রসিকতা কেন ?" সময়ের কথা বলা ভার। কোন্ সময় যে কাহার মনে কি হয় তাহার কোন স্থিরতা নাই। জগৎ পরিবর্তনশীল কেবল একমাত্র আত্মা অর্থাৎ পরমাত্মা একরূপই থাকে। তাই আজ রামীর স্বভাবের এত পরিবর্তন। সরকার মহাশয় রামীকে বলিলেন “তােমার কি প্রয়ােজন বল।” “এসব আমার সঙ্গে এস। এখানে বলা হবেনা।” রামী অগ্রে অগ্রে চলিতে লাগিল সরকার মহাশয় তাহার পশ্চাতে। তিনি রামীর সঙ্গে চলিতে পারিতেছেন না। কাজেই রামী ক্রুদ্ধ হইয়া বলিতেছে “কি সরকার মহাশয় আপনি কি পুরুষ না মেয়ে। আমি বুড়ি আমার সঙ্গে আসতেও কি আপনার কষ্ট হচ্ছে।” সরকার মহাশয় নিতান্ত অপ্রতিভ হইলেন। কোন উত্তর দিয়া অপেক্ষাকৃত বেগে চলিতে লাগিলেন। শেষে তাহারা একটী নিভৃত স্থানে উপস্থিত হইলেন। রামী সরকার মহা- শয়কে বলিল “ আপনাকে একটা কথা বলি কাহাকেও বল- বেন না?” “আচ্ছা আমি কাহাকেও বলব না।” “তবে এই পত্রখানি পড়ন।”
১২৮
সরযু
মিটিল না।
সরকার মহাশয় কাষ্ঠপুত্তলিকাবৎ দণ্ডায়মান হইয়া সেই
পত্রখানি পড়িলেন। দুই তিনবার পড়িলেন তথাপি সন্দেহ
শেষে বলিলেন না তা কি হয় ?"
রামী বলিল “তুমি নিতান্ত বদরসিক। অমৃতে অরুচি
কেন ? খেলে যে অমর হবে। কুঞ্জদিদির এমন রূপে ও তোমার
মন ফিরিল না ? তুমি ভাল জিনিসের দাম জান না। রসি-
কত জাননা।”
রামীক কথায় সরকার মহাশয় একটু হাসিলেন। রামী
সে হাসির অর্থ নিজ মনোমত করিয়া লইল। কিন্তু তিনি তার
এক ভাবে হাসিলেন। রামী প্রফুল্লমনে তাড়াতাড়ি কুঞ্জকামি-
নীর নিকট গমন করিল।
সরকার মহাশয় ভাবিলেন “আমি বদরসিক হলেম।
অষ্টের দোষ বলিতে হইবে। একজনের নিকট ত একদিন
রসিক ছিলাম।”
একবিংশ পরিচ্ছেদ।
এ সন্ন্যাসী কে ?
রামী সরকার মহাশয়ের নিকট হইতে চলিয়া আসিল।
রাস্তায় আসিতে হাসিতে মনে করিল ‘বুঝি সরকার মহাশয়ের
মন টলেছে। তা না হবেই বা কেন? কুঞ্জদিদির রূপ ত
সামান্য নয়
? যযাগী ঋষি পৰ্যন্ত ভুলে যায়। তাতে এত
সামান্য সরকার মহাশয়। যাই তবে দিদির কাছ থেকে অপর
কিছু আদায় কতে হবে
রামী গিয়া হাসিতে হাসিতে কুঞ্জকামিনীকে সুখবর দিল।
সেও রামীর মত বুঝিল। সরকার মহাশয়ের হাসি, তাহার
কথাবার্তা সমস্তই নিজের বিষয় মনে করিল। মনে আশা
হইল। ভাবিল “একদিন না একদিন হরেন্দ্রনাথকে নিজের
লােক মনে করিয়া তাহার সহিত প্রেমালাপ করিতে পাই।
একদিন না একদিন তাঁহাকে নয়ন ভরিয়া দেখিতে পাইব।
ফাদ ত পেতেছি। চাদও এসেছে। পড়ব পড়বও হয়েছে।
তবে এখন কোনদিন পড়ে ইহাই চিন্তার বিষয়। পরে সে
বামীর দিকে মুখ ফিরাইয়া বলিল “রামী তােকে কালকে আরও
পাঁচ টাকা দেব। আজ তুই আমার যে উপকার করেছি এর
১৩০
সরয।
ধীরে ধীরে
জন্যে আমি তােক যে কি বলব কিছু ঠিক করতে পারি না।
আচ্ছা তােকে একটা কথা জিজ্ঞাসা করি—সরকার মহাশয়
সন্ধ্যে বেলা কোথায় থাকেন জানিস্ ?”
“দিদি তিনি সন্ধ্যের সময় বাগানে থাকেন।”
“ঠিক জানিস্ ?”
“হ্যা দিদি ঘঁা—তিনি অনেক রাত্রি পর্যন্ত বাগানেই
থাকেন।”
‘‘আচ্ছা, তবে তুই এখন যা। ডাকলে আসিস। যা ঐ
বুঝি মা তােকে ডাকচেন।”
রামী চলিযা গেল। কুঞ্জকামিনী ভাবিতে লাগিল।
এদিকে সরকার মহাশয় বাড়ী আসিয়া ভাবিতে থাকেন।
ক্রমে তাহার বাগানে যাইবার সময় হইল।
বাগানে গেলেন। সেখানে গিয়া একটা পুষ্করিণীর নিকট
বসিলেন। বাতাস মধ্যে মধ্যে দুই চাৰিটী কুসুম আনিয়া
তাহার মাকে নিক্ষেপ করিতেছে। পুষ্করিণীর জলে তরঙ্গমালা
নাচিয়া নাচিয়া বেড়াইতেছে। তিনি মনে করিলেন পুরিণীয়
তরঙ্গ গণনা করিবেন কিন্তু পারিলেন না। দেখিতে দেখিতে
সন্ধ্যা হইল। এইসময় কে আসিয়া হঠাৎ তাহার সম্মুখে
আসিয়া দাঁড়াইল। লােকটাকে দেখিয়াই তিনি বুঝিলেন
এ ব্যক্তি আমার পরিচিত।” কিন্তু সন্দেহ হইল।জিজ্ঞাসা
করিলেন “কে তুমি চিনতে পাচ্ছিনে।”
আগন্তুক উত্তর দিল “কেন আমায় কি আর কখনও
দেখনি।”
স্বর শুনিয়া হরেন্দ্রনাথ চমকিত হইলেন। পরে বলিলেন
এ সন্ন্যাসী কে। ১৩১ তবে কে কুঞ্জকামিনী ! সন্ধ্যের সময় এখানে কেন ? একলা বাগানে আসতে আছে ?” “একলা কেন আসব। এই যে আপনি রয়েছেন। আমার ভয় কি?” “আমি থাকলে তােমার কি ? তুমি ছেলেমানুষ কিছু জাননা। তাই একটা ছাই ভষ্ম কি আমায় চিঠি লিখেছিলে।” কুঞ্জকামিনী কিছু ক্ষুন্ন হইল। সে হরেন্দ্রনাথের তােষা- মােদ করিতে লাগিল। কিন্তু হরেন্দ্রনাথের মন টলিল না। শেষে কুঞ্জকাহিনী তাহাকে জড়াইয়া ধরিল। হরেন্দ্রনাথ ছাড়াইবার চেষ্টা করিলেন। কিন্তু পাছে কেহ জানিতে পারে এই আশঙ্কায় সদুপদেশ দ্বারা কুঞ্জকামিনীকে নিৰ্ব করিতে চেষ্টা করিলেন। অবশেষে হরেন্দ্র ছয্যর আশ্রয় গ্রহণ করিলেন। কুঙ্কামিনীর কোন ভয় নাই। সে প্রেম- পাগলিনী। সে হরেন্দ্রনাথের সমস্ত কথাই হাসিয়া উড়াইতে লাগিল। তিনি কুঞ্জকামিনীকে বলিলেন “দেখ তুমি যদি আমায় সত্যি সত্যি ভালবাস তবে কাল সন্ধ্যাবেলায় তাহার পরিচয় দিও। আজ তুমি যাও।” কুঞ্জকামিনী তাহাকে ছাড়িয়া দিয়া ক্ষুন্ন মনে গৃহে প্রতিগমন করিল। হস্রনাথও বাগান হইতে চলিয়া গেলেন । গৃহে আসিয়া কুঞ্জকামিনী দাসীকে সমস্ত পরিচয় দিল। রামী উত্তর দিল “কাজ সিদ্ধ হবে।” “তাই ৰল মামী। তাের মুখে ফুল চন্দন পড়ুক।”
১৩২ সর। এদিকে হরেন্দ্রনাথ গৃহে প্রত্যাগমন করিয়া শ্রবণ করিলেন “গ্রামে একজন সন্ন্যাসী এসেছে। তাহার বয়স খুব কম। নবীন সন্ন্যাসী। কিন্তু পরিচ্ছদ বিভিন্ন ।” হরেন্দ্রনাথের মনে ঘাের সন্দেহ উপস্থিত হইল। তিনি ভাবিলেন “এ সন্ন্যাসী কে? আচ্ছা দেখিয়া আসি।” হরেন্দ্রনাথ গৃহ হইতে বহির্গত হইলেন। শীঘ্রই সন্ন্যাসীর নিকট উপস্থিত হইলেন। হরেন্দ্রনাথ অতিথিসেবায় তৎপর। ভিক্ষুকদিগকে সাধ্যমত দান করেন। দয়াকে তিনি শ্রেষ্ঠ ধৰ্ম্ম মনে করেন। নিকটে গিয়া দেখিলেন সন্ন্যাসী যুবা পুরুষ। শরীরে তৈল মর্দন করেন না তথাপি তাঁহার দেহ মসৃণ। ত্বক রুক্ষ্ম তথাপি তাহার মধ্য হইতে এক প্রকার জ্যোতিঃ নির্গত হইতেছে। সম্মুখে বহ্নি প্রজ্জ্বলিত। তাহাতে তাঁহার মুখ- কান্তি আরও উজ্জ্বল বােধ হইতেছে। মস্তকের কেশসমূহ রুক্ষ কিন্তু মনােহর মাধুৰ্য সমন্বিত। কর্ণদ্বয় বিস্তৃত। ললাট প্রশস্ত। ভুজদ্বয় সুবিশাল, কিন্তু যেন একটু ক্ষীণ হইয়াছে । চক্ষুদ্বয় আকর্ণ বিস্তৃত। নাসিকা খগরাজের নাসিকার ন্যায় কিন্তু শরীরের অনুরূপ। আকৃতি দেখিলে বােধহয় লােকটী ভদ্রবংশসস্তৃত, বুদ্ধিমান ও বীরপুরুষ। সন্ন্যাসীকে দেখিবামাত্র হরেন্দ্রনাথের মনে কি এক আশ্চৰ্য- ভাৰ উপস্থিত হইল। যেন তিনি পূর্বে কোন বস্তু হারাইয়া- ছিলেন এক্ষণে তাহা পুনঃপ্রাপ্ত হইলেন। লােকটী নূতন নহে, তিনি যেন পূর্বে তাহাকে কোথাও দেখিয়াছেন কিন্তু মনে হই- তেছে না তিনি কে? আবার তাহার চেহারায় নূতন পুরাতন উভয় দ্রব্যই মিশ্রিত রহিয়াছে।
এ সন্ন্যাসী কে। হরেন্দ্রনাথ বলিলেন “সন্ন্যাসী জী আমাদের বাড়ী যাবেন ? কিছু আহার হয়েছে কি?” সন্ন্যাসী কোন উত্তর দিলেন না। হরেন্দ্রনাথ আবার সেই- কথাই জিজ্ঞাসা করিলেন। সন্ন্যাসী তাহায় দিকে চাহিলেন। তাহাকে দেখিয়াই একটু লজ্জিত হইলেন। হরেন্দ্রনাথ আবার বলিলেন “সন্ন্যাসী আসুন, আমাদের বাড়ী নিয়ে যাব।” সন্ন্যাসী মনে করিলেন তাহার কথায় দ্বিরুক্তি করিবেন কিন্তু পারিলেন না। কে যেন তাঁহার মুখ চাপিয়া ধরিল হরেন্দ্রনাথের প্রস্তাবে সম্মত হইলেন। পরে জিজ্ঞাসা করিলেন : “আপনি আমায় কোথায় নিয়ে যাবেন ? এখানে কি আপনার বাড়ী ?” সন্ন্যাসীর প্রশ্নের অর্থ গূঢ় বলিয়া বােধ হইল। যাহাকে প্রশ্ন করা হইল তিনিই ইহার অর্থ জ্ঞাত হইলেন। পরে উত্তর দিলেন “আমার বাড়ী পূর্বে এখানে ছিলনা। তবে এক্ষণে আমার বাড়ী এখানে বলিলেও অত্যুক্তি হয় না। এখানে আমি কাযকৰ্ম্ম করিয়া থাকি। আপনাকে সেখানেই নিয়ে । যাব।” “তবে চলুন।” অগ্রে হরেন্দ্রনাথ পথ দেখাইয়া চলিতেছেন। পশ্চাতে সন্ন্যাসী যাইতেছেন। দেখিলে বােধহয় যেন দুইটা বন্ধু যাই- তেছে। মনে কত পূৰ্ব স্মৃতি আসিয়া পড়ে। দেখিতে দেখিতে তাহারা নন্দকিশাের বাবুর বাড়ীতে
সরষু।
আসিলেন। সকলেই নবীন সন্ন্যাসীকে দেখিয়া নিতান্ত বিস্মিত
হইলেন। এদিকে কুঞ্জকামিনীও সন্ন্যাসীকে দেখিতে পাইল।
সে একদৃষ্টে তাহার মুখের দিকে দৃষ্টিপাত করিতে লাগিল।
সে ভাবিল এ সন্ন্যাসী আবার কোথা হতে এল ?”
দ্বাবিংশ পরিচ্ছেদ
বন্ধুতে বন্ধুতে।
হরেন্দ্রনাথ সন্ন্যাসীকে নিকটে বসাইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন
‘‘সন্ন্যাসী আপনার নাম কি ?
“আমার নামে আপনার কোন প্রয়ােজন আছে কি ?
সন্ন্যাসীর নাম জানিয়া কি করিবেন ?”
“কেন আপনার নাম বলিবার কি কোন প্রতিবন্ধক আছে?”
“না। প্রতিবন্ধক এমন কিছু নহে।”
“তবে কিজন্য নাম লিতে এত কুণ্ঠিত হইতেছেন ?”
“আমার ইচ্ছা নাম প্রকাশ করিব না। আমি নরাধম
ছিলাম। আমি পাপী-হতভাগ্য—তাই বলি আমার নাম
জানিয়া আপনাদের কোন প্রয়ােজন নাই। এবং আমার নাম
নিলে আপনাদের কর্ণকুহর অপৰিৱ হইবে।”
“আচ্ছা আপনি কত দিন সন্ন্যাসী হইয়াছেন?”
প্রায় চার পাঁচ বৎসর হইল।
“কেন আপনি সন্ন্যাসী হইয়াছেন?”
"সে অনেক কথা।”
“একটাও কি শুনতে পাই না?”
সরঘু।
‘আমার মনে ঘাের বিরহানল জ্বলিতেছে।”
“কিসের বিরহ ?”
‘কলত্ৰ বিরহ ও বন্ধুবিচ্ছেদ।”
হরেন্দ্রনাথের মনে ঘাের সন্দেহ উপস্থিত হইল। তিনি
মনে মনে যাহা ভাবিতেছেন তাহা যদি ঠিক হয়-তবে? তবে
আজ আর তাহার সৌভাগ্যের সীমা থাকিবে না। তাহার
ঔৎসুক্য ক্রমে ক্রমে বৃদ্ধি পাইতেছে। ক্ষণে ক্ষণে তাহার
মনে কত প্রকার আশা হইতে লাগিল। পরে আগ্রহের সহিত
জিজ্ঞাসা করিলেন “আপনার বাড়ী কোথায় ছিল ?”
‘‘বঙ্গদেশের কোন গ্রামে।
“এখানে কি করিয়া আসিলেন ?”
তীর্থযাত্ৰা করিব মনে করিয়া । এবং যদি বন্ধুর কোন
সংবাদ পাই তবে-
সন্ন্যাসীর মুখে আর কথা বাহির হইল না। মুখের কথা
মুখের ভিতরেই থাকিল।
‘‘আপনার বন্ধুর নাম কি ?”
“গেন্দ্রনাথ দত্ত।” হরেন্দ্রনাথ আর থাকিতে পারিলেন
না। ব্যাকুল হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন “সন্ন্যাসী জি আপনার
নাম জানিতে আমার বড় ইচ্ছ' হইতেছে। কোন বাধা থাক
আর নাই থাক্ আপনার নাম আমায় বলিতে হইবে ?”
সন্ন্যাসী হাসিতে হাসিতে ও লজ্জার সহিত বলিলেন
“আমার নাম দেবেন্দ্রনাথ দাস।”
“কি তােমার নাম দেবেন্দ্রনাথ-তুমিই কি সেই দেবেন্দ্র
দেবেন্দ্র তুমিই কি নগেন্দ্রনাথের বা আমার সেই পলায়িত
বন্ধুতে বন্ধুতে। ৩৭ দেবেন। এস দেবেন। আমি প্রতারক। আমার নাম হরেন্দ্রনাথ নহে। আমিই সেই হতভাগ্য নগেন্দ্রনাথ। তােমায় খুজিয়া খুঁজিয়া ক্লান্ত হইয়াছিলাম। শেষে মনে করিলাম আর দেশে ফিরিব না। তাই এখানে নন্দকিশাের বাবুর বাড়ী চাকুরী করিয়া জীবিকা নির্বাহ করিব মনে করিলাম এবং নানা উপায়ে তােমার সন্ধান লইতে লাগিলাম। আজ আমার অদৃষ্ট নিতান্ত সুপ্রসন্ন—তাই বহুদিনের পর তােমায় পাইলাম ! আজ বড় সুখের দিন। “নগেন-আমি কপট সন্ন্যাসী। আমি বিশ্বাসঘাতক ও প্রবঞ্চক। আমার মনের বিকৃতি হইয়াছে। • যেদিন আমি তােমায় ছাড়িয়া চলিয়া আসি সেই দিন হইতে আমার মনে আরও অশান্তি বিরাজ করিতে লাগিল। সেই দিন অবধি আমি জীবন্ম ত হইয়া গ্রামে গ্রামে, নগরে নগরে বিচরণ করিতে লাগিলাম । ভাবিলাম সংসারের সকল আশাই ফুরাইল । সরােজকে জন্মের মত হারাইলাম । তােমাকেও হারাইয়া- ছিলাম। তাই আমি মনে করিয়াছিলাম আর সংসারে থাকিব । বিরহগ্নি দিন দিন আমার হৃদয় দগ্ধ করিতে লাগিল । মনের প্রফুল্লতা দিন দিন নীহারাচ্ছাদিত শ্বেততাৎপলবৎ ম্লান হইতে লাগিল। স্থিরতা ও সহিষ্ণুতা অনুদিন প্রবৃটকালের পর্বতদুহিতার ন্যায় উত্তরোত্তর বেগবতী ও চঞ্চলা হইয়া অব- শেষে কোন্ অকুলসমুদ্রের দিকে গমন করিতে লাগিল জানি না। তাদেবীও অনাচ্ছাদিত পা রক্ষিত কপুরবৎ অল্পে অল্পে আমার মন হইতে তিরোহিত হইতে লাগিলেন এবং নিরাশ আসিয়া তাহার পরিত্যক্ত স্থান গুলি অধিকার করিয়া ১৮ সরযু। । বসিলেন। সুখদ বসন্ত ঋতু যেরূপ ক্রমে ক্রমে অলক্ষিতভাবে প্রবল বাত্যাবিশিষ্ট গ্রীষ্মকাল দ্বারা নিয়াকৃত হয় তদ্রুপ শান্তি দেবী প্রতিনিয়তই, আমার মন হইতে, দুর্বিসহ অশান্তি কর্তৃক বিতাড়িত হইতে লাগিল। স্মৃতিশক্তি দিন দিন বিষধর দষ্টা, বিকতদেহকান্তি লাবণ্যময়ী অথচ কুরূপা কামিনীর ন্যায় কোন অজানিত স্থানে নীত হইলেন জানি না। তবে দিন দিন সরযূর মােহিনী মূর্তি আমার হৃদয়মধ্যে আরও জাজ্বল্যমান হইয়া বিরাজ করিতে লাগিল। শেষে আমি ফলমূল দ্বারা জীবন- মাত্রা নির্বাহ করিতে করিতে সেই দিব্যাঙ্গনা সরযূর অনুসন্ধান করিব মনে কলািম।” “আমিও নিতান্তু দুঃখিত হইয়া বনে বনে তােমার অনেক অনুসন্ধান করিলাম। অবশেষে একটা ক্ষুদ্র কুটীরে উপনীত ত যায় এক বিষম বিপদে বা মুখদ সম্পদে পড়ি- লাম --একটা ব্রয়ােদশ বর্ষীয়া বালিকা ভিন্ন অপর কেহ সেই কুটীরে ছিলনা। সেই আমার অতিথিসৎকার করিল। দিন থাকিতে থাকিতে তাহার সহিত বিশেষ ভালবাসা জন্মিল। আমি তাহাকে গান্ধকমতে বিবাহ করিলাম। বালিকার প্রেমে পড়িয়া তােমার সহিত বন্ধুত্বও বিস্মৃত হইলাম। কয়েকদিন পৰ্য্যন্ত তােমার কথা আদতে আমার মনে হইল না। আমি নিতান্ত স্বার্থপর হইলাম। সেই বালিকাকেই আমি সর্বস্বধন মনে করিলাম। তাহার সহিত আমােদ প্রমােদে লিপ্ত থাকিয়া আমি সংসারের অপর সকল দ্রব্যই বিস্মৃত হইলাম। আজ আমি তােমার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করিতেও লজ্জিত হইতেছি। তদনন্তর সেই বালিকাকে সঙ্গে লইয়া আমি তােমার অনুসন্ধানে হলাম । ২।৪ = বন্ধুতে বন্ধুতে। ১৩১ বহির্গত হইলাম। একটী গ্রামের নিকটে গিয়া শুনিলাম তুমি পশ্চিম গিয়াছ। আমিও তন্ম হর্তে নৌকা ভাড়া করিয়া পশ্চিম আসিবার জন্য ছাড়িলাম। পথিমধ্যে ঝড় বৃষ্টিতে নৌকা নিমগ্ন হইল। সে বালিকা কোথায় গেল জানিনা। আমি অনেক ক৪ে তীরে উঠিলাম । সেই বালিকার বিষয় চিন্তা করিতে করিতে ধীরে ধীরে চলিতে লাগিলাম । তােমার কথা তখন আমার মনে পড়িল। কলত্র বিরহের যন্ত্রণা তখন আমি সম্পূর্ণ- রূপে বুঝতে পারিলাম।” নগেন্দ্র তুমি আমার জন্য অনেক কষ্ট সঙ্ক করিয়াছ। আমি তােমার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করি। নগেন তুমি আজ অবধি আমায় আর ঘৃণা করিও না। আমি নিরাশ্রয়--আমা আশ্রয় দাও। আমি হতভাগ্য। আমার উপর দয়া কর । আমি দুরবস্থাপন্ন !!! 'ছি দেবেন, এত আত্মঅবজ্ঞা কেন ? এস কাপড় চোপড় ছেড়ে কিছু খাবে । সমস্ত দিন বােধহয় কিছু খাও নেই। তােমায় আমি অনেক কষ্ট দিলাম। আমায় ক্ষমা কর।”
ত্রয়ােবিংশ পরিচ্ছেদ
AAL
তীর্থ যাত্রা।
নগেন্দ্রনাথ ও দেবেন্দ্রনাথ আহারান্তে বৈঠকখানার এক
কুঠরীতে শয়ন করিলেন। উভয়েই একটা পৰ্যঙ্কে শয়ন করিয়া
শন আপন দু.খ বিবৃত করিতে লাগিলেন। গ্রীষ্মকাল।
কাজেই ভিতরে থাকিতে তাহাদের কষ্ট বােধ হইল।
বাহিরের বারান্দায় আসিয়া শুইলেন।
আকাশ পরিষ্কার, চন্দ্র নির্মল গগনে কিরণজাল বিতরণ
করিতেছেন। দেবেন্দ্রনাথ বলিলেন “নগেন চল এখানে
থাকিয়া কি হইবে ? তীর্থযাত্রায় গমন করি। আমাদের সুখের
আশা খুব অল্প। তাই বলি চল না হয় তীর্থে ই জীবন বিসর্জন
করিব।”
“দেবেন আমিত তােমায় পূর্ব হইতেই বলিয়া আসিতেছি
যে সংসারে সুখ খুব কম। পূর্বে আমার আশা ছিল সরসূকে
পাওয়া যাইবে। এক্ষণে দেখিতেছি সে আশা খুব অল্প।
এক্ষণে দেখিতেছি নিরাশা কোন সময়েই আমাদিগকে ত্যাগ
করিবে না। তাই বলি আমিও তােমার কথার বিশেষ অনু-
মোদন করি। তবে কিজান অতিরিক্ত হতাশ হওয়াটাও কিছ
তীর্থ যাত্রা। ১৪১ । নয়। ভাগ্যের উপর কতকটা নির্ভর করাও ভাল। সংসারে আশাই একমাত্র উপায়। ইহাতে মনে কতক শান্তি পাওয়া যায়। তাই বলি চল তীর্থ করিতে যাইব কিন্তু তাহার সঙ্গে সঙ্গে সরসূ ও ইন্দুমুখীর অনুসন্ধান করিতে ছাড়িব কেন ? “তােমার কথা যথার্থ। আমি জানি আর সসূকে পাইব , তথাপি আমার মন কেন সেইরূপ ভাবিতেই ভালবাসে ? মনে হয় সরষু জীবিত আছে।” ‘তুমি সরযূকে পাইবে এরূপ আশা করিতে পার। কিন্তু আমি যে ইন্দুমুখীকে পাইব সে আশা আর করিতে পারি না। ইন্দুমুখী সন্তরণ জানিত না সুতরাং সে হয়ত দীজুলেই জীবন বিসৰ্জন করিয়াছে। তবে কিজান “ভাগ্যং ফলতি সর্বত্র।” “তবে কল্যই যাইব।” ‘। তাই করিব। কিন্তু হঠাৎ চলিয়া যাওয়াটা না ভাই। ইহাতে আর কিন্তু বল। চলিবে না।” দেবেন্দ্রনাথ ও নগেন্দ্রনাথ কথাবার্তা কহিতেছেন। কুঞ্জ- কামিনী পশ্চাৎ দিক হইতে অন্তরালে থাকিয়া সমই শুনি- তেছে। চলিয়া যাইবার কথাটাতে তাহার হৃদয়ে নিদারুণ আঘাত লাগিল। সে তাড়াতাড়ি অন্তঃপুরে গেল। ভিতরে গিয়া রামীর সহিত ফিস ফিস্ করিয়া কি পরামর্শ করিল। বলিল ‘চলুক না আমি ওদের সঙ্গে যাব।” এদিকে রামীকে নন্দকিশাের বাবু ডাকিয়া বলিলেন “তুই এখনি সরকার মহাশয়কে বল যে জামাই বাবুর অসুখ করেছে তিনি একবার দেখে আসুন। রামনাথ তাহার সঙ্গে যাইবে।” রামী নগেন্দ্রনাথকে সেই কথা বলিল। নগেন্দ্রনাথ বন্ধুর ১৪২ সরযু। । সহিত কথাবার্তা কহিতেছিলেন রামী আসিয়া তাহার ব্যাঘাত দিল ইহাতে তিনি দুঃখিত হইলেন। দীর্ঘনিশ্বাস ত্যাগ করিতে করিতে দেবেন্দ্রনাথকে বলিলেন “দেবেন তুমি থাক ঘুমাইওনা আমি শীঘ্র ফিরিয়া আসি।” নগেন্দ্রনাথ চলিয়া গেলেন। কুঞ্জকামিনী অবসর পাইয়া ধীরে ধীরে দেবেন্দ্রনাথের নিকট উপস্থিত হইয়া বলিল “কিহে নবীন সন্ন্যাসী। তুমি কি সন্ন্যাসী নাকি ? কিসের সন্ন্যাসী ? প্রেমের সন্ন্যাসী নাকি ? তোমার এমন রূপ। এই নবীন বয়স! দিব্বি চেহারা। তবে সন্ন্যাসীর বেশ কেন ? মদন তােমায় ভয় করে নাকি ? না তুমি জিতেন্দ্রিয়, পুরুষ ?” দেবেন্দ্রনাথ অবা। অপরিচিত কামিনী তাহাকে এরূপ- ভাবে সম্বােধন করিতেছে ইহাতে তাহার বড় বিস্ময় হইল । কোন কথা না বলিয়া মৌনবলম্বন করিয়া থাকিলেন। কিন্তু কুঞ্জকামিনী আবার জিজ্ঞাসা করিল “কিহে তুমি এমন অরসিক কেন ? কথা কহিতে জাননা নাকি? না কি তুমি যােবা ? কি ভাবছ ? কড়ি বরগা গণনা হচ্ছে বুঝি?” দেবেন্দ্রনাথ আর চুপ করিয়া থাকিতে পারিলেন না। ধীরে ধীরে অথচ গম্ভীরভাবে বলিলেন ‘সুন্দরি “কিহে এইযে কে বলে শিমুলফুলের গন্ধ নাই?) তুমি কথা কহিতে পার। দেবেন্দ্রনাথ আবার বলিলেন নুরি-আর আমায় কষ্ট দিওনা, আমি এক্ষণে বড় কষ্ট পাইতেছি। আর তুমি মরার উপর খাড়ার ঘা দিওনা। আমি নিজের কষ্টে নিজেই দগ্ধ হচ্ছি। স্ত্রীলােক দেখিলে আমার মনে বড় দুঃখ হচ্ছে।
তীর্থ যাত্রা। ১৪ত তুমি আমার পরিচিত নও। অথচ কেন আমার সঙ্গে কিরূপে এরূপ ভাবে কথা কহিতেছ ?” “কেনহে তােমার আবার কষ্ট কি ? এস তােমার সব কষ্ট দূরে রেখে দি। আমি তােমায় চিনি। কিন্তু তুমি আমায় এস “কেন বৃথা কষ্ট দাও—আমরা কল্যই চলিয়া যাইব? তুমি বুঝি নন্দকিশাের বাবুর ছোট কন্যা ? তােমার স্বামীরই বুঝি অসুখ করেছে ? “না ভাই ওসব কথায় কাজ নাই। তোমার বেশ রূপ। দেখলে তােমায় ভালবাতে মন যায় । তুমি যেখানে যাবে আমি তােমার সঙ্গে যাব। আমি তােমার জন্য প্রাণ পর্যন্ত পণ করিয়াছি। তােমায় আর কোথায় যেতে দেব না। আমার নিকটে এস তােমায় কাছে রাখব।” “যাও ওসব কথা আমার কাছে বল না। তুমি কি কুলটা? লােকে শুনলে কি বলবে।” “আমার কলঙ্ক হয় হউক তাহাতে আমি ভয় করি না। যদি তােমায় পাই তবে আমি সব সহ্য কতে পারি। তােমার জন্য আমি মরিতে পারি।” ‘‘তাই করবে। কিন্তু এখন যাও।” এদিকে নগেন্দ্রনাথ আসিয়া উপস্থিত। কুঞ্জকামিনী নিঃশব্দ- পদবিকেপে চলিয়া গেল। নগেন্দ্রনাথ বলিলেন “জামাইবাবুর অসুখ বড় বেশী। তিনি কুঞ্জকামিনীকে একবার দেখিতে চান।” কুকামিনী তাহা শ্রবণ করিয়া পীড়ার ভাণ করিয়া এক গৃহে শুইয়া থাকিল। নন্দকিশাের বাবু জানিলেন কুঞ্জকামিনীয় ১৪৪ সরযু । . বড় জ্বর হইয়াছে। কাজেই তিনি স্বয়ং জামাই বাবুকে দেখিতে গেলেন। এদিকে রামী আসিয়া কুঞ্জকামিনীর শুশ্রুষা করিতে লাগিল। কুঞ্জকামিনী যেন সত্য সত্যই পীড়িত। ছি কুঞ্জকামিনী তােমার স্বভাব এত খারাপ! তােমার হৃদয় এত নীচ! তােমার চিত্ত- চাঞ্চল্য এত অধিক !! তুমি একজনকে ভালবাসিতে পার না। দেখ তুমি নগেন্দ্রনাথের রূপ দেখিয়া ভুলিয়াছিলে। আবার আজ দেবেন্দ্রনাথের রূপ দেখিয়া তুমি নগেন্দ্রনাথকে ছাড়িয়া দেবেন্দ্রনাথকে ভালবাসিতে চাও ? ছি তােমার হৃদয়ের ভিতর এত কুঅভিসন্ধি কেন ? তুমি আবার কুলবালা নাম ধরিতে চাও ? যাও কুঞ্জকামিনী তুমি নরককুণ্ডের কুঞ্জবনে বিহার কর। থানে পাপিনীগণ নিয়ত যন্ত্রনায় ছটফট করিতেছে, যেখানে দুর্গন্ধপূর্ণ বিষ্ঠারাশি অবিরত বিরাজ করিতেছে—যেখানে পূরী- যই একমাত্র জীবন ধারণের দ্রব্য নিশ্বাস প্রশ্বাস করিবার বায়ু-যেখানে পুরীষই চোৰ্ব, চোষ্য ও সেবনীয় দ্রব্য—যেখানে পূতিগন্ধ পরিপুর্ণ পদার্থগণই সর্বস্থান সমাচ্ছন্ন করিয়াছে। যেখানে দুরন্ত শমনকিঙ্করগণ অবিরত পাপিনীদিগকে সুদৃঢ় লৌহমুদার দ্বারা প্রহার করিতেছে—সেই নরককুণ্ডে যাও। সেইস্থানই তোমার উপযুক্ত বাসস্থান !! নগেন্দ্রনাথ আসিয়া দেবেন্দ্রনাথের নিকট কুঞ্জকামিনীর কথা শ্রবণ করিয়া কোন বিষ্ময়সূচক ভাব প্রকাশ করিলেন না। কারণ তিনি সমই জানেন। দেবেন্দ্রনাথ ইহাতে আরও বিস্মিত হইলেন। কিন্তু নগেন্দ্রনাথ বলিলেন “দেবেন্ ইহাতে বিস্ম- তীর্থ যাত্রা। ১৪৫ য়র কারণ কিছুই নাই। তােমার চক্ষে পূর্বে কখনও এরূপ ঘটনা পড়ে নাই তাই তুমি বিস্মিত হইতেছ। কিন্তু আমি সমস্তই দেখিতেছি। যদি তুমি আর ২৪টা এরূপ ঘটনা দেখ তবেই সংসারের গতিক বুঝিতে পারিবে । ‘‘ন ভাই। এরূপ ঘটনা আর আমার দেখিবার প্রয়ােজন নাই। কল্য দিবার জন্য অপেক্ষা করিবার প্রয়ােজন নাই চল অদ্য রাত্রিতেই চলিয়া যাইব।” “তবে চল আর এখানে থাকিবার আবশ্যকতা নাই। তার বাবুও আমায় কিছু বলিতে পারিবেন না। কারণ আমি হিসাব পত্র টাকা কড়ি সমস্তই ঠিক করিয়া রাখিয়াছি। তিনি একবার দেখিলেই সব বুঝিতে পারিবেন। তবে একখানি পর লিখিয়া বাক্সের উপর রাখিয়া যাই।” ‘‘তাই কর।” তৎপরে নগেন্দ্রনাথ ও দেবেন্দ্রনাথ নন্দকিশাের বাবুর বাটী হইতে বহির্গত হইলেন। শীঘ্র শীঘ্র চলিতে লাগিলেন। অনেকদূর গমনের পর রাত্রি প্রভাত হইল। দুই একখানি গ্রাম তাহাদের নিকটে থাকিল। রাস্তায় যাহাকে দেখিতে পান তাহাকেই ইন্দুমুখী ও সরযুর কথা জিজ্ঞাসা করেন। অনেকে তাহাদিগকে পাগল ভাবিল। আবার অনেকে তাহাদের কথা সত্য ভাবিয়া সময়ােচিত উত্তর দিল। অবশেষে তাঁহারা রাজ- নগর গ্রামে উপনীত হইলেন। বেলা তখন অনেক হইয়াছে। এক বৃদ্ধাকে দেখিতে পাইয়া দেবেন্দ্রনাথ তাহাকে সরযূর খবর জিজ্ঞাসা করিলেন। বৃদ্ধা উত্তর দিল ‘মশাই নাম টাম জানিনে তবে দুটী বালিকা, কিছুদিন আগে, এই গ্রাম ১৪৬ সরষু। দিয়া যাইতেছিল। হঠাৎ কয়েকজন দস্যু তাহাদিগকে হত্যা করিয়া তাদের যথাসর্বস্ব অপহরণ করে। তবে গ্রামের কেহ কেহ বলিতেছে তাদের মধ্যে একের নাম সরযূ আর অপরের নাম ইন্দুমুখী।” দেবেন্দ্রনাথ বৃদ্ধাকে আর কোন কথা জিজ্ঞাসা করিতে পারিলেন না। নগেন্দ্রনাথও নিতান্ত মর্মাহত হইলেন। যত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আশানক্ষত্র ক্ষণেক পূর্বে তাঁহাদের হৃদয়াকাশে উদিত হইয়া অস্পষ্টভাবে দীপ্তি পাইতেছিল তাহার সমস্তই একে একে বিলীন হইতে লাগিল। যত আশাৰীজ তাহাদের হৃদয়ক্ষেত্রে অঙ্কুরিত হইতেছিল সমস্তই অঙ্কুরে শুষ্ক হইল। হতাশা আসিয়া তাহাদিগকে সমাচ্ছন্ন করিল। নগেন্দ্রনাথ নিতান্ত অধীর হইলেন। দেবেন্দ্রনাথ অধীর অথচ ধীর! চঞ্চল অথচ গম্ভীর, ব্যাকুল অথচ প্রশান্ত। দগ্ধ কলেবর তথাপি হিমাদ্রিবৎ স্থির। তিনি নগেন্দ্রনাথকে বলি- লেন “নগেন আর ভাবিলে কি হইবে। চল দেখিব তীর্থে কোন সুখ আছে কিনা।” এদিকে কুঞ্জকামিনী পদিন প্রভাতে উঠিয়া যখন দেখিল দেবেন্দ্রনাথ ও হরেন্দ্রনাথ চলিয়া গিয়াছেন, তখন তাহার মাথায় আকাশ পাতাল ভাঙ্গিয়া পড়িল। সে বেলা দুই প্রহ- রের সময় কাহাকেও কিছু না বলিয়া বাটী হইতে বাহির হইল । কোথায় চলিয়া গেল জানিনা।
========== -- --- = চতুর্বিংশ পরিচ্ছেদ। সন্ন্যাসিনী। সুবিশাল প্রান্তর। প্রান্তরে অনেকগুলি ক্ষুদ্র বৃহৎ বৃক প্রকৃতিদেবী কর্তৃক রােপিত হইয়াছে। তরুজির অধিকাংশই নিবিড়পল্লবসমাচ্ছন্ন। প্রান্তরের স্থানে স্থানে দুই চারিটী পুষ্পবৃক্ষ তাহার শােভা আরও বৃদ্ধি করিতেছে। স্থানে স্থানে দুই চারিটা প্রস্তরখণ্ড পড়িয়া আছে। শিলাগুলির মধ্যে কোনটী কৃষ্ণবন; কোনটা শ্বেতবর্ণ। আবার কোনটী শ্বেত কৃষ্ণবর্ণে মিশ্রিত কোনটী ভগ্ন, কোনটী অভয়। কোনটী দৈর্ঘ্যে অধিক, কোনটা প্রস্থে কিছু বেশী । কোথাও কোথাও কতকগুলি উপলখণ্ড একত্র হইয়া দুই দশ হাত উচ্চ ক্ষুদ্র পাহাড়ের অনুকরণ করিতেছে। তাহার উপর কতকগুলি বৃক্ষও জন্মিয়াছে। প্রান্তরের কোন স্থান উন্নত-কোন স্থান অপেক্ষাকৃত নিমু। উন্নত স্থানে বৃহৎ বৃহৎ বৃক্ষ জন্মিয়াছে ; নিম্নভূমিতে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গুল্মাদি রহিয়াছে। প্রান্তরের মধ্যস্থলে দাঁড়াইয়া চতুর্দিকে দৃষ্টি করিলে কোন গ্রামই দৃষ্ট হয় না। সমস্তই অন্ধকার বলিয়া প্রতীয়মান হয়। দূরের বৃক্ষাদিও অন্ধকারাচ্ছন্ন বােধ হয়। রজনী প্রভাত হইয়াছে। পূর্বদিকে নীলাকাশের কিয়দংশ লােহিতবর্ণ ধারণ করিয়াছে। আবার কোন কোন অংশ ও ১৪৮ সরযূ । খণ্ড মেধদ্বারা মেঘদ্বারা আচ্ছন্ন হইয়া এক নূতন শােভা দান করিতেছে। অত্যুষ্ণদ্ৰবকাঞ্চনবর্ণের থালার ন্যায় বর্তুলাকার দিনমনি দেখা দিতেছেন। পূৰ্বদিক কুলবধুর ন্যায় ধীরে ধীরে আপন ঘােমটা খুলিয়া সংসারস্থ জীবগণকে আপন মনােহর মুখখানি দেখাইতেছেন এবং সেই সঙ্গে সঙ্গে তাহাদিগকে নিরভিমানী হইতে উপদেশ দিতেছেন। তরুণ অরুণ কিরণ প্রান্তরস্থ হরিৎবর্ণশপবিতিপরিপূর্ণ স্থান-নিপতিত-শিশিরবিন্দু-নিচয়ের উপর প্রতিফলিত হইয়া তাহাদের শােভা আরও বৃদ্ধি করিতেছে। বােধ হইতেছে যে প্রকৃতিদেবীর হরিৎমুখের ভ্ৰস্মিত প্রমাণ করিবার জন্যই শিশিরকণা সমূহ এত আগ্রহের সহিত অরুণ কিরণের অপেক্ষা করিতেছিল। মুক্তবর্ণের নবকিশলয়দলের উপর পতিত মুক্তামালাবৎ বিন্যস্ত শিশিরবিন্দু সমূহ প্রকৃতিসুন্দরীর রক্তাধর নিম্নস্থ শুভ্র দপঙক্তি জীবগণের চক্ষুগোচর করিতেছে। পবনদেব হিমানিসিক্ত হইয়া, পুষ্পগণের নিকট হইতে সৌরভ অপহরণ করিয়াও গন্ধবহ নাম ধারণপুৰ্ব্বক মন্দ মন্দ সঞ্চরণ করিতেছেন। প্রান্তরের মধ্যে দুই একটী জলাশয়ও আছে। সেই সমস্ত সরােবরে অরবিন্দবৃন্দ বিকসিত হইয়া সূৰ্যদেবের অভ্যর্থনা করিতেছে। ভ্রমগণ গুণ গুণ স্বয়ে নানা কমলের মধুপান করিয়া বেড়াইতেছে। বিবিধবর্ণের বিহঙ্গগণ ইচ্ছামত এক এক বৃক্ষে বসিয়া এক শাখা হইতে অপর শাখায়, এক পল্লব হইতে অপর পল্লবে, এক পত্র হইতে অপর পত্রে গমন করিতেছে এবং মধ্যে মধ্যে মধুর রবে গান করিতেছে। এইরূপে প্রকৃতিদেবী প্রান্তরটীর শােভা বৃদ্ধি করিতে ক্রটি স্বীকার করেন নাই।
সন্ন্যাসিনী। ১৪৯ এই প্রান্তরে প্রভাতে একখণ্ড শিলার উপর একটা নবীন সন্ন্যাসিনীকে উপবিষ্ট দেখা গেল। দেখিলে বােধহয় তাহার বয়স অনূ্যন ষােড়শ বর্ষ। তাহার আকৃতি দেখিলে সহসা তাহাকে মানবী বলিয়া মনে হয় না। মনে হয় কোন স্বগীয়া রমণী ধরাতলে কোন অলৌকিক কাৰ্য্য সম্পাদন করিবার জন্য এই মনােহর প্রান্তরে ক্ষণকাল বিশ্রাম লাভ করি- তেছেন। তাহার পদাঙ্গুলির নখজ্যোতিতে শত চন্দ্রমা দূরে নিক্ষিপ্ত হয়, কারণ চন্দ্র কলঙ্ক আছে কিন্তু এই সন্ন্যাসিনীর নখাতিতে কিছুমাত্র কলঙ্ক নাই। চরণের অঙ্গুলিসমুহ নবনীত বৎ কোমল, রক্তপদ্ম বৎ লােহিতবর্ণ। তাহার ঘা সুগােল, সুবর্তুল, নাতিদীর্ঘ, নাতিক্ষুদ্র। উরুদেশ রামরা তুরুর ন্যায় নহে কারণ তাহা অতীব শৈত্যগুণ বিশিষ্ট-গজেন্দ্র করব। নহে কারণ তাহা কর্কশচর্ম ।. তাহার উপমাল, অনুসন্ধামে অতীত। বঙ্গভাষায় তেমন শব্দ নাই, আমার কল্পনায় তেমন কবিও নাই, তজ্জন্য পাঠকবর্গের নিকট ইহার যথার্থ বর্ণনা করিতে পারিলাম না । সংসারে তেমন ব্ৰব্য পাইলাম না যাহার সহিত তাহার কিছু সাদৃশ্য দেখাইতে পারি। নিতম্বদেশ কিন্নরীগণের নিতম্বের ন্যায় অতীব গুরু নহে। কটিদেশ ক্ষীণ। কিন্তু তাহার উপমা নাই। তাহার উপমা তাহাই। কটির উপরিভাগে ত্রিবলি। বােধ হইতেছে যেন মূর্তিধারী নবযৌবন মদনের আরােহণের সুবিধা করিবার জন্য এই তিন মনােহর সােপান রচনা করিয়াছেন। তাহার বক্ষে স্কুল, কঠোর, কুচ- গিরিয় উন্নতভাবে দণ্ডায়মান হইয়া দাড়িম্ব ফলের মনে যধিক লজ্জা উৎপাদন করিতেছে। সুতরাং দাড়িম্বগণ লজ্জায় সরষু। অধােবদন হইয়া শাখ। হইতে পতিত হইবার চেষ্টা করিতেছে। যেন তাহারা সৰ্বসাপারিণী পৃঙ্খমাতার নিকট গমন করিয়া হ্রীজনিত, অন্তঃস্থল বিদীর্ণকারী দুঃখের কিয়দংশ তাহার নিকট ব্যক্ত করিয়া স্ব স্ব হৃদয়ের ভার কথঞ্চিৎ লাঘব করিবে, এবং তাহার নিকট কিছু উপদেশ গ্রহণ করবে, এই জন্য বাকুল হইয়া বাতাসের সহায়তা প্রার্থনা করিতেছে। কিন্তু তরু তাহাদিগকে বলপূর্বক ধরিয়া আছে। কাজেই তাহার মনের কষ্ট মনেই আঁখিতে বাধ্য হইতেছে। কুচদ্বষের মধ্যবর্তী অবকাশ এত সংকীর্ণ যে তাহার মধ্যে মৃণাল দণ্ডের এক একটী মূত্রের শতংশের এক অংশও অতি কষ্টে প্রবেশ করিতে পারে। তাহার হস্তদ্বয় শিষ পুষ্প অপেক্ষা কোমলতর। করতল প্রাত.সূর্যের ন্যায় লােহিতবর্ণ। কিন্তু অপমার দোষ হইল। সূর্যের কিরণে প্রখরতা আছে ; কিন্তু এই করতল শৈত্যগুণবিশিষ্ট এবং কোমলতার আধার। করােরুহজ্যোতিতে অগণম কতদুতি ক্ষীণতা প্রাপ্ত হয় । গ্রীবাদেশ কোমল। অতি দীর্ঘও নহে অতি ক্ষুদ্রও নহে। কন্তু তাহার অনুকরণে প্রবৃত্ত হইয়াছিল কিন্তু কৃতকার্য হয় নাই । শেষে ঘৃণায় বিকৃতকার ধারণ করিয়া নানাস্থানে পড়িয়া আছে। তাহার বদনের শােভা অতুলনীয়। স সয়ে এমন কোন বস্তু নাই যদ্বারা তাহার সাদৃশ্য বর্ণনা করিতে পারি। পৰু বিম্বগণ একত্র হইয়া তাহার ওষ্ঠাধরের অনুকরণ করিতে অভিলাষ করিয়াছিল কিন্তু বিফল প্রযত্ন হইয়া হরিৎবর্ণ পত্রের অন্তরালে লুকায়িত হইয়াছে। যদি মনে মনে কুল ফুল সাজাইয়া রক্তবর্ণ নবকিশলয়ের উপর স্থাপিত করা যায়, অথ বা সন্ন্যাসিনী। যদি মুক্তার মালা গাঁথিয়া পরিস্কার প্রবালের উপর রাখা যায়, কিম্বা যদি পৰু বিম্ব সমূহ স্তরে স্তরে সজ্জি ই করিয়া তাহার এক এক শুরে কয়েকটা করিয়া কুল কুসুম মনে মনে সাজান যায়, অথবা যদি রক্ত শতদলদল এক নির্জন স্থানে রাখিয়া মনে মনে মুক্তার মালা তাহার উপর ব্যাপ্ত করা যায়, তবে তাহার রক্তাধর নিম্নস্থ দপংক্তির শোভ। কতক পরিমাণে অনুভব করা যাইতে পারে। যদি মনে মনে খগরাজের নাসিকা, কোন অজ্ঞত পূর্ব, অতপুৰ্ব্ব ক্ষমত, দ্বারা মনােত করিয়া লুওয়া যায় তবে তাহার নাসিকার সাদৃশ্য কতকটা বর্ণনা করা যায়। তাহার নীলােৎপল বিনিন্দিত নেত্ৰদ্বয় প্রায় তিববরের নিকট পর্যন্ত গমন করিয়াছে। তাহার সুচারু, মনােহারিণ, শুদ্ধ ললামসমৰিা ভুলতা পুষ্প দ্বিার কাম্মুখজ্যর লজ্জা উৎপাদন করিয়াছে। তাহার মেয়ে মৃগনয়নের ন্যায় চঞ্চলতা আছে অথচ তাহা নিৰ্বাতপ্রদেশ. রক্ষিত দীপশিখার ন্যায় স্থিরভাবে থাকে। চমরীমৃগ যুগ যদ একবার সন্ন্যাসিনর আলুলায়িত অলক গুচ্ছ দর্শন করে, তবে তাহাদের লাঙ্গুলকেশােকর্ষতা জনিত অহঙ্কারের সমুহ লঘুত্ব হয়। পাঠক রাগ করিও না। আমি তােমার ক্ষমা প্রার্থী। আমার মনে তেমন গাঢ় ভাব নাই, কল্পন{য় তেমন মধুরত্ব নাই, ভাষাষ তেমন কথা পাইলাম না, আমার বুদ্ধিশক্তি তেমন তীক্ষ্ণ নহে, কোন গ্রন্থে তেমন ভাব পাইলাম না, যদ্বারা তােমায় নিকট এই সন্ন্যাসিনীয় অপরূপ রূপের কিয়দংশ উপস্থিত করিতে পারি। তবে এইমাত্র আমার মনে হয়—বিধাতা হয় একাধারে সমস্ত সৌন্দৰ্য্য দর্শন করিবার নিমিত ১৫২ সরযু। জগতের সৌন্দৰ্য্য সমুহের উৎকর্ষতা একত্র করিয়া ইহার শরীরে অৰ্পণ করিয়াছেন; অথবা তাহাকে প্রথমে তুলিকাদ্বারা চিত্র- পটে অঙ্কিত করিয়া পরে তাহার শরীরে প্রাণ দিয়াছেন- কিম্বা তিনি মনে মনে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডস্থ সমস্ত সৌন্দৰ্য্য, মধুরতা, চারুতা ইত্যাদি একত্র করিয়া মনে মনেই তাহাকে নির্মাণ কমিয়াছেন। তাই আজ আমি তােমার নিকট তাহা ব্যক্ত করিতে পারিলাম না। চপলতা মাপ করিবে। আমার সাহসিকতার উপর দোষারােপ করিও না । তােমার নিকট ইহাই প্রার্থনা। ক
পঞ্চবিংশ পরিচ্ছেদ।
“তুই নরপিশাচ !”
সন্ন্যাসিনী সেই প্রস্তরখণ্ডের উপর বসিয়া আছ। তাহার
ঠিক পশ্চাতে একটী বৃক্ষ। বৃক্ষের শাখাগুলি সুদূর বিস্তৃত।
অনেকক্ষণ ধরিয়া সন্ন্যাসিনী ইতস্ততঃ দৃষ্টিপাত করিতে লাগিল।
পরে উঠিয়া চলিতে আরম্ভ করিল। মরালগণ যদি এসময়
তাহাকে দেখিতে পায়, তবে হয়ত তাহারা ঈর্ষাভরে আর চাল।
চাহিবে না। চিরকাল নিষ্পলভাবে থাকিবে। সন্ন্যাসিক
কেশদাম পৃষ্ঠদেশ ব্যাপ্ত করিয়া, নিতম্বদেশ সমাচ্ছন্ন করিয়া,
প্রায় মৃত্তিকার উপরিভাগ পর্যন্ত গমন করিয়াছে।
তাহার অলক্ষিতভাবে কে তাহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ গমন ।
করিতেছে। বাতাস দিতেছে। সুতরাং সন্ন্যাসিনী তাহার
পদশব্দ শ্রবণ করিতে পারিতেছে না। এদিকে অনুগমন.
কারীও সতর্কতার সহিত পদবিক্ষেপ করিতেছে। কিয়দ্দর
গমন করিয়া যেমন পশ্চাৎদিকে চাহিল, অমনি সে অবাক হইল।
তাহাকে দেখিয়া তাহার আত্মপুরুষ বিক্ষয় হইল। কারণ
তাহার মূর্তি ভীষণত্বপূর্ণ। তাহার বয়স অনূন চত্বারিংশৎ
বৎসর। 'তাহাতে সে পুরুষ জাতি। সন্ন্যাসিনীর মুখে কথা ফুটিল
সেই ব্যক্তিই জিজ্ঞাসা করিল :-
১৫৪
সরষু।
“কি চাদ এখানেও যে এসেছ ? মনে করেছ এখানে এলে
পরিত্রাণ পাবে ? জাননা আমার নাম তারানাথ। আমার
নাম শুনলে লােকে ভয় করে, আর তুমি কি না আমার হাত
থেকেও পলায়ন করেছ ?”
সন্ন্যাসিনী ধীরে ধীরে উত্তর দিল “না মহাশয়, আমার মন
বড় খারাপ হয়েছিল তাই এখানে এসেছিলেম।”
“বাবা,অন্য কোথাও বুঝি থানার স্থান পাওনি? তাই রাত্রিতে
এখানে মর্তে এসেছিলে ? আর তাের সেই সঙ্গিনীটা কোথায়?”
“তার খবর আমি জানি না!”
“তুই রাত্রিতে আমায় না বলে কেন সেখান থেকে সেদিন
চলে এসেছিলি বল।”
“আমার প্রয়ােজন ছিল। তাই এসেছিলেম। তাতে
ম আপনার ক্ষতি কি?
“কি তুই আমায় অবজ্ঞা কছি।”
সন্ন্যাসিনীর ক্রোধ ক্রমশঃ বৃদ্ধি হইতে লাগিল।
জোরের সহিত উত্তর দিল “অবশ্য চিরকালইত তুই আমার
অবজ্ঞা বস্তু। তুইত নরকের কীট!”
আগন্তুক দেখিল বলপ্রকাশ দ্বারা সহজে কার্যসিদ্ধি হইবে
। কাজেই সে একটু নরম হইয়া বলিল “দেখ সন্ন্যাসিনী
না তােমায় সন্ন্যাসিনী কেন বলিব ? দেখ নবযুবতি-দেখ
মনােমমাহিনি—আর আমায় কষ্ট দিও না। এস তোমায়
আলিঙ্গন করিয়া প্রাণ শীতল করি।
‘কি নরপিশাচ! নরাধম । আমার শরীরে হস্তক্ষেপ করিতে
উদ্যত।”
তুই নরপিশাচ। “না-না-দেবী না—তুমি আমায় কৃপা কর। আমি তােমার ক্রীতদাস। এই আমি তােমার পদতলে পড়িলাম।” সন্ন্যাসিনী সেদিকে দৃপাত না করিয়া চলিতে লাগিল। সে সময় বুঝিয়া মন আরও দৃঢ় করিল। কিন্তু অনুসরণকারী তখন আর ক্রোধ সম্বরণ করিতে পারিল না। ধীরগম্ভীর স্বরে বলিল : “জানিস না আমি পুরুষ। আমার নাম তারানাথ শৰ্ম্মা। আমি বুঝি তাের কথায় ভয় করিব? এই দ্যাখ তাকে বল- পূর্বক ধরি।” এই বলিয়া, যেমন তারানাথ সন্ন্যাসিনীকে ধরিতে গেল অমনি সন্ন্যাসিনী সরিয়া গেল। তারানাথ তাড়াতাড়ি করিতে গিয়া একটী গর্তে পতিত হইল। কে যেন অলক্ষিত ভাে সন্ন্যাসিনীকে অন্যত্র লইয়া গেল। কিন্তু তারানাথ মরি । গর্তের মধ্যে কতক জল ও কতক পাক ছিল। তারা- নাথ পাকে পড়িয়া আর উঠিতে পারিল না। সন্ন্যাসিনী তাহাকে বলিল “কি নরপিশাচ তুই আমার উপর অত্যাচার করূতে যা।” এই বলিতে বলিতে সে চলিয়া গেল। তারানাথ তথায় থাকিল।
ষড়বিৎশ পরিচ্ছেদ।
রক্ষাকর্তা কে ?
সন্ন্যাসিনী প্রান্তরের পূর্বদিক অভিমুখে অনেকদূর গমন
করিয়া একখান গ্রাম দেখিতে পাইল। মনে করিল গ্রামে
প্রবেশ করিবে; কিন্তু পরক্ষণেই সে ইচ্ছা তাহার মন হইতে
তিতি হইল। কারণ সে যে এক্ষণে সন্ন্যাসিনী—তৰে
লােকালয়ে যাইবে কেন ?
কিন্তু পাঠক! একটা কথা আমার জিজ্ঞাস্য-বাস্তবিকই কি
সন্ন্যাসিনী মনুষ্যের সংসর্গ ভালবাসে না? বাস্তবিকই কি সে
আর কখনও মনুষ্যের মুখ দেখিবে না ? তাহার মনের গতি
কি প্রকার ?
পাঠক পারত তুমি নিজেই একথার উত্তর দাও। আমি
আপাততঃ যাহা বলিব তাহা তােমার মনে না ধরিতে পারে।
সন্ন্যাসিনীর ইচ্ছা বা অভিপ্রায়, সে আর জনসমাজে ফিরিবে
, আর সে লােকের নিকট মুখ দেখাইতে পারিবে না। কিন্তু
সময় ত তাহাকে ছাড়িবে না। সময় বলে “বেশ তােমায় খােল।
মুখ দেখাইতে হইবে না—তুমি ঘােমটার ভিতর মুখ লুকাইয়া
লােকালয়ে থাক।
রক্ষাকর্তা কে । আচ্ছা তাহা হইল, কিন্তু পাঠক তুমি কি এই যুবতি সন্ন্যা- সিনীকে সন্ন্যাসিনী দেখিতে ভালবাস? তােমার কি ইচ্ছা অমূৰ্যম্পরূপাকামিনী চিরকাল কঠোরতা অবলম্বন করিয়া জীবনযাত্রা নির্বাহ করিবে, অথবা অবশেষে এই সন্ন্যাসিনী বল পরিধান করিয়া পৰ্বতকরে বাস করিয়া জীবিতকালের দিনগুলি একে একে শেষ করিবে? কিম্বা সে নেত্রদ্বয় নিমী- লিত করিয়া গঙ্গাগর্ভে বসিয়া মনে মনে আপন উপাস্য দেবতাকে ভক্তিপুষ্প দ্বারা পূজা করিতে করিতে শেষে ভাগিরথী- সলিল কর্তৃক অকুলসমুদ্রে নীত হইবে ? ইহার মধ্যে কোন্টী তােমার মনােমত হইল? যেটাই তােমার ভাল বােধহউক, যেটাই তােমার প্রিয় হউক আমি কিন্তু এখানে সাহসিকতার কাৰ্য্য করিতে প্রবৃত্ত হইলাম। আমার মতের সহিত তােমার মত না মিলিতে পারে। যে যাহাকে চায় সে যদি তাহাকে না পায় তবে আমার মনে বড় দুঃখ হয়, যে যাঁহার প্রিয়বস্তুর নিমিত্ত জীবনের মমতা ত্যাগ করিতে পারে, সে যদি তাহাকে না পায়, তবে আমার মনে বড় দুঃখ হয়। যদি কেহ কাহাকে বাল্যকাল অবধি ভালবাসিয়া থাকে, এবং যদি সে হঠাৎ কোন অভাবনীয় ঘট- নার বশবর্তী হইয়া তাহার নিকট হইতে বিক্ষিপ্ত হয়, তবে আমার মন উভয়ের জন্যই ক্রন্দন করে। আবার যদি আমি তাহাদিগকে একস্থানে মিলিত দেখি তবে আমার মনে বড় আনন্দ হয়। তাই বলি আমি বড় স্বার্থপর। সর্বদা নিজের সুখের জন্যই লালায়িত। আমি জানি সন্ন্যাসিনীর অভিপ্রায় বিভিন্ন প্রকৃতির বশবর্তী। আমি জানি সন্ন্যাসিনী-সন্ন্যাসিনী—একটা সরয। ব্যের জন্য সন্ন্যাসিনী—একটা জিনিষ পায় নাই বলিয়াই সে এই কঠোর ব্রত অবলম্বন করিয়াছে। সেই দ্রব্যটী তাহার মননানয়নে অবিরত বিরাজ করিতেছে; তজ্জন্ত তাহার মন যদিও কিয়ৎ পরিমাণে পরিতুষ্ট, তথাপি তাহার বাহনয়ন তাহার অদ- শনে সর্বদাই ব্যাকুল। মনে যাহা অনুভব করা যায়, তাহা যদি শরীরের দ্বারা বােধ করিতে পারা যায় তবে আমাদের আনন্দ দ্বিগুণিত হয়। আমরা সর্বদাই এই দ্বিগুণিত আনন্দের প্রার্থী। একটা পাইলেই আমরা আর একটা চাই। একপ্রকার সুখ পাইলেই অপর প্রকারের জন্য আমরা ৰ্যন্ত হই। তাই বলি পাঠক এ নবীন সন্ন্যাসিনীকে জলে ভাসিয়ে ওরা কি ভাল দেখায় ? তাহার সংসারে প্রবেশ করিতে ইচ্ছা ছিল এবং এখনও কিছু কিছু আছে তবে উপায় দুর্লভ। যাইতে যাইতে সে এক নদীতীরে উপস্থিত হইল। শুনিল নদীটীর নাম সর। ঘাটের নিকট গিয়া মনে মনে চিন্তা হইল মাঝি পাছে পয়সা চায়? আমার নিকট ত একটীও পয়সা নাই।” ভাবিয়া ভাবিয়া শেষে মাঝিকে ডাকিল। মাঝি নিকটে আসিয়া তাহার কথা শুনিল এবং বলিল ‘মা তুমি পয়সা কোথায় পাবে ? চল তােমায় পার করতে পয়সা নেব না। আমরা ব্রাহ্মণদিগকে ও সন্ন্যাসীদিগকে বিনা পয়সায় পার করি। তবে চল মা তুমি নৌকায় ওঠ।” মাঝি নৌকা ছাড়িবে এমন সময় একটী লােক তথায় উপস্থিত হইয়া তাড়াতাড়ি বলিলেন “আরে মাঝি চল শীগগির শীগঙ্গি নৌকা সাজা, আমায় পারে যেতে রক্ষাকর্তা কে। হবে। মাঝি নৌকা ছাড়িল। আয়ােহর মধ্যে মাঝিরা তিন জন, সন্ন্যাসিনী ও সেই লােকটা । সন্ন্যাসিনী প্রথমে তাহাকে চিনিতে পারে নাই,পরে সে ব্যক্তি যখন নৌকায় উঠিলেন তখন সে অবাক হইল কিন্তু অতুল সাহ- সের সহিত বলিয়া উঠিল ‘কি তারানাথ ! নরপিশাচ! এখানেও এসেছি।” কিন্তু সে মনে ভাবিল “এখন আমার রক্ষাকর্তা কে?” নৌকা ধীরে ধীরে চলিতেছে। ঝড় নাই, বাতাস নাই, আকাশ পরিষ্কার। বেলা প্রায় শেষ হইয়াছে।• তারানাথ নৌকায় সন্ন্যাসিনীকে যথেচ্ছ। ভৎসনা করিতে লাগিলেন। সন্ন্যা- সিনী তাহাতে আরও ক্রুদ্ধ হইল। শেষে তিনি তাহার তােষা- মােদ করিতে লাগিলেন, কিন্তু তাহার মন নরম হইল না। তারা- নাথ তখন দুঃসহ পরুষবাক্যে তাহাকে তিরস্কার করিতে লাঠি, সন্ন্যাসিনীর আর সহ্য হইল না ; সে ক্রোধে অর্থ, হইয়া পড়িল। তারানাথ বলপূর্বক তাহাকে ধরিবার চেষ্টা করিলেন,কিন্তু সে ধীরে ধীরে সরযূর পবিত্র সলিলে পতিত হইল। মাঝি এতক্ষণ সঁড় টানিতেছিল। সে যখন এই ভয়াবহ, হৃদয়বিদারক দৃশ্য স্বচক্ষে অবলােকন করিল, তখন সে তারা- নাথকে যথেচ্ছ তিরস্কার করিতে লাগিল। তারানাথ ক্রুদ্ধ হইয়া মাঝিকে মারিতে গেলেন। হাতাহাতি আরম্ভ হইল। তারানাথ নৌকা হইতে পড়িয়া গেলেন। সরযূ তাহাকে কতদূরে লইয়া গেল জানি না। তারানাথের জীবনলীলা শেষ হইল। নিষ্ঠুরতা কোথায় চলিয়া গেল। কণেকের মধ্যে সমস্তই ফুরাইল। তাই বলি কাহারও উপর ব্যবহার করিও না। সময়ের নিকট কিছুই অপরিচিত নহে। লেন।
সরযু।
এদিকে মাঝি শূন্য নৌকা লইয়া পর পায়ে উপস্থিত হইল।
সন্ন্যাসিনীর জন্য নিতান্ত দুঃখিত হইয়া সরযূতীরে ক্ষুন্ন মনে
ইতস্ততঃ ভ্রমণ করিতে করিতে দেখিতে পাইল একটী স্ত্রীলােক
বসিয়া আছেন। তাহার উরুদেশে মস্তক রাখিয়া অপর একটা
স্ত্রীলােক শুইয়া আছেন। নিকটে তাহারই পরিচিত একজন
মাঝি বসিয়া আছে। মাঝি নিকটে গিয়া দেখিল শায়িতা স্ত্রী
লােকটী সেই সন্ন্যাসিনী। যে মাঝি নিকটে বসিয়া আছে সেই
তাহাকে তুলিয়াছিল। সন্ন্যাৱিনীর চৈতন্য হইয়াছে, কিন্তু তাহার
শরীয় অবসন্ন। ধীরে ধীরে সে এক একবার বলিতেছে “আমি
কোথায়। আমার রক্ষা কর্তা কে ?”
-- ''If
w.nl
IT ।
TUITI
[ Tim
.
THLiful
বা
সপ্তবিংশ পরিচ্ছেদ। সরযু তটে। দিনকর সমস্ত দিন সন্ন্যাসীর ন্যায় অনন্ত আকাশে পরিভ্রমণ করিয়া ক্লান্ত হইলেন। শেষে পশ্চিমাকাশে গিয়া নীহারমণ্ডিত অস্তাচলচূড়ায় উপবেশন করিলেন। দেখিতে দেখিতে পূর্ব- দিকে চন্দ্রদেব তাহার বিশ্বম্ভর মূর্তির অনুকরণ করিয়া কুমুর্তিী বিরহব্যথা বিদূষীত করিতে যত্নবান হইলেন। কমলিনী, দুঃখে, ঈর্ষায় ও ক্ষোভে ম্লানমুখী হইয়া লজ্জাবসনে অবগুণ্ঠন দিয়া মৃণালাসনে উপবেশন করিলেন। রজনীদেবী ও অগণ্য তারকা সমন্বিত চন্দ্রদেবকে সীমন্তে ধারণ করিয়া, শুক্লান্বয়ে বিভূষিত। হইয়া, বাঞ্চল দ্বারা জগতস্থ পদার্থ সমুদায় সমাচ্ছন্ন করিলেন। ভূচর, খেচর ও জলচরগণের অধিকাংশই নিদ্রাদেবীয় মােহিনী- মায়ায় মুগ্ধ হইল। সরষুর পবিত্র বারি ধীরে ধীরে বহিয়া যাইতেছে। সায়া, সমীরুম ম গতিতে তাহার উপর দিয়া সঞ্চরণ করিতে করিতে সান্ধ্যান কার্য সম্পন্ন করিতেছেন। এক একটা তরঙ্গ আসিয়া জয়ের নিকট অপেক্ষা কমি মনে করিতেছে কি তাহাদের পশ্চাৎ পচাৎ অগণ্য বীচিমালা ধাবিত হইতেছে।
সরষু। শেষে সকলেই একে একে হতাশাপূর্ণ হৃদয়ে সহােদরা ভগিনী- গণের ন্যায় একসঙ্গে বিতাড়িত হইতেছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় কেহই কাহারও সঙ্গ পরিত্যাগ করিতেছে না। কাহারও ইচ্ছা নাই যে বিভিন্ন স্থানে অবস্থান করি। সকলেই একদিকে একস্থানে থাকিতে অভিলাষী। সুবিমল শশধরকর সরষু সলিলে তরঙ্গমালার উপর পতিত হইয়া সহস্র সহস্র অংশে বিভক্ত হই- ছে। বােধ হইতেছে যেন সহস্র সহস্র চন্দ্র জলে ভাসিতেছে। নৈশগগন নির্মল, মেঘগণ দুরে পলায়ন করিয়াছে। তারকাগণ সাধ্যানুসারে নিজ নিজ জ্যোতিঃ প্রকাশ করিতেছে, কিন্তু সুধাংশু কিরণে তাহাদের জ্যোতি ম্লান হইতেছে দেখিয়া অভিমানে তাহারা, তাহাই পার্শ্বে, লুক্কায়িত হইতেছে। ..সমস্ত আকাশটাই সরযু জলে ভাসিতেছে। তবে উপরের আকাশটী স্থিরভাবে আছে আর নিমের আকাশ চঞ্চল। উপ- রের চন্দ্র একপ্রকার স্থির আছে, কিন্তু নিম্নের চন্দ্র বার বার বিচ- লিত হইতেছে। তাই বলি সংসারে আঙ্গত জিনিষের উপর লক্ষ্য রাখিবে। নকল দ্রব্য গ্রহণ করিও না। নকলে বিঘ্ন আছে, চঞ্চ- লতা আছে, আসল নিরাপদ, নির্বিঘ্ন ও স্থির। তটে বৃক্ষলতাদি সরযুজলে অধােমুখে অবস্থিতি করিতেছে। দৃশ্য রমণীয়। এই সময় সরযূ তটে একটী বালিকাঅথচযুবতী রমণী বসিয়া আছে। তাহার অঙ্গে মস্তক রক্ষা করিয়া অপর একটা যুবতী আকাশের দিকে চাহিয়া আছে। তাহার মুখ হইতে ধীরে ধীরে দুই একটা কথা বাহির হইতেছে। তাহার মন্তকের কেশগুলি কতক বালিকাযুবতীর অঙ্গে এবং কতক মৃত্তিকায় পড়িয়া আছে। পরিধেয় বস্ত্রখানির কতক অংশ তাহার শরীরে আছে এবং
সরযু তটে।
কতক অংশ মাটিতে পাড়িয়া আছে। তাহার হত দুইটীয় মধ্যে
একটী তাহার বক্ষে আছে এবং অপরটী বালিকা-যুবতীয় অঙ্গে
আছে। ক্ষণেক থাকিয়া সে বলিল “ইন্দুমুখি তােমরা আমায়
বাঁচাইয়া ভাল কর নাই। দেখ আমি যদি মরিয়া যাইতাম, তবে
আমার কত ভাল হইত ! ইহাতে আমার দুইবার মরা হইবে ।
দেখ যদি আমি সরযূ জলেই প্রাণ দিতে পারিতাম তবে আর
আমায় এজীবনে দেবেন্দ্রনাথের বিরহব্যথা ভােগ করিতে হইত
না। আমি মৃত্যুর পর কখনও না, কখনও দেবেন্দ্রনাথের সাক্ষাৎ
পাইতাম। কিন্তু তুমি আমার সে সাধে বাধা দিয়াছ।”
‘সরযূ ! বৃথা তুমি কেন এত উতলা হচ্ছ। তুমি পতিব্রতা,
তুমি অবশ্যই দেবেন্দ্রনাথের দেখা পাইবে। তিনি জীবিত
আছেন।”
“না ইন্দুমুখি ! আজ আমার মন বড় চঞ্চল হইতেছে,
আজ আমার মনে হইতেছে দেবেন্দ্রনাথ এজন্মে আর আমায়
দেখা দিবেন না।”
‘সরযূ ! মন স্থির কর, উঠে ব’স। শুয়ে থাকলে মনে
আরও বেশ ভাবনা আসিবে।”
“না ইন্দু! আমি আর উঠিতে পারিব না। শরীর অবসন্ন
হইয়াছে। বােধ হইতেছে যেন কেহ অদ্বারা নিয়ত আমার
শরীরে আঘাত করিতেছে। আমার আমার আমার
শরী2 আর-- সংসায়ে থাকিবে না।”
সন্ন্যু ক্ৰমশঃই অবসন্নাঙ্গী হইতেছে। ইন্দুমুখী স্থির দৃষ্টিতে
তাহার মুখপানে চাহিয়া আছে।
অহহ! এই সময় যদি কোন ঐন্দ্রজালিক বিদ্যার প্রভাবে
।
১৬৪ সরযু। দেবেন্দ্রনাথকে আনিতে পারা যায়-অথবা যদি সয়যুর ভাগ্য- ক্রমে তিনি এখানে আসিয়া পড়েন তবে কি সরযূর প্রাণ রক্ষা হয় ? ইন্দুমুখী ভাবিল “আমি যখন অন্যের বিষয় কথা কহিতেছি তখন সরযূ প্রায় অচৈতন্য হইতেছে, কিন্তু যখন দেবেন্দ্রনাথের কথা কহিতেছি তখন সরযূ ক্রমশই প্রফুল্ল হইতেছে। তবে 'আমি বার বার দেবেন্দ্রনাথের নামি করি।” এই ভাবিয়া ইন্দুমুখী যেমন দেবেন্দ্রনাথের নাম উচ্চারণ করিল অমনি সরষু চকিত হরিণীর ন্যায় ইতঃস্তত দৃষ্টিপাত করিতে লাগিল এবং উচ্চৈঃস্বরে বলিয়া উঠিল “দেবেন্দ্রদেবেন্দ্র- দেবেন—আমায় মনে পড়েছে কি ? দেবেন এস আমার কাছে এস। সেই অঙ্গীকারের দিন মনে আছে কি-না ভুলে গিয়েছ? দেবেন তুমি না সেই দিন আমার জন্য অকুলপাথার ভাবিতে- ছিলে? কৈ দেবেন আমার নিকটেত এলে না। তবে তুমি আর জীবিত নাই। তবে তুমি আর এ সংসারে নাই। তবে তুমি দেবলােকে চলিয়া গিয়াছি। না বােধ হয় তুমি বেঁচে আছ ; তুমি সংসারে আছ। তুমি বিবাহ করেছ। তবে তুমি সহধম্মিণীকে নিয়ে সুখে থাক। অচিরাৎ তােমার একটা পুত্র হউক। তুমি দীর্ঘজীবী হইয়া সুখে কালযাপন কর। কিন্তু দেবেন। আমিত আর তােমায় পাইলাম না; তবে আশা থাকিল। জীবন যদি থাকে তবে আশাও থাকিবে। আবার জীবনান্তেও আমার আশা থাকিবে, আমি সুরলােকে তােমার সাক্ষাৎ পাই। তুমি যাই বল দেবেন আমি তােমার আশা কখনও ত্যাগ করিতে পারিব না। তুমি সৎ পুরুষ, তুমি সুরসিক, তুমি বিজ্ঞ, বুদ্ধিমান, ভুমি পরিণামদর্শী; আমি তােমার জন্য সব কাৰ্যই
সরযু তটে।
করিতে পারি। তুমি আমায় দেখা দাও—তুমি যা বলিবে, আমি
তাই করিব—কিন্তু পর জন্মে যেন তােমায় পাই। না দেবেন
কৈ তুমি এলে নাত ; তবে আমি আর বাঁচিব না; তবে আমি
আর এখানে থাকিব না। সংসার তুচ্ছ! কিন্তু যদি আমি
পতিতা হই তবে মৃত্যুকালে নিশ্চয়ই তােমার দেখা পাব।”
ইন্দুমুখী আর চুপ করিয়া থাকিতে পারিল না, বলিল “সরযু
তুমি পাগলের মত এত কি বলছ। উঠে বস। বৃথা কেন
কষ্ট পাও।”
“ইন্দুমুখি—আমি বসিতে পারি না। আর আমি বাচি-
তেও পারিব না! যাই সরযুজলে জীবন দিগে।”
এই বলিয়া যেমন সে সরযূর জলে পড়িতে যাইবে অমনি
ইন্দুমুখী তাহাকে ধরিতে গেল, কিন্তু পারিল না, অপর একজন
কে আসিয়া সরযূকে ধরিল। সরযূ মূচ্ছি তা হইল। ইন্দুমু
যেমন পশ্চাৎদিকে দেখিতে যাইবে অমনি কে আসিয়া একবারে
তাহার গলা জড়াইয়া ধরল। ইন্দুমুখী প্রথমে তাহাকে চিনিতে
পারে নাই, কিন্তু যখন তাহার হন্ত তাহার গলায় পড়িল তখন সে
জানিল নগেন্দ্রনাথ তাহাকে ধরিয়াছেন। ইন্দ্রমুখীর মুখে কথা
নাই। সে অবাক হইয়া অবনতমস্তকেই থাকিল।
এদিকে সরযূ মূচ্ছি। ইন্দুমুখী তাড়াতাড়ি জল আনিয়া
তাহার মুখে দিল। কিন্তু তাহার চৈতন্য হইল না।
একমুচ্ছিতাবস্থায় দেবেন্দ্রনাথের অঙ্গে শয়ন করিয়া আছে।
তাহার কথা কহিবার শক্তি নাই। তাহার চক্ষুও এক্ষণে দেবে
নাথের রূপ দেখিতে পাইতেছে না কিন্তু ইহা তাহার বড়
সৌভাগ্যের বিষয়।
সরযু
সরয। r একটা লতার মূল অবশেষে ইন্দুমুখী নগেন্দ্রনাথকে বলিল ‘‘আমার সঙ্গে এস, কুটীরে এক ঔষধ আছে তাহাতে বােধ হয় সরুর বিশেষ উপকার হবে। “চল বিলম্বের প্রয়ােজন নাই। শীঘ্র তাহা আনি” এই বলিয়া নগেন্দ্রনাথ ইন্দুমুখীর সহিত তাহার কুটীয়াভিমুখে গমন করিলেন। এদিকে মাঝি সেই সময় তথায় উপস্থিত হইয়া সন্ন্যাসিনীকে অর্থাৎ সরফুকে সেই অবস্থায় দেখিয়া, দেবেন্দ্রনাথকে জিজ্ঞাসা করিল “সন্ন্যাসিনী মার কি হয়েছে।” দেবেন্দ্রনাথ অতি মৃদুস্বরে উত্তর দিলেন “মুচ্ছা।” মাঝি বলিল “ইহার জন্য এত চিন্তা কেন ?” এই বলিয়া সে আনিয়া সরযুর নাসিকার নিকট ধরিবা মা হায় চৈতন্য হইল। তাহার শরীরে বল হইল । মাঝি ইমুখীকে খুঁজিবার জন্য তাহার কুটীয়াভিমুখে গমন করিতে লাগিল। এই সময় দেবেন্দ্রনাথ মনে করিলেন বহুদিনের সাধ পূর্ণ করিয়া সরযুর মুখে একটা চুম্বন দিবেন। সরযু কী- স্বরে নলিল ‘‘আমি কোথায় ?” দেবেন্দ্রনাথ উত্তর দিলেন “কোথায় থাকিলে তুমি ভাল থাক?” “আমার ভাল থাবার স্থান কি তােমরা দিতে পাবে ?" “অবশ্য"- ‘আমি দেবেন্দ্রনাথের অঙ্কে থাকতে ভালবাসি।” ‘তুমি সেইস্থানেই আছ।” এতক্ষণ সরযূ দেবেন্দ্রনাথের স্বর বুঝিতে পারে নাই, পরে হঠাৎ তাহার স্বর চিনিতে পারিয়া বলিল “কি দেবেন্দ্রনাথ।
সরযূ তটে
তুমি এত নিষ্ঠুর কেন? তােমায় এত ডাকিলাম তবু তুমি উত্তর
দিতেছিলে না? এই কি তােমার ভালবাসা ?-কিন্তু দেবেন
আজ কি আর সংসারে আছি। আর কি আমি সে সরযু। আজ
আমি দেবেন্দ্রনাথের অস্থিতা সরয়।
সর। আজ আমার মনে
সাহস হয়েছে, দেহে বল হয়েছে, শান্তি আমার শরীরে বিরাজ
করিতেছে। যে সংসার একদিন বিষ মনে হয়েছিল আজ
তাহা অমৃত বলিয়া বােধ হচ্ছে। আজ আমি স্বর্গে। আজ
আমি পৃথিবীতে নাই।”
‘সর-যখন আমি তােমায় মুচ্ছি তা দেখিয়া হতাশ হইয়া-
ছিলাম তখন আমার মন নিতান্ত খারাপ হইয়াছিল। আমি
মনে করিয়াছিলাম বােধ হয় আমারও জীবনলীলা এইস্থানে
শেষ হইবে। মনে করিতেছিলাম সরযূতটে শাস্তুিদেবী নিয়তই
অবস্থিতি করেন কিন্তু কৈ আমি ত এখানে শান্তি পাইলাম না ;
ভাবিতেছিলাম সরযূতটে সরযূকে পাইলে, সরযূনদীর উপাসনা
করিয়া জীবন সার্থক করিব, কিন্তু আমি তখন অচৈতন্যা সরযু
পাইয়াছিলাম। যখন আমি তােমায় মুচ্ছিতা দেখিলাম, তখন
আমার শােকানল দ্বিগুণ হইয়াছিল। ভাবিতেছিলাম ঈশ্বর
নির্দয়, কপট, শঠ ও প্রবঞ্চক; কিন্তু আমার সে ভাবনা দূরে গেল।
দেখিলাম তিনি সরল ও সদয় । মনে করিয়াছিলাম তিনি
অশান্তির বিধানকর্তা; কিন্তু এক্ষণে দেখিতেছি তিনি শান্তির
আর মনে করিতেছিলাম “আমি তােমায় পেয়ে হারাই
লাম” কিন্তু এখন দেখিতেছি আমি তােমায় হারাইয়া পাইলাম।
তাই বলি সয়েজ তুমি আমার হারান ধন! এস তােমার মুখে
অনেকদিনের একটা চুম্বন দি। যতদিনের চুম্বন বাকি ছিল, আজ
সরয়। সবই এক চুম্বনে শােধ করিয়া লইব। ইহা আমার নিজের শাসিত মহল। এখানে আমি নিজেই সমস্ত কর আদায় করি, নিজেই তাহা উপভােগ করি এমহলে অপর কাহারও অধিকার নাই । আজ কর আদায় করিতে বসিয়াছি সমস্ত আদায় না হইলে ছাড়িব না।” সরযু লজ্জিত হইল। কিন্তু বলিল ৫ সে কি আমার দোষ ? না আমার অদৃষ্টের দোষ ? সে ত তােমার দোষ, সে ত তোমার ভ্রান্তি। তােমারই আলস্য তুমি এত দিন আদায় কর নাই, তাই আদায় হয় নাই। তুমি প্রজার খোঁজ খবর নাও নেই, তাই প্রজা তােমায় কর দিতে পারে নি। তবে তুমি এখন আদায় করতে এসেছ, বেশ হয়েছে, মনের সুখে আদায় কর, আমার কিছু আপত্তি নেই। তদনন্তর দেবেন্দ্র- নাথ তাঁহার মুখে একটী আদরের চুম্বন দিলেন। দিলেন। সরয় সমস্ত শােক তাপ বিস্মৃত হইল। এদিকে নগেন্দ্রনাথ, ইন্দুমুখী ও মাঝি আসিয়া উপস্থিত হইল। ইন্দুমুখী ও সরযূ উভয়েই দেবেন্দ্রনাথকে দেখিয়া বড় লজ্জিত হইল। মাঝি তাহাদের নিকট আসিয়া বলিল “ইনিই কি আমার সন্ন্যাসিনীর মার পতি ?” নগেন্দ্রনাথ বলিলেন “হ্যা ।” মাঝি সন্তুষ্ট হইল । তদনভর তাহারা পাঁচজনে সে রাত্রি ইন্দুমুখীর কুটীরেই যাপন করিলেন। আজ অবধি মাঝি হা” দের প্রধান সঙ্গী হইল। দেবেন্দ্রনাথ মাঝিকে প্রাণাপেক্ষা অধিক ভাল বাসিতে লাগিলেন, কারণ সেই মাঝি দ্বারাই তিনি হারান ধন পুনঃ প্রাপ্ত হইয়াছেন।
সরযূ তটে
দেও তাহাদের আজ্ঞাকারী ভৃত্যের ন্যায় থাকিল। আজ
এখনটৈ দেবে সরযূর শুভ সম্মিলন সম্পাদিত হইল। ইহাদের
। ধর্মের আধার। পাপ ইহাদের নিকট আসিতে পারে
সা
১৫
অষ্টবিংশ পরিচ্ছেদ।
“ইহারই নাম পাপের প্রায়শ্চিত্ত ”
পরদিন প্রভাতে গাত্রোখান করিয়া তাহার কুটীর হইতে
বহির্গত হইলেন। সরযূনদীর তীরস্থ হইয়া দেবেন্দ্রনাথ মাঝিকে
বলিনে “মাঝি আজ অবধি তুমি আমার প্রকৃত বন্ধু হইলে ।
তােমার স্ত্রী পুত্রাদি সমস্তই আমাদের দেশে লইয়া চল।”
মাঝি বলিল “মহাশয় আমার অপর কেহই নাই। আমি
একাকী। চলুন আমি আপনাদের দেশে যাব।”
মাঝি ব্যবসায়ী মাঝি নহে। সে পূর্বে ইমুখীর পিতার
নিকট ভৃত্য থাকিত। ইন্দ্রমুখীর পিতার মৃত্যুর পর সে তাহার
সহিত তাহার মামার বাড়ী ছিল। যখন ডাকাইতের ইদুমুখীর
মাতুলের সর্বস্ব অপহরণ করে, ও ইন্দুমুখীকে লইয়া পলায়ন করে
তখন মাঝি আর সেখানে থাকিতে না পারিয়া চলিয়া যায় ।
তৎপরে দেশে দেশে ঘুরিয়া ঘুরিয়া অবশেষে সরযূনদীতে মাঝির
কাৰ্য্য করিতে লাগিল। সে ইন্দুমুখীকে চিনিতে পারিয়া
বড় আনন্দিত হইল। তাহাদের আজ্ঞাকারী ভূভ্য হইয়া
থাকিল।
ইহারই নাম পাপের প্রায়শ্চিত্ত । ১৭১ দেবেন্দ্রনাথ বলিলেন “তবে তােমার নৌকা আন আমরা এখনই দেশে যাইবার নিমিত্ত ছাড়ি।” আজ্ঞামাত্র মাঝি নৌকা সজ্জিত করিয়া আনিল। তাহারা সকলেই আরোহণ করিলেন। নৌকা দক্ষিণ পূর্বদিকাভিমুখে ছুটিল। অনুকূল বাতাস বহতে আরম্ভ করিল। সরযূর আজ বড় আনন্দ। আনন্দের সহিত আজ সে নদীতীরস্থ বস্তু সমুদয় দর্শন করিতে লাগিল। ক্রমে তাহার গঙ্গানদীতে উপনীত হই লেন। আজ সরযূ গঙ্গাবক্ষে পতির সহিত চলিতেছে। তাহার হৃদয়ে আনন্দ ধরে না! যখন বেলা প্রায় শেষ হইব হইব হইয়াছে, তখন তাহারা বরাহনগরে উপনীত হইলেন। দেবেন্দ্রনাথ বলিলেন অদ্য বরাহনগরের ঘাটেই নৌকা রাখ, হয় অদ্য রাত্রিতে ছাড়িব না হয় কল্য প্রভাতে যাত্রা করিব।” দেবেন্দ্রনাথের আজ্ঞানুসারে মাঝি বরাহনগরের ঘাটে নৌকা থামাইল। সকলেই অবতরণ করিয়া গ্রামের ভিতর গেলেন। তথায় একটা বাসা ভাড়া করা হইল। সামান্থরূপ আহারাগি করিয়া দেবেন্দ্রনাথ ও নগেন্দ্রনাথ গ্রামের । মধ্যে একবার বেড়াইতে গেলেন। ইতস্ততঃ বেড়াইতে বেড়াইতে দেখিলেন একস্থানে কতকগুলি লােক দাড়াইয়া আছে। জনতা দেখিয়া তাহাদের মনে একটু কৌতুহল জন্মিল তাহারা সেই দিকেই চলিতে লাগিলেন। নিকটে গিয়া দেখিলেন একটা শ্রীলোক ধূলির উপর বসিয়া আছে। তাহার সর্বাঙ্গে ঘা হই- য়াছে। মস্তকে কেশে ধূল সংলগ্ন হইয়াছে। পালে পালে মক্ষিকা আসিয়া তাহার ক্ষতস্থানে উপবিষ্ট হইতেছে। ক্ষত- স্থানের মধ্য হইতে দুই চাৰিটী কীট বাহির হইতেছে। মক্ষিকা তদনন্তর সরফু। বিদ্ধ হইয়া সে ছট ফট করিতেছে। তাহাদিগকে তাড়াইয়া দিবার চেষ্টা করিতেছে কিন্তু তাহার হস্তপদাদি সমস্তই অবসন্ন। তাহার কথা কহিবার ক্ষমতা নাই। কেবল এক একবার হা করিতেছে, সেই সময় কোন কোন দুষ্ট ছেলে তাহার মুখে প্রস্রাব ত্যাগ করিতেছে। সে তখন বিরক্ত, ক্রুদ্ধ ও ক্ষুব্ধ হইয়া ইয়া পড়িতেছে। কোন কোন ৪ বালক ইট লইয়া তাহার শরীরে নিক্ষেপ করিতেছে। কেহ কেহ ধূল লইয়া তাহার গায় দিতেছে। কেহ কেহ জল আনিয়া তাহার শরীরে ঢালি। দিতেছে। আবার কেহ কেহ জলে লবণ ও লেবুর রস মিশ্রিত করিয়া তাহার ক্ষতস্থানগুলিতে ঢালিয়া দিতেছে, সে যন্ত্রণায় অস্থির হইয়া এপাস ওপাস করিতেছে, কিন্তু তাহার কোন সাধ্য নাই। কেহ আসিয়া তাহার উপর লাঠিদ্বার। আঘাত করিতেছে। দেবেন্দ্রনাথ এই সমস্ত দেখিয়া বড় দুঃখিত হইলেন, তাহার হৃদয় দ্রব হইল। তিনি নিকটে গিয়া দেখিলেন স্ত্রীলােকটি সেই কুঞ্জকামিনী। ধীরে ধীরে অথচ গভীরভাবে কিন্তু নম্রতার- সহিত দেবেন্দ্রনাথ জিজ্ঞাসা করিলেন “কি কুঞ্জকামিনি এখন সব বুঝেছ ত? সংসারে কত সুখ সব জানতে পেরেছ ? পূর্বে তোমায় কি বলিয়াছিলাম মনে পড়ে কি ? তখন যদি একটু বুঝতে পারিতে তবে তোমায় একষ্ট ভােগ করিতে হইত না। এখন যমও যে তােমায় ঘৃণ; করেছে ? মনে করি না যে আমি তােমায় গালাগালি দিতেছি। তােমায় যে ভৎসনা করিতেছি ইহাতে অপরে শিক্ষা পাইবে। তােমার আসকাল নিকটবী, এখন তুম হরিনাম কর। ইষ্টদেবতাকে স্মরণ কর। আমি তােমার সৎকার করিব। কুঞ্জ কামিনী কোন কথা বলতে ইহারই নাম পাপের প্রায়শ্চিত্ত। ১৭৩ পারিল না। কেবল মাথা নাড়িয়া দেবেন্দ্রনাথকে নিকটে যাইতে আজ্ঞা করিল। দেবেন্দ্রনাথ নিকটে গেলেন, সে তঁাহার পদতলে মন্তুক রক্ষা করিল। তাহাতে অনেকেই তাহাকে উপ- হাস করিতে লাগিল। কিন্তু নগেন্দ্রনাথ তাহাদিগকে প্রকৃত কথা বুঝাইয়া দেওয়াতে তাহারা একদৃষ্টে দেবেন্দ্রনাথকে দেখিতে লাগিলেন। তদনন্তর তাড়াতাড়ি একব্যক্তি আসিয়া কুঞ্জকামিনীকে লক্ষ্য করিয়া একটা ইট ছুড়িয়া বলিয়া উঠিল “কি াদ এসব কি প্রেমের দায় নাকি?” দেবেন্দ্রনাথ সকলকেই বলিলেন “আপনারা আর কেন এর উপর অত্যাচার করেন, ২৪ মিনিট পরেই এর মৃত্যু হবে।” দেখিতে দেখিতে কুঞ্জকামিনী জীবনলীলা সম্বরণ করিল। দেবেন্দ্র- নাথ কয়েকজন লােক ডাকিয়া তাহার সৎকারের নিমিত্ত তাহাকে গঙ্গাতীরে লইয়া গেলেন। সরযূ ও ইন্দুমুখীকে ডাকিয়া দেবেন্দ্রনাথ বলিলেন-“দেখ ইহারই নাম পাপের প্রায়শ্চিত্ত। অপরাপর কথা পরে তােমা। দিগকে বলিব।” তদনন্তর তাহারা সকলেই গঙ্গাতীরে উপনীত হইলেন। শীঘ্রই চিতা সজ্জা করা হইল। চন্দন কাষ্ঠ গুগগুল ইত্যাদি সুগন্ধি দ্রব্য আনা হইল। কুঞ্জকামিনীর দেহ দেবেন্দ্রনাথ ও নগেন্দ্রনাথ চিতায় স্থাপন করিলেন। অগ্নি সংযােগ করিবামাত্র ধূ ধূ শব্দে চিতা জ্বলিয়া উঠিল। দেখিতে দেখিতে ক্ষণকাল মধ্যে তাহাঁর দেহ ভস্মীভূত হইয়া গেলেন। তাই বলি পাপ- কাৰ্য্য করিও না। সময়ে পাপের ফল ফলিবে।
১৭৪
সরয
তৎপরে নগেন্দ্রনাথ ও দেবেন্দ্রনাথ গঙ্গাজলে স্নানাদি সম্পন্ন
করিয়া বাসায় আসিলেন। বরাহ নগরে অধিকক্ষণ থাকিতে তাহা
দের ইচ্ছা হইল না। দেবেন্দ্রনাথের আজ্ঞানুসারে সকলেই
তীরে গমন করিলেন। মাঝি নৌকা সাজাইল।
সাজাইল। তাহারা
আরােহণ করিলেন; নৌকা ছাড়া হইল। আবার নৌকা
‘তীরবেগে ছুটিল। দেবেন্দ্রনাথ ও নগেন্দ্রনাথ সস্ত্রীক দেশে
প্রতি গমন করিতেছেন। তঁাহারা তীর্থ যাত্রা করিতে আসিয়া-
ছিলেন তীর্থও হইল, নিজ নিজ কার্য সম্পন্ন হইল। আবার
সেই সঙ্গে সঙ্গে পাপের প্রায়শ্চিটাও দেখা হইল।
•
উনত্রিংশ পরিচ্ছেদ আজ বড় সুখের দিন । * আজ বড় সুখের দিন। আজ রতনপুর আবার আনন্দ পূর্ণ। আজ দেবেন্দ্রনাথ আবার সেই রতনপুরে। সেই সরযূ আবার রতনপুরে। সেই নগেন্দ্রনাথ আজ ইন্দুমূখীর সহিত দেবেন্দ্র- নাথের গৃহে অবস্থান করিতেছেন। মাঝি আজ বড় ব্যস্ত। আজ। দবেন্দ্রনাথের বিবাহ। মাঝির আজ বড় সুখ। সুখে সে কাৰ্য্য করিতেছে। জীবনকৃষ্ণ বাবুর বাড়ীতেও আজ আনন্দ কোলাহল উখিত হইতেছে। আজ সরযু আর সন্ন্যাসিনী নাই। আজ আর সর সর তীরে শুইয়া নাই। আজ আর সরযূ কাননে । বসিয়া ক্রন্দন করিতেছে না। আজ আর সরষু গৃহিণীর সান্তনা বচন অবহেলা করিয়া রজনীকে সহচরী করিয়া, ইন্দু- মুখীকে সঙ্গে লইয়া বনে বনে বেড়াইতেছে না। बाखम বাপের বাড়ী। আজ তাহার বিবাহ। আজ তাহার বাড়ীতে অসংখ্য দাস দাসী অবিরত ব্যক্তভাবে ধাবিত হইতেছে। সন্ধ্যা গত হইল। দেবেন্দ্রনাথ রীতিমত ঘটা করিয়া বিবাহ বহির্গত হইলেন। নগেন্দ্রনাথ সমস্ত কাৰ্যই পৰ্যবেক্ষণ করি- তেছেন। দেখিতে দেখিতে বর জীবনকৃষ্ণ বাবুর বাড়ী উপস্থিত সরষু। হইলেন। মঙ্গলাচরণ করিতে করিতে বরকে সকলে গৃহে লইয়া গেল। বর দেবেন্দ্রনাথ সভার মধ্যস্থলে বসিলেন। তাহার সম্মুখে কয়েকটী সপুষ্প ফুলদান রহিয়াছে। পুষ্পগন্ধে গৃহ আমােদিত হইতেছে। ইহা ব্যতীত আতর গােলাপ জল ইত্যা- দিরও অভাব নাই। বরের দক্ষিণ দিকে ব্রাহ্মণদের আসন। অপর তিন পার্শ্বে কায়স্থাদি অপরাপর সূত্রের নিমিত্ত বিছানা দেওয়া হইয়াছে। অনেক লােকই বরযাত্র গিয়াছেন। তাঁহাদের মধ্যে কেহ আজ্ঞা করিতেছেন “আরে তামাক দে” কেহ বলিতেছেন “পান আন রে।” আবার কেহ কেহ বিবাহ কখন তাহা জানিবার জন্য বলিতেন “জীবনকৃষ্ণ বাবু কোথায় গেলেন লগ্নটা কখন স্থির কমেছেন ?” কেহ বলিতেছেন “লগ্নের সময় হইল বরকে নিয়ে চল।” এদিকে কতকগুলি বালক গােলাপ জল ইত্যাদি লইয়া বরযাত্র- গণের শরীরে নিক্ষেপ করিয়া কৌতুক দেখিতেছে। হাসির ধূম চলিতেছে। ধূমপানাসক্ত ব্যক্তিগণ ধূমপান করিতে করিতে গৃহের অভ্যন্তর প্রায় মেঘাচ্ছন্ন করিয়া তুলিলেন। দেখিতে দেখিতে দেবেন্দ্র-সরযু পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হইলেন। আজ সরযূ বাসর ঘরে কুলবধূ। ঘােমটা দিয়া চুপ করিয়া একস্থানে বসিয়া আছে। অনেকেই তাহাকে কত কথা বলিয়া বিদ্রুপ করিতেছে। কোন কোন রমণী তাহার মুখ লইয়া দেবেন্দ্রনাথের মুখের নিকট আনিতেছেন। লজ্জায় সরযু আপন মুখ সরাইয়া লইতেছে। কিন্তু তাহার মনে মনে ইচ্ছা হইতেছে “দেবেন্দ্রনাথের মুখে মুখ দিয়া বসিয়া থাকি।” দেবেন্দ্রনাথের অজি বড় সুখের দিন হৃদয়ে এক্ষণে শান্তি দেবী বিরাজ করিতেছেন। তাহার চিন্তা- শক্তি এক্ষণে এক নব স্রোত বেগে প্রবাহিত হইতেছে। সরযু এক্ষণে সুখিনী। কিন্তু একটা বিষয়ের জন্য তাহার মন ক্রন্দন করিতেছে—সেই গৃহিণী এক্ষণে বৈধব্যানলে দগ্ধ হই- তেছে। যাহাহউক আজ আনন্দের দিন। সংসার মিশ্রিত দ্রব্যের আধার। বিশুদ্ধ সুখ পাওয়া যায় না। তাই বলি- যে সুখ পাওয়া যায় তাহারই সদ্ব্যবহার করা কর্তব্য। ভাবিতে যাও ভাবনা তোমায় কোথায় নিক্ষেপ করিবে বুঝিতে পারিবে না। তবে “অ'জ বড় সুখের দিন” এই মনে করিয়া সংসারে যতদিন বাঁচতে পারা যায় ততদিনই সুখের হইয়া থাকে ! অতএব মনে সন্তোষ রাখিতে চেষ্টা কর ।
উপসংহার। s car, rnrn রত ললনা বর্গ ! একবার আমার কথা শ্রবণ কর। সরযূর দিকে একবার দৃষ্টিপাত কর। সরসূর সতীত্বের গৌরব দেখ !! পতিপরায়ণ- তার মহিমা দেখ। পতিব্ৰত্যধর্মের অসীম শক্তি অবলােকন কর। পত্যেকব্ৰতা সরযুর অবস্থা মনেমনে চিন্তাকর। কল্পনাদেবীর আশ্রয় গ্রহণ করিয়া সরযূর প্রস্ফুটিত সরােজ-প্রতিম-রূণ নিরীক্ষণ কর! পতি-বিচ্ছেদ পাগলিনী, সন্ন্যাসিন্যাশ্ৰমাবলম্বিন পূত হৃদয়, সমমূবালার দিকে নেত্রপাত কর। দেখ তাহার হৃ!!" . কত পবিত্রতা পূর্ণ !! দেখ তাহার মন কতপ্রকার অলৌৰি প্রব্যে নির্মিত হইয়াছে ! দেখ সে কত কঠোরতা সহ্য করি পারে ! দেখ পতির অভাবে সে সংসার কত তুচ্ছ মনে করে !! দেখ সে স্নেহময়ী জননীর কথা অবহেলা করিয়া, গুরুদেব পিতার বচন লঙ্ঘন করিয়া, সদুপদেশদাত্রী গৃহিণীর বাক্যে অবহে ফরিয়া, সহােদর সহােদরার স্নেহ, মমতা ইত্যাদি তুচ্ছ’
উপসংহার ।
১৭৯
করিয়া পতির জ জীবন উৎসর্গ করিতে প্রস্তুত কিনা ! দেখ
তাহা মন কত উন্নত।
ভারত—সতীরমণীগণের আবাস স্থান। অদ্যাপি ভারতে
সতী আছে। ভারত আজিও পুণ্যক্ষেত্র, ধর্মের আধার ভারত
ভূমি! এই পবিত্রতাপূর্ণ ধৰ্ম্মক্ষেত্রের কেবল একটী সন্ততি আজ
আমি পাঠকগণের নিকট বিশেষতঃ তােমাদের সমীপে উপস্থিত
করিলাম।
তােমরা হয়ত মনে করিবে আমি নির্বোধ। হয়ত তােমরা
বলিবে পতির জন্য আবার কোন সময় কে দেশত্যাগিনী হইয়া
থাকে ? তােমরা হয় ত ভাবিবে উপন্যাস-লেখকগণ অসম্ভব
অসম্ভব বস্তু আমাদের চক্ষে উপস্থিত করেন। কিন্তু ভেবে
দেখ ভারতরমণী সতীত্বকে কত আদরণীয় বস্তু মনে করে।
কথা, দময়ন্তীর বিষয়, শকুন্তলার বিবরণ, সাবিত্রীর কথা স্মৃতি
পথে আনয়ন করিতে চেষ্টা কর। স্থিরভাবে গম্ভীর
গভীরতার সহিত চিন্তা করিয়া দেখ—ইহা কবির অলরত
না অথবা সত্য ঘটনা।
সতীত্বের পুরস্কার, অসতত্বের তিরস্কার, পতিব্রতার আদর
শৈণির লাঞ্ছনা, দ্বিচারিণীর বিষময় পরিণাম, ব্যভিচারিণী
যন্ত্রণা, বারনগণের বৃন্ধুত্ব ও তাহাদের শেষ অবস্থা
খ, তুলনা কর, বিচার কর, সিদ্ধান্ত কর, দেখ ফল পাও
সীতার
'ৰ বস্তুই চিরস্থায়ী
পুির অর্থাৎ
সর। অমর। ধর্ম স্বর্গবাসী। ধর্ম নিত্য। পতিব্রত, নারীগণের শ্রেষ্ঠ ধৰ্ম্ম। পতিব্রতা অভঙ্গুর ইহা চিরকাল এক থাকিবে। যাহা পবিত্রতা তাহা পবিত্রই থাকিবে। সতীত্ব পবিত্রতা পূর্ণ। জড় দেহ ভূতলে পড়িয়া থাকিবে। ধৰ্ম্ম সঙ্গে যাইবে। সতীত্ব তােমাদের ধর্মের প্রধান অঙ্গ। সতীত্ব তােমাদের সঙ্গে যাইবে। সতীত্ব তােমাদিগকে স্বর্গে লইয়া যাইবে। তাহায় ক্ষমতায় কেবল তােময় কেন, তোমাদের পতিগণও তােমাদের সহিত স্বর্গেয়াইবেন। মাটীর দেহ মাটীতেই মিশিবে।” তাই বলি পতির জন্য কষ্ট স্বীকার করিতে কুণ্ঠিত হইও না। পতি আজ্ঞা পালনে বিমুখ হইও না। বরং তোমাদের পতিদিগকে তীত্বের মহিমা শিক্ষা দাও। সৎব্যক্তির কত আদম। অসতের ল। ভাবিয়া দেখ--ফল পাইবে।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.