Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Tuntunir Gaan
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
টুনটুনি গান
সুনির্মল বসু
কলিকাতা
বাগচী এণ্ড সন্স
২০৩২, কর্ণওয়ালিশ ষ্ট্রীট
বাগচী এণ্ডস, ২০৩২ কর্ণওয়ালিশ স্ট্রীট
কলিকাতা হইতে হেমচন্দ্র বাগচী, এম-এ
কর্তৃক প্রকাশিত
প্রথম প্রকাশ,
আষাঢ়,১৩৩৭
দাম এক টাকা]
প্রিন্টার—শ্রীশশধর ভট্টাচার্য্য
মাসপয়লা প্রেস
১৫/এ,ঝামাপুকুর লেন,কলিকাতা
বসন্তের এক রঙীন্ ভােরে
হঠাৎ সেদিন আমার দোরে
গাইলাে এসে ছােট্ট সে এক টুনটুনি ;
আপন মনে অবুঝ ভাষায়
খােশ খেয়ালে গান গেয়ে যায়,
অবাক হয়ে একমনে সেই গান শুনি’
কাকাতুয়া তােতার মত
জানেনা গান অত শত,
শেখা-বুলি তাইতে টুনি গাইলােনা
বুকের মাঝে যে গান ছিল,
সরল ভাষায় শুনিয়ে দিল
পড়া-বুলি শুনাতে সে চাইলাে ন
l০
ছােট্ট-পাখীর ছােট্ট কথা
উদাস প্রাণের আকুলতা
গানের সুরে ছড়িয়ে দিল দিল খুলি’
যে যা পারে বলুক না ভাই
সহজ গানের মূল্যটা তাই
আমার কাছে পড়লো ধরা বিস্কুলি।
গিরিডি
১৩৩৪, চৈত্র
সূচী :: :: ১ ৪ ৯ : : : : * * * ১৮ ২০ : : : ২৩ ২৬ ২৮ টুনটুনি পথ-চলার গান বাদল-মাদল মেঘলা দিনে জংলা-সুর চাদূনী-রাতে আবার আলাে ঝলমলালাে পূজার বাজার শীতের গীত বনের নিরালায় ভাোয় গায় হলুদ চাদ হারানাে সুর নব-হিল্লোল চল্ রে পথে কিশাের-দ খােকা-কবি আমি যেন ভাই চৈতের হাওয়া ঘূর্ণিহাওয়া যুঁই তুই দোল দোল সাঁওতাল-মেয়ে :: ৩৭ ৩৯ ৪২ 88 ৪৮ ::
-
চলতি পথের গান
দূরের পাড়ি
৫৭
৬১
৬৩
৬৪
চৈত-বিদায়
অতসী
ভােরবেলায়
ঘুম-পরী
পরীর দেশের মেয়ে
“হুম্পাহুমার পাল্কী চলে
টুনটুনি গায় গান
ও ৪ ঃ ং ২ ৪ ৪ ?
৬৭
৬৯
৭৩
টুনটুনি গান
টুনটুনি
নীড়ের মালিক শালি-পাখীর মেজাজ, বড় চটা,
চক্ষু করে কটা,
বল্লে সে আজ লাটসাহেবের চালে,
“বটের সারা ডালে
আমার একাই দাবী,
যা’ পালা এক্ষুনি
গাছের থেকে নাবি’
মুখপুড়ী টুনটুনি !
টুনটুনিটা বেজায় ভীতু একেবারে ভয়েই হােললা সারা,
নেহাৎ গাে-বেচারা
ছােট্ট পাখী কিনা!
করবে সে কি ?-নড়চড়-বিন
রইল শুধু বসে
মনেরই আফশােষে।
.
টুনটুনির গান
হঠাৎ জোরে, বেগে
দুষ্ট ছেলের ঢিটি এসে লেগে
ডালের শালিক, পাখী
কাতর স্বরে ডাকি
পড়লাে এসে ভূয়ে,
ছুঁয়ে ছুঁয়ে ছুঁয়ে
রক্ত-ধারা পড়লাে তাহার বুকটি ছেয়ে ছেয়ে !
শিটি বেয়ে বেয়ে !
বাজলাে ব্যথা টুনটুনিটির কোমল-কাতর-বুকে,
ঝুকে—
দেখল-শালিক খাচ্ছে যেন খাবি ;
এক্ষুনি সে মরূবে এবার ভাবি’
ঝট্ করে সে পাশের দীঘির শীতল বারি আলে ঠোটে করে ;
ধরে’-
জল খাওয়ালাে, ঝাপটে ডানা করলে তারে হাওয়া,
ছােট্ট ডানা ছড়িয়ে দিয়ে ধরুল মুখে ছাওয়া
যে করে’ হােক বাঁচলাে শালিক, উঠলাে তখন জেগে,
টুনটুনিরে সামনে দেখে বল্লে রুখে রেগে--
—“ওরে লক্ষীছাড়া!
ঘুম ভাঙ্গালি !—আচ্ছা তবে দাড়া
হদ্দ ভেড়ের ভেড়ে—
এই না বলে উঠতে গিয়ে চোখ রাঙ্গিয়ে তেড়ে
টুনটুনি
মটুকে গেল ঘাড়খানি তার হঠাৎ ভারী দুর্বলতায়,
রাখবে এবার কে বল তায় ?
হাঁ করে সে রইলাে ভূয়ে পড়ে।
মচকে গেল মরে’
টুনটুনিটা তারই একটি ধারে
চুপটি করে দাড়িয়েছিল, বুঝতে নাহি পারে
ব্যাপার কি যে হােলাে-
হয়তাে বা তার নিজের দোষেই শালি-পাখী মােলল !
পথ-চলার গান
| সাঁওতালী ভাবে ]
তাজা প্রাণে মাদল বাজা উদাস দুপুরে,
ঝিমায় কে হায় এই অবেলায় দাওয়ার উপুরে,
বাজা বাজা মাদল বাজা,
আজকে মােরা গানের রাজা-
“ঝুমুর ঝুমুর বাজবে ঘুঙুর পায়ের নূপুরে ;
বাজা বাজা মাদল বাজা
আজকে মােরা গানের রাজা
রইব না আজ চুপটি করে’ এ কুটীরে,
মাঠের বাকা পথটি ধরে চলব ছুটি’ রে—
মটর ক্ষেতের মধ্য দিয়ে
চব মােরা হহনিয়ে
মুঠো মুঠো তুলব ক্ষেতের মটরশুটি রে।
বাজা বাজা মাদল বাজা
আজকে মােরা গানের রাজা।
৪
পথ-চলার গান
আকুল কোকিল ঢালবে অঢেল গানের সুধা রে
‘সুনসুনিয়া’র হদে কুসুম দুলবে দু’ধারে।
আমরা দুজন উঠব মেতে,
চলব পথে উল্লাসেতে
ভুলব মােরা বিকুলি আজ পিয়াস-ক্ষুধা রে।
বাজা বাজা মাদল বাজা
আজ কে মােরা গানের রাজা।
চলব মােরা দুলকি চালে আততা চরণে,
হদে কাপড় আঁট করে’ ভাই থাকবে পরণে,
দূরে দূরে গগনতলে
দিনের চিতা উঠবে জ্বলে-
পাল্টা সুরে গান গা’ব ফের নতুন ধরণে।
বাজা বাজা মাদল বাজা
আজকে মােরা গানের রাজা।
সাঁঝের প্রদীপ উঠবে জ্বলে সকল কুটীরে
ফিরবে সবাই, ফিরব না আর আমরা দুটি রে ;-
সূর্য্যি মামা অস্ত যাবে,
অন্ধকারে পথ মিলাবে
আমরা তবু চলব দু’টি গুটিগুটি রে।
বাজা বাজা মাদল বাজ৷
আজকে মােরা গানের রাজা
;
টুনটুনির গান
বন্-মেহেদীর জংলা গাছে ডাবে পাপিয়া
ওই সুরে ফের জাগবে গীতি পরাণ ছাপিয়া ;
ঝাপসা নিঝুম্ নদীর ধারে
চল্ রে ঐ নীল্ পাহাড়ে
আ মােলল, তাের চলতে চরণ উঠছে কঁপিয়া।
বাজা বাজা মাদল বাজা
আজকে মােরা গানের রাজা।
( মাদল—ধিতাং ধিতাং তুর ধিতাং...... )
বাঁশীতুতু-তু-আ তু-উ উউ......
৬
বাদল-মাদল বাঁশঝাড়ে ওই শব্দ শােন, এলাে ঝড়-বাদল ধর মাদল গান্ বাজা তা বশীর, গ্রাম-বাসীর প্রাণ, তাজা। (মাদল-ধিন্ তা, ধিন্ তা, ধিন্ তাতা) ওই শস্ ছাড়ে কোন্ বাতুল ? নিশ্বাসে ফিফাসে মন্ আকু। (মাদল ধিন্ তাতা, ধিন্ তাল, ধিন্ তাতা) গ্রাম-কোণে আম-বনে ঝাতে মন, মাতে স্তব্ধ মন- (মাদল-ধিন্ তা, ধিন্ তাতা, ধিন্ তাতা) নাহি রাশ মানে আশ মানে মেঘ চপল; खर्ट ধানক্ষেতে গান-মেতে ভেকু সকল! (মাদল-ধিন্ তাতা, ধিন্ তাল, ধিন্ তাতা ) মর্মরি’ ঝঝরি’ বন, কঁপায় ! বহে পূর্ব বাতাস, খুব সাবাস, মন, মাতায়। (মাদল-ধিন্ তা ধিন্ তাতা, ধিন্ তাতা) ঝুমকো ফুল চুমলাে ধূল, ফুল ঝরে - ডাল মটকালাে ছট্কালাে, ধূল, ওড়ে ( মাদল-ধিন্ তাতা, ধিন্ তাতা, ধিন্ তাতা) sov ৭
টুনটুনির গান
এলাে ঝড়, বাদল বর্ষাজল
ঝরূছে রে-
এলাে
ঝড়, বাদল
ঝর্ণা-তল
ভরছে রে।
( মাদল-ধিন্ তাত, ধিন্ তাতা, ধিন্ তাল)
আরাে ঝড়, জাগে- ডর লাগে ? ভর কি তাের।
আরে ঈস পাগল, দিস আগল ঘর ভিতর !
( মাদল-ধিন্ তাতা, ধিন্ তাতা, ধিন্ তা )
এলাে বালা ঘাের ; পাগলা তাের কোন রে কাজ !
ওই
সুর সুরু ঝুর ঝুরু
শােনরে আজ।
(মাদল-ধিন্ তাতা, ধিন্ তাতা, ধিন্ তা )
সুরু শাল বনে তা বনে বাদল ঝড়
আজ বৈকালে
মালা ধর।
( মাদল-ধিন্ তাতা, ধিন্ তাতা, ধিন্ তাতা)
দিল্ খুলি’ ; বিলকুলি প্রাণ, তাজা
তােরা গান, বাজা গান, বাজা গান, বাজা।
( মাদল-ধিন্ তা, ধিন্ তা, ধিন্ ধিন্ তা
বশীভূ-আ-তৃ, ভূ-আ-তু, ভূ-আ-তৃ...)
. ঐ তালে
৮
মে দিনে মেঘ করেছে ভাই, জোর ছুটেছে তাই। ভােরের বেলা উঠেই দেখি বালা দিনের পাগলা হাওয়া থমথমে ঘাের জমাট, আঁধার, বাদল বুঝি নামবে এবার ; হঠাৎ যেন ইসে-গুড়ির ভােরের বেলা উঠেই দেখি আসার আভাষ পাই। মেঘ করেছে ভাই। মাতায় কেরে ঐ ? কেমন করে রই। গান গেয়ে আজ পাতায় পাতায় আসে হয়ে ঘরের ভিতর পথের পাশে ঘাসে ঘাসে বাদল দিনের খবর আসে, শাপলা ফুলে দুলে দুলে ভােরের বেলা উঠেই দেখি নাড়ছে মাথাটাই ; মেঘ করেছে ভাই। বিলের কিনারায় বলল এসে ঠায় ; ঘর পালিয়ে ভোদড়, ভুলে মাছ ধরতে চুপে চুপে মেঘের ধূসর ফাটল দিয়ে, উঠতে “মামা” ঝিমিলিয়ে আবার মেঘের খুঞ্চি-পােষে ভােরের বেলা উঠেই দেখি ঢাকলাে সহসাই। মেঘ করেছে ভাই।
টুনটুনির গান দোল-পাত্তা খেলবি কেরে জা করে আজ, চল্ চলে যাই একটি ছুটে ছাতিম বনের মাঝ ; ছাতিম গাছের মাথায় ছাতি তার তলে আজ মাতামাতি ; রবিবারের ছুটি রে আজ লুটোপুটি খাই; ভােরের বেলা উঠেই দেখি মেঘ করেছে ভাই। হাবুল টেপু রে— সবুজ ভেপুরে। “শটী” গাছের বাঁশী বাজায় গড়ছে ভােলা কলাপাতার নালা ডােবার ধারে ধারে- ব্যাঙ ডেকে যায় বারে বারে,- ঝড় ঝাউয়ের ঝড়ে ঝড়ে ভােরের বেলা উঠেই দেখি গান জাগে শাঁই শাই ; মেঘ করেছে ভাই। মন্ হােলাে চঞ্চল, ছেলে মেয়ের দল ; মেঘলা দিনের আবেশ লেগে ‘আয় বৃষ্টি’ ডাক্লাে আকুল নামবে এবার বৃষ্টি ধারা গরম যাবে সৃষ্টি-ছাড়া, বসে বসে ব্যাকুল হয়ে ভােরের বেলা উঠেই দেখি বাদলা-গীতি গাই ; মেঘ করেছে ভাই। পারুল-ভাঙ্গার ঝিল,- করতেছে ঝিমি— গাজন-তলার হাটের শেষে মেঘের ফাকের একটু আলােয় মন্ মানে না একটু বারণ— আয়রে গণেশ, আয় নিবারণ, ১০ মেঘলা দিনে তেপান্তরের মাঠের শেষে ভােরের বেলা উঠেই দেখি উধাও হয়ে যাই। মেঘ করেছে ভাই। ঝর-ঝরানির গান করব রে আজ স্নান- শােন্ দেখি ওই ! ওই যে দূরে আসলে বাদল, আদুল্ গায়ে “টাপুর টুপুর” নামলাে ধারা আলকী বন কেঁপেই সারা, হাততালি দ্যায় খেজুর শাখা ভােরের বেলা উঠেই দেখি খুশীর সীমা নাই। মেঘ করেছে ভাই।
জংলা-সুর
---
বন্-পাহাড়ী, জংলা ভারী
আংলা-বুড়াের দেশ,
উচু নীচু ঘাসের জমি
-পথের নাহি শেষ।
ফাগুন বেলা শেষ হয়ে যায়
আগুন-হাওয়া বয়-
সন্ধ্যা-রেতে জাগতে পারে
ভূত, পেরেতের ভয় !
স্কন্ধকাটার নাম শােনা যায়
অন্ধকারেই ভাই,
মামদো-দানাের ভয় এড়িয়ে
জদি চলল তাই।
জংলা দেশের ঠিক কি বল ?
মঙ্গলা ভায়া জলদি চল
জলদি চল।••••
১২
জংলা সুর (মাদল-দিপি দিপাং দিপিন্ দিপাং দিপি দিপাং তাং- বাঁশী-তুতুর তু আ উতু তু আ তুতু তু আ তু..••••) ডাইনে রঙীন রঙন, কুসুম, তাই নে তুলে ভাই, বােনের খোঁপায় সাজবে তােষা, বাড়বে বাহার তাই। এই যে পাশে ঝাড়ের ঘাসে বেগনী বুননা ফুল বােনের কাণে বনের ফুলে ঠিক ইরাণী-দু। তাই তুলে নে আলতাে করে জলদি চলে চল সাঁঝের আগেই পার হওয়া চাই এই বুনাে-জঙ্গল। জংলা দেশের ঠিক্ কি বল- মঙ্গলা ভায়া জদি চল্ জদি চল্।•••••••• (মাদল-দিপিন্ দিপাং দিপি দিপাং দিপির দিপাং তাং- বাঁশী তুতুর তু আ উতুর তু আ তুতুর তু আ তু.•••••) ঘূর্ণি হওয়ার ঝটকা লেগে ঝরলাে পাতার দল। ঘূর্ণি হাওয়ার ঘুরূণ পাকে মন্ হােলাে চঞ্চল। ১৩ টুনটুনির গান শালের বনে ডালে ডালে কাপন লেগে যায়- কোন্ উদাসী পলাশ-তলায় ভীম্পলাশী গায় ? ল্যাজ-ঝোলা ঐ কুবাের-দলে করছে কোলাহল- হদি গাঁয়ের পথটি ধরে জদি চলে চল্ । জংলা দেশের ঠিক্ কি বল, মঙ্গলা ভায়া জলদি চল- জদি চল্।•••• (মাদন্স—দিপি দিপাং দিপি দিপাং দিপির দিপাং তাং- বাশী-তুতুর তু আ উতু তু আ তুতুর তু আ তু......) ঝরা পাতায় পথ ঢেকেছে, হায় হােলাে মুশকিল শিরশিরিয়ে উঠছে দূরের ‘শিরশিরিয়ার ঝি। ওরই পাশের মাঠ টি যেন জানা জানা ঠিক ছােটুকু মাঝির ভিটে ছিল ওরই কোনাে দিক। এমনি দিনে ছােটুকু মাঝি বাঘের পেটে যায়- ১৪ জংলা সুর এমনি দিনে, এম্নি বেলায়, এমনি নিরালায়। জংলা দেশের ঠিক কি বল— মঙ্গলা ভায়া জলদি চ জলদি চ••••••• ( মাদল-দিপির দিপাং দিপির দিপাং দিপি দিপাং তাং- বাঁশী-তুতুর তু আ উতুর আ তুতু তু আ তু.••••• তু ) মরা-নদীর চরায় কঁদে অধীর কবুতর ঘূর্ণিপাকের দূর্বিপাকে ভাঙ্গলাে যে ওর ঘর। হুমকি শােনাে হুতুম্থুমাের ফুলিয়ে ডুমাে গাল, পালায় দূরে ‘হুড়ার’ ফেরু-পাল। বট-মহুয়ার তলে তলে “হুয়া হুয়া” রব, খা খাকিয়ে উঠছে দূরে খ্যা-শেয়ালী সব। ব-ফেরারী জংলা দেশের ঠিক কি বল, মঙ্গলা ভায়া জলদি চ- জদি চল্।••••• ১৫ টুনটুনির গান (মাদল-দিপির দিপাং দিপিন্ দিপাং দিপির দিপাং তাং- বাঁশী-তুতুর তু আ উতুর তু আ তুতু তু আ তু••••••) ঐ দেখা যায় ধূসর পাহাড় “ভাদুই বুঢ়” নাম। বন্ পেরিয়ে, ভয় এড়িয়ে চলরে অবিরাম করলে দেরী মা-বােনেরা ভেবেই হবে খুন- যত্ন করে রেখে দেছেন পাস্থা-ভাত আর মুন্। মুলী বাজা জোরসে ভায়া, মালা বাজাই জোর পৌছে যাব গাঁয়ের ঘরে সাঁঝ, না হতে ঘাের। জংলা দেশের ঠিক কি বল, মঙ্গলা ভায়া জলদি চল, জলদি চল,। (মাদল-দিপি দিপাং দিপির দিপাং দিপি দিপাং তাং- বাঁশী—তুতু তু আ উতু তু আ তুতুর তু আ তু......) ভাইয়া বাজা মুরূলী মধুর ভাবনা কিছু নাই মাদল বাজাই সঙ্গে আমি, চলুরে তালে ভাই।
জংলা রে
আংল-বুড়াে বনের রাজা
করব তারে জয়,
দুষমন্ সব থাকবে দূরে
আর বা কারে ভয়?
বেলা-শেষের লালিম্ আভা
রাঙলল গগন-তল,
হলদি-গাঁয়ের পথটি ধরে
জলদি চলে চল!
জংলা দেশের ঠিক কি বল,
মঙ্গলা ভায়া জলদি চল,
জলদি চল।•••••
.......
( মাদল-দিপিন্ দিপাং দিপির দিপাং দিপির দিপাং তাং-
বাশী-তুতুর তুআ উতুর তু আ তুতু তু আ তু
**
}
১৭
চানী-রাতে
চাদ উঠেছে নিঝুম রাতে
অশথ গাছের আড়ে,
ঝিলমিলিয়ে ঝিলের বারি
উঠছে বারে বারে।
অথির বাতাস পাতায় কঁপায়,
দোল লাগে চাপায় চাপায়,
সুর-হারা ওই ঝিল্লী হােয়
হানা-হানার ঝাড়ে,
চাদ উঠেছে নিঝুম রাতে
অশথ গাছের আড়ে।
দিগন্তরের রেখায় রেখায়
আলােয় মাখামাখি,
জ্যোৎস্না-মাতাল চক্ৰবাকের
আকুল ডাকাডাকি।
ঝােপ-কিনারে ফড়িং ঘুমায় ;
জাগল তারা আলাের চুমায়,
চাদনী-রাতের সুর মূরছায়
সবুজ মাঠের পারে ;
চঁদ উঠেছে নিঝুম রাতে
অশথ গাছের আড়ে।
১৮
নী-রাতে
খি দেওয়া ঐ আঁধার ঘরে
সুপ্তি-মগন কে রে?
দুয়ার ধারে চন্দ্র-লােকের
ক এসেছে যে রে।
বন্ধ কেন অন্ধ-কারায় ?
ডাক দিয়েছে লক্ষ তারায়,
সুপ্তি ছেড়ে আয় চলে আয়
মুক্ত মাঠের ধারে-
আলাের ঝোরায় স্নান করে আজ
ধষ্ট হয়ে যাবে।
আবার আলাে ঝলমলালাে
আবার আলাে ঝলমলালাে
আবার ধরা আকুল-করা
উষার আলাে আকাশ চিরে
কাঁচা রােদের ঝিলিমিলি
আবার আলাে ঝলমলালাে
শাদা মেঘের ফাকে ফাকে
আলাের আমেজ মাখে মাখে।
ঠিকরে পড়ে বিশ্ব ঘিরে,
পাতায় পাতায় শাখে শাখে ;
শাদা মেঘের ফাঁকে ফাঁকে।
=
রঙীন ফুলের ফুলঝুরি আজ
ফুরফুরে বায় সুড়সুড়ি দ্যায়,
মৌমাছিরা হেনার ঝড়ে
ঘুম-কুড়িদের ঘুম্ ভাঙাতে
আবার আলাে ঝলমলালো
গুলবাহারী গাছে গাছে,
ফুলকুঁড়িরা নাচে নাচে।
মাে-বাটিতে
চুমুক মারে ;
চুম্-কুড়ি দ্যায় ঝাঁকে ঝাঁকে
শাদা মেঘের ফাঁকে ফাঁকে
শিউলি ফুলের বোঁটু খসেছে, পড়ছে ঝরে চুপে চুপে,
পথের পাশে সবুজ ঘাসে
ঐ জমেছে পে স্তপে,
সামলে চলিস, মাড়াস্ না রে, আয় চলে আয় একটি ধারে,
আগােছে আয়, কুড়াই আজি, সাজাই সাজির থাকে থাকে,
আবার আলাে ঝলমলালাে শাদা মেঘের ফাঁকে ফাঁকে।
আবার আলাে ঝলমলালে শালুক-ফুলে ঠোকর মারে দু ধরেছে তার নয়নে প্রজাপতির অথির পাখা দোলন, লাগে কাশের রাশে, আবার আলাে ঝলমলালে শালিখ পাখী মাঝে মাঝে, মাে-মদিরার ঝাঁকে ঝাঁকে। দায় হােলাে তায় সামলে রাখা, দোলায় মাথা লাখে লাখে শাদা মেঘের ফাকে ফাকে। পাতার পাশে পারুল হাসে, কেয়ার কলি ফোটো ফোটো- ও মালতী, ভাের হােলল ভাই, চোখ মেলে চাও, ওঠো ওঠো, হাওয়ায়-কাপা চাপার শাখে উদাস সুরে দোয়েল ডাকে, আবেশ লাগে কোয়েল-বধূর ঢুলু ঢুলু আঁখে আঁখে, আবার আলাে ঝলমলালাে শাদা মেঘের ফাঁকে ফাঁকে। জান লা কপাট দে খুলে দে, ঢুকুক আলাে ঘরে ঘরে, নাশুক আঁধার, হাসুক আলাে, আসুক হাওয়া থরে থরে। টাটকা হাওয়া, টাটকা আলাে মন-মরাদের লাগবে ভালাে, জড়ের মতন ঘরের ভিতর কে ঐ নয়ন ঢাকে ঢাকে। আবার আলাে ঝলমলালাে শাদা মেঘের ফাঁকে ফাঁকে। মন চলে যায় ভেসে ভেসে পা মেঘের মােহন ভেলায় হাল্কা হাওয়ায় ঘুরে বেড়ায় কেউ জানে না যার ঠিকানা রং-তুলিতে কল্পনা মাের আবার আলো ঝলমলালাে স্বপন-হাওয়া দেশে দেশে পথের খবর নাইক জানা আপনা তার আঁকে অকে শাদা মেঘের ফাকে ফাকে।
টুনটুনির গান
বাটের বাউল বাজায় বীণা, পথের পথিক চলে চলে
ঘর-ছাড়াদের মন মেতেছে, ঘর ছেড়েছে দলে দলে।
দূরের সবুজ মাঠটি জুড়ি
আলােয় ছায়ায় লুকোচুরি
কোন উদাসী বাজায় বাঁশী ভরা নদীর বাঁকে বাঁকে
আবার আলাে ঝলমলালে শাদা মেঘের ফাকে ফাকে।
আবার আলাে ঝলমলালাে
উলসে ওঠে উল্লাসী মন
ঝলমলালাে শরৎ-ভােরে
হাত ছানি দ্যায় আকাশ বাতাস
শাদা মেঘের ফাঁকে ফাঁকে।
আর কি ঘরে থাকে থাকে।
প্রাণ যে আমার আকুল করে
শাদা মেঘের ফাঁকে ফাঁকে।
২২
পূজার বাজার আজি এই পূজার দিনে, যা খুশী আতে কিনে মা দিলেন পয়সা আমায়, নিয়ে তাই রাস্তা চলি আমি আজ কৌতূহলী কি কিনি ভাবছি তা ঠায়। গেলাম চলে বাজারে দেখি ভাই সদল বলে- কত লােক কত কি করছে বাজার, কিছে আলি’- পুতুল-বাণী, হাজার হাজার। খেলেনা : কত সব বুদিয়া কত কি আমারে দোকানী বাবু সাব, কিছে সরেশ ক্ষীর দরবেশ কিনছে মিঠাই সামনে দেখে বছে হেঁকে তােমার কি চাই?
পূজার বাজার কি কিনি ভাবছি আমি, কত কি সস্তা দামী দেখে সব চক্ষু ধাধায়। ঝমাঝম বাজ ছে কাসর জমেছে মায়ের আসর আবেগে গড় করি’ যায়। ! ও পাড়ার কিনেছে আমারে বে। করে নিমেষে হাবুল, গানুশ, লাট্ট, ফানুস দেখায় এসে। লাটু, ঘুরায় ফানুস উড়ায় দেখে সব মরছে হেসে। অদূরে সকরুণ রয়েছে একটি ছেলে- চোখ টি মেলে- মুখটি নীচু। কাঁদন সুরে হাতটি জুড়ে ভিক্ষে কিছু মিনতির বলে সে “বাবু দে “সারাদিন দু’ মুঠি খাইনি যে গাে- ভিক্ষে দে গাে ক্ষুধার জ্বালায় মরি যে २8 পূজার বাজার আহা তার আঁখি-জল শরীর কাপে নয়ন ছাপে কঁপছে যে হায়। কথা তার গায়ে তার অঝোরে মেখেছে ছিন্ন বসন- ঝরছে নয়ন পথের ধূলি ; ভিড় ঠেলে, ভাই সামনেতে যাই, পয়সা গুলি। দেখে তাই আমি তার দিনু তায় কিনে আজ যে টুকু সে টুকুর আজি এই যা প্রীতি আহা তার খেলনা শত স্ফৰ্ত্তি হােততা মূল্য কি ভাই ? ক্ষুদ্র দানে জাগছে প্রাণে মুল্য যে নাই। উল্লাসে কয় আমার তনয়- শুনে মা “ওরে তুই এ কথা' পুলকে ওরে তুই পেয়েছি ভাবতে মনে, বুক ভরে যায়। আয় বুকে আয় শুভক্ষণে। २६ শীতের গীত ঠক ঠকা ঠক্ হাড়-কাঁপানি যায় বুঝি হায় প্রাণটা ; উত্তরে বায় বইছে তােড়ে বাপ, কি ভীষণ ঠাণ্ডা । সন্ধ্যা উষায় হিম্ কুয়াসায় বিশ্বখানি ঢাছে ; সর্দি লেগে হদ্দ লােকে “হাচ্চো” করে’ হচছে। কন্ ক ক ঠাণ্ডা হাওয়ায় হাত, পা ফেটে চুর চুর- ঠাণ্ডা লেগে কাটা টাটায় প্রাণটা করে সুড় সুড়। গাছ-পালা সব শিউরে কঁপে শীতের দাপে বি কুল ঠাণ্ডা জলে নাইতে গেলে চক্ষে দেখি তিল্ ফুল। ২৬
শীতের গীত
ছেলের দলে চুপটি করে
লেপ, জড়িয়ে চিতপাত,
ঢং ঢং ঢং আটটা বাজে
নাইক তাতে দৃকপাত।
ঝাপড়া ঝােপের ঝুমকো ঝাড়ে -
কোকিল বুঝি ডাকলাে ?
অন্তরে তার বসন্তের-ই
আমেজ বুঝি লাগলাে ?
আর কেন ভাই, দিন পনেরাে
থাক্ না সয়ে কষ্ট ;
ফাগুন রাণীর আগুন-হানায়
শীত টি হবে নষ্ট।
বনের নিরালায়
ঘুমাও ঘুমাও রাখাল ছেলে গাছের তলাতেই,
শ্রান্ত বুঝি চরণ তােমার,ক্লান্ত চলাতেই ?
দুর্বাঘাসের সবুজ শ্যামল, কোমল বিছানায়
ঘুমাও ঘুমাও রাখাল ছেলে বনের নিরালায়।
ঘুম পাড়াতে প্রকৃতি মা দিলেন পেতে কোল
ঘুমাও, ঘুমাও রাখাল ছেলে, করবে না কেউ গােল।
রাখাল ছেলে ছায়ায় শুয়ে আঁচল পেতে তার
শুনছে যেন বাজছে বাঁশী ধানের ক্ষেতে কার ?
উত্তরী বায় দোলায় উত উত্তরীয় খান্,-
শুনতে পেলে দূর এলেকার অােেহরের গান।
আশে পাশে ঘাসের ফুলে ফড়িং দোলা খায়,
প্রজাপতির রঙিন্ ঘুড়ি কোথায় উড়ে যায় !
কেউ জানেনা তার ঠিকানা, কেউ রাখেনা খােজ,
কার তরে ভাই ঝি ঝির দলে গুমরে মরে বােজ!
ওপার হতে ডাকছে ঘুঘু একঘেয়ে তার স্বর
এপারে তার প্রতিধ্বনি জাগছে নিরন্তর।
ভিগা দেশের চাষার মেয়ে আলের পথে যায়,
রাখাল ছেলে আবেশ-চোখে মিটি মিটি চায়।
এপার ওপার দুই-গাঁ প্রদেশ,-মধ্যে নদী বয়
শাদা কাপড় জড়িয়ে গায়ে বালুর চরা রয়।
সর্ষে ফুলের সােণার টোপর পড়লাে রে কোন্ বর,
নতুন কনের লাচে চেলী দুলছে ক্ষেতের পর।
২৮
বনের নিরালায় শালের বনে দোল্ দিয়ে যায় দামাল ছেলে কোন্ ভেবে ভেবে রাখাল ছেলের আকুল হােলাে মন। কালাে কালাে পাথর-পাশে পাথরকুচির ঝাড়, তারই ঝােপে টুনটুনিটা মুখ করেছে বার। . ডানায় তাহার ওড়ার নেশা প্রথম যেন আজ ভাবছে মনে উধাও হবে নীল আকাশের মাঝ । ঐ যেখানে বক উড়ে যায়, খায় চিলে ঘুরূপাক- ঐ যেখানে সবুজ টিয়ের মাতাল-করা ডাক- ঐ যেখানে মেঘের ভেলা হাওয়ায় ভেসে যায়, ভাবছে টুনি সাঁতার কাটে ঐ আকাশের গায়। দুষ্ট মা তার কোথায় গেছে,ভুলিয়ে রেখে, ছাই, শুবে না সে মায়ের মানা, চলবে উড়ে, ভাই। নীড়-ছাড়া আজ প্রথম টুনি-জাগছে আবার ভয় ওড়ার নেশা মনেই চেপে ঝােপের আড়েই রয়। সােণার ধানে পেটটি ভরে ঠাণ্ডা করে প্রাণ আন্তা-পাটি সিমের ঝাড়ে—শালিক গাহে গান্। ঝরে ঝরে’ শিউলী এবার বিদায় নিয়ে যায় শিউলি ফুলের আসন এবার শিরীশ-ফুলে চায় ? রাখাল ছেলে দেখছে চেয়ে,লাগছে চোখে দুল, মুখের উপর পড়ছে উড়ে দীঘ কালাে চুল। বাঁশের বাঁশী পাশেই পড়ে’-বাজায় না সে আর, পাখীর সুরে বাঁশের বাঁশী হার মেনেছে তার।
ওলাে
ভাোয় গায়
শােত্ ওইগুন্ গুন্
ভােয় গায়-
গুবিবি, ফুণী
তােমরা কোথায় ?
ভােয় গায়।
দারু-বীথিকায়
চারু গীতি গায়
শােননা
ঘুরে
তারা
ওই
গুঞ্জন ভেসে আসে
তারা
হাওয়ায় হাওয়ায়।
ভােগ্রায় গায়।
পউষ ঊষায় আজ হিম্ ঝুরেছে,
ঝি-লাগা নিম্ ফুলে মৌ চড়েছে
তারা
গান জুড়েছে।
ঘুম ভাঙালাে,
ধূম্ লাগালাে,
চুম্ খায় ঘুম্-যাওয়া
ঝুমকো গাঁদায়।
ভােমরায় গায়।
তারা
মহা
মেহে
শােনাে
ভােমরায় গায় গগনের গায় লাল ছােপ, লাগেনি দুলু ঢুলু চোখ কারঘুম্ ভাঙেনি। ওরে ঘুম ভাঙেনি। পাস আসে ওই দ্যাখ, তারা তােরা গীতের আভাস্? শীতের বাতাস, হাসনা-হানার বাস হাওয়ার বাওয়ায়। তােমরায় গায়। জাগাে জাগাে ফুলরাণী ঘুমাস্ নে লো তাের দোরে আজ ভােরে অতিথি এলো, ওই অতিথি এলাে। ভৈরবী গায়, কৈ রবি’, হায় * খোঁজাখুঁজি করে বুঝি কিরে চলে যায়। ভােদ্রায় গায়। ঝর ঝর ঝরে মৌ মউয়া-বনায় মৌমাছি লুটে নেয় কণায় কণায় নেয় কণায় কণায়। জর্দা ভােরে পর্দা তােড়ে! রং জাগে গগনের নী পর্দায়, ভােমরায় গায়। শােন্ Jh কেরে নীল ওই শােনাে ৩১ টুনটুনির গান শােনাে তার আজ যেন বীণে তাতে তার চির ভােয় গায় । পুষ্পে লতায়-- মধু-গুঞ্জন- হরে প্রাণ, মন্। ওস্তাদে গায় মীড় খেলে যায়। নৃত্য করে চিত্ত হরে, প্রাণে কি আশা ? মৌ-পিয়াসা। তাই ছুটে যায় আনন্দে মৌ লুটে পিপাসা মিটায়। গুন্ গুন্ এন্তার গুণ তার গায়। রুম্ ঝুম ঝুম ঝুম্ ঘুঙুর বাজায়, তােমরায় গায় ভােমরায় পায়। ফুলে দুলে । সাথে , শােনাে শােনাে ৩২ হলুদ চঁাদ “বুবদিদি তুই চাদ দেখেছিস্?”—উমা ডেকে বলে দিদিরে তার, ঝিমি ঝিমি সঁঝে ঝি ঝির আসরে রিমি ঝিমি ঝিমি বাজে সেতার। নিঝঝিম্ পাড়া,-হি সিম্ লাগেঢিমে হি-হাওয়া গান্ শােনায়, রাঙা চঁাদা-মামা ওই দিল হামা, সাঁঝ-আকাশের এক কোণায়। “শ্চাদ দেখে যাও,—ঈ কত বড়?” উমা ডাকে—“দিদি দেখবি আয়। মহুয়ার ডালে পাতার আড়ালে ওই বুঝি মামা আটকে যায়।” মা ডেকে বলেন—“উমা আয় আয়, লাগানে হিম,খেয়ে যা দুধ—” উমা বলে-“মাগাে, আগে দেখে যাও,চাদের যে আজ গায়-হলুদ। চাদা-মামা সে তাে তােমারই ভাই মা, তাই মা তােমায় খোঁজে বুঝি, পৃথিবীর যত বােন্ আছে তার—আজকের সাঁঝে ফেরে খুঁজি। –এসো মা দৌড়ে, বুবদিদি আয়,—চাদা-মামা দেয় হাতছানি ঝিলিমিলি আলো বিলিয়ে বিলিয়ে মেতে ওঠে যেন রাতখানি। স ধোয়া জমে আসে এপাশে ওপাশে, কুটিরে কুটিরে জ্বলে আগুন্ জড়াে সড়াে হয়ে জমে চারিপাশে চাষাদের ছেলে কেঁপে যে খুন্। চাষার ছেলেরা গান ধরে আর চাষার মেয়েরা ধরিছে ভুল,- চাষার মেয়েরা নাচে দুলে দুলে-চাষার ছেলেরা হেসে আকুল। সুর ভেসে আসে হাওয়ায় হাওয়ায়, হাসি আর গান শােনা যে যায়, দাওয়ায় দাওয়ায় গরীব চাষীরা সুখ-টান টানে ডাবা-হুকায়। দূরে কোথা জানি মাদল বাজেরে—হয় বুঝি কোথা ঝুমুর নাচ, আলাের রসেতে চুর চুর হােলাে মহুয়ার শাখা ডুমুর গাছ। -- টুনটুনির গান পিছনে আঁধার ডাহিন বাঁধার ফিকে করে আনে হলুদ-চাঁদ, কালাের ঝালর তুলে ঝলমল হেসে ওঠে যেন দূরের বাঁধ। ঝাউ-শাখা দোলেবায়ু হিল্লোলে লাউয়ের মাচায় আলাের ঢেউ, এদিকে আঁধার ওদিকে আলােক--এমন দেখেছ তােমরা কেউ ? চিক কলার পাতায় পাতায় আলাে ঢ ঢ পিছলে যায়- তাই তাড়াতাড়ি সাঁতারি’ সাঁতারি’ কাড়াকাড়ি করে সব পাতায়। কথায় জড়াননা ঝিয়ের মেয়েটা দুলে দুলে পড়ে আঙিনাতে, ওরে বুঝি আজ আবেশ লেগেছে, ঘুম ছেয়ে আসে আঁখি-পাতে। বড়দা ও ঘরে কি জানি কি লেখে—ছােড়দা দেখিছে ছবির বই- সেজদা দাওয়ায় গান গায় বসে—মেজদা এখনাে ফেরেনি কই। মা বসে রাধেন খিচুড়ী ও ভাজা, বুবুদিদি ভাজে আলুর চপ, ঠান্দি ওদিকে মালা নিয়ে বসে’ ইষ্ণদেবের করেন জপ। চাদার আমেজে বাঁধা পড়ে গেছে—ধাঁধায় পড়েছে উমাটা আজ, তাই সে লাফায় “আয়, আয়, আয়”—পউষের হিমে, সারাটা সাঁঝ, “আধা-আধি উঁদা উঠেছে এবার—মামার যে আজ গায়ে হলুদ ওমা ছুটে এসে,-যাও, না-ই এলে, কক্ষণাে আজ খাবনা দুধ।” ঝিমি ঝিমি সাঁঝে ঝি ঝির আসরে ঝিমি ঝিমি ঝিমি বাজে সেতার- “লক্ষীটি দিদি আয় আয় আয়”উমা ডেকে বলে দিদিরে তার। ৩৪
হারানাে সুর
শিউলী ফুলের গন্ধে রে ভাই জাগলাে স্মৃতি ছেলেবেলার
হারানাে সুর আসছে ফিরে সেই কবেকার ছেলেখেলার।
হারিয়ে-যাওয়া সেই সে তীরে
আবার যেন এলাম ফিরে
রূপ-কথারি রূপাের দেশে, সােয়ার হয়ে মনের ভেলার।
শিউলী ফুলের গন্ধে রে ভাই জাগলাে স্মৃতি ছেলেবেলার।
পাতার লুচি কাদার ভাতে স্বাদ পেয়েছি কত মধুর
ভাসিয়ে সে সব কালের স্রোতে, হায় এসেছি আজ কত দুর !
সমান প্রীতি সবার সনে,
আপন ছিল সকল জনে,
কোনােই তফাৎ ছিল না ভাই, সােণার ঢেলা মাটির ঢেলার।
শিউলী ফুলের গন্ধে রে ভাই জাগলো স্মৃতি ছেলেবেলার।
পাখীর ডাকে শুনতে পেতাম ঘর-ছাড়ানাে থির-ইসারা
হায়রে আজি লক্ষ ডাকেও তেমন করে দ্যায় কি সাড়া?
ডাক্ততা ঘুঘু নিঝুম বনে,
জাগতাে রে গান মনের কোণে
ঘরটি ছেড়ে যেতাম ছুটে স্বটি শুনে বন-কোয়েলার।
শিউলী ফুলের গন্ধে রে ভাই জাগলাে স্মৃতি ছেলেবেলার ।
টুনটুনির গান
স্পষ্ট চোখে দেখতে পেতাম চাদের বুড়ী চরকা চালায়,
দেখতে পেতাম তারার দেশে কারা এমন প্রদীপ জ্বালায়।
জ্যোৎস্না-ঝরা চাঁদনী রাতে
আস্ততা পরী ঘুম পাড়াতে ;
স্পষ্ট যেন শুনতে পেতাম আওয়াজ তাদের চরণ ফেলার।
শিউলী ফুলের গন্ধে রে ভাই জাগলাে স্মৃতি ছেলেবেলার।
সন্ধ্যাবেলা জ্বলতাে ঘরে মাটির প্রদীপ মিটিমিটির,
ভাইবােনেরা গলাগলি,কতই সােহাগ স্নেহ-প্রীতির।
মায়ের মুখের গল্প শুনে
কল্পনারি জালটি বুনে
ঘুমিয়ে যেতাম মায়ের কোলে, নয় সে স্মৃতি অবহেলার
শিউলী ফুলের গন্ধে রে ভাই, জাগলাে স্মৃতি ছেলেবেলার।
হায়রে আজি নাইরে সেদিন, পাইনা খুঁজে কোনখানেই ;
স্বর্গ নেমে যেদিন রে ভাই, কইত কথা ধরার কানেই ;
হঠাৎ দেখি ভােরের বেলা,
শিউলী ফুলের মােহন মেলা,
গন্ধে তাহার অতীত স্মৃতি মন টেনেছে আজ একেলার
আবার যেন এলাম ফিরে স্বপন-যুগে ছেলেবেলার।
নব-হিল্লোল
সহসা সেদিন রজনীর শেষে
দেখিনু নয়ন তুলে
দিগদিগন্তে ঘন-কুয়াসার
আবরণ গেছে খুলে।
জড়িত-নয়ন মুছি’ বারবার
আলাে ঝল্ম দেখি চারধার,-
সহসা একি এ নব-হিল্লোল
আমার পরাণে দুলে,
দেখিনু নয়ন তুলে।
কোরাণ-পুরাণ এক হয়ে গেছে
বাজে মৈত্রীর বাঁশী ।
কাশী এসে যেন সহসা দাড়ালাে
মক্কার পাশাপাশি
ব্রজ-রজঃ-রেণু উড়ে উড়ে এসে
হেজাজের পূত পথ-ধূলে মেশে,
উৰ্ম্মি-উছ গঙ্গা মিলিল
‘ফোরাত নদীর কূলে।
দেখিনু নয়ন তুলে।••••••
৩৭
টুনটুনির গান
ফকির ফুকারে আজান্ আজিকে
দূরে কোন, দরগায়,
শিব-মন্দিরে ‘হর হর ব্যোক
সেই রবে মিশে যায় ।
হাজী সন্ন্যাসী, সাধু ও ফকির
বাঁধ ভেঙে ফেলে নিজ গণ্ডীর ;
চিতার ভস্ম উড়ে এসে মেশে
কবরের কালাে ধূলে।
দেখিনু নয়ন তুলে।
;
নাহি হানাহানি, নাহি রাহাজানি
শুধু জানাজানি, ভাই,
এর প্রাণে বাজে ওর সঙ্গীত,
কোনাে গােলযােগ নাই।
চিত্ত-তীর্থ এই তাে হেথায়--
দেবতা-মানব এক হয়ে যায়,
প্রাণের-দেউল সদা মশগুল
প্রেম-ধূপ-গুগগুলে—
সহসা সেদিন রজনীর শেষে
দেখিনু নয়ন তুলে।•••••
৩৮
চল রে পথে কিশাের-দল
চলুক পথে কিশোর-দল,
জ্বলুক ওদের শিরায় শিরায়
রক্ত-তরল লাল অনল ;
ভীম ভৈরব সুর-যােগে
তুৰ্য বাজা দুর্যোগে,
জাগা প্রাণের সূৰ্য্যকে,
টুটিয়ে মনের মেঘ-মাদল।
চলুক পথে কিশাের-দল।
খােশ-খেয়ালে পথ চলুক
আপন তেজে জোর জ্বলুক,
স্থবির যারা যাই
বলুক,
মানিসনে ছাই মিথ্যা ছল
চরে পথে কিশাের-দল।
সামনে তােরা রাস্তা নে—
ঝাণ্ডা উডুক্ আশ মানে-
জাগবে কেন ত্রাস প্রাণে ?
ঝরবে কেন অশ্রুজল ?
চরে পথে কিশাের-দ।
টুনটুনির গান
প্রাণের নেশায় মত্ত হাে-
লক্ষ্য ওদের সত্য হােক,
সাবাস্ দেবে মৰ্ত্ত-লােক,
টুটবে পায়ের ওই শিকল।
চরে পথে কিশাের-দল ।
কিশাের তােরা সাচ্চা ভাই,
নাইকো এতে বাছ-বাছাই,
গান গেয়ে যা আচ্ছা তাই
দরে কাটা, চ চপ
চরে পথে কিশাের-দল।
চলরে নতুন ভঙ্গীতে;
জ্বরে আপন বহ্নিতে ;
বরে তােরা সঙ্গীতে,
“আমরা নবীন্ বীর সকল”।
চলুরে পথে কিশাের-দ।
ফ্যাল্ খুলে ফ্যাল্ মান্ধাতার
স্যাৎসেতে ঐ বন্ধ-দ্বার,
ছাপিয়ে দিয়ে অন্ধকার,
হাসবে আলাের শ্বেত-কমল।
চলরে পথে কিশাের-দ।
৪০
চলরে পথে কিশাের-দল কিশাের হ’বার গর্বব ভাই জাগুক মনে সৰ্ব্বদাই, করবে না’ক খর্ব তাই, রইবে খাড়া থির অটল। চলুরে পথে কিশাের-দ। উঠবে কিশোের উঠবে রে, নিশার আঁধার টুটবে রে, আবার আলাে ফুটবে রে- পূব-গগনেই খুব উজ। চরে পথে কিশাের-দ। আলােয় ধরা ছায়রে ছায় সুযােগ বুঝি যায়রে যায় আয়রে কিশাের আয়রে আয়, বাংলা মায়ের ভরা-থ- চলরে পথে কিশাের-দ। ৪১
খােকা-কবি
খােকা-কবি লেখে কবিতা গান
নীল পপসিলে, লাল খাতায়,
কিন্তু হায় তা’ শুবে কে !
খাতা ভরে ওঠে গান-গাথায়।
বাবা বলে-“চুপসময় নাই।
মা বলেন--“থাম্, অনেক কাজ,
দিদি বলে ‘হবে অন্য দিন,
পড়া শােনা আছে অনেক আজ।
দাদা বলে তাের ন্যাকামি রাখ,
ধন্ দেখি সূততা, মাঞ্জা দেই,
মামা বলে-“চোপ, ইষ্টপিড,
গাট্টার চোটে প্রাণ যাবেই।
হায়রে কবিতা শুনবে কে--
মুগ্ধ হবে কি গুণ দেখে!
ও পাড়ার নিলী যায় কোথায় ?
খােক ডেকে বলে—শুবি আয়।”
বকুলের ছায়ে নিরিবিলি
খােকা-কবি আর নিলী মিলি’
স্তব্ধ দুপুরে এক মনে
খােকা পড়ে আর নিলী শােনে।
**
৪২
থােকা-কবি
খােকা পড়ে যায় কবিতা তার
কত ইতিহাস চঁাদ-তারার,
কত শত কথা অপসরীর ;
জ্যোৎস্নায় নাওয়া সব পরীর,
বাতাসের দোলা ফু-বনেই,
পাখীদের গান বন্-কোনেই,
স্বপনের দেশে কেমনে যায়
কোন মন্তরে মন,-ভেলায়।
এই সব শুনে কবিতা-গান
গেঁয়ো নিলীটার মুগ্ধ প্রাণ।
মা-মরা মেয়ে সে কথা না কয়,
ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রয়।
হাঁ করে থােকার মুখ চাহে
খােকা পড়ে যায় উৎসাহে।
খোজ খোজ খোজ, নিলীটা কই,
সৎমা এসেছে সন্ধানে ;
মামা ছুটে আসে করিতে খোজ,
খােকা-ছেড়া গেছে কোন খানে !
খাতা ছুঁড়ে ফেলে হায় থােকার,
দুম্ দাম্ পিঠে কী পড়ে,
সৎ-মা গালীতে ভূত ভাগায়,
নিল’ নিলীটার চুল্ ধরে।
৪৩
আমি যেন ভাই চৈতের হাওয়া আমি যেন ভাই চইতের হাওয়া ফুরফুর ভেসে ভেসে ফিরি, ঝিরি ঝিরি ঝিরি ঝুর ঝুর ! এখানে সেখানে ভেসে চলে যাই, দি-দো গাছে গাছে জাগে আকুলি বিকুলি হিল্লোল। চাদ-কবি লেখে জ্যোৎস্নার গান রাত-তাের- সেই আলাে-গানে বিলাে বিভাে প্রাণ মাের। কুশল শুধাই কচি কিশলয়ে বার বার, খোঁজ করে’ ফিরি—এখানে সেখানে চার ধার। কলার বাগানে কলা-বউ ডাকে —আয়, আয়- নব-হিল্লোলে কচি পল্লব গান গায়। ৪৪
আমি যেন ভাই চৈতের হাওয়া
মিঠে মহুয়ার মৃদু বাস ভাসে
সন্ধ্যায়
দুলে দুলে যেতে দুলে দুলে পড়ি
তন্দ্রায়।
জোনাকী মেয়েরা দীপ জ্বালে বসে
জল জ্বল
শিশির ফোটার সানরী হার
ঝলম।
ঝিমাননা ঝি ঝির থেমে গেছে ভাই
এসরাজ ;
গায়ক তােমর যেন ছেড়ে গেছে
দেশ আজ।
নিদালু অলিরা দুলে দুলে পড়ে
ফুল-গায় ;
পলাশের গায়ে রাঙা প্রজাপতি
দুল খায়।
আলিপনা-আঁকা আঙিনায় ঝরে
ফুল-রাশ,
তাই দেখে মাের মনে মনে জাগে
উল্লাস।
তুলসী-তলার নিবু নিবু দীপ
উলসায়
তা’র কঁাপা দেখে, কঁপন ধরেছে
উল্কায়।
৪৫
টুনটুনির গান
মিন্টু মিটে ‘তারা তারাও যেন রে
ঠিক তাই,
আকাশে হাজার তুলসী-তলার
দীপ ভাই।
রজনীগন্ধা তন্দ্রা হারালাে
বিকু-
জ্যোৎস্নার আলাে বুকেতে জড়ানাে
যুঁই ফুল।
ফুলকলিদের চুল-লাগা-চোখ
ঘুম্ ঘু,
গাছ-মা বাজায় পাতা-ঝুমঝুমি
ঝুমঝুম্।
জ্যোৎস্নার গানে শীস দ্যায় ওই
ধাশীস্ ;
মাদারের তলে আঁধার জড়ালাে
মিশ, মিশ।
আমি যেন ভাই চইতের হাওয়া
ফুর ফুর
ভেসে ভেসে চলি, ঝিরি ঝিরি ঝিরি
ঝুর ঝুর।
আম-বউলের কস্তুরী মাখি
গায় মাের,
বাঁশের পাতার ঘুঙুর বাজিছে
পায় মাের।
আমি
যেন
ভাই চৈতের হাওয়া
ফুল-পরাগের আবীর ছড়াই
সব রাত
ঝরা-পাতা আর ঝরা-ফুলে ছায়
সওগাত,।
কাকু-জ্যোৎস্নায় তাের ভেবে আজ
দাড় কাক
বিড়ােল, বিতাের ভােরের নেশায়
দ্যায় ডাক্।
হানা-হানার বাস ভেসে আসে
ভুর ভুরু
আমি যেন ভাই চইতের হাওয়া
ফুর ফুর।
৪৭
ঘূর্ণি-হাওয়া
ঘুর্ণি হাওয়া, ঘূর্ণি হাওয়া
পাগলা ঝােড়াে ভূত,
ঘুর্ণি হাওয়া
শূন্যে ধাওয়া-
কাল-বােশখীর দূত।
শূন্যে ধূলাের ঝাণ্ডা ধরে
ঘুর্ণি হাওয়ার চক্রে চড়ে,
চলাে কে ভাই এই দুপরে
কোন্ দানবের পুত, ?
ঘূর্ণি
হাওয়া,
পাগলা ঝােড়াে ভূত।
ঘূর্ণি হাওয়া
ঘূর্ণি হাওয়া ঝড়ের খেয়াল
বেদম্ খেয়ালী-
ধতে নারি একটুও ওর
মনের হেয়ালী।
৪৮
ঘূর্ণি হাওয়া
হঠাৎ আসে হঠাৎ পালায়
খােশ-খেয়ালে চরকি চালায়,
নাই ঠিকানা কোন্ খানে যায়
নিতান্ত বিস্তৃত।
ঘূর্ণি হাওয়া,
ঘূর্ণি হাওয়া
পাগলা ঝােড়াে ভূত।
এই দুপুরে আমের বনে
একলা গেলি কে ?
হাবলা রে তুই ডাক না পাড়ার
পটুলা নেলীকে।
আম, ঝরেছে ঘূর্ণিঝড়ে
আয় না সবাই কুড়াই, ওরে--
কুড়িয়ে নিতে আঁচল ভরে
এবার ভারি জুৎ।
ঘূর্ণি হাওয়া, ঘূর্ণি হাওয়া
পাগলা ঝােড়াে ভূত।
আকাশ-গাঙে আলাে ভেসে
মেঘের ভেলা রে
ওপার ছছয়ে নামলাে ছায়া
দুপুর বেলা রে।
৪৯
টুনটুনির গান ঘূর্ণি হাওয়া উতল, পাখায়- ঠিকরে পথে ডিগবাজী খায়, হুল্লোরে জোর যায় ছুটে যায়- ক্ষিপ্র সে বিদ্যুৎ- হাওয়া ঘূর্ণি পাগলা ঝােড়াে ভূত,। ঘূর্ণি নীড় ভেঙেছে চড়াই পাখীর কাতর চোখে চায়, মৌমাছিদের চাক ভেঙেছে হায়রে নিরুপায় । ধূলায় ধূলায় আকাশ ছেয়ে ধ্বংসলীলার গানটি গেয়ে চছে ঝড়ী পাী বেয়ে ; মন্ করে খুৎ খুৎ ; ঘূর্ণি হাওয়া ঘূর্ণি হাওয়া পাগলা ঝােড়ো ভূত। ঘূর্ণি হাওয়া, চমকে চাওয়া, ধ্বংসেরই ইঙ্গীত- ঘূর্ণি হাওয়া, ধমকে যাওয়া, রুদ্রেই সঙ্গীত।
ঘূর্ণি হাওয়া
ঘূর্ণি হাওয়ার মােচড়, পাকে
ফুল ঝরে যায় লাখে লাখে,
মচকে ভাঙে গাছের শাখে
ভাপালা মজবুত।
ঘূর্ণি হাওয়া ঘূণি হাওয়া
পাগলা ঝােড়ো ভূত,।
শ্বাস,
ঘূর্ণি হাওয়া কার জানি ও
গভীর বুকের
ঘূর্ণি হাওয়ার গান শুনে আজ
প্রাণ, করে হাঁস-ফাস।
ঘূর্ণি হাওয়ার চকা চলে
‘বন্ বন্ বন্’ বন্-বিরলে,
ভাবছি বসে কৌতূহলে
কাণ্ড কি অদ্ভুত !
ঘূর্ণি হাওয়া ঘূর্ণি হাওয়া
পাগলা ঝােড়াে ভূত,।
যুঁই তুই দোল দোল যুঁই মুখ, A ভাই, নেই তাের নাই সেই ঝল মল দোর দোল দোল তােল তােল। হয় নাই। ভয় নাই। ঘাের আর ঘর বার। খােল খােল- দোল দোল। গাইবার নাই আর ? গায় আজ •ছায় আজ ? শােন তুই বন্-যুঁই। ই আন্ আজ পিক কোন্ তুই গান্ কাজ ঠিক বন্ বার ফোট ভাল মি কুল, ভাই ওঠ, লাল, ঝি ফুল, নত, গায়, সব তায়। ই শােন, কোন চোখ, চায় শােক তায়। দূর দূর র ফুর। শােন, আজ, বায় ধায় সব রব মন, আজ। উস যুঁই মুখ, খুস তুই টু দোল দোল, তােল তােল। ६२ সাঁওতাল-মেয়ে কালাে চুল, কালাে চোখ, কালাে রং তার তার মাঝে খোজ পেনু সাদা মনটার । পাহাড়ীর ছােট মেয়ে,—বনে ঘর তার বুনাে ভাষা, বুনাে আশা, বুননা কারবার। একদিন ভােরবেলা বেড়াতে যেতে, দেখিলাম তারে এক ভুট্টা-ক্ষেতে। ছােট্ট-মেয়েটি—মােটা সাড়ী পরণে- ‘ঝুম্ ঝুম্ মল, বাজে কালাে-চরণে। এলো-মেলাে এলাে-খোপা—তােফ শােভা তার- দোপাটি গুজেছে তায়,-মরি কি বাহার। কাণে গোঁজা জবা-ফুল-“হাঁসুলী” গলে ; কথায় কথায় যেন হাসি উথলে । আগে আগে হার কাস্তে হাতে আস্তে আস্তে চলে ঝুড়িটি-মাথে? ডাক, দিল পিছু চেয়ে—“আয় দুলালী- -মিছে তুই পিছে পিছে পড়িস খালি টুনটুনির গান ছুট দিল ছােট মেয়ে মার কাছে রে— ‘রুমু রুনু ঝুনু ঝুনু ম’ল বাজে রে । সাওতাল মেয়ে ভাই যেন বুনাে ফুল- বনে ফোটে বনে ঝরে,নাহি তার তুল। কেহ খোঁজ নাহি রাখে,—কেহ না শুধায় ওদের হাতে কিছু নাহি আসে যায়। রােদে জলে কাবু নয়—বাবু নয় তাই, প্রকৃতি মানুষ করে নিজ হাতে ভাই। বনের প্রকৃতি নিয়ে ওরা মশগুল, পাহাড়ীর ছােট-মেয়ে—পাহাড়িয়া ফুল।
চলতি পথের গান মেঘ, চিন্তা হে ; আয়রে হেথা “দুল দুলা”- শেষ করে নে ফুল-তুলা। কাজলা-কালে এলাে ঘূর্ণি ঝড়ের বেগ এলাে রে মেঘ, এলাে। মাদল-ধিন্ ধিতাং ধিন্ ধিতাং ধিন্ ধিতাং... চলতে হবে ভিন গাঁয়ে তাইতাে লাগে দুলদুলা তাের ভাবনা নেই ? থাকতে না চা সাবধানেই রে ভাবনা নেই ? মাদল-ধিন্ ধিতাং ধিন ধিতাং ধিন্ ধিতাং... ঝড় এলাে ঐ দিল, মাতায়, গান্ ওঠে শােন, নীল, পাতায়, ঢাকলাে আকাশ বালাতে তাল দে রে তাের মাদ্লাতে রে বালাতে। মাদল-ধিন্ ধিতাং ধিন ধিতাং ধিন্ ধিতাং... আয়রে হেথা দুল দুলা- শেষ করে নে ফুল, তুলা,-
টুনটুনির গান
ফুল তুলে তাের
কাজ কি ভাই?
গাঁথবি মালা
আজকি ভাই রে
কাজুকি ভাই ?
মাদল-ধিন্ ধিতাং ধিন্ ধিতাং ধিন্ ধিতাং...
তার চেয়ে তুই ধর মাদল
আসছে ছেয়ে
ঝড়, বাদল,
ঘরমুখাে চল,
এই বেলায়,
পড়তে হবে
খুব ঠেলায় রে
এই বেলায়।
মাদল-ধিন্ ধিতাং ধিন্ ধিতাং ধিন্ ধিতাং...
শুকনাে নদীর
আসবে বাণ,
তাই দেখে ফের ত্রাসূবে প্রাণ,
থাকতে হবে
জঙ্গলেই,
ঠায় বসে এই
বন, তলেই রে
জঙ্গলেই।
মাদল-ধিন্ ধিতাং ধিন্ ধিতাং ধিন্ ধিতাং...
চলরে ছুটে
দুল দুলা,
শেষ করে নে
ফুল-তুলা
মাদল-দিপির দিপাং তাং ধিতাং-দিপাং দিপাং তাং,
দূরের পাড়ি
ঘুর ঘুর ঘুর ঘুর-চাকায়
ঐ গাড়ােয়ান দূর হাঁকায়,
গরুর-গাড়ী ছুটছে ঠায় ;
ছুটছে যা
নাচছে প্রাণ;
হেঁই যােয়ান্
জোর চালাও,
ছুটছে গাই,
সঙ্গে ভাই
পাল্লা দাও
ছুটছে গাই
বলছে ‘চল
দিচ্ছে জোর
ওই আওয়াজ
স্তব্ধ মাঠ
মাছে ছুট
শীত পহর
হাট ফেরৎ
পাল্লা দাও,
জোর চালাও।
ছুটছে যান,
হেঁই যােয়া’
ল্যাজ মােচড়-
‘কঁাচ কোচ’ ;
শব্দ নাই
শীর্ণ গাই।
নামছে সৰু
একলা আজ।
টুনটুনির গান ঘুর ঘুর ঘুর ঘুর-চাকায় গরুর গাড়ী ছুটছে ঠায় ; গাড়ােয়ানজী দূর হাঁকায়। আস্তে যায়, আস্তে যায় ; শ্রান্ত গাই খুব হাঁপায়। ডাইনে বাঁয় সবজে ক্ষেত; ফুল অতুল, হলদে শ্বেত, ঝোপড়া ঝােপ, বন্-বাদাড়, বন্-চঁড়াল মা-ঝাড় ; উঠছে ওই দূর-চড়ায়, নাতি পথ গড়-গড়ায়। বন্ কোণায় দীর্ঘ-বাঁক, যাচ্ছে যা , খাচ্ছে পাক। সামনে ওই শুননা খাল দুই তীরেই উচ্চ আ; সরষে ক্ষেত কাঁপছে বায়- আলুতে ফুল ঝরছে হায় ! ছুটছে যা উড়ছে ধূল, আসছে ঘুম লাগছে দু। প্রাণ, উদাস ডাকছে কাক উড়ছে ওই চক্রবাক। শূন্যে ওই ঘূর্ণি বায় স্য-ক্ষেত চুৰ্ণি যায় ।
দূরে পাড়ি ঘুর ঘুর ঘুর ঘুর-চাকায় গরুর গাড়ী চলছে ঠায় গাড়ােয়ানজী জোর হাঁকায়। কাঁপছে বায় শাল-পিয়াল, ডাকছে ভাম্ এ্যাকশিয়াল। ডাকছে ফেউ দূর বনায়, শীত-পহর সাঁঝ-ঘনায়। জন-বিহীন প্রেত-শ্মশান, একলা আজ কঁপছে প্রাণ, ভাঙতে ভয় গাইছে গান। হায়, চালক কম্পমা। শ্যাওড়া ঝোপ অন্ধকার ; বঘেঁটুর বন্-বাদাড়। ওই দ্যাখায় নী-পাহাড় ; জোর হাঁকায়। গ্রামটি তার কাছ ঘেঁসে, ঐ গ্রামেই যাচ্ছে সে। জ্বললাে রে চললাে যান, চললাে রে- বােন মায়ের মুখটি আজ আনছে ফের সুখ টি আজ ; ঘূৰ্ত্তি তার রুখবে কে ? গাইছে গান, তাল রেখে। দূর সীমায় সন্ধ্যা-দীপ ৫৯
চলরে ভাই
টুনটুনির গান
একটু আর
দীর্ঘ পথ
নাই রে নাই।
ঐ দ্যাখায়
গ্রাম-প্রদেশ
পথ, ফুরায় যাত্রা শেষ।
ঘুর ঘুর ঘুর ঘুর-চাকায়
গরুর-গাড়ী আসলাে গাঁয়,
গাড়ােয়ানজীর প্রাণ জুড়ায়,
পাল্লা শেষ
পথ, ফুরায়।
৬০
হ-বিদায়
চৈতী রাতের বিদায়-কাঁদন
শুনূতে পেলাম বারে বারে,
শুতে পেলাম আধেক রাতে
বেণা-বনের ঝড়ে ঝড়ে।
শুনতে পেলাম ঝাপসা রাতে
আঁধার আলোর আবছায়াতে,
শ্বাস ফেলে যায় যাবার বেলায়
ঘুমতী নদীর ধারে ধারে।
চৈতী রাতের বিদায়-কঁদন
শুনতে পেলাম বারে বারে।
চমকে উঠি, ঘুম্ ভেঙে
কেমন করে ঘুমাই রে ভাই,
আজকে যে ও, বিদায় নেবে
কেমন করে বনা ঘুমাই?
ব্যথায় আমার পরাণ দোলে
চৈতী-রাতি যায় যে চলে,
বেদন-বাণী বাজলাে আমার
পরাণ-বীণার তারে তারে !
৬১
টুনটুনির গান
চৈতী রাতের বিদায় কঁদন
শুতে পেলাম বারে বারে।
একটি পাখী উঠলাে কেঁদে
একটি পলাশ পড়ল ঝরে’
একটি চাদের পাশাপাশি
একটি তারায় কঁপন ধরে।
চৈতী-রাতি বিদায় মাগে,
একটি কবির দরদ জাগে,
শিউরে উঠে মন্ খানি আজ
বিদায়-ব্যথার ভারে ভারে।
চৈতী-রাতের বিদায় কঁাদন
শুনতে পেলাম বারে বারে।
অতসী
অতসী ফুটেছে বন-কোণায়
খোঁজ রাখে তার কোন জনায় ?
গেল দোল দোল দিনে রাতে
দুলে দুলে সারা নিরালাতে—
অভিমানে মরে কাদিয়া রে-
মুদে আসে আঁখি আঁধিয়ারে।
মধু নেই তার নেই বাহার
বাতাসে মিলায় শ্বাস তাহার ।
মাঝ রাতে যবে চঁাদ জাগে
সবুজ আলাের বাঁধ ভাঙ্গে-
অতসী বাতাসে দুলে দুলে
অবিরাম পড়ে দুলে দুলে।
পাতার আড়ালে মুখ ঢাকে
হায় কে তাহার খোঁজ রাখে ?
কবি এসে বলে নতশিরে-
বন-গােপনের অতসীরে--
অতসী, অতসী, মােছ, আঁখি-
আমি কবি তাের খোঁজ রাখি।”--
৬৩
ভাের বেলায় শিউলী ফুল শিউলী ফুল হাল্কা বায় গন্ধ-তার আলগা তায় মন, বাহার চোখ, মেলায় ভাের বেলায় অপ্সরীর ফুল-বালার চল, কুড়াই তৃপ্ত মন দো-দোদুল হাল্কা বায়, লাল, বোঁটায় পা লাগায়। সন্ধ্যা আর ভাের বেলায়, দিল-ভােলায় দো-দোলায়। শ্বেত জরীর ওই শরীর ফুলবালার, তুল কাহার ? রূপ তাহার দিল-বাহার। চল রে ভাই, প্রাণ জুড়াই গন্ধে আজ, সর্বক্ষণ, মা’র চরণ বনে আজ। ওই নবীন, কোন, অচীন, বন-বিহগ, গান শােনায় উঠছে রব জুড়ছে স্তব ভােরা দল। শ্রান্তি নাই, দেখবি ভাই চল রে চল। চল, চপল, খােল, আগল, দোর দুয়ার, আসলাে ভাের লাল আলাের জোর জোয়ার ঠোট রঙীন, ফুল মেলায় ভাের বেলায় মস্ত সখ,। এন্ত সব শােনরে ভাই চলরে চল কাটলাে ঘাের ৬৪
ঘুম-পরী
খােকার চোখে ঘুম যােগাতে
ঘু-পরী তুই আয়রে আয়
অস্পরী তুই আয়রে আয় !
ভর করে তাের নীল ডানায়
ঘুরাণী তুই আয়রে আয়।
ঝিম্ লেগেছে হিমচঁাদে
তাই দেখে ভাই প্রাণ কাঁদে ;
আবছা-আঁধার ফুল-বাগে
ফুলকলিদের দু লাগে;
ঢল লাগে ঐ মৌমাছির
রব, থেমেছে সৰ ঝিঝির।
ভােমরা অলি সব ঘুমায়
ঘু-দেবী তুই আয়রে আয়।
প্রজাপতির থির ডানা
সব নিঝুমের কারখানা।
টুনটুনিটা মুখ বুজে
ঘুমিয়ে প’ল ঘাড় গুজে
বাইরে তাজা লাউ-মাচায় ;
ঘুম মেয়ে তুই আয়রে আয়।
-
টুনটুনির গান
সেউতি নদীর দুই তীরে
আঁধার এলাে দিক্ ঘিরে।
আঁধার আলাের ইন্দ্রজাল
শ্মশান ভূমি ভীম্ ভয়াল
ভূত পেরেতে দ্যায় হানা
ভাঙবে খােকার ঘাড়খানা।
লাখ, আলেয়া জ্বলছে রে
খােকার খোঁজে চলছে রে।
;
ঘুমাে ঘুমাে দুষ্টরে
ঘুমটি আসুক চোখ জুড়ে।
থােকার চোখে ঘুম যােগাতে
ঘুমপাড়ানী আয়রে আয় ।
ঘুমের রাণী আয়রে আয় ।
পরীর দেশের মেয়ে আমরা পরীর দেশের মেয়ে ধরার বুকে নেমে এলাম আলাের সিঁড়ি বেয়ে ! মমাদের অচীন, দেশে ঘর- ধরার মানুষ খোঁজ রাখেনা, কোথায় সে সহর। নিঝুম নিথর ঘুপুরী সে, স্বপ্নে আছে ছেয়ে পরীর দেশের মেয়ে। আমরা ঘুরি হাল্কা হাওয়ায় প্রজাপতির পিঠে, পল্কা মেঘে গা ভাসিয়ে গান ধরি গাে মিঠে ! সােণার ঝর্ণা ঝরে যায় কুলু কুলু শব্দে আঁখি ঢুলু ঢুলু প্রায় ঘুমিয়ে পড়ি একটি টেরে ফুলের মধু খেয়ে। পরীর দেশের মেয়ে।
টুনটুনির গান
পারিজাতের গুজি-কাঠি গুজি চিকন চুলে
সুবাসে তার উদাস দুটি নয়ন আসে চুলে।
নিশুত, রাতে রােজ
ধরার বুকে নেমে আসি, রাখেনা কেউ খোঁজ ;-
হাসি, নাচি, ঘুরি, ফিরি, চাদের আলােয় নেয়ে
পরীর দেশের মেয়ে।
রামধনুকের ঘর আমাদের রূপ-সাগরের তীরে
জর্দা ভােরের পর্দা ঠেলে সেথায় যাব ফিরে।
ভাের হােলল যে ভাই,
ধরার বুকে আর আমাদের থাকার যাে টি নাই,
যাবার সময় হােলাে এবার, চব ধেয়ে ধেয়ে
পরীর দেশের মেয়ে।
৬
“হুম্পাহুমার পাল্কী চলে
কোথায় থাকে মাসীপিসী কোন্ স্বপনের দেশে
কোন্খানে কোন্ মেঘের ভেলায় বেড়ায় ভেসে ভেসে !
নাম জানিনা, নাই ঠিকানা, কিন্তু লােকে বলে
‘হুম্পাহুমার পাল্কী চড়ে সেথায় যাওয়া চলে।
কিন্তু কোথায় ‘হুম্পাহুমার’ পাল্কী যাবে পাওয়া
কেমন করে, কোন্ পথে ভাই সেথায় যাবে যাওয়া?
ভূত-পেরেতে পাল্কী টানে, চাল কি তাদের, বাবা,
মধ্যরাতে শশ্মশান-পথে কেবল ওঠা-নাবা !
রাত দুপুরে হাত-পা ছুঁড়ে মাসীর দেশে চলে
বেজায় রুখে হোঁৎকা মুখে ‘হুম্পাহুমা বলে।
ভাবতে গিয়ে তন্দ্রা ধীরে নয়ন ছেয়ে আসে
শুনি মাসীর পায়ের ধ্বনি আমার আশে পাশে।
হঠাৎ মাসী ঘুম দিয়ে যায় চুম্ দিয়ে যায় এসে,
মাসীর দেখা পাবার আগেই ঘুমিয়ে পড়ি শেষে।
হঠাৎ শুনি মধ্যরাতে অনেক দূরে দূরে
পালকী চলে’ নিঝুম্ রাতে ‘হুম্পাহুমা’ সুরে-
হুম্পাহুমার
পাল্কী চলে
ববিরলে ;
রাত-বেরেতে
ববিরলে,
আবছায়াতে,
টুনটুনির গান বাঁশ-বাগানের পাশটা দিয়ে চলছে কারা বনবনিয়ে! বন্-বাদাড়ে কোন্ আদাড়ে ভূত-বেহারা হকি ছাড়ে । “ হুহুমা” “হুম্পাহুমা”— থির প্রকৃতি, সব নিঝুমা। ঘাড়টি গুজে কার দুলালী পাকী মাঝে কাছে খালি ? পথ মিশেছে অন্ধকারে চলছে তবু বন-বাদাড়ে। শ্যাওলা-ছাওয়া শ্যাওড়া তলে লাখ, জোনাকীর চুকী জ্বলে। দেখছি মশাল দূর আলেয়ার ঘুটঘুটে ঐ মনসা-তাের। ডাকছে কোথায় হুতমাে-থুমা- হুমকি শোেননা “হুম্পাহুমা”। কাজলা-কালাে আঁজলা ভরে কার পিপাসা শ্রান্ত বুঝি ছয় বেহারা চলছে ছুটে জল ভরে’ কে- পান্ করে যে লাগলাে রাতে-- পথ চলাতে । ভূত-চেহারা শ্রান্তি-হারা। ৭ ০ “ হুহুমার পাল্কী চলে ঘুম টুটেছে বসুছে খােকা বলছে মা তার হুমকি শােনাে কার কুটীরে, ঠায় উঠি’ রে ; “শীঘ্র ঘুমা” “হুম্পাহুমা”। ইট খসেছে ; সব ধ্বসেছে ; তাই ঠেলে জোর ডালপালা ওর ; ছয় বেহারা জীর্ণ দেউল চূণ-বালি তার ভগ্ন প্রাচীর গাছ মেলেছে তার তলেতে পাল কী চালায় পিচ-পাকুড়ের বিশ্রী পচা ছুটছে মশা হুমকি শােনাে জোরসে তারা। পিছলা তলায় বদ্ধ জলায় উঠছে ধূমা, “ হুহুমা—” চলছে কোথায়, দীর্ঘ পথের রাত্রে চলে নাম না জানা- নাই সীমানা। অন্ধকারে বন-বাদাড়ে। সঙ্গোপনে বগােপনে। ছয় বেহারা নিত্য চলা খুব নিরালায় ৭১
টুনটুনির গান
রাত্রি বেলা
এই যে চলা
অর্থ কি এর, যায় না বলা।
একটু কি ছাই
খোজ মেলে, হায়
পালকী চড়ে কার মেয়ে যায় ?
কার মেয়ে ও
কার বধূ-মা?
হুমকি শুনি
“হুম্পাহুমা-
তােতমা।
१२
টুনটুনি গায় গান
ঝুমকো গাছের ঠুনকো ডালে
টুনটুনি গায় গান
ও সে•••গান গেয়ে হয়রাণ।
দোলে•••দোল দোল দোল্ দোল,
হাল্কা হাওয়ায় যায় ভেসে যায়
গানের কলরােল
তার•••উলসে ওঠে প্রাণ ;
টুনটুনি গায় গান।
;
হিমের চাদর গায় জড়ালে ভােরের বাঁকা চাদ ;
আলাের ধারা রাঙলাে আকাশ, ভাঙলাে পূবের বাঁধ !
বাতাস••ঝুর ঝুর ঝুর ঝুর
গানে গানে প্রাণে প্রাণে
আনে উদাস সুর,
আহা•••মন-টানা সেই তান
টুনটুনি গায় গান।
টুনটুনির গান
শিরি গাছে ঝুনঝুনিয়ে গুনগুনিয়ে গায়
অবাক হয়ে কৌতূহলে টুনটুনি তাকায়,
শিশির...টুল, টুল, টুল, টুল,
পাতায় পাতায় পাপড়ি ফুলে
কাপতেছে বিল কুল,
টুনি করলে তাতে স্নান,
নীড়-ছাড়া আজ প্রথম টুনির
অধীর তনুখান ;
হাল্কা হাওয়ায় পল্কা ভালে
টুনটুনি গায় গান
ও সে•••গান গেয়ে হয়রাণ।
৭৪
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.