Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Santwana

Basu,keshabchandra · 2010/01/22

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

সান্ত্বনা
শ্রীকেশবচন্দ্র বসু
s
প্রণীত।
প্রকাশক–শ্রীভুবনমােহন মিত্র,
গিরীশ লাইব্রেরী
২১ নং কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট, কলিকাতা।
মুল্য । মাত্র।

কলিকাতা,
৬৪১, ৬৪২ নং সুকিয়া স্ত্রী, “লক্ষ্মী প্রিন্টিং ওয়ার্ক” হইতে
সতিশ চন্দ্র ঘােষ দ্বারা মুদ্রিত ।

val
উৎসর্গ।
একদিন যে চন্দ্রমা উদ্ভাসিয়া হৃদি
বিতরিত জ্যোৎস্না-রাশি অশেষ বিশেষে ;
কেমনে বর্ণিব সেই সলজ্জ-স্বভাব।
জায়ারে, যা’র গুণে বিমােহিত আমি ।
হায়রে বিদরে বুক, বলিতে সে সব
কথা, কালের গরাসে পতিত হইল
মাের লক্ষ্মী-স্বরূপিণী প্রেমময়ী দারা ;
সে মর্মবেদনা আর বলিব কাহারে।
তখন জননী-বীণাপাণি-নাম হায়
হৃদয়ে জাগিল, লই শরণ তার
তার ফলে বন-পুষ্প পাইয়াছি যত,
সংগ্রহিয়া সমুদায়, করিয়া গ্রন্থন,
সােনা” নামেতে মাল্য করিয়া রচন
উৎসর্গ করি আমি উদ্দেশে “তাহার”।
}
লেখক।

No text on this page.

ভূমিকা ; গ্রন্থের প্রারম্ভে ভূমিকা লিখিবার চিরন্তন প্রথা আছে। কিন্তু আমার এই সামান্য কবিতা-পুস্তকে ভূমিকা লিখিবার মত কিছুই নাই। ভূমিকা-বিহীন গ্রন্থ সাধারণের অপ্রিয় হইবার আশঙ্কায় মুখবন্ধস্বরূপ কিঞ্চিত্র লিখিলাম । বহুদিবস পূর্বে হৃদয়ের আবেগে কতিপয় কবিতা লিখিয়াছিলাম ; পরে তাহা বন্ধুবর শ্রীযুক্ত প্রাণনাথ ঘােষ মহাশয় হার ‘প্রীতি’ নামক মাসিক পত্রিকায় প্রথম প্রকাশ করিয়া আমাকে বাধিত করেন। এক্ষণে কতিপয় বন্ধুর উৎসাহে উৎসাহিত হইয়া প্রীতি’ পত্রিকায় প্রকাশিত এবং অন্যান্য কবিতা একত্রে সংগ্রহ করিয়া পুস্তকাকারে মুদ্রিত করিতে যত্নবান হইলাম। বিগত সন ১৩১৬ সালের ১লা বৈশাখে আমার পত্নী শ্ৰীমতী প্রমদাসুন্দরীর পরলােকপ্রাপ্তি হয়। তাহার মৃত্যুর পর ব্যথিত হৃদয়ে কতিপয় কবিতা লিখিয়াছিলাম, তাহাও এই পুস্তকে সন্নিবেশিত হইল। প্রারম্ভ হইতে শেষ পর্যন্ত কবিতাগুলি আবেগ ও উচ্ছাসের বশবর্তী হইয়া লিখিত হইয়াছে—সেজন্য নানা দোষে দূষিত হইবার সম্ভাবনা। সহৃদয় পাঠক ও পাঠিকাবর্গের নিকট প্রার্থনা, তাঁহারা যদি ইহার একটা মাত্র কবিতা পাঠ করিয়া ক্ষণ- কালের জন্যও আনন্দ অনুভব করেন, তাহা হইলে আমার সমস্ত শ্রম সফল মনে করিব।

অবশেষে কৃতজ্ঞতার সহিত প্রকাশ করিতেছি যে, আমার
পরলােকগতা পত্নীর ভ্রাতা শ্রীযুক্ত বাবু পূর্ণচন্দ্র দত্ত আমার এই পুস্তক
প্রকাশের সম্বন্ধে যথেষ্ট অর্থ সাহায্য করিয়াছেন—সেজন্য আমি
তাঁহার নিকট চিরঋণী রহিলাম ।
প্রকাশিত কবিতাগুলির কিয়দংশ পরিবর্তিত করিয়া মুদ্রিত
করিলাম।
মজিলপুর।
মহাসপ্তমী,
সন ১৩১৭ সাল।
শ্রীকেশবচন্দ্র বর

সূচী পত্র। বিষয়। পৃষ্ঠা। বিসর্জন ৪ ••• • • • শ্মশান ভাগীরথী-তীরে নির্বাণ বিদায়-গাথা বিলাপ প্রার্থনা কোকিল ••• . ••• • পূর্ণিমা নিশি ••• ৪৩ = = = ৪৬ স্বপন নিদয় আঁধার নির্জন-আলাপ ৪৯ ৫৮ প্রণয় পরিণাম স্বদেশের প্রতি বালিকার বিবাহ ••• ৬৪ স্কুল ••• ৬৭

পৃষ্ঠা
বিষয়
চিন্তা
৩ . .
৭১
৭৩
০৬
আবেগ
প্রবাস-জীবনে দুর্গোৎসব
জন্মভূমি
•••
৮০

সান্ত্বনা।
বন্দনা।
নমি আমি বীণাপাণি ! ও রাঙ্গা চরণে,
যাহার প্রসাদে মাগাে, নশ্বর ভুবনে
ভবভূতি, কালিদাস,
মধু আদি কৃত্তিবাস,
অমরত্ব লভি’ সবে করেছে গমন,
বড় সাধ পূজিতে মা, সে দুটী চরণ।
তােমারি প্রসাদে মাগো, চোর রত্নাকর
রছিলেন রামায়ণ সুধার আকর,
তাই আজ মহামুনি
কবি-কুল-শিয়ােমণি
আদর্শ-পুরুষ নামে খ্যাত চরাচরে ;
অমর ভঁহার স্মৃতি নশ্বর সংসারে।

সান্ত্বনা
এমনি আছে গাে মাতা, কত মহাজন
পৃজিবারে অনুক্ষণ ও রাঙ্গা চরণ,
যুক্তকরে ভক্তিভরে
দাড়ায়ে মন্দির-দ্বারে,
পৃজিতে, ভক্তিতে মাগাে, রাতুল-চরণ;
এমনি দাড়ায়ে আছে কত মহাজন।
ভাগ্যবান তারা তোর কৃতিসন্তান,
দাও মা, তাদের তুমি চরণে স্থান ;
মিলিয়া কল্পনা সনে,
মালা গাথি মনে মনে,
সাজাইতে পারে সেই মনের মতন,
কবিতা-কুসুম দিয়া ও রাঙ্গা চরণ।
দীন আমি, কেমনে মা, পূজিব তোমায়,
কেমনে ম, পুষ্পাঞ্জলি দিব রাঙ্গা পায়,
কেমনে এ ক্ষুদ্র মনে
ভক্তিশৃঙ্গ হেয় প্রাণে,
রচিয়া গাঁথিব মাগাে, মালা সুচিকণ,
পৃজিবার তরে ওই রাতুল-চরণ।

বন্দনা,
শক্তি দাও, দয়াময়ি! দুর্বল সন্তানে,
বাজুক হৃদয়-তন্ত্রী সুমধুর তানে,
কর মা, আশীষ দান ;
গাহিব মা তব গান,
শুভদে বরদে মাতঃ, ভুবনমোহিনি।
সন্তানের পুষ্পাঞ্জলি ধর গো, জননি ।

বিসন
প্রিয়তমে !
এ বিশ্ব-সংসার হ'তে যবে চিরতরে
লইলে বিদায় তুমি অতি ধীরে ধীরে ;
নীরবে কাতর-প্রাণে
চাহিয়া সবার পানে
জানালে বিদায়-বার্তা অন্তরে অন্তরে ;
বসেছিনু সে সময় তোমার শিয়রে ।
চাহিলে আমার পানে সেই শেষ বার,
বুঝি বা জানালে মােরে অন্তর তোমার,
কহিলে না কোন কথা,
নীরবে জানায়ে ব্যথা,
বিদায় লইলে তুমি জনমের তরে ;
সে সময় বসেছিনু তােমার শিয়রে।

বিসর্জন
ডেকেছিলে কতবার দেখিবার তরে,
কিন্তু শেষ বার যবে ডাকিয়া আমারে
কহিলে করুণ-স্বরে
“এস মাের কাছে স'রে”
কিন্তু আর কোন কথা না বলিয়া মােরে
বিদায় লইলে তুমি জনমের তরে ।
জননী তোমার ভাসি’ নয়নের জলে,
তুলিয়া নিলেন তাঁর সুকোমল কোলে,
কিন্তু তুমি একবার
চাহিলে ফিরে আর
বলিলে কোন কথা—নীরব অন্তরে,
জানালে বিদায়-বাৰ্তা অতি ধীরে ধীরে।
নিকটে বসিয়া ছিল জননী আমার,
ডাকিয়া করুণ-স্বরে বলিলে আবার,
“কই মা, কোথায় তুমি,
দেখিতে না পাই আমি,
এত বলি রুদ্ধ-কণ্ঠে, সজল-নয়নে
বিদায় লইলে মাের মাতৃ-সন্নিধানে।

সান্তনা। নীরবে মলিন মুখে তােমার সদনে, পঁড়াইয়া ছিল “মেনী" উদাস পরাণে ; জনমের মত তারে কোলেতে নি’বার তরে তুলিলে কম্পিত হাত—সেই শেষ বার— উঠিল ক্ষণেক পরে গৃহে হাহাকার ! ভাসিয়; নয়নজলে ঢাহিনু যখন, গিয়াছ চলিয়া সতি, ত্যজিয়া ভুবন ; শেষ আশা ছিল যাহা, ফুরাল সকলি তাহ- ঘুচিল সকল সাধ, সুখের স্বপন, জনমের মত তোরে করি’ বিসর্জন। দ্বাদশ বৎসর ধরি' কত যত্ন ক'রে যে ঘর বাঁধিয়াছিলে আপনার করে, ভাগী মােরা দুই জনে, বল তুমি কোন্ প্রাণে, চলে গেলে একবারে কিছুই না ল’য়ে ; জনমের মত হায় আমারে কঁাদায়ে ?

বিসর্জন।
.
এতদিন পরে অজি তোমার সংসারে,
হইলাম তোমাহীন—তোমারি সে ঘরে ;
কে আর এ ঘরে আসি,
বিকাশি’ মধুর হাসি,
গৃহলক্ষী-সম, হায় ! দাড়াবে এখন,
কে অার হইতে পারে তোমার মতন ?
এত অল্প অয়ি ল'য়ে তুমি গাে কন্যাশি ?
এ সংসার-রঙ্গভূমে আসি' একাকিনী,
না মিটিতে কোন সাধ
ঘটাইয়া পরমাদ—
কঁাদায়ে কঁদিয়ে তুমি হইলে বিদায়,
চিরতরে শােকার্ণবে ভাসায়ে আমায়।
বিধির বিধান তরে আমরা দুজনে,
এ সংসারে মিশেছিনু এক প্রাণে মনে ;
ধৰ্ম্মসাক্ষী করি প্রিয়ে,
দেবদ্বিজে প্রণমিয়ে,
পেতেছিনু সবে মাত্র সাধের সংসার ;
সহসা চলিয়া গেলে করি ছারখার।
৭

সান্তনা।
একদিন এ সংসারে নব-বধূবেশে,
দাড়াইয়াছিলে আসি’ অভাগার পাশে,
নিৰ্ম্মল মধুর হাসি,
হেসেছিলে কত নিশি,
সুধ-কণ্ঠে কতদিন ব'লেছ আমায়,
দাসী আমি প্রাণাধিক, বাঁধা তব পায়।
বসন্তের সে যামিনী আসিবে ফিরিয়া,
গাহিবে কোকিল পুনঃ দিগন্ত ব্যাপিয়া,
মলয়-পবন আসি।
আমার দুয়ারে বসি'
আবার জানাবে তার নব অগিমন,
কে আর করিবে বল স্নেহ-সম্ভাষণ ?
জোছনা-শােভিত রাতি
মুক্ত বাতায়ন,
আছে ত তেমনি খােলা সদা সর্বক্ষণ।
তবে কেন এই ঘরে,
আঁধার রয়েছে ঘেরে,
কালিমায় ঢেকে গেছে এ গৃহ-প্রাঙ্গণ ;
তেমনি ত আছে খােলা মুক্ত বাতায়ন !

বিসর্জন।
।
**
নিশীথে এখনও আসি সুধাংশু-কিরণ
এ ভয় গৃহেতে তব করে অন্বেষণ,
মলিন শয্যার পরে,
দেখে যায় উকি মেরে,
প'ড়ে আছে ভাঙ্গা ঘর, ভাঙ্গা আয়ােজন,
শ্রীহীন মলিন ভাবে সদা সর্বক্ষণ।
আর ত বাজে না বাঁশী মধুর সুস্বনে,
গাহে না পাপিয়া আর সুমধুর তানে ;
মল্লিকা মালতী ফুল,
সৌরভে করে অকুল,
আর ত ফোটেনা তারা আমাদের তরে,
মলিন বদনে সব গেছে যেন ঝ'রে ।
শূন্য ঘর ছাড়ি যদি দাঁড়াই বাহিরে,
কি জানি কেন বা পুনঃ অভ্যাসের তরে,
দেখিব তােমায় বলে,
যাই আমি ঘরে চলে ;
খুঁজে খুঁজে ফিরি আমি তােমায় না পাই,
এ ভগ্ন গৃহেতে আর গৃহলক্ষী নাই।

সাত্তম।
স্বহস্তে সাজায়ে তুমি সুমঙ্গল করে,
রাখিয়া গিয়াছ যাহা এ ঘর দুয়ারে,
সকলি ত প'ড়ে আছে,
যে যা’বার সেই গেছে,
একটী বালুকা-কণা সে ত লয় নাই ;
সকলি 'ত আছে পড়ে কিন্তু সেই নাই।
গৃহলক্ষী ছিলে তুমি আমার সংসারে,
খুজিয়া বেড়াই তাই হারা ধন 'তরে ;
যে দিকে ফিরাই আঁখি,
নিরবধি আমি দেখি,
তোমার মঙ্গল হন্ত ব্যাপ্ত চারি ধারে
গৃহলক্ষী ছিলে তুমি আমার সংসারে।
পুরাতন চিঠিগুলি রয়েছে পড়িয়া ;
একদিন সাহা তুমি স্বহস্তে লিখিয়া,
দিয়াছিলে ভাল বেসে,
তাই আজ মনে আসে,
অতীতের সে কাহিনী সুখের স্বপন ;
কেন রে দারুণ বিধি ঘটালি এমন ?

বিসর্জন।
ভাল তুমি বেসেছিলে হৃদয় ভরিয়া,
তাইত তােমার স্মৃতি রয়েছে জাগিয়া ;
এ সংসারে চারি ধারে,
জীবনের সুরে সুরে,
সুবৰ্ণ-অক্ষরে লেখা শত শত বার ;
ভুলিবে তােমারে সতি, হেন সাধ্য কার ?
সুষুপ্তির শান্তিময় কোলেতে যখন,
জগৎ ঘুমায়ে থাকে হয়ে অচেতন,
একাকী বিরলে বসি',
কাঁদি আমি সারা নিশি,
তোমার বিচ্ছেদে এই শূন্যময় ঘরে ;
গৃহলক্ষী ছিলে তুমি আমার সংসারে।
ত্রিদিবের
সুখময় শান্তিনিকেতনে,
অনন্ত সুখের স্রোত বহে গাে যেখানে,
যেখানে নন্দন-বনে,
পারিজাত ফুল্ল মনে,
বিতরে সুষমা তার অমর মাঝারে ;
এ ঘর ছাড়িয়া তুমি থাক সেই ঘরে।

দত্বনা।
বিরহ-বিচ্ছেদ তথা না পারে পশিতে,
চির মিলনের সেই সুমঙ্গল পথে,
চলিয়া গিয়াছ তুমি,
তাই আজ খুঁজি আমি,
এ ভগ্ন গৃহের মাঝে ব্যাকুল পরাণে,
সারা দিন সারা নিশি গােপনে গােপনে।
রঙ্গভূমে অভিনয় করি’ উদ্যাপন,
যবনিকা যত দিন না হবে পতন,
তত দিন এই ভাবে,
তােমারে হৃদয়ে ভেবে,
জাগাইব অতীতের সুখের স্বপন,
যতদিন যবনিকা না হবে পতন।
আমি রহিব জাগিয়া,
উদাস পরাণে,
বলিব না কোন কথা ;
চাহিব কেবল,
তাের মুখপানে,
বহিব হৃদয়ে ব্যথা।
কঁদিব আপনি,
আপনার মনে,
সারাটি নিশি বসিয়া ;
চাহিব কেবল,
তাের মুখপানে,
;
মরম বেদনা চাপিয়া।

বিপজ্জন। *. । । ডাকিব তােমারে, সকরুণ সুরে, বসিয়া ঘরের মাঝে ; এস যদি ফিরে, আবার সংসারে, প্রভাত গােধূলি সাঁজে। তুলি' ফুলরাশি, নিরজনে বসি', গার্থিব মোহন মালা ; পরাব তােমারে, আপনার মনে, ভুলিব দারুণ জ্বালা। কোকিল-কুলেতে, করিয়ে মধুর গান ; শুনাবে আমারে সুমধুর স্বরে, খুলিয়া আপন প্রাণ। ফুটিবে বকুল, নানাবিধ ফুল, সৌরভে আকুল করি' ; রহিব চাহিয়া, সজল নয়নে, তােমারি বদন স্মরি'। মধুর নিশিতে, প্রভাতে যখন, উঠিবে তপন, পূরব-গগন-ভালে; মধুর হিল্লোলে, বহিবে বাতাস, তটিনী নাচিবে কূলে। ১৩

সান্ত্বনা।
বহিবে উজান,
কুল কুল রবে,
হাসিবে কুমুদ জলে ;
(আমি) চাহিয়া রহিব, তাের মুখ পানে,
ভাসিয়া নয়ন-জলে।
১৪

শ্মশান
সংসার ভিতরে অথচ বাহিরে
এই সে পরম সুখের ঠাই ;
চিরশান্তিসুখ বিরাজিত হেথা,
কভুও দুঃখের পরশ নাই।
শত দাসদাসী সেবিত যে দেহ
একদা যাহার সুখের তরে,
দুগ্ধফেণনিভ কোমল শয়ন
থাকিত প্রস্তুত প্রাসাদ’পরে।
দেখহ চাহিয়া স্থানের মহিমা,
এখানে আসিয়া তাদৃশ জনে,
ধরণী-শয়নে করিছে শয়ন,
ধনী মানী চিরদুখীর সনে।

সান্তনা
শর, বীর যার দম্ভ আস্ফালনে
ভীরু কাপুরুষ কাপিত ভরে,
উভয়ে এখানে একই শয়নে,
নিদ্রিত অনন্ত কালের তরে।
কামুক যে জন, সদা কামপর
আছিল একদা মানস যার,
কাম-কামনায় সদা লালায়িত,
এবে সেই ভাব গিয়াছে তার।
বিলাসী ত্যজিয়ে বসন ভূষণ,
পুরা-স্মৃতি আর নাহিক মনে,
হ'তেছে অনা’সে ধূলায় ধূসর
মিলিয়ে অসংখ্য দরিদ্র সনে।
শোভার আধার পূর্ণ সুধাকর,
অতুল-সুষমা কুসুমগণ
তাহাতে সুন্দর রমণী-বদনে
একদা যাহার মোহিত মন।
নন্দন-গৌরব ফুল্ল পারিজাত,
সৌন্দৰ্য-আদর্শ অপরচিয়,
দেখাও তাহারে, কিছুতেই আর
মানস তাহার মােহিত নয়।

শ্মশান,
পর৷ দর্শন করিলে যাহার,
জ্বলিত হৃদয়ে মাৎসর্য-অনল;
চাহিতে নারিত পরসুখপানে,
এবে সেই ভাব সকলি বিকল।
কুবের-ভাণ্ডার করি অধিকার,
দাড়াও যাইয়া নিকটে তার,
ফিরে না চাহিবে, আর তােমা পানে,
ঈর্ষানলে মন পুড়িবে না আর।
এ সুখ-শয়নে, নাহি তন্দ্রা কভু,
অনন্ত গভীর সুনিদ্রা অতি;
অপেক্ষা না করে প্রভাত-গােধূলি
প্রভাকর কিম্বা শশীর ভাতি।
তবে কেন আর করিব রােদন,
নাচরে হৃদয় আনন্দভরে ;
আসিব হেথায়, র’ব শান্তিসুখে
অবাধে অনন্ত কালের তরে।
১১] ,

ভাগীরথী-তীরে
পুণ্যতােয়া ভাগীরথি ! আজি তব হারে,
এসেছি মা নেত্ৰ-নার ফেলিবার তরে ;
আশ-তরু বড়াইত,
চির-তাম। সমাগত,
অস্তগত সুখশশী গগনের গায়,
চির তরে শোকার্ণবে ভাসায়ে অামায়।
•
তোমার নির্মল বারি অতি সুশীতল ;
সে বিনা পরাণ মম হবে না শীতল
কি বা অাছে এ জগতে,
পেপাড়া প্রাণ শীতলিতে,
তাই ডাকি তোরে মাগাে শান্তি-স্বরূপিণি,
চির-শান্তি দাও মোরে কৈবল্যদায়িনি।
১৮

ভাগীরথী-তীরে
আজ আর আসিনি মা উল্লাসে নাচিয়া,
মাতেনি আনন্দে আজ অভাগার হিয়া,
আজি মম আঁখিজল,
ঝরিতেছে অবিরল,
তোমার পবিত্র তার নির্জন ভাবিয়া,
এসেছি কঁদিতে মাগাে পরাণ ভরিয়া।
নাহিক সে দিন আর, গিয়াছে সকল,
এখন রােদন মাত্র রয়েছে সম্বল ;
কঁাদিব মা কার কাছে,
তােম বিনা কেবা আছে,
কে বুঝিবে অভাগার মরম-বেদনা !
দীনের রােদন হয় কেহ ত শুনে না ?
স্নেহ মায়া ভালবাসা হৃদি আকিঞ্চন,
সকলি ও পূত নীরে দি’ছি বিসজ্জন
সুখ-আশা ছিল যাহা,
সকলি গিয়াছে তাহা,
জীবন আঁধার এবে কঁাদি অবিরত,
আঁখিজলে বক্ষঃস্থল সতত প্লাবিত।

সমা
কি কাজ ধরিয়া মাগাে এ ছার জীবন,
সুখ নাই শূন্যময় আঁধার ভুবন ;
তাই ডাকি সকাতরে,
দে মা স্থান অভাগারে,
তাের ও পবিত্র ক্রোড়ে ও মা নিস্তারিণ,
নিদয় হ'য়ে না ওগো পাষাণ-নন্দিনি।
কত বা জানাবো মাগো তােমার চরণে,
অসাম অনন্ত জ্বালা এ পােড় পরাণে,
জ্বলিতেছে দিবানিশি,
আঁধার মা দশ দিশি ;
এ জ্বালা জুড়াতে কেবা আছে এ সংসারে ?
তােম। বিনা পাতকারে কে আর নিস্তারে ?
দারুণ আঘাতে মম ব্যথিত জবিন,
শূন্যময় চারি দিক্‌ আঁধার ভুবন,
হৃদয় হয়েছে ছাই,
সকলি নীরব তাই,
শুব্ধ বসুন্ধরা যেন হয়েছে প্রলয় ;
আঁধারে আবৃত আজ বিশ্ব সমুদয় ।

ভাগীরথী-তীরে।
;
মত আশা ছিল এবে দিমু বিসর্জন,
ব্যথিত জীবনে অরি কিবা প্রয়ােজন ;
ছিড়েছে হৃদয়-তার,
সহিতে না পারি আর,
এ দারুণ মর্মভেদী হৃদয়-বেদনা ;
ব্যথিত-বেদন মাগাে কেহ ত বুঝে না !
দীন হীন অভাজন কাতর সন্তানে,
দে মা স্থান দয়াময়ি ও রাঙ্গাচরণে।
হতাশ জীবন যার,
কি ফল বাঁচিয়া তার,
বরঞ্চ তাহার পক্ষে মঙ্গল মরণ
হতাশ জীবনে মাগাে কিবা প্রয়োজন ?
দ্বাদশ বৎসর ধরি ছিনু যার সনে,
রেখেছিনু যারে আমি অতীব যতনে ;
আজ সে নিদয় হ'য়ে,
চির তরে কঁাদাইয়ে,
অনন্তের কোলে মাগাে লয়েছে আশ্রয়,
দিও মা চরণে স্থান তুমি প্রমদায়।

পানা।
বিসর্জন দিতে তায় তােমার চরণে,
অস্থি তার বুকে করি' এনেছি যতনে ;
মিশায়ে নয়নজলে,
দিব মা চরণতলে,
দিও মা চরণে স্থান তব তনয়ায়,
চিরতরে সমর্পিনু তােরে প্রমদায় ।
দয়াময়ি! তব সম কেহ নাই আর,
তোমার কোলেতে জ্বালা জুড়ায় সবার ;
পাপা কিম্বা পুণ্যবান,
দরিদ্র কি ধনবান,
অন্তিমে তােমার কোলে জীবন জুড়ায় ;
তাই আজ সমপিনু হতা'রে প্রমদায়।
২২

নিৰ্বাণ।
মধুর হিল্লোলে তুমি বহ সমীরণ,
অতি ধীরে ধীরে কর অমিয় বর্ষণ ;
হেথা মোর প্রাণপ্রিয়ে,
মহাঘুমে আছে শু'য়ে,
মুদিত করিয়া আঁখি জনমের তরে ;
বহ তুমি সমীরণ অতি ধীরে ধীরে।
রাখগাে মেদিনী তুমি করিয়া যতন,
শ্যামল অঞ্চলে ঢাকি তারে অনুক্ষণ,
যেন মা তােমার বুকে,
ঘুমাইয়া থাকে সুখে,
অবাধে অনন্ত কাল হ'য়ে অচেতন ;
অতি ধীরে ধীরে তুমি বহু সমীরণ।

সান্ত্বনা।
এস কূলে কূলে ভরা ক্ষীণ। প্ৰবাহিণী,
নবীন সাজেতে সাজি এসগাে ধরণী ;
যে সুধা এখানে আছে,
পাবনা পৃথিবী খুঁজে,
পথিক চলিয়া গেছে, স্মৃতি মাত্র তার,
নীরবে আচ্ছন্ন তাই,—মগ্ন চারি ধার।
অনন্ত নীলিমা হ'তে ওহে সুধাকর,
সুধারাশি ঢাল তুমি সুখে নিরন্তর,
এই পুণ্য ভূমি পরে,
বিদায় দিয়াছি তা'রে,
প্রেমের আদর্শ মণি, হৃদয়-রতনে,
স্নেহ-সূত্রে বাঁধা সদা ছিনু যা’র সনে
হে চির-বসন্ত—চির-উজ্জ্বল-বরণ,
মলয়-সমীর সনে এস অনুক্ষণ,
অতি ধীরে সযতনে,
স্নিগ্ধ বায়ু পরশনে,
জুড়াও 'তাহার হিয়া সুধা বরিষণে,
বিতর বিমল শান্তি সন্তাপিত প্রাণে।
২৪

নিৰ্ব্বাণ।
;
উষার আলােক সনে ফুটি ফুলদল,
সৌরভে আকুল হয়ে এস পরিমল ;
অতি শ্রান্ত প্রাণ মনে,
আঁখি-বারি বরিষণে,
নিয়ে চলিনু আমি চির অনল,
হারায়ে হৃদয়-রাণী সোনার কমল।
কেঁদনা কেঁদনা মন আর তার তরে,
ডেকেনি তাহারে অর সকরুণ সুরে,
সে যেখানে চলে গেছে,
বড় সুখে সেথা আছে,
মৰ্ম্মভেদী আর্তনাদে করিয়া রােদন,
ভেঙ্গোনা তাহার ঘুম আর সর্বক্ষণ।
२०

বিদায়-গাথা
এস চিরপ্রিয় মম প্রমদা-রতন,
আঁধার হৃদয় মোর, ব্যথিত জীবন ;
অস্ত যায় দিনমণি,
এ সময়ে একাকিনী,
বল প্রিয়তমে! তুমি যাও কোন স্থানে,
এস ফিরে প্রেমময়ি সুচারু-বদনে।
কি বলিব প্রাণাধিকে! বুক ফেটে যায়,
নিব শমন আসি গ্রাসিল তােমায় ,
আছিল অদৃষ্টে লেখা,
তােমার এ দৃশ্য দেখা,
প্রভাত-তপন যথা মেঘে ঢাকে হায় !
অনাদরে এবে তুমি লুষ্ঠিত ধূলায় ।

বিদায়গাথা।
এস ফিরে প্রেমময় সুচারু-বদনে,
রাখিব হৃদয়ে ধ'রে অতীব যতনে,
কিম্বা নিজ আয়ু দিয়া,
তোর প্রাণ বাঁচাইয়া,
সুখেতে ত্যজিব আমি এ ছার জীবন,
এস চির-প্রিয় মম প্রমদা-রহন।
অকালে আসিয়া কাল গ্রাসিল তােমায়,
নাহিক শকতি মোর রােধিবারে তায় ;
কিম্বা আমি নরাধম,
দীন হীন ক্ষুদ্রতম,
পশিল না মাের ডাক তার রাঙ্গা পায়,
অকালে আসিয়া কাল গ্রাসিল তােমায়।
;
কি বলিব প্রিয়তমে ! বিদরে হৃদয়,
মনেতে তােমার কথা হইলে উদয়
বিধির বিধান তরে,
চলে গেলে স্বর্গপুরে
এতটুকু স্মৃতি মাত্র রাখিয়া ধরায়,
অকালেতে মহাকাল গ্রাসিল তােমায়।
२१

নামা।
এস চির-প্রিয় মম প্রমদা-রতন,
ঐ দেখ তব তরে করিছে লােদন,
তােমার স্নেহের ‘মেনি',
যেন আজ অনাথিনী,
খেলা ফেলি’ সদা তাে'রে দেখিবারে চায়,
আয় একবার তা'রে কোলে নিবি আয়
স্নেহময়ী মা আমার শােকে পাগলিনী,
চাপিয়া মরম-ব্যথা দিবস যামিনী,
রেখেছেন বুকে ক'রে,
কই সােহগভরে,
সমাদরে সর্বক্ষণ তব তনয়ায়,
তবু ‘মেনি ভোলে নাই হায়রে তোমায় !
•০
অজি জাহ্নবীর কূলে,
বকুলের তরুমূলে,
জনমের মত তো'রে দিমু রে বিদায়
বল মন হরি হরি,
স্বর্গপথ আলাে করি,
যাও চলি, প্রিয়তমে অমর-ভবনে ;
রাখিনু তােমার স্মৃতি ধরিয়া পরাণে।
২৮

•
* * * *
বিলাপ।
বিধি রে ! এই কি মম অদৃষ্ট-লিখন,
অথবা এ অভাগার দৈব-বিড়ম্বন ;
কিম্বা বল কৰ্ম্মদোষে,
পড়িয়া তােমার রােষে,
এ হেন দুর্গতি মম ঘটিল জীবনে,
অনন্ত দুঃখের সহ সংসার-ভবনে।
ধন, জন, বিদ্যা আদি বিভব বিষয়,
আছিল সকলি বিধি তব করুণায় ;
তবে বল কি কারণ,
করি হেন কু-ঘটন,
সকলি হরিয়া নিলে ভাসায়ে পাথারে ;
কেন বা সাধিলে বাদ অভাগা উপরে।

দানা।
}
প্রশান্ত সাগর সম ছিল যার মন,
দয়া, মায়া, স্নেহ তাহে পূর্ণ অনুক্ষণ
হায় মােরা সে অর্ণবে,
ভেসে ছিনু সুখে ভবে,
কেন বা অশুভ-উৰ্ম্মি সহসা উদিল,
অভাগা জনম তরে অকূলে ভাসিল।
অবশেষে যেই লত। সংসার-উদ্যানে,
রােপণ করিয়াছিনু পরম যতনে,
আশারূপ বারি দানে,
কই প্রফুল্ল মনে,
সেবিতাম সদা যায় সরল অন্তরে,
ভালবাসা ফুল্ল ফুল পাইবার তরে।
বিধাতঃ ! সে লতা হায় অকালে নাশিলে,
সংসার-সুখের পথে কণ্টক রােপিলে ;
কি দোষ চরণে তাের,
করেছি কি পাপ ঘাের,
কি দোষে কি শাপে বিধি হেন দণ্ড দিলে,
জনমের মত হায় আমারে কঁদালে ।

বিলাপ
এবে মোর শূন্যময় এ ভব সংসার,
শূন্য দেহে শূন্য প্রণি করে হাহাকার ;
বিরলে বিজন স্থানে,
সদাই উদাস মনে,
সন্তাপিত প্রাণে সদা করি যে রােদন,
কে বল বুঝিবে আর মরম-বেদন।
কে আছে, কাহারে আমি করি সম্ভাষণ,
একমাত্র জীবনের সম্বল রােদন,
স্বার্থের সাধন তরে,
ভ্রমি সদা দ্বারে দ্বারে,
আকুল অন্তরে সদা সন্তাপিত প্রাণে ;
কে বল ফিরিয়া চায় অভাগার পানে ?
দুদিনের তরে খেলা ফুরাবে দুদিনে,
স্মৃতি মাত্র রবে এই নশ্বর ভুবনে,
ক্রমে ক্রমে, পলে পলে,
বিস্মৃতি-অতল-জলে,
তাহাও ডুবিয়া যাবে র’বেনা কখন ;
এইত ভবের খেলা ওরে ভ্রান্ত মন ।

সান্ত্বনা।
কোথা হে করুণাময়! দয়ার নিধান,
পিতের অমিয়তা, নিরাশের প্রাণ,
তুমি হে মঙ্গলময়,
এই ভিক্ষা দয়াময়,
কাতরের একমাত্র এই নিবেদন,
ঘুচাও মরম-ব্যথা শ্রীমধুসূদন।

প্রার্থনা।
কবে প্রভু হেন দিন হইবে আমার,
অন্তরে অনন্তরূপ হেরিব তোমার ;
প্রেমময় সে মূরতি
অচিন্ত্য অব্যক্ত ভাতি,
দেখিব হে নিশিদিন মানস-মন্দিরে,
পুলকে আনন্দ-স্রোত বহিবে অন্তরে
জল স্থল, চরাচর, ভূচর, খেচর,
নদনদী, গিরি, গুহা, পর্বত, কন্দর,
পাপ পুণ্য ভেদাভেদ,
ঘুচিবে মনের খেদ,
সবার আধার, প্রভু তুমি দয়াময়,
দেখিব—দেখাবে নাথ হইয়ে সদয়।

নান্তুনা।
অজ্ঞান-তিমির নাশি চিদানন্দময়,
হেরিব তানন্ত বিশ্ব সব তােমাময়,
এক মাত্র তুমি সার
সর্বকৰ্ম্মমূলাধার,
হেন জ্ঞান কবে নাথ হইবে উদয়,
দীননাথ! কবে তুমি হইবে সদয় ।
দাড়াও হৃদয় মাঝে নারদ-বরণ,
কমলিনী লয়ে বামে কমল-নয়ন,
করেতে লইয়া বাঁশী,
উজলিয়া দশ দিশি,
এস এ হৃদয় মাঝে জুড়াতে জীবন,
ভক্তি-পুষ্পে পূজিব হে রাঙ্গাচরণ ।
কিম্বা শ্যামা মুক্তকেশী হ'য়ে ত্রিনয়নী,
জটাজুট ধরি, পুনঃ, হ'য়ে শূলপাণি,
হৃদয়-কমল' পরি,
এস নাথ দয়া করি,
করিব হে প্রাণ ভরে রূপ নিরীক্ষণ,
আত্মহারা হয়ে নাথ পড়ি তখন।
৩৪

প্রার্থনা,
অকৃতি অধম আমি গুণ-জ্ঞান-হীন,
দাও প্রভু দয়া করে দাসেরে সুদিন ;
তুমি হে অনিন্দময়,
তব ধ্যানে মেক্ষি হয়,
জন্ম মৃত্যু ধৰ্ম্মাধৰ্ম্ম থাকে না জীবনে,
তােমার নিৰ্ম্মল জ্যোতিঃ পশে যদি প্রাণে
দূরে যাবে কৰ্ম্মফল তব দরশনে,
তুমি আমি সম জ্ঞান ঘটিবে জীবনে,
তাভেদ দেবতানর,
পশুপক্ষী চরাচর,
সৰ্বৰ জাবে ব্রহ্মজ্ঞান হইবে তখন,
হেন ভাগ্য দয়াময় হবে কি কখন।

কোকিল।
নির্জন কাননে বসি, মাতাইয়া দশদিশি,
কে তুমি হে বনসখা গাহি সুন্দর ;
তোর ঐ কুস্বরে, ভুবন মোহিত করে,
ভাবি তাের কাছে কিন্নরার সুর।
তাের কাল রূপ রাশি, হেরিবারে ভাল বাসি,
তার চেয়ে ভালবাসি শুনিতে ও স্বর ;
ওরে পিক! তোর স্বরে, না জানি কি সুধা ক্ষরে,
শুনিলে জুড়ায় মাের তাপিত অন্তর।
কত দিন প্রিয়াসনে, বসন্তের সমীরণে,
শুনেছি তােমার ঐ ধামাখা স্বর ;
বিভাের হইয়া তায়,
প্রেমালাপে দুজনায়,
কত দিন কেটে গেছে ওহে পিকবর ।

কোকিল
কিন্তু হে বিহগমণি। এবে সে সুধার খনি,
করেছি জনম তরে চির বিসৰ্জ্জুন ;
তাই তাের কুম্বরে,
হৃদয় আকুল করে,
জেগে উঠে জীবনের দারুণ বেদন।
বধিতে বিরহি-প্রাণ,
কেন পাখী তুলি তান,
ডাকিছ আবার তুমি বসিয়া কাননে ;
কি যে জ্বালা তোর স্বরে, তুই তা কেমন ক'রে,
বুঝিবিরে কাল পাখি তাের ক্ষুদ্র প্রাণে ।
অছি সুখে প্রিয়াসনে, সদ। প্রো আলাপনে,
স্বভাবের শােভা তুমি করিছ দর্শন ;
কিবা দোষ আছে তাের,
যা' ছিল অদৃষ্টে মাের,
একে একে সব তাহা হইল পূরণ ।
থাক পাখী বসি ডালে, গাও তুমি কুতুহলে,
শুনিও না ব্যথিতের মরম-বেদন;
বিরহীর কথা শুনে,
থেক না উদাস মনে,
কুহুস্বরে কর তুমি অমিয় বর্ষণ।
৩৭

সাত্তমা
সৃজন পালন যার,
করি তারে নমস্কার,
তুলিয়া পঞ্চম তানে তার গুণ গাও;
শুনায়ে বিভুর গান,
স্নিগ্ধ করি মন প্রাণ,
অভাগার মন-ব্যথা বারেক ভুলাও।

০।
পূর্ণিমা নিশি।
হে শুধাংশু ! কেন তুমি উজ্জ্বল আননে,
গগন-গবাক্ষ খুলি প্রীতি-ফুল্ল মনে,
পরিয়া তারার মালা,
বাড়াতে বিরহ-জ্বালা,
এসেছ আবার ঐ নীল নভঃস্থলে,
ভাসাইতে অভাগীয় নয়নের জলে।
পড়ে মনে একদিন এমনি সময়,
হে সুধাংশু ! হয়েছিল তােমার উদয়,
এমনি
মধুর রাতে,
তাহারে লইয়া সাথে,
বিভাের হইয়াছিনু প্রেম আলাপনে,
সুধা মাখ। সুনির্মল তোমার কিরণে।

সান্তনা।
মনে পড়ে দুই জনে বসিয়া নিৰ্জ্জনে,
মনােলােভা প্রকৃতির স্নিগ্ধ সমীরণে,
আদরে ধরিয়া গলা,
ভুলিয়া বিরহ-জ্বালা,
সতৃষ্ণ নয়নে চাহি তাের মুখ পানে,
কেটে গেছে কত দিন এমনি নির্জনে।
এমনি পূর্ণিমা নিশি ছিল আলােকিত,
কোকিলের 'তানে সদা দি মুখরিত,
দোয়েল, পাপিয়া আসি,
জাগাইয়া সারানিশি,
শুনায়ে গিয়াছে তারা কত শত গান,
অার ত অাসে না এলে জুড়াইতে প্রাণ ?
তাই হে সুধাংশু, আজ তব দরশনে,
শেল-সম বাজে মাের তাপিত পরাণে,
হৃদয়ের স্তরে স্তরে,
যে অনল দগ্ধ করে,
তোর দরশনে তাহা দ্বিগুণিত হয়,
কেন হে সুধাংশু, পুনঃ হয়েছ উদয় ?
৪০

মা নিশ।
তুমিত এসেছ ফিরে ওহে সুধাকর,
মনােহর বেশে পুনঃ সাজিয়া সুন্দর,
সঙ্গে লয়ে প্রণয়িনী,
কোমলঙ্গী কুমুদিনী,
সতী-শিরােমণি-রাণী সুচারু-হাসিনী
মনোরম। মনোহরা সুধাংশুবদনী।
•
তুমি ত এসেছ ফিরে ওহে শশধর,
সাজিয়া নবীন বেশে অম্বর উপর ;
কিন্তু সে সুধার খনি,
হৃদয়ের স্পর্শ-মণি,
ফিরিবে না কভু আর এ বিশ্ব-সংসারে ;
বিসর্জন দি’ছি তায় জনমের তরে।
অনন্তে তােমার স্থান, অনন্তে ভবন,
অনন্তের পথে সদা কর বিচরণ,
তাই রে সুধাই তােরে,
জান যদি বল মােরে ;
কোথায় আছে সে মাের হৃদয়তন ;
যার তরে প্রাণ মম সদা উচাটন।
৪১

সান্ত্বনা।
অথবা সে ডুবে গেছে নিবিড় আঁধারে,
দিয়াছি বিদায় তারে জনমের তরে ;
আর না হাসিবে আসি,
আর না নিকটে বসি,
ঢালিয়া বচন-সুধা জুড়াবে জীবন,
সােনার প্রতিমা হায় দিছি বিসর্জন।
বিরাম-দায়িনিনিদে শান্তি-প্রদায়িনি,
সকাতরে ডাকি তােরে এস গেঃ জনন
লও মা কোলোতে তুলে,
ক্ষণ তরে যাই তুলে,
এ দারুণ মৰ্ম্মভেদী হৃদয়-বেদনা,
দুর্বল শরীরে মাগো আর যে সহে না !
82

স্বপন।
হেরিনু নিশীথে মরি সুন্দর স্বপন,
তোর সেই মধুমাখা সুচারু বদন,
বহিল মধুর বায়,
অমিয় ছড়ায়ে তায়,
ব্যাপিল দিগন্ত তার শান্তি পরশনে,
উজলিল পোড়া প্রাণ প্রিয় দরশনে ।
সত্যই কি প্রাণাধিকে হৃদয়-রতন,
এসেছিলে ? অথবা এ নিশার স্বপন ?
দেখা দিতে অভাগারে,
কেন তুমি বারে বারে,
এস প্রিয়তমে তুমি নিশি আগমনে,
কাঁদাইয়া তবে বল যাও কোন্ প্রাণে !
৪৩

সান্ত্বনা।
তব স্মৃতি সুখময় জাগিছে জীবনে,
গাঁথা আছে তোর কথা দেহ প্রাণে মনে ;
একটী বাঁধন তার,
খুলিবারে সাধ্য কার ?
অটুট রহিবে তাহা আমার অন্তরে,
যতদিন এ জীবন রহিবে সংসারে।
অতীতের কথাগুলি পড়ে যবে মনে,
কি যে জালা জ্বলে মাের সন্তাপিত প্রাণে,
বলিব কাহার কাছে,
হেন জন কেবা আছে ?
নারবে—গােপনে তাই মুদিয়া নয়ন,
তাের সুখময়-স্মৃতি করি দরশন।
সত্য যদি একদিন ছিলি এ ধরায়,
তবে কোন্ প্রাণে বল কঁাদায়ে আমায়,
এমনি নিদয় হ'য়ে,
চিরতরে ফাঁকি দিয়ে,
চ'লে গেলে প্রিয়তমে অমর-ভবনে,
বাজিল না বিন্দুমাত্র তোমার পরাণে।
৪

স্বপন।
কেন এসেছিলি তুই দুদিনের তরে,
ছায়াটির মত এই নিদাঘ-সংসারে,
মনে মনে ছিল অশা,
কত প্রেম ভালবাসা,
স্বার্থশূন্য জীবনের কত অকিঞ্চন,
করেছিনু কত দিন দুজনে গঠন।
কিন্তু হায় ভাগ্যদোষে হারানু যখন,
জীবনের ধ্রুবতারা অমূল্য রতন,
এবে আমি ভাবি তাই,
তুই বুঝি ছিলি নাই,
স্বপ্নে শুধু এসেছিলে ক্ষণেকের তরে,
কঁাদাইতে অভাগারে হায়রে সংসারে !
দুই দিন আগে যারে ভেবেছি আপন,
হেরিলে যাহার মুখ জুড়া’ত জীবন,
আজি তার স্মৃতি ল'য়ে,
উদাস অন্তরে চেয়ে,
স্বপ্ন-সম ভাব মন নীরবে, নিনে,
ফিরিবে না কভু আর নশ্বর-ভুবনে !
৪৫

নিদয়।*
;
সত্য হে নিদয় আমি, পাষাণ-হৃদয়,
মমতার বিন্দু মাত্র নাহি পরিচয় ;
প্রেম, ভক্তি, ভালবাসা,
মধুর প্রণয় আশা,
ভ্রমেও জাগেনা কভু হৃদয়ে আমার,
সহ্যই নিদয় আমি নাহি সদাচার।
পাষাণে গড়েছে বিধি আমার জীবন,
মরুভূমি-সম হৃদি ঘাের-দরশন,
জলিতেছে দিবানিশি,
উগারি অনলরাশি,
নাহি তাহে তিল মাত্র জুড়া’বার স্থান,
কেমনে তথায় তুমি পাবে পরিত্রাণ ?
প্রিয়তমা জীবিতকালে একখানি পত্রে কেবল মাত্র “নিদয়”
এই কথাটি লিখিয়াছিল। প্রত্যুত্তরে আমি এই কবিতাটা পাঠাইয়া-
ছিলাম। সন ১৩১১ সালে ইহা “প্রীতি” পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।

নিদয়
নিদয় যদি না হবে আমার জীবন,
তা না হলে বল দেখি, কেন অনুক্ষণ
এত কষ্ট এত তাপ,
দুর্বিষহ অনুতাপ,
কেন বা সহিবে তুমি কোমল পরাণে ?
সত্যই নিদয় আমি এ মর-ভবনে।
তোমাসম প্রণয়িনী লভিয়া যখন,
নারিনু বারেক মাত্র করিতে ঘতন,
তখনি জেনেছি হায়,
অামা সম অভাগায়,
কেন বা বরিল বিধি পতিত্বে তোমার ;
সত্যই নিদয় আমি নাহি সদাচার।
প্রবেশিয়া মম সনে সংসার-কাননে,
এক দিন সুখী তুমি হলে না জীবনে,
মনঃ-ক্লেশে যায় দিন,
ক্রমে হবে তনু ক্ষীণ,
কবে বল সুখী তুমি হইবে আবার ?
সত্যই নিদয় আমি নাহি সদাচার।
৪৭

সান্ত্বনা।
নিরমল বিধুমুখে সদাই বিষাদ,
মিটিল বিন্দুমাত্র জীবনের সাধ,
কেবলি দুখেতে ভরা,
ছল ছল আঁখি তারা,
তা'দেখি এ হিয়া তােরে করিনু অপর্ণ,
দয়া করি, তুমি প্রিয়ে ! করহ গ্রহণ।
যদিও নিদয় আমি বিধির বিধানে,
তথাপি তোমার সুখ মাগি মনপ্রাণে ;
তাই বলি চাননে,
দৃষ্টি রেখ ধৰ্ম্ম পানে,
উদিবে অবশ্য তব সুদিন নিশ্চয়,
নিশা গতে হয় যথা ভানুর উদয় ।
কোথা পুণ্যময় বিধি অনাথ-শরণ!
দীননাথ দয়াময় এমধুসূদন,
পরিশ্রান্ত এই প্রাণে,
বল নাথ কত দিনে,
তাবসাদ বিদূরিত হইবে তাহার,
হব আশীর্বাদে হবে সােনার-সংসার ।
৪৮

আঁধারে।
এই কি সংসার সুখ, শান্তিনিকেতন ;
জীবনের এই কিরে সুখের স্বপন ?
এ সুখ ত সুখ নয়,
এ শান্তি অশান্তিময়,
অধির আঁধারময় হেরি যে সকল ;
কে বলে অমৃত, এ যে ভীষণ গরল ?
ধন, জন, যশ বল বিভব, বিষয়,
সকলি আঁধারে ঘেরা সদা বিষময়,
এই কি সুখের হেতু,
এই কি স্বরগ-সেতু,
এ যে ঘাের অন্ধকার—আমি অভাজন,
কেমনে আধার-পথে করিব গমন ?
৪৯
৪

সান্ত্বনা
ভেসে যাই অন্ধকারে অকূল পাথারে,
নিবিড় যে তমােরাশি না দেখি কাহারে,
কে দেখাবে সেই পথ,
পূরাবে হে মনােরথ,
আলাে বিনা শান্তি-সুখ মিলিবে কোথায় ?
আঁধারে অভাগা বুঝি জীবন হারায় ।
ঐ না জ্বলিছে আলো নিবিড়-আঁধারে,
, না, ও যে প্রলােভন ভুলাতে আমারে,
নিরমল সুধামাখা,
সদাই বিষেতে ঢাকা,
হলাহল সম ও যে অতীব ভীষণ,
বিপাকে অভাগা বুঝি হারায় জীবন।
অবিদূরে হের কি মানস-মােহন,
ভুবন-ভুলান রূপ করিয়া ধারণ,
নানা ছলে প্রতিবার,
ডাকিতেছে অনিবার,
সুধা ছলে কালকূট বিতরণ করি,
হৃদয়ে আঁধার বুঝি আসিল আবরি।

আধারে
দেখা কর্তব্য পথ, অন্ধে কৃপা করে,
তােমা বিনা কেহ নাই এ ঘাের আঁধারে,
ডুবায়ে দুরিত-কূপে,
ষড় রিপু সহ সুখে,
খেলিতে দিয়াছ ল'য়ে ধন, জন, বল,
ভুলায়েছ তব নাম ভবেরি সম্বল।
জানিব কবে হে নাথ আমি কোন জন,
আসিয়াছি এ সংসারে কিসের কারণ।
কি কাৰ্য্য সাধন তরে,
পাঠাইলে তুমি মােরে,
কি কার্যে ফুরাল দিন জীবন-খেলায়,
কে বলিবে তত্ত্ব-কথা কি হবে উপায়।
দীননাথ ! কৃপা-কণা কর মোরে দান,
অজ্ঞান-আঁধার নাশি দাও দিব্য-জ্ঞান,
পরিহরি তমােরাশি,
স্থির চিত্তে দিবানিশি,
অন্তর মাঝারে সদা-সদানন্দময়
নিৰ্ম্মল মূরতি দেব দেখি দয়াময় ।

নির্জন আলা
প্রণয়িনি। বল তুমি কোথা এ সময় ?
এ ঘোর নিশাথে দেখ পরিহরি ভয়,
পবিত্র প্রণয়-দেবে,
পৃজিব অন্তরে ভেবে,
হের প্রিয়ে একা আমি বসিয়া নির্জনে ;
সুহাসিনি ! এ সময়ে আছ কোন খানে ?
;
শয়নে নাহিক সুখ কি ছার শয়ন,
তোমা ছাড়া ভাল মোর নিশি জাগরণ ;
এ ঘাের যামিনাভাগে,
বল প্রিয়ে কে গো জাগে,
সকলেই শুয়ে আছে, সুখের শয়নে ;
কিন্তু মাত্র জাগি আমি তােমার কারণে।

নির্জন আলাপ।
অন্তরের সাধ মম, হবে কি পূরণ ?
কিম্বা মাত্র হবে সার, নিশি জাগরণ :
তোমারি আশাতে আসা,
এবে এই ঘাের নিশা,
কে জাগে, কেহ ত নাই—সকলেই সুখী,
কেবলি জাগিয়ে আমি ওলাে বিধুমুখি !
গভীরা রজনী তায় তিমিরা-বরণী,
ঝিল্লি-রবে নিনাদিত হ’তেছে মেদিনী,
হেনকালে তন্দাবশে,
দেখিনু নিশার শেষে,
চির-পরিচিত সেই উজ্জ্বল আনন,
সতই হৃদয় যারে করে অন্বেষণ।
••
ছল ছল নেত্রে যেন রহিনু চাহিয়া
বিদরে হৃদয় মাের, সে দৃশ্য হেরিয়া
তা দেখি মধুর সুরে,
সম্ভাষিয়া সমাদরে,
বসিল নিকটে প্রিয়া, জুড়াল হৃদয় ;
দূরে গেল জীবনের দুঃখ সমুদয় ।

পাবনা।
সাদরে যুগল-ভুজ করি প্রসারণ,
মৃণাল-সদৃশ হস্ত করিয়া ধারণ,
কহিনু সোহাগভরে,
বল প্রিয়ে ত্বরা করে,
সত্য কি এসেছ তুমি ফিরিয়া আবার,
উজ্জ্বল করিতে মোর গৃহাদি সংসার।
আদরে হৃদয় মাঝে করিয়া ধারণ,
মল্লিকার ফুলহার অগুরু-চন্দন,
সযতনে ল’য়ে করে,
সাজাইমু প্ৰেয়সারে,
মজিল অন্তর মম কহিনু তখন,
সার্থক হইল প্রিয়ে নির্জন-মিলন।
Z
22
৫০

প্রণয়।
ধন্য রে প্রণয় তুমি, এ বিশ্ব-সংসারে,
সর্বলােকে সদা তব সমাদর করে।
চাহ তুমি যার পানে,
সে তােমারে ভাল জানে,
চির-সুখে সেই জন, জীবন কাটায়,
অতুল আনন্দপ্রদ নশ্বর ধরায়।
তােমারি কারণে এই ধরণী মাঝারে,
জীবিত এ জীবকুল ভজিয়া তােমারে ;
চিরসুখী কোন জন,
কারাে ভাগ্যে আজীবন,
হা হুতাশ কিম্বা সদা অশ্রু বরিষণ,
বিফল জনম তার বিফল জীবন।

সান্তনা।
তোমারি কারণে দেখি কোথাও কুশল,
কোথাও নেহারি সদা ঘাের অমঙ্গল,
কি যে বিদ্যা জান তুমি,
জানেন অন্তরযামী,
আর জানে সেই জন, প্রণয়ী যে হয়,
তোমার অপার লীলা সুখদুঃখময়।
জীবনের আকিঞ্চন করি পরিহার,
জলধি সলিলে কেহ দিতেছে সাঁতার,
শ্বাপদ-পৃরিত বনে,
প্রবেশিয়া শূন্য মনে,
ভ্রমিতেছে কত শত হায়রে সংসারে,
কঁদিয়া কাহারাে প্রাণ যায় চিরতরে।
সানুকূলে যারে তুমি ভাবহ আপন,
তুলনায় তার সম সুখী কোন্ জন ?
সকলি আনন্দময়,
এ সংসার সুধাময়,
দুখের আভাষ কভু জানেনা জীবনে
ধন্য সেই মহাজন নগর ভুবনে।

প্রণম্ন।
;
কামিনী কোমল-কায়া অতুল-তুলনা,
বিধির অপূর্ব সৃষ্টি হায়রে ললনা ;
মনােমত হলে পরে,
সর্বসুখ একাধারে,
আপনারে ধন্য বলি মানে সে মানব ;
বসুধায় মিলে হায় অমর-বিভব ।
ভাগ্যদোষে যে অভাগা বঞ্চিত এ সুখে,
বৃথায় জনম যায় সদা ভাসে দুখে;
সংসার শশ্মশান তার,
সার মাত্র হাহাকার,
ভূপতি হইলেও সে বড় অভাজন,
জীবনে জানেনা হায় প্রণয় কেমন!
প্রণমি প্রণয় তব বিচিত্র লীলায়,
সাধ্য নাই বর্ণিবারে মম ক্ষমতায় ;
তুমি যদি নিজগুণে,
আমি হেন মুট জনে,
শিখাও সদয় ভাবে প্রকৃত প্রণয়,
তাহে যদি অভাগার হয় জ্ঞানােদয়।
জ্ঞ

পরিণাম।
সখে।
নীরবে একাকী কেন দাঁড়ায়ে অদূরে,
দীন হীন সম আজি- -শীর্ণ কলেবরে,
ছল ছল আঁখিতারা,
সদাই বিষাদে ভরা,
কি পাপে ঘটিল তব হেন কুঘটন
কেন বা করিছ সদা অশ্রু বরিষণ।
কোথা সেই স্বর্ণকান্তি উজ্জ্বল বরণ,
কোথা সেই মনােহর বসন ভূষণ,
কোথা এবে গেল তারা,
নিশিদিন ছিল যারা,
পরম আত্মীয় ভাবে—নিকটে তােমার,
ভলাইত নানা ছলে যত দুরাচার ।

পরিণাম।
নিৰ্মাণ করিয়াছিলে দিয়া বহু ধন,
পিশাচিনীর তরে ওই সুন্দর ভবন,
না মিটিতে তব অশা,
ঘটিল এ হেন দশা,
বুঝিতেছ এবে ভাই আপনার মনে,
কি অধৰ্ম্ম পাপাচার করেছ জীবনে ?
অতুল গৃহের শােভা দেখিয়া সকলে,
জিজ্ঞাসা করিত সবে মহা কুতূহলে,
আমরি কি মনোহর,
কেমন সুন্দর ঘর,
কা’র ও সুন্দর ধাম প্রাসাদ সমান,
সুসজ্জিত চারি ধারে পুষ্পের উদ্যান।
কদাচার-স্রোতে মগ্ন করিয়া জীবন,
আছিলে উন্মত্ত তুমি সদাসর্বক্ষণ,
চাটুকার মিলি শত,
কুপথে লইত কত,
বন্ধুভাবে অসি সবে তব সন্নিধানে,
তুতি তােমায় সদা—তোষামােদ দানে।

সাত্তমা।
বিষধরে সে সময়ে আপন ভাবিয়া,
অনায়াসে দিয়াছিলে হৃদয় পাতিয়া,
তাই আজ তারি বিষে,
তব পূর্ব কৰ্ম্মদোষে,
অনুতাপে দহিতেছে জীবন তােমার,
অধমে জানে কি কভু অর্থ-ব্যবহার ?
এ খেলার শেষ দিন আসিবে যখন,
কি করিবে ল'য়ে তুমি এ ছার জীবন ?
এত দিন বুঝ নাই,
এখন বুঝিবে ভাই,
এ পাপের পরিণাম কতই ভাষা,
সুধ-ভ্রমে কালকূট করেছ ভক্ষণ।
ভাগ্যে যাহা ছিল তব পূরণ হইবে,
অনুতপ্ত প্রাণে এবে সুফল ফলিবে,
পার যদি এইবার,
ডাক তঁারে অনিবার,
ভক্তিভরে—সে চরণে লও হে শরণ,
বিফল রোদনে বল কিবা প্রয়ােজন।
০
{} sঙ্গ'

স্বদেশের প্রতি।
সুদূর এ পরবাসে,
সততই মনে আসে,
মধুমাখা ভবানন স্বদেশ আমার ;
যেস্থানে যখন থাকি, মা বলে তােমারে ডাকি,
পুলকে পূর্ণিত তনু হয় অভাগার।
থাকি যদি বহু দূরে,
নদ, নদী, সিন্ধু পারে,
অথবা নিবিড়-বনে নির্জনে বসিয়া,
মুদিলে যুগল আঁখি, সতত তােমারে দেখি,
অন্তরের অন্তঃস্থলে আছে গাে জাগিয়া ।

পানা।
এত স্নেহ কারো প্রাণে, দেখি না মা কোন স্থানে
এত গুণ একাধারে কে পেয়েছে কবে,
কে বলে মা তুমি তুচ্ছ, তুমি যে জগতপূজ্য,
তব পুণ্যে সবে মাের। পৃণিত গৌরবে ।
সেই ধ্য এ জগতে,
আছে যার জীবনেতে,
বিন্দুমাত্র ভক্তি মাগাে তােমার চরণে,
সে যদি অকৃতি হয়,
রহিবে অনন্তকাল নশ্বর-ভুবনে।
তবু তার পরিচয়,
যে দিকে দেখি মা চেয়ে, তব স্নেহ আছে ছেয়ে
আবার সন্তানগণে রেখেছে যতনে,
নিজ অঙ্গ করি দান,
বাঁচাও সবার প্রাণ,
এই মেহ বল গো মা আছে কার প্রাণে।
কত সাধু মহাজন,
আছিল মা অগণন,
সুসন্তান কত ছিল তোমার কোলেতে,
ধরিয়া যাদের কোলে,
সব জ্বালা ভুলে ছিলে,
স্মৃতি ভার বিঘােষিত হতেছে জগতে।

স্বদেশের প্রতি
যুগে যুগে যুগান্তরে, যেন মাগাে আসি ফিরে,
সুকোমল কোলে তব পাই যেন স্থান,
পারি যেন ডাকিবারে,
প্রতি বারে সমাদরে,
মা বলে জুড়ায় যেন সন্তাপিত প্রাণ।

fi১
বালিকার বিবাহ।
বিয়ের কথা শুনে বালা মুচকে হেসে যায়,
লজ্জা হচ্ছে আবার যদি দেখতে কেহ পায়,
আপন মনে ভাবছে সদা নূতন বরের কথা,
এমন সময় এল তাহার প্রিয়সখা তথা ।
সহচরা দেখে বালা, শুধুই কেবল হাসে,
সমাদরে প্রিয়সখী বল্‌ছে মধুর ভাষে,
ওলো তাের যে বিয়ে হবে পাবি রাঙ্গা কর,
তুই যে এবার ক'নে হবি, চেলির কাপড় পর।
কনে সেজে ঘেষ্টা দিয়ে পিঁড়ায় ব'সে রবি,
মনের ভিতর দেখবি তখন নতুন বরের ছবি,
রাঙ্গা বরটী আসবে যখন পাকি চড়ে হেথা,
দৌড়ে আমরা দেখতে যাবাে বরের সভা যথা।
৩৪

বালিকার বিবাহ।
ঘুরে ফিরে আস্বাে দেখে চাঁদের মত বর,
ঘরে এসে তোকে ঘিরে বস্বাে তাহার পর,
বল্বাে তােরে বরের কথা শুনবি চুপি চুপি,
চোক্‌ বুজিয়ে মনের ভিতর দেখবি কত ছবি।
শাঁক বাজাবে উলু দেবো, ক’রবাে কত মজা,
কাষ্টী ধরে তোমার বরের করে দিব সােজা;
গান গাইবাে ছড়া কাটুবাে যত গো আছে মনে,
কত যে ভাব, করবাে রে ভাই তোমার বরের সনে।
রাঙ্গা বরটী ছাউনি তলায় আসবে লাে যখন,
চুপি চুপি উকি মেরে দেখবি লাে তখন,
ঘােষ্টা দিয়ে পিড়ায় তুলে ঘুরাবে তথায়,
থবিদ মেরা তাের সনেতে লজ্জা কি লাে য় ?
বাসরঘরে বস্বাে গিয়ে বরকে নিয়ে ঘিরে,
রাঙ্গা বরের শুনবাে কথা কত মজা ক'রে,
দিয়ে তােরে বরের কোলে দেখবাে মনের সাধে,
খাবাে মােরা চারি ধারে সকলে দল্ বেঁধে।
৫

সান্ত্বনা।
তার পরেতে যাবাে চলে যে যার ঘরে ভাই,
জাগতে ত নাই সারা রাত, বলেছে সবাই,
মনের সুখে থাকি রে ভাই নূতন বরের কাছে,
ভক্তি করো ভাল বেসে যেবা যেথায় আছে।
১৭

ফুল
ফুল তুমি এ জগতে প্ৰীতি-নিদর্শন,
বিধাতার এক মাত্র মানস-সৃজন,
তর সম কোমল,
তব সম সুনির্মল,
ধরণীতে কভু কিগে৷ হ'য়েছে সৃজন ;
এ সংসারে কেবা বল ফুলের মতন।
উষার আলােক মাঝে শোভে তব কায়,
মলয়-পবন আসি চুমি চলে যায়,
নিশার শিশির দল,
যেন বা মুকুতা-ফল,
সাজান তােমার দেহে মানস-মােহন,
সে রূপে প্রেমিক জনে সদা নিমগন।

পাতন।
মধুর সৌরভ তব লইয়া পবন,
অযাচিত ভাবে সবে করে বিতরণ,
বিরহী আকুল প্রাণে,
কল্পনায় মনে মনে,
সাদরে সােহাগভরে করে যে চুম্বন,
কেবা আছে এ সংসারে ফুলের মতন।
ফোটো ফোটে। মুখখানি অতি ধীরে ধীরে,
চাহ যবে তুমি ফুল উকি ঝুকি মেরে,
মরি কি সুন্দর তায়,
অপরূপ শোভা পায়,
ঘোষ্টি। মাঝারে যথা যুবতী-বদন,
সলজি চাহনি তার চিত্ত-বিমােহন।
হাসিমুখে যবে তুমি প্রফুল্ল অন্তরে,
ফুটে উঠ বৃন্ত’পরে সােহাগের ভরে,
নয়ন-রঞ্জন গুণে,
বিমোহিত জগজনে,
কি যে শান্তি ঢাল তুমি মানব-জীবনে,
প্রেমিক বিহনে বল অঙ্গে কে বা জানে।

ফুল।
যুবক-যুবতি কিম্বা শিশু সুকুমার,
থবা নাহিক যার জ্ঞানের সঞ্চার,
সবাই যতন করে।
স্নেহ-চক্ষে সমাদরে,
আদরে সােহাগ ভরে হৃদে দেয় স্থান,
কে বল হইতে পারে তােমার সমান।
নিষ্ঠুর ভ্রমর-দলে আপন ভাবিয়া,
অকাতরে দাও তুমি হৃদয় পাতিয়া,
কিন্তু সেই ক্রুর জাতি,
এমনি কপটমতি,
মধু পান করি শেষে দংশিয়া তোমায়,
পলাইয়া যায় কভু ফিরিয়া না চায়।
অভিমানে হয় তব বিশুদ্ধ বদন,
অবশেষে ধীরে ধীরে মুদিয়া নয়ন,
স্বার্থপর সৃষ্টি হ'তে,
যাও চলি স্বর্গ-পথে,
হতাদরে বিলুণ্ঠিত হও অযতনে,
পরিশেষে পরিণাম এইত ভুবনে!

সান্ত্বনা।
তাে’র মত ওরে ফুল মানব-জীবন,
যার জন্য করে সবে এতেক যতন,
এও বটে এক দিন,
নিশ্চয় হইবে লান,
চিহ্ন মাত্র না থাকিবে নশ্বর-সংসারে,
পরিণাম এক সূত্রে গাঁথা পরস্পরে ।

চিন্তা।
ছাড়িয়া সংসার মায়া এস দেখি মন,
দিবানিশি প্রাণপণে করি অন্বেষণ,
ভবের আরাধ্য সেই গােকুল-রতনে,
ভাগ্যে যদি পাই দেখা হায় রে জীবনে
উদাস,
শুনেছি দয়াল তিনি কাঙ্গালের ধন,
পরম করুণাময় পতিতপাবন,
পাতকী হইয়ে তবে কি হেতু
পৃজিতে মনের সাধে সেই শ্ৰীনিবাস।
মুদিয়া যুগল আঁখি পবিত্র হৃদয়ে,
পরম পিতার নামে এক প্রাণ হ'য়ে,
থাকোনা অবােধ মন হ'য়ে অচেতন,
অনায়াসে জুড়াইবে এ পাপ জীবন ।
৭১

নামা।
বিপুল বিষয় কিম্বা ধনাদি কাঞ্চন,
অসার অনিত্য ধনে কিবা প্রয়ােজন,
কাতর অন্তরে সেই কাঙ্গালের ধনে,
দিবা নিশি হের মন মানস-নয়নে।
কি হবে তােমার মন কামিনী-কাঞ্চনে,
মায়া-জাল ছিন্ন করি হের নিরঞ্জনে,
পূর্ণ হবে মনসাধ জীবন যৌবন,
ভবের যন্ত্রণা তব হবেরে মােচন।
ভলিবাস মনে মনে পরম যতনে,
অনুদিন রাখ মতি ভঁহার চরণে,
অগতির গতি তিনি কমল-লােচন,
কেশব করুণাময় শ্রীমধুসূদন।
এই কর দীননাথ রাধিকারমণ,
রাঙ্গা পায় এ দীনের এই নিবেদন,
দিনান্তে তোমায় নাথ পড়ে যেন মনে,
এ জাবন সায় যেন হরি-গুণ-গানে।
#ড়ে
৭২

--
আবেগ।
কতদিন চলে গেছে হৃদয়ের রাণী,
দেখি নাই কতদিন সেই মুখখানি;
কি জানি সে কোন প্রাণে
তেয়াগিয়া প্রিয়জনে,
অশ্রুজলে ভাসাইয়া গেছে গাে চলিয়া,
কতদিন দেখি নাই সে জীবন-প্রিয়া ।
জেগে উঠে জীবনের ভরা ব্যাকুলতা,
অশান্ত পরাণে আসে নিদারুণ ব্যথা,
আশা-লতা শুকায়েছে,
সে ভাবনা করা মিছে
তবুও তাহার স্মৃতি কেন সুখময়
মুদিত করিয়া আঁখি দেখি যে সময় ।

সান্ত্বনা।
সুখের বাসরে কেন নিভে গেল বাতি,
অসময়ে শুকাইল কেন বা ব্রততী,
জোছনা নিশিতে আসি
রবি-সুত গৃহে পশি,
গ্রাসিল কেন বা মাের হৃদয়ের রাণী ;
দেখি নাই কত দিন সেই মুখখানি ।
যদিও সুখের স্রোতে ভাসিতেছে ধরা,
যদিও নিখিল বিশ্ব প্রেমগীতে ভরা,
তবুও তাহার তরে,
অশ্রুজলে চক্ষু ভরে,
উগ্ধ অাকাশের পানে চাহিয়া চাহিয়া,
হৃদয়-আবেগ আরো যায় গাে বাড়িয়া।
৭৪

প্রবাস-জীবনে দুর্গোৎসব।
মাগাে !
সারাটি বৎসর ধরি করি আকিঞ্চন,
হেরিতে তোমার ওই দুলভ চরণ.
তবে মা কিসের তরে,
রাখিলি এমন ক'রে,
আবদ্ধ করিয়ামােরে বিদেশে বিজনে,
কিবা দোষ করেছি মা তোমার চরণে ।
সুদীর্ঘ বরষ-ব্যাপী মনের বাসনা,
হৃদয়ে আছিল মাগে। কতই কল্পনা,
আশার তুলিকা ধরি,
মন প্রাণ এক করি,
যে ছবি আঁকিয়াছিনু করি প্রাণপণ,
সকলি হতাশ-জলে হ'লাে নিমগন।

দানা।
সুদূর প্রবাসে যারা থাকে নিরন্তর,
ছিল না যাদের ভাগ্যে ক অবসর,
এ হেন সুখের দিনে,
তারাও প্রফুল্ল মনে,
জনমভূমির দিকে চলেছে ছুটিয়া,
নাচিছে আনন্দে মাগাে সবাকার হিয়া।
পুলকিত শুগণ তব অগমনে,
শােভিছে চন্দ্রিমা তাই বঙ্গের গগনে
উজলিয়া দশদিশি,
মায়ের আনন্দে মিশি,
এ সংসারে সে বারতা জানাবার তরে ;
শোভিতেছে তাহা কিবা অম্বর উপরে।
জয় তরঙ্গিণি! করি কুল কুল ধ্বনি
কোথায় চলেছ তুমি হয়ে উন্মাদিনী ?
আসিছেন মহামায়া,
ভরাধ্যা ভবজায়া,
বিশ্ব-প্রসবিনী সেই ভুবনমােহিনী,
তাই কি আনন্দে তুমি মন্তু কল্লোলিনি ?

দুর্গোৎসব
অদূরে বাজিছে কিবা মধুর বাজনা,
আরম্ভ হইল বুঝি মাতৃ-উপাসনা ;
হায় প্রিয় জন্মভূমি,
এ সময় কোথা তুমি,
তব অঙ্কে মাতৃমূর্তি দেখিব বলিয়া
সারাটি বৎসর আমি ছিনু যে চাহিয়া।
কোথায় জনমভূমি প্রিয়-দরশন,
কোথায় জননী মাের আত্মীয় স্বজন
কোথা সেই স্নিগ্ধ বায়,
অমিয় ছড়ায়ে যায়,
কোথা সেই মনােলােভা গৃহাদি প্রাঙ্গণ ;
বিদেশে বিষাদে আজ কাতর জীবন ।
কোথা সেই জীবনের স্নেহময় ভাই,
তুলনায় যার সম কেহ আর নাই,
শিশু কন্যা কোথা মম,
প্রাণাপেক্ষা প্রিয়তম,
কোথায় রহিল তার এ আনন্দ-দিনে ;
বিদেশে রহি যে মাগাে নিরানন্দ মনে।

বানা ।
ভালবাসি যারে আমি পরাণে পরাণে,
সতত যাহার কথা পড়ে মাের মনে,,
কোথা সেই সুবদনী,
সংসার-সুখের খনি,
হেন শুভদিনে তায় নারিনু দেখিতে,
কোথায় রহিল মম প্রাণের বনিতে।
হায়রে দেশ! তব ভালে এ সময়,
আনন্দের শত সূৰ্য হয়েছে উদয়
তােমার শ্যামল কোলে,
ভ্রমিতেছে কুতূহলে,
শত শত পুত্র তব—মাতৃ-অগিমনে,
হাসিছে খেলিছে সবে প্রফুল্লিত মনে।
দুরদৃষ্ট কিবা আছে ইহার মতন,
নতুবা এ শুভ দিনে কেন অনুক্ষণ,
এ হেন মনের খেদে,
যায় দিন অবসাদে,
আঁখিবারি কেন হায় রােধিতে না পারি ;
বিদেশে বিষাদে আজ মনাগুনে মরি।
৭৮

দুর্গোৎসব।
এস মা কল্পনে ! মোর অতৃপ্ত পরাণে,
হৃদয়-অসনে তােরে বসা’য়ে যতনে,
হেরিব সদাই আমি,
প্রিয়তম জন্মভূমি,
তদুপরি দশভুজা দশপ্রহরিণ,
বেষ্টিত সন্তানগণে দনুজ-দলনী।

জন্মভূমি
সুমঙ্গলে !
মনে পড়ে অতীতের উজ্জ্বল কাহিনী,
সুজলা সুফলা রূপে যবে গাে জননি,
শােভিতে মা এ ভুবনে ;
তােমার সন্তানগণে,
উত্তরে হিমাদ্রি হ'তে দক্ষিণে জলধি,
মা বলে ডাকিত সবে তােরে নিরবধি।
এই সে ভারতবর্ষ সুখময় স্থান,
চির-প্রিয়তম এ যে জননী-সমান,
যাঁহার অঙ্কের পরে,
যুগে যুগে যুগান্তরে,
কত শত মহাজন জনম লভিয়া,
গাহিলেন কত গীত পরাণ ভরিয়া।

জন্মমি।
পঞ্চনদ উপকূলে আৰ্য ঋষিগণ,
যবে আসি করিলেন বেদ উচ্চারণ,
সাম নিনাদিত কত,
মহাযজ্ঞ, মহাব্রত,
এই পুণ্যভূমি' পরে করি অনুষ্ঠান,
অক্ষয় সুধার ধারা করিলেন দান।
বশিষ্ঠ, গৌতম আদি মহামুনিগণ,
বেদব্যাস, বাল্মীকি ভারত-ভূষণ,
গাহিলেন প্রতি জনে,
বিশুদ্ধ নিৰ্ম্মল প্রাণে,
অমর ভারত-কথা-পুণ্য রামায়ণ,
আদর্শ হিন্দু ধৰ্ম্ম করিলা স্থাপন।
আবার যখন এই আর্যাবর্তভূমে,
অবতীর্ণ বুদ্ধদেব—শাকাসিংহ নামে,
যাহার মানব-প্রীতি,
জ্ঞানের অপূর্ব জ্যোতি,
ছাইল ভারতভূমি—হইল প্রচার
“অহিংসা পরমধর্ম” সর্ববধৰ্ম্মসার।
৮১

না।
অমিত সে দীপ্ত আভা ছাইয়া ভারত,
আলােকল চীন ব্ৰহ্ম জাপান তিববৎ,
মিলি সবে এক তানে,
গাহিল বিমুগ্ধ প্রাণে,
জয় জয় বুদ্ধদেব-দেব-অবতার,
প্রকাশিয়া জ্ঞানালোক ঘুচালে আঁধার।
বিনাশিতে এ ভারতে ধৰ্ম্মদ্বেষিগণ,
করিতে প্রচার পুনঃ ধৰ্ম্ম সনাতন,
দক্ষিণে কেরলভূমে,
আচাৰ্য শঙ্কর নামে,
জনমিল যবে সেই পুরুষ-প্রবর,
রাখিতে অাদর্শ-ধৰ্ম্ম অবনী ভিতর ।
তর্কযুদ্ধে পরাভূত করিয়া সকলে,
“শিববাহহং শিবােহহং" নামে জয়ধ্বনি তুলে,
রাখিতে হিন্দুর নাম,
পূরাইতে মনস্কাম,
অবতীর্ণ এ ভারতে সেই মহাজন,
পূণ্যবতী কে আছে মা তােমার মতন!
৮২

জন্মভূমি।
সাধিতে কৰ্ত্তব্য কৰ্ম্ম করি প্রাণপণ,
জীবনের মহাব্ৰত করি উদ্যাপন,
‘শৃঙ্গগিরি’ ‘জ্যোষী’ নামে,
‘গোবর্দ্ধন' পুরীধামে,
পশ্চিমে ‘সারদা মঠ’ করিয়া স্থাপন,
মহাযােগে মহাযােগী হ'লাে নিমগন।
রামানুজ, রামানন্দ, দক্ষিণাপথেতে,
বিতরিলা রামনাম জীব উদ্ধারিতে ;
দাদু ও কবির আদি,
গাহিলেন নিরবধি,
মধুর বীণার সুরে-বিভুগুণগান ;
পুণ্যবতী কে আছে মা তােমার সমান।
ভক্ত-চূড়ামণি সেই উজ্জ্বল-রতন
অমর তুলসী কবি ভারত-ভূষণ,
বাজায়ে মধুর বীণা,
বরষি অমৃত-কণা
গাহিলেন সুমধুর রামায়ণ-কথা,
শুনিলে জুড়ায় যাহে মরমের ব্যথা।

সান্তনা } শিখগুরু নানকাদি মহারথিগণ- তােমার সন্তান বলি’ বিখ্যাত ভুবন ; ‘আদিগ্রন্থ' করি পূজা হয়ে সবে মহাতেজা, বীরপুত্র বলি সবে আছিল শােভিত ; স্বর্ণপ্রসূ তুমি যে মা ভুবন-বিদিত। মথুরার সন্নিকটে আসিয়া যখন, বল্লভ আচাৰ্য নামে সাধু মহাজন, একদিন কৃষ্ণনামে, এই পুণ্য আৰ্যভূমে, সুরদাস, মীরাবাই সনেতে মিলিয়া, গাহিলেন কত গান পরাণ ভরিয়া। উজ্জ্বল করিয়া যবে বঙ্গের গগন অবনীতে অবতীর্ণ প্রভু নারায়ণ, নবদ্বীপ পুণ্যধামে, শ্রীচৈতন্যদেব নামে উদ্ধার করিতে জীবে দিল দরশন, রূপের অভাতে করি উজ্জ্বল গগন। ৮৪

জন্মভূমি।
নিত্যানন্দ আদি যত ভক্তগণ সনে,
বিতরিলা হরিনাম সুমধুর তানে,
একদা মা বঙ্গভূমি,
গিয়াছিলে ডুবে তুমি,
প্রেমের তুফানে সদা নাম-সংকীৰ্ত্তনে,
শ্রীচৈতন্যমহাপ্রভু-পাদ-পরশনে।
উঠেছিল নদীয়ায় প্রেমের তুফান,
প্রচার করিতে ভবে হরিগুণগান,
পাষণ্ড পাতকী যারা,
হইল উদ্ধার তারা,
“নামে রুচি, জীবে দয়া” ভক্তি নারায়ণে,
সকল ধর্মের সার জানিয়া জীবনে।
এমনি ছিলাে গাে মাতা পুত্র শত শত,
পৃজিত ভজিত যারা তােরে অবিরত,
আবার কবে গাে মাতঃ
তােমার সন্তান যত
গাহিবে মা তব গান কাঁপায়ে ধরণী,
পুণ্যবতী তাের মত কে আছে জননি।
---
সমাপ্ত।
৮৫

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Santwana

Author
Basu,keshabchandra
Title
Santwana
File name
Santwana
Text
OCR done
Citation
1910
Published
2010/01/22
Publisher
Sri Bhubanmohan Mittra, Kolkata
Language
Sanskrit
Pages
102
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Lyrics
Keywords
Bhagirathir Tire
DLI number
513220
Barcode
4990010020219.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
Nf0exiQ7jgR
Download PDF

Santwana