Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Deradun Masuri O Haridwar
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
দান ।
k,
ল
গুরুদ্বার ব ক রাম রায়ের মন্দির
মধুরিওহরিদ্বার।
শীনৃপেন্দ্রনারায়ণ দত্ত
প্রণীত।
কলিকাতা ;
নং ১২৯ শ্যামবাজার স্ত্রী হইতে
শ্রীনলিনীন্দ্রনাথ ঘােয় কর্তৃক
প্রকাশিত।
১৩১১
উইকলি নােটস্ প্রিটিং ওয়ার্কস্,
কলিকাতা ;
৩ নং হেষ্টিংস্ স্ত্রী।
মুখরন্ধ ইংরাজী বা বাঙ্গালায় যাঁহারা দেরাদুন সম্বন্ধে কিছু লিখিয়াছেন, তাহারা সকলেই স্বর্গীয় জি. আর. সি. উইলিয়ম্স্ প্রণীত “Historical, and Statistical Memoir of Dehra Doon” atap pata অবলম্বন করিয়াছেন। এমন কি, গভর্মেন্টের অনেক রিপাের্টে ও ঐতিহাসিক হন্টার প্রণীত Imperial Gazettecrএ এই প্রদেশসম্বন্ধীয় অনেক তথ্য ঐ পুস্তক হইতে সঙ্কলিত হইয়াছে। সুতরাং মৎসদৃশ ক্ষুদ্র লেখকের ঐ পুস্তক অবলম্বন করিয়া লেখা ভিন্ন গত্যন্তর কোথায় ? কিন্তু স্বর্গীয় উইলিয়মূসের প্রাগুক্ত পুস্তক বহুকাল হইল রচিত হইয়াছে ; ঐ পুস্তক-রচনার পর দেরাদুন সহরের অবস্থার অনেক পরিবর্তন ও উন্নতি হইয়াছে ; সুতরাং দেরাদুনের বর্তমান অবস্থা ঐ পুস্তক হইতে অবগত হওয়া যায় না। সেই জন্য আমি ই. টি. এটকিন্স কর্তৃক সংগৃহীত Gazetteer of N.-W. P., দেরাদুনের ভূতপূর্ব সুপারিন্টেণ্ডেন্ট, বেকারের Settlement Report প্রভৃতি পুস্তক ও স্বকীয় সামান্য অভিজ্ঞতাবলম্বনে দেরার এই প্রাচীন ও আধুনিক চিত্র অঙ্কিত করিয়াছি। বাহুল্য-ভয়ে আনুপূর্বিক ঘটনা বিশদী- করণের প্রয়াস পাই নাই ; এবং সে বিষয়ে কোন প্রয়ােজনও, উপলব্ধি করি নাই ; বভ্র-সমুৎকীর্ণ মণিতে সূত্রের ন্যায় প্রবেশ করিয়া দেরার বর্তমান অবস্থার কিঞ্চিৎ আভাষ-প্রদান ভিন্ন কোন পূর্ণাবয়ব ইতিহাস রচনা এই সামান্য গ্রন্থের উদ্দেশ্য নহে। মসুরি ও দেরা বিভিন্ন নগর হইলেও, পরস্পর এত ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধে আবদ্ধ, যে উভয়কে উভয়ের উপকণ্ঠস্বরূপ গণ্য করা যায়। সুতরাং দেরাদুনের সহিত মসুরির বিষয়ও কিছু বলা প্রয়ােজন মনে করিয়াছি। হরিদ্বারের ইতিহাস লিখিবার চেষ্টা করি নাই ; এই প্রাচীন নগরের ইতিহাস অপেক্ষা তীর্থ-মাহাত্মই সুবিশ্রুত ; সুতরাং ইতিহাস ত্যাগ করিয়াছি। ইংরাজী ভাষায় প্রত্যেক বিশিষ্ট দেশের • Guide Book আছে; কিন্তু হিন্দুর তীর্থের, বিশেষতঃ যে তীর্থে শ্বেতাঙ্গের বসতি নাই, সেই সকল তীর্থের Guide Book নাই বলিলেই কয় ; অন্ততঃ বাঙ্গালা ভাষায় এই শ্রেণীর পুস্তক যে নিতান্ত বিরল, সে বিষয়ে সন্দেহই নাই। এই অভাব-মােচনের অভিপ্রায়ে আমি পরিচয়-পুস্তকের ন্যায় হরিদ্বারের যে বৃত্তান্ত লিপিবদ্ধ করিয়াছি, তাহা পাঠকবর্গের প্রীতিপ্রদ হইবে কি না, বলিতে পারি না। প্রত্নতত্ত্বের কূটতর্কে পাঠকের ধৈৰ্য্যচ্যুতি ঘটিবার সম্ভাবনা, এই আশঙ্কায়, যত দূর সম্ভব, সে পথ ত্যাগ করিয়াছি। সংস্কৃত কলেজের সুযােগ্য অধ্যক্ষ মহামহােপাধ্যায় শ্রীযুক্ত পণ্ডিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, এম. এ., ইম্পিরিয়াল লাইব্রেরীর অধ্যক্ষ শ্ৰীযুক্ত ম্যাক্- ফালেন্ এবং দেরাদুন-নিবাসী রায় সাহেব শ্রীযুক্ত উপেন্দ্রনাথ কাঞ্জিলাল, এ এল. এস্ ও শ্রীযুক্ত ঈশানচন্দ্র দেব, এ. এ. এই পুস্তক-প্রণয়ণ-কালে স্থানীয়-তথ্য-সংগ্রহে সাহায্য করিয়া এবং পিপল ও প্রতিবাসী-সম্পাদক শ্রীযুক্ত শ্যামসুন্দর চক্রবর্তী ও সাহিত্য-সম্পাদক শ্ৰীযুক্ত সুরেশচন্দ্র সমাজপতি প্রফু-সংশােধনে সাহায্য করিয়া আমার বিশেষ ধন্যবাদভাজন হইয়াছেন। এই পুস্তকে কয়েকখানি চিত্র সন্নিবেশিত করিয়াছি। শ্রীযুক্ত উপেন্দ্র- নাথ কাঞ্জিলাল, শ্ৰযুক্ত সতীশচন্দ্র দত্ত ও শ্রীযুক্ত সুরেশচন্দ্র সমাজপতি ঐ চিত্রগুলি সংগ্রহ করিয়া না দিলে আমার পুস্তকখানি চিত্রিত হইত ; সুতরাং ঐ চিত্রের নিমিত্ত যদি পুস্তকের কিছু সৌন্দৰ্য্যবৃদ্ধি হইয়া থাকে, তবে তাহা সম্পূর্ণ উক্ত মহােদয়গণের অনুগ্রহে। এই আমার প্রথম উদ্যম,আশা করি, ভ্ৰম প্রমাদ প্রভৃতি সুধী-সমাজের মার্জনীয় হইবে। ইতি মজিলপুর। শ্রীনৃপেন্দ্রনারায়ণ দত্ত। ; সন ১৩১১ সাল।
উৎসর্গ
অপার প্রীতির ভাজন, অতুলপ্রণয়াস্পদ,
•বিদেশ-ভ্রমণে চিরসহচর,
অভিন্নহৃদয়
সুহৃদ
শ্ৰীযুক্ত বিজয়চন্দ্র দত্তের
করকমলে
দেবােদ্দেশে সযত্ন-রক্ষিত বৃক্ষের
প্রথম ফলস্বরূপ
আমার প্রথম উদ্যমের ফল
এই অকিঞ্চিৎকর গ্রন্থ
সাদরে
অর্পিত হইল।
মজিলপুর।
নৃপেন্দ্রনারায়ণ দত্ত।
সন ১৩১১ সাল।
बा-मरनाथन। है नाडि . . बीब-को-कनवाब बर्डपान् पेणि भिवयो बाब-क्किनबार বর্তমান बधिर ভগীরথী . 80 " पवाब बहिमश्व इ-जनन-मन विमान বেশীর मिनारमा २ ए. 8 3 एछ-न-मा विषायांन বােলির घोरामा ग वधिमग -भूजलपकांचनव- অপেক্ষা অধিক मकान बामा २५ ७." H १ योगन -भूजलपकांपन्या- অপেক্ষাধিক . শফিযুক্ত ", অবণে २ ७ चाबवत मोनम সহযাত্রীবর্গ विदिविनो- मनवाब बान कबिष्ट मरवांजिवणे পিরিতলিশ- पर्जनानखब पनि कब्रिण्ड पब्रिटक . 68 1,0 बाबाषिक १७ पारिख चरबाब মৰি पशई धरा- मण চীপত্র। २२ . . . ৩. । ৭ ৮ . . . . . . + ০ ০ ১১ ২৪ ০ ০ ০ • • দেরাদুন উপক্রমণিকা অকালী সম্প্রদায় অকালীদিগের সহিত ‘রামরায়ি’- দেরার পথ-প্রাচীন ও বর্তমান দিগের মতভেদের কারণ জেলার চতুঃসীমা মােহান্ত হরপ্রসাদ, হরসেবক, প্রাকৃতিক বিবরণ স্বরূপদাস ও প্রীমদাস... পর্বত ও পৰ্বত-ন্ধ পথ রাজা প্রদীপ্ত সাহ २२ নদী। নাজীবুদ্দৌলার দেয়া আক্রমণ বৃক্ষাদি ও জীব জন্তু... নাজীবের শাসনকালে দেরাদুনের পুরাবৃত্ত। সমৃদ্ধি ২৩ মহাভারত ও রামায়ণ নাজীবের মৃত্যুর পর দেরাদুনের পালসি শিলালিপি • দুর্দশা বঞ্জার রাজা পর্ণমান সাহ २8 গড়ওয়াল রাজ্যের বিবরণ ১১ গোলাম কাদেরের অত্যাচার রাজ। ভােগদন্ত কাপ্তেন হার্দিকের গড়ওয়াল গমন ২৫ রাজা অজয় পাল হার্দি-বৃর্ণিত রাজা ও রাজ্যের বৃত্তান্ত২৫ দারা-পুত্র সােলিমা গড়ওয়াল-রাজধানী শ্রীনগরের তদানীন্তন শিখগুরু হর রায় অবস্থা গুরু রাম রায়... রাজস্ব গুরু হর রায়ের মৃত্যু••• খনিজ দ্রব্যাদি ও ব্যবসায় বাণিজ্য...২৬ গুরু হরকিষণ সৈন্য ও শাসন-প্রণালী २१ গুর্খা কর্তৃক দের আক্রমণ ও দখল ২৯ গুরু তেগবাহাদুর পর্দমানের মৃত্যু গুরু গােবিন্দ দেশের দুর্দশা ও দাস-ব্যবসায় রাম রায়ের পঞ্জাব-ত্যাগ ও দেরায় কীৰ্ত্তিপুর-ধ্বংস-কাহিনী আশ্রম-নিৰ্ম্মণ... গুগ-যুদ্ধের কারণ .. রাজা ফতে সাহ ইংরাজের পরাভব ও ইংরাজ রাম-রায়ি সম্প্রদায় সেনাপতি জিলিপির বীরত্ব... ৩২ দেরাদুন নামের অর্থ গুর্খা সেনাপতি বলভদ্রের বীরত্ব... ৩৪ রাম রায়ের দেহত্যাগ ইংরাজের জয় ও কালজ। দুর্গের ধ্বংস ৩৫ রাম রায়ের ধর্মমত কলু দস্থ্য উদাসী সম্প্রদায় কুয়ার দ্য . ১৬ re . . . ০ ০ ০ . . . . . . ১৭ | ০ ০ ০ ১৭ ৮ । হরকিষণের মৃত্যু , এr ৪ ০ ••• • • • E ••• 성성 # ০ ০ ৫ । E + ৩ # ৫ p to ০ ০ ০ ৪৪ ০ ০ ০ ৪৭ ০ ০ ০ ৮০০ ৩৭ . . . . . . •• ৪৮ •• ০ ০ ০ . . . ৪৯ • ০ ০ ০ ৩ | ০ ০ . . . ৪৯ ৪৯ ০ ০ ০ ০ ০ বর্তমান অবস্থা। জেলার বিভাগ সহরের পথঘাট বাজার অধিবাসী বিদ্যালয়।দি ইয়াকুব খা ইম্পিরিয়াল ক্যাডেট কোৰ... মিউনিসিপালিটি ••• অাদালতাদি জমীর ও প্রজা শত্যাদি ৪ ০ ৪ ০ se ৪ ০ ০ ০ ০ ১০ . . .. ৪১ । | জাতি ধর্ম ও আচার পদ্ধতি, বনবিভাগ ও ফরেষ্ট স্কুল ফরেষ্ট স্কুল মিউজিয়ম ত্রিকোণমিতি-জরীপ-বিভাগ দেয়া সহরের জল সরবরাহ.. দ্রষ্টব্য স্থানাদি। সহধা গন্ধকের উৎস... দ্য-গুহা বা গুহপানি টপকের 8२ নালাপানি জিলিপি ও লভরে স্মৃতিস্তম্ভ... ৬৭ রাম রায়ের মন্দির ঝামেলা মসুরি যমুনার ঝােলা পুল ••• কেমী প্রপাত... বােটানিক্যাল গার্ডেন ৮১ মিউনিসিপালিটি •••• জলবায়ু••• অধিবাসী ১ pre ৪০ ০ ০ . ৮. . कन ৪৩ . . . = = . . . . ৮. ০ ০০ জলবায়ু••• গ্রাম্য পও 3 ৮০০ . ৮ . . . ০ ০ . • ৭ ০ ০ ৫ E = = ৭৭ s ৩০ মরি যাইবার পথ ••• পথঘাট ••• লাইব্রেরী ক্যামে ব্যক্তি ল্যার বাজার লালটিব্বা হাপি ভ্যালি ৭৭ ১ se ৭৮ tn ০ ০ ০ ০ ০ ০ ৭ ৮ ॥ ০ ০ ০ . . uns ১০০ ০ ০ ০ ৭৯ ১ ৮. . ০ ০ ০ হরিদ্বার আভাষ ৮২ sun ১১ . . ১০০ sus ১১ . . . ৮৭ ૦૨ er •• ০ ০ ০ ০ ০ ০ ০ . r কুণাবর্ত ... সর্বনাথ... মারাদেবী রাজপথ ত t; কলধল ক্ষের ও সতীকুও... নীলধারা চণ্ডী পাহাড় মিউনিসিপালিটি জলবায়ু•• নাম মাহাত্ম্য••• ••• গঙ্গাতীরের দৃ s ০ ০ . ০ . ০০০ এ . ৫০০ s ০ ০ ০ ৫০০ ভীমঘােড় , দশার মন্দির বিফের + ৩০০ css দেরাদুন। উপক্রমণিকা। । বহুদিবস হইতে প্রিয়জনবর্গের নিকট সুদূর দেরাদুনের সুখ্যাতি শ্রবণ করিয়া ঐ প্রদেশ দেখিবার বাসনা অত্যন্ত বলবতী হয়। কিন্তু বৎসর বৎসর নানা প্রতিবন্ধকতাবশতঃ ইচ্ছা পূর্ণ হয় নাই। অবশেষে গত বৎসর নানা বাধা বিপত্তি অতিক্রম করিয়া শারদীয়া মহাপূজাবসানে আত্মীয়-স্বজনগণের নিকট বিদায় লইয়া একাদশীর দিনে ব-ে মেলে’ যাত্রা করিলাম। হাবড়া স্টেসন লােকে লােকারণ্য—দাড়া- ইবার স্থান নাই—বহুকষ্টের পর আমরা যে গাড়িতে যাইব তাহা খুঁজিয়া পাইলাম। কেবলমাত্র বম্বেমেলেই দেরাদুন যাই- বার জন্য একখানি প্রথম, একখানি দ্বিতীয় ও একখানি মধ্যম ও তৃতীয় শ্রেণীর ‘থ গাড়ি থাকে যাহা একেবারে দেরাদুনে পৌছিয়া এই সকল নির্দিষ্ট গাড়িতে উঠিলে মােগলসরাইএ বা লুকসরে গাড়ি বদল করিতে হয় না, নচেৎ অন্য ট্রেণে বা গাড়িতে উঠিলে মােগলসরাইএ নামিয়া ‘আউদ্ রােহিলখণ্ড’ রেলে উঠিতে হয়, তাহার পর লুসরে নামিয়া দেরাভিমুখী ট্রেণে উঠিলে দেয়।
[ ২ ] দেরাদুন সহরে পৌছিয়া দেয়। পূৰ্বে দেরাদুনে পূর্বের পথ। যাইতে হইলে সাহারাণপুর পর্যন্ত রেলে যাইয়া তাহার পর ঘােড়ার গাড়িতে যাইতে হইত, কিন্তু হরিদ্বার স্টেসনের পর রেল কোম্পানী পর্বত ভেদ করিয়া দুইটি সুড়ঙ্গ বা ‘টনেল’ প্রস্তুত করায় এখন রেলে করিয়াই বরাবর টনেল । দেরায় যাওয়া যায়। এই টনেল দুইটীর মধ্যে এত অন্ধকার যে দ্বিপ্রহরের সময়ও ইহাদের মধ্য দিয়া ট্রেণ যাইলে গাড়ির ভিতরে কোন পদার্থই দৃষ্টিগােচর হয় না। যাহা হউক বেলা ৩টার সময় প্রাচীন লক্ষণাবতী পেীছিলাম। তথায় তিন দিন মাত্র থাকিয়া দেরাদুন সহরে যাইবার জন্য বেলা ৩টার মেলে পুনরায় উঠিলাম। এবারে গাড়িতে কোনও জনতা ছিল না, সুতরাং বেশ নির্জনে লক্ষণাবতীর পুরাতন স্মৃতি, অতীত গৌরব চিন্তা করিতে করিতে চলিলাম। শেষরাত্রে হঠাৎ শীত বােধ হইল—এবং গাড়ি যতই চলিতে লাগিল ক্রমশই শীতের বৃদ্ধি বৈ হ্রাস হইল না। প্রথমে মনে হইল বুঝি আমার জ্বর হইয়াছে নচেৎ এত শীত করিবে কেন ? কিন্তু পরক্ষণেই জানালা খুলিয়া যাহা দেখিলাম তাহাতে শীতের কারণ বুঝিতে পারিলাম। দেখিলাম দূরে অনন্ত-পর্বত- শ্রেণী পৃথিবীর মানদণ্ড দেবভূমি হিমালয়ের প্রত্যন্ত-দেশ দিয়া এই বাষ্পীয় শকট দ্রুতবেগে চলিতেছে। রাত্রি তখন ৩টা। ক্ষীণচালােকে নিবিড় অরণ্য, শীর্ণা নদী, হিমালয়ের অঙ্কে চিত্রের ন্যায় শােভা পাইতেছে, সেই নীরব নিস্তব্ধ শেষরাত্রে সেই নীল, গিরি-শ্রেণী, গভীর বিজন অরণ্যানী, উপল-খণ্ড- অচল [ ৩ ] প্রতিহত, নিঝরিণী কত মহামহিমময়, দেখাইতে ছিল তাহা বর্ণনা করা অসম্ভব। ক্রমে ঐ অভ্রভেদী ভূধর-মালা ভেদ করিয়া রাত্রি ৫ টার সময় আমরা দেরাদুনে উপস্থিত হইলাম। একখানি টাঙ্গা করিয়া, আমাদের বাসায় আসিয়া পৌছিলাম। ক্রমে প্রভাত হইল। পূর্বদিকে ঊষার রক্তিমচ্ছটা দেখা দিল। জাগ্রত-পক্ষী-কলরবে ' প্রভাত-বায়ু-স্পর্শে পাদপ-শ্রেণী সজীব হইয়া উঠিল। কুজঝটিকা যবনিকার ন্যায় ক্রমে অপসৃত হইল— ক্রমে একটির পর একটি, তাহার পর আর একটি করিয়া শৃঙ্গ নয়ন-পথে পতিত হইতে লাগিল। দেখিলাম চতুর্দিকে গগনস্পর্শী পর্বতমালা, শৃঙ্গের পর, শৃঙ্গ, যতদূর নয়নগোচর হয় কেবল অনন্ত অচল অটল ভূধরশ্রেণী জগৎ- পাতার অনন্তকীর্তিস্তম্ভ স্বরূপ দণ্ডায়মান রহিয়াছে। এই নয়ন-মনােহর দৃশ্য আমি আপনা-হারা হইয়া দেখিতে লাগিলাম—আমার হৃদয় অভূতপূর্ব শান্তিরসে পরিপ্লত হইল। ইচ্ছা হইল যে যখনই এই কৰ্ম্মক্ষেত্র হইতে অবসর পাইব তখনই প্রকৃতির এই নির্জনবাসে আশ্রয় গ্রহণ করিব। এই ভাবিয়া যতদিন তথায় ছিলাম তত দিনই উহার পূর্বকথা, প্রাকৃতিক বিবরণ, বর্তমান্ অবস্থা প্রভৃতি যথাসাধ্য সংগ্রহ করিয়াছিলাম। আজ সেই সমুদয় বৃত্তান্ত লিপিবদ্ধ করিলাম। জানিনা পাঠক বর্গের প্রীতিপদ হইবে কি না। স্বভাবের লীলাভূমি, দিগন্ত-প্রসারী শিবালিক পর্বতের উপত্যকা-সন্নিবিষ্ট এই সাধুজন-মনােমােহন, ভাগিরথী- চতুঃসীমা। নিঝর-শীকর-সম্পৃক্ত, বৃক্ষ-লতা-সমাকীর্ণ, বিহগ- [ ৪ ] এক বিবরণ। কাকলী-সঙ্কুল, সুরম্য কাননকে প্রকৃতিদেবী সংসারের তীব্র কোলাহল, দ্বেষাদ্বেষি, বিবাদ বিসম্বাদ হইতে যেন রক্ষা করিবার জন্যই অতি যত্নে ক্রোড়ে করিয়া লুকাইয়া রাখিয়াছেন। এই প্রদেশের উত্তরে হিমালয়, দক্ষিণে শিবালিক, পূর্বে ভাগিরথী ও পর পারে বৃটিশ ও স্বাধীন গড়ওয়াল এবং পশ্চিমে যমুনা। প্রাকৃতিক দিকে পবিত্র-সলিলা ভাগিরথী, অপর দিকে প্রসন্ন তােয়া যমুনা হিমালয়ের কোন নিভৃত কন্দর হইতে বহির্গত হইয়া এই প্রদেশের ক্ষেত্র সকল প্লাবিত করতঃ সাগর ভিমুখে ধাবিত হইতেছে। দক্ষিণে হিমালয়ের অংশবিশেষ শিবা- লিক পর্বত উহাকে বেষ্টন করতঃ দুইটি বৃহৎ উপত্যকা উৎপাদন করিয়া ইহার পশ্চিমাংশকে নিম্নস্থ উর্বর সমতল ক্ষেত্র হইতে পৃথক্ করিয়া দিয়াছে। এই শিবালিক এবং হিমালয়ের মধ্যবর্তী উপত্যকার এক অংশকে ‘পূর্ব-দুন ও অপরাংশকে ‘পশ্চিম- দুন’ কহে। পুৰ্ব্ব-দুন ক্রমশঃ গঙ্গাভিমুখে নিম্নতর হইয়াছে এবং পশ্চিম-দুন গভীর-অরণ্যানী-পরিব্যাপ্ত হইয়া যমুনাভিমুখে গমন করিয়াছে। এই প্রদেশ এবং গড়ওয়াল রাজ্যের মধ্য দিয়া কলুষ-নাশিনী জাহুবী উপল-খণ্ড-প্রতিহত উৎফুল্ল-জল-রাশি লইয়া নিরন্তর-স্নিগ্ধ-নীল-পরিসরারণ্য-গিরি-কলর কল-নাদে মুখরিত করিয়া, কোথাও হংস-কারবাদি জলচর পক্ষী-সমুহের কাকলী- সঙ্কুল ফল-পুষ্প-শােভিত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দ্বীপপুঞ্জ বেষ্টন করিয়া বেগভরে ভারতের পুণ্যক্ষেত্র হরিদ্বারের পাদদেশ বিধৌত করিয়া প্রবাহিত হইতেছে। নির্মল-সলিলা নীল-বসনা কল-নাদিনী যমুনা বেগভরে ইহার দক্ষিণ-পশ্চিমাংশ প্লাবিত করিয়া দিল্লির সম্রাট [ ৫ ] দিগের মৃগয়া-ভূমি সাহারণপুরের অন্তঃপাতী বাদসামহল নামক নগর দিয়া প্ৰধাবিত হইয়াছে। উত্তরে বিশাল জনসর বাওর’ নামক পর্বত’তমসা এবং যমুনার মধ্যবর্তী উপত্যকা ব্যাপিয়া রহিয়াছে। এই প্রদেশে হিমগিরির অংশ মসুরি, শিবালিক, এবং নুয়াদা বা নাগসিদ্ধ পর্বতই প্রধান। মরি (লােকে মরি পর্বত। ‘মন্সুরি’ বলে) প্রায় ৭৫০০ ফুট উচ্চ। ইহার সানুদেশ গভীর অরণ্যে পরিব্যাপ্ত কিন্তু উচ্চ শৃঙ্গ সকল প্রায় পাদপাদিশূন্য তবে কোন কোন স্থানে বিখ্যাত রডােড়ে- ডু এবং ওক্ প্রভৃতি বিরল বৃক্ষাদি দেখিতে পাওয়া যায়। শিবালিক পর্বত হিমালয়ের সহিত, প্রায় সমান্তরালভাবে শিবালিক পঞ্চনদের বিপাৱা তীর হইতে ননিতাল পাহাড়ের নিম্নে কাষ্ঠগুদাম পৰ্যন্ত গিয়াছে। এই পর্বত দীর্ঘে প্রায় ৪০ মাইল, প্রস্থে ১০ মাইল ও উচ্চে ৩৫০০ ফুট হইবে। এই পাহাড়ে সাল, সাঁই, পাই প্রভৃতি বৃক্ষ আছে। দেরাদুন সহরের ৫ মাইল দক্ষিণ-পূর্বে নুয়াদা বা নুয়াদা বা নাগসিদ্ধ নামক অনুচ্চ পর্বত অবস্থিত। পুরাকালে নাগসিদ্ধ গড়ওয়াল রাজ্যের রাজ-প্রতিনিধিরা এই স্থানে বাস করিতেন। এই প্রদেশে আসিবার দুইটি পাস (pass) বা পৰ্বত- পৰ্বত-র- রন্ধ-পথ আছে। একটি যমুনার ৭ মাইল দূরে অপরটি যমুনা এবং গঙ্গার মধ্যবর্তী স্থানে। প্রথম টির নাম “তিলি’ পাস্ ও দ্বিতীয়টির নাম ‘খেরি বা মােহ পাস। পর্বত। পর্বত। পথ।
নদী।
[ ৬ ]
গঙ্গা, যমুনা, অসন, সং, সুস্থ, টসি প্রভৃতি নদী দ্বারা
এই প্রদেশের জল সরবরাহ হয়। গঙ্গা’ উৎপত্তি-
স্থান হইতে ১৬৫ মাইল আসিয়া ত্রিলােক-প্রসিদ্ধ
ব্যাসাশ্রম তপােবন দিয়া দেরাদুনে প্রবেশ করিয়াছে। আর
‘যমুনা’ ১১০ মাইল আসিয়া এই দেশ দিয়া প্রধাবিত হইয়াছে।
‘সুস্ব’ নদী ভীমতাল নামক হ্রদের নিকট বহির্গত হইয়া গঙ্গায়
মিলিত হইয়াছে। উহার ৬ মাইল দূরে, সং’ নামক নদী
ইহার সহিত মিলিত হইয়া কালঙ্গার নিকট দিয়া প্রবাহিত
হইয়াছে।
‘অসন নদী ২১২১ ফুট উচ্চ হইতে নির্গত
হইয়া ৬৫২ ফুট উচ্চ স্থানে যমুনার
সহিত সঙ্গত
হইয়াছে। ইহার শাখা ‘টসি’ (ওঁাচীন তমসা ) ভীমতালের
সন্নিকটে ইহার সহিত মিলিত হইয়াছে। গ্রীষ্মকালে ইহা
প্রায় শুকাইয়া যায়—কোথাও পর্বতমূলে জল, দেখা যায়—
অতঃপর উহা কোথায় অন্তর্হিত হয় তাহা বলা যায় না।
স্থানে জল থাকেন সে স্থানে গভীর করিয়া কূপ খনন, না
করিলে জল পাওয়া যায় না। সাের সাহেব তাহার কাছারির
নিকট প্রায় ১১০০০ হাজার টাকা ব্যয় করিয়া ২২৮ ফুট
খনন করিলে পর জল পাইয়াছিলেন।
বর্ষাকালে গঙ্গা ও যমুনার স্রোত এত প্রবল হয় যে
কিছুতেই পার হওয়া যায় না। তপােবনের নিকট গঙ্গার
উপর একটি দড়ির শাঁকো ও খাসির নিকট যমুনার উপর
Tainasáz-Gacctteer of N.-W. P, Vol. XI, page 337.
[ ৫ ] - জীব জন্তু। আছে। মৎস্য। একটি লৌহ সেতু আছে। শেষােক্ত সেতু দীর্ঘে সেতু। ৩৮৩ ফুট ও প্রস্থে ১০ ফুট। এই প্রদেশের অরণ্যে দেবদারু, ও, শাল, টু, শিশু, চীর, ক্ষীর, শিরীষ, সই প্রভৃতি নানা প্রকার বৃক্ষ বৃক্ষাদি। বৃহৎ মাতঙ্গ, ব্যাঘ্র, ভল্লুক, বরাহ,-চৌশিঙ্গা, সম্বর প্রভৃতি হরিণ-নীলগাই, অজাগর সর্প ও বানর প্রভৃতি নানাবিধ জন্তু ও সরীসৃপ এবং বিবিধ প্রকার পক্ষী নদীতে রােহিত, শাল, এবং মাসির নামক বৃহৎ বৃহৎ মৎস্য পাওয়া যায়। এই মাহসির মৎস্য মাহসির সচরাচর অর্ধমণ ত্রিশ সের দেখা যায়। কোন কোন ক্ষুদ্র নদীতে কুম্ভীরও আছে। এখানকার অধিবাসীরা বলে যে শিবালিক পর্বতে, সিংহ আছে কিন্তু অদ্যাবধি কেহ দেখিতে পায় নাই। হয়ত অতি প্রাচীন কালে ছিল কিন্তু এখন আর নাই। মহা- কবি কালিদাসের গ্রন্থাবলীতেও হিমালয়ে সিংহের অস্তিত্ব বিষয়ক বর্ণনা পাওয়া যায়। প্রকৃতির এই রমণীয় উদ্যানে আসিয়া ইহার অনির্বচনীয় শােভ সন্দর্শন করিয়া কাহার না ইহার পুরাবৃত্ত পুরাবৃত্ত। জানিতে ইচ্ছা করে ? তুমি যদি ইহার প্রাচীন কাহিনী শ্রবণ কর তাহা হইলে দেখিবে যে এই নির্জন প্রদেশও নিতান্ত গৌরবহীন ছিল না। এই প্রকৃতির নিভৃত কক্ষ প্রাচীন কেদারখণ্ডের অন্তর্ভুত ত অতি প্রাচীন পবিত্র স্থান বলিয়া সংসার-বিরাগী সাধু মহাত্মারা আসিয়া নিশ্চিন্তচিত্তে সিংহ।
হইয়াছে। হর-পার্বতীর [ ৮ ] ভগবদারাধনায় ব্যাপৃত থাকিতেন। কিম্বদন্তী আছে যে ঐ পর্বতে দেবাদিদেব লীলা করিতেন বলিয়া উহার নাম ‘শিবালিক’ অদ্যাপিও এই দেরাদুন সহরে একটি মন্দির আছে। কথিত আছে যে অযােধ্যাপতি রঘু- কুল-পাবন মহারাজ রামচন্দ্র রাবণ-বধ-জনিত পাপের প্রায়- শ্চিত্তার্থে এই পবিত্র স্থানে আসিয়াছিলেন । এবং মহাযশাঃ পাণ্ডবগণও মহাপ্রস্থান-কালে এই স্থান দিয়া হিমালয়ে আরােহণ করেন। কেহ কেহ বলেন যে ধনুর্ধরাগ্রগণ্য মহারথ দ্রোণা- চার্য্যের ইহা আবাসস্থান ছিল এবং এই প্রদেশেই তিনি কুরু- পাণ্ডবদিগকে অস্ত্র-শিক্ষা প্রদান করিতেন। ইহাও কিম্বদন্তী আছে যে একদা মহাত্মা কশ্যপের যজ্ঞে আহূত যষ্ঠিসহস্র অঙ্গুষ্ঠ-প্রমাণ বালখিল্য মুমিগণকে গােষ্পদ-নির্মিত হ্রদ উত্তীর্ণ হইতে অসমর্থ দেখিয়া দেবরাজ ইন্দ্র উপহাস করিলে ঐ উগ্র- তপাঃ ঋষিগণ রুষ্ট হইয়া যােগবলে দ্বিতীয়-ইন্দ্র সৃজন-মানসে ঘােরতর তপস্যায় প্রবৃত্ত হইলে উহাদিগের দেহ-নিঃসৃত স্বেদ হইতে এক নদী উৎপন্ন হইল—উহা অদ্যাপি ‘সুস্ব’ নামে কথিত আছে। এই ব্যাপার অবলােকনে ত্রিদশাধিপতি শচী- নাথ নিতান্ত ভীত হইয়া প্রজাপতি ব্রহ্মার শরণাপন্ন হইলেন কৃপা-পরবশ হইয়া হৃত-হুতাশন-সদৃশ মুনিদিগকে প্রসন্ন করিয়া সুররাজের ভয় মােচন করিলেন। ৯ এ কথা মহর্ষি বাল্মীকি প্রণীত রামায়ণে দৃষ্ট হয় না। + মহামহােপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মহাশয়ের মতে পাণ্ডবগণ মহাপ্রস্থান-কালে দেরাদুনের কোনও প্রদেশ দিয়া গমন করেন নাই।
[ ৯ ] ইহাও প্রথিত আছে যে নাগবংশীয় বামন নাগ-সিদ্ধ পর্বতে কিয়ৎকাল রাজত্ব করেন। এতদ্বারা এক সময়ে নাগবংশীয় রাজগণ এই স্থানে আধিপত্য বিস্তার করিয়াছিলেন ইহা অনুমান করা নিতান্ত অযুক্তিসঙ্গত বােধ হয় না। যমুনাতীরে হরিপুর সন্নিকটে মহারাজ অশােকের একখানি শলালিপি অশােকের শিলালিপি অদ্যাপি বিদ্যমান্ আছে। বিখ্যাত প্রত্নতত্ত্ববিৎ “খালসি”। কনিংহ্যাম সাহেব এই শিলালিপির এই প্রকার বর্ণনা করিয়াছেন—যমুনার দক্ষিণ তীরে এবং উক্ত নদী ও ট নদীর সঙ্গমের কিঞ্চিৎ অগ্রে ভুবন-বিদিত মহারাজ অশােকের লিপি-খােদিত এক বৃহৎ উপলখণ্ড আছে। ঐ শিলালিপি ব্যাস এবং হরিপুর গ্রামের সন্নিকটে খাসি-গ্রাম হইতে অর্ধক্রোশ দূরে অবস্থিত। উহা লম্বে ও উচ্চে ১০ ফুট ও তলদেশে ৮ ফুট। দক্ষিণ দিকে এক গজের মূর্তি অঙ্কিত আছে এবং ঐ গজের পদদ্বয়ের মধ্যে গজোত্তম’ শব্দ খােদিত আছে। ঐ লিপিতে আন্টিওকস্, টলেমি, আন্টিগােনস, ম্যাগস্ এবং আলেজার * "Khalsi :- About 15 miles to the west of Masuri and on the right bank of the Jiununa, just above the junction of the Tons River there stands a huge quarta boulder covered with one of the well-known inscriptions of Asoka. The inscribed rock is situated close to the villages of Byas and Haripur and about one mile and half to the south of the large and well-known village of Khalsi. The block is 10 feet high, 10 feet long and 8 feet thick at the bottom. The south-eastern face has been smoothed, but rather unevenly as it follows the uaculation of the original surface. The main inscription is engraved on the smoothed surface which measures 51 feet in height with a breadth of 5. feet at top (which increases towards the bottom to 7 feet 10!, inches.”—Cunningham's Archeological Survey of India, Vol. I.
[ ১ ] লােকে ঐ এই পাঁচজন গ্ৰী নরপতির নাম দৃষ্ট হয়। শিলাকে ‘ছত্ৰশিলা বলে। এতদ্বারা কনিংহ্যাম্ সাহেব অনুমান করেন যে এক সময়ে ঐ প্রস্তর-খণ্ড কোন প্রকার ছত্র বা চন্দ্রাতপ দ্বারা আচ্ছাদিত থাকিত। প্রত্নতত্ত্ববিৎ ফুরার সাহেব বলেন যে কনিংহ্যাম্ সাহেব উহাকে যে ছত্ৰশিলা বলিয়াছেন তাহা ভুল—উহাকে ‘চিত্র- শিলা ণ বলা যাইতে পারে কেননা উহাতে চিত্র অঙ্কিত আছে। তিনি বলেন যে কনিংহ্যাম্ সাহেব অধিবাসীদিগের কথা শুনিতে ভুল করিয়াছেন—তিনি চিত্র’ শুনিতে ‘ছত্র’ শুনিয়াছেন। যাহা হউক ইহার সত্যাসত্য বিচার আমাদের সাধ্যাতীত। এই শিলালিপি দৃষ্টে কেহ কেহ অনুমান করেন যে দেরাদুনই চীন এবং ভারত-সাম্রাজ্যের সীমা নির্দেশক ছিল। কিন্তু প্রথিত নামা চীন-পরিব্রাজক হিউএনসাং এতদ্দেশ সম্বন্ধে কোন প্রকার উল্লেখ করেন নাই। *“On the right-hand side an elephant is tracer ini vutline with the words 'Gajataine' inscribed between his legs iu the same character as those of the inscription, Among the people the rork is known by 'chhatrasila' or the canopy-stone which would show that the inscribed block had formerly heen covereu by sonje kind of canory or perlaps hy an umbrella In 13th edict I fouud nanies of five (Ireek kings-Antiochus, l'tolemy. Antigonus, Magas and Alexander."- Crninghan's Archäologicul. Surrey of India, Pol. I. ^ " The natives call it chitrasílı inscribed or pictured stone vot as General Cunningham slates chhatrusilu, canopied stone."-A. Frihrer's Monumental 'Antiquities and Inscriptions in N.-W. P., Vol. II, page 8.
[ ১১ ] বঞ্জাম। বহুকাল হইতে এই প্রদেশ গড়ওয়াল-রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। শুনিতে পাওয়া যায় যে কোন সময় একদল বঞ্জারা এই দেশ দিয়া গমন-কালে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যে বিমুগ্ধ হইয়া বাস করিতে থাকে। গড়ওয়ালাধিপতির বিনা অনুমতিতে ইহারা বসবাস করিয়াছিল বলিয়া গড়ওয়াল-রাজ উহাদিগকে বিদূরিত করিয়া দিবার জন্য কুতসঙ্কল্প হইয়া ঐ বঞ্জারাদিগের দলপতিকে হয় পরাজয়-স্বীকার না হয় যুদ্ধ করিবার প্রস্তাব করিয়া পাঠাইলেন। বঞ্জারা-দলপতি পরাভাব-স্বীকার করিয়া কর-প্রদানে স্বীকৃত হইল। ইহাদের সময়ে কৃষিকার্যের বিস্তর উন্নতি সাধিত হয় ও তাহারা সুখে কাল হরণ করিতে থাকে। কিন্তু ইহাদের দলপতির মৃত্যুর পর তাহাদিগের দুরবস্থার সূত্রপাত হয়। এই প্রসঙ্গে গড়ওয়াল-রাজ্যের একটু বিবরণ প্রদান না গড়ওয়াল করিলে এই প্রদেশের প্রচীন ইতিবৃত্ত বুঝা যাইবে । যেহেতু গড়ওয়াল-রাজ্যের উন্নতি ও অবনতির সহিত এই প্রদেশের উন্নতি ও অবনতি সুসম্বদ্ধ। ১৭৯৬ খৃষ্টাব্দে কাপ্তেন হার্দিক (Captain Hardwick) লােকমুখে এই বৃত্তান্ত অবগত হয়েন যে তৎকালিক রাজা পর্দ- মান সাহের রাজত্বের ৩৭৭৪ বৎসর পূর্বে এই প্রদেশ (গড়ওয়াল- রাজ্য) ২২ পরগণায় বিভক্ত ছিল। প্রত্যেক পরগণা এক একটী : রাজ্যের বিবরণ। শ, "Banjárií-A tribe whose primary occupatiou is or råther used to be to act as grain-carriers and suppliers to armies in the field. Their name is derived from the Sanskrit Vanijya or Banijyakaru, 'a merchant,". Crooke's Tribes and Castes of N.-M. P., page 149.
[ ১২ গেদম্ভ। করিয়া রাজার অধীনে ছিল। এই প্রকার অবস্থায় বহুকাল থাকিবার পর গুজরাট হইতে ভােগদন্ত নামে এক উচ্চাভিলাষী বুদ্ধিমান্ পরমার রাজপুত ধনােপাৰ্জন আশয়ে তাহার ভ্রাতা সুঝদন্তের সহিত আসিয়া ঐ দ্বাবিংশতিজন নরপতির মধ্যে চণ্ডীপুরাধিপতির অধীনে কৰ্ম্মগ্রহণ করেন। ক্ৰমে ভােগদন্ত বুদ্ধিমত্ত্বায় রাজার প্রিয়পাত্র হইয়া সেনাপতি- পদে প্রতিষ্ঠিত হইলেন। এই সময়ে তিনি স্বপ্নে গড়ওয়াল- রাজ্যের এক যােগীবরকে দেখিতে পাইলেন—যেন সেই উৎপত্তি। যােগাবর তাহাকে রাজত্ব স্থাপনের উপদেশ দিতেছেন এই প্রকার বুঝিলেন। এ তিনি উহা ঈশ্বরাদেশ মনে করিয়া তাহার প্রভু রাজাকে হত্যা করিয়া ক্রমে আর ২১ জন নরপতিকে যুদ্ধে পরাভূত করিয়া একছত্রী রাজা হইয়া গড়ওয়াল-রাজ উপাধি ধারণ করিলেন। কেহ কেহ বলেন যে উহার নাম ভােগদন্ত নহে প্রকৃত অন্যান্য বিবরণ। নাম কনকপাল। তিনি মালব-প্রদেশের অন্তঃপাতী ধারা নগর হইতে আসিয়া এই দেশ জয় করেন ‘বাহান্ন- খুকারিয়া। এবং উহা তখন ২২ পরিবর্তে ৫২ পরগণায় বিভক্ত ছিল এবং বাহান্ন-থুকারিয়া নামে অভিহিত ছিল তাহা অধিবাসীদিগের এখনও স্মরণ আছে। কনকপাল। # t; According to account given to Captain Harilwick in 1796 A. I)., the viole country hall been 3774 years before the accession of the reigning prince Purdlooman Shah divided into 22 Pergunpals each under the sway of a chieftain." - Williams's Memoirs of Dehra Dun.
[ ১৩ ] লব্ধ-প্রতিষ্ঠ উইলিয়ম সাহেব বলেন যে তিনি কানেকি, কনিক্ষ বা কনক নামাঙ্কিত অনেক প্রাচীন মুদ্রা পাইয়াছিলেন। তাহা হইতে তিনি অনুমান করেন যে কনকই যথার্থ এই রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা এবং ইনিই সেই প্রথিত নামা শকাধিপতি কনিক্ষ। রাজা অজয়পাল ১৩৫৮ খৃঃ হইতে ১৩৭০ খৃষ্টাব্দের মধ্যে ?? “Main point of agreement between both is that Bhog Dhunt and Kanak came from uzrat for Bhog Dhunt was a native of Guzrat, xo also was Kanak for he came from Dhara iu Sourastra. The discovery of coins of Kanerki, Kanik-lika or Kanak series in Saharanpur (listrict lead us to assume that Kanak to be identical with kaverki or Kaniksbka and ye may fairly carry back the foundation of the kingdom of Charwal to the era of Scythian supremacy in the first or secoud century before Christ - Hüllians's Memoirs of Dehra Dun. এই প্রত্নতত্ত্বের জটিল মিমাংসা আমার ক্ষুদ্র বুদ্ধির অগম্য। ইহা বঙ্কিম বাবুর লােক- রহস্যের “রামায়ণের সমালোচনায় রাম। যবনের ন্যায় হইল বলিয়াই বােধ হয়। কিন্তু ৰেকেট সাহেব ও উইলিয়ম সাহেবের সংগৃহীত গড়ওয়াল-রাজগণের নামের তালিকায় কনকপালই ঐ রাজবংশের আদি নরপতি বলিয়া লিখিত আছে ও এটকিন্স সাহেব তাহার “গেজেটিয়রে”ও এই কথা সমর্থন করিয়াছেন যথাঃ- "Kank the eponymous fouuler in the second list ( i. e. in Beckett's list, ) is none other than Kanishkha and is also said to have come from Guzrat where we have recorded evidence of an Indo-skythian rule"- Atkinson's Gazetteer of N.-M.P., I'ol. XI, pruge 449. "The Huvishka of the inscription has been identified with Ooerki of coins and the Kanishkha of the inscriptions with Kancrki of the coins." - Ditto Ditto, payc 406. কনক, কানেৰ্কি ও কনিক্ষ একই ব্যক্তি স্বীকার করিলেও কাপ্তেন হার্দিকের লিখিত ভােগদন্তও যে সেই ব্যক্তি তাহা কি করিয়া বুঝি ? সকলেই গুজাট হইতে আসিয়া ছিলেন এইমাত্র তাহাদিগের মধ্যে সৌসাদৃশ্য দৃষ্ট হয়। এই প্রমাণেই কি সকলেই একই ব্যক্তি তাহা স্থির করা যায় ?
০ [ ১৪ ] শ্রীনগর স্থাপন করেন এবং বহুকাল ব্যাপিয়া ইহা গড়ওয়াল রাজ্যের নৃপতিদিগের বাসভূমি ছিল। + উপরে যে সকল ঘটনা বিবৃত হইল তাহা কেবল জনপ্রবাদ মাত্র। ইহার সত্যাসত্য নির্ধারণ করা সম্ভবপর নহে। ভারতের অতীতগৌরকের কাহিনী, ধনধান্য-পরিপূর্ণ সমৃদ্ধিশালী জনপদের কথা, অতুলনীয় কীর্তি, দূরদর্শী ধৰ্ম্মপরায়ণ রাজগণের বৃত্তান্ত, অমিতবলশালী দুৰ্দর্য যােদ্ধগণের বীরত্ব-কাহিনী কালের অন্ধকার- তম গর্ভে বিলীন হইয়াছে। নিত্যোৎসবপূর্ণ ঐশ্বৰ্যপ্রভায় দ্বিতীয়-অমরাবতী-সদৃশ নগরী সকল এখন ব্যাভলুকাদি-শ্বাপদ- সঙ্কুল গভীর অরণ্যে পরিণত হইয়াছে। পুরা, ইতিহাস, ন্যায়, দর্শন, কাব্য, অলঙ্কার সকল কোথায় বিলুপ্ত হইয়াছে কে বলিতে পারে ? কত বিপদ, কত উপদ্রব, কত সমাজবিপ্লব, কত ধৰ্ম্মবিপ্লব, কত রাষ্ট্রবিপ্লব শত শত বৎসর ব্যাপিয়া এই মহাদেশের উপর দিয়া চলিয়া গিয়াছে তাহা কে গণনা করিতে এই সমুদায় দ্বিতীয়-প্রলয়-সদৃশ বিপ্লব বােধ হয় এই সুদূর ভূধররক্ষিত প্রদেশে আসিয়া ইহাকে বিজন অরণ্যে পরিণত করিয়াছিল এবং সেই নিমিত্তই এই প্রদেশের কোনও প্রকৃত বিবরণ প্রাপ্ত হওয়া যায় না। যাহাহউক আমরা দোর্দণ্ডপ্রতাপ হিন্দুবিদ্বেষী মােগল সম্রাট ঔরঙ্গজেবের সময় হইতে কতক ধারাবাহিক ইতিহাস প্রাপ্ত হই। ১৬৫৭ খৃষ্টাব্দে সম্রাট সাজিহানের পুত্ৰচতুষ্টয় দারা, সুজা, মুরাদ এবং ঔরঙ্গজেব ভারত-সাম্রাজ্যের সিংহাসন- পারে ? + Sec Gazettrer of A.-W'. P., Vol. XI, page 448.
[ ১৫ ] দারা যুদ্ধে লাভের জন্য পরস্পরের শােণিত-পানে লােলুপ হইয়া যে ভীষণ সমরানল প্রজ্জ্বলিত করেন তাহা বােধ হয় কাহারও অবিদিত নাই। সেই ঘাের-ভ্রাতৃ-বিদ্রোহ-কালীন দুইটী ঘটনার সহিত আমাদের এই পার্বত্য প্রদেশের সম্বন্ধ আছে। পরাভূত হইয়া লাহােরে পলায়ন করিলেন ও সেইস্থান হইতে পুত্র সােলিমানকে সৈন্য-সমভিব্যাহারে যােগ দিবার জন্য সংবাদ পাঠা- ইলেন । সােলিমাও পিতার সহায়তা করিবার জন্য একদল সৈন্য সংগ্রহ করিয়া লাহােরে যাইয়া দারার সহিত যােগ দিবার মানসে দিল্লি হইতে পলায়ন করেন, কিন্তু ঔরঙ্গজেবের চক্রান্তে পড়িয়া অগ্রসর হওয়া দূরে থাকুক—প্রাণ পর্যন্ত সংশয় হইয়া উঠিল। তিনি পলায়ন করিয়া শ্রীনগুরের রাজা পৃথীসিংহের শরণাপন্ন হইলেন। রাজাও পরমত্ন ও সমাদরের সহিত সােলি- মাকে আশ্রয় প্রদান করিলেন। কিন্তু সােলিমানের বুদ্ধি- বিপৰ্যয় পটিল। তিনি আতিথ্য, বন্ধুত্ব, সমস্ত বিস্মৃত হইয়া গােপনে রাজান্তঃপুরে প্রবেশ করিয়া কুলকামিনীগণের সর্বনাশসাধনে যত্নবান্ হইলেন রাজা এই সংবাদ শ্রবণে নিতান্ত ক্রুদ্ধ হইয়া ঔরঙ্গজেবের হস্তে সমর্পণ করিবেন স্থির করিলেন। সােলিমা রাজার অভিসন্ধি অবগত হইয়া পলায়ন করিলেন কিন্তু বিধিলিপি কে খাইতে পারে ? তিনি পর্বতে পর্বতে ভ্রমণ করিয়া পথ ভুলিয়া আবার শ্রীনগরে আসিলে রাজা তাঁহাকে পত করিয়া ঔরঙ্গ- জেবের হস্তে সমৰ্পণ করিয়া প্রতিহিংসা চরিতার্থ করিলেন। D * মুসলমান ঐতিহাসিকগণ বলেন যে পৃথীসিংহ ঔরঙ্গজেবের ভয়ে ভীত হইয়া সােলি- মাকে তাঁহার হস্তে সমর্পণ করেন।
এদিকে দারা পুত্রের নিকট হইতে সাহায্য প্রাপ্তির বিলম্ব দেখিয়া তৎকালীন শিখদিগের নেতা গুরু হর রায়ের সহিত যােগ দিলেন। কিন্তু তাহাতে ‘বিশেষ ফল লাভ হইল না। ইতিহাসজ্ঞ পাঠককে এই ভ্রাতৃযুদ্ধের পরিণাম বােধ হয় বলা অনাবশ্যক। জগৎ জানেঔরঙ্গজেব কি প্রকারে ভ্রাতৃরক্তে অভিষিক্ত হইয়া ভারতবর্ষের রাজসিংহাসনে অধিরূঢ় হইলেন। তিনি রাজপদে প্রতিষ্ঠিত হইয়াই গুরু হর রায়কে দিল্লিতে আনয়ন করিয়া অবরুদ্ধ করিলেন। সে সময়ে গুরু হর রায়ের দুই পুত্র বৰ্ত্তমান্ ছিল। জ্যেষ্ঠ রাম রায়ের বয়ঃক্রম পঞ্চদশ বর্ষ মাত্র ও কনিষ্ঠ হরষিণের ৬ বৎসর মাত্র। রাম রায়ের, সহিত তাঁহার পিতার তখন সদ্ভাব ছিল না। রাম রায় বাল্যকালে যােগাভ্যাস করতঃ অলৌকিক ক্ষমতাপন্ন ফন। তাঁহার ধৰ্ম্মপ্রাণতা, ও যােগ- প্রভাব দর্শনে নানা দেশ বিদেশ হইতে নর-নারীগণ আসিয়া তাঁহার চরণােপান্তে বসিয়া উপদেশ গ্রহণ করিত। হর রায় স্বীয় জীবদ্দশায় পুত্রকে বিনানুমতিতে শিষ্য গ্রহণ করিতে দেখিয়া যার পর নাই ক্রুদ্ধ হন। তিনি পুত্র কর্তৃক আপনাকে অবমানিত বােধ করিয়া ষষ্ঠবর্ষীয় বালক হরকিষণকে শিখ সম্প্রদায়ের ভাবী গুরু বলিয়া নির্দেশ করিলেন। রাম রায় পিতার এই আদেশ শ্রবণে ব্যথিত হইয়া বলেন যে “হরকিষণ অগ্রে বসন্ত রােগ হইতে রক্ষা পাউক তাহার পর ভবিষ্যৎ বাণী। পিতার গদীতে বসিবে।” রাম রায়ের It is said that the Guru (Har Rai) was (lispleased with his eldest scr. because he macle disciples of his own and worked miracles. When he had therefore one day gone away to visit his own disciples, Har [ ১৭ ] হর রায় দিল্লিতে আবদ্ধ হইয়া কি উপায়ে পরিত্রাণ পাইবেন তাহার উপায় উদ্ভাবন করিতে লাগিলেন। অবশেষে তিনি সম্রাটের নিকট রাম রায়কে ‘জামিন’ স্বরূপ রাখিয়া নিজের অব্যাহতির প্রস্তাব করিলেন। ধূৰ্ত্ত ঔরঙ্গজেব ইহাতে স্বীকৃত হইলেন। তিনি সমর-নিপুণ শিখগণকে শিখগণকে সন্তুষ্ট রাখিবার জন্য রাম রায়কে পরম যত্ন ও সমাদরের সহিত গ্রহণ করিলেন। দিল্লির বিলাস-কাননে সম্রাটের কপট স্নেহে রাম • রায় সুখে গুরু হর রায়েব কালাতিপাত করিতে লাগিলেন। হর রায় ১৬৬১ খৃষ্টাব্দে মানবলীলা সম্বরণ করিলেন। শিখগণ তাহাদের চিরশত্রু মুসলমান সম্রাটের অনুগ্রহ-বর্ধিত রাম রায়কে গুরুপদে বরণ করিতে অস্বীকার করিল। তাহারা জ্যেষ্ঠ রাম রায়কে পরিচারিকা-পুত্র বলিয়া, উপেক্ষা করিল। এবং মৃত্যুকালেও গুরু হর রায় হরকিষণকে নিজ উত্তরাধিকারী নির্দেশ করিয়াছেন বলিয়া কনিষ্ঠ হরকিষণকেই গুরুত্বে বরণ এইরূপে দুই ভ্ৰাতায় বিষম বিবাদের হরকিষণ । সূত্রপাত হইল। ক্রমে উভয়ে উভয়কে পরাভূত করিতে চেষ্টা করিলে এই বিবাদ মীমাংসার জন্য সম্রাদনে Rai declared his younger son in succession to Guruship ; when Ram Rai heard this he was much vexed; he said before the Sikhs, that Harkissen was still a minor, on whom the small-pox had not yet broken- if he should get through small-pox, then he might take the Guruship." -Adi Granth-as translated from Original Gurumukhi by Dr. Ernest Trumph. * “In 1661 the seventh Guru Har Rai died leaving two sons Ram Rai about 15 and Hurkissen about 6 years of age ; but the elder was the offspring of a hand-maiden and not wife of equal degree and Har Rai is further said to have declared the younger his successor."- Cunningham's History of the Sikhs. করিল।
[ ১৮ ] আছে। আবেদন হইল। সম্রাট ঔরঙ্গজেব হরকিষণকে এই বিবাদের মীমাংসার জন্য দিল্লিতে আসিতে আদেশ করিলেন। কিন্তু হরকিষণ পথিমধ্যে বসন্তরােগে আক্রান্ত হইয়া ১৬৬৪ খৃষ্টাব্দে হরকিষণের কালগ্রাসে পতিত পতিত হইলেন। তিনি মৃত্যুকালে বলিয়াছিলেন যে বক্কালা গ্রামে তাহার উত্তরাধিকারী তৎসময়ে এই গ্রামে গুরু হরগােবিন্দের পুত্র তেগ- বাহাদুর বহুতীর্থ পৰ্যটনের পর আশ্রম নির্মাণ করিয়া বাস করিতে ছিলেন। হরকিষণের মৃত্যুসংবাদ শ্রবণ করিয়া রাম রায় পুনরায় গুরু- পদের জন্য বিশেষ চেষ্টা করিতে লাগিলেন।' কিন্তু শিখগণ তাহাকে উপেক্ষা করিয়া, বক্কালা গ্রামে যাইয়া গুরু হরগােবিন্দের পুত্র ধার্মিকপ্রবর প্রথিতনামা তেগবাহাদুরকে মহা- সম্রমের সহিত বরণ করিল। তেগবাহাদুরকে গুরু- পদে আসীন দেখিয়া রাম রায় আর একবার ঔরঙ্গজেবের সাহায্যে গুরুত্বে বৃত হইবার প্রয়াস পাইয়াছিলেন কিন্তু তাহাতে কোনই ফল লাভ হইল না। চতুর ঔরঙ্গজেব দেখি- লেন যে শিখগণ প্রেমময় ধৰ্ম্ম ত্যাগ করিয়া উগ্র ও কলহপ্রিয় হইয়া উঠিতেছে। সমগ্র শিখজাতি তাঁহার বিষনয়নে পতিত হইল। কিসে তাহাদের উচ্ছেদসাধন করিবেন এই চিন্তাই বলবতী হইয়া উঠিল। অবশেষে কৌশলজাল বিস্তারপূর্বক মহাতেজস্বী, তেগবাহাদুরকে দিল্লিতে অতি নৃশংসরূপে বধ তেগবাহাদুর। । * * When Hurkisren was about to expire, he is stated to have signified that his successor would be found in the village of Bukkúla, near Gobindwal on the Beas river."-Cunningham's History of the Sikhs.
[ ১৯ ] করিলেন। এই পাশৰ অত্যাচারে শিখগণ ক্রোধান্ধ হইল—ধীরে ধীরে যে বহ্রি প্রধূমিত হইতেছিল তাহা একেবারে জ্বলিয়া উঠিল— তাহারা এই পাশব ব্যবহারের প্রতিশােধ লইতে বদ্ধপরিকর হইল। দুরাত্মা ঔরঙ্গজেব যাহা ভাবিয়াছিলেন তাহা হইল না। শিখগণ তেগবাহাদুরের উপযুক্ত পুত্র মহাতপস্বী গােবিন্দ সিংহকে এই নিদারুণ হত্যাকাণ্ড শ্রবণ করাইল। গােবিন্দ বুঝিলেন যে জাতি, ধর্ম, কুল, মান, সন্ত্রম সমস্তই যবনকুলাঙ্গারের হস্তে প্রণষ্ট হইতে বসিয়াছে। তখন তিনি ক্রোধে ও দুঃখে বিচলিত হইয়া শান্তিময় আশ্রম ত্যাগ করিয়া, এই অমানুষিক হত্যার প্রতিশােধ লইবার জন্য বদ্ধপরিকর হইলেন। রাম রায়ের শান্ত-নীতি বৈরনির্যাতনের প্রবল বন্যায় ভাসিয়া গেল। শিখগণ গগাবিন্দকে গুরুপদে বরণ করিল। গুরু গােবিন্দের শিক্ষায় ও উপদেশে তাহারা নূতনরূপে গঠিত হইয়া নিতান্ত দুর্ধর্ষ হইয়া উঠিল। তাহারা গুরু নানকের প্রেমপূর্ণ উদার কোমল গুরু গোবিন্দ। ধৰ্ম্মের বশবর্তী রহিল না। যে উদাসী-সম্প্রদায়া- বলম্বী, শান্ত, কলহ-বিমুখ, ধীরপ্রকৃতিক শিখগণ নিয়ত ঈশ্বরাে- পাসনায় ও ধর্মগ্রন্থাদি পাঠে সময়াতিপাত করিত-সহস্র অত্যা- চারেও যাহাদের ধৈর্য্যচ্যুতি ঘটিত না—তাহারা ক্রমাগত মুসলমানের অত্যাচারে ও নিষ্ঠুর ঔরঙ্গজেবের পাশব ব্যবহারে গুরু গােবিন্দের মহামন্ত্রে দীক্ষিত হইয়া নিরতিশয় যুদ্ধপ্রিয় হইয়া উঠিল। তাহারা চিরকাল মুসলমানদিগের সহিত যুদ্ধ-বিগ্রহে লিপ্ত থাকিতে প্রতিজ্ঞা বদ্ধ হইল। শত্রুবিনাশই তাহাদের প্রধান ধৰ্ম্ম হইয়া উঠিল। রাম রায়ের সমস্ত আশা একেবারে নির্মূল হইল। তিনি স্বদেশ [ ২ ] হইতে চিরদিনের জন্য প্রস্থান করিতে ইচ্ছা করিলেন। সংসারের বিষময় কোলাহলে, বিষয়বাসনাভিভূত মানবের নির্মম ব্যবহারে তাঁহার হৃদয় শুষ্ক হইয়াছিল—তিনি শান্তির কোমল ক্রোড়ে আশ্রয়-প্রয়াসী হইয়া এই সুদূর হিমালয়ের নিভৃততম প্রদেশে জীবনের অবশিষ্টাংশ নিরুপদ্রবে ভগবদারাধনায় যাপন করি- বার অভিপ্রায়ে ঔরঙ্গজেবের নিকট হইতে এক অনুরোেধ-পত্র গ্ৰহণান্তর পড়ওয়াল-রাজ-সন্নিধানে গমন করিয়া আশ্রম নির্মাণের অনুমতি প্রার্থনা করিলেন। গড়ওয়াল-রাজও তাহাকে দেরায় বাস করিতে অনুমতি প্রদান করিলেন। রাম রায় নির্জনপ্রদেশে আশ্রম নিৰ্মাণ করিয়া স্বমত প্রচারপূর্বক ‘রামরায়ি’ সম্প্রদায় রামরায়ি’ প্রতিষ্ঠা করিলেন। তাহার শিষ্যবর্গ এই স্থানের নাম সম্প্রদায়। দেহরাদুন’ , রাখিলেন। গড়ওয়ালাধিপতি রাজা ফতে সাহ শিখগুরু রাম রায়ের অসাধারণ ধৰ্ম্মপ্রাণ ও অলৌকিক ক্ষমতা দর্শনে বিমােহিত হইয়া দেরাদুনে তাহাকে এক মন্দির নির্মাণ করিয়া দিলেন এবং মন্দিরের ব্যয়নিৰ্বাহাৰ্থ তিনখানি গ্রাম জায়গির প্রদান করিলেন। মহাত্মা রাম রায়ের যশঃ ক্রমশঃ দেশ বিদেশে ব্যাপ্ত হইয়া পড়িল এবং নানা স্থান হইতে বহুবিধ লােক আসিয়া তাঁহার শিষ্যত্ব গ্রহণ করিয়া ঐ মন্দির সন্নিধানে আবাস নির্মাণ করিতে আরম্ভ করিল। এইরূপে দেরা একটি ক্ষুদ্র নগরীতে পরিণত হইল। কথিত আছে যে রাম রায় যােগবলে সমাধিস্থ হইয়া ২৩ দিবস মৃতবৎ অবস্থিত থাকিতেন। * শিখ ভাষায় ‘দেহরা’ শব্দের অর্থ আশ্রম’ ও ‘দুন’ শব্দে দুইটি পর্বতের মধ্যস্থ উপত্যকা বুঝায় ?
রাম রায়ের [ ২১ ] একদা তিনি কোনও শিষ্যের মঙ্গলার্থে অতি কঠোর তপশ্চরণে প্রবৃত্ত হইয়া যােগাবলম্বনপূর্বক দেহত্যাগ করেন। দেহত্যাপ। তাঁহার শিষ্যেরাও গুরুদেব এই আধিভৌতিক দেহ ত্যাগ করিয়াছেন বুঝিয়া সৎকারাদি সমাপনান্তে মন্দির-মধ্যে সমাধি প্রস্তুত করাইয়া দেন।* অদ্যাপিও সেই সমাধিস্থান ও যে খট্টায় তিনি শয়ন করিতেন সেই খট্টা সাদরে পূজিত হয়। এবং দেশ বিদেশ হইতে উদাসী সম্প্রদায়ের শিখগণ আসিয়া ঐ স্থানে পূজাবন্দনাদি করে। রামরায়ি সম্প্রদায় উদাসী সম্প্রদায়ের শাখা মাত্র। উদা- "नामी সীরা গুরু নানকের মতাবলম্বী। ইহারা মঠে বাস করিয়া থাকেন। অপরে বঁধিয়া দিলে তবে ইহারা আহার করেন। প্রতিদিন আদিগ্রন্থ (নানকাদি গুরুদিগের সংগৃহীত ধৰ্ম্মপুস্তক) পাঠ করা ইহাদের ধর্মসাধনের প্রধান প্রায় সকল জাতিই এই সম্প্রদায়ভুক্ত হইতে পারে। রাম রায়ের মতে গুরুই পরম দেবতা ও একমাত্র উপাস্য। তিনিই সকল তীর্থের সার ও একমাত্র গতি। ধৰ্ম্মমত। মাত্র গুরুর উপাসনা করিলে মনুষের পরমব্রহ্মের উপা- সনা করা হয়। সুতরাং, একমাত্র গুরু ব্যতীত জীবের অন্য নমস্ত সম্প্রদায়। অঙ্গ। রাম রায়ের নাই। "It is reported that Ram Rai for the sake of one of his disciples, underwent in a deep cave a very severe course of austerities; when the breath had risen to the tenth gate, the disciples who were near him, knew that the Guru had died and they burnt the body is the manner of the Hindus"--Trumph': Translation of Adi Granth. + "He taught his disciples not to bow the head before any one but himself and not to worship any god or goddesses but himself."-Ditto, ditto.
[ ২২ ] সম্প্রদায়। গুরু গােবিন্দ কিন্তু এই রামরায়ি’দিগকে জাতিচ্যুত করেন এবং ‘অকালী’ নামক সম্প্রদায় প্রবর্তিত করেন। এই অকালী অত্যাচারপ্রপীড়িত বৈরনির্যাতনে কৃতসঙ্কল্প গােবিন্দের ধৰ্ম্মান্ধ শিখশিষ্যগণই ‘অকালী’ নামে অভিহিত ইহারা উপাসনার সময় মুহুর্মুহুঃ অকালপুরুষের নামােচ্চারণ করে—নীলবর্ণ পরিচ্ছদ ধারণ করে ও কখন কেশ বা শ্মশ্রু মুণ্ডন করে না। ইহারা সর্বদা সশস্ত্র থাকে। রাম রায় ঔরঙ্গজেবের সহিত চক্রান্ত করিয়াছিলেন বলিয়া ও ঔরঙ্গ- জেবের অনুরােধে দেরায় বাস করিতে পাইয়াছিলেন বলিয়া অকালী সম্প্রদায়ের লােকেরা রামরায়ি’দিগকে নিতান্ত ঘৃণার চক্ষে দেখে। রাম রায় পরলােক গমন করিলে তাহার পত্নী, দেওয়ান হরপ্রসাদের সাহায্যে বিষয়-কাৰ্যাদি নিৰ্বাহ করিতেন। অবশেষে দেওয়ান হরপ্রসাদ এই মন্দিরের মহান্ত নির্বাচিত হয়েন এবং প্রায় পঞ্চবিংশতি বৎসর ধরিয়া মহান্তপদে প্রতিষ্ঠিত থাকেন। তাহার দেহাবসানে কর্মঠ হরসেবক গদীতে আরােহণ করেন। ১৮১৮ খৃষ্টাব্দে তাঁহার মৃত্যু হইলে অকৰ্ম্মণ্য মূখ স্বরূপদাস এবং তাহার পর প্রীতমদাস মহান্ত হয়েন। রাজা ফতে সাহের মৃত্যুর পর ১৭১৭ খৃষ্টাব্দে তাহার পৌত্র প্রদীপ্ত সাহ সিংহাসনারােহণ করেন। ইহার রাজত্ব- কালে এই দেরাদুন সহরের বিস্তর উন্নতি সাধিত হয়। কিন্তু সাহারাণপুরের শাসনকর্তা নাজীবুদ্দৌল্লা এই ক্ষুদ্র রাজা প্রদীপ্ত সাহ। * Williains সাহেবের মতে ১৬৯৯ খৃষ্টাব্দে।
আক্রমণ। দেশ [ ২৩ ] নাজীবুদ্দৌল্লার নগরীর সমৃদ্ধি দেখিয়া ১৭৫৭ খৃষ্টাব্দে একদল রােহিলা সৈন্য সমভিব্যাহারে শিবালিক পর্বত আঁতিক্রমপূৰ্ব্বক এই রাজ্য আক্রমণ করিয়া হস্তগত করিলেন। প্রদীপ্ত সাহও পুত্তলিকার ন্যায় তাঁহার অনুগত হইয়া রহিল। নাজীবের ন্যায়পরায়ণতা, বিচক্ষণতা এবং শাসনকৗশলে এই নগর অভূতপূৰ্ব বিভবশালী হইয়া উঠে। এইসময়ে নানা হইতে বহুসংখ্যক মুসলমান আসিয়া কৃষি-বাণিজ্য নগরের সমৃদ্ধি। প্রভৃতির উৎকর্ষ সাধন করে। নাজীবুদ্দৌল্লা স্থানে স্থানে কূপাদি খনন, জলাশয় ও সরিৎ নির্মাণ এবং সুগম পথ সকল প্রস্তুত দ্বারা প্রজা-পুঞ্জের সুখ বর্ধন করিয়াছিলেন। এই সময়ে বাৎসরিক প্রায় ১ লক্ষ ২৬ হাজার টাকা রাজস্ব আদায় হইত। কিন্তু হায়! দূরদর্শী নাজীরুদ্দৌল্লার দেহান্তের সহিত ক্ষণপ্রভার ন্যায় নগরীর ঐশ্বৰ্য্য-লক্ষী অন্তর্হিত হইলেন। নষ্ট কান্যা গতিঃ—যে কৃষি-বাণিজ্যের সুহিত রাজ্যাদির সুখ-সমৃদ্ধির নিত্য সম্বন্ধ, কুক্ষণে বৃদ্ধ রাজা প্রদীপ্ত সাহের সেই কৃষি-বাণিজ্যের বিলােপ সাধনেই প্রবৃত্তি জন্মিল। তিনি রাজ্যের প্রাণভূত ব্যবসায়ি-সম্প্রদায়কে বিতাড়িত করিলেন। ছিদ্রেধনর্থ বহুলীভবন্তি—অপচীয়মান রাজ্যশ্রী শিখ, রাজপুত প্রভৃতি জাতির নিরন্তর আক্রমণে একেবারে বিলীন হইয়া গেল। ধনরত্নবহুল, নিত্যসুখলালিত অধিবাসিবর্গের উৎসবকোলাহলমুখরিত গড়ােয়াল- রাজ্য এক ভীষণ মরুপ্রদেশে পরিণত হইল। কিন্তু মঙ্গলময়ের রাজ্যে নিরবচ্ছিন্ন অন্ধকার বড় দেখিতে পাওয়া যায় না, তাই মৃত্যুর কিছু পূর্বে প্রদীপ্ত সাহ আবার স্বরাজ্য আংশিক ।
[ ২৪ ] রাজা শ্ৰীসম্পন্ন দেখিয়া ১৭৭৪ খৃষ্টাব্দে ইহলীলা সাঙ্গ করিলেন। তাঁহার পুত্র ললিত সাহ সাত বৎসরকাল রাজত্ব করিয়া ১৭৮১ খৃষ্টাব্দে কালগ্রাসে পতিত হয়েন। তাহার পর পর্দমান সাহ। ইহার পুত্র পর্দমান সাহ রাজা হয়েন। এই সময়ে পূৰ্বোল্লিখিত শিখ, রাজপুত ও গুজর জাতি আসিয়া ক্রমাগত আক্রমণ ও উপদ্রব করিতে লাগিল। ইহারা প্রথম প্রথম ধন রত্নাদি ইচ্ছামত লুণ্ঠন করিয়া চলিয়া যাইত কিন্তু এখন ইহারা এই নগরে বাস করিয়া ক্রমাগত রাজা ও প্রজাবৰ্গকে পীড়ন করিতে লাগিল। রাজা উপায়ান্তর না দেখিয়া এই সকল অত্যাচার হইতে নিষ্কৃতি-লাভ-প্রয়াসে ক্রমাগত জাগির প্রদান দ্বারা ইহাদিগকে সন্তুষ্ট করিতে চেষ্টা করিলেন। ১৭৮৬ সালে নাজীবুদ্দৌল্লার পৌত্র দুরন্ত গােলাম কাদের পিতামহের লুপ্ত রাজ্য উদ্ধার করিবার আশায় গড়ওয়াল রাজ্য আক্রমণ করিয়া দেরা দখল করিল এবং রাজাকে র করিয়া দিল। হৃতসর্বস্ব প্রজাবর্গের আর্তনাদে, উৎপীড়িত অবলাকুলের উষ্ণ নিশ্বাসে এবং অধিবাসীদিগের মৃতদেহে নগর শ্মশান-ভূমি হইয়া উঠিল। সর্বত্র হাহাকার-শব্দ উথিত হইল। দুরাত্মার বৈর-নির্যাতন-প্রবৃত্তি ইহাতেও চরিতার্থ হইল না। পাপিষ্ঠ গুরু রাম রায়ের পবিত্র মন্দিরে গােহত্যা করিয়া সমাধি গােরক্তে প্লাবিত করিল—রাম রায়ের পবিত্র খট্টায় শয়ন করিয়া শয্যা কলুষিত করিল। অবশেষে দুরাত্মা তাহার বিশ্বস্ত অনুচর উমেদ সিংহের হস্তে রাজ্যভার সমর্পণ করিয়া, রাজ্য ছারেখারে দিয়া প্রস্থান করিল। কিন্তু পাপের ফল কে রােধ করিবে ? শ্রুত হওয়া যায় যে এই দুরাত্মা অনতিবিলম্বে উন্মত্ত হইয়া যায়। ঐ
[ ২৫ ]
উমেদ সিংহ রাজার সহিত সন্ধি স্থাপন করিয়া পুনরায়
তাহাকে রাজ্যে আহ্বান করিলেন কিন্তু পর্দমান নামে মাত্র রাজা
হইলেন—বস্তুতঃ উমেদই রাজ্যের হর্তাকর্তা হইয়া রহিল। তিন
বৎসর গত না হইতেই এই পাপিষ্ঠ উমেদ বিশ্বাসঘাতকতা পূর্বক
সিরমুরের রাজার হস্তে এই রাজ্য অর্পণ করিল—সিরমুরের
রাজাও দেরায় আপন রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করিল। পর্দ মান প্রথমে
বর্গীদিগের সহিত যােগদান করিয়া নিজ রাজ্য উদ্ধারের
চেষ্টা করিতে লাগিলেন ; অবশেষে উমেদ সিংহের সহিত নিজ
নয়ার বিবাহ দিয়া উমেদের সাহায্যে লুপ্ত রাজ্য পুনরায়
উদ্ধার করিলেন।
১৭৯৬ খৃষ্টাব্দে কাপ্তেন হার্দিক গড়ওয়াল-রাজ্যে গমন
করেন। তাঁহার অবস্থিতিকাল রাজা পদ্মান,
পরাক্রম ও প্রীতম নামক ভ্রাতৃদ্বয় সমভিব্যাহারে
তাঁহার সহিত সাক্ষাৎ করিতে আইসেন। কাপ্তেনের
ভ্রমণবৃত্তান্তে রাজা ও রাজ্যের এইরূপ বর্ণনা দেখিতে পাওয়া যায়
তাঁহার বর্ণিত রাজার বয়ঃক্রম ২৭ বৎসর, আকৃতি খর্ব, দেহ
কৃশ এবং দুর্বল, পরিচ্ছদ সাদাসিধা । তিনি
বুদ্ধিমান্, বাক্পটু এবং সমসাময়িক রাজনৈতিক
জগতের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন; এমন কি পূর্বপ্রদেশে ইংরাজের
রাজত্ব কতদূর বিস্তৃত হইয়াছে তিনি তাহার প্রকৃত তত্ত্ব
অবগত হইতেও ব্যগ্রতা প্রকাশ করিয়া ছিলেন ।
রাজধানী শ্রীনগর : মাইল দীর্ঘ হইবে। গৃহ সমুদায় প্রায়ই
কাপ্তেন
হার্দিকের
গড়ওয়াল
গমন।
রাজা ও
রাজ্যের
বৃত্তান্ত।
[ ২৬ ] -- { অবস্থা। রাজস্ব। হইত। করিত। দ্বিতল—দেয়াল প্রস্তরের, ছাদ শ্লেট পাথরের । তদানীন্তন শ্রীনগরের রাস্তা অতি অপ্রশস্ত ও অপরিষ্কার। রাজবাটী অতি পুরাতন ও ভগ্নপ্রায়। সমুদায় রাজ্যে সর্বসমেত রাজস্ব পাঁচলক্ষ টাকা আদায় । প্রজারা রাজস্ব, দ্রব্যে এবং অর্থে প্রদান উৎপন্ন শস্যের অর্ধেক হিসাবে রাজস্ব গৃহীত হইত। সমস্ত ব্যয় নির্বাহ হইয়া রাজকোষে অতি সামান্যই অর্থ উদ্বৃত্ত হইত। অধিকাংশ করই সৈন্যদিগের বেতনপ্রদানে ব্যয়িত হইত। সৈন্য, কাপরদাজ, নৰ্তকী, গায়ক প্রভৃতি দিগের বেতনের জন্য জমীদারদিগের উপর বরাত দেওয়া হইত। এই রাজ্যে সে সময়ে বিস্তর খনি ছিল। কর্ণ-প্রয়াগ, দেব-প্রয়াগ, হৃষীকেশ প্রভৃতি স্থান হইতে স্বর্ণ খনিজ দ্রব্য। আহৃত হইত। যাহারা স্বর্ণ আহরণ করিত তাহা- দিগকে বাৎসরিক ১০০ শত টাকা করিয়া কর দিতে হইত। শ্রীনগরের ৪০ ক্রোশ দূরে নাগপুর নামক স্থানে একটি তামের খনি ছিল। এই খনিতে বৎসরের মধ্যে তাম্রখনি! ৮ মাস কাল কাৰ্য্য হইত। ইহা হইতে প্রায় শত করা ৫০ ভাগ বিশুদ্ধ তাম্র উদ্ধত হইত ও ইহার অর্ধেক রাজ- কোষে জমা হইত। অপরাদ্ধ হইতে তাম্রখনি পরিচালনের ব্যয় নির্বাহ হইত। নগরের ৫০ ক্রোশ পূর্বে দুসৌলি নামক গ্রামে সীসকের [ ২৭ ] গনি। সীসকের খনি ছিল। যাহারা খনিতে কাৰ্য্য করিত তাহ- দিগকে নিষ্কর ভূমি প্রদত্ত হইত ; তাহারা ইহার বিনিময়ে পরিশ্রম করিত ও এই খনির সমস্ত উপসত্ব রাজ- কোষে জমা হইত। চণ্ডীপুরের লৌহখনি যাহার ইচ্ছা সে চালাইতে পারিত ইহার জন্য অনুমতি গ্রহণ বা কর প্রদান করিতে লৌহখনি। হইত না। লৌহােত্তোলনব্যাপারে তেমন লাভ হইত না বলিয়া রাজা এ বিষয়ে দায় গ্রহণ করিতেন না। ভুটান হইতে সােহাগা ও লবণ, বদরিনাথ এবং তৎসমীপবর্তী প্রদেশ হইতে মৃগনাভি ও ক্রীত দাস, ‘পাইকুণ্ডা’ আমদানি। নামক স্থান হইতে লুই, ধােসা প্রভৃতি গাত্রবস্ত্র এবং ‘রােহিখণ্ড’ হইতে সর্ব প্রকারের বস্ত্র আমদানি হইত। এই রাজ্যের সৈন্য সংখ্যা ৫০০০ হাজার ছিল। সহরে প্রায় সর্বদাই সহস্র সৈন্য পাকিত। সৈন্যের ঢাল, তরবার, তীর, ধনু প্রভৃতি অস্ত্র-শস্ত্রে সজ্জিত থাকিত কিন্তু ইহাদের পােষাক পরিচ্ছদ, বা নিয়ম পদ্ধতি কিছুই ছিল না। প্রত্যেক সৈন্যকে কিছু জমি দেওয়া থাকিত। এবং ঐ সকল জমি উহাদের সেনাপতি ফৌজদারের তত্ত্বাবধানে থাকিত। এই ফৌজদারেরাই দেওয়ানি ও সামরিক কাৰ্য্য নির্বাহ করিত। আদায়, ওয়াশিল, আয় ব্যয় নির্বাহ ও বিচার কাৰ্য তাহারাই সম্পন্ন করিত। কেবল অত্যাবশ্যক গুরুতর কাৰ্য সকল দেওয়ানজী সম্পাদন করিতেন। সৈন্য ।
[ ২৮ ] হইত। জরিমানা ও বাজেয়াপ্ত করণই প্রধান শাস্তি ছিল। হত্যা করিলে অপরাধীর প্রায় প্রাণদণ্ড হইত না। রাজ- দণ্ডনীতি। পুত অপরাধী হইলে অধিক জরিমানা এবং ব্রাহ্মণ অপরাধী হইলে নির্বাসনের দ্বারা শাসিত হইত। গােহত্যা, রাজবিদ্রোহ, জাতিপাত প্রভৃতি অপরাধে প্রাণদণ্ডের ব্যবস্থা ফাঁসি ও শিরচ্ছেদন এই দুই প্রকারেই প্রাণদণ্ড গুরুতর চৌৰ্য্যাপরাধে কখন হস্তপদাদি বা নাসা- কর্ণচ্ছেদন দ্বারা দণ্ড প্রদান করা হইত। নিকৃষ্ট জাতির স্ত্রীলােকের সহিত ব্যভিচার করিলে জরিমানা, কিন্তু উচ্চবংশীয়া রমণী ব্যভিচারিণী হইলে নাসাকর্ণচ্ছেদন এবং তাঁহার প্রণয়ীর প্রাণদণ্ড হইত। কখন কখন স্বামীকে স্বহস্তে তাহার স্ত্রীর উপপতিকে বিনাশ করিতে আজ্ঞা প্রদান করা হইত। রাজা স্বেচ্ছাচারী সর্বেসর্বা কৰ্ত্তা হইলেও মন্ত্রীসভা দ্বারা হার ক্ষমতা নিয়ন্ত্রিত হইত। ভারতবর্ষীয় রাজ- রাজার ক্ষমতা। গণ চিরকালই ধৰ্ম্মনীতি-প্রিয় প্রজারঞ্জক পর্দ মান শ্রদ্ধার সহিত ধৰ্ম্মশাস্ত্রের বিধি অনুসারে সকল কার্য করিতেন। প্রজার সুখসন্তোষের জন্য উপযুক্ত ব্যক্তি দ্বারা মন্ত্রীসভা গঠিত করিতেন। পাছে প্রজাপালক নামে কলঙ্ক হয় এই ভয়ে সর্বদা শঙ্কিত থাকিতেন। মন্ত্রীসভা দেওয়ান, উজির, ফৌজদার ও অন্যান্য সম্ভ্রান্ত লােক লইয়া গঠিত হইত। এই সময়ে পর্দমান সাহ গুর্খাদিগকে বাৎসরিক ২৫০০০ টাকা কর প্রদান করিতেন। ছিলেন। ch [ ২৯ ] ৮ গুরুখ, আক্রমণ। রাজা পদ্দ মানের মৃত্যু। ১৮০৩ খৃষ্টাব্দে গুরখারা বিপুল আয়ােজন করিয়া গড়ওয়াল রাজ্য আক্রমণ করিলে রাজা পর্দ মান সাহ শ্রীনগর হইতে দেরাদুনে, এবং তথা হইতে সাহারাণপুরে পলায়ন করেন। সাহারাণপুরে যাইয়া তিনি নিজ সিংহাসন দেড় লক্ষ টাকায় এবং বদরিনাথের মন্দির ৫০০০০, টাকায় বন্ধক প্রদান করিয়া ১২০০০ হাজার সৈন্য সংগ্রহ পূর্বক দেরাদুন দখল করিবার উদ্যােগ করেন, কিন্তু ১৮০৪ সালে যুদ্ধে হত হন। তাঁহার কনিষ্ঠ ভ্রাতাকে বন্দী করিয়া গুরা নেপালে প্রেরণ করে। কেল পরাক্রম সাহ হিন্দোরের রাজা রামসরণের শরণাপন্ন হইয়া ও পদ্মানের পুত্র সুদর্শন সাহ জোয়ালাপুরে যাইয়া আত্মরক্ষা করেন। যখন পর্দমান সাহ সাহারাণপুরে পলায়ন করেন গুরখারা সেই যােগে দেরা দখল গুর্খা কর্তৃক গুরখাদের অত্যাচারে দেশের অবস্থা শােচনীয় হইয়া উঠিল। দাস-ব্যবসায় ভয়ানকরূপে প্রচলিত দেশের দুর্দশা ও হইল; এমন কি প্রকাশ্য বাজারে এক একটি দাস, উষ্ট্র বা অশ্ব অপেক্ষা কম মূল্যে বিক্রীত হইতে লাগিল। ইহাদিগের অত্যাচারে কত গ্রাম যে উৎসন্ন যাইল তাহার নির্ণয় করা যায় না। আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা সকলেই সর্বদা সশঙ্কিত হইয়া থাকিত। কাহার কখন্ সর্বনাশ সাধিত হইবে কেহ বলিতে পারিত না। একবার নেপালের রাজা পৃথীনারায়ণের ভ্রাতা স্বরূপরতন কীৰ্ত্তিপুর গ্রাম আক্রমণ করিলে গ্রামবাসিগণ প্রাণপণে, আসাধারণ বিক্রমে কিছুদিন আত্মরক্ষা করে; কিন্তু কত দেরা দখল। করে। ; দাস-ব্যবসায়।
{ ৩০ ] । দিন তাহারা শিক্ষিত সৈন্যের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করিতে সক্ষম হইবে? বিশেষতঃ নেপালী সৈন্যগণ তখন ইংরাজি প্রথায় রণ করিতে শিক্ষা করিতেছিল। অবশেষে তাহারা স্বরূপরতনের নিকট প্রস্তাব করিয়া পাঠাইল যে যদি তিনি শপথ করেন যে তাহারা আত্মসমর্পণ করিলে তাহাদের জীবনের উপর হস্তক্ষেপ করিবেন না, তাহা হইলে তাহারা আত্মসমর্পণ করিবে। স্বরূপ- রতন তাহাই প্রতিজ্ঞা করিলেন । গ্রামের প্রধান ব্যক্তিরা যাইয়া বশ্যতা স্বীকার পূর্বক অস্ত্র ত্যাগ করিল—কিন্তু পাপিষ্ঠ স্বরূপরতন পূৰ্বপ্রতিজ্ঞা বিস্মৃত হইল। দুরাত্মা গ্রামের প্রধান ব্যক্তিগণকে বধ করিয়া, বৃদ্ধ, বালক ও স্ত্রীলােকদিগের নাসিকা কৰ্ত্তন করিয়া দুরাত্মা এই পৈশাচিক ব্যাপার চিরস্মরণীয় করিবার জন্য গ্রামের নাম পরিবর্ত্তন পূর্বক ‘নাসকাটাপুর’ রাখিল। কিন্তু পাপের ফল কে বােধ করিবে ? ভগবানের শাস্তি যে কোথা হইতে আইসে তাহা কেহই বলিতে পারেনা। যখন পাপের উপর পাপ সঞ্চিত হয়—যখন পাপের ভরা পূর্ণ হইয়া আইসে—তখন বিশ্বনিয়ন্তার কঠোরতম দণ্ড তাহাকে চূর্ণ বিচূর্ণ করিয়া ফেলে। গুরখাদিগের সম্বন্ধেও সে নিয়মের ব্যতিক্রম হইবে কেন ? তাহাদের অত্যাচার-পিপাসা ক্রমশঃই বৃদ্ধি হইতে লাগিল; অবশেষে যেন বিদ্ধস্ত হইবার জন্যই ১৮১৪ খৃষ্টাব্দের ২৯শে মে তারিখে, অকারণে ইংরাজের ভূতওয়ালের দিল। ; * "Their noses and lips enabled the Raja to take a census of the towo-- ihe uame of which was changed to 'Naskatapur"--11'illims's Memoirs of Dehra Dun.
[ ৩ ]
কারণ।
দলের
থানা আক্রমণ করিল—১৮ জন কনষ্টেবল
গুরু-যুদ্ধের
ও ৬ জন আহত হইল। থানার দারােগা, এই
নেতা মানরাজ ফৌজদারের শরণাগত
হই, কিন্তু দুবৃত্ত মানরাজ শরণাগত দারােগাকে নিজের
সম্মুখে অতি নৃশংস রূপে হত্যা করিল। এইরূপে ইংরাজের
পান। লুণ্ঠন করাতে তাহাদের ক্রমে সাহস বৃদ্ধি হইল। তাহারা
আর একটি থানা আক্রমণ পূর্বক বহু লােকের প্রাণ বধ করিল।
ইংরাজ গভর্মেন্ট দেখিলেন যে আর শাসন না করিলে ইহা
দিগের প্রতাপ আরও বৃদ্ধি পাইবে কিন্তু অসময় বলিয়া যুদ্ধ
ঘাষণার পরিবর্তে এই সকল রাক্ষসােচিত অত্যাচারকাহিনী
বিবৃত করিয়া নেপালরাজকে, এক পত্র লিখিলেন। নেপালরাজ
সেই পত্র পাইয়া অত্যাচার নিবারণ করা দূরে থাকুক, এমন
উদ্ধত উত্তর প্রেরণ করিলেন যে বৃটিশ-সিংহের অনতিবিলম্বে
যুদ্ধ ঘােষণা করা ব্যতীত উপায়ান্তর রহিল না।
৩৫১৩ জন সৈন্য ও ১৮টি কামান লইয়া বৃটিশ গভমেন্ট
জেনারেল জিলিপিকে দেয়া হস্তগত করিয়া শ্রীনগরে অমর
সিংহের বিরুদ্ধে যুদ্ধ যাত্রা করিবার আদেশ প্রদান করিলেন।
জিলিপির সৈন্যদল ২৪শে অক্টোবর দেরাদুন দখল করিল।
জিলিপি তখন উপস্থিত ছিলেন না। তাঁহার সহকারী কর্ণেল
মৌলির উপর সেনাপরিচালনের ভার ছিল। এদিকে গুরখারাও
নিশ্চিন্ত ছিল না। দেরাদুনের উত্তরে সাড়ে তিন মাইল মধ্যে
পাহাড়ের উপর কালঙ্গা নামক স্থানে
গুরখা-সেনাপতি
বলভদ্র সিংহ বালক, বৃদ্ধ, স্ত্রীলােক ও সৈন্য সহিত ৩০০ মাত্র
{ [ ৩ ] লােক লইয়া একটি দুর্গ প্রস্তুত করিয়া বাস করিতে ছিলেন । সেই স্থানের পর্বত প্রাচীরবৎ সরলােন্নত সুতরাং গাত্র অবলম্বন করিয়া আরােহণ করা বড় দুরূহ। তাহার পর দুর্গ হইতে সমতল ভূমি পৰ্য্যন্ত গভীর শাল বনে আচ্ছন্ন। দুর্গ ইত- স্ততঃ বিক্ষিপ্ত উপলখণ্ড ও শাল বৃক্ষ দ্বারা নির্মিত। যখন ইংরাজ সৈন্য দেরায় উপস্থিত হইল তখন বলভদ্র সিংহের সৈন্যগণ দুর্গের প্রাচীর নির্মাণ করিতেছিল ও শাল বৃক্ষের বেড়া দিতেছিল। কর্ণেল মৌলি সেই রাত্রেই বলভদ্র সিংহকে আত্মসমর্পণ করিতে বলিয়া পাঠাইলেন। দূত আসিয়া নিবেদন করিল যে বলভদ্র সিংহ অবজ্ঞার সহিত পত্র ছিড়িয়া ফেলিয়াছে এবং বলিয়াছে যে সমর- ক্ষেত্রে সেনাপতির সহিত ত্বরায় সাক্ষাৎ করিবেন। দূতমুখে এই নির্ভীক উত্তর শ্রবণ করিয়া, ইংরাজসেনাপতিগণ বিস্ময়স্তব্ধ হইয়া গেলেন। তাহারা এক জন সামান্য অসভ্য দুর্গস্বামীর নিকট হইতে এরূপ উদ্ধত, নির্ভীক উত্তর আশা করেন নাই। তাহারা মনে করিয়াছিলেন যে বলভদ্র ইংরাজের অগণিত সৈন্যশ্রেণী দেখিয়াই ভয়ে আত্মসমর্পণ করিবে। যাহা হউক উত্তর শ্রবণে যার পর নাই রােষাবিষ্ট হইয়া দুর্গ আক্রমণ করিলেন। কামান শ্রেণী অগ্নি উদগীরণ করিতে লাগিল কিন্তু সেই পর্বত-দুর্গের একখানি প্রস্তরও স্থানচ্যুত হইল না। পরদিন ২৬শে অক্টোবর জিলিপি সমর-প্রাঙ্গনে উপস্থিত হইয়াই ৫০০ শত গজ মাত্র দূরে কামানশ্রেণী সজ্জিত করিলেন ও চতুর্দিক হইতে একই সময়ে কালাঙ্গার দুর্গ আক্রমণ করিতে আদেশ প্রদান করিলেন। ইহাতে তিনি মনে করিয়াছিলেন যে শত্রুরা কোন্ দিক্ রক্ষা করিবে বুঝিতে না পারিয়া কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইয়া পড়িবে। কিন্তু বলভদ্র জানিতেন যে তাহার দুর্গ সুরক্ষিত—সিড়ি ভিন্ন তন্মধ্যে প্রবেশলাভ অসম্ভব; তাই তিনি নির্ভীকচিত্তে ও একরূপ নিশ্চেষ্টতা অবলম্বন দ্বারা শত্রুগণের বিস্ময় উৎপাদন করিয়া- ছিলেন। যাহা হউক জিলিপি সাহেব মহাতেজে অগ্রসর হইলেন— কিন্তু দুগোপরি কামানশ্রেণীর অনবরত জ্বলন্ত-গােলক-বর্ষণেও সেই পাৰ্বতীয় দুর্গ সম্পূর্ণ অটুট রহিল। জিলিপি মনে মনে বিপদ গণিলেন—তিনি যে দুর্গ অঙ্গুলিহেলনে অবলীলাক্রমে জয় করিবেন মনে করিয়াছিলেন তাহা এখন কর্মক্ষেত্রে পড়িয়া বুঝিলেন যে তত সহজসাধ্যে নহে। তিনি প্রতিজ্ঞা করিলেন যে হয় দুর্গ- প্রাকারে বৃটিশ-পতাকা উড্ডীন হইবে, নচেৎ অকিঞ্চিৎকর প্রাণ বীরের ন্যায় বিসর্জন দিবেন—বৃটিশ নামে কখনই কলঙ্ক আরােপিত হইতে দিবেন না। এই স্থির করিয়া তিনি ভীম বেগে, অসীম উৎসাহের সহিত নিষ্কাসিত-অসি-হস্তে অগ্রসর হইতে লাগিলেন— দলে দলে ইংরাজসৈন্য হত হইতে লাগিল—কিন্তু জীবন থাকিতে কেহই পশ্চাৎপদ হইল না ; এমন সময়ে একটি জ্বলন্ত গােলক আসিয়া জিলিপির বক্ষে পতিত হইল—তিনি তৎক্ষণাৎ মানবলীলা সম্বরণ করিলেন। বিজয়-লক্ষী বাম হইলে প্রাণ দিয়াও জয়লাভ করা যায় না—ইংরাজসৈন্য সেদিনকার যুদ্ধে পরাস্ত হইয়া দেরাদুনে ফিরিয়া আসিল। কর্ণেল মৌলি এবার সৈন্যাধ্যক্ষ হইলেন। তিনি দিল্লি হইতে Battering train পাঠাইবার জন্য পত্র লিখিলেন। ২৪শে নভেম্বর Battering train আসিয়া উপস্থিত হইল। অনতিবিলম্বে [ ৩৪ ] আবার কামান স্থাপিত হইল। দুর্গের উপর দিবারাত্র গােল বর্ষিত হইতে লাগিল। ক্রমে অনেক গােলাবর্ষণের পর দুর্গের এক স্থান ভাঙ্গিয়া গেল। ইংরাজসৈন্যগণ এবার দুর্দমনীয় বেগে আক্রমণ করিয়া সেই ভগ্নাংশ দিয়া দুর্গপ্রবেশের চেষ্টা করিল--কিন্তু কাহার সাধ্য সে দুর্গে প্রবেশ করে ? গুরখাগণ সিংহবিক্রমে সেই ভগ্নাংশ রক্ষা করিতে লাগিল—দুইবার ইংরাজের সুশিক্ষিত সৈন্যকে অসভ্য গুর্খা গুলিবর্ষণ দ্বারা বিফল-প্রযত্ন, করিল। এইরূপে তিন দিন ঘােরতর যুদ্ধ চলিতে লাগিল। এদিকে ইংরাজের সংবাদ পাইল যে নালাপানি’ নামক নিঝরিণীদ্বারা নালাপানি। এই দুর্গে জল সরবরাহ হয়। ইংরাজের। সেই সলিলপ্রবাহ বন্ধ করিয়া দিল। গুরখা-সৈন্যগণ তাহাতেও হটিল —তাহারা কয়েক দিন বিনা বারিপানেই যুদ্ধ করিতে লাগিল— কিন্তু স্বভাবের সহিত ক্ষুদ্র মানবের কয়দিন যুদ্ধ করা সম্ভবে ? একে ক্রমাগত ভীষণ যুদ্ধে যারপরনাই ক্লান্ত হইয়াছে—তাহার উপর পিপাসায় কণ্ঠ-তালু শুষ্ক হওয়ায় তাহারা অধীর হইয়া উঠিল -আহার-সামগ্রী ফুরাইয়া গিয়াছিল—বালক, বৃদ্ধ ও স্ত্রীলােক- গণ আহাৰ্য-পানীয়ের অভাবে পঞ্চত্ব প্রাপ্ত হইতে লাগিল— বলভদ্র দেখিলেন যে আর দুর্গ রক্ষা হয় না—মনুষ্যের যাহা সাধ্য তাহা তিনি করিয়াছেন—তবে কেন ইংরাজের ঘাতকহস্তে প্রাণ বিসৰ্জন করিবেন। বীর বলভদ্র মরিতে কাতর ছিলেন না। তিনি রি করিলেন যে যদি মরিতে হয় তবে বীরের ন্যায় সম্মুখসমরে বলভদ্রের প্রাণত্যাগ প্রাণত্যাগ করিবেন । এই ভাবিয়া বীরশ্রেষ্ঠ বীর। বলভদ্র সিংহ হতাবশিষ্ট, ৭০ জন মাত্র সৈন্য লইয়া - ।
[ ৩৫ ] ০ সিংহবিক্রমে উন্মুক্ত-তরবারি-হস্তে ইংরাজ-সৈন্য ভেদ করিয়া প্রস্থান করিলেন। তাঁহার সে প্রচণ্ড তেজঃ ও অপ্রতিহত বেগ কেহই রােধ করিতে সমর্থ হইল না। তিনি নিরাপদে ঐ পর্বতস্থিত আর একটি দুর্গে আশ্রয় লইনে। ইংরাজ তখন সেই পরিত্যক্ত কালঙ্গা দুর্গে প্রবেশ করিয়! যাহা দেখিলেন তাহাতে বিস্ময়াভিভূত হইলেন। দেখিলেন যে , শশান-ভূমিতে পরিণত হইয়াছে চতুর্দিকে শবদেহের পুতিন সে স্থানে ক্ষণমাত্র তিষ্ঠান যায় না। ইংরাজ ঐ দুর্গ একেব: বংস করিয়া ফেলিলেন—চিহু মাত্র রাখিলেন না। আ:, • যায় যে মহাবলশালী বলভদ্র হতাবশিষ্ট সৈন্যের সহি ঞ্জাব-কেশরী রণজিৎ সিংহের সৈন্যশ্রেণীভুক্ত হইয়া ত ** যুদ্ধে প্রাণত্যাগ করিয়াছিলেন। এইরূপে ইংরাজ-রাজ ৫ • হস্তগত করিয়া শান্তি স্থাপন করিলেন। ইহার পর • ...নও উপদ্রব হয় নাই। কেবল একবার মাত্র অসন্তুষ্ট জাতি কলুয়া নামক এক দস্যর অধীনে বি হইয়াছিল। এই কলুয়া বিখ্যাত কলুয়া দ্য। [লের ন্যায় ছিল বলিয়া শুনা যায়। সে ধনীর ধনা, এরিয়া দরিদ্রের সহায়তা করিত। ইংরাজ প্রথমে কলুয়ার " স্তত্ব নাই ও তৎসম্বন্ধীয় জন- তি কল্পনা-প্রসূত বলি। Fা করিয়াছিলেন—কিন্তু যখন ক্রমাগত লােকে দক : ক্রান্ত হইতে লাগিল—থানা, দস্য তান্তি, *। বাহুল্যভয়ে যুদ্ধের বৃত্তান্ত সং: জানিতে ইচ্ছা করেন তঁাহারা | নামক পুস্তক পাঠ করিবেন। হইল। যাঁহারা যুদ্ধের বিষয় সবিশেষ 97 z;is Memoirs of Dehra Dun [ ৩৬ ] কাছারি প্রভৃতি লুষ্ঠিত হইল—তখন ইহার বিরুদ্ধে ২৪টি অভি- যান হইল—কিন্তু কিছুতেই ঐ পার্বত্য দস্যু ধৃত হইল না। অব- শেষে বহুকষ্টের পর স্থানীয় লােকদিগের সাহায্যে কলুয়া ধৃত হইয়া প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত হইল। কলুয়ার মৃত্যু হইলে কুয়ার’ নামক উহার একজন সর্দার কিছু দিন উপদ্রব করিয়াছিল, কিন্তু সেও অচিরে ধৃত হয়। এই সকল সামান্য উপদ্রবের পর আর কোনও গােলযােগ ঘটে নাই। এমন কি ১৮৫৭ খৃষ্টাব্দের সিপাহিবিদ্রোহেও এই দেরাদুন সহরের শান্তি বিচলিত হয় নাই। কুয়ার।
বর্তমান অবস্থা। প্রাচীন দেরার বিচিত্র ইতিহাস ফুরাইয়া গেল। অতীত ঘটনার’ আখ্যানে মানুষ পূর্ব মহত্ত্ব অক্ষুন্ন রাখিতে উৎসাহিত হয়—তাই পুরাবৃত্তের এত সমাদর দেখিতে পাওয়া যায়। কিন্তু বর্তমানের চিত্র অতীতের সহিত সংযুক্ত থাকিলে প্রাচীন মহত্ত্ব আরও বিশেষভাবে ফুটিয়া উঠে এবং ইতিহাস-প্রসিদ্ধ স্থান প্রভৃতির বর্ণনার সম্পূর্ণতা বিহিত হয়-তাই আমরা এই স্থানে দেরার বর্তমান অবস্থা ধর্ণনে' প্রবৃত্ত হইলাম। এই স্বভাব-সুন্দর নিভৃত স্থান পাশ্চাত্য সভ্যতার কিরণ- স্পর্শে কিরূপ মূৰ্ত্তি পরিগ্রহ করিয়াছে, প্রাকৃতিক অবস্থা এবং অধিবাসিগণের প্রকৃতির কিরূপ পরিবর্তন সংঘটিত হইয়াছে তাহা জানিবার জন্য বােধ হয় অনেকের কৌতূহল উদ্দীপিত হইয়া থাকিবে। আমরা যথাসাধ্য তাহার চরিতার্থতা সাধনে চেষ্টা করিব দেরাদুন প্রদেশের (জেলার ) প্রধান নগর দেরাদুন সহর। এই জেলা ৭১৫ বর্গমাইল । রাজস্ব ও শাসন বিভাগাদি। বিভাগের সুবিধার নিমিত্ত ইহা একটী তহসিলের অন্তর্গত ‘পূর্ব-দুন’ ও ‘পশ্চিম-দুন’ নামক দুইটি পরগণায় বৰ্তমান * ৪র্থ পৃষ্ঠায় দেখ।
[ ৩৮ ] বিভক্ত। এই জেলায় ৫০৫ খানি গ্রাম আছে। ইহার বাৎসরিক আয় এখন ৫৭০০০ হাজার টাকা। দেরাদুন সহর পশ্চিম-দুন পরগণায়। সহরটি ক্ষুদ্র হইলেও অতি সুন্দর। পরিষ্কার লাল রাস্তা নগরময় শাখা থঘাট। প্রশাখা বিস্তার করিয়াছে। পথের দুই পার্শ্বে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ‘বাংলা’—প্রত্যেক বাংলায় একটি করিয়া নানাপ্রকার ফল-পুষ্পশােভিত পৰ্যাপ্ত-পুস্পস্তবকানা-লতাকুঞ্জ-সংযুক্ত উদ্যান সংলগ্ন আছে। এই সমস্ত উদ্যানে এত সুন্দর গােলাপ প্রস্ফুটিত হইয়া থাকে যে দেখিলে মনে হয় যেন বাগানটি সদা হাস্য করিতেছে ! রাজপুর রাস্তা বরাবর মসুরি পর্বতের পাদদেশে রাজপুর গ্রাম পর্যন্ত গিয়াছে। এই রাস্তা বেশ প্রশস্ত ও পরিষ্কার। . ইহার উভয় পার্শ্ব শ্রেণীবদ্ধ স্নিগ্ধ ছাযাপ্রদ শ্যামল তরুরাজি দ্বারা শােভিত। এই রাস্তা যে যে স্থান দিয়া গিয়াছে সেই সকল স্থান দেরাদুনের অপরাংশ অপেক্ষ অধিকা স্বাস্থ্যকর—সুতরাং এই সকল স্থানে সাহেবদিগের গৃহের সংখ্যা অধিক। বাজার। এই সহরে একটি প্রকাণ্ড বাজার আছে। ইহাতে সর্ব- প্রকার দ্রব্য যথেষ্ট পরিমাণে সকল সময়ে পাওয়া যায় । ব্যবসায়ী মাড়ওয়ারী, পার্শী ও কাবুলীরা এখানে বহুসংখ্যক দোকান খুলিয়াছে ; কিন্তু দেরায় বাঙ্গালী অধিবাসীর সংখ্যা অধিক হইলেও এই সমগ্ৰ সহরে বাঙ্গালীর একখানিও দোকান নয়নগােচর হয় না। চিরাভ্যস্ত সুবৃত্তিই সেখানেও বাঙ্গালীর একমাত্র অবলম্বন। সুদূর মাড়ওয়ার, [ ৩৯ ] বােম্বাই ও কাবুল হইতে তওঁৎ প্রদেশের অধিবাসীরা দেরায় যাইয়া আপনাদিগের দেশজাত দ্রব্যাদির প্রচলন-বৃদ্ধির চেষ্টা করিতেছে। কিন্তু বঙ্গদেশের কোন দ্রব্যই সেখানে দেখিতে পাওয়া যায় না। দেরা, মসুরি , ননিতাল প্রভৃতি স্থান ভ্রমণ- কারিগণের পৰ্যটন-কক্ষের অন্তর্ভক্ত, তথায় পৰ্য্যটকেরা নানা দেশীয় বিচিত্র বস্তুর অনুসন্ধান করিয়া থাকেন; কিন্তু উদ্যোগী পুরুষসিংহ বঙ্গবাসীর বাণিজ্যের প্রতি কিরূপ প্রকৃতিগত বিদ্বেষ এই সকল প্রদেশে বঙ্গদেশজাত দ্রব্যাদির এককালীন অভাব দেখিয়াই তাহা তাহারা বিশেষভাবে বুঝিতে পারেন। অভিশাপগ্রস্ত অধমজাতি পৃথিবীর সকল প্রধান কৰ্ম্মক্ষেত্রেই নিশ্চেষ্টতার অবতাররূপে বিরাজ করিতেছে। হায় ! ভগবান কি কখনও এ জাতির প্রতি মুখ তুলিয়া চাহিবেন না ! উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের মধ্যে এই স্থানে সর্বাপেক্ষা অধিক সংখ্যক ( প্রায় ৬০০ শত ঘর ) সাহেবের বাস। gafatst ( Forest Department ) ত্রিকোনমিতি-জরীপ-বিভাগের (Trigonometrical Survey) আফিসের জন্য অনেক বাঙ্গালী বাস করিয়াছেন। সর্বসমেত এই সহরের লােকসংখ্যা ১৯০০০ হাজার হইবে এই সহরে একটি উচ্চশ্রেণীর ইংরাজি বিদ্যালয়, একটি বালিকা বিদ্যালয়, হাসপাতাল ও ফরেষ্ট স্কুল আছে বিদ্যলয়াদি। এবং এই ফরেষ্ট-স্কুল-সংশ্লিষ্ট একটি মিউজিয়ম (Museum) ও ‘ববার্ডিং হাউস্ আছে। ভূতপূর্ব আগান লােকজন। 'ও
[ ৪ ]
নিৰ্বাসিত
আমীর ইয়াকুব
খাকে এখানে নির্বাসিত করা
ইয়াকুৰ খা। হইয়াছে।
এখানে গ্রীষ্ম কালে বড়লাট সাহেবের
ঘােড়া থাকে ও ইম্পিরিয়া ক্যাডেট কোর’ এখানে ছাউনি
'ইম্পিরিয়াল,
করিয়া কুছ কাওয়াজ ( Drill ) শিক্ষা করে।
ক্যাডেট্ কোর'। ' এতদ্ব্যতীত এখানে গুরখা এবং অন্যান্য পল্টনের
ছাউনি আছে।
এই নগরের মিউনিসিপালিটির বাৎসরিক আয় প্রায় ১৬০০০
মিউনি হাজার টাকা হইবে। গৃহ-কর হইতেই ইহার প্রধান
সিপালিটি। আয়। উত্তর-পশ্চিমের অন্যান্য সহরের ন্যায় এই
সহরে ‘অকুয়’ শুল্ক আদায় হয় না।
সমগ্র দেরাদুন জেলা, ম্যাজিষ্ট্রেট ও কলেক্টারের ক্ষমতা-
প্রাপ্ত এফ জন সিবিলিয়ান সুপারিন্টেডেন্টের
আদালতাদি।
অধীনে আছে। এতদ্ব্যতীত নয়জন ম্যজিষ্ট্রেট
ও ছয়জন সিভিল ও
রেভেনিউ জজ আছেন। সুপা-
রিন্টেডেন্ট সাহেব ও জজ সাহেব অক্টোবর হইতে এলে
মাস পর্যন্ত দেরা সহরে ও এপ্রেল হইতে অক্টোবর মাস
পৰ্য্যন্ত মসুরি পাহাড়ে কাৰ্য নির্বাহ করেন। একজন
মুসেরিম, একজন ডেপুটি কলেক্টার, একজন তহসিলদার
ও একজন নায়েব-তহসিলদার দেরায় থাকেন। এতদ্ব্যতীত এই
• সহরে দশজন অবৈতনিক ম্যাজিষ্ট্রেট আছেন। এখানে একটি
ছােট আদালত আছে।
এই জেলায় রাজপুত জমীদারের সংখ্যাই সর্বাপেক্ষা অধিক।
[ ৪১ ) ও পূজা। জমীদার ও ইহার পরে ব্রাহ্মণ জমীদার। কয়েক ঘর সাহেব জমীদারও আছেন। প্রজারা খাজনা কতক শস্যে ও কতক অর্থে প্রদান করে। জমীদারেরাও গভমেন্টকে ঐ প্রকারে রাজস্ব দেন। জর্মীদার ও প্রজায় বিশেষ সাব থাকায় অন্যান্য দেশের ন্যায় প্রজাদিগকে নিরবচ্ছিন্ন দুঃখে কালযাপন করিতে হয় না। এই প্রদেশে ‘পতিত জমী’র পরিমাণ এত অধিক যে সমুদায় জমীর কর্মণের নিমিত্ত কৃষক পাওয়া যায় না। কাজেই জমীদারেরা প্রজাদিগকে বশে রাখিবার জন্য তাহাদিগকে ঘাস ও কাষ্ঠাদি বিনামূল্যে প্রদান করেন—এমন কি কুটীরনিৰ্মাণার্থ কখন কখন অর্থাদিদ্বারাও সাহায্য করেন। নূতন প্রজা আসিলে জমীদারেরা প্রথম দুই বৎসর খাজনার জন্য পীড়াপীড়ি করেন না, কেন না তাহারা বেশ জানেন যে বেশী পীড়াখুঁড়ি করিলে তাহারা ঘর ভাঙ্গিয়া অন্য জমীদারের জমীতে ঘর বাঁধিবে এবং তাহাতে নিজেরাই ক্ষতিগ্রস্ত হইবেন, যেহেতু সেই জমীতে যাবৎ না অন্য প্রজা আসিবে তাবৎ উহা পতিত থাকিবে। কিন্তু প্রজাদিগের এক জমী ত্যাগ করিয়া অপর জমীতে যাওয়ায় ক্ষতি হয় না। এই সকল কারণে জর্মীদারেরা প্রজাপীড়ন করিতে সাহসী হয়েন না। উৎপন্ন ফসলের মূল্যানুসারে খাজনা প্রদত্ত ও গৃহীত হয়। এইরূপ রাজস্বগ্রহণের ব্যবস্থায় ভূমি-করের হ্রাস-বৃদ্ধি স্বাভাবিক নিয়মেই নিয়মিত হইয়া থাকে। শস্যের মূল্যের উপর রাজা * " l'uder the system the rents are solt-acljusting, the value of land- * lor's and tenant's share rires and falls simultaneously with prices, * while if the crop partially fails the loss is shared by both parties ; if “it fails entirely the tenant, luses his scel, but is not crusheil by having to pay a rent for the land which has sielded him nothing."--Baker's Settlement Report of Denme Dun, 1886. ৫
[ ২ ]
প্রজা উভয়েরই লাভ ও ক্ষতি নির্ভর করে।
ফসল তেমন ভাল
হইলে উভয়েই কিছু ক্ষতিগ্রস্ত হয়, কিন্তু ফসল একেবারে
জন্মিলেও, প্রজা প্রাণে মারা যায় না—তাহার বীজগুলি
নষ্ট হয় বটে, তবে ভূমিতে শস্যের নামগন্ধও নাই অথচ সেবারেও
যােল আনা খাজনা দিতে হইবে এরূপ ব্যবস্থা না থাকায় তাহার
সর্বনাশের সূত্রপাত হয় না। যদি প্রজার গােমহিষাদি মরিয়া
যায় তাহা হইলে জমীদার চাষের জন্য স্লোমহিষাদির ব্যবস্থা
করিয়া দেন।
প্রজার ঋণ করিবার প্রয়ােজন হইলে অন্য
মহাজনের নিকট কনা লইয়া ইহারা স্ব স্ব জমীদারের
নিকট হইতে ঋণ গ্রহণ করে। , ইহাতে তাহারা মহাজনদিগের
অপেক্ষা অল্প সুদে টাকা পায়, আর জমীদারও টাকা ধার দিয়া
প্রজাকে বশ করিয়া রাখেনও যাহাতে ফসল ভাল হয় তাহার প্রতি
দৃষ্টি রাখেন। এই সকল কারণে এদেশে সাধারণতঃ প্রজার
অবস্থা ভাল। একার (aere) প্রতি (৩০ বিঘায় ১ একার )
ঠিকা প্ৰজার ৪০ আষা করিয়া ও যােত্ব প্রজার ২১০ আনা
হিসাবে খাজনা দিতে হয়।
এই প্রদেশে খারি ও রবি উভয় প্রকার শস্যই জন্মায়।
উৎপন্ন চাউলের মধ্যে রামজুয়ান’ ও ‘বাসমতি’
শস্থাদি।
চাউল সর্বাপেক্ষা উৎকৃষ্ট ; বলিতে কি ‘বাসমতি’
চাউলের ন্যায় চাউল অন্যত্র দুর্লভ। এতদ্ব্যতীত মুগ, অরহর,
ছােলা, ইক্ষু,, আলু, আদা, হলুদ, লঙ্কা, যব প্রভৃতি সমস্ত দ্রব্যই
উৎপন্ন হয়। কিন্তু ঘৃত, তৈল ও গুড় অন্য স্থান হইতে আনীত
হয়। এদেশ হইতে কাষ্ঠ, বংশ, চণ, কাষ্ঠকয়লা, চা ও চাউল
[ ৪৩ ) অন্য দেশে রপ্তানি হয়। দেশী ও বিলাতি সকল প্রকার ফল এখানে উৎপন্ন হয়; কেবল স্ট্রবেরী, পিচ্ ও আঙ্গুর আর্দ্রতাবশতঃ ভাল হয় এবং গ্রীষ্মকালে উত্তাপের অভাবে আম সুস্বাদু হয় না। সকল প্রকার বিলাতি পুষ্প পাওয়া যায়। বিশেষতঃ ভাওলেট’ ও ‘প্রিমরােজে’রই প্ৰাচুৰ্য্য। গােলাপের ফুল। সংখ্যাও যথেষ্ট এখানে যে রকম বড় বড় গােলাপ ফুটে এতবড় অন্য কোথাও দেখিতে পাওয়া যায় না। দেরাদুন সহর সমুদ্র হইতে প্রায় ৩০০০ হাজার ফুট উচ্চ হইলেও জলবায়ু, কেমন একটু স্বাভাবিক 'জলবায়। আদ্র। এই আর্দ্রতা বর্ষকালেই অধিক প্রতীয়মান হয়। অন্য সময়ে বেশ শুষ্ক । বর্ষাকালে এই আর্দ্রতার জন্য এখানে ম্যালেরিয়া জ্বরের প্রাদুর্ভাব হয়। সে সময় এই সহর অস্বাস্থ্যকর হইয়া উঠে। বর্ষাকালে যখন এখানকার নদী, খাল, বিল পূর্ণ হইয়া উঠে তখন এই সমুদায় নদীর বেগ এত প্রবল হয় যে পারাপার হওয়া দুঃসাধ্য হইয়া উঠে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় এই যে নদীর বেগ এত প্রবল হইলেও বড় একটা ‘ভাঙ্গন দেখা যায় না। কার্তিক মাস হইতে বেশ শীত পড়ে ও ফাল্গুনের শেষ পৰ্য্যন্ত খুব শীত থাকে ; চৈত্র বৈশাখ মাস এখানকার বসন্তকাল বলা যাইতে পারে। এই সময়ে এই স্থান বেশ স্বাস্থ্যকর হয় এই বসন্তসমাগমে এখানে নানাজাতীয় বৃক্ষ পুষ্পিত হইতে থাকে—সেই পুষ্পিতবৃক্ষরাজির সৌন্দর্য্যে বনভূমি রমণীয় শােভা ধারণ করে। এখানে গ্রীষ্ম অল্পকাল মাত্র স্থায়ী। আমাদের দেশের মত প্রখর গ্রীষ্ম কদাপি হয় না। যে বৎসর নিতান্ত অধিক [ ৪৪ ] গ্রীষ্ম হইল সে বৎসর ১০০ ডিগ্রির অধিক উত্তাপ হয় না। গ্রীষ্মকালেও রাত্রি বেশ শীতল থাকে। এই প্রদেশ উৎকৃষ্ট অশ্বগগামহিষাদি জননের অনুকূল নহে এবং কৃষকেরাও এই সকল গ্রাম্য পশুর উন্নতি- সাধনে নিতান্ত অমনােযােগী। তাহারা বলে যে একেত এ দেশের তৃণাদি পুষ্টিকর নহে, তাহার পর গােমহিষাদি এখানকার পাহাড়ের এক প্রকার বাস খাইয়া দুর্বল হইয়া পড়ে। কিন্তু স্থানীয় কৃষকগণের পশুপালনে অযত্নই গ্রাম্য পশুর দুর্দশার প্রকৃত কারণ বলিয়া বােধ হয় কারণ ইহা দেখা গিয়াছে যে অন্য স্থান হইতে এদেশে আনীত অশ্ব বেশ বলিষ্ঠ হয় । এখানকার অধিবাসীদিগের মধ্যে ব্রাহ্মণ ও রাজপুতের সংখ্যাই অধিক। ব্রাহ্মণদিগের মধ্যে সমতলবাসী ও জাতি। পাহাড়ী এই দুই শ্রেণী আছে। পাহাড়ী ব্রাহ্মণের মধ্যে ‘সরােল’ ও ‘গঙ্গারি’ নামক দুই শ্রেণীর ব্রাহ্মণের ‘সরোল সংখ্যাই অধিক। ‘সরােল ব্রাহ্মণেরা ‘গঙ্গারি দিগের উপর আধিপত্য করে। উহাদিগের সহিত কোন প্রকার সংস্রব রাখেনা, এমন কি উহাদের সৃষ্ট রুটি পৰ্য্যন্ত ব্রাহ্মণ। ৪ : “Sarola :- Those who have settled in Chandpur aud Lohoa call themselves Sarolas however, and it would appear that the latter are the sertion of tle Brahmans living along the Ganges, who obtained employment at the Court of the petty Rajas.”-Crooke's Tribes od Crestas. ✓ " Gadgâri : -- class of hill Brahm..ns who are inferior to the Sarules, and are so called because they live on the banks of the Ganges. “The offspring of any Sarols why sinks by intermarriage with a lower family becomes simply a Gangåri. Ihr augt is serve in the temples of the village deities anıl as priests of Bhurraiou ; but the Sarolas though not very orthodox in their ritual inly worship the orthorlox (leities" - Ditto, litto, [ ৪৫ ) স্পর্শ করে না। গড়ওয়াল-রাজবংশীয় পরমার-রাজপুতগণ সােল ব্রাহ্মণকৃত অন্নাদি ভক্ষণ করে কিন্তু ‘গঙ্গারি’সৃষ্ট অন্ন ‘গঙ্গারি' স্পর্শ পৰ্য্যন্ত করে না। 'গঙ্গারি’ ব্রাহ্মণদিগের মধ্যে ব্রাহ্মণ। বিধবা-বিবাহ বিশেষতঃ ভ্রাতৃজায়া-বিবাহ বিশেষ রূপে প্রচলিত আছে। এই শ্রেণীর ব্রাহ্মণেরা ঝড় সুরাপানে আসক্ত। এখানকার সমতলবাসী ব্রাহ্মণদিগের মধ্যে গৌড়’ ও ‘সারস্বত’ শ্রেণীর ব্রাহ্মণই দৃষ্ট হয়। এই উভয় শ্রেণীর সমতলবাসী ব্রাহ্মণেরা ‘পঞ্চ গৌড়ে’র অন্তর্ভুক্ত। উহার পর্বতবাসী ব্রাহ্মণদিগকে, জারজ ও অনাচারী বলিয়া বড় ঘৃণার নয়নে ‘গৌড় দেখে। গৌড় ব্রাহ্মণেরা পাহাড়ী ব্রাহ্মণের সহিত ব্রাহ্মণ। কোনও সংস্রব রাখেনা ও উহাদিগের স্পষ্ট অন্নজল গ্রহণ করে না। কিন্তু সারস্বত ব্রাহ্মণের পাহাড়ী ব্রাহ্মণের কন্যা বিবাহ করিতে অস্বীকৃত নহে— এমন কি মৃগয়ালব্ধ মাংসাদি উহাদের সহিত ভক্ষণ করিতে আপত্তি করে না। এই ‘গৌড়’ ও ‘সারস্বত শ্রেণীর ব্রাহ্মণেরা পরিশ্রমী ও কৃষিকর্মে দক্ষ। রাজপুতেরা এখানে সচরাচর ‘রংঘর’, ‘রাওয়ৎ' এবং ‘বি’ নামক তিন শ্রেণীতে বিভক্ত। ‘রংঘর’ রাজপুতেরা বলে যে তাহারা সাহারাণপুরের ১e “সারস্বতাঃ কান্যকুজা গৌড়মৈথিলকোকল । পঞ্চ গৌড়া ইতি খ্যাঃ বিন্ধ্যস্যোত্তরবাসিনঃ ॥” --ইতি স্কন্দপুরাণে। 1" Ringhar, Rangar :- A sect of Muhammaclan Rajputs priucipially found in the Upper Ganges-Jamuna Duâb. Accoriling to Tod, the worii is derived froin rana (314), ' strife,' in the sense of turbulent; but ‘সরস্বত’ ব্রাহ্মণ।
[ ৪৬ ] ‘রংঘর’ ‘পুন্দিয়ার’ জাতির শাখা মাত্র। গড়ওয়াল-রাজ্যের রাজপুত। অবনতিকালে এই দেশে আসিয়া বাস করে কিন্তু ক্রমশঃ পাহাড়ী স্ত্রীলােকের সহিত বিবাহাদি করিয়া মূলজাতি হইতে ভ্রষ্ট হইয়া পাহাড়ী হইয়া গিয়াছে। ‘রাওয়ৎ রাজপুতেরা বলৈ যে তাহারা নিম্নপ্রদেশ হইতে আসিয়া আমােরার রাজার অধীনে কৰ্ম্ম গ্রহণ করে। রাজপুত। তদানীন্তন আমােরার পূর্ব-রাজার মৃত্যু হইলে তাঁহার বিধবা পত্নী সৌরাজপুরের রাজার পুত্রকে দত্তক গ্রহণ করেন। সৌরাজপুরের রাজা তাহার চারিজন জ্ঞাতির সহিত পুত্রকে আমােরায় প্রেরণ করেন। উহাদের মধ্যে একজন কোন কারণে বিরক্ত হইয়া আমোরা ত্যাগ করিয়া শ্রীনগরে আসিয়া গড়ওয়াল-রাজ্যে, ‘আশ্রয় তাঁহার সদাচরণে তুষ্ট হইয়া গড়ওয়ালাধিপতি তাহাক অনেক ধন-রত্নাদি প্রদান করেন। •এইরূপে তিনি ও তাঁহার বংশধরেরা ঐ রাজ্যে এত প্রতিপত্তি লাভ করিয়া ছিলেন যে তদ্বংশীয়া রাণী কর্ণাবতী ও অজুকুমার নুয়াদায় রাজপ্রতিনিধি হইয়া আইসেন। এই সময়ে তাহারা তাহাদের স্বজাতিবর্গকে অজপুর, কর্ণপুর, উদিওয়ালা প্রভৃতি স্থানে বাস করান। ‘বি’ রাজপুতেরা পাহাড়ী রাজপুত অপেক্ষা উচ্চশ্রেণীর গ্রহণ করেন। this is very doubtful. Mr. Ibbetson says :- Ringar is a term contemptuvusly applicrl in the erstern and south-easteru district of the Punjab to any Musulman Rajput"---Croolie's Tribes and Castcs. ৯ ৪৭এর পৃষ্ঠায় দেখ।
[ ৪৭ ] অন্যান্য জাতি। কয়েক } রাজপুত বলিয়া গৰ্ব করে। পাহাড়ী রাজপুতেরা ‘বিষ্ট রাজপুত। খসিয়া রাজপুতের অন্তর্গত। এতদ্ব্যতীত গুজর, চৌহান, আহির (গােপ), বেণিয়া (বণিক), ভাঙ্গি (মেথর), বড়হাই ( ছুতার), কাহার, চামার, লােহার (কামার), মেহ্রা, ধুম প্রভৃতি জাতির বাস আছে। মুসলমানদিগের সংখ্যা নিতান্ত অল্প। দর শিখ এই দেশে বাস করিয়াছে। ব্রাহ্মণ ও রাজপুতেরা সকলেই হিন্দুধর্মাবলম্বী। অনেকেই বিষ্ণু ও শিবের উপাসক কিন্তু ভৈরব ও শক্তি পূজার আধিক্যও দেখা যায়। দেব-দেবীর পূজা সাধারণতঃ বৈদিক বিধি অনুসারেই সম্পাদিত হয় ; আমাদিগের দেশের পূজা-পদ্ধতির ন্যায় বাহুল্য দৃষ্ট হয় না। দুন-বাসীরা বড় একটা শাস্ত্র বা পুরাণের ধার ধারে না—সেই জন্য তাহাদের পূজার অঙ্গবিস্তৃতি নাই। বাঙ্গালায় যেরূপে দশভুজার আরাধনা হয় এখানে সে প্রকারে হয় না। হােম ও চণ্ডীপাঠ হয় মাত্র। এখানকার অধিবাসী শিখেরা সকলে উদাসী- সম্প্রদায়ভুক্ত। নীচজাতীয় হিন্দুর আচার-ব্যবহার বিশুদ্ধ হিন্দুর অচার হইতে অনেক পৃথক্। ইহাদিগের মধ্যে ভূত-প্রেতাদি স্য ও চিরি। ; কেবল * " l'abîri :-A gencral term for the lill-men of the higher and lower llimalajas. The name is applied to a considerable sect of Rajputs in Dehr: Dun who are probably :illierl to the Khasiyn"--Crooke's Tribes alud Costes. H Gujara :-An important agricultural and pistora' tribe found principally in the Western district. They take their brun from the Sanskrit 663 the original name of the country now calleil Quzrat --Crooke's Tribes and Custes.
[ ৪৮ ] পূজার বাহুল্য দৃষ্ট হয়। এখানকার অধিকাংশ রাজপুতেরা মাংস ও মৎস্যাদি আহার করে, কিন্তু নিষিদ্ধ মাংস খায় না। কি ব্রাহ্মণ, কি রাজপুত সকলেই সুরাপানে আসক্ত। এইজন্য ইহাদের আয়ে সঙ্কুলান হয় না সুতরাং ইহারা ঋণজালে জড়িত হইয়া পড়ে। ইহাদিগের জাতিবিচার পঞ্চায়তের দ্বারা মীমাংসিত হয়। অপরাধী যে পৰ্য্যন্ত না পঞ্চায়তের আদেশ প্রতিপালন করে সে পর্যন্ত তাহাকে একঘরে করিয়া রাখা হয়। পঞ্চায়ত যখন জরিমানা করে তখন জরিমানা আদায় হইলে সেই টাকায় মদ্য ক্রয় করিয়া সকলে একত্র হইয়া পান করে। পাহাড়ীদিগের বিবাহসময়ে কন্যার পিতা বরকে অর্থ প্রদান করিয়া ক্রয় করে। কিন্তু উপত্যক বাসীদিগের কন্যাকে বিবাহ করিবার জন্য বর অর্থ প্রদান করে। উত্তর-পশ্চিমের বনবিভাগের ও বনশিক্ষাবিভাগের কর্তার প্রধান আফিস এই দেরাদুন সহরে। বনবিভাগের । বনবিভাগ। কাৰ্যশিক্ষা প্রদানার্থ এখানকার প্রাগুক্ত ফরেষ্ট স্কুল’ স্থাপিত হয়। সিংহল, ব্ৰহ্ম প্রভৃতি ভারতের সর্বস্থান হইতে যুবকেরা এই বিদ্যালয়ে বনবিভাগের কার্য শিক্ষা করিতে আইসে। সরকারী অরণ্যরক্ষক কৰ্ম্মচারী ( Ranger) শিক্ষিত করাই এই বিদ্যালয়ের উদ্দেশ্য। Higher Standard ও lower Standard বলিয়া দুইটি পরীক্ষা হয়। যাহারা Higher Standard এ ‘তানার’ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয় তাহারা ৮০ টাকা ও.যাহারা lower Standard এ অনার’ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয় তাহারা ৩৫ টাকা বেতনে Ranger পদ পায়। এই বিদ্যালয়ের ছাত্রদিগের জন্য স্বতন্ত্র বাের্ডিং হাউস্ আছে।
==
॥
ফরেষ্ট স্কুল।
No text on this page.
[ ৪৯ ] ছাত্রদিগকে বিদ্যালয়ের নিয়মাধীন হইয়া তথায় বাস করিতে হয় । ছাত্রদিগকে চারিমাসকাল মাত্র দেরাদুন সহরে থাকিয়া, তাহার পর পর্বতে পর্বতে ঘুরিয়া অরণ্য-বিভাগের কাৰ্য্য শিক্ষা করিতে হয়। এই বিদ্যালয়ের শিক্ষাকাৰ্য ১জন অধ্যক্ষ ও ৮জন শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে নির্বাহিত হয়। এই বিদ্যালয়-সংশ্লিষ্ট একটি বনসম্বন্ধীয় মিউজিয়ম (Museum) আছে। ইহাতে ভারতবর্ষীয় যাবতীয় কাষ্ঠ, পত্র, পুষ্প, কাষ্ঠ-কীট প্রভৃতির নমুনা প্রদর্শিত হইয়াছে। ইহা দেখিবার সময় আমার যথেষ্ট কৌতূহল ও উৎসাহ জন্মিয়াছিল। দেরাদুনে আসিলে এই মিউজিয়মটী ও তৎসংলগ্ন বৃহৎ, নানাবিধবৃক্ষাদিপূর্ণ উদ্যানটী দেখা উচিত। ছাত্রের এই উদ্যানে উদ্ভিদতত্ত্ব (Botiuy) শিক্ষা করে। গবর্মেন্টের ত্রিকোণমিতি-জরীপ-বিভাগের (Trigon)- metrical Survey Office) etata optapa sby ত্রিকোণমিতি- জরীপ বিভাগ। সালে কর্ণেল ওয়াকার সাহেবের তত্ত্বাবধানে কলিকাতা হইতে এই সহরে অনীত হয়। এই জরীপ আফিসে জ্যোতিষ ( Astronomical), 5178. (Meteorological) e colegiats (Magnetic) গণনার জন্য তিনটি মানাগার আছে এবং তদসম্বন্ধীয় 7*a (drawing), qu4 (printing), Fldi (photo),canta FCO (solar photo) প্রভৃতি সমস্ত কাৰ্যই ঐ আফিসে সম্পন্ন হয়। এই সহরের অধিবাসিবর্গের দৈনন্দিন জল সরবরাহের জন্য অত্রস্থ মিউনিসিপালিটি এক অভিনব উপায় অবলম্বন দৈনন্দিন জল করিয়াছে। পূর্বে বলিয়াছি যে অতীব গভীর করিয়া কূপ খনন না করিলে এখানে জল পাওয়া যায় না ও সরবরাহ। ৪
[ ৫০
]
তজ্জন্য উহা ব্যয়সাধ্য বলিয়া এ সহরে কূপ নাই। এই কারণে
অধিবাসীরা পূর্বে নিঝর হইতে জল আনয়ন করিত এবং তাহাতে
সাধারণ লােকের বিস্তর অসুবিধা হইত। গুরু রাম রায়ের
পত্নী এই জলকষ্ট দূরীকরণার্থ গুরুদ্বারসম্মুখে এক বৃহৎ
দীর্শিকা খনন করান ও তাহাতে জল যােগাইবার জন্য মসুরি
পাহাড়ের একটি ঝরণাকে বাঁধিয়া এই নগরের মধ্য দিয়া আনিয়া
এই তড়াগের সহিত যােগ করিয়া দেন। কিন্তু ইহাতেও সে
অসুবিধা দূর হয় নাই। 'এক্ষণে নগরের বহির্দেশে ঐ ‘নহর’
হইতে আর একটি ‘নহর’ বাহির করিয়া বরাবর কর্ণপুরের ভিতর
দিয়া প্রবাহিত করা হইয়াছে। এই দুইটি ‘নহর’ই ইষ্টক দিয়া
বাঁধান। যাহার আবশ্যক হইয়াছে সে এই নহর হইতে প্রণালী
কাটাইয়া আপন বাটিতে লইয়া গিয়াছে। এইরূপে সহরের
প্রায় সকল রাস্তার পার্শ্বে ই প্রণালী আছে।
এ সমুদয় প্রণালী,
বাঁধান নহে—সুতরাং জল আবর্জনাপূর্ণ ও অপরিষ্কার। এই
নিহরে’র জল লইতে হইলে ঘণ্টাহিসাবে মূল্য দিতে হয়। এই
জল কেহ পার্থ ব্যবহার করে না-করিলে গলা ফুলিয়া যায় ও
জুর হয় ; কেবল উদ্যানে জল দিবার জন্য অথবা কাপড় কাচিবার
বা বাসন মাজিবার জন্য উহা ব্যবহৃত হয়। লােকে পানীয় জলের
জন্য নালাপানির জল ব্যবহার করে। নালাপানির জল অতি সুস্বাদু
ও জীর্ণকারক। মিউনিসিপালিটি ঐ জল বরাবর নলে করিয়া
আনিয়া স্থানে স্থানে ঘর প্রস্তুত করাইয়া কল লাগাইয়া দিয়াছে
লােকে সেই কল হইতে বিনামূল্যে জল লইয়া যাইতে পারে
উহার জন্য মিউনিসিপালিটিকে কিছু দিতে হয় না।
।
;
০
এইবার এই প্রদেশের কয়েকটি বিশেষ বিশেষ দৃশ্যের
উল্লেখ করিয়া দেরাদুন-কাহিনী সমাপ্ত করিব।
দ্রষ্টব্য স্থানাদি।
যখন ভ্রমণবৃত্তান্ত লিখিতে বসিয়াছি তখন আমি
দর্শনীয় সকল স্থানের উল্লেখ করিতে বাধ্য, তজ্জন্যই সেই সমুদয়
স্থানের বিষয় লিপিবদ্ধ করিতে যত্নবান্ হইয়াছি, নচেৎ শক্তি-
সামর্থের পরিমাণাতীত বিষয় সকলের বর্ণনায় প্রবৃত্ত হইতাম না।
জগৎপাতা জগদীশ্বরের বিশাল রাজ্যের কত স্থানে কত
অনির্বচনীয় ব্যাপার সংঘটিত হইতেছে, তাহার সহস্রাংশের
একাংশও আমরা বিদিত নহি ; তবে আমার নগন্য জীবনে যত
প্রকার নয়নাভিরাম, হৃদয়হারী, প্রাণ-মন-বিমুগ্ধকর ও শান্তিপ্রদ
স্থান দেখিয়াছি তাহার মধ্যে সহস্রধারা” নামক জলপ্রপাতের
দৃশ্য, সৌন্দর্য্যের পারিপাট্যে ও মহনীয়তায় যে
সহস্রধারা।
সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ তাহা অকপটচিত্তে বলিতে পারি।
ইহা অপেক্ষা অধিকতর বেগবান, প্রশস্ত বা উচ্চ জলপ্রপাত
আছে সত্য, কিন্তু ইহার অনন্য সাধারণ বৈচিত্র্য এবং মাধুৰ্য্য
স্বয়ং অনুভব করিয়া হৃদয়ঙ্গম করিতে
হয়,
অপরে
অপরে তাহা
বর্ণনা করিয়া বুঝাইতে পারে না। এই প্রপাতটি মসুরির কোনও
[ ২ ] এক নিভৃত সানুদেশ হইতে পতিত হইতেছে ; সুতরাং তথায় যাইতে হইলে প্রাগুক্ত রাজপুর গ্রামে যাইতে হয়। পূর্বেই বলিয়াছি যে মসুরি পাহাড়ের ঠিক পাদদেশে এই ক্ষুদ্র গ্রামটি অবস্থিত। মসুরিতে কোনও শকটারােহণে উঠা যায় না বলিয়া এই স্থানে শকটাদি ত্যাগ করিয়া পদব্রজে অথবা ডাণ্ডী বা অশ্বা- রােহণে পর্বতােপরি উঠিতে হয়, সেই নিমিত্ত এখানে প্রচুর ডাণ্ডী ও অশ্ব ভাড়া পাওয়া যায় । যাহা হউক আমরাও সহস্রধারা দেখিবার মানসে একখানি গাড়ী করিয়া রাজপুরে আসিয়া উপস্থিত হইলাম এবং তথা হইতে ডাণ্ডী আরােহণে সহস্রধারার পথে অগ্রসর হইলাম। রাজপুর পর্যন্ত পূৰ্বোল্লিখিত সুন্দর রাজপথ দিয়া আসিলাম কিন্তু সহস্রধারায় যাইবার কোনও সরকারী রাস্তা, নাই—কেবলমাত্র একটি সঙ্কীর্ণ একপদী ঘুরিয়া ফিরিয়া কন্টকাদিপূর্ণ ক্ষুদ্র জঙ্গলের মধ্য দিয়া : গিয়াছে; অতএব যে যে স্থানে পথ নিতান্ত বন্ধুর ও সঙ্কীর্ণ অথবা ‘চড়াই উৎরাই অত্যন্ত, অধিক সেই সকল স্থানে নামিয়া পদব্রজে যাইতে হইল। যাহা হউক আমরা এইরূপে কখনও ডাণ্ডীতে কখনও পদব্রজে প্রায় তিন মাইল পথ অতিক্রম করিলে একটী কল্লোলিনী-জােতস্বিনী-তীরে উপস্থিত হইয়া উপলখণ্ডের উপর বিশ্রাম করিতে লাগিলাম—চাহিয়া দেখিলাম যে: কেবল ফল- পুষ্পশােভিত-ছায়াপ্রদ-পাদপরাজি-সমাকীর্ণ অভ্রভেদী ভূধরমালা চতুর্দি বেষ্টন করিয়া রহিয়াছে—যে দিকেই নয়ন-পাত # ৩৮ এর পৃষ্ঠায় দেখ।
দেলদুন। সহস্রধারা
No text on this page.
[ ৩ ] করি সেই দিকেই চিত্ত-বিমােহন দৃশ্য পুঞ্জীকৃত হইয়া রহিয়াছে দেখিতে পাই। দৃষ্টি যে স্থানে পতিত হয় সেই স্থানেই সংলগ্ন হইয়া থাকে, আর ফিরিতে চাহেনা—বােধ হয় যেন প্রকৃতিদেবী কৃত্রিম-সৌন্দৰ্য্যাভিমানী সভ্যজগতের দস্তকে উপহাস করিবার নিমিত্ত নিজের অলােক-সামান্য রূপরাশি বিস্তার করিয়া বসিয়া আছেন। সে স্থান এত গাম্ভীৰ্যময়, নির্জন ও নিস্তব্ধ যে বৃক্ষপত্রের পতন-শব্দটি পৰ্য্যন্ত শ্রুত হইতেছে -কেবুল সেই পুঞ্জীকৃত শুভ্র-ফেন-রাশি-শােভিতা হাস্যময়ী গিরিনদীর কুলুকুলুধ্বনি আর বিহগগণের মধুর গীতি সেই ভীতিপ্রদ নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করিতেছে। কিয়ৎক্ষণ বিশ্রাম করিবার পর আমরা আবার চলিতে লাগিলাম—কিছুদূর অগ্রসর হইয়া নদীর একটি বাঁক পার হইলে যাহা অবলোকন করিলাম তাহা আর কখনও দেখি নাই—পুনরায় দেখিব কিনা জানি না ! কোন্ যাদুকর তাহার মায়াদণ্ডের দ্বারা এ দৃশ্য নয়নপথে উন্মুক্ত করিল তাহা বুঝিলাম না ! দেখিলাম নিবিড়-পাদপরাজি-পূৰ্ণ অত্যুচ্চ পর্বতশিখর হইতে নানাবিধ কুসুমিতলতাপুঞ্জের মধ্য দিয়া হরজটাভ্রষ্ট গঙ্গার ন্যায় একটি ক্ষুদ্র নিঝর স্তরে স্তরে হাসিতে হাসিতে অবতরণ করিয়া অবশেষে কন্দরের ছাদপ্রান্ত হইতে বিবৃদ্ধ, শতছিদ্রযুক্ত, অন্যূন বিংশতি হস্ত ঊৰ্ধস্থ শিলাখণ্ডের উপর হইতে সহস্র ধারে বৃষ্টির ন্যায় অবিরল ঝর ঝর শব্দে পড়িতেছে। আমার দেখিয়াই মনে হইল যেন কোন তাপস শ্রেষ্ঠ প্রকৃতির এই নিভৃত নিকেতনে যােগাসনে বসিয়া নিমীলিত-নেত্রে বিশ্বপিতার ধ্যানে নিমগ্ন রহিয়াছেন—আর তাহার [ ৪ ] সেই নিমীলিত নেত্র হইতে প্রেমধারা নিরন্তর পতিত হইতেছে এবং কত কুসুমিত-পাদপনিচয় উভয় পার্শ্বে দণ্ডায়মান থাকিয়া বিহগকূজনস্বরে তাহার স্তুতিবাদ করিতে করিতে পুস্পাঞ্জলি প্রদান করিয়া তাহাদিগের বৃক্ষজন্মের সার্থকতা করিতেছে। তাহার পর আরও দেখিলাম সেই গিরিকরের ছাদ হইতে তলদেশ পর্যন্ত নানাপ্রকার পুষ্পিত কাননবল্লরী ও বিচিত্র বর্ণের শৈবালরাজি ঐ স্থানকে এক অনির্বচনীয় শােভায় শােভিত করিয়াছে--দূর হইতে দেখিলে বােধ হয় কে যেন সহস্র সহস্র হীরকখণ্ড নিরন্তর বিচিত্র বর্ণের আসনের উপর ছড়াইতেছে ; আবার তাহার উপর সূর্যকিরণসম্পাতে যখন রামধনু প্রতিফলিত হয় তখন বিশ্বপিতার কারিগিরি ' আমাদের বুদ্ধিবল ও কলা- মর্মে মর্মে অনুভব করাইয়া হায় ক্ষুদ্র মানব ! তােমার একটা সামান্য তৃণ রচনা করিবার ক্ষমতা নাই অথচ তুমি তােমার বুদ্ধিবলে ও বিজ্ঞানের আশ্রয়ে এই বিশ্বরাজ্যের সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব লােপ করিয়া দিতে চাই ? বলিতে পার কি যে কেন এই নিঝর অনন্তকাল হইতে দয়াময়ের অনন্ত দয়ার ন্যায় অবিরাম ঝরিতেছে? পৃথিবীর কোন্ কাৰ্য্য ইহার দ্বারা সম্পাদিত হইতেছে ? কেনই বা ঐ গিরিনিঝরিণী আবহমান কাল হইতে প্রবাহিত হইতেছে ? লােকশিক্ষা দিবার জন্যই কি ? কি করিয়া সহস্র বিপৎপাত অগ্রাহ্য করিয়া, শত ঝাবাত তুচ্ছ করিয়া, অপরিমেয় জঞ্জালভার বহন করিয়াও অটলভাবে নীরবে ভগবদারাধনায় ব্যাপৃত থাকা যায় তাহাই কি ঐ ভূধররাজ শিক্ষা দিতেছেন? আর ঐ স্রোতস্বিনী—উনি কি কৌশলের ক্ষুদ্র দেয়।
[ ৫ ]
বলিতেছেন যে একাগ্রচিত্ত হইলে সকল কাৰ্য্য সমাধা হয় ?
দেখাইতেছেন কি উহার প্রতি পদে কত পাথর বাধা দিয়াছিল, কত
বৃহৎ বৃহৎ বৃক্ষ, কত কাননব্রততী পথরােধ করিয়াছিল কিন্তু সে
প্রস্তর ভেদ করিয়া, বৃক্ষ উৎপাটিত করিয়া, লবন্ধন ছিন্ন করিয়া
ভগবানের দিকে অগ্রসর হইতেছেন—আর মানব? তুমি ভগবানের
অনুগৃহীত জীব হইয়াও এই সামান্য কল্পিতদুঃখরাশি বাধাবিপত্তি
অতিক্রম করিতে পারিবে না ? অথবা উনি কি বলিতেছেন যে
“একবার নামিলে আর উঠা যায় না—আমিও একবার উচ্চে
ছিলাম তখন কত আনন্দে ছিলাম—তখন আকাশের সহিত, পূত
সমীরণের সহিত কত খেলা করিতাম—কিন্তু তাহাতে আমার মন
উঠিল না—একবার সংসার দেখিতে সাধ হইল--একবার বিষয়
ভােগ করিতে বাসনা হইল তখন উচ্চ সঙ্গ ছাড়িয়া নীচে নামিলাম
—কিন্তু আর, উঠিতে পারিতেছি না—আমি প্রতি পদবিক্ষেপে
নামিতেছি-যাহা অবলম্বন করিতেছি তাহাই ভাঙ্গিয়া যাইতেছে
যাহাদের জন্য লােকালয়ে আসিলাম তাহারা রক্ষা করা দূরে থাক
আরও অবনতির পথে অগ্রসর করিয়া দিতেছে—একবার পর্বতের
ক্রোড়ে আশ্রয় লইয়াছিলাম কিন্তু আমার চঞ্চল ও মুখরা
প্রকৃতি দেখিয়া তিনি ত্যাগ করিলেন—আবার নামিতেছি—শেষে
যাবৎ না সমুদ্রে মিশিব তাবৎ আর আমার রক্ষা নাই।”—এই
দুঃখগাথা কি গিরিরাণী গাহিতে গাহিতে চলিতেছেন
বুঝিবে ?
যখন এই সমুদায় ভাবিতে ভাবিতে ইতস্ততঃ ভ্রমণ করিতেছি
তখন সহসা একটি ক্ষুদ্র লতার অর্ধেক সজীব ও অপরাদ্ধ প্রস্তরে
?
পরিণত হইয়াছে দেখিয়া বড়ই বিস্ময়াপন্ন হইলাম—কৌতূহলাক্রান্ত হইয়া আরও ঐ রকম আছে কিনা, দেখিবার জন্য অনুসন্ধান করিতে লাগিলাম কিন্তু অধিক দূর যাইতে হইল না—নিকটেই দেখিলাম একটি পাথরের পাতা পড়িয়া রহিয়াছে ; হস্তে লইয়া দেখিলাম যে যদিও পাতাটি সম্পূর্ণরূপে প্রস্তরে পরিণত হইয়াছে তথাপি তাহার প্রত্যেক শিরা, প্রত্যেক রেখা অতি সুন্দররূপে পরিস্ফুট রহিয়াছে—নিকটে আর একটি প্রস্তরীভূত শাখা ছিল, সেটি দুইখণ্ড করিয়া দেখিলাম যে কঠিন প্রস্তরের ভিতর এখনও কঁচা রহিয়াছে। যাহা হউক আমরা সেইরূপ প্রস্তরে পরিণত অনেকগুলি পত্র ও শাখা, সংগ্রহ করিয়া আনিয়া ইহার কারণ অনুসন্ধানে অবগত হইলাম যে সহস্রধারার জল চুনের পাহাড় দিয়া পড়িতেছে, তজ্জন্য সেই জল যাহা স্পর্শ করে তাহাতেই চুণের একটি আবরণ পতিত হয় ; তাহার পর আবরণের উপর আবরণ পড়িয়া ক্রমে কাঠিন্য প্রাপ্ত হইয়া প্রস্তরাকারে পরিণত হয়। হায় । আমাদের হৃদয়ওত এইরূপেই কঠিন হয়। যখন প্রথম পাপের আবরণ পড়ে তখন হৃদয় সরস ও কোমল থাকে ; তাহার পর যতই পাপের উপর পাপ সঞ্চিত হইতে থাকে তখন সে কোমলতা, সরস ভাব, নির্মল মনােবৃত্তি সকল ক্রমে শুষ্ক হইয়া অবশেষে কঠিন প্রস্তরে পরিণত হয় । আমরা প্রস্তরে পরিণত বৃক্ষপত্রাদি সংগ্রহ করিবার জন্য যখন একটু অগ্রসর হইয়াছি তখন গন্ধকের গন্ধ অনুভব করিলাম ; একটু বিস্মিত হইয়া আমাদের এক ডাণ্ডীবাহককে জিজ্ঞাসা করায় সে বলিল যে নদীর ঠিক অপর পারে একটি গন্ধকের
[ ৫৭ ]
গন্ধকের
উৎস।
-
উৎস আছে তথা হইতেই এই গন্ধ' আসিতেছে।
আমরাও কৌতূহলাক্রান্ত হইয়া জুতা হন্তে লইয়া,
কাপড় গুটাইয়া নদী পার হইবার জন্য জলে নামিলাম--
কিন্তু সে স্থানে স্রোত এত প্রবল, 'শিলাসকল এত পিচ্ছিল
যে কাহার সাধ জলমধ্যে পা দৃঢ় করিয়া রাখে ? সুতরাং কি
করিব ভাবিতেছি এমন সময়ে আমাদের ডাণ্ডীবাহকেরা বলিল
যে তাহাদের পৃষ্ঠে ভারবহন করা অভ্যাস আছে—তাহারা পৃষ্ঠে
করিয়া আমাদের পার করিয়া দিবে ; অগত্যা তাহাতেই সম্মত
হইলাম ও অশ্ব পরিবর্তে মনুষ্যপৃষ্ঠেই নদী পার হইলাম। তখন
গন্ধকের আরও তীব্র গন্ধ পাইলাম। নিকটে যাইয়া দেখিলাম
একটি ক্ষুদ্র বন্ধ হইতে একটি ক্ষুদ্র প্রস্রবণ নির্গত হইতেছে ও
তাহারই জলে এইরূপ গন্ধ ; আর ঐ জল যে স্থান দিয়া প্রবাহিত
হইতেছে সেই স্থানের সকল পদার্থই একটু নীলাভ। এই
উৎস দেখিয়া আবার পূর্ব প্রকারে নদী পার হইয়া সহস্রধারার
পূত বারিধারায় স্নান করিয়া আহারাদি সমাপনান্তে অনেকক্ষণ
নয়ন ভরিয়া সে মনােহর রমনীয় দৃশ্য প্রাণ ভরিয়া দেখিয়া ধীরে
ধীরে প্রত্যাগমন করিলাম। এই সহস্রধারা ও গন্ধকের উৎস
দেখিয়া কোনও বিদেশী ভ্রমণকারী বলিয়াছিলেন যে “The
Sulphur Spring close by would also have been
• exploited by enterprizing citizens of the Great
Republic (America), and probably, a health
resort, flamingly advertised, would long since
have been developed in the vicinity. * **
[ ৫৮ } Near the Sulphur Spring is a natural curiosity, the Sansbadara or Cave of a Thousand Drippings, which would lose no whit of its attractions in the clever hands of the 'cute Yankee"* কথা সত্য বটে কিন্তু আমার বােধ হয় তাহা হইলে প্রকৃতির এই নির্জনবাস সংসার-সংগ্রাম-নিরত মানবের কোলাহলে ব্যতিব্যস্ত হইত—স্রোতস্বিনীর নিৰ্ম্মল জলরাশি সভ্যজগতের আলােড়নে পঙ্কিল হইয়া উঠিত-- এমন বিমল অনলঙ্কত স্থির গম্ভীর শান্ত সৌন্দৰ্য্য যে একেবারে বিলুপ্ত হইত তাহাতে আর সন্দেহ নাই। দৃশ্যের পারিপাট্যে সহস্রধারা অপেক্ষা অপকৃষ্ট হইলেও দেরা। দা-গুহা বা -ভ্রমণকারীর ‘দ্য-গুহা’ (Robloor's Cave) দুন- ‘পানি। নামক গহবর দর্শন করিতে যাওয়া উচিত। এখানে আসিলে স্বভাবের শােভার সহিত ঐতিহাসিক ঐতিহাসিক ঘটনাবলী স্মৃতিপথে আবির্ভূত হইয়া হৃদয়ে এক অভূতপূর্ব ভাবের সঞ্চার করে । এই পর্বতকন্দর সহর হইতে অধিক দূরে নহে দুই ক্রোশ মাত্র। আমরা ইহার সন্ধান জানিতাম না। একদিন ফরেষ্ট স্কুলের ছাত্রনিবাস দেখিতে গিয়া সেখানে কয়েকজন আমাদের সমবয়স্ক ছাত্রের সহিত আলাপ হইল। তাহারা ঐ পর্বতাভিমুখে একটা একটা excursion এর প্রস্তাব করিলেন। আমরাও তাহাতে সম্মত হইলাম। তাহার পরদিন প্রভাতে * * Engress."November, 1902, No. 2.
দেরাদুন ।
se.
•
দ্য-গুহা বা গুহপনি
No text on this page.
; [ ৫৯ ] প্রায় ১২। ১৪ জন ছাত্রবৃন্দের সহিত মিলিত হইয়া পরিধেয় বস্ত্রাদি ও কিঞ্চিৎ তণ্ডুল ও অন্যান্য সামগ্রী বাঁধিয়া লইয়া ঐ গুহাদর্শনে রওনা হইলাম। ছাত্রেরাই আমাদিগের পথপ্রদর্শক হইলেন। আমি ও আর দুইজন একখানি গাড়িতে উঠিলে একজন ছাত্র শকটচালককে ‘গুহপানিতে লইয়া যাইতে আদেশ করিলেন। গুহ্যপানি কি এই কথা জিজ্ঞাসা করায় তিনি আমাকে বলিলেন যে এখানকার লােকে ঐ দস্যগুহাকে ‘গুহ- পানি’ বলে ; ইহার কারণ এই যে ঐ কন্দরে একটি নিরিণী প্রবাহিত হইতেছে, তাহার জল প্রথমদর্শনে কোনও গুহ্য প্রদেশ হইতে আসিতেছে বলিয়া বােপ্ন হয়। যাহা হউক আমরা প্রায় দুই ক্রোশ যাইলে—একটি শীর্ণতােয়াঃ পর্বতবাহিণীর তীরস্থ আমবনে আমাদের গাড়ীগুলি থামিল । আমরাও সকলে নামিয়া ঘাের কলরব করিতে করিতে অভিযানে অগ্রসর হইতে লাগিলাম। একজন ছাত্র বলিলেন যে এই নদী তমসা নদীর একটি শাখা মাত্র। ইহা শিবালিকের একটি সুড়ঙ্গ মধ্য দিয়া বাহির হইয়াছে আমরা সেই স্থানে যাইতেছি। একটু অগ্রসর হইয়া দেখিলাম যে একটি অনুচ্চ গিরিশ্রেণীর অঙ্কে একটি ক্ষীণতােয়া নদী ধীরে ধীরে অন্ধকারামুবিদ্ধ জ্যোৎস্নার ন্যায় ইতস্ততঃ বিকীর্ণ শিলাসমূহের মধ্য দিয়া আঁকিয়া বাঁকিয়া মৃদুমন্দ গতিতে প্রবাহিত হইতেছে। আমরা একটি বৃহৎ প্রস্তরের উপর অভিযানের সাজ- সজ্জা রক্ষা করিয়া মহােল্লাসে ঐ নদীমধ্য দিয়া স্রোতের উজানে জল ভাঙ্গিয়া যাইতে যাইতে দেখিলাম একটি প্রকাণ্ড সুড়ঙ্গ হইতে ঐ নিঝর বহির্গত হইয়াছে ; বুঝিলাম উহাই কোনও গুহার .
[ ৬ ] প্রবেশদ্বার। তন্মধ্যে প্রবেশ করিতে আমার প্রথমে একটু ভয় হইয়াছিল, কিন্তু যখন আমার সঙ্গীগণ অগ্রসর হইলেন তখন আমিও তাঁহাদের পশ্চাদগামী হইলাম। সেখানে নদীর পরিসর ৩৪ হাত মাত্র, জল এক ফুট, দুই ধারে পর্বত প্রাচীরের ন্যায় সরলােন্বতভাবে প্রায় সহস্র হস্ত উঠিয়াছে—উপরে অতি সামান্য মাত্র যে ফাঁকটুকু আছে তাহা বন্যপাদপে এরূপ আচ্ছন্ন যে ভাল আলােক আসিতেছেনা। প্রায় ৫৭ মিনিট সেই জলের ভিতর দিয়া আসিলে উপরে আকাশ দেখিতে পাইলাম কিন্তু বােধ হইল সে স্থানে জলবেগ একটু অধিক ; ক্রমে যতই অগ্রসর হইতে লাগিলাম ততই স্রোতের বেগ আরও বর্ধিত হইতে লাগিল। এইরূপে কিয়ৎদূর অগ্রসর হইলে দেখিলাম একস্থানে একখানি প্রকাণ্ড প্রস্তর শৃঙ্গচ্যুত হইয়া পড়িয়াছে—ও তাহার দুই পা দিয়া ঐ নদীজল প্রবাহিত হইতেছে এবং রন্ধের উপরিভাগ পাদপাচ্ছন্ন হওয়ায় ঐ স্থানের আলােক অবরুদ্ধ হয় নাই। ঐখানে পর্বতগাত্রে কয়েকটি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গহর দৃষ্টিগােচর হইল। আমার সহযাত্রীবর্গ সেই সমুদায় কন্দরগুলিকে ভারতের Robin Hood কালুয়া ও কুয়ারের অতীত আশ্রয়স্থান বলিয়া নির্দেশ করিলেন—তখন আমার সেই সমুদায় অতীত কাহিনী ধীরে ধীরে মানসপটে উদিত হইল—ভাবিয়া দেখিলাম বাস্তবিকই স্থানটি দদিগের আশ্রয়ােপযােগী সন্দেহ নাই। এই সকল গুহার মধ্যে আশ্রয় লইয়া তাহারা ইতস্ততঃ দস্যুবৃত্তি করিয়া লুক্কাইত হইত আর কেহ ধরিতে পারিত না । বস্তুতঃ ঐ বন্ধ মধ্যে মনুষ্য বাস করিতে পারে তাহা বহির্দেশ হইতে বা পর্বতের শিরােভাগ হইতে
[ ১ ]
।
;
অনুমান করা যায় না। যাহা হউক ঐরূপ নানা কথা আন্দোলন
করিতে করিতে আরও প্রায় অর্ধ মাইল অতিক্রম করিবার
পর সে সুড়ঙ্গ শেষ হইল ; একটি পর্বতবেষ্টিত উপত্যকায়
আসিয়া আমরা উপস্থিত হইলাম। কিয়ৎকাল বিশ্রামান্তে
পুনরায় সেই পথ দিয়া ফিরিয়া আসিয়া সেই নিঝরের নির্মল
সলিলে স্নান করিলাম ও সকলে মিলিয়া খেচরান্ন রন্ধন করিয়া
পরমানন্দে এক এক শিলাখণ্ডের উপর উপবেশনপূর্বক আহার
সমাপ্ত করিলাম।সেদিন বড়ই আনন্দে কাটিয়াছিল—শৈশবে
এক এক দিন সমবয়স্কদিগের সহিত এইরূপ বিমল আহলাদে
অতিবাহিত হইত—তখন মন এত কলুষিত ছিল না—হৃদয় এত
সঙ্কীর্ণ, এত স্বার্থপর, এত অবিশ্বাসী ছিল না--তখন যাহা করি-
তাম সকলই অকপটচিত্তে সরলভাবে করিতাম--তাই তাহাতে এত
বিমল আনন্দ অনুভব করিতাম। সেই দিন একবার সেই শৈশব
ফিরিয়া আসিয়াছিল--তাই সেই ক্ষুদ্র বীচিবিক্ষুব্ধ গিরিনিঝরিণীর
কুলুকুলুস্বর বড় মধুর লাগিয়াছিল--তাই সেদিন অতীত শৈশবের
স্মৃতি হৃদয়কে আলােড়িত
আললাড়িত করিয়াছিল—তাই বলিতে ইচ্ছা
হইয়াছিল :-
“Greetings to thee, sparkling streamlet,
“What a gentle voice is thine!
“ How the ripples on thy bosom
"Lightly laugh and sweetly shine!
[ ২ ] “Childhood's dreams are hovering near me, “And the past appeareth plain, “But the rosy days of childhood Never will return again. একদিন অপরাহ্নে আমরা এই নগর-প্রান্তস্থিত শিবালিক- শৈল-গুহা-বিহারী ‘টপকেশ্বর’ মহাদের দর্শন করিতে টপকেশ্বর। গিয়াছিলাম। কোন্ মহাত্মা পিনাকপাণিকে এই অদ্ভুত আখ্যা প্রদানান্তর প্রতিষ্ঠিত করিয়াছিলেন তাহা জানি না তবে এই বিচিত্র নাম প্রদানের জন্য তাহার উদ্ভাবনী শক্তির প্রশংসা না করিয়া থাকা যায় না। অধিবাসীরা বলেন যে ধূর্জটির মস্তকোপরি গহবরের ছাদ হইতে অবিরল ‘টপ’ ‘টপ’ করিয়া বারিবিন্দু পতিত হয় বলিয়াই ‘টপকেশ্বর’ নাম প্রদত্ত হইয়াছে। আমরাও দেখিলাম যে ললাটেন্দুশেখরের শিবরাদেশ অনবরত সলিলবিন্দুপাতে অভিষিক্ত হইতেছে। নাম যাহাই হউক, স্থানটী যে অতি মনােরম সে বিষয়ে কোনও প্রশ্নই উত্থাপিত হইতে পারে । নিকটে মনুষ্যের বসতি নাই সুতরাং অতি নির্জন ও শান্ত। কেবল মূক প্রকৃতি মধ্যে মধ্যে বিহগ-কাকলীরবে কুসুমপরিমলবাহী সমীরণের সহিত কথােপকথন করিয়া সে নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করিতেছে। আর পূৰ্বোল্লিখিত তমসার একটি শাখানদী মগতিতে আকাশের উগ্ৰানিলভিন্ন-মেঘখণ্ডবৎ প্রতীয়মান শিলাসকলের পার্শ্বদিয়া সেই পবিত্র শিবালয়ের পাদদেশ বিধৌত করিয়া প্রবাহিত হইতেছে। লােকালয় ত্যাগ করিয়া প্রায় এক মাইল বন্ধুর পার্বত্য * The Dutl Fanuily Album, published by Messrs. Longmaans, Green & Co., London, page 158.
[ ৩ ] পথ অতিক্রম করিলে ঐ গিরিতরঙ্গিনী-তীরবর্তী টপকেশ্বরে আসিয়া উপস্থিত হই। এই স্থানে নদীগর্ভ গভীর হওয়ায় উভয় পার্শ্বস্থ পৰ্বত সেই গর্ভ হইতে অপেক্ষাকৃত উচ্চ দেখায়। আমাদের বর্ণিত গুহা সেই পর্বতগাত্রে অবস্থিত। নদীগর্ভ গভীর বলিয়া নদী আদৌ গভীর নহে—অন্যান্য পাৰ্বতীয় নিঝরিণীর ন্যায় উহার জল কোথাও চারি অঙ্গুলি কোথাও বা এক বিঘৎ মাত্র। পূর্বে ঐ মহাদেব দর্শন করিতে হইলে প্রথমে নদীগর্ভ মধ্যে অববােহণ করিয়া পরে নদীমধ্য হইতে পর্বতগাত্রে আরােহণ করিলে তবে গুহায় প্রবেশ করা যাইত এবং দেবাদিদেবের দর্শনলাভ হইত। কিন্তু তাহাতে সময়ে সময়ে যাত্রীদিগের বিপদ ঘটিত কারণ হয়ত নদীর প্রবাহ বেশ নিস্তেজ ও জল অল্প দেখিয়া যাত্রিগণ নদীগর্ভ দিয়া দেবদর্শনে চলিয়াছে কিন্তু তখনই হঠাৎ কোথা হইতে এরূপ প্রবলবেগে জল নামিয়া আসিয়া বহিয়া গেল যে হয়ত কতক লােক ভাসিয়া গেল পুনরায় একঘণ্টা পরে জলরাশি প্রবাহিত হইয়া গেলে দেখা যাইত যে নদী যেমন নিস্তেজ ও অল্পতােয়াঃ সেইরূপই রহিয়াছে। কখন কখন এইরূপ জলপ্রবাহ ৪৫ দিন পর্যন্ত স্থায়ী হইত। এইরূপ অলক্ষিত নিঝরপ্রবাহবিধবস্ত যাত্রীর অবস্থার সহিত নিত্যবিঘ্নবিহত মানবজীবনের কি সুন্দর সৌসাদৃশ্য রহিয়াছে। যখন জীবন বেশ সচ্ছলে মৃদুমন্দ গতিতে ঐ নদীর মত যাইতেছে—একটা বহুদিনের সযত্ন-পােষিত আশা সফল করিবার উদ্যোগ চলিতেছে—এমন সময়ে কোথা হইতে প্রবল বারিধারার ন্যায় বিপদের স্রোত আসিয়া মানুষকে এমনই বিপর্যস্ত করিয়া ফেলিল—তাহার [ ৬ ] আশা-সঙ্কল্প সমস্ত প্রবল বন্যায় কোথায় ভাসাইয়া লইয়া গেল- যে আর সে, জীবনে কখনও সাইবে তাহা মনে হইল না। সে কথা যাউক—এখানকার এই বিপদ নিবারণের জন্য মহাত্মা শ্ৰীযুক্ত কালীকৃষ্ণ ঠাকুর মহাশয় পর্বতগাত্রে গুহা পর্যন্ত একটী প্রস্তরনির্শিত পথ প্রস্তুত করাইয়া দিয়াছেন সুতরাং এখন গুহায় প্রবেশ করিতে হইলে আর নদীগর্ভ দিয়া যাইতে হয় না এবং আমাদিগকেও সে অসুবিধা ভােগ করিতে হয় নাই। আমরা টপকেশ্বর দর্শনান্তর কালীকৃষ্ণ বাবুকে মনে মনে ধন্যবাদ প্রদান করিতে যখন প্রত্যাবর্তন করিতেছি—এমন সময়ে দেখিলাম সেই শৈলশৃঙ্গ হইতে জটাজুটশােভিত গৈরিকবসনপরিধারী কমণ্ডলুহস্ত সন্ন্যাসী একটি প্রদীপ হস্তে ধীরে ধীরে অবতরণ করিতেছেন —যেন মহর্ষি বশিষ্ঠ অরুন্ধতীকে সঙ্গে লইয়া পার্বতীনাথের চরণ বন্দনা করিতে আসিতেছেন। দেখিলাম যে তাপসরাজ সেই শিব- মন্দিরে প্রবেশ করিলেন— আমরাও তাঁহার অনুগামী হইলাম। তিনি সায়ংসন্ধ্যা সমাপ করিয়া আরত্রিক করিতে লাগিলেন- আমরাও করজোড়ে দণ্ডায়মান রহিলাম। আরত্রিক সমাপ্ত হইল তিনি আমাদিগকে একটি নির্মাল্য প্রদান করিলেন আমরা প্রণিপাতপূর্বক গ্রহণ করিলাম—তিনিও ধীরে ধীরে যে পথে আসিয়াছিলেন সেই পথে ফিরিয়া গেলেন ;-সন্ধ্যার ছায়া ক্রমে গভীর হইতে লাগিল—আমরাও কি একটা ভাব লইয়া ফিরিতে লাগিলাম। প্রত্যাবর্তনকালে মনে হইল যে সহস্রধারা বা গুহ- পানিতেও যে অচলরাজি, যে বিটপি-শ্রেণী, যে গিরিনিঝরিণী দেখিয়াছি এখানেও সেই শৈলমালা, সেই কুসুমিত-লতা-জাল-বদ্ধ ০ [ ৬৫ 1 বৃক্ষাবলী, সেই স্রোতস্বিনী—কিন্তু সহস্রধারার দৃশ্য হইতে গুহ্যপানির ও গুহ্যপানির দৃশ্য হইতে টপকেশ্বরের দৃশ্য- সৌন্দৰ্য কত বিভিন্ন ! এই দৃশ্যগুলি কত ভিন্ন ভাবের উদ্দীপক। প্রকৃতি একই উপাদানে গড়িয়াছেন অথচ একটী অপরটী হইতে কত বিভিন্ন । এই বৃক্ষটী ইহার পার্শ্ববর্তী বৃক্ষ হইতে কত পৃথক! জড়প্রকৃতিতেও যেরূপ পার্থক্য জীব- মধ্যেও সেই প্রকার লক্ষিত হয়। কারণ ও উপাদান এক হইলেও শারীরিক ও প্রকৃতিগত বৈষম্য সহজেই লক্ষ্যের বিষয়ীভূত হয়। তুমি ও আমি একই মায়ের সন্তান—যে রক্ত মাংস তােমাকে পরিপুষ্ট করিতেছে—সেই • রক্তই আমার ধমনীতে প্রবাহিত হইতেছে—সেই মাংসই আমার অঙ্গসৌষ্ঠব বর্ধিত করিতেছে-তবে তােমার দেহ একরূপ আমার দেহ অন্যরূপ হইল কেন ? তবে তােমার মনের ভাব এক প্রকার-আমার মনের ভাব আর এক প্রকার কেন ? এই সাম্যে বৈষম্য (variety in unity) কি সৃষ্টিকর্তার বিচিত্র সৃষ্টিকৌশল নহে? যদি বিশ্বকৰ্ম্মার এই অদ্ভুত শিল্পচাতুৰ্য বিশেষরূপে পর্যালােচনা করা যায় তাহা হইলে কি তাহার অপার মহিমা অতিবড় অবিশ্বাসীর হৃদয়েও ভক্তিরসের সঞ্চার করে না ? পূৰ্বে যে নালাপানি’র নাম বারংবার উল্লেখ করিয়াছি এক্ষণে পাঠকবর্গকে সেই ‘নালাপানি’র বিষয় ) কিছু বলিব। হিমালয়ের প্রত্যন্তদেশস্থিত কোন অনুচ্চ শৈল হইতে একটী নিঝর বহির্গত হইয়াছে। မှ নিঝর এখানে নালাপানি নামে অভিহিত এবং যে “শৈল ? D নালাপানি।
[ ৬৬ ]
করে।
হইতে ঐ নিঝর প্রবাহিত হইতেছে তাহারও নাম নালাপানি।
ঐ নির্বারকে কেন নালাপানি কহে বা কিজন্য উহার নামের
সহিত ঐ পর্বতের নামের কোন বিভেদ নাই তাহা আমি
অবগত নহি—তবে ঝরণা ও পাহাড়ের নাম এক হওয়ায় মধ্যে
মধ্যে যে সংজ্ঞাবিভ্রাট ঘটে তাহাতে সন্দেহ নাই। যাহা
হউক পূর্বেই বলিয়াছি এই পর্বতবাহিনীর জল অতি স্বচ্ছ
ও সুস্বাদু এবং তজ্জন্য দেরাদুনবাসীরা উ পার্থ ব্যবহার
আরও বলিয়াছি যে এই নালাপানি’র জল বন্ধ
করিয়া দেওয়াতেই কালঙ্গা-যুদ্ধে গুর্খারা তৃষ্ণার্ত হইয়া দুর্গ
ত্যাগ করিতে বাধ্য হয় ; সুতরাং নালাপানি এখন ইতিহাসে স্থান
পাইয়াছে। এই নালাপানি পাহাড়ও নিঝরিণী দেখিতে যাইতে
হইলে কর্ণপুর হইতে এক' মাইল যাইতে হয়। তাহার পর উক্ত
পর্বতে কিয়দ্র আরােহণ করিলে একটী নিঝর-প্রবাহ একটী
সুবৃহৎ ইষ্টকনিৰ্ম্মিত আধারমধ্যে অবরুদ্ধ হইতেছে দৃষ্ট হয়।
সেই জলাধার হইতে লোহার নলদ্বারা দেরাদুন সহরে জল লইয়া
যাওয়া হইয়াছে। ঐ স্থান হইতে আর একটু উচ্চে এই গিরির
শিখরদেশে এক তাপসের পবিত্র আশ্রম আছে। একটী
ক্ষুদ্র, সুপরিচ্ছন্ন প্রাঙ্গন—চারিপার্শ্বে কয়েকখানি পর্ণকুটীর ও
প্রাঙ্গনমধ্যে একটী রুদ্রাক্ষবৃক্ষ আছে। ঐ রুদ্রাক্ষবৃক্ষতলে
একটী বেদিকা ও তাহার উপর তৃণাচ্ছাদিত গােলাকার চাল,
দেওয়া আছে। আশ্রমের চারিধারে নানাবিধ সযত্নপ্রােথিত,
পুষ্প-ফল-প্রদ, বিহগ-কাকলী-মুখরিত বৃক্ষাবলী এই স্থানের
শান্ত সৌন্দৰ্য্য আরও বর্ধিত করিয়াছে। এই তপােবনে তাসিলে
[ ৬৭ ) মনে হয় যেন মূর্তিমতী শান্তি নিয়ত বিরাজ করিতেছেন। এই স্থান হইতে দেরাদুন সহরটী আলেখ্যৎ প্রতীয়মান হয়। পথ ঘাট, গৃহ উদ্যান যেন চিত্রাঙ্কিত রহিয়াছে বলিয়া বােধ হয়। আমরা তানেকক্ষণ সেই তপােবনে বিশ্রাম করিয়া ঐ পর্বতের যে স্থানে কালঙ্গা-দুর্গ ছিল তাহা দেখিতে যাইলাম। পূর্বেই বলিয়াছি যে ইংরাজগণ দুর্গ জয় করিবার পর সমস্ত সমভূমি করিয়াছিলেন-- দুর্গের চিমাত্রও রাখেন নাই। একসময়ে যে এই স্থানে ভারতের এক বার জাতির অভেদ্য দুর্গ ছিল ও এক সময়ে সেই দুর্গ জয় করিতে শত শত ইংরাজযােদ্ধা প্রাণ বিসর্জন দিয়াছিলেন তাহা কোনও নিদর্শনই নাই—নিবিড় অরণ্যে সে স্থান পরিব্যাপ্ত হইয়া রহিয়াছে। সেই স্থান হইতে পাহাড়ের নিম্নে নামিয়া আসিলে লৌহ-রেলিং-বেষ্টিত দুইটা শ্বেতপ্রস্তরনিৰ্ম্মিত ক্ষুদ্র স্মৃতিস্তম্ভ দেখিতে পাইলাম। একটী, জেনারেল জিলিপি ও ইংরাজপক্ষীয় যে সকল সেনানায়ক এই যুদ্ধে নিহত হইয়াছিলেন তাঁহাদের স্মৃতিচিহু—অপরটী, এ সিংহ ও তাহার অনুচরবর্গের অমানুষিক বীর.. ইংরাজ বীরের প্রতি এই সম্মান প্রদর্শন। । • বীরােচিত কাৰ্য্যই করিয়াছেন। তাহারা স্বীয় দুর্পণ • : কালৌকিক বীরত্বের কাৰ্ত্তিস্তম্ভ নির্মাণ করিয়া দিয়া যে ধন্যবাদাহঁ হইয়াছেন তাহাতে আর সন্দেহ নাই। বীর গুর্খাদিগের স্মৃতি-স্তম্ভের পূর্বগাত্রে এইরূপ খােদিত আছে :- ওখা-সেনাপতি { [ ৬৮ ] This is inscribed As a tribute of respect to our gallant adversary, BULBUDDER, Commander of the Fort, And his brave Goorkbaş, Who were afterwards, While in the service of Runjeet Singhi, Shot down in their ranks to the last man By Afghan Artillery. পশ্চিমপার্শ্বে নিম্নলিখিত কথাগুলি খােদিত কাছে ? On the highest point Of the hill above this tomb, Stood the fort of Kalanga. After two assaults, On the 31st October and 27th November, It was captured by the British troops On the 30th November 1814, And completely razed to the ground. দেরাদুন সহরের মধ্যে গুরু রাম রায়ের মন্দির ব্যতীত অন্য কোন দ্রষ্টব্যই নাই এবং এই মন্দিরের প্রাচীনত্ব গুরুদ্বার বা গুরু রাম রায়ের ব্যতীত উহাতে স্থাপত্য বা অন্য কোন প্রকার শিল্প- মনির। কুশলতা দৃষ্ট হয় না। মন্দিরের প্রবেশদ্বারের সম্মুখেই একটী লালমৎস্য-পরিপূর্ণ বৃহৎ সরােবর। ইহার চারি দিক্ বাঁধান। কেহ কেহ বলেন যে রাম রায়ের পত্নী এই জলাশয়ে দেলদুন। গুরুদ্বারের সম্মুখস্থ দীঘিকা, তােরণ ও বাণ্ডিা
No text on this page.
[ ৬৯ ] জল আনয়নার্থ রাজপুর প্রণালী খনন করান। মন্দিরের প্রবেশ- দ্বার ও সরােবরের মধ্যবর্তী স্থানে একটী প্রকাণ্ড ঝাণ্ডা বা ধ্বজা প্রােথিত আছে। ফটক দিয়া প্রবেশ করলেই বিস্তৃত প্রাঙ্গন উহার চতুর্দিকে মহান্ত মহারাজের দপ্তর, কাছারি, বৈঠকখানা প্রভৃতি গৃহ। তাহার পর একটী প্রকাণ্ড চত্বরের মধ্যে মন্দির। মন্দিরটী দেখিতে ঠিক লাহােরের নিকটস্থ সাদূরার জাহাঙ্গীর বাসার সমাধি-নিকেতনের ন্যায়। মন্দিরের চারি কোণ হইতে চারিটী মিনার বা স্তম্ভ ও ছাদের মধ্য হইতে একটী বৃহৎ গম্বুজ উঠিয়াছে। মন্দিরের বামদিকের একটী প্রকোষ্ঠে নানক হইতে শিখদিগের আটজন গুরুর মূর্তি অঙ্কিত আছে। মন্দিরের উঠানের চারিদিকে চক্মিলান ঘর। তাহাতে সাধু-সন্ন্যাসী, অতিথি-অভ্যাগত আসিলে বাস করিতে পারেন। পূৰ্বেই বলিয়াছি এই মন্দিরমধ্যস্থ খট্টা ও সমাধি প্রত্যহ সাদরে পূজিত হয়। ঐস্থানে অহরহঃ গুরুমুখী অধীত হয়। প্রত্যেক বৎসর ১লা চৈত্র হইতে ১০ই পৰ্য্যন্ত মেলা বা সঙ্গৎ হয়। দেশ- বিদেশ হইতে সাধু-সন্ন্যাসীরা আসিয়া এই মেলায় যােগ দান করেন। বিশেষতঃ যে বৎসর হরিদ্বারে কুম্ভ মেলা হয় সে বৎসর লােকসংখ্যা অধিক হয়। মেলার ষষ্ঠ দিবসে + শিখগণ ঝাণ্ডা মেলা। + “On the first of Chait, the fair or Mela (called Sungat) commences. It lasts till the tenth. On the 6th a new flag is hoisted upon an enormous flag staff standing between the temple and the large tank."- Williams's Memoir of Dehra Doon, pp. 38-39. “ The first nine pights of the sudi or light half of Chait are known as the Chait nauratri The Chait naurâtri is also the season of the great sangat or fair at the temples of Guru Rám Rái in Dehra and Sripagar.”—E. T. Atkinson's Gazetteer of N.-W. P., Vol. XI. pp. 847-48.
} { ৭ ] কর্তৃক প্রাগুক্ত বৃহৎ ধ্বজ প্রােথিত হয়। ইহা শিখদিগের মেলা হইলেও বিভিন্নধর্মাবলম্বী সহস্র সহস্র যাত্রী পুণ্যার্থে এই কার্যে সহায়তা করেন। এই ধ্বজ বা ঝাণ্ডা রােপিত হয় বলিয়া ইহাকে ‘ঝাণ্ডা মেলা’ বলে। চৈত্র মাস পর্যন্ত আমরা দেরাদুনে থাকি নাই সুতরাং এই ঝাণ্ডা মেলার সময়ে আমি উপস্থিত ছিলাম —বঙ্গের সুপ্রসিদ্ধ লেখক শ্ৰীযুক্ত বাৰু জলধর সেন মহাশয় এই মেলা স্বয়ং দর্শন করিয়া যাহা লিখিয়াছেন তাহা পাঠকবর্গের সন্তোষসাধনের জন্য নিম্নে উদ্ধৃত করিলাম – “প্রতি বৎসর ১লা চৈত্র এখানে একটি মেলা হয়, তাহার নাম ‘ঝাণ্ডার মেলা। ‘ঝাণ্ডা’ কথাটির অর্থ আগে একটু পরিষ্কার করিয়া বলা আবশ্যক। সন্ন্যাসীদিগের হস্তে এক গাছি করিয়া লাঠী থাকে ; কোনও স্থানে বাস করিতে হইলে তাহারা প্রথমে সেইখানে লাঠী প্রােথিত করে, এবং তাহার অগ্রভাগে নিশানের মত একখণ্ড লাল কাপড় বাঁধিয়া দেয় ও তাহার পর সেখানে আসন পাতে। * গুরু রাম রায়ও চৈত্র মাসের প্রথম দিনে এখানে আসিয়া আচ্ছা কনে ও ঝাণ্ডা স্থাপন করেন। " There are two great assemblies : one on the 5th of Chait (March- April) aud another on the 8th of Bhadon (August-Sepſeuber), chiefly attended by Sikhs from the Punjab, The uext day the pil. grims bathe and a party proceeds to Siddh-ban and cut down a new pole for the Guru's standard, which after being batlied in Ganges water is set up in the place of the old one with great ceremony.--Ditto, ditto, p. 841. পাঠক বর্গ ‘প্রবাস-চিত্র’ হইতে উদ্ধত অংশে দেখিবেন যে মেলার প্রথম দিবসে ঝাণ্ডা ভােলা হয়। জলধর বাবু স্বয়ং দেখিয়াছিলেন সুতরাং তাহার কথার উপরে কথা কহিতে পারি না। আমি যখন স্বয়ং দেখি নাই তখন কোটী যথার্থ তাহা অবগত নহি। ।
[ ৭১ ] ; সেই উপলক্ষে এখনও প্রতি বৎসর মেলা বসিয়া থাকে। রাম রায়ের সেই ‘ঝাণ্ডা’ এখন আর ক্ষুদ্র লাঠী নাই, বৃহৎ জাহাজের মাস্তুলের মত একটি প্রকাণ্ড কাষ্ঠখণ্ডে পরিণত হইয়াছে ; তাহার সর্বশরীর লাল বস্ত্রখণ্ডে মণ্ডিত, শিবরাদেশে সমুজ্জ্বল লােহিত নিশান। পূর্বের ন্যায় এখন আর ইহা মৃত্তিকায় প্রােথিত করিবার সুবিধা নাই ; সিংহদ্বারের সম্মুখে পুষ্করিণীতীরে প্রায় ১৫/২০ হস্ত উচ্চ স্থান ইষ্টক ও প্রস্তর দ্বারা বাধান হইয়াছে; তাহারই ভিতর সেই প্রকাণ্ডকায় “ঝাণ্ডা দণ্ডায়মান থাকে। প্রতি বৎসর তাহার এক পার্শ্বের ইষ্টকস্তুপ ভাঙ্গিয়া ঝাণ্ডা’ নামান "হয়, এবং ফদি সেই কাষ্ঠদণ্ডের অবস্থা ভাল থাকে, তবে তাহার গাত্রেই নূতন লাল কাপড় জড়াইয়া নূতন নিশান খাটাইয়া ঝাণ্ডা উঠান হয়, নতুবা কাষ্ঠদণ্ড বদলাইয়া দিতে হয়। ঝাণ্ডা’ তুলিবার সময়ের দৃশ্য অতি চমৎকার ; ১লা চৈত্রের রাত্রি প্রভাত হইতে না হইতে, সহস্র সহস্র নরনারী ‘ঝাণ্ডা’তলে সমবেত হইতে আরম্ভ করে; ক্রমে ঝাণ্ডা তুলিবার সময় হইলে মন্দিরের মহান্ত সেখানে উপস্থিত হন। তঁাহাকে দেখিবামাত্র দর্শকগণ উৎসাহে ‘জয় গুরুজি কি জয়’ শব্দে কর্ণ বধির, ও আকাশ বিদীর্ণ করিয়া ‘ঝাণ্ডা নামাইয়া ফেলে। তাহার অল্পক্ষণ পরে সেই সমস্ত লােক পুনর্বার সেই ‘ঝাণ্ডা পূৰ্ব স্থানে সংস্থাপিত করে; অনন্তর প্রত্যেকে ঝাণ্ডা’র গাত্রে ‘রাখি’ বাঁধিয়া দেয়। গুরুদ্বারের মহান্ত সেদিন অনাহারে, গলে উত্তরীয় বাঁধিয়া, নগ্নপদে, কৃতাঞ্জলিপুটে, ‘ঝাণ্ডা’র নিকট দাঁড়াইয়া থাকেন। যে মহান্ত মঠপ্রান্তে পদার্পণ করিতেও অপমান গ
[ ৭২ ]
;
বােধ করেন, যাহার মস্তকে ছত্রধারণের জন্য এবং পদতলে
পাদুকাপ্রদানের নিমিত্ত শত শত ব্যক্তি সদা সন্ত্রস্ত অবস্থায়
অবস্থান করে, আজ তিনি সর্বাপেক্ষা দীনবেশে, বিনীতভাবে,
গললগ্নীকৃতবাসে ঝাণ্ডা’র সম্মুখে দাড়াইলেন, আজ জনসাধারণের
মধ্যে তিনি সাধারণ ব্যক্তির ন্যায় দণ্ডায়মান। দূরে দাঁড়াইয়া
আমি এই দৃশ্য দেখিতেছিলাম।
এক বৎসর এমন
হইয়াছিল যে, ‘ঝাণ্ডা আর কিছুতেই তুলিতে পারা যায় না;
সহস্র সহস্র
লােক প্রাণপণে
চেষ্টা করিয়াও
যখন ‘ঝাণ্ডা উঠাইতে পারিল না, তখন সেই উৎসবক্ষেত্রে সমাগত
ভক্ত নরনারীর মধ্য হইতে একটা ঘাের ক্রন্দনের রােল উখিত
হইল; এবং এক অদৃষ্টপূর্ব অমঙ্গলের আশঙ্কায় সকলেই
ভীত ও অবসন্ন হইয়া পড়িল। স্বয়ং মহান্তজী (বয়স ৩০/৩৫
বৎসর ) আকুল হইয়া ক্রন্দন করিতে লাগিলেন। তাহার
চক্ষে অশ্রু দেখিয়া সকলে আরও অধিক ভীত হইয়া পড়িল ;
হাহাকারধ্বনিতে আকাশ বিদীর্ণ হইতে লাগিল; সকলের মুখেই
বিষাদকালিমা পরিব্যাপ্ত।
যে উৎসবক্ষেত্র
আনন্দ ও উৎসাহে পরিপূর্ণ ছিল, দেখিতে দেখিতে তাহা যেন
তরঙ্গায়িত শােকসাগর বলিয়া প্রতীয়মান হইতে লাগিল।
সকলেই দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া বলিতে লাগিল, হে গুরুজী, হাে
গুরুজী। * যাহা হউক, চেষ্টার ত্রুটি হইল না ;
ক্রমে বেলা তিনটা বাজিয়া গেল ; কিন্তু এতগুলি 'লােক
চেষ্টা করিয়াও কিছুতেই ‘ঝাণ্ডা উঠাইতে পারিল না। প্রকাণ্ড
প্রকাণ্ড অতি শক্ত, স্থূল কাছি ধরিয়া উন্মত্ত ভক্তগণ টানাটানি
একঘণ্টা পূর্বে
নাই ;
;
[ ৩ ]
করে, আর সেগুলি জীর্ণসূত্রের মত ছিড়িয়া যায়। আর উপায়
সকলের বিশ্বাস হইল, গুরুজীর অকৃপা হইয়াছে ;
নতুবা ঝাণ্ডা এমন বিশ্বম্ভর মূর্তি ধারণ করিবে কেন ?
* অবশেষে মহান্ত মহাশয় উন্মত্তের মত হইয়া সেই
জনতার চতুর্দিকে ছুটিয়া সকলকে উৎসাহিত করিতে লাগিলেন ;
তাহার উৎসাহবাক্যে উৎসাহিত হইয়া সকলে
আর একবার অগ্ৰসৰু হইল, শরীরের সমস্ত বল এবং প্রাণের
সমস্ত ভক্তি নিয়ােজিত করিয়া স্ত্রী পুরুষ, বালক বৃদ্ধ, আর
একবার ঝাণ্ডা উঠাইবার জন্য টানাটানি করিল। মুহূর্তের মধ্যে
‘ঝাণ্ডা উঠিয়া গেল। সহসা সেই বিষাদচ্ছিন্ন জনস্রোতের মধ্যে
যে আনন্দকল্লোল উত্থিত হইল, তাহা অনির্বচনীয় ; উৎসাহে
সকলে ‘জয় গুরুজী কি জয় ! রবে আকাশ বিদীর্ণ করিল।”
সৌন্দৰ্য-সম্পদের অতুলনীয় ভাণ্ডার, আৰ্যকীর্তির অন্যতম
স্মৃতিক্ষেত্র দেরার চিত্র এই অধম চিত্রকরের তুলিকায় ফুটিবার
নহে। এখানে মানবের বিদ্যা-বুদ্ধির তেমন কোনও জ্বলন্ত
নিদর্শন নাই ; এখানে কর্তৃত্বাভিমানী মানুষের অহমিকা-বৃদ্ধির
কোনও উপকরণ নাই-এখানে বিজ্ঞানের জয়স্তম্ভ, অবিশ্বাসীর
কুহক-জননক্ষম মায়া-মরীচিকার বড়ই অদ্ভাব—এখানে যাহা
আছে তাহা ভাবুকের, তাহা ভগবৎপ্রেমিকের উপভােগের বস্তু।
সেই বিবিধরসাত্মক দৃশ্যবলী যাঁহার নেত্রপ্রান্তে প্রেমা আনয়ন
করে সেই মহাপুরুষই এই দৃশ্যাবলী দেখিবার অধিকারী।
;
। “প্রবাস-চিত্র * ২৮-৩৫ পৃষ্ঠ ।
মসুবি। 1 দেরাদুনে আসিয়া ইংরাজের এই সুপ্রসিদ্ধ বিলাস- কানন না দেখিলে এ প্রদেশভ্রমণ অসম্পূর্ণ থাকিয়া যায়। এই ক্ষুদ্র পার্বত্য সহরের প্রায় সমস্তই বিলাতী ধরণে নির্মিত। স্বদেশবৎসল ইংরাজ যতদূর পারিয়াছেন এই স্থানটী তাহাদের চিরপ্রিয় জন্মভূমির অকরণে গড়িয়াছেন। যদি কাহারও সুদূর বিলাতের পল্লী দেখিতে বাসনা থাকে তবে এই শৈলাবাস দেখিলেই ভঁহার সে ইচ্ছা আংশিক পূর্ণ হইবে। বিশেষতঃ দেরাদুন ও মসুরি পাশাপাশি থাকায় ভারতের ও বিলাতের পল্লীর পার্থক্য সহজে বুঝিতে পারা যায়। আমরা একদিন প্রত্যুষে ইংরাজের এই সাধের শৈলাবাস দেখিতে একটী গাড়ী করিয়া রওনা হইলাম। মধ্যে পূৰ্বোল্লিখিত রাজপুরে উপস্থিত হইলাম। সেখান হইতে একটী অশ্বারােহণে পাহাড়ে উঠিতে আরম্ভ করিলাম। যাহাদের অশ্বারােহণ কর অভ্যাস নাই তাহারাও এখানকার অশ্বে নির্ভয়ে আবােহণ করিতে পারেন। একে বেচারারা নিতান্তু দুর্বল, এক ঘণ্টার [ ৫ ] ১১ । তাহার পর পাছে দ্রুত যায় বুঝি এই ভয়ে ইহাদিগের সহিসেরা এই সকল অশ্বের পুচ্ছদেশ এরূপ দৃঢ়ভাবে ধরিয়া থাকে যে ঐ অশ্বের দ্রুত গমনের কোনও প্রকার সম্ভাবনাই থাকে না। ইহার উপর ইংরাজ পাহাড়ে উঠিবার রাস্তা যতদূর সম্ভব সমান করিয়া রাখিয়াছেন ও খাদের দিকে সুদৃঢ় রেলিং দিয়াছেন। একটী অশ্বের ভাড়া ‘টাকা মাত্র। যদি নিতান্তই কাহারও ঐ অশ্বনামধারী জীবের পৃষ্ঠে পাহাড়ে উঠিতে ভয় হয়, তবে তাহাকে অগত্যা ডাণ্ডী ভাড়া করিতে হইবে। এক এক ডাণ্ডীর ভাড়া কুলি সহিত ৩, টাকা। পাহাড়ের উপর উঠিতে প্রথম কতকটা পথ বেশ প্রশস্ত দুইধারে অট্টালিকা ও বিপণী-শ্রেণী মনে হয় না যে পাহাড়ে উঠিতেছি। তাহার পর ক্রমে দোকানের সংখ্যা কমিয়া গিয়াছে। যে স্থানে হৰ্মাবলী ও বিপণী-শ্রেণী শেষ হইয়াছে সেই স্থানে একটী শুল্কঘর শুল্কঘর আছে। এখানে অশ্ব প্রতি ॥ আনা ও ডাণ্ডী প্রতি ১ টাকা করিয়া শুল্ক দিতে এই শুল্কঘর মসুরি মিউনিসিপালিটির সীমান্তে অবস্থিত সুতরাং এই স্থানহইতে যথার্থ মসুরি আরম্ভ হইয়াছে বলা যাইতে পারে। এই স্থান হইতে পথ যদিও ক্রমশঃ অপ্রশস্ত হইয়াছে তথাপি দুইজন অশ্বারােহী স্বচ্ছন্দে পাশাপাশি যাইতে পারে। এই পথের এক দিকে উচ্চ পর্বত—অপর দিকে গভীর খা। নিম্নে খাদের দিকে দৃষ্টিপাত করিলে মস্তক বিঘূর্ণিত হয়। এইরূপ সাত মাইল পার্বতীয় পথ অতিবাহিত করিয়া তিন ঘণ্টার পর আমরা মসুরি সহরে আমাদের বাসায় উপস্থিত হইলাম। আমরা যতই উঠিতে লাগিলাম দেখিলাম ততই ক্ষেত্রের বন্ধুত্ব হয়।
[ ৬ ] লােপ পাইতেছে—সকল পদার্থই সমােচ্চ বলিয়া বােধ হইতে লাগিল-বৃহৎ ক্ষুদ্র, স্থূল সূক্ষম, উচ্চ নীচ, বিশাল ক্ষীণের অন্তরায় অন্তর্হিত হইতে লাগিল;- আমি ভাবিলাম মানুষের যতই আধ্যাত্মিক উন্নতি হয়—মানবের মন যতই উচ্চ হয়—ততই তাহার নিকট সকল বস্তুই সমান বলিয়া প্রতীয়মান হয়--তাহার নিকট ধনী দরিদ্রের সমান আদর, সুরম্য অট্টালিকায় ও শতচ্ছিদ্র পর্ণকুটীরে প্রভেদ থাকে না। এই বিবিধ-পাদপরাজি-পরিব্যাপ্ত ভূধরমালা একশত বৎসর পূর্বে শ্বাপদসঙ্কুল-ভীষণ-অরণ্য-গর্ভ-নিহিত ছিল—বর্তমান সুন্দর জনাকীর্ণ নগরের চিহ্নমাত্রও ছিল না—কেবলমাত্র কয়েক ঘর পাহাড়ীর পর্ণকুটীর সেই বিজন অরণ্য মধ্যে মনুষ্যসমাগম সূচিত করিত। কিন্তু শীকারপ্রিয় ইংরাজজাতি দেরাদুন হস্তগত করিবার পর ইহার অরণ্যসকল বন্দুকের ধ্বনিতে বিধ্বস্ত করিতে লাগিল। কেহ কেহ এই মসুরি পর্বতে আসিয়া শীকার আরম্ভ করিলেন ; ক্রমে ১৮২৩ খৃষ্টাব্দে মিঃ সাের ও কাপ্তেন ইয়ং নামক দুই জন শীকারপ্রিয় ইংরাজ এই পর্বতের ক্যামেল ব্যা’ শিখরের কোনও অংশে শীকারের নিমিত্ত একটী ক্ষুদ্র গৃহ নির্মাণ করেন। তাহারা শীকার করিতে আসিয়া সেই ক্ষুদ্র প্রকোষ্ঠে কখন কখন রাত্রি যাপন করিতেন। তাঁহাদের নিকট তাহাদের বন্ধুবর্গ ঐ স্থানের মনােহারিত্বের কথা শ্রবণ করিয়া তথায় উপ- নিবেশ স্থাপনে মনস্থ করেন। এইরূপে ক্রমে একটীর পর একটী করিয়া ইংরাজের গৃহসকল নিৰ্ম্মিত হইতে লাগিল। ল্যাণ্ডরে ‘মালিঙ্গার’ নামক প্রাসাদ সর্বপ্রথমে নির্মিত হয়।
[ ]
এখন ঐ প্রাসাদে ‘ফিলাণ্ডার স্মিথ ইনষ্টিটিউট’ নামক বিদ্যালয়
স্থাপিত হইয়াছে। তাহার পর ১৮২৭ খৃষ্টাব্দে ইংরাজ গভর্মেন্ট
ল্যাণ্ডরে গােরাবারিক নির্মাণ করেন। রুগ্ন ইংরাজসৈন্যগণ
এই স্থানে স্বাস্থ্যলাভের জন্য প্রেরিত হইত। এক্ষণে মসুরি
ও ল্যাগুর এই দুইটী পাহাড় লইয়া একটী সহর প্রস্তুত হইয়াছে।
কোথায় ল্যাণ্ডর শেষ হইয়া মসুরি আরম্ভ হইয়াছে তাহা বলা
বড় কঠিন। তবে ল্যাগুর, মসুরি হইতে ঈষৎ উচ্চ। মসুরি
৭১৮৭ ফুট ও ল্যাণ্ডার ৭৫৩৩ ফুট উচ্চ। মসুরিতে বড় বড়
সাহেব সুবারা বাস করেন আর ল্যাণ্ডরে মধ্যবিৎ অবস্থার সাহেব
ও অবসরপ্রাপ্ত সৈনিকদিগেরই বাস অধিক। পূর্বেই বলিয়াছি
দেরাদুন হইতে কাছারি বয়েক মাসের জন্য মসুরিতে উঠিয়া
আইসে, সে সময় মসুরি সহর খুব জমকাইয়া উঠে।
আমার বােধ হয় মরি ল্যাণ্ডর অপেক্ষা বেশী পরিষ্কার
পরিচ্ছন্ন। পথ সকল বেশ প্রশস্ত, পার্শ্বে ইংরাজের
বড় বড় হােটেল, পানাগার, ক্লব, দোকান। মসুরির
চৌরাস্তার উপর একটি সুন্দর পুস্তকালয় আছে ও তাহার
সন্নিকটে একটি ছােটখাট দেশী রকমের বাজারও
লাইব্রেরী।
আছে। লাইব্রেরীর সন্নিকটে এই বাজারটী অবস্থিত
বলিয়া ইহার নাম ‘লাইব্রেরী বাজার’ হইয়াছে। এই ক্ষুদ্র
বাজারের নিকটে পাহাড়ের উচ্চ
চূড়া লম্বালম্বিভাবে পূর্ব
পশ্চিমে গিয়াছে। দূর হইতে ইহা ঠিক উষ্ট্রের
ক্যামেল ব্যাক্।
পৃষ্ঠের মত দেখায় বলিয়া স্থানীয় ইংরাজেরা ইহাকে
‘ক্যামেল ব্যা’ (Camel back) বলেন। এই ক্যামেল
.
পথ ঘাট।
[ ৭৮ ] ব্যা’এর উপরে একটী মান-মন্দির ও বহুসংখ্যক মান-মন্দির। অট্টালিকা আছে। ইহার চারিদিক্ বেষ্টন করিয়া একটী সুন্দর, প্রশস্ত, সমতল পথ গিয়াছে। এই পথে ভ্রমণ করিতে করিতে প্রকৃতির মনােলােভা শােভা হৃদয়ে অতি অপূর্ব ভাবের সঞ্চার করে। দূরে চির-তুষার-মণ্ডিত হিমগিরির দৃশ্য দেখিয়া কাহার না প্রাণ মন বিমুগ্ধ হইয়া যায় ? নিবিড়-নীল-পাদপাচ্ছন্ন গিরিশ্রেণীর পর মল-বল-হিমানী-মণ্ডিত গিরি-শিখরসকল এখান হইতে যেন দ্বিরদ-রদ-শুভ্র-ফেণপুঞ্জ- কিরীটী সাগর-তরঙ্গবৎ প্রতীয়মান হয়। বস্তুতঃ এই পথের যে স্থানেই দাড়াইয়া দৃষ্টিপাত করি না কেন—সেই স্থানেই অতি অপূর্ব প্রাকৃতিক সৌন্দৰ্য নয়নপথে পতিত হয়। ল্যাওরে একটী রহৎ বাজার আছে। এ প্রকার বহুবিধ-দ্রব্য- সম্ভার-পূর্ণ বিপণীসঙ্কুল বাজার বােধ হয় কোনও পার্বত্য সহরে নাই। এই বাজারে পাওয়া যায় এমন দ্রব্যই নাই। ভারতের অতি সুদূর প্রান্ত হইতে ব্যবসায়ীরা আসিয়া এস্থানে ক্রয় বিক্রয় করিতেছে। আশ্চর্যের বিষয় এই যে যদিও অনেক দূর হইতে দ্রব্য সমুদয় আসিতেছে তথাপি দূরত্বের অনুপাতে মূল্য মহার্ঘ বলিয়া মনে হয় না। ল্যাণ্ডরের সর্বোচ্চ শৃঙ্গকে ‘লালটিবা’ বলে। লালটি’ ৭৫৩৩ ফুট উচ্চ। এই শৃঙ্গের অগ্রভাগ কাটিয়া বেশ সমতল লালটিলা। কৃরিয়া দেওয়া হইয়াছে। অতি পরিষ্কার দিবসে এখান হইতে গঙ্গা ও যমুনা দেখা যায়। এই স্থান হইতে চির-তুষার- বিভূষিত, দিগন্ত বিস্তৃত হিমালয়ের দৃশ্য অতীব সুন্দর দেখায়। ল্যাণ্ডর বাজার।
মসুরি। ক্যামেল-ব্যাক রােড
No text on this page.
[ ৭৯ ]
দেরাদুনের বিচিত্র বর্ণের হয়ঁসকল কানন-কুন্তলা ধরণীর
অঙ্গে অলকা-তিলকের ন্যায়, দূরত্ব-হেতু
স্তিমিত-প্রবাহ। শীর্ণা নদী
কণ্ঠগত মুক্তাহারের ন্যায় ও বায়ু-সঞ্চালিত ধূসর বর্ণের মেঘসংযুক্ত
শ্যামল-বৃক্ষরাজি-মণ্ডিত আদ্রিসকল “মধ্যে শ্যামঃ স্তন ইব ভুবঃ
শেষবিস্তারপাণ্ডু”ৰৎ প্রতীয়মান হয়।
স্বর্গীয় ডিউক অব এডিনবরা যখন ভারতবর্ষ ভ্রমণ করিতে
আসিয়াছিলেন তখন তিনি দেরাদুন ও মসুরি দেখিয়া যারপরনাই
প্রীত হয়েন। তিনি তাহার প্রীতির নিদর্শন স্বরূপ ল্যাওরের
সমাধি-ভূমিতে স্বহস্তে একটি দেবদারুবৃক্ষ রােপন করেন। সেই
দেবদার---শিশু এখন পল্লবাকীর্ণ শাখা-প্রশাখা-বহুল মহামে
পরিণত হইয়াছে। ইহার গত্রে একটী ফলকে এই কয়েকটী
কথা লিখিত আছেঃ “Planted by. H. R. H. the Duke
of Edinburgh. February, 1870."
অন্যান্য অট্টালিকার মধ্যে ল্যাণ্ডর বাজারের অব্যবহিত
উপরস্থ স্বর্গীয় মহারাজা দলীপ সিংহের ‘ক্যা (The Castle)
নামক বাসভবন, অফিঙ্গাঞ্জিস্থানের ভূতপূর্ব আমীর ইয়াকুব
শার গ্রীষ্ম-নিবাস, ও পুঁতির মহারাজার প্রাসাদ ও
‘সালিভি (liarlel: Htv l) নামক প্রসিদ্ধ হােটেলই
উল্লেখযােগ্য। এই ‘সারগিতি হােটেলের নিম্নে ‘হ্যাপি ভ্যালি’
(Happy Vuiley) নামক একটী সুন্দর উপত্যকা
ভ্যালি'। আছে।
উপত্যকার চারিদিকেই পাহাড়,
পাহাড়ের উপর সহর। যখন এই উপত্যকায় ঘােড়দৌড়,
ক্রিকেট, ফুটন্ প্রভৃতি খেলা হয় তখন সাহেবেরা পাহাড়ের
‘হ্যাপি
এই ক্ষুদ্র
[ ৩ ]
ঝােলা
পুল।
গায়ে বসিয়া দেখে। উপর হইতে ‘হাপি ভ্যালি’তে নামিবার
অনেকগুলি পথ আছে।
মসুরি-ভ্রমণকারীর যদি কেবল মসুরি সহর দেখিয়াই
তৃপ্তি না হয় এবং যদি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অভিযানে আপত্তি
দ্রষ্টব্য।
থাকে তবে তিনি ইহার সন্নিকটে যে কয়েকটী
দ্রষ্টব্য স্থান আছে তাহা দেখিবেন। যমুনার উপর একটা
ঝােলা পুল আছে। ইচ্ছা করিলে দেখিয়া একদিনেই
মসুরিতে ‘ফিরিয়া আসা যায়। বরাবর বেশ
রাস্তা আছে—মসুরি হইতে এগার মাইল মাত্র। যদি সেই দিন
ফিরিতে কষ্ট বােধ হয়, তাহা হইলে সেই সেতু পার হইয়া
এক ক্রোশ যাইলে ‘লক্কর’ ডাকবাংলায় রাত্রি যাপন করিতে
পারা যায়।
কেটী জলপ্রপাত ( Kempti Fall ) মসুরি হইতে
কেন্দী চক্রাতা পর্যন্ত যে পথ গিয়াছে তাহার অনতিদূরে ও
মসুরি হইতে ছয় মাইল দূরে রিঙ্গল নদীর উপরে
অবস্থিত। এই ঝরণাটী বেশ সুন্দর ও স্থানটী অতি মনােরম।
পাঁচটী প্রপাত স্তরে স্তরে অনেক উচ্চ হইতে পতিত হইতেছে।
সহস্রধারায় যেমন জলধারা বৃষ্টির ন্যায় বিন্দু বিন্দু পতিত
হইতেছে ইহা সে প্রকারের নহে; একেবারে প্রভূত জলরাশি
প্রবল বেগে গভীর গর্জনে উচ্চ স্থান হইতে কৃষ্ণবর্ণের শিলা,
সকলের উপর নিপতিত হইয়া ইতস্ততঃ পুষ্পরাশির ন্যায় বিক্ষিপ্ত
হইতেছে—আবার কোথাও যেমন স্তরে স্তরে নামিতেছে অমনি
ফেনরাশি পুঞ্জীকৃত হইয়া উঠিতেছে। একটী সঙ্কীর্ণ, পথ
প্রপাত।
মজুরি।
।।।।
* *
.
.
হ্যাপি ভ্যালি
No text on this page.
[ ৮১ ] পর্বতগাত্র অবলম্বন করিয়া ঝরণার নিকটে গিয়াছে। সে স্থানে যাইবার সময় একটু সাবধানে চলিতে হয়; কেন না, সে স্থানে পাহাড় একেবারে ঢালু হইয়া গিয়াছে। চতুর্থ প্রপাতের তীরে রমণীয় সুশীতল ছায়াপ্রদ স্থান আছে। যদি কাহারও বনভােজন করিবার ইচ্ছা থাকে, তবে তিনি বন্ধুবৰ্গ-সমভিব্যাহারে তথায় অতি আনন্দসহকারে সময় অতিবাহিত করিতে পারেন। ৫ মসুরির বােটানিক্যাল্ গার্ডেন (Botanical Garden) একটী দ্রষ্টব্য স্থান। অদ্রিরাজ হিমালয়ের উপর নানা বােটানিক্যাল গাডেন্। স্থানে যে সকল নানাবিধ বৃক্ষলতা জন্মে, সেই সকল পাদপাদি এই উদ্যানে একত্র সুমবেত দেখিতে পাইবে। বিশেষতঃ ডালিয়া, প্রিমরােজ ও ভাওলেটের ত কথাই নাই। মসুরির জলবায়ু অত্যন্ত স্বাস্থ্যকর।, দেরায় যেমন বর্ষা- কালে একটু একটু ম্যালেরিয়া জ্বরের প্রাদুর্ভাব হয়, জলবায়ু। এখানে সে ভয় নাই। বরং দারজিলিং প্রভৃতি শৈলে যে একটু আর্দ্রতা আছে, এখানে তাহার নামমাত্রও নাই। চারি দিকে কোনও উচ্চ পাহাড় না থাকায় নির্মল বায়ুপ্রবেশের কোন- রূপ অন্তরায় নাই, এবং সেই জন্য স্থানটী কখনও আর্দ হয় না। এখানকার মিউনিসিপালিটি খুব জাঁকাল। বাৎসরিক আয় মিউনি প্রায় ৩০,০০০ হাজার টাকা হইবে। লােক সিপালিটি। সংখ্যা ৪০ ০ ০ হাজার-সময়ে সময়ে ৭০০০ হাজার হয়। শ্বেতাঙ্গ বালকবালিকাদিগের জন্য এখানে অনেকগুলি বিদ্যালয় আছে।
হরিদ্বার ।
ত দূর আসিয়া কেবলমাত্র দেরাদুন দেখিয়াই প্রত্যাবর্তন
করিতে ইচ্ছা হইল না। একবার ভারতের পবিত্র তীর্থ হরিদ্বার
দর্শন করিবার লােভ =ংবরণ করিতে পারিলাম না—একবার
পূতপরিবাহিণী কলিমলাপহারিণী ভাগীরথীর নির্মল সলিলে
অবগাহন করিয়া জন্মান্তরীণ-সঞ্চিত-পাপরাশি বিধৌত করিবার
বাসনা হইল—সুতরাং এই পুণ্যধামে ত্রিরাত্র বাস করিয়া তাহার
পর প্রত্যাবর্তন করিব, সঙ্কল্প করিলাম।
দেরাদুন হইতে বেলা ১০ টার ট্রেনে হরিদ্বারে আসিবার
জন্য রওনা হইলাম।
হরিদ্বারে পৌছিতে প্রায় সাড়ে
এগারটা বাজিয়া গেল। কলিকাতা হইতে যাত্রাকালে আমা-
দিগের জনৈক বন্ধু এই তীর্থে পাণ্ডাদিগের উপদ্রবের ভয়
দেখাইয়াছিলেন ও শ্ৰীযুক্ত বাবু সূৰ্য্যমল বুঝুওয়ালার প্রসিদ্ধ
ধৰ্ম্মশালায় থাকিবার পরামর্শ দিয়াছিলেন। আমরা যখন হরিদ্বারে
পৌছিলাম, তখন কোনও পাণ্ডাই উপস্থিত নাই দেখিয়া
মনে মনে একটু আনন্দিত হইয়াছিলাম। স্টেসনের বাহিরে
আসিয়া কোন প্রকার যানই দেখিতে পাইলাম না।
[ ৮৩ ] জন কুলিকে জিজ্ঞাসা করিলাম “সূৰ্য্যমল বাবুর ধৰ্ম্মশালা কত দূর ?” সে বলিল- -“খুব নগি”। সুতরাং গাড়ী না পাওয়ায় দুঃখিত হইলাম না—বরং চারি দিক দেখিতে দেখিতে যাইব ভাবিয়া মনে মনে একটু আনন্দিত হইলাম। কিন্তু যতই যাইতে লাগিলাম, ততই বােধ হইতে লাগিল, যেন পথ আর ফুরায় না। রাস্তা প্রশস্ত, কিন্তু উহাতে ছায়ার লেশমাত্র নাই, আবর্জনা ও ধূলায় পরিপূর্ণ—বােধ হইল, কস্মিন্ কালেও জল পড়ে না। পথে যাইতে একটী হাসপাতাল, একটী ডাক ও তারধর দেখিতে পাইলাম। যাহা হউক, প্রায় দেড় মাইল পথ অতিক্রম করিবার পর সূৰ্য্যমল বাবুর, ধৰ্ম্মশালায় আসিয়া উপস্থিত হইলাম। বাটীটী সন্মুখ হইতে দেখিতে বেশ জমুকাল—উচ্চ পােতর উপর নির্মিত -সুন্দর-কারু-কাৰ্য-বিশিষ্ট পাথরের দ্বিজ গৃহ। ভিতরে প্রশস্ত পরিচ্ছন্ন প্রাঙ্গন—প্রাঙ্গনের চারি পার্শ্বে মিলান ঘর। প্রত্যেক প্রকোষ্ঠের সম্মুখে দরদালান ও পশ্চাতে রন্ধন করিবার স্থান আছে। সূৰ্য্যমল বাবুর তত্রস্থ কর্মচারী আমাদিগকে একটী প্রকোষ্ঠ খুলিয়া দিল—কিন্তু উহা আমাদিগের পছন্দ হইল না— কারণ উহাতে কোনও জানালা নাই—কেবলমাত্র একটী দরজা আছে—এবং উহাই বায়ু ও আলােক প্রবেশের একমাত্র পথ। নিম্নতলে সমুদায় প্রকোষ্ঠই তদ্রুপ। দ্বিতলে যাইয়া দেখিলাম যে, তথাকার প্রকোষ্ঠগুলি প্রশস্ত-জানালা দরজা আছে—ছাদ হইতে গঙ্গাদর্শন হয়। কিন্তু সে সময়ে উপরকার সমস্ত ঘরগুলিই কয়েক জন বাঙ্গালী বাবু সপরিবারে দখল করিয়া অবস্থান করিতে ছিলেন'; সুতরাং আমরা বাধ্য হইয়া অন্যত্র বাসা করিব, মুনঃস্থ [ ৮৪ ) করিলাম। যে কয়েক জন বাঙ্গালী বাবু সেখানে ছিলেন, তাহা- দিগের নিকট বাসার অনুসন্ধান করায় তাহারা বলিলেন যে, যদিও তাঁহারা হরিদ্বারে দুই সপ্তাহ রহিয়াছেন, তথাপি সূৰ্যমল বাবুর ধৰ্ম্মশালা ব্যতীত অন্য কোন্ স্থানে যাত্রীরা বাসা পাইতে পারে কিনা সে সংবাদ তাহারা রাখেন না। আমরা কি করিব-কাহাকে জিজ্ঞাসা করিলে বাসার সন্ধান পাইব, এইরূপ ভাবিতেছি-এমন সময় এক পাণ্ডাজী আসিয়া আমাদিগকে সম্ভাষণ করিয়া নাম ধাম ইত্যাদি জিজ্ঞাসা করিতে লাগিল—আমরাও তাহাকে দেখিয়া, তাহার নিকট স্থানীয় সমস্ত সন্ধান পাইতে পারিব ভাবিয়া একটু আশ্বস্ত হইলাম। যাহা হউক, অতি অল্পক্ষণ আলাপ পরিচয়ের পরই পাণ্ডাজী তাঁহার চিরপ্রসিদ্ধ খাতার, সাহায্যে স্থির করিয়া দিলেন যে, তিনি এবং তাহার পূর্বপুরুষই আমাদিগের পূর্বপুরুষের হরিদ্বারস্থ পাণ্ডা। সুতরাং তাহার সহিত বাস অনুসন্ধানে বহির্গত হইলাম। যত বাটীই দেখিলাম, সকলগুলিই বাসের অনুপযােগী কেবলমাত্র তীর্থস্থানে আসিয়া দুই এক দিন কষ্টসৃষ্ট্যা কাটাইবার মত--কোনগুলির একেবারে জানালা দরজার কপাটই নাই—কোনটীর বা কেবল একটীমাত্র দরজা আছে— কোনটীর বা জারিকাটা গবাক্ষমাত্র আছে। অনেক অনুসন্ধান করিয়া পাণ্ডাজীর সাহায্যে ব্ৰহ্মকুণ্ডের উপর প্রত্যহ ২, টাকা ভাড়া দিয়া একটী প্রকোষ্ঠ স্থির করিলাম। অনেকগুলি জানালা ও দরজা আছে; বিশেষতঃ জানালা খুলিলেই তুষারাবৃত ধবলগিরি নয়নগােচর হইত বলিয়া হৃদয়ে বড়ই আনন্দ- সঞ্চার হইত। বাস্তবিক সে স্থানের পুনরাবর্তী দৃশ্য বড়ই রমণীয় । সে প্রকোষ্ঠীর
[ ৮৫ ]
নিম্নে সরিদ্বরা গঙ্গা–পর পারে অনন্ত পর্বতমালা-
* "hills that rise in air
In a horizon limpid, scattered graud,
Gird it in part, like a transparent band,”+
।
-তাহার পশ্চাতে ধবলগিরির রজতকিরীট বড়ই সুন্দর
দেখাইত। আমাদিগের বাসা অনুসন্ধান করিতে প্রায় চারিটা
বাজিয়া গেল, সুতরাং সেদিনকার মত বিশ্রাম করিলাম। পাণ্ডাজী
আমাদিগের বাসায় খাটিয়া কম্বল সতরঞ্চী চেয়ার প্রভৃতি আনাইয়া
দিল, এবং আহারের আয়ােজনাদি করিয়া দিল—বস্তুতঃ সে
ব্যক্তি এত পরিশ্রমপূর্বক, আমাদিগকে স্বচ্ছন্দে রাখিবার
চেষ্টা করিতে লাগিল যে, ঙ্খন আমাদিগের বন্ধুকথিত পাণ্ডার
উপদ্রবের কথা নিতান্ত অলীক বলিয়া মনে হইল। বলিতে কি,
আমরা যে কয়দিন সেখানে ছিলাম, পাণ্ডা সে কয়দিনই এরূপ
কষ্টস্বীকার করিয়া যত্ন করিত যে, প্রত্যাবর্তনকালে আমাদিগের
প্রদত্ত দক্ষিণা তাহার উপযুক্ত পারিশ্রমিক বলিয়া আমরা মনে
করি নাই, কিন্তু পাণ্ডাজী সেই যৎকিঞ্চিৎই যথেষ্ট বলিয়া সন্তোষ
প্রকাশ করিয়াছিল। আমরা দখিলাম যে, তীর্থযাত্রিগণের
পাণ্ডারাই চক্ষুঃস্বরূপ। অবশ্য মন্দ বা প্রবঞ্চক পাণ্ডা যে নাই,
এরূপ নহে—তবে তাহারা আপনাদের যজমানকে, বিশেষতঃ
শিক্ষিত যজমানকে প্রতারিত করিতে চেষ্টা করে না।
FA Sheaf gleaned in French Fields by Toru Dutt (published by
Messrs C. Kegau Paul & Co., London) pp. 298-99.
[ ৮৬ ] যাইলাম। তাহার পরদিন প্রভাতে আমরা ব্ৰহ্মকুণ্ডে স্নান করিতে এই ব্ৰহ্মকুণ্ডের অপর একটী নাম ব্ৰহ্মকুণ্ড। ‘হ-কি-পেড়ি ঘাট ; কেহ কেহ ‘হরি-কি-চরণ’ ঘাট বলে। এই ঘাটের উচ্চ প্রাচীরে হরিচরণাঙ্কিত একটী প্রস্তর প্রােথিত আছে। কথিত আছে যে, প্রকৃত প্রস্তরখানি জলমধ্যে অদৃশ্য হইয়া গিয়াছে। এই প্রসিদ্ধ তীর্থের অতি সন্নিকটে গঙ্গাদ্বারের মন্দির প্রতিষ্ঠিত। কুম্ভ মেলার সময় এই ঘাটে স্নান প্রশস্ত। গত কুন্তে প্রায় পাঁচ ছয় লক্ষ সাধু-সন্ন্যাসী সমবেত হইয়াছিলেন। সাধু-সন্ন্যাসীদিগের মধ্যে যিনি সর্বশ্রেষ্ঠ বলিয়া খ্যাত, তিনি সর্বপ্রথমে এই ব্ৰহ্মকুণ্ডে স্নান করিলে পর অপর সকলে স্নান করিতে পান। এই স্নানের অধিকার লইয়া পূর্বে ভয়ানক দাঙ্গা হাঙ্গামা হইয়া গিয়াছে। কুম্ভে গােস্বামীদিগের সংখ্যাই অধিক হয়। বৈরাগীর সংখ্যা নিতান্ত অল্প হয়। ১৭৬০ খৃষ্টাব্দের কুম্ভে গােস্বামী ও বৈরাগী দলে ঘােরতর বিবাদ হয়। সেই বিবাদে প্রায় ১৮০০ শত লােক হত হইয়াছিল। আর এক- বার ১৭৯৫ খৃষ্টাব্দে শিখদিগের সহিত গােস্বামীদিগের কলহে ৫০০ শত গােস্বামী বিনষ্ট হইয়াছিল । দেশ বিদেশ হইতে বহুতর যাত্রী আসিয়া এই ঘাটে মৃতস্বজন- বর্গের চিতাভস্ম, অস্থি প্রভৃতি, টাকা, সিকি, দুআনি বা পয়সার সহিত নিক্ষেপ করে। এমন কি, যাঁহারা স্বয়ং আসিয়া বা কোনও লােকদ্বারা মৃত আত্মীয়ের ভস্মাদি নিক্ষেপ করিতে অসমর্থ হয়েন, তাহারা ডাকযােগে স্ব স্ব পাণ্ডাকে উহা প্রেরণ করেন— পাণ্ডারা আসিয়া তাহা জাহুবীর পূত-সলিলে নিক্ষেপ করিয়া
হবিদার।
শ
• %%
1st
ব্ৰহ্মকুও ঘাট
No text on this page.
[ ৮৭ ] D প্রেতাত্মার মঙ্গলসাধন করে। অনেক দুঃখী লােক এই সমুদায় জলমধ্যস্থ কঙ্কালরাশি হইতে টাকা পয়সা বাছিয়া লইয়া জীবিকা- নির্বাহ করে। এখানকার গঙ্গায়, বিশেষতঃ এই কুণ্ডমধ্যে নানাবিধ বৃহৎ বৃহৎ মৎস্য অহরহঃ বিচরণ করে। হরিদ্বারে প্রাণিহত্যা নিষেধ বলিয়া কেহই ঐ সকল মৎস্য ধরে না; সুতরাং খৈ, মুড়ি প্রভৃতি খাদ্যদ্রব্য প্রদান করিলে যখন তাহারা ঝাঁকে ঝাঁকে নিকটে আসিয়া উহা নির্ভয়ে আহার করে তখন সে দৃশ্য দেখিতে বড়ই আনন্দ হয়। আমরা ব্ৰহ্মকুণ্ডে স্নান করিয়া কুশাধৰ্ত্ত ঘাটে পুনরায় স্নান কুশাবৰ্ত্ত ঘাট। করিতে গেলাম। এই পবিত্র তীর্থে শ্রাদ্ধাদি পিতৃ- কাৰ্য প্রশস্ত বলিয়া, দেখিলাম, ধনী দরিদ্র আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা শত শত নর-নারী তথায় শ্রাদ্ধাদি সম্পাদন করিতেছে ; বিরাম নাই— এক দল উঠিয়া যাইতেছে—আবার আর এক দল আসিতেছে। যাহারা উঠিয়া যাইতেছেন, তঁাহারা যথাসাধ্য দান করিতেছেন— কেহ তণ্ডুল বিলাইতেছেন, কেহ অর্থ দিতেছেন, কেহ বা গাত্রবস্ত্র বিতরণ করিতেছেন-কেহ বা নানাবিধ মিষ্টান্ন দিতেছেন দৃশ্য দেখিতে অতি সুন্দর মনে হইল, যেন দয়া মূর্তিমতী হইয়া হরিদ্বারে বিরাজ করিতেছেন। এই কুশাবৰ্ত্ত ঘাটে স্রোত বড়ই প্রবল। ঘাটের সােপানাবলীর । সহিত লৌহ-শিকল সংযুক্ত আছে—তাহা অবলম্বন করিয়াও স্নান করা দুরূহ। অতি কষ্টে পা দৃঢ় করিয়া রাখা যায়—একবার শিকল ছাড়িয়া দিয় অবগাহন করিলে যে কোথায় ভাসাইয়া লইয়া সে ।
[ ৮৮ ] স' থ। যাইবে, তাহার স্থিরতা নাই। এই স্থানে গঙ্গার পরিসর এক মাইলেরও কিঞ্চিৎ অধিক হইবে। আমরা এই তীর্থে স্নানাদি করিয়া সর্বনাথ দেবের মন্দির দর্শন করিতে যাই- লাম। শতচূড়শশাভিত মন্দিরটী অতি সুন্দর একটী বিস্তৃত প্রাঙ্গণের মধ্যে অবস্থিত ;-মধ্যস্থলে দেবাদিদেবের লিঙ্গমূর্তি বিরাজিত—অঙ্গনের চতুর্দিকে দ্বিতল গৃহ। প্রত্নতত্ত্ববিৎ কনিংহ্যাম্ বলেন যে, তিনি এই সর্বনাথ দেবের মন্দির-সান্নিধ্যে একটী পুরাতন দুর্গের ভগ্নস্তুপ, কতকগুলি নষ্ট- প্রায় পুত্তলিকা ও নানাবিধ পুরাতন মুদ্রা প্রাপ্ত হইয়াছিলেন, এবং অনুসন্ধানে উহা বেন রাজার দুর্গ বলিয়া অবধারিত করিয়ছিলেন। আমরা সর্বনাথ দেবের পূজাদি'করিয়া মায়াদেবী দর্শন করিতে মায়াদেবী। চলিলাম।' মায়াদেবীর মন্দির ভগ্নপ্রায়—-চারি দিকে জঙ্গল--আর ভয় অট্টালিকার ইষ্টকস্তুপ। এই মন্দির অতি প্রাচীন বলিয়া বােধ হইল। ' দেবীর মূর্তি সিন্দরের প্রলেপে আবৃত, সুতরাং আকৃতি ভাল বুঝিতে পারিলাম । পাণ্ডাজী বলিল যে, দেবীর তিন মস্তক, ঢারি হস্ত। হস্তে অভয় প্রদান করিতেছেন, অপর হস্তে নৃমুণ্ড ধারণ করিয়া আছেন, তৃতীয় হস্তে চক্র, এবং চতুর্থ হস্তে ত্রিশূল বিদ্যমান আছে। কনিংহাম সাহেবও এই প্রকার বর্ণনা করিয়াছেন। তিনি মন্দিরের দ্বারে খােদিত শিলালিপি দৃষ্টে অনুমান করেন যে, খৃষ্টীয় দশম বা একাদশ শতাব্দীতে এই মন্দির নির্মিত হয় * আমরা --- *"From the remains of an inscription over the doorway I think Ithe temple of Miyu Davi] may be as old as 10th or 11th century"- Cunningham's Archæological Survey of India, Vol. II, page 233. . {
[ ৮৯ ]
রাজপথ।
এই শিলালিপি দেখিতে পাই নাই—দেখিতে পাইলেও বুঝিতে
পারিতাম না।
কনিংহাম সাহেব লিখিয়াছেন যে, এই মায়াদেবীর মন্দিরের
অনতিদূরে নারায়ণশিল ও ভৈরব দেবের দুইটী পুরাতন মন্দির
আছে।
আমরা এই দেবালয় দুইটী দেখি নাই—সুতরাং বর্ণনা
করিতে পারিলাম না।
মায়াদেবীর মন্দির দর্শন করিয়া আমরা বাসায় ফিরিলাম।
ফিরিবার সময় বাজারের মধ্য দিয়া আসিয়াছিলাম ।
হরিদ্বারে দুইটীমাত্র রাস্তা আছে--একটী স্টেসন
হইতে সূৰ্য্যমল বাবুর ধর্মশালার সম্মুখ দিয়া উত্তর মুখে গিয়াছে—
অপরটী বাজারের মধ্য দিয়া খালের নিকট প্রাগুক্ত রাস্তায় আসিয়া
মিশিয়াছে।
এখানে বলিয়া রাখি য়ে, ষ্টেসনের রাস্তাই বরাবর
কনখল পর্যন্ত গিয়াছে। বাজারের মধ্য দিয়া যে রাস্তা গিয়াছে
উহা পাথর দিয়া বাঁধন ; পথের উভয় পার্শ্বে চারি পাঁচ তলা বাটী।
বাটীর নীচের বরগুলি দোকান ও অন্যান্য প্রকোষ্ঠে যাত্রীরা
থাকে। বাজারে দেখিলাম, সকল প্রকার দ্রব্যই
বিক্রয়ার্থ রহিয়াছে। সাধারণতঃ যাহা কিছু আবশ্যক
হয়, তাহা সমস্তই পাওয়া যায়। দুগ্ধ ও ধৃত বেশ সুলভ ও উত্তম
পাওয়া যায় ; কেবল মৎস্য ও মাংসের ক্রয় বিক্রয় দেখিলাম না।
শুনিলাম, বৎসরান্তে এখানে পশুবিক্রয়ার্থ একটী মেলা বসে—
নানা স্থান হইতে, এমন কি, পঞ্জাব ও পেশােয়ার হইতে অশ্ব ও
উষ্ট বিক্রয়ার্থ আসিয়া থাকে। আমরা বাজার দেখিয়া বাসায়
আসিয়া আহারাদি সমাপন করিলাম। এখানকার শীতল ও সুস্বাদু।
বাজার।
[ ৯০ । গঙ্গাজল পান করিয়া শরীরের সমস্ত ক্লান্তি দূর হইল। বৈকালে আমরা ‘ভীমঘােড়া’ দেখিতে যাইলাম। শিবালিকের একটী কন্দরে ভীমার্জুন প্রভৃতি পঞ্চ ভ্রাতার ভীমঘােড়। মূর্তি আছে। প্রবাদ আছে যে, মহাবলশালী ভীম সেনের অশ্বের ক্ষুর লাগিয়া পর্বতগাত্রে ঐ গহ্বর হইয়া যায় । এই গহ্বরের ঠিক নিম্নে একটী ক্ষুদ্র উৎস পর্বতগাত্রস্থ ক্ষুদ্র ছিদ্রমধ্য হইতে বহির্গত হইয়া তৎসমীপবর্তী কুণ্ডে পতিত হইতেছে ও সেই কুণ্ড হইতে একটী প্রণালী দ্বারা সেই জল গঙ্গায় প্রবাহিত হইতেছে। পাণ্ডারা ঐ জলনির্গমের স্থানকে গঙ্গানির্গমের দ্বার বলিয়া দেখাইয়া যাত্রীদিগের নিকট হইতে বেশ দুই টাকা উপার্জন করে। ভীমঘােড়া দেখিয়া ভামরা দশাবতারের মন্দিরে প্রবেশ দশাবতারের করিলাম। এই মন্দিরটা ঠিক জাহুবীকূলে স্থাপিত। মন্দির। ইহার অভ্যন্তরে শ্রীকৃষ্ণের দশাবতারের দশটী প্রস্তর-বিনির্মিত মূৰ্ত্তি বিরাজমান। এখান হইতে আমরা শিবালিক-গহবরস্থিত কালিকাদেবীর মূর্তি দর্শন করিয়া বিশ্বকেশ্বর মহাদেব দর্শন করিতে বিকেশ্বর। যাইলাম। এই মন্দিরটী মায়াদেবীর মন্দিরের সন্নিহিত-রাজপথের কিছুদূরে জঙ্গলের ভিতর শিবালিকের একটী শিখরে সংস্থাপিত। মন্দিরটী যে পুরাতন সে বিষয়ে সন্দেহ হইল না। মন্দিরপার্শ্বে একটী বিল্ববৃক্ষ আছে—বােধ হয় সেই জন্যই ইহার বিশ্বকেশ্বর নাম হইয়াছে। যাহা হউক, আমরা বিশ্বকেশ্বর দর্শন করিয়া বাসায় ফিরিয়া আসিলাম। . ।
[ ১১ 1 কনখল। নহে। পরদিন প্রভাতে উঠিয়া আমরা কখলে যাত্রা করিলাম। হরিদ্বার হইতে কনখল প্রায় দুই মাইল। হরিদ্বারে যেমন দুইটী বৈ আর রাস্তা নাই—কখলে সেরূপ হরিদ্বারে মায়াদেবীর মন্দির ব্যতীত আর সমস্তই আধুনিক বলিয়া বােধ হয়—কিন্তু কখলের ঘর বাটী, মন্দির, রাস্তা, দেখিবামাত্র প্রাচীন বলিয়া বুঝা যায়। মহাভারতাদিতেও কনখলের উল্লেখ দৃষ্ট হয় *। প্রবাদ, কনখল প্রজাপতি দক্ষের রাজধানী ছিল। সেকালে যে কনখল নিশ্চয়ই দ্রষ্টব্যের মধ্যে পরিগণিত হইত, তাহাতে আর সন্দেহ নাই। মহাকবি কালিদাসের মেঘদূতে যক্ষ মেঘকে অলকায় যাইবারপথে দৃশ্যাবলীর নির্দেশ- কালে বলিতেছেন যে, তস্মাগচ্ছের কনখলং শৈলরাজাবতীৰ্ণাং জয়াঃ কন্যাং সগরতনয়স্বৰ্গসােপানপঙক্তিম্। গৌরীব কুটিরচনাং যা বিহস্তেব ফেনৈঃ শন্তোঃ কেশগ্রহণমকররাদিন্দুলগ্নোশ্মিহস্তা।” এই প্রাচীন নগরীর শ্রেষ্ঠতম তীর্থ দক্ষেশ্বর মহাদেব ও সতীকুণ্ড। যে স্থানে মহামায়া আদ্যাশক্তি সতী সতাকুণ্ড। দেবী পতি-নিন্দা-শ্রবণে দেহত্যাগ করিয়াছিলেন— সেই স্থানই সতীকুণ্ড। পাণ্ডারা উত্তমরূপ দক্ষিণ প্রাপ্ত হইলে দক্ষের ও * “সনৎকুমারঃ কোরব্য! পুণ্যং কনখলং তথা। পৰ্বতস্য পুরুনাম যত্ৰ জাতঃ পুরূরবঃ ॥”--মহাভারত। • “তীর্থং কনখলং নাম গঙ্গাঘারেস্তি পাবনম্।” -কথাসরিৎসাগর।
৫
[ ৯২ ]
সেই কুণ্ডমধ্যে হােম করিতে দেয়। এই সতীকুণ্ডের সমীপে
দক্ষেশ্বর মহাদেব। যে মন্দিরে দক্ষেশ্বর বিরাজ করিতেছেন, তাহা
উচ্চচুড় এক প্রকাণ্ড বটবৃক্ষের শাখার ভারে ভাঙ্গিয়া গিয়াছিল,
এখন পুনরায় মেরামত হইয়াছে।
কনখলের গঙ্গা নীলধারা নামে অভিহিত হয়। এই নীলধারা
গঙ্গায় অবগাহন
বিশেষ
প্রশস্ত। মহাভারতের
নীলধারা।
বনপর্বে লিখিত আছেঃ-
* বিশেষে বৈ কনখলে ৩াগে পরমং মহৎ।
যত্রাকার্যাশতং কৃত্বা কৃতং গঙ্গাবসেচনম্ ।
সৰ্ব্বং তৎ তস্য গঙ্গাপাে দহত্যগ্নিরিবেন্ধন।”
নীলধারার তীরে বহুসংখ্যক উদ্যান। সেই সকল উদ্যান
হইতে সােপানাবলী জলে নামিয়াছে। প্রত্যেক উদ্যানে এক
একটী করিয়া দেব মন্দির আছে—প্রত্যেক মন্দিরই অতি সুন্দর ও
নানাবিধ কারুকার্যবিশিষ্ট। হরিদ্বারের ন্যায় এই সকল মন্দির
বা ঘাট জনাকীর্ণ নহে। দূর হইতে এই শান্ত পবিত্র চিত্র বড়
হৃদয়গ্রাহী—বড় নয়নপ্রীতিকর—মনে হয়, যেন চির শান্তি
এখানে নিয়ত বিরাজ করিতেছে।
ভাগীরথীর অপর কূলে চণ্ডী পাহাড়। এই পাহাড়ের শিখর,
দেশে একটী দেবালয় আছে ইহাই চণ্ডী দেবীর
চণ্ডী পাহাড়। মন্দির। কথিত আছে যে, এই স্থানে পূর্বে মহা-
একটী ত্রিশূল ছিল--এখন ঝড়ে পড়িয়া গিয়াছে।
[ ৯৩ ]
কনখল ও হরিদ্বার লইয়া এখানে একটী মিউনিসিপালিটি
মিউনি স্থাপিত হইয়াছে। হরিদ্বার ও কনখল অতি প্রাচীন
সিপালিটি। তীর্থ হইলেও পথ ঘাটের দুর্দশা দেখিলে বিস্মিত
হইতে হয়। মিউনিসিপালিটির বন্দোবস্তে এখন রাস্তা ঘাট
কতকটা পরিচ্ছন্ন থাকে, নতুবা মলমূত্রের দুর্গন্ধে পূর্বে গতায়াত
কষ্টকর হইত। হরিদ্বারের ঘর বাটীর অবস্থা অতি শশাচনীয়।
বাটীর নিম্নতল, প্রস্তরনিৰ্মিত, উপরতল ইষ্টকনিৰ্ম্মিত ; কিন্তু
কখলের সমস্ত বাটীই প্রস্তরনির্মিত বাঙ্গালী ভদ্রলােকের
সপরিবারে থাকিবার মত ভাল বাটী একটীও নাই—সমস্ত বাটীই
যাত্রী থাকিবার মত। পাণ্ডারা কেহই হরিদ্বারে থাকে না ;
সকলেই কনখলে বাস করে। কেন যে পাণ্ডারা হরিদ্বারে ভাল
বাটী করে না, তাহা জানি না-বােধ হয় তাহারা স্বয়ং হরিদ্বারে
থাকে না বলিয়া এখানে বাটীর উন্নতিসাধনে মনােযােগী হয় না।
অত্রস্থ মিউনিসিপালিটির অধীনস্থ স্থানের লােকসংখ্যা প্রায়
২০,০০০ হাজার।
জল বায়,
হরিদ্বার বেশ স্বাস্থ্যকর স্থান—কেবল বর্ষাকালে জুরের বড়
প্রকোপ হয়। মেলার সময় পূর্বে ভয়ানক কলেরা
হইত, কিন্তু এখন গভমেন্টের খর দৃষ্টিতে অনেক
কমিয়া গিয়াছে। এখানকার জল অতি সুস্বাদু ও জীর্ণকারী।
যতই আহার করা যাউক না কেন, একবার জাহুবীর নির্মল
সলিল পান করিলেই সমস্ত অচিরে জীর্ণ হইয়া যাইবে
এই ভুবনবিখ্যাত পুরাতন তীর্থের নাম লইয়া একটু গেলযােগ
নাম। [ ৯৪ ] আছে। শৈবেরা বলেন, এই বলেন, এই স্থানের নাম ‘হর-দ্বার’ ; বৈষ্ণবেরা বলেন, হরিদ্বার। মহা- ভারতে ইহা ‘গঙ্গা-দ্বার’ নামে অভিহিত হইয়াছে ৷ আবার কেহ কেহ বলেন যে, এই তীর্থের নাম ‘মায়াপুর ও ইহা “সপ্ত মােক্ষ- দায়িকা” ধামের মধ্যে এক ধাম। আমরা কাশীখণ্ডের সপ্তম অধ্যায়ে দেখিতে পাই যে, এই স্থান হরিদ্বার, গঙ্গাদ্বার ও মায়াপুর এই তিন নামেই প্রথিত ছিল মহাকবি কালিদাস হরিদ্বার, গঙ্গাদ্বার বা মায়াপুরীর কোনও উল্লেখ না করিয়া কেবল কনখলের নাম যে কেন উল্লেখ করিয়াছেন, তাহ' বলা যায় না কিন্তু পূর্বে যে উহা ঐ সকল নামে অভিহিত হইত, তাহা মহা- ভারতাদির শ্লোকদৃষ্টে স্পষ্টই প্রতীয়মান হয়। চীন-পরিব্রাজক হিউএনসাং খৃষ্টীয় সপ্তম শতাব্দীতে এই প্রদেশে ‘ময়ুলাে’ নামক নগরীতে আসিয়াছিলেন বলিয়া উল্লিখিত হয়। কনিংহাম সাহেব এই ‘ময়ূলাে’ ও ‘মায়াপুর’ একই নগর তততা গচ্ছেত ধৰ্ম্মজ্ঞ নমস্কৃত্য মহাগিরি। স্বর্গদ্বারেণ যতুল্যং গঙ্গাদ্বারং ন সংশয়ঃ ॥” --বনপর্ব ৮৪ অধ্যায়। “বিভেদ তরস গঙ্গাং গঙ্গাদ্বারং যুধিষ্ঠির। পুণ্যং তধ্যায়তং রাজন্ ! ব্রহ্মর্ষিগণসেবিতম্ ॥” -বনপর্ব ৯১ অধ্যায়। । “ ততো মায়াপুরীং প্রাপ্ত দুষ্প্রাপাং পাপকারিভিঃ । যত্র সা বৈষ্ণবী মায়া জন্তু পাশৈর্ন পাশয়ে। কেচি চুহরিদ্বারং মােক্ষদ্বারং জগুঃ পরে। গঙ্গাদ্বারঞ্চ কেইপ্যাহুঃ কেচিন্মায়াপুরীং পুনঃ॥” কাশীখণ্ড।
[ ৯৫ ] বলিয়া স্থির করিয়াছেন। এই মায়াপুর বর্তমান হরিদ্বারের কিঞ্চিৎ দক্ষিণে। ময়ুলাে’ অর্থে ময়ূর বুঝায়—বােধ হয় ইহার নিকটবর্তী অরণ্যে বহুসংখ্যক ময়ুর বিচরণ করিত বুলিয়া উহাকে ময়ুরপুর বলিত।অদ্যাপিও ঐ অরণ্যে বিস্তর ময়ুর দেখিতে পাওয়া যায়। ঐতিহাসিক হন্টার,বলেন যে, পূর্বে এই তীর্থের নাম ‘কপিলস্থান ছিল। অন্যান্য প্রত্নতত্ত্ববিদ পণ্ডিতদিগের মত এই যে, হরিদ্বার’ নামটী আধুনিক –কেন না প্রসিদ্ধ মুসলমান লেখক আবু রিহান ও রসি উদ্দীন কেবলমাত্র ‘গঙ্গাদ্বার’ নামেরই উল্লেখ করিয়াছেন । এই সমুদায় নামবিভ্রাটের মীমাংসা করা আমাদের সাধ্যাতীত; তবে আমরা এই পর্যন্ত অনুমান করিতে পারি যে, গঙ্গাদ্বার, কপিলান ও হরিদ্বার একই নগরীর বিভিন্ন নামমাত্র। মায়াপুর হরিদ্বার হইতে পৃথক্ হইলেও এখন সমস্ত স্থানটী হরিদ্বার নামে অভিহিত হয়। এই পুণ্যতীর্থে যিনি ত্রিরাত্র বাস করিয়া জাবীর পূতসলিলে স্নাম করেন তাহার অশ্বমেধ যজ্ঞের ফললাভ হয় ; তিনি অশেষ পাপরাশি হইতে বিমুক্ত হইয়া পরকালে অক্ষয় স্বর্গবাসসুখে অধিকারী হয়েন। মহাভারতে লিখিত আছেঃ- গঙ্গাদ্বারে কুশাবৰ্তে বিশ্বকে নীলপৰ্বতে। তথা কনখলে স্নাত্বা ধূতপাখা দিবং ব্ৰজেৎ ॥” ততঃ কনখলে স্নাত্বা ত্রিরাতত্রাপােষিতে নরঃ। অশ্বমেধমবাপ্পেতি স্বর্গলােকঞ্চ বিন্দতি ॥” হরিদ্বারের গঙ্গাতীরের দৃশ্য বড়ই হৃদয়গ্রাহী। প্রাতঃকাল হইতে সন্ধ্যা পর্যন্ত কেবল অবিরাম ধৰ্ম্মকর্মের স্রোত বহিতে থাকে। কাহারও অন্য চিন্তা নাই- মাহাত্ম্য। ৫ গঙ্গাতীরের দৃশ্য।
[ ৯৬ ] তাহার অবসরও নাই। সকলেই * বগলের কৰ্ম্মে অবহিত। কত অসংখ্য নর-নারী দলে দলে তা । বিষ্ণুপাদপ্রসূতা জাহুবীর নিৰ্ম্মল সলিলে অবগাহ ক আজন্ম-সঞ্চিত-পাপরাশি বিধৌত করিতেছে—কত ভক্ত চ সেই পূত-সলিলে দণ্ডায়মান থাকিয়া যুক্তকরে সুস্বরে : পাঠ করিতেছেন -কত দানবীর দীন। দরিদ্র ভিক্ষুকদিগ. আহাৰ্য্য পরিধেয় বা অর্থ দান করিতেছেন- কোথাও শ্রাদ্ধ?দি পিতৃকার্য সম্পাদিত হইতেছে, কোথা, সাধুসন্নাসীদিগের ভোজনের আয়ােজন হইতেছে—কোথাও কোনও যােগিবর ধর্মোপদেশ দিতেছেন—আর অগণিত-নর-নারী গলগ্নীকৃতবাসে শ্রবণ করিতেছে—এই সকল দেখিয়া প্রাচীন ভারতের হিন্দুজাতির পূর্বকথা হৃদয়ে জাগিয়া উঠে। সায়ংকালে যখন ভাগীরথীর নির্মাল সলিলে অসংখ্য দীপাবলী সান্ধ্য-তারার ন্যায় প্রতিভাতহয়, যখন গঙ্গাদেবীর আরত্রিক-কালীন সহস্র কণ্ঠোথিত নানাযন্ত্রসম্মিলিত স্তবধ্বনিতে আকাশমণ্ডল পরিপ্লত হয় —যখন ভাগীরথীতীরবাসী শরীরবদ্ধ বৈরাগ্যসদৃশ, জটাজুটসমাযুক্ত, বিভূতি-ভূষিত, সদ্যোহুত হােমকুণ্ডের সম্মুখে একপদে দণ্ডায়মান সাধুমণ্ডলীর শঙ্খধ্বনি পর্বতে পর্বতে প্রতিধ্বনিত হতে থাকে —তখন দুঃখশােকময় সংসারের অস্তিত্ব বিস্মৃত হইতে হয়—তখন বিষয়চিন্তা হৃদয়কন্দর হইতে দূরে পলায়ন করে—তখন ভক্তির পীযূষধারায় পঙ্কিল মন স্বতঃই দ্রব হইয়া দয়াময় শ্রীভগবানের চরণার্চনে জীবনের অবশিষ্টাংশ অতিবাহিত করিতে প্রয়াসী হয়।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.