Jhikira Kedarnath Sadharan Pathagar, Howrah
Sita
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
সর
সীতা
।
অধিকৃত হইয়াছে
যোগীন্দ্রনাথ বসু প্রণীত
}
No text on this page.
পতিতা গ্রন্থাবলী
সীতা
himenarm Kabarnath Satharan Pathane
Jhikil'a Howrah
---
মাইকেল মধুসূদন দত্তের জীবন-চরিত-লেখক
শ্ৰীযােগীন্দ্রনাথ বস্তু বি, এ, প্রণীত।
কলিকাতা
১৩২০।
মূল্য ॥ আনা
উৎকৃষ্ট বাঁধাই • আনা
৯১১২ মেছুয়াবাজার ইট, নববিভাকর প্রসে
শ্রীগােপালচন্দ্র নিয়ােগীর দ্বারা মদ্রিত।
এবং
৩০ নং কর্ণওয়ালিশ ষ্ট্রীট, সংস্কৃত প্রেস ডিপজিটরী হইতে
শ্রী অনুকূলচন্দ্র ঘােষ কর্তৃক প্রকাশিত।
বিজ্ঞাপন। বাঙ্গালা সাহিত্যের বহু অভাবের মধ্যে হিন্দু মহিলার পাঠের উপযােগী আখ্যান-গ্রন্থের অভাব অন্যতম। হিন্দু পারিবারিক জীবনের আদর্শ অক্ষুব্ধ রাখিয়া যাহা যইতে আনন্দ ও উপদেশ লাভ করিতে পারা যায় তাদৃশ আখ্যান-পুস্তক বাঙ্গালা ভাষায় প্রকৃতই বিরল। নিজের শক্তি অনুসারে এই অভাব, কিয়ৎপরিমাণে, মােচনের জন্য আমি ভারতের পতিব্রতা কুলের শীর্ষস্থানীয় কয়েকটা পৌরাণিক মহিলার চরিত্র উপন্যাসাকারে বর্ণন করিয়া পতিব্রতা নামে একখানি পুস্তক প্রকাশ করিয়াছি। তাহার প্রথম ভাগে সতী, শকুন্তলা, দময়ন্তী ও শৈবাদেবীর এবং দ্বিতীয় ভাগে গান্ধারী, সুনীতি, সাবিত্রী ও সীতাদেবীর চরিত্র বিবৃত হইয়াছে। অনেকেই তাহা পাঠ করিয়া প্রীতিপ্রকাশ করিয়াছেন এবং অনধিক কালের মধ্যে প্রথম মুদ্রাঙ্কনের দুই সহস্র পুস্তক নিঃশেষ হওয়ায় সম্প্রতি তাহার দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হইয়াছে। পুস্তকখানি আদৃত হইলেও মুদ্রাঙ্কনের পারিপাট্য ও ত্রিবর্ণের চিত্র-সন্নিবেশ ইত্যাদি কারণে আমি তাহা ইচ্ছানুরূপ সুলভ করিয়া সাধারণের অধিগম্য করিতে পারি নাই। পুস্তকসন্নিবিষ্ট আখ্যান গুলি যখন পরস্পর নিঃসম্বন্ধ তখন তাহাদিগের এক একটী, স্বতন্ত্র ভাবে, অপেক্ষাকৃত অল্পমূল্যে, প্রকাশ করিলে কাহারও অসুবিধা হইবে না বরং অনেকের সুবিধা হইতে পারে এই বিবেচনায় আমি পতিব্রতা দ্বিতীয়ভাগের সীতা আখ্যান বৰ্তমান আকারে প্রকাশ করিলাম। পতিব্রতায় সন্নিবিষ্ট আখ্যানের সহিত কোনও বিষয়ে ইহার পার্থক্য নাই।
মূল রক্ষা
আমার লিখিত আখ্যানে আমি অবিকল মূলের অনুসরণ করি
নাই।
বহু আলােচিত এবং চিরপরিচিত বিষয়কে চিত্তাকর্ষক
করিতে হইলে নূতনত্বের সমাবেশ আবশ্যক; এইজন্য,
করিয়া, আমি, স্থলে স্থলে, নিজের কল্পনার আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছি।
আশা করি তদ্বারা মূল চরিত্রের গৌরবহানি হয় নাই। কালিদাস
ও ভবভূতি হইতে মধুসূদন পর্যন্ত শত শত ভারতীয় মহাজন যে
পথে গমন করিয়াছেন, আমি সেই পথেই গমন করিয়াছি। সুতরাং
আমার এরূপ স্বাতন্ত্র্য অবলম্বন নিন্দনীয় হইবে না বলিয়া সঙ্গত
আশা করিতে পারি।
যে উদ্দেশ্যে সীতা লিখিত হইয়াছে, ইহা তাহার উপযােগী
হইয়াছে বিবেচিত যইলে শ্রম সফল জ্ঞান করিব। ইতি
৩৫ নং গুয়াবাগান লেন,
কলিকাতা ;
শ্রীযােগীন্দ্রনাথ বসু।
১৩২০।
চিত্রসূচী।
বিষয়
পৃষ্ঠা
প্রারম্ভ-পত্র
১। বালিকা সীতাদেবী
২। অশােকবনে রাক্ষসীবেষ্টিত সীতাদেবী
৩। সীতাদেবীর অগ্নিপরীক্ষা
৪। যজ্ঞসভায় সীতাদেবী
৮৮
১১৭
No text on this page.
No text on this page.
7
এক
ব্যাংক তাদেবী
সীত' এরপত্র
Athira Kedarnath Sadharan Jhikira Muvrah Call No সীতা। ১৬ প্রথম পরিচ্ছেদ। ফাত্তনের সুখদোষ্ণ সমীরণের স্পর্শে মিথিলার আম্রকানন মঞ্জরিত হইয়াছে। বৃক্ষে, বৃক্ষে মধুধারা ক্ষরিত হইতেছে এবং মধুগন্ধে আকৃষ্ট মধুপকুলের গুনগুন শব্দে তরুকুঞ্জসমূহ মুখরিত হইয়া উঠিয়াছে। পুষ্পিত কিংশুকতসমূহের রক্তিম আভায় মিথিলার গ্রামান্ত সমুজ্জল, নবােদ্ভিন্ন কিশলয়ে বনস্থল শ্যামায়মান, এবং সুপুষ্ট যবারে ক্ষেত্রসমূহ স্বর্ণাভ। উপবনসমূহ বনমল্লিকার সৌরভে সুরভিত হইতেছে। আকাশ উজ্জ্বল নীল ; দি মণ্ডল কুঙ্কটিকা-শূন্য, কোকিলকুল কুহুরবে পৃথিবীতে বসন্তের আগমন ঘােষণা করিতেছে। ফাত্তনমাস বিবাহের স; তাই মিথিলাবাসীদিগের মধ্যে যাহাদিগের গৃহে বিবাহযােগ্য কুমার, কুমারী আছেন, তাঁহারা, প্রতিবাসিগণের সঙ্গে মিলিত হইয়া, হরগৌরীর বিবাহ-গীতি গান করিতেছেন। গৃহে, গৃহে বৈবাহিক উৎসবের আয়ােজন হইতেছে। কেহ হরিদ্রা, পাটল প্রভৃতি বর্ণে বস্ত্র রঞ্জিত করিতেছে, কেহ লাক্ষারাগ সংগ্রহ করিতেছে, কেহ জাতিফল ও আমলকী চূর্ণ করিতেছে। পুরবাসিনীদিগের ব্যস্ততার সীমা নাই ; কোন চিত্র- কলা-নিপুণা বর্ণ-সংযােগে গৃহদ্বারে ঐরাবতারূঢ়া ইন্দ্র ও শচীর মূর্তি অঙ্কিত করিতেছেন ; কোন চিত্রপ্রিয়া পিষ্টতণ্ডুলজলে বিবাহমণ্ডপে ২ সীতা। এবং নববধূর গৃহ-প্রবেশ-পথে কেতকী ও কদম্ব কুসুম রচনায় নিযুক্ত আছেন, আবার কোন সুপকাৰ্য্য-পারদর্শিনী, সঙ্গিনীগণের সহিত, মােলড়, নির্মাণে ব্যাপৃতা রহিয়াছেন। রন্ধনশালা হইতে তৈয়ঙ্গবীনের গন্ধ চতুর্দিকে প্রসারিত হইতেছে। যে সকল গৃহে বিবাহ-সম্বন্ধ স্থিরীকৃত হইয়া গিয়াছে, তাহা হইতে, মধ্যে মধ্যে, শঙ্খ- ধ্বনি দ্বারা বৈবাহিক উপহার প্রেরণের প্রাপ্তির সংবাদ ঘােষিত হইতেছে। পুরবাসিগণের এই আনন্দ ও উৎসাহ রাজভবনেও লব্ধপ্রসর হইয়াছে। রাজকুটুম্বিনীগণ ভাবিতেছেন, “ফাল্গুন ত আসিয়াছে, আমাদিগের রাজকুমারীর বর কি আসিবেন না ?” রাজা জনক মিথিলারাজ্যের অধিপতি। একদিকে হিমাচলের পাদদেশ, অপর দিকে ভাগীরথী-তীর ; একদিকে গণ্ডক, অপর দিকে কৌষিকী, তাঁর সুবিস্তৃত রাজ্যের সীমা। ঐশ্বর্য্যে ও সৌন্দর্য্যে ভারতভূমিতে তাহার রাজ্যের তুলনা নাই। যাহা কিছু ইন্দ্রিয়ের উপভােগ্য প্রকৃতি তাহা মুক্ত হস্তে দান করিয়া মিথিলার রমণীয়তা সম্পাদন করিয়াছেন। তরুলতা স্নিগ্ধ-শ্যাম মূর্তিতে সম্বৎসর এখানে নয়ন প্রীত করে, বিহগের মধুর সঙ্গীতে এখানে নিরন্তর কর্ণ পরিতুষ্ট হয়, পুষ্পের সৌরভ এখানে একদিনের জন্যও নাসিকার পরিতোষে বিরত থাকে না, এখানকার ফল অমৃতের অপেক্ষাও মধুর আস্বাদনে রসনার তৃপ্তি দেয় এবং নাতিশীতােষ্ণ বায়ু মধুর হিল্লোলে এখানে চিরদিন শরীর স্নিগ্ধ করিয়া রাখে। কিন্তু এই অক্ষয় ভােগ-ভাণ্ডারের মধ্যে বাস করিয়াও রাজা জনক সুখে অনাকৃষ্ট এবং তােগে অনাসক্ত। তাঁহার রাজধানী অমরাবতীর ন্যায় শােভাময়ী, তাহার ভাণ্ডার কুবেরের ভাণ্ডারের ন্যায় রত্নাঢ্য, তাহার উপবন নন্দনকাননের ন্যায় রমণীয়। কিন্তু এই অতুল ঐশ্বর্যের মধ্যে বাস করিয়াও তিনি সংসারে উদাসীন। গৃহশ্রমের প্রথম পরিচ্ছেদ। ত সকল বিষয়েই তাঁহার পুঙ্খানুপুঙ্খ দৃষ্টি, কিন্তু পার্থিব কোন সুখই তাহার চিত্ত অধিকারে সক্ষম নয়। রাজপ্রাসাদে বাস করিয়াও তিনি পােবনবাসী এবং সিংহাসনে আসীন হইয়াও তিনি কুশাসনস্থ। লােকে যখন দেখিত তিনি রাজস্ব-সচিবের সহিত রাজ্যের আয় ব্যয়ের, সান্ধিবৈহিকের সহিত সন্ধি বিগ্রহের এবং প্রাড়বিবাকের সহিত বিচারকার্যের আলােচনা করিতেছেন, তখন তাহার চিত্ত ভগবৎপদারবিন্দধ্যানে মগ্ন থাকিত। অষ্টাবরে ন্যায় বেদ-বেদাঙ্গ- বিৎ ঋষি এবং গার্গীর ন্যায় ব্রহ্মবাদিনী তপস্বিনী আসিয়া তাহার সহিত শাস্ত্রালােচনা করিতেন, আবার তাঁহার ক্ষেত্রপাল আসিয়া তাহার নিকট ব্রীহিযব উৎপাদনে পরামর্শ জিজ্ঞাসা করিত। ধনজনে এবং বিলাসদ্রব্যে পরিবৃত থাকিয়াও সংযমে ও বৈরাগ্যে তিনি ঋষি এবং স্বাধ্যায় ও সাধনে ব্যাপৃত থাকিয়াও বিষয়ভােগে তিনি রাজা ; তাই লােকে তাঁহাকে “রাজর্ষি” এই অনন্যসাধারণ উপাধি দান করিয়াছিল। রাজা জনকের রাজধানী মিথিলানগরীও সর্বাংশে তাঁহার উপযুক্ত ছিল। তাহা এক দিকে বিলাস-সুখের, অপরদিকে বৈরাগ্য- সাধনের উপযােগী উপাদানে পূর্ণ থাকিত। একদিকে ধনিজন- সেবিত অট্টালিকা, অপর দিকে তাপসজনাশ্রিত পর্ণশালা ; এক- দিকে নুপূরসিঞ্জন-মুখরিত সঙ্গীতাগার, অপর দিকে সামগান- ধ্বনিত যজ্ঞভূমি ; এক দিকে বাহাস্কোট-বিকম্পিত মল্লভবন অপর দিকে শান্তিরসাস্পদ দেবালয় মিথিলা-নগরীর শােভাবর্ধন করিত। বিষয়াসক্ত সেখানে আসিয়া দেখিত, পৰ্বতাকার অট্টালিকাসমূহ দণ্ডায়মান, রাজপথ অশ্ব, গজে আকীর্ণ, বিপনী সমূহ বহুমূল্য মণিমুক্তায় এবং রসনাতৃপ্তিকর সুমিষ্ট দ্রব্যে পূর্ণ। আবার তাপসজন সেখানে আসিয়া দেখিতেন, সবােবরতীরে ;
৪ সীতা। যজ্ঞার্থ বেদী নির্মিত হইয়াছে, যুপকাষ্ঠসমূহ প্রােথিত রহিয়াছে, দ্বিগণ তরুতলে সাম গান করিতেছেন এবং স্বয়ং রাজ্যেশ্বর, সিংহাসন পরিত্যাগ পূৰ্ব্বক, গৃহতলে কুশাসনে বসিয়া, কৌপীন- ধারী কোন তপস্বীর সহিত আত্মা ও পরমাত্মার সম্বন্ধ বিচার করিতেছেন। জনককে দেখিয়া অন্যান্য নৃপতিগণ ভাবিতেন, যদি ধনজনাঢ্য,প্রকৃতিরঞ্জক রাজা কেহ থাকেন, তবে সে জনক; আবার তাপসগণ ভাবিতেন, যদি মন্ত্রদ্রষ্টা, ব্রহ্মপরায়ণ ঋষি কেহ থাকেন, তবে সে জনক। তাই লােকে যুগে যুগে ঘােষণা করিয়া আসিতেছে, “যদি সংসার করিতে হয়, তবে রাজা জনকের মত কর।” দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ। • প্রাতঃকালীন হােম সমাপনান্তে, একদিন, রাজা জনক আপনার অগ্নিশরণ-গৃহে উপবিষ্ট আছেন। চতুর্দিকে পঞ্চযজ্ঞের উপকরণ- সমুহ সজ্জিত রহিয়াছে ; ধূপগন্ধে ও নানা জাতীয় পুষ্পের সৌরভে গৃহ আমােদিত হইতেছে ; অল্পক্ষণ পূৰ্ব্বে রাজা যে অগ্নিতে হােম করিয়াছিলেন, তাহা হইতে সুগন্ধি ধূম, কুণ্ডলিত হইয়া, উন্ধে উখিত হইতেছে। রাজা মূর্তিমান ব্ৰহ্মচর্যের ন্যায় লক্ষিত হই তেছেন। তাহার ললাটে, বক্ষে, বাহুতে চন্দন-মিশ্রিত বিভূতিরেখা, এবং কণ্ঠে রুদ্রাক্ষদাম ; তাহার পরিধান শুভ্র কৌষিক বসন। তাহার সম্মুখে, স্বতন্ত্র আসনে, যােগীশ্বর যাজ্ঞবল্ক্য উপবিষ্ট আছেন। তাহার ললাট প্রশস্ত, নাসিকা উন্নত, বর্ণ তপ্তকাঞ্চনের ন্যায় উল ; দেহ ক্ষীণ কিন্তু তপঃপ্রভায় প্রদীপ্ত। ব্ৰহ্মবিদ্যায় তিনিই জনকের উপদেষ্টা। গৃহ নীরব ; রাজা ভক্তিবিনম্রভাবে মহর্ষির বাক্য ৰণ করিতেছেন। মহর্ষি বলিলেন, “বৎস!
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ।
‘অঙ্গুষ্ঠমাত্রঃ পুরুষ। মধ্য আত্মনি তিষ্ঠতি।
ঈশানাে ভূত ভব্যস্য ন ততো বিজুগু্যতে ॥”
“যিনি আত্মার অভ্যন্তরে সূক্ষ্মরূপে বৰ্তমান পরমাত্মার সত্বা
উপলব্ধি করেন, তাহার এই সংস্কার হয় যে, আমি এবং আমার
অন্তরাত্মস্থিত সেই দেব একই। তবে তাঁহার নিকট হৃদয়ের
কোন্ ভাব গােপন করিব, আমার আশঙ্কার বস্তুই বা কি আছে ?
রাজা বলিলেন “সত্য! এই ভেদজ্ঞানেই জীবের বিপদ, কিন্তু
ইহা
দুর করাও ত সহজ নয়।”
মহর্ষি বলিলেন, “তাহাতে সন্দেহ কি ? কিন্তু জীবাত্মাও ত
সামান্য নয় ; বিশ্বাত্মার অংশ, সুতরাং তন্নিবিষ্ট হইলে সকল
জ্ঞানই তাহার লভ্য।” কিয়ৎক্ষণ পরে মহর্ষি বলিলেন, “রাজর্ষি ।
তােমার সহিত আলাপ করিতে বসিলে কথার ত শেষ হয় না।
আমাকে অদ্যই উত্তরাপথে যাত্রা করিতে হইবে। আমি মহিষী
এবং রাজকুমারীদিগকে আশীৰ্বাদ করিয়া যাইব।”
রাজা বলিলেন ; “তাহারা আপনার আগমন-সংবাদ পাইয়া-
ছেন, এখনই আসিবেন।”
* ইহার অনুবাদ যথা :-
অঙ্গুষ্ঠ প্রমাণ হয়ে অতি সূক্ষ্ম তনু মনে,
আত্মার অন্তরে তিনি করেন বিরাজ ;
জাহার শাসন-বলে
চরাচরে সবে চলে,
ভূত, ভাবী, বর্তমানে ব্রহ্মাণ্ডের মাঝ।
তাহার সত্তার জ্ঞান জতে যেই মতিমান্,
আত্ম-সংগােপনে তার বাসনা না হয়;
এই তার হয় মনে
অভিন্নত দুই জনে,
কারে লুকাইব, আর কারেই বা ভয়।
পতিতা-লেখক-কৃত কঠোপনিষদের কবিতাবাদ হইতে উন্নত
সীতা। রাজার কথা শেষ না হইতে হইতেই রাজমহিষী, দুহিতা সীতা- দেবী ও উর্মিলাদেবীকে সঙ্গে লইয়া, গৃহে প্রবেশ করিলেন। রাজকুমারীদিগের রূপপ্রভায় হােমাগ্নিও যেন মলিন হইল। তাঁহাদিগের প্রত্যেক অঙ্গ প্রত্যঙ্গ হইতে যেন লাবণ্য নিঃসৃত হইতেছিল । বসন্ত-সমাগমে পুষ্পিতা লতার ন্যায় উভয়েই নব- যৌবন-সমাগমে শােভাময়ী ; উভয়েরই মুখে বালিকার সরলতার সঙ্গে তরুণীর ব্রীড়া-সঙ্কুচিত ভাব বিরাজমান। মহিষী দুহিতৃগণের সঙ্গে প্রণাম করিলে মহর্ষি তাহাদিগকে নিকটে উপবেশন করিতে আদেশ দিলেন এবং বহুক্ষণ নির্নিমেষ নয়নে রাজকুমারীদিগের মুখ অবলােকন করিয়া মহিষীকে বলিলেন “বৎসে। তােমাকে কি আশীৰ্বাদ করিব তাহাই চিন্তা করিতেছি। তােমার স্বামী সাক্ষাৎ মহেশ্বরতুল্য ; তুমি পাৰ্বতী- সদৃশী; তােমার কন্যা দুইটী লক্ষ্মী, সরস্বতীর অনুরূপা ; আশীৰ্বাদ করি, তােমার নারায়ণ সদৃশ জামাতা লাভ হউক।” রাজা, রাণী একসঙ্গে বলিলেন, “আমরা এই আশীর্বাদ বররূপে গ্রহণ করিলাম।” পরে রাজা মহিষীকে বলিলেন, ‘প্রিয়ে ! শুনিয়াছ, গুরুদেব আমাদিগের মায়া ছিন্ন করিয়া সন্ন্যাশ্রম গ্রহণ করিতেছেন।” মহিষী। “নাথ ! আমি সমস্তই শুনিয়াছি ; আমার দাসী ফেমাকে গতকল্য আশ্রমে পাঠাইয়াছিলাম, সে আসিয়া সমস্ত বলিয়াছে, এবং সেই সঙ্গে ইহাও বলিয়াছে, আৰ্যা মৈত্রেয়ী, আপনার উত্তরচ্ছদ পর্যন্ত ত্যাগ করিয়া, এক বসনে রহিয়াছেন।” রাজা শুনিয়া বিস্ময় সহকারে বলিলেন ; “গুরুদেব! ইহার কারণ কি? মহৰি। “কারণ বলিতেছি; আমি সন্ন্যাসাম গ্রহণের সঙ্কল্প দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ। ৭ করিয়া কাত্যায়নী এবং মৈত্রেয়ী আমার পত্নীদ্বয়কে আহ্বান পূর্বক নিজের অভিপ্রায় জানাইয়া বলিলাম, “আমার অনুপস্থিতিকালে কি জানি তােমাদিগের মধ্যে বিরােধ উপস্থিত হয়, সেইজন্য আমি আমার সর্বস্ব তােমাদিগের মধ্যে বিভাগ করিয়া দিবার ইচ্ছা করিয়াছি। উভয়ে গ্রহণ কর।” রাজা। “তাহার পর।” মহর্ষি। “শুনিয়া কাত্যায়নী কোন উত্তর দিলেন না; কিন্তু মৈত্রেয়ী আমাকে বলিলেন ; “প্রভােআপনি আমাকে যাহা দিতে চাহিতেছেন, তাহা দ্বারা কি আমি অমরতা লাভ করিতে পারিব ?” আমি বলিলাম “প্রিয়ে। পার্থিব বস্তু লইয়া কে কবে অমর হইতে পারিয়াছে ? আমি তােমাকে যাহা দিব, তাহা দ্বারা তােমার গ্রাসাচ্ছাদনের অভাব দূর হইবে মাত্র, কিন্তু তাহার দ্বারা অমরতালাভের সম্ভাবনা কোথায় ? রাজ্ঞী। “শুনিয়া আৰ্য্যা কি বলিলেন।” মহর্ষি । “মৈত্রেয়ী শুনিয়া বলিলেন, “ভগবন্! আমার এই সকল বস্তুতে কিছুমাত্র প্রয়ােজন নাই। আমি যাহার দ্বারা অমরতা লাভ করিতে পারি, আপনি আমাকে তাহাই দান করুন।” এই বলিয়া তিনি আপনার অংশের সমস্ত সম্পত্তি ত্যাগ করি- লেন এবং বিনীতা শিষ্যার ন্যায়, কৃতাঞ্জলিপুটে, আমার উপদেশ শ্রবণের জন্য, উপবেশন করিলেন। আমি তাঁহাকে শুদ্ধাচারা, ধীমতী ও সমাহিতচিত্তা জানিয়া ব্ৰহ্মবিদ্যা দান করিলাম। ইহাই তাহার সর্বস্বত্যাগের ও এক বসন ধারণের কারণ।” রাজকুমারীরা এতক্ষণ মহর্ষির সহিত মাতাপিতার কথােপকথন শ্রবণ করিতেছিলেন, একটা মাত্রও উক্তি করেন নাই। এইবার সীতা। ; মহিষী। “শুনিয়াছি বৈ কি। এই পাপিষ্ঠা মহাতপােবি- কারিণী ; ইহার ভয়ে শত শত ব্রহ্মচারিণী মিথিলায় গমনাগমন ত্যাগ করিয়াছেন।” রাজা। “ইহারই অত্যাচারে মলদ ও করুষ নামক উত্তরােত্তর বর্ধমান দুইটা জনপদ লােকশূন্য হইয়াছে। স্ত্রীজাতি হইলেও তাহার দেহে মত্তহস্তিনীর ন্যায় বল। বৈধব্যের পর হইতে পাপিষ্ঠার অত্যাচার ও দুষ্পবৃত্তি আরও বর্ধিত হইয়াছে ; শুনিতে পাই, যক্ষিণী হইয়াও, সে এখন রাক্ষসীর ন্যায় নরমাংস ভক্ষণ করে। তাহার একটী পুত্র আছে । সেও মাতার প্রকৃতি লাভ করিয়াছে। যেখানেই ঋষিগণ যজ্ঞ আরম্ভ করেন, পাপিষ্ঠ সেখানেই দলবল সহ উপস্থিত হয় এবং রক্ত, মাংস নিক্ষেপ করিয়া যজ্ঞ নষ্ট করে। কিন্তু আপনি রামচন্দ্রের কথা বলিতে বলিতে পাপিষ্ঠা তাড়কার কথা আনিলেন কেন?” মহর্ষি। “কেন ? বলিতেছি ; রামচন্দ্র ও লক্ষ্মণ, কয়েক দিন পূর্বে, মিথিলাগমনের পথে তাড়কার গ্রামে প্রবেশ করিয়া- ছিলেন।” মহৰ্ষি লক্ষ্য করিলেন, শুনিবামাত্র রাজকুমারীদ্বয়ের চক্ষুর তারকা স্থির ও ওষ্ঠাধর স্ফুরিত হইল। মহিষী ব্যগ্রতার সহিত বলিলেন, “তাহার পর। মহর্ষি। “তাহাদিগের আগমন-বার্তা শ্রবণে তাড়কা, অতিমাত্র কুদ্ধ হইয়া, শিলাখণ্ড বর্ষণ করিতে করিতে, তর্জন গর্জন করিয়া, রামচন্দ্রের দিকে ধাবমানা হইল। তাহার পরিধান চিত্র-ব্যাঘ্রের চর্ম, কঠে নরকপালে গ্রথিতমালা, দেহে অস্থিভূষণ ; তাহার কেশজাল তাম্রাভ এবং দেহ রুধিরপঙ্কে লিপ্ত। তাহার ভয়ঙ্করমূর্তি দর্শনে সেখানে যাহারা উপস্থিত ছিল, তাহারা ভয়ে পলায়ন করিল।
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ। ; মহর্ষি বিশ্বামিত্র রাক্ষসীকে যুদ্ধকামা দেখিয়া রামচন্দ্রকে বলিলেন “বৎস! ইহাকে বধ কর”। রামচন্দ্র শুনিয়া অবজ্ঞায় কেবলমাত্র বলিলেন, “ভগবন্! এ যে স্ত্রীজাতি।” নিমেষমাত্রে তাহার নিক্ষিপ্ত শর রাক্ষসীর বক্ষোদেশ বিদীর্ণ করিল ; সঙ্গে সঙ্গে রাক্ষসী, বিকট আৰ্তনাদ করিতে করিতে, ভগ্ন গিরিশৃঙ্গের ন্যায়, ধরাতলে পতিত হইল। রামচন্দ্রের এমনই অব্যর্থ লক্ষ্য, তাহার বাহুতে এমনই অসাধারণ বল যে, তাহার শর দূরবর্তিনী তাড়কার বিপুল দেহ ভেদ করিয়াও আমূল ভূগর্ভে প্রবেশ করিয়াছিল।” রাজমহিষী ও রাজকুমারীদ্বয় দীর্ঘ নিশ্বাস ত্যাগ করিয়া যেন শান্তিবােধ করিলেন। মহিষী বলিলেন, “গুরুদেব । রামচন্দ্রের এই অপূৰ্ব্ব বীরত্ব-কাহিনী শ্রবণে আমাদিগের তৃপ্তি হইতেছে না, তাহার পর কি হইল?” মহষি। “তাহার পর রামচন্দ্র মহর্ষি বিশ্বামিত্রের আশ্রমে গমন করিলেন। আশ্ৰমস্থ ঋষিগণ সেখানে এক মহাযজ্ঞের আয়ােজন করিয়াছিলেন। স্বভাবতঃ যজ্ঞদ্বেষী তাড়কাপুত্র মারীচ, এই সংবাদ পাইয়া, মাতৃহত্যার প্রতিহিংসাচরণের জন্য, আপনার বন্ধু সুবাহু নামক রাক্ষসপতির সঙ্গে, বিপুল রাক্ষস-বাহিনী লইয়া, তামাভ সান্ধ্যমেঘের ন্যায়, যজ্ঞভূমি অবরােধ করিয়া দাঁড়াইল। তাহারা যজ্ঞাগ্নি নির্বাপণের জন্য চতুর্দিক হইতে ধূলি, পাংশু ও প্রস্তরখণ্ড নিক্ষেপ করিতে লাগিল এবং যজ্ঞবেদীর উপর মাংস ও শােণিত- বৃষ্টি আরম্ভ করিল। এক দিকে রামচন্দ্র ও লক্ষণ, অপর দিকে বিপুল রাক্ষসদল ; ঋষিগণ সন্ত্রস্ত হইলেন। কিন্তু সূর্যোদয়ের সঙ্গে কুটিকা যেমন নিরাসিত হয়, তেমনি রামচন্দ্রের অমােঘ শরনিকরে ;
সীতা। রাক্ষসসৈন্য অল্পক্ষণের মধ্যেই বিধ্বস্ত হইল। সুবাহু নিহত হইয়াছে, মারীচ ভগজানু হইয়া পলায়ন করিয়াছে। দলপতিদিগের অবস্থা দেখিয়া অন্যান্য রাক্ষসগণ অরণ্যের মধ্যে যে কে কোথায় অদৃশ্য হইয়াছে, তাহার স্থিরতা নাই। মহর্ষিগণ, প্রীতমনে, যজ্ঞ সমাপন করিয়া, এক্ষণে, রামচন্দ্রকে আশীর্বাদ করিতেছেন এবং মহর্ষি বিশ্বামিত্র তাহাকে দুর্লভ দিব্যাস্ত্রসমূহ দান করিয়াছেন।” রাজকুমারীদ্বয়ের মুখ আননে উজ্জ্বল হইল। কনিষ্ঠা রাজ- কুমারী উর্মিলাদেবী জনককে সম্বােধন করিয়া বলিলেন, “বাবা! রামচন্দ্র মিথিলায় আসিবেন ত ?” রাজা কন্যার প্রশ্নের উদ্দেশ্য বুঝিলেন, ঈষৎ হাস্য করিয়া বলিলেন, “কেন মা?” উৰ্মিলা। “তাহা হইলে তিনি একবার হরধনু পরীক্ষা করিয়া দেখিতেন।” রাজা, কন্যার কথার কোন উত্তর না দিয়া, মহর্ষিকে বলিলেন, “গুরুদেব! রামচন্দ্রে রজোগুণের পরিচয় ত যথেষ্ট পাইলাম ; সত্বগুণের কোন লক্ষণ আছে কি ?” মহর্ষি । “রামচন্দ্রে রজোগুণের অপেক্ষা সত্ত্বগুণেরই প্রাধান্য ; দুই একটা নিদর্শন বলিতেছি। একবার গঙ্গাস্নান উপলক্ষে শৃঙ্গবের- পুরাধিপতি চালরাজ গুহকের সৈন্যের সহিত রাজা দশরথের সৈনিকদিগের মহান সংঘর্ষ হইয়াছিল। অপমানিত চণ্ডালদল, প্রাণপণ করিয়া, যুদ্ধার্থ দণ্ডায়মান হইয়াছিল ; রঘুসৈনিকগণও রােষে ও ঘৃণায়, প্রজ্বলিত অগ্নির ন্যায়, তাহাদিগকে দণ্ড দিবার জন্য ধাবমান হইয়াছিল। কিন্তু পাছে চণ্ডালকে স্পর্শ করিতে হয় এই ভয়ে, কিয়ৎকালের জন্য, যুদ্ধ স্থগিত ছিল। বালক রামচন্দ্র, শুনিতে পাইয়া, একাকী রণক্ষেত্রে উপস্থিত হইলেন এবং অতি মধুর বাক্যে দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ। উভয় দলকে যুদ্ধ হইতে নিরস্ত করিলেন। চণ্ডালরাজ গুহককে মিত্র সম্বােধনে সম্মানিত করিয়া তিনি আলিঙ্গনদানে কৃতার্থ করি- লেন। বৃষ্টিপাতে দাবাগ্নির ন্যায় প্রধুমিত যুদ্ধানল নিৰ্বাণ হইল জনক। “রামচন্দ্র চণ্ডালরাজকে আলিঙ্গন করিয়াছিলেন?” মহর্ষি। “হা! বক্ষে বক্ষে মিলাইয়া নির্ভর আলিঙ্গন করিয়া- ছিলেন। সেই হইতে দুর্ধর্ষ চণ্ডালদল অযযাধ্যারাজের দাসানুদাস হইয়াছে।” মহিষী আননগদগদ স্বরে বলিলেন, “সখী কৌশল্যা ধন্যা যে, এমন সুপুত্র গর্ভে ধারণ করিয়াছিলেন।” মহর্ষি বলিলেন, “রামচন্দ্রের কীর্তিকাহিনী এখনও শেষ হয় নাই, আরও বলিতেছি, শুন। গৌতমপত্নী অহল্যা দীর্ঘকালাবধি মনস্তাপে ও আত্মগ্লানিতে ম্রিয়মানা হইয়াছিলেন। স্বামী, পুত্র কেহই তাহার সংবাদ রাখিতেন না, তিনিও কাহারও সংবাদ লইতেন না। নিজে অপমানিত ও উপেক্ষিত হইয়া তিনি স্নেহ- মমতা-শূন্য পাষাণের ন্যায় জীবনযাপন করিতেছিলেন। রামচন্দ্র, তাহার পূর্ববৃত্তান্ত ও বর্তমান অবস্থা শুনিয়া, তাঁহার আশ্রমে গমন করিয়াছিলেন। মধুর মাতৃসম্বােধনে তিনি তাহার সকল মনস্তাপ দূর করিয়াছেন। বসন্তবায়ুস্পর্শে হিমপাতশীৰ্ণা লতার ন্যায় অহল্যা আবার সঞ্জীবিত হইয়াছেন। মহর্ষি গৌতম তাহাকে আবার আদরে গ্রহণ করিয়াছেন, মরুভূমিতে অমৃতস্রোত প্রবাহিত হইতেছে।” মহষি, কথােপকথন কালে, জ্যেষ্ঠা রাজকুমারী সীতাদেবীকে বিশেষভাবে লক্ষ্য করিতেছিলেন। তাড়কাবধ এবং রাক্ষসযুদ্ধ, গুহককে আলিঙ্গন-দান ও অহল্যা-উদ্ধার শ্রবণে তাঁহার মুখে, পৰ্য্যায়- জমে, যে উদ্বেগ ও শাস্তির, যে উল্লাস ও প্রীতির লক্ষণ সূচিত হইতে- ছিল, তাহা অন্তর্ভেদী দৃষ্টিতে দেখিতেছিলেন। এ দিকে কথােপ- ১৪ সীতা। •• কথনে বেলাও ক্রমে অধিক হইয়াছিল ; মহর্ষি রাজকুমারীদ্বয়কে বলিলেন, “বৎসে সীতে! বৎসে উম্মিলে! আজ আমি তােমাদের গৃহে আতিথ্য-গ্রহণ করিব। দীর্ঘকাল তােমাদিগের প্রস্তুত অন্ন, ব্যঞ্জন ভােজন করি নাই ; উভয়ে কেমন রন্ধন করিতে শিখিয়াছ, আজ দেখাও। কেবল রাজকন্যা সাজিয়া, হীরা, মুক্তা পরিয়া, থাকিলে হইবে না। স্বামী, পুত্রকে, অতিথি, অভ্যাগতকে অন্ন দিতে হইবে যেন স্মরণ থাকে।” রাজকুমারীদ্বয়, লজ্জানমুখে, মহষির এবং মাতাপিতার চরণে প্রণাম করিয়া বিদায় লইলেন। তাঁহাদিগের প্রস্থানের পর মহর্ষি রাজমহিষীকে বলিলেন ; “বৎসে ! সীতার বিবাহ সম্বন্ধে তােমার নিকট আমার প্রতিশ্রুতি আমি বিস্মৃত হই নাই। আমার যাহা করণীয় তাহা আমি করিয়াছি। আমার প্রথম কাৰ্য্য উপযুক্ত পাত্র-সংগ্রহ। মহষি বিশ্বামিত্র আমার অনুরােধ-ক্রমে রামচন্দ্রকে লইয়া মিথিলায় আসিতেছেন। আমি রামচন্দ্রের বাহুবল সম্বন্ধে যাহা জানি, তাহাতে হরধনুভঙ্গ তাহার নিকট বালকের ক্রীড়ামাত্র বলিয়া আমার বােধ হয়। তঁাহার কৃত- কাৰ্যতা সম্বন্ধে:তুমি নিশ্চিন্ত থাকিতে পার । তাহার পর আমার দ্বিতীয় কাৰ্য্য সীতার হৃদয়-পরীক্ষা, তাহাও আমি করিয়াছি। তােমরা উভয়ে দেখিয়াছ কিনা বলিতে পারি না, কিন্তু আমি পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে তাহার মুখের ভাব লক্ষ্য করিয়াছি। তাড়কা-বধ হইতে অহল্যা- উদ্ধার পর্যন্ত রামচন্দ্রের কাৰ্য্য শ্রবণে সীতা মুগ্ধা ; আজ হইতে সীতার জীবন রামময় হইয়াছে ; রাম ভিন্ন আর কেহ তাহার হৃদয় অধিকার করিতে পারিবে না। আমার কাৰ্য শেষ হইয়াছে, আমি অদ্যই উত্তরাপথে যাত্রা করিব। তােমরা উভয়ে নিশ্চিন্ত মনে আমায় বিদায় দাও।”
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ।
মহষি, ক্ষণকালের জন্য নিস্তব্ধ হইয়া, পরে মহিষীকে বলিলেন ;
“বৎসেএকটা কথা জিজ্ঞাসা করি, আমি সীতাকে যােগমার্গে
যে শিক্ষা দিয়াছিলাম, তাহার ফল কি বুঝিতেছ ?”
রাজ্ঞী। “প্রভা। আপনার প্রদত্ত উপদেশ কি কখনও নিস্ফল
হইতে পারে? সীতা, বালিকা হইলেও, যােগাভ্যাসে বয়ােবৃদ্ধাদিগকে
পরাজিতা করিয়াছে। চিত্তবৃত্তির নিরােধে সে যেমন পারদর্শিনী,
বহিঃপ্রকৃতির উপরেও সে তেমনি শক্তিমতী। সমাধিস্থা হইলে
পৃথিবীর সহিত তাহার সম্বন্ধ থাকে না। অগ্নি তখন তাহাকে দগ্ধ
করিতে, বারি তখন তাহাকে সিক্ত করিতে, এবং বায়ু তখন তাহাকে
চালিত করিতে পারে না। তাহার শক্তি দেখিয়া আমরা বিস্মিত
হই। অনিদ্রায়, অনাহারে, শীতাতপে কিছুতেই সীতা কাতরা নয়।”
মহষি বলিলেন “উত্তম! সীতার শিক্ষা তাহার ভবিষ্যৎ
জীবনের উপযুক্তই হইয়াছে।”
রাজ্ঞী। “প্রভাে! আপনার কথার ভাবে বােধ হইতেছে
সীতার ললাটে অনেক ক্লেশ আছে। সীতা কি সুখী হইতে,
পারিবে না ?”
মহর্ষি। “সে কথা জিজ্ঞাসা করিও না; এইমাত্র জানিও
সীতার জন্ম নিজের সুখের জন্য নয়, নারীজাতির কল্যাণের জন্য।
এই যে ধূপ দেখিতেছ, এ নিজে দগ্ধ হইয়াই গৃহ সৌরভপূর্ণ
করিতেছে। সীতা নিজে দগ্ধ হইয়াই জগৎ পবিত্র করিবে।
তােমরা যে এমন কন্যার জনক, জননী তজ্জন্য তােমরাও ধন্য
হইবে।”
রাজদম্পতী ভক্তিভরে মহর্ষির চরণে প্রণাম করিলেন এবং
আহারের জন্য তাহাকে সঙ্গে লইয়া অন্তঃপুরে প্রবেশ করিলেন।
তৃতীয় পরিচ্ছেদ। • মহর্ষির প্রস্থানের পর সপ্তাহ কাল অতীত হইয়াছে। রামচন্দ্র হরধনু ভঙ্গ করিয়াছেন, তাহার সহিত সীতার বিবাহ স্থিরীকৃত হইয়াছে। কেবল সীতার বিবাহ নয় ; লক্ষ্মণের সহিত উৰ্মিলার এবং জনকের কনিষ্ঠ ভ্রাতা কুশধ্বজের কন্যা মাণ্ডবী ও শ্রুত কীর্তির সহিত, যথাক্রমে, ভরত ও শত্রুঘ্নের বিবাহ-সম্বন্ধ স্থির হইয়াছে। দশরথ স্বজনবর্গ সহ মিথিলায় আগমন করিয়াছেন। মিথিলাপুরী উৎসবে পূর্ণ ; পুরবাসীদিগের আনন্দের সীমা নাই । রাজকুমারীগণ রূপে, গুণে পৃথিবীতে অতুলনীয়া ; তাহারা যে উপযুক্ত পাত্রে ন্যস্ত হইতেছেন এই ভাবিয়া মিথিলার আবালবৃদ্ধবনিতা পুলকিত হইয়াছে। লােকের মুখে অন্য কথা নাই, কেবলই রাজকুমারীদিগের বিবাহবাৰ্তা আলােচিত হইতেছে। হরধনুর্ভঙ্গই প্রধান আলােচনার বিষয়। প্রিয়দর্শন, সুকুমার রামচন্দ্র কিরূপে সেই গুরুভার, দুর্জয় ধনু উত্তোলন করিয়া ভগ্ন করিলেন, অনেকে তাহা বুঝিতে পারিতেছে না। কেহ বলিতেছে “মহর্ষি বিশ্বামিত্র ইন্দ্রজাল জানেন, ইহা তাহারই কৌশল।” কেহ বলিতেছে “না! আমাদিগের রাজর্ষি ইন্দ্রজালে মুগ্ধ হইবার ব্যাক্ত নহেন। রামচন্দ্রকে দেখিয়া তাহাকে জামাতা করিবার জন্য রাজর্ষির বড় ইচ্ছা হইয়াছিল, অন্য কাহারও সম্বন্ধে সেরূপ ইচ্ছ হয় নাই। তাহার ন্যায় ব্যক্তির ইচ্ছা কখনও অপূর্ণ থাকিতে পারে না। তাই আমাদের রাজর্ষির পুণ্যবলে রামচন্দ্র হরধনু ভঙ্গ করিয়াছেন।” অপর একজন বলিল, “যাহা স্বাভাবিক নিয়মে হয়, তাহার তৃতীয় পরিচ্ছেদ। ১৭ জন্য ইন্দ্রজাল, পুণ্যবল এ সকলের প্রয়ােজন কি ? রাজর্ষির ও রাজকুমারীর পুণ্যবলে যে রামচন্দ্রের ন্যায় পাত্রের সঙ্গে বিবাহসম্বন্ধ স্থির হইয়াছে তাহাতে সন্দেহ নাই, কিন্তু তােমরা যদি অনাবৃতদেহ রামচন্দ্রকে একবার দেখিতে তবে ইন্দ্রজাল, চন্দ্রজাল এ সকল কথা বলিতে না। সে দিন আমরা তাহাকে স্নানাৰ্থ মন্দাকিনী-সরােবরে আসিতে দেখিয়াছিলাম। কি সুন্দর, সুগঠিত দেহ। পদের অঙ্গুষ্ঠ হইতে মস্তক পর্যন্ত দেখিলে মনে হয়, যেন কোন নিপুণ শিল্পী একখানি নিকষ পাথর খুদিয়া মূর্তি বাহির করিয়াছে। যেমন স্কন্ধ, তেমনই বক্ষ, তেমনই বাহু, তেমনি উরু। আমাদের অস্ত্রাচাৰ্য ব্যহভি রামচন্দ্রকে দেখিয়া বলিয়াছেন যে, তিনি তাহার শােত্তর বৎসর বয়সে ভারতের লক্ষাধিক প্রধান বীরপুরুষকে দেখিয়াছেন, কিন্তু কখনও এমন সৰ্বাঙ্গসবল পুরুষ দেখেন নাই। আনান্তে রামচন্দ্র রাজপথ দিয়া যখন গমন করিতেছিলেন তখন মনে হইতেছিল, যেন শিশু ঐরাবত চলিয়াছে; পদভরে পথ যেন কম্পিত হইতেছিল। এমন পুরুষের পক্ষে ধনুর্ভঙ্গের জন্য কি ইন্দ্রজালের প্রয়ােজন ?” মিথিলার নগরে, পল্লীতে, হাটে, ঘাটে, চত্বরে এইরূপ আলো- চনা চলিতেছিল। আজ বিবাহের দিন; সমগ্র মিথিলাপুরী আজ যেন এক মহা বিবাহ-সভায় পরিণত হইয়াছে। রাজা দশরথ এত অনুযাত্রী সহ আসিয়াছেন এবং রাজা জনকের এত আত্মীয়, কুটুম্ব উপস্থিত হইয়াছেন যে, বিশাল রাজপুরীতেও স্থান হইতেছে না। তাই পুরবাসিগণ নগরের নানা স্থানে বরযাত্রীদিগের উপবেশনের ও আহারের স্থান করিয়াছেন এবং রাজকুটুম্বদিগকে আত্মকুটুম্বের অপেক্ষা অধিক আদরে অভ্যর্থনা করিতেছেন। রাজপুরী হইতে ২ ১৮ সীতা। পরিচারকগণ খাদ্য ও পানীয়ের ভার লইয়া সর্বত্র পরিভ্রমণ করি- তেছে। তাহাদিগের স্কন্ধস্থ পাত্র হইতে উচ্ছলিত দধি, দুগ্ধ ও ঘৃতে রাজপথ পিচ্ছিল হইয়াছে। শর্করা, মােদকলড্ড, ও পান্নে স্থানে স্থানে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্ৰ পৰ্বত হইয়াছে। নিমন্ত্রিতগণের মুখের কথা বাহির হইতে না হইতে পরিচারকগণ প্রয়ােজনীয় দ্রব্য দান করিতেছে। বরযাত্রী ও কন্যাত্রীদিগের মধ্যে তর্ক, বিতর্ক বিবাহের অঙ্গ ; এখানেও তাহার অভাব হইতেছে না। মিিথলা ও অযােধ্যা উভ- ল্পের মধ্যে কোটী অধিক প্রাচীন, সূৰ্য্যবংশ ও চন্দ্রবংশ উভয়ের মধ্যে গুণগৌরবে কোটী শ্রেষ্ঠ এবং ক্ষত্রিয়ের পক্ষে অগ্ন্যাধান প্রভৃতি ব্রাহ্মণণাচিত কৰ্ম্ম সঙ্গত কিনা এইরূপ নানা বিষয়ে তর্ক চলিতেছে। যুবজন উত্তেজনার সহিত নিজ নিজ মত সমর্থন করিতেছেন এবং বাহুবলে তাহার অকাট্যতা প্রদর্শনের প্রয়াস পাইতেছেন। প্রবীণগণ উভয় পক্ষকে বুঝাইয়া নিরন্ত করিতেছেন। এইরূপে মিথিলানগরীর সর্বত্র বিবাহের উৎসব চলিয়াছে। রাজপুরী আলােক-মালায় সজ্জিতা। পত্র, পুষ্প, পল্লবে এবং চিত্র বিচিত্র পতাকায় তাহা অপূর্ব শােভা ধারণ করিয়াছে। পুরীর মধ্যস্থিত অঙ্গনে বহুমূল্য উর্ণা-নির্মিত আসন প্রসারিত হইয়াছে। সপরিজন রাজা দশরথ তথায় উপবিষ্ট আছেন। সাধারণের স্থান হইতে স্বতন্ত্র আসনে বশিষ্ঠ, বামদেব, বিশ্বামিত্র, গৌতম, শতানন্দ প্রভৃতি ঋষিগণ উপবেশন করিয়াছেন। সুবেশা, সুরূপা নর্তকীগণ। নৃত্য এবং সুগায়কগণ মধুর সঙ্গীতালাপ করিতেছে। সভার মধ্য স্থলে পুষ্পদামে সজ্জিত মহামূল্য বরাসন; শ্রীরামচন্দ্র তথায় মনােহর বৈবাহিক বেশে আসীন। তাহার কণ্ঠে গজমুক্তার হার, কর্ণে হীরক- কুল, বাহুতে রজ-খচিত অঙ্গদ, প্রকোষ্ঠে মণিময় লয়। বিবাহ- সভাতেও ক্ষত্রিয়লক্ষণ ধনুর্বাণ তাহার করে বিজিত রহিয়াছে।
তৃতীয় পরিচ্ছেদ। , তঁাহার ললাট শুভ্র চন্দনে চর্চিত, শ্বেত পুষ্পমাল্য তাহার বক্ষোদেশে, শশাভা পাইতেছে। তাহার প্রশান্ত পবিত্র মূর্তি বিবাহবেশে দ্বিগুণ সুন্দর দেখাইতেছে। দশরথ এবং জনক অনিমেষ তাঁহার মুখ দেখিতেছেন, তাঁহাদিগের তৃপ্তিবােধ হইতেছে না ; আনলে তাহা- দিগের বক্ষ স্ফীত হইতেছে। জ্যেষ্ঠানুক্রমে চারিত্রাতার বিবাহ হইবে বলিয়া স্থির হইয়াছিল। প্রথমে রামচন্দ্রের বিবাহ আরম্ভ হইল। শুভলগ্নে উজ্জ্বল বসনভূষণে সজ্জিতা সীতাদেবী বিবাহ- মণ্ডপে প্রবেশ করিলেন। নারীকণ্ঠ-নিঃসৃত উলুধ্বনি, শঙ্খধ্বনি এবং মঙ্গলবাদ্যে রাজপুরী ধ্বনিত হইয়া উঠিল। সীতাদেবীকে দেখিয়া সভাস্থ ব্যক্তিগণের বােধ হইল যেন তাহারা মূর্তিমতী লক্ষ্মী- দেবীকে দর্শন করিলেন। চতুর্দিকে চিত্রকুম্ভ, অঙ্কুর-সমন্বিত শরব, ধুপপাত্র, শঙ্খপাত্র, ধ্রুব, সক, অর্ঘ্য এবং লাজপূর্ণ পাত্র দ্বারা পরিবেষ্টিত, কুশাচ্ছাদিত বেদীমধ্যে সীতাদেবী ও রামচন্দ্র পীঠোপরি উপবেশন করিলেন। স্বয়ং বশিষ্ঠদেব যে বিবাহের বিধানদাতা, তাহা যে কিরূপ সদাচারে সম্পন্ন হইয়াছিল, তাহা বলিবার প্রয়ােজন নাই। রঘুকুলের ও জনককুলের পুরােহিতগণ বেদবিহিত মন্ত্র উচ্চারণ করিতে লাগিলেন। রাজর্ষি জনক রামচন্দ্রকে সম্বােধন করিয়া বলিলেন ; বৎস! ইয়ং সীতা, মম সুতা, সহধর্মচরী তব। প্রতীচ্ছ চৈনাং, ভদ্রং তে, পাণিং গৃহীদ পাণিনা ॥ রামচন্দ্র সীতাদেবীর কর করদ্বারা গ্রহণ করিলেন ; উভয়ের শরীর কণ্টকিত হইল, অঙ্গলি ঘৰ্ম্মে সিক্ত হইল। স্পর্শ-জনিত “এই আমার দুহিতা সীতা ; ইনি অদ্য হইতে তােমার সফর হইলেন। তুমি ইহাকে গ্রহণ কর, কর দ্বারা ইহার কর ধারণ কর, তােমার কল্যাণ হই।
২০ সীতা। সুখ যে কি অপূর্ব উভয়ে তাহা এই প্রথম অনুভব করিলেন। রাম- চন্দ্র সীতাদেবীকে বলিলেন ; বপ্নামি সত্যগ্রন্থিনা মনশ্চ, হৃদয়ঞ্চতে ; যদেং হৃদয়ং তব তদও হৃদয়ং মম ; যদেতৎ হৃদয়ং মম তদস্তু হৃদয়ং তব। বিধাতার অশিীর্বাদে এই মন্ত্র সুসিদ্ধ হইয়াছিল। পৃথিবীতে আর কোন বধুবরের হৃদয় এরূপ ভাবে একীভূত হয় নাই। সেই জন্যই উভয়ে, জীবনে, অন্যের অসহ্য দুঃখ সহ্য করিতে সমর্থ হইয়াছিলেন। উভয়ের চারি চক্ষু মিলিত হইল, উভয়েই ভাবিলেন পৃথিবীর মধ্যে যাহা দর্শনীয় তাহা দেখিলাম ; এতদিনে চক্ষুষ্মত্তা সার্থক হইল। ক্রমে বিবাহ সুসম্পন্ন হইল। অন্যত্র বধূ আকাশে অরুন্ধতী দর্শন করেন, সীতাদেবী শরীরিণী অরুন্ধতীদেবীকে দেখিয়া কৃতার্থ হইলেন। রাজকুটুম্বিনীগণ একবাক্যে বলিলেন রূপে, গুণে, কুলে, শীলে সীতার উপযুক্ত বরই হইয়াছে বটে। শুনিয়া রাজমহিষীর আনন্দের সীমা রহিল না। রামচন্দ্রের বিবাহের পর ভরত, লক্ষ্মণ এবং শত্রুঘ্নের বিবাহ যথাক্রমে মাওবী, উৰ্মিলা এবং শ্রুতকীর্তি দেবীর সহিত সম্পন্ন হইল। আত্মীয় স্বজন সকলেই পরিতােষলাভ • সত্যরূপ গ্রন্নি আমি তোমার হৃদয় ও মনকে বন্ধন করিতেছি। তােমায় যে এই হৃদয় তাহা আমার হউক এবং আমার এই যে হৃদয় তাহা তোমার হা।
চতুর্থ পরিচ্ছেদ। করিলেন; সাধারণ লােক ভূরিভােজনে তৃপ্ত হইল। রাজা জনক কন্যা ও জামাতাদিগকে দাস, দাসী, সুবর্ণ, অশ্ব, গজ এবং ভূমি যােতুক দিলেন। কয়েক দিন মিথিলায় অবস্থানের পর দশরথ পুত্র, পুত্রবধূদিগকে লইয়া আযােধ্যায় প্রত্যাগমন করিলেন। হরধনুর্ভঙ্গ বার্তা শ্রবণে কুপিত, ক্ষত্রিয়কুলান্তক পরশুরাম, অকাল জলদের ন্যায়, তাহার সুখসূৰ্য ক্ষণকালের জন্য আসিয়া আবৃত করিয়াছিলেন, কিন্তু রামচন্দ্রের বিক্রমে পরাজিত হইয়া তিনি স্বস্থানে প্রস্থান করিলেন। বাদ্যোদ্যমে দিত্মমণ্ডল মুখরিত করিয়া দশরথ অযযাধ্যায় উপস্থিত হইলেন। কৌশল্যা, সুমিত্রা, কৈকেয়ী প্রভৃতি রাজ- মহিষীগণ যে কি আনন্দে পুত্র ও পুত্রবধুদিগকে অভ্যর্থনা করিলেন, তাহা বলিবার আবশ্যক করে না। চতুর্বেদী ব্রাহ্মণ যেমন আদরে শাখাসমন্বিত ঋক, যজু, সাম ও অথৰ্ব্ব এই চারিবেদকে গ্রহণ করেন, পুরবাসিগণও তেমনি বধু-দ্বিতীয় রামচন্দ্র, ভরত, লক্ষ্মণ ও শত্রুকে আদরে গ্রহণ করিলেন। চতুর্থ পরিচ্ছেদ। সীতাদেবীর বিবাহের পর ক্রমে দ্বাদশ বৎসর অতীত হইয়াছে। শরৎকালীন জ্যোৎস্না যেমন আকাশ উজ্জ্বল করে, সীতাদেবীর যৌবন-মনােজ্ঞ, পবিত্র মূর্তি তেমনই অযযাধ্যার রাজভবন উজ্জ্বল করিয়াছে। দশরথ এতদিন আত্মহারা হইয়া পুদিগকে ভাল বাসিতেন, এখন পুত্রবধুগণ আসিয়া তাহার হৃদয় অধিকার করিয়া লইয়াছেন। বন্ধুদিগের মধ্যে প্রত্যেকের প্রতি অকপট স্নেহ থাকিলেও সীতাদেবী, নিজগুণে, সর্বাপেক্ষা তাঁহার প্রিয়পাত্রী হইয়াছেন। রামচন্দ্রকে না দেখিলে বরং দশরথ থাকিতে পারেন, २४ সীতা। ; বাসিতেন। দশরথ রামচন্দ্রের পিতা ; কৌশল্যা, সুমিত্রা, কৈকেয়ী রামচন্দ্রের মাতা ; ভরত, লক্ষ্মণ এবং শত্রুঘ্ন রামচন্দ্রের ভ্রাতা; ইহঁ- দিগকেত তিনি ভাল বাসিতেনই, কিন্তু সেই সঙ্গে অযােধ্যার প্রত্যেক নরনারীও তঁাহার ভালবাসার পাত্র ছিল। কারণ তাহারা রামচন্দ্রের প্রজা। তিনি জানিতেন পতিকুলের প্রত্যেককে ভাল না বাসিলে তাঁহার পতিপ্রেমের পূর্ণতা হইতে পারে না। কারণ ইহারাও তাহার পতির অঙ্গ। সীতাদেবী ভাবিতেন, ইহাদিগের সুখের জন্য এবং ইহাদিগের মনােরঞ্জনের জন্য তবে তিনি কোন্ ক্লেশ সহ্য করিতে, কোন্ সুখ বিসর্জন দিতে পরাজুখী হইবেন? পৃথিবীতে যুগে যুগে সতী পতিকে ভাল বাসিয়া আসিতেছেন, কিন্তু সীতার ন্যায় আর কেহ পতির সঙ্গে পতিকুলকে ভাল বাসিতে পারেন নাই। তিনি যে অবনত মস্তকে নির্বাসন-ক্লেশ সহ্য করিয়াছিলেন, তাহার মুল কারণ তাহার পতিভক্তি, কিন্তু সেই সঙ্গে তাহার পতির প্রজাদিগের প্রতি বাৎসল্যও অন্যতম কারণ বটে। এক দিকে পতিকুল সম্বন্ধে এই অনুরাগ, অপর দিকে শৈশবা- র্জিত সংস্কার সীতাদেবীর প্রকৃতি-গঠনে বিশিষ্টরূপ কাৰ্য্য করিয়া- ছিল। রাজা জনক তাঁহাকে শিখাইয়াছিলেন, “সাংসারিক কার্যে পুখানুপুঙ্খরূপ লিপ্ত থাকিলেও কখনও ভগবৎপদারবিন্দ বিস্মৃত হইবে না।” পতিদেবতা সীতা এই উপদেশকে আদর্শ লইয়া ভাবিতেন, পতিকুলের সকলকেই প্রাণমনে ভালবাসলেও, মুহুর্তের জন্য, কখন পতিকে বিস্তৃত হইলে চলিবে না। প্রয়ােজন হইলে তাঁহার জন্য সর্বত্যাগিনী হইতে হইবে। সীতার মনের এই ভাবই, পরে, শ্বশুর, শ, আত্মীয় সকলের মায়া ছিন্ন করিয়া তাহাকে বনগমনােত পতির অনুগামিনী করিয়াছিল। সীতাদেবীর জীবন এইরূপে পরম সুখে অতিবাহিত হইতেছিল।
Jhikira. Howrah dea No Call No চতুর্থ পরিচ্ছেদ। কিন্তু বিধাতার লীলা কে বুঝিতে পারে? যে অগ্নিকুণ্ডের মধ্যে নিক্ষেপ করিয়া সীতারূপ সুবর্ণের বিশুদ্ধি পরীক্ষা করা তাহার অভিপ্রেত ছিল, দিন দিন বিধাতা তাহার ইন্ধন সঞ্চয় করিতে- ছিলেন। অযােধ্যাপুরীর সকলেই রামচন্দ্রের ও সীতাদেবীর গুণে মুগ্ধ ছিলেন। কেবল এক জনের ঈর্ষাকলুষিত কুটিল দৃষ্টি সর্বদা তাহাদিগের উপর পতিত হইত। সে কৈকেয়ীদেবীর পরিচারিকা, নাম মন্থরা। কৈকেয়ীদেবীর শৈশবে সে তাহাকে তাঁহার পিত্রালয়ে পালন করিয়াছিল এবং তাহার বিবাহের পর, অযযাধ্যা পুরীতে আসিয়া, তাহার নিকট বাস করিতেছিল। বিধাতা তাহাকে অতি কুরূপা ও বিকৃতাঙ্গী করিয়াছিলেন। তাহার শরীরের বর্ণ কৃষ্ণ, তাহার দন্তগুলি উচ্চ, ওষ্ঠাধর স্থূল, উদর লম্বিত, এবং পৃষ্ঠে প্রকাণ্ড কুঁজ। তাহাকে দেখিলেই লােকে হাস্য করিত সে হাস্য তাহার মৰ্ম্মে মর্মে গাঁথা থাকিত। ভালবাসা না পাইলে ভাল বাসিতে প্রবৃত্তি হয় না। কাহারও ভালবাসা না পাইয়া এবং সকলের নিকট বিদ্রুপ ও উপহাস লাভ করিয়া মন্থরার হৃদয় শুষ্ক হইয়া গিয়াছিল। কেবল দুইজনের সম্বন্ধে তাহার হৃদয়ের সরসতা নষ্ট হয় নাই। প্রথম কৈকেয়ী, দ্বিতীয় কৈকেয়ীপুত্র ভরত। ইহাদিগের মঙ্গলের জন্য দিবারাত্র তাহার হৃদয় স্নেহে বিগলিত থাকিত ; ইহাদিগের সুখের জন্য সুকৰ্ম্ম, দুষ্কর্ম এমন কিছুই ছিল না, মন্থরা যাহা করিতে কুষ্ঠিত হইত। রামচন্দ্রের ও সীতাদেবীর প্রতি তাহার প্রকৃত ক্রোধ ছিল না ; তাহার আক্রোশ কৌশল্যাদেবীর উপর। কারণ তিনিই কৈকেয়ীর প্রতিদ্বন্দিনী এবং মন্থরার বিবেচনায় তাহার প্রাধান্যের বিঘ্নরূপিণী। কৌশল্যার উপর আক্রোশ হইতে ক্রমে রামচন্ত্রের সীতাদেবীর উপরে তাহার আক্রোশ জন্মিয়া- ২৬ সীতা। ছিল। মন্থরা ভাবিত, “কেকয়রাজ যে এমন বৃদ্ধ বরে আপনার সােণার প্রতিমা কন্যা দিয়াছিলেন সে কিসের জন্য ? কৌশল্যা ও সুমিত্রার সন্তান হইবার আশা নাই ; কৈকেয়ীর গর্ভে যে সন্তান হইবে সেই অযযাধ্যা-রাজ্যের অধীশ্বর হইবে, এই আশায় ত বটে। কিন্তু তাহার কি হইল * বিধাতার এমনই বিড়ম্বনা যে কৈকেয়ীর সন্তান হইবার পূর্বেই কৌশল্যার সন্তান হইল। জ্যেষ্ঠ পুত্ৰই ত রাজ্যের অধিকারী ; তবে আমার কৈকেয়ীর এবং আমার ভরতের উপায় কি হইবে? হায়! হায়! কৈকেয়ী যে রূপে, গুণে অনুপমা; কি মুখ! কি চুল ! কি গড়ন ! তাহার রূপের সঙ্গে কি কৌশল্যার রূপের তুলনা হয় ? আর গুণে কৈকেয়ীর তুল্যা কে? রাজা যখন অসুর-যুদ্ধে আহত হইয়া যন্ত্রণায় অস্থির হইয়াছিলেন, তখন কে তাহার সেবা করিয়াছিল? দুষ্ট ব্রণে যখন তাহার প্রাণ যাইবার উপক্রম হইয়াছিল, তখন মুখ দিয়া ক্ষতের বিষ চুষিয়া লইয়া ছিল কে? আমার এমন লক্ষ্মী-প্রতিমা কৈকেয়ী কৌশল্যার মুখাপেক্ষিণী দাস হইয়া থাকিবে ? তাহা কখনই হইতে দিব না। কৈকেয়ী বড় নির্বোধ, নিজের হিতাহিত বুঝে না, তাই সপত্নী কৌশল্যাকে ভালবাসে, তাহার পুত্র রামকে ভরত হইতেও অধিক স্নেহ করে। বড় লােকের বুদ্ধি কোন কালেই সূক্ষ্ম নয় ; ভাল। কৈকেয়ী নিজে না বুঝিলেও আমিত তাহার ভাল, মন্দ বুঝিতে পারি; দেখি কি হয় ! সুযােগ পাইলেই কৌশল্যার দাসীত্ব হইতে তাহাকে মুক্ত করিব।” t * কৈকেয়ী দশরথের মধ্যমা কি কনিষ্ঠা পত্নী তৎসম্বন্ধে মতভেদ আছে। রামায়ণের প্রামাণিক টীকাকার রামানুজ “কৈকেয়াপেক জ্যেষ্ঠত্বং কৌশল- পেরুয়া কনিং” ইত্যাদি যাক্যে সুমিত্রা যে দশরথের মধ্যমা পত্নী ইহা ইজিত করিয়াছেন। আমি তাহার মতের অনুসরণ করিয়াছি।
চতুর্থ পরিচ্ছেদ। মন্থরা সর্বদা এইরূপ ভাবিত। ঘটনাক্রমে তাহার অভিলাষ পূর্ণ হইবার সুযােগ উপস্থিত হইল। রাজা দশরথ বৃদ্ধ হইয়া- ছিলেন। আপনাকে রাজকার্যে অক্ষম দেখিয়া এবং জ্যেষ্ঠপুত্র রামচন্দ্রকে প্রাপ্তযৌবন, কার্যক্ষম এবং প্রজাপ্রিয় দেখিয়া তিনি তাঁহাকে যৌবরাজ্যে অভিষেক করিবার সঙ্কল্প করিলেন। ভরত এই সময়, বিশেষ কোন কাৰ্য্য উপলক্ষেমাতুলালয়ে গিয়াছিলেন; অন্য শুভদিন শীঘ্ন না থাকায় রাজা, নিরুপায়ে, তাঁহার অনুপস্থিতি-কালেই, রামচন্দ্রের অভিষেক-ক্রিয়া সম্পন্ন করিবার আদেশ দিলেন। অযােধ্যাপুরী আনন্দোৎসবে মগ্ন হইল। নৃত্য, গীত এবং বাদ্যোথমে প্রজাগণ আপনাদিগের আনন্দ জ্ঞাপন করিতে লাগিল। পথ সকল পরিদ্ভুত এবং সুগন্ধিজলে সিক্ত হইল। দেবালয় সকল চূর্ণ দ্বারা ধবলিত এবং পুষ্পমাল্য ভূষিত হইল। গৃহচূড় হইতে নানা বর্ণের পতাকা সকল উডডীন হইতে লাগিল। স্থানে স্থানে বিচিত্র তােরণ এবং মঞ্চ সকল নির্মিত হইল এবং গায়কগণ সেই সকল মঞ্চের উপর বসিয়া বেণু, বীণা, মৃদঙ্গ প্রভৃতি বাদ্যযন্ত্র সংযােগে সঙ্গীত করিতে লাগিল। ব্রাহ্মণগণ উচ্চৈঃস্বরে বেদগান করিতে লাগিলেন এবং রাজা ভাণ্ডার উন্মুক্ত করিয়া প্রার্থীদিগকে অন্ন, বস্ত্র ও ধন দান করিতে লাগিলেন। মন্থরা প্রথমে এই আনন্দোৎসবের কারণ জানিতে পারে নাই, পরে জানিতে পারিয়া ক্রোধে অন্ধা ও হিংসায় জর্জরিতা হইল। সে নির্জনে কৈকেয়ীর নিকট উপস্থিত হইয়া কর্কশ স্বরে বলিল ; “মূঢ়ে! নিশ্চিন্তা হইয়া আছ ; কোন সংবাদ রাখনা?” মন্থরার মুখে “মূঢ়া,” “বুদ্ধিহীনা” ইত্যাদি উক্তি শ্রবণে কৈকেয়ী অভ্যস্ত ছিলেন। সুতরাং বিস্মিতা ধৈৰ্য্যচ্যুত না হইয়া বলিলেন, “কি সংবাদ” ?
২৮ সীতা। মন্থর বলিল ; “রাজা কৌশল্যা-পুত্রকে যুবরাজপদে বরণ করিয়াছেন ; নগরে অভিষেকোৎসব আরম্ভ হইয়াছে।” কৈকেয়ী আপনার কণ্ঠ হইতে রত্নখচিত হার উন্মােচন পূর্বক মন্থরাকে প্রদান করিয়া বলিলেন, “মন্থরে! তুমি আমায় যে সুসংবাদ দিলে এই তাহার পুরস্কার লও।” মন্থরা ক্রোধে হার দূরে নিক্ষেপ করিয়া কর্কশস্বরে বলিল “বুদ্ধিহীনে! এই যদি তােমার মনের ভাব তবে সন্তান গর্ভে ধরিয়া ছিলে কেন?” কৈকেয়ী বিস্মিত হইলেন, বলিলেন “মন্থরে! তােমার এ সকল কথা বলিবার উদ্দেশ্য কি ? কি হইয়াছে ?” মন্থরা। “কি হইবে ? তােমার কপাল ভাঙ্গিয়াছে। তােমার সপত্নীপুত্র রাজা হইতেছে ; আর তােমার পুত্র তাহার চামর- ধারী হইবে, রাজা তাহার আয়ােজন করিতেছেন।” কৈকেয়ী। “রাম ত আমার সঙ্গে সপত্নীপুত্রের মত ব্যবহার করে না। কৌশল্যারও অপেক্ষা সে আমায় শ্রদ্ধা করে, আর ভরতকে সেত প্রাণের অপেক্ষা ভালবাসে। ভরত রাজা হইলেও আমার যেমন সুখ, রাম রাজা হইলেও তেমন।” মন্থরা আপনার ললাটে করাঘাত করিয়া বলিল, “হায়! হায়! কেকয়রাজবংশ চিরকাল তেজস্বিতার জন্য প্রসিদ্ধ, সে বংশে যে এমন বুদ্ধিহীনা, এমন অধমা কন্যা জন্মিবে, তাহা কে জানিত ? একবার তােমার মনে হইতেছে না, রাম রাজা হইলে, বৃদ্ধ রাজা যখন চকু মুদিবেন, তখন,এক মুষ্টি অন্ত্রের জন্য, তােমাকে কৌশল্যার মুখের দিকে চাহিয়া থাকিতে হইবে ? শৃগালী অন্য জন্তুর ভাবশেষ আহার করিয়া তৃপ্তিলাভ করে, কিন্তু সিংহী করে না। তুমি সিংহের কুলে শৃগালী জন্মিয়াছ।”
চতুর্থ পরিচ্ছেদ। ২৯ কৈকেয়ী শুনিয়া অনেকক্ষণ নীরব রহিলেন; পরে দীর্ঘনিশ্বাস ছাড়িয়া বলিলেন, “এখন উপায়?” মন্থরা বুঝিল, ঔষধ ধরিয়াছে। গম্ভীরভাবে বলিল, “উপায় তােমারই হস্তে ; নিজে কৌশল্যার দাসীত্ব করিয়া সুখ পাও, দাসীত্ব কর, কিন্তু পুত্রকে আজীবন দাস করিয়া রাখিতে চাও কেন?” কৈকেয়ীর মুখ আরক্ত হইল, চক্ষু দুইটী উজ্জ্বল হইল। মন্থর হস্ত ধারণ করিয়া বলিলেন, “মন্থরে! আর বলিতে হইবে না, এখন উপায় কি বল ?” মন্থরা। “উপায় না ভাবিয়া তােমার নিকট আসি নাই। এখন রামের পরিবর্তে ভরতকে সিংহাসনে বসাইতে পারিলেই সকল বিপদ ঘুচিবে। স্মরণ আছে ত, তােমার সেবায় সন্তুষ্ট হইয়া, রাজা তােমাকে দুইটা বর দিতে প্রতিশ্রুত হইয়াছিলেন? তুমি প্রয়ােজন মত সে দুইটী বর লইবে এই বলিয়াছিলে। এখন প্রথম বরে কৌশল্যাপুত্রের চতুর্দশ বৎসরের জন্য নির্বাসন এবং দ্বিতীয় বরে ভরতের জন্য রাজ্য প্রার্থনা কর। রাজা সত্যরক্ষার জন্য প্রাণ দিতে পারেন, কখনও নিজের প্রতিশ্রুতি লঙ্ঘন করিবেন না।” কৈকেয়ী নির্বাক হই মন্থরার মুখের দিকে চাহিয়া রহিলেন। কিয়ৎক্ষণ পরে বলিলেন, “মন্থরে! বুঝিলাম পৃথিবীতে তােমার মত আমার হিতৈষিণী কেহ নাই। কিন্তু রাগ করিও না, একটা কথা জিজ্ঞাসা করি, ভরতের জন্য রাজ্য প্রার্থনা করিতে চাও কর, কিন্তু নিরপরাধ রামচন্দ্রকে নির্বাসিত করিতে চাও কেন?” মন্থরা। “তােমার বুদ্ধি চিরদিনই সমান রহিল ; রাজার কন্যা, রাজার স্ত্রী হইয়াও রাজনীতি বুঝিতে শিখিলে না। রামকে নির্বাসিত না করিলে ভরত যে একটা দিনের জন্য সুখে রাজত্ব করিতে পারিবে না। গুরু, পুরােহিত হইতে প্রজা, প্রতিবাসী, ;
সীতা।
সৈন্য, সেনাপতি সকলেই রামের গুণের পক্ষপাতী। রাম যদি
ইঙ্গিত করে তবে অযযাধ্যার লক্ষ লােক আসিয়া রাত্রির মধ্যে
রাজপুরী অবরােধ করিয়া দাড়াইবে। সে অগ্নি নির্বাণ করা
ভারতের পক্ষে সহজ হইবে না; কিন্তু রাম নির্বাসনে যাইলে সে
আশঙ্কা থাকিবে না।”
কৈকেয়ী। “তবে চতুর্দশ বৎসরের জন্য নির্বাসন কেন?
চিরদিনের জন্য হইলেই ত আরও ভাল হয়।”
মন্থরা। “না! ওরূপ নিষ্ঠুর প্রার্থনা রাজা রক্ষা নাও করিতে
পারেন। অধিক আকর্ষণে বন্ধন-রজ্জ, ছিড়িয়া যায়, তাহা ত
জান। আর চতুর্দশ বৎসর নির্বাসন নিতান্ত অল্প নয়। ইহার
মধ্যে ভরত সকলকেই বশীভূত করিয়া লইতে পারিবে। এক
দিনের কথা বলা যায় না, চতুর্দশ বৎসরে রাম, সীতার অদৃষ্টে কি
ঘটিবে কে বলিতে পারে ?”
কৈকেয়ী। “সীতাকেও নির্বাসন দিতে চাও না কি? সে যে
ননীর পুতুল, নিশ্বাসের উত্তাপে গলিয়া যায়; নিজের শাড়ী
অপেক্ষাও সে আমায় অধিক ভক্তি করে। নিরপরাধে তাকে
নির্বাসন দিতে চাও কেন? সে কথা আমি বলিতে পারি না।”
মন্থরা হাসিয়া বলিল ; “আমি তােমায় সে কথা একবার মুখেও
আনিতে বলিতেছিনা। তুমি রামের নির্বাসন চাও, তাহা হইলেই
সব হইবে।
কৈকেয়ী। “কিন্তু ভরত কি রাজ্য লইবে? রাম তাহার
ইষ্টদেব, রামের অপ্রিয়কাৰ্য সে কিছুতেই করিবে না। সে যদি
বলে আমি রাজ্য চাই না, তখন কি হইবে?”
মন্থ। “ভরত যদি জানে যে, পিতার আদেশ তখন সে
কিছুতেই অসাত হইবে না। এই সূৰ্য্যবংশের সঙ্গে ব্যবহারে
।
少
55
:::
No text on this page.
চতুর্থ পরিচ্ছেদ। ৩১ একটা বড় সুবিধা আছে। ধর্মের দোহাই দাও, শান্ত্রের দোহাই দাও, ইহাদিগের আর মাথা উঠাইবার শক্তি থাকিবে না। তুমি ভরতকে বলিও, তােমার পিতা তােমায় এই রাজ্য দিয়াছেন, তাহার পর যাহা ফল হয় দেখিবে।” কৈকেয়ী। “চতুর্দশ বৎসর পরে ভরত যদি রামকে রাজ্য ফিরাইয়া দেয় তখন কি হইবে?” মন্থরা। “সে কথা পরে হইবে। তােমার এই পালঙ্কের উপর শয়নে যাহার অভ্যাস হইয়াছে, সে কি কখন ভূমিতে শয়ন করিতে চায়? একবার রাজ্য-সুখ ভাগের পর ভােগ-শক্তি থাকিতে তাহা ত্যাগ করিতে ঋষি, তপস্বীরও ইচ্ছা হয় না, সাধারণ মানুষের ত দূরের কথা। আর যদি চতুর্দশ বর্ষ রাজ্যভােগের পর ভরত নিতান্তই রামকে রাজ্য ছাড়িয়া দেয়, তবে জানিও বিধাতা সুখ- ভােগের জন্য ভরতকে সৃজন করেন নাই, তাহা হইলে তুমিই বা কি করিবে আর আমিই বা কি করিব ?” কৈকেয়ী। “বুঝিলাম ! আর কিছু বুঝাইতে হইবে না; তােমার অই কুজের ভিতর যে এত বুদ্ধি তাহা জানিতাম না। এখন কি করিতে হইবে, বল।” মন্থরা। আর কিছু করিতে হইবে না, অভিমান করিয়া বসিয়া থাক, রাজা সান্ত্বনা করিতে আসিলে অই দুইটা বর লইও। কিন্তু সাবধান! রাজার চক্ষুর জল দেখিয়া যেন গলিয়া যাইও না।” কৈকেয়ী। “না না! আর বলিতে হইবে না, কৈকেয়ী কেমন মেয়ে এইবার দেখিবে।” মন্থরা। “হ! এ কথার যদি অন্যথা হয়, তবে জানিব তুমি কেকয়-রাজকুলের কন্যা নও।” তাহার পর যাহা হইল, তাহার বিস্তারিত বর্ণনার প্রয়ােজন সীতা। নাই। কৈকেয়ী মন্থরার পরামর্শে রাজার নিকট রামচন্দ্রের নির্বা- সন এবং ভরতের রাজপদ প্রার্থনা করিলেন। এরূপ বিপদ ঘটিবে দশরথ স্বপ্নেও চিন্তা করেন নাই ; কৈকেয়ীর বাক্যে তিনি যেন বজ্রাহত হইলেন। প্রথমে মধুর বাক্যে, তাহার পর কৃতাঞ্জলিপুটে, এবং অবশেষে তাহার পদতলে ধূল্যবলুষ্ঠিত হইয়া, তিনি কৈকেয়ীকে এই নিষ্ঠুর বরপ্রার্থনা প্রত্যাহার করিতে বলিলেন। রামচন্দ্রের অভাবে তাহার প্রাণসংশয় হইবে, ইহাও পর্যন্ত জানাইলেন। ক্ষোভে ও রােষে তিনি কৈকেয়ীকে মর্মভেদী তিরস্কার করিলেন কিন্তু কিছুতেই কিছু ফল হইল না। মন্থরার মন্ত্রে দীক্ষিত কৈকেয়ী পাষাণীর ন্যায় রাজাকে তাঁহার সত্য রক্ষার জন্য অনুরােধ করিতে লাগিলেন এবং রঘুবংশের কোন রাজা কখনও সত্য হইতে বিচ্যুত হন নাই বারংবার এই কথা তাহাকে শুনাইতে লাগিলেন। যে ক্ষীণাঙ্গী নিঝরিণী কোমলতায়, স্নিগ্ধতায় এবং কল কল সঙ্গীতে হৃদয়, মন শীতল করে, তাহাই আবার পৰ্বতদেহ বিদীর্ণ করিয়া, উভয় কুল প্লাবিত করিয়া এবং তটতরু উম্মলিত করিয়া সংহারিণী মূর্তিতে ধাবিত হয়। নারীহৃদয় স্বভাবতঃ কোমল এবং স্নেহপ্রবণ, কিন্তু যদি একবার তাহা প্রকৃতিচ্যুত হয়, তাহা হইলে তাহাও উন্মাদিনী গিরিনদীর আকার ধারণ করে; লজ্জা, ভয়, স্নেহ, দয়া কিছুই তাহার গতিরােধ করিতে পারে না। পুত্রের অমঙ্গল-চিন্তায় ভীতা এবং স্বার্থে অন্ধা কৈকেয়ী যখন কিছুতেই সঙ্কল্পচ্যুত হইলেন , তখন সত্যভঙ্গভয়ে রাজা দশরথ, অনন্যোপায় হইয়া, রামচন্দ্রকে বনপ্রেরণে সম্মত হইলেন।
পঞ্চম পরিচ্ছেদ। অন্তঃপুরে, রজনীতে, কৈকেয়ী-ভবনে, যখন এই বজ্রগর্ভ মেঘের সঞ্চার হইতেছিল, কৌশল্যাদেবী, রামচন্দ্র বা সীতাদেবী কেহই তখন সেই ঘটনার বিন্দুমাত্রও অবগত ছিলেন না। কৌশল্যাদেবী, পুত্রের মঙ্গলের জন্য, দেবারাধনা ও দীন, দরিদ্রকে অর্থ দান করিতেছিলেন। রামচন্দ্র ও সীতাদেবী, আপনাদিগের ভাবী দায়িত্ব অনুভব করিয়া, শুদ্ধ ও সংযত চিত্তে নিশাপনান্তে, কতক্ষণে পিতার নিকট হইতে অভিষেকের আদেশ আসিবে তজ্জন্য অপেক্ষা করিতেছিলেন। প্রজাগণ, সমস্ত রাত্রি উৎসবে অতিবাহন করিয়া, প্রভাত না হইতে হইতে, অভিষেক দর্শনের জন্য, দলে দলে, রাজপুরীর দিকে অগ্রসর হইতেছিল। রাজসভা লােকে পরিপূর্ণ ; নিমন্ত্রিত ঋষিগণ, রাজগণ ও রাজকুটুম্বগণ আপন আপন স্থানে উপবেশন করিয়াছেন। অভি- ষেক-মণ্ডপে তীর্থোদক, তীর্থমৃত্তিকা, ঘৃত, মধু, দধি, প্রবাল, কাঞ্চন প্রভৃতি অভিষেক-সামগ্রী সজ্জিত হইয়াছে। মৃগচর্মান্তীর্ণ, স্বর্ণ- খচিত ভদ্রাসন এবং তাহার পার্শ্বে শ্বেত চামর ও শ্বেতচ্ছত্র শােভা পাইতেছে। সুসজ্জিত শ্বেত বৃষভ, শ্বেতবর্ণ অশ্ব এবং সুলক্ষণাক্রান্ত হস্তী দ্বারদেশে অপেক্ষা করিতেছে। সামগায়ী ব্রাহ্মণগণ, পলাশ- কাষ্ঠে যজ্ঞাগ্নি উদ্দীপন করিয়া, উচ্চৈঃস্বরে গান আরম্ভ করিয়াছেন। কতক্ষণে রাজা, রামচন্দ্রকে সঙ্গে লইয়া, অন্তঃপুর হইতে বাহিরে আসিবেন তজ্জন্য সকলেই উৎসুক চিত্তে অপেক্ষা করিতেছেন। বেলা ক্রমে প্রহরাতীত এবং অভিষেক-কাল অতিক্রান্ত প্রায় হইল দেখিয়া বশিষ্ঠদেব সুমন্ত্রকে অন্তঃপুরে প্রেরণ করিলেন। তিনি কৈকেয়ীর ভবনে যাইয়া যাহা দেখিলেন, তাহাতে তাহার আর ৩৪ সীতা। বাঙনিষ্পত্তির শক্তি রহিল না। তিনি দেখিলেন রাজা দশরথ ভূতলে পতিত আছেন। অনবরত রােদনে তাঁহার চক্ষু দুইট আরক্ত ও তাহার ললাটের শিরা স্ফীত হইয়াছে ; বক্ষে ও ললাটে বারম্বার আঘাত করাতে সেই সকল স্থান লােহিতবর্ণ হইয়া উঠিয়াছে। তাহার অঙ্গের বসন বিশ্রত এবং তাহার গণ্ডস্থল বহিয়া অনবরত অশ্রুধারা বহিতেছে। অদ্বিতীয় প্রতাপশালী প্রভুর এই অবস্থা দেখিয়া সুমন্ত্র স্তম্ভিত হইলেন। কোন কথা জিজ্ঞাসা করিতে তাহার সাহস হইল না। দশরথ তাহাকে দেখিয়া ভগ্নস্বরে বলিলেন, “সুমন্ত্র ! একবার আমার রামকে এখানে লইয়া এস।” সুমন্ত্র “যে আজ্ঞা” বলিয়া বিদায় লইলেন। রামচন্দ্র পিতার আদেশ শ্রবণ মাত্র তৎক্ষণাৎ সুমন্ত্রের সঙ্গে কৈকেয়ীর ভবনে উপ- স্থিত হইলেন এবং সুমন্ত্র তাহাকে যে অবস্থায় দেখিয়া গিয়াছিলেন সেই অবস্থায় বর্তমান দেখিলেন। বিষাদে এবং বিস্ময়ে তাহার হৃদয় পূর্ণ হইল। তিনি পিতার ও বিমাতার চরণে প্রণাম করিয়া করপুটে দণ্ডায়মান হইলেন। তাঁহাকে দেখিয়া দশরথের শােকসিন্ধু যেন উচ্ছসিত হইয়া উঠিল। তিনি একবার মাত্র বলিলেন “রাম”। আর কিছু বলিবার তাহার শক্তি হইল না, বালকের ন্যায় রােদন করিতে লাগিলেন। রামচন্দ্র তাহাকে কিছু জিজ্ঞাসা না করিয়া আপনার স্বাভাবিক মধুর সুরে কৈকেয়ীকে বলিলেন, “মা”। যে নারীর বক্ষে একবার ক্ষীর সঞ্চার হইয়াছে এবং সন্তানকে শুন্যদানের সময় যিনি একবার তাহার আধাে আধাে কথা শ্রবণ করিয়াছেন, “মা” কথার ন্যায় আর কিছুই তাঁহার হৃদয় দ্রবীভূত করিতে পারে না। “মা” এই মধুর আহ্বানে কৈকেয়ীর পাষাণ হৃদয়ও দ্রবীভূত হইল।
পঞ্চম পরিচ্ছেদ।
রামচন্দ্র তাহাকে পুনর্বার বলিলেন “মা। বাবা আজ এরূপ
অবস্থায় কেন ? কোন স্থান হইতে কি কোন দুঃসংবাদ আসি-
আছে ? ভরত, শত্রুঘ্ন ভাল আছে ত? আপনার পিত্রালয়ের ত
কুশল!”
কৈকেয়ী বলিলেন, “রাম! সকলেরই কুশল ! তােমার পিতা
তােমারই জন্য এত কাতর হইয়াছেন।”
রাম। “আমারই জন্য! কি করিতে হইবে বলুন; পৃথিবীতে
এমন কিছুই নাই তাহাকে সুখী করিবার জন্য আমি যাহা করিতে
পারি।”
কৈকেয়ী। “তুমি সূৰ্য্যবংশের তিলক। তােমার পিতার জন্য
তােমাকে একটু ক্লেশ স্বীকার করিতে হইবে। পারিবে ত?”
রাম। “মা! আপনি ওরূপ জিজ্ঞাসা করিতেছেন কেন ?
পিতার আদিষ্ট কোন কাৰ্য্যই আমার নিকট ক্লেশকর বােধ হইবে
না। পিতা যদি আদেশ করেন, এই মুহূর্তে আমি ধন, জন, রাজ্য,
এমন কি নিজের প্রাণ পৰ্য্যন্ত ত্যাগ করিতে পারি।
কৈকেয়ী বিস্ময়ে তাঁহার মুখের দিকে চাহিলেন ; বলিলেন ;
“রাম! তুমি চিরজীবী হও; প্রাণত্যাগের কথা বলিতেছ কেন?
অল্পদিন কিছু ক্লেশ স্বীকার করিতে হইবে মাত্র। তােমার পিতা
আমাকে দুইটী বর দিতে প্রতিশ্রুত ছিলেন, আমি একটী বরে
তােমার চতুর্দশ বৎসরের জন্য বনবাস এবং অপর বরে ভরতের
রাজ্যলাভ প্রার্থনা করিয়াছি। সত্যব্রত রাজা আমার প্রার্থনা পূর্ণ
করিতে স্বীকৃত হইয়াছেন। তাঁহার প্রতিশ্রুতিরূপ ঋণ-মােচনের
তার এক্ষণে তােমার হন্তে।”
এই মর্মভেদী সংবাদে রামচন্দ্রের মনের ভাব কিরূপ হয় কৈকেয়ী
তাহা লক্ষ্য করিতেছিলেন। কিন্তু তিনি দেখিলেন তাঁহার মুখ
;
সীতা।
;
;
বিন্দুমাত্রও পরিবর্তিত হইল না। রামচন্দ্ৰ পূৰ্ব্ববৎ প্রসন্ন মুখে,
পূৰ্ব্ববৎ মধুর বচনে, বলিলেন ;
“মা! আজ আমি ধন্য হইলাম! একদিকে পিতার সত্যমােচন,
অপরদিকে আপনার পরিতােষ, এবং সেই সঙ্গে প্রাণাধিক ভরতের
রাজ্যলাভ এই তিনই আমার প্রিয়। আপনি পিতাকে নিশ্চিন্ত
হইতে বলুন, তাহার আদেশ আমি শিরােধার্য্য করিলাম।”
গুণের পক্ষপাতী নয় কে? রামচন্দ্রের ব্যবহারে কৈকেয়ী
মুগ্ধ হইলেন; ক্ষণকালের জন্য তাহার মনে হইল, হায়! আমি এ কি
করিতেছি। এমন ধার্মিক, সুশীল সন্তানকে ক্লেশ দিতেছি। কিন্তু
সেই সঙ্গে ভরতের ভাবী উপজীবিত্ব, কৌশল্যার প্রাধান্য এবং
সর্বোপরি মন্থরার গঞ্জনা তাহার মনে হইল। তিনি অবিচলিত
ভাবে বলিলেন ;
“রাম! তােমার ব্যবহারে পরম প্রীত হইলাম। আশীৰ্বাদ
করি, যেন চিরদিনই তােমার এইরূপ ধৰ্ম্মে মতি থাকে। কিন্তু
তােমাকে অদ্যই বনগমন করিতে হইবে; তুমি না যাইলে ভরত
অযযাধ্যায় ফিরিয়া আসিতে পারিবে না।”
রাম। “আপনি যাহা আজ্ঞা করিতেছেন, তাহাই হইবে। আমি
অদ্যই বনগমন করিব। পিতার ও আপনার চরণে প্রণাম করিয়া
জননীর ও সীতার নিকট হইতে বিদায়গ্রহণের মাত্র আমার
অপেক্ষা।”
রামচন্দ্র এই বলিয়া দশরথের ও কৈকেয়ীর চরণে প্রণাম করিয়া
বিদায় লইলেন। দশরথের বাঙনিষ্পত্তির শক্তি ছিল না; তিনি
কেবল উদাসনয়নে রামচন্দ্রকে দেখিতে ছিলেন। দুই একবার
“রাম রাম উচ্চারণ করিয়া তিনি ধরাশায়ী হইলেন। এদিকে রামচন্দ্র
যেখানে কৌশল্যাদেবী দেবালয়ে তাহার জন্য পূজা দিতেছিলেন
;
ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ। ৩৭ সেই স্থানে উপস্থিত হইলেন। কি বলিয়া তিনি পুত্রগতপ্রাণা জননীর নিকট বিদায় লইয়াছিলেন, মর্মপীড়িতা কৌশল্যাই বা কি বলিয়া তাহার নিকট আপনার নিদারুণ বেদনা প্রকাশ করিয়াছিলেন তাহা বিস্তারিত বলিবার প্রয়ােজন নাই। এইমাত্র বলিলেই হইবে যে, বক্ষ হইতে সবলে হৃৎপিণ্ড উৎপাটন করিলে শরীরী জীবের যে যন্ত্রণা হয়, কৌশল্যা সেই যন্ত্রণা অনুভব করিলেন। তিনি আপনার অদৃষ্টকে ধিক্কার দিলেন, কৈকেয়ীকে এবং রাজাকে তিরস্কার করিলেন, রামচন্দ্রকে বনগমনে নিষেধ করিলেন এবং পুত্রের বিশাল বক্ষস্থলে আপনার মন্তক রাখিয়া শিশুর ন্যায় ক্রন্দন করিতে লাগিলেন। রামচন্দ্র তাহাকে তদবস্থায় যাহা বলা কৰ্তব্য তাহা বলিয়া সান্ত্বনা দিলেন। কিন্তু কৌশল্যার হৃদয় অবােধ মানিল না। তপ্ত অশ্রুধারায় এবং দীর্ঘশ্বাসে তিনি তাহার বেদনা ব্যক্ত করিতে লাগিলেন। বহুক্ষণের পর, অবশেষে, তাহার চরণে প্রণাম করিয়া এবং কোনরূপে তাহার বিদায়-আশীৰ্বাদ গ্রহণ করিয়া যেখানে সরলহৃদয়। সীতাদেবী তাহার জন্য অপেক্ষা করিতেছিলেন, রামচন্দ্র তথায় গমন করিলেন। ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ। এইবার আমরা সীতারামের কথােপকথন সর্বপ্রথম শ্রবণ করিব। এতদিন আমরা দেখিয়াছি, মেঘান্তৰ্হিতা সৌদামিনীর ন্যায় সীতাদেবীর স্বতন্ত্র অস্তিত্ব নাই; রামরূপ মেঘে সীতা সৌদামিনীর সত্বা লুপ্ত হইয়া আছে। কিন্তু মেঘ যে বিদ্যুৎ নয় এবং বিদ্যুৎ যে মেধ নয়, অবস্থা বিশেষে বিদ্যুৎ যে আপনাকে প্রকাশিত করে, এইবার আমরা তাহা দেখিতে পাইব। সীতাদেবী রামচন্দ্রের ৩ সীতা। ; প্রত্যাগমনের জন্য অপেক্ষা করিতেছিলেন; কিন্তু তাঁহাকে একাকী, এরূপ ভাবে, প্রত্যাগত দেখিয়া তাহার হৃদয় কম্পিত হইল। মুহূর্ত পরে যিনি অযযাধ্যার যুবরাজপদে অভিষিক্ত হইবেন, তিনি এরূপ নিঃসঙ্গ কেন? স্বভাবতঃ গম্ভীরপ্রকৃতি হইলেও এবং বাহ- লক্ষণে যাহাতে তাহার মনােগত বেদনা প্রকাশিত না হয় তজ্জন্য যত্নবান হইলেও সীতাদেবীর দৃষ্টি হইতে নিজের মানসিক ভাব গােপন করা রামচন্দ্রের সাধ্য ছিল না। তাহাকে দেখিয়া সীতাদেবী আপনার স্বাভাবিক সপ্রেম, মধুর বাক্যে বলিলেন “নাথ! আপনাকে এরূপ ভাবে একাকী প্রত্যাগমন করিতে দেখিয়া আমার হৃদয় কম্পিত হইতেছে। আজ আপনার অভিষেকের দিন, ছত্র ও চামরধারিগণ আপনার অনুসরণ করিবে, সূত, মাগধগণ আপনার জয়গান করিবে, দিব্যরথ ও হস্তী আপনার জন্য অপেক্ষা করিবে, পুরবাসিগণ আপনাকে দেখিবামাত্র জয়ধ্বনি করিতে থাকিবে, না আপনি, সাধারণ জনের ন্যায়, নিঃশব্দে, পদব্রজে আগমন করিলেন, ইহার কারণ কি বলুন। আপনার আকার প্রকার দেখিয়া আমার প্রাণ অত্যন্ত ব্যাকুল হইতেছে। আৰ্য মহারাজ কুশলে আছেন ত ? রামচন্দ্র বলিলেন, “প্রিয়ে। আৰ্য কুশলে আছেন। অন্য কোন অহিত চিন্তার কারণ নাই। আৰ্য্যা বিমাতার অনুরােধে পিতা আমার অভিষেক স্থগিত রাখিবার আদেশ দিয়াছেন।” সীতাদেবী বিস্ময় সহকারে বলিলেন “সে কি ? অকস্মাৎ এরূপ আদেশ দিলেন কেন?” তখন রামচন্দ্র আনুপূর্বিক সমস্ত ঘটনা বিবৃত করিয়া বলিলেন; “প্রিয়ে। বিধাতার লীলা কে বুঝিতে পারে ? দুঃখের সঙ্গে মুখ এবং মুখের সঙ্গে দুঃখ তিনি এরূপ ভাবে মিশ্রিত করিয়া ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ। ৩৯ রাখিয়াছেন যে, কেহই নিরবচ্ছিন্ন সুখ বা নিরবচ্ছিন্ন দুঃখ প্রাপ্ত হয় । আমরা এত দিন কেবল সুখই ভােগ করিয়া আসিতেছিলাম, এইবার দুঃখের পৰ্য্যায় আসিয়াছে। তুমি ব্যাকুল হইও না, পৃথিবীর প্রত্যেক নরনারী যে নিয়মের বশবর্তী, আমাদিগের সম্বন্ধে তাহার অন্যথা হইবে, এ আশা করা সঙ্গত নয়। সীতা। “নাথ : আমি বিন্দুমাত্র ও ব্যাকুল হই নাই, আপনি যাহা সহ করিতে পারিবেন, দুৰ্বলা নারী হইলেও, আমি তাহা সহ করিতে অক্ষম হইব না।” রামচন্দ্র। “উত্তম। পিতার আদেশে আমাকে অদ্যই অযােধ্যা ত্যাগ করিতে হইবে। আমি তাহার নিকট ও মাতা ঠাকুরাণীর নিকট বিদায় লইয়া আসিয়াছি, এক্ষণে তুমি আমায় সহাস্যমুখে বিদায় দাও।” সীতা। “নাথ! আপনি কি আমার সঙ্গে রহস্য করিতেছেন? নচেৎ আমার নিকট হইতে বিদায়ের কথা বলিবেন কেন? সুখে, দুঃখে, সম্পদে বিপদে, গৃহে অরণ্যে, সর্বাবস্থায় এবং সর্বত্র, আপনার সহচরীত্ব করিবার জন্যই পিতা আমাকে আপনার হতে দান করিয়াছেন। আপনি যদি অরণ্যে গমন করেন, তবে কোন্ সুখের প্রলােভনে আমি রাজভবনে বাস করিব ?” রাম। “প্রিয়ে ! সুখভােগর জন্য নয় ; তুমি দুঃখে অন- ভ্যন্তা ; স্বভাবতঃ কোমলঙ্গী; অরণ্যবাসের ক্লেশ তােমার সহ্য হইবে না, সেইজন্যই তােমাকে রাজভবনে থাকিতে হইবে।” সীতা। “নাথ! দাসীর অপরাধ গ্রহণ করিবেন না ! পুরুষ সর্বশাস্ত্রজ্ঞ হইলেও নারীর হৃদয় বুঝিতে পারেন না! গৃহে হউক আর অরণ্যে হউক, পতির সঙ্গে বাস যে নারী ক্লেশকর বলিয়া মনে করে, সে পত্নী নামের অযােগ্যা এবং নারীকুলে অধমা। আপনি দাসীকে কি এই অধমা বলিয়া মনে করেন? ; ;
সীতা। রাম। “প্রিয়ে ! তুমি এখনও বালিকা! বন যে কি ভয়ঙ্কর স্থান তােমার তাহা জ্ঞান নাই, সেই জন্যই তুমি বনগমনে সাহস করিতেছ। সিংহ, ব্যাঘ্রাদি দুরন্ত শ্বাপদগণ নিরন্তর বনে পরিভ্রমণ করিতেছে। তাহাদিগের গর্জন শ্রবণ করিলে বীরপুরুষ- দিগেরও হৃদয়ে আতঙ্ক হয়। বিশালঙ্গ মহিষকুল, রক্তচক্ষু ঘূর্ণিত করিয়া, তথায় ইতস্ততঃ ধাবমান হইতেছে এবং মদমত্ত মাতঙ্গদল, দেহের ঘর্ষণে বৃহৎ বৃহৎ বৃক্ষ ভয় করিয়া, সেখানে সর্বপ্রাণীর ভীতি উৎপাদন করিতেছে। তালবৃক্ষের ন্যায় সুদীর্ঘকায় অজগর সমূহ তথায় শয়ন করিয়া আছে ; যে কোন প্রাণীই হউক, একবার তাহাদিগের সম্মুখে পতিত হইলে তাহার রক্ষা নাই। ঘনসন্নিবিষ্ট তরুলতায় দিবসেও সেখানে নিবিড় অন্ধকার, খদ্যোতের আলােকে মাত্র পথ নির্ণয় করিতে হয়। ঝিল্লীর অবিরাম বিরাবে, পেচকের সুতীব্র ঘুৎকারে, এবং বৃক্ষকোটবস্থিত তক্ষকের গম্ভীর শব্দে সেখানে কর্ণ বধির হয়। বৃশ্চিক, দংশ ও মশকের উৎপাতে মুহূর্তকাল স্থির থাকিতে পারা যায় না। কোনরূপ সুমিষ্ট আহাৰ্য্য দ্রব্য সেখানে সুলভ নয় ; যদৃচ্ছালব্ধ কটু, কষায় ফল এবং শুষ্কপত্র- সংস্পৃষ্ট অপেয় বারি দ্বারা সেখানে জীবনযাপন করিতে হয়। ইহার উপর আর্যজাতির পরম শত্রু রাক্ষসগণ তথায় সর্বদা বিচরণ করিতেছে। তাহারা স্বভাবতঃ নিষ্ঠুর ও মায়াবী, সুযােগ পাইলেই নানাবিধ উপায়ে সজ্জনদিগের অনিষ্ট সাধন করে। এরূপ স্থানে বাস পুরুষের পক্ষেও দুঃসাহসিকতার কাৰ্য, তুমি নারী হইয়া কিরূপে সেখানে যাইতে সাহস করিতেছ বুঝিতে পারিতেছি না।” সীতা। নাথ। “দাসী কোন দিন আপনার কথার প্রতিবাদ করে নাই, কিন্তু আজ যখন আপনি তাহাকে ত্যাগ করিয়া যাইতে চাহিতেছেন, তখন আপনার নিকট মনের কথা না বলিলে ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ। ৪১ সে আপনারই নিকট অপরাধী হইবে। তাই দুই একটা কথা বলি- তেছি, শুনুন। নারী পুরুষের ন্যায় শারীরিক ক্লেশে অভ্যন্তা নয়, নারী দুর্বল, এ সকল কথা সত্য। কিন্তু পতির সঙ্গে নারী যে পাষাণীর ন্যায় অবিচলিত হইয়া অসহ ক্লেশ সহ্য করিতে পারে, পতির সঙ্গে ভীষণ অরণ্য যে তাহার নিকট নন্দনকাননের অপেক্ষাও মনােম বােধ হয়, তাহাও কি সত্য নয়? আপনি যদি কটু, কষায় ফলমূল ভােজন করিয়া, দংশ, মশকের উৎপাত সহ্য করিয়া, অরণ্যে বাস করিতে পারেন, তবে কি সীতা পারিবে না? আর সিংহ, ব্যাঘ্র, মহিষ, মাতঙ্গের ভয় কাহার? যে নারীর স্বামী কাপুরুষ, আপনার পত্নীকে রক্ষা করিতে অক্ষম, তাহার। আপনি রাক্ষসের কথা বলিতেছেন, কিন্তু সীতা বীৰ্য্যশুক্কা ; সীতা হরধনুঞ্জকের পত্নী ; দেবতা হউন আর রাক্ষস হউক, সীতাকে যে অপবিত্র চিত্তে স্পর্শ করিবে, তাহার অব্যাহতি হইবে না। নাথ ! আপনি নিবারণ করিবেন না, অামি নিশ্চয়ই আপনার সঙ্গে বনগমন করিব।” রামচন্দ্র অনেকক্ষণ নিস্তব্ধ রহিলেন, পরে বলিলেন “প্রিয়ে। তুমি এ সঙ্কল্প ত্যাগ কর, আমি কিছুতেই তােমার বনগমনে সম্মতি দিতে পারি না।” সীতাদেবী, এইবার, অভিমানভরে, রামচন্দ্রের মুখের দিকে চাহিলেন ; তাহার নয়নপল্লব দুটী আ হইল। তিনি কৃতাঞ্জলি- পুটে বলিলেন ; প্রভাে! সীতা কোন দিন আপনার নিকট কোন প্রার্থনা করে নাই, এই তাহার প্রথম প্রার্থনা, আপনি তাহাকে নিরাশ করিবেন না। সীতার কোন অপরাধের জন্য যদি আপনি তাহাকে ত্যাগ করিতে চান, তবে সে স্বতন্ত্র কথা। কিন্তু সীতা বনবাস-ক্লেশ সহ্য করিতে পারিবে না ইহাই যদি তাহাকে সঙ্গে না লইবার কারণ হয়, তবে আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন।
8२ সীতা। পিত্রালয়ে ত্রিকালজ্ঞ ঋষিগণ আমাকে দেখিয়া অনেকবার বলিয়াছেন যে, আমার অদৃষ্টে অরণ্যবাস আছে। মাতার আদেশে আমি, সেই জন্য, নিজেকে সর্বপ্রকার ক্লেশে অভ্যস্ত করিয়াছি। অনশন, অর্ধা- শন, কুশাসনে শয়ন, চীর পরিধান কিছুতেই আমার ক্লেশ হইবে না। আপনি পরীক্ষা করিয়া দেখুন, সীতা কত ক্লেশ সহ্য করিতে পারে। অথবা ক্লেশের কথাই বা বলি কেন? আপনার সেবা করিতে পাইলে কোন ক্লেশই আমার নিকট ক্লেশ বলিয়া বােধ হইবে না। রাজভবনে সহস্র পরিজনের মধ্যে আপনার পরিচর্যা করিবার আমার সুযােগ হয় নাই। অরণ্যে যেখানে অপর কেহ আপনার সেবার জন্য থাকিবে না, বড় সাধ, সেখানে প্রাণ ভরিয়া আপনার সেবা করিব। আপনি অরণ্যে যাহা কিছু সংগ্রহ করিবেন, আমি তাহা স্বহস্তে আপনার জন্য রন্ধন করিব ; নবীন দুৰ্ব্বাদল, কোমল পল্লব সংগ্রহ করিয়া আমি আপনার জন্য শয্যা রচনা করিব; নদী হইতে আমি আপনার পাদপ্রক্ষালনের জন্য জল আনিয়া দিব ; উত্তপ্ত বালুকাপথে ভ্রমনের পর, প্রান্ত হইয়া, আপনি যে স্থানে উপবেশন করিবেন, জল সিঞ্চন করিয়া, আমি তাহা মিথ করিব এবং অগ্ৰে অগ্রে গমন করিয়া যাহাতে আপনার পদে বেদনা লাগে তজ্জন্য পথের কুশ, কঙ্কর মর্দন করিয়া যাইব। ভাবিয়া দেখুন, যখন আমার মনে হইবে যে, অরণ্যে আপনার সেবায় জন্য একজনও নিকটে নাই, আর আমি দাস, দাসী পরিবৃতা হইয়া আছি, তখন আমার মনের কি অবস্থা হইবে।” বলিতে বলিতে সীতাদেবীর স্বর রুদ্ধ হইয়া আসিল, চক্ষু দুইটা জলে পূর্ণ হইল। তিনি দাড়াইয়া ছিলেন, অবনতজানু হইয়া উভয় হন্তে রামচন্দ্রের পদযুগল ধারণ করিলেন ; করিয়া বলিলেন, “নাথ । আপনার সঙ্গে থাকিলে সীতা সকল ক্লেশ সহ্য ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ। করিতে পারিবে, কিন্তু আপনার অভাবে জীবনধারণের তাহার শক্তি থাকিবে না। রােগে হউক, অনলে হউক, গরলে হউক, তাহার জীবন শেষ হইবে।” সীতাদেবীর আর বাক্য-স্ফুৰ্ত্তি হইল না। রামচন্দ্র তাহাকে উত্তোলন করিয়া বক্ষে ধারণ করিলেন এবং বলিলেন “প্রিয়ে। অন্তরাত্মা জানেন যে, সীতা ভিন্ন রামের জীবনে সুখ, শান্তি নাই। তবে যে তােমাকে গৃহে রাখিয়া যাইতে চাহিতেছিলাম, সে কেবল তােমারই মঙ্গলের জন্য। কিন্তু বুঝিতেছি তাহা হইবে না, এক্ষণে প্রস্তুত হও। আমাদিগের যাহা কিছু আছে, বিপন্ন, দরিদ্র, ব্রাহ্মণ ও পরিজনদিগের মধ্যে বিতরণ কর। গুরুজনদিগের নিকট বিদায় লইয়া এস ; আমি লক্ষ্মণের নিকট বিদায় লইয়া বনগমনের জন্য প্রস্তুত হই।” সীতাদেবী এই কথা শ্রবণমাত্র দ্রুতপদে কৌশল্যাদেবীর ভবনের দিকে ধাবমান হইলেন। কৌশল্যাদেবী যখন তাহার বনগমন-সঙ্কল্প অবগত হইলেন, তখন তাঁহার বিদীর্ণ হৃদয় যেন আরও বিদারিত হইল। কিন্তু পুত্র যে সাধ্বী পুত্রবধূর সেবা হইতে বঞ্চিত হইবেন এই ভাবিয়া সেই যন্ত্রণার মধ্যেও তিনি কথঞ্চিৎ শান্তিলাভ করিলেন। তিনি পুত্রবধূকে তৎকালােচিত উপদেশ দিলেন। সীতাদেবী, তাহাকে প্রণাম করিয়া, অন্য দুই শর ও দশরথের নিকট বিদায় লইলেন। প্রাচীন রাজকুটুম্বিনীগণ রামচন্দ্রের বনগমন-সংবাদে কোনরূপে ধৈৰ্য্য রক্ষা করিয়াছিলেন, কিন্তু কোমলাঙ্গী তরুণী বধূ সীতা তাঁহার অনুগমন করিবেন শুনিয়া আর স্থির থাকিতে পারিলেন না। কেহ কৈকেয়ীকে ধিক্কার দিতে, কেহ আর্তনাদ করিতে লাগিলেন। অল্পক্ষণের মধ্যে রাজভবন জন-কোলাহলে পূর্ণ হইল।
১১
সীতা।
;
এদিকে রামচন্দ্র লক্ষ্মণের নিকট বিদায় লইতে গিয়াছিলেন।
লক্ষ্মণ পূৰ্বেই সমস্ত কথা শুনিয়াছিলেন সুতরাং তাঁহাকে নূতন
কিছু বলিতে হইল না। ক্ষোভে এবং রােষে লক্ষ্মণের শরীর
কম্পিত হইতেছিল, চক্ষু দুইটী রক্তবর্ণ হইয়াছিল, ক্রুদ্ধ সর্পের ন্যায়
তিনি ঘন ঘন নিশ্বাস ত্যাগ করিতেছিলেন। তিনি রামচন্দ্রকে
দেখিয়া বলিলেন; “আৰ্য। আপনি কৈকেয়ীপুত্রের জন্য রাজ্যত্যাগ
করিতেছেন কেন?”
রামচন্দ্র গম্ভীরভাবে বলিলেন, “পিতার আদেশ।”
লক্ষ্মণ। “পিতা বার্ধক্যে, হিতাহিতজ্ঞানশূন্য; পিতা স্ত্রীবাধ্য ;
তাহার আদেশ পালনীয় নয়।”
রামচন্দ্র। “লক্ষ্মণ ! আমি তােমার নিকট পিতৃনিন্দা শ্রবণ
করিতে আসি নাই। পিতা আমাদিগের দেবতা; তিনি যে সত্য
রক্ষার জন্য আমাকে বনপ্রেরণ করিতেছেন, ইহাতে তাহার প্রকৃত
দেববাচিত গুণই প্রকাশ পাইতেছে। তুমি তাহার নিন্দা করিয়া
পাপভাগী হইও না; ধাৰ্মিক জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা ভরতকে কৈকেয়ীপুত্র
বলিয়া অবজ্ঞা করিও না। আমার কথা শুন। আমি মাতাপিতা
সকলের নিকট বিদায় লইয়া আসিয়াছি, এক্ষণে তুমি হৃষ্টচিত্তে
আমাকে বিদায় দাও”।
লক্ষণ। “জীবন থাকিতে লক্ষ্মণ আপনাকে বিদায় দিতে
পারিবে না; তাহার মৃত দেহ পদদলিত না করিয়া আপনি
অযযাধ্যার তােরণ অতিক্রম করিতে পারিবেন না।”
রামচন্দ্র। “ভাই! অবােধের মত কথা বলিও না। মনুষ্য
নিজের নিজের কর্মানুসারে ফলভােগ করে। আমি আত্মত
কর্মের ফল ভােগ করিতে যাইতেছি; তুমি কেন বৃথা আমার
সঙ্গে ক্লেশ ভােগ করিবে? তুমি গৃহে থাকিয়া মাতা, পিতার,
ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ। ৪৫ সেবা কর; তােমাকে দেখিলে তাহারা আমার অভাব কথঞ্চিৎ বিস্মৃত হইবেন। পুত্রের পক্ষে মাতাপিতার সেবা অপেক্ষা আর ধর্ম নাই।” লক্ষ্মণ। “দাদা! কোন দিন আপনার কথার অন্যথা করি নাই, কিন্তু আজ করিব। লক্ষ্মণের মাতা নাই, পিতা নাই, ইষ্টদেব নাই, আপনি তাহার সব। আপনার সেবাই তাহার ধর্ম, অন্য ধৰ্ম্মে তাহার প্রত্যয় নাই। সঙ্গে লইয়া না যান, আপনি পুরদ্বার ত্যাগ করিবার পূর্বেই এই শর তাহার হৃদয়ের শােণিত পান করিবে।” লক্ষ্মণ এই বলিয়া আপনার করস্থিত ধনুতে বাণ যােজন করিলেন। রামচন্দ্র তাহাকে নিবারণ করিয়া বলিলেন, “ভাই। বুঝিয়াছি রামের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব নাই; সীতা ও লক্ষ্মণ লইয়াই রাম। যাও, তবে গুরুজনদিগের নিকট বিদায় লইয়া এস ; বনবাসের উপযােগী অস্ত্র, শস্ত্র সঙ্গে লইয়া প্রস্তুত হও। অবিলম্বে আমাদিগকে অযােধ্যা ত্যাগ করিতে হইবে।” লক্ষ্মণ “যে আজ্ঞা” বলিয়া রামচন্দ্রকে প্রণাম করিলেন। তখন উভয় ভ্রাতা এক সঙ্গে সুমিত্রার নিকট গমন করিলেন। সুমিত্রা পূৰ্বেই সীতাদেবীর নিকট সমস্ত অবগত হইয়াছিলেন, তিনি রামচন্দ্রকে বলিলেন “রাম! লক্ষ্মণ আমার নয়, লক্ষ্মণ তােমার ; তাহার প্রতি যাহা কৰ্তব্য করিও।” পরে লক্ষ্মণকে বলিলেন, “লক্ষণ! তােমায় আর কি বলিব ? রামকে তােমার পিতা হইতে এবং সীতাকে আমা হইতে অভিন্ন জ্ঞান করিও। এমন ভাবে চলিও, যেন, যুগ যুগান্তে লােকে বলে লক্ষ্মণের মত ভাই।” দুইজনে তাঁহাকে প্রণাম করিয়া বিদায় লইলেন। তাহার পর যাহা হইল তাহা বর্ণন করিবার প্রয়ােজন নাই। দশরথ, কৌশল্যা, সুমিত্রা ও উর্মিলাকে অকুল শােকসাগরে নিক্ষেপ করিয়া, অযােধ্যাপুরী অন্ধকার করিয়া, রামচন্দ্র, সীতাদেবী ৪৬ সীতা। ও লক্ষ্মণ অরণ্যযাত্রা করিলেন। প্রহরমাত্ৰ পূৰ্বে যে অযােধ্যা উৎসবাননে পূর্ণ ছিল, তাহা গভীর শােকসাগরে নিমগ্ন হইল। দশরথ উন্মত্তের ন্যায় তাঁহাদিগের পশ্চাৎ পশ্চাৎ ছুটিলেন, এবং পুরবাসিগণ, সর্বকৰ্ম্ম পরিত্যাগ করিয়া, তাঁহাদের অনুবর্তী হইলেন। রামচন্দ্র যথােচিত মধুর বাক্যে সকলকে সান্ত্বনা দিয়া নিরন্ত করিলেন। পিতার আদেশে তিনি কিয়দ্র রথারােহণে গমন করিয়াছিলেন ; অযযাধ্যার সীমা অতিক্রম করিয়া রথ ত্যাগ করিলেন, এবং প্রিয় সুহৃদ গুহকের সাহায্যে গঙ্গা উত্তীর্ণ হইয়া, মহর্ষি ভরদ্বাজের উপদেশক্রমে, চিত্রকুট পৰ্বতে যাইয়া অবস্থিতি করিতে লাগিলেন। সপ্তম পরিচ্ছেদ। যে দশরথ একদণ্ডও রামচন্দ্র ও সীতাদেবীকে না দেখিলে অস্থির হইতেন, রামচন্দ্রের অযােধ্যাত্যাগের পর তাহার অবস্থা কিরূপ হইয়াছিল তাহা বলিবার অপেক্ষা করে না। তিনি রাজ- কাৰ্য, অন্ন, জল, বিশ্রাম, নিদ্রা সমস্তই ত্যাগ করিলেন, এবং অব শেষে ভগ্নহৃদয়ে রামচন্দ্রের নাম উচ্চারণ করিতে করিতে প্রাণত্যাগ করিলেন। একে রামচন্দ্রের বনবাস, তাহার উপর দশরথের মৃত্যু, অযােধ্যাপুরী যেন শ্মশানে পরিণত হইল। রাজ্য অরাজক দেখিয়া মন্ত্রিগণ দূত প্রেরণ পূর্বক ভরত, শত্রুকে মাতুলালয় হইতে আনয়ন করিলেন। ভরত আসিয়া অযযাধ্যার যে অবস্থা দর্শন করিলেন তাহাতে সঁহার হৃদয় স্তম্ভিত হইল। সেই নৃত্য-গীত- মুখরিত, বেদগানপ্রতিধ্বনিত, জনকোলাহলপূর্ণ পুরী নীরব হইয়া- ছিল। রাজপথ জনশূন্য, বিপণীসমূহ পরিত্যক্ত, এবং গৃহসমূহের সপ্তম পরিচ্ছেদ। ৪৭ দ্বার ও বাতায়ন রুদ্ধ হইয়াছিল। গভীর শােকের ছায়া অমানিশার লায় পুরী আবৃত করিয়াছিল। দিবসেও সেখানে পেচকদল, সৌধ- শিরে উপবিষ্ট হইয়া, চীৎকার করিতেছিল এবং শৃগালদল রাজপথে সুখে বিচরণ করিতেছিল। অল্পক্ষণের মধ্যেই ভরত সমস্ত বৃত্তান্ত অব- গত হইলেন। জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার নির্বাসন, পিতার মৃত্যু, সমস্তই তাহার মাতার আচরণের ফল বুঝিয়া, ধাৰ্মিক ভরত ক্ষোভে ও লজ্জায় ম্রিয়মাণ হইলেন। মন্থরা যাহা আশা করে নাই, কিন্তু কৈকেয়ী যাহা আশঙ্কা করিয়াছিলেন, তাহাই ঘটিল। ভরত কিছুতেই রাজ্যগ্রহণে সম্মত হইলেন না। “তােমার পিতা তােমাকে রাজ্য দিয়া গিয়াছেন কৈকেয়ী এ কথা বারংবার বলিলেও তাঁহার মতের পরিবর্তন হইল । তিনি বলিলেন, “এ রাজ্য পিতার স্বেচ্ছাদত্ত নয়, ইহা অধৰ্ম্মা- জ্জিত সুতরাং আমি ইহা গ্রহণ করিতে পারিব না।” তিনি পিতার ঔদ্ধদৈহিক ক্রিয়া সমাপন করিয়া পুরবাসী ও পরিজনদিগের সঙ্গে রামচন্দ্রের অন্বেষণে যাত্রা করিলেন এবং বহু পৰ্যটনের পর চিত্র- কুটে যাইয়া তাঁহাকে দর্শন করিলেন। রামচন্দ্র, চিত্রকূটে, তাপস- যােগ্য পর্ণশালা নির্মাণ করিয়া, সীতাদেবী ও লক্ষ্মণের সহিত বাস করিতেছিলেন। তাঁহার পরিধান বৃক্ষের বল্কল, মস্তকের কেশ জটাবদ্ধ, সর্বশরীর বিভূতিলিপ্ত। তাঁহাকে তদবস্থায় দর্শন করিয়া পুরবাসীদিগের চক্ষু জলে পূর্ণ হইল। ভরত, রামচন্দ্রের চরণে মস্তক স্থাপন করিয়া, পিতার মৃত্যু ও অযােধ্যাপুরীর অবস্থা বর্ণন করিলেন, এবং তাঁহাকে অযযাধ্যায় প্রত্যাগমন করিয়া রাজ্যভার গ্রহণের জন্য, কাতর ভাবে, অনুরােধ করিতে লাগিলেন। রামচন্দ্র ব্যথিত হৃদয়ে পিতার ঔদ্ধদৈহিক কার্য সম্পন্ন করিলেন। কিন্তু পিতার সত্য-ভঙ্গ হইবার আশঙ্কায় কিছুতেই অযযাধ্যায় প্রত্যাবর্তনে ও রাজ্যভার গ্রহণে সম্মত হইলেন না। অবশেষে এই স্থির হইল যে, রামচন্দ্রের ৪৮ সীতা। পাদুকা সিংহাসনে স্থাপন করিয়া, ভরত স্থাপ্য সম্পত্তিরূপে রাজ্য- শাসন করিবেন। চতুর্দশ বৎসর অন্তে রামচন্দ্র পুনর্বার তাহ। গ্রহণ করিবেন। মহামতি ভরত, তখন, রামচন্দ্রের পাদুকা শিরে বহন করিয়া, অযােধ্যায় প্রত্যাবৃত্ত হইলেন। কিন্তু অযযাধ্যায় বাস তাঁহার পক্ষে অসহ্য ক্লেশকর হইল। চতুর্দিকে রামচন্দ্রের স্মৃতি- চিহ্ন বর্তমান। রাজপুরীর যে সকল প্রকোষ্ঠে তাঁহারা চারি ভাতায় শয়ন, অধ্যয়ন, উপবেশন এবং ভােজন করিতেন, যে উদ্যানে অপরাহ্নে সকলে এক সঙ্গে পরিভ্রমণ করিতেন, যে তরুতলে ক্রীড়াচ্ছলে রামচন্দ্রকে রাজারূপে শিলা-সিংহাসনে বসাইয়া অপর তিন ভ্রাতার মধ্যে কেহ ছত্র ধারণ, কেহ চামর ব্যজন করিতেন, তাহা তেমনি বর্তমান ছিল। অগ্নিশিখার ন্যায় এই সকল ভরতের নেত্র দগ্ধ করিত। অন্তঃপুরের যে ভবনে রামচন্দ্র সীতাদেবীর সহিত সুখে বাস করিতেন, উন্মুক্তদ্বার এবং শূন্য অবস্থায় যেন তাহা তাহাকে গ্রাস করিতে আসিত। তিনি অযােধ্যা ত্যাগ করিয়া নন্দীগ্রামে রাজধানী স্থাপন করিলেন এবং তথায় রত্নময় সিংহাসনে রামচন্দ্রের পাদুকা স্থাপনপূর্বক রাজ্যশাসন করিতে লাগিলেন। রামচন্দ্রের পাদুকা তাহার নিয়ন্তা ও প্রভুস্থানীয় হইল। দুরূহ রাজকাৰ্য্য সম্বন্ধে তিনি পাদুকার নিকট আপনার বক্তব্য জানাইতেন, কেহ কোন উপহার দিলে তাহা অগ্রে পাদুকার নিকট নিবেদন করিয়া পরে ভাণ্ডারে রাখিবার আদেশ দিতেন। রামচন্দ্র, পিতার আদেশে, যে ভাবে, অরণ্যে জীবনযাপন করিতেছিলেন, তিনি, স্বেচ্ছায়, সেইভাবে, রাজভবনে জীবনযাপন করিতে লাগিলেন। তিনি রামচন্দ্রের ন্যায় বল পরিধান এবং জটা ধারণ করিলেন। তাহার ন্যায় ফলমূল মাত্র ভােলনে তৃপ্তিলাভ করিতে লাগিলেন। সর্বত্যাগী সন্ন্যাসী যেমন শুদ্ধ ও সংযতচিত্তে ইষ্টদেবের দর্শনের জন্য তপশ্চৰ্য্যা করেন, Jhik.ro ha urah blog No Call Negro অষ্টম পরিচ্ছেদ। ভরতও, তেমনি, রামচন্দ্রের দর্শনের জন্য, মহা তপস্যায় প্রবৃত্ত হইলেন। রাজভবনের সুখ সম্পদ, যৌবনের ভােগ-লালসা, পতিপ্রাণ তরুণী পত্নীর প্রেম ও সৌন্দৰ্য্য, কিছুই তাঁহার তপস্যার ব্যাঘাত করিতে পারিল না। ভ্রাতৃপ্রেমের অনুরােধে আত্ম- সংযমের এরূপ আদর্শ পৃথিবীর অপর কোন জাতির কেহ প্রদর্শন করিতে পারিয়াছেন কি না বলিতে পারি না; কিন্তু জানি না কোন্ পাপে আমরা এখন এ আদর্শ হইতে বিচ্যুত হইতেছি!!! অষ্টম পরিচ্ছেদ। অযােধ্যা ছাড়িয়া, পাঠক! আসুন, আমরা পুনর্বার সীতাদেবীর ও রামচন্দ্রের নিকট প্রত্যাবর্তন করি। ভরতকে বিদায় দিয়া রামচন্দ্র ভাবিলেন যে, চিত্রকুট অযযাধ্যা হইতে অধিক দূরে নয়। তিনি সেখানে থাকিলে অযােধ্যাবাসিগণ, মধ্যে মধ্যে, তাহাকে দেখিতে আসিবেন এবং স্নেহবশতঃ কেহ কেহ তথায় বাস করিতেও পারেন; সুতরাং জনসংসর্গে পিতার উদ্দেশ্য বনবাস সিদ্ধ হইবে না। সেইজন্য তিনি অযােধ্যা হইতে দূরবর্তী কোন নির্জন স্থানে গিয়া বাস করিতে সঙ্কল্প করিলেন। বহু স্থান ভ্রমণের পর জনস্থানমধ্যবর্তী, গােদাবরীতীরস্থিত পঞ্চবটী তাহার ও সীতাদেবীর মনােনীত হইল। লক্ষণ, রামচন্দ্রের আদেশ ক্রমে, তথায় কয়েকখানি সুন্দর পর্ণকুটীর নিৰ্মাণ করিলেন। তাঁহাদিগের গৃহের অদূরে বহুযােজনব্যাপী দণ্ডকারণ্য নিরন্তর সুন্নিগ্ধ শ্যামশােভা বিকাশ করিত। প্রত্যেক ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে তাহা নব নব বেশে সুশশাভিত হইত। বসন্তাগমে তাহা শ্যামল কিশলয়ে এবং বর্ষাগমে তাহা কুটজ ও কদম্বকুসুমে ৪ সীতা। অপূৰ্ব শ্রী ধারণ করিত। দূরস্থিত গিরিরাজী, অচল মেঘশ্রেণীর ন্যায় দণ্ডায়মান থাকিয়া, তাহাদিগের নয়ন স্নিগ্ধ করিত এবং উপলঘাতিনী গােদাবরীর অবিরাম কল কল নিনাদে তাঁহাদিগের কর্ণ নিরন্তর তৃপ্ত হইত। পঞ্চবটী দর্শন করিয়া সীতাদেবী পরম পরিতােষ লাভ করিলেন ; অযােধ্যাপুরীর সুখস্মৃতি তাহার চিত্ত হইতে ক্রমশঃ লুপ্ত হইতে লাগিল। পঞ্চবটীতে সীতাদেবী নূতনভাবে সংসার-ধৰ্ম্ম আরম্ভ করিলেন গ্ৰহবৈগুণ্যে তিনি অযযাধ্যারাজ্য হারাইয়াছিলেন, কিন্তু এক্ষণে দণ্ডকারণ্যকে রাজ্য এবং দণ্ডকাবাসীদিগকে প্রজারূপে প্রাপ্ত হইলেন। কুসুমভারনত ব্রততীসমূহ, তাহার কুটীরের চতুর্দিকে বিরাজিত থাকিয়া, রাজভবনের রত্নখচিত সজ্জাকেও পরাজিত করিত। বনবৈতালিক পিকবর মধুর ভাতিক সঙ্গীতে প্রতিদিন তাহাকে নিদ্রা হইতে উদ্বোধিত করিত এবং বননৰ্ত্তক ময়ূরদল তাঁহার দ্বারে আসিয়া আনন্দে নৃত্য করিতে থাকিত। স্বচ্ছতােয়া সরসী তাহার দর্পণ এবং কুবলয় তাহার শিরােভূষণ হইল। রামচন্দ্র বহন্তে কুসুম চয়ন করিয়া তাহাকে পুষ্পভরণে সজ্জিত করিতেন। তিনি রাজেন্দ্রাণীর ন্যায় মুক্তহস্তে কত বিহগশিশুকে এবং কত কুরঙ্গশাবককে আহার দিতেন। দণ্ডকা যাহার ভাণ্ডার এবং লক্ষণ যাহার পরিচায়ক তাহার অভাব কি ? বনচারী সন্ন্যাসী এবং অতিথিদিগের জন্য তাঁহার সদাব্রতের দ্বার সর্বদা উন্মুক্ত থাকিত। অরণ্য তরুলতাদিগকে পুত্রকন্যা স্থানীয় করিয়া তিনি তাহাদিগের বিবাহ দিতেন। তাঁহার স্নেহপালিতা লতাবধু কুসুমিতা হইলে তাহার আনন্দোৎসব হইত। পুষ্পিত তরুকুতে, জ্যোৎস্নাধৌত নদীতটে এবং ছায়াপ্তি অধিত্যকাভূমিতে রামচন্দ্রের সঙ্গে ভ্রমণ করিয়া তিনি যে আনন্দ অনুভব করিতেন, পৃথিবীর অষ্টম পরিচ্ছেদ। কোনও রাজমহিষীর ভাগ্যে তাহা সুলভ নয়। দণ্ডকার অবিদূরে মহর্ষি অগস্ত্যের আশ্রম বর্তমান ছিল। তাহার পত্নী লােপামুদ্রাদেবী, মধ্যে মধ্যে, সীতাদেবীর কুটীরে আসিয়া, তাহার সহিত ধর্মালােচনা করিতেন। পিতৃগৃহে সীতাদেবী যে তপশ্চৰ্য্যায় উপদিষ্টা হইয়া- ছিলেন, অরণ্যবাসকালের সাধনায় তাহার সম্যক্ পরিণতি হইল। রাজদুহিতা ও রাজবধূ হইয়াও তিনি আজন্মঅরণ্যপালিতার ন্যায় সুখে দিন অতিবাহন করিতে লাগিলেন। কিন্তু সুখভােগের জন্য সীতাদেবীর জন্ম হয় নাই। তাহার সুখচন্দ্রমাকে গ্রাস করিবার জন্য অকস্মাৎ রাহুর উদয় হইল। তঁাহারা যেখানে বাস করিতেছিলেন, তাহার নিকটবর্তী প্রদেশ পর্যন্ত লঙ্কাধিপতি রাক্ষসরাজ রাবণের রাজ্য বিস্তৃত ছিল। রাক্ষস- রাজের অনুচরগণ সর্বদা এই সকল প্রদেশে বিচরণ করিত। রামচন্দ্রের দণ্ডকায় আগমনের কিছুদিন পূর্ব হইতে রাবণের কনিষ্ঠা ভগিনী শূর্পণখা পরিজনগণ সহ তথায় বাস করিতেছিল। শূর্পণখা বালবিধবা; যৌবনের চাঞ্চল্য ও লালসা তাহার হৃদয় হইতে অন্তর্হিত হয় নাই। রামচন্দ্রের বীরােচিত মূর্তি দর্শনে শূর্পণখা মােহিতা হইল, এবং, জাতিগত পার্থক্য বিস্মৃত হইয়া, রামচন্দ্রকে পতিরূপে লাভের জন্য ব্যাকুল হইয়া উঠিল। শূর্পণখা ভাবিল, সীতাদেবীই তাহার রামচন্দ্রের সহিত মিলনের পথের অন্তরায়। সেই জন্য সে, সুযােগ বুঝিয়া, একদিন, সীতাদেবীকে বধ করিতে উদ্যত হইল। নিত্যসতর্ক লক্ষ্মণ, জানিতে পারিয়া, তাহার পাপের প্রায়শ্চিত্ত স্বরূপ, তাহার নাসা ও কর্ণ ছেদন করিয়া দিলেন। শূর্পণখার অনুচরগণ তখন রামচন্দ্র ও লক্ষ্মণকে আক্রমণ করিল, কি দাবানলে যেমন শুষ্কপত্রসমূহ দগ্ধ হইয়া যায়, রামচন্দ্রের শরানলে তাহারাও তেমনই ভস্মীভূত হইল। অপমা- সীতা। নিতা, জিঘাংসাপরায়ণা শূর্পণখা যাইয়া সহােদর রাবণকে রাজ- সভামধ্যে আপনার দুর্দশা জ্ঞাপন করিল। বালবিধবা দুঃখিনী ভগ্নীর অপমানে রাবণের হৃদয় স্বভাবতই ব্যথিত হইল; তাহার উপর রাবণ আপনাকে পৃথিবীর মধ্যে অদ্বিতীয় বীর বলিয়া দম্ভ করিত। তাহার ঐশ্বর্যের এবং সৈন্যবলের সীমা ছিল না; সুতরাং নিজের প্রতিপত্তি রক্ষার জন্য শূর্পণখার অপমানের প্রতিবিধান অবশ্য- কর্তব্য বলিয়া তাহার বিবেচনা হইল। ইহার উপর তাহাকে উত্তে- জিত করিবার জন্য শূর্পণখা একটী কৌশল অবলম্বন করিয়াছিল। বলে ও কৌশলে পত্নীগ্ৰহণ রাক্ষসদিগের চিরাভ্যস্ত ; শূর্পণখা, তাহা জানিয়া, আপনার পাপ উদ্দেশ্য গােপন করিয়া, এইরূপ প্রচার করিয়াছিল যে, অনুপমা সুন্দরী সীতাদেবীকে, দিগ্বিজয়ী, বীর ভ্রাতার যােগ্যা পত্নীবােধে, আনয়নের চেষ্টাতেই তাহার তাদৃশ দুর্দশা ঘটিয়াছিল। সুতরাং রামচন্দ্রকে শাস্তিদানের সঙ্গে সীতা- দেবীকে হস্তগত করিবার ইচ্ছাও রাবণের বলবতী হইল। জনশ্রুতি বহুপূর্ব হইতেই সীতাদেবীর অতুল সৌন্দর্য্যের সংবাদ তাহার নিকট আনয়ন করিয়াছিল। এক্ষণে কি উপায়ে নিজের উভয় উদ্দেশ্য সিদ্ধ হইতে পারে রাবণ তাহা চিন্তা করিতে প্রবৃত্ত হইল। অল্পসংখ্যক সৈন্য দ্বারা যে রামচন্দ্রকে শান্তি দিবার সম্ভাবনা ছিল না, শূর্পণখার অনুযাত্রিগণের পরাজয়েই তাহা প্রমাণিত হইয়াছিল। রামচন্দ্র যেখানে বাস করিতেছিলেন তাহা প্রবলপ্রতাপ বানররাজ বালীর রাজ্যের সীমান্ত প্রদেশ। অধিক সৈন্য সহ সেখানে গমন করিলে বালীর সৈন্যের সহিত সংঘর্ষ হইতে পারে; কিন্তু মহাবীর বালীর সঙ্গে অকারণে বিরােধ প্রার্থনীয় নয়। একা যাইয়া পরশুরাম- জয়ী, হরধনুর্ভঙ্গকারী রামচন্দ্রকে সম্মুখ যুদ্ধে আহ্বান করাও অতিসাহসিকতার কাৰ্য। সুতরাং সসৈন্য হউক আর একাই হউক, অষ্টম পরিচ্ছেদ। রামচন্দ্রের সহিত যুদ্ধে প্রবৃত্ত হওয়া সঙ্গত বলিয়া তাহার বােধ হইল । বিশেষতঃ রামচন্দ্রকে বধ করিলে সীতাদেবী যদি ক্ষোভে আত্মহত্যা করেন, তাহা হইলে ত সকলই নিস্ফল হইবে; সুতরাং যুদ্ধ অপেক্ষা কৌশলে সীতাদেবীকে হরণ ও ক্রমে তাহাকে বশীকরণ রাবণের নিকট নিরাপদ ও যুক্তিসঙ্গত বলিয়া বােধ হইল। এই উপায় দ্বারা নিজের লালসাতৃপ্তি এবং রামচন্দ্রকে লাঞ্ছনাদান উভয়ই হইবে। রাক্ষসদিগের মধ্যে কে তাহাকে এই কাৰ্য্যে সাহায্য করিতে পারে তাহা চিন্তা করিতে করিতে তাড়কাপুত্র মারীচের কথা রাবণের স্মরণ হইল। মাতৃহন্তাকে দণ্ডদানে মারীচ আনন্দের সহিত সাহায্য করিবে এই ভাবিয়া রাক্ষসরাজ তাহার নিকট আপনার অভিপ্রায় ব্যক্ত করিল। কিন্তু রামচন্দ্রের পরাক্রম মারীচের অবিদিত ছিল না। সে, নানাপ্রকার যুক্তি দেখাইয়া, রাক্ষসরাজকে তাহার পাপ সঙ্কল্প হইতে বিরত হইতে পরামর্শ দিল। কিন্তু নিশ্চিৎ-মৃত্যু রােগী যেমন চিকিৎসকের কথায় কর্ণপাত করে না, রাবণও তেমনি মারীচের বাক্যে কর্ণপাত করিল না। অবশেষে স্থির হইল যে, মারীচ কোনরূপ কৌশলে রামচন্দ্র ও লক্ষ্মণকে সীতাদেবীর নিকট হইতে দূরে লইয়া যাইবে এবং সেই সুযােগে রাবণ সীতাদেবীকে হরণ করিয়া রথারােহণে প্রস্থান করিবে। এইরূপ স্থির হইলে মারীচ, শােভন মৃগবেশে প্রচ্ছন্ন হইয়া, যেখানে রামচন্দ্র ও সীতাদেবী উপবিষ্ট ছিলেন, তাহার অবিদূরে উপবনমধ্যে বিচরণ করিতে লাগিল। দুর্ভাগ্যক্রমে সীতাদেবী গুল্মবরণে প্রচ্ছন্ন মারীচকে প্রকৃত মৃগ ভ্রম করিয়া এবং তাহার সুন্দর আকৃতি দর্শনে মুগ্ধ হইয়া রামচন্দ্রের নিকট তাহাকে ধৃত করিবার জন্য প্রার্থনা করিলেন। রামচন্দ্র, লক্ষ্মণের উপর সীতা- দেবীর রক্ষার ভার দিয়া, ধনুর্বাণহন্তে কল্পিত মৃগের পশ্চাতে ৫৪ সীতা। ; ধাবমান হইলেন। মায়ামৃগ বায়ুবেগে ধাবিত হইল এবং রামচন্দ্রও তাহার অনুসরণে, ক্রমে, কুটীর হইতে দূরে যাইয়া পড়িলেন অল্পক্ষণের মধ্যেই রামচন্দ্রের বজসম শরে মারীচের বক্ষস্থল বিদীর্ণ হইল। মারীচ যন্ত্রণাক্লিষ্ট স্বরে “সীতা! সীতা! লক্ষ্মণ ! প্রাণ যায়” বলিয়া চীৎকার করিয়া উঠিল। বনরাজী ভেদ করিয়া সেই করুণ পর সীতাদেবীর ও লক্ষ্মণের কর্ণে প্রবেশ করিল ; উভয়েই চমকিত হইলেন। সীতাদেবী বলিলেন ; “লক্ষ্মণ ! এ কি! কে এমন কাতর স্বরে তােমার ও আমার নাম ধরিয়া ডাকিতেছে ! তােমার অগ্রজের কোন বিপদ হয় নাইত ? অগ্রসর হইয়া দেখ।” “লক্ষ্মণ বলিলেন, “দেবি! আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন, এ তাহার কণ্ঠস্বর নয়। আপনার ভ্রম হইয়াছে।” আবার সেই আর্তস্বর উভয়ের কর্ণে প্রবেশ করিল। লক্ষ্মণের প্রবােধ-বাক্য পতিপ্রাণার মনে স্থান পাইল না। সীতাদেবী পুনৰ্বার বলিলেন, “লক্ষ্মণ ! অই শুন! বৃথা আমায় প্রবােধ দিও না ; মৃত্যুকালে মনুষ্যের স্বর কি স্বাভাবিক থাকে ? বিলম্ব করিও , এখনি অগ্রসর হইয়া দেখ।” লক্ষ্মণ বলিলেন, “দেবি ! পাপিষ্ঠা শূর্পণখার দণ্ডের পর হইতে মায়াবী রাক্ষসগণ দিবারাত্র আমাদিগের ছিদ্রান্বেষণ করিয়া বেড়াইতেছে; এ অবস্থায় আপনাকে একা রাখিয়া আমি কিরূপে গমন করিব! আপনি উদ্বিগ্ন হইবেন না; সশস্ত্ৰ আৰ্য্যকে যুদ্ধে পরাজয় করিতে পারে পৃথিবীতে এরূপ ব্যক্তি কেহ নাই।” লক্ষ্মণ এই বলিয়া অবনত মস্তকে দণ্ডায়মান রহিলেন। তৃতীয় বার সেই স্বর, আরও সকরুণ ভাবে, “সীতা! সীতা! লক্ষণ” বলিয়া চীৎকার করিয়া উঠিল! সীতাদেবীর মর্মস্থল অষ্টম পরিচ্ছেদ। যেন বিদীর্ণ প্রায় হইল, তিনি আর স্থির থাকিতে পারিলেন না। তাহার চক্ষু দুইটা জলে পূর্ণ হইল; তিনি ক্রোধ-কম্পিত স্বরে বলিলেন “কাপুরুষ ! তােমার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা মৃত্যু-যন্ত্রণায় আর্তনাদ করিতে- ছেন, আর তুমি, ক্ষত্রিয় হইয়া, সশস্ত্র পুত্তলিকার ন্যায়, দাঁড়াইয়া আছ! তােমায় ধিক! ক্ষত্রিয়-সমাজে এ মুখ আর দেখাইও না।” লক্ষ্মণ বলিলেন, “দেবি। অকারণে ভীতা হইয়া আমায় তিরস্কার করিতেছেন কেন? সত্যই আৰ্য্যের বিপদ বুঝিলে লক্ষ্মণ তাহার তুচ্ছ প্রাণ দিতে কুণ্ঠিত হইবে না।” পতির অনিষ্ট সম্ভাবনা ভাবিলে সতীর ধৈৰ্য্য, সহিষ্ণুতা কিছুই থাকে না। লক্ষ্মণের প্রবােধবাক্যে সীতাদেবীর মন শান্ত হইল । তিনি আরক্তনেত্রে, বজ্রগম্ভীর স্বরে, লক্ষ্মণকে বলিলেন, “কুলাঙ্গার ! তােমার ন্যায় অধমের জন্মে রঘুকুল কলঙ্কম্পৃষ্ট হইল। পিতৃতুল্য জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা প্রাণসঙ্কটে তােমায় আহ্বান করিতেছেন, আর তুমি তাহাকে রক্ষার জন্য পদমাত্র অগ্রসর হইতেছ না ! তবে কপট ভ্রাতৃপ্রেম দেখাইবার জন্য অরণ্যে আসিয়াছিলে কেন? তােমার উদ্দেশ্য কি আমি বুঝিতে পারিতেছি না। আমি চলিলাম, দেখি, কে আমায় বিপদে পড়িয়া আদান করিতেছে।” সীতাদেবী এই বলিয়া কুটীর হইতে বহির্গত হইবার উপক্রম করিলেন। লক্ষ্মণ গােখিয়া কৃতাঞ্জলিপুটে বলিলেন ; “দেবি! অতিসাহসের কাৰ্য্য করিবেন না; কুটীরে থাকুন, এই আমি চলিলাম ; রঘুকুল-দেবতারা আপনাকে রক্ষা করুন।” লক্ষ্মণ এই বলিয়া, সীতাদেবীকে প্রণাম করিয়া, ধনুর্বাণহন্তে কুটীর হইতে বহির্গত হইলেন এবং অল্পক্ষণের মধ্যে বনান্তরালে ; অদৃশ্য হইলেন।
সীতা। লক্ষ্মণের অদর্শনের সঙ্গেই সীতাদেবীর হৃদয় প্রবলবেগে স্পন্দিত হইতে লাগিল। কি যেন অমঙ্গলের ছায়া তাহার অন্তরে পতিত হইল। পত্রের মর্মরে, আশ্রমপালিত মৃগশাবকের পদ- সঞ্চারে এবং বায়ুর হিল্লোলে তিনি চমকিতা হইতে লাগিলেন। কিয়ৎক্ষণ এইরূপে অতীত হইলে সীতাদেবী দেখিতে পাইলেন জটাজুটধারী, বিশালকায় এক সন্ন্যাসী বনাভ্যন্তর হইতে তাহার কুটীরের দিকে আগমন করিতেছেন। যতই তিনি নিকটবর্তী হইতে লাগিলেন, ততই তাহার মূর্তি সীতাদেবীর সুস্পষ্ট গােচর হইতে লাগিল। আগন্তুকের পরিধান বক্তবর্ণ বসন, করে কমণ্ডলু, ললাটে বিভূতিরাগ, কণ্ঠে রুদ্রাক্ষমাল্য। সুদীর্ঘ জটাজাল, তাহার গ্রীবা এবং স্কন্ধ আবৃত করিয়া, পৃষ্ঠদেশে পতিত হইয়াছিল। তাহার দেহ মাংসল, সুগঠিত এবং অসাধারণ বলব্যঞ্জক। সাধারণ সন্ন্যাসীতে সেরূপ বলবত্তার লক্ষণ দৃষ্ট হয় না। সন্ন্যাসী, আশ্রমের দ্বারদেশে উপস্থিত হইয়া, গম্ভীর স্বরে বলিলেন, “আমি ক্ষুধার্ত অতিথি, কে আছ, ভিক্ষা দাও।” শ্রবণ মাত্র সীতাদেবী কুটীরাভ্যন্তর হইতে বলিলেন ; “প্রভাে। ক্ষণকাল অপেক্ষা করুন, আমি একাকিনী কুটীরে অবস্থিতি করিতেছি। আমার স্বামী ও দেবর এখনই প্রত্যাগমন করিয়া আপনার সমূচিত সৎকার করিবেন।” সন্ন্যাসী ক্রোধবিকম্পিত স্বরে বলিলেন, “অনৃতাচারিণি। অতিথির অপমাননায় তােমার ভয় নাই! তােমার অবসর ও সুবিধার প্রত্যাশায় আমি অনাহারে অপেক্ষা করিব। এই আমি চলিলাম। আমার সঞ্চিত পাপ তােমাদিগের এবং তােমাদিগের সঞ্চিত পুণ্য অদ্য হইতে আমার হউক।” সন্ন্যাসী এই বলিয়া গমনােত হইলেন। তাহার কথা শুনিয়া অষ্টম পরিচ্ছেদ। সীতাদেবীর হৃদয় ভয়ে কম্পিত হইতে লাগিল। তিনি কাতর বচনে বলিলেন “প্রভাে। যাইবেন না, আতিথ্য গ্রহণ করুন।” এই বলিয়া তিনি সৰ্বাঙ্গ বসনে আবৃত করিয়া এবং অতিথি- সেবার উপযুক্ত অর্ঘ্যও ফল মূল গ্রহণ করিয়া কুটীর হইতে বহির্গত হইলেন এবং তাহা সন্ন্যাসীর সম্মুখে রাখিয়া বিনম্রভাবে তাহাকে প্রণাম করিলেন। সন্ন্যাসী একবার তাহার আপাদ মস্তক দর্শন করিল। সে দর্শনে সীতাদেবীর শরীর যেন কণ্টকবিদ্ধ হইল। সন্ন্যাসী তখন অতি মধুরস্বরে সীতাদেবীকে বলিল, “সুন্দরি ! আমি রাক্ষসাধিপতি রাবণ, ত্রিভুবনে অতুলনীয়া, সমুদ্রপরিবেষ্টিত লঙ্কাপুরী আমার রাজধানী। তােমার অনুপম রূপ লাবণ্যের কথা শুনিয়া আমি তােমার অনুসন্ধানে এখানে আসিয়াছি। আজ আমার নয়ন সার্থক হইল। এক্ষণে আমার সঙ্গে চল; পৃথিবীতে যে সুখ কোন রমণী কখনও ভােগ করে নাই, তুমি তাহা ভােগ করিবে। পিতৃতাড়িত, বান্ধবহীন, ক্ষুদ্র রাম তােমার পতি হইবার যােগ্য নয়, তুমি আমারই মহিষী হইবার উপযুক্তা ; লঙ্কাপুরীর অধীশ্বরী হইলে শত অযযাধ্যার সম্পদ তােমার ভােগ্য হইবে।” শ্রবণ মাত্র সীতাদেবীর চক্ষু দুইটী ক্রোধে আরক্ত হইল, সর্বশরীর কম্পিত হইতে লাগিল। তিনি গভীর স্বরে বলিলেন ; “পাপিষ্ঠ ! সাধু সজ্জন বেশে আমাকে আহ্বান করিয়া এরূপ প্রস্তাব করিতে তাের লজ্জা বােধ হইল না ? আজ যদি রামচন্দ্র বা লক্ষ্মণ এখানে উপস্থিত থাকিতেন, তাহা হইলে এইক্ষণে তাের পাপ জিহ্বা শত খণ্ডে কর্তিত হইত। তুই আমাকে সামান্যা নারী মনে করিয়া এইরূপ প্রস্তাবে সাহস করিলি ! কিন্তু তুই জানিস, আমি রাজৰি জনকের কন্যা, রাজা দশরথের পুত্রবধু; আমার স্বামী রামচন্দ্র সিংহ, তুই কুকুর! কুকুর হইয়া তুই সিংহীর প্রতি ৫৮ সীতা। • লােভ করিতেছি। যদি প্রাণের মায়া থাকে, তবে রামচন্দ্র বা লক্ষ্মণ ফিরিয়া আসিবার পূর্বেই পলায়ন কর।” সীতাদেবী এই সময় দেখিতে পাইলেন রক্তপতাকা-সমম্বিত, খরবাহিত এক দিব্য রথ, ধীরে ধীরে, বনপথে আসিয়া আশ্রম- দ্বারে দণ্ডায়মান হইল। দর্শনমাত্র সন্ন্যাসী আপনার জটাজাল ও কমণ্ডলু দূরে নিক্ষেপ করিল এবং সীতাদেবীর দিকে অগ্রসর হইয়া হন্ত দ্বারা তাহাকে আকর্ষণপূর্বক পরিহাসসূচক স্বরে বলিল ; “সুন্দরি! অত ক্রুদ্ধা হইও না। তােমার মত শত শত রূপসীর ক্রোধ আমি দেখিয়াছি, এখন তাহারা আমার পদানতা। চল, আমার সঙ্গে রথারােহণ কর।” পাপিষ্ঠ, এই বলিয়া, সীতাদেবীকে বলপূৰ্ব্বক ধারণ করিয়া, রথে স্থাপন করিল। তাহার ইঙ্গিত মাত্র সারথি সবলে কশাঘাত করিলে বাহনদ্বয় বায়ুবেগে ধাবিত হইল। সীতাদেবী রথ হইতে লক্ষ দিয়া পড়িবার চেষ্টা করিলেন। কিন্তু পাপিষ্ঠ তাহার উন্মুক্ত কেশ ও বস্ত্র ধারণ করিয়া প্রতিরােধ করিল। রথ বায়ুবেগে ধাবিত হইতে লাগিল। সীতাদেবী রামচন্দ্রের ও লক্ষ্মণের নাম উচ্চারণ করিয়া উচ্চৈস্বরে ক্রন্দন করিতে আরম্ভ করিলেন এবং স্বর্গের দেবগণ হইতে অরণ্যের পশুপক্ষী, বৃক্ষলতা পর্যন্ত সকলকেই সােধন করিয়া তাহাকে রক্ষা করিবার জন্য প্রার্থনা করিলেন। তাহার ক্রন্দনে বনভূমি আকুল হইয়া উঠিল; কিন্তু হায়! কেহই তাহাকে রক্ষা করিতে সক্ষম হইলেন না। কেবল মধ্যপথে গৃঙ্খরাজ জটায়ু তাহার রক্ষার জন্য সম্মুখ যুদ্ধে প্রাণদান করিয়া বীরজন্ম সার্থক করিলেন। সীতাদেবী রথ হইতে মধ্যে মধ্যে আপনার অলঙ্কারগুলি নিক্ষেপ করিয়া চিহ্ন রাখিতে লাগিলেন। যােজনের পর যােজন অতিক্রান্ত হইতে লাগিল। বৃক্ষলতা নিষ্পিষ্ট করিয়া, ;
অষ্টম পরিচ্ছেদ! শিলাখণ্ড চূর্ণিত করিয়া, রথ দিবারাত্র অবিরাম গতিতে লঙ্কাভি- মুখে ধাবিত হইল। ক্রমে নীলােৰ্ম্মিময় মহা সমুদ্র সীতাদেবীর নয়ন- গােচর হইল। রাবণ, সমুদ্র অতিক্রম করিয়া, দুর্ভেদ্য প্রকার- বেষ্টিতা, কাঞ্চন-সৌধ-কিরীটিনী লঙ্কাপুরীতে উপনীত হইল। এদিকে রামচন্দ্র, মৃগরূপী মারীচকে বধ করিয়া, কুটীরাভি মুখে প্রত্যাগমনপথে লক্ষ্মণকে দেখিতে পাইলেন। মারীচের কপট আহ্বান শ্রবণে পাছে লক্ষ্মণ সীতাদেবীকে একাকিনী পরিত্যাগ করিয়া আসেন এই চিন্তায় তাঁহার হৃদয় উৎকণ্ঠিত ছিল, লক্ষ্মণকে দেখিয়া তাহার উৎকণ্ঠা দ্বিগুণিত হইল। উভয়ে দ্রুতবেগে কুটীরাভিমুখে ধাবিত হইলেন, কিন্তু তথায় উপস্থিত হইয়া দেখিলেন কুটীর শূন্য। দ্বারদেশে অতিথি-সৎকার-যােগ্য অর্ঘপাত্র ও ফলমূল পতিত আছে এবং সম্মুখস্থ পথে রথচক্রের চিন্তু বর্তমান রহিয়াছে। তখন প্রকৃত অবস্থা অনুমান করিতে উভয়ের বিলম্ব হইল না। রামচন্দ্রের হৃদয় যেন শতধা বিদীর্ণ হইয়া গেল। তিনি কখনও পর্বতশিখরে, কখনও নদীতটে, কখনও বনাভ্যন্তরে দণ্ডায়মান হইয়া উচ্চৈঃস্বরে “সীতা সীতা” বলিয়া আহ্বান করিতে লাগিলেন, কিন্তু সীতাদেবী কোথায় ? কে উত্তর দিবে? তিনি নদীতট হইতে ডাকেন, “সীতা! সীতা!” প্রতিধ্বনি অপর পার হইতে বলে ‘নীত নীতা”। তিনি পর্বতশিখরে দণ্ডায়মান হইয়া বলেন “সীতা! সীতা”। গিরিগহ্বর প্রতিধ্বনিচ্ছলে গম্ভীর স্বরে বলে “হৃত হৃতা”। সীতাদেবী যে সকল স্থলে ভ্রমণ ও উপবেশন করিতে অভ্যস্তা ছিলেন, যে কমল-গন্ধ-সুরভি সরােবরে স্নান করিতে ও যে মাধবীমণ্ডপে মধ্যাহ্নে শয়ন করিতে ভাল বাসিতেন, উভয়ে তন্ন তন্ন করিয়া সেই সকল স্থান অন্বেষণ করিতে লাগিলেন। একবার খুজিয়া তৃপ্তি হয় না, সীতা। দ্বিতীয় বার, তৃতীয় বার, তাহার পর আরও একবার, সেই একই স্থান খুঁজিয়া দেখেন, কিন্তু সীতাদেবী তখন বহু যােজন দূরে ; কোথায় তাহার সন্ধান পাইবেন। তখন উভয়ে, অস্ত্র শস্ত্র গ্রহণ করিয়া, রথচক্রের চিহু অনুসারে, দক্ষিণাভিমুখে অগ্রসর হইতে লাগিলেন। পথমধ্যে রক্তাক্ত, মৃতকল্প জটায়ুকে দেখিতে পাইয়া উভয়ে তাঁহার নিকট উপস্থিত হইলেন। জটায়ু, আপনার তাদৃশ অবস্থার কারণ এবং রাবণ কর্তৃক সীতাহরণ-বৃত্তান্ত বৰ্ণন পূৰ্ব্বক, প্রাণত্যাগ করিলেন। শুনিয়া রামচন্দ্র ক্রোধে অগ্নিপ্রায় হইলেন এবং রাবণকে সমুচিত শাস্তিদানের জন্য প্রতিজ্ঞা করিলেন। জটায়ুর প্রেকৃত্য সমাপন করিয়া উভয়ে পুনর্বার দক্ষিণাভিমুখে অগ্রসর হইতে লাগিলেন। কঠিন প্রস্তাবৎ ভূমিতে অনেক স্থলে রথচিনু লুপ্ত হইয়াছিল ; তাহার কোথাও নিষ্পেষিত তরুগুল্ম, কোথাও চক্ররেখা, কোথাও বা সীতাদেবীর নিক্ষিপ্ত অলঙ্কার লক্ষ্য করিয়া গন্তব্যপথ স্থির করিতে লাগিলেন। ক্রমে তাহারা মাল্যবান পৰ্বতে উপস্থিত হইলেন। নবীন মেঘমালা তৎকালে মাল্যবানের শিখর আবৃত করিয়াছিল, এবং কুসুমিত কদম্ব তরুতে গিরিদেহ আপাদমস্তক আবৃত হইয়াছিল। মদমত্ত ময়ুরগণ সেই সকল কদম্বতরুর শাখায় বসিয়া ময়ুরীদিগের সঙ্গে ক্রীড়া করিতে ছিল। তাঁহারা তথা হইতে পম্পাসরােবরের তীরে উপস্থিত হইলেন। পম্পার জল অতি নির্মল ; নানাবর্ণের জলজ পুষ্প- সমূহ বিকসিত হওয়াতে পাের শােভার তুলনা ছিল না। জলে হংস হংসীদল এ তটস্থিত শাল ভূমিতে মৃগ ও মৃগীগণ সুখে বিচরণ করিতেছিল। এই সকল রমণীয় স্থান দর্শনে রামচন্দ্রের সীতাশােক দ্বিগুণিত হইল। লক্ষ্মণ সুমিষ্ট বাক্যে তাহাকে সানা দিতে লাগিলেন। এইরূপে কয়েক দিবস অতীত হইলে, নবম পরিচ্ছেদ। একদিন, তাহারা ঋষ্যমুক নামে কোনও পৰ্বতের শিখরে অমানুষ বীরাকৃতি পাঁচটী পুরুষকে দেখিতে পাইয়া তাঁহাদিগের নিকটবর্তী হইলেন। তাহার পর যাহা হইল, পাঠক! তাহা পরে জানিতে পারিবেন। অসহায় সীতাদেবীকে লঙ্কাপুরীতে লইয়া রাবণ তাহার সহিত কিরূপ ব্যবহার করিতেছে, আসুন, তাহা অগ্রে দর্শন করি। নবম পরিচ্ছেদ। লঙ্কার পশ্চিমাংশে সাগরবারি বিদীর্ণ করিয়া সুবেলপর্বত উখিত হইয়াছে। তাহার শৃঙ্গসমূহ নাগরাজ বাসুকীর ফণার ন্যায় বহু যােজন পর্যন্ত বিস্তৃত রহিয়াছে। পৰ্বতের যে অংশ সমুদ্রের দিকে স্থিত, তাহা লম্বভাবে প্রাচীরের ন্যায় দণ্ডায়মান ; অপরদিক, ক্রমনিম্ন হইয়া, সমতল ভূমিতে মিলিত হইয়াছে। পর্বত- চূড়ায় রাক্ষসরাজ রাবণের রাজধানী প্রতিষ্ঠিত। তাহার তিন দিক দুর্ভেদ্য প্রাচীরে ও পরিখাদ্বারা রক্ষিত, কেবল যে দিকে সমুদ্র অবস্থিত, দুরাক্রম্য বলিয়া সেদিকে প্রাচীর বা পরিখা নাই। পর্বতের শৃঙ্গে, শৃঙ্গে রাক্ষসরাজের ও তাহার পরিবারবর্গের রমণীয় প্রাসাদ অবস্থিত। প্রত্যেক প্রাসাদের চতুর্দিকে নানা- জাতীয় পুষ্পের কুঞ্জ এবং শ্যামল তৃণাচ্ছাদিত ভূমি। পালিত ময়ুর ও মৃগগণ তাহাতে আনন্দে বিচরণ করিতেছে। সুপ্রশস্ত রাজপথসমূহ, মহাকায় সর্পের ন্যায় শৈলদেহ বেষ্টন করিয়া, শৃঙ্গ হইতে শৃঙ্গান্তরে মিলিত হইয়াছে। পথের উভয় পার্শ্বে নানাজাতীয় পুষ্পবৃক্ষের শ্রেণী এবং মধ্যে মধ্যে কৃত্রিম নিঝর। সেই সকল নিঝর হইতে অনবরত মুজাফলের ন্যায় বারি নির্গত হইতেছে।
৬২ সীতা। পৰ্বতের সানুদেশে পুরবাসীদিগের ভবন। মহামূল্য সজ্জায় সজ্জিত অট্টালিকা, নানাজাতীয় দ্রব্য-সম্ভার-পূর্ণ বিপনী, নাট্য শালা, মধুপানগৃহ, এবং দেবমন্দির সমূহ রাক্ষসপুরীর শােভা বন্ধন করিতেছে। স্থানে স্থানে ছায়াশীতল রসালকুঞ্জ ও কমলদল- পূর্ণ সরােবর। পৰ্বত, সমুদ্র এবং উপবন তিন মিলিত হওয়াতে লঙ্কাপুরী সৌন্দর্য্যে যক্ষরাজপুরী অলকাকেও পরাজিত করিয়াছে। পর্বতের সর্বোচ্চ শিখরে রাক্ষসরাজের ও তাহার প্রিয় মহিষী- গণের ভবন। নানাজাতীয় বহুমুল্য প্রস্তর, প্রবাল, সুবর্ণ, মুক্তা এবং গজদন্তে সেই সকল ভবন খচিত। নগরীর এই অংশে রথের ঘর্ঘর শব্দ, কাৰ্ম্মকের টঙ্কার এবং অশ্বের হ্রেষা শ্রুত হয় না; তাহা কেবলই নৃত্য, গীত ও আনন্দধ্বনিতে পূর্ণ। দিবাকরের সুবর্ণময় করজাল তাহাকে উজ্জ্বল করে ; চন্দ্রমার শুভ্র কিরণে তাহা বিধৌত হয় এবং সাগররাথিত বায়ু তাহাকে নিরন্তর সুখশীতল করিয়া রাখে। অনুপম সুন্দরীগণের কলহাস্যে ও অলঙ্কারসিঞ্জনে তাহা সর্বদা মুখরিত থাকে। রাবণ এই সুখময়ী পুরীতে দেবরাজ ইন্দ্রের ন্যায় প্রতাপে বাস করে। সীতাদেবীকে হরণের কিয়ৎকাল পরে, একদিন অপরাহে, রাবণ আপনার প্রাসাদস্থ একটী নিভৃত কক্ষে সিংহাসনে উপবিষ্ট আছে। অপর কেহ সেখানে নাই ; কেবল তাহার নিকট হইতে কিঞ্চিৎ দূরে মধ্যবয়স্কা একটী রমণী দণ্ডায়মানা রহিয়াছে। যৌবনশ্রী অপগত হইলেও তাহাকে দেখিলে সুন্দরী বলিয়া মনে হয়। তাহার সর্বাঙ্গ রত্নালঙ্কারে বিভূষিত, পরিধান চম্পকবর্ণের বসন। যে রাক্ষসরাজের পরাক্রমে অপর সকলে ভীত, সাধারণ রমণী হইয়াও সে তাহার প্রতি কোন বিশেষ সন্ত্ৰমের ভাব প্রকাশ করিতেছে না। হাস্যে, অঙ্গভঙ্গীতে এবং কটাক্ষপাতে সে এরূপ ভাব প্রকাশ করিতেছে, নবম পরিচ্ছেদ। যেন রাক্ষসরাজের সঙ্গে তাহার বিশেষ ঘনিষ্ঠতা আছে। রাক্ষসরাজ তাঁহাকে সম্বােধন করিয়া বলিল ; “দন্তিকে! সীতাকে ত অনেক দিন তােমার হস্তে সমৰ্পণ করিয়াছি ; কি বুঝিতেছ ? কত দিনে তাহাকে আমার বশীভূত করিতে পারিবে ?” দন্তিকা হাসিয়া বলিল ; “অধিক বিলম্ব নাই; তুমি দিগ্বিজয়ী বীর, যেদিন সূর্যদেবকে প্রভাতে পশ্চিমদিকে উদিত করিতে পারিবে, সেই দিনই সীতা তােমার বশীভূত হইবে।” রাবণ। “তােমার সকল কথাতেই রহস্য ; সূৰ্য্য কি পশ্চিমে উদিত হওয়া কখনও সম্ভবপর ?” দন্তিকা। “সতীর পক্ষে কি পরপুরুষসেবা কখনও সম্ভবপর ?” রাবণ। “এ বয়সে অনেক সতী দেখিয়াছি, কেহ তিন দিনের, কেহ তিন মাসের ; তিন বৎসরের সতী ত এ পর্যন্ত দেখি নাই। বলপ্রয়ােগে একদিনেই আমি সীতার দর্প চূর্ণ করিতে পারি। কিন্তু আমি তাহাকে আমার প্রধানা মহিষী করিব বলিয়া স্থির করিয়াছি। বলপ্রয়ােগে তাহার মহিষীপদের মর্যাদা চিরদিনের জন্য নষ্ট হইবে। তাহার পর সীতা যেরূপ তেজস্বিনী তাহাতে বলপ্রয়ােগ করিলে সে অভিমানে আত্মহত্যা করিতে পারে। এই সকল কারণে, সময় দিয়া, তাহাকে অল্পে অল্পে বশীভূত করিতে আমার ইচ্ছা। আমার প্রাসাদ, উপবন, রত্নভাণ্ডার সকলই উন্মুক্ত করিয়া দিতেছি। সীতা কোন বস্তু আহার করিতে ভালবাসে, কিরূপ বস্ত্রালঙ্কার তাহার প্রিয়, অনুসন্ধান কর। খ্রীজাতি হইয়া ভােগসুখের জন্য আত্মবিক্রয় না করে, এমন কাহাকেও ত আমি এ পর্যন্ত দেখি নাই। আমার গন্ধোৎকটা নামে যে হস্তিনী ধৃত করিবার সময় সর্বাপেক্ষা উগ্র ও অদম্য ছিল, সুখাদ্যের লােভে সেই এখন আমার সর্বাপেক্ষা বশীভূতা। সেই এখন অন্য সীতা। হস্তিনীদিগকে ধৃত করিয়া আনে। তুমিও ত এক দিন সতীপণী দেখাইয়াছিলে?” দস্তিকা কুটী করিয়া বলিল, “দুরাচার ! আমার সর্বনাশ করিয়া আবার আমায় ব্যঙ্গ করিতেছ? আমার স্বামী, আত্মীয়, স্বজন যুদ্ধে নিহত না হইলে আমি তােমার কেমন বশীভূত হইতাম, দেখিতে পাইতে। আমি চলিলাম।” দন্তিকা এই বলিয়া ক্রোধে গমনােম্মুখী হইলে রাক্ষসরাজ তাহার হস্ত ধারণ করিয়া বলিল, “দন্তিকে! একটী রহস্যও কি করিতে দিবে না? এত বস্ত্রালঙ্কার দিয়া, এত ভালবাসিয়াও, তােমার মন পাইলাম না, ইহাই আশ্চৰ্য্য।” দস্তিকা শুনিয়া অবজ্ঞার সহিত বলিল ; ‘ধূর্ত! আর ভাল- বাসার কথা মুখে আনিও না। বস্ত্রালঙ্কার দিতেছ সত্য, কিন্তু তুমি তােমার গন্ধোৎকটা হস্তিনীকে যে জন্য রাখিয়াছ, আমাকেও যে সেইজন্য রাখিয়াছ, তাহা কি আমি বুঝিতে পারি না? আমার কথা শুন! আমি স্বয়ং সতী না হইলেও কে সতী, কে অসতী তাহা বুঝিতে পারি। তুমি এ পর্যন্ত প্রকৃত সতী রমণী দেখ নাই, তাই সতীর শক্তি, সতীর গৌরব জান না। নিশ্চয় জানিও, তুমি সীতাকে কিছুতেই বশীভূত করিতে পারিবে না।” রাবণ। “ভাল! পরীক্ষা করিয়া দেখি। এখন তুমি বল, তাহাকে বশীভূতা করিবার জন্য কি কি উপায় অবলম্বন করিয়াছিলে ?” দন্তিকা। “অন্য সকলের সম্বন্ধে যে যে চেষ্টা করিয়াছি, তাহার সম্বন্ধে বরং তদপেক্ষা অধিক চেষ্টা করিয়াছি। প্রথমে নির্যাতন, তাহার পর সুখের প্রলােভন, সান্ত্বনা, ভৎসনা, কিছুই অপরীক্ষিত রাখি নাই। তাহাকে সপ্তাহকাল অনাহারে রাখিয়া তাহার পর অমৃতের ন্যায় স্বাদু অম, পানীয় নির্জনে তাহার নিকট রাখিয়া নবম পরিচ্ছেদ। ; দিয়াছি; কিন্তু সীতা একবার সে দিকে দৃষ্টিপাতও করে নাই। যেখানে দংশ, মশক ও বৃশ্চিকের উৎপাতে লােকে চক্ষু মুদিত করিতে পারে না, রাত্রির পর রাত্রি, সীতাকে সেই বৃক্ষতলে রাখিয়া, পরে, উৎকৃষ্ট স্থানে, দুগ্ধফেননি শয্যা রচনা করিয়া তাহাকে শয়ন করিতে আহ্বান করিয়াছি, কিন্তু সীতা, ধ্যানস্থা হইয়া, সেই বৃক্ষতলেই রাত্রি যাপন করিয়াছে ; শয্যার নিকটেও যায় নাই। ধ্যানাবস্থায় তাহাকে দেখিয়া মনে হইয়াছে যেন তরুতলে কেহ স্বর্ণময়ী প্রতিমা প্রতিষ্ঠা করিয়াছে। কেবল “রাম রাম” উচ্চারণে তাহার অধরেষ্ঠের কম্পন হইতেই তাহাকে জীবিতা বলিয়া জ্ঞান হইয়াছে। যখন তীব্র উত্তর বায়ুতে লােকের শরীর কণ্টকিত হইয়া উঠিয়াছে, তখন তাহার সমীপে সুখস্পর্শ, লােমজ বস্তু রাখিয়া দিয়াছি, কিন্তু সীতা তাহা স্পর্শও করে নাই। তৈলাভাবে সীতার মস্তকের কেশ রূক্ষ, অনাহারে তাহার দেহ ক্ষীণ, অসংস্কারে তাহার বর্ণ মলিন, চিন্তায় তাহার কপােলন্বয় পাণ্ডুবর্ণ ; তথাপি তাহার কান্তিতে অশােকবন উজ্জ্বল হইয়া আছে। জানি না সীতা কোন্ মন্ত্রে দীক্ষিতা, কোন্ দেবতার বলে বলবতী। ধর্মের জন্যই হউক আর অধর্মের জন্যই হউক, তুমি আমায় আশ্রয় দিয়াছ ; তােমার হিতের জন্য দুই একটা কথা বলি, শুন। লালসার শেষ নাই; ভােগে কখনও কামনার তৃপ্তি হয় না। বিধাতার নিয়মে পাপের প্রায়শ্চিত্ত হইবেই হইবে। তােমার পাপভার যথেষ্ট হইয়াছে ; সীতার ন্যায় সতীর ধর্মনাশের চেষ্টা করিয়া সবংশে ধ্বংস হইও না।” রাবণ শুনিয়া ক্ষণকাল নিস্তব্ধ রহিল, পরে বলিল ; “তােমার উপদেশ রাখিয়া দাও, এখন বল, সীতাকে আমার ঐশ্বৰ্য্য দেখাইয়া- ছিলে কি না। আমার কথা বুঝিলে ত ?” • ;
৬৬ সীতা। ; দন্তিকা বলিল, “বুঝিলাম বই কি! সেদিন সন্ধ্যার পর, সীতাকে লইয়া, পুষ্পকারােহণে তােমার প্রিয় মহিষীদিগের পুরী দেখাইছে হইয়া গিয়াছিলাম। আমার উপদেশে সে দিন গৃহে, গৃহে উৎসবের আয়ােজন হইয়াছিল। গন্ধতৈলপূর্ণ স্ফটিক- দীপের আলােকে পুরী উজ্জ্বল, চন্দন-বারিতে গৃহ, প্রাঙ্গণ ও পথ সিক্ত, এবং পুষ্পভরণে তােরণসমূহ সুসজ্জিত হইয়াছিল। নৃত্য, গীত ও বাদ্যধ্বনিতে প্রতিগৃহ মুখরিত হইতেছিল ; সুস্বাদু খাদ্যের ও অমৃততুল্য মদিরার গন্ধ চতুর্দিকে প্রসারিত হইতেছিল। সুবেশা, সুরূপা দাসীগণ ময়ূরপুচ্ছ-নির্মিত ব্যজনী হন্তে সিংহাসনস্থা, রত্নালঙ্কার-বিভূষিতা তােমার মহিষীদিগকে ব্যজন করিতেছিল। আমি তাহাদিগকে দেখাইয়া সীতাকে বলিলাম, “বৈদেহি ! দেখ, এই সকল রমণীদিগের মধ্যে কেহ সামান্য গৃহস্থের বধু, কেহ বনচারী তপস্বীর পত্নী, কেহ বা কৃষিজীবীর দুহিতা ছিল, কিন্তু আমাদের মহারাজের কৃপায় ইহারা এক্ষণে ইন্দ্রাণীর ন্যায় সুখে কালযাপন করিতেছে।” “রাক্ষসরাজ শুনিয়া ব্যগ্রচিত্তে বলিল; “শুনিয়া সীতা কি বলিল ?” দন্তিকা। “সীতা প্রথমে কিছুই বলিল না; কিন্তু দেখিলাম, তাহার নীলােৎপল তুল্য চক্ষু দুইটা হইতে অশ্রুধারা নির্গত হইতেছে।” রাক্ষসরাজ। “ইহাই ত আমি চাহিতে ছিলাম। আমার মহিষী হইলে যে কি সুখ তাহা সে বুঝিয়াছে ; আমার মহিষীদিগের সহিত তুলনায় নিজের শশাচনীয় অবস্থা ভাবিয়াই নিশ্চয় সে অশ্রুপাত করিয়াছে। তবে তুমি বলিতেছিলে কেন যে, সে কখনই আমার বশীভূতা হইবে না? আর সপ্তাহকাল চেষ্টা কর, দেখিবে, সীতা আমার ক্রোড় ছাড়িয়া কোথাও যাইতে চাহিবে না।”
দশম পরিচ্ছেদ।
;
;
দন্তিকা। নির্বোধ ! শুন, সীতা নিজের কষ্টের জন্য ক্রন্দন
করে নাই ; সীতা তােমার মহিষীদিগের পরিণাম দেখিয়াই ক্রন্দন
করিয়াছিল। সীতা বলিল ; “হতভাগিণীগণ! এই তুচ্ছ সুখের
জন্য নারীর সর্বস্ব ধন সতীত্ব বিসর্জন করিয়াছ! ইহার অপেক্ষা
কুকুরীর ন্যায় রাজপথের ধূলিলিপ্ত উচ্ছিষ্ট অন্ন আহার করিয়া
প্রাণধারণ করিলেও ত ভাল হইত। সতীত্ব রক্ষার জন্য প্রাণ দিলে
কেন?” তাহার পর সীতা আমাকে বলিল ; “দুতি! আমায়
এ দৃশ্য আর দেখাইও না; নারী হইয়া নারীর অধঃপতন আর
দেখিতে পারি না।”
“এখন তুমি বুঝিলেত !”
রাবণ এইবার একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ছাড়িয়া বলিল ; “বুঝিলাম,
কিন্তু প্রাণ থাকিতে সীতার আশা ত্যাগ করিতে পারিব না।
তুমি যাও, সন্ধ্যার পর আমি স্বয়ং আজ অশােকবনে যাইব,
দেখিব, সীতা আমার বশীভূত হয় কি না।”
দন্তিকা রাবণকে অভিবাদন করিয়া বিদায় লইল।
দশম পরিচ্ছেদ।
রাবণের প্রাসাদের অবিদূরে একটা সুন্দর উপবন সুবেলশিখর
হইতে ত্রিকূটশৃঙ্গ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। চম্পক, বকুল, নাগকেশর,
অশােক, কিংশুক, কদম্ব প্রভৃতি তরুদলে তাহা সকল ঋতুতেই
অপূৰ্ব শােভায় সুশােভিত থাকিত। বসন্ত সময়ে যখন তাহাতে
গুচ্ছে গুচ্ছে অশােককুসুম প্রস্ফুটিত হইত, তখন তাহার শােভার
উপমা থাকিত না। অন্যান্য তরু সত্বেও অশােতর বাহুল্য
বশতঃ তাহা অশােকবন নামেই পরিচিত ছিল। রাবণ সীতা-
৩৮ সীতা। দেবীকে এই অশােকবনে প্রহরিণীগণে পরিবৃতা করিয়া রাখিয়া ছিল। একদিকে সমুদ্র, অপর তিন দিকে প্রস্তরনির্মিত প্রাচীর উপবনটীকে লােকচক্ষুর অদৃশ্য করিয়া রাখিত। রাবণ ভিন্ন অপর কোনও পুরুষের হাতে প্রবেশাধিকার ছিল না। প্রহরিণী- গণ অতি সাবধানে তাহার প্রবেশপথ রক্ষা করিত। কিন্তু উপবনের যে অংশে পৰ্বত সমুদ্রের দিকে লম্ব ভাবে উঠিয়াছিল, সেই দিক হইতে কাহারও উপবনে প্রবেশের সম্ভাবনা ছিল না বলিয়া সে দিকে কোন প্রহরিণী থাকিত না। যে দিন অপরাহ্ েরাবণ দন্তিকার সহিত কথােপকথন করিতেছিল, সেই দিন, সন্ধ্যার পূর্বে, উপবনের এই অংশে, একটী শিলাস্তুপের উপর দণ্ডায়মান হইয়া কোনও অনুপম লাবণ্যবতী রমণী এক দৃষ্টে সমুদ্র দর্শন করিতেছিলেন। তাহার পরিধেয় বসন জীর্ণ ও মলিন, তাহার দেহ অলঙ্কারশূন্য, এবং মস্তকের কেশ রুক্ষ ; একমাত্র বেণীর আকারে তাহার কেশদাম তাহার জানু স্পর্শ করিতেছিল। সান্ধ্য বায়ু, ধীরে ধীরে, প্রবাহিত হইয়া, তাহার অলকাম কম্পিত করিতে ছিল। তাহার দৃষ্টি স্থির এবং অঙ্গ নিশ্চল ; তাহাকে দেখিলে সুনিপুণ শিল্পীর নির্মিত দেবীমুর্তি বলিয়া মনে হইত। বলা নিষ্প্রয়ােজন ইনিই সীতাদেবী। তাহার সম্মুখে সীমান্য, নীলােজ্জল মহাসমুদ্র প্রসারিত। সীতাদেবী এক দৃষ্টে সমুদ্রের দিকে চাহিয়া- ছিলেন আর ভাবিতে ছিলেন, “এই অকুল সাগর অতিক্রম করিয়া প্রভু কি কখন এখানে আসিতে পারিবেন ? না। তবে আমার উদ্ধারের আশা কোথায় ? মৃত্যু ভিন্ন এই দুরাচারের হস্ত হইতে আমার নিষ্কৃতির উপায় নাই। কিন্তু দেখি ; মৃত্যুত আমার হস্তেই আছে। মরিলে তাহাকে দেখিতে পাই না। আত্মহত্যাজনিত পাপে পরলােকেও তাহার সহিত মিলনের আশা নষ্ট হইবে। আর ?
দশম পরিচ্ছেদ। ; আমি মরিলে হয়ত পাপিষ্ঠকে দণ্ড দিবার জন্য তাহার তাদৃশ আগ্রহ থাকিবে না। সুতরাং যতই কষ্ট হউক মরিব না ; দেখি কি হয়।” তিনি যে শিলাস্তুপের উপর দণ্ডায়মান ছিলেন, তাহার নিম্নেই পাষাণময় বন্ধুর বেলাভূমি ; উচ্ছল তরঙ্গরাজী পুনঃ পুনঃ তাহাতে আঘাত করিয়া ফেনদাম বিকীর্ণ করিতেছিল। সন্ধ্যার ছায়া ধীরে ধীরে দূরবর্তী নারিকেলকুঞ্জে ঘনীভূত হইতে ছিল। হংস, সারস এবং চক্রবাক প্রভৃতি জলচর পক্ষিগণ সন্ধ্যাসমাগমে সমুদ্রকুল ত্যাগ করিয়া উড্ডীন হইতেছিল। জালজীবিগণ, সমুদ্রতটস্থ গুল্মে আপনাদিগের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নৌকা বন্ধন করিয়া গৃহাভিমুখে গমনের উদ্যোগ করিতেছিল। ক্রমে সূৰ্য্য সমুদ্র- বারি অলক্তক রাগে রঞ্জিত করিয়া তন্মধ্যে নিমগ্ন হইলেন ; সঙ্গে সঙ্গে চতুর্দিক অন্ধকারে আবৃত হইল। এই সময় সীতাদেবী দেখিতে পাইলেন এক অদ্ভুতদর্শন, মহাকায় পুরুষ বেলাভূমি হইতে আসিয়া পৰ্বতশৃঙ্গে আরােহণ করিতেছে। পৰ্বতপার্শ্ব এই স্থানে এরূপ দুরাবােহ যে, মনুষ্যের কথা দুরে থাকুক, পার্বত্য ছাগও সেখান দিয়া আরােহণ করিতে পারে না। কিন্তু আগন্তুক, অবলীলাক্রমে, কখনও পর্বতপার্শ্ব হইতে বিলম্বিত বৃক্ষশাখা ধারণ করিয়া, কখনও প্রস্তর হইতে প্রস্তরে উল্লম্ফন দিয়া, মহাবেগে অগ্রসর হইতেছিল। ক্রমে চন্দ্রোদয় হইল ; সীতাদেবী দেখিতে পাইলেন আগন্তুকের দেহ অতি প্রকাণ্ড; তাহার বাহয় আজানুলম্বিত, বক্ষস্থল বিশাল, হনুদ্বয় উন্নত, গ্রীবা ও স্কন্ধ মাংসল এবং সৰ্বাঙ্গ সুদৃঢ়। দেখিবামাত্রই তাহাকে অসাধারণ বলশালী বলিয়া মনে হয়। সে লক্ষে লক্ষে আসিয়া, যে শিলাপের উপর সীতাদেবী দণ্ডায়মান ছিলেন, তাহার নিয়ে উপস্থিত হইল।
সীতা। • ও সীতাদেবী তাহাকে দেখিয়া চমকিতা হইলেন, ভাবিলেন একি রাবণের চর কোন দুরভিসন্ধিতে আমার নিকট আসিয়াছে ; আবার ভাবিলেন তাহা হইলে, এভাবে, এ পথ দিয়া আসিবে কেন ? তবে কি এ আমার প্রভুর দূত গােপনে আমার অনুসন্ধানে আসিয়াছে। ভাবিতে তাঁহার সর্বশরীর আনন্দে রােমাঞ্চিত হইয়া উঠিল। এই সময় “মহারাজ আসিতেছেন, মহারাজ আসিতেছেন” বলিয়া চেড়ীদিগের কোলাহল শ্রুত হইল। শুনিয়া সীতাদেবী শিলাপ হইতে অবতরণ করিলেন। আগন্তুকও সেই অবসরে কোথায় যে বৃক্ষান্তরালে অন্তর্হিত হইল, তাহা তিনি দেখিতে পাইলেন না। চন্দ্রোদয়ের সঙ্গে অশােক বন দ্বিগুণ শােভায় সুশােভিত হইয়াছিল। মৃদুবায়ু উপবনস্থ বকুলবৃক্ষের শাখা কম্পিত করিয়া চতুর্দিকে তীব্র মধুর সৌরভ বিকীর্ণ করিতেছিল। রাক্ষসরাজ, মদিনাপানে ঋলিতপদে এবং ঘূর্ণিত নয়নে, অনুচরীগণে পরিবৃত হইয়া, অশােকবনে প্রবেশ করিল। অস্ত্রধারিণী ও আলােক- বৰ্ত্তিধারিণী চেড়ীগণ তাহার অগ্রে অগ্রে এবং তাহার মহিষীগণ তাহার সঙ্গে সঙ্গে গমন করিতে লাগিল। তাহার পশ্চাতে শত শত সুবেশা দাসী তাহার অনুগমন করিতেছিল। তাহাদিগের মধ্যে কাহারও হস্তে মহামূল্য রত্নালঙ্কার, কাহারও হন্তে স্বর্ণ- খচিত কৌষেয় বসন, কাহারও হস্তে সুরস খাদ্য, কাহারও হন্তে সুশীতল বারিপূর্ণ স্বর্ণময় ভৃঙ্গার, কাহারও হন্তে মদিনাপূর্ণ পাত্র। রাবণ, ধীরে ধীরে অগ্রসর হইয়া, যে তরুমূলে সীতাদেবী আপনার জীর্ণ বসন ও বাহরা বক্ষ আবৃত করিয়া অপােবদনে অবস্থিতি করিতেছিলেন, তথায় উপনীত হইল। দুৰ্বত্ত বহুক্ষণ তাহাকে মুগ্ধনেত্রে নিরীক্ষণ করিয়া বলিল, “নিষ্ঠুরে। আমি তােমার দশম পরিচ্ছেদ। ৭১ ; একান্ত অনুগত; তােমা ভিন্ন আমার প্রাণরক্ষা হইবে না। সেই জন্য বারংবার তােমার দুৰ্বাক্য শ্রবণ সত্ত্বেও আমি তােমার নিকট আসিয়াছি। দেখ, জ্যোৎস্নালােকে এই উপবনের কি অপূৰ্ব্ব শােভা হইয়াছে ; বকুল ও চম্পকের গন্ধে চতুর্দিক আমােদিত হইতেছে। এ সময় তােমাকে এ বেশে এই তরুতলে অবস্থিতি করিতে দেখিয়া আমার হৃদয় বিদীর্ণ হইতেছে। এ বেশ ত্যাগ কর, ইহা তােমার উপযুক্ত নয়। এই দেখ দাসীগণ আমার ভাণ্ডারের সর্বোৎকৃষ্ট রত্ন, দেবদুর্লভ বস্ত্রালঙ্কার এবং সুখাদ্য ও সুপেয় লইয়া তােমার আদেশ অপেক্ষা করিতেছে ; ইচ্ছানুরূপ এই সকল বস্তু উপভােগ কর। অথবা এ সকল যদি তােমার মনােমত না হয় তবে পৃথিবীতে কোন্ বস্তু তােমার অভিলষিত তাহা আমাকে বল। আমি তােমার পিতা জনককে পৃথিবীর অধীশ্বর করিয়া দিব ; তােমার আত্মীয়, স্বজনদিগকে তাহাদিগের ঈপিত বস্তু প্ৰদান করিব ; তােমাকে আমার মহিষীদিগের মধ্যে প্রধানা করিব ; দেবকন্যাগণ তােমার সেবা করিবে। আমার পুষ্পকরথ, সৰ্বৰ্ত্তসুখ প্রাসাদ, নন্দনবিজয় উপবন তােমার হইবে। কৈলাস হইতে লঙ্কা পর্যন্ত যেখানে ইচ্ছা তুমি বিহার করিবে। দেবী, গন্ধৰ্ব্বী মানবী কেহ কখনও যে সুখ ভােগ করে নাই, তুমি তাহার অধিকারিণী হইবে! বনচারী দরিদ্র রাম তােমার ন্যায় নারীরঙ্গের আদর কিরূপে করিবে? তুমি এই ভুবনমােহিনী লঙ্কাপুরীর অধিশ্বরী হইবার যােগ্যা। দাসীগণ এই সময় রাবণের ইঙ্গিতে, তাহাদিগের আনীত বস্ত্রালঙ্কার, গন্ধদ্রব্য এবং উৎকৃষ্ট খাদ্য, পানীয় সমূহ সীতাদেবীর সম্মুখে পাকারে রাখিয়া দিল। স্বর্ণাধারস্থিত রত্নরাজির উপর দীপালােক পতিত হওয়াতে তাহা অপূর্ব জ্যোতি বিকীর্ণ १२ সীতা। ; করিতে লাগিল; কিন্তু সীতাদেবী সেদিকে দৃষ্টিপাতও করিলেন । তখন রাবণ, তাহার আসনের সম্মুখে মস্তক নত করিয়া, হস্তদ্বারা তাঁহার পদযুগল ধারণের চেষ্টা করিল। দেখিয়া সীতাদেবী সেখান হইতে সরিয়া বসিলেন এবং রাবণকে সম্বােধন করিয়া বলিলেন; “মূঢ়! তুমি আমায় ঐশ্বর্যের প্রলােভনে মুগ্ধ করিবার চেষ্টা করিতেছ ? কিন্তু আমার স্বামীর পদের একটা ধূলিকণা আমি তােমার সমস্ত ঐশ্বর্যের অপেক্ষা অধিক মূল্যবান্ বলিয়া মনে করি। আমার স্বামী বনচারী হউন আর সিংহা- সনস্থ হউন, তিনি আমার দেবতা ; স্বপ্নেও কখন তাহাকে ভিন্ন অপর কাহাকেও আমি চিন্তা করি নাই। তােমার পাপ সংকল্প ত্যাগ কর ; সতীর সতীত্ব নাশের অপেক্ষা পৃথিবীতে আর অধর্ম নাই। কেন এ অধর্মের আচরণ করিয়া নিজের সর্বনাশে উদ্যত হইয়াছ?”. রাবণ বলিল ; “আমরা রাক্ষস, বলে পত্নীগ্রহণই আমাদিগের ধৰ্ম্ম, সুতরাং তােমাকে বলে গ্রহণ করাতে আমার কোন অধৰ্ম্ম হয় নাই। আর তুমি যে বারংবার তােমার স্বামীর গর্ব কর, আমি ত তাহাকে কীটের অপেক্ষা তুচ্ছ মনে করি। আমি ইঙ্গিত করিলে প্রভাতের পূর্বেই তাহার মুণ্ড তােমার পদতলে লুষ্ঠিত হইতে পারে। যদি তােমার স্বামীর প্রতি তােমার যথার্থ মমতা থাকে, তবে, তাহার প্রাণরক্ষার জন্য, আমার বশীভূত হও। আমি তােমার প্রীতির জন্য তাহাকে প্রাণে বধ করিব না।” শ্রবণ মাত্র সীতাদেবীর হৃদয় যেন অগ্নিময় হইয়া উঠিল। সর্বশরীর কম্পিত হইতে লাগিল, নাসারন্ধু ফুরিত হইল। তিনি ক্রোধােদীপ্ত বচনে বলিলেন ; “পাপিষ্ঠ। তােনার মত নির্লজ্জ পৃথিবীতে দ্বিতীয় নাই ;
দশম পরিচ্ছেদ। १७ ? তুমি এই নারীগণের সম্মুখে গৰ্ব্ব করিয়া বলিতেছ যে, তুমি আমাকে বলে হরণ করিয়াছ ? তােমার কি মনে হইতেছে না যে, লােভী কুকুর যেমন গােপনে যজ্ঞীয় শ্রুক মুখে লইয়া পলায়ন করে, তুমি তেমনি আমার স্বামীর অসাক্ষাতে আমায় লইয়া পলায়ন করিয়াছিলে ? একবার পশ্চাৎ ফিরিয়া চাহিতেও তােমার সাহস হয় নাই। তুমি বলিতেছ, তুমি অনুকম্পা করিয়া আমার স্বামীকে প্রাণে বধ করিতেছ না, কিন্তু, পাপিষ্ঠ! যে দিন আমার স্বামীর সুতীক্ষ্ণ শর তােমার বক্ষের শােণিত পান করিবে, সেই দিন তুমি বুঝিবে যে, রাজা জনক পুরুষসিংহের কন্যাদান করিয়াছিলেন ; আর তুমি কুকুর হইয়া সিংহীর প্রতি লােভ করিয়াছিলে।” রাবণ মদ্যপানে উত্তেজিত হইয়া সীতাদেবীর নিকটে আসিয়াছিল ; স্ত্রীগণের সম্মুখে এরূপ তিরস্কারে ধৈৰ্য্যচ্যুত হইল। তাহার চক্ষু আরক্ত হইল ; শরীর ক্রোধে কম্পিত হইতে লাগিল সে, নিজের অধর দংশন করিয়া, আপনার কটিবন্ধস্থিত অসি কোষমুক্ত করিবার জন্য উদ্যোগী হইল। তাহার ভাব দেখিয়া তাহার মহিষীগণ ও চেড়ীগণ শঙ্কিত হইল; কিন্তু সীতাদেবী তাহাকে দেখিয়া বিন্দুমাত্রও ভীত হইলেন না, এক পদও পশ্চাৎ- বর্তিনী হইলেন না। তিনি বসিয়াছিলেন, উঠিয়া দাড়াইলেন; তাহার চক্ষু দুইটী হইতে যেন দুইটী প্রচণ্ড অগ্নিশিখা নির্গত হইতে লাগিল। তিনি একবার উর্ধনেত্রে আকাশের দিকে চাহিয়া দেখিলেন ; অনিমেষ নয়নে কি যেন দেখিয়া তাঁহার মুখ প্রফুল্ল হইল। তিনি অনুচ্চস্বরে একবার বলিলেন, “মা! এসেছ ?” তাহার পর আপনার স্বাভাবিক মধুর অথচ দৃঢ়তাব্যঞ্জক স্বরে রাবণের দিকে চাহিয়া বলিলেন ; “কাপুরুষ! তুই আপনাকে বীর বলিয়া ৭৪ সীতা। • গর্ব করিস্ ; অসহায় নারীর প্রতি এইরূপ ব্যবহারে কি তাের বীরত্ব? তুই আমাকে অসহায়া মনে করিতেছি, কিন্তু আমি অসহায়া নই। লঙ্কাপুরীর অধিষ্ঠাত্রী, সতীশিরােমণি দেবী চণ্ডিকা আমার সহায়। এই দেখ, তিনি আমার পার্শ্বে দণ্ডায়মানা ; এই দেখ, তাহার হস্তের খড় বিদ্যুৎপ্রভায় ঝলসিত হইতেছে, তাের বক্ষের উপর পতিত হইবার পূর্বে এস্থান ত্যাগ ক।” সতীর তেজ-প্রদীপ্তমূর্তি দর্শনে রাবণ স্তম্ভিত হইল। তিনি যেদিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করিয়াছিলেন, একবার বিস্ময়ে সেইদিকে দৃষ্টিপাত করিল, কিন্তু কিছুই দেখিতে পাইল না, অথচ যেন কোন দৈবশক্তি তাহার সর্বাঙ্গ নিশ্চল করিল ; এই সময় ধান্যমালিনী নামে রাবণের এক পত্নী, পশ্চাৎ হইতে আসিয়া, তাহার অসি বলপূর্বক গ্রহণ করিল এবং তাহাকে আলিঙ্গন করিয়া বলিল ; “মহারাজ ! আপনি এ কি করিতেছেন? ত্রিভুবনবিজয়ী বীর হইয়া নারীর দেহে অস্ত্রাঘাত করিতে যাইতেছেন ? শুনিলে লােকে কি বলিবে ? সীতা মানুষী, সে আপনার মহিমা ও বীৰ্য্য কি বুঝিবে ? আপনাকে দেখিয়া সে ভয়ে কম্পিত হইতেছে ; আপনার স্পর্শমাত্র হয় ত সে প্রাণত্যাগ করিবে। আপনি চলুন, আমরা আপনার প্রীতিসম্পাদন করিব।” শুনিয়া রাবণ কোপ ত্যাগ করিল এবং সীতাদেবীকে সম্বােধন করিয়া বলিল ; “রূপাভিমানিনি! তােমার সহিত আমার প্রতিজ্ঞা ছিল যে, আমি তােমায় এক বৎসর সময় দিব ; তাহার দশমাস গত হইয়াছে, আর দুইমাস মাত্র সময় আছে। ইহার মধ্যে তুমি আমার বশীভূতা না হও আমার সুদগণ তােমাকে আমার প্রাতরাশের জন্য খণ্ড খণ্ড করিবে। জীবিতাবস্থায় তােমাকে ভােগ করিতে না পাই, তােমার মৃতদেহের রক্ত, মাংস ভােগ করিয়া তৃপ্ত হইব।” ? •
No text on this page.
URAY
অশােকবনে রাক্ষসী পরিবেষ্টিত সীতাদেবী।
সীতা ৭৫ পৃষ্ঠা।
একাদশ পরিচ্ছেদ
রাবণ এই বলিয়া নিজের প্রাসাদাভিমুখে প্রস্থান করিল।
তাহার সঙ্গিনীগণও অনেকে তাহার অনুবর্তিনী হইল।
একাদশ পরিচ্ছেদ।
বসিল।
রাবণ প্রস্থান করিলে তাহার পত্নী ও অনুচরীগণের মধ্যে
যাহারা সেখানে রহিল, তাহারা সীতাদেবীকে বেষ্টন করিয়া
কেহ উপহাসসূচক স্বরে, কেহ বা পরুষ বচনে, কেহ
বা মধুর ভাষায় তাঁহাকে নানা কথা বলিতে লাগিল। একজন
বলিল
“আহা কি সতীপণাই দেখাইতেছেন! আর কাহারও ত
স্বামী থাকে না, আর কেহ ত স্বামী লইয়া ঘর সংসার করে না?
যথেষ্ট হইয়াছে ; আর কেন ? এখন মানে মানে আদরিণী হয়ে
থাকুন, নচেৎ ধৰ্ম্মও যাবে, প্রাণও যাবে। ধান্যমালিনী না থাকলে
এতক্ষণে ত সব শেষ হয়ে যেত।”
আর একজন বলিল, “সীতে! তুমি কি বিশ্বাস কর যে, তােমার
স্বামী এসে তােমাকে উদ্ধার কবেন ? এই অকুল সমুদ্র, এই
পার্বত্য দুর্গ, এখান হতে তােমাকে উদ্ধার করা দেবতাদেরও
সাধ্য নয়, মানুষ কোন ছার! রাক্ষসরাজের বশীভূত হও,
অকারণ কষ্ট পাও কেন?”
তৃতীয়া একজন মৃদুস্বরে বলিল, “জানকি। আমিও তােমার
মত মানুষী, কাশী আমার পিতৃভূমি ; তােমার পিতার সঙ্গে আমার
পিতার পরিচয় আছে। বানপ্রস্থাশ্রমতি আমার বৃদ্ধ স্বামীর
নিকট হতে রাক্ষসরাজ আমায় হরণ করে এনেছিলেন। নিরুপায়ে
এখন আমি তার পত্নীত্ব স্বীকার করেছি। তুমি তার বশীভূত
৭৮
সীতা।
তুমি আমার প্রভুর নিকট হইতে আসিয়াছ, তাহার কুশল
সংবাদ বল।”
হনুমান তখন একে একে মায়ামৃগের অনুসরণ হইতে
রামচন্দ্রের শূন্য কুটীরে প্রত্যাগমন, নানাস্থানে অন্বেষণের পর
জটায়ুর মুখে রাবণকর্তৃক সীতাহরণবৃত্তান্ত শ্রবণ, সুগ্রীবের সহিত
সখ্য স্থাপন, বালিবধ, সীতার অন্বেষণে সুগ্রীব কর্তৃক চতুর্দিকে দূত
প্রেরণ এবং অবশেষে নিজের সমুদ্র উত্তরণ ও লঙ্কায় আগমন
আদ্যোপান্ত বৰ্ণন করিলেন। সীতাদেবী শুনিয়া সজল নয়নে
বলিলেন, “বৎস! প্রভু কত দিনে লঙ্কায় আসিবেন বলিয়া
মনে হয় ?”
হনুমান বলিলেন; “আমি প্রতিগমন করিয়া সংবাদ দিলেই
তিনি আসিবেন। রাবণ যে দুইমাস আপনাকে সময় দিয়াছে,
সেই দুই মাসের মধ্যেই আপনার উদ্ধার হইবে। কিন্তু মা ।
আপনাকে ছাড়িয়া যাইতে আমার ইচ্ছা হইতেছে না। রাবণের
সহিত আজ আপনার যে কথােপকথন হইয়াছিল, আমি তাহা
সমস্তই শুনিয়াছি। এই দুৰ্বত্তের নিকট আপনাকে একাকিনী
রাখিয়া যাইতে আমার আশঙ্কা হইতেছে। আপনি অনুমতি
করুন, আমি আপনাকে স্কন্ধে লইয়া প্রস্থান করি। আমি যে
দুর্গম পথে আসিয়াছি, সে পথে কেহ আমার অনুসরণ করিতে
পারিবে না। আমি অনায়াসেই আপনাকে লইয়া কোন নিরাপদ
স্থানে পঁহুছিতে পারিব।”
সীতাদেবী বলিলেন “বৎস! তােমার সঙ্গে পলায়ন আমার
কৰ্তব্য নয় ; আমার প্রভু আমাকে উদ্ধার করিলে উহারও গৌরব
আমারও গৌরব। তুমি পুত্রস্থানীয় হইলেও তােমার অঙ্গ স্পর্শ
করা আমার পক্ষে উপযুক্ত হইবে না। আমার জন্য চিন্তা
দ্বাদশ পরিচ্ছেদ।
৭৯
করিও না। আমার মৃত্যুর পর রাবণ আমার রক্ত, মাংস ভােগ
করিতে পারিবে, কিন্তু জীবন থাকিতে আমার দেহ ভােগ করিতে
পারিবে না। তুমি আমার এই অভিজ্ঞানমণি লইয়া যাও ;
প্রভুর চরণে দিয়া বলিও, সীতা তাহার দর্শনের অপেক্ষায় প্রাণ
রাখিয়াছে। দুই মাসের মধ্যে তাহার উদ্ধার না হইলে সে রাবণের
ভক্ষ্য হইবে।”
হনুমান সীতাদেবীর চরণে প্রণাম করিয়া বিদায় লইলেন।
দ্বাদশ পরিচ্ছেদ।
সীতাদেবী হনুমানকে যেরূপ সুশীল বালকটীর মত দেখিয়া-
ছিলেন, হনুমান বাস্তবিক সেরূপ সুশীল বালক ছিলেন না।
হনুমান সীতাদেবীর নিকট বিদায় লইবার পর ভাবিলেন, “প্রভুর
আগমনের এখনও ত বিলম্ব আছে ; এই রাক্ষসাধম ও তাহার
পরিজনেরা আজ মাতাঠাকুরাণীর সঙ্গে যেরূপ ব্যবহার করিয়াছে,
বার বার সেরূপ করিলে ত তাহার প্রাণ থাকিবে না। ইহা
নিবারণের একটা উপায় “করিতেই হইবে। রাবণ বুঝুক যে,
রামচন্দ্র দূরে থাকুন, তাহার দূতের হন্তেই নিস্তার নাই। কিন্তু
আমি একা, রাক্ষসেরা অসংখ্য।” হনুমান কিয়ৎক্ষণ ভাবিয়া
বলিলেন; “ভাল ! দেখি ; প্রভুর দয়ায় কি করিতে পারি।”
হনুমান এই ভাবিয়া প্রথমেই রাবণের সুন্দর উপবন নষ্ট
করিতে আরম্ভ করিলেন। কোন বৃক্ষ সমূলে উৎপাটন, কোন
বৃক্ষের শাখাভঞ্জন, কোন বৃক্ষের কাবিদারণ হইতে অল্পক্ষণের
মধ্যেই উপবন শােভা শূন্য হইল। তুমুল শব্দে প্রহরিণীগণ জাগ্রত
হইয়া দেখিল এক বিকৃতদর্শন, উলঙ্গপ্রায় পুরুষ উপবন উচ্ছিন্ন
৮০ সীতা। ৮ করিতেছে। তাহারা তাহার সম্মুখীন হইতে সাহস না করিয়া রক্ষকদিগকে সংবাদ দিল। তখন চন্দ্রমা অস্তমিত হইয়াছিলেম, রাক্ষসেরা সুন্নিগ্ধপ্রভাতবায়ুস্পর্শে নিদ্রাসুখভােগ করিতেছিল ; স্বপ্নজড়িত নেত্রে, অস্ত্র শস্ত্র গ্রহণ পুৰ্ব্বক, আসিয়া হনুমানকে বেষ্টন করিল। কিন্তু অন্ধকারে তাহাদিগের অস্ত্র হনুমানের দেহে পতিত হইবার পূর্বেই তিনি একটী লৌহস্তম্ভ উৎপাটন করিয়া তাহাদিগের মধ্যে লম্ফ দিয়া পড়িলেন এবং তাহার আঘাতে রক্ষকদলকে সমূলে নিঃশেষ করিলেন। তাহাদিগের মধ্যে রাবণের কয়েকজন প্রধান সৈনিক ও তাহার একটী তরুণ বয়স্ক পুত্রও নিহত হইল। ক্রমে প্রভাতের সঙ্গে অসংখ্য রাক্ষস আসিয়া হনুমানকে বেষ্টন করিল। রাবণের জ্যেষ্ঠ পুত্র অদ্বিতীয় বীর ইন্দ্রজিতও এই সময় আসিয়া তথায় উপস্থিত হইলেন। দেখিয়া হনুমান ভাবিলেন, কৌশল অবলম্বন ভিন্ন এ অবস্থায় উদ্ধারের পথ নাই। তিনি ইন্দ্রজিতের অস্ত্রাঘাতে মূচ্ছার ভান করিয়া ভূতলে পতিত হইলেন। রাক্ষসেরা আসিয়া তাহাকে বন্ধন করিয়া রাবণের নিকট লইয়া চলিল। রাবণ তাহার পরিচয় পাইয়া কোপে, প্রথমে, তাহার প্রাণদণ্ডের আদেশ দিল। তাহার পর দূত অবধ্য বুঝিয়া তাহাকে কোনরূপ কঠোর শাস্তিদানের পর ছাড়িয়া দিবার আদেশ দিল। স্বভাবনিষ্ঠুর রাক্ষসগণ, কৌতুক দেখিবার জন্য, হনুমানের অঙ্গ বস্ত্রাবৃত করিয়া তাহাতে ধৃত ও তৈল লেপন পূর্বক অগ্নিদান করিল। হনুমান এইরূপই একটা সুযােগ অন্বেষণ করিতেছিলেন। তাঁহাকে অস্ত্রাঘাতে মৃতকল্প ও চলৎশক্তিরহিত ভাবিয়া রাক্ষসেরা অসতর্ক ছিল। দেখিয়া হনুমান এক লক্ষে সমীপবর্তী একটী গৃহের উপর উঠিলেন এবং তাহার অগ্নিস্পৃষ্ট আচ্ছাদন-বস্ত্র উন্মােচন পূর্বক হন্তে লইয়া গৃহে গৃহে ভ্রমণ দ্বাদশ পরিচ্ছেদ। ৮১ করিতে লাগিলেন। যেখানেই তিনি কোন দাহ্য পদার্থ দেখিলেন, তাহাতেই তিনি অগ্নিসংযােগ করিলেন। উল্লম্ফনে ও গতিবেগে রাক্ষসগণের কেহই তাহার সমকক্ষ ছিল না ; মহাবেগে ভ্রমণ করিয়া তিনি, ক্রমে, লঙ্কাপুরীতে প্রলয়ানল উদ্দীপন করিলেন। প্রাসাদ, বিপনী, নাট্যশালা, দেবায়তন দগ্ধ হওয়াতে লঙ্কাপুরী প্রহরকাল অতীত হইতে না হইতে শ্রীভ্রষ্ট হইল। শত শত স্ত্রীপুরুষ এবং সহস্র সহস্র হস্তী, অশ্ব প্রভৃতি পালিত জন্তু অগ্নিদগ্ধ হইয়া প্রাণত্যাগ করিল। লঙ্কাপুরীতে তুমুল কোলাহল ও আর্তনাদ উখিত হইল। সেই সােমহর্ষণ ব্যাপারের মধ্যে হনুমান যে দুর্গম পথ দিয়া আসিয়াছিলেন, সেই পথ দিয়া অদৃশ্য হইলেন। হনুমান নির্বিঘ্নে লঙ্কাপুরী হইতে কিষ্কিন্ধ্যায় প্রত্যাগত হইলেন। তাহার মুখে সীতাদেবীর সংবাদ পাইয়া রামচন্দ্র অগণ্য বানরবাহিনী সহ লঙ্কাভিমুখে যাত্রা করিলেন এবং তাহাদিগের সাহায্যে সমুদ্রে এক মহাসেতু বন্ধন করিলেন। এদিকে হনুমান যাহা ভাবিয়া- ছিলেন, তাহাই ঘটিল। তাহার বীরত্ব ও কৌশল দর্শনে রাক্ষস, রাক্ষসীরা সন্ত্রস্ত হইল। রাবণ ভাবিয়াছিল, রামচন্দ্র সীতাদেবীর সংবাদ পাইবেন না; পাইলেও দুর্গম লঙ্কাপুরী হইতে তাহার উদ্ধারের কোন চেষ্টা করিবেন না। কিন্তু হনুমানের কাৰ্য্যে রাবণের হৃদয় ভীতিগ্রস্ত হইল। সে সীতাদেবীকে পূৰ্ব্ববৎ উত্ত্যক্ত করিতে নিরস্ত হইল। ত্রিজটা নাম্নী এক রাক্ষসী পূর্ব হইতেই সীতাদেবীর গুণপক্ষপাতিনী ছিল, এই হইতে সে অন্য রাক্ষসীদিগকে তাহার প্রতি সদয় ব্যবহারের জন্য উপদেশ দিতে লাগিল। একদিন প্রভাতে ব্রিজটা আসিয়া সীতাদেবীকে বলিল “সতি! তােমার উদ্ধার নিকটবর্তী ; আমি গত রাত্রিতে স্বপ্ন দেখিয়াছিলাম, তােমার বামী তােমাকে উদ্ধার করিতে আসিয়াছেন; সে স্বপ্ন সত্য ;
সীতা। হইয়াছে। রামচন্দ্র, সমুদ্রে মহাসেতু বন্ধন করিয়া, অগণ্য সৈনিকসহ লঙ্কার পশ্চিম দ্বার অবরােধ করিয়া বসিয়াছেন। তাহার সৈনিক, দিগের বাসের জন্য নির্মিত পর্ণশালায় সমুদ্রকূল আবৃত হইয়াছে। অই শুন, তােমার স্বামীর জয়শব্দ, সমুদ্রগর্জনকেও পরাজয় করিয়া, এখান হইতে শ্রুত হইতেছে। এই সময় সহস্র সহস্র কণ্ঠ হইতে সমুখিত “জয় রামচন্দ্রের জয়” “জয় প্রভু রঘুনাথের জয়’ সীতাদেবীর কর্ণে প্রবেশ করিল। আষাঢ়ের প্রথম মেঘগর্জন শ্রবণ করিলে ময়ূরী যেমন উল্লসিত হয়, সেই শব্দ শ্রবণে শীতাদেবীও তেমনি উল্লসিত হইলেন। তাহার দেহ রােমাঞ্চিত, বক্ষ স্ফীত এবং নয়ন অশ্রুসিক্ত হইল। তিনি করযােড়ে পতিকুল-দেবতা- দিগকে প্রণাম করিলেন। তাহার পর যাহা হইল, তাহা বিস্তৃত ভাবে বর্ণনার প্রয়ােজন নাই। কারণ তাহার সহিত সীতাদেবীর সাক্ষাৎ সম্বন্ধ অল্প। রামচন্দ্রের সহিত রাক্ষসরাজের তুমুল সংগ্রাম আরব্ধ হইল। দিনের পর দিন যুদ্ধ চলিতে লাগিল। রণভূমি মৃতদেহে দুর্দর্শনীয় এবং শশাণিতপাতে পঙ্কিল হইল। প্রধান প্রধান রাক্ষস বীরগণ একে একে নিহত হইতে লাগিল। অসংখ্য রাক্ষস-সৈনিক মহাবীর হনুমানের হন্তে প্রাণত্যাগ করিল। লঙ্কাপুরী পুত্রহীনা মাতার এবং পতিহীনা রমণীর করুণ ক্রন্দনে পূর্ণ হইল এবং চিতাধুম নিবিড় কুঙ্কটিকার ন্যায় তাহা সমাবৃত করিল। রাবণ আত্মকৃত কার্য্যের পরিণাম দেখিয়া দারুণ মর্মপীড়া ভােগ করিতে লাগিল। কাহারও নিকট সহানুভূতি লাভের তাহার আশা ছিল না, কারণ সমস্তই তাহার নিজের দুষ্কৃতির ফল। তাহার কনিষ্ঠ ভ্রাতা ধার্মিক বিভীষণ তাহাকে ত্যাগ করিয়া রামচন্দ্রের শরণাপন্ন হইলেন। তাহার মধ্যম ভ্রাতা, অদ্বিতীয় দ্বাদশ পরিচ্ছেদ। বলশালী কুম্ভকর্ণ, তাহাকে বহু অনুযােগ করিলেন এবং অবশেষে ভ্রতার অনুরােধে যুদ্ধে গিয়া রামচন্দ্রের হস্তে নিহত হইলেন। তাহার জ্যেষ্ঠ পুত্র, ধনুর্ধরাগ্রগণ্য ইন্দ্রজিৎ, সমরে অজেয় বলিয়া গণিত ছিলেন, কিন্তু তিনিও লক্ষ্মণের সঙ্গে যুদ্ধে প্রাণত্যাগ করিলেন। রাক্ষসরাজের দুর্দশার সীমা রহিল না; কিন্তু এ অবস্থাতেও সীতা প্রত্যর্পণে তাহার ইচ্ছা হইল না। ইন্দ্রিয়- লালসার অপেক্ষা লােকলজ্জাই তখন প্রবল অন্তরায় হইল। শােকে ও ক্ষোভে পীড়িত হইয়া রাবণ এক দিনের যুদ্ধে লক্ষ্মণকে নিদারুণ শক্তিশেল দ্বারা আঘাত করিল, কিন্তু বীরবর হনুমান দুর্লভ ঔষধ সংগ্রহ করিয়া লক্ষ্মণের প্রাণরক্ষা করিলেন। অবশেষে ঘােরতর সংগ্রামের পর রাক্ষসরাজ রামচন্দ্রের হস্তে নিহত হইল। সতীর অবমাননার পূর্ণ প্রায়শ্চিত্ত হইল। ধনবল, জনবল, বাহুবল কিছুই যে পাপীকে বিধাতার ন্যায়দণ্ড হইতে রক্ষা করিতে পারে , তাহার উজ্জ্বল উদাহরণ দেখাইয়া রাবণ পৃথিবী হইতে অপহৃত হইল। সীতাদেবী যদিও অশােকবনে বন্দিনীর ন্যায় বাস করিতে ছিলেন, তথাপি যুদ্ধের প্রধান প্রধান ঘটনাগুলি তাহার অবিদিত ছিল না। বিভীষণ-পত্নী সরমা এবং ব্রিজটা আসিয়া, মধ্যে, মধ্যে তাহাকে যুদ্ধের সংবাদ প্রদান করিতেন। অধিকাংশ দিনই তিনি রামচন্দ্রের বিজয়বার্তা শ্রবণে হরষিত হইতেন, কিন্তু যে দিন রাক্ষসদিগের জয়ধ্বনি তঁাহার কর্ণগােচর হইত, সে দিন তাঁহার চিন্তার ও উদ্বেগের সীমা থাকিত না। অবশেষে একদিন তিনি শ্রবণ করিলেন যে, তাহার সকল দুঃখের মূল রাবণ যুদ্ধে নিহত হইয়াছে। তাহার হৃদয় হইতে যেন পৰ্বত-প্রমাণ ভার অপসারিত হইল। তিনি শান্তিলাভ করিলেন; কিন্তু সেই সঙ্গে লঙ্কাপুরীর ৮৪ সীতা। দুর্দশা স্মরণ করিয়া, এবং কত নিরপরাধ শিশু পিতৃহীন, কত বৎসলা মাতা পুত্রহীনা, কত পূহৃদয়া সতী পতিহীনা হইলেন ভাবিয়া তাহার কোমল হৃদয় ব্যথিত হইল। রাবণবধের সঙ্গে সীতাদেবী ভাবিয়াছিলেন, তাঁহার দুঃখের অবসান হইবে, কিন্তু তাহা হইল না। বৈশাখের প্রখর রৌদ্রের পর, সুমিষ্ম ধারাপাতের সঙ্গে, কিরূপ বিশ্বাহী বজ্রাগ্নি পতিত হয়, পরবর্তী অধ্যায়ে আমরা তাহা দেখিতে পাইব। ত্রয়ােদশ পরিচ্ছেদ। যুদ্ধজয়ের পর রামচন্দ্র সীতাদেবীকে আনয়নের জন্য বিভীষণকে প্রেরণ করিলেন। সীতাদেবীর ইচ্ছা ছিল যে, তিনি যে অবস্থায় অশােকবনে বাস করিতেছিলেন সেই অবস্থাতেই রামচন্দ্রকে দর্শন করিবেন। কিন্তু বিভীষণ, তাহার অনিচ্ছা সত্বেও, তাহাকে রামচন্দ্রের অভিপ্রায় জানাইয়া, উৎকৃষ্ট অঙ্গরাগে এবং মনােহর বসন ভূষণে সুসজ্জিতা করিয়া তাহাকে রামচন্দ্রের সমীপে আনয়ন করিলেন। সেই দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর, সেরূপ মর্মভেদী যন্ত্রণানুভবের পর, উভয়ে পরস্পরকে দেখিয়া কতই সুখী হইবেন ভাবিয়াছিলেন। উভয়েই কল্পনায় কতই সুখের চিত্র অঙ্কিত করিয়াছিলেন, কিন্তু অকস্মাৎ সমস্তই বিলুপ্ত হইল। মহর্ষি যাজ্ঞবল্ক্য যথার্থই বলিয়া- ছিলেন যে, সুখভােগর জন্য সীতাদেবীর জন্ম নয়। লঙ্কাবিজয়ী, আনন্দোৎফুল্ল বীরগণের মধ্যে সভাস্থলে সীতাদেবী শিবিকা হইতে অবতীর্ণ হইলেন; যেন ভূতলে শরীরিণী বিল্পতা দৃষ্ট হইল। কিন্তু তাঁহাকে দেখিয়াই রামচন্দ্রের মনে কি জানি কি ভাবান্তর হইল। যাহার জন্য তিনি অনিদ্রায়, অনাহারে, দেশে দেশে, এয়ােদশ পরিচ্ছেদ। ৮৫ উন্মত্তের ন্যায় ভ্রমণ করিয়াছিলেন, যাহার জন্য তিনি রণক্ষেত্রে অজস্রধারে দেহের শােণিতপাত করিয়াছিলেন, যাহার মূর্তি অধিষ্ঠাত্রী দেবীরূপে হৃদয়মন্দিরে স্থাপন করিয়া তিনি পূজা করিতেছিলেন, তাঁহাকে দেখিয়া তিনি, নির্মমের ন্যায়, পরুষবচনে বলিলেন ; “ভদ্রে। বহু ক্লেশের পর আমি তােমায় উদ্ধার করিয়াছি। রঘুবংশের গৌরব, আমার পৌরুষ রক্ষা হইয়াছে, এবং তােমার প্রতি আমার কর্তব্য সম্পাদন হইয়াছে। কিন্তু তুমি একাকিনী এতদিন রাবণগৃহে বাস করিয়াছিলে ; রাবণ মায়াবী, বলবান এবং অসংযতেন্দ্রিয়। তাহার গৃহে এতদিন একাকিনী অবস্থিতির পর তােমাকে গ্রহণ করিতে আমার প্রবৃত্তি হইতেছে না। আমি তােমাকে অনুমতি দিতেছি, তুমি এক্ষণে যথেচ্ছ গমন ও যথেচ্ছ জীবন যাপন করিতে পার।” হায়! ইহার অপেক্ষা সীতাদেবীর মস্তকে অশনিপাত হইল কেন ? পৃথিবী বিদীর্ণা হইয়া তাহাকে গ্রাস করিলেন না কেন? তিনি কি উত্তর দিবেন? জাগ্রতে, স্বপ্নে যাহার কথা ভিন্ন তাহার অন্য চিন্তা ছিল না, লঙ্কাপুরীর সমুদ্রতট হইতে বায়ু আসিলে এই বায়ু আমার প্রভুর দেহ স্পৃষ্ট হইয়া আসিতেছে ভাবিয়া যিনি আদরে তাহা আলিঙ্গন করিতেন, সেই রামচন্দ্র তাঁহার প্রতি এইরূপ উক্তি করিলেন; “যথেচ্ছ গমন”, “যথেচ্ছ জীবনযাপন পতির মুখে পত্নীর সম্বন্ধে ইহার অপেক্ষা আর কঠোরতর বাক্য কি হইতে পারে? তাঁহার হৃদয় যেন মথিত হইয়া গেল। তিনি নিস্পন্দভাবে দণ্ডায়মানা রহিলেন। রামচন্দ্র কিরূপে সীতাদেবীর সম্বৰ্ধনা করেন দেখিবার জন্য হনুমান ও লক্ষ্মণ উৎসুক ছিলেন। রামচন্দ্রের কথা শ্রবণ করিয়া তাহারাও নির্বাক্ ও নিস্পন্দ হইলেন। সমবেত জনমণ্ডলীর মধ্যে কাহারও মুখে বাক্যৰ্ত্তির শক্তি রহিল ?
সীতা। । সীতাদেবী একবার রামচন্দ্রের মুখের দিকে চাহিলেন, তাহার সেই চিরারাধ্য ধন তাহার প্রতি এরূপ কঠোর বাক্য প্রয়ােগ করিতেছেন, সে মুখ দর্শনে তাহা তাহার বিশ্বাস হইল না। তিনি ভাবিলেন, তাঁহার ভ্রম হইয়াছে কিন্তু পরক্ষণেই তিনি শুনিতে পাইলেন রামচন্দ্র বলিতেছেন ; “সীতে! যে স্ত্রী অসচ্চরিত্র পরপুরুষের গৃহে দীর্ঘকাল বাস করে, কোনও তেজস্বী পুরুষ তাহাকে গ্রহণ করিতে পারেন না ? নেত্রবােগগ্রস্ত ব্যক্তির সম্মুখস্থ দীপশিখা যেমন তাহার চক্ষুর যন্ত্রণা উৎপন্ন করে, তুমিও তেমনই আমার সম্মুখে বর্তমান থাকিয়া আমার অন্তর দগ্ধ করিতেছ। তােমার প্রতি আমার যাহা কৰ্ত্তব্য, আমি তাহা করিয়াছি, তােমাতে আমার আর প্রয়ােজন নাই ; তুমি যথা ইচ্ছা গমন কর।” পতির মর্যাদারক্ষা সতীর অবশ্য কর্তব্য ; কিন্তু পতি যদি তাহার পাতিব্ৰত্য সম্বন্ধে সন্দিহান হন, তবে আত্মমর্যাদা রক্ষার জন্য, সময় বিশেষে, সতীকে পতির কথার প্রতিবাদ করিতে হয়। সীতাদেবীর পক্ষে এখন সেই সময় উপস্থিত হইয়াছিল। তিনি বাঞ্চলে আপনার চক্ষু মার্জনা করিলেন, এবং যথােচিত ধৈৰ্য্য সংগ্রহ পূর্বক বলিলেন ; বীর! ইতর জন অনাৰ্য্যা রমণীর প্রতি যে বাক্য প্রয়ােগ করে, আপনি আমার প্রতি সেইরূপ বাক্য প্রয়ােগ করিতেছেন কেন? রাবণ বলপূর্বক আমাকে গ্রহণ করিয়া আবদ্ধ করিয়া রাখিয়াছিল সত্য, আমি দুর্বলা নারী, রক্ষক না থাকায় সে আমায় তাহার রথে আরােপণ করিয়াছিল সত্য, কিন্তু তাহাতে আমার অপরাধ কি? আমার দেহ আমার আয়ত্ত নয়, সুতরাং তাহা রাবণের স্পর্শ হইতে আমি রক্ষা করিতে পারি নাই, কিন্তু যাহা • এয়ােদশ পরিচ্ছেদ। ৮৭ আমার আয়ত্ত অর্থাৎ আমার হৃদয় তাহাত কেহ স্পর্শ করিতে পারে নাই, তাহা একমাত্র আপনাতেই অনুরাগী রহিয়াছে। আমার আবাল্যপ্রকৃতি এবং আপনার প্রতি আমার ভক্তি ও অনুরাগ আপনি বিবেচনা করিলেন না?” বলিতে বলিতে সীতাদেবীর কণ্ঠ রুদ্ধ হইল। তিনি কিয়ৎক্ষণ পরে লক্ষ্মণকে বলিলেন ; বৎস লক্ষ্মণ ! এরূপ অপবাদগ্ৰস্তা ও অপমানিত হইয়া আমি আর প্রাণধারণ করিতে ইচ্ছা করি না। অনলে আমার সতীধৰ্ম্মের পরীক্ষা হউক, তুমি আমার জন্য অগ্নিকুণ্ড প্রস্তুত কর।” সীতাদেবীর প্রতি রামচন্দ্রের ব্যবহার দর্শন করিয়া লক্ষ্মণ ক্রোধে, বার বার, দীর্ঘনিশ্বাস ত্যাগ করিতে ছিলেন। তিনি তাহার কথা শুনিয়া রামচন্দ্রের দিকে দৃষ্টিপাত করিলেন এবং তাঁহার মুখভঙ্গী হইতে বুঝিলেন যে, সেই কঠোর পরীক্ষা রাম- চন্দ্রের অনভিপ্রেত নয়। তখন, অল্পক্ষণের মধ্যে, লঙ্কার সমুদ্র- কূলে এক বিশাল অগ্নিকুণ্ড রচিত হইল। শুষ্ক কাষ্ঠ, ঘৃত ও সর্জরস ইত্যাদি দাহ্য পদার্থের যােগে তাহাতে অল্পক্ষণের মধ্যেই হুতাশন লেলিহান জিহ্বা প্রসারিত করিতে লাগিলেন। সমবেত জনমণ্ডলী, কুণ্ড পরিবেষ্টন করিয়া, চিত্রার্পিতের ন্যায় সে দৃশ্য দেখিতে লাগিলেন। কাহারও মুখে বাক্য মাত্র রহিল না, কিন্তু সহস্র সহস্র নয়ন হইতে নীরবে অশ্রুবিন্দু পতিত হইতে লাগিল এবং সহস্র সহস্র দীর্ঘনিশ্বাসে অগ্নিশিখা চঞ্চল হইয়া উঠিল। কেবল তিনজনের মুখে কোন বিষাদলক্ষণ লক্ষিত হইল না। প্রথম রামচন্দ্রের, দ্বিতীয় লক্ষ্মণের, তৃতীয় হনুমানের। রামচন্দ্র একবারেই বিকারশূন্য, তাহার মুখে হর্ষ, উদ্বেগ, চিন্তা কিছুই নাই, উদাসীনের ন্যায় তিনি অগ্নিপরীক্ষার আয়ােজন দেখিতে লাগিলেন।
৮ সীতা। লক্ষ্মণের মুখে উৎকণ্ঠার অপেক্ষা ক্রোধের ভাবই অধিক সূচিত হইল। হনুমান, স্থির গম্ভীর ভাবে, শুষ্ক কাষ্ঠ আনিয়া কুণ্ড সাজাইতে ছিলেন ; তাহার মুখে যেন তাচ্ছল্যের ভাব ব্যক্ত হইতেছিল। তিনি অনুচ্চস্বরে বলিতে ছিলেন, “প্রভাে! এ পরীক্ষা কাহার জন্য? আপনার নিজের বিশ্বাসের জন্য না জনতার সন্তোষের জন্য ? সূৰ্য্যালােককে কি দীপালােক-পাতে উজ্জল করিতে হইবে, না অমৃতকে শর্করা-সংযােগে মধুর করিতে হইবে? ভাল ! পরীক্ষা হউক; পৃথিবী দেখুক, আধ্যাত্মিক শক্তি আধিভৌতিক শক্তিকে পরাজয় করিতে পারে কি না।” সীতাদেবী ধীর অথচ দৃঢ় পদে অগ্নিকুণ্ডের দিকে অগ্রসর হইলেন। একবার উদ্ধানেত্রে আকাশের দিকে চাহিয়া রঘুকুল- দেবতা সূৰ্য্যদেবকে প্রণাম করিলেন। তাহার পর রামচন্দ্রকে প্রদক্ষিণ ও প্রণাম করিয়া জনতার দিকে দক্ষিণ হস্ত উত্তোলন করিলেন। একই শক্তির বলে পরিচালিত যন্ত্রাঙ্গের ন্যায় সমবেত জনমণ্ডলী, মস্তক অবনত করিয়া, সঙ্গে সঙ্গে, তাহাকে প্রণাম করিল। তিনি, অগ্নিদেবকে প্রণাম করিয়া সাতবার চিতা প্রদক্ষিণ করিলেন এবং তাহার পর ব্রতনিষ্ঠা তপস্বিনী যেমন সমাধির জন্য আপনার আসন গ্রহণ করেন, সেইরূপ গিয়া অগ্নিকুণ্ডের মধ্যে উপবেশন করিলেন। অগ্নির প্রচণ্ড জ্বালায় ও ধূমে তাহার মূর্তি অল্পক্ষণের মধ্যেই অদৃশ্য হইল। সাধারণে ভাবিল ভস্ম ভিন্ন তাহার আর কোন চিহ্নই থাকিবে না। তখন কেহ দীর্ঘনিশ্বাস ত্যাগ করিতে, কেহ অশ্রু বিসর্জন করিতে, কেহ বা পরস্পরকে অনুচ্চ স্বরে কি বলিতে লাগিল। চতুর্দিকেই একটা আকুলতার লক্ষণ লক্ষিত হইল ; অন্যের কথা দুরে থাকুক, স্বয়ং রামচন্দ্রও বিচলিত হইয়া উঠিলেন। কিন্তু এ কি! সঞ্চিত কাষ্ঠশি দগ্ধ
সীতাদেবীর অগ্নিপরীক্ষা।
সীতা ৭৫ পৃষ্ঠা।
No text on this page.
যােদশ পরিচ্ছেদ। ৯ করিয়া অগ্নি যতই আপনা আপনি ক্ষীণপ্রভ হইয়া আসিতে লাগিলেন, ততই সীতাদেবীর পবিত্র মূৰ্ত্তি কাঞ্চনপ্রতিমার ন্যায় লােকচক্ষু আকর্ষণ করিতে লাগিল। সতীধৰ্ম্মের গৌরব রক্ষার জন্য প্রকৃতি যেন আপনার নিয়মের পরিবর্তন করিলেন, পরাজয়েও তাহার জয় হইল। লােকে দেখিল, জলদঙ্গার রাশির উপর লােহিত পদ্মাসনা কমলার ন্যায় সীতাদেবী বিরাজমানা আছেন। তাহার পরিধেয় বসনের একটা সূত্র, তাহার মস্তকের একটী কেশ, তাহার দেহের একটা লােমও দগ্ধ হয় নাই। রাক্ষস-বধুগণ তাহার কবরী যে পুষ্পদামে এবং তাহার কণ্ঠ যে কুসুমমাল্যে সুশােভিত করিয়া দিয়াছিলেন, তাহাও প্রফুল্ল রহিয়াছে, ধুমসংযােগে এক বিন্দুও মলিন হয় নাই। রামচন্দ্র স্বয়ং অগ্রসর হইয়া দক্ষিণ হস্তে সীতাদেবীর কর ধারণ করিলেন; দেখিয়া হনুমান আনন্দে তাণ্ডব-নৃত্য আরম্ভ করিলেন। অযুত কণ্ঠে “জয় সতীর জয়” “জয় রামচন্দ্রের জয়” “জয় সীতারামের জয়” ধ্বনিত হইতে লাগিল। নবােদিত সূর্যের আলােক আরও উজ্জ্বল হইল; বায়ু আরও মধুর হিল্লোলে প্রবাহিত হইতে লাগিল এবং লঙ্কার জল, স্থল অপূর্ব সুন্দর কুসুমে সুশশাভিত হইল। কি বলিয়া রামচন্দ্র ও সীতাদেবী পরস্পরের নিকট দীর্ঘ বিরহ- বেদনা ব্যক্ত করিলেন, মায়ামৃগের অনুসরণের দিন হইতে তৎকাল পর্যন্ত উভয়ে কোথায়, কি ভাবে জীবনযাপন করিয়া ছিলেন, তাহা কিরূপে বর্ণন করিলেন, তা উল্লেখ করিবার প্রয়ােজন নাই। সহৃদয় পাঠক, পাঠিকা তাহা কল্পনায় অবগত হইবেন। অপ্রিবেশ সম্বন্ধীয় ঘটনার উল্লেখ করিয়া রামচন্দ্র শতবার সীতাদেবীর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করিলেন। কিন্তু অপরাধ বলিয়া ভাবিলেত ক্ষমা ! রামচন্দ্র কোন অপরাধ করিয়া- ;
সীতা। ছেন, এ চিন্তা স্বভাবসরলা সীতাদেবীর মনে একবারও উদয় হইল না। নিজের চিরাভ্যস্ত, সপ্রেম বচনে তিনি বলিলেন “নাথ। ক্ষমা কিসের জন্য? এই অগ্নিপরীক্ষায় আপনি সীতার গৌরব বর্ধন করিয়াছেন, তবে ক্ষমাপ্রার্থনা কেন?” রামচন্দ্র বলিলেন, “প্রিয়ে। কি বলিব ? অন্তরাত্মা ভিন্ন রামের হৃদয় আর কেহ জানে না। প্রথম দর্শনের দিন যেমন ছিলে, চিরদিনই তেমন, এ হৃদয়ের অধিষ্ঠাত্রী দেবী হইয়া থাক। সুখে দুঃখে, মিলনে বিরহে, কোমলতায় কঠোরতায় রামের হৃদয়কে কখনও অবিশ্বাস করিও না।” সীতাদেবী বলিলেন “তাহা আর বলিতে হইবে না।” চতুর্দশ পরিচ্ছেদ। লঙ্কাযুদ্ধের অবসানের সঙ্গে রামচন্দ্রের নির্বাসনকালও শেষ হইয়াছিল। তিনি বিভীষণকে রাজপদে প্রতিষ্ঠিত করিয়া লঙ্কা যুদ্ধের সহচরদিগকে সঙ্গে লইয়া অযােধ্যাভিমুখে যাত্রা করিলেন। রাক্ষসরাজের আকাশগামী পুষ্পকথ তাহাদিগকে লইয়া গগনপথে উথিত হইল। রামচন্দ্র অঙ্গুলি নির্দেশ পূৰ্ব্বক সীতাদেবীকে পথের পরিচয় দিতে লাগিলেন। যে মহাসেতু দ্বারা তিনি সাগর উত্তীর্ণ হইয়া লঙ্কায় উপনীত হইয়া ছিলেন, নীলাকাশ মধ্যস্থিত ছায়াপথের ন্যায় তাহা শশাভা পাইতে ছিল এবং ফেনময় তরঙ্গ- রাজী তাহার উভয় পার্শ্বে মহাবেগে আঘাত করিতেছিল ; প্রথমেই তাহা দেখাইলেন। রথ সমুদ্র অতিক্রম করিয়া উত্তরমুখে ধাবিত হইল ; ক্রমে ঋষ্যমুক গিরি পম্পাসবােবর এবং মাল্যবান পর্বত প্রভৃতি যে যে স্থানে তিনি উন্মত্তের ন্যায় সীতাদেবীর অন্বেষণ ;
চতুর্দশ পরিচ্ছেদ। ধাবিত হইল। ক রিয়াছিলেন, তাহা নির্দেশ করিতে লাগিলেন। গােদাবরীতীরবর্তী যে রমণীয় প্রদেশে আশ্রম নিৰ্মাণ করিয়া উভয়ে পরম সুখে দীর্ঘ কাল অতিবাহিত করিয়া ছিলেন, এবং যেখান হইতে রাবণ সীতাদেবীকে হরণ করিয়া লইয়া গিয়াছিল ক্রমে তাহা তাহাদিগের নেত্রপথে পতিত হইল। দেখিয়া পূৰ্ব্বকথা স্মরণ হওয়াতে উভয়েরই হৃদয় উচ্ছসিত এবং নয়ন অশ্রুসিক্ত হইল। রথ আরও উত্তর মুখে উভয়ে মহর্ষি অগস্তের আশ্রম, চিত্রকূট এবং গঙ্গাযমুনা-সঙ্গম দর্শন করিলেন। প্রিয়সখা গুহককে দর্শনদানে আপ্যায়িত করিয়া রামচন্দ্ৰ ক্ৰমে অযােধ্যার নিকটবর্তী হইলেন এবং ভরতকে সংবাদ দিবার জন্য হনুমানকে অগ্রে নন্দীগ্রামে প্রেরণ করিলেন। অল্পক্ষণের মধ্যে সে সংবাদ অযােধ্যায় প্রচারিত হইল। বালক বৃদ্ধ, স্ত্রী পুরুষ, ধনী দরিদ্র, সৰ্ব্বকৰ্ম্ম ত্যাগ করিয়া, রামচন্দ্রকে অভ্যর্থনা করিতে বহির্গত হইলেন। ভরত, শত্রু, বৃদ্ধা মহিষীগণ এবং বশিষ্ঠ, বামদেব প্রভৃতি ঋষিগণ মিলিত হইয়া রামচন্দ্র ও সীতাদেবীকে আদরে গ্রহণ করিলেন। চীধারী, জটামণ্ডিত, শুষ্ণমূৰ্ত্তি ভরতের বেশ দর্শন করিয়া রামচন্দ্র অশ্রুপ্লাবিত নেত্রে তাহাকে আলিঙ্গন করিলেন। শােকা আনন্দাশ্রুতে পরিণত হইয়া শত ধারে অযােধ্যায় প্রবাহিত হইতে লাগিল। কৈকেয়ীদেবী আত্মকৃত কার্যের জন্য মনােদুঃখে ম্রিয়মাণ হইয়াছিলেন, রামচন্দ্র মধুর বচনে সান্ত্বনা করিয়া তাহার সকল ক্লেশ দূর করিলেন। কৌশল্যাদেবী ও সুমিত্রাদেবী হারানিধি প্রাপ্ত হইয়া কৃতার্থ হইলেন ; উৰ্মিলার বিশুষ্ক মুখ মধুর হাস্যে আবার সমুজ্জ্বল হইল। শুভদিনে মহাসমারােহে রামচন্দ্রের অভিষেকক্রিয়া সম্পন্ন হইল। উজ্জ্বল রাজবেশে সুসজ্জিত হইয়া রামচন্দ্র সিংহাসনে উপবেশন করিলেন; বামে সীতাদেবী ভুবনমােহন বেশে আসীনা হইলেন।
৯২ সীতা। যাহারা তাহাদিগকে রাজসিংহাসনে দর্শন করিলেন, তাহারা আপনাদিগের নয়ন সার্থক জ্ঞান করিলেন। ভরত হতে ছত্র ধারণ এবং লক্ষ্মণ ও শত্রুঘ্ন চামর ব্যজন করিতে লাগিলেন। অযযাধ্যাবাসীদিগের সকল ক্ষোভ, সকল অভাব দূরীভূত হইল। রামচন্দ্ৰ ধৰ্ম্মানুসারে অযযাধ্যারাজ্য শাসন করিতে লাগিলেন ; রাম- রাজ্য সুশাসনের উদাহরণ রূপে পরিগণিত হইল। ইহার উপর, কিয়দ্দিনের মধ্যে, সীতাদেবীর গর্ভলক্ষণ লক্ষিত হওয়াতে অযােধ্যা- বাসীদিগের আনন্দের আর সীমা রহিল না। কবে পৌত্রমুখ দর্শন করিবেন এই আনন্দে বৃদ্ধা মহিষীগণ দিন গণনায় প্রবৃত্ত হইলেন। রামচন্দ্রের ও সীতাদেবীর পরস্পরের প্রতি অনুরাগ যেন আরও ঘনীভূত হইল। অতীতের দুঃখের সহিত তুলনায় বর্তমানের সুখ যেন আরও অধিক মধুর, আরও অধিক প্রগাঢ় বােধ হইতে লাগিল। কিন্তু, হায় ! বিধাতার বিধান কে বুঝিতে পারে? সায়ংকালে পশ্চিমাকাশ যখন বিবিধ বর্ণে রঞ্জিত হইয়া দর্শকের নয়ন পরিতৃপ্ত করে, তখন সেই বর্ণসম্পাতের অন্তরালে নিবিড় কৃষ্ণ মেঘখণ্ড সঞ্চিত হইতেছে বলিয়া কে সন্দেহ করে ? কুসুমকলিকা স্ফুটনােম্মুখ হইয়া যখন মধুর সৌরভে নাসিকা তৃপ্ত করিতে থাকে, তখন বিষকীট যে তাহার অভ্যন্তর জীর্ণ করিতেছে, তাহা কে জানিতে পারে? যখন রামচন্দ্র ও সীতাদেবী, সুখের পরাকাষ্ঠা প্রাপ্ত হইয়া, পিতামাতার ন্যায় স্নেহে অযােধ্যাবাসীদিগকে পালন করিতেছিলেন, তখন কে জানিত যে, তাঁহাদিগের সন্দিগ্ধচিত্ত প্রজাগণ তাহাদিগের বিরুদ্ধে হৃদয়ে তীব্র হলাহল পােষণ করিতেছে ? অথবা সে কথাই বা বলি কেন, দুর্জন না থাকিলে সুজনের মহত্ব প্রকাশিত হইবে কিরূপে? প্রজাগণের সুখ দুঃখ, অভাব অভিযােগ গােপনে অবগত চতুর্দশ পরিচ্ছেদ। হইবার জন্য রামচন্দ্র একজন বিশ্বাসী চর নিয়ােজিত করিয়াছিলেন। সে প্রতিদিন আপনার লােকচর্চার ফল রামচন্দ্রকে জ্ঞাপন করিত। প্রতিদিনই নিজের প্রশংসাবাক্য রামচন্দ্রের কর্ণগােচর হইত। এক- দিন তিনি বলিলেন ; “দূত! তুমি প্রতিদিনই আমার প্রশংসার কথা বল, কিন্তু আমি কেবল প্রশংসা শুনিবার জন্য ত তােমাকে নিযুক্ত করি নাই ; যদি কেহ আমার কোন প্রম, কোন ত্রুটী উল্লেখ করে, তবে বল, তােমার নিকট হইতে জানিয়া তাহা সংশােধন করিতে পারিব বলিয়াই আমি তােমায় রাখিয়াছি।” দূত শুনিয়া, একটু ইতস্ততঃ করিয়া, বলিল ;-“মহারাজ। আমি আপনার ভৃত্য, আপনার অন্নে প্রতিপালিত হইতেছি; মহারাজের আদেশপালনই আমার পরম ধর্ম। আমি প্রকৃতই সর্বদা মহারাজের সুখ্যাতি শ্রবণ করি। কচিৎ কোন কোন দিন কোন নিন্দা শ্রবণ করিয়া থাকি। যদি তাহা জানিবার মহারাজের অভিপ্রায় হয়, আমাকে অভয় দান করিলে আমি বলিতে পারি।” রামচন্দ্র বলিলেন ; “তুমি নিশ্চিন্ত মনে বল, আমি নিজেই ত তােমাকে আমার দোষ শুনাইবার জন্য রাখিয়াছি, সুতরাং অপ্রিয় কথা বলিলেও তােমার কোন অপরাধ হইতে পারে না।” দূত অবনত মস্তকে বলিল ; “মহারাজ! প্রজাগণ একবাক্যে আপনার রাজধর্মের প্রশংসা করে। তাহারা বলে, এরূপ সুশৃঙ্খলে রাজ্যশাসন, এরূপ অপক্ষপাত বিচার, এবং প্রজাগণের এরূপ সর্বাঙ্গীন উন্নতি ইক্ষাকুবংশীয় কোন রাজার সময়ে কখনও হয় নাই। কিন্তু তাহাদিগের মধ্যে অনেকে ইহাও বলে যে, আপনার রাজধর্মের আদর্শ অতি উচ্চ হইলেও পারিবারিক ধর্মের আদর্শ তাদৃশ উচ্চ নয়। কেহ কেহ এতদূর বলে যে, আপনি পারিবারিক জীবনে অতি কুদৃষ্টান্ত প্রদর্শন করিতেছেন।”
৯৪ সীতা। ; রামচন্দ্র চমকিত হইলেন ; হৃদয়ের মধ্যে একটা তীব্র জ্বালা অনুভব করিলেন; কিন্তু ভাব গােপন করিয়া বলিলেন ; “দূত ! তাহাদিগের এরূপ বলিবার কারণ কি ? দূত বলিল, “কথায় কথায় জিজ্ঞাসা করিয়া তাহা জানিয়াছি। তাহারা বলে, “নারীর চরিত্রের উপর পারিবারিক সুখ ও শান্তি প্রতিষ্টিত। এই জন্য শাস্ত্রকারগণ পুরুষের অপেক্ষা নারীর পবিত্রতা সম্বন্ধে কঠোর দৃষ্টি রাখিয়াছেন এবং সেই জন্য সমাজও নারীর, স্বেচ্ছাকৃত হউক বা অনিচ্ছাকৃত হউক, অপরাধের প্রশ্রয় দিতে পারে না। পুরুষ একাধিক পত্নী গ্রহণ করিলে সমাজে নিন্দনীয় হয় না, কিন্তু নারীর একাধিক পতিগ্ৰহণ সর্বথা গহণীয়। এমন কি নারী যদি পতিগৃহ হইতে একাকিনী দীর্ঘকাল পিতৃগৃহে বাস করে, তাহা হইলেও সে সমাজে নিন্দনীয়া হয় এবং তাহার পতি তাহাকে গ্রহণ করিতে সঙ্কুচিত হন। কিন্তু আমাদিগের রাজ- মহিষী দীর্ঘকাল একাকিনী দুৰ্বত্ত রাবণগৃহে বাস করিলেন, অথচ মহারাজ অসঙ্কোচে তাহাকে গ্রহণ করিলেন, ইহা কিরূপ ব্যবহার ? ইহার দ্বারা কি উচ্ছঙ্খলতার প্রশ্রয় দেওয়া হইল না ?” রামচন্দ্র দীর্ঘ নিশ্বাস ছাড়িয়া বলিলেন, ‘রাজমহিষী ত স্বেচ্ছায় রাবণগৃহে বাস করেন নাই, সুতরাং তাহার অপরাধ কি ? দূত। “প্রজাগণ বলে যে, যদি কোন ব্যক্তির দেহে তাহার অনিচ্ছায় সংক্রামক ব্যাধির বিষ প্রবিষ্ট হয়, তবে কি তাহার দেহ জীর্ণ হয় না, না তাহার সহিত সংসর্গী ব্যক্তি রােগগ্রস্ত হয় না? সেইরূপ যদি কোন নারীর অনিচ্ছা সত্বেও তাহার ধর্ম অপহৃত তবে কি সে পাপভাগিৰী হয়, না তাহার গ্রহীতা স্বামী প্লত্যব্যয়ূভাগী হন ফ9 জমহিষী স্বয়ং সুশীলা হইলেও রাবণের নিকট যে ধৰ্ম্মরক্ষা করিতে পারিয়াছেন, ইহা সম্ভব নয়। কারণ ?
চতুর্দশ পরিচ্ছেদ। ? রাবণ একেই অসংযতেন্দ্রিয়, তাহার উপর সে মদিরাসক্ত ও অসীম বলবান। শত শত সতীর ধর্ম অপহরণে তাহার চিত্ত কঠোর ও কলুষিত ছিল। এরূপ ব্যক্তি পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠা রূপবতীকে দীর্ঘকাল আয়ত্বে রাখিয়া তাহার পবিত্রতা রক্ষা করিয়াছিল, ইহা কিরূপে বিশ্বাস হইবে ? রামচন্দ্র। “সত্য। কিন্তু সীতাদেবী যে অগ্নিপরীক্ষা দ্বারা আপনার চরিত্রের বিশুদ্ধি প্রমাণিত করিয়াছিলেন, প্রজাগণ কি তাহা অবগত নহে ?” দূত। “অধিকাংশ প্ৰজাই অবগত নহে। যে অল্পসংখ্যক ব্যক্তি অবগত আছে, তাহাদিগেরও মধ্যে কেহ কেহ বলে, অগ্নি- পরীক্ষা কেবল চাটুবাদ মাত্র। অগ্নি আপনার দাহিকা শক্তি সংবরণ করিবেন, ইহা কি কখনও বিশ্বাসযােগ্য? বিশেষতঃ তাহারা যদি মহারাজের অথবা কুমার লক্ষ্মণের মুখে অগ্নিপরীক্ষার কথা শুনিত, তাহা হইলে হয় ত বিশ্বাস করিতে পারিত। কিন্তু তাহারা কেবল লঙ্কাযুদ্ধের পর মহারাজের সঙ্গে যে সকল রাক্ষস ও বানর আসিয়াছিল, তাহাদিগেরই মুখে রাজমহিষীর অগ্নিপরীক্ষার কথা শুনিয়াছে। প্রজাগণ বলে যে, এই শ্রেণীর লােকদিগের বুদ্ধি ও বিচারশক্তি কতদূর যে, তাহাদিগের কথার উপর আস্থা স্থাপন করিতে পারা যাইবে। অগ্নিপরীক্ষার কথা না বলিয়া মহারাজ যদি বলিতেন যে, “আমার স্ত্রী পরম রূপবতী, রূপজমােহে আমি তাহাকে ছাড়িয়া থাকিতে পারিব না, তাহা হইলে বরং ভাল হইত।” লােককে অগ্নিপরীক্ষার কথা বলিয়া প্রবঞ্চিত করার অপেক্ষা এরূপ স্পষ্টবাদিতা ভাল। তবে তিনি রাজা, বলবান ; সুতরাং যাহা ইচ্ছা বলিতে বা করিতে পারেন। দূত এই বলিয়া ক্ষণকাল নিস্তব্ধ থাকিয়া পরে বলিল, মহারাজ ।
সীতা। • ; আমি প্রজাদিগের কথা যাহা শুনিয়াছি ও তাহাদিগের মনের ভাব যাহা বুঝিয়াছি, তাহাই নিবেদন করিলাম। ইহা আমার নিজের মত নয় ; আমি জানি যে, আমাদিগের রাজমহিষী লক্ষ্মীস্বরূপিনী ; গঙ্গাজলে বরং মলিনতা আছে, কিন্তু তাহাতে মলিনতা নাই।” রামচন্দ্র বলিলেন “দূত ! তােমার অদ্যকার কাৰ্য শেষ হইয়াছে, তুমি বিদায় লইতে পার।” দূত প্রণাম করিয়া প্রস্থান করিল। দূতের সঙ্গে যতক্ষণ কথােপকথন করিতে ছিলেন, ততক্ষণ কৰ্তব্যানুবােধে রামচন্দ্র কোনরূপ উদ্বেগের চিহ্ন প্রদর্শন করেন নাই। কিন্তু একক হইবার পরই তাহার বােধ হইল, যেন তাহার শরীরের প্রত্যেক অংশে তীক্ষ্ণবিষ বৃশ্চিক দংশন করিতেছে। তাঁহার সর্বশরীর ঘর্মাক্ত হইয়া উঠিল ; হৃৎপিণ্ড প্রবলবেগে স্পন্দিত এবং মন্তক ঘূর্ণিত হইতে লাগিল। তিনি মন্ত্রভবনে গমন করিয়া প্রতিহারী দ্বারা ভরত, লক্ষ্মণ ও শত্রুঘ্নকে আহ্বান করিয়া পাঠাইলেন। আদেশ শ্রবণমাত্র তাঁহারা উপস্থিত হইলেন ; কিন্তু রামচন্দ্রকে দেখিয়া তাহাদিগের বাক্যস্ফুৰ্ত্তি হইল না। সদানন্দময়, গম্ভীর পুরুষকে তাঁহারা কখনও বিষন্ন ও ব্যাকুল হইতে দেখেন নাই, আজ দেখিলেন সামান্য জলের ন্যায় তিনি ভূমিতলে উপবিষ্ট রহিয়াছেন; তাহার মুখ মলিন, শরীর শীর্ণ এবং চক্ষুদ্বয় অপূর্ণ। ভ্রাতৃগণকে দেখিয়া রামচন্দ্রের শােকসিন্ধু যেন উথলিয়া উঠিল ; গণ্ডতল দিয়া নীরবে অশ্রুধারা প্রবাহিত হইতে লাগিল। ভরত প্রভৃতি ইহার কারণ কিছুই বুঝিতে পারিলেন না। অনেক ক্ষণ পরে, কথঞ্চিৎ ধৈৰ্য্যাবলম্বন করিয়া, রামচন্দ্র দূতের মুখে যাহা যাহা শুনিয়াছিলেন, সমস্তই বর্ণন করিলেন এবং করিয়া বলিলেন ; “ভ্রাতৃগণ! তােমরাই আমার বল, বুদ্ধি ও ভরসা অবস্থায় কি করা কর্তব্য পরামর্শ দাও।” যে চতুর্দশ পরিচ্ছেদ। ; ভরত বলিলেন ; “আৰ্য। আপনার ন্যায় ব্যক্তিকে আমরা কি পরামর্শ দিতে পারি ? আমরা জানি, আপনি যাহা করিবেন, তাহাই ধৰ্ম্ম, আপনি যাহা বলিবেন, তাহাই আপ্তবাক্য। তবে আমাদিগের এইমাত্র বক্তব্য যে, যে যাহা বলিবে তাহা শুনিতে হইলে সংসারে বাস করা চলে না। প্রজারা নির্বোধ, তাহাদিগের কথা উপেক্ষা করাই সঙ্গত।” লক্ষ্মণ বলিলেন ; “দাদা! রাবণের শেলে বুক এখনও বিদীর্ণ হইয়া আছে, তাহার উপর বঠাকুরাণীর সম্বন্ধে কোন কঠোর আদেশ দিয়া আরও বিদীর্ণ করিবেন না। লক্ষ্মণকে যাহা বলিবেন লক্ষ্মণ তাহাই করিবে; কিন্তু লক্ষ্মণ লৌহ নয়, প্রস্তর নয়, রক্ত- মাংসের মানুষ, ইহা মনে রাখিবেন।” শত্রু বলিলেন ; “দাদা! আপনি আদেশ করুন, যাহারা বধূঠাকুরাণীর নিন্দা করিয়াছে, আমি তাহাদিগের জিহ্বা কাটিয়া আনিয়া দিতেছি।” রামচন্দ্র বলিলেন; “ভ্রাতৃগণ ! ভীত, মুগ্ধ, বা উত্তেজিত হইলে রাজধৰ্ম্ম প্রতিপালন হয় না। রাজধৰ্ম্ম সামঞ্জস্যের ধর্ম। বালক- বৃদ্ধ, স্ত্রীপুরুষ, ধনী দরিদ্র, পণ্ডিত মূৰ্থ সকলের কথা স্মরণ রাখিয়া, ইহকালের ও পরকালের সম্বন্ধ বিবেচনা করিয়া, কাৰ্য্য না করিলে রাজাকে বিপন্ন ও পাপভাগী হইতে হয়। বিধাতা আমাদিগকে রাজকুলে প্রেরণ করিয়াছেন ; আমরা যে যশস্বী মহাপুরুষদিগের বংশে জন্মগ্রহণ করিয়াছি, তাহাদিগের যশ ও গৌরব আমাদিগের কার্যের উপর নির্ভর করিতেছে। যশােধনদিগের নিকট যশ প্রাণাপেক্ষাও প্রিয়। সুতরাং সকল দিক দেখিয়া এ সম্বন্ধে আমি যাহা স্থির করিয়াছি, তােমাদিগকে তাহা বলিতেছি। শুনিয়া যদি তােমাদিগের কোন বক্তব্য থাকে, অকুন্ঠিত চিত্তে আমাকে বল।” ৭ ৯৮ সীতা। ; তিন ভ্রাতাই একসঙ্গে বলিলেন “আজ্ঞা করুন।” রামচন্দ্র বলিলেন; “প্রজাগণ সীতার পবিত্রতা সম্বন্ধে সন্দেহ করে। রাবণের ন্যায় দুৰ্বত্তের গৃহে বাসের পর এরূপ সন্দেহ করিলে তাহাদিগকে দোষী বলা যায় না। তাহারা বলে যে, আমি, রূপজমােহে মুগ্ধ হইয়া, অপবিত্র নারীকে পত্নীর আসনে স্থান দিয়াছি। আমার দৃষ্টান্তে সমাজে উচ্ছজ্জ্বলতা বৃদ্ধি পাইবে। একদিকে তাহাদের এই আশঙ্কা দূরকরা আমার কর্তব্য ; কিন্তু অপর দিকে যখন আমার নিজের দৃঢ় বিশ্বাস আছে যে, সীতার চরিত্র নিষ্কলঙ্ক, তখন নিরপরাধে তাহার মর্যাদাভঙ্গ করাও আমার কর্তব্য নয়। আমি যখন রাজা, প্ৰজাদিগের ধৰ্ম্মের রক্ষক, তখন, সুনীতি ও সদাচার রক্ষার জন্য, আমার নিজের যে কোন সুখ, যে কোন স্বার্থ বিসর্জন করা আমার কর্তব্য। আমি যে ইন্দ্রিয়জমােহে মুগ্ধ নই এবং প্রজাদিগের কল্যাণের জন্য আমি যে আমার হৃৎপিণ্ড উৎপাটিত করিয়া ফেলিতে প্রস্তুত সীতাকে পরিত্যাগ করিয়া আমি তাহা দেখাইব। সেই সঙ্গে সীতা যে চিরপবিত্রা, সীতা যে সত্যই আমার প্রাণাধিকা, (বলিতে বলিতে রামচন্দ্রের কণ্ঠ রুদ্ধ হইল, তিনি অমার্জন করিয়া বলিলেন) সীতার প্রতি আমার আজীবনব্যাপী সমাদর, অনুরাগ ও একনিষ্টতার দ্বারা আমি তাহাও দেখাইব। ইহা হইলে উভয় কর্তব্যেরই সামঞ্জস্য হইবে।” ভরত বলিলেন। “উত্তম! কিন্তু বধূদেবীকে পরিত্যাগ করা ভিন্ন কি আপনার উদ্দেশ্য সিদ্ধির অন্য উপায় নাই ?” রামচন্দ্র। “না! আর কিছু উপায় থাকে ভাবিয়া বল। মনে কর, যদি আমি তাহাকে পরিত্যাগ না করিয়া এই প্রাসাদেই রাখি, আর আমরা উভয়ে ব্ৰহ্মচর্যে জীবন যাপন করি, আমাদিগের সংযম চতুর্দশ পরিচ্ছেদ। N কি কেহ বিশ্বাস করিবে ? প্রজাগণ তখনও বলিবে আমি কলঙ্কিনী মােহে এরূপ মুগ্ধ যে, তাহার দর্শন, বাক্যশ্রবণ ও সংস্পর্শরূপ সুখ হইতে নিজেকে সংযত রাখিতে সমর্থ নই। আর সেরূপ অবস্থায় বাস সীতারও পক্ষে সুখশান্তির কারণ হইবে না। তাহার অপেক্ষা তপােবনে নির্বিঘ্নে তপশ্চরণ করিতে পারিলে তিনি বরং সুখে ও শান্তিতে থাকিতে পারিবেন। সীতা হইতে পৃথক থাকিলে আমার যে কষ্ট হইবে, আমা হইতে পৃথক থাকিলে সীতার তদপেক্ষা অধিক কষ্ট হইবে না। কর্তব্যের অনুরােধে আমরা উভয়েই কষ্ট সহ্য করিব। আমরা পরস্পরের হৃদয় জানি। সীতা রাজপ্রাসাদেই থাকুন আর অরণ্যেই থাকুন, তিনি আমার হৃদয়ের মধ্যে আছেন, এ বিশ্বাস তাহার কখনই যাইবে না। এই বিশ্বাসেই দম্পতীর প্রকৃত সুখ ; যখন এ সুখ হইতে কেহ আমাদিগকে বঞ্চিত করিতে পারিবে না, তখন বিরহে ক্লেশ কি ?” রামচন্দ্র রাজোচিত ধৈৰ্য্য ও গাম্ভীর্য্যের সহিত এই কথাগুলি বলিলেও তাঁহার ভ্রাতৃগণ বুঝিলেন যে, তাহার কথার বর্ণে বর্ণে তাহার হৃদয়স্থ অগ্নির জ্বালা নিঃসৃত হইতেছে। লক্ষ্মণ বলিলেন ; “আপনি বধূদেবীকে কোথায় পাঠাইবেন স্থির করিয়াছেন?” রামচন্দ্র। “আমি তাঁহাকে মহর্ষি বাল্মীকির আশ্রমে পাঠাইব স্থির করিয়াছি। মহর্ষি রঘুকুল ও জনককুল উভয়েরই হিতৈষী এবং স্বর্গীয় পিতৃদেব ও রাজর্ষি উভয়েরই সুহৃদ। আমার ও সীতার জীবনের সমস্ত ঘটনা তাঁহার সুপরিচিত। তিনি সীতাকে যেরূপ সদ্ভাবে গ্রহণ করিবেন, আর কেহ সেরূপ করিবেন না। তাহার উপর তিনি একাধারে কবি, দার্শনিক এবং রাজনীতিজ্ঞ; বেদ, বেদাঙ্গ, ধনুর্বেদ, গন্ধৰ্ব্ববেদ, সৰ্ব্বশাস্ত্রে তাহার অধিকার আছে। সীতা পূর্ণগর্ভা, তাঁহার পুত্র হইলে মহর্ষির নিকট সেই বালক রাজ- সীতা। পুলাচিত শিক্ষা লাভ করিতে পারিবে। এই সকল কারণে সীতাকে বাল্মীকির আশ্রমে পাঠানই আমি সঙ্গত মনে করিতেছি। ভাই লক্ষ্মণ ! আমি তােমাকে লৌহ বা প্রস্তর বলিয়া মনে করি না। রক্তমাংসে গঠিত মানুষ, আমার অপেক্ষা হৃদয়বান মানুষ, বলিয়াই মনে করি। সীতা অন্য পােবন দর্শনের ইচ্ছা প্রকাশ করিয়াছিলেন। আমিও তাহাকে আগামী কল্য পােবনদর্শনে পাঠাইব বলিয়া প্রতিশ্রুত আছি। ঘটনাক্রমে এই নিদারুণ বিধিবিড়ম্বনা উপস্থিত হইয়াছে। এক্ষণে তাহাকে পােবনে রাখিয়া আসিবার ভার তােমাকেই লইতে হইবে। তুমি আমার ও সীতার উভয়েরই হৃদয় জান। তপােবনে যাইয়া, যে ভাবে ও যেরূপে, তাহাকে আমার অভিপ্রায় জানান কর্তব্য মনে কর, জানাইও। প্রজাগণ যখন আমাকে রূপজ মােহে মুগ্ধ বলিয়া বিবেচনা করে এবং তাহা- দিগের সেই ভ্রম দুর করিতে যখন আমি কৃতসঙ্কল্প হইয়াছি, তখন, বিদায়ের পূৰ্ব্বে, সীতার সহিত আর আমার সাক্ষাতের প্রয়ােজন নাই। আমার হৃদয়ের অধিষ্ঠাত্রী দেবীরূপে অন্তরে তাহাকে চিরদিন পূজা করিয়াই আমি তৃপ্তিলাভ করিব। তোমাকে আমার অধিক কথা বলিবার প্রয়ােজন নাই, এ সম্বন্ধে এই আমার শেষ কথা।” ভ্রাতৃগণ শুনিয়া নীরব রহিলেন ; মন্ত্রসভা ভঙ্গ হইল। ; পঞ্চদশ পরিচ্ছেদ। নির্বাসনের পর ক্রমে দ্বাদশ বৎসর অতীত হইল। কিন্তু নির্বাসন কাহার সীতাদেবীর না রামচন্দ্রের ? সীতাদেবী অযােধ্যা হইতে নির্বাসিত হইয়াছিলেন সত্য, কিন্তু রামচন্দ্রও কি সেই পঞ্চদশ পরিচ্ছেদ। ১০১ ? অযযাধ্যায় ছিলেন ? তাহা হইলে তাহার একজনও ব্যক্তি, একটাও দৃশ্য, একটীও তরুলতা তাহাকে আর পূর্বের মত প্রীত করে না কেন? বাহিরের নির্বাসনত নিৰ্বাসন নয় ; অন্তরের নির্বাসনই প্রকৃত নিৰ্বাসন। এই জন্যই প্রিয়জনের সহবাসে মরুভূমি গৃহ হয় এবং তদভাবে গৃহ মরুভূমির আকার ধারণ করে। রামচন্দ্রের নিকট অযােধ্যা এখন নিৰ্বাসন-ভূমি মহামরুতে পরিণত হইয়াছে। অন্তরে, বাহিরে পরিবর্তন ঘটিয়াছে। সীতাদেবীর সহিত এক সঙ্গে আহুতি- দান করিবেন বলিয়া যে অরুণােদয়ের জন্য রামচন্দ্র প্রতীক্ষা করিয়া থাকিতেন, সে অরুণােদয় এক্ষণে তাঁহার নেত্রজ্বালা উৎপাদন করে। প্রাসাদ-বাতায়ন হইতে জ্যোৎস্নাসমুজ্জ্বল সরযুর জলক্রীড়া দেখিবার জন্য রামচন্দ্র যে পূর্ণিমারজনীর প্রতীক্ষা করিতেন, সেই পূর্ণিমারজনী এখন তাহার নেত্র অশ্রুসিক্ত করিয়া দেয়। যে মন্দিরে উভয়ে একসঙ্গে প্রতিদিন প্রণাম করিতে যাইতেন, সে মন্দির এখন তাহার নিকট দেবতাশূন্য বলিয়া বােধ হয়। সুমন্দ অনিল, যে প্রস্ফুটিত কুসুম, যে বিহগের মধুর সঙ্গীত তাঁহার হৃদয়ে অমৃত বর্ষণ করিত, এখন তাহা বিষবৃষ্টি করে। লঙ্কা হইতে প্রত্যাগমনের পর সীতাদেবীর সঙ্গে বাস করিবার জন্য তিনি যে সুরম্য প্রাসাদ নির্মাণ করিয়াছিলেন, এক্ষণে তাহার মধ্যে তিনি প্রবেশ করিতে পারেন না। বহুতে নির্মিত সরযূতীরবর্তী রমণীয় উপবন এক্ষণে পরিত্যক্ত হইয়াছে। কেবল জড়প্রকৃতি সম্বন্ধে এই বিরাগ নয়, অযযাধ্যাবাসী ও অযযাধ্যাবাসিনীদিগকেও আর তিনি সেই পূর্বের মেহদৃষ্টিতে দেখিতে পারেন না। তাহা- দিগের মঙ্গলের জন্য যাহা করা কর্তব্য, তিনি সর্বদাই তাহা করিতে প্রস্তুত, কিন্তু তাঁহার স্বাভাবিক স্নেহপ্রবণতা অজ্ঞাতসারে ক্ষীণ হইয়াছে। তাহার আহার হইতে তৃপ্তি, নয়ন হইতে নিদ্রা এবং যে ১০২ সীতা। হৃদয় হইতে শান্তি নির্বাসিত হইয়াছে। সেই জন্যই বলিতে- ছিলাম নির্বাসন কাহার ? রামচন্দ্রের, সীতাদেবীর, না উভয়ের ? বাহিরের লােক রামচন্দ্রের ব্যবহারে কোন পরিবর্তন দেখিতে পাইত না। রাজসভায় তিনি আচাররক্ষক, শাস্ত্ৰদৰ্শী, দৃঢ় পরিশ্রমী রাজা; মন্ত্রণাকক্ষে তিনি কুশাগ্ৰবুদ্ধি, দূরদর্শী, রাজনীতিজ্ঞ ; বিচারগৃহে তিনি ন্যায়নিষ্ঠ, অপক্ষপাতী বিচারক ; সুতরাং প্রজার ভাবিত তিনি সীতাশােক অনায়াসেই সহ্য করিয়াছেন। কিন্তু যাহারা তাহাকে ঘনিষ্ঠরূপে দেখিতেন, তাহারা সকলে, বিশেষত কৌশল্যা ও লক্ষ্মণ, বুঝিতেন কি দাবানলে দিবারাত্র তাহার অন্তর দগ্ধ হইতেছে। সীতাদেবীর নির্বাসনকালে কৌশল্যা ঋষ্যশৃঙ্গের যজ্ঞে গমন করিয়াছিলেন; যখন ফিরিয়া আসিলেন, তখন সকল শেষ হইয়া গিয়াছিল, তিনি আর কি করিবেন ? তিনি জানিতেন, তাহার যে দেবতুল্য পতি নিজের প্রাণ বিসর্জন করিয়াছিলেন, তথাপি সত্য- চ্যুত হন নাই, রামচন্দ্র তাহারই ঔরসজাত ; সুতরাং রামচন্দ্র যে নিজের হৃৎপিণ্ড উৎপাটিত করিয়া কৰ্তব্যপালন করিবেন, ইহাতে তিনি বিস্মিত হন নাই। কিন্তু তিনি মাতৃ-দৃষ্টিতে দেখিতেন তাহার পুত্রের বীরবপু দিন দিন শুষ্ক হইয়া আসিতেছে ; তাহার নয়নদ্বয় কোটরগত এবং ললাট গভীর রেখাঙ্কিত হইতেছে। আহারে, বিশ্রমে, এমন কি পূজা আরাধনায়, তাহার চিত্ত শান্তিহীন। দেখিয়া কৌশল্যার হৃদয় বিদীর্ণ হইত, কিন্তু তিনি বুঝিতেন প্রতিবিধানের উপায় নাই, তিনি নীরবে সহ্য করিতেন। আর লক্ষ্মণ ? লক্ষ্মণ বুঝিতেন সীতাহীন রামচন্দ্র বিকলাঙ্গ ও জীবনীশক্তিহীন। এ অবস্থায় তাঁহাকে যে ভাবে সেবা করিলে তাহার প্রাণরক্ষা হইতে পারে, সেই ভাবে তিনি তাঁহার সেবা করিতেন। স্বয়ং কৌশল্যা যাহা পারিতেন না, লক্ষ্মণ তাহা করিতেন। যে দিন রাজসভায় পঞ্চদশ পরিচ্ছেদ। কোনও সুশীলা পত্নীর প্রতি দুর্ব্যবহারের জন্য কোনও দুৰ্বত্ত পতির বিরুদ্ধে অভিযােগ আসিত, লক্ষ্মণ জানিতেন যে, সে দিন রামচন্দ্রের রাত্রিতে নিদ্রা হইবে না, যেদিন কোনও উত্তরাধিকারিহীন ব্যক্তির ত্যক্ত সম্পত্তি রাজকোষভুক্ত হইবার আদেশ হইত, লক্ষ্মণ জানিতেন সে দিন রামচন্দ্রের বিশ্রাম-সুখ ঘটিবে না; তিনি বুঝিয়া পূৰ্ব্ব হইতে প্রস্তুত হইয়া থাকিতেন। সীতাদেবীকে নির্বাসিত করিয়া, এবং স্বয়ং সুখ, শান্তি হইতে নির্বাসিত হইয়া, রামচন্দ্র এইরূপে জীবন অতিবাহিত করিতেছিলেন। প্রথমে সীতা-নিৰ্বাসন লইয়া প্ৰজাদিগের মধ্যে যে আন্দোলন ও আলােচনা আরব্ধ হইয়াছিল, তাহা ক্রমে মন্দীভূত হইয়াছিল। দ্বাদশবর্ষান্তে হঠাৎ একটা বিশেষ কারণে আবার তাহা উজ্জীবিত হইয়াছে। রামচন্দ্র অশ্বমেধ মহাযজ্ঞের আয়ােজন করিয়াছেন। এই যজ্ঞে সস্ত্রীক ব্ৰতাচরণ ও হােমাগ্নিতে আহুতি-দান করিতে হয়। এজন্য বৃদ্ধা মহিষীগণ, কুলগুরু বশিষ্ঠদেব এবং প্রধান প্রধান প্রজাবর্গ সকলেই রামচন্দ্রকে পুনর্বার দারপরিগ্রহে অনুবােধ করিয়াছিলেন, কিন্তু তিনি কিছুতেই তাহাতে সম্মত হন নাই। তিনি স্বর্ণময়ী সীতাপ্রতিকৃতি নির্মাণ করাইয়া এবং প্রাণপ্রতিষ্ঠান্তে তাহাকে সহধর্মিণীস্থানীয়া করিয়া যজ্ঞ আরম্ভ করিয়া ছিলেন। দেশ দেশান্তরের লােক আহুত হইয়া যজ্ঞদর্শনার্থ উপস্থিত হইয়াছিলেন। রামচন্দ্রের ব্যবহার তাহাদিগের ও পুরবাসিগণের আলােচনার বিষয় হইয়াছিল। সাধুসজ্জনগণ, তাহার অমানুষিক সংযমে ও সহধর্মিণীর প্রতি একনিষ্ঠতা দর্শনে মুগ্ধ হইয়া, তাহার ভূয়সী প্রশংসা করিতেছিলেন। কিন্তু দুর্জনের জিহ্বা কুৎসারটনাতেও নিরস্ত ছিল না। তাহারা বলিতেছিল, “রাজচরিত্র দুয়ে; যে রমণীকে কলঙ্কিনী ভাবিয়া একবার নির্বাসন দিয়াছেন,
১০৬
সীতা।
জিনিকোটী সুধাকর
কিবা মুখ মনােহর,
অঙ্গে শােভে নানা আভরণ।
বসায়ে বেদীর পরে,
দোহার মিলায়ে করে,
রাজঋষি ক'ন স্নেহভরে
“শুন, রাম গুণধাম। সুতা মম সীতা নাম
অর্পিলাম আজ তব করে।
সতী মাঝে নিরূপমা, লাবণ্যে কমলা সমা,
সীতার তুলনা নাই ভবে ;
তব সুখে পাবে সুখ, দুখে তব পাবে দুখ,
ছায়া সম সাথে সাথে র’বে।”
সীতা, রাম পুলকিত, স্পর্শে তনু রােমাঞ্চিত,
মিলে চারি নয়নে নয়ন ;
মুখে মৃদু হাসি ফুটে,
আঁখিতে পুলক ছুটে ;
উলুধ্বনি দেয় রামাগণ।
মােহিত মিথিলাবাসী, করযােড়ে সবে আসি,
প্রণময়ে দোহার চরণে।
গাও, বীণা! তুলিন সীতারাম-গুণগান
কি আনন্দ দোহার মিলনে।”
বালকদিগের কিন্নর-নিন্দিত কণ্ঠের স্বরে বনভূমি প্লাবিত হইতে
লাগিল। শুনিয়া ঋষিপত্নীগণ বলিলেন “আবার গাও।” বালকেরা
আবার তেমনি মধুরস্বরে সেই গান করিল। শুনিয়া তৃপ্তিবােধ
হইল না, তাহারা বলিলেন “আবার গাও” বালকেরা আবার
গাইল। এইরূপ চার, পাঁচ বার গান করিতে করিতে সন্ধ্যা হইয়া
পঞ্চদশ পরিচ্ছেদ। ১০৭ আসিল। তখন ঋষিপত্নীদিগের মধ্যে কেহ তাহাদিগের মুখচুম্বন করিয়া, কেহ তাহাদিগের হস্তে কোন সুমিষ্ট দ্রব্য দিয়া, কেহ আশীৰ্বাদ করিয়া, তাহাদিগকে বিদায় দিলেন। বালকেরা, তাহা- দিগের চরণে প্রণাম করিয়া সমীপবর্তী একটী কুটীরে প্রবেশ করিল। এক শান্তোজ্জল-মূৰ্ত্তি তপস্বিনী এই কুটীরের দ্বারে বসিয়া রামায়ণ- গান শ্রবণ করিতে ছিলেন। তাহার শরীর শীর্ণ, মুখ শুষ্ক ; তথাপি লাবণ্যময়ী ছায়া তাঁহাকে দেবীর ন্যায় জ্যোতিতে বিভূষিত করিয়া রাখিয়াছিল। তিনি বাম করে কপােল বিন্যস্ত করিয়া ছিলেন, আর তাহার নীলােৎপল তুল্য চক্ষু দুইটী হইতে অবিরল অশ্রু তাঁহার করতল বহিয়া ভূতলে পতিত হইতে ছিল। বালকদিগকে কুটীরের দিকে আসিতে দেখিয়া তিনি অমার্জন করিয়া দণ্ডায়মান হইলেন। বালকেরা নিকটে আসিয়া তাহাকে প্রণাম করিল। তাহাদিগের মধ্যে জ্যেষ্ঠটী বলিল, “মা! আজ তুমি রামায়ণগান শুনিতে যাও নাই কেন?” তপস্বিনী বলিলেন ; “বাবা। আমি এখানে বসিয়া শুনিতে ছিলাম, এখান হইতেও বেশ স্পষ্ট শােনা যায়।” কনিষ্ঠটী মাতার চক্ষু অশ্রুসিক্ত দেখিয়া বলিল, “মা! তুমি রামায়ণগান শুনিলে এত কঁাদ কেন? তুমি যদি কাদ, তবে আমরা আর রামায়ণ গান করিব না।” তপস্বিনী বলিলেন, “না বাবা! এমন কথা বলিও না ; তােমাদের এই রামায়ণগান শুনিয়াই আমি বাঁচিয়া আছি। গান শুনিয়া আমি কান্না রাখিতে পারি না বটে, কিন্তু সে কান্নাতে আমার সুখ আছে। তােমরা রামায়ণগান না করিলে আমি মরিয়া যাইব।” জ্যেষ্ঠ বালক। “মা! এতদিন পরে আজ আমাদের মনের একটী মহাসংশয় দূর হইয়াছে।”
১০৮ সীতা। তপস্বিনী। “কি সংশয়, বাবা?” জ্যেষ্ঠ বালক। “আমরা যেদিন গুরুদেবের নিকট শুনিয়া ছিলাম যে, রামচন্দ্র লােকনিন্দা শ্রবণে সীতাদেবীকে ত্যাগ করিয়া- ছেন, সে দিন আমাদের ভয়ানক ক্রোধ হইয়াছিল। আমরা ভাবিয়াছিলাম এমন লােকের চরিত আর আমরা পাঠ করিব না। আমরা গুরুদেবকে বলিলাম, “প্রভাে! রামচন্দ্র সীতাদেবীকে নির্বাসিতা না করিয়া তাহাকে লইয়া নিজে বনে গেলেন না কেন? সীতার একটী পদরেণুর সঙ্গেত শত অযযাধ্যার তুলনা হয় না। কতক গুলি নির্বোধ, নিক ব্যক্তির কথায় তিনি সীতার ন্যায় পত্নীকে ত্যাগ করিলেন। প্রজারঞ্জন বড় না নির্দোষীকে বৃথা অপবাদ হইতে রক্ষা করা বড় ?” তপস্বিনী। “মহর্ষি শুনিয়া কি বলিলেন?” জ্যেষ্ঠ বালক। “মহর্ষি বলিলেন ; “বৎসগণ! তােমাদের বিচার সুসঙ্গত হয় নাই। রামচন্দ্র রাজা ; প্রজাদিগকে পালনই রাজধৰ্ম্ম, পরিত্যাগ রাজধৰ্ম্ম নয়। রাবণের ন্যায় দুৰ্বত্তের গৃহে দীর্ঘকাল বাস করিয়া কোনও নারী সতীধৰ্ম্মরক্ষা করিতে পারেন প্রজারা ইহা কিরূপে বিশ্বাস করিবে ? রামচন্দ্র সীতার হৃদয়, সীতার মানসিক বল জানিতেন; কিন্তু প্রজাদিগের তাহা জানিবার সুযােগ কোথায় ? প্রজাগণ অগ্নিপরীক্ষা দর্শন করে নাই, সুতরাং তাহারা যদি সীতার পবিত্রতা সম্বন্ধে কোন সন্দেহ করে, তবে সেই অপরাধে তাহাদিগকে ত্যাগ করিয়া একটী অরাজকতা উৎপাদন করা কি প্রজাহিতৈষী রাজার কর্তব্য। মনে কর, রামচন্দ্র যদি রাজ্য ত্যাগ করিতেন, তবে ভরত, লক্ষ্মণ, শত্রু কেহ কি সে রাজ্য গ্রহণ করিতেন? রামচন্দ্রের তখন পুত্র হয় নাই, কে রাজ্যের অধিকারী হইতেন? জ্ঞাতি-বিবাদে, না হয় ;
পঞ্চদশ পরিচ্ছেদ। ১০৯ প্রতিবাসী কোন বলবান রাজার দ্বারা আক্রান্ত হইয়া, প্রাচীন ইক্ষাকু-কুল ধ্বংস হইত ; সরযু রক্তস্রোত বহন করিত ; ইহা কি সঙ্গত হইত? রামচন্দ্র যদি সীতার জন্য রাজ্য ত্যাগ করিতেন তবে স্বার্থপর ও কর্তব্যভীরু বলিয়া তিনি সাধুসমাজে নিন্দনীয় হইতেন।” “মা! আমরা বুঝিয়া দেখিলাম, মহষির কথা অসঙ্গত নয়। কিন্তু একটী বিষয়ে আমাদিগের সন্দেহ ছিল। আমরা ভাবিতাম রামচন্দ্ৰত প্ৰজাদিগের প্রতি কর্তব্যপালনের জন্য সীতাদেবীকে ত্যাগ করিলেন, কিন্তু যখন তিনি সীতাদেবীকে নিরপরাধ বলিয়া জানিতেন, তখন তাহার প্রতি নিজের কি কৰ্তব্য করিলেন । সীতাদেবীর অলীক অপবাদ খণ্ডন করাও ত তাঁহার অবশ্য কর্তব্য ; তাহা না করিলে তাহার মহত্ব কিরূপে স্বীকার করিব ? এতদিন পরে আমাদিগের সেই সংশয় দূরীভূত হইয়াছে।” তপস্বিনী। “কিরূপে হইল।” জ্যেষ্ঠ বালক। “মা! আজ অযযাধ্যা হইতে নিমন্ত্রণের পত্র লইয়া এক দূত আসিয়াছিল। শুনিলাম রাজা রামচন্দ্র, অশ্বমেধ যজ্ঞে প্রবৃত্ত হইয়া, ‘গুরুদেবকে নিমন্ত্রণ করিয়াছেন। আমরা দূতের নিকট যজ্ঞের নানাবিধ সংবাদ জিজ্ঞাসা করিতেছিলাম। যাহা শুনিলাম, তাহাতে বিস্মিত হইলাম। যে বিপুল আয়ােজন হইয়াছে, তাহা অতি অদ্ভুত ; কিন্তু তাহার অপেক্ষা আরও অদ্ভুত একটা কথা শুনিলাম। মা ! তুমি বােধ হয় জান যে, অশ্বমেধ যজ্ঞে সস্ত্রীক আহুতিদান করিতে হয়।” তপস্বিনী ব্যগ্রভাবে বলিলেন; “তবে কি রামচন্দ্র পুনৰ্ব্বার দারপরিগ্রহ করিয়াছেন ?” জ্যেষ্ঠ বালক। “না মা ! তাহা হইলেত আমাদিগের সংশয় ১১০ সীতা। আরও দৃঢ়ীভূত হইত। দারপরিগ্রহের জন্য পুরবাসিগণ, বৃদ্ধা মহিষীগণ, এমন কি স্বয়ং বশিষ্ঠদেব পৰ্য্যন্ত রামচন্দ্রকে অনুরােধ করিয়াছিলেন, কিন্তু তিনি কাহারও অনুরােধ রক্ষা করেন নাই। তিনি, সীতাদেবীর এক স্বর্ণময়ী প্রতিকৃতি নির্মাণ করাইয়া, এবং প্রাণপ্রতিষ্ঠান্তে তাহাকেই পত্নীস্থানীয়া করিয়া, যজ্ঞে প্রবৃত্ত হইয়াছেন। মা! যে রামচন্দ্র প্রজারঞ্জনের অনুরােধে প্রাণাধিকা সীতাকে নির্বাসনে পাঠাইয়াছেন, সেই রামচন্দ্রই ভারতের নিমন্ত্রিত রাজগণের ও ঋষিগণের সমক্ষে সেই নির্বাসিতা সীতাকে ধৰ্ম্মপত্নীর আসন দিয়া তাঁহার অপবাদ খণ্ডন করিলেন, ইহার অপেক্ষা রাজধৰ্ম্মের ও দাম্পত্যধর্মের উৎকৃষ্ট সামঞ্জস্য আর কি হইতে পারে? সেইজন্যই বলিতে ছিলাম, আমাদিগের সংশয় এতদিনে দূর হইয়াছে। আমরা গুরুদেবের মুখে অনেক মহাপুরুষের কথা শুনিয়াছি, কিন্তু এমন পাষাণকঠোর এবং এমন কুসুমকোমল মহাপুরুষের কথা কখনও শুনি নাই।” বালকের কথা শুনিবার সময় তপস্বিনীর দুইটী চক্ষু দিয়া দর দর ধারে জল পড়িতে ছিল। দেখিয়া কনিষ্ঠ বালকটা বলিল “মা! তুমি আবার কঁদিতেছ ? রামচন্দ্রের কথা শুনিলে তুমি এত কাদ কেন ?” তপস্বিনী। “বাবা! আমি দুঃখে কাঁদি নাই, রামচন্দ্রের গুণের কথা শুনিয়া, আনন্দে কাঁদিতেছি। রামচন্দ্র একবার সীতাকে বলিয়াছিলেন ; “সুখে দুঃখে, মিলনে বিরহে, কোমলতায় কঠোরতায় কখনও রামের হৃদয়কে অবিশ্বাস করিত না।” সে কথা সার্থক হইল।” কনিষ্ঠ বালক। “মা! আমরা যখন রামচন্দ্রের কথা বলি, তখন তুমিও অনেক কথা বল। রামায়ণে যে সকল কথা নাই ল;
পঞ্চদশ পরিচ্ছেদ।
১১১
•
তুমি তাও বল। তুমি এ সকল কেমন করিয়া জানিলে ?”
রামচন্দ্রকে কি তুমি জাননা?”
তপস্বিনী। তিনি দেবতা, আমরা মানুষ ; তাহার সকল গুণ
কিরূপে জানিব ? তবে যাঁহারা সাধুলােক তাহাদের কথা সকলেই
জানে; রামচন্দ্র সাধু, তাই অনেকের নিকট তাহার কথা শুনিয়াছি।
আর রামচন্দ্র আমাদের রাজা, আমরা তাঁর প্রজা; প্রজা মাত্রই
রাজার কথা কিছু না কিছু জানে।”
জ্যেষ্ঠ বালক। “মা! তােমার নিকট আমাদের একটি
প্রার্থনা আছে। শুনিয়াছি গুরুদেব নিমন্ত্রণরক্ষাৰ্থ কাল অযােধ্যায়
যাইবেন। তাঁহার সঙ্গে বিদ্যার্থীদিগের মধ্যে অনেকেই যজ্ঞ দেখিতে
যাইবেন। রামচন্দ্রকে দেখিব বলিয়া অনেক দিন হইতে আমাদের
সাধ আছে। তুমি অনুমতি দিলে আমরা গুরুদেবের সঙ্গে
যাইতে পারি।”
তপস্বিনী। “মহর্ষি সঙ্গে লইয়া যাইতে সম্মত হইলে আমার
আপত্তি নাই, কিন্তু যাওয়া হইলে সেখানে যেন কোন অশিষ্ট
ব্যবহার করিও না।”
জ্যেষ্ঠ বালক ।
“না! তুমি নিশ্চিন্ত থাকিও। গুরুদেব
ফিরিয়া আসিলে তুমি জিজ্ঞাসা করিও, আমরা কেমন ব্যবহার
করি।”
কথােপকথনে ক্রমে রাত্রি হইয়াছিল ; দেখিয়া তপস্বিনী বলি-
লেন, “বাবা! সমস্ত দিন ক্রীড়ায় ও অনেকক্ষণ গান করিয়া
তােমরা শ্রান্ত হইয়াছ, এখন বিশ্রাম কর।”
এই বলিয়া তিনি গৃহতলে একখানি মৃগচর্ম প্রসারিত
করিলেন। এবং দুইজনকে দুইদিকে রাখিয়া নিজে মধ্যস্থলে
শয়ন করিলেন।
১১২ সীতা। বলিতে হইবে কি যে, এই তপস্বিনীই আমাদিগের সীতাদেবী এবং এই দুইটা বালক তাহার পুত্রদ্বয় কুশ এবং লব। লক্ষ্মণ রামচন্দ্রের আদেশে সীতাদেবীকে পরিত্যাগ করিয়া যাইলে মহর্ষি বাল্মীকি তাহাকে নিজের আশ্রমে রাখিয়া দুহিতার ন্যায় স্নেহে পালন করিয়াছিলেন। আশ্রমস্থ অতি অল্প ব্যক্তিই সীতাদেবীর প্রকৃত পরিচয় জানিতেন। সাধারণের নিকট অজ্ঞাত থাকিয়া তিনি তপশ্চৰ্য্যায় দিনপাত করিতেন। আশ্রমে আগমনের সময় তিনি পূর্ণগর্ভা ছিলেন, সেখানে যমজ সন্তান প্রসব করিলেন। মহর্ষি তাহাদিগের জাতকৰ্ম্মাদি সম্পন্ন করিয়া জ্যেষ্ঠের নাম কুশ ও কনিষ্ঠের নাম লব রাখিয়াছিলেন। কুশ, লবের বয়ােবৃদ্ধির সঙ্গে মহর্ষি তাহাদিগকে রাজপুত্রোচিত শিক্ষা প্রদানের ব্যবস্থা করিলেন। বালকেরা রাজনীতি, ধৰ্ম্মনীতি, বেদ, বেদাঙ্গ সৰ্ব্ব বিদ্যায় পারদর্শী হইল। বাণক্ষেপে প্রসিদ্ধনামা ধনুর্ধরদিগকেও তাহার পরাস্ত করিত। তাহারা মহর্ষির রচিত রামায়ণ পাঠ করিয়া তান লয় সংযােগে তপােবনবাসীদিগকে তাহা গান করিয়া শুনাইত ; কিন্তু রামচন্দ্র ও সীতাদেবী যে কে তাহা জানিত না। পাঠক! আমরা সেই গানই শ্রবণ করিয়াছি। যােড়শ পরিচ্ছেদ। অরুণােদয়ের সঙ্গে মহর্ষি বাল্মীকির আশ্রমে মহা কোলাহল উথিত হইয়াছে। আশ্রমস্থ ঋষিগণ ও বিদ্যাথিগণ অযযাধ্যাগমনের উদ্যোগে প্রবৃত্ত হইয়াছেন। কেহ মৃগচর্ম, কুশাসন ও কমণ্ডলু, কেহ যজ্ঞীয় সােমকণ্ডনের পাত্র, চমস ও ভ্রু এবং কেহ বা অগ্নি প্রজালকের সহায় খনি, লৌহশলাকা ও কুঠার বন্ধন করিয়া পৃষ্ঠে যােড়শ পরিচ্ছেদ। ১১৩ আবােরাপণ করিতেছেন। বিদ্যার্থিগণ পুস্তক সঙ্গে লইয়া যাইতে অনিচ্ছুক, কিন্তু তাহাদিগের উপাধ্যায়গণ বলিতেছেন, “দীর্ঘকাল পাঠবিমুখ হইয়া থাকা কর্তব্য নয়, অন্ততঃ নিরুক্ত ও ব্যাকরণ সঙ্গে লইয়া চল, অবসরক্ৰমে পাঠ করিবে।” এ কথা ছাত্রদিগের বড় প্রীতিকর হইতেছে না। তাহারা বলিতেছেন, “রাজগৃহের নিমন্ত্রণে নৃত্যগীত ও কৌতুক দর্শনের জন্যইত গমন, সেখানে যদি ব্যাকরণের সূত্র আবৃত্তি করিতে হয়, তবে গমনের প্রয়ােজন কি?” উভয় পক্ষে এইরূপ বাদানুবাদ চলিতেছে। কোন ক্ষুধাকাতর ছাত্র, গােপনে, কয়েকটী সুপক্ক কদলী ও একটা বিফল কমণ্ডলুর মধ্যে লইয়াছিলেন ; হঠাৎ কাহারও দৃষ্টিপথে তাহা পতিত হওয়াতে তুমুল সমালােচনা আরব্ধ হইয়াছে। অপরাধী ছাত্রের নাম লইয়া কেহ বলিতেছেন, “ভাে ভাে ভাণ্ডায়ন! দেখিয়াছ হে! হারীত কিরূপ ঔদরিক, কমণ্ডলুর মধ্যে কদলী ও বিফল লইয়া চলিয়াছে।” ভাণ্ডায়ন বলিলেন, “হা ধিক! হা ধিক! এত বয়স হইল, কিন্তু হারীতের জিহ্বালাম্পট্য দূর হইল না।” শুনিয়া অপর একজন বলিলেন, “এইবার হইতে উহাকে হারীত না বলিয়া “কুম্ভোদর” বলিয়া ডাকা যাইবে।” শুনিবামাত্র সকলেই করতালি দিয়া হারীতকে “কুম্ভোদর” “কুম্ভোদর” বলিয়া আহ্বান করিতে লাগিলেন। হারীত লজ্জায় অপােবদন হইলেন। অকস্মাৎ সংবাদ আসিল যে, মহর্ষি বাল্মীকি সেই দিকে আগমন করিতেছেন; মুহূৰ্তমাত্রে কোলাহল নিস্তব্ধ হইল। মহর্ষি স্নানা- হিক সমাপনান্তে সীতাদেবীর কুটীরাভিমুখে চলিয়াছিলেন। তিনি পূর্বেই তাহার সহিত কুশ ও লবের অযােধ্যাগমনের সংবাদ সীতা- দেবীর নিকট পাঠাইয়াছিলেন ; এক্ষণে তাহার নিকট বিদায় লইতে আয়ােছিলেন। সীতাদেবী জানিতেন না যে, মহর্ষি, তাদৃশ ৮ ১১৪ সীতা। ; ; সময়ে, তাহার কুটীরে আসিবেন, সুতরাং তিনি অন্যান্য দিনের ন্যায় আনান্তে পূজায় বসিয়াছিলেন। মহর্ষি, তাহার কুটীরের দ্বার উম্মুক্ত দেখিয়া, নিঃশব্দে অগ্রসর হইলেন, এবং দ্বারদেশ হইতে দেখিলেন, সীতাদেবী একাগ্রচিত্তে পূজায় ব্যাপৃতা আছেন। তাঁহার সম্মুখে কোন ঘট, পট বা বিগ্রহ নাই ; কিন্তু একখানি শিলাফলক রহিয়াছে। তাহাতে দুইটী ধ্বজবাদি চিহিত রাজপদ চন্দনদ্বারা অঙ্কিত আছে। সীতাদেবী তাহা পুষ্পদামে সজ্জিত করিয়া ভক্তি- গদগদ চিত্তে পূজা করিতেছেন। মহর্ষি দেখিলেন, ভক্ত অভীষ্ট- দেবতার দর্শন পাইলে তাঁহাকে যে ভাবে পূজা করেন, সীতাদেবী, সেই ভাবে, সেই পদচিহু পূজা করিয়া, করযােড়ে প্রণামপূৰ্ব্বক, বলিলেন ; “পাদপদ্মে অধিষ্ঠিত দেবতা! রঘুকুলের কল্যাণ হউক ; অযযাধ্যার প্রজাবর্গের কল্যাণ হউক; সীতা জন্ম জন্ম এই পাদপদ্ম পূজার অধিকারিণী হউক।” এই পাদপদ্ম কাহার মহর্ষি দৃষ্টিমাত্র তাহা বুঝিলেন ; তাহার নয়ন অশ্রুঘ্নত হইল। এই সময় পূজান্তে মহর্ষির দিকে সীতাদেবীর দৃষ্টি পতিত হইল। তিনি ব্যগ্র হইয়া মহর্ষিকে প্রণাম করিলেন এবং পাদপদ্মাঙ্কিত ফলক বাঞ্চলে গােপন করিবার চেষ্টা করিলেন। মহর্ষি বলিলেন ; “বৎসে! সঙ্কোচের কারণ নাই ; পৃথিবীতে যাহারা এতদিন পতিতকুলের রাজ্ঞী বলিয়া সমাদৃত হইতেছেন, তুমি তাঁহাদিগকেও পরাস্ত করিয়াছ। আশীৰ্বাদ করি, যেন পৃথিবীতে পতিদেবতা নারীদিগের নামােল্লেখকালে লােকে অগ্রে তােমারই নাম করে। বৎসে! আমি তােমার নিকট একটা প্রস্তাব করিতে আসিয়াছি। আমি অদ্য কুশ ও লবকে লইয়া যজ্ঞদর্শনার্থ গমন করিব। অবস্থা বিবেচনায় যদি তােমাকে সেখানে যাইবার জন্য সংবাদ পাঠাই, তবে গমনে কুষ্ঠিত হইও না।”
যােড়শ পরিচ্ছেদ। ১১৫ সীতাদেবী বলিলেন ; “পিতঃ! আপনার আদেশ শিরােধার্য ; যেরূপ আজ্ঞা করিবেন, সেইরূপই করিব। কিন্তু সীতার সংসারিণী হইবার আর আশা নাই। পদ্মিনী লক্ষ যােজন দূরস্থ সূৰ্য্যদেবকে আপনার পার্শ্বস্থ সলিলে প্রতিবিম্বিত দর্শন করিয়াই যেমন প্রফুল্ল থাকে, সীতাও দূর হইতে এই পাদপদ্মে অধিষ্টিত সেই দেবতার পূজা করিয়াই তেমনই তৃপ্ত থাকিবে।” মহর্ষি শুনিয়া কোন প্রত্যুত্তর দিলেন না; তিনি সীতাদেবীকে আশীর্বাদ করিয়া বিদায় লইলেন। পাঠক! পাঠিকা! কল্পনা সাহায্য আমরা একসঙ্গে বহু স্থান দর্শন করিয়াছি। মিথিলার বিবাহ-সভা, অযযাধ্যার রাজাপুর, দণ্ডকাস্থিত পঞ্চবটী, রাক্ষসপূর্ণ লঙ্কাপুরী, এবং মহর্ষি বাল্মীকির তপােবন দর্শন হইয়াছে ; আসুন অন্য একটা স্থানে গমন করি। অই যে বহু যােজনবিস্তৃত প্রান্তরের মধ্যে ঘনসন্নিবিষ্ট শিবিরশ্রেণী লক্ষিত হইতেছে, যথায় সহস্র সহস্র রাজা, ঋষি, বণিক ও ভিক্ষুক সন্মিলিত হইয়াছেন; রণােন্মত্ত অশ্ব, গজ, ও সৈনিকদিগের চীৎকারের সঙ্গে যে স্থান হইতে ঋত্বিকগণের কণ্ঠ-নিঃসৃত বেদগান শ্রুত হইতেছে, উহার নাম নৈমিষারণ্য। রামচন্দ্র, তাঁহার অনুষ্ঠিত অশ্বমেধ যজ্ঞ সমাপনের জন্য, অযযাধ্যা হইতে এখানে আগমন করিয়াছেন। তাঁহার আদেশে এই স্বভাবতঃ নির্জন প্রদেশ জন- কোলাহলপূর্ণ মহানগরীতে পরিণত হইয়াছে। নিমন্ত্রিতদিগের বাসের জন্য তথায় বিচিত্র ভবন সমূহ নির্মিত হইয়াছে, পানীয় জলের জন্য সরােবর খনিত হইয়াছে, সুরম্য উদ্যান ও প্রশস্ত রাজপথ রচিত হইয়াছে। শিল্পাগার, বিপনী, পাকভবন, সৈনিকা- বাস, দেবমন্দির কিছুরই সেখানে অভাব নাই। রাজকর্মচারিগণ অশ্বপৃষ্টে ভ্রমণ করিয়া নিমন্ত্রিতদিগের পরিচর্যার আয়ােজন ১১৬ সীতা। করিতেছেন। যজ্ঞ নির্বিঘ্নে সমাপ্ত হইতেছে ; কাহারও মুখে অভাবের কথা নাই, অসন্তোষের ভঙ্গী নাই; সুশৃঙ্খলায় সমস্ত কাৰ্য্য চলিয়াছে। নৈমিষারণ্যে আগমনের পর, মহর্ষির আদেশে, কুশ ও লব কয়েক দিন অবধি রামায়ণ গান করিয়া নিমন্ত্রিত ব্যক্তিদিগকে শুনাইতে- ছিলেন। একে রামচন্দ্রের চরিত, তাহার উপর মহর্ষির রচনা, সেই সঙ্গে কুশ, লবের কিন্নর-নিন্দিত কণ্ঠ, যে সেই সঙ্গীত শ্রবণ করিতেছে, সেই মােহিত হইতেছে। লােকের প্রশংসা শুনিয়া রামচন্দ্রও একদিন সপরিজনে তাহা শ্রবণ করিলেন, এবং শ্রবণ করিয়া মুগ্ধ হইলেন। ক্রমে মহর্ষির মুখে কুশ, লবের প্রকৃত পরিচয় পাইয়া তাঁহার হৃদয়ে সীতাশােক উদ্বেল হইয়া উঠিল। কৌশল্যাদি মহিষীগণ এবং ভরত, লক্ষ্মণাদি ভ্রাতৃগণ শুনিয়া সীতা- দেবীকে পুনর্বার গ্রহণের জন্য তখন রামচন্দ্রকে অনুরােধ করিতে লাগিলেন। মহর্ষি বাল্মীকিও সীতাদেবীকে পােবন হইতে আনয়ন সম্বন্ধে রামচন্দ্রের নিকট প্রার্থনা জানাইলেন। রামচন্দ্র তাহাকে বলিলেন, “প্রভাে! ইহার পরিণাম কি হইবে বলিতে পারি না ; তবে যখন আপনাদিগের সকলের ইচ্ছা তখন আমার অসম্মতি নাই।” শুনিয়া মহর্ষি সীতাদেবীকে আনয়নের জন্য তপােবনে লােক প্রেরণ করিলেন। সীতাদেবী, ঋষিপত্নীদিগের নিকট বিদায় গ্রহণ করিয়া, স্পন্দিত হৃদয়ে নৈমিষারণ্যে উপস্থিত হইলেন। স্থির হইল যে, যজ্ঞে পূর্ণাহুতি দানের দিন, যখন রাজগণ, ঋষিগণ, ও পৌর- জনপদবর্গ সকলেই যজ্ঞসভায় উপস্থিত থাকিবেন, তখন মহর্ষি স্বয়ং সীতাদেবীকে সঙ্গে লইয়া তাঁহার পুনগ্রহণ সম্বন্ধে প্রস্তাব করিবেন; বশিষ্ঠদেব প্রভৃতি তাহা অনুমােদন করিবেন। মহর্ষি ৩ যােড়শ পরিচ্ছেদ। ১১৭ ভাবিলেন, যদি বিধাতা প্রসন্ন হন, তবে, স্বর্ণময়ী সীতার পরিবর্তে, শরীরিণী সীতাই স্বয়ং রামচন্দ্রের সঙ্গে পূর্ণাহুতি দান করিবেন। অদ্য আহুতিদানের দিন; যজ্ঞসভা লােকে পূর্ণ। বিশাল চন্দ্রাতপের তলে রামচন্দ্র ভ্রাতৃগণে ও অমাত্যবর্গে পরিবৃত হইয়া উপবেশন করিয়াছেন। এক দিকে রাজগণ ও ঋষিগণ, অপর দিকে পৌরজানপদবর্গ। কৌশল্যা প্রভৃতি রাজমহিষীগণ এবং উৰ্মিলা প্রভৃতি সীতাদেবীর ভগ্নীগণ, স্বতন্ত্র স্থানে উপবেশন করিয়া, উৎসুক হৃদয়ে সীতাদেবীর আগমন প্রতীক্ষা করিতেছেন। রামচন্দ্রের হৃদয় প্রবল বেগে স্পন্দিত হইতেছে ; সকলেরই দৃষ্টি সভার দ্বারে। কিয়ৎক্ষণ পরে রক্ষিগণ সমীপবর্তী ব্যক্তিদিগকে অপসৃত হইবার জন্য সঙ্কেত করিল। সীতাদেবী শিবিকা হইতে অবতীর্ণ হইলেন। তাঁহার সম্মুখে প্রশান্ত মূর্তি, শ্বেতশ্মশ্রু, মহষি বাল্মীকি, পার্শ্বে দেবকুমার সদৃশ সুকুমারতনু কুশ ও লব। সহস্র সহস্র নেত্র তখন সেই দিকে সম্বদ্ধ হইল। যাঁহারা সীতাদেবীকে, একদিন, নববধূবেশে অযযাধ্যায় প্রবেশ করিতে দেখিয়াছিলেন, তাঁহারা তাহাকে দেখিয়া চমকিত হইলেন এবং ক্ষোভে দীর্ঘনিশ্বাস ত্যাগ করিয়া মস্তক অবনত করিলেন। সেই স্কুটনােম্মুখী চম্পক- কলিকা সদৃশী সীতা, সেই সাক্ষাৎ কমলারূপিণী বধূ আজ পাংশুবর্ণা, কঙ্কালশেষ হইয়াছেন। তাঁহার দেহে মাংস নাই, কপােল এবং অধরে রক্ত নাই, চক্ষু দুইটী বসিয়া গিয়াছে, ক্ষীণ দেহলতা ভাঙ্গিয়া কুজ হইয়াছে ; কেবল সেই পূৰ্ব্বলাবণ্যের ছায়া হইতে প্রতিপন্ন হইতেছে যে, ইনিই সেই সীতাদেবী বটেন। তাঁহার পরিধান তপস্বিনীজনােচিত গৈরিক বসন, মন্তকে একটা মাত্র বেণী লম্বিত হইতেছে ; অঙ্গ অলঙ্কার-শূন্য ; কেবল কণ্ঠের স্ফটিকমাল্য ও হস্তের দুই গাছি কঙ্কন তাহার অবৈধব্য ১১৮ সীতা। সূচনা করিতেছে। তাহাকে দেখিয়া অন্তঃপুরচারিণীগণ আর্তনাদ করিয়া উঠিলেন। রামচন্দ্রেরও বােধ হইল, যেন, তাহার অধিষ্ঠান- ভূমি সরিয়া গিয়াছে, তিনি শূন্যে ঘূর্ণিত হইতেছেন। কিন্তু পাছে সভাস্থ ব্যক্তিগণ তাঁহাকে লঘুচিত্ত মনে করেন, এই জন্য তিনি, যথাশক্তি ধৈৰ্য্য অবলম্বন পূৰ্ব্বক, স্থির হইয়া বসিলেন। এদিকে সীতাদেবী, অগ্রসর হইয়া, প্রথমে, বশিষ্ঠাদি ঋষি- গণকে, কৌশল্যাদি শ্বশাদিগকে এবং তাহার পর, রামচন্দ্রকে প্রণাম করিলেন। রামচন্দ্রের বিশুষ্ক দেহ এবং অশ্রুকলঙ্কচিহ্রিত মুখ দর্শন করিয়া তাঁহার হৃদয় বিদীর্ণ-প্রায় হইল। তিনি রামচন্দ্রের পদে বদ্ধদৃষ্টি হইয়া অবনত মস্তকে দণ্ডায়মানা রহিলেন। মহর্ষি বাল্মীকি তখন গম্ভীর-স্বরে সভাস্থ ব্যক্তিদিগকে সমােধন করিয়া বলিলেন ; “হে ব্রাহ্মণক্ষত্রিয়প্রমুখ পৌরজানপদবর্গ! রামচন্দ্র সীতাকে পুনৰ্বার গ্রহণ করিবেন, আপনারা প্রফুল্লচিত্তে সম্মতি দান করুন। যে বিশ্বাত্মা ভূলােক ও দ্যুলােক ব্যাপ্ত করিয়া আছেন; অগ্নি, জল, বায়ু, চন্দ্র এবং সূৰ্য্য অবিচ্ছেদে যাঁহার সত্ত্বার সাক্ষ্য দান করিতেছে, তিনি অবগত আছেন যে, সীতা অন্তরে, বাহিরে নিষ্পপা।” মহর্ষি এই বলিয়া নীরব হইলে সভাস্থলে একটী মহান্ কলরব উথিত হইল। মহর্ষি বশিষ্ঠদেব এবং সভাস্থ অধিকাংশ ব্যক্তিই “তথাস্তু তথাস্তু” বলিয়া মহর্ষির কথার সমর্থন করিলেন; কিন্তু এক সম্প্রদায় নীরব রহিল এবং আকারেঙ্গিতে পরস্পরকে কি বলিতে লাগিল। সীতাদেবী মহর্ষির পার্শ্বেই দণ্ডায়মান ছিলেন, তিনি একবার সভার চতুর্দিক নিরীক্ষণ করিলেন। এই সকল লােকের ভাবভঙ্গী তাহার দৃষ্টি অতিক্রম করিতে পারিল না। নিজেকে নিপাপা জানিয়াও নারীর প্রাকৃতিক ধর্মে তাঁহার হৃদয় ব্যথিত ;
ঘােড়শ পরিচ্ছেদ। ১১৯ হইল। তিনি রামচন্দ্রকে পুনর্বার প্রণাম করিলেন, একবার সজলনেত্রে কুশ ও লবের দিকে চাহিয়া দেখিলেন, তাহার পর অবনতজানু ও কৃতাঞ্জলি হইয়া ভূনত নেত্রে বলিলেন, “সৰ্বংসহে ভূতধাত্রি ! সহিষ্ণুতাগুণে সীতা যেন তােমার দুহিতা নামের যােগ্যা হয়। আমার সংসারের সাধ মিঠিয়াছে, মা! তােমার ক্রোড়ে আমায় স্থান দাও।” কথা শেষ হইবার সঙ্গে সঙ্গেই তাহার শেষ নিশ্বাস নিঃসৃত হইল এবং তাহার প্রাণহীন তনু, আকাশচুতা তারকার ন্যায়, নিষ্প্রভ হইয়া সভাতলে পতিত হইল। পৃথিবী সীতাদেবীকে বক্ষে গ্রহণ করিলেন। সীতাদেবীর দেহের রেণু, পরমাণু পৃথিবীর রেণু, পরমাণুর সহিত ওতপ্রােত ভাবে মিলিত হইয়াছে, কিন্তু তাহাদিগের জীবনীশক্তি লােপ পায় নাই ; পৃথিবীর সর্বত্র বিরাজিত থাকিয়া তাহা এখনও নারী- সমাজের কল্যাণ সাধন করিতেছে। যেখানে দেখিতে পাই, সংসারের সুখ, সম্পদ, ভােগ, বিলাস ত্যাগ করিয়া, মমতাময়ী সতী সর্বস্বান্ত, বিপন্ন পতির দুঃখের অংশভাগিনী হইবার জন্য প্রস্তুত রহিয়াছেন, সেখানে মনে হয় সীতাদেবী বিরাজমানা। যেখানে দেখিতে পাই, প্রলােভন ও নির্যাতনকে সমভাবে পদদলিত করিয়া, তেজস্বিনী সতী আপনার ধর্ম অক্ষুন্ন রাখিয়াছেন, সেখানে মনে হয় সীতাদেবী আবির্ভূত হইয়া অভয়বাণী উচ্চারণ করিতেছেন। আবার যেখানে দেখিতে পাই, পতির কৰ্ত্তব্যসাধনরূপ ব্রত উদ্যাপনের জন্য, আত্মত্যাগিনী সতী নিজেকে নীরবে বলি দিতেছেন, সেখানে মনে হয় সীতাদেবী মূর্তিমতী হইয়া অধিষ্ঠিতা আছেন।
১২০
সীতা
ভারতমহিলাগণ ! সীতাদেবী আপনাদিগের মধ্যে বিরাজিতা ;
জ্ঞাননেত্রে তাহাকে দর্শন করুন, জ্ঞানশ্রোত্রে তাঁহার বাণী শ্রবণ
করুন, এবং প্রজ্ঞানে তাঁহাকে ধ্যান করুন, কৃতার্থা হইবেন; আর
সেই সঙ্গে আমরাও কৃতার্থ হইব। *
সম্পূর্ণ।
on Kodarnath Sadharan Pathah.
Jhikiri Herrab
৷
শ্ৰীযুক্ত যােগীন্দ্রনাথ বসু প্রণীত অন্যান্য পুস্তক সম্বন্ধে বিজ্ঞাপন। পতিব্রতা। হিন্দুমহিলার পাঠের উপযুক্ত কি উপাখ্যানগ্রন্থ আছে, সহস্র সহস্র ব্যক্তিকে একথা জিজ্ঞাসা করিতে হয়। এতদিন পরে সে- প্রশ্নের উত্তর দিবার মত একখানি গ্রন্থ প্রকাশিত হইয়াছে। এই গ্রন্থে সতী, সাবিত্রী, শকুন্তলা প্রতি ভারতীয় পতিব্রতকুলের অগ্রগণ্যা কয়েকটী মহিলার চরিত্র উপন্যাসাকারে, অভিনব প্রণালী- ক্রমে, বিবৃত হইয়াছে। সেই সঙ্গে প্রাচীন ভারতের দেশ, কাল, অবস্থা এবং রাজসভা, পােবন, স্বয়ংবর-সভা প্রভৃতি এরূপ চিত্তা- কৰ্ষকরূপে বর্ণিত হইয়াছে যে, পাঠ করিলে সেই পুরাতন কথা গুলি নূতন বলিয়া মনে হইবে। বলিয়া মনে হইবে। এক সঙ্গে আনন্দ ও উপদেশ লাভের জন্য ইহার অপেক্ষা হিন্দু মহিলার উপযােগী কোন উপাখ্যান গ্রন্থ এ পর্যন্ত বাঙ্গালা ভাষায় প্রকাশিত হয় নাই, ইহা আম স্পকার সহিত বলিতে পারি। ইহার ভাষা যেমন মধুর, ভাব তেমনি পবিত্র। পাঠ করিতে করিতে নয়ন অশ্রুসিক্ত এবং শরীর রােমাঞ্চিত হইবে। ধর্মহীন, মাদক উপন্যাস পাঠের ফ হিন্দু সংসারে অনেকেই অনুভব করিতেছেন। এক্ষণে এই শ্রেণীর গ্রন্থপাঠ কৰ্তব্য কি না, সকলেই বিবেচনা করুন। এন্টিক কাগজে পরিষ্কার ছাপ ; মলাট ও ছবি অতি চিত্তাকর্ষক। বিবাহে, জন্মদিনে, উৎসবে, নববর্ষ এবং বিস্তারের [ ২ ] পরীক্ষান্তে স্নেহ-পাত্রীকে যদি কোন পুস্তক উপহার বা পুরস্কার দিতে হয়, তবে ইহাই সর্বোৎকৃষ্ট। শ্রীযুক্ত সার গুরুদাস বন্দ্যাপাধ্যায় মহাশয়ের অভিমত। আপনার পতিব্রতা পাঠ করিয়াছি এবং বলা বাহুল্য, পাঠ করিয়া অতিশয় প্রীত হইয়াছি। একে ত চিত্রিত চরিত্রগুলি পৌর- ণিক পতিব্রতা-চরিত্রের শীর্ষস্থানীয়, তাহাতে হবার আপনার পবিত্র সিদ্ধহস্তে চিত্রাঙ্কনের পারিপাট্য পূর্ণতা লাভ করিয়াছে ; সুতরাং এই গ্রন্থখানি যে অতি উপাদেয় হইবে, তাহা বিচিত্র নহে। ইহা বঙ্গমহিলাগণের বিশেষ পাঠোপযােগী হইয়াছে এবং পাঠ করিয়া তাহারা একদা জ্ঞান ও আনন্দ লাভ করিবেন। উৎসর্গপত্রে যে অপূর্ব সুন্দর কবিতা পাঠ করিলাম, তাহা সাহিত্য-ভাণ্ডারের একটি অমূল্য রত্ন।” প্রবাসী বলৈন ;-লেখকের ভাষা বিশুদ্ধ, সুললিত ও মুখপাঠ্য ; পুস্তকখানি পাঠ করিলে নারীগণ যে বিশেষভাবে উপকৃত হইবেন ও নির্মল আনন্দ লাভ করিবেন, তদ্বিষয়ে সন্দেহ নাই। নব্যভারত বলেন ;-পড়িবার সময় শরীর রােমাঞ্চিত হইয়াছে, বহুবার অশ্রুপাত হইয়াছে। এখানি গৃহ-পঞ্জিকার ন্যায় বঙ্গগৃহে প্রচারিত হউক; আর ঘরে ঘরে অমৃত ফল ফলুক। সঞ্জীবনী বলেন ;-যােগীন্দ্র বাবু মাইকেলের জীবনবৃত্তান্ত লিখিয়া প্রথিতনামা হইয়াছেন। আমাদের মনে হয়, লিপি-কৌশল- গুণে পতিব্র মাইকেলকেও হারাইয়া দিয়াছে। হৃদয়স্পর্শী ভাষায় ৩ রচিত হওয়াতে, পাঠক কোথাও সমবেদনার অশ্রুজল ফেলিবেন, কোথাও ভক্তিতে উচ্ছসিত হইবেন ; কোথাও দুদ্দান্তের অত্যা- চারে চণ্ডমূর্তি ধারণ করিবেন। পতিৱতা অতি সুন্দর, 'অতি মধুর হইয়াছে। আমরা সকলকে এই পুস্তক অধ্যয়ন করিতে অনুরােধ করিতেছি। হিতবাদী বলেন ;- হিন্দু রমণীর পক্ষে এরূপ সুখপাঠ্য, উপাদেয় ও শিক্ষা প্রদ গ্রন্থপাঠের সুযােগ অনেক দিন হয় নাই। এমন সৰ্বাঙ্গসুন্দর স্ত্রীপাঠ্য গ্রন্থ বঙ্গসাহিত্যে আর নাই বলিলে অত্যুক্তি হইবে না। The Bengalee says; --We can unhesitatingly recommend this book to our ladies and we believe every home will be the better and the happier for its perusal. মূল্য সাধারণ ১১, রাজ সংস্করণ ১০ টাকা। ডাকমাশুল • মাইকেল মধুসূদন দত্তের জীবনচরিত। বিস্তৃত সংস্করণ মূল্য ২• ডাক মাশুল ৩০। সংক্ষিপ্ত সুলভ সংস্করণ মূল্য ॥y• ডাক মাশুল। এ গ্রন্থের পরিচয় দানের জন্য অধিক কথা বলা নিষ্প্রয়ােজন। বঙ্গভাষা যে অল্পসংখ্যক গ্রন্থ লইয়া গেরবান্বিত, ইহা তাহাদিগের অন্য তম। বঙ্গের প্রতিষ্ঠাবান ব্যক্তিগণ ও পত্রিকা-সমূহ ইহার সম্বন্ধে কি বলিয়াছেন, দেখুন ;- AMRITA BAZAR PATRIKA.-It may compare lavourably with s some of the best biographical works of the west. INDIAN MIRROR:-Like lie subject of the memoir, Babu Jogindra Vath Bose has immortalised himself by being the writer of thic lir: biography, properly so called, in the Bengali Language. BENGALEE. It is a noble monument of the great poet. Every Bengalee, every lover of his country and his country's literature, should proviile himself with a copy of the Book.
[ ৫ STATESMAN.-In the performance of thie sellimposmel task, which we can well believe was aliroot labur ol love the author has exbicised a consciestiousness which would have done credit to: German Sivalil. সঞ্জীবন যিনি এই পুস্তক পাঠ না করিবেন, তিনি বঙ্গসাহিত্যের একটা উজ্জ্বল রত্নের পরিচয় পাইবেন না। তঁাহার বঙ্গসাহিত্যের জ্ঞান অসম্পূর্ণ থাকিয়া যাইবে। বঙ্গবাসী —এমন পুস্তক বাঙ্গালা ভাষায় কেন, বােধ কার, অন্য ভাষাতেও অতি অল্পই থাকিবার সম্ভাবনা। ব্যভারত।পৃথিবীর যে কোন ভাষায় এমন গ্রন্থ প্রকাশিত হলে দেশবাসীর গৌরব হয়। হিতবাদী - নাইকেলের সৌভাগ্য যে, তিনি যােগ বাবুর ন্যায় জীবন-চরিত লেখক পাইয়াছিলেন। মহারাজ! সার বীন্দ্রমােহন ঠাকুর।- আপনার এই গ্রন্থ অনেকাংশে অপুৰ্ব্ব ; ইতিপূর্বে বা ইহার পরে এরূপ জীবন- চরিত বঙ্গভাষায় প্রকাশিত হয় নাই। RAJNARAYAN BOSE.-llis distined to be as immortal as the principal productio:is of the priest himself. নবীনচন্দ্র সেন।-এমন সৰ্বাঙ্গসুন্দর জীবন-চরিত বাঙ্গায় কখনও বাহির হয় নাই। ইহাতে আপনি কি শক্তি, ক কে- | ৬ ] সহিষ্ণুতা, ‘ক উদ্যম দেখাইয়াছেন, তা যিনি এই অপূৰ্ব জীবন- চরিত পড়িবেন, তিনিই বুঝিতে পারিবেন। ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়।—চরিতবর্ণনের গ্রন্থরচনায় কোন ব্যক্তি, কোন ভাষায় আপনার অপেক্ষা কৃতিত্ব দেখাইতে পারিয়া- চেন বলিয়া আমার জানা নাই। কালীপ্রসন্ন ঘােষ।—আপনার পুস্তক, সৰ্ব্বাংশে বাঙ্গালা সাহিত্যের ক্ষেত্রে এক দিকে একখানি আদর্শ পুস্তক হইয়াছে। চন্দ্রনাথ বসু। এমন প্রাণপণে, এরূপ সরল ও বিশুদ্ধ মনে, এদেশে এ পর্যন্ত, কেহ কাহারও জীবন-চরিত লেখে নাই। শ্রীশিবনাথ শাস্ত্রা।-কবিবর মধুসূদন যেমন কবিতারাজ্যে নবভাব ও নবশক্তির অবতারণা করিয়াছিলেন, তুমিও, তেমনি, জীবন-চরিতের নতুন প্রণালী প্রবর্তিত কবিয়া, বঙ্গসাহিত্যে কীর্তি স্থাপন করিলে । যাহা অধিক মল্যর পুস্তক-ক্রয়ে অসমর্থ, তাদের জন্য সংক্ষিপ্ত সুলভ সংস্করণ প্রকাশিত হইয়াছে। আপনি যদি এতদিন এই গ্রন্থখানি পাঠ না করিয়া থাকেন, তবে আমাদিগের বিনীত অনুরােধ, ইহা এক বার পাঠ করুন। বাঙ্গালা সাহিত্যে কি এক পানি সুন্দর গ্রন্থ আছে, আপনি তার পরিচয় পাইবেন।
সরল কৃত্তিবাস-রামায়ণ। সরল কাশীরাম দাস-মহাভারত। প্রত্যেক হিন্দু মাতাপিতাই ইচ্ছা করেন যে, তাদের পুল- কন্যাগণ রামায়ণ মহাভারত পাঠ করেন; কিন্তু ইহাদিগের কোন কোন স্থল বর্তমান কালের রুচিসঙ্গত নহে। এইজন্য অসার ও অশ্লীল অংশ বর্জন করিয়া এবং উৎকৃষ্ট অংশ রক্ষা করিয়া বালক- বালিকাগণের ও সেই সঙ্গে মহিলাদিগের পাঠের জন্য এই দুই গ্রন্থ সম্পাদিত হইয়াছে। কৃত্তিবাসের ও কাশীরাম দাসের জন্মভূমি, বদরিকামস্থিত মন্দির, গঙ্গোত্রী, কৈলাশপৰ্বত, বাল্মীকির ও ভরদ্বাজের আশ্রম, সেতুবন্ধ রামেশ্বর, গিরিব্রজপুর, ইন্দ্রপ্রস্থ প্রভৃতি স্থানের দুর্লভ চিত্রের সঙ্গে বঙ্গদেশের প্রতিষ্ঠাবান্ চিত্রকরদিগের অঙ্কিত অনেকগুলি চিত্রের হাফটোন ব্লক ইহাতে প্রদত্ত হইয়াছে। স্থান নির্দেশের জন্য প্রাচীন ভারতের মানচিত্র এবং পরিশিষ্টে দুরূহ ও অপ্রচলিত শব্দের অর্থ সন্নিবিষ্ট হইয়াছে। ছাপা, বাঁধাই ও কাগজ অতি উৎকৃষ্ট। এ দেশে বালক, বালিকাদিগের উপ- যােগী কৃত্তিবাস, কাশীরামদাসের এরূপ সংস্করণ আর প্রকাশিত হয় নাই। উপহার ও পুরস্কার দানের জন্য এই দুই গ্রন্থ অতুলনীয়। রামায়ণের মূল্য ১০, মহাভারতের মূল্য ২৮০। SIR ASUTOSH MUKERJEE, M. A. D. L. VICE CHANCELLOR Calcutta University রামায়ণ সম্বন্ধে that any 18271667; -“I have read with great pleasure and diterest your edition of the Rimayan of Krittibash. The Selection is admirable, and no one who does. not know the original, would suppose thing has been lell 011. It is a book which ouglit lis irro read by every student of these Pso.inces. -1510175 176 farfant(57 I have read will greit interest and delight thor a'rilindrslition of the W.viabharat of kishiran dos,proptreed by my friend, Bilou Jogincira Niith Besse. Tia: Work has been came out with extrem: care and tauliless judgment. The book which is admirably got up and nicely. illinatrated should be placed in the hands of (Vert Bengali boy and girl who will, I trust love gallratrd with the ideals presented in our great naivnal epic. যােগন্দ্রবাবুর রচিত, অহল্যাবাই, কবিতা-প্রসঙ্গ প্রভৃতি সম পুই আমাণি:গর নিকট পাওা যায়। অধ্যক্ষ-সংস্কৃতপ্রেস ডিপজিটরী ৩০ নং কর্ণওয়ালিস দ্বীট কলিকাতা।
No text on this page.
* কবিভূষণ শ্ৰীযােগীন্দ্রনাথ বস প্রণীত। ১। তত্ত্বজ্ঞানেছুর জন্য কঠোপনিষৎ-কবিতানুবাদ ২। স্বদেশ-প্রেমিকের জন্য পৃথীরাজ মহাকাব্য শিবাজী মহাকাব্য ৪। শিক্ষার্থী শিশুর জন্য রামায়ণে' ছবি ও কথা ছবি ও কবিতা ১ম ভাগ ঐ ২য় ভাগ ৭। সাহিত্যরসজ্ঞের জন্য মাইকেলের জীবন-চরিত । ঐ ক্ষিপ্ত সংস্করণ । ব্রহ্মচারিণী বিধবার জন্য অহল্যাবাঈ এর জীবন-চরি? * ভক্তিপিপাসু সাধুর জন্য তুকারামের জীবন-চরিত » । হিন্দু মহিলার জয়, পতিব্রতা ১ম ভাগ ১২। { ১৪. -২য়:ভাগ ১।' সরল কৃত্তিবাস ১৪E সরল কাশীরাম দা, প্রত্যেক স্বপ্রেম গ্রন্থ হের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ কি, বিচার করুন। ইতি অধ্যক্ষ-সংস্কৃতপ্রেস ডিপজিটরী ৩ নং কর্ণওয়ালি সাহিত্য ভাণ্ডার ২০৩১ য়ালিস খ্রী ১: } }}}; Vroh ২.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.