Bally Sadharan Granthagar
Sitaram Ed. 1st
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
বঙ্কিমচন্দ্রের
সীতারাম
(নাটক)
নাট্যরূপ—
শীবীরেন্দ্র কক্ষ ভদ্র
বেঙ্গল পাবলিশার্স
১৪, বঙ্কিম চাটুজ্জে ফ্রীট, কলিকাতা
দু’ টাকা
প্রথম সংস্করণ
বৈশাখ, ১৩৫৩
বেঙ্গল পাবলিশার্সের পক্ষে প্রকাশক-ঐশচীন্দ্রনাথ মুখােপাধ্যায়, ১৪ বঙ্কিম চাটুজ্জে
ট, মানসী প্রেসের পক্ষে মুদ্রাকর-শ্রীশনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, ৭৩, মাণিকতলা দীট,
কলিকাতা, প্রচ্ছদপট পরিকল্পনাআশু বন্দ্যোপাধ্যায়, ব্লক ও প্রচ্ছদপট মুদ্রণ
ভারত ফোটোটাইপ ডিও, বাঁধাই-বেঙ্গল বাইণ্ডাস।
স্বগীয় রায় সাহেব
কালীকৃষ্ণ ভদ্র
পিতৃদেবের
শ্রচরণােদ্দেশে
—বীরেন
No text on this page.
নাট্যরূপকারের নিবেদন বঙ্কিমচন্দ্রের সীতারামেষ ভূমিকা লেখার ধৃষ্টতা প্রকাশ করছি না, কিন্তু তাঁর উপন্যাসকে নাট্টে রূপান্তরিত করার দায়িত্ব গ্রহণ করে যে দুঃসাহসিকতা দেখিয়েছি, তার জন্যে পাঠকবর্গকে কৈফিয়ং দেওয়ার প্রয়ােজন আছে বলে মনে করি। বছর দুয়েক আগে নটসূৰ্য্য অহীন্দ্র চৌধুরী মশায়ের অতিরিক্ত তাগিদে ও আগ্রহে সীতারামকে নাট্যরূপ দেবার সঙ্কল্প করি, কিন্তু আমার বচন যত দ্রুত চলে, লেখন ততই পিছিয়ে পড়ে এবং সেই কারণে আমি সাহিত্যিক হবার জোর দাবী আজও করতে পারিনা বা ভবিষ্যতেও হয়তাে পারবাে না। আমার এই অলসমন্থর মনের খবরটি অন্তরঙ্গতা সুত্রে অহীন্দ্রবাবুর অজানা ছিলনা তাই তার দিক থেকে অবিরত তাগিদের অসম্ভব কোন দিনই ঘটেনি এবং একমাত্র সেই কারণেই সীতারামের নাট্যরূপদান আমার দ্বারা সম্ভবপর হয়েছিল। প্রথমতঃ বইখানি আগাগােড়া ঘূর্ণায়মান রঙ্গমঞ্চের জন্য রচিত হয়, তারপর বর্তমানে আবার প্রয়ােগশিল্পীকে স্থির-রঙ্গমঞ্চের জন্য তার কিছু কিছু অংশ পরিবর্তন ও পরিবর্জন করতে বাধ্য হতে হয়। অহীন্দ্রবাবু ও রঙমহলের বর্তমান স্বত্বাধিকারী শরৎ চট্টোপাধ্যায় সীতারামের নাট্যরূপ দেখে এত খুণী হন যে তারা এই বইটি খুব ভালভাবে প্রযােজনা করবার জন্য মহলাও দৃশ্যপটে কিছু অর্থব্যয় করতেও কাতর হননি এবং সত্যই যদি এ নাটকের প্রযােজনা তারা করতেন তাহলে তঁাদের এদিক দিয়ে অকৃপণতারই পরিচয় পাওয়া যেত। তারপর কি জানি কি অজ্ঞাত কারণে ‘রঙমহল সহসা সীতারাম নাটক অভিনয়ের সঙ্কল্প পরিত্যাগ করেন এবং ভবিষ্যতেও যে কোনদিন করবেন [ ৩ ] ৩ তার আভাস পর্যন্ত দেন নি, আমিও তা জানবার জন্য কোনদিন ব্যগ্রতা প্রকাশ করিনি। ‘সীতারাম’ নাট্যরূপকারের শেলফের মধ্যে আবদ্ধ হ’ল এবং এ-যে কোনদিন অভিনীত হবে তা আমার মনে হয়নি। সহসা আমার অগ্রজ- প্রতিম শ্রদ্ধেয় শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত একরকম জোর ক'রেই সীতারাম নাটকটি মিনার্ভায় প্রযােজনার জন্য টেনে নিয়ে যান এবং সীতারামকে সর্বতােভাবে সাফল্যমণ্ডিত করবার জন্য তিনি অ-প্রাণ চেষ্টা করেন। সীতারাম খুব জমেছে ব'লে সকলের ধারণা কিন্তু তার মূলে আছে এই সুবিখ্যাত সাংবাদিক ও নাট্যকারের স্বার্থহীন অকুণ্ঠ্য-প্রচেষ্টা। এ ছাড়া নাটকটিকে সুন্দর করবার জন্য মহম্মদজান, সন্তোষ সিংহ জহর গাঙ্গুলী, রবিরায়, কমলমিত্র, সরযুবালা ও প্রত্যেকশিল্পী যে আন্তরিক প্রচেষ্টা করেছেন তার জন্যে আমি কৃতজ্ঞ। আর কৃতজ্ঞতা জানাবার আছে দেলওয়ার হােসেন সাহেবের কাছে। তিনি দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হ'য়ে বহু বাধাবিধু তুচ্ছ করে যদি না এই বইটির অভিনয়ের জন্যে আমাদের সর্বপ্রকারে সাহায্য করতেন তাহলে সীতারাম পাদপ্রদীপের সম্মুখে উপস্থিত হত না। বঙ্কিমচন্দ্রের মূল উপন্যাসের প্রথম সংস্করণ থেকে সীতারামের নাট্যরূপ দেওয়া হয়েছে তা হয়তো অনেকে জানেন না, তাই বঙ্কিমবাবুর রচনাকে আমার রচনা বলে যেন কেউ ভুল না করেন এই আমার অনুরােধ। মুসলমানকে বঙ্কিমচ যে শ্রদ্ধা করতেন তার যথেষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় এই সংস্করণে। পরিশেষে পাঠকবর্গের কাছে আমার নিবেদন যে অত বড় বিরাট উপন্যাসকে সংক্ষেপে নাট্য-রূপায়িত করার জন্য যদি কোন ত্রুটি হয়ে থাকে তা যেন সকলে মানা করেন। [ • ]
মিনার্ভা থিয়েটার
সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের
সীতারাম
প্রথম অভিনয় রজনী ২৩শে ফেব্রুয়ারী ১৯৪৬, সন্ধ্যা ৭টা, শনিবার
-
নাট্যরূপবীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্র
প্রয়ােগশিল্পী-শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত
নাট্য-নিয়ন্ত্রণ-সন্তোষ সিংহ
বঙ্গ-শিল্পী-মহম্মদ জান
সুরশিল্পী-রতন দাস
আলােকশিল্পী-ওয়াহিয়া রহমান (কঃ)
প্রধান রূপসজ্জাকর-মণি মিত্র
সঙ্গীত ব্যঞ্জনা—বিজয়কৃষ্ণ দে
নাটকটি যাদের সহযােগিতায় সাফল্য মণ্ডিত হয়েছে
শশীভূষণ মুখােপাধ্যায় ও দুলাল দাস
সঙ্গীতে
শিশির চক্রবর্তী (পিয়ানাে ), বিজন কুমার ঘােষ (ক্লারিনেট ),
বলরাম পাঠক (ট্রামপে ) ধীরেন বসু ( ইউফোনিয়াম ), দেবেন্দ্রনাথ
[ ৩ ]
ভট্টাচাৰ্য (কেল ড্রাম), দীনুবাবু (তবলা), জ্ঞান চট্টোপাধ্যায় (বেহালা)
রতন দাস ( হারমােনিয়াম ), বিজয় দে (বেলা)
রূপশিল্পে
বাদল গাঙ্গুলী, কালী চট্টোপাধ্যায়, তুলসী দাস, গুইরাম দাস, গােবিন্দ দাস
রশিয়ে
বৈদ্যনাথ দাস (প্রধান) সুরেন দাস, নিতাই অধিকারী, পঞ্চু বৈরাগী,
সুধীর রায়, প্রাণবল্লভ, নিরাপদ দাস, তারাপদ দাস, প্রহলাদ প্রামাণিক
নাসিরুদ্দীন, নারায়ণ গােৰামী, বটকৃষ্ণ পাল
রঙ্গশয্যায়
বিজয় চিত্রকর
আলােক নিয়ণে
হা, আলি, চণ্ডীচরণ দাস, পঞ্চানন চট্টোপাধ্যায়, রাধানাথ বসাক,
কাশীনাথ পাল, নিমাই রায়
স্ব-বিক্ষেপনে
সন্তোষ বসাক
[ । ]
অভিনেতৃবর্গ পুরুষ ভূষণার জমিদার পরে রাজা রাজা সীতারাম রায় কমল মিত্র জহর গাঙ্গুলী গঙ্গারাম ঐ সম্বন্ধী ও নগর রক্ষক • • • চচুড় সুশীল রায় (পরে) রবি রায় দেবী চক্রবর্তী ধীরেন চট্টোপাধ্যায় মুন্ময় চাদ শা কাজী শাহ সাহেব ঐ গুরু ও মন্ত্রী ঐ সেনাপতি ফকির ও মন্ত্রী ভূষণার বিচারক ফকির ফৌজদার গঙ্গারামের সহকারী রাজার প্রধান সেনানী ঘােষক • • কুঞ্জ সেন নরেন চক্রবর্তী সমর মিত্র যতীন গােস্বামী পঞ্চানন চট্টোপাধ্যায় তােরাব খা বন্দে আলি রাজপূতরক্ষী নকীব ০ ০ ০ মিলন দত্ত কবিরাজ রাজ চিকিৎসক অরুণ চট্টোপাধ্যায় কমলেন্দু সরকার রাজভাণ্ডারী ৫০ ০ ০ ০ শিবচন্দ্র ভট্টাচাৰ্য্য মিহির বিশ্বাস শিশির চক্রবর্তী ০ ০ জীবন মহম্মদপুরের রক্ষী বৈরাগী ফৌজদার সেনানী রামাদ সামাদ রাধারমণ পাল সন্তোষ সিংহ জনৈক প্রাচীন গৃহস্থ জনৈক নবীন গৃহস্থ জীবেন বন্ধু [ ৩ ] बौ সরঘুবালা রেখা চাটার্জী নন্দা মা ০ ০ ০ অলি রায় মুরলা যমুনা शोधा বামা উমা সীতারামের প্রথমা স্ত্রী ঐ দ্বিতীয়া ঐ তৃতীয়া রমার প্রধান পরিচারিকা ঐ দ্বিতীয়া দাসী নন্দার পরিচারিকা ঐ দ্বিতীয়া ঐ তৃতীয় ইলা প্রবাল রাধারাণী কমলাবালা লাঠিয়ালগণ, সৈনিকগণ, সভাসদবর্গ, পারিষদবর্গ, নর্তকীগণ প্রভৃতি বিভিন্নাংশে শচীন মুখখাপাধ্যায়, অমূল্য মিত্র, গণেশ দত্ত, সমর দীর্ঘাঙ্গী, গিরিণ ঘােষ, রামকৃষ্ণ দাস, শচীন ভট্টাচাৰ্য, প্রফুল্ল বসু, যামিনী বিশ্বাস, অনিল ইন্দু, নীহার ঘােষ, হরিপদ দাস, খগেন শৰ্মা সিদ্ধেশ্বর চট্টোপাধ্যায়, মমতাজ উদ্দীন, প্রকাশ ঘােষ, ভূপেন ঘােষ, অমরেন্দ্র কর, শৈলেন বসু, তারক পাল। বীণা, রাধা (বড় ও ছােট ), মীরা (বড় ও ছােট ), দুলি, মেনকা, নীলা, কমলা, প্রফুল্ল। বাহকবৃন্দ ক্ষুদিরাম বিশ্বাস, নারায়ণ দাস, মাহল কাই। - সত্বাধিকারীবৃন্দ দেলওয়ার হোসেন নরেশ গুপ্ত চণ্ডীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় [: 19
সীতারাম
প্রথম অঙ্ক
প্রথম দৃশ্য
[ ভূষণা গ্রামের প্রান্তে চন্দ্রচূড় ঠাকুরের আখড়ার সম্মুখস্থ পথ। কাল সন্ধ্যা—একদল
যুবক লাঠি খেলিতেছিল ও কয়েকজন তাহাদের উৎসাহ দিতেছিল। একটি
যুবক গান গাহিতে গাহিতে প্রবেশ করিল ]
গীত
ওঠ ওঠ বাংলার সিংহের শিশুরা
কর আজি নব অভিযান।
সূর্যের বহ্নি অন্তরে জালিয়া
জীবনের কর জয়গান !
মৃত্যুরে কিবা ভয়—তুচ্ছ
আনাে বুকে নব আশা—উচ্চ ।
জড়তার শৃঙ্খলে
টুটে ফেল অবহেলে
জাগাে অমৃতের সন্তান।
গানের শেষে চচুড় ঠাকুর প্রবেশ করিলেন ]
ভাই সব, তােমাদের এই নবীন উৎসাহ দেখে, আগ্রহ দেখে
আজ আমার মন ভরে উঠেছে। আমাদের ভূষণা গ্রাম শঙ্গে,
চ।
প্রথম অঙ্ক ] সীতারাম [ প্রথম দৃ সম্পদে অতুলনীয় হয়ে উঠেছে আমাদের নেতা সীতারাম রায়ের কল্যাণে। তার পাশে তো দাড়িয়ে থেকো—তাহলেই একদিন শুধু ভূষণা নয় সারা বাংলার বুকে উঠবে আনন্দের ঢেউ—তাঁর নাম নিয়ে তােমরা কর্মক্ষেত্রে ঝাপিয়ে পড়, বল- জয় সীতারাম রায়ের জয়। সকলে। জয় সীতারাম রায়ের জয় | বলিতে বলিতে স্থান। বিপরীত দিক দিয়া সীতারাম মৃন্ময়ের সহিত প্রবেশ করিলেন ] সীতারাম। না, না জয় নয়, জয় নয় আমার জয়গানের সময় এখনও আসেনি। সারা বাংলা আমি ঘুরে দেখে এলুম মৃন্ময়, ঘরে ঘরে উঠেছে কান্নার রােল-শুধু ভূষণা গ্রামে পৌছে জয়ধ্বনি শুনলে মনে হয় যেন সকলে আমাকে পরিহাস করছে। মৃন্ময়। আপনি একি কথা বলছেন রায়জী, আপনি দেশের রাজা, আপনার সুশাসনে এই ভূষণা কত বড় হয়ে উঠেছে। বাদশাহ পর্যন্ত আপনাকে শ্রদ্ধা করেন। আপনার জয়ধ্বনি করলে আমাদের যে ধর্মের কাছে অপরাধী হতে হবে। সীতা। মৃন্ময়, প্রকৃত রাজা আমি হতে পারলুম কৈ ? ক্ষুদ্র এক গ্রামের ভুইয়া, তােমরা সকলে তাকে নকল রাজা সাজিয়ে তুলেছ। সারা বাংলা সইছে দুঃখের নির্যাতন আর আমি দেশের এক ক্ষুদ্র সীমান্তে বসে রাজার খ্যাতি উপভােগ করছি -এর চেয়ে লজ্জার আর কি আছে মৃন্ময় ? মৃয়। কিন্তু সারা বাংলার দুঃখ মােচনের ভার ত’ আপনি নেননি রায়জী ! সীতা। নিইনি সত্য, কিন্তু সেই ভার গ্রহণ করবার জন্য বিধাতা যেন ২ প্রথম অঙ্ক ] সীতারাম [ প্রথম দৃশ্য আমায় আদেশ করছেন—এই কথাই যেন আমার বারবার মনে হয়। [ পিছন হইতে চন্দ্রচূড়ের পুনঃ প্রবেশ চন্দ্রচূড়। কিন্তু সে আদেশ পালন করতে গেলে কি দুঃসহ দুঃখকে বরণ করে নিতে হবে সে কথা কি ভেবেছ সীতারাম ? সীতা। • ভেবেছি বৈ কি! সেই দুঃখকে বরণ করবার জন্য আমি মৃন্ময়। সীতা। চন্দ্র। সীতা। চত্র। আপনি যদি প্রস্তুত থাকেন তাহলে আমরাও প্রস্তুত রায়জী। কিন্তু তােমরা মাত্র ক’জন মৃন্ময়? আমি যে চাই হাজার হাজার কর্মী--সাহসে, বীর্যে যারা হবে অদ্বিতীয়-ভয়কে যারা ভয় বলে মানবে না, মৃত্যুকে যারা উপেক্ষা করবে হাসিমুখে। তাও তুমি পাবে। কোথায় গুরুদেব? এইখানেই সীতারাম—তােমার এই ভূষণায় ! আপনি এতদিন বাংলা পর্যটনে বেরিয়েছিলেন তাই সমস্ত সংবাদ হয়তাে পান নি। গুরুদেব দেশের যুবকদের এক নূতন জীবনের মন্ত্রে দীক্ষিত করে তুলেছেন। গুরুদেব, শিষ্যের সঙ্কল্প অনুমান করে আপনি তাহলে কাজ আরম্ভ করে দিয়েছেন ? পরগণার বাইরে থেকে আমি সত্যই এ সংবাদ পাইনি। মৃন্ময় , আমার সােনার স্বপ্ন বুঝি সফল হতে চললাে! দূর ভবিষ্যতের বুকে আমি যেন দেখতে পাচ্ছি এক বিশাল রাজ্য-নদীর কলতানে, পাখীর গানে, : মৃন্ময়। সীতা।
প্রথম অঙ্ক)
সীতারাম
[ প্রথম দৃশ্য
দেশের আকাশ বাতাস মুখরিত হয়ে উঠেছে—সমগ্রজাতি
বুকে পেয়েছে বল, মুখে পেয়েছ ভাষা, আর আমি তাদের
সেবায় যেন আত্মহারা হয়ে রয়েছি, আমার সীতারাম নাম
সার্থক হয়ে উঠেছে।
[ সহসা নেপথ্যে কোলাহল—এই মৎ যাও’, ‘খবরদার’ প্রভৃতি শব্দ উঠিল একটি
অবগুণ্ঠিতা নারী ছুটিয়া আসিয়া সীতারামের পায়ের কাছে পড়িয়া বলিয়া
উঠিল—আমায় বাচান। স্ত্রীলােকটির পিছনে পিছনে দুইকন রক্ষী ও জীবন
ভাণ্ডারী ছুটিয়া আসিয়াছিল ]
সীতা।
[ বিমিত ভাবে পদতলে পতিতা নারীর দিকে চাহিয়া বলিয়া উঠিলেন,
কে, কে তুমি?
জীবন। হজুর, এ কিছুতেই শুনলে না, আমরা নিষেধ করা সত্ত্বেও
দেখুন জোর করে এখানে ছুটে এল। স্ত্রীলােক বলে আমরা
ওর গায়ে হাত দিইনি, কিন্তু আপনার হুকুম পেলে-
সীতা। জীবন। চুপ কর। কোন ভয় নেই। ওঠ কি তােমার নিবেদন
বল?
[ জীবন ভাণ্ডারীর প্রস্থান ]
[ কুণ্ঠার সহিত উঠিয়া ] আমি গােপনে বলতে চাই। নিদারুণ
বিপদে পড়ে আপনার আশ্রয়ে এসেছি।
সীত। গুরুদেব।
চ। আমি জানি উনি কে। এস মৃগয়।
[ চন্দ্রচূড় ও মৃন্ময় প্রস্থান করিলেন।
সীতা। এইবার বল, তুমি কে?
[ এ অবগুণ্ঠন মােন করিলেন ।
আমি ।
প্রথম অঙ্ক ] সীতারাম [ প্রথম দৃশ্য সীতা। [ বিস্মিত ভাবে ] তুমি, তুমি ? শ্রীর এমন রূপ ? । আমি তােমার ব্যঙ্গে যােগা নই। সীতা। ব্যঙ্গ আমি করিনি । আমি আজ বড় দুঃখী। তুমি বিশ্বাস কর, কোন পরনারী তােমার সঙ্গে ছলনা করবার দুঃসাহস নিয়ে তােমার সামনে এসে দাড়ায়নি। ভাল করে আমার দিকে চেয়ে দ্যাখ, হয়তো আমাকে মনে পড়বে, হয়তাে বুঝতে পারবে আমিই সেই অভাগী শ্রী সীতা। হাতুমি সত্যই শ্ৰী । দাসীকে তাহ'লে মনে পড়েছে ? সীতা। কিন্তু শ্ৰী, এতদিন পরে তুমি আমার কাছে ফিরে এলে কেন? আর এলেই যদি তবে বুক ভরা এত ব্যথা, চোখভরা এমন জল নিয়ে কেন এলে ঐ ? শােন, আমার কাছে এস- আমি তাে তােমায় স্পর্শ করতে পারবাে না। আমার অশৌচ। সীতা। অশৌচ ! মা মারা গিয়েছেন। ও! তুমি সেই বিপদে পড়েই আমার সাহায্য নিতে এসেছ? দাদাকে আমি আজ হারাতে বসেছি। সীতা। কেন গঙ্গারামেরও কি কোন অসুখ হয়েছে ? , কাজী সাহেব তাকে জীয়ন্তে কবর দিতে বলেছেন। সীতা। কি সর্বনাশ! তার অপরাধ? সেদিন রাত্রে মায়ের অসুখের বাড়াবাড়ি হওয়ায় দাদা কবিরাজ । সীতা।
প্রথম অঞ্চ। সীতারাম [ প্রথম দৃশ্য সীতা। সীতা। সীতা। বাড়ীতে যাচ্ছিলেন, পথে এক ফকিরের সঙ্গে তার ঝগড়া হয়, ফকির বলেন যে দাদা নাকি তাকে অপমান করবার জন্যে পা মাড়িয়ে চলে গিয়েছেন। গঙ্গারাম কি বলে ? দাদা বলেন তিনি তা করেন নি। ফকির সাহেবকে পথের ওপর রাস্তা জুড়ে শুয়ে থাকতে দেখে তিনি হাত ঘােড় ক'রে প্রথমে তাকে উঠতে বলেন কিন্তু তিনি সেকথা কিছুতেই না শােনাতে বাধ্য হয়ে দাদা তাকে ডিঙিয়ে চলে যান। কিন্তু তার কথা কাজী সাহেব বিশ্বাস করেন নি। তাই তাে, তাহলে উপায় ! উপায় তুমি। সত্যই তুমি তাই মনে কর? মনে করি বলেই তাে এত বছর পরে লাজ লজ্জা সমস্ত বিসর্জন দিয়ে তোমার কাছে ছুটে এসেছি। [ চিন্তান্বিত ভাবে ] তাই তাে ! মা গিয়েছেন, আজ যদি আমার একমাত্র ভরসা দাদা চলে যান তাহলে আমি কি নিয়ে বাঁচবাে ? [ শ্রী কঁদিতে লাগিল ] তােমার ভাইকে হয়তাে আমি বাঁচাতে পারি কিন্তু তার ফলে আমার কি হবে জান ? দীন দুঃখীকে বাঁচালে কখনও তােমার অমঙ্গল হবে না। তােমার এই সরল বিশ্বাসকে আমি ভেঙ্গে দিতে চাইনা। কিন্তু যদি জানতে••••• সীত। সীতা সীতা।
প্রথম অঙ্ক ] সীতারাম [ প্রথম দৃ তুমি যদি আমাদের দিকে না চাও, তাহলে আর কে চাইবে ? -তুমি দেশের নেতা। সীতা। কি বল্লে শ্রী ? তুমি দেশের নেতা। সীতা। সত্য। সত্যই আমি দেশের নেতা-তুমি সত্যকথাই বলেছ | আমি দেশের নেতা। দায়িত্ব আমার অনেক বেশী । আমি তােমায় কথা দিচ্ছি - গঙ্গারামকে উদ্ধারের জন্য আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করবাে। একমাত্র তুমিই তাকে বাঁচাতে পার। সীত। পারবাে কিনা জানি না, তবে প্রাণপণ চেষ্টা করবাে। আমি জানি, আমি জানি। কি জান শ্ৰী , আমি এখন যাই। সীতা। তুমি যাবে ? [ বিহ্বল ভাবে এর দিকে চাহিলেন ] [ মাথা নত করিয়া ] হ্যা। [ সীতারাম আত্মসংবরণ করিয়া ] বেশ, এস! [ পুনরায় অবগুণ্ঠনে মুখ ঢাকিয়া এর প্রস্থান) সীতা। এ চলে গেল। যেমন হঠাৎ এসেছিল, তেমনি হঠাৎ চলে গেল। থাকবার যার অধিকার নেই, কোন ভরসায় সে থাকবে। যাক, সে চলেই যাক, মুছে যাক তার চিন্তা। গঙ্গারামকে বাঁচাতে হবে:••ফকীরের কােষ থেকে, কাজীর দণ্ড থেকে। [ নেপথ্যের দিকে চাহিয়া ডাকিলেন । সীতা। ? সীতা। মৃন্ময়! ৭ প্রথম অঙ্ক] সীতারাম [ প্রথম দৃশ্য ( মৃন্ময়ের প্রবেশ - সীতা। মৃন্ময়। আমায় ডাকছেন রায়জী ? [ ব্যভাবে ] হা শােন, একটা গুরুতর কাজ আছে। আমার পরিবারবর্গকে নিয়ে অবিলম্বে তােমাকে নদীর ওপারে শ্যামপুরে যেতে হবে। আজ রাত্রেই তােমরা যাত্রা কর । মৃন্ময়। আজ রাত্রেই ? সীতা। হা আজ রাত্রেই, আমি এক বিষম বিপদের আশঙ্কা কচ্ছি। মৃন্ময়। [ সবিস্ময়ে ) বিপদ! হ্যা, সমস্ত কথা বলবার সময় এখন আমার নেই, যথা সময়ে তুমি সব জানতে পারবে। নন্দা, রমা আর খােকাকে নিয়ে তুমি অবিলম্বে শ্যামপুরে যাও ! সেইখানে আমার সঙ্গে দেখা হবে। সীতা। [ মৃন্ময় চলিয়া যাইতেই চন্দ্রচূড়ের প্রবেশ ] চন্দ্র। সীতা। মৃন্ময়কে কোথায় পাঠালে সীতারাম ? শ্যামপুরে আমার পরিবারবর্গকে নিয়ে যেতে বললাম। ভূষণার মায়া হয়তাে আমাদের চিরকালের জন্ত পরিত্যাগ করতে হবে। গঙ্গারামের মহাবিপদ ••শুনেছেন গুরুদেব ? এই ত’ সব শুনে এলাম। আমি তাকে উদ্ধার করতে চাই। সে বড় কঠিন কাজ সীতারাম। তার এই গুরুদণ্ড রহিত করতেই হবে গুরুদেব। চ। সীতা। । সীতা। ৮ প্রথম অঙ্ক ] সীতারাম [ প্রথম দৃ চ। সীতা। চন্দ্র। সীতা। চন্দ্র। সীতা। চ। সীতা। আবেদন নিবেদনে কিছু হবেনা জেনাে । যে করেই হক গঙ্গারামকে বাচাতেই হবে। এ কি সেই জন্যই এসেছিলেন ? হ্যা, আমি তাকে কথা দিয়েছি। কি করে কথা রাখবে ? কাজী সাহেবের পায়ে ধরে গঙ্গারামের প্রাণভিক্ষা চেয়ে নেব। ভিক্ষা যদি না পাও? আমি ভূষণার সীতারাম রায় পায়ে ধরে চাইলেও ভিক্ষা পাবনা ? যদি না পাও? বলুন গুরুদেব, আপনিই বলুন যদি ভিক্ষাও না পাই? তাহলে কে যে কথা দিয়ে তা রাখতে পারবে না। তা আমাকে রাখতেই হবে। তার জন্য যদি দরকার হয়, পারবে••• গুরুদেব! আমি পারবাে•••আপনার অভিপ্রায় বলুন। পারবে অসি হাতে দাবী জানাতে ? পিরবাে গুরুদেব। সে দাবীও যদি প্রত্যাখ্যাত হয় ? কাজীর কবল থেকে গঙ্গারামকে আমি ছিনিয়ে আনবে সীতা। চ। সীতা। চন্দ্র। সীতা। চ। সীতা। চন্দ্র। সীতা। গুরুদেব। চন্দ্র। কাজীর সহায় ফৌজদার, ফৌজদারের হাতে বাদশাহের পাঙ্গা; যে বাদশাহের আছে অপরিমেয় অর্থবল, অগণ্য সৈন্যবল। ভারতের পূর্বপ্রান্তে দাঁড়িয়ে দুর্দম শক্তি নিয়ে পারবে তুমি
প্রথম অঙ্ক ]
সীতারাম
[ প্রথম দৃ
সীতা।
চ।
সীতা।
চন্দ্র।
কাবুল থেকে বাংলা পৰ্য্যন্ত বিস্তৃত বিশাল সেই সাম্রাজ্যের
বিপুল শক্তির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘােষণা করতে?
আপনার আশীর্বাদে আর লক্ষ্মীনারায়ণের অনুগ্রহে সীতারাম
রায়ের সে সাহস আছে গুরুদেব।
সাহস আছে স্বীকার করি, কিন্তু শক্তি ?
তারও পরিচয় আমি দোব।
পরিচয় আমি চাই না সীতারাম। আমি শুধু বলতে চাই
বিবােধ যদি করতেই হয়, সম্পূর্ণ যােগ্যতা নিয়েই যেন আমরা
দাঁড়াতে পারি। মনে রেখো সীতারাম এ শুধু তােমার শ্রীর
অনুবােধ নয়, শুধু গঙ্গারামের জীবন ভিক্ষাও নয়, এ হচ্ছে
হৃতসৰ্বশ্ব মাতৃশ্রীর অন্যায়ের কবল থেকে তাকে ফিরিয়ে
আনবার আকুল আহ্বান। গঙ্গারাম উপলক্ষ মাত্র।
আমি তা জানি গুরুদেব-আপনার আশীর্বাদে আমি সে
অন্যায়ের প্রতিরােধ করতে সর্বশক্তি নিয়ােগ করবে।
সীতা।
[ সীতারামের প্রস্থান। বিপরীত দিকে চচুড় চলিয়া গেলেন। যন্ত্রসঙ্গীত
সহযােগে দৃশ্য পরিবর্তিত হইয়া গেল ]
দ্বিতীয় দৃশ্য
কাজী সাহেবের কক্ষ
[ কক্ষের ভিতরে কাজী সাহেব একটি আসনে উপবিষ্ট, তাহার পার্শ্বে শাহ সাহেব
আর একটি আসনে বসিয়া আছেন—কিছু দুরে শৃঙ্খলিত গঙ্গারাম
রক্ষী পরিবৃত হইয়া দাঁড়াইয়া আছে ]
কাজী।
এখনও সত্য কথা বল গঙ্গারাম !
[ বিরক্তভাবে ) আমার যা বলবার তা সবই বলেছি-
আর কিছু আমার বলবার নেই।
কাজী।
তিল তিল করে যখন জমীর অন্দরে খাস আটকে ম’রবে
তখন বুঝতে পারবে যে মিথ্যাকথা বলে আমাদের কাছে
বাহাদুরী নিয়ে গেলেও আল্লার দরবারে গিয়ে রেহাই পাবে না।
দোজখে পচতে হবে ।
গঙ্গা। আল্লা তার জন্যে বােধ হয় আপনাকেও তলৰ ক'রে পাঠাতে
পারেন, আর দোজখের খবরদারি করবার জন্যে শাহ সাহেব ত’
রয়েছেনই।
শাহ, সাহেব। শুনছেন কাজী সাহেব, কমবখতের কথাগুলাে শুনছেন?
এইবার বুঝে দেখুন যে, আমি কথাগুলাে সত্যি বলেছিলুম
কি না? ওর হাড়ে হাড়ে বদমায়েসি !
কাজী। মরবার সময়ও ওর তেজ কমেনি দেখছি। যাক আর বিলম্ব
করে কোনও ফল নেই, যাও ওকে মাঠে নিয়ে যাও।
[রক্ষী গঙ্গারামকে লইয়া যাইবার উপক্রম করিতেই দ্রুত সীতারাম
কক্ষে প্রবেশ করিলেন ]
সীতা।
দাঁড়াও! সেলাম কাজী সাহেব। বন্দীর সম্বন্ধে হুজুরের
দরবারে আমার কিছু আজি আছে।
প্রথম অঙ্ক ] সীতারাম [ দ্বিতীয় দৃশ্য কাজী। শাহ। কাজী। ? সীতা। কাজী। এই পাড়া। [ রক্ষীরা দাড়াইল ] দেখুন কাজী সাহেব, ওঁর যা আৰ্জুি আছে তা উনি পেশ করুন, ততক্ষণ আমরা একে নিয়ে মাঠে যাই, কারণ একবার যা হুকুম হ'য়ে গেছে তা তাে আর রদ হবে না ? -তবু রায়জীর যা বক্তব্য সেটা শােনা আবশ্যক বৈ কি। তারপর—রায়জী, এই বন্দীর সম্বন্ধে আপনার কি বক্তব্য আছে ব’লছিলেন আজ্ঞে হ্যা, এই গঙ্গারামের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে আমি আপনার দরবারে ছুটে এসেছি। আপনি জানেন না রায়জী এই বদবখত কি গুরুতর অপরাধ করেছে। তা জানলে আপনিও হয়তাে এই বে-তমিজের জন্যে দরবার করতে আসতেন না। আপনার কথা খুবই সত্য -তবু সে আমার স্বজাতি। তার কসুর মাফ, করবার জন্যেই আমি হুজুরের কাছে। এসেছি। খোদা মালেক! আমার দ্বারা এ বিষয়ের কোন কিছু করা কোনমতেই সম্ভবপর নয় রায়জী। দশহাজার আস্ফী জরিমানা দেবে। আপনি অনুগ্রহ করে জান বখশিশ ফরমায়েশ করুন। T টাকার কথা শুনিয়া কাজী একটু চিন্তান্বিত হইলেন | দশ হাজার আফী ! [ ফকিরের দিকে সম্মতি লইবার অভিপ্রায়ে চাহিতেই ফকির তাঁহার দিকে চাহিয়া ঘাড় নাড়িল, তথনই কাজী লােভ সংবরণ করিয়া বলিয়া উঠিলেন ] না, না, সে কিছুতেই হবে না। রায়জী, যে সীতা। কাজী। সীত। কাজী।
সীতা। প্রথম অঙ্ক ] সীতারাম [ দ্বিতীয় দৃশ্য লােক সাধু ফকিরর অসম্মান করে সেই কাফেরের মৃত্যুদণ্ড ছাড়া আর কোন দণ্ড নেই। [ উৎকণ্ঠিত ভাবে। কাফেরের প্রাণ নিতেই হবে। আমিও তাে কাফের কাজী সাহেব, আমার প্রাণ নিলে এর প্রায়শ্চিত্ত । হয় না? আমি কবরে যেতে প্রস্তুত, আমার প্রাণের বিনিময়ে ওর প্রাণভিক্ষা দিন! ( হাতযোড় করিলেন ] কাজী। আমি তাে কিছুই ভেবে উঠতে পাচ্ছি না রায়জী ! সত্য এ আপনার কে যে এই তুচ্ছ একটা লােকের জন্য আপনি প্রাণদান করতেও কুণ্ঠিত নন ? সীতা। ও আমার ভাইয়ের চেয়ে, পুত্রের চেয়েও আত্মীয় কাজী সাহেব, কেন না আমার শরণাগত। [ কাজী সাহেব শা সাহেবকে একটু দুরে ডাকিয়া চুপি চুপি বলিলেন ] কাজী। ফকির সাহেব, রায়জী যখন দশ হাজার আস্ফী দিতে চাচ্ছেন তখন সরকারী বিলে টাকাটা জমা করে নিয়ে ওকে ছেড়ে দিই, কি বলেন? শাহ। আমার ত’ মনে হয়, দু’টোকেই একসঙ্গে পুতে ফেলা ভাল ! কাজী। আরে তােবা, তােবা! সীতারাম রায় অত্যন্ত গণ্যমান্য সচ্চরিত্র লােক, এ আপনি কি বলছেন। গলা। রায়জীর আবেদনের ফল কি হবে জানি না, তবে সীতারাম রায়ের প্রাণ নিয়ে আমায় প্রাণদান করলে আমি সে ভিক্ষা নেব না- তার আগে এই হাতকড়ি মাথায় মেরে নিজের মাথা ফাটাবাে। [ হাতকড়ি মাথায় মারিবার চেষ্টা করিতেই রক্ষী বাধা দিল ] এই চোপও ! রুকী।
প্রথম অঙ্ক) সীতারাম [দ্বিতীয় দৃশ্য শাহ। কাজী সাহেব, এ কমবখতের মতলব বিশেষ ভাল নয়—ওর হাতকড়িটা খুলিয়ে ফেলাই ভাল। কারণ কখন ও যে কি করে বসে তার ঠিক নেই। কাজী। তা ঠিক! এই ওকে বাইরে নিয়ে গিয়ে কামারকে দিয়ে ওর হাতকড়িটা আগে খুলিয়ে নিয়ে আয়। শয়তান যােগ পেলে সব করতে পারে। [ রক্ষীরা গঙ্গারামকে টানিয়া লইয়া গেল ] সীতা। কাজী সাহেব! তাহলে কি আমার সমস্ত আবেদন ব্যর্থ হ’ল ? কাজী। রায়জী, আমার দ্বারা আর কোনও কিছু করা সম্ভব নয় । ন্যায়ের বিচারে যার একবার দণ্ড হয়েছে তা আপনার অনুরােধে বিচারের অবমাননা করা হবে। আপনি আর আমায় অনুরােধ করবেন না। মকুব করলে এ বিষয়ে [ সহসা নেপথ্যে কোলাহল উঠিল—এই পাড়া, পাড়াে-আসামী আগতে হয় | কাজী। তাই ত’ এত গােলমাল কিসের ? [ প্রথম রক্ষীর দ্রুত এবেশ ] ১ম রক্ষী। হুজুর ! সর্বনাশ হয়েছে। আসামী গঙ্গারাম পালিয়েছে। কাজী। পালিয়েছে ? শাহ। এ ! [ মাথায় হাত দিয়া বসিয়া পড়িলেন ] কাজী। [ উত্তেজিত ভাবে ] তােরা কি ক’চ্ছিলি উল্লুক? উল্লুক? তােদের কোতল করলে তবে আমার রাগ যায়। চতুর্দিকে কড়া পাহারা আর তার ভেতর থেকে সে পালিয়ে গেল? ১ম রক্ষী। জনাব ! কামার তার হাতের বেড়ী খুলে দিতেই সে হঠাৎ ১৪
প্রথম অঙ্ক।
সীতারাম
[ দ্বিতীয় দৃশ্য
এক লাফে বাইরে গিয়ে রায়জীর ঘােড়র ওপর চড়ে তীরের
মত বেরিয়ে গেল ।
[ কাজী উত্তেজিত ভাবে সীতারামের দিকে অগ্রসর হইতেই রক্ষীর প্রস্থান ]
?
কাজী। বটে, বটে, রায়জী এ সব কী
সীতা।
আমি তাে কিছুই বুঝতে পাচ্ছি না কাজী সাহেব !
কাজী। বুঝতে
পাচ্ছেন না? কিন্তু আমি বুঝেছি এ এ সমস্ত
সীতারাম রায়ের চক্রান্ত !
সীতা। তাই যদি হত তাহলে নিরস্ত্র হয়ে মৃত্যুভিক্ষা চাইতে আসতুম না।
কাজী।
সেই মৃত্যু ভিক্ষাই আমি তােমাকে দেব সীতারাম রায়
গঙ্গারামের বদলে তােমাকেই আমি জীয়ন্তে কবর দেব।
[ আবার ভীষণ কোলাহল উঠিল। দ্বিতীয় রক্ষীর দ্রুত প্রবেশ ]
দ্বিতীয় রক্ষী। হুজুর, ভয়ানক বিপদ, বাইরে লুটতরাজ দাঙ্গা শুরু হয়েছে।
সীতারাম রায়ের প্রজারা আমাদের সমস্ত পাহারাদারদের
আক্রমণ করেছে।
কাজী। বটে, বিদ্রোহ ! এখনি গুপ্তপথ দিয়ে বেরিয়ে ফৌজদারকে
খবর দে। [ দ্বিতীয় রক্ষীর দ্রুত প্রস্থান ] সীতারাম রায়, তুমি
বড় চতুর, বিদ্রোহের আয়ােজন করেই এসেছিলে, কিন্তু মূর্ণ
তুমি জান না কার বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হতে সাহসী হয়েছ।
[ তৃতীয় রক্ষীর প্রবেশ ]
তৃতীয় রক্ষী। হুজুর, শিগগির এখান থেকে পালান-বিদ্রোহীরা এই
দিকেই ছুটে আসছে।
কাজী। আমাদের রক্ষীরা সব গেল কোথায় ?
প্রথম অঙ্ক] সীতারাম [দ্বিতীয় দৃশ্য ] তৃতীয় রক্ষী। তারা সব ছত্রভঙ্গ হয়ে পালিয়ে যাচ্ছে—একজন জেনানা সবাইকে ক্ষেপিয়ে নিয়ে এদিকে ছুটে আসছে। [ কোলাহল আরও বাড়িল ] হুজুর, শিগগির পালান! কাজী। তােরা সীতারাম রায়কে বন্দী করে আপাতত কোথাও নিয়ে যা তারপর আমি এ অপমানের শােধ নােব। আসুন শাহ, সাহেব। [ কাজী ও শাহ সাহেব উভয়ের দ্রুত স্থান। রক্ষীরা অসতর্ক হইতেই সীতারাম তাহাদের তরবারি কাড়িয়া লইয়া আক্রমণ করিলেন। তাহার কেহ আহত হইয়া কেহ ভয় পাইয়া পলাইয়া গেল। নেপথ্যে চন্দ্রচূড়ের চীৎকার শোনা গেল জয় মা চণ্ডিকে, আলুলায়িতা কেশে এ প্রবেশ করিলেন ] সংহার, সংহার! [ পশ্চাতে চন্দ্রচূড় সীতা। এ-কি ঐ গুরুদেব ? .চ। তােমাকে সাহায্য করতে। তােমাকে মুক্ত করতে সারা দেশে আমরা আগুন জ্বালিয়েছি। বিদ্রোহী সীতারামের জয়গানে ভূষণা আজ মুখর হয়ে উঠেছে। সীতা। গুরুদেব ! বিধাতার একী খেলায় অস্ত্র ধারণ করবে না বলে সংকল্প ক'রেছিলুম কিন্তু নারায়ণ নিজে যেন আজ আমার হাতে অস্ত্র তুলে দিলেন। চ। আমি তা জানতাম সীতারাম ! যুগে যুগে নির্যাতিতদের রক্ষা করবার জন্য তিনি তাদের নেতার হাতে এমনিভাবে অস্ত্র তুলে দেন। [ নেপথ্যে কামান ও ভীষণ কোলাহলের শব্দ ] সীতা। ঐ ফৌজদারের সেপাইরা বােধ হয় কামান চুড়তে চুড়তে এগিয়ে আসছে। আসুন গুরুদে, এস এ । [ উভয়ের হাত ধরিয়া একরূপ টানিতে টানিতে প্রস্থান করিলেন। কোলাহল ও কামান গর্জনের মধ্যে দৃষ্ঠান্তর হইয়া গেল। ১৬ প্রথম অঙ্ক ] সীতারাম [ তৃতীয় দৃশ্য স্যাম। রাম। দাদা, কাদের যেন পায়ের আওয়াজ পাচ্ছি। এ-তাই নাকি? তাহলে বকরুদ্দীন এগিয়ে চল। ‘দুষমণ দেখ আর মার।' ‘দুষমণ দেখ আর মার। [দ্রুত প্রস্থান) ৫ ( ক্লান্ত দেহে ভিন্ন দিক দিয়া গ্রীর প্রবেশ। সীতারাম তাহাকে ধরিয়া আনিতেছিলেন। চন্দ্রচূড় লাঠি হন্তে মাঝে মাঝে পিছন ফিরিয়া সতর্কতা সহকারে দেখিতেছিলেন কেহ অনুসরণ করিতেছে কিনা। শ্ৰী। ওঃ! আর আমি চলতে পাচ্ছি না। [ বসিয়া পড়িল ] সীতা। [ উদ্বিগ্নভাবে ] ঐ, ঐ আর একটু পথ চল। এস্থান এখনও নিরাপদ নয়। , আর কোথাও আমি যেতে পারবাে না। তােমরা যাও, আমার ভাগ্যে যা ঘটবার ঘটুক ! চ। [ নেপথ্যের দিকে চাহিয়া ] কে যেন এদিকে আসছে। দাঁড়াও আমি দেখে আসি। বিপদ বুঝলেই সঙ্কেত করবে। তােমরা ঐ বনের দিকে আত্মগােপন কর। [ প্রস্থানােন্বত হইতেই গঙ্গারামের এবেশ ] [ সবিস্ময়ে ! একি গঙ্গারাম ? গঙ্গা। [ হাঁপাতে হাঁপাইতে ] চতুর্দিকে ফৌজদারের ফৌজদারের সেপাইরা ঘুরছে, আমি বহুকষ্টে এদিকটা নির্জন দেখে পালিয়ে এসেছি। সীতা। কিন্তু এখানে থাকা তােমার পক্ষে নিরাপদ নয় গঙ্গারাম অবিলছে তুমি নদীর ওপারে শ্যামপুরে চলে যাও ! সেখানে মৃন্ময়ের সঙ্গে আমার বাড়ীর সকলকে পাঠিয়ে দিয়েছি। সেই খানেই তােমার সঙ্গে আমার দেখা হবে। সীতা।
প্রথম অঙ্ক ]
সীতারাম
[ তৃতীয় দৃশ্য
গা। আপনাদের এ অবস্থায় রেখে
সীতা।
[ ব্যস্ততাৰে । কোন কথা নয় গঙ্গারাম-আমার আদেশ ! তুমি
অবিলম্বে স্থান-ত্যাগ কর।
[ গঙ্গারাম যেন অনিচ্ছুক ভাৰে চলিয়া গেল ]
[ চন্দ্রচূড়ের প্রতি লক্ষ্য করিয়া ] গুরুদেব আমি ঐকে নিয়ে ঐ বনে
আপাততঃ আত্মগােপন করছি। আপনি একটু দেখুন ও
আমার আদেশ সত্যি পালন করে কি না।
চন্দ্র। বেশ আমি দেখছি—তোমরাও শী এখান থেকে চলে যাও!
[ চন্দ্রচূড়ের প্রস্থান ]
সীতা। এইবার চল ঐ। তােমার সঙ্গে আমার অনেক কথা আছে।
এ প্রান্তরে আর কোন মতেই অপেক্ষা করা চলে না। চল
আমরা এগিয়ে যাই।
[.শ্রী ও সীতারামের প্রস্থান। যন্ত্রসঙ্গীত সহযােগে দৃশ্যান্তর ]
প্রথম অঙ্ক]
সীতারাম
[তৃতীয় দৃশ্য
इंडोन न्य
প্রান্তর পথ
[ একদল লােক ছুটিতে ছুটিতে পলাইতেছে। সকলের মুখে ‘পালা, পালা’ রব ]
১ম ব্যক্তি। কোনদিকে পালাৰ ?
২য় ব্যক্তি। যেদিকে দুচোখ যায় ছুটে পালা !
৩য় ব্যক্তি। তােৰ খ এগিয়ে আসছে সঙ্গে তার হাজার সৈন্য।
সকলে। ঐ রে এলাে রে। পালা পালা !
[ কামানের আওয়াজ দূরে। হাঁপাইতে হাপাইতে রামাদ খামাদের প্রবেশ।
রামচাদের হাতে একটি পুটলি, বগলে ছাতি, কাপড় লুঙ্গির মত পরা।
খামাদের হাতে ছােট একটি লাঠি ও পায়ে একপাটি চটি |
খাম। [ হাঁপাতে হাঁপাইতে ] ও একেই বলে বিপদ! দাড়াও
দাদা, এইখানে একটু জিরিয়ে নিই।
রাম।
দেখ বিপদ! আর জিরুবার আবশ্যক নেই দৌড় দাও ।
খাম। নাঃ, এদিকটা একটু ঠাণ্ডা আছে দাদা। ভিড়ের মধ্যে আর
গিয়ে কাজ নেই। বাপরে বাপ, কি ঝাট ।
রাম। [ চটিয়া ] এখন হয়েছে কি? ভূষণা গাঁয়ের সব কটাকে
যদি একগাড়ে কবর না দেয় ত’ কি বলেছি। দুদিন লাঠি
ঘুরিয়ে বড় সব বাহাদুর হয়ে গিয়েছিল কি না—এইবার নে
সালা।
Uাম। আচ্ছা রামাদ দা!
রাম। [তনি সঙ্কেতে ] চুপ, !
আম। কেন ?
রাম। আমার নাম রামাদ তোমায় কে বলে?
১৭
প্রথম অক] সীতারাম [তৃতীয় দৃশ্য খাম। সে কি খাম। রাম। তাম। হাঁ, এদেশ না—ছাড়া পর্যন্ত আমি কালু মিঞা। আর আমি? বরুদ্দীন। বাপ পিতােমাের দেওয়া নামটা পর্যন্ত শেষে বদলে ফেলবাে? [ চটিয়া ] ওরে বাবা-দিনকাল যা প'ড়েছে তাতে বাপ পিতােমাের নাম কি বলছো-খােলন’লচে সব পাল্টে ফেলতে লােকে কথায় বলে, আপনি বাঁচলে বাপের নাম। রাম। শ্যাম। রাম। তাম। তা যা বলেছ-এখন কোথায় যাওয়া যাবে বল ? যাব যে কোন চুলােয় তা ত’ ভেবে পাচ্ছি না। ফৌজদার তোরাব খাঁ এখন ক্ষেপেছে, এখানে থাকলে ত’ আর নিষ্কৃতি নেই—এক নদীর ওপারে শ্যামপুরে গিয়ে যদি থাকা যায়- বাহক ওখানে দু'চারজন ঘর আছে। তাই চল! ওঃ, হতচ্ছাড়া গঙ্গারাম আর সীতারাম দেশটার সর্বনাশ করলে। সর্বনাশ করলে বলে ক’রলে। তার ওপর জুটেছে ঐ বামনা চচুড়। তুই টুলে পণ্ডিত, কোথায় পাজিপুতি দেখবি, তা নয় সব ছেড়ে একপাল ছোড়া নিয়ে-হালে আবার একটা মেয়েছেলেকে কোথা থেকে জুটিয়ে মাঠের মধ্যে ধেই ধেই নৃত্য করতে লাগলি। ছি ছি! তার ফলে নিজেদের সর্বনাশ ত’ করলিই, আমাদেরও মারলি। অত বৃদ্ধি থাকবে না—এইবার সব থোতা মুখ ভোঁত। রাম। রাম। হয়ে গেছে। ১৮ O প্রথম অঙ্ক] সীতারাম [চতুর্থ দৃশ্য ? কেন তুমি আমাকে সেই অধিকার থেকে বঞ্চিত রাখলে তা আজও জানতে পারি নি। সীতা। তার একটা কারণ ছিল । তােমাকে একদিন তা' বলবাে। একদিন নয়, আমি আজই তা জানতে চাই। সীতা। প্রতিজ্ঞা কর, সে-কথা শুনলে তুমি আমায় ত্যাগ করবে না? সে-কি এমনি কঠিন কথা যা শুনে তােমাকে আমি ত্যাগ করতে চাইব? সীতা। সীতা। བུ সীত। । হ্যা, সে অত্যন্ত কঠিন কথা, প্রতিজ্ঞা কর । জেনে তাহলে কেমন করে প্রতিজ্ঞা করি? 'আগে তুমি বল । আজ নয় একদিন নিশ্চিতই বলবাে। বােঝনা তুমি, তা না বল্লে তােমার সঙ্গে যাবার বাধা আমি অতিক্রম করতে পারি না। বেশ, সব শােন। [ চুপ করিয়া রহিলেন ] বল, চুপ করে রইলে কেন ? আমার এখনও মনে হচ্ছে তােমার না শােনাই ছিল ভাল। তবুও আমি শুনবাে। বিবাহের সময় আমার পিতা তোমার কোষ্টি দেখতে চেয়েছিলেন মনে আছে ? হা আছে। আমার কোষ্ঠি ছিল না। সেইজন্য তােমার সঙ্গে আমার বিবাহ দিতে আপত্তি হয়েছিল শুনেছি। কিন্তু তােমাকে সুন্দরী দেখে আমার মা জিদ করে তােমার সঙ্গে আমার বিবাহ দেন। সীতা। এ । সীতা। সীতা।
। । প্রথম অঙ্ক] সীতারাম [চতুর্থ দৃশ্য ঐ। স্বর্গের দেবী আমাকে স্বর্গে ঠাই দিতে চেয়েছিলেন। সীতা। বিয়ের কয়েক মাস পরে আমাদের বাড়ীতে এক বিখ্যাত দৈবজ্ঞ এলেন। পিতা তঁাকে তােমার কোষ্ঠি তৈরী করতে বললেন। কোষ্ঠি তৈরী করে তিনি পিতাকে তা পড়ে শােনালেন। সেইদিন থেকেই তুমি পরিত্যজ্যা হলে। কেন? সীতা। তােমার কোষ্ঠীতে বলবান চন্দ্র স্বক্ষেত্রে থেকে শনির ত্রিংশাংশগত হয়েছিল। তাহলে কি হয় ? সা। যার তা হয় সে স্ত্রী প্রিয়-প্রাণহন্ত্রী হয়। প্রিয়-প্রাণহন্ত্রী সীতা। স্বামীই শ্রীলােকের প্রিয়। পতি বধ তােমার কোষ্ঠির ফল। আমি প্রিয় প্রাণহী! আমার কোষ্ঠির ফল পতিবধ ! সীতা। আমার কথা এখনও শেষ হয়নি । না আর কোন কথা আমি শুনতে চাই না। আমি বুঝেছি তােমার গৃহে আমার স্থান নেই, সংসারের কোথাও আমার স্থান নেই—আমার স্থান খাপদ-সঙ্কুল গভীর অরণ্য, যেখানে মেহ মায়া প্রীতি নিয়ে কোন প্রিয়জন আমার জন্থে কোনদিন অপেক্ষা করে। থাকবে না। ভগবান! একী নিদারুণ অভিশাপ দিয়ে তুমি আমায় সংসারে পাঠিয়েছ ভগবান! ( দূরে বৃক্ষতলে গিয়া বসিল ] সীতা। তুমি উতলা হয়ে না , শান্ত হও, স্থির হও। ২৪ প্রথম অঙ্ক] সীতারাম [চতুর্থ দৃশ্য তুখ দৃশ্য বন সীতা। সীতা। [ শ্রী ও সীতারাম ক্লান্তদেহে প্রবেশ করিলেন ] এইবার আমরা নিরাপদ স্থানে এসে পৌচেছি। তুমি কি পথ চিনে এখান থেকে একা যেতে পারবে? কোথায় যাব? কোথায় যেতে চাও, বল। বাড়ীতে মা নেই, দাদাও আর সেখানে ফিরতে পারবেন -তবে আমি কোথায় যাব? আমি এইখানেই থাকবে। এ যে প্রান্তর-এখানে কি থাকা যায় ? আমি আজ নিরাশ্রয়। আমার কাছে পথ, প্রান্তর, বন সবই এক। কিন্তু এখানে তােমায় দেখতে পেলে তারা ধরে নিয়ে সীতা। সীত। যাবে। সীতা। কারা ? তুমি হাঙ্গামায় ছিলে, অনেকে তােমায় দেখেছে, ফৌজদার একবার ধরতে পারলে তােমায় কঠোর শাস্তি দিতে পারে। কোন শান্তিতেই আর আমার ভয় নেই। অবুঝ 'মােনা গ্রী ! তােমার দাদাকে গুরুদেব নিশ্চিতই শ্যামপুরে পাঠিয়েছেন। তুমি সেইখানে তার কাছে থাকবে সীতা। চল। কে আমার সঙ্গে যাবে?
প্রথম অঙ্ক] সীতারাম [চতুর্থ দৃশ্য সীতা। ০ কেন আমি। আমার সঙ্গে তুমি যাবে ? ( শ্ৰী হাসিল ] এতদিন পরে আবার একথা কেন ? তার উত্তর আমি পরে দেব শ্রী ! কিন্তু আগে তা না শুনলে ত’ আমি তােমার সঙ্গে যেতে সীতা। পারি না। আমার সঙ্গেও যেতে পার না? সীতা। ঐ। গীতা। না ! কেন ? সীতা। আমায় যখন ত্যাগ করেছিলে তখন কি আমার কোন কথা জানতে চেয়েছিলে ? তখনকার কথার মীমাংসা এখন হয় না শ্ৰী । কেন হয় না? এখন তােমার জীবন বিপন্ন। তাই দয়া করে তুমি আমাকে আজ সঙ্গে নিয়ে অপরের আশ্রয়ে রেখে কর্তব্য শেষ করতে চাও? আমার দাদার জীবনের জন্য তােমার দয়া ভিক্ষা করেছিলাম, কিন্তু আমার নিজের জন্য তা কখনাে করবাে না। তুমি ভুল বুঝছে ঐ, দয়া আমি করছি না। তুমি আমার স্ত্রী আমি তােমায় সেইভাবেই নিয়ে যেতে এসেছি। প্রীর কোন অধিকারই ত’ কখনাে পাই নি, আজ তুমি তা কি কি করে আমায় দেবে? শুনেছি তােমার দুই স্ত্রী রয়েছে, তাদের সবার আগে আমার স্থান ছিল কিন্তু কেন তা রইলো সীতা। ২২
প্রথম অ]
সীতারাম
[চতুর্থ দৃশ্য
সীতা। ফুল, ফুল কি হবে ?
অঞ্জলি দিয়ে আগে দেবতাকে প্রীত করবে। তবে ত’ তিনি
প্রসন্ন হবেন ?
সীতা। কিন্তু ফুল তো এ কাননে নেই।
ঐ যে কৃষ্ণচূড়ায় একটা গাছ ছেয়ে রয়েছে।
সীতা। তুমি অপেক্ষা কর, আমি এখুনি নিয়ে আসছি।
[ সীতারাম চলিয়া গেলেন, এ৷ কিছুকাল সেইদিকে চাহিয়া
রহিল তারপর উদ্দেশ্যে প্রণাম জানাইয়া কহিল ।
যাবার বেলাকার এই ছলনার জন্য অপরাধ নিয়ে না স্বামী!
প্রিয়-প্রাণহন্ত্রী হবার জন্য তােমার দৃষ্টির সামনেও আমি আর
থাকতে পারি না। আমার পুণ্যের ফলে তােমাকে পেয়েছিলাম,
তবু অজানা পাপ কোথায় জমে উঠে সেই আশ্রয় থেকে আমায়
সরিয়ে দিলে। কিন্তু পাপ-পুণ্যের বিচার শেষ হবার পর আবার
একদিন তোমায় আমায় দেখা হবে এই আশা নিয়েই তােমার
অভাগী ঐ আজ অজানা পথে পা বাড়ালাে। তাকে তুমি ভুল’
বুঝে না।
[ সীতারাম যেদিকে গেছেন সেইদিকে অপলক দৃষ্টিতে চাহিয়া রহিল,
পরে আত্মসংবরণ করিয়া কহিল ।
, আর দেরী নয়। এখুনি হয়তো এসে পড়বেন। ওরে
অভাগ তাের ভয় কি ? পথে যিনি দাড় করিয়েছেন পথের
সন্ধান তিনিই দেবেন।
[ শ্ৰীয় স্থান-ক্ষুট যন্ত্রসঙ্গীত হইতেছিল-সীতারাম নেপথ্য হইতে বলিতেছিলেন ।
সীতা।
-ঐ কত ফুল তুলেছি দেখে যাও! আরও চাই?
।
সীতা।
প্রথম অঙ্ক]
সীতারাম
[চতুর্থ দৃশ্য
[ অঞ্জলি ভরিয়া ফুল লইয়া সীতারামের প্রবেশনেখিলেন শ্রী নাই।
আকুল ভাবে তিনি ডাকিতে লাগিলেন ]
ত্র একি ঐ কোথায় গেল? এ লুকিয়ে থেক না
দেখা দাও, দেখা দাও ।
[ গঙ্গায়ামের প্রবেশ ]
গঙ্গা। ঐ-কোথায় রায়জী ?
[ সবিস্ময়ে ] একি গঙ্গারাম তুমি আবার ফিরে এলে ?
গঙ্গ।। গুরুদেব বললেন সন্ধ্যার পূর্বে এস্থান ত্যাগ করা বিপজ্জনক,
আবার ধরা পড়ার সম্ভাবনা। তাই তিনি আমায় এখন এই
বনে আত্মগোপন করতে বললেন। সহসা আপনার কণ্ঠস্বর
শুনে আমি এদিকে ছুটে এলাম, কিন্তু এ কোথায় রায়জী ?
সীতা। আমিও তাই জানতে চাই গঙ্গারাম কোথায় ?
গঙ্গা। আমি ত তাকে দেখিনি।
সীতা। এইখানেই বসিয়ে রেখে তার জন্যে ফুল আনতে গিয়েছিলাম
গঙ্গারাম। কিন্তু তাকে ত’ আর দেখতে পাচ্ছি না। বলতে
পার এমন হঠাৎ সে কোথায় চলে গেল?
গদা। ফৌজদারের গুপ্তচরেরা তার সন্ধান পেয়ে তাকে তাে ধরে
নিয়ে যায়নি রায়জী ?
সীতা। সন্ধান কর গঙ্গারাম! যদি তােমার আশা সত্য হয়, তাহলে
জেনাে সারা ভূষণায় আমি আগুন জেলে তুলবাে, ফৌজদার
সুবেদার, দিল্লীর অধীশ্বরও সীতারামের সেই দীপ্ত রােষানল থেকে
রেহাই পাবে না। যাও গঙ্গারাম যাও, আর বিলম্ব কোরাে না।
[ গজায়ামের প্রস্থান কালে সেই দিক দিয়া চুড়ের প্রবেশ ||
'চ। গঙ্গারামকে কোথায় পাঠাও সীতারাম ?
প্রথম অঙ্ক] সীতারাম [চতুর্থ দৃশ্য স্থির হব, নিজেকে প্রিয়-প্রাণতন্ত্রী জেনেও কেমন ক'রে স্থির হয়ে থাকবাে বল? আমিতাে পাষাণ নই। সীতা। আমার সব কথা এখনও শেষ হয়নি । আমি বুঝতে পারি না, আমি বুঝতে পারি না এর পরও আর কি বলার বাকী থাকতে পারে ! সীতা। পিতার আদেশে তােমাকে পরিত্যাগ করে আমায় আবার বিবাহ করতে হয়—তার জীবদ্দশায় আমি তার অধীনে ছিলাম, কিন্তু আজ- সীতা। ( বাধা দিয়া) আজ তিনি স্বাগত বলেই কি তাঁর আদেশকে তুমি এখন অমান্য করবে ? না তার চেয়ে বড় বিধাতার আদেশকে অমান্য করে নিজের ধর্মপত্নীকে একদিন ত্যাগ করেছিলুম বলে আজ আমি প্রায়শ্চিত্ত করবে। , না। ওগাে তুমি ওগাে তুমি ভুলাে না, তুমি শুধু আমার প্রিয় নও তুমি প্রিয়তম, তুমি পরম আরাধ্য, আমার ইহকালের পরকালের সৰ্বৰ তুমি ! তাইতাে এই প্রিয়-প্রাণহন্ত্রীকে তােমার সংস্পর্শ এড়িয়ে, দূরে বহুদূরে, তােমার দৃষ্টির বাইরে, তােমার সকল সৃষ্টির বাইরে থেকে আমরণ তােমারই স্মৃতি বুকে নিয়ে পড়ে পড়ে কাদতে হবে। সীতা। না, না । সে দুঃখের সাধনা তােমাকে করতে হবে না, আমি তােমাকে আর কোথাও যেতে দেব না, তোমাকে আমি যেতে দিতে পারি না। কেন পারবে না? আমাকে পরিত্যাগ করে এতদিন ত বেশ २८
প্রথম অ]
সীতারাম
[চতুর্থ দৃশ্য
ছিলে। তােমার সােণার সংসার, অতুল
ঐশ্বৰ্য্য, ইন্দ্রাণীর মত
রূপবতী দুই স্ত্রী, কার্তিকের মত কুমার, এত থেকেও, এত
পেয়েও তোমার মন ভরে না?
সীতা। ভ’রতাে যদি তাহলে তােমাকে ফিরিয়ে নেবার জন্য এমন ব্যাকুল
আবেদন আজ আমার অন্তর ছাপিয়ে এমন করে উপচে
উঠতো না ! তােমাকে স্পর্শ করে আমি বলচি এ আমার
বাসনা, কামনা, জীবনের সাধনা সব জলাঞ্জলি দিয়েও তোমাকে
আমার কাছেই রাখতে চাই ।
তুমি তাই চাও বলেই কি আমি তােমার এতখানি মেহ,
এতখানি ভালবাসার বিনিময়ে তােমাকে প্রাণে মারবার জন্য
তােমার কণ্ঠলগ্ন হয়ে থাকবাে ? আপন জনের কাছে কোন
দাবী করবার অধিকার দিয়ে ভগবান আমাকে সংসারে পাঠান
নি। দেশের দশজনে আজ এক অমূল্য দাবী নিয়ে তােমার
সামনে দাড়িয়ে। সে দাবী পূর্ণ করা তোমার ধর্ম। পরিত্যক্তা
হলেও আমি তােমার ধপত্নী । এক সঙ্গে ধর্ম পালন করতে
পারলাম না যদি, স্ত্রী হয়ে স্বামীর ধৰ্ম্মহানি করে আমার
পরকালের পণেও কাটা দিয়ে রাখব? তুমি জ্ঞানী, সবই
তুমি বােঝ। প্রসন্ন মনে আমাকে আজ বিদায় দাও!
সীতা। প্রসন্ন মনে, কেমন করে দেব ?
আমি উপায় বলে দিতে পারি যাতে তােমার মনের সন্তাপ
দূর হয়।
সীতা। বেশ, তাই বলে দাও, ঐ।
তুমি আগে আমায় কিছু ফুল এনে দাও !
দ্বিতীয় অঞ্চ। সীতারাম [ প্রথম দৃশ্য জয়। জয়। জয়। তাই কি খুঁজে খুঁজে বৈতরণী পারে এসে পঁড়িয়েছ? হ্যা, আরও পাকা-মাঝির সন্ধানে যাচ্ছি। এক্ষেত্রে তিনি নাকি বিরাজ করেন -তারই কাছে নয় যাই। চল, আমিও সেইখানে সেইখানে যাব। আমার সঙ্গে আসবে কি? আসবে। কিন্তু আমার তাে কিছু পুজি নেই। আমারও ত’ নেই। তুমি তাহলে দিনপাত কর কি করে ? ভিক্ষা করে। আমি তো তা পারবাে না। বেশ তােমার হয়ে আমিই নয় ভিক্ষা করবাে। তোমার এই বয়েস, এই রূপ, তুমি পথে পথে ভিক্ষা কর কেন ? তোমার ভয় করে না? আমি যে সংসার ত্যাগী। আমার আবার ভয় কিসের? ধৰ্ম যে আমার সহায়। কিন্তু আমার সহায় ত’ কিছু নেই। কেন তুমিও এই বেশ পর না। আমার ঝুলিতে সর্ব আছে - সব দিয়ে তােমায় সাজাবাে।. সাজবে ? সাজবাে।-আমায় তােমার সাথী কর মা। দেখ, তােমায় একটা কথা বলি, আর মা-বাছা বলা পােয় । তুমি আর আমি ত’ সমবয়সী । আমরা দুজনে ভাই নাম ধরেই এবার থেকে ডাকবো। তােমার নাম ? জয়। জয়। . ৩১:
বিতীয় অঙ্ক)
সীতারাম
প্রথম দৃশ্য
বেশ, আমাকে তােমার বােন ব'লেই জেনাে ঐ আর আমাকে
তুমি জয়ন্তী ব'লেই ডেকো।
বেশ, এখন কি করবাে বােন?
জয়। কোন কিছুতে মন দাও !
কিসে মন দেব-পাপে ?
জয়।
কেন পুণ্যে !
স্ত্রীলোকের একমাত্র পুণ্য স্বামী সেবা—যখন তাই ছেড়ে এসেছি
আবার আমার কি পুণ্য আছে ?
স্বামীর স্বামীও তাে একজন আছেন।
তিনি স্বামীর স্বামী-আমার নন।
আচ্ছা ভাই, তুমি
বলে
তুমি স্বেচ্ছায় তােমার স্বামীকে ত্যাগ
করে চলে এসেছ -তবুও তুমি কেন মনে কর স্ত্রীলােকের
একমাত্র পুণ্য স্বামী সেবা ?
কেন মনে করি ! জানি না জয়ী। কোন যুক্তি দিয়ে তা
আমি বােঝাতে পারি না। কিন্তু পলে পলে অনুভব করি
পথের কাটার আঘাত থেকে তঁার চরণ কমল অক্ষত রাখবার
জতে তার পায়ের তলায় যদি বুক পেতে দিতে পারতাম, তাতেই
আমার নারী জীবন সার্থক হত।
তােমার কথা শুনে মনে হচ্ছে তােমার সঙ্গে তােমার স্বামীর
দেখা সাক্ষাৎ খুব কমই হ'য়েচে, তবুও তাকে এত ভালবাসলে
কি করে?
তুমি যে ঈশ্বরকে এত ভালবাস ক’দিন তার দেখা পেয়েছ বােন?
আমি যে ঈশ্বরকে দিনরাত ভাবি।
জয়।
প্রথম অঙ্ক] সীতারাম [চতুর্থ দৃশ্য সীতা। শ্রীর সন্ধানে, গুরুদেব! চন্দ্র। শ্রীর সন্ধানে! একে তাে আমি তােমারই হাতে সঁপে দিয়ে গিয়েছিলাম। সীতা। ঐ অন্তৰ্হিতা। চন্দ্র। অন্তৰ্হিতা ! সীতা হঁ্যা গুরুদেব, সহসা অন্তৰ্হিতা। কিন্তু, কিন্তু গুরুদেব শ্রীর সন্ধান পেলে আমার জীবনের সাধনা ব্যর্থ হয়ে যাবে। চঞ্জ। সে কি সীতারাম? সীতা। আপনিই না বলেছিলেন গুরুদেব, এর ভিতর যে শক্তি রয়েছে সেই শক্তিরই সাধনা আমরা করি। চত্র। কিন্তু ঐ যে তােমায় স্বেচ্ছায় ত্যাগ করে গেছেন, সীতারাম। গেলেন বলেই ত’ আমি ঐ-হীন, আমার রাজ্য হীন- -হীন এই শ্যামা বঙ্গভূমি। সকলে ঐ-হীন বলেই ত’ আমরা আজ শক্তিহীন। গুরুদেব শক্তির সাধক এই সীতারাম সারা মন দিয়ে আজ ঐকে ফিরে পেতে চায়। সে জানে ঐ এলেই তার বাহুতে আসবে শক্তি, শক্তি এনে দেবে মুক্তি, যে মুক্তির আশায় আপনি, আমি, সারাদেশ একসঙ্গে আজ শােন জেগে বসে রইচি। সীতা। [ সীরে ধীরে প্রথম অঙ্কের যবনিকা পড়িবে ] ২৯
দ্বিতীয় অঙ্ক
প্রথম দৃশ্য
বৈতরণী তীর
[ পার্বত্য নদী-দূরে পাহাড়ের গালে এক গুহা-আশেপাশে জঙ্গল
-নদীর কুলে এ দাঁড়াইয়াছিল ]
ওঃ! আর যে পারি না ! তােমার কোলে আমায় স্থান দাও
মা! লােকে বলে বৈতরণী পার হলে মাকি সব জালা জুড়ােয়
—তােমার বুকে কি আমার জালা জুড়বে না?
[ নদীতে শ্রী ঝাপ দিবার উদ্যোগ করিতেছে এমন সময়
জয়ন্তী আসিয়া ধরিলেন ]
ছিঃ ! ছিঃ ! কি কর? এ সে বৈতরণী নয়!-যমদ্বারে না
। গেলে সে বৈতরণীর সন্ধান মেলে না।
কে, মা তুমি আমায় বাধা দিলে ? আমি যে যমদ্বারেই
* যেতে চাই।
এত তাড়াতাড়ি কেন মা? এখনও যে তােমার সকাল বেলা।
বেলা হ'লে বাতাস উঠবে যে ।
তাই তুফানের ভয় কচ্ছ? কেন তােমার কি কোন পাকা
মাঝি নেই ?
পাকামাঝি ! হ্যা, আছে, কিন্তু তার নৌকোয় আমি উঠলুম না।
শুধু শুধু কেন তার নৌকো ভারি করবে।
জয়।
শ্রী।
দ্বিতীয় অঙ্ক)
সীতারাম
[ প্রথম দৃশ্য
আমিও তাই। মনে মনে তাকেই দেবতারূপে এতদিন পূজা
করে আসছি। চলুন ঘসে দেয়ালের গায়ে মাখিয়ে ভেবেছি
তারই অঙ্গে মাখিয়ে দিলাম সেই চন্দন, মালা গেঁথে ফুলতর।
গাছের গলায় পরিয়ে দিয়ে ভেবেছি, তারই গলায় পরিয়ে দিলাম
সেই মালা; নিজের গহনা বিক্রি করে ভাল খাবার এনে
বেঁধে বেড়ে তারই উদ্দেশে নদীর জলে ভাসিয়ে দিয়েছি।
ঠাকুর প্রণাম করতে গিয়ে ঠাকুরকে দেখতে পাইনি-মাথার
কাছে তাঁরই পাদপদ্ম দেখেছি। তিনি আমায় ডেকেছিলেন
জয়ন্তী, তবু আমি তাকে উপেক্ষা করে চলে এসেছি। কিন্তু
আমি যে আর থাকতে পাচ্ছি না জয়ন্তী-কিছুতেই পাচ্ছি না।
তবে তার সঙ্গে দেখা করবে চল !
-না-জয়ন্তী, আমি যে সর্বনাশের আগুন নিয়ে সংসারে
এসেছি - চল, চল এখান থেকে দূরে—আরও দূরে চলে যাই।
[ এর দ্রুত প্রস্থান। জয়তী তাহাকে অনুসরণ করিল-যন্ত্রসঙ্গীত
সহযােগে দৃশ্যান্তর ]
জয় ।
দ্বিতীয় অঙ্ক]
সীতারাম
(দ্বিতীয় দৃশ্য
দ্বিতীয় দৃশ্য
শ্যামপুরে সীতারামের নূতন প্রাসাদের একাংশ।
[ সীতারাম ও গঙ্গারামের কথা কহিতে কহিতে প্রবেশ 3
গা। বহুদূর দূরান্তরে ঘুরে এলুম মহারাজ!—শ্রীর কোন সন্ধান করতে
পারলুম না।
সীতা। কিন্তু তার সন্ধান যে আমার চাইই।
গল। তার দুর্ভাগ্য সে আপনার আশ্রয় পেয়েও অাবার সে আশ্রয়
থেচ্ছায় হারালাে। বিধাতা তার ভাগ্যে আমীমুখ লেখেন
নি মহারাণ!
সীতা। কিন্তু বিধাতা যে তার ভাগ্যের সঙ্গে আমার ভাগ্যকেও জড়িয়ে
দিয়ে গেছেন গঙ্গারাম। তাকে আমায় খুঁজে পেতেই হবে।
তার অভাবে আমার জীবন মূল্যহীন, উপহাসের নামান্তর।
মহারাজ, আপনি রাজাধিরাজ, কঠিন কর্তব্যের ভার আপনার
ওপর-আপনি অধীর হলে যে সমস্ত রাজত্ব ধ্বংস হয়ে যাবে।
[ আত্মস্থ হইয়া) সত্য আমি দুর্বল হয়ে পড়েছিলাম গঙ্গারাম।
আমি আমার দেশকে ভুলেছিলাম, তুমি আমায় ক্ষমা কর ।
মহারাজ! আমার অপরাধকে আপনি আরও বাড়িয়ে
তুলছেন। আমি যে আপনার দাসানুদাস—সেবক -নগণ্য
ভৃত্য! আপনি আদেশ করুন, আবার আমি তার অনুসন্ধানে
যাত্রা করি।
সীতা। না গঙ্গারাম, তার অনুসন্ধান বৃথা! তাকে হৃদয় থেকে মুছে
ফেলে দেওয়াই ভাল। আমার এই নতুন রাজ্যের মাঝখানে
সীতা।
৩
দ্বিতীয় অঙ্ক ]
সীতারাম
[ দ্বিতীয় পৃষ্ঠ
আর তার দুঃস্বপ্নকে জাগিয়ে তুলতে চাই না। তৃণার
পুরাতন স্মৃতির সঙ্গে তার স্মৃতিও মিশিয়ে যাকশােন গঙ্গারাম
সম্প্রতি আমি দিল্লী যাচ্ছি, আমার অনুপস্থিতিতে হয়তাে তােরাব
খা গামপুর আক্রমণ করতে পারে।
কিন্তু এই নগর প্রবেশের চেষ্টা করলে সে নিজেকেই বিপদগ্রস্ত
করে তুলবে।
সীতা। তবু তুমি সাবধানে নগর রক্ষা কর। গুপ্তচর বলে কাউকে
সন্দেহ করলে আমি ফিরে না আসা পর্যন্ত তাকে বন্দী করে
রাখবে। মনে রেখে গঙ্গারাম, বাইরে থেকে শত্রুরা এসে কোন
দেশকে ধ্বংস করতে পারে না-দেশকে ধ্বংস করে দেশেরই
বেইমানরা!
গঙ্গা। আপনার আদেশ আমার মরণ থাকবে।
[ নমস্কার করিয়া প্রস্থান )
সীতা। [ অন্তঃপুরের দিকে অগ্রসর হইয়া ডাকিলেন ] না, না !
( নলার প্রবেশ
নন্দা। আমায় ডাকছো ?
সীতা। হা! আমি দু'একদিনের মধ্যেই দিল্লী যা করবে। তার
আগে আজ সন্ধ্যায় লক্ষ্মীনারায়ণজীকে দর্শন করতে যাব—তুমি,
রমা আমার সঙ্গে চুল।
নন্দা। তা' দিল্লী যাবার আগে আবার এত তাড়া পড়লাে কেন?
সীতা। দিল্লীর বাদশাহের কাছ থেকে রাজা খেতাব আনতে যাচ্ছি।
না। তুমি তাে রাজা আছই, আবার কি খেতাব চাও?
সীতা। আরে সে খেতাব তত দিয়েছে আমার দেশের লােকেরা।
বাদশাহ তো দেয়নি।
৩০
দ্বিতীয় অঙ্ক।
সীতারাম
[দ্বিতীয় দৃশ্য
নন্দা। দেশের লােকের দেওয়া খেতাবের চেয়ে বড় সম্মান আর কি
হতে পারে?
সীতা। কিছুই নয় তা আমি জানি। তবু শাহের সনদ না পেলে
বিরােধের আর অন্ত থাকবে না। সব তুমি বুঝবে না নন্দা
এসব রাজনীতির কথা। আমি অল্পদিনের ভেতরই ফিরে
আসবাে।
না। কিন্তু তুমি গেলে তােমার আদরিণী ছােটরাণীকে শান্ত রাখবে কে ?
সীতা। সেজন্যে তাে তুমিই রয়েছ না। তবে রমাকে আমার যাবার
কথাটা না বলাই ভাল।
নন্দা। সে আবার বলতে ? খবরটা কানে গেলে আর রক্ষে রাখবে
ভাবছে? এখুনি কেঁদে কেটে বাড়ী মাথায় করবে না।
কোন কিছু যদি বােকে! দিনরাত শুধু ভয়ে ভয়েই গেল।
সীতা। কিসের ভয়?
নন্দা। তার কত হিসেব দেব বলতো? আগে ছিল সতীনকে ভয়,
এখন সেটা গিয়ে ভয় হয়েছে কেবল ফৌজদারকে।
সীতা। জলাতন!
নন্দা। চারিধারে গড়, দুর্গ তৈরী হচ্ছে শুনে আমায় নােজ বলবে, অ
দিদি, তুমি ওকে বারণ করনা—তা না হলে আমাদের সর্বনাশ
হয়ে যাবে।
সীতা। কিন্তু কোথায় কি হচ্ছে সে খবরই বা ওর কানে যায় কি করে ?
নন্দা। হায়রে! খবর দেবার আবার লােকের অভাব ! ঐ যে ঘােট
বৌয়ের বাপের বাড়ীর ঝি মুরটি রয়েছেন, তার কাছে রাজ্যের
নিতীয় অঙ্ক]
সীতারাম
[দ্বিতীয় দৃশ্য
কোন খবর জানতে বাকী আছে? সব-কিছু বলবে। বারণ
করলে তােমার হােটরাণীতাে আমায় আস্ত রাখবে না।
[ নলার শেষ কথাগুলি বলার সময় ছােটরাণী রমা পিছন হইতে
প্রবেশ করিয়া হাসিমুখে তাহার কথা শুনিতেছিল ]
এতদিন বড় সােহাগ জানিয়ে এসেছ—এখন তার মর্ম বােঝ!
রমা। [ হাসিতে হাসিতে অগ্রসর হইয়া ] যা ভেবেছি, ঠিক আমার নামে
দিদির নালিশ আরম্ভ হয়েছে।
না। হয়েছেই তাে। সতীনের নামে না লাগিয়ে সতীন কখনও
থাকতে পারে ?
রমা। তা দিদি এতদিন তাে তুমি ওঁর সঙ্গে ঘর করে এলে, এখন নয়
আমার কাছে একটু ছেড়ে দিলেই ভাই।
གག།
| পােড়ারমুখী, স্বামীকে কেউ কোনদিন সতীনের হাতে ছেড়ে
রমা।
নন্দা।
দিলে সতান কেড়ে নিতে পারে তাে ?
বেশ তাে, কেড়ে নেবার শক্তি থাকে তাই নেনা। তাের
হাতেই ছেড়ে দিয়ে যাচ্ছি।
[ নন্দা হাসিতে হাসিতে চলিয়া গেল, রমা সীতারামের
কাছে আসিয়া বলিল।
।
রমা। হা গা, তােমায় একটা কথা জিজ্ঞাসা করব?
সীতা। কি ?
রমা। চারিধারে এত সেপাই শাছির কুচকাওয়াজ হচ্ছে কেন? আবার
যুট কিছু হবে নাকি?
সীতা। হ'লেই বা, তাতে ভয়ের কি আছে?
দ্বিতীয় অঙ্ক)
সীতারাম
দ্বিতীয় দৃশ্য
সীতা।
রমা। ভয়ের নেই, তুমি কি বলছো ? ‘শত্রুরা এসে আমাদের সবাইকে
মেরে ফেলবে না?
আমরাও তত শত্রুদের মেরে ফেলতে পারি।
রমা। না না ফৌজদারের লােকের সঙ্গে আমরা পেরে উঠব না, তুমি এ
সব দুর্গগড় ভেঙে ফেলে দাও। চল আমরা ফৌজদারের পায়ে
গিয়ে পড়ি তাহলে নিশ্চয়ই তিনি কিছু করবেন না।
সীতা। পায়ে যারা দিনরাত পড়ে তাদের ভাগ্যে কি জোটে জান ?
-লাথি।
রম। কিন্তু দাম যার থাকে সে পায়ের তলায় পড়লে লােকে মাথায়
তুলে নেয়।
সীতা। তােমায় এত সব কথা কে শেখালে ?
রমা। শেখাবে কেন? আমি কি জানিনা? [ উত্তেজিত ভাবে ] শ্রী যেদিন
তােমার পায়ে লুটিয়ে পড়েছিল সেদিন তুমি কি করেছিলে ?
আমার কাছে যুদ্ধ করবে না বলে যে প্রতিজ্ঞা করেছিলে তাও
ভুলে যেতে তােমার দেরী হয়নি।
সীতা। আমি তা স্বেচ্ছায় করিনি। আমায় তা বাধ্য হয়ে করতে
হয়েছিল।
বুমা বাধ্য হয়তাে হতেনা, যদি ঐ না হয়ে আর কেউ বলতো।
তাই আমার চেয়ে তােমার কাছে তুচ্ছ এক ভিখারিণী ঐ বড়
হয়ে উঠলাে।
সীতা। [ উত্তেজিত ভাবে ] ঐ ভিখারিনী নয়, সে রাজরাণী, তা তুমি জান।
-তাকে হিংসা করে নিজেকে ছােট করেনা তার শক্তির এক
কণা যদি তােমার থাকতাে তাহলে আমি খুশী হতাম।
নিতীয় অঙ্ক ]
সীতারাম
[দ্বিতীয় দৃঙ্গ
রমা। [ উত্তেজিত স্বরে ] বেশত তাহলে তাকে নিয়েই খুসী হও !
সীতা। তাইতাে হতে চাই, কিন্তু পাই কই? ঝড়ের মত সে একবার দেখা
দিয়ে আবার কোথায় মিলিয়ে গেছে। আজ সে থাকলে
শত্রুকে ভয় করে তােমার মত পিছিয়ে আসবার অনুরােধ
জানাতাে না। আমার পাশে দাড়িয়ে শক্ত—বিজয়ে সহায়তা
করতাে।
রমা। আমিও তা পারতুম ! কিন্তু আমার-আমার খােকার জন্যে যে
তা পারিনা। তাকে কি চিরদিনের মত দুঃখী ক'রে যাব ?
সীতা। শত্রুকে তােমার এত ভয়?
রমা। শত্রুকে ভয় নয়, ভয় আমার তােমাকে! [ সীতারামের কাছে গিয়া
তাহার বাহু ধরিল ] তুমি যে দুঃসাহসী, বড় একরােখা, তাই আমার
এত ভয়। তােমার ভালবাসা আমি হারিয়েছি তা আমি বুঝতে
পারি কিন্তু আমার ভালবাসা যে তোমাকেই ঘিরে দাঁড়িয়ে
রয়েছে। ওগাে তােমার পায়ে পড়ি, আমাদের কিছু দরকার
নেই। চল আমরা খােকাকে নিয়ে এখান থেকে চলে যাই
[ পায়ে ধরিল ]
[ বিরক্ত ভাবে রমাকে উঠাইয়া যলিলেন ] আঃ পা ছাড়! তুমি যদি
এভাবে আমায় বার বার বিরক্ত করে তােল, তাহলে আমায়
অন্তঃপুরে আসা বন্ধ করে দিতে হবে দেখতে পাচ্ছি।
রমা । , না তুমি আমার উপর রাগ করােনা—আমি এখান থেকে
চলে যাচ্ছি। খােকা যদি আমার কোলে না আসতাে তাহলে
চিরদিনের মত আমি তােমার কাছ থেকে চলে যেতুম।
[ প্রস্থানােত
সীতা।
দ্বিতীয় অঙ্ক
সীতারাম
[ দ্বিতীয় দৃশ্য
সীতা। শােন! [ রমা ফিরিল ] আচ্ছ•এতটুকু শাস্তি কি তুমি আমায়
দিতে পার না?
রমা।
[ কাতর ভাবে ] কি করলে তুমি সুখী হবে বল?
সীতা। আমার কাজ না দেখে ঘরের কাজে মন দাও।
রম। বেশ এবার থেকে তাই দেব!-তুমি রাগ করােনা !
[ নাের প্রবেশ ]
নন্দা। কি গাে ছােটরাণী—এখনও কথা শেষ হ’ল না? আবার যে
যেতে হবে অনেকদূর!
রমা। কোথায় দিদি?
নন্দা। ওমা এখনও তুমি সে কথাটা ওকে বলবার সময় পাওনি?
সীতা। না ভুলে গিয়েছিলাম। , তােমরা ঠিক হয়ে নাও—আমরা
লক্ষ্মীনারায়ণজীকে দর্শন করতে যাব।
[ সীতারাম একদিকে নন্দ ও রমা অপরদিকে প্রস্থানােত
হইতেই যন্ত্রসঙ্গীত সহযােগে দৃশ্যান্তর হইয়া গেল ]
দ্বিতীয় অ] সীতারাম [তৃতীয় দৃশ্য তৃতীয় দৃশ্য * খামপুরের পথ [ হক হন্তে রমাদ তামাক খাইতে খাইতে প্রবেশ করিল পিছনে খামচাদ কলা খাইতে খাইতে আসিতেছিল ] শ্যাম। যাই বল দাদা, এইখানে আর যাই হক বেশ একটু শান্তি পাওয়া যাচ্ছে, কি বল ? রাম। আপাতত তো কাটছে ভাল। হাজার হক সীতারাম রায় একটা লােক বটে তাে! দেখতে দেখতে শ্যামপুরকে কি রকম শহর বানিয়ে ফেললে দেখ। শ্যাম। হবে না কেন দাদা? বাপ, ঠাকুন্দা তাে আর কম রেখে যাননি! তার ওপর আবার স্বয়ং বাদশাহ রায়জীর দিকে। শুনেছি খুব শিগগিরই মহারাজাধিরাজ উপাধি দেবার জন্যে দিল্লীতে সীতা- রামের ডাক পড়েছে। রাম। একেই বলে শ্যামচাদ বরাত, সেই সঙ্গে আমাদের কথাটা একবার ভাব। রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয়, উলুখাগড়ার প্রাণ যায়। কর মেরে ছাতু করে দিয়ে গেল- শ্যাম। বাপের দেওয়া নামটা পর্যন্ত বদলিয়ে ছাড়ালে। রাম। সে ছাড়ালে-ছড়ালে, তাতে কিছু এসে যায়না। কারে পড়লে বাপ কি বলছে বাপের ঠাকুর্দার পর্যন্ত নাম পাল্টে যেতে পারে তা নয়—শেষকালে দেখ হ’ল কি?-তুমি যে খামাদ সেই শ্যামাদ রয়ে গেলে, আর আমি যে রামচন্দ্র সেই রামচন্দ্রই রয়ে গেলাম। পিটুনি খেলাম আমরা আর মাঝখান থেকে সীতারাম রায় হয়ে গেল রাঙ্গাবাহাদুর খাঞ্জা খা, আর তার শ্যাৎরা খেলে মনে ফলার। ১১
দ্বিতীয় অঙ্ক ]
সীতারাম
[তৃতীয় দৃশ্য
শ্যাম। এত—দাদা শাস্ত্রেই আছে, আঁবে দুধে মিশে গেল আঁটি প'ড়ে
গড়াগড়ি খেল।
রাম। আরে আঁটি হ'লেও তো বাঁচতুম-রাজার পাতের সামনে
দু’পাচবার গড়াগড়ি খেয়েও তবু সুখ পাওয়া যেত। কিন্তু আমরা
হ’লুম একেবারে যাকে বলে ইয়ে আর কি
শ্যাম। আঁবের খােসা।
রাম।
হ্যা তাই! স্রেফ, ফলটি খাবার আগে আমাদের ছাড়িয়ে ফেলে
দিলে। আঁটি হ’ল ঐ চচুড়, আর আঁশ হ’ল গঙ্গারাম,
একেবারে রাজার দাঁতের ফাকে ফাকে জড়িয়ে আছে।
শ্যাম। [ হাসিয়া ] তা যা বলেছ রামাদ দা। তাইত ভাবি, কেমন চট্ট
করে দেখ চন্দ্রচূড় হয়ে গেলেন মন্ত্রী, মৃন্ময় হলেন সেনাপতি
আর গঙ্গারাম হ’ল নগর রক্ষক।
রাম।
অথচ মজা দেখ, সেই গঙ্গারামকে নিয়েই যত কাণ্ড! তুই
একটু কষ্ট করে ম’রলে পারতিসতা নয় দেশশু সবাইকে
মারবার যােগাড় কল্পি
শ্যাম। যাক, তার ফলটা ভালই হ’ল দাদা—এখন বেশ নিশ্চিন্তি।
ভূষণা শুদ্ধ সবাই এখানে এসে হাজির হয়েছে, তা ছাড়াও যে
কতলােক আসছে তার ঠিক নেই।
রাম। কিন্তু চারিদিকে এখানে যেমন গড় আর দুর্গ তৈরী হচ্ছে
আবার না হাঙ্গামা বাধে দেখ।
শ্যাম। বাধলে ত’ ভারী বয়েই গেল। এ আর ভূষণার মাঠ নয় এর
মারধারে গড় আর পাচিল আবার তার ওপর ইয়া বড় বড়
ওই
দ্বিতীয় অঙ্ক ]
সীতারাম
[ তৃতীয় দৃশ্য
কামান। এখানে এলে আমিই মেরে হাড় গুড়াে করে দেবনা
চালাকী।
[ ঢােল বাজাইতে বাজাইতে ঢাকার প্রবেশ, সঙ্গে
ফৌজদারের সৈনিক, তাহার হাতে দোয়াত ও কলম।
সৈনিক চীৎকার করিয়া হাঁকিতেছিল।
সৈনিক।
ভূষণাতে এই সেদিনে হাঙ্গামা যা হল,
তার মধ্যে তােমাদের কে কে ছিলে বল ?
ফৌজদারের কড়া হুকুম, বলতে হবে না,
নামের সঙ্গে নাম মিললেই ফুরুবে হাঙ্গাম।
[ ঢাকে কাঠি দিল। হঠাৎ রামাদ ও
শ্যামাদের দিকে নজর পড়িতেই বলিল ]
এই যে আরও দুটি লােক পাওয়া গেছে। কি নাম তােমাদের ?
রাম। বলি, ব্যাপারটা কি কিছুতাে বুঝতে পাচ্ছিনে।
সৈনিক। ওপারে ভূষণা গায়ে সেদিন একটা হাঙ্গামা হয়েছিল; সেই
হাঙ্গামা করে অনেকে এখানে পালিয়ে এসেছে, তাই ফৌজদার
তােরাব খাঁ সাহেব সীতারাম রায়কে হুকুম পাঠিয়েছেন, সেই সব
লােককে ধরে পাঠিয়ে দিতে হবে।
শ্যাম। [ কাঁদ কাঁদ ভাবে ] আপনার তােরাব খর হয়ে বুঝি তাদের
ধরতে এসেছেন?
রাম। [ বাধ দিয়া।] আঃ! চুপ কর ! আগে কথাটা শুনি! তা হাঙ্গামা
করে পালালে ধরবেন বৈ কী! তা কি করে ধরবেন ?
সৈনিক। কেন, এর আর শক্ত কি ? ফৌজদারের কাছে তাদের নাম
৪৩
দ্বিতীয় ] সীতারাম [ তৃতীয় দৃশ্য লেখা আছে, এখানে সেই নামের লােক পাওয়া গেলেই ধরা পড়বে। রাম। তা বটে! অদ্ভুত আপনাদের ফৌজদারের মগজ ! তা’ রায়জী কি বলছেন? সৈনিক। ( ক্রুদ্ধ ভাবে ] রায়জী আবার কি বলবেন? তিনি আমায় খুঁজে নিতে বলেছেন। বাজে কথা বলে লাভ নেই, তােমার কি নাম বল ? [ কাগজ কলমে নাম লিখিবার উদ্যোগ | রাম। আজ্ঞে, তা লিখে নিন্! আমার নাম ভজহরি পাঞ্জা, পিতার নাম স্বর্গীয় ত্রিপুরারি পাঞ্জা, পিতামহের নাম ঈশ্বর সরপুরী পাঞ্জা প্রপিতামহের নাম রসবড় সৈনিক। থামঃ! নিবাস কোথায় বল ? রাম। নিবাস গুড়গুড়িপুর—মিঠেকড়া গ্রাম। সৈনিক। হাঙ্গামার বিষয় কিছু জান? রাম। [ সহাস্যে ] আজ্ঞে সেইটে জানবার জন্যেই ত’ বড় ইচ্ছে হচ্ছে চলুন না একটু দাওয়ায় বসে তামাক- সৈনিক। বকো মাৎ! তুমি যাও! ( শ্যামচাদের দিকে অগ্রসর হইয়া ] তােমার নাম? শ্যাষ। [ আর কঁদিয়া ফেলে সেইভাবে ] আস্তে আমার নাম গণেশ। বাবার নাম ধনেশ। [ ঢোক গিলিতে লাগিল] ঠাকুর্দার নাম কি যে বলে দাদা! [ কাতভাবে আমাদের দিকে চাহিল, হা হইতে মুখ তুলিয়া রামাদ চট, করিয়া বলিল ] রা। মরেশ। । ০৪
দ্বিতীয় অক]
সীতারাম
[ তৃতীয় দৃশ্য
সৈনিক। [ রামাদকে ধাকাইয়া উঠিল ] এই চোপরও! [ পুনরায়
খামাদকে ] বাড়ী,?
শ্যাম। বুড়ী গঙ্গার তীরে।
সৈনিক। এখানে কি কর ?
শ্যাম। আজ্ঞে, তামাক খাই।
সৈনিক। আরে আহাম্মক ! আমি তা জিজ্ঞাসা কর্জিনে! বলছি কি
কাজ কর ?
শ্যাম। কাজ ? দাদার পেছন পেছন ঘুরি আর
সৈনিক। থাম! [ ঢাকীর প্রতি ] চলহে চল এসব বাজে লােক বলে
মনে হচ্ছে, ঢাকটা বাজাতে বাজাতে ঐ মাঠটায় গিয়ে লােক
যােগাড় করবে চল।
[ ঢাকী ঢাক বাজাতে বাজাতে ও সৈনিক পুনরায় ছড়া
বলিতে বলিতে চলিয়া গেল।
রাম। ইস! শ্যামাদ, রগ ঘেসে বেঁচে গেছ।
শ্যাম। দাদা, তোমার কথাবার্তা শুনে আমি যেন কি রকম হয়ে গেলুম !
রাম। বুঝতে পাঙ্গো, ফৌজদারের বায়নাকা শুরু হ’ল কিনা ?
শ্যাম। বেশ বুঝেছি, এখন ঢাকে কাঠি পড়েছে এর পর পিঠে কাঠি
পড়বে। আর নয়-বাড়ীর দিকে চল।
[ উভয়ের প্রস্থান। যন্ত্র-সঙ্গীত সহযোগে দৃশ্যাম্ভর ]
তিীয় অঙ্ক]
সীতারাম
[চতুর্থ দৃশ্য
০
ভুথ দৃশ্য
গভীর বনমধ্যস্থ লক্ষ্মীনারায়ণজীর মন্দির
[ সীতারাম, রমা ও নন্দা ধীরে ধীরে মন্দিরের দিকে অগ্রসর হইতেছিলেন ।
সী। খুব সাবধানে এস! মন্দিরের কাছে আমরা এসে পড়েছি।
রমা। কী গভীর জঙ্গল। হ্যাগা, এই অন্ধকার বনের মধ্যে লক্ষ্মী-
নারায়ণজীকে রেখেছ কেন ?
সীতা। সমীনারায়ণজীর থাকবার ইচ্ছে হ’ল বলে। কেন তােমার কি
ভয় কচ্ছে?
রমা। [ ভীতভাবে ] ও মা, ঐ দেখ পিদিম হাতে কে লমীনারায়ণের
মন্দির থেকে বেরিয়ে আসছে।
[ দূরে প্রদীপ হাতে একটি মূর্তিকে দেখা গেল ]
না। [ বিস্মিতভাবে সত্যই ততা, ও কে ? ছােট বৌ, তুই আমার
কাছে আয় ! [ রমাকে কাছে টানিয়া লইল ]
সীত। দাড়াও তােমরা, আমি দেখছি ! [ অগ্রসর হইয়া ] কে তুমি?
[ কোন উত্তর আসিল না ] শীঘ্র উত্তর দাও, নইলে এই মুহূর্তে
আমি তােমায় হত্যা করবাে !
[ দূরে পাষাণের মত প্রদীপ হস্তে দণ্ডায়মান মুর্তি উত্তর
করিল ]
ফকির। আমি মানুষ।
সীতা। এদিকে এস ! [ ফকির ধীর পদক্ষেপে সীতারামের দিকে অগ্রসর হইলেন ]
কি উদ্দেশ্যে এই গভীর অরণ্যে তুমি একাকী ঘুরে বেড়াচ্ছ?
ফকির। উদ্দেশ্য আমার কিছুই নেই, আমি একজন পথিক মাত্র।
০৬
দ্বিতীয় অঞ্চ ] সীতারাম [ চতুর্থ দৃশ্য সীতা। পথিকের স্থান পথে, এই গুপ্ত মন্দিরের মধ্যে তার কি প্রয়ােজন? ফকির। আমিও যদি তােমাকে ঐ প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করি? সীতা। তুমি জান কার সঙ্গে তুমি কথা কইছছ? ফকির। জানি, রাজা সীতারাম রায়ের সঙ্গে। সীতা। বুঝতে পেরেছি তুমি তস্কর। লক্ষ্মীনারায়ণজীর অলঙ্কার চুরির লােভে গােপনে এই মন্দিরে প্রবেশ করেছিলে। ফকির। তুমি আমায় ভুল বুঝেছ রাজা। অতি নির্জন আশ্রয় স্থান বলে মাঝে মাঝে আমি এইখানে থাকি। সীতা। এইখানে থাক ? একথা আমার বিশ্বাস হয় না। ফকির। প্রমাণ চাও তাও দিতে পারি। সীতা। কি প্রমাণ? ফকির। প্রতিদিন তোমার মন্ত্রী চচুড় ঠাকুর অতি প্রত্যুষে ও সন্ধ্যায় এই ঠাকুরের পূজা করে যান, কিন্তু পূজার আয়ােজনের মধ্যে আমারও কিছু অংশ থাকে। সীতা। তিনি তাহলে তোমাকে চেনেন ? ফকির। না, তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয়ের সুযােগ হয়নি। সীতা। হু বুঝেছি, তুমি তাহলে তার গতিবিধি লক্ষ্য করে কোন ষড়যন্ত্রের আয়ােজন করছে; তবে তুমি শত্রুর গুপ্তচর ? ফকির। এ তােমার মিথ্যা ধারণা রাজা। আমি একজন মুসাফির ফকির মাত্র। সীতা। [ সবিস্ময়ে ) ফকির, মুসলমান। ফকির। যা রাজা, আমি মুসলমান। সীত। কী সর্বনাশ! ; ৭.:
দ্বিতীয় সৰু]
সীতারাম
[ চতু দৃশ্য
ফকির। [ মৃদু হাসিয়া একটু কাছে আসিলেন ] কেন, এতে সর্বনাশ কোন
খানে হত ?
সীত। ঠাকুরের মন্দিরের মধ্যে মুসলমান!
ফকির। তাতে দোষ কি রাজা? ঠাকুর কি সেজন্য অপবিত্র হয়ে
গেলেন।
সীতা। নিশ্চয়ই! তুমি মুসলমান, হিন্দুর ঠাকুরের মর্যাদা তুমি কি বুঝবে ?
তােমার সাহস ও স্পর্ধা দেখে আমি শুন্তিত হয়ে যাচ্ছি।
কিন্তু এই কার্যের জন্য তােমাকে কঠিনতম শাস্তি পেতে হবে।
ফকির। তুমি এদেশের রাজা, শান্তি তুমি অবশ্যই আমাকে দিতে পার
কিন্তু তোমারও তো অধীনে বহু মুসলমান প্রজা রয়েছে,
তাদেরও কি তুমি এই জাতি-ভেদবুদ্ধি দিয়ে শাসন করে থাক?
সীত।। না তা আমি করিনা, কিন্তু তাই বলে তাদের আমি
আমার ধর্মমন্দিরের ভেতরে প্রবেশ করতেও অধিকার দিতে
পারি না।
ফকির। বেশ! আমি যদি অন্যায় করে থাকি তার জন্য আমায় শান্তি
দাও ! কিন্তু তার পূর্বে তােমার কাছ থেকে কয়েকটি প্রশ্নের
উত্তর পাবার আশা করতে পারি কি?
সঙ্গত প্রশ্ন হলে নিশ্চয়ই তার উত্তর পাৰে।
ফকির। তোমাদের এ ঠাকুর কি ঠাকুর? আর ইনি কি করেন রাজা।
সীতা। ইনি না, জগতের সৃষ্টি স্থিতি প্রলয় কর্তা।
ফকির। ইনি দি সৃষ্টি স্থিতি এলয় কর্তা, তাহলে ইনি এই মন্দিরের মধ্যে
থেকেই সৃষ্টি স্থিতি এনয় করেন, না আর কোনও থাকার স্থান
এর কাছে?
সীতা।
দ্বিতীয় অ]
সীতারাম
[দুধ দৃষ্ট;
সীতা।
সীতা। ইনি সৰ্বব্যাপা, সর্বঘটে, সর্বভূতে ইনি আছেন।
ফকির। তাইলে আমাতেও তিনি আছেন?
সীতা। [অনেক চিন্তা করিয়া ] হ্যা তা অবশ্যই আছেন, তােমরা তাে
সে কথা মানি না।
ফকির। হিন্দুর মধ্যে যারা নাকি তারা কি এসব কথা মানে?
[ উত্তরের অপেক্ষায় সীতারামের দিকে ক্ষণকাল চাহিয়া রহিলেন, পুনরায়
বলিলেন। তারা যদি মন্দিরে আসে তাহলে মন্দির পবিত্র
হয় কি?
[ নিরুত্ত ভাবে চিন্তা করিতে লাগিলেন ]
ফকির। তােমার যুক্তি তাহলে কি রাজা? তােমাদের পরমেশ্বরকে স্পর্শ
করে আমি যদি অপবিত্র করতে পারি তাহলে তার চেয়ে
একবিষয়ে আমার বেশি শক্তি বল? উত্তর দাও না!
সীতা। না তা নয়। তবে কি জানেন, এ আমাদের দেশাচার সংস্কার।
ফকির। সংস্কার আর দেশাচারের বশীভূত হয়ে রাজত্ব করা চলে কি
বৎস! কোন সীণ ভিত্তির ওপর রাজ্য সংস্থাপন করলে তাতে
স্থায়ী হবেনা, হিন্দু মুসলমানকে যদি তুমি সমান করে না
দেখতে পার তাহলে এই হিন্দু মুসলমানের দেশে তুমিতাে রাজ্য
রক্ষা করতে পারবে না। দেশাচারের বশীভূত হয়ে ভেদবুদ্ধির
এই পাপকে প্রশ্রয় দিওনা রাজা!
সী। আপনি সত্য কথাই বলেছেন। আপনার কথায় আমার মনের
পাপ দূর হল। আপনি মুসলমান হলেও আজ থেকে আমি
আপনাকে শিক্ষাগুরু বলে বরণ করে নিলাম।
আশর্বাদ করুন।
[কষােড় করিয়া শিল্প নকৰিলে।
দ্বিতীয় অং] সীতারাম [ চতুর্থ দৃশ্য ফরি। তােমার মঙ্গল হক রাজা। এবার তুমি তােমার সেই সহ- ধৰিীদের নিয়ে দেবদর্শনে যাও, আমি অন্তরালে যাচ্ছি। [ ফকির একটু অগ্রসর হইতেই সীতারাম হার নিকটবর্তী হইয়া বলিলেন। সী। তার পূর্বে আমাকে একটা কথা দিয়ে যান ফকির সাহেব। ফকির। কি বল ? সীতা। আপনি আমার রাজধানীতে থাকুন! আমি ব্রা, হয়তাে আবার আমি ভুল করব কি আপনি কাছে থাকলে চিরদিনই এ-কথাটা আমার মনে থাকবে যে বাংলা দেশ হিন্দুর নয়, মুসলমানের নয়। হিন্দু-মুসলমান এই দুই মহাজাতির মিলন সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে আছে আমার এই বাংলাদেশ। চলুন আমার রাজদরবারকে আপনি অলত করবেন। ফকির। আমার কোন আপত্তি নেই, তবে তােমার নতুন রাজধানীর নাম পরিবর্তন করতে হবে রাজা। সীতা। কি নাম দেব বলুন? ফকির। মহম্মদপুর। সী। এ নাম কেন? ফকির। এ নাম এই কারণে যে মুসলমানও তােমাকে বিশ্বাস করতে পারবে যে তুমি হিন্দু-মুসলমানকে সমান চোখে দেখতে সত্যই সীতা। যেশ, আপনার আদেশ শিনােধাৰ্য্য! আমি কালই প্রভাতে এ রাজ্যের নাম পরিবর্তন করে মহম্মদপুর বলে ঘােষণা
দ্বিতীয় ]
সীতারাম
[চতুর্থ দৃশ্য
ফকির। তোমার কথায় আমি অত্যন্ত প্রীত হলাম বৎস, আমি ফকির
কোন নির্দিষ্ট স্থানে আমি বাস করি না..তবে আমি যেখানেই
থাকি প্রয়োজন হলেই তােমার পাশে এসে দাঁড়াবে। এ বিষয়ে
তুমি নিশ্চিন্ত থেকো! তাহলে এখন আমি যাই রাজা।
[ফকির প্রস্থানােত, ইতেই নলা ও মা
কাছে আসিল ]
নন্দা! যাবার আগে আমাদের দুজনকে আশীর্বাদ ক'রে যান বাবা।
ফকির। মা তুমি রাজমহিষী, মহিষীর ধর্ম পালন কোয়ে! তােমাদের
হিন্দুশাস্ত্রে স্বামীর প্রতি যা আচরণ করৰার নিয়ম আছে তাই
পালন করলে সুখী হবে, রাজারও মঙ্গল হবে।
[ মাকে দেখিয়া সস্নেহে)
তোমাকে কিছু ভীরু স্বভাব বলে মনে হচ্ছে মা, কিন্তু
বিপদে পড়ে কখনও ভয় কোরাে না, তাতে বড় অমঙ্গল ঘটে।
সর্বদা মনে রেখাে, তুমি রাজার ঘরণী, রাজার মহিষা, ভয়
তােমাকে করতে নেই। চিরায়ুতী হও মা!
[ আশীর্বাদ করিয়া প্রস্থান ]
সীতা। এইবার চল, আমরা মন্দিরে যাই।
( সকলে মন্দিরের ভিতরে প্রবেশ করিলেন অপু
যন্ত্রসঙ্গীত হইতেছিল-শঙ্কিত আবেগ লইয়া চন্দ্র
দুইজন রক্ষীর সহিত প্রবেশ করিলেন, হাতে চীনের
মাল)
চ।
তােরা তাহলে কি দেখেছিস ?
১ম রক। আমাদের চোখ যদি না প্রতারণা করে থাকে তবে নিশ্চয়
বলতে পারি সে মুসলমান ফকির।
তিীয় অ] সীতারাম [চতুর্থ দৃশ্য চ। তাহলে নিশ্চয় কোন কু-মতলব নিয়ে এখানে ঘােরা ফেরা করছে। সম্ভবতঃ খোঁজ পেয়েছে যে রাজা আজ একাকী রাজ- মহিষীদের নিয়ে রক্ষীত হ'য়ে দেবদর্শনে আসছেন তাই সে মুযযাগের অপেক্ষায় আছে। তােরা গােপনে কাছাকাছি লুকিয়ে থাক, আমি সঙ্কেত করলেই ছুটে আসবি। আমি মহারাজকে এ সংবাদ দিছি। [ রক্ষীয়ে স্থান মহারাজ, মহারা! সীতা। আঃ, পূজার সময় কে আমাকে জকে ? [ মন্দির হইতে বাহির হইয়া আসিলেন। ও গুরুদেব! আপনি? কিছু মনে কোেনা বস! আমি এক মহা বিপদের আশঙ্কায় তােমার পূজার ব্যাঘাত করেছি, এক মুসলমান ফকিরকে এইমাত্র মন্দিরের কাছ থেকে বীর যেতে দেখেছে। সম্ভবতঃ শতপক্ষের কোন লোক। পাছে তোমার কোন অনিষ্ট করে সেই ভয়ে আমি তােমাকে সতর্ক করে দিতে ছুটে এলুম। সীতা। আপনার এ কল্পনা অমূলক গুরুদেব। তিনি মুসলমান ফকির সত্য, কিন্তু তিনি লমীনারায়ণ প্রেরিত এক মহাপুৰুষ-আমারই রাজ্যের মঙ্গলকামনায় ছুটে এসেছেন। তার আদেশে আমি শ্যামপুরের নাম পরিবর্তন করে মহম্মদপুর নাম রাখতে স্বীকৃত হয়েছি, তিনিও তার সমস্ত শক্তি দিয়ে আমাকে সাহায্য করবেন বলে এতিতি দিয়ে গেছেন। চ। মুসলমানকে তুমি বিবাস কর ? চ।
দ্বিতীয় অঞ্চ।
সীতারাম
[চতুর্থ দৃশ্য
সীতা। এতদিন করিনি, কারণ এতদিন যে তাদের অন্তরের পরিচয়
টুকুও জানতে চাইনি গুরুদেব ? চিরদিনই যে তাদের দূরে
ঠেলে রাখতে চেয়েছি। কিন্তু তাদের বাদ দিয়ে চললে
আমার রাজ কোনদিনই পূর্ণতা পাবে না তা আমি আজ
অন্তরে অন্তরে উপলব্ধি করতে পেরেছি।
চ।
তােমার সঙ্কর শুভ সন্দেহ নেই—তবুও আমি বলবাে হিন্দু-
মুসলমানের মিলন অসম্ভব।
সীতা। সেই অসম্ভবের মূলে রয়েছে দুইজাতির মুষ্টিমেয় কয়েক স্বার্থপর
লােকের ষড়যন্ত্র। আমি তার মূল উৎপাটন ক’রবাে গুরুদেব।
আমি চাই তাদের নিয়ে রাজ্য গড়তে যারা শুধু হিন্দুর নয়,
মুসলমানের নয় সমগ্র দেশের। যারা হিন্দুর দুঃখ হ'লে তার
ব্যথা মােচন করতে ছুটে আসবে, মুসলমানের চোখে জল দেখলে
যারা নিজের হাতে তা মুছে দিয়ে যাবে। এ কাজে সহায়তা
করতে কি আপনি আমার পাশে এসে দাড়াবেন না?
সীতারাম তুমি সত্যই মহৎ! আমি পূর্বেও বলেছি আবার
বলছি তুমি আমাকে ত্যাগ না করলে আমি কোনদিনই তোমার
কাছ থেকে দূরে চলে যাবনা।
( বিপরীত দিক হইতে ফকিরের প্রবেশ
ফকির। আমিও না। [সীতারাম ফকিরকে দেখিয়া হৰোইলেন ]
সীতা। এই যে আপনি এসেছেন।
চ। ইনিই কি সেই ফকির ?
সীতা। , এদে, ইনিই সেই মহাপুরুষ!
সেই মহাপুৰুষ! আজ আমি ধন্য।
লক্ষ্মীনারায়ণের কপার আজ হিন্দু-মুসলমানের প্রতির ধারায় আমি
চ।
তিীয় অ]
সীতারা
[চতুর্থ দৃশ্য
অভিষিক্ত হয়েছি। আপনারা দুজনে থেকে আমায় আজ
আশীর্বাদ করুন যেন দেশের সেবার চেয়ে, জাতির সেবার চেয়ে
আর কোন কামনাই আমার জীবনে বড় হ'য়ে না ওঠে।
হাতঘােড় করিয়া শির নত করিলেন
চত্র। [ আশীর্বাদ করিয়া ] তােমার মনােবাহা পূর্ণ হ’ক সীতারাম !
ফকি। [হাত তুলিয়া তােমার জয় হক রাজা !
[ ধীরে ধীরে যবনলী িপড়িল ]
৫
মির্জা। তৃতীয় অঙ্ক প্রথম দৃশ্য শ্যামপুর–তােরাব খর কক্ষ [ তােরাব খা একটি মানচিত্র দেখিতেছিলেন সহসা মিজ্জা মহম্মদ প্রবেশ করিয়া আবাদন কৰিলেন ] মির্জা। জনাব ! তােরাব। এই যে মির্জা মহম্মদ তুমি এসেছ! কি সংবাদ ? সংবাদ বিশেষ জরুরী। নবাব মুর্শিদকুলী খাঁ হুকুম দিয়েছেন যে সীতারাম রায়ের রাজ্য আক্রমণ করতে যেন আর বিল হয়। সীতারাম এখন দিল্লীতে, এই সুযােগে যেন মহম্মদ পুরকে ছারখার করে দেওয়া হয়। তিনি আরও বললেন সীতারামকে আর অবসর দিলে সে এক বিরাট স্বাধীন-রাজ্য গড়ে তুলবে। তােরাব। স্বাধীন-রাজ্য গড়ে তুলবে আমি বেঁচে থাকতে ? তার আগে আমি তার সর্বনাশ করবাে সাম্রাজ্যের বনেদকে ভেঙে এড়িয়ে দেবার জন্যে আমি এখানে ফৌজদার হয়ে বসিনি মির্জা মহম্মদ, আমি একে আরও পাকা, আরও শক্ত করে যাব। পীর বকুল। [ পীর বসে প্রবেশ ] পীয়। জাহাপনা ! তােরব। ওদের আক্রমণ করতে আর আমাদের বাধা কি? পীর। বাধা আমাদের সৈয় সংখ্যা। সীতারাম রায় মহম্মদপুরের সকলকে যুদ্ধবিদ্যায় রীতিমত তালিম দিয়ে ঠিক করে ফেলেছে। সেইজ- তৃতীয় অঙ্ক] সীতারাম [প্রথম দৃশ্য তোরা। আরে রেখে দাও তােমার তালিম। এদেশের লােক আবার যুদ্ধ করবে—ওরা যুদ্ধের জানেই বা কি আর যুদ্ধ করলেই বা কবে? সীতারাম রায় ডাকাতি করে ভেবেছে সে ফৌজদার- কেও জব করতে পারবে। হু : [ পায়চারি করিতে লাগিলেন) পীর। আজ্ঞে শুধু তো এ দেশের লােক নয়। পশ্চিম থেকে সে দলে দলে রাজপুত আর ভােজপুরীদের আনিয়ে নিজের সৈন্যদের সঙ্গে মিশিয়ে ফেলেছে, তাছাড়া বহু মুসলমানও এখন তার দলে। তােৰ। পীর বক্স, মুসলমান বলে সে লােকগুলােকে আর ডেকোনা। হিন্দুর সঙ্গে যারা হাত মেলায় তারা কাফের শয়তান। আপনি যে-কোন নামেই তাদের ডাকুন জাহাপনা, তারা সীতারাম রায়কেই তাদের রাজা বলে জানে। তার জন্যে তারা জান দিতে কসুর করবে না। তােৰ। তাইতাে তাহলে তো বড় ভাবনার কথা হল। সীতারাম রায় যে আয়ােজনটা কিছু বেশী করে ফেলেছে। চতুর্দিকে গড় আর দুর্গ যে এত তাড়াতাড়ি করে ফেলবে তাতে আমি স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি। সে যে কত বড় ধূর্ত তার আর একটা প্রমাণ, ভূষণার সমস্ত দাঙ্গাকারীদের সে এতদিন লুকিয়ে রেখেছিল, এখন প্রকাশ্যে তার সেই রাজ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। গঙ্গারাম হয়েছে রাজধানীর পীর। মির্জা। তােরাব। ও, আমার হাত কামড়াতে ইচ্ছা করছে পীর বস, আমায় হাত কামড়াতে ইচ্ছা করছে। আমারই নিকিতা যে আমি
তৃতীয় অঙ্ক)
সীতারাম
[ প্রথম দৃশ্য
পীর।
এতদিন চুপ করে বসেছিলাম। দিল্লীর সম্রাটের কাছ থেকে
রাজা সনা এনে ফেলবার আগে তাকে যদি বিদ্রোহী প্রমাণ
করতে না পারা যায় তাহলে সমূহ বিপদ।
আক্ৰমণ আমরা করবােই। আর সপ্তাহ খানেক আপনি
অপেক্ষা করুন। আমি পশ্চিম থেকে দু’দল পাঠান সেনা
আনিয়ে ফেলবার ব্যবস্থা ক’চ্ছি। তারা এসে পড়লেই আমরা
আর মুহূর্ত বিলম্ব করবে না।
তােরাব। ইতিমধ্যে আমি তাহলে এক কৌশল করি। মহম্মদপুরের
আরও কাছাকাছি নদীর ওপারে গিয়ে তাঁবু ফেলি। ওরা
ভাববে ফৌজদার সাহেব আমােদ করতে বেরিয়েছে আরও
নিশ্চিন্ত থাকবে, তুমি সেই অবসরে যুদ্ধের সমস্ত আয়ােজন
করে ফেলবে।
আপনার এ প্রস্তাব খুবই ভাল। আমি তাহলে সৈন্যদের
ভেতরে ভেতরে ঠিক করতে থাকি। পাঠান সেনারা এসে
পৌছলেই মির্জা মহম্মদকে দিয়ে আপনাকে সংবাদ দেব ।
তােরার। সেই ভাল। মির্জা মহম্মদ।
জনাব !
তােরা। তুমি আপাততঃ পীর বসের সঙ্গে থাক। দেখাে কোনমতে
যেন আমাদের এ মতলবের কথাটা না ফাল হয়ে যায় ।
মিলা। বান্দা বেঁচে থাকতে তা হবে খােবাল, !
চলুন
। সাহেব।
[মির্জা ও পীর বসের একদিক দিয়া প্রস্থান, ও তােরা খাঁ ভিন্ন দিক দিয়া
চলিয়া গেলেন। যন্ত্রসঙ্গীত সহযােগে কৃতান্তর ]
পীর।
মির্জা।
विलोन फा
মহম্মদপুর-ল
[ একদল লােক ছুটিতে ছুটিতে যাইতেছিল।
১ম ব্যক্তি। পালাও পালাও!
২য় ব্যক্তি। কোথায় যাব ?
১ম ব্যক্তি। যেখানে খুশী। ফৌজদার সাহেব নদীর ওপারে গাড়ী
গাড়ী কামান নিয়ে এসে পড়েছে।
২য় ব্যক্তি। তাহলে চল! ঐ কারা আসছে সরে পড়, সরে পড়।
[ চচুড়, মৃন্ময় ও গঙ্গারামের প্রবেশ ]
চত্র। [ পলায়মান জনতা দেখিয়া ওরা কারা গঙ্গারাম?
শহরের কতকগুলি ভীতু লােক বলেই মনে হল। আমাদের
দূর থেকে দেখে ছুটে পালালাে।
মৃন্ময়।
ওরা এত ভয় পাচ্ছে কেন?
চ। বুঝতে পাচ্ছ না মৃন্ময়, পরাধীনতার তলে তলে এত দিন ধরে
যে ভয় জমা হয়ে উঠেছে তারই ওপর গড়ে তুলেছে ওরা
ওদের জীবন, ভূতের ভয়ে, বেতের ভয়ে, কুসংস্কারে ওরা এমন
অপদার্থ হয়ে গেছে যে মাটীর তলায় বাসা বেঁধে দিলে তবে
বােধ হয় ওরা একটু নিশ্চিন্ত থাকতে পারে।
আপনি যদি বলেন তাহলে আমি ওদের পালাবার পথ
একেবারে বন্ধ করে দিতে পারি।
চত্র। না তার প্রয়ােজন নেই। যারা যুদ্ধ বিদ্যা শিখেছে এমন কোন
লােককে নগর পরিত্যাগ করতে দেবে না। যদি কােন
করে যেতে চায় তাহলে তখুনি তাকে গুলি করবে।
৫৮
তৃতীয় অঙ্ক] সীতারাম দ্বিতীয় দৃশ্য মৃন্ময়। আচ্ছা গুরুদেব তােরাব খ। সত্যই যদি আমাদের আক্রমণ করতে আসছে, তাহলে আমরা আমাদের সৈন্য নিয়ে আগে তাকে আক্রমণ করি না কেন? আগে আক্রমণ করে আমাদের বৃথা সৈন্তক্ষয়ের প্রয়ােজন কি মৃন্ময় ? কিন্তু নদীর ওপারে যদি কামান সাজিয়ে দাড়াও তাহলে কার সাধ্য নদী পার হয়? তা সত্য, তােরাব খ। এতখানি দুঃসাহস করবে না বলেই মৃন্ময়। মনে হয়। চন্দ্র। মৃন্ময়। আর যদিই বা তা করে তাহলে পরাজয় তার অনিবার্য। যাক সমস্ত প্রস্তুত রেখ, আমাকে না জানিয়ে কোথাও যেওনা। মনে রেখে মৃন্ময়, রাজা সীতারাম রায়ের মর্যাদা রক্ষার ভার সে তােমাদের ওপর দিয়ে নিশ্চিন্তে দিৱী যাত্রা করেছে। জীবনের দীপশিখা নিভে যাবার আগে সে মৰ্যাদা তার সেনাপতির হাতে ক্ষুঃ হবে না গুরুদেব ! (খয়ের প্রস্থান ] গঙ্গারাম, তোমাকে আর নতুন করে বলার কিছু নেই। একটি মুর্তের জন্যও অসতর্ক হয়ােনা। আমি চর পাঠিয়েছি সংবাদ নিতে তুমিও সন্ধান রাখ কোন দিক থেকে তার আক্রমণের সম্ভাবনা। আমি দেখি গুপ্তচর ফিরে এলাে চ। কি না! আপনি নিশ্চিত থাকুন! [ চচুড়ে স্থান ও বিপরীত দিক দিয়া মুরলার প্রবেশ [ মুলার দিকে অগ্রসর হইয়া ] কে, কে তুমি?
তৃতীয় অ]
সীতারাম
[দ্বিতীয় দৃশ্য
। আমি যে হইনা কেন তাতে আপনার অত দরকার কি বাপু?
বরং ভিসা কন আমি কি চাই? •
বাজে কথা রাখ। তুমি স্ত্রীলােক হয়ে রাজপথে এত রাত্রে
একাকী ঘুরে বেড়াচ্ছ কেন ? আজকাল কি সময় পড়েছে
জান না?
মুর। ওমা, তা আর জানি না ? জানি বলেই তাে আপনার খোজ
করতে বেরিয়েছি?
গঙ্গা। আমার খোঁজ করতে বেরিয়েছ ? মিথ্যা কথা, আমাকে তুমি
চেননা।
মুরলা। আপনিই তো সহরের মালিক গাে। তা কি আর আমি
জানি না দাস মশাই।
বে। যদিই বা জানতাহলে এখানে যে আমি আসবাে তা’
তুমি কি করে জানলে?
মুরলা। আমি অনেকক্ষণ ধরে আপনাকে যে অলিতে গলিতে খুজে
বেড়াচ্ছি। আপনার বাড়ীতেও গেছলুম।
কেন?
মুরলা। এইটেই তাে আগে জিজ্ঞেস করা উচিত ছিল! আপনি একটা
দুঃসাহসিক কাজ করতে পারবেন?
কি?
মুরলা। আমি আপনাকে যেখানে নিয়ে যাব সেখানে এখুনি যেতে
পারবেন ?
কোথায়?
মরল। ' আপনাকে আগে 'নবাে না।
[ৰিতীয় দৃশ্য
তৃতীয় অ]
সীতারাম
গা।
[ কুদ্ধ ভাবে সত্য কথা বল! কি উদ্দেশ্যে তুমি আমার
কাছে এসেছ? তা না হলে এখুনি তােমাকে বন্দী করে
নিয়ে যাব!
মুরলা।
[ হাসিয়া উঠিল ] হাঃ হাঃ হাঃ! আপনার মত ভীতু লােক যা
সহর রক্ষে করবে, তা আমি বেশ বুঝতে পাচ্ছি।
গা। তুমি দেখছি অত্যন্ত বাচাল। এখন সত্য বল তোমার
নাম কি ?
মুরলা। আমার নাম মুরলা, আমি রাজবাড়ীর দাসী-বিশ্বাস না হয়
আমার সঙ্গে আনুন !সাহস আছে?
চল দেখে আসি !
[ উভয়ের প্রস্থান, যন্ত্রসঙ্গীত সহযোগে দৃশ্যান্তর ।
তৃতীয় অৰু]
সীতারাম
[তৃতীয় দৃশ্য
তৃতীয় দৃশ্য
[ হাতঘােড় করিয়া একমনে ঠাকুরকে ডাকিতেছে ।
রমা। ঠাকুর! ঠাকুর! আমার ছেলেকে বাঁচিয়ে রাখফৌজদার
এসে যদি আমাদের মেরে ফেলে তাহলে আমার খােকাকে কে
দেখবে ঠাকুর? লক্ষ্মীনারায়ণজী! এ বিপদ থেকে তুমি আমাদের
উনার কর।
[ চক্ষে অঞ্চল দিল।
[ নন্দার প্রবেশ ]
না। হারে হােট বৌ, তুই কি কিছুতে শান্ত হৰিনা? দিনরাত
শুধু এই রকম ভয়ে ভয়ে কাটাবি? এতরাত হ’ল তৰু এখনও
তুই শুনি, উনি ফিরে এসে এসব শুনলে আমাকে কি
বলবেন বলতো।
রুমা। আমার যে ভয় করছে দিদি। সারারাত ভয়ে আমি চোখের
পাতা ফেলতে পারি না-আচ্ছা উনি এখন কেন দিলী
গেলেন দিদি?
না। ওঁর কাজ উনিই জানেন। আমরা তার কি বুঝব বােন ?
রমা। তা এখন যদি ফৌজদার আসে তাহলে কে পুরী রক্ষা করবে?
না। বিধাতা করবেন।
রণা। আচ্ছ ফৌজলার যদি আসে, তাহ'লে সবাইকে মেরে ফেলবে?
যে শজ সে কি আর কাউকে দয়া করবে?
রমা। আমাদের নয় মেরে ফেলবে তাতে কিছু এসে যায় না, কিন্তু
ছেলেপুলেদের ওপরও কি দয়া করবে না ?
তৃতীয় অঙ্ক ]
সীতারাম
[ তৃতীয় মৃ
রমা।
না। ওসব কথা কেন মুখে আনিস বােন? বিধাতা যা কপালে
লিখেছেন তাই হবে। ওসব কথা যাক, যত ভাববি তত ভাবনা
বাড়বে। তার চেয়ে আয় আমার ঘরে, দু' একদান পাশা
খেলবি, মনটা হাকা হয়ে যাবে।
তুমি চল, আমি যাচ্ছি।
না। ঠিক আসবি তাে? তা না হলে আমি আবার কোন সময়
ঘুমিয়ে পড়বে।
রমা। আচ্ছা যাচ্ছি, তুমি চলনা। [ নন্দার হন।
না চলিয়া গেলে
রমা ধীরে ধীরে বাহিরের দিকে উকি মারিয়া দেখিয়া
আসিল না চলিয়া গিয়াছে কি না। ফিরিয়া আসিতেছে
এমন সময় মুরলার প্রবেশ ]
মুরলা। দিদিমণি, এসেছে। ও, কি করে যে এনেছি।
রমা। এসেছেন! তুই চুপি চুপি তাকে এই ঘরে নিয়ে আয়। আমি
ওদিকটা একবার দেখে আসি, আর দিদিকে ঘুমুতে বলে
দিইগে।
মুরলা। আচ্ছা-
[ মুরলা ও রমার ভিন্ন ভিন্ন দিক দিয়া এস্থান। পরেই
গঙ্গারাম ও মুরলার প্রবেশ। গদাম অত্যন্ত শকিভাবে
এবেশ করিল।
আসুন রক্ষী মশাই, এইখানে একটু বসুন।
[ একটি আসন দেখাইয়া দিল )
গঙ্গারাম। তুমি আমায় এখানে নিয়ে এলে কেন? না—এক মুহূর্ত আমি
এখানে থাকতে পারিনা, তুমি আমায় বাইরে নিয়ে চল।
মুর। খাৰুৰেন না কেন নি? ভয়টা কিসের?
মুরলা।
মুরলা।
মুরলা।
তৃতীয় অঙ্ক )
সীতারাম
[ তৃতীয় দৃষ্ণ
গঙ্গা। তুমি কি জাননা এটা রাজার অপুর? বিনা অনুমতিতে
আমাদের এখানে আসা অপরাধ ।
কার হুকুম চাই ?
রাজার।
মুরলা। তিনি তো এখানে নেই, রাণীর হুকুম হলে চলবে?
গল। ‘া তা চলতে পারে।
তিনিই হুকুম দিয়েছেন তবে আপনাকে এখানে এনেছি।
তানা হলে আমি তাে আর দামী বই আর কেউ নই।
গঙ্গা। কিন্তু একথা প্রকাশ পেলে মহা অনর্থের সৃষ্টি হবে।
মুরলা। প্রকাশ পেলেই হ'ল কি না? আর কে জানবে? খিড়কির
ঐ ভােজপুরী দরােয়ান? ও আমার মুঠোর মধ্যে। তাছাড়া
নিজের কাণেই তাে শুনলেন যে আপনাকে আমার ভাই ব'লে
নিয়ে এলাম।
কিন্তু আমাকে কি প্রয়ােজন থাকতে পারে রাণীর?
তা রাণীর নিজের মুখেই শুনবেন।
কোন্ রাণী আমায় ডেকেছেন ?
মুরলা। রমারাণী। যিনি হােট-বাজার সবচেয়ে আদরের। আপনি
বসুন আমি এখুনি তাকে পাঠিয়ে দিচ্ছি। [ মুরলার প্রধান ]
প্রগলভা এক পরিচারিকার কথা শুনে এখানে এসে ভাল
করিনি। আমি আর ভাই, তবুও রাজভৃত্য। ভৃত্যের উচিত
নয় এর শয়ন কক্ষে প্রবেশ। কিন্তু ফিরেই ৰা ৰাৰ ক্ষে
মুলার সাহায্য ছাড়া এখন তো আবারও কোন
উপায় নেই।
মুরলা।
তৃতীয় অঙ্ক)
সীতারাম
[ তৃতীয় দৃশ্য
[ মুৱলা ও পশ্চাতে রায় প্রবেশ ]
মুরল। ছােট রাণী এসেছেন, কোতােয়াল মশাই।
মুরলার পরিচয় দিয়া এস্থান ।
রমা। [ নমস্কার করিল ও গঙ্গারাম নমস্কার করিয়া মাথা হেঁট করিয়া দাঁড়াইল
বন!
ঠিক আছি। আমাকে আপনি স্মরণ করেছেন?
রমা। হ্যা, বড় বিপদে পড়ে আপনাকে আমি ডেকে পাঠিয়েছি।
আপনি কিছু মনে করবেন না। আপনি এর দাদা আমারও
সেই সম্পর্কে বড় ভাই, তাই এমন সময়ে আপনাকে আমি
ডেকে আনতে সাহসী হয়েছি।
আপনি আমাদের কী-ভৃত্যকে যখনি আদেশ করবেন
তখনি সে হাজিরা দিতে বাধ্য।
রমা। মুরল ব'ললে প্রকাশ্যে আপনি হয়তাে আসতে চাইবেন না,
তাই আমি আপনাকে গােপনে ডেকে পাঠিয়েছি। আপনি
আমার ভাই, আমায় রক্ষা করুন।
[ কাকুতি করিয়া হাতঘােড় করিল ]
গঙ্গা। মহারাণী ! দাসকে অপরাধী করবেন না। বলুন আমাকে
কী করতে হবে!
রমা। শুনছি ফৌজদার তোয়াব খাঁ মহম্মদপুর লুট করতে আসছে,
আমাদের নাকি খুন করে সহর পুড়িয়ে দিয়ে চলে যাবে।
এগৰ ৰাকে এনে বিশাল করেন কেন মহারাণী? এই
দুর্ভে নগরে প্রবেশ করা তার পক্ষে অসম্ভব! আপনি
নিশ্চিত থাকুন!
তৃতীয় অঙ্ক) সীতারাম [ তৃতীয় দৃশ্য রমা। রমা। রমা। ধরুন যদি এ নগর রক্ষা করা না যায় ? তাহলে প্রাণ দেব! তার চেয়ে এক কাজ করুন না, আপনি ফৌজদারের সঙ্গে চুপি চুপি দেখা করে বলুন না যে তােমরা যদি কাউকে প্রাণে মার তাহলে তােমাদের হাতে আমরা কেনা দিয়ে দেব। তাহলে আমরা সকলে বেচে যাই। মহারাণী ! আপনি একি বলছেন? আমার কাছে যা বলেছেন বলেছেন আর কাউকে একথা বলবেন না। শত্রুর হাতে রাজ্য তুলে দেওয়ার চেয়ে মৃত্যু ঢের ভাল। সে কাজ যদি কেউ করতে যায় তাহলে নিজের হাতে আমি তাকে হত্যা করতেও দ্বিধা করবে না। তাহলে কি কোনও উপায় নেই ? আমার ছেলেকে কি কিছুতেই বাঁচাতে পারবো না? আপনিও কি দয়া ক'রবেন ? [ রমার কণ্ঠস্বর অশ্রুতে ভারী হইয়া আসিল ] আপনার ছেলের জন্যে আপনি ভয় পাচ্ছেন? আচ্ছা, আমি যদি আপনাদের স্থানান্তরে নিয়ে যেতে চাই আপনি যেতে রাজী আছেন । হঁ্যা, বাপের বাড়ী নিয়ে গেলে আমি যেতে পারি। কিন্তু কি বলুন? বড়রাণী আর ঠাকুর মশাই যে যেতে দেবেন না। তাহলে তাে লুকিয়ে নিয়ে যাওয়া ছাড়া আর কোন উপায় নেই। বেশ—আমি আপনাকে কথা দিচ্ছি যে যদি তেমন কোন বিপদ দেখি তাহ'লে নিজে এসে আমি আপনাদের নিয়ে যাব। গঙ্গা। রমা। রমা।
তৃতীয় অঙ্ক ]
সীতারাম
[ তৃতীয় দৃশ্য
রমা। আমি কি করে খবর পাব?
মুরলাকে দিয়ে খবর দেব—তবে মুরলা যেন গােপনে আমার
সঙ্গে দেখা করে। কারণ বুঝতে পাচ্ছেন এসব কথা
জানাজানি হলে আপনার ও আমার দু’জনের পক্ষেই
অমঙ্গল।
রমা। কেউ জানতে পারবে না। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন! আপনি
আজ আমাকে আশা দিয়ে প্রাণে বাঁচালেন। চিরদিন আমি
আপনার দাসী হয়ে থাকবাে !
[ ‘দাসী’ শুনিয়া গঙ্গারাম যেন সচকিত হইয়া উঠিল, বলিল ]
আমি তাহলে এবার যেতে পারি ?
রমা। হ্যা, একটু অপেক্ষা করুন, আমি মুরলাকে পাঠিয়ে দিচ্ছি।
[ রমার প্রস্থান )
গঙ্গা।
[ চিন্তাবিত ভাবে ] দাসী হয়ে থাকবাে? দাসী ! [ সহসা যেন সম্বিং
পাইয়া ] না--না এ কি ভাবছি আমি! রাজার গৃহিনী, আমার
প্রভুপত্নী ! সেকথা মনে করাও পাপ ।
[ মুরল মৃদু হাস্য সহকারে প্রবেশ করিল। গঙ্গারামকে
চিন্তাবিত দেখিয়া সে বলিয়া উঠিল ।
মুরলা। কি রক্ষী মশাই, কি ভাবছেন?
গঙ্গারাম। [ সচকিত ভাবে না-না, ও মুরলা এসেছ চল!
[ যাইবার জন্য ব্যস্ত হইয়া উঠিল ]
চলুন। [ দু’ এপদ অগ্রসর হইয়াই পিছনে গঙ্গারামের দিকে পুনরায়
তাকাইয়া সহাস্যে বলিল । আবার আসবেন তাে ?
গঙ্গারাম। [ অপ্রস্তুত ভাবে ] নানা—আবার আমি কেন আসবে?
!
মুরলা।
তৃতীয় অঙ্ক ]
সীতারাম
[ তৃতীয় দৃশ্য
মুরলা। ঠিক আসবেন গাে- ঠিক আসবেন।
গােলাপকে একবার
দেখে কি দেখার সাধ মেটে ?
গঙ্গারাম। মুরলা, মিনতি কর্জি আমায় বাইরে নিয়ে চল।
মুরলা। মিনতিটা আর কার জন্যে রেখে আমাকে খুশী হয়ে বখশিস
করবেন তাতেই আমি দূতিগিরি করব।
গঙ্গা। তুমি কি ব’লচো মুরলা?
মুরলা। কিছু না—আনুন! ( গঙ্গারামের দিকে একবার কটাক্ষপাত করিয়া
তাহার শােচনীয় অবস্থাটা যেন বুঝিয়া লইল। তাহার পর তাহাকে লইয়া
বাহির হইয়া গেল। যন্ত্রসঙ্গীত সহযােগে দৃষ্ঠান্তর ]
তুথ দৃশ্য
মহদপুর পথ
[ জনৈক বৈরাগীয় গান গাহিতে গাহিতে প্রবেশ
বাউল সুর
(ও মন) পিছল পথে যাসনে আঁধার রাতে
চারিধারে কঁাটার বেড়া
কখন ফুটবে চরণ পাতে।
(ভােলা মন) পাখীর মত পড়াই কত তােকে
একটু পরে সবই ভুলিস, চলি আপন রােখে।
আমার কথা ভুলিস্ যদি
ঠবি প্রতি হাতে।
অন্ধকারে মােহের ঘােরে
ছুটিসনি মন অমন কোরে
মিথ্যে মায়া ভােলায় তােরে
ভুলিনি কো তাতে।
[ বৈরাগীর প্রস্থান ও জয়ন্তী বিপরীত দিক দিয়া প্রবেশ করিল।
শ। আবার আমরা সহরে এসে পড়লুম।
জয়। কেন সহ কি আর ভাল লাগে না ?
না। কোলাহল থেকে দূরে ছিলুম সেই বেশ ছিল। পাখীর
গানে কান ভ'রে উঠতে-নদীর কলতানে প্রাণ জুড়ােতত সেই
বেশ ছিল বােন—সেই বেশ ছিল।
তৃতীয় অঞ্চ }
সীতারাম
[ চতুর্থ দৃশ্য
এখানে যদি তােমার স্বামীর কদর শুনতে পাও তাহলে কি
ভাল লাগবে না?
কি জানি অনেক দিন তাে সে কর শুনিনি, মনে পড়ে না।
কিন্তু হঠাৎ তার কথা তুমি আবার তুলছে কেন জয়ন্তী ?
তার সঙ্গে যে তােমাকে একবার দেখা করতে হবে। তাই তো
এত পথ ঘুরে তােমাকে আমি তার এই নূতন রাজ্য মহম্মদপুরে
নিয়ে এসেছি।
সে কি! গুরুদেব কি আমাকে তার সঙ্গে দেখা করবার
অনুমতি দিয়েছেন?
দিয়েছেন বৈকী। তাছাড়া আমাকেও বলেছেন তােমার সঙ্গে
আর এই
মন্ত্রঃপূত ত্রিশূল দিয়েছেন আমাদের
রক্ষা করতে।
বি-
কিন্তু কি ?
যদি দেখা হলে আর তিনি আমায় ছাড়তে না চান।
ছাড়বেনই বা কেন? আর তুমি ছেড়ে আসবেনই বা কেন ?
আমি যে তােমার শিষ্যা সন্ন্যাসিনী। আমাকে নিয়ে তিনি
কি আর সুখী হবেন, না আমিই রাজাধিরাজকে পেয়ে
যেতে।
জয়।
সুখী হব?
সুখ দুঃখের ভাবনা তােমার নয় আমারও নয়-সে ভাবনা-
বিধাতার। এখন চল সন্ধ্যা হয়ে এল, এই খানেই কোথাও
আয় খুলে নি।
[ ও জয়ন্তীর প্রস্থান ]
তৃতীয় অঙ্ক]
সীতারাম
[ চতুর্থ দৃ
[ চন্দ্রচূড়, মৃন্ময় ও গঙ্গারামের প্রবেশ ]
চ। সহরের অবস্থা তাহলে এখন ভালই বুঝছো ?
গঙ্গা। আমার তাে তাই অনুমান হয়। বাজে লােকের ভীড় খুৰ
কমে গেছে, এখন যারা আছে তারা প্রত্যেকেই কাজের।
মৃন্ময়।
আচ্ছা গুরুদেব! তােরাব খা আর অগ্রসর হ’ল না কেন আমি
তাই ভাবছি। নদীর ওপারে সে কয়েকজন নর্তকী নিয়ে খুব
আমােদ প্রমােদ করছে শুনতে পেলুম। এর কারণ কি ?
চন্দ্র। কারণ অবশ্যই কিছু আছে। আমি তার কাছে এক প্রস্তাব করে
পাঠিয়েছি তাতে সে খুসী হয়েছে খুব।
মৃন্ময়। কি প্রস্তাব ?
চন্দ্র। আমি তাকে বলে পাঠিয়েছি যে আমাদের কেল্লা তােমায় বিক্রি
ক’রবাে কতটাকা দেবে বল ?
গঙ্গা।
সে কি ?
মৃন্ময়। (ক্ষুব্ধভাবে আপনি কি বিশ্বাসঘাতক হবার সংকল্প করেছেন?
চন্দ্র। মূখ! এটুকু বুঝতে পাচ্ছনা দরদস্তুর চালাতে চালাতে সময় নিতে
থাকবে—ইতিমধ্যে রাজাও সনদ নিয়ে ফিরে আসবেন।
গঙ্গা। আপনার এ উদ্দে যদি সে টের পায় ?
চ। অসম্ভব! একথা তুমি, আমি আর মৃন্ময় জানলুম-আর জানেন
ফকির সাহেব। তিনি আমাদের রাজ্যের হিতাকাঙ্খী, সে জন্য
তার কাছ থেকে কোন বিপদের সম্ভাবনা নেই।
মৃন্ময়। তাহলে এখন আমাদের কর্তব্য।
চ। যেমন সতর্কভাবে আমরা আক্রমণ প্রতিরােধের আয়ােজন
করে চলেছি তেমনি ভাবেই চলবে।
তৃতীয় অঙ্ক ) সীতারাম [ চতুর্থ দৃশ্য [ মুরলার হাসিতে হাসিতে প্রবেশ ] মুরলা। [তীতভাবে আমি গােবিন্দের মাসী বাবা। বাড়ী যাবার পথ হারিয়ে ফেলেছি। রাত্তিরে সব বাড়ীই এক রকম দেখছি কিনা। &। এ সময় রাত্রিকালে স্বীলােক একা বেরিয়েছ কেন? তুমি কোথায় থাক? মুরল। আমি এই কাছাকাছি থাকি বাবা, সেই জায়গাটার কাছ বরাবর গেলেই আমি ঠিক যেতে পারব। আশ্চৰ্য্য ! গঙ্গারাম, ওর বাসা কোথায় অনুসন্ধান করে ওকে পৌছে দিয়ে আসবার ব্যবস্থা কর। আমরা যাই- এস মৃন্ময় ! [ চচুড় ও ন্মিয়ের প্রস্থান । মুরলা। [ খিল খিল করিয়া হাসিয়া উঠিল ) চুপ! কেউ শুনতে পাবে। মুরলা। কেন এত ভয় কিসের? এতত আর রাজবাড়ীর অন্দর নয় ? রাজবাড়ীর অন্দরের চেয়ে তােমাকে আমার ভয় বেশী। মুরলা। তা তাে হবেই। এখন সেখানে পাঁচবার যাতায়াত করেছ ভয় ভেঙে গেছে কিন্তু আমি না থাকলে সে পথ চেনাতত কে? তবু তাে তুমি আমায় বিশ্বাস করে এখন কোন কথাই বলনা! গঙ্গা। নানা বিশ্বাস আমি তােমায় খুব করি, তবে কি জান মুরলা অনেক গােপন কথা থাকে সেটা তাকেই শােনাতে হয়। মুরলা। কিন্তু আর তো সে পথ বন্ধ ! १२
তৃতীয় অঙ্ক)
সীতারাম
[ চতুর্থ দৃশ্য
গা। কেন ?
মুরলা। পাঁড়েজীর সন্দেহ হ'য়েছে।
আমি যদি তাকে আমার পরিচয় দি।
মুরলা। তাহলে তাে আরও ভাল, যেটুকু কেলেঙ্কারীর বাকী আছে
সেটুকু পূর্ণ হবে।
আমি তো কোন মন্দ উদ্দেশ্য নিয়ে সেখানে যাচ্ছি না ।
মুরলা। যে উদ্দেশ্য নিয়েই যাও! পাঁড়েজী তােমায় ঢুকতে না দেওয়ায়
রাণীরও মনে ভয় হয়েছে। তিনি আর দেখা করবেন না।
গঙ্গা। কিন্তু আমার যে কতকগুলি বিশেষ দরকারী-কথা বলবার ছিল।
তার কাছে আর একবার নিয়ে যেতে পার মুরলা? আমি
সেগুলাে ব'লে আসি।
মুরলা। তার ফল যা হবে জানি, নৈবিদ্যির কলাটি। [ বৃদ্ধাঙ্গু দেখাইল
সে কি !
মুরলা। হ্যা, ছােটরাণী আরাম হয়ে গিয়েছেন।
তার কি অসুখ করেছিল?
মুরলা। হ্যাগাে-বাতকের ব্যামাে। তা না হলে তুমি কি অন্দরে
ঢুকতে পাও?
কেন আমি কি ?
মুরলা। তুমি কি সেখানকার যুগ্যি?
তবে আমি কোথাকার যােগ্য বলে তােমার মনে হয়?
মুরলা। এই ছেড়া আঁচলের। বাপের বাড়ী নিয়ে যেতে হয় তাে
আমাকে নিয়ে চল, অনেকদিন মা বাপকে দেখিনি।
[ হাসিয়া দ্রুত এস্থান ।
তৃতীয় অঙ্ক। সীতারাম [ চতুর্থ দৃষ্ঠ গঙ্গা। বলে। ও এতখানি অপমান! দাসীকে দিয়ে আমায় অপমান করতে পাঠিয়েছে। কিন্তু মুখ রমণী তুমি জাননা যে নিজের হাতে আমার মনে যে আগুন তুমি জেলে দিয়েছ তাতে তােমায় পুড়তে হবে। [ অস্থিরভাবে পায়চারি করিতে লাগিল, বন্দে আলির প্রবেশ ] এই যে আপনি এখানে ? কদিন থেকে আপনি আহার নিদ্রা ত্যাগ করে সহর পাহারা দিচ্ছেন, এইবার একটু বিশ্রাম করুন হুজুর, আমরা তত আছি। বিশ্রাম ক’রবাে-বিশ্রাম ক’রবাে সময় এলে আজ নয়। আপনাকে এত উত্তেজিত দেখছি কেন হুজুর। উত্তেজনার কোন কারণ ঘটেছে বলে আলি। গঙ্গা। বলে। গঙ্গা। বলে। কি কারণ হুজুর? গঙ্গা। বলে। গঙ্গা। বলে। গঙ্গা। তুমি কখনাে কোন নারী কর্তৃক প্রতারিত হয়েছ ? নারীর প্রতারণা? হ্যা, সুন্দরী কোন নারীর ? কোন নারীর কাছে কোনদিন আমি প্রার্থনা নিয়ে উপস্থিত হইনি তাই প্রতারিতও হইনি। কিন্তু এ এমন নারীর কথা বলচি, যাকে একবার দেখলেই পায়ে লুটিয়ে পড়তে ইচ্ছা হয়—ধর্ম, অধৰ্ম্মের, পাপ পুণ্যেব বিচার ভুলে গিয়ে তাকে আপনার ক'রে নেবার জন্যে চিত্ত চঞ্চল হয়ে ওঠে। তাহলে তাে সে নারী নয় হুজুর হুরী ! তাদের কাজই হজুর ছলনা, প্রতারণা! পুরুষদের নিয়ে ছিনিমিনি খেলা। বলে। ৭৪ তৃতীয় অরু] সীতারাম [চতুর্থ দৃ গঙ্গা। গঙ্গা। বলে। গঙ্গা। বলে। গঙ্গা। এ খেলায় কি তাদের পরাজিত করা যায় না? আমি তো কখনও সে খেলা খেলিনি হুজুর। কিন্তু আমাকে সে কিছুদিন ধরে খেলিয়েছে। আমার চিত্ত- কাননে সে তার রূপের আগুন ধরিয়ে দূরে দাঁড়িয়ে তাই দেখচে-তার ঠোটে ব্যাঙ্গের হাসি, চোখে নির্মম বিদ্রুপ । তার রূপের গর্ব, ক্ষমতার আস্ফালন চূর্ণ করে আমি তা ধূলােয় মিশিয়ে দেব, বন্দে আলি। আপনার পক্ষে তা অসম্ভব নয়, কারণ আপনিও অসাধারণ রূপবান। বন্দে আলি ! আদেশ করুন। তােমাকে একদিন আমি বাঁচিয়েছিলুম তার পরিবর্তে আজ আমাকে একটা ভিক্ষা দেবে ? কি বলছেন হুজুর, গােলামকে হুকুম করুন ! শপথ কর আমি যা ব’লবাে-তা গােপনে আমার জন্যে তুমি করবে? খােদার নাম নিয়ে বলছি আপনার জন্য জান দোব। আমার একটা গােপন সংবাদ নিয়ে তোরাব খার শিবিরে আজ তােমায় যেতে হবে। [ বিস্মিতভাবে ] তােরাব খার শিবিরে ? হ্যা, অত্যন্ত গােপনে। তুমি আগে যাবে তারপর তােমার সঙ্কেত পেলেই আমিও সেখানে যাব। আপনিও যাবেন ? এই বান্দ। গঙ্গা। বলে। গঙ্গা। গঙ্গা।
তৃতীয় অঙ্ক ]
সীতারাম
[চতুর্থ দৃশ্য
গঙ্গা।
গঙ্গা।
বলে।
হা, তুমি বিস্মিত হ'চ্ছ?
না এখন বুঝতে পারচি—প্রতারণার প্রতিশােধ!
চুপ বলে আলি।
আমি ভুলিনি হুজুর, আপনি একদিন আমার জীবন রক্ষা
করেছিলেন। আর কেউ একথা জানবে না। চলুন
তােরাব খাকে পত্র লিখে দেবেন। গােলাম তা' বয়ে নিয়ে
যাবে।
[ উভয়ের এস্থান-সঙ্গীত সহযােগে দৃশ্যান্ত ]
পম দৃশ্য
তােয়াব খার শিবিরাভ্যন্তর
[ তােব খাঁ ও মির্জা মহম্মদ কথা কহিতেছিলেন ।
তােব। তুমি দেখে নিও মির্জা মহম্মদ। আমি সীতারামকে বিদ্রোহী
প্রমাণ করবেই। তখন বাদশাহ, বুঝবেন কাকে তিনি
মহারাজাধিরাজ সনদ দিয়েছিলেন।
মির্জা। কিন্তু আপনি এখনও আক্রমণ করছেন না কেন ?
তােরাব। আর দুদিন অপেক্ষা, বিনা যুদ্ধে যদি মহম্মদপুর হাতে আসে
সেটা কি ভাল নয় ?
মির্জা। কিন্তু আমার তাে মনে হয় আমাদের পক্ষে যুদ্ধ না-করা ছাড়া
কোন উপায় নেই।
তােরাব। এ কথা তুমি কেন বললে মির্জা মহম্মদ ?
মির্জা। বললাম এই কারণে যে, পাথরের দুর্গ কামান দিয়ে জয় করা
যায়, কিন্তু মানুষের হৃদয় দুর্গকে অত সহজে দখল করা যায়
। মহম্মদপুরের মানুষগুলাে পাথরের চেয়েও কঠিন, বজ্রের
চেয়েও দৃঢ় তাদের পণ—দেশকে তারা ভালবাসে প্রাণের মতন।
তােরাব। কিন্তু নির্বোধের দল জানে না যে যারা তাদের সেই দেশের
প্রতিনিধি তারা এক একজন বেইমানের প্রতিমূর্তি !
মির্জা। আপনি বলেন কি!
তােৰাব। এখুনি তার প্রমাণ পাবে। কিছুক্ষণ পূৰ্বে গুপ্তচর এক
অদ্ভুত জীবকে এখানে নিয়ে এসেছিল। সে আমাকে যে
বার্তা এনে দিনে তাই থেকে জানলাম সব চেয়ে সেরা এক
বেইমান আমার শিবিরে।
তৃতীয় অ]
সীতারাম
[পঞ্চম দৃশ্য
রক্ষী।
মির্জা।
কেন ?
তােরাব। পুরস্কারের লােভে। এরা যদি না থাকতত মির্জা মহম্মদ
তাহ'লে কোন দেশই কোন রাজা অধিকার করে নিতে
পারত না।
[ জনৈক রক্ষীর প্রবেশ ও অভিবাদন ]
গঙ্গারাম দাস হুজুরের সাক্ষাৎ প্রার্থী।
তােরাব। একটু অপেক্ষা করতে বল ।
[ রক্ষী চলিয়া যাইতে তােরাব পা মির্জা মহম্মদের দিকে চাহিয়া হাসিলেন ]
আশ্চর্য হ’?-এই দুনিয়া! দেশকে এরা ভালবাসে না
এরা ভালবাসে নিজেকে। নিজের স্বার্থসিদ্ধি না হলে দেশের
থাকা না থাকায় এদের কিছু এসে যায় না। আজ গঙ্গারাম
এসেচে, কাল চন্দ্রচূড় আসবে, তার পরদিন দেখতে পাবে
মৃন্ময়কে।
মির্জা। আপনি তাহলে তার সঙ্গে কথাবার্তা ক’ন। আমি পাশের
শিবিরে অপেক্ষা কচ্ছি।
তােৰ। হ্যা তাই যাও! আর সমস্ত রক্ষীদের সতর্ক থাকতে বল।
কারণ বেইমান হ'লেও এখনও সে শত্রুপক্ষ।
[ মির্জা মহম্মদ চলিয়া গেলে তােরাব খ। বলিলেন |
কোই হায় ! গঙ্গারাম দাস।
[ক্ষণপরে গঙ্গারামকে লইয়া রক্ষার প্রবেশ
গঙ্গারাম অভিবাদন করিয়া দাড়াইল, তাহার গায়ে কাল অংরাখা।
রক্ষীর প্রস্থান ।
তােৰ। এই যে গঙ্গারাম এসেছ! তােমার অভিপ্রায় জেনে আমি
৭৮
তৃতীয় দৃশ্য]
সীতারাম
পেম দৃশ্য
খুসী হয়ে তােমার আগেকার কসুর সব মাফ করে দিয়েচি
তা এনেছ? .
গা। হুজুরের মেহেরবানী। বলে আলি আমায় সেকথা জানিয়েচে
বলেই আমি আপনার কাছে আসতে সাহসী হয়েছি।
তােব। তারপর, চন্দ্রচূড় ঠাকুরের সঙ্গে টাকাকড়ি দেওয়ার বিষয় তাে
সব ঠিক হয়ে গেছে। তবে দেরী কিসের?
গঙ্গা। আপনি বরাবরই ভুল করে এসেছেন ফৌজদার সাহেব।
চচুড় আপনার সঙ্গে প্রতারণা করেছে।
তােরাব। প্রতারণা করেচে !
দিনের পর দিন আপনাকে লােভ দেখিয়ে কিছুদিন যুদ্ধ থেকে
বিরত রাখবার উদ্দেশ্যেই তার এই ছলনা। যতটা সময় তিনি
নিতে পারেন ততই তার পক্ষে মঙ্গল—ইতিমধ্যে রাজা ফিরে
এতে আপনার সঙ্কল্প ব্যর্থ হবে তারও উদ্দেশ্য সিদ্ধ হবে।
তােরব। চন্দ্রচূড় এত বড় শয়তান! তােমাদের আমি কাউকে বিশ্বাস
করি না গঙ্গারাম, কাউকে না। তােমরা এক একজন সাপের
চেয়ে খল শয়তানের চেয়েও ভীষণ !
গা। কিন্তু আমি তা নই।
তােরাব। কেমন করে তা বলতে পার ? তার প্রমাণ কই ?
প্রমাণ-আপনার শিবিরে আমি একাকী অসহায় অবস্থায়
আপনারই সাহায্যের জন্যে এসেছি।
তােরাব। সে কথা সত্য ! কিন্তু তুমি আমাদের কি সাহায্য করতে পার ?
গঙ্গা। দুগের চাবি আমার হাতে, আমি আপনাদের দুর্গার খুলে দেব।
তােব। আরে দুর্গারে পৌছলে ত’ তুমি আমাদের দুর্গার খুলে দেবে,
তৃতীয় অ]
সীতারাম
[পঞ্চম দৃশ্য
কিন্তু তার পূর্বে তোমার সেনাপতি মৃন্ময় তাে অার
আমাদের কম বাধা দেবে না ?
আপনি যদি আমার পরামর্শ গ্রহণ করেন তাহ'লে জয় আপনার
অনিবাৰ্য্য।
তােরাব। কি রকম?
গঙ্গা। মহম্মদপুরে যাবার দুটো পথ আছে। উত্তর পথ আর দক্ষিণ
পথ। দক্ষিণ পথে দূরে নদী পার হতে হয়, আর উত্তর
পথে কেল্লার সামনে দিয়ে পার হতে হয়। আপনি গােপনে
দক্ষিণ পথ দিয়ে যাবেন, কারণ কেল্লার সামনে নদী পার
হওয়া অসম্ভব!
তােরাব।ই, তােমার কথা শুনে আমি বুঝতে পাচ্ছি সত্যই—তুমি
আমাদের হিতাকাঙ্খী। যুদ্ধজয়ের পর কি পুরস্কার তুমি
চাও, বল ?
সীতারামের দুই রাণী আছেন।
তােরাব। আরে সে তাে নবাবের হয়।
বড় রাণীকে আপনি নবাবের কাছে উপহার দিয়ে পাঠান হুজুর,
কিন্তু ছােট রাণী রমাকে আমার চাই।
তােরা। তুমি বল কি গঙ্গারাম?
ফৌজদার সাহেব, আমি শুধু তারই জন্যে নিজের দেশ, ধর্ম
সব কিছু আপনার কাছে বিকিয়ে দিতে এসেছি। তাকে
পেলে আমার বেচে থাকা অবন।
তােরা। (চিখিত ভাবে। তাই তাে!
আপনি এতিশতি দিন।
তৃতীয় অঙ্ক)
সীতারাম
[পঞ্চম দৃশ্য
সে যে আমার কাছে কী, তা আমি ভাষা দিয়ে আপনাকে
বােঝাতে পারবাে না। তাকে না পেলে আমি আপনাদের
কোন কাজেই আসবে না।
তােরাব। [ গঙ্গারামের দিকে চাহিয়া ঘূণাব্যঞ্জকভাবে আশ্চৰ্য্য! তুমি গঙ্গারাম
কাজীর বিচারে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছিলে, সীতারাম রায়
আমাদের অপ্রীতিভাজন হবেন জেনেও তােমাকে
করেছিলেন। তুমি আজ সেই সীতারাম রায়ের মহিষীকে
তােমার ত্রাণকর্তার, অন্নদাতার ধর্মপত্নীকে অবৈধভাবে পাবার
জন্যে উন্মাদ হয়ে আমার কাছে ছুটে এসেচ বিশ্বাসঘাতকতার
দ্বারা সীতারাম রায়কে সর্বহারা করে দিতে ?
গলা।
অধীরভাবে ] উপদেশ নয় ফৌজদার সাহেব, উপদেশ নয়
উপদেশ শুনতে আমি আপনার কাছে আসিনি।
তােরাব। উপদেশ নয় গঙ্গারাম তােমার প্রস্তাব আমার মনে যে ঘৃণার
উদ্রেক করেছে, তাই ভাষায় প্রকাশ করলুম।
গঙ্গা। অধীনের ঘৃণ্য প্রস্তাব তাহলে আপনি অগ্রাহ্য করচেন ?
তােরাব। [ তােব খ। আত্মসংবরণ করিয়া বলিলেন না, না, গঙ্গারাম তােমার
প্রস্তাব মত কাজ করতে নিজেকে মুহূর্তে প্রস্তুত করে নিলুম।
বেইমানের সাহায্য না নিয়ে ভূষণা সহজে জয় করা যাবে না,
আমি জানি। কার্যোদ্ধার হবার পর তােমাকে আলিঙ্গন
করে বলবাে তােমার বেইমানিই আমাকে বিজয়ীর মান
দিয়েছে।
গঙ্গা। রমার কথা কি তখন মনে রাখবেন ?
ভােব। মনে রাখবার কথা আমার নয়—তােমার।
তৃতীয় অ]
সীতারাম
[পঞ্চম দৃ
আপনারা আক্রমণ করলেই আমি মাকে নিয়ে মহম্মদপুর
ছেড়ে চলে যাব।
তােরা। কোথায় ?
যেখানে আর কোন প্রতিদ্বন্দ্বী তাকে আমার কাছ থেকে ছিনিয়ে
নেবার জন্যে বাহ বাড়াবে না। যেখানে গরু-ন্যায়ের প্রশ্ন
তুলে, পাপ-পুণ্যের কথা শুনিয়ে আমার বিবেককে কেউ
কশাঘাত করবে না। যেখানে প্রচুর অবসর নিয়ে সেই
অপরূপ রূপের লাবণী প্রবাহে নিমজ্জিত থেকে সপ্ত, অভিশপ্ত
এই জীবনকে সার্থক করে তুলতে পারবাে !
তােব। তুমি নিশ্চিন্ত থাক গঙ্গারাম, রমাকে তুমি পাবে।
গন। প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন ?
তোরাব। তঁা, আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্চি।
যা আমি তাহলে নিশ্চিন্ত ! রাত্রি শেষ হয়ে আসছে,
এখুনি আমাকে ফিরতে হবে। আমি তাহলে আসি জনাব।
অভিবাদন করিল ]
তেয়াব। এ!
[গারা পুনরায় কালাে কাংখায় ভাল করিয়া গা ঢাকি প্রদান করিল।
যন্ত্র সঙ্গীত সহযােগে দৃশ্যান্তর ]
২
चछे कृष्णा
চ।
মহম্মদপুর দুর্গ চত্বর=প্রহরীগণ পাহারায় রত।
[ চচুড় ও রাজপুত সর্দার ।
তােরাব খ। সম্ভবতঃ আজ রাত্রেই দুর্গ আক্রমণ করবে বলে
আমার মনে হচ্ছে সর্দার। কারণ সে আমার সঙ্গে কথাবার্তা
চালাতে চালাতে হঠাৎ থেমে গেল কেন বুঝলাম না। তাছাড়া
গােপনে দক্ষিণ-পথে তার সেনাপতি পীর বকস বহু সৈন্য নিয়ে
নদীপার হবার চেষ্টা করছে শুনলুম।
রাজপুত সর্দার। তাহলে তাে সমূহ বিপদ গুরুদেব। যুদ্ধ অনিবার্য।
চন্দ্র। আশঙ্কার কিছুই নেই—আমিও সেজন্য প্রস্তুত ছিলাম! মৃত্ময়কে
সমস্ত সৈন্যদিয়ে বাধা দিতে পাঠিয়ে দিয়েছি।
পাঠিয়ে দিয়েছি। তােমরা শুধু
সতর্ক থেক।
সর্দার। যথা আজ্ঞা !
[ গদারামের প্রবেশ
| প্রহরীদের প্রতি তােমরা এখন বিয়াম করতে যেতে পার।
[ রক্ষীয় ধীরে ধীরে চলিয়া গেল।
[ বিস্মিত ভাৰে একি গঙ্গারাম! ওদের সকলকে এখন বিশ্রাম
করতে পাঠালে কেন ?
গা। এখন তো আমরা নিশ্চিত।
কি বলছাে তুমি? তােৰা আমাদের আজ আক্রমণ করতে
পারে। এই নদীপথে যদি তার মুষ্টিমেয় সৈন্যও বিনাবাধায়
পার হয়ে আসে অহ'লে সর্বনাশ হয়ে যাবে।
চ।
০
তৃতীয় অক] সীতারাম [ ষষ্ঠ দৃশ্য চন্দ্র। গঙ্গা। গঙ্গা। আপনি তােরা খকে অতু নির্বোধ মনে করবেন না। জানে দুর্গের সামনের নদীপার হতে যাওয়ার বিপদ কতখানি। কিন্তু কিছুই তাে নিশ্চয় করে বলা যায় না গঙ্গারাম? যুদ্ধের সময় যদি চতুর্দিকে সতর্ক দৃষ্টি না রাখ, তাহলে বিপদ যে কোনদিক থেকে আত্মপ্রকাশ করবে কে জানে? সে সতর্ক দৃষ্টি রাখবার জন্যে তো আমি রয়েছি। কিন্তু তুমি একা কি ক’ববে? না, না, গঙ্গারাম তােমার কর্তব্যে শৈথিল্য প্রকাশ পাচ্ছে। তুমি বিপদের গুরুত্ব বুঝতে পাচ্ছনা। [ রাগতস্বরে | ঠাকুর, নগর-রক্ষার দায়িত্ব, আপনার চেয়ে আমার কম নয়। অতএব আমার কর্তব্য কি, আমি তা ভালভাবেই জানি। আপনি সেজন্য উদ্বিগ্ন না হলেই সুখী হবে। গঙ্গারাম তুমি কি বলছে? আমি যা বলছি ঠিকই বলছি-আমার কর্তব্য সম্বন্ধে অপরের উপদেশ নিয়ে কাজ করতে আমি অনভ্যস্ত। আপনি মন্ত্রী, আমি নগররক্ষী। আমারও যেমন আপনার কর্তব্য সম্বন্ধে উপদেশ দেওয়া বাঞ্ছনীয় নয়—তেমনি আপনারও অযথা আমাকে শৈথিল্যের জন্য অভিযুক্ত করা অশােভন। আমি তােমার কাছে রাজ্যের মঙ্গলের জন্যই একথা ব’লচি গঙ্গারাম। রাজ্যের মঙ্গল আপনার মত আমিও দেখি। আমারই ভুল হয়েছে গঙ্গারাম-বেশ তুমি যা ভাল বোঝ কর! [ চুড়ে এখন ] চ। গঙ্গা। চঞ্জ। ১৪।
তৃতীয় অঙ্ক ) সীতারাম (ষষ্ঠ দৃশ্য আমাকে আমার কত শেখাতে এসেছেন। আমার কর্তব্য আমি ঠিক করে নিয়েছি। আমি তােমাদের কেউ নই, দেশের কেউ নই—আমি শুধু একজনের। কিন্তু যার জন্য আজ সর্বস্ব বিসর্জন দিতে বসেছি সে কি ধরা দেবে ! [ চিন্তা করিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলিলেন ] কে জানে! মুরলার প্রবেশ মুরলা। এই যে রক্ষী মশাই, আপনি এখানে আপনার কাছে আবার আসতে হল। কেন ? ওঃ! আপনার এখনও রাগ যায়নি দেখছি! আচ্ছা আমার ওপর নয় রাগ করলেন, কিন্তু সে যে তােমায় ছাড়া আর কাউকে জানেনা গাে ! তারই দুটো কথা বলতে এসেছিলুম- তাহলে চলি। [ মুরল। প্রস্থানােন্বত হইতেই গঙ্গারাম তাহার কাছে গিয়া সাগ্রহে বলিল ] গঙ্গা। , না মুরলা•••রাগ আমি করিনি। বল, বল কি তার কথা ? মুরলা। হােটরাণী বললেন যে আপনি তার কাছে ছেলেকে রক্ষা ক’রবার যে প্রতিজ্ঞা করে এসেছিলেন তা মনে আছে তাে? গঙ্গা। হ্যা, তা আমার মনে আছে। বল তো আমি এখুনি গিয়ে তার ছেলেকে নিয়ে আসি। মুরলা। না, না এখন নয়"ফৌজদার যদি সহরে ঢুকে পড়ে তখন। কিন্তু সে সময় আর অবসর পাওয়া যাবে না। এখুনি তুমি আমায় তাঁর কাছে নিয়ে চল।
তৃতীয় অঙ্ক ]
শীতার
[ ষষ্ঠ দৃ
মুর। অ বেশ, আমি তাহলে তাকে একবার জিগ্যেস করে আসি।
চল আমিও তােমার সঙ্গে নয় যাই।
মুরলা। না না আপনি একটু সরে থাকুন আমি একা ঠিক যাব।
আপনার সঙ্গে গেলে এখুনি ধরা পড়ে যাব। যুদ্ধের ভয়ে
কেউ রাত্তিরে আজকাল ঘুমােয় না ।
গঙ্গা।
বেশ, তুমি একাই যাও, আমি ঠিক এই জায়গা বরাবরই থাকবে।
[ গারামের প্রস্থান। গঙ্গারামের গমনপথের দিকে
চাহিয়া হাসিতে হাসিতে মুরলা বলিয়া উঠিল ]
“প্রেমের নাগর বুকে তােমার দেখবে। জালা কত
সে যদি হয় বাসতো ভাল একটু তােমার মত।
[ পিছন হইতে এ ও জয়ন্তীর প্রবেশ ]
জয়ন্তী। [তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে মুরলার প্রতি চাহিয়া কহিল] এখানে তুই কি কচ্ছিস?
মুরলা। [ ভীতভাবে ) ওমা, তোমরা আবার কে ?
আমরা যেই হই না কেন, এই ত্রিশূল দেখচি, সত্যই তুই কে
বললে এখুনি তাের বুকে এইটে বি ধিয়ে দেব।
মুরলা। ও মা তােমাদের পায়ে পড়ি মা, আমায় মেয়ােনা ! আমি
মুরলা-রাঙ্গার বাড়ীর কি।
এয়। তুই এতক্ষণ যা বলছিলি, আড়াল থেকে সব আমরা শুনেছি।
তােয়া কি মতলব ক’র্জিলি শিগগির বল !
মুরলা। বলছি। কিন্তু ও যে এখানে এখুনি এসে পড়বে।
য়।
মুরলা। রক্ষী মশাই।
হু! একে আমাদের সেই ভাঙা মন্দিরে নিয়ে যাও বােন।
তৃতীয় অঙ্ক )
সীতারাম
আমি যেন কেমন একটা বিপদের আভাস পাচ্ছি। এখান
থেকে সমস্ত খবর না জেনে আমি এখন যাবনা।
ঐ। আমার সঙ্গে অয় [ মুরলা শঙ্কিতভাবে স্ত্রীর সহিত চলিয়া গেল ]
জয়। কিছুই তো বুঝতে পার্জি না—এত বড় একটা যুদ্ধের আয়ােজন
অার সারা শহর নিশ্চিন্ত হয়ে আছে ?
[ ব্যস্তভাবে চন্দ্রচূড়ের প্রবেশ ]
কে মা তুমি !
জয়। পরিচয়ের কোন দরকার নেই চন্দ্রচূড় ঠাকুর, শুধু এইটুকু জেনে
রেখো আমি তােমাদের রাজ্যের মঙ্গলাকাজী। শুনলুম শত্রু
দক্ষিণপথে আক্রমণ করেছে কিন্তু এখানে তাে কোন আয়ােজনই
দেখছি না -নগর রক্ষার কি ব্যবস্থা করেছ?
চন্দ্র। কি ব্যবস্থা করবাে মা, আমার সমস্ত গােলমাল হয়ে যাচ্ছে।
সেনাপতি মৃন্ময় সমস্ত সৈন্য নিয়ে যুদ্ধে চলে গেছে সামান্য
যে-ক'জন রক্ষী এখানে আছে-তারা অবশ্য ইচ্ছা করলে
এ দুর্গ রক্ষা করতে পারে কিন্তু করবে কিনা সন্দেহ !
জয়।
কেন?
চন্দ্র।
কারণ গঙ্গারামের যেন কি রকম পরিবর্তন লক্ষ্য করছি।
জানিনা তার মনে কি উদ্দেশ্য আছে। সেই নগরী, তার
আদেশ ছাড়া এখানকার রক্ষীরা তো কারুর কথা শুনবে না।
জয়।
চ।
তােমার আদেশও নয় ?
না মা আমার আদেশও নয়। তারা এতদিন তাকেই মেনে
এসেচে আজ আমাকে মানবে কেন? একমাত্র মধুসূদন ছাড়া
এ রাজ্য রক্ষার আর কোন উপায় নেই মা। সমস্ত নগরে
৭
তৃতীয় অঙ্ক] সীতারাম [ई मुश চ। জয়। . হাহাকার উঠেছে, কিন্তু গিয়ে যে সান্ত্বনা দেব, সে জোরও আমার আর নেই। ভয় পেয়ােনা চন্দ্রচূড়, এ রাজপুরী আমি রক্ষা করবে। তুমি যাও ! মা রাজলক্ষ্মী ! আমি তােমায় দেখেই চিনেচি। তােমার রাজ্য তুমিই রক্ষা কর মা। [ চন্দ্রচূড়ের প্রস্থান ] যা ভেবেছিলুম দেখছি তাই সত্যি। এতবড় আর আমি নিলাম গুরুদেব, তুমি আমার মুখ রক্ষা করাে। শ্রীর প্রবেশ একি , আবার চলে এলে? ঘৃণায়, লজ্জায় এ নগরে আর এক মুহুর্ত থাকতে ইচ্ছা করছে না জয়ন্তী। আমি মুরলার কাছে যা শুনলাম তাতে আর মানুষের কাছে থাকতে সাহস হয় না। কেন কি শুনলে ? যা শুনলাম তা শুনে আত্মহত্যা করতে ইচ্ছা করে। মহারাজার ছােটরাণীকে আমার ভাই পেতে চায়। বুঝেচি। সেইজন্যে সে আজ শত্রুর সঙ্গে ষড়যন্ত্র করেছে, তা আমি এইবার স্পষ্ট বুঝতে পাচ্ছি। কিন্তু তাকে এ-পাপ করতে আমি দেব না তুমি ! হ্যা আমি। বুঝতে পাচ্ছনা সময় না হলে আজ মহম্মদপুরে আসবার জন্যে গুরুদেবের আদেশ পাব কেন? তােমাকে আমাকে যে তিনি মঙ্গলের নির্দেশ দিয়েই এখানে পাঠিয়ে দিয়েছেন। জয়। শ্রী জয়। । ৮৮
তৃতীয় অঙ্ক]
সীতারাম
[ ষষ্ঠ দৃশ্য
তােমার কথায় আমি যেন মনে জোর পাচ্ছি কিন্তু বুঝতে পাচ্ছি
কি মঙ্গল আমাদের দ্বারা হবে!
সে মঙ্গলময়ই জানেন।
[ সহসা নেপথ্যে চাহিয়া ]
ঐ বােধ হয় তােমার ভাই এদিকে আসছে। তুমি ফিরে যাও।
[ এর প্রস্থান ও বিপরীত দিক হইতে গঙ্গারামের প্রবেশ ]
গঙ্গা। [ জয়ন্তীকে পিছন হইতে বিশেষ লক্ষ্য না করিয়া বলিল ] এই যে মুরলা
তিনি—[ জয়ন্তী মুখােমুখি হইয়া দাঁড়াতেই অপ্রস্তুত ভাবে ] একি
জয়।
আপনি কে মা !
[ গম্ভীর ভাবে ] আমি দেবীর সেবিকা। তার আদেশে আমি
তােমার কাছে এসেছি।
কি জন্য বলুন?
আমাকে একগাড়া গােলাবারুদ ও একজন গােলন্দাজ দাও!
গােলাবারুদ নিয়ে আপনি কি করবেন ?
মন্দির রক্ষা করতে হবে।
মন্দির তত সহরের মধ্যে। সেখানে শত্রুর তাে কোন যাবার
সম্ভাবনা নেই।
থাকুক না থাকুক, তবু আমার চাই।
গঙ্গা।
[দৃপ্তস্বরে) গঙ্গারাম ! যদি এখনও নিজের মঙ্গল চাও, তাহলে
যা চাই, আমাকে অবিলম্বে দিয়ে দাও! তানা হ'লে মুলা,
রমা তােমার সমস্ত কথা আমি এখুনি প্রকাশ করে
দেব। আর যদি বলপ্রয়ােগ করতে চাও, তাহলে
৩
সীতারাম
[ ষষ্ঠ দৃঙ্গ
এই মন্ত্রপূত ত্রিশূল দিয়ে তােমাকে হত্যা করতেও দ্বিধা
ক’রবাে না।
গঙ্গা। ( ভীত ভাবে ] না-না আমি সব দিচ্ছি, আপনি আমার সঙ্গে
আনুন!
[ গঙ্গারাম ও জয়ন্তীর প্রস্থান। বিপরীত দিক হইতে ফকির সাহেব
ও চন্দ্রচূড় কথা কহিতে কহিতে প্রবেশ করিলেন ]
চ। এ আপনি কি বলছেন ফকির সাহেব! অাপনার কথাও
আমার বিশ্বাস হচ্ছেনা। গঙ্গারাম এতদূর নেবে গেছে ?
সীতারাম যে একদিন তাকে প্রাণ দিয়ে বাঁচিয়েছিল।
ফকির। তার উপযুক্ত পুরস্কার দেবার আয়ােজন তো সে করেছে। আজই
ততা তার ঋণ শােধের দিন। ভোেরর আলাে ফোটার সঙ্গে
সঙ্গে সীতারাম রায়ের সাধের রাজ্য চ'লে যাবে আর সে তারই
অপুর থেকে তুলে নিয়ে আসবে একটি ফুটন্ত গােলাপকে।
চন্দ্র। এসব কথা শুনলেও পাপ হয় ফকির সাহেব। মানুষ বেইমান
হয় জানি, কিন্তু এতখানি কৃতঘ্নতা, এ আমার কল্পনার বাইরে।
ফকির। দুঃখ এই যে আপনি এতদিকে খেয়াল রাখেন কিন্তু প্রদীপের
আলাের তলায় যে এতখানি অন্ধকার তারই সংবাদ রাখতে
ভুলে গিয়েছিলেন।
চত্র। কল্পনা করতে পারিনি ফকির সাহেব যে যে-মাটির ওপর
দাড়িয়ে আছি সেই মাটীই একদিন পায়ের তলা থেকে সরে
যাবে।
ফকির। কিন্তু রাষ্ট্রের ভার গ্রহণ করে সে সংবাদ রাখা আপনার
উচিত ছিল।
তৃতীয় অঙ্ক]
मोगाय
[ ষষ্ঠ দৃশ্য
চন্দ্র। টোল ছেড়ে রাজ্য পরিচালনা করতে এসেছিলুম, ভেবেছিলুম
আমি খুব কৌশখী, সে দন্তের হয়তাে এই শান্তি! মুসলমানকে
চিরদিন অবিশ্বাস করে এসেছি, আজ দেখছি সেই আমার
পাশে দাঁড়িয়ে আছে, আর ভাইয়ের চেয়ে যাকে আপন বলে
ভাবতুম, সে বসে আছে ছােরা নিয়ে আমায় হত্যা করতে ।
ফকির। চন্দ্রচূড় ঠাকুর! বেইমানের জাতই আলাদা! সে হিন্দুও
নয় মুসলমানও নয়।
[জনৈক রক্ষীর দ্রুত প্রবেশ]
রক্ষী। ঠাকুর মশাই, সর্বনাশ হয়েছে। দক্ষিণ পথে ফৌজদারের
সেনাপতি পীরবক্সের সঙ্গে ভীষণ যুদ্ধ বেধেছে, কিন্তু তােব
ধ। আর একদল সৈন্য নিয়ে নিজে এই দুর্গ আক্রমণ করতে
অাসছে।
চ।
ওরে, তােরা একবার রক্ষীদের এখানে আসতে বল ।
রক্ষীর দ্রুত প্রস্থান
ফকীর সাহেব, বুঝতে পাচ্ছি আর রক্ষা নেই। দুর্গ প্রকারে
উঠে দেখি তারা কতদূরে? আপনি যদি পারেন একবার
কোতােয়ালীকে জাগাবার শেষ চেষ্টা করুন।
ফকির। তা’ যাচ্ছি, কিন্তু আশা আমারও নেই !
[প্রস্থান—দুরে কোলাহল
৪।
[ চন্দ্রচূড় দুর্গ আকারে উঠিলেন |
সত্যই তাে ওরা এগিয়ে আসচে! লক্ষ্মী নারায়ণ তােমার মনে
এই ছিল।
হে জনান রক্ষা কর! রক্ষা কর!
১১
তৃতীয় অঙ্ক) সীতারাম (ষষ্ঠ দৃশ্য গঙ্গা। চন্দ্র। [ গঙ্গারামের প্রবেশ। চন্দ্রচূড় দুর্গ প্রাকার হইতে ছুটিয়া ] গঙ্গারামের নিকটে আসিলেন ] গঙ্গারাম ! ফৌজদারের সেনারা যে দলে দলে এগিয়ে আসছে। তুমি এখনও তােমার রক্ষীদের তােপ ছুড়তে ছুড়তে আদেশ দেবে না ? সময় উপস্থিত হ'লেই দোব। সে সময় হয়তাে তুমি আর এজীবনে পাবে না, আমি ব্রাহ্মণ তােমার মঙ্গলাকাঙ্ক্ষী, করযােড়ে আজ তােমার কাছে দেশের নামে, রাজার নামে ভিক্ষা চাচ্ছি, গঙ্গারাম অস্ত্র ধারণ কর। আপনি অনর্থক ব্যস্ত হচ্ছেন। আসুক না ফৌজদারের সেনা, আসুক না ফৌজদার নিজে—এই দুর্ভেদ্য দুর্গ তারা কি করে অধিকার করে তাই নয় দেখি । [ করযোডে) গঙ্গারাম, মিনতি কচ্ছি, এখনও রক্ষীদের একবার আদেশ দাও! আকাশ ওদের মশালের আলােয় লাল হয়ে উঠলাে, কিন্তু ওরা যদি আমাদের এত সাধের স্বাধীন রাজ্য কেড়ে নেয় তাহলে সে লজ্জায় কি তােমারও মুখ রাঙা হয়ে গঙ্গা। চন্দ্র। উঠবে না? চ। আচ্ছা, আমি দেখছি। [ গঙ্গারামের প্রস্থান ] নারায়ণ, নারায়ণ রক্ষা কর। [ তােপধ্বনি । একি, তােপ দাগে কে? তবে কি গঙ্গারাম আদেশ দিয়েছে! নারায়ণ, লক্ষী জনার্দন সত্যই তুমি আছ। [ চন্দ্রচূড়ের প্রস্থান ] [ গঙ্গারামের বিরক্তভাবে প্রবেশ ] [ চীৎকার করিয়া কে তােপ দাগে? আমার আদেশ ছাড়া গঙ্গা।
তৃতীয় অঙ্ক ]
সীতারাম
[ ষষ্ঠ দৃশ্য
কামানে কে হাত দিয়েছে ?
[ পুনরায় তােপধ্বনি-নেপথ্যে তােরাব
খার কণ্ঠস্বর শােনা গেল ]
তােরা। ওঃ! শয়তান গঙ্গারাম! এত বড় বেইমান তুই ?
[ আহত অবস্থায় প্রবেশ
ওঃ খােদা! বেইমানির শাস্তি নিজের হাতে দিয়ে যেতে
পারলুম না। [ তােৰাব খাঁর মৃতদেহ মাটিতে লুটাইয়া পড়িল।
গঙ্গারাম তােৰাব খাঁর নিকটে ছুটিয়া গেল ]
গঙ্গা।
এ কি ! ফৌজদার সাহেব ! [ মৃত লেখিয়া উঠিয়া পড়িল ।
আমার বিনা হুকুমে কার এত বড় স্পর্ধা যে কামান চালায়?
তাকে আমি এখনই প্রাণদণ্ড দেব ! কে সে?
[ উত্তেজিতভাবে পায়চারি করিতে করিতে
এ নিশ্চয়ই সেই ডাকিনীর কাজ। আমার কাছ থেকে গােলা
বারুদ নিয়ে এই সর্বনাশ করেছে। কামানে যে হাত দিয়েছে
তাকে আমি মৃত্যুদণ্ড দেব। কে আছিস, তাকে বন্দী করে নিয়ে
আয় !
[ দুর্গের বাহির হইতে সীতারাম কালিঝুলি মাখা অবস্থায়
ছুটিয়া আসিলেন সঙ্গে জয়ন্তী
পিছনে পিছনে দুইজন রক্ষী তরবারি হস্তে আসিয়া দাঁড়াইল ]
সীতা।
কাকে—কাকে তুমি বন্দী করতে চাও গঙ্গারাম?
গঙ্গা।
[ সরিয়ে মহারাজ ?
সীত। হা, আজকে আমি সত্যকারের মহারাজা। তােমাকে নিজের
হাতে দৎ দেবার অধিকার নিয়ে আমি ফিরে এসেছি।
তৃতীয় অঙ্ক)
সীতারাম
অকৃতজ্ঞ যেইমা! দেশ জননীকে আজ পরাধীনতার যে
শৃঙ্খল পরাতে চেয়েছিলে তার জন্য যে কতখানি তা সারা
জীবন ধরে লৌহশৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়ে তােমাকে মর্মে মর্মে
অনুভব করতে হবে। রক্ষীগণ ! একে বন্দী কর।
[ রক্ষীগণ গঙ্গারামের পার্থে দাড়াইল-গঙ্গারাম মাথা নত
করিয়া দাড়াইয়া রহিল।]
D
চতুর্থ
অঙ্ক
প্রথম দৃশ্য
রাজারবার কক্ষ
[ সিংহাসন শূন্য পড়িয়া আছে। চতুর্দিকে সভাসদগণ আসীন, নাগরিকগণ একধারে
দণ্ডায়মান। ফরি সাহেব ও চন্দ্রচূড় উপবিষ্ট, সৈন্যগণ পাহারায় রত—একধারে উচ্চবেদী
-তাহার পার্শ্ব দিয়া অন্তপুরে যাইবার পথ ( যবনিকা উত্তোলিত হইতেই দামামা
বাজিয়া উঠিল। নব গুহন্তে আসিয়া ঘােষ করিল।
নকীব। মহামহিমান্বিত, নিখিল প্রজাপালক, ধবজ, বিপুল বিক্রমাদিত্য
দ্বাদশ ভৌমিকাধিপতি, শ্রীল শ্ৰীযুক্ত মনমােহন মহারাজাধিরাজ
সীতারাম রায়।
[ পুনরায় তিনবার দামাধনি হইল, প্রথমে রাজা সীতারাম
তাহার পাতে মৃন্ময় তৎপগতে সৈগণ প্রবেশ করিয়া সার
একপার্শে সারি বাধিয়া দাঁড়াইয়া গেল, সকলে সীতারাম এবেশ
করিতেই দাঁড়াইয়া উঠিলে৷ তৎপরে তিনি আসন গ্রহণ করিতে
সকলে যে যাহার স্থানে উপবিষ্ট হইলেন। ]
সীতা।
বনী গঙ্গারাম দাস।
[ জনৈক ক্ষী তৎক্ষণাৎ চলিয়া গেল ও অন্যান্ত রক্ষীরা
শলিত গঙ্গারামকে লইয়া প্রবেশ করিল।
গঙ্গারাম! তুমি আমার আত্মীয়, এজা এবং বেতনভােগ !
আমি তােমাকে চিরদিন স্নেহ ও অনুগ্রহ করতাম—তুমি আমার
শুধু প্রিয়পাত্র নয় অতি বিশ্বসের পাত্র ছিলে কিন্তু তা সত্বেও
[প্রথম দৃশ্য
চতুর্থ অঙ্ক)
সীতারাম
তুমি আমার অনুপস্থিতির সুযােগ নিয়ে যে বিশ্বাসঘাতকতা
কয়েছ তার জন্য তুমি কি শান্তি গ্রহণ করতে চাও?
গঙ্গা। মহারাজ স্বদেশ ভৌমিকাধিপতি, আমি আপনার এক ক্ষুদ্র
প্রজা—ইচ্ছা করলে আপনি আমাকে যে-কোন শাস্তিদান
করতে পারেন কিন্তু ন্যায় বিচার প্রার্থনা করার অধিকার
বােধ হয় আমার আছে।
সীতা।
সেই ন্যায় বিচার করবার জন্যই আজ আমি তােমায় প্রকাশ্য
দরবারে এনেছি, কারণ তােমার অপরাধ শুধু আমার কাছে
নয় সমস্ত দেশের কাছে।
কিন্তু আমি আমার অপরাধ অশ্বীকার করি। আমি কোন
বিশ্বাসঘাতকতার কাজ করিনি। আমার বিরুদ্ধে ধর্মশাস্ত্র সঙ্গত
কোন প্রমাণ নেই।
কিন্তু সে প্রমাণ দেবার জন্য এখানে এমন কয়েকজন ব্যক্তি
উপস্থিত আছেন যাদের ওপর সমগ্ৰ প্ৰজাপুঞ্জের বিশ্বাস সুগভীর।
চন্দ্রচূড় ঠাকুর, গঙ্গারাম সম্বন্ধে আপনার কি বলবার আছে?
মহারাজ ! এই হীনচেতা গঙ্গারাম উচ্চকণ্ঠে সভাস্থলে তার
৫।
নির্দোষিতা প্রমাণ করবার চেষ্টা করছে কিন্তু তাকে বিজ্ঞাসা
করুন কোন হিত কামনায় আমারই চোখের সম্মুখে বিপন্ন
নগরের রক্ষার ব্যবস্থা না ক'রে সে রক্ষীদের বিশ্রামের আদেশ
দিয়েছিল? কোন ধৰ্ম্মনীতির বলে নদীপথে শত্রু সমাগত
দেখেও সে নিশ্চেষ্ট হয়ে বসেছিল। আমি তার কাছে দেশের
নামে, ধর্মের ন ম যখন কাতর অনুরােধ জানিয়েছিলুন তখন
কি ব্যবস্থা সে করেছিল ?
সীতা।
চতুর্থ অঙ্ক ) সীতারাম [ প্রথম সীতা। গঙ্গারাম ! গা। আমার উদ্দেশ্য ছিল অন্যরূপ, তা আমি কার কাছে প্রকাশ করিনি। প্রথমতঃ যে সময় চন্দ্রচূড় ঠাকুর আমাকে কামান চালাতে অনুরােধ করেন সে সময় শক্তকে আক্রমণ করতে তারা সতর্ক হয়ে ফিরে যেত। সেইজন্য আমি আরও সুযােগ নেবার অপেক্ষা করছিলুম। চন্দ্রচূড় ঠাকুর ব্রাহ্মণ পণ্ডিত-- যুদ্ধনীতি সম্বন্ধে তার সঙ্গে আমার মতবিরােধ হয়েছিল এই মাত্র। চন্দ্র। মহারাজ, আমি উপবীত স্পর্শ করে বলতে পারি যে শক্রকে দুর্গের অধিকার দেওয়াই ছিল গঙ্গারামের আসল অভিপ্রায়। আমিও শপথ করে বলতে পারি মহারাজ যে এ অভিযােগ সম্পূর্ণ মিথ্যা, কারণ দুগের মধ্যে আমিও বাস করতাম, শত্রুর হাতে দুর্গ তুলে দেওয়ায় কি আমার লাভ হত ? সীতা। তােমার সে লাভ ক্ষতির সন্ধান দিতে পারেন আর একজন। ফকির সাহেব ! ফকির। মহারাজ! আপনি গঙ্গারামের এ উক্তি সমর্থন করেন? ফকির। সমর্থন হয়তো করতুম বদি না নিজের চোখে দেখতুম বে তার অনুচর বন্দে আলি নিশীথ রাত্রে নৌকা করে ফৌজদারের শিবিরে গিয়ে দেখা করতে এবং তারপরই গঙ্গারাম তাকে অনুসরণ করলে। কি উদ্দেশে সকলের অগােচরে তার শত্রু শিবিরে যাত্রা হয়েছিল মহারাজ? সীতা। একথা তুমি অধীকার কর গঙ্গারাম? সীত।
চতুর্থ অ] সীতারাম [প্রথম পৃষ্ঠ , একথা আমি সম্পূর্ণ স্বীকার করি। মি ফৌজদারের শিৰিয়ে গিয়েছিলাম সত্য। কারণ আমার উদ্দেশ্য ছিল বিশ্বাস ঘাতকের ছদ্মবেশ গ্রহণ ক'রে অকে কু-পথে নিয়ে এসে এই দুর্ভেদ্য গড়ের নীচে চিরকালের মত কণ্ঠরােধ করে দেব। সীতা। তার জন্যে কি পুরস্কার তুমি চেয়েছিলে ? গঙ্গা। অর্ধেক রাজ্য! কারণ তা না হলে তার বিশাল জন্মাননা অসম্ভব ছিল। সীতা। এ ছাড়া আর কিছু ? । ফকির সাহেব, আপনি সে-কথা কিছু জানেন? ফকির। জানি। কি করে জানলেন? ফকির। বলে আলি নিজমুখে আমার কাছে সমস্ত স্বীকার করেছিল। তার বিশ্বাস হয়েছিল যে যেহেতু আমি মুসলমান, সেই হেতু শত্রু হলেও দেশের চেয়ে আমি আমার ব্যাতিকে বেশী ভালবাসি। গােপনে তােরাব থাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে আসার সময় সেও নিহত হয়েছে। তার মুখে আমি যে-কথা শুনেছি তা এই প্রকাশ্য সভাস্থলে উচ্চারণ করতেও আমার সীতা। সীতা। ভয় হয় মহারাজ সীতা। আপনি নির্ভয়ে বলুন। ফকির। গঙ্গারাম আপনার কনিষ্ঠা মহিষীকে প্রার্থনা করেছিল। [ সঙ্গে সঙ্গে দরবার সঞ্চলে চীৎকার করিয়া বলিয়া উঠিল- কি সর্বনাশ!]
চতুর্থ অক। সীতারাম [প্রথম দৃশ্য সীতা। মৃগায়। [ তরকারি স্পর্শ করিয়া তীব্র দৃষ্টিতে গঙ্গারামের প্রতি চাহিল ] ১ম দঃ। ওকে হত্যার আদেশ দিন মহারাজ! ২য় দ। ওকে এখনই বধ করুন। ৩য় দ। বিশাসঘাতককে আমরা ধ করবে। আপনারা শান্ত হন। [ গর্জিয়া বলিয়া উঠিল) মিথ্যা, মিথ্যা, জঘন্য মিথ্যা ! আমি বুঝতে পারি আমার বিরুদ্ধে এরা সকলে অতি হীন ষড়যন্ত্র করেছেন। আমি মহারাজের কনিষ্ঠা মহিষীকে জীবনে কখনও দেখিনি। কি জন্য তাকে কামনা করবাে ? সীতা। নরাধম ! তবে কুকুরের মত গভীর রাত্রে গােপনে আমার অন্তঃপুরে যেতে কি কারণে? গঙ্গা। [ সবিস্ময়ে ] মহারাজ! আপনি কি বলছেন? সীতা। সত্য কথাই বলছি। রাজবাড়ীর মুরলা তার সাক্ষী-মুরলা ! [ একজন রক্ষী চলিয়া গেল-ক্ষণপরে মুরলাকে একজন পরিচারিকা অপুর হইতে লইয়া আসিল। মুরলা। মুলা, গঙ্গারামকে তুমি অন্তঃপুরে নিয়ে যেতে ? হা মহারাজ! অনেকবার তিনি আমার সঙ্গে রাত্তিরে গেছেন আমি ওঁকে আমার ভাই বলে চুপি চুপি নিয়ে যেতুম। কিন্তু আমার কোন দোষ নেই, আমি- [ ক্রশন পরায়ণা হইয়া উঠিল ] সীতা। চুপ কর। [ রক্ষীর প্রতি । এই স্ত্রীলােকটিকে আপাততঃ নজর- বন্দী করে রাখ। [ মুরলা, পরিচারিকা ও রুক্ষীর প্রস্থান গঙ্গারাম ! এর পরও আর কোন প্রমাণ চাও? ' চতুর্থ অক] সীতারাম [ প্রথম দৃশ্য মহারাজ, এই যীলােক অতি, কুচরিত্রা। আমি তাকে নগরে বহুর আচরণের জন্য শান্তি দিয়েছি, সেই রাগে আজ সে সুযােগ পেয়ে প্রতিশােধ নিতে এসেচে। [ রক্ষীর পুনরায় প্রত্যাবর্তন ] সীতা। বটে। কিন্তু স্বয়ং মহারাণী এসে যদি বলেন তার কথা কি অবিশ্বাস করবে? । তিনি যদি এই প্রকাশ্য রাজসভায় এসে আমার বিরুদ্ধে নিজ মুখে কিছু মুখে কিছু বলতে ধীকার পান তাহলে আমি যে-কোন দণ্ড মাথায় পেতে নিতে প্রস্তুত মহারাজ! সীতা। তােমার সেই অভিলাষই আমি পূর্ণ করবে। কে আছিস মহারাণী ! [ রক্ষী অপুতিমুখে চলিয়া গেল । [ সবিস্ময়ে ] মহারাজ! রাণী আসবেন প্রকাশ্য দরবারে ? সকলে। তাইত ! এ কি হল? স্বয়ং মহারাণী আসবেন সাক্ষ্য দিতে? [ গুঞ্জনধ্বনি ও পরস্পরের সহিত পরস্পরের কথােপকথন শুরু হইল ] সীতা। এই বিচারের সঙ্গে দুর্ভাগ্যক্রমে যখন তার নাম জড়িত হয়ে পড়েছে তখন তাকেও আসতে হবে বৈকি! [গীর বেশ—তাহার পাতে জনৈক পরিচারিকা সমেত নমার প্রবেশ ] সকলে। [ মাকে দেখিয়া ] মারাণী! ওঃ । মৃন্ময়। [ গঙ্গারাম এবার তাহার দিকে চাহিয়া মাথা নত করিল। সমস্ত সভা নিদ্ধ। সীতারামই সভার নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করিয়া প্রথম কথা কহিলেন ] সাতা। রাণী! আজ তােমাকে [ সীতারারে কইতে যেন বর অর বাহির হইল না] [ উঠয়া আপনি শান্ত হন মহারাজ! আমি এ রাজ্যের মন্ত্রী। চ।
চতুর্থ অঙ্ক ] সীতারাম [ প্রথম দৃশ্য রমা। চ। রম। আমি আপনার প্রতিনিধি অরূপ রাণীকে কয়েকটি প্রশ্ন জিজ্ঞাসা ক’চ্ছি। মহারাণী ! আজ গঙ্গারামের বিচার, অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হলেও গুরুতর কারণেই আজ অসূৰ্য্যম্পা রাজরাণীকে সাক্ষ্যদেবার জন্য এই প্রকাশ্য সভায় আনতে হয়েছে। আমি তােমার গুরু, রাজার আজ্ঞা নিয়ে তােমাকে জানাচ্ছি না জিজ্ঞাসা করব আশা করি তুমি তার সত্য উত্তর দেবে? [ গ্রীবা উন্নত করিয়া ] রাজার রাণীতে কখনও মিথ্যা কথা বলে না গুরুদেব ! আমি যদি মিথ্যাবাদিণী হতাম তবে এ সিংহাসন এতদিন ভেঙেওঁড়ো হয়ে যেত। এ কথা কি সত্য যে গঙ্গারাম রাজ অন্তঃপুরে যেত? হ্যা, একথা সত্যু! গঙ্গারাম রাজার ভৃত্য, আমাদেরও ভৃত্য। সেই হিসেবে রাজকার্যের জন্যই তাকে আমায় বাধ্য হয়ে ডেকে পাঠাতে হয়েছিল। কিন্তু এমন কি রাজকাৰ্য মা, যার জন্য সহর কোতােয়ালকে গভীর রাত্রে অন্তঃপুরে ডেকে পাঠাতে হয়েছিল? আমার একমাত্র পুত্রকে রক্ষার জন্য আমি তাকে ডেকে পাঠিয়েছিলাম। পুত্র আমার প্রাণ—তার জন্য আমি চিরদিনই বড় ব্যাকুল। যখন শুনলুম ফৌজদার এ নগর আক্রমণ করে আমাদের সকলকে ধ্বংস করতে আসছে তখন আমি কারুর কাছ থেকে আশ্বাস না পেয়ে নগররক্ষককে ডেকে পাঠাই। ধৰ্ম্ম জানেন এই শিশুকে বাঁচানাে ছাড়া আমার কোন উদ্দেশ্য ছিল না। নিজের সন্তানকে রক্ষা করা যদি তার মায়ের পক্ষে অপরাধ হয় তাহলে আমি দণ্ড নিতে প্রস্তুত। চ। রমা। ১০১ চতুর্থ অঙ্ক] সীতারাম [এথম দৃশ্য কয়েকজন। সাধু! সাধু! জয় মহারাণীর জয় ! [ সকলে ফি জয় দিল না ] রামাদ। আমাদের কিন্তু ঠিক একথা লিখাস হয় না। শ্যামাদ। তিনি রাণী হয়ে যদি এই কাজ করেন তাহলে আমরা কি না সীতা। রমা। সীতা! শােন রাণী, আমি বুঝতে পাচ্ছি প্রজাব তােমার একথা ঠিক বিশ্বাস করছে না। [ রমা আকুলতাৰে চারিদিকে চাহিল ] [ নিরুপায় ভাবে । বিশ্বাস ক’চ্ছে না, কেউ বিশ্বাস কচ্ছে না? তাহ'লে মৃত্যু ছাড়া ত’ এ কলঙ্কিত জীবন রাখবার কোন অর্থ হয় না মহারাজ ! আপনি আমার চিতা সাজাতে বলুন! আমি হাসতে হাসতে সে চিতায় প্রবেশ করবে কিন্তু তার আগে শুধু আপনি আমায় একবার বলুন যে আপনার বিশ্বাস আমি হারাই নি ! আমার বিশ্বাস অবিশ্বাসে কি এসে যায় ? আর কার কিছু আসে যায় কিনা জানিনা-আমার যায়। আপনি আমার স্বামী, গুরু, ইহকালের পরকালের সর্ব। আপনার সামনে আমি বলছি, আমি অবিশ্বাসিনী নই। যদি অবিখাসিনী হই তবে ইহজীবনে যা-কিছু পুণ্য করেছি সব যেন ব্যর্থ হয়। সকলে আমাকে অভিশাপ দিন, আমি যদি অবিখাসিনী হয়ে থাকি তাহলে যে সন্তান আমার প্রাণ, আমার চোখের সামনে যেন তার মৃত্যু হয় ! [ মা মূর্ধিতায় হইতে চলচূড় কাছে দ্রুত ছুটিয়া আসিলেন। রমা।
চতুর্থ অঙ্ক ] সীতারাম [ প্রথম দৃশ্য সকলে। জয় মহারাণীর জয় । ১ম দর্শক। মহারাণী, আপনাকে আমরা বিশ্বাস করি। ২য় দর্শক। আপনি অন্তঃপুরে যান। চত্র। চল মা অন্তঃপুরে চল ! সকলে তােমার কথা বিশ্বাস করেছে। [ চন্দ্রচূড়, দাসী ও রমার ধীরে ধীরে অন্তঃপুরের পথে এস্থান সীতা। গঙ্গারাম! তাহলে আর কিছু প্রমাণের আবশ্যকতা আছে? গঙ্গা। সে প্রমাণের অপেক্ষা আপনি রাখবেন না আমি জানি, আপনি রাজা, দণ্ডমুণ্ডের সর্বময় কর্তা। আপনার স্ত্রী যা বলেছেন আপনি তা বিশ্বাস করবেন এই স্বাভাবিক, কিন্তু আমি এখনও বলবো তিনি রাণী হলেও স্ত্রীলােক। এ রাজ্য তিনি গড়েন নি, গড়েছি আমরা—আপনারই রাজভৃত্যেরা। রাজরাণী বিপথ- গামিনী হলেও হতে পারেন, কিন্তু বিশ্বাসী রাজভৃত্যেরা কখনন বিপথে যায় না। সীতা। তুমি কি বলতে চাও পাপিষ্ঠ যে রাণী বিপথগামিনী ? সে বিচারের ভার আপনার—আমি শুধু এইটুকু বলতে চাই যে স্ত্রীলােক অনেক সময় দোষালনের জন্য ভূতের উপর দোষারােপ করে থাকেন। মহারাণী রাত্রিতে কার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন তার স্থিরতা | সহসা রাজসভার এন্তে ত্রিশূল হন্তে থােষ কষায়িত লােচনে জয়ীকে প্রবেশ করিতে দেখিয়া সভয়ে বলিয়া উঠিল। মহারাজ! রক্ষা কর, রক্ষা কর ! [ হাঁটু গাড়িয়া বসিয়া পড়িল ] জয়ন্তী। [ দুর হইতে গভীর স্বরে) এখনও সত্য কথা বল।
চতুর্থ অঙ্ক)
সীতারাম
[প্রথম দৃশ্য
বলছি মহারাজ, আমি অপরাধী। মহারাণী আমার মাতৃরূপা।
তার রূপে অন্ধ হয়ে তাকে লাভ করবার জন্যে আমি শত্রুর সঙ্গে
ষড়যন্ত্র করেছিলাম, আমাকে শাস্তি দিন।
[ সিংহাসন হইতে নামিয়া হাসিয়া গঙ্গারামের কাছে দাড়াইলেন ] কৃতঘ্ন
বিশ্বাসঘাতক! তাের শাস্তি মৃত্যু! রক্ষীগণ একে কারাগারে
সীতা!
নিয়ে যাও!
( যন্ত্র সঙ্গীত যেন একটি প্রবল আর্তনাদ ধ্বনিত হইয়া
উঠিল ও তৎসঙ্গে দৃগান্তর হইয়া গেল ]
দ্বিতীয় দৃশ্য মহম্মদপুর পথ [ রামাদ ও শ্যামাদের প্রবেশ ] রাম। শ্রাম। রাম। শ্যাম। রাম। দেখলে তাে শ্যাম ! বিচারের বহরটা দেখলে ? দোষ করলে ঘােটরাণী আর সাজা পেলে গঙ্গারাম। কিন্তু ছােটরাণী তাে মূচ্ছে গেলেন। মূচ্ছে গেলেন? দেখলে না সােনার বরণ সাদা হয়ে গেল, হাত পা খিচে পড়লেন সখীর ঘাড়ে। আমি যদি পাশে থাকতুম দাদা, কিছু না ভেবে চিন্তে জয় মা কালী ব'লে জড়িয়ে ধরতাম। এই মরেচে রে ! দাদা মরিনি। ম’রবাে মরবাে ভাবছিলাম কিন্তু ঐ গঙ্গারামের দশা দেখে প্রাণটা হাতে হাতে নিয়ে সামলে গেলুম। গঙ্গারাম! গঙ্গারাম কি অপরাধ করেছিল? কি পাঠিয়ে তাকে অন্দরে ডাকাই বা কেন, গােপনে ঢলাঢলিই বা কেন, আবার লােক জানাজানি হলে রাজ্যশু, লোেক ডেকে এ কেলেঙ্কারীই বা কেন? একথা কিন্তু ঠিকই বলেছ! কেলেঙ্কারী বলে কেলেঙ্কারী। আর এটা বিচার হল ? দাড়াও দাদা ভেবে দেখি বিচার ঠিক হ’ল কি না? খাম্ থা তােকে আর ভাবতে হবে না। বিচার হল কি না রাম। রাম।
[क्लिीय प्रमा চতুর্থ অঙ্ক ] সীতারম তুই ভেবে দেখৰি তাহলেই হয়েছে। হা-সেকথা বলতে পারে এই রাম বাঁড়ুয্যে। তাম। কি রকম? বিচারটা ঠিক হত কিসে? রাম। ব’লবাে? রাম। খাম। রাম। স্যাম। রাম। থাম। রাম। বল তো দাদা। আচ্ছা, মনে কর আমি রাজা। তুমি রাজা? হ্যা, আমি রাজা। তুমি যদি রাজা, তাহলে কৈ তােমার সিংহাসন—তিন তিনটে রাণী, তার একটা আবার সন্ন্যাসিনী ? কিছুই তাে দেখছি না। মনে কর সবই আছে। মনরে, জেনে রাখ দাদার আমার সবই আছে। হ্যা, এইবার বল দাদা। আমি ব’লতুম, আরে দুশ্চরিত্রা রাণী—প্রজারঞ্জন আমার ধৰ্ম্ম। সে প্রজারঞ্জনের জন্য তােকে আমি ত্যাগ করলাম। সেই হত বিচার। সভাস্থ সকলে ধ ধষ্ট করতো, আকাশে বাজতাে দুন্দুভি আর দেবতারা করতেন পুষ্পবৃষ্টি। এই হ'ত তােমার বিচার ! ওরে সেকালে শ্রীরামচন্দ্র এই বিচার করেছিলেন বলেই এই জাতের পুরুষরা না ভেবে চিন্তে স্ত্রী ত্যাগ করে ধর্মকর্ম বজায় রেখেছে। তােমার এই বিচারে আমি কি খুব খুসী হতুম । তুমি খুসী হ’তে ? তোমাকে খুশী কৰার জন্যেই যেন বিচারের দরকার। হতভাগা কোথাকার! খাম। রাম। গ্রাম। রাম।
চতুর্থ অৰু] সীতারাম [ দ্বিতীয় দৃশ্য খাম। মের না দাদা, একবার ভাবলাে-রাজত্যাগ করবার পর অনাথা, আশ্রয়হীন, রাণী একাকিনী বনে বনে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, ঘুরতে ঘুরতে পড়লেন রামাদ আর শ্যামাদ নামক দুই সৎ ব্রাহ্মণের সায়ে। তখন••••• রাম। তখন ? শ্যাম। ‘া দাদা তখন•• রাম। তখন আমি কি করতুম দ্যাখ, এই এমনি করে সেই মা শালাকে সাম্নে থেকে সরিয়ে দিয়ে সােজা চলে যেতুম সেই রাণীর কাছে। [ রামাদ হনহ করিয়া চলিয়া গেল ] খাম। ও দাদা, আমাকে একা ফেলে যেও না! ভায়াকে সামনে টোপ ফেল, তা না হলে সুবিধে হবে না। [ আমাদের অনুসরণ করিল। বিপরীত দিক দিয়া সীতারাম ও জয়ন্তী কথা কহিতে কহিতে প্রবেশ করিলেন ] সীতা। আপনি দেবী ! মানুষীর বেশে আমার রাজ্যে এসেছেন তা আমি জানি। আমাকে ছলনা করছেন কেন মা? জয়। আপনি ভুল বুঝছেন মহারাজ ! আমি দেবী নই—দেবীর সেবিকা মাত্র। আপনার রাজ্য, আপনার সম রক্ষার জন্য এক মহাপুৰুষ আমায় এখানে পাঠিয়ে দিয়েছেন—আপনার কাছে এখনও আমার কিছু ভিক্ষা আছে। সীতা। [ সাগ্রহে ] কি বলুন না ! আপনাকে অদেয় ত’ আমার কিছু নেই। আপনি আমাকে সে দিন অযাচিত ভাবে সাহায্য দিয়ে রাজ্য রক্ষা করেছিলেন আজ আমার কুমৰ্যাদা রক্ষা ক'রলেন। আপনি কি চান বলুন! ১০৭ চতুর্থ অফ ] সীতারাম [দ্বিতীয় দৃশ্য সীতা। জয়। সীতা। গঙ্গারামের মুক্তি। [ সবিস্ময়ে । সে কি মা ! রাহুমুক্ত সূর্যের মত আজ আপনার গৌরব প্রকাশিত ; অধৰ্ম্ম নিঃশেষিত, এমন মহাক্ষণে আমার জন্য একজনের জীবন যায় কেন? বেশ, আমি তাকে মুক্তি দেব, কিন্তু তার পূর্বে একটা কথা আপনাকে স্মরণ করিয়ে দিই, আপনি আমায় সেদিন বলেছিলেন যে আমি যে অমূল্য সামগ্রী খুজছি তা আপনি আমায় উপহার দেবেন। গঙ্গারামের মৃত্যুর পরিবর্তে আমি সেই সামগ্রী ভিক্ষা চাই। আপনি তা পাবেন। কি রাজপ্রাসাদে ত' পাবেন না মহারাজ! সীতা। তবে, কোথায় পাব বলুন? সীতা। কোন নিন স্থানে। বেশ, লােকালয়ের বাইরে ‘চিত্ত-বিশ্রাম’ বলে আমার এক নির্জন উজান বাটী আছে, সেইখানে আমি আজ রাত্রে যাব। , কাল সন্ধ্যায় যাবেন রাজা—সেইখানে তাকে আমি পাঠিয়ে দেব। দেবি, আপনি শুধু আজ একজনের জীবন রক্ষা করলেন না, সঙ্গে সঙ্গে আর একজনেরও। এই নি, আমার নামাঙ্কিত অঙ্গুরী, কারারক্ষীদের দেখালে আপনি যা আদেশ করবেন তা পালন করতে তারা বি করবে না। কেবল একটি সীতা। ১০
[ দ্বিতীয় দৃশ্য
চতুর্থ অঙ্ক )
সীতারাম
অনুরােধ, মুক্তির পর পাপিষ্ঠ যেন জন্মের মত এদেশ পরিত্যাগ
করে।
আপনার আদেশ যাতে সে অক্ষরে অক্ষরে পালন করে ।
আমি দেখবাে-আপনার জয় হক মহারাজ।
সীতা।
( জয়ন্তী চলিয়া যাইতেছিলেন সহসা পুনরায় সীতারামের ডাকে দাঁড়াইলেন |
তাহ'লে দেব, কাল সন্ধ্যায় সে নিশ্চয় আসবে?
জয়। ‘া মহারাজ, কাল সন্ধ্যায়-চিত্তবিশ্রামে।
[ উভয়ের বিপরীত দিকে স্থান। যন্ত্র-সঙ্গীত সহযােগে দৃশ্যান্তর।
डौन्न
কারাগার।
[ শৃঙ্খলিত গঙ্গারাম বিভান্তের মত এক কোণে বসিয়া আছে।
সহসা যেন সে ভয় পাইয়া দাঁড়াইয়া উঠিল। অক্ষুট যন্ত্রসঙ্গীত
হইতেছিল ]
কে? কে তােমরা ? আমাকে নিতে এসেছ? কিন্তু
ম’রতে এখন আমি চাই না, মরতে এখন আমি চাই না।
জীবনের অনেক সাধ আমার এখনও বাকী রয়ে গেল।
আমাকে বাঁচতে দাও, আমাকে বাঁচতে দাও! দেবে না, দেবে
না? ( হতাশ ভাবে ] রাজ্যের সবাই বেঁচে থাকবে মরবাে শুধু
আমি ? [ ক্ষুব্ধ ভাবে । কিন্তু আমার যে সর্বনাশ করলে, সে
রাক্ষসী ত’ এখনও বেঁচে আছে-সেই ত’ আমায় দেশ
ভুলিয়েছিল, কর্তব্য ভুলিয়েছিল।-কেন সে এল আমার চোখের
সামনে তার আগুনের মত জ্বালাময় রূপ নিয়ে? ওঃ, পাপিষ্ঠার
ঐ রূপকে আমি নিজের হাতে পুড়িয়ে যেতে পারলুম না—এ
আক্ষেপ আমার মৃত্যুতেও যাবে না ! [ হতাশ ভাবে আর একধারে
গিয়া বসিল, পরে ব্যঙ্গের সুরে ] রাজার রাণী !
রাজার রাতে
কখনও মিথ্যা বলে না-সতী সাধবী রমণী ! তাই নিশীথ
রাত্রির অন্ধকারে গােপনে এক অপরিচিত পুরুষকে বার বার
নিজের শয়নকক্ষে ডেকে পাঠাতে? [ ক্ষোভে ] মিথ্যাবাদিনী!
তাই আমার দাসী হতে চেয়েছিলে, না? কিন্তু আমি মূখ।
তাই রমণীকে বিশ্বাস করেছিলুম। কৃতকার্যের উপযুক্ত শাস্তি।
[ আক্ষেপে ছটফট করিতে করিতে পুনরায় আর একস্থানে গিয়া বসিল ]
১১০
চতুর্থ অঙ্ক )
সীতারাম
[ তৃতীয় দৃশ্য
ওঃ! কেন আমি রাজপুরীর নির্জন কক্ষে সেই আধ আলাে
ছায়ায় যে কোন রাত্রে তার প্রলুব্ধ অধরে আমার কামনার চিহ্ন
অঙ্কিত করে দিয়ে এলুম না? এন্তা হরিণীর মত সে যখন
শিকারীর জালে জড়িয়ে পড়েছিল কেন আমি তাকে মুক্তির
সুযােগ দিলাম? আমারই ভুল, আমারই ভুল! [ দীর্ঘনিঃশ্বাস
ফেলিল। পুনরায় ক্ষোভের সহিত । আমি যদি স্বীকার না করতাম,
আর যদিই বা করলাম তখন কেন উচ্চকণ্ঠে সকলের সামনে
প্রচার করে এলাম না যে রাণীকে আমি অশায়িনী করেছিলাম
সত্য, কিন্তু চিরদিনের মত পাবার কামনাই আমাকে বিশ্বাসঘাতক
করে তুলেছিল। এক ডাকিনী এসে যে আমায় কেমন
অভিভূত করে ফেললে•••[ সহসা কারাভ্যন্তরে রক্ষীর সহিত জয়ন্তীকে
প্রবেশ করিতে দেখিয়া ভয়ে ] কে? কে ?
চিনতে পাচ্ছ না?
ওঃ! তুমি আবার এসেছ? [ অরুদ্ধ কণ্ঠে চীৎকার করিয়া |
জীবনের অন্তছায়ার পারে এসে জমি দাড়িয়েছি এখানেও কি
তুমি আমাকে মুক্তি দেবে না?
তােমাকে মুক্তি দিতেই আমি এসেছি গঙ্গারাম।
মুক্তি দেবার তােমার কি অধিকার আছে ?
আছে কি না জাখ! রক্ষী, একে মুক্ত করে দাও।
[ রক্ষী কর্তৃক শৃঙ্খল মােচন ।
[ বিস্মিত হইয়া ] সতাই কি তুমি আমাকে মুক্ত করে
কিন্তু রাজা যে সৈন্য দিয়ে আবার আমায় ধরে
জয়।
জয়।
দিলে?
আনবে।
১১১
চতুর্থ অক]
সীতারাম
[ তৃতীয় দৃশ্য
বুঝতে পাচ্ছ না, তার অনুমতি না পেলে আমি তােমাকে মুক্তি
দিতে পারতুম না।
আমি তাহলে সত্যই মুক্ত! মৃত্যু নয় মুক্তি।
হ্যা, আর কণার সময় নেই। রাত্রি শেষ হবার পূর্বেই
state!
[ অগ্রসর হইতে হইত ] বাচ্ছি, যাচ্ছি! [ স্বগতঃ ] রাজরাণী! এবার
তােমায় ভিখারিণী করে আমার সাধ করবাে!
[ প্রস্থান—যন্ত্র সঙ্গীত সহযােগে—দৃশ্যান্তর ]
সুখ দশ্য
চিবিএম কুঞ্জপথ
( সীতারাম অধীরভাবে পদচারণা করিতেছেন।
সীতা। কই এখনও তাে সে এল না? এত বিলম্ব হচ্ছে কেন? তবে
কি গঙ্গারামের মুক্তি ক্রয়ের জন্য আমার সঙ্গে সে ছলনা
করলে? না-ছলনাই যদি সে করবে তাহলে সে আমার
মঙ্গলের জন্য এত আয়ােজন, এত এম ক’রবে কেন ? কি
জানি তার সকলই রহস্যময় ! [ সহসা নেপথ্যের দিকে চাহিয়া ]
এই যে দেবী এসেছ ! কই এখনও তাে সে•••[ স্ত্রীর সন্ন্যাসিনীর
বৈশে প্রবেশ ] একি, শ্রী ! তােমার একি বেশ!
[ শান্ত ভাবে ] এই আমার সত্যকারের বেশ মহারাজ।
সে কি ? এ বেশ তাে রাণীর নয়। এ বেশ যে সন্ন্যাসিনীর !
আমি যে সত্যই সন্ন্যাসিনী, সর্ব কৰ্মত্যাগ করে সন্ন্যাস আশ্রম
গ্রহণ করেছি।
সীতা; সে অধিকার তাে তােমার নেই। আমি তােমার স্বামী এখনও
বর্তমান। পতিসেবাই তােমার একমাত্র ধর্ম।
ঐ । যে সমস্ত কর্মত্যাগ করেছে তার পতিসেবা, দেবসে কোন
কিছুই যে ধর্ম নয় মহারাজ।
সীতা। স্বামীর সঙ্গে থাকলে স্ত্রী ধর্মভ্রষ্ট হয় এ কুশিক্ষা তােমায় কে দিলে?
স্বামীর সাহচর্যই তােমার একমাত্র ধর্ম।
মহারাজ! সে ধর্মপালনে আমি সত্যই অক্ষম। অমা
বিদায় দিন।
সীতা।
৮
চতুর্থ অঙ্ক)
সীতারাম
[চতুর্থ দৃশ্য
সীতা। আবার আমি তােমায় বিদায় দেব? অসম্ভব! যৌবনের
প্রথম লগ্নে তোমায় আমি হারিয়েছিলাম আজ জীবনের গোধূলা
ছায়ায় ফিরে পেয়ে আবার কি তােমায় হারাতে বল ?
কিন্তু মহারাজ, আমি থাকলেও তাে তুমি সুখী হবে না।
সীতা। হব! হব! নিশ্চয়ই হব। তােমাকে দেখলেই আমি সুখী হব।
বল, বল তুমি আমায় ছেড়ে আর যাবে না।
কিন্তু রাজপুরীতে তাে আমি থাকতে পারবাে না।
সীতা। কোথায় থাকবে বল ?
কোন নির্জন কুটিরে।
সীতা। বেশ, তাহলে এই নিভৃত চিত্ত বিশ্রামেই তুমি থাক। তােমার
আদেশ ভিন্ন একটা কীট পতঙ্গও এখানে প্রবেশ করতে পারবে
। কিন্তু
এতে আর চিন্তার কি আছে মহারাজ ?
সীতা। আছে বৈকি ! লোকে যে উপহাস করবে।
করুক না! তাতে ক্ষতি কি। সন্ন্যাসিনীর তাতে তাে মান
অপমান কিছু নেই। আমার সত্যকারের মান অপমান নির্ভর
করবে তােমার হাতে।
সীতা। আমার কছে কি তুমি অমৰ্যাদা পাবার আশা কর?
, তা আমি করি না—তবু মানুষের মন বিভ্রান্ত হতে কতক্ষণ?
আমি যে থাকতে চাই—তােমার স্পর্শ থেকে অনেক দূরে
সীতা। গৈরিকের এই আবরণই কি তােমার আমার মধ্যে চিরদিন
ব্যবধান রচনা করে রাখবে ?
ব্যবধান সেইদিনই দূর হবে মহারাজ, যেদিন সমস্ত কামনা শত
-
১১৪
সীতা।
চতুর্থ অক]
সীতারাম
[চতুর্থ দৃশ্য
হয়ে তুমি আমার পাশে এসে দাঁড়াবে। তা যদি না পার
তাহলে জেনাে মৃত্যুর পাথেয় আমার এই অচিলেই বাধা আছে।
শ্ৰী, স্বেচ্ছায় তুমি বন্দিনী না হলে আমি তােমায় জোর করে
বন্দী করতে যাবনা। আশা করি সে বিশ্বাস তােমার আছে ?
তা না থাকলে তােমার কাছে আসতে সাহসী হতাম না।
সীতা।
[ সাগ্রহে ] তাহলে আমার কথা তুমি রাখবে?
রাখবে। তােমাকে ছেড়ে যাবার দিন দূর থেকে তােমার
উদ্দেশে একদিন প্রণাম জানিয়ে ছিলুম আজ কাছে এসে আবার
প্রণাম জানাচ্ছি।
সীতা। নিজের স্ত্রীকে যার স্পর্শের অধিকার নেই তাকে তার আশীর্বাদের
অধিকার আছে কিনা জানিনা। তবু আমি বলছি ঐ আজ
থেকে আর কখনও তােমাকে দৃষ্টির বাইরে রাখবে না। আজ
থেকে তােমার ধ্যানই হবে আমার জীবনের সাধনা।
তােমার রাজ্য, তােমার কর্তব্য ?
সীতা। সব যদি তলিয়ে যায়, তাতেও ক্ষতি নেই। আমি দেখতে চাই
আমার অনুরাগ দিয়ে এই পাষাণ প্রতিমায় প্রাণের সঞ্চার
করতে পারি কি না?
না, না মহারাজ! আর তুমি আমায় বিহ্বল করাে না। আমি
সন্ন্যাসিনী-সংসার আমার স্থান নয়।
সীতা। স্পর্শের অধিকার তুমি কেড়ে নিয়েছ অদর্শনের অভিসম্পাত দিয়ে
আবার তাকে তিক্ত করে তুলােনা দেবী
[ ঐ এক বিহবল দৃষ্টিতে সীতারামের দিকে চাহিয়া ধীরে ধীরে
প্রস্থান করিলেন। বিলভাবে সীতাম তাহার অনুগমন
করিলেন—যন্ত্রসঙ্গীত সহােগোদৃশ্যান্ত ।
পম শ্য
রমা।
রমার ক
[ রমা শয্যায় শায়িতা। যমুনা দাসী খলে ওষুধ মাড়িয়া তাহার কাছে আসিয়া ডাকিল ]
যমুনা। ছোট রাণীমা, এইবার ওষুধটা খেয়ে নাও বাছা।
আর আমি ওষুধ খেতে পারি না যমুনা-ওসব রেখে দে!
আমায় একটু উঠিয়ে বসিয়ে দে।
[ মুনা ধীরে ধীরে মাকে বসাইয়া পাশে বালিশ এভৃতি দিয়া দিল ]
যমুনা তুই এক কাজ করতে পারি?
যমুনা। কি বল মা ?
রমা। তুই আমায় ওষুধগুলো বেচে দিবি তারপর আমি যা করবার
করব।
যমুনা। কিন্তু মা বড়রাণীমা যদি জানতে পারে ?
বুমা। তাের কোন ভয় নেই, কেউ টের পাবে না। যা ওষুধটা ফেলে
দিয়ে আয়।
যমুনা। তা তুমি যখন খাবেই না বলে পিতিজ্ঞে করেছ তখন ফেলেই
আসি। আর সত্যি কথা মা। কি দুঃখেই বা খাৰে? অমন
রাজা সােয়মী, কি থেকে কি হয়ে গেল? তােমার অমন
অসুখ একবারটি দেখতে এলুনি! এক ডাইনিকে নিয়ে
দিবেয়াত্তির বাগান-বাড়ীতে বসে আছে গা !
রমা। [ বিরক্ত ভাবে ] যমুনা, তােকে ব’তে হবে না। তুই যা !
যমুনা। এই যাই না। [ প্রস্থানােত হইতেই নেপথ্যের দিকে চাহিয়া ব্যস্তসমস্ত
ভাবে কাপড়ের ভিতর ঔষধ লুকাইবার জন্য চেষ্টা করিতে লাগিল ] হেই
দেখ বড় রাণীমা আবার কবরেজ মশাইকে নিয়ে এই দিক বাগেই
!
১১৬
চতুর্থ অ] সীতারাম [পঞ্চম দৃশ্য আসছে গাে। আমি এখন কোথায় যাই। [ নন্দা ও কবিরাজের প্রবেশ। যমুনার ভাবার লক্ষ্য করিয়া না তাহার দিকে তীব্র দৃষ্টিতে চাহিয়া কহিল ] ননা। যমুনা, তুই কি কচ্ছিস? যমুনা। এই মা জিনিষ পত্তরগুলাে ধুয়ে নিয়ে আসি। নন্দা। আচ্ছা যা। [কবিরাজের প্রতি ] কবিরাজ মশাই এত ওষুধ বিষুধ খেয়েও তাে কোন ফল হচ্ছে না দেখতে পাচ্ছি। কৰি। তাইতো, আমি তাে কিছুই বুঝতে পাচ্ছি না, মা ! নন্দা। [ বিরক্তভাবে ] আপনি কিছু বুঝতে পাচ্ছেন না? আশ্চর্য ! তাহ'লে বিদেশ থেকে কবরেজ আনতে হবে বলুন। আপনারা দেখছি কোন কাজের নন্ ! কবি। মা, আমরা ওষুধ দিতে পারি কিন্তু পরমায়ুততা দিতে পারি না? তাছাড়া আমার মনে হয় ওষুধ ঠিকমত বােধ হয় পড়ছে না। নন্দা। তার মানে? কবি। আমার মনে হয় কি জানেন, যে দাসী চাকরের ওপরে ওষুধ খাওয়ানাের ভার থাকে অনেক সময় হয়তো তারা অবহেলা করে, ওষুধ দিতে বিলম্ব করে। আপনি যদি অনুমতি করেন তাহলে আমি নিজে উপস্থিত থেকে ওষুধ খাওয়াতে পারি। রমা। [ উত্তেজিত অরে] না-না-আপনি কেন দেবেন, আপনি যা। আপনি—যান! বেশ বেশ তাই হবে, আপনি উত্তেজিত হবেন না। [কবিরা মােয়ত হইতেই চচুড় প্রবেশ করিয়া কবিরাজের সহিত কথা বলিলেন—না শয্যায় গিয়া মার পার্কে বসিল ] কৰিব।
চ। কবি। কবি । চতুর্থ অঙ্ক) সীতারাম (পঞ্চম দৃশ্য মায়ের অবস্থা এখন কেমন দেখছেন কবরেজ মশাই? আমি তাে কোন আশাই দেখতে পাচ্ছি না। । [ চিন্তিত ভাবে ] তাইতাে! বড়ই দুর্ভাবনার কথা হল। এর কি কোন উপায় নেই ? উপায় [ একটু ভাবিয়া ] আচ্ছা, মহারাজকে এখানে একবার আনতে পারেন না? আমি বারবার সে চেষ্টা করে ব্যর্থকাম হয়েছি কবরেজ মশাই। রাজ্য যেতে বসেছে তবু তার চৈতন্য নেই। চিত্ত-বিশ্রাম থেকে সে এক মুহূর্তের জন্য বাইরে আসতে চায় না। তার যে এতখানি পরিবর্তন হবে এ আমি কোনদিন কল্পনাও করতে পারিনি। রমা। দিদি ! না। কি বল ? রমা। উনি কোথায় ? উনি এখুনি আসবেন বােন। বুমা। আমায় ভােলা ? আমি জানি, উনি আর আসবেন না। আমি যে তাকে নিজে হারিয়ে ফেলেছি, কিন্তু আমি কোন দোষ করিনি। [ কণ্ঠস্বর কান্নায় ভারী হইয়া আসিল ] না। [ সস্নেহে ] কে বললে তুই দোষ করেছিস? কেউ তাে বলেনি । সীতার মত তুই অগ্নি পরীক্ষা দিয়ে সবাইকে জানিয়ে দিয়েছিস তুই কত বড়। রমা। সত্যি বলছো ? না। সত্যি না তাে কি মিথ্যে ? না। ১১৮ চতুর্থ অ} সীতারাম [ পঞ্চম দৃশ্য রমা। তুমি বললে মনটা ভারি হাল্কা হয়ে গেল। তােমাকে কত হিংসে করেছি দিদি সে সব কিছু মনে রেখ’না ভাই। [ নন্যার হাত ধরিয়া ] সতীনকে যে হিংসে করতে হয়। আর তােমায় এলাতে আসবে না। [ কাঁদিয়া ফেলিল ] পােড়ারমুখী, তুই আমায় এতখানি শান্তি দিয়ে আজ চলে যাবি এ যে কখনও ভাবতেও পারিনি। রমা। ওঃ, বুকটা যে আমার কেমন কচ্ছে। খােকা—থােকা... [ অস্থির হইয়া পড়িল । নন্দা। রমা। নন্দা। চ। তাকে একবার আনবে, দেখবি ? [ নন্দা শষ্যা ছাড়িয়া দাড়াইল ] [ বাধা দিয়া ] না, না, তাকে এন না, তাকে দেখলে আবার আমার বাঁচতে ইচ্ছা করবে। যার জিনিষ তাকে দিও, কিন্তু একবারটি ওঁকে [ ছটফট করিতে লাগিল ] গুরুদেব, আপনি কি একবার.••••• যাচ্ছি মা যাচ্ছি, আর একবার শেষ চেষ্টা করবাে। [ প্রান। যদি উনি না আসেন তাহলে একটু ওর পায়ের ধুলাে•একটু পায়ের ধূলে। ও! ( শষ্যায় লুটাইয়া পড়িল ] [ কাছে গিয়া ] ছােট বৌ, ছােট বৌ! ছিঃ কি করছিস? [ গায়ে হাত দিয়া ] একি গা হাত-পা এত ঠাণ্ডা কেন? কবিরাজ মশাই, দেখুনতাে! [ কবিরাজ তাড়াতাড়ি নাড়ী পরীক্ষা করিলেন ] [ ধীরে ধীরে শষ্যার কাছ হইতে সরিয়া আসিয়া বিমর্ষভাবে বলিলেন ] মা অামার শান্তি পেয়েছেন। রমা। নন্দা। কবি।
চতুর্থ অঙ্ক]
সীতারাম
[পঞ্চম দৃশ্য
নন্দা। এ), ছােট বৌ নেই, হােট বৌ নেই? [ মার বুকের উপর
পড়িয়া নীরবে কাঁদিতে লাগিল ]
[ অস্ফুট যন্ত্র-সঙ্গীতে কক্ষ ভরিয়া উঠি, ধীরে ধীরে সীতারাম
প্রবেশ করিলেন।
সীতা। আমায় ডাকছিলে কেন?
নন্দা। আমি নই! ( ধীরে ধীরে শষ্যাপা হইতে উঠিয়া সরিয়া দাড়াইল ]
সীতা। তবে কে ?
নন্দা। [ উদাসভাবে সম্মুখের দিকে চাহিয়া গম্ভীর স্বরে ধীরে ধীরে বলিতে লাগিল ]
যে ডেকেডিল সে ডেকে ডেকে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে, আর
কোনদিনই ডাকবে না। গােলাপ ফুলের মতই ফুটে উঠেছিল
সে রাজার বাগানে, আজও তার পূর্ণ সৌন্দৰ্য্য নিয়েই সে ঝরে
প'ড়ে গেল।
[ সীতারাম ছুটিয়া রমার শয্যার কাছে গিয়া বসিলেন। রমাকে
বিগতণা দেখিয়া শির নত করিলেন। সহসা না দৃপ্ত সিংহীর
মত গাইয়া বলিয়া উঠিল ]
এর জন্য দায়ী তুমি! মহারাজ! তুমিই রমার মৃত্যুর কারণ!
সীতা।
( উদাসভাবে ] হয়ত তাই! তােমার কথাই হয়তাে সত্য।
কে জানে জীবনের পরপারে গিয়ে সে আমাকে ক্ষমা করবে
কিনা! ( ধীরে ধীরে নন্দার কাছে উঠিয়া আসিলেন ]
তুমি বিশ্বাস কর না আমি মাকে ভালবাসতাম, কিন্তু অদৃষ্টের
কুর পরিহাসে আমি নিজেকেই আজ হারিয়ে ফেলেছি। আমি
যাচ্ছি...আমি যাচ্ছি।
[ প্রস্থানােত হইতেই চচুড় প্রবেশ করিলেন ।
। কোথায় যাও, মহারাজ ?
চতুর্থ অঙ্ক ]
সীতারাম
{ পম দৃশ্য
সীত।। রাজপুরীর বাইরে গুরুদেব! এখানকার বাতাস আমার কাছে
ভারী হয়ে উঠেছে। আমি পাচ্ছিনা—এখানে থাকতে আমি
পাচ্ছিনা।
একজনকে আজ হারালাম আর একজনকে
অবহেলা করে দূরে ফেলে রেখে দিয়েছি...আবার কোন্
ভুলে হয়তাে তাকেও হারাবাে। আমি যাই, আমি যাই!
[ চলিয়া গেলেন ]
চন্দ্র। [ বিস্মিতভাবে তৰু পিছন হইতে অক্ষুটস্বরে ডাকিয়া উঠিলেন ] সীতারাম।
নন্দা। থাকু গুরুদেব! পিছু ডেকে আর কোন লাভ নেই। ওকে
এখন যেতেই দিন্ ! [ চন্দ্রচূড় শির নত করিলেন ]
[ ধীরে ধীরে যবনিকা পড়িল ]
১২১
পঞ্চম অঙ্ক
প্রথমদস্য
চিত্ত বিশ্রাম কুঞ্জপথ
[ সীতারাম দরবার পােষাক পরিধান করিয়া অধীর আগ্রহে-কে ডাকিতে
ডাকিতে প্রবেশ করিলেন ]
সীতা।
[ এর হাসিতে হাসিতে প্রবেশ ]
ঐ । আশ্চৰ্য্য! দরবারে যাবে বলে প্রস্তুত হয়ে আবার ফিরে
এলে—কি হল ?
সীতা। পারলাম না।
আচ্ছা, একটি বারও কি তুমি আমায় চোখের আড়াল
করতে পারনা ?
সীতা।
, একবার যে আড়াল করে ঠকেছিলাম।
এ । আচ্ছা, সর্বদাই—তাে তুমি চিত্ত বিশ্রামে থাক, তাইলে রাজ্য
করে কে ?
সীতা। রাজ্য কোথায়? রাজ্য তো তুমি। রাজ পুরীতে থাকতে
আমি পারিনা—কেন তা তুমি জান ? তোমার কাছে যে সুখ
তার চেয়ে কি রাজ্যে সুখ আছে ?
এ । তুমি একি ব’লছে আমার ভয় কছে।
সীতা। কেন?
১২২
পঞ্চম অক] সীতারাম [ প্রথম দৃশ্য মনে হচ্ছে আমার জন্যে একজনকে হারিয়ে আবার আমার জয়ে হয়তো রাজ্য যাবে। সীতা। যায় যাক ! আমি রাজ্য ছাড়তে পারি সে অতি তুচ্ছ, কিন্তু তােমায় আমি ইহজীবনে ছাড়তে পারিনা। [ সহসা নেপথ্যে ঘণ্টাধ্বনি ] কে ? রক্ষী। [ জনৈক রক্ষীর প্রবেশ ও অভিবাদন ] মহারাজ! ফকির সাহেব আপনার জন্যে বাইরে অপেক্ষা করছেন। বলছেন রাজকার্য সম্বন্ধে কতকগুলি বিশেষ কথা বলতে এসেছেন। সীতা। ব'লেদে এখন সাক্ষাতের সময় হবেনা। এখানে এসে অকারণে তিনি যেন না আমায় বিরক্ত করেন। [ রক্ষীর প্রস্থান ] রাজকাৰ্য্য, রাজকাৰ্য্য! নিজেদের যদি কোন যােগ্যতা থাকে। শ্ৰ তাই যদি মনে কর নিজেই সব দেখনা কেন ? সীতা। নিজেই যদি সব দেখবে তাহলে মন্ত্রী, সেনাপতি রক্ষী কাউকে রাখবার প্রয়ােজনীয়তা কি? রাজকাৰ্য্য ছাড়া কি রাজার বিশ্রামের সুযােগও মিলবেনা ? সত্যই যদি সে সময় না পাও তাহ'লে রাজকাৰ্য কোন যােগ্য ব্যক্তির হাতে দিয়ে সন্ন্যাস গ্রহণ করে আমার সঙ্গে চলনা কেন মহারাজ ? সীতা। তােমার সঙ্গে? ঐ। সীতা। বেশ তেৰে দেখি। [ চিন্তাথিত হইলেন, পুনরায় ঘণ্টাধ্বনি। সীতারাম বিরক্ত হইয়া উঠিলেন। আঃ আবার কে এল? শ্ৰী ১২৩
পঞ্চম অঞ্চ,
সীতারাম
[ প্রথম দৃশ্য
রক্ষী।
যেতেও
=
[ রক্ষীর পুনঃ প্রবেশ ও অভিমাদন )
মহারাজ ক্ষমা করবেন। চচুড় ঠাকুর বাইরে অপেক্ষা করছেন।
সীতা। ব'লেদে এখন আমার সময় হবেনা। আর আমি এখন
পারবনা। এখানে আমি বিশ্রাম করতে এসেছি
রাজকাৰ্য্য করতে আসিনি।
মহারাজনিশ্চয় কোন গুরুতরকার্যের জতিনিতােমায় ডাকছেন।
সাল। এখন কোন গুরুতর কাৰ্য্য থাকতে পারেনা।
তবু একবার দেখা দিলে কোন ক্ষতি ছিল কি? আমার জন্য
কি সত্যই তুমি ঘর সংসার সব ভুলবে?
সীতা। ভুলেতাে আছিই—কিন্তু মাঝে মাঝে দুগ্রহের মত ওরা এসে যে
আমার সে ভুল ভেঙ্গে দিয়ে যায়। স্বপ্নের আবেশে যখন মন
ভরে ওঠে এমনি সময় ওদের অতর্কিত ডাক আমার স্বপ্নকে
রূঢ় আঘাতে টুকরাে টুকরো করে ফেলে। কিন্তু ওর যাক!
শুধু তুমি—তুমি এস , তুমি আমার বুকে এস। তােমাকে নিয়ে
আমি আর এক জীবনের স্রোতে গা ভাসিয়ে দেই।
[ আলিঙ্গনােত ]
[ সহসা যেন ভয় পাইয়া পিছাইয়া গেল ] মহারাজ। আমার স্পর্শ
ক’নােনা, আমায় স্পর্শ করাে না তাহলে আমার এই প্রাণহীন
দেই
সীতা। [আত্মসংবরণ করিয়া) না না আমি আমার প্রতিজ্ঞা ভুলিনি, প্রতিজ্ঞা
ভুলিনি! শুধু•••[ সহসা জয়ন্তীকে প্রবেশ করিতে দেখিয়া ]
ও; আপনি...আমি রাজপুরীতে যাচ্ছি, আমি রাজপুরীতে
যাচ্ছি। (সীতারাম দ্রুত প্রদান করিলেন ]
১২
পঞ্চম অঞ্চ]
সীতারাম
[প্রথম দৃশ্য
[ জয়ন্তীর কছে গিয়া ] জয়ন্তী তুমি এইখানেই আছ?
ছিলাম না, এসেছি। মহাপুরুষ বলেছেন যে তােমার এ রাজ্য
এখন ত্যাগ করাই মঙ্গল। তুমিও কি তা বুঝতে পাচ্ছনা ?
পাচ্ছি।
তাহলে এখুনি এখান থেকে চলে যাও ?
কোথায় যাব?
আপাততঃ তুমি রাজপুরােহিতের বাড়ী যাও ! তিনি তােমায়
আশ্রয় দেবেন আমি সমস্ত বন্দোবস্ত করে এসেছি।
কেমন করে এখান থেকে যাব?
এই নাও,-আমার ত্রিশূল আর আমার অঙ্গুরী। এই দেখিয়ে
তুমি অবিলম্বে এস্থান ত্যাগ কর। [ ত্রিশূল ও অঙ্গুরী প্রদান ]
তুমি কেমন করে যাবে? রাজা জানতে পারলে তাে তােমার
জীবন বিপন্ন হবে বোন!
আমার জন্যে ভেবনা-জেনাে আমি সন্ন্যাসিনী!
[ এর স্থান ও যন্ত্রসঙ্গীত সহযােগে দৃশ্যান্তর ]
১২৫
দ্বিতীয়
দস্য
সীতারামের রাজপ্রাসাদের কক্ষ
[ সীতারাম অত্যন্ত উত্তেজিত ভাবে দণ্ডায়মান। তাহার দুই পার্শ্বে চচুড় ও
ফকির সাহেব ]
সতা।
আমি আশ্চর্য হয়ে যাচ্ছি যে সামান্য কয়েকদিন বিশ্রামের
জন্য আমি ছিলাম না, আর তারই ভেতরে রাজ্যের সমস্ত
শৃঙ্খলা নষ্ট হয়ে গেছে।
চন্দ্র। সেটা তাে স্বাভাবিক মহারাজ। রাজ্য কেন, নিজের সংসারের
দিকে চেয়ে দেখ, সেদিকেও দৃষ্টি না থাকাতে কী নিদারুণ
ক্ষতিই না হয়ে গেল।
সীতা আপনিও কি সেজন্য আমাকে দায়ী করতে চান ?
দায়ী করবার স্পর্ধা আমার নেই—তবে আমি তােমার গুরু
ও এ রাজ্যের মন্ত্রী, সেই কারণেই বলতে পারি যে যা কিছু
রক্ষণীয় তুমি যদি তা রক্ষা না কর, তাহ'লে তার ধ্বংস
অনিবার্য।
সীতা। ই! এতদিন একথা বলেন নি কেন?
চ। বার সুযােগ পেলাম কোথায় ? মাসের পর মাস অপেক্ষা
করেচি, তুমি রাজপুরীতে ফিরে আসনি। যদিও বা ক্ষণেকের
জন্য এসেচ তাও তােমার অবসরের অভাবে বলতে পারিনি।
সাতা। আমি এইটেই বুঝতে পাচ্ছি না যে আপনারা তাহলে করেন
কি? আপনি, ফকির সাহেব, মৃন্ময়?
ফকির। রাজার কর্তব্য যদি রাজার কর্মচারীদের দিয়েই সম্ভব হত,
চয।
[ দ্বিতীয় দৃশ্য পঞ্চম অঞ্চ ] সীতারাম তাহলে তাে কোন চিন্তাই ছিল না—মহারাজ! সকলে আপনার আদেশ-চায় । সী। বেশ, সেই আদেশই তারা আজ পাবে। [ উত্তেজিত যে পদচারণা করিতে লাগিলেন ] [ চন্দ্রচূড়ের প্রতি ] মুর্শিদাবাদে এক বৎসরের খাজনা বাকী এর কারণ কি ? চ। প্রথম কারণ ব্যয় বৃদ্ধি, দ্বিতীয় কারণ, রাজস্বের সঠিক হিসাব কেউ রাখে না। সীতা। বটে! কে আছিস? [ রক্ষীর প্রবেশ ] খাজাঞ্চী ! [ রক্ষীর অভিবাদন করিয়া প্রস্থান ] আমি আজ বুঝতে পাচ্ছি এ সংসারে কাউকে বিশ্বাস করতে নেই, কাউকে নয় ! আমি আজ আদেশ দেব, রাজার আদেশ! [ জীবনভাণ্ডারী প্রবেশ করিয়া নমস্কারপূর্বক দাড়াইল ] এই যে জীবন। তােমাকে আমি উচ্চপদ দিয়েছিলাম বিশ্বাস করে। সে বিশ্বাসকে আশা করি অক্ষুন্ন রেখেছ ? জীবন। (করঘােড় ] আজ্ঞে মহারাজ! একেবারে নিরি ওজনে। সীতা। রাজকোষে কত অর্থ আছে ? জীবন [ মাথা চুলকাইয়া] আজ্ঞে, কোনমতে এ মাসটা রাজবাড়ীর খরচ চালিয়ে দেব। সীতা। ই! তােমার অধীনে কতজন কর্মচারী আছে ? জীবন। আজ্ঞে, একশাে আশি জন। সীতা। কে আছিস? [দুইজন রক্ষী প্রবেশ করিল ] এই জীবন ভাণ্ডারী পঞ্চম অঞ্চ) সীতারাম [বিতীয় দৃ আর এর অধীনে যত কর্মচারী আছে এদের প্রত্যেককে কাল প্রভাতে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে। বানিয়ে যা ! ( রক্ষীর জীবনকে ধরিতে যে চীৎকার করিয়া কাঁদিয়া উঠিল। জীবন। মহারাজ, আমি কিছু করিনি, আমি কিছু করিনি আমায় বা করুন। সীতা। [ মাটিতে পদাঘাত করিয়া ] যাও! ( রক্ষীরা জীবনকে টানিয়া লইয়া গেল ] মহারাজ! এদের মধ্যে যে বহু ব্রাহ্মণ আছে। সীত। [ ব্যঙ্গ করিয়া চন্দ্রচূড়কে কহিলেন ] আপনার স্বজাতি ব'লে ব্যথা লাগছে না কি? কিন্তু জেনে রাখবেন তারা আপনার প্রজাতি হলেও গৌরবের পাত্র নয় - লজ্জার! তারা চোর! ( কুদ্ধভাবে ) আমি আজ কাউকে ক্ষমা করবে না—বহুজনের ভাগ্যে আজ কারাবাসের আদেশ ঘটবে। ফকির। কিন্তু মহারাজ কারাগার রক্ষার সৈন্য কই ? অর্ধেক সৈন্য যে বেতন না পেয়ে চলে গিয়েছে। সীতা। [ সবিস্ময়ে ] চলে গিয়েছে? ফকির। হ্যা, এতদিন মৃন্ময় তাদের কোন রকমে বুঝিয়ে রেখেছিলেন- সে পরগণা পরিদর্শনে বেরিয়ে যেতে তারা অধিকাংশই এখন চলে গেছে। আর আপনারা দূরে দাঁড়িয়ে কৌতুক উপভােগ করছেন? এরই জন্য আপনাদের আমি আমন্ত্রণ জানিয়ে রাজ্যের পুরােভাগে স্থাপন করেছিলুম। চমৎকার আপনাদের কর্তব্য বুদ্ধি। এর চেয়ে বেতনভুক কর্মচারী রাখলে তারা এ বিষয়ে অবহিত ১২৮ পঞ্চম অঞ্চ ] সীতারাম [ দ্বিতীয় দৃ হত। আপনাদের মত মঙ্গলাকাজীদের নিয়ে আমায় বিব্রত হতে হত না? ফকির। আমাকে তাহলে বিদায় দিন মহারাজ! চত্র। আমাকেও! সীতা। বেশ! তাতে আমার আপত্তি নেই। ( ফকির সাহেব ও চন্দ্রচূড়ের প্রস্থান ] আমি সকলকে অতিরিক্ত মৰ্যাদা দিয়েছিলুম তার এই পরিণাম ! জগতে কার অভাবে কিছু অচল হয় না, এঁদের আমি তাই দেখাবাে। [ নেপথ্যে কোলাহল ] কিসের গােলমাল? রক্ষী! [ রক্ষীর প্রবেশ ] গােলমাল কিসের? রক্ষী। কয়েকজন রক্ষী একজন সন্ন্যাসিনীকে ধরে আনছে, তারই সঙ্গে জনতার কোলাহলঃমহারাজ! সন্ন্যাসিনীর প্রতি বুঝি অত্যাচার করতে চায়? প্রজাদের বড় আনন্দ, না! সকলকে এখানে নিয়ে আয়। [ রক্ষীর প্রস্থান। আকাশ স্পশী স্পর্ধা আজ রাজ্যের অধিবাসীদের এমনি চঞ্চল ক'রে তুলেছে যে তারা আজ কাউকে মানতে প্রস্তুত নয় দেখছি। আজ আমি সব কিছুর অবসান করবে। [ রক্ষাগণ, জয়ী ও জনতার প্রবেশ। সীতারাম জয়ন্তীকে দেখিয়া বিস্মিতভাবে কহিলেন ] আপনি! প্রথম রক্ষী। মহারাজ চিত্ত বিশ্রামে এই সন্ন্যাসিনী আপনার নামাঙ্কিত অঙ্গুরী দেখিয়ে প্রবেশ করে সেখানকার দেবীকে গােপনে মুক্ত করে দিয়েছে। ১২৯ G
পঞ্চম অঙ্ক ]
সীতারাম
[ বিতীয় দৃশ্য
সীতা।
।
সীতা। ( উত্তেজিত ভাবে ] সে কি, ঐ নেই ? তােদর আমি সকলকে
হত্যা করব ! [ রক্ষীর কণ্ঠ টানিলা ধরিলেন ]
জয়ন্তী। ওদের কোন অপরাধ নেই, আমিই কৌশলে তাকে পালাতে
সাহায্য করেচি।
[ জয়ন্তীয় কাছে আসিল ] ডাকিনী, আমাকে নিয়ে তুমি খেলা
করছে। ? আজ বুঝতে পাচ্ছি তােমরাই কুশিক্ষায় শ্রী আমার
আপন হয়েও আপন হ’লনা। কি তােমার উদ্দেশ্য ?
জয়ন্তী। উদ্দেশ্য তােমার মঙ্গল রাজ্যের মঙ্গল।
সীত।। সেই মঙ্গলাচরণের বােধন উৎসব, আমি তােমাকে দিয়েই আরম্ভ
করবাে। [ ১ম রক্ষীকে ডাকিয়া ] এই, এই ডাকিনীকে সকলের
সম্মুখে বিবস্ত্র করে পঞ্চাশ ঘা বেত লাগা !
১মরক্ষী। মহারাজ । [ জনতা শিহরিরা উঠিল ও সকলে করজোড়ে বলিয়া উঠিল ]
সকলে। মহারাজ উনি স্ত্রীলােক ওকে মার্জনা করুন।
, না এ অপরাধের মার্জনা নেই ! নির্লজ্জার আবার লজ্জা
কিসের ? রক্ষী।
[ রক্ষী ভয়ে ভয়ে জয়ন্তীর দিকে অগ্রসর হইতে, জয়ন্তী হাটু গাড়িয়া কাতর
ভাবে প্রার্থনা করিতে লাগিল |
জয়ন্তী। নারায়ণ ! জনার্দন, আমি সন্ন্যাসিনী হলেও এখনও যে আমার
নারীত্বের অভিমান যায়নি প্রভু! রক্ষা কর, রক্ষা কর !
[ রক্ষী বেত তুলিল। সহসা অন্তঃপুর হইতে না ছুটিয়া আসিয়া জয়ন্তীকে
ধরিয়া বলিয়া উঠিল ।
না। সাবধান!
জনতা। [ সােৎসাহে ] জয় মহারাণীর জয়!
সীতা।
১৩০
পঞ্চম অঞ্চ] সীতারাম [দ্বিতীয় দৃশ্য সীতা। এ কি রাণী! তুমি এখানে কেন ? অন্তঃপুরে যাও, এখানে তােমার স্থান নয়। নন্দা। মহারাজ, এখানে আমার স্থান নয় আমি জানি, কিন্তু তুমি আজ কোথায় এসে দাঁড়িয়েছ সেইটে আজ শুধু একবার ভেবে দেখ। তােমার জন্যে আজ রাণীকেও অন্তঃপুর থেকে বাইরে ছুটে আসতে হয়। | জনতার দিকে চাহিয়া ] তােমাদের বােধ হয় আর এখানে প্রয়ােজন নেই, সকলে যেতে পার। [ জনতা চলিয়া গেলে জয়ন্তীর হাত ধরিয়া বলিল ] এস মা! তুমি কে তা জানিনা, আমি তােমায় নিরাপদে পাঠিয়ে দেব এস। শুধু যাবার বেলায় একটি ভিক্ষা দিয়ে যাও মা, যেন ওঁর সমস্ত অপরাধ আমার চোখের জলে ধুয়ে যায় ! [ জয়ন্তীকে লইয়া নন্দ অন্তঃপুরে চলিয়া গেল ] সীতা। [ অস্থির ভাবে পদচারণা করিতে করিতে ] ওঃ! শান্তি নেই, শান্তি নেই। বাধা চারিদিকে বাধা ! আমার জীবন নিয়ে সকলে খেলা ক'রে চলেছে, আমি কেন সবার জীবন নিয়ে খেলা ক’রবাে না। আমি এর প্রতিশােধ নেব। [ নেপথ্যে কোলাহল উঠিল। জনৈক রাজপুত রক্ষীর দ্রুত প্রবেশ ] রাক্ষী। মহারাজ! সর্বনাশ উপস্থিত হয়েছে। নবাব মুর্শিদকুলী খা মহম্মদপুর আক্রমণ করেছেন। তীরবেগে তার সৈন্যরা এই দিকে ছুটে আসছে। দুর্গের সমস্ত ফৌজকে ভা। রাজ-রক্ষী। আমরা অল্প কয়েকজন রাজপুত রক্ষীছাড়া দুর্গে আর কেউ নেই। সীতা। কেউ নেই—কেউ নেই? কিন্তু সীতারাম রায়তাে এখনও সীতা। ১৩১
পঙ্ক অঙ্ক ]
সীতারাম
[ দ্বিতীয় দৃ
মরেনি। মরণের সঙ্গে আমার আজ শেষ প্রতিদ্বনিন্যা !
[ স্বহস্তে রক্ষীর তরবারি টানিয়া লইয়া সীতারাম বলিয়া উঠিলেন ] দেখি
নবাবের ফৌজ কত শক্তি ধরে ?
[ দ্রুত প্রস্থান। রাজপুত রক্ষী তাহার অনুসরণ করিল। যন্ত্রসঙ্গীত সহযোগে
দৃশ্যান্তর, বাহিৰে তাহার সহিত কোলাহলও মিশ্রিত ]
১৩
डौमा পথ [ রামাদ ও খামাদ একাণ্ড দুই পুটলী লইয়া ছুটিতে ছুটিতে প্রবেশ করিল। উভয়েই হাঁপাইতেছিল। তাহারা প্রবেশ করিতে কোলাহল ধীরে ধীরে কমিয়া গেল ) রাম। শ্যাম। রাম। শ্যাম। আর দেখবে কি? শেষ পর্যন্ত এই রাম বড়য্যের কথাটা ফ’ললাে কি না দেখ ! নবাবী ফৌজ তাে এসে পড়লাে বলে। হু হু বাবা। বারেবারে যাদু তুমি খেয়ে যাও ধান, এইবার ! শেষ পর্যন্ত যে এই হবে তা আমিও জানতুম । হঁা, তুমি তো সবই জানতে। তাই তিনমাস আগে গােদের ওপর বিষ ফোড়া আবার একটা বিয়ে করতে যাচ্ছিলে? আহা, তুমি বুঝছােনা দাদা, ব্রাহ্মণের মেয়ে নেহাৎ কন্যাদায় বলে ধরেছিল তাছাড়া দেখতে শুনতেও. মন ছিলনা তাই তাতাে জানি, কিন্তু মাসকতক পরে এর বদলে তাকেই হয়তো যেতে হত রাজার কুঞ্জে। সেটা ভেবেছিলে ? তা ভাবিনি। কিন্তু দেখ, আমি কতদিন আগে থেকে সব ভেবে রেখেচি। ওরে বাপু, ঐ জন্যে তাে বিয়ে করি করি করেও করলুম না। তোমার কথা ছেড়ে দাও দাদা, ওঃ, কি করে যে সেই বুড়ী বামনিকে নিয়ে তুমি [ বাধা দিয়া ] আহা! কাজ তাে চলে গেল! অথচ মনে রাম। খাম। রাম। শ্যাম। রাম। ১৩ পঞ্চম অঙ্ক) সীতারাম (তৃতীয় দৃশ্য কর স্ব-শ্রেণী। অধৰ্ম্ম হ’ল না—সেই তো রাঁধা বাড়া থেকে সবই চালালে? শ্যাম। তা যাকগে ওসব। আপাতত কোন দিকে? রমা। চাল চিড়ে বেধে নিয়েছি যেদিকে সবাই পালাচ্ছে ঠিক তার উল্টো দিকে হাঁটতে শুরু কর। একটা ভাল আস্তানা মিলবেই। শ্যাম। কিন্তু ভাবছি, আবার কোথায় গিয়ে পড়বে। রমা। ওহে ভাবাভাবি ছাড়, আমি বলছি এবার যেখানে যাব সেখানে আর যাই হক ডাকিনীর উৎপাত থাকবে না এটা ঠিক। শ্যাম। তা’ যা বলেছ= এক ডাকিনী না যােগিনী জুটেই রাজাকে খেলে। রমা। দাঁড়াও! এখন হয়েছে কি ? এখনও হাড় খাবে, মাস খাবে.. চামড়া নিয়ে ডুগডুগি বাজাবে। তবে তো? শ্যাম। [ সহসা নেপথ্যের দিকে চাহিয়া ভীতভাবে ) দাদা! রাম। কি রে ? শ্যাম। আসছে! রাম। কে ? শ্যাম। রাম। শ্যাম। ডাকিনী ? হ্যা ! উল্টো দিকে উল্টো দিকে! রাম। [ রামদে হাতে চটি লইয়া ছুটীল, তাহার পিছনে পিছনে শ্যামাদ ও ছুটিয়া পালাই—বিপরীত দিক হইতে স্ত্রী ও জয়ন্তীর প্রবেশ ] এখনও এখান থেকে যেতে চাইছে না কেন বােন? আবার কি ১৩৪
পঞ্চম অঞ্চ ]
সীতারাম
[তৃতীয় দৃশ্য
জয়ন্তী।
বিপদ ডেকে আনবে ? আমার জন্যে তো তঁার সব যেতে
বসেছে। কেন তার সঙ্গে দেখা করলুম বােন?
দেখা করে ঠিকই করেছিলে, কিন্তু আজ বুঝেছি তার সঙ্গে ঘর
কল্পে ই ভাল করতে। আমারই ভুল, স্বামীর কাছে থাকলে
কি অধৰ্ম হয় ?
শ্ৰী
তোমার মুখে এ কি কথা জয়ন্তী ?
জয়ন্তী। এই কথাই সত্য! নিজেকে দিয়ে তােমার বিচার করতে গিয়ে
ভূল করেচি।
তাই আমাদের জ্ঞানের অহঙ্কার মহাপুরুষ
চুর্ণ করেছেন।
তাইলে আমি কি করবাে ?
জয়ন্তী। চল ! তঁার চরণে আবার তােমাকে রেখে আসি [ অগ্রসর হইয়া ।
এ রাজ্যের রক্ষা নেই জানি। তবু তােমায় দেখে যদি তিনি
বল পান। আবার যদি নারায়ণ সব রক্ষা করেন।
তাই চল, তিনি যদি স্থান দেন তবেই ভাল, না হলে আবার
বনচারিণী হব।
[ উভয়ের প্রস্থান। যন্ত্র সঙ্গীত সহযােগে দৃশ্যান্তরী
থদশ্য
দুর্গচত্বর
[ সীতারাম দুর্গদ্বারে যােদ্ধে বেশ পরিয়া দয়ামান। সূর্যের লাল আভা
তাহার মুখের উপর পড়িয়াছে। রাজপুত দ্রুত প্রবেশ করিয়া বলিল ।
রাজ-রক্ষী। মহারাজ! এখনও পাঁচজন রক্ষী আছে। তারা দুর্গের
বাইরে কামান নিয়ে দাড়িয়ে আছে। একবার শেষ চেষ্টা
করতে চায়।
সীতা। নবাবের ফৌজ কত ?
রাজ-রক্ষী। বিশ হাজারের বেশী।
সীতা। তারা কতদূরে ?
রাজ-রক্ষী। নলদী পরগণায়।
[ ক্লান্ত ভাবে ] তােরা আর আমার পাশে দাড়িয়ে আছিস কেন
রাজপুত ফিরে যা!
রাজ-রক্ষী। এ কি আদেশ করছেন মহারাজ-আপনাকে একাকী
রেখে আমরা কোথায় যাব ?
[ স্নান হাসিয়া ] কোথায় যাবি ? ঘরে যা, ঘরে যা। [ দীর্ঘনিঃশ্বাস
ফেলিয়া ] আমায় ছেড়ে সবাই চলে গেছে। চন্দ্রচূড় ঠাকুর চলে
গেছেন, ফকির সাহেব গেছেন, অভিমানিনী রমা চলে গেছে
আর যার জন্যে সব গেল সেও নেই! তােরা আমার পাশে
আর কেন থাকবি দাড়িয়ে ? মৃত্যু যেখানে অনিবাৰ্য সেখানে
তােদের আমি পাড়িয়ে থাকতে বলি কোন সাহসে?
রাজ-রক্ষী। মহারাজ! আমরা রাজপুত-বাঙ্গালী নই।
সীসা।
সীতা।
পঞ্চম অঞ্চ ] সীতারাম [ চতুর্থ দৃশ্য সী। তা আমি জানি। কিন্তু তােরা কি বাংলা দেশ থেকে বাঙালীর এই পরিচয়ই নিয়ে যাবি যে তারা অমানুষ ? ওরে তা নয়, আমার মত অপদার্থ সবাই নয়। এখানে এখনও মৃন্ময় আছে, চন্দ্রচূড় আছেন, ফকির সাহেব আছেন যাদের বুকে নিয়ে সারাদেশ ধন্য হয়েছে আর তারা আছেন বলেই এখনও বাঙালীর নাম মুছে যায় নি। রা-রক্ষী। মহারাজ! অপরাধ নয় ভাই ভুল। আমরা সবাই ভূলের খেয়ায় পাড়ি দিয়ে চলেছি। তােদের প্রতি আমরা ভুলবােন— তােরা ফিরে যা। রা-রক্ষী। [ কর যােড়ে ] ও আদেশ আমাদের করবেন না মহারাজ। বাংলার নিমক খেয়ে তার দুঃখের দিনে আমরা তাকে ছেড়ে যেতে পারবাে না। বেশ! তাহ'লে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হওগে ভাই! সীতা। নন্দা। [ রাজরক্ষীর প্রস্থান ] [ দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলিয়া ] কি আশ্চর্য ! আজ আমি শুধু রাজ্য হারাতে বসিনি, এমন মহাপ্রাণদের নিজের হাতে বলি দিতে চলেছি। [ নন্দার প্রবেশ ] মহারাজ। এ কি না ? তুমি এখানে কেন ? [ কাতর ভাবে ] তােমার পাশে ছাড়া আমার কোথায় স্থান বল? কিন্তু আমি যে মৃত্যুপথ যাত্রী। আমিও তােমার সহবাহিনী হব। সীতা। নন্দা। সীতা। নন্দা।
পঞ্চম অৰু] সীতারাম [চতুর্থ দৃশ্য সীতা। [ সহসা সীতারামকে জড়াইয়া ধরিয়া কাঁদিতে কাদিতে বলিয়া উঠিল ] ওগাে, তুমি ছাড়া যে আমাদের আর কেউ নেই ! সীতা। [ অরুদ্ধ কণ্ঠে গভীর ভাবে ] তােমার দুর্ভাগ্য, রমার দুর্ভাগ্য যে আমাকে স্বামীরূপে পেয়েছিলে। জীবনে একদিনও তােমাদের সুখী করতে পারলুম না। [ নন্দা স্থিরভাবে সীতারামের মুখের দিকে চাহিয়া গ্রীব। উন্নত করিয়া কহিল ] নন্দা। কে বলে সুখী হইনি? ঈশ্বরের কাছে এখনও প্রার্থনা করি যে জন্মে জন্মে যেন তােমাকেই স্বামীরূপে পাই ! বেশ, তাহলে প্রস্তুত হয়ে এস ! রাজপরিবারের সকলকে গুপ্তদ্বার দিয়ে যেকোন জায়গায় পাঠিয়ে দাও। [ না ফিরিয়া গেল। সীতারাম পুনরায় দুর্গদ্বারের দিকে অগ্রসর হইতেই ৷ ও জয়ন্তী প্রবেশ করিল ] কে ?-ও তোমরা এসেছ? এখনও কি মনস্কামনা সিদ্ধ হয়নি? অদৃষ্টের লেখা ত’ অক্ষরে অক্ষরে মিলে গিয়েছে তার শেষ মুহূর্তটি কি দেখতে এলে ? [ জয়ন্তী দূরে মাথা নত করিয়া দাড়াইল ] [ কাছে আসিয়া ] মহারাজ ! আমাকে ক্ষমা কর! আমাকে তােমার সাথী কর। আমার সাথা হবে না—তুমি ত’ সর্বকৰ্ম্ম ত্যাগিনী সন্ন্যাসিনী, তােমার ত এ ধৰ্ম্ম নয় । আমি অপরাধিনী আমায় ক্ষমা কর। [ চন্দ্রচূড়ের প্রবেশ ] চন্দ্র। না মা তুমি অপরাধিনী নও তুমি শতি-রূপিনী। আত্ম-বিস্মৃত রাজাকে তুমি শক্তির সন্ধান দাও মা! সীতা। ১৩
সীতা।
পঞ্চম অঙ্ক ]
সীতারাম
[ চতুর্থ দৃশ্য
[ সীতারাম গুরুদেবকে সহসা দেখিয়া বিস্মিত নেত্রে তঁাহার দিকে এতক্ষণ
চাহিয়াছিলেন, বলিলেন)
গুরুদেব!
চন্দ্র। অভিমান করে দেশত্যাগী হয়েছিলাম বৎস, কিন্তু এই দুদ্দিনে
আমার মাতৃভূমিকে ভুলে দূরে থাকতে পারলাম না। তাই
প্রাণ বলি দেবার জন্য আবার ফিরে এলাম।
এমি করে সবাইকেই আজ আসতে হবে গুরুদেব! আজ
গুরু-শিষ্য, স্বামী-স্ত্রী, রাজা-প্রজা একসঙ্গে পাশাপাশি পঁড়িয়ে
মৃত্যুর সাধনা করবাে। আমাদের চিতার আগুনে আজ
আকাশ লাল হয়ে যাবে।
সীতা।
[ কোলাহল ও কামানের প্রচণ্ড শব্দ হইতে লাগিল ।
ঐ শত্রুর জয়নাদ! ঐ কামানের বজ্রধ্বনি! নদী পার হয়ে
তারা নগরে প্রবেশ করছে।
চ। তবে আর কালক্ষেপ কর কেন মা? আর একবার চণ্ডিকারূপে
অঞ্চল ঘুরিয়ে সন্তানদের আহ্বান করে বল মা, মা, শত্রুমার।
[ জয়ন্তীর প্রতি ] তুমিও মা নগর লক্ষ্মী ! আর একবার ভৈরবী-
রূপে দেখা দিয়ে দুর্বল সন্তানদের ভয় হরণ কর মা ।
ও জ। [ যােড় করে স্তব করিতে লাগিল ]
জয় শিব শঙ্কর। ত্রিপুর নিধনকর।
রণে ভার! জয় জয় হে
চক্র গদাধর,
কৃষ্ণ পীতাম্বর।
জয় জয় হরিহর,-
জয় জয় হে!
পঞ্চম অঙ্ক ] সীতারাম [ চতুর্থ দৃশ্য সীঃ ও চঃ। জয় শিবশঙ্কর। দুর্গ চূড়ে সহসা গঙ্গারামকে দেখা গেল। সে চীৎকার করিয়া বলিয়া উঠিল জয় শিব শঙ্কর। চ। গঙ্গারাম ! গঙ্গা। হা, চন্দ্রচূড় ঠাকুর, নির্বাসিত গঙ্গারাম নিজ কর্তব্য পালন করবার জন্য আজ নিশ্চিন্তে ফিরে এসেছে। সীতা। এস গঙ্গারাম! মাতৃভূমির মঙ্গলের জন্য একসঙ্গে যারা যাত্রা করেছিলাম, তারা একসঙ্গেই আজ আত্মবিসর্জন করি। [ গঙ্গারাম ধীরে ধীরে নামিয়া আসিতে লাগিল এমন সময় আহত হইয়া মৃন্ময় প্রবেশ করিল ] মৃন্ময়। মহারাজ! মহারাজ। পারলুম না। দেশকে রক্ষা করতে পারলুম না, জীবনপাত করলাম তবুও পারলমনা মহারাজ । আপনি যদি [ মৃন্ময় টলিতে টলিতে পড়িয়া গেল, সীতারাম তাহাকে ধরিয়া বলিয়া উঠিলেন) সীতা। আমিও পারবনা মৃন্ময়, কিন্তু আমিও তােমারই মত জীবনপাত করবাে ! গঙ্গা। [সহসা তাহার কালাে আংরাখার ভিতর হইতে তরবারি বাহির করিয়া সাতরমকে আঘাত করিবার অভিপ্রায়ে বলিয়া উঠিল ] তাই কর মহারাজ! [ এ পিছন হইতে লাফাইয়া পড়িয়া গঙ্গারামের হাত ধরিল ] দাদা! দাদা, সর্বনাশ ক'রােনা দাদা [ গঙ্গারাম এর হাত ছাড়াইবার চেষ্টা করিতে লাগিল ] সরে যা, সরে যা শ্ৰী, আমাদের লানার প্রতিশােধ!
পঞ্চম অঙ্ক] সীতারাম [চতুর্থ দৃশ্য। [ সীতা। সীতা। [ মুহূৰ্তমধ্যে মৃন্ময়ের তরবারি লইয়া গঙ্গারামকে আক্রম প্রতিশােধ ? এই নাও বিশ্বাসঘাতক! [ বুকে তর.. দিলেন। গঙ্গারামাটিতে পড়িয়া গেল ) কি করলেন মহারাজ ! [ কাঁদিতে লাগিল ] সীতা। অন্যায় করলাম-না? আমি তা বলিনি মহারাজ! আমি আমার প্রিয় ভায়ের প্রাণহন্ত্রী হ’লাম! বিধিলিপি আপনার আঘাতেই পরিপূর্ণ হ’ল ! গঙ্গা। [ আহত হইয়া ছটফট, করিতে করিতে বলিল ] এখনাে পরিপূর্ণ হয়নি। দুর্গে আমি ফৌজদারের সৈন্য স্থাপন করেচি- [ গঙ্গারামের শেষ নিঃশ্বাস বাহির হইয়া গেল ] [ সচকিত ভাবে ] দুর্গে শত্রু সৈন্ত ! গুরুদেব আপনি এদের রক্ষা করুন ! [ টিতে ছুটিতে দুম্বার দিয়া প্রস্থান করিলেন ] [ অলভাবে ] আমাকে এখান থেকে নিয়ে চল জয়ন্তী ! আমার নিঃশ্বাসে বিষ আছে। আমি এখানে থাকলে কেউ বাঁচবে না সর্বস্ব পুড়ে যাবে! চন্দ্র। অধীর হ’য়ােনা মা! মহারাজ একা শবুহে প্রবেশ করেচেন গুরুদেব, তাকে রক্ষা করবার কেউ নেই। চন্দ্র। আমি আছি তােমরা আত্মরক্ষা কর। আমি সীতারামকে ফিরিয়ে আনছি। [ প্রানােন্বত হইতেই দুর্গ প্রকারে সীতারামকে দেখা গেল। ঠাহর দেহ রক্তে ভাসিয়া যাইতেছে ঐ মহারাজ! ফিরে আসছেন। (সীতারাম টলিতে টলিতে কাছে আসিলেন । ১৪১ সীতা। পঞ্চম অঙ্ক সীতারাম [ চতুর্থ দৃশ্য ফিরেই আসতে হ’ল দেবি। শ্রী কি চলে গেছে গুরুদেব ? ( চন্দ্রচূড় ফীতারামকে জড়াইয়া ধরিলেন ] [ কাঁদিতে কাঁদিতে } কোথায় যাবে মহারাজ ? তােমার পায়ের তলা ছাড়া আর কোথাও তত আমার স্থান নেই। পায়ের তলায় নয় ঐ আমার হৃদয় মন্দিরে। গুরুদেব, আপনি বলেছিলেন শ্রী এলেই শক্তি ফিরে আসবে। ঐকে আমি পেলাম, কিন্তু শক্তি? গুরুদেব কোথায় সেই শক্তি যা দিয়ে দেশের শত্রুকে আমি জয় করতে পারতাম? সীতা। [ নেপথ্যে রাজা রক্ষীর কণ্ঠস্বর শােনা গেল । রাঃ-র। মহারাজ, মহারাজ! সব শেষ । [ রাজপুত রক্ষী প্রবেশ করিয়া দেখিল, সীতারাম রক্তাক্ত কলেবরে চন্দ্রচূড়কে ভর দিয়া বসিবার চেষ্টা করিতেছেন, শ্রী তাহার পায়ের কাছে কাদিতেছে, এক পার্শ্বে জয়ন্তী দাঁড়াইয়া—তাহারও গণ্ড বাহিয়া অশ্রু ঝরিতেছে। দূরে এক বৈরাগী অতি করুণ সুরে গান ধরিয়াছে—যায় ডুবে যায় সােনার রবি... ] সীতা। একি আপনি এমন ভাবে ? আমারও সব শেষ ভাই! রা-রঃ। মহারাজ, চলুন, ওরা এখানে আসার পূর্বে আপনাকে এখনও আমি কোন রকমে হয়তাে বাইরে নিয়ে যেতে পারবাে। [ পিছনে হাঁটু গাড়িয়া বসিল ] ( ক্লান্ত ভাবে ] আমাকে বাঁচাবার আর ব্যর্থ চেষ্টা করছে কেন তোমরা? মায়ের বুকে আমায় একটু শান্তিতে মরতে দাও! ওগাে, দেশলী, আমার শেষ প্রণাম গ্রহণ কর। সীতা। ওগাে ১১২
পঞ্চম অঙ্ক ]
সীতারাম
[চতুর্থ দৃশ্য
আমার ভাৰী বাংলার ভায়েরা, যে-দেশকে আমি জীবনের
মহাভুলে পরাধীনতার গ্লানি দিয়ে ভরিয়ে রেখে গেলাম, তােমরা
হৃদয়ের রক্ত দিয়ে আবার তাকে একদিন গৌরব দীপ্ত ক'রে
তুলাে !
[ চন্দ্রচূড়ের বুকে ঢলিয়া পড়িলেন দুরে বৈরাগীর কণ্ঠস্বর আরও স্পষ্ট শােনা গেল
গীত
যায় ডুবে যায় সােনার রবি
ওরে যাবার পথে কারে ডাকে।
ওপারের বনানীর ছায়
তার বিদায়ের সুর ভরে রাখে।
যবনিকা পাতের পরও এই গানের সুর ভাসিয়া আসিতে লাগল
শেষ
১৪৩
পরিশিষ্ট
সাধারণ রঙ্গমঞ্চে সময় সংক্ষেপার্থ ও প্রযােজনার সৌকৰ্যার্থ কয়েকটি দৃশ্য
পরিবর্জিত ও কয়েকটি দৃশ্য সংযােজিত হয়ে থাকে। যদি কেউ সেইভাবে নাটক
প্রযােজনা করতে চান তাহলে তাঁদের সুবিধার জন্য পরিশিষ্টে মুলত: সেই পরিবর্তনটুকু
প্রকাশ করা হল
ক
প্রথম অঙ্ক, তৃতীয় দৃশ্যে রামাদ খামাদের প্রস্থানের পর স্ত্রী,
সীতারাম, চচুড় ও গঙ্গারামের কথােপকথন অংশটুকু পরিবজ্জিত হয়ে
থাকে। অবশ্য এ অংশটুকু সৌখিন সম্প্রদায়ের পক্ষে রাখলে ভালই হবে।
তৃতীয় অঙ্ক প্রথম দৃশ্যে তােরাব খাঁ ও মির্জা মহম্মদের কথােপকথনের
পরিবর্তে নিম্নলিখিত দৃশ্যটি অভিনীত হয়ে থাকে।—দ্বিতীয় দৃশ্যটিও
অভিনয়ের সময় পরিত্যাগ করা হয়।
[ সীতারাম রায়ের প্রাসাদ কক্ষচন্দ্রচূড় ও নন্দ। ]
চত্র।
সীতারাম দিল্লী পৌছে যে সংবাদ পাঠিয়েচন তা সবদিক দিয়েই
শুভ। শারীরিক কুশল সংবাদ দিয়ে তিনি জানিয়েছেন
বাদশাহ, তাঁকে প্রতির চোখেই দেখেছেন, মহারাজ খেতাব দিয়ে
তিনি তাকে সম্মানিত করেছেন।
না। লীনারায়ণের কৃপা গুরুদেব-আপনার আর ফকির সাহেবের
আশীৰ্বাদ।
১০০
তৃতীয় অঙ্ক ]
সীতারাম
[প্রথম দৃশ্য
চন্দ্র।
ফকির সাহেবের কথা আর বােলােনা মা-কিসে সীতারামের
মঙ্গল হবে, মহারাজ সয়াম রায়ের এই রাজ্য কিসে সম্পদে
বাংলার শ্রেষ্ঠতম রাজ্যে পরিণত হবে, সেই চিন্তা ছাড়া অন্য
কোন চিন্তা তার নেই।
অথচ মুসলমান বলে একদিন তাকে আমরা সন্দেহের চোখে
দেখেছিলুম।
তখন যে আমরা অন্ধ ছিলাম মা। বাংলার সকল মুসলমানই
যদি ফকির সাহেবের মত হত—আর হিন্দুরাও যদি মনুষ্যত্ব
ফিরে পেত, তাহলে বাংলাকে কোনদিনই দিল্লীর প্রত্যাশী
হয়ে থাকতে হত না।
শুনলাম নবাব মুর্শিদকুলী খাঁ নাকি আমাদের অভ্যুদয় প্রীতির
চোখে দেখছেন না। তিনি তােরা খাঁকে আদেশ দিয়েছেন
চন্দ্র।
নন্দা।
মহম্মদপুর আক্রমণ করতে।
5ষ্ট।
তােরাব খাকে অভ্যর্থনার জন্যে আমরাও প্রস্তুত হয়ে রয়েছি।
কালান্তক যম সম মেনহাতী মৃন্ময় ঘাটী আগলে ব'সে রয়েছে,
গঙ্গারাম যেন স্বয়ং শূলপাণি, মহম্মদপুরের দ্বারী, ফকির সাহেব
দিবারাত্র রাজ্য পরিভ্রমণ করে অমঙ্গলের কারণ দূর করচেন।
কুশলী শিল্পীর তত্ত্বাবধানে অসংখ্য কামান বন্দুক গােল বারুদ
তৈরী হচ্চে, দুর্গপ্রাকার, পরিখা, গড় শন্ত্রপাণি সৈনিকে
পরিপূর্ণ। তােৰাব খ এলে সত্ৰমে শঙ্কায় শির নত করে ফিরে
যাবে। বয়ং সীতারামও মহম্মদপুরের এই নবরূপ দেখে বিস্ময়ে
চেয়ে থাকবেন।
১০৫
তৃতীয় অঙ্ক ]
শীতারাম
[ এথম দৃশ্য
নন্দা। আপনার শিষ্য কি অযােগ্য লােকের ওপর রাজ্যভার দিয়ে
নিশ্চিতে দিনী যাত্রা করতে পারতেন গুরুদেব ?
চন্দ্র। যােগ্যতার স্পর্ধা করিনা মা। আমি শুধু জানি এদেশ
সীতারামের রাজ্য কিন্তু আমার মাতৃভূমি। রাজা তার রাজত্ব
একবার হারালে আবার নূতন রাজ্য গড়তে পারেন কিন্তু সন্তান
মাকে একবার হারালে সর্বহারা হয়—তার চেয়ে দুর্ভাগা আর
কেউ থাকে না।
নন্দা। সে দুর্ভাগ্য থেকে লক্ষ্মীনারায়ণ আমাদের রক্ষা করবেন।
চ। নিশ্চয় করবেন না। এখন তাহলে আমি আসি। প্রতিদিন
এসে তােমাকে রাজ্যের মঙ্গল সংবাদ দিয়ে যাব।
নন্দা। রাজ্যের মঙ্গল সংবাদে আমার কি প্রয়ােজন গুরুদেব ?
চঞ্জ। তবুও তুমি রাজমহিষী, মহারাণী । মহারাজা সীতারাম রায়ের
অনুপস্থিতিতে এ রাজ্যের অধিশ্বরী তুমি। আমরা রাজভৃত্য,
তােমারই সেবক। তােমাকে সকল সংবাদ দেওয়া আমাদের
কর্তব্য।
নন্দা। কিন্তু ভুলবেন না আমি আপনার কন্যা।
[ নন্দা পদধুলি লইল ]
চিরায়ূতী হও মা!
[ আশীর্বাদ করিয়া প্রস্থান।
নন্দা। দিল্লী কতদূর জানিনা। কবে তিনি ফিরে আসবেন?
[ শ্যামা, বাম, উমা, প্রভৃতি পরিচারিকাগণের দ্রুত প্রবেশ ]
শামা। ওগাে রাণীমা গো, একি.ওনি গাে !
বামা। আমাদের বাঁচাও রাণীমা !
।
১
তৃতীয় অঙ্ক।
সীতারাম
[প্রথম দৃশ্য
উমা।
উমা।
এলে জাতও মারবে ধর্মও রাখবে না।
শ্যামা। বাঁচাও রাণীমা, আমাদের বাঁচাও।
নন্দী। আম, কি হ'ল তাই বলনা আগে।
বামা।
ফৌজদার নাকি এইদিকে আসছে?
নন্দা। তাতে তােদর কি লা?
বামা। ফৌজদারের সঙ্গে হাঙ্গামা করে কেউ কোনকালে টিকতে
পারেনি-তােমাদের রাজ্য তাে যাবেই, সঙ্গে সঙ্গে আমরাও যাব।
নন্দা। আমাদের রাজ্য যাবে কোন দুঃখে, তােমরাই জাহামে যাও।
তা আমাদের দোষ কি? আমরা যা শুনি তাই তো বলি।
নন্দা। ফের ব’ল্পে কামার ডেকে জিভ কাটিয়ে ফেলবে।
তাহলে সবার আগে ছােটরাণীর জিব, কাটতে হবে।
বামা। তিনি আর মুরলা রাতদিনই তাে ঔ নিয়ে ফিস ফিস্ গিজ গিজ,
করছেন।
উমা । আর তিনিই তাে আমাদের পাঠালেন তােমার কাছে।
নন্দা। যা বলতে পাঠালেন তা তো বলা হয়েছে, এখন যাও, তারই
কাছে ফিরে যাও !
শ্যামা ! তুমি মিছে আমাদের ওপর রাগ করচো রাণীমা, আমরা কিছু
ভয় পাইনি-ছােটাণীই কেঁদে আকুল।
বামা। ঐ মুরলা মাগীই যত নষ্টের গােড়া।
আমরা তোমার পাশে পাশেই থাকবে। যুদ্ধ করতে বল
যু করবে।
বামা। কিন্তু রাণমা ঐ মুরলা বড় বৃদ্ধি পেয়েছে, তার মাথা মুড়ােতেই
।
তৃতীয় অঙ্ক) সীতারাম [ প্রথম দৃশ্য নন্দা। যাও বাহারা, তােমাদের কাজে যাও! রাজত্ব নিয়ে আর তােমাদের মাথা ঘামাতে হবে না—তার জঙ্গে ঠাকুরমশাই আছেন, ফকির সাহেব আছেন, মেনহাতী আছে, গঙ্গারাম আছে। শ্যামা। ও মা তাও বুঝি শােননি ? নন্দা। কি? উমা। শ্যামা। গঙ্গারাম কোতােয়ালের কথা শােননি মা ? নন্দা। কোন্ কথা ? শ্যামা। তিনি যে মুরলার পরামর্শ ছাড়া কাজ করেন না। নন্দা। সে কি ? শ্যামা। গরীবের মুখ দিয়ে কথা বেরােলাে চেপে গেলুম তুমি মিলিয়ে নিয়ে ! [ প্রস্থান ] নন্দা। শ্যামা, ওকথা বললে কেন ? ওর কথায় তুমি কান দিয়ােনা-ও ঐ রকমই। [ প্রস্থান ] বামা। তবে কথাটা বলেই যাই-ঐ শ্যামা আর উমাকে সঙ্গে সঙ্গে সেই মুরলা মাগীকেও যদি না ঝেটিয়ে বিদেয় করতে পার, এই রাজবাড়ীতে শান্তি থাকবে না। বামার কথা মিলিয়ে নিও! [ হনহন্ করিয়া চলিয়া গেল ] , মহারাজ ফিরে এলে বাচি। নইলে ফৌজদারের আগে এরাই আমাকে এই প্রাসাদ থেকে তাড়াবে। মুরলা, মুরলা। [ মাঃ এবেশ । ১৮ তৃতীয় অঙ্ক। সীতারাম [ প্রথম দৃশ্য রমা। মুরলাকে ডাকচো দিদি। নন্দা। হ্যা, কোথায় সে ? । রমা। আমি তাকে একটু কাজে পাঠিয়েছি। নন্দা। তা বেশ করেচি, কিন্তু এ-সব কি শুনচি ? তুই নাকি অন্তঃপুরে মেয়েদের বলিচি ফৌজদার এসে সবাইকে মেরে ফেলবে তাই তার হাতে রাজ্য তুলে দেওয়াই ভাল? রমা। বলিচিই তাে। কিন্তু আমার কথা কেউ শােনে না দিদি। দিনরাত আমি তাই ভয়ে ভয়ে থাকি আর রােজ ঠাকুরের কাছে কাঁদি আর বলি ঠাকুর, ঠাকুর - ইত্যাদি... [ তৃতীয় অঙ্ক, তৃতীয় দৃশ্যে মুরলা ও গঙ্গারামের প্রবেশ পৰ্যন্ত পুস্তকে প্রকাশিত অংশটুকু বলা হয়। গঙ্গারাম ও মুরলা, গঙ্গারাম ও রমার কথোপকথনের মধ্যে নিম্নলিখিত অংশটুকু যুক্ত হয় ] ৬৪ পৃঃ- গঙ্গা। মুরলা। গঙ্গা। মুরলা। কোন্ রাণী আমাকে ডেকেছেন ? রমারাণী। রমারাণী । ছােটরাণী । শুনিচি তিনি অপরূপ সুন্দরী। মিলিয়ে দেখে নেবেন, যটুকু শুনেছেন তার চেয়ে কত বেশী সুন্দরী। আর একটা কথা জানেন কোতােয়াল মশাই ? গঙ্গা। গঙ্গা। কি ? মুরলা। তিনিও শুনেছেন আপনি খুব সুপুরুষ। কে শুনেছেন? ১৪৯ তৃতীয় অঙ্ক। সীতারাম [এম দৃশ্য রমারাণী! আপনি বসে বসে তার ধ্যান করুন, আমি তাকে নিয়ে আসি। মুরলা। কাকে? মুরলা। যার জয়ে এত কষ্ট করে এখানে এলেন তাকে। আমার সা?ে মুরলা। পেটে খিদে মুখে লাজ আমাদেরই মানায়, আপনাদের নয়। বসুন, আমি আসছি। [ প্রস্থান ] [ মুরলা ও রমার প্রবেশ ও তাহার পরবর্তী অংশটুকুর পরিবর্ধন নিম্নে দেওয়া হইল। তা হ'লে কি কোন উপায় নেই ? ৬৬ পৃঃ হইতে ] আপনি এত ভয় পাচ্ছেন কেন বলুন তাে? রমা। ভয় নয়। তবে? রমা। গলা। রমা। ভাবনা। কিসের ? আমার খােকার জীবন রক্ষার ভাবনা। আপনি দয়া করুন। আমার থােক যাতে বেঁচে থাকতে পারে তার ব্যবস্থা করুন ! মহারণ, শান্ত হন ছেলের জন্য দুশ্চিন্তা নিয়ে কেমন করে আমি শান্ত হব? যদি আপনার পরামর্শ মতো কাজ না করে অন্য উপায়ে আপনাকে, আপনার ছেলেকে নিরাপদ রাখতে পারি, আপনি আমার কথামত কাজ করতে সম্মত হবেন। রমা। ১৫?
তৃতীয় অঙ্ক ) সীতারাম [ এ দৃ রমা। রমা। বলুন কি করতে হবে? যদি আপনাদের স্থান্তরে নিয়ে যেতে চাই। যেতে পারবেন? এক বাপের বাড়ী ছাড়া আর কোথাও তো আমার বার স্থান নেই। স্থান যদি আমিই ঠিক করে দিই। রমা। রমা। রমা। গঙ্গা। রমা। আপনার সঙ্গে যেতে হবে? আর কাউকে জানতে দেবনা কোথায় আপনাকে স্থানান্তরিত করেচি। ফৌজদার আমার ছেলেকে তাহলে খুঁজে পাবে না ? কেউ আর আপনার সন্ধান পাবে না। কিন্তু বড়রাণী আর ঠাকুর মশাই যে যেতে দেবেন না। তারা কি আপনার ছেলেকে রক্ষা করতে পারবেন? তাদের ওপর আমার ভরসা নেই। তবে? পারবাে। আমার খােকাকে বাচাতে আমি সব করতে পারি স্বামীকে না জানিয়েও আপনার সঙ্গে যেতে পারি, আপনার দাসী হয়ে থাকতে পারি। ও-কথা বলবেন না মহারাণী কবে নিয়ে যাবেন ? আয়ােজনের কিছু সময় লাগবে। যদি তারই মাঝে- তার মাঝেই যদি বিপদের আশঙ্কা দেখি আমি তাহলে নিজে এসে আপনাদের নিয়ে যাব। রমা । গঙ্গা। রমা। ১১ তৃতীয় অঙ্ক ] সীতারাম [ প্রথম দৃশ্য রমা। রমা। আমি কেমন করে জানবাে আপনি কখন আসবেন ? মুরলাকে দিয়ে খবর দেব। মুরলাকে তত তাহলে রােজই আপনার কাছে পাঠাতে হবে। তাই পাঠাবেন—কিন্তু গােপনে। বােঝেন তো কেউ যদি জানতে পারে রমা। জানি—আমায় যেতে দেবে না। গঙ্গা। রমা। গঙ্গা। রমা। তাহ'লে আপনার খোকার- , না সে অমঙ্গলের কথা মুখে আনবেন না। কেউ কিছু জানতে পারবে না। আমি তাহলে এখন আসতে পারি? আসুন! , আমি মুরলাকে পাঠিয়ে দিচ্চি। সে সঙ্গে না থাকলে আপনি তো যেতে পারবেন না। [ রমার প্রস্থান ] অপরূপ ! অদ্ভুত ! আশার অতীত!-আমি আপনার দাসী হয়েও থাকতে পারবাে••দাসীনা না। [ পরবর্তী অংশটুকু প্রকাশিত দৃশ্যানুযায়ী] গঙ্গা।
তৃতীয় অঙ্ক ]
সীতারাম
[ দ্বিতীয় দৃশ্য
( গ )
[ তৃতীয় অঙ্ক, দ্বিতীয় দৃশ্যের, বৈরাগীর গানটি তােরা খার সহিত গঙ্গারামের
আলাপ আলোচনার পর, দৃশ্য পরিবর্তিত হইয়া গীত হয় অর্থাৎ চতুর্থ দৃশ্যে বৈরাগীর
গানটি হয়—ওমন পিছল পথে ]
[ তােরাব খার শিবিরে প্রথমে সখীদের গান হয়।
তৃতীয় দৃশ্য )
রঙ্গমঞ্চে এইটি তৃতীয় অঙ্ক
গান
তােমার সাথে মিলন মােদের
হাসুহানার বাগিচায় ।
সুৰ্মা পরা আঁখি দেখে
বিড়ােল হ’ল মােদের কায়।
অধর পরে অধর দিয়ে
জাগিয়ে মনে শতেক আশা
বাধলে বঁধু হৃদয় মাঝে
তােমার গােপন ভালবাসা।
সেদিন হ'তে কাছাকাছি
তােমার সাথে মিশে আছি
পরাণ মােদের হারিয়ে গেছে
তােমার তনুর তনিমায়।
( পারিষদবর্গ ফুর্তি করিতেছিল এমন সময় জনৈক সেনানীর প্রবেশ
সেনা। [ কুর্ণিশ করিয়া ] বলে আলি হুজুরের সাক্ষাৎ প্রার্থী।
তৃতীয় অঙ্ক ]
সীতারাম
[ বিতীয় দৃশ্য
তােরা। এইখানে নিয়ে আয়। তােমরা এখন পাশের শিবিরে গিয়ে
একটু বিশ্রাম কর।
[ নর্তকী ও পারিষদবর্গের স্থান। বন্দে আলির প্রবেশ ও অভিবাদন ]
এই যে বলে আলি এসেছ। গুপ্তচরের মুখে আমি তােমার সব সংবাদ
শুনেচি।
বলে।
হুজুরের ভরসা পেয়েই আমি এই পত্র আনতে সাহসী হয়েছি।
তােরা। দেখি ।
[ পত্র পাঠ করিয়া ]
হু, তােমার সব কসুর আমি মাপ করলাম তঁাকে আমার সঙ্গে
সাক্ষাৎ করতে বল।
বলে। তিনি খুব কাছেই আছেন, আপনার হুকুম হলেই তিনি সাক্ষাৎ
করতে প্রস্তুত।
তােরা। তাকে অবিলম্বে পাঠিয়ে দাও।
যে আদেশ [ কুর্ণিশ করিয়া প্রস্থান)
-তােরা। আশ্চর্য! এই দুনিয়া! দেশকে এরা ভালবাসে না এরা
ভালবাসে নিজেকে। নিজের স্বার্থসিদ্ধি না হলে দেশের থাকা
-থাকায় কিছু এসে যায় না। আজ এসেছে গঙ্গারাম, কাল
আসৰে চচুড়, তার পরের দিন দেখা দেবে মৃন্ময় ।
চমৎকার!
মৃদু হাসিলেন, এমন সময় গঙ্গারামের রক্ষীর সহিত প্রবেশ-কাল আংরাখায় তার
গা ঢাকা-রক্ষার প্রস্থান।
পরবর্তী অংশটুকু পুস্তক অনুযায়ী
১৫০
সীতারাম নাটক সম্বন্ধে সংবাদপত্রের অভিমত Amrita Bazar Patrika : The striking feature of the dramatised version was the fidelity with which the leading characters of the story were reproduced on the stagena result seldom attained in the case of adaptations. Hindusthan Standard : One of the best dramatised versions of Bankim Chandra. . Nationalist : With a clear understanding of tho character and situations, the original novel has been thoughtfully rendered into a forceful drama for which the credit goes to Birendra Krishna Bhadra of the A. I. R. fame. Sports and Screen : Sitaram is a masterpiece of Bankim Chandra and it has been brilliantly dramatized by Mr. Birendra Krishna Bhadra. বসুমতী: আমরা বীরেনবাবুর নাট্যরূপের প্রশংসা করি, কারণ অন্যান্য সাধারণ নাট্যকারদের মত ইনি মূল লেখককে জবাই করেন নি বা লেখকের সৃষ্টির ওপর কলম চালিয়ে নিজের বাহাদুরী দেখাবার চেষ্টা করেন নি। লেখক রঙ্কিমবাবুর মূল উপন্যাসের রকে অক্ষুন্ন রেখে নাট্যাকারে সার্থক রূপ দিয়েছেন বলে মনে হয়। আনন্দ বাজার : বীরেনবাবু বঙ্কিমচন্দ্রের সীতারাম উপন্যাসের নাট্যরূপদান করিতে যথেষ্ট মুন্সীয়ানা প্রদর্শন করিয়াছেন। নবমুগ : হিন্দু-মুসলমানের মিলন-প্রচেষ্টার সহায়ক এই নাটক। Advance : Mr. Biren Bhadra has shown his brilliance in dramatisation. ভারতউপন্যাসের অধ্যায়ে অধ্যায়ে যে নাটকীয় ঘটনার সৃষ্টি করিয়াছে তাহা একখানি নাটকে রূপান্তরিত করা অত্যন্ত দুরূহ কাজ বীরেন্দ্রকৃষ্ণ সে বিষয়েও কৃতিত্বের পরিচয় দিয়াছেন। যুগান্তর : বীরেন্দ্রবাবুর নাট্য-রূপায়েই এই জিনিষটা প্রথম লক্ষ্য করা গেল যে বঙ্কিমচন্দ্রের বিষয় ও চরিত্রকে যথাযথ গ্রহণ করলেও, সবই তিনি নিয়েছেন আপন সানুভূতির [ ১ ] ܢ জারক রসে অতিৰিক্ত করে, যার ফলে উপন্যাসের জগত থেকে নাটকের জগতে এসে তারা পুতুল নাচের পুতুলদের মত নিরর্থক হাতপা নাড়ে নি নাট্যকার কোটুকু অপৰিহাৰ্য্য তার সীমা নির্ণয়ে যে সুক্ষ্ম রসজাল ও বিচার বুদ্ধির পরিচয় দিয়াছেন তা বাস্তবিকই বিস্ময়কর। (শ্রীনন্দগােপাল সেনগুপ্ত ) সচিত্র ভারত। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র যখন বঙ্কিমচন্দ্রের এই শেষ শিল্প সৃষ্টিকে মঞ্চে রূপদান করিবার বাসনা প্রকাশ করিয়াছিলেন তখন আমার আশঙ্কা ছিল স্বল্প পরিসরের মধ্যে বঙ্কিমচন্দ্রের মর্মকথাটি পরিস্ফুট করিতে হয় তাে তিনি পারিবেন না কিন্তু আমার সে আশঙ্কা অমুলক প্রমাণিত হইয়াছে। বীরেনবাৰু বঙ্কিমচন্দ্রের সীতারামের মর্যাদা অক্ষুন্ন রাখিয়াছেন। (সজনীকান্তু দাস) পরাগ : বঙ্কিমচন্দ্র আজকের দিনে বেঁচে থাকলে সীতারাম উপন্যাসকে এর চেয়ে ভাল কোন নাট্যরূপ দিতে পারতেন কিনা সন্দেহ। ( পরিমল গােস্বামী) : নাট্যরূপদানে বঙ্কিমচন্দ্রের মূল রসকে বিস্বাদ না করে বরং আধুনিক চিন্তাধারার সঙ্গে তাল রেখে, সংলাপ সংযােজনা ও দৃশ্য পরিকল্পনা করে নাট্যকার যথেষ্ট কৃতিত্বই দেখিয়েছেন। আজাদ : আনন্দের বিষয় আমরা সীতারামের নাট্য-রূপায়নের মধ্যে কোথাও প্রশংসা ছাড়া আপত্তির বিষয়বস্তু দেখতে পেলাম না। হিন্দু-মুছলমানের পরস্পরের মন জানাজানির ভিত্তিতে সহজ ও স্বচ্ছন্দ গতিতে নাটকের যে সুখকর পরিণতি ঘটানো হয়েছে তা বীরেনবাবুর সুস্থ মনােভাব ও চরিত্র সৃষ্টির সার্থক ক্ষমতার পরিচয় দেয়। মােণর বাংলা : বীরেনবাবুর নাট্যরূপ সত্যই প্রশংসনীয়। রূপমঞ্চ: শ্ৰীযুত ভদ্র তার সীতারাম নাটকের ভিতর দিয়ে—তদানীন্তন রাজনৈতিক অবস্থার যেমন ছবি একেছেন—তেমনি হিন্দু-মুসলমানের মিলনের যে আদর্শ প্রচার করেছেন—এজন্য তাঁর প্রগতিশীল দৃষ্টিভংগীর প্রশংসাই করবে। উপরােক্ত বিভিন্ন পত্রিকা ব্যতীত কৃষক বাতায়ন, স্বদেশ, লােকমান্য, বিশ্বামিত্র, ও অন্যান্য বহু সাময়িক ও দৈনিক পত্রিকায় সীতারাম নাটকের অবিমিশ্র প্রশংসা বাহির হইয়াছে। [ ২ ] বেঙ্গল পাবলিশার্সের প্রকাশিত কয়েকখানি বাংলা বই ডাঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখােপাধ্যায়ের দুঃখ নিশার শেষে (২য় সং) ২। পঞ্চাশের মন্বন্তর ( ৪র্থ সং) পৃথিবী কাদের ১০ ডাঃ সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের একদা নিশীথকালে २/० বৈদেশিকী ( ২৪ সং) বনমর্মর (৩য় সংস্করণ) ২০ সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদারের নর-বাধ ১৮ সমাজ ও সাহিত্য (২য় সং) ২০ সৈনিক (২য় সংস্করণ ) প্রেমেন্দ্র মিত্রের নবেন্দুভূষণ ঘােষের কুড়িয়ে ছড়িয়ে ডাক দিয়ে যাই (২য় সং) ২৮০ ভাবীকাল যা এই সীমান্তে ২০ শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের গ্রাৎসিয়া দেলেদ্দার বিষের ধোয়া (৩য় সং) মা (ঋষিদাস অনূদিত) ২|| পঞ্চত ১৮০ নৃপেন্দ্রকুমার ব উপেন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়ের ফ্রয়েডের ভালবাসা ৩০ ছদ্মবেশী (২য় সং) , নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের রাজপথ (৩য় সং) তিমির তীর্থ ২|• প্রবােধকুমার সান্যালের দুঃশাসন সায়াহ্ন (২য় সং) ২১ অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তের চেনা ও জানা (২য় সং) কাঠ-খড়-কেরাসিন ১৭০ অঙ্গরাগ (২য় সং) ২১ নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় সম্পাদিত মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ১৩৫১র সেরা গল্প প্রতিবিম্ব গােপাল ভৌমিক সম্পাদিত দিবারাত্রির কাব্য (২য় সং) ২৮০ ১৩৫১র সেরা কবিতা দিগিচন্দ্র বন্দোপাধ্যায়ের মহেচন্দ্র রায়ের বিশ্ব-সংগ্রামের গতি ম্যাক্সিম গকী ৩০ পরম তৃষ। ৩ দীপ-শিখা (গণনাট্য ) ৭০ | বিনয় ঘােষের সুবােধ ঘোষের শ্রীবৎসের নানাপ্রসঙ্গ গ্রাম-যমুনা ২১ রঙ্গ-ী ২১ আজাদ হিন্দ গ্রন্থমালায় মনােজ বনুর নেতাজী সুভাষচন্দ্রের দিনী চলে ২|| ভুলি নাই (৬ষ্ঠ সংস্করণ) মুক্তি পতাকা তলে ২০ নূতন প্রভাত (৩য় সং) • নেতাজী ও আজাদ হিন্দ ফৌজ ২০ প্লাবন (২য় সংস্করণ) ১|| আরাকান ফ্রন্টে বীতংস ২১ ২০ ১৩ কৌতুক ১ শৈল চক্রবার শনিচক্র sho কাটুন , অদৃশ্য শত্রু Sho চপলাকান্ত ভট্টাচার্যের মুখােস ১০ কংগ্রেস-সংগঠনে বাংলা রক্তলােভী নিশাচ (৩য় সং) ১৩ ওয়েলে উইকির রাত্রি যখন গভীর হয় • ওয়ান ওয়াল্ড (২য় সং) কিরীটি রায়ের বাহাদুরী ১। ভবানী মুখখাপাধ্যায়ের আঁধার পথের যাত্রী (২য় সং) ১০ একালিনী নায়িকা ২• ডাইনীর বাণী প্রমথনাথ বিশীর লাল চিঠি (২য় সং) ১০ বাঙালী ও বাংলা সাহিত্য(২য় সং) ২ রঙীন ধরণী ১০০ ডাকিনী ফানী মুখাপাধ্যায়ের গােপাল ভৌমিকের জলে জাগে ঢেউ ২০ ভারতের মুক্তিসাধক ১৭০ পাতালের পাকচক্র ১। বনফুলের ওঙ্কারের টঙ্কার বনফুলের গল্প (: সং) কালপুরুষ ডাঃ কিউ তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদারের হারানাে সুর (২য় সং ) ঠানদিদির থলে ( ৩য় সং) চৈতালী ঘূর্ণি ১৭ খগেন্দ্রনাথ মিত্রের সীতা দেবীর মাটির বাসা ৩৩; মণীন্দ্র দত্তের মণিলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের রূপ-কাহিনী গােটা মানুষ (২য় সংস্করণ) ২৩ অমর মরণ ১১ উপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের তারাপদ রাহার নিাসিতের আত্মব থা ৩য় ) :. যে দেশে যেতে মানা উনপঞ্চাশ ইন্দিরা দেবীর পরিমল গােস্বামীর আষাঢ়ে দেশ তুমি নারী মহীয়সী কালিদাস রায়ের অণজিৎকুমার সেনের পy সব্যসাচী নীহাররঞ্জন গুপ্তের রঞ্জিত সিংহের ডাগন ১৭ রংKধ ১৭০ ময়নামতীর দেশ বেঙ্গল পাবলিশার্স, ১৪, বঙ্কিম চাটুজে থ্রট, কলিকাতা খুনের ধাধা ৬ মর্ণিং স্কুল ১। ১৭
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.