Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Jebunnisa Begam
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
জেবুন্নিসা বেগম
No text on this page.
বঙ্গীয় সাহিত্য-পরিষৎ
শৈল স্মৃতি গ্রন্থসংগ্র
প্ৰদাত্ৰীশ্ৰীমতী নিশাৰাণী ঘোষ,
৩৫১৩, পদ্মপুকুর রোড।
উ
আমার স্বর্গগতা
সুখ-দুঃখের চির-সঙ্গিনীর উদ্দেশ্যে
“জেবুন্নিসা বেগম” নামক
এই পুস্তিকা উৎসর্গ
করিলাম।
No text on this page.
জেনুন্নিসা বেগম
শ্ৰীসমরেন্দ্রচন্দ্র দেববর্মা
৫৯১, বালীগঞ্জ সারকুলার রােড
কলিকাতা
১৩৯ ত্রিপুরা
Printed and published by T. Banerji for Messrs. S. C. Auddy & Co.. At the Wellington Printing Works 10, Haladhar Bardhan Lane and 6 & 7, Bentinck Street, Calcutta.
সুদীপত্র ।
০ ০ ০
৩৭
বিষয়
পৃষ্ঠা
জেবুন্নিসা বেগমের জন্ম এবং কুরান অভ্যাস
জেবুন্নিসা বেগমের বিদ্যাশিক্ষা এবং কবিতার অনুশীলন
জেবুন্নিসা বেগমের কবিতার পাদ-পূরণ
ঔরঙ্গজেব বাদশাহের উপর জেবুন্নিসা বেগমের প্রভাব ৩১
জেবুন্নিসা বেগমের কারাবাস
আকিল খাঁ ও জেবুন্নিসা বেগমের প্রণয়-কাহিনী
জেবুন্নিসা বেগমের বিবাহের প্রস্তাব•••
জেবুন্নিসা বেগমকে বিবাহ করিবার জন্য পারস্যাধিপতির
পুত্র শাহজাদা ফরুখের দিল্লীতে আগমন
জেবুন্নিসা বেগম ও আকিল খাঁর প্রণয়ের শশাচনীয়
পরিণাম
জেবুন্নিসা বেগমের মৃত্যু
৪৫
০০০
০ ০ ০
in
৭৭
一
یع
او
জহানারা
জাহানারা
مي
দুইটী
شبے
' شبلي
সমস্ত
58
نهب
২৫
و
ور
রােজা ও তসবিহ
রােজা তসবিহ
هاے ، ' هراے، 'پاے‘‘ 'هائي، هوائي ‘ ' پائي، 85
8b
'اے
(
بنے ،
98
ها ، بوسے
هائي
بوئي
-ی-24
বহুকুম
No text on this page.
সূচনা একদিন বন্ধুবর শ্রীযুক্ত অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর ডি. লিট, সি. আই. ই. ও শ্রীযুক্ত সমরেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সহিত দেখা হওয়ার কালে প্রসঙ্গক্রমে ভুবন- বিখ্যাত কবি “জেবুমি” বেগমের কথা উত্থাপিত হয়। কিছুদিনের জন্য আমি যখন আগ্রায় ছিলাম, সেই সময়ে উর্দু ভাষায় রচিত উক্ত বিদুষী মহিলার যে একখানি জীবন-চরিত ক্রয় করি—ঐ পুস্তকে বিবৃত কথাগুলি আমি তাহাদিগকে বলিয়া শুনাই। উক্ত বন্ধুদ্বয় আমার নিকট হইতে “জেবুন্নিসা” বেগমের বৃত্তান্ত শুনিয়া তাঁহার সম্বন্ধে একখানি পুস্তক লিখিবার জন্য আমাকে ধরিয়া বসেন। তাঁহাদিগের অনুরােধ এড়াইতে না পারিয়া আমি অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে কহিলাম—আপনারা যখন oh বলিতেছেন তখন আমি এই অসুস্থ অবস্থাতেও আপনাদের কথা রাখিতে প্রস্তুত আছি। তবে আপনাকেও ইহার ভূমিকা লিখিয়া দিতে হইবে। আমার সেই অনুরােধে তিনি এই পুস্তিকার ভূমিকা লিখিয়া দিয়াছেন, এজন্য আমি তাহাকে আন্তরিক ধন্যবাদ প্রদান করি। “জেবুন্নিসা বেগমের যে জীবন-চরিতের বিষয় উল্লেখ করিয়াছি, তাহাতে উক্ত বেগমের বিদ্যানু- শীলন ও কবিত্বের বিষয় এবং তদীয় জীবনের উপর দিয়া সুখ-দুঃখময় যে সমুদয় ঘটনাস্রোত প্রবাহিত হইয়া গিয়াছে—যাহার অধিকাংশই রােম্যান্টি- সেই সব কথা বিশদরূপে বর্ণিত আছে। ঐ পুস্তক অবলম্বনেই জেবুন্নিসা বেগমের জীবনে ঘটিত বিষয়া- বলীর কাহিনী সঙেক্ষপে গল্পের ছলে লিখিয়াছি। উল্লিখিত বেগমের আর একখানি জীবন- বৃত্তান্ত অনেকদিন পূর্বে আমার নিকট ছিল—
৭০
তাহাও উর্দু ভাষায় রচিত। যতদূর পর্যন্ত মনে
পড়ে পুস্তক দুইখানির বিবৃত বিষয় প্রায় একই
প্রকার, পার্থক্য থাকিলেও সামান্যই হইবে।
এই পুস্তিকার শেষ অংশ “লতীফ-এলাহাের”
নামক সুবিখ্যাত গ্রন্থ ও “রূপ” পত্রিকা হইতে
গৃহীত হইয়াছে। পুস্তিকাখানি লিখার সাহায্যের
জন্য শ্ৰীযুত অজিত ঘােষ, এম. এ. বি. এল.,
এভোকেট মহাশয় ঐ পত্রিকা আমাকে দিয়া-
ছিলেন। এজন্য তাঁহার নিকট আমি বিশেষ বাধিত
আছি।
মুগল রাজত্বকালে অঙ্কিত চিত্র ও পারস্য
অক্ষরে লিখিত পুস্তকাদি সংগ্রহকারক উক্ত
বিজ্ঞবরের নিকট শুনিলাম—প্রাচীন গ্রন্থাদি
বিক্রেতা জনৈক ব্যক্তি জেবুন্নিসা-বেগমের “বৈয়াজ”
(হাতের লিখা পুস্তক) বিক্রয়ের জন্য তাঁহার
নিকট আনিয়াছিল। হাজার টাকা মূল্য বলাতে
পy
অনেক অধিক মূল্য চাহিতেছে মনে করিয়া তিনি
উহা রাখেন নাই।
যে “দিওয়ান-এ-মখফী” সচরাচর দৃষ্ট হয়,
তাহা হইতে অতিরিক্ত কবিতা ঐ বৈয়াজে আছে
কিনা, এবং তাহার দ্বারা বর্ণিত বেগমের বিষয়
আরও নূতন কিছু উদঘাটিত হয় কিনা ইহা বৈয়াজ
খানি দেখিলে জানা যাইত।
এই পুস্তিকার ফারসী কবিতা এবং কথাসমূহ
কলিকাতা মিউজিয়মের সহকারী তত্ত্বাবধায়ক
মৌলবী শামসুদ্দীন আহম্মদ সাহেব এম. এ.
দেখিয়া দিয়াছেন। তিনি এই নিঃস্বার্থ পরিশ্রম
স্বীকার করাতে আমি তাঁহাকে মুক্তকণ্ঠে ধন্যবাদ
প্রদান করি।
৫৯১, বালীগঞ্জ সারকুলার রােড
কলিকাতা।
২রা পৌষ ১৩৬৯ ত্রিপুরাব্দ।
সমরেন্দ্রচন্দ্র দেববর্মা
ভূমিকা
সম্রাট ঔরঙ্গজেবের দুহিতা শাহজাদী কুমারী কবি
জেবুন্নিসার জীবন নাট্যে যে অঙ্কে যে যে ভাবে যবনিকা
উঠেছিল পড়েছিল শত শত বৎসর আগে, তারি কথা নিয়ে
এই পুস্তিকাখানি দেশবিত স্বাধীন ত্রিপুরা রাজবংশের
স্বনামধন্য সুরসিক পার্সি, উছু, হিন্দি এবং নানা ভাষাতে
সুপণ্ডিত নানা কলাবিদ্যায় পারদর্শী বিশেষ
করিয়া চিত্রে এবং সঙ্গীতে সুনিপুণ এবং সুলেখক শ্রীল
শ্ৰীসমরেন্দ্রচন্দ্র দেববর্মা এই কাহিনীর রচয়িতা। ভারতের
একচ্ছত্র মােগল সম্রাটের কন্যার কথা লিখেছেন বাংলার
শ্রেষ্ঠতম রাজবংশের রাজপুত্র; এর চেয়ে আনন্দের বিষয়
আর কি হতে পারে। আমার একান্ত শ্রদ্ধা ও সম্প্রীতির
বশেই বন্ধুবরের লেখার ভূমিকা লিখৃতে প্রস্তুত হয়েছি ;
হলে আমার মনে হয় যে এই ভূমিকা কোন এক সুকবি
সাহিত্যিকের উপর পড়লেই ভাল হতাে।
ভারতের রাষ্ট্রীয় ইতিহাসে যেমন, তেমনি ভারতের
সাহিত্যের ইতিহাসেও বিদুষী জেবুন্নিসার স্থান সুনির্দিষ্ট হয়ে
গেছে। কিন্তু তথাপি বলতে হচ্ছে যে বাংলাতে এ পর্যন্ত
জেবুন্নিসার জীবনী ও কাব্য-কলা নিয়ে একখানি বই
১
প্রকাশের কচিৎ চেষ্টা হয়েছে। বাংলার কি হিন্দু কি
মুসলমান অনেক নবীন কবি ও লেখককে আমি জানি। কিন্তু
জেবুন্নিসার অপূর্ব রচনাগুলিকে বাংলা ভাষাতে তর্জমা
করার উৎসাহ তাঁদের মধ্যে কারাে দেখিনে। সত্য বটে কাল
বলেছে এবং সেই সঙ্গে আমাদের ভাব ও রুচির বদল
হয়েছে; কিন্তু যে সমস্ত রস-রচনা ও কবি-জীবন দেশকালের
অতীত হয়ে অমৃত লােকে স্থান পেয়ে গেল তাদের সম্বন্ধে
উদাসীন হয়ে একালের মানুষ আমরা বসে রইলাম, এতাে
হতে পারে না।
এই বইখানিতে জেবুন্নিসার সমস্ত কবিতা ও তার
ব্যাখ্যা দেওয়া সম্ভব হয়নি, কেবল জেবুন্নিসার জীবনের
ছবিটুকু সুপরিস্ফুট করে তুলতে যে রচনাগুলি দেওয়া
দরকার সেইগুলিই দেওয়া হয়েছে। সুতরাং জেবুন্নিসার
একখানি পূরােপুরি কবিতার বই বাংলাতে লেখার অবসর
এখনাে রয়ে গেল ; জানিনে সে সুযােগ ও সুসময় দেশে
কবে আসবে যখন দেশের জিনিসের খবর নিতে হবে না
আমাদের বিদেশী ঐতিহাসিক ও সাহিত্যিকগণের কাছে।
বাদশাহ ঔরঙ্গজেব-রস কোন অবসর পেলােনা যার
অন্তরে প্রবেশ করতে—তারি অন্দরে জন্মালে সুরসিকা,
সুকবি জেনুন্নিসা। বড় দুঃখের জীবন সে বহন করে
১/০
;
গেল এবং সেই অতি বড় দুঃখই দিয়ে গেল তাকে
কবির অমরত্ব ; তার কথা এবং তার রচনা সমস্ত জাতে
কৌতূহল কার না হয়।
জীবদ্দশায় মোগল প্রাসাদের পাষাণ অবরােধের মধ্যে
যে জেবুন্নিসাকে পাই আমরা অবগুণ্ঠিতা বন্দিনী বেশে ;
মৃত্যুর পরে যখন সে অবগুণ্ঠন সরে গেল, তখন পেলেম
আমরা নিরবগুণ্ঠিতা অকুন্ঠিতা চিরযৌবনা একজনকে
পাপড়ির অবরােধ-ভাঙ্গা পরিমলের মতাে সে ! এইটুকু
ঘটনা—একটুখানি জীবনের সকরুণ কাহিনী—এই নিয়ে এই
বইখানিরবড় একটা ভূমিকা লিখে একে ভারাক্রান্ত করতে
চাইনে। শুধু এই আশা করি যে-কোন দিন রচয়িতা
তঁার সুনিপুণ হস্তে জেবুন্নিসার কবিতাগুলি দিয়ে তার
রূপখানি পরিপূর্ণ করে আমাদের চোখে ধরবেন; কেন না
দেখি—জেবুন্নিসা তিনি নিজেই বলছে—“যে আমাকে চায়
সে নিয়ে নিক আমাকে আমার কবিতা থেকেই।” আমরা
ভাবি মােগল বাদশাহদের অন্দরটা বুঝি ছিল কেবলি আলস্য
আর বিলাসের লীলাভূমি ; কিন্তু গুলবদন বেগম, নূরজাহ,
তাজবিবি, জাহানারা, জেবুন্নিসা প্রভৃতি কতকগুলি নাম এ
অপবাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিচ্ছে। এদের জীবনী ও রচনা-
বলী আমাদের পাঠকগণের নিকটে যতই সুগম হবে ততই
;
;
১৮/০
সব
এই ভুল ধারণা আমাদের মন থেকে দূর হবে। ইতিহাসের
দিক্ দিয়ে এবং সাহিত্যের দিক দিয়ে এই ধরণের পুস্তকাদি
প্রকাশের প্রয়ােজন হয়ে পড়েছে। আজকের দিনের
সুশিক্ষিত মুসলমান সম্প্রদায় এ বিষয়ে উদাসীন না থেকে
যদি উৎসাহের সঙ্গে এই কাজে অগ্রসর হন তবে সম্যক
ফল পাওয়া সম্ভব হয়।
আমি আমার বন্ধুপ্রবরের মুখে দিনের পর দিন এই
মােগল অন্তঃপুরবাসিনী শাহজাদী ও সম্রাজ্ঞীগণের
কাহিনী ও কবিতা শুনে কেবলি ভেবেছি কে
এ সব রমণীয় রচনা ও কাহিনী তজ্জমা করে সাধারণ
পাঠকদের কাছে ধরে দেবে ! অপরিচিত ভাষার বাধা
সরিয়ে, বিস্মৃতির অবগুণ্ঠন অপসারণ করে দিয়ে এই ক্ষুদ্র
পুস্তিকায় আমার সে আশা বন্ধুবর অনেকটা পূর্ণ করেছেন ;
কিন্তু মনের ক্ষুধা এতে ত সম্পূর্ণ নিবৃত্তি হল না। মােগল
অন্তঃপুরের পাষাণ প্রাচীর ও পর্দার ওপারে যে সব ফুল
ফুটে ফুটে সুদূর ইরান পৰ্যন্ত সৌরভ বিস্তার করে গেছে,
তাদের মানস-শতদলের শত শত পাপড়ির রং ও রূপ
একমাত্র তাদের রচনা থেকে পেতে পারি আমরা। এই
কাজে অগ্রসর হয়েছেন আমার বন্ধুবর ভগ্নশরীর নিয়ে,
সেজন্য তিনি আমাদের সকলের ধন্যবাদের পাত্র। এমনি
১০
আরাে মনােরম কাহিনী ও কবিতার বই তাঁর কাছ থেকে
পাওয়ার আশা করি আমরা ; আর আশা করি বাংলা-
শিক্ষিত মুসলমান সম্প্রদায় এই কাজে অগ্রসর হউন। রস
চিরদিন রসের বস্তুকে অম্লান ফুলের মতাে করে রাখে,
রসিকের উপভােগের আয়ােজন যা, সেটি হল দেবদুল্লভ এক
অমৃতের আস্বাদের অপরিমেয় আনন্দ-একমাত্র কবিজনের
কাছ থেকে পাই সেই আনন্দ যার তুলনা নাই।
২৫শে অগ্রহায়ণ, ১৩৩৬।
কলিকাতা, জোড়াসাঁকো।
} শ্ৰীঅবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর
No text on this page.
জেবুনিসা বেগমের জন্ম এবং কুরান অভ্যাস ১০৪৮ হিজরী, ১৬৩৬ খৃষ্টাব্দ ১০ই শওয়ালের প্রাতে জেবুন্নিসা বেগম জন্মগ্রহণ করেন। মুগল সম্রাট শাহানশাহ মহীউদ্দীন ঔরঙ্গজেব আল- গীরের পত্নী, শাহনৌআজ খাঁর দুহিতা দিবানু বেগম তাহার জননী। প্রসবের পর মুগল বাদশাহগণের বেগমেরা সন্তান প্রতিপালন করিতেন না—কোন ধাত্রী স্তন- দুগ্ধ পান করাইয়া সেই শিশুকে লালন পালন করিত। জেবুন্নিসা বেগমের জন্ম হইলে পর, মুগল রাজপরিবার-মধ্যে চিরপ্রচলিত উক্ত প্রথা
২
জেবুন্নিসা বেগম
অনুসারে “মিয়াবাই” নামে একজন মহিলার উপর
তাঁহার প্রতিপালনের ভার অর্পিত হয়।
উক্ত ধাত্রী নিষ্ঠাচারিণী ছিল। সে রােজা, নমাজ
ইত্যাদি মুসলমান ধৰ্ম্মানুযায়ী সমস্ত নিয়ম রক্ষা
করিয়া চলিত। প্রত্যহ প্রাতে সে যখন কুরান
পাঠ করিত, অল্পবয়স হইলেও জেবুন্নিসা বেগম
সে সময়ে তাহার নিকট বসিয়া একাগ্রচিত্তে কুরান
পাঠ শুনিতেন।
ঔরঙ্গজেব বাদশাহ তঁাহার দুহিতার এইরূপ
কুরান শুনিবার আগ্রহ ধাত্রীর নিকট হইতে
জানিতে পারিয়া, জেবুমি বেগম পঞ্চম বর্ষে
পদার্পণ করিলে তাহাকে কুরান পাঠ করাইবার
জন্য “মরিয়ম” নামক একজন স্ত্রী হাফেজকে
নিযুক্ত করেন। এই অল্পবয়সেই তিনি অক্লান্ত
পরিশ্রম করিয়া দুই বৎসর তিন মাসের মধ্যে সমস্ত
কুরান কণ্ঠস্থ করিতে সক্ষম হন।
জেবুন্নিসা বেগম
এইরূপে জেবুন্নিসা বেগম বালিকা বয়সেই
আদি হইতে অন্ত পর্যন্ত কুরান মুখস্থ করিয়া
“হাফেজ” উপাধি লাভ করাতে ঔরঙ্গজেব বাদশাহ
অতিশয় সন্তুষ্ট হন; এবং তঁাহার কন্যার এই
কৃতিত্বের জন্য সসমারোহে এক উৎসবের অনুষ্ঠান
করেন। সেই উপলক্ষে অনেক গরীব দুঃখীকে
দান, খয়রাত এবং সর্বসাধারণকে ভোজ ও পারি-
তােষিকইত্যাদি বিতরণ করা হইয়াছিল। তাহা
ছাড়া জেবুন্নিসা বেগমের কুরান শিক্ষয়ত্ৰী হাফেজ
মরিয়মও প্রচুররূপে পুরস্কৃত হইতে ত্রুটী হয় নাই।
No text on this page.
জেনিসা বেগমের বিদ্যাশিক্ষা
এবং কবিতার অনুশীলন
ও
ঔরঙ্গজেব, বাদশাহ তাহার কন্যাকে হেন
ধীমতি প্রতিভাশালিনী দেখিয়া তাহাকে
লেখা পড়া শিখাইবার জন্য কয়েকজন শিক্ষক
নিযুক্ত করেন। তাহাদিগের মধ্যে মুল্লা আশ্রফ
মান্দ্রাণীর নাম উল্লেখযােগ্য। এই ব্যক্তি
ইরান নিবাসী সুবিখ্যাত পণ্ডিত সৈয়দ তকী
মজলিসীর বংশসস্তৃত; এবং তথা হইতেই
ভারতবর্ষে আইসেন।
জানা যায়—জেরুন্নিসা বেগম কুরান পাঠ শেষ
করিয়াই মুল্লা আশ্রফের নিকট পড়িতে আরম্ভ
জেবুন্নিসা বেগম
করেন নাই—কয়েক বৎসর পর আরম্ভ করিয়া-
ছিলেন। ইতিমধ্যে অপর কয়েকজন শিক্ষক
তাঁহাকে লেখা পড়া শিখাইয়াছিল। এরূপে প্রায়
একুশ বৎসর বয়স পর্যন্ত বিদ্যাভ্যাস করিবার পর
তিনি লেখা পড়ার চর্চায় জীবনের অধিকাংশই
অতিবাহিত করিয়াছিলেন।
মুগল বাদশাহী পরিবারস্থ
মহিলাগণ-মধ্যে
কেবল জেবুন্নিসা বেগমই যে বিদ্যাভ্যাস করিয়া-
ছিলেন তাহা নহে—অপরাপর বেগমেরা এবং
সভাসদগণের অন্তঃপুর-চারিণীরাও যে লেখা পড়া,
গান বাজনা এবং নানাবিধ শিল্পকাৰ্য শিক্ষা করি-
তেন ইহাতে কোন সন্দেহ নাই। কারণ নূরজহাঁ,
জাহানারা ও রােশনারা প্রভৃতি বেগমেরাও
সুশিক্ষিতা ছিলেন। কিন্তু তাহাদিগের মধ্যে কেহই
জেবুন্নিসা বেগমের সমকক্ষ হইতে পারেন নাই।
ভারতবর্ষে মুগল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা জহী-
No text on this page.
fr
R
--
বালিকা বিদ্যালয়—ফতেহপুর সিক্রী
৭
জেবুন্নিসা বেগম
রুদ্দীন বাবর ও তাহার পুত্র নসিরুদ্দীন হুমায়ুন
বাদশাহের রাজত্বকালে মুগল অন্তঃপুর-মহিলাগণকে
লেখা পড়া শিক্ষা দেওয়া হইত কি না বলা যায় না।
কিন্তু স্বনামধন্য মুগল সম্রাট মহম্মদ জলালুদ্দীন
অকবর শাহের রাজ্যশাসনকালে যে মুগলদিগের
মধ্যে স্ত্রীশিক্ষার প্রচলন ছিল, তাহার প্রমাণ স্বরূপ
ফতেহপুর সিক্রীর বালিকা বিদ্যালয় আজও বর্তমান
রহিয়াছে। খুব সম্ভব—উক্ত বাদশাহই তাহাদিগের
মধ্যে প্রথমে স্ত্রীশিক্ষার প্রবর্তন করিয়া থাকিবেন।
জেবুন্নিসা বেগম মুল্লা আশ্রফের নিকট কেবল
আরবী ও পারসী ভাষা শিখেন নাই—তিনি ধর্ম
শাস্ত্র এবং কাব্যাদি নানা বিষয়েরও অনেক গ্রন্থ
অধ্যয়ন করিয়াছিলেন। তবে সর্বাপেক্ষা কাব্যেই
তাহার অধিক রুচি ছিল। মুল্লা আশ্রফও একজন
সুকবি ছিলেন। সুতরাং তাহার কাব্যশাস্ত্র শিক্ষা
পাইতে ক্ৰটী হয় নাই।
জেবুন্নিসা বেগম
জেবুন্নিসা বেগম আরবী ভাষায় এরূপ পারদর্শী
হইয়াছিলেন যে, ঐ ভাষাতেই তিনি প্রথম একটী
কসীদা (একশ্রেণীর কবিতা) রচনা করেন।
সে সময়ে ঔরঙ্গজেব বাদশাহের দরবারে মক্কাশরীফ
নিবাসী একজন বিজ্ঞ সভাস ছিলেন। আরবীই
তঁাহার মাতৃভাষা ছিল। এজন্য কসীদাটী তাহাকে
দেখান হয়। দেখিয়া তিনি বলেন—ইহা কোন
আরবদেশীয় লোকের রচিত হইবে না। কারণ
এই কসীদা অতি সুন্দর হইলেও ইহার কোন কোন
স্থানে বাকপদ্ধতির ভ্ৰম-প্রমাদ দেখা যায়। তথাপি
কসীদাটী যে ব্যক্তিই রচনা করুক না কেন, তাঁহার
যে পাণ্ডিত্য আছে একথা স্বীকার করিতে হইবে।
ইহার পর হইতে জেবুন্নিসা বেগম আরবীতে আর
কিছু লিখেন নাই—তাহার মাতৃভাষা ফারসীতে
কবিতা রচনা করিতে থাকেন।
ঔরঙ্গজেব বাদশাহ ঘাের কবিদ্রোহী ছিলেন।
জেবুন্নিসা বেগম তাহার সম্মুখে কেহ কবিতা আবৃত্তি করিলে তিনি বিরক্ত হইয়া উঠিতেন। তাহার দরবারে কোন কবি আদর বা আশ্রয় পাইত না। পূৰ্বাবধি রাজসভায় যে সব কবি ছিল, উক্ত বাদশাহের এই- রূপ ভাবগতিক দেখিয়া ক্রমে তাহারা দরবার হইতে সরিয়া পড়ে। ঔরঙ্গজেব বাদশাহ কেবল যে কবিদ্রোহী ছিলেন তাহা নহে—সঙ্গীতও মােটেই ভালবাসিতেন । তঁাহার দরবারে যেমন কোন কবির স্থান ছিল না সেইরূপ কোন সঙ্গীতবিদ্যাবিৎ ব্যক্তিও স্থান পাইত না। বাদশাহী পরিবারের কেহ যে, কোনরূপ রঙ্গীন বস্ত্র ব্যবহার করে ইহা ঔরঙ্গজেব বাদশাহের ইচ্ছার বিরুদ্ধ ছিল। এজন্য জেবুন্নিসা বেগম প্রায় সৰ্ব্বদাই সাদা কাপড় পরিতেন—অলঙ্কারও অধিক ব্যবহার করিতেন না। এ সম্বন্ধে তিনি যে,
জেবুন্নিসা বেগম
কবিতা লিখিয়াছিলেন, তাহা নিম্নে উল্লেখ করা
হইল।
" دختر شاهم ولیکن در بفقر آورده ام
زیب و زینت بس همينم نام من زیب النسا ،،
“দখত-এ-শাহ ওলেকি রুবফকর আউরদাঅম্
জেব, ও জিনত, বস্ হমীন নাম-এ-মন্ জেবুন্নিসা।”
বাদশাহের কন্যা আমি কিন্তু গরীবের রূপ ধরিয়াছি।
বেশভূষা আমার এই–এরূপের যে আমি আমার
নাম “জেবুন্নিসা” অর্থাৎ স্ত্রী-ভূষণ।
হেন গোঁড়া মুসলমান ও নীরস পিতার ভয়ে
জেবুন্নিসা বেগম প্রকাশ্যরূপে কাব্যালােচনা করিতে
সাহস পাইতেন না। গােপনে একটী পুস্তকে
কবিতা লিখিয়া তাহা সাবধানে লুকাইয়া রাখিতেন।
ঘটনাক্রমে সেই পুস্তকখানি একদিন মুল্লা
আশ্রফের হাতে পড়ে। তাহাতে লিখিত কবিতা-
গুলি পাঠ করিয়া সেই সব কবিতার লালিত্যে তিনি
জেবুন্নিসা বেগম বিমুগ্ধ হইয়া যান। তখন তিনি ঐ সমস্ত কবিতা কে রচনা করিয়াছে ইহা জানিবার জন্য উৎসুক হইয়া তাহার ছাত্রীকে জিজ্ঞাসা করিলেন- “শাহজাদী, এসব কি তােমার রচিত?” জেবুন্নিসা বেগমই ঐসব কবিতা রচনা করিয়াছেন—উত্তরে ইহা জানিয়া মুল্লা আশ্রফ বলিলেন—“সুবহান আল্লা (ধন্য ভগবান্), তুমি যে একজন সুকবি; তোমারত কবিতা লিখিবার বেশ শক্তি আছে। যদি কোন আপত্তি না থাকে, তবে তুমি যে সব কবিতা রচনা কর, তাহা আমাকে দেখাইও।” শিক্ষকের মুখে এই প্রকার প্রশংসা ও উৎসাহ- বাক্য শুনিয়া জেবুন্নিসা বেগমের কবিতা লিখিবার উদ্যম দ্বিগুণ বৃদ্ধি হইল। এবং সেদিন হইতে তিনি যখন যে কবিতা রচনা, করিতেন তাহা নিজ গুরুর দ্বারা সংশােধন করাইয়া লইতে লাগিলেন। জেবুন্নিসা বেগমের হেন কবিতার অনুরাগ ও
১২
জেবুন্নিসা বেগম
চৰ্চ্চার কথা ক্রমে যখন সর্বত্র প্রচার হইতে লাগিল,
তখন যে সব কবি নির্জীব অবস্থায় ছিলেন, তাহাদের
দেহে যেন আবার জীবনসঞ্চার হইল; এবং যাহাতে
তাঁহাদিগের রচিত কবিতা উক্ত বেগমের নিকট
পেীছে, সেজন্য তাহারা যথাসাধ্য চেষ্টা করিতে
লাগিলেন।
এমন কি অনেকেই প্রার্থনা-পত্রাদি
পৰ্য্যন্ত কবিতায় লিখিয়া পাঠাইতেন। তাহার
একটা উদাহরণ এই ঃ-
নিয়ামত খাঁ। আলী নামক এক উচ্চবংশীয়
কবি অভাবে পড়িয়া একটী “কগী” (পাগড়ী বা
টুপীর অলঙ্কার বিশেষ) বিক্রয়ের জন্য জেবুন্নিসা
বেগমের নিকট প্রেরণ করেন। কিন্তু অনেক
দিন অপেক্ষা করিয়াও যখন তঁাহার বাঞ্ছিত বিষয়ের
কোন ফল জানিতে পারিলেন না, তখন তিনি
জেবুন্নিসা বেগমকে স্মরণ দেওয়ার উদ্দেশ্যে ইঙ্গিতে
এ সম্বন্ধে একটা কবিতা রচনা করিয়া তাহা
জেবুন্নিসা বেগম
১৩
উক্ত বেগমের নিকট প্রেরণ করেন। কবিতাটা
এই ঃ-
و اے بند گيت سعادت اختر من
در خدمت تو عیان شده جوهر من
گر جيفة خريدنيست پس گو زر من
در نیست خریدنی بزن بر سر من
8
‘অয়, বন্দগীয়ত, সা’দত, আখত-এ-মন্
* দক্ খেদমত-এ-তু অয়। শুদা জোহর-এ-মন্
গরু জিকা খরিদনেস্ত পস্ গু জর-এ-মন্
ও নেস্ত খরিদনী বজ ব সর-এ-মন্।”
ভাবার্থঃ-
হে, আমার শুভগ্রহ তােমাকে প্রণাম করি,
আমার অলঙ্কার তােমার সেবায় নিয়ােজিত আছে।
যদি ঐ শব অর্থাৎ সামান্য দ্রব্য ক্রয়ের অভিপ্রায়
হয়—তবে তাহাই আমার অমূল্য রত্ন বলিব।
যদি ক্রয় করিতে না চাও তবে আমার
শিরােপরি আঘাত কর।
উক্ত কবিতা জেবুন্নিসা বেগম পাইলে তাহার
১৪ এ জেবুন্নিসা বেগম রচনা-কৌশল দেখিয়া তিনি অতিশয় সন্তুষ্ট হন, এবং তৎক্ষণাৎ পাঁচ সহস্র মুদ্রা নিয়মিত খাঁ আলীকে পাঠাইয়া দেন। এরূপের আরও প্রার্থনা- পত্রাদি আছে। বাহুল্য-ভয়ে সে সব উল্লেখ করা হইল না। ফারসী কবিতার প্রত্যেক কথার প্রতিশব্দ ঠিক রাখিয়া বাঙ্গালায় অনুবাদ করা অত্যন্ত কঠিন প্রকার অনুবাদ করিতে গেলে অনেক স্থলে অস্বাভাবিক ও শ্রুতিকটু হইয়া পড়ে। তথাপি প্রত্যেক শব্দের অর্থ ঠিক রাখিয়াই অনুবাদ করিতে যথাসাধ্য চেষ্টা করিয়াছি। যেখানে সেরূপ করা নিতান্ত অসম্ভব হইয়াছে সেখানে ভাবার্থ মাত্র লেখা হইল। বিদ্যানুরাগিণী জেবুন্নিসা বেগম অনেক বিজ্ঞ- ব্যক্তিকে প্রতিপালন করিয়া তাহাদিগের দ্বারা নানা বিষয়ের গ্রন্থ লিখাইতেন। সেই সময়েই
জেবুন্নিসা বেগম
১৫
ধৰ্ম্মবীর কবীরের গ্রন্থ ফার্সী ভাষায় অনুবাদ করা
হইয়াছিল।
জেবুন্নিসা বেগম কেবল অন্যকে লেখা পড়া
চর্চার উৎসাহ প্রদান করিতেন না—তিনি স্বয়ংও
“জেবুনমনশাহ্” নামে ফারসী ভাষার রচনা-প্রণালীর
একখানি পুস্তক এবং “মখফী” ভণিতাযুক্ত তাহার
সুপ্রসিদ্ধ কবিতাবলী “দিওয়ান-এ-মখফী” রচনা
করিয়াছিলেন।
কাহারও কাহারও মতে উক্ত দেওয়ান
জেবুন্নিসা বেগম রচনা করেন নাই—১৭১৯
হইতে ১৭৪৮ খৃষ্টাব্দের দিল্লীর বাদশাহ রােশন
আখ ত মহম্মদ শাহের আশ্রিত এক রমণীই
ঐ দেওয়ানের রচয়িত্রী।
উল্লিখিত বাদশাহের রাজত্বকালে বাণিজ্য
ব্যবসা উপলক্ষে বিদেশ হইতে এক ব্যক্তি দিল্লীতে
আইসে। ঐ বণিকের সঙ্গে তাহার এক রূপসী
১৬
জেবুন্নিসা বেগম
কন্যাও ছিল। তাহারা আমেনীয়েন বা সর্বেশীয়েন
হওয়া সম্ভব। মহম্মদ শাহ সেই কন্যার রূপে
বিমুগ্ধ হইয়া তাহাকে নিজ আশ্রয়ে রাখিয়া দেন।
স্ত্রীলােকটী নাকি প্রায় সর্বদাই বুখায় মুখ ঢাকিয়া
রাখিত বলিয়া তাহার নাম “মখফী” অর্থাৎ “গুপ্তা”
হইয়াছিল। প্রবাদ এই ঐ রমণী বুদ্ধিমতি ও
অতি চতুর ছিল। বাদশাহী মহলে থাকিয়া
সে ফার্সী ভাষা উত্তমরূপে শিক্ষা প্রাপ্ত হয়, এবং
ঐ ভাষায় কবিতা রচনা করে।
যে যাই বলুক না কেন “দিওয়ান-এ-মখফী”
যে জেবুন্নিসা বেগম রচনা করিয়াছিলেন ইহা
সৰ্ববাণিসম্মত। কবিতাগুলি এত উচ্চ ভাবের
এবং এমন সুমধুর যে, ঐ সব কবিতা ভুবনবিখ্যাত
পারস্য কবি শমসুদ্দীন মহম্মদ হাফেজের কবিতা
হইতে কোন অংশে হীন নহে—এইরূপ অনেকের
অভিমত।
জেবুন্নিসা বেগম ১৭ কথিত আছে—জেরুন্নিসা বেগম নানা বিষয়ের মূল্যবান বহু গ্রন্থ সংগ্রহ পূর্বক একটী পাঠাগার স্থাপন করিয়াছিলেন। তাহার এইরূপ বিদ্যানু- রাগের কথা ইরান পৰ্যন্ত ছড়াইয়া পড়িলে সে দেশ হইতেও অনেক বিজ্ঞ ব্যক্তি এবং কবি ভারতবর্ষে যশ কিনিবার উদ্দেশ্যে দিল্লীতে আসিয়াছিলেন। নাসিরালী সরহিন্দী, মির্জা মহম্মদালী সায়েব, মুল্লা হগনী, আকিল খাঁ রাজী, বহবােজ ও নিয়ামত, খ। আলী প্রভৃতি সুপ্রসিদ্ধ কবি ও বিদ্বান লােকেরা জেবুন্নিসা বেগমের সমসাময়িক ছিলেন। তাহাদিগের মধ্যে আকিল খাঁ ও নাসিরালীর সঙ্গে উক্ত বেগমের প্রায়ই কবিতাতে বাদানুবাদ এবং বিদ্রুপ ও চাতুরি চলিত। ধারাবাহিকরূপে নাসিরালী ও তাঁহার পূর্ব- পুরুষগণ কবিতা রচনা এবং শিক্ষকতা করিয়া জীবিকানির্বাহ করিতেন। যদিও নাসিরালী বিজ্ঞ ২
জেবুন্নিসা বেগম
সুকবি ছিলেন কিন্তু নিজকে সেইরূপ মনে করিয়া
তিনি কখনও গর্ব করিতেন না। কাহারও স্তুতি-
করা তাহার স্বভাব-বিরুদ্ধ ছিল। অনাহারে
পড়িয়া থাকিতে প্রস্তুত তথাপি কোন বড়লোকের
কাছে হাত পাতিতেন না। এজন্য তাহার অবস্থা
তেমন সচ্ছল ছিল না। সেই সময়ের ‘‘আলী”
ভণিতাযুক্ত যে সকল কবিতা দেখা যায় সে সমস্তই
তাঁহার রচিত।
নাসিরালীর সুখ্যাতি লােকপরম্পরা জেবুন্নিসা
বেগম জানিতে পারিলে, তাঁহার সহিত কবিতা-চর্চা
করিবার বাসনা উক্ত বেগমের মনে জাগিয়া উঠে।
নাসিরালীর মনেও এইরূপ বাসনা পূৰ্বাবধিই ছিল।
তিনি প্রায়ই ভাবিতেন—যদি কোন প্রকারে
জেবুন্নিসা বেগমূের দরবারে প্রবেশ করিতে পারি,
তাহা হইলে আমার অবস্থার অনেক উন্নতি হওয়া
সম্ভব। দৈববশতঃ একদিন সে সুবিধা ঘটিয়া উঠে।
জেবুন্নিসা বেগম
১৯
একদিন নাসিরালী দিল্লী-দুর্গের নিকট দিয়া
যাইতেছিলেন। এমন সময় তিনি
তিনি দেখিতে
পাইলেন—জেবুন্নিসা বেগম লাল পােশাক পরিয়া
মহলের অলিন্দের উপর পাইচারি করিতেছেন।
তাঁহাকে দেখা মাত্র নাসিরালীর চিনিতে বাকী
রহিল না তিনিই জেবুন্নিসা বেগম। তখন তিনি
উক্ত বেগম যেন শুনিতে পান এরূপ উচ্চৈঃস্বরে
নিলিখিত কবিতা আবৃত্তি করিলেন।
آيد
سرخ پوش به لب بام نظر می
نه بزر رنه بزاري به بزر می
آید
সুখ পােশে বলব-এ-বাম নজরূ মে আয়দ
নবজো ও নবজারী ন বজর মে আয়দ।
লােহিত বেশধারী এক ব্যক্তিকে অলিন্দের
উপর দেখিতেছি।
বলেতে, বিলাপে বা ধন দৌলতে তাহাকে
লাভ করা যায় না।
২০ জেবুন্নিসা বেগম উক্ত কবিতা শুনিয়া জেবুন্নিসা বেগম মনে করিলেন—এ ব্যক্তি নিশ্চয়ই নাসিরালী হইবে, সে ব্যতীত আর কেহ হইবে না। এইরূপ অব- ধারণ করিয়া তিনি নিম্নলিখিত উত্তর প্রদান করেন। ناصر علی بنام علي برد . پناه ورنه به ذوالفقار علی سر بریده مت নাসিরালী বনাম আলী বুরদ-ই-পনাই ওরনা ব জুলকা-এ-আলী সরবুরীদামত, নাসিরালী তােমার নাম “অলী” তাই আশ্রয় পাইয়াছ। নতুবা আলীর “জুলকার” তর- বারিতে তােমার মস্তক ছেদন করিতাম । উক্ত কবিতার সম্বন্ধে একটু পরিষ্কার রূপে বলা অপ্রাসঙ্গিক হইবে না মনে করিয়া অপর পৃষ্ঠায় বিবৃত করা হইল।
জেবুন্নিসা বেগম
২১
নাসিরালীর “খলুস” অর্থাৎ ভণিতার নাম
“আলী” ছিল—একথা পূৰ্বেও বলা হইয়াছে।
মহম্মদের জামাতার নামও আলী”। এইজন্য
জেবুন্নিসা বেগম বলিয়াছেন—মহম্মদের জামাতার
নামের মত তােমার নাম হওয়াতে আশ্রয়
পাইয়াছ।
‘জুলকার সাধারণ তরবার নহে। উহা
মহম্মদের ছিল। তাঁহার মৃত্যুর পর সেই তরবার
মহম্মদের জামাতা “আলী” পাইয়াছিলেন।
নাসিরালী ও জেবুন্নিসা বেগমের প্রথম সাক্ষা-
তের সম্বন্ধে যে কথা বলা হইয়াছে তাহার পর
অবধিই নাসিরালী উক্ত বেগমের আশ্রয় পাইয়া-
ছিলেন, এবং তাঁহাদের দুই জনের মধ্যে কবিতার
অনুশীলন চলিতে লাগিল।
আকিল খাঁ জেবুন্নিসা বেগমের প্রণয়-পাত্র
ছিলেন। তিনি লাহােরের শাসনকার্যে নিযুক্ত
জেবুন্নিসা বেগম
থাকিবার সময় তথায় জেবুন্নিসা বেগমের সহিত
তাহার প্রণয়ের সূচনা হয়।
এ বিষয় পরে
উল্লেখ করা হইবে।
জেসুন্নিসা বেগমের পাদপুরণ
কবিতা চর্চার উদ্দেশ্যে জেবুন্নিসা বেগমের
মহলে প্রায়ই কবি সম্মেলন হইত। শিক্ষক
ব্যতীত অপর কোন পুরুষের সম্মুখে কোন সন্ত্রান্ত
মুগল মহিলা বাহির হইতে পারিতেন না। সেই
অবরােধ প্রথা অনুসারে জেবুন্নিসা বেগম পরদার
অন্তরালে থাকিয়া ঐ সব কবি সম্মেলনে যােগ
দান করিতেন।
একদিন নাসিরালী প্রভৃতি কয়েক জন কবিকে
লইয়া জেবুন্নিসা বেগম কাব্যালােচনা করিতে-
ছিলেন। এমন সময়ে উপস্থিত কবিগণের মধ্যে
২৪ জেবুন্নিসা বেগম একজন নিম্নলিখিত পংক্তি আবৃত্তি করিয়া উহার পাদপূরণ করিতে বলিলেন। ماند اگر ماند شبی اگر ماند شبی ماند شب دیگر نمي هلال عيسد چون ابرژان دلبر نمی ماند ماند شب دیگر نمی অগত্ মান শবে মান শব-এ-দিগর নমে মান যদি রহে এক রাত্র রহে দ্বিতীয় রাত্র রহে না নাসিরালী পাদপূরণ করিলেন- ماند হিলাল-এ-ই চেী অব্ৰু-এ-আঁ দিলবর নমে মান অগর মান শবে মান শব-এ-দিগর নমে মান ইদের চন্দ্র (২য়ার চন্দ্র) প্রিয়তমার ক্রুর মত রহে না যদি রহে এক রাত্র রহে দ্বিতীয় রাত্র রহে না। আর একজন এইরূপ পাদপূরণ করিলেন— دلبر نمی ماند شب () هفته به ماه در ماند دیگر نمی اگر ماند شبی ماند
জেবুন্নিসা বেগম
২৫
মাহ-এ-দুহতা বরুখ-এ-দিলবর, নমে মান
অগর মান শবে মানদূ শব-এ-দিগর নমে মান
দুই সপ্তাহের চন্দ্র প্রিয়তমার মুখের মত রহে না
যদি রহে এক রাত্র রহে দ্বিতীয় রাত্র রহে না।
সকলের পাদপূরণ করা শেষ হইলে পর জেবুন্নিসা
বেগম এইরূপ আবৃত্তি করিলেন।
ماند
حجاب نو عروسان در بر شوهر نمی
اگر ماند شبی ماند شب دیگر نمی ماند
হেজাব-এ-নৌ অরুস। দরবর শোহর নমে মানদ
অগর মান শবে মান শব-এ-দিগর নামে মান
পতির বক্ষে (আলিঙ্গনে) নববধূগণের লজ্জা রহে না
যদি রহে একরাত্র রহে দ্বিতীয় রাত্র রহে না।
আরও কবিগণ যে সব পাদপুরণ করিয়াছিলেন,
সেগুলিতে কোন বিশেষত্ব বা তেমন কিছু সৌন্দর্য্য
না থাকাতে ঐ সব আর উল্লেখ করা হইল না।
জেবুন্নিসা বেগম
একদা জেবুন্নিসা বেগম বেড়াইতে বেড়াইতে
একটী সুরম্য কাননে উপস্থিত হন। তখন বসন্ত
কাল ছিল। বৃক্ষ-ডালে নবীন মুকুল বিকশিত
হইতে আরম্ভ হইয়াছে ; কোকিল কূজনে চারিদিক
গুঞ্জরিত ; মৃদুমন্দ মলয় পবন ফুলের সৌরভে
সারা কানন সুবাসিত করিতেছে; মধু ঋতুর হেন
মনােমুগ্ধকারী সময়ে জেবুন্নিসা বেগম ভাবেতে
বিভাের হইয়া যান। এবং স্বতঃ তাঁহার মুখ হইতে
নিম্নলিখিত দুই চরণ কবিতা বাহির হয়।
چهار چیز غم دل برد کدام چهار
شراب و سبزه و آب روان و روے نار
চহার চিজ, গম-এ-দিল বুরদ,কদাম চহার
শরাব, ও সজা ও আব-এ-রােয়। ও রু-এ-নিগার।
চারিটী দ্রব্য মনের ব্যথা দূর করে—সে চারিটী কি
সুরা, শ্যামল মাঠ, ঝরণা ও সুন্দর মুখ।
২৭
জেবুন্নিসা বেগম
দুর্ভাগ্যবশতঃ এমন সময়ে ঔরঙ্গজেব, বাদশাহ
তথায় আসিয়া পড়েন; এবং তাহার কন্যা যেন
কি আবৃত্তি করিতেছিল শুনিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন
-“ জেবুন্নিসা তুমি কি আবৃত্তি করিতেছিলে ?”
তাঁহার পিতার প্রশ্নে জেবুন্নিসা বেগম কিছুমাত্র
বিচলিত না হইয়া তৎক্ষণাৎ উক্ত কবিতার শেষ
চরণ পরিবর্তন পূর্বক পুনরাবৃত্তি করিলেন
چهار چیز غم دل برد - کدام چهار
نماز و روزه و تسبیح و توبه استغفار
চহার চিজ, গম-এ-দিলবুদ—কদাম চহার,
নমাজ ও রােজা তসবিহ, ও তােবা ইস্তগফার।
চারিটী দ্রব্য মনের ব্যথা দূর করে—সে চারিটী কি
ঈশ্বরুপাসনা, উপবাস, জপমালা ও
পাপক্ষালনের জন্য ভােব করা।
উক্ত কবিতা শুনিয়া ঔরঙ্গজেব, বাদশাহ
প্রফুল্লমনে চলিয়া গেলেন। এইরূপ প্রত্যুৎপন্ন
২৮
জেবুন্নিসা বেগম
মতিত্ব-বলে জেবুন্নিসা বেগম তঁাহার গোঁড়া ও
কর্কশ প্রকৃতি পিতার রোষ হইতে নিষ্কৃতি লাভ
করিয়াছিলেন।
একদিন বাদশাহী দরবারে এক বাজীগর
তামাশা
দেখাইতেছিল।
অন্তঃপুর-মহিলাগণও
চিকের অন্তরাল হইতে তাহা দেখিতেছিলেন।
বাজীগর তামাশা দেখাইয়া শেষ করিলে পর তাহার
সুন্দরী স্ত্রী একটা দীর্ঘ বংশদণ্ডের উপর চড়িয়া
উলটিয়া পালটিয়া খেলা দেখাইতে থাকে। স্ত্রী-
লােকটীর খেলাতে সন্তুষ্ট হইয়া সভাসগণের মধ্যে
এক ব্যক্তি তাহার প্রশংসাসূচক নিম্নলিখিত
কবিতা আবৃত্তি করেন।
این لعبت بود عجب پر ماھ پیداست
در شاه رعنا ست
یا تازه گل بر سر
ই লাবত, বুদ আজিব, চো মাহে পৈদাস্ত
ইয়া তাজা গুলে বর সর-এ-শাখ, রানাস্ত।
২৯
জেবুন্নিসা বেগম
এই অদ্ভুত পুতুল যেন একটী চন্দ্র উদয় হইয়াছে,
অথবা নূতন একটী ফুল বৃক্ষশাখে শােভা পাইতেছে।
উক্ত কবিতা শুনিয়াই জেবুন্নিসা বেগম এ
বিষয়ে আর একটি কবিতা রচনা করিয়া একজন
দাসীর দ্বারা তাহা সভায় প্রেরণ করিলেন।
কবিতাটী এই ঃ-
-
نے نے غلط است که آفتاب معشر
بر نیزه بر آمسسل ر قیامت برپاست
নে-নে-গত অস্ত,
কি
আফতাব-এ-মহশর
বর নেজা বর আমদ্ ও কিয়ামত, বরপাস্ত।
-না-ভুল হয়েছে, যেন মৃতব্যক্তিগণের পুনরুত্থান
দিনের রবি শূলের উপর উদয় হইয়া প্রলয় সৃষ্টি করিয়াছে।
মুসলীম ধর্মমতে “মহশর” অর্থাৎ resurrection
দিনে শূলের উপর সূর্যোদয় হইবে। সেই সময়ে
“ইসা মসীহ (যীশু খৃষ্ট) “কুমবেজনী” (আমার
জেবুন্নিসা বেগম
আদেশে উঠ) বলিয়া ধরাতলে যষ্টি প্রহার করিলে
সমস্ত মৃতব্যক্তি জীবিত হইয়া উঠিবে ।
তখন
পরমেশ্বর তাহাদিগের পাপ-পুণ্যের বিচার
করিবেন।
ঔরঙ্গজেব বাদশাহের উপর
জেবুন্নিসা বেগমের প্রভাব
জানা যায়—জেবুন্নিসা বেগম ও তাঁহার পিতার
মধ্যে প্রায়ই নানা বিষয়ে বাদানুবাদ ও আলােচনা
হইত। সেই সব চর্চায় ঔরঙ্গজেব বাদশাহ,
তাহার দুহিতার বিদ্যা ও বুদ্ধিবল দেখিয়া অবাক
হইতেন। উক্ত বাদশাহের ন্যায় কুটিল রাষ্ট্রনীতি-
পরায়ণ ব্যক্তি যাহার সহিত তর্কবিতর্কে নিৰ্বাক
হইতেন—সেই ব্যক্তির যে কিরূপ প্রখর বুদ্ধি ও
বিদ্যাবল ছিল ইহা সহজেই অনুমান করা যায়।
একজন ক্রীড়াদক্ষ ব্যক্তি সিংহাদি মারাত্মক
জন্তুকে সুকৌশলে বশীভূত করিয়া যেরূপ কেবল
জেবুন্নিসা বেগম অঙ্গুলি সঙ্কেতে পরিচালন করে, সুচতুরা জেবুন্নিসা বেগমও ব্যাঘ্রের মত তাঁহার পিতার উপর সেই- রূপ প্রভাব বিস্তার করিয়াছিলেন। কঠোর-প্রকৃতি ঔরঙ্গজেব বাদশাহের নিকট কোন অন্তঃপুর মহিলাই কোন বিষয়ে প্রশ্রয় পাওয়া দূরের কথা—অগ্রসর হইতে শঙ্কিত হইত। তিনি বাদশাহী মহলে কোন সময়েই কাহাকেও কোন বিষয়ে স্বাধীনতা দিতেন না; কিন্তু জেবুন্নিসা বেগম অনেক বিষয়েই স্বাধীনতা পাইতেন। তাহার কথার কাছে কাহারও কথা ঔরঙ্গজেব বাদশাহের নিকট লাগিত না। বাদশাহী অন্তঃপুরে কেহই কবিতাপুস্তক পাঠ বা কবিতা আবৃত্তি করিতে পারিত না। বিশেষত সুপ্রসিদ্ধ কবি শসুদ্দীন মহম্মদ হাফেজের রচিত ভুবনবিখ্যাত “দিওয়ান-এ-হাফেজ” পাঠ করা একেবারে নিষেধ ছিল। কেননা উক্ত গ্রন্থ নিরাশ
জেবুন্নিসা বেগম
প্রেমিকের বিলাপে এবং সুরা ও সুন্দরীর প্রশংসায়
পূর্ণ। যদিও উক্ত পুস্তকের কবিতাগুলি সাধারণ
চক্ষে দেখিলে এরূপ দেখায় বটে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে
ঐ সব কবিতা ঈশ্বর-প্রেমে উন্মত্ত. প্রেমিকের
ব্যাকুলতা প্রকাশ ব্যতীত আর কিছুই নহে।
জেবুন্নিসা বেগম তাঁহার পিতার কঠিন হৃদয় নিজ
বশে আনিতে পারায় ঐ নিষিদ্ধ কবিতা পুস্তক
পাঠ করিতে অধিকার পাইয়াছিলেন।
ঔরঙ্গজেব বাদশাহ ও জেবুন্নিসা বেগম “সুন্নী”
মতাবলম্বী ছিলেন। এই কারণে দরবারে ঐসম্প্রদায়-
ভুক্ত ব্যক্তিগণই অধিক ছিল এবং তাহাদেরই
প্রাধান্যও ছিল। তথাপি “শীয়া” মতাবলম্বী লোক
যে না ছিল এমন নহে। দরবারস্থ উক্ত সম্প্রদায়-
ভুক্ত লােক ব্যতীত ঔরঙ্গজেব বাদশাহের পুত্র
শাহজাদা মহম্মদ মােঅজ্জম এবং অন্তঃপুরের মহিলা
গণের মধ্যেও অনেকেই “শীয়া মতাবলম্বী ছিল।
t ৩৪ জেবুন্নিসা বেগম উক্ত দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে মতের অনৈক্য হেতু প্রায়ই বিবাদ কলহের সূত্রপাত হইত। ধৰ্ম্ম সম্বন্ধীয় এই বিরােধ মিটাইবার জন্য অনেকেই যথাসাধ্য চেষ্টা করিয়াছিলেন; কিন্তু কেহই কৃতকার্য হন নাই। অবশেষে বুদ্ধিমতি জেবুন্নিসা বেগম সুকৌশলে উভয় পক্ষকে প্রবোধ প্রদান পূৰ্ব্বক তাহাদিগের বাদবিসংবাদ মিটাইয়া অশান্তি ও উপদ্রব বারণ করিয়াছিলেন। কেহই তাহার মীমাংসা ঠেলিতে পারে না—উভয় সম্প্রদায়ভুক্ত লােকেরাই উহা শিরােধার্য পূৰ্ব্বক গ্রহণ করে। এইরূপে জেবুন্নিসা বেগম অনেক সময়েই প্রখর বুদ্ধিবলে সামাজিক ও অন্যান্য বিষয়ের বিবাদ কলহ নিষ্পত্তি করিতেন। সুচতুর রাজ- নীতি-বিশারদ ঔরঙ্গজেব বাদশাহ পর্যন্ত রাজ- কাৰ্য্যের জটিল বিষয়ে সময় সময় তাঁহার কন্যার পরামর্শ গ্রহণ করিতে কুণ্ঠিত হইতেন না।
জেবুন্নিসা বেগম
ঔরঙ্গজেব বদিশাহের উপর জেবুন্নিসা বেগমের
এ প্রকার প্রভাব দেখিয়া তাহার অনুগ্রহ পাওয়ার
জন্য সর্বদাই লােকে চেষ্টা করিত। হিংসুকেরও
অভাব ছিল না—তাহার ক্ষমতা দেখিয়া কেহ কেহ
যে ঈর্ষা না করিত এমনও নহে।
No text on this page.
জেবুন্নিসা বেগমের কারাবাস
হিন্দুদিগের উপর অন্যায় রূপে নির্ধারিত যে
জিজীয়া কর উদারমনা শাহানশাহ মহাবলী মহম্মদ
জলালুদ্দীন অব রহিত করিয়া যান, ঔরঙ্গজেব
বাদশাহ তাহা আবার গ্রহণপূৰ্ব্বক দেবমন্দিরাদি
বিধ্বস্ত করিতে এবং হিন্দুদের উপর নানা বিষয়ে
উৎপীড়ন করিতে লাগিলে রাজপুতগণ ইহা সহ্য
করিতে পারিলেন না। তাহারা উক্ত বাদশাহের
বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করিয়া ঐ সব অত্যাচারের
প্রতিশােধ লইতে উদ্যত হইলেন।
এইরূপে রাজপুতানায় বিদ্রোহানল দাউ দাউ
জেবুন্নিসা বেগম করিয়া জ্বলিয়া উঠিলে তাহা নিবাইবার উদ্দেশ্যে ঔরঙ্গজেব বাদশাহ তাঁহার পুত্র শাহজাদা অকৃ- বরকে রাজপুতানায় প্রেরণ করেন। তিনি তথায় পৌছিয়া বিদ্রোহ দমনের পরিবর্তে রাজ্যলােভে বিদ্রোহী রাজপুতগণের সহিত মিলিয়া আপন পিতারই বিরুদ্ধাচরণে প্রবৃত্ত হইলেন। অনুদার ঔরঙ্গজেব বাদশাহ যেমন স্বীয় পুত্রগণকে বিশ্বাস বা স্নেহ করিতেন না, তাঁহারাও তেমনই পিতৃভক্ত বা পিতৃবৎসল ছিলেন না। শাহজাদা অক্বর জেবুন্নিসা বেগমের সহােদর ছিলেন। তাঁহার রাজপুতানায় অবস্থান কালে ভাই ও ভগিনীর মধ্যে চিঠি পত্র চলিত। কূট- নীতি-বিশারদ ঔরঙ্গজেব বাদশাহের গুপ্তচরের অভাব ছিল না—তাহারা ঐ সব চিঠি পত্র হস্তগত করিয়া উক্ত বাদশাহের নিকট প্রদান করে। সেই সব পত্রে সাধারণ কথা ও কুশল মঙ্গল- জেবুন্নিসা বেগম না। বার্তা ব্যতীত কোন দোষণীয় বিষয় উল্লেখ থাকিত কিন্তু পরশ্রীকাতর কয়েকজন ব্যক্তি জেবুন্নিসা বেগমকে তাঁহার পিতার বিষদৃষ্টিতে নিক্ষেপ করিবার জন্য তাহার বিরুদ্ধে নানা কথা বলিয়া ঔরঙ্গজেবের মনে সন্দেহ জন্মাইয়া দেয়। স্বভাবতঃই ঔরঙ্গজেব সন্দিগ্ধ প্রকৃতির লােক ছিলেন। অন্যকে বিশ্বাস করা দূরে থাক যে নিজ সন্তানকে পর্যন্ত বিশ্বাস করে না, কন্যা হইলেও হেন ব্যক্তির কাছে কি আর জেবুন্নিসা বেগমের নিস্তার আছে। ঔরঙ্গজেব বাদশাহ তাহার দুহিতার উপর সন্দিহান হইয়া তাহাকে “সলিমগড়” বা “নূরগর” দুর্গে নজরবন্দী করিয়া রাখেন। এবং বার্ষিক বৃত্তিস্বরূপ তিনি যে চারি লক্ষ টাকা পাইতেন তাহাও বন্ধ করিয়া দেওয়া হয়। উক্ত দুর্গ যমুনার মধ্যবর্তী এক দ্বীপে শের- শাহের পুত্র সলিমা বা সেলীম শাহ নিৰ্মাণ করিয়া-
৪০
জেবুন্নিসা বেগম
ছিলেন। জানা যায়—পূৰ্বে উহা নুরুদ্দীন জাহাঙ্গীর
বাদশাহের নির্মিত একটি সেতুর দ্বারা দিল্লীর সহিত .
সংযুক্ত ছিল। মুগল শাসনকালে রাজবন্দিগণকে
আবদ্ধ রাখিবার জন্য সচরাচর ঐ দুর্গ ব্যবহৃত
হইত। তাহাতেই ঔরঙ্গজেব তাঁহার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা
শাহজাদা দারা শিকোকে হত্যা করান।
জেবুন্নিসা বেগম সলীমগড়ে নজরবন্দী থাকার
সময় রুহউল্লা খাঁর মাতা হমীদা বানু বেগমের
মৃত্যু হইলে তিনি তথা হইতেই মৃত বেগমের
“তাজীয়ত” অর্থাৎ মৃত ব্যক্তির জন্য শােক প্রকাশ
ক্রিয়াতে যােগ দান করিয়াছিলেন। সেই
বৎসরেই ঔরঙ্গজেব বাদশাহের পুত্র শাহজাদা
কাবখসের বিবাহ হয়। জেবুন্নিসা বেগমের বিশেষ
অনুরােধে সেই বিবাহ-উৎসব তাঁহার সেখানেই
সম্পাদিত হইয়াছিল।
সলীমগড় দুর্গে অবরুদ্ধ থাকিবার কালে
85.
জেবুন্নিসা বেগম
জেবুন্নিসা বেগম বিদ্যালােচনায় দিন যাপন
সে সময়ে তিনি স্বীয় অদৃষ্টকে লক্ষ্য
facoal
করিয়া যে কবিতা রচনা করিয়াছিলেন তাহা নিম্নে
প্রদত্ত হইল।
” درد که زقید ستم آزاد نه گشتم
یک لحط زغم هائی جهان شاد نه گشتم
گرچه پا زنجير مخفی زد ته دیوار غم
شکر الله کز جفائی هم گنا آسوده ام
دل من اسير مخفي به بلائی هجر
تا کے
که بجز هوائی وصلت گناه دگر ندارم
مخفي ميد رهائی تا بروز حشر نيست
خاک غربت هر که را در مهد دامنگیر شد
تا مرا زنجير در پائی دل دیوانه شد
درست شد دشمن مرا هر آشنا بیگانه شد
“দদকিজ-কয়েদ সিত আজাদ নগশতম্
এক লহজা জেগমহায়ে জহ শাদ নগশতম্।
৪২
জেবুন্নিসা বেগম
গরচে পাবঞ্জির “মখফী” জ তা হে দিওয়ার-এ-গম
শুকুর আল্লা কজ, জফা-এ-হমগুন। আসুদা অম
দিল-এ-মন্ আসির “মখফী” বাবলাই হিজর তাকে
কি বজুজ
হোয়াই
ওসলত, গুনাহ দিগর নদারম।
“মখফী” উমেদ্ রেহাই তাবরেজ হস্র নেস্ত
খাক-এ গুবত হরকে রদির মহদ দামনিগর শুদ
তা মরা জঞ্জির দরপায়ে দিল দিওয়ানা শু,
দোস্ত শুদ্ দুশমন্ মরা হর আশনা বেগানা শুদ।
ভাবার্থঃ-
হায় ব্যথা-উৎপীড়নের কারাবাস হইতে মুক্তিলাভ
করিতে পারিতেছি না।
এক মুহূর্তের জন্যও আমি ভব যন্ত্রণা হইতে পরিত্রাণ
পাইলাম না।
যদিও পায়ে বেড়ী, আছে ও দুঃখরূপ প্রাচীরের
অন্তরালে রহিয়াছি,
ধন্য ভগবানসকুলের অত্যাচার হইতে অব্যাহতি
পাইয়া আরামেই আছি।
বিচ্ছেদের যন্ত্রণায় আমার মন কতদিন পর্যন্ত বন্দী
থাকিবে ?
জেবুন্নিসা বেগম
৪৩
কেবল মিলনের ইচ্ছা ব্যতীত অন্য কোন পাপ মনে
রাখি না।
দারিদ্রের ধূলা যাহাকে শৈশব হইতে স্পর্শ করিয়াছে ;
তাহার মহাপ্রলয়ের পূর্বে মুক্তির আশা নাই।
যখন হইতে পায়ে বেড়ী পরিয়াছি সেই দিন হইতেই
মন উন্মাদগ্রস্ত হইয়াছে।
যাহারা আমার বন্ধু ছিল তাহারাও শত্রু হইয়াছে এবং
প্রিয়জনও এখন আমার অপরিচিত হইয়া গিয়াছে।
জেবুন্নিসা বেগম এই প্রকার সুখে ও দুঃখে
বৎসরাধিক কাল সলীমগড় দুর্গে অবরুদ্ধ থাকিবার
পর অবশেষে মুক্তিলাভ করেন।
No text on this page.
আকিল খাওজেরুন্নিসা বেগমের প্রণয়কাহিনী লাহােরের শাসনকর্তা আকিল খাঁ কেবল রাজ- কাৰ্যেই নিপুণ ছিলেন না, কবি বলিয়াও তাঁহার সুখ্যাতি ছিল। স্বীয় কর্তব্য কাৰ্য্যের অবকাশ সময় তিনি কাব্যানুশীলনে কাটাইতেন। দিল্লীতে জেবুন্নিসা বেগমের সেখানে প্রায়ই যে “মশা’রা” অর্থাৎ কবি সম্মিলন হইত একথা দেশ বিদেশে প্রচার হইলে আকিল খাঁও ইহা শুনিতে পান। এ সংবাদ শুনিয়া তিনিও তাহাতে যােগ দান করিবার জন্য লালায়িত হন; কিন্তু এতদূর হইতে কিরূপে ইহা সংঘটিত হইতে পারে তাহার উপায় ভাবিয়া পান না।
৪৬ জেবুন্নিসা বেগম এমন সময় আকিল খার সৌভাগ্যে ঔরঙ্গজেব বাদশাহ অসুস্থ হওয়াতে চিকিৎসকগণের ব্যবস্থা অনুসারে বায়ু পরিবর্তনের জন্য তিনি লাহােরে গমন করেন। সেখানে যাওয়ার পর অবধি ক্রমে তাহার স্বাস্থ্যের উন্নতি হইতেছে দেখিয়া তিনি আরও কিছু অধিক কাল লাহােরে বাস করিতে মনস্থ করেন এবং সেই উদ্দেশ্যে তাঁহার পরিজন- বর্গকে দিল্লী হইতে লাহােরে আনয়ন করেন। আকিল খাঁ দেখিলেন—জেবুন্নিসা বেগমের সহিত তাহার আলাপ পরিচয় করিবার ইহা এক বিশেষ সুযােগ উপস্থিত। তখন তিনি এই উদ্দেশ্য সাধনের জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করিতে লাগিলেন। পারস্যদেশ-নিবাসী সম্রান্তবংশীয় সুপুরুষ আকিল খাঁ যে সুজ্ঞি, এবং কাব্যালঙ্কার শাস্ত্রে তাঁহার বিশেষ অধিকার আছে, এ বিষয় জেবুন্নিসা বেগম অবগত হইয়া তাহার সহিত আলাপ করিবার
জেবুন্নিসা বেগম
৪৭
জন্য তিনিও লালায়িত হন। কিন্তু তাঁহার পিতার
কঠোর শাসনের আশঙ্কায় এ বিষয়ে কোন উপায়
অবধারণ করিতে সক্ষম হন না।
ঔরঙ্গজেব বাদশাহের সহিত জেবুন্নিসা বেগম
লাহােরে অবস্থান করিবার কালে তিনি তথায়
একটী বাগান প্রস্তুত করেন। তাহার ভগ্নাবশেষ
আজও বর্তমান আছে। ঐ বাগান প্রস্তুত হওয়ার
সময়ে তাহার কাজ দেখিবার জন্য প্রায়ই তিনি
সেখানে থাকিতেন।
আকিল খাঁ ভাবিলেন—জেবুন্নিসা বেগমের
সহিত দেখা হওয়ার যদি কোন সম্ভাবনা থাকে
তবে তাহার প্রকৃত সময় এই। এ সময় চলিয়া
গেলে এ জীবনে আর তাহার সহিত দেখা হওয়ার
সুযােগ ঘটিবে না ; অতএব এই সুযােগ ছাড়িয়া
দেওয়া উচিত নহে মনে করিয়া আকিল খাঁ এজন্য
প্রাণপণে চেষ্টা করিতে লাগিলেন।
৪৮
জেবুন্নিসা বেগম
জেবুন্নিসা বেগমের যে বাগান প্রস্তুত হইতেছিল
তাহার নির্মাণকাৰ্য্য দেখার উদ্দেশ্যে তথায় তিনি
অবস্থান করিবার কালে একদিন তাঁহার সহচরী-
দিগের সহিত চৌসর খেলিতে ছিলেন। এমন
সময় আকিল খাঁ জীবন-মরণ পণ করিয়া মজুরের
বেশ ধারণ-পূৰ্ব্বক ইট, সুরকীর বােঝা মাথায়
করিয়া সেখানে প্রবেশ করিলেন। হঠাৎ অজানিত
ব্যক্তি উপস্থিত হওয়াতে জেবুন্নিসা বেগম চক্ষু
তুলিয়া চাহিবামাত্র আকিল খাঁ বলিয়া উঠিলেন—
طلبت گرد جهان می گردم
মন্দ তলবত, গিদ-এ-জহা মে গিদ
আমি তাের অনুসন্ধানে জগতের চারিদিক ঘুরিতেছি।
জেবুন্নিসা বেগম
পূর্বেই
জানিয়াছিলেন,
আকিল খাঁ। তাহার সহিত সাক্ষাতের জন্য
ব্যাকুল। উল্লিখিত এক চরণ কবিতা শুনিয়া এবং
জেবুন্নিসা বেগম
৪১
তাহার আকার-প্রকার দেখিয়া সুচতুর। বেগমের
বুঝিতে বাকী রহিল না—এ ব্যক্তিই যে আকিল ,
খা। চৌদর খেলিতে খেলিতে তিনি এই উত্তর
প্রদান করিলেন।
گر باد شری بر سر زلفم نه رسی
গর বাদ শুই বর সর-এ-জুলফ নরসী
বায়ুরূপে আসিলেও আমার কেশাগ্ৰ পৰ্যন্ত
পৌছিতে পারিবে না।
এই উত্তর শুনিয়া আকিল খাঁ নত শিরে
চলিয়া আসিলেন। তাহার পর হইতেই জেবুন্নিসা
বেগম ও আকিল খাঁর মধ্যে পত্রাদি চলিতে এবং
গােপনে দেখা-সাক্ষাৎ হইতে আরম্ভ হয়।
ইতিমধ্যে ঔরঙ্গজেব বাদশাহ সুস্থ হইয়া
দিল্লীতে ফিরিয়া আসিলেন, কিন্তু জেবুন্নিসা
৪
জেবুন্নিসা বেগম
বেগমের বাগানের কাজ শেষ না হওয়াতে তিনি
তাঁহার পিতার সহিত ফিরিয়া আসিলেন না।
ঔরঙ্গজেব বাদশাহের লাহোরে অনুপস্থিতি বশতঃ
উক্ত বেগমের সহিত আকিল খাঁর দেখা
সাক্ষাতের বিশেষ সুবিধা ঘটে; কিন্তু এই সুযােগ
অধিক দিন স্থায়ী হয় নাই।
জেবুন্নিসা বেগম ও আকিল খাঁর প্রণয়ের কথা
যে দাসী জানিত, সে কার্যে অবহেলা করাতে উক্ত
বেগম তাহাকে শাসন করেন। ইহার প্রতিশােধ
নেওয়ার উদ্দেশ্যে ঐ দাসী দিল্লীতে আসিয়া তাহার
কী ও আকিল খাঁর প্রণয়ের কথা ঔরঙ্গজেব
বাদশাহের নিকট প্রকাশ করিয়া দেয়।
উক্ত বাদশাহ এই প্রকারে তাহার কন্যা ও
আকিল খাঁর প্রণয়ের কথা দাসীর নিকট হইতে
অবগত হইয়া অত্যন্ত রাগান্বিত হইলেন, কিন্তু
স্বীয় মনােভাব কোনরূপে প্রকাশ করিলেন না।
জেবুন্নিসা বেগম জেবুন্নিসা বেগমকে আর লাহােরে থাকিতে দেওয়া কোন মতেই যুক্তিসঙ্গত নহে মনে করিয়া তৎ- ক্ষণাৎ তিনি তাহার কন্যাকে লিখিয়া পাঠাইলেন— পত্র পাওয়া মাত্র যেন তিনি দিল্লীতে চলিয়া আইসেন কোনরূপ বিলম্ব যেন না হয়। ঔরঙ্গজেব হেন বাদশাহের আদেশ অবহেলা করিতে পারে—এমন সাধ্য কোন ব্যক্তির আছে ? তাঁহার পিতার আদেশানুসারে জেবুন্নিসা বেগম অগৌণে দিল্লীতে চলিয়া আসিলেন।
No text on this page.
জেরুন্নিসা বেগমের বিবাহের
প্রস্তাব
জেবুন্নিসা বেগম দিল্লীতে চলিয়া আসিলে পর
ঔরঙ্গজেব বাদশাহ তাঁহাকে কোনরূপ শাসন
করিলেন না। সুচতুর বাদশাহ ভাবিলেন—তাঁহার
কন্যা ও আকিল খাঁর প্রণয়ের সম্বন্ধে কোন কথা
বলিতে বা কিছু করতে গেলে ইহা সর্বত্র প্রকাশ
হইয়া নিজ কুলেই কলঙ্ক স্পর্শিবে। অতএব তিনি
এ বিষয়ে কোন উচ্চবাচ্য না করিয়া কেবল তাহার
বিবাহের প্রস্তাব উত্থাপন করিলেন।
ঔরঙ্গজেব বাদশাহের এই প্রস্তাৰ শুনিয়া
জেবুন্নিসা বেগম করজোড়ে শির নত করিয়া
৫৪
জেবুন্নিসা বেগম
কহিলেন—“এ ক্রীতদাসী শাহানশাহ আলমগীরের
আদেশ শিরােধার্য্য-পূৰ্ব্বক গ্রহণ করিতেছে।
ধৃষ্টতা বলিয়া যদি মনে করা না হয়, তবে
জহাঁপনাহের নিকট দাসী এই স্বাধীনতাটুকু
প্রার্থনা করে, এ বিবাহের কথা যেন সর্বত্র
প্রচারের আদেশ প্রদান করা হয়। এ সংবাদ
শুনিয়া যাহারা বিবাহপ্রার্থী হইবে, দাসী স্বয়ং
তাহাদের কুল-শীল পরীক্ষা করিয়া একজনকে
পতিরূপে বরণ করিবে।”
জেবুন্নিসা বেগমের প্রার্থনা অনুসারে তাঁহার
বিবাহের কথা ঔরঙ্গজেব বাদশাহ সর্বত্র প্রচার
করাইলেন। এই বিষয় সকলে জানিতে পারিলে
অনেকেই জেবুন্নিসা বেগমের বিবাহ-প্রার্থী হন।
তাহাদের মধ্যে আকিল খাও ছিলেন।
নিজ-বংশমর্যাদা বর্ণনাসহ বিবাহপ্রার্থীগণের
প্রার্থনা-পত্ৰ আসিয়া পৌছিলে, পিতা-পুত্রীর মধ্যে
জেবুন্নিসা বেগম
অনেক আলােচনার পর লাহােরের সুবেদার
আকিল খাঁর সহিতই জেবুন্নিসা বেগমের বিবাহ
নির্ধারিত হয়। তদনুসারে আকিল খাঁকে এ
বিষয় জানাইয়া দিল্লীতে আসিবার জন্য ঔরঙ্গজেব
বাদশাহ তাঁহার নিকট আদেশ-লিপি প্রেরণ
করেন। বাদশাহী ফরমা পাইয়া আকিল খ
আনন্দে উৎফুল্ল হইয়া উঠিলেন, কিন্তু শীঘ্রই
তাহার হরিষে বিষাদ ঘটিল।
ঔরঙ্গজেব বাদশাহের দরবারে আকিল খাঁর
প্রতিদ্বন্দ্বীর অভাব ছিল না। সভাসদগণের মধ্যে
অনেকেই জেবুন্নিসা বেগমের পরিণয়াকাফী
ছিলেন। আকিল খাঁর সহিত যে জেবুন্নিসা
বেগমের বিবাহ হইবে, ইহা তাহাদের সহ্য হইল
না। বাদশাহজাদী—বিশেষতঃ এমন যে একটী
রমণীরত্ন তাহা আকিল খাঁ সকলকে ঠকাইয়া
লইয়া যাইবে এমন কখনও হইতে পারে না। যে
জেবুন্নিসা বেগম প্রকারেই হউক ইহার বাধা জন্মাইতে হইবে— এরূপ সকলে পরামর্শ করিয়া নিম্নলিখিত মৰ্ম্মের একখানি পুত্র আকিল খাঁর নিকট প্রেরণ করা হইল। “লাহােরে জেবুন্নিসা বেগমের সহিত তোমার যে গুপ্ত প্রণয় সংঘটিত হইয়াছিল একথা শাহান- শাহ, ঔরঙ্গজেব আলমৃগীরের শুনিতে বাকী নাই। তিনি যে কি প্রকৃতির লােক, ইহা তােমার বিশেষ রূপই জানা আছে—এ বিষয় অধিক লিখা বাহুল্য। বাদশাহজাদীকে বিবাহ করার প্রকৃত অর্থ যে প্রাণবধ ব্যতীত আর কিছুই নহে, ইহা তােমার মত,সুচতুর লােকের বুঝিতে কঠিন হইবে না।” কুটিল প্রকৃতির ঔরঙ্গজেব বাদশাহ যেমন সকলকেই অবিশ্বাস করিতেন—সেইরূপ তাহার উপরও শত্রু-মিত্র কেহই বিশ্বাস স্থাপন করিত না। সকলেই জানে, তাহার দ্বারা সাধিত হইতে
জেবুন্নিসা বেগম
পারে এমন কাৰ্য বিরল। এই সব জানিয়া-
শুনিয়া আকিল খাঁ ভাবিলেন—ঔরঙ্গজেব বাদশাহ
সরল চিত্তে তাহার নিকট ফরমান পাঠান নাই,
নিশ্চয়ই তাহার মনে দুরভিসন্ধি আছে। বিবাহের
প্রস্তাব সেই দুরভিসন্ধির আবরণ মাত্র। দিল্লীতে
গেলে তাঁহার রক্ষা থাকিবে না-শিরচ্ছেদন বা
হস্তিপদতলে বিমর্দিত হইতে যে হইবে তাহার
কোন সন্দেহ নাই।
এই সৰ নানা কারণে আকিল খাঁ মনে
করিলেন—বাদশাহজাদীকে লাভ করা প্রাণের
নিকট তুচ্ছ। অতএব তিনি জেবুন্নিসা বেগমকে
বিবাহ না করাই স্থির করিলেন এবং তদনুসারে
নিম্নলিখিত কবিতায় স্বীয় মনের ভাব ব্যক্ত করিয়া
তাহা দিল্লীতে প্রেরণ পূর্বক বাদশাহী কাৰ্য
পরিত্যাগ করিয়া প্রাণভয়ে লাহাের হইতে সরিয়া
পড়িলেন।
৫৮
জেবুন্নিসা বেগম
طاعت زیاده
نہین هرتي بنده مسے
بس اب خانه آباد و دولت زیاده
নহি হােতী বাসে তায়েত জিয়াদা
বস্ অব খান আবাদ ও দৌলত জিয়াদা ।
দাসের দ্বারা অধিক আদেশ প্রতিপালিত
হইতে পারে না। ধন দৌলত ও বাড়ী
ঘরের এই শেষ।
জেবুন্নিসা বেগম অকিল খার এই পত্র
দেখিয়া অত্যন্ত মর্মাহত হন এবং এ জীবনে
আর বিবাহ না করাই মনে মনে স্থির করেন ;
কিন্তু তাহার মনােভাব কাহারও নিকট প্রকাশ
করিলেন না।
জেবুনিসা বেগমকে বিবাহ করিবার জন্য পারস্যধিপতি পুত্র শাহজাদা ফরুখের দিল্লীতে আগমন জেবুন্নিসা বেগমের রূপ এবং বিদ্যা ও বুদ্ধির কথা পূৰ্ব্বাবধি সৰ্বত্ৰ খ্যাত ছিল। হেন সৰ্বগুণ- সমন্বিতা বাদশাহজাদীর বিবাহ হইবে—একথা পারস্য দেশ পর্যন্ত প্রচার হইলে সেই দেশের অধিপতির পুত্র শাহজাদা “ফরুখ,” উক্ত বেগমকে বিবাহ করিবার উদ্দেশ্যে দিল্লীতে আগত হন। তিনি সুপুরুষ ও কাব্যরসে রসিক ছিলেন। সকলেরই একান্ত বাসনা ছিল এইরূপ এক
জেবুন্নিসা বেগম
রাজপুত্রের সহিত মুগল সম্রাটের দুহিতা পরিণয়-
সূত্রে আবদ্ধ হন, কিন্তু নিম্নলিখিত ঘটনায় তাহা
হইল না।
ইরানের রাজপুত্র শাহজাদা ফরুখ, দিল্লীতে
আসিয়া জেবুন্নিসা বেগমের বিবাহপ্রার্থী হইলে
উক্ত বেগম শাহজাদা ফরুখকে একবার স্বচক্ষে
দেখিবার অভিলাষে নিজ ভবনে আহার করিবার
জন্য তাঁহাকে নিমন্ত্রণ করেন। শাহজাদ ফরুখ
জেবুন্নিসা বেগমের দ্বারা নিমন্ত্রিত হওয়াতে অতিশয়
সন্তুষ্ট হইলেন। তিনি উক্ত বেগমকে ধন্যবাদ
প্রদান পূর্বক সাদরে তাঁহার আমন্ত্রণ গ্রহণ করিয়া
আহার করিবার জন্য যথাসময়ে জেবুন্নিসা বেগমের
মহলে উপস্থিত হন এবং ভােজনের জন্য নির্দিষ্ট
স্থানে উপবেশন পূর্বক খাদ্যসামগ্রীর প্রশংসা
করিতে করিতে আহারে প্রবৃত্ত হন।
জেবুন্নিসা বেগম চিকের অন্তরাল হইতে
জেবুন্নিসা বেগম তাঁহাকে দেখিতেছিলেন। শাহজাদা ফরুখ, ইহা টের পাইয়া বলিয়া উঠিলেন- و سنبوسة بيسن بده সন্ধুসা-এ-বেসন বিদা বেসনের সম্ভসা দেও ” এই কথা দুই প্রকার ভাব প্রকাশ করে। সরলভাবে দেখিতে গেলে বেসনের “সম্বুসা” ( সিঙ্গারার মত খাদ্যদ্রব্য) দেও, এই অর্থ হয়। অক্ষর বিন্যাসের ব্যতিক্রম করিয়া অর্থ করিতে গেলে বে, সন অর্থাৎ ‘স” ও “ন” এই দুই অক্ষর ব্যতীত “সমুসা” দেও, এই ভাব ব্যক্ত করে। সমুসা হইতে “স” ও “ন” বাদ দিলে কেবল “বুসা” শব্দ থাকে। “বুসা” শব্দের অর্থ চুম্বন। তাহা হইলে বুঝা যায় যে শাহজাদা ফরুখ জেবুন্নিসা বেগমকে বলিতেছেন “চুম্বন দেও”। উক্ত বেগম সরল ভাবের অর্থ ধরিয়া না লইয়া, শেষের কুটিল অর্থই ধরিয়া লইলেন। কোন জেবুন্নিসা বেগম সম্রান্ত ব্যক্তির অন্তঃপুর-মহিলাকে লক্ষ্য করিয়া একজন অপরিচিত পুরুষ এপ্রকার কথা বলিয়া ধৃষ্টতা প্রকাশ করতে জেবুন্নিসা বেগম অত্যন্ত রুষ্ট হইলেন। তিনিও তৎক্ষণাৎ দ্ব্যর্থযুক্ত কথায় ঐ উক্তির নিম্নলিখিত উত্তর প্রদান পূর্বক সেই স্থান হইতে চলিয়া গেলেন। از مطبخ مادر طلب অজ মতবখ-এ-মা দর তলব এ কথার সরল অর্থ করিতে গেলে –“আমাদের রান্নাঘর হইতে চেয়ে নেও”—এইরূপ বুঝায়। “মা” ও “দর” এই দুই শব্দ একত্র করিলে “মাদর” শব্দ হয়, ইহার অর্থ মাতা। এই প্রকারে বলিলে—“(তাের) রান্নাঘরের মার নিকট হইতে চেয়ে নেও” অথ প্রকাশ করে। শাহজাদা ফরুখও শেষের অথই গ্রহণ করিয়া লজ্জিত- মনে আহার-স্থান হইতে নতশিরে চলিয়া গেলেন।
জেবুন্নিসা বেগম
জেবুন্নিসা বেগম পূর্বেই এক প্রকার স্থির
করিয়াছিলেন—তিনি আর বিবাহ করিবেন না।
কেবল তাঁহার পিতার বিশেষ অনুরােধ রক্ষা না
করা ধৃষ্টতা ভাবিয়া শাহজাদা ফরুখকে বিবাহ
করিতে সম্মত হন। তাহাও সন্তুষ্টচিত্তে বা
স্বেচ্ছায় নহে। এই ঘটনার পর তিনি উক্ত
শাহজাদাকে বিবাহ করিতে কোনমতেই স্বীকার
করিলেন না। তিনি বলিলেন--“যে ব্যক্তি মহিলার
প্রতি সম্মান প্রদর্শনের কর্তব্যজ্ঞানহীন, হেন
ব্যক্তিকে বিবাহ করা ধিক্।”
শাহজাদা ফরুখ জেবুন্নিসা বেগমকে বিবাহ
করিবার জন্য বড় আশা করিয়া আসিয়াছিলেন,
কিন্তু তাঁহার বাসনায় ছাই পড়াতে তিনি ক্ষুন্নমনে
স্বদেশে ফিরিয়া গেলেন।
উক্ত ইরান রাজপুত্র ইতিপূর্বে যে একটী
কবিতার মুখপাত রচনা করিয়া জেবুন্নিসা বেগমের
৬৪
জেবুন্নিসা বেগম
নিকট প্রেরণ করিয়াছিলেন তাহা নিম্নে প্রদত্ত
হইল।
هر که دیدن میل دارد در ساخن بيند
ترا ای مه جبین بی پرده دیدن آرزو دارم
جمالت هائی حسنت را رسیدن آرزو دارم
بیند مرا
بلبل از گل بگدرر گرد چمنی
بت پرستی کے کند گر برهمن بيند مرا
در سخن پنها شدم چو بوئی گل در برگ گل
তরা অয়, মাজবীন্ বেপরদা দীদ আজু দারম্
জমালত, হা-এ-হুস্তরা রসীদ আজুদারম্।
হে চন্দ্রাননে—তােমাকে অবগুণ্ঠন হইতে বিমুক্ত
দেখিতে বাসনা পােষণ করি।
তােমার রূপ লাবণ্যের সমীপে পৌঁছিবার
ইচ্ছা করি।
এই কবিতা জেবুন্নিসা বেগমের নিকট
পৌছিলে তিনি নিম্নলিখিত উত্তয় লিখিয়া
পাঠান।
জেবুন্নিসা বেগম
বুলবুল অজ, গুল বগুজর
গিঁদ চমন্ বীনদ মরা।
বুত পরস্তী কে কুনি
গর ব্ৰহমন্ বীনদ মরা।
দ সুখ পিনিহা শুদম
চৌ বু-এ-গুলদ বর্গ-এ-গুল,
হ কি দীদন মৈ দারদ
দ শুখন্ বীনদ মরা ।
আমাকে বাগানে দেখিলে বুলবুল ফুল ত্যাগ করে।
ব্রাহ্মণ যদি আমাকে দেখে তবে সে আর কেন
মূর্তি পূজা করিবে।
ফুলের সুবাস যেমন ফুলের পাপড়ীর ভিতর
লুকাইয়া থাকে, আমিও তেমন আমার কবিতার
ভিতর লুকাইয়া আছি।
যে আমাকে দেখিতে ইচ্ছা করে সে আমার
কবিতার ভিতর আমাকে দেখিতে পাইবে।
৫
জেবুন্নিসা বেগম
এইরূপ লেখালেখির পরিণাম যে পূৰ্ববর্ণিত
ঘটনায় পরিণত হইবে, বােধ করি শাহজাদা
ফরুখ ইহা স্বপ্নেও ভাবেন নাই।
উক্ত ইরান রাজপুত্রের সহিত জেরুন্নিসা
বেগমের পরিণয়-সূত্রে আবদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনা
হইয়াও অবশেষে তাহা ভাঙ্গিয়া গেলে তাহার আর
বিবাহ হয় নাই। সারা জীবন তিনি অবিবাহিত
অবস্থায় অতিবাহিত করেন। ইহা দেখিয়া
জেবুন্নিসা বেগমের নিয়তিতে বিধাতা যে বিবাহ
লিখিয়া দেন নাই একথা ব্যতীত আর কি বলা
যায়।
জেনিসা বেগম ও আকিল খাঁর
প্রণয়ের শােচনীয়পরিণাম
ইরাণের রাজপুত্র শাহজাদা ফরুখ জেবুন্নিসা
বেগমকে বিবাহ করিবার উদ্দেশ্যে যে সময়
দিল্লীতে আসিয়াছিলেন, সেই সময়ে আকিল খাও
গােপনে দিল্লীতে আসিয়া এক নির্জন স্থানে বাস
করিতে থাকেন। শাহজাদা ফরুখের সহিত
জেবুন্নিসা বেগমের বিবাহের প্রস্তাব এবং অবশেষে
তাহা ভাঙ্গিয়া যাওয়া—এ সমস্ত সংবাদই তিনি
রাখিতেন।
আকিল খ যে দিল্লীতে বাস করিতেছেন এ
বিষয় ক্রমে জেবুন্নিসা বেগমও শুনিতে পাইলেন।
জেবুন্নিসা বেগম
ইহা জানিলে পর তিনি নিম্নলিখিত কথা এক
খণ্ড কাগজে লিখিয়া সাবধানে একজন দাসীর
দ্বারা আকিল খার নিকট প্রেরণ করেন।
شنیدم ترک خدمت کرد عاقل خان بنادانی
শুনিদম তর্ক খেদমত কদআকিল খা বনাদানী
শুনিলাম নির্বদ্ধিতায় আকিল খাঁ খিদমত
অর্থাৎ রাজসেবা ত্যাগ করিয়াছে।
এই লিপি পাইয়া আকিল খাঁ সঙেক্ষপে তাহার
এইরূপ উত্তর লিখিয়া পাঠাইলেন।
چرا کارسے کند عاقل که باز آید پشیمانی
চিরা কারে কুনদ আকিল কি বাজ আয়েদ পুশিমানী
আকিল কি এমন কাজ করে যে জন্য পরে
অনুতাপ করিতে হয়।
‘আকিল’ শব্দ দুইটী ভাব প্রকাশ করে।
প্রথমতঃ তাহার নাম, দ্বিতীয়তঃ বুদ্ধিমান।
এইরূপে জেবুন্নিসা বেগম ও 'আকিল খাঁর
জেবুন্নিসা বেগম মধ্যে পত্রাদি চলাচল হইতে আরম্ভ হয়, এবং কিছুদিন পর আকিল খাঁ আবার ছদ্মবেশে জেবুমিনা বেগমের মহলে যাতায়াত করিতে লাগিলেন। জেবুন্নিসা বেগমের মহলে আকিল খাঁ যে ছদ্ম- বেশে যাতায়াত করিতেছে এ বিষয় অধিক দিন গােপন রহিল না। বাদশাহী মহলের প্রায় অনেক লােকেই, ইহা জানিতে পারিলে একথা লইয়া দুর্গ মধ্যে কানা-ঘুষা হইতে লাগিল এবং তাহাদের দুর্ভাগ্যক্রমে এ সংবাদ ঔরঙ্গজেব বাদশাহের কানে পৰ্য্যন্ত পৌছিতে বাকী রহিল না। আকিল খাঁ ও তাহার কন্যার দেখা-সাক্ষাতের বিষয় ঔরঙ্গজেব বাদশাহ জানিতে পারিলে এ সম্বন্ধে তিনি গােপনে অনুসন্ধান করিতে প্রবৃত্ত হন, এবং জেবুন্নিসা বেগমের একজন পরিচারি- কাকে কৌশলে বশীভূত করিয়া তাহার মুখে
জেবুন্নিসা বেগম
সমস্ত শুনিলে পর সেই দাসীকে বলিয়া দেন—
আকিল খ। যখন তাহার কন্যার নিকট আইসে
তখন যেন সে ঔরঙ্গজেব বাদশাহকে একথা
জানায়।
তদনুসারে একদিন আকিল খাঁ জেবুন্নিসা
বেগমের মহলে উপস্থিত থাকার সময় ঐ দাসী
ঔরঙ্গজেব বাদশাহের নিকট যাইয়া একথা বলিয়া
দেয়। ইহা শুনিবামাত্র তিনি মহলের চারিদিক
প্রহরি দ্বারা ঘেরাও করাইয়া স্বয়ং তথায় অনুসন্ধান
করিবার উদ্দেশ্যে গমন করেন।
এ সংবাদ জেবুন্নিসা বেগম জানিতে পারিয়া
ভয়ে অস্থির হইয়া পড়িলেন এবং সেই মুহূর্তে
আকিল খাঁকে তাহার মহল হইতে সরাইয়া দিতে
কোন উপায় নির্ধারণ করিতে পারেন নাই। তাহার
স্নানের জল গরম করিবার বড় একটী দেগ, মহলের
এক কোণে ছিল, অনন্যোপায় হইয়া তিনি
জেবুন্নিসা বেগম তাহারই মধ্যে আকিল খাঁকে লুকাইয়া রাখিলেন। এদিকে ঔরঙ্গজেব বাদশাহ তাহার কন্যার মহলে প্রবেশ পূৰ্ব্বক সমস্ত স্থান তন্ন তন্ন রূপে অনুসন্ধান করিয়াও আকিল খাঁর কোন চিহ্নই দেখিতে পাইলেন না। যে দেগের ভিতর আকিলখ লুকাইয়াছিলেন তাহার উপর ঔরঙ্গজেব বাদশাহের হঠাৎ চক্ষু পড়াতে তাহার মনে যেন কিরূপ এক সন্দেহ জন্মিল। ইহাতে আকিল খাঁ। লুকাইয়া থাকা খুব সম্ভব এইরূপ মনে করিয়া তিনি সেই দেগ লক্ষ্য করিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন- “ইহাতে কি হয় ?” উত্তরে জানিতে পারিলেন ইহাতে জেবুন্নিসা বেগমের স্নানের জল গরম করা হইয়া থাকে। এ কথা শুনিয়া তিনি বলিলেন-“জল গরম করা হইতেছে না কেন? এখনই জল গরম কর।” জেবুন্নিসা বেগম তাহার
৭২
জেবুন্নিসা বেগম
পিতার এই নিদারুণ আদেশ শুনিয়া মৃতপ্রায়
হইলেন। রুদ্র প্রকৃতির ঔরঙ্গজেব বাদশাহের
আদেশ অমান্য করিতে পারে হেন সাধ্য কার
আছে—তাহার হুকুম মত সকলে দেগটা ধরাধরি
করিয়া জ্বলন্ত আগুনে ভরা চুলার উপর চড়াইয়া
দিল।
এ দৃশ্য জেবুন্নিসা বেগমের পক্ষে কিরূপ
হৃদয়বিদারক হইয়াছিল ইহা বুঝা কঠিন, নহে।
জীবন্ত দগ্ধ হইয়া আকিল খাঁর এ ধরা হইতে
বিদায় গ্রহণের সময় উপস্থিত, আজ তাহার মৃত্যু
সুনিশ্চিত, রক্ষার কোন উপায় নাই দৃষ্টে
জেবুন্নিসা বেগম আর স্থির থাকিতে পারিলেন না।
পাগলের মত হইয়া তিনি ঐ দেগের নিকট গমন
পূৰ্ব্বক নিম্নলিখিত কথা বলিলেন।
" سم باش مثال كله بارے
দম্ বাশ মিসাল-এ-কল্লা বারে
৭৩ জেবুন্নিসা বেগম ভাবার্থ- একবার মুহূর্তের জন্য মুণ্ডের মত থাক ; মুণ্ডের অর্থ এখানে ছেদিত মস্তক বুঝিতে হইবে। অর্থাৎ ছিন্ন মস্তকের মুখ ও জিহ্বা থাকিলেও যেমন কথা বলিতে পারে না, সেইরূপ নীরব থাক। আকিল খাঁ জেবুন্নিসা বেগমকে প্রাণের অধিক ভাল বাসিতেন। হেন প্রিয় জনের অনুরােধু অবহেলা করা অপেক্ষা স্বয়ং জীবন্ত দগ্ধ হইয়া মরা শ্রেয় মনে করিলেন, এবং তদনুসারে তিনি তিলে তিলে জ্বলিয়া মৃত্যুকে আলিঙ্গন করিতে কুণ্ঠিত হইলেন না। মৃত্যুর পূর্বে তিনি নাকি কেবল এই মাত্র বলিয়াছিলেন- - " بعد مردن ز جفائی تو اگر یاد کنم ‘‘ از کفن دست برون آرم و فریاد کنم বাদ মুদন জে জফা-এ-তু অগর ইয়াদ কুন অজ, কফ দস্তব আরম ও ফরিয়াদ কুনম
৭৪
জেবুন্নিসা বেগম
মৃত্যুর পরও যদি তাের উৎপীড়নের কথা মনে করি
শবাচ্ছাদনের ভিতর হইতে হাত বাহির করিয়া
(ভগবানের নিকট) বিচার প্রার্থনা করিব।
উঃ-কি নিষ্ঠুর ব্যাপার, ভাবিতেও শরীর
কণ্টকিত হয়।
এইরূপে একজন তােক যে
জীবন্ত জ্বলিয়া মরিতে পারে এবং এপ্রকার
যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যুর সময় সে কবিতা আবৃত্তি করিয়া-
ছিল এই সব শুনিলে অসম্ভব বলিয়াই মনে হয়।
ঔরঙ্গজেব বাদশাহ আকিল খাঁকে এপ্রকার
নৃশংস রূপে হত্যা করিবার পর তাঁহার কন্যাকে
কোনরূপ লাঞ্ছনা বা তিরস্কার করিয়াছিলেন কি না,
যে উর্দু গ্রন্থ অবলম্বনে এই পুস্তিকা লিখিত
হইয়াছে, তাহাতে ইহার কোন উল্লেখ নাই।
এমনও হইতে পারে—জেবুন্নিসা বেগমের সম্মুখেই
তাঁহার প্রণয়-পাত্রকে এ প্রকার অমানুষিক নিষ্ঠ
উপায়ে হত্যা করাই তাহার পক্ষে যথেষ্ট
র
No text on this page.
জেবুন্নিসা বেগম
ইরাণের রাজপুত্র শাহজাদা ফরুখ, জেবুন্নিসা
বেগমকে বিবাহ করিতে না পারিয়া লজ্জিত মনে
ফিরিয়া যাওয়াতে পারস্য দেশের অপমান
হইয়াছে—এইরূপ ধারণ ঐ দেশবাসিগণের মনে
জন্মে। এই কারণেই তাহারা বর্ণিত বেগমের
চরিত্রে কলঙ্ক প্রদান পূর্বক ইহার প্রতিশােধ
গ্রহণের উদ্দেশ্যে আকিল খাঁর সহিত তাঁহার
অবৈধ প্রেমের গল্প রটাইয়া দেয়।
জেনিসা বেগমের মৃত্যু
যতদূর পর্যন্ত জানা যায়—জেরুন্নিসা বেগমের
শেষ জীবন সুখ-শান্তিতে অতিবাহিত হয় নাই।
মানসিক ক্লেশের দরুণ তিনি নির্জনে বাস করিয়া
সাংসারিক সমস্ত কাৰ্য্য এবং চিন্তা বর্জন পূৰ্বক
বিদ্যানুশীলনেই নাকি দিন যাপন করিয়াছিলেন।
জেবুন্নিসা বেগমের মৃত্যু হইলে লাহােরে তিনি
যে বাগান প্রস্তুত করিয়াছিলেন সেখানেই তাঁহার
দেহ সমাহিত করা হয়, এবং তাহার বাসনা
অনুসারেই এই কাৰ্য্য সম্পাদিত হইয়াছিল—
এইরূপ পূর্বকথিত উদু পুস্তকে উল্লেখ আছে।
-৭৮
জেবুন্নিসা বেগম
কিন্তু কোথায় তাঁহার মৃত্যু হইয়াছিল ইহা
লেখা নাই।
পঞ্জাবের অন্তর্গত গুরুদাসপুরের অতিরিক্ত
জুডিশিয়েল কমিশনার, ঐ প্রদেশস্থ বিশ্ববিদ্যালয়ের
সদস্য খাঁ বাহাদুর সৈয়দ মহম্মদ লতীফের রচিত
সুপ্রসিদ্ধ গ্রন্থ ‘লতীফ-এ-লাহাের’ হইতে জানা
যায়—লাহােরেই জেবুন্নিসা বেগমের মৃত্যু হইয়া-
ছিল, এবং নিজ দেহ সমাহিত করিবার উদ্দেশ্যে
যে মকবরাটী তিনি ঐ নগরস্থ তাহার বাগানে
নির্মাণ করাইয়াছিলেন, সেখানেই তাঁহাকে গাের
দেওয়া হইয়াছে।
ঐ পুস্তকে তাঁহার মৃত্যুর বৎসর যেরূপ
উল্লেখ আছে তা নিম্নে প্রদত্ত হইল।
و زیب النسا بعكم قضا
ناگهان از نگاه مخفی
জেবুন্নিসা বেগম
منبع علم وفضل رحسن و جمال
همچو یوسف بچاه مخفي شد
سال تاریخ از خرد جستم
گفت هاتف که ماه مخفي شد
আহ, জেবুন্নিসা বহুকুম কজা
নাগহ অজ, নিগাহ মখফী শুদ।
সম্বা-এ-ইল্ম ও ফজল ও হুসন ও জমাল
হচো য়ুসফ বচাহ মখফী শুদ।
সাল তারিখ অজ খির জুস্তম
গুফত হাতিফ, কি মাহ মখফী শুদ।
আহা, জেবুন্নিসা বিধাতার আদেশে
দৃষ্টি হইতে অকস্মাৎ লুকাইয়াছেন।
বিদ্যা, বুদ্ধি, রূপ ও লাবণ্যের ধারা-স্বরূপ তিনি
মুসফের ন্যায় কূপের ভিতর লুকাইয়াছেন।
মৃত্যুর বৎসরের কথা বিবেককে প্রশ্ন করিলাম
অদৃশ্য হইতে বলিল “চন্দ্র লুক্কায়িত হইলেন”।
‘অবজ অথাৎ শ্রেণীবিন্যস্ত অক্ষরের দ্বারা
সংখ্যা নিরূপণের যে সঙ্কেত আরবী ও ফারসীতে
•
জেবুন্নিসা বেগম
আছে, তদনুসারে উক্ত কবিতা হইতে বুঝা যায়
যে ১০৮০ সনে জেবুন্নিসা বেগমের মৃত্যু হইয়া-
ছিল।
যে উদুপুস্তক অবলম্বনে জেবুন্নিসা বেগমের
কাহিনী লিখিত হইয়াছে, সেই পুস্তকের রচয়িতা
উক্ত তারিখ স্বীকার করেন না। ঐ তারিখ ঠিক
হইতে পারে না এবং সন নির্ধারণে কোনরূপ প্রম
প্রমাদ হইয়া থাকিবে—এইরূপ তাঁহার অভিমত।
সৈয়দ মহম্মদ নামক একজন সম্ভ্রান্ত ও
সুশিক্ষিত মুসলমান ভদ্রলােক জেবুন্নিসা বেগম
সম্বন্ধে একটী মনােরম প্রবন্ধ ‘রূপম’ পত্রিকায়
লিখিয়াছেন।
তাহাতে উক্ত
কথা যেরূপ বিবৃত আছে, তাহার মর্ম সক্ষেপে
নিম্নে উল্লেখ করা হইল।
ঔরঙ্গজেব বাদশাহ আকিল খাকে দেগের
ভিতর দগ্ধ করিয়া চলিয়া যাওয়ার পর জেবুন্নিসা
বেগমের মৃত্যুর
জেবুন্নিসা বেগম ৮১ বেগম তাঁহাকে এক নির্জন স্থানে গােপনে সমাহিত করেন, এবং প্রায়ই তিনি সেখানে যাইয়া রােদন করিতেন। এইরূপে জেবুন্নিসা বেগম তাঁহার প্রণয়ীর জন্য সদাসর্বদা অশ্রুপাত করার ফলে ক্রমে তাঁহার শরীর ভাঙ্গিয়া পড়ে। এই কারণ- বশতঃ স্বাস্থ্যলাভের জন্য তিনি কাশ্মীর যাত্রা করেন; কিন্তু তথায় পেঁৗছান তাহার ঘটিয়া উঠিল -লাহােরেই তিনি কাল-কবলে পতিত হন, এবং সেখানে নিজের জন্য যে সমাধি-মন্দিরী তিনি প্রস্তুত করাইয়াছিলেন, তাহাতেই তাঁহার মৃতদেহ সমাহিত করা হইয়াছিল। উক্ত প্রবন্ধে একথাও উল্লেখ আছে যে, মৃত্যুর পূৰ্বে জেবুন্নিসা বেগম পরবর্তী পৃষ্ঠার কবিতাটী রচনা করিয়াছিলেন ।
৮২ জেবুন্নিসা বেগম چراغ رنے گلے نے ما غریباں هزار ما لبر نے پر پروانه رنے صداے بلبلے বর মজার-এ-মা গরীব নে চেরাগ ও নে গুলে নে পর-এ-পরওয়ানয়ে ও নে সদা-এ-বুলবুলে। জন্মভূমিত্যাগী আমাদের সমাধির উপর একটী প্রদীপও নাই, ফুলও নাই। একটী পতঙ্গের পক্ষ পৰ্য্যন্ত নাই ও বু পাখীর শব্দ নাই। জেবুন্নিসা বেগমের মৃত্যুর সম্বন্ধে সুনিশ্চিত- রূপে কোন কথা বলা দুষ্কর; যেখানে যেরূপ দেখিয়াছি তাহাই এ পুস্তকে উল্লেখ করা হইল। জানা যায়—উক্ত বেগমের মকবরাটী অতি দুরবস্থায় রহিয়াছে। প্রবল পরাক্রান্ত মুগল সম্রাট ঔরঙ্গজেব আলমগীরের দুহিতবিশেষতঃ ভুবন- বিখ্যাত এক সুকবি বিদুষী মহিলার সমাধিমন্দির জবুন্নিস বগমের ভাঙ্গা মক্বরালাহাের
No text on this page.
জেবুন্নিসা বেগম
যে যত্নের অভাবে ধ্বংসকবলে ধাবিত হইতেছে
ইহা অতি দুঃখের বিষয়।
সম্ভবতঃ এক কালে এই সমাধিমন্দিরে রীতি-
মত সান্ধ্যদীপ দেওয়া হইত এবং জেবুন্নিসা বেগমের
মৃত্যু তিথিতে আড়ম্বরের সহিত “উস” অর্থাৎ
খাদ্যদ্রব্য বিতরণ করা হইত। তদুপলক্ষে তাঁহার
স্বৰ্গকামনায় নমাজ, কুরান পাঠ ও দান, খৈরাত
ইত্যাদি না জানি কত কিছুই হইয়া থাকিবে।
কালের কুটিলচক্রে সেই স্থানের আজ এই
দশা—ইহা শুনিলে অত্যন্ত দুঃখ বােধ হয়।
যে সময়ে ভারতবর্ষে স্ত্রীশিক্ষার বিশেষ কোন
অনুশীলন ছিল না, (সই সময়ের এক প্রতিভাশালিনী
বিদুষী মহিলার হেন দুর্দশাগ্রস্ত স্মৃতিচিহ্নটী রক্ষার
কি কোন উপায় হইতে পারে না? জানি না
গভর্ণমেন্টের প্রাচীন স্মৃতি রক্ষণের বিভাগ হইতে
উক্ত বেগমের সমাধিটীর জীর্ণ সংস্কার করিয়া তাহা
"৮৪ জেরুন্নিসা বেগম রক্ষা করা হইতেছে কি না। সেরূপ যদি না হইয়া থাকে তাহা হইলে স্থানীয় ব্যক্তিগণের-- বিশেষতঃ মুসলমানগণের এ বিষয়ে গভর্ণমেন্টের দৃষ্টি আকর্ষণ পূর্বক পরস্পর সহযােগিতায় একজন খ্যাতনামা বিদুষী শাহজাদীর স্মৃতিরক্ষা যুক্তিসঙ্গত মনে করি। জেবুন্নিসা বেগম দুঃখময় এ জগৎ হইতে চির- দিনের তরে বিদায় গ্রহণ করিয়াছেন বটে—কিন্তু যতদিন পর্যন্ত তাঁহার রচিত “দিওয়ান-এ-মখী” বর্তমান থাকিবে ততদিন তাহার নামও রহিয়া যাইবে, এ ধরা হইতে মুছিয়া যাইবে না। { সমাপ্ত
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.