Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Jatibhede

Sashtri,shibnath · 2009/10/13

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

জাতিভেদ
যুক্ত শিবনাথ শাস্ত্রী এম, এ,
মহাশয়ের বক্ততা।
সাধারণ ব্রাহ্মসমাজ পুস্তক প্রচার বিভাগ
কমিটি হইতে প্রকাশিত।
কলিকাতা,
২ নং বারাণসী ঘােষের স্ট্রীট, সাধারণ ব্রাহ্মসমাজে,
শ্ৰীমণিমোহন রক্ষিত দ্বারা মুতি ও প্রকাশিত।
১২৯১ সাল

No text on this page.

জাতিভেদ। কিরূপে জাতিভেদ প্রথার সৃষ্টি হইল? ইহার প্রমাণ সকল আমরা কোথা হইতে সংগ্রহ করিব ? যাহাকে বিশ্বাস- যােগ্য ইতিহাস বলে, যাহাতে অতীতকালের ইতিবৃত্ত যথা- যথরূপে বর্ণিত হইয়াছে, সংস্কৃত ভাষাতে এরূপ গ্রন্থ বিরল যে কিছু ইতিবৃত্তমূলক গ্রন্থ আছে, তাহাও কবির কল্পনা দূষিত ; সে সকলকে অতীতের ইতিবৃত্ত বলিয়া গ্রহণ করা দুষ্কর। এরূপ স্থলে উপায় কি? আমরা একটু চিন্তা করিলেই দেখিতে পাইব যে একটী জাতির সাহিত্য, কাব্য, নাটক, ধর্মশাস্ত্র, পুরাণ প্রভৃতি যদি পাওয়া যায় এবং ঐ সকল গ্রন্থের কাল নির্ণয় যদি কোন প্রকারে করিতে পারা যায়, তাহা হইলে আমরা বহুল পরিমাণে উক্ত জাতির সামাজিক ইতিবৃত্ত নির্ণয় করিতে পারি। মনে করুন বেদের কোন স্থানে যদি এরূপ একটা স্তুতি দেখি—হে ইন্দ্র! তুমি ত্বরায় তােমার উপাসকগণের নিকট এস, বণিক সমুদ্রে পােত প্রেরণ করিয়া যেরূপ উৎসুক অন্তরে অপেক্ষা করে, আমরাও সেইরূপ তােমার জন্য উৎকণ্ঠিত চিত্তে অপেক্ষা করিতেছি। এতদ্বারা কি এরূপ

২
জাতিভেদ।
অনুমান করা যায় না যে, যে সময়ে বেদের উক্ত সূক্তটা
রচিত হইয়াছিল সে সময়ে নিশ্চয় বাণিজ্যার্থ সমুদ্রে গমনা-
গমন হইত? এইরূপে জাতিভেদ প্রথার আদি নির্ণয়ের
জন্যও আমাদিগকে প্রাচীন শাস্ত্র সকল অবলম্বন করিয়া
ইতিবৃত্তের তত্ত্ব নিশ্চয় করিতে হইবে।
এক্ষণে সকল গ্রন্থের মধ্যে আদি গ্রন্থ বেদ। তাহার
মধ্যে আদিতম ঋগ্বেদ। এই ঋগ্বেদ সম্বন্ধে দুই একটা কথা
বলা আবশ্যক বােধ হইতেছে। এই ঋগ্বেদ কতকগুলি
মন্ত্রের সমষ্টি মাত্র। এই মন্ত্রগুলি ছন্দোবদ্ধ গীতের ন্যায়।
এই সকল মন্ত্র এককালের রচিত মন্ত্র নয়। তাহাদের ভাষা,
বর্ণনীয় বিষয়, বণিত সমাজের ছবি প্রভৃতি দেখিলেই
তাহাদিগকে নানা যুগের রচিত বলিয়া বােধ হয়। এই
সকল মন্ত্রের অধিকাংশ এমন সময়ে রচিত হইয়াছিল, যখন
বর্ণমালার সৃষ্টি হয় নাই এবং লিখিবার প্রথা প্রবর্তিত ছিল
। তখন ঐ সকল মন্ত্র মখে মুখে রচিত হইয়া মুখে মুখে
শেখা হইত, এবং মুখে মুখে বিচরণ করিত। লােকে ইহার
মুখে, উহার মুখে, তাহার মুখে মন্ত্রগুলি সর্বদা শুনি, কিন্তু
কেহ কখনও তাহা লিখিত দেখে নাই। এই জন্য ঐ সক
লের নাম শ্রুতি হইয়াছিল। তৎপরে বর্ণমালার সৃষ্টির
পরে সময়ে সময়ে এক একজন পণ্ডিত উদ্যোগী হইয়া
স্মৃতি হইতে ও লােক মুখ হইতে সংগ্রহ করিয়া বর্ণিত বিষ।
মানুসারে তাহাদিগকে মণ্ডল, অধ্যায়, সূক্ত প্রভৃতিতে বিভাগ

জাতিভেদ।
করিয়া গ্রন্থাকারে নিবদ্ধ করিয়া গিয়াছেন। এই সকল
পণ্ডিত বেদব্যাস নামে উক্ত হইয়াছেন। এই সকল ঋগ্বেদের
কোন একটী সূক্ত পাঠ করিতে গেলেই দেখিতে পাইবেন
যে সর্বাগ্ৰেই অমুক দেবতা, অমুকৃ ঋষি, অমুক ছন্দ, প্রভৃতি
নির্দেশ করা হইয়াছে। ইহার তাৎপৰ্য এই সংগ্রহকা
সংগ্রহ করিবার সময় যে ঋষিকে যে মন্ত্রের রচয়িতা বলিয়া
শুনিয়াছেন সেই মন্ত্রের অগ্রে সেই নাম নির্দেশ করিয়া
গিয়াছেন। দৃষ্টান্ত স্বরূপ মনে করুন, পথভিখারীদিগের মুখে
আমরা প্রতিদিন কত শত সঙ্গীত শুনিয়া থাকি। তাহার
কোনটী রামপ্রসাদের,
কোনটী' দেওয়ানজীর, কোনটা
শ্ৰীধরের কোনটা অন্য অন্য কবির। আমরা অনেক দিন
হইতে এই সকল গান শুনিয়া আসিতেছি, এবং অনেকগুলি
কণ্ঠস্থও করিয়াছি কিন্তু কখনও পুস্তকাকারে লিখিত দেখি
নাই। এখন যদি কেহ এইগুলি সংগ্রহ করিবার সংকল্প
করেন, তাহা হইলে তাঁহাকে কি করিতে হয় ? উঁহাকে
এ ভিক্ষুকের নিকট দশটী, উহার নিকট চারিটী এইরূপ করিয়া
সংগ্রহ করিতে হয় ; অথচ সংগ্রহ করিবার
অথচ সংগ্রহ করিবার সময় বিদ্যা-
পতির সময় অবধি বর্তমান সময় পর্যন্ত এই তিন চারি শতা-
ব্দীর মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে রচিত গান সকল একত্র নিবন্ধ
করিতে হয় এবং ভিক্ষুকদিগের মুখে যে গানের যে রচয়ি-
তার নাম প্রাপ্ত হওয়া যায় তাহা লিখিয়া দিতে হয়। বেদ
মন্ত্র সকল ঠিক এই প্রণালীতে সংগৃহীত ও বিভক্ত হইয়া-

জাতিভেদ।
ছিল। যাহা হউক বেদ সম্বন্ধে এত কথা বলিবার অভি-
প্রায় এই যে আপনারা সর্বদা স্মরণ রাখিবেন যে বেদের
মন্ত্র সকল এক সময়ে রচিত নহে, কোনটা বা অপরটীর সহস্র
বৎসর পরে রচিত।
এই সকল বেদমন্ত্রে আমরা আদিম ভারত সমাজের অনেক
কথা জানিতে পারি এবং এই সকল মন্ত্র মনােযােগ সহকারে
পাঠ করিয়াই পণ্ডিতগণ আদিম সমাজের অনেক তত্ত্ব নিরু-
পণ করিয়াছেন। এই সকল বেদমন্ত্র পাঠ করিয়া আমরা
জানিতে পারি বেদোক্ত আৰ্যগণ (১) সুবিশাল নগর সকল
নিৰ্মাণ করিয়াছিলেন; (২) স্বর্ণ রৌপ্যাদির অলঙ্কার
নিৰ্মাণ করিতেন; (৩) যুদ্ধক্ষেত্রে দেহ রক্ষার জন্য লৌহ
নির্মিত বৰ্ম্ম পরিধান করিতেন; (৪) শর তুণীর প্রভৃতি
সাংগ্রামিক প্রহরণ সকল প্রস্তুত করিতেন; (৫) বাদ্যযন্ত্র
সকল নির্মাণ ও ব্যবহার করিতেন ; (৬) যান বাহন
প্রভৃতি ব্যবহার করিতেন; (৭) ঔষধ ও চিকিৎসা
দ্বারা রােগ নিবারণ করিতেন ; (৮) সূক্ষ্ম গণনানুসারে
সময় নির্ধারণ করিতেন; (৯) এবং পথিকজনের সুবিধার
নিমিত্ত পান্থশালা সকল নিৰ্মাণ করিতেন। এই সকল মন্ত্রে
আরও জানিতে পারা যায় যে তাহাদের সমাজে (১০)
কাগণ পিতৃদায়ের অধিকারিণী হইতেন এবং (১১) নারী-
গণ অবরােধে না থাকিয়া প্রকাশ্য স্থানে গতায়াত করিতেন।
এমন কি সভ্য সমাজের যে সকল গুরুতর পাপ তাহারও

জাতিভেদ।
নিদর্শন সকল প্রাপ্ত হওয়া যায়। বারাঙ্গনাদিগের দুদ্ধি-
যার এবং জারজ সন্তানদিগের গােপনে প্রসূত হওয়ার
উল্লেখ দৃষ্ট হয়। এখন আপনারা প্রশ্ন করিতে পারেন যে
যে ঋগ্বেদে প্রাচীন সমাজের এত কথা উক্ত হইয়াছে তাহাতে
জাতিভেদ প্রথার উৎপত্তির কোন উল্লেখ পাওয়া যায় কি
না? ইহার উত্তর এই, একটী স্থল ব্যতীত ঋগ্বেদের কুত্রাপি
ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয় বৈশ্য শূদ্র প্রভৃতি জাতির বিবরণ প্রাপ্ত
হওয়া যায় না।
যে সূক্তের মধ্যে জাতিভেদের উৎপত্তির কিঞ্চিৎ বিবরণ
প্রাপ্ত হওয়া যায় তাহার নাম পুরুষ সূক্ত। এই সূক্তটিতে
এইরূপ বর্ণিত হইয়াছে যে দেবগণ এক আশ্চর্য্য প্রকৃতি-
সম্পন্ন পুরুষকে যজ্ঞে বলি দিলেন। সেই পুরুষের দেহ
হইতে সৃষ্টির তাবৎ পদার্থ উৎপন্ন হইল। নানা প্রকার
পদার্থের সৃষ্টি বর্ণনা করিয়া অবশেষে বলিতেছেন :-
“তস্মাৎ যজ্ঞাৎ সৰ্বহুতঃ ঋচঃ সামানি জজ্ঞিরে। ছাংসি
জজ্ঞিরে তস্মাৎ যজুম্মাদজায়ত। তস্মাদা অজায় যে
কে চোভয়াদতঃ। গাবােহ জজ্ঞিরে তস্মাৎ তম্মাজ্জা
অজাবয়।* * * * “ব্রাহ্মণােস্ত মুখমাসীৎ বাহু রাজন্যঃ
কৃতঃ। উরূ তদস্য যদ্বৈশঃ প্যাং শূদ্রো অজায়ত।”
অর্থ-সেই সৰ্বহুত যজ্ঞ হইতে ঋক সকল ও সাম সকল
জন্ম গ্রহণ করিল! তাহা হইতে ছন্দ অর্থাৎ বেদ সকল ও
যজুর্বেদ উৎপন্ন হইল। তাহা হইতে অশ্ব সকল ও দুই

জাতিভেদ। পাটী দন্ত বিশিষ্ট অপর সকল প্রাণী এবং গণ মেষ অজা প্রভৃতি উৎপন্ন হইল। * * * ইহার মুখই ব্রাহ্মণ হইল; বাহুদ্বয় ক্ষত্রিয়রূপে পরিণত হইল ; বৈশ্য যাহা দেখিতেছ, ইহাই তঁাহার উরূ এবং পদদ্বয় হইতে শূদ্র উৎপন্ন হইল।” ঋগ্বেদের পূর্বোক্ত সূক্তটীর ভাষা দেখিয়াই সামান্য সংস্কৃ- ভজ্ঞ ব্যক্তিগণ বুঝিতে পারিতেছেন, যে ইহা আধুনিক সংস্কৃত। ঋগ্বেদের অন্যান্য মন্ত্রের ভাষা আধুনিক সংস্কৃতের অনুযায়ী নহে। টীকাকারদিগের বিশেষ সাহায্য লইয়াও তাহার অর্থ বােধ অনেক সময় দুষ্কর। তাহার ব্যাকরণ বিভিন্ন, তাহার ছন্দ, বিভিন্ন এবং তাহার অধিকাংশ শব্দ বর্তমান সময়ে অপ্রচলিত। দৃষ্টান্ত স্বরূপ ঋগ্বেদের প্রথম মন্ত্রটা পাঠ করুন। “অগ্নি মীলে পুরােহিতং যজ্ঞস্য দেব মৃত্বিজং। হােরং রত্নধাতমং।” আধুনিক সংস্কৃত যাঁহারা জানেন তাহারা টীকাকারের সাহায্য ব্যতীত সহজে এই মন্ত্রের অর্থ গ্রহণ করিতে পারি- বেন না। ঋগ্বেদের অধিকাংশ মন্ত্রের ভাষা এইরূপ দুর্বোধ। কিন্তু পুরুষ সূক্ত হইতে যে অংশটুকু উদ্ধত করা গিয়াছে তাহা কেমন সুবােধ আধুনিক সংস্কৃতের নিয়মানুযায়ী। ইহা দেখিয়াই একজন অনুমান করিতে পারেন যে এই অংশটুকু অপরাপর মন্ত্রের অনেক পরে রচিত হইয়া থাকিবে। মােক্ষ- জাতিভেদ। মূলার প্রভৃতি প্রতীচ্য পণ্ডিতগণ, যাহারা ঋগ্বেদ মুদ্রিত করিয়াছেন এবং সকল বেদাঙ্গের আলােচনাতে নিরন্তর রত আছেন, তাহারাও প্রমাণ করিয়াছেন যে এই অংশটুকু অনেক পরে ঋগ্বেদের মধ্যে নিক্ষিপ্ত হইয়াছে। সংস্কৃতজ্ঞ পাঠক এই উদ্ধত অংশটুকুর মধ্যেই আরও একটী আভ্যন্তরীণ প্রমাণ প্রাপ্ত হইতেছেন। এই সূক্ত মধ্যেই উক্ত হইয়াছে, যে ঐ দেব যজ্ঞ হইতে ঋগ্বেদ ও সাম- বেদ প্রসূত হইল। এতদ্বারা কি প্রমাণ হইতেছে না যে, এই মন্ত্র যিনি রচনা করিয়াছিলেন, তিনি বেদ বিভাগ করার পরে অর্থাৎ বেদমন্ত্র সকল সংগৃহীত হইয়া ঋক, সাম, যজুঃ প্রভৃতি শ্রেণীতে বিভক্ত হওয়ার পরে এই অংশটুকু রচনা ও প্ৰক্ষেপ করিয়াছিলেন। অথচ ইহাও স্পষ্ট বােধ হয় যে মন্বত্রি প্রভৃতি স্মৃতি কর্তাদিগের অভ্যুদয়ের পূর্বে এবং মহাভার- তাদি বর্তমান আকারে লিখিত হইবার পূর্বে এই সূক্ত রচিত হইয়া থাকিবে। কারণ মৰাদি গ্রন্থে ও মহাভারতাদিতে এই সূক্তের উল্লেখ ও জাতি সৃষ্টির এই বিবরণের প্রতিধ্বনি দেখিতে পাওয়া যায়। হারীত স্মৃতিতে এক স্থানে আছে “বিধিনা পুরুষ সূক্তস্য গত্ব বিষ্ণুং সমর্জয়েৎ।” অর্থাৎ পুরুষ মুক্তোক্ত বিধি দ্বারা বিষ্ণুকে অর্চনা করিবে। মনু জাতিভেদের উৎপত্তি বিষয়ে এইরূপ বলিতেছেন ?

জাতিভেদ। লােকানা বিবৃদ্ধ্যর্থং মুখ বাহুরূপদত। ব্রাহ্মণং ক্ষত্রিয়ং বৈশ্যং শূদ্রঞ্চ নিরবর্ভয়ৎ। ঈশ্বর লােকের বুদ্ধির নিমিত্ত মুখ বাহু উরু ও পদদ্বয় হইতে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্রকে প্রকাশ করলেন। মহাভারতেও এই জাতি সৃষ্টির বিবরণের প্রতিধ্বনি প্রাপ্ত হওয়া যায়। যথা- পুরুরবা উবাচ। কুতশ্চিৎ ব্রাহ্মণণা জাগে, বর্ণাশ্যাপি কুতন্ত্রয়। কস্মাচ্চ ভবতি শ্রেষ্ঠ স্তন্মে ব্যাখ্যাত মহসি। মারিখশ্বাবা। ব্রাহ্মণ মুখতঃ সৃষ্টো ব্ৰহ্মণণা রাজসত্তম। বাহুভ্যাং ক্ষত্রিয়ঃ সৃষ্ট উরূভ্যাং বৈশ্য এবচ। বর্ণানাং পরিচৰ্যার্থং ত্রয়ানাং ভরতভ, বর্ণশ্চতুর্থঃ সস্তৃতঃ পভ্যাং শূদ্রো বিনির্মিতঃ।” মহাভারত, শান্তিপর্ব। ইহার অর্থ ;-পুরুরবা জিজ্ঞাসা করিলেন,—“ব্রাহ্মণ কোথা হইতে উৎপন্ন হইল, এবং অপর তিন বর্ণই বা কিরূপে সৃষ্ট হইল ? আর কেনই বা ব্রাহ্মণ সকলের শ্রেষ্ঠ হইলেন, তাহা অনুগ্ৰহ করিয়া বৰ্ণন করুন। মারিশ্যা বলি- লেন। হৈ রাজসত্তম! ব্রাহ্মণ ব্রহ্মের মুখ হইতে সৃষ্ট হইয়া- ছেন, বাহুদ্বয় হইতে ক্ষত্রিয় সৃষ্ট হইয়াছেন এবং উরুদ্বয় হইতে বৈশ্য সৃষ্ট হইয়াছেন; এবং হে ভরতভ পূর্বোক্ত তিন বর্ণের পরিচৰ্য্যার্থ চতুর্থ বর্ণ শূদ্র পদদ্বয় হইতে নির্মিত হইয়াছে।” এই সমুদয় বচন পূর্বোক্ত পুরুষ সূক্তের বর্ণাননু- সারে লিখিত হইয়াছে। কিন্তু পূর্বেই উক্ত হইয়াছে পুরুষ ;

জাতিভেদ। সূক্তের উক্ত অংশটুকু ঋগ্বেদের অপর সকল মাপেক্ষা আধুনিক। এখন আমরা সহজেই এই বিচার করিতে পারি যে জাতিভেদ যদি নিতান্ত আদিম কালেও থাকিত, যদি ইহা প্রাচীনতমৰ্য সমাজের একটা বিশেষ প্ৰথা হইত, তাহা হইলে প্রাচীন মন্ত্র সকলের মধ্যে নিশ্চয়ই ইহার কোন কোন প্রকার উল্লেখ থাকিত। ইহা কি সম্ভব হইতে । পারে যে, যে মন্ত্র সকলের মধ্যে প্রাচীনতম আর্যসমাজের এত প্রকার রীতি নীতির নিদর্শন প্রাপ্ত হওয়া যাইতেছে কি রূপে ঋত্বিকগণ যজ্ঞাদি করিতেন, কিরূপে জ্যোতির্বিদ- গণ নক্ষত্রাদি লক্ষ্য করিতেন, কিরূপে সময় জানিছেন, কিরূপে কৃষকগণ কৃষিকাৰ্য্য করিত ; কিরূপে কুলস্ত্রীগণ যব ধানাদি পেষণ করিতেন, কিরূপে বণিকগণ বাণিজ্যে প্রবৃত্ত হইত, সমাজের সকল আভ্যন্তরীণ কথাই প্রাপ্ত হওয়া যাইতেছে, ইহা কি সম্ভব যে সেই সকল মন্ত্রের মধ্যে জাতিভেদ প্রথার ন্যায় একটী প্রধান সামাজিক রীতির কোন আভাস থাকিবে না? এই জন্যই পণ্ডিতেরা অনুমান করেন যে বর্তমান জাতিভেদ প্রথা ভারতক্ষেত্রে আৰ্যগণের পদার্পণের পরে বহুকালে ক্রমে ক্রমে প্রবর্তিত হইয়াছে। আর অতি প্রাচীনতম কালে যে বর্ণভেদ ছিল না, এরূপ সংস্কারের প্রমাণও শাস্ত্রে প্রাপ্ত হওয়া যায়। মহাভারত শান্তিপর্বে আছে;

জাতিভেদ। ‘ন বিশেষােস্তি বর্ণানাং সর্বং ব্রাহ্ম মিদং জগৎ। ব্ৰহ্মণা পূৰ্বসৃষ্টংহি কৰ্ম্মভিঃ বর্ণং গতং।” অর্থঃ-বর্ণভেদ নাই, সমস্ত জগতে এক ব্রাহ্মণ মাত্র ব্ৰহ্ম কর্তৃক পূৰ্বে সৃষ্ট হইয়াছিলেন, তৎপরে কর্মের বিভি- তা বশতঃ বর্ণের বিভিন্ন প্রাপ্ত হইয়াছেন।” এতদ্বারা ইহাই প্রমাণ হইতেছে যে, বর্তমান জাতিভেদ- প্রথা কর্মের বিভিন্নতা বশতঃ অভূদিত হইয়াছে। সমগ্র ঋগ্‌বেদ খানি মনোেযােগ পূৰ্ব্বক পাঠ করিলেও ইহার প্রমাণ প্রাপ্ত হওয়া যায়। ঋগ্ বেদের প্রাচীন স্ত্ৰ সকল পাঠ করি- লেই সর্বত্র “আ” এবং “দ” এইদু ই শ্রেণীর লােকের উল্লেখ দেখিতে পাওয়া যায়। মন্ত্র-কর্তা ঋষিরা আগ্রহ সহ- কারে প্রার্থনা করিতেছেন “হে ইন্দ্র ! তােমার শুভ্রবর্ণ বন্ধুদি- গের সহায় হও, এবং কৃষ্ণ বর্ণ ত্বকে নিঃশেষ কর।” ইন্দ্রের প্রশংসাৰ্থ তাহাকে “সুশি” শােভন-নাসিকাযুক্ত বলিয়া সম্বােধন করা হইতেছে। এবং দস্যু বলিয়া যাহাদিগকে বর্ণন করা হইতেছে, তাহাদিগের প্রতি নাসিকা বিহীন” ছাগের ন্যায় নাসিকা-বিশিষ্ট, আম মাংসাশী প্রভৃতি ঘৃণা সূচক শব্দ সকল প্রয়ােগ করা হইতেছে। এই উক্তি পরম্পরাকে একত্র সমাবেশ করিয়া দেখিলে কি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় না সে, যে সময়ে এই সকল বেদ মন্ত্র রচিত হইয়াছিল, সে সময়ে ভারতসমাজে দুই শ্রেণীর মানব বিদ্য- মান ছিল, এক শ্রেণীর লোেক গৌর বর্ণ শােভন নাসিকাযুক্ত জাতিভেদ। ১১ ; ও প্রক্ক মাংসাশী, অপর শ্রেণী কৃষ্ণ বর্ণ, ছাগনাশা বিশিষ্ট ও আম মাংসাশী। প্রথম শ্রেণীর লােকগণ আপনাদিগকে আৰ্য বলিয়া পরিচয় দিতেছেন এবং অপর শ্রেণীকে দস্য বা দাস বলিয়া বৰ্ণন করিতেছেন। এবং ইহাও প্রতিপন্ন হইতেছে যে, এই উভয় শ্রেণীর মধ্যে সর্বদা বিবাদ বিস- স্বাদ চলিত ; কারণ তাহা যদি না হইবে তরে দস্যদিগের উচ্ছেদের জন্য ইন্দ্রাদি দেবতার নিকট স্তুতি করিবার অভি- প্রায় কি ? কেবল তাহা নহে ঋগবেদের মন্ত্র মধ্যে এরূপ প্রমাণও প্রাপ্ত হওয়া যায় যে, এই দাস বা দস্যদিগের কিয়- দংশ পৰ্বত পৃষ্ঠে বা বনভ্যন্তরে আশ্রয় লইয়া বাস করিত। এক স্থানে মন্ত্রকর্তা বলিতেছেন “উত দাসং কৌলিতরং বৃহতঃ পৰ্বতাদবি” মাসকে বৃহৎ পর্বতের উপর হইতে ফেলিয়া দেও। ইহাতে প্রমাণ হইতেছে যে দাসদিগের কেহ কেহ পৰ্বতাদিতে অবস্থিতি করিত। তবে আপনারা এখন মনােযােগ পূৰ্ব্বক আলােচনা করুন। এই দেখুন প্রাচীন ভারত সমাজে দুই দল লােকের * সংগ্রাম। ইহারা কখনই এক জাতীয় লােক নহেন, কারণ তাহাদের বর্ণ ও আকৃতিগত বিশেষ বৈষম্য দৃষ্ট হইতেছে। আপনারা এক্ষণে প্রশ্ন করিতে পারেন ইহারা তবে কে? বহুতর গবেষণার দ্বারা পণ্ডিতেরা নির্ণয় করিয়াছেন, এই গৌরবর্ণ জাতির পূর্ব পুরুষগণ মধ্য আসিয়ার কোন হিম- প্রধান বিভাগে বাস করিতেন এবং মানব ইতিবৃত্তের কোন ১২ জাতিভেদ। অনির্দিষ্ট কালে, কোন অনির্দিষ্ট কারণে আপনাদের আবাস ভূমি পরিহার করিয়া ভারতের সুবিখ্যাত ব্ৰহ্মর্ষি দেশে সপ্ত নদীর উপকূলে আসিয়া উপনিবেশ সংস্থাপন করি- য়াছিলেন। এই আৰ্য সমাগম কালের ঘটনা সকল মানব- স্মৃতির পূর্বতন অজ্ঞানান্ধকার মধ্যে বিলুপ্ত হইয়াছে। কেবল ঋগ্বেদের প্রাচীনতম মন্ত্র সকলে এখানে তাহার সেখানে আভাস মাত্র জানিতে পারা যাইতেছে। তবে যেমন বর্তমান জনসমাজ সকল পরিদর্শন করিয়া প্রাচীন সমাজ সকলের বিকাশ প্রক্রিয়া নির্ধারণ করিতে হয়, সেইরূপ আধুনিক জাতিদিগের ইতিহাস দেখিয়া প্রাচীন জাতি সকলের ইতি- হাস নিরূপণ করিতে হয়। আমরা আবার জগতের অপরাপর জাতির ইতিবৃত্তে যখন দেখি যে এক শ্রেণীর অপেক্ষাকৃত সভ্য লােক আসিয়া কোন এক অসভ্যতর লােকের মধ্যে উপনিবেশ স্থাপন করিতেছে তখন আমরা কি দেখিতে পাই? দেখিতে পাই যে নবাগত শত্রুগণ আসিবামাত্র আদিম অধিবাসীদিগের সহিত বিবােধ উপস্থিত হয়, এবং সেই সংগ্রামে পরাস্ত হইলে আদিম অধিবাসী- দিগের মধ্যে কিয়দংশ জেতাদিগের দাসত্ব স্বীকার করিয়া হাদিগের পরিচর্যায় নিযুক্ত হয় এবং অপরাংশ যাহারা আপনাদের স্বাধীনতাকে শান্তি অপেক্ষা মূল্যবান বলিয়া জ্ঞান করে, যাহারা সৰ্বস্বাপহারী প্ররল শর্কর দাসত্ব নিগড় কণ্ঠে ধারণ করা অপেক্ষা গিরি পৃষ্ঠে বা নির্জন বনে জাতিভেদ। গিয়া মৃগয়াজীবী হওয়া শ্রেষ্ঠ মনে করে, তাহারা গিরিশৃঙ্গ বা বিজন অরণ্যের ন্যায় দুরারােহ ও দুরাক্রম্য স্থান সকলে আশ্রয় লইয়া আপনাদের স্বাধীনতাকে রক্ষা করিতে থাকে। ইংলণ্ডের ইতিহাসের প্রতি দৃষ্টিপাত করুন, ইহার প্রমাণ প্রাপ্ত হইবেন। স্যাক্সনগণ যখন ইংলণ্ডে আসিয়া উপনিবেশ সংস্থাপন করিলেন তখন কি ঘটনা ঘটিল ? তখন ব্রিটনের আদিম অধিবাসিগণের সহিত তাহাদিগের যে বিরােধ ঘটনা হইয়াছিল তাহা সকলেই বিদিত আছেন। সেই সমরে পরাভূত হইয়া আদিম অধি- বাসিদিগের কিয়দংশ জেভাদিগের দাসত্ব-শৃঙ্খল গলে ধারণ করিতে এবং সামান্য ক্রীতদাসের ন্যায় জেদিগের গৃহে পরিচৰ্য্যা কাৰ্যে নিযুক্ত হইতে স্বীকৃত হইল; অব- শিষ্টাংশ ওয়েলস প্রদেশীয় ও স্কটলণ্ড প্রদেশীয় দূরারােহ পৰ্বতশৃঙ্গে আশ্রয় গ্রহণ করিল। প্রাচীন গ্রীস দেশেও ঠিক এই ব্যাপার ঘটিয়াছিল। ইতিহাসের পৃষ্ঠা উল্টাইয়া দেখ দেখিতে পাইবে যে, যখন লেসিডিমােনিয়াগণ সদলে স্পার্ট প্রদেশে গিয়া উপনিবেশ স্থাপন করিল, তখন আদিম অধিবাসিগণের কিয়দংশ দাসত্ব স্বীকার করিয়া হেলট বা দাসরূপে পরিণত হইল, অবশিষ্টাংশ মেসিনা প্রদেশের পৰ্বত ও বন শ্রেণীতে আশ্রয় গ্রহণ করিল। সভ্যতম আমে- রিকার প্রতি দৃষ্টিপাত কর; যেখানে তিন চারিশত বৎসরের অধিক হইবে না, শ্বেতকায় ইউরােপীয় দল উপনিবেশ ;

১৪ জাতিভেদ। সংস্থাপন করিয়াছেন। সেখানে আদিম অধিবাসিদিগর কি দশা হইয়াছে। তাহাদের মধ্যে যাহারা অধিক শান্তিপ্রিয় তাহারা জেতৃগণের দাসত্ব স্বীকার করিয়া জেতাদিগের গ্রাম ও জনপদ প্রভৃতিতে আশ্রয় প্রাপ্ত হইয়াছে ; আর যাহারা স্বাধীনতাকে প্রিয়জ্ঞান করিয়াছে তাহারা জন-সঞ্চার- রহিত বিজন অরণ্যে বা দুর্লঙ্ঘ্য আণ্ডিসগিরির নিভৃত উপ- ত্যকা ও অধিত্যকাতে আশ্রয় লইয়া আছে। ভারতবর্ষেও এই ব্যাপার ঘটিয়াছিল, যখন আৰ্যেরা সপ্তনদীর তীরবর্তী প্রদেশে পদার্পণ করিলেন, তখন এদেশের আদিম অধি- বাসিগণের সহিত তাহাদিগের ঘােরর সংগ্রাম উপস্থিত হইল। সেই সংগ্রামে তাহারা জয়লাভ করিলেন। এই জয়লাভের পর তাঁহাদের প্রভুত্ব ও রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হইল। আদিম অধিবাসীগণের কিয়দংশ তাহাদের দাসত্ব স্বীকার করিল অপরাংশ পৰ্বত ও অরণ্যাদিতে আশ্রয় লইয়া নিরন্তর তাহাদের উপরে উপদ্রব করিতে আরম্ভ করিল। যাহারা দাসত্ব স্বীকার করিল তাহারা দাস, ও যাহারা উপদ্রব কারী হইয়া দাঁড়াইল, তাহারা “দ” নামে পরিচিত হইল কিন্তু উভয়ে এক জাতির লােক। ইহারাই ভবিষ্যতের শূদ্র। আপনারা দেখিলেন কিরূপে শূদ্র জাতির সৃষ্টি হইল। প্রাচীনকালে সকল দেশেই এই প্রথা ছিল যে যাহারা যুদ্ধক্ষেত্রে বন্দী হইত, কিংবা যাহারা রণে, পরাজিত হইয়া জেদিগের শরণাপন্ন হইত, তাহারা ক্রীতদাস বলিয়া জাতিভেদ। পরিগণিত হইত। তাহার পর তাহাদিগকে পশু-প্রায় ব্যব- হার করিতে কাহারও মনে বাধিত না; শুপালের ন্যায় তাহাদিগকে দান বিক্রয়ের অধিকার প্রভুর থাকিত ; তাহাদের প্রাণের উপর কাহারও মায়া মমতা থাকিত না। বিশেষ বন্দীকৃত দাসগণ সভ্যতাংশে হীন হইলে ত কথাই ছিল না। তাহাদের প্রভুগণ তাহাদিগকে ঠিক পশুর প্রায় ব্যবহার করিত। এইরূপে প্রাচীন রােমনগরে বর্ষে বর্ষে অসভ্য জাতীয় যে সকল পুরুষ ও রমণী বন্দীকৃত হইয়া আনীত হইত, বােমের সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিগণ তাহাদিগকে বাজারে ক্রয় করিতেন এবং নিজ নিজ গৃহে অতি নীচ কায়িকশ্রমে ও পরিচৰ্য্যাতে নিযুক্ত করিতেন। কখনও কখনও সহরের লােককে কৌতুক দেখাইবার জন্য এই সকল হতভাগ্য দাদিগকে সিংহ ব্যাঘ্র প্রভৃতি হিংস্র শ্বাপদের মুখে ফেলিয়া দেওয়া হইত। ইহারা সেই ভয়ানক সমরে রক্তাক্ত হইয়া যখন নিহত হইত, তখন সমাগত নগরবাসি- গণ চারিদিক হইতে করতালি দিয়া আনন্দধ্বনি করিত। পরাজিত ব্যক্তিদিগের প্রতি প্রাচীন কালে এই ব্যবহার ছিল। ভারতবর্ষে ইহার ব্যতিক্রম হয় নাই। আদিম অধি- বাসিদিগের মধ্যে যাহারা আৰ্য জেতাগণের নিকট দাসত্ব স্বীকার করিল, তাহারা ত্বরায় সকল প্রকার সামাজিক অধি- কার হইতে বঞ্চিত হইয়া ক্রীতদাসের অবস্থাতে পরিণত জাতিভেদ। হইল। । আর তাহাদেরই স্বজাতীয়গণ যাহারা পর্বত প্রভৃতিতে আশ্রয় গ্রহণ করিল, তাহারা বিধিমতে আত- ভায়ী আৰ্য্যগণের উপরে উপদ্রব করিতে আরম্ভ করিল। ইহা ইতিহাসে নূতন কথা নয়। আমেরিকার ঔপনি- বেশিকদিগের উপর আদিম ইণ্ডিয়ানদিগের উপদ্রবের কথা একবার স্মরণ করুন।। এখন একবার কল্পনাতে তৎকালীন আৰ্য সমাজের অবস্থা চিত্রিত করিবার চেষ্টা করুন। একদিকে দেখুন একদল দীর্ঘাকৃতি, গৌরবর্ণ, উন্নত নাসিকা-বিশিষ্ট বিদেশী- লােক আসিয়া পঞ্চনদের উপকুলে উপনিবেশ স্থাপন পূর্বক বাহুবলে পরাজিত দেশকে স্বদেশ করিয়া আপনাদের গ্রাম জনপদ প্রভৃতি নিৰ্মাণ করিতেছেন ; কৃষি বাণিজ্যের আয়াে- জন করিতেছেন; অরণ্য সকল নিঃশেষ করিয়া মনােহর কৃষিক্ষেত্র সকল বিস্তার করিতেছেন; উপনিবেশের প্রান্ত বর্তী অরণ্যভূমি সকলে মৃগয়ার্থ পৰ্যটন করিতেছেন; এবং আপনাদের যজ্ঞাগ্নি প্রজ্জ্বলিত করিয়া তাহাতে হােম কাৰ্য সম্পন্ন করিতেছেন। আর একদিকে দেখুন পরাজিত আদিম অধিবাসিগণ পৰ্বতাদিতে আশ্রয় লইয়া নিরন্তর তাহাদের উপর উপদ্রব করিতেছে। আৰ্যেরা যাহাতে বিরক্ত হইতেন এই সকল অসভ্য দস্যগণ তাহাই করি- তেছে। আরো ইহাদিগকে আম মাংসভােজী বলিয়া ঘৃণা করেন সুতরাং ইহারা, দুষ্টামি করিয়া তাহাদের যজ্ঞ- ;

জাতিভেদ। ভূমিতে আম মাংস প্রভৃতি বর্ষণ করিতেছে ; হঠাৎ বনভ্যন্তর হইতে নির্গত হইয়া তাহাদের রমণীদিগকে পথে পাইলে ধরিয়া লইয়া যাইতেছে। আপনারা প্রাচীন যে সকল পৌরাণিক কথাতে ঋষিদিগের উপর রাক্ষসদিগের উপ- দ্রবের বিবরণ শুনিতে পান, তাহাতে এই সকল উপদ্রবেরই প্রমাণ প্রাপ্ত হওয়া যায়। যাহা হউক, যখন প্রতিনিয়ত দস্যগণের উপদ্রব চলিতে লাগিল এবং তাহাদের ভয়ে সুখ শান্তিতে শ্রমের অন্ন ভােগ করা আর্য্য- দিগের পক্ষে দুষ্কর হইয়া পড়িল, তখন আৰ্যগণের আত্ম- রক্ষার বিশেষ উপায় অবলম্বন করা আবশ্যক হইল। তাহারা আপনাদের মধ্য হইতে কতকগুলি সবলকায় সাহসী ও সমর-কুশল লােক বাছিয়া আপনাদের গ্রাম ও জনপদ সকলের প্রান্তভাগে স্থাপন করিলেন। ইহারা সশস্ত্র হইয়া দলে দলে স্বীয় স্বীয় অধিকার মধ্যে বাস করিতে লাগি- লেন। ইহারাই ক্রমে ক্ষত্র বলিয়া পরিগণিত হইলেন। ক্ষত্ৰ শব্দের অর্থ যাহারা ক্ষয় হইতে রক্ষা করে। এই অর্থের সহিত বর্ণিত ঘটনার চমৎকার সৌসাদৃশ্য লক্ষিত হইতেছে। এই ক্ষত্ৰগণ আদিতে অবিভক্ত আৰ্য সমাজের অঙ্গীভূত ছিলেন ; তখন ব্রাহ্মণ ক্ষত্র প্রভৃতি প্রভেদ ছিল ; কৰ্ম্মভেদ বশতঃ এই সকল প্রভেদ উৎপন্ন হইল। পূৰ্বে একমাত্র জাতি ছিল তাহা হইতে ক্ষত্র প্রভৃতি উৎপন্ন হইল ইহার একটী ওমাণ মহাভারত হইতে দেওয়া হইয়াছে।

১৮ জাতিভেদ। 1 আর একটা প্রমাণ দেওয়া যাইতেছে। বৃহদারণক্য উপ- নিষদে আছে— “ব্ৰহ্মৰা ইদমগ্ৰে আসীৎ একমেব, তাদেকং সৎ,নব্যভবৎ। তচ্ছে যে রূপং অত্যসৃজত ক্ষত্ৰং।” অর্থ—অগ্রে একমাত্র ব্রাহ্মণ জাতিই ছিল। ঐ জাতি একাকী বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হইল না—সুতরাং সেই শ্রেষ্ঠ বর্ণ (ব্রাহ্মণ) ক্ষকে সৃষ্টি করিলেন।” যাহারা বেদ বা স্মৃতি কিছুমাত্র পাঠ করিয়াছেন তাহারা জানেন যে ব্রহ্ম শব্দ ব্রাহ্মণ অর্থে ভূরি ভূরি স্থলে প্রয়ােগ হইয়াছে ; এখানে ব্ৰহ্ম শব্দের অর্থ ব্ৰাহ্মণ। উপনিষদ অতি প্রাচীন গ্রন্থ, এতদ্দেশে ইহা বেদ বলিয়া আদৃত সুতরাং দেখুন আমি জাতিভেদের উৎপত্তির যে বিবরণ দিতেছি তাহার প্রমাণ বেদের মধ্যেই প্রাপ্ত হওয়া যাইতেছে। দেখুন তবে কেমন করিয়া প্রাচীন আৰ্য-সমাজে শূদ্র ও ক্ষত্র দুইটী জাতির সূত্রপাত হইল। এখন প্রশ্ন হইতে পারে অবশিষ্ট আৰ্য্যগণ কি করিতে লাগিলেন। তাহাদের মধ্যে কিয়দংশ লােককে একটী গুরুতর কাৰ্যে নিযুক্ত হইতে হইল। সে কাৰ্যটী কি ? আপনারা স্মরণ রাখিবেন যে, যে সময়ে বেদের প্রাচীন মন্ত্র সকল রচিত হইয়াছিল, সে সময়ে লিখিবার প্রথা প্রচলিত হয় নাই ; সুতরাং সে সময়ে ঐ সকল মন্ত্র কণ্ঠস্থ করিয়া রাখিতে হইত। আৰ্যেরা যখন ভারতবর্ষে প্রবেশ করেন তাহার পূর্বাবধিই তাঁহাদের জাতিভেদ। মধ্যে সােম যজ্ঞ ও অগ্নির উপাসনা প্রভৃতি প্রচলিত ছিল। বর্তমান পারসীকদিগের প্রাচীন ধৰ্ম্ম-শাস্ত্রে এই গুলির উল্লেখ দৃষ্ট হয়। পণ্ডিতেরা প্রভূত গবেষণা দ্বারা স্থির করিয়াছেন যে বর্তমান হিন্দুগণের ও বর্তমান পারসীক- দিগের পূর্ব পুরুষগণ ভারতবর্ষে প্রবেশের পূর্বে একত্র বাস করিতেন। সুতরাং অগ্নির উপাসনাদি সেই সময়কার ধৰ্ম্মানুষ্ঠান হইবে। যাহা হউক অতি প্রাচীনতম কাল হইতে অগ্নির উপাসনাদি ও তদর্থ রচিত মন্ত্র সকল দৃষ্টিগােচর হয়। আৰ্যেরা যখন অত্যুন্নত গিরিমণ্ডিত, বহুনদ পরিধৌত, ও শস্যশালী-শ্যামল-ক্ষেত্ৰ-পূৰ্ণ ভারতবর্ষে প্রবেশ করিলেন, তখন এখনকার প্রকৃতির গম্ভীর ও মনােরম ভাবসকল সদর্শন করিয়া তাহাদের চিত্তে কবিত্ব শক্তির সমধিক আবির্ভাব হইতে লাগিল। যখন তাহারা ঊষাকালে নবােদিত সূর্যের তরল কিরণচ্ছটা দ্বারা অনুরঞ্জিত নীলাকাশ দেখিতে লাগি- লেন, যখন নিদাঘের প্রখর তাপের পর প্রাবৃটকালের নব মেঘনালার ঘন নীলিমা প্রত্যক্ষ করিলেন, যখন গিরিপৃষ্ঠ হইতে অবতীর্ণ বন্যা সমূহের কল্লোলিত জলরাশি নিরীক্ষণ করিতে লাগিলেন, তখন তাঁহাদের হৃদয় সাগরে অপূর্ব ভাবতরঙ্গ সকল উধিত হইতে লাগিল এবং মন্ত্রের পর মন্ত্র সকল রচিত হইতে লাগিল। ঋগ্বেদ এই সকল কবিত্ব রসপূর্ণ সঙ্গীত লহরীর সমষ্টি মাত্র। ইহার স্থানে স্থানে কবিত্ব কি সুন্দর! কি আশ্চৰ্য্য, প্রকৃতির সৌন্দৰ্য্য গ্রহণের শক্তি! কি ২০ জাতিভেদ। হৃদয় মুগ্ধকর মানব প্রাণের স্বাভাবিক ছবি! বেদ মন্ত্রকার কবিগণ বর্ষাকালের ভেকের ক্রো কা ধ্বনির মধ্যেও এক প্রকার অপূৰ্ব্ব মাধুরী অনুভব করিয়াছিলেন। এই সকল বেদমন্ত্রকে কবির কবিত্ব বল,বিহঙ্গমের স্বাধীন কণ্ঠের সঙ্গীত ধ্বনি বল, সৌন্দৰ্য্য, মােহিত-মানব-হৃদয়ের উচ্ছলিত ভাব- রাশি বল, ঠিক বলা হইল, কিন্তু শাস্ত্র বল, ধর্মোপদেশ বল, লৌকিক কি আধ্যাত্মিক বিধি ব্যবস্থা বল ঠিক বলা হইল না। যাহা হউক আৰ্যগণ পুণ্যারণ্য ভারতক্ষেত্রে যখন তাহাদের ধর্মানুষ্ঠানে প্রবৃত্ত হইলেন, তখন তাঁহাদের মন্ত্র সকলের সংখ্যা দিন দিন বৰ্ধিত হইতে লাগিল। সে সময়ে বর্ণমালার সৃষ্টি হয় নাই সুতরাং এক শ্রেণীর লােককে যত্ন সহকারে এই সকল মন্ত্র অভ্যাস করিয়া রাখিতে হইত। ইহারা বালক কাল হইতে ঐ সকল মন্ত্র কণ্ঠস্থ করিতেন ; যজ্ঞস্থলে ঐ সকল মন্ত্র উচ্চারণ করিয়া হােম কার্যের সহায়তা করিতেন। বর্তমান সময়ে আপনারা পল্লীগ্রামে অনেক ব্রাহ্মণ পণ্ডি- তের সন্তান দেখিয়া থাকিবেন, ইহারা বর্ণজ্ঞান-বিহীন, সংস্কৃত ভাষার বিন্দু বিসর্গ জানেন না; অথচ ইহারা দশকর্মান্বিত অর্থাৎ গৃহস্থের গৃহে যে সকল নিত্য নৈমিত্তিক ক্রিয়ার অনুষ্ঠান হয় তাহার সমুদায় প্রকরণ ইহারা কণ্ঠস্থ করিয়া রাখিয়াছেন। জিজ্ঞাসা করুন পিতৃশ্রাদ্ধ কিরূপে করিতে হয়? অমনি ইহারা শ্রাদ্ধের মন্ত্র, সকল অনর্গল বলিয়া যাইবেন। মধুবাতা ঋতায়তে মধুবালা ঋতায়তে প্রভৃতি মন্ত্র জাতিভেদ। সকল পাঠ করিতে আরম্ভ করিবেন। শুদ্ধ হউক অশুদ্ধ হউক যেরূপ শিখিয়াছেন অবিকল আবৃত্তি করিতে পারি- বেন। বর্তমান হিন্দু সমাজের ধর্মানুষ্ঠানের সাহায্যের জন্য যেমন এক শ্রেণীর দশকর্মান্বিত লােক দৃষ্ট হয়, প্রাচীন আৰ্য সমাজেও বেদ মন্ত্র সকলের রক্ষা ও শিক্ষার নিমিত্ত এক শ্রেণীর লােক নিযুক্ত হইয়াছিলেন। ইচ্ছারাই উত্তর- কালে ব্রাহ্মণ” বলিয়া প্রসিদ্ধ হইলেন। ব্রাহ্মণ শব্দের বুৎপত্তি-লব্ধ অর্থ যিনি ব্রহ্মকে জানেন বা ধারণ করেন। প্রাচীন সংস্কৃতে ব্ৰহ্ম শব্দের অনেক অর্থ—এক অর্থ ঈশ্বর, দ্বিতীয় অর্থ ব্ৰাহ্মণ জাতি তৃতীয় অর্থ বেদ মন্ত্র। এখানে ব্রহ্ম অর্থে বেদমন্ত্র। বেদমন্ত্র যাঁহারা ধারণ করেন তাহারা ব্রাহ্মণ। মনু কহিয়াছেন :- উত্তমাজোড়বাৎ জ্যৈষ্ঠাৎ ব্ৰহ্মণশ্চৈব ধারণাৎ সৰ্বত্যৈবাস্য সৰ্গশ্য ধৰ্ম্মত ব্রাহ্মণঃ প্রভুঃ । মনু ১ম অধ্যায়। “উমাঙ্গ হইতে উৎপন্ন হওয়াতে, জ্যেষ্ঠতা নিবন্ধন এবং বেদমন্ত্রের ধারণ নিবন্ধন ব্রাহ্মণ এই সমুদায় সৃষ্টির প্রভু।” এইরূপে যখন প্রাচীন আৰ্য সমাজের একাঙ্গ সশস্ত্র হইয়া সমাজ রক্ষা তে ব্ৰতী হইলেন এবং অপরাঙ্গ বেদ- মন্ত্র সকল শিক্ষা ও রক্ষা কার্যে নিযুক্ত হইলেন, তখন ২২ জাতিভেদ। সমাজের অপর সকল লােক—ইহাদেরই সংখ্যা সর্বাপেক্ষা বেশি ছিল—কৃষি বাণিজ্য প্রভৃতিতে নিযুক্ত হইয়া অর্থোৎ- পাদনে রত হইলেন। বেদে ইহারা “বিশ” শব্দে উক্ত হইয়াছেন। বর্তমান বাঙ্গালা ভাষাতে “সাধারণ প্রজা” এই শব্দদ্বয় ব্যবহার করিলে যেরূপ অর্থ বােধ হয় বেদমন্ত্র সকলে ‘বিশ” শব্দের সেই প্রকার অর্থ। বিশ অর্থাৎ প্রজাবর্গ। এই কারণে “বিশাস্পতিঃ” শব্দের অর্থ রাজা, যিনি প্ৰজাদিগের প্রভু। দেখুন তবে কেমন অপরিহার্য কারণে আদিম আৰ্য- সমাজ মধ্যে চারি প্রকার জাতির সূত্রপাত হইল। প্রথম যখন ভিন্ন ভিন্ন শ্রেণী ভিন্ন ভিন্ন কার্যের ভার গ্রহণ করিলেন, তখন জাতিভেদের বর্তমান চিহ্ন সকল কিছুই বিদ্যমান ছিল । অর্থাৎ বর্তমান সময়ে জাতিভেদের যে তিনটী প্রধান চিহ্ন দৃষ্ট হয় (১ম) নিম্ন জাতীয়দিগের অন্ন পান গ্রহণ নিষেধ, (২য়)ভিন্ন ভিন্ন বর্ণের মধ্যে বিবাহ সম্বন্ধ নিষেধ (৩য়)জাতির প্রভেদ অনুসারে ব্যবসায়ের বিভিন্নতা। আদিম আৰ্য- সমাজে এই সকল চিহ্নের কোনটাই লক্ষিত হয় না। এগুলি প্রবল দলাদলি ও বৈরভাবের ফলস্বরূপ, সুতরাং এগুলি সামাজিক নিয়মরূপে পরিগণিত হইতে অনেক শতাব্দী লাগিয়াছিল। বরং শাস্ত্রে এমন ভূরি ভূরি নিদর্শন প্রাপ্ত হওয়া যায়, যদ্বারা ইহা স্পষ্টই বুঝিতে পারা যায় যে বর্তমান সময়ে জাতি যেমন জন্মগত, গুণগত নয়, পূর্বে তাহা ছিল জাতিভেদ। , উৎকৃষ্ট বর্ণের হীন বর্ণত্ব প্রাপ্তি, এবং হীনবর্ণের উত্তম বর্ণত্ব প্রাপ্তি দেখিতে পাওয়া যায়। ইহার শাস্ত্রীয় প্রমাণ সকল পরে প্রদর্শন করিতেছি। এখন একটা কথা আপনারা স্মরণ রাখিবেন। বর্তমান সময়ে সভ্যসমাজে সাধারণ শিক্ষার যেমন রীতি দৃষ্ট হয় আদিম আৰ্যসমাজে তাহা কখনই ছিল না। অর্থাৎ এখন যেমন একটী বিদ্যালয়ে তুমি আমি দশজন আপনাপন অবস্থা ও শক্তি অনুসারে আমাদের সন্তানদিগকে প্রেরণ করিতে পারি, দশদিক হইতে দশ শত বালক বালিকা আসিয়া প্রতিদিন শিক্ষা করিতে পারে, প্রাচীন ভারত- সমাজে এরূপ বিদ্যালয় ছিল না। তখন বিদ্যার্থদিগকে গুরুকুলে বাস করিতে হইত, ও গুরুদিগের প্রতি কঠোর, শাসন ছিল, তাহারা ভূতি বা বেতন গ্রহণ করিতে পারি- তেন না, পরন্তু শিষ্যগণকে অন্ন দিয়া পুষিতে হইত। শিষ্য গণ গুরুগৃহে বাস ও গুরুগৃহের পরিচর্যায় নিযুক্ত হইয়া দিনাতিপাত করিতেন। বিশেষ তখন বর্তমান সময়ের মিত গ্রামে গ্রামে বিদ্যালয় ছিল না; মুদ্রা-যন্ত্র না থাকাতে অতিকষ্টে অনেক পরিশ্রম সহকারে বিদ্যার্থীদিগকে বিদ্যা- ভ্যাস করিতে হইত ; সুতরাং ব্যুৎপন্ন গুরুর সংখ্যা অধিক হইত না। যে সকল ব্যুৎপন্ন ব্যক্তি শাস্ত্র-বিশারদ বলিয়া প্রতিষ্ঠা-ভাজন হইতেন, বহুদূর হইতে শিষ্যগণ আকৃষ্ট হইয়া সেখানে আসিয়া বাস করিত। এইরূপ অবস্থায়

জাতিভেদ।
যাহার যে বিদ্যা ছিল তাহা শৈশব অবস্থা হইতেই নিজ
বংশীয় বালকদিগকে শিক্ষা দেওয়াই স্বাভাবিক। মানুষ
যে বিষয়ে প্রতিষ্ঠা বা গৌরব লাভ করে তাহা নিজ বংশে
রক্ষা করিবার ইচ্ছা স্বতঃই উদিত হয়। এই সকল কারণেই
দেখিতে পাই এ দেশে সকল প্রকার বিদ্যাই কৌলিক
হইয়া যায়। এখানে নৈয়ায়িকের ছেলে নৈয়ায়িক,
স্মার্ভের ছেলে স্মার্ড, দেওয়ানের ছেলে দেওয়ান, বৈদ্যের
ছেলে-বৈদ্য। যিনি যখন যে বিষয়ে কৃতিত্ব লাভ করিয়া-
ছেন তিনিই তাহা নিজ বংশধরদিগকে শিক্ষা দিয়া গিয়া-
ছেন।
আপনারা এই বিষয়টী স্মরণ রাখিলেই কিরূপে বর্তমান
জাতিভেদ প্রথার সৃষ্টি হইল, তাহা বুঝিতে পারিবেন।
যাহারা সশস্ত্র হইয়া দেশ রক্ষাতে নিযুক্ত হইলেন, তাহারা
যুদ্ধ বিদ্যাতে যে নিপুণতা লাভ করিলেন, তাহা তাহাদের
বংশ-পরস্পরাতে থাকিল—যাঁহারা বেদমন্ত্র সকল রক্ষা ও
শিক্ষা করিতে লাগিলেন সৈই কাৰ্য্য তাহাদেরও কৌলিক
কাৰ্য্য হইল—যাঁহারা কৃষি ও বাণিজ্যাদিতে প্রবৃত্ত হইলেন,
তাঁহারাও আপনাপন সন্তানদিগকে উক্ত বিষয়ে শিক্ষা দিতে
লাগিলেন। এখন কি পাঠকদিগকে দেখাইয়া দেওয়া
আবশ্যক যে, যে বিদ্যা এ প্রকার কৌলিক হয়, অর্থাৎ
যেটী বংশ-মৰ্য্যাদার একটী অঙ্গ-স্বরূপ হয়; লােকে সর্বদাই,
যত্নপুর্বক তাহাকে রক্ষা করিয়া থাকে, ও তদুপরি অপরকে

জাতিভেদ।
২৫
সহজে অধিকার স্থাপন করিতে দেয় না। আপনারা সমাজ
মধ্যে প্রতিদিন হাজার হাজার প্রকার প্রমাণ প্রাপ্ত হইতেছেন
সুতরাং এই কথার প্রমাণ দিবার জন্ধ আর ব্যগ্র হইবার
প্রয়ােজন নাই। যখন বেদ মন্ত্র রক্ষকগণ আপনাদের কর্মের
জন্য গৌরব ও স্পর্ধা করিতে লাগিলেন এবং দেশ রক্ষক
ক্ষত্রগণ স্বীয় কার্যের গৌরব ঘােষনা করিতে লাগিলেন,
তখন অল্পে অল্পে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও বিদ্বেষভাবের সৃষ্টি হইল।
এবং ক্রমে ক্রমে বর্তমান কঠিন নিয়ম সকল দেখা দিল।
এক্ষণে আপনারা প্রশ্ন করিতে পারেন যে এই বিদ্বোনল
প্রধুমিত হইতে অল্প দিন লাগে নাই। তখন এই দীর্ঘকালের
মধ্যে এমন সকল নিদর্শন নিশ্চিত পাওয়া উচিত, যদ্বারা
দেখিতে পাওয়া যায় যে ক্ষত্রিয় ব্রাহ্মণ হইতেছে,বা পরস্পরের
সহিত আহার বিহারাদি ও বিবাহাদি চলিতেছে? ইহার
উত্তরে আমি পাঠকদিগকে ভুরি ভুরি শাস্ত্রীয় প্রমাণ উদ্ধৃত
করিয়া দেখাইতেছি যে এরূপ ঘটনা সকল সর্বদাই ঘটিত।
প্রথমতঃ এ কথা ত পাঠকদিগের সকলেরই জানা আছে,
যে ক্ষত্রিয়-সন্তান বিশ্বামিত্র স্বীয় তপস্যাবলে ব্রাহ্মণত্ব লাভ
করিয়াছিলেন। এরূপ আরও বহুসংখ্যক দৃষ্টান্ত শাস্ত্রে
দেখিতে পাওয়া যায়। যথা-
“করুষাৎ মানবাৎ আসন করুষাঃ ক্ষত্ৰ-জাতয়ঃ।
উত্তরা পথ গােপ্তারাে ব্ৰহ্মণ্যা ধৰ্ম্ম বৎসলা।
শ্রীমদ্ভাগবত ৯ম স্কন্ধু ২য় অধ্যায়।

জাতিভেদ।
অর্থঃ-মনুর পূত্র করুষ হইতে কারুষ সম্প্রদায়ের সৃষ্টি
হয়, ইহারা ক্ষজাতীয়। ইহারা উত্তরাপথের রক্ষক, ব্ৰহ্মণ্য
এবং ধর্ম-বৎসল ছিলেন। পুনশ্চ,
“পৃষদ্রো হিংসয়িত্বাতু গুরাে গাং জনমেজয়।
শাপাৎ শূদ্রত্ব মাপন্নঃ॥”
হরিবংশ ৯ম অধ্যায়।
অর্থঃ-পৃষ রাজা গুরুর গােহত্যা করিয়া শাপৰশত
শূদ্রত্ব প্রাপ্ত হইয়াছিলেন।
অথবা হরিবংশে
“নাভাগারিষ্ট পুত্রৌ দৌ বৈশ্যে ব্রাহ্মণভাং গতো।”
অর্থঃ-নাভাগ ও অরিষ্ট পুত্র ইহারা দুইজনে, বৈশ্য
হইয়াও ব্রাহ্মণত্ব প্রাপ্ত হইয়াছে।
এইরূপ আরও অনেক বচন দ্বারা আমরা ইহারই প্রমাণ
পাই যে জাতিভেদ প্রথা বর্তমান আকারে পরিণত হইবার
পূৰ্ব্বে, এক বর্ণের অপর বর্ণ প্রাপ্তি প্রায় ঘটিত। পরস্পরের
বিবাহ সম্বন্ধ বা অন্নাদি ভােজনের ত কথাই নাই। এমন কি
মনুসংহিলকারের সময়ে, অনুলােম বিবাহের বিধি দৃষ্ট হয়।
“শূর্দৈব ভাৰ্যা শূদ্রস্য সাচ স্বাচ বিশঃস্মৃতে।
তেচ স্বাচৈব রাজ্ঞ তাশ্চচাগ্ৰজন্মনঃ।
মনু ৩য় অধ্যায়।
অর্থঃশূদ্র কেবল একমাত্র শূদ্রের কন্যাকে বিবাহ করিতে
পারিবে ; বৈশ্য শূদ্র ও বৈশ্যের কন্যাকে বিবাহ করিতে

জাতিভেদ। পারিবে।” ক্ষত্রিয় ক্ষত্রিয়ের কন্যা এবং বৈশ্য শূদ্রের কন্যা বিবাহ, করিতে পারিবে; এবং ব্রাহ্মণ চারি জাতিরই কন্যা বিবাহ করিবে।” উচ্চ জাতীয় পুরুষে নিম্ন জাতীয় কন্যাতে যেবিবাহ হইত, তাহাকে অনুলােম বিবাহ বলিত কিন্তু উচ্চ জাতীয় কন্যা ও নিম্ন জাতীয় পুরুষে যে বিবাহ হইত তাহা প্ৰতিলােম বিবাহ। প্রতিলােম বিবাহ নিতান্ত নিষিদ্ধ বলিয়া পরিকীর্তিত হইয়াছে, কিন্তু মনু অনুলােম বিবাহের বিধি দিয়া গিয়াছেন। বিভিন্ন বর্ণের মধ্যে বিবা- হের যেমন প্রমাণ পাঠকগণ পাইলেন সেই রূপ পরস্পরের অন্ন গ্রহণেরও প্রমাণ প্রাপ্ত হওয়া যায়। এই প্রমাণের জন্য বড় অধিক দূরে যাইতে হইবে না। যে পরাশর স্মৃতি কলির ধর্মশাস্ত্র বলিয়া উক্ত হইয়াছে তাহাতেই আছে : “ক্ষত্রিয়ােবাপি বৈশ্রোবা ক্রিয়াবন্তৌ শুচিব্রতো। তুগৃহে দ্বিজৈর্ভোজ্যং হব্যকব্যে নিত্যশঃ।” অর্থ-যে সকল ক্ষত্রিয় ও বৈশ্য ক্রিয়াবান ও শুচিত- ধারী তাহাদের গৃহে ব্রাহ্মণেরা সর্বদা হব্যে কব্যে ভােজন করিবে। যাহা হউক জাতিভেদের কঠোর নিয়ম সকল সৃষ্টি হইতে অনেকদিন লাগিয়াছিল । নিতান্ত বৈরভাব ও দ্বেষাঘেষি না থাকিলে পরস্পর আহার বিহার ও বিবাহ সম্বন্ধ রহিত হয় না। বর্তমান সমাজে আমরা কি দেখি? দুই গৃহস্থের মধ্যে যখন মনান্তর উপস্থিত হয়, যখন কোন কারণে

২৮
জাতিভেদ।
প্রবল শক্রতা হয়, তখন তাহারা পরস্পরের সহিত আবার
বিহার করে না। পরস্পরের আতিথ্য গ্রহণ একটা বিশেষ
সদ্ভাবের কর্ম। যেখানে সদ্ভাব নাই, প্রণয় নাই, বন্ধুত্ব
নাই সেখানে মানুষ পরস্পরের আতিথ্য গ্রহণ করে না।
আপনারা এখনও সৰ্ব্বদা দেখিতে পান দুই খানি গ্রামের
মধ্যে যদি বিবােধ ঘটনা হয় তাহা হইলে তাহাদের মধ্যে
আর বিবাহ সম্বন্ধ থাকে না। প্রাচীন কালে সেইরূপ
কারণেই বিভিন্ন জাতিদের মধ্যে আহার বিহার ও আদান
প্রদান বন্ধ হইয়াছিল। এক্ষণে আপনারা জিজ্ঞাসা
করিতে পারেন, যে যদি বিবাদ বিসম্বাদ ঘটনা হইয়াই
আহার বিহারাদি সম্বন্ধ বন্ধ হইয়া থাকিবে, তাহা হইলে
ত প্রাচীন গ্রন্থাদিতে তাহার কোন বিবরণ থাকা উচিত ?
এরূপ বিবরণ ভূরি ভূরি আছে। আমি তাহার কয়েকটা
মাত্র প্রদর্শন করিতেছি। (১ম) প্রথমতঃ বিশ্বামিত্র ও
বশিষ্টের মধ্যে যে বিবাদ ঘটনা হইয়াছিল তাহা আপনারা
জানেন। বিশ্বামিত্র ক্ষত্রিয় হইয়াও ব্রাহ্মণত্ব লাভ করিবার
জন্য তপস্যা করিয়াছিলেন এবং সেই জন্য তিনি বশিষ্ট
প্রভৃতি ঋষির ঈৰ্যা ভাজন হইয়াছিলেন। এখানে দেখি-
তেছেন একজন ক্ষত্রিয় সন্তান ব্রাহ্মণের অধিকার লাভ করি-
বার জন্য প্রয়াস পাইতেছেন। আবার পরশুরামের আখ্যায়ি
কাতে দেখুন একজন ব্রাহ্মণ সন্তান একবিংশতিবার ক্ষত্রিয়
রক্তে পিতার তর্পণ করিতেছেন। বেণ, নহুষ, নিমি প্রভৃতির

জাতিভেদ। উপাখ্যানেও ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়দলের মধ্যে ঘােরতর বিবাদের বিবরণ প্রাপ্ত হওয়া যায়। এই সকল উপাখ্যানের ন্যায় আরও অনেক উপাখ্যান আছে। পুরাকালে ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয়- দলের মধ্যে যে বিবাদ ঘটনা হইয়াছিল তাহার অন্য প্রকার প্রমাণও প্রাপ্ত হওয়া যায়। বৃহদারণ্যক উপনিষদ হইতে জাতির উৎপত্তি বিষয়ে যে বচন উদ্ধৃত করা হইয়াছে, তাহার পরবর্তী অংশেতে দেখা যায় যে পূর্বোক্ত বচন কর্তা ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয় উভয়েরই প্রাধান্য স্বীকার করিয়া উভয়ের মধ্যে সন্ধি স্থাপন করিবার চেষ্টা করিতেছেন। যথা “তস্মাৎ ক্ষাৎ পরংনাস্তি তস্মাৎ ব্রাহ্মণঃ ক্ষত্রিয় মধস্তা দুপাস্তে রাজসূয়ে। ক্ষত্র এব দ্যশে দধাতি। শৈষ। ক্ষত্রস্ত যােনি য তস্মাৎ যদ্যপি রাজা পরমতাং গচ্ছতি ব্ৰহ্মৈবান্ততঃ উপনিয়তি হাং যােনিং। ষ এনং হিনস্তি স্বাংসযােনি মৃচ্ছতি স পাপীয়ান ভবতি।” অর্থঃ—অতএব ক্ষত্রিয় অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ নাই; এই কারণে রাজসূয় যজ্ঞে ব্রাহ্মণদিগকে ক্ষত্রিয়ের অধীন হইয়া উপা- সনা করিতে হয়। সে যশ ক্ষত্রিয়ই ধারণ করে। কিন্তু ব্রাহ্মণই ক্ষত্রিয়ের উৎপত্তি স্থান সুতরাং ক্ষত্রিয় যদি পরম উন্নতিও প্রাপ্ত হয়, তাহা হইলে স্বীয় উৎপত্তি স্থান ব্রাহ্মণ- কেই আশ্রয় করিবে। যদি কোন ক্ষত্রিয় ব্রাহ্মণকে ক্লেশ দেয় সে আপনার উৎপত্তি স্থানকেই নষ্ট করে, সে পাপী

জাতিভেদ।
ইহার ফলিতাৰ্থ,-“তােমরা দুই দলে বিবাদ করিও
, এক দিক দিয়া দেখিলে ক্ষত্রিয়গণ শ্রেষ্ঠ অপর দিক
দিয়া দেখিলে ব্রাহ্মণই শ্রেষ্ঠ, দুই দলেরই শ্রেষ্ঠতার কারণ
আছে।” এইরূপ অনুমান করা যায় যে, বহু শতাব্দী ধরিয়া
ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়গণের মধ্যে এইরূপ বিবাদ ও সংগ্রাম চলিয়া
অবশেষে উভয় পক্ষের সম্মতি-অনুসারে এই স্থির হয় যে
ক্ষত্রিয়গণ দেশ-রক্ষা ও রা স্য শাসন কাৰ্য্য করিবেন এবং
ব্রাহ্মণগণ যজন যাজন অধ্যয়ন অধ্যাপন প্রভৃতি কাৰ্য
সম্পন্ন করিবেন। ইহঁারা পরস্পর পরস্পরের অধিকার লাভ
করিবার জন্য প্রয়াস পাইবেন না। এই বিবাদ ও কলহের
সময়েই ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয় প্রভৃতি জাতির মধ্যে ক্রমে আহার
বিহারানি বন্ধ হইয়া যায়।
এইরূপ সন্ধি স্থাপন হইয়া প্রাচীন আৰ্যসমাজে শান্তি
প্রতিষ্ঠিত হইল বটে, কিন্তু ব্রাক্ষণদিগের প্রতাপ ও পরাক্রম
দিন দিন বৃদ্ধি পাইতে লালি। যে আধ্যাত্মিক শক্তিতে
সাজ 'দা শাণিত হয় সেই শক্তি তাহাদের হস্তে
থাকিল। ক্ষত্রিয় রাজা হইলেন কিন্তু মন্ত্রী ব্রাহ্মণ , ক্ষত্রিয়
বিচারক হইলেন কিন্তু ব্রাহ্মণ প্ৰাড় বিবাক হইলেন ;
ক্ষত্রি, রক্ষক হইলেন কিন্তু ব্রাহ্মণ তার গুরু হইলেন
ক্ষত্রিয় বাহু, ব্রাহ্মণ মস্তিষ্ক। বাহ অপেক্ষা মস্তিষ্ক শ্রেষ্ঠ
সুতরাং ব্রাহ্মণগণের ক্ষমতা দিন দিন নিরঙ্কুশ হইয়া উঠিতে
লাগিল।
;

জাতিভেদ। ' ৩১ . এইরূপে.প্রাচীন আৰ্য সমাজে ব্ৰাহ্মণদিগের শক্তি ও প্রতাপ যত নিরঙ্কুশ হইতে লাগিল ততই অপরাপর জাতি হীন দশা প্রাপ্ত হইতে লাগিল। এমন কি রাজগণও নাম মাত্র রাজদণ্ড ধারণ করিতে লাগিলেন, ব্রাহ্মণগণই তাহাদের পরিচালক হইলেন। বৈশ্যগণ আরও হীন দশা প্রাপ্ত হইতে লাগিলেন। শূদ্রদিগের ত কথাই নাই। তাহারা সকল প্রকার সামাজিক শক্তি ও অধিকার হইতে বঞ্চিত হইয়া নিতান্ত নিকৃষ্ট ও পশু প্রায় হইয়া জীবন ধারণ করিতে লাগিল। ইহাদের সামাজিক দুর্গতির সীমা পরিসীমা রহিল না। এই সামাজিক দুর্গতির পরিচয় কিরূপে দিব ? মনু রচিত সংহিতা যে সময়ে সংকলিত হইয়াছিল, সেই সময়কে জাতিভেদের প্রকোপের পরাকাষ্ঠাকাল বলিয়া গণ্য করা যাইতে পারে। অতএব সেই মনুসংহিতা হইতে কতকগুলি বচন উদ্ধত করিতেছি—তাহা দেখিলেই পাঠক- গণ বুঝিতে পারিবেন প্রাচীন আৰ্যসমাজে হতভাগ্য শূদ্র জাতির কতদূর দুর্গতি হইয়াছিল। মনু বলিয়াছেন :- “যেন কেন দিঙ্গেন হিংস্যাঞ্চেচ্ছে ৪ মন্ত্যজঃ। ছেত্তব্যং ভদে বাস্য তন্মনাে রনুশাসনং। অর্থঃ-অন্ত্যজ অর্থাৎ শূদ্র যে কোন অঙ্গের দ্বারা শ্রেষ্ঠ জাতীয় কোন ব্যক্তিকে প্রহার করিবে তাহার সেই সেই অঙ্গ ছেদন করিতে হইবে, ইহাই মনুর বিধি।

৩২
জাতিভেদ।
পুনশ্চ
“পাণিমুদ্যম দণ্ডংবা পানিচ্ছেন মহতি।
পাদেন প্রহর কোপাং পাদচ্ছেদন মহতি।”
মনু ৮ম অধ্যায়।
অর্থঃশূদ্র শ্রেষ্ঠজাতীয় ব্যক্তিকে প্রহার করিবার জন্য
যদি হস্ত কিম্বা দণ্ড উত্তোলন করে তাহা হইলে শূদ্রের
হস্তচ্ছেদন করিয়া দিতে হইবে; যদি কোপ বশতঃ পদ
দ্বারা প্রহার করে তাহা হইলে পদ ছেদন করিতে হইবে।”
জপিচ
সহাসন মভিপ্রেরুৎকৃষ্টস্যাপকৃষ্টজঃ
কট্যাং কৃতাঙ্কো নিৰ্বাস্যঃ-
(অর্থ :—“শূদ্র যদি শ্ৰেজাতির সহিত একাসনে বসিতে
অভিলাষী হয়—তাহা হইলে তাহার কটিদেশে লােহা
পােড়াইয়া দাগ দিয়া দেশ হইতে নির্বাসিত করিবে।”
কি ভয়ানক! উচ্চ জাতির সহিত একাসনে বসা দূরে
থাকুক, যদি একাসনে বসিতে অভিলাষীও হয় তাহা
হইলেও তাহাকে নির্বাসিত করিতে হইবে।
উচ্চ জাতির সহিত সমকক্ষতা করিতে গেলে শূদ্রের
প্রতি কি গুরুতর সাজা তাহা ত দেখিলেন; এখন একবার
দেখুন, অপর সকল সামাজিক অধিকার সম্বন্ধে শূদ্রদিগের
কি দুরাবস্থা করা হইয়াছিল। যে সকল সামাজিক অধি
কারকে মানুষ প্রিয় জ্ঞান করে, এবং যে সকল অধিকারের

জাতিভেদ
৩৩
;
অভাবে মানব জীবন ভার ও বিড়ম্বনা বরূপ হইয়া পড়ে ;
তন্মধ্যে নিজের কার্য সম্বন্ধে স্বাধীনতা একটা সর্বশ্রেষ্ঠ
অধিকার। অর্থাৎ যে কাৰ্য্য আমার ভাল লাগিবে, যাহাতে
আমার হৃদয়ের অনুরাগ হইবে, যাহাতে আমার কৃতকাৰ্য্য
হইবার আশা থাকিবে, আমি সেই কাৰ্য্য করিব; আমি
আমার শ্রমের অন্ন ঘরে আনিব ; আমার দুঃখের অন্ন
সুখের করিয়া স্বীয় স্ত্রী-পুত্র পরিবারগণের সহিত আহার
করিব। হায়! অতি দীন দরিদ্র ব্যক্তিও এ আকাঙ্খ
করিয়া থাকে,
আমাদের সকলের ত মানবের দেহ,
মানবের প্রাণ! আমরা হৃদয় দেখিয়া বিচার করিতে পারি।
মানবের প্রাণ নিরুপদ্রবে নিজ ইচ্ছা ও রুচি অনুসারে
নিজের শ্রমশক্তিকে চালনা করিয়া সংসারে সুখী হইতে চায়
কি না? কিন্তু একবার প্রাচীন আৰ্য-সমাজের প্রতি দৃষ্টি-
পাত করুন, তথায় কি দেখিবেন ?
মনু বলিতেছেনঃ-
‘শূদ্ৰন্তু কায়েন্দাং ক্রীতমক্রীতমেববা।
দাস্যায়ৈবহি সৃষ্টোসৌ ব্রাহ্মণস্য স্বয়ম্ভুবা।”
মনুসংহিতা ৮ম অধ্যায়।
অর্থ—শূদ্র ক্রীতই হউক আর অক্রীতই হউক ব্রাহ্মণ
তাহাকে ধরিয়া দাসত্বে নিযুক্ত করিবেন; কারণ ব্রাহ্মণের
দাসত্ব করিবার জন্যই ঈশ্বর তাহার সৃষ্টি করিয়াছেন।”
;

• জাতিভেদ। পূনশ্চ। “নমিনা নিসৃষ্টোপি শূদ্রো দাস্যা দিমুচ্যতে। নিসর্গজংহি তত্তস্য কস্তম্মা উদপােহতি। মনু ৮ম অধ্যায়। অর্থঃ—“স্বীয় প্রভু যদি শূদ্রকে দাসত্ব হইতে মুক্তি দেন তাহা হইলেও শূদ্র দাসত্ব হইতে মুক্ত হইতে পারে না ; কারণ দাসত্ব তাহার স্বভাবজাত কে তাহা লম্বন করিতে পারে ? একবার আপন আপন হৃদয় দিয়া বিচার করিয়া দেখুন। আমি চাই এক কাৰ্য্য করিতে আর একজন যদি বলপূর্বক আমাকে অন্যবিধ কাৰ্যে প্রবৃত্ত করে, তাহা হইলে মানবাত্মার পক্ষে সে অবস্থা কিরূপ যন্ত্রণাদায়ক? ইচ্ছামত কাৰ্য, রুচি অনুসারে শ্রম, ও শ্রান্ত হইলে বিশ্রাম এ অধিকার- টুকুও যদি মানবের না থাকে তাহা হইলে জীবন কিরূপ ভারস্বরূপ হয় ? কিন্তু প্রাচীন আৰ্য-সমাজের ব্রাহ্মণগণ শূদ্র- দিগকে এই ঘাের দাসত্বে পরিণত করিয়াও সন্তুষ্ট হন নাই। ধনােপার্জনের অধিকার মানবজীবনের আর একটা প্রিয় অধিকার তাহা হইতেও শূদ্রদিগকে বঞ্চিত করিয়াছিলেন, দেখুন মনু কি বলেনঃ- “বিশ্রং ব্রাহ্মণ শূদ্রাব্যোপাদান মাচরেৎ। নহিতস্তাত্তি কিঞ্চি: স্বভর্তৃহাৰ্য্য-ধনােহিসঃ ॥” মনু ৮ম অধ্যায়।

জাতিভেদ। অর্থঃ—“শূদ্র যদি কোন দ্রব্য উপার্জন করে ব্রাহ্মণ অসঙ্কোচে সমুদায় কাড়িয়া লইবেন, কারণ শূদ্রের ধনে অধিকার নাই; সে যে কিছু উপার্জন করিবে সে সমুদায় তাহার প্রভুর।”। পুনশ্চ শক্তেনাপিহি শূদ্রেণ ন কাৰ্যো ধন সঞ্চয়ঃ। শূদ্রোহি ধন মাসাদ্য ব্রাহ্মণনেব বাধতে।” অর্থ—শূদ্র যদি কৃতীও হয় তথাপি সে ধন-সঞ্চয় করিবে । কারণ শূদ্রের হস্তে ধন-সঞ্চয় হইলে ব্রাহ্মণদিগকে রুশ পাইতে হইবে।” পাঠক আর কি নিতে চান ? শূদ্র ধনশালী হইলে পাছে ব্রাহ্মণদিগের প্রতাপ খর্ব হয়, পাছে তাহাদের নির- স্কুশ প্রভুত্বের হাঁনি হয় এই জন্য শূদ্র কৃতী হইলেও ধনসঞ্চয় করিবে না। শূদ্র ইচ্ছামত শ্ৰম করিতে পারিবে না; ইচ্ছা মত বিশ্রাম করিতে পারিবে না; স্বাধীনভাবে বিচরণ করিতে পারিবে না; শরীরের রক্ত জল করিয়া যে বস্তু উপা- ৰ্জন করিবে তাহাতে তার অধিকার থাকিবে না; পাছে ব্রাহ্মণদিগের প্রভুত্বের হানি হয় এজন্য ধনসঞ্চয় করিবে না। কি ভয়ানক বিধি ? অপেক্ষা করুন আরও আছে। প্রাচীন শাস্ত্রকারগণ যদি এখানেও ক্ষান্ত হইতেন, তাহা হইলেও এক প্রকার হইত। ধর্মে মানব মাত্রেরই অধিকার ; যদি সেই ধৰ্ম্মে শূদ্রদিগের অধিকার দিতেন তাহা হইলেও বলি- ডাম, যে না প্রাচীন আর্য-সমাজের ধর্মশাস্ত্রকারগণ মানবকে ;

জাতিভেদ। ; নিতান্ত পণ্ডপ্রায় ব্যবহার করিতে বুলেন নাই, কিন্তু বলিতে গভীর ক্ষোভে মন আন্দোলিত হইয়া উঠিতেছে, দুঃখে হৃদয় পূর্ণ হইতেছে, লজ্জায় মস্তক অবনত হইতেছে, শূদ্রকে সমু- দায় সামাজিক অধিকার হইতে বঞ্চিত করিয়ও হারা সন্তুষ্ট হইলেন না; কিন্তু তাহাদের পশুত্বকে পরিসমাপ্ত করি- বার জন্য, তাহাদিগকে সম্পূর্ণরূপে মনুষ্যত্ব হইতে বঞ্চিত করিবার জন্য, তাহাদিগকে ধর্মের অধিকার হইতেও বঞ্চিত করিলেন। শুনুন মনু কি বলিতেছেন ;-) “ন শূদ্রে পাতককিঞ্চিৎ নচ সংজ্ঞার মহতি ন ঢাধিকারাে ধৰ্ম্মেস্তি ন ধৰ্মাৎ প্রতিষেধনং ॥” মনু ১০ম অধ্যায়। অর্থ-শূদ্র যে কোন দুস্কাৰ্য্য করুক না কেন, তাহার পাতক নাই ; শূদ্রের কোন প্রকার ধর্ম-সংস্কার নাই; তাহার ধৰ্ম্মে অধিকার নাই, সুতরাং ধর্ম হইতে নিষেধও নাই।” কি সর্বনাশ! আমরা যাহাকে দুষ্কর্ম বলি, পশুগণ তাহা করে অথচ তাহাদের পােপ নাই; কারণ তাহারা ধৰ্ম্ম- নিয়মের অধীন নয়, সেইরূপ শূদ্র যদি গুরুতর দুফাৰ্য্য করে। তাহার পাতক নাই, কারণ তাহার ধৰ্ম্মে অধিকার নাই।” হা ভগবান! মানুষ হইয়া কি মানুষকে এতদূর পীড়ন করিতে পারে? তুমি যে ভ্রান্ত যুবক শাস্ত্র শাস্ত্র করিয়া পাগল, প্রতি পদে শাস্ত্রের দোহাই দেও, তুমি দেখ তােমার শাস্ত্রে কতদূর আছে। এই কি শাস্ত্র ? এই কি ধৰ্ম্ম ? এই

জাতিভেদ।
৭
যদি ধৰ্ম হয় তবে অধর্ম কি? মানবকে যাহাতে পণ্ড করি-
বার আদেশ দেয় সেই কি শা? যদি কোথাও নরককুণ্ড
থাকে,তবে শাস্ত্রের এই অংশকে সেই নরককুণ্ডে নিক্ষেপ কর।
শাস্ত্রের সেই অংশকে পােড়াইয়া ভস্ম কর, এবং সেই ভস্ম
কৰ্মনাশার জলে নিক্ষেপ কর। আমি হৃদয়ের সহিত ঈশ্বরকে
অগণ্য ধন্যবাদ করি যে ব্রাহ্মণদিগের সেই প্রতাপের দিন
খর্ব হইয়াছে ; শূদ্রগণ মাথা তুলিবার অবসর পাইয়াছে।
হিন্দুশাস্ত্রকারগণের সেই প্রতাপ প্রবল থাকিলে কি
রক্ষা ছিল ? তাহা হইলে বাঙ্গালি-সমাজের বর্তমান
দলপতিগণ কোথায় থাকিতেন। আজ অপরাহ্নে যে
আমরা কৃষ্ণদাস পাল মহাশয়ের মৃতদেহ চিতানলে সমর্পণ
করিয়া আসিলাম, তাহা হইলে এই কৃষ্ণদাস পাল কোথা
থাকিতেন। আজ কৃষ্ণদাস পালের মৃত্যুর দিন, আজ ৰীয়
যুবক সরলভাবে সত্যপ্রিয় লােকের ন্যায় বল দেখি, জাতি-
ভেদের প্রকোপ শিথিল হইয়া তােমার দেশের কল্যাণ হই
আছে কি অকল্যাণ হইয়াছে। তুমি কি এই সকল রহিত
করিয়া আবার সেই প্রাচীন বিধি-ব্যবস্থা প্রচলিত করিতে
চাও? তােমার কি তাহা করিবার শক্তি আছে? তুমি কি
কালের এই প্রবল গতিকে নিয়মিত করিতে পার? তুমি কি
এই পরিবর্তন শ্রোতকে ফিরাইয়া লইয়া যাইতে পার? যদি
তুমি ইহা পার তবে তুমি কনিষ্ঠ-অঙ্গুলির উপরে গােনও
ধারণ করিতে পার। নাই, নাই, সাধ্য নাই, তােমাদের

জাতিভেদ ।
একজনের কেন লক্ষ জনেরও সাধ্য নাই, যে সভ্য সমাজের
বিকাশশান্মুখ শক্তি সকলকে বাধাদিতে পার ? দেখ না কি
চির পরাধীন, চির বন্দীকৃত জাতিসকলের মুক্তির জন্য
বিধাতার বিধি প্রচার হইয়াছে, কার সাধ্য এই বিধির প্রতি
কূলতা করে, দেখ জাতিভেদের আসন্ন কাল উপস্থিত।
বলিতে গেলে এখন জাতিভেদ প্রথাকে আক্রমণ করা আর
মড়ার উপর খাড়ার ঘা মারা দুই সমান। বিশ্বাস কর,
জাতিভেদের মৃত্যুদিন ঘনাইয়া আসিতেছে ; এমন ঔষধ
মাই যাহাতে ইহার জীবনকে আর রক্ষা করিতে পারে।
“আর যদিই তােমরা ইহাকে বাঁচাইয়া রাখিতে চাও জিজ্ঞাসা
করি ঐ সকল প্রাচীন ব্যবস্থা পুনর্জীবিত করিতে চাও
কি না ?আমি নিশ্চয় জানি তােমরা তাহা চাও না।
কারণ শাস্ত্রে কোন কালে কবে শুনিয়াছ যে নিম্নজাতীয় ব্যক্তি
উচ্চজাতীয়দিগকে ধর্মোপদেশ দেয়? মনু বলিয়াছেন
নিম্নজাতীয় ব্যক্তি যদি ব্রাহ্মণদিগকে ধর্মোপদেশ দিবার
চেষ্টা করে তাহা হইলে ঘৃত অগ্নিবর্ণ করিয়া তাহার গলদেশে
কেলিয়া দিতে হইবে। কিন্তু দেখ নিকৃষ্ট জাতীয় ব্যক্তি-
গণ এখন ব্রাহ্মণদিগের ধর্মোপদেষ্টা হইয়াছে। কত কত
ব্রাহ্মণ যুবক ইহাদিগের নিকট ধর্মোপদেশ গ্রহণ করিয়া
আপনাদিগকে কৃতার্থ মনে করিতেছেন। এই জন্যই বলি-
তে ছ জাতিভেদ আর নাই। তােমরা তাহা মান না।
জাতিভেদ প্রথার বর্তমান দুর্বলতা কিরূপে উপস্থিত

জাতিভেদ।
•
তাহাও কিঞ্চিৎ বলা আবশ্যক। মনুস্মৃতি হইতে যে
সকল বচন উদ্ধৃত করা হইল তাহা শুনিয়া সকলেই অনুভব
করিতেছেন যে ইহার অপেক্ষা সামাজিক অত্যাচার হইতে
পারে না। • ইতিহাসে মানব-সমাজের গতিবিধি যাহারা লক্ষ্য
করিয়াছেন, তাহারা জানেন যে সামাজিক অত্যাচার যখন
একেবারে অসহ্য হইয়া পড়ে ; সেই দুর্বহ ভারে নরনারীর
প্রাণ যখন পিষিয়া যাইতেথাকে, তখন সেই দারূণ সামাজিক
ব্যাধির মধ্য হইতেই তাহার ঔষধ দেখা দেয়। অবশেষে
পদদলিত মানব-প্রকৃতির প্রতিহিংসা প্রবৃত্তি প্রবল হইয়া
উঠে ; ঘােরর সামাজিক বিপ্লব উপস্থিত হয়। এই সকল
সময়ে সচরাচর দেখা যায়, এক এক জন অপ্রতিম প্রতিভা
সম্পন্ন মহাপুরুষ অত্যুখিত হন ; শত শত লােকে গােপনে
যে অশ্রুবর্ষণ করিতেছিল তাহা ইহরা দর্শন করেন ; শত
সহস্র হৃদয়ে যে ক্রোধাগ্নি প্রধুমিত হইতেছিল তাহা ইহঁয়ের
হৃদয়ে প্রচণ্ড দাবানলের আকার ধারণ করে, শত সহস্র
অন্তরে যে বাসনা জাগিতেছিল, তাহা ইহাদের প্রাণে ঘনী
ভূত হয়। ইহারা নিগৃহীত পদদলিত প্রপীড়িক জাতি
সকলের প্রতিভূ ও মুখ-স্বরূপ হইয়া সিংহগর্জনে জগৎকে
কম্পিত করিতে আরম্ভ করেন; জগতের সমবেত শক্তি
সকলের প্রতি ক্ষেপও না করিয়া সত্যের ও ন্যায়ের বিজয়
নিশান উড্ডীন করিয়া দেন; এবং ব-দৃঢ় মুষ্টিতে অত্যা-
রীর সিংহাসনের পায়া ধরিয়া ভূমিতে লুণ্ঠিত করিয়া চূর্ণ

জাতিভেদ। ; করিবার প্রয়াস পান। উহারা মনুষ্য কুলে বীর। রােমীয় পােপদিগের অত্যাচার হইতে প্রজাকুলকে রক্ষা করিবার জন্য ইউরােপে এইরূপ এক বীরের অভ্যুদয় হইয়াছিল। ইহার নাম মার্টিন লুথার। ফরাসি বিদ্রোহের প্রতি দৃষ্টিপাত কর সেখানে কি দেখিবে? ধনিদিগের অত্যাচার যখন অসহ্য হইয়া উঠিল, একদিকে ফ্রান্সের দীন দরিদ্র প্রজাকুল এক মুষ্টি অন্নের জন্য লালায়িত হইয়া বেড়াইতেছে, অপরদিকে ধনিগণ নিজ নিজ প্রাসাদে বিলাসিনীগণ সহিত আমােদ প্রমোদে মত্ত রহিয়াছেন; একদিকে প্রজাকুল ক্ষুধাতুর কুকুরের ন্যায় দ্বারে দ্বারে ছুটিয়া ছুটিয়া বেড়াইতেছে ও কীট পতঙ্গের ন্যায় পথে ঘাটে পড়িয়া মরিতেছে, অপরদিকে ধনিগণ তাহাদের দুর্দ- শার প্রতি ক্ষেপও না করিয়া বরং তাহাদিগকে ঘৃণাসূচক ভাষায় পার হইতে তাড়াইয়া দিতেছেন। এই ঘাের বৈষম্য, এই ঘাের দুর্দশা, এই ঘাের সামাজিক অত্যাচার যখন দুর্বহ ভারের ন্যায় হইয়া উঠিল, তখন গগণ মেদিনীকে বিকম্পিত করিয়া ঈশ্বরের এই বাণী প্রচারিত হইল—“অভ্যুত্থান কর, বিদ্রোহ পতাকা উড্ডীন কর”। কি। আমি এসব নর- কধিরময় বিদ্রোহকেও ঈশ্বরের আজ্ঞা বলিতেছি! হাঁ আমি দির্য চক্ষে দেখিতে পাইতেছি, ঈশ্বর অত্যাচারকারীর অত্যা- চারের মধ্যেই তাহার শাস্তি নিহিত করিয়া রাখিয়াছেন। বিদ্রোহীগণ যে অকারণ নিষ্ঠুরতা করিয়াছে, যে প্রবঞ্চনা করিয়াছে, যে পশুবৎ আচরণ করিয়াছে, যে রুধির হােত জাতিভেদ। ৪১ 2 বর্ষণ করিয়াছে, সে জন্য শােক করি, মানব প্রকৃতি দুর্বল বলিয়া লজ্জা পাই, কিন্তু সেই সমুদায় রক্তপাত, নৃশংসতা ও পাপাচরণের পশ্চাতে দেখিতে পাই ঈশ্বর অত্যাচারি- দিগকে উপযুক্ত শাস্তি দিতেছেন। সেইরূপ প্রাচীন আৰ্য- সমাজে ব্রাহ্মণদিগের প্রবল প্রতাপে হীনজাতি সকল যখন কঁপিতে লাগিল, রাজাদের শক্তি পর্যন্ত যখন নামমাতে পরিণত হইল, আধ্যাত্মিক দাসত্বে এজাকুলের মনুষ্যত্ব যখন বিলীন প্রায় হইল, মানব যখন পশু প্রায় হইয়া পড়িল, তখন ঈশ্বর আদেশ করিলেন-”উখান কর।” অমনি যুব- রাজ সিদ্ধার্থ সত্যের মশাল হস্তে ধরিয়া ভারন্ধকার মধ্যে উঠিয়া দাড়াইলেন। এ কে আসিল বলিয়া ভারত- ক্ষেত্রে হুলস্থল পড়িয়া গেল। বুদ্ধ যেমন একদিকে রাজ সম্পদকে পায়ে ঠেলিলেন, অপরদিকে ব্রাহ্মণদিগের আধ্যা- ত্মিক প্রভুত্বের উপরেও খাঘাত করিলেন। লেন—“হে পদদলিত নিপীড়িত জাতি সকল আমার নিকট আগমন কর। আমি তােমাদিগকে আলিঙ্গন দিতেহি। আমার ধর্ম আকাশের ন্যায় বিস্তৃত, ইহার তলে ব্রাহ্মণ চণ্ডাল পুরুষ রমণী, ধনী দরিদ্র, বালক, বৃদ্ধ, সকলে সমভাবে বাস করিবে।” সত্যের বিজয় ভেরীর নিনাদের সহিত এই মহা ঘােষণা যখন প্রচারিত হইল তখন ভারত- সমাজ উত্তপ্ত পাকপাত্রের ন্যায় টগবগ, করিয়া ফুটিতে আরম্ভ করিল। এক পুরুষরত্নকে প্রসব করিয়া ভারতভূমি আর ঘুমাইতে ৪২ জাতিভেদ। ; { পারিল না। বুদ্ধের অভ্যুদয়ের সঙ্গে ভারতসমাজে দুইটী প্রধান বিষয়ে পরিবর্তন লক্ষিত হইল। প্রথমতঃ সেই দিন হইতে হিন্দু সমাজ বিভিন্ন সম্প্রদায়ে বিভক্ত হইতে লাগিল। যেমন ইউরােপে মহামতি লুথার একবার স্বাধীনতার পতাকা উড্ডীন করাতে সেই স্বাধীনতা প্রবৃত্তি চারিদিকে প্রবল হইয়া উঠিল ; লােকে নিজের জ্ঞান অনুসারে কাজ করিতে শিখিল ; ভারতবর্ষেও সেই দশা ঘটিয়াছিল। বুদ্ধ- দেব ব্রাহ্মণদিগের প্রতাপে প্রতিবাদ করিয়া প্রতিবাদের পথ, খুলিয়া দিলেন। তদবধি চারিদিকে স্বাধীন চিন্তার ধ্বজা উড়িতে আরম্ভ হইল। পরিশেষে ভারতসমাজ অগণ্য সম্প্র- দায়ে বিভক্ত হইয়া পড়িল। দ্বিতীয়তঃ বৌদ্ধ ধর্মের প্রচারের দিন হইতে নীচ জাতীর লােকদিগের উন্নতি আরম্ভ হইল। দলে দলে নিকৃষ্ট বর্ণের লােক বুদ্ধের শরণাপন্ন হইতে লাগিল। ক্রমে শ্রমণ শব্দ ব্রাহ্মণ শব্দের প্রতিদ্বন্দ্বির ন্যায় হইয়া দাড়া- ইল। এমন কি যে ভারতবর্ষে এককালে মনু শূদ্র রাজ্যে বা করিতে নিষেধ করিয়াছিলেন, সেই ভারত- বৰ্থে বুদ্ধের জন্ম হইতে তিনশত বৎসরের মধ্যে শূদ্রের নামে রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হইল। এইরূপে মহাত্মা শাক্য সিংহ ভারতসমাজে এক অভূত- পূর্ব পরিবর্তন আনিয়া দিলেন। ব্রাহ্মণদিগের শক্তি প্রবল আঘাত পাইল বটে, জাতিভেদের কঠোর নিয়ম সকল কিঞ্চিৎ শিথিল হইল বটে, কিন্তু ব্রাহ্মণদিগের প্রভুত্ব একেবারে জাতিভেদ বিলুপ্ত হইল না। দেশে হিন্দু রাজাদিগের রাজত্ব রহিল। পাটলীপুত্রের রাজগণ বৌদ্ধধর্ম প্রচার করিতে লাগিলেন। কিন্তু অপরাপর প্রদেশের রাজারা হিন্দু ধর্মের যাজন করিতে রত থাকিলেন। ব্রাহ্মণদিগের প্রতাপ রাজাদিগের ভুজ বলের দ্বারা সুরক্ষিত হইয়া তখনও কর্তৃত্ব করিতে লাগিল। জাতিভেদের উপরে দ্বিতীয় আঘাত সলমান রাজারা দিলেন। ইহঁারা জাতিভেদ ও পৌত্তলিকতার ঘাের বিদ্বেষী ছিলেন। ইহারা বলিলেন তােমাদের জাতিভেদ আমরা বুঝি না; আমাদের কাৰ্য যে করিতে পারিবে আমরা ভাহা-- কেই পুরস্কার দিব।” ব্রাহ্মণগণ জাত্যহংকারে স্ফীত হইয়া এই ম্লেচ্ছদিগের অনেক দূরে দণ্ডায়মান থাকিলেন এবং শূদ্র- গণ ও অপরাপর নিকৃষ্ট জাতীয় ব্যক্তিগণ অগ্রসর হইয়া ইহা- দের অধীনে রাজ কাৰ্য সকল গ্রহণ করিলেন এবং ইহঁদের ভাষা শিক্ষা করিতে লাগিলেন। ইহাতে দুইটা পরিবর্তন উপস্থিত হইল। প্রথমতঃ মুসলমানদিগের সংশ্রবে আসিয়া এই সকল হিন্দু মুসলমানদিগের রীতি নীতি শিক্ষা করিতে লাগিল ; প্রতিনিয়ত পৌত্তলিকতা ও জাতিভেদের বিরুদ্ধ কথা রাজাদিগের নিকট শুনিয়া ইহাদের হিন্দুধর্মের প্রতি আস্থার হ্রাস হইতে লাগিল। দ্বিতীয়তঃ কায়স্থ, বৈদ্যু প্রভৃতি হীন জাতীয় ব্যক্তিদিগের হস্তে ধন সঞ্চয় হইতে লাগল। ইহারা অনেকে মুসলমান রাজাদিগের নিকট সনন্দ প্রাপ্ত হইয়া জমিদারি লাভ করিতে লাগিলেন। একদিকে ।

৪৪ জাতিভেদ। শূদ্রগণের পদ ও ক্ষমতা বৃদ্ধি হইয়া তাহারা সমাজে দলপতি হইতে লাগিলেন, অপর দিকে পারসী বিদ্যার বহুল প্রচার হওয়াতে এবং সংস্কৃত বিদ্যার অনাদর হওয়াতে ব্রাহ্মণগণ মূর্খ ও শাস্ত্রজ্ঞান-বিহীন হইয়া পড়িতে লাগিলেন। ব্রাহ্মণ- দিগের বিদ্যা বুদ্ধি হাস হইয়া তাহারা ধনী শূদ্রদিগের বিদায় প্রার্থী ও পরভাগ্যোপজীবী হইয়া পড়িতে লাগিলেন। দেশের যখন এইরূপ অবস্থা তখন ইংরেজের এদেশে পদার্প করিলেন। নুতন রাজারা মুসলমান রাজাদিগের ন্যায় প্রজাদিগের ধর্মের উপর হাত দিলেন না, কিন্তু সমাজ মধ্যে এমন পরিবর্তন স্রোত প্রবিষ্ট করিয়া দিলেন যে তাহাতে সমাজের ভিত্তিদেশ পর্যন্ত পরিবর্তিত হইয়া যাইতে লাগিল। প্রথমতঃ সকল শ্রেণীর জন্য ইহরা শিক্ষার দ্বার উন্মুক্ত করিলেন। বিদ্যাদান বিষয়ে ব্রাহ্মণ শূদ্র বিচার করিলেন না। চিরদিনের পদদলিত জাতি সকল যখন ইহঁদের গ্রন্থাদিতে মানুষের মনুষ্যত্ব ও মহত্বের কথা পাঠ করিতে লাগিল, স্বাধীনতার সংগ্রাম, সকলের বিবরণ পাঠ করিতে লাগিল, তখন তাহাদের অন্তরে এক প্রকার নবজী মনের ফুর্তি হইতে লাগিল। তাহারা দেখিল এক নবরাজ এ নুতন উন্নতির পথ তাহাদের সম্মুখে প্রসারিত। ইহা দেখিয়া তাহারা আগ্রহের সহিত ধাবিত হইল। ক্রমে ছুতার, গােয়াল, সগােপ, সুবর্ণবণিক, পকলেই ইংরাজের বিদ্যালয়ে স্বীয় স্বীয় ছাত্রদিগকে প্রেরণ করিতে লাগিল।

জাতিভেদ। ৪৫ সকলের সন্তান এক সঙ্গে শিক্ষা লাভ করিতে লাগিল, একা- সনে বসিতে লাগিল, এক সঙ্গে খেলিতে লাগিল, একপ্রকার পদ লাভ করিতে লাগিল। ইহার অপেক্ষা অধিক সাম্যের শিক্ষা কিসে হইতে পারে? দ্বিতীয়তঃ পাশ্চাত্য সাহিত্য ও বিজ্ঞানের চর্চা যতই হইতে লাগিল ততই লােকের হৃদয় মনের বিকাশ হইতে লাগিল। প্রাচীন কুসংস্কার সকল তাড়াইবার জন্য মুসল- মান রাজারা ভরবার ধরিয়াছিলেন; কিন্তু তাহারা দুরবার ধরিয়াও যাহা করিতে পারেন নাই বর্তমান রাজার বিদালয় খুলিয়া তাহার অধিক করিলেন। বিনা তর্কে বিনা প্রচারে, বিনা সংগ্রামে নব্য শিক্ষিত ব্যক্তিদিগের কুসংস্কার রাশি বিদূরিত হইতেছে। ঈশ্বর এক জনকে ব্রাহ্মণ, একজন শূদ্র করিয়াছেন একথা একজন দ্বাদশবর্ষীয় স্কুলের হাতেরও নিকট উপহাসের কথা হইয়াছে। তৃতীয়তঃ বর্তমান সময়ে মুদ্রান্ত্রের প্রচার হওয়াতে সমু- দায় প্রাচীন শাস্ত্র মুদ্রিত হইয়া আপামর সাধারণ সকলের হস্তে অর্পিত হইতেছে। যে শারূপ অস্ত্র লুক্কায়িত রাখিয়া ব্রাহ্মণগণ হীন জাতীয়দিগের উপর প্রভুত্ব বিস্তার করিয়া ছিলেন তাহা এখন ঐ হীনজাতীয়দিগের হস্তে পড়ি- তেছে। প্রাচীন কালে শাস্ত্রকারগণ বলিয়াছিলেন শূদ্রের । বেদে অধিকার নাই। এখন কি দেখিতেছি ? শূদ্র দূরে থাক স্লেচ্ছগণ বেদের উদ্ধার কর্তা হইয়াছেন এবং আমাদিগকে জাতিভেদ। । তাঁহাদের নিকট বেদ বেদাঙ্গের অর্থ শিক্ষা করিতে হইছেছে। এই সকল কারণে বর্তমান সময়ে জাতিভেদ প্রথা দিন দিন দুর্বল হইয়া পড়িতেছে। বর্তমান ইংরাজী সভ্য- তার ন্যায় ইহার আর শক্র নাই। বলিতে গেলে জাতি- ভভদ প্রথার উপর আর আমাদের আক্রমণ করিবার প্রয়াে- জন নাই। • ইংরাজী শিক্ষা ইহার তলে ঘুণ হইয়া লাগি •য়াছে এবং ত্বরায় ইহাকে বিনষ্ট করিবে। আপনারা কি দেখিতেছেন? বৃথা তর্কে প্রয়ােজন কি? এই কলি- কাতা সহরে এমত কত শত হিন্দু সন্তান আছেন, যাঁহারা প্রতিদিন ইংরাজদিগের হােটেলে অভক্ষ্য দ্রব্য সকল আহাদ করিতেছেন অথচ তাহারা অবাধে সমাজ মধ্যে স্থান পাই- তেছেন। কেবল তাহা নহে, তাহারাই অনেক স্থলে সমাজ পতি ও দলপতি বলিয়া প্রতিষ্ঠা লাভ করিতেছেন, তবে আর জাতিভেদ কোথায় ? এখন দেখা যাউক এদেশে জাতিভেদ প্রথা প্রচলিত থাকাতে কি কি অনিষ্ট ঘটিয়াছে। কিন্তু অনিষ্ট ফলের গণনার পূর্বে, ইহার ইষ্ট ফল যদি কিছু ঘটিয়া থাকে, তাহা দেখা আবশ্যক। একজন ইংরাজ গ্রন্থকার জাতি- ভেদ প্রথার পক্ষ সমর্থন করিয়া একখানি গ্রন্থ লিয়িয়া- ছেন। জাতিভেদের সপক্ষে তিনি কি বলেন, দেখি- বার জন্য আমি মনােযােগ পূর্বক উক্ত গ্রন্থখানি পাঠ জাতিভেদ। ৪৭, করিয়াছিলাম। তিনি কতকগুলি ইষ্ট ফুলের উল্লেখ করি আছেন, তম্মধ্যে দুইটী প্রধান। আমি অগ্রে উক্ত দুইটার উল্লেখ করিব। তিনি প্রথমতঃ বলিয়াছেন জাতিভেদ প্রথা নিবন্ধন হিন্দুদিগের নীতি অপেক্ষাকৃত ভাল হই- আছে। অন্যান্য দেশের প্রতি যদি দৃষ্টিপাত করা যায়- তবে দেখিতে পাই নীচ শ্রেণীর লােকদিগের আধ্যাত্মিক ও নৈতিক অবস্থা কি শশাচনীয়। পানাসক্তি ও ব্যভিচার তাহাদের মধ্যে কি প্রবল ! এই উভয় পাপে সেই সকল জাতিকে পশু প্রায় করিয়া রাখিয়াছে। জাতিভেদের কঠোর শাসন নিবন্ধন উক্ত উভয় পাপ হিন্দু সমাজ মধ্যে প্রবল হইতে পারে নাই। এই কথার মুলে গেলে, ইউ- রােপের সভ্য সমাজ সকলের সভ্যতার সহিত প্রাচীন ভারতসমাজের সভ্যতার একটা প্রভেদ দেখিতে পাই। বর্তমান পাশ্চাত্য সভ্যতা বৈষয়িকসুখ-প্রধান সভ্যতা। যাহাতে মানবের দিনযাত্রা নির্বাহের সুবিধা করে না, শারীরিক সচ্ছল বৃদ্ধি করে না, কায়িক ক্লেশের লাঘৰ করে না,, ধনাগমের নব নব দ্বার উন্মুক্ত করে না, কিম্বা চরমে ধনাগমের নুতন দ্বার উন্মুক্ত করিবার সম্ভাবনা যাহাতে নাই, এমন বিষয়ে পাশ্চাত্য দেশবাসিগণ মনাে- যােগী নহেন। তাহাদের বিজ্ঞান চর্চা, সাহিত্য চর্চা, রাজনীতি চৰ্চ্চা সকলেরই উদ্দেশ্য ঐহিক সুখ বৃদ্ধি। ইংলণ্ডে এই বিষয়-তৃষ্ণা অতিশয় প্রবল। যদি আজ

৪৮
জাতিভেদ।
জ্যোতিষ শাস্ত্রের একটী নব সত্য আবিষ্কৃত হয় একটা
নুতন নিয়ম আবিষ্কৃত হয় অমনি ইংরাজ পণ্ডিতগণ
ভাবিতে বসিবেন তারা বাণিজ্যের কতদুর সুবিধা হইতে
পারে। যদি জড়ের কোন নুতন শক্তি প্রকাশ পায়,
অমনি তাঁহারা চিন্তা করিতে বসিবেন দ্বারা কোন
নুতন ব্যবসা ভােলা যায় কি না ? ইউরােপের সভ্যতা
বিষয়-সুখ প্রধান সভ্যতা? প্রাচীন ভারতবর্ষের সভ্যতা
নীতিপ্রধান ও আধ্যাত্মিক সত্যতা। প্রাচীন কালের দর্শন
শাস্ত্র, প্রাচীন কালের পুরাণ ইতিহাস, সকলের একই
উদ্দেশ্য, মানবকে মুক্তিলাভে সমর্থ করা। মুক্তি কাহাকে
বলে এই প্রশ্নের উত্তর দিবার জন্যই যড় দর্শনের সৃষ্টি।
অন্যান্য দেশে যাহার নাম আইন ভারতবর্ষে তাহার নাম
ধর্মশাস্ত্র। ইহাতেই প্রমাণ পাওয়া যায়, ধর্মের প্রতি
প্রাচীন ভারতীয় সমাজের কতদূর দৃষ্টি ছিল।
ভারতীয় সভ্যতা নীতি প্রধান ও আধ্যাত্মিক ভাব সম্পন্ন
সভ্যতা হইল কেন? এই প্রশ্নের বিচারে প্রবৃত্ত হইলেই
দেখিতে পাওয়া যায় যে ব্রাহ্মণগণ অনন্য-কৰ্ম্মা হইয়া কেবল
ধর্ম চর্চা, ধৰ্ম্ম চিন্তা, ধর্ম যাজন ও ধর্ম প্রচারে নিযুক্ত
ছিলেন, এবং সমাজ মধ্যে তাঁহাদের প্রভুত্ব সর্বোপরি প্রতি-
ঠিত ছিল, সুতরাং তাহাদের আধ্যাত্মিক ভাবের ছবি সমগ্র
সমাজের উপরে দৃঢ়তর রূপে মুদ্রিত হইয়াছিল। জাতিভেদ
প্রথা নিবন্ধন ব্রাহ্মগণ অনন্তকৰ্ম্মা হইয়া ধৰ্মচৰ্চ্চাতে নিযুক্ত

জাতিভেদ।
হইতে পারিয়াছিলেন, সেই প্রাচীন সমাজে জাতিভেদ
থাকলে কার্য্যের বিভাগ থাকিত না।
ইহার উত্তরে বলা যায় যে, শ্রম ও কাৰ্যের বিভাগ
বর্তমান সকল সভ্য-সমাজের একটি প্রধান লক্ষণ। এই
শ্রম বিভাগ দ্বারা সকল বিষয়েই আশ্চৰ্য্য উন্নতি লক্ষিত
হইতেছে। এক শ্রেণীর লােক বিজ্ঞান চর্চা করিতেছেন; এক
শ্রেণী শিল্প সাহিত্যের অনুসরণ করিতেছেন ; এক শ্ৰেণী ধর্ম।
প্রচার করিতেছেন। এইরূপে কাহার দ্বারা অনুরুদ্ধ না
হইয়া স্বেচ্ছাতে মানবগণ বিবিধ কাৰ্য অবলম্বন করিতেছেন।
সুতরাং প্রাচীন ভারত-সমাজে জাতিভেদ যে কাৰ্য্য করিয়াছিল
তাহার জন্য বর্তমান সময়ে সেরূপ প্রথার প্রয়ােজন নাই।
উক্ত ইংরাজ দ্বিতীয় কথা এই বলিয়াছেন যে জাতিভেদ
প্রথা না থাকিলে ভারতবর্যের জাতি সকল বিদেশীয় জেতা-
এর সংশৰে আসিয়া লােপপ্রাপ্ত হইত। তিনি ইহার
দৃষ্টান্তস্বরূপ নীলগিরির টোডা জাতির উল্লেখ করিয়াছেন।
তিনি বলেন টোডাদিগের মধ্যে জাতিভেদ প্রথা প্রচলিত
থাকাতে তাহারা নিম্নশ্রেণীর ইউরােপীয়দিগের সংস্রবে
আসিয়া ক্রমশঃ লােপপ্রাপ্ত হইতেছে। এ বিষয়ে বক্তব্য
আছে। টোডারা যে নিঃশেষ হইতেছে তাহা জাতিভেদের
অভাৰ নিবন্ধন নহে। কিন্তু উক্ত জাতির আলস্য, বুদ্ধি
সম্বন্ধে হীনতা ও অকর্মণ্য নিবন্ধন। জীবন সংগ্রামে
অপর সকল অতিদিগের দ্বারা পরাস্ত হইয়া তাহারা দিন

জাতিভেদ। দিন ঘাের দারিদ্র্যে নিপতিত হইতেছে এবং তাহাদের সংখ্যা ক্রমে হ্রাস হইয়া যাইতেছে। এই কারণে দারজিলিঙ্গে লেপচাদিগের সংখ্যাও বােধ হয় হীন হইতেছে। অপর দিকে ব্ৰহ্মদেশের দৃষ্টান্ত প্রদর্শন করা যায়। ব্ৰহ্মদেশবাসী- গণের মধ্যে জাতিভেদ নাই। কোন ব্ৰহ্মদেশীয় রমণী যদি একজন ইউরােপীয়ের সহিত পরিণীতা হয়, তাহা হইলে ডাহাকে জাত্যংশে হীন হইতে হয় না। বৈধব্য হইলে বা কোন কারণে সে বিবাহ সম্বন্ধ বিচ্ছিন্ন হইলে সে রমণী পুনরায় আপনার জ্ঞাতি-কুটুম্বের মধ্যে অবাধে স্থান প্রাপ্ত হইয়া থাকে। এইরূপে ব্ৰহ্মদেশবাসী অনেক ইউরােপীয়ের ব্ৰহ্মদেশীয় স্ত্রী আছে। কই ব্ৰহ্মদেশীয়েরা ত এই কারণে উৎসঃ যাইতেছে না। যাহা হউক এক্ষণে জাতিভেদের, অনিষ্টফল কি কি ঘটিয়াছে তাহা একবার চিন্তা করিয়া দেখা যাউক। প্রথম অনিষ্ট ফল। এই প্রথা ভারত-ক্ষেত্রে বিচ্ছেদ ও অনাত্মীতার বীজ বপন করিয়াছে। ইহারই জন্য, “মানুষ মানুষের ভাই” এই মহাসত্য ভারতবাসীর মনে আপনার বল প্রকাশ করিতে পারে নাই। এই প্রথা নিবন্ধন এক প্রদে- শের ও এক জেলার ভিন্ন ভিন্ন জাতীয় লােকের রীতি-নীতি আচার-ব্যবহার, বিভিন্ন প্রকার । পরস্পরের সহিত কোন প্রকার সামাজিক সম্বন্ধ নাই, সুতরাং আত্মীয়তা বৃদ্ধি হইবার উপায় নাই। চিন্তা করিয়া দেখ এই সহরের ব্রাহ্মণ কায়স্থ-

জাতিভেদ।
গণ সুবর্ণবণিকদিগকে কিরূপ ঘৃণা করেন। জাতিগত ঘৃণা
যেখানে, আত্মীয়তা সেখানে কোথায়? তৎপরে আর একটু
দূরে দৃষ্টি ফেলিয়া দেখ—দেশের কি শশাচনীয় দুরবস্থা।
চব্বিশ পরগণার লােক যদি কর্মোপলক্ষে মেদিনীপুরে গিয়া
থাকে, সেখানকার লােকদিগকে ঘৃণা করে ; বালীগণ যদি
বেহারে থাকে, বেহারিদিগকে ঘৃণা করে ; পঞ্জাবের বাঙ্গালি-
দিগকে পঞ্জাবীরা ঘৃণা করে, বাঙ্গালিগণ পঞ্জাবীদিগকে হন
বলিয়া অবজ্ঞা করে। এই যত প্রকার অমিত্রতা যত প্রকার
জাতি বা শ্রেণীগত বিদ্বেষ ইহার মূলে জাতিভেদ। বিবাহ
সম্বন্ধই দুই দল লােকের মধ্যে আত্মীয়তা বৃদ্ধির একটী প্রধান
উপায়, ইহা আপনারা সহজেই অনুভব করিতে পারেন।
ইতিহাসের প্রতি দৃষ্টিপাত করুন।
প্রাচীন রােমানদিগের
সহিত তাহাদের প্রতিবেশ স্যাবাইনদিগের কিরূপ শত্রুতা
ছিল তাহা সকলেই জানেন। কিন্তু যখন বােমীয় যুবকগণ
শজাতীয় কতকগুলি রমণীকে হরণ করিয়া আনিল এবং
তাহাদের সহিত পরিণয়-পাশে বদ্ধ হইল তখন সেই রমণী-
গণের দ্বারাই শত্রু জাতির সহিত আত্মীয় ও প্রণয়
স্থাপিত হইল। ইতিহাসের শরণাপন্নই বা হই কেন?
আপনারা কি অনেকবার দেখেন নাই, যে দুইটী গ্রামের
লােকের মধ্যে ঘন ঘন বিবাহ-সম্বন্ধ হয় সেই দুই গ্রামের মধ্যে
কেমন আত্মীয়তা। যে গ্রামে মাসী বা পিসী বা ভগিনী
দশজন আছেন, সে গ্রাম আমার কত ভালবাসার গান ;

জাতিভেদ। তাহার লােকের সঙ্গে আমার কত আত্মীয়তা। জাতিভেদ প্রথা নিবন্ধন ভারতর্ষে এই আত্মীয়তা বৃদ্ধি হইতে পারে নাই। যেস্থলে আত্মীয়তা নাই, সেস্থলে লােকে অপরের সুখে সুখী দুঃখে দুঃখী হয় না। আজ যদি আপনারা শুনিতে পান যে মাদ্রাজ সহরে ভয়ানক দুর্ভিক্ষ বা মারীভয় হইয়া দলে দলে লোেক মরিতেছে, তাহা হইলে স্বদেশ বলিয়া সাধা- রণভাবে আপনাদের সকলেরই কিঞ্চিৎ দুঃখ হইবে; আমার হৃদয়ে বিশেষ আঘাত লাগিবে, কারণ আমার অনেকগুলি বন্ধু ও আত্মীয় লােক তথায় আছেন। আবার আমার সেই কেশ আরও ঘনতর হইত, যদি সেখানে আমার দুই চারিজন মাসী, পিসী কি ভগিনী থাকিতেন। ইহা আপনারা সহজেই অনুভব করিতে পারেন। ইহা বলা বাহুল্য যত আত্মীয়তা ততই সমদুঃখসুখ। জাতিভেদ প্রথা ভারতীয় জাতি সকলের মধ্যে আত্মীয় স্থাপিত হইতে দেয় নাই। আত্মীয়তা ও ঐক্যের অভাবই ভারতবাসীদিগের দুর্গতির প্রধান কারণ—ইহার জন্যই ভারতবর্ষ এত সহজে বিদেশীয় জাতিদিগের দাসত্ব-পাশে বন্ধ হইয়াছে। একবার পঞ্জাব প্রদেশ ভ্রমণ করিবার সময় একজন উচ্চশ্রেণীর ইউরােপীয় কর্মচারীর সহিত আমার একবার ভারতবর্ষের ভাবী অবস্থার বিষয়ে আলাপ হয়। উক্ত ইউ- রােপীয় কর্মচারী আমাকে বলিলেন আমার অনুমানে বােধ হয় তুমি বঙ্গদেশের লােক।

জাতিভেদ। আমি বলিলাম । আমি পঞ্জাব ভ্রমণের উদ্দেশে আসিয়াছি। ইউরােপীয় কর্মচারী বলিলেন, আচ্ছা এস আমরা তােনাদের দেশের ভাবী অবস্থার বিষয়ে কথা কই। আমি বলিলাম ও বিষয়টা রাখিয়া দিলে ভাল হয় না? কারণ ও বিষয়ে আমাদের মত ভেদ উপস্থিত হইয়া কথােপকথনের সুখের ব্যাঘাত হইবে। তিনি বলিলেন। না না, বিবাদ করা ত আমার উদ্দেশ্য নয়। তখন আমি বলিলাম, আপনারা আমাদিগকে যে ইংরাজী শিক্ষা দিয়াছেন তাহার গুণে আমাদের অন্তরে স্বাধীনতা ও স্বায়ত্ত শাসনের আকাঙ্ক্ষা উদিত হইয়াছে। তিনি একটু হাসিয়া বলিলেন, অর্থাৎ তােমর সেই দিনের প্রতীক্ষা করিতেছ যখন আমরা এ দেশ হইতে যাইব। আমি হাসিয়া বলিলাম— তা বই কি? তখন তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, আচ্ছা তােমরা যে আমাদিগকে তােমা- দের দেশ হইতে তাড়াইবে তাহার কোন সম্ভাবনা দেখিতে পাও? আমি বলিলাম। না, তিন চারি শত বৎসরের মধ্যে সে সম্ভাবনা দেখি না এবং সেই জন্যই মনে ক্লেশ হয়। তখন তিনি বলিলেন, তােমাদের মধ্যে যে বাহুবল- শালী ও সমর কুশল লােক নাই তাহা নহে, দেখ তােমা- জাতিভেদ। দেরই লােকের দ্বারা তােমাদিগকে শাসনে রাখিয়াছি। বলের অভাবের জন্য ভােমরা আমাদের অধীন নও, কিন্তু আর এক কারণে। তােমাদের মধ্যে এমন একটা বিষয় আছে যে জন্য তোমাদিগকে এক হইতে দিবে না এবং তােমরা আমাদিগকে তাড়াইতে পারিবে না। আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, সে বিষয়টা কি ? তিনি বলিলেন—তাহা জাতিভেদ প্রথা। এ প্রথা বাঁচিয়া•থা, আমাদিগকে এদেশ হইতে তাড়ায় কাহার সাধ্য ? বাস্তবিক এই জাতিভেদ প্রথা ভারতীয় জাতি সকলের মধ্যে আত্মীয়তা ও সমদুঃখসুখ বৰ্দ্ধিত হইতে দেয় নাই। এই কারণেই ভারতবাসিগণ এত দুর্বল। জাতিভেদের দ্বিতীয় অনিষ্ট ফল এই হইয়াছে যে এত- দ্বারা কায়িক শ্রমসাধ্য কাৰ্য্যকে নিকৃষ্ট ও লােকের চক্ষে হেয় করিয়াছে। এ দেশে কায়িক শ্রম চিরদিন হীন জাতি- রাই করিয়া আসিতেছে ; ব্রাহ্মণ প্রভৃতি উৎকৃষ্ট বর্ণেরা সে সকল কাৰ্য্যকে তাহাদের অযােগ্য বােধে পরিত্যাগ করিয়া- দেশে এই প্রথা চিরদিন প্রচলিত থাকাতে কায়িক শ্রমের প্রতি ভদ্রলােকের মৃণা বদ্ধমূল হইয়াছে। এই কারণে দেখিতে পাই এদেশে শিক্ষা বা অন্য কোন কারণে যাহাৱই অবস্থা একটু ভাল হয় সে এবং তাহার পুত্র পৌত্রগণ অমনি কায়িক শ্রমকে ঘৃণিত বলিয়া অনুভব ঙ্গেন।

জাতিভেদ। করিতে থাকে। এই ব্যাধি এতদুর পৰ্যন্ত প্রবল, যে এক- জন ব্রাহ্মণ কায়স্থের সন্তান অর্থাভাবে সপরিবারে অর্ধাশনে থাকিবে অথচ কোন প্রকার কায়িক শ্রমের দ্বারা আর্থো- পাৰ্জন করিবে না। ব্রাহ্মণদিগের ত কথাই নাই কোন ব্রাহ্মণ ভিখারীকে যদি দোষ দেওয়া যায় সে বলে মহাশয়। ব্রাহ্মণের সন্তান খাটিয়াও খাইতে পারি না সুতরাং ভিক্ষা করিয়া খাইতে হয়। ভিক্ষাতে ব্রাহ্মণের লজ্জা কি! কি ভয়ানক যে দেশে মনুষ্যোচিত কায়িক শ্রম অপেক্ষৰ ভিক্ষা প্রশংসার বিষয় সে দেশকে দুর্গতি হইতে রক্ষা করে কার সাধ্য ? হে ভারতীয় যুবক! তুমি যত দিন সাহসী, কর্মঠ, স্বাধীনচেতা, মনুষ্যের ন্যায় নিজের মস্তকের ঘৰ্ম্মে নিজের অন্ন উপার্জন করিতে না শিখিবে, জগদীশ্বর তােমাকে যে বাহুদ্বয় ও পদদ্বয় দিয়াছেন তাহাদিগকে খাটাইয়া নিজ উন্নতি করিবার চেষ্টা না করিবে ততদিন তােমার দুর্গতি দুৰ হইবে না। ইতিহাসের প্রতি দৃষ্টিপাত কর দেখিতে পাইবে, যে ব্রাহ্মণদিগের প্রতাপ যখন প্রবল ছিল তখন এদেশে শ্রমজীবিদিগের উন্নতি হইতে পারে নাই। এদেশে শিল্পের যে সকল আশ্চৰ্য কীর্তি দেখিতে পাওয়া যায় তাহার অধিকাংশ বৌদ্ধ রাজাদিগের রাজ্যকালে সুম্পা- দিত হইয়াছিল। অর্থাৎ যখনই ব্রাহ্মণদিগের প্রতাপ খাট হইয়াছে তখনই শ্রমজীবী ও শিল্পের উন্নতি দৃষ্ট হইয়াছে। জাতিভেদের তৃতীয় অনিষ্ট ফল এই যে, ইহাতে ভারত-

জাতিভেদ।
বর্ষকে দরিদ্র করিয়াছে। এই প্রথা নিবন্ধন সমুদ্র যাত্রা
নিষিদ্ধ হইয়াছে সুতরাং বাণিজ্যের উন্নতি হইতে পারে নাই।
সমুদ্রযাত্রা ব্যতীত আজ পর্যন্ত কোন দেশ কবে বাণিজ্য
বিষয়ে উন্নতি লাভ করিয়াছে ? বােম্বাই নগরে গিয়া দেখ
এদেশের লােকে কত কাপড়ের কল চালাইতেছেন। তাহারা
প্রতিদিন রাশি রাশি সুতার নুটী প্রস্তুত করিয়া তাহাদের
কারখানাতে স্তুপাকার করিতেছেন। কিন্তু সেই সকল
সুভার মুটী কোথায় বিক্রয় হইতেছে ? কেন, বােম্বাইয়ের
বাজারে। কে ক্রয় করিতেছে? কেন ইউরােপীয় বণিকগণ
ঐ সকল সুতা ক্রয় করিয়া চীন, জাপান প্রভৃতি দেশে
গিয়া বিক্রয় করিয়া আসিতেছে। একজনেরা সুতা প্রস্তুত
করিল, দ্বিতীয় ব্যক্তি আসিয়া সেইগুলি লইয়া আর
একজনের নিকট বিক্রয় করিয়া লাভ করিয়া গেল। জাতি-
ভেদ প্রথা থাকাতে প্রথমােক্ত ব্যকি সে লাভ করিতে পারি-
লেন না। এই ঔন্য ভারতবাসীদের এত দাবি।
চতুর্থ, এই প্রথা নিবন্ধন এদেশের লােকের এত শারী-
রিক ও মানসিক দুর্বলতা। জাতিভেদ প্রথা নিবন্ধন
আমাদের বিবাহ সম্বন্ধ ক্রমেই সঙ্কীর্ণ হইতে সঙ্কীর্ণতর
সীমার মধ্যে বন্ধ হইয়াছে ; রক্তের বিমিশ্রণ হইতে পারে
নাই। ইহা একটী প্রাণি জগতের পরীক্ষিত সত্য যে
অল্প পরিসর ক্ষেত্রের মধ্যে যদি ক্রমাগত বিবাহ সম্বন্ধ
ঘটিতে থাকে, তাহা হইলে সে জাতি ত্বরায় হীন তেজ

জাতিভেদ। - হইয়া যায় এবং কালে উৎসন্ন দশা প্রাপ্ত হয়। দুইটা হাঁস পােষ, তাহাদিগকে এমন স্থানে লইয়া যাও যেখানে অন্য হাঁস নাই। এই দুইটা হাঁসের যে বংশ তাহা দেরই মধ্যেই বংশ বৃদ্ধি চলুক, আব বাহিরের হাঁস আনিও । কয়েক পুরুষের মধ্যেই দেখিবে হাঁসগুলি দুর্বল, নিস্তেজ হইয়া গিয়াছে, আরও কয়েক পুরুষ পরে দেখিৰে তাহাদের বংশ বৃদ্ধি বন্ধ হইয়া গেল। রক্তের বিমিশ্রণাভাবে যে শারীরিক দুর্বলতা তাহা বিজ্ঞানের প্রমাণিত সত্য। সুতরাং এবিষয়ে অধিক বলা নিরর্থক। আবার অপরদিকে ইংরাজ জাতির প্রতি দৃষ্টিপাত কর কর । ইহাদের বল বিক্রম ও শৌর্য বীর্যের বিষয় চিন্তা কর। সমগ্ৰ ইংলণ্ড দ্বীপটী ভারতবর্ষের তুলনায় কি সামান্য স্থান! বিস্তৃতিতে ইহার একটা প্রদেশের ন্যায়ও নহে অথচ এই সামান্য ২.পে যে জাতি বাস করিতেছে তাহাদের শৌর্য বীৰ্য্য কত? কেবল যে ভারতবর্ষের ন্যায় প্রকাণ্ড সাম্রাজ্য ইহ- দের দ্বারা সুচারুরূপে চালিত হইতেছে তাহা নহে, কিন্তু ইহাদের ভয়ে পৃথিবীর জাতি সকল সৰ্ব্বদা সশঙ্কিত। ইহাদিগকে অগ্রাহ্য করিয়া জৰ্ম্মণির সম্রাট কাৰ্য্য করিতে পারেন না; ইহাদিগের কুচী দেখিলে রুসিয়ার সম্রাটুকে তঁাহার সিংহাসনে বসিয়া কঁাপিতে হয়। ভারতবর্ষ কিরূপে শাসন হইতেছে তাহাই একবার চিন্তা কর। কিরূপ লােকের দ্বারা আমরা শাসিত হইতেছি? ইংলণ্ডের প্রথম ।

৫৮ জাতিভেদ। শ্রেণীর লােক গ্লাডষ্টোন, ব্রাইট প্রভৃতি ; উহারা ত এদেশে আসিবার কথা স্বপ্নেও দেখেন না; দ্বিতীয় শ্রেণীর লােক ফসেট প্রভৃতি ইহঁদের দুই এক জন, গবর্নর জেনালের পদ গ্রহণ করিয়া আসেন; তৃতীয় শ্রেণীর লােকগণও এদেশে আসা প্রয়ােজন মনে করেন না; কেবল সেখানকার চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণীর লােকেরা সিবিল সাৰ্বিসে প্রবিষ্ট হইয়া ও অপরাপর কৰ্ম্ম অবলম্বন করিয়া এদেশে আগমন করেন, এই পঞ্চম শ্রেণীর লােকেরাই এদেশকে ভঙ্গিতে- ছেন, গড়িতেছেন, রাজাগুলিকে কাদার পুতুলের ন্যায় সিংহাসনে তুলিতেছেন, নামাইতেছেন, সমুদায় রাজকাৰ্য্য সুচারুরূপে চালাইতেছেন। ইহা কি আশ্চর্য দৃশ্য নয়? ইহাতে কি ইংলণ্ডের বলের পরিচয় পাওয়া যায় না? সে দেশ না জানি কিরূপ হইবে যাহার পঞ্চম শ্রেণীর লােক দিগের এত শক্তি, এত বিক্রম। কিন্তু ইংরাজদিগের এই তেজস্বিতা ও মানসিক শক্তির মূল কোয়? ইহার মূল তাহাদের রক্তে। আমরা অনেক সময় ভুলিয়া যাই যে নির্ভীকতা, উদ্যোগিতা, কৰ্ম কুশলতা, শ্রম দক্ষ, অধ্য- বসায়, স্বাধীনচিত্ততা প্রভৃতি গুণ গুলি অনেক পরিমাণে শারীরিক তেজের উপর নির্ভর করে। এ বিষয়ে আমার একটী, পৌরাণিক আখ্যায়িকা মনে হয়। একবার দেবগণ কোন অসুরের উপদ্রবে নিতা উত্যক্ত হইলেন। দানব নিপাতের জন্য তাঁহারা অবশেষে বিষ্ণুর শরণাপন্ন হইলেন;- জাতিভেদ। এইরূপ স্থির হইল যে দেবগণের সংশোদ্ধার করিয়া একজন অমিত-তেজ-সম্পন্ন রাজাকে সৃষ্টি করা হইবে। ইন্দ্র তিন ভাগ দিলেন, যম তিন ভাগ দিলেন, বায়ু বরুণ প্রভৃতি অপর দিকৃপাল স্বীয় স্বীয় অংশােদ্ধার করিয়া দিলেন। এই সকল অংশে এক মহাশক্তির জন্ম হইল, তিনিই সেই দানব দলনে সমর্থ হইলেন। এরূপ আখ্যায়িকা আপনারা অনেকবার নিশ্চয় শুনিয়া থাকিবেন। ইংরাজ জাতির জন্মও সেই প্রকারে। আদিতে স্যান, সিনেমার, নৰ্মান, প্রভৃতি নানা জাতি সম্মিলিত হইয়া তাহাদের সৃষ্টি হইয়াছে। তৎপরে এখনও বিবাহ সম্বন্ধ বিষয়ে তাহাদের কোন কুসংস্কার নাই। ইহারা যেখানেই যাইতেছেন সেই- খানেই বিবাহ সম্বন্ধে আবদ্ধ হইতেছেন। ইংরাজ ফরাসিদেশে যাইতেছেন, একটী ফরাসি রমণী ঘরে আমিতেছেন, ইটালিতে যাইতেছেন ইটালীর রমণী ঘরে আনিতেছেন, এইরূপে নির- স্তর নব নব রুধির-স্রোত ইংরাজ সমাজে প্রবাহিত হইতেছে। নানা শক্তির সমাবেশ হইয়া ইহারা শক্তি সম্পন্ন হইয়াছেন। ইহাদের ভাষা যেমন নানাভাষা হইতে শব্দ সংগ্রহ করিয়া উন্নতি প্রাপ্ত হইয়াছে, ইহাদের দেহ মনও তেমনি নানা জাতির গুণ শক্তি সকল লাভ করিয়া সবল হইয়াছে। পঞ্চমতঃ-এই জাতিভেদ প্রথা বহু বহু শতাব্দী ধরিয়া আমাদের উন্নতির পথে একটা কঠিন অর্গল স্বরূপ হইয়া রহিয়াছে। চীনদেশবাসীগণ যেমন এক পাষাণ প্রাচীরের জাতিভেদ। দ্বারা আপনাদের রাজ্যকে বেষ্টন করিয়া বাহিরের লােক, বাহিরের উন্নতির স্রোত, বাহিরের চিন্তাকে বহু শতাব্দী ধরিয়া আপনাদের রাজ্যে প্রবেশ করিতে দেয় নাই, হিন্দু- গণও তেমনি জাতিভেদরূপ এক আধ্যাত্মিক • প্রাচীরের দ্বারা আপনাদিগকে আবদ্ধ করিয়া সকল প্রকার উন্ন- তির পথে প্রতিবন্ধক অর্পণ করিয়া রাখিয়াছেন। এই কারণেই জাপানবাসীগণ বিগত ৩০ বৎসরের মধ্যে রাজ নীতি, সমাজনীতি প্রভৃতি সম্বন্ধে যতদূর অগ্রসর হইতে পারিয়াছেন, বিগত দেড় শতাব্দীর অধিক ইংরাজ রাজ্যে বাস করিয়াও এদেশবাসীগণ সে উন্নতিলাভ করিতে পারেন নাই। কি আশ্চৰ্য্য এই ভারতের উপর দিয়া কষ্ট স্রোত বহিয়া যাইতেছে। এখানে মহাত্মা বুদ্ধের নব ধর্ম প্রচারিত হইয়াছিল, এখানে মুসলমানগণ সশস্ত্র হইয়া আপনাদের ধর্ম প্রচার করিবার চেষ্টা করিয়াছেন, এখানে শত শত খ্ৰীষ্টীয় প্রচারক দিবারাত্র পরিশ্রম করিয়া দেহের শােণিত শুষ্ক করিতেছেন, কিন্তু কেহই যেন এই স্থাবর, অচলিষ্ণু ঘীভূত প্রাণিপুঞ্জকে অগ্রসর করিতেছেন না। ইহার কারণ কি? এই জাতিভেদ প্রথাই ইহার কারণ। জাতি- খঙ্গ মন্তকোপরি দোদুল্যমান, কে হঠাৎ পা বাড়াইতে সাহসী হইবে। যদি এদেশবাসী নরনারীর গলদেশ জাতির নিগড়ে এত দৃঢ়তর রূপে বন্ধ না হইত, তাহা হইলে এদেশের রক্ষণশীলতা এত অধিক হইত না।

জাতিভেদ। ষষ্ঠতঃজাতিভেদ যেমন এদেশবাসীদিগকে রক্ষণশীল ও উন্নতি পরায়ুখ করিয়াছে, তাহার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের মনুষ্যত্ব হরণ করিয়াছে। আমাদিগকে কাপুরুষের জাতি করিয়াছে। এই কথাগুলি হৃদয়ের গুরুতর দুঃখ ও ক্ষোভের সহিত বলিতেছি। মানবাত্মার উন্নতির সহায়তা করিবার জন্যই জনসমাজ। যে সমাজে বাস করিয়া আমি জ্ঞানে ধৰ্ম্মে বর্ধিত হইব, প্রেম পবিত্রতা লাভ করিব, কর্তব্যের পথে অবাধে অগ্রসর হইতে পাবি, স্বাধীন ভাবে অসং- কোচে ও নির্বিঘ্নে আপনার সেই মনের শক্তি সকল ঈশ্বরের ‘প্রয়কাৰ্য্য সাধনে নিয়ােগ করিতে পারি, তাহাই ঈশ্বরের ইচ্ছার অনুগত সমাজ। কিন্তু তাহা না হইয়া জনসমাজ যখন প্রপীড়ক ও অত্যাচারী হয়, যখন অবাধে স্বীয় কর্তব্য পালন করিতে দেয় না, যখন সরল ধর্মপিপাসু লােকদিগকে দ্য ভুঙ্করের ন্যায় সাজা দিতে আরম্ভ করে, যখন তন্মধ্যে স্বাধীন ভাবে বিবেকের আদেশ পালন করা যায় না, নিজের আত্মার গৌরব ও মনুষ্যত্ব রক্ষা করিতে পারা যায় না, তখন সে বিকৃত সমাজ ব্যাধিগ্রস্ত ব্যাধিগ্রস্ত দেহের ন্যায়, মানবাত্মার বাসের অযােগ্য হইয়া পড়ে। এই জাতিভেদ প্রথা নিবন্ধন হিন্দু সমাজের সেই দুরবস্থা উপস্থিত হইয়াছে। হায় হায় । ইহাতে আমাদের পুরুষদিগকে কাপুরুষ করিয়া ফেলিয়াছে। জাতি যাওয়ার ভয়ে লােকে স্বীয় কর্তব্য- পালনেও পরায়ুখ হইতেছে। ঐ দেখ একজন শিক্ষিত

জাতিভেদ।
গৃহস্থের নিরপরাধ বালিকা কন্যা দশমবর্ষে বৈধব্য দশা
প্রাপ্ত হইতেছে। সেই সুকুমারমতি সরলস্বভাব বালিকা
সংসারের সুখ দুঃখ বিষয়ে অনভিজ্ঞ থাকিয়া ধূলা খেলা
করিতেছিল, এমন সময়ে পিতা দেশাচারের ভয়ে তাহাকে
ধরিয়া তাহার বিবাহ দিয়াছিলেন। এক বৎসর না যাইতে
যাইতে সে ঘাের বৈধব্য দশা প্রাপ্ত হইয়াছে। এখন,
তাহার নবযৌবনের উদয়। শিক্ষিত পিতা ও অশিক্ষিতা
জননী • যতবার তাহার নবযৌবন প্রস্ফুটিত, সরল ও
অনিন্দিত মুখের দিকে দৃষ্টিপাত করিতেছেন ততবার
গােপনে অশ্রুবর্ষণ করিতেছেন। তাহাদের হৃদয় বলিতেছে,
প্রাণ বলিতেছে, ধৰ্ম্মজ্ঞান বলিতেছে যে, বল পূর্বক তাহাকে
চির বৈধব্য রাখা অকর্তব্য—কিন্তু সাহসে কুলাইতেছে না।
কাহার ভয় ? জাতি যাওয়ার ভয়। যদি জাতি বলিয়া
একটা কিছু না থাকিত যদি দশজনে মিলিয়া একুজনকে
এত কষ্ট দিতে না পারি তাহা হইলে কি ঐ বালিকার
সাংসারিক সুখের পথে অর্গল পড়িত? বলিতে কি সমাজের
ভয়ে লােকের মনুষ্যত্ব লােপ হইতেছে। যদি জাতিভেদ
প্রথা না থাকিত সমাজের এত ভয় থাকিত না।
সপ্তমত চিন্তা করিয়া দেখ এই জাতিভেদ প্রথা হইতেই
বিবাহ সম্বন্ধীয় রীতি নীতি এতদূর দূষিত হইয়া পড়িয়াছে।
ভারতবর্ষের যেখানে হিন্দু সেইখানেই বাল্য বিবাহ প্রচলিত
দেখা যায় কেন? জাতিভেদ প্রথা কি ইহার অন্যতম কারণ

জাতিভেদ। নহে? বাঙ্গলা দেশে প্রধানতঃ তিন শ্রেণীর ব্রাহ্মণ আছেন রাঢ়ী, বৈদিক ও বারেন্দ্র। ইহারা পরস্পরের সহিত বিবাহ সম্বন্ধে আবদ্ধ হন না। ইহঁদের মধ্যে আবার কুলীন, মৌলিক, বংশজ আছে। ইহাদের পরস্পরের মধ্যে বিবাহ সম্বন্ধে অনেক কঠিন নিয়ম। এইরূপে কালক্রমে বিবাহােপযােগী স্থল ক্রমেই সংকীর্ণ হইতে সংকীর্ণতর সীমার মধ্যে বদ্ধ হইয়া আসিতেছে। ইহার উপর এক বাটীতে এক পুরুষের বিবাহ হইলে, সে বাড়ীতে তাঁহার সন্তান সন্ততির বিবাহ হওয়ার স্থল অতি অল্প থাকে। ওদিকে আবার ক্যাদিগকে দশম বৎসরের পর অবিবাহিত রাখিতে ধৰ্ম্ম শাস্ত্রে কঠিন নিষেধ আছে, সুতরাং কালক্রমে যথা সময়ে উপযুক্ত পাত্র পাওয়া দুষ্কর হইয়া পড়িয়াছে। সুতরাং কন্যাকর্তাগণ উপযুক্ত পাত্র দেখিলেই সময় না আসিতে বিবাহ দিতে বাধ্য হইয়া থাকেন। কি জানি কন্যা বড় হইলে যদি উপযুক্ত পাত্র না পাই, তখন কন্যা রাখিতে পারিনা সুতরাং উপযুক্ত অনুপযুক্ত বিবেচ- নার সময় থাকিবে না, অতএব সময় থাকিতে একটী উপযুক্ত পাত্র দেখিয়া দুই হস্ত এক করিয়া দেওয়া যাউক। গৃহস্থগণ এইরূপ বুদ্ধি প্রণােদিত হইয়া কাৰ্য্য করিয়াছেন ও করিতে- ছেন। এই কারণে কলিকাতার দক্ষিণস্থ বৈদিকগণের মধ্যে সূতিকা গৃহ হইতে বহির্গত হইলেই কন্যার বিবাহ সম্বন্ধ করিবার প্রথা প্রচলিত হইয়াছে। এই জন্যই কুলীন ব্রাহ্মণ দিগের মধ্যে পারিবারিক সুখের কন্টক স্বরূপ বাল্য বিবাহ

৬৪
জাতিভেদ।
A
প্রথা প্রচলিত হইয়াছে। এই কারণেই এতদ্দেশীয় সুবর্ণ
বণিক, বৈদ্য, কায়স্থ প্রভৃতি সকল শ্রেণীর মধ্যেই কন্যার
বিবাহের ব্যয় ভয়ানক বৃদ্ধি হইতেছে। এই ব্যয় ইতি-
মধ্যে এতদূর বাড়িয়াছে যে, কোন গৃহস্থের গৃহে তিনটী
কন্যা জন্মিলে, সেই তিন কন্যার বিবাহ দিতে তাহাকে
সর্বস্বান্ত হইতে হইতেছে। যাহাদের ঘরে উপযুক্ত বুদ্ধিমান
ও শিক্ষিত পুত্র আছে, তাহাদের লাভের সীমা নাই। তাহারা
এক একটী পুত্রকে নীলামে বিক্রয় করিয়া অনেক অর্থ
উপার্জন করিতেছেন। এই সামাজিক দৌরাত্ম্য পূর্বোক্ত
শ্ৰেণীসকলের মধ্যে এত অসহ হইয়া পড়িয়াছে যে, তাহারা
এই অনিষ্ট নিবারণের জন্য মধ্যে মধ্যে সভা করিতেছেন
ও বলিতেছেন এস সকলে প্রতিজ্ঞা পুর্বক একটা ব্যয়
ধার্য্য করি, তাহার অধিক কোন বরকর্তা চাহিতে পারিবেন
না। কিন্তু তাহাদের সে সকল চেষ্টা সম্পূর্ণ সফল হইতেছে
। হইবে কেন? যে জাতিভেদ প্রথা হইতে বাল্য বিবা-
হের সৃষ্টি, যে জাতিভেদ প্রথা নিবন্ধন একটা ভাল ছেলের
জন্য নীলামের ডাক পড়ে, সে প্রথা অপরিবর্তিত থাকিতে
উক্ত অনিষ্ট নিবারিত হইতে পারে না।
অষ্টমতঃজাতিভেদ প্রথাকে এজন্য ঘৃণা করি যে ইহা
অধর্মের উপরে প্রতিষ্ঠিত। জগদীশ্বর মানবকে দেহ মনের
শক্তি দিয়া প্রত্যেককে এই অধিকার দিয়াছেন, আপনার
ইচ্ছা মত সেই সমুদায় শক্তি নিজ উন্নতি সাধনে ও অপরের

জাতিভেদ।
কল্যাণ সাধনে নিয়ােগ করিবে। ইহাই ঐশ্বরিক বিধি।
জাতিভেদ প্রথা এই বিধিকে লঘন করিয়াছে। জাতিভেদ
প্রথা বলিতেছে তুমি যদি বুদ্ধিমান হও,
বুদ্ধিমান হও, যদি জ্ঞানী হও, যদি
ধার্মিক প্রবর হও, কিন্তু তুমি যদি শূদ্র হও তবে তুমি ব্রাহ্মণের
সমাধিকার পাইবে না। এই ন্যায়বিরুদ্ধ, ধৰ্ম্মবিরুদ্ধ ও
ঈশ্বরেচ্ছা বিরুদ্ধ বিধি প্রচলিত থাকাতে বহু বহু শতাব্দী
ধরিয়া ব্রাহ্মণগণ ব্রাহ্মণেতর জাতিদিগের প্রতিভা ও আধ্যা-
ত্মিক শক্তি সকলকে চাপিয়া রাখিয়াছিলেন। তাহাদিগকে
এইরূপে পদতলে চাপিয়া রাখাতে কি দেশের সমূহ অকল্যাণ
করা হয় নাই ? তাহারা যদি অবাধে আপনাদের শক্তি
সকলকে বিকশিত করিবার অবসর পাইত, যদি স্বীয় শক্তি
অনুসারে উন্নত পদে আরােহণ করিতে পারিত, যদি তদনুরূপ
সামাজিক সম্ভ্রম লাভে সমর্থ হইত, যদি আপনাদের প্রতিভা
লােকে দেশীয় সাহিত্যকে আলােকিত করিতে পারি, তাহা
হইলে কি তাহাদের গৌরবে দেশ আরও গৌরবান্বিত
হইত না? তাহাদের যশঃ সৌরভে ভারভাকাশকে,আমাে-
দিত করিত না? সে লাভ কাহার হইত? বর্তমান সময়ে
জাতিভেদের প্রকোপ শিথিল হওয়ার ফল আমরা কি
দেখিতে পাইতেছি? আমাদের ডাক্তার মহেন্দ্রলাল সরকার,
আমাদের কৃষ্ণদাস পাল, কে ইহাদের নাম স্মরণপূর্বক স্বদে-
শকে গৌরবান্বিত মনে করে না? জাতিভেদ প্রবল থাকিলে
কি এ সকল লােককে পাওয়া যাইত? ইহাদিগের দ্বারা

জাতিভেদ। দেশ কি উপকৃত হইতেছে না? চিন্তাবিহীন যুবক ! তুমি কি কখনও ভাবিয়া দেখিয়াছ, এই দুরন্ত জাতিভেদ প্রথা প্রচ- লিত না থাকিলে আরও কত মহেন্দ্রলাল সরকার ও কৃষ্ণদাস পাল জন্মিতে পারিত। তবে দেখ জাতিভেদ প্রথা তােমার দেশের কি শত্রুতা করিয়াছে। ইলবার্ট বিলের আন্দোলনের সময় ইংরাজগণ বলিয়াছিলেন—ভারতবীরগণ বিদ্যা বুদ্ধিতে যতই বড় হউক, আমাদের সমাধিকার পাইতে পারে না। তাহাভে কেন সকলে বিরক্ত হইয়াছিলেন? ইহাতে জাতি- ভেদের কথা. ইহা ধৰ্ম্ম বিরুদ্ধ। পাপের উপর ইহার ভিত্তি। নবমতঃ—আমি মনে করি জাতিভেদ প্রথা নিবন্ধনই এ দেশবাসীদিগের পক্ষে পরের দাসত্ব পাশ গলে ধারণ করা সহজ হইয়াছে। ব্রাহ্মণেতর জাতির সংখ্যা দেশে সর্বকালেই অধিক ছিল। উক্ত ব্রাহ্মণের জাতিগণ কঠোর আধ্যাত্মিক দাসত্বের মধ্যে বাস করিয়া মনুষ্যত্ববিহীন হইয়া পড়িয়াছিল সুতরাং যখন বিদেশীয়গণ এ দেশ আক্রমণ করিল, তখন মনুষ্যত্ববিহন ও দাসত্বে অভ্যস্ত, জাতি সকল অনায়াসে তাহাদের দাসত্ব নিগড় গলদেশে ধারণ করিতে সম্মত হইল। আর অধিক দোষ প্রদর্শনের প্রয়ােজন নাই। এই জাতি ভেদ হইতে সমুহ অনর্থের উৎপত্তি হইয়াছে। এই জাতিভেদ প্রথা, ভারতে ঈৰ্যানল প্রজ্জ্বলিত করিয়াছে ইহাতে ভ্রাতৃ- বিদ্বেষ ঘটাইয়াছে, কায়িক শ্রমকে নিকৃষ্ট করিয়াছে, শিল্প বাণিজ্যের দুর্গতি করিয়াছে, দারিদ্র যাতনা বৃদ্ধি করিয়াছে,

জাতিভেদ।
শারীরিক ও মানসিক দুর্বলতা আনয়ন করিয়াছে, সামাজিক
উন্নতির পথে প্রতিবন্ধক হইয়াছে, হিন্দুগণের মনুষ্যত্ব হরণ
করিয়া কাপুরুষতার বৃদ্ধি করিয়াছে, বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ,
প্রভৃতি দূষিত রীতি সকল প্রসব করিয়াছে, জাতির উন্নতি
ও মানসিক উন্নতির পথ রােধ করিয়াছে, শত শত বৎসর
ধরিয়া নিম্নজাতীয়দিগকে চাপিয়া রাখিয়াছে, এবং সর্ব শেষে
এ দেশবাসীদিগকে পরের দাসত্ব পাশ বহনের জন্য প্রস্তুত
করিয়াছে। আর কি শুনিতে চাও? এমন প্রথার সপক্ষে
আবার কথা কও? আমি যখন এই সকল অনিষ্ট প্রথার
বিষয় স্মরণ করি তখন বলি এই জাতিভেদ প্রথা যদি কোন
ঝোপ বা বৃক্ষ হইত তাহা হইলে দুই হস্তে সজোরে ধরিয়া
উপাড়িয়া ফেলিলাম। ইহা উন্নতির কণ্টক ও দেশের শত্রু

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Jatibhede

Author
Sashtri,shibnath
Title
Jatibhede
File name
Jatibhede
Text
OCR done
Citation
1884
Published
2009/10/13
Publisher
Sadharan Brahmasamaj Pustak Prachar Bibhag Committee,kolkata
Language
Sanskrit
Pages
76
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Essays
Keywords
Sudra
DLI number
512721
Barcode
4990010019768.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
ODi6Fmj0gJZ
Download PDF

Jatibhede