Bally Sadharan Granthagar

Port Artharer Khudha

Bandyopadhyay, Sri Sureshchandra · 2009/08/6

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

পাের্ট-আর্থারের ফুৰা লেখকের অন্যান্য রচনা চিত্রবহ!—অভিনব অপরূপ উপন্যাস। বহুল আলোচিত ও সব্বত্র প্রশংসিত। পৃষ্ঠা। ৪০০ জাপান-সংশোধিত ও পরিবর্ধিত দ্বিতীয় সংস্করণ। অসংখ্য ছবি। বহুবর্ণ চিত্রিত প্রচ্ছদ। বহুপূর্ণ চিত্রি আলুপােড়া–ছােটদের সচিত্র গল্পের বই। হানাষি—উৎকৃষ্ট জাপানী ছােট গল্পের বই। নামিকো-আধুনিক জাপানের প্রসিদ্ধ গার্হস্থ্য উপন্যাসের অনুবাদ। বনস্পতির অভিশাপ—প্রাচীন জাপানের রোমাটিক উপন্যাস অবলম্বনে বিরচিত। চিত্রগ্রীব—ছােটদের চমৎকার সচি; উপ- স। অনুবাদ।

পাের্ক-আর্থারের ক্ষুধা
সুরেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
এম, সি, সরকার এণ্ড সন্স,
কলিকাতা

প্রকাশক
শ্রীসুধীরচন্দ্র সরকার
১৫ কলেজ স্কোয়ার
কলিকা
All Rights Reserved
by Author
জ্যৈষ্ঠ ১৩৩৯
কালিকা প্রেস
২১ নন্দকুমার চৌধুরী লেন, কলিকাতা
এক্ষেৰমােহন দালাল কর্তৃক মুদ্রিত

পাট-আর্থারের ক্ষুধা” ‘প্রবাসী’তে ধারাবাহিক প্রকাশিত হইয়াছিল। রুশ-জাপান যুদ্ধের পরিণাম পোর্ট-আর্থার বিজয়ের উপর অনেকাংশে নির্ভর করিয়াছিল বলিলে অত্যুক্তি হয় না। পাের্ট-অর্থিারে জাপানী ও রুশ, উভয় পক্ষই অমিতৰিক্ৰমে জীবন পণ করিয়া সংগ্রামে প্রবৃত্ত হয়—তাই এই যুদ্ধের কাহিনী ইতিহাসে অমর হইয়া আছে। সেই দুর্ভেদ্য গিরিদুর্গ অধিকারের জন্য যে-সব জাপানী যুদ্ধ করিয়াছিল লেটেন্যান্ট সাকুরাই তাদের একজন। ডান হাতখানি যুদ্ধে বিসর্জন দিয়া বাঁ হাতে তার প্রত্যক্ষলব্ধ অভিজ্ঞতা তিনি লিপিবদ্ধ করেন। আধুনিক যুগের যুদ্ধের সেই প্রোজ্জ্বল চিত্র—জাপানীর শৌর্যবীৰ্য্য, দেশভক্তি ও অপূৰ্ব আত্মদানের নিগুঢ় পরিচয়-বাঙালী পাঠককে উপহার দিলাম। খ্যাতনামা শিল্পী শ্ৰীযুক্ত হরিপদ রায় এই গ্রন্থের প্রচ্ছদপট রচনা করিয়া ইহার সৌষ্ঠব বাড়াইয়াছেন, সেজন্য তার কাছে আমি কৃতজ্ঞ। ০ -অনুবাদক।

No text on this page.

অনুশােচনা
(পোর্ট- আর্থার-বিজয়ী জেনারেল নােগি বিরচিত
ঘুষির বদলে ঘুসি দিতে গেল
যুদ্ধে জাপানী সেনা,
ময়দানে আর কেল্লায় হ’ল
গোলাগুলি লেনা দেনা ;
-জিয়ী জাপান ; তবু, জয়গান
গাহে না তেমন কেহ,
ভরি ময়দান পাহাড়-প্রমাণ
পড়ে আছে মৃতদেহ।
শুধু মৃতদেহ,—শুধু মুমূয়ু,
পাহাড়-প্রমাণ দুখ ;
পাহাড়-সমান দুঃখের ভারে
ভেঙেছে আমার বুক।

too
ভাবিতেছি শুধু স্বদেশে ফিরিয়া
মন যে কেমন হবে ;-
ফিরিল না যারা তাদের বারতা
সকলে সুধাবে যবে !
দুখে দুখে যারা দিন কাটায়েছে
পাকায়েছে চুল দাড়ি,
ক্ষীণ আশা লয়ে আছে পথ চেয়ে,
তারা এসে তাড়াতাড়ি
সুধালে বারতা,কী দিব জবাব ?
গেছে—সব গেছে যারা,
কেল্ল। যাহারা করিল দখল
কেউ ফেরে নাই তারা।
-সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের 'অনুবাদ

No text on this page.

No text on this page.

গাের্ড-আধারে ক্ষুধা আহবান যুদ্ধযাত্রার আদেশ যখন পৌছিল তখন বসন্তকাল, চেরিগাছে ফুল ফুটিতে সুরু করিয়াছে। ভাবিতেছি, সত্যই কি এবার আমাদের অধীর প্রতীক্ষার অবসান হইল ? খবরটা এতই ভাল যে বিশ্বাস করিতে ভয় করে ! এ দলের পতাকা বহন করা আমার কাজ। নায়ককে বলিলাম, কর্নেল ! আমাদের আন্তরিক অভিনন্দন ! এই মাত্র হুকুম পেয়েছি। কর্নেলের মুখে আনন্দের হাসি, কহিলেন, হ্যা, শেষ পর্যন্ত এসেছে, আশা ছিল না, কি বলো? এমন সুখের দিন আর কপনাে আসিয়াছিল কি ?—কই মনে ত ;ীড়ে না! ফুর্তির চোটে কি করি কোথা যাই কিছুই ঠিক করিতে পারি না, ছুটাছুটি কারা জনে জনে খবরটা শুনাইয়া বেড়াই। সকলের অন্তর আচ্ছন্ন করিয়া যেন একটা অদ্ভুত তড়িৎপ্রবাহ বহিতে সুরু করিল—তার ফলে কি নায়ক কি সৈনিক, প্রত্যেকের মনে হইতে লাগিল, যেন সে একাই গোটা রুশিয়া দেশটার সঙ্গে লড়িতে পারে। প্রথম ও দ্বিতীয় ‘রিজার্ভ’-দলের লােকও অবিলম্বে নিজ নিজ পতাকাতলে জড়াে হইতে লাগিল। তাদের মধ্যে এমন সব গরীবও ছিল যারা যুদ্ধে গেলে তাদের পরিবারের অনাহারে থাকার সম্ভাবনা কেউ বা স্থবির রুগ্ন বাপ-মাকে ঘরে ফেলিয়া আসিয়াছে—যুদ্ধযাত্রায় ৩০ ২ পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা ‘বাধা দিবার মত চিন্তা ও উদ্বেগ সকলেরই ছিল, কিন্তু দেশের এই সঙ্কটকালে সাহস ও নিষ্ঠার সহিত দেশসেবা করিতে হইবে”-স্বজাতির জন্য প্রাণ দিতে পারা যে কত বড় সৌভাগ্য সকলে সেই কথাই ভাবিতে লাগিল। । নাকামুরা প্রথম ‘রিজার্ভ'-দলের সৈনিক। তার ঘরে পীড়িতলী ও বছর তিনেকের এক শিশু। নিঃস্বের সংসার, কায়ক্লেশে দিন কাটে। পতির যুদ্ধযাত্রার আগের দিন দীনহীন অস্থির মেয়েটি তার স্বল্পাবশেষ শক্তির উপর নির্ভর করিয়া সহরতলী থেকে পােয়া দেড়েক চাল ও এক পয়সার জ্বালানি কাঠ কিনিয়া আনিল। পতির জীবনে যুদ্ধযাত্রার মহাসুযােগ উপস্থিত, বিদায়-ভােজের আয়ােজন না করিলে মানায় কি? পত্নী মৃত্যুশয্যায়, শিশু অনাহারে অবসন্ন, পতি চলিয়াছে দেশের জন্য প্রাণ দিতে। প্রথম ও দ্বিতীয় রিজার্ভ’-এর লােকেরা যথাসময়ে সৈন্তাবাসে পৌছিল। দুর্বলতা বা ভগ্ন-স্বাস্থ্যের জন্য যারা বাতিল হইল, তাদের দুঃখ ও নিরাশার আর অন্ত নাই। তারা কাকুতি-মিনতি জুড়িয়া দিল- “দয়া করে কোনােরকমে আমায় নিতে পারেন না কি ? দেখুন, গ্রাম থেকে আসার সময় তারা ভারি সমারােহে বিদা দিয়েছে, ট্রেন ছাড়ার সময় বার বার জয়ধ্বনি করে কত আনন্দ প্রকাশ করেছে। সঙ্কল্প করে এসেছি, ঘরে আর ফিরবাে না। এখন উপায়? কেমন করে ফিরি বলুন ? তারা যে ভাববে আমি একটা অকেজো অপদার্থ সে অপমান কি করে সহ করবাে? দয়া করে আমায় সঙ্গে নিন-দোহাই আপনার, দয়া করুন—আমায় ফেরাবেন না!” E কানজি বৌদ্ধমন্দিরে জনকয় লােক যুদ্ধযাত্রার অপেক্ষায় বাস পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা করিতেছিল। স্থির ছিল, এ দলে তারা যাইবে না, ডাক আসিলে পরে যাইবে। মিয়াকে তাদের একজন—দেহে মনে বেশ সুস্থ সবল। ঘৰু থেকে বিদায়ের সময় পণ করিয়া আসিয়াছে প্রথম দলের সঙ্গেই যুদ্ধে যাইবে ! অথচ এমনি দুর্ভাগ্য, যুদ্ধে প্রাণদানের বদলে দেশের মধ্যেই নিষ্কর্মা বসিয়া থাকা ধাৰ্য্য হইল ! কবে পাঠাইবে রুও ঠিকানা নাই। এ কি সহ হয়—মনে হইল মৃত্যুই তার পক্ষে শ্রেয় । একদিন, তখন অনেক রাত, মিয়াকের বন্ধুরা গভীর ঘুমে অচেতন। নিরিবিলি সে একখানি বিদায়লিপি রচনা করিতে বসিল। তাহাতে লিখিল—কত সৈনিক যুদ্ধে গেল, দুর্ভাগা আমি এখন 'ড়ে আছি—এ দুঃখ সহ্য করার ক্ষমতা নেই! কত সাধ্যসাধনা করেছি কেউ আমাকে সঙ্গে নিলে না! আমার রাজভক্তি ও দেশপ্রীতি মরে প্রমাণ করা ছাড়া ত উপায় দেখি না!... মৃত্যুর জন্য তৈরি হইয়া সাদা কাঠের খাপ থেকে সে একখানি। তীক্ষ্ণধার ছােরা বাহির করিল, তারপর সম্রাটের উদ্দেশে চাপাগলায় ‘বাজাই বলিয়া হারাকিরি করিল—অর্থাৎ তলপেটের এধার হইতে ওঁধার পর্যন্ত চিরিয়া ফেলি! পুরানাে দেবালয়ের নিভৃত নির্জন প্রান্তে এই ভয়ানক কাণ্ড কেহ দেখিতে পাইল না, কেহ জানিতেও পারিল । বাহিরে তখন মৃদু বর্ষণের ঝিরঝির শব্দ—আর কোনাে শব্দ নাই। দেশভক্ত সৈনিকের নিষ্ঠা বােধ করি বিধাতার বুকে বাজিল-হঠাৎ বন্ধুদের ঘুম-ভাঙিয়া যাওয়ায় তার প্রাণরক্ষা হইল। শেষে একদিন তার সাধও পূর্ণ হইল—সে হাসপাতাল ছাড়িয়া যুদ্ধযাত্রা করিল। । লড়াই চলিতেছে। যুদ্ধের পর যুদ্ধ জয়ের খবরে মন অবশ্যই খুশি হয়, তবুও স্বীকার করা ভাল, আনন্দটি নিছক আনন্দ নয়। ভাবি পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা এইভাবে চলিলে আমরা যখন পৌছিব, তখন হয় ত যুদ্ধ চুকিয়া যাইবে। দিন কয় পরে নাকি অপর একটি দল যাত্রা করিবে—আমাদের পাল কখন? এখানে হাত-পা গুটাইয়া বসিয়া আছি, ওদিকে উহারা লড়াই ফতে করিয়া বসিল যে! আরও বিলম্বে সেখানে গিয়া করিব কি? ‘র্যাক, শেষ পর্যন্ত হুকুম আসিয়াছে—ভাের ছয়টায় ‘প্যারেড’-ঠে সকলে জড়াে হইবে ! অসীম অনিন্দ—এতদিনে জীবনে মহােচ্চ কীৰ্ত্তর সুযােগ মিলিল! কথায় বলে, সাহসীর চোখে অবশ্য অশ্রু আছে, কিন্তু বিদায়কালে সে অশ্রু বর্ষণ করে না ! ভালমন্দ সব কিছুর জন্য তৈরি বলিয়াই ত আমরা এ বিদায়কে চিরবিদায় না ভাবিয়া পারি না। মন কঠিন করিয়া মুখে হাসি ফুটাইয়াছি, তবু অন্তরের অশ্রু কেমন করিয়া নিরােধ করিব ? যাত্রার পুৰ্ব্ব রাত্রি। উটিয়া পালটিয়া বন্ধুবান্ধবের ছবিগুলি বেশ 'করিয়া দেখিয়া লইলাম। পরে ডেক্সর টানার মধ্যে দরকারি কাগজপত্র গুছাইয়া রাখিলাম—যেন আমি মরিলে আমার বিষয়-ব্যবস্থার জন্য কাহাকেও বেগ পাইতে না হয়। তারপর স্বচ্ছন্দমনে মেঝের উপর ঘুমাইয়া পড়িলাম। বাড়িতে সেই শেষ নিদ্রা ! রাত তিনটায় পুরানাে কেল্লায় গিরিশীর্ষ হইতে তিন বার কামান গর্জন করিল। মুহূর্তে শয্যা ছাড়িয়া নিৰ্ম্মল জলে স্নান করিয়া সৈনিকের বেশে সাজিলাম। তারপর যে দিকে আমাদের মহামহিম সম্রাট বিরাজিত, সেই পূৰ্বদিকে ফিরিয়া মাথা নত করিলাম। মিকাদো’র যুদ্ধ-ঘােষণাপত্র শ্রদ্ধার সহিত পড়িয়া তার উদ্দেশে কহিলাম--আমি আপনার নগণ্য অধম প্রজা, এইমাত্র যুদ্ধযাত্রা করছি! বাপীঠের সামনে অমি আরাধনা করার সময় সর্বাঙ্গে কাটা দিল। মনে হইল পিত্বপুরুষেরা যেন বলিতেছেন—আজ থেকে তােমার দেহমন তােমার । * পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা নয়! সম্রাটের মহিমা অক্ষুন্ন রাখার জন্য, জাতিকে দারুণ বিপদ থেকে গরিত্রাণ করার জন্য তুমি চলে ! অস্থি যদি চূর্ণ হয়। মাংস যদি ছিন হই তা-ও সহ্য করবে—এই সঙ্কল্প ক'রে যাও! কাপুরুষতা দ্বারা কদাচ পূৰ্ব পিতামহগণের অসম্মান করে না ! পরিবার পরিজন আমাকে ঘিরিয়া দাড়াইল, বিদায়ের পনির হাতে তুলিয়া দিল, তাদের আন্তরিক শুভ ইচ্ছা ও আশীৰ্বাদ জানাইল। পিতা কহিলেন, সংসারের জন্য চিন্তা নেই! দীর্ঘকালের সকল সাধু- সঙ্কল্প এবার কাজে পরিণত ক’বাে ! তােমার মৃত্যুর জন্য আমি প্রস্তুত হয়েছি—দেশের জন্য কীর্তি অৰ্জন করে আমাদের পরিবালেনাম মহােচ্চ সম্মানের পুষ্পে বিভূষিত করে। আমি বলিলাম, আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন—সৈনিকের জীবনে এ বাড়া সুযােগ আর কি আসতে পারে ? আপনার শরীর দুর্বল, স্বাস্থ্যের প্রতি লক্ষ্য রাখবেন ! যাত্রাকাল উপস্থিত। বাস্তুপীঠ থেকে তলােয়ার তুলিয়া লইয়া কোমরে ঝুলাইলাম। তারপর মায়ের হাতের জল খাইয়া খুসিমনে ক্ষপদে বাহির হইলম সৈন্যদল “প্যারেড’-ভূমিতে সারবন্দি দাড়াইয়াছে—যুদ্ধপতাকা মাঝখানে। জলদগম্ভীর সুরে রণসঙ্গীত ধ্বনিত হইয়া উঠিল। কর্নেলের পানে চাহিলাম—তিনিই আমাদের কর্ণধার। সাহসী সৈনিকেরা অনুভব করিল, তারা যেন তারই হাত-পা। পিতামাতাকে ছাড়িয়া আঁসিয়াছে, অতঃপর তিনিই তাদের স্থান অধিকার করিবেন। গৃহ হইতে চিরবিদায় লইয়াছে, অতঃপর মাঞ্চুরিয়ার অসীম প্রান্তরেই বসবাস করিতে হইবে।

পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা সৈন্যশ্রেণীর উপর আগাগােড়া চোখ বুলাইয়া কর্নেল উচ্চকণ্ঠে তার উপদেশ পড়িয়া শুনাইলেন। তার কণ্ঠে কণ্ঠ মিলাইয়া দেশনায়ক সম্রাটের উদ্দেশে সকলে তিনবার ‘বাই’-ধ্বনি করিল। -এই যে শক্তিমান যােদ্ধদলের উদ্ভব হয়েছে, মহামহিম দো’র আদেশে এরা অস্ত্রচালনার প্রতিযােগিতায় অগ্রসর ! এদের গতির সম্মুখে আকাশ বিদীর্ণ হবে, ধরণী চূর্ণবিচূর্ণ হবে। “পয়লা দল, আগে চলল!” বিলম্বিত সৈন্যশ্রেণী বিসর্পিত গতিতে পায়ে পায়ে চলিতে সুরু করি তালে তালে পদক্ষেপ-শব্দের সহিত পােসাক ও অন্ত্রশস্ত্রের মৃদু ঘর্ষণধ্বনি মিশিল। নিকটে ও দুরে সৈনিকেরা ভূৰ্যনিনাদে দেশবাসীকে বিদায়-অভিনন্দন জানাইতেছে। প্রবীণ ও তরুণের কণ্ঠ সম্মিলিত হইয়া ভৈরবরবে মুহুর্মুহু ঘােষণা করিল—“বাজাই’—চিরজীবী হও, চিরজীবী হও ! জাহাজে উঠিলাম। ডেকের উপর পতাকা রাখিলাম। জলযান থরথর করিয়া কাপিতে লাগিল, তারপর পিছনে ঝলকে ঝলকে মসীবর্ণ ধুম উগার করিয়া পশ্চিমে যাত্রা শুরু করিল। সহসা আকাশে মে- দেখা দিল, অচিরে বর্ষণ আরম্ভ হইল—প্রথমে মৃদুমন্দ, তারপর তীব্র- বেগে, মুষলধারায়। T २ সমুদ্রযাত্রা জয়ধ্বনি এখনো যেন কানে বাজিতেছে, কল্পনা উধ, হইয়া ছুটিয়াছে গিরিদরি নদীসমুদ্র অতিক্রম করিয়া বিরাট এক রণক্ষেত্রে- সুদূর পশ্চিমে আমাদের যাত্রা। কোথায় চলিয়াছি, কোথায় নামিব, যুদ্ধ করিব কোত্থানে ? আমাদের কর্নেল আর জাহাজের কাপ্তেন ছাড়া এ সব খবর কেহই জানে না। যাত্রাকালে তারাও যে খুব বেশ্যি জানি- তেন তা নয়; স্থির ছিল, মাঝে মাঝে আদেশ আসিবে। চেনাপু না ইয়ালুনদীর মােহানা, হাইচেং না পাের্ট-আর্থার অবরােধে—কোথায় যাইতেছি? কেবল অনুমান করিতে পারি, কল্পনা করিতে পারি, তার বাড়া কিছু নয়। কিন্তু যেখানেই নামি বা যুদ্ধ যেখানেই করি, ক্ষতিবৃদ্ধি নাই; অচিরে সম্রাটের আদেশে আমরা নিজ নিজ শৌর্যবীর্যের পরিচয় দিতে পারিব, ইহাই যথেষ্ট—কেবল এই চিন্তায় মশগুল হইয়া আছি। সন্ধ্যার দিকে শিমনােসেকি প্রণালী ভেদ করিলাম। জাপানের পানে “শেষ বিদায়ের চাওয়া” চাহিলাম-বিচ্ছেদের শূল বুকে বিধিল । মনে মনে কহিলাম, বিদায় ঘামাতো ! জন্মভূমি—বিদায়, বিদায়! সেদিন রাত্রে জাপান-সমুদ্ৰ স্থির নিস্তরঙ্গ ; দিনের বৃষ্টিশেষে আকাশ ; # জাপান।

পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা এখন মেঘমুক্ত ও নির্মল। চারিদিক নীরব, তাহারই মাঝে হাজার হাজার যােদ্ধ গভীর ঘুমে অচেতন। যুদ্ধাত্রার এই প্রথম রাত্রি—এ রাত্রে তাদের স্বপ্ন কোন্ পথে ধাবমান--পূৰ্বে না পশ্চিমে ? মৃদু তরঙ্গ অবাধ মণ গতি, মাঝে মাঝে একটা বিলম্বিত নিঃশ্বাসের শব্দ স্তব্ধতাকে আরও নিবিড় করিয়া তুলিতেছে। পরদিন প্রভাতে স্বচ্ছ সুমাজ্জিত আকাশ হাসিতেছে। মুৎসুরে দ্বীপপুঞ্জের পাশ দিয়া জাহাজের পর জাহাজ হু হু করিয়া চলিয়াছে, বহুদূরে ৎসুশিমার পাহাড় দেখা দিয়াছে, এমন সময় হঠাৎ একটা বাজপাখী জাহাজের ডেকের উপর আসিয়া নামিল। এ পাখীর আবির্ভাব শুভ লক্ষণ, তাই সকলে খুশীমনে তার পিছু পিছু ছুটাছুটি সুরু করিয়া দিল। মাস্তুলের উপরে বসিয়া, কখনাে আবার জাহাজের উপরে উড়িয়া ফিরিয়া পাখীটা কিছুকাল আমাদের সঙ্গ ধরিয়া রহিল। তারপর, আশীৰ্বাদ বিতরণ সাঙ্গ হইলে সে পিছনের জাহাজের সৈন্যদলকে উৎসাহ দিবার জন্য উড়িয়া গেল। দিন কয় যাইতে-না-যাইতেই মনে হইতে লাগিল, সময় যেন, আর কাটে না। দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রার একঘেয়েমির তাড়নায় যার যেটুকু পুজিপাটা ছিল সমস্তই ক্রমে ক্রমে প্রকাশ করিতে হইল। কেহ বলিতে বসিল বিগত জীবনের অভিজ্ঞতা, কেহ শুনাইতে লাগিল ভূতুড়ে কাহিনী বা হাসির গল্প, আবার আবৃত্তি বা চতি প্রেমের গানে কেহ বা আসর জমাইয়া দিল। সভ্যদের রুচি ও প্রবৃত্তি অনুসারে অনেক গুলি ঘােট ঘােট বৈঠক গড়িয়া উঠিল। মাঝে মাঝে কোন তুখোড় লােক লম্ফঝম্প ধুপধাপ করিয়া পালোয়ানী নাচ দেখাইতে প্রবৃত্ত হয়, কেহ বা সৈনিকের পোটলাটিকে বই রাখার ডেক্স পরিণত করিয়া হাতে পাখা নাড়িতে নাড়িতে পেশাদার কথকের অনুকরণ করে। জাহাজের পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা মধ্যেকার সঙ্কীর্ণ আকাশ ও পরিমিত পৃথিবী আনন্দকলরবে মুখর হইয়া ওঠে—অভিনেতাদের মুখে গর্বের ভাব দেখা দেয়। সংক্রামক উৎসাহের ফলে সেই আলুর গাদার মত মানুষের পাল থেকে ক্ষণে ক্ষণে রকমারি খেলা দেখাইবার কত লােক যে বার হয় তার আর ইয়ত্তা নাই।... সকলে যুদ্ধে চলিয়াছে—সে-যুদ্ধ থেকে কেহ ফিরিবার আশা রাখে । তাই বােধ করি সৈনিকে ও নায়কে এত মাখামাখি, এমন ভাব- সকলে যেন আত্মীয়—একই বৃহৎ পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। তাই সকলেরই চেষ্টা সকলকে খুশী করার। তাই তারা নিজ নিজ বিদ্যাবুদ্ধি অনুযায়ী খেলা দেখাইয়া, অভিনয় করিয়া সময়ের ভার কমাইতে চায়—তাই তাদের প্রাণখােল। খুশীর হাসিতে বাতাস কাঁপিতে থাকে—হাসিক চোটে সকলের পেটে খিল ধরিয়া যায়। পিছনে কুয়াসার আড়ালে ৎসুশিমাকে ফেলিয়া সাগরপথে উত্তরে চলিয়াছি—কোরিয়ার পৰ্ব্বতপুঞ্জ ও গিরিশৃঙ্গ এখনাে দেখা যাইতেছে। দিনের পর দিন তেমনি ফু—িমাঝে মাঝে আনাড়ি হাতে পিয়ানাের বাদ্য, ডেকের উপর বাজখাই সুরে রণসঙ্গীত। খেলাধূলা কুস্তিতে বিতৃষ্ণা ধরিলে যুদ্ধচালুনা-প্রণালী আলােচনা করিতে বসি। ইচ্ছা হয় রণক্ষেত্রের যবনিক। এই দণ্ডে উঠিয়া যাক্, লড়াইয়ের বহর দেখাইয়া শত্রুকে তাক লাগাইয়া দিই—সমগ্র জগৎ সমস্বরে বলিতে থাকুক সাবাস ! সাবাস! বেশ মনে পড়ে ২৩ মে তারিখে কাপ্তেন অামাদের হস্তাক্ষর চাহিলেন—যুদ্ধযাত্রার স্মৃতিচিহ্ন। একখানি কাগজের মাথার দিকে আমাদের চলন্ত জাহাজ “কাঙোশিমামারু’র ছবি আঁকিলাম। তার তলদেশে কর্নেল আওকি ও অপর নায়কেরা সহি করিলেন। সবশুদ্ধ সায়ত্রিশটি নাম—এখন তাদের মধ্যে ক’জনই বা বাঁচিয়া আছে।

পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা ১০ চব্বিশ তারিখ সকালে এলিয়ট দ্বীপপুঞ্জের পাশ দিয়া যাইবার সময় দেখিতে পাইলাম অনেকগুলি ধূমধারা আকাশ ও জলের সমান্তরালে ভাসিতেছে—জাপানের সম্মিলিত রণপোতবাহিনী অগুসার হইয়া অভ্যর্থন করিতে আসিয়াছে! মুক্ত সাগরের বুকে তাদের এই অপ্রত্যাশিত আবির্ভাবে সকলের অন্তরে সে যে কি উদ্দীপনার সঞ্চার হইল, বলা যায় না ! . দেখিতে দেখিতে একখানি ‘জার’ কাছে আসিয়া আমাদের সঙ্গ ধরিল, বােধ করি কোনাে আদেশপত্র আনিয়াছে। অবণের আর দেরি নাই -যুদ্ধক্ষেত্র সন্নিকট। তবুও জানি না কোথায় নামিব বা কোন্ দিকে যাইব। সকলেরই মনস্কামনা-পাের্ট-আর্থার। অবতরণ আমরা নামিব কোথায়? সমুদ্রযাত্রার শুরু হইতে শেষ পর্যন্ত এই প্রশ্ন কেবলই মনে জাগিয়াছে। এ সম্বন্ধে জল্পনা-কল্পনার অন্ত ছিল না। জাহাজের গতি পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তারও ঘন ঘন বদল হইতে লাগিল, শেষে যখন জাহাজের যাত্রাপথের নক্সায় দেখিলাম আমরা এলিয়ট দ্বীপপুঞ্জের দক্ষিণে চলিয়াছি, তখন আমাদের গন্তব্যস্থল যে পাের্ট-আর্থারের পথে কোথাও হইবে তাহা সকলে নির্বিবাদে মানিয়া লইলাম। সৈন্যবাহী জাহাজ শান্ত্রী জাহাজের সঙ্গে সেই দিকেই চলিল দেখিয়া আমাদের উত্তেজনা ও আনন্দের আর সীমা রহিল না।

। ১১ পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা কিছুকাল পরে ঘন কুয়াসার জাল ভেদ করিয়া গাঢ় পাণ্ডুবর্ণ দীর্ঘাকৃতি একফালি ভূখণ্ড অস্পষ্টভাবে দেখিতে পাইলাম। উহাই লিয়াওতুং উপদ্বীপ। ওখানেই দশ বৎসর আগে জাপানের কত একনিষ্ঠ সাহসী সন্তান অস্থি রক্ষা করিয়াছে। ঐ যুদ্ধক্ষেত্রেই আমাদের দেহও ফেলিয়া যাইতে হইবে । কাল সন্ধ্যা হইতে আকাশ অন্ধকার, ধূসর কুয়াসা ও মেঘ ক্ষণে ক্ষণে আসা যাওয়া করিতেছে, মাস্তুলের মাথায় বাতাস খসিতেছে, ঢেউএর পর ঢেউ জাহাজের মুখে আছাড় খাইয়া চূর্ণবিচূর্ণ হইয়া তুষারকণার মত উড়িতেছে, ঝরাফুলের মত ছড়াইয়া পড়িতেছে।পিছনে কেবল মেঘ আর জল—তার আদি নাই, অন্ত নাই। ঐ মেঘেরও পশ্চাতে আছে, জাপানের আকাশ ! সুবিপুল জয়ধ্বনি, বৃদ্ধা নারীদের হাতে জপের গুটির শব্দ, নিস্পাপ শিশুকণ্ঠের রণসঙ্গীত—সমস্তই যেন এখনাে ঝােড়াে-হাওয়ার উপর ভর করিয়া কানে আসিয়া পৌছিতেছে। উপদ্বীপের পূর্বে মেন্তা-আও উপসাগর, চীন-সমুদ্রের এক ক্ষুদ্র শাখা। সেখানেই আমরা নামিব। নিকটে ভাল বন্দর কোথাও নাই, আছে জ্বালিয়েনওয়া—তা’ও শত্রুর অধিকারে। অগত্যা দায়ে পড়িয়া বিপদের সম্ভাবনা সত্ত্বেও এইখানেই আমাদের নামিতে হইবে। এখানে সমুদ্র বা তার শ্রোত, কিছুর উপরই বিশ্বাস নাই—সামান্য একটু ঝড় উঠিলে নামা ত দূরের কথা, নঙ্গর করিয়া থাকাও কঠিন। তা ছাড়া এখানকার জল অগভীর, বড় জাহাজ মাত্রেই তীরভূমি হইতে ক্রোশাধিক পথ দুরে নঙ্গর করে। বাতাস জোরে বহিলে জাহাজ ভাসিয়া কয়েক ক্রোশ তফাতে সরিয়া যাইতে পারে। এরূপ অবস্থায় অবতুরণের তদ্বির যারা করিবেন তাদের ক্লেশ ও উদ্বেগ সহজেই অনুমেয়। পাখীর মা শাবককে যেমন করিয়া আগলায় আমাদের রণপােতগুলিও ০ । পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা ২ তেমনি নিকটে ও দূরে সতর্ক পাহারা দিতেছে, পাছে নামার সময় অতর্কিতে শক্ত অক্রিমণ করে। বিপদ আসিল কিন্তু অন্যরূপে। সকালে যে বাতাস বহিতে সুরু করিয়াছিল, ক্রমেই তার বেগ বৃদ্ধি হইতে লাগিল। বীচিবিক্ষুব্ধ অশান্ত সাগর পাহাড়প্রমাণ হইয়া উঠিল— তার উপর সৈন্যবাহী জাহাজ ও সাম্পান’ # উড়ন্ত পাতার মত দুলিতে লাগিল। বাতাসে বিপৰ্য্যন্ত ভাড়াটে চীনা নৌকার মাস্তুলগুলাে অরণ্যের বৃক্ষরাজির মত—মনে হয় যেন হাকাত-উপসাগরে মােঙ্গল-আক্রমণের একখানি প্রকাণ্ড ছবি দেখিতেছি। এমন ঝডে-কি নিরাপদে নামা সম্ভব? তীরে পা দিয়াই কি শত্রু সম্মুখীন হইতে হইবে? আমাদের অবস্থা গাড়িতে জোতা ঘোড়ার মত—আশপাশের খবর কিছুই জানি না। কেবল কর্নেলই সমস্ত জানেন তারই হাতে আমাদের জীবন মরণ। সে যাই হােক, আমরা জানি আপাতত সম্মুখে আমাদের দুটি কাজ—তীরে নামা ও হাঁটিয়া চলা। ক্ষণকাল অপেক্ষার পর বিপদের সম্ভাবনা সত্ত্বেও অবতরণ শুরু হইল—বােধ করি যুদ্ধের যে অবস্থা তাহাতে বিলম্ব সহে না। শত শত নৌকা, সাপা’ ও ষ্টিমার সৈনিক ও নায়কদিগকে বহিবার জন্য জাহাজ ঘিরিয়া ফেলিল। এ সব কোথা হইতে কিরূপে আসিল কে জানে? অতিকায় তরঙ্গ পাহাড়ের মত উচু হইয়া উঠিতেছে আবার পরক্ষণেই উপত্যকার মত গভীর গহ্বরে নামিয়া আরােহীসমেত নৌকাগুলােকে যেন গ্রাস করিয়া ফেলিতেছে। সময়ােচিত গাম্ভীর্যের সহিত পতাকা লইয়া কর্নেলের সঙ্গে একই নৌকায় উঠিলাম। এক এক ষ্টিমারের সঙ্গে অসংখ্য ছােট নৌকা বাঁধা— জপমালার * চীন ও জাপানে ব্যবহৃত ছােট নৌকা—আমাদের পাসির মত।

পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা গুটির মত। উঠিয়া পড়িয়া ধাক্কাধাক্কি করিয়া বাঁশি বাজাইয়া নৌকার মালা তীরের দিকে অগ্রসর হইতে লাগিল। যথাসময়ে যুদ্ধপতাকা ঝড়ল তুচ্ছ করিয়া নিরাপদে তীরে উত্তীর্ণ হইল। শত্রু-অধিকৃত ভূমিতে পা বাড়াইলাম—একবার...দুইবার। মনে হইল মাত্র কাল যেন পিতৃভূমি ছাড়িয়াছি, আর এখন ইহারই মধ্যে, স্বপ্নে নয়, সদ্যসত্যই আকাঙ্ক্ষিত দেশের উপর পদক্ষেপ করিতেছি। মহামহিম সম্রাটের পতাকা পুনৰ্বার লিয়াওতুং উপদ্বীপের বুকে প্রতিষ্ঠিত করিলাম—এ কি অপূৰ্ব আনন্দ! ভ্রাতৃরক্তপূত এই ভূমি— এ মাটির সঙ্গে জাপানের মাটিও যে অচ্ছেদ্য বন্ধনে জড়াইয়া আছে ! ঝড়ের বেগ বাড়িয়াই চলিল—মনে হইল সকলের তীরে পৌঁছান অসম্ভব, অথচ জাহাজে ফিরিবারও উপায় নাই। একমাত্র উপায়, নৌকা তীরের কাছাকাছি আনিয়া জলে ঝাপ দিয়া জলঝড়ের সঙ্গে। যুঝিয়া কোনো গতিকে তীরে আসিয়া ওঠা। কাপ্তেন ৎসুকুদো তার অধীনস্থ সাটজন আন্দাজ সৈনিক লইয়া একখানি নৌকায় চড়িয়া ছিলেন। ছােট একখানি ‘মিলঞ্চ’ সেই নৌ টানিয়া তীরাভিমুখে আসিতেছিল। উত্তাল তরঙ্গের মাঝে পড়িয়া নৌকাখানির, দুর্দশার একশেষ। উহা বলের মত ইতস্তত বিক্ষিপ্ত হইতে লাগিল—মনে হইল সমুদ্র অচিরে উহাকে গ্রাস করিবে। গতিক দেখিয়া নৌকার বাঁধন কাটিয়া দিয়া লঞ্চখানি রণে ভঙ্গ দিল। কথায় বলে, যে অতিকায় হাে’ • দশ হাজার মাইল অবিরাম ছুটিতে সক্ষম, সমুদ্র-তরঙ্গ তার পাখাও না কি ভাঙিয়া দিতে পারে! মনে হইল, মাছের পেটে সমাধিলাভ করা ছাড়া অতি দুঃসাহসিকেরও আর কাল্পনিক পাখী।

পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা ১৪ গতি নাই! উদ্ধার অসম্ভব, বিধির বিধান মানিতেই হইবে! মরণের জন্য তারা প্রস্তুত, কিন্তু হাতের কাছে যে-শত্রু, তার প্রতি একবার অক্ষেপ করিবার আগেই সমুদ্রের জঞ্জালে পরিণতি...এ যে একেবারে অসহ। কাপ্তেনের মাথার চুল খাড়া হইয়া উঠিল, চোখে রক্তের উচ্ছাস— সৈনিকদিগকে রক্ষা করিবার জন্য তিনি প্রাণপণে যুঝিতে লাগিলেন। কিন্তু হায়! নির্জন প্রান্তরে প্রাচীন পরিত্যক্ত কূপের মধ্যে নিপতিত ব্যক্তির মতই যে তাদের অবস্থা ! ডুবিতেছে না, অথচ উঠিতেও পারে না—প্রারক্ষার আশায় লতাগুল্ম আঁকড়াইয়া ধরিয়া দেখে বন্য মুষিক তারও মুলােচ্ছেদ করিতে আরম্ভ করিয়াছে । পরিশেষে মরিয়া হইয়া কাপ্তেন সমুদ্রে ঝাপ দিলেন, তারপর তীরের দিকে সাঁতার দিয়া চলিলেন—কিন্তু তার অধীর অদম্য আগ্রহের কাছে, নিষ্ঠুর তরঙ্গ হার মানিল না। তারা নির্দয়ভাবে তাকে ক্ষণে গ্রাস ক্ষণে উদ্গার করিয়া তালগোল পাকাইয়া লােফালুফি করিতে সুরু করিল। তীরে পৌছিবার পূর্বেই প্রান্তিভারে অবসন্ন হইয়া তিনি জ্ঞান হারাইলেন। বিধাতা কিন্তু তাহাকে পরিত্যাগ করিলেন না। জ্ঞানলাভ করিয়া তিনি দেখিলেন, সমুদ্রতীরে সম্পূর্ণ বিবস্ত্র অবস্থায় পড়িয়া আছেন। নগ্ন দেহ আবৃত করিবার তর সহিল না, তিনি তদবস্থায় তীরবতীর্ণ সৈন্থদলের ছাউনিতে ছুটিয়া গেলেন। তারপর উন্মাদের ভঙ্গীতে ইসারায় ইঙ্গিতে নৌকাবােহী অনুচরদের জন্য সাহায্য ভিক্ষা করিতে লাগিলেন। তখন তার অশ্রু শুকাইয়া গেছে—কাঁদিবার শক্তিও নাই। আড়ষ্ট মুখে বাকশক্তি লােপ পাইয়াছে। শেষ পর্যন্ত তার সৈন্যদল মৃত্যুমুখ হইতে রক্ষা পাইয়াছিল।

পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা । মনের মাঝে যে দেশের ছবি আঁকিয়াছিলাম সে কি এই দেশ ? বৎসর আগে জাপানী হৃদির দিয়া এই স্থান কিনিয়াছিল—আজ দেখিয়া ত বিশ্বাস করিতে প্রবৃত্তি হয় না! এ যে রুক্ষ শুষ্ক জনহীন মরুপ্রান্তর, এক পরিত্যক্ত বালুকাবিথার, তরঙ্গায়িত ভূমির অসীম প্রসার! একঘেয়ে নগণ্য পটভূমিকার উপর কেবল যেন গাঢ় লাল আর তরল ধূসরের প্রলেপ ! জাপানের যে বিচিত্র ও পরিপূর্ণ রূপ দেখিতে আমরা অভ্যস্ত, তার তুলনায় এ ছবির সর্বত্র একটা অমার্জিত অসম্পূর্ণ অযত্নের ভাব পরিস্ফুট। অবতরণস্থলে ঘােড়া ও মালগাড়ি লইয়া কাজের প্রত্যাশায় শত শত চীনা জমা হইয়াছে—এও একটা নূতন দৃশ্য বটে! এরা মানুষ না জন্তু? দুষমণ চেহারা, ফিসফিস করিয়া পরস্পরে কথা কয়, তারপর আগাইয়া চলে। দুষ্ট লোেক হিসাবে তারা প্রীতিলাভের অযােগ্য সন্দেহ নাই, কিন্তু এই কু-শাসিত রাজ্যের প্রজা হিসাবে তারা নিশ্চয়ই অনুকম্পার যােগ্য। গোড়ায় গােড়ায় তারা জাপানীকে ভয় করিত, দূরে দাঁড়াইয়া আমাদের লক্ষ্য করিত নিকটে আসিত না। সম্ভবত রুশেরা তাদের ধনসম্পত্তি লুট করিয়াছে, স্ত্রীকন্যাকে বেইজ্জত করিয়াছে। স্থানীয় লােকেদের প্রতি যাহাতে ন্যায়ানুগত সহৃদয় ব্যবহার করা হয়, দৈনিক কর্তব্য যাহাতে তারা নিরাপদে সম্পাদন করিতে পারে সেদিকে জাপানী সৈন্যদল বিশেষ দৃষ্টি রাখিয়াছিল। ফলে অচিরে তাদের মন আমাদের প্রতি অনুকূল হইয়া উঠিল—সাগ্রহে তারা আমাদিগকে অভ্যর্থনা করিতে লাগিল। তবুও বলিতে হয়, তারা এমন জাতের লােক যারা অর্থলােতে নিজের জীবন পর্যন্ত বিপন্ন করিতে পারে, পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা দশহাজার মোহর পকেটে থাকিতেও যারা শূকরের খােয়াড়ে বাস করে ! “আতা, আত।! গাে, গাে!”—সর্বদা এই অদ্ভুত বুলি শুনিতে পাই, চীনারা এই বলিয়া গরু ঘােড়া চালনা করে। গৃহপালিত পশু পরি- চায় তারা আমাদের চেয়ে ঢের বেশি নিপুণ। জীবজন্তু তাদের এমন আজ্ঞাবহ দেখিয়া অবাক হই। ইসরার শব্দে তারা বামে বা দক্ষিণে যায়—চাবুকের ব্যবহার আদৌ নাই, অথচ তারা চলে চালকের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের মতই সহজে। এই সব চীনা ও তাদের পালিত জীবদের মধ্যেকার সম্বন্ধ সুশিক্ষিত সৈন্যদলের সঙ্গে তাদের নায়কের সম্বন্ধের মত। যুদ্ধে পারদর্শিতা ও নিয়ম মানিয়া চলার মূলে বেত বা ধমকের ভয় নাই—আছে শ্রদ্ধা, প্রীতি ও বাধ্যতা। অনেক হাঙ্গামার পর কয়েকটি দল তীরে নামিল। বাদবাকির অবতরণ ঝড়ের উপদ্রবে স্থগিত রাখিতে হইল। কর্নেল, দোভাষী ও রক্ষীর সঙ্গে রাত্রি-আবাস অভিমুখে যাত্রা করিলাম। ম্যাপ ও কম্পাস লইয়া আমরা যখন ব্যস্ত, দোভাষী তখন প্রশ্নের পর প্রশ্নে চীনাদের ব্যতিব্যস্ত করিয়া তুলিল। চীনা-জাপানী বাক্যালাপের বইখানা বার করিয়া ভাঙা-ভাঙা ভাষায় জিজ্ঞাসা করিলাম, “কশসৈন্য— তারা কি আসিয়াছে ?” জবাব পাইলাম, “পােট-আর্থারে তারা পালাইয়াছে।” অবিলম্বে শসম্মুখীন হইতে না পারিয়া আমরা নিরাশ হইলাম। বালুকাময় সমতলের উপর দিয়া প্রায় নয় ক্রোশ পথ হাঁটিয়া সন্ধ্যার মিয় বৃষ্টি ও বাতাসের মধ্যে ‘উইলাে’-ঢাকা গ্রামে গিয়া পৌছিলাম। অজানা পাখীর দল তখন দ্রুতগতি নীড়ে ফিরিতেছে। বােকাটে বুড়া আর নােংরা ছোঁড়ার দল পিপড়ের মত চারিদিকে ১৭ সীম। । ০ পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা জড়ো হইয়া আমাদিগকে লক্ষ্য করিতে লাগিল। তাদের কৌতুহলের নাই বুড়োদের মুখে লম্বা লম্বা ধূমপানের নল—দেখিয়া মনে হয় দেশে যে বিষম বিপদের সূচনা হইয়াছে, সে-সম্বন্ধে তারা সম্পূর্ণ উদাসীন অথবা অচেতন। যেমন সব বাড়ি তেমনি তাদের বাসিন্দা—সে যে কি নোংরা, ভাষায় বর্ণনা করা যায় না। নবাগত আমরা উৎকট দুর্গন্ধে অস্থির হইয়া মুখ ফিরাইয়া দাড়াইলাম। নামেই, ছাউনি—বাড়ির আলিসার তলে আশ্রয় লইয়াছি। এখানেও ছােট বড় চীনার ভিড়, তাদের গায়ে রসুনে..গন্ধ দুরভুর করিতেছে। ক্ষুধায় আমরা কাতর, তবুও গরম গরম ভাতের নীড় পেটের মধ্যে গিয়াই সেই দুর্গন্ধে আবার বাহির হইয়া আসিতে চায়। লিয়াওতুঙে প্রথম রাত্রি এইভাবে কাটিল। . তৃণশয্যায় আধখোলা তঁাবুর তলে শীত ও বৃষ্টির উৎপাত অগ্রাহ্য করিয়া অনেকে গভীর ঘুমে মগ্ন হইল। কেহ কেহ সারা রাত খড়ের ধোয়াটে আগুনের ধারে বিনিদ্র বসিয়া বসিয়া চিন্তার অতলে ডুবিয়া গেল। পাথরের দেওয়ালে খাবারে কৌটাগুলি ঝুলিতেছে, সেদিকে দৃষ্টি নাই—বিদায়কালে- পাওয়া খাবার তার। অনিমনে চিবাইতেছে। ভোর হয়-হয়, এমন সময় পশ্চিমাকাশ বিদীর্ণ করিয়া সহসা বিদ্যুৎ ঝলসিয়া উঠিল, মুহুর্মুহু বজ্রধ্বনি হইতে লাগিল। ব্যোমচারী বিদ্যুৎ নয়—অগ্নিশিখা; বজ্রনিনাদ নয়-কামনিগর্জন। প্রবল বাতাস উঠিয়ং দৃশ্যটাকে আরও ভয়াবহ করিয়া তুলিল—দেখিতে দেখিতে আকাশে যেন রক্তের ছোপ ধরিয়া গেল ! নাশানের যুদ্ধ শুরু হইয়াছে।

নানশান নাশানের দিকে সেই আগুনের খেলা কনে ভীষণ ও উদ্দাম হইয়া উঠিল। লড়াইয়ের খবর কি ? আমাদের দল সাহস ও অধ্যবসায়ের পরিচয় দিতেছে ত? জায়গাটা দখল হইল, না এখনাে চেষ্টা চলিতেছে ? এই আমাদের প্রথম যুদ্ধ-এ যুদ্ধে যােগ দিতে হইলে তৎপরতার প্রয়ােজন, এমন সুযােগ হেলায় হারাইবার নয়। কিন্তু যাত্রার হুকুম আন্দে কই- “মন নাশানের পানে উধাও হইল, অসহিষ্ণুতার আর সীমা নাই। ওদিকে, আমাদের অনুবর্তী দল নিরাপদে তীরে অবতীর্ণ হইল কি না, জানি না। কনেলের হাতে মাত্র পাঁচশ’ লােক—নিতান্ত ছােট একটি দল। এই ক’জন সৈনিক লইয়া তিনি কি অগুসার হইবার সাহস করিবেন? তাঁর চিন্তাক্লিষ্ট মূখ দেখিয়া বুঝিলাম, অবিলম্বে আমাদিগকে রণক্ষেত্রে হাজির করা সম্ভব নয়। তবে কি কেবুল দূর হইতে যুদ্ধটি দেখিব সাহায্যে অগ্রসর না হইয়া ?, নদী এপারে দাঁড়াইয়া ওপারের অগ্নিকাণ্ড দেখার মত? মন নিরাশায় ভরিয়া উঠিল। অবশ্য যুদ্ধ দীর্ঘকাল চলার সম্ভাবনা সবে যবনিকা উঠিয়াছে—এই নাশান্ ত আর শেষ অঙ্ক নয়। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রের এত কাছে আছি, অথচ শত্রু-সম্মুখীন হইবার উপায় নাই ; যুদ্ধের আওয়াজ পাইতেছি অথচ সেদিকে যাইতে পারি না—এ অবস্থা বউই ক্লেশকর। কথায় বলে—যে অপেক্ষা করে সবই তার কাছে আসে। একদিন আদেশ পেীছিল–কমাণ্ডার ওকুর নেতৃত্বে দ্রুতগতি নাশা যাত্রা পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা করাে! কর্নেল আদেশটি ঘোষণা করিলে সকলে এমন খুশি হইল যেন দৈববাণী শুনিয়াছে! যাত্রার জন্য ত তারা পা বাড়াইয়াই আছে— এখন কেবল চলল, চলল, ছুটিয়া চলো! পা দুইটা যথাসম্ভব বিস্তৃত করিয়া ক্ষেতের পর ক্ষেত, গ্রামের পর গ্রাম পদাঘাতে পশ্চাতে ফেলিয়া চলিলাম, কত ক্রোশ ছুটিলাম সে-চিন্তা একবারও মনে অসিল না। শক্রর মূর্তি চোখের সুমুখে যেন ভাসিতেছে, তাই বেদনা বা শান্তিবােধ নাই। স্বেদবিন্দু আর পায়ের ধূলা মুখের উপর যেন মুখােস পৱাইয়া দিল—কিন্তু তাহাতেই বা ক্ষতি কি? দেখিতে দেখিতে জলের বােতল খালি হইল, গলা শুকাই কাঠ হইল, শ্বাসরোধ হইবার উপক্রম, তবুও একটি লােক শ্ৰেণীচ্যুত হইল না। শত্রুর কল্পিত আস্তানার দিকে চাহিয়া কামান গর্জনের পানে ছুটিয়া চলিয়াছি-শ্রান্তি, বেদনা বা বাধাবিঘ্নের কথা আর মনে নাই। “নাশা এখনাে টিকিয়া আছে ত?” “লড়াই জমে উঠেছে, চটপট যাও!” এমনি কথাবার্তা না-ফেরতা কুলি ও সৈনিকদের মধ্যে প্রায়ই শােননইতেছে! কথাটা শুনিতে বােকার মত হইলেও, কামনা করিতেছিলাম, যেন আমন্না পৌছানর পূর্বে নাশানের পতন না হয়। হয় ত মনে আমাদের গর্ব ছিল, আমাদের মত তাজা সৈন্যদলের সাহায্য বিনা পরিশ্রান্ত যােদ্ধারা স্থানটা দখল করিতে পারিবে না ! পথে দেখিলাম জন দুই তিন শত্রুপক্ষীয় নায়ক বন্দী অবস্থায় জাপানী শিবিরে নীত হইতেছে। দেখিয়া মনে যুগপৎ আনন্দ ও আশঙ্কার সঞ্চার হইল। পরাজিত শত্রুর প্রথম দর্শন লাভে আনন্দ এবং নাশা হয় ত ইতিমধ্যে অধিকৃত হইয়া গেল এই আশঙ্কা! পথ চলা অভ্যাস করিবার জন্য যখন সৈন্যদল ‘মার্চ করে; অথবা যুদ্ধের পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা সময়, কিন্তু ঠিক লড়াইয়ে যোগ দিবার জন্য নয়—তখন তাদের বিশ্রাম ও আহারের যতদূর সম্ভব ব্যবস্থা থাকে। কিন্তু যখন একটা চলতি লড়াইয়ে যােগদানের জন্য তারা চলে, তখন ঝড়ঝঞ্চা উপেক্ষা করি খাদ্যপানীয় ব্যতিরেকেই চলিতে হয়। প্রত্যেক সৈনিকের সঙ্গে সের দশেক ওজনের একটি করিয়া পুটুলি ও একবােতল করিয়া জল থাকে। বােতল খালি হইবার পর আর এক ফোটা জল পাওয়ার উপায় নাই। দিনের পর দিন মাঠের মাঝে তাঁবু গাড়িয়া বিশ্রাম বা নিদ্রা-ঝড়বৃষ্টি যতই হােক, সেইখানেই থাকিতে হয়, বাড়ির কার্নিশের তলেও আশ্রয় লইতে পারেন। শ্রান্তির অবসাদ বা, ব্যথাবােধের অজুহাতে মুক্তি নাই। মুখের ঘাম মুছিবার সময় নাই, তাহা নােনা বাতাসের সংস্পর্শে অচিরে জমিয়া সাদা হইয়া ওঠে। শ্বাসরােধ হইবার উপক্রম, তবুও হাঁপাইতে হাপাইতে সে কোনােগতিকে অগ্রসর হয়। মানুষকে এই অগ্নিপরীক্ষার মধ্যে ফেলা হয়ত নিষ্ঠুর বােধ হইতে পারে, কিন্তু কর্তব্যের খাতিরে সুখসুবিধা সব যে ত্যাগ করিতেই হয়। একজন সৈনিকেরও ত পিছাইয়া পড়িলে চলে না—আক্রমণ যার করিবে, তাদের দলে একটি বন্দুকের অভাবও যে মুস্ত অভাব। এমনি দুরূহ মার্চের পর সৈনিকেরা তখনি ভীষণ যুদ্ধে নিযুক্ত হয়। তবেই দৈখা যাইতেছে, যুদ্ধে জয়-পরাজয় ‘মার্চ’ করিবার সমনেই একরকম নির্ধারিত হইয়া যায়। এই জন্যই শান্তির সময়েও সৈনিকদিগকে জলপান না করিয়া ‘মার্চ’, রাত্রিকালে ‘মার্চ এবং দ্রুত মার্চে তালিম দিতে হয়। মহােৎসাহে ধাবিত হইতেছি—বলা উচিত, উন্মত্তের মত চলিতেছি —প্রথম যুদ্ধে মনে কেবল এই চিন্তা। ক্রমে গন্তব্য স্থানের কাছাকাছি পৌছিলাম, গাছের তলায় ও পাহাড়ের গায়ে, চুচলাে শিবিরশ্রেণী • ২১ পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা চোখে পড়িল। সেগুলি হাসপাতাল। তঁাবুর সংখ্যা দেখিয়া যুদ্ধের ফল সম্বন্ধে ভাবনা হইল। খাটিয়ার পর খাটিয়ায় আহতেরা আসিতেছে। তাদের নামাইয়া বাহকের আবার ছুটিতেছে যুদ্ধক্ষেত্রে, আরও আনিবার জন্য। চলার শক্তি যাদের লোপ পায় নাই, তারা খাটিয়ার পিছু পিছু আসিতেছে, দলে দলে—সারা পথ হাঁপাইতে হঁপাইতে। খাটিয়া-শায়িত বা পদচারী-সকলেরই দেহ রক্তে কাদায় মাখামাখি । শােণিতসিক্ত সাদা ব্যাণ্ডেজে সম্মানের ক্ষতচিহ্ন আবৃত খাটিয়ার ভিতর দিয়া ফোটা ফোটা রক্ত পড়িয়া মাটিকে মহিমান্বিত করিতেছে । এমন সময় যে দুত আদেশ লইবার জন্য অগ্রগামী হইয়াছিল, সে ফিরিয়া আসিল, খবর দিল—নাশা দখল হইয়াছে ! সমস্ত ‘রিজার্ভ সৈন্য চুংচিয়াতুনের নিকটে আড্ডা গাড়িয়া নূতন আদেশের প্রতীক্ষায় থাকুক। শুনিয়া, নায়ক হইতে ঘোড়ার সহিস পৰ্য্যন্ত সকলেই দুঃখে ও নিরাশায় নির্বাক হইল। সত্য বটে শত্রুপক্ষের কাছে নাশা ছিল পােট-আর্থারের চাবির মত ; সেই স্থান দখল হওয়ায় আমাদের ভবিষ্যখ যুদ্ধপ্রণালী নিয়ন্ত্রিত করার পক্ষে বিশেষ সুবিধা হইল। সংবাদে আনন্দ প্রকাশ করা উচিত ছিল, এবং আমরা অবশ্য তাই করিলাম। চবে নিরাশ হইলাম বলিয়া দোষ দিলেও চলিবে না, জাহাজ ছাড়িয়াই একদমে ছুটিয়া, আসিতেছি, তারপর যথাস্থানে পৌছিয়া শুনি, আমাদের কাজ অন্যে শেষ করিয়াছে। মাত্র একটি পাহাড় আমাদের সম্মুখে—তারপর রক্তস্রোত আর মৃতদেহের স্তুপ। সেখানে পৌছিতেই শ্রবণবিদারী কামান-গর্জন সহসা থামিয়া গেল—গিরিশ্রেণী ও উপত্যকা আবার অনাদি স্তব্ধতার মাঝে অবগাহন করিল। আহতেরা অবিরাম চলিয়াছে—ইহাই কেবল পোর্ট-আর্থারের ক্ষুধা ২২ দেখিতেছি। দেখা হইলেই তাদের সান্ত্বনা দিই—তাদের কীর্তির জন্য সাধুবাদ করি। এখন পাহাড়ের তলায় বিশ্রামের পালা। যুদ্ধফের এক সহিস সগর্বে লড়াইয়ের বর্ণনা শুরু করিল। মাথা দুলাইয়া হাত নাড়িয়া পেশাদার কথকের মত বলিতে লাগিল—শুনিতে শুনতে আমাদের মনে ভারি উত্তেজনার সঞ্চার হইল একটি জলের বােতল দেখাইয়া বলিল, সেটি এক রুশ সৈনিকের সত্তি। তার বলার ভঙ্গীতে মনে হইতেছিল সে যেন একাই শত্রুপক্ষকে পরাভূত করিয়াছে ! আমরা এখনাে বন্দুকে টোট। ভরি নাই, খাপ হইতে তলােয়ার খুলি নাই, তার কথা শুনিয়া দমিয়া গেলাম, বিষম লজ্জা বােধ হইল। জানি, সহিসটা কিছু অর যুদ্ধ করে নাই, তবুও কেমন মনে হইতে লাগিল, সে যেন একটা মস্ত বীরপুরুষ ! প্রচুর তারিফ করিতে করিতে তার কাহিনী যেন আমরা গিলিতে লাগিলাম । কত প্রশ্নই যে তাহাকে করিতে লাগিলাম তার আর হিসাব নাই। চুংচিয়াতুনে রাত্রিবাস করার আদেশ আসিল। আবার একই রাস্তা ধরিয়া ক্রোশদুই পথ পিছনপানে চলিতে হইবে! এবার আর উৎসাহ নাই—সৈনিকেরা যেমন ঘােড়াগুলাও তেমনি, মা নীচু করিয়া পায়ে পায়ে হাঁটিয়া চলিল। পথ হইতে পীতাভ ধুলা উড়িতে লাগিল, তার আবরণে ক্রমে আমাদের মুর্তি হইল যেন হলদে-মটরগুড়াে-মাখাননা ফুলরী। নাশানের কথা ভাবিতে ভাবিতে দিনরাত অবিরাম যখন হাঁটিয়াছিলাম, তখন মােটেই পা ব্যথা করে নাই, এখন ফিতি পথে সমস্তই উল্টাইয়া গেল। পা যেন আর চলে নাইট পাটকেল মাড়াইয়া ফেলি, খানাখন্দে পা পড়ে, মেজাজ বিগড়াইয়া যায়, দেহে মনে কোথাও পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা যেন আর শক্তি নাই—সমস্তই শিপিল হইয়া পড়িয়াছে। পুরুষানুক্রমে জাপানী যে-মনোভাৰ অৰ্জন করিয়াছে, তার মধ্যে পিছুহটার স্থান নাই—নিশ্চিত মৃত্যুমুখেও নয়। যুগে যুগে কঠিন নিম্নম পালনের দ্বারা এই মনােভাব দৃঢ়তর হইয়াছে, তাই বোধ করি পিছন পানে চলিতে এত কষ্ট । শেষ পর্যন্ত চুংচিয়াতুন পৌছিলাম। জনশূন্য গ্রাম, মাঝ দিয়া এক স্রোতস্বতী প্রবাহিত। চাদের মুখ স্নান পঙুির, আকাশ নক্ষত্রবিরল। নাতৃরূপা প্রকৃতি তৃণশয়নে নিদ্রিত, শ্রান্ত ক্লান্ত আশাহত সৈনিকের দুঃপের ভাগ’ যেন লইয়াছে—সেদিন যুদ্ধে যারা মরিয়াছে, তাদের শোকে সে যেন মর্মাহত। রাত অনেক, তবুও মাঝে মাঝে বিনিদ্র লােক চোখে পড়িতেছে—নব নব ভাবের আনাগোনায় বােধ করি মন তাদের 'অশস্তি। শূন্যপথে গাবমান কোকিলের বিক্ষিপ্ত কুহুরব, ঘুমহারা সৈনিকের কণ্ঠে ‘বিওয়া’* গানের দুই এক পদ গুনগুনানি-রাত্রির কি বিষঃ নিঃসঙ্গ মূৰ্ত্তি যুদ্ধশেষে কোনেগিতিকে চুংচিয়াতুনে যে রাত্রি কাটাইলাম। পরদিন সকালে নাশনের তলায় এক গ্রামে আজ্ঞা গাড়ির আদেশ আপিল। আমাদের রেজিমেন্টের পঞ্চম ও ষষ্ঠ দল নাশানের পাহারায় মােতায়েন হইবে। * তারের বাদ্যযন্ত্র।

পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা ২৪ নানে পৌছিলাম। । খাড়া পাহাড়টার মাথায় উঠিয়াই, দেখি এক বহুবিস্তৃত তরঙ্গায়িত ভূমি। তার দক্ষিণে কিচ্চাউ ও বামে তাহােশাংসানি পাহাড়। কালকের ভীষণ যুদ্ধ এখানেই হইয়াছিল। সামনের এক পাহাড় থেকে সাদা ধোয়া উঠিতেছে--বহুদুর পর্যন্ত উহা একটা অদ্ভুত গন্ধ ছড়াইতেছিল। সাহসী সৈনিকদের মৃতদেহের সৎকার হইতেছে—রণক্ষেত্রের বেদীর উপর দেশের জন্য যারা প্রাণ দিল তাদের দেহ ভস্মে পরিণত হইতেছে ! ধূমাবরণে দেশভক্তের শত শত আত্মা স্বর্গে চলিয়াছে! টুপি খুলিয়া উদ্দেশে নমস্কার করিলাম। ঘরে যখন মা ছেলের কথা ভাবিতে ভাবিতে নাটাইয়ে সুতা জুড়াইতেছে আর পত্নী শিশুকে পিঠে বঁধিয়া সেলাই করিতে করিতে পতিচিন্তা করিতেছে, তখন যুদ্ধক্ষেত্রে সেই সব সন্তান ও পতি খণ্ড-বিখণ্ড চূর্ণবিচুর্ণ হইয়া ধূমপুঞ্জে পরিণত হইতেছে ! উপত্যকার তলে বা পাহাড়ের ধারে মৃতদেহের স্তুপ—সেইসব দেহে গাঢ় রক্তের কালাে দাগ। মুখ নীল, চোখের পাতা ফুলে-ফুলে, রক্ত ও ধুলামাখা চুলে জট বাঁধিয়াছে, সাদা সাদা দাঁত ঠোট চাপিয়া বসিয়াছে। পােষকের লালটারই কেবল বদল হয় নাই। দৃশ্য দেখিয়া কঁপিয়া উঠিলাম। মনে হইল, আঁমি শীঘ্রই অমনি হইব—কাছে গিয়া ভাল করিয়া যে দেখিব এমন সাহস কাহারও হইল । আতঙ্কে ও বিতৃষ্ণায় দূর হইতে আঙুল বাড়াইয়া দেখাইতে লাগিলাম। রক্তমাখা পাদচ্ছদ (gaiters ), পােষাক, টুপি ও অন্তবাসের (underwear) টুকরা সর্বত্র ছড়াইয়া আছে—চারিদিকে পূতিগন্ধ, বীভৎস দৃশ্য। শত্রুপক্ষের খাতের (trench) ধারে ধারে অসংখ্য বারুদের বাক্স ও খালি কাজের গাদা—তারা আক্রমণকারীদের উপর কতটা মরিয়া হইয়া গুলি চালাইয়াছে তাহারই স্পষ্ট প্রমাণ।

২৫ পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা শত্রুসৈন্যের মৃতদেহ দেখিলেই তাদের প্রতি সহানুভূতি জাগিতেছে ; মনে হইতেছে, হােক শত্রু, তারাও ত স্বদেশেরই জন্য প্রাণ দিল । সঙ্গে তাদের সমাহিত করা হইল, কিন্তু এই পরাজিত বীরদের নাম আমরা জানি না—ভবিষ্যতে যারা আসিবে তাদের জন্য সেনাম রাখিয়া যাইতে পারিলাম না। গৃহে তাদের পিতামাতা, পন্নী বা সন্তানেরা জানিতে পারিবে না—কবে, কোথায়, কেমন করিয়া তাদের প্রিয়জন প্রাণ হারাইল। প্রায় সকলেরই বুকে ক্রুশচিহ্ন কিম্বা হাতে “আইকন”। আশা করি মৃত্যুকালে তারা ভগবানের করুণা লাভ করিয়াছে। কারও কারও পােমাকে নম্বর ছিল, সেগুলি আমরা শত্রুপক্ষকে জানাইয়াছিলাম। তাহা দ্বারা মৃতের নাম নির্ণয় করা সম্ভব হইবে। কিন্তু যাদের সনাক্ত করিবার মত কোন চিহ্ন ছিল না, তাদের নাম চিরতরে অজানার গর্ভে ডুবিয়া গেল। আপাতত চেচিয়াতুনে থাকার বন্দোবস্ত হইল। রাত্রিবাসের জন্য নির্দিষ্ট চীনা বাড়িতে সবে পৌছিয়াছি, হঠাৎ পাশের বাড়ি হইতে মানুষের কাতরানির শব্দ কানে পৌছিল। ব্যাপার কি দেখিবার জন্য তাড়াতাড়ি ছুটিয়া গিয়া থমকিয়া দাঁড়াইলাম, এ যে একেবারে নরকের বিভীড়িকা! উঠানে জন পনেরাে ষােলাে মরণাহত জাপানী ও একজন রুশল্পরস্পরের গায়ের উপর গাদাগাদি পড়িয়া নিদারুণ যন্ত্রণায় ছটফট করিতেছে, আমাকে দেখিয়া একজন হাতজোড় করিয়া সাযায্য ভিক্ষা করিতে লাগিল। এমন অবস্থায় মানুষকে সাহায্য করিতে পারা তাে ভাগ্যের কথা, এর জন্য আবার কাকুতিমিনতি? কেন যে হতভাগ্য সৈনিকেরা এ অবস্থায় পড়িয়া আছে, কিছুই বুঝিলাম না। আগে জানিলে ভালরকম সাহায্যের ব্যবস্থা করা ২৬ । পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা যাইত। যাই হােক, তখন ডাক্তার ডাকিয়া তাদের যন্ত্রণা লাঘবের চেষ্টা সুরু হইল। ডাক্তারেরা যখন তাহাদের আহত অঙ্গের পরিচর্যায় নিযুক্ত তখন তারা অভিভূত কণ্ঠে কেবলই বলিতে লাগিল, “আপনার এ দয়া কখনো ভুলব না, আপনার কাছে চিরদিন কৃতজ্ঞ থাকব, আপনি আমাদের বাঁচালেন, বাঁচালেন!” অধরা দেখিয়া বুঝিতে বাকি রহিল না, কথা- গুলা তাদের অন্তর নিঙড়াইয়া বাহির হইতেছে—কেবল কথার কথা নয়। শুনিলাম, দু’দিন তারা এককণা খাবার বা এক বিন্দু জল পায় নাই। সকলেরই আঘাত গুরুতর—কারও পা ভাঙিয়াছে, কারও বাহু চুর্ণ হইয়াছে, কারও বা মাথায় অথবা বুকে গুলি লাগিয়াছে ! কারও কারও পরমায়ু আর আধ ঘণ্টাও নয়—তারাই আবার পরস্পরের হাত ধরিয়া, গায়ে হাত বুলাইয়া, কত সমবেদনা জানাইতেছে, সান্ত্বনা দিতেছে! লড়াইয়ে আমাদের পক্ষেরই হতাহতের সংখ্যঃ চার হাজারের বেশি, ইচ্ছা করিলেই কি সকলের সেবা শুশ্রুষা সম্ভব? দেখিতে দেখিতে দুজনের মুখ বিবর্ণ হইয়া উঠিল, শ্বাসপ্রশ্বাস ক্ষীণ হইয়া গেল। ধীরে ধীরে চোখ মুদিত হইল, অধরের কাপন থামিয়া গেল। পাশের এক সৈনিক আমাকে বলিল, “ওদের মধ্যে একজন বাড়িতে কেবল বুড়ী মাকে রেখে এসেছে!” মৃত বা আহত যুদ্ধের ঘােড়াগুলিকে দেখিলে ভারি কষ্ট হয়। তারাও সমুদ্র পার হইয়া বিদেশে আসিয়াছে! গােলাগুলি উপেক্ষা করিয়া কামান গর্জনে ভয় না পাইয়া প্রভুকে পিঠে লইয়া সানন্দে তারা যুদ্ধক্ষেত্রে ছুটিয়া ফিরিয়াছে! প্রভুর যত্ন ও দয়ার প্রতিদান দিতে পারিল, মৃত্যুকালে ইহাই যেন তাহারা ভাবিতেছে। ভারি বােঝা বহিয়া, ভারি গাড়ি টানিয়া, মালবাহী ঘােড়াগুলিই কি নীরবে কম যন্ত্রণা সহ করে। যুদ্ধ জয় অবশ্য নির্ভর করে সাহসী २१ পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা •• সৈনিক ও নায়কের চেষ্টার উপর, কিন্তু এই সব অনুগত জীবের সাহাযাও ত ভুলিলে চলিবে না! মােটা খড় ও কাদাগোলা জলেই তারা তুষ্ট, অবিরাম বৃষ্টি বা তুষারপাতের মধ্যেও অসন্তোষ নাই, প্রভুর একটু আদরই তাদের সবার বাড়া আরাম। কাজ তারা সৈনিকের মতই নিখুঁতভাবে সম্পন্ন করে,কিন্তু তারা ভাষাহীন—আঘাত বা যন্ত্রণার কথা বলিতে পারে না। অসুখ হইলে কখনাে কখনাে ঔষধ জোটে না, এমন কি একটুখানি আদর, একটু হাতের স্পর্শও নয়। যন্ত্রণায় ছটফট করে, অবশেষে একদিন শেষ বিদায়ের ডাক ডাকিয়া প্রাণত্যাগ করে কেহ একবার ফিরিয়াও চাহে না! অনাবৃত মুক্ত প্রান্তরে তাদের মৃতদেহ পড়িয়া থাকে, কাক ও নেকড়ে আসিয়া সে দেহ খাইয়া ফেলে ! কঠিন স্থূল অস্থিগুলা দিনের পর দিন ঝড়-ঝাপটার তাড়নে বিপর্যস্ত হইয়া ক্রমে ক্রমে ক্ষয় পাইতে থাকে। এই সব অনুগত ঘােড়াও ত বীর-কর্তব্য সাধন করিতে গিয়া ভীষণ মৃত্যুর কবলে পড়িয়াছে । কৃতজ্ঞতা ও শ্রদ্ধার সহিত তাদের স্মরণ করা উচিত নয় কি? বৌদ্ধতি নাকাবায়াসি আহতের সেবার জন্য স্বেচ্ছায়, আমাদের সঙ্গে আসিয়াছিলেন। যুদ্ধক্ষেত্রে সেবাকাৰ্য্যের অবসরে তিনি গােলার টুকরা সংগ্রহ করিতেন। বলিতেন, তাহা দিয়া এক অশ্বরােহী ‘কানন’ * মূর্তি তৈরি করাইবেন। তার ফলে হয়ত যুদ্ধে নিহত ঘোড়াগুলির আত্মার পরিতৃপ্তি হইতে পারে । শত্রুপক্ষের ব্যবস্থার পরিচয় লইবার জন্য একদিন নান্শনের পাহাড়ে উঠিলাম। আত্মরক্ষার বন্দোবস্ত নিখুত,এক মহা যােদ্ধাজাতির সম্পূর্ণ উপযােগী। তারের বেড়া, খানাখন্দ ও ভূমিগর্ভে বিস্ফোরক ‘মাইনের’ কথা নাই বলিলাম! পাহাড়ের চারিদিকে খাতের পর খাত * জাপানী পুরাণােক্ত করুণা দেবী।

পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা ২৮ —সর্বত্রই ‘মেশিগান্ চালাইবার বন্ধু । অনেক কেল্লার ভিতর হইতে অতিকায় কামান মুখ বাড়াইয়া অাছে দেখিলাম। স্থানটি সুরক্ষিত করিবার প্রায় কায়েমি বন্দোবস্ত। সৈন্যাস, গুদামঘর কিছুরই অভাব নাই। গুদামে সর্ববিধ শীতবস্ত্র -রেলপথ ও ‘ব্যাটারি’ও রহিয়াছে। নায়কের বাড়ির সাজসজ্জা ও আরামের উপকরণ বিস্ময়ের উদ্রেক করে। ঘরের আসবাবপত্র চমৎকার—দেখিলে আর যুদ্ধক্ষেত্রের কথা মনে থাকে না। সবচেয়ে অদ্ভুত লাগিল, যখন দেখিলাম স্ত্রীলােকের রাত্রিবাস ও প্রসাধন-সম্ভার এবং শিশুর পোষাক-পরিচ্ছদ ইতস্তত ছড়াইয়া আছে। দূরবীন দিয়া পূৰ্ব সমুদ্রতীরে দেখি বেলাভূমির উপর অসংখ্য মানুষ ও ঘােড়র মৃতদেহ—ধূসর তরঙ্গ তাদের উপর দিয়া আনাগােনা করিতেছে ! ইহারা শত্রুর অশ্বারােহী সেনাদলের অবশেষ—পদাতিক- দের ডান পাশ রক্ষা করিবার জন্য মােতায়েন ছিল। পশ্চিম তীর হইতে অতর্কিতে পিছন দিকে অক্ৰিান্ত হইয়া পালাইবার পথ পায় নাই—বিতাড়িত হইয়া প্রায় সকলেই সলিল-সমাধি লাভ করিয়াছে। স্থানটা দুর্ভেদ্য বলিয়া ভাবিয়াছিল, তাই এই পরিণাম। পাহাড়ের মাঝামাঝি উঠিতেই চোখে পড়িল একটি ভাঙাচোরা সন্ধানী আলাে আর একগাদা হাউই। রাতের অন্ধকারে শত্রুর দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা এইগুলিই বারবার পণ্ড করিয়াছে স্থানটি দখলে আসিবার পর উহা ধ্বংস করিয়া আমাদের সৈনিকেরা প্রতিশােধ-প্রবৃত্তি মিটাইয়াছে। ক্রমেই মৃতের সমাধিফলকের সংখ্যা বাড়িয়া চলিল। নাশা হইতে কিচু পর্যন্ত দেখিতে দেখিতে চলিয়াছি। এক জায়গায় একটি আলগা মাটির ঢিপি, তার উপর একখণ্ড বাঁখারি পোতা। ব্যাপারটা কি দেখিবার জন্য পা দিয়াই চমকিয়া উঠিলাম—পায়ের তলায় এক পাের্ট-আর্থারের ক্ষুয়া রুশের মৃতদেহ! মৃতদেহ কখনাে মাড়াই নাই—সেদিনকার সে-আতঙ্ক এখনাে মনে পড়ে। যুদ্ধে তখনাে নামি নাই, তাই যুদ্ধের শশাকাবহ পাগপূর্ণ পরিণাম দেখিয়া শিহরিত হইলাম ! এখন ভাবিলে ব্যাপারটা অদ্ভুত মনে হয়। চলন্ত গোলাগুলির সামনে ঘুরিয়া ঘুরিয়া ক্রমে যুদ্ধের আতঙ্ক কমিয়া আসে—গোড়ায় যা বীভৎস, পীড়াদায়ক মনে হয়, তার প্রতি মন উদাসীন হইয়া ওঠে। অতিপরিচয়ের ফলে অনুভূতির তীক্ষ্ণতা কমিয়া যায়—নহিলে যুদ্ধের ধকল সহিয়া কে বাঁচিতে পারিত ? শত্রর চর য়েচিয়াতুন হইতে চুংচিয়াতুন বেশিদূর নয়, কিন্তু মার্চ করার কথা মনে হইলেই সেই পথের কথা না ভাবিয়া পারি না। পাের্ট আর্থারের আশপাশের ভূমি কেবল পাথরে ও মুড়িতে ভরা। অন্যত্র সবই মাটি—চালের কুঁড়ো বা ছাইয়ের মত। প্রবল বাতাসে সেই ধূলা উড়িয়া কণ্ঠরােধের উপক্রম করে—সর্পাকৃতি চলন্ত সৈন্যশ্রেণীকে গ্রাস করিতে উদ্যত হয়। অনেক সময় এতটুকু সম্মুখে দৃষ্টি চলে —পদে পদে সৈনিকের ছােড়ভঙ্গ হওয়ার সম্ভানা ঘটে। ব্যাপার এমন যে, খাবারের কৌটার মধ্যে ভাত পর্যন্ত ধূলায় ভর্তি হইয়া যাইত। অন্য সময়ে দশ বিশ ক্রোশ বা ততােধিক পথ দিনরাত অবিরাম চলিয়া অতিক্রম করিয়াছি, দশ ক্রোশ, হয়ত ছুটিয়াই গিয়াছি। কখনাে পানীয় বিনা, কখনাে গভীর অন্ধকারে চলিয়াছি—কিন্তু এই ধূলার উপর দিয়া ‘মার্চ করার কষ্টের তুলনায়, সে-সব অভিজ্ঞতা নগণ্য। আসল পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা যুদ্ধে যোগ দেওয়ার যে সম্মান, 'হাহা লাভ করিবার এই যদি মূল্য হয়, তবে নিশ্চয়ই সে মূল্য আমরা দিয়াছি। পরিশ্রম ও কষ্টের জন্য অবশ্য প্রস্তুত ছিলাম, কিন্তু মন যখন বর্শাফলক ও গোলাগুলির অপেক্ষায় আছে তখন প্রকৃতির সহিত এই দ্বন্দ্ব বড়ই যন্ত্রণাদায়ক—যেমন জনহীন প্রান্তর অতিক্রম করা, পাহাড়ে চড়া, বৃষ্টি বাতাস শীতাতপের সহিত সংগ্রাম আর তৃণশয্যায় শয়ন ! ক্রমে আমরা ভাবিতে সুরু করিলাম, ইহাও যুদ্ধেরই একটা বিশিষ্ট অঙ্গ। শেষে এমন হইল, ভুট্টাক্ষেতে বা শিলাশয়নে শুইয়াও নিদ্রা উপভােগে ব্যাঘাত ঘটিত না। মুক্ত আকাশ- তলে চাঁদের পানে চাহিয়া পতঙ্গগুঞ্জন শুনিতে শুনিতে ভুলিয়াই যাইতাম যে, আমরা প্রাসাদ বা দুর্গকক্ষে সুখশয্যায় শুইয়া নাই। অবিরাম ‘মার্চ’ করিয়া চুংচিয়াতুন পৌছিবার পর তৃতীয় ডিভিসনের সৈন্যদল অবসর পাইল। তাদের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতে নিজেদের অনভিজ্ঞতায় ভারি লজ্জা বােধ হইতে লাগিল। সেখান থেকে সরিয়া যাইতে পারিলে যেন বাঁচিনাশানের কীর্তির পর তারা যেন মহিমার মুকুট পরিয়াছে! মনে হইল, আমরা ঘেঁয়াে লােক, ট্রেন ‘মিস’ করিয়া ইঞ্জিনের বিলীয়মান ধূমধারার পানে বােকার মত হাঁ করিয়া তাকাইয়া আছি! তাদের উপর হিংসা হইতে লাগিল-কল্পনায় দেখিতে পাইলাম তাদের পােষাক ছিন্নভিন্ন রুধিরাক্ত, তাদের অঙ্গে স্থানের তাজা ক্ষতচিহ্ন! শ্রদ্ধা ও প্রীতির দৃষ্টিতে তাদের পানে চাহিলাম—মনে মনে তাদের ধূলিমলিন টুপি ও রক্তমাখা পট্টির কত তারিফ করিতে লাগি- লাম। চাহনি, ভাবভঙ্গী, সমন্তের মাঝ থেকেই যেন তাদের “মহান কীৰ্ত্তির পরিচয় উকি দিতেছে। শত্রুর সামনে এক পাহাড়। আমাদের সৈন্যশ্রেণীর মধ্যদেশ যেখানে তারই দক্ষিণে উহা দাড়াইয়া। আন্তজুন পাহাড় হইতে তাইজুষান ।

পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা ০ পাহাড় পর্যন্ত, প্রায় আট ক্রোশ ব্যাপিয়া জাপানী দলের বিস্তার। মাঝে মাওতুংজু গিরিসঙ্কট। তারই মাঝামাঝি এক জায়গায় আমরা আছি। এই গিরিসঙ্কটের উত্তরে লিচিয়াতুন গ্রাম। আমাদের নিজেদের দল দক্ষিণে এই গ্রাম হইতে নদীর ওপারে য়ুচিয়াতুন গ্রাম পর্যন্ত বিলম্বিত। তারপরে শৈলশ্রেণী। সে নে সুদৃঢ় বাধা তুলিয়া, শত্রুর গতিবিধির উপর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখিয়া আক্রমণ ও আত্মরক্ষার আয়োজনে আমরা ব্যস্ত হইয়া উঠিলাম। ইতিমধ্যে জেনারেল নােগি দলবল সহ ডানির প্রায় চার ক্রোশ উত্তর-পশ্চিমে এক গ্রামে গিয়া পৌছিলেন। তার পৌছানর সঙ্গে সঙ্গে তৃতীয় “আর্মির সংগঠন সম্পূর্ণ হইল। শত্রু নাশানে পরাজিত হইলেও ডানি ত্যাগ করিবার ইচ্ছা তাদের ছিল না, কিন্তু কি করে, প্রাণের দায়ে স্ত্রী পুত্র লইয়া পাের্ট আর্থার অভিমুখে পালাইতে হইল। যাইবার পথে তারা শানশিলি-পাও গ্রাম পুড়াইয়া দিয়া গেল। সন্ধানী দূত খবর দিল—শত্রুপক্ষ পান্তন, লুন্নি-চিয়াও, ওয়াইতু, গুয়ান্তিং প্রভৃতি পাহাড়ের যােগসাধন করিয়া সেই স্থান সুদৃঢ় ও সুরক্ষিত করিয়াছে। রুশ ও জাপানী সৈন্যশ্রেণীর মধ্যে ব্যবধান তিন হাজার হইতে পাঁচ হাজার মিটার। প্রথম দিনই খন্তা ও কোদাল লইয়া কাজ শুরু করিয়া দিলাম। এক একটি জায়গায় এক এক অশ্বারােহী বা পদাতিক দল নিযুক্ত হইল। দিন রাত ট্রেঞ্চ বা খাত কাটা চলিতে লাগিল। সৈনিকেরা তার মধ্যে ওৎ পাতিয়া থাকিবে। এ কাজে কর্মচারীরা হইল সর্দার, আর সৈনিকেরা হইল কুলি। ওদিকে কাঁচা পাকা সেনানায়কেরা চরের কাজে বহাল হইয়া শত্রুর গতিবিধি লক্ষ্য করিতে লাগিল। এক মিটার এক গজ অপেক্ষা ইঞ্চি তিনেক বড়।

পোর্ট-আর্থারের ক্ষুধা ইঞ্জিনিয়ারিং কাজ দিন দিন অগ্রসর হইতেছে। প্রথম প্রতিবন্ধক -ট্রেঞ্চ ও অশ্বারােহীদের জন্য বােমানিক দেওয়াল ধীরে ধীরে গড়িয়া উঠিতে লাগিল। ডানি হইতে আমদানি বােরর মধ্যে বালি ভরিয়া, সেই বােরা স্তুপাকারে সাজাইয়া এই দেওয়াল বা আড়ালের সৃষ্টি। অশ্বারােহী থাকিবে প্রথমে। তারপর যারা ওৎ পাতিয়া থাকিবে তাদের জন্য খাতের ব্যবস্থা। সাদাসিধা ধরণের তারের বেড়া খাড়া হইল, একটা ভাল রাস্তাও তৈরি হইল। এই রাস্তা হইতে মাকড়সার সূতার মত নানা সৰু সৰু কেঁকড়ি পথ বাহির হইয়া ভিন্ন ভিন্ন দলকে পরস্পর সংযুক্ত করিল। সৈন্যেরা হয় পল্লী- বাসীদের সহিত তাদের গৃহে, নয় প্রাঙ্গণে বা গাছের তলায় তবু ফেলিয়া বাস করিতে লাগিল। শত্রুর আক্রমণে যারা বাধা দিবে, রাত্রে তাদের নিশ্চিন্ত নিদ্রার জো নাই, শীত নিবারণের জন্য আগুন জালিবার উপায় নাই। রাত্রি- কালেই সবিশেষ সজাগ ও হুসিয়ার থাকা প্রয়ােজন। সৈন্যশ্রেণীর কাছাকাছি থাকে শান্ত্রী, সামনে দূর পর্যন্ত থাকে চর, সবকিছুর উপরেই তাদের লক্ষ্য রাখিতে হয়। সারাদিন পরিশ্রমে যতই শ্রান্ত হউক, রাত্রে এমন সজাগ থাকিতে হয় যাহাতে একটি সরব পতঙ্গ বা উড়ন্ত পাখী তাদের দৃষ্টি এড়াইতে না পারে। ঠাণ্ডা মাথায় নিশ্বাস বােধ করিয়া খুব সতর্কতার সহিত চোখ কান ব্যবহার করিতে হয় পিছনের সমস্ত সেনাদলের জন্য। “কে যায় ? দাঁড়াও!” শান্ত্রীর এমনি চীৎকার রাত্রির উদ্বেগ ও নির্জনতা বাড়াইয়া তােল। সহসা অন্ধকারে দু’একবার বন্দুকের আওয়াজ হয়-হয় ত শক্রর চর আবিষ্কৃত হইয়াছে। আবার সমস্ত নীরব। রাত বাড়িয়া চলে। পুঞ্জ পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা পুঞ্জ কালাে মেঘ উত্তর হইতে যাত্রা করিয়া অচিরে সারা আকাশে কালি লেপিয়া দেয়। ফোটা ফোটা বৃষ্টি শুরু হয়। • আক্রমণ-প্রতিরােধের বন্দোবস্ত প্রায় সম্পূর্ণ, এমন সময় শক্র মাথা তুলিতে সুরু করিল। শান্ত্রীশ্রেণীর নিকটে প্রতি রাত্রেই বন্দুকের শব্দ শােনা যাইতে লাগিল। অবিরাম খবর আসিতেছে—অমুক জায়গায় জন পাচ ছয় শত্রুর পদাতিক চর দেখা দিয়া তখনি উপত্যকার মধ্যে অদৃশ্য হইল। তাদের ধরিবার জন্য রকমারি ফাদ উদ্ভাবন করিতে সুরু করিলাম। এমন একটি ফাদের কথা বলি। আমাদের এলাকা হইতে কিছু দূরে এক গাছা দড়ি দুই প্রান্তে দুই খোঁটায় মাটির উপর টানিয়া বাধা হইল। সেই দড়ির সঙ্গে অপুর একগাছা দড়ির এক প্রান্ত বাধিয়া, অন্য প্রাড় শান্ত্রীর পায়ের কাছে আটকান রহিল। চলার সময় শক্রর পা প্রথম দড়িতে লাগিলে তার কম্পন দ্বিতীয় দড়ি বাহিয়া শান্ত্রীর নিকট পৌছিবে। তখন শাস্ত্রী ছুটিয়া গিয়া শত্রু-চরকে গ্রেফতার করিতে পারিবে। একদিন সঙ্কেত পৌছিল -শিকার জালে পড়িয়াছে। শাস্ত্রীদল উদ্ধশ্বাসে ছুটিয়া গেল। গিয়া দেখে মানুষের টিকিও নাই, কেবল একটা মন্ত কালাে কুকুর 'আকাশপানে চাহিয়া দাঁত খি চাইয়া ঘেউ ঘেউ করিতেছে ! প্রথমবন্দী একদিন লেফটেন্যান্ট তােকি জন কয় সৈনিক লইয়া লুয়ানি-চিয়াওর আশপাশে শক্ৰসন্ধানে বাহির হইলেন। শত্রুর দেখা মিলিল না, তাই পশ্চাতে প্রহরী দাঁড় করাইয়া ফিরিতে সুরু করিলেন। এ হেন সময়ে পোর্ট-আর্থারের ক্ষুধা ৩৪ তার দল ও পশ্চাদৰ্তী প্রহরীদলের মধ্যে দুইজন রুশচরের অপ্রত্যাশিত আবির্ভাব। জাপানী সৈনিকের বেড়াজালের মধ্যে পড়িয়াও, তারা বশ্যতা স্বীকার করিল না—কিরিচ লইয়া রীতিমত লড়াই শুরু করিয়া দিল। অবশেষে গুলির ঘায়ে আহত হইয়া তারা যখন ধরাশায়ী হইল, তখন দেখা গেল, আঘাত গুরুতর হইলেও তখনাে প্রাণ বাহির হয় নাই। এই আমাদের প্রথম বন্দী। তাদের প্রশ্ন করিবার জন্য সকলে অধীর হইয়া উঠিল। অবিলম্বে খড়ের মাদুর তৈরি হইয়া • গেল, তার উপর দুজনকে শােয়াইয়া একটি জলধারার পাশে আনা হইল। সেখান থেকে আমাদের ছাউনি বেশি দূর নয়। বন্দী শত্রু দেখিবার আগ্রহে সৈনিকেরা চারিধারে ভিড় করিয়া দাড়াইল। দোভাষী সঙ্গে লইয়া অবিলম্বে একজন কর্মচারী আসিয়া পৌছিলেন, দুই বন্দীকে দুই জায়গায় রাখিয়া পরীক্ষা শুরু হইল। সাধ্যমত শুশ্রুষান্তে ডাক্তারেরা প্রবােধ দিয়া বলিল, চিন্তা নেই, আমরা তােমাদের দেখাশুনাে করবাে ! এখন বেশ নিশ্চিন্ত হয়ে সব প্রশ্নের ঠিক ঠিক উত্তর দাও দেখি । ডাক্তারেরা আমাদের জানাইল, গুলি দুজনেরই ধুক ভেদ করিয়াছে। বড় জোর ঘণ্টাখানেক বাচিতে পারে। জ্ঞান থাকিতে থাকিতে দরকারী কথা জিজ্ঞাসা করা ভাল। প্রশ্ন হইল—তোমার কোন্ রেজিমেন্ট আর কোন্ দল ? বন্দী বেচারা হাঁপাইতে হাঁপাইতে বলিল, Infantry Sharpshooters ২৬ নম্বর রেজিমেন্ট। ৬ “বেশ। তােমাদের দলের নায়ক কে?” জানি না।”

পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা দোভাষী তাহাকে বুঝাইতে লাগিল-জানি না বলে কেন? নিজের নায়কের নাম তোমার জানা উচিত । বন্দীর মুখ দেখিয়া মনে হইল না সে মিথ্যা কহিতেছে। তার মুখ দিয়া রক্ত পড়িতেছিল, শ্বাসপ্রশ্বাসেও কষ্ট হইতে লাগিল। সে জল চাহিল। আমি তার পাশেই ছিলাম। ঝর্ণা থেকে এক গ্লাস জল ধরিয়া তাহাকে দিতে গেলাম। নেওয়া দুরের কথা, সে ফিরিয়াও তাকাইল না। “আমার বােতলে ফোটানােজল আছে, আমাকে তাই দিন।” তাই করিলাম। জানি না, সেই রুশ সৈনিক আসন্ন মৃত্যুকালেও শত্রুর-দেওয়া জল পান করিতে ঘৃণা বোধ করিল কি না। তবে কাচা জল পান না করিয়া স্বাস্থ্যবিধি, পালনের যে-আগ্রহ সে দেখাইল, তাহাতে বিস্মিত হইলাম। চরিত্রের এই দৃঢ়তার জন্যই আহত না হওয়া পর্যন্ত সে জাপানীদের সঙ্গে নির্ভয়ে যুঝিতে পারিয়াছিল। এই রুশ সৈনিকটিই যে কেবল তার নায়কের নাম জানি না, তা নয়। পরে অনেক বন্দীকেই প্রশ্ন করিয়া বুঝিয়াছি অধিকাংশই সমান অজ্ঞ। কিসের জন্য বা কার জন্য যে তারা লড়িতেছে, তা-ও তারা জানিত না। দশ জনের মধ্যে ন-জন বলিত, তাড়ার চোটে যুদ্ধক্ষেত্রে আসিয়াছে—কেন, কি বৃত্তান্ত, অতশত বােঝে না! বন্দীকে রেহাই দেওয়া হইল। ক্রমেই সে সাদা হইতেছে, শ্বাস- প্রশ্বাসের কষ্ট বাড়িয়া চলিয়াছে, মৃত্যুর আর বিলম্ব নাই। ডাক্তার জিজ্ঞাসা করিল, কষ্ট হচ্ছে কি ? কিছু বলতে চাও? সহানুভূতির কথায় বন্দীর চোখে জল আসিল। মাথাটা একটু D পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা ৩৬ তুলিয়া সে কহিল, দেশে স্ত্রী-পুত্র রেখে এসেছি। তাদের জানাবেন, কেমন করে আমার মৃত্যু হ’ল। অপর বন্দীটি ভিন্ন প্রকারের। দোভাষী যখন জিজ্ঞাসা করিল, তােমার রৈজিমেন্ট এখন কোথায় ? সে কতকটা এইরূপ উত্তর দিল— “চোপ রও! জানি না আমি! জাপানীরা ভারি নিষ্ঠুর ! যারা আত্মসমর্পণ করে তাদের প্রতি লেশমাত্র দয়া নেই। আমাকে সূপ’ দাও, চুরট দাও।” নাশানে বিশেষভাবে পরাজিত হইয়াও রুশেরা বুঝে নাই জাপানী দের যথার্থ কৃতিত্ব কোথায়। পাের্ট-আর্থারের তথাকথিত অজেয় শক্তির উপর নির্ভর করিয়া তারা খর্বকায় শত্রুকে হেয়জ্ঞান করিয়াছিল। কূপমণ্ডুকের মত তাদের অবস্থা। চিউলিয়ে-চেঙে আমাদের বিজয় বার্তা তারা শশানে নাই, রুশেরা কোরিয়া হইতে নিঃশেষে বিতাড়িত হইয়াছে তাও জানে না। এসব কথা শুনিয়াও তারা বিশ্বাস করে নাই। শত্রুর আডডা আবিষ্কারের চেষ্টা দিনরাত চলিতেছে। একবার একটা বড় দল শত্রুসন্ধানে বার হইয়া একদল অশ্বাবােহী রুশসৈন্যের মুখখামুখি পড়িয়া যায়। শত্রুপক্ষের অনেকে নিহত হইল। জাপানীরা তাদের ঘােড়াগুলি ধরিয়া লইয়া আসিল। রুশেরাও আমাদের উপর অবিরাম লক্ষ্য রাখিয়াছিল। দূরে ওয়াইতু- যা গিরিশিরে দূরবীন্ হাতে লইয়া কালাে পতাকা নাড়িয়া শান্ত্রীরা সর্বদাই ইসারা করিতেছে দেখিতে পাইতাম। কখনাে কখনাে তারা আমাদের অগ্রবর্তী শ্রেণীর উপর নজর রাখিবার জন্য চীনাসাজে গুপ্তচর পাঠাইত। প্রথম প্রথম তাদের ছদ্মবেশ ধরা পড়ে নাই—অসতর্কতার ফলে কয়েকজন জাপানী প্রহরী নিহত হয়। পরে আমরাও সাবধান ৩৭ পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা হইলাম—এমন কি আসল চীনাদেরও আমাদের এলাকায় অসিতে দিতাম না। একবার সমুখের গ্রামের চীনা ‘মেয়র’ জাপানী এলাকায় প্রবেশের অনুমতি চাহিলেন। এই নিয়মে তাদের অত্যন্ত অসুবিধা হইতেছে, জানাইলেন। তখন জাপানী কর্তৃপক্ষ একটি বিশিষ্ট কমিটির হাতে এরূপ ব্যক্তিগত ব্যাপারের তদন্তের ভার অর্পণ করেন। ফলে, যাদের পরিবার বা আত্মীয়-স্বজন এলাকার মধ্যে বাস করে, কেবল তারাই প্রবেশের অনুমতি পাইল। এইরূপে আসল যুদ্ধের আয়ােজনে নিরত থাকিয়া সুযােগের প্রতীক্ষা করিতে লাগিলাম। সামরিক কারণে কিছুকাল গায়ে পড়িয়া আক্রমণ না করিয়া, সে-কাজ শত্রুকে করিতে দেওয়া হইল। যাহাতে তারা অতর্কিত আক্রমণ করিতে না পারে, কেবল ততটুকু সাবধানতা আমরা অবলম্বন করিলাম। ইত্যবসরে শত্রুর রণপােত সিয়াওপিং তাও এবং হেইষি-চিয়াওর নিকটে আবির্ভূত হইয়া এলােপাতাড়ি গােলা ছুড়িয়া আমাদের আড্ডা আবিষ্কারের চেষ্টা করিতে লাগিল। ওয়াইতুষানের যুদ্ধ মাসাবধি কাল আটঘাট বাঁধিয়া যােগের প্রতীক্ষায় আছি। শত্রুর সহিত অবিরাম খণ্ডযুদ্ধ চলিতেছে। শত্রু আছে অনেকগুলি উচু পাহাড়ে, আমরা আছি নীচে। সুতরাং আমাদের গতিবিধি লক্ষ্য করা তাদের পক্ষে সহজ। শত্রুকে এই সুবিধা দেওয়া আর উচিত নয়। পাহাড়গুলির নাম ওয়াইতুষান্ (উচ্চতা ৩৭২ মিটার’) শুংতিং- পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা যান্ (দুই চূড়াবিশিষ্ট, উচ্চতা ৩৫২ মিটার’) আর একটি অনামা পাহাড় আমরা তাহার নাম দিয়াছিলাম কোন বা খগিরি’, সেটি প্রথম দুইটির চেয়ে উচু এবং দুরারােহ। এই-সব পাহাড় আমাদের আক্রমণ থেকে নিরাপদ। সেখানে ভালাে ভালাে দূরবীন্ বসাইয়া শত্রুপক্ষ আমাদের ছাউনি, তালিয়ে উপসাগর ও ডালনিতে কি ঘটিতেছে সমস্তই দেখিতে পায়। ইহা আমাদের একটা মস্ত অসুবিধা। ঐ সব জায়গা যতদিন শত্রুর হাতে থাকিবে, ততদিন আমাদের পিছনে যুদ্ধের আয়ােজন হইবার জো নাই, হয়ত অগ্রসর হইয়া আক্রমণ করিবার সুযােগও হারাইতে হইবে। অতএব স্থানগুলি অবি- লম্বে দখল করা দরকার। তা ছাড়া সিয়াওপিং-তাও লইতে হইবে, যাহাতে শত্রুর জাহাজ লিয়েন্-উপসাগরে হানা দিতে না পারে। ওয়াইতুষানে আমাদের প্রথম যুদ্ধের ইহাই কারণ। এ যুদ্ধ কিছু মারাত্মক নয়—ঐ সব পাহাড় থেকে শত্রুকে বিতাড়িত করাই ইহার উদ্দেশ্য। সুদৃঢ় স্থান—তাই রুশেরা উহা রক্ষার বিশেষ কোনো বন্দোবস্ত করে নাই। সে-স্থান আক্রমণ করা তাই তেমন কঠিন ছিল না। আমাদের কিন্তু ইহাই প্রথম যুদ্ধ, তাই প্রচুর উৎসাহ ও জেদের সহিত লড়িয়াছিলাম। একদিন গােপন আদেশ পৌছিল—অবিলম্বে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হও! তখন রাত অনেক, শিবিররক্ষীদের আগুন নিবিয়া আসিয়াছে। মাঝে মাঝে গাধার ডাক রাত্রির নির্জনতা আরও বাড়াইয়া তুলিতে- ছিল। মাঝরাতে এ আদেশ আসিল কেন ?—চীনাদের ভয়ে। স্থির ছিল পূৰ্বদিন আক্রমণ হইবে, কিন্তু যাত্রার আয়ােজন সুরু হইবার পর সন্দেহ হইল যে, চীনারা শত্রুপক্ষের কাছে আমাদের অভিসন্ধি ফাস করিয়া দিয়াছে। অগত্যা সেদিন আক্রমণ স্থগিত রাখিয়া পরদিন পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা প্রত্যুষে করাই স্থির হইল। চীনারা টের পাইবার আগেই যাত্রা শুরু করিতে হইবে । সে-রাত্রে উত্তেজনায় ঘুম আসিল না। বিছানায় এপাশ-ওপাশ করিতে করিতে আসন্ন যুদ্ধের কল্পনায় মন ভরিয়া উঠিল। মাঝে মাঝে পাশের শয্যায় শায়িত সৈনিকের সঙ্গে যা তা আবোল-তাবােল বকিতে লাগিলাম। অন্ধকারে ইতস্তত ছােট ছোেট আগুনের ঝিলিক চোখে পড়িতেছে। বুঝিলাম অনেকেই জাগিয়া আছে এবং সিগারেট টানিতে টানিতে আমারই মত হয়ত কত কি ভাবিতেছে ! অচিরে শিবিরের সর্বত্র একটি নীরব চঞ্চলতার সৃষ্টি হইল। সৈনিক ও নায়কের। দ্রুতগতি শয্যাত্যাগ করিয়া যথাসম্ভব নিঃশব্দে তাঁবু ও ওভারকোট পাট করিতে সুরু করিল। অতি সাবধানে কঁাচকেঁচে চামড়ার বোঁচকা (knappsack) আঁটিয়া পা টিপিয়া টিপিয়া ঘাসের উপর দিয়া এক জায়গায় গিয়া জড়ো হইলাম। বন্দুকগুলি গাদা দিয়া দাড় করাইয়া রাখা হইল। মেঘাচ্ছন্ন আকাশ কালির মত কালাে- অন্ধকারে কেবল কিরিচ ও টুপির উপকার ধাতুময় তারাগুলি চকচক করিতেছে। নয়ন নিদ্রালস ও নিষ্প্রভ হইলেও সৈনিকদের চিত্তে দৃঢ়তা ও অধীরতার অভাব নাই ! চাপারে কথা চলিতেছে—কিছু ফেলিয়া আস নাই ত?' সব আগুন নিবিয়াছে ? সহসান্সকলে নিৰ্বাক হইল। “নিঃশব্দে চলো”—এই আদেশ পাইয়া তারা চলিতে সুরু করিল গ্রামসীমা না ছাড়ানাে পর্যন্ত সন্তর্পণে চলিতে হইল—যাহাতে চীনারা না জানিতে পারে, প্রভাতে উঠিয়া আমাদের না দেখিয়া যেন অবাক হইয়া যায়! একমাস গ্রামে ছিলাম, ইহারই মধ্যে সেখানকার নদী গিরি প্রান্তর পরিচিত হইয়া উঠিয়াছে, তাদের উপর মায়া পড়িয়া গেছে, গ্রামখানি গৃহের মত হইয়া পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা উঠিয়াছে। এতদিন যে তরু আশ্রয় দিল, যে জলধারা তৃষ্ণা মিটাইল, তাদের প্রতি উদাসীন হই কিরূপে? পল্লীবাসীদের মধ্যে এক বুড়া ছিল—তার নাম চ্যাং-তিশি। লােকটি আমাদের অনেক সেবা করিয়াছে, সকালে জল তুলিয়াছে, সন্ধ্যায় আগুন জ্বলিয়াছে। কেমন করিয়া টের পাইয়াছিল আমরা যাইতেছি—সারা রাত সে আমাদের কাজ করিল, তারপর গ্রাম অন্তে আসিয়া আমাদের বিদায় দিয়া গেল। বেচারা! তাহাকে আজও ভুলিতে পারি নাই। ভােরের কুয়াসায় আকাশ আচ্ছন্নপূৰ্যোদয় এখনাে হয় নাই। সুদীর্ঘ, সৈন্যশ্রেণীশীর্ষে সূৰ্য্য-পতাকা উড়িতেছে। দক্ষিণে বহু দূরে কয়েকটা আওয়াজ হইল—যুদ্ধ শুরু হইল না কি? ঠিক সেই সময় আমাদের দলের দক্ষিণ ও বাম বাহু (solumn) ‘যুদ্ধ আরম্ভ করিল। দক্ষিণ বাহু পাতুগ্রামের দক্ষিণ পশ্চিমের পাহাড় আক্রমণ করিবে, আর বাম বাহু আক্রমণ করিবে লুয়ান্নিচিয়াও পাহাড়ের পূর্বদিকের গিরিশীর্ষে শত্রুর ঘাটি। আমরা বাম বাহুর মাঝের অংশ—আমরা আক্রমণ করিব ওয়াই- তুষা। ঘােড়ার জিভ বাঁধিয়া, পতাকা মুড়িয়া, অস্ত্রাদি নীচু করিয়া নিঃশব্দে চলিতে লাগিলাম। কাছাকাছি পৌছি েশত্রুপক্ষ উপর হইতে খুব এক চোট গুলিবর্ষণ করিল। প্রবল বাধার মুখে আমরাও তাদের দিকে গুলি চালাইতে লাগিলাম। তারা উপরে আমরা নীচে, তাদের গােলাগুলি আমাদের মাথায় বৃষ্টিধারার মত পড়িতে লাগিল—আমাদের পায়ের কাছে ধূলা উড়াইল। এত দিনে আমাদের প্রথম অঙ্কের যবনিকা উঠিল । সময় যতই যাইতেছে, গােলাগুলির আনাগােনা ততই বাড়িতেছে ৪১ = পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা ব্যাপার গুরুতর হইয়া উঠিল। নিধুম বারুদের বিস্ফোরক গ্যাসের দুর্গন্ধে যুদ্ধক্ষেত্র ভরিয়া গেল। বন্দুকের টোটার কামরা খােধা ও বন্ধ হওয়ার এবং খালি টোটা ছিটকাইয়া পড়ার শব্দ, গুলির গুমরানি, গােলার চাঁপা গর্জন এবং আঘাতের পর ফাটিয়া পড়া—অতি অপূৰ্ব্ব, রক্ত চঞ্চল হইয়া ওঠে। দিকে দিকে ‘আগে চলল, আগে চলাে’ ধ্বনি। খাড়া পাহাড়, খঙ্গের মত পাথর, সমস্ত উপেক্ষা করিয়া সৈন্যদল দ্রুতপদে অধীর আগ্রহে উঠিতেছে। বন্ধনীর মধ্যে টোটাগুলা খড় খড় করিতেছে, চলার ছলে তলোয়ার খাপ হইতে লাফাইয়া লাফাইয়া উঠিতেছে, চিত্ত যেন নাচিতেছে! চলল আর গুলি চালাও, গুলি চালাও আর চলল। শত্রুর গুলি বৃষ্টিধারার মত নীচে নামিতেছে আর আমাদের গুলি হাউইয়ের মত শূন্য ভেদিয়া উপরে উঠিতেছে। যুদ্ধ ভীষণ হইয়া উঠিল শত্রুশ্রেণীকে যতক্ষণ না গােলাগুলি দিয়া বিদীর্ণ করা যায় ততক্ষণ গুলি চালাইয়া তাদের ব্যতিব্যস্ত করা দরকার। যুদ্ধে কামানের কাজও যথেষ্ট, যদিও যুদ্ধ শেষ করিতে হয় কিরিচ দিয়া। গুলি চালাইতে হয় খুব সাবধানে। যুদ্ধ একবার সুরু হইলে উত্তেজনায় পা হইতে মাথা পর্যন্ত কাপিতে থাকে, কাণ্ডজ্ঞান হারাইবার অবস্থা হয়, কিন্তু তা হইলে চলে না। ঠাণ্ডা মাথায় কাজ করা খুব কঠিন, তবুও ধীরেসুস্থে টিপ করিয়া বন্দুকের ঘােড়া টানিতে হয়। যতই সােরগােল হােক, রক্তস্রোত যাই কেন বহিতে থাকুক, তবুও বিচলিত হইবার জো নাই। ‘শীতের রাতে যেমন করিয়া হিম পড়ে তেমনি সন্তর্পণে ধীরে ধীরে বন্দুকের ঘােড়া টানিয়াে”—কবিতায় এই শিক্ষা পাই। এমনি করিয়া সজ্ঞানে অবিচলিত হাতে গুলি চালাইলে লক্ষ্যভেদ হইবেই। যােদ্ধাদের উদ্যম ও আগ্রহ ক্রমে বাড়িয়া চলিল—যুদ্ধও জমিয়া উঠিল। আহতের সংখ্যা প্রতি মুহূর্তেই বাড়িতেছে। আ!” বলিয়া পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা 82 আৰ্তনাদ, তারপরই গুরুভার পতন শব্দ-সঙ্গে সঙ্গে মানুষটি একেবারে অজ্ঞান। 'শেষ সুযােগ দ্রুতগতি আসিতেছে, শত্ৰু টলিতে সুরু করিয়াছে। এক পা আগে, এক পা পিছনেতাদের মনমরা অবস্থা। হুঙ্কার দিয়া শক্রর প্রতি ধাওয়া করার এই অবসর। সহসা যেন শত বজ্ৰ হাঁকিয়া উঠিল, পাহাড় ও উপত্যকা, আকাশ ও পৃথিবী কাঁপিতে লাগিল, আমাদের নাক কাপ্তেন মুরাকামি সুদীর্ঘ অসি আস্ফালন করিয়া চীৎকার করিয়া সম্মুখে ধাবিত হইলেন। তার দৃষ্টান্ত অনুসরণ করিয়া সৈনিকেরা চকিতে শত্রুশ্রেণী বিদীর্ণ করিল-লম্ফঝম্প করিয়া হৈ-হৈ রৈ রৈ শব্দে। প্রাণের দায়ে শক্ত পিছন ফিরিয়া ছত্রভঙ্গ হইয়া দৌড় দিল—অস্ত্রশস্ত্র, টুপি, টোটা প্রভৃতি পশ্চাতে ফেলিয়া। : ওয়াইতুষান্ দখল হইল। আটটার সময় বানজাই’ ধ্বনিতে সকালের আকাশ কাঁপিতে লাগিল। কেনজা ওয়াইতুসান্ স্বচ্ছন্দে দখল করিয়া জাপানীদের সাহস বাড়িয়া গেল। দীর্ঘ অপ্রশস্ত পার্বত্য পথ ধরিয়া তারা পলায়নপর শত্রুকে দাড়া করিল। কোন্ বা “৩৬৮ মিটার পাহাড়” আক্রমণ করাই উদ্দেশ্য। তাদের উৎসাহ অসীম—এক চালেই বাজিমাত করিবার আশা। কোন্ শিলাময় অতি বন্ধুর দুরারােহ গিরিচূড়া। সেখানে উঠিবার একটিমাত্র পথ আমাদের দিকে ছিল। সে-পথ এমন যে একটি মানুষ তার মাঝে দাড়াইয়া হাজার হাজার লােকের ওঠা নামায় বাধা পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা দিতে পারে। গােড়ায় এ পাহাড়ের কোনাে নাম ছিল না, আগেই বলিয়াছি। রুশেরা নাম দৈয় “Quin lill"। স্থানটি আমাদের দখলে আসার পর জেনারেল নোগি উহার নাম রাখিয়াছিলেন “কেজান্” বা “খগিরি”। প্রথমে জানিতাম না কত শত্রুসৈন্য সেখানে আছে—শুনিয়াছিলাম কিছু পদাতিক ও দশটি কামান মাত্র তাদের সম্বল। আমাদের রেজিমেন্টই ওয়াইতুষানের পাদদেশ প্রদক্ষিণ করিয়া সাগরতীরাভিমুখে শস্যক্ষেত্রের মাঝে গিয়া থামিল। লিয়াওতুঙে তখন দারুণ গ্রীষ্ম-নিকটে মুখ ভিজাইবার মতও একটি জলধারা নাই। গ্রামের অন্তে গাছপালা, ঝােপঝাড়ের অভাবে একটু ছায়াও মেলে না। পদতলে একগাছা ঘাস পর্যন্ত নাই—সূৰ্য্যরশ্মি যেন জ্বলন্ত লৌহশলাকা— টুপি ফুড়িয়া আমাদের মাথা গলাইয়া দিবার উপক্রম করিল। মনকে, বুঝাইলাম, এ নিদারুণ দাহ-যন্ত্রণা বেশিক্ষণ থাকিবে না—অচিরেই যুদ্ধে মাতিবার সুযােগ মিলিবে ! কিন্তু বৃথা বৃথা! সকাল নটা হইতে বেলা তিনটা পৰ্যন্ত সমভাবেই কাটিয়া গেল। বামে বহুদূরে পূৰ্বসাগরের বীচিবিক্ষুব্ধ বারিরাশি দেখা যাইতেছে। মনে হইতে লাগিল—আহা! যুদ্ধক্ষেত্রে গিয়া মরিবার গ্লাগে যদি একবার ঐ শীতল জলে ডুব দিতে পারিতাম ! কিছুক্ষণ পরে আমাদের বামদিকে সিয়াওপিং-তাও দ্বীপের নিকটে এক রুশ মানােয়ারি জাহাজ আসিয়া অচিরে আমাদের উপর গােলাবর্ষণ শুরু করিল। উৰ্দ্ধ আকাশে ইতস্তত ধোয়ার কুণ্ডলী রচিত হইতে লাগিল, বাতাসে একটা হুরর ধ্বনি উঠিল—গােলার পর গােলা, শব্দের পর শব্দ। গােলা পাথরের উপর পড়িয়া স্ফুলিঙ্গ বর্ষণ করিতেছে, চারিদিকে ধোয়া ছড়াইতেছে, টুকরা পাথর এদিক-ওদিক পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা ৪৪ ছুটিতেছে। নিরাপদে দুরে দাড়াইয়া দেখিলে মনে উত্তেজনার সঞ্চার হয় বটে, কিন্তু গােলার ঘায়ে ঘায়েল হইবার সাধ হয় না। অধিকাংশ গােলাই খুব কাছে পড়িলেও ভাগ্যক্রমে কেহই আহত হইল না। শীঘ্রই কেন্ঞ্জানের দিক থেকে বন্দুক ও কামানের শব্দ আসিতে সুরু করিল। আক্রমণ তবে আরম্ভ হইয়াছে। যুদ্ধে যােগ দিবার জন্য মন অস্থির হইয়া উঠিল। । যাত্রার আদেশ আসিয়াছে। ভারি চামড়ার বোচকা (knapsack) চটপট চলাফেরার বাধা। সকলে তাড়াতাড়ি এক একটা লম্বা থলির মধ্যে একদিনের আন্দাজ রসদ ভরিয়া পিঠে বাঁধিল, তারপর ওভারকোট কাঁধে ফেলিল। গােটা দুই তিন সিগারেট সংগ্রহ করিয়া তখনি রওনা হইলাম। দ্রুতগতি চলিবার বিশেষ কোনাে আদেশ ছিল না, তবুও আমাদের চলার বেগ দেখিতে দেখিতে বাড়িয়া গেল। যেদিক থেকে বন্দুকের আওয়াজ ও কামানের গর্জন আসিতেছিল সেইদিকে একটানা সুদীর্ঘ পথ অতিক্রম করিয়া চলিলাম, যুদ্ধক্ষেত্র ক্রমে নিকটে আসিতে লাগিল। পৌছিয়া দেখি শত্রু-অধিকৃত পাহাড়টা আমাদের সম্মুখে প্রায় খাড়া হইয়া উঠিয়াছে। রুশেদের সহিত আমাদের প্রথম সৈন্যশ্রেণীর অবিরাম গােলাগুলি বিনিময় চলিতেছে। যুদ্ধের তেজ বাড়ার সঙ্গে সই আহতের সংখ্যাও বাড়িয়া চলিয়াছে—আমাদের পিছনপানে তারা ঘনঘন বাহিত হইতেছে। জাপানী গােলন্দাজেরা শত্রুর কামান থামাইবার খুব চেষ্টা করিতে লাগিল। পদাতিকেরা একজনের পিছনে আর এক জন খাড়া পাহাড়ে কোনাে গতিকে উঠিতে সুরু করিল। মাঝে মাঝে থামিয়া গুলি চালায়, ৪৫ পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা তারপর আবার একটু ওঠে, আবার গ্রামে। আকাশ ব্যায়া পাণ্ডুর মেঘ, সাদা ও কালাে ধোয়া গাদাগাদা উঠিতেছে, মাটির উপর চড়বড় ফরিয়া গোলাবৃষ্টি হইতেছে। গােলন্দাজের হাত ভাল, অচিরে শত্রুর তিন চারিটি কামান নীরব হইয়া গেল। আমাদের পদাতিকেরা শত্রুর খুব নিকটে পৌছিয়াছে এমন সময় দুইটা ‘মাইন’ তাদের সামনে ফাটিয়া গেল। কালাে ধোঁয়া আর ধূলার মেঘের মধ্যে আমাদের লােকেরা অদৃশ্য হইলে ভয় হইল বুঝি-বা সর্বনাশ ঘটিয়াছে। কিন্তু আশ্চৰ্য, ধোয়া মিলাইলে দেখিলাম আমাদের একটি লােকও মরে নাই! তবে কিরুশের। এত বহুমূল্য বাৰুদ নষ্ট করিল শুধু ধূলা উড়াইবার জন্য ? কেবল বিস্ফোরক,‘মাইন’ দিয়া নয়, বারবার একযােগে গুলিবর্ষণ . করিয়া শত্রু আমাদের বাধা দিতে লাগিল। তাদের পানে মুখ ফিরানাে দায়, আরামে মাথা তােলারও উপায় নাই। তবুও নির্ভয়ে অগ্রসর হইতে লাগিলাম। ছােট একটি দল মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হইয়া হাতে পায়ে ভর দিয়া পাহাড়ের উপর উঠিয়া পড়িল। অমনি সেই দৃষ্টান্তে উৎসাহিত হইয়া বড় বড় দল বন্যার মত শক্রর মধ্যে গিয়া পড়িতে লাগিল। মাইন এর মুখ মাড়াইয়া, সমুখ ও পাশের গােলাগুলি উপেক্ষা করিয়া এই আক্রমণ—তাহাতে কত যে বিপদ বুঝাইয়া বলা কঠিন। কোনগিরি দৈববলে বলীয়ান, তাহাকে কি ছাড়া যায়? শত্রু প্রাণপণে বাধা দিতে লাগিল। যুদ্ধ ত নয় যেন সাক্ষাৎ নরক। বর্ষার সঙ্গে বর্ষা, তলােয়ারের সঙ্গে তােয়ার মিলিল, ভীষণ কামানগর্জনে ডুবিল যােদ্ধৃদলের হুঙ্কার ও আস্ফালন এবং আহতের সকরুণ বিলাপ ; আকাশ ধূমাবরণে অদৃশ্য হইল। শক্রর সকল চেষ্টা ব্যর্থ করিয়া গােট-আর্থারের ক্ষুধা ৩৬ বিজয়লক্ষ্মী আমাদের আশ্রয় করিলেন। নানা পরাজয়-চিহ্ন পশ্চাতে ফেলিয়া শত্রু পালাইল। শৈলশিরে নব-পতাকা সগর্বে উড়িতেছে। কেল্লা হাতে আসিয়াছে-শত্রুকে আর কি উহা ফিরাইয়া দিব? পালা আক্রমণ কোন হস্তগত হইবার পর শীঘ্রই শুয়াংতিংসান ও আশপাশের স্থানগুলি আমাদের দখলে আসিল। ধোয়ার মাঝ দিয়া দেখিলাম বিজয়ী সেনাদলের উপুর জাপানী পতাকা উড়িতেছে। তাদের জয়ধ্বনি বায়ু ভেদিয়া আকাশে বজ্রনিনাদের মত উঠিতে লাগিল। শুয়াংতিংযান কেজানের মতই প্রয়োজনীয় অথচ সুরক্ষিত নয়, তাই বেশিক্ষণ যুঝিতে পারিল না। প্রাচীন প্রবাদ আছে—দলের একটি বুনাে হাঁস ভয় পাইলে সমস্ত দলটাই বিপর্যস্ত হইয়া পড়ে। তেমনি একটি সৈন্যদল পিছু হটিলে সমগ্র বাহিনী পরাজিত হয়। : কেজানের উপর শেদের খুব আস্থা ছিল। যেমনি তার পতন হইল অমনি শুয়াংতিংযান ও সিয়াওপিংতাও শুকনাে পাতার মত ঝরিয়া পড়িল। যে-উচ্চতা হইতে শত্রু এতদিন আমাদের গতিবিধি লক্ষ্য করিত, এখন সেখানে আমরাই দর্শকের স্থান অধিকার করিয়া বসিলাম। এমন জায়গা যে রুশেরা আবার দখল করিবার চেষ্টা করিবে তাহাতে বিস্ময়ের হেতু নাই। শােনা যায়, রুশ জেনারেল ষ্টেসেল তার সমগ্র পােট-আর্থারে শেদের প্রধান সেনাপতি।

৪৭ পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা সৈন্যবাহিনীকে, যেমন করিয়া হােক কোন্ পুনরধিকার করিবার আদেশ দিয়াছিলেন। কারণ পাের্ট-আর্থার রক্ষায় কোন্ অপরিহার্য। আমরাও পণ করিয়াছিলাম, শত্রুকে কিছুতেই সে-স্থান ছাড়িয়া দিব । না। তাদের মত আমরাও চরম ত্যাগ করিতে প্রস্তুত। গ্রীষ্মের দীর্ঘ দিন শেস হইল—সূর্য অস্ত গেল। যুদ্ধশেষে নিরানন্দ ধূসর আলােয় আকাশ ও ধরণী ঢাকা পড়িল। শােণিতাক্ত তৃণপুঞ্জের উপর দিয়া অস্বস্তিকর তপ্ত হাওয়া বহিতে লাগিল। ক্ষণেক পূর্বের রণতাণ্ডবের পর আসিল ভয়াবহ গভীর স্তব্ধতা, মাঝে মাঝে কেবল দু-চারিটা বন্দুকের শব্দ—ছাড়াছাড়া, নিস্তেজ, পরিশ্রান্ত। মনে হইল, এমনি করিয়া এলােমেলাে গুলি চালাইয়া পরাজিত শত্ৰু তার দুঃখ ও ক্রোধের ভার লাঘবের চেষ্টা করিতেছে! সহসা গিরিশিখর কালাে মেঘপুঞ্জ উদ্গার করিতে লাগিল, নিমেষে সারা আকাশ কালিত হইয়া গেল—বিদ্যুৎ ও বর্জের পর ক্ষিপ্রবেগে বৃষ্টি নামিল বন্দুকের গুলির মত! কিছু পূর্বে মানুষ যে মারাত্মক দৃশ্যের অবতারণা করিয়াছিল, প্রকৃতি যেন তাহারই পুনরাবৃত্তি সুরু করিয়া দিল। বিরূপ প্রকৃতির এই যুদ্ধ সৈনিকদের কষ্ট আরও বাড়াইয়া তুলিল—একটা গাছও নাই যার তলে আশ্রয় মিলিতে পারে ! দেখিতে দেখিতে সকলের মুৰ্ত্তি হইল যেন জলে-ডােবা ইদুর! বৃষ্টির মধ্যে পাহাড়ের উপর রাত কাটিল— শুনিতে লাগিলাম তলায় ঘােড়াগুলা হাঁকডাক করিতেছে। ভয়ানক যুদ্ধের পর সাধারণত একটা খুব ঝড় বা বৃষ্টি হয়। যুদ্ধ খুব জমিলে আকাশ বারুদের ধােয়ায় অন্ধকার হইয়া ওঠে—চারিদিক ভারি নিরানন্দ ফাকা ফাঁকা ঠেকে, অচিরে কানে তালা দিয়া বজ্র হকিয়া ওঠে এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই সজোরে বৃষ্টি নামিয়া যুদ্ধক্ষেত্রের পার্ট-আর্থারের ক্ষুধা ৪৮ সমস্ত মলিনতা ধুইয়া দেয়। এমনি বর্ষণকে বলে—“বিজেতার জন্য আনন্দাশ্রু আর পরাজিতের জন্য শােকা।” এমনি দুর্যোগের রাত বেহাত জায়গা পুনরধিকারের চেষ্টার উপযুক্ত সময়। আমরা কিন্তু যুদ্ধ- জয়ের প্রও অসতর্ক হই নাই-বজ্রগর্জনে বা বারিবর্ষণে ঢিলা দিবার পাত্র আমরা নয়। সূচনামাত্রেই শত্রুর অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা পণ্ড করিতে লাগিলাম। কোন ও শুয়াংতিংষান অধিকারের সাত দিন পরে একদা মধ্যাহ্নে শত্রু পাল্টা আক্রমণ শুরু করিল। আট নয় শত পদাতিক-ওয়াংচিয়াতুন হইতে সিধা অগ্রসর হইতে লাগিল, আর তাষিতুঙের আশপাশ হইতে গােলা বর্ষণ আরম্ভ হইল। ব্যাপার অপ্রত্যাশিত নয়—আমরা বিস্মিত হইলাম না। তাদের পানে আমাদের সমস্ত বন্দুক ও কামান দাগা সত্ত্বেও তারা নির্ভয়ে দ্রুতগতি সম্মুখে ধাবিত হইল—কিন্তু অধিকক্ষণের জন্য নয়। আমাদের প্রত্যেক ভলি”র পর শত্রু দলে দলে ধরাশায়ী হইতে লাগিল। তাদের নায়ক দীর্ঘ তরবারি শূন্যে ঘুরাইয়া ছুটিয়া আসিতেছিল--সে-ও পড়িয়া গেল। দেখিয়া অবশিষ্ট সৈনিকেরা রণে ভঙ্গ দিয়া উপত্যকার মধ্যে এলােমেলাে ছুটিয়া পালাইল। গােলাজেরা কিন্তু অত সহজে নিরস্ত হইল না! আরও কিছুকাল তারা আমাদের পানে গােলা চালাইতে লাগিল। শেষ, বােধ করি পলায়নপর পদাতিক দলকে দেখিয়া নিরাশ হইয়া হাল ছাড়িয়া দিল। 'চারিদিক আবার নীরব-কোন্ পুনরধিকারের প্রথম চেষ্টা সফল হইল না ! ইহার কিছুকাল পরে রুশেরা তাইপােষানের উপরে দেখা দিল। প্রথম আক্রমণে যত ছিল, এবারও প্রায় তত পদাতিক সাননে ‘ব্যা’ বাজাইয়া আমাদের প্রথম লাইনের পানে অগ্রসর হইল। দুই দলের 3) পাের্ট-আর্থারের কুন মধ্যেকার ব্যবধান যখন ৭০০-৮০০ মিটার’ * মাত্র তখন তারা, “উলা’ গৰ্জন করিয়া ছুটিয়া আসিল। অমনি আমরা ঘনঘন গুলিবর্ষণ শুরু করিয়া দিলাম। ফলে, অগ্রগামীরা ত মরিলই, যারা পৃষ্ঠ প্রদর্শন করিল, তারাও মরিল। অবশেষে শত্রু তাইপােষানের দিকে ফিরিয়া গেল। পরদিন রাত একটায় অন্ধকারে কোন্ আবার আক্রান্ত হইল। আক্রমণ যেমন দ্রুত তেমনি সুচিন্তিত—কুশেরা মৃত্যু পণ করিয়া আসিয়া- ছিল। তারা এমন নিঃশব্দে খাড়া পাহাড়ে হামা দিয়া উঠিয়াছে যে, একখানা পাথর বা মুড়িও স্থানচ্যুত হয় নাই। অতর্কিতে জাপানী শান্ত্রীকে বধ করিয়া সদলবলে তারা আমাদের শিবিরের উপরে ঝাপাইয়া পড়িল। গভীর অন্ধকার-শত্রু-মিত্র চিনিবার জো নাই, তার মাঝে ভীষণ যুদ্ধ। কে যে কাহাকে মারিতেছে জানে না, তবুও সকলে তলোয়ার চালাইতেছে। কিছুই দেখা যায় না, শুধু আততায়ীর পতন শব্দ কানে পৌছিতেছে। রুশেরা এবারেও আমাদের বাধা ভেদ করিতে পারিল না-হতাশ হইয়া বেশ শৃঙ্খলার সহিত পাহাড় হইতে নামিয়া গেল। আহত অবস্থায় যারা পড়িয়া রহিল, তারা কিন্তু যথাসম্ভব বন্দুক ও তলােয়ারের সাহায্যে আমাদের বাধা দিতে লাগিল। বিশেষ করিয়া এক জনের কথা মনে পড়ে, তার আঘাত সাংঘাতিক, মৃত্যু আসন্ন। এমন সময় সে তার অবনত মাথা কষ্টে তুলিয়া একটু হাসিল। লােকের যে পথিক—তার অধরে সেই অগ্রাহের ও কঠিন সঙ্কল্পের হাসি অতি ভয়ঙ্কর। ভাবিয়াছিলাম শত্ৰু এইবার নিরস্ত হইল, কিন্তু আমাদের অনুমান মিথ্যা প্রতিপন্ন করিয়া বহু শত্রুসৈন্য প্রত্যুষে আবার আক্রমণ করিল। ; এক মিটার এক গজ অপেক্ষা তিন ইঞ্চির কিছু বেশি।

$-আর্থারের ক্ষুধা অবিরাম গােলা বর্ষণের আড়ালে পদাতিকেরা অগ্রসর হইতে লাগিল। সম্মুখের সারিতে শত্রুসেনার সংখ্যা কেবলই বাড়িতেছে—মনে হইল যেমন করিয়া হউক কোন্ দখল করিবার পণ তারা করিয়াছে। বারবার শত্রু-আক্রমণ ব্যর্থ করিয়া আমাদের নানা অভিজ্ঞতা লাভ হইয়া- ছিল, ইহা একটা মস্ত সুবিধা। তবুও এবার বিশেষ বেগ পাইতে হইল। শত্রু অনেক, তবে আমাদেরও সৈন্যসংখ্যা বাড়িয়াছে—আক্রমণ প্রতি- রােধের ব্যবস্থারও উন্নতি হইয়াছে। ফলে, এই যুদ্ধ আমাদের কোন্ আক্রমণের তুল্যই ভীষণ হইয়া উঠিল। ঘণ্টার পর ঘণ্টা শত্রুর কামানের সংখ্যা বাড়িয়া চলিয়াছে। একাধিক গিরিশিখর হইতে কেঞ্জা ও আমাদের পদাতিক শিবিরের উপর গােলা নিক্ষিপ্ত হইতে লাগিল। গােলন্দাজের অপূর্ব তৎপরতা, লক্ষ্যও প্রায় অভ্রান্ত। এক মিনিট ত দূরের কথা, এক সেকেণ্ডেরও বিরাম নাই—গােলাগুলি অবিরাম পড়িতেছে। প্রত্যুষ হইতেই আমাদের গােলন্দাজ ও পদাতিকেরাও কামান ও বন্দুক চালনা করিয়া শত্রুকে অগ্রসর হইতে দেয় নাই। ক্রমে দুই পক্ষের গােলাগুলিতে আকাশ ভরিয়া উঠিল—পাখীর আর উড়িবার ঠাই নাই, জীবজন্তুর লুকাইবার স্থান নাই। শূন্য যেন গুরুভার—দিগ্বিদিকে অবিচ্ছিন্ন গভীর নিনাদ—সারা আকাশ ও ধরণী যেন অগণ্য উন্মত্ত অসুরের ক্রোধকবলিত। শত্রুর বিস্ফোরক গােল দলে দলে ছুটিয়া আসিয়া মাথার উপর ফাটিতেছে—নির্দয়ভাবে আঘাত হানিতেছে, হত্যা করিতেছে ! তাহা প্রতিরােধ করিবার জন্য আমা- দের গােলন্দাজেরা প্রাণপণে যুঝিতেছে—কখনাে বা দায়ে পড়িয়া স্থান পরিবর্তন করিতেছে। যুদ্ধের ফল অনিশ্চিত। মাঝে মাঝে শত্রুর দল বৃদ্ধি হইতেছে—অমনি নূতন বিক্রমে তারা আক্রমণ শুরু .

পাের্ট-আর্থারের কুফা করিতেছে। আমরাও ‘রিজার্ভ’ দলের কতক অংশ যুদ্ধে নাইয়াছি কয়েকদল গোলন্দাজও বড় বড় কামান লইয়া অশপাশে অভিড়া গাড়িয়াছে। দক্ষিণে শকুহো নামক স্থানে নৌ-গোলন্দাজের স্থাপিত। এইরূপে উভয় পক্ষের শক্তি বৃদ্ধির ফলে প্রত্যেকেই অপরের উচ্ছেদের চেষ্টা করিতে লাগিল। দিন শেষ হইয়া গেল, রাত্রি আসিল, সংগ্রামের তবুও বিরাম নাই। নিরানন্দ যুদ্ধক্ষেত্রের উপর সূর্যাস্তের স্নান আললা আসিয়া পড়ি ঘাছে। পশ্চাতে ঘনপার—সমস্তই কেমন বিষাদময় হইয়া উঠিল। আজিকার যুদ্ধ কি নিস্ফল হইল? মন বলিতেছে, নিশাগমে শত্ৰু নিৰস্ত হইবে না-অমাদিগকে শ্রান্ত অবসন্ন করিয়া আমাদের গােলাগুলির অভাব ঘটাইবার উদ্দেশ্যেই তারা সকাল হইতে সন্ধ্যা পর্যন্ত গােলা চালাইয়াছে! তাই রাত্রে সজাগ সতর্ক হইয়া তাদের প্রতীক্ষায় রহিলাম গভীর রাতে প্রচণ্ড আক্রোশে শত্রু একযােগে আক্রমণ করিল মনে হইল, তাদের ‘উলা’-ধ্বনি যেন শত শত বন্যজন্তুর গর্জন। অন্ধকারে তাদের কিরিচ অলিতেছে তুষারের উপর সূর্যরশ্মির মত। ভাবিলাম, এবার শত্রুকে দেখাইব, আমরা কেমন পদার্থ ! সকলে লক্ষ্য স্থির করিয়া গুলি বর্ষণ করিতে লাগিলাম—সে অব্যর্থ সন্ধানের মুখে শক্রর পরাজয় নিশ্চিত। উলা’-ধ্বনি ক্রমেই নিস্তেজ হইতে লাগিল—অসির জৌলুসও অন্ধকারে অন্তর্হিত হইল। আবার চারিদিক নীরব। সেই নীরবতায় তৃণভূমি হইতে পতঙ্গের করুণ গুঞ্জন এবং যুদ্ধক্ষেত্রে পরিত্যক্ত আহত রুশেদের কাতরানি স্পষ্ট হইয়া উঠিল। উপরে, আকাশে ঘনমেঘ বুকিয়া পড়িয়াছে—বর্ষণ আসন্ন, সন্দেহ নাই। সে-বর্ষণের পূর্বে আমাদের নয়ন দু-ফোটা অশ্রুবর্ষণ করিল—এ যুদ্ধে যারা প্রাণ দিল, তাদের জন্য !

১১ প্রতিরােধ প্রতিরােধের কাজ বিষম বিড়ম্বনা! ভিতরে বাহিরে হয়ত যুদ্ধের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত, তবু সুযােগের অপেক্ষায় বসিয়া থাকিতে হয়। কাজের অভাবে কটিবন্ধ হইতে বিলম্বিত অসি গুমরাইতেছে, হাতের পেশিগুলা দীর্ঘশ্বাস ছাড়িতেছে, তথাপি নিরুপায় ! আক্রমণের গোড়ার কথা প্রতিরােধ—এ কথা কিন্তু ভুলিলে চলে না। যুদ্ধপ্রণালী স্থির করিয়া আক্রমণে অগ্রসর হইবার পূর্বে সতর্ক প্রতিরােধের সব রকম উপায় অবলম্বন করিতে হয়, শত্রুর অবস্থা পুঙ্খানুপুঙ্খ ও নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করিতে হয়, তাদের সৈন্যসংস্থান আবিষ্কার করিতে হয়। কাজেই অামাদের বর্তমান অবস্থা যেন সরােবরের মধ্যে “ড্রাগন”-এর ক্ষণস্থায়ী আত্মগােপন, আর আমাদের যুদ্ধযাত্রা যেন মেঘ ও কুয়াশায় ঢাকা “ড্রাগন”এর স্বর্গারােহণ । শত্রু কেন্জা লইতে না পারিয়া স্কুয়াংতাইকু ও আন্তজুলিং এবং দক্ষিণে তাইপােষান্ ও লাওৎসােযানের দিকে অনেকটা পিছু হটিয়া গেল। সেখানে বরাবর পাহাড়ের উপর সুদৃঢ় বাধা তুলিয়া জাপানী আক্রমণ প্রতিরােধের জন্য প্রস্তুত হইল। আমরা যেখানে ছিলাম ঠিক সেখানেই রহিলাম, শত্রুকে কণা পরিমাণ ভূমিও ফিরাইয়া দিলাম । হুয়াংনি-চুয়ান্তাষাংতুনের, উত্তর পূর্বের পাহাড়গুলির উপর লক্ষ্য রাখা আমাদের দলের কাজ। প্রথম দিনই কোদাল ও শাবল লইয়া মাটি খুঁড়িতে সুরু করিলাম। চুংচিন্নাতুনের তুলনায় এবার ৩ পাের্ট-আর্থারের আমরা শত্রুর আরও নিকটে আছি। শত্রু মাঝে মাঝে হানা দিবে ইহা নিশ্চিত, তাই প্রতিরােধের রীতিমত ব্যবস্থার প্রয়ােজন। অবিরাম কঠিন যুদ্ধের পরও সৈনিকের বিশ্রামের অবসর নাই, সে-চিন্তা তাদের মনেও ওঠে না। দিনরাত তারা বালির বস্তা ও তারের বেড়া পিঠে লইয়া খাড়া পাথুরে পথ দিয়া ঘাসের চাবড়া বা ছুচলল পাথর ধরিয়া ধরিয়া উঠিতেছে। কঙ্কালের মত এক পাষাণময় তুঙ্গশৈলের উপর আমাদের আস্তানা, পাহাড়ের ধার নীচে উপত্যকায় প্রায় সােজা নামিয়াছে। জলশুন্য বৃক্ষবিরল পাহাড়। একমাত্র সুখ-কুয়াসার ভিতর দিয়া দূরে লাও-- তীযানের দুর্গশ্রেণী চোখে পড়ে, নিকটের পাহাড়েও গড়-ঘেরা মাটির টিপি দেখিতে পাই। দেখিয়া কল্পনা করি, অচিরে ওই রঙ্গমঞ্চে আবার যবনিকা উঠিবে—আবার ওখানে এক জীবন্ত নাট্যাভিনয় দেখিতে পাইব। দুর্বার সংগ্রামের আমেজ পাইতেছি—এবার যেন মন করিয়া নিঃশেষে আত্মাহুতি দিতে পারি, যাহাতে দেহের কণা পরিমাণ 'অস্থিমাংসও অবশিষ্ট না থাকে। কঠিন পরিশ্রম অার ব্যর্থ কল্পনায় দিন কাটিয়া যায়। রাত্রির নিকষ কালাে পর্দা ঠেলিয়া একদল কালাে মূর্তি পাহাড়ে উঠিয়া আসে। উহারা কে? সারাদিনের শ্রমে কাতর সৈনিককে অব্যাহতি দিবার জন্য নুতন লােক আসিতেছে। তবে কি রাতেও কাজ চলে? চলে বই কি--আক্রমণ-প্রতিরােধ ব্যবস্থায় এই রাতের কাজই আসল। দিনের বেলা, কোথায় কাজ চলিতেছে নির্ণয়ের জন্য শত্রু গােলা চালায়—তখন একটানা কাজ অসম্ভব। তাই রাতে খাটিয়া সময়ের ক্ষতিপূরণ করিয়া লইতে হয়। দূরে শত্রু-শিবির হইতে উখিত ধােয়ার পানে চাহিয়া আমাদের সৈনিকেরা পাথরের গাদা দেয় বালি বহিয়া ৫৪ শেন্ট-আর্থারের ক্ষুধা আনিয়া খলি ভর্তি করে এবং তারের বেড়া দিবার খোটা পেতে। যথাসম্ভব নিঃশব্দে কাজ করিতে হয়—ধূমপানের উপায় নাই, বলাই বাহুল্য। একটি সিগারেট ধরাইলে শক্ত গুলি চালাইতে পারে । রাত দুটা তিনটা পর্যন্ত দারুণ ঝড়জলের মধ্যেও কাজ চলিতে থাকে। প্রত্যুষে কেবল ক্ষণকালের বিশ্রাম। কেহ কেহ তখনাে বন্দুক- কাধে মুর্তির মত খাড়া দাড়াইয়া শত্রু-শিবির পানে দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখে। শান্ত্রীদের কাজ মােটেই সহজ নয়। অনাবৃত আকাশতলে শীতল নিশীথ বাতাসে দাড়াইয়া মৃদু হাসিয়া তারা বলাবলি করে-বেজায় শীত হে! আজ আবার ওঁরা (শ ).আসছেন না কি ? রুশ গােলদাজেরা ঠিক কোথায় কেহ জানে না। উপত্যকায় আমাদের কর্মচারীদের শিবির-সেখানে তারা গােলা ফেলিত। এক- দিন একটা প্রকাণ্ড গােল উড়িয়া আসিয়া দারুণ শব্দে ফাটিয়া গেল। পাড়ের খানিকটা চুর্ণ হইল, পাথর ছিটকাইল, পীতাভ ঘন ধোয়ায় চারিদিক ভরিয়া গেল, মাটি কাপিয়া উঠিল। যুদ্ধে ব্যবহৃত সাধারণ কামানের গােলার অভিজ্ঞতা ছিল—এতবড় গােলা এই প্রথম দেখিলাম। ভারি বিস্ময় বােধ হইল—তবে কি, শত্রু লুংওয়াংতাঙে নৌ-কামান টানিয়া তুলিয়া গােলা দাগিতেছে। আর একটা ব্যাপারেও মনে খটকা লাগিল। প্রত্যহ প্রায় একই সময়ে শত্রু আমাদের পানে বিক্রমে গােলা চালাইত, সর্বদাই সেনাধ্যক্ষের আড্ডা লক্ষ্য করিয়া কামান ছুড়িত—তার ফলে আমাদের অপ্রত্যাশিত ক্ষতি হইতে লাগিল। মনে হইত, শত্রুর এই আচরণের মধ্যে কোথায় যেন কি একটা রহস্য আছে, কিন্তু তা ভেদ করা মােটেই সহজ নয়। অবশেষে দীর্ঘকাল সতর্ক সন্ধানের ফলে জানা গেল যে, আমাদের শাস্ত্রীশ্রেণীর পিছনে চীনারা গরু বা ভেড়ার পাল লইয়া ০ ৫৫ পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা পাহাড়ে উঠিত-জন্তুগুলি চরানােই যেন তাদের উদ্দেশ্য ! হা হইতে দূরবর্তী রুশ-দলকে সঙ্কেত করিত। যেদিকে বা যে গ্রামে গােলা ফেলা দরকার, একটা কালাে গরু বা একপাল ভেড়া ধীরে ধীরে সেদিকে চালিত করিয়া ইঙ্গিতে ব্যাপারটি বুঝাইয়া দিত। মাসের শেষের দিকে আমাদের সন্ধানী কর্মচারীরা শত্রুর প্রহরী শ্রেণী ভেদ করিয়া তাদের কয়েকজন কর্মচারীকে অতর্কিতে ঘেরিয়া ফেলিল। কাজ হাসিল করিয়া ফিরিবার পথে তিন চার জন রুশ সন্ধানী দূতের সঙ্গে সাক্ষাৎ। এদিক ওদিক তাড়া খাইয়া বন্দী হইবার ভয়ে তারা মরিয়া হইয়া গুলি চালাইয়া পলায়নের চেষ্টা করিতে লাগিল। শেষ পর্যন্ত কেবল একজনকে বন্দী করিয়া জাপানী কর্মচারীরা সগৌরবে ফিরিয়া আসিল। বন্দীকে যথাবিধি প্রশ্ন করা শুরু হইল। সে একজন পদাতিক কৰ্ম্ম- চারী। ঘনঘন মাথা নােয়াইয়া সে প্রাণভিক্ষা করিতে লাগিল। যাহা জানে সমস্তই প্রকাশ করিবে বলিয়া প্রতিশ্রুতি দিল। যেখান থেকে 'শক্রর গতিবিধি নজরে পড়ে সেখানে লইয়া গেলে সে রুশ-সৈন্যের সংস্থান-ব্যবস্থা অসঙ্কোচে দেখাইয়া বুঝাইয়া দিল। তার উত্তরের সঙ্গে আমাদের লােকের সংগৃহীত বিবরণ মিলাইয়া দেখা গেল, সে মিথ্যা কহে নাই। সে যাহা জানিত সমস্তই অকপটে প্রকাশ করিল—আমরা যথেষ্ট উপকৃত হইলাম। তবুও তার প্রতি কৃতজ্ঞতার বদলে ঘণারই উদ্রেক হইল—সে কাপুরুষ বলিয়া! •আর একজন রুশ সৈনিকের পরীক্ষার কথা বলি। আমাদের কেজান্ আক্রমণের পরের রাত্রে একটা প্রকাণ্ড পাথরের তলায় সে ধর পড়ে। সেখানেই সে লুকাইয়া ছিল। আমাদের কথাবার্তা হইল কতকটা এইরূপ পপ আর্থারের ক্ষুধা “আমাদের আক্রমণ সম্বন্ধে তোমাদের ধারণা কি?” “আমরা ভয় পাইয়াছিলাম। প্রতি মুহুর্তেই ভাবিতেছিলাম জাপানীদের ভীষণ আক্রমণ শুরু হইবে।” নায়কেরা তােমাদের যত্ন আত্তি করে ত?” “প্রথম যখন পাের্ট-আর্থারে আসি, তখন বেশ সদয় ব্যবহার পাইয়াছি, কিন্তু ইদানী আর তেমন নাই। মাস-তিনেক হইতে বেতনের মাত্র এক-তৃতীয়াংশ পাইতেছি। রসদের পরিমাণও সম্প্রতি প্রায় অর্ধেকে দাড়াইয়াছে—বাকি যায় ওদের পকেটে!” “নাশানে পরাজিত রুশেরা কি পাের্ট-আর্থারে ফিরিয়াছে ?” “আসল দুর্গের মধ্যে তারা প্রবেশ করিতে পায় নাই—প্রথম ‘লাইনে কাজ করিবার আদেশ পাইয়াছিল। খাদ্য অবশ্য পায় নাই, কারণ তার না-কি অভাব ! অগত্যা সেটা সংগ্রহের ভার তাদেরই।” • “তােমার দেশের লােক অনেকে বন্দী হইয়া জাপানে গেছে খবর রাখ কি?” “হ জানি। এই সেদিন আমারই এক বন্ধু সেখানে গেল!” ১২ শিবির-জীবন ভাবিতাম, তাবুগুলাে অন্তত বৃষ্টি ও হিম আটকাইবার পক্ষে যথেষ্ট কিন্তু বাতাস ও বৃষ্টির উপদ্রবে অধুনা তাহাদের অবস্থা শােচনীয় হইয়া উঠিয়াছে। ষাট দিন হইল জাহাজ হইতে নামিয়াছি, ষাট দিনই তাবুর মধ্যে বাস। তাবুই আমাদের সাধারণ বাসস্থান—সেই একথান *৫৭ পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা ক্যাম্বিসই আমাদের সম্বল। বােদ আটকানাে ছাড়া, আপতত আর কোনাে কাজে উহা লাগে না। দেহ নয় প্রকৃতির অত্যাচার সহ্য করিল, কিন্তু রসদ আর অস্ত্রশস্ত্র গােলাগুলি রক্ষা পায় কিরূপে? অথচ এ সব পদার্থ আমাদের জীবনের মতই মূল্যবান! নিরুপায় অবস্থায় বৃষ্টির মধ্যেও সুনিদ্রার ব্যাঘাত হয় না—সুখস্বপ্ন আমাদের দিনের শ্রান্তি দূর করে। তখন আমাদের সুপ্ত মুখের পানে চাহিলে দেখিতে পাইবে, সাজ-পােষাক আঁটিয়া আমরা ঘুমাইয়া আছি। মাথার লম্বা চুল এলােমেলাে বিপর্যস্ত, মুখে খোঁচা খোঁচা গোঁফদাড়ি, রােদে-পােড়া গায়ের চামড়ায় ধুলামাটির প্রলেপ-যেন ভিখারী বা ডাকাতের পাল সকলেই কৃশকায় হইয়া পড়িয়াছে। আহারেই আমাদের একমাত্র আনন্দ। একটু অবসর পাইলেই মনে হয় কি খাওয়া যায় ? “ভাল খাবার কিছু আছে ?” “না, তােমার কাছে নিশ্চয়ই আছে। দাও না ভাই একটু।” দুজনে দেখা হইলেই এমনিধারা আলাপ হয়। মুখ বদলাইবার ইচ্ছা অদম্য হইলে ছােলা মটর বা গম ভাজিয়া ইদুরের মত কুড়মুড় শব্দে চিবাইতে থাকি। ডানি দখলে আসার পর জিনিষপত্র আনার সুবিধা বাড়িল। ঠিক যুদ্ধে ব্যাপৃত থাকার সময় ছাড়া আর বিশেষ কষ্ট রহিল না। সৈনিকেরা নিয়মিত রসদ পাইতে লাগিল—নিজেরা বাধিয়া খায়। পাহাড়ের ছায়ায় বা পাথরের ঢিপির আড়ালে শুকনাে ভুট্টাগাছ জ্বালাইয়া রান্না হইতেছে, নিবন্ত আগুনের ধোয়ায় অধীরভাবে ভাত সিদ্ধ হইবার আশায় তারা বসিয়া আছে, দেখিতে পাইতাম। তাদের দেখিয়া মনে হইত যেন একপাল ফুর্তিবাজ ছেলে ! শশা, শুকনাে মূলা, শাক-সবজি, শুকনাে রাঙা আলু বা টিনেভা খাদ্যেই তাদের সমধিক পাের্ট-আখীরের ক্ষুধা ৫৮ রুচি। বিনা জলে শুকননা বিস্কুট গেল। সাধারণত যাদের অভ্যাস, আধসিদ্ধ ভাতের সঙ্গে দু-একটা মুনে-জরানো কুল পাইলে যারা রীতিমত ভােজ বলিয়া মনে করে, উপরােক্ত আহাৰ্য্য পাইয়া তারা যে বৰ্ত্তিয়া যাইবে, সে কথা বলাই বাহুল্য। বর্তমানে চুংচিয়াতুন অপেক্ষা প্রীতিপ্রদ স্থানে আছি। এখানে কিছু কিছু শ্যামল তৃণ আছে, দু-চারিটি ফুলও হাসিতেছে। ঝিনুকের খােলর মধ্যে ফুলগুলি সাজাইয়া রাখি, কখনাে বা কোটের বােতামে আটকাইয়া তাদের সৌরভ আম্রাণ করি। ক্ষুদে ক্ষুদে নীল “Forget-me-not”-এর পানে চাহিয়া কল্পনায় ভর করিয়া প্রিয়জনের কাছে উড়িয়া যাই! রুশ ছাড়া জাপানী যােদ্ধার অপর এক শত্রু ছিল—আবহাওয়া নামক বিষম দানব। মানুষ যতই কেন সাহসী হােক, হঠাৎ পীড়িত হইয়া রণক্ষেত্র ত্যাগে বাধ্য হইতে পারে। ইহাকেই বলে আবহাওয়া নামক শত্রুর হাতে ঘায়েল হওয়া। কখনো কখনাে আর এক শত্রুর হাতে তারা ঘায়েল হয়—তার নাম ‘খাদ্য। মুক্ত আকাশতলে বৃষ্টি বাতাসের মাঝে থাকার দরুণ কখনাে কখনাে সংক্রামক রােগের আবির্ভাব হয়। কাছাকাছি গাছ-জাতীয় কিছু ছিল না বটে, তবে ঘাস ছিল যথেষ্ট। তার দ্বারা কাজ-চালানাে-গােছ ‘ঘরের ছাউনি হইতেও পারে। সেই ঘাসের চালা রৌদ্র নিবারণে যথেষ্ট হইলেও ঝড়বৃষ্টিতে একেবারে অচল, বর্ষাকালে আমাদের ছেড়া তাবুর চেয়েও অধম। শত্রুর গােলার ঝড় তবুও সহ হয়, কিন্তু প্রাকৃতিক ঝড় একেবারে কাবু করিয়া ফেলে। দিনরাত অতি পরিশ্রম, নিদ্রাভাব, অতি কদৰ্য্য জলপান, তার উপর বৃষ্টিতে ভিজিয়া ভিজিয়া হাড়-ইস্তক ঠাণ্ডা হইয়া যায়। এ সবের ফলে সৈন্যশ্রেণীতে আমাশয় দেখা দিয়া অনেককেই অকেজো করিয়া ছাড়িল। আমি বেশ বলিষ্ঠ ও হৃষ্টপুষ্ট ৫৯ পাের্ট-আর্থারের-ক্ষুধা ছিলাম—উক্ত রোগের কবলে পড়িয়া অতি দ্রুত দেহের শক্তি ও স্বাস্থ্য হারাইতে বসিলাম। ভয় হইল শেষ পর্যন্ত বা সেই শত্রুর হাতেই পরাজয় ঘটে! ভাবনায় বড়ই বিমর্ষ হইয়া পড়িলাম। প্রতিদিনই যুদ্ধযাত্রার আদেশ পাইব আশা করিতেছিলাম। সুস্থ হওয়ার পূর্বে আদেশ আসিলে আমরা পড়িয়া থাকিব--আর যুদ্ধের গৌরবের ভাগ পাইব না! একে অসুস্থতা, তার উপর ভাবনাচিন্তায় অধীরতা ও দুঃখের ভারও বাড়িয়া গেল। তখন যে তিন ব্যক্তি আমার উপকার করিয়াছিলেন তাদের সহৃদয়তা কখনাে ভােলা সম্ভব নয়—দু-জন অস্ত্রচিকিৎসক, মাসাইচি-য়্যানুই ও হাজিমে-আন্দো; আর আমার সৈনিক-ভৃত্য বুকিচি-তাকাও। আমার রােগ ছোঁয়াচে, তবুও তারা নিয়ত আমার কাছে কাছে থাকিয়া সযত্নে ঔষধ পথ্য ও সেবার ব্যবস্থা করিতেন। আনন্দ ও সান্ত্বনা দিবার জন্য কত মজার মজার গল্প বলিতেন। তাদেরই চেষ্টায় সুস্থ হইয়া আবার যুদ্ধে যােগ দিয়া কর্তব্য সম্পন্ন করা সম্ভব হইয়াছিল। এইরূপে তাদের প্রতি সবিশেষ অনুরক্ত হইয়া, যতদিন সেখানে ছিলাম, তাদের দুঃখের ও শ্রমের ভাগ লইয়া তৃপ্ত হইতাম। সুদৃঢ় দুর্গের ভীষণ অবােধ যখন চলে, তখন যারা সম্মুখে থাকে, আঘাত ও মৃত্যু কেবল তাদেরই মধ্যে নিবদ্ধ থাকে না—পশ্চাতে অস্ত্র- চিকিৎসক ও অন্যান্য অ-যােদ্ধার মধ্যেও উহা আবির্ভূত হয়। শুধু তাই নয়, অনেক সময়ে আহতকে তুলিয়া আনার জন্য, নিজ জীবন বিপন্ন করি গােলাগুলির মুখেও ডাক্তারকে আগুসার হইতে হয়। এমন অবস্থায় কে যে আগে মরিবে কেহ তাহা জানে না। যুদ্ধক্ষেত্রের গােলমালে কার বিশেষ বন্ধু কোথায় মরিল সাধারণত জানা অসম্ভব, তার দেহও খুঁজিয়া পাওয়া দায়। মৃত বা জীবিত অবস্থায় পােঠ আর্থারের ক্ষুধা তার সাক্ষাৎ লাভ এত অনিশ্চিত যে, তেমন দুরাশা কেহই করে না। তাই পাের্ট-আর্থার দুর্গের প্রথম আক্রমণ ঘােষিত হইলে ডাক্তার-দুজনের হাত ধরিয়া শেষ বিদায় লইলাম। আবার তাদের দেখিবার আশা ছিল না। সৈন্যাবাসে যে সৈন্যদল আমার শিক্ষাধীন ছিল, তার মধ্যে আমার সৈনিক ভৃত্য বুকিচি-তাকাও অন্যতম। তার অনুরাগ, আগ্রহ ও অকপট ব্যবহার আমাকে মুগ্ধ করিয়াছিল। সদরে বদলি হইবার পর অনেক পীড়াপীড়ি করিয়া তার নায়কের অনুমতি আদায় করিয়া তাকে ভৃত্যের কাজে বাহাল করি। শান্তির সময়, কর্মচারী ও তার ভৃত্যের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কই থাকে, কিন্তু একত্রে যুদ্ধক্ষেত্রে থাকার সময় সে-সম্পর্ক আরও নিবিড় হয়, তখন আর প্রভুভৃত্যের সম্বন্ধ নয়, বড় ও ছােট ভাইয়ের সম্বন্ধ। সকল বিষয়েই আমি তাকাও’র উপর নির্ভর করিতাম—সেও আমার অত্যন্ত অনুগত হইয়া পড়িয়াছিল। রাধাবাড়া করিয়া সে আহার পরিবেশন করিত—কোথা হইতে একটা প্রকাণ্ড জলাধার সংগ্রহ করিয়াছিল—দূর থেকে জল আনিয়া তাহা ভরিয়া দিত—তার কল্যাণে গরম জলে স্নানের আরাম উপভােগ করিতাম। রােগের সময় শান্তি ভুলিয়া সে সারারাত আমার পাশে বসিয়া থাকিত, গা-হাত-পা টিপিয়া আমাকে আরাম দিবার চেষ্টা করিত। ক্ষুধায় কাতর হইয়া খাইতে চাহিলে সে আমাকে ভৎসনা করিত- শিশুকে ভুলাইবার মতই বলিত, এখন আপনার অসুখ, এখন কি খেতে আছে? শীগগির সেরে উঠুন, তখন যা চাইবেন তাই খেতে দেব । প্রত্যেক খুঁটিনাটির প্রতি দৃষ্টি রাখিয়া সে সেবা করিত, এতটুকু নড়চড় হইত না, না চাহিতেই সব কিছু পাইতাম। আমার সেই সহৃদয় ভৃত্যের কথা কখনাে ভুলিব না।

স্মৃতিতর্পণ পাের্ট-আর্থারে রুশের অধিকার ক্রমেই খর্ব হইয়া আসিতেছিল, সেই জন্যই আমাদের সৈন্যশ্রেণী বিদীর্ণ করিয়া হাত-পা মেলিবার তাদের প্রাণপণ চেষ্টা। আমাদের সামনে এক খাড়া পাহাড়, তার নাম দিয়া- ছিলাম ইওয়ায়্যামা। সেখানে শত্রুর চর প্রায়ই আমাদের সন্ধান লইতে আসিত। অগত্যা সেই জায়গায় আমাদের এক ঘটি বসানাে স্থির হইল। ১৬ জুলাই তারিখে, তখনাে গভীর অন্ধকার, লেফটেন্যান্ট সুগিমুর কয়েকজন সৈনিক লইয়া সেখানে যাইবার আদেশ পাইল। গ্রীষ্মকালেও রাতের হাওয়া ঠাণ্ডা—সেই ঠাণ্ডা হাওয়া তাদের মুখে ঝাপটা দিয়া ‘তৃণগুলের মাঝে সবুস ধ্বনি তুলিল। রাতের পর রাত সুনিদ্রার অভাবে তাদের অবস্থা শোচনীয়—স্নায়ু দুর্বল, দেহে মাংস নাই, সকলেই অস্থিসার। অন্ধকার ভেদ করিয়া তার দেখিবার চেষ্টা করিতেছে, শত্রুর পদশদের জন্য মাঝে মাঝে মাটছে কান পাতিয়া শুনিতেছে, কারণ এমন রাতে শত্ৰু নিশ্চয়ই শসিব সহসা শাস্ত্রী হাকিলশ! অমনি লেফটেন্যান্ট হুকুম দিল-ছড়িয়ে পড়াে ছড়িয়ে পড়াে! অবিচলিত সাহসে শত্রুর আক্রমণ প্রতিরােধ করিয়া জায়গাটি রক্ষা করিবার জন্য সুগিমুরা বদ্ধপরিকর হইল। শত্রু তিনদিক ঘিরিয়াছে, সংখ্যায় তারা অনেক বেশি, যদিও ঠিক তত অন্ধকারে বুঝিবার জো নাই। উপরন্তু তারা ‘মেশিন-গান’ সঙ্গে অনিয়াছে। আত্মরক্ষার জন্য এই ভীষণ পােয় আর্থারের ক্ষুধা মারণাস্ত্র' রুশেরা ব্যবহার করিয়া থাকে। নান্‌শানে ইহারই মুখে শত সহস্র জাপানী চুর্ণ হইয়াছে। মাত্র জন কর্য সৈনিক লইয়া তিন দিকে শত্রু-পরিবৃত হইয়া সুগিমুরা লড়িতে লাগিল। তার নিজের এবং দল- বলের শৌর্যবীৰ্য্য এমন যে দুই ঘণ্টা লড়াইয়ের পরও শত্রু এতটুকু ভূমি অধিকার করিতে পারিল না। ফলে হঠাৎ রণে ভঙ্গ দিয়া তারা অন্ধকারে অদৃশ্য হইল। কিন্তু সাহসী মুগিরা মারাত্মকভাবে আহত হইল— ‘মেশিনগানের গুলি তার মাথা ভেদ করিয়াছে। যে কয় মিনিট সে বাঁচিয়া ছিল চীৎকার করিয়া সকলকে উৎসাহ দিয়াছে, হু হু করিয়া চোখের মধ্যে রক্ত ঝরিয়া পড়িয়াছে, তবু নিরস্ত হয় নাই। রুশপক্ষ দশজনের বেশি মৃত সৈনিক ফেলিয়া গিয়াছিল। পরদিন প্রত্যুষে ‘রেড-ক্ৰশ’ নিশান ও ‘চোর’ লইয়া রুশেরা আসিল। জাপানী শাস্ত্রীদের দিকে গম্ভীরভাবে অগ্রসর হইয়া মৃত দেহ কুড়াইবার ছলে আমাদের শিবিরে উকি দিবার চেষ্টা করিতে লাগিল। এ ত গেল, এ ছাড়া তারা অন্যায়ভাবে শ্বেত পতাকা ও জাপানী সূৰ্য-পতাকার সাহায্যে ইতিপূর্বে আমাদের ঠকাইবার ঘৃণ্য চেষ্টা করিয়াছে। একবার নয়, দুইবার নয়, এ চালাকি প্রায়ই তারা করিয়া থাকে। একবার আর এক রকমে তাদের নীচতা প্রকাশ পায়। একদিন রাতে আমাদের শাস্ত্রী দেখিতে পাইল একটা অন্ধকার ছায়া তার পানে আগাইয়া আসিতেছে। দস্তুরমত সে হাঁকিল, “কে যায় ? দাঁড়াও!” ছায়ামূৰ্ত্তি উত্তর দিল, “জাপানী সামরিক কর্মচারী...” শান্ত্রী ভাবিল হয়ত কোনাে কর্মচারী শত্রুর খোজে গিয়াছিল, এখন ফিরিয়া আসিল। তাই সে বলিল, “যাও!” হঠাৎ সেই মূর্তি কিরিচ লইয়া তাহাকে অক্রমণ করিল। নিমিষে শাস্ত্রীর ভুল ভাঙিয়া গেল, সে কহিল, “ওরে পাজি, পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা তুই শত্রু! তবে এই দ্যাখ!” বলিয়া বন্দুকের বাঁট দিয়াএক ঘায়ে তাহাকে ধরাশায়ী করিয়া ফেলিল। শত্ৰু কয়েকটা জাপানী কথা শিখিয়া তাহারই সাহায্যে আমাদের ঠকাইবার চেষ্টা করিত। বাহকেরা সুগিমুরাকে তুলিয়া এক গােলাঘরে লইয়া গেল। সেখানে তার সৈনিক ভৃত্য ইতাে মায়ের মত যত্নে তার সেবায় নিরত হইল। বিশ্বাসী ইতাের চোখে জল, ভাবনা ও শান্তিভারে মুখ মলিন, তবুও সে আহত প্রভুকে কত মত সান্ত্বনা দিতে লাগিল। সুগিমুরাকে হাসপাতালে পাঠানাের পরও সে সময় পাইলেই অনেকখানি দুর্গম পথ পায়ে হাঁটিয়া তাহাকে দেখিতে যাইত। একদিন সদর থেকে ফিরিবার পথে দেখি কঁাধে ভারি বেঝার ভারে হাঁপাতে হাঁপাইতে এক সৈনিক পাহাড়ে উঠিয়া আসিতেছে। কাছে পৌছিয়া দেখি সে ইতাে। জিজ্ঞাসা করিলাম, সুগিমুরার অবস্থা কেমন ? “ভারি খারাপ। আজ আর তিনি কোনাে কথা বুঝতে পারছেন না।” “তাই ত! তােমার সেবা যত্নে নিশ্চয়ই তিনি তুষ্ট হয়েছেন!” কথাটা শুনিয়া ইতাে কাঁদিয়া ফেলিল, কহিল, “তার সঙ্গে আমিও কেন আহত হইনি, এই আমার দুঃখ! কত দয়া তিনি করেছেন, তার কোনো প্রতিদান দিতে পারিনি, আর এখন তিনি ছেড়ে চল্লেন জন্মের মত ! দুজনে একসঙ্গে মরতে পারলে কত আনন্দ হত ! এই ত কাল রাতে তিনি আমার হাতখানা চেপে ধরে বল্লেন, তােমার স্নেহ ভুলতে পারবাে না ! শুনে আমার কেবলই মনে হতে লাগলাে, কেন তার সঙ্গে আমারও মরণ হ’ল না।” তার পর সে বলিল, “তবে আসি, আর দাঁড়াবার সময় নেই। দেরি হলে হয়ত তাঁকে দেখতে পাব না।”

পাে-আর্থারের ক্ষুধা ৬৪ ইতে চলিতে লাগিল। তার কাঁধের উপর যে ভারি বােঝা, তাহাতে সুগিমুরারই জিনিষপত্র ছিল। আর একজনের কথা বলি। সৈনিকটির নাম হেইগাে য়ামাশিত। লােকটি ভারি বাধ্য ও কর্তব্যপরায়ণ, পরিশ্রম যতই হােক তার আপত্তি নাই। সঙ্গীরা তাহাকে শ্রদ্ধা করিত, ভালবাসিত, তাদের ধারণায় সে ছিল সৈনিকদের আদর্শস্থানীয়। একদিন যুদ্ধক্ষেত্রে সে তার প্রিয়তম বন্ধুর পানে ফিরিয়া গম্ভীরভাবে বলিল, “প্রাণ নিয়ে ফিরে যাবার আশা আমার নেই। দশবছর আগে যে-সব সঙ্গীরা মারা গেছে তাদের সঙ্গে দেখা করে বলবাে তাদের মৃত্যুর পূর্ণ প্রতিশােধ নেওয়া হয়েছে—এ ছাড়া আমার অন্য কামনা নেই। কিন্তু আমার এক দাদা আছেন তিনি ভারি গরিব। আমি মরলে, তাকে জানিয়ে আমার মরণের ফুল কেমন করে কি অপরূপ রূপে ফুটেছিল !” অনতিকাল পরে এক জরুরি চিঠি বিলি করিবার আদেশ সে পাইল। কাজ শেষ করিয়া ফিরিবার পথে তার পেটে গুলি লাগিল। কিন্তু তার হৃক্ষেপ নাই। বলিল, “এ আর এমন কি? বিশেষ কিছুই নয়।” লােকজন আসিয়া তাহাকে তুলিয়া লইয়া গেল, কারণ তার দাড়াইবার শক্তি ছিল না। ডাক্তার পরীক্ষা করিয়া মায়া নাড়িলেন। দলের নায়ক কর্নেল তাহাকে দেখিতে আসিলেন, সান্ত্বনা দিয়া কহিলেন, “ভয় নেই। নিরাশ হয়ে না! নিশ্চয়ই খুব কষ্ট পাচ্ছ, কিন্তু সাহস হারালে চলবে না।” মৃত্যু আসন্ন হইল। ঝাপসা চোখে কর্নেল বলিলেন, “এ আঘাত সন্মানের। তােমার কর্তব্য তুমি পালন করেছ...* হেইগাের চোখ একটুখানি খুলিল, মুখে যন্ত্রণাকাতর মিনতি কর্নেল ক্ষমা...আমার মৃত্যুর প্রতিশােধ...

৬৫ পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা তার হাত কাঁপিতে লাগিল, ঠোট নড়িয়া উঠিল, যেন সে আরও কিছু বলিতে চায়, কিন্তু তা আর হইল না। দেখিতে দেখিতে সে পরপারে যাত্রা করিল, যেখান থেকে কাহারও ফিরিবার উপায় নাই। কেন্জান আক্রমণ থেকে এ পর্যন্ত বড় কম লােক মরে নাই। সেই সব বীরাত্মাকে স্মরণ করিবার জন্য একটি দিন ধার্য হইল। নির্দিষ্ট দিনে মেঘলা সন্ধ্যার দিকে লিংগুইহােজুর কাছে এক গােলাবাড়িতে একটি বেদী স্থাপনা করা হইল। নামেই বেদী, কিন্তু আসলে এক কৃষকের উঠান থেকে আহরিত একটি ডেক্স। সাদা কাপড়ে সেটি ঢাকিয়া তার উপরে টাঙানাে হইল ‘অমিদা’ বুদ্ধের এক ছবি। ধর্মযাজক তােয়ামার কাছে ছবিখানি পাওয়া গেল। বেদীর সামনে মৃতের ভবিশেষ-ভরা বাক্সগুলি থাক দিয়া সাজানাে হইল-- চারি কোণা বাক্স, দৈর্ঘ্য ও প্রস্থে পাঁচ ইঞ্চি। ধূপ জ্বালানাে হইল, বেদীর মুখ রহিল পাের্ট-আর্থারের দিকে। মােমবাতির স্নান আলােয় নিরানন্দ শােকের ভাব মূর্ত হইয়া উঠিল, নিকটে ও দূরে পতঙ্গদল সুর করিয়া যেন জীবনের নশ্বরতার কথা প্রচার করিতে লাগিল। বাতাস সিরসির করিয়া উইলাের শাখা চিরুণীর মত আঁচড়াইতে লাগিল, আর তারই মাঝ দিয়া বৃষ্টি ঝরিতে লাগিল যেন আকাশের কান্না। বেদীর সম্মুখে দাড়াইল নায়কেরা অর্ধচন্দ্রাকারে, তাদের পিছনে দাড়াইল সেনাদল। ধর্মযাজক শাস্ত্রগ্রন্থ থেকে পাঠ করিতে লাগিলেন। পাঠ শেষে প্রধান নায়ক অগ্রসর হইয়া ধূপ জ্বালাইলেন, তারপর মাথা নত করিয়া দাড়াইলেন। অন্যান্য নায়কেরাও একে একে তার দৃষ্টান্ত অনুসরণ করিল। স্তব্ধ নির্বাক সভা, কেহ কোনাে কথা বলিল না। অগােচরে নায়ক ও সৈনিকের জামার অস্তিন ভিজিয়া উঠিল—সে কি কেবল বৃষ্টির জলে ?

১৪ তাইপােষানেৱ যুদ্ধ আমরা যেখানে আছি প্রতিদিন সেখানকার শক্তি বৃদ্ধি হইতেছে। এবার আগে চলার আয়ােজন সুরু হইল। নান্‌শানে শত্রুর বারােটি কামান দখলে আসে, লুয়ান্নিচিয়াওর কাছে উচ্চভূমিতে সেগুলি বসানাে হইল; তা ছাড়া চুচুয়ানৎজুর পশ্চিমে উচ্চভূমিতে রাখা হইল ছয়টি অতিকায় নৌ-কামান। শত্রুর অগ্রবর্তী ঘাটির খবর আনিবার জন্য সন্ধানী দল ঘনঘন যাইতে লাগিল। ধনুকের জ্যা একমাস ধরিয়া টানিয়া আছি, এইবার তীর ছাড়িবার জন্য আমরা প্রস্তুত—কেবল প্রস্তুত নয়, উৎসুক। সৈনিকদের উৎসাহে বান ডাকিয়াছে—আক্রমণের এই সুযােগ। আটাশে জুলাই আমাদের বিভিন্ন দল যাত্রা করিল দক্ষিণে রুশের আড়ার উপর নামিবার জন্য। আমার দলের উদ্দেশ্য সুরক্ষিত তাইপােষান দখল করা। যুদ্ধের পূৰ্ব্ব রাতে ব্রিগেডিয়ার-জেনারেল লড়াইয়ের প্রণালী পরিষ্কার বুঝাইয়া দিলেন। নায়ক ও সৈনিককে প্রাণপণে লড়িতে বলিলেন, জায়গাটি দখল করা চাই-ই, কারণ এই যুদ্ধে জিতিলে তবেই পাের্ট-আর্থারের আসল অবরােধ শুরু হইতে পারে। আমাদের কর্নেলও বলিলেন, এই প্রথম আমাদের সমগ্র রেজিমেন্ট যুদ্ধে যােগ দিবে। যুদ্ধে জয়-পরাজয় আসলে যুদ্ধের শুরুতেই সূচিত হয়। তিনি আমাদের নায়ক, আমাদের প্রাণের মালিক এখন তিনিই, তাহা বলি দিতে তিনি দ্বিধা করিবেন -লড়াইয়ের সময় যে-কোনাে উপায় সমীচীন বােধ হইবে তাহাই ৬৭ পাের্ট-আর্থারের-ক্ষুধ, তিনি অবলম্বন করিবেন। তিনি আরও বলিলেন, “বুশিদো’ ক জাপানী ক্ষাত্ৰধৰ্ম্মের শক্তি পরীক্ষার এই সময়। মহামহিম সম্রাট কৃপা করিয়া আমাদের উপর যে-বিশ্বাস ন্যস্ত করিয়াছেন, প্রমাণ করিতে হইবে আমরা তার অনুপযুক্ত নই, প্রয়োজন হইলে পতাকাতলে সকলেরই প্রাণ বিসর্জন করিতে হইবে । যাত্রার আগের রাতে শিবিরের দৃশ্য অসাধারণ। হেথা-হােথা সৈনিকেরা ফিসফিস করিয়া কথা কহিতেছে, কেহ বা একা দাঁড়াইয়া আলগাভাবে বন্দুক পরিয়া আপন মনে ঈষৎ হাসিতেছে—কেন, তা সে-ই জানে। অনেকে অন্তর্বাস (underwear) বদলাইয়া তাদের সবসেরা ধােপদস্ত পরিষ্কার অন্তর্বাস পরিতেছে—ময়লা কাপড়ে মরিয়া তার শত্রুর অবজ্ঞাভাজন হইতে চায় না। আবার কেহ কেহ উদাসভাবে আকাশ- পানে চাহিয়া গুনগুন করিয়া গাহিতেছে। পরদিন শেষরাত্রে চারিদিকে নিবিড় কুয়াসা—একফুট সামনেও দৃষ্টি চলে না ; পূৰ্বদিন সন্ধ্যায় বৃষ্টির পর থেকে হু হু করিয়া ঠাণ্ডা বাতাস বহিতেছে। এমন সময় হাজার হাজার সৈনিক অন্ধকার ঠেলিয় চলিতে সুরু করিল সুদীর্ঘ অজগরের মত। রাত তিনটায় ইওয়ায়্যামা পাহাড়ের পাদমূলে পৌছিলাম। আমাদের রেজিমেন্টের “রিসার্ভ’ দল এখানে থাকিবে, পাহাড়ের মাথায় থাকিবে ‘স্কাবৃমিশাস’, ডানদিকে অপর একটি পাহাড়ে থাকিবে গােলন্দাজ। যুদ্ধ শুরু করিবার সঙ্কেত না পাওয়া পর্যন্ত সৈন্যশ্রেণী থেকে কাহারও মাথা বাড়াইবার হুকুম নাই।সকলে বন্দুকে গুলি ভরিয়া কার্তুজের বাক্স খুলিয়া রাখিল, নিশ্বাস রুধিয়া সকলেই কর্নেলের ‘ফায়ার’ আদেশের অপেক্ষা করিতেছে। ইয়ায়ামার মাথায় দূরবীন্ হাতে কর্নেল দাঁড়াইয়া আছেন, তার সামনে খােলা ম্যাপ হাতে দাঁড়াইয়া অ্যাডজুট্যান্ট ; মাঝে মাঝে, সে পিেটআথারের ক্ষুধা ম্যাপের বক্স হাতড়াইতেছে। গােলাগুলিবাহী ঘােড়াগুলাে পাহাড়ের তলায় জড়ো হইয়াছে, মালবাহী সৈনিকেরাও কাজ শুরু করিবার জন্য অধীর। সঙ্কেত হইবে একটি কামানের শব্দ। নিজ নিজ ঘড়ির কাটার পানে তাকাইয়া আছি, এক এক মিনিট যায় আর বুক টিপটিপ করিতে থাকে। অবশেষে এগারােটা উনপঞ্চাশ মিনিটে বাঁ দিকে তােপের আওয়াজ পাওয়া গেল। লাওৎসাে-ষান্ থেকে তাইপােষান্ পৰ্য্যন্ত শত্রুকে আক্রমণ করার এই সঙ্কেত। গত ত্রিশ দিনের মধ্যে একটি গােলাও ছাড়া হয় নাই—ইহার জন্য শত্রু অদৌ প্রস্তুত ছিল না। তাড়াতাড়ি তারা যে উত্তর দিল তা ভারি অলস ও নিস্তেজ শুনাইল—আমাদের মাথার অনেক উপর দিয়া তাহাদের গােল চলিয়া গেল! স্থির ছিল আমাদের বা দিকের সৈন্যদল প্রথমে লাওৎসাে-যানের উপর শত্রুকে আক্রমণ করিয়া পরাভূত করিবে, পরে আমাদের দল গিয়া তাহাদের সঙ্গে যােগ দিবে। তাই কিছুক্ষণ স্থির হইয়া সেই আক্রমণের গতি লক্ষ্য করিতে লাগিলাম। একটু পরে আমাদের নৌ-কামানগুলাে এমন সােরগােল তুলিব যে মনে হইল শত্রুপক্ষ অচিরে ভয়ে তটস্থ হইয়া ঘাটি ছাড়িয়া পালাইবে, কিন্তু দেখা গেল তারা ততটা দুর্বল নয়। যুদ্ধের তেজ ক্রমেই বাড়িতেছে। আমাদের সমস্ত কামান লাওৎসাে-যানের উত্তরের ঢালুতে শক্রর বড় কামানগুলােকে থামাইবার চেষ্টা করিতে লাগিল। কিছুক্ষণ পরে শত্রুর গােলাবর্ষণ একটু কমিয়া আসিল, সুযােগ বুঝিয়া আমাদের বাঁ দিকের পদাতিক দল জাপানী তােপের আশ্রয়ে অগ্রসর হইতে সুরু করিল। অবিলম্বে তারা আন্দাজ দু’হাজার গজ সামনে একটি অর্ধচন্দ্রাকার উচ্চভূমি দখল করিল, তার- পরেই বামে ঘুরিয়া বেলা দশটার সময় লাওৎসাে-যানের উত্তর মুখের পাের্ট-আর্বকের ক্ষু অসম্ভব। বাধটা দখল করিল। মনে হইল রুশেরা এই সব জায়গা সুরক্ষিত করিবার তেমন বন্দোবস্ত করে নাই, কারণ খানিক বাধা দেওয়ার পর তারা এখানকার বড় কেল্লা ছাড়িয়া দিল। আমাদের পদাতিকেরা পাহাড়ের মাথা দখল করার পরও কতক শত্ৰু নির্ভয়ে দক্ষিণে ঢালুর উপর দাঁড়াইয়া মরিয়া হইয়া আমাদের নিম্নগামী একাগ্র গুলিবর্ষণের সম্মুখীন হইল- আক্রমণ এতক্ষণ চলার তাহাই কারণ। শেষ পর্যন্ত আমাদের বা দিকের দল তাহাদিগকে সেখান থেকে ছত্রভঙ্গ অবস্থায় তাড়াইয়া দিল। কিন্তু তাদের পিছনে ছিল লুংওয়াংতাং খাড়ি, তাই সেদিকে পলায়ন ফলে বহু হতাহতকে ফেলিয়া বাদবাকি নৌকার মধ্যে লাফাইয়া পড়িয়া খড়ির ওপারে গিয়া লুকাইল। বাঁ দিকের দলের (left wing) কর্তব্য এইভাবে সম্পন্ন হইল।. এবার আমাদের পালা। কর্নেল আওকি কাপ্তেমদের হুকুম করিলেন, ডানদিকের দল, গুলি চালাতে সুরু করে। অমনি সমস্ত শ্রেণী মাথা বাড়াইয়া দিল, চড়বড় করিয়া তাদের বন্দুকের শব্দ হইল মুড়িভাজার মত। সঙ্গে সঙ্গে, রুশেদের গুলি বড় বড় ফোটায় আমাদের চারিদিকে পড়িতে লাগিল-বালি উড়াইয়া, পাথর ছিটকাইয়া, মানুষকে ধরাশায়ী করিয়া । কানের কাছ দিয়া যেগুলাে যায় তারা শিস দেওয়ার মত শব্দ করে, শূন্যে উচু দিয়া যেগুলাে যায় কম্পমান গম্ভীর তাদের শব্দ। দীর্ঘ সৈন্ঠশ্রেণী শিকলের মত বিলম্বিত, তাদের মাঝে মাঝে জোড় ভঙ্গ হইতে লাগিল। ‘চোর’ লইয়া বাহকেরা হতাহতকে তুলিবার জন্য ছুটিয়া বেড়াইতেছে। শিলা- বৃষ্টির মত কেবল বন্দুকের গুলি নয়, বড় বড় কামানের গােলা আমাদের মাথার উপর ফাটিয়া সাদা ধোয়া ছড়াইতে লাগিল। গােলার টুকরা ধুপধাপ করিয়া পড়িয়া মাটিতে গর্ত করিতেছে কি আক্রমণকারীর ৫ পাের্ট-প্যাথরের ক্ষুধা ৭০ মাথার ওপরে বিধিয়া বসিতেছে। কখনন কখনাে গােলার শূন্য খােলটা পাহাড় ডিঙাইয়া আমাদের রিসার্ভ’ দলের মধ্যে গিয়া পড়ে। আমি যখন ‘রিসার্ভে' ছিলাম তখন এমনি একটা শূন্য গােলার খােল এক সৈনিকের গায়ে লাগিতে দেখি—তার ফলে তার ডান হাত উড়িয়া গিয়া সেখানেই সে মারা পড়ে। পরে সেই খােলটা পরীক্ষা করিয়া দেখা গেল, তার মধ্যে, প্রথমে এক টুকরা ওভারকোট, তারপর এক টুকরা কোট, তারপর এক টুকরা গেঞ্জি, তারপর মাংস ও হাড়, তারপর আবার গেঞ্জি কোট ও ওভারকোট, সঙ্গে রক্তমাখা ঘাস ও নুড়ি-- লে এক অভিনব ও ভয়ঙ্কর canned goods ( টিনে ভরা মাল)। এই যুদ্ধ কয়েক ঘণ্টা ধরিয়া চলিল। শত্রুর প্রবল গােলাবর্ষণের মুখে অগ্রসর হওয়ার সুযােগ হইল না। আমাদের হতাহতের সংখ্যা এত দ্রুত বাড়িতে লাগিল যে ‘চোর’ তৈরি করিয়া কুলানাে দায়। আমাদের অনেক পিছনে প্রাথমিক শুশ্রষা-শিবিরেও গােলা পড়িতে লাগিল। সেখানে জনকয় আহত সৈনিক দ্বিতীয় দফা আঘাত পাইল বা মারা পড়িল। এ এক সাংঘাতিক যুদ্ধ। গোলন্দাজদের বামে “রিসার্ভ’ দল আনা হইল, সুযােগ উপস্থিত হইলে, মুহূর্তের মধ্যে তারা ছুটিয়া গিয়া শত্রুর উপর ঝাপাইয়া পড়িতে পারিবে। এ সময়ে আমি “রিসার্ভ দলের পতাকাবাহী ছিলাম। গােলন্দাজদের সঙ্গে আছি এবং পতাকাটা বেশ স্পষ্ট, তার ফলে ওয়াংচিয়াতুনের রুশেরা আমাদের উপর ভীষণভাবে গােলা দাগিতে লাগিল। শক্রর লক্ষ্য ভাল, গােলাগুলাে বাতাসে বৃষ্টিধারার মত কাত হইয়া আসিতে লাগিল। মিনিট খানেকের জন্য দােয়া সরিয়া গেলে দেখিলাম একজন লেফটেন্যান্ট—লে সেইমাত্র সাহসের সঙ্গে সৈনিকদের চালনা করিতেছিল—রক্তমাখা দেহে মরিয়া পডিয়া আছে। গােলন্দাজ-নায়ক ও তার সহকারীরা টুকরা টুকরা ৭১ পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা হইয়া গেছে, তাদের মাথার ঘি ফিকি দিয়া বাহির হইতেছে, নাড়ি- ভুড়ি কাদায় ও রক্তে মাখামাখি। রিসার্ভ গােলন্দাজেরা তাদের স্থান লইতে গেল এবং তারাও মারা পড়িল। অবস্থা এমন দাড়াইল, সেখানে থাকিলে প্রতি মুহূর্তে লােক ক্ষয় হওয়ার সম্ভাবনা। কিছুক্ষণ থেকে আকাশে মেঘ জমা হইতেছিল, এখন চারিদিক অন্ধকার নিরানন্দ হইয়া উঠিল। দেখিতে দেখিতে প্রবল বাতাস বারুদ ও ধোয়ার পাশাপাশি পাল্লা দিয়া ছুটিতে লাগিল, কাদা- গােলা বৃষ্টি গুলিগােলার সঙ্গে তেরছাভাবে পড়িতে লাগিল। ঠিক সেই সময় আমাদের রিসার্ভ’ দল কর্নেলের সঙ্গে মিলিবার হুকুম পাইল। গােলন্দাজদের সান্নিধ্য ছাড়িয়া বাঁ দিকে ‘মার্চ' করিতে সুরু করিলাম। পাথরের উপর দিয়া অতি কষ্টে চলিতেছি, তীব্র বাতাসে পতাকা এমন পতপত করিতে লাগিল যে ভয় হইল পাছে ছিড়িয়া টুকরা টুকরা হইয়া যায়। এমন সময় মাথার উপর একটা গোলা ফাটিল, তার টুকরাগুলা ছড়াইয়া গেল। পতাকার খানিকটা উড়িয়া গেল, একটি লোক মরা পড়িল এবং গােলার এক টুকরা আমাদের অনেক পিছনে এক উপত্যকার মাঝে গিয়া পড়িল। কর্নেল ছিলেন ইওয়ায়্যামা পাহাড়ের মাথায়, সে কথা আগেই বলিয়াছি। তাঁহাকে সেখানে দেখিয়া শত্ৰু নিঃসন্দেহ বুঝিল সেখানেই আমাদের সমস্ত শক্তি সংহত, তাই বুঝিয়া তারা পাহাড়ের উপর শিলা- বৃষ্টির মত গােলা ফেলিতে লাগিল। কর্নেল আওকি শত্রুর পানে এক- দৃষ্টে চাহিয়া অচল অটল ভাবে দাড়াইয়া রহিলেন। তার কাছে গিয়া পতাকা ছিড়িয়া যাওয়ার খবর দিলাম, তিনি কেবল বলিলেন, বটে! ক্ষণকাল পরে বলিলেন, ঠিক ম্যানুভারের মত, কি বলে ? বেলা দুইটা। এখনাে লড়াইয়ের মীমাংসা হয় নাই। ঘণ্টায় ঘন্টায় পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা ৭২ আমাদের হতাহতের সংখ্যা বাড়িতেছে। এই সময়ে আমাদের বা দিকের এক অংশ অগাইতে শুরু করিল। আমাদের দলও আগে যাইবার আদেশ পাইল। অমনি সমস্ত লােক উঠিল একটা কালো দেওয়ালের মত এবং হু হু করিয়া শত্রুর কামানের মুখের কাছে গিয়া পড়িল। সুযােগ বুঝিয়া রুশেরা তােপের বহর আরও বাড়াইয়া দিল। আমাদের মধ্যে যারা অগ্রবর্তী হইয়াছিল তারা ছিন্নভিন্ন হইল, যারা যায় নাই তারা আগেই মরিয়াছে। সাব-লেফটেন্যান্ট হাচিদার বুকে গুলি লাগিয়াছে, তবুও সে সামনে চলে, সামনে চলে, বলিয়া হাঁকি- তেছে ; ঝলকে ঝলকে রক্ত পড়িতেছে, তবুও হৃক্ষেপ নাই। তার আঘাতের কথা সৈনিকেরা জানেও না। শক্রর পানে খানিকটা পথ দ্রুতবেগে ছুটিয়া গিয়া মৃদুকণ্ঠে ‘বাজাই বলিয়া সে মরিয়া গেল। ', হাচিদা আহত হওয়ার আগে তার এক সৈনিকের ডান হাত চূর্ণ হইয়া যায়, তবুও সে রণে ক্ষান্ত দেয় নাই। লেফটেন্যান্ট তাহাকে শু-শিবিরে পাঠাইতে চাহিলে সে বলিল, আজ্ঞে এ অতি তুচ্ছ আঘাত! আমি এখনাে বেশ লড়তে পারি। এই বলিয়া বােতলের ৩ জলে ক্ষত স্থান ধুইয়া তার উপর তােয়ালে জড়াইয়া সে ছুটিয়া চলিল বাঁ হাতে বন্দুক ধরিয়া। শত্রুর কাছাকাছি পৌছিয়া নায়ক হাচিদার পাশেই সে নিহত হইল। শেষ পর্যন্ত কর্নেল অকির রিসার্ভ দুই দল পদাতিক ও একদল এনীয়ারে আসিয়া ঠেকিল। সকাল থেকে আমাদের গােলদাজে শত্রুর কামান থামাইবার যথাসাধ্য চেষ্টা করিয়াও সফল হয় নাই। শত্রু অধিকৃত আসল জায়গা এখনাে অক্ষত আছে। দিন শেষ হইল। যুদ্ধের দৃশ্য মলিন অন্ধকারের পর্দায় ঢাকা পড়িল। কিছুক্ষণের জন্য বৃষ্টি ধরিয়াছে, রাত্রির বিষাদ দিকে দিকে ব্যাপ্ত হইল।

৭৩ পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা, পাহাড়ে ও উপত্যকায় শত শত মৃতদেহ ছড়াইয়া আছে, অন্ধকারের গায়ে শত্রুর কেল্লাগুলাে মাথাতুলিয়া যেন নিষ্ফল আক্রমণে আমাদিগকে আহ্বান করিতেছে। রাত্রে কামান ও বন্দুক অবিরাম চলিতে লাগিল, ‘ষ্ট্রেচারের অভাব, তাই হতাহতকে তাবুর উপর ফেলিয়া বহন করা হইতেছে। অক্ষত আমরা মূকমৌন মৃত্যুকবলিতদের পাশে বসিয়া নিদ্রাহীন চোখে দিবাগমের অধীর প্রতীক্ষা করিতে লাগিলাম। ভাইপােমান অধিকার পরদিন প্রত্যুষে পদাতিকদলের পথ খােলসা করিবার জন্য সমম্ভ জাপানী কামান তােপ দাগিতে সুরু করিল। গােল বর্ষণ আগের দিনের চেয়েও প্রবল, অনুপাতে শত্রুর জবাবও তেমনি। রুশের কেল্লার এই অদ্ভুত দুর্ভেদ্যতার কারণ কি? তাদের খাতের সামনে পাহাড়, উপরে তক্তার ছাউনি নিরাপদে লুকাইয়া ঘুলঘুলির ভিতর দিয়া তারা গুলি চালায়, আমাদের বিস্ফোরক গােলায় তাদের ক্ষতি হয় না। ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় তাদের দ্রুতবর্ষী কামান ও ‘মেশিগান’ সাজানাে আছে—তার দ্বারা সব দিক থেকেই আমাদের উপর গােলা ফেলা যায় । আর সেই ভয়ানক কামানগুলাে কঠিন পদার্থে তৈরি, কঠিন আবরণে, 'সুরক্ষিত। তার উপর, আমাদের পাহাড়ের পাশ ও তাদের পাহাড়ের উল্টা পাশে মিলিয়া একটা শিলাময় উপত্যকা সৃষ্টি হইয়াছে—তার দেওয়ালগুলাে প্রায় খাড়া হইয়া ওঠায় অমানুষিক চেষ্টা ছাড়া সেখানে নামা ওঠা সম্ভব নয়।

পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা ৭৪ কমানের কাজ যতক্ষণ ঠিকমত না হয় ততক্ষণ বন্দুক চালাইয়া ফল নাই। যেমন করিয়া হােক শক্রর ‘মেশিগান’ অকেজো করা চাই। বন্দুক কাজে লাগাইতে না পারিলে মানুষকে গুলির মত ব্যবহার করা ছাড়া উপায় নাই—অর্থাৎ গুলি যেখানে গিয়া আঘাত হানিতে অক্ষম মানুষ সেখানে গিয়া আঘাত করিবে ! অচিরে সেই আদেশ আসিল। আমাদের রেজিমেন্টের পঞ্চম, সপ্তম ও দশম দল হুড় হুড় করিয়া উপত্যকার মধ্যে নাশিয়া পড়িয়া শত্রুকে ভীষণ আক্রমণ করিল। রুশ গােলন্দাজেরা এতক্ষণ আমাদের কামান লক্ষ্য করিয়া গােলা ছাড়িতে ছিল, এবার তারা এই অসম্ভব-প্রত্যাশী ধাবমান সৈন্যশ্রেণীর উপর কামানের মুখ ঘুরাইয়া দিল। সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত মেশিগান’ ও কেল্লার পদাতিক একযোগে সেই দুঃসাহসী দলের উপর অগ্নি বর্ষণ শুরু করিল। কিন্তু সেনাদল ক্ৰক্ষেপ করিল না, হুহুঙ্কারে ঝড়ের মত তারা ছুটিয়া ছলিল—কামান গর্জনের সঙ্গে তাদের সেই হুঙ্কার মিশিয়া শত বজ নির্ঘোষের মত শুনাইতে লাগিল। দানবের মত তারা লড়িতে লাগিল—আহত নায়কের খোঁজ লইল না, মৃত সঙ্গীর পানে তাকাইল না। মৃত ও মরণাপনের উপর দিয়া ছুটিয়া বা লাফাইয়া জীবিতের অবশেষে শত্রুর নিকটে গিয়া পৌছিল। সমুখে প্রকৃতির অচল বাধা- খাড়া পাহাড়ের আড়াল। পিছনে সাথীদের অর্ধেক গতপ্রাণ পাহাড়ের ধারে ছড়াইয়া পড়িয়া আছে। একদৃষ্টে শত্রুর পানে চাহিয়া সেখানে তারা দাঁড়াইয়া রহিল—আর কিছুই করিতে পারিল না। গােলাগুলির ধারাবর্ষণের মাঝ দিয়া যখন তারা যাইতেছিল তখন মনে হইতেছিল যেন ফিকা পাণ্ডুর ছায়ার দল গাঢ় ধোয়ার মাঝ দিয়া চলিয়াছে। দেখা গেল তাদের মধ্যে কেহ কেহ অতিকায় গােলার ঘায়ে শূন্যে উড়িতেছে। তাদের দেহ তুলিয়া লওয়ার পর দেখা গেল ৭৫ । পাের্ট-আপ্নারেরূ ক্ষুধা কোনো কোনাে সৈনিকের গায়ে আঘাতের চিহ্নমাত্র নাই, কিন্তু গায়ের চামড়া আগাগােড়া বেগুনেহইয়া গেছে। দেহ উর্দ্ধে উৎক্ষিপ্ত হইয়া সজোরে ভূমির উপর পড়ায় এমন হইয়াছে। প্রকাও মন্দিরের ঘণ্টাকে একটা আলপিন দিয়া ঘা দিবার চেষ্টা যেমন ব্যর্থ হয়, শত্রুর প্রবল বাধার মুখে আমাদের গােলাবর্ষণের ফলও তেমনি হইল। এমনিভাবে চলিলে হয়ত আমরা কিছুই করিতে পারিতাম না। তাই নিঃশেষে ধ্বংস হওয়ার সম্ভাবনা সত্ত্বেও আমাদের শেষ চেষ্টা করিতে হইল। ব্রিগেডিয়ার-জেনারেল শীঘ্রই আদেশ দিলেন এই যুদ্ধের সূচনা হইতে নায়ক ও সৈনিকদের বিক্রম উচচ প্রশংসার যােগ্য। আজ অপরাহ্ন পাঁচটায় তাইপােযানের পূর্ব দিকে আমাদের “ব্রিগেড’ শত্রুকে আক্রমণ করিবে। সমগ্র গােলন্দাজবাহিনী তােপ দাগিবে, তার ফলে সুযােগ উপস্থিত হইলেই বা দিকের দল দ্রুতগ্রাতি আক্রমণ করিয়া শত্রুকে অভিভূত করিয়া পরাস্ত করিবে। তখন তােমার রেজিমেন্ট তােমাদের সমুখের শত্রুর ঘাটি অধিকারের প্রাণপণ চেষ্টা অবশ্য করিবে আশা করি। কিছুক্ষণ পরেই এক তরুণ সেনানায়কের আবির্ভাব—তার হাতে এক বােতল; বীয়ার। আগের দিন থেকে পানাহার জোটে নাই বলিলেও চলে, যুদ্ধক্ষেত্রে সেই বীয়ারের বােতল এক অপূর্ব দৃশ্য। ভাবিতে লাগিলাম, এ ব্যক্তি কে হইতে পারে ? নিকটে আসিলে তাহাকে চিনিলাম—দ্বিতীয় ব্যাটালিয়নের লেফটেন্যান্ট কান। “কেমন, আজব চীজ নয় কি এই বীয়ার ? কাল থেকে বেল্টে এই বােতল বয়ে বেড়াচ্চি শত্রুর এলাকায় বাঙ্গাই’ পান করার জন্যে ! এস ভাই সব, এক সঙ্গে পান করি—বিদায়ের পাত্র ! তােমাদের কাছ থেকে অনেক মেহ পেয়েছি—ঠিক করেছি আজ সুন্দরভাবে মরবাে...” ৭ পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা ৭৬ পাংশালের এমনি পব কথা তরুণ নায়ক খুব ফুৰ্ত্তির সঙ্গে বলিতে লাগিল, কিন্তু সে যে রহস্য করিতেছে না তাহা কারও বুঝিতে বাকি রহিল না। অ্যালুমিনিয়াম পাত্র সোনালী সুরায় পূর্ণ করা হইল, তারপর সেই পত্র সকলের হাতে হাতে ঘুরিয়া আসিল। পান করার সময় সকলের মুখে একটু ম্লান হাসি খেলিয়া গেল। তারপর লেফটেন্যান্ট কান খালি বােতলটা তুলিয়া ধরিয়া হাকিল, সকলের কুশল প্রার্থনা করি ! তারপর মৃত সৈনিকদের কবরখিবার জন্য ছুটিয়া চলিয়া গেল। কেমন করিয়া বুঝিব সেই তার শেষ বিদায় ? শত্রুর এলাকায় বাজাই’ হাঁকিবার আনন্দ লাভ করার আগেই সে মৃত্যুর গহনে প্রবেশ করিল। পরে শুনিয়াছিলাম, মৃতের কবর দেওয়ার কাজ তদারক করার সময় সে বলিয়াছিল, ওদের ওপর ভালাে করে মাটি চাপাও, কারণ আমার পালাও এল বলে’! মৃত্যুর পদধ্বনি সে কি শুনিতে পাইয়াছিল ? বেলা পাঁচটা। আমাদের সমস্ত গােলন্দাজবাহিনী একযােগে অগ্নি বর্ষণ শুরু করিল এবং সমস্ত পদাতিক তার সঙ্গে যােগ দিল। ধোয়ায় ধোয়ায় স্বর্গ মত্ত অন্ধকার হইয়া উঠিল, গােলা ফাটিতে লাগিল, গুলি ছুটিতে লাগিল, মনে হইল গিরিদরি ছিন্ন হইল বা। পদাতিকেরা গুলি চালায় আর ছুটয়া যায়, আবার থামিয়া গুলি চালায়, তারপর সামনে লাফাইয়া পড়ে। শত্রুর গােলার মুখে তারা সিধা যাইতে পারিতেছে না। খনাে মরণাহত সৈনিক ক্ষীণকণ্ঠে কেবল লেফটেন্যান্ট’ বলিয়া কৃতজ্ঞতা জানাইতে চাহিতেছে, কখনাে বা কেবল ‘আ’ বলিয়া মরিতেছে। অবশেষে আমাদের প্রথম ব্যাটালিয়ন শত্রুর থেকে কুড়ি গজ আন্দাজ তফাতে আসিয়া পৌছিল, কিন্তু সামনে দেওয়ালের মত খাড়া পাহাড়, তাহাতে পা রাখিবার ঠাই পৰ্য্যন্ত নাই। পাহাড়ে ওঠার জন্য .

. ৭৭ পাের্ট-আর্গারের ক্ষুধা অধীর অথচ উঠিতে একেবারে অক্ষম, এমন অবস্থায় পাশ থেকে শত্রুর গুলি অবিরাম ঝরিতে লাগিল। শত্রুর মুখােমুখি দাড়াইয়া আমাদের দ্বিতীয় দল রুশেদের ‘মেশিগানের মুখে দেখিতে দেখিতে শেষ হইয়া গেল। একটা গুলি কাপ্তেন মাৎসুমার অসিফলক ভেদ করিয়া তার বা গাল চুইয়া ছুটিয়া গেল। আমাদের কামানের গােলা শুন্তে রােসনাই সৃষ্টি করিল বটে, কিন্তু শত্রুর কেল্লার প্রায় কোন ক্ষতিই করিতে পারিল না। এ্যাপনেলের’ (চাঙের মত গুলিভরা ধাতুময় আধার) কৰ্ম্ম নয়, শত্রুর খাতের (trench) ছাউনি চুর্ণ করার জন্য গোলাকার ‘শে ফাটানাে দরকার। গােলন্দাজের কাছে দুতের পর যাইতে লাগিল আদেশ লইয়া—আমাদের পদাতিকদের প্রাণ বিপন্ন হয় হােক, তবুও গােলাকার ‘শেল’ যত ঘনঘন সম্ভব ছাড়িতে থাকে। কিন্তু দুতেরা যথাস্থানে আদেশ বিলি করার আগেই প্রত্যেকে মারা পড়িল-একজনও প্রাণ লইয়া ফিরিল না। সাতটা বাজিল, আটটা বাজিল, শেষে ন’টা বাজিল, তবুও আমাদের অবস্থার কোনাে উন্নতি নাই। প্রথম ব্যাটালিয়ন কিছু ক্ষণের জন্য দাঁড়াইতে বাধ্য হইল। দ্বিতীয় ব্যাটালিয়নের নায়ক মেজর তামাই সাংঘাতিকভাবে আহত ; তার সহকারী লেফটেন্যান্ট কান্ আক্রমণের পথের খোঁজ করিতেছিল, এমন সময় তার মাথার মধ্যে গুলি লাগিল—ফিরিয়া সংবাদবাহককে ডাকার সঙ্গে সঙ্গেই মৃত্যু। তৃতীয় ব্যাটালিয়ন শত্রুর কাছে পৌছিল বটে, কিন্তু ঐ পৰ্য্যন্ত, আর • কছু করিতে পারিল না। প্রতিমুহূর্তে সে-দলের হতাহতের সংখ্যা নড়িয়া চলিল। আমাদের অবস্থা দে মাছের মত-অতিকায় তিমি হাকে অচিরে গিলিয়া ফেলিবে। কিন্তু, আমাদের সৈন্যশ্রেণীর ধতিজ্ঞা যেমন দুর্জয় সাহসও তেমনি অদম্য-শত্রুকে আয়ত্ত করা যতই - পােট আর্থারের ক্ষুধা ৭৮ কঠিন হইতে লাগিল ততই তাদের রোখ বাড়িয়া চলিল, ততই নূতন নূতন উপায় তারা আবিষ্কার করিতে লাগিল। সকল ব্যাটালিয়ন, শেষ করিয়া প্রথমটি, কুড়ুল দিয়া পাথর ভাঙিয়া, সেগুলি উপর উপুর থাক দিয়া পা রাখিবার ব্যবস্থা করিতে লাগিল। কিন্তু কাজ সােজ। নয়, শক্রর এত কাছে যে দুই পক্ষই যেন দুই বাঘ, দাত বার করিয়া পরস্পরকে ছিড়িয়া ফেলার ভয় দেখাইতেছে। রুশেরা আমাদের কাজে বাধা দিবার খুব চেষ্টা করিতে লাগিল-কুড়লের একটু আওয়াজ হয় আর অাগুনের জিভ বার হইয়া আমাদের আশপাশের জায়গাটা বুভুক্ষুর মত চাটিয়া লয়। তবুও তারই মধ্যে একরকম দাড়াইবার ঠাই তৈরি হইয়া গেল, আমরা এবার একযােগে আক্রমণের জন্য প্রস্তুত। রাত বাড়িয়া চলিয়াছে, যুদ্ধক্ষেত্রের উপর অস্তগামী চাদের বিশঃ ম্লান আলাে। আমাদের শিবিরের আধখানা সেই আলােয় একখানি black and white ছবির একাংশের মত দেখাইতেছে। দ্বিতীয় ব্যাটালিয়নের নায়ক মেজর উচিননা আমাদের কর্নেলের কাছে এই লিপি পাঠাইলেন- “আমাদের ব্যাটালিয়ন আক্রমণ করতে চলেছে—অাশা করছি আমরা নিঃশেষে ধ্বংস হব। আপনারাও আক্রমণ করুন। আমার বিশ্বাস আমাদের প্রিয় ও পরম শ্রদ্ধেয় কর্নেল এ আক্রমণের বিজয়ী নায়ক হতে পারবেন এবং সূর্যোদয়ের সঙ্গে স্নামাদের যুদ্ধপতাকা শত্রুর দুর্গপ্রাচীরে পিত হবে। আমার বিদায়-নমস্কার গ্রহণ করুন।” তারপর বামদিকে বহুদূরে শুনিতে পাইলাম তুরীতে ‘কিমিগায়ের গম্ভীর সুর বাজিয়া উঠিল। আমাদের উপত্যকার আকাশে চাঁদ ভাসিতেছে, জাতীয় সঙ্গীতের বিলম্বিত ক্ষীণ প্রতিধ্বনি যেন অন্তরে গিয়া প্রবেশ করিল। সুরটি শুনিয়া মনে হইল যেন স্বয়ং সম্রাট

বজ্রকণ্ঠে হুকুম
পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা
অগ্রসর হওয়ার আদেশ দিতেছেন! নায়ক ও সৈনিকেরা ঠিদা হইয়া
দাড়াইল, তারপর অসীম সাহসে হুঙ্কার দিয়া হাতে পায়ে পাথর ও
নুড়ির উপর দিয়া গিয়া শত্রুর বক্ষ প্রমাণ প্রাকারের উপর ঝাপা-
ইয়া পড়িল। একেবারে সামনের দলে মেজর মাৎসুমুর দীপ্তচোখে
হুকুম করছেন—ছুটে চলল সামনে। আবার তুরীতে
‘কিমিগায়াে’ বাজিয়া উঠিল, দলের
উঠিল, দলের পর দল ‘বাঙ্খাই’ হাকিতে
লাগিল, ভৈরব নদে পাহাড় কম্পমান। পাহাড়ের মাথায় কিরিচে
কিরিচে সংঘর্ষ আগুনের ফুলকি ছড়াইতেছে। দলের পর দল ছুটিয়া
আসিতেছে অতিকায় ঢেউয়ের মত। রুশেরা টলিতেছে—মুখখামুখি
হাতাহাতি লড়াই আর কতক্ষণ চলে?
অবশেষে, বেলা আটটায়, পূবের আকাশ যখন লালে লাল,
তখন তাইপােষান্ আমাদের সম্পূর্ণ দখলে আসিয়া গেল।
আমাদের নুতন শিবিরের অনেক উচুতে জাপানী পতাকা
উড়িতেছে। দিকে দিকে বাজাই’ ধ্বনি শুনিতে পাইতেছি।
যুকশৈমে
তাইপােষান্ সম্পূর্ণ দখল হওয়ার আগে আমরা একটানা
টান্ন ঘণ্টা লড়াই করিয়াছিলাম । সে সময়ের মধ্যে অবশ্য পানা-
হার ও নিদ্রা হয় নাই। শত্রু সহজে পরাজয় স্বীকার করে নাই,
অসীম বিক্রমে লড়িয়াছিল। আমাদের এই জয়ে যুদ্ধের পরবর্তী
বারা নিয়ন্ত্রণে যথেষ্ট সাহায্য হইল।

পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা ৮০ পাের্টআৰ্তরে নাশানের যুদ্ধে আমাদের পক্ষে হতাহতের সংখ্যা হয় চার হাজার। এ পর্যন্ত উহাই সর্বাপেক্ষা মারাত্মক যুদ্ধ বলিয়া গণ্য হইতেছিল, কিন্তু তাইপোষানের তুলনায় নাশা সস্তাদরে পাওয়া গিয়াছিল, সন্দেহ নাই। নাশানে শত্রুর সমুখে ছিল বিস্তীর্ণ ঢালু জমি ; আমাদের সৈন্যদল সেখানে থাকায় নিরাপদ স্থান থেকে শত্রু তাদের উড়াইয়া দিয়াছিল। তাইপােষানের আশপাশের প্রকৃতি সম্পূর্ণ আলাদা কেবল খাড়া পাড় আর গভীর উপত্যকা। সেখানে সহজেই আত্মরক্ষা করা বা লুকাইয়া থাকা সম্ভব। তবুও সেখানে আমাদের পক্ষে হতাহতের সংখ্যা নাশানের সমান হইয়াছিল। তাইপােন যুদ্ধের ভীষণ ইহা হইতে অনুমান করা যায়। একটুখানি জায়গার জন্য তিন দিন ধরিয়া লড়াই চলে। পিছন থেকে কোনাে খাদ্যই, আনাননা যায় নাই—কেবল শুকনো বিস্কুট চিবাইয়াছি। এক ফোটা জল পাই নাই, এক মুহূর্ত ঘুমাই নাই। উদ্বেগ ও উত্তেজনার আতিশয্যে আহার নিদ্রার কথা মনেই ছিল । এক খাওয়ার কষ্ট ছাড়া শেদের অবস্থাও তেমনি। তাদের পরিত্যক্ত কালো রুটি আর জমাট চিনি পাইয়া, আমাদের লােকেরা আহলাদে আটখানা। যুদ্ধশেষে আমাদের প্রথম অনুভূতি-নিদ্রাবেশ। তখন মনে হয় আর কিছুরই দরকার নাই, কেবল ঘুমাইতে চাই। মৃত সঙ্গীদের কথা বলিতে বলিতে, যুদ্ধের অভিজ্ঞতা আলােচনা করিতে করিতে জনে জনে ঢুলিতে সুরু করিল, তারপর শত্রুর খাতের ছাউনি তলায় শুইয়া নিরীহ শিশুর মত ঘুমাইয়া পড়িল। রক্তে মাখা- মাখি হইয়া নিহত রুশ সৈনিকেরা চারিদিকে পড়িয়া আছে, তাহাতে তাদের গভীর ঘুমের ব্যাঘাত নাই । পানাহারের চিন্তাও ৮১ পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা লােপ পাইয়াছে—তাদের নাক ডাকিতেছে সুদূর বজ্রধ্বনির মত। মাঝে মাঝে শক্রর গুলি ছুটিতেছে-শশা ভন ভন করিলে যেটুকু ঘুমের অসুবিধা, তাহাতে সেটুকুও হইতেছে না। যুদ্ধের মহিমা প্রকাশ পায় কেবল গোলাগুলি বর্ষণের মাঝে, কিন্তু তার বীভৎসতা সব চেয়ে ভাল দেখা যায় যুদ্ধ পানির পর। মৃত্যুর পক্ষপাত নাই—শত্রু-মিত্র নির্বিচারে তার ছায়া বিস্তারিত। ভয়ঙ্কর হত্যাকাণ্ডের শেষে রক্তমাখা অগণ্য মৃ:দেহ ঘাসের উপর আর পাথরের মাঝে দীর্ঘকাল পড়িয়া থাকে। নানে নিহত সৈন্য দেখিয়া আতঙ্কে ও বিতৃষ্ণায় চোখ না ঢাকিয়া পারি নাই। এখানকার দৃশ্যও তেমনি বীভৎস, তবুও সেবারের মত আঁকাইয়া উঠিলাম না। কোনো কোনো সৈনিকের মুখ ও মাথা চূর্ণ হইয়া গেছে, মস্তিষ্কের সঙ্গে ধূলানটির মাখামাখি। কাহারও বা নাড়ি ভুড়ি ছিড়িয়া বার হইয়াছে, তা থেকে রক্ত, ঝরিতেছে। নন্শিানে শত্রুর মৃতদেহ দেখিয়া তাদের জন্য মায়া হইয়াছিল, তাদের প্রতি সহানুভূতি জাগিয়াছিল, কিন্তু এখানে তাদের ঘৃণা করিতে লাগিলাম। 'কেন, তাদের কি দোষ ? তারাও কি যােদ্ধা নগ্ন, তারাও কি কৰ্তব্য করিতে গিয়া মরে নাই? তাদের সঙ্গে কঠিন যুদ্ধের ফলে আমাদের এত গুলি, সৈনিকের প্রাণ নষ্ট হওয়ায় আমাদের মনে শক্রর প্রতি এই ঘৃণার সঞ্চার। কেন তারা প্রাণপণে . বাধা দিল, কেন সহজে হার মানিল না? কেন তারা খাতের মধ্যে নরাপদে সঁাড়াইয়া গর্তের ভিতর দিয়া বন্দুকের নল বাহির করিয়া অামাদের সৈনিকদিগকে হত্যা করিল ? যুদ্ধের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা হাদের আছে, তাহারা সাহসী ও দুর্জয় শত্রুর মৃতদেহ দর্শনে ৮২ পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা এই ঘৃণা ও ক্রোধের উৎপত্তি অক্লেশে বুঝিতে পারিবে, যদিও এ মনােভাবের মূলে কোনাে যুক্তি নাই। একটি খাতের মধ্যে দেখা গেল এক রুশ সৈনিক মরিয়া পড়িয়া আছে। তার মাথায় ব্যাণ্ডেজ বাধা। সম্ভবত প্রথম আঘাতের পর ও সৈ সাহসের সঙ্গে লড়িয়াছিল, শেষে আমারে দ্বিতীয় গুলি তার প্রাণ সংহার করিয়াছে। যে সব সাহসী রুশ যােদ্ধা খাতের ভিতর থেকে ছুটিয়া পার হইয়াছিল, নিশ্চয় তাদেরই মৃতদেহ ওই বক্ষঃপ্রমাণ প্রকারের পাশে ছড়াইয়া পড়িয়া আছে। আমরা হুড়মুড় করিয়া গিয়া পড়তে ইহারই খাতের বাহিরে আসিয়া আমাদের সঙ্গে কিরিচ ও ঘুসি দিয়া লড়িয়াছিল। ইহাদের কারও কারও বুকের মধ্যে স্ত্রী পুত্রের রক্তমাখা ছবি পাওয়া যায়। যুদ্ধ শেষ হইবার পরই আমার ভৃত্য রুশেদের একটি ঝুলি [haversack) লইয়া উপস্থিত। তার ভিতর থেকে রকমারি জিনিস বার হইল—মায়, এক সুট চীনা পােষাক। সেটি যেমন আমাদের বিস্ময় উদ্রেক করিল তেমনি তার সাহায্যে একটা হদিসও মিলি। রুশের সন্ধানী দূতেরা চীনা সাজিয়া আমাদের খোঁজখবর করিতে আসিত ! এই যুদ্ধে আমরা কতকগুলি অকেজো ‘মেশিগান দখল করি : এই যন্ত্রকে আমরা সব চেয়ে বেশি ভয় করিতাম। মত্ত একখান লােহার পাত ঢালের কাজ করে, তার মাঝ দিয়া লক্ষ্য স্থির করা হয়। উচু দিকে, নীচু দিকে, ডাইনে বাঁয়ে অস্ত্র চলাফেরা করি- বার সময়ও ঘােড়া টানা চলে। মিনিটে ছ’শ'র বেশি ‘বুলেট স্বতশ্চালিতভাবে নিঃসারিত হয়, যেন একটা দীর্ঘ অখণ্ড ‘বুলেটের শিক কামানের মুখ নিক্ষেপ করিতে থাকে। হাে’ বা ক্যাম্বিসের পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা নল দিয়া যেমন করিয়া রাস্তায় জল ছিটানাে হয়, ইহা দ্বারা তেমনি করিয়া ‘বুলেট’ ছিটানাে চলিতে পারে। চালকের ইচ্ছামত ইহা অল্প বা বেশি জায়গা ব্যাপি। নিকটে বা দূরে গুলি চালাইতে সক্ষম। কেহ এই ভীষণ মারণাস্ত্রের লক্ষ্যস্থল হইলে বিদ্যদেগে তিন চারিটি গুলি তার দেহের একই জায়গা ভেদ করিয়া মস্ত অঘািতের সৃষ্টি করিতে পারে। বন্দুকে যেমন ‘বুলেট ব্যবহৃত হয় এ গুলি ও তত বড়। একটি লম্বা ক্যাম্বিসের ‘বেল্টে' এমনি অনেক গুলি পরান থাকে, সেই ‘বেল্ট' ‘মেশিন্ গানের কামরায় (chamber) ভরা হয়— বায়স্কোপের ফিল্মের মত ঐ ‘বেণ্ট’ চালিত হয়। কাছ থেকে শব্দটা হয় অতি দ্রুত ট্যাপ, ট্যাপ, ট্যাপ, কিন্তু দূর থেকে শুনিলে মনে হয় যেন স্তব্ধ নিঝুম নিশীথ রাতে কলের তাঁত চলিতেছে। শব্দটা ভন্নানক—শুনিলে গায়ে কাঁটা দেয়। রুশেরা এই যন্ত্র চালনায় বিশেষ পটু। যতক্ষণ না আমাদের সৈনিকেরা খুব কাছে আসে ততক্ষণ তারা চুপ করিয়া থাকে, রপর যেই আমরা সােল্লাসে বাজাই’ হাঁকিতে উদ্যত হই, অমনি এই মারাত্মক অস্ত্রের সংহারের ঝাটা দিয়া আমাদিগকে কঁাটাইতে সুরু করে ; তার ফলে দেখিতে দেখিতে মড়ার ঢিপি ও পাহাড় রচনা হইয়া যায়। তাইপোসানের যুদ্ধের পর শত্রুর এলাকায় আমাদের এক সৈনিকের দেহ পাওয়া যায়, তার নাম হােদো, সে দ্বিতীয় দলের একজন ক্ষীণ-আশা” সম্প্রদায়ের চর। তার দেহে সাতচল্লিশটা গুলি, কেবল ডান হাতেই পচিশটা ! অপর এক রেজিমেন্টের সৈনিকের গায়ে সত্তরটার বেশি গুলি লাগিয়াছিল। এখানে শত্রুর চার পাঁচটি যুদ্ধের কুকুর নিহত দেখিতে পাই। বলিষ্ঠ, গায়ে ঘােট ঘােট বাদামী রোয়া, মুখের চেহারা চালাক চতুর। ক পাের্ট আর্থারের ক্ষুধা ৮৪ আমাদের গুলিতে তারা মরিয়াছে—ইতর প্রাণী হইলেও যুদ্ধক্ষেত্রে মৃত্যুর সম্মানের ভাগ লইয়াছে। যুদ্ধে ব্যবহার করিবার জন্যই রুশেরা এই কুকুরগুলিকে তালিম দেয়, নানা কাজে এদের নিযুক্ত করে। শুনিতে পাই কখনন কখনাে ইহার চরের কাজও করিয়া থাকে। এই যুদ্ধের পর আমাদের দলের লােক একখানি পত্র কুড়াইয়া পায়। সেখানি রুশ-নায়ক জেনারেল ফকের লেখা। তাহাতে লেখা ছিল- “জাপানী সৈন্যদল ‘মার্চ’ করিতে জানে কিন্তু পিছু হটিতে জানে । কোনাে জায়গা একবার আক্রমণ শুরু করিলে ভীষণ একরোখা ভাবে লড়িতে থাকে। এটা নয় অনুমােদন করিলাম, কিন্তু যখন অবস্থা- গতিকে অগ্রসর হওয়া অসম্ভব হয়, তখন কখনাে কখনাে পিছু হটিলে ও লাভ হইতে পারে। কিন্তু বিপদ যতই থাক, জাপানীরা আক্রমণ চালাইবেই, কিছুতেই ক্ষান্ত হইবে না। হয়ত জাপানী লড়াইয়ের কায়দা যারা রচনা করিয়াছেন, তারা পিছু হটার কায়দা সম্বন্ধে চিন্তাই করেন নাই।” প্রাথমিক শুশ্রষা-শিৰিৱ যুদ্ধের উত্তেজনায় আর কিছু ভাবিবার সময় পাই নাই, এখন বন্ধু ডাক্তার হ্যামুইয়ের কথা মনে পড়িল। তিনি নিরাপদে আছেন ? সেদিন সন্ধ্যার আকাশে ঘনঘটা, আমি তাইপােষানের তলায় ছোট একটি স্রোতস্বতীর ধারে ধারে ‘উইলাে’ গাছের তলায় একলা বেড়াইতেছি। ভাবিতেছিলাম, আহতের শুশ্রুষায় ডাক্তার নিশ্চয়ই পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা খুব ব্যস্ত। এমন সময় হঠাৎ সেনানায়কের জুতার শব্দ কানে পৌছিল, ফিরিয়া দেখি, তিনি পাশে আসিয়া দাঁড়াইয়াছেন। “ডাক্তার হ্যাসুই!” “লেফটেন্যান্ট সাকুরাই!” বেশ ভালাে আছেন ?” পরস্পরে সানন্দে করমর্দন করিলাম। উভয়ের কৃশতার উল্লেখের পর সম্প্রতিকার যুদ্ধের আলোচনায় প্রবৃত্ত হইলাম। কাপ্তেন মাংসুমার আহত হইয়াছিলেন, তিনিও আসিলেন। তার কাধে সেই গুলির- ঘরে-বাঁকা ফলকে-গােল-জানালা-কুটানাে তলােয়ার। তিনিও সাগ্রহে আমাদের কথাবার্তায় যোগ দিলেন। ডাক্তার হ্যাসুই প্রাথমিক শুনা- শিবিরের ( first aid.station) নিখুত বর্ণনা করিতে লাগিলেন- যুদ্ধের সময় প্রায়ই শত্রুর গােল চীনাদের বাড়ির কাছে পড়িত। আমাদের সাময়িক শুশ্রু-শিবিরের সঙীন অবস্থা। একবার একটা মস্ত ‘শে ছাত ফুড়িয়া উঠানে ফাটিয়া যাওয়ার ফলে অনেক আহত সৈনিক টুকরা টুকরা হইয়া গেল। বাড়ির দেওয়ালে ও থামে তাদের রক্তমাংসের ছাপ পড়িল। আর একবার বাহকেরা বহুকষ্টে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে একটি মাহত সৈনিককে আনিয়া সবে উঠানে নামাইয়াছে, এমন সময় শত্রুর একটা গুলি ছিটকাইয়া আসিয়া বেচাৱাকে শেষ করিয়া দিল। শুশ্রু-শিবিরের সে সব হৃদয়বিদারক দৃশ্য বর্ণনা করা যায় না। নরকের বিভীষিকার সঙ্গে তার তুলনা করিতে ইচ্ছা করে। * * *একজন আহত লােককে আনিলেই, তা সে কর্মচারীই হােক আর সাধারণ সেনাই হােক, ডাক্তার ও হাসপাতালের লােকেরা তার প্রাথমিক শুক্রবার ব্যবস্থা করে। যুদ্ধক্ষেত্রে গােলাগুলির প্রকোপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আহতের সংখ্যাও দ্রুত থেকে দ্রুততর বাড়িতে থাকে, পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা তখন ডাক্তার ও তার সহকারীদের ক্ষমতায় কুলায় না। একজনের ব্যবস্থা করিতে করিতে হয়ত দেখিতে পায় অপর একজন হপাইতে সুরু করিয়াছে, গায়ের রংও ফ্যাকাশে হইয়া উঠিতেছে। এই দ্বিতীয় ব্যক্তির মুখে যখন কয়েক ফোটা ব্রাণ্ডি দিতেছে তখন হয় ত তৃতীয় ব্যক্তি বিনা চিকিৎসায় মারা যাইবার উপক্রম। একজনের ক্ষতে যথারীতি ঔষধ দিন্ন ব্যাণ্ডেজ করার আগেই দশ পনেরাে জন নূতন আহত আসিয়া হাজির। ডাক্তারদের চারিদিকে মারাত্মক-রকম আহত সৈনিক। তারা শার্টের আস্তীন গুটাইয়া সারা পােযাকে রক্ত মাপিয়া প্রাণপণে খাটিতেছে। কারও ব্যাণ্ডেজ বাঁধা হইতেছে, যাদের হাড় ভাঙিয়াছে তাদের splint বাধার ব্যবস্থা। অবশ্য তাড়াহুড়ার ব্যাপার-সাময়িক সাহায্য মাত্র ; তবুও ডাক্তারদের নিশ্বাস ফেলার সময় নাই। করিবার এত আছে অথচ কতটুকুই বা করা সম্ভব, ভাবিতে ভাবিতে আর চারিদিকের সেই যন্ত্রণার দৃশ্য দেখিতে দেখিতে মাথা খারাপ হইবার যােগাড় হয়। কিন্তু এই বাড়িতে বা ওই উঠানে যারা শান্বিত, তারা সকলেই সাহসী সৈনিক। যার বিলম্ব হইলে বা তা যথেষ্ট না হইলেও তাদের নালিশ নাই। বিশেষ কোনাে অভিলাষ বা অসন্তোষ তারা প্রকাশ করে না। যুদ্ধের উন্মায় ও উত্তেজনায় এখনো তারা আচ্ছন্ন, তাই সৈনিকের হুঙ্কার বা কামানের আওয়াজ শুনিতে পাইলেই তার ছুটিয়া যুদ্ধে যাইতে চায়। তাদের শান্ত করিয়া স্থির করিয়া রাখিতে ডাক্তারদের রীতিমত বেগ পাইতে হয়। মাথায় চোট লাগার যত যারা পাগল হইয়াছে, তারা মৃদু কণ্ঠে ‘তেমা হেইকা বাজাই (সম্রাট দীর্ঘজীবন লাভ করুন) বা শকি’ (রুশ) বলিয়া টলিয়া টলিয়া বেড়ায়, ডাক্তাৱ চাপিয়া ধরিয়া থাকিলে তারা রাগে জ্বলিয়া ওঠে, .

৮৭ পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা বলে—তুই ‘শকি'! এমনি ধ্বস্তাধ্বস্তির ফলে অতিমাত্রায় রক্তস্রাব হইয়া শীঘ্রই তারা মারা পড়ে। সাতাশ তারিখে আহতের সংখ্যা খুব বেশি ছিল। শুষ-শিবিরের সম্মুখের গোলাবাড়ির উঠান একেবারে ভর্তি হইয়া গেল। ডাক্তার যখন একজনকে দেখিতেছে তখন পিছন থেকে তার ইজেরে টান পড়িল। ফিরিয়া দেখে এক ব্যক্তি তার পায়ে ঠেস দিয়া নিরীহ শিশুর মত চিরনিদ্রায় ঢলিয়া পড়িতেছে। আমার প্রাণ রক্ষা হবার নয়, আমাকে এখনি মেরে ফেলুন—ডাক্তারকে দুই হাতে চাপিয়া একজন যন্ত্রণায় চেঁচাইতেছে। একজন সার্জেন্ট হাতের উপর ভর দিয়া পা দুখানা টানিতে টানিতে ডাক্তারের কাছে আসিয়া উপস্থিত সজল- চোখে সে মিনতি করিতেছে—দেখুন, ওই যে লােকটি, মারই দলের ; ও যে-ভাবে হাপাচ্ছে হয় ত কোনাে ফল হবে না, তবুও দয়া করে’ আর একবার ওকে দেখবেন কি ? সেই সার্জেন্ট নিজেই খুব আহত, তবুও তাবেদারের কষ্ট সহিতে পারিতেছে না! সেদিন সকালবেলায় শুষ-শিবিরে বিবর্ণ পাংশুমুখে এক সৈনিক আসিয়া উপস্থিত। ডাক্তার তাহাকে দেখিতে পাইয়া জিজ্ঞাসা করিল, “কি হয়েছে তােমার ! আহত ?” কোনাে জবাব নাই, বৃথাই তার ঠোট নড়িতে লাগিল। আবার ডাক্তার প্রশ্ন করিল, “ব্যাপার কি? না বললে আমি বুঝব কি করে?” তবুও সে নিরুত্তর। ডাক্তারের ভারি অদ্ভুত ঠেকিল। লােকটির মুখের পানে লক্ষ্য করিতে সে তার উপর “একটু রক্ত দেখিতে পাইল। ভাল করিয়া পরীক্ষার পর দেখা গেল ডান দিক থেকে বা দিকের রগ এফোঁড় ওফোড় করিয়া গুলি চলিয়া গেছে। তার ফলে তার দর্শন ও শ্রবণ শক্তি দুই লােপ পাইয়াছে। বুঝিতে পারিয়া ডাক্তার তখনি শুশ্রষা শুরু করিয়া দিল। বেচারার হাতখানা

পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা
৮৮
সময়ে তুলিয়া লইতেই সে দাঁত কিড়মিড় করিয়া বলিল—প্রতিহিংসা!
দেখিতে দেখিতে কার দেহ কঠিন হইয়া গেল, তার যন্ত্রণারও অবসান
হইল—লড়াইয়ের সাধ আর মিটিল না।
একদিন এক আহত সৈনিক দুই হাত দুলাইতে দুলাইতে ছুটিয়া
আসিল, যেন বিশেম তাড়া।
“জোর লড়াই চলেছে। ভারি মজা। জায়গাটা দখল হ’ল বলে।”
ডাক্তার জিজ্ঞাসা করিল, তুমি কি আহত ?
“কোমরের কাছে একটু—”
ডাক্তার যুদ্ধের ফল জানিতে উৎসুক। বলিলেন, তুমি অনেক
শত্রু মেরেছ নিশ্চয়? জখম হ’ল কাদের দিকে বেশি।
কেকটি চাপা গলায় বলিল, এবারও জাপানের দিকেই বেশি ?
তারপর ডাক্তার তার কোমরের কাছে সামান্য আঘাত’ পরীক্ষ।
করিতে গিয়া :চমকিয়া উঠিল। ডান দিকের উরুদেশের মাংস গােলার
ঘায়ে বেমালুম অদৃশ্য হইয়াছে। যুদ্ধে বীরত্ব দেখাইয়াছে, কৰ্ত্তব্যে
ত্রুটি হয় নাই—ইহারই গৌরবে সে অস্থির। জানেই না যে ফোট।
ফোটা করিয়া তার প্রাণের স্রোতেই ভাটা পড়িয়া আসিতেছে। মহ।
উৎসাহে আনন্দে সে যুদ্ধের গল্প করিয়া চলিল।
“বেশ। এবার যেতে পারে। ব্যাণ্ডেজ করা হয়ে গেছে!”
ডাক্তারের কথায় লােকটি দাড়াইয়া উঠিল, কিন্তু এক পা-ও চলিতে
পারিল না। লড়াইয়ের উত্তেজনায় এমন অবস্থায়ও লােকে হটিতে
বা দৌড়িতে পারে, কিন্তু তার পর স্নায়ুগুলা একবার ঢিলা হইয়া গেলে
হঠাৎ যন্ত্রণায় একেবারে কাবু হইয়া পড়ে।
যুদ্ধ যখন চলিতে থাকে তখন ইতস্তত ‘
রেশ’ নিশান যুদ্ধক্ষেত্রের
আহতদিগকে আহবান করে। যে সব বীর যুদ্ধে মরিয়াছে, তারা এই

৮৯ পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা সেবাসরে কোনো সাহায্য পায় ন, সমস্ত সুবিই ভােগ করে আহতের, তাই কখনো কখনো তাদের মনে হয়, নিহতের কাছ থেকে যেন কিছু চুরি করিতেছে ! যুদ্ধ শুরু হইবার সঙ্গে সঙ্গেই ডুবি-বাহকের। ডুলি কারে লইয়া যুদ্ধক্ষেত্রে বাহির হইয়া পড়ে, ঘুরিয়া ঘুরিয়া অংহকে তুলিয়। তারা প্রাথমিক শুশ্রুষ-শিবিরে লইয়া যায়। এই সব বাহকদেরও আসল যােদ্ধার মত নিৰীক হওয়া চাই। গোলাগুলি তলোয়ার উপেক্ষা করিয়া আহতকে খুজিয়! বার করিয়া তাহাকে নিরাপদ স্থানে লইয়া যাইতে হয়। এই বিপদসঙ্কুল সেবার ভার তাদেরই উপর ন্যস্ত আছে। শুধু তাই নয়, আপনাপন পরিমিত খাদ্যের ও মহামূল্য জলের ভাগও আহতকে দিতে হয়, যথাসাধ্য সাবধানে তাদের বই করিতে হয় এবং সস্নেহে তাদের সান্ত্বনা দিতে হয়। দেশের হাসপাতালে যে সব পাড়িত ও আহত সোকে ফেরত পাঠানো হয়, তাদের পােষাক সাদা, তারা ডাক্তার ও সেবিকাদের সস্নেহ সেবা শুশ্রম। পাইয়া থাকে। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রের হাসপাতালে ব্যাপার অন্যরকম। সেখানে গ্রীষ্মকালে হতভাগ্য আহত সেনাকে ঝাক ঝাক মাছি আসিয়া আক্রমণ করে, তাদের নাকে মুখে পোকা পড়ে, কারও কারও হাত অকেজো হইয়া পড়ায় সেগুলােকে তাড়াইতেও পারে না। ইচ্ছা থাকিলেও হাসপাতালের আবদালি আর কতটুকু সাহায্য করিতে পারে ?—একশাে আহতের পিছনে একজনমাত্র আরদালি। দিনের বেলা প্রখর রৌদ্রে, রাত্রে বৃষ্টিতে বা হিমে তার! "লা পড়িয়া থাকে। কখনাে কখনো দীর্ঘকাল এমনিভাবে পড়িয়া থাকিয়া তাদের অবস্থা অকথ্য নােংরঃ হইয়া ওঠে, তখন ক্ষতের পরিচর্যা করিবার আগে ঝরণার জলে ডুবাইয়া বুরুশ দিয়া ঘসিয়া ঘসিয়া তাদের দেহ সাফ করিতে হয়।

১৮ অবিরাম চলা প্রকৃতি তাইপােসানের কেন্দ্রগুলোকে প্রায় অজেয় করিয়া রাখিয়া- ছিল, তা-ও যখন জাপানীর দখলে আসিল তখনাে রুশেরা দমিয়া গেল । কারণ তাইপােষানকে ঘিরিয়া তাদের আসল আত্মরক্ষার আয়ােজন এখনাে অ্যাহত আছে। দুই তিনটা পরাজয়ে এমন কি আসে যায়? এবার কান্তা পাহাড়ে হটিয়া গিয়া সেখানে আক্রমণ প্রতি রোধের নূতন তব্যবস্থায় মন দিল-সেখানে তৃতীয়বার দাড়াইবার চেষ্টা হইবে। আমাদের একদিনের বিলম্বে উহাদের একদিনের সুবিধা। তাই দীর্ঘকাল যুদ্ধের পর শ্রান্ত দেহের বিশ্রামের অবসর হইল না ; আমরা শত্রুর পিছু পিছু অবিরাম ধাওয়া করিয়া চলিলাম বাস্রোতের মত। উদ্দেশ্য, তাদের আত্মরক্ষার অয়ােজন সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই তাহাদিগকে তাড়াইয়া প্রধান কেল্লায় ঠেলিয়া ভােলা। প্রথমেই গুলিবারুদের অভাব পূরণ করা হইল, তার পর দলের পুনর্গঠন এবং শক্রর অশ্বারােহী দলের সন্ধান। স্থির হইল পরদিন আমাদের সমগ্র সেনাবাহিনী একযােগে যাত্রা শুরু করিবে। ২৯ তারিখে হুচিয়াতুনের কাছে উপত্যকায় আমাদের রেজিমেন্ট একটা অস্থায়ী আ গাড়িল। রাত তিনটায় ব্রিগেড সদর থেকে কর্নেলের কাছে আদেশ আসিল—এখনি লােক পাঠাইয়া কর্তব্য বুঝিয়া লও। আমাকে সেই কাজে পাঠানাে হইল। একজন আরদালিকে সঙ্গে পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা নিয়া নদীর ধার দিন্না দেড় ‘বি’ * ছুটয়৷ চারটের কিছু আগে সদরে পৌছিলাম। কাজ শেষ হইলে মনে হইল, যদি আরও তাড়াতাড়ি ছুটিয়া শিবিরে ফিরিতে না পারি, তবে আমাদের রেজিমেন্ট যথাসময়ে যুদ্ধে যােগ দিতে পারিবে না। সুতরাং হালকা হওয়া দরকার। অগত্যা সমস্ত পােক খুলিয়া ফেলিয়া আদালির হাতে দিলাম, তারপর এক হাতে পিস্তল আর অন্য হাতে তলোয়ার ধরিয়া একেবারে দিগম্বরবেশে উদ্ধশ্বাসে ছুটিলাম। তখনো অন্ধকার, ভুল পথে না যাই সে সম্বন্ধে সতর্ক আছি। নদীর ধার দিয়া অবিরাম ছুটিতেছি, দম বন্ধ হইয়া আসিতেছে। হঠাৎ এক জায়গায় পে-মাষ্টার’ মিশির গলার আওয়াজ পাইলাম—তিনি অহাৰ্য্য পাঠাইবার ব্যবস্থা করিতেছিলেন। দৌড়িতে দৌড়িতেই চীৎকার করিয়া বলিলাম- খাবারের আদবকার নেই, এখনি আমরা যাত্রা করবো। আমার কথা শেষ হলে পিছনে অনেক দূরে মিশিমার গলার আওয়াজ পাইলাম । ভাগ্যক্রমে ভুল করিয়া পথ হারাই নাই। পাঁচটার দশ মিনিট আগেই আমাদের অস্থায়ী আড্ডায় পেীছিলাম। সৈন্যদল তখনি জড়ো হইয়া শত্রুকে আক্রমগ্ন করার আদেশ পাইল। যে আরদালির হাতে আমার পোষাক দিয়াছিলাম সে এখনাে ফেরে নাই! অবশ্য গ্রীষ্মকালের প্রত্যুষে এমনি বিবস্ত্র অবস্থায় থাকায় দিব্য আরাম, কিন্তু এ ভাবে ত আর ‘মার্চ করা যায় না। প্রথম কর্তব্য বিনা পােষাকে সুসম্পন্ন হইয়াছে, কিন্তু এখনকার কর্তব্যে যে পোষাক দরকার। প্রথম আমদালির সন্ধানে দ্বিতীয় অবদালি ছুটিল, কিন্তু তবুও তার দেখা নাই শেষে যাত্রাকাল উপস্থিত, আমার অবস্থা শশাচনীয় হইয়া দাড়াইল। এক রি’=ইংরেজী ২ মাইল গালাজ ।

পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা হাল ছাড়িয়া দিম্মাছি, এমন সময় ভাগ্যক্রমে শেষ মুহুর্তে পোষাক আসিয়া পৌছিল, উলঙ্গ অবস্থায় লড়াই করার গৌরব অর্জন করা গেল না ! এখন সেটা হাসির কথা, কিন্তু তখন রীতিমত ভাইয়া তুলিয়াছিল। বােঝা গেল এবার লড়াই হইবে খোলা মাঠে। তার মানে প্রথম শ্রেণীতে চলিল skirmishers, তার পিছনে ‘রিজার্ভ’ দল-সমস্তই দস্তুরমাফিক সাজানাে, যেন শান্তির সময়ে সখের লড়াই হইবে। কেল্ল আক্রমণের সময় এভাবে সৈন্যচালনা প্রায় অসম্ভব—তখন রণভূমির অবস্থা অনুযায়ী ‘রিজার্ভের সংখ্যা ক্রমশ বাড়াইতে হয়। এ পর্যন্ত শিলাময় পার্বত্য ভূমিই আক্রমণ করা হইয়াছে; তাই যতদূর সম্ভব শত্রুর কাছাকাছি হওার চেষ্টা, যাহাতে সুযােগ পাইলেই একযােগে তাদের উপর পাইয়া পড়া যায়। এই ধরণের আক্রমণে ড্রিলের কেতাবে “লেখা সেনাৎস্থান সম্ভব নয়। সে যাই হোক, এবার তাইপােষান পার হইলেই সেখান থেকে সমুচ্চ তাকুমা পৰ্যন্ত বিস্তৃত সমতল, তাই এবার প্রথম খােল মাঠে লড়াইয়ের সম্ভাবনায় আমাদের বেজায় স্ফুর্তি। শত্রু অপ্রস্তুত অবস্থায় ছিল, সুযােগ বুঝিয়া আমরা হঠাৎ আক্রমণ করিলাম। তারা কতকটা বাধা দিলেও পায়ে-পায়ে হটিতে বাধ্য হইল। আমাদের রেজিমেন্টের কেবল দুটি দল হাতে রহিল, বাকি সকলেই যুদ্ধে নামিয়া গেল। ক্রমে তারা শত্রুকে ঘেরিয়া ফেলিল ; দুই দিকেই আক্রমণ করার ফলে মাঝ- খানের দলের হার হইতেই তারা দুই ভাগে বিচ্ছিন্ন হইয়া পড়িল, তখন আর পিছু না হটিয়া উপায় রহিল না। শেষ লক্ষ্যস্থলে তখনাে পৌছি নাই, ভুট্টাক্ষেতের উপর দিয়া পতাকা হাতে ছুটিয়া চলিয়াছি, এমন সময় মেজর উচিনাের সঙ্গে দেখা। ঔার তীক্ষ্ণ চোখ বাজপাখীর চোখের মত জ্বলিতেছে, তলােয়ারে ভর পাের্ট-আর্থরের ক্ষুধা দিয়া একখানা পাথরের উপর তিনি দাড়াইয়া। দেশে থাকিতে আমাদের রেজিমেন্টের সদরে একত্রে ছিলাম, তার চরিত্রের প্রভাব যাদের উপর খুব বেশি পড়িয়াছিল আমি ছিলাম তাদেরই একজন। লড়াইয়ের কায়দা সম্বন্ধে তার সুস্পষ্ট ধারণা, অদম্য সাহস, সরল সংযত ব্যবহার অামার শ্রদ্ধা আকর্ষণ করিত। ইনিই তাইপােষান আক্রমণের মাঝে কর্নেলকে সেই বিদা-লিপি পাঠাইয়াছিলেন। ইনিই তার বাছা বাছা দুই দল লোক লইয়া পাহাড়ের উত্তর-পূর্ব কোণে ছুটিয়া উঠিয়া পশ্চাদ্বর্তী দলের আক্রমণের পথ খোলসা করিয়াছিলেন। তারপর আর সেই নির্ভীক নায়কের সঙ্গে দেখা হয় নাই। ভুট্টাক্ষেতে তাহাকে দেখিয়া মনে হইল আবার যেন তাহাকে অসীম বিক্রমে লড়িতে দেখিতেছি। তাহাকে না ডাকিয়া পারিলাম না। ডাক শুনিয়া তিনি ফিরিয়া চাহিলেন, উৎসাহ দিয়া বলিলেন, পতাকার গৌরব অ3. বাড়িয়ে তোলে! সেদিন মধ্যাহ্নে ঈপিত স্থান আমাদের সম্পূর্ণ দখল আসিয়া গেল। এখন আমাদের সৈন্যশ্রেণীর বিস্তার হইল উত্তরে তুচেংতুন পাহাড় থেকে দক্ষিণে তাকুমানের পূর্ব দিকের পাহাড় পর্যন্ত। সেই নবলব্ধ ভূমির উপর দাড়াইয়া দূরবীনের সাহায্যে এক অদ্ভুত দৃশ্য চোখে পড়িল। এখান থেকে সর্বপ্রথম পোর্ট-আর্থারের দুর্ভেদ্য দুর্গের আসল আক্রমণ-প্রতিরােধ ব্যবস্থা চোখে পড়িল। দক্ষিণে চিকুয়া থেকে সুরু করিয়া উত্তরে যতদূর দৃষ্টি চলে, চারিদিকে কেবল কেল্লা আর ‘ট্রেঞ্চ। তার মাঝ থেকে ভীষণ-দর্শন কতকগুলাে পদার্থ মাথা তুলিয়া আছে যেন বাঘ ও চিতার দল লাফ দিবার জন্য উদ্যত—সেগুলো অতিকায় কামান। এখানে ওখানে সর্বত্র কুয়াসার মাঝ দিয়া অস্পষ্ট পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা ৯৪ দেখা যাইতেছে আট দশ থাক করিয়া তার—সেগুলি তারের বেড়া। মাঝে মাঝে শক্রর সন্ধানী চরের থানা। বিশ ত্রিশ জনের এক একটি দল তারের বেড়া বসাইতেছে। এই রঙ্গমঞ্চের উপরই যুদ্ধের ভাগ্য নির্ণয় হইবে—এখানেই জগতের দৃষ্টি পড়িয়া আছে। আমরা যারা এই রঙ্গমঞ্চে অভিনয় করিব, আমরা ত ইহার কথা ঘুমের মাঝেও ভুলিয়া থাকিতে পারি না। সেদিন থেকে আমরা লাংতুর কাছে পাকিয়া কান্তাষান গিরিশিরে সুদৃঢ় বাধা তুলিতে লাগিলাম । আমাদের উদ্দেশ্য, শত্রুর ডান দিকের মুখখামুখি তাকুন্ ও সিয়া ওকুফা পাহাড় হঠাৎ আক্রমণ করিয়া দখল করা ; তারপর, উক্ত পাহাড় দুটিকে আমাদের আক্রমণের বুনিয়াদ করিয় শত্রুর আসল আত্মরক্ষার বেড়ার (main line of defence) উপর আক্রমণ শুরু করা। - ভাষা দখল পাের্ট-আর্থার কেল্লার পূর্বদিকে বেলাভূমির উপরে সমুচ্চ বন্ধুর পৰ্বত, তার পার্শ্বদেশ প্রায় খাড়া উঠিয়াছে, ঝুকিয়া-পড়া পাথরে আর ফাটলে এখানে-ওখানে বেঁটে গাছের মেলা। দূর থেকে সমস্তটা দেখিলে মনে হয় যেন এক প্রাচীন বাঘ পাহাড়ের উপর বসিয়া আছে। সেটি তাকুষান্ বা বড় ‘অনাথ’ ; সিয়াওকু বা ছােট ‘অনাথ’ দক্ষিণে অবস্থিত, লাওলুৎসুই কেল্লার নিকটে এবং তার মুখােমুখি তাকু- শৃঙ্গ একক, তার দক্ষিণ-পশ্চিম পাশ পাের্ট আর্থারের কেল্লার দিকে • পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা নামিয়াছে, তার উত্তর-পশ্চিম পাশ আমাদের বামের ওমাঝের অবরােধক সৈন্যশ্রেণীর উপরে রহিয়াছে। আমাদের অবরােধের ব্যবস্থা, প্রত্যেক দলের চুলাফেরা, গােলন্দাজের সংস্থান সেখান থেকে স্পষ্ট দেখা যায়। পাহাড়ের যে-পাশ আমাদের সামনে তা বিশেষ রকম খাড়া; তার উপর চড়া প্রায় অসম্ভব—কোন্ ও তাইপোষানের মতই দুরারোহ। পাহাড়-দুটি থেকে শত্রু যেমন আমাদের লক্ষ্য করিতে পারি, তারাও তেমনি আমাদের কামানের লক্ষ্য হইয়া উঠিয়াছিল। তাদের সম্বন্ধে আমাদের ‘ডিভিসনের নায়ক বলিতেন—ওই পাহাড়-দুটির সঙ্গে মুর্গির পাঁজরের মাঝের মাংসের তুলনা করা যেতে পারে। আয়ত্ত করা কঠিন, অথচ ছাড়তেও মন সরে না। ওই দুই পাহাড় যতক্ষণ শক্রর হাতে থাকবে ততক্ষণ তার ওপর থেকে আমাদের ওপর তােপ দাগবে, আবার আমরা যখন পাহাড়-দুটো দখল করবাে তখনাে শত্রুর কামানের লক্ষ্য হয়ে উপায় থাকবে না। স্বভাবতই যে-স্থান এমন সুরক্ষিত তা দখল করা কঠিন, দখলে রাখা ততােধিক। অবর্ণনীয় সংগ্রামের পর যদিই বা নেওয়া যায়, তখন আশপাশের কেল্লা থেকে গােলার ঘায়ে অস্থির হইতে হইবে। প্রয়ােজনের খাতিরে, ওই জায়গা দখল করাই চাই, নায়কেরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছিলেও, আমরা একটি গােলাও না ছুড়িয়া সুযােগের প্রতীক্ষায় রহিলাম—শত্রু যদিও অবিরাম তােপ দাগিতেছিল। দুর্ভেদ্য অবরােধের আয়ােজন শেষ করার জন্য আমরা ব্যস্ত হইয়া উঠিলাম। শেষ পর্যন্ত সাতই আগষ্ট আক্রমণের দিন ধার্য্য হইল। ইহারই মধ্যে খুব গােপনে রকমারি কামান যথাস্থানে বসানাে হইয়াছে। বেল। চারিটার সময় সমস্ত কামান একত্রে গােলাবর্ষণ শুরু করিল দুই পাহাড়ের শীর্ষরেখা লক্ষ্য করিয়া।

পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা '৯৬ কামানের গুরুগর্জনে শূন্য যেন ছিড়িয়া টুকরা টুকরা হইয়া গেল, সাদা পোয়ার আড়ালে আকাশ অদৃশ্য হইল। কেবল ওই দুই পাহাড়ের কেল্লা থেকে নয়, পিছনের পানলুং, চিকুয়া, লালুংসুই পাহাড়ের কেল্লা থেকে ও তপনি আমাদের তোপের জবাব সুরু হইয়া গেল। যতদূর দেখা যায় সমস্তই বোয়ার ঢাকা, অন্ধকার আসন্ন- বর্ষণ আকাশ ভেদ করিয়া শত শত বজের ভীষণ আওয়াজ যুগপৎ ছুটিতে লাগিল। আমাদের গােলা তাকুমানের শিলাময় দেহে আঘাত হানে, আর অমনি হরিদ্রাভ সাদা আগুনের ফিনকি আর ছিন্নভিন্ন পাথর দূরে দূরান্তরে ছড়াইয়া পড়ে। শত্রুর কামান আমাদের চেয়ে সংখ্যায় বেশি, তা ছাড়া শত্রু আমাদের উপরে রহিয়াছে—সে-সুবিধা ত অছেই। আমাদের গোলন্দাজেরা নানা অসুবিধা ও কষ্টের মধ্যে লেড়িতে লাগিল, তাদের ক্ষতিও হইল বিস্তর। কিন্তু আমাদের বড় কামান সমস্তই উপত্যকার মাঝে আছে—মনে হইল শত্রুর গােলন্দাজেরা তাহা জানে না। তাই তারা আমাদের সৈন্যশ্রেণীর সঙ্গের কামানের উপর এবং আমাদের পদাতিকের উপরই তোপ দাগিতে লাগিল। ফলে, আমাদের বড় কামানের কোনাে ক্ষতিই হইল না, সূর্যাস্তের কিছু পূর্বে শত্রুর উপর তাদের প্রভাব অনেকটাবােঝা গেল—তাকু- যানের উপর শেদের কামান প্রায় নীরব হইয়া আসিল। বেলা চারিটার সময় আমাদের রেজিমেন্ট যাত্রা শুরু করে। উদ্দেশ্য ছিল আমাদের কামান পথ খােলসা করিলেই তারা তাকু-নদী পার হইয়া শত্রুকে আক্রমণ করিবে। এই ভয়ানক যুদ্ধ বর্ণনা করার আগে, যুদ্ধের ঠিক আগে আমি কি ভাবিয়াছিলাম ও করিয়াছিলাম তাহাই বলিব। এই অভিজ্ঞতা কেবল আমার নয়—কঠিন যুদ্ধের আগে প্রায় সকল সৈনিকেরই এমনি হইয়া s ১৭ পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা থাকে। সৈনিকের যে-সব দুর্বলতা থাকে, তার মধ্যে একটি ইহার দ্বারা বোঝা যায়। আমি অতি নগণ্য ও তুচ্ছ ব্যক্তি, তবুও লিয়াও- তুঙের মাটিতে পা দিবার পর গত তিন মাস যাবৎ রেজিমেন্টের পতাকা বহন করিয়া আসিতেছিযে-পতাকা স্বয়ং সম্রাটের প্রতীক। কেনজান, তাইপােষা ও কান্তাষা—এই তিন যুদ্ধ পার হইয়া আসিয়াছি। সৌভাগ্যই বলুন অর দুর্ভাগ্যই বলুন, এ পর্যন্ত গায়ে একটি আঁচড়ও লাগে নাই। অথচ সেই পতাকার তলে অনেক সাহসী যােদ্ধা মারা পড়িয়াছে, পতাকাটিও শত্রুর গোলার ঘায়ে ছিড়িয়াছে। উক্ত ঘটনার সময় আমার খুব কাছে এক সৈনিক দাড়াইয়া ছিল, সে নার পড়িল, কিন্তু আমি অক্ষত রহিলাম। সে যাই হােক, আমার মৃত্যুর গুজব বার-বার দেশে রটনা হয়, সংবাদপত্রে আমার আহত হওয়ার মিথ্যা খবর ও বাহির হয়। এ সব যুদ্ধক্ষেত্রে থাকার সময়ই শুনিতে পাই। একটা গুজব রটিয়াছিল যে, জাহাজ থেকে নামার সময় বিষম ঝড়ে অমির ‘সাপান্* উল্টাইয়া যায় এবং সমুদ্রের ঢেউ আমাকে গ্রাস করে। তবে মরার আগে আমি নাকি অনেকক্ষণ নিশান কামড়াইয়া ধরিয়া সার দিয়াছিলাম ! আর একবার রটনা হয় যে, আমি জাহাজ থেকে নামিয়াই শত্রুর মুখে পড়ি। আমাদের প্রথম দলের কাপ্তেনের সঙ্গে মারা পড়ি। এই সব ভুল খবরের কল্যাণে আমি ইতিমধ্যে ‘বীর’ আখ্যা লাভ করিয়াছিলাম ; তারপর প্রায়ই আমার অহত হওয়ার সংবাদ বাহির হইতে লাগিল এবং প্রতিবারই সে-ঘটনার পরমাশ্চৰ্য্য খুটিনাটি বর্ণনা প্রকাশিত হইল। কিন্তু নিজেকে পরীক্ষা করিয়া দেখিতে পাইলাম আমি গুণলেশহীন এবং আমার দেহে একটা তুচ্ছ আঘাতও নাই! লজ্জিত না হইয়া * চীনা নৌকা। ৭ পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা ৯৮ কি করি, মনে হইল আমার উপর বন্ধুবান্ধবের অনেক আশা, আমি একেবারেই তার অযোগ্য। এই চিন্তা আমার শান্তি হরণ করিল । মনে মনে ঠিক করিয়া ফেলিলাম এই তাকুমানের যুদ্ধে মরিয়া হইয়া লড়িয়া প্রাণত্যাগ করিব। আক্রমণ শুরু হইবার দিনকয় আগে ভৃত্যকে বলিলাম, ঠিক করেছি এবার মরবই ! তোমার সেবা ও মেহের জন্য কেমন করে ধন্যবাদ দেব জানি না—আমার এই মৃত্যুপণকেই কৃতজ্ঞতার নিদর্শন বলে গ্রহণ করাে ! তাহাকেও সবিক্রমে লড়িতে অনুরােধ করিলাম। অামার কথা শুনিয়া বেচারার চোখে জল আসিল, সে বলিল, আপনার যে-পথ আমারও সেই পথ ! তাহাকে বলিলাম, আমার ভস্মাবশেষের জন্য একটি কৌটা তৈরি করিব ; তবে যদি এমন সুন্দর মৃত্যু হয় যাতে অস্থির চিহ্ন পৰ্য্যন্ত থাকে, তবে সে যেন বাড়িতে আমার কিছু চুল আর কয়েকটা নখ পাঠাইয়া, দেয়! তারপর, বড় গোলা প্যাক করার বাক্সের তার টুকরা দিয়া এক কৌটা তৈরি করিলাম ; আমার ভৃত্যের তৈরি বাঁশের পেরেক দিয়া তক্তাগুলা জোড়া হইল। ইঞ্চি তিনেক চৌক: একট। যেমন-তেমন কৌটা খাড়া করিয়া তার মধ্যে আমার একগােছ! চুল, নখের টুকরা, অার দেহভস্ম মোড়ার কয়েকখানি কাগজ রাখি। দিলাম। কোটার ঢাকার উপর আমার নাম এবং মৃত্যুত্তর বৌদ্ধ নামও লিখিলাম। কফিন' তৈরি হইয়া গেল, এবার কেবল প্রাণপণ চেষ্টায় মরিয়া সম্রাটের ও দেশের দয়ায় ঋণ পরিশােধ করিলেই হয়। বলা বাহুল্য, শেষ পর্যন্ত সে-কোটা আমার ভস্মাবশেষ বহন করে নাই, এখন তাহা নিজের ও বন্ধুবর্গের পরিহাসের বস্তু হইয়া আছে। সেদিন সন্ধ্যায় তােকিয়ােতে দাদার কাছে পত্র দিলাম। সম্প্রতি কার যুদ্ধের খবর দিয়া লিখিলাম, পরদিন আমাদের আক্রমণ শুরু ;

৯৯ পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা হইবে। লিখিলাম, মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হইয়াছি-আমার দেহ পােট আর্থারে ধ্বংস হইলেও আমার আত্মা ‘সাত জন্মরাজভক্তি ভুলিবে না! চিঠিখানি আমার শেষ বিদায় লিপিরূপেই পাঠাইয়াছিলাম। সেই দিনই আবার দাদার এক পত্ৰ আসিল। তিনি লিখিয়াছিলেন- “মানের কথা বা গুণের কথা ভাবিয়ে। না, কেবল অপন কৰ্তব্য করিয়া যাও। “নেন্ যখন ট্রাফালগারের যুদ্ধে মহান মৃত্যু বরণ করিলেন, তখন বলিয়াছিলেন—Thank iod I have done my duty!” সাতই আগষ্ট বেলা পাচটায় কামানের গর্জনের সঙ্গে প্রবল বৃষ্টি মিলিত হইল। অপরাহ্ন-আকাশ অন্ধকার নিরানন্দ হইয়া উঠিল। তলায় তাকু নদী, উপরে উচ্চভূমিতে অমরা বসিয়া আছি—আগে চলার অদেশের অপেক্ষা করিতেছি। ক্রমে বৃষ্টি বাড়িতে লাগিল আকাশ আরও অন্ধকার হইল। শত্রুর সন্ধানী আলাে পাহাড় ও উপত্যকার এক পাশে পড়িয়া শ্বেতাভ নীল আলাে ছড়াইয়া আমাদের পদাতিকের চলায় বাধা দিতে লাগিল। শত্রুর তােপের বিক্রম ক্রমেই বাড়িয়া উঠিতেছে। তোপের শব্দ বৃষ্টির শব্দে মিশিয়া একটা অদ্ভুত আওয়াজ সৃষ্টি করিতেছে। একটা ওভারকোট দু’জনে মুড়ি দিয়া লেফটেন্যান্ট হায়াশি ও আমি মাঝে মাঝে কথা কহিতেছি। হঠাৎ হায়াশি বলিল, যে কোন মুহূর্তে আমাদের ছাড়াছাড়ি হতে পারে! মনে হল সে তার মৃত্যুর কথা ভাবিতেছে। উত্তরে বলিলাম, আমিও আজ রাতে মরবই । শুনিয়া হায়াশি বলিল, কতদিন একসঙ্গে আছি বলে ত! বাক্যালাপ চালাইবার আর সুযােগ হইল না, আমাদের ছাড়াছাড়ি পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা ১০০ হইল। দেশে বহুদিন দুজনে একই মেসে বাস করিয়াছি, যুদ্ধে ও আমরা পরস্পরে সঙ্গী ছিলাম। এই হায়াশিই তাইপোমা আক্রমণের সময় সবার আগে তলােয়ার ঘুরাইয়া শত্রুর কেল্লায় প্রবেশ করে। এই আমাদের শেষ দেখা। আগে বলিয়াছি, সন্ধ্যার দিকে আমাদের তােপের ফল ফলিতে সুরু হইল। তখন প্ল্যান্ অনুযায়ী আমাদের দল অগ্রসর হইতে সুরু করিল। বৃষ্টি বাড়িয়াই চলিয়াছে—তার আর বিরাম নাই ; সরু পথগুলাে ডোবায় পরিণত হইল। হাঁটুজল ও কাদা ভাঙিয়া বহুকষ্টে চলিতে লাগিলাম। ভাবিয়াছিলাম, তাকুনের উপর শত্রুর কামান অকর্মণ্য বা নিস্তেজ হইয়া পড়িয়াছে, এখন বুঝিলাম সে ধারণা ভুল ! যেই তারা দেখিতে পাইল ধোয়া ও বৃষ্টির মাঝ দিয়া ‘মা’ করিয়া চলিয়াছি অমনি আবার নুতন উদ্যমে তােপ দাগিতে সুরু করিল। তা নদীতে পৌছিয়া দেখি ঘােলা জল কুল ছাপাইয়া উঠিয়াছে, নদীর গভীরতা বুঝিবার উপায় নাই। প্রবল বৃষ্টির সুযােগে শত্ৰু কিছু দূরে নীচে স্রোতের মুখে বাধ তুলিয়া বন্যার সৃষ্টি করিয়া আমাদের গতিরােধ করিবার চেষ্টা করিতেছে। যতই সাহসী হই রুশেদের এই অপ্রত্যাশিত মিত্রকে তুচ্ছ করিতে পারিলাম না। তাহা করিলে শত্রুর ততাপের মুখে না মরিয়া হয়ত কেবল জলে ডুবিয়া মরিব যে! দেখিতে দেখিতে আমাদের একদল বেপরােয়া ইঞ্জিনীয়ার অন্ধকার জলে ঝাঁপ 'দিয়া পড়িয়া বাঁধ ভাঙিয়া দিল, তার ফলে কিছুক্ষণের মধ্যেই জল নামিয়া গেল। তখন পদাতিক দল জল ঠেলিয়া অগ্রসর হইতে লাগিল। এবার তারা ডুবিল না বটে, কিন্তু অনেকেই জলের মধ্যে শত্রুর গােলার ঘায়ে মরিল—তাদের মৃতদেহ এমন জড়ামড়ি করিয়া পড়িল যে নদীর এপার থেকে ওপার পর্যন্ত প্রায় যেন সেতু গড়িয়া উঠিল। ত • ৩০ পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা অবশেষে আমরা তাকুনের তলায় গিয়া পৌছিলাম। এবার তারের কাটা-বেড়া ভাঙার পালা, সেই সঙ্গে ‘মাইন্ মাড়াইবার অশিঙ্কা। এক বিপদ শেষ হয় ত অন্ত বিপদ আসে। কিন্তু এখন ইতস্তত করিবার সময় নর—অামরা হাতে-পায়ে হাম। দিয়া পাহাড়ে উঠিতে সুরু করিলাম। ঘন অন্ধকার ও প্রবল বৃষ্টি আমাদের অসুবিধা বাড়াইয়া তুলিল। নদী পার হওয়ার সময় একচোট ভিজিয়াছি, তারপর এই বৃষ্টিপা থেকে মাথা পর্যন্ত ভিজিয়া সপসপ করিতেছে তবুও রক্ত চলাচল করাইবার জন্য ইচ্ছামত পেশী চালনার উপায় নাই তার উপর, যতই রুশেদের ট্রেঞ্চের কাছাকাছি আসিতেছি, ততই তারা আমাদের মাথার উপর গুলি চালাইতেছে ; কখনাে বা পাথর ও কাঠের চাই ফেলিতেছে—অগ্রসর হওয়ার বাধা পদে পদে। আমাদের কাছা- কাছি একটা দল ‘ট্রেঞ্চে’র নিকটে পৌছিয়াছে—পাহাড়ের গায়ে প্রায় মাঝপথে ‘ট্রেঞ্চ’গুলি ঘােড়র ক্ষুরের আকারে রচিত। আমাদের দিকে পাহাড়ের পাশে পাথরের উপর দৃঢ়ভাবে দাড়াইবার ব্যবস্থা হইতে লাগিল—শক্রকে রাত্রিকালে অতর্কিতে আক্রমণ করা হইবে। ওদিকে শত্রু সন্ধানী আলো আর তারারাজির সাহায্যে আমাদের অগ্রগমনে বাধা দিবার জন্য অতিমাত্রায় তৎপর হইয়া উঠিল। ফলে নিশীথ আক্রমণ অসম্ভব মনে হওয়ায় সেমতলব আমরা ত্যাগ করিলাম ; প্রত্যুষে আক্রমণ করাই স্থির হইল। অতঃপর আমরা দুইদল পরস্পর এবং শত্রুর মুখােমুখি দাঁড়াইয়া অপেক্ষা করিতে লাগিলাম—অবারিত বৃষ্টিধারা আমাদের উপর অবিরাম ঝরিতে লাগিল। পূবের আকাশ ফরসা হইয়া আসিল, বৃষ্টি তখনাে পড়িতেছে। তাকু নদীতে ইতস্তত সঙ্গীদের দেহ সংগ্রহ করা গেল না, নদীর পরপারে কোনাে আরদালিও পৌছিতে পারিল না। শত্রুর ঠিক দৃষ্টির তলে পার্ট-আর্থারের ক্ষুধা ১০২ অাছি, তবুও আৱদালি পাঠাইবার কামাই নাই—তারা প্রত্যেকেই গুলির ঘায়ে পড়িতে লাগিল, একজনও. বাদ গেল না। নিদারুণ নিষ্ফলতা! কারও কোনো প্রস্তাব নাই, জানি না কখন বা কি উপায়ে শত্রুর উপর হানা দেওয়া সম্ভব। সেই সময় সার্জেন্ট-মেজর ঈনে। তাকুমানের তলায় পড়িয় যন্ত্রণায় ছটফট করিতেছিলেন। তার পেটে গুলি বিধিয়াছে। যে-কেহ তার পাশ দিয়া যাইতেছে তাহার কাছেই অনুনয় করিতেছেন—আমাকে মেরে ফেল, আমাকে মেরে ফেল যন্ত্রণা আর সহ্য হয় না ! ওদিকে রুশেদের এগারখানি জাহাজ য়েনচ্যাঙের কাছে বাহির হইয়া আমাদের, পদাতিক দলের পিছনে তােপ দাগিতে লাগিল। আমাদের কোনাে আড়ালই নাইশত্রুর অগ্নিবাণের আমরা নিশ্চিন্ত লক্ষ্য হইয়া উঠিলাম। তারা যথেচ্ছ আমাদিগকে মারিতে লাগিল। আমাদের আর আশা নাই—সামনের ফটকে বাঘকে আটকাইতেছি এমন সময় পিছনের ফটকে নেকড়ের হানা! গিৱিশিৱে সূর্ষ-পতাকা বারুদের ধোয়া তরঙ্গভঙ্গের মত সকল দিক আচ্ছন্ন করিয়া আছে ; কালাে বৃষ্টিধারা যেন ক্রুদ্ধ কেশরীদল। মাথার উপরে খাড়া পাহাড় আকাশ চুম্বন করিতেছে-তার উপর চড়া বাঁদরের পক্ষেও কষ্টকর। উপরপানে প্রতি পদক্ষেপের সঙ্গে পাহাড়ের চড়াই ক্রমে দুরারোহ হইতেছে—এক চড়াইয়ের অন্তে দ্বিতীয় চড়াইয়ের সুরু; তাহা আরােহণ করা আরও কষ্টকর। সেই উচ্চতা থেকে ভয়ঙ্কর ‘রুশ ঈগল’ বিপদের পােট-আর্থারের ক্ষুধা সূচনা করিতেছে। সকল দিক থেকে আমাদের অগ্নিবর্ষণ শত্রুর খাটি তাকুমানের উপর কেন্দ্রীভূত। এই আক্রমণের জবাব দিবার জন্য সম্মুখে শেদের বড় কামানগুলাে রক্তজিহ্বা নেলিতেছে, আর পিছনে আসিতেছে তাদের রণতরী আমাদের পিঠ চুর্ণ করার জন্য। সুবিধা অনেক, অক্রমণ প্রতিরোধের ব্যবস্থাও প্রবল, তাদের পরাজিত করা সহজ নয়। কিন্তু এ জায়গা দখল করিতে না পারিলে আমাদের সমস্ত সেনার গতি রুদ্ধ হইবে, পোট-আর্থারের কেল্লা আক্রমণ সম্ভব হইবে না, পোট-অৰ্থার অবরােধের ভিত গড়া যাইবে না। তাই যতই কঠিন হােক এবং যত ক্ষতিই হােক শত্রুকে সেখান থেকে হটানো চাই। প্রবল বারি ও গোলা বর্ষণের তলে পাহাড়ের ধারে আমাদের দল সেই রাত ও পরদিনের সকাল কাটাইল। বিকাল তিনটার আক্রমণের সুযোগ আসিল। আমাদের গােলন্দাজেরা শত্রুর জাহাজকে কিছুকালের জন্য পিছু হটতে বাধ্য করায় সুবিধা হইল। নায়কের আদেশ পাওয়া মাত্র দুই ধারের দলই এক সঙ্গে যাত্রা শুরু করিল। খাড়া পাহাড়, প্রচণ্ড গােলাগুলি, বিরূপ প্রকৃতি—সমস্তই উপেক্ষা করিয়া দেবতার মত অবিচলিত শক্তি ও সাহসে সকলে উপরে ঠেলিয়া উঠিতে লাগিল। সৈনিকের চীৎকার ও হুঙ্কার, কামানের গুরুগর্জন, কিরিচ ও তলোয়ারের ঝিলিক, উড়ন্ত ধূলা, রক্তের প্রবাহ, চূর্ণ অস্ত্র ও মস্তিষ্ক-লণ্ডভণ্ড ব্যাপার ভীষণ হাতাহাতি লড়াই। শক্ৰ উপর থেকে প্রকাণ্ড পাথর গড়াইয়া ফেলিতেছে, তার ঘায়ে অনেক হতভাগ্য গভীর উপত্যকার মাঝে গিয়া পড়িতেছে, অনেকে পাহাড়ের গায়ে গুড়া হইয়া যাইতেছে। চিকুয়া যান ও এরলুংযানের বড় কামানের লক্ষ্য ভাল—গােলাগুলাে ঠিক তাকুনের চূড়ায় ফাটিতে লাগিল। বৃত্তাকার ও অন্যবিধ গােলার পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা ১০৪ অাগুনের বোঝা উজ্জ্বল আলোর সুদীর্ঘ রেখায় সকল দিক থেকে আনাগোন। ও কাটাকাটি করিতে লাগিল। দেপিতে দেখিতে বিপুল ‘বাজাই’ ধ্বনি যুগপৎ গিরিমূল ও শীর্ষদেশ থেকে উঠিয়ঃ- পাহাড় কাপাইয়া দিল। এ কি ? কি হইল ? ঐ না ধোয়ার মেঘের মাকে সূৰ্য-পতাকা উড়িতেছে ? আমাদের আক্রমণ সফল হইয়াছে ! দেখিয় আনন্দে কাদিয়া ফেলিলাম। ভস্মবর্ণ ধোয়ায় মোড়। তাকুষান এখন আমাদের দখলে। কিন্তু সেই ব্যাপার ঘটিবামাত্রই শত্রুর সকল কেল্ল। পাহাড়ের উপর আমাদের প্রধান আস্তানা লক্ষ্য করিয়া তােপ দাগিতে সুরু করিল। বড় কামানের গােলাগুলো, আকারে সাধারণ জলের কুজার মত, বাতাস কাপাইয়া ইঞ্জিনের মত হুসহুস করিয়া ছুটিয়া আসিতে লাগিল। বিকট শব্দে ফাটার সময়, সাদা ধোয়া যেখানে উঠিতেছে সেখানে একট। অদ্ভুত আলো ঝকমক করিতেছে, আর যেখানে অন্ধকার মেঘ ঝুকিয়: আছে সেখানে পাহাড় চূর্ণ হইতেছে। পৃথিবীর মেরুদণ্ড যেন নড়বড়ে হইয়া উঠিল, মৃত সৈনিকের দেহগুলা টুকরা টুকরা হইয়া গেল। আমাদের অবস্থা নিরাপদ ত নহেই, বরং বিশেষ সঙ্কটাপন্ন। জায়গাটা যারা দখল করিয়াছে আমাদের সেই সৈন্যদলের স্বস্থানে টিকিয়া থাক। দায়। শত্রু যদি আবার ফিরে-ফিরতি আক্রমণ করে এবং তা সে করিবেই—তাহা হইলে এই বিপদসঙ্কুল গিরিশীর্ষে তাহাকে ঠেকানাে যাইবে কি উপায়ে ? ঢালুর ওপারে শত্রুর ধাটি দেখিবার জন্য একটু গলা বাড়াইলেই তাদের গুলি চলিতে থাকে—এক পা নড়িবার জো নাই। পাহাড়ের মাথায় শত্রুর ছয়টা কামান আমাদের হাতে পড়িয়াছিল, একজন সৈনিক সেগুলাের পাহারায় মােতায়েন ছিল, একটা গােটা গােলা আসিয়া বেচারাকে আঘাত করিয়া পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা একেবারে ছাতু বানাইয়া দিল। তার এক টুকরা মাংস আমাদের মাথার উপর দিয়া উড়িয়া গিয়া আমাদের পিছনে এক পাথরের উপর আঁটিয়া বসিল—সেইটুকুই তার ধ্বংসাবশেষ। আর একটা গোলা একদল সৈনিকের মাঝে পড়ায় এক মিনিটে ছাব্বিশ জন লোক উৰিয়া গেল ; আর সেই গােলার ঘায়ে চুর্ণ পাথরের তলায় তিন জন সৈনিকের জীবন্ত সমাধি লাভ হইল। সেইদিন লেফটেন্যান্ট কুনিওর পেটে গুলি বিধিল। সন্ধ্যার দিকে অবস্থা খুব খারাপ হইয়া উঠিল, তার ভৃত্য ও অন্য কয়েকজন তার সেবায় নিরত এমন সময় তার দাদা কাপ্তেন সেগাওয়া আসিয়া উপস্থিত। ভাই যে আহত, তার যে মৃত্যু আসন্ন-সে কিছুই জানে । তাহাকে দেখি সকলে বলিল, তোমার ভাই যে যেতে বসেছে! যাও, যাও, তার মুখে শেষবারকার মত একটু জল দিয়ে এস! কাপ্তেন তাড়াতাড়ি ভাইয়ের কাছে গিয়া হাঁকিল, কুনিও কুনিওর তখন অন্তিম দশা-সে চোখ বুজিয়া পড়িয়া ছিল, কিন্তু দাদার ডাক তার কানে পৌছিল ; মনে হইল, সে যেন সেই ডাকটি শুনিবার আশায় এতক্ষণ মরিতে পারে নাই! ঘােলাটে দৃষ্টি মেলিয়া সে দাদার মুখের পানে চাহিল, হাত বাড়াইয়া তার হাত খানা ধরিল, কিছুক্ষণ কারও মুখ দিয়া কথা বার হইল না। শেষে কাপ্তেন বলিল, সাবাস কুনিও, সাবাস! কিছু কি বলবে ভাই? বলিয়া সে মরণাহত ভাইয়ের মুখখানি সযত্নে মুছাইয়া দিল, তারপর নীচু হইয়া নিজের বােতল থেকে তার মুখে জল ঢালিয়া দিল। কুনিও ঈষৎ একটু মাথা নাড়িল, তারপর বলিল, দাদা! দাদা! আর কিছু বলিতে পারিল না। দাদাকে হয়ত কত কথা বলার ছিল, কিন্তু মরণ তার অবসর দিল কই। • পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা ১৬ দুই সপ্তাহ পরে, ২৪ আগষ্ট তারিখের যুদ্ধে কাপ্তেন সেগাওয়া বিদেহী অনুজের কাছে যাত্রা করিল ! যে কেল্লার শ্রেণী জাপানী আক্রমণ প্রতিরােধ করিবে, তাকুষান্ তার চাবি। সেই তাকুষান্ হাতছাড়া হওয়ায় রুশেরা যে খুব ক্রুদ্ধ ও নিরাশ হইবে ইহা স্বাভাবিক। তাকুন্ আবার দখল করার জন্য বারবার তারা আক্রমণ করিতে লাগিল, কিন্তু প্রতিবারেই বিতাড়িত হওয়ায় তাদের নৈরাশ্য বাড়িয়া গেল। ঐ পাহাড় দখলের দিনকয় পরে . গিরিশীর্ষে স্থাপিত আমাদের এক শাস্ত্রী একদিন প্রত্যুষে রুশ সন্ধানী চরের গুলিতে মারা পড়িল। যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হইয়া আমাদের দল ছুটিয়া গিয়া পাহাড়ের মাথায় উঠল। দেখিতে পাইল তাদের দশ পনেরো ফুট নীচেই জনকয় রুশ স্মচারী প্রায় সত্তর জন সৈনিকের আগে আগে তলােয়ার ঘুরাইতে ‘ঘুরাইতে উঠিয়া আসিতেছে। আর এক মুহূর্ত ইতস্তত না করিয়া শত্রুর দিকে বন্দুক ঘুরাইয়া জাপানীরা গুলি চালাইতে সুরু করিয়া দিল। এই অপ্রত্যাশিত অভ্যর্থনায় শক্রদলের চমক লাগিল, ফিরিয়া তার পলায়ন করিল—তাড়াতাড়িতে উলটিয়া পালটিয়া প্রায় গড়াইয়া গেল। বলা বাহুল্য, আমাদের দল এমন সুযোগের সম্পূর্ণ সদ্ব্যবহার করিল-পলায়নপর শত্রুর দিকে অবিরাম গুলি চলিতে লাগিল। একজনকেও প্রাণ লইয়া ফিরিতে হইল না—পাহাড়ের গায়ে তাদের মৃতদেহ ছড়াইয়া রহিল মসীচিহ্নের মত। রুশেদের প্রচণ্ড একগুয়েমি দেখিয়া অবাক হইয়া যাই। হয়ত তাহাদের কোনাে জায়গা আক্রান্ত হইয়াছে এবং তার এক অংশ বেদখল হইয়াছে, তখন অপর অংশের সৈন্যদের সেখান থেকে হটিয়া ১০৭ পাের্ট-আর্কারের ক্ষুধা যাওয়া দরকার হইতে পারে। অন্যথায় হয় মৃত্যু, নয় বন্দীদশা প্রাপ্তি। এমন অবস্থায়ও তারা স্থান ত্যাগ না করিয়া সেইখানেই লাগিয়া গাকে—যতক্ষণ না তার। মারা পড়ে। সকলে মারা পড়িবার পর হত একজনে আসিয়া ঠেকিয়াছে, তখন সেই একজনই গুলি চালা- ইতে থাকে। কাছাকাছি হইলে বন্দুকে কিরিচ চড়াইগ্না সে লড়িতে গাকে যতক্ষণ না আত্মসমর্পণের চিন্তা তার মনে উদিত হয়। কেন্জান, তাইপোমা, আর তাকুষানে এমন ব্যাপার প্রায়ই ঘটিত। শুনিয়াছি, নানশানের যুদ্ধের পরে, কোথা থেকে কেহ জানে না, গুলি ছুটিয়া আসিয়া আমাদের জন দশেক লোককে জখম ও নিহত করে। চারিদিকে খোজ খোজ রব উঠিল, অনেক: সন্ধানের পর দেখা গেল, রান্নাঘরে এক রুশ সৈনিক লুকাইয়া জানালা দিয়া নির্ভয়ে পরমাগ্রহে গুলি চালাইতেছে। রুশবন্দীকে যখনই এরূপ করার কারণ জিজ্ঞাসা করিয়াছি, তারা উত্তর দিয়াছে—নায়কের হুকুম অমান্য করিতে পারি না। একজন মার্কিন সামরিক কর্মচারী জাপানী সেনাদলের সঙ্গে কয়েকমাস মাঞ্চুরিয়ায় ছিলেন। তিনি বলেন, “জাপানী দলের মধ্যে, উচু থেকে নীচু পর্যন্ত সবার মধ্যে একটি সখ্যভাব ও একত্ববোধ বর্তমান। তেমনটি আর কোনো জাতির সেনাদলের মধ্যে দেখা যায় না, এমন কি ইংলণ্ড বা গণতান্ত্রিক আমেরিকাতেও নয়। তাহাদের এই বিশেষত্ব মনকে আকর্ষণ করে। কিন্তু রুশ সৈনিকের বিশেষত্ব যে একরোখা সাহস—তাও আমাদের প্রশংসার যোগ্য। পাের্ট-আর্থার আঁকড়াইয়া থাকার সময় তাদের গােলাগুলি রসদ ইত্যাদির যথেষ্ট অভাব ঘটে, তার ফলে সৈনিকেরা হাজারে হাজারে মারা পড়ে—তাদের দুরবস্থা হয় ঝোড়াে হাওয়ার মুখে দীপশিখার পাের্ট-আর্কারের ক্ষুধা ১০৮ মত ; সেই নিরাশার মধ্যেও তারা অবিচলিত ছিল, শত্রুকে বাধ: দেয়ার দৃঢ় সঙ্কল্প এতটুকু শিথিল হয় নাই! রুশেদের সামরিক বিপিতে আছে—যুদ্ধে জয়মাল্য লাভ হয় কিরিচ ও রণহুঙ্কারের দ্বারা ! গুলি ফুরাইয়া গেলে বন্দুকের বাটের ঘায়ে শত্রুকে নিপাতিত করাে! বন্দুকের বাঁট যদি ভাঙে তবে কামড়াইয়া দাও । আক্রমণে ও বাধা দেওয়ায় তারা একরোখা, একথা খুব সত্য; কিন্তু আবার নিজেদের প্রাণ বাচাইবার জন্য তারা বিশেষ সতর্ক। চরিত্রের এই দুইটি বিশেষ লক্ষণ পরস্পর বিরোধী। “বরং ইটের টালি হইয়া বাঁচিয়া থাকিবে তবুও মণি হইয়া ভাঙিবে না”—মনে হইত ইহাই তাদের আদর্শ। জাপানী আদর্শ তার বিপরীত-সুন্দর মরণ বরণ করিয়ে, কিন্তু অসম্মানের জীবন চাহিয়াে না ! শুনিতে পাই এক বন্দী রুশ বলিয়াছিল—বাড়িতে আমার প্রেমিক পত্নী আমার জন্য নিশ্চয়ই খুব ব্যাকুল হইয়া আছে। আমাদের নায়ক বলিতেন, জাপানী সেনা মাটির মূর্তির মত ভঙ্গুর ; কিন্তু দেখিতেছি ঠিক তার উল্টো, তারা অসুরের মত শক্তিমান। যুদ্ধে মারা যাওয়ার চেয়ে স্ত্রীর জন্য প্রাণটা রাখাই ভাল--আমি মারা পড়িলে শােকে সে পাগল হইয়া যাইবে। জাপানীকে আঁটিতে পারিব না। তাদের হাতে মৃত্যু নিশ্চিত জানিয়াও লড়িতে থাকা মুখতা নহে কি ? ; শত্রুর আঘাতের মুখে কুষান্ রক্ষা করা ও আয়ত্তে রাখা খুব কঠিন হইলেও আমরা তাই করিলাম, শেষ পর্যন্ত রুশেরা রণে ক্ষান্ত দিয় তাদের অধিকারভুক্ত স্থান দৃঢ়তর করার চেষ্টায় নিরত হইল, এবং বিভিন্ন কেল্লা থেকে বড় বড় কামান অবিরাম দাগিয়া আমাদের কাজে বাঃ দিতে লাগিল। তাকুষানের যে পাশ শত্রুর দিকে অবস্থিত সেই দিকটা ও পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা সুদৃঢ় করা ; অবরোধের মাল-মসলা সংগ্রহ, অতিকায় কামানের ভিত্তি রচনা, শত্রুর ‘মাইন’এর খবর লওয়া, তাদের কাটাতারের বেড়ার আমাদের ‘মার্চ' যে পথে হইবে তাহা কতটা শত্রুর তােপের অধীন তাহা নির্ণয় করার জন্য হুসিয়ার গুপ্তচর নিয়ােগ—এইরূপে আমরা ভাবী যুদ্ধের আয়ােজন করিতে লাগিলাম। সমস্ত ব্যবস্থা ও সন্ধান সম্পূর্ণ হইলে ১৯ আগষ্ট প্রথম আক্রমণের দিন ধার্য হইল। আমাদের দলের প্রধান লক্ষ্য পূৰ্ব্ব-চিকুয়ানা। ২১ পদোন্নতি ও বিদায় সম্রাটের ঘোড়ার সুরের তলায় ধূলায় পরিণত হইবার সঙ্কল্প করি আমরা জাপান ছাড়িয়াছিলাম সত্য; বলিয়াছিলাম-মরণের জন্য প্রস্তুত হইয়া এখানে দাড়াইলাম! হৃদয় অধীর, কিন্তু সুযােগ আসিতেছে মগতি ! যুদ্ধক্ষেত্রের উদ্দেশে যাত্রার শুরু থেকে শতাবধি দিন কাটিয়া গেল। তখন দেশের মাঠে ও পাহাড়ে কত ফুল মধুর গন্ধে আমাদের পােষাক সুরভিত করিয়াছিল, মলয় বাতাস সন্তর্পণে সূৰ্য্য-পতাকাকে চুমা দিয়া অজানা দূরদেশে আমাদিগকে ভাসাইয়া লইয়া গিয়াছিল। সময় কত শীঘ্র চলিয়া যায়—এখন আমরা সবুজ পাতার ছায়ে বসিয়া আছি। রাতে বাহুর উপর মাথা দিয়া যখন ঘুমাইয়াছি, দিনে গুলি- বৃষ্টির মাঝে যখন ঘুরিয়াছি, মরিয়া সম্রাটের দয়ার ঋণ শুধিবার ইচ্ছা কখনই মন হইতে সরিয়া যায় নাই। শেষ যুদ্ধ জয়ের আনন্দ উপভােগ না করিয়াই আমাদের হাজার হাজার সঙ্গী মারা পড়িল, তাদের অশান্ত 'পাের্ট-আপীরের ক্ষুধা অয়া এখনাে বিরান পাইল । তাদের মৃত্যুর প্রতিশোধ লইতে আমরা উৎসুক কিন্তু সুযোগ আসে কই ? আমরা যারা বাচিয়া আছি, আমরা গলিত মাংস ও মুণপর। অস্থির দুর্গন্ধের মাঝে বাস করিতেছি। অামাদের দেহের মাংসও শুকাইয়াছে, অস্থি শীর্ণ হইয়াছে। অামরা যেন একদল আত্মা, শীর্ণ ভঙ্গুর দেহে তীব্ৰ অধীর আকাঙ্ক। বহিয়া ফিরিতেছি, অথচ আমরা স্নামাতোর আসল চেরিগাছেরই শাখা প্রশাখা। কি করিয়া এখনো পঁচিয়া আছি, একটা দুটো নয়, চার চারটে যুদ্ধ লড়িয় ? কেন এখনে মনােরম চেরির পাপড়ির মত যুদ্ধক্ষেত্রে ঝরিয়া পড়িলাম ? তাকুমানের উপর মরিব বলিয়াসঙ্কল্প করিয়াছিলাম, আমার কত সঙ্গী অানাকে পিছনে ফেলিয়া চলিয়া গেল, কিন্তু আমার মরা হইল কই ? এবার নিশ্চয়ই জন্মভূমিকে আমার নগণ্য, দেহ নিবেদন করার সন্মান লাভ করিতে পারিব ! এই ধারণা, ইচ্ছা ও সঙ্কল্প লইয়া যুদ্ধে যাত্রা করিলাম। আগষ্ট মাসের প্রথমেই পদোন্নতি হয়, কিন্তু প্রথম-লেটেন্যান্ট হওয়ার খবরটা এখন আসিল। কর্নেল আওকি আমাকে ডাকিয়া খুব গম্ভীরভাবে বলিলেন—তােমার পদোন্নতিত্বে অভিনন্দন করি! গোড়া থেকেই তুমি পতাকা বহন করেছ, সে-কাজ থেকে এবার তােমার অব্যাহতি। অতঃপর আরও তৎপর হওয়া চাই—কাল সম্মিলিত আক্রমণের দিন। অনেক দিন, একত্রে আহার নিদ্রা সম্পন্ন হয়েছে, আজ বিদায় নিতে দুঃখ হচ্ছে, কিন্তু তবুও বলি, নমস্কার ! তােমার চেষ্টা সার্থক হােক ! তাই বটে। এদেশে আসার পর থেকেই নায়কের সঙ্গে খাইয়াছি শুইয়াছি, তার পাশে পাশে থাকিয়া লড়িয়াছি। বৃষ্টি ও হিম মাথায় * জাপানে।

১১১ পােট-আগারের ক্ষুধা করিয়। যুদ্ধের প্রতীক্ষায় থাকার সময় কর্নেল তার শয্যার ভাগ দিয়াছেন পাছে আমার সুনিদ্রার ব্যাঘাত ঘটে। আহাৰ্য পর্যাপ্ত নয়, তবুও তাহ। আমার সঙ্গে ভাগ করিয়া খাইয়াছেন—মুখে প্রসন্ন তৃপ্ত হাসি, যেন আপন গৃহে আত্মীয়-স্বজনের মাঝে আহার সমাপ হইতেছে। বাড়িতে পালঙ্কে দিব্য আরামে শোওয়ার যার অভ্যাস, খড়ের মাদুরে খড়ের বালিশ মাথায় দিয়া হয় অমুখে পড়িবেন বলিয়া ভয় হইত। তিন হাজার প্রাণ যার হাতে, তার জীবন মহামূল্য-তার স্বাস্থ্যের উপর সমস্ত রেজিমেন্টের উদ্যম ও উৎসাহ নির্ভর করে। সাধ্যমত তাহাকে সাহায্য করিয়াছি, যুদ্ধক্ষেত্রের নানা অসুবিধার মধ্যে তাহাকে যথাসম্ভব আরামে রাখার চেষ্টা করিয়াছি। কিছুকাল আগে চুংগ্নিাতুনে থাকার, সময় একটা জালায় জল গরম করিয়া তাকে স্নানের জন্য দিয়াছিলাম। তিনি ভারি খুশী হইয়াছিলেন-তখনকার তার সেই আনন্দিত মুখ কখনো ভুলিব না। এখন সেই কর্নেলকে ছাড়িয়া যাওয়ার সময় দুঃখের আর অবধি রহিল না। এখনাে অবশ্য তারই অধীনে অন্য এক দলে থাকিব, এখনাে আমি তারই তঁালেদার। এ প্রকৃত ছাড়াছাড়ি নয়, তবুও কিন্তু মনে হইল তার কাছ থেকে বহুদূরে চলিয়া যাইতেছি। তার বিদায়বাণী শুনিয়া কান্নায় আমার গলা ধরিয়া আসিল, কিছুক্ষণ মাপা তুলিতে পারিলাম না। সম্পদে-বিপদে এতকাল যে-পতাকার পরিচর্যা করিয়া আসিলাম, সেই পতাকা ত্যাগ করাও আমার পক্ষে কষ্টকর ছিন্নভিন্ন মলিন সেই পতাকা কর্নেলের বামে দুলিতেছে ; তার পানে চাহিয়া মনে হইল, ঐ পতাকা দর্শনে তিন হাজার লােকের প্রাণে উত্তেজনার সঞ্চার হয় বটে, তবুও তার মধ্যে কেবল আমারই মনে সবার বেশি ভাবের সঞ্চার হওয়ার যেন একটা বিশেষ দাবি আছে। মুহুৰ্তকাল নীরব থাকিয়া কহিলাম-কর্নেল, লড়াই করে আপনাকে হইল।

পােট-আর্থারের ক্ষুধা ১১২ দেখাববা...! আর কিছু বলিতে পারিলাম না, ধীরে ধীরে ফিরিয়া কয়েক পা গিয়া, ছুটিয়া আমার ভৃত্যের কাছে হাজির হইলাম । বলিলাম—হুকুম এসেছে, এবার এসেছে, এবার আমায় যেতে হবে। কাজেই তোমাকেও আমার কাজ ছাড়তে হবে, কিন্তু তােমার দয়া আমি ভুলবাে না। চিরদিন আমাকে বড় ভাই বলে মনে রেখে আর নির্ভয়ে যুদ্ধ কোরাে। শুনিয়া আমার সৈনিক ভৃত্য তাকায়াে কাদিয়া অস্থির। তাহাকে সানা দিয়া কহিলাম, তাকুষানের যুদ্ধের আগে দুজনে যে-কৌটাটি তৈরি করেছি, এবার নিশ্চয়ই সেটি কাজে লাগবে ! তাকায়া কাঁদিতে কাদিতে জিজ্ঞাসা করিল, সত্যই কি আপনি আমাকে ছােটভাইয়ের মত দেখেন? পাছে নিজেও কাদিয়া ফেলি সেই ভয়ে আর জবাব দিতে পারিলাম না। পতাকা ছাড়িয়া, কর্নেলকে ছাড়িয়া, অনুগত বিশ্বাসী ভৃত্যকে পিছনে ফেলিয়া নির্জনতার মাঝ দিয়া একলা চলিয়াছি। এইসব পাহাড় ও উপত্যকা এখন আমার স্নেহের সাথীদের সমাধিভূমি... আকাশে মেঘ আসাযাওয়া করিতেছে...ভাবিতে লাগিলাম, যা-কিছু পার্থিব তা কত নশ্বর! হঠাৎ মনে হইল আর একবার ডাক্তার মাসুইয়ের সঙ্গে দেখা করি, আমার গ্রামের উপরিতন কর্মচারী কাপ্তেন মাৎসুওকাকেও বিদায় নমস্কার করিয়া যাই। তখনি ফিরিলাম। তাকুনের উত্তর পাদমূলে এক গিরিসঙ্কটে গিয়া পৌছিলাম। কাপ্তেন একাকী তাঁর তাঁবুর মধ্যে বসিয়া ছিলেন। আমাকে দেখিয়া হইলেন। “কিছু কাল তােমায় দেখিনি। ভাল আছ বেশ ?”

১১৩ পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা “ভালই আছি। ধন্যবাদ! আমার পদোন্নতি হয়েছে—প্রথম লেটেন্যান্ট হয়েছি। আমার ওপর দয়া রাখবেন।” কাপ্তেন হঠাৎ বলিলেন, তাহলে এ জগতে এই 'আমাদের শেষ আমি বলিলাম, আমিও মরবে। বলে আশা করি। চিকুয়ামানের চূড়ায় একসঙ্গে মরতে পারলে বেশ হয় ! যাইবার জন্য দাড়াইয়া উঠিলে কাপ্তেন আমার কাধ থাবড়াইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, কোমরবন্ধে ওটা কি ? ঈষৎ হাসি বলিলাম, আমার কফি’! “বটে? তুমি তাহলে তৈরি হয়েই আছ!” তারপর প্রথম ব্যাটালিয়নের সদরে হাজির হইলাম—চুচিয়াতুনের কাছে, পাহাড়ের আড়ালে। ডাক্তার সুইয়ের সঙ্গে দেখা হইল। সেখানে পৌছানর অল্পক্ষণ পরেই তাবুর সামনে বিকট শব্দে কয়েকটি ক্রর গোলা আসিয়া পড়িল। এ সব এখন সহিয়া গেছে। আমরা ক্ষেপ করিলাম না। শুনিলাম, এই জায়গাটিকে লক্ষ্য করিয়া শত্রু প্রায়ই তােপ দাগিয়া থাকে। ডাক্তার অ্যাসুইকে পদোন্নতির খবর নিলে তিনি আমাকে এক পাশে লইয়া গেলেন। দেখিলাম বারুদের বাক্সগুলাে গাদা করা রহিয়াছে। তিনি বলিলেন, আমার দেখা পাইবার জন্য অধীর হইয়া ছিলেন। বলিলেন, এক জায়গায় থাকি তবু একটু নিরিবিলি গল্প করা ঘটিয়া ওঠে না। | প্রতিদিন তিনি আমার চিঠির অপেক্ষা করিয়াছেন। শুনিয়া মন গলিয়া গেল। বলিলাম, অাশ্চৰ্য্য যে আমরা দুজনে এখনাে বাচিয়া আছি! কিন্তু এবার আর গােল নাই, মরিতেই হইবে—এবার শেষ বিদায় লইবার জন্য ইচ্ছা করিয়াই আসিলাম। সেই হুয়াংনিচুয়ানের বাড়িতে দুজনে যে প্রতিজ্ঞা ৮ পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা ১১৭ পরে অতি করিয়াছিলাম, তাহা স্মরণ করাইয়া দিয়া বলিলান, দুজনে মরিলে কত নাই, কিন্তু যদি আমি আগে মরি, তবে সে অামার রক্তমাখা পোষাকে খানিকটা কাটিয়া লইয়া স্মৃতিচিহ্ন রাখিয়া দিবে। তারপর পরস্পটে হাত চাপিয়া ধরিয়া বলিলাম, এই শেষ ! পরস্পরের সাফল্য কামন করিয়া চোখের জল ফেলিয়। বিদায় লইলাম। অনিচ্ছায় পায়ে পায়ে তাবু থেকে বার হইয়া তাকু ননী প!. হইলাম। 'তারপর শত্রুর কেল্লার মুখােমুখি পাহাড়ের ঢালু বাহি: উঠিয়া ব্রিগেড়-সদরে ব্রিগেডিয়ার-জেনারেলকে সেলাম দিবার জন গেলাম। ঠিক সেই সময় এক কৰ্ম্মচারী পীড়িত হইয়। ছুটি লইয়া ছিলে আমাকে তাঁর জায়গায় এটিনি নিযুক্ত করা হইল। বারাে নম্বর কম্পানির নায়কের পদ পাই। আক্রমণের আগের রাতে পাচক দুখানা চিঠি আনিয়া দিল । জায়গায় এই অবস্থায় চিঠির আশা করা যায় না চিঠি দুখানা অনেক মুরিয়া আমার হাতে পৌছিয়ছে। দুই পত্ৰই দাদার লেখা—একখানা মধ্যে এক ফাউন্টে পেন, অন্যখানার মধ্যে তিন ও চার বৎসর বয়সে দুই ভাইঝির ছবি। কচি কচি মিষ্টি মুখ—ছবির মাঝ থেকে যেন ত? ‘কাকা’ বলিয়া ডাকিতেছে! ফটোর শিশুগুলি যদি দেখিতে পাই তবে দেখিত কাকার মুখ এমন শীর্ণ যে আর চেনা যায় না দেখি হয়ত কাঁদিয়া ফেলিত। দিনরাত কেবল অপরিচ্ছন্ন সৈনিক, ভাঙা হাড় আর ছিন্ন মাংস দেখিয়া আসিতেছি। তৃণভূমির উপর যে ফুলগুলি হাসিতে থাকিত তারাও এখন পায়ের চাপে সব মারা পড়িয়াছে। এমন নিষ্করুণ নীরস যুদ্ধক্ষেত্রে কঠিন যুদ্ধের আগের রাতে আমার মেহের দুই ভাইঝি আসিয়া আমাকে সম্মানিত করিল—আমার অধীর অন্তরে কোমল হাত বুলাইয়া দিল—এ কী আনন্দ! তাদের সুন্দর চোখেমুখে " ১১৫ পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা চুমা না দিয়া পারিলাম না। আপন মনে বলিতে লাগিলাম—তাদের সাহস ত কম নয় ! মায়ের আদরের কোল ছেড়ে বিরাট বিস্তীর্ণ সাগর আর বিশাল ঢেউ অতিক্রম করে আমাকে দেখতে এলি এই বারুদের মেঘ আর গোলাগুলির বৃষ্টির দেশে! তা বেশ করেছিস, কাকা কাল তােদের সঙ্গে করে নিয়ে দেখাবে কেমন করে জাপানের শত্রুকে শাস্তি দিতে হয়। অাজ রাতের মত শেয়ার মেণ কাটিয়া গেছে, আকাশে উজ্জ্বল তারাল হাসিতেছে। শিশু ‘ভাইঝি-দুটিকে পাশে নিম্ন তাবুতে ঘুমাইলাম। নেশনের শেস কপ। মনে পড়িতে লাগিল। জাপান ছাড়ার সময় যে শ্লোক লিখিয়া বাবাকে দিয়া আসিয়াছিলাম, সেটি বারবার আবৃত্তি করিতে লাগিলাম। তাহাতে লিখিয়াছিলাম- মৃত্যুর মহি...সাতজন্ম ব্যাপী রাজভক্তি! নির্জন প্রান্তরে মাথার , খুলি ফেলিয়া দেশভক্ত আত্মার সপ্ত জন্ম পরিগ্রহ কাল ঘটিবে, না তার পরদিন ? ঘ্যামামোতাে নামে এক ল্যান্স-কর্পোন্নাল ছিল। সে এই সময় মা ও ভাইয়ের কাছে নখ ও চুলের টুকর। পাঠায়, তার সঙ্গে ছিল বিদায়- লিপি ও একটি কবিতা। সেই চিঠিই তার শেষ চিঠি। তাহাতে লেখা ছিল— “ইতিমধ্যে দুই দুইবার দুঃসাহসী দলে যােগ দিলাম, তবুও মাথা এখনাে কাধের উপর আছে। মৃত সঙ্গীদের কথা ভাবিলে দুঃখে মন ভরিয়া ওঠে। আমাদের দলের প্রায় দু-শ’ ললাকের মধ্যে কেবল কুড়িজন অক্ষত-দেহ আছে। সৌভাণ্য বা দুর্ভাগ্য যাই হােক, এই অল্প- সংখ্যকের মধ্যে আমিও একজন। মানুষ বাঁচে আর কতদিন, জৈার বছর পঞ্চাশ—যথাসময়ে সেই জীবন দিতে না পারিলে এর পর হয়ত সুযােগ পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা ১১৬ মিলিবে না। দু-দিন আগে নয় পরে সকলের মত আমাকেও মরিতে হইবে, তাই ‘টালি হইয়া অস্ত থাকার চেয়ে মণি হইয়া গুড়া হওয়ার গোলাগুলি কিরিচ যাই আসুক না কেন, মরিব কেবল একবার ! ডানদিকে আমার সাথীর গায়ে গুলি বিধিল, বাঁদিকে আমার নায়কের উরু ও বাহু শূন্যে উড়িল, মধ্যে আমার গায়ে কিন্তু আঁচড়টি পর্যন্ত লাগিল না-স্বপ্ন কি না পরখ করার জন্য নিজের গায়ে চিমটি কাটিলাম। চিমটি লাগিল—তবে নিশ্চয়ই এখনো বাঁচিয়াই আছি। আমার মৃত্যুকাল এখনাে আসে নাই—সঙ্গীদের মৃত্যুর প্রতিশোধ লইবার জন্য তৎপর হওয়া চাই। আমি নিগুণ, কিন্তু হৃদয় আমার অধীর। কুঁড়েঘরে খড়ের চাটাইয়ের উপর স্বাভাবিক স,তুচ্ছ মৃত্যুর বদলে যদি নির্ভয়ে লড়িয়া রণক্ষেত্রে প্রাণ দিই, তবে চামার ছেলে হইলেও লোকে আমার সঙ্গে চেরিফুলের তুলনা করিয়া গান গাহিবে ! বাঙ্গাই, বাজাই, বাঙ্গাই!” २२ সমবেত আক্রমণের সুরু শোনা যায় রুশ খবরের কাগজ Novoye remya-র সংবাদদাতা পাের্ট আর্থার রক্ষার ব্যবস্থা দেখিয়া বলিয়াছিলেন—এ যেন ঈগলের বাসা—আকাশ-ছোয়া মইও তার কাছে পৌছিতে পারিবে না। তাই বটে। যতদূর চোখ যায়, ছােটবড় প্রত্যেক পাহাড়ে কেবল কেল্লা আর প্রাচীর (র্যাপার্ট ), স্থলের দিকটা সুকঠিন লৌহ-প্রাচীরবেষ্টিত। ক সৈন্যদলের বাছা বাছা সাহসী সৈনিক তার রক্ষক। সেই ‘দুর্ভেদ্য ১১৭ পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা দুর্গকে ‘ভেদ্য প্রমাণ করার জন্য আমরা এখন তার সম্মুখে আসিয়া হাজির হইয়াছি। তাকুষানের তলায় থাকার সময় আক্রমণের. নানা আয়োজন চলিতে লাগিল। কাটা-তারের বাবার উপর শত্রুর খুৰ আস্থা—তাহ। অতিক্রম করার উপায় আবিষ্কার করা দরকার। সেই বেড়ার তারে ও খুটিতে আগেকার যুদ্ধে আমাদের বহু সৈনিক মরা পড়িয়াছে। বড় ছােট উচু নীচু যত পাহাড় দেখিতেছি সর্বত্রই এই সব ভয়ানক পদার্থ দূর হইতে দেখিলে মনে হয় জমির উপর কালাে কালাে ফোটা ছিটানাে রহিয়াছে। এই-সব বাধা ভাঙিয়া মাড়াইয়া যাইতে হইবে। আসলে তার কাটার কাজ ইঞ্জিনিয়ারের, কিন্তু তাদের সংখ্যা পরিমিত, অথচ তারের বেড়ার শেষ নাই বলিলেও চলে, অগত্যা পদাতিক সৈন্যদল এইকাজ শিখিতে হইল। তাকু-নদীর তীরে এক নকল তারের বেড়া খাড়া করিয়া ঠিক সেটিকে কিরূপে ভাঙিয়া ফেলিতে হয়, ইঞ্জিনিগ্নারের কাছে শিখিতে লাগিলাম। প্রথমে একদল লােক বড় হাতলের কাচি হাতে অগ্রসর হইয়া লােহার তার কাটিয়া ফেলিবে, তারপর করাতধারীরা গিয়া খোঁটাগুলো ভূমিসাৎ করিবে অথবা করাত দিয়া চিরিয়া ফেলিবে, এইরূপে তারের বেড়ায় খানিকটা ফাক হইলেই তার মাঝ দিয়া একদল লােক ছুটিয়া ঢুকিয়া যাইবে। কাজটি বিশেষ জরুরী, তাই অধ্যবসায় ও উৎসাহের সঙ্গে অভ্যাস করিতে লাগিলাম। আসল লড়াইয়ে কিন্তু এত সহজে কাজ সম্পন্ন হয় না। তারের বাধা ধ্বংস করিতে যারা অগ্রসর হয়, তারা প্রায় সকলেই মারা পড়ে, কারণ ‘মেশিগানের মুখের কাছে দাঁড়াইয়া তাদের কাজ করিতে হয়। তার উপর দেখা গেল তারগুলােতে পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা ১৮ তড়িৎপ্রবাহ আছে। যদিও উক্ত তড়িৎ-প্রবাহ সম্বন্ধে দুইটা মত ছিল— কেহ বলিত, প্রবাহ এত প্রবল যে, তার ছুইলেই মৃত্যু হয় ; কেহ বলিত, প্রবাহ দুৰ্বল ; উহার উদ্দেশ্য, তার যারা ধ্বংস করিতে আসিবে তাদের আগমন শক্রর মিনারে জানাইয়া দেওয়া। সে যাই হােক, বিদ্যুৎ-প্রবাহ যতক্ষণ আছে ততক্ষণ সাধারণ কাচি দিয়া তার কাটার উপায় নাই, তাই আমরা কাচির হাতলে বাঁশের ছড়ি বাঁধিয়া বিদ্যুৎ-প্রবাহের শক্তিকে বাধা দিবার চেষ্টা করিলাম। এসব সাবধানতা সত্ত্বেও আসল লড়াইয়ের সময় দেখা গেল তারে প্রবল প্রবাহ বৰ্ত্তমান, তার ফলে আমাদের কতুক লােক নিমেষে মারা পড়িল, রিও কারও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বাখারির মত কাটিয়া চৌচির হইয়া গেল। মইয়ের সাহায্যে শত্রুর খাত পার হওয়ার অভ্যাসও চলিতে লাগিল, কিন্তু কাক্ষেত্রে দেখা গেল খাতগুলি এত চওড়া বা গভীর যে, মই গুলি বিশেষ কোনো কাজে লাগিল না। সৰ্ব্বত্র মাটিতে পোঁতা ‘মাই। ইঞ্জিনিয়ারেরা পলিতা কাটিয়া দিয়া সেগুলাে নষ্ট করিল। আক্রমণের দিন পর্যন্ত দূরবীন্ দিয়া দেখিতে লাগিলাম রুশেরা ইতস্তত এই সব বিস্ফোরক মাটিতে পুতিতেছে। আমাদের ম্যাপে সেই সব জায়গা চিহ্নিত করিলাম। সন্ধান লইয়া যতটা সম্ভব সমস্তই মনে করিয়া রাখিলাম। যেমন, তারের বেড়ার প্রত্যেক খুটি হাতুড়ির বারাে ঘায়ে বসানাে হইয়াছে। অমুক উপত্যকায় এতগুলি ‘মাইন’ পোঁতা হইয়াছে ! আমাদের সন্ধানী দল জানিতে পারিল যে, যে-সব গিরিসঙ্কট দিয়া আমাদের সেনাদলের উপরে ওঠার সম্ভাবনা, তার প্রত্যেকটির মধ্যে প্রচুর চতুরতার সহিত ‘মাই বসানাে হইয়াছে। যেমন ধরুন গিরিসঙ্কট যেখানে খুব সরু, সেখানে এমন একটি মাইন্ পোতা আছে যার উপর পা দিলেই মাটিয়া ১১৯ পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা যাইবে। প্রথম লোকটি মারা পড়িলে স্বভাবতই বাকি লোক গিরি- সঙ্কটের দুই পাশে সরিয়া দাড়াইবে, অমনি সেখানকার শ্রেণীবদ্ধ ‘মাই সমস্ত দলটাকেই শেষ করিয়া দিবে। এই সব জায়গা দিয়া নিরাপদে নওয়া ভারি শক্ত। তার উপর সমস্ত কেল্লা ও গুপ্ত খাতের (ট্রেঞ্চ) কামান ও বন্দুক এমন ভাবে স্থাপিত যে, প্রত্যেক গিরিসঙ্কট ও পাহাড়কে লক্ষ্য করিয়া গোলাগুলি দাগ চলে। তিন দিকের গোলাগুলি থেকে কার ও পরিত্রাণের উপায় নাই। শত্রুর আত্মরক্ষার ব্যবস্থায় এটি নাই বলিলেও হয়। ১৯এ আগষ্ট তারিখের প্রত্যুষে আমাদের সমস্ত গোলন্দাজেরা একযোগে গোলা দাগিতে সুরু করিল। পূৰ্ব্ব-চিকুয়ান্ যদিও প্রধান লক্ষ্যস্থল, তবুও অন্যান্য কেল্লা বাদ গেল না। অচিরে আক্রমণ- কারীরা তোপের আড়ালে শত্রুর দিকে শনৈঃ শনৈঃ অগ্রসর হতে লাগিল। রুশেদের উপর যেই তোপের ফল ফলিতে সুরু করিবে অমনি সকলে হুড়মুড় করিয়া গিয়া পড়িবে। তাই আমাদের গোল- নজেরা সমস্ত শক্তি দিয়া কেল্ল। ভাঙার, বোমা-নিবারক আড়াল চূর্ণ করার এবং গুপ্ত খাতের মাঝ দিয়া পপ করার চেষ্টা করিতে লাগিল। সই পথ দিয়া আমাদের দল প্রবেশ করিবে। আমাদের দিক থেকে গোল। চলা শুরু হইতে-না-হইতে শত্রুর সকল কামানের সারি জবাব দিতে লাগিল। উদ্দেশ্য, আমাদের কামানের মুখ বন্ধ করিয়া পদাতিক দলকে অগ্রসর হইতে না দেওয়া। দু-দিকের অতিকায় কামান থেকে যখন বড় বড় গোলার লেনদেন চলিতে লাগিল, তখন সে কী দৃশ্য ! পিপের মত বড় বড় বিস্ফোরক ‘শে আর গোলাকার ‘শে শূন্যে বিষম কাপনের সৃষ্টি করিল, তাদের গোঙানির ঘাত-প্রতিঘাত বাজের হুহুঙ্কারকে আমলেই আনিল না। শেল’ ফাটিয়া পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা ১২০ সর্বত্র তড়িৎ বৃষ্টি করিতে লাগিল, ধোয়া দিগ্বিদিক বাষ্পঘন মেঘে ঢাকিয় দিল, মনে হইল তার মধ্যে কোনো জীবেরই নিশ্বাস লওয়া অসম্ভব। শত্রুর ‘শে’-এর নাম দিয়াছিলাম ‘ট্রেশে, কারণ সেগুলাে গুগুম শব্দের সঙ্গে তীক্ষ্ণ চীৎকার করিতে করিতে আসিংহ—যেন তীব্ৰসুরে বাঁশি বাজাইয়া ট্রেন ষ্টেশন ছাড়িতেছে। আমাদের কাছে যখন এমনি শব্দ পাইতাম তখন সমস্ত পৃথিবী যেন কাপিতে থাকিত, আর সেই ভয়ঙ্কর গর্জনে মানুষ, ঘােড়, পাথর ও বালি একযােগে উপরপানে ছিটকাইয়া উঠিত। এই সমস্ত ট্রেনের সঙ্গে যার ধাক্কা লাগিত তাই চুর্ণবিচূর্ণ হইয়া যাইত ; সেই টুকরাগুলা মাটিতে পড়িয়া আবার লাফাইয়া উঠিত যেন তাদের ওড়ার ডানা আছে। শে’-এর টুকরায় একজন লেফটেন্যান্টের গলা ছি ডিয়া কেবল চামড়ায় মুণ্ডটা ঝুলিতে লাগিল ! এক সৈনিকের দু-দুটা হাত কাধ থেকে পরিষ্কার কাটি উড়িয়া গেল। গোেলা চালাইয়াই সে দিনটা শেষ হইল। প্রথমে দু-একদিন তােপ দাগিয়া পরে পদাতিকের আক্রমণ হইবে ইহাই স্থির ছিল। সেদিন সন্ধ্যায় কাৰ্য্যগতিকে আমাদের ডিভিসনের সদরে গেলাম- সেখানেই আমাদের গােলন্দাজেরা স্থাপিত হইয়াছিল। অন্ধকার রাত, আকাশের মাঝ দিয়া শ্বেতাভ নীল আগুনের দণ্ড যুদ্ধমান দুই দলের মাঝে ছুটাছুটি করিতেছে—মনে হইল সেটা যেন নরকে যাইবার প্রশস্ত পথ ! চিকুয়ান্যান ও পাইইন্যান্ থেকে রুশেদের সন্ধানী আলো আমাদের গােলন্দাজের আড়ার উপর পড়িতেছে। ভীতিপ্রদ সেই আলাে ঘনঘন আমাদের পায়ে পায়ে অগ্রগামী পদাতিকদলের দিকে ফিরিতেছে। শত্রুর যে-সব সন্ধানী আলাে কাড়িয়া লইয়াছিলাম তাহার দ্বারা কুশেদের আলােৰ শক্তি প্রতিহত করিবার চেষ্টা করিতে ১২১ পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা লাগিলাম, সেই আলােয় রুশেদের কামানগুলোও প্রকাশিত হইতে লাগিল। কিন্তু শত্রুর কাছে এখনো যেগুলাে আছে তার শক্তি আমাদের সন্ধানী আলাের চেয়ে ঢের বেশি। মাঝে মাঝে শত্রু তারা- ‘শে ছুড়িতেছে—মনে হইতেছে যেন শূন্যে বিজলী বাতি ঝুলিতেছে ; চারিদিকে যেন দিনের আলাে, তাহাতে একটি পিঁপড়ের চলাফেরাও দেখা যায়। সুতরাং আমাদের এতটুকু নড়াচড়াও শক্রর দৃষ্টি এড়ায় , অমনি আক্রমণেচ্ছু সেনাদলের উপর ‘মেশিগান্-এর মারাত্মক গুলিবৃষ্টি শুরু হইয়া যায়। তাই আকাশে তারা-বাজি ফাটিতে দেখিলেই পরস্পরকে সাবধান, করি—খবরদার! নােড়ােনা, নােড়ােনা ! ‘ডিভিসন্-নায়কের সদরে পৌছিয়া দেখি দলবল-সহ তিনি গােল দাজদের কাছে দাড়াইয়া তিমিরাবরণ-মুক্ত রাতের লড়াইয়ের দশ দেখিতেছেন। রুশ-কেল্লায় সন্ধানী আলো দেখা দিলেই “শা ওটাকে! দাও গুড়ো করে’! নিতান্ত তাচ্ছিল্যের ভাবে হাতদুটো মুড়িয়া বলিতে থাকেন—নতুন কনের মত আমার অবস্থা! এত আলাের মাঝে দাড়িয়ে লজ্জায় মারা যেতে বসেছি। সেই রাতে আমাদের দল ইয়াংচিয়া-কউ পৰ্য্যন্ত হাঁটিল। সেখানে পৌছিবার কিছু পরেই বিকট শব্দে এক ‘শে আসিয়া পড়িল। আমরা বলাবলি করিতে লাগিলাম—নিশ্চয়ই কেউ মরেছে! কে তারা? কে? ধোয়া সরিলে দেখিলাম জন চার পাঁচ হতাহত পড়িয়া আছে, তাদের মধ্যে দুজন নবাগত, মাত্র কয়েকদিন আগে দেশ হইতে আসিয়াছিল। দু-জনের ভয়াবহ মৃত্যু-কোমরের নীচে আধখানা দেহ উড়িয়া গেছে। অপরের দুই পা চুর্ণ হইয়াছে—হুহু করিয়া জলের মত রক্ত বার হইতেছে। যুদ্ধক্ষেত্রে একজনের গায়ে কেন গুলি লাগে অথচ অপর জনের গায়ে লাগে না—এ এক দুজ্ঞেয় রহস্য। এমন লােক আছে যে একটার লাগা পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা ১২২ পর একটা ভয়ানক যুদ্ধে লড়িতেছে, কিন্তু গায়ে তার একটি আঁচড়ও লাগিতেছে না ; অাবার এমন লোক আছে যে নিজের উপর গুলি যেন টানিয়া লইতেছে চুম্বকের মত—যেখানেই যাক, গুলি তার পিছু ধাওয়া করিবেই ! যুদ্ধক্ষেত্রে পা দিয়াই কেহ কেহ মারা পড়ে—গুলির আঘাত কেমন লাগে বােঝার আগেই। একবার যদি বন্দুকের লক্ষ্যস্থল হও তবে চল্লিশ পঞ্চাশটা গুলি তোমার গায়ে বিধিতে পারে। ইহাই কি অদৃষ্ট, না কেবল ঘটনাচক্র ? ১৯এ আগষ্ট তারিখে ডিভিসনের সদর তাকুমানের উত্তর ঢালুতে সরাইবার সময় ডিভিসন-নয়িক দুই ধারে দুই কর্মচারী লইয়া শত্রুকে পর্যবেক্ষণ করিতেছিলেন। এমন সময় একটা ল। আসিয়া-নিমেসে কর্মচারী দুজনের প্রাণ সংহার করিল, অথচ কি দুজনের মাঝে থাকিয়াও অক্ষতদেহ রহিলেন! কেল্লা আক্রমণের মিয় যারা সামনে থাকে তাদেরই আঘাত পাওয়ার খুব সম্ভাবনা, কিন্তু আসলে যারা পিছনে থাকে তাদেরই চোট লাগে বেশি। নেপোলিয়ন বলিতেন—“গুলি তোমাকে লক্ষ্য করিয়া ছােড়া হইতে পারে, কিন্তু সেটা তােমাকে তাড়া করিতে পারে না। যদি তা পারিত, তবে জগতের শেষ সীমায় পালাইয়া ও তােমার নিস্তৃর থাকিত না, তার কবলে তুমি পড়িতেই!” গুলিটা ভূতের মত এক বিকুটে ব্যাপার। কাহারও বলার শক্তি নাই সেটা লাগিবে না ফসকাইবে। উহা সম্পূর্ণ মানুষের বরাতের উপর নির্ভর করে। এই সূত্রে আর একটি ঘটনা মনে পড়িতেছে। তাইপােষনের যুদ্ধের পর দেখা গেল পলায়নপর রুশেদের মধ্যে জন পাঁচ ছয় লােক তাড়াহুড়া না করিয়া ধীরেসুস্থে বেপরােয়াভাবে হাত দুলাইতে দুলাইতে চলিয়া যাইতেছে। তাদের স্পর্ধা দেখিয়া আমরা প্রত্যেকে ড্রিলের মাঠে লক্ষ্যভেদ অভ্যাসের সময় যেমন করিতাম তেমনি সাবধানে অনড় জিনিষের উপর বন্দুক রাখিয়া টিপ, করিয়া পােট-আর্থারের ক্ষুধা গুলি ছাড়িতে লাগিলাম—কিন্তু একটি গুলিও তাদের গায়ে লাগিল না। শেষে একজন নায়ক বলিল, নিশ্চয়ই সে মারিবে, কিন্তু সেও পারিল না। রুশেরা ধীরে ধীরে হাটিতে হাঁটিতে শেসে অদৃশ্য হইয়া গেল। তারপর কতবার রুশের। কেল্লার উপর দাড়াইয়া রুমাল নাড়িয়া আমাদের ডাকিয়াছে, কখনো বা দেওয়ালের বাহিরে আসিয়া অপমান করিয়াছে--তাদের উপর লক্ষ্যভেদ শক্তির পরখ করিতে গিয়া আমাদের ক্রোধ, কৌতূহল ও দক্ষতা সত্ত্বেও বারে বারে নিস্ফল হইয়াছি। ইহাকেই বলে নিয়তির খেলা। এইজন্যই কয়েকটা লড়াই পার হইলেই লোকে নির্ভয় অসাবধানী হইয়া ওঠে। প্রথম প্রথম ছােট একটি ‘বুলেটের’ শব্দে মাথা অাপনি নামিয়া যায়, নায়ক ধমক দিয়া বলেন, শত্রুর গুলিকে সেলাম করে কে হে? কিন্তু তিনিও গোড়ায় শত্রুকে সেলাম না করিয়া পারেন নাই। অবশ্য, এটা মােটেই ভীরু-লক্ষণ নয়-এ একটা স্নায়বিক ব্যাপার। কিন্তু গুলি যখন বৃষ্টিধারার মত আসিতে থাকে তখন প্রত্যেক গুলিকে সেলাম করার অবসর কোথায় ? অগত্যা তপন নিমেষে সাহসী হইয়া উঠি। তখন বড় বড় গোলার গর্জনেও মনে ভাবান্তর হয় না। যখন বুঝি বিকট শব্দটা কানে পৌছানর অনেক আগেই গােলা আমাদের ছাড়াইয়া বহুদূর চলিয়া গেছে, তখন মনে সাহস আসে, তখন আর ফঁাকা আওয়াজের সামনে মাথা নীচু করি না। তখন দুর্গপ্রাচীরে দাড়াইয়া শত্রুকে কলা দেখাইয়া ভাতের নাড়, চিবাইতে থাকি! আর গুলিগোলাও তখন দুঃসাহসীর কাছে বসে না—পাশ কাটাইয়া গিয়া অন্যের গায়ে লাগে।

পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা ১২৪ মানুষ‘বুলেট’ বৃষ্টি সাহসীর মৃতদেহে পাহাড়ের উপর পাহাড় তৈরি হইয়া উঠিল, উপত্যকায় রক্তের স্রোত বহিতে লাগিল। যুদ্ধক্ষেত্র সমাধিভূমিতে এবং পাহাড় ও উপত্যকা পােড়া মাটিতে রূপান্তরিত হইল। প্রতি মিনিটে প্রতি সেকেণ্ডে জীবনের পর জীবন অনন্তের পথে প্রয়াণ করিতেছে। আক্রমণকারীর হাতে আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র ও গােলাগুলি থাকিলে শত্রুকে ভড়কান যায় বটে, কিন্তু লড়াই ফতে হয় কিরিচ আর রণহুঙ্কারে। শাণিত কিরিচ ও ভীষণ হুঙ্কারের জোরে শত্রু রণে ভঙ্গ দিল। “লণ্ডন ষ্ট্যাণ্ডার্ড”-এর জনৈক সংবাদদাতা যথার্থই লিখিয়াছিল—জাপানীদের রণইষ্টার শেদের হৃদয় বিদীর্ণ করিয়াছিল । সে যাই হােক সেই আক্রমণের কথা মনে পড়িলে চোখে জল আসে। প্রথম সমবেত আক্রমণের সময় কিরিচের ঝিলিক আর হুঙ্কারের ভীষণতা কিছুই টিকিল না, ক্রমেই সে সব ক্ষীণ হইতে ক্ষীণতর হইয়া উঠিল। অসংখ্য গােলা ছুটিল, অনেক মানুষ-‘বুলেট’ খরচ হইল, তবুও কেল্লা দখল হইল না। রুশেরা বলিত, সে সব কেল্লা অজেয়, সে-কথা অপ্রমাণ করা গেল না। পর পর আক্রমণে দেশভক্ত যােদ্ধাদের কেবল রক্তপাত হইল, অস্থি চুর্ণ হইল। কেল্লা যথাসম্ভব শীঘ্র দখল করিতে হইবে, তাই প্রচুর লােকা সত্বেও আক্রমণের পর আক্রমণ চলিতে লাগিল। সেই সব নিস্ফল আক্রমণ শেষ পর্যন্ত সার্থকতার পথেই আমাদিগকে লইয়া গেল। উনিশ তারিখ থেকে রুশ কেল্লার উপর—বিশেষ করিয়া আমাদের লক্ষ্য পূৰ্ব্ব-চিকুয়ানষান কেল্লাগুলির উপর অবিরাম গােলাবর্ষণের ফলে ১২৫ পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা । দেখা গেল শত্রুর বিশেষ ক্ষতি হইয়াছে। একুশ তারিখ রাত্রে যােশি- নাগা ব্যাট্যালিয়নকে মার্চ করিবার হুকুম দেওয়া হইল। আগে আগে চলিল একদল অহমসাহসিক ইঞ্জিনিয়ার তারের বেড়া ভাঙিবার জন্য। ভাগ্যক্রমে তাদের মরিয়া চেষ্টা সফল হইল—পদাতিক দলের জন্য একটু পথ পরিষ্কার হইল। তখন মেজর য়েশিনাগা তার দলবলকে আদেশ করিলেন, কেহ একটি গুলি ছুড়িবে না, ফিসফিস করিয়া কথা কহিবে , অন্ধকার রাতে গা ঢাকা দিয়া কেবল অগ্রসর হইবে। ফলে শত্রুর প্রাচীরের একেবারে গা ঘেঁসিয়া একদল ছায়ামূৰ্ত্তির আবির্ভাব। রুশেরা ভড়কাইয়া গিয়া যুদ্ধের চেষ্টামাত্র না করিয়া পালাইতে বাধ্য হইল। কিন্তু কিছুদূর পিছু হটার পরই মস্ত একদল নূতন সৈন্য দেখা দিল, তাদের পিছনে ‘মেশিগানের’ ভীষণ আওয়াজ। পলায়নপর রুশেদের আগুয়ান হইতে বাধ্য করিয়া একত্রে তারা পাল্টা আক্রমণ করিল তাদের ‘উলা’ গর্জনে আকাশ ও পৃথিবী কাপিতে লাগিল। মেজর হােশিনাগা হুকুম দিলেন তার সেনাদল এক পা-ও পিছু হটিতে পারিবে না। ভীষণ হাতাহাতি যুদ্ধ শুরু হইয়া গেল। উভয় দলই ঘুষি কিরিচ ও বন্দুকের সাহায্যে মরিয়া হইয়া লড়িতে লাগিল। মেজর মােশিনগা একটা ঢিপির উপর দাড়াইয়া সৈন্য চালনা করিতেছিলেন, বুকে গুলি লাগায় তিনি মারা পড়িলেন। কাপ্তেন ওকুবাে তার স্থান লইলেন, অচিরে তিনিও নিহত হইলেন। বদলীর পর বদলী মারা পড়িতে লাগিল, পরিশেষে কেবল নায়কেরা নয়, সৈনিকেরাও প্রায় সকলেই নিহত হইল। তাদের সাহায্যের জন্য কেহ আসিল না। শত্রুর গুলিবর্ষণের বহর ক্রমেই বাড়িয়া চলিল, অল্প কয়েকজন অবশিষ্ট সৈনিক তারের বেড়ার নীচে গিরিসঙ্কটের মধ্যে হটিয়া গিয়া ‘রিসার্ভ সৈন্তের আগমন- প্রতীক্ষা করিতে লাগিল, কিন্তু কেহই আসিল না। পরদিন সন্ধ্যা পর্যন্ত পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা ১২৬, সঙ্গীদের মৃতদেহের সামনে দাড়াইয়া পায় তারা অপেক্ষা করিতে লাগিল। শক্রর ঠিক নীচেই তারা ছিল—তাদের থেকে বারাে ফুট আন্দাজ তফাতে। সেইখানে রই শক্ত করিয়া ধরিয়া 'রুশেদের পানে চাহিয়া তোে ঘণ্টা সময় কাটাইয়া দিল, কিছুই করিতে পারিল না। বাইশ তারিখ রাতে তাকেতোমি ব্যাটালিয়ন ভাঙা তারের বেড়ার মাঝ দিয়া গিয়া ভীষণ আক্রমণে পূর্ব রাতের ব্যর্থতা শােধরাইবার চেষ্টা করিল। কাপ্তেন মাংসুক। প্রথমে আহত হইলেন, উরু কাটিয়া উড়িয়া যাওয়ায় তিনি আর দাড়াইতে পারিলেন না। গুলি লেফটেন্যান্ট নিয়াকের ফুসফুস ভেদ করিয়া গেল। ব্যাপার ক্রমেই গুরুতর হইয়া উঠিল, রুশেরা এমন ভাব দেখাইল যেন তারা আমাদের অপেক্ষাতেই ছিল,আগের রাতের সফলতার জন্য তাদের বেজায় গর্ব। তাদের সন্ধানী আলাে ঘন ঘন ঘুরিয়া আক্রমণকারীদের চোখে ধাধা লাগাইয়া দিল, আমাদের মাথার উপর তাদের তা-বাজি ফাটিতে লাগিল, তার ফলে আমাদের প্রতি গুলি চালানাে সহজ হইয়া গেল। ছুটে গিয়ে আক্রমণ করে। ! আগে চলো ! উ-ও-আ...বলিয়া চীৎকার করিয়া কাপ্তেন যানাগাওয়া নির্ভয়ে ছুটিয়া গেলেন, তারাবাজির আলােয় দেখা গেল তার মুখের অর্ধেকটা রক্তে লাল, ডান হাতে তিনি একখানা ঝকঝকে তলােয়ার আস্ফালন করিতেছেন। আবার তিনি হাকিলেন—ছুটে চলল! তার নির্ভীক কণ্ঠস্বর সেই শেষবার শােনা গেল। অন্ধকারে সাদা অসিলক ঝিলিক হানিতে লাগিল বাতাসে-দোলা নলখাগড়ার মত। কিন্তু সেই ঝিলিক দেখিতে দেখিতে থামিয়া গেল, ক্ষণেক পূৰ্বের উচ্চ চীৎকার আর শোনা গেল না—তার পরিবর্তে দেওয়ালের পিছনে শত্রুর উল্লাসধ্বনি উঠিল। ঢিপির উপর উঠিয়া তারা আনন্দে ১২৭ পাের্ট-আর্কারের ক্ষুধা নাচিতে লাগিল, আর আমাদের সৈনিকেরা মরিয়া কেবল মড়ার পাহাড় আর রক্তের নদীই সৃষ্টি করিল। কাপ্তেন মাৎসুওকা সাংঘাতিক আঘাত পাইয়াছিলেন, বলিয়াছি। আহত উরুদেশ থেকে অতিরিক্ত রক্তস্রাবের ফলে অচিরে তার শ্বাসপ্রশ্বাস ক্ষীণ হইয়া আসিল, তিনি বুঝিতে পারিলেন মৃত্যুর আর দেরি নাই, তখন পকেট থেকে গুপ্ত ম্যাপগুলি বাহির করিয়া নষ্ট করিয়া ফেলিলেন। শত্রুর কাঁটাতারের বেড়ায় জড়ানাে অবস্থায় তার মৃত্যু হইল। যারা তঁর দেহ আনিতে গেল তারাও সকলে মারা পড়িল, সাহসী কাপেনের পাশে তারাও চিরনিদ্রায় অভিভূত হইল। কাপ্তেন গ্ল্যানগাওয়া কয়েক স্থানে অাহত হওয়া সত্ত্বেও চীৎকার করিতে করিতে শত্রুর পানে ছুটিয়া গেলেন, রুশেদের গড়-ঘেরা মাটির ঢিপিতে। (rampart) লাফাইয়া উঠিতে যাইতেছেন এমন সময় গুলি আসিয়! গায়ে বিপিল, শান্তিতে মরিবার জন্য বামপাটের আলিসায় ঠেস দিয়া দাড়াইলেন, তা-ও শত্রুর সহ হইল না, তারা তাহাকে টুকরা টুা করিয়া কাটিয়া ফেলিল। শত্রুর দ্বারা বারবার বিতাড়িত বিপর্যস্ত হইয়াও আমরা পণ করিলাম শক্রর আঁতে ঘা দিবই। সেইজন্য ‘ব্রিগেড় কেন, একটা গােটা ‘ডিভিসন’ই ধ্বংস হইলেও ক্ষতি নাই। ২৪ তারিখ রাত তিনটায় আবার আক্রমণ করা স্থির হইল। কয়েক দিন ধরিয়া আমাদের দল য়্যাংচিয়াকু গিরিসঙ্কটে জড়ো হইয়াছিল, ২৩ তারিখ রাতে সে স্থান, ত্যাগ করিয়া উচিয়াফ্যাঙে মিলিত হওয়া প্রয়ােজন। তাই আমাদের কাপ্তেন তার লেফটেন্যান্টদের ডাকিয়া বলিলেন-নমস্কার, বিদায়। আর কিছু বলবার নেই, স্থির করেছি কালকের যুদ্ধক্ষেত্রে দেহ রক্ষা করবাে। দীর্ঘ বিদায়ের জলের পেয়ালা দয়া করে গ্রহণ করাে!

পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা ১২৮ কাপ্তেনের কথা শােনার আগেই আমরাও এবার মরিতে স্থিরসঙ্কল্প হইয়াছিলাম। জলের বোতল থেকে পেয়ালা লইয়া তাহাতে জল ভরিয়া পরস্পরে আদান প্রদান চলিল, বলিলাম—আজ সন্ধ্যায় আমাদের জলের স্বাদ অমৃতের মত! আমাদের দল নিঃশব্দে মিলন-স্থান ছাড়িয়া নদীতীরে অন্ধকার উইলাের তলে সারবন্দি দাড়াইল। একত্র বাসের এই শেষ বুঝিয়া কাহারও চোখের জল আর বাধা মানিল না। অচিরে ‘মার্চ' সুরু হইল, তরুবীপিকার মাঝ দিয়া চলার সময় চোখে পড়িল পর পর অসংখ্য ‘চোর’—গত কয়েকদিনের আহত সৈনিকেরা তার উপর বাহিত হইতেছে। চলিতে চলিতে একজনকে জিজ্ঞাসা করিলাম, কোথায় লেগেছে ? আহত লােকটি উত্তর দিল, পা দুটো ভেঙে গেছে । “সাবাস!” আমাদের দল, হাতীর পিঠের মত এক পাহাড়ের ওপারে নদীর ধারে গিয়া পৌছিল। নিবিড় অন্ধকার, চোখে কিছুই দেখা যায় না। উচিয়াফ্যাঙের দিকে হাতড়াইয়া পথ খুজিয়া চলিতে চলিতে এক জায়গায় মানুষের গলার আওয়াজ পাইলাম। চকিঙে মাটিতে শুইয়া পড়িয়া ঘাড় তুলিয়া অন্ধকারের মাঝ দিয়া দেখি নদীতীরে আমাদের আহতেরা অনেকদূর পর্যন্ত পরপর শােয়ানো রহিয়াছে। আহতের সংখ্যা দেখিয়া মন খারাপ হইয়া গেল, তাহাদের অতিক্রম করিতে বেশ কিছুক্ষণ সময় লাগিল। তাদের কাতরানি, হাঁপানি, বেদনা ও কষ্ট ; তার উপর এমনিভাবে রাতের হিমে অনাবৃত পড়িয়া থাকা—সব দেখিয়া শুনিয়া মন বিকল হইয়া গেল। এদিকে আমরা পথ হারাইয়া উচিয়াফ্যাং খুঁজিয়া পাইলাম না, ১২৯ পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা ঘুরিতে ঘুরিতে হঠাৎ নবম ‘ডিভিসনের’ সদরে আসিয়া পৌছিলাম। দেখি কি, নায়ক জেনারেল ওশিমার পরণে শীতের কালাে পােষক- যদিও সমস্লট। শীতকাল নয়। তার কোমরে রেশমী ক্রেপের ‘বি’ বা কোমরবন্ধ আঁটসাট করিয়া জড়ানো, তা থেকে এক লম্বা জাপানী তলোয়ার ঝুলিতেছে। দেখিয়া মনে হইল রোমান্সের রাজ্যে আসিয়া পৌছিলাম। যখন তার “ডিভিসন’ পালুংসান দখল করে, তখন শোনা যায়, জেনারেল এই কালো পোষাক পরিয়া সৈন্যদলের সম্মুখে নিজেকে শত্রুর বন্দুকের সুস্পষ্ট লক্ষ্যে পরিণত করিয়াছিলেন। বিপদকে এইরূপে তুচ্ছ করিয়া আপন সৈন্যদলে তিনি সাহস ও বিশ্বাসের সঞ্চার করিয়াছিলেন। একজন কর্মচারীর কাছে পথের নির্দেশ জানিয়া লইয়া অমর। ফিরিলাম, কিন্তু তবুও ঠিক জায়গাটি বাহির করিতে পারিলাম না। আবার জিজ্ঞাসা করায় ভাহিনে যাইতে হইবে শুনিলাম, ডাহিনে গিয়া শুনি যেখান থেকে যাত্রা করিয়াছি সেখানে ফিরিতে হইবে, কোনদিকে যে যাইব কিছুই বুঝিলাম না। একটার সময় নির্দিষ্ট স্থানে গিয়া জড়াে হইবার কথা, সে সময়ের অর বেশি দেরি নাই। যথাসময়ে পৌছিতে না পারিলে বিম লজ্জা-ব্যক্তিগত লজ্জার কথা ছাড়ি। দিলে ও অসিন্ন আক্রমণে সৈন্যসংখ্যা যত বেশি থাকে ততই সুবিধা। তা ছাড়া, আমাদের বিলম্বে পৌছানর ফলে পরাজয়ও ঘটিতে পারে । কাপ্তেন ও আমরা সকলেই অত্যন্ত অধীর ও উদ্বিগ্ন হইয়া উঠিলাম। ভাগ্যক্রমে সেই সময় ইঞ্জিনিয়ার দলের এক লােকের সঙ্গে দেখা, সে আমাদের বিশদভাবে বুঝাইয়া দিল কিরূপে উচিয়াফ্যাং পৌছিতে হইবে—একটু আগে একটা পথ আছে, সেখানে আমাদের ইঞ্জিনিয়ারের। ‘ট্রেঞ্চ’ খোড়ার কাজ করিতেছে, সেই পথ দিয়া যাইতে হইবে।

পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা নির্দেশমত চলিয়া অচিরে আমাদের অবরোধ-খাত দেখিতে পাইলাম, তার পাশে পাশে চলিয়া শেষে একটা ফাকের মুখে পৌছিলাম। সেটা পার হইয়া মাঠের মাঝ দিয়া শ র দৃষ্টির সম্মুখ দিয়া যাইতে হইল। ছুটিয়া চলিতেছি এমন সময় সন্ধানী আলাের ঝিলিক। হুকুম হইল— শুয়ে পড়াে! শুয়ে পড়াে ! নিশ্বাস রুধিয়া শুইয়া পড়িয়া সেই মারাত্মক আলাের বিদায়ের অপেক্ষা করিতে লাগিলাম। কিন্তু সার্চলাইট আর সরে না। ওদিকে পিছনের সঙ্গে যােগ ছিন্ন হইল। শেষ পর্যন্ত এক জায়গায় পৌছিলাম, অনুমান হইল, সেইখানেই সকলের জড়াে হইবার কথা। সেখানে আমাদের একজনও সৈনিক নাই, ইতস্তত ছড়ানাে মৃতদেহ কালাে দেখাইতেছে। সম্ভবত আমাদের সৈন্যদল ইতিমধ্যে পূর্ব পালুং-কেল্লার পাদমূলে জড়াে হইয়াছে, কে জানে হয়ত সেইটাই আমাদের আক্রমণের প্রধান লক্ষ্য। ঘড়িতে একটা বাজিয়া কয়েক মিনিট গত হইয়াছে। প্রধান দলকে খুজিয়া বার করিবার সকল চেষ্টা বৃথায় গেল । আমরাই কি দেরি করিয়া ফেলিলাম? কাপ্তেনের উদ্দেগের সীমা নাই—নৈরাশ্যের সে কী যন্ত্রণা! সমবেত আক্রমণে যােগ দিবার সুযােগ কি আমরা হারাইলাম ? কাপ্তেন বলিল, আত্মহত্যা করলেও আমার অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত হবে না। কেবল তার নয়, সকলেরই মনে হইতে লাগিল, এই যুদ্ধে যােগ দিতে না পারিলে চিরদিনের জন্য আমাদের দলের মুখে কালি পড়িবে সে লজ্জার তুলনায় আমাদের একত্রে আত্মহত্যাও অকিঞ্চিৎকর। চারিদিকে চর ছুটিল, কিন্তু কেহই কোনাে খবর আনিতে পারিল । আর সময় নাই, তাই স্থির হইল এখন পূর্ব পাঙের পুরানো কেল্লায় যাওয়াই কর্তব্য। তেমন তেমন হইলে নিজেরাই লড়িব। আর যদি প্রধান দল সে সময়ের মধ্যে যুদ্ধ শুরু করিয়াই থাকে, তবে ত ১৩১ পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা কথাই নাই, তাহাদের সঙ্গে যোগ দিলেই চলিবে। ঐ যে মাঝে মাঝে মেশিগানের শব্দ—নিশ্চয়ই পালুং থেকে আসিতেছে। এক গিরিসঙ্কটও আবিস্কার হইল, তার ভিতর দিয়া পাহাড়ে পৌছান যাইবে ভাবিয়া উচিয়াফ্যাং থেকে সেই গভীর সঙ্কীর্ণ পথ ধরিয়া আমরা যাত্রা করিলাম। প্রস্থে চার হাতেরও কম সেই গিরিসঙ্কট । পূব্বদিন সেখানে নবম ডিভিসন এবং দ্বিতীয় রিসার্ভ'-এর সপ্তম ও নবম দল দারুণ লড়িয়াছে। ভয়ঙ্কর ব্যাপার-‘চোর’ নাই, 'ওষুধ নাই, ইতস্তত কোণে ঘুজিতে হত ও আহত উপর উপর গাদা হইয়া পড়িয়া আছে, কেহ যন্ত্রণায় কাতরাইতেছে, কেহ সাহায্য প্রার্থনা করিতেছে, আর কেহ একেবারে স্থির নিস্পন্দ বিগতপ্রাণ। তাদের না মাড়াইয়া চলা দুষ্কর। মৃত ও প্রায়-মৃতে ভরা সে এক নরক! মৃত সঙ্গীকে মাড়াইবার ভয়ে ডাইনে চলিতে গিয়া বয়ে আহতকে পদাঘাত করিয়া ফেলি। মাটির উপর চলিতেছি ভাবিয়া পা বাড়াইয়া দেখি খাকী রঙের মৃতকে মাড়াইয়া যাইতেছি। মড়ার উপর পা দিয়ে না” বলিয়া অনুচরদিগকে সতর্ক করার মুহূর্তেই দেখি নিজে মড়ার বুকের উপর দাড়াইয়া আছি। তখন আর কি করি, অনুতপ্ত চিত্তে উদ্দেশে বলি—ক্ষমা করাে ভাই, ক্ষমা করাে ! দেখতে পাইনি—এ অপমান অনিচ্ছাকৃত। দীর্ঘ সৰু পথ মড়ায় ভরা-হতভাগা বাক্যহারা সঙ্গীদের ন| মাড়াইয়া চলি কিরূপে? গিরিসঙ্কটের প্রায় শেষে আসিয়া পড়িয়াছি, আর কয়েক পা অগ্রসর হইলেই কাঁটাতারের বেড়ার সামনে আসিয়া পড়িব, এমন সময় ক্ষণেকের জন্য থমকিয়া দাড়াইলাম। আমাদের বামে শত্রুর মেশিন- গান’ অন্ধকার ভেদ করিয়া অগ্নিশিখা নিক্ষেপ করিতে সুরু করিয়াছে।

পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা ১২ তখনি একটি গােলন্দাজ দলের শব্দ পাইলাম, আমাদের ছয়টি কামান সেই পথ দিয়াই পালুং উঠিবার চেষ্টা করিতেছে। সেই সঙ্কীর্ণ পথে পদাতিক ও গোলন্দাজ গাদাগাদি করিয়া রুশের ‘মেশিন গান এড়াইবার চেষ্টা করিতে লাগিল। যে পাহাড় আমাদের লক্ষ্য এখন তার তলায় আসিয়া পৌছিয়াছি, কিন্তু আমাদের প্রধান দলের চিহ্নমাত্র নাই। ব্যাপার কি, তারা গেল কোথায় ? আক্রমণ স্থগিত রহিল না কি ? অনেক চিন্তার পর কাপ্তেন স্থির করিলেন উচিয়াফ্যাঙে ফিরিয়া গিয়া নূতন আদেশের অপেক্ষা করিবেন। তাঁর স্থির সিদ্ধান্ত অবশ্য আমরা মানিতে বাধ্য যদিও খুব অনিচ্ছায়। আবার সেই গলি, আবার সেই নরক অতিক্রম। একবার ভায়েদের মৃতদেহ মাড়াইয়া ক্ষমা চাহিয়াছি, আবার সেই বীভৎস কাজ করিতে হইবে। অন্ধকারে আবার হতাহতকে হাতড়াইয়া চলিতে লাগিলাম। তাদের অবস্থা আরও শােচনীয়, কারণ আমাদের পরে সেই পথ দিয়াই গােলন্দাজেরা গিয়াছে, কামানের গাড়ির চাকা অনেক হতাহতকে পিষিয়া দিয়াছে। যে-প্রাণ ধুকধুক করিতেছিল, লােহার চাকরি তলে পড়িয়া তা থামিয়া গেছে ; যে-দেহে প্রাণ ছিল না তা খণ্ডবিখণ্ড শতছিন্ন। চুর্ণ অস্থি, ছিন্ন মাংস এবং রক্তধারা ভাঙা তলােয়ার ও চৌচির বন্দুকের সঙ্গে একাকার হইয়া আছে। আবার গিরিসঙ্কটের মুখে ফিরিলাম। সেখানে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর দেখিলাম অন্ধকারের মাঝ দিয়া দলের পর দল ছায়ার মত কাহারা আসিতেছে—এই আমাদের প্রধান দল—ইহাদের অপেক্ষাতেই এতক্ষণ কী উৎকণ্ঠায় কাটিয়াছে। আমাদের আনন্দের আর সীমা রহিল না। শুনিলাম, তারা যথাসময়ে নির্দিষ্ট স্থানে পৌছিতে পারে নাই . পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা শত্রুর সন্ধানী আলাের উৎপাতে। সে যাই হােক, শেষ পর্যন্ত প্রধান দলের নাগাল পাইয়া অামরা স্বস্তির নিশ্বাস ছাড়িলাম। আমরাই আক্রমণের সূত্রপাত করিব ভাবিয়া খুব আনন্দ হইল। এই জায়গাটা শত্রুর গােলাগুলি থেকে আমাদের আড়াল করে না, এমন প্রশস্তও নয় যে অনেক লােক ধরিতে পারে ; কেবল একটা খাড়া পাহাড় ইহাকে আগলাইয়া আছে—সেটা থাকায় শত্রু আমাদের পানে নীচু হইয়া চাহিতে পারে না। এখানে নায়কেরা যারা আছেন তাদের মধ্যে মেজর মাৎসুমুর একজন। তাকুষান্ আমাদের দখলে আসার পর শত্রুর পালটা আক্রমণ প্রতিরােধ করিয়া ইনি খ্যাতি লাভ করেন। সে-সময়ে তার ডান পা মচকাইয়া যায়, সেই আঘাতের জন্য তিনি ডাক্তারের সাহায্য লইতে রাজী হন নাই—তাঁর মতে সে-আঘাত অতি তুচ্ছ। তিনি এখনাে বেতের লাঠির উপর ভর দিয়া ব্যাটালিয়ন চালনা করিয়া থাকেন। আজও তার পায়ে যন্ত্রণা আছে, তবু নিজের দলের আগে আগে লাঠিতে ভর দিয়া আসিলেন। আমার পাশে বসিয়া বলিলেন, এতদিনে সময় এসেছে। কাপ্তেন সেগাওয়া, ফিন তাকুষানে ছােট ভাইয়ের কাছে শেষ বিদায় লইয়াছিলেন, তিনিও উপস্থিত। লেফটেন্যান্ট সােনে আসিল হাতে বন্দুক এবং কোমরে কার্তুজের বেন্ট। জিজ্ঞাসা করিলাম, এ অপূৰ্ব সাজ কেন? সে বলিল, কাল রাতে চরের কাজ করিতে গিয়া তলােয়ারখানি হারাইয়াছে, তাই সাধারণ সৈনিকের অস্ত্রই লইতে হইল! নায়কেরা সকলে একত্র হইয়া পরস্পরের সাফল্য কামনা করিয়া কিছুক্ষণ গল্পসল্প করিতে লাগিল। কয়েক ঘণ্টা পরে তাদের মধ্যে কয়জন ইলাকে থাকিবে কে বলিতে পারে !

পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা ১৩৪ २४ .' নিশ্চিমৃত্যু’ দল খাড়া পাহাড়টার তলায় সকলে জড়ো হইয়া চলার অদেশের অপেক্ষায় আছি, এমন সময় এক টুকরা কাগজ হাতে হাতে আমার কাছে আসিয়া পৌছিল। খুলিয়া পড়িলাম—“য়াসুকিচি হল। মাসের উনিশ তারিখে গুলির ঘায়ে মারা পড়েছে। আহত অবস্থায় তাকে যখন জল পান করতে দিলুম, তখন সে কাঁদতে লাগলো, আর লেফটেন্যান্ট সাকুরাইকে বিদায়-নমস্কার দিতে বল্লে। ইতি বুকিচি তাকাও।” বছরখানেক আগে এই হল আমার ভৃত্যের কাজ করিত। লােকটি বিশ্বাসী, তার জন্য বিশেষ কিছুই করিতে পারি নাই, অথচ অন্তিমকালে সে আমাকেই নমস্কার জানাইয়াছে ! ভাবিলে দুঃখ হয়, তার জীবদ্দশায় একটু বিদায়-সম্ভাষণও করিতে পারিলাম না । আমার দলবলকে কাছে ডাকিয়া বলিলাম-এবার তােমাদের সকলের কাছে বিদায় নেব। প্রাণপণ শক্তিতে লড়বে। পােট- আর্থার দখল হবে কি-না তা এ যুদ্ধে বােঝা যাবে। এই নাও জল, ভাবাে এটা মৃত্যুক্ষণে পান করছে। একটি পাত্র জলে ভরিলাম। সে-জল দুই একজন সৈনিক জীবন সঙ্কট করিয়া লইয়া আসিল। সেই একই পাত্র থেকে আমরা বিদায়- পান করিলাম। পাঙের ধার দিয়া আধাপথ বরাবর একটা জায়গায় উঠিবার আদেশ আসিল। নিঃশব্দে চলিতে শুরু করিলাম—আমরা যারা একত্রে ক্ষণকাল পূৰ্বে চিরবিদায়-পেয়ালা থেকে পান করিয়াছি, আমরা আবার সেই সাথীদের মন্তদেহে-ভরা ভয়ানক গিরিসঙ্কটের ভিতর ১৩৫ পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা দিয়া চলিলাম। এই তৃতীয়বার এই পথ অতিক্রম করিতেছি, চতুর্থবার জীবিত অবস্থায় কেহই এ পথ অতিক্রম করার আশা রাখে না। সকলেরই ইচ্ছা ও সঙ্কল্প উদীয়মান-সূৰ্য্য-পতাকার তলে স্বদেশের প্রতি মহান্ কর্তব্য সাধনকালে মৃত্যুলাভ। এই শেষ যুদ্ধ যাত্রার আগে আমরা সকলেই যথাসম্ভব হাল্কা হইলাম—দিন দুই তিন চলার মত শক্ত বিস্কুট সঙ্গে রহিল, বাদবাকি জিনিস ফেলিয়া আসিলাম। কোমরবন্ধ থেকে ঝুলানাে একখণ্ড জাতীয় পতাক। আমার খাকী পোষাকের শােভা বাড়াইল, গলায় একখানা জাপানী তোয়ালে বাঁধিলাম। পায়ে জুত। নাই—কেবল নেকড়ার ‘তাবি’•* অদ্ভুত সাজে আমার মূৰ্ত্তি হইল গ্রীষ্মের পল্লী-উৎসবের নৰ্ত্তকের মত। এই বেশে তলোয়ার, জলের বােতল ও তিনখানা শক্ত বিস্কুট লইয়া মহান্ মৃত্যুর রঙ্গমঞ্চে আবির্ভূত হইতে চলিয়াছি। সেই গিরিসঙ্কটের কথা মনে পড়িলে এখনাে গায়ে কাঁটা দেয়। মড়ার গাদ। মাড়াইয়া ডিঙাইয়। নাক চাপিয়া চলিতে লাগিলাম। চলিতে চলিতে একটা ঘুজির মধ্যে দেখি এক আহত সৈনিক বসিয়া বসিয়া যন্ত্রণায় কাতরাইঙ্গেছে। কোথায় চোট লাগিয়াছে জিজ্ঞাসা করায় সে বলিল, তার দুই পা ভাঙিয়াছে, গত তিন দিনে কণামাত্র খাদ্য বা পানীয় জোটে নাই, তাহাকে লইবার জন্য কোনাে ‘চোর’ আসে নাই—যুদ্ধে আহত হইবার পর থেকে সে মৃত্যুর প্রতীক্ষা করিতেছে, কিন্তু এমনি কপাল যে মরণও তাহাকে ভুলিয়াছে ! আমার তিনখানা বিস্কুট তাহাকে দিলাম। বলিলাম, আপাতত এই খেয়ে ধৈৰ্য্য ধরে’ বাহকের জন্যে অপেক্ষা করাে। কৃতজ্ঞতায় আনন্দে পায়ের গাঁট পৰ্যন্ত বিস্তৃত জাপানী মাজ।

পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা সে হাত জোড় করিয়া কাঁদিতে লাগিল, বারবার আমার নাম জানিতে চাহিল। মনটা কেমন হইয়া গেল, আগু বাড়িয়া চলিলাম, “বিদায় বলা ছাড়া আর কিছু তাহাকে বলা হইল না। এইবার আমরা পালুং- যানের কাঁটাতারের বেড়ার কাছে আসিয়া হাজির হইলাম। পালুঙের এই কেল্লা নবম ডিভিসন’ এবং দ্বিতীয় “রিসার্ভ’-এর সপ্তম ও অষ্টম রেজিমেন্টের রক্তমাংসের দ্বারা দখল হইয়াছে। এখন এ জায়গার খুব কদর, এখান থেকেই পূৰ্ব্ব চিকুয়া ও ওয়াইয়ের উত্তরের কেল্লাগুলাের উপর হানা দেওয়া হইবে। জেনারেল ওশিমার সৈনিকদের সাহস ও মারাত্মক যুদ্ধের ফলে এ জায়গা দখলে আসিয়াছে। গিরিসঙ্কটের ভীষণ দৃশ্যে সেই বিষাদময় কাহিনী প্রকাশিত। তারের বেড়ার ফাক দিয়া ছুটিয়া যাইতে যাইতে দেখিলাম অনেক ইঞ্জিনিয়ার ও সৈনিক মরিয়া গাদা হইয়া পড়িয়া আছে—কেহ তারের বেড়ায় জড়াইয়া গেছে, কেহ বা দুই হাতে একটা খোটা বা বড় লােহার কাচি চাপিয়া আছে। পাঙের পার্শ্বদেশের মাঝামাঝি পৌছিয়া দেখি মাথার উপরে অন্ধকারে আমার বাহিত সেই পুরানাে পতাকা উড়িতেছে। দেখিয়া হৃদয় নাচিয়া উঠিল। হাতে পায়ে হামা দিয়া নিশানের কাছে উঠিয়া কর্নেল আওকির সামনে গিয়া পড়িলাম। দিনকয় আগে তাকুষানের তলায় তার কাছে বিদায় লইয়া আসিয়াছি। “কর্নেল । আমি লেফটেন্যান্ট সাকুরাই।” তিনি আমার পানে চাহিয়া যেন অতীত দিনের কথা ভাবিতে লাগিলেন। মুখে বলিলেন—ও, সাকুরাই! বেশ বেশ! তােমার সাফল্য কামনা করি এমন সময়ে শুনিলাম পাহাড়ের মাথা থেকে আমার নাম ধরিয়া !

১৩৭ পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা কে যেন ডাকিতেছে। সেখানে গিয়া দেখি লেফটেন্যান্ট স্নােশিদা একলা বসিয়া আছে। সে আমার বন্ধু, আমরা একই জেলার লােক। শুনিয়াছিলাম সে নবম ডিভিসনে আছে এবং পাের্ট-আর্থারের সামনে লড়িতেছে। তার সঙ্গে দেখা হইবে অাশা ছিল না। ভীষণ যুদ্ধে ব্যাপৃত হওয়ার আগে পুরানো বন্ধুর সাক্ষাৎ লাভ বড়ই করুণ। বিষন্নভাবে সে বলিল, সাকুরাই। গত দিনদুই তিন বড় ভয়ানক লড়াই গেছে, কি বলে? তার সেখানে থাকার হেতু বুঝিতে না পারিয়া জিজ্ঞাসা করিলাম, এখানে একলা বসে করছে। কি ? “মড়াগুলোর পানে একবার চাও!” তার অশপাশে কালাে কালাে ছায়াভাবিয়াছিলাম সেসব অামাদের রেজিমেন্টের লোক। যখন দেখিলাম সেই খাকীপরা লােকের গাদা চােশিদার দলের হত ও আহত সৈনিক, তখন অবাক হইয়া গেলাম। দুই তিন কোথাও বা চারিটি করিয়া দেহ উপরে উপরে গাদা করা। শত্রুর কামানের উপর হাত রাখিয়া কেহ মরিয়া আছে, কেহ ‘ব্যাটারি’ অতিক্রম করিয়া গিয়া কামানের গাড়ি আঁকড়াইয়া মরিয়া আছে। মড়ার তলায় আহতের। চাপা পড়িয়া গোঙাইতেছে। এই দুঃসাহসীর দল যখন সঙ্গীদের দেহ মাড়াইয়া শত্রুর কেল্লার পানে ছুটিয়া গিয়াছিল তখন মেশিন-গান”এর গুলি কেল্লার সন্নিকটে তাহা- দিগকে নিঃশেষে সংহার করিয়াছে—আহতদের উপর মড়ার স্তুপ রচিত হইয়াছে। পিছনে যারা ছিল তারা রাগের মাথায় সঙ্গীদের মৃত্যুর প্রতিশােধ লইবার জন্য শত্রুর পানে ছুটিয়া গিয়া মৃতের সংখ্যা বৃদ্ধি করিয়াছে। লেফটেন্যান্ট মােশিদা হতভাগ্য অনুচরদের ছাড়িয়া যাইতে পারে নাই—তাহাদেরই দেহাবশেষের পানে চাহিয়া বসিয়া, পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা ১৩৮, আছে! পরে ২৭ অক্টোবর তারিখে এলুযানের ভীষণ যুদ্ধে সে মারা পড়ে। পালুঙের মাথায় এই দেখ আমাদের শেষ দেখা। সকলে একত্র হইবার পর কর্নেল উঠিয়া শেষ উৎসাহ দিলেন। বলিলেন, এই যুদ্ধ আমাদের পক্ষে দেশসেবার শ্রেষ্ঠ সুযােগ ! আজ রাতে পেট-আর্থারের আঁতে ঘা দিতে হবে । আমাদের কেবল মরতে কৃতসঙ্কল্প হলেই চলবে না ; আমাদের মরাই চাই! আমি তােমাদের পিতৃস্থানীয়, বরাবর তােমরা নির্ভয়ে যুদ্ধ করেছ, সেজন্য আমি যে কত কৃতজ্ঞ, বলে বোঝাতে পারি না! সকলকেই বলি, যথাসাধ্য করো! ঠিক, জাপান ছাড়ার সময়ই আমরা মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হইয়াছি। অবশ্য, যারা যুদ্ধে যায় তারা প্রাণ লইয়া ফেরার আশা রাখে না। কিন্তু এই বিশেষ যুদ্ধে কেবল মরিতে প্রস্তুত থাকিলেই চলিবে না—‘মরিবই’ এই সঙ্কল্প চাই। এবার এই আক্রমণের মহিমা ও ভীষণতা বিবৃত করি। আমি সামান্য লেফটেন্যান্ট মাত্র, আমার মনের মাঝে সমস্ত ব্যাপারটা স্বপ্নের মত হইয়া আছে—আমার কাহিনী অন্ধকার থেকে জিনিষ খুটিয়া খুটিয়া তােলার মত হইবে। ধারাবাহিক বিবরণ দেওয়া সম্ভব নয়, কেবল টুরা-টুকরা স্মৃতিই দিতে পারিব। এই কাহিনী যদি আমার আপন কীৰ্ত্তির বড়াইয়ের মত শােনায়, তার কারণ ইহা নয় যে আমি নিজের গুণে আত্মহারা, তার কারণ এই যে, যে-সব ব্যাপার ব্যক্তিগত এবং আমার আশপাশে ঘটিয়াছে, আমি কেবল তাহাই নিঃসংশয়ে বলিতে পারি। • এই খণ্ডিত বিবরণ যদি এই ভীষণ লড়াইয়ের গােটা গল্পটা অনুমানে সহায়তা করে, তবে আমার চেষ্টা সফল জ্ঞান করিব।

১৩৯ পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা ‘নিশ্চিত-মৃত্যু’ দলের লোকেরা কর্তব্য সম্পাদনে ত্রুটি করে নাই, নির্ভয়ে তার। মৃত্যুমঞ্চে আরোহণ করিল। পালুংসা উত্তীর্ণ হইয়া গাদা-করা মড়ার মাঝ দিয়া তাহারা পথ করিয়া চলিল। এক এক দলে পাচ ছয় জন করি। সৈনিক পরে পরে বেড়া-দেওয়া ঢালুতে গিয়া পেীছিল । কর্নেলকে বলিলাম, আসি তবে কর্নেল ! বিদায় লইয়া চলিতে সুরু করিলাম। আমার প্রথম পদক্ষেপ এক মড়ার মাথার উপর। পূৰ্ব্ব-চিকুয়ানের উত্তরের কেল্লা ও ওয়াংতাই পাহাড় আমাদের লক্ষ্য। শত্রুর skirmish খাতে বােমা লইয়া লড়াই শুরু হইল। আমাদের বোমাগুলো খাসা ফাটিতেছে—জায়গাটায় দেখিতে দেখিতে অগ্নিকাণ্ড ঘটিয়া গেল। তক্তাগুলো ছিটকাইয়া পড়িতেছে, বালিভরা বোরা গুলো কাটিতেছে, নরমুণ্ড শূন্যে উড়িতেছে, ধড় থেকে পা ছিড়িয়া আলাদা হইতেছে। ধোয়ার সঙ্গে আগুনের শিখা মিলিয়া একটা অদ্ভুত লাল আভায় আমাদের মুখ উদ্ভাসিত হইল, মুহুর্তে সৈন্তশ্রেণী ভ্যাবাচ্যাকা খাইয়া গেল। আর আশা নাই ভাবিয়া শত্রু সেস্থান ছাড়িয়া পালাইতে সুরু করিল। “চলো, চলল, অগে চলো, এই অগ্রসর হওয়ার সুযোগ ! ওদের তাড়া করাে, এক লাফে জায়গা দখল করাে!” বিজয়গর্বে আমরা নির্ভয়ে অগ্রসর হইলাম। কাপ্তেন কাওয়াকামি তলােয়ার উঠাইয়া বলিলেন, অগ্রসর হও ! তখন আমি তার পাশে দাঁড়াইয়া হাকিলাম, সাকুরাইয়ের দল অগ্রসর হও! এমনিভাবে চেঁচাইতে চেঁচাইতে অমি কাপ্তেনের বাঁ দিক ছাড়িয়া পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা ১৪ চলার পথের সন্ধানে গড়-ঘেরা, ঢিপির ( rampart) উপরের পথে চলিলাম। আমাদের চোখের সামনে ওই কালাে পদার্থটা কি? উত্তর কেল্লার ব্যাপার্ট'। পিছু ফিরিয়া দেখি একটি সৈনিকও নাই। তাই ত, দলছাড়া হইয়া পড়িলাম না কি ?' ভয়ে ভয়ে সাবধানে দেহটা বায়ে হেলাইয়া বারাে নম্বর কম্পানিকে ডাকিতে লাগিলাম । যতবার ডাকি উত্তর আসে-লেফটেন্যান্ট সাকুরাই! শব্দ লক্ষ্য করিয়া ফিরিয়া গিয়া দেখি কর্পোরাল ইতে। সশব্দে কাদিতেছে । “ব্যাপার কি? কাদছো কেন?” কান্না থামিল না। কর্পোরাল আমার হাতখানা চাপিয়া ধরিয়া বলিল, লেফটেন্যান্ট সাকুরাই, আপনি ত এবার মাতব্বর হলেন। “কান্নার কি কারণ? খুলেই বল না?” সে আমার কানে কানে বলিল, আমাদের কাপ্তেন মারা পড়েছেন ! শুনিয়া আমিও কাঁদিয়া ফেলিলাম। এই ত এক মুহূর্ত আগে তিনি হুকুম করিলেন, আগে চলাে এইমাত্র যার সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হইল সেই কাপ্তেন আর ইহলােকে নাই? এক মুহূর্তে আমাদের কোমলপ্রাণ স্নেহময় কাপ্তেন কাওয়াকামি ও আমি দুই ভিন্ন জগতের জীবে পরিণত হইলাম। এ কি সত্য, না স্বপ্ন ? কর্পোরাল ইতত কাপ্তেনের দেহ দেখাইয়া দিল, নিকটেই রামপার্টে যাওয়ার পথের উপর পড়িয়া আছে। ছুটিয়া গিয়া দুই হাতে সেই দেহ তুলিয়া লইলাম । “কাপ্তেন !••• আর একটি কথাও মুখে সরিল না। কিন্তু নিশ্চেষ্ট হইয়া থাকিলেও চলিবে না, কাপ্তেনের কাছে যে গুপ্ত ম্যাপ ছিল তাহা লইয়া নির্ভয়ে ১৪১ পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা ঈড়াইয়া উঠিয়া হাকিয়া বলিলাম-এখন থেকে আমিই বারাে নম্বর কম্পানির নায়ক। হুকুম দিলাম, আহতদের মধ্যে কেহ কাপ্তেনের দেহ লইয়া যাক। একজন আহত সৈনিক দেহটি তুলিতে উদ্যত হইয়াছে এমন সময় মোক্ষম স্থানে আঘাত পাইয়া কাপ্তেনের গায়ে ঢলিয়া সে মারা গেল। তার স্থান লইতে গিয়া সৈনিকের পর সৈনিক মারা পড়িতে লাগিল। লেফটেন্যান্ট নিয়ােমিয়াকে ডাকিয়া জিজ্ঞাসা করিলাম, ‘সেকস- গুলাে একত্র আছে ত? সে বলিল, হা। কর্পোরাল ইতােকে আদেশ দিলাম, সৈন্যশ্রেণী যেন ঠিক থাকে, যেন জোড়ভঙ্গ হইয়া না যায় ! বলিলাম, দলের মাঝখানে থাকিব আমি। অন্ধকারে জায়গাটার চেহারা দেখা যায় না, কোনদিকে চলিতে হইবে তারও ঠিকানা নাই। অন্ধকার আকাশের গায়ে উত্তরের কেল্লা ও ওয়াংতাই পাহাড় খাড়া উঠিয়াছে। সামনে এক প্রাকৃতিক দুর্গ, আমরা আছি কটাহের মত নাবাল জমির মধ্যে, তবুও আমরা পাশা- পাশি ‘মার্চ করিয়া চলিলাম। “বারাে-নম্বর দল, আগে চলো!” ডানদিকে ফিরিয়া স্বপ্নের ঘোরে যেন আগাইয়া চলিয়াছি। সে সময়ের কিছুই স্পষ্ট মনে পড়ে না। “লাইন যেন না ভাঙে।” এই আমার একমাত্র আদেশ। কর্পোরাল ইয়াের গলা আর শুনিতে পাই না—সে আমার ডাইনে ছিল। অন্ধকারে কিরিচগুলাে ঝিকমিক করিতেছিল, সেগুলাে আর তেমন পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা ১৪২ দেখিতে পাইতেছি না। অগ্রবর্ত্তী সৈন্যদল এখন মাত্র কয়েকজনে আসিয়া ঠেকিল। সহসা মাটির উপর তালগােল পাকাইয়া পতন—- যেন মুগুরের ঘায়ে আহত হইয়াছি। ডানহাতে চোট লাগিয়াছে। শত্রুর চমৎকার ম্যাগনেসিয়াম্ আলাে ঝিলিক দিয়া উঠিল, সেই আলোয় মড়ার গাদা দেখিতে পাইলাম। আহত হাতখানা তুলিয়া দেখি কজির কাছে ভাঙিয়াছে। হাতখানা ঝুলিতেছে, তা পেকে হু হু করিয়া রক্ত ঝরিতেছে। তৈরি ব্যাণ্ডেজ বার করিয়া ত্রিকোণ টুকর। দিয়া ক্ষতস্থান বাধিলাম। তার উপর একখানা রুমাল জড়াইয়া উদীয়মান্ সূৰ্যপতাকা দিয়া গলা থেকে ঝুলাইয়া দিলাম—সেই পতাকাই শত্রুর কেল্লার উপর বসাইবার পণ করিয়াছিলাম । মাথা তুলিয়া দেখি আমার ও ওয়াংতাই পাহাড়ের মাঝে কেবল একটি উপত্যকা—পাহাড়ের মাথা যেন প্রায় আকাশে গিয়া ঠেকিয়াছে। দারুণ তৃষ্ণা, কোমর হাতড়াইয়া দেখি জলের বােতল নাই—কেবল তার চামড়ার বন্ধনীটা আমার পায়ে জড়াইয়া আছে। সৈনিকদের গলার আওয়াজ ক্রমেই কমিয়া আসিতেছে। ওদিকে ঘৃণ্য শত্রুর ‘রকেটের’ চোখ-ঝলসানাে আলাে আর তােপের শ্রবণ-বিদারী আওয়াজ বাড়িয়া চলিয়াছে। আস্তে আস্তে পা-গুলাে ঘলিয়া দেখি সেগুলাে অক্ষত আছে, তখন উঠিলাম। তলােয়ারের খাপ ফেলিয়া দিয়া তলােয়ারখানা বাঁ হাতে লাঠির মত করিয়া ধরিয়া ঢালু বাহিয়া নামিয়া চলিলাম—যেন স্বপ্নে চলিতেছি ! মাটির দেওয়াল ডিঙাইয়া ওয়াংতাই পাহাড়ে চড়িতে সুরু করিলাম। সামনে দীর্ঘাকার অতিকায় কামানগুলাে উচু হইয়া আছে- আমার দলের কজনই বা এখনাে বাঁচিয়া আছে কে জানে! যারা বাঁচিয়া আছে তাদের উদ্দেশে, চীৎকার করিয়া বলিলাম—আমাকে

১৪৩
R
পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা
ন
;
-
অনুসরণ করে। ; কিন্তু কেহই অামার ডাকে সাড়া দিল না। মনে
হইল, অন্য দলগুলোর অবস্থাও নিশ্চয়ই এমনি—ভাবিয়া বুক যেন
দমিয়া যাইতে লাগিল। তাজ। সৈন্যদল আসিঃ সাহায্য করিবে, সে
আশা নাই; তাই একজন সৈনিককে আদেশ দিলাম-রামপাটে
উঠে -পতাকা বসিয়ে দাও। কিন্তু হায়, চোখের নিমেসে গুলির
ঘায়ে সে মরিল--মুখ দিয়! একটা আওয়াজ ও সরিল না।
হঠাৎ আমার চারিদিক দিয়া একটা বিকট শব্দ উঠিল—যেন
লােকান্তর থেকে।
পাল্টা আক্রমণ !
র্যাম্পার্টের উপর কালো কাঠের দেওয়ালের মত আবির্ভূত হইল
একদল শত্রু। নিমেসে আমাদিগকে ঘিরিয়া ফেলিয়া উল্লাসে তারা
চীৎকার করিয়া উঠিল এমনভাবে আছি যে বাধা দেওয়া সম্ভব নয়,
তা ছাড়া আমরা সংখ্যায় এত কম যে তাদের সঙ্গে লড়াও যায় না।
খাড়া পাহাড় বাহিয়া পিছু হটিতে হইল। ঘাড় ফিরাইয়া দেখি শত্রু
পিছু পিছু ধাওয়া করিয়া গুলি ছাড়িতেছে। পূর্বে সে মাটির গড়ের
কথা বলিয়াছি, তার কাছে পৌছিয় শত্রুর মুখােমুখি ঘুরিয়া দাড়াইলাম।
বিষম সোরগোল বীভৎস হত্যাকাণ্ড শুরু হইয়া গেল।
কিরিচে কিরিচে ঠোকাঠুকি বাধিল, শত্রু একটা মেশিগান্
বাহির করিয়া আমাদের উপর এলােপাতাড়ি গুলি চালাইতে
লাগিল—দু পক্ষেই মানুষ পড়িতে লাগিল কাস্তের মুখে ঘাসের মত।
সে-দৃশ্যের বিস্তারিত বর্ণনা দিতে পারিব না, কারণ তখন আমার
অচ্ছিন্ন অবস্থা। কেবল মনে আছে ভীষণ আক্রোশে তলােয়ার
দুরাইতেছি, মাঝে মাঝে মনে হইল শত্রুকে কাটিয়া ফেলিতেছি।
মনে পড়ে একটা এলােমেলো লড়াই, সাদা ফলকের উপর সাদা

পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা ১৪৪ ফলকের আঘাত, ‘শেলের’ শিলাবৃষ্টি, ধাক্কাধাক্তি, কাটাকাটি, মারাত্মক হাতাহাতি। শেষে গলা এমন ধরিয়া গেল যে, আর চেঁচাইতে পারি । হঠাৎ সশব্দে আমার তলোয়ার ভাঙিয়া গেল—আমার বাঁ হাত বিদীর্ণ হইয়াছে। পড়িয়া গেলাম। উঠিবার আগেই একটা ‘শে আসিয়া আমার ডান পা গুড়া করিয়া দিল। সমস্ত শক্তি সংগ্রহ করিয়া দাড়াইবার চেষ্টা করিলাম, কিন্তু মনে হইল যেন ভাঙিয়া পড়িতেছি—সম্পূর্ণ অসহায় ভাবে মাটিতে হুড়মুড় করিয়া পড়িলাম। এক সৈনিক আমাকে পড়িতে দেখিয়াছিল । সে বলিল, লেফটেন্যান্ট সাকুরাই! আসুন আমরা একসঙ্গে মরি ! বাঁ হাত দিয়া তাহাকে জড়াইয়া ধরিলাম। চারিদিকে হাতাহাতি যুদ্ধ চলিতেছে—অক্ষম অসহায় পড়িয়া পড়িয়া দাতে দাত চাপিয়া তাহাই দেখিতে লাগিলাম। মনে দারুণ উন্মাদনা, কিন্তু দেহ অচল অবশ! ২৫ মৃত্যুর মাঝে জীবন উভয় পক্ষের হতাহতে-ভরা যুদ্ধক্ষেত্রের উপর ২৪শে আগষ্ট তারিখের দিবাগম হইল। যাহাকে জড়াইয়া আছি, সে কেসুকে-ওনাে-এ সৈনিক আমার কাছেই শিক্ষা পাইয়াছে। তাহার ডান চোখের পাশ দিয়া গুলি বিধিয়াছিল। মৃত্যু নিশ্চিত ভাবিয়া সে আমার নাম ধরিয়া ডাকিয়া আমারই সঙ্গে মরার প্রস্তাব করে। বেচারা! তাহাকে জড়াইয়া আমার বা হাত, তাহাতে. গাঢ় রক্তের ছােপওনাের গলার ১৪৫ পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা উপর দিয়। সেই রক্ত বহিয়া যাইতেছে। ওনা সন্তর্পণে অামার হাত সরাইল, নিজের ব্যাণ্ডেজ বাহির করিয়া আমার বা হাত বাধিয়া দিল। এমনিভাবে সাংঘাতিক আহত অবস্থায় শত্রু-পরিবৃত হইয়া পড়িয়া রছিলাম-মুক্তির কণামাত্র আশা দেখিতে পাইলাম না। মৃত্যু যদি ন হয় তবে নিঃসন্দেহ অচিরে শক্রর হাতে পড়িব—সে-দুর্ভাগ্য মৃত্যুর চেয়ে ঢের বেশি অসহনীয়। সেই অপমান এড়াইবার জন্য মন আত্মহত্যা করার জন্য ছটফট করিতে লাগিল, কিন্তু সঙ্গে কোন অস্ত্র নাই, হাতও নাই যে অস্ত্র পাইলে ধারণ করিতে পারে ! দুঃখে কণ্ঠরোধ হইয়া আসিল। ‘ওনো, ভাই, আমাকে মেরে ফেল, তারপর এখান থেকে ফিরে গিয়ে এখানকার অবস্থা জানাও”—এই বলিয়া তাহাকে পীড়াপীড়ি করিতে লাগিলাম। কত কাকুতি-মিনতি করিলাম, কিন্তু সে শােনে । সে প্রায় অন্ধ, তার দুই চোখই রক্তে ঢাকা পড়িয়াছে, তবুও সে বন্দুক ঢাপিয়া ধরিয়া বলিল—আমি রক্ষা করবাে... তার সঙ্গে তর্ক করিতে লাগিলাম, আমাদের অবস্থা বুঝাইয়া বলিলাম। শত্রুর মতিগতির বদল হইয়াছে, তারা পাল্টা আক্রমণ করিয়াছে, অামাদের ঘেরিয়া ফেলিয়াছে, কাল রাত থেকে আমরা শত্রুর এলাকার অনেকটা ভিতরে আসিয়া পড়িয়াছি, এমনি অসহায় অবস্থায় থাকিলে নিশ্চয়ই আমাদের বন্দী করিবে—তাহাকে কত মতে বুঝাইলাম,, তারপর তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলাম, রুশের হাতে বন্দী হইতে কেমন লাগিবে? আমি অচল অনড় অবস্থায় পড়িয়া আছি, হাত পা নাড়িবার শক্তি পর্যন্ত নাই, আমাকে এখনি মারিয়া ফেলিলেই আমার সবচেয়ে বেশি উপকার করা হইবে, তারপর তুমি পালাইতে পারিবে—তাহাকে পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা ১৪৬ বলিলাম। কিন্তু ওনোর কাণ্ডজ্ঞান নাই, সে কেবল বলিতে লাগিল— আমি রক্ষা করবো! নিরুপায় বােধে হাল ছাড়িয়া দিয়া সেখানেই মরিতে প্রস্তুত হইলাম। কিন্তু তবুও ওনােকে পাঠাইয়া যুদ্ধের বর্তমান অবস্থা জানাইবার জন্য অধীর হইলাম। বলিলাম—যাও তবে, ‘চোর’ নিয়ে এস, আমি যাবো। চটপট করো! বেশ জানি ‘চোর’-বাহক এই গিরিসঙ্কটে কিছু পৌছিতে পারিবে না—এই শত্রু-পরিবৃত স্থানে আসার ত কথাই নাই। কেবল আশা—এইরূপে ওনাে জীবিত অবস্থায় আমাদের প্রধান দলের কাছে ফিরিবার সুযোগ পাইবে এবং আমার মৃত্যুর খবরটাও দিতে পারিবে। আমার কথা শুনিয়া ওনাে পাগলের মত লাফাইয়া উঠিল। আচ্ছা থাকুন এখানে, আসচি—বলিয়া মাটির দেওয়ালের পানে ছুটিয়া গিয়া অদৃশ্য হইল। শত্রুর বাধা ভেদ করিয়া সে ঠিআমাদের প্লান-তাড়ােন পৌছিতে পারিবে ? ওনাে চলিয়া গেল, মৃত ও মৃতপ্রায় সৈনিকদের মাঝে আমি একলা পড়িয়া রহিলাম। আমার জীবনে এই সময়টি সর্বাপেক্ষা পবিত্র গভীরতম দুঃখের ও চরম হতাশারহুৰ্ত্ত। নেলসনের কথা আপনমনে বলিতে লাগিলাম—ভগবানের অশেষ করুণা, আমার কর্তব্য সম্পন্ন করিয়াছি। ব্যর্থ হইলেও সারা জীবনের কাজ করিয়াছি—এই ভাবিয়া মনকে সান্ত্বনা দিলাম। আর কিছুই ভাবি নাই। এই কথাটি কেবল বুঝিলাম যে পঁচিশ বছর বয়সের এক যুবকের হৃদিরক্ত দ্রুতগতি ঝরিয়া বরিয়া অচিরে নিঃশেষ হইতে চলিয়াছে, কিন্তু সর্বাঙ্গের ক্ষতের বেদনা মােটেই অনুভব করিলাম না। অদুরে রুশেরা খাতের মধ্যে যাওয়া আসা করিতেছে, আমাদের দলে যারা এখনাে বাঁচিয়া আছে তাদের লক্ষ্য করিয়া গুলি চালাইতেছে, প্রত্যেকে পালা করিয়া পাঁচ ছয়টি ১৪৭ পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা বন্দুক ব্যবহার করিতেছে। চাহিয়া চাহিয়া তাদের কীর্তি দেখিতেছি, এমন সময় তাদের একজন লক্ষ্য করিল যে, আমি তখনাে বাঁচিয়া আছি। অপর রুশেদের সে সঙ্কেত করিল, অমনি তিন চারিটা গুলি আমার পানে ছুটিয়া আসিল। বন্দুকের মাথায় কিরিচ চড়াইয়া লাফাইয়া তারা আমার দিকে ধাবিত হইল। চোখ বুজিলাম- এবার আমাকে হত্যা করিবে। প্রথমত, আমার দেহ লােহা বা পাথরের তৈরি নয়, তার উপর অঙ্গ-প্রতঙ্গ চূর্ণ হইয়াছে—শত্রুকে বাধা দিবার বা তাহাকে তাড়া করিবার শক্তি নাই। “নেকড়েগুলাের” বিষাক্ত দংশন থেকে পরিত্রাণ কোথায় ? কিন্তু ভগবান এখনাে আমাকে ত্যাগ করেন নাই। এই সঙ্কটে নিকটেই একটা হাতাহাতি লড়াইয়ের শব্দ পাইলাম, কিন্তু কোনাে অজানা বৰ্ব্বরের কিরিচের ডগা আমার গায়ে বি ধিল না। আমার পানে যেই তারা ছুটিয়া আসিল অমনি আমাদের জন পাঁচ ছয় লোেক তাদের সঙ্গে লড়িতে শুরু করিল এবং সকলেই মারা পড়িল। আমি নিশ্চিত মৃত্যু ছাড়া কিছুই আশা করি নাই, তবুও আমার প্রাণ দুর্ভাগা সঙ্গীদের প্রাণের মূল্যে রক্ষা পাইল! এইরূপে আমার ক্ষীণ নিশ্বাসপ্রশ্বাস সুখনাে চলিতে লাগিল। ঠিক সেই সময়ে এক সৈনিক চীৎকার করিয়া মাটির দেওয়ালের উপর লাফাইয়া উঠিল তলােয়ার আস্ফালন করিয়া। কে এই বীর, একাকী শত্রুর খাত দখল করিতে চায়? তার দুঃসাহসে চমক লাগিল। কিন্তু হায়, কোথা থেকে একটা গুলি ছুটিয়া আসিয়া তাহাকে আঘাত • করিল, হুড়মুড় করিয়া সে আমার ডানদিকে পড়িয়া গেল ! অতি সহজে অসঙ্কোচে সে মৃত্যুর গহনে প্রবেশ করিল, যেন বাড়ি ফিরিতেছে। মৃত্যুর সন্ধানেই ত সে সেখানে একলা নির্ভয়ে লাফাইয়া উঠিয়াছিল এবং বিজয়-হুঙ্কারে শত্রুর দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়াছিল।

পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা ১৪৮ কিছুক্ষণ পরে আমাদেরই সৈন্যদলের নিক্ষিপ্ত গোলা আমাদের মাথার উপরে ঘন ঘন ফাটিতে সুরু করিল। চারিদিকে jeneussion গোলা—ধোয়া ও রক্ত একত্রে উৎক্ষিপ্ত হইতে লাগিল। কালো কালাে টুকরা টুকরা হাত পা গল। চারিদিকে ছড়াইয়া পড়িতে লাগিল। হাল ছাড়িয়া দিয়া চোখ বুজিলাম। কামনা করিতে লাগিলামমুহূর্তে আমার দেহ শতখণ্ডে চূর্ণ হোক, অচিরে আমার যন্ত্রণার অবসান হোক! তবুও আমার অস্থিমাংস চূর্ণ করিতে কোনাে গেল। আসিল না ; অসিল কেবল গোলার ছােট ছােট টুকরা আমার আহত অঙ্গপ্রত্যঙ্গে নূতন অঘাত হানিবার জন্য। পাশেই এক আহত সৈনিকের মুখে সেই ভয়ঙ্কর গােলার একটা টুকরা আসিয়া বি ধিয়া গেল। কয়েক মুহূর্ত যন্ত্রণায় ছটফট করিয়া মুখ থুবড়িয়া পড়িয়া সে মরিয়া গেল। প্রতি মুহূর্তে আমিও হয় অমনি এক পরিণাম, নয় অর্ধমৃত অৰ্দ্ধজীবিত অবস্থায় সম্পূর্ণ অসহায়ভাবে যুদ্ধক্ষেত্রের ক্ষুধার্ত কুকুর বা নেকড়ের মুখে যাইবার অাশা করিতে লাগিলাম। উত্তরের ভয়ঙ্কর ‘ঈগল আমাকে একটু একটু করিয়া খুটিতেছে। মাথার কাছে শুনিলাম কে ‘নিপ্পন্ বাজাই’ বলিয়া হাঁকিল। চোখ মেলিয়া অস্পষ্টভাবে দেখিলাম এক হতভাগ্য আহত সেনা। মাথা একেবারে খারাপ হইয়া গেছে, তবুও স্বদেশের জন্য ‘বাঙ্গাই' হাঁকিতে ভোলে নাই। সে বারবার ‘বাজাই বলিতে লাগিল, কখনাে বা বলিতেছে—এস এস জাপানী সেনাদল! যতক্ষণ না অবসন্ন হইয়া পড়িল ততক্ষণ উন্মাদের মত নাচিয়া কুঁদিয়া চীৎকার করিতে লাগিল। তারপর তার ঠোটে ঠোট বসিয়া গেল, মুখ ফ্যাকাশে হইয়া উঠিল। চোখ বুজিয়া প্রার্থনা করিতে লাগিলাম—শান্তিতে তার মরণ হােক! # জাপানের জয়।

১৪৯ পােট-আথারের ক্ষুধা । ক্ষতস্থান থেকে নির্গত রক্তে আমার সারাদেহ লালেল। হইয়া গেছে। কেবল দুই বহুত ব্যাণ্ডেজ, বাদবাকি ক্ষত সমস্তই অনাবৃত। কখনো কখলে শান্ত মনে চোখ বুজিতেছি, কখনো চেখ মেলিয়া চারি- দিক লক্ষ্য করিতেছি। বাঁ দিকে দেখি ‘উদীয়মান সূৰ্য্য'-পতাকা উড়িতেছে, তার তলে দুজন জাপানী সেনমরিয়া পড়িয়া আছে। সম্ভবত পতাকাটি ঐ দুই বীর সৈনিকই সেখানে পুতিয়ছে। আমাদের লােকের। যদি ওদিকে অগ্রসর হয়, 'তৰে শত্ৰু তাহাদিগকে গুলি করিয়া মারিবে ; আর রুশেরা যদি ঐ জায়গা পুনরধিকারের চেষ্টা করে, তারাও নিশ্চিত আমাদের গোলাজের হাতে মারা পড়িবে। নিতীক সেনাদ্বয় মরিয়াও জায়গাটি দখলে রাখিয়াছে, আর তারা নিশ্চয়ই সফলতার গৌরবে হাসিমুখে তৃপ্তমনে প্রাণ দিয়াছে। তাহাদের মৃত্যুর মহিমার কথা ভাবিতে ভাবিতে মন যখন স্নিগ্ধ হইয়া উঠিয়াছে, ঠিক তখন এক বর্বর নৃশংস কাণ্ড চোখে পড়িল। লক্ষ্য করিতেছিলাম, এক রুশ কর্মচারী বারবার তার অাহত পা দেখাইয়া হাতের ইসারায় সাহায্য চাহিতেছে। দেখিলাম, এক জাপানী হাস- পাতালের আরদালি, সেও আহত, উক্ত রুশের কাছে গিয়া উপস্থিত হইল। অপন ক্ষতের পরিচর্যা না করিয়া সে কোমরের থলি থেকে ব্যাণ্ডেজ বার করিয়া সযত্নে রুশের ক্ষতস্থান বাঁধিয়া দিল ! আহত শত্রুর প্রতি এই দয়ার প্রতিদান রুশ কর্মচারী কিরূপে দিল? কৃতজ্ঞতার অশ্রুমােচন করিয়া ?—না। করমর্দন করিয়া ধন্যবাদ দিয়া ?-না। তবে করিল কি ? আরদালির ব্যাণ্ডেজ বাঁধা যেই শেষ হইল অমনি সেই রুশ ইজেরের পকেট থেকে রিভলভার বাহির করিয়া এক গুলিতে সেই জাপানীর প্রাণ সংহার করিল ! নির্মম অত্যাচার দেখিয়া ক্রোধে আত্মহারা হইলাম, কিন্তু কিছুই ২াের্ট-আর্থারের ক্ষুধা ১৫০ করিতে পারি না, আমি যে পঙ্গু হইয়া পড়িয়া আছি। কেবল চোখ বুজিয়া দাত কিড়মিড় করিতে লাগিলাম। শীঘ্রই শ্বাস-প্রশ্বাস লওয়া কষ্টকর হইয়া উঠিল। মনে হইল প্রাণবায়ু দ্রুতগতি শেষ হইয়া আসি- তেছে, এমন সময় কে একজন আমার কোট ধরিয়া আমাকে শূন্যে তুলিল, মিনিট খানেক পরে আবার রাখিয়া দিল। ঈষৎ চোখ খুলিয়া অস্পষ্টভাবে দেখি দু-তিনজন রুশ পাহাড়ের উপর উঠিয়া যাইতেছে। বন্দী হইতে হইতে বঁচিয়া গেছি! যে মুহূর্তে আমাকে তুলিয়া ধরিয়া নামাইয়া রাখিল সেই মুহূর্তটি জীবন ও মৃত্যুর, সম্মান ও অপমানের সীমারেখা। হয়ত তারা ভাবিল আমি মরিয়াছি। তেমন ভাবা বিচিত্র নয়, কারণ আমি রক্তে মাখামাখি অবস্থায় ছিলাম । তারপর কে একজন নিঃশব্দে আমার পাশে ছুটিয়া আসিয়া একটি কথাও না বলিয়া ধূপ করিয়া পড়িয়া গেল। মরিয়াছে না কি? না, মৃত্যুর ভাণ করিতেছে? কিছুক্ষণ পরে সে আমার কানে কানে বলিল— চলুন ফিরে যাই! আমি আপনাকে সাহায্য করবাে! হাঁপাইতেছি, অনিয়মিত শ্বাস-প্রশ্বাস বহিতেছে, তারই মাঝে লােকটির পানে তাকাইলাম। অচেনা লােক—একজন সাধারণ সেনা, তার মাথায় ব্যাণ্ডেজ। তার সদয় প্রস্তাবের উত্তরে বলিলাম, এ অবস্থায় জীবিত ফেরা আমার পক্ষে অসম্ভব! তুমি বরং আমাকে মেরে ফেলে পার তাে নিজে চলে যাও ! সে বলিল, আমাকে জীবিত অবস্থায় ফিরাইয়া লইয়া যাওয়ার আশা সে রাখে না, তবে অন্তত সে আমার দেহ লইয়া যাইবে—শর মাঝে ফেলিয়া যাইবে না। এই কথা বলিয়াই সে আমার বাঁ হাত ধরিয়া তার কাঁধের উপর রাখিল। ঠিক সেই সময়ে আমার ডানদিকে যে নির্ভীক পাের্ট-অর্শারের ক্ষুধ ১৫১ লােকটি পড়িয়া পড়িয়া কিছুক্ষণ থেকে গোঙাইতেছিল, সে অরুদ্ধ অস্পষ্ট কণ্ঠে বলিল, লেফটেন্যান্ট, শেষবার আমাকে একটু জল দিয়ে যান ! শুনিয়া বুক ফাটিয়া যাওয়ার উপক্রম হইল, আমার সাহায্য- কারীর হাত ছাড়াইয়া তার পাশে পড়িয়া গেলাম। কে জানে, এই দুর্ভাগা হয় ত আমারই দলের লােক, আমাকেই শেষ বিদায় দিতে বলিতেছে ! আহা বেচারা! হতভাগ্য সঙ্গীকে একলা ফেলিয়া কেমন করিয়া যাইব। সাহায্যকারীকে জিজ্ঞাসা করিলাম, জল আছে তােমার কাছে ? সে তার জলের বোতল বার করিয়া আমার বুকের উপর দিয়া ডিঙাইয়া মৃতপ্রায় ব্যক্তির মুখে ঢালিয়া দিল। তখন সে মিনতির ভঙ্গীতে ভাঙা- চোরা হাত দুখানি জোড়া করিল, তারপর অস্ফুটস্বরে বলিতে লাগিল নামু-আমিদা-বুৎসু, নামু-আমিদা-বুৎসু ! বলিতে বলিতে তাঁর শেষ নিশ্বাস বাহির হইয়া গেল। হত ও আহত অন্যান্য সেনাকে ফেলিয়া বিপদ থেকে মুক্তি লাভের ইচ্ছা হইতেছিল না। কিন্তু আমার দয়ালু বন্ধু আমার বাঁ হাতি চাপিয়া ধরিয়া আমাকে পিঠে তুলিয়া লইল, তারপর একলাফে মেটে গড় পার হইয়া গেল। দুজনে ধুপ করিয়া নীচে পড়িলাম। চট করিয়া একটা ওভারকোট তুলিয়া লইয়া তার দ্বারা আমাকে ঢাকিয়া ফেলিয়া সে নিজে আমার পাশে শুইয়া পড়িল। এইভাবে এক অজানা সেনার পিঠে খাত থেকে মুক্তি লাভ করিলাম। তার পিঠে থাকার সময় গড়ের এক কোণে পা ঠেকিয়া গেল—সেই সর্বপ্রথম ভয়ঙ্কর বেদনা বােধ করিলাম। কিছুক্ষণ কাটিয়া যায়। সে আবার ফিফিস্ করিয়া বলিল, ঘন ঘন গুলি আসছে, খানিক অপেক্ষা করতে হবে ! * বুকে প্রণাম করি।

পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা সে খাপ থেকে কিরিচ খুলিয়া লই! তেলে দিয়া আমার ভাঙা পারে sylint-এর মত করিয়া বপি: লি। বিম তৃষ্ণা-জল খাইতে চাহিলাম। তার বোতলে যেটুকু জল বাকি ছিল সশস্ত দিয়া বলিল, বেশি খাবেন না। প্রায়ই সে আমাকে শান্ত করার উদ্দেশ্যে বলিতেছিল, বেশি নয়, একটুখানি দৈৰ্য্য ধরে থাকুন! চারিধারে দেখিতেছি অনেক সৈন্য গোঙাইতেছে, যন্ত্রণায় ছটফট করিতেছে। আমার দয়ালু বন্ধু ইতস্তত বিক্ষিপ্ত জলের বােতল কুড়াইয়া লইয়া তাদের জল দিতে লাগিল। শত্রুর চোখ এড়াইবার জন্য প্রায়ই সে মরার ভাণ করিয়া চট করিয়া আমার উপর শুইয়া পড়িতেছে। এখন পর্যন্ত এই অদ্ভুত মানুষটির নাম পর্যন্ত জানি না। জিজ্ঞাসা করিলাম, তােমার নাম কি ? সে ফিসফিস করিয়া বলিল, আমার নাম তাকেসাবুরাে কোন্দে।। “কোন্ রেজিমেন্ট ?” “কোচি রেজিমেন্ট। এই যে সাহসী সেনা আমাকে রক্ষা করিতে আসিয়াছে, এ আমার তাবেদারও নয়, আমার রেজিমেন্টের লােকও নয়—ইহাকে আগে কখনাে চোখেও দেখি নাই। অদৃষ্টের এ কোন্ রহস্যময় সূত্রে দুজনে বাঁধা পড়িলাম ! রক্ষা পাইবার কয়েক ঘণ্টা পরে সম্পূর্ণ অজ্ঞান হইয়া পড়িলাম। জ্ঞান ফিরিয়া আসিলে প্রথমেই মনে পড়িল কোলোর প্রিয় নাম। নির্ভীক তাকেসাবুরে! সেই আমাকে ওয়াইয়ের শত্রু-বাহের বাহিরে আনিয়াছে, কিন্তু জাপানী এলাকায় পৌছিতে এখনাে দেরি আছে। প্রকাশ্য দিবালােকে রুশেদের ‘মেশিগান’ এড়াইয়া ফিরিতে হইবে। লােকটি ত নিজেও আহত ! আমার প্রাণরক্ষা হওয়া পােট-আর্থারের ক্ষুধা অনিশ্চিতেরও বাড়া—আমাকে ফেলিয়া একলা নিরাপদ স্থানে পালাইতে পরিলে তার এমন দুর্ভোগ হইত না। কিন্তু সে পণ করিয়াছে আমাকে সাহায্য করিবে-তার কাছে সে প্রতিজ্ঞার মূল্য আপন প্রাণেরও অধিক। সে সকল বিপদ তুচ্ছ করিল, সকল অসুবিধা সহ্য করিল, অদ্ভূত চতুরতা ও বুদ্ধির সহিত আমার উদ্ধারের জন্য কত রকমের উপায় অবলম্বন করিল, অথচ আমার সঙ্গে ত ব্যক্তিগতভাবে কোনো বাধ্য- বাধকতা তার ছিল না। কিছুক্ষণ নিজের দেহ দিয়া ঢাকিয়া সে আমাকে রক্ষা করিল। তারপর বলিল, এখন আমাদের চারিদিকে যথেষ্ট গুলি পড়ছে বটে, তবুও এখানে রাত পর্যন্ত থাকা সঙ্গত নয়, কারণ তা হলে শত্রু এসে নিশ্চয় আমাদের মেরে ফেলবে! এখনি আমাদের যেতে হবে! ভাবুন আপনি মারা পড়েছেন ! একটি ওভারকোট দিয়া সে আমাকে মুড়িয়া ফেলিল, তারপর নিকটের এক সৈনিককে ইসারায় ডাকিল। আহত লােকটি হামা দিয়া আমার পাশে আসিল। আমাকে দেখিতে পাইয়া জিজ্ঞাসা করিল, আপনি না লেফটেন্যান্ট সাকুরাই ? সে যে কে আমি তাহা জানিতাম না, কিন্তু সে যখন আমাকে চেনে তখন নিশ্চয়ই আমাদের রেজিমেন্টের লােক। আমাকে দেখিয়া সে বলিল, ইস, বেজায় জখম হয়েছেন দেখছি! বলিষ্মা তাকেসাবুলাের সঙ্গে ফিসফিস করিয়া কথা কহিতে লাগিল। কিছুক্ষণ পরে তারা দুজনে আমাকে বহন করিয়া লইয়া চলিল। ওয়ান্তাই পিছনে ফেলিয়া হতাহত সঙ্গীদেরকে ছাড়িয়া একলা চলিয়াছি, সারাক্ষণ সেই লজ্জা কাটার মত মনে বিধিতে লাগিল। আমার দুই বাহক পাচ দশ পা চলে আর শুইয়া পড়ে যেন মারা গিয়াছে। এইরূপে শত্রুর চোখে পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা ১৫৪ ধূল। দেয়। বাহিত হইবার সময় বেদনা বোধ করি নাই, তবে ভাঙা হাড়ের মড়মড়ানি অস্বস্তিকর। কাঁটাতারের বেড়া পার হইয়া, বক্ষপ্রমাণ প্রাচীর পার হইয়া, মধ্যাহ্নের জ্বলন্ত উগ্ৰ রোদের মাঝ দিয়া বাহিত হইয়া শেষে এক গিরিসঙ্কটে আসিয়া পৌছিলাম তারের বেড়ার কিছু নীচে। মনে হইল জায়গাটা চিকুয়ানের পাদদেশ । সেখানে কিছুক্ষণের জন্য আমাকে নামাইয়া রাখিল। শরীর অবসন্ন, মাথা ঘুরিতেছে, ক্রমে সমস্তই, ঘুমের মধ্যে যেমন, তেমনি আমার চেতনার বাহিরে চলিয়া গেল। অতিরিক্ত রক্তস্রাবই ইহার হেতু। পরে শুনিয়াছি, এই সময়ে আমি মৃত বলিয়া গণ্য হইয়া- ছিলাম। আমার মৃত্যুসংবাদ বাড়িতে পৌছিলে আমার শিক্ষক মুরাই-মহাশয় আমার লেখা একখানি পােষ্টকাড বাস্তুপীঠে রাখিয়া আমার আত্মার উদ্দেশে ধুপধু ও ফুল নিবেদন করিয়াছিলেন । গিরিসঙ্কটে কয়েক ঘণ্টা একরকম মড়ার মত পড়িয়া রহিলাম, কিন্তু পরলােকের দ্বার তখনাে আমার জন্য খােলে নাই, তাই আবার শ্বাস- প্রশ্বাস বহিতে লাগিল। প্রথম শব্দ যাহা কানে পৌছিল তাহা একটা বিকট বিরাট শব্দ—একটা বড় কামানের গােলা আমার কাছে পড়িয়া মুড়ি ও বালি উড়াইল। আমি ধূলায় ঢাকা পড়িলাম। মনে হইল কামানগর্জন আমার আত্মাকে ইহজগতে ফিরাইয়া আনিল। জ্ঞান হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্ষত স্থানে ভয়ানক যন্ত্রণা হইতে লাগিল। ডান পা’খানা ওরই মধ্যে একটু ভালাে, নাড়িবার চেষ্টা করিলাম, কিন্তু একটুও নড়িল না। তা থেকে হুহু করিয়া রক্ত বার হইয়া উপরে জমিয়া গেল। দেখিলাম আমার মুখের উপর একখানি সূৰ্য্য-পতাকা সামিয়ানার মত বিস্তারিত—তাকেসাবুররা কোনো তখন আমার পাশে বসিয়া।

পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা ১৫৫ চার-পাঁচ জন আহত সৈনিক আসিয়া পৌছিল। যে-ওভারকোটে আমি জড়ানো ছিলাম তাহাতে বাশ বাধিয়া আমাকে প্রাথমিক শুশ্রষা- শিবিরে লইয়া যাইবার জন্য সে তাহাদের সাহায্য চাহিল। যে-নিশানে আমার মুখ ঢাকা ছিল তার একটা কোণ তুলিয়া সে বলিল, লেফটেন্যান্ট, মনে হচ্ছে আমার আঘাত মারাত্মক নয়, আমি আর ফিরে যাব না। আপনার অবস্থা খুব খারাপ। সাবধানে থেকে সুস্থ হয়ে উঠবেন আশা করি ! এই বলিয়া সে অবশেষে বিদায় লইল। আর তাহাকে দেখি নাই। তার আশ্চর্য সেবা ও সাহসের জন্য তার হাতখানা ধরিয়া তাহাকে কি ধন্যবাদ দিলাম? আমার অচল হতে তাহা করা সম্ভব হইল না। তার দয়ার জন্য অসীম কৃতজ্ঞতায় কেবল চোখের জল ফেলিলাম, প্রার্থনা করিলাম—ভগবান ওকে রক্ষা করাে! কথায় বলে, 'একই গাছের ছায়ার ভাগ লইলে, একই জলধারা থেকে তৃজ্ঞা মিটাইলে লােকান্তরে মিলন নিশ্চিত হয়। কিন্তু সে স্বেচ্ছায় বিপদের ঘূর্ণাবর্তে আপনাকে নিক্ষেপ করিয়া আমাকে নিশ্চিত মৃত্যু থেকে উদ্ধার করিয়াছে—আমার এ নবজীবন যথার্থই তারই দান। আমার বর্তমান জীবন মােটেই আমার নয়। ওয়ান্তাইয়ে নিঃসন্দেহ আমার মৃত্যু ঘটিত, আমি যে এখন বাঁচিয়া আছি, সে কেবল কোন্দোর অনুগ্রহে। সে কথা যখন ভাবি, তখন দুঃখে কাদিতেও পারি না—মনের ভাব কাহাকেও বুঝাইতেও পারি না—কথা আর কান্না দুই-ই কণ্ঠে জমিয়া যায়! রাত্রে চার পাঁচজন আহত সেনা অন্ধকারের সুযােগে শত্রুর সন্মুখদেশ অতিক্রম করিয়া অনেক কষ্টে প্রাথমিক শুষ-শিবির খুজিয়া বাহির করিল। সেখানে যখন পৌছিলাম আমি তখনো পাের্ট-আপীরের ক্ষুধা পারি না। অবসন্ন, একটা আচ্ছন্ন বের হয়ে আছি, বিশেষ কিছুই বুঝিতে কেবল মনে পড়ে, ওভারকোট ও বাশগুলো ন! খুলিয়াই আমাকে চোরের উপর রাখা হইল। স্ট্রেচারে বহন করিয়া যেখানে আমাকে নামাইল, সেখানে দেখিলাম লোকের। ব্যস্তভাবে ছুটাছুটি করিতেছে। বাস্তবিক সেইটাই প্রাথমিক শুশ-শিবির। যেই সে কথা বুঝিতে পারিলাম অমনি বলিয়া ফেলিলাম—সার্জন স্ন্যামুই এখানে আছেন কি ? আর সাজ আলো ? তখনি জবাব পাইলাম—আমিই আন্দো! গ্যাসুইও এখানেই আছেন ! সেখানে বন্ধুদের দেখা পাইব আশা করি নাই, কেবল তাদের নাম উচ্চারণ করিয়াছিলাম যেন স্বপ্নঘােরে, যে নাম আমার এত প্রিয়। কিন্তু সেই অদ্ভুত রহস্যময় সূত্র যাহা আমাদিগকে বন্ধুত্বে বাধিয়াছিল, তাহাই আমাকে সেখানে টানিয়া আনিয়া তাদেরই চিকিৎসাধীনে রাখিয়া দিল ! ছাড়াছাড়ি হওয়া, ছড়াইয়া পড়া যুদ্ধক্ষেত্রের সাধারণ বিধি- সেখানে এ ব্যাপার কিছুতেই ঘটানাে যাইত না। বিধাতার নিগুঢ় অভিপ্রায় কে বুঝিবে, যখন দরকার ঠিক সেই সময়েই তাহাদের দেখা পাইলাম। তাদের অপ্রত্যাশিত গলার আওয়াজ শুনিয়া আমার বুক দ্রুততালে নাচিয়া উঠিল—সার্জ ম্যানুই! সার্জ আন্দো! তাহারা আসিয়া আমার হাত ধরিল, কপালে হাত বুলাইয়া দিতে লাগিল, কহিল—সাবাস ভাই...খুব করেছ ! দেখিতে পাইলাম আমার ব্যাটালিয়নের নায়ক মেজর উয়েমুরার দেহ বামদিকে শায়িত, আর অনন্ত নিদ্রায় অভিভূত সেই নির্ভীক যােদ্ধার দেহ জড়াইয়া ধরিয়া তার ভৃত্য তারস্বরে কঁদিতেছে। আমার ক্ষতস্থানে ব্যাণ্ডেজ বাঁধা শীঘই শেষ হইল। তখন অনিচ্ছায় আমার t ১১৫৭ পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা দুই ডাক্তার বন্ধুর কাছে বিদ: লইলাম। আমাকে তাহার পিছনে পাঠাইয়া দিল। পরে সঞ্জিন য়াইয়ের মুখে শুনিয়াছি—“যে প্রাথমিক শুনা- শিবিরে তোমাকে অনিয়াছিল, সেখানে আমাদের দলের আহত সেনা "আসিতে পারে বলিয়া বিশ্বাস ছিল না; তবুও তােমার শুরু করা সম্ভব হইল ইহাই সবচেয়ে বিস্ময়ের ব্যাপার। আহতেরা আসিয়া পৌছিতে লাগিল, তোমার কথা জিজ্ঞাসা করায় তারা বলিল তুমি নিশ্চয়ই মারা পড়িয়ছি ! এমন কি একজন জোর করিয়া বলিল যে, তুমি চিকুয়ানে তারের বেড়ার তলে নিহত হইয়াছি। নানিয়া লইলাম, তোমাকে আর ইহজগতে দেখিতে পাইব না। কিন্তু তোমার দেহ উদ্ধার করা চাই, তাই কোনখানে তুমি মার। পড়িয়াছ সে-সম্বন্ধে বিশেষভাবে খোজখবর করিলাম, কিন্তু কোনো ফল হইল না। পরে সাদাক। নামে এক সার্জেন্ট আসিল। তাহাকে জিজ্ঞাসা করায় সে বলিল, তুমি চিকুরানের গিরিসঙ্কটে মারা পড়িছি। তখন কয়েকজন আরদালিকে তােমার দেহ চোরে অনিবার জন্য পাঠাইলাম। কিন্তু তখন বেজায় অন্ধকার আর শত্ৰুৰ গুলিও খুব চলিতেছে, তাই তারা ব্যর্থ হইয়া ফিরিয়া আসিল। আমি স্থির হইতে পারি না, কিছু পরে অবার দিতীয় দল আরালি পাঠাইলাম, তাহারা তোমাকে জীবন্ত ফিরাইয়া আনিল ! আমাদের বিস্ময় ও যেমন, আনন্দ ও তেমনি, কিন্তু প্রথম দর্শনে মনে হইল তােমার আয়ুষ্কাল বড় জোর কয়েক ঘণ্টা মাত্র। সার্জ আলো ও আমি সদুঃখে পরস্পরের পানে চাহিলাম, তােমাকে বড় হাসপাতালে পাঠাইবার সময় ভাবিলাম সেই আমাদের চিরবিদায় ..

পাের্ট-আর্থারের ক্ষুধা ১৫৮ এই ঘটনার মাসখানেক পরে একদিন আমাদের প্রাথমিক শুশ্রষা- শিবিরের সমুখ দিয়া এক সৈনিক শাবল কাধে করিয়া চলিয়াছে। হঠাৎ সে উচু পানে মুখ করিয়া পড়িয়া গেল, ছুটিয়া গিয়া দেখি সে তােমারই পরিত্রাতা তাকেসাররা। সে আমার বিশেষ শ্রদ্ধা ও প্রীতির পাত্র, কারণ আমি জানিতাম সে-ই তোমাকে শত্রুর কবল থেকে উদ্ধার করিয়াছিল। তখনাে মৃদু নিশ্বাস বহিতেছে, আমার বোতল থেকে তার মুখে একটু জল ঢালিয়া দিলাম। ঠোটে একটু হাসির আভাস দেখিলাম, তারপর মৃত্যু...শান্ত নিরুদ্বেগ !” ৩ এখন যুদ্ধ শেষ হইয়াছে-ঝড় থামিয়াছে। এই শাস্তি আসিল অযুত যােদ্ধার রুধিরের স্রোত বাহিয়া। অনাগত যুগে হয় ত এমন সময় আসিবে যখন পাের্ট-আর্থারের সুকঠিন গিরিশ্রণী ধূলার সঙ্গে মিশিবে, যখন লিয়াওতুঙের নদী শুকাইয়া যাইবে ! কিন্তু দেশভক্ত লক্ষ লক্ষ সেনা, যারা সম্রাট ও দেশের জন্য প্রাণ দিল, তাদেরও নাম বিস্মৃতির গর্ভে ডুবিবে—এমন সময় কখননা আসিতে পারে না। তাদের সে-নামের সৌরভ যুগযুগান্তে ছড়াইয়া পড়িবে, অনাগত জাপানী চিরদিন তাদের গুণগরিমা কৃতজু অন্তরে শ্রদ্ধার সহিত সুরণ করিবে। অনুগ্ৰহ করিয়া পুস্তকে মন্তব্য লিখিবেনা, ব, ছবি থাকিলে ছিড়িবেন না। শেষ সুরেশবাবুর প্রসিদ্ধ উপন্যাস “চিত্রহার প্রশংসা ভারতবর্ষ নদী তার উভ'তীরের দৃশ্যাবলী অন স্রোতের বুকে বহন করে চলে বলে তার অপর নাম ‘চিত্র। সুরেশবাবুর উপন্যাসেও জীবনের খরস্রোতা প্রবাহিনী আশপাশের নানা চিত্র বহন করে তরতর বেগে চলেছে ! এদিক থেকে বলা যেতে পারে যে তার বইয়ের এই নামকরণ সার্থক হয়েছে। তার লেখার ভঙ্গী 'মাদের বিশেষ করে মুগ্ধ করেছে। আর মুগ্ধ করেছে জাপ তরুণী ওহানা'। অনবদ্য চিত্র ! রচনা-কৌশলে তিনি যে কৃতিত্ব দেখিয়েছেন তা যথার্থই উপভোগ্য ! বিষয় বস্তুর বৈচিত্র্যে ও নানা চরিত্রের মাধুর্য্যে তাঁর এই নূতন উপন্যাস ‘চিত্রতা' এমন একটি অভিনবত্ব বহন করে চলেছে, যার প্রশংসা না করে থাকা যায় না। দেশ-দেশান্তরের নর-নারীর নানারূপ এই গ্রন্থে বিবিধ ঘটনার সমাবেশে এমন জীবন্ত হয়ে ফুটে উঠেছে যে, তারা উপন্যাসের পাত্র- পাত্রী না হয়ে একেবারে রক্তমাংসে গড়া মানুষ হয়ে উঠেছে। বিচিত্রা-সুবৃহৎ উপন্যাস। সম্পূর্ণ নূতন ধরণে লেখা। বর্তমান শতাব্দীর প্রারম্ভে বাঙ্গালী যে সত্যের আঘাতে জাগিয়াছিল তাহারই একটা দিক কাহিনীর ছত্রে ছত্রে ফুটিয়াছে। প্রায় কুড়ি পঁচিশ বৎসর পূর্বেকার সেই উদ্দীপনার প্রথম উন্মেষ হইতে আজিকার দাহশেষ অঙ্গার দীপ্তি পৰ্য্যন্ত, একটি প্রাণশিখার সমগ্র ইতিহাস এই উপন্যাসখানির নানা ঘটনা চরিত্র ও চিত্রের মধ্য দিয়া ফুটিয়া উঠিয়াছে। নায়ক অমর সেই যুগের আবহাওয়ায় বর্ধিত একটি স্বপ্নাতুর অথচ দৃঢ়চেতা একনিষ্ঠ যুবক। সামাজিক ও পারিবারিক জীবনের যত কিছু মিথ্যাচার ও কাপুরুষতার বিরুদ্ধে তার সারা প্রাণ বিদ্রোহী হইয়া উঠিল। জাতীয় আত্মসম্মানবােধ ও রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতার আকাক। যেমন জাগিয়াছে, তেমনি সামাজিক জীবনে ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও সত্যের প্রতিষ্ঠা তার চেতনায় অধিকতর প্রবল হইয়া উঠিয়াছে। সহজ সরল, জীবনযাত্রার আদর্শে উৎসাহিত একটি তরুণ হৃদয়ের স্বাধিকার লাভের আগ্রহ, আত্ম- প্রতিষ্ঠার জন্য নিরন্তর সংগ্রাম, এবং সর্বক্ষপণ করিয়াও পরিশেষে পরাজয়ের মধ্যেও [ ২ ] ৩ একটি মহিমার আভাস—ইহাই এই উপন্যাসের ভাববস্তু। ভাষা স্বচ্ছ, মার্জিত ও অপূর্ণ—কোনোখানে সাবাহুল্য নাই। সংগত ও পরিমিত শব্দবিন্যাস লেখকের লিখনভঙ্গি একটি অনন্যসুলভ বৈশিষ্ট্য লাভ করিয়াছে। এই ভাষার দ্বারা রচনার গাঢ়তা উপলব্ধি হয়, এবং তাহা হইতেই লেখকের seriousness ও sincerity পাঠকের মনকে অধিকার করে। উদ্যাসখানি পড়িবার সময় মনে হয়, বাস্তবে ও কল্পনায়, সত্যে ও স্বপ্নে মিশাইয়া লেখক যাহা সৃষ্টি করিয়াছেন তাহার মধ্যে একটি সত্যকার প্রাণ স্পন্দিত হইতেছে। * * এই উপন্যাসখানি পাঠক সমাজের বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করিবে। গত কয়েক বৎসরের মধ্যে বাংলা উপন্যাস-সাহিত্যে এমন একখানি সত্যকার আগে, গভীর ভাবনা ও অনুভূতিপূর্ণ উপন্যাস আমরা পাঠ করি নাই। নির্ভীক সত্যবাদ, সর্ব সংস্কার ভেদ করিবার সৎসাহস এবং সর্বোপরি গভীর সহৃদয়তা ও উদার মনুষ্যত্বের অকাজা এই উপন্যাসখানির গৌরবৃদ্ধি করিয়াছে। —শ্রীমােহিতলাল মজুমদার উত্তরা দেশাত্মবােধের এই সন্ধিক্ষণে অমরের সহিত আমাদের পরিচয়। এতদিনের চেনা অথচ অচেনা দেশের সহিত অকস্মাৎ আত্মীয়তায় সে বিস্মিত বিহবল—রূপ-বিমুগ্ধ। প্রথম কৈশােরেই সে দেশের ব্যথা বুঝিল, তাই সে ব্যথা নিরসনের চেষ্টা হইল তাহার যৌবনের স্বপ্ন। ভদ্র গৃহস্থের শিক্ষিত সন্তান সে—রূপে-গুণে সে সকলেরই প্রিয়—আবাল্য সুখের মধ্যেই সে মানুষ হইয়াছে, কিন্তু আত্মসুখস্বাচ্ছন্দ্যের মধ্যেও দেশকে সে ভুলে নাই—সে দেশের কথা ভাবে, তর্ক করিয়া লােককে বুঝাইবার চেষ্টা করে, পরের দেশের ইতিহাস পড়িয়া দেশের স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখে। দেশে শিল্পসমৃদ্ধির অভাব দেখিয়া তাহার পুনরুদ্ধার কল্পে সে যৌবন-প্রারম্ভে জাপানে চলিয়া গেল—কত কিছুই সে পড়িল, ভাবিল, শিখিল, ঘােড়ায় চড়িল, বন্দুক চুড়িল, Patrick Henryর মত বুক ফুলাইয়া বলিতে চাহিল “হয় মৃত্যু নয় স্বাধীনতা,” কিন্তু কিছুই করিল না—হয় ত করিবার অবকাশ হইল না—মনােমত ত্রে পাইল না। দেশে ফিরিয়া জাগ্ৰত বুৰি দিয়া, মনের সমস্ত শক্তি দিয়া সামান্য কিছু গড়িয়া তুলিবার চেষ্টাতেও অমর কোন কিছুকেই প্রাণপণে আঁকড়াইয়া ধরিতে [ ৩ ] পারিল না। উদ্যম ও কর্মহীনতার ঘূর্ণি হওয়ায় তাহার কৈশাের-যৌবনের স্বদেশ- স্বাধীনতার কল্পরখ চূর্ণ-বিচূর্ণ হইয়া গেল। ইহাই বুঝি তাহার সব চেয়ে বড় ট্রাজেডি। যে অনেক কিছুই করিতে পারিত সে কিছুই করিল’—চিত্রের পর চিত্রে অনবদ্য সুন্দর ভাষাপ্রবাহে অমরের জীবনের বিচিত্র কাহিনীর মধ্য এই ট্রাজেডি যেন মর্মান্তিক হইয়া উঠিয়াছে। লেখক বলিয়াছেন, “মর স্বপ্ন-বিলাসী’—সে কথা সত্য। সে স্বপ্ন-সাধক নহে। বর্তমান বাঙ্গালীর ইহাই তত মনের চেহারা—এই ত type। তাহার শিক্ষা দীক্ষা, তাহার ভাবচিন্তা, তাহার বোধবুদ্ধি 'দিবা-স্বপ্নের মত তাহাকে মােহগ্রস্ত করে, উত্তেজিত করে, কিন্তু কল্পনাকে সার্থক করিবার মত শক্তির প্রেরণা জাগাইয়া কর্মক্ষেত্রের দিকে অগ্রসর করিয়া দেয় না। আত্মপ্রয়োজনের স্বল্পজল খালের মধ্যে লগি বাহিয়৷ আর গুণ টানিয়া তাহার জীবন ভাের হইয়া যায়। সাধনােচিত কৃচ্ছ- সাধনের তাহার না থাকে কর্মশক্তি না থাকে বিরাট অবসর। অমরের জীবনেও এ-নিয়মের ব্যতিক্রম হইল না। প্রেয়সী ও প্রেমময়ী পত্নীকে অসম্মান ও লাঞ্ছনা হইতে বাচাইবার জন্য ঘরের মধ্যে মনােমালিন্যে একদিন সে আপনজনের নিকট পর হইয়া গেল—তাহার পর বাঁচিয়া থাকিবার, শুধু দিন যাপন করিবার জন্য প্রাণশক্তির সে কি বিরাট অপচয়, যৌনশক্তির সে কি মর্মান্তিক পরাভ! দারিদ্র্যের কঠোর নিষ্পেষণে কর্মজীবনের রূঢ় অভিঘাতে অধিকাংশ শিক্ষিত বাঙ্গালী যুবকের যে অবস্থা—আশা, স্বাস্থ্য, উদ্যম, আনন্দহীন যে নির্জীবতা- অমরের মধ্যে তাহার স্বরূপটি প্রত্যক্ষ হইয়া উঠিয়াছে। সম্মুখ সমরে প্রাণপণ করিয়া স্বদেশের স্বাধীনতা অর্জনের স্বপ্ন তাহার আর নাই-লটারির বাজি জিতিয়া পরের দাসত্ব হইতে মুক্তিটুকু লাভ করিতে পাইলেই সে বাঁচিয়া বৰ্ত্তিয়া যায়! এ যেন বিরূপ ভাগ্যদেবতার বিরাট সড়যন্ত্র ! * * কিন্তু সান্ত্বনার তাহার অভাব ছিল কি ? সে তো বলিতে পারিত all for love and the world well lost'! জীবনের আর যে কোন দিকেই সে বঞ্চিত হউক, নারীর প্রেমে সে কোনদিনই বঞ্চিত হয় নাই—সে প্রাণ ভরিয়া ভালবাসিয়াছে, প্রাণঢালা ভালবাসার অমৃতধারায় তাহার জীবন গৌরবময়, যুক্ত। অতি বিচিত্র এই প্রেমের কাহিনীগুলি-ওহানা ও মাধুরীর নিষ্কলঙ্ক প্রেমের [ ৪ ] ; অবদান বাংলা সাহিত্যের অলঙ্কার। মনে হয় শুধু অমর নহে—গ্রন্থকার সুরেশবাবুও নারীকে ভালবাসেন—তা যেমন বস্তুপরিচ্ছিন্ন নারীকে তেমনই দেহ-মনে-গড়া সজীব নারীকে। বাইর চিত্ৰবহা’ যেন নারী-চিত্রের একটি চারু ও শােভন কার ছত্র। করুণ, ওনা, মাধুরী; কি দরদ ও মমতায় তাহারা মূর্তি পরিগ্রহ করিয়াছে— ত্যাগে প্রেমে জীবনের অপুর্ব মহিমী তাহারা পােল—পাঠকের কল্পলােকে তাহাদের আসন যেন চিরপ্রতিষ্ঠিত। * * প্রকাশের দিক দিয়া-সুরেশবাবুর ত্রুটি নাই বলিলেও চলে। তাহার ভাষার প্রশংসা না করিয়া থাকা যায় না--অলঙ্কারের অভাব নাই, অথচ তাহাতে জড়তা নাই, তাহা যেমন সাবলীল তেমনই স্বচ্ছ। আয়াসের চিহ্নমাত্র লক্ষিত হয় অথচ চাৰিশত পৃষ্ঠার এই দীর্ঘ গ্রন্থখানি সুরেশবাবুর প্রথম মৌলিক উপন্যাস। শ্রীআনন্দসুন্দর ঠাকুর Forward-It is often made a reproach against present-day novelists that they draw so little upon life and so much upon books, that even their frankest realism is realism but not real. Here is a novel which would placate the most thorough-going admirer of sincerity. No attempt is made in it to make pseudopsychology a substitute for experience of life. It gives the critic an impression that all the feelings and all the scenes which are described in it were felt and seen. It is the story of the tragic life of a young man who suddenly awoke to the existence of his country and his love for it in the glorious dawn of nationalism in 1905, and after many vicissitudes, moral and sentimental, at least found peace, if not fulAlment in the cult of Mahatma Gandhi. It is the familiar story of many Bengalee lives of our days that it is to be wondered why other novelists have not told it before. Mr. Banerji's treatment of the theme is full of passion yet restrained. In the Japanese chapters of Mr. Banerji's novel we are full in the midst of the chiarm and the romance of Japan. Perhaps these scenes too are realisticMr. Banerji knows Japan at first hand, [ ৫ ] but, then, even realistic Japan has more attractions than the romances of many other countries. Romance and idyll, hard and drab reality, passionate idealism with the sordidest experience arc entwined in the story. We admire the author's style and live over again many of our own years with the experiences, the asorations, the disappointments and the joys of Amar-Mr. Banerji's hero. নবশক্তি—চিত্রনহা’র লেখক শ্রীসুরেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়কে আমি আবাল্য শ্রদ্ধা করে এসেছি তিনি কেবল সুলেখক নয় সত্য লেখক বলে। তাঁর রচনার সংস্কারমুক্ত নির্ভীক তেজসিতা আমাকে বল দেয়। তিনি সেকেলে কিম্বা একেলে কোনো রকম বৈরাগ্যের ধার ধারেন না, কামিনী কাঞ্চনের প্রতি তাঁর বিতৃষ্ণা বা ব্যাহত তৃষ্ণা নেই, তিনি রাজসিক জীবনের গম্ভীর উপাসক। অমরের এক একটি স্মৃতি এক একটি চিত্রের মতো; এই স্মৃতি চিত্রগুলির আলম হচ্ছে ‘চিত্রহা। তা বলে কিছু কম চিত্তাকর্ষক হয়নি, বার বার পড়তে ইচ্ছা করে। * ‘চিত্ৰবহ চিত্রবহুলা বটে। ৯ বইখানিতে চরিত্রও বহু সংখ্যক ও বিচিত্র। * * এই মানুষগুলিকে একবার চিনলে ভােলা যায় না—এরা সত্যিকারের মানুষ, গল্পের খাতিরে কাল্পনিক নামরূপ পেয়েছে। * চারশাে পাতার একখানি বইতে এতগুলি চরিত্রকে স্পষ্ট করে’ ধরা ক্ষমতাসাপেক্ষ। বাবুর এই ক্ষমতা আমাকে বিস্মিত করেছে। * * এই গ্রন্থটির অংশ বিশেষকে নাকি “অশ্লীল” আখ্যা দেওয়া হয়েছে। সেই অংশটি যে কোনটি তা আমি অনেক সন্ধান করেও আবিষ্কার করে উঠতে পারলুম না। চিত্ৰবহার সব চেয়ে করুণ চিত্র সেই যাতে ওহানা ভরা প্রেমের সংসার থেকে সহসা নিরুদ্দেশ হয়ে গেল, যেন পূর্ণিমার চন্দ্র মধ্য রাত্রিতে আকাশ-সমুদ্রে ডুবে গেল। প্রেমিকা আমার মরে গেছে কিম্বা প্রেমে ক্লান্ত হয়েছে—এ দুঃখ সহ যায়। কিন্তু এই পৃথিবীতে কোথাও সে আছে এবং আমাকে পরম ভালােবাসছে, তবু তার ঠিকানাটা জানবার আশা নেই—আমার ঠিকানাও সে জানবে না। যত ভাবি তত আমার হৃদয় হায় হায় করে ওঠে। হৃদয়বাপে কৰােখ হয়। লীলাময় রায় [ ৬ ] শনিবারের চিঠি • সম্প্রতি সুরেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘চিব উপন্যাসখানিরও পরিচ্ছেদ বিশেবের বর্ণনাংশ লইয়া এইরূপ একটা জনরব উঠিয়াছে। ‘চিব’য়-অশ্লীলতা আছে কিন্তু অশ্লীলতার কারণ Criminology বা Sex Psychology বিলাস নয়। সমগ্র উপন্যাসখানি যাহারা পড়িবেন, তাঁহারা বুঝিতে পারিবেন, এই অশ্নীলতার অবতারণায়লেখকের কোনও মন্দ অভিসন্ধি নাই। এক স্থানে লেখক নায়কের বিকাশশান্মুখ যৌবনের একটা স্বভাবধর্ম চিত্রিত করিয়াছেন। সমগ্র উপন্যাসখানির inspirationএ ইহার একটা প্রয়ােজন আছে। লেখক মানব-জীবনের ভালাে-মন্দ, সুন্দর-কুৎসিৎ সকল দিকের মধ্য দিয়া একটা চরিত্রের বিকাশ ও জীবনের পরিণাম চিত্রিত করিয়াছেন। জীবনকে যদি কেহ সমগ্রভাবে দেখিবার চেষ্টা করেন তবে কিছুই বাদ দিবার প্রয়ােজন হয় না। কারণ তাহা হইলে তাহার সর্বাংশের একটা সামঞ্জস্য ধরা পড়ে। কু ও ৪ দুই মিলিয়া একটি অখণ্ড রাগিনীর সৃষ্টি করে, তাহা moralও নয়, immoralও নয়—আরও বড়, আরও মহময়। • কিন্তু যেখানে সমগ্রতার কল্পনা নাই, সেখানে কোনও একটা দিক বা অংশ বৃহৎ হইয়া দেখা দেয়, এজন্য সু-ই থােক আর কু-ই হােক, শ্লীলই হোক আর অশ্লীলই হােক, তাহা উপাদেয় নয়। সুরেশবাবুর বই সকলে সবটা পড়েন নাই, কিন্তু সাহিত্যরসিক মাত্রেই Jean Christophe পড়িয়া থাকিবেন। Jean Christophe কি অশ্লীল ? তাহা হইলে ‘চিত্ৰবহা’ও অশ্লীল। * কিন্তু এই অশ্নীলত ও দুর্নীতি এক নহে, এ কথা কেহই ভাবেন না। “চিত্রবহা’ উপন্যাসখানি পাঠ করিলে অন্ততঃ এ সন্দেহ ঘুচিবে। ‘সমাজ ও সাহিত্য প্রবন্ধ Amrita Bazar Patrika-"Chitravaha" is a distinguished work of art. It fully maintains Mr. Banerji's reputation as a writer of rare charm and insight...the story portrays crer-changing many-coloured life in a series of fascinating pen-pictures...the unforgetable days of Swadeshi...surprisingly come to life at the touch of the gifted author's pen...Some of the chapters of the book dealing with our hero's life in Japan are of surpassing elegance depicting Amar's romantic life and love in the Land of the Rising Sun...

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Port Artharer Khudha

Author
Bandyopadhyay, Sri Sureshchandra
Title
Port Artharer Khudha
File name
Port Artharer Khudha
Text
OCR done
Citation
1932
Published
2009/08/6
Publisher
Sri Sudhirchandra Sarkar, Kolkata
Language
Sanskrit
Pages
182
Library
Bally Sadharan Granthagar
Classification
Other Genres.
Keywords
Essays on an war
DLI number
513064
Barcode
4990010020077.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
OFkJgvZnEf1
Download PDF

Port Artharer Khudha