Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Firingi-banik Ed. 1st
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
ফিরিঙ্গি-বণিক
শ্ৰীঅক্ষয়কুমার মৈত্রেয়
সঙ্কলিত
প্রথম সংস্করণ
গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় এণ্ড সন্স
২০৩১১, কর্ণওয়ালিস্ স্ট্রীট, কলিকাতা
শ্রাবণ-১৩২৯
[ সর্বস্বত্ব রক্ষিত ।
মুল্য দুই টাকা
ক্লাহর
গুরুদাস
यानी
চট্টোপাধ
ত
185mm
প্রিন্টার—শ্ৰীশরচ্চন্দ্র চক্রবর্তী
কালিকা প্রেস
২১, নন্দকুমার চৌধুরীর ২য় লেন, কলিকাতা
সূচীপত্র se . ••• ১০ t E E ২৮ ৩৭ ৫৫ । . C ... # ০ ০ . ৮০ ) ৫০ ০ ০ ৬৭ ৭৯ প্রথম পরিচ্ছেদ। পুরাতন বাণিজ্য পথ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ। ইস্লাম-বিপ্লব তৃতীয় পরিচ্ছেদ। নূতন স্থল-বাণিজ্য-পথের সন্ধান-চেষ্টা চতুর্থ পরিচ্ছেদ। পুরাতন জল-বাণিজ্য-পথ পঞ্চম পরিচ্ছেদ। অপরাজিত অধ্যবসায় ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ। অসাধারণ আত্মত্যাগ সপ্তম পরিচ্ছেদ। উত্তমাশা অন্তরীপ অষ্টম পরিচ্ছেদ। ভারত-যাত্ৰা ... নবম পরিচ্ছেদ। কালিকট দশম পরিচ্ছেদ। প্রথম পরিচয়... একাদশ পরিচ্ছেদ। দ্বাদশ পরিচ্ছেদ। আত্মরক্ষা ব্রয়ােদশ পরিচ্ছেদ। বাহুবল চতুর্দশ পরিচ্ছেদ। রাজ্যলাভ ... পঞ্চদশ পরিচ্ছেদ। বাণিজ্য বিস্তার যােড়শ পরিচ্ছেদ। বাণিজ্য-নীতি সপ্তদশ পরিচ্ছেদ। ভােগাভিলাষ অষ্টাদশ পরিচ্ছেদ। প্রতিদ্বন্দ্বী উনবিংশ পরিচ্ছেদ। প্রবল সংঘর্ষ বিংশ পরিচ্ছেদ। পরিণাম উপসংহার ঐ • se ৮১ E , ৫০ ৯৮ . . ০ ০. ১১৮ ৮ ০ ০ ৫০০ ১২৮ pre ১৮ ৫০ ১৭১ ৫ ০ ০ ১৮১ ৫০ • EE ১৮৪ .
গ্রহকার প্রণীত
সিরাজদ্দৌলা
মীরকাসিম
ও এ
০ ০ ০
অবতরণিকা ‘সাহিত্য-পত্রিকায় প্রকাশিত “ফিরিঙ্গি-বণি’ শীর্ষক প্রবন্ধ সংশােধিত কলেবরে পুস্তকাকারে মুদ্রিত হইল। ইহাতে যে সকল ঐতিহাসিক তথ্য সঙ্কলিত হইয়াছে, তাহা আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়নির্দিষ্ট পাঠ্যগ্রন্থে দেখিতে পাওয়া যায় না; অথচ তাহা আধুনিক সভ্য- সমাজের অভূতপূর্ব ভাগ্য-বিবর্তনের প্রধান কথা,-যেমন কৌতুহলপূর্ণ, সেইরূপ শিক্ষাপ্রদ। মুসলমান ইতিহাস-লেখকগণ ইহার কোন কোন কথা লিপিবদ্ধ করিয়া গিয়াছিলেন। গােলাম হােসেন সলেমী “রিয়াজ-উস্-সলাতিন” নামক পারস্যভাষার রচিত বাঙ্গালার ইতিহাসে তাহার সারাংশ উদ্ধৃত করিয়া- ছিলেন। তাহার গ্রন্থ হইতে উপাদান সঙ্কলন করিয়া, ইংরাজী ভাষায় বাঙ্গালার ইতিহাস রচনা করিবার সময়ে স্টুয়ার্ট তাহা পরিত্যাগ করিয়া- ছিলেন। বাঙ্গালা ভাষায় যে সকল বাঙ্গালার ইতিহাস লিখিত হইয়াছে, তাহা ষ্টুয়ার্টের পদ্ধতি অবলম্বন করায়, তাহাতে ফিরিঙ্গি-বণিকের কথা যথাযােগ্যভাবে স্থানলাভ করিতে পারে নাই। বাঙ্গালার ইতিহাস “রিয়াজ-উস-সলাতিনের” অনুবাদ নহে। তাহার একখানি অনুবাদের প্রয়ােজন প্রদর্শন করিয়া, তৎপ্রতি বঙ্গ-সাহিত্য-সেবকগণের দৃষ্টি আকর্ষণের আশায়, সাহিত্যে গােলাম হােসেন” শীর্ষক একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত করিয়াছিলাম। উহা পাঠ করিয়া, শ্রীযুক্ত রামপ্রাণ গুপ্ত মহাশয় অশেষ অধ্যবসায়ে “রিয়াজ-উস্- সলাতিনের একখানি বাঙ্গালা অনুবাদ প্রকাশিত করাইবার পর, বঙ্গীয় এসিয়াটিক সােসাইটীর উদ্যমে, শ্ৰীযুক্ত আবদুস সালেম সাহেব একখানি ইংরাজী অনুবাদ প্রকাশিত করিয়াছেন। ফুয়ার্টের [ ২ ] } গােলাম হােসেনের গ্রন্থে ফিরিঙ্গি-বণিকের বিবরণ যদিন কেবল পারস্যভাষায় নিবদ্ধ থাকিয়া অপরিচিত হইয়া রহিয়াছিল, ততদিন ইংরাজী-ভাষানিবদ্ধ গ্রন্থ অবলম্বন করিয়াও ফিরিঙ্গি-বণিক সম্বন্ধে অধিক কথা অবগত হইবার উপায় ছিল না। তাহা তখন পর্তুগীজ- ভাষানিবদ্ধ গ্রন্থে ও রাজদপ্তরের কাগজপত্রে লুক্কায়িত ছিল। পর্তুগীজ- দপ্তরের যথাযােগ্য অনুসন্ধান করিয়া, তদবলম্বনে ড্যাভার গ্রন্থ রচনা করায়, এবং স্ব উইলিয়ম্ হণ্টার নানা তথ্যের আলােচনা করায়, যাহা পৰ্তুগীজ-ভাষানভিজের নিকট অপরিচিত ছিল, তাহা এখন ইংরাজী-ভাষাভিজ্ঞের নিকট সুপরিচিত হইয়াছে। এখন বাঙ্গালা ভাষায় ফিরিঙ্গি-বণিকের বিস্তৃত ইতিহাস লিখিত হইবার সুযােগ উপস্থিত হইয়াছে। সাহিত্যে প্রকাশিত প্রবন্ধ ১৩১২ সালে সমাপ্তি লাভ করে। কিন্তু এতদিনের মধ্যেও বাঙ্গালা ভাষায় ফিরিঙ্গি-বণিকের বিস্তৃত ইতিহাস রচনা করিবার জন্য কোনরূপ আয়ােজনের পরিচয় প্রাপ্ত হওয়া যায় নাই। তৎপ্রতি বঙ্গ-সাহিত্য-সেবকগণের দৃষ্টি আকর্ষণের আশায়, ‘সাহিত্যে প্রকাশিত ফিরিঙ্গি-বণিক শীর্ষক প্রবন্ধ পুস্তকাকারে মুদ্রিত করাইবার জন্য চির-সুহৃৎ শ্ৰীযুক্ত জলধর সেন উদ্যোগী হইয়া উঠিয়াছিলেন। স্বাস্থ্য-ভঙ্গে অবসন্ন হইয়া পড়ায়, তাহার অনুরােধ রক্ষা করিতে বিলম্ব ঘটিয়া গিয়াছে। কতকগুলি অনির্বচনীয় কারণে এই গ্রন্থকে মুদ্রাযন্ত্রের কবল হইতে বাহির করাইয়া আনিতেও বিলম্ব ঘটিয়া গিয়াছে। বাণিজ্যেই যে লক্ষ্মীর প্রকৃত নিবাস, তাহা প্রাচীন ভারতে প্রবাদ- বাক্যে পরিণত হইয়াছিল। সে প্রবাহ এখনও অপ্রচলিত হইয়া পড়ে নাই। কিন্তু তাহার সমুচিত মৰ্যাদা রক্ষার অধ্যবসায় নানা কারণে ক্রমে ক্রমে অন্তর্হিত হইয়া গিয়াছে। যাহা এখন সভ্য-সমাজের অন্যান্য , দেশে • অধিক উৎসাহ লাভ করিতেছে, আমাদের দেশে তাহা কেবল স্বপ্নকথায় পর্যবসিত হইয়াছে। কেন এমন হইল, ইতিহাস তাহার ; [ ৩ ] উত্তর দানে অসমর্থ ; কিরূপ ঘটনা-পরম্পরায় এমন হইয়াছে, ইতিহাস কেবল তাহারই যৎকিঞ্চিৎ বিবরণ প্রদান করিতে পারে। এই গ্রন্থে তৎসংক্রান্ত স্কুল বিবরণগুলি সঙ্কলিত হইয়াছে ; মূলানুসন্ধানের প্রয়ােজন দূরীভূত হয় নাই। তৎপ্রতি বঙ্গ-সাহিত্য-সেবকগণের দৃষ্টি আকৃষ্ট হইলে, সকল শ্রম চরিতার্থ হইবে ;-প্রথম অপৰ্যাপ্ত উদ্যমে যে সকল ভ্রম ত্রুটি রহিয়া গিয়াছে, তাহাও সংশােধিত হইতে পারিবে । ইহাতে প্রসঙ্গক্রমে আরও একটি কথা আলােচিত হইয়াছে। ভারতবর্ষ না থাকিলে,-ভারত-বাণিজ্যে অর্থোপার্জনের সম্ভাবনা না থাকিলে, আধুনিক ইউরােপের পক্ষে নব-জীবন লাভ করিতে বিলম্ব ঘটিবার সম্ভাবনা ছিল। ভারতবর্ষই পরােক্ষভাবে ইউরােপকে যুগান্তর আনয়নের সহায়তা করিয়াছে। ইহা কতদূর প্রতিপাদিত হইয়াছে, পাঠক তাহা বিচার করিয়া দেখিবেন। অলমতিবিরেণ- L- রাজশাহী শ্রাবণ, ১৩২৯
No text on this page.
ফিরিঙ্গি বণি প্রথম পরিচ্ছেদ পুরাতন বাণিজ্যপথ In no year does India drain our Empire of less than fifty-five millions of Sesterces giving back her own wares in exchange, which are sold at once hundred times their prime cost-Pliny. জগদ্বিখ্যাত রােমক-সাম্রাজ্যের অ্যুদয়কালেও তাহার সুপরিচিত ইতিহাস-লেখক মর্মপীড়িত হইয়া লিখিয়া গিয়াছিলেন,-অগ্নিমূল্যে ভারতবর্ষের শিল্পদ্রব্য ক্রয় করিয়া, রােমক সাম্রাজ্য প্রতি বর্ষেই ভারত- বর্ষকে অকাতরে অর্থদান করিতে বাধ্য হইয়া থাকে ! সে দিনের কথা এখন স্বপ্নের ন্যায় অলীক বলিয়াই মনে হয়। তথাপি তাহা স্বপ্ন নহে; ঐতিহাসিক সত্য। কোন্ পুরাকালে ভারতবর্ষ এইরূপে শিল্পদ্রব্য-বিনিময়ে বিবিধ দূরদেশ হইতে অর্থলাভ করিয়া সমৃদ্ধ হইয়া উঠিয়াছিল, ইতিহাসে তাহার সম্যক পরিচয় প্রাপ্ত হইবার উপায় নাই। এত পুরাতন কাহিনী কোন দেশেই লিপিবদ্ধ হইবার সম্ভাবনা ছিল না। তখন প্রাচ্যের তুলনায় অধিকাংশ প্রতীচ্য জনপদ নিরক্ষর জাতির আবাসভূমি বলিয়াই পরিচিত ছিল। ভারত- • বর্ষের পুরাতন সাহিত্যে তাহার সাধারণ নাম-“ম্লেচ্ছদেশ”। সে দেশের বিশেষ বিবরণ লিপিবদ্ধ করিবার জন্য ভারতীয় সাহিত্যের কোনরূপ প্রয়ােজন বা আগ্রহের কারণ বর্তমান ছিল না। এখন ভাগ্যবিপর্যয়ের { ফিরিঙ্গি বণিক ফলে সেই প্রয়ােজন অনুভূত হইতেছে ! যে দেশ গ্রহণ করিত, সেই দেশ এখন মুক্তহস্তে দান করিতেছে। কিরূপে, কতদিনে, এই অচিন্তিতপূর্ব ভাগ্যবিপর্যয় সংঘটিত হইল, তাহার ইতিহাস অধ্যয়ন করিবার জন্য কাহার না কৌতুহল উপস্থিত হয় ? সে ইতিহাস সৰ্ব্বথা শােচনীয় হইলেও, শিক্ষাপ্রদ। তাহার উপকরণ নিতান্ত অপ্রচুর। কিন্তু পাশ্চাত্য-পণ্ডিতবর্গের অনুসন্ধান-কৌশলে ক্রমশঃ নানা বিলুপ্ত তথ্য আবিষ্কৃত হইতেছে ; ঐতিহাসিকগণ ভারত- বর্ষের সহিত ম্লেচ্ছদেশের বাণিজ্য-সম্পর্কের পরিচয় প্রকাশিত করিয়া, সভ্য-সমাজকে বিস্মিত করিয়া তুলিতেছেন। দিন দিন যে সকল পুরাতত্ত্ব সংকলিত হইতেছে, তাহার গতি কেবল এক দিকেই প্রবাহিত ; —এ কালে যেমন প্রতীচ্য জনপদ হইতে শিক্ষা-দীক্ষা শিল্প-বাণিজ্য অবিচ্ছিন্ন প্রবল প্রবাহে নিয়ত প্রাচ্য জনপদের দিকেই অকুতােভয়ে প্রধাবিত হইতেছে, সেকালে ইহার বিপরীত অবস্থা বর্তমান ছিল। সকল প্রাচ্য-জনপদ হইতে শিক্ষা-দীক্ষা-শিল্প-বাণিজ্য নিরন্তর প্রতীচ্য জনপদে প্রধাবিত হইয়া, সভ্যতা-বিস্তারে প্রতীচ্য মানব-সমাজের সমুন্নতি-সাধনের সহায়তা করিয়াছিল, তন্মধ্যে ভারতবর্ষের নাম সর্বাগ্রে উল্লিখিত হইবার যােগ্য। ভারতবর্ষের সূ-শিল্প ভারতবর্ষের নাম জগদ্বিখ্যাত করিলেও, তাহার ভৌগােলিক পরিচয় সুদূর পাশ্চাত্য দেশে সকলের নিকট সুপরিচিত করিতে পারে নাই। যে বিষয়ের প্রত্যক্ষ ভান যত সীমা- নিবদ্ধ, সেই বিষয়ে কল্পনার প্রাবল্য তত অধিক হইয়া পড়ে। ভারত- বর্ষের পক্ষেও তাহাই হইয়াছিল। অধিকাংশ পাশ্চাত্য দেশে ভারতবর্ষ অলৌকিক রত্নভূমি বলিয়া পরিচিত হইয়া উঠিয়াছিল । কি এসিয়া, কি ইউরােপ, যে কোনও মহাদেশের সমৃদ্ধ জনপদ পুরাকালে পাশ্চাত্য- সমাজে সুপরিচিত হইয়াছিল, সকল জনপদই ভারতবর্ষের পণ্যব্য পশ্চিম বাণিজ্যপথ বিক্রয় করিয়া সমৃদ্ধ হইয়া উঠিয়াছিল। যাহার স্পর্শমাত্র লৌহপিণ্ড সুবর্ণময় করিত, তাহা যে কত বহুমূল্য, তাহার ইয়ত্তা কি ? এইরূপে সত্যতা-বিকাশের প্রথম প্রভাত হইতেই পাশ্চাত্য মানব- সমাজ ভারতবর্ষের অলৌকিক ঐশ্বর্যের কথায় আস্থা স্থাপন করিয়া, কল্পবলে তাহাকে কল্পবৃক্ষ বলিয়া বিশ্বাস করিতে শিক্ষা করিয়াছিল। কিন্তু সে কল্পবৃক্ষ কোথায় অবস্থিত, তাহা বহুকাল কুজ্জটিকাছন্ন ছিল। পুরাতন পৃথিবীতে ভারতবর্ষ, কল্পবৃক্ষের মতই বিবিধ কাম্যফল বিতরণ করিয়া, পাশ্চাত্য জনসাধারণের অন্ধবিশ্বাস অটল করিয়া তুলিয়াছিল। এই বিশ্বাস এখনও সম্পূর্ণরূপে তিরােহিত হইয়াছে বলিয়া বােধ হয় না। কল্পবৃক্ষ ক্রমে ক্রমে শাখাপত্রহীন নীরস কাষ্ঠখণ্ডে পরি- ণত হইবার উপক্রম হইয়াছে ; তথাপি পাশ্চাত্য-সমাজের বদ্ধমূল পূৰ্ব্ব- সংস্কার সমূলে উৎপাটিত হয় নাই। * ভারতবর্ষ প্রাচ্য ও প্রতীচ্য জনসমাজের মধ্যস্থলে অবস্থিত থাকিয়া, জলে স্থলে নানা পথে বাণিজ্য-বিস্তারে অগ্রসর হইয়াছিল। পূৰ্বাঞ্চলে কোন পথে কত দূর পর্যন্ত ভারত-বাণিজ্য বিস্তৃতিলাভ করিয়াছিল, তাহার সহিত বৰ্ত্তমান আলােচনার সম্বন্ধ নাই। পশ্চিমাঞ্চলে কোন পথে কতদূর পর্যন্ত ভারত-বাণিজ্য বিস্তৃতিলাভ করিয়াছিল, তাহার আলােচনায় প্রবৃত্ত হইবামাত্র, ভারতবর্ষের পশ্চিম সীমার দিকে দৃষ্টি- পাত করিতে হয়। তাহার অধিকাংশ কেবল উত্তালতরঙ্গতাড়িত সমুদ্রবেলা। যে অম্লাংশের সহিত স্থলভাগের সংযােগ, তাহাও নদ, নদী, পৰ্ব্বত ও মরুভূমির আধিক্যবশতঃ, দুর্গ প্রাচীরের ন্যায় দুলঘ্য জল- * ইহার কারণ আছে। ভারতবর্ষ যথার্থই অনন্ত রত্নভাণ্ডার। ভারতবর্ষের অধিবাসিগণ শিল্পবাণিজ্যে পুনরায় কৃতিত্ব প্রদর্শন করিতে পারিলে, তাহাদের জন্ম- ভূমি পুনরায় রত্নপ্রসবিনী বলিয়া বিশ্ববিখ্যাত হইয়া উঠিবে। ০ ফিরিঙ্গি বণিক পথ ভিন্ন স্থলপথে ভারত-বাণিজ্য পশ্চিমাঞ্চলে বিস্তৃত হইবার পক্ষে বিপ্ন- বাধার অভাব না থাকিলেও, স্থলপথই সৰ্ব্বাপেক্ষা পুরাতন বাণিজ্য-পথ বলিয়া প্রতিভাত হয়। * সে পথে ইচ্ছামত বহু পণ্যদ্রব্য বহন করা আয়াসসাধ্য বলিয়া, ক্রমে জলপথে বাণিজ্য-বিস্তারের চেষ্টা প্রবর্তিত হইয়া থাকিবে। এক্ষণে পূৰ্ব্বকথা বিলুপ্ত ও তাহার রহস্যভেদ করিবার উপায় তিরােহিত হইয়াছে। যত দিনের কথা অবগত হইবার উপায় আবিষ্কৃত হইয়াছে, তাহাতে অতি পুবাকাল হইতে জল স্থল উভয় পথেই ভারত- বাণিজ্য প্রবাহিত হইবার পরিচয় প্রাপ্ত হওয়া যায়। পাশ্চাত্য ইতিহাস- লেখকগণ এই সকল পুরাতন বাণিজ্য-পথের নানারূপ নামকরণ করিতেছেন। পুরাতন সাহিত্যে এই সকল নাম প্রাপ্ত হওয়া যায় না। বুঝিবার ও বুঝাইবার সুবিধার জন্য এইরূপ নামকরণ আবশ্যক। স্থল-বাণিজ্য-পথের আরম্ভ সিন্ধুতীরে। তথা হইতে গিরিসঙ্কট অতিক্রম করিয়া, এই পথ বহুভাগে বিভক্ত হইয়া, ক্রমে পশ্চিমাঞ্চলে অগ্রসর হইবার জন্য কাস্পীয় হ্রদের উত্তর ও দক্ষিণ উভয় তটেই প্রধা- বিত হইত। কাস্পীয় হ্রদের উত্তর তটের বাণিজ্যপথ ভৱানদী ও কাস্পীয় হ্রদের সঙ্গমস্থলে উপনীত হইয়া, জলপথে পরিণত হইত। কাস্পীয় হ্রদের দক্ষিণ তটের বাণিজ্য-পথের এক শাখা কৃষ্ণসাগরতটে উপনীত হইয়া, জলপথের সহিত মিলিত হইত;—অপর শাখা স্থলপথে দক্ষিণাবর্তে পুরাতন কাস্পীয় রাজ্যে উপনীত হইয়া, তথা হইতে ভূমধ্য- . The most ancient of the three routes was the middle one through Syria.-Hunter's llistory of British India. 893976- পুরাতন বাণিজ্যপথ, তাহার কোনও প্রমাণ উল্লিখিত হয় নাই। পথই স্বাভাবিক সুপরিচিত পুরাতন বাণিজ্যপথ। স্মরণাতীত পুরাকাল হইতে স্থলপথেই ভারতীয় পণ্যদ্রব্য নানা দিগদেশে প্রেরিত হইত। সুতরাং স্যার উইলিয়ম হন্টারের ন্যায় বিজ্ঞ ইতিহাস-লেখক জলপথকেই সর্বাপেক্ষা পুরাতন পথ বলিয়া ব্যক্ত করিলেও তাহাতে আস্থাস্থাপন করিতে সাহস হয় না।
লাভের পথ সাগরতটে ক্ষণকাল বিশ্ৰামলাভ করিয়া, পুনরায় দক্ষিণাবর্তে মিশরদেশ পর্যন্ত প্রবাহিত হইত। এই সৰ্ব্বপ্রাচীন স্থল-বাণিজ্যপথের “কাস্পীয় পথ” নামকরণ করা যাইতে পারে। কিন্তু ইহার প্রধান লক্ষ্য ভূমধ্য- সাগর বলিয়া, ইহাকে “ভূমধ্যসাগর-পথ” বলিলেই সুসঙ্গত হয়। এই পথে ভারতবর্ষের বাণিজ্যদ্রব্য কেবল কাস্পীয় হ্রদ, কৃষ্ণসাগর, বা ভূমধ্য- সাগরতীরে প্রবাহিত হইয়াই নিরস্ত হইত না; তথা হইতে আধুনিক ইউরােপের সকল দেশেই নানা পথে প্রবাহিত হইয়া, পশ্চিম এসিয়া, উত্তর-আফ্রিকা ও সমগ্র ইউরােপের সহিত ভারতবর্ষের অবিচ্ছিন্ন বাণিজ্যসূত্র বন্ধন করিয়া দিত। ভারতবর্ষ যে এই পুরাতন বাণিজ্য-পথে কত দেশের ধনাহরণ করিয়া সমৃদ্ধিলাভ করিত, তাহার সংখ্যা নির্ণয় করা যায় না। অন্যান্য দেশের উদ্যমশীল বণি-সম্প্রদায় ভারতীয় বণিদিগের নিকট হইতে পণ্যদ্রব্য ক্রয় করিয়া লইয়া, তাহা জলে স্থলে বিবিধ পথে বিবিধ দেশে বিক্রয় করিয়া ধনশালী হইত। স্থল-বাণিজ্যপথ অতি পুরাকাল হইতে ভারতবর্ষের নিকট সুপরি- চিত ও সুনিশ্চিত হইলেও, এই পথে পণ্যদ্রব্য বহন করিবার অসুবিধার অবধি ছিল না। কখন শকটে, কখন নৌকায়, কখন অশ্ব বা উষ্ট্র-পৃষ্ঠে আরােহণ করিয়া, কখন নিবিড় অরণ্যে, কখন দুর্লঙ্ঘ্য গিরিসঙ্কটে, কখন বা উত্তপ্ত মরুমরীচিকায় পরিশ্রান্ত হইয়া, বণিকেরা অতি অল্প দ্রব্যই স্থল- পথে বহন করিতে পারিতেন। তাহাও আবার দস্য-তঙ্করের আক্রমণ ও লুণ্ঠন-ভয়ে অল্প ব্যয়ে সম্পন্ন হইত না। জলপথ নিয়ত তরঙ্গসঙ্কুল, অপরিচিত ও অনিশ্চিত। কখন সুধীর সমীরণ, কখন বা প্রবল প্রভঞ্জন তাহাকে নিরতিশয় অব্যবস্থিতচিত্ত মহাদৈত্যের মত পরাক্রমশালী করিয়া রাখিয়াছে। তথাপি নৌবিদ্যাবিশারদ নাবিকগণের চালন-কৌশলে স্থলপথ অপেক্ষা জলপথই সমধিক লাভের পথ বলিয়া পরিচিত হইয়াছিল। এই পথ’ ভারতবর্ষের পশ্চিম উপকূল হইতে পারস্য, আরব ও মিশর দেশের ফিরিঙ্গি বণিক বিবিধ “বন্দর পর্যন্ত বিস্তৃতিলাভ করিয়াছিল। ইহার দুই শাখাই ইতিহাসে প্রসিদ্ধিলাভ করিয়াছে। এক শাখা পারস্যোপসাগরে, অপর শাখা লােহিতসাগরে প্রধাবিত হইত। পারস্যোপসাগরের শাখা কাল- দীয়-রাজ্যে উপনীত হইয়া, স্থলপথের সহিত মিলিত হইত; লােহিত সাগরের শাখা মিশর-রাজ্যে উপনীত হইয়া স্থলপথের সহিত মিলিত হইত। এই দুই জল-বাণিজ্যপথ যথাক্রমে “কান্দীয় পথ” ও “মিশরীয় পথ” নামে অভিহিত হইতে পারে। স্থলপথের ন্যায় জলপথেও অন্যান্য দেশের নাবিকবর্গ ভারতীয় বাণিজ্য-ভাণ্ডার বহন করিয়া অর্থোপার্জন করিত। 'জল স্থল উভয় পথেরই এক লক্ষ্য,—প্রাচ্য রাজ্যের পণ্য- বিনিময়ে প্রতীচ্য রাজ্যের ধনাহরণ। এই লক্ষ্য দীর্ঘকাল ভারতবর্ষের সৌভাগ্যবর্ধন করিয়া, ভারতবর্ষের নাম জগদ্বিখ্যাত করিয়া তুলিয়া- ছিল। সুদূর পাশ্চাত্য জনপদে ভারতীয় শিল্প সকল সময়ে ভারতবর্ষের নামে পরিচিত হইত না। যে দেশ বা বন্দর হইতে তাহা আনীত হইত, তাহার নামেই পরিচিত হইত। এক্ষণে যে রক্তবস্ত্র “টর্কি রেড” নামে পরিচিত, এক সময়ে তাহা “এড্রিনোপােলিস্ রেড” নামে পরিচিত ছিল। অথচ তাহা ভারতবর্ষে সুরঞ্জিত হইয়াই পাশ্চাত্য জনপদে বিক্ৰয়াৰ্থ প্রেরিত হইত। অনেক প্রতীচ্য রাজ্যের পুরাতন সাহিত্যে ভারতবর্ষের নাম উল্লিখিত না থাকিবার প্রকৃত কারণ কি, এই একটি- মাত্র দৃষ্টান্ত হইতেই তাহা বুঝিতে পারা যায়। হোমরের অমর কাব্যে ভারতবর্ষের নাম উল্লিখিত না থাকায়, অনেক পাশ্চাত লেখক হােমরের তিরােধানের পর ভারত-বাণিজ্য বিস্তৃত হইয়াছিল, এই কথা লিপিবদ্ধ * এতদ্ব্যতীত আর একটি জল পথ ‘সিংহলপথ” নামে কথিত হইতে পারে। এই পথে বঙ্গদেশের পণ্যভাণ্ডার সিংহলে প্রেরিত হইয়া, তথা হইতে আবার “কাদীয় পথে” এবং “মিশরীঃ পথে” প্রেরিত হইত।
ভারত-বাণিজ্যের ফল করিয়া গিয়াছেন। সম্প্রতি সকলেই এই মত ভ্রান্ত বলিয়া স্বীকার করিতে আরম্ভ করিয়াছেন। ভারতীয় শিল্প-দ্রব্যই যে প্রতীচ্য জন- পদকে সভ্যজনােচিত বিবিধ ভােগ্যবস্তুর সন্ধান প্রদান করিয়া ক্রমে ক্রমে ভােগাভিলাষ বর্ধিত করিয়া তুলিয়াছিল, তাহার নানা প্রমাণ প্রাপ্ত হওয়া যায়। যে সকল বাণিজ্যপথে ভারতীয় পণ্যদ্রব্য পূৰ্ব্ব হইতে পশ্চিমাঞ্চলে বাহিত হইত, তাহার উভয় পার্শ্বে ই বিবিধ সম্পন্ন জনপদ প্রতিষ্ঠিত হইয়া, ভারতীয় পণ্যদ্রব্যের ক্রয়বিক্রয়-ব্যাপারে প্রচুর ধনােপাৰ্জন করিয়া সৌভাগ্যশালী হইয়াছিল। এইরূপে কাদীয় রাজ্যের অভ্যুদয়,-এই- রূপে ব্যাবিলনের সৌভাগ্য-গৰ্ব্ব,—এইরূপে ফিনিসীয় বণিশ্বর্গের অসা- ধারণ বাণিজ্যোন্নতি ;-এইরূপেই মিশর, গ্রীস, রােম প্রভৃতি ইতিহাস- প্রসিদ্ধ প্রতীচ্য পুরাতন সাম্রাজ্যের অলৌকিক ঐশ্বৰ্যবিকাশ। প্রাচীন মিশর যে মৃতদেহ-সংরক্ষণকৌশলের জন্য জগদ্বিখ্যাত, তাহার উপকরণ ভারতবর্ষ হইতে সংগৃহীত। প্রাচীন ইহুদীর নরপতি সলমন্ যে অলৌকিক ঐশ্বৰ্যবিজ্ঞাপক বস্ত্রালঙ্কারের জন্য ইতিহাসে সুপরিচিত, তাহা ভারতবর্ষ হইতেই অগ্নিমূল্যে ক্রীত। এ সকল কথা এখন পাশ্চাত্য-পণ্ডিতবর্গও মুক্তকণ্ঠে স্বীকার করিতেছেন। ভারতবর্ষের পুরাতন বাণিজ্যপথ অধিকার করিবার আশায় নিরন্তর কত সময়কোলাহলে এসিয়ার পশ্চিম * Homer does not mention the name of India, but he was acquainted with the art-wares of Sidon, a Mediterranian out port of the Eastern trade.--Hunter's llisture of British India, vol. I. p. 19. + If the commerce with India became a source of fortune to the industrious trader, and an important branch of revenue to the government, the introduction of the products of the East also led to stimulate and increase the already excessive luxury which prevailed at Rome. Researches of Ancient and Modern India. | Danver's Portuguese in India-Introduction.
ফিরিঙ্গি বণিক প্রদেশ প্রতিধ্বনিত হইত। এই বাণিজ্যপথ যখন যে জাতির অধিকার- হইয়াছে, তখনই সেই জাতি শুল্কসঞ্চয় করিয়া, পণ্যদ্রব্যের ক্রয়- বিক্রয়ে অর্থসঞ্চয় করিয়া, অল্পদিনের মধ্যেই সমৃদ্ধ হইয়া উঠিয়াছে। এই বাণিজ্যপথ যখন যে জাতির অধিকার-বিচ্যুত হইয়াছে, তখনই সেই জাতি দেখিতে না দেখিতে, বায়ুতাড়িত ধূলিপটলের ন্যায় সৌভাগ্যবেলা হইতে ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত হইয়া পড়িয়াছে। তাহাদের পুরাতন রাজধানীর ধ্বংসাবশেষ অদ্যাপি কত স্থানে এই পুরাকাহিনীর অতীতসাক্ষিরূপে দণ্ডায়মান আছে। এই সকল কারণে ভারতীয় বাণিজ্যপথ করতলগত করিবার প্রবল প্রয়াস সকল জাতির মধ্যেই অল্পাধিক মাত্রায় লক্ষিত হইয়াছে। এই পথ কখন কাদীয় রাজ্যের অধিকারে, কখন ইহুদীয় জাতির অধিকারে, কখন বা পারস্য, গ্রীস ও রােমের অধিকারে আনীত হইয়াছে। সেকালে এই সকল পুরাতন জাতি ভারতবর্ষের শিল্পদ্রব্যের ন্যায় বহুমূল্য দ্রব্য উৎপাদনের চেষ্টা করে নাই; তাহারা কেবল ভারত- বর্ষের নিকট ক্রয় করিয়া, অন্যত্র বিক্রয় ও তদ্বারা অর্থোপার্জন করিবার জন্যই, পুরাতন বাণিজ্যপথ অধিকার করিবার আশায়, শত সমরক্ষেত্রে বীরশােণিতে বসুন্ধরা রুধিরাক্ত করিয়াছে। পাশ্চাত্য জাতির এই সকল অন্তবিপ্লব ভারতীয় স্থলবাণিজ্যের অপকারসাধন করে নাই বরং বিবিধ জাতির প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ভারতীয় পণ্যদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি সাধিত করিয়া, ভারতবর্ষের অর্থাগমের পথ উত্তরােত্তর প্রশস্ত করিয়া দিয়াছে । স্থলপথের ন্যায় জলপথেও নানা প্রতিদ্বন্দ্বী কলহ-কোলাহলে লিপ্ত হইত। তাহারা কেবল বহন করিবার, কেবল ক্রয়বিক্রয়ের “দালাল” হইবার, কেবল ভারতবর্ষের পণ্যদ্রব্য বিদেশে বিস্তার করিবার অধিকার- লাভাৰ্থ ই কলহ-কোলাহলে লিপ্ত হইত। ইহাতে মিশর ও আরব দেশের লােকে ক্রমে ক্রমে সাগরপথে নৌচালন-কৌশল আয়ত্ত করিয়া সমুদ্র-যাত্রার প্রভাব ১ শক্তিশালী হইয়া উঠিয়াছিল। ভূমধ্যসাগরতীরের ফিনিসীয়-বণিক ভারতীয় পণ্যদ্রব্য সংগ্রহ করিবার আশায়, অর্ণবপােত সুসজ্জিত করিয়া বাণিজ্যপথগামী অশ্ব বা উষ্ট্ৰশ্রেণীর খরথুরােখিত ধূলিপটলের দিকে দৃষ্টি নিবন্ধ করিয়া দিন গণনা করিত। আরবীয়-নাবিকগণ প্রথমে স্বদেশের উপকূলভাগে ভারতীয় অর্ণবপােতের সমাগমপ্রতীক্ষায় কালক্ষয় করিতে করিতে, অবশেষে ভারতবর্ষে উপনীত হইয়া, সর্বাগ্রে পণ্যদ্রব্য ক্রয় করিয়া, বিদেশে বিক্রয় করিবার অধিকার সংস্থাপিত করিয়াছিল। তখন সমুদ্রযাত্রার প্রবল প্রভাব ভারতবর্ষের সর্বত্র সুপরিচিত ছিল। তখনও অনুদার সংকীর্ণ শিক্ষা ভারতবাসীকে গৃহকোটরনিবদ্ধ পেচকের ন্যায় অলীক গাম্ভীৰ্যসম্ভোগকেই মানব-জীবনের পরম পুরুষাৰ্থ বলিয়া মনুষ্যত্বহীন দাসজাতিতে পরিণত করিতে সমর্থ হয় নাই ! তখন তাহারা যে পথে উত্তাল তরঙ্গ অতিক্রম করিয়া দ্বীপপপদ্বীপে পদার্পণ করিয়াছে, সেই পথে ভারতীয় পণ্যদ্রব্যের সহিত শিক্ষা দীক্ষা ও সভ্যতার আদর্শ বহুদূরদেশে প্রচারিত করিয়া, কত অজ্ঞাত মানবসমাজকে সমুন্নত করি- য়াছে ; স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করিবার সময়ে, কত অজ্ঞাত রাজ্যের ধন- রত্ন আহরণ করিয়া, ভারতবর্ষের সুখসৌভাগ্য বর্ধিত করিয়াছে। ভারতবর্ষের চরণরেখাঙ্কিত সেই পুরাতন বাণিজ্যপথ অদ্যাপি বর্তমান। কিন্তু সে পথে আর ভারতীয় বাণিজ্যস্রোত প্রবাহিত হইতেছে না। * Not only Jews from earlier times (from the 6th century B. C.) and St. Thomas Christians from 68 A.D. but also Arab traders ( Moplahs ) both in pre-Islamic and Islamic times were settled on the Malabar coasts.-Rivas-15-salatin, notes. + বুদ্ধশিষ্য শাণবাসিক পরিনির্বাণকালে সুদূর সমুদ্রপথে বাণিজ্য-ব্যাপারে ব্যাপৃত থাকিবার কথা বৌদ্ধ-সাহিত্যে উল্লিখিত আছে। তাহা খৃষ্টাবির্ভাবের পাঁচশত বৎঙ্গরের পূর্ববর্তী কালের কথা।
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ইম-বিপ্লব The Caliph's curtains were of brocade with elephants and lions embroidered in gold. Four clephants caparisoned in peacock-silk stood at the palace-gate, and on the back of each were eight men of Sind-Sir. IV. Hunter, ইসলামের অভ্যুদয় পৃথিবীর ইতিহাসের একটি চিরস্মরণীয় ঘটনা। ইসলামের নামে যাহরা ইতিহাসে বিবিধ কলঙ্কের আরােপ করিয়া, ইম-দিগ্বিজয়কাহিনী নিতান্ত ভীতিপ্রদ করিয়া তুলিয়াছেন, তাহারা নিরপেক্ষভাবে ইতিহাসের মর্যাদারক্ষার জন্য আগ্রহপ্রকাশ করেন নাই। যাহার নাম পুরাতন পৃথিবীর সম্পূর্ণ অপরিজ্ঞাত, এরূপ অভিনব জাতি সহসা গাত্রোত্থান করিয়া, এসিয়াখণ্ডের পশ্চিমাঞ্চল অধিকার করিবা- মাত্র, দেখিতে না দেখিতে এসিয়া হইতে আফ্রিকা, এবং আফ্রিকা হইতে ইউরােপে, আত্মশক্তিবিস্তার করায়, ইউরােপীয়-লেখকবর্গ সেই উদ্যমাে- ন্মত্ত প্রবল জাতির প্রতি সমুচিত সমাদর প্রদর্শন করতে সম্মত হইতেন । সে অনুদার ধর্মান্ধ সংকীর্ণ সংস্কার ক্রমে দুরীভূত হইতেছে। মূলসূত্রের অনুসন্ধান করিলে, ইস্লামের অভ্যুদয়কেই পরােক্ষভাবে আধুনিক ইউরােপের অচিন্তিতপূর্ব অসীম অভুদয়ের মূল কারণ বলিয়া স্বীকার করিতে হয়। ইম বহুজাতির সম্মিলিভ শক্তির অপূৰ্ব বিকাশ। যাহারা বৌদ্ধ, সৌর বা মূর্তিপূজক রূপে এসিয়াখণ্ডের সমগ্র পশ্চিমাঞ্চল অধিকার করিয়া, স্মরণাতীত পুরাকাল হইতে বিবিধ সুখ দুঃখ, জয় পরাজয়, ও উন্নতি অবনতির ভিতর দিয়া ধীরে ধীরে অগ্রসর হইতেছিল, তাহারাই নবধর্মে দীক্ষিত হইয়া, সহসা এক অজেয় মহাশক্তিরূপে পৃথিবীর বসাের ও বােগদাদ ইতিহাস উদ্ভাসিত করিয়া তুলিয়াছিল। আরবের অনুর্বর মরুভূমির মধ্যে জন্মলাভ করিয়া, এই শক্তি যখন দিগ্বিজয়ে বহির্গত হয়, তখন ভারতীয় পুরাতন বাণিজ্য-পথ ইসলামের অধিকারভুক্ত হইতে বিলম্ব হয় নাই। ইস্লাম যাহাদিগকে ধৰ্ম্মদীক্ষায় দলভুক্ত করিয়া, দিগ্বিজয়ে বহির্গত হইয়াছিল, তাহারা কেবল অসিহস্তে ধরাতল রুধিরাক্ত করিয়াই জীবন- যাপন করে নাই। তাহারা পূর্বেও বাণিজ্য করিত, পরেও বাণিজ্য করিতে বিস্তৃত হয় নাই। মুসলমান খলিফাগণের বসােরা, বােদাদ প্রভৃতি বাণিজ্যপ্রধান স্থান এইরূপেই জগদ্বিখ্যাত হইয়া উঠিয়াছিল। খৃষ্টীয় সপ্তম শতাব্দীর প্রারম্ভে খলিফা ওমরের সংস্থাপিত বসাের। নগরী, এবং খৃষ্টীয় অষ্টম শতাব্দীর মধ্যভাগে খলিফা আল মনসুরের বােন্দাদ নগরী ভারতীয় স্থ-বাণিজ্য-পথের প্রধান কেন্দ্রস্থলে পরিণত হইয়া- ছিল। জলপথে যে সকল পণ্যদ্রব্য ভারতবর্ষ হইতে পারস্যোপসাগর দিয়া এক সময়ে “কালদীয় পথে” পশ্চিমাঞ্চলে ব্যাপ্ত হইয়া পড়িত, বােেরা নগরী তাহারই ঐশ্বৰ্যগর্বে ক্রমশঃ স্ফীত হইতে লাগিল। ইউ- রােপ যাহা কিছু ভারতীয় পণ্যদ্রব্য প্রাপ্ত হইত, তাহা ইল্লামের * Wlien the planet of the Musliin faith rose, and the bright effulgence of the Muslim sun shone on the East and the West, gradually the countries of Hindustan and the Dakhin were recepient of the rays of the moon of the Mahomedan faith, and Muslims commenced visiting those countries.-Riras-us-salatin, p. 399. + The Saracen Irabs, who under the conquering impulse of Islam, rext seized the countries of the Indo-Syrian route, soon vrealised its value. They were a trading not less than a fighting Tace, and Bussorala and Bagdad under the Caliphs became the opulent head-quarters of the Indian trade, Hunter's Ilistory of British Inuia, vol. I P. 29. ।
ফিরিঙ্গি বণিক অধিকারভুক্ত হইল, এবং ইউরােপের পুরাতন সুখসৌভাগ্য তিরােহিত হইবার উপক্রম ঘটিল। খৃষ্টজন্মভূমি মুসলমানের অধিকারভুক্ত হইবার পর, ইউরােপের খৃষ্টধৰ্ম্মানুরক্ত বীরপুঙ্গবগণ তাহার উদ্ধার-সাধন করিবার আশায়, অকুতােভয়ে যুদ্ধযাত্রা করিতে আরম্ভ করিলেন। ইহার মুখ্য লক্ষ্য ধৰ্ম্মকলহ বলিয়া ইতিহাসে সুপরিচিত হইলেও, তাহার সহিত বাণিজ্য কলহও সম্মিলিত হইতে বিলম্ব ঘটিল না। ভূমধ্যসাগরের বাণিজ্য-পরায়ণ নাবিকবর্গ ক্রমে ক্রমে ধৰ্ম্মযুদ্ধোন্মত্ত বীরবৃন্দের সহিত মিলিত হইয়া, কিছুদিনের জন্য ভারতীয় বাণিজ্যপথ পুনরায় হস্তগত করিবার চেষ্টা করিয়াছিলেন। সে চেষ্টা সফল হইলে, অল্প দিনেই হয় ত পুরাতন বাণিজ্যপথে ইউরােপীয় বণিশ্বর্গের পুরাতন বাণিজ্যাধিকার সুসংস্থা- পিত করিতে পারিত। কিন্তু মধ্য-এসিয়ার তুর্কিগণ প্রবল হইয়া, খৃষ্টীয় একাদশ শতাব্দী হইতে চতুর্দশ শতাব্দীর মধ্যে, ক্রমে ক্রমে সমগ্র স্থল- বাণিজ্যপথ হইতে ইউরােপের সমস্ত প্রভাব চিরকালের জন্য বিলুপ্ত করিয়া দিয়াছিল। “মিশরীয় পথে” ভারতীয় বাণিজ্য প্রবাহিত করিয়া, তদ্বারা পুরাতন স্থল-বাণিজ্য-পথের প্রাধান্য লােপ করিবার জন্য নানা চেষ্টা প্রবর্তিত হইয়াছিল। সুয়েজ হইতে নীল নদ পর্যন্ত জলপ্রণালী- খনিত হইয়াছিল ; লােহিতসাগরতীরে নুতন বন্দর সংস্থাপিত হইয়া- ছিল ,-মিশরদেশই ভারতীয় বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্রস্থলে পরিণত হইবে, এইরূপ অনুমিত হইয়াছিল। ইসলামের অভূদয়ে তাহাও ক্রমে ক্রমে ইউরােপের হস্তবিচ্যুত হইয়া গেল। রাজাধিকার অপেক্ষা বাণিজ্যাধিকারের চেষ্টাই ভূমধ্যসাগরতীরের পুরাতন জনপদবাসিগণের প্রধান লক্ষ্য হইয়া উঠিতে লাগিল। স্থলপথ অপেক্ষা জলপথই কলহ- কোলাহলের প্রধান ক্ষেত্রে পরিণত হইল। ইসলাম স্থলপথে বিজয়- পতাকাহস্তে দেশ হইতে দেশান্তরে অধিকারবিস্তার করিল। ইসলাম প্রাচ্যবিদ্বেষের সূত্রপাত জলপথেও রণতরণী সজ্জীভূত করিয়া, জলযুদ্ধের আয়ােজনে ব্যস্ত হইয়া উঠিল। পুরাকালে ভূমধ্যসাগরতীরের যে সকল জাতি নির্বিবাদে বাণিজ্য করিয়া অর্থোপার্জন করিত, তাহাদের মধ্যে কেহ বাণিজ্যের জন্য, কেহ বা বাণিজ্যদ্রব্য লুণ্ঠন করিবার জন্য, বাণিজ্যপােতকে রণ- পােতে পরিণত করিতে আরম্ভ করিল। এক দিকে প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের সমর-কোলাহল, অন্য দিকে প্রতীচ্য জলদস্যুর আক্রমণ ও লুণ্ঠনকৌশল খৃষ্টীয় পঞ্চদশ শতাব্দীতে ভূমধ্যসাগরতটে অরাজকতার অত্যাচার বদ্ধমূল করিয়া দিল। একদা বাণিজ্য-পথ হিন্দু ও বৌদ্ধের অধিকারভুক্ত থাকিয়া, প্রাচ্য ও প্রতীচ্য রাজ্যের মধ্যে বিবিধ পণ্যসম্ভার বিনিময় করিতে গিয়া, জ্ঞানবিস্তারে পুরাতন সভ্যসমাজকে সমুন্নত করিত ; সৰ্বত্ৰ সুখসৌভাগ্য বিবর্ধিত করিয়া, শান্তি-সাম্রাজ্য-সংস্থাপনের আশায় সমগ্র মানব-সমাজকে এক অখণ্ড মহাপরিবারে পরিণত করিবার আয়ােজন করিত ;-সে শান্তি তিরােহিত হইয়া গেল। নূতন আশা, নূতন উৎসাহ, নুতন নীতি, নূতন পথে প্রতীচ্য মানব-সমাজকে প্রাচ্য-বিদ্বেষে পূর্ণ করিতে লাগিল। ইহাই ইতিহাসে “ইসলা-বিপ্লব” বলিয়া পরিচিত। প্রতীচ্য লেখকবর্গ যে ভাবে এই “ইসলাম-বিপ্লব” লিপিবদ্ধ করি- তেন, তাহাতে পাঠকচিত্ত ইসলামের নামে ঘৃণা, ঈর্ষা ও অসঙ্গত ইসলাম- বিভীষিকায় পূর্ণ হইয়া উঠিত। ইস্লাম কেবল ধ্বংসলীলার দানবশক্তি বলিয়াই প্রতিভাত হইত। নিয়ত কৃপাণস্কন্ধে বসুন্ধরা নরশােণিতে প্লাবিত করাই যেন ইসলামের ধর্ম ; কুঠারহস্তে পৃথিবীর পুরাতন কীর্তি- চিহ্ন খণ্ড-বিখণ্ডিত করাই যেন ইস্লামের পুণ্যব্রত ; জলে স্থলে ছল প্রতারণায় নিয়ত পরপহরণ করাই যেন ইসলামের প্রধান লক্ষ্য। অধিক কি, মানব-সভ্যতার উজ্জ্বল প্রদীপ ফুৎকারে নির্বাপিত করিয়া, উন্নতিসােপান তমসাচ্ছন্ন করাই যেন ইস্লামের অতৃপ্ত আকাঙ্ক্ষা বলিয়া tv ১৪ ফিরিঙ্গি বণিক কত পাশ্চাত্য ভাষায় কত অপূৰ্ব্ব ইতিহাস, আখ্যায়িকা ও মহাকাব্য রচিত হইয়াছিল। সে দিন ধীরে ধীরে সুদূরে চিরপ্রস্থান করায়, আধুনিক সত্যানুসন্ধানপ্রীতি নূতন ভাবে ইসলামের অভ্যুদয়-কাহিনী কীৰ্ত্তন করিতে অগ্রসর হইয়াছে। ইসলাম সত্যসত্যই কৃপাণস্কন্ধে বহু দেশের বহু সমরক্ষেত্র নর- শােণিতে অনুরঞ্জিত করিয়াছিল। ইসলাম সত্যসত্যই কুঠার-হস্তে বহু পুরাতন কীৰ্তিচিহ্ন বিলুপ্ত করিবার কারণ হইয়া উঠিয়াছিল। ইলাম সত্যসত্যই জলে-স্থলে ছল-প্রতরণায় পরস্পাপহরণের চেষ্টা করিতেও ক্রটি করে নাই। কিন্তু তাহাই পৃথিবীর সকল জাতির প্রথম অভুদয়কালের সাধারণ কাহিনী। তাহা ঝটিকা-সমাগমের প্রথম প্রকোপ। সে প্রকোপ প্রশমিত হইবার পর, ইসলাম জ্ঞানবিস্তারে ইউরোপের নবজীবনদানের কারণ হইয়া উঠিয়াছিল। ইসলামের ধ্বংসলীলার অভাব নাই ; ইস্লামের গঠনপ্রতিভার সমুচিত সমাদর সুপ্রতিষ্ঠিত করিবার জন্য ইতিহাস যথাযােগ্য আয়োজন না করায়, ধ্বংসলীলাই ইসলামের একমাত্র ঐতিহাসিক চিত্র বলিয়া পরিচিত হইয়া রহিয়াছে। ভারতবর্ষের সহিত ইসলামের প্রথম সম্বন্ধ কেবল বাণিজ্য-সম্বন্ধ। সে সম্বন্ধে ভারতবর্ষ বিক্রেতা, ইসলাম ক্রেতা ;-ভারতবর্ষ বণিক-রাজ, ইলাম তাহার পণ্যবাহক। পুরাকাল হইতে যাহারা পারস্যোপসাগর ও লােহিতসাগর উত্তীর্ণ হইয়া, পুরাতন “কাদীয়” ও “মিশরীয় পথে ভারতীয় পণ্যদ্রব্য বহন করিয়া অর্থোপার্জন করিত, তাহারা মূর্তিপূজার পরিবর্তে ইসলামের নব ধর্মমত গ্রহণ করিয়া, পূৰ্বব্যবসায় পরিত্যাগ করে নাই। স্থলপথে ও জলপথে তাহাদের পুরাতন বাণিজ্য- .. যাত্রা পূৰ্ব্ববৎ প্রচলিত ছিল। এই বাণিজ্যপ্রবাহ সেকালের সমগ্র এসিয়খণ্ডের সহিত ভারতবর্ষের সুদৃঢ় সম্বন্ধ সংস্থাপিত করিয়া দিয়া- .
প্রথম সংঘর্ষ ছিল। সুদূর চীন, জাপান ও প্রশান্তমহাসাগরের অসংখ্য দ্বীপপুঞ্জ হইতে যে সকল পণ্যদ্রব্য সিংহলে সংগৃহীত হইত, তাহার সহিত অঙ্গ বঙ্গ কলিঙ্গের শিল্পসম্ভার মিলিত হইয়া, সিংহলকে প্রাচ্য-পণ্যদ্রব্যের অনন্ত ভাণ্ডারে পরিণত করিয়াছিল। এই পণ্য সংগ্রহের জন্য আরবীয় নাবিকগণ "তৎকালে এসিয়াখণ্ডের সমগ্র সমুদ্রোপকূলে গতিবিধি করিত। তাহাদের অর্ণবপােত সিংহল হইতে মেলাবার-তীরসংলগ্ন সমুদ্রবক্ষে সিন্ধু-সাগরসঙ্গমের নিকটবর্তী পুরাতন পথেই পারস্যোপ- সাগরে প্রবেশ করিত। এই সুদীর্ঘ সমুদ্রযাত্রায় তাহাদিগকে পণ্য- সংগ্রহের জন্য, পণ্য-বিনিময়ের জন্য ও খাদ্য-সঞ্চয়ের জন্য ভারতবর্ষের বিবিধ বন্দরে উপস্থিত হইতে হইত। তাহাদের বাণিজ্যপােতে বণিক ভিন্ন তীর্থযাত্রিগণও ইসলামের পুণ্যতীর্থ দর্শন করিবার আশায় আশ্রয় গ্রহণ করিত। খৃষ্টীয় অষ্টম শতাব্দীর প্রারম্ভে এইরূপে ইসলাম বাণিজ্য- পােত সিংহল হইতে সিন্ধুসাগর-সঙ্গমের নিকটবর্তী হইলে, সিন্ধুনিবাসী হিন্দুগণ তাহাদের প্রতি অসদ্ব্যবহার করায়, ইসলাম-শক্তি জলপথে সিন্ধুরাজ্য আক্রমণ করিতে বাধ্য হইয়াছিল। ভারতবর্ষের বিরুদ্ধে ইহাই ইলামের প্রথম অভিযান। তাহার সহিত অকারণ নর-শােণিতপিপাসা বা দিগ্বিজয়-লালসায় সম্বন্ধ ছিল না ;—তাহা কেবল অত্যাচারের প্রতিবিধান কামনায় অত্যাচার-প্ৰয়ােগ। তাহাই মানবসমাজের চিরন্তন ঐতিহাসিক তথ্য। এই অভিযানে সিন্ধুদেশের সহিত ইস্লাম-সাম্রাজ্যের যে সম্বন্ধ সংস্থাপিত হয়, তাহা ইসলামের বােগদাদ রাজধানীকে জ্ঞানালােচনায় সমুন্নত করিবার কারণ হইয়া উঠিয়াছিল। খলিফাগণ হি, গ্রীক ও সংস্কৃত সাহিত্য হইতে জ্ঞানাহরণ করিবার আশায় আরবীয় ভাষায় গ্রন্থানুবাদ করাইতে প্রবৃত্ত হইয়া, অল্পকালেই আরবীয় সাহিত্যের শ্রীবৃদ্ধিসাধন করিয়া, তাহার গৌরবধােষণায় সুদূর ইউরােপের দ্বারদেশে উচ্চচুড় বিদ্যামন্দিরনির্মাণে কৃতসংকল্প হইয়াছিলেন। তখন ফিরিঙ্গি বণিক ইউরােপ পূৰ্বাশিক্ষা বিচ্যুত অনুন্নত অর্ধশিক্ষিত কলহকোলাহলময় মানবসমাজে পরিব্যাপ্ত। তাহারা ধর্মের নামে ধর্মান্ধ হইয়া নিরপরাধ নরনারীকে চিতামঞ্চের যূপকাষ্ঠে বন্ধন করিয়া, জীবিতাবস্থায় অগ্নি- সৎকার করিত। তাহারা ধৰ্ম্মমতের প্রাধান্য-রক্ষার্থ, স্বাধীন, সত্যনিষ্ঠ বিমল জ্ঞানজ্যোতিকে পাশবশক্তিবলে পরাহত করিয়া; ধৰ্ম্ম বিস্তার করিত। তাহারা গ্রীস ও রােমের পুরাতন সাহিত্যনিহিত জ্ঞানভাণ্ডারকে কুসংস্কারলব্ধ অলংক উপাখ্যানবােধে প্রত্যাখ্যান করিয়া বৰ্বর হইয়া উঠিয়াছিল। ইসলামের বিবিধ বিদ্যালয় ইউরােপের অন্তর্গত স্পেনরাজ্যে যে জ্ঞানবিস্তারে ব্যাপৃত ছিল, তাহা হইতে চিকিৎসাবিদ্যা ও গণিত- বিজ্ঞান সমগ্র ইউরােপে ব্যাপ্ত হইবার সূত্রপাত হইল। ভারতবর্ষ, গ্রীস, মিশর প্রভৃতি পুরাতন সভ্য দেশের সযত্নসঞ্চিত জ্ঞানভাণ্ডার হইতে ইলাম বহু শ্রমে যে জ্ঞানরত্ন-সংকলনে প্রবৃত্ত হইয়াছিল, তাহা ক্রমে এসিয়া হইতে আফ্রিকা ও আফ্রিকা হইতে ইউরােপে ব্যাপ্ত হইয়া, পাশ্চাত্য মানবসমাজের সমুন্নতিলাভের কারণ হইয়া উঠিল। সমগ্র মানবসমাজের সভ্যতার ইতিহাসে ইহাই ইসলামের অতুল কীর্তি ; তাহা স্বর্ণাক্ষরে লিখিত হইবার যােগ্য। যখন ইলাম এইরূপে আধুনিক ইউরােপকে নবজীবনদানে প্রবৃত্ত, তখন ইউরােপীয় মা-বসমাজ পূৰ্ব্বাপেক্ষা অধিক আগ্রহে ভারতবর্ষের দিকে আকৃষ্ট হইতে লাগিল। ভারত-বাণিজ্য হস্তগত করিবার উপায়- উদ্ভাবন করাই সমগ্র ইউরােপের প্রধান ও প্রবল আকাঙ্ক্ষার পরাকাষ্ঠায় পরিণত হইল। সেকালের এই অতৃপ্ত আকাঙ্ক্ষা ভারতবর্ষে পণ্যদ্রব্য বিক্রয় করিয়া অর্থোপার্জন করিবার বর্তমান আকাঙ্ক্ষা হইতে সম্পূর্ণ পৃথক। সেকালের ইউরােপীয় জনসমাজ শিল্পদ্রব্য প্রস্তুত করিবার কৌশলে ভারতবর্ষের সমকক্ষ বা শ্রেষ্ঠ হইবার আশা কল্পনা করিতেও সাহস করিত না। তাহারা কেবল নির্বিবাদে ভারতীয় পণ্যদ্রব্য-বহন ইসলাম প্রভাব ; ও তাহার ক্রয়বিক্রয়ব্যাপারে অর্থোপার্জন করিবার অধিকার লাভ করিতে পারিলেই পরিতৃপ্ত হইত। ইসলাম-বিপ্লব সে আশা নির্মূল করিয়া, সমস্ত সুপরিচিত পুরাতন বাণিজ্যপথ করতলগত করিয়াছিল। তাহা আর সহসা ইসলামের হস্তচ্যুত হইবার সম্ভাবনা ছিল না। ইস- লামের রণতরণী, জলপথে নবশক্তির বিকাশ-সাধন করিয়া, সৰ্ব্বত্র অজেয় হইয়া উঠিয়াছিল ;-ইসলামের সেনাবল স্থলপথকে ইউরােপীয় জনসমাজের পক্ষে নিরতিশয় দুর্গম করিয়া তুলিয়াছিল। শক্তি-পরীক্ষায় অগ্রসর হইয়া, ইউরােপীয় খৃষ্টানগণ এসিয়ার মুসলমানের সহিত যে সকল যুদ্ধ কলহে লিপ্ত হইতেন, তাহাতে কখন কখন জয়লাভ করলেও, তাহার ফল দীর্ঘস্থায়ী হইত না। অবশেষে ইসলামের হস্তে পুরাতন বাণিজ্যপথ সমৰ্পণ করিয়া, ইউরােপীয় জনসমাজ নূতন পথের আবিষ্কার সাধন করিবার জন্যই ব্যগ্র হইয়া পড়িল। পুরাতন পথ রুদ্ধ হইল না। সে পথে ভারত-বাণিজ্য ধীরে-ধীরে ইউরােপে বিস্তৃত হইতে লাগিল । -কিন্তু তাহার প্রধান লভ্যাংশ আর ইউরােপীয় খৃষ্টানগণকে সমৃদ্ধিদান করিল না। তাহা ক্রমে ইলামের সৌভাগ্য বর্ধিত করিতে লাগিল। ইহাতে ইউরােপকে কেবল ক্ষতিস্বীকার করিয়া, অগ্নিমূল্যে ভারতীয় পণ্যদ্রব্য ক্রয় করিতে হইত। ইহাতেই ইউরােপ দিন দিন অর্থমােক্ষণে দুৰ্বল হইয়া পড়িল। এই সময়ে ইউরােপে শিল্পচর্চার সূত্রপাত হয়। কিন্তু শিল্প- দ্রব্যের অধিকাংশ উপকরণের জন্য ইউরােপকে প্রাচ্য-রাজ্যের মুখাপেক্ষী হইয়া নিতান্ত অসহায় অবস্থায় কালযাপন করিতে হইত। ইসলাম ইউবােপকে যে তীব্র তাড়নায় ব্যতিব্যস্ত করিয়াছিল, তাহা যদি ইউরােপকে উদ্যমশূন্য করিতে পারি, তাহা হইলে ইসলামই পৃথিবীর সৰ্বপ্ৰধান মহাশক্তিরূপে অদ্যাপি মানবসমাজের শীর্ষস্থানে প্রতিষ্ঠিত থাকিত। ইসলামের নবােন্তম যাহা অধিকার করিয়াছিল, ইসলামের t ১৮ ফিরিঙ্গি বণিক অধ্যবসায় তাহা অধিক দিন রক্ষা করিতে সমর্থ হয় নাই। ইউরােপ বাহুবলে পরাজিত হইলেও, হৃদয়বলের অপরাজিত উৎসাহে স্বাধীনতা- লাভের উপায়-উদ্ভাবনে নিয়ত যত্নশীল হইয়াছিল। প্রাচ্য ও প্রতীচ্য মানবসমাজের এই প্রকৃতিগত প্রবল পার্থক্যই ইস্লামের অধঃপতনের ও ইউরােপের অভ্যুদয়ের ঐতিহাসিক কারণ। এক, পথে প্রতিহত হইয়া, অন্য পথের আবিষ্কারের জন্য ইউরােপ যে অপূৰ্ব অধ্যবসায়ের পরিচয় প্রদান করিয়াছে, তাহা মানবসমাজের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হইয়া রহিয়াছে। অভিনব বাণিজ্যপথের আবিষ্কার-কামনায় ইউরােপ জল স্থল পথেই ধাবিত হইয়াছিল। যাহারা এই দুষ্কর কাৰ্যে অগ্রসর হইয়া- ছিলেন, তাহাদের অনেকের নাম বিস্মৃতিগর্ভে বিলীন হইয়া গিয়াছে। যাহাদের নাম অদ্যাপি লােকসমাজে সুপরিচিত, তাহারা কিরূপ উদ্যমে, কত ক্লেশে, কত অধ্যবসায়ে, স্বকাৰ্যসাধনে প্রবৃত্ত হইয়াছিলেন, তাহার বিবরণ শিক্ষাপ্রদ। একের চেষ্টায় যাহা কিছু সংসাধিত হইতে পারে, তাহা নিতান্ত অকিঞ্চিৎকর। রাজা ভিন্ন জনসমাজের জন্য কাহারও একাকী কোন বৃহদ্ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করিয়া সফলকাম হইবার আশা নাই। নানা কারণে বাণিজ্য-ব্যাপারে বহু জন একত্র মিলিত হইবার প্রয়ােজন উপ- লব্ধ হইতে লাগিল। ইসলাম-বিপ্লবই ইউরােপকে এই মহাশিক্ষা প্রদান করিবার প্রকৃত কারণ। বণিশ্বর্গের সমবেত-শক্তি একত্র প্রয়ােগ করিবার প্রথম প্রয়ােজন ইসলাম-বিপ্লব-কালেই অনুভূত হইয়াছিল। সে প্রয়ােজন যেমন বাণিজ্যৰক্ষাৰ্থ সমবেতশক্তির একত্র প্রয়ােগের উপকারিতা বুঝিতে পারিয়াছিল, সেইরূপ নূতন বাণিজ্য-পথের আবি- স্কারকালেও সমবেত-শক্তির একত্র প্রয়ােগের উপকার স্বীকার করিতে বাধ্য হইয়াছিল। ইহাই ইউরােপীয় বিবিধ কোম্পানীর মূল-রহস্য।
তৃতীয় পরিচ্ছেদ নূতন স্থল-বাণিজ্য-পথের সন্ধান-চেষ্টা The modern first-class Powers.--France, Germany, Austria, Russia, Italy, Great Britain,--were not yet built up. Spain was still divided between Castile, Iragon and the Moors. Europe remained a continent of principalities, duchies, counties, little oligarchies, and little republics.--Sir IV. Hunter. ইসলাম-বিপ্লব-বিপৰ্যস্ত ইউরােপীয় খৃষ্টান-সমাজ যখন ভারত- বাণিজ্যের অভিনব স্থলপথ আবিষ্কৃত করিবার চেষ্টায় পূৰ্বাভিমুখে পৰ্যটক প্রেরণ করিতে আরম্ভ করে, তখন ইউরােপ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র খণ্ডরাজ্যে বিভক্ত ছিল। তখনও ইউরােপীয় প্রবল পরাক্রান্ত রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হইয়া, খৃষ্টানশাসনকে পৰ্যাপ্তরূপে শক্তিশালী করিতে সমর্থ হয় নাই। বলে বলীয়ান হইয়া আধুনিক ইউরােপ জগদ্বিখ্যাত হইয়াছে, তখন পৰ্যন্ত সেই জ্ঞানবল সঞ্চিত হয় নাই। তখনও প্রাচ্যরাজ্যের তুলনায় প্রতীচ্য রাজ্য অশিক্ষিত। এক দিকে নানা নুতন শিক্ষার সন্ধানলাভ করিয়া, অন্য দিকে বলদৃপ্ত মুসলমান শক্তির নিকট উপর্যপরি অপদস্থ হইয়া, সমগ্র ইউরােপেই শক্তিসঞ্চয়ের জন্য জনসমাজ ব্যাকুল হইয়া উঠিয়াছিল। যে সকল বাণিজ্যপ্রধান ইউরােপীয় মহানগর একদা ধন- রত্নে পরিপূর্ণ হইয়া, আশাতীত ঐশ্বৰ্য-গৰ্বে খৃষ্টান-জগতের নরনারীকে নিয়ত প্রলুব্ধ করিত, ইসলাম-বিপ্লবে তাহা জনশুন্য অরণ্যমাত্ৰে পৰ্য- বসিত হইয়া, সমগ্র ইউরােপকে ব্যথিত করিয়া তুলিয়াছিল। ইউরােপ তাহার জন্য হাহাকার করিয়াছিল। সেই করুণ আর্তনাদ পুরাতন ফিরিঙ্গি বণিক সাহিত্যের মধ্যে অদ্যাপি ধ্বনিত হইয়া উঠিতেছে। কিন্তু তাহা অসমর্থ, অপদার্থ, আত্মগৌরব-বােধশূন্য, অবসন্ন জাতির চিত্তক্ষোভ হইতে সম্পূর্ণ পৃথক্ বেদনায় ইউরােপকে ব্যথিত করিয়া তুলিয়াছিল। সেই ব্যথাই ব্যথামােচনের উপায়-উদ্ভাবনের জন্য প্রবল আকাঙ্ক্ষা উত্তেজিত করিয়াছিল। ইউরােপ স্বতন্ত্র স্বতন্ত্র ক্ষুদ্র রাজ্যে বিভক্ত হইলেও, ধৰ্ম্মা- চাৰ্য পােপ খৃষ্টান-ইউরােপের সৰ্ববাদিসম্মত প্রধানপুরুষ বলিয়া সুপরিচিত ছিলেন। পােপ হইতে নগণ্য নাবিক পর্যন্ত সকলেই স্বতন্ত্রভাবে একই চিন্তায় ব্যতিব্যস্ত হইয়াছিলেন। নূতন স্থল-বাণিজ্য পথের সন্ধান-চেষ্টা এইরূপে আরব্ধ হয়। আরব হইতে মুসলমান-ধৰ্ম্ম এসিয়াখণ্ডের জলে স্থলে ব্যাপ্ত হইবার সময়ে, বৌদ্ধধৰ্ম্মই এসিয়ার অধিকাংশ নরনারীর প্রচলিত ধৰ্ম্ম বলিয়া পরিচিত ছিল। দেশভেদে, কালভেদে, পাত্রভেদে, শাক্যসিংহের দার্শ- নিক ধর্মতত্ত্বের সহিত কত লােকাচার দেশাচার জড়িত হইয়া, এসিয়ার বৌদ্ধধৰ্ম্মকে বহুসংখ্যক বিভিন্ন সম্প্রদায়ে বিভক্ত করিয়া রাখিয়াছিল। ইসলাম পশ্চিম-এসিয়াখণ্ডে ধৰ্ম্মরাজ্য বিস্তৃত করিবার সময়, সকল স্থান খলিফাগণের রাজশাসন স্বীকার করে নাই ;-ধৰ্ম্মে এক হইয়াও, রাজতন্ত্রে স্বতন্ত্র থাকিয়া, এসিয়ার মুসলমানগণ দেশভেদে নামভেদ প্রাপ্ত হইয়াছিল। যাহারা খৃষ্ট-জন্মভূমি অধিকার করিয়া, সমগ্র ইউরােপের সহিত ধর্মযুদ্ধে আহূত হইয়াছিল, তাহাদের পদোন্নতি লক্ষ্য করিয়া, তাতার দেশের মুসলমান বীরগণ তাহা অধিকার করিবার আশায় দলে দলে পূৰ্ব্ব হইতে পশ্চিমাঞ্চলে ধাবিত হইতে আরম্ভ করে। পূর্ব দিক হইতে তাতার ও পশ্চিম দিক হইতে ইউরােপ যুগপৎ আক্রমণ করিয়া, ই- লামশক্তিকে চূর্ণ করিয়া, এসিয়ার পুরাতন বাণিজ্য-পথ ভাগ করিয়া লইবে বলিয়া আশঙ্কা উপস্থিত হইয়াছিল। যে মন্ত্রে উত্তরকালে ভেদনীতি ইউরােপ সমগ্র এসিয়াখণ্ডে প্রাধান্য লাভ করিয়াছে, প্রথম সংঘর্ষকালেই সেই মন্ত্র প্রথমবার ব্যবহৃত হয়। তাতারদেশের মুসলমানকে দিয়া ইসলামের মূলশক্তি পরাস্ত করিবার জন্য ইউরােপ উপহার উপঢৌকন সমভিব্যাহারে খা-সাহেবদিগের জয়স্কন্ধাবারে দূত প্রেরণ করিতে আরম্ভ করে। তাতারগণ খৃষ্টীয় ত্রয়ােদশ শতাব্দীর প্রারম্ভে পারস্যদেশে, কাস্পীয়ান- তীরে ও কৃষ্ণসাগরতটে অধিকার বিস্তার করিয়া, অধিকাংশ বাণিজ্যপথ করতলগত করিয়াছিল। ভয়া নদী ও কাস্পীয়ান হ্রদের সঙ্গমস্থল এসিয়া-ইউরােপের বাণিজ্য-পথের সর্বপ্রধান সন্ধিস্থল বলিয়া পরিচিত ছিল। তাতারগণ ভরা নদীর সন্ধিস্থলেও শিবির-সন্নিবিষ্ট করিয়াছিল। সুতরাং সেই পথে ভারতীয় পণ্যদ্রব্য অনায়াসে সমগ্র ইউরােপে ব্যাপ্ত হইতে পারিবে ভাবিয়া, ইউরােপীয় ধর্মাচাৰ্য্য ও তাহার অনুগত প্রধান শিষ্য ফরাসী নরপতি সেন্ট লুই ভাতারদিগের সহিত মিত্ৰতা- সংস্থাপনের জন্য নানারূপ আয়োজন করিয়াছিলেন। দৌত্য সফল হইল না। তাতারগণ আত্মবিক্রয় করিল না। তাহা দিগকে বাহুবলে পরাভূত করিবার শক্তি না থাকায় ইউরােপকে অগত্যা ক্ষুন্নহৃদয়ে তাতার-সৌহার্দ্য পরিত্যাগ করিতে হইল। সাক্ষাৎসম্বন্ধে ভগ্নমনােরথ হইলেও, এই দৌত্যকাৰ্যে ইউরােপ অনেক শিক্ষা লাভ করিল। কৃষ্ণসাগর ও কাস্পীয়ান হ্রদের তীর হইতে মধ্য-এসিয়ার মরু- ভূমি পর্যন্ত যে পুরাতন বাণিজ্য-পথ প্রচলিত ছিল, তাহার সমগ্র ভৌগােলিক বিবরণ প্রকাশিত হইয়া পড়িল। তাহা লিখিত ও অনুদিত হইয়া, ইউরােপের বিবিধ প্রদেশে সযত্নে অধীত হইতে লাগিল। মুসলমান-শক্তির অভ্যন্তরেই যে তাহার অবশ্যম্ভাবী ধ্বংসবীজ গুপ্ত হইয়া রহিয়াছে, তাহারও নানা পরিচয় প্রকাশিত হইয়া পড়িল। এই দৌত্যকাৰ্য্য সফল হইলে, মধ্য-এসিয়ার ন্যায় ইউরােপকেও স্থলযুদ্ধের ফিরিঙ্গি বণিক কৌশল-উদ্ভাবনে চিরনিবিষ্ট করিয়া, অশ্বপালকরূপে অশ্বশালায় জীবন- যাপন করিতে বাধ্য করিত ;-জলপথ উপেক্ষিত হইয়া, ইউরােপের আধুনিক সমুন্নতিলাভের প্রধান পথ চিররুদ্ধ করিত। এসিয়ার ন্যায় ইউরােপকেও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র খণ্ডরাজ্যে বিভক্ত হইয়া, ক্ষুদ্র জয়পরাজয় লইয়াই ব্যাপৃত থাকিতে হইত। দৌত্য সফল হইল না বলিয়াই, ইউরােপকে বাধ্য হইয়া নূতন স্থল-বাণিজ্য-পথের সন্ধান-চেষ্টা পরিত্যাগ করিতে হইল। এই সামান্য ঘটনা বিচ্ছিন্নভাবে পর্যালােচনা করিলে, ইহা ইউরােপের ইতিহাসের একটি নগণ্য ঘটনা বলিয়া উপেক্ষিত হইতে পারে। কিন্তু আদ্যন্তের সহিত একত্ৰ পৰ্যালােচনা করিলে, ইহাকেই আধুনিক পৃথিবীর ইতিহাসের সর্বপ্রধান ঘটনাবলীর সংখ্যাভুক্ত করিতে হয়। মনীষিগণ সেই ভাবে এই দৌত্য-বিবরণী পাঠ করিয়াছিলেন বলিয়া, ইউরােপ পথভ্রান্ত হইবার প্রথম উপক্রমেই সাবধান হইতে সমর্থ হইয়াছিল। কৃষ্ণ-সাগর-পথে ভারতীয়-পণ্যদ্রব্য-বহনের অভিনব স্থল-বাণিজ্যপথ আবিষ্কার করিবার আশায়, রাজদূত ব্যতীত নানা ধৰ্ম্মাচাৰ্য ও পরি- ব্রাজকগণও পদব্রজে ভূপ্রদক্ষিণে বহির্গত হইয়াছিলেন। তাহাদের মধ্যে মার্কো পােলাের নাম জগদ্বিখ্যাত। তিনি খৃষ্টীয় ত্রয়ােদশ শতা- ব্দীর শেষাংশে চতুর্বিংশতি বৎসর এসিয়াখণ্ডের জলে স্থলে নানা দেশ পৰ্যটন করিয়া, ইউরােপে প্রত্যাবর্তন করেন। তাঁহার ভ্রমণ-কাহিনী অদ্যপি সযত্নে মুদ্রিত ও অধীত হইয়া থাকে। তিনি স্থলপথে চীনদেশ পৰ্যন্ত গমন করিয়া, ভারতবর্ষের উপকূলসংলগ্ন সমুদ্রপথে পারস্যরাজ্যে উপনীত হইয়াছিলেন। ভারত-বাণিজ্যের জল স্থল সকল পথেরই সন্ধান লাভ করিয়া, এই বিশ্ববিখ্যাত পরিব্রাজক যখন স্বদেশে প্রত্যাবৃত্ত হইলেন, তখন স্থল অপেক্ষা জলপথের কথাই আলােচিত হইবার সূত্রপাত হইল। কৃষ্ণসাগরতীরে স্থলবাণিজ্য-পথের সন্ধান সেকালের এসিয়া করিবার চেষ্টা প্রবর্তিত হইবার সময়ে, আর এক দল অনুসন্ধাননিপুণ পরিব্রাজক ভূমধ্যসাগরপথে মিশরদেশে উপনীত হইয়া, তথা হইতে সিরিয়ার বাণিজ্য-পথের অনুসন্ধান করিবার জন্য যত্ন করিতে প্রবৃত্ত হইয়াছিলেন। খৃষ্টীয় ত্রয়ােদশ হইতে পঞ্চদশ শতাব্দী পর্যন্ত এইরূপে বিবিধ উপায়ে স্থল-বাণিজ্য-পথের সন্ধানচেষ্টা পরিচালিত হইবার প্রমাণ প্রাপ্ত হওয়া যায়। কোন অভিনব তত্ত্বের আবিস্কার সাধন করিতে হইলে, পরিণামে সৰ্ব্বথা সফলকাম হইবার মূলসূত্র অধ্যবসায়। তাহা বিচারবুদ্ধির আশ্রয় গ্রহণ করিলে, কালে কাম্যফল প্রদান করিয়া, সকল শ্রম সফল করিয়া থাকে। পৃথিবীর ইতিহাসে ইহার উদাহরণের অভাব নাই। ইউরােপ যে অকুতােভয়ে, অপরাজিত অধ্যবসায়ে ভারত-বাণিজ্য-পথের সন্ধান- চেষ্টায় তিন শত বৎসর অক্লান্ত-চরণে এসিয়ার মরুগিরি ও মহারণ্যে বিচরণ করিয়া গলদঘর্ম হইয়াছিল, তাহাতে সন্দেহ নাই। কিন্তু সে অধ্যবসায় বিচারবুদ্ধির আশ্রয় গ্রহণ করায়, অল্পদিনের মধ্যেই ইউরােপ বুঝিয়াছিল,-স্থলপথে সিদ্ধকাম হইবার সম্ভাবনা নাই। তখনও বাষ্প-যান প্রচলিত হয় নাই। তখনও লৌহবত্ম পৃথিবীর পূৰ্ব্বপশ্চিমকে অনায়াস-গম্য করিয়া, কৌতুহল-প্রিয় ভুবনভ্রমণশীল বিলাসিবর্গের বিলাসক্ষেত্রে সমগ্র এসিয়াকে উৎসর্গ করিবার কৌশল ইউরােপের অধিগত করিয়া দেয় নাই। সে দিন ইউরােপের শ্বেতচর্ম ও রক্তনেত্র, এসিয়াবাসীকে সভয়ে সন্ত্রস্তচরণে দূরে সরিয়া দাঁড়াইয়া সমুচিত সমাদরপ্রদর্শনের শিষ্টাচার শিক্ষায় মনুষ্যত্বহীন করিয়া, দৃষ্টিমাত্রে দিগ্বিজয়সাধনের অব্যর্থ কৌশল উদ্ভাবিত করিতে সমর্থ হয় নাই। সে দিন বড় কঠিন দিন বলিয়াই পরিচিত ছিল। তখন বৌদ্ধপ্রভাব এবং সৌজন্য-সদাচার তিরােহিত হইয়াছিল। তখন কৃষক তাহার হলফলক লইয়া তরবারি নির্মাণ করিত ;-এসিয়া তাহার পুরাতন প্রফুল্লবদন २४ ফিরিঙ্গি বণিক কুটকুটীল বিভীষিকার আধার করিয়া, অশ্বপৃষ্ঠে প্রতীচ্য-বিজয়ে যাত্রা করিবার জন্য অশান্ত হইয়া উঠিয়াছিল। তখন মধ্য-এসিয়ার জীবন- প্রতাত; ইউরােপের জীবন-সন্ধ্যা। তখন এসিয়া—আফ্রিকা ইউরােপে---সৰ্ব্বত্র—কেবল এসিয়ার কথাই সর্বপ্রধান আলােচ্য কথা। সে দিন যাহারা ইউরােপ হইতে এসিয়ায় উপনীত হইয়া বাণিজ্যপথের সন্ধান-চেষ্টায় নিযুক্ত হইয়াছিলেন, তাহাদের চেষ্টা সফল হইবার আশা ছিল না বলিয়া, সে চেষ্টা একেবারে নিষ্ফল হয় নাই। ব্যর্থচেষ্টাই জল- পথের দিকে লােকচিত্ত আকৃষ্ট করিয়া, ইউরােপের অভ্যুদয়সাধনের কারণ হইয়াছিল। ব্যর্থচেষ্টার ইতিহাসই চেষ্টা-সাফল্যের প্রকৃত ইতিহাস। সে কথা বিস্মৃত হইয়া, অধ্যবসায়শূন্য অব্যবস্থিতচিত্ত অকর্মণ্য অধিবাসিগণ বাণিজ্যোন্নতিসাধনের জন্য আহুত হইবামাত্র, ব্যর্থ-চেষ্টার উল্লেখ করিয়া, উদ্যমহীন হইয়া পড়িয়াছিল। দেখিয়াছি-করিয়াছি-যথেষ্ট হইয়াছে —আর কেন—আশা নাই—এ সকল কথা যে ইউরােপে একেবারে অপরিজ্ঞাত ছিল, তাহা বলিতে হইলে, ইতিহাসের অবমাননা করা হয়। ইউরােপেও কত লােকে মাথায় হাত দিয়া বসিয়া পড়িয়াছে। লােকে ব্যর্থচেষ্টার বিষময় ফলে সৰ্ব্বস্বান্ত হইয়াছে ; কত কবি, কত নাট্যকার উপহাসবৃত্তি চরিতার্থ করিবার জন্য, গদ্যে পদ্যে বিদ্যা প্রকাশ করিয়া,“গণ্ডের উপর পিণ্ড” সংযােগ করিতে ব্যস্ত হইয়া উঠিয়াছে; কিন্তু যে বসিয়া পড়িয়াছিল, সে আবার উঠিয়া দাড়াইয়াছে ;-এক পথে প্রতিহত হইয়া, অন্য পথে ধাবিত হইয়াছে ;-পুনঃ পুনঃ ব্যর্থমনােরথ হইয়াও, পুনঃপুনঃ সামর্থ্যবলে আত্মজয় করিয়া, পরিণামে সাফল্য- লাতে কৃতার্থ হইয়াছে। ইউরােপীয় অভ্যুদয়ের ঐতিহাসিক মুল- সূত্র এই সকল ব্যর্থ চেষ্টার বিলুপ্তঘটনাবলীর মধ্যেই লুক্কায়িত হইয়া, রহিয়াছে। স্থলপথে ব্যর্থ-মনােরথ হইয়া জলপথের প্রতি আকৃষ্ট হইবার সময়ে, পুরাতন পুণ্যপথ স্থলপথের আশা একেবারে পরিত্যক্ত হয় নাই। ইউরােপ অদ্যাপি সে আশা ত্যাগ করিতে পারে নাই। রুসিয়া যে সুদীর্ঘ লৌহবত্মে এসিয়ার সহিত ইউরােপকে সংযুক্ত করিবার আয়ােজন করিতেছে, তাহার অধিকাংশ কেবল পুরাতন স্থল-বাণিজ্যপথের ভারত-সৌভাগ্যচরণাঙ্কিত সুপরিচিত পুণ্যপথ। সেই পথে বৌদ্ধ শ্ৰমণ জগন্তু মণে বহির্গত হইয়া, বণিগ্বর্গের আশ্রয়ে দেশ হইতে দেশান্তরে মুক্তিমন্ত্র প্রচারিত করিতেন। তাহার উভয় পার্শ্বে অদ্যাপি যে সকল পুরাকীৰ্ত্তি ভস্মাচ্ছন্ন হইয়া বৌদ্ধ- বিজয়ের ধারাবাহিক ইতিহাস-পত্র বিচ্ছিন্ন করিয়া রাখিয়াছে, তাহা পুনরায় আবিষ্কৃত ও আলােচিত হইতেছে। তাহাকে এসিয়ার পুরাতন পুণ্যপথ ভিন্ন কি বলিব ? যে পথে গমনাগমনকালে এসিয়াবাসিগণ পৃথিবীর ইতিহাসে শৌর্যবীৰ্য্য-জ্ঞানবৈরাগ্য-শিল্পবিজ্ঞান-গৌরবে পরা- ক্রান্ত হইয়া, ইতিহাসে অমরত্ব লাভ করিয়াছে, তাহা এসিয়ার পুরাতন পুণ্যপথ। সে পথের পার্শ্বে এশিয়ার অতীত-গৌরব অদ্যাপি যেন ছায়া- কলেবরে দণ্ডায়মান। ইউরােপ যখন জলপথে ভারতবর্যে উপনীত হইবার সৌভাগ্য লাভ করে, সেদিন ভারতবর্ষে পদার্পণ করিয়া ইউরােপীয়গণ দেখিয়াছিল, -স্থলপথে তাহাদের কোন কোন স্বদেশী পর্যটক বহু পূর্বেই ভারতবর্ষে উপনীত হইয়াছে। যাহারা মিশরীয় পথে অগ্রসর হইয়াছিল, তাহারাও সহসা অধ্যবসায় পরিত্যাগ করে নাই। জলপথ আবিষ্কৃত হইবার পর, প্রয়ােজনের অভাবেই, স্থল-বাণিজ্যপথের সন্ধান-চেষ্টা ক্রমে ক্রমে পরিত্যক্ত হইয়াছিল। মধ্যযুগের ইউরােপীয় জনসমাজ ভূমণ্ডলের বিবিধ অবিজ্ঞাত প্রদেশ আবিষ্কত করিবার জন্য লালায়িত হইবার কথা ইতিহাসে সুপরিচিত হইয়া রহিয়াছে। কিন্তু তাহাকে প্রকৃত প্রস্তাবে কোন অবিজ্ঞাত নুতন, দেশের আবিষ্কার কামনা বলিয়া বর্ণনা করা যায় না। তাহা কেবল চিরপরিচিত ফিরিঙ্গি বণি ৩ ভারতবর্ষের অভিনব বাণিজ্যপথের সন্ধানচেষ্টার আকস্মিক ফল। এই সকল অভিনব আবিষ্কার-ব্যাপার যদি ইউরােপের পক্ষে উত্তরােত্তর উন্নতিসােপানে আরূঢ় হইবার কারণরূপে উল্লিখিত হয়, তবে ভারত- বর্ষকেই তাহার মূল কারণ বলিয়া স্বীকার করিতে হইবে। ভারতবর্ষে উপনীত হইবার যে সকল বাধাবিঘ্ন ইউরােপের পক্ষে তৎকালের পুরাতন স্থল-বাণিজ্য-পথ নিরতিশয় দুর্গম করিয়া রাখিয়া- ছিল, জলপথে সেরূপ বাধা বিঘ্ন ইউরােপকে পরাস্ত করিবার আশঙ্কা ছিল না ! এসিয়া কোন্ পুরাকালে সমুদ্রপথে বাণিজ্য করিবার জন্য নৌচালন-কৌশলের উদ্ভাবন করিয়াছিল, তাহার সন্ধানলাভ করিবার উপায় নাই। সমুদ্রোপকূলের সকল দেশই তাহাতে লিপ্ত হইয়া থাকিবে। ভারতবর্ষের সমুদ্রোপকূল স্মরণাতীত পুরাকাল হইতেই সমুদ্র-যাত্ৰা-কোলাহলে প্রতিধ্বনিত। ভূমধ্যসাগরতীরের পুরাতন পরাক্রান্ত মানবসমাজ অতি পুরাকাল হইতেই সমুদ্রপথে বিচরণ করিতে শিক্ষা করিয়াছিল। তথাপি এসিয়া ও ইউরােপের নৌ-বিদ্যার পার্থক্য ছিল। ইউরােপীয়গণ যে সমুদ্রপথে বিচরণ করিতেন, তাহা ভূবেষ্টিত বৃহদায়তন হ্রদ ভিন্ন মহাসাগর নামে কথিত হইতে পারে না! এসিয়ার সমুদ্রোপকূলনিবাসী নাবিকগণের পক্ষে এরূপ ভূবেষ্টিত সমুদ্রপথে বিচরণ করিবার সম্ভাবনা ছিল না। তাহাদিগকে নিয়ত মহাসাগরে বিচরণ করিয়া, দেশদেশান্তরে গমনাগমন করিতে হইত। এই পথে প্রতি- দ্বন্দ্বীর সংখ্যা অল্প ; তাহাদের সকলেরই লক্ষ্য ভারতবাণিজ্যের কল্যাণে অর্থোপার্জন। সুতরাং এসিয়ার সমুদ্রযাত্রা কেবল জলযান- গঠন-কৌশল, এবং সীমান্য সমুদ্রপথে জলযানচালনা-কৌশল উদ্ভাবিত করিয়াই নিবন্ত হইয়া রহিয়াছিল। জলযুদ্ধের প্রয়ােজন অনুভূত হয় নাই বলিয়া, তাহার কৌশলজাল বিস্তার করিবার জন্য কোনরূপ চেষ্টা আর হইবার প্রয়ােজনও অনুভূত হয় নাই। ইউরােপে পুরাকাল হইতেই ইউরােপের জলপথ-ভীতি २१ সে প্রয়োজন অনুভূত হইয়াছিল। সংকীর্ণ প্রণালী-পথের সংঘর্ষ- সম্ভাবনা পরস্পরকে পরস্পরের পরাজয়সাধনের কৌশল-উদ্ভাবনার্থ উত্তেজিত করিয়া, ইউরােপীয়গণকে জলযুদ্ধনিপুণ বীরজাতিতে পরিণত করিয়াছিল। তাহারা স্থলপথ অপেক্ষা জলপথেই সমধিক শৌর্য প্রকাশ করিতে পারিত। তথাপি তাহারা মহাসাগর সম্বন্ধে বিশেষ কোন অভিজ্ঞতা উপার্জন করিতে সমর্থ হয় নাই। যখন জলপথের সন্ধান চেষ্টা ইউরােপকে উত্তেজিত করিয়া তুলিল, তখন ইউরােপের সুবিখ্যাত নাবিকবর্গও মহাসাগর অতিক্রম করিয়া ভারতবর্ষে উপনীত হইবার জল- পথ আবিষ্কার করা সম্ভব বলিয়া সহসা বিশ্বাস করিতে পারেন নাই।
চতুর্থ পরিচ্ছেদ পুরাতন জল-বাণিজ্যপথ Certain men hare supposed, following a foolish tradition, that the Atlantic is united on the south with the Indian Ocean.--Joannes Philoponus. বিদ্যালয়ের বালকগণের বিশ্বাস-ভাঙ্কো ডা গামাই ভারতবর্ষে আসিবার জলপথ আবিষ্কৃত করিয়া, ইউরােপের অধিবাসিগণকে নুতন জল-বাণিজ্যপথের সন্ধান প্রদান করেন। কিন্তু অতি পুরাকালেও এই পথের সন্ধান সম্পূর্ণ অপরিজ্ঞাত ছিল বলিয়া বােধ হয় না। মিশরদেশের পণ্ডিতবর্গের নিকট তাহার জনশ্রুতি সুপরিচিত ছিল। তথা হইতে সে কথা সমগ্র ইউরােপে ব্যাপ্ত হইয়া পড়িয়াছিল। মধ্যযুগের জ্ঞানগৌরব- বিচ্যুত ইউরােপীয় মানবসমাজ সে জনশ্রুতিতে আস্থাস্থাপন করিতে সম্মত হইত না। তাহারা আফ্রিকার পশ্চিমােপকূলের অত্যল্প স্থানের সহিত পরিচিত ছিল। তাহার দক্ষিণে কোথায়ও যে স্থলভাগের শেষ হইতে পারে, এবং পশ্চিম সমুদ্রের সহিত পূৰ্ব্ব সমুদ্রের সংযােগ থাকিতে পারে, সে কথা অল্প লােকেই চিন্তা করিতে সম্মত হইত। তাহারা ভাবিত,-দক্ষিণে কেবল অত্যুত্তপ্ত মরুস্থল সে দেশে মানবসমাজ অবস্থান করিতে পারে না। সুতরাং সে পথে অগ্রসর হইবার জন্য কাহারও কোন কৌতুহল বা সাহস হইত না। বরং তদ্বিষয়ক জনশ্রুতি সর্বত্র উপহসিত হইত। স্থল-বাণিজ্যপথ অধিকার করিবার আশা ব্যর্থ হইবার আশঙ্কা ক্রমে প্রবল হইয়া, ইউরােপকে অল-বাণিজ্য-পথের সন্ধানে প্রবৃত্ত হইবার জন্য পুনঃপুনঃ উত্তেজিত করিতে লাগিল। এই সময়ে জলবাণিজ্য-পথের পুরাতন বিবরণ সংগ্রহ করিবার জন্য বিশেষ আগ্রহ উপস্থিত হইয়াছিল। মিশর হইতে লােহিত সাগরের পথে ভারতবর্ষে যাতায়াতের পুরাতন জলবাণিজ্য-পথের কথা ইউরােপে অপরিজ্ঞাত ছিল না। ভারতবর্ষের বহু বণিক সাগরপারের মিশর-রাজ্যে গমনাগমন করিতেন। এই পথে ইউরােপের অজ্ঞতা এই পথে কোন কোন ভারতীয় রাজদূত রােমক সাম্রাজ্যের রাজধানী পৰ্যন্ত গমন করিয়াছিলেন। এসিয়া ও ইউরােপের মধ্যস্থলে অবস্থিত হইয়া, মিশর দেশ ভারতীয় পণ্যদ্রব্যের প্রধান পণ্যশালা বলিয়া বিখ্যাত হইয়া উঠিয়াছিল। ভূমধ্যসাগর হইতে আটলান্টিক মহাসাগরে গমনা- গমনের পথ সুপরিচিত ছিল। সেই পথে রােমক সাম্রাজ্যের অত্যুদয়- কালে বিলাসলােলুপ রােমান নাগরিকগণের রসনাতৃপ্তিদায়ক গুগলি- শক্তি ইংলণ্ড হইতে আনীত হইত। কিন্তু আটলান্টিক মহাসাগরের পশ্চিমে বা দক্ষিণে কেবল অনন্ত জলরাশি দিগ্বলয়ে বিলীন হইয়া, সে পথে অধিক দূর অগ্রসর হইবার জন্য কাহাকেও প্রলুব্ধ করিত না। সেই এক দিন, আর এই এক দিন। এ দিনের বালকবৃন্দও সে দিনের ইউরােপীয় জ্ঞানবৃদ্ধ পণ্ডিতবর্গের এই অকারণ বিভীষিকা ও অসঙ্গত অজ্ঞতার কাহিনী পাঠ করিতে বসিয়া, হাস্যসংবরণ করিতে পারে না। তথাপি পাঁচ শত বৎসর পূৰ্ব্বে, ইউরােপের অবস্থা এইরূপ শশাচনীয় ছিল। ইউরােপের ইতিহাসই তাহার সাক্ষী। * খৃষ্টীয় চতুর্দশ শতাব্দীর পর্যটকরাজ ইবন বতােতার নাম বঙ্গ- সাহিত্যে সুপরিচিত হইয়াছে। তিনি চতুর্বিংশতি বৎসর এসিয়া ও আফ্রিকার নানা স্থানে ভ্রমণ করিয়া, যে সকল বিবরণ সঙ্কলিত করিয়া- * বিগত পাঁচ শত বৎসরের পৃথিবীর ইতিহাসের সহিত ভারতবর্ষের নাম চির- সংযুক্ত হইয়া রহিয়াছে। ভারতবর্ষের সাহিত্যে তাহার বিশেষ উল্লেখ না থাকিলেও, সমগ্র সভ্যদেশের সাহিত্যে তাহার যথেষ্ট পরিচয় প্রাপ্ত হওয়া যায়। এই সকল পুরাতন প্রমাণের সংগ্রহ ও সমালােচনা করিয়া সুবিখ্যাত ঐতিহাসিক স্যর ডলিউ হণ্টার বুটীশভারতের যে সুবিস্তৃত ইতিহাস রচনায় প্রবৃত্ত হইয়াছিলেন, তাহার সূচনা- মাত্র প্রকাশিত হইতে না হইতেই, ঐতিহাসিকের নশ্বর জীবন নিঃশেষ হইয়া গিয়াছে। তথাপি তাহার সংকল্পিত সুবৃহৎ গ্রন্থের যে অত্যল্পাংশমাত্র প্রকাশিত হইয়াছে, তাহাতেই তাহার নাম ভারতবর্ষে চিরস্মরণীয় হইবে। ভারতবর্ষের আধুনিক ভাবিপৰ্যয়ের ইতিহাস-সঙ্কলন কাৰ্যে হস্তক্ষেপ করিবার সময়ে, সকল লেখককেই হটারের নিকট কৃতজ্ঞহৃদয়ে ঋণ-স্বীকার করিতে হইবে।
ফিরিঙ্গি বণিক ছিলেন, তাহাও ইউরােপীয় বিবিধ ভাষায় অনুদিত হইয়া, সভ্যসমাজের নিকট সুপরিচিত হইয়াছে। তাহাতে পুরাতন জল-বাণিজ্যপথের বিশেষ বিবরণ প্রাপ্ত হওয়া যায়। ইবন বতােতা পৃথিবীতে পাঁচটিমাত্র বাণিজ্যপ্রধান প্রসিদ্ধ বন্দর দেখিতে পাইয়াছিলেন। একটি কৃষ্ণসাগর- তীরে ; একটি মিশ-দেশে ; একটি চীন-সাম্রাজ্যে; এবং দুইটি ভারত- বর্ষের মালাবার-উপকূলে। তন্মধ্যে একটি “কালিকট” নামে ইতি- হাসে চিরস্মরণীয় হইয়া রহিয়াছে। এই সকল বন্দর প্রাচ্য-বাণিজ্যের বিজয়গৌরবে ভারতবর্ষের নাম সমুজ্জ্বল করিয়া রাখিয়াছিল। সেকালের বাণিজ্যের কথা কেবল ভারতবর্ষের কথায় পর্যবসিত হইয়াছিল। ভারত- বর্ষে যে সকল পণ্যদ্রব্য উৎপাদিত হইত, তাহার একাংশ প্রশান্তমহা- সাগরের দ্বীপপুঞ্জে ও চীন-জাপানাদি সুদূর দেশে প্রেরিত হইত,অপরাংশ প্রতীচ্য রাজ্যে প্রেরিত হইত। যাহা পূৰ্বাঞ্চলে প্রেরিত হইত, তাহার বিনিময়ে পূর্বাঞ্চলের বিবিধ পণ্যদ্রব্য আনীত হইয়া, তাহাও পশ্চিমাঞ্চলে প্রেরিত হইত। ভারতবর্ষ কাহারও নিকট ক্রয় করিত না; পূর্কে পশ্চিমে আপন পণ্যদ্রব্য বিক্রয় করিত ; এবং পূৰ্বাঞ্চল হইতে সংগৃহীত পণ্যদ্রব্যও পশ্চিমাঞ্চলে বিক্রয় করিয়া, স্বদেশের ঐশ্বৰ্যগৰ্ব বিবর্ধিত করিত। এই বাণিজ্য-ব্যাপারে স্থলপথ অপেক্ষা জলপথেরই প্রাধান্য সংস্থাপিত হইয়াছিল। তজ্জন্য মিশরদেশের ন্যায় সিংহল দ্বীপও প্রাচ্য- প্রতীচ্যের সম্মিলনক্ষেত্র বলিয়া সুপরিচিত হইয়াছিল। ইল্লাম ইহার অংশ ভােগ করিবার জন্য সমুদ্রপথে শীঘ্রই প্রাধান্যলাভে কৃতকার্য হইয়া- ছিল। প্রশান্তমহাসাগরের যে সকল দ্বীপপুঞ্জ একদা শৈব ও বৌদ্ধ- ধৰ্ম্মের শঙ্ঘণ্টা-নিনাদে মুখরিত ও ধুপ-গুগ্গুল-গন্ধে আমােদিত হইয়া শিক্ষা-দীক্ষা, ভাষা-সাহিত্য ও আচার-ব্যবহারে, দ্বীপবাসিগণকে ভার- তীয় সভ্যতায় সমুন্নত করিয়া, ভারতবর্ষের বাহিরে বৃহত্তর ভারতবর্ষের সৃষ্টি করিবার আয়ােজন করিতেছিল, সেখানে ক্রমে ক্রমে ইসলামের ভারতবর্ষের বাণিজ্য-প্রভাব আধিপত্য বিস্তৃত হইয়া, ধৰ্ম্মে, আচার-ব্যবহারে, ভাষা ও সাহিত্যে, অদ্যাপি মুসলমানের বিজয়ঘােষণা করিতেছে। পুরাতন জলবাণিজ্যপথে মুসলমানের আধিপত্য প্রবল হইলে, মুসলমানাধিকৃত মিশর ভারতবাণিজ্যে সমৃদ্ধ হইয়া উঠিতে লাগিল। সে পথে খৃষ্টান-ইউরােপের অগ্রসর হইবার আশা তিরােহিত হইয়া গেল। ভূমধ্যসাগর ও লােহিতসাগরের মধ্যে যে সংকীর্ণ স্থলভাগ অতিক্রম করিয়া ভারতীয় পণ্যদ্রব্য ইউরােপে আনীত হইত, তাহা মুসলমানের অধিকারভুক্ত হইবার পর, খৃষ্টান-ইউরােপের পক্ষে পুরাতন জলবাণিজ্য- পথের প্রধান প্রবেশদ্বার অবরুদ্ধ হইয়া গেল। ভূমধ্যসাগরে ইসলাম- শক্তি পরিস্ফুট হইয়া উঠিতে লাগিল। স্থলপথের ন্যায় জলপথেও, প্রাচ্য- এসিয়া প্রতীচ্য-ইউরােপকে পদে পদে অপদস্থ করিয়া, এসিয়ার বিজয়- গৌরবে ইউরােপকে অবসন্ন করিবার উপক্রম করিল। এই সঙ্কট-কাল ইউরােপের ইতিহাসের প্রধান পরীক্ষা-কাল। এই সময়ে অপদস্থ হইয়া, ইউরােপ অধ্যবসায়হীন অবসন্ন অবস্থায় আপন দুর্ভাগ্যকে চিরসহচর করিয়া উদ্যম-প্রয়ােগে অসম্মত হইলে, ইউরােপের ইতিহাস ভিন্ন ভাবে লিখিত হইত ;-ভারতবর্ষের ইতিহাসও ভিন্ন মুত্তি গ্রহণ করিত। ইউরােপ কঠিন পরীক্ষায় নিপতিত হইয়াও, লক্ষ্যচ্যুত হয় নাই। তাহাই ইউরােপের আধুনিক অভ্যুদয়ের প্রধান কারণ। এই সময়ে ইউরােপের অবস্থা কিরূপ ছিল, তাহা বিশেষ ভাবে আলােচিত হওয়া আবশ্যক। গ্রীসের জ্ঞান-গৌরব ও রােমের রাজশক্তি এক সময়ে ইউরোপকে সমুন্নত করিবার আয়ােজন করিলেও, সে আয়াে- জন সৰ্বাংশে সফল হয় নাই। প্রধান প্রধান মহানগর ভিন্ন, সমগ্র দেশ সে পুরাতন সভ্যতার ফললাভ করিতে সমর্থ হয় নাই। যাহারা What we call Greeks and Romans are chiefly the citizens of Athens and Rome.Max Muller's India, what can it teatch us p, af.
ফিরিঙ্গি বণিক মহানগরে বাস করিয়া, সভ্য হইবার সুযােগ প্রাপ্ত হইয়াছিল, তাহারাও সভ্যতার প্রকৃত অমৃতফলে বীতরাগ হইয়া, তাহার বিবিধ কুফল লাভের জন্যই লালায়িত হইয়া উঠিয়াছিল! সম্ভোগ-লালসা প্রবল হইয়া, সংযমসীমা অতিক্রম করিয়াছিল। জ্ঞান কেবল সম্ভোগের উপায় উদ্ভাবন করিত ;-ধৰ্ম্ম কেবল বাহাড়ম্বরের সম্ভোগকে সম্ভজনীয় করিয়া তুলিত ;-লােকাচার কেবল মানবসমাজকে নিয়ত পশু- স্বভাবের দিকেই প্রাণপণে আকর্ষণ করিত। ইহার ফল ফলিতে বিলম্ব টিল না। ইউরােপ শীঘ্রই সৌভাগ্য-বিচ্যুত হইল। অজ্ঞানতার অন্ধকারে পূৰ্বশিক্ষা বিলুপ্ত হইয়া গেল। এসিয়ার খৃষ্ট-ধৰ্ম্ম ইউরােপে প্রচারিত হইবামাত্র, তাহার স্বভাবসুন্দর সন্ন্যাসীর সৌম্যমুর্তি পরি- বর্তিত হইয়া গেল। ইউরােপ ধৰ্ম্মান্ধ হইয়া উঠিল; নিয়ত শয়তানের কথা চিন্তা করিতে করিতে শয়তানের কথারই প্রচার করিতে লাগিল। জ্ঞান ও ধৰ্ম্মের মধ্যে চিরবিবােধ সঞ্জীবিত হইয়া উঠিল। যাহা কিছু নূতন, তা শয়তানের কুটিল কৌশল বলিয়া ব্যাখ্যাত হইবামাত্র, জনসাধারণ তাহার নিকট হইতে দূরে পলায়ন করিয়া, আত্মার সদগতিরক্ষাৰ্থ ব্যাকুল হইয়া পড়িল। ধৰ্ম্মাচাৰ্য্যগণ স্ব স্ব পদমর্যাদা বর্ধিত করিবার আশায়,অশিক্ষিত জনসাধারণের জন্য নানারূপ ধৰ্ম্মান্ধতার আবরণ সৃষ্টি করিয়া লোেকলােচন আচ্ছন্ন করিতে প্রবৃত্ত হইলেন। ইসলামের সহিত খৃষ্টান-সমাজের ধর্ম- যুদ্ধ বিঘােষিত হইলে, খৃষ্টানের ধর্মান্ধতা অধিকতরকঠোর হইয়া উঠিল। দুর্দশার দিনে দুৰ্ম্মতি আসিয়া মানবসমাজের জ্ঞানচক্ষু আবৃত করিয়া দেয়। ইউরােপের অবস্থাও সেইরূপ হইয়া উঠিল। ইউরােপ স্মরণাতীত পুরাকাল হইতে জলপথে নৌচালন করিত। ভূমধ্যসাগর ইউরােপের নিকট স্থলপথের ন্যায় সুপরিচিত হইয়া উঠিয়াছিল। কিন্তু ভূমধ্য- সাগরের ইউরােপীয় অর্ণবপােত কেবল ক্ষেপণীবলেই পরিচালিত হইত। বায়ুবলে সমুদ্রপথে পােতচালনা করিবার কৌশল অতি পুরাকালে হইত না! খৃষ্টীয় কুসংস্কার আবিষ্কৃত হইয়াছিল। ভারত-মহাসাগরের বাণিজ্যপােত নৈসর্গিক বায়ুপ্রবাহের উপর নির্ভর করিয়াই, ভারতবর্ষ হইতে বর্ষান্তরে গমনা- গমন করিত। প্রয়ােজনের অভাবে ভূমধ্যসাগরে সে উপায়ে পােত- চালন-কৌশল অবলম্বিত হইত না। দিদর্শনশলাকা আবিষ্কৃত হইলেও, ধৰ্মান্ধ খৃষ্টান নাবিকগণ তাহাকে “শয়তানের যন্ত্র” মনে করিয়া, তাহার ব্যবহার করিতে সম্মত হইত না। কেহ সে যন্ত্র ব্যবহার করিয়া পােত- চালনা করিতে সাহস করিলে, কোনও খৃষ্টান নাবিক সেরূপ অর্ণবপােতে পদার্পণ করিয়া তাহার পরকালের সদগতিকে সঙ্কটাপন্ন করিতে সাহসী এরূপ অবস্থায় পুরাতন জলবাণিজ্যপথে প্রতিহত হইয়া, নূতন জলবাণিজ্যপথের অনুসন্ধান করা সেকালের ধর্মান্ধ ইউরোপের পক্ষে কত না কঠিন হইয়া উঠিয়াছিল। ইসলামের অভ্যুদয়ের বহুপূৰ্ব্ব হইতে ভূমধ্যসাগরে ফিনিসীয় রণিগ্বর্গের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠালাভ করিয়াছিল। তৎপূর্বে একদা পুরাতন মিশর রাজ্যই ভূমধ্যসাগরের অদ্বিতীয় অধিপতি হইয়া, সমগ্র ইউরােপে বাণিজ্যযাত্রা করিয়া ধনােপাৰ্জন করিত। মিশর কালক্রমে সেই পুরাতন জলবাণিজ্যপথের অধিকার-বিচ্যুত হইলে, নুন জলবাণিজ্য- পথের সন্ধান-চেষ্টায় নানারূপ আয়ােজন করিবার পরিচয় প্রাপ্ত হওয়া যায়। এক দিকে ভূমধ্যসাগর, অন্যদিকে লােহিতসাগর, এই দুইটি ভূবেষ্টিত ক্ষুদ্র উপসাগরের সহিত সুপরিচিত থাকিলেও, মিশরবাসিগণ ভারতমহাসাগরের সহিত পরিচিত হইবারও সুযােগ প্রাপ্ত হইয়াছিল। শিল্প, বিজ্ঞান, গণিত ও দর্শনবিদ্যায় মিশরদেশ পুরাকালেই উন্নতিলাভ করে। তখন কোনরূপ অন্ধবিশ্বাস বা কুসংস্কার মিশরবাসিগণকে •অভিনব তালােচনায় নিরস্ত করিত বলিয়া বােধ হয় না। তাহারা আফ্রিকার একাংশে বাস করিয়া, অপরাংশের সম্বন্ধেও কিয়ৎ পরিমাণে ভৌগােলিক জ্ঞানসঞ্চয়ে সফলকাম হইয়াছিল। তাহারা আফ্রিকার ৩৪ ফিরিঙ্গি বণিক চতুর্দিকে সাগরজলরাশির অস্তিত্বের পরিচয় প্রাপ্ত হইয়া, পূৰ্বসাগর হইতে পশ্চিম সাগরপথে ভূমধ্যসাগরে উপনীত হইবার সম্ভাবনায় কোন রূপ সংশয় প্রকাশ না করিয়া, অভিনব জলবাণিজ্যপথের সন্ধান-চেষ্টায় প্রবৃত্ত হইয়াছিল। ভারতীয় পণ্যদ্রব্যের বাণিজ্য-ব্যাপারে ফিনিসীয় বণিগ্বর্গের প্রাধান্য লুপ্ত করিয়া, মিশরের প্রাধান্যসংস্থাপনের প্রবল প্রলােভন, মিশরের রাজা-প্রজা সকল শ্রেণীর লােকের পক্ষেই, নূতন জলবাণিজ্যপথ আবিষ্কৃত করিবার জন্য আগ্রহের কারণ হইয়া উঠিয়াছিল। খৃষ্টাবির্ভাবের বহুপূর্বে মিশরাধিপতি ইতিহাসবিখ্যাত ফ্যারাও নিকো লােহিতসাগর হইতে একদল নাবিক প্রেরণ করেন। তাহারা লােহিত সাগর হইতে ভারতসাগর, তথা হইতে আটলান্টিক সাগর, এবং তথা হইতে ভূমধ্যসাগর অতিক্রম করিয়া, পুনরায় মিশরদেশে প্রত্যাবর্তন করে। ইহাতে তিন বৎসর অতিবাহিত হইয়া যায়। সেকালের গঠনকৌশলহীন ও চালনকৌশলহীন ক্ষুদ্রকায় অর্ণবপোতের পক্ষে ইহা অপেক্ষা অল্পকালে আফ্রিকা প্রদক্ষিণ করিবার সম্ভাবনা না থাকায়, নূতন জলবাণিজ্যপথের সন্ধান লাভ করিয়াও, মিশরাধিপতি তারা উপকার লাভ করিতে পারিলেন না। নাবিকগণ স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করিয়া, এক অলৌকিক কাহিনীর কীৰ্ত্তন করিতে লাগিল। তাহাদের সুদীর্ঘ সমুদ্রযাত্রার প্রথমভাগে, সূৰ্য্যদেব বাম দিক্ হইতে উদিত হইতেন; শেষভাগে, সেই সূৰ্য্যদেব দক্ষিণ দিক হইতে উদিত হইছেন। নাবিকগণ ইহা স্বচক্ষে দর্শন করিয়া আসিয়াছিল। কিন্তু জনসাধারণ সে কথায় অস্থাস্থাপন করিতে পারিল না। আফ্রিকার পূৰ্বোপকূলের সমুদ্রপথে মিশর হইতে দক্ষিণাভিমুখে পােতচালনা করিবার সময়ে, সূৰ্যদেবের বাম দিক হইতে উদিত হইবার কথা। আফ্রিকার পশ্চিমােপকূলের সমুদ্রপথে উত্তরাভিমুখে পোতচালনা, ইউরােপীয় অজ্ঞানতা করিবার সময়ে, সূৰ্যদেবের দক্ষিণ দিক হইতেই উদিত হইবার কথা। ইহা একালের বালকবৃন্দও অলীক কাহিনী বলিয়া প্রত্যাখ্যান করে না। কিন্তু সেকালে হেয়ােদোতসের ন্যায় মনীষীবর্গও ইহাতে আস্থাস্থাপন করিতে অসম্মত হইয়াছিলেন। আফ্রিকা প্রদক্ষিণ করিয়া, প্রাচ্য হইতে প্রতীচ্য জনপদে বাণিজ্যপােত চালনা করিবার এই সকল পুরাতন প্রমাণ ইউরােপের অপরিজ্ঞাত ছিল না। কিন্তু ইউরোেপ তাহাতে আস্থাস্থাপন করিতে পারিত না। এরূপ পুরাকাহিনী অলীক কাহিনী বলিয়াই প্রত্যাখ্যাত হইত। বিষুবরেখা পৃথিবীকে উত্তর দক্ষিণ দুই ভাগে বিভক্ত করিয়া রাখিয়াছে ;—সে কথা অপরিজ্ঞাত ছিল না। কিন্তু বিষুব-রেখা যে সকল জলস্থলের উপর দিয়া অবস্থিত আছে, তাহার স্বাভাবিক তাপ- ধিক্য সম্বন্ধে নানারূপ অতিশয়ােক্তি প্রচারিত হইয়াছিল। এত উত্তাপ যে, তাহা মানবশক্তিকে ভস্ম করিয়া ফেলিবে! বিষুব-রেখার নিকটে যখন এত উত্তাপ, তাহার দক্ষিণে হয় ত উত্তাপাধিক্যের অবধি নাই এই সকল জ্ঞানান্ধ ভ্রান্ত সংস্কার ইউরােপকে বহুকাল পর্যন্ত আফ্রিকার দক্ষিণাংশে গমনাগমনের কল্পনা পরিত্যাগ করিতেই শিক্ষাদান করিয়া- ছিল। ইউরােপীয় পুরাতন সাহিত্যে আফ্রিকার পশ্চিমােপকূলের সমুদ্রপথ অবিজ্ঞাত! আটলান্টিক মহাসাগর যেন এক অভেদ্য কুহে- লিকায় সমাচ্ছন্ন! তাহা অপরিজ্ঞাত-অপরিজ্ঞেয়-অন্ধকার। এই বিশ্বাস কেবল ইউরােপকেই উপহাস্পদ করে নাই ;-ইসলামের পক্ষেও ইহা উপহাসের বিষয় হইয়া রহিয়াছে। ইসলাম এক সময়ে প্রতীচ্য মানবসমাজে জ্ঞানবিস্তারকার্যে ব্যাপৃত হইয়াও, স্বয়ং বহু বিষয়ে অজ্ঞের ন্যায় আচরণ করিতেন। মুসলমান মনীষিগণ বলিতেন, - আটলান্টিক মহাসাগরে অধিকদূর অগ্রসর হইবার সম্ভাবনা নাই। মুসলমান আফ্রিকা প্রদক্ষিণ করিয়া, আটলান্টিক সাগরপথে ইউরােপে পদার্পণ করিবার সন্ধান-লাভ করিলে, মুসলমানকে ইউরােপ হইতে ফিরিঙ্গি বণিক তাড়িত করা সহজ হইত না। কিন্তু ইলাম-প্রতিভা সে পথে পরিচালিত হয় নাই। তাহা কেবল বিষুব-রেখার উত্তরপার্শ্বের জলস্থল লইয়াই পরিতৃপ্ত ছিল। ইউরােপের এই পুরাতন ভ্রান্ত সংস্কার সহসা দূরীভূত হয় নাই। ইহার জন্য যেরূপ আত্মত্যাগ ও লাঞ্ছনা গঞ্জনা সহ করিতে হইয়াছে, তাহা ইউরােপের ইতিহাসে সুপরিচিত হইয়া রহিয়াছে। যাহার অদম্য উৎসাহ, অবিচলিত অধ্যবসায় ও অপরাজিত আত্মত্যাগ ইউরােপের এই চিরসঞ্চিত ভ্রান্ত-সংস্কার দূরীভূত করিয়া, মহাসাগর- পারের বিবিধ অভিনব রাজ্যে ইউরােপীয় অধিকার-বিস্তারের পথ প্রদ- শন করিয়াছিল, তিনি আধুনিক ইউরােপের নবজীবনদাতা। তাঁহার কথা ইউরােপের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লিখিত হইয়া রহিয়াছে। তাহার জীবনকাহিনী ইউরােপের দেশে দেশে প্রচারিত হইয়াছে। তাহার পবিত্র সমাধিক্ষেত্র ইউরােপের পুণ্যতীর্থে পরিণত হইয়াছে। তাহার নাম রাজকুমার হেরী। তিনি নাবিক-রাজ বলিয়াই সুপরিচিত।
পঞ্চম পরিচ্ছেদ অপরাজিত অধ্যবসায় The mystery, which since creation had hung over the Atlantic, and hidden from man's knowledge one-half of the surface of the globe, had reserved a field of noble enterprise for Prince Henry the Navigator.-R. H. Major's Prince Ilenry the Navigator. আটলান্টিক মহাসাগর-তীরে পর্তুগাল নামক যে ক্ষুদ্র স্থান অদ্যাপি মানচিত্রে একটি স্বতন্ত্র ইউরােপীয় রাজ্যরূপে অঙ্কিত হইয়া আসিতেছে, তাহা একদা রােমক-সাম্রাজ্যের একটি নামগােত্রহীন নগণ্য উপবিভাগ বলিয়াই পুরাতন সভ্যসমাজে পরিচিত ছিল। লােকসংখ্যা অধিক ছিল না। যাহা ছিল, তাহারও অধিকাংশ কেবল দীনদরিদ্র নিরক্ষর নরনারী। তাহারা কায়ক্লেশে জীবনযাত্রা নির্বাহ করিয়া, রোমক- সাম্রাজ্যের পাদুকা বহন করিত। তাহারা যে কদাপি শিক্ষায় সমুন্নত হইবে, তাহারা যে রণকৌশলে অজেয় হইয়া উঠিবে, তাহারা যে নৌবিদ্যাবিশারদ প্রধান পুরুষ বলিয়া জগদ্বিখ্যাত হইবে, তাহারাই যে ইউরােপের নবজীবনলাভের পথপ্রদর্শন করিয়া, ইতিহাসে চিরস্মরণীয় কীর্তিকলাপে অমরপদবী লাভ করিবে ;-সে কথা ভবিষ্যতের অন্ধ- কারে আচ্ছন্ন হইয়া ছিল। ইসলাম-শক্তি দিগ্বিজয়ে বহির্গত হইলে, এই দেশ ইসলামের পদভরে কম্পিত হইয়া উঠিয়াছিল। স্পেন ও পর্তুগাল ইসলাম-গৌরবে জগদ্বিখ্যাত হইলেও, দেশের লােক তাহাতে গৌরবলাভ করে নাই। সে গৌরব ইসলাম একাকী উপ- ভােগ করিত। দেশের লােক কেবল বিস্মিত নেত্রে ইসলামের অভ্রভেদী মসূজেদ-চুড়ার গঠনকৌশলের প্রশংসা করিয়া, ইসলামের ক্রীতদাস হইয়াই মানবজীবন চরিতার্থ করিত। A ৩ ফিরিঙ্গি বণিক ৫ খৃষ্টীয় দ্বাদশ শতাব্দীর প্রারম্ভে এই অনুন্নত মানবসমাজ সহসা সমু- তিলাভের উপায় প্রাপ্ত হইল। ইসলামই তাহার পরােক্ষ কারণ। ইসলাম বিবিধ বিদ্যালয়ে জ্ঞানবিস্তারকার্যে ব্যাপৃত হইয়া, খৃষ্টান ইউ- রােপকে মুসলমান ধর্মের আশ্রয়দানের চেষ্টা করায়, সমগ্র ইউরােপে এক অজ্ঞাতপূৰ্ব্ব ধৰ্ম্মান্ধ সমর-পিপাসা প্রবল হইয়া উঠিয়াছিল। খৃষ্টান ইউরােপের যে দেশ যত নিরক্ষর, সেই দেশ তত নরশােণিতলোলুপ হইয়া, অশান্তহৃদয়ে মুসলমানের কণ্ঠচ্ছেদ করিবার জন্য উন্মত্ত হইয়া উঠিল। খৃষ্টধর্মের বিমল শান্তিপিপাসা তিরােহিত হইয়া গেল। জন- সমাজ রাজ্য চাহিল না, বাণিজ্য চাহিল না, সম্ভোগ চাহিল না, ঐশ্বৰ্য্য লালসায় অশান্ত হইল না ;—চাহিল কেবল ক্ষমাশূন্য সীমান্য দয়াশূন্য অগণ্য ধৰ্ম্মযুদ্ধ। এই যুদ্ধোন্মাদ জলে স্থলে ব্যাপ্ত হইয়া পড়ি। ইহাতেই পর্তুগাল মুসলমান-শাসন উৎখাত করিয়া, বাহুবলে স্বাধীন হইয়া উঠিল। স্বাধীন শক্তি উভয় হস্তে সম্মুখের অন্ধকার ঠেলিয়া, দৃঢ়পদে উন্নতি-সােপানে আরােহণ করিতে শিক্ষালাভ করিল। ত্রয়ােদশ শতা- ব্দীর মধ্যভাগে পর্তুগাল সম্পূর্ণরূপে মুসলমান-শাসন-পাশ বিচ্ছিন্ন করিয়া, আফসাে নামধেয় তৃতীয় নরপালকে সিংহাসনে সংস্থাপিত করিল। শান্তি প্রত্যাবর্তন করিল; সমৃদ্ধি করতলগত হইল ; যে দেশ রােমক- সাম্রাজ্যের নিতান্ত নগণ্য প্রদেশ বলিয়া উপেক্ষিত হইত, তাহাই ইউ- রােপের প্রধান রাজ্যরূপে পরিচিত হইল। পর্তুগালের ইতিহাসের এই অভিনব অভ্যুদয়-যুগের বিস্তৃত কাহিনী নানা ভাষায় লিপিবদ্ধ হইয়া সভ্যসমাজে সুপরিচিত হইয়াছে। যাঁহারা বাহুবলে মুসলমান-শক্তি প্রতিহত করিয়া পর্তুগালকে স্বাধীন করিয়া তুলিয়াছিলেন, তাহারা ধর্মবীর নামে সুপরিচিত। খৃষ্টান সমাজপতি ধৰ্মচাৰ্য্য পােপ খৃষ্টধর্মের কল্যাণকামনায় নবােদগত ই- ধৰ্ম্মোন্মাদ লাম শক্তির বিরুদ্ধে ধৰ্ম্মযুদ্ধ ঘােষণা করিয়া, স্বধর্মনিষ্ঠ খৃষ্টানগণকে নিয়ত উত্তেজিত করিতেন। তাহাতে ইউরােপের সকল দেশেই বহুসংখ্যক ধর্মবীর মুসলমানের সহিত সমর-কলহে লিপ্ত হইয়াছিলেন। তাহারা নানা দেশ হইতে নানা পথে খৃষ্টজন্মভূমির উদ্ধারসাধনার্থ সমরক্ষেত্রে মিলিত হইবার জন্য যখন যুদ্ধযাত্রা করিতেন, বা যুদ্ধান্তে স্বদেশে প্রত্যা- বৰ্তন করিতেন,তখন ইউরােপীয় জনসমাজ তাহাদিগকে ধর্মবীর-রূপেই পূজা করিতে ধাবিত হইত। এই সকল ধর্মবীরদিগের মধ্যে পর্তুগালের ধর্মবীরগণ বিশেষ সমরনৈপুণ্য লাভ করিয়া, ইউরােপের সকল দেশেই বিখ্যাত হইয়া উঠিয়াছিলেন। তাঁহাদিগের ইসলাম-বিদ্বেষ সৰ্ব্বাপেক্ষা প্রবল হইয়াছিল ; কারণ, তাহাদের ধৰ্ম্মোন্মাদ স্বদেশপ্রীতির সহিত জড়িত হইয়া গিয়াছিল। যেখানে মুসলমান, সেইখানেই পর্তুগালের ধর্মবীরগণ অসিহস্তে ধাবিত হইবার জন্য লালায়িত ; মুসলমান-নিপাত-সাধনই যেন তাঁহাদিগের ধর্মজীবনের সর্বাধ্য মূলমন্ত্র হইয়া উঠিয়াছিল। তাহাদের ধৰ্ম্মোন্মাদের পুরাকাহিনীর কীৰ্ত্তন করিতে হইলে, আধুনিক ইতিহাসলেখকবও ইহার উল্লেখ করিয়া থাকেন।* পৰ্তুগালের স্বদেশ- বৎসল সুবিখ্যাত ইতিহাস-লেখক পর্তুগালের রাজ্যস্থাপন ও রাজ্যবিস্তা- রের মূল কারণ বিবৃত করিবার সময়ে স্পষ্টাক্ষরেই লিখিয়া গিয়াছেন, “যাহারা ধৰ্মার্থ আত্মােৎসর্গ করিয়াছিলেন, তাঁহাদিগের পবিত্র শােণিতেই রাজ্যস্থাপন ও রাজ্যবিস্তার সুসম্পন্ন হইয়াছিল।”+ মুসলমান- ; *In the stern school of adversity ihe latent energies of the race had been gradually developed. Religion, or rather religious fanaticism was the inspiring principle, the very main-spring of every movement, of every heroic exploit. Their wars were rather Crusades than patriotic struggles. They fought the Moor rather as an enemy to the faith, than as the invader of their country-Portuguese Discoveries by Rev. Alex. 7. D. D' Orsey. B. D. of "The Kingdom was founded in the blood of Martyrs and by Martyrs was spread over the globe."--De Barros.
ফিরিঙ্গি বণিক বিজয় সুসম্পন্ন হইলেও, এই ধৰ্ম্মোন্মাদ সহসা বিলুপ্ত হইতে পারে নাই। নিকটের মুসলমান বিজিত হইলে, দূরের মুসলমানকে জয় করিবার জন্য, এবং মুসলমানের অনধিকৃত রাজ্যে খৃষ্টধৰ্ম্মের সুসমাচার প্রচার করিবার জন্য, বহুকাল পর্যন্ত প্রবল উৎসাহ প্রকাশিত হইয়াছিল। রাজা প্রজা সকলেই তাহার জন্য অর্থ দান করিতেন; বীরপুরুষগণ আহুত হইবামাত্ৰ ধৰ্ম্মযুদ্ধে জীবন-বিসৰ্জন করিবার জন্য সগর্বে ধাবিত হইতেন; কখন বা নিতান্ত তুচ্ছ কারণে যুদ্ধকলহের সৃষ্টি করিয়া, জীবনমুক্তিলাভের সহজ পথ প্রস্তুত করিবার জন্য ব্যাকুলতা-প্রদর্শন করিতেন। তৎকালে স্পেন-পর্তুগালের অপর পারে আফ্রিকার উপকূলে মুসল- মানরাজ্য প্রতিষ্ঠিত ছিল। ভূমধ্যসাগরেও মুসলমান-রণতরণী জলপথে আধিপত্য বিস্তার করিত। মুসলমান-বিদ্বেষ যেমন স্থলপথে ধৰ্ম্মযুদ্ধে জীবন-বিসৰ্জন করিবার জন্য ইউরােপকে উত্তেজিত করিয়াছিল, সেইরূপ জলপথেও রণতরণী সজ্জীভূত করিবার প্রয়ােজন প্রকাশিত করিয়াছিল। পর্তুগাল অল্পদিনের মধ্যে জলপথেও প্রবল হইবার জন্য ব্যাকুল হইয়া উঠিল। খৃষ্টীয় ত্রয়ােদশ শতাব্দীর শেষভাগে পৰ্ত্ত- গালের প্রথম রণতরণী নিৰ্ম্মিত হইল। ইউরােপীয় জনপদনিচয়ের মধ্যে নিতান্ত ক্ষুদ্র হইয়াও, পৰ্তুগাল এইরূপে বৃহৎ বিজয় গৌরব- লাভের যােগ্য হইয়া উঠিতে লাগিল। ইংরাজ ইতিহাসলেখকগণ পর্তুগালের এই অসাধারণ কৃতিত্বলাভের ইতিহাস অধ্যয়ন করিয়া, তাহার মূলে ইংলণ্ডের প্রভাব থাকা ব্যক্ত করিবার জন্য, নানা ঐতিহাসিক কারণ-পরম্পরার উল্লেখ করিতে প্রবৃত্ত হইয়াছেন। ইংলণ্ডের ধৰ্ম্মবীরগণ কখন কখন পথিমধ্যে বিশ্রাম- লাভাৰ্থ কিছুক্ষণের জন্য পর্তুগালে অবতীর্ণ হইতেন; তাহারা কখন বা ধনুর্বাণহস্তে পর্তুগালের প্রজাবৃন্দের পক্ষাবলম্বন করিয়া, মুসলমানের আত্মােৎসর্গ ৪১. সহিত যুদ্ধ করিতেন ; রাজকুমার হেনরীর জননী ইংলণ্ডের রাজবংশে জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন ;-এই সকল পুরাতত্ত্বের উল্লেখে পর্তুগালের অভ্যুদয়ের মূলে ইংলণ্ডের প্রবল প্রভাব আবিষ্কার করিবার জন্য যাহার ইতিহাস রচনা করিতেছেন, তাহারা ইংরাজ। ইহাতে তাহাদের স্বদেশ-প্রীতি অভিব্যক্ত হইলেও, ঐতিহাসিক বিচার-বুদ্ধির প্রাখৰ্য্য অভিব্যক্ত হইতেছে বলিয়া বােধ হয় না। * পর্তুগাল ক্ষুদ্র হইলেও, তাহার ক্ষুদ্রতার মধ্যেই প্রবল শক্তিবীজ গুপ্তভাবে বর্তমান ছিল। ইউরােপের অন্যান্য প্রদেশে কেবল ধৰ্ম্মো- ন্মাদ প্রবল হইয়া উঠিয়াছিল ; পর্তুগালের ধৰ্ম্মোন্মাদের সহিত স্বদেশ প্রীতিও মিলিত হইয়াছিল। পর্তুগালের স্বদেশ-বৎসল ইতিহাস- লেখকের মতে ধৰ্ম্মবীরগণের আত্মােৎসর্গই পর্তুগালের অভ্যুদয়ের ঐতি- হাসিক মূল-সূত্র। তাহা কেবল অপরাজিত অধ্যবসায়ের বিজয়-কাহিনী। পর্তুগালের আধুনিক অভ্যুদয়-কাহিনী যত সংক্ষেপে ও সরলভাবে কীৰ্তিত হইয়া আসিতেছে, প্রকৃত অভ্যুদয় তত সংক্ষেপে বা সরলভাবে সাধিত হইতে পারে নাই। তাহার জন্য আলফনসাে নামধেয় তিন জন নরপতি দীর্ঘকাল কেবল পূৰ্ব্ব-সূচনার সূত্রপাত করিয়াই জীবন-বিসর্জন করিয়াছিলেন। সাঙ্কো ও ডিনিজ নামধেয় নরপালদ্বয়ের শাসন-কাল কৃষি- শিল্পবাণিজ্যের সমুন্নতিসাধন-চেষ্টায় অতিবাহিত হইয়া গিয়াছিল। চতুর্থ * The English alliance formed the key-stone of the policy of John the Great. The friendship of Portugal and England had, indced, been of slow and solid growth. Towards the close of the twelfth century a body of London crusaders halted on their way to the Holy Land to help the Portueguse against the Moors. The end of the thirteenth and beginning of the fourteenth centuries found King Diniz "The Labourer" in close correspondence with our Edwards I. and II., &c., &c.-Sir IV. Hunter's History of British India, vol.1, 58, ফিরিঙ্গি বণিক আসসা নামধেয় নরপালকে স্পেন-পর্তুগালের গৃলকলহ শান্ত করিতেই ব্যতিব্যস্ত হইয়া জীবনয় করিতে হইয়াছিল। এই সকল বাধা- বিঘ্ন দূর হইলেও, পর্তুগালের অভ্যুদয়-পথে আরও অনেক প্রবল বিঘ্ন- বাধা বর্তমান ছিল। ধৰ্মচাৰ্যগণ ধৰ্ম্মযুদ্ধার্থ উৎসাহদান করিতেন । সামগণ উৎসাহে উদ্দীপ্ত হইয়া, ধৰ্মার্থ জীবনবিসর্জন করিতেন ;- এই উভয় শক্তির উপর নির্ভর করিয়াই, নরপতি সিংহাসনে উপবিষ্ট হইয়াছিলেন। ইহারা রাজশক্তিকে গ্রাহ করিতে অসম্মত হইয়া, পর্তু- গালে যে গৃহবিবাদের সূত্রপাত করেন, তাহতেই পৰ্তুগালের সকল আশা আকাশ-কুসুমে পরিণত হইত। পতিত জাতির অভ্যুদয়লাভের পথে যাহা কিছু বিন্ন বাধা বৰ্ত্তমান থাকিতে পারে, পৰ্তুগালের পক্ষে তাহার অভাব ছিল না। কে কাহাকে মানিতে চাহিত ? মুসলমান- বিদ্বেষ কেবল ধর্মযুদ্ধকালেই সকল পক্ষকে সাধারণ উদ্দেশ্যসিদ্ধির জন্য এক পথে পরিচালিত করিত। সে উদ্দেশ্য সিদ্ধ হইবার পর, সকলে স্ব-প্রধান হইয়া, সৰ্বাংশে রাজশক্তির অবমাননা করিতে ত্রুটি করিতেন । খৃষ্টীয় ১৩৮৬ অব্দে আলজুবাৰােটার সমর-ক্ষেত্রে রাজশক্তি জয়- ‘যুক্ত হইয়া, পর্তুগালের অভ্যুদয়লাভের পথ পরিষ্কৃত করিয়া দিল। পৰ্ত্ত গালের ইতিহাস-বিখ্যাত জন-দি-গ্রেট এইরূপে রাজসিংহাসনের মৰ্যাদা-সংস্থাপনে কৃতকাৰ্য্য না হইলে, পর্তুগালের ইতিহাস জগদ্বিখ্যাত হইবার সুযােগ প্রাপ্ত হইত না।* জন-দি-গ্রেট যথার্থ ই চিরস্মরণীয় হইবার যােগ্য। তাহার সুদৃঢ়শাসন কিঞ্চিদূন অর্ধশতাব্দীকাল পৰ্তুগালকে ভূমণ্ডলের সকল প্রদেশেই সু- Yet all the efforts of the Kings, though occasionally successful, failed to curb the turbulence of the feudatories till the battle of Aljubarrota in 1385. gained by John I. over the rebels, effectually, crushed insubordination, and restored the dignity of the Crown- Dialogos-de-voria-Historia, মাতা ও পুত্র ৪৩ পরিচিত করিয়া তুলিয়াছিল। এই নরপতি ১৩৮৫ হইতে ১৪৩৩ খৃষ্টাব্দ পৰ্যন্ত পৰ্ত্ত গালের রাজসিংহাসন অলঙ্কত করিয়াছিলেন। তিনি যখন সিংহাসনে পদার্পণ করেন, তখন তাহার তরুণ জীবন। তখন ইংলণ্ডে- শ্বর তৃতীয় এডওয়ার্ডের সুযােগ্য পুত্র জন-অব-ঘণ্ট ইউরােপে সুপরিচিত হইয়াছিলেন। তিনি স্পেদেশের রাজকুমারীর পাণিগ্রহণ করিলেও, স্পেন-পর্তুগালের গৃহকলহে পর্টুগালের পক্ষাবলম্বী হইয়াছিলেন। সে কলহের অবসানে জন-দি-গ্রেট পর্তুগালের সিংহাসনে আরােহণ করিলে, জন্-অব-ঘণ্টের দুহিতার সহিত তাহার পরিণয়-সম্বন্ধ সংস্থাপিত হইয়া- ছিল। ইংলণ্ডীয় রাজকুমার ১৩৮৬ খৃষ্টাব্দে দুহিতৃদ্বয় সমভিব্যাহারে পর্তুগালে উপনীত হইয়া, কন্যাদানের জন্য ব্যস্ত হইয়া উঠিয়াছিলেন। স্পেন-পর্তুগালের অধীশ্বরদ্বয় তাহার জামাতৃদ্বয় বলিয়া মনােনীত হইবা- মাত্র, শুভবিবাহ সুসম্পন্ন হইয়া গেল। এই বিবাহ-সূত্রে স্পেন-পর্ত্ত- গালের গৃহকলহের পুরাতন সূত্র ছিন্ন হইয়া গেল। যে বৃটনরাজকুমারী পৰ্তুগালের রাজমহিষী হইলেন, তাহার নাম ফিলিপা। তিনি রূপে গুণে রাজলক্ষ্মী বলিয়াই ইতিহাসে উল্লিখিত। তঁাহার ধৰ্ম্মজীবন আড়- স্বরশূন্য আত্মত্যাগের জন্যই সুবিখ্যাত। তিনি রাজমহিষী হইয়াও ব্রহ্মচারিণীর ন্যায় নিয়ত ধৰ্ম্মকর্মে ই জীবন-যাপন করিতেন। ইতিহাস- বিখ্যাত রাজকুমার হেনরী হঁহারই পঞ্চম পুত্র। তিনি সর্বাংশে জননীর ধৰ্ম্মজীবনের আত্মত্যাগপ্রবৃত্তির উত্তরাধিকারী হইয়া, তরুণজীবনে চিরকুমারব্ৰত গ্ৰহণ করিয়া, স্বদেশের ও স্বধৰ্ম্মের সেবায় সম্পূর্ণরূপে আত্মােৎসর্গ করিয়াছিলেন। ইহাই আধুনিক ইউরােপের নবজীবন- দাতার জন্মের ও বাল্যকাহিনীর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস।
ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ অসাধারণ আত্মত্যাগ The institution of chivalry, one which has so inuch elerated human nature,--that love of glory instead of mere country,--that spirit purified from contamination of surrounding barbarism,- appeared upon the banks of the Tagus, with all the splendour which had characterised its origin in France and England. Fortuguese Discoveries অসাধারণ আত্মত্যাগই মানবসমাজের অভ্যুদয় লাভের মূল কারণ বলিয়া ইতিহাসে সুপরিচিত। সম্ভোগ মানবসমাজকে স্বার্থপর করিয়া, অভ্যুদয় লাভের পথ সংকীর্ণ করিয়া রাখে। স্বার্থচিন্তা প্রবল হইলে, প্রধান পুরুষগণকেও স্বদেশদ্রোহে লিপ্ত করিয়া, অধঃপতনের সূত্রপাত করে। পর্তুগাল যখন মুসলমান-শাসন উৎখাত করিয়া, স্বাধীনতালাভের আয়ােজন করিতে প্রবৃত্ত হইয়াছিল, সে সময় ইউরােপের নবজীবন- লাভের প্রথম প্রভাত বলিয়া উল্লিখিত হইতে পারে। তখনও মধ্যযুগের অজ্ঞানতার অন্ধকার সম্পূর্ণরূপে তিরােহিত হয় নাই,তখনও স্বার্থ ছাড়িয়া পরার্থ-চিন্তার জন্য নূতন আকাঙ্ক্ষা ভাল করিয়া আত্মপ্রকাশ করিতে প্রবৃত্ত হয় নাই। তথাপি আশার তরুণ কিরণে দিগ্বলয় ধীরে ধীরে উদ্ভাসিত হইয়া উঠিতেছিল। স্বদেশ অপেক্ষা স্বকীর্তি যেন অধিক প্রতাপে মানবসমাজে কৰ্তব্যনিষ্ঠার নূতন শিক্ষা প্রচারিত করিবার জন্য ব্যস্ত হইয়া উঠিতেছিল। যেখানে অত্যাচার, সেখানেই জনসাধারণ তাহার বিরুদ্ধে সশস্ত্রে দণ্ডায়মান ;-প্রতিকারকামনায় জীবনবিসর্জন করিতে প্রস্তুত,—প্রয়ােজন হইলে, দলে দলে পতঙ্গবৎ অনলশিখায় আত্মােৎসর্গ করিতে লালায়িত।
৪৫ সেকালের ৩ নব ধর্মনীতি এই শিক্ষা একদিকে অকুতােভয়তায়, অন্যদিকে অকৃত্রিম গৌরব- লালসায়, ইউরােপীয় জনসমাজকে অসাধারণ আত্মত্যাগ স্বীকার করি- বার জন্য প্রস্তুত করিয়া তুলিয়াছিল। রাজকুমার হেরী এই যুগে জন্ম- গ্রহণ করিয়া, শৈশবেই অধ্যবসায়শীল, কর্তব্যনিষ্ঠ বীরবালক বলিয়া পরিচিত হইয়াছিলেন। সেকালের ধৰ্ম্মোন্মাদ তাহাকেও উন্মত্ত করিয়া তুলিয়াছিল। মুসলমান-বিদ্বেষ তাহার তরুণ হৃদয়েও জিগীষার জন্মদান করিয়া, খৃষ্টধর্মপ্রচারকার্যে উত্তেজনা উপস্থিত করিয়াছিল। সেকালের লােকচরিত্রের নিগুঢ় রহস্য ভেদ করিয়া, এই সকল বিমিশ্র চিত্তবৃত্তির কথা স্মরণ রাখা আবশ্যক। যে কেহ ধৰ্ম্ম- রাজসংস্থাপন-কামনায় আত্মােৎসর্গে অগ্রসর হইত, সে কেবল সন্ন্যাসী হইয়া, একগণ্ডে চপেটাঘাত সহ্য করিয়া, অন্য গণ্ড ফিরাইয়া দিয়া, খৃষ্ট- ধর্মের মর্যাদা রক্ষা করিতে সম্মত হইত না; বরং অনেক সময়ে স্বয়ং অগ্রবর্তী হইয়া, অপরের গণ্ডে অকারণে চপেটাঘাত করিয়া, ঔদ্ধত্য প্রকাশিত করিতেও লজ্জিত হইত না! যে কেহ বিষয়সুখে জলাঞ্জলি দিয়া, সন্ন্যাসীর কঠোর তপস্যায় খৃষ্টান-সমাজের সেবাব্ৰত গ্ৰহণ করিত, সে কেবল ভিক্ষালব্ধ তিল-তণ্ডুল লইয়া তৃপ্তিলাভ করিত না ;-সময় বা সুযোেগ প্রাপ্ত হইবামাত্র পরস্বপহরণেও কুণ্ঠিত হইত না! উদ্দেশ্য ভাল হইলেই হইল ; কিরূপে সে উদ্দেশ্য সফল করিতে হইবে, তাহার বিচার-বিতণ্ডার প্রয়ােজন উপস্থিত হইত না;-বাহুবল তাহার মীমাংসা- ভার গ্রহণ করিয়া, খৃষ্টানসমাজকে চিন্তামুক্ত করিত। এই ধৰ্ম্মনীতি এসিয়ার শান্তশীতল খৃষ্টধৰ্ম্ম-নীতি হইতে পৃথক হইয়া পড়িয়াছিল। হেরী যখন ধাত্রীক্রোড়ে,-শৈশবক্রীড়ায় অবসরশূন্য,-হেনরীর জন্মভূমি তথন মুসলমান-বিজয়ের নূতন পথে দণ্ডায়মান। মুসলমানগণ ৪১ ফিরিঙ্গি বণিক পর্তুগাল হইতে তাড়িত হইয়া, আফ্রিকার উত্তরপশ্চিমাঞ্চলে সমুদ্রোপ- কূলে রাজ্যভােগ করিতেন। অশান্ত পর্তুগাল সেখানে উপনীত হইয়াও মুসলমান-রাজ্য বিধ্বস্ত করিবার জন্য লালায়িত হইয়া উঠিয়াছিল। এই কাৰ্য্য ধৰ্ম্মসঙ্গত বলিয়া, খৃষ্টান ইউরােপ, জয়ধ্বনি করিয়া, পর্তুগালকে নিরন্তর উৎসাহদান করিতে প্রবৃত্ত হইয়াছিল। ইংলণ্ডের ধনুধরগণ ইংলণ্ডাধিপতির জামাতার সমরবিজয়ের সহচর হইবার জন্য, সগর্বে আস্ফালন করিয়া উঠিয়াছিলেন। আয়ােজনের ত্রুটি হইল না ;-জীবন-বিসর্জনের অবধি রহিল না ; আত্মত্যাগের পুণ্যকীৰ্ত্তিতে খৃষ্টান-সমাজের ধৰ্ম্মোন্মাদ শতগুণে বর্ধিত হইতে লাগিল;-তথাপি মুসলমানশক্তি সহসা পিপীলিকার ন্যায় পদ- বিদলিত হইতে সম্মত হইল না। মুসলমানগণ অভেদ্য কিউটা-দুর্গের আশ্রয় গ্রহণ করিয়া,অসিহস্তে আত্মরক্ষার জন্য বীরদর্পে দণ্ডায়মান হইল। তাহাদের উপর সমুদ্রতরঙ্গের ন্যায় শক্রসেনাতরঙ্গ প্রবল গর্জনে পুনঃ পুনঃ আস্ফালন করিয়া, আঘাত করিতে লাগিল ।তথাপি মুসলমানগণ রিচলিত হইল না! পঞ্চদশ শতাব্দীর প্রারম্ভে এই সকল শক্তিপরীক্ষায় পৰ্ত্ত গালের দিগ্বিজয়-লালসা উত্তরােত্তর প্রবল হইয়া উঠিল। রাজকুমার হেনরী অষ্টাদশ বর্ষে পদার্পণ করিতে না করিতেই, সেনা- নায়ক হইয়া, মুসলমান-বিজয়ের জন্য আফ্রিকার সমুদ্রোপকূলে প্রেরিত হইলেন। হেনরী বিজয়লাভ করিলেন। যে মুসলমান দুর্গ এতকাল অভেদ্য বলিয়া সুপরিচিত ছিল, তাহা অবরুদ্ধ হইল! মুসলমানের শেষ আশ্রয়স্থল অধিকার করিবার আশায়, হেনরী অসাধ্যসাধনে কৃতসংকল্প হইলেন। তাঁহার চরিতাখ্যায়ক এই দুর্গজয়-কাহিনীর বর্ণনা করিবার সময়ে, হেনরীর অসাধারণ আত্মত্যাগের কথা পুনঃপুনঃ কীৰ্ত্তন করিয়া গিয়াছেন। সে দিন মুসলমান-সেনা প্রাণপণে আত্মরক্ষার চেষ্টা করিয়া- ছিল। তাহদের প্রবল প্রতাপে খৃষ্টান-সেনা পুনঃপুনঃ দুর্গমূল হইতে = অলৌকিক আত্মত্যাগ। ৪। তাড়িত হইয়াছিল। কেবল একজন খৃষ্টান সেনানায়ক দৃঢ়পদে দণ্ডায়- মান থাকিয়া, অকুতােভয়তার প্রতিমূর্তিরূপে প্রতিভাত হইয়াছিলেন। সেই খৃষ্টান সেনানায়ক স্বয়ং রাজকুমার হেনরী। দুর্গজয় সুসম্পন্ন হইলে, এই অলৌকিক বীরত্বকাহিনী সমগ্র ইউ- রােপখণ্ডে ব্যাপ্ত হইয়া পড়িল। পােপ,জর্মন সম্রাট-স্পেনরাজ, ইংলণ্ডাধিপতি—সকলেই রাজকুমার হেল্পীকে আপন আপন রাজ্যের সেনাপতি করিবার আশায় তাহাকে পুনঃপুনঃ আমন্ত্রণ করিতে লাগি- লেন। পৰ্তুগালের অধীশ্বরের পঞ্চম পুত্রের পক্ষে রাজসিংহাসনে আরােহণ করিবার সম্ভাবনা না থাকিলেও, সেনাপতি হইয়া অতুল ঐশ্বৰ্য্য এবং অলৌকিক বীরকীৰ্ত্তি সস্তোগ করিবার সম্ভাবনা উত্তরােত্তর প্রবল হইয়া উঠিয়াছিল। বীরকুমারীগণ নবীন সেনাপতিকে অভ্যর্থনা করিবার জন্য বরমাল্য হস্তে হেরীর প্রত্যাগমন-পথে প্রতীক্ষা করিতে গিয়া দেখিতে পাইলেন,-হেী এক অসাধারণ আত্মত্যাগে সমগ্র ইউ- রােপকে বিস্মিত করিয়া দিলেন। তিনি স্বদেশে প্রত্যাবৃত্ত হইয়া, চিরকুমার-ব্ৰত গ্ৰহণ করিয়া, সন্ন্যাসী হইলেন। রাজকুমার হেল্পীর এই অলৌকিক আত্মত্যাগ ইউরােপের ইতি- হাসে উজ্জ্বল অক্ষরে লিখিত হইয়া রহিয়াছে। ইহা অসাধারণ সন্ন্যাস- কাহিনী। স্বদেশের অভ্যুদয়কামনাই ইহার একমাত্র মূলমন্ত্র। কিরূপে স্বদেশের মুখ উজ্জ্বল করিয়া তুলিবেন, কিরূপে স্বদেশের পদমর্যাদা বিশ্বব্যাপ্ত করিবেন, কিরূপে স্বদেশের ঐশ্বৰ্যগৰ্ব স্ফীত করিয়া দিবেন, তাহার উপায় উদ্ভাবিত করিবার জন্য, সেই উপায় অবলম্বন করিয়া স্বদেশের অভ্যুদয় সাধনের জন্য, হেনরী সন্ন্যাস গ্রহণ করিয়াছিলেন। ইতিহাস এরূপ অকৃত্রিম আত্মত্যাগের মস্তকে চিরদিন পুষ্পবর্ষণ করিয়া থাকে। আফ্রিকার উত্তরপশ্চিমােপকূলের মুসলমান-রাজ্য দক্ষিণাংশের নানা ৪৮ ফিরিঙ্গি বণিক স্থান হইতে বাণিজ্য-ব্যাপারে ধনাহরণ করিত। হেনরী সন্ন্যাস গ্রহণ করিয়া, সেই সকল স্থানে যাতায়াতের জলপথ আবিষ্কৃত করিবার জন্য বদ্ধপরিকর হইলেন। তাহার বাল্যশিক্ষা তাহাকে গণিত-বিজ্ঞানের অনুরক্ত করিয়া তাহাকে এই কাৰ্য্য সুসম্পন্ন করিবার সামর্থ্যদান করিয়াছিল। সন্ন্যাসী সে সামর্থ্য স্বদেশ-সেবায় উৎসর্গ করিয়া দিলেন। তিনি রাজকোষ হইতে যে বৃত্তি লাভ করিলেন, তাহা এই কার্যের সহায়তা সাধন করিল। খৃষ্টধর্ম প্রচারিত হইবার পূর্বে ইউরােপের “ই”—পুরােহিতগণ জনসাধারণের শ্রদ্ধা আকর্ষণ করিবার আশায় নানা অলৌকিক শক্তির পরিচয় প্রদান করিবার চেষ্টা করিতেন। অশিক্ষিত জনসাধারণ পুরাে- হিতবর্গের কোন কাহিনীতেই অনাস্থা প্রদর্শন করিত না। “সেন্টভিন- সেন্ট” নামক পৰ্ত্ত গালের বিশ্ববিখ্যাত অন্তরীপ পুরােহিতগণের পবিত্র সাধনক্ষেত্র বলিয়া পরিচিত ছিল। তথায় তাঁহাদিগের মন্দিরে প্রতি রজনীতে দেবতাদিগের সমাগত হইবার কথা জনসাধারণ নিরতিশয় শ্রদ্ধার সহিত শ্রবণ করিত,-সৰ্বান্তঃকরণে বিশ্বাস করিতে কুণ্ঠিত হইত না! খৃষ্টধর্ম প্রচারিত হইবার পরেও এই পুণ্যক্ষেত্র অলৌকিক শক্তিলাভের সাধনক্ষেত্র বলিয়া সুপরিচিত ছিল। সন্ন্যাস গ্রহণ করি- বার পর, রাজকুমার হেনরী এই পুরাতন পুণ্যক্ষেত্রেই আশ্রম সংস্থাপিত করিলেন। কি উদ্দেশ্যে হেরী এই স্থান মনােনীত করিয়াছিলেন, তাহা সহজেই অনুমিত হইতে পারে। A * In days long past, there stood upon the sister head-land of St. Vincent, at about a league's distance, a circular Druidical temple, where, as Strabo tells us, the old Iberians beleived that the Gods assembled at night, and from the ancient name of Sacruri! Promontorinm, hence given to the entire promontary hy the Ramans, Cape Sagres received its modern appelation. As may be imagined the motive for the Prince's choice could not have been an ordinary one.-Major's "Prince Henry, the Navigator,"p2.
আত্মােৎসর্গ আটলান্টিক মহাসাগরের অনন্ত নীলাম্বু-কল্লোল আশ্রমনিবাসী নবীন সন্ন্যাসীর কর্ণপুটে নিয়ত প্রতিধ্বনিত হইয়া, তাঁহাকে নিরন্তর মহাসাগরের রহস্যভেদ করিবার জন্য উৎসাহযুক্ত করিত। তিনি আফ্রিকার পশ্চিমােপকূলের সন্ধানলাভার্থ জলযান নির্মাণে ব্যাপৃত হইয়া, অপরিজ্ঞাত সমুদ্রপথে পােতচালনা করিবার বৈজ্ঞানিক শিক্ষাবিস্তারের আয়ােজন করিতে প্রবৃত্ত হইলেন। অল্পকালের মধ্যেই এই পুণ্যাশ্রম নৌবিদ্যালােচনার প্রধান পাঠ- শালায় পরিণত হইল। ইউরােপের নানাস্থানের প্রবীণ নাবিকগণ তথায় উপনীত হইয়া, অভিনব জ্ঞানলাতে সুশিক্ষিত হইয়া উঠিতে লাগিল। হেনরী ধৰ্ম্মবীর,হেরী সন্ন্যাসী,-হেনরী সুপরিচিত স্বদেশ- প্রেমিক। তাঁহার নিকট অভিনব জ্ঞান শিক্ষা করিতে কাহারও ইতস্ততঃ হইল না। পর্তুগালের জনসাধারণ এতদিনের পর সুদূর সমুদ্র- পারের অজ্ঞাত রাজ্যের ধনাহরণ করিয়া সমৃদ্ধিলাভ করিবে,—চিরশত্রু মুসলমানকে পরাভূত করিয়া মুসলমানাধিকৃত বহুদেশে খৃষ্টধর্ম প্রচারিত করিবার অবসরলাভ করিবে,—এই আশার আলােকে পর্তুগালের রাজাপ্রজা সমভাবে প্রবুদ্ধ হইয়া উঠিলেন। তখন পর্যন্ত পর্তুগাল ভিন্ন অন্য কোনও খৃষ্টান রাজ্যের পক্ষে এই সকল সুযােগ উপস্থিত হইতে পারে নাই। সুতরাং ক্ষুদ্র হইয়াও, পর্তু- গাল এই দুষ্কর কাৰ্যের পথ-প্রদর্শক হইবার অবসরলাভ করিয়াছিল। The war-like character of the population, the long range of coast bordered by the unknown Atlantic, and the desire to avenge the thraldom under which their native land had groaned, inspired the Portuguese with a desire to carry the war into the enemy's tounery, and to subdue the territory of the infidel to the Faith of the Cross. ---Portuguese Discoveries, by Lev. Alex J. D, D' Orsey, B, D. p. 7-8. ৪ ফিরিঙ্গি বণিক । যে অদম্য উৎসাহ,—অপরাজিত অধ্যবসায়,-অসাধারণ আত্মত্যাগ,-ইহা ভিন্ন হেনরীর অন্য সম্বল অধিক ছিল না। যে সকল জলযান প্রচলিত ছিল, তাহা ক্ষুদ্রকায় ;-কেবল ক্ষেপণিবলে পরিচালিত হইত। সকল নাবিক বহুদশী বলিয়া অহঙ্কার প্রকাশ করিত, তাহারা কেবল তট-সংলগ্ন সমুদ্রজলের উপকূলপথে পােতচালনায় সিদ্ধহস্ত ;—ইহা ভিন্ন হেনরীর সম্মুখে অন্য কোনও উপকরণ বর্তমান ছিল না। অবিজ্ঞাত নূতন দেশের আবিষ্কার-সাধনের জন্য সুদূর সমুদ্রপথে পােত-চালনা করিতে হইলে, দীর্ঘকালের জন্য অন্নজল সঞ্চিত করিতে হয়। সেকালের ক্ষুদ্র পােতে তাহার স্থান সংকুলন হইবার সম্ভাবনা ছিল না। কেবল পােতের আয়তন বর্ধিত করিলে, তাহাকে ক্ষেপণিবলে চালিত করাও কঠিন হইয়া উঠিত। এই সকল বিঘ্নবাধা হেীর নিকট এক সময়ে অনতিক্রমনীয় বলিয়াই প্রতিভাত হইয়াছিল। তথাপি তাঁহার অধ্যবসায় অবসন্ন হয় নাই। তিনি বায়ুবলে পােত-চালনা করিবার শিক্ষাদান করিয়া, অর্ণবযানের আয়তন বর্ধনের চেষ্টা করিতে প্রবৃত্ত হইলেন। সুদূর সমুদ্রপথে পােত- চালনা করিতে হইলে, সকল সময়ে উপকূল-ভূমির প্রতি লক্ষ্য রাখিয়া, দিঙ নির্ণয় করিবার উপায় থাকে না। কখন কখন অনন্ত মহাসমুদ্রে পতিত হইয়া দিগ্ভ্রান্ত হইতে হয়। হেনরী এই সকল অসুবিধা দূর করিবার জন্য যন্ত্রনির্মাণে ব্যাপৃত হইয়াছিলেন। একালের তুলনায় তাহা অসম্পূর্ণ ও অকিঞ্চিৎকর হইলেও, সেকালের নাবিকগণের পক্ষে তাহাই একমাত্র সহায় বলিয়া পরিচিত হইয়া উঠিয়াছিল। এই সকল আয়ােজন সুসম্পন্ন করিতে কত সময়, কত অর্থ, কত শ্রম ক্ষয়প্রাপ্ত হইতে লাগিল ; কিন্তু হেনরী তাহাতে ধৈৰ্য্যচ্যুত হইলেন ! সিদ্ধিলাভ করিবার জন্য দীর্ঘকাল কত আয়ােজন সম্পূর্ণ করিতে হইয়াছিল, তাহার বর্ণনা করিবার সময়ে কেহ কেহ লিখিয়া গিয়া- আত্মচেষ্টা ছেন,—হেনরীর জীবনের অধিকাংশ ভাগই এই কাৰ্যে ক্ষয় প্রাপ্ত হইয়াছিল ! তাহাকে মান-মন্দির নির্মিত করিতে হইয়াছিল,-নােবিদ্যালয় সংস্থাপিত করিয়া, গণিত-বিজ্ঞানের শিক্ষাদানে সুদক্ষ নাবিকগণকে সুশিক্ষিত করিয়া তুলিতে হইয়াছিল।* অসহিষ্ণু জনসাধারণ এত দীর্ঘকাল ধৈৰ্য্যধারণ করিয়া সিদ্ধিলাভের জন্য অপেক্ষা করিতে পারে ;-তাহারা বীজ বপন করিবামাত্র ফলভােগ করিবার জন্য লালায়িত হইয়া থাকে। তাহারা হেরীর অভিনব জলযানসমূহের বিবিধ দুর্দশার ও ব্যর্থ চেষ্টার সমাচার প্রাপ্ত হইয়া, তাহার বিপুল উদ্যমকে উন্মত্ততা, অবিমৃষ্যকারিতা বলিয়া নিন্দা করিতে লাগিল। সন্ন্যাসী ঝঞ্চাতাড়নার ন্যায় জনসমাজের তীব্র তাড়না অকাতরে সহ করিয়া, সাধনপথে অগ্রসর হইতে লাগিলেন। সেকালে আফ্রিকার পশ্চিমােপকূলের অত্যল্প অংশই খৃষ্টানসমাজের নিকট সুপরিচিত ছিল। হেনরী যখন তদ্দেশে পােত প্রেরণের আয়াে- জন করেন, তখন জিব্রটারের দক্ষিণে অধিকদূর পােতচালনার সম্ভাবনা থাকা নাবিকদিগের নিকট পরিচিত ছিল না। তাহারা জানিত, জিব্রটারের দক্ষিণে ৮ ডিগ্রি পর্যন্ত গমনাগমন করা যায়। তাহার দক্ষিণে “বােজাডর অন্তরীপ”। সেই সীমাই শেষ সীমা। On that barreu spur of rocks and shifting sands, and stuntod juniper, with the roar of the Ocean for ever in his ears, and the wide Atlantic before him inviting discovery from sunrise to sunset, he spent his remaining forty-two years, a man of one high aim,without wife or child. * Amid its solitude he built the first observatory in Portugal, established a naval arsenal, and founded a school for navigation, marine mathematics and chart-making: Thither he invited the most skilful pilots and scientific sailors of Christendom, fron Bruges near the North Sea to Genoa and Venice on the Medeterranean. Thence, too, he sent forth at brief intervals exploring expeditions into the unknown South :-expeditions often unfruitful, sometimes calamitous, even denounced as folly and waste.--Sir W. Hunter, History of British India, vol. I. pp. 62-63.
ফিরিঙ্গি বণিক । এই শেষ সীমা অতিক্রম করিয়া, জলপথে ভারতবর্ষে উপনীত হইবার আশায় ১২৯১ খৃষ্টাব্দে একদল জেনােয়া-নিবাসী সাহসী নাবিক সমুদ্র- যাত্রা করিয়াছিল। তাহারা আর স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করিতে পারে নাই। তাহাদের সাহস বাতুলতা বলিয়া পরিচিত হইয়াছিল, তাহা ইউরােপের কাব্যে ইতিহাসে অতিসাহস বলিয়াই নিন্দিত হইয়াছিল। হেরী সেই পথেই পােত প্রেরণ করিতে কৃতসংকল্প হইয়াছিলেন। তিনি বুঝিয়াছিলেন,-প্রচলিত জনশ্রুতির অলীকত্ব সংস্থাপিত করিতে না পারিলে, ভারতযাত্রা সফল হইবে না,-নাবিকগণ সাহস করিয়া অকূল সমুদ্রে অগ্রসর হইবে না। পঞ্চদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে হেরীর সুশিক্ষিত নাবিকগণ “বােজাডর অন্তরীপ অতিক্রম করিয়া স্বদেশে প্রত্যাবৃত্ত হইলে খৃষ্টান সমাজের ভ্রান্ত সংস্কার দূরীভূত হইয়া গেল। বিষুব-রেখার নিকটবর্তী হইলে যে ভস্মসাৎ হইবার আশঙ্কা নাই, সে কথা জনসমাজে ব্যাপ্ত হইয়া পড়িল। হেনরীর দীর্ঘ সাধনা সিদ্ধিলাভ করিল। ক্রমে দক্ষিণাভিমুখে অগ্রসর হইতে পারিলেই যে ভারতবর্ষের পথ আবিষ্কৃত হইবে, তাহাতে কাহারও সংশয় রহিল না। কিন্তু এই কাৰ্য সুসম্পন্ন করিতে যত সময় অপেক্ষা করিবার প্রয়ােজন, তত সময় সন্ন্যাসীর নশ্বর দেহ ধরাধামে রহিল না। তাহার তিরােভাবে সমগ্র ইউরােপ হাহাকার করিয়া উঠিল। পুণ্যাশ্রমের সাগর-সৈকতের দুর্গদ্বারে হেনরীর অসাধারণ আত্মত্যাগের স্মৃতিচিহ্ন- স্বরূপ এক অত্যুন্নত জয়স্তম্ভ এখনও মহাসাগর-কল্লোলে স্তয়মান হইয়া সন্ন্যাসীর সম্মান রক্ষা করিতেছে। তাহার ফলক-লিপিতে ১৪৬ খৃষ্টাব্দ হেরীর তিরােভাবকাল বলিয়া উল্লিখিত। । এ বিষয়ে ইতিহাস-লেখকদিগের মধ্যে মত-পার্থক্যের অভাব নাই। তাহার উল্লেখ না করিয়া স্মৃতিস্তম্ভে উল্লিখিত খৃষ্টাব্দকেই হেল্পীর তিরােভাবকাল বলিয়া গ্রহণ করা যাইতে পারে।
সপ্তম পরিচ্ছেদ উত্তমাশা-অন্তরীপ So strangely were right and wrong compounded by these pioneers of so-called Chritianity, that the fifth part of the proceeds of the salc of human beings was granted to the Grand Master of the Order of Christ.-Portuguese Discoveries. রাজকুমার হেরীর সমসাময়িক গােমেজ-ইয়ানেজ-ডি-অহেরারা একজন সুনিপুণ ইতিহাস-লেখক বলিয়া সুপরিচিত। তিনি হেরীর গুণমুগ্ধ স্বদেশভক্ত খৃষ্টান লেখক। তাহার গ্রন্থে এই যুগের নানা রহস্য সুব্যক্ত হইয়া রহিয়াছে। খৃষ্টধর্মাচাৰ্য পােপ (চতুর্থ ইউজি) এই সকল অভিনব আবিষ্কারবার্তা প্রাপ্ত হইয়া, হেনরীকে আফ্রিকা ও তাহার পূর্বাঞ্চলের সকল দেশের একাধিপত্য প্রদান করিয়াছিলেন। মুসলমান বাদশাহগণ আপন সেনাপতি ও অমাত্যবর্গের প্রতি প্রণন্ন হইয়া, তাহাদিগকে পৃথিবীর যে কোনও অংশ দান করিয়া ফেলিতেন। সে দেশ স্বাধীন বা অনধিকৃত হইলেও, দানের ব্যাঘাত ঘটিত না। ভারতবর্ষ জয় করিবার পূর্বেই কুতবুদ্দিন “ভারত-সম্রাট”-উপাধি প্রাপ্ত হইয়াছিলেন ;-বঙ্গদেশে উপনীত হই- বার পূর্বেই বক্তিয়ার খিলিজি “সনন্দ লাভ করিয়াছিলেন। এখনও ইংরেজ-সেনাপতি স্বাধীন কান্দাহারের অধিপতি বলিয়া উপাধি লাভ করিয়া থাকেন। সেকালে এইরূপেই হেনরী সমগ্র প্রাচ্যরাজ্যের আধিপত্য লাভ করিয়াছিলেন। তাঁহার তিরােভাবে পৰ্ত্তগালের অধি- বাসিগণ সেই আধিপত্যের অধিকারী হইলে, তাহাদের ধনলিপ্সা প্রবল হইয়া উঠিয়াছিল। তাহারা যে কোন উপায়ে ধনাহরণের জন্য দেশ- ৫৪ ফিরিঙ্গি বণিক লুণ্ঠনে বহির্গত হইয়াছিলেন। সেকালের খৃষ্টধর্মপ্রচারকগণ ইহাকে অধৰ্ম্ম বলিয়া মনে করিতে পারেন নাই। আফ্রিকার পশ্চিমােপকূলের সন্ধান লাভ করিবামাত্র, পর্তুগালের ধৰ্ম্মোন্মত্ত নাবিকলের অর্থোন্মাদ প্রবল হইয়া উঠিয়াছিল। তাহারা পণ্যদ্রব্যের সন্ধান না পাইয়া, তদ্দেশের কৃষ্ণকায় বর্বরগণকে ছলে বলে ধৃত করিয়া, ক্রীতদাসরূপে বিক্রয় করিতে শিক্ষা করিয়াছিল। এইরূপে ইতিহাসবিখ্যাত “দাস-ব্যবসায়ের সূত্রপাত হয়। এই ব্যবসায়ের লভ্যাংশের পঞ্চমভাগ রাজকুমার হেরীর প্রাপ্য বলিয়া নির্দিষ্ট হইয়া- ছিল। তাহার সমসাময়িক লেখকবর্গ ইহার উল্লেখ করিবার সময়ে হেরীর পক্ষসমর্থনের জন্য লিখিয়া গিয়াছেন,—“ইহাতে দোষ ছিল ; ক্রীতদাসগণ খৃষ্টধৰ্ম্মের আশ্রয়ে আনীত হইয়া, পরিত্রাণের সুসমা- চার লাভ করিত ;-সে লাভের তুলনায় স্বাধীনতার ক্ষতি উল্লেখযােগ্য বলিয়া বিবেচিত হইতে পারে না।” একালেও এরূপ তর্কের অবসান হইয়াছে বলিয়া বােধ হয় না। অপহরণকে দানরূপে ব্যাখা করিয়া, সেকালের লেখকবর্গ চিত্তপ্রসাদ লাভ করিতেন। উত্তরকালে ভারত- বর্ষে উপনীত হইয়াও, ফিরিঙ্গি বণিক এইরূপ দানমাহাত্ম্য কীৰ্ত্তিত করিতে ক্রটি করেন নাই। হিন্দু-মুসলমানের মধ্যেও পুরাকালে ”দাস-ব্যবসায় প্রচলিত ছিল। তাহারা তাহাকে ধৰ্ম্মের আবরণে ঢাকিয়া রাখিবার চেষ্টা করিতেন না। খৃষ্টান সমাজ “দাসব্যবসায়ে লিপ্ত হইবার সময়ে ধৰ্ম্মের ভাণ করিয়া অর্থোপার্জনে ব্যাপৃত হইয়াছিলেন। অল্পদিনের মধ্যেই ইহার ফল ফলিতে আরম্ভ করিল। ক্রীতদাসের হস্তে সৰ্বস্ব সমর্পণ করিয়া, পর্তুগীজগণ দিগ্বিজয়ে বহির্গত হইয়া, অর্থাহরণে নিযুক্ত হইলেন। ধৰ্ম্মো, ন্মাদের সঙ্গে অর্থোন্মাদ মিলিত হইল;-তাহাকে ধৰ্ম্মানুমােদিত করিতে বাধ্য হইয়া, খৃষ্টধর্ম তাহার সমুচ্চশিখর হইতে অধঃপতিত হইতে আরম্ভ অর্থোন্মাদ করিল। সম্ভোগলালসা বিবর্জিত হইয়া, জনসমাজের চিত্তবিকার উৎপাদিত করিয়া দিল। অর্ধশতাব্দী পূর্বে যাহারা আত্মত্যাগে ভুবন- বিখ্যাত হইয়া উঠিতেছিল, তাহারা দেখিতে না দেখিতে সম্ভোগের ক্রীতদাস হইয়া, জলে স্থলে রুদ্রমূৰ্ত্তিতে বিচরণ করিতে আরম্ভ করিল। এই সময়ে হেনরীর সুশিক্ষিত নাবিকগণ সমস্ত ইউরােপে সুপরিচিত হইয়া উঠিয়াছিলেন। তাহাদের জনৈক প্রধান পুরুষের কন্যার পাণি- গ্রহণ করিয়া, স্বনামখ্যাত কলম্বাস গােপনে হেনরীর নৌবিদ্যালয়ের মান- চিত্রাদির সহিত সুপরিচিত হইয়া, পশ্চিমসমুদ্রপথে ভারতবর্ষে উপনীত হইবার জলপথ আবিষ্কৃত করিবার আশায় অশান্ত হইয়া উঠিয়াছিলেন। তাঁহার বিশ্বাস হইয়াছিল,-পশ্চিম সমুদ্রপারেই ভারতবর্ষ। ইহা জন- সমাজের নিকট বাতুলতা বলিয়াই প্রতিভাত হইল। কলম্বাসের সুযােগ্য পুত্র ফার্দিন লিখিয়া গিয়াছেন,-পর্তুগালে অবস্থান করিবার সময়েই তাঁহার পিতার মনে এই সংকল্প উদিত হইয়াছিল। মার্কো পােলো স্থলপথে পূৰ্বাভিমুখে অগ্রসর হইয়া, চীনদেশে আসিয়া সমুদ্রতীরে উপনীত হইয়াছিলেন। পর্তুগালে আসিয়া, স্থলভাগের শেষ এবং মহাসাগরের আরম্ভ লক্ষ্য করিয়া, কলম্বস ভাবিয়াছেন,—প- গাল হইতে পশ্চিমাভিমুখে অগ্রসর হইতে পারলেই, প্রাচ্যরাজ্যে উপনীত হইতে পারিবেন। তিনি এই বিপদসঙ্কুল সমুদ্রযাত্রার জন্য কৃতসঙ্কল্প হইয়া, পর্তুগালের অধীশ্বরের শরণাগত হইয়াছিলেন। দ্বিতীয় জেমস নামক নরপতি তখন পর্তুগালের রাজসিংহাসন অলঙ্কৃত করিতে- ছিলেন। তাহার অমাত্যবর্গ দীর্ঘসূত্রী বলিয়া পরিচিত ছিলেন। তাঁহারা কলম্বসের প্রস্তাবকে বিজ্ঞানবিরুদ্ধ বাতুলতা বলিয়া প্রত্যাখ্যান It was in Portugal that the Admiral began to surmise that if the Portuguese sailed so far South, one might also sail westwards, and find land in that direction.
ফিরিঙ্গি বণিক করিলেন। নরপতি স্বয়ং কোনও অভিমত ব্যক্ত করিলেন না। তিনি তখন আফ্রিকার পথে ভারতবর্ষে উপনীত হইবার আশা প্রাপ্ত হইয়া, অন্য পথে অগ্রসর হইবার প্রয়ােজন স্বীকার করিতে ইতস্ততঃ করিয়া, কালক্ষয় করিতে লাগিলেন। পশ্চিমসমুদ্রপথে অধিকদূর অগ্রসর হইবার সম্ভাবনা আছে কি না, গােপনে গােপনে তাহার অনুসন্ধানকাৰ্যও আরব্ধ হইল। নাবিকগণ ঝঞ্চাবেগ সহ করিতে অসমর্থ হইয়া, পর্তুগালে প্রত্যাগমন করিতে লাগিলেন। কলম্বসও পর্তুগাল পরিত্যাগ করিয়া, স্পেন রাজ্যে গমন করিলেন। ১৪৯২ খৃষ্টাব্দে স্পেনরাজ্যের প্রতিনিধি- রূপে কলম্বাস আমেরিকার আবিষ্কারকার্য সুসম্পন্ন করায়, তাহা ভারতবর্ষ নামেই সুপরিচিত হইল। ইহাতে পর্তুগালের জনসমাজ বিচলিত হইয়া উঠিল। আফ্রিকা অতিক্রম করিয়া ভারতবর্ষে উপনীত হইবার জলপথ শীঘ্র শীঘ্র আবিষ্কৃত না হইলে, ভারত-বাণিজ্য স্পেনরাজ্যের করতলগত হইবার আশঙ্কা প্রবল হইতে লাগিল । আফ্রিকার কোনও এক নিভৃত প্রদেশে প্রেষ্টার জন নামক জনৈক খৃষ্টান নরপতি বর্তমান থাকিবার জনশ্রুতি ইউরােপে ব্যাপ্ত হইয়া পড়িয়া- ছিল। রাজকুমার হেনরী প্রেষ্টার জনের প্রাচ্যরাজ্যের সন্ধানলাভের চেষ্টা করিতে প্রবৃত্ত হইয়াছিলেন। সে চেষ্টা সফল হইবার পূর্বেই তাহার তিরােভাব হয়। পর্তুগালের জনসমাজ তাহার কথা অবগত ছিল। পর্তুগালের অধিপতিও এই সন্ধানকার্যের সহায় হইয়াছিলেন। এইরূপে জলস্থল উভয় পথেই ভারতযাত্রার আকাঙ্ক্ষা উদ্ৰিক্ত করিয়া দিয়া, হেনরী তাহার জন্মভূমির কল্যাণসাধন করিয়া গিয়াছিলেন। তিনি দেখিয়া যাইতে পারেন নাই ;-কিন্তু তিনিই ভারতবর্ষে উপনীত হইবার অভিনব জলবাণিজ্যপথের প্রকৃত আবিষ্কারকর্তা। ১৪৮৬ খৃষ্টাব্দে আগষ্ট মাসে বাথােলেমু ডায়া নামক নাবিক- বর দক্ষিণসমুদ্রপথে প্রেরিত হইয়াছিলেন। মিশরপথে অনুসন্ধান ; অনুসন্ধান-চেষ্টা কাৰ্যে প্রবৃত্ত হইবার জন্য কোভিলহাম এবং পয়ভা নামক দুইজন স্থলপৰ্যটকও বহির্গত হইয়াছিলেন। ভায়া যখন দক্ষিণ সাগরপথে পােতচালনা করেন, এই দুই স্থলপৰ্যটক তথন লােহিতসাগরতীরের এভেন বন্দরে উপনীত হইয়াছিলেন। কোভিলহাম তথা হইতে আরবীয় অর্ণবপােতে আরােহণ করিয়া ভারতযাত্রা করিলেন ;-তাহার সহচর, প্রেষ্টার জনের উদ্দেশে, আবিসিরিয়াভিমুখে প্রস্থান করিলেন। কোভিলহাম ভারতবর্ষের পশ্চিমােপকূলের বিবিধ বন্দর পরিদর্শন করিয়া, তাহা হইতে আফ্রিকার পূৰ্ব্বোপকূলের সােফালা বন্দরে উপনীত হইলেন। সােফালা হইতে মাদাগাস্কর দ্বীপ অতিক্ৰমণ করিয়া ভারত- বর্ষে আসিবার সুপরিচিত সমুদ্রপথ এইরূপে কোভিলহামের প্রত্যক্ষ- গােচর হয়। তিনি বুঝিলেন,-আফ্রিকার দক্ষিণ সীমা অতিক্রম করিয়া সােফালা বন্দরে উপনীত হইতে যাহা কিছু বিলম্ব ; নচেৎ ভারত- বর্ষের পথ আবিষ্কৃত হইয়া গিয়াছে। এই সুসমাচার বহন করিয়া কোভিলহা স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করিবার আশায় মিশরে আসিয়া সহচরের মৃত্যুসংবাদ প্রাপ্ত হইলেন ! কোভিলহামের স্বদেশযাত্রা নিরস্ত হইয়া গেল। তিনি সমস্ত সমাচার লিপিবদ্ধ করিয়া স্বদেশে প্রেরণ করিলেন, এবং আবিসিনিয়া গমন করিবার জন্য পুনরায় পূৰ্বাভিমুখে ধাবিত হইলেন। কোলিহা আবিসিনিয়া-রাজ্যে বিবাহ করিয়া, তদ্দেশেই মানবলীলা সংবরণ করিয়াছিলেন। নচেৎ তিনি ইউ- রােপে উপনীত হইয়া, আবিষ্কর্তা নামে সুপরিচিত হইতে পারিতেন। কোভিলহামের ভ্রমণকাহিনী ইউরােপে উপনীত হইবার পূর্বেই নাবিকবর ভায়া স্বদেশে প্রত্যাবৃত্ত হইলেন। তিনি অকুতােভয়ে দক্ষিণাভিমুখে পােতচালনা করিতে করিতে আফ্রিকার দক্ষিণসীমা- সংলগ্ন সমুদ্রপথে উপনীত হইয়া, প্রবলঝটিকায় বিপর্যস্ত হইয়াছিলেন। তাহার অর্ণবপােত সে ঝটিকাবেগ সহ করিতে না পারিয়া, বহুদূরে ৮ ফিরিঙ্গি বণিক সমস্ত চলিয়া গিয়াছিল। ঝটিকাশেষে নাবিকবর দেখিতে পাইলেন, আফ্রিকার দক্ষিণসীমা অতিক্রম করিয়া তাহার অর্ণবপােত ভারতসাগরে উপনীত হইয়াছে। আনন্দের অবধি রহিল না। কিন্তু সে আনন্দ শীঘ্রই নিরানন্দে পর্যবসিত হইল। নাবিকগণ অশান্ত হইয়া উঠিল। অজ্ঞাত সমুদ্রপথে এতদূর অগ্রসর হইয়া, ঝটিকাবেগে সদলে নিহত হইতে হইতে পরিত্রাণ লাভ করিয়া, নাবিকগণ স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করিবার জন্য ব্যাকুল হইয়া উঠিল। অগত্যা ভারতবর্ষে উপনীত হই- বার আশায় জলাঞ্জলি দিয়া, ডায়া স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করিতে বাধ্য হইলেন। তিনি আফ্রিকার দক্ষিণসীমায় ঝটিকাতাড়িত হইয়াছিলেন বলিয়া, তাহার “ঝটিকান্তরীপ” বলিয়া নামকরণ করিয়াছিলেন। বৃত্তান্ত অবগত হইয়া, পর্তুগালরাজ তাহাকে ভারতবাণিজ্যপথের প্রবেশ- দ্বার বলিয়া “উত্তমাশা-অন্তরীপ” নামে নামকরণ করিলেন! কোভিলহামের ভ্রমণবৃত্তান্ত পর্তুগালে প্রচারিত হইবামাত্র. জন- সমাজ জয়ধ্বনি করিয়া উঠিল। ভারতবর্ষে গমনাগমন করিবার জল- পথ যে সত্যসত্যই আবিষ্কৃত হইয়াছে, সে কথা স্বীকার করিতে আর কাহারও সংশয় রহিল না। কোভিলহামের ভ্রমণবৃত্তান্ত পথপ্রদর্শক হইল। তাহাতে লিখিত ছিল,—যে সকল অর্ণবপােত গিনিপ্রদেশে প্রেরিত হইয়া থাকে, তাহারা আফ্রিকার দক্ষিণসীমা অতিক্রম করিয়া, সােফালা-বন্দরে উপনীত হইতে পারিলেই, ভারতবর্ষের পথ আবিষ্কৃত হইতে বিলম্ব ঘটিবে না। রাজকুমার হেরীর অসাধারণ আত্মত্যাগ সফল হইল,-অকুতােভয় নাধিকবর্গের অপরাজিত অধ্যবসায় জয়যুক্ত হইল,-এসিয়ার ভাগ্য- বিপর্যয় সাধিত হইবার সূত্রপাত হইল। এই সকল কারণে “উত্তমাশা; অন্তরীপ” ইউরােপ-এসিয়ার ইতিহাসে সমভাবে চিরস্মরণীয় হইয়া রহিয়াছে।
অষ্টম পরিচ্ছেদ ভারত-যাত্রা The epic of Vasco Da Gama is an allegory of liis nation's story in the East.-Sir W. Hunter. ভারত-বাণিজ্যের অভিনব জলপথের সন্ধানলাভ করিবামাত্রই প,গালের অধীশ্বর ভারত-যাত্রার আয়ােজন করিবার অবসর প্রাপ্ত হইলেন না। তাঁহার শেষ জীবন নিরবচ্ছিন্ন রােগে-শােকে অতি- বাহিত হইয়া গেল। সৌভাগ্যশালী ইমানুয়েল, সিংহাসনে পদার্পণ করিয়াই, ভারত- যাত্রার আয়োজন করিতে প্রবৃত্ত হইলেন। কিন্তু সে সুদীর্ঘ সমুদ্র- যাত্রার সংকল্প তাঁহার প্রজাবর্গের হৃদয়ে নানারূপ অপূৰ্ব্ব- আতঙ্ক উদ্বেলিত করিয়া তুলিল ! তাহারা ইমান্যুয়েলের অক্লান্ত অধ্যবসায়কে অশান্ত উন্মত্ততা বলিয়া ঘােষণা করিতে লাগিল। জনসমাজ স্থিতিশীল। কখন কোন ক্ষণজন্মা মহাপুরুষ জনসমাজকে সম্মুখে অগ্রসর হইবার জন্য উৎসাহদান করিলেও, লােকে সহসা তাহাতে আগ্রহ প্রকাশিত করে না। রাজকুমার হেনরী পর্তুগালের জনসমাজকে স্বদেশের ক্ষুদ্র সীমা অতিক্রম করিয়া, বিদেশে বৃহৎ বিজয়- গৌরবলাভের জন্য পুনঃপুনঃ আহ্বান করিয়া গিয়াছিলেন। ইমানুয়েল তাহার জন্য সমুচিত আয়ােজন করিতে প্রবৃত্ত হইয়া, জনসমাজের নিকট উৎসাহলাভ করিতে পারিলেন না। কোথায় ভারতবর্ষ, আর কোথায় পৰ্ত্ত গাল! ভারত-যাত্ৰাই যে সমগ্র পাশ্চাত্য জাতির বিবিধ সমুন্নতিলাভের প্রধান কারণ বলিয়া ফিরিঙ্গি বণিক ভবিষ্যতের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হইবে, পর্তুগালের অশিক্ষিত জনসমাজ তাহা বিশ্বাস করিতে পারিল না। তাহারা ইমানুয়েলের বাতুলতার কথাই চিন্তা করিতে লাগিল ! এইরূপে ইমান্যুয়েলের রাজত্বের প্রথম বৎসর অতিবাহিত হইয়া গেল। আফ্রিকা অতিক্রম করিয়া, ভারত-বাণিজ্যের জলপথের আবিষ্কার- সাধনের অধিকার একমাত্র পর্তুগালের উপরেই অর্পিত হইয়াছিল। তখনও পােপের শাসন লঙ্ঘন করিয়া, অন্য কোনও খৃষ্টানসমাজের পক্ষে আফ্রিকার পথে ভারত-যাত্রায় প্রবৃত্ত হইবার সম্ভাবনা ছিল না। তাহারা আটলান্টিক অতিক্রম করিয়া, পৃথক পথের আবিষ্কার সাধনের জন্য লালায়িত হইয়া উঠিয়াছিল। কলস্ তাহার পথ প্রদর্শন করায়, ইংলও সেই পথে ভারত-যাত্ৰা করিবার জন্য ব্যাকুল হইয়া উঠিল। ১৪৯৭ খৃষ্টাব্দের মে মাসে অষ্টাদশ নাবিক সমভিব্যাহারে ইংলণ্ডের ইতিহাসবিখ্যাত নাবিকরাজ জন ক্যাবট সেই পথে ভারতবর্ষের সন্ধানে বহির্গত হইলেন। * আধুনিক ইতিহাসলেখকগণ পর্তুগালের জনসমাজকেই ভারত- যাত্রার প্রধান উত্তর-সাধক বলিয়া বৰ্ণনা করিয়া থাকেন। পর্তুগালের মহাকাব্য “লুসিয়াদ” পাঠ করিলে, তাহাতে আস্থাস্থাপন করা যায় না। “লুসিয়াদ” কাব্য হইলেও, সেকালের জনসমাজের চিত্তবৃত্তির অকৃত্রিম ইতিহাস। তাহাতে দেখিতে পাওয়া যায়,—পৰ্তুগালের জনসমাজ যেন উৰ্দ্ধবাহু হইয়া ইমানুয়েলকে অভিশাপ দান করিয়াছিল। * মালাবার প্রদেশের সেন্টটমাস সম্প্রদায়ভুক্ত খৃষ্টান সমাজের কথা ইংলণ্ডে অপরিজ্ঞাত ছিল না। ৮৩৩ খৃষ্টাব্দে ইংলণ্ডের অলফ্রেড সেন্ট টমাসের সমাধিমন্দিরে উপঢৌকন দ্রব্য প্রেরণ করিবার জন্য এক রাজদূত প্রেরণ করিয়াছিলেন। জল ক্যাবট যখন পশ্চিম সমুদ্রপথে ভারতযাত্রা করেন, তখন “নিউ ফাউন্ডল্যাণ্ড” আবিষ্কৃত হয় ;-ক্যাবট ভারতবর্ষ পৰ্যন্ত অগ্রসর হইতে পারেন নাই।
মহাযাত্রা তথাপি ইমানুয়েল অবিচলিত-হৃদয়ে সংকল্পসাধনে অগ্রসর হইয়া- ছিলেন। তাঁহার আদেশে “সান গাব্রিয়েল” এবং “সা রাফেল” নামক দুইখানি অর্ণবপােত সজ্জীভূত হইল। একালের তুলনায় তাহা নিতান্ত ক্ষুদ্র হইলেও, সেকালের তুলনায় তাহাই সুবৃহৎ বলিয়া বিবেচিত হইয়াছিল। তাহার সহিত দ্রব্য-ভাণ্ডার বহন করিবার জন্য আর দুইখানি ক্ষুদ্র পােত সংযুক্ত হইল। ১৪৯৭ খৃষ্টাব্দের ৮ই জুলাই শনিবার ইউরােপের ইতিহাসের একটি স্মরণীয় দিন। এই দিন টো-নদীর তীরভূমি অপূৰ্ব শােভায় উৎফুল্ল হইয়া উঠিল। সমবেত জনসমূহের সম্মুখে সমুচিত সমারােহে রাজাজ্ঞা বিঘােষিত হইল। স্বদেশের পবিত্র তটতল চুম্বন করিয়া, ভাস্কো ড গামা ১৬০ জন নাবিক লইয়া ভারত-যাত্রায় বহির্গত হইলেন। ধৰ্ম্মযুদ্ধোন্মত্ত অশান্ত বীরপুরুষের উদ্ধৃঙ্খল হৃদয়বেগে অধীর হইয়াও ভাস্কো ডা গামা কাতর-হৃদয়ে বিশ্ববিধাতার কৃপা ভিক্ষা করিয়া রজনী অতিবাহিত করিয়াছিলেন। রাজকুমার হেনরী টেগস-তীরে যে ধৰ্ম্ম-মন্দির নির্মিত করিয়া নাগরিকগণকে অজ্ঞাত সমুদ্রযাত্রায় উৎসাহদান করিতেন, সে দিন সেই পবিত্র মন্দিরের ঘণ্টানিনাদে জলস্থল মুখরিত হইয়া উঠিয়াছিল। যাহারা এইরূপে ভারত-যাত্রায় বহির্গত হইল, তাহারা পূৰ্বেই পথের সন্ধান প্রাপ্ত হইয়াছিল। তাহারা জানিত,-আফ্রিকার পশ্চিম তট আশ্রয় করিয়া দক্ষিণাভিমুখে পােতচালনা করিলে, স্থলভাগের শেষ সীমায় উপনীত হইবে। সেই সীমা পূর্বেই আবিষ্কৃত, এবং “উত্তমাশা অন্তরীপ” নামে সুপরিচিত হইয়াছিল। অন্তরীপ অতিক্রম করিলেই ভারত-মহাসাগর। তাহাতে পতিত হইয়া, আফ্রিকার পূৰ্ব্বত আশ্রয় করিয়া, উত্তরাস্যে কিয়দর অগ্রসর হইতে পারিলেই, প্রাচ্য বাণিজ্য- পােতের চিরপরিচিত ভ্রমণপথ প্রকাশিত হইবে। কলম্বাসের সম্মুখে ৫ ফিরিঙ্গি বণি এরূপ আশার আলোেক পথপ্রদর্শকরূপে অগ্রসর হয় নাই। তাহার সমুদ্রযাত্রা চিরযাত্ৰা বলিয়াই প্রতিভাত হইয়াছিল। অশিক্ষিত জনসমাজ ভাস্কো ডা গামার সমুদ্রযাত্রাকেও চিরযাত্রা মনে করিয়া শিহরিয়া উঠিয়াছিল। বাণিজ্যপােতের সমাগমের অভাবে আফ্রিকার পশ্চিম তট সভ্য- সমাজে সুপরিচিত ছিল না। পূৰ্ব্বতটের অধিকাংশ বন্দরেই ভারত- বাণিজ্যপােত গমনাগমন করিত। সুতরাং আফ্রিকার উত্তর-পূর্বাংশের সমুদ্রকূলের জনসমাজের নিকট ভারতবর্ষে গমনাগমন করিবার বাণিজ্য- পথ সুপরিচিত ছিল। তাহারা স্মরণাতীত পুরাকাল হইতে সেই পথে মালাবার উপকূলে গমনাগমন করিয়া ভারতবর্ষের সহিত সুপরিচিত হইয়াছিল। পূর্বে ভারতবর্ষ, উত্তরে পারসিক রাজ্য, পশ্চিমে আরব, মিশর ও আফ্রিকার পূৰ্ব্বোপকূল,-এই স্থলবেষ্টিত লবণাম্বুরাশি নিয়ত পােতচালনকোলাহলে প্রতিধ্বনিত হইত। যাহারা বাণিজ্য-সূত্রে ভারতবর্ষের পশ্চিমােপকূলের সহিত পরিচিত হইয়াছিল, তাহারা বাণিজ্যোপলক্ষে ভারতবর্ষে বাস করিতেও ত্রুটি করে নাই। খৃষ্টাবির্ভাবের পূর্ব হইতেই য়িহুদীয় জাতির এক শাখা মালাবার উপকূলে বাস করিতে আরম্ভ করে। সূৰ্যোপাসক পারসিকগণ অদ্যাপি তদ্দেশে বাস করিতেছেন। আরব ও মিশর দেশের লােকও বাণিজ্যসূত্রে মালাবার উপকূলের অধিবাসী হইয়াছিল। ভাস্কো ডা গামা যখন ধীরে ধীরে আফ্রিকা অতিক্রম করিয়া ভারত- বর্ষাভিমুখে অগ্রসর হইতেছিলেন, তৎকালে এসিয়ার অবস্থা কিরূপ ছিল? ইতিহাসে দেখিতে পাওয়া যায়, তখন মধ্য-এসিয়া তৈমুরলঙ্গের অশান্ত অত্যাচারে পরিশ্রান্ত হইয়া উঠিয়াছে। আর্যাবর্তের পাঠান- সাম্রাজ্য ছত্রভঙ্গ হইয়া পড়িয়াছে। দিল্লীশ্বর নামসর্বস্ব সম্রাট হইয়া দিল্লীর নিকটবর্তী ক্ষুদ্র জনপদের অধীশ্বর হইয়াছেন! বঙ্গভুমি স্বাধীন ভারত-বিপ্লব পাঠান-শাসনে দিল্লীর অধীনতা অস্বীকার করিয়া স্বতন্ত্র হইয়া উঠি- য়াছে। দাক্ষিণাত্যেও হিন্দু-মুসলমানের কলহ-কোলাহলে পুরাতন রাজশক্তি শিথিল এবং বিবিধ অভিনব ক্ষুদ্র রাজ্য গঠিত হইয়াছে। এই সকল রাষ্ট্রবিপ্লবে ভারতবাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হইত না। স্থলপথের গরিবর্তে জলপথে পণ্যদ্রব্য প্রেরিত হইত। বিপ্লব উপস্থিত হইলে, স্থলবাণিজ্য অপেক্ষা জলবাণিজ্য প্রবল হইয়া উঠিত। এইরূপে খৃষ্টীয় পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষভাগে জলবাণিজ্যের বিশেষ উন্নতি সাধিত হইয়া- ছিল। পারস্য ও লােহিত সাগর অতিক্রম করিয়া, মিশর ও আরব দেশের বণিকগণ দলে দলে মালাবার-উপকূলে উপনীত হইয়া, ভারতীয় পণ্যদ্রব্য ক্রয় করিতেন। সমুদ্রপথে জলদস্যুর উপদ্রব ছিল না। এসিয়ার অধিবাসিগণ ধর্মপথে থাকিয়াই অর্থোপার্জন করিত। মালাবার-উপ- কূলের বাণিজ্যপ্রধান বন্দরগুলি এইরূপে বহু জাতির আশ্রয়স্থল বলিয়া পরিচিত হইয়া উঠিয়াছিল। রাজা হিন্দু হইলেও, সৰ্ব্বধৰ্ম্মের সমাদর রক্ষা করিতেন। * লােকে নিরুদ্বেগে জীবনযাপন করিত। ঘাটগিরি প্রাচীরের ন্যায় দণ্ডায়মান থাকিয়া, উপকূলভাগকে মধ্য-দেশের সমর- কলহ হইতে রক্ষা করত। ভাস্কো ভা গামা শান্ত সুশীল প্রাচ্য বণিকের ন্যায় ভারতযাত্রা করেন নাই। + তিনি ফিরিঙ্গি বণিক। তাহার ধৰ্ম্মনীতি এসিয়ার ধৰ্ম্মনীতি অপেক্ষা পৃথক। সমগ্র ভারতবর্ষ তাঁহার রাজ্য—তিনি সে দেশের রাজার রাজা। তিনি অজ্ঞানান্ধ নরনারীর পরিত্রাণের মুক্তিমন্ত্রদাতা। Dr. Hunter states that at the time the Malabar chiefs were tolerant of the religions of the many nations who traded at their ports.- Riaz-us-Salateen, Notes. + The Riaz account would however shew that the provocation came from the side of Portuguese, who came with a crusading spirit.-Ibid.
৬৪ ফিরিঙ্গি বণিক একাধারে এত অধিকার গ্রহণ করিয়াই ফিরিঙ্গি বণিক ভারতযাত্রায় বহির্গত হইয়াছিলেন! মুসলমানকে বাহুবলে পরাভূত করা সেকালের খৃষ্টান বীরপুরুষ- দিগের প্রধান কাৰ্য্য বলিয়া সুপরিচিত হইয়াছিল। সুযােগ প্রাপ্ত হইলে, তরবারিবলে ধৰ্ম্মপ্রচার করাও তাঁহাদের প্রধান লক্ষ্য বলিয়া খ্যাতিলাভ করিয়াছিল। যে দেশে যে বিধান বর্তমান আছে, তাহা উৎখাত করিয়া, নববিধানের প্রচার করাই তাহাদের পুণ্যব্রত বলিয়া প্রতিষ্ঠা- লাভ করিয়াছিল। যাহারা এইরূপে তরবারি-বলে ধর্মপ্রচারে নিযুক্ত হইয়াছিলেন, তাঁহারা উত্তরকালে মুসলমানের স্কন্ধে সেই দুরপনেয় কলঙ্ক ক্ষেপণ করিয়া, সাধুপুরুষ বলিয়া আত্মপ্রচার করিয়াছিলেন। তথাপি নিরপেক্ষ সত্যনিষ্ঠ ইতিহাস-লেখকগণ অদ্যাপি খৃষ্টধৰ্ম্মের শােণিত-পিপাসার উল্লেখ করিতে ইতস্ততঃ করেন না। লােক এই সময়ে ভারত-যাত্রায় বহির্গত হইত তাহারও কিছু কিছু প্রমাণ প্রাপ্ত হওয়া যায়। যাহারা রাজদণ্ডে দণ্ডিত, লােকালয়ে লাঞ্ছিত, কুকাৰ্যপরায়ণ বলিয়া স্বদেশে সর্বত্র ধিক্কত, চরিত্রহীনতায় পশুর ন্যায় অবনতিপ্রাপ্ত,—সেই নামগােত্রহীন নরাকার রাক্ষসগণই ভারতযাত্রায় বহির্গত হইত। * তাহাদের সম্মুখে কোন বাধাই বাধা বলিয়া পরিগণিত হইত না। কোন শ্রেণীর At the time of embarkation at Lisbon, selection was impossible ; every one was enrolled who wished to go,---vagrants, jailbirds, debtors, criminals of every description, wretches, incapable by immorality and loss of character of obtaining cmployment at home-whom Portugal was glad to banish to save the honor of their families.-Portuguese Discoveries by Rev. Alex. J. D. D. Orsey.
ভারত-যাত্রা তাহারা ধর্মের নামে অধর্মাচরণ করিতেও কুণ্ঠিত হইত না। একমাত্র অদম্য অধ্যবসায় না থাকিলে, এই শ্রেণীর চরিত্রহীন নরাধমগণ জগতের কোনরূপ বৃহদ্ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করিতে সমর্থ হইত না। অধ্যবসায়গুণে তাহাদের চরিত্রহীনতা সংকল্পসাধনের অন্তরায় হইতে পারে নাই। ইহাই তাহাদের সফলতালাভের প্রধান কারণ। এই শ্রেণীর ফিরিঙ্গি বণিক যেদিন বাণিজ্যযাত্রায় বহির্গত হইয়াছিল, সে দিন ইউরােপ তাহাদের সহিত কোনরূপ পণ্যদ্রব্য প্রেরণ করিতে পারে নাই। ভারতবর্ষে বিক্রীত হইতে পারে এমন কোন পণ্য ইউরােপে উৎপন্ন হইত? সে দিন তাহারা ক্রয় করিতে, সুযােগ পাইলে,-লুণ্ঠন করিতে অগ্রসর হইয়াছিল। সে দিন তাহাদের অদম্য অধ্যবসায় কেবল বাহুবলকেই অদ্বিতীয় উপায় বলিয়া পূজা করিতে শিক্ষা করিয়াছিল। ভাস্কো ডা গামা যাহাদের সহিত সমুদ্রযাত্রা করেন, তাহারা নাবিক, সৈনিক, কর্মচারী, বণিক,-একাধারে সর্বময়। তাহার সহােদরও তাহার সহিত পােতায়ােহণ করিয়াছিলেন। তাহারা যখন আফ্রিকার পশ্চিমতটের শেষ সীমায় আসিয়া “উত্তমাশা অন্তরীপ” অতিক্রম করিলেন, সেদিন নিশান উড়াইয়া, জয়ধ্বনি করিয়া, রণবাদ্যরবে বিজয়ঘােষণা করিলেন! তাহার পর ভারতবর্ষের বাণিজ্যপথের সন্ধানলাভ করিতে অধিক বিলম্ব হইল না। আফ্রিকার পূর্বতট আশ্রয় করিয়া উত্তরাস্যে কিয়দ্দর অগ্রসর হইবার পর জনসমাজের অস্তিত্বের পরিচয় প্রকাশিত হইতে লাগিল। ২৬শে এপ্রিল তারিখে গামা আফ্রিকার তটায় পরিত্যাগ করিয়া ভারতবর্ষাভিমুখে পােতচালনা করিলেন। আফ্রিকা হইতে যে পথপ্রদর্শক (আড়কাঠি) প্রাপ্ত হইয়াছিলেন, তাহার ইঙ্গিতক্রমেই পােত- সকল পূৰ্বাভিমুখে পরিচালিত হইতে লাগিল। সেকালে বাণিজ্যপােত- চালন করিবার জন্য সমুদ্রতীরের ধীবরগণকে আড়কাঠি নিযুক্ত করা ফিরিঙ্গি বণিক । হইত। তাহারা বায়ুপ্রবাহের উপর নির্ভর করিয়া নক্ষত্র দর্শনের অভিজ্ঞতায় পােতচালনার পথ নির্দেশ করিতে পারিত। ভাঙ্কো ডা গামা এই উপায় প্রাপ্ত না হইলে, কালিকটের প্রসিদ্ধ বন্দরের দিকে অগ্রসর হইতে পারিতেন না। তাঁহার পথ প্রদর্শক নিপুণ নাবিক বলিয়াই প্রশংসালাত করিতে লাগিল। তাহার নির্দেশক্রমে ২৩ দিবস পােতচালনা করিবার পর, ভাস্কো ডা গামা পূৰ্ব্ব গগনে এক অপূর্ব মেঘমালা দর্শন করিলেন ; আড়কাঠি কহিল,—যাহা মেঘমালারূপে প্রতিভাত হইতেছে, তাহাই ঘাটগিরির শিখরমালা। ১৪৯৭ খৃষ্টাব্দের ২০শে মে গামার বাণিজ্যপােত কালিকটের সম্মুখে ভারতভূমির “তালীবনরাজিনীলা” সমুদ্রবেলায় উপনীত হইল। ফিরিঙ্গি বণিকের ভারত-যাত্রা সফল হইল। প্রাচ্য-সাম্রাজ্যের সহিত প্রতীচ্য- সাম্রাজ্যের সাক্ষাৎ পরিচয় সাধিত হইল। সমগ্র প্রাচ্য রাজ্যের ইতিহাস অভিনব ঘটনাস্রোতে বিপর্যস্ত হইবার সুত্রপাত হইল।
নবম পরিচ্ছেদ কালিকট ! “Great is the country, rich in every style, Of goods from China sent by sea to Nyle."-Lusiad. ভারতবর্ষের অলৌকিক ঐশ্বৰ্যকাহিনী সেকালের ইউরােপীয় কবি- কল্পনাকে নিরতিশয় মুখর করিয়া তুলিয়াছিল ! কবিকাহিনী কিয়ৎপরি- মাণে অতিরঞ্জিত না হইয়া যায় না। তথাপি তাহাকে একেবারে অলীক বলিয়াও প্রত্যাখ্যান করিবার উপায় নাই। “নহমূল জনশ্রুতিঃ”। লােকসমাজে যে সকল জনশ্রুতি প্রচলিত হয়, তাহার মূলানুসন্ধান করিতে পারিলে, কিছু না কিছু সত্যসংস্রব প্রকাশিত হইয়া পড়ে। ইউরোপীয় কবিকল্পনা যে সকল জনশ্রুতি অবলম্বন করিয়া এরূপ মুখর হইয়া উঠিয়াছিল, তাহার মূলেও কিছু না কিছু ঐতিহাসিক সত্য নিহিত ছিল। জনসাধারণ তাহার আবিষ্কারসাধনের জন্য ব্যস্ত হইত না ; তাহারা জনশ্রুতিকেই ঐতিহাসিক সত্য বলিয়া গ্রহণ করিত। কবিকল্পনায় কেবল সেই তথ্যই বিকশিত হইয়া রহিয়াছে। সেকালের ইউরােপীয় জনসাধারণের নিকট ভারতবর্ষ যে ভাবে প্রতিভাত হইত, “লুসিয়াদের কবিতায় তাহারই আভাস প্রাপ্ত হওয়া যায়। সেকালের ইউরােপের তুলনায় ভারতবর্ষ সত্যসত্যই সমধিক সম্পন্ন রাজ্য বলিয়া পরিচিত হইতে পারিত। তখনও বিশ্ববিজয়িনী বাণিজ্যশক্তি পরিস্ফুট হইয়া, ইউরােপকে পরাক্রান্ত হইবার অবসর দান করে নাই। তখনও নগরে নগরে শিক্ষাগার প্রতিষ্ঠিত হইয়া, ইউরােপকে শিল্পকৌশলে প্রভাবশালী করিয়া তুলিতে পারে নাই। তখনও জলে স্থলে বাহুবিস্তার ৬৮ ফিরিঙ্গি বণিক করিয়া, ইউরােপ এশিয়ার অন্তরাত্মা প্রকম্পিত করিবার ক্ষমতা লাভ করে নাই। তখন কেবল ইউরােপের জীবন-প্রভাত। সে প্রভাতে ইউরােপের নরনারী কেবল বিস্মিতনয়নে ভারতবর্ষের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করিয়া, ভারতবর্ষের মতই শিল্পবাণিজ্যে উন্নতিলাভ করিবার উপায়-অন্বেষণে ব্যাকুল হইয়া উঠিয়াছিল। যে দেশ সুদূর মহাচীন সাম্রাজ্যের বহুমূল্য পণ্যভাণ্ডার কুক্ষিগত করিয়া নীলনদের উভয় তটের বিবিধ পণ্যবীথিকা সজ্জীভূত করিত; পণ্যবিনিময়ে ইউরােপের সমগ্র জনপদের কষ্টসঞ্চিত ধনভাণ্ডার বহন করিয়া আনিত,—তাহা যে ঐশ্বৰ্য্যগৰ্বে স্ফীত হইয়া উঠিয়াছিল, সে কথা জলে স্থলে সর্বত্র ব্যাপ্ত হইয়া পড়িয়াছিল। ভারতবর্ষ বহু বিস্ময়ের লীলাভূমি বলিয়া সভ্যসমাজে সুপরিচিত।* তাহার পুরাতন সাহিত্য ও শিল্পকলা অদ্যাপি কত অধ্যয়নশীল পাশ্চাত্য অধ্যাপকের বিস্ময় উৎপাদন করিতেছে। । তাহার অলৌকিক জ্ঞান- গৌরব অদ্যাপি কত অভিনব তথ্যের মূল প্রস্রবণের সন্ধান প্রদান করিয়া, ভারতবর্ষকে মহিমান্বিত করিয়া তুলিতেছে ; তাহার কথা সুধীসমাজের অপরিজ্ঞাত নাই। ভারতবর্ষের সমুদ্রসৈকতের পুরাতন জনসমাজ অতি পুরাকালেই সমুদ্রপথে অগ্রসর হইয়া, নানা দিদেশের পণ্যসংগ্রহে নিযুক্ত হইয়াছিল। If I were to look over the whole world to find out the country most richly endowed with all the wealth, power nd beauty that nature can bestow,-in some parts, a very paradise on earth -...) should point to India.---Max Muller. # If I were asked under what sky the human mind has most fully developed some of its choicest gifts, has most deeply pondered on il!e greatest problems of life, and has found solutions of some of ther which will deserve the attention of even those who have studied Plato and Kant, I should point to India-Max Muller.
কালিকট পুরাতন সাহিত্যে অদ্যাপি তাহার বিবিধ প্রমাণ প্রাপ্ত হওয়া যায়। অকুতােভয় নাবিকবর্গের অপরিসীম অধ্যবসায়ে অধিকাংশ সভ্যদেশেই ভারতবাণিজ্যের প্রবল প্রভাব প্রতিষ্ঠালাভ করিয়াছিল। অন্য কোনও সভ্যজাতি বাণিজ্যবিস্তারে ভারতবর্ষের প্রতিদ্বন্দ্বী হইবার সাহস প্রকাশ করে নাই। ইসলাম অংশলাভের আশায় ভারতবর্ষের অনুগত হইয়াই বাণিজ্য-ব্যাপারে লিপ্ত হইয়াছিল। সে বাণিজ্যে পরস্পাপহরণ প্রবৃত্তির সম্পর্ক ছিল না ;-জাতিধৰ্ম্মের কলহ-কোলাহল কাহারও শান্তিভঙ্গ করিত না-যে পারিত, সে তাহার শক্তিসামর্থ্য লইয়া নিরুদ্বেগে বাণিজ্য-ব্যাপারে অর্থোপার্জন করিত। ইউরােপের প্রথম চেষ্টাতে হয় ত এই সুপরিচিত আকাঙ্ক্ষাই বৰ্ত্ত- মান ছিল ;-ভারতবাণিজ্যের অভিনব জলপথের আবিস্কার-সাধনের আশায় পর্তুগাল হইতে সমুদ্রযাত্ৰা করিবার সময়ে গামার হৃদয়ে হয় ত এইরূপ আকাঙ্ক্ষাই জাগিয়া উঠিয়াছিল। কিন্তু ভারতভূমিতে পদার্পণ করিবার পূর্বেই তাঁহার সে সাধুসংকল্প তিরােহিত হইয়া গিয়াছিল। আফ্রিকার পূৰ্ব্বোপকূলে উপনীত হইবামাত্র, তদ্দেশে ইসলামের আধি- পত্য দর্শন করিয়া, গামার খৃষ্টধর্মানুরাগ অলিয়া উঠিয়াছিল। যে জাতির প্রবল ৰাহুবলে স্থলবাণিজ্যপথ হইতে ইউরােপ চিরনিৰ্বাসিত হইয়াছে, জলবাণিজ্যপথেও তাহাদিগের প্রবল প্রতাপ লক্ষ্য করিয়া, গামা তাহা চুর্ণ করিবার উপায় চিন্তা করিতে করিতেই ভারতবর্ষাভিমুথে পােত- চালনা করিয়াছিলেন। কালিকটের বন্দরে উপনীত হইবার অল্পকাল পরেই সে গুপ্ত সংকল্প প্রকাশিত হইয়া পড়িল। পুরাকালে দাক্ষিণাত্যে কেরল নামক একটি সম্পন্ন রাজ্য বর্তমান ছিল। পুরাতন গ্রন্থে তাহার উল্লেখ প্রাপ্ত হওয়া যায়।* কেরল রাজ্য . কেরল দেশের নাম রামায়ণে দেখিতে পাওয়া যায়, পাণিনি এবং কাত্যায়ন কেরলের উল্লেখ করেন নাই, কিন্তু পতঞ্জলি তাহার উল্লেখ করিয়া গিয়াছেন।
ফিরিঙ্গি বণি চতুঃষষ্টি গ্রামে বিভক্ত হইয়া,সমুদ্রোপকূল পর্যন্ত বিস্তৃতিলাভ করিয়াছিল। এখন যাহার নাম মালাবার উপকূল, তাহা সেই পুরাতন কেরল রাজ্যের চতুর্থাংশমাত্র। পশ্চিমে আরবসাগর, পূৰ্ব্বে গিরিপ্রাচীর, মধ্যস্থলে মালাবারের সংকীর্ণ ভূমি,-কোনও স্থলে নততন্নত, কোনও স্থলে সম্পূর্ণ সমতল। স্থানে স্থানে পরিসর এত সংকীর্ণ, যেন ঘাটগিরি আসিয়া সমুদ্রসৈকতে মিলিত হইয়া রহিয়াছে। এই সংকীর্ণ সমুদ্রতটে কত বন্দর বর্তমান ছিল, তাহার বিস্তৃত বিবরণ বিলুপ্ত হইয়া গিয়াছে। কেবল কালিকট বন্দরের নাম এখনও জগদ্বিখ্যাত হইয়া রহিয়াছে। যে সকল অর্ণবপোেত পারস্য, আরব ও মিশর দেশে যাতায়াত করত, তাহাদের যাত্রাপথে দণ্ডায়মান থাকিয়া, মালাবার-উপকূল কত অতীত ঘটনাই না প্রত্যক্ষ করিয়া আসিয়াছে! যে সকল অর্ণবপােত প্রাচ্য দ্বীপ- সমূহের পণ্যভাণ্ডার মিশরদেশ পর্যন্ত বহন করিয়া লইয়া যাইত,তাহারাও মালাবারের উপকূলভূমির নিকট দিয়াই গমন করিতে বাধ্য হইত। এই সকল কারণে মালাবারের উপকূল বহু বিদেশীয় নরনারীর নিকট সুপরিচিত হইয়া উঠিয়াছিল। বাণিজ্যের বিজয়লক্ষ্মী মালাবার হইতে সর্বপ্রকার কলকোলাহল চিরনিৰ্বাসিত করিয়া,নানা জাতি ও নানা ধৰ্ম্মকে আশ্রয়দান করিয়াছিল। যে সকল য়িহুদীয় পারসীক বা মিশরীয় ভদ্রসন্তান মালাবারে বসতি * Be it not hidden from the bright hearts of the bankers of the treasure of History and the appraisers of the Jewel of Chronicles, that the Jewish and Christian communities, before the advent of Islam, used to come to many ports of the Dakhin, like Malabar, for trading purpose by the sea-route, and after acquiring familiarity with the people of that country, they settled down in some of the towns, created houses with ' gardens, and in this manner dwelt there several years.-Riaz-us-salatecn.
কালিকট ৭১ করিতেন, তাহার বিদেশাগত হইয়াও, ভারতবাসীর ন্যায় অধিকার লাভ করিয়া, রাজকার্যে অসঙ্কোচে নিয়ােগ প্রাপ্ত হইতেন। এই সকল কারণে মালাবারের ইতিহাস বাণিজ্যপরায়ণ ইউরােপীয় বন্দরের ইতিহাস হইতে পৃথক। ইউরােপে কেবল সমরকাহিনীর আতিশয্য। ইউরােপের শিল্প- বাণিজ্যের ইতিহাসে কেবল হিংসার কথা,-নরহত্যার কথা,-পস্থাপ- হরণের কথা ;-সয়তান যেন শােণিতের অক্ষরে দুর্দান্ত দর লুণ্ঠন- কাহিনী লিপিবদ্ধ করিয়া রাখিয়াছে। সে দেশের ধর্মান্ধ নরনারী ধৰ্ম্মের নামে কত অধৰ্ম্মসঞ্চয় করিয়াছে, পুণ্যের নামে কত অপবিত্র আচারের অনুষ্ঠানে লিপ্ত হইয়াছে, নিরন্তর বিদ্বেষবিষে জর্জরিত হইয়া, মানবের ললাটপটে কত দুরপনেয় কলঙ্করেখা অঙ্কিত করিয়া রাখিয়াছে, তাহার কথা কোনও ইতিহাস-পাঠকের অপরিজ্ঞাত নাই। ভারত- বাণিজ্যের ইতিহাস তাহা হইতে সম্পূর্ণ পৃথক্। সত্যনিষ্ঠায় ভারত- বাণিজ্যের প্রতিষ্ঠা। শান্তি ও প্রীতিতে ভারতবাণিজ্যের প্রসার । নিরবচ্ছিন্ন অধ্যবসায়ে ভারতবাণিজ্যের শ্রীবৃদ্ধি। যাহা গুণ, দুর্ভাগ্যক্রমে তাহার ফলেই ভারতবাণিজ্য শ্রীভ্রষ্ট হইয়া গিয়াছে। ফিরিঙ্গি বণিকই তাহার একমাত্র মূল কারণ। প্রত্যেক ঐতিহাসিক ঘটনায় সেই মূল কারণ প্রকাশিত হইয়া রহিয়াছে। কেরল রাজ্য ভারতবর্ষের অন্যান্য জনপদ হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া, কেবল বাণিজ্যব্যাপার লইয়াই পরিতৃপ্তি লাভ করিত। তাহার দুর্ভেদ্য গিরি প্রাচীর উল্লম্বন করিয়া ভারতীয় রাষ্ট্রবিপ্লব সাগরসৈকতে উপনীত হইত না। দিল্লীর উত্থানপতনের সহিত মালাবারের উত্থানপতনের সম্পর্ক দেখিতে পাওয়া যাইত না। কালিকটের বন্দরে চিরদিনই ভারতবাণিজ্যের বিজয়বাৰ্তা। সেখানে অন্য কথা,অন্য চিন্তা, লােকচিত্ত আলােড়িত করিবার অবসর প্রাপ্ত হইত না। আয়তনে = १२ ফিরিঙ্গি বণিক ক্ষুদ্র হইয়াও, কালিকটের বন্দর এইরূপে বৃহৎ বিজয়গৌরবলাতের অধিকারী হইয়াছিল। যতদূর পর্যন্ত কুকুট-রব শ্রুত হইতে পারে, তাহাই কালিকটের স্বাভাবিক পৌর-সীমা,-এই জনশ্রুতি অবলম্বন করিয়া, কালিকট শব্দের ব্যুৎপত্তি নির্দিষ্ট হইয়া আসিতেছে। তাহা যে সমুদ্রযাত্রার জন্যই সর্বত্র প্রাধান্য লাভ করিয়াছিল, রাজবংশের উপাধি অদ্যাপি তাহার পরিচয় প্রদান করিয়া থাকে। রাজার উপাধি “সামরী”; তাহাতে সমুদ্রের উপর আধিপত্য থাকাই সূচিত হয়। ফিরিঙ্গি বণিক “সামরীর উচ্চারণবিকৃতি সাধিত করিয়া, কালিকটরাজকে “জামারিণ” নামে সুপরিচিত করিয়া গিয়াছেন। ফিরিঙ্গি-বণিকের বাণিজ্যতরণী কালিকট-বন্দরে উপনীত হইবার সময়ে, তদ্দেশে নানা জাতির ও নানা ধর্মের নরনারীর বাসস্থান প্রতিষ্ঠিত ছিল। কোন পুরাকালে তাহার সূত্রপাত হয়, তাহা নির্ণয় করিবার উপায় নাই। খৃষ্টাবির্ভাবের বহুপূৰ্ব্বেও মালাবারের উপকূল ভারতবাণিজ্যের জন্য খ্যাতিলাভ করিয়াছিল। রােমক সাম্রাজ্যের রাজদূতগণও মালাবারে বসতি করিতেন বলিয়া, প্রমাণ প্রাপ্ত হওয়া যায়। কালিকট নগরে ব্রাহ্মণের সংখ্যা অধিক ছিল না। ব্রাহ্মণগণ মন্ত্রিত্ব- কার্যে নিযুক্ত ছিলেন। ক্ষত্রিয়ের সংখ্যাও অধিক ছিল না। ক্ষত্রিয়গণ সমরশিক্ষা বিস্মৃত হইয়া বাণিজ্যে অর্থোপার্জনের আশায় ব্রাত্যক্ষত্রিয় • Zamorin the European form of the Tamil Samuri, is still used in official addresses to the Calicut chief.--Sir W. Hunter. মুসলমান-লিখিত ইতিহাসে “সামরী” নাম পরিচিত। সমুদ্র শব্দের অপভ্রংশ হইতে “সামী” শব্দের উৎপত্তি হইয়াছে। মুলের প্রতি লক্ষ্য না করিয়া, কেহ কেহ ইংরাজির অনুকরণে বঙ্গসাহিত্যেও “জামােরিণ” শব্দের ব্যবহার করিতেছেন গােলাম হােসেনের “রিয়াজ-উস-সলাতিন” নামক ইতিহাসে “সাময়ী” নাম উল্লিখিত থাকায়, তাহাই গৃহীত হইবার যােগ্য ; তাহাকে পরিত্যাগ করিবার কারণ নাই।
কালিকট হইয়া উঠিয়াছিলেন। সকলেই বৈশ্যাচার-পরায়ণ হইয়া, বাণিজ্য- ব্যাপারে লিপ্ত হইয়াছিলেন। যিহুদীয়গণের সংখ্যাও নিতান্ত অল্প ছিল না। তাহারাই ইউরােপের চিরভ্রমণশীল প্রধান বণিক। অদ্যাপি সকল সভ্য দেশেই য়িহুদীয় বণিকের সমাগম দেখিতে পাওয়া যায়। পুরাকালে তাহাদের অর্থবল প্রবল ছিল। খৃষ্টানসমাজ ইহুদীয়গণকে ঘৃণা করিলেও, ঋণগ্রহণের জন্য যিহুদীয়গণের দ্বারস্থ হইতে বাধ্য হইতেন। ইউরােপের বাণিজ্যোন্নতির মুলে য়িহুদীয়গণের প্রভাব দেখিতে পাওয়া যায়। এক সময়ে পারস্যোপ- সাগরের ভারতবাণিজ্যপথ য়িহুদীয়গণের করতলগত হইয়াছিল। সেই সময় হইতে যিহুদীয়গণ দলে দলে ভারতবর্ষের সমুদ্রোপকূলে বাস করিতে আরম্ভ করিয়াছিলেন। পারসীকগণও এইরূপে ভারতবর্ষে বাস করিতে আরম্ভ করিয়া, অদ্যাপি দাক্ষিণাত্যে বিবিধ বাণিজ্য- ব্যাপারে লিপ্ত রহিয়াছেন। পারস্য, আরব, মিশর প্রভৃতি পাশ্চাত্যরাজ্যে যে সকল নবধৰ্ম্মের অভ্যুদয় হইত, তাহা অন্যত্র প্রচারিত হইবার পূর্বেই, ভারতবর্ষের সমুদ্রোপকূলে তাহার কথা ব্যাপ্ত হইয়া পড়িত। এই কারণে, খৃষ্ট ও মহম্মদের ধর্মমত অল্পদিনের মধ্যেই মালাবারে ব্যাপ্ত হইয়া পড়িয়াছিল। মালাবারে খৃষ্টধর্ম প্রচারিত হইবার মূল কারণ কি, তদ্বিষয়ে বাদানুবাদের অভাব নাই। এ বিষয়ে দাক্ষিণাত্যে যে জনশ্রুতি প্রচলিত ছিল না। * সেকালের খৃষ্টান সমাজে ভারতবর্ষের খষ্টানদিগের কথা একেবারে অপরিচিত ৫২৭ খৃষ্টাব্দে রচিত একখানি গ্রন্থে তাহার উল্লেখ আছে। “In the Malabur country also where pepper grows there is a Bishop." কৌতুকের বিষয় এই যে খ ষ্টীয় নবম শতাব্দীতে একজন ইংরাজ পাদ্রিয় ভারতবর্ষে আসিবার প্রমাণ প্রাপ্ত হওয়া গিয়াছে। In the ninth century, an interesting episode connects England with India ; for in 883 Alfred the Great sent Sighalm Bishop of Sherborne on a mission to the Shrine of St. Thomas near Madras ---Portuguese Discoveries.
৭৪ ফিরিঙ্গি বণিক আছে, তাহাই ক্রমে ক্রমে ঐতিহাসিক সত্য বলিয়া স্বীকৃত হইতেছে। স্বনামখ্যাত বিশপ হীবর ও স্যার উইলিয়ম হণ্টার তাহার বিবিধ তথ্যানুসন্ধানে ব্যাপৃত হইয়াছিলেন। তাঁহারা উভয়েই দাক্ষিণাত্যের জনশ্রুতিকেই ঐতিহাসিক সত্য বলিয়া স্বীকার করিয়া গিয়াছেন। ইহা যদি সত্য হয়, তাহা হইলে ভারতীয় পুরাতত্ত্বের সহিত খৃষ্টধৰ্ম্মের পুরাতন সম্পর্কের মূল-রহস্য কালক্রমে প্রকাশিত হইয়া পড়িবে। যীশুখৃষ্ট জর্দন-নদের তীরে দীক্ষাগ্রহণ করিয়াছিলেন। দীক্ষা- গুরু “জন” অবশ্যই খৃষ্টান ছিলেন না। তঁাহার বেশভূষার যেরূপ বিবরণ প্রাপ্ত হওয়া যায়, তাহাতে তাহাকে “স্বস্তিকধারী” সন্ন্যাসী বলিয়াই স্বীকার করিতে হয়। যীশুখৃষ্টের জন্মদিনে প্রাচ্য সাধুপুরুষগণ তাহাকে সূতিকাগারে দর্শন করিতে গিয়াছিলেন, এ কথা খৃষ্টধর্মগ্রন্থে উল্লিখিত আছে। তৎকালে এসিয়াখণ্ডের জলে স্থলে বৌদ্ধ সন্ন্যাসীর অব্যাহত গতির ও স্বধৰ্ম্মবিস্তারের অক্লান্ত অধ্যবসায়ের কথা স্মরণ করিলে, যীশুখৃষ্টের দীক্ষাগুরুকে ভারতবর্ষীয় বৌদ্ধশ্রমণ বলিয়াই স্বীকার করিতে ইচ্ছা হয়। এ বিষয়ে যাহা কিছু প্রমাণ প্রাপ্ত হওয়া যায়, ঐতিহাসিক তথ্যানুসন্ধানের পক্ষে তাহা যথেষ্ট নহে। তথাপি মনে হয়,-দ্বিসহস্রবৎসর পূর্বে ভারতীয় বৌদ্ধ-শ্ৰমণ ভিন্ন “স্বস্তিকধারী” সন্ন্যাসী আর কোনও দেশে বর্তমান ছিল না। যাহা হউক, খৃষ্টধৰ্ম্ম যে এসিয়া হইতেই ভারতবর্ষে প্রথম উপনীত হইয়াছিল, ফিরিঙ্গি বণিকের ইতিহাসে তাহার যথেষ্ট প্রমাণ প্রাপ্ত হওয়া যায়। খৃষ্টানগণ যাহাকে সমগ্র মানবজাতির মুক্তিমন্ত্র বলিয়া দিগদিগন্তে ধর্ম প্রচারে বহির্গত হইয়াছেন, খৃষ্টধৰ্ম্মপ্রবর্তক যীশুখৃষ্ট তাহাকে স্বজাতির নিকট প্রচারিত করিবার জন্যই ব্যস্ত হইয়াছিলেন। ইহাকে তাহার স্বজাতিপ্রীতি বলিলেও অত্যুক্তি হয় না। তিনি শিষ্যগণকে বলিয়া- ছিলেন,-'আগে য়িহুদীয়গণকে, তাহার পর অন্যান্য নাগরিকগণকে কালিকট নবধৰ্ম্মের সুসমাচার বিতরণ করিব। য়িহুদীয়গণ ধৰ্ম্মামৃত হইতে চির- বঞ্চিত হইয়া বাহাড়ম্বর ও ক্রিয়াকাণ্ড লইয়াই উন্মত্ত ছিলেন। তাহাদের নিকটে ধৰ্ম্মব্যাখ্যা করাই যীশুখৃষ্টের সৰ্ব্ব প্রথম লক্ষ্য বলিয়া প্রতিভাত হইয়াছিল। তিনি তাহার জন্যই অকালে দেহবিসর্জন করিতে বাধ্য হইয়াছিলেন। খৃষ্টশিষ্যগণের মধ্যেও এই প্রবৃত্তি প্রবল ছিল। * খৃষ্টশিষ্য টমাস নামক সন্ন্যাসী ভারত-প্রবাসী য়িহুদীয়গণের নিকট থৰ্ম্মপ্রচার করিবার উদ্দেশ্যেই ভারতবর্ষে উপনীত হইয়াছিলেন। টমাস নানা স্থানে ধৰ্ম্ম প্রচার করিয়া মাদ্ৰাজ প্রদেশের মালিয়াপুর নামক স্থানে দেহবিসর্জন করেন। তাঁহার স্মৃতিরক্ষাৰ্থ অদ্যাপি বর্ষে বর্ষে মালিয়া- পুরে মেলা বসিয়া থাকে। তাহা দাক্ষিণাত্যে “সেন্ট টমাসের মেলা” নামে সুপরিচিত। ফিরিঙ্গি বণিক মালাবারের উপকূলে উপনীত হইবার সময়ে এই সম্প্রদায়ের খৃষ্টানদিগের আধিপত্য প্রবল ছিল। তাহারা রাজকার্যে নিয়ােগপ্রাপ্ত হইয়া সেনাবিভাগে প্রভুত্ব লাভ করিয়াছিলেন। এই শ্রেণীর ভারতবর্ষীয় খৃষ্টানগণ কখনও কখনও মন্ত্রি- পদেও আরােহণ করিতেন। ১৪৪২ খৃষ্টাব্দে বিজয়নগরের হিন্দু রাজার মন্ত্রী খৃষ্টধর্মাবলম্বী ছিলেন। খৃষ্টানগণ ভারতবর্ষে স্বধর্মের আচার- * সেন্টটমাস কিরূপে ভারতবর্ষে ধর্মপ্রচার করেন, এতৎসম্বন্ধে পাদরদিগের গ্রন্থেও লিখিত আছে,-Love for his nation inflamed his zeal and faithful to the command of Jesus Christ, who had enjoined his apostles to proclaim the faith to the Jews before turning to the Gentles, he ( St. Thomas ) repaired to the country which his compatriots had chosen for their asylum-Portuguese discoveries. † These numerous conversions excited the jealousy and hatred of the Brahmins, two of whom urged the populace to stone the wholy Apostle,-Portuguese Discoveries, # The Portuguese on their first expedition into India, found 'there 200000 Christians. Ibid.
ফিরিঙ্গি বণিক ব্যবহার প্রতিপালন করিবার স্বাধীনতা লাভ করিয়াছিলেন। মুসলমান- দিগের পক্ষেও তাহাতে কোনরূপ বাধা উপস্থিত হয় নাই। ধৰ্ম্মে ও আচার-ব্যবহারে পৃথক হইয়াও, রাজতন্ত্রে ও বাণিজ্যব্যাপারে এই সকল ভারতপ্রবাসী বিধর্মিগণ ভারতবাসী বলিয়াই পরিচিত হইয়াছিলেন। যে সকল মুসলমান অতি পুরাকাল হইতে মালাবারে বাস করিতেন, তাঁহারা আরব দেশ হইতে সমাগত। তাহাদের সাধারণ নাম- মােপলা। তাহারা ধর্মান্ধ ছিলেন না। যাহারা মিশর ও পারস্যদেশ হইতে আগমন করিয়াছিলেন, তাহারা খৃষ্টবিদ্বেষী হইলেও, হিন্দুবিদ্বেষী ছিলেন না। মালাবারে হিন্দু-মুসলমান তুল্যভাবে বাণিজ্যব্যাপারে প্রভুত্ব লাভ করিতেন। বরং অনেক সময়ে মুসলমান বণিকেরাই সমধিক প্রভুত্বের পরিচয় প্রদান করিতেন। মালাবারের হিন্দু অধিবাসিগণ নবাগত বণিকদলকে সাদরে অভ্যর্থনা করিয়া, লাভের ললাতে, তাঁহাদিগের সহিত চিরপরিচিত আত্মীয়ের ন্যায় ব্যবহার করিতেন। ক্রেতার সংখ্যা অধিক হইলেই বিক্রেতার অধিক লাভের পথ উন্মুক্ত হইতে পারে। এই কারণে, মালাবারের হিন্দু অধিবাসিগণ নূতন ক্রেতাকে সমুচিত সমাদর প্রদর্শন করিতে ক্রটি করিতেন না। * ফিরিঙ্গি বণিকের পক্ষে মালাবার অপেক্ষা ভারতবর্ষের অন্য কোনও স্থান অধিক অনুকূল হইত বলিয়া বােধ হয় না। অন্যান্য প্রদেশ হইতে সম্পূর্ণরূপে বিচ্ছিন্ন হইয়া, মালাবারের সমুদ্রোপকূল বহুসংখ্যক স্বতন্ত্র রাজ্যে বিভক্ত হইয়া পড়িয়াছিল। একটি ক্ষুদ্র বন্দরমাত্রই একটি রাজ্যের শেষ সীমা! তাহার রাজা কেবল বাণিজ্যশুল্ক সংগ্রহ করিয়াই অর্থোপার্জনে ব্যাপৃত। কেহ কখনও তাহার শাসন-ক্ষমতা অস্বীকার করিবে, কেহ কখনও বাহুবলে রাজ্য আক্রমণ করিবার জন্য সদর্পে * They welcomed foreign merchants, as the greater part of their revenues consisted of dues on Sea-trade.--Sir W. Hunter.
4 কালিকট অগ্রসর হইবে, কেহ কখনও হিংসাদ্বেষ প্রজ্বলিত করিয়া মালাবারের শাস্তিকুটীর ভস্মসাৎ করিবে,–এরূপ আশঙ্কা কদাচ রাজমস্তিষ্কে প্রবিষ্ট হয় নাই। পুরাকাল হইতে কত বিদেশের বণিক আসিয়া বাণিজ্য- ব্যাপারে লিপ্ত হইয়াছে, কেহ কখনও স্বপ্নেও কালিকটের রাজার সহিত কলহ উপস্থিত করে নাই। রাজা এই সকল কারণে রাজ্যরক্ষার্থ বহুসংখ্যক সৈন্য পালন করিতেন না। * সুতরাং পর্তুগালের পক্ষে এরূপ অরক্ষিত ক্ষুদ্ররাজ্যের ক্ষুদ্র নরপতিকে বাহুবলে পরাজিত করিবার সম্ভাবনা ছিল। ভাস্কো ডা গামা যখন ভারতবর্ষে উপনীত হইলেন, তখন ভারত- বাণিজ্যের এইরূপ অসহায় অবস্থার সন্ধানলাভ করিয়া নিরতিশয় উৎফুল্ল হইয়া উঠিলেন। রাজ্যজয়, বাণিজ্যবিস্তার ও ধর্মপ্রচার একত্র সুসম্পন্ন করিবার উপযুক্ত ক্ষেত্রের সন্ধানলাভ করিয়া, ফিরিঙ্গি বণিক তস্করের ন্যায় ভারতবর্ষের পুণ্যভূমিতে প্রথম পদক্ষেপ করিলেন। যে দেশে সকল জাতির ও সকল ধর্মের তুল্যরূপ সমাদর প্রতিষ্ঠিত ছিল, সে দেশের পক্ষে তাহা গুণ হইয়াও দোষের আকর হইয়া উঠিল! যাহা ছিল না, ফিরিঙ্গি বণিকের আগমনে তাহাই প্রজ্বলিত হইয়া উঠিল ; তাহা নিৰ্বাপিত করিবার শক্তি না থাকায়, রাজা ও রাজ্য দগ্ধ হইয়া গেল। সেই ‘তালীবনরাজিনীলা’ ভারতসাগরবেলা যদি প্রতি দিবসের ঘটনাবলী লিপিবদ্ধ করিয়া রাখিত, তবে সভ্যসমাজ স্পষ্টাক্ষরে দেখিতে They themselves never wished for conquest. They simply wished to be left alone and to be allowed to work out their view of life.-Max Muller. + The love of conquest, the thirst for gold, the flattering hope of personal or political aggrandisement influenced the early Portuguese adventurers to such an extent that all restraint on their passions and conduct was abandoned, -Portuguese Discoveries.
ফিরিঙ্গি বণি পাইত,-ফিরিঙ্গি বণিক ভারতবর্ষে প্রথম পদার্পণ করিয়াই কত অত্যাচার-অবিচারের প্রশ্রয় দান করিয়াছিলেন । ভারতবর্ষের তুলনায় পর্তুগাল নগণ্য ক্ষুদ্র রাজ্য। কিন্তু কালিকটের তুলনায় পর্তগাল ক্ষুদ্র বলিয়া কীৰ্তিত হইতে পারে না। কালিকটের ন্যায় অরক্ষিত ক্ষুদ্র বন্দরকে বাহুবলে পরাভূত করিবার ক্ষমতা ছিল বলিয়াই পর্তুগালের বিশ্ববিখ্যাত নাবিকরাজ ভারতবর্ষে রাজ্যস্থাপনের আশা করিতে সাহসী হইয়াছিলেন। গামা ধৰ্ম্ম-কলহের সহিত বাণিজ্য- কলহ মিশ্রিত করিয়া, কালিকটের বন্দরে এক অজ্ঞাতপূৰ্ব বিপ্লক উপস্থিত করিয়া কালিকট-রাজকে ব্যতিব্যস্ত করিয়া তুলিলেন।
দশম পরিচ্ছেদ প্রথম পরিচয় When Vasco da Gama landed in 1498, the old order of things. alike in Northern and and in Southern India was passing away, the new order had not yet emerged.-Sir W. Hunter. এক সময়ে সমগ্র কেরল রাজ্যই হিন্দু নরপতির অধীন ছিল। পুরাতন হিন্দুরাজ্য কিরূপে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়, তাহার কোনও ধারাবাহিক ইতিহাস প্রাপ্ত হওয়া যায় না। এ বিষয়ে দাক্ষিণাত্যে অদ্যাপি যে জন- শ্রুতি প্রচলিত আছে, তাহা নিরতিশয় কৌতুকাবহ। লােকে বলে, খৃষ্টীয় নবম শতাব্দীর প্রারম্ভে কেরল রাজ্য যে হিন্দু নরপতির অধীন ছিল, তিনি মুসলমানধৰ্ম্ম গ্রহণ করেন। পরিণতবয়সে বিষয়ানুরাগ শিথিল হইলে, তিনি মদিনা যাত্রা করেন ; আরব দেশেই তাহার অকাল উপস্থিত হয়। তাহার রাজ্য এই সূত্রে বহু ভাগে বিভক্ত হইয়া পড়ে। অধিকাংশ স্থান বিজয়নগরের হিন্দু সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হইয়াছিল ; কোন কোন স্থান কালে মুসলমানের অধীন হইয়া, ব্রাহ্মণী-রাজ্যগঠিত করিয়া তুলিয়াছিল। কিন্তু এই সকল রাষ্ট্রবিপ্লবেও মালাবারের সমুদ্রোপকূল স্বতন্ত্র থাকিয়া, হিন্দু রাজন্যবর্গেরই অধিকারভুক্ত হইয়াছিল। এই সকল বাণিজ্যবন্দর বহু রাজার অধীন হইলেও, কাহারও সহিত কাহারও বাণিজ্য-কলহ উপস্থিত হইত না; সকলেই আপন আপন ক্ষুদ্র বন্দরে * এই জনশ্রুতি “রিয়াজ-উস-সলাতিনেও” উল্লিখিত আছে। যথা—Many of the kings and rulers of those parts embraced the Islamic religions, # The first Mussalman conquests in the Dakin were made in the reign of Jalal-u-ddin Khilji, Emperor of Delhi, through the military genius of his nephew Alauddin Khilji,-Tarikh-i-Firozshahi, p. 170.
৮ ফিরিঙ্গি বণিক। আধিপত্য বিস্তার করিয়া, যথাসাধ্য বাণিজ্যশুল্ক সংগ্রহ করিতেন। কালিকটের হিন্দু রাজা বাহুবলে পরাক্রান্ত না হইলেও বাণিজ্যগৌরবে জগদ্বিখ্যাত হইয়া উঠিয়াছিলেন। তাহার নাম সমগ্র সভ্যদেশেই সুপরিচিত ছিল। ভাস্কো ডা গামা ভারতবর্ষাভিমুখে যাত্রা করিবার সময়ে, পর্তুগালরাজের নিকট হইতে কালিকটের সামরীর নামে পত্র লইয়া পােতারােহণ করিয়াছিলেন। গামা যখন কালিকটের বাণিজ্য-বন্দরে প্রথম পদার্পণ করেন, তখন ভারতবর্ষ একরূপ অরাজক অবস্থায় পতিত হইয়াছিল। তখনও মােগল- শাসন প্রতিষ্ঠিত হয় নাই। তখনও দিল্লীর শাসনক্ষমতা দাক্ষিণাত্যে প্রভুত্ববিস্তারে সমর্থ হয় নাই। তখন পাঠান-শাসন ক্রমে ক্রমে ছত্রভঙ্গ হইয়া পড়িতেছিল।* কালিকটের সামুরীর সহিত পাঠান-সম্রাটের সম্পর্ক ছিল না। তিনি স্বতন্ত্রভাবেই রাজ্যশাসন করিতেন। ফিরিঙ্গি-বণিকের আগমনবার্তা প্রাপ্ত হইয়া, কালিকটরাজ ভাস্কো ডা গামাকে সমুচিত সমাদর প্রদর্শন করিতে ক্রটি করিলেন না। গামা যেদিন ভারতবর্ষের পুণ্যতটে প্রথম পদবিন্যাস করেন, সেদিন তাহার আনন্দের সীমা ছিল । এতকাল যাহা কেবল কবিকল্পনায় অনুরঞ্জিত হইয়া, পৰ্ত্ত গালের জনসাধারণের নিকট বিস্ময়বিজড়িত স্বপ্নরাজ্যের ন্যায় প্রতিভাত হইত, সে রাজ্যে প্রথম পদন্যাস করিবার সময়ে পর্তুগালের রাজপ্রতিনিধি সমুচিত সমারােহের ক্রটি করিলেন না। সর্বোৎকৃষ্ট পরিচ্ছদে আপাদমস্তক সুশােভিত করিয়া ভাস্কো ডা গামা বহুমূল্য উপঢৌকন হস্তে রাজসন্দর্শনে বহির্গত হইলেন। রাজপথের নাগরিকগণ কালিকটের বাণিজ্যবন্দরে এক অজ্ঞাতপূৰ্ব অভিনব দৃশ্য দর্শন করিল। At the time ( 1488 when Vasco da Gama landed in India ) the Afgan sovereignty in Northern India was dwindling to a vanishing point.-Sir W. W. Hunter.
প্রথম পরিচয় ২১ গামার দৃঢ়োন্নত বীরকলেবর জনস্রোতের মধ্যে আলােকস্তম্ভের ন্যায় প্রতিভাত হইল। জনসাধারণ ফিরিঙ্গি-বণিকের যথাযযাগ্য অভ্যর্থনার ত্রুটি করিল না। সামরী গামাকে দর্শন করিবামাত্র সমুচিত আনন্দ প্রকাশ করিলেন। বাণিজ্য-বিস্তারের এইরূপ অচিন্তিতপূর্ব উপায় উপস্থিত হইল বলিয়া, কালিকট-রাজ ফিরিঙ্গি-বণিকের উৎসাহবৰ্ধন করিবামাত্র, তাঁহার সরল ব্যবহারে পরম পরিতৃপ্তি লাভ করিয়া ফিরিঙ্গি-বণিক পণ্যসংগ্রহে প্রবৃত্ত হইলেন। যাহারা পণ্যবিক্রয়ে অর্থোপার্জন করিত, তাহারাও নুতন ক্রেতার দর্শনলাভ করিয়া নিরতিশয় উৎফুল্ল হইয়া উঠিল। কিন্তু আরব দেশের যে সকল বিচক্ষণ বণিক রাজসভায় উপস্থিত ছিলেন, তাহারা ফিরিঙ্গি বণিককে সর্বান্তঃকরণে অভ্যর্থনা করিতে পারিলেন না। নূতন জল-বাণিজ্যপথের আবিষ্কার-কাহিনী তাহাদের হৃদয়ে এক অপরিজ্ঞাত আশঙ্কা উদ্ৰিক্ত করিয়া দিল। তাহাদের মনে হইল,-কলহপ্রিয় খৃষ্টান- গণ ভূমধ্যসাগর ছাড়িয়া,আরবসাগরে সময়-কোলাহল উত্থাপিত করিবার জন্যই এত ক্লেশে এরূপ দূরদেশে উপনীত হইয়াছেন। বাণিজ্য কেবল কথার কথা,-ব্যপদেশমাত্র ! ফিরিঙ্গি-বণিকের বাণিজ্যতরণীতে আমন্ত্রিত হইয়া, তাহারা যে সকল যুদ্ধোপযােগী অস্ত্রশস্ত্রের সন্ধানলাভ করিলেন, তাহাতে সেই আশঙ্কা আরও ঘনীভূত হইয়া উঠিল। মুসলমান- লিখিত ইতিহাসে ইহার যথেষ্ট আভাস প্রাপ্ত হওয়া যায়। * সেকালে যে সকল জলপথে বা স্থলপথে ভারতীয় পণ্যদ্রব্য নানা দিদেশে প্রেরিত হইত, সেই সকল বিভিন্ন দেশের রাজন্যবর্গ শুল্করক্ষার * ভারতবর্ষের সমুদ্রোপকূলে আরবদিগের প্রতিপত্তি দেখাইয়া ইহুদী ও খ্রীষ্টানগণ ঈৰ্য্যায় জ্বলিয়া মরিত, গােলাম হােসেন এই কথা লিখিয়া গিয়াছেন। যথা—In consequence, the Jews and the Christians burnt in the fire of envy and malice.
৮২ ফিরিঙ্গি বণিক জন্যই বাণিজ্য রক্ষা করিতেন। কোন দেশে সমরকলহ বিদ্যমান থাকিলেও উভয় পক্ষই বাণিজ্যরক্ষাৰ্থ চেষ্টা করিতেন। দস্যু ভিন্ন অন্য কেহ বাণিজ্যদ্রব্য লুণ্ঠন করিবার চেষ্টা করিত না। এই সকল কারণে, মধ্য-এসিয়ার বিবিধ বিপ্লবের মধ্যেও ভারত-বাণিজ্য অব্যাহতগতিতে প্রাচ্য হইতে প্রতীচ্য সাম্রাজ্যে প্রবাহিত হইত। বণিশ্বর্গের পক্ষে অস্ত্রশস্ত্রে সুসজ্জিত হইয়া এক দেশ হইতে অন্য দেশে গমনাগমন করিবার প্রয়ােজন হইত না। এরূপ অবস্থায় ফিরিঙ্গি-বণিকের সামরিক বেশ আরবীয় বণিশ্বর্গের হৃদয়ে সহজেই আতঙ্ক উপস্থিত করিতে লাগিল। সে কথা ক্রমে ক্রমে সৰ্ব্বত্র ব্যাপ্ত হইয়া পড়িল। বণিক ভিন্ন অন্য কেহ কালিকটে উপনীত হইত না। সুতরাং কালিকটরাজ ফিরিঙ্গি-বণিককে বণিক বলিয়াই গ্রহণ করিয়াছিলেন। মুসলমানগণ তাহাতে নিরুদ্বেগে আস্থাস্থাপন করিতে সাহসী হইলেন না। তাহারা ফিরিঙ্গি-বণিকের প্রকৃত স্বভাব অবগত ছিলেন। তঁাহারা যে ভূমধ্যসাগরে ধৰ্ম্মকলহের সহিত বাণিজ্যকলহ সংযুক্ত করিয়া, মুসলমানের সহিত যুদ্ধবিগ্রহে লিপ্ত হইয়া রহিয়াছেন, সে কথা ভারতবাসী মুসলমান- দিগের অপরিজ্ঞাত ছিল না। সরলস্বভাব কালিকট-রাজ তাহাদের এই সকল আশঙ্কাকে অমূলক বলিয়াই বিশ্বাস করিয়াছিলেন। মুসলমানগণ রাজার চিত্তবিকার উপস্থিত করিতে অসমর্থ হইয়া, ফিরিঙ্গি-বণিকের প্রকৃত পরিচয় উদঘাটিত করিবার আশায়, এক অভিনব কৌশলের অবতারণা করিতে বাধ্য হইলেন। মুসলমানগণের উপদেশে কালিকটের পণ্যবিক্রেতৃগণ নিতান্ত অকর্মণ্য পণ্যদ্রব্য অগ্নিমুল্যে বিক্রয় করিবার প্রস্তাব উপস্থিত করিল ; অনভিজ্ঞ ফিরিঙ্গি-বণিক তাহাই সহাস্যবদনে ক্রয় করিতে প্রবৃত্ত হইলেন। মুসলমানগণ রাজাকে বুঝাইলেন,নবাগত ফিরিঙ্গি-বণি বাণিজ্য- ব্যপদেশে দস্যুবৃত্তি করিতে আসিয়াছে; বণি হইলে, অকর্মণ্য পণ্যদ্রব্য প্রথম পরিচয় অগ্নিমূল্যে ক্রয় করিত না! ইহাতে কালিকটের প্রজাবর্গের লাভ হইতেছে বলিয়া, কালিকট-রাজ মুসলমানগণের প্ররােচনায় কর্ণপাত করিলেন না। কিন্তু মুসলমানগণ কলহের সূত্রপাত করিলেন। এই কলহে উভয়পক্ষেই রক্তপাতের আয়ােজন হইয়াছিল; রাজা কাহনিবা- রণ না করিলে, প্রথম সন্দর্শনেই অনর্থ উৎপন্ন হইত। * মুসলমানগণ আপাততঃ নিরস্ত হইতে বাধ্য হইলেও, মনে মনে বুঝিতে পারিলেন, ফিরিঙ্গি-বণিকূকে নির্বাসিত করিতে না পারিলে, ভারতবাণিজ্যে মুসলমানের আধিপত্য বিলুপ্ত হইতে বিলম্ব ঘটিবে না। ফিরিঙ্গি- বণিও মনে মনে বুঝিলেন, -মুসলমানকে পরাভূত করিতে না পারিলে ভারতবাণিজ্যে ফিরিঙ্গি-বণিকের আধিপত্য প্রতিষ্ঠালাভ করিবে না। যেখানে হিংসাদ্বেষ অপরিচিত ছিল, সেখানে হিংসাদ্বেষ অঙ্কুরিত হইয়া উঠিল ; যেখানে বাণিজ্যে বাহুবলের সম্পর্ক অপরিজ্ঞাত ছিল, সেখানে বাহুবলই প্রবল হইবার উপক্রম হইয়া উঠিল। তাহার জন্য রাজা-প্রজা কেহই প্রস্তুত ছিলেন না। কেবল ফিরিঙ্গি-বণি তাহার জন্য প্রস্তুত হইয়াই ভারতবর্ষে উপনীত হইয়াছিলেন । অল্পদিনের মধ্যেই ফিরিঙ্গি বণিকের বাণিজ্যতরণী পণ্যভারে ভারাক্রান্ত হইয়া উঠিল। তঁাহারা স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করিবার পূর্বে কালিকট-রাজের নিকট উপঢৌকনদ্ৰব্য প্রাপ্ত হইলেন; মৌখিক শিষ্টাচারের কিছুমাত্র ক্রটি হইল না ; পর্তুগালরাজের নামে কালিকট- রাজ স্বর্ণপত্রে যে প্রীতিসম্ভাবণ লিপিবদ্ধ করিয়া দিলেন,ভাস্কো ডা গামা তাহা সৰ্ব্বসমক্ষে মস্তকে ধারণ করিয়া পােতারােহণ করিলেন। তথাপি স্বর উইলিয়ম হণ্টার ইহার উল্লেখ করিয়া গিয়াছেন। গোলাম হোসেন ইহার উল্লেখ করেন নাই। তাহার মতে ফিরিঙ্গিরাই কলহের সূত্রপাত করিয়াছিল। তাহা ভাস্কো ডা গামার প্রত্যাবর্তনের পরে সংঘটিত হয়। কিন্তু এ স্কুলে গােলাম হােসেনের উপর নির্ভর করিতে সাহস হয় না।
৮৪ ফিরিঙ্গি বণিক এক অজ্ঞাতপূৰ্ব আশঙ্কা ভিন্ন অন্য কোনও কথা ভারতবর্ষে পরিজ্ঞাত হইল না। কোথায় পর্তুগাল, কোথায় বা তাহার রাজধানী,—লােকে তাহার কোন কথাই বুঝিতে পারিল না। সমুদ্রগর্ভ হইতে অকস্মাৎ ফিরিঙ্গি-বণিকের বাণিজ্যতরণী দৃষ্টিপথে সমুদিত হহয়াছিল; তাহা আবার অকস্মাৎ সমুদ্রগর্ভেই বিলীন হইয়া গেল। অনুসন্ধানবিমুখ ভারতবাসিগণ নানা অলীক কল্পনার অবতারণা করিয়াই নিরস্ত হইয়া পড়িল। কিন্তু এই অল্পকালের অসম্পূর্ণ পরিচয়- লাভেই ফিরিঙ্গি-বণি ভারতবর্ষ সম্বন্ধে বিবিধ তথ্য সংগ্রহ করিতে সমর্থ হইলেন। এ দেশে যে সকল সেন্ট-টমাস-সম্প্রদায়ভুক্ত খৃষ্টান এজার বসতি ছিল, তাহারা হিন্দু রাজার উদার শাসননীতির কল্যাণে, বিধর্মী হইয়াও প্রভূত প্রভুত্ব লাভ করিয়াছিল। তথাপি সে কথা বিস্মৃত হইয়া, ভারতপ্রবাসী খৃষ্টানগণ প্রথম সন্দর্শনেই ফিরিঙ্গি-বণিকের পক্ষভুক্ত হইয়াছিল। হইয়াছিল ।* গামা তাহাদের নিকট ভারত-বাণিজ্যের বিবিধ তথ্য লাভ করিয়া, বাণিজ্যবিস্তারের উপায়-উদ্ভাবনে নিযুক্ত হইলেন ৷t ভারতবর্ষে সেন্ট-টমাস-সম্প্রদায়ভুক্ত খৃষ্টানদিগের বসতি না থাকিলে, ফিরিঙ্গি-বণিকের পক্ষে সহসা গৃহছিদ্রের সন্ধানলাভের সম্ভাবনা উপস্থিত হইত না! ৩ The Christians of St. Thomas were the first to be ensnared by these spacious appearances. These people, ignorant and credulous, persuaded themselves that Christians who had travelled 1200 leagues, braving the perils of a painful navigation, to extend the empire of their religion, could not but be just and benevolent men.-Portuguese Discoveries. + They presented to Vasco-da-Gama a Sceptre or baton of vermilion wood the ends of which were tipped with silver, and surmounted by three little bells.-Ibid.
প্রথম পরিচয় ৮৫ সকল মালাবারের বিবিধ বন্দরে বিবিধ রাজ্য প্রতিষ্ঠিত ছিল। রাজ্যই ক্ষুদ্র রাজ্য। সকল রাজ্যই স্বতন্ত্র রাজ্য। সকল রাজ্যই বাণিজ্য- লিপ্ত। উপকুল প্রদেশের এই সকল ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্বতন্ত্র রাজ্যের মধ্যে কলহ উত্থাপিত করিয়া এক রাজাকে আশ্রয় করিয়া অন্য রাজাকে পরাভূত করিবার সম্ভাবনা ছিল। প্রথম সন্দর্শনেই ভাঙ্কো ভা গামা ভারতবর্ষের এই গৃহছিদ্রের সন্ধানলাভ করিলেন। অধ্যবসায়ে ও অকুতােভয়তায় বিশ্ববিজয় সাধিত হইয়া থাকে। পৃথিবীর ইতিহাস কেবল অধ্যবসায়ের ও অকুতােভয়তার ইতিহাস। ফিরিঙ্গি-বণিকের ইতিহাসের প্রতি পৃষ্ঠায় তাহার কথা পুনঃ পুনঃ লিখিত হইয়া রহিয়াছে। অধ্যবসায় ও অকুতােভয়তা ভিন্ন রাজকুমার হেরীর অন্য সম্বল অধিক ছিল না। তিনি সেই সম্বলের আশ্রয় গ্রহণ করিয়া, অভিনব জলপথের আবিষ্কারসাধনের জন্য যে অতৃপ্ত আকাঙ্ক্ষা উদ্ৰিক্ত করিয়া ইহলােক হইতে অবসর গ্রহণ করিয়াছিলেন, তাহাতে উন্মত্ত হইয়াই তাহার স্বদেশের নাবিকরাজ ভারতবর্ষে উপনীত হইয়া- ছিলেন। এই অভিনব জলপথের আবিষ্কারসাধন সুসম্পন্ন হইবামাত্র, প্রাচ্যসাগরে একাধিপত্য বিস্তার করিয়া, ভারতবাণিজ্যে প্রভুত্বলাভের আশায় অভিনব অধ্যবসায় ও অকুতােভয় উদ্ৰিক্ত হইয়া উঠিল । ভাস্কো ডা গামা তাহার জন্যই মালাবারের উপকূলের অন্যান্য বন্দরের সন্ধানলাভ না করিয়া, স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করিতে সম্মত হইলেন না। ভাস্কো ডা গামার বাণিজ্যতরণী কালিকট হইতে পশ্চিমাভিমুখে অফ্রিকার দিকে চালিত হইল না, তাহা দক্ষিণাবর্তে পরিচালিত হইয়া মালাবার উপকূলের অন্যান্য ক্ষুদ্র বন্দরের নিকট দিয়া কোচীন বন্দরে উপনীত হইল। এই বন্দরেও ফিরিঙ্গি-বণি যথাযােগ্য অভ্যর্থনা ও উৎসাহ প্রাপ্ত হইলেন। কোচীনয়াজ শক্তিসামর্থে কালিকট-রাজের সমকক্ষ না হইলেও,বাণিজ্যগৌরবে আপনাকে কালিকট-রাজের সমকক্ষ ফিরিঙ্গি-বণিক ; বলিয়াই বিশ্বাস করিতেন। তিনি অজ্ঞাতকুলশীল ফিরিঙ্গি-বণিকের সৌভাগ্যবর্ধনের জন্য প্রতিশ্রুত হইয়া, পর্তুগালরাজের সহিত সন্ধি সংস্থাপিত করিয়া, পর্তুগালের বাণিজ্যোন্নতিসাধন করিবার ভার গ্রহণ করিলেন। এই বন্দর হইতেও বিবিধ পণ্যদ্রব্য ফিরিঙ্গি-বণিকের বাণিজ্যতরণীতে পুঞ্জীভূত হইতে লাগিল। অধিক বাণিজ্যশুল্ক লাভ করিবার লােভে মালাবারের বাণিজ্যবন্দরের রাজন্যবর্গ এইরূপে ফিরিঙ্গি- বণিকের উৎসাহবৰ্ধন না করিলে, প্রথম বাণিজ্যযাত্রাতেই ফিরিঙ্গি- বণিক আশাতীত সাফল্য লাভ করিতে পারিতেন না। আফ্রিকা অতিক্রম করিয়া ভারতবর্ষে উপনীত হইবার পক্ষে বাধা-বিদ্মের অবধি ছিল না ; তরঙ্গসংকুল অকূল সাগরে ক্ষুদ্র তরণী জলমগ্ন হইবার আশঙ্কা ছিল ; অপরিজ্ঞাত প্রাচ্যসাগরে উদ্ধতস্বভাব মুসলমানগণের অত্যাচারে ফিরিঙ্গিগণের সর্বনাশ সংঘটিত হইবার আশঙ্কা ছিল; সুদূর সমুদ্রপথে সুদীর্ঘকাল পােতচালনা করিতে গিয়া পরিশ্রান্ত নাবিকগণের পক্ষে ব্যাধিযুক্ত হইয়া অকালে প্রাণত্যাগ করিবার সম্ভাবনা ছিল। এরূপ বাণিজ্যযাত্রায় লাভ না হইলে, ব্যয়বাহুল্যে পর্তুগালের পক্ষে ক্রমশঃ সৰ্ব্বস্বান্ত হইবারও অসম্ভাবনা ছিল না। এরূপ অবস্থায় প্রথম বাণিজ্য- যাত্রায় পণ্যসংগ্রহে অসমর্থ হইলে ফিরিঙ্গি-বণিকের পক্ষে পুনরায় ভারতযাত্রার আয়ােজন করা অসম্ভব হইয়া উঠিত। অশিক্ষিত কুসংস্কারান্ধ জনসমাজ ব্যর্থ বাণিজ্যযাত্রার নানা কাল্পনিক বিভীষিকার সৃষ্টি করিয়া,ফিরিঙ্গি-বণিকের অধ্যবসায় অবসন্ন করিয়া দিত; ক্ষতিলাভ- গণনা-নিপুণ ধনকুবেরগণ অল্প দিনের মধ্যেই ভারতবাণিজ্যে বীতশ্রদ্ধ হইয়া উঠিতেন! প্রথম বাণিজ্যযাত্রা সফল হইল বলিয়াই, পর্তুগালের পক্ষে বাণিজ্যবিস্তারের মাহেন্দ্রক্ষণ উপস্থিত হইল। প্রথম পরিচয়ে ফিরিঙ্গি-বণি লাভের লােভে অন্ধ হইলেও, প্রকাশ্য- ভাবে বাহুবলের প্রয়ােগ করিতে সাহসী হন নাই। মুসলমান বণিগ- প্রথম পরিচয় ৮৭ বর্গের বিদ্বেষ যত ঘনীভূত হইতে লাগিল, বাহুবলপ্রয়ােগের প্রয়ােজন ততই প্রবল হইয়া উঠিল। কিন্তু ফিরিঙ্গি-বণিকের পক্ষে বাহুবলে সহসা বিজয়লাভ করিবার সম্ভাবনা ছিল না। ভারতবর্ষ হইতে আফ্রিকার উপকূল পর্যন্ত সমগ্র সাগরপথে মুসলমানের আধিপত্য। সে আধিপত্য চূর্ণ করিবার শক্তি না থাকায়, ভাস্কো ডা গামা যাহা পাইয়া- ছিলেন, তাহা লইয়াই স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করিতে বাধ্য হইলেন। প্রত্যাবর্তনকালে নিরন্তর প্রবল ঝঞ্জায় ব্যতিব্যস্ত হইয়া, ফিরিঙ্গি- বণিকের বাণিজ্যতরণী নানারূপে বিধ্বস্ত হইতে লাগিল। পরিশ্রান্ত নাবিকবর্গ একে একে মৃত্যুমুখে পতিত হইতেছে দেখিয়া, গামার বীরহৃদয়ও বিচলিত হইয়া উঠিল। তাঁহার সহােদর মৃত্যুমুখে নিপ- তিত হইলেন! চারি মাস পােতচালনা করিবার পর, গামার তরণীসমূহ যখন আফ্রিকার নিকটবর্তী হইল, তখন অন্নজলের অভাবে উপকূলের আশ্রয় গ্রহণ করিতে হইল। উপকূলসকল মুসলমানের অধিকারভুক্ত। তথায় আশ্রয় গ্রহণ করিতে সাহস হইল না। অবশেষে অনেক ইতস্ততঃ করিয়া গামা মেলিন্দা নামক বন্দরে উপনীত হইলেন! সেখানে প্রচুর অন্নজল সংগ্রহ করিয়া, উত্তমাশা অন্তরীপ অতিক্রম করিবার আশায়, দক্ষিণাভিমুখে পােতচালনা করিতে লাগিলেন। এইরূপে অক্লান্ত অধ্যবসায়ে দীর্ঘকালব্যাপী সমুদ্রভ্রমণের পর ১৪৯৯ খৃষ্টাব্দের ২৪শে আগষ্ট তারিখে ফিরিঙ্গি- বণিকের বাণিজ্যতরণী পর্তুগালে উপনীত হইল। যাহারা যাত্রাকালে দুই হাত তুলিয়া পর্তুগালরাজকে অকথ্য ভাষায় ভৎসনা করিয়া- ছিল, তাহারা সবিস্ময়ে চাহিয়া দেখিল,-গামার বিজয়তরণী সগর্বে টেগস-নদের জলস্রোত অতিক্রম করিয়া বন্দরাভিমুখে অগ্রসর হই- তেছে ! দেশের লােক ছুটিয়া আসিতে লাগিল; পণ্যবিক্রয়ের কোলাহলে পর্তুগালের বন্দর মুখরিত হইয়া উঠিল; ভারতবাণিজ্য ৮ ফিরিঙ্গি বণিক পর্তুগালের করতলগত হইয়াছে বলিয়া রাজা প্রজা সকলেই আনন্দে অধীর হইয়া উঠিলেন। ভারতযাত্রার জন্য যাহা কিছু ব্যয় হইয়াছিল, পণ্যবিক্রয়ে তাহার ষাটগুণ লাভ হইল! এত লাভের কথা কেহ কখন স্বপ্নেও কল্পনা করিতে সাহস করে নাই। সমগ্র ইউরােপ যেন সহসা পুলকিত হইয়া উঠিল ; ভারতভূমি যে রত্নপ্রসবিনী, তাহাতে আর কাহারও সন্দেহ রহিল না। ভাস্কো ডা গামা বিবিধ রাজপ্রসাদ ও সম্মানসূচক উপাধি লাভ করিলেন। রাজা প্রজা সকলে মিলিয়া পুনরায় ভারত-যাত্রার আয়ােজন করিবার জন্য লালায়িত হইয়া উঠিলেন। পােপর শাসনপত্রে ভারত-যাত্রার নবাবিষ্কৃত জলপথে কেবল পর্তু গালেরই অধিকার প্রতিষ্ঠিত হইল। তখন পর্তুগাল হইতে পণ্যক্রয়ের জন্য নানা দেশের বণিশ্বর্গ পর্তুগালে উপনীত হইয়া, পর্তুগালকে ইউরােপীয় বাণিজ্যের কেন্দ্রস্থলে পরিণত করিল। ভারতবর্ষ কোথায়, ভারতবর্ষ কিরূপ দেশ,—সে কথা আর কাহারও অপরিজ্ঞাত রহিল না। সমগ্র ইউরােপে কেবল ভারতবর্ষের কথাই আলােচিত হইতে লাগিল। স্পর্শমণির স্পর্শলাভে লৌহখণ্ড সুবর্ণখণ্ডে পরিণত হয় ;—ভারতবর্ষকে স্পর্শ করিয়া, পৰ্ত্ত গালের ক্ষুদ্র রাজ্য ইউরােপীয় সমাজে বৃহৎ বলিয়াই প্রতিভাত হইল! বাণিজ্যলুব্ধ নাগরিকগণ অভিনব রত্নখরি সন্ধান প্রাপ্ত হইলেন; ধর্মান্ধ খৃষ্টানগণ মুসলমান-দলনের অভিনব যুদ্ধক্ষেত্র সম্মুখে বর্তমান দেখিয়া, ধৰ্ম্মপ্রচারের জন্য তরবারি শাণিত করিতে লাগিলেন! * Here indeed was the East of Man's dreams,-a land of gold and silver, of spices and silks, pearls and diamonds. To arms Portug!! This was a prize worth fighting for !
একাদশ পরিচ্ছেদ The eyes of the Malabar Princes were at length opened. Up to. this time they had seen in their visitors only men urged by the desire of wealth, and anxious to gratify it in trading with India. Esperience tore away the veil, and exposed the secret machinery of Portuguese policy.- Portuguese Conquests in India. উত্তমাশা অন্তরীপ অতিক্রম করিয়া, ইউরােপ হইতে ভারতবর্যে গমনাগমন করিবার অভিনব জলপথ আবিষ্কৃত হইবামাত্র, পর্তুগালের অধীশ্বর “ইথিওপিয়া, আরেবিয়া, পারসিয়া ও ইণ্ডিয়ার বিজয়বিধাতা” এই অভিনব উপাধি গ্রহণ করিলেন! * পােপ এই উপাধি প্রদান করায়, পর্তুগাল-রাজের ভারত-বিজয়ের অদ্বিতীয় অধিকার সর্বত্র স্বীকৃত হইল। পর্তুগালের অধীশ্বর এইরূপে অধিকারলাভ করিয়া, ভারত-বিজয়ের আয়ােজন করিতে প্রবৃত্ত হইলেন। ১৫০০ খৃষ্টাব্দে এয়ােদশ অর্ণবপােত সজ্জীভূত হইল। তাহাতে গােল, বারুদ ও কামান উত্তোলিত হইল। যাহারা সুবিখ্যাত নাবিক,সুশিক্ষিত সৈনিক,—তাহারাই ভারত-যাত্রার জন্য নির্বাচিত হইল। খৃষ্টধর্ম- প্রচারের জন্য সপ্তদশ ধর্মপ্রচারক সজ্জীভূত হইলেন। পি আল- ভারেজ কেবরাল এই নৌ বাহিনীর অধিপতি হইয়া ভারত-যাত্রায় বহির্গত হইলেন। ৮ই মার্চ ৮ই মার্চ ১২০০ আরােহী লইয়া এয়ােদশ অর্ণবপােত যখন বিজয়-যাত্রার জন্য প্রস্তুত হইল, তখন পর্তুগালের অধীশ্বর স্বহস্তে নৌসেনাপতির হস্তে এক মন্ত্রপূত বিজয়পতাকা সমৰ্পণ করিয়া, তাহাকে বুঝাইয়া দিলেন,—“ধৰ্ম্ম প্রচারকগণ যে * Lord of the Conquest, Navigation and Commerce of Ethicpia, Arabia, Persia ard India.-Danzier's Portuguese in India. Iul. 1.94.
ফিরিঙ্গি বণিক সুসমাচার প্রচার করিবেন তাই। গ্রহণ না করিলে, বিধৰ্ম্মিগণকে নিহত করিতে হইবে।” খৃষ্টধৰ্ম্ম-প্রচারের এরূপ অমােঘ উপায় যাহাদের ইতিহাস চির লঞ্চত করিয়া রাখিয়াছে, তাহার কিরূপ নিষ্ঠুর প্রকৃতির পরিচয় প্রান করিয়াছিলেন, ভারতবর্ষের ইতিহাসে তাহার দৃষ্টান্তের অভাব নাই। স্যার উইলিয়ম হণ্টার ভারতবর্ষের ইতিহাস-সংকলন করিবার সময়ে পৰ্ত্ত গাল-রাজের এই নিষ্ঠুর রাজাজ্ঞার উল্লেখ করেন নাই ! পৰ্ত্ত গানের ইতিহাস-লে ৩. 'ণ সগর্বে ইহার উল্লেখ করিয়া গিয়াছেন। খৃষ্টধর্ম প্রচারকগণও ইহার উল্লেখ করিতে বিস্মৃত হন নাই। আফ্রিকার পশ্চিমত ‘ব নিকট দিয়া দক্ষিণাভিমুখে পােতচালনা করিবার সময়ে, ঝটিকাবে পেসকল পথভ্রষ্ট হইয়া, অন্য পথে ধাবিত হইতে লাগিল। এই আকস্মিক দুর্ঘটনাই পর্তুগালের পক্ষে এক নূতন সৌভাগ্যলাভের কারণ হইয়া উঠিল । এপ্রিল মাসের শেষে নৌ-সেনাপতি দেখিলেন,-সম্মুখে এক নিবিড় বন ;—তাহা ভারত- বর্ষের তালবন নহে;—এক অজ্ঞাতপূর্ব নূতন রাজ্যের সমুদ্রসীমা ! পর্তুগাল এইরূপে যে রাজ্যে সন্ধান প্রাপ্ত হইল, তাহা এক্ষণে ব্ৰে'জল .শ নামে সৰ্ব্বত্র সুপরিচিত হইয়াছে। একদিনে এই নুতন রাজ্য পর্তুগালের অধিকারভুক্ত হইল,কেবল বায়ুপ্রবাহের উচ্ছ ঙ্খল গতি এইরূপে অকস্মাৎ পর্তুগালের সৌভাগ্যবর্ধন করিল! + On the Sth of March, the king, having heard Mass, in the Convent of Belem, placed a consecrated banner in the hands of Cabral, who accompanied by eight Fanciscan Missionaries was instructed to destroy all infidels, refusing to listen to the Christianity which the Friars preached.-Portuguese Discoveries ; P. 23-24. + Thus the immense Empire of Brazil, the brightest jewel in প্রথম পরিচয় বিজয়-যাত্রার প্রথম উপক্রমে নবরাজ্যে পর্তুগালের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করিয়া নৌ-সেনাপতি পুনরায় উত্তমাশা অন্তরীপ অতিক্রম করিবার আয়ােজন করিতে লাগিলেন। ভাস্কো ডা গাম। যে পথে ভারতবর্ষে উপনীত হইয়াছিলেন, তাহা নাবিকগণের অপরিচিত ছিল । অল্পদিনের মধ্যেই পােতসমূহ তাহার সন্ধান প্রাপ্ত হইয়া, ভারতবর্ষাভিমুখে ধাবিত হইতে লাগিল। চারিখানি অর্ণবপােত পথভ্রষ্ট হইয়া অকূল সাগরে আত্মসমর্পণ করিল; অবশিষ্ট অর্ণবপােত সেপ্টেম্বর মাসে কালিকটে উপনীত হইল। এবার ফিরিঙ্গি-বণিক বীরবিক্রমে অগ্রসর হইয়াছেন। এবার কালিকটের নিকটবর্তী হইবামাত্র, কামানসকল ভীমগর্জনে নাগরিক- গণের ভীতি-উৎপাদন করিয়া, ফিরিঙ্গি-বণিকের আগমনবার্তা সর্বত্র প্রচারিত করিয়া দিল। ইহারা যে দুর্দান্ত জলদস্যুমাত্র, মুসলমানগণ রাজাকে তাহা বুঝাইবার চেষ্টা করিয়াও কৃতকাৰ্য হইতে পারিলেন না। রাজাজ্ঞায় কালিকটের বন্দরে ফিরিঙ্গি-বণিকের একটি কুঠী সংস্থাপিত হইল। মুসলমানগণের উপদেশে পণ্যবিক্রেতৃগণ সাবধান হইল ; তাহারা পুরাতন ক্রেতৃগণকেই পণ্যবিক্রয় করিতে লাগিল। কেবল ইহাতে অতিমাত্ৰ অসন্তুষ্ট হইয়া, একখানি মুসলমানের বাণিজ্যতরণী লুণ্ঠন করিলেন। মুসলমানগণ রাজদ্বারে অভিযােগ উপস্থিত করিতে ক্রটি করিলেন না। ফিরিঙ্গি-বণি যে সত্যসত্যই জলদস্য মাত্র, সে কথা কেহই অস্বীকার করিতে পারিলেন না। কিন্তু রাজা তাহাতে বিচলিত হইলেন না। তিনি মুসলমান- গণকে বলিলেন,-“তােমরাও যাহা করিতে পার, মুসলমানগণ এইরূপে স্বাধীনতালাভ করিয়া, নাগরিকবর্গের সহিত the Portuguese Crown, was won in a single day, Providence requiring merely to invoke the winds.--Portuguese Discoveries, P. 24.
ফিরিঙ্গি বণিক মিলিত হইয়া ফিরিঙ্গি-বণিকের কুঠী আক্রমণ করিয়া, কুঠীয়ালগণকে নির্দয়রূপে নিহত করিলেন। তখন আর শান্তিসংস্থাপনের সম্ভাবনা রহিল না। ফিরিঙ্গি-বণিক অর্ণবপােত হইতে গােলাবর্ষণ করিয়া, নগর আক্রমণ করিলেন ; মুসলমানের বাণিজ্যতরণী লুণ্ঠন করিতে প্রবৃত্ত হইলেন ,-জলে-স্থলে সমরানল প্রজ্বলিত হইয়া উঠিল। নাগরিকগণ যুদ্ধার্থ প্রস্তুত ছিলেন না। ফিরিঙ্গি-বণিক যুদ্ধার্থ প্রস্তুত হইয়াই আসিয়াছিলেন। বাহুবলের পরিচয় প্রদান করিবার উপযুক্ত অবকাশ উপস্থিত হইবামাত্র যুদ্ধ আরম্ভ হইল। মুসলমান- গণের দশখানি পণ্যপূর্ণ বাণিজ্যতরণী লুণ্ঠিত হইল। ফিরিঙ্গি-বণিক সেই সকল অর্ণবপােতে অগ্নিসংযােগ করিলেন। অসহায় নাগরিকগণ তীরে দাড়াইয়া এই সৰ্ব্বনাশ দর্শন করিতে লাগিল। তখন তীরের দিকেও প্রচণ্ডবিক্রমে গােলাবর্ষণের সূত্রপাত হইল। কত লােক প্রাণত্যাগ করিল ; কত লােক সৰ্বস্বান্ত হইল ; কত লােক নগর- ত্যাগ করিল; নগরের একাংশ ভস্মীভূত হইয়া গেল ! তখন ফিরিঙ্গি- বণি কালবিলম্ব না করিয়া, পলায়ন করিলেন। তাঁহাদের তরণী- সমূহ কালিকট ছাড়িয়া কোচীন বন্দরে উপনীত হইল। কালিকট- রাজ এতদূর ভাবিয়া দেখেন নাই। এখন বন্দর-রক্ষার জন্য * এই ঘটনার বর্ণনা করিবার সময় গােলাম হােসেন লিখিয়া গিয়াছেন,-But the Christians commenced molesting the Mussalmans in merchantilo business, so that the Samri, becoming enraged, ordered the former's slaughter and massacrc. Seventy lcading Christians were slain. ইহা মুসলমানদিগের উক্তি বলিয়াই বােধ হয়। এ কথা সত্য হইলে পর্তগীজগণ ইহার উল্লেখ করিতে ক্রটি করিতেন বলিয়া বােধ হয় না। যাহা হউক, এস্থলে উভয় মতই উল্লিখিত হইল।
প্রথম পরিচয় তাহাকেও আয়ােজন করিতে হইল। জলদস্যু দমন করিতে না পারিলে, বাণিজ্যলক্ষ্মী অন্তর্হিত হইবে; তাহা বুঝিতে পারিয়াই কালিকটরাজ-রণতরণী সজ্জীভূত করিতে প্রবৃত্ত হইলেন। ফিরিঙ্গি-বণিকের প্রবল প্রতাপের পরিচয় প্রাপ্ত হইয়া, কোচীনরাজ সন্ধি সংস্থাপিত করিয়া আত্মরক্ষা করিলেন! কোচীন-বন্দরে ফিরিঙ্গি- বণিকের কুঠী সংস্থাপিত হইল ; তাহাতে কুঠীয়ালগণ বাস করিতে আরম্ভ করিলেন। * কোচীন-রাজকে কালিকটের সিংহাসনে সংস্থাপিত করিয়া দিবেন বলিয়া কেবল স্পর্ধা প্রকাশ করিতে লাগিলেন। এই সময়ে সংবাদ আসিল,কালিকট-রাজের রণতরণী কোচীন আক্র- মণের জন্য অগ্রসর হইতেছে। ফিরিঙ্গি-বণিক এই সংবাদে ব্যতিব্যস্ত হইয়া, কুঠীয়ালগণকে কোচীনে রাখিয়া, কোচীনের জনৈক ব্রাহ্মণকে অর্ণবপােতে তুলিয়া লইয়া, স্বদেশাভিমুখে পলায়ন করিতে আরম্ভ করিলেন ! ! নানা ক্লেশে ছয়খানিমাত্র অর্ণবপােত পর্তুগালে উপনীত হইল। * খৃষ্টান লেখকগণ একটি কথার উল্লেখ করিতে বিস্মৃত হইয়াছেন। কোচীনে কুঠী নিৰ্মাণ করিবার সময়ে তাহারা বলপূৰ্ব্বক একটী মসুজেদ ভাঙ্গিয়া গির্জা নির্মাণ করিয়াছিলেন। গােলাম হােসেন তাহার উল্লেখ করিয়া লিথিয়া গিয়াছেন,—“Dismantling a mosque, which stuod on the sea-shore, they built on its site a church.” গােলাম হােসেনের মুসলমান অনুবাদক একটী টীকা সংযুক্ত fan farferaten,-The fanatical Vandalism of the Portuguese Christians in demolishing a Moslem mosque is in sad contrast to the toleration and scrupulous regard for the sanctity, the Christian church was shown by the early Moslem Arabs under Omar after the conquest of Palestine ! + The Admiral, “judging discretion the better part of valour' and avoiding the conflict, sailed for Lisbon, and left the Raja of Cochin to his fate.Purtuguese Discoveries P. 25-26 # ফিরিঙ্গি বণিক ফিরিঙ্গি-বণিকের পক্ষে শান্তভাবে বাণিজ্যব্যাপারে অর্থোপার্জন করিবার অসুবিধা ছিল না। ফিরিঙ্গি-বণিক সে পথে অগ্রসর না হইয়া, যে পথের পথিক হইয়াছিলেন, তাহা পৰ্ত্ত গালের জনসাধারণের নিকট নিরতিশয় আপৎসংকুল বলিয়াই প্রতিভাত হইল। যাহারা ধৰ্ম্মপ্রচারের জন্য উন্মত্ত হইয়াছিলেন, তাঁহারাও বুঝিতে পারিলেন, ভারতবর্ষে খৃষ্টধৰ্ম্ম-প্রচারের আশা আকাশকুসুমে পরিণত হইবে। কিন্তু পর্তুগালের অধীশ্বর তাহাতে ভীত বা বিচলিত হইলেন না;—তিনি বাহুবলকেই প্রকৃত বল বলিয়া ঘোষণা করিতে লাগিলেন। সুতরাং পুনরায় বাহুবলে কালিকট ধ্বংস করিবার আয়ােজন হইতে লাগিল। জলে স্থলে সমরঘােষণা না করিলে, ভারতবাণিজ্যে পর্তুগালের অধিকার সংস্থাপিত হইবে না; এই বিশ্বাসে পর্তুগালের অধীশ্বর বাহুবল প্রয়ােগের জন্য অধীর হইয়া উঠিলেন। এ দিকে কালিকট-রাজের রণতণীসমূহ কোচীন বন্দরের নিকটবর্তী হইলে, ফিরিঙ্গি-বণিকের পলায়নবার্তা প্রকাশিত হইয়া পড়িল। তখন কালিকট-রাজের নৌ-সেনাপতি কোচীন-রাজের নিকট দূভ প্রেরণ করিয়া, ফিরিঙ্গি-কুঠীয়ালগণকে ধৃত করিয়া দিবার জন্য অনুরােধ জ্ঞাপন করিলেন। কোচীন-রাজ তাহাতে সম্মত হইলেন না। তখন কোচীন ও কালিকটের বাণিজ্য-কলহ সমর-কলহে পরিণত হইল। । মালাবারের উপকূলে এইরূপে যে সমরানল প্রজ্বলিত হইয়া উঠিল, তাহাতেই Animated by a crusading spirit, the aim of the Portuguese goverminent was to destroy the Arab coinmerce, and to establish an arıned monopoly.--Riaz-us-Salateen, Note. + এই কলহে কোচীনরাজের পুত্র নিহত হইবার কথা “রিয়াজে” লিখিত আছে। 71,--Consequently, the Samri, advancing with his forces, slew the son of the king of Kuchin, and ravaging that province, returned.
প্রথম পরিচয় a বাণিজ্যলক্ষ্মী ভস্মীভূত হইবার উপক্রম হইল। জলে স্থলে হিংসাদ্বেষ ও পরপহরণ প্রবল হইতে লাগিল। এই সময়ে পৰ্ত্ত গাল হইতে যে সকল বাণিজ্যতরণী সমাগত হইয়াছিল, তাহাদিগকে রক্ষা করিবার কন্য কোচীন-রাজ যত্ন করিতে লাগিলেন ; কালিকট-রাজ তাহাদের ধ্বংস- সাধন করিবার জন্য বদ্ধপরিকর হইলেন। পর্তুগালের বাণিজ্যতরণী কোনরূপে পৰ্ত্তগালে প্রত্যাবর্তন করিবামা ও পৰ্তুগালরাজ কালিকট ধবংস করিয়া, অন্যান্য বন্দরের সহিত বাণ করিবার জন্য কৃতসংকল্প হইলেন। ১৫০২ খৃষ্টাব্দে পুনরায় ভাস্কো ড্য গামা সসৈতে ভারতযাত্রা করিলেন। এবার কেবল ভারতবর্ষে যাতায়াতের অভিনব জলপথের আবিষ্কারকামনা তাহাকে ভারত-যাত্রায় উৎসাহযুক্ত করে নাই; এবার বৈরনিৰ্যাতনের প্রবল উত্তেজনায় পর্তুগী ? সেনাপতির ধৰ্ম্ম বুদ্ধি বিলুপ্ত হইয়া গিয়াছিল। গামা ভারতবর্ষের নিকটবর্তী হইবামাত্র, কালিকট আক্ৰমণ করিয়া, নগর-প্রাচীরের উপর গোলাবর্ষণ করিতে লাগিলেন বন্দরের মুসলমান বণিশ্বর্গের বাণিজ্যতরণী ভস্মীভূত করিয়া ফেলিলেন, মালাবারের অন্যান্য বন্দরে উপনীত হইয় , কুঠী সংস্থাপিত করিয়া, একটি কুঠীতে গােপনে গােল, বারুদ ও কামান ভূগর্ভে প্রােথিত করিয়া রাখিলেন; এবং তীররক্ষাৰ্থ রণতরণী স'াপিত করিয়া, কালিকটের রণতরণীসমূহ আক্রমণ করিতে প্রবৃত্ত হইলেন। ভাস্কো ডা গামা যেন দুর্দান্ত জলদৈত্যের মত সৰ্বত্ৰ ধাবিত হইতে লাগিলেন। কালিকটের রণতরণী পরাভূত হইল। কালিকট রাজের নৌসেনা গামার নিকট বন্দি-বেশে আনীত হইল। গামা ৮৫০ বন্দীর নাসা কর্ণ ও হস্তদ্বয় ছেদন করিয়া তাহা উপঢৌকনস্বরূপ কালিকট-রাকে প্রেরণ করিলেন। হতভাগ্য বন্দিগণ ইহাতেও মুক্তিলাভ করিল না। কাষ্ঠফলকের আঘাতে তাহাদের দপঙক্তি উৎপাটিত হইতে লাগিল। একজন • ফিরিঙ্গি বণিক t ব্রাহ্মণদূত উপনীত হইবামাত্র, গামা তাহার কর্ণদ্বয় ছেদন করিয়া, তাহার স্থলে কুকুরের কর্ণ সংযুক্ত করিয়া দিয়া, ব্রাহ্মণদূতকে কালিকট-রাজের নিকট প্রেরণ করিলেন। জনৈক মুসলমান বণিক এই সকল পাশব অত্যাচারের প্রতিবাদ করায়, গামার প্রধান পােতাধ্যক্ষ তাহার পৃষ্ঠে কশাঘাত করিতে করিতে, তাঁহাকে ধরাশায়ী করিয়া, তাঁহার মুখে শূকরের মাংস বাঁধিয়া দিলেন। ইতিহাসে এরূপ লােমহর্ষণ অত্যাচার- কাহিনী অধিক লিপিবদ্ধ হয় নাই! এইরূপে দিগ্বিজয় সুসম্পন্ন করিয়া, ভাস্কো ডা গামা ভারতবর্ষ হইতে প্রস্থান করিলেন। ফিরিঙ্গি-বণিকের নামে কালিকটের নাগরিকগণ শিহরিয়া উঠিল। কালিকট-রাজ বুঝিতে পারিলেন,—কোচীন-রাজের সহায়তা লাভ করিয়াই গামা এতদূর স্পর্ধা প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। তখন কোচীন-বন্দর আক্রান্ত হইল;-কালিকট ও কোচীনের মধ্যে চিরশত্রুতা প্রতিষ্ঠিত হইল। ভাস্কো ডা গামার স্বদেশীয় লেখকবর্গ তাঁহার এই সকল পাশব অত্যাচারের পক্ষসমর্থন করিয়াই ইতিহাসের রচনা করিয়া গিয়াছেন। কিন্তু উত্তরকালের খৃষ্টধৰ্ম্ম-প্রচারকগণ ইহার পক্ষ-সমর্থনের চেষ্টা করেন নাই। তাহারা ইহাকে কালধৰ্ম্ম বলিয়াই ব্যক্ত করিয়া গিয়াছেন।* কালিকট-রাজের অপরাধ ছিল না; মুসলমান বণিকবর্গেরও বিশেষ অপরাধ ছিল না। কালিকট-রাজ ফিরিঙ্গি-বণিকের সহিত মিত্ৰতাস্থাপন It is unnecessary to multiply these frightful recitals, but it was requisite to give some idea of the arrogance and cruelty of the Portuguese conquerors. Of course, every attempt is made by their fellow-countrymen to justify or paliate such atrocities as we have described. But though the bad faith of the Ilindu monarchs and the perſidious insinuations of the Moors may explain the conduct of the Admiral, the spirit of his age can alone excuse it- Portuguese Discovercs. P. 32.
প্রথম পরিচয় করিয়া মিত্রতারক্ষাৰ্থ আপন প্রজাবর্গের প্রকৃত অভিযােগেও উপেক্ষা প্রদর্শন করিয়াছিলেন। মুসলমান বণিগবর্গ প্রথমে ফিরিঙ্গি-বণিককে আক্রমণ করেন নাই। তাহাদের বাণিজ্যতরণী লুষ্ঠিত হইবার পর, তাহারা রাজদ্বারে অভিযােগ উপস্থিত করিয়াছিলেন। রাজা সে অভিযােগে কর্ণপাত না করায়, তাহারা ফিরিঙ্গি-বণিকের কুঠী আক্রমণ করায় কুঠীয়ালগণ নিহত হন। বিচার করিয়া দেখিলে, ইহার জন্য কালিকট- আক্রমণের পক্ষ সমর্থন করা যায় না। কিন্তু যে যুগে এই সকল ঘটনা সংঘটিত হয়, সে যুগে ইউরােপের বিচারবুদ্ধি মার্জিত হয় নাই ;-তখনও বাহুবলই সকল তর্কের মীমাংসা করিয়া দিত,—তখনও পাশব অত্যাচারই বাহুবলের পরাকাষ্ঠা বলিয়া পরিচিত ছিল। দ্বিতীয়বার ভারতবর্ষে উপনীত হইবামাত্র গামা কালিকট-রাজকে বলিয়া পাঠাইলেন,-মুসলমানগণকে চিরনিৰ্বাসিত না করিলে, কালিকট ধ্বংসপ্রাপ্ত হইবে। হিন্দু নরপতি মুসলমান প্রজাবর্গের বাণিজ্যরক্ষার্থ সর্বস্বান্ত হইতে প্রস্তুত না হইলে, কালিকট ধ্বংস প্রাপ্ত হইত না। কিন্তু কালিকট-রাজ রাজধৰ্ম্ম বিসর্জন দিয়া নগররক্ষা করিতে সম্মত হইলেন । ইহাতেই অনর্থ উৎপন্ন হইল। এই সকল ঐতিহাসিক ঘটনা ধীরভাবে বিচার করিয়া দেখিলে সকলকেই স্বীকার করিতে হইবে, যাহা চরিত্রগুণ, তাহার জন্যই কালিকটের সর্বনাশ হইয়াছিল। ৭ দ্বাদশ পরিচ্ছেদ The Zamorin made every effort to rouse the apathetic sovereigns to take part in the conimon cause.-Porluguese Conquest in India. ; কালিকট:রাজ আত্মরক্ষার আয়ােজন করিতে ত্রুটি করেন নাই। তথাপি তাহার আয়ােজন ব্যর্থ করিয়া, ভাস্কো ডা গামা ভারতবর্ষে বিভীষিকার সঞ্চার করিতে কৃতকার্য হইলেন। তিনি ইহার জন্য প্রস্তুত ছিলেন; কিন্তু ভারতবর্যের লােক এরূপ নিষ্ঠুরতার জন্য প্রস্তুত ছিল না। এখন ভাস্কো ডা গামার নাম ইতিহাসে সুপরিচিত হইয়াছে। তাহার চরিত্রদোষ বিস্মৃত হইয়া, ইতিহাস-লেখকগণ তাহার চরিত্রগুণেরই উল্লেখ করিতেছেন। কিন্তু সেকালের কাগজপত্রে দেখিতে পাওয়া যায়,-গামা বীর হইলেও দস্যু, ধৰ্ম্মোন্মত্ত হইলেও রাক্ষসের ন্যায় নিষ্ঠুর ! ফিরিঙ্গি-বণিকের সহিত মালাবার-প্রবাসী যে সকল মুসলমান বণিকের কলহ ঘটিয়াছিল, তাহারা রাজা বা রাজপুরুষ ছিলেন না। কলহ কেবল ব্যক্তিগত বাণিজ্য-কলহ ; তাহা জাতিগত ধৰ্ম্ম-কলহ নহে। গামা তাহাকে সে ভাবে গ্রহণ করেন নাই। তিনি তাহাকে মুসলমান ও খৃষ্টানের-এসিয়া ও ইউরােপের—কৃষ্ণাঙ্গ ও শ্বেতাঙ্গের—জাতিগত কলহ বলিয়াই ধরিয়া লইয়াছিলেন। তিনি যখন ভারতবর্ষ অভিমুখে অগ্রসর হইতেছিলেন, তখনই তাহার প্রমাণ প্রকাশিত হইয়া পড়িয়াছিল। মিশরের সুলতানের নিরীহ প্রজাবর্গ মক্কাতীর্থ দর্শন করিয়া, একখানি অর্ণবপােতে অরােহণ করিয়া, স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করিতে- ছিল। আফ্রিকার পূর্বোপকূলের নিকটে অসিয়া, গামার অর্ণবপােতের আত্মরক্ষা সহিত এই সকল তীর্থযাত্রীর অর্ণবপােতের সংঘর্ষ উপস্থিত হইল। তীর্থযাত্রী বলিয়া কেহ নিষ্কৃতিলাভ করিল না! যাহার নিকট যাহা ছিল, হাজিগণ সর্বস্ব সমৰ্পণ করিয়া, কেবল প্রাণভিক্ষা করিল। কিন্তু তাহারা যে সকলেই মুসলমান! গামা মুসলমান তীর্থযাত্রীর কাতর ক্রন্দনে কর্ণপাত না করিয়া, তাহাদের অর্ণবপোত লক্ষ্য করিয়া গােলা- বর্ষণ করিতে প্রবৃত্ত হইলেন *। পােতে অগ্নি সংযুক্ত হইবামাত্র তীর্থ- যাত্রিগণ সাগরজলে তাহা নিৰ্বাপিত করিবার জন্য চেষ্টা করিতে লাগিল। গামা পুনরায় অগ্নিসংযোেগে প্রবৃত্ত হইলেন। এক জন লিখিয়া গিয়াছেন,-“মুসলমান তীর্থযাত্রিবর্গের অর্ণবপােতে যে সকল রমণী ছিলেন, তাঁহারা শিশু সন্তানগণকে উর্ধে উত্তোলিত করিয়া, গামার দিকে কাতরনয়নে চাহিয়া, বালকবালিকার প্রাণভিক্ষা করিতে লাগিলেন ;-গামা অবিচলিতচিত্তে স্ত্রীহত্যায় শিশু-হত্যায় নিবিষ্ট হইয়া রহিলেন।” । কালিকটে উপনীত হইবার পূর্বেই কালিকট-রাজের সম্ভ্রান্ত রাজ- দূতগণ ভাস্কো ডা গামার অর্ণবপােতে আরােহণ করিয়া সন্ধিস্থাপনের জন্য যথাসাধ্য যত্ন করিয়াছিলেন। গামা তাহার প্রত্যুত্তরে বলিয়া- ছিলেন,—“সমস্ত মুসলমান প্রজাকে কালিকট হইতে চিরনির্বাসিত না করিলে সন্ধি হইবে না।” কালিকট-রাজের পক্ষে বাহুবলে কালিকট রক্ষা করিবার সম্ভাবনা ছিল না। তথাপি তিনি এরূপ প্রস্তাবে সম্মতি- enormous The Arabs, seeing resistance hopeless, offered an ransom, which the Admiral accepted, and yet ordered the vessel to be fired. The poor wretches succeeded in extinguishing the flames but the merciless Da Gama ordered his inen to rekindle the:n.-Portugiese Discorerles. † The women held up their children to Da Gama. Navegacas as Indias Orientaes por Thome Lopes.
ফিরিঙ্গি-বণি জ্ঞাপন করিতে করিতে পারিলেন । তাহাকে জানিয়া-শুনিয়াই আত্মবিসৰ্জন করিতে হইল। তিনি আত্মরক্ষার্থ রাজস্যগণকে আহ্বান করিয়াছিলেন। তাহাতে কেহ কর্ণপাত না করায়, কালিকট-রাজ একাকী সমরানলে আত্মাহুতি প্রদান করিতে বাধ্য হইলেন। কোচীন-রাজ ফিরিঙ্গি-বণিকের পৃষ্ঠপােষক না হইলে, গামা একাকী এতদূর স্পর্ধা প্রকাশ করিতে সাহসী হইতেন না। লাভের লােভ অন্ধ হইয়া, কোচীন-রাজ স্বদেশদ্রোহে লিপ্ত হইলেন। তাহাই ভারত- বর্ষের ইতিহাসের প্রধান কথা। ভারতবর্ষের ইতিহাসে যে সকল সন্ধিকালের পরিচয় প্রাপ্ত হওয়া যায়, তাহার সকল কালেই স্বদেশ- দ্রোহীর অত্যচারেই ভারতবর্ষ পরাভূত হইয়াছে ! কাপুরুষ না হইলে, কেহ স্বদেশদ্রোহে লিপ্ত হয় না। কোচীন-রাজ কাপুরুষের মতই আচরণ করিতে লাগিলেন। গামা স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করিবামাত্র, কোচীন-রাজ নগর ত্যাগ করিয়া, বিপিন নামক একটি ক্ষুদ্র দ্বীপের দুর্গমধ্যে পলায়ন করিলেন । কোচীন বন্দরে আশ্রয়লাভ না করিলে,-কোচীন-রাজের প্রশ্রয় প্রাপ্ত না হইলে,—ফিরিঙ্গি-বণিক সহসা সমরঘােষণা করিতে সাহসী হইতেন না। সে কথা উভয় পক্ষের কাহারও অজ্ঞাত রহিল না। কালিকটরাজ বাধ্য হইয়া কোচীন-বন্দর ধ্বংস করিবার জন্য কৃতসংকল্প হইলেন ; পৰ্ত্ত গাল-রাজও বাধ্য হইয়া কোচীন বন্দর রক্ষা করিবার জন্য কৃতসংকল্প হইলেন। যাহা কালিকট ও পর্তুগালের কলহ, তাহা এইরূপে কালিকট ও কোচীনের কলহে পরিণত হইল ;—যাহা হিন্দু, মুসলমান ও খৃষ্টানের কলহ, তাহা কেবল হিন্দু-মুসলমানের গৃহকলহে পরিণত হইল;—যাহা শ্বেতকৃষ্ণের শত্রুতা, তাহা এইরূপে গৃহশত্রুতায় পর্যবসিত হইল! এক ভারতবাসী অন্য ভারতবাসীর কণ্ঠচ্ছেদ করিয়া আত্মরক্ষা উভয়ে গত হইবামাত্র, ফিরিঙ্গি আসিয়া শূন্য সিংহাসন অধিকার করিল! ১৫০৩ খৃষ্টাব্দে আলবুকার্ক নামক স্বনামখ্যাত পর্তুগীজ সেনাপতি মালবারে উপনীত হইয়া দেখিলেন,—কোচীন বন্দর অবরুদ্ধ ; রাজ পলায়িত ; কোচীনের ফিরিঙ্গি কুঠিয়ালগণ জীবন্মত। আবু- কার্ক উপনীত না হইলে, কোচীন বন্দর ধ্বংসপ্রাপ্ত হইত। আলবুকার্ক আসিয়া কোচীন-রাজের লজ্জা রক্ষা করিলেন। * আবার কোচীন বন্দর আপন্মুক্ত হইল; আবার কোচীন-রাজ সিংহাসনে আরােহণ করিলেন। এই উপকার স্মরণ করিয়া, কৃতজ্ঞ কোচীন-রাজ ফিরিঙ্গি- বণিকে কোচীনে দুর্গনিৰ্মাণ করিবার অধিকার দান করিলেন। কোচীনের ন্যায় কুইলন বন্দরেও ফিরিঙ্গি-বণিকের কুঠী সংস্থাপিত হইল, এবং বন্দর-ক্ষার্থ ফিরিঙ্গি-বণিকের রণতরী মালাবারের নানা স্থানে গতায়াত করিতে লাগিল। পরাভূত কালিকট-রাজ বাধা প্রদান করিতে পারিলেন না; বরং বাধ্য হইয়া সন্ধিস্থাপনে সম্মত হইলেন। পাকিও নামক সেনাপতিকে ভারতবর্ষে রাখিয়া, (১৫৪) আল- কার্ক পর্তুগাল অভিমুখে প্রত্যাবর্তন করিতে না করিতে কালিকট- রাজ আবার কোচীন বন্দর আক্রমণ করিতে প্রবৃত্ত হইলেন। ফিরিঙ্গি- বণিকের সেনাবল অধিক ছিল না; পাকিও অনন্যোপায় হইয়া নায়ার- বংশীয় সিপাহীগণকে পল্টন-ভুক্ত করিতে প্রবৃত্ত হইলেন। এই সূত্রে ফিরিঙ্গির বাহুবলের সহিত ভারতবাসীর বাহুবল সংযুক্ত হইয়া ভারত- বর্ষের পরাজয়-সাধনে অগ্রসর হইল। ভারতবর্ষের যে জাতি স্বদেশের At every time, the Portuguese helped Kuch in, so that the Samri did not succeed in subduing it, and without attaining his object retired.--Riaz-us-salateen. P. 402-403.
ফিরিঙ্গি-বণি বিরুদ্ধে খড়গধারণ করিবার জন্য সর্বপ্রথমে ফিরিঙ্গির পল্টন-ভুক্ত হয়, তাহারা নায়ার নামে অদ্যাপি সৰ্ব্বত্র সুপরিচিত। নায়ারদিগের সঙ্গে সেন্ট টমাস সম্প্রদায়ভুক্ত খৃষ্টান ও কোন কোন মুসলমানও ফিরিঙ্গির পণ্টন-ভুক্ত হইতে লাগিল। অল্প দিনের মধ্যে তাহারা সমরশিক্ষায় সুশিক্ষিত হইয়া, জলে স্থলে কালিকট-বাজকে পরাভূত করিয়া, কোচীন বন্দরে ফিরিঙ্গি-বণিকের প্রাধান্য সংস্থাপিত করিয়া দিল। ভাস্কো ডা গামা ভারতবাণিজ্যের অভিনব জলপথের আবিষ্কার সাধন করিতে না করিতে, চকিতের ন্যায় ফিরিঙ্গি-বণিকের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হইতে লাগিল। যাহারা প্রথমে বণিকের বেশে ক্ষুদ্র পােতে আরােহণ করিয়া ভারতবর্ষে উপনীত হইয়াছিল, তাহাদের পক্ষে সমুদ্র ও সমুদ্রপােত ভিন্ন অন্য কোনও আশ্রয়স্থল বৰ্তমান ছিল না। অল্প দিনের মধ্যে তাহারা কুঠী সংস্থাপিত করিল; অল্প দিনের মধ্যে তাহারা দুর্গনিৰ্মাণ করিল; অল্প দিনের মধ্যে তাহারা সেনাদল সংগ্রহ করিয়া বাহুবলে ভারতবাণিজ্যে আধিপত্যবিস্তার করিয়া, মালাবারের জন্য- বর্গের ভাগ্যবিধাতা হইয়া উঠিল। ইতিহাসে এরূপ আকস্মিক বিজয়- কাহিনী অধিক নাই ! মুসলমানগণ আত্মরক্ষা করিতে পারিলেন না। তাহারা ভারতবর্ষে আশ্ৰয়লাভ করিয়া, বাণিজ্যব্যাপারে অর্থোপার্জন করিতেন,-কখনও বাহুবলের পরীক্ষা প্রদান করিবার প্রয়ােজন উপস্থিত হয় নাই। সহসা সেই প্রয়ােজন উপস্থিত হইবামাত্র, মুসলমানগণ পদে পদে পরাভূত হইলেন। লােহিতসাগরমুখে ফিরিঙ্গি-বণিকের রণতরী সজ্জীভূত থাকিয়া বা মিশর হইতে মুসলমানদিগের সহায়তা-সংগ্রহের পথ রুদ্ধ করিয়া দিয়াছিল। অগত্যা মুসলমানগণ ধনরত্ন সংগৃহীত করিয়া পােতারােহণে পারস্যোপসাগরপথে পলায়ন করিবার আয়ােজন করিতে লাগিলেন।
আত্মরক্ষা আয়ােজন সমাপ্ত হইলে, মুসলমানদিগের অর্ণবপােত কালিকট হইতে বিদায় গ্রহণ করিল। এই সময়ে সােয়ারেজ নামক ফিরিঙ্গি- সেনাপতি ত্রয়ােদশ অর্ণবপােত লইয়া ভারতবর্ষে উপনীত হইলেন। তিনি মুসলমানদিগের পলায়নপথে রণতরণী সংস্থাপিত করিয়া, তাহাদের ধন- রপূর্ণ সপ্তদশ অর্ণবপােত অধিকার করিবামাত্র, দ্বিসহস্র মুসলমান নিহত করিয়া, মুসলমানবিজয় সুসম্পন্ন করিলেন। যাহারা এইরূপে প্রাণবিসৰ্জন করিল, তাহারা আত্মরক্ষার চেষ্টা করিবারও অবসর প্রাপ্ত হইল না। কালিকট-রাজের আত্মরক্ষার চেষ্টা ব্যর্থ হইয়া গেল। * বাণিজ্যবই কালিকট-রাজের একমাত্র বল; সে বল প্রবল পীড়নে চুর্ণ হইয়া গেল। মুসলমান বণিকের পলায়নে কালিকট-রাজের পক্ষে ফিরিঙ্গি-বণিকের আধিপত্য অস্বীকার করিবার উপায় রহিল না। ফিরিঙ্গি-বণিকের বাহুবলের কথাই ইতিহাসে লিখিত হইয়া সৰ্ব্বত্র সুপরিচিত হইয়াছে। তাহাতে সকল কথার সুসঙ্গত ব্যাখ্যা প্রাপ্ত হওয়া যায় না। তাঁহাদের বাহুবল অপেক্ষা কুটিল কৌশলই যে বাণিজ্য- বিস্তারের প্রধান সহায়, তাহা জানিতে না পারিলে, ফিরিঙ্গি-বণিকের বিজয়কাহিনী আরব্যোপন্যাসের অলীক কাহিনীর ন্যায় প্রতিভাত হইয়া থাকে। কি গুণে ফিরিঙ্গি-বণিক সাত বৎসরের মধ্যে বহু শতাব্দীর মুসল- * Becoming powerless, he sent envoys to the rulers of Egypt, Jiddah, tha Dakhin and Gujrat. Complaining of the mal-practices of the Christians, he asked for help, and sending out narratives of the oppressions, practised by the Christians over the Mussalmans, he stirred up the veins of their zeal and rage. Riar-us- Salateen. p. 403.
১০৪ ফিরিঙ্গি বণিক মান-বাণিজ্যের প্রবল প্রতাপ পরাভূত করিয়া, ভারতসাগরে প্রভুত্ব বিস্তার করিতে সমর্থ হইয়াছিলেন, তাহার তথ্যানুসন্ধানে প্রবৃত্ত হইবা- মাত্র মনে হয়,-হৃদয়বলই ফিরিঙ্গি-বণিকের অভ্যুদয়লাভের মূল কারণ। অধ্যবসায় ও অকুতােভয় জয়যুক্ত হইল; তাহার সহিত নিষ্ঠুরতা মিলিত না হইলে, ইতিহাস কলঙ্কিত হইত না। স্বার্থপরতা ও গৃহকলহ পরাভূত হইয়া গেল ; তাহার সহিত স্বদেশদ্রোহ মিলিত না হইলে, ইতিহাস কলঙ্কিত হইত না! তথাপি এই স্বদেশদ্রোহের কলঙ্ককাহিনীর সম্যক আলােচনা না করিলে, ফিরিঙ্গি-বণিকের অসাধারণ অভ্যুদয়লাভের প্রকৃত কাৰ্যকারণ- শৃঙ্খলা প্রকাশিত হইতে পারে না। ইউরােপীয় ইতিহাসলেখকেরাও ইহার উল্লেখ করিয়া গিয়াছেন। যাহারা ইতিহাসের মৰ্যাদারক্ষা করিয়া লেখনী-চালনা করিয়া গিয়াছেন, তাহারা কেহই ফিরিঙ্গি-বণিকের কলঙ্কঘােষণা করিতে ইতস্ততঃ করেন নাই। কিন্তু কেহই কোচীন- রাজের স্বদেশদ্রোহের সমালােচনা করিবার চেষ্টা করেন নাই। ইহাতে ইতিহাসে কেবল ফিরিঙ্গি-বণিকের নামই কলঙ্কযুক্ত হইয়া রহিয়াছে ;- ভারতবর্ষের স্বদেশদ্রোহীর নাম কলঙ্কযুক্ত হয় নাই। কোচীন-রাজ দুৰ্বল বলিয়া ফিরিঙ্গি-বণিকের হস্তে আত্মসমর্পণ করিলে, তাঁহাকে দুৰ্বল বলিয়া ভারতবর্ষের ইতিহাসলেখক কৃপা করিতে পারিতেন। কিন্তু কোচীন রাজ স্বার্থলুব্ধ হইয়াই ফিরিঙ্গি-বণিকে আশ্রয়দান করিয়াছিলেন ; তাহাদের সহায়তা গ্রহণ করিয়া, কালি- কটের সিংহাসনে আরােহণ করিবার আশায় উন্মত্ত হইয়া উঠিয়াছিলেন এবং সেই জন্যই স্বদেশদ্রোহে লিপ্ত হইয়াছিলেন। ইতিহাসলেখক এরূপ চরিত্রকে কদাচ কৃপা করিতে পারেন না। পাপ চিরদিনই পাপ! স্বদেশদ্রোহ মহাপাপ! ফিরিঙ্গি-বণিক প্রথম সন্দর্শনেই কোচীন-রাজের এই পাপ-প্রবৃত্তির আত্মরক্ষা পরিচয় প্রাপ্ত হইয়া, সৰ্বপ্ৰযত্নে তাহাকে বিবর্ধিত করিয়া তুলিয়া- ছিলেন। কোচীন-বন্দরে উপনীত হইয়া, ফিরিঙ্গি-বণি যে অভিজ্ঞতা লাভ করেন, তাহাই ইউরােপের পক্ষে এসিয়া-বিজয়-কামনা পােষণ করিবার প্রধান প্রলােভন। ফিরিঙ্গি-বণিক এ দেশে আসিয়া স্বদেশ- দ্রোহীর সহায়তা লাভ করিতে না পারিলে, কেবল বাহুবলে ভারত- বাণিজ্যে শক্তিবিস্তার করিতে পারিতেন না। মালাবারের স্বাধীন-বাণিজ্য ফিরিঙ্গি জলদস্যুর অন্যায় উৎপীড়নে এইরূপে বিপর্যস্ত হইবামাত্র, সমগ্র পাশ্চাত্য-সমাজে আশঙ্কা উক্তি হইয়া উঠিল। যাহারা মুসলমান বণিকবর্গের যােগে পারস্যোপসাগরের ও লােহিত সাগরের পুরাতন বাণিজ্যপথে ভারতীয় পণ্যদ্রব্য প্রাপ্ত হইয়া, ইউরােপের নানা দেশে বাণিজ্য করিয়া প্রভূত অর্থোপার্জন করিতেন, তাঁহারা আশঙ্কান্বিত হইয়া উঠিলেন। তাহাদের মধ্যেও আত্ম- রক্ষার উপায় আবিষ্কারের জন্য উত্তেজনা অনুভূত হইতে লাগিল। একালের ন্যায় সেকালে অল্পক্ষণের মধ্যে সকল কথা জগদ্ব্যাপ্ত হইবার উপায় ছিল না; সুতরাং সকল কথা জগদ্ব্যাপ্ত হইতে বিলম্ব ঘটিতে লাগিল। অবশেষে ভূমধ্যসাগরের ইউরােপীয় বণিবর্গ যখন মুসলমান বণিগবর্গের সর্বনাশের প্রকৃত কারণ অবগত হইলেন, তখন মুসলমান- বাণিজ্য রক্ষা করিবার জন্য আগ্রহ উপস্থিত হইল। পর্তুগাল হইতে ভারতীয় পণ্যদ্রব্য সংগ্রহ করিয়া ভূমধ্যসাগরতীরের বিবিধ পণ্যবীথিকায় বিক্রয় করিয়া অর্থোপার্জন করা অপেক্ষা মুসলমান বণিকের নিকট পণ্য-সংগ্রহ করা সমধিক লাভজনক। সুতরাং মুসলমানগণকে অধিক প্রয়াস স্বীকার করিতে হইল না। ভূমধ্যসাগরের ইউরােপীয় বণিগবর্গের মধ্যে তৎকালে ভিনিসীয়গণই প্রাধান্যলাভ করিয়াছিলেন। তাহারা মুসলমানের সহিত একবাক্যে ভারত-বাণিজ্য রক্ষা করিবার জন্য বদ্ধ- পরিকর হইলেন। এক দল খৃষ্টান মুসলমান-দলনে অগ্রসর, অন্যদল ফিরিঙ্গি বণিক ; খৃষ্টান মুসলমান-রক্ষাৰ্থ বদ্ধপরিকর । এইরূপে ইউরােপের খৃষ্টানগণ দুই দলে বিভক্ত হইয়া পড়িলেন। উভয় দলই তখন পর্যন্ত পােপের শাসনক্ষমতা শিরােধার্য্য করি- তেন। উভয় দলের কথাই পােপের কর্ণগােচর হইল। পােপ বিচলিত হইয়া উঠিলেন। পৰ্তুগালের অধীশ্বর বিচলিত হইলেন না। পােপ সকল সমাচাঃ জানিতেন না বলিয়া বিচলিত হইলেন। পৰ্ত্ত গালের অধীশ্বর সকল সমাচার জানিতেন বলিয়াই কিছুমাত্র বিচলিত হইলেন না। তখনও ইউরােপ হইতে মুসলমানাতঙ্ক সম্পূর্ণরূপে নিরস্ত হয় নাই। আরব দেশের মরুমরীচিকায় জন্মগ্রহণ করিয়া, যে মহাশক্তি বিশ্ববিজয়ে বহির্গত হইয়াছিল, রােমক সাম্রাজ্যের অনেক প্রধান স্থান তাহার কর- তলগত হইয়া পড়িয়াছিল। খৃষ্টানগণ অকাতরে আত্মবিসর্জন করিয়াও প্যালেষ্টিন ও ইউরােপীয় তুর্কিস্থান হইতে মুসলমানকে বিতাড়িত করিতে পারেন নাই। তখন মিশর ও আফ্রিকার অন্যান্য সম্পন্ন জনপদ মুসলমানের অধিকারভুক্ত। তখন স্পেন-পর্তুগাল মুসলমানের কবল- মুক্ত হইলেও, আতঙ্কশূন্য হয় নাই। এরূপ সময়ে মিশরের মুসলমান সুলতান পােপকে তর্জন গর্জন করিয়া লিখিয়া পাঠাইলেন,-“প- গালকে শাসন না করিলে, সুলতান খৃষ্টান-জন্মস্থানের পবিত্র মন্দির ধূলিসাৎ করিবেন ; খৃষ্টানগণকে নিহত করিয়া প্রতিহিংসাবৃত্তি চরিতার্থ করিতে বাধ্য হইবে।” . ভিনিসীয় খৃষ্টানগণও পােপকে ভয় প্রদর্শন করিতে ত্রুটি করিলেন না। পােপ বিচলিত হইবামাত্র পর্তুগালের অধীশ্বর তাহাকে বিনীতভাবে বুঝাইয়া দিলেন,—“ভারত-বাণিজ্য ব্যপদেশমাত্র ; সত্য-ধৰ্ম প্রচারিত করাই প্রকৃত উদ্দেশ্য ;—তাহা সুসিদ্ধ হইবার উপক্রম হইহ্মছে।” পােপ আশ্বস্ত হইলেন। পর্তুগালের বাহুবল উচ্চুঙ্খল হইয়া উঠিল। ইউরােপ ছাড়িয়া মুসলমান-খৃষ্টানের সমরকোলাহল এসিয়ার সমুদ্রোপকূল মুখরিত করিয়া তুলিল। ;
আরা ১০৭ মুসলমান-পক্ষে আত্মরক্ষার পথ পূর্বেই রুদ্ধ হইয়া গিয়াছিল মুসলমানগণ মিশর ও মালাবার এই উভয় স্থান হইতে আক্রমণ করিয়া, ফিরিঙ্গি-বণিকে সহজে পরাভূত করিতে পারিতেন। কিন্তু উভয় স্থান হইতেই মুসলমান-শক্তি পরাভূত হইবার পর মুসলমানের আত্ম- রক্ষার আয়ােজন আরব্ধ হইল। সে আয়ােজন সৰ্ব্বথা ব্যর্থ হইয়া পড়িবে, পর্তুগাল-রাজ তাহা জানিতেন বলিয়াই কিছুমাত্র বিচলিত হইলেন না, বরং ভারতবর্ষে ফিরিঙ্গি-বণিকের বাহুবল প্রবল করিয়া তুলিবার জন্য উপায় উদ্ভাবনে ব্যাপৃত হইলেন। এসিয়া সময় থাকিতে জাগিল না; যখন জাগিয়া উঠিল, তথন চাহিয়া দেখিল,-এসিয়ার সমুদ্রপথে ফিরিঙ্গি-বণিকের বাণিজ্য-তরণী রণ-তরণীতে পরিণত হইয়াছে ;-তাহার প্রবল পীড়নে এসিয়ার জল স্থল কম্পিত হইয়া উঠিয়াছে। ;
এয়ােদশ পরিচ্ছেদ বাহুবল If the Portuguese feats of arins in India had been brilliant, the policy which directed aud supported them at Lisbon was farreaching and profound.-Sir W. ITuntr. সুলতানের নৌ-সেনাদল ফিরিঙ্গি-বণিকের দর্প চূর্ণ করিবার জন্য আয়ােজন করিতেছে,–এই সংবাদে ভারতপ্রবাসী ফিরিঙ্গি-বণিকগণ নিতান্ত আতঙ্কযুক্ত হইয়া, পৰ্তুগালে পত্র লিখিতে লাগিলেন। কোচীনের কুঠীয়ালগণ লিখিয়া পাঠাইলেন,—“অবিলম্বে পর্তুগাল হইতে রাজ-সেনা সমাগত না হইলে, সর্বনাশ হইবে।” পর্তুগাল-অধীশ্বর সৌভাগ্যশালী ইমান্যুয়েল প্রতিভাবলে ইতিহাসে আপন নাম চিরস্মরণীয় করিয়া গিয়াছেন। তিনি বুঝিলেন,অতঃপর দীর্ঘকাল বাহুবলে বাণিজ্যরক্ষা করিতে হইবে ; তাহার জন্য ভারতবর্ষে একজন সুযােগ্য রাজপ্রতিনিধি প্রেরণ করাই যুক্তিসঙ্গত। তাহার আদেশে ১৫৫ ৫ খৃষ্টাব্দের মার্চ মাসে আমডা নামক সম্ভ্রান্ত রাজপুরুষ পর্তুগালের রাজপ্রতিনিধি হইয়া ভারতযাত্ৰা করিলেন। তাহার সহিত উপযুক্ত সেনাদল প্রেরিত হইল। প্রাচ্য-গগন ক্রমশঃ মেঘমালায় আচ্ছন্ন হইতে লাগিল। জলে স্থলে বাহুবলের প্রবল প্রতাপ প্রতিষ্ঠা লাভ করিল। বাণিজ্যলক্ষ্মী অন্তর্হিত হইয়া গেল। জলদস্যুর উৎপীড়নে ভারতবাসিগণ ব্যতিব্যস্ত হইয়া M উঠিল। সকলেই বুঝিতে পারিল,-বাহুবল প্রবল বল। সুলতান বাহুবলে বাহুবল বাণিজ্যরক্ষা করিবার আশায়, আফ্রিকার পূৰ্ব্বোপকূলে সমরসজ্জা করি- লেন। পর্তুগীজ রাজপ্রতিনিধি ও তদ্দেশে আত্মশক্তি প্রবল করিবার আশায় কুইলােয়া নামক স্থানে দুর্গনির্মাণে প্রবৃত্ত হইলেন। যাহা মুসলমান ও খৃষ্টানের ধৰ্ম্মকলহরূপে এতকাল ভূমধ্যসাগরে বাহুবলের পরিচয় প্রদান করিতে ব্যস্ত ছিল, যাহা কালক্রমে মালাবার-উপকূলে আসিয়া বাণিজ্য-কলহে পরিণত হইয়াছিল, তাহা ক্রমে ক্রমে আফ্রিকার উপকূলে আসিয়া সাম্রাজ্য-কলহের আকার ধারণ করিল। আফ্রিকার পূর্বোপকূলে উপনীত হইয়া, ফিরিঙ্গি-বণিক তদ্দেশের আড়কাটিগণের সহায়তায়, ভারতবর্ষাভিমুখে পােতচালনা করিতেন। আড়কাটিগণ সুলতানের প্রজা। সুলতানের সহিত যুদ্ধ উপস্থিত হইলে, ফিরিঙ্গি-বণিকের পক্ষে মুসলমান আড়কাটির সহায়তা লাভ করা সহজ হইবে না। আমি এই কথা চিন্তা করিবামাত্র, একটি স্বতন্ত্র আড়- কাটিদল গঠন করিতে প্রবৃত্ত হইলেন। ভারতসমুদ্রে কাহার আধিপত্য প্রবল হইবে, তাহার উপরেই ফিরিঙ্গি-বণিকের জয়-পরাজয় নির্ভর করিতেছিল। আমি যে ভাবে আফ্রিকার পূর্বোপকূলে শক্তিবিস্তার করিলেন, তাহাতে সুলতানের নৌসেনাদলের পক্ষে ভারতসাগরে আধিপত্য রক্ষা করিবার সম্ভাবনা রহিল না। তথাপি তাহারা চেষ্টার ক্রটি করিল না। আমির অধীনে দ্বাবিংশ অর্ণবপােত বাহুবলে ফিরিঙ্গির বাণিজ্য- রক্ষা করিবার জন্য ভারতসাগরে সম্মিলিত হইয়াছিল। অস্ত্রশস্ত্রের অভাব ছিল না; সাহসী সেনানায়কগণের অভাব ছিল না; সুতরাং জলে-স্থলে বাহুবলের পরীক্ষা চলিতে লাগিল। সে পরীক্ষায় সুলতানের সেনাদল জয়লাভ করিতে পারিল না ; আফ্রিকার উপকূলে ফিরিঙ্গি- বণিকের আধিপত্য দিন দিন প্রবল হইতে লাগিল। চারি বৎসর ধরিয়া ফিরিঙ্গি-বণি আধিপত্য-বিস্তারের চেষ্টা করিতে গিয়া, কালিকট-রাজকে ফিরিঙ্গি বণিক বহুবার পরাভূত করিয়া, সিংহল-রাজের মিত্ৰতা লাভ করিলেন। ইহাতে ফিরিঙ্গি-বণিকের আধিপত্য আরও প্রবল হইয়া উঠিল। কালিকট-রাজ আত্মরক্ষার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করিতে ক্রটি করি- লেন না। তাঁহার ৮৪ খানি রণপােত ও ১২০ খানি ছিপ ফিরিঙ্গি- বণিকের সহিত জলযুদ্ধে লিপ্ত হইয়াছিল। যখন কালিকট-রাজ পরাভূত হইলেন, তখন তাহার নৌসেনাদলের তিন সহস্র মুসলমান নিহত হইয়া গেল,-প্রাণ থাকিতে কেহ পরাভব স্বীকার করিল না। সুলতান এই সকল পরাজয়বাৰ্তা প্রাপ্ত হইয়া, ১৫৩৮ খৃষ্টাব্দে আমীর হােসেন নামক সুদক্ষ নৌসেনাপতিকে সেনাপতি-পদে বরণ করিলেন।* আমীর হােসেন ভারতবর্ষে উপনীত হইয়া, কালিকটের সেনাদলের সহিত মিলিত হইবেন, এবং হিন্দু-মুসলমানের সমবেত বাহু- বলে দুর্ধর্ষ ফিরিঙ্গি-বণিককে সমুচিত শিক্ষাদান করিবেন, এই আশায় সুলতান যথাযযাগ্য রণসজ্জার ত্রুটি করিলেন না। আমীর হােসেন পর্তুগালের ইতিহাসে “মীর হােসেন” নামে সুপরি- চিত। তিনি বােম্বাই প্রদেশে উপনীত হইয়া, ভারতীয় নৌসেনা- দলের সহিত মিলিত হইলেন। । সমবেত নৌবাহিনী দক্ষিণ- * At length Sultan Qabsur Ghuri despatched to the Indian, coasts a general named Amir Husain with a fleet of thirteen warvessels, containing a naval force with armaments.-Riaz-us-Salateen P. 404. । এই নৌসেনাদলের বিবরণ “রিয়াজে” উল্লিখিত আছে। গুজরাট ও বাহ্মণী রাজ্যের সুলতানগণও যথাসাধ্য রণতরণী সঞ্জীভুত করিয়াছেন। First the ships from Egypt arrived in the port of Deo, and uniting with the ships of Gujrat, set out for Tabril, which was the rendezvous of the Portuguese. And some ships of the Samri and som'è ships of Goa and Dabil having also joined them, they kindled the fire of war.-Riaz-us-Salateen. p. 404.
বাহুবল ১১১ ভিমুখে অগ্রসর হইয়া, কালিকটের ছত্রভঙ্গ সেনাদলের সহিত মিলিত হইতে পারিলে, ফিরিঙ্গি-বণিকের সর্বনাশ হইত। আমীর হােসেন কালিকটের নিকটবর্তী হইবার পূর্বেই, ফিরিঙ্গির নৌবাহিনী কর্তৃক মধ্যপথে আক্রান্ত হইলেন। আমির দ্বাবিংশবর্ষ-বয়স্ক যুবা পুত্র লােরেঞ্জো এই জলযুদ্ধে ফিরিঙ্গি-বণিকের আধিপত্য-রক্ষাৰ্থ প্ৰাণবিসর্জন করিলেন। যুদ্ধের প্রথম উপক্রমেই গােলার আঘাতে তাহার পদদ্বয় ভগ্ন হইয়া গেল। তিনি আহতকলেবরে মাস্তুলের নিকটে বসিয়া সেনাচালনা করিতে করিতে প্রাণত্যাগ করিলেন। হিন্দু-মুসলমানের নৌবাহিনী জয়লাভ করিয়াও, এই অসাধারণ আত্মত্যাগ দর্শনে শত্রুপক্ষের জয়ধ্বনি করিয়া উঠিল ; সমুচিত সমাদরে বীরপুরুষের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করিয়া, বীরপুত্রের অলৌকিক বীরত্বের জন্য আলমিডাকে অভিনন্দন করিতে লাগিল। এই যুদ্ধে জয়লাভ করিয়াও, হিন্দু-মুসলমান স্থায়ী ফললাভ করিতে পারিল না। পর বৎসরে তাহারা অাবার পরাভূত হইয়া গেল। এই যুদ্ধ ডিউ নগরের সম্মুখে সংঘটিত হইয়াছিল। ইহা ভারতযুদ্ধের মধ্যে চির- স্মরণীয় হইয়া রহিয়াছে। এই যুদ্ধে সমগ্র এসিয়াখণ্ডের ভাগ্যবিপৰ্যর সম্পন্ন হইয়া গেল; এই যুদ্ধে সমস্ত ইউরােপের অভ্যুদয়লাভের পথ প্রশস্ত হইয়া পড়িল ; এই যুদ্ধে এসিয়া আঁধার, ইউরােপ সৌভাগ্যের আলােকে উজ্জ্বল হইয়া উঠিল। ১৫০৯ খৃষ্টাব্দের ২রা ফেব্রুয়ারী তারিখে এই মহাযুদ্ধ সংঘটিত হয়। পর্তুগাল-রাজ ভারতসাগরে ফিরিঙ্গি-বণিকের আধিপত্য চিরসংস্থাপিত করিবার আশায় নৌসেনাবল বর্ধিত করিয়াছিলেন। সর্বাপেক্ষা সুবৃহৎ অর্ণবপােত সকল ভারতসাগরেই প্রেরিত হইয়াছিল ; সৰ্ব্বাপেক্ষা সুদক্ষ পােতাধ্যক্ষগণ তাহার পরিচালন-কার্যে নিযুক্ত হইয়াছিল ; সৰ্ব্বা- পেক্ষা সাহসী নৌসেনাদল তাহাতে আরােহণ করিয়া, ভারতবর্ষে উপ- । ১১২ ফিরিঙ্গি-বণিক নীত হইয়াছিল। পুত্রশােকার্ত আমি প্রতিহিংসা চরিতার্থ করিবার উপযুক্ত অবসরকালের প্রতীক্ষায় দিনগণনায় ব্যাপৃত ছিলেন। সিংহল হইতে কালিকট পর্যন্ত সকল স্থানে তাহার আধিপত্য প্রবল হইয়াছিল। ভারতীয় নৌবাহিনী উত্তরাংশে বােম্বাই বন্দরের নিকটবর্তী সাগর- সলিলে বিচরণ করিয়া, কালিকটের উদ্ধারসাধনের অপেক্ষা করিতে বাধ্য হইয়াছিল। তাহাদের আয়ােজন সম্পূর্ণ হইবার পূর্বেই ফিরিঙ্গি-বণিকের আয়ােজন সম্পূর্ণ হইয়া গেল। আমি স্বয়ং সেনাচালনার ভার গ্রহণ করিয়া যুদ্ধার্থ অগ্রসর হইলেন। এই যুদ্ধে তিন সহস্র মুসলমান প্রাণবিসর্জন করে । এই যুদ্ধে মুসলমান-বাণিজ্য চিরদিনের মত পরাভূত হইয়া যায়; এই যুদ্ধেই ভারতসাগরে ফিরিঙ্গি-বণিকের আধিপত্য চির- প্রতিষ্ঠিত হয় এবং রাজ্য-প্রতিষ্ঠারও সূত্রপাত হয়। পৃথিবীর ইতিহাসে যে সকল জলযুদ্ধের বিবরণ লিপিবদ্ধ হইয়া রহি- য়াছে, তাহার অনেক যুদ্ধের তুলনায় এই যুদ্ধ সামান্য যুদ্ধ বলিয়াই পরিগণিত হইতে পারে। কিন্তু পরিণামফলের কথা আলােচিত হইলে, ইহাকেই পৃথিবীর ইতিহাসের সৰ্ব্বাপেক্ষা স্মরণীয় জলযুদ্ধ বলিয়া স্বীকার করিতে হইবে। ইহাতে পৃথিবীর ইতিহাস সম্পূর্ণরূপে পরিবর্তিত হইয়া গিয়াছে ; ইহাতে প্রাচ্যের প্রতিষ্ঠা প্রতীচ্য-সমাজকে আশ্রয় করিয়া দুৰ্বলকে সবল ও সবলকে দুর্বল করিয়া দিয়াছে ; যাহারা সমগ্র সত্য- সমাজে পণ্য-বিক্রয় করিয়া ধনগৌরবে প্রবল হইয়া উঠিয়াছিল, তাহা- দিগকে দীনহীন কাঙ্গাল সাজাইয়া ভিক্ষাপাত্ৰকরে ইউরােপের দ্বারস্থ করিয়া দিয়াছে। এই সময়ে সমগ্র ইউরোপে পর্তুগালের অসাধারণ সৌভাগ্যবৃদ্ধির জন্য ঈৰ্য্যান্বেষ জন্মগ্রহণ করে নাই ; বরং পৰ্তুগালের বিজয়বার্তা সমগ্র খৃষ্টানসমাজের বিজয়বাৰ্তা বলিয়াই সর্বত্র গৃহীত ও সমাদৃত হইয়াছিল। এসিয়ার অবস্থা সেরূপ ছিল না ! এসিয়াবাসিগণ ইহাকে কালিকটের বাহুবল হিন্দু-মুসলমানের পরাজয় ভিন্ন সমগ্র এসিয়ার পরাজয বলিয়া হৃদয়ঙ্গম করিতে পারে নাই। মুসলমান-সমাজের অবস্থাও শােচনীয় হইয়া উঠিয়াছিল। এই যুদ্ধে মুসলমান-প্রতাপ যে এসিয়া হইতে চিরদিনের মত অন্তর্হিত হইবার উপক্রম হল, মুসলমানগণ তাহা ভাল করিয়া অনুধাবন করিবার অবসর প্রাপ্ত হইলেন না। তৎকালে মিশর ও ইউরােপীয়-তুর্কিস্থানে দুই জন স্বতন্ত্র মুসলমান সুলতান বর্তমান ছিলেন। ধৰ্ম্মে এক হইয়াও, এই দুই সুলতান দুই সহচরের ন্যায় উভ- য়ের সাধারণ শত্রুর পরাজয়সাধনের চেষ্টা করিতে প্রবৃত্ত হইলেন না; এক সুলতান অপর সুলতানের রাজ্য জয় করিবার জন্য অশান্ত হইয়া উঠিলেন। এক ভ্রাতা অপর ভ্রাতার রাজ্যাথহরণের জন্য বাহু প্রসারিত করায়, মুসলমানের পক্ষে এই পরাজয় চিরপরাজয়ে পরিণত হইয়া ফিরিঙ্গি-বণিকের সমরবিজয়কে চিরবিজযে পরিণত করিয়া দিল। * তুরস্কের সুলতান মিশরের সুলতানকে ব্যতিব্যস্ত করিয়া, কালক্রমে মিশর-বিজয় সম্পন্ন করিয়াছিলেন। স্বজাতিকলহে আত্মরক্ষাৰ্থ ব্যতি- ব্যস্ত হইয়া, মিশরের সুলতান আর ভারতবাণিজ্যে মুসলমানের আধি- পত্য-রক্ষার আয়ােজন করিতে পারিলেন না ! যে পর্তুগীজবীর এইরূপে প্রাচ্যসাগরে প্রতীচ্য-শক্তি দৃঢ়-প্রতিষ্ঠিত করিলেন, তাহার কথায় কর্ণপাত করিলে, প্রাচ্য-সাগরে পর্তুগালের আধিপত্য চিরপ্রতিষ্ঠিত হইত! আমিডা ভারতসাগরে স্বদেশের একাধিপত্য সংস্থাপিত করিবার আশায়, দ্বীপে দ্বীপে দুর্গনিৰ্মাণ করিয়া, নৌবাহিনীর উন্নতিসাধনের জন্য ব্যস্ত হইয়াছিলেন; স্থলভাগে দুর্গনিৰ্মাণ * In as much as at that period, Sultan Salim Khaqan of Rum ( Turkey ) defeated the Ghoriah Sultan of Egypt, and the empire of the latter came to an end, the Samri, who was the promoter of this war, lost heart, and the Portuguese acquired completo domination.-Riaz-us-Salateen p. 404.
১১৪ ফিরিঙ্গি বণিক ; করিয়া পণ্যরক্ষা বা রাজ্য-সংস্থাপনের জন্য লালায়িত হন নাই। পর্তু- গালরাজ স্থলদুর্গের উন্নতিসাধন করিয়া, রাজ্যসংস্থাপনের জন্যই ব্যস্ত হইয়া উঠিয়াছিলেন। ইম্যান্যুয়েল প্রভু; আলমিড। রাজপুরুষমাত্র। তাহাকে রাজার আদেশ শিরােধার্য্য করিতে হইল। কিন্তু ইতিহাস এখন মুক্তকণ্ঠে রাজা অপেক্ষা রাজপুরুষেরই প্রশংসাবাদ করিয়া আসি- তেছে! ইমান্যুয়েল দূরে বসিয়া ভারতবর্ষেরই প্রকৃত অবস্থা হৃদয়ঙ্গম করিতে না পারিয়াই, রাজপ্রতিনিধির সমীচীন সৎপরামর্শে উপেক্ষা , প্রদর্শন করিলেন। আলমিড়া সহজে সম্মত হইলেন না। তিনি পুনঃপুনঃ প্রতিবাদ করিয়া লিখিয়া পাঠাইলেন,-“স্থলদুর্গের সংখ্যা বৃদ্ধি করিয়া রাজ্যসংস্থা- পনের চেষ্টায় প্রবৃত্ত হইলে, প্রত্যেক দুর্গের সেনা-সংখ্যা অল্প হইয়া পড়িবে ; তাহারা সহজে পরাভূত হইয়া, ফিরিঙ্গি-বণিকের সৰ্ব্বনাশ- সাধন করিবে ; তাহার পরিবর্তে জলদুর্গের উপর নির্ভর করিলে, ভারত-সাগরে ফিরিঙ্গি-বণিকের প্রবল প্রতাপ চিরপ্রতিষ্ঠিত হইয়া, ভারত বাণিজ্যে তাহাদের একাধিপত্য সংস্থাপিত করিয়া দিবে।” ভৃত্য প্রভুকে যতদূর সতর্ক করিতে পারে, আমি তাহার ত্রুটি করিলেন । তিনি লিখিয়া পাঠাইলেন,—“ভারতবর্ষ হইতে মুসলমান বণিকে চিরনিৰ্বাসিত করিবার প্রকৃত পথ আবিষ্কৃত হইয়াছে ; সেই পথে অগ্রসর হইলে, ঈশ্বরেচ্ছায় অচিরেই উদ্দেশ্য সফল হইতে পারিবে।” ইমানুয়েল এই সকল প্রতিবাদে ধৈর্য্যচ্যুত হইয়া মনে করিলেন, আমি যাহা ভাল বুঝিবেন,তাহাই করিবেন; তিনি হয় ত রাজাদেশ গ্রাহ করিবেন না! সুতরাং ইমানুয়েল তাহাকে পদচ্যুত করিয়া, তাঁহার স্থল অধিকার করিবার জন্য আলবুকার্ককে রাজপ্রতিনিধি নিযুক্ত করিয়া ভারতবর্ষে প্রেরণ করিলেন। ভারতবর্ষ সম্বন্ধে আলবুকার্কের অভিজ্ঞতার অভাব ছিল না। তিনি বাহুবল D ভারতবর্যে আসিয়া অতি অল্প সময়ে যেরূপ প্রতিষ্ঠালাভ করিয়া স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করিয়াছিলেন, তাহাতে রাজসদনে তাহার আধিপত্য প্রবল হইয়া উঠিয়াছিল। আলবুকার্ক সম্মুখের লাভের লােভে অন্ধ হইয়া, আমির ন্যায় ভবিষ্যতের দিকে দৃষ্টিপাত করিতে পারেন নাই। তিনি বুঝিয়াছিলেন, রাজ্যবিস্তার না করিলে, ফিরিঙ্গি-বণিকের বাণিজ্য বিস্তারের অন্য পথ নাই। তিনি যাহা বুঝিয়াছিলেন, রাজাকেও তাহাই বুঝাইয়া দিয়াছিলেন। কিন্তু আমি তাহাকে মূৰ্থ, বাতুল, রাজপ্রতিনিধির উচ্চপদে নিযুক্ত হইবার সম্পূর্ণ অননুপযুক্ত বলিয়া প্রকাশ্যভাবে ব্যক্ত করিতে লাগিলেন।# আলবুকার্ক নৌবাহিনী সমভিব্যাহারে আফ্রিকার পূৰ্ব্বোপকূলে উপনীত হইয়া, সােকাট্রা নামক বিখ্যাত বন্দর আক্রমণ করিলেন। এই বন্দর লােহিতসাগরের প্রবেশদ্বার রক্ষা করিয়া, মিসরের সহিত ভারতবর্ষের জলবাণিজ্যের প্রধান সহায় বলিয়া সুপরিচিত ছিল। এখানে বাণিজ্যোপলক্ষে বহু দেশের লােকের বসতি ছিল। এই বন্দর অধিকার করিবামাত্র অবুকার্ক মুসলমানগণকে নির্বাসিত করিয়া, তাঁহাদের তালবনে খৃষ্টানদিগের অধিকার সংস্থাপিত করিয়া দিলেন। সােকোট্রা অধিকার করিবার পর, আলবুকার্ক আরবদেশের উপকূলভাগ আক্রমণ করিলেন ; মঙ্কট নগরের উপর গােলাবর্ষণ করিয়া, পারস্যোপ- সাগরেও ফিরিঙ্গি-বণিকের প্রাধান্য-সংস্থাপক সন্ধি স্থাপিত করিতে কৃতকাৰ্য্য হইলেন। তিনি ১৫৩৮ খৃষ্টাব্দের শেষে ক্যানানােরে উপনীত হইয়া, আলমিডাকে নিয়ােগপত্র দেখাইলেন। আমি তখন পুত্র- He constantly referred to Albuquerque as a "fool" and a “mad man" and there can be little doubt but that he actually did bring his mind to consider him in fit to adininister the affairs of the Indian trade : -Danver's Portuguese in India Vol. I. p. 147.
১১৬ ফিরিঙ্গি বণিক শশাকের প্রতিশােধ-কামনার যুদ্ধের আয়ােজন করিতে ব্যাপৃত ছিলেন। সুতরাং ভিউ নগরের নিকটবর্ত্তী মহাযুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমি পদত্যাগ করিলেন না ; অগত্যা আলবুকার্ক যুদ্ধাবসানের প্রতীক্ষা করিয়া রহিলেন। জলযুদ্ধে বিজয়লাভ করিয়া আমি। যখন সগৌরবে মালাবারে প্রত্যাবৃত্ত হইলেন, তখন তিনি পদত্যাগ করিতে সম্মত হইলেন না। আবুকার্ক তাহার জন্য পুনঃপুনঃ তর্জন গর্জন করায়, আমি তাহাকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করিয়া কারারুদ্ধ করিলেন; এবং সেই ভাবেই তাহাকে পর্তুগালে প্রেরণ করিবেন বলিয়া ভয় প্রদর্শন করিতে লাগিলেন। ফিরিঙ্গি-বণিকের এই আকস্মিক গৃহকলহ ক্ষুদ্র কোচিন রাজ্যের রাজা প্রজার মনে আতঙ্কসঞ্চার করিল। কিন্তু অল্পদিনের মধ্যেই পৰ্ত্ত গাল হইতে আলবুকার্কের ভ্রাতুস্পুত্র মার্শাল ডমফানাল কুটি হো রাজাদেশে নৌবাহিনীর অধিপতিরূপে ভারতসাগরে উপনীত হইবামাত্র আমিডার চক্রান্তজাল ছিন্ন হইয়া গেল। আলবুকার্ক রাজ-প্রতিনিধির কাৰ্যভার প্রাপ্ত হইলেন, আমি স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করিতে বাধ্য হইলেন। উত্তমাশা অন্তরীপ অতিক্রম করিয়া, আফ্রিকার দক্ষিণতটে খাদ্য ও পানীয় সংগ্রহের আয়ােজন করিতে গিয়া, স্বদেশের বর্বর অধিবাসিগণের সহিত আলমির ভৃত্যবর্গ বিবাদ বাধাইয়া দিল। আলমিডা তীরে অবতীর্ণ হইয়া ভৃত্যবর্গের পৃষ্ঠরক্ষার চেষ্টা করিতে গিয়া, কণ্ঠে তীরবিদ্ধ হইয়া, সৈকতশয্যায় প্রত্যাগ করিলেন। আমির তিরােভাবের সহিত ফিরিঙ্গি-বণিকের ভারত-বাণিজ্য নীতির প্রথম লক্ষ্য তিরােহিত হইয়া গেল। সে লক্ষ্যের সহিত যে লােভ আত্মপ্রকাশ করিয়াছিল, তাহা বাণিজ্য-লােভ,—প্রাচ্য-বাণিজ্যে একাধিপত্য বিস্তারের অর্থ-লােভ। তাহা ভারতসাগরতীরে সাম্রাজ্য- বাহুবল সংস্থাপনের দুরাকাঙ্ক্ষাকে প্রশ্রয়দান করিত না, বরং সেখানে যেরূপ শাসনপ্রণালী বৰ্তমান ছিল, দেশীয় নৃপতিবৃন্দের অধীনে তাহা সংস্থাপিত করিয়া, তাহাদের সাহায্যে বাণিজ্যপথ হইতে প্রতিদ্বন্দ্বী অপসারিত করিবার জন্যই প্রয়াস স্বীকার করিত। পর্তুগালের নৌবল প্রবল হইয়া সে লক্ষ্যসাধনকে ক্রমে সহজ করিয়া তুলিতেছিল। আলবু- কার্কের আগমনে ইতিহাসের একটি নুতন অধ্যায় উদ্ঘাটিত হইল। ফেরেস্তার গ্রন্থে, আকবর-ই-মহব্বৎ নামক গ্রন্থে, তুহকাতুল-মুজাহিঙ্গল নামক গ্রন্থে ও রিয়াজ-উস-সলাতিন গ্রন্থে ফিরিঙ্গি-বণিকের ভারত-বাণিজ্যের বিবরণ লিপিবদ্ধ আছে। তাই সংক্ষিপ্ত হইলেও, তাহাতে ঘটনাগুলি সরলভাবেই উল্লিখিত হইয়াছে।
চতুর্দশ পরিচ্ছেদ রাজ্যলাভ Albuquerque entered at once on those vast schemes of conquest which have made him one of the heroes of Portugal.-Purtuguese Congrests in India. ১৪৫৩ খৃষ্টাব্দে আকার্কের জন্ম হয়। তখনও পর্তুগাল পর- পদানত নগণ্য দেশ। তাহার পর যে সকল ঘটনাস্থত্রে পর্তুগাল ধীরে ধীরে প্রাধান্য লাভ করিতেছিল, তাহা সমস্তই আবুকার্কের সময়ে সংঘটিত হইয়াছিল। তিনি যৌবনে পদার্পণ করিয়া যে স্বদেশপ্রেমে মত্ত হইয়া উঠিয়াছিলেন, পরিণত জীবনে তাহার মাত্রা ক্রমেই বিবর্জিত হইয়াছিল। ভারতবর্ষে আসিয়া রাজপ্রতিনিধির উচ্চপদ অধিকার করিবার সময়ে তাহার বয়ঃক্রম প্রায় ষাট বৎসর হইয়াছিল ; তথাপি তিনি উৎসাহে ও অধ্যবসায়ে দৃঢ়নিশ্চয় যুবকগণকে লজ্জা দিতে পারিতেন। তিনি বাণিজ্য অপেক্ষা রাজ্যলাভকেই প্রধান লক্ষ্য করিয়াছিলেন। স্বহস্তে কাৰ্যভার গ্রহণ করিবামাত্র আলবুকার্ক লক্ষ্যসাধনের জন্য ব্যাকুল হইয়া উঠিলেন। মালাবারের বিবিধ বন্দরে ফিরিঙ্গি-বণিকের বাণিজ্যালয় সংস্থাপিত হইয়াছিল। ভারতসাগরে ফিরিঙ্গি-বণিকের লুণ্ঠন-প্রতাপে অন্যান্য বণিকের বাণিজ্য-তরণী একরূপ অপরিচিত হইয়া উঠিয়াছিল ;-তথাপি কালিকাটর বন্দর যেন ফিরিঙ্গি-বণিকের চিরশত্রুরূপে বৰ্ত্তমান থাকিয়া আতঙ্ক-সঞ্চার করিতে বিরত হন নাই। কেবল কালিকট-রাজের ভয়েই ফিরিঙ্গি-বণিক এত দুর আতঙ্কযুক্ত হইত না। সমগ্র মুসলমান- সমাজ কালিকট-রাজের পক্ষভুক্ত হইতে পারেন, এই আতঙ্কই • রাজ্যলাভ ফিরিঙ্গি-বণিকে নিরতিশয় বিব্রত করিয়া তুলিয়াছিল। ঐ আসিতেছে, -ঐ আসিল, সৰ্ব্বদা এইরূপ উৎকণ্ঠায় ফিরিঙ্গি-বণিক ব্যতিব্যস্ত হইয়া উঠিতেন। * আলবুকার্ক ইহার মূলােচ্ছেদ করিবার জন্য কৃত- হইলেন। এই ফিরিঙ্গি-বীরের মুসলমান-বিদ্বেষ চিরস্মরণীয় হইয়া রহিয়াছে। তনি ইতিহাসে তাহার যে সকল প্রমাণ রাখিয়া গিয়াছেন, তাহা অল্প নহে। . কিন্তু তাহার চরিতখ্যায় যে সকল গুপ্ত সংকল্পের উল্লেখ করিয়া গিয়াছেন, তাহা আরও ভয়ঙ্কর! মিশরের মুসলমান সুলতানকে শিক্ষাদান করিবার জন্য, আবুকার্ক খাল কাটিয়া নীল নদকে লােহিত সাগরে টানিয়া আনিবার সংকল্প করিয়াছিলেন। ইহাতে সমগ্র মিশর দেশ মরুভূমিতে পরিণত হইত। সমগ্র মুসলমানসমাজকে শিক্ষাদান করিবার জন্য মুসলমান-ধৰ্ম্ম প্রবর্তক মহম্মদের পবিত্র অস্থি সৰ্বসমক্ষে ভস্মসাৎ করিবার সংকল্প হইয়াছিল। বলা বাহুল্য, ইহার কোনও সংকল্পই কাৰ্য্যে পরিণত হয় নাই। কিন্তু ইহা হইতেই আলবুকার্কের মুসলমান-বিদ্বেষের মাত্রা কতদূর চড়িয়া উঠিয়াছিল, তাহার উৎকৃষ্ট পরিচয় প্রাপ্ত হওয়া যায়। + আবুকার্কের এই মুসলমান-বিদ্বেষ সেকালের সকল ফিরিঙ্গির। The cry "the Rumes are coming" menaced me at every step.--Albuquerque's letter to the King, April, 1512. + "There are two actions suggested by the magnanimity of his heart which he determined to perform. One was to divert the channel of the Nile to the Red Sea and prevent it from running througlı Egypt, thereby to render the lands of the Grand Turk sterile ; the other to carry away from Meca the bones of the abominable Mafoma (Mahammad ) (Mahammad) that they being reduced publicly to ashes, the votaries of so foul a sect might be confound. ed - Machado, ফিরিঙ্গি-বণিক সাধারণ-বিদ্বেষরূপে প্রচলিত থাকায়, চরিতাখ্যায়কগণ ইহার উল্লেখ করিতে কিছুমাত্র লজ্জাবােধ করেন নাই। তাহারা বরং ইহাকে দৃঢ়- চরিত্র বীরপুরুষােচিত চিত্তবল বলিয়া বৰ্ণনা করিয়া গিয়াছেন। আলবুকার্কের হিন্দু-বিদ্বেষেরও অভাব ছিল না। হিন্দু-মুসলমান একত্র মিলিত হইয়া কালিকট-রাজের সহায়তা করিত ; কালিকটের বন্দর তাহাদের প্রধান সম্মিলনক্ষেত্র হইয়া উঠিয়াছিল। সুতরাং কালিকট-ধ্বংস করাই প্রথম ও প্রধান কর্তব্য বলিয়া প্রতিভাত হইয়া- ছিল। জল-যুদ্ধে হিন্দুমুসলমানের সম্মিলিত শক্তি পরাভূত হইয়াছিল কিন্তু স্থলবত্মে হিন্দু-মুসলমানের সমবেত শক্তি অক্ষুন্নপ্রতাপে বর্তমান ছিল। আলবুকার্ক সেই শক্তি চুর্ণ করিবার আশায় রাজ্যলাভার্থ ব্যাকুল হইয়া উঠিলেন। ১৫১০ খৃষ্টাব্দের প্রারম্ভে কালিকট আক্রান্ত হইল! ফিরিঙ্গি- বণি নগরদাহ করিয়া রাজপথ অধিকার করিলেন। * তখন হিন্দু- মুসলমানগণ রাজপ্রাসাদে সমবেত হইয়া, প্রবলপ্রতাপে ফিরঙ্গিগণকে আক্রমণ করিলেন। পাঁচশত ফিরিঙ্গি প্রাণত্যাগ করিতে বাধ্য হইলেন; যাহার কোনরূপে রক্ষা পাইলেন, তাঁহারা সে বীর প্রতাপ সহ্য করতে না পারিয়া, অর্ণবপােতে পলায়ন করিয়া আত্মরক্ষা করিতে বাধ্য হইলেন। + তাহার কোলাম বন্দরের অধিপতির আশ্রয়লাভ করিয়া তথায় একটি ক্ষুদ্র দুর্গ নির্মাণ করিলেন; এবং তন্মধ্যে বসতি করিয়া আপাততঃ আত্মরক্ষা করিতে প্রবৃত্ত হইলেন। প্রথম পরাজয়ের * In the month of Ramzan 915 A. H. the Portuguese proceeded to Kalikot, set fire to the Cathedral Mosquc, and swept the town with the broon of plunder. Riaz-us-Salatcen p. 404. + The Malabarees collecting together attacked the Christians, killed five hundred leading Portuguese and drowned many of them in the sea. Those who escaped the sword, fled to the port of Kolam, and intriguing with the Chief of that place, erected a small fort and entrenched themselves there.-Riaz-us-Salatcen. p. 405.
রাজ্যলাত অবসাদে আলবুকার্ক আপাততঃ কালিকট পরিত্যাগ করিয়া, অন্য কোনও স্থানে রাজধানী সংস্থাপিত করিবার জন্য স্থানান্বেষণে নিযুক্ত হইলেন। স্থান মিলিল। একজন ভারতীয় জলদস্যু স্থান দেখাইয়া দিল। তাহা একটি ক্ষুদ্র দ্বীপ। সেই দ্বীপে দুর্গ নির্মাণ করিয়া, আদিল শাহ নামক নরপতি রাজত্ব করিতেন। আলবুকার্ক ১৫১০ খৃষ্টাব্দের প্রারম্ভে এই ক্ষুদ্র দ্বীপ আক্রমণ করিলেন। হিন্দু, মুসলমান ও পারসীক নাগরিক- গণ সে আক্ৰমণ-বেগ সহ করিতে না পারিয়া আত্মসমর্পণ করায়, আবুকার্ক সিংহাসন অধিকার করিয়া রাজত্ব করিতে প্রবৃত্ত হইলেন। আদিল শাহ মে মাসে পুনরায় নগর অধিকার করায়, যুদ্ধ উপস্থিত হইল। ছয় মাসের যুদ্ধে নগর ও দুর্গপ্রাচীর চূর্ণ হইয়া গেল ; তখন অনন্যোপায় হইয়া ফিরিঙ্গি-বণিক সমুচিত মূল্য প্রদান করিয়া নগর অধিকার করিলেন। সেই সময় হইতে আজ পর্যন্ত তাহা পর্তুগীজ- রাজধানী গােয়ানগরী নামে সুপরিচিত হইয়া রহিয়াছে। * ফিরিঙ্গি-বণিকের ভারত-বাণিজ্যের রাজধানী শীঘ্রই সুদৃঢ় দুর্গে বেষ্টিত হইয়া ধনরত্নে সম্পন্ন হইয়া উঠিতে লাগিল। এই রাজধানীতে রাজকাৰ্যালয় সংস্থাপিত করিয়া, রাজপ্রতিনিধি আবুকার্ক রাজ্যশাসনে ও বাণিজ্য বিস্তারে প্রবৃত্ত হইলেন। লােহিতসাগর ও পারস্যোপসাগর মুসলমান-বাণিজ্যের আশ্রয়স্থল। এই উভয় সাগর-পথের প্রবেশদ্বারে মুসলমানগণ দুর্গনিৰ্মাণ করিয়া বাণিজ্য-রক্ষা করিতেন। সে বাণিজ্য কেবল ভারত-বাণিজ্য নহে, * রিয়াজে মূল্য দান করিবার কথাই লিখিত আছে। খৃষ্টান লেখকদিগের গ্রন্থে তাহার উল্লেখ নাই। But after a short period, the Portuguese offering a farge sum of money to the ruler of that place, re-acquired possession of it, and establishing their capital at that port, which was very strong, fortified it further.-Riaz-us-Salteen. p. 405.
১২৪ ফিরিঙ্গি-বণি যে সংঘর্ষে প্রাচ্য-প্রতীচ্যের পুরাতন সম্বন্ধ এইরূপে পরিবর্তিত হইয়া গিয়াছে, তাহাতে সমগ্র ইউরােপ সম্মিলিত শক্তিতে লিপ্ত হইলেও বিস্ময়ের অভাব থাকিত না। পর্তুগালের ন্যায় ক্ষুদ্র রাজ্যের চেষ্টায় তাহা অতি অল্পকালে সুসিদ্ধ হইয়াছিল বলিয়া, বিস্ময় আরও অধিক হইয়া রহিয়ছে। তথাপি ভারত-বাণিজ্যের পুরাতত্ত্বের আলােচনায় প্রবৃত্ত হইলে, বিস্ময় দূরীভূত হইয়া যায়। যাহারা সত্যনিষ্ঠাকেই বাণিজ্যের একমাত্র সহায় বলিয়া জানিত, যাহারা বাহুবলের কথা বিস্মৃত হইয়া কৰ্ম্মবলকেই বাণিজ্য-ব্যাপারের প্রধান বল বলিয়া বুঝিত, বাহারা দস্যুবৃত্তিকে সৰ্বান্তঃকরণে ঘৃণা করিত, তাহারা কিরিঙ্গি-বণিকের মত অশান্ত প্রতি- দ্বন্দ্বীর সমকক্ষ ছিল না। * প্রাচ্য-শক্তি বিচ্ছিন্নভাবে বিবিধ স্থানে সীমাবদ্ধ ছিল ; প্রতীচ্য-শক্তি একত্র সংহত হইয়া আঘাত করিবামাত্র বিচ্ছিন্ন প্রাচ্য-শক্তি একেবারে ছত্রভঙ্গ হইয়া গেল। ফিরিঙ্গি-বণিকের বাণিজ্য-কলহের সহিত ধৰ্ম্ম-কলহ মিশ্রিত হইয়া গিয়াছিল। মুসলমান-বিদ্বেষ ও খৃষ্টধর্মানুরাগ উত্তরােত্তর প্রবল হইয়া ফিরিঙ্গি-বণিকের আত্মত্যাগকে তাহাদের নিকট মহনীয় করিয়া তুলিয়াছিল। ফিরিঙ্গিগণ হাসিতে হাসিতে জীবন-বিসৰ্জন করিতে পারিত। কারণ, তাহাদের যুদ্ধ ধৰ্ম্মযুদ্ধ,-ধৰ্ম্মবিস্তারের প্রধান উপায়। Whilst some ships of Emperor Jalaluddin Mahammad Akbar which without a pass from the Portuguese had proceeded to Makkah, were returning from the port of Jiddah, they looted them, and inflicted various molestations and humiliations on the Mussulmans, and set fire to the ports of Adilabad and Farabin which belonged to Adil Shah, and ravaged them completely, Riaz-us-Salatcen, p. 408. + From the time of Albuquerque the inexorable issue between Catholicism and Islam in Asia stands forth, each side firmly beliored itself fighting the battles of its God.--Sir. W. W. Hunter.
রাজ্যলাভ ১২৫ ফিরিঙ্গি-বণিক হাসিতে হাসিতে অসহায় স্ত্রীপুরুষ ও বালকবালিকার প্রাণবধ করিতে পারিত; কারণ, তাহাদের নরহত্যা কেবল বিধৰ্ম্মি- হত্যা! একালের ইতিহাসলেখকগণ যে সকল কাহিনী লিপিবদ্ধ করিতে শিহরিয়া উঠিতেছেন, সেকালের ইতিহাসলেখকগণ তাহার কীৰ্ত্তন করিবার সময়ে গৌরবরােধ করিতেন। সে যুগ ইউরােপের মধ্যযুগ। তখনও বর্বরতা নিৰ্বাসিত হয় নাই ; তখনও বাহুবল সুসংযত হয় নাই ; তখনও সমগ্র মানবসমাজকে সমুন্নত করিবার উচ্চাকাঙ্ক্ষা ইউরােপকে নবজীবন দান করে নাই ! তখন হত্যাই ধৰ্মলাভের প্রধান সােপান বলিয়া পরিচিত ছিল। * তরবারিহস্তে ধর্মপ্রচার প্রাচ্যশিক্ষার পক্ষে সম্পূর্ণ অপরিচিত। প্রাচ্য যখন ধৰ্ম্ম প্রচারে প্রথমবার পদবিন্যাস করে, তখন সন্ন্যাসীর সৌম্যমূর্তি গ্রহণ করিয়া ভিক্ষাপাত্র লইয়া দ্বারে দ্বারে পরিভ্রমণ করিয়াছিল। তাহাই প্রাচ্যরাজ্যের ধর্মপ্রচারের আদর্শ। সেই পুরাতন আদর্শের অনুকরণ করিয়াই খৃষ্ট ও খৃষ্টশিষ্যগণ ধৰ্ম্মপ্রচারে বহির্গত হইয়াছিলেন। কিন্তু খৃষ্টধর্ম এসিয়া ছাড়িয়া ইউরােপে উপনীত হইবার পর, তাহার মূল- প্রকৃতি এতদূর পরিবর্তিত হইয়া গিয়াছিল যে, বাহুবলই প্রবল বল বলিয়া প্রসিদ্ধি লাভ করিয়াছিল। তার সম্মুখে জ্ঞান ও ধৰ্ম্ম ভাল করিয়া আত্মপ্রকাশ করিতে পারে নাই। আবুকার্ক এই বাহুবলের ধর্মে দীক্ষিত হইয়াই প্রাচ্যসাগরে উপনীত হইয়াছিলেন। এই অংশের পাণ্ডুলিপি পাঠ করিয়া, কোনও প্রধান লেখক ইহার পার্শ্বে লিখিয়া দিয়াছেন-“এখন বােধ হয় হইয়াছে ?” ইহার উত্তর দিতে হইলে, সত্যনিষ্ঠ ইতিহাস-লেখককে (আধুনিক অনেক ঘটনা বিস্মৃত না হইলে) অবনতমস্তকে স্বীকার করিতে হয়,–এখনও হয় নাই। এখনও ইউরোপ সর্বপ্রকার বর্বরতা অতিক্রম করিয়া প্রকৃত সভ্যতা লাভ করিতে সমর্থ হয় নাই। এখনও তাহার ইতিহাসে মধ্য- যুগের শোণিত-পিপাসাই জনসমাজকে অশান্ত করিয়া রাখিয়াছে। বিগত জগন্ধ্যাপী মহাযুদ্ধে এই ঐতিহাসিক তথ্য এত সুস্পষ্ট হইয়া উঠিয়াছে যে ইউরােপীয় সভ্যতার উন্নত মস্তক অবনত হইয়া পড়িয়াছে।
১২৬ ফিরিঙ্গি বণিক বাহুবলের ইতিহাস কলঙ্কের ইতিহাস। সে কথা বিস্মৃত হইয়া ফিরিঙ্গি-ইতিহাসলেখকগণ ফিরিঙ্গি-বণিকের অলৌকিক দিগ্বিজয়ের বর্ণনা করতে গিয়া, পুনঃপুনঃ বাহুবলেরই গৌরবঘােষণা করিয়া গিয়া- ছেন। ইস্লাম পরাভূত হইবামাত্র খৃষ্টানের ন্যায় বাহুবমের উপাসক হইয়া উঠিল। তাহারাও ধৰ্ম্মযুদ্ধে জীবনবিসৰ্জন করিবার জন্য লালা- য়িত হইল। * তখন ভারতসাগরে কেবল সমরকোলাহলই প্রবল হইয়া উঠিল। ঐ আসিতেছে !ঐ আসিল !–এই কণই উভয় পক্ষের প্রধান কথা হইয়া দাড়াইল। বাণিজ্যের বিজয়লক্ষ্মী অন্তর্হিত হইবামাত্র, জলে-স্থলে দস্যুবৃত্তি প্রবল হইতে লাগিল। ভারতবর্ষের রাজশক্তি ইহার সন্ধান পাইল না; তখন তাহা মোগল-পাঠানের মধ্যে কাহাকে বরণ করিয়া লইবে, তাহা স্থির করিতে ব্যস্ত ছিল। ১৫১৫ খৃষ্টাব্দের শেষভাগে ফিরিঙ্গি-বার আলবুকার্ক কাল-কবলে নিপতিত হইলেন। মৃত্যুর পূর্বেই তাহার পদে অন্য রাজপুরুষ নিযুক্ত হইয়াছিলেন। তিনি আসিয়া কাৰ্য্যভার গ্রহণ করিতে না করিতে, ফিরিঙ্গি বণিকের প্রাণে মুসলমানাতঙ্ক আবার প্রবল হইয়া উঠিল। ডিউ নগরের সম্মুখে জলযুদ্ধে বিজয়লাভ করিবার পর, ফিরিঙ্গি-বণিক তদ্দেশে নিতান্ত নিশ্চিন্তচিত্তে কালক্ষয় করিতে পারেন নাই। এডেন বর আক্রমণ করিয়া দীর্ঘকালেও তাহাকে সম্পূর্ণরূপে পরাভূত করিতে পারেন নাই। মিশরের সুলতানের বাণিজ্যশক্তি কিয়ৎপরিমাণে বিধ্বস্ত হইলেও, সম্পূর্ণরূপে পরাহত হয় নাই। কেবল আলবুকার্কের অসাধারণ * সােলেমান পাশার একখানি পত্র ইহার পরিচয় প্রাপ্ত হওয়া যায়। রিয়াজের সুযােগ্য অনুবাদক টীকা সংযােগে তাহার উল্লেখ করিয়া লিখিয়াছেন,—It denounccd the aggressions of the Christians of Portugal, and warned an Indian Prince that if he held back, nis soul would descend into hell.
রাজ্যলাভ প্রবল প্রতাপে প্রতিদ্বন্দ্বিগণ তাঁহার পদচ্যুতির অপেক্ষায় কিছুকালের জন্য নিশ্চেষ্ট হইয়াছিল। তাহার জীবন-বায়ুর অবসান হইলে, মুসলমান- শক্তি আবার প্রধান্য লাভের জন্য ব্যস্ত হইয়া উঠিল। তুরস্কের সুলতান যতদিন মিশরের সুলতানকে পরাভূত করিবার জন্য যুদ্ধবিগ্রহে লিপ্ত ছিলেন, ততদিন মুসলমানের পক্ষে প্রবলপ্রতাপে ফিরিঙ্গি-বণিকের গতিরােধ করিবার সম্ভাবনা ছিল না। আলবুকার্কের মৃত্যুকালে সেই সম্ভাবনা প্রবল হইয়া উঠিল ; মিশর তুরস্কের নিকট পরাভূত হইবামাত্র তুরস্কের সুলতান ফিরিঙ্গি-বণিকের সহিত শক্তিপরীক্ষার আয়ােজনে প্রবৃত্ত হইলেন।
পঞ্চদশ পরিচ্ছেদ বাণিজ্য-বিস্তার a monopoly of The main object of tlie Portuguese in Asia was the Indo-Europcan trade.-Sir. W. Hunter. * । } ভারত-বাণিজ্যে একাধিপত্য লাভ করিবার জন্যই ফিরিঙ্গি-বণিক যুদ্ধ-কলহে লিপ্ত হইয়াছিলেন। যতদিন কেবল জলপথে বাহুবল বিস্তৃত করিয়া সেই উদ্দেশ্যে সিদ্ধ করিবার সম্ভাবনা ছিল, ততদিন স্থলপথে অগ্রসর হইবার প্রয়ােজন স্বীকৃত হয় নাই। আলবুকার্কই তাহার প্রথম পথপ্রদর্শক। কিন্তু তাহাকেও কেবল বাণিজ্য-বিস্তারের অনুরােধেই রাজ্য-বিস্তারের চেষ্টা করিতে হইয়াছিল। বাণিজ্য-চিন্তাই প্রধান চিন্তা বলিয়া, পরিচিত ছিল। তাহাতে আত্মহারা হইয়া, যখন যাহা করিতে হইয়াছে, ফিরিঙ্গি-বণি তখনই তাহ অম্লানবদনে সম্পন্ন করিয়া আসিয়াছেন। তাহাতে ফিরিঙ্গি বণিকের নাম কলঙ্কযুক্ত হইলেও, সেকালের কেহ তাহাতে লজ্জাবােধ করেন নাই। বরং যাহারা এরূপ কাৰ্য্যে প্রাণত্যাগ করিতেন, তাহার স্বদেশের ইতিহাসে অমরকীৰ্ত্তি লাভ করিতেন। ইতিহাসের কল্যাণে এইরূপে কত নরাধম দ-তঙ্করও মহাবীর বলিয়া পূজা প্রাপ্ত হইয়াছে। কেবল বাহুবলেই ফিরিঙ্গি-বণি আত্মশক্তি বিস্তৃত করিতে পারি- তেন না। তাহার সহিত যে শাসন-কৌশল সংযুক্ত হইয়াছিল, তাহাই দিগ্বিজয়লাভের প্রকৃত কারণ। কালিকটের ইতিহাসে তাহার প্রচুর প্রমাণ প্রাপ্ত হওয়া যায়। কালিকট-রাজ ভারত-বাণিজ্যের স্বাধীনতা- রক্ষার জন্য প্রাণপণে ফিরিঙ্গি-বণিকের গতিরোধের চেষ্টা করিয়াছিলেন।
৮ বাণিজ্য-বিস্তার ১২৯ তিনি যতদিন জীবিত ছিলেন, ততদিন তাঁহাকে পরাভূত করিবার সম্ভা- বনা ছিল না। কিন্তু তাহার ভ্রাতার হৃদয়ে রাজ্যলােভ প্রবল হইবা- মাত্র, আলবুকার্কের পথ সহজ হইয়া উঠিল। ভ্রাতা যদি বিষপ্রয়ােগে ভ্রাতৃহত্যা করিতে পারেন, তবে আলবুকার্ক ভ্রাতৃঘাতককে সিংহাসনে প্রতিষ্ঠিত করিয়া দিবেন,—এই মর্মে গুপ্ত সন্ধিপত্র সম্পাদিত হইবার পর, ভ্রাতৃহত্যা সংঘটিত হইয়া গেল। এই উপায়ে যিনি কালিকটের রাজসিংহাসনে আরােহণ করিলেন, তিনি প্রথমে ১৫১৩ খৃষ্টাব্দে ও তাহার পর ১৫১৫ খৃষ্টাব্দে সন্ধিসূত্রে আত্মবিক্রয় করিতেও ইতস্তত করিলেন না। শেষ সন্ধিসূত্রে কালিকটরাজ পর্তুগালের সামন্ত হইতে স্বীকৃত হইয়া অঙ্গীকার করিলেন,-“(১) পর্তুগালের শত্রুগণ কেহ কখনও কালিকটে আশ্রয় লাভ করিতে পারিবে না; (২) খৃষ্টান- গণ বিনাশুল্কে বাণিজ্য করিতে পারিবেন , (৩) দেশীয় খৃষ্টানেরাও সেই অধিকার লাভ করিবেন; (৪) কালিকট-রাজ অন্য লােকের নিকট যে শুল্ক প্রাপ্ত হইবেন, তাহার অর্ধাংশও পর্তুগালরাজ প্রাপ্ত হই- বেন।” + এই মৰ্ম্মে সন্ধিপত্র লিখিত হইবার পর, কালিকটের পুরাতন বন্দরে ফিরিঙ্গি-বণিকের কুঠীবাড়ী নির্মিত হইল। রাজা যাহা রক্ষা * In 1513 the Zamorin of Calicut was hostile, his brother friendly, to Portugal. Albuquerque offered, if the brother would poison the Zamorin, to secure for him the threne ; and the compact was duly carried out.--Sir W. Hunter's History of British India, voli. p 163. প্রথম সন্ধিসূত্রে কালিকটরাজের পক্ষে বৎসরে চারিখানি বাণিজ্যপােত আরব দেশে প্রেরণ করিবার অধিকার স্থিরীকৃত হইয়াছিল। “রিয়াজে” দেখিতে পাওয়া যায়, পর্তুগীজ দুর্গ নিৰ্মিত হইবামাত্র এই অধিকারও বিলুপ্ত হইয়া গিয়াছিল। যথা- For a short while, the Portuguese kept their promise and word, but when the fort was completed, they prevented his trading in aforesaid articles and commenced various malpractices and oppos.- tions on the Mussalmans.-Riaz-us-salateen, P; 405. + Treaty dated 26 February 1515.
ফিরিঙ্গি-বণিক করিবার আশায় প্রাণপণ করিতেন, ভ্রাতৃঘাতক রাজভ্রাতা তাহাই ফিরিঙ্গি-বণিকে দান করিয়া, সিংহাসন লাভ করিলেন । কোচিনরাজ প্রলােভনে পড়িয়া অসময়ে আশ্রয়দান না করিলে, ফিরিঙ্গি-বণিকের পক্ষে ভারত-বাণিজ্যে একাধিপত্য-লাভ কখনও সহজ হইত না। ফিরিঙ্গির বাহুবলে একবার কালিকটের সিংহাসন লাভ করিতে পারিলে, ক্রমে ক্রমে ভারতবর্ষের একছত্র সম্রাট হইতে পারি- বেন, এই প্রলােভনে প্রলুব্ধ হইয়াই কোচিন-রাজ স্বদেশদ্রোহে লিপ্ত হইয়া, কালিকটের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করিয়াছিলেন। উদ্দেশ্যসিদ্ধির জন্য ফিরিঙ্গি-বণি তাহাকে প্রলুব্ধ করিতে ত্রুটি করেন নাই। উদ্দেশ্য সিদ্ধ হইয়া গেল, কোচিনরাজের স্বদেশদ্রোহই সার হইল। কালিকটের রাজসিংহাসনে আর এক জন স্বদেশদ্রোহী উপবেশন করিলেন। তখন মর্মাহত কোচিন-রাজ পর্তুগালের অধিপতির নিকট আবেদনপত্র প্রেরণ করিতে প্রবৃত্ত হইলেন। এই আবেদনপত্র এখন ইতিহাসপাঠকগণের নিকট সুপরিচিত হইয়াছে। স্বার্থসিদ্ধির জন্য বিদেশের লােকে যে সকল অলীক আশায় ভারতবর্ষের নগণ্য ব্যক্তিগণকে প্রলুব্ধ করিয়া, তাহাদের সহায়তায় শক্তিবিস্তার করিয়া লইয়া, তাহাদিগকে জীর্ণ- বস্ত্রবৎ অকাতরে পরিত্যাগ করিয়াছেন, তাহাদের কথা ভারতবর্ষের ইতিহাসে পুনঃপুনঃ লিখিত রহিয়াছে। কোচিন-রাজ তাহার প্রথম পাত্র বলিয়া তাহার আবেদনপত্রখানি উল্লিখিত হইবার যােগ্য। ১৫১৩ খৃষ্টাব্দে কোচিন-রাজ যথাবিহিত সম্মানপুরঃসর প্রবল প্রতাপান্বিত শ্ৰীল শ্ৰীযুক্ত পর্তুগাল-রাজকে লিখিয়া পাঠাইলেন,—“আপনি আমাকে সমগ্র ভারতবর্ষের সম্রাট সাজাইয়া উপহারস্বরূপ স্বর্ণমুকুট প্রেরণ করিয়াছিলেন। আপনার প্রতিনিধি মহাশয় আমার অভিষেক ক্রিয়া সম্পন্ন করিয়া, আমাকে সমগ্র ভারতবর্ষের অধিপতি করিয়া দিবেন বলিয়া শপথ করিয়াছিলেন। আমার বিরুদ্ধে কেহ মশুকোত্তোলন বাণিজ্য-বিস্তার করিলে, সাহায্য করিবার কথাও স্বীকৃত হইয়াছিল। আমিও তাহাকে যথাসাধ্য সহায়তা প্রদান করিয়া তাহার শত্রুদলনে প্রতিশ্রুত হইয়া- ছিলাম ; তাহার জন্য প্রাণবিসৰ্জন করিতেও প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হইয়াছিলাম। এইরূপে এই সকল কথা আপনাদের ধর্মের দোহাই দিয়া ধৰ্ম্মমন্দিরে শপথ করা হইয়াছিল। তাহার কি পরিণাম হইল ?” তাহার কি পরিণাম হইল ? সে কথা জনৈক সহৃদয় ইংরাজ ইতি- হাসলেখক একটি সংক্ষিপ্ত বাক্যে লিপিবদ্ধ করিয়া গিয়াছেন। তাহার আর কি হইবে ? যাহা হইবার, তাহাই হইল। কথা কথাই রহিয়া গেল! দ্বাদশ বৎসরের মধ্যে কোচিন-রাজের সর্বনাশসূচক সন্ধিপত্রে, কালিকট-রাজের সহিত ফিরিঙ্গি-বণিকের মিত্ৰতা সুসংস্থাপিত হইয়া গেল ! + ফিরিঙ্গির ধর্মপ্রতিজ্ঞা যে যথাধর্ম প্রতিপালিত হইবে না, কোচিন-রাজ তাহা বিশ্বাস করিতে পারেন নাই বলিয়াই, কাতরকণ্ঠে অৰ্ত্তনাদ করিয়া উঠিয়াছিলেন। এই আর্তনাদ আধুনিক ভারতবর্ষের বিস্ময়াবহ ইতিহাসের অপরিহার্য আকুল আৰ্তনাদ ; তাহাতে কোচিন- রাজের ন্যায় ভারতবর্ষের অনেক শাসনকর্তাকে হায়! হায়! করিতে হইয়াছে,-একদিনের জন্যও ফিরিঙ্গি-বণিকের সমবেদনা আকর্ষণ করিবার সুযােগ উপস্থিত হয় নাই। Your Highness sent me a golden crown, as a sign that I was crowned the chief King of the whole of India. And your Governor specially crowned me as king, and he declared on oath that he would make me the chief king of all India, and assist me against any one who should come upon me. And I also promised to assist him against whoever should come upon them and to stand to the defence of your fortress until death ; and in this manner they swore to it by oath in the Church.--Letter dated II Decembes, si3. + Yet after twelve years these fine promises remained empty words, and here was Albuquerque in 1513 making treaties with Calicut to the detriment of Cochin.-Sir W. Hunter's History of British India, V I. 141 ফিরিঙ্গি-বণিক পারস্যোপসাগর একটি পুরাতন বাণিজ্যপথ বলিয়া সুপরিচিত ছিল। সে পথেও ফিরিঙ্গি-বণিকের অধিকার বিস্তৃত হইল। ১৫১৫ খৃষ্টাব্দে অরমজ বন্দরে ফিরিঙ্গিদুর্গ নির্মিত হইবার পর, জলে স্থলে ফিরিঙ্গির প্রতাপ প্রবল হইয়া উঠিতে লাগিল। অরমজ, বন্দরের অধিপতিকেও কালিকট-রাজের ন্যায় অকীৰ্ত্তিকর সন্ধিসূত্রে আত্মরক্ষা করিতে হইল। ১৫২৩ খৃষ্টাব্দের সন্ধিসূত্রে অরমজ, বন্দরের অধিপতি সম্পূর্ণরূপে আত্মবিক্রয় করিতে বাধ্য হইলেন। তাহার রাজ্য, প্রকৃতপক্ষে পর্তুগালের অধীন হইয়া গেল। পর্তুগাল-রাজ ইচ্ছামাত্রে সে রাজ্য হস্তগত করিবার অধি- কার লাভ করিলেন। অরমজ, বন্দরের অধিপতি কেবল নামসর্বস্ব অধিপতি রহিলেন। ফিরিঙ্গি-বণি বিনাশুল্কে পণ্য গ্রহণ করিবার ক্ষমতা প্রাপ্ত হইলেন ;-অরমজ, বন্দরের অধিপতি পৰ্ত্ত গালকে কর প্রদান করিতে স্বীকৃত হইলেন;—যে সকল ফিরিঙ্গি তাহার রাজ্যে পলায়ন করিয়া স্বদেশদ্রোহে লিপ্ত হইয়াছিল, তাহাদিগকে ধরা দিতে হইল ;-রাজা ও নগরপালের দেহরক্ষক ভিন্ন অন্য কোনও মুসলমানের পক্ষে অস্ত্র-ব্যবহার বা অস্ত্রাদি কইয়া গমনাগমনের ক্ষমতা রহিল না ;-কেহ দ্বিতীয়বার সেরূপ অপরাধ করিলে বেত্রাঘাতে ও তৃতীয়বারে একেবারে প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত হইবার ব্যবস্থা স্থিরীকৃত হইয়া গেল! মুসলমান হইলে বাণিজ্য- ব্যাপারে শুল্কদান করিতে হইবে, ফিরিঙ্গি হইলে বিনা শুল্কেই বাণিজ্য- করিতে পাইবে ;-এইরূপ রাজাজ্ঞা মুসলমান-রাজকে স্বহস্তে লিপিবদ্ধ করিতে হইল !* এইরূপে ভারতসাগরের প্রধান বাণিজ্যপথে ফিরিঙ্গি-বণিকের আধি- * ইহার উল্লেখ করিবার সময় সার উইলিয়ম হণ্টার একটি পাদটীকায় লিখিয়া falatta, This agreement made at Medina July 15, 1523, affords a striking illustration of the process by which the Portuguese demands were increased.-Hunter's History of British India, vol. I. p. 145. note 2.
বাণিজ্য-বিস্তার ১৩৩ পত্য বিস্তৃত হইবার সময়ে, লােহিতসাগরের বাণিজ্য-পথ স্বাধীনতা রক্ষা করিতে লাগিল। সে পথে ফিরিঙ্গির বাহুবল বা শাসন-কৌশল সহসা বিজয়লাভ করিতে পারিল না। এভেন বন্দর তাহার জন্য ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হইয়া রহিয়াছে। এই বন্দর আরব-বণিদিগের প্রধান আশ্রয়স্থান বলিয়া পরিচিত ছিল। মিশরের সুলতান এডেন হস্তগত করিবার জন্য চেষ্টা করিয়াছিলেন, ফিরিঙ্গি-বণিও চেষ্টার ত্রুটি করেন নাই। কিন্তু আলবুকার্ক, ভগ্নমনােরথে সে চেষ্টা আপাততঃ পরিত্যাগ করিতে বাধ্য হইয়াছিলেন। ১৫১০ খৃষ্টাব্দে আলবুকার্কের প্রচণ্ড পীড়নে ক্ষতবিক্ষত হইয়াও, এডেনদুর্গ পরাভূত হয় নাই। ১৫১৫ খৃষ্টাব্দে মিশরাধিপতির আক্রমণেও এডেনদুর্গ আত্মরক্ষা করিয়াছিল। কিন্তু উভয় শক্রর যুগপৎ আক্রমণে এডেনদুর্গের পক্ষে দীর্ঘকাল আত্মরক্ষা করা কঠিন হইয়া উঠিতে লাগিল। তৎকালে এডেনদুর্গের অধিপতি “শঠে শাঠ্যং সমাচরেৎ” এই নীতি অবলম্বন করিয়া, কখন কখন ফিরিঙ্গির সহিত মিত্ৰস্থাপনে স্বীকৃত হইয়া, আবার সুযােগ পাইবামাত্র স্বাতন্ত্র অবলম্বন করিতে প্রবৃত্ত হইয়াছিলেন। এইরূপে বিবিধ বিড়ম্বনা সহ করিয়াও, এডেনদুর্গ প্রকৃত প্রস্তাবে কাহারও পদানত হইল না। কিন্তু ভারতসাগরের প্রধান বন্দর- গুলি ও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দ্বীপপুঞ্জ পর্তুগালের অধীনতা স্বীকার করায়, ভারত- বাণিজ্যে পর্তুগালের আধিপত্য ক্রমেই প্রবল হইয়া উঠিতে লাগিল। ফিরিঙ্গি-বণিকের বাণিজ্যযাত্রার প্রথম উদ্যোগের সহিত ধৰ্ম্মপ্রচারের * রিয়াজে” দেখিতে পাওয়া যায়, ফিরিঙ্গিগণ নানা স্থানে দুর্গ নির্মাণ করিয়াই প্রবল হইয়া উঠিয়াছিলেন। মুসলমানগণ তাহার গতিরােধের চেষ্টা করিতে ব্রুটা করেন নাই, এবং কিছুদিন জয়লাভের আশাও তাহাদিগকে উৎফুল্ল করিয়াছিল। At this time, Sultan Sulaimari son of Sultan Salim of Turkey, planned to turn out Portuguese from the ports of India and to take possession thereof himself.—Riaz-us-salateen p. 407.
১৩ঃ ফিরিঙ্গি-বণিক আড়ম্বর সংযুক্ত ছিল। তাহার জন্যই অনেক সময় পােপের ঘােষণা- পত্র গৃহীত হইত ; কখনও বা ধৰ্ম্মোন্মত্ত প্রচারকগণকেও ভারতবর্ষে প্রচারকার্যে নিযুক্ত করিতে হইত। তথাপি ফিরিঙ্গি-বণিকের প্রধান লক্ষ্য বাণিজ্য,তাহা কখনই অস্বীকৃত হয় নাই। ভারতবাণিজ্যে ধর্ম- কলহ প্রবল হইলে, ফিরিঙ্গি-বণিকের সর্বনাশ উপস্থিত হইতে পারিত। সে কথা বুঝিতে পারিয়া, সময় থাকিতে ফিরিঙ্গি-বণিক সাবধান হইয়া- ছিলেন। যে ধৰ্ম্মোন্মাদ একদিন তাহাদিগকে মুসলমানের ধৰ্ম্মমন্দির চূর্ণ করিবার জন্য নিয়ত উত্তেজনা করিত, তাহা ক্রমে অবসন্ন হইয়া গেল। এমন কি, হিন্দু মুসলমানের ধৰ্ম্ম-মন্দির রক্ষা করিবার কথাও বিধি-ব্যবস্থার মধ্যে লিখিত হইতে লাগিল।* এইরূপে ফিরিঙ্গি- বণি ভারতবাণিজ্যে আধিপত্যবিস্তারের চেষ্টা করিতে লাগিলেন। সে চেষ্টা সফল হইতে বিলম্ব ঘটিল না। প্রাচ্য দ্বীপপুঞ্জের পণ্যদ্রব্য সিংহলে পুঞ্জীকৃত হইত। তাহা আর হিন্দু-মুসলমানের করতলগত রহিল না। ভারতবর্ষ হইতে যে সকল পণ্যদ্রব্য জলপথে মুসলমান-রাজ্যে বাহিত হইত, তাহা আর সে পথে বাহিত হইবার অবকাশ পাইল না। এডেনদুর্গ সম্পূর্ণরূপে পরাভূত হইলেও, ভারত-বাণিজ্যে ফিরিঙ্গি-বণিকেরই একাধিপত্য প্রতিষ্ঠালাভ করিল। এই প্রতিষ্ঠার মূলে যে নৌশক্তি বর্তমান আছে, সে কথা ফিরিঙ্গি- বণিক বিস্মৃত হইতে পারিলেন না। জলযান-নিৰ্মাণ, জলযান-চালন- * ইংরাজ বণিকৃ ভারতসাগরে উপনীত হইবার পূর্বেই এই “উদার নীতি” প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল। ইহার সহিত স্বার্থের সংশ্রব না থাকিলে, ইহা ইউরােপীয় উদারতার নিদর্শনরূপে গৌরবলাভ করিতে পারিত। কিন্তু ইহা স্বার্থরক্ষার কৌশলরূপে অবলম্বিত হইয়াছিল বলিয়া, ইতিহাস ইহাকে অকৃত্রিম ভারত-প্রীতির নিদর্শন ৰলিয়া অভ্যর্থনা করিতে পারে নাই। এই “উদারতার মুলেও কড়াক্রান্তির হিসাব-বণিকের ক্ষতিলাভগণনার শান্ত আগ্রহ।
বাণিজ্য-বিস্তার কৌশল ও জলযুদ্ধের কৌশল-উদ্ভাবনে প্রাচ্য ও প্রতীচ্য মানবসমাজ তুল্যভাবে নিযুক্ত হইয়াছিল। যাহারা তাহাতে উৎকর্ষলাভ করিবে, তাহারাই যে উত্তরকালে ভারত-বাণিজ্যের আধিপত্য অধিকার করিতে পারিবে, তাহাতে কাহা- রও সংশয় ছিল না। সুতরাং ভারতবর্ষের লােকে যাহাতে জল- যান নির্মাণ করিতে না পারে, তাহারা যাহাতে জলযান- নিৰ্মাণ-কৌশল বিস্মৃত হইয়া যায়, তাহার জন্যই ফিরিঙ্গি-বণিক চেষ্টা করিতে প্রবৃত্ত হইলেন। তৎকালে জলযানের সংখ্যা অধিক ছিল না। যে সকল জলযান হিন্দুমুসলমানের পণ্যদ্রব্য বহন করিত, তাহা ধ্বংস করিতে পারিলে, সহসা জলযান পুনর্গঠিত করিবার সম্ভাবনা ছিল না। যুদ্ধ-কলহে ফিরিঙ্গি-বণিক ভারতীয় জলযানসমূহের ধ্বংস করিয়াই নিশ্চিন্ত হইতে পারিলেন না; পুনর্গঠনের পথ রুদ্ধ করিবার জন্যও যথাসাধ্য চেষ্টা করিতে লাগিলেন। ডিউ নগরের সম্মুখে যে জলযুদ্ধে ফিরিঙ্গি-বণিক জয়লাভ করিয়া- ছিলেন, তাহাতে ভারতীয় জলযান-গঠন-প্রতিভার পরিচয় প্রাপ্ত হইয়া, ফিরিঙ্গি-বণিক চিন্তিত হইয়াছিলেন। সন্ধি-সংস্থাপনের সময়ে সে কথা বিস্মৃত হন নাই। কালিকট ও গুজরাটই জলযান-নিৰ্মাণ-কৌশলে প্রসিদ্ধিলাভ করিয়াছিল। সন্ধিসূত্রে এই উভয় স্থলের জলযান-নির্মাণের ক্ষমতা তিরােহিত হইয়া যায়। অবশেষে ১৫৩৪ খ্ৰীষ্টাব্দের সন্ধিপত্রে গুজরাটের জলযান-নির্মাণের ভবিষ্যৎ অধিকার পর্যন্ত বিলুপ্ত হইয়া গেল। খৃষ্টীয় পঞ্চদশ শতাব্দীর প্রারম্ভেও ইউরােপ অপেক্ষ। ভারতবর্ষের জলযান উৎকৃষ্ট বলিয়া বিবেচিত হইত। শত বর্ষের • # The same unsparing policy which flogged and sentenced to death the Arabs of Ormuz who ventured to carry arms, also put an end to naval construction at alien Indian harbours.--Hunter's History of British India, vol. I. p. 151.
৪৩৬ ফিরিঙ্গি বণি মধ্যে ভারতবর্ষের জলযান-নির্মাণের অধিকার পর্যন্ত বিলুপ্ত হইয়া গেল। তাহার কথা এখন কেবল স্বপ্নবৎ ইতিহাসে প্রতিভাত হইয়া থাকে। গােয়, বেসিন, দামন ও ভিউ, এই চারিটি ফিরিঙ্গি-দুর্গে ভারত- বর্ষের পশ্চিম সমুদ্রতটে ফিরিঙ্গি-বণিকের আধিপত্য দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত হইবার পর, ভারতবাসীর পক্ষে আর গােপনে জলযান-গঠনের উপায় রহিল । যে শিল্পকৌশল অনুশীলনবলে ক্রমে জলযান-নির্মাণে অধিকতর কৃতিত্ব প্রদর্শন করিতে পারিত, তাহা এইরূপে চিরদিনের জন্য বিলুপ্ত হইয়া গেল। পারস্যোপসাগর হইতে যে সকল অর্ণবযান ভারতবর্ষে উপনীত হইত, তাহা প্রথমে ডিউ নগরের বন্দরে দৃষ্টিপথে পতিত হইত ; তাহা আর ভারতবাসীর দৃষ্টিগােচর হইবার উপায় রহিল না। এই সময়ে বিজাপুর রাজ্যের প্রবল প্রতাপ অবসন্ন হইয়া পড়িয়াছিল। আদিল শাহের মৃত্যুর পর, তাহার শিশুপুত্রের সিংহাসন রক্ষা করাই মন্ত্রিবর্গের প্রধান লক্ষ্য হইয়া উঠিয়াছিল। বিজাপুরের অধিকারভুক্ত গােয়া দ্বীপ এই সময়ে অধিকার করিয়া লইতে ফিরিঙ্গি-বণিককে অধিক উদ্বেগ সহ করিতে হয় নাই। যে জলদস্যু ফিরিঙ্গি-বণিককে ইহার সন্ধান প্রদান করে, তাহার নাম টিমোজা। * সে ভারতবর্ষের অধিবাসী হইয়াও স্বার্থলােভে ফিরিঙ্গির সহায়তা করিয়াছিল। তাহার সেনাদলের সহ- যতা লাভ না করিলে গােয়া দ্বীপ ফিরিঙ্গির অধিকারভুক্ত হইত না। টিমােজা যে সময়ে জন্মগ্রহণ করিয়াছিল, তখন ভারতবর্ষ একরূপ অরাজক বলিলেও অত্যুক্তি হয় না। তখন কত লােকে কত উপায়ে কত রাজ্য-গঠনে প্রবৃত্ত হইয়াছিল। টিমােজার সাহস ছিল, সেনাদল ছিল, জলপথে আধিপত্য ছিল ; স্বয়ং সমুদ্রতটে বিস্তৃত রাজ্য সংস্থাপিত * The pirate chief Timoja proposed to Albuquerque that, as the Lord of Goa is dead ( in reality absent ) they should scize the place. This they easily did in March 1510.-Sir W. W. Hunter.
বাণিজ্য-বিস্তার ১৩৭ করিবার সম্ভাবনা ছিল। সে তাহাতে ব্যাপৃত না হইয়া, জলদস্যরূপে, পণ্য লুণ্ঠন করিত ; লাভের লােভে ফিরিঙ্গি-বণিকের পক্ষভুক্ত হইয়া গােয়া অধিকার করিয়া দিয়াছিল। তাহার নাম এখন বিস্মৃতিগর্ভে বিলীন হইয়া গিয়াছে; কিন্তু গোয়া নগরী এখনও তাহার স্বদেশদ্রোহের সাক্ষিরূপে বৰ্তমান আছে। টিমােজা কৃতজ্ঞ ফিরিঙ্গি-বণিকের অধীনে জায়গীর ও রাজপদ প্রাপ্ত হইয়াছিল; কিন্তু এক বৎসরের অধিক তাহার ফলভােগ করিতে পারে নাই ;-এক বৎসরের মধ্যে প্রাণত্যাগ করিয়া ইহলােক হইতে অবসর গ্রহণ করিয়াছিল। আবুকার্কের বাণিজ্যনীতি ও টিমােজার বাহুবল যে গােয়া নগরী প্রতিষ্ঠিত করিয়াছিল, তাহা এখন পুরাতন নগরী বলিয়া পরিচিত। সেখানে এখন পুরাতন ধ্বংসাবশেষ। কোনও স্থানে অট্টালিকার ভগ্নাবশেষ, কোনও স্থানে ধৰ্ম্মমন্দিরের ভগ্নচূড়া,সকল স্থানেই শ্মশা- নের শােক-চিহ্ন! একদিন কিন্তু এই গােয়া নগরী “স্বর্ণপুরী” নামে ইউরােপের সকল দেশেই সুপরিচিত হইয়াছিল! পর্তুগীজগণ বলিত,-“যে গােয়া নগরী দর্শন করিয়াছে, তাহার পক্ষে লিন নামক পর্তুগালের রাজধানী দর্শন করিবার প্রয়ােজন নাই।” গােয়া নগরী প্রাচ্য ও প্রতীচ্য সভ্যসমাজের প্রথম সম্মিলনক্ষেত্র। গােয় নগরী ফিরিঙ্গি-বণিকের প্রথম পরাক্রান্ত রাজধানী। গােয়া নগরী পৰ্ত্ত গালের অভ্যুদয় ও অবনতির বিস্ময়াবহ বিচিত্ৰ ক্ষেত্র। গােয় নগরী ভারতবর্ষের ইতিহাসের চিরস্মরণীয় শ্মশানভূমি। এই মহাশ্মশানে কোটী কোটী ভারতবাসীর ভবিষ্যৎ অভ্যুদয় ভস্মসাৎ হইয়া গিয়াছে। সুতরাং ইহার কথা বিস্তৃতভাবে আলােচিত হইবার যােগ্য। * There is a modern account of Goa, written in English, by the Rev. Cotteneau de Kloguen and published at Madras in 1831; This coutains a complete historical sketch of Goa from 1509 to 1812 and gives a description of all the churches, convents and the pu lic buildings accompanied by a map. It is in faet a modern gui to Goa.
১৩৮ ফিরিঙ্গি-বণিক এক সময়ে গােয় নগরী সমগ্ৰ ভূমণ্ডলের মধ্যে সর্বোৎকৃষ্ট বাণিজ্য- বন্দর বলিয়া খ্যাতি-লাত করিয়াছিল। প্রাকৃতিক সংস্থানে গােয়া নগরী তৎকালে প্রধান বাণিজ্য-বন্দর বলিয়া পরিচিত হয় নাই। ফিরিঙ্গি- বণি রচনা-কৌশলে তাহাকে বাণিজ্যের উপযােগী করিয়া তুলিয়া- ছিলেন। মালাবার উপকূলে এরূপ স্থান অনেক ছিল ; যে কোনও স্থান এইরূপ সৌভাগ্য লাভ করিতে পারিত। কিন্তু এইখানে আসিয়া ফিরিঙ্গি-বণিক প্রাণপণে নব রাজধানীর গঠন-কার্যে নিযুক্ত হইয়াছিলেন বলিয়াই, গােয়া নগরী অল্প দিনের মধ্যে সৰ্বশ্রেষ্ঠ হইয়া উঠিয়াছিল। কোচিন, কালিকট প্রভৃতি পুরাতন বাণিজ্য-বন্দরের তিরােভাবের জন্যই গােয় নগরীর প্রাদুর্ভাব হইয়াছিল। কিছুকাল তাহার প্রবল প্রতাপে সমস্ত সভ্যজগৎ বিস্মিত হইয়া উঠিয়াছিল। এখন তাহা আবার ধীরে ধীরে বিভিসাগরে বিলীন হইতেছে।
ঘােড়শ পরিচ্ছেদ বাণিজ্য-নীতি Ask of me, and I shall give thee the heathen for thine inheritance, and the uttermost parts of the earth thy possession. Thou shalt break them with a rod of iron; thou shalt dash in pieces like a potter's vessel.- Psalın ii. 8. 9. ফিরিঙ্গি-বণিকের অভ্যুদয়ের যুগ, ইউরােপের ইতিহাসের অশান্ত ধৰ্ম্মোন্মাদের যুগ। সে যুগের খৃষ্টান ইউরােপ ধর্মের নামে যে সকল অত্যাচার উৎপীড়নে জলস্থল কম্পিত করিয়া তুলিয়াছিল, তাহা স্মরণ করিলে শিহরিয়া উঠিতে হয়। তাহার কথা স্মরণ করিতে আধুনিক খৃষ্টান লেখকবর্গও লজ্জা অনুভব করিয়া থাকেন। ফিরিঙ্গি-বণিক ভারতবর্ষে বাণিজ্য বিস্তৃত করিবার সময়ে, কাহারও কিছুমাত্র লজ্জাবোেধ ছিল না। যে ধৰ্ম্মোন্মাদে পর্তুগালের সমুদ্রোপকূল হইতে নাবিকগণ উত্তমাশা অন্তরীপ অতিক্রম করিবার আশায় পােতারােহণ করিত, তাহার সহিত লুণ্ঠনলােভ সংযুক্ত হইয়া তাহাকে বীভৎস করিয়া তুলিয়া- ছিল। কালে লুণ্ঠনলােভ প্রবল হইতে লাগিল; লােকে তাহার পক্ষ- সমর্থনের জন্য খৃষ্ট-ধৰ্ম্মের শাসনবাক্য উদ্ধৃত করিতে শিক্ষা করিল। এইরূপে ফিরিঙ্গির বাজিণ্য-নীতি লুণ্ঠন-নীতিতে পরিণত হইল। * কোনও কোনও ইতিহাসলেখক ফিরিঙ্গির দোষক্ষালনের আশায় লিখিয়া গিয়াছেন,-“তাহারা যে সকল নির্দয় ব্যবহারের জন্য নিন্দিত হইয়া * একজন পৰ্ত্ত গীজ রাজ-প্রতিনিধি নিজেই লিখিয়া গিয়াছেন,—The Portuguese entered India with the sword in one hand and the crucifix in the other ; finding much gold, they laid aside the crucifix to fill their pockets.-Jano-de-Castro. A ১৪ ফিরিঙ্গি-বণিক ক থাকে, তাহার কারণ ছিল। তাহা কালধৰ্ম্ম। ফিরিঙ্গি-বণিক এসিয়াতে আসিয়া যেরূপ অসহায় অবস্থায় পতিত হইয়াছিল, তাহাতে তাহাদের নিষ্ঠুর ব্যবহারই তাহাদের আত্মরক্ষার উপায় বলিয়া স্বীকৃত হইবার যােগ্য! তাহাদের সংখ্যা এত অল্প, তাহাদের অবস্থা এত বিপদসঙ্কুল, তাহারা নিষ্ঠুর ব্যবহার না করিলে, আত্মরক্ষা করিতে পারিত না।” এ সকল কথা একালের ইতিহাসলেখকদিগের নিজের কথা,-তাহাদের কল্পনাপ্রসূত উপাখ্যানমাত্র। সেকালের ইতিহাসলেখকগণ এরূপ কৈফিয়তের অবতারণা করেন নাই। যাহারা অলঙ্কারলুণ্ঠনের লােভে অসহায় মহিলাবর্গের নাসাকর্ণচ্ছেদন করিতে কুণ্ঠিত হইত না, তাহাদের নিষ্ঠুর ব্যবহারের পক্ষসমর্থন করা অসম্ভব। তাহা বর্বরতমাত্র। সেকালের ইউরােপ এরূপ বর্বরতা পরিত্যাগ করিয়া উঠিতে পারে নাই ;- যেখানে গিয়াছে, সেইখানেই ফিরিঙ্গির বর্বরতায় মানবসমাজ ব্যতিব্যস্ত হইয়া উঠিয়াছে। এই স্বভাবসুলভ বর্বরতার সহিত ধৰ্ম্মান্ধতা মিলিত হইয়াছিল ; স্বার্থচিন্তায় তাহা উত্তরােত্তর বীভৎস মূর্তি ধারণ করিয়াছিল। সেনাপতিগণ যুদ্ধজয়ের সংবাদ লিপিবদ্ধ করিবার সময়ে অম্লানবদনে লিখিয়া পাঠাইতেন,—“কুকুরগুলাকে কাটিয়া ফেলা হইয়াছে, তাহারা আর কি প্রত্যাশা করিতে পারে ?” কেহ বা লিখিয়া পাঠাইতেন, “একজনকেও ছাড়া হয় নাই,—কি স্ত্রীলােক, কি বালক, সকলকেই নিহত করা হইয়াছে।” একজন সুবিখ্যাত আধুনিক ইতিহাসলেখক লিখিয়া গিয়াছেন,-“পর্তুগালের লােকে তাহাদের ক্ষমতার অতীত দিগ্বিজয়কার্যে লিপ্ত হইয়াছিল বলিয়াই, এই সকল গর্হিত উপায় অবলম্বন করিতে বাধ্য হইয়াছিল। * এই সকল “গর্হিত উপায়ের” * Terrorism had to take the place of strength. It was a device to which the Portuguese were compelled by plans of conquest, beyond their national resources.-Sir W. Hunter's History of British India. vol. I, 141.
বাণিজ্য-নীতি ১৪১, জন্যই ফিরিঙ্গির নাম ভারতবাসীর নিকট ক্রমে অবিমিশ্র ঘৃণার আধার হইয়া উঠিতে লাগিল। লােকে ফিরিঙ্গি-বণিকে ভয় করিতে শিখিল, ভক্তি করিতে পারিল না। ধাহারা ভয় করিল না, তাহারা নিষ্ঠুর আচরণে নিষ্ঠুরতার প্রতিশােধ লইবার চেষ্টা করিতে লাগিল। ফিরিঙ্গি-বণিক ভারতবর্ষে উপনীত হইয়া যে বাণিজ্য-নীতি অবলম্বন করিয়াছিলেন, তাহার সহিত ভারতবর্ষে ইউরােপীয় শিল্পদ্রব্যবিক্রয়ের সম্বন্ধ ছিল না। তখনও ইউরােপীয় শিল্পদ্রব্য ভারতবর্ষে সমাদর লাভ করিতে পারে নাই; তখনও এসিয়া ও ইউরােপের সমস্ত সভ্যদেশে প্রাচ্য- শিল্পেরই একাধিপত্য বৰ্তমান ছিল। সেই শিল্পদ্রব্য সংগ্রহের ও বিক্রয়ের একাধিপত্য লাভ করিবার আশায় ফিরিঙ্গি-বণিক ব্যাকুল ছিলেন। সেকালের কাগজপত্রে দেখিতে পাওয়া যায়, রােমক সাম্রাজ্যের ন্যায় পর্ন গালের লােকেও রৌপ্য বিনিময়ে ভারতবর্ষ হইতে বিবিধ কৃষিজাত ও শিল্পজাত দ্রব্য ক্রয় করিয়া ইউরােপে বিক্রয় করিতেন; তাহার সহিত বহুমূল্য মণিমুক্তা হীরকাদিও সংযুক্ত ছিল। শিল্পের উন্নতিসাধন করিয়া ভারতবর্ষের সহিত প্রতিযগিতা করিবার আকাঙ্ক্ষা তখনও ইউরােপকে প্রবুদ্ধ করিতে পারে নাই। এই বাণিজ্যনীতি রক্ষা করিবার জন্য, জলপথে আত্ম-শক্তি প্রবল করিবার আশায়, ফিরিঙ্গি-বণিক পােত ও দুর্গের নির্মাণে নিযুক্ত হইয়া ভারতসমুদ্রে একাধিপত্য বিস্তৃত করিয়াছিলেন। পর্তুগালের ন্যায় ক্ষুদ্র রাজ্যের নাবিক ও সৈনিকগণের চেষ্টায় এই কাৰ্য সুসম্পন্ন হইবার সম্ভাবনা ছিল না। ইহার জন্য ভারতবর্ষের লােকের সহায়তা গ্রহণ করিবার প্রয়ােজন উপস্থিত হইয়াছিল। ফিরিঙ্গি-বণিক ফিরিঙ্গি-বণিক তাহার জন্য ‘জলে স্থলে ভারতবর্ষের লােকের বাহুবলের আশ্রয় গ্রহণ করিয়াই ভারতবর্ষের লােকের পরাজয়সাধন করিয়াছিলেন। খৃষ্টীয় খৃষ্টীয় ষােড়শ শতাব্দীর প্রথমভাগ ভারতবর্ষের ইতিহাসের বিপ্লবযুগ বলিয়া কথিত 1 ১৪২ ফিরিঙ্গি-বণি। ; হইয়া থাকে। তখনও মােগলশাসন সংস্থাপিত হয় নাই; তখনও দাক্ষিণাত্যের গৃহকলহ প্রবল প্রতাপে বৰ্তমান ; তখনও জলে স্থলে কেবল বাহুবলেরই প্রাধান্য। ফিরিঙ্গি-বণিক তাহার সন্ধানলাভ করিয়াই ভারত-বাণিজ্যের একাধিপত্য অধিকার করিতে সমর্থ হইয়াছিলেন। পর্তুগালের অধীশ্বর ভারত-বাণিজ্যের সর্বময় প্রভু বলিয়া ইউরােপে সুপরিচিত হইয়াছিলেন। পােপের আদেশপত্রের মৰ্ম্মানুসারে তাহার শাসনক্ষমতা কেহই অস্বীকার করিতে সাহস করিতেন না। পর্তুগাল- রাজ এইরূপে যে বাণিজ্যনীতি সংস্থাপিত করিয়াছিলেন, তাহাতে ফিরিঙ্গির বাণিজ্যকে রাজকীয় বাণিজ্য বলিতে পারা যায়। রাজার নামেই সকল কার্য নির্বাহিত হইত। যাহারা ভারতযাত্রা করিত, তাহারা রাজার কর্মচারিরূপে নিযুক্ত হইত। তাহাদিগকে এই কাৰ্য্যে উৎসাহিত করিবার আশায় পর্তুগাল-রাজ এক প্রবল প্রলােভনের অবতারণা করিতে বাধ্য হইয়াছিলেন। যাহারা অর্ণবপােতে আরােহণ করিয়া রাজকীয় বাণিজ্য-বিস্তারের জন্য ভারতবর্ষে গমন করিত, তাহারা সকলেই পদমর্যাদা-অনুসারে কিছু কিছু পণ্যদ্রব্য আনয়ন করিয়া ইউরােপে বিক্রয় করিতে পারিত। লােকে এই উপায়ে অতি অল্পকালের মধ্যে প্রভূত ধনােপাৰ্জন করিতেছে দেখিয়া, সকলেই ভারতযাত্রার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করিতে লাগিল। ইহাতে প্রথমে পর্তুগাল-রাজের লাভ হইলেও, পরিণামে সর্বনাশ সংঘটিত হইবার সূত্রপাত হইল। রাজার ন্যায় রাজমন্ত্রিবর্গও ভারত-বাণিজ্যে অর্থোপার্জন করিবার আশায়, কৰ্ম্মচারি-নিয়ােগের সময়ে গােপনে উৎকোচ গ্রহণ করিতে শিক্ষা করিলেন। যাঁহারা এইরূপে রাজকৰ্ম্মচারী হইয়া ভারতবর্ষে আসিতে লাগিলেন, তাহারাও সর্বাগ্রে আােেদর পূর্ণ করিবার জন্যই ব্যাকুল হইয়া উঠিলেন। ধর্মাধর্মের যাহা কিছু পার্থক্য ছিল, তাহাও বাণিজ্য-নীতি ১৩ বিলুপ্ত হইয়া গেল। রাজদত্ত যৎসামান্য বেতন উপলক্ষমাত্র, ভারত- বাণিজ্যের প্রচুর লাভই সকল শ্রেণীর রাজকর্মচারীর প্রকৃত লক্ষ্য হইয়া উঠিল। ইহাতে ভারতবর্ষে এক অভিনব উৎপীড়নের সূত্রপাত হইল। যাহারা রক্ষক, তাঁহারাই ভক্ষক হইয়া উঠিলেন; স্বার্থের চরণতলে বিচারবুদ্ধি নিয়ত নিহত হইতে লাগিল। যে সকল রাজকর্মচারী এইরূপে গুপ্ত বাণিজ্যে লিপ্ত হইতে লাগিলেন, তাহারা অল্প দিনের মধ্যেই ধনােপার্জনের নিত্য নূতন উপায়ের উদ্ভাবন করিতে প্রবৃত্ত হইলেন। পােতাধ্যক্ষ প্রথমে নিজের লাভের সংস্থান না করিয়া, রাজার লাভের কথা চিন্তা করিতে পারিলেন না। কুঠিয়ালগণও সেই পথ অবলম্বন করিলেন। এই সকল কাৰ্য্য গােপনে সুসিদ্ধ করিবার আশায় ভারতবাসীর সহিত বেনামীতে বাণিজ্য করিবার প্রথা প্রবর্তিত হইতে লাগিল। ভারতবর্ষের লােক স্বাধীন-বাণিজ্য হইতে বঞ্চিত হইয়া, ফিরিঙ্গির অধীনে এইরূপ গুপ্ত- বাণিজ্যে নিযুক্ত হইতে ইতস্তুত করিল না। এরূপ গুপ্ত-বাণিজ্যে পৰ্ত্ত গাল-রাজের যথেষ্ট ক্ষতি হইতে লাগিল। কিন্তু ইহাতেই আবার অল্পসংখ্যক ফিরিঙ্গির পক্ষে ভারত-বাণিজ্যে প্রাধান্যলাভের সুবিধা উপস্থিত হইল। ভারতবর্ষের লােকে “সর্বনাশে সমুৎপন্নে অর্ধং ত্যজতি পণ্ডিত”-এই পুরাতন প্রবাদবাক্য স্মরণ করিয়া ফিরিঙ্গির অধীনে বাণিজ্য করিতে প্রবৃত্ত হইয়া, স্বদেশের প্রকৃত স্বার্থ বিস্মৃত হইল। অল্প দিনের মধ্যে ফিরিঙ্গি রাজকর্মচারিবৰ্ণ সমরক্ষেত্র ছাড়িয়া অর্থোপার্জনের সহজ পথের পথিক হইতে লাগিলেন। সময়ের সহিত জয়পরাজয়ের সংস্রব আছে; আহত বা নিহত হইবার আশঙ্কা আছে। নিয়ত ক্লেশ স্বীকার করিবারও প্রয়ােজন আছে ;-সুতরাং তাহাতে কাহারও প্রবৃত্তি রহিল না। সকলেই রাজধানীতে বসিয়া রাজভােগ ১৪৪ ফিরিঙ্গি-বণিক সম্ভোগ করিবার আশায়, রাজকার্যে অবহেলা করিতে অভ্যস্ত হইয়া উঠিলেন। পর্তুগালের অধিবাসিগণকে ভারতযাত্রায় উৎসাহিত করিবার আশায় পৰ্ত্ত গালের অধীশ্বর তাহাদের জন্য ভারতবর্ষে বিবাহ করিবার সুযােগের সৃষ্টি করিয়াছিলেন। বিবাহিত হইলে, বিবাহিত হইলে, কর্মচারিগণ শান্ত শিষ্ট হইয়া, রাজকার্যে মনােনিবেশ করিবেন,—এই আশায় রাজা যে ব্যবস্থা করিলেন, তাহাতে বিপরীত ফল সমুৎপন্ন হইতে লাগিল। যাহারা ভারতবর্ষে বিবাহ করিতে লাগিলেন, তঁাহারা অন্যায় উপায়ে অর্থোপার্জনের জন্য অধিক লালায়িত হইয়া উঠিলেন অভিনব অজ্ঞাত রাজ্যের আবিষ্কার-কামনা, উদ্দেশে খৃষ্টধর্ম- প্রচারের প্রবল উৎসাহ, জলে স্থলে বিজয়গৌরবলাভের উন্মত্ত আকাঙ্ক্ষা কালক্রমে কথামাত্ৰে পৰ্যবসিত হইল। সকলেই অর্থোপার্জনের জন্য লালায়িত হইয়া উঠিলেন। প্রথমে ভারতবর্ষের লােক ফিরিঙ্গি কর্মচারিগণের গুপ্তবাণিজ্যের সহকারী হইয়া যাহা কিছু উপার্জন করিবার সুবিধা পাইত, কালে তাহাও দূরীভূত হইতে লাগিল। ফিরিঙ্গি রাজকর্মচারিগণ রাজা-প্রজাকে তুল্যরূপে প্রতারিত করিয়া, আত্মাধিকার প্রতিষ্ঠিত করিয়া লইলেন। ক্রমে রাজকীয় বাণিজ্যের লাভের অংশ অল্প হইতে লাগিল। অবশেষে ক্ষতি হইতেছে দেখিয়া, পর্তুগাল-রাজ যখন কারণানুসন্ধানে লিপ্ত হইলেন, তখন দেখিলেন,-কর্মচারিগণকে শাসন করা অসম্ভব হইয়া উঠিয়াছে ;-মন্ত্রিদল উৎকোচবশে রাজকৰ্ম্ম- চারিগণের ক্রীতদাস হইয়া উঠিয়াছেন। ইহার প্রতিকারসাধনের জন্য রাজা এক অভিনব উপায়ের উদ্ভাবনা করিতে বাধ্য হইলেন। রাজকোষ হইতে অর্থব্যয় করিয়া ভারত বাণিজ্যের কাৰ্য-পরিচালনা না করিয়া স্বদেশের ধনাঢ্যগণের “কোম্পানী” নামক সমিতিকে বাণিজ্যের অধিকারপত্র প্রদান করিয়া অর্থলাভের বাণিজ্য নীতি ১৪৫ চেষ্টা করিতে প্রবৃত্ত হইলেন। এইরূপে পর্তুগালেই কোম্পানী”র জন্ম হইল। কিন্তু তাহা সফল হইল না। যাহারা রাজাদেশ লাভ করিয়া, এইরূপে “কোম্পানী” নাম গ্রহণ করিয়া, ভারত-বাণিজ্যে অগ্রসর হইলেন, তাহারা লাভ করিতে পারিলেন না। পর্তুগালের শাসন-প্রণালী এরূপ বাণিজ্যের অনুকূল ছিল বলিয়া বােধ হয় না। দেশের লােকে কৃষি-শিল্পের ভার ক্রীত- দাসের উপর ন্যস্ত করিয়া, বাণিজ্য লইয়াই ব্যাপৃত হইয়া পড়িয়াছিল। অল্পসংখ্যক লােক এইরূপে ধনশালী হইবার পথ প্রাপ্ত হইলেও, দেশের অধিকাংশ লােকে ফললাভ করিত না। তাহারা নানা দুষ্কর্মে লিপ্ত হইয়া, স্বদেশে ঘৃণার পাত্র হইয়া উঠিয়াছিল। এই সকল লােকেই ভারতবর্ষে প্রেরিত হইত। তাহার উপযুক্ত বেতন প্রাপ্ত হইত না ; যে যাহা প্রাপ্ত হইত, তাহাতে গ্রাসাচ্ছাদনেরও সংকুলন হইত না। এই শ্রেণীর লােক ভারতবর্ষে আসিয়া, যে কোনও উপায়ে অর্থোপার্জন করিতে গিয়া, ফিরিঙ্গি-বণিকের সর্বনাশ সাধন করিতে সমুদ্যত হইল। এরূপ বাণিজ্য-নীতি দীর্ঘকাল জয়লাভ করিতে পারে না। ফলেও তাহাই হইল। বিশ্বাসই বাণিজ্যের জীবন। তাহা সম্পূর্ণরূপে তিরােহিত হইতে চলিল। ভারতবর্ষের লােকে ফিরিঙ্গি-বণিককে বিশ্বাস করিতে পারিল না ; পর্তুগালের রাজা তাহার কর্মচারিগণকে বিশ্বাস করিতে পারিলেন না; কর্মচারিগণও পরস্পরকে আর পূর্বের ন্যায় বিশ্বাস করিবার উপায় দেখিলেন না;—সকলই যেন ছত্রভঙ্গ হইয়া পড়িতে লাগিল। অবশেষে ভারত-প্রবাসী ফিরিঙ্গি সজ্জনগণ পর্তুগালের অধীশ্বরের নিকট আবেদনপত্র প্রেরণ করিয়া আর্তনাদ করিতে লাগিলেন -“রক্ষা কর-রক্ষা কর।” গােয়ানগরীর মহাধম্মাধিকার ও তদীয় সহকারিবৃন্দ ১৫৫২ খৃষ্টাব্দের ২৫ নভেম্বরের আবেদনপত্রে স্পষ্টাক্ষরে নিবেদন করিলেন,-“ভারতবর্ষে সুবিচার নাই; রাজপ্রতিনিধি ১৪৬ ফিরিঙ্গি-বণিক নিকটই হউক, আর রাজাজ্ঞা-পরিপালক রাজকর্মচারিবৃন্দের নিকটেই হউক, কাহারও নিকটেই সুবিচার লাভের আশা নাই। কোনও মুসলমানই আর পর্ভ গীজগণকে বিশ্বাস করে না। হে রাজাধিরাজ। আমরা ভিক্ষা চাহিতেছি,-কৃপা, কৃপা, কৃপা। রক্ষা কর, হে রাজাধি- রাজ ! রক্ষা কর, কারণ, আমরা ডুবিয়া যাইতেছি।” রাজা বহুদূরে অবস্থিত। তিনি রক্ষা করিতে পারিলেন না। যাহারা ক্ষুধার্ত ব্যাঘ্রের ন্যায় ভারতবর্ষে উপনীত হইতে লাগিল, তাহাদের উপদ্রবে সমগ্র খৃষ্টান সমাজের নামই কলঙ্কযুক্ত হইতে লাগিল। ফিরিঙ্গির নাম বিভীষিকার আধার হইয়া উঠিল ;-লােকে তাহাকে ভয় করিত বটে, কিন্তু কেহই ঘৃণা করিতে বিরত হইত না। + যে বাণিজ্য-নীতি কেবল আহােদর পূর্ণ করিবার জন্যই লালায়িত, তাহা কিছু দিন বিজয় লাভ করিতে পারিলেও, এক দিন না এক দিন পরাভূত হয়। সময় থাকিতে এই ঐতিহাসিক সত্যে আস্থাস্থাপন করিতে পারিলে, পর্তুগাল সহসা ভারত-বাণিজ্যের একাধিপত্য হইতে চিরবঞ্চিত হইত না। রাজা তাহা স্বীকার না করিয়া, স্বয়ং সকল লাভ আত্মসাৎ করিবার জন্য ব্যাকুল হইয়া উঠিয়াছিলেন ;-রাজকর্মচারিগণ তাঁহার অনুকরণ করিয়া আমােদর পূর্ণ করিবার জন্যই ব্যাকুল হইয়া . * In India there is no justice, either in your Viceroy, on in those who are to mete it out. * There is no Moor who will trust" a Portuguese. * Senhor,' we beg for mercy, mercy, mercy. Help us Senhor, help us ; for we are sinking.- Letter of the Judge and Aldermen" of Goa to the king, 25 November 1552. + The ravenous hordes thus let loose on India made the race name of Christian ( Firingi ) a word of terror,-until the strong rule of the Mughal Empire turned it into one of contempt.-Sir W. Hunter's History of British India. vol I-p-184.
বয়-হতা-পার-ফগার। ১ঃ বাণিজ্য-নীতি উঠিয়াছিলেন,-কেবল প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বীর অভাবেই ভারতসাগরে ফিরিঙ্গির আধিপত্য কোনরূপে আত্মরক্ষা করিতেছিল। এই সময়ে ভারতবর্ষের লােকে চেষ্টা করিলে, অল্পায়াসেই ফিরিঙ্গি-বণিককে তাড়িত করিতে পারিত। কিন্তু তখন তাহারা গৃহকলহে ব্যতিব্যস্ত,-ব্যক্তিগত স্বার্থচিন্তায় অবসরশুন্য! ফিরিঙ্গি-বণিকের রাজধানী গােয়ানগরী এই সকল কারণে নানা প্রকার অসৎ কাৰ্য্যের আধার হইয়া উঠিতে লাগিল। যাহা বাহ সম্পদে পর্তুগালের রাজধানী লিসান নগরীকে পরাভূত করিয়া দিয়াছিল, তাহার অভ্যন্তরে নরকের বীভৎস দৃশ্য উদ্ঘাটিত হইতে লাগিল। যে প্রবল শক্তি একদিন সন্ন্যাসী রাজকুমার হেল্পীর অপূর্ব আত্মত্যাগে ধীরে ধীরে প্রবুদ্ধ হইয়া উঠিয়াছিল, তাহা তাহার স্বদেশের অকর্মণ্য নরাধমদিগের আত্মসম্ভোগ-লালসায় যৌবনেই জরাজীর্ণ হইয়া পড়িতে লাগিল। - | এক যে সং, কাজ সপ্তদশ পরিচ্ছেদ ভােগাভিলাষ An Arsenal in ruins, palaces in ruins, quay-walls in ruins,-all in ruins ---Sir TV. Houard Russel. ফিরিঙ্গি-বণিকের যে ইতিহাসবিখ্যাত প্রাচ্য রাজধানীর ঐশ্বৰ্য্যগর্ব একদিন সমগ্র ইউরােপকে বিস্মিত ও ঈর্ষান্বিত করিয়া তুলিয়াছিল, তাহা একটি ক্ষুদ্র দ্বীপে অবস্থিত ছিল তাহার আয়তন পঞ্চক্রোশের অধিক ছিল না। কেবল প্রাকৃতিক সংস্থান-গুণেই এই ক্ষুদ্র দ্বীপ জগদ্ব্যাপী বিপুল বাণিজ্যের কেন্দ্রস্থলে পরিণত হইয়াছিল। এখন আর সে দিন নাই। সকলই ধীরে ধীরে ধ্বংসমুখে পতিত হইয়াছে। এখন নূতন ভাবে নূতন রাজধানী নির্মিত হইয়াছে। তথাপি পুরাতনের কথা ইতিহাস হইতে এখনও বিলুপ্ত হইয়া যায় নাই। এখনও পর্যটনপটু ভ্রমণকারিগণ তাহার ধ্বংসাবশেষ দর্শন করিবার জন্য কৌতূহল প্রদর্শন করিয়া থাকেন। কিন্তু এখন সে অন্ত্রশালা, সে প্রমােশালা,—সে ঐশ্বৰ্য্য-লীলাময় সৌধশােভা আর লােকলােচনের আনন্দবর্ধন করে না। এখন তাহা শশানের শােকচিহ্নে পৰ্য্যবসিত হইয়াছে। কি ছিল,—সমসাময়িক পর্তুগীজ ইতিহাসলেখকের গ্রন্থে তাহার বিস্তৃত বিবরণ দেখিতে পাওয়া যায়। পর্তুগীজ প্রাচ্য-বাণিজ্য- সাম্রাজ্যের গৌরবাস্পদ রাজধানী গােয়ানগরী সুদৃঢ় প্রাচীরবেষ্টিত ছিল । ছয়টি সুবৃহৎ কোষ্ট নগররক্ষাৰ্থ নির্মিত হইয়াছিল। এই নগর বৃহৎ, বহুজন পূর্ণ, এবং সুদৃঢ় বলিয়া সুপরিচিত ছিল। ইহা যে প্রাচ্য-বাণিজ্য- সাম্রাজ্যের রাজধানী বলিয়া গৰ্বপ্ৰকাশ করিত, তাহা যথার্থই গর্ব- ভােগাভিলাষ ১৮ প্রকাশের যােগ্য হইয়া উঠিয়াছিল। উত্তমাশা অন্তরীপ হইতে লােহিত- সাগরের প্রবেশপথ পর্যন্ত সে সাম্রাজ্যের প্রথম বিভাগ আফ্রিকা মহা- দেশের সমগ্র সমগ্ৰ পূৰ্ব্বোপকূলের উপর আধিপত্য বিস্তৃত করিয়াছিল। লােহিত-সাগরের প্রবেশপথ হইতে পারস্যোপসাগরের প্রবেশপথ পৰ্যন্ত সে সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় বিভাগ মােচা হইতে মস্কোট পৰ্যন্ত আরবসাগর- বেলার বাণিজ্য-বন্দরে প্রভুত্ব সংস্থাপিত করিয়াছিল ; ইউফ্রেটি সাগরসঙ্গমে অবস্থিত বসােরা বন্দর হইতে ক্যাম্বে উপসাগর পর্যন্ত সে সাম্রাজ্যের তৃতীয় বিভাগ পারস্য, বেলুচিস্থান ও সিন্ধুপ্রদেশের বন্দর- সমুহে আত্মশক্তি সম্প্রসারিত করিয়াছিল। ক্যাম্বে হইতে কুমারিকা- কুমারিকা হইতে গঙ্গাসাগর,–গঙ্গাসাগর হইতে সিঙ্গাপুর, সিঙ্গাপুর হইতে ভারতদ্বীপপুঞ্জ পৰ্যন্ত সে সাম্রাজ্যের অন্যান্য বিভাগ পর্তুগীজ বাণিজ্যের বিজয় দুন্দুভিনাদে মুখরিত হইয়া উঠিয়াছিল। পৃথিবীতে এত বৃহৎ বাণিজ্যক্ষেত্রে একাধিপত্য লাভ ফিরিঙ্গি-বণিকের ইতিহাসে সগৌরবে উল্লিখিত হইয়া রহিয়াছে। যাহা দীর্ঘকালে গঠিত হয়, তাহা অল্পকালেই ধ্বংসপ্রাপ্ত হইতে পারে। অভ্যুত্থান অপেক্ষা অধঃপতন কিছু অধিক দ্রুতবেগ লাভ করিয়া থাকে। পর্তুগালের পক্ষে তাহাই সংঘটিত হইবার সূত্রপাত হইল। চরিত্রহীনতাই তাহার একমাত্র কারণ বলিয়া ইতিহাসে প্রসিদ্ধি লাভ করিয়াছে। রাজধানী রক্ষার জন্য বিশেষ প্রয়াস স্বীকারের প্রয়ােজন ছিল সমুদ্র এবং সমুদ্রের খাড়ি দুর্গ-পরিখার ন্যায় নগররক্ষা করিত, নৌসমরকুশল নাবিকবর্গ অল্পসংখ্যক রণপােতের সাহায্যে আক্রমণ-পথ অবরুদ্ধ করিয়া করিয়া রাখিত। নগর আক্রান্ত হইবার আশঙ্কামাত্রও – Taria de Sonsa's Asia Portuguesa, vol III.
ফিরিঙ্গি-বণিক তিরােহিত হইয়া গিয়াছিল। যাহারা একদা সুযােগ পাইবামাত্র আক্ৰমণ করিতে সাহস করিত, সেই বীরবংশােদ্ভব হিন্দুমুসলমান ফিরিঙ্গির দাসত্ব গ্রহণ করিয়া, কায়ক্লেশে জীবিকার্জন করিতে অভ্যস্ত হইয়া উঠিয়াছিল। যে সকল অর্ণবপােত সহসা সাগরগর্ভ হইতে সমুখিত জলদৈত্যের ন্যায় পক্ষ বিস্তার করিয়া বন্দরাভিমুখে অগ্রসর হইত, তাহাদিগের সমুন্নত পতাকারাজি পর্তুগালের বাণিজ্য-সাম্রাজ্যেরই বিজয় ঘােষণা করিত। এক দিকে অতুল ঐশ্বৰ্য্য, অন্য দিকে অসীম প্রতাপ এবং অকুতােভয় অধিষ্ঠান ফিরিঙ্গি-বণিকের বিলাস-বাসনা বর্ধিত করিয়া তুলিতেছিল। সেকালে ইউরােপের সম্মুখে যে ভােগাভিলাষের আদর্শ বর্তমান ছিল, তাহা প্রাচ্য আদর্শ বলিয়া কথিত হইত। কেবল ইউরােপ কেন, এসিয়ার অন্যান্য দেশেও ভারতবর্ষের বাহাড়ম্বরের অনুকরণ-লালসা প্রবল হইয়া উঠিয়াছিল। সওদাগরগণ ভােগাভিলাষের অনুকূল বহুমূল্য পণ্য- সম্ভার পুঞ্জীকৃত করিয়া, ইউরােপের ভােগাভিলাষ প্রবল করিয়া তুলিয়াছিল। ইউরােপের কিয়দংশে মুসলমান-শাসন প্রবর্তিত হইবার পর, ক্রমে ক্রমে সমগ্র ইউরােপ ভােগাভিলাষে অধিক উন্মত্ত হইয়া উঠিতেছিল। ঐশ্বৰ্য্যলাভ করিতে পারিলেই ইউরােপীয়গণ ভারতীয় হাবভাবের অনুকরণ করিতে ইতস্তত করিতেন না। তথন হারা ভারতবর্ষের নামে নাসিকা কুঞ্চিত করিতেন না; তাহাকে ভূস্বর্গ ভাবিয়া তাহার দিকে ধাবিত হইবার জন্যই আগ্রহ প্রকাশ করিতেন। ক্ষুদ্র রাজ্য পর্তুগাল ভারত-বাণিজ্যে অসীম ঐশ্বৰ্য লাভ করিয়া ভােগাভিলাষী হইবামা, শারীরিক শ্রমে বিরত হইয়াছিল কৃষিশিল্পের অনুশীলনভার ক্রমে ক্রমে ক্রীতদাসগণের উপরেই ন্যস্ত হইয়া পড়িয়াছিল। যাহারা কষ্টসহিষ্ণু, পরিশ্রম-নিপুণ বীরজাতি বলিয়া পরিচিত ছিল, তাহারা নবাবী করিবার জন্য লালায়িত হইয়া তােগাভিলাষ - উঠিবামা, সকলেই ঐশ্বৰ্য্য বিকাশের বাহাড়ম্বরকে মানবজীবনের পরম পুরুষার্থ ভাবিয়া, প্রাণপণে ঐশ্বৰ্য্য-সঞ্চয়ে যত্নশীল হইয়াছিল। গােয়া নগরীতে ইহা বিশেষভাবেই পরিস্ফুট হইয়া উঠিয়াছিল। নাগরিকগণের উচ্চ অট্টালিকা রাজপ্রাসাদকে লজ্জিত করিতে আরম্ভ করিল। রাজপথপাশ্বে যে সকল প্রমােণশালা নির্মিত হইতে লাগিল, তাহার অভ্যন্তরাগত অট্টহাস্তে দিঙ মণ্ডল প্রতিধ্বনিত হইতে আরম্ভ করিল। জনসমাজ প্রকাশ্যভাবেই প্রাচ্য হাবভাব প্রকাশিত করিয়া, প্রাচ্যের অনুকরণে বসন-ভূষণের আড়ম্বর প্রকাশে অভ্যস্ত হইয়া উঠিল। নাতিশীতােষ্ণ সমুদ্রবেলা কি এক অলৌকিক মােহ- মদিনায় নরনারীকে নিয়ত আবিষ্ট করিয়া রাখিতে আরম্ভ করিল,- তাহার কথা বিবিধ কাব্যে পুনঃ পুনঃ বর্ণনা করিয়াও, ফিরিঙ্গি-কবির রচনা-লালসা নিরস্ত হইতে পারিল না। চিরবসন্তের চিত্তমনােহর চপল সৌন্দৰ্য্য নরনারীকে যে পথে আকর্ষণ করিল, তাহার আলােচনা করিতে গিয়া, ইউরােপীয় ইতিহাস লেখকগণ লজ্জায় অপােবন হইয়া থাকেন। গৃহমধ্যে পর্তুগীজ স্ত্রীপুরুষ অধিক বসন ভূষণের ব্যবহার করিতেন না, বালক-বালিকারাও উলঙ্গ দেহেই গৃহপ্রাঙ্গণে ক্রীড়া করিয়া বেড়াইত। কিন্তু রাজপথে বাহির হইতে হইলে, আড়ম্বরের অবধি মহিলার্গ দোলায়ােহণে বহির্গত হইতেন; তাহাদের পরিচ্ছদের এবং দোলার আবরণবস্ত্রের চাকচিক্যে রাজপথ ঝলমল করিয়া উঠিত। সঙ্গে সঙ্গে বহুসংখ্যক সুসজ্জিত দাসদাসী পদব্রজে অনুগমন করিত। বসন-ভূষণে কেবল বসন-ভূষণে কেবল স্বর্ণ রৌপ্য মণিমাণিক্যের ছড়াছড়ি,-তাহার উপর সুচিক্কণ উত্তরীয় বিস্তৃত করিয়া, ফিরিঙ্গি সুন্দরীগণ হাস্তে লাস্যে আশােত উদ্ভাসিত করিয়া তুলিতেন। নগ্ন চরণপ্রান্তে মণিমাণিক্য-খচিত বিচিত্র পাদুকা ঐশ্বৰ্য্য বিকাশের থাকিত না।
ফিরিঙ্গি-বণিক অলৌকিক আড়ম্বর বিকশিত করিয়া তুলিত। পুরুষগণ অশ্বারােহণে বাহির হইতেন ; সঙ্গে সঙ্গে আশা সেটা ছত্র চামরাদি ধারণ করিয়া, ভৃত্যগণ তাহাদিগের অনুগমন করিত। যাহারা নিতান্ত নিধন, তাহারাও সমরক্ষাৰ্থ নিতান্ত পক্ষে একজন ছত্রধর ভাড়া করিয়া দেখিলে মনে হইত, প্রত্যেক ফিরিঙ্গি যেন এক একটি লইত। ক্ষুদ্র নবাব ! রমণীগণকে অন্তঃপুরে রাখিয়া, পুরুষগণ নিরন্তর বাহিরে বাহিরে প্রমােশালায় বিলাসবাসনা চরিতার্থ করিতে অভ্যস্ত হইয়া, পশুত্বের দিকে অগ্রসর হইতে লাগিল। স্বামিসহবাসে বঞ্চিত। অন্তঃপুরচারিণী রমণীগণ নারীধৰ্ম্মের মর্যাদা রক্ষার্থ উৎসাহ লাভ করিতে পারিল না। ধৰ্ম্ম কৰ্ম্ম ভাসিয়া গেল ; তাহা কেবল প্রথারক্ষার্থ ভজনালয়কে অধিক আড়ম্বরপূর্ণ করিয়া তুলিতে লাগিল। সেকালের পর্যটকগণ গােয় নগরীর যে সকল বিলাস-ব্যসনের বর্ণনা লিপিবদ্ধ করিয়া গিয়াছেন, তাহা পাঠ করিতে করিতে শিহরিয়া উঠিতে হয়। পুরুষের একাদিক্রমে বহুদিন পর্যন্ত আমােদশালায় সময় অতিবাহিত করিতেন; পরিত্যক্তা পরিণীতাগণ অন্তঃপুরে বসিয়া, তাহারই প্রতিশােধ লইবার ব্যবস্থা উদ্ভাবিত করিতেন। তাহারা কখন কখন স্বামীকে ঔষধপ্রয়ােগে অচেতন রাখিয়া, তাহার সমক্ষে তাহারই শয্যাকক্ষের অবমাননা করিতেও কুণ্ঠিত হইতেন না ! মানব কতদূর পর্যন্ত দানব হইতে পারে, গােয়া নগরী তাহারই প্রদর্শনী-ক্ষেত্রে পরিণত হইতে লাগিল। : The travellers who visited Goa during its prime tell strange tales of the hardihood with which the Portuguese matrons pursued their amours,-not scrupling to stupify the husband with drugs, and admitting the paramour into his chamber.-Sir, W. Hunter's History of British India, vol l-p. 157.
ভােগাভিলাষ এই সকল কারণে ফিরিঙ্গির নাম ভারতবর্ষের সকল স্থানেই’ বিভীষিকার আধার হইয়া উঠিতে লাগিল। লােকে ফিরিঙ্গির নামে এখনও যে সকল কাহিনীর আলােচনা করিয়া থাকে, তাহা সম্যক লিপিবদ্ধ করিবার উপায় নাই। স্বদেশ হইতে বহুসহস্র যােজন দূরে আসিয়া, আশাতীত অসীম ঐশ্বর্যের সন্ধান লাভ করিবামাত্র, এইরূপে ফিরিঙ্গি-বণিকের অধঃপতনের সূত্রপাত হইল। ভারতবর্ষে ফিরিঙ্গি-সেনার সংখ্যা কখনই অধিক ছিল না। অধিক সেনাবলের প্রয়ােজন অনুভূত হইবামাত্র, ফিরিঙ্গি-বণিক ভারতবর্ষের অধিবাসিগণকে সেনাদলে গ্রহণ করিয়া, শিক্ষাদান করিতে বাধ্য হইয়া- ছিলেন। ইহারাই জলে-স্থলে ফিরিঙ্গি-বণিকের বাণিজ্যের এবং বিজয়- গৌরবের প্রধান রক্ষক হইয়া উঠিয়াছিল। ফিরিঙ্গির সংসারে ক্রীতদাসের প্রাধান্য ছিল। তাহারা ভারতবর্ষে আসিয়াও বহুসংখ্যক ক্রীতদাস প্রতিপালিত করিতেন। ক্রীতদাসের মধ্যে অনেকে গৃহকাৰ্যে নিযুক্ত ছিল, কেহ কেহ সেনাদলেও প্রবেশ লাভ করিয়াছিল। তাহাদের হস্তে রাজ্যরক্ষার ভার ন্যাস্ত করিয়া, ফিরিঙ্গি-বণিক যখন আলস্যে ও বিলাসে অভিভূত হইয়া, নবাবী করিতে প্রবৃত্ত হইলেন, ঠিক সেই সময়ে ইউরােপের ইতিহাসে এক যুগান্তরের সূত্রপাত হইল। ইউরােপ ধীরে ধীরে জাগিয়া উঠিতেছিল। সে জাগরণের মূলে ভারতবর্ষের প্রভাবই প্রচ্ছন্নভাবে বর্তমান ছিল। ভারত-বাণিজ্যে আধি- পত্যলাভ সেকালের ইউরােপের পক্ষে ঐশ্বৰ্য্যলাভের একমাত্র পথ বলিয়া পরিচিত হইয়া উঠিয়াছিল। সেই পথে ধাবিত হইবার জন্য সকল জাতিই সমানভাবে লালায়িত হইয়া উঠিয়াছিল। পৰ্তুগালরাজ ভারত-বাণিজ্যের জলপথ অধিকার করিয়া ভারত- সাগরে প্রাধান্য লাভ করিলেও, কেবল বাহুবলে সে প্রাধান্য দীর্ঘকাল এই সকল উত্তর সমুদ্রপথে ফিরিঙ্গি বণি রক্ষা করিবার উপযুক্ত শক্তিশালী ছিলেন না। ইউরোপের যে কোনও জাতি বাহুবলে তাহাকে অচিরাং উৎখাত করিতে পারিত। পােপের শাসন-লিপিই তাহাকে প্রাধান্য স্থাপন ও প্রাধান্য সংরক্ষণে সহায়তা করিয়াছিল। যতদিন পােপর শাসনলিপি লঙ্ঘন করিবার সাহসের অভাব ছিল, ততদিন ইউরােপীয় জনসমাজ উত্তমাশা অন্তরীপের পথে একমাত্র পর্ত- গালেরই অবিসম্বাদিত অধিকার থাকা স্বীকার করিয়া লইয়া অন্য পথে ভারতবর্ষে উপনীত হইবার বিবিধ চেষ্টায় ব্যাপৃত হইয়াছিল। সে চেষ্টা সফল হইল না। পশ্চিম সমুদ্রপথে ক্রমাগত পশ্চিমাভিমুখে পােত চালনা করিয়া ভারতবর্ষে উপনীত হইবার চেষ্টা আমেরিকার আবিষ্কার সাধন করিয়াই আপাততঃ নিরস্ত হইতে বাধ্য হইয়াছিল। পােতচালনা করিয়া ভারতবর্ষে উপনীত হইবার চেষ্টা বহুলােকের অকালমৃত্যুর কারণ হইয়াছিল। এই সকল চেষ্টা বর্তমান থাকিতেও পর্তুগালের বাণিজ্যাধিকার বিলুপ্ত হয় নাই। ইউরােপের অন্যান্য দেশের লােক পর্তুগাল হইতেই ভারতীয় পণ্যদ্রব্য ক্রয় করিয়া স্বদেশে বিক্রয় করিত, এবং সেই সংকীর্ণ বাণিজ্যের যৎসামান্য লাভ পাইয়া পরিতৃপ্ত থাকিতে বাধ্য হইত ;-পােপর শাসন লঘন করিয়া উত্তমাশা অন্তরীপের পথে ভারত-যাত্রার আয়ােজন করিবার কল্পনামাত্রও উৎসাহলাভ করিত না। ভারতবর্ষ কোথায় ? এই চিন্তায় একদিন সমগ্র ইউরােপে যে প্রবল অনুসন্ধিৎসা প্রবুদ্ধ হইয়া উঠিয়াছিল, পর্তুগালের কৃপায় সে ৗতূহল পরিতৃপ্ত হইয়াছিল। পর্তুগাল হইতে দলে দলে ফিরিঙ্গি- বণিক ভারতবর্ষে গমন করিত, আবার তাহারা দলে দলে পর্তুগালে প্রত্যাবৃত্ত হইয়া আলৌকিক ঐশ্বৰ্য-বিস্তারে ইউরােপীয় জনসমাজকে বিস্ময়াবি করিত। সুতরাং ভারতবর্ষ কোথায় এবং তদ্দেশে যাতায়াতের ভােগাভিলাষ ; উপায় কি, তাহা কাহারও অপরিজ্ঞাত ছিল না। কিন্তু পােপের অলঙ্ঘ্য শাসনে একমাত্র পর্তুগাল ভিন্ন অন্য কোনও খৃষ্টান দেশের পক্ষে সে পথে ভারতবর্ষে যাতায়াত করিবার অধিকার ছিল না। তখন অন্য পথের চিন্তা—অন্য পথের আবিষ্কার-কামনা উত্তরােত্তর অধিক প্রবল হইয়া উঠিতেছিল। ইউরােপের অন্যান্য দেশের লােক যখন এই কামনায় অকাতরে অর্থ- ব্যয় করিয়া দরিদ্র হইয়া পড়িতেছিল, পৰ্ত্ত গাল তখন ভারতবাণিজ্যের একাধিপত্যের সম্ভোগে ও ঐশ্বৰ্য্যগৰ্বে সমগ্র ইউরােপে সর্বাপেক্ষা অধিক ধনশালী বলিয়া পরিচিত হইয়া উঠিয়াছিল। পর্তুগাল বৃহৎ রাজ্য হইলে, অন্যান্য রাজ্যের লােকে নিরস্ত হইতে বাধ্য হইত। পর্তুগাল ক্ষুদ্র রাজ্য ; কেবল পােপের পদমর্যাদার কাল্পনিক বিভীষিকাই তাহাকে মৰ্যাদা দান করিতেছিল। তাহাকে মানিয়া লইয়া অন্য পথে তারত-বাণিজ্যে অংশলাভ করা, এবং তাহাকে অগ্রাহ্য করিয়া ভারত- বাণিজ্যে আত্মপ্রতিষ্ঠা সংস্থাপিত করা, প্রায় একই সময়ে ইউরােপের অন্যান্য দেশের লােকের চিত্তক্ষেত্র আন্দোলিত করিয়া তুলিতেছিল। যুগে এই যুগান্তরের সূত্র পাত হইতেছিল, সে যুগে পর্তুগালের অধীশ্বর এবং পােপ তুল্যরূপেই তাহার প্রতি অনাস্থা প্রকাশিত করিয়া নিশ্চিন্ত হৃদয়ে কালযাপন করিতেছিলেন। যাহারা এইরূপে সমগ্র ইউরােপে এক অজ্ঞাতপূর্ব উত্তেজনার সৃষ্টি করিয়া যুগান্তর আনয়নের কারণ হইয়া উঠিয়াছিল, সেই পতুগীজগণ বিলাসাতিশয্যে অল্পদিনের মধ্যেই অবসন্ন হইয়া পড়িতে লাগিল। তাহা- দিগের দিগ্বিজয় আর অধিকদূর অগ্রসর হইবার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করিল তাহাদের বীরকীৰ্ত্তি আর যথাযােগ্য উৎসাহ লাভ করিতে পারিল না ; তাহাদের সকল চিন্তা কেবল সম্ভোগের অভিনব উপায় উদ্ভাবনের জন্যই তন্ময় হইয়া পড়িল। ;
ফিরিঙ্গি-বণিক ভারতবর্ষও এই যুগ-সন্ধিকালে নিতান্ত অবসন্ন হইয়া পড়িয়াছিল। তাহার রাজশক্তি শিথিল এবং বাণিজ্যশক্তি অন্তর্হিত হইয়া গিয়াছিল ; তাহার অধ্যবসায় কেবল রাষ্ট্রবিপ্লবের অবসরে নিত্য নূতন রাজ্য গঠনের জন্যই ব্যগ্র হইয়া উঠিয়াছিল। পাঠানশক্তি খসিয়া পড়িতেছে ; মােগল- শক্তি ভাল করিয়া প্রতিষ্ঠালাভ করিতে পারে নাই; এইরূপ যুগসন্ধি কালে ভারতবাসিগণ স্বার্থসাধনের আপাতরম্য প্রলােভনে প্রলুব্ধ হইয়া জাতিগত স্বার্থ বিস্মৃত হইয়া গেল। সেকেন্দার শাহ এসিয়াভিমুখে দিগ্বিজয়ে ধাবিত হইবার সময়ে সমগ্র এসিয়াকে গ্রীকদেশের অনুকরণে গঠিত করিয়া তুলিবার সংকল্প করিয়া- ছিলেন। তঁাহার সে সংকল্প অঙ্কুরেই বিনষ্ট হইয়া গিয়াছিল। এসিয়া গ্রীকবেশ ধারণ করে নাই ;-বরং গ্রীকদেশেই নানা বিষয়ে এসিয়ার ভাব প্রভাব বিস্তৃত করিবার সুযােগ লাভ করিয়াছিল। ফিরিঙ্গি-বণিক ভারতবর্ষে রাজধানী সংস্থাপিত করিয়া, ভারতবর্ষে ফিরিঙ্গি প্রভাব দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত করিবার আশায়, এক অভিনব উপায় অবলম্বন করিতে প্রবৃত্ত হইলেন। ভারতবর্ষের নিম্নশ্রেণীর রমণীগণের সহিত ফিরিঙ্গি-সেনার বিবাহের ব্যবস্থা প্রচলিত হইল। রাজা তাহাতে উৎসাহ দান করিবার অভিপ্রায়ে নবদম্পতীর কল্যাণ কামনায় রাজকোষ হইতে বিবাহের ব্যয় নির্বাহের ব্যবস্থা করিয়া দিলেন। কিন্তু ইহাতে হিতে বিপরীত হইল। নিম্নশ্রেণীর রমণীগণের সংসর্গে আসিয়া, ফিরিঙ্গি-সেনা দিন দিন অধিক অধােগতি লাভ করিতে লাগিল। তাহাদের সন্তান-সন্ততি স্বেচ্ছাচার- পরায়ণ হইয়া, ফিরিঙ্গির নাম অধিকতর ঘৃণাস্পদ করিয়া তুলিল। যাহা বহু অধ্যবসায়ে গঠিত হইয়াছিল, তাহা বিলাস-তরঙ্গে ভাসিয়া যাইতে লাগিল; কেহ কেহ তাহার জন্য আৰ্তনাদ করিতে লাগিলেন ; কিন্তু কেহই তাহার গতি বােধ করিতে পারিলেন না। যতদিন বাণিজ্য-ব্যাপারে রাজার লাভ অধিক ছিল, ততদিন সেনাদল ভােগাভিলাষ যথাসময়ে বেতন প্রাপ্ত হইত। রাজার লাভ সঙ্কুচিত হইবামাত্র বেতন-প্রাপ্তির অসুবিধা ঘটিতে লাগিল। তখন তাহারা আর কি করিবে? কেহ ভারতবাসীর নিকট বন্দুক বিক্রয় করিয়া, কেহ বা সুযােগ প্রাপ্ত হইবামাত্র দেশ লুণ্ঠনে প্রবৃত্ত হইয়া, কেহ দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা করিয়া অন্নসংস্থান করিতে বাধ্য হইল। যাহারা এইরূপে রাজকাৰ্য পরিত্যাগ করিতে বাধ্য হইল, তাহাদের সন্তানসন্ততির দুর্দশার অবধি রহিল না। এইরূপে গােয়া নগরী এক দিকে ঐশ্বৰ্য গর্বে উন্মত্ত, অন্য দিকে দুঃখদৈন্যে অভিভূত হইয়া পড়িল। যাহারা ধনী, তাহারা ধনাতিশয্য,যাহারা দরিদ্র, তাহারা ধনাভাবে ধৰ্ম্মজ্ঞানশূন্য ;-সুতরাং সমগ্র রাজধানী ধৰ্ম্মজ্ঞানশূন্য হইয়া উঠিল। ফিরিঙ্গি-বণিকের অধীনে নিয়ােগ প্রাপ্ত হইয়া যে সকল ভারতীয় সেনা ফিরিঙ্গির দিগ্বিজয় সাধনের সহায়তা করিয়াছিল, তাহাদের মধ্যেও কেহ কেহ ধনশালী হইয়া উঠিয়াছিল। যাহারা এইরূপে ধনশালী হইবার সুযােগ লাভ করিয়াছিল, তাহারা ফিরিঙ্গির বিলাস-লালসার অনুকরণ করিতে শিক্ষা করিয়াছিল। যাহারা নিধন অবস্থায় রাজদত্ত সামান্য বেতনের বা লুণ্ঠনের লােভে সেনাদলে নিয়ােগ লাভ করিতেছিল, তাহারা উজ্জ্বল হইয়া উঠিতে লাগিল। শৌর্যে বীর্যে সমর-কৌশলে এই সকল ভারতীয় সেনা সৰ্বাংশেই ফিরিঙ্গি সেনার সমকক্ষ হইয়া উঠিয়াছিল ; * কিন্তু ইহাদের প্রভুভক্তি বা সমরকৌশল ইহাদিগকে রক্ষা করিতে পারিল না। ইহারাও ছত্রভঙ্গ হইয়া পড়িতে লাগিল। ; Certify to your Highness that they are as good as our.- Petro de Faria's letter 18 January 1522.
১৫৮ ফিরিঙ্গি-বণিক যে নৌ-সেনাবল ফিরিঙ্গি-বণিকের প্রবল সহায় বলিয়া পরিচিত ছিল, তাহাও দিন দিন দুৰ্বল হইয়া পড়িতে লাগিল। পােতাধ্যক্ষগণ বাণিজ্য-ব্যাপারে অর্থোপার্জন আশায় বন্দরে বন্দরে যাতায়াত করিয়া, সমগ্র নৌ-সেনাকে বাণিজ্যলুব্ধ করিয়া তুলিলেন। তাহারাও বিলাসের স্বাদ প্রাপ্ত হইয়া, ধীরে ধীরে নাগরিকগণের সমকক্ষ হইয়া উঠিল।
অষ্টাদশ পরিচ্ছেদ প্রতিদ্বন্দ্বী The Portuguese soon found that they had other rivals in the East than the Turk.- Sir W. Hunter. এক সময়ে মুসলমানেরাই ফিরিঙ্গি-বণিকের একমাত্র প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী বলিয়া পরিচিত ছিল। তাহারা যথাসাধ্য ফিরিঙ্গি-বণিকের ভারত-বাণিজ্যের গতিরােধের চেষ্টা করিয়াছিল ;-পদে পদে পরাভূত হইয়াও, ফিরিঙ্গি-দলনের সংকল্প সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাগ করে নাই। কিন্তু ভারতবাণিজ্যে ফিরিঙ্গি-বণিকের একাধিপত্য দিন দিন যেরূপ প্রবল হইয়া উঠিতেছিল, তাহাতে মুসলমানের পক্ষে সহসা বিজয়লাভের সম্ভাবনা ছিল না। ফিরিঙ্গি-বণিক রাজ্যবিস্তৃত করিয়া, রাজধানী সংস্থাপিত করিয়া, রাজ-দুর্গে জলস্থল সুরক্ষিত করিয়া, ভারত-বাণিজ্যের সর্বময় প্রভু হইয়া উঠিয়াছিলেন। তাহাদের অভ্যুদয়ে বাধাপ্রদানে অশক্ত হইয়া, মুসলমানগণ ক্রমে ক্রমে নিরুদ্যম হইয়া পড়িয়াছিল। কিন্তু ইউরােপের অন্যান্য দেশে আর এক শ্রেণীর প্রতিদ্বন্দ্বী ধীরে ধীরে প্রবল হইয়া উঠিতেছি। পৃথিবীর আকার কিরূপ,-তাহার প্রকৃত তথ্য অধিক দিন প্রাচ্য- সমাজের অপরিজ্ঞাত ছিল না। স্মরণাতীত পুরাকাল হইতে বৃহৎ বাহজগতের বিবিধ বৃহৎ পদার্থের সহিত পরিচিত হইবার সুযােগলাভ করিয়া, প্রাচ্যসমাজ জলে স্থলে অন্তরীক্ষে বিবিধ বৈজ্ঞানিক সত্য পৰ্যবেক্ষণ করিয়া সর্বাগ্রে পৃথিবীর গােলত্ব স্বীকার করিয়া লইয়াছিল। কিন্তু পাঁচশত বৎসর পূর্বেও এ বিষয়ে ইউরােপে অজ্ঞতার অভাব ছিল না। পৃথিবীর গােলত্বে ইউরােপীয় খৃষ্টান সমাজ কিছুমাত্র আস্থাস্থাপন ১৬০ ফিরিঙ্গি-বণিক করিত না। যাহারা ভূমধ্যসাগরের স্থলবেষ্টিত জলপথে ক্ষেপনী-সঞ্চালনে তরণী-চালনা করিয়া, উপকূল-প্রদেশের বাণিজ্য-ব্যাপার লইয়াই পরিতৃপ্ত ছিল,-সাহস করিয়া মহাসাগরে পােতচালনা করিতে অগ্রসর হইত না,—তাহাদের পক্ষে পৃথিবীর গোলত্বে আস্থাস্থাপন করিবার কারণ উপস্থিত হইত না। কেবল পর্তুগাল যখন সীমান্ত মহাসাগর-পথে বাণিজ্য-যাত্রায় বহির্গত হয়, তখন কে কোন পথে গমন করিবে, তদ্বিষয়ে কলহের আশঙ্কা উপস্থিত হইবামাত্র, শান্তিসংস্থাপন-লালসায় ধৰ্মচাৰ্য্য পােপ শাসনলিপি প্রচারিত করিয়া, দুই প্রতিদ্বন্দ্বীর জন্য দুইটি পৃথক্ সমুদ্রপথ নির্দিষ্ট করিয়া দিয়াছিলেন। তদনুসারে দক্ষিণ-পশ্চিম সমুদ্রপথে স্পেন, এবং দক্ষিণপূর্ব সমুদ্রপথে পর্তুগাল, চিরস্থায়ী বাণিজ্যযাত্রার অধিকার লাভ করিয়াছিল। একের পথে অন্যের পােত-চালনার অধিকার ছিল না; এবং স্পেন-পর্তুগাল ভিন্ন অন্য কোনও দেশের পক্ষে এই এই দুইটি সমুদ্রপথের কোনও পথেই প্রবেশাধিকার স্বীকৃত হইত না। একজন নিয়ত পশ্চিমাভিমুখে, আর একজন নিয়ত পূৰ্বাভিমুখে পােত- চালনা করিতে থাকিলে, কাহারও সহিত কাহারও কোনকালেও সংঘর্ষ উপস্থিত হইবার আশঙ্কা থাকিবে না, এইরূপ ধারণার বশবর্তী হইয়াই পােপ তাহার সুবিখ্যাত শাসনলিপি প্রচারিত করিয়াছিলেন ; স্পেন এবং পর্তুগালও ইহাতে উৎফুল্ল হইয়া, নির্দিষ্ট সমুপথে পােত- চালনায় ব্যাপৃত হইয়াছিল। পােপের এই ভ্রান্ত ধারণা-প্রসূত শাসন- লিপিতে তৎকালের খৃষ্টান সমাজের অজ্ঞতা পরিস্ফুট হইয়া রহিয়াছে। স্পেন-পর্তুগাল একটু অধিকদূর অগ্রসর হইলেই, পরস্পরের উপর আপতিত হইবে,আবার কলহ কোলাহলে খৃষ্টান সমাজের অকল্যাণ উপস্থিত হইবে,–এরূপ আশঙ্কা তৎকালে কাহারও হৃদয়ে স্থানলাভ করিতে পারে নাই। পােপের শাসনপত্রে উত্তর সমুদ্র পথের উল্লেখ প্রতিদ্বন্দ্বী ১৬১ ছিল না। সে পথে স্পেন-পৰ্ত্ত গালের অগ্রসর হইবার অধিকার ছিল । সুতরাং ইউরােপের অন্যান্য উদ্যমশীল খৃষ্টান-সমাজ পূর্ব-দক্ষিণ ও পশ্চিম-দক্ষিণ সমুদ্রপথ পরিত্যাগ করিয়া, উত্তর-পূৰ্ব্ব ও উত্তর-পশ্চিম সমুদ্রপথেই ধাবিত হইতে আরম্ভ করিয়াছিল। এই দুইটি অবারিত সমুদ্রপথে ভারতবর্ষে উপনীত হইয়া, ভারত-বাণিজ্যে লাভবান হইবার আশায়, ওলন্দাজ, ফরাসী এবং ইংরেজ অধ্যবসায়ের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করিতেছিল। পুনঃ পুনঃ প্রতারিত হইয়াও, পুনঃ পুনঃ বিজয়লাভের লুব্ধশ্বাসে এই সকল উদ্যমশীল জাতি অকাতরে জীবন বিসর্জন করিতেছিল;-একদল পরাভূত হইবামাত্র, অন্যদল ছুটিয়া বাহির হইতেছিল ! ভিনিসীয় বণিকগণ প্রাচ্য বাণিজ্যের চিরপরিচিত পুরাতন পথ পরিত্যাগ করিয়া, অভিনব পথের আবিস্কার সাধনের জন্য কিছুমাত্র ব্যাকুলতা প্রকাশিত করে নাই। তাহার লােহিত সাগরের পথে ভারত-বাণিজ্যে অধিকার লাভের আশায়, খ্রীষ্টান হইয়াও মিশরের মুসলমান সুলতানের সহিত যােগদান করিয়া, পর্তুগীজগণের অনিষ্ট সাধনের চেষ্টা করিতেছিল। সে চেষ্টা সফল হয় নাই ; কিন্তু তাহার জন্য সময়ে সময়ে তিনিসীয়গণের বিরুদ্ধে পােপের নিকট অভিযােগ উপস্থিত হইতেছিল। ভিনিসীয়-মিসরীয় চক্রান্তে যে ফিরিঙ্গি-বণিকের প্রকৃত আশঙ্কার কারণ বর্তমান ছিল না, তাহা সকলকেই স্বীকার করিতে হইয়াছিল। যতদিন ইউরােপীয় খৃষ্টান-সমাজে খৃষ্টধর্মাচার্যের শাসনলিপির মৰ্যাদা অক্ষুঃ ছিল, ততদিন অন্য কোনও খৃষ্টান প্রতিদ্বন্দ্বীর পক্ষে ভারত-বাণিজ্যে অধিকার বিস্তৃত করিবার কোনরূপ সম্ভাবনা বর্তমান ছিল না। কেবল স্পেনের পক্ষে ক্রমাগত পশ্চিমাভিমুখে পােতচালনা করিতে করিতে ভারতবর্ষে উপনীত হইবার যে সম্ভাবনা ছিল, তাহা ;
১৬২ ফিরিঙ্গি বণিক সম্ভাবনামাত্র। সে পথ নিতান্ত দুর্গম ; তাহাভে অগ্রসর হইবার জন্য স্পেনরাজ্যের বিশেষ আগ্রহ পরিলক্ষিত হইত না। যাহারা উত্তর-পূৰ্ব্ব ও উত্তর-পশ্চিম সমুদ্রপথে ভারতবর্ষে উপনীত হইবার জন্য ব্যর্থচেষ্টায় শক্তিক্ষয় করিতেছিল, তাহাদের চেষ্টা যে কখনও সফল হইবে, তাহাতে কেহই আস্থাস্থাপন করিতে সাহস পাইত না। সে পথের যে সকল কাহিনী ইউরােপে প্রচারিত হইতেছিল, তাহাতে সকলেই বুঝিয়াছিল— মেরুমণ্ডলের চিরতুষারাবৃত বন্ধুর পথে ভারতবর্ষে উপনীত হইবার সম্ভাবনা থাকিলেও তাহা কার্যে পরিণত হইবার সম্ভাবনা নাই। এই সকল কারণে, ফিরিঙ্গি-বণিক নিরুদ্বেগেই ভারতবর্ষে নবাবী করিতে প্রবৃত্ত হইয়াছিলেন। যাহারা আদ্যন্ত সকল অবস্থার বিচার করিয়া দেখিত, তাহার সকলেই একবাক্যে স্বীকার স্বীকার করিত,—ফিরিঙ্গি-বণিকের প্রাচ্য- বাণিজ্যাধিকার যাবচ্চন্দ্রদিবাকর অক্ষুন্ন প্রতাপে বৰ্তমান থাকিবে। তাহা যে কখনও শিথিল হইতে পারে, তাহা যে কখনও ফিরিঙ্গি-কবল হইতে ঋলিত হইয়া পড়িতে পারে,-তাহা যে কখনও অন্য কোনও প্রতিদ্বন্দ্বীর সৌভাগ্যবর্ধন করিতে পারে,-পৰ্ত্তগীজ ইতিহাস-লেখকগণ একদিনের জন্য স্বপ্নেও তাহার কল্পনা করিতে পারিতেন না। তাঁহাদিগের বিশেষ অপরাধ ছিল না। তৎকালের সমগ্র সভ্যসমাজের সকল প্রকার অবস্থা পর্যালােচনা করিলে, সকলকেই ইহা একবাক্যে স্বীকার করিয়া লইতে হইত,—ইহা স্বতঃসিদ্ধ সিদ্ধান্তে পরিণত হইয়াছিল। তখন পর্যন্ত একমাত্র পর্তুগালই সমগ্র ভূমণ্ডলের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ নাবিকদলের জন্মভূমি বলিয়া সর্বত্র সুপরিচিত ছিল। কি পােতনিৰ্মাণ-কৌশলে, কি পােত- চালন-নৈপুণ্যে, কি বাহুবলে, কি অকুতােভয়তায়, কি অসীম সাহসে, কি অতুল অধ্যবসায়ে, সকল বিষয়েই পর্তুগাল এমন বিভীষিকার সঞ্চার করিয়া দিয়াছিল, যে পর্ভ গালের অধিবাসিগণ যেন অপরাজেয় প্রতিদ্বন্দী জলদৈত্যের ন্যায় অপ্রতিহত প্রভাবে সগর্বে সর্বত্র বিচরণ করিত। ভারতসাগরের ক্ষুদ্র বৃহৎ অসংখ্য দ্বীপপুঞ্জে ও বাণিজ্য-বন্দরে যে সকল সুদৃঢ় পর্তুগীজ দুর্গ রচিত হইয়াছিল, তাহা যে কালক্রমে ধূলিপরিণত হইতে পারে,কে তাহা বিশ্বাস করিতে পারিত? তখন পর্যন্ত খৃষ্টধর্মাচাৰ্য পােপের প্রবল প্রতাপ সমগ্ৰ খৃষ্টান সমাজের ভাগ্যনিয়ন্তা বলিয়া সুপরিচিত ছিল। পােপের শাসন ঈশ্বরের শাসনের ন্যায় অবিচারনীয়া আজ্ঞা বলিয়া প্রতিপালিত হইত। তাহা যতই কঠোর হউক, যতই পক্ষপাত- দুষ্ট হউক, যতই অসমীচীন হউক, খৃষ্টান-জনসমাজের নিকট তাহাই বিধাতার আদেশ বলিয়া প্রতিষ্ঠা লাভ করিয়াছিল। লােকে কষ্টসঞ্চিত অর্থ-বিনিময়ে পােপের নিকট হইতে নৱক-যন্ত্রণা হইতে পরিত্রাণ লাভের লিখিত মুক্তিপত্র ক্রয় করিত! সুতরাং পােপের শাসন রাজশাসনকে অবলীলাক্রমেই পদানত করিয়া রাখিয়াছিল। তাহা যে কখন শিথিল হইবে বা সম্পূর্ণরূপে উৎখাত হইয়া পড়িবে, কে তাহা কল্পনা করিতে সাহস করিত ? নশ্বর সংসারে কিছুই চিরস্থায়ী হয় না; তথাপি সাম্রাজ্যের স্থায়িত্বে বিশ্বাস সকল যুগে সকল দেশে সমান ভাবে প্রবল থাকিতে দেখা যায়। পর্তুগালেও সেই বিশ্বাস অটল হইয়া উঠিয়াছিল। ১৫২১ খৃষ্টাব্দে একটি আকস্মিক ঘটনায় এই অটল বিশ্বাস সহসা টলিয়া উঠিল। স্পেনদেশের একখানি অর্ণবযান দক্ষিণ আমেরিকা প্রদক্ষিণ করিতে গিয়া, ভারতসাগরে উপনীত হইবামাত্র, পর্তুগালের বাণিজ্য-কলহ পুনরায় জাগরিত হইয়া উঠিল। যে সুবিখ্যাত নাবিক এই অসম্ভব ব্যাপার সম্ভব করিয়াছিলেন, তাঁহার নাম ম্যাগেলেন। তিনি কিছুদিন আলবুকার্কের অধীনে পর্তুগালাধিকৃত ভারতসাগরে পােধ্যক্ষের কাৰ্যে নিযুক্ত ছিলেন। সেই সময়েই তিনি বুঝিতে পারিয়াছিলেন যে, পােপের শাসনলিপি লঙ্ঘন ১৬৪ ফিরিঙ্গি-বণিক t না করিয়াও, স্পেনের পক্ষে পশ্চিমসমুদ্রপথে পােতচালনা করিতে করিতে ভারতবর্যে উপনীত হইবার সম্ভাবনা আছে। সুতরাং ভূমণ্ডল প্রদক্ষিণ করিয়া ইহা প্রতিপন্ন করিবার জন্য ম্যাগেলেনের হৃদয়ে এক উচ্চাকাঙ্ক্ষা উদ্ৰিক্ত হইয়া উঠিয়াছিল। ফিরিঙ্গি-বণিক এ বিষয়ে তাহাকে সাহায্য করিতে স্বভাবত অসম্মত দেখিয়া, তিনি পর্তুগালের আশ্রয় ত্যাগ করিয়া, স্পেনের আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছিলেন। ১৫১৯ খৃষ্টাব্দে স্পেনরাজ্যের পাঁচখানি অর্ণবযান ম্যাগেলেনের অধীনে পশ্চিম-সমুদ্রপথে ভারতযাত্রা আরম্ভ করিয়াছিল। ম্যাগেলেন ফিলিপাইন দ্বীপপুঞ্জে উপনীত হইয়া, ভূপ্রদক্ষিণ পরিসমাপ্ত করিয়া, পৃথিবীর গােলত্ব প্রমাণে পােপের শাসনলিপির অসারত্ব প্রতিপাদিত করিবামাত্র ফিলিপাইন দ্বীপপুঞ্জে নিহত হইলেন ; তাহার সযত্ন-পরিচালিত চারিখানি অর্ণবযান বিনষ্ট হইয়া গেল। একখানিমাত্র নানা বিঘ্ন-বাধা অতিক্রম করিয়া উত্তমাশা অন্তরীপ অতিক্রম করিয়া, স্পেনরাজ্যে প্রত্যাবর্তন করিল। পশ্চিম-সমুদ্রপথে ভারত-যাত্ৰা করিয়া, ক্রমাগত পশ্চিমাভিমুখে পােতচালনা করিতে থাকিলে, আবার যাত্ৰাস্থানে প্রত্যাবর্তন করা যায়,–এই অভিজ্ঞতা ইউরােপীয়গণের নিকট মানব- জ্ঞানের এক রুদ্ধ দ্বার উন্মুক্ত করিয়া দিল। সে দিন তাহাদের ইতিহাসের কি স্মরণীয় দিন। সে দিন স্পেনরাজ্যের সম্মুখে ভারত- বাণিজ্যের তােরণদ্বার সহসা উন্মুক্ত হইয়া পড়িল,-পর্তুগালের অঙ্কু বাণিজ্যাধিকারে প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বীর আবির্ভাব হইল,-পোপের শাসন- লিপির মৰ্যাদা অক্ষুন্ন রহিল ; কিন্তু তাহার উদ্দেশ্য পণ্ড হইয়া গেল, সমগ্র ইউরােপে এক নবযুগ প্রবর্তিত হইল। পর্তুগাল কি বলিবে ? এতকাল অন্য কোন ইউরােপীয় অর্ণবপােত ভারতসাগরে উপনীত হইবামাত্র পােপের শাসনলিপির বলে- অনধিকার-প্রবেশের অপরাধে-পর্তুগীজ কর্তৃক নির্দয়রূপে লুষ্ঠিত হইত।
প্রতিদ্বন্দ্বী . এখন স্পেনরাজ্য হইতে যে সকল অর্ণবপােত ভারতসাগরে উপনীত হইতে আরম্ভ করিল, অনধিকার-প্রবেশের অজুহাতে তাহার অঙ্গে হস্তক্ষেপ করিবার অধিকার রহিল না; কারণ তাহা দ্বারা পােপের শাসন লঙ্ঘিত হয় নাই। পর্তুগাল-রাজ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইয়া পড়িলেন। স্পেনের অধিপতি পঞ্চম চার্লস তখন সমগ্র ইউরােপে পােপের দক্ষিণ হস্ত বলিয়া সুপরিচিত। তিনিই তখন সমগ্র খৃষ্টান-সমাজের সর্বপ্রধান সম্রাট, খৃষ্টধর্মাচাৰ্য পােপ এবং খৃষ্টান সমাজের সর্বপ্রধান সম্রাট চার্লস তখন সৰ্ববাদিসম্মত প্রবল পুরুষ। তাঁহাদিগের উভয়ের বিরুদ্ধে খড়গ ধারণ করা পর্তুগালের ন্যায় ক্ষুদ্র রাজ্যের পক্ষে অসম্ভব। সম্রাট চালস তখন ইউরােপের স্থলযুদ্ধে নিতান্ত ব্যতিব্যস্ত। আমেরিকার একাংশে তাহার অধিকার বিস্তৃত হইয়াছিল ; তথা হইতে বর্ষে বর্ষে রৌপ্য সংগৃহীত হইয়া রাজকোষে প্রেরিত হইত। আমেরিকা অপেক্ষাকৃত নিকটে--রৌপ্য অপেক্ষাকৃত অল্পায়াসে মুদ্রারূপে ব্যবহৃত হইতে পারিত। ভারতবর্ষ বহুদূরে,-বাণিজ্যের লাভ অধিক হইলেও, পণ্যদ্রব্যের ক্রয়বিক্রয়ে অর্থোপার্জন অর্থোপার্জন করা নিতান্ত অনায়াসসাধ্য নহে। এরূপ ক্ষেত্রে ভারত-বাণিজ্যে অধিকার বিস্তারে অবসর প্রাপ্ত হইয়াও, সম্রাট চালস তাহাতে অধিক ঔৎসুক্য প্রকাশ করিলেন । পৰ্ত্ত গাল-রাজ অর্থদান করিয়া ভারত-বাণিজ্যের একাধিপত্য রক্ষাৰ্থ প্রস্তাব উত্থাপিত করিবামাত্র, সম্রাট অর্থ-বিনিময়ে মােলাকক্কাস দ্বীপপুঞ্জে স্পেনের বাণিজ্যাধিকার পর্তুগালরাজের নিকট বিক্রয় করিলেন। ম্যাগেলেনের ভূপ্রদক্ষিণ-ব্ৰত সফল হইবামাত্র ইউরােপের ইতিহাসে যে যুগান্তরের সূত্রপাত হইয়াছিল, তাহাতে অনেক পুরাতন ব্যবস্থা পরিবর্তিত হইতে আরম্ভ করিল। এতদিন এসিয়া কেবল পর্তুগালের .
ফিরিঙ্গি-বণিক ৫ e, বলিয়াই পরিচিত ছিল। এখন আফ্রিকা হইতে মােলাক্কাস পর্যন্ত পর্তুগালের, এবং তাহার পূর্বদিকে যাহা কিছু, তৎসমস্ত স্পেনের বলিয়া নির্দিষ্ট হইল। এতদিন এসিয়ার সাগরবক্ষে কেবল পৰ্ত্ত গালের অর্ণবযানই অব্যাহত গতিতে গতায়াত করিতেছিল ; এখন পর্তুগালের ন্যায় স্পেনের অর্ণবপােতও তুল্যরূপ অব্যাহতগতিতে গতায়াত আরম্ভ করিয়া দিল। কালে ইহাতে অনর্থ উপস্থিত হইতে পারে বলিয়া আশঙ্কার আবির্ভাব হইতে না হইতেই, একটি আকস্মিক ঘটনায় সে আশঙ্কা নিরস্ত হইয়া গেল। ১৫৮০ খৃষ্টাব্দে পর্তুগাল স্পেন রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হইয়া গেল ; সুতরাং এসিয়ার সমুদ্রপথে আবার কিয়ৎকালের জন্য একটি মাত্র ইউরােপীয় রাজ্যের অর্ণবযান গতায়াত করিতে লাগিল। পৃথিবীর ইতিহাসে দেখিতে পাওয়া যায়—যাহা দীর্ঘকালে ধীরে ধীরে গােপনে গােপনে সঞ্চিত হইতে থাকে, সুসময় প্রাপ্ত হইবামাত্র তাহা অতি অল্পক্ষণের মধ্যেই যুগান্তর উপস্থিত করিয়া থাকে। খৃষ্টীয় ষােড়শ শতাব্দীর শেষ পাদ এইরূপ একটি অল্পক্ষণ ; কিন্তু অল্প হইলেও চিরস্মরণীয়। সেই অল্পক্ষণে যাহা সংঘটিত হইয়াছিল, অদ্যাপি তাহার প্রভাব বিলুপ্ত হয় নাই ; বরং তাহার প্রভাবে মানবচিত্ত দিন দিন অধিক স্বাধীনতা অবলম্বনে অধিক উন্মত্ত হইয়া উঠিয়াছে। সেই অল্পক্ষণে রাজা ফকির হইয়াছে, ফকীর রাজমুকুট কুড়াইয়া পাইয়াছে ! তখনও ইউরােপের অবস্থা সৰ্বাংশে প্রশংসনীয় হয় নাই ; কৃষিশিল্প তখনও যথাযােগ্য সমাদর লাভ করে নাই ;—শিক্ষা ও সভ্যতা কখনও মানব-সমাজের সকল স্তরে যথাযােগ্য প্রভাব বিস্তার করিতে পারে নাই,তখনও এক দিকে অদম্য জ্ঞানানুরাগ, অন্যদিকে চিরনিদ্রাতুর অন্ধ অজ্ঞানতা সমগ্র খৃষ্টান সমাজকে যুগপৎ বিপরীত পথে আকর্ষণ করিতেছিল; বরং বর্বরতা পরিহার করিবার প্রাণপণ চেষ্টা যেন পুরাতন বর্বরতাকে অধিক প্রবল করিয়া তুলিয়াছিল। তুলিয়াছিল। তখন ;
প্রতিদ্বন্দ্বী ১৬৭ নরক্তে জলস্থল কলঙ্কিত হইয়া উঠিয়াছে ;-বাহুবলের প্রবল প্রাদুর্ভাব সর্বত্র প্রভাব বিস্তারের জন্য আন্দোলন করিয়া বেড়াইতেছে। ধৰ্ম্ম আত্মরক্ষার আশায় নিষ্ঠুরতার আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছে ;-অগ্নিকুণ্ড সকল তর্কের মীমাংসাভার গ্রহণ করিয়া চিতাধূমে গগনমণ্ডল আচ্ছন্ন করিয়া ফেলিয়াছে ;-মানব দানববলে বিধাতার বিচিত্র বিশ্বরচনা বিধ্বস্ত করিবার জন্য বীর দর্পে আস্ফালন করিতে উৎসাহ লাভ করিয়াছে। ইহাতে সমগ্ৰ খৃষ্টান সমাজে এক অভিনব আত্মকলহের সূত্রপাত হইয়াছিল। সে কলহ নূতন-পুরাতনের অপরিহার্য্য আত্মকলহ। একদিন যে খৃষ্টান-সমাজ এক বাক্যে মুসলমানের কণ্ঠচ্ছেদ করিবার জন্য জয় জয় রবে অসি হস্তে জলে স্থলে ধৰ্ম্মানুরাগের পরিচয় প্রদান করিতে ব্যাকুল হইয়া উঠিয়াছিল, সেই খৃষ্টান-সমাজ দ্বিধা বিভক্ত হইয়া, মুসলমানকে ছাড়িয়া পরস্পরের বিরুদ্ধে খড়গ ধারণ করিবার জন্য কোলাহল করিতে প্রবৃত্ত হইয়াছিল। যাহারা পুরাতনপন্থী, তাহারা ধৰ্মচাৰ্য পােপের চরণধূলি মস্তকে গ্রহণ করিয়া, খৃষ্টান সমাজকে বাহুবলে মুক্তি-ক্ষেত্রের দিকে আকর্ষণ করিতেছিল;-যাহারা নুতনপন্থী, তাহারা পােপের ক্ষমতা অস্বীকার করিয়া, বাহুবলে মানবাত্মার স্বাধীনতা ঘােষণার জন্য খৃষ্টান সমাজকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে আহ্বান করিতেছিল। উভয় দলের এই কলহের মধ্যে আধুনিক ইউরােপের অলৌকিক অভ্যুদয় লাভের মুল তথ্য নিহিত রহিয়াছে। পুরাতনের মােহ ইউরােপকে পােপের শাসন-স্তম্ভে বাঁধিয়া 'রাখিতে পারিলে, ইউরােপ নবজীবন লাভ করিতে পারিত না। যে জ্ঞান এক সময়ে প্রাচ্যরাজ্য হইতে সমগ্র সভ্যসমাজে বিকীরিত হইত, তাহা মুসলমানের দিগ্বিজয়ের সঙ্গে সঙ্গে ইউরােপের দক্ষিণাংশে উপনীত হইয়া, সহসা বাধা প্রাপ্ত হইয়াছিল। ধৰ্ম্মা খৃষ্টান-সমাজ ফিরিঙ্গি-বণিক তখনও সমুন্নত গণিত বিজ্ঞানের অত্যুজ্জ্বল আলােকসম্পাত সহ করিবার উপযুক্ত দৃষ্টিশক্তি লাভ করিতে পারে নাই। তখনও বিদ্যা কেবল ধর্মগ্রন্থনিহিত ক্রিয়াকাণ্ডের মন্ত্ৰার্থবিচারে পর্যবসিত হইয়া, অল্পসংখ্যক ধর্মযাজকের নিকট মৰ্যাদা লাভ করিতেছিল। জনসমাজের জন্য যে বিদ্যা উপার্জনের কিছুমাত্র প্রয়ােজন আছে, তাহা স্বীকার করা দুরে থাকুক, তাহার আলােচনার প্রয়ােজনও উপস্থিত হইতে পারিত না। দীর্ঘকালের মােহনিদ্রার অবসানে ইউরােপ যখন জাগিয়া উঠিল, তখন জ্ঞানলাভের জন্য ব্যাকুলতা উপস্থিত হইল। সে ব্যাকুলতা কোনও একটি মাত্র বিষয় সীমাবদ্ধ রহিল না। সকল বাধই ভাঙ্গিয়া গেল ; বন্যাস্রোতের ন্যায় জ্ঞানস্রোত সর্বত্র ব্যাপ্ত হইয়া পড়িল। পােপের অটল সিংহাসন টলিয়া উঠিল ; তাহার বিধিদত্ত অধিকার অস্বীকৃত হইতে লাগিল; চিন্তার স্বাধীনতা যখন বাক্যের স্বাধীনতা লাভ করিল, তখন কৰ্ম্মের স্বাধীনতা অনায়াসে পােপের শাসনপাশ ছিন্ন করিতে প্রবৃত্ত হইল। পােপ পদেপদে পরাভূত হইয়া, তর্জন-গর্জনে অভিশাপে অভিযােগে খৃষ্টান-সমাজকে পদানত রাখিবার জন্য প্রয়াস স্বীকারে আলস্য প্রকাশ করিলেন না; কিন্তু নবজীবনের নূতন স্পন্দন খৃষ্টান-সমাজের শৃঙ্খল-মােচন করিয়া তাহার সম্মুখে এক অভিনব কীর্তিক্ষেত্র উন্মুক্ত করিয়া দিল। ইউরােপের কোনও দেশেই রাজকার্য পরিচালনায় স্বাধীনতার অভাব ছিল না। রােমক সাম্রাজ্যের অধঃপতনের পর ইউরােপের সকল দেশই স্বতন্ত্র হইয়া উঠিয়াছিল। কিন্তু জনসমাজের চিত্তক্ষেত্রে ধৰ্মচাৰ্য পােপের বিধিদত্ত অধিকার সম্বন্ধে যেরূপ ধারণা বদ্ধমূল হইয়া গিয়াছিল, তাহাতে স্বাধীন চিন্তা, স্বাধীন উক্তি, স্বাধীন কাৰ্য বিলুপ্ত হইয়া গিয়াছিল। যাহারা রাজকার্য পরিচালনায় স্বাধীন, তাহারা এই কারণে পরাধীনের ন্যায় কালযাপন করিতে বাধ্য হইয়া প্রতিদ্বন্দ্বী ১৬৯ পড়িয়াছিল। তাহারা যখন জাগিয়া উঠিল, তখন কুসংস্কার বর্জন করিতে প্রবৃত্ত হইল। মানুষ হইয়া উঠিবার আগ্রহে তাহার গৃহকোটর ছাড়িয়া বিপুল বিশ্বরাজ্যে ছুটিয়া বাহির হইল। একদিকে নূতন নূতন দেশভ্রমণ, অন্যদিকে নূতন নূতন জ্ঞানের সহিত সাক্ষাৎকার, নবপ্রবুদ্ধ ইউরােপীয় খৃষ্টান সমাজকে দিন দিন জ্ঞানে ও কর্মে শক্তিশালী করিয়া তুলিতে লাগিল। জাৰ্ম্মণী হইতেই ইউরােপের এই নবজাগরণের সূত্রপাত হয়। ইহার প্রভাব ক্রমে ফ্রান্সে, ইংলণ্ডে এবং হল্যাণ্ডে ব্যাপ্ত হইয়া পড়ে। এই কয়টি উদ্যমশীল দেশের অভ্যুদয়লােলুপ স্বাধীনচেতা প্রধান পুরুষগণ পােপের শাসনপাশ বিচ্ছিন্ন করিয়া, খৃষ্টান-সমাজে একটি উন্নতিশীল অভিনব সম্প্রদায়ের সৃষ্টি করিয়া, স্বাধীনভাবে সৌভাগ্যান্বেষণে বহির্গত হইল। স্পেন পর্তুগাল পােপের পদমর্যাদা ও শাসন-ক্ষমতা রক্ষা করিবার পক্ষপাতী হইয়া, অত্যাচারে, স্বেচ্ছাচারে, উৎপীড়নে, খৃষ্টান- সমাজকে পুরাতনের জীর্ণ-খুটায় বাঁধিয়া রাখিবার জন্যই চেষ্টা করিতে থাকিল। যাহারা পােপের শাসন অস্বীকার করিবার সাহস লাভ করিল, তাহারা নূতন পথে, নূতন শক্তিতে, নূতন উৎসাহে ধাবিত হইতে লাগিল। কি নূতন, কি পুরাতন, সকল দলই ভারত-বাণিজ্যে অধিকার লাভের জন্য লালায়িত ছিল। কারণ, তখন পর্যন্ত ভারত-বাণিজ্যই অর্থোপার্জনের প্রধান পথ, আত্মােন্নতি সাধনের প্রধান সােপান বলিয়া সৰ্ব্বত্র সুপরিচিত ছিল। এতদিন পােপর শাসনলিপি লঙ্ঘন করিয়া আর কেহ উত্তমাশা অন্তরীপ অতিক্রম করিতে সাহস প্রকাশ করিতে পারিত না। সকলেই অন্য কোনও নুতন পথের আবিষ্কার সাধনের জন্য বিবিধ চেষ্টায় প্রবৃত্ত হইয়া, কখনও আশায় উৎসুল্ল হইয়া উঠিত, কখন বা নিরাশায় অভিভূত হইয়া পড়িত। এখন পােপের শাসন-পাশ ১৭ ফিরিঙ্গি বণিক বিচ্ছিন্ন হইবামাত্র উন্নতিশীলদল উত্তমাশা অন্তরীপের পথে তারতযাত্রার আয়ােজন করিতে প্রবৃত্ত হইল। খৃষ্টীয় ষােড়শ শতাব্দীর প্রারম্ভে পন্ত গীজগণ ভারত বাণিজ্যের প্রতিদ্বন্দ্বিহীন অধিপতি বলিয়া সুপরিচিত হইয়াছিলেন। শতবর্ষের অবসর লাভ করিয়া, তঁাহারা একাধিপত্য দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত করিবার জন্য যথাযােগ্য আয়জন করিয়াছিলেন। কিন্তু শত বর্ষ পূর্ণ হইবার পূর্বেই ভারত-বাণিজ্যে বহুসংখ্যক প্রবল প্রতিদ্বন্দীর আবির্ভাব হইতে লাগিল। তখন ইচ্ছায় অনিচ্ছায় সকলকেই স্বীকার করিতে হইল,-বীরভােগ্য বসুন্ধরা।
উনবিংশ পরিচ্ছেদ প্রবল সংঘর্ষ We are of the truc faith, what you from the West may be ; for we come from the place where the followers of Christ were first called Christians.--Raply of the Syrians to the Portuguose. স্পেন-পর্তুগাল পরস্পরের নিকটবর্তী দেশ হইলেও, এই দুই দেশের লােকের মধ্যে চরিত্রগত পার্থক্যের অভাব ছিল না। তজ্জন্য তাহারা এক রাজার অধীনে আসিয়া শক্তিলাভ করিতে পারিল না। আপাতত উভয়ের মধ্যে সমস্ত কলহ নিরস্ত হইল বটে, কিন্তু তাহাতে উভয় দেশের লােক ক্রমশঃ দুর্বল হইয়া পড়িতে লাগিল। যে উৎসাহ ও অধ্যবসায় একদিন পর্তুগালের সম্মুখে দিগ্বিজয় লাভের পথ উন্মুক্ত করিয়া দিয়াছিল, তাহা অবসন্ন হইয়া পড়িল ; কেবল ধর্মান্ধতাই দিন দিন প্রবল হইয়া উঠিল। ইউরােপের নব জাগরণে স্পেন-পর্তুগাল জাগিয়া উঠিল না ; -ইউরােপের নবজীবন লাভে স্পেন-পর্তুগাল নবজীবন লাভ করিল । কালস্রোতের বিপরীত পথের অনুরাগী হইয়া এই দুই দেশ জীবন্মত হইয়া পড়িল। মানবচিত্ত স্বভাবতঃ স্থিতিশীল হইলেও, ঘটনাচক্রে গতিশীল হয়। তাহা সহসা চিরাভ্যস্ত স্থিতিশীলতা পরিত্যাগ করিতে পারে না; কিন্তু একবার যদি পরিত্যাগ করিতে পারে, তাহার গতিশীলতা উত্তরােত্তর অধিক শক্তি লাভ করিয়া থাকে। ইউরােপের যে সকল দেশ গতিশীল হইল, তাহারা পুরাতনকে পশ্চাতে ফেলিয়া রাখিয়া নূতনের সেবার জন্য ব্যাকুল হইয়া উঠিল। উঠিল। স্পেন-পর্তুগাল যখন এই গতিশীলতার গতিরােধের উপায় উদ্ভাবনের জন্য আয়ােজন করিতেছিল, তখন ওলন্দাজ ১৭২ ফিরিঙ্গি-বণিক ও ফরাসী-এবং তাহাদের দৃষ্টান্তে উৎসাহ প্রাপ্ত ইংরাজ আত্মােন্নতি সাধনের সুযােগ লাভের জন্য শক্তি-সঞ্চয়ে প্রবৃত্ত হইল। স্পেন-পর্তুগালের সহিত ইংলণ্ডের মিত্রতার অভাব ছিল না। ইংলণ্ডেশ্বর অষ্টম হেল্পী সেই পুরাতন মিত্রতার মর্যাদা রক্ষা করিয়াই রাজ্য-শাসন করিয়া গিয়াছিলেন। রাজ্ঞী মেরী তাহার অল্পকালের শাসনসৌভাগ্যের সময়ে সে মিত্রতার মাত্রা বর্ধিত করিবার জন্যও চেষ্টা করিয়া গিয়াছিলেন। রাজ্ঞী এলেজাবেথের শাসন-সময়ে তাহার ব্যতিক্রম ঘটিবার সম্ভাবনা উপস্থিত হইল। কিছুদিন ইতস্ততের অভাব ছিল না। ইংলণ্ডের অভ্যুদয়লােলুপ নবীনপন্থী নবজাগরণােন্মত্ত নাগরিকগণ প্রথম হইতেই অশান্ত হইয়া উঠিয়াছিলেন। কিন্তু রাজ্ঞী এলিজাবেথ অনেকদিন পর্যন্তও তাহাতে উৎসাহ প্রদর্শন করিতে সাহস করেন নাই। অবশেষে স্পেনের সহিত ইংলণ্ডের সমর-কলহ উপস্থিত হইবামাত্র সকল ইতস্ততঃ ভাসিয়া গেল। ১৫৮৮ খৃষ্টাব্দে স্পেনরাজ্যের ইতিহাস-বিখ্যাত “আরমাডা” নামক নৌ-বাহিনী ইংলণ্ড আক্রমণ করিতে আসিয়া দৈবদুৰ্ব্বিপাকে পরাভূত হইয়া গেল। ইহাই ইংরাজদিগের সৌভাগ্যলাভের প্রথম সােপান ; কারণ ইহাতেই ইংলণ্ডের আত্মশক্তি প্রবুদ্ধ হইয়া উঠিয়াছিল। ইংরাজের এতকাল আত্মশক্তির উপর নির্ভর করিয়া একাকী কোনও বৃহদ্ব্যপারে অগ্রসর হইতে সাহস করিতেন না। জনসাধারণ কখন কখন উন্মত্ত হইয়া উঠিলেও রাজশক্তি তাহার পক্ষ সমর্থন করিত না। বাহুবল অপেক্ষা দৌত্য-কৌশলের উপর অধিক নির্ভর করিয়া ইউরােপীয় অন্যান্য দেশের সহিত সংঘর্ষ পরিহার করাই প্রধান শাসননীতি বলিয়া মৰ্য্যাদা লাভ করিয়াছিল। এবার যখন ‘আরমাডা’ বীরদর্পে ইংলণ্ড আক্রমণের জন্য অগ্রসর হইতে লাগিল, তখন অনন্যোপায় প্রবল সংঘর্ষ ১৭৩ ইংলণ্ডের রাজশক্তি এবং প্রজাশক্তি আত্মরক্ষার যথাযােগ্য আয়ােজন করিতে বাধ্য হইল, এবং দেশের সর্বত্র এক অশান্তিপূর্ণ আশঙ্কা ও উদ্বেগ সকলকে একমতাবলম্বী করিয়া তুলিল। এই সূত্রে ইংলণ্ডে এক নবশক্তি জাগরিত হইয়া উঠিল, তাহা আত্মশক্তির উপর নির্ভর করিতে শিখাইয়া ইংলণ্ডকে তাহার ভৌগােলিক ক্ষুদ্রতা বিস্মৃত হইবার পথ প্রদর্শন করিল। সকলেই বুঝিতে পারিল,—আত্মশক্তির উপর নির্ভর করিতে সাহস না পাইলে ইংলণ্ডকে সকলের পশ্চাতে পড়িয়া থাকিতে হইবে। নাবিকগণ জলপথ রক্ষার জন্য, নাগরিকগণ সমুদ্রতীর রক্ষার্থ, দেশের সকল শক্তি সকল শক্তি একত্র মিলিত করিয়া আত্মরক্ষার আয়ােজন করিতে বাধ্য হইল। ঐ আসিতেছে—ঐ আসিল—সর্বত্র এই রব এক আতঙ্কের সৃষ্টি করিয়াছিল; আরমান্ডা- নৌবাহিনীর রণপােতগুলি যে ইংলণ্ডের পক্ষে অপরাজেয়, এইরূপ একটি অতিরঞ্জিত ধারণা ইংলণ্ডকে অধিক আকুল করিয়া তুলিল। কিন্তু আরমাডা অর্ধপথেই ছত্রভঙ্গ হইয়া গেল ; ঝটিকা-বেগ সহ করিতে না পারিয়া সে নৌবাহিনীর অনেক রণতরণী সমুদ্রগর্ভে নিমজ্জিত হইল ; অনেক রণতরণী বিপৰ্যপ্ত হইয়া পড়িল ; ফলে ইংলও জয় করা দূরে থাকুক, ইংলণ্ডের উপকূল পর্যন্ত অগ্রসর হইবার জন্যও চেষ্টা না করিয়া, ‘আরমাডা’ স্বদেশে প্রস্থান করিতেই বাধ্য হইল। এই সূত্রে ইংলণ্ড অকুতােভয় হইল। তাহাই ইংলণ্ডের বিজয় লাভ । এতদিন ইংরাজেরা পােপের শাসনলিপির মর্যাদা রক্ষা করিয়া, ভারত-বাণিজ্যের পৃথক্ পথের সন্ধান-চেষ্টায় শক্তিক্ষয় করিতেছিলেন। এখন পােপের শাসনলিপি লঙ্ঘন করিবার প্রয়ােজন অনুভূত হইল তাহা অনুদার,-তাহা পক্ষপাতদুষ্ট,—তাহা স্বাধীন বাণিজ্যের গতি- রােধক,—তাহা অসমীচীন,এবং কাহারও কাহারও বিবেচনায় তাহা পােপের অনধিকার-চৰ্চ্চা বলিয়া প্রতিভাত হইল। এতদিন খৃষ্টান ১৭৪ ফিরিঙ্গি-বণিক নরনারী তাহাকেই ঈশ্বর-প্রেরিত অবতার এবং অসাধারণ পুরুষ মনে করিয়া ভয়ভক্তি-বিনম্ৰমস্তকে বিনা বিচারে আদেশ প্রতিপালন করিত, তাহার অনুচরবর্গের নিকট মুক্তিপত্র ক্রয় করিয়া অর্থদানে সৌভাগ্যবৰ্ধন করিত,—তাহার নামাঙ্কিত মুক্তিপত্র স্বর্গরাজ্যের প্রবেশপত্র মনে করিয়া সযত্নে সঞ্চয় করিয়া রাখিত ;—যাহারা তাহাতে আস্থা-স্থাপন করিতে অসম্মত হইত, তাহাদিগকে অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করিয়া ধৰ্ম্ম রক্ষা করিত। ইউরােপে এমন দেশ ছিল না, যেখানে এই সংকীর্ণ ধর্মান্ধতা মানব- সমাজকে নিপীড়িত করিতে কিছুমাত্র ইতস্ততঃ করিত। বরং পাশব অত্যাচারে উৎপীড়িত নরনারী অগ্নিকুণ্ডে ভস্মীভূত হইবার সময়ে খৃষ্টান জনসমাজ সেই বর্বরােচিত নৃশংস অনুষ্ঠানকে ধৰ্ম্মানুষ্ঠান মনে করিয়া ভগবানের নামে জয়ধ্বনি তুলিয়া, আনন্দপ্রকাশ করিতে ক্রটি করিত না। খৃষ্টধর্মের প্রকৃত তত্ত্ব লােকসমাজে অপরিচিত ছিল। তাহা যে ভাষায় লিখিত, তাহাও জনসমাজে অপ্রচলিত ছিল;- ধৰ্মচাৰ্য্যগণ তাহার যখন যেরূপ ব্যাখ্যা করিয়া অর্থোপার্জন করিতেন, জনসমাজ তাহাকেই আপ্তবাক্য বলিয়া গ্রহণ করিত। মানসিক স্বাধীনতাশূন্য অগণ্য অজ্ঞানান্ধ অসহায় কৃপাপাত্র নরনারীর উপর পােপের এই অকীৰ্ত্তিকর আধ্যাত্মিক প্রভুত্ব অক্ষুন্ন রাখিবার জন্য রাজন্যবর্গ পুরােহিতগণের প্ররােচনায় জনসমাজের জ্ঞানালােচনায় যথাসাধ্য বাধা প্রদান করিতেন। কোনও নূতন তত্ত্ব অধিগত বা আবিষ্কৃত হইলে, তাহা প্রকাশ্যভাবে জনসমাজে প্রচারিত হইতে পারিত না;—গ্রন্থাকারে মুদ্রিত হইলে, সে গ্রন্থ পােপের আদেশে তৎক্ষণাৎ ভস্মীভূত হইত! ধৰ্ম্মের নামে পােগের অনুচরবর্গ খৃষ্টান-সমাজের জনসাধারণের জন্য যেরূপ শিক্ষা প্রচলিত রাখিতে প্রাণপণ করিতেন, তাহা প্রচলিত থাকিলে ইউরােপ দিন দিন অধিক মাত্রায় বর্বরতার লীলাভূমি হইয়া উঠিত। কিন্তু জ্ঞানের অমােঘ প্রতাপ অজ্ঞানতাকে পরাভূত করিল;-বন্ধন- প্রবল সংঘর্ষ বিমুক্ত মানবচিত্ত আধ্যাত্মিক দাসত্বশৃঙ্খল ভগ্ন করিয়া, স্বাধীন চিন্তার, স্বাধীন কাৰ্য্যের মুক্তক্ষেত্রে বিচরণ করিতে আরম্ভ করিল। স্পেনরাজ্যের অধীশ্বর পােপের শাসনক্ষমতা অক্ষুন্ন রাখিবার অভিপ্রায়ে অনুদার স্থিতি- শীলদলের পক্ষাবলম্বন করায়, গতিশীলদলের সহিত তাহার কলহ উপস্থিত হইয়াছিল। আরমাডা’-সাহায্যে ইংলণ্ডবিজয়ের সুখস্বপ্ন ভাঙ্গিয়া গেল। সঙ্গে সঙ্গে ইংরাজ আত্মশক্তি বিকাশে প্রবল হইয়া উঠিতে লাগিল। স্পেন-পর্তুগালের সহিত ইংলণ্ডের মিত্রতা বর্তমান থাকিতে, ইংলণ্ডের পক্ষে স্বাধীনভাবে ভারত-বাণিজ্যে অগ্রসর হইবার উপায় ছিল না। জনসমাজ যখনই সেরূপ অধিকার পরিচালনার জন্য রাজানুমােদন ভিক্ষা করিত, ইংলণ্ডের অধিপতিকে মিত্ৰতাৰক্ষাৰ্থ তখনই প্রজাবৰ্গকে বিমুখ করিতে হইত। তৎকালে অনন্যোপায় হইয়া ইংরাজগণ কেবল পরােক্ষ- ভাবে ভারত-বাণিজ্যের ফললাভের জন্য চেষ্টা করিয়াই নিরস্ত হইতে বাধ্য হইতেন। ভারতবর্ষ হইতে যে পণ্যদ্রব্য ইউরােপে আনীত হইত, তাহা প্রথমে লিসবন নগরে, পরে তথা হইতে হান্তের অন্তর্গত আটোয়ার্প নগরে বিক্রয়ার্থ পুঞ্জীকৃত হইত। ইংরাজেরা আন্টোয়ার্প হইতে পণ্য ক্রয় করিয়া স্বদেশে বিক্রয় করিতেন। ইহাতে ভারত-বাণিজ্যের প্রধান লাভ পর্তুগালের করতলগত থাকিত,—ওলন্দাজগণ যাহা কিছু লাভ প্রাপ্ত হইতেন, তাহা আন্টোয়ার্পের যেরূপ ভাগ্যোন্নতি সাধিত হইয়াছিল, তাহা সমগ্র ইউরােপকে বিস্মিত করিয়া তুলিয়াছিল। ভারতীয় পণ্য- দ্রব্যের ক্রয়বিক্রর ব্যাপারেই আটোয়ার্প ইউরােপে বাণিজ্যবন্দরগুলির শীর্ষস্থানে আরূঢ় হইয়াছিল। ইংলও একটি ক্ষুদ্র দ্বীপ। পৃথিবীতে সেরূপ ক্ষুদ্বীপের অভাব নাই। দেশের আয়তনের প্রতি লক্ষ্য করিলে, তাহাকে নিতান্ত নগণ্য বলিলে অত্যুক্তি হয় না। রােম সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত থাকিবার সময়ে ইংলণ্ড সত্যসত্যই নগণ্য ছিল। সে দেশের লােকের পক্ষে অভ্যুদয় লাভ করা ১৭৬ ফিরিঙ্গি-বণিক দূরে থাকুক, কেবল বাঁচিয়া থাকিবার জন্যই বহু বিদেশের উপর নির্ভর করিতে হইত। একে চারিদিকে সমুদ্র-পরিখা, তাহাতে আবার খাদ্যদ্রব্যের জন্যও বিদেশের সাহায্য আবশ্যক। এরূপ অবস্থায় ইংলণ্ডের অধিবাসিগণকে বাধ্য হইয়াই জলপথে বাণিজ্য-ব্যাপারে লিপ্ত হইতে হইয়াছিল। হলান্ত দ্বীপ না হইলেও, ইংলণ্ডের মতই একটি ক্ষুদ্র রাজ্য। তাহার পক্ষেও ইংলণ্ডের ন্যায় বহির্বাণিজ্যে লিপ্ত হইবার প্রয়ােজন ছিল। এই দুই দেশের লােক বাণিজ্য-ব্যাপারে অর্থোপার্জনের আশায় ভুবন- ভ্রমণে বহির্গত হইয়াছিল। পােপের শাসনে বাধ্য হইয়া ইহারা কেবল উত্তর-সমুদ্রপথেই ভারতবর্ষে উপনীত হইবার চেষ্টা করিতেছিল। উত্তর-সমুদ্রপথে প্রাচ্য-বাণিজ্যে অধিকার বিস্তারের উপায় আবিষ্কৃত হইলে, ইংলণ্ডের বা হলাণ্ডের পক্ষে পােপের শাসন লঙ্ঘন করিবার প্রয়ােজন উপস্থিত হইত না। কিন্তু চিরতুষারাবৃত মেরুমণ্ডলের চির- বন্ধুর যাত্রাপথে অগ্রসর হইবার সম্ভাবনা যতই তিরােহিত হইতে চলিল, পােপের শাসন ততই অন্যায় অত্যাচার বলিয়া প্রতিভাত হইতে লাগিল। পর্তুগালের আনীত প্রাচ্য পণ্যদ্রব্য কুড়াইয়া লইয়া জীবিকার্জনের পথ উন্মুক্ত রাখিতে পারিলেও, পপাপের শাসন লঙ্ঘন করিবার কল্পনা কাৰ্য্যে পরিণত করিতে বিলম্ব ঘটিতে পারিত। ঘটনাক্রমে আটোয়ার্পের বাণিজ্যস্রোত সহসা শুষ্ক হইয়া গেল। ধৰ্ম্মবিপ্লবে ওলন্দাজগণ উদার নীতির পক্ষাবলম্বন করায়, অনুদার স্পেন- পৰ্ত্ত গালের সহিত কলহ উপস্থিত হইবামাত্র, লিসবন হইতে আন্টোয়ার্পে পণ্যসংগ্রহ করিবার উপায়ও রহিত হইয়া গেল। গেল। তখন তখন ওলন্দাজ এবং ইংরাজ ফিরিঙ্গি বাণিজ্যপােত লুণ্ঠন করিবার জন্য জলপথে ব্যবৃত্তি অবলম্বন করিতে বাধ্য হইলেন। উত্তমাশা অন্তরীপের প্রাচ্য- বাণিজ্যপথ বিবদমান খৃষ্টান বণিকবর্গের কলহকোলাহলে মুখরিত হইয়া উঠিল ;-অন্যায়ের গতিরােধ করিয়া ন্যায়সংস্থাপন লালসায় যাহারা প্রবল সংঘর্ষ ১৭৭ তাহাতে প্রবৃত্ত হইলেন, তাহারাও অন্যায় মার্গই অবলম্বন করিতে বাধ্য হইলেন, সুতরাং বাহুবলই সকল তর্কের মীমাংসাভার গ্রহণ করিল। এক সময়ে সমগ্র খৃষ্টান-সমাজ পােপের আদেশ শিরােধার্য্য করিয়া, মুসলমানের বিরুদ্ধে খড়গধারণ করিয়াছিল। পর্তুগীজগণ যখন ভারত- সাগরে উপনীত হইয়া মুসলমানদলনে কৃতিত্ব প্রদর্শন করিতে আরম্ভ করেন, তখন তাহাদের প্রাচ্য-বাণিজ্যরাজ্য ধৰ্ম্মরাজ্য এবং প্রাচ্যবাণিজ্য- নীতি ধৰ্ম্মনীতি বলিয়া খৃষ্টান-সমাজের সাধুবাদ লাভ করিয়াছিল। সে পুরাতন ধারণা পরিবর্তিত হইয়া গেল,-সে পুরাতন মিত্ৰতাও বিনষ্ট ইয়া গেল। যাহা তাহার স্থান অধিকার করিল, তাহা-ক্ষমাশূন্য 1ম শূন্য, অশান্ত আস্ফালন—দয়াশূন্য মমতাশূন্য বাহুবললীলা ! এক দিকে সমগ্র ইংরাজজাতির জীবনমরণের সমস্যা, অন্য দিকে বিলুপ্তপ্রায় পুরাতন মৈত্রীভাব,- রাজ্ঞী এলিজাবেথ দীর্ঘকাল উভয়কুল রক্ষা করিতে পারিলেন না। তাঁহাকে অবশেষে প্রকাশ্যভাবে অনুমতি প্রদান করিতে হইল। পৃর্ত্তগাল নবজীবন লাভ করিয়া, অতি অল্পদিনের মধ্যেই সমগ্র ইউরােপে এক অভিনব আকাঙ্ক্ষার উদ্রেক করিয়া দিয়াছিল। রাজ্য ক্ষুদ্র হইলেই যে বৃহৎ বিজয়লাতে অনধিকারী হয় না, পর্তুগাল তাহা প্রমাণ করিয়া দিয়া ইউরােপের অন্যান্য ক্ষুদ্র রাজ্যগুলিকেও বৃহৎ বিজয়লাভের উচ্চাকাঙ্ক্ষা প্রকাশিত করিতে সাহসী করিয়া তুলিয়া- . ছিল। সকলেই গৃহকোটর ছাড়িয়া, “বায়ু উল্কাপাত বর্জশিখা” ধরিয়া “স্বকাৰ্য সাধনে অগ্রসর হইয়াছিল। অনেকে অনেক অজ্ঞাত দেশের আবিষ্কার-সাধনে কৃতকার্য হইয়াছিল;—সকলেই পৃথিবীতে আত্মশক্তি বিস্তৃত করিবার জন্য উত্তেজনা অনুভব করিতেছিল। যে দেশের লােক ইউরােপের বাহিরে যে অজ্ঞাত দেশের আবিষ্কার সাধনে কৃতকার্য হইয়াছিল, তাহারা তাহা লইয়া পরিতৃপ্ত থাকিতে সম্মত হইলে, ভারত- ১৭৮ ফিরিঙ্গি-বণি সাগরে পর্তুগালের প্রভুত্ব হরণের জন্য কাহারও আকাঙ্ক্ষা জাগিয়া উঠিতে পারিত না। কিন্তু সকলেই ভারতবর্যে উপনীত হইবার জন্যই ভুবন-ভ্রমণে বহির্গত হইয়াছিলেন। যে সকল অজ্ঞাত দেশ আবিষ্কৃত হইতেছিল, তাহা ভারতবর্ষ নহে, ইহা বুঝিবামাত্র তাহার গৌরব কাহাকেও তৃপ্তিদান করিতে পারিল না; কেবল স্পেনরাজ্য কথঞ্চিৎ তৃপ্তিলাভের পরিচয় প্রদান করিয়াছিল; আর সকলেই ভারতবর্ষে উপনীত হইবার পথের সন্ধানে ব্যাপৃত হইয়া রহিয়াছিল। পর্তুগাল এইরূপে সমগ্র ইউরােপে যে অশান্ত আকাঙ্ক্ষা জাগাইয়া তুলিয়াছিল, তাহা সকল দেশেই উত্তরােত্তর অধিক প্রবল হইয়া উঠিয়াছিল, কেবল পৰ্ত গালেই তাহা দিন দিন অবসন্ন হইয়া পড়িতেছিল। ইতিহাস-লেখক বলিয়া থাকেন,-পর্তুগালের এই অ-পূৰ্ব্ব গৌরব পর্তুগালের অধিবাসিগণের গৌরব বলিয়া কথিত হইতে পারে না; তাহা পর্তুগালের রাজবংশের গৌরব ; তাহাকে জাতিগত গৌরব বলিয়া অভিহিত করা যায় না। যে রাজবংশে জন্মগ্রহণ করিয়া, রাজকুমার হেল্পী অপূৰ্ব আত্মত্যাগে পৰ্তুগীজ-জাতির প্রাণ প্রতিষ্ঠা করিয়াছিলেন, সেই রাজবংশের তিরােধানের সঙ্গে সঙ্গে তাহার কীর্তিকলাপও তিরােহিত হইয়া গিয়াছিল। ইহাকে ব্যক্তিগত বা বংশগত গৌরব বলিয়াই গ্রহণ করা কর্তব্য। সুতরাং স্পেনরাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হইবার পর পর্তুগালের অপদার্থ অধিবাসিগণ আবার অবসন্ন হইয়া পড়িয়াছিল। স্পেন রাজ্যের অধিপতি ধৰ্ম্মকলহে লিপ্ত থাকিয়া ভারত-বাণিজ্যের একাধিপত্য রক্ষার্থ যথাযােগ্য আয়ােজন করিতে পারেন নাই ;-ওলন্দাজ এবং ইংরাজেরাও অবসর বুঝিয়া স্পেনের ধৰ্ম্ম-কলহকে বাণিজ্য-কলহে পরিণত করিবার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করিয়াছিলেন। ফলে, তাহারাই জলে স্থলে প্রবল হইয়া উঠিতে লাগিলেন ;-স্পেন-পর্তুগালের পক্ষে তাহার গতিরােধ করিবার সম্ভাবনা ;
প্রবল সংবর্ষ দিন দিন তিরােহিত হইয়া গেল। পর্তুগালের অভ্যুদয় জাতিগত অভ্যুদয় হইলে, তাহা এত অল্পকালে এমন ভাবে অধঃপতিত হইতে পারিত না। ফিরিঙ্গি-বণিকের অসংযত অত্যাচারে মুসলমান-শক্তি কিছুদিনের জন্য সঙ্কুচিত হইলেও, একেবারে বিনষ্ট হয় নাই। পারস্যের অধিপতি সহসা ভারত-বাণিজ্যের অধিকার পরিত্যাগ করিতে অসম্মত হইয়া, উপযুক্ত অবসরের প্রতীক্ষার দিন গণনা করিতেছিলেন। তাহার প্রার্গ স্মরণাতীত পুরাকাল হইতে পারস্যোসাগর-পথে ভারতীয় পণ্য। দ্রব্য বহন করিয়া অর্থোপার্জন করিত। সে পথে ফিরিঙ্গি-বণিকের আধিপত্য প্রবল হইলেও, পারস্যাধিপতি পুনরায় প্রভুত্ব সংস্থাপনের জন্য চেষ্টা করিতেছিলেন। আরব দেশের মুসলমান-বণিকেরাও নিশ্চিন্ত ছিলেন না। ফিরিঙ্গি-বণিকের অভ্যুদয়লাভের পূৰ্বে সমস্ত অবস্থা তাহাদিগের অনুকূল ছিল। কিন্তু মিশরের অধিকার লাভের জন্য একদল মুসলমান আর একদল মুসলমানের সহিত কলহ-কোলাহলে লিপ্ত হইয়া আরব-বাণিজ্যকে ফিরিঙ্গি-বাণিজ্যের নিকট পরাভব স্বীকার করিতে বাধ্য করিয়াছিল। ভারতবর্ষের মুসলমান-শক্তি তাহাদিগকে রক্ষা করিতে পারে নাই; কারণ, সে শক্তি তখনও সমুদ্রোপকুল পর্যন্ত ভাল করিয়া অধিকার করিতে অবসর লাভ করে নাই। তদ্দেশে পাঠান- দিগের যাহা কিছু আধিপত্য বর্তমান ছিল, রাষ্ট্র-বিপ্লবে তাহা বিপৰ্যন্ত। হইয়াছিল। মােগল শাসনশক্তি প্রতিষ্ঠালাভ করিয়া, ভারতবর্ষের পশ্চিম উপকুলে অধিকার বিস্তৃত করায়, ফিরিঙ্গি-বণিকের পক্ষে পুনরায় জলে- স্থলে মুসলমানের সহিত শাক্ত পরীক্ষার প্রয়ােজন উপস্থিত হইতেছিল। ভারত-সাগরে ফিরিঙ্গি-বণিকের প্রবল প্রতাপ চূর্ণ করিবার জন্য এসিয়ার বিভিন্ন স্থানে যখন এইরূপ আয়ােজনের সূত্রপাত হইতেছিল, সেই সময়ে ওলন্দাজ ও ইংরাজগণ ভারতসাগরে উপনীত হইলেন।
১৮০ ফিরিঙ্গি-বণিক ফিরিঙ্গি-বণিকের পক্ষে এক সঙ্গে এই সকল প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বীর আক্রমণ- বেগ সহ করিবার সম্ভাবনা ক্রমশঃ তিরােহিত হইয়া গেল। আর সেদিন নাই। রণকুশল পােতাধ্যক্ষগণ বাণিজ্য-বন্দরের রাজ- প্রাসাদতুল্য উচ্চ অট্টালিকায় বাস করিয়া, বিবিধ বিলাস লালসায় কালাতিপাত করিতে গিয়া অকর্মণ্য হইয়া পড়িয়াছিলেন। সেনাদলও তাহাদের পূর্ব শিক্ষা বিস্মৃত হইয়া নেতৃবর্গের পদাঙ্ক অনুসরণ করিতে শিক্ষা করিয়াছিল। সংযম ভাসিয়া গিয়াছিল,-সম্ভোগ প্রবল হইয়া সকল শক্তি অবসন্ন করিয়া ফেলিয়াছিল। ইউরােপের অবস্থাও আশাপ্রদ ছিল না। শান্তি বিনষ্ট হইয়া গিয়াছিল ; পােপের পদমর্যাদা যায় যায় হইয়া উঠিয়াছিল। ইংরাজেরা তাহার অবশ্যম্ভাবী পতনকাল লক্ষ্য করিয়া, ওলন্দাজগণের দেখাদেখি ভারতসাগরে উপনীত হইয়া, ফিরিঙ্গি-বণিকের দুর্বল হস্ত হইতে ভারত- বাণিজ্যের একাধিপত্য কাড়িয়া লইবার জন্য কৃতসংকল্প হইয়াছিলেন।
বিংশ পরিচ্ছেদ পরিণাম from the moment of their landing on the shores of India the first settlers cast off all those bonds which had restrained them in their native villages; they regarded themselves as privilegeri beings--privileged to violate all the obligations of religion and morality, and to outrage all the decencies of life. They 100 went thither were often desperate adventurers, who sought those olden sands of the East to repair their broken fortunes ; to bury in oblivion a sullied name ; or to wring, with lawless hand, froin the weak and unsuspecting, that wealth which they had not the character or capacity to obtain by honest industry at home. They cheated, they gambled, they drank ; they revelled in all kinds of debauchery'-Key's Christ in India. p. 46. সত্যনিষ্ঠ-ইংরাজ লেখকগণ মুক্তকণ্ঠে ব্যক্ত করিয়া গিয়াছেন 6ে, যাহারা ফিরিঙ্গি-বণিকের ন্যায় ভারত-বাণিজ্যে অধিকারলাভে কৃতসংকল্প হইয়া, ইংলণ্ড হইতে বাণিজ্য-যাত্রায় বহির্গত হইতেছিল, সেই প্রথম ঔপনিবেশিকগণ যে মুহূর্তে ভারত-সাগরতটে পদার্পণ করিয়াছিল, সেই মুহূর্তেই সকল বন্ধন মুক্ত করিয়া ফেলিয়াছিল ; স্বদেশে যে বন্ধন সংযম শিক্ষা দিত, তাহা একেবারে পরিত্যজ্য হইয়াছিল। তাহারা আপনাদিগকে সাধারণ মনুষ্য অপেক্ষা, বিশেষ অধিকারশালী অসাধারণ মনুষ্য বলিয়া মনে করিত ; এবং ধর্মের ও নীতির সকল দায়িত্বই দলন করিত ; মানবজীবনের সকল শ্লীলতারই মৰ্যাদা নষ্ট করিত। যাহারা যাইত, তাহারা প্রাচ্য-সুবর্ণবালুকা কুড়াইয়া লইয়া তাহাদের ধ্বংসপ্রাপ্ত সৌভাগ্যের জীর্ণ-সংস্কারের চেষ্টা করিত,-কলঙ্ক-মলিন নামগােত্র বিস্মৃতি-গর্ভে সমাধি-নিহিত করিতে চাহিত ; অথবা ন্যায়-পথে, চরিত্র- ১৮২ ফিরিঙ্গি-বণিক A বলে বা কাৰ্যদক্ষতায় স্বদেশে থাকিয়া যে ধন সৎপথে উপার্জন করিতে পারিত না, তাহারা দুর্বল এবং অসংদিগ্ধ ব্যক্তিগণের নিকট হইতে অবৈধ হস্তে সেই ধন কাড়িয়া লইবার জন্য অগ্রসর হইত। তাহারা প্রতারণা করিত, দূতক্রীড়া করিত, মদ্যপান করিত, এবং সকল প্রকার ব্যভিচারেই বিভাের হইয়া রহিত। তথাপি, এই শ্রেণীর লােক ভিন্ন অসমসাহসিকতায় প্রাচ্য-সাগরের বাণিজ্য-কলহে আত্মবিসর্জন করিবার জন্য আর কাহারা অগ্রসর হইবে ? গুণ্ডার দল যতই নিন্দনীয় হউক, এরূপ ক্ষেত্রে তাহারাই অগ্রসর হইতে লাগিল। যে কোন উপায়েই হউক, ফিরিঙ্গি-বণিকের দুর্বল হস্ত হইতে বাণিজ্যাধিকার কাড়িয়া লইবার জন্য কৃতসংকল্প হইয়াই, ইহারা ভারত- যাত্রায় বহির্গত হইয়াছিল। সে সংকল্প প্রকাশ্যভাবে ব্যক্ত করিবার সাহস থাকিলে, ইংরাজ তাহার ত্রুটি করিতেন না। কিন্তু তখনও প্রকাশ্যভাবে গুপ্ত সংকল্প ব্যক্ত করিবার সময় উপস্থিত হয় নাই। আরমাডা নৌবাহিনী ছত্রভঙ্গ হইবার পর, স্পেন-পর্ত্ত গালের নৌবল কিছু দুর্বল হইয়া পড়িয়াছিল ; তথাপি ইউরােপীয় সাগরপথে স্পেন-পর্তুগালকে সহসা পরাভূত করিবার সম্ভাবনা ছিল না। ইংরাজেরা তাহা জানিতেন। কিন্তু তাহারা ইহাও জানিতেন,—ইউরােপে যাহাই হউক, এসিয়ায় নৌবল প্রবল করিবার জন্য স্পেন-পর্তুগাল সহসা যথাযােগ্য আয়ােজন করিবার অবসর প্রাপ্ত হইবে না। তজ্জন্য ইংরাজের। এসিয়া সম্বন্ধে আশান্বিত হইয়া, বলিতে লাগিলেন,-তাহারা আর অধিক দিন পােপর শাসন- লিপির মর্যাদা রক্ষা করিয়া আত্ম-বঞ্চিত হইতে অসম্মত ; পােপের এরূপ পক্ষপাতপূর্ণ শাসনলিপি প্রচারিত করিবার ক্ষমতা নাই ! এতকাল পরে, এই কথা ব্যক্ত করিবার সময়ে, ফিরিঙ্গি-বণিকের দৃঢ়-সংস্থাপিত বাণিজ্যাধিকারকে অস্বীকার করিবার উপায় ছিল না।
পরিণাম ১৩ শাসন-লিপি প্রচারে পােপের অধিকার থাকুক আর না থাকুক, তাহার সুযােগ লাভ করিয়া ফিরিঙ্গি-বণি যে প্রাচ্য-বাণিজ্যজ্য সংস্থাপিত করিয়াছিলেন, তাহাকে অনধিকার-প্রবেশ বলিয়া গণ্য করিবার সম্ভাবনা ছিল না। তজ্জন্ত ইংরাজকে স্বীকার করিতে হইল,-পর্তুগীজগণ সর্বাগ্রে ভারত-বাণিজ্যে অধিকার বিস্তার করিয়া, যেখানে যেখানে কুঠি সংস্থাপিত করিয়াছেন, ইংরাজেরা তাহার মর্যাদা রক্ষা করিতে বাধ্য। এই সূত্রে ইউরােপীয় আন্তর্জাতিক রাষ্ট্রনীতি নুতন আকার ধারণ করিল। এতদিন সমগ্ৰ খৃষ্টান-ইউরােপ অবনত মস্তকে পােপর শাসন- লিপিকে ব্যক্তিবিশেষের বা জাতিবিশেষের সৰ্ববাদিসম্মত অধিকারপত্র বলিয়া স্বীকার করিয়া আসিয়াছে। কেবল তর্কে-বিতর্কে মুখে মুখে স্বীকার করা নহে; কেহ কখন তাহার বিরুদ্ধাচরণ করিয়া কাৰ্য্যক্ষেত্রে উদ্যম প্রকাশ করে নাই ; বরং তাহাকে মানিয়া চলিতে গিয়া নির্বিবাদে নানারূপ ক্ষতিস্বীকার করিয়া আসিয়াছে। এখন তাহা প্রকাশ্যভাবে অস্বীকার করিবার সময়ে, পূৰ্ব্বসংস্থাপিত অধিকার যে সূত্রে প্রতিষ্ঠালাভ করিয়া থাকুক না কেন, তাহাকে ন্যায়ানুমােদিত অধিকার বলিয়াই স্বীকার করিতে হইল। এই নীতি ইউরােপে যথাযথভাবে প্রতিপালিত হইলেও, এসিয়ায় আসিয়া, ইহার মর্যাদা রক্ষা করা সকল সময়ে সকল অবস্থায় সুবিধা- বাদের অনুকূল হইবে না বুঝিতে পারিয়া, ইংরাজের এসিয়াখণ্ডে তাহার মৰ্যাদারক্ষা করিতে সম্মত হইলেন না। এই সময় হইতে ইউরােপের এবং এসিয়ার রাষ্ট্রনীতির পার্থক্য প্রতিষ্ঠালাভ করিতে লাগিল। ইউরােপে যাহাই হউক, এসিয়ায় সুবিধাবাদই প্রাধান্য লাভ করিল ; এবং তাহার পক্ষ সমর্থনের জন্য যুক্তিতর্কের অভাব ঘটিল না! ইউরােপ এসিয়া নহে,-এসিয়া এসিয়া। সে দেশে আসিয়া, ইউরােপীয় রাষ্ট্র- নীতির মর্যাদা সর্বদা রক্ষা করিবার বাধ্যবাধকতা স্বীকার করিতে অসম্মত ১৮৪ ১০ ; পূর্ব ফিরিঙ্গি-বণিক হইয়া, কাৰ্যকালে বাহুবলের নিকট ন্যায়বলকে বলিদান করিতে হইল। ইউরােপের সন্ধিপত্র এসিয়ায় অস্বীকৃত ও পদদলিত হইয়া, এই নীতি- পার্থক্যকে দিন-দিন স্থায়িত্বদান করিতে লাগিল। পার্থক্য এইখানেই নিরস্ত হইল না। ইউরােপের ধৰ্ম্মনীতিও এসিয়ায় আসিয়া, ভিন্ন মূর্তি ধারণ করিতে লাগিল। যাহা ইউরােপে সৰ্ববাদিসম্মত সদাচার, তাহাও এসিয়ায় আসিয়া, পদে পদে পদদলিত হইতে আরম্ভ করিল কারণ ইউরােপ এসিয়া নহে; এসিয়া এসিয়া। উত্তমাশা অন্তরীপ ভূমণ্ডলকে দুইভাগে বিভক্ত করিয়া ফেলিল ভাগ স্বার্থ, সুবিধা, বাহুবল, স্বেচ্ছাচার দিন দিন প্রবল হইতে লাগিল। তাহাতে পূৰ্ব্ব প্রতিষ্ঠিত অধিকার অধিক দিন মৰ্যদা রক্ষা করিতে পারিল না। যে ওলন্দাজগণ ইউরােপে ইংরাজ-বাণিজ্যের আশ্রয়দাতা এব, ইংরাজের প্রাচ্যবাণিজ্য বিস্তার -চেষ্টার প্রধান পথপ্রদর্শক, এসিয়ায় আসিয়া, ইংরাজগণ সেই ওলন্দাজদিগের সহিত কলহ করিতেও কুষ্টিত হইলেন না। এসিয়াপ্রবাসী, বিলাসজীর্ণ, চরিত্রহীন ফিরিঙ্গি-বণি কাহারও নিকট হইতে আত্মরক্ষার উপযােগী সাহায্যলাভ করিতে পারিলেন না। ইউ- রােপে পােপের সিংহাসন টলিয়া উঠিয়াছিল। তাহাকে অধঃপতন হইতে রক্ষা করিবার জন্য স্পেন-পর্ভ গাল ইউরােপীয় কলহ-কোলাহলে অবসর- শূন্য হওয়ায়, প্রাচ্যবাণিজ্যরক্ষার্থ, যথাযােগ্য চেষ্টা করিবার অবসর লাভ করিল না। ফিরিঙ্গি-বণিক সৌভাগ্যের দিনে জলে স্থলে দস্যুবৃত্তি করিয়া এসিয়ানিবাসিগণকে যেরূপ উৎপীড়িত করিতে প্রবৃত্ত হইয়াছিলেন, তাহাতে তাহারা এসিয়ার কাহারও নিকট সাহায্য পাইবার সুযােগ লাভ করিলেন না। এক সঙ্গে ইউরােপ হইতে নানা প্রবল জাতি, এসিয়াখণ্ডে আপতিত হইবামাত্র, ফিরিঙ্গি-বণিকের প্রাচ-বাণিজ্য মৰ্যদার যে ছায়ামাত্র অবশিষ্ট ছিল, তাহা সহজেই বিলুপ্ত হইয়া গেল।
পরিণাম ১৮ তাহাদিগের বাণিজ্যপােত লুষ্ঠিত হইতে লাগিল; বাণিজ্যকেন্দ্র আক্রান্ত হইতে লাগিল; নূতন নূতন বাণিজ্যকেন্দ্র সংস্থাপিত হইয়া, পুরাতনকে ধ্বংসাবশেষমাত্ৰে পৰ্য্যবসিত করিল। অবশেষে ফিরিঙ্গি-বণিকের প্রাচ্য- বাণিজ্যসাম্রাজ্য জলবুদ্বদের ন্যায় ভারত-সাগরে বিলীন হইয়া গেল। এসিয়াকে বুঝিতে হইলে, ইউরােপের এই ইতিহাস অধ্যয়ন করিতে হইবে। ইউরােপকে বুঝিতে হইলেও, এসিয়ার এই ইতিহাস অধ্যয়ন করিতে হইবে। এসিয়া ইউরােপকে নবজীবন দান করিয়াছে ; ইউ- রােপীর প্রতিযােগিতায় এসিয়ার শেষ নিঃশ্বাস অবরুদ্ধ হইয়া গিয়াছে। এসিয়া না থাকিলে, ইউরােপ এত বড় হইয়া উঠিত না ;-ইউরােপ না থাকিলে, এসিয়া এত ছােট হইয়া পড়িত না ।
উপসংহার ইউরােপ বড় হইয়া উঠিয়াছে, এসিয়া ছােট হইয়া পড়িয়াছে, ইহা সৰ্ববাদিসম্মত। ফিরিঙ্গি-বণিকের ইতিহাস এই বিচিত্র ভাগ্য- পরিবর্তনের ইতিহাস,-তাহাও সৰ্ববাদিসম্মত। কিন্তু ইহার কারণ কি, তৎসম্বন্ধে মতভেদের অভাব নাই। অদৃষ্টবাদের সিদ্ধান্ত নিরতিশয় সরল সিদ্ধান্ত ; তাহার সমালোচনা অনাবশ্যক। অদৃষ্টবাদ আলস্যবাদ;—তাহা কোন ঘটনাই কাৰ্যকারণ- শৃঙ্খলার আবিষ্কার সাধনের জন্য কিছুমাত্র শ্রম স্বীকার করিতে সম্মত হয় না। কারণ, যাহা ঘটিবার, তাহাই ঘটিয়া থাকে,—ইহাই সূত্র। যাহারা ইহাতে আস্থা স্থাপন করিতে অসমর্থ, তঁাহারা ইহার বিবিধ কারণ-পরম্পরার আলােচনা করিয়া গিয়াছেন। সে ইতিহাসে ভারতবর্ষ সকলের নিকট সমানভাবে পক্ষপাতশুন্য সুবিচার লাভ করিতে পারে নাই। ভারতবাসী দুৰ্বল, ভীরু ও কাপুরুষ বলিয়া বর্ণিত হইয়াছে, এবং তাহাদের অযােগ্যতাই তাহাদের অধঃপতনের কারণ বলিয়া উল্লিখিত হইয়া, সর্বত্র সত্য সিদ্ধান্ত বলিয়া মৰ্যাদালাভ করিয়াছে। পরিণামের প্রতি দৃষ্টিপাত করিয়া, অনেক ভারতবাসীও ইহাকেই সত্য সিদ্ধান্ত বলিয়া মানিয়া লইতে বাধ্য হইয়াছেন। তজ্জন্য বিচারবিমূঢ়তা, আত্মশক্তি সম্বন্ধে এক অন্ধ অবিশ্বাসের সৃষ্টি করিয়া, ভারতবাসীকে কালক্রমে সত্য- সত্যই দুর্বল, ভীরু ও কাপুরুষ করিয়া তুলিয়াছে। ভারতবাসীর এই চিত্ত-দুর্বলতা অধঃপতনের পরিণাম”; ইহা তাহার “কারণ” বলিয়া, স্বীকৃত হইতে পারে না। এসিয়া একটি মহাদেশ। তাহা নানা দেশে বিভক্ত। তাহাতে উপসংহার ১৮৭ = নানা জাতি, নানা ভাষা, নানা ধৰ্ম্ম বৰ্ত্তমান। তথাপি এসিয়া অনেক বিষয়ে পৃথক হইয়াও, কোন কোন বিষয়ে এক। তখনও এবং এখনও তাহার প্রমাণ এসিয়ার সকল দেশেই দেদীপ্যমান। বাণিজ্য বিষয়ে এসিয়ার সকল দেশ একই নীতির অনুসরণ করিত। তাহার মূলসূত্র- বিশ্বাস। তজ্জন্য এসিয়ার অন্যান্য দেশের দেশের অধিবাসিগণের ন্যায় ভারতবর্ষের অধিবাসিগণ সকল দেশের, সকল জাতির, সকল ধর্মের বণিক-সম্প্রদায়কে তুল্যভাবে বিশ্বাস করিত,-তুল্যভাবে আশ্রয় দান করিত,-তুল্যভাবেই বাণিজ্যাধিকার প্রদান করিত। সমুদ্রোপকুলের বাণিজ্য-বিপণীশ্রেণী সৈন্যশ্রেণীর সাহায্যে সুরক্ষিত রাখিবার প্রয়ােজন অনুভূত হইত না। যাহারা বাণিজ্য-বন্দরে যাতায়াত করিত, তাহারাও এই নীতির অনুসরণ করিয়া, বিশ্বাসের মৰ্যাদা অক্ষুন্ন রাখিয়াই ভারত-বাণিজ্যে অর্থোপার্জন করিত। তাহারা সকলেই এসিয়াবাসী; অনেক বিষয়ে পৃথক্ হইলেও, এ বিষয়ে এক হইয়া একই নীতির অনুসরণ করিত। কারণ, তাহারা যে চির-পুরাতন সভ্যতা-সদাচারের পক্ষপাতী ছিল, তাহাতে স্বাধীনতা ছিল, স্বেচ্ছাচার ছিল না ;প্রতিযােগিতা ছিল, অনধিকারচর্চা ছিল না যে আসিত, ভারতবাসিগণ তাহাকেই স্বাগত সম্ভাষণে অভ্যর্থনা করিয়া লইত। স্বদেশ-বহিস্কৃত ইহুদী, স্বরাজ্য-বহিস্কৃত পারসী, সেন্টটমাস সম্প্রদায়ভুক্ত খৃষ্টান, আরব, মীশর, পারসিক দেশের মুসলমান, ভারত-বাণিজ্য-বন্দরে তুল্য-রূপেই আশ্রয় লাভ করিয়াছিল, এবং সময়ে সময়ে রাজকার্যেও নিয়ােগ লাভ করিয়াছিল। এ বিষয়ে ভারতবর্ষেই প্রকৃত সাম্যনীতি মৰ্য্যাদা লাভ করিয়াছিল। ফিরিঙ্গি-বণি ভারতবর্ষে উপনীত হইয়া, ভারতবাসীর এই চরিত্র-গুণের প্রচুর পরিচয় প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। ইহা না থাকিলে, ফিরিঙ্গি-বণিকের প্রথম অভিযানই শেষ অভিযানে পর্যবসিত হইত। যাহারা স্বদেশ হইতে অপরিচিত সমুদ্রপথে বাণিজ্য যাত্রা .
১৮৮ ফিরিঙ্গি-বণিক করিয়াছিল, তাহারা পণ্যভাণ্ডার লইয়া স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করিতে না পারিলে, পর্তুগাল হইতে দ্বিতীয় অভিযান অকুলে আত্মবিসর্জনের জঙ্গ যাত্ৰা করিতে সাহসী হইত না। রােমক-শাসনশৃঙ্খলমুক্ত ইউরােপীয় রাজ্যসমূহ যে সভ্যতা-সদাচারের অনুসরণ করিতে শিক্ষালাভ করিয়াছিল, তাহাতে বিশ্বাস অপেক্ষা বাহুবল অধিক প্রাধান্য লাভ করিয়াছিল। সুতরাং সাম্যবাদ অপেক্ষা সুবিধাবাদই অধিক প্রতিষ্ঠালাভ করিয়াছিল। ভারত-সাগরে উপনীত হইবামাত্র ফিরিঙ্গি-বণিক তাহার প্রচুর পরিচয় প্রদান করিয়াছিলেন। ভারতবর্ষ তাহার জন্য প্রস্তুত ছিল না। অল্পসংখ্যক ফিরিঙ্গি-সেনাব আক্রমণে বহুসংখ্যক ভারতবাণী পরাভূত হইত। তাহাতে বাহুবলে! অনুশীলনের অভাব সূচিত হইত; বাহুবলের একান্ত অভাব সূচিত হইত না। কারণ, সেই ভারতবাসী যখন ফিরিঙ্গি-সেনাদলে নিয়োগ প্রাপ্ত হইয়া বাহুবলের অনুশীলনে প্রবৃত্ত হইয়াছিল, তখন তাহারা অল্পায়াসেই ফিরিঙ্গি-সেনার সমকক্ষ হইয়া উঠিয়াছিল। ভারতবাসীকে দুৰ্বল, ভীরু, কাপুরুষ বলিয়া ইতিহাস রচনা করিলে, সে ইতিহাসে সত্যের মর্যাদা সুরক্ষিত হইতে পারে না। নিজ পরিতৃপ্ত প্রাচ্য-সভ্যতা পরার্থ-লােলুপ প্রতীচ্য-সভ্যতার সহিত প্রথম সংঘর্ষেই পরাভূত হইয়া গিয়াছিল। ইহাই ফিরিঙ্গি-বণিকের অভ্যুদয় লাভের মূল তথ্য। যে নীতিতে ফিরিঙ্গি-বণিকের অভ্যুদয়, সেই নীতিতেই তাহার অধঃপতন। তাহা সাম্যবাদ নহে, সুবিধাবাদ ;-ন্যায়বল নহে, বাহুবল। তাহ পরিণামে যােগ্যতমকেই বিজয় দান করিয়াছে।
No text on this page.
No text on this page.