Makardah Saraswat Library, Howrah

Netaji

Bhoumik, Gopal · 2009/08/14

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

মজ
( নেতাজী সুভাষচন্দ্রের জীবনােপন্যাস)
গােপাল ভৌমিক
১৪)
শীপবাশিকোম্পানি
মাতা

প্রকাশক : দিলীপকুমার বােস
২০৩৪, কর্ণওয়ালিশ স্ট্রীট, কলিকাতা।
নেতাজী
(প্রথম প্রকাশ
আষাঢ় ১৩৫৩
t
দাম—দুই টাকা
মুদ্রাকর: শ্ৰপুলিনবিহারী সামন্ত
দি প্রিন্টিং হাউস
৭০, আপার সার্কুলার রােড, কলিকাতা।

মজা

No text on this page.

উৎসর্গ
শ্ৰীযুক্ত মনীষীনাথ ঘােষ
শ্রীচরণকমলেষু

No text on this page.

নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু বর্তমান ভারতের শ্রেষ্ঠ জাতীয় নেতৃবৃন্দের মধ্যে অন্যতম। ব্ৰহ্মরণাঙ্গণে তার সামরিক কীর্তিকাহিনী প্রকাশিত হবার পর তার সম্বন্ধে এরই মধ্যে বহু গ্রন্থ রচিত ও প্রকাশিত হয়েছে। এটা শুভলক্ষণ সন্দেহ নেই। তিনি পরাধীন তিনি স্বাধীন ভারতের যে মুক্তি-পথের সন্ধান দিয়েছেন, তার সঙ্গে পরিচিত হওয়া স্বাধীনতাকামী ভারতীয় মাত্রেরই কর্তব্য। অনেকে প্রশ্ন করতে পারেন--নেতাজী সম্বন্ধীয় এত পুস্তক থাকতে আমি আবার নতুন গ্রন্থ রচনা করতে গেলাম কোন দুঃসাহসে? তদুত্তরে আমার বক্তব্য এই যে বাংলা ভাষায় নেতাজী সম্বন্ধে এ পর্যন্ত যত বই বেরিয়েছে, তার কোন পানির মধ্যেই আমি সুভাষচন্দ্রের আনুপূর্বিক পূর্ণাঙ্গ জীবন, তার রাজনৈতিক মতবাদ এবং জীবন-দর্শনের সন্ধান পাই নি। অথচ পাঠক-পাঠিকা সমাজে এরকম একখানি বইয়ের চাহিদা আছে বলে আমার মনে হয়। আলােচ্য গ্রন্থে আমি এই অভাব পূরণ করারই প্রয়াস পেয়েছি। আমি বহু ইংরেজী, বাংলা গ্রন্থ ও সংবাদ পত্র এবং সাময়িক পত্রাদি থেকে প্রয়ােজনীয় তথ্যাদি সংগ্রহ করে স্বল্প আয়তনের মধ্যে নেতাজীর একখানি নির্ভরযােগ্য তথ্যপূর্ণ জীবনী রচনার চেষ্টা করেছি। এই গ্রন্থ রচনায় আমাকে যার প্রেরণা সব চেয়ে বেশী অনুপ্রাণিত করেছে তিনি স্ত্রী পাবলিশিং কোম্পানির কর্ণধার বন্ধুবর ঐদিলীপকুমার বােস। তঁার উৎসাহ ও আগ্রহ না থাকলে এ গ্রন্থ রচনা করা হয়ত হয়েই উঠত না। নেতাজীর সমগ্র জীবন-কথা জানতে উৎসুক-বাংলার এমন অগণিত পাঠক পাঠিকাদের জন্যেই আমার দুঃসাহসিক প্রচেষ্টা। তাদের তৃপ্তি বিধান করতে পারলেই আমার প্রচেষ্টা সার্থক হয়েছে বলে মনে করব। কলিকাতা জ্যৈষ্ঠ ১৩৫৩ গােপাল ভৌমিক

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

নেতাজী বাল্য ও কৈশাের মহাত্মাজী বলতে যেমন সমগ্র বিশ্বের রাজনীতি-ক্ষেত্রে মাত্র একজন বিশেষ ব্যক্তিকে বােঝায়, নেতাজী বলতেও আজ তেমনই সমগ্র বিশ্বে একটি মাত্র লােককেই বােঝায়। মহাত্মাজী ও নেতাজী–পরাধীন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে দুটি বিরাট স্তম্ভ বিশেষ । এদের দুজনের স্বাধীনতা সংগ্রামের পথ ও মত ভিন্ন—কিন্তু লক্ষ্য এক এবং অভিন্ন। দুজনেরই জীবনের মূলমন্ত্র পরাধীন ভারতের স্বাধীনতা, নির্যাতিত নিপীড়িত ভারতবাসীর বৈদেশিক শােষণ-মুক্তি। রাজনীতির ক্ষেত্রে স্বাধীনতার সংগ্রামে অহিংসার অস্ত্র প্রয়ােগ করে গান্ধীজী সমগ্র বিশ্বের সম্মুখে এক নতুন আদর্শ সংস্থাপন করেছেন। তিনি শুধু রাজনৈতিক নেতা নন, তিনি আধ্যাত্মিকতার শিক্ষক, নতুন জীবন-বেদ ও দর্শনের উদগাতা। নেতাজী সুভাষচন্দ্রের জীবনের দিক মাত্র একট—তিনি পরাধীন ভারতের স্বাধীনতার একনিষ্ঠ উপাসক। ভারতকে দাসত্বের থেকে উদ্ধার করা ছিল তার কৈশােরের স্বপ্ন, যৌবনের ধ্যান, সমগ্র জীবনের ঐকান্তিক সাধনা। গান্ধীজীর মত নিজের দেশের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্ব-মানবতার কল্যাণ সাধনা হয়ত তার জীবনের ব্রত নয় । তাই তিনি দার্শনিক চিন্তায় কালক্ষেপ করতে পারেন নি কিংবা স্বাধীনতা লাভের একমাত্র অস্ত্র হিসাবে অহিংসাকেও গ্রহণ করতে পারেন নি।

নেতাজী রাজনীতিক্ষেত্রে নেতাজী তাই চরম বিপ্লবী—ভারতের স্বাধীনতার জন্যে তিনি যে কোন পন্থা অবলম্বনে প্রস্তুত। গান্ধীজীকে যদি বুদ্ধ, যীশুখৃষ্ট প্রভৃতি বিশ্বপ্রেমিকদের সমপর্যায়ভুক্ত করা যায়, তবে নেতাজীকেও গ্যারিবী, ম্যাটসিনি, ওয়াশিংটন, ডিভ্যালেরা, লেনিন প্রভৃতি বিশ্বের দেশপ্রেমিক বিপ্লবীদের সঙ্গে সমপর্যয় ভুক্ত করতে হয় । বরং কোন কোন বিষয়ে নেতাজী এদের চেয়েও শ্রেষ্ঠ ছিলেন। তারা জীবনে যে সুযােগ ও সুবিধা পেয়েছিলেন, নেতাজী সেই সব সুযােগ সুবিধা পেলে ভারতের স্বাধীনতা-সংগ্রামকে পূর্ণ সাফল্যমণ্ডিত করতে পারতেন। সাফল্যই সব কিছু নয়—প্রচেষ্টার মূল্য ও কোন ক্রমে উপেক্ষণীয় নয়। একবার ভাবুন’ত দেখি নিরস্ত্র নিরীহ একটি বাঙ্গালী সন্তান আজাদ হিন্দ, গবর্নমেন্ট গঠন করে এবং আজাদ হিন্দ ফৌজের মত সুশিক্ষিত নােবাহিনী তৈরী করে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিপুল সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে ভারতের স্বাধীনতা-সংগ্রাম পরিচালনা করছেন। শ্রদ্ধায় ও বিস্ময়ে মাথা নত হয়ে আসে নাকি ? তা ছাড়া সময়ই বা কত অল্প ! ওয়াশিংটন, গ্যারিবী বা ডিভ্যালেরা মাসের পর মাস, বৎসরের পর বৎসর তাদের মুক্তিফৌজ গড়ে তুলে- ছিলেন। আর নেতাজী মাত্র এক বৎসর সময়ের মধ্যে সেই অসাধ্য সাধন করেছিলেন। আজাদ হিন্দ, ফৌজের মহান কীতি বিস্ময়ের উদ্রেক করলেও, যারা এর সংগঠক ও পরিচালক নেতাজী সুভাষচন্দ্রকে জানেন, তারা জানেন যে তার পক্ষে এরূপ কৃতিত্ব আদৌ অসম্ভব নয়। জন্ম-বিপ্লবী সুভাষচন্দ্রের মত কর্মমুখর ঘটনাবহুল জীবন আর কোন ভারতীয় নেতার আছে কিনা সন্দেহ। তিনি যেন রূপকথার রাজপুত্র নেতাজী -দৈত্যপুরীতে বন্দিনী রাজকুমারীকে উদ্ধার করাই তার জীবনের একমাত্র ব্রত। বন্দিনী রাজকুমারী এখানে দুঃখিনী ভারতমাতা- তিনি মুক্তি চান ব্রিটিশদের হাত থেকে। সুভাষচন্দ্র জীবনের প্রথমেই মায়ের এই ব্যাকুল আহ্বান শুনেছিলেন এবং সেই থেকে পরাধীন ভারতের মুক্তি সাধনাই হয়ে দাড়িয়েছিল তার জীবনের ব্রত। এই ব্ৰত উদ্যাপন করতে গিয়ে তিনি জীবনের সব সুখস্বাচ্ছন্দ্য দিয়েছিলেন বিসর্জন, রাজরােষ, কারাজীবন, নির্বাসন কিছুই তঁাকে ব্রতচ্যুত করতে পারে নি। শেষ পর্যন্ত সেই প্রেরণায় তিনি চরম দুঃখ বরণ করে নিয়ে গড়ে তুলেছিলেন আজাদ হিন্দ ফৌজ। সুভাষচন্দ্রের জীবনকথা রূপ- কথারই মত চমকপ্রদ—বিস্ময়কর। তার জীবনকথা পুরােপুরি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে আজাদ হিন্দ ফৌজ তার জীবনের শ্রেষ্ঠ কীর্তি হলেও, এটা তার জীবনের কোন একটি আকস্মিক ঘটনা নয়।• জীবনে তিনি যে চরম বিপ্লবী রাজনীতির ধারক ও পােষক ছিলেন, আজাদ হিন্দ ফৌজ তারই মূর্ত বহিঃপ্রকাশ মাত্র। ৩শে জানুয়ারী তারিখটি ভারতের স্বাধীনতা-সংগ্রামের ইতিহাসে ২৩শে স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ থাকবে। ১৮৯৭ খৃষ্টাব্দের এই তারিখটিতে কটক- প্রবাসী একটি সম্ভান্ত বাঙ্গালী কায়স্থ পরিবারে নেতাজী সুভাষচন্দ্র জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম ছিল রায়বাহাদুর জানকীনাথ বসু এবং মাতার নাম ছিল প্রভাবতী দেবী। তাদের পৈতৃক গৃহ ছিল ২৪ পরগণা জেলায় কোদালিয়া গ্রামে। জানকীবাবু আইন-ব্যবসায়ী ছিলেন এবং ব্যবসায়-সূত্রেই কটকে বসবাস করতেন। তিনি সে সময় কটকের সরকারী উকিলের পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। সে সময় কটকে নেতাজী তার মত প্রতিষ্ঠাবান উকিল আর ছিল না। তিনি কটক বারের সর্বজনমান্য নেতা ছিলেন বললেও অত্যুক্তি হয় না। তা ছাড়া, কটকের জনসমাজেও তাঁর প্রতিষ্ঠার অন্ত ছিল না। এই জনপ্রিয়তার জন্যেই জানকীনাথ বেশ কিছুকাল কটক মিউনিসিপ্যালিটি ও জেলা- বাের্ডের চেয়ারম্যান পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। ওদিকে স্বকার্যে কৃতিত্বের অন্যে রাজদরবারেও তাঁর প্রতিষ্ঠা ছিল। এই প্রতিষ্ঠার প্রমাণ তাঁর সরকারী রায়বাহাদুর খেতাব লাভ। কিন্তু সরকারী খেতাব লাভ করেছিলেন বলেই জানকীনাথের অন্তরে স্বদেশপ্রেম ছিল না মনে করলে ভুল করা হবে। সুভাষচন্দ্রের সুভাষচন্দ্রের চরিত্রে আমরা জলন্ত স্বদেশ প্রেমের যে বিরাট মহীরুহ দেখতে পাই, তার বীজ নিহিত ছিল পিতারই চরিত্রে।/ আইন অমান্য আন্দোলন দমনের জন্যে গবর্ণনেন্ট যখন কঠোর ব্যবস্থা অবলম্বন করেছিলেন, তার প্রতিবাদে জানকীনাথ সরকারী রায়- বাহাদুর খেতাব ত্যাগ করে নিজের দেশপ্রেমের প্রমাণ দিতে কুণ্ঠিত হন নি। পিতার চরিত্র যেমন সুভাষচন্দ্রকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করে তুলেছিল, মাতার আদশ ধর্মনিষ্ঠ চরিত্র তেমনি তার মনে এনে দিয়েছিল কোমলতা, ধর্মনিষ্ঠা। প্রভাবতী দেবী তাঁর পরিবারে ‘মা-জননী' নামে পরিচিত। ছিলেন। সমস্ত পুত্রকন্যার মধ্যে সুভাষচন্দ্ৰই ছিলেন তার চোখের মণি । সুভাষচন্দ্রও মাকে অন্তরের সমস্ত শ্রদ্ধাভক্তি দিয়ে ভালবাসতেন। মার পরদুঃখকাতরতা অতি শৈশব থেকে পুত্রের চরিত্রেও প্রতিফলিত হয়েছিল। সুভাষচন্দ্র পিতামাতার ষষ্ঠ পুত্র ছিলেন। তাঁর অন্যান্য সব ভাইও জীবনে কৃতবিদ্য এবং সুপ্রতিষ্ঠিত। তাঁর প্রিয় মেজদাদা শ্ৰীযুক্ত / নেতাজী শরৎচন্দ্র বসু প্রখ্যাতনামা ব্যারিষ্টার এবং বর্তমানে বাঙ্গলার অবিসম্বাদী নেতা। সুভাষচন্দ্রের রাজনৈতিক কর্মজীবনে শরৎচন্দ্রের নীরব অকুণ্ঠ দান শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণযােগ্য। শরৎচন্দ্রের সঙ্গে সুভাষচন্দ্রের এই আন্তরিক অকৃত্রিম যােগাযােগ বাল্যের থেকেই গভীর ছিল। পরিবারের অন্য একটি লােকের সঙ্গেও সুভাষচন্দ্রের শৈশব থেকেই গভীর হৃদয়ের যােগাযােগ ছিল। এর নাম সারদা-ইনি ছিলেন বসু পরিবারের পরিচারিকা, আশৈশব সুভাষচন্দ্রের দাই-মা। এই অশিক্ষিত পরিচারিকা অন্তরের স্নেহ উজার করে দিয়ে ছােট থেকে সুভাষচন্দ্রকে কোলেপিঠে করে মানুষ করেছিলেন। সুভাষচন্দ্রের যত কিছু স্নেহের অত্যাচার আবদার সব কিছু চলত সারদার উপরে। তিনি সস্নেহে সুভাষচন্দ্রের সব আবদারই রক্ষা করে চলতেন। সুভাষচন্দ্র ও একে মায়ের মতই ভক্তি করতেন। ইনি আমৃত্যু বসু পরিবারেই, ছিলেন। সুভাষচন্দ্র জীবনে কোনদিন অর্থোপার্জন করলেন না, বিবাহাদি করে সংসারধর্ম পালন করলেন না—এতে সারদা বিশেষ সন্তুষ্ট ছিলেন না। তার মত অশিক্ষিতা পরিচারিকার পক্ষে সুভাষচন্দ্রের জীবনের মহং ব্রত বুঝতে পারা সম্ভব নয়। তবে একদিনও সুভাষচন্দ্রের উপর থেকে তার স্নেহদৃষ্টি বিচ্যুত হয়নি। একদিন কে যেন সারদাকে প্রশ্ন করেছিল, তিনি সুভাষচন্দ্রের মােটরে যাচ্ছেন কিনা, এ প্রশ্নের উত্তরে সারদা আক্ষেপের সঙ্গে বলেছিলেন : “সুভাষ আবার মােটর গাড়ী পাবে কোথায় ? সে ত জীবনে কিছু রােজগারই করল না। হায় ! ও আর মানুষ হবে না !” ১৯৪১ সালে সুভাষের গৃহত্যাগের পর স্নেহশীলা পরিচারিকার হৃদয় যেন ভেঙে পড়েছিল। এই ঘটনার এক বছরের নেতাজী মধ্যেই তিনি ভগ্নহৃদয়ে মারা যান। এর এক বৎসর পরে ১৯৪৩ খৃষ্টাব্দে ২৮শে ডিসেম্বর সুভাষচন্দ্রের স্নেহময়ী জননী প্রভাবতী দেবীও পুত্রের দীর্ঘ বিচ্ছেদ সহ্য করতে না পেরে ভগ্নহৃদয়ে দেহত্যাগ করেন। আর তাঁর প্রিয় পুত্র পরাধীন ভারতের প্রিয়তম নেতাজী বন্দিনী দেশমাতৃকার পায়ের শিকল খােলার সাধনায় তখন ব্ৰহ্মদেশে আজাদ হিন্দ ফৌজ গড়ে তুলছেন। বালক বয়স থেকেই সুভাষচন্দ্র ছিলেন ভিন্ন প্রকৃতির। সাধারণ আর দশজন ছেলের মত তার জীবনযাত্রা ছিল না। তিনি তীক্ষ্ণধী মেধাবী ছাত্র ছিলেন। কিন্তু নেহাৎ ভাল ছেলের মত সব সময় পড়াশুনাে করা তিনি ভালবাসতেন না। পরের দুঃখ মােচন, রােগীদের সেবাশুশমা প্রভৃতির দিকে তাঁর প্রথম থেকেই ঝোঁক দেখা যায় । ছাড়া অতি অল্প বয়স থেকেই তার চরিত্রে ধর্মভাবের বিকাশ দেখা যায়। তাঁর ছাত্রজীবনের হাতে খড়ি হয় কটকের প্রােটেষ্টান্ট ইউরােপীয় স্কুলে। সুভাষচন্দ্র স্বচ্ছল বাঙ্গালী পরিবারের সন্তান ছিলেন বলে তাকে কখনও অভাবের যন্ত্রণা ভােগ করিতে হয়নি। না চাইতেই তিনি হাতের কাছে সব কিছু পেয়ে যেতেন। কিন্তু তাতে তার তৃপ্তি হত না। জীবনের গােড়া থেকেই তার চরিত্রে কেন যেন একটা স্বর্গীয় অতৃপ্তি’ ছিল। তার পরিবারের সকলেরই বিশ্বাস ছিল যে তিনি বড় হয়ে একদিন যশ খ্যাতি ও অর্থের অধিকারী হবেন। কিন্তু কেউ কোনদিন স্বপ্নেও ভাবতে পারেন নি যে এই ছেলেই একদিন বড় হয়ে ভারতে ব্রিটিশ গবর্ণমেন্টের শ্রেষ্ঠ শত্রু হয়ে দাড়াবেন এবং পরাধীন ভারতের স্বাধীনতা-সংগ্রামের সেনানায়করূপে বিশ্বের ইতিহাসে অমর কীতি নেতাজী রেখে যাবেন। যাই হােক, সুভাষচন্দ্র পাঁচ বৎসর বয়সে প্রােটেষ্টান্ট ইউরােপীয় স্কুলে ভর্তি হন এবং বারো বৎসর বয়স পর্যন্ত এখানে পড়েন। তারপর ১৯০৯ খৃষ্টাব্দে তাকৈ কটকের র্যাভেনশ কলেজিয়েট স্কুলে ভর্তি করে দেওয়া হয়। কলেজিয়েট স্কুলেও তিনি বিশেষ কৃতিত্বের পরিচয় দেন। সাধারণত দেখা যায় যে যারা বড়লােকের ছেলে, যার। বহু অর্থব্যয়ে বড় এবং ভাল স্কুল কলেজে শিক্ষা পায়, তারা শিক্ষার ক্ষেত্রে বিশেষ কৃতিত্ব দেখতে পারে না। তার কারণ অর্থের বাহুল্য-জনিত বিলাসব্যসনই তাদের জীবনের বহু সময় নিয়ে নেয়। কিন্তু সুভাষচন্দ্র সম্বন্ধে আদৌ একথা বলা চলে না। তাকে মুহূর্তের মধ্যেও পরিবেশের দাস হতে দেখা যায়নি—বরং তিনি এমন অন্য ধাতুতে গড়া ছিলেন যে বিলাবাসন তাকে স্পর্শ করতে পারত না, তিনি ছিলেন পারিপার্শ্বিক পরিবেশের উধ্বে। তাই কলেজিয়েট স্কুলে তিনি প্রত্যেকবারই নিজের শ্রেণীতে প্রথম স্থান অধিকার করতেন। ভাল ছাত্র হিসাবে তিনি শিক্ষক মােয়দের প্রিয়পাত্র ছিলেন। কলেজিয়েট স্কুলের জীবনে তিনি আদর্শ চরিত্রের প্রবীন শিক্ষক বেণীমাধব দাস মশায়ের গভীর সংস্পর্শে আসেন। এই সংস্পর্শ তার জীবনের গতি ফেরাতে যথেষ্ট সাহায্য করেছিল। দেশপ্রেমিক ও ধর্মনিষ্ঠ বেণীবাবুর আদর্শ চরিত্র সুভাষচন্দ্রকে মুগ্ধ করে, তিনি তার দ্বারা অনুপ্রাণিত হন। এই সময় সাধক রামকৃষ্ণ দেব এবং সৈনিক-সন্ন্যাসী স্বামী বিবেকানন্দের প্রভাবও সুভাষচন্দ্রের চরিত্রে দেখা যায়। তিনি সযত্নে রামকৃষ্ণ দেবের কথামৃত এবং স্বামী বিবেকানন্দের তেজোদ্দীপক কর্মের বাণী-মুখর গ্রন্থাবলী পাঠ করতেন। তার নেতাজী এ সময়ের পর্যালােচনার প্রধান সঙ্গিনী ছিলেন মাতা প্রভাবতী দেবী। তিনি ধর্ম সম্বন্ধে পুত্রকে উৎসাহিত করতেন। ধর্মালােচনা ছাড়াও সুভাষচন্দ্রের এ সময়ের বড় কাজ ছিল দরিদ্র-নারায়ণের সেবা, পরের দুঃখ যােচন, রুগ্নদের শুষ। কয়েকজন সমধর্মী বন্ধুর সঙ্গে সুভাষচন্দ্র একটি ছােট খাটো দল গড়ে তােলেন। এই দলের উদ্দেশ্য হয় রামকৃষ্ণ- বিবেকানন্দের উপদেশ অনুসারে নিজেদের জীবন গড়ে তােলা, পরহিতে জীবন উৎসর্গ করা, আজীবন ব্রহ্মচারী থাকা। তাঁর জীবনের ভবিষ্যৎরূপ তখন পর্যন্ত সুভাষচন্দ্রের কাছে স্পষ্ট হয়ে ধরা না পড়লেও এ বােধ তাঁর ছিল যে তিনি সাধারণ দশজন লােকের মত গতানুগতিক জীবন যাপনের জন্যে পৃথিবীতে আসেন নি। পৃথিবীতে আসেন নি। তার জীবনের বিশেষ উদ্দেশ্য চিনে নিতে তার আরও কয়েক বৎসর সময় লেগেছিল বটে—কিন্তু তিনি তখন থেকেই ভবিষ্যৎ জীবনের জন্যে প্রস্তুত হচ্ছিলেন। সুভাষচন্দ্রের জ্যেষ্ঠভ্রাতা শ্ৰীযুক্ত সতীশচন্দ্র বসু নেতাজীর ৫০তম জন্মদিবস উপলক্ষে লাহোরের উদু দৈনিক ‘মিলাপে’ তার বাল্যজীবনের যে বর্ণনা দিয়েছিলেন, এখানে তার অংশ বিশেষ উদ্ধৃত করে দিচ্ছি । “সুভাষ যখন মাত্র ১৫ বৎসরের বালক তখনই সে ছাত্রদের মধ্য থেকে আত্মত্যাগী কর্মীদের একটি দল গঠন করে তুলেছিল। সহরে এবং পাড়াগায়ে কলেরা, বসন্ত প্রভৃতির মহামারী লাগলে যন্ত্রণাকাতর রােগীদের সেবা-শুশ্রুষা করাই ছিল এই দলের কাজ। কয়েকবার সে বহুদূরে কলের'র মহামারী লেগেছে শুনে পায়ে শুনে পায়ে হেঁটে কটক থেকে সুদূর গ্রামে কষ্ট করে গেছিল। একবার সে কয়েকজন কলেরা রােগীকে শুশ্রুষা করার জন্যে জাজপুর সহরে কটক) গেছিল। তার নেতাজী এবং তার সহকর্মীদের জাজপুর রােড ষ্টেশন থেকে বহুদূর পায়ে হেঁটে জাজপুর সহরে যেতে হয়েছিল। সেখানে কয়েকদিন কাটানাের পর সে শীর্ণ বিবর্ণ হয়ে ফিরে এসেছিল বাড়ীতে। তার নেতৃত্বে অপর একটি ছাত্রসও গড়ে উঠেছিল—তাদের ব্রত ছিল আজীবন কৌমার্য । কিন্তু সে নিজে এবং আর ২১জন ছাড়া এপর্যন্ত আর কেউ সে ব্রতের মর্যাদা রক্ষা করে নি।” জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা প্রদত্ত এই বিবরণের মধ্যে সুভাষচন্দ্রের কৈশােরের একটা নিখুৎ চিত্র প্রতিফলিত। তিনি যে রাতারাতি নেতাজী হয়েছেন, তা নয়। তিনি ছিলেন জন্ম-নেতা। কিশোের-বয়সেও তিনি ছাত্রদের নেতৃত্ব করতেন এবং আজাদ হিন্দ ফৌজের মত তিনি স্বদলীয় ছাত্রদেরও কলেরা বসন্ত প্রভৃতি মারাত্মক বােগের হাতে নিশ্চিত মৃত্যুর মধ্যে ঠেলে নিয়ে যেতেন। রণক্ষেত্রে উদ্যত গােলার মুখে নিজে দাড়িয়ে থেকে তিনি যেমন আজাদ হিন্দ ফৌজের মনে অসীম সাহস সঞ্চার করতেন, তেমনি কৈশােরের সহকর্মীদের সঙ্গে পাশাপাশি দাড়িয়ে তিনি কলেরা বসন্ত রােগে আক্রান্ত রােগীদের শুশ্রুষা করে তাদের মনে জন-সেবার প্রেরণা জোগাতেন। নেতৃত্বের গুণাবলী তার চরিত্রে জীবনের প্রথম থেকেই ছিল। তবে বয়ােবৃদ্ধি এবং অভিজ্ঞতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সেই সব গুণ বিকাশ লাভ করেছিল মাত্র। যাই হােক, সুভাষচন্দ্রের স্কুলজীবনের যে রােজনামচা আমরা দেখলাম তাতে মনে হয় না যে তিনি নিজের পড়াশুনাের পিছনে খুব বেশী সময় দিতেন। কিন্তু তিনি এত তীক্ষ্ণধী ছিলেন যে বার্ষিক পরীক্ষায় প্রতিবারই ক্লাসে প্রথম স্থান দখল করতেন। খৃষ্টাব্দে তিনি কটকের ব্যাভেনশ কলেজিয়েট স্কুল থেকেই ম্যাট্রিকুলেশন নেতাজী পরীক্ষায় সসম্মানে উত্তীর্ণ হন। বিশ্ববিদ্যালয়ের উত্তীর্ণ ছাত্রদের মধ্যে তিনি দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন। প্রবেশিকা পরীক্ষায় ইংরেজীতে তিনি এত ভাল করেছিলেন যে পরীক্ষক তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে বলেছিলেন: “আমি নিজে পরীক্ষা দিলেও এত ভাল করতে পারতাম ।” মাত্র মােল বৎসরের একটি কিশােরের পক্ষে এ কৃতিত্ব অর্জন কম কথা নয়। এইখানেই সুভাষচলের উড়িষ্যার জীবনে ছেদ পড়ল পরীক্ষায় পাশ করে তিনি এলেন কলকাতায় কলেজে পড়তে। কলেজে পড়ার সময় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিতাড়িত হয়ে তিনি অবশ্য মাঝে বৎসর দুই পুনরায় কটকে কাটিয়েছিলেন। যাক, সে পরের কথা। - কলেজ-জীবন ও ইংল্যাণ্ড-প্রবাস ১৯১৩ খৃষ্টাব্দে কলকাতায় এসে সুভাষচন্দ্র প্রেসিডেন্সী কলেজে আই-এ ক্লাসে ভর্তি হলেন। স্কুল থেকে কলেজে এসেও তার জীবনের ধারা বিশেষ পরিবর্তিত হল না। তা ছাড়া তিনি উড়িষ্যার আবহাওয়া থেকে এসে পড়লেন বাঙ্গলার রাজধানীর আবহাওয়ায়। কিন্তু এই পরিবর্তনের কোন সুস্পষ্ট ছাপ সঙ্গে সঙ্গেই তার উপর পড়ল না। ধর্ম-বােপ, ধর্মচর্চা, দীনদুঃখীর সেবা পূর্বের মতই তার জীবনকে ঘিরে রইল। রাজনৈতিক বােৰ তখনও কিশাের তরুণের মনে মাথা চাড়া দেবার সুযােগ পায় নি। রাজনীতি-ক্ষেত্রে বাঙ্গলা দেশ চিরদিনই চরম ১৮৫৭ সালের বিপ্লবের পর সাময়িক ভাবে সমগ্র দেশ কিছু কালের জন্যে সুপ্ত হয়ে পড়েছিল। সমগ্র ভারতের মনে নব চেতনার সঞ্চার করে বাঙ্গলাই ভারতবাসীদের সে মােহ-নিদ্রার অবসান করেছিল। বাঙ্গলা দেশের উদ্যোগী নেতাদের প্রচেষ্টাতেই ১৮৮৫ খৃষ্টাব্দে আমাদের জাতীয় কংগ্রেসের অভ্যুদয় হয়েছিল। সুভাষচন্দ্র যখন কলেজের ছাত্র তখনও কংগ্রেসের ধারক ও পােষক ছিলেন প্রধানত বাঙ্গালী নেতারাই। তা ছাড়া ১৯০৫ সালের স্বদেশী আন্দোলনে বাঙ্গলা দেশই ছিল অগ্রণী। আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনে এই ১৯০৫ সাল একটি গৌরবময় যুগ। কটক প্রবাসী কিশাের সুভাষচন্দ্রের চোখের আড়ালেই পন্থী।

নেতাজী এ সব ঘটনা-প্রবাহের বিবর্তন হয়েছিল। তিনি যদি সে সময় এই ঘটনাবর্তের কেন্দ্রস্থল কলকাতায় থাকতেন, তবে নিঃসন্দেহে বলা যায় যে তার অনিসন্ধিৎসু বলিষ্ঠ মনে আরও অল্প বয়সেই রাজনৈতিক বােধর সঞ্চার হত। তিনি যখন কলেজে ভর্তি হলেন, তখন ইউরােপে প্রথম মহাযুদ্ধ প্রায় আরম্ভ হয় হয় ভাব । তার কিছুদিন পরেই মহাযুদ্ধ আরম্ভ হয় এবং তার ফলে আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনও হয়ে পড়ে । কিছুটা স্তিমিত। তাই তখনও রাজনীতির দিকে সুভাষচন্দ্রের দৃি ঘােরার সুযােগ পায়নি। তিনি তার ব্রহ্মচারী-সুলভ জীবন যাপন এবং রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দের আদর্শ নিয়ে তখনও আচ্ছন্ন । অন্যান্য ছাত্রদের মত সাধারণ জীবন যাপন করতে তিনি পারতেন সেই খাওয়া দাওয়া, খেলাধুলো, থিয়েটার, সিনেমা দেখা পড়াশুনাে করা—এ ধরণের জীবন-যাত্রার কথা সুভাষচন্দ্র কোনদিনই ভাবতে পারেন নি। তার বুদ্ধিবাদী, সত্যান্বেষী মনে এতটুকু শান্তি ছিল না—কি একটা অজানার আকর্ষণ যেন সব সময় তাকে বাইরের দিকে টানত। কাজেই যে বয়সে আমাদের ছেলেরা পথে পথে খেলা করে বেড়ায় কিংবা স্কুল কলেজে শান্তশিষ্ট হয়ে পড়াশুনাে করে, বাড়ীতে গিয়ে ভাল ছেলের মত পিতামাতার উপদেশ অনুসরণ করে চলে, নিজের একটা স্বাধীন মতামতই যে বয়সে জন্মায় না, সেই বয়স থেকেই সুভাষচন্দ্র ছিলেন অন্য ধরণের। তিনি তখন ধর্মকর্ম করছেন, ধর্মের পথে মুক্তি খুজছেন। তার কিশাের হৃদয়ের এই ব্যাকুলতা কেউ বুঝত কিনা জানি না—তবে তিনি নিজে এ ব্যাকুলতার সন্ধান রাখতেন। কলকাতায় এসেও তিনি তার সমধর্মীদের একটা দল পেয়ে গেলেন। ১২ নেতাজী সেই সময় কলিকাতা মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র ডাক্তার সুরেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রচেষ্টায় মির্জাপুর স্ট্রীটে ছাত্রদের একটি দল গড়ে উঠেছিল। এই দলের আদর্শ ছিল কৌমার্যব্রত পালন, দীন দুঃখীর সেবা এবং ধর্ম জীবন যাপন। সুভাষচন্দ্র এই দলের আদর্শের মধ্যে নিজের জীবনাদর্শের কিছুটা প্রতিফলিত দেখলেন। তাই তিনি অবিলম্বে এই দলে অন্যতম উৎসাহী সদস্যরূপে যােগ দিলেন। प খানেই ত্যাগব্ৰতী কংগ্রেস নেতা ডাঃ প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষের সঙ্গে তার ঘনিষ্ট পরিচয় হয়। এমনি করে কলেজ জীবনের একটি বছর কেটে গেল। কিন্তু অশান্ত সত্যান্বেষীর মনে শান্তি নেই—তিনি যেন সব সময় কিসের একটা অভাব অনুভব করেন। কিশাের সত্যান্বেষীর হৃদয়ের সে অন্ধ ব্যাকুলতা বুদ্ধি দিয়ে বােঝা যায় না—হৃদয় দিয়ে অনুভব করতে হয়। এই রকম একটা অজানার টানেই একদিন বুদ্ধ স্ত্রী পুত্র রাজ্যপাট ছেড়ে পথে বেরিয়ে পড়েছিলেন, চৈতন্য করেছিলেন গৃহত্যাগ, স্বামী বিবেকানন্দ হয়েছিলেন হিমালয়বাসী। ধর্মপিপাসু সুভাষচন্দ্র এদের সকলের কথাই মনোেযােগ দিয়ে পড়েছিলেন। তাই তার মনে একটা ধারণা জন্মেছিল যে হিমালয়ে গেলে তিনি হয়ত প্রকৃত গুরুর সন্ধান পাবেন—যিনি তাকে দেবেন প্রকৃত পথের নির্দেশ। ধর্ম ই তখনও তার জীবনের মূল বস্তু। তাই এই অজানার আহ্বানে অসীম শান্তিলাভ এবং মুক্তির আশায় ১৯১৪ সালে তিনি হঠাৎ একদিন করলেন গৃহত্যাগ। কাউকে কিছু বলে যান নি—কেননা তিনি জানতেন যে পিতামাতা, ভ্রাতা, ভগ্নীদের তিনি যেরূপ প্রিয়, তাতে তার সংকল্পের কথা জানতে পারলে নেতাজী কেউ তাকে যেতে দেবে না। তাই এক সমধর্মী বন্ধুর সঙ্গে তিনি রিক্ত হস্তে যাত্রা করলেন নিরুদ্দেশের পথে-উদ্দেশ্য গুরুলাভ। তার নিরুদ্দেশ যাত্রায় পরিবারে বজ্রাঘাত হল । পরিবারের সকলেরই তার উপর যেমন বিশেষ স্নেহ-দৃষ্টি ছিল, তেমনই ছিল তার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে উচ্চাশ। উদ্বিগ্ন চিত্তে সুভাষচন্দ্রের স্নেহময়ী জননী পুত্রের পুনর্দশন আশায় রাতের পর রাত জেগে কাটাতে লাগলেন—এ যেন গৃহত্যাগী নিমাইর জন্যে শচীমাতার উদ্বিগ্ন প্রতীক্ষা। এখানে সেখানে খোঁজ-খবর করা হল—কিন্তু কোথাও সুভাষচন্দ্রের কোন হদিস পাওয়া গেল না। সত্যান্বেষী তরুণ তখন হিমালয়ের পাদমূলে হরিদ্বার, মথুরা প্রভৃতি স্থানে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তার বিশ্রাম নেই—অহরহ শুধু গুরুর চিন্তা। সারা পৃথিবী যখন রাত্রির কোলে নিদ্রামগ্ন তখনও নির্ভীকচিত্ত তরুণ স্থান থেকে স্থানান্তরে যাচ্ছেন গুরুমিলনের প্রত্যাশায়। এমনই ভাবে তিনি পুরাে ছয়টি মাস ভারতের বহু বিখ্যাত তীর্থক্ষেত্রে ঘুরে বেড়ালেন। হরিদ্বার, মথুরা, বৃন্দাবন, দিল্লী, আগ্রা, বারাণসী, গয়া প্রভৃতি বহুস্থানে তিনি গেলেন। কোথাও তার ঈপ্সিত গুরুর সন্ধান মিলল না। এই গুরুর সন্ধান না পাওয়া আমাদের দেশের পক্ষে ভালই হয়েছে। সুভাষচন্দ্র যদি প্রকৃত গুরুর সন্ধান পেতেন, তবে কোনদিন হয়ত আর গৃহ-জীবনে ফিরে আসতেন না। ফলে তরুণ ভারত হারাত এক মহা শক্তিশালী বিপ্লবীকে যিনি আজ ভারতের স্বাধীনতা- আন্দোলনকে নতুন ভাবে সঞ্জীবিত করে তুলেছেন। বিভিন্ন স্থানে সাধু মহান্তদের বিলাসী জীবনযাত্রা দেখে সুভাষচন্দ্র তাদের উপর বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়লেন। স্পর্শকাতর তরুণ মনের উপর ১৪ নেতাজী বাস্তবের এই আলােকসম্পাতে মিথ্যা মােহ ভেঙে গেল। এদিকে ক্রমশ অতি পরিশ্রমে এবং অনভ্যস্ত জীবন যাপনে তার স্বাস্থ্যও খারাপ হয়ে পড়ছিল। তিনি দেখলেন যে বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে তথাকথিত সাধু মহান্তরা সাধারণ লােকদের চেয়েও বেশী বিলাসী, আয়েসী এবং স্বার্থবাদী। তাছাড়া, বারাণসীতে তারা যখন রামকৃষ্ণ মিশনের এক কর্মীর সঙ্গে কিছুকাল কাটান, তখন তিনি সুভাষচন্দ্র ও তার বন্ধুকে বৃথা কালক্ষেপ না করে বাড়ী ফেরার পরামর্শ দেন। সুভাষচন্দ্র একে সাধু- সন্ন্যাসীদের উপর বিরক্ত হয়ে উঠেছিলেন, তার উপর অনিয়ম অত্যাচারে তার শরীর ভেঙ্গে পড়তে শুরু করেছিল। তাই তিনি প্রায় ছয় মাস পরে কলকাতায় ফিরে আসাই মনস্থ করলেন। ফলে তিনি সম্পূর্ণ নাটকীয় ভাবেই একদিন ফিরে এলেন বাড়ীতে। তাঁর পরিবারের প্রায় সবাই বসেছিলেন বৈঠকখানায়। সুভাষচন্দ্র সরাসরি এসে বৈঠকখানায় ঢুকে পড়লেন এবং সােজা মার কাছে গিয়ে তাঁর পদধূলি মাথায় তুলে নিলেন। তার আকস্মিক আবির্ভাবের আনাতিশয্যে সকলেই বিস্মিত, হতবাক। সবচেয়ে যিনি বেশী আনন্দ পেলেন তিনি সুভাষচন্দ্রের জননী। রাতের পর রাত মাতৃহৃদয়ের ব্যাকুলতা নিয়ে তিনি নিরুদ্দেশ- যাত্রী পুত্রের প্রত্যাবর্তন কামনা করেছেন। পুত্রের আকস্মিক প্রত্যাবর্তনে আনন্দাশ্রুতে তার দুচোখ ভরে গেল—তিনি সস্নেহ কাতরােক্তি করে উঠলেন : “সুভাষ, তুই আমাকে মেরে ফেলার জন্যেই জন্মেছিস!” বিষাদাচ্ছন্ন বস্ত্র পরিবারে আবার আনন্দের সাড়া পড়ে গেল। বাড়ীতে ফিরে আসার পরেই বােঝা গেল যে অনির্দিষ্ট ভ্রমণের ফলে সুভাষচন্দ্রের স্বাস্থ্য ভেঙ্গে পড়েছে। তিনি যে অনিয়ম অত্যাচার নেতাজী করে প্রকৃতি-বিরুদ্ধ কাজ করেছিলেন, প্রকৃতি এতদিনে তার প্রতিশােধ নেওয়া শুরু করল। বাড়ীতে ফেরার কিছুদিন পরেই তিনি টাইফয়েড রােগে আক্রান্ত হন। এই রােগের জের বেশ কিছুদিন চলেছিল। কিন্তু এই ভগ্নস্বাস্থ্য নিয়েও তিনি পুনরায় পড়াশুনাে আরম্ভ করেন এবং ১৯১৫ খৃষ্টাব্দেই আই-এ পরীক্ষা দিয়ে প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। তিনি যেরূপ মেধাবী ছাত্র ছিলেন, তাতে নিরুদ্দেশ ভ্রমণে এবং তজ্জনিত বােগে প্রায় বৎসর খানেক নষ্ট না হলে তিনি পরীক্ষায় আরও ভাল ফল করতে পারতেন। সুভাষচন্দ্র সাময়িক ভাবাবেগের বশবর্তী হয়ে গৃহত্যাগ করে গেছিলেন এরূপ মনে করলে ভুল করা হবে। তিনি সুস্থমস্তিষ্কে বেশ ভেবেচিন্তেই গৃহত্যাগ করেছিলেন এবং পরে বাস্তব সংঘর্ষে তার ভুল ভেঙে যাওয়ায় আবার গৃহে ফিরে এসেছিলেন। কৈশাের থেকেই তিনি তঁার সব কাজের পিছনে একটা ঐশী প্রেরণা অনুভব করতেন এবং এই প্রেরণার বশবর্তী হয়েই তিনি প্রকৃত গুরুর সন্ধান লাভের প্রত্যাশায় নিরুদ্দেশ যাত্রা করেছিলেন। তিনি যে প্রকৃত গুরুর সন্ধান পান নি- তার ফল আমাদের রাজনৈতিক জীবনের পক্ষে সব দিক দিয়েই শুভ হয়েছে। স্পষ্টভাবে না হলেও সুভাষচন্দ্র এই আঠারাে বৎসর বয়সেও নিজের জীবনের উদ্দেশ্য সম্বন্ধে সজাগ ছিলেন। নিরুদ্দেশ যাত্রা থেকে ফিরে আসার পরেই ১৯১৫ খৃষ্টাব্দে একটি বন্ধুর কাছে লেখা চিঠিতে তিনি প্রসঙ্গত মন্তব্য করেছিলেন : “আমি ক্রমেই উপলব্ধি করছি যে আমার জীবনের একটা নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য আছে এবং তারই জন্যে আমি এ দেহ ধারণ করে চলেছি—জনসাধারণের মতে তৃণের মত নেতাজী ভেসে যাওয়া আমার কাজ নয়। লােকেরা আমার প্রশংসা করবে কিংবা নিন্দা করবে—পৃথিবীর রীতিই এই—কিন্তু আমার গভীর আত্মসচেতনতার ফল এই যে আমাকে তা নাড়া দিতে পারে না।” আঠারাে বৎসরের একটি কোমলমতি তরুণের জীবনাদর্শ সম্বন্ধে এমন সুস্পষ্ট দৃঢ় সঙ্কল্প বিস্ময়কর নয় কি? তিনি নিজের সম্বন্ধে এই বয়সেই যা বলে গেছেন, তা অক্ষরে অক্ষরে ফলে গেছে। পরজীবনে আমরা দেখেছি যে তিনি নিন্দা এবং প্রশংসা দুহাত দিয়ে কুড়িয়েছেন। কিন্তু যা তিনি সত্য বলে জেনেছেন, শত নিন্দাও তার থেকে তাঁকে বিচ্যুত করতে পারে নি। এটা সুভাষচন্দ্রের দৃঢ় চরিত্রের একটা বড় বিশেষত্ব। আই-এর পর সুভাষচন্দ্র প্রেসিডেন্সী কলেজেই বি-এ পড়তে থাকেন। এর পরেই আসে তার ছাত্রজীবনের বড় দুর্ঘটনা—ওটেন সাহেবকে মারার দরুণ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তার বিদায়। .বি-এতে সুভাষচন্দ্র দর্শন শাস্ত্রে অনার্স নিয়েছিলেন। নিজের চারিত্রিক সবলতা, কর্মকুশলতা এবং সংগঠন-নৈপুণ্যের জন্যে তিনি প্রেসিডেন্সী কলেজের ছাত্রসমাজের নেতৃত্ব পদে বৃত হন। ছাত্ররা তখন তার কথায় ওঠে বসে। ১৯১৬ খৃষ্টাব্দের কথা। সে সময় প্রেসিডেন্সী কলেজে মিঃ সি, এফ, ওটেন নামে ইংরেজী সাহিত্যের একজন অধ্যাপক ছিলেন। এই অধ্যাপক প্রবর পরে বাঙ্গলার জনশিক্ষা বিভাগের ডিরেক্টার হয়েছিলেন। এই শ্বেতাঙ্গ অধ্যাপক প্রবরের মনে সাম্রাজ্যবাদী জাতিসুলভ গর্ব কিছুটা বেশী পরিমাণেই ছিল। তিনি ভারতীয় ছাত্রদের মানুষ বলেই গ্রাহ্য করতে চাইতেন না। তিনি প্রায়ই ভারতীয় ছাত্রদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করতেন। তাঁর এই ঔদ্ধত্য, ১৭ ২ নেতাজী জাতিগর্ব এবং দুর্ব্যবহারে সমগ্র প্রেসিডেন্সী কলেজের ভারতীয় ছাত্র- সমাজ ছিল তার উপর চটা। বিশেষ করে, ভারতীয় ছাত্রদের প্রতি শ্বেতাঙ্গ অধ্যাপকের এ দুর্ব্যবহার সুভাষচন্দ্রের মনেই ব্যথা দিত সর্বাপেক্ষা বেশী—কেননা তার মনে জাতীয় মর্যাদাবােধ ছিল অত্যন্ত প্রবল। তিনি অধ্যাপক প্রবরের এই অবিচ্ছিন্ন দুর্ব্যবহারে মনে মনে ভয়ানক রেগে ছিলেন। একদিন এই ওটেন সাহেব তার স্বাভাবিক ঔদ্ধত্যবশত বি-এ ক্লাসের একটি ভারতীয় ছাত্রের গালে চপেটাঘাত করেন। কলেজে এ জাতীয় ঘটনা অভিনব এবং সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত। সুভাষচন্দ্র তখন গােপনে ছাত্রদের সভা-সমিতি ডেকে ছাত্র সমাজের ইতিকতব্য নির্ধারণ করলেন। তার নেতৃত্বে প্রেসিডেন্সী কলেজের ছাত্ররা মিঃ ওটেনের দুর্ব্যবহারের প্রতিবাদে ধর্মঘট করল। তার নেতৃত্বে ধর্মঘট এত সাফল্যপূর্ণ হয়েছিল যে শেষ পর্যন্ত কলেজ কতৃপক্ষ ছাত্রদের সঙ্গে একটা সম্মানজনক অপােষরফা করতে বাধ্য হন। ছাত্ৰ-সমাজের এই বিজয়ে শ্বেতাঙ্গ অধ্যাপক প্রবর সাময়িক ভাবে ঘাবড়িয়ে যান এবং কিছুদিন সংযত হয়ে চলার চেষ্টা করেন। কিন্তু চিতাবাঘের পক্ষে তার গায়ের দাগ মুছে ফেলা যেমন অসম্ভব, মিঃ ওটেনের পক্ষে তেমনই জাতিগর্ব ভুলে থাকা ছিল অসম্ভব। তিনি তার পুরণে রােগের হাত থেকে কিছুতেই মুক্তি পেলেন না। এই ঘটনার মাসখানেক পরে ওটেন সাহেব পুনরায় ছাত্রদের অপমানিত এবার আর ছাত্ররা প্রতিকারের জন্যে কলেজ কতৃপক্ষের কাছে গেল না। তারা নিজেরাই মিঃ ওটেনের শাস্তির ব্যবস্থা করল। মিঃ ওটেন সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিতভাবে ছাত্রদের দ্বারা প্রহৃত হলেন। ১৮ নেতাজী এই ঘটনা নিয়ে সারা কলেজে হৈ চৈ পড়ে গেল। বিব্রত অধ্যক্ষ ভবিষ্যতে আবার যাতে এরূপ ঘটতে না পারে, তার জন্যে কয়েকজন ছাত্রকে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিতাড়িত করতে মনস্থ করলেন। ধর্মঘটের পর থেকেই কলেজ কতৃপক্ষ জানতেন যে সুভাষচন্দ্র ছাত্র- সমাজের অবিসম্বাদিত নেতা। সুভাষচন্দ্রের বিরুদ্ধে অভিযােগ আনা হল যে মারপিটের ব্যাপারেও তিনি ছিলেন অন্যতম পাণ্ডা এবং এই জন্যে তাকে অন্যান্য আরও কয়েকজন ছাত্রের সঙ্গে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিতাড়িত করা হয়। ওটেনের ব্যাপারে সুভাষচন্দ্রের ছাত্রজীবনে একটা সাময়িক ছেদ পড়ে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিতাড়িত হবার ফলে তিনি কটকে ফিরে যান এবং সেখানে প্রায় দুবৎসর কাল কাটান। ১৯১৭ খৃষ্টাব্দে পরলােকগত স্যার আশুতােষ মুখােপাধ্যায়ের চেষ্টায় তিনি পুনরায় কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নের অনুমতি পান। তবে এবার আর তিনি প্রেসিডেন্সী কলেজে ফিরে গেলেন না তিনি ভর্তি হলেন স্কটিশচার্চ কলেজে। সামরিক নিয়মানুবর্তিতা এবং সামরিক শিক্ষা- দীক্ষার প্রতি সুভাষচন্দ্রের মনে যে একটা অচেতন ঝোঁক ছিল তার প্রমাণ মেলে এই সময়। তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের সামরিক শিক্ষা দেবার উদ্দেশ্যে ইউনিভারসিটি ট্রেণিং কোর’ সবে মাত্র গড়া হয়েছিল। সুভাষচন্দ্র এই ট্রেণিং কোরে যােগ দেন এবং মহােৎসাহে কুচকাওয়াজ করতে থাকতেন। ধর্মের প্রভাব পুরােপুরি তখনও কাটে নি ; অবশ্য তিনি চিরকালই কিছুপরিমাণে ধর্মভীরু এবং নৈষ্ঠিক জীবন যাপনে অভ্যন্ত। তবে এই সময় তিনি কৈশােরের সন্ন্যাসী হবার স্পৃহা কাটিয়ে নেতাজী ক্রমশ কমের দিকে ফিরতে শুরু করলেন। ১৯১৯ খৃষ্টাব্দে তিনি স্কটিশচার্চ কলেজ থেকেই বি-এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন এবং দর্শন শাস্ত্রে প্রথম শ্রেণীতে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন। এরপর তিনি ব্যবহারিক মনােবিজ্ঞান( Experimental Psychology) নিয়ে কলিকাতা বিশ্ব- বিদ্যালয়ের এম্-এ শ্রেণীতে ভর্তি হন। কলেজ-জীবনে মিঃ ওটেনের ঘটনা সুভাষচন্দ্রের জীবনে একটা বিরাট পরিবর্তনের সূচনা করে। এই সর্বপ্রথম তিনি শ্বেতাঙ্গ শাসক- জাতির মজ্জাগত ঔদ্ধত্যের মুখখামুখী এসে দাড়ান এবং তার ঘৃণ্য স্বরূপ দেখে শিউরে ওঠেন। এই প্রথম তার মনে শ্বেতাঙ্গ-বিদ্বেষের বীজ উপ্ত হয় এবং স্পষ্টভাবে না হলেও অস্পষ্টভাবে তার মনে পরাধীনতার শিকল ছেড়ার স্পৃহা রূপ নেয়। ইংরেজরা আমাদের দেশ শাসনের নামে সােনার ভারতকে নির্মমভাবে শশাষণ করে নিজেদের দ্বীপের শ্রীবৃদ্ধি করে—আবার আমাদেরই উপর চোখ রাঙ্গায়—তার কাছে এ যেন কেমন অসহ্য লাগে। তাঁর জীবনের যাত্রাপথ তখনও অনিশ্চিত। তখনও কেউ জানত না যে শ্বেতাঙ্গ ইংরেজ অধ্যাপককে মারপিট করার অভিযােগে যাকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাড়ানাে হল, তিনিই একদিন ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সর্বাপেক্ষা বড় শত্রু হয়ে দাড়াবেন এবং রাজদ্রোহের অভিযােগে তাকে বারবার কারাকক্ষে নিক্ষেপ করতে হবে। শুধু তাই নয় চরম বিপ্লবী হিসাবে তাঁকে মান্দালয়ের নির্জন কারাকক্ষেও বন্দী করে রাখা হবে। আমরা তার কলেজজীবনের যে বর্ণনা দিয়েছি তার থেকে কেউ যেন না মনে করেন যে সুভাষচন্দ্র বুঝিবা আর্ত-দীনদের সেবা করে নেতাজী এবং কলেজের অধ্যাপক ঠেঙ্গিয়েই কাল কাটাতেন। কাটাতেন। তা মােটেই নয়। পড়াশুনাের দিকেও তার যথেষ্ট নজর ছিল । প্রেসিডেন্সী কলেজ জীবনে তার সতীর্থ কবি-ঔপন্যাসিক-সাধক দিলীপকুমার রায় একটি প্রবন্ধে বলেছেন যে সুভাষচন্দ্র সেই বয়সেই দেশী বিদেশী অনেক শ্রেষ্ঠ গ্রন্থকারের রচনাবলী পড়েছিলেন এবং তার স্মৃতিশক্তি এত প্রখর ছিল যে তিনি অকাতরে এই সব গ্রন্থ থেকে উধৃতি দিয়ে তার বক্তব্য সমর্থন করতেন। তার ব্যক্তিত্বের যে একটা বলিষ্ঠতা এবং মাধুর্য আছে, তা সেই বয়সেই ধরা পড়েছিল—বয়েস নির্বিশেষে সকলেই তাঁর নেতৃত্ব মেনে চলত। ছাত্রসমাজকে ভাবীযুগের মানুষ করে গড়ে তােলার স্বপ্ন তিনি দেখতেন এবং এই উদ্দেশ্যে ভিনি নিজেদের মধ্যে ডিবেটিং ক্লাব বা বিতর্ক-সভার আয়ােজন করেছিলেন। তাঁর মন ক্রমশ রামকৃষ্ণ দেবের সাধনার পথ থেকে দূরে সরে আসছিল—আর তিনি ক্রমশ কর্মবীর স্বামী বিবেকানন্দের আদর্শের দিকে ঝুকে পড়ছিলেন। বিতর্কসভার অনুষ্ঠানে তার যে আদর্শ ছিল সে সম্বন্ধে তিনি শ্রীযুক্ত রায়কে নিম্নোক্তরূপ বলেছিলেন : “আমি চাই যে আমাদের ছেলেরা চটপট ভাববার শিল্পটি শিখুক। তারপর বিতর্ক-শিল্প মানুষের মনে আত্মবিশ্বাস জাগায়। এটা নিশ্চয়ই বড় লাভ। আমরা ভারত- বাসীরা কাজ, মতামত, কর্মোদ্যোগ—সব কিছুর জন্যই বড় পরের উপর নির্ভরশীল। কাজেই আমি স্থির করেছি যে নিজেদের পায়ের উপর সােজা হয়ে দাড়াতে বিতর্ক-সভাই আমাদের অনুপ্রাণিত করবে।” একবার ভেবে দেখুন তে'-এই কথাগুলি যিনি বলেছেন, তিনি আঠার বৎসরের একটি কলেজ ছাত্র ! আইন অনুসারে তখনও তিনি নেতাজী সাবালকত্ব অর্জন করেন নি। সুভাষচন্দ্রের এই জন্মগত নেতৃত্ব-শক্তি সম্বন্ধে যুক্ত দিলীপকুমার রায় বলেছেন: “কিন্তু যখন আমরা আণ্ডার- গ্রাজুয়েটরা সুভাষের সঙ্গে কথা বলতাম, কেমন করে জানি না আমরা সবাই তাকে আমাদের চেয়ে কয়েকবৎসরের বড় বলে মনে করতাম। তার নেতৃত্ব করার ক্ষমতা ছিল এবং তিনি তা জানতেন। আমি জানি এই সচেতনতার গভীর অসুবিধা আছে এবং এর ফলে সুভাষের কখনও কোন ক্ষতি হয় নি—এমন কথা আমি বলব না। কিন্তু আমি বিশ্বাসের সঙ্গে একথা বলব যে যারা তার নেতৃত্ব মেনে চলত, তাদের তিনি কখনও অনুভব করতে দিতেন না যে তারা তার চেয়ে ছোট।” শ্ৰীযুক্ত রায়ের এ উক্তি যে কত সত্য তার প্রত্যক্ষ প্রমাণ আমরা পেয়েছি নেতাজীর আজাদ হিন্দ ফৌজ গঠনের ব্যাপারে। হিন্দু মুসলমান খৃষ্টান শিখ নির্বিশেষে আজাদ হিন্দ ফৌজের সৈন্যরা নেতাজীর সম্বন্ধে পরম শ্রদ্ধাশীল । নিজের চারিত্রিক দৃঢ়তা, ব্যক্তিত্ব এবং সদাশয়তার গুণেই তিনি তার সৈন্যদলের উপর এ অভূতপূর্ব প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছিলেন। অফিসার এবং সাধারণ সৈন্যনির্বিশেষে তিনি সকলকেই সমান চোখে দেখতেন—সকলের সঙ্গে সমান ব্যবহার করতেন। সুভাষচন্দ্র বি-এ পাশ করে যখন এম-এ ক্লাসে ভর্তি হলেন তখন ১৯১৯ সাল। ভারতের রাজনৈতিক জীবন তখন বিরুদ্ধ ঘটনাসংঘাতে বিক্ষুব্ধ—চঞ্চল। যুদ্ধান্তের পূর্বে ভারতবর্ষকে ভরসা দেওয়া হয়েছিল যে যুদ্ধ শেষে ভারতকে স্বায়ত্বশাসন দেওয়া হবে। কিন্তু যুদ্ধ শেষে বৃটিশ কূটনীতিবিদরা সে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করলেন না। ভারতের নেতাজী ভাগ্যে জুটল একদফা শাসন-সংস্কার—মন্টেগু চেমসফোর্ড শাসন-সংস্কার। সারা ভারতের জনমত এর বিরুদ্ধে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠল। রাউলাট বিল, জালিয়ানওয়ালাবাগে পাঞ্জাব পুলিশের হত্যাকাণ্ড, খিলাফং প্রশ্ন প্রভৃতিকে কেন্দ্র করে তখন হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে ভারতবাসীরা বৃটিশদের বিরুদ্ধে সংহত শক্তি নিয়ে লড়াই করার পরিকল্পনা করছে। শাসক এবং শাসিতদের মধ্যে বিদ্বেষ তখন চরম আকার ধারণ করেছে। জনমতের বিক্ষোভ দমন কল্পে সরকারী কর্তৃপক্ষ সবরকম ব্যবস্থাই অবলম্বন করেছিলেন জনপ্রিয় নেতাদের গ্রেপ্তার, শান্তিপূর্ণ জনসভার উপর নিষ্ঠুর গুলী বর্ষণ, প্রকাশ্য স্থানে বেত্রাঘাত প্রভৃতি কোন কিছুই বাদ পড়েনি। ভারতীয় রাজনীতি,ক্ষত্রে এই সময়েই পরম সত্যাগ্রহী গান্ধীজীর আবির্ভাব। যুবক সুভাষচন্দ্রের মনে স্বদেশপ্রেম তখন স্পষ্ট রূপ গ্রহণ করেছে—তিনি বুঝেছেন যে দেশকে তিনি ভালবাসেন এবং বিদেশী শাসকশক্তির হাত থেকে দেশের মুক্তিকামনা করেন। সুভাষ- চন্দ্রের মাতাপিতাও তার মনের খবর রাখতেন। তাদের মনে খুব আশা ছিল যে তিনি বড় সরকারী চাকুরে হবেন। তা না হয়ে, একবার স্বদেশ সেবার দিকে যদি তার ঝোক যায়, তবে তাকে ফেরানো যে সহজ হবে না-এ সত্যও তারা জানতেন। তাই বি-এ পাশ করার পর কয়েক মাস যেতে না যেতেই তারা সুভাষচন্দ্রকে আই-সি-এস পড়ার জন্যে ইংল্যাণ্ডে পাঠানাের সংকল্প ব্যক্ত করলেন। তাদের মনে ধারণা ছিল যে একবার রাজার দেশের হাওয়া তার গায়ে লাগলে, উগ্র স্বদেশ- প্রেম ভুলে যেতে তার বেশী সময় লাগবে না। বিলাত যাবার প্রস্তাবে সুভাষচন্দ্র পড়লেন মহা ফ্যাসাদে। তিনি নেতাজী তখনও তার নিজের জীবন সম্বন্ধে ইতি-কৰ্তব্য ভেবে স্থির করে উঠতে পারেন নি। একদিকে পিতামাতার কথা রাখা, তাদের মনের ইচ্ছা কানে পরিণত করে তাদের তৃপ্তি দেওয়া—অপরদিকে দেশ-মাতৃকার সেবা। তিনি কোন দিকে যাবেন ? তখন তার চোখের উপরই পাঞ্জাবে সামরিক আইনের কড়াকড়ি—দেশব্যাপী সরকারী অত্যাচার। যে বিদেশী গবর্ণমেন্ট এমন নিষ্ঠুরভাবে প্রজাপীড়ন করে চলেছে, তাদেরই কৃপাভিক্ষার জন্যে তাকে যেতে হবে ইংল্যাণ্ডে। দেশপ্রেমের প্রেরণায় তিনি স্থির করে ফেলেছিলেন যে বিলাত যাবেন না। এমন সময় তার প্রিয় বন্ধু শ্ৰীযুক্ত হেমন্তকুমার সরকারের উপদেশে তিনি ইংল্যাণ্ড যেতে সম্মত হলেন। কিন্তু তার মনে পূরাে মাত্রায় সন্দেহ ছিল যে তিনি যদি আই-সি-এস্ পরীক্ষায় পাশ করে বসেন, তবে তার আদর্শচ্যুতির সম্ভাবনা আছে। হেমন্তবাবু যখন তাকে বিলাতে যাবার উপদেশ দিচ্ছিলেন, তখন সুভাষচন্দ্র উত্তর দিয়েছিলেন : “কিন্তু আমি যদি সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় সাফল্য লাভ করি, তবে ভীষণ অসুবিধার সৃষ্টি হবে। তখন আমি হয়ত আদর্শ হারিয়ে ফেলব।” অবশেষে বহু চিন্তা ভাবনা করে তিনি নিতান্ত অনিচ্ছুক ভাবেই ইংল্যাণ্ড যাত্রা করতে মনস্থ করলেন। তখন তার মনের ভাব কেমন ছিল, তার একটা বন্ধুকে লেখা চিঠিতে তার সন্ধান মেলে: “মানসিক উদ্বেগের মধ্যে আমার গত কয়েকদিন কেটে গেছে। নিজের সঙ্গে যথেষ্ট লড়াই করে আমি ইংল্যাণ্ডে (আই-সি-এস্ পড়ার জন্য) যেতে সম্মত হয়েছি —কিন্তু আমার সিদ্ধান্ত যে ঠিক হয়েছে একথা মনকে এখনও বােঝতে পারিনি।” ২৪ নেতাজী এইভাবে সুভাষচন্দ্র ইংল্যাণ্ডে গেলেন। তাঁর জীবনের আদর্শ এবং লক্ষ্য প্রায় স্থির হয়ে গেছে। তবে তখনও প্রকাশ্যে তিনি সে কথা ঘােষণা করেন নি—এই মাত্র। ফলে ইংল্যাণ্ডে গিয়েও তার জীবন- যাত্রার ধারা বদলালাে না-রাজার দেশের আবহাওয়া তার মনে কোনই পরিবর্তন আনতে পারল না। বরং ইংল্যান্ডে গিয়ে তার স্বদেশপ্রীতি আরও চূড়ান্ত আকার ধারণ করতে লাগল। তিনি দেখতে পেলেন ইংরেজরা তাদের নিজেদের নিয়ন্ত্রণাধীন বলে সেখানকার যুবকযুবতীরা নিজেদের ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে কত বেশী আশাবাদী—ছেলেমেয়েরা বিনা খরচে সামরিক এবং সাধারণ শিক্ষা পায়—সমগ্র দেশ স্বাধীনতা ও স্বাচ্ছন্দ্যের মন্ত্রে মুখর। ইংল্যাণ্ড এবং ভারতের চিত্র পাশাপাশি রেখে সুভাষচন্দ্র এইবার তুলনা করে দেখবার সুযােগ পেলেন। তিনি দেখলেন যে ইংরাজদের শাসন ও শােষণের ফলে ভারতবর্ষ আজ মেরুদণ্ডহীন দাসমনােবৃত্তি সম্পন্ন হয়ে পড়েছে—নিজেদের দেশে যে ইংরেজরা এমন সাধু সজ্জন, ভারতে গিয়ে তারাই হয়ে ওঠে অত্যাচারী। এই ইংরাজ শাসনের ফলেই ভারতে দেখা দিয়েছে সর্বব্যাপী দারিদ্র, অশিক্ষা, প্রতিক্রিয়াশীলতা। তিনি বুঝলেন যে বিরাট ভারতবর্ষকে অগ্রগতি ও উন্নতির উচ্চ শিখরে অধিষ্ঠিত করতে হলে, সর্বাগ্রে চাই বৈদেশিক শাসন-মুক্তি। ইংল্যাণ্ডে বসে বসে সুভাষচন্দ্র ভারতের এই ভয়াবহ ও শােচনীয় অবস্থার কথাই শুধু চিন্তা করতেন। দেশে তখনও ১৯১৯ এর সরকারী অত্যাচারের জের পুরাে মাত্রায় চলছে। কংগ্রেসের নেতৃত্ব- ভার গ্রহণ করেছেন মহাত্মা গান্ধী। সমগ্র দেশ তার নেতৃত্বে বৈদেশিক শাসন-মুক্তির প্রয়াসে সজঘবদ্ধ হচ্ছে। সুভাষচন্দ্র ইংল্যাণ্ডে বসে নেতাজী এসব খবর পেতেন এবং সযত্নে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের আভ্যন্তরীন কার্যকলাপ অনুধাবন করার চেষ্টা করতেন। তার ইংল্যাণ্ড প্রবাস তাকে আরো বেশী পরিমাণ ব্রিটিশ-বিরােধী করে তুলল। আধুনিক ভারতের যারা শ্রেষ্ঠ জাতীয়তাবাদী নেতা-যেমন মহাত্মা গান্ধী, পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরু, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন প্রভৃতি—এদের সকলেই ইংল্যাণ্ডে শিক্ষা-দীক্ষা পেয়েছেন। কিন্তু ইংল্যাণ্ড তাদের মনে সাহেবিয়ানা সৃষ্টি করে তাদের দাস-মনন ভাবাপন্ন ত করতেই পারে নি বরং তারা হয়ে উঠেছেন বেশী পরিমাণে ব্রিটিশ-বিরােধী। পরাধীন ভারতসন্তানের পক্ষে ইংল্যাণ্ডের মুক্ত স্বাধীন আবহাওয়া তাকে নিজের পরাধীনতার অভিশাপ সম্বন্ধেই অধিকতর সজাগ করে তোলে। সুভাষচন্দ্রের মনে ইংরেজ-বিদ্বেষ এবং স্বদেশ প্রেম ক্রমশ কি ভাবে দানা বাঁধছিলো, বিলাতে পৌছে বন্ধু শ্ৰীযুক্ত হেমন্তকুমার সরকারকে খাে একাধিক চিঠি থেকে তার সন্ধান মেলে। একটি পত্রে লিখেছিলেন । “আমার সব চেয়ে বেশী সুখ হয় যখন দেখি যে সাদা চামড়া আমার সেবা করিতেছে এবং জুতা পরিষ্কার করিতেছে।” বিলাতে গিয়ে তিনি যদিও সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার জন্যে তৈরী হচ্ছিলেন, তবু তার মনে একটা ধারণা জন্মেছিল যে সিভিল সাভিস শেষ পর্যন্ত তার ভাগ্যে টিকবে না। শযুক্ত সরকারকে একটি পত্রে তিনি লিখেছিলেন । “আমার মতলব আগামী বৎসর সিভিল সাভিস পরীক্ষা দেওয়া এবং পাশ করি বা ফেল করি—১৯২১ সালের মে মাসে Moral Science Tripos-এর পরীক্ষা দেওয়া। এখানকার ডিগ্রী আমাকে লইতে হইবেই—কারণ ভবিষ্যতে আমার বিশেষ কাজে লাগিবে।” আর এক নেতাজী পত্রে তিনি লিখেছিলেন । “এখনও বুঝিতে পারি নাই আমি আদর্শ- ভ্রষ্ট হয়েছি কিনা। আমি আত্মপ্রতারণা করে নিজেকে বুঝাতে চাই না যে Civil Service এর জন্য পড়াটা ভাল। চিরকাল ঐ জিনিসটাকে ঘৃণা করতাম, এখনও বােধ হয় করি। এ অবস্থায় Civil Service এর জন্য চেষ্টা করা দুর্বলতার নিদর্শন অথবা কোন দূরবর্তী মঙ্গলের সূচক, তা ঠিক বুঝতে পারছি না। আমার একমাত্র প্রার্থনা যে আমার হিতৈষীরা আমার সম্বন্ধে কোনও hasty opinion না form করেন।” এই দুইটি উদ্ধৃতি থেকে স্পষ্ট বােঝা যায় সুভাষচন্দ্র নিজের ভবিষ্যৎ ইতিপূর্বেই স্থির করে ফেলেছিলেন। শুধু পিতামাতা প্রভৃতি গুরুজনদের মন রাখার জন্যেই তিনি সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা দেবার চেষ্টা করেছিলেন। এই সময় শ্ৰীযুক্তা সরােজিনী নাইডু ইংল্যাণ্ডে ছিলেন এবং এই মহিয়সী মহিলার বক্তৃতায় সুভাষচন্দ্র যে চরম পন্থার সন্ধান পেয়েছিলেন, তা তাকে উদ্বুদ্ধ করেছিল। চরমপন্থী রাজনীতির প্রতি সুভাষচন্দ্রের ঝোঁক চিরদিনের। আপােষরফার স্থান তার কাছে ছিল না হেমন্তবাবুকে লেখাই অপর একটি চিঠিতে সুভাষচন্দ্র শ্ৰীযুক্তা নাইডু এবং অন্যান্য ভারতীয় মহিলাদের বক্তৃতা সম্বন্ধে কি বর্ণনা দিয়েছিলেন শুনুন : “যে দিন Mrs. Sarojini Naidu এখানে বক্তৃতা দিয়েছিলেন, সেদিন আনন্দে বুক দশ হাত ফুলে উঠেছিল, সেদিন দেখিলাম ভারত-রমণীর আজও এমন শিক্ষা, দীক্ষা, গুণ ও চরিত্র আছে যে পাশ্চাত্য জগতের সম্মুখে দাড়াইয়া তাহারা আত্মপরিচয় দিতে পারেন। লণ্ডনে মিসেস মিত্রের সঙ্গে আলাপ হয়। দেখিলাম মিঃ মিত্র moderate in politics, fpe falcony fore extremist697.3 16a ২৭ নেতাজী হয় যে, যে দেশে রমণীর আদর্শ এত উচ্চ, সে দেশের উন্নতি না হয়ে পারে না।” ভাবী আই, সি, এসের মুখে এই প্রকার চরমপন্থী রাজনীতির গুণ গান শুনে স্পষ্ট বােঝা যায় যে তার মনের গতি বিপরীত দিকে চলেছে । যে তরুণের মনে স্বদেশপ্রেমের এমন জলন্ত আদর্শ তার জীবনযাত্রাও সহজে অনুমান করা যায়। আমাদের দেশের অনেক বড়লােক-নন্দন, আই, সি, এস পরীক্ষার জন্যে কিংবা ব্যারিষ্টারী পড়ার জন্যে ইংল্যাণ্ডে যান এবং সেখানে দুহাতে পিতার অর্থ ছড়িয়ে মজা ললাটেন। আমােদ-প্রমােদ এবং নারীসঙ্গ লাভ হয়ে ওঠে তাদের প্রধান কাম্য । ইংল্যাণ্ডে এক ধরণের যুবতীরা সব সময় ওঁৎ পেতে থাকে ভারতীয় যুবকদের ফাদে ফেলার জন্যে। তাদের ধারণা যে ভারত থেকে যেসব যুবক উচ্চ শিক্ষার জন্যে ইংল্যাণ্ডে আসে তারা রাজা মহারাজেরই সমগােত্র। কাজেই তাদের কারও স্ত্রী হবার অধিকার অর্জন করতে পারলে তারা পরম সৌভাগ্য মনে করে। কিন্তু সুভাষচন্দ্র ছিলেন অন্য ধাতুতে গড়া। হালকা আমােদ-প্রমােদে তিনি আনন্দ পেতেন না। তার পিতার অর্থাভাব ছিল না। কিন্তু তিনি ইংল্যাণ্ডে খুব মিতব্যয়ী, সংযমী জীবন যাপন করতেন। সারা জীবন ধরে আমরা তাকে এই আদর্শ পালন করে আসতে দেখেছি। ইংল্যাণ্ডে পদার্পণের পর মাত্র নয় মাসের মধ্যেই সুভাষচন্দ্র আই-সি-এস পরীক্ষা দিলেন এবং ১৯২০ সালের আগষ্ট মাসে তিনি আই-সি-এস পরীক্ষায় চতুর্থ স্থান অধিকার করে সসম্মানে উত্তীর্ণ হলেন। এই পরীক্ষায় তিনি ইংরেজী রচনায় প্রথম স্থান অধিকার করেছিলেন। সুভাষচন্দ্র আই-সি-এস পরীক্ষায় কৃতকার্য হলেন বটে—কিন্তু তার ২৮ নেতাজী আদর্শচ্যুতি ঘটল না। যে পরীক্ষায় পাশ করতে পারলে জজ ম্যাজিষ্ট্রেট হবার প্রত্যাশায় বহু ভারতীয় যুবক নিজেদের পরম ভাগ্যবান বলে মনে করে, সুভাষচন্দ্র সেই পরীক্ষায় চমৎকার কৃতিত্ব লাভ করে হয়ে উঠলেন অনুতপ্ত। তিনি ভারতে তার এক বন্ধুকে লিখেছিলেন। “তুমি শুনে দুঃখিত হবে যে আমি আই-সি-এস পাশ করে ফেলেছি এবং চতুর্থ স্থান অধিকার করেছি। এখন উপায়?”—উপায় আর কি ? তিনি যথানিয়মে সরকারী বৃত্তি নিয়ে শিক্ষানবিশী করতে লাগলেন এবং সঙ্গে সঙ্গে কেন্থি জ বিশ্ববিদ্যালয়ের বি-এ ডিগ্রীর জন্যেও প্রস্তুত হতে লাগলেন। সুভাষচন্দ্রের দেশাত্মবােধ এবং জাতীয় মর্যাদাবােপ কত প্রবল ছিল—সে সম্বন্ধে তাঁর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা শ্ৰীযুক্ত সতীশচন্দ্র বসু একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করেছেন। ঘটনাটি এই : “সে (সুভাষচন্দ্র) যখন ইংল্যাণ্ডে সিভিল সার্ভিসের শিক্ষানবিশী করছিল, তখন ইণ্ডিয়া অফিস থেকে প্রচারিত একটি সরকারী বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছিল যে শিক্ষা- নবিশরা যখন ভারতে ফিরে যাবেন তখন তারা যেন তাদের ঘােড়া- গুলাের খাবার ও সহিসাদির ব্যবস্থা সম্বন্ধে বিশেষ যত্ন নেন। এই বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়েছিল যে ঘোড়ার খাবারই সহিদের খাবার। এই বিজ্ঞপ্তি ভারতীয় চরিত্রের উপর কলঙ্ক লেপন করেছে বলে যুবক সুভাষ এই অসম্মানকর বিজ্ঞপ্তির বিরুদ্ধে ইণ্ডিয়া অফিসে প্রতিবাদ জ্ঞাপন করেছিল। ইণ্ডিয়া অফিস থেকে বলা হয়েছিল যে আলােচ্য বিজ্ঞপ্তিটি ইতিপূর্বেই প্রচারিত হয়ে গেছে ; তবে ভবিষ্যতে যাতে বিজ্ঞপ্তিতে অসম্মানজনক কথাগুলাে না থাকে তার ব্যবস্থা করা হবে।” ১৯২১ এর মে মাসে সুভাষচন্দ্র কেম্বি জ বিশ্ববিদ্যালয়ের বি-এ পরীক্ষায় নেতাজী উত্তীর্ণ হলেন। সুভাষচন্দ্র তাঁর জীবনের আদর্শ তখন স্থির করে ফেলেছেন। ভারতে তখন গান্ধীজীর নেতৃত্বে অসহযােগ আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছে। সুভাষচন্দ্র ইংল্যাণ্ডে বসে বসে এ সব সংবাদ পেতেন এবং তার মন শৃঙ্খলিতা ভারতমাতাকে মুক্ত করার কামনায় উদ্বেলিত হয়ে উঠত। ১৯২১ এর মে মাসে তিনি আই-সি-এস পদে ইস্তফা দিয়ে ভারতে ফিরে গিয়ে দেশ-সেবায় আত্মনিয়ােগ করতে মনস্থ করলেন। তিনি নিজেই তার পদত্যাগ পত্র নিয়ে তৎকালীন ভারত সচিব মিঃ মন্ট্যাগুর কাছে গেলেন। ভারত সচিব তাকে পদত্যাগ পত্র প্রত্যাহারের জন্যে অনেক অনুরােধ জানালেন—কিন্তু কোন হল না। কেননা সুভাষচন্দ্র ত আর ঝোঁকের মাথায় এমন লােভনীয় চাকুরী ছেড়ে দিচ্ছিলেন না। অনেক ভেবে চিন্তেই তিনি এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিলেন। এমনই করে ভারতীয় সিভিল সার্ভিস তার মত একজন সুযােগ্য রাজকর্মচারী হারাল বটে—কিন্তু তার মত একজন সুযােগ্য দেশপ্রেমিক নেতা পেয়ে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন আরও বেশী শক্তিশালী হয়ে উঠল। এমনই ভাবে সুভাষচন্দ্রের ইংল্যাণ্ড প্রবাস শেষ হল। তাঁর পিতামাতা আত্মীয়-স্বজনরা আশা করেছিলেন যে তিনি আই-সি-এস হয়ে ফিরে আসবেন—আর তিনি ফিরে এলেন আই-সি এস পদত্যাগ করে—স্বাধীনতা আন্দোলনে যােগ দিতে। সুভাষচন্দ্রের এ অপূর্ব ত্যাগে সমগ্র দেশ মুগ্ধ হয়ে গেল। তিনি কেন এমন লােভনীয় পদ ত্যাগ করলেন, সে সম্বন্ধে নিজেই লিখেছেন : “আমি ১৯২০ সালে ইংল্যাণ্ডে ভারতীয় সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলাম কিন্তু দেখলাম যে বৃটিশ গবর্নমেন্ট এবং আমার স্বদেশ-- এই দুই প্রভুর সেবা এক সঙ্গে করা আমার পক্ষে অসম্ভব হবে। কাজই ১৯২১ সালের মে মাসে পদত্যাগ করে আমি দেশে যে-স্বাধীনতা সংগ্রাম পূর্ণোদ্যমে চলছে, সেই সংগ্রামে আমার নিজের স্থান গ্রহণের উদ্দেশ্যে তাড়াতাড়ি ভারতে ফিরে এলাম।” ৩০ রাজনৈতিক কর্মজীবন কারাদণ্ড ও নির্বাসন নতুন আশার উদ্দীপনা ও জলন্ত স্বদেশপ্রেমের বহ্নিশিখা বুকে নিয়ে যুবক সুভাষচন্দ্র ১৯২১ সালের ১৬ই জুলাই বােম্বাইতে পদার্পণ করলেন। জাহাজ থেকে নেমেই তিনি গেলেন গান্ধীজীর সঙ্গে দেখা করতে। গান্ধীজী তখন বােম্বাই সহরে মণিভবনে বাস করছিলেন। সমগ্র দেশে তখন অসহযােগ ও খিলাফং আন্দোলন পূবরাদমে চলেছে। এই আন্দোলনের নেতা গান্ধীজীর মুখ থেকে আন্দোলনের উদ্দেশ্য ও কার্যক্রম জানার জন্যেই সুভাষচন্দ্র তার সঙ্গে দেখা করলেন। কিন্তু এই প্রথম দর্শনেই গান্ধীজীর শান্ত সমাহিত মূর্তি এবং তার প্রশ্নের উত্তর বিপ্লবী সুভাষচন্দ্রকে সন্তুষ্ট করতে পারল না। সুভাষচন্দ্র গান্ধীজীর মধ্যে যে বিপ্লবের মূর্ত প্রতীক দেখার প্রত্যাশা করেছিলেন তা তিনি দেখতে পেলেন না—দেখতে পেৱেন সর্বত্যাগী রাজনীতি-সুনিপুণ একটি ফকিরবেশী মহাত্মাকে। তাই তিনি কিছুটা হতাশই হলেন বলা চলে। গান্ধীজী তাকে নির্দেশ দিলেন বাংলায় ফিরে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের সঙ্গে দেখা করতে। দেশবন্ধু তখন বিপুল ত্যাগ এবং রাজনৈতিক কর্মক্ষমতার দরুণ সমগ্র বাংলার হৃদয় জয় করেছেন—তিনি তখন বাংলার মুকুটহীন রাজা। প্রথম শ্রেণীর রাজনীতিবিদ, দেশের জন্যে সর্বত্যাগী এবং উচ্চ শ্রেণীর বুদ্ধিবাদী চরম বিপ্লবী নেতাজী নেতারূপে দেশবন্ধুর খ্যাতি তখন সারা ভারতব্যাপী। সুভাষচন্দ্র কলিকাতায় ফিরেই দেশবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন এবং দেশের যুবশক্তির এই পরম বন্ধু ধৈর্যের সঙ্গে এই বিপ্লবী তরুণের আশা আকাঙ্ক্ষার কথা শুনলেন এবং তাকে সর্বপ্রকার সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিলেন। প্রথম দর্শনেই দেশবন্ধু বুঝতে পেরেছিলেন যে সুভাষচন্দ্রের জন্যে গৌরবােজল ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করে আছে। সুভাষচন্দ্রও দেশবন্ধুর আন্তরিক সংস্পর্শে এসে তাকে নেতা বলে মেনে নিলেন এবং তাঁরই নির্দেশে দেশের কাজে আত্মনিয়ােগ করলেন। গান্ধীজীর অসহযােগ আন্দোলনের আহ্বানে তখন বাংলার আকাশ বাতাস মুখরিত। কত বড় বড় লোেক সরকারী চাকুরী ছেড়েছেন, কত উকিল ব্যারিষ্টার দেশের আহ্বানে নিজেদের লােভনীয় আইন ব্যবসায় ত্যাগ করেছেন। এই সময় ত্যাগব্ৰতী নেতা ডক্টর প্রফুল্লচন্দ্র ঘােষও ইম্পিরিয়াল সার্ভিসের অ্যাসে মাষ্টারের (Assay Master) পদ ত্যাগ করে দেশের সম্মুখে এক বিরাট আদর্শ স্থাপন করেন। বাংলা এবং ভারতের অন্যান্য প্রদেশে মহাত্মা গান্ধীর আহ্বানে স্কুল কলেজের বহু ছাত্রছাত্রীও পড়াশুনাে ত্যাগ করে দেশের কাজে আত্মনিয়ােগ করেছে। যারা স্বেচ্ছায় দেশের কাজের জন্যে পড়াশুনাে ত্যাগ করেছিল এবং দেশের কাজে যােগদানের জন্যে যাদের স্কুল কলেজ থেকে বিতাড়িত করা হয়েছিল, তাদের উপযুক্ত শিক্ষাদানের নৈতিক দায়িত্ব এসে পড়ল কংগ্রেসের উপর। এই সময় বিভিন্ন প্রদেশে কংগ্রেস নেতাদের ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় এবং তত্ত্বাবধানে জাতীয় স্কুল কলেজ সংস্থাপিত হয়েছিল। বাংলাদেশে যে জাতীয় স্কুল কলেজ স্থাপিত

No text on this page.

No text on this page.

নেতাজী হয়েছিল তাঁর নেতৃত্বভার ছিল দেশবন্ধুর উপর। দেশবন্ধু সুভাসলের বিদ্যাবত্তা, তার স্বদেশ প্রেম ও ত্যাগৱতী চরিত্রের পরিচয় পেয়ে তাঁকেই জাতীয় কলেজের অধ্যক্ষ নিযুক্ত করলেন। বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটির প্রচার বিভাগের দায়িত্ব সুভাষচন্দ্রের স্কন্ধে এসে পড়ে। এর কিছু পরে যে কংগ্রেস জাতীয় স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গঠিত হয়, তারও পরিচালনার ভার পান সুভাষচন্দ্র। তিনি তাঁর ত্রিবিধ দায়িত্বই সুষ্ঠুভাবে পালন করেছিলেন। জাতীয় কলেজ তার পরিচালনা ধীনে দ্রুত ক্রমােন্নতির পথে যেতে থাকে। জাতীয় কলেজে যারা শিক্ষা পেতে থাকেন, তাঁদের পুথিগত শিক্ষা ছাড়াও তাদের নৈতিক চরিত্র গঠনে এবং তাদের মনে স্বদেশ প্রেমের বীজ বপনে তরুণ অধ্যক্ষ নিপুণতার পরিচয় দেন। গবর্ণমেন্ট কিছুকাল এই জাতীয় বিদ্যালয় গুলােকে অবজ্ঞা করে গেলেও, অতি শীঘ্রই এগুলাের কার্যকলাপে শঙ্কিত হয়ে ওঠে এবং কিভাবে এই জাতীয় বিদ্যালয় গুলােকে ধ্বংস করা যায় তার উপায় উদ্ভাবন করতে থাকে । তরুণ অধ্যক্ষ সুভাষচন্দ্রের কার্যে বাংলা গবর্ণমেন্টও শঙ্কিত হয়ে ওঠেন এবং অঙ্কুরেই জাতীয় কলেজকে ধবংস করার পরিকল্পনা আঁটতে থাকেন। প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটির প্রচারসচিব রূপেও সুভাষচন্দ্র ইস্তাহার রচনায় অদ্ভুত নৈপুণ্যের পরিচয় দিয়েছিলেন। সুভাষচন্দ্রের তৎকালীন বিবৃতি ও প্রচার পত্রাদি পড়ে কলিকাতার ইঙ্গ-ভারতীয় দৈনিক ষ্টেটসম্যান' পর্যন্ত মুগ্ধ হয়েছিলেন এবং সখেদে এই মন্থব্য করতে বাধ্য হয়েছিলেন রে সুভাষচন্দ্রের মত অসাধারণ শক্তিমান রাজকর্মচারীকে হারিয়ে বৃটিশ আমলাতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অত t নেতাজী স্বেচ্ছাসেবকবাহিনী গড়ে তােলাতেও সুভাষচন্দ্র অদ্ভুত নৈপুণ্যের পরিচয় দেন। কলেজ-জীবনে ইউনিভাসিটি ট্রেণিং কোরে যােগ দিয়ে তিনি যে সামরিক শিক্ষালাভ করেছিলেন, তা এখন কাজে লাগে। তার নেতৃত্বে, তার কর্ম নৈপুণ্যে, তার অদম্য উৎসাহে জাতীয় স্বেচ্ছা- সেবকবাহিনী ক্রমােন্নতির পথে এগিয়ে চলে। ১৯২১ খৃষ্টাব্দের ১৭ই নবের সম্রাটের জ্যেষ্ঠপুত্র যুবরাজ ভারত মণ উপলক্ষে বোম্বাইতে অবতরণ করেন। কিন্তু জালিয়ানওয়ালা বাগ, রাউলাট অ্যাক্ট এবং বৃটিশ গবর্ণমেন্টের যুদ্ধকালীন প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ সমগ্র দেশ বৃটিশ গবর্ণমেন্টের বিরুদ্ধে এমন বিমুগ্ধ হয়ে ছিল সে দেশবাসীরা যুবরাজকে অভ্যর্থনা করতে সম্মত হয় না। ভারতের জাতীয় কংগ্রেস পূর্ব থেকেই স্থির করেছিলেন যে যুবরাজের ভারত পরিভ্রমণ কালে সর্বত্র হরতাল প্রতিপালিত হবে এবং কৃষ্ণ পতাকা প্রদর্শন করে বিক্ষোভ প্রদর্শন করতে হবে। কংগ্রেসের এই আহ্বানে সমগ্র জাতি সাড়া দেয় । নবেম্বর যুবরাজ বােম্বাই সহরে পদার্পণ করেন। সেদিন ভারতের সর্বত্র প্রধান প্রধান সহর গুলিতে হরতাল প্রতিপালিত হয়। সেদিন কলিকাতা হরে ও সুভাষচন্দ্রের সুদক্ষ পরিচালনায় পূর্ণ হরতাল প্রতিপালিত হয় । এদিনের হরতালের প্রধান বৈশিষ্ট ছিল এই যে কংগ্রেস স্বেচ্ছা- সেবকগণের প্রচেষ্টায় কোথাও কোন শান্তিভঙ্গ হয় নি—অথচ সমগ্ৰ নগরে দেশীয় জনসাধারণ স্বেচ্ছায় পূর্ণ হরতাল প্রতিপালন করেছিল। এই সাফল্যপূর্ণ হরতালের দৃশ্য দেখে বা লার কতৃপক্ষ ভয় পেয়ে গেলেন । নির্ধারিত সময় তালিকা অনুসারে স্থির ছিল যে যুবরাজ ২৫শে ডিসেম্বর কলকাতায় পৌছুবেন। কিন্তু তার একমাস পূর্বেই বাংলা গবর্ণমেন্ট :१३ ৩৪ নেতাজী কংগ্রেস ও খিলজিং আন্দোলনের স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীকে অবৈধ ঘােষণ করলেন এবং তিন মাসের জন্যে কলিকাতা ও সহরতলীতে জনসভা ও শশাভাযাত্রা নিষিদ্ধ হল। কংগ্রেস ও খিলাজং আন্দোলনের নেতারা এই সরকারী আদেশ অমান্য করা স্থির করেন এবং তার ফলে ১০ই ডিসেম্বর দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ, মৌলানা আবুল কালাম আজাদ, সুভাষচন্দ্র প্রভৃতি নেতৃবৃন্দ গ্রেপ্তার হন। তাদের প্রত্যেকেরই কারাদণ্ড হয়। সুভাষচন্দ্র এই সর্বপ্রথম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন। বিচার শেষে ম্যাজিষ্ট্রেট যখন রায় দেন যে সুভাষচন্দ্রকে ছয় মাসের জন্যে কারাদণ্ড দেওয়া হল, তখন সুভাষচন্দ্র সবিস্ময়ে বলে উঠেছিলেন “ছয় মাস মাত্র। আমি কি তবে মুরগী চুরি করেছি?” এত করেও কিন্তু সরকারী উদ্দেশ্য সিদ্ধ হল না। ২৫শে ডিসেম্বর যুবরাজ কলকাতায় এসে দেখলেন মহানগরীর সে এক বিষাদ করুণ রূপ! সারা সহরের দোকানপাট বন্ধ, পথে ঘাটে লােজন নেই, বাড়ীতে বাড়ীতে কালো পতাকা উড্ডীন। তিনি স্পষ্ট বুঝতে পারলেন যে ভারতবাসীরা ব্রিটিশ শাসনে সন্তুষ্ট নয়--তারা চায় স্বাধীনতা ১৯২২এর সেপ্টেম্বর মাসে পূর্ণ কারাদণ্ড ভােগের পর সুভাষচন্দ্র মুক্তিলাভ করেন। এই সময় উত্তর- বঙ্গে প্রবল বন্যার ফলে বাংলার সমাজজীবনে নেমে এসেছিল এক দারুণ দৈব দুর্বিপাক। হাজার হাজার নরনারী ও শিশু এই বন্যার ফলে গৃহহীন এবং জীবন ধারণের উপায়বিহীন হয়ে দাড়িয়েছিল। বন্যার্তদের করুণ আহ্বানে তিনি সাড়া না দিয়ে পারলেন না। এই সময় বাংলার পরহিতব্রতী দেশসেবক বৈজ্ঞানিক আচার্য প্রফুল্লচন্দ্রের সভাপতিত্বে উত্তরবঙ্গ বন্যাত্ৰাণ সমিতি গঠিত হয় এবং সুভাষচন্দ্র তার সম্পাদক নেতাজী নির্বাচিত হন। সরকারী সহায়তা ব্যতীতই এই সমিতির প্রচেষ্টায় প্রায় ৪ লক্ষ টাকা সংগৃহীত হয়েছিল এবং পরে সমিতির আত ত্রাণ কার্যে মুগ্ধ হয়ে বাংলা গবর্ণমেন্টও ২০ হাজার টাকা সমিতিকে দান করেছিলেন। আত ত্রাণকার্যে সুভাষচন্দ্র যে অদ্ভুত সংগঠনী শক্তি ও কর্ম নৈপুণ্যের পরিচয় দিয়েছিলেন তা দেখে বাংলার তৎকালীন গবর্নর লর্ড লিটন পর্যন্ত মুগ্ধ হয়েছিলেন এবং তিনি নিজে প্রকাশ্যে সুভাষচন্দ্রকে অভিনন্দিত করেছিলেন। ১৯২১ খৃষ্টাব্দেই প্রকৃতপক্ষে সুভাষচন্দ্রের নিখিল ভারত কংগ্রেসের জীবন আরম্ভ। এই বৎসর ডিসেম্বর মাসে গয়ায় দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের সভাপতিত্বে কংগ্রেসের বার্ষিক অধিবেশন হয়। এই অধিবেশনে কংগ্রেসে দুটি ভিন্ন দলের অস্তিত্ব ধরা পড়ে। গান্ধীজীর নির্দেশে কংগ্রেস দুবৎসর বৃটিশের সঙ্গে পুরােপুরি অসহযােগিতা করে এসেছে তদনুযায়ী ১৯১৯এর শাসনসংস্কার অনুসারে নবগঠিত প্রাদেশিক ব্যবস্থা পরিষদ গুলিকেও কংগ্রেস বর্জন করে চলেছিল। চিত্তরঞ্জন দশ পণ্ডিত মতিলাল নেহেরুর সমর্থন ও সহযােগিতায় ঘোষণা করলেন যে কংগ্রেসের নির্বাচনে আইন-পরিষদগুলিও দখল করা উচিত এবং পরিষদের ভিতর থেকেও বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদকে আঘাত করা উচিত। এর ফলে গয়া অধিবেশনে আইনসভার নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য দেশবন্ধুর নেতৃত্বে কংগ্রেসের মধ্যে স্বরাজ্য দল গঠিত হয়। দেশবন্ধুর সহকারীরূপে সুভাষচন্দ্র গয়া অধিবেশনে যােগ দিয়েছিলেন এব’ স্বরাজ্য দল গঠনের প্রস্তাব সমর্থন করেছিলেন। গয়া অধিবেশন থেকে ফিরে সুভাষচন্দ্র বাঙ্গলার কথা’ নামক একখানি বাংলা দৈনিক পত্র প্রকাশ এইবার দেশবন্ধু নেতাজী করেন। এই সময় দেশবন্ধু রাজ্য দলের আদর্শ জনসমাজে প্রচারের উদ্দেশ্যে ‘ফরওয়ার্ড নামক ইংরেজী দৈনিক প্রত্রিকা প্রকাশ করেন এবং সংবাদপত্র পরিচালনায় সুভাষচন্দ্রের কৃতিত্বের পরিচয় পেয়ে তারই রুদ্ধে ‘ফরওয়ার্ডের সমস্ত দায়িত্বভার অর্পণ করেন। কারাবাসের সময় সুভাষচন্দ্র দেশবন্ধুর সঙ্গে একই কারাকক্ষে ছিলেন—ফলে গুরু-শিষ্যের মধ্যে হৃদ্যতার সম্পর্ক বেড়ে গিয়েছিল । এখন কার্যক্ষেত্রে সেই হৃদ্যত। উত্তরােত্তর বাড়তে থাকল। ১৯২৩ খৃষ্টাব্দে ব্যবস্থা পরিষদের নির্বাচন উপলক্ষে সুভাষচন্দ্র প্রাণপণ পরিশ্রম করেন এবং এই নির্বাচনে স্বরাজ্য দল কেন্দ্রে এবং প্রাদেশিক ব্যবস্থাপরিষদে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। ফলে দেশবন্ধুর কাছে এবং দেশবাসীদের দৃষ্টিতে সুভাষচন্দ্রের মর্যাদা ও গৌরব আরও বৃদ্ধি পায়। এই সময় তিনি বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটির সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯২৩ খৃষ্টাব্দে সুভাষচন্দ্র বঙ্গীয় তরুণ সঙ্গ বা Young Bengal Party নামে একটি নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করেন। সুভাষচন্দ্রের দৃষ্টিভঙ্গী প্রথম থেকেই কিরূপ চরমপন্থী ছিল এই দলের কর্মসুচী থেকে তার কিছুটা প্রমাণ পাওয়া যায়। ১৯২৮ সাল পর্যন্ত কংগ্রেসের দৃষ্টিতে স্বরাজ ও ডােমিনিয়ন ষ্ট্যাটাস ছিল সামর্থবােধক। কিন্তু সুভাষচন্দ্রের বঙ্গীয় তরুণ সঙ্ঘের আদর্শ ছিল পূর্ণ স্বরাজ লাভ বা পরিপূর্ণরূপে বৈদেশিক শাসন-মুক্তি। তা ছাড়া এই বঙ্গীয় তরুণ সঙ্ঘের মারফৎ সুভাষচন্দ্র আমাদের দেশের কৃষক ও শ্রমিকদের দিকে ও দৃষ্টিপাত করেছিলেন এবং তাদের ন্যায্য দাবী সম্বন্ধে দেশবাসীদের সচেতন করে তুলেছিলেন। সুভাষচন্দ্রের দৃষ্টিভঙ্গী যে বহু পূর্ব থেকেই প্রগতিশীল ছিল বঙ্গীয় তরুণ দল প্রতিষ্ঠাই তার শ্রেষ্ঠ প্রমাণ।

নেতাজী ১৯২৪ খৃষ্টাব্দে দেশবন্ধুর নেতৃত্বে স্বরাজ্যদল নবসংস্কৃত কলিকাতা কর্পোরেশনের নির্বাচন দ্বন্দ্বে অবতীর্ণ হন এবং শাজ্যদলের প্রতিনিধিরা বিপুল সংখ্যাধিক্যে নির্বাচিত হন। “ দেশবন্ধু কলিকাতার প্রথম কংগ্রেসী মেয়র নির্বাচিত হন এবং তিনি তার বিশ্বস্ত সহকর্মী সুভাষচন্দ্রকে নিযুক্ত করেন কর্পোরেশনের প্রধান কর্মসচিব। বাংলা গবর্ণমেন্ট অনেক দ্বিধাদ্বন্দ্বের পর উগ্রপন্থী সুভাষচন্দ্রের নিয়ােগ সমর্থন করতে বাধ্য হয়েছিলেন। প্রধান কর্মসচিবের পদের বেতন ছিল মাসিক ৩ হাজার টাকা। সুভাষচন্দ্র স্বেচ্ছায় এই বেতন কমিয়ে দেড় হাজার টাকা মাত্র গ্রহণ করতেন। সে দেড় হাজার টাকাও তার ব্যয়.কত গরীব ছাত্রদের ভরণ-পােষণে, তাদের বৃত্তিদানে, আত ত্রাণে। ২৭ বৎসর বয়স্ক তরুণ কর্মসচিব নিজের অদ্ভূত কর্ম নৈপুণ্যে অবিলম্বেই জন- সাধারণের প্রিয় হয়ে উঠলেন। দেশবন্ধু এবং সুভাষচন্দ্রের ঐকান্তিক সহযােগিতার ফলে কর্পোরেশনের শাসন-ব্যবস্থা গেল সম্পূর্ণ পালটে--- ইউরােপীয়দের আধিপত্য ক্ষুন্ন হল—পাদি এবং স্বদেশর মন্ত্রে কলিকাতা কর্পোরেশন পেল নতুন জীবন। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক গণমেণ্ট এই সর্বব্যাপী স্বদেশীর বিস্তারে ভয় পেয়ে গেল এবং এ জাতীয় কার্যকলাপ বন্ধ করতে কৃতসংকল্প ইল। প্রথম আঘাত এসে পড়ল সুভাষচন্দ্রেরই উপর । ১৯১৪ খৃষ্টাব্দের ২৫শে অক্টোবর তিনি বঙ্গীয় অডিনাঙ্গ অনুসারে ধরা পড়লেন। এইবার সুরু হল তার বিনা বিচারের দীর্ঘ কারাবাস। তার বিরুদ্ধে এমন কোন সুস্পষ্ট অভিযােগ ছিল না যে তাকে বিচারার্থ উপস্থিত করা যায়। তাঁর মত আরও অনেক কংগ্রেস কর্মীকে এবং ব্যবস্থাপরিষদের স্বরাজ্যদলীয় কয়েকজন প্রসিদ্ধ সদস্যকেও ৩৮ নেতাজী গ্রেপ্তার করা হল এবং তাদের বি! বিচারে আটক রাখা হল। ব্যবস্থা পরিষদে এবং স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান গুলিতে স্বরাজ্য তখন সরকারী কাজে প্রবল বাধা দিচ্ছিল। তা ছাড়া এই জাতীয় সর্বব্যাপী গ্রেপ্তারের আর কোন কারণ আবিষ্কার করা যায় না। সরকারী পক্ষ থেকে যুক্তি দেওয়া হয়েছিল যে বলায় তলে তলে অনুষ্ঠিত বিরাট বিপ্লবী সড় সমূলে উৎপাটিত করার জন্যেই সরকার এ কর্মপন্থা অবলম্বন করতে বলা হয়েছিলেন। কিন্তু সরকার পক্ষের এ উক্তি কোনদিন প্রমাণিত হয় নি। এই সময় কলিকাতার দুটি ইঙ্গ-ভারতীয় দৈনিক ‘ইলিশ- ম্যান’ ও ‘ষ্টেটম্যানে’ ক্রমাগত সুভাস বিরােধী প্রবন্ধাদি বেরােচ্ছিল এব’ এই পত্রিকা দুটি গবর্ণমেন্টকে এই বলে উত্তেজিত করেছিলেন যে সুভাষচন্দ্রই আলােচ্য বিপ্লবী ষড়যন্ত্রের পরিচালক ---অতএব তাকে সরে রাখাই বাঞ্ছনীয়। এতে কংগ্রেসী মহলে প্রবল বিক্ষোভ দেখা দেয় এব’ পত্রিকা দুটির বিরুদ্ধে মানহানির মামলা আনীত হয়। বেশ কিছুকাল পরে এ মামলা চলেছিল। কিন্তু পত্রিকা দুটি অত্যন্ত প্রভাবশালী এবং সরকারী কৃপাপরিপুষ্ট বলে শেষ পর্যন্ত তাদের কোন শাস্তি হয় নি। কর্পোরেশনের প্রধান প্রধান কর্মসচিব কাসচিব অকস্মা গ্রেপ্তার কর্পোরেশনের কাজের খুবই অসুবিধা হতে থাকে । 9 ভাষচন্দ যতদিন আলিপুর জেলে ছিলেন, ততদিন তাকে কর্পোরেশনের কাজ করার বিশেষ অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। তার সেক্রেটারী রোজ গিয়ে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন। কিন্তু দু’মাস যেতে না যেতেই তাকে মুর্শিদাবাদের বহরমপুরে জেলে স্থানান্তরিত করা হল। এখানে তিনি কয়েক মাস ছিলেন । বিনাবিচারে সুভাষচন্দকে এ ভাবে কারারুদ্ধ ৩৯ নেতাজী করায় সমগ্র দেশ প্রতিবাদে মুখর হয়ে ওঠে। কর্পোরেশনের সভায় সরকারী কাজের নিন্দাসূচক প্রস্তাব গৃহীত হয় এবং মেয়র দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন ঘােষণা করেন যে সুভাষচন্দ্র দেশপ্রেমের দোষে দোষী—তিনি নিজেও সেই দোষে দোষী। সুভাষচন্দ্রকে গ্রেপ্তার করলে, একই অপরাধে তাকেও গবর্ণমেন্টর গ্রেপ্তার করা উচিত। কোন দাবীতেই কাজ হল না। গবর্নমেন্ট ভাবলেন যে সুভাষচন্দ্রকে দেশ থেকে দূরে পাঠিয়ে দিলে হয়ত বা দেশবাশীরা তাকে ভুলে যাবে তার মুক্তির জন্যে আন্দোলনও কমে যাবে। এই দুরাশায় সুভাষচন্দ্রকে সুদূর ব্রহ্মের মান্দালয় কারাগারে নির্বাসিত করা হল। তার সঙ্গে আরও সাতজন রাজনৈতিক কর্মীও নির্বাসিত হলেন। সুভাষচন্দ্রের মান্দালয়ে নির্বাসনের সংবাদ যখন তার পিতামাতার কাছে পৌছুলো, তখন তার দেশপ্রেমিক পিতা বলেছিলেন : “আমরা সুভাষের জন্যে গা বােধ করি !” কারাবাস যতই কঠোর হােক, দেশপ্রেমিকদের হৃদয়ের বহ্নিশিখা তাতে নির্বাপিত করতেই পারে না—বরং তাদের জলন্ত স্বদেশপ্রেম আরও ইন্ধন জোগায়। হিটলার নাকি একদা কারাগারে বসে বসেই জার্মান জাতির জন্য বাঁচার স্থানের (label। Sraum) পরিকল্পনা করেছিলেন। মান্দালয়ের নির্জন কারাবাসে বসে মাতৃভূমিকে বৈদেশিক কবল মুক্ত করার কামনাও তেমনই সুভাষচন্দ্রের মনে আরও গভীর প্রভাব বিস্তার করেছিল । মান্দালয় কারাগারে বন্দীদের অত্যন্ত শােচনীয় অবস্থার মধ্যে রাখা হয়। কিন্তু সুভাষচন্দ্র এতে একটুও দমে যান নি। তিনি মান্দালয়ের কারাজীবন সম্বন্ধে লিখেছেন : “কিন্তু আমার স্পষ্ট মনে পড়ছিল যে এই স্থানেই লােকমান্য তিলক প্রায় ৪০ নেতাজী ৬ বৎসর কারারুদ্ধ ছিলেন এবং পরে লালা লাজপত রায়ও বছর খানেক আটক ছিলেন। তাই আমরা এই ভেবে কিছুটা সান্ত্বনা ও গর্ব অনুভব করতাম যে আমরা তাদেরই পদাঙ্ক অনুসরণ করছিলাম।” মান্দালয় বন্দী নিবাসে স্থানান্তরিত হবার কিছুকাল পরে সুভাষচন্দ্র এবং অন্যান্য কয়েকজন রাজবন্দী অনশন ধর্মঘট করেছিলেন। তখন মান্দালয় কারাগারে বাঙ্গালী রাজবন্দীদের দুর্গাপূজার কোন সুযােগ সুবিধা ছিল কিংব দুর্গাপূজার জন্যে কোন সরকারী সাহায্যের ব্যবস্থাও ছিল না। এই অব্যবস্থার প্রতিবাদে তারা অনশন ধর্মঘট করেছিলেন এবং পক্ষকাল ধর্মঘট করার পরেই কারাকর্তৃপক্ষ তাদের দাবী মেনে নিতে বাধ্য হন। কারাকর্তৃপক্ষ কারাবন্দীদের প্রতি যে কত অবিচার করেন, বন্দীরা যে তাদের চোখে মানুষ বলেই বিবেচিত হয় না, এ বােধ সুভাষচন্দ্রকে সব সময়েই পীড়িত করত। ১৯২৫ খৃষ্টাকে মান্দালয় কারাগার থেকে যুক্ত বস্তু তার সতীর্থ যুক্ত ক্লিীপকুমার রায়কে যে পত্র লিখেছিলেন, তার মধ্যে কারাসংস্কার সম্বন্ধে তার অনেক মতামত পাওয়া যায়। সেই পত্র থেকে বােঝা যায় যে রাজবন্দীদের চেয়ে সাধারণ কয়েদীদের দুর্ভোগ তাকে আরও বেশী ব্যথিত করে তুলত। এই সালেই সুভাষচন্দ্র কারাগারে একটা শোক-সংবাদ পান। ১৯১৫ খৃষ্টাব্দে ১৬ই জুন তার রাজনৈতিক গুরু দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন অকস্মাৎ দেহত্যাগ করেন। দেশবন্ধুর অকাল মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে সুভাষচন্দ্র কারাগারে অসহায় বালকের মতই কেঁদে উঠেছিলেন। দেশবন্ধুকে তিনি শুধু শ্রদ্ধা করতেন , অন্তর দিয়ে তাকে ভালবাসতেন। দেশবন্ধুর মৃত্যুর পর পরলােকগত ঔপন্যাসিক ডাঃ শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় স্মৃতিকথা' নামক একটি সুন্দর প্রবন্ধ ৪.

লিখে তার স্মৃতিতর্পণ করেছিলেন। এই প্রবন্ধটি পড়ে বন্দী সুভাষচন্দ্র এত বিমুগ্ধ হয়েছিলেন যে তিনি মান্দালয় থেকে শরৎচন্দ্রকে একটী দীর্দ চিঠি লিখে অভিনন্দন 'না জানিয়ে পারেন নি। এই চিঠির প্রতি ছত্রে ছত্রে তার দেশবন্ধুর প্রতি ভক্তি ও প্রীতি ফুটে উঠেছে। ইতিমধ্যে তার মুক্তির দাবীতে বাংলার আকাশ বাতাস প্রতিনিয়তই মুখর হয়ে ছিল। কিন্তু গবর্ণমেন্ট সে দাবীতে কান দিচ্ছিলেন না। উপায়ান্তর না দেখে বাংলা কংগ্রেস এক নতুন চাল চালল । বন্দী সুভাষচন্দ্র |ংলা কংগ্রেসের পক্ষ থেকে প্রাদেশিক ব্যবস্থা পরিষদের সদস্য মনােনীত হলেন এবং বিপুল ভােটাধিক্যে নির্বাচিত হলেন। অনেকে আশা করল যে এবার হয়ত তাকে মুক্তি দেওয়া হবে। কিন্তু শীঘ্রই সে আশ মিথ্যা প্রমাণিত হল। তাকে মুক্তি দেওয়া হল না, বিচারের জন্য তাকে আদালতে হাজির করা হল না। এদিকে মান্দালয় কারাবাসে সুভাষচন্দ্রের স্বাস্থ্য ক্রমশ অবনতির দিকে যেতে লাগল। মান্দালয়ে কারাবাসের অভিজ্ঞতা যাদের আছে, তারা সবাই একবাক্যে স্বীকার করেছেন যে মান্দালয় নরক বিশেষ। দীর্দ দুই বৎসর এই নরকবাসের ফলে ১৯১৭ এর এপ্রিল মাসে সুভাষচন্দ্রের স্বাস্থ্য 'এত খারাপ হয়ে পড়ল যে তার বিছানা থেকে নড়বার সামর্থও রইল ডাক্তাররা একযােগে রায় দিলেন যে তার অবস্থা আশঙ্কাজনক। সারা বাংলা আবার তার মুক্তির দাবীতে মুখর হয়ে উঠল। এই অবস্থায় গবর্ণমেণ্ট তাকে রেঙ্গুনে স্থানান্তরিত করলেন এবং তাঁর স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্যে একদল ডাক্তার প্রেরণ করা হল। তার ভ্রাতা ডাক্তার সুনীলচন্দ্র ৪১ নেতাজী বসুও এই ডাক্তার দলের অন্যতম ছিলেন। তার শরীরের ওজন তখন ৪০ পাউণ্ড কমে গেছে এবং ক্ষয়রােগের লক্ষণ দেখা দিয়েছে। তখন বিব্রত হয়ে সরকার পক্ষ থেকে প্রস্তাব দেওয়া হল যে সুভাষচন্দ্র স্বাস্থ্যোদ্ধারের জন্যে সুইজাৰ্ল্যাণ্ডে যান, এতে সরকারপক্ষের কোন আপত্তি নেই। তবে তার নিজের ব্যয়ভার নিজেকে বহন করতে হবে এবং ভারতের কোন বন্দরে না থেমে তাকে সরাসরি রেঙ্গুন থেকে ইউরােপ যেতে হবে। সরকারপক্ষের এই সর্তাধীন মুক্তির প্রস্তাব গ্রহণ করতে সুভাষচন্দ্র অসম্মতি জ্ঞাপন করেন। এই প্রসঙ্গে তিনি ইনসিন সেন্ট লি জেল থেকে ১৯২৭এর এপ্রিল মাসে তার মেজদাদা শযুক্ত শরৎচন্দ্র বসুকে সে পত্র লিখেছিলেন, সে পত্ৰখানি বিশেষ স্মরণযােগ্য। তার মনের জলন্ত স্বদেশপ্রেম, অত্মমর্যাদাবােধ এবং জাতীয় সম্মানবােধ এই পত্রখানির প্রতি ছত্রে ফুটে উঠেছে। তিনি স্পষ্ট জানান যে কোনপ্রকার সতাধীন মুক্তি নিয়ে তিনি নিজের জীবনকে বাঁচাতে চান না। এই অবস্থায় পড়ে তাকে ভগ্নস্বাস্থ্যের দরুণ বিনা সতে মুক্তি দেওয়া ছাড়া গবর্ণমেন্টের গত্যন্তর থাকে না। খৃষ্টাব্দের ১৫ই মে তাকে রেঙ্গুন থেকে জাহাজযােগে ডায়মণ্ড হারবারে নিয়ে আসা হয়। সেখানে তাকে বাংলার গবর্ণরের লঞ্চে ওঠানো হয় এবং এই লঞ্চের উপরেই ডাঃ স্যার নীলরতন সরকার, ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়, লেঃ কঃ স্যাণ্ডস এবং মেজর সঙ্গ্যিান প্রভৃতি চিকিৎসাবিদর! তার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেন। সেদিন তিনি লঞ্চেই কাটান। পরদিন তাকে জানানাে হয় যে তিনি নিঃসত মুক্তি পেয়েছেন। তার মুক্তির সংবাদে সমগ্র বাংলায় আনন্দের স্রোত বয়ে যায়। তিন বৎসর পূর্বে যখন তিনি ৪৩ নেতাজী ধরা পড়েন, তখন তিনি ছিলেন স্বাস্থ্যোজল তেজোদ্দপ্ত যুবক। তিন বৎসর পর বৃটিশ কারাগার থেকে যখন তিনি মুক্তি পেলেন, তখন তিনি ভগ্নস্বাস্থ্য ক্ষয়রােগী। ভগ্নস্বাস্থ্যের দরুণ বেশীদিন বিশ্রাম সুখ ভােগ করা তার ভাগে ছিল না। দেশবন্ধুর মৃত্যুতে বাঙ্গলার রাজনৈতিক জীবনে যে শূন্যতা এসেছিল, দেশপ্রিয় যতীন্দ্রমােহন সেনগুপ্ত তা কতকাংশে পরিপূরণের প্রয়াস পেয়েছিলেন। কিন্তু তরুণ বাংলার দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল বিপ্লবী সুভাষচন্দ্রের উপর। সুতরাং মুক্তি পেতে না পেতেই দেশের যুবশক্তির আহ্বানে, তাঁকে কর্মসাগরে লাফিয়ে পড়তে হল। মুক্তির কিছু পরেই তিনি বঙ্গীয় প্রাদেশিক রাষ্ট্রীয় সমিতির সভাপতি নির্বাচিত হলেন। ১৯২৮-২৯ সাল সুভাষচন্দ্রের জীবনের কর্মবহুল দুটি বৎসর। এই বৎসর তিনি পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুর সঙ্গে ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক নিযুক্ত হন। এই বৎসর ফেব্রুয়ারী মাসে ভারতের ডাবী শাসনতন্ত্রে প্রয়ােজনীয় সংস্কার সাধন সম্বন্ধে তদন্তের জন্যে সাইমন কমিশন ভারত ভ্রমণে আসেন। ৭৮ বৎসরের অভিজ্ঞতায় বৃটিশ গবর্ণমেন্ট বুঝতে পেরেছিলেন যে ১৯১৯এর মন্টেগু চেমসফোর্ড শাসন- সংস্কার ভারতবাসীদের আদৌ সন্তুষ্ট করতে না পারায় ব্যর্থ হয়েছে। তাই এ সাইমন কমিশনের প্রহসন । কংগ্রেস সাইমন কমিশন বর্জনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। সারা দেশব্যাপী সাইমন কমিশনবিরােধী আন্দোলন চলে। সুভাষচন্দ্রের নেতৃত্বে কলিকাতায় এবং বাংলা দেশে সাইমন কমিশনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রদর্শন খুব সাফল্যমণ্ডিত হয়। এই বৎসরের আর একটি উল্লেখযােগ্য ঘটনা সর্বদলীয় সম্মেলন এবং ৪৪ নেতাজী নেহেরু কমিটির অধিবেশন ; এ দুয়েরই উদ্দেশ্য ছিল ভারতের ভাবী শাসনতন্ত্রের খসড়া রচনা। কংগ্রেসী মহলে এই সময় একটা আপােষ রফার সুর স্পষ্ট হয়ে দেখা দেয়। নেহেরু কমিটি যে শাসনতন্ত্রের কাঠামাে রচনা করেন তার মূল নীতি ছিল ভারতের ঔপনিবেশিক স্বায়ত্ত শাসন বা ডােমিনিয়ন ষ্ট্যাটাস লাভ। নেহেরু কমিটির এই রিপােট লক্ষৌএ অনুষ্ঠিত সর্বদলীয় সম্মেলনে গৃহীত হয়। কিন্তু সুভাষচন্দ্র, পণ্ডিত জওহরলাল প্রভৃতি তরুণ নেতাদের নেতৃত্বে তরুণ ভারত এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে অসম্মত হয়। তারা জানান পর্ণ স্বাধীনতা লাভই ভারতবাসীদের মূল উদ্দেশ্য। তবে এই মতভেদ নিয়ে যাতে কংগ্রেসের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি না হয়, সেইজন্যে পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরু ও সুভাষচন্দ্রের নেতৃত্বে বামপন্থীদের যে ঘরােয়। বৈঠক হয় তাতে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যে নেহেরু কমিটি ও সর্বদলীয় সম্মেলনে গৃহীত প্রস্তাবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জ্ঞাপনের উদ্দেশ্যে স্বাধীনতা লীগ ( Independence Lagu | গঠিত হবে। এই ভাবে সুভাষচন্দ্র সর্বপ্রথম কংগ্রেসের আপােষমূলক মনোভাবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জ্ঞাপন করলেন। ১৯৩০ খৃষ্টাব্দে আপােষ আলােচনার ব্যর্থতার পর মহা গান্ধীর নেতৃত্বে যে আইন অমান্য আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিল, সুভাষচন্দ্রের ইচ্ছা ছিল সে আন্দোলন ১৯২৮ সালেই শুরু হয়। সাইমন কমিশনের আগমনে সারা দেশে তিনি যে জাগরণ দেখেছিলেন, বদৌলীর কৃষকরা খাজনা বন্ধ করে যে গণ-জাগরণের পরিচয় দিয়েছিল, তার ফলে সুভাষচন্দ্রের ধারণা জন্মেছিল যে দেশ প্রস্তুত। গান্ধীজীর নেতৃত্বে এই আন্দোলন যাতে আরম্ভ হতে পারে তদুদ্দেশ্যে ১৯১৮ সালের মে নেতাজী মাসে সুভাষচন্দ্র সবরমতী আশ্রমে গিয়ে মহাত্মাজীকে দেশের পরিস্থিতি বুঝিয়েছিলেন। কিন্তু গান্ধীজী তার প্রস্তাবে রাজী হন নি। ১৯২৮ এর মে মাসে সুভাষচন্দ্র পুণায় মহারাষ্ট্র প্রাদেশিক রাষ্ট্রীয় সম্মেলনের সভাপতিত্ব করেন। ঐ বৎসরের আগষ্ট মাসে কলিকাতায় পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরুর সভাপতিত্বে যে নিখিল বঙ্গ ছাত্র সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল, সুভাষচন্দ্র সে সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন। ডিসেম্বর মাসে কলিকাতায় বােম্বাইএর বামপন্থী পাশী নেতা মিঃ কে, এফ, নরীম্যানের সভাপতিত্বে নিখিল ভারত যুব সম্মেলনের প্রথম অধিবেশন হয় । সুভাষচন্দ্র এ সম্মেলনেও সক্রিয় অংশ গ্রহণ করেছিলেন। ১৯২৮ সালের সর্বশেষ উল্লেখযােগ্য ঘটন কলিকাতায় পণ্ডিত মতিলাল নেহেরুর সভাপতিত্বে জাতীয় কংগ্রেসের বার্ষিক অধিবেশন। মহারাষ্ট্র সম্মেলন থেকে ফিরে সুভাষচন্দ্র এই উপলক্ষে বিরাট একটি স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গড়ে তুলেছিলেন। তিনি নিজে ছিলেন এই বিরাট স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর জি, ও, সি, ব; জেনারেল কম্যাণ্ডিং অফিসার। আমাদের জাতীয় মহাসভার ইতিহাসে সুভাষচন্দ্র-গঠিত এই স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী একটি বিশেষ উল্লেখযােগ্য ঘটনা। এই স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী সুভাষচন্দ্রের সামরিক সংগঠনী শক্তির প্রকৃত নিদর্শন। এদের সামরিক কায়দায় কুচকাওয়াজ এবং সামরিক নিয়মানুবর্তিতা শেখানো হয়েছিল। নির্বাচিত সভাপতি পণ্ডিত মতিলাল নেহেরুকে অভ্যর্থনার জন্যে যে বিরাট শোভাযাত্রার আয়ােজন সুভাষচন্দ্র করেছিলেন, আমাদের জাতীয় ইতিহাসে সে শােভাযাত্রার তুলনাও বিরল। এই অধিবেশনেই সর্বাংশে নেহেরু রিপাের্ট গ্রহণের ৪৬ নেতাজী জন্যে প্রস্তাব উত্থাপিত হয়। পণ্ডিত মতিলাল নেহেরুর দল এ প্রস্তাবের স্বপক্ষে থাকলেও দেশের যুবশক্তি ছিল এর বিরুদ্ধে। দেশের যুবশক্তি যে পূর্ণ স্বাধীনতা চায় গান্ধীজী সে সংবাদ রাখতেন। তাই তিনি একটা মাঝামাঝি আপােষের জন্যে একটি সংশােধিত প্রস্তাব আনলেন। এই সংশােধিত প্রস্তাবের মূল কথা এই যে ১৯১৯ এর ৩১শে ডিসেম্বরের মধ্যে ব্রিটিশ গবর্ণমেন্ট যদি নেহেরু শাসনতন্ত্র গ্রহণ না করেন, তবে কংগ্রেস আবার অহিংস অসহযােগ আন্দোলন ঘােষণা করবে। এতেও তরুণ দল সন্তুষ্ট হল না। সুভাষচন্দ্র একটি তীব্র বক্তৃতায় গান্ধীজীর প্রস্তাবের বিরােধিতা করলেন এবং একটি সংশােধনী প্রস্তাব আনলেন। পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরু সুভাষচন্দ্রের সংশােধনী প্রস্তাবের পক্ষে একটি সুন্দর বক্তৃতা করেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভােটাধিক্যে সুভাষচন্দ্রের প্রস্তাব অগ্রাহ্য হয়ে যায়। এমনই ভাবে কলিকাতার অধিবেশন সমাপ্ত হল । এদিকে ব্রিটিশ গবর্ণমেন্টকে যে এক বৎসর সময় দেওয়া হল তাতে বিশেষ কাজ হল না। কেননা ব্রিটিশ গবর্ণমেণ্ট নেহেরু শাসনতন্ত্র সম্বন্ধে আদৌ কোন উৎসাহ দেখালেন না। এর লাহোর কংগ্রেসের দিন এগিয়ে আসতে লাগল। তীক্ষধী গান্ধীজী ঘটনা প্রবাহ দেখে বুঝতে পেরেছিলেন যে দেশে বামপন্থী যুবশক্তি ক্রমশই দান। বাঁধছে। কলিকাতা কংগ্রেসেই তিনি তার প্রমাণ পেয়েছিলেন। তারপর আহমেদাবাদ, নাগপুর, লাহাের প্রভৃতি স্থানে পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরু, সুভাষচন্দ্র বসু এবং কমলাদেবী চট্টোপাধ্যায়ের সভাপতিত্বে বহু যুব সম্মেলনও হয়ে গেল। গান্ধীজী বুঝলেন যে এ অবস্থায় লাহাের ৪৭ নেতাজী অধিবেশনের জন্যে একজন বামপন্থী কংগ্রেস সভাপতি নির্বাচিত না করলেই নয়। তাই লাহাের অধিবেশনের জন্য গান্ধীজীর নিজের নাম প্রস্তাবিত হলেও, তিনি জওহরলালকে আলােচ্য অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত করার নির্দেশ দিলেন। এ সম্বন্ধে সুভাষচন্দ্র লিখেছেন : “বামপন্থী বিবােধিতাকে পরাজিত করে কংগ্রেসের উপর তার আগেকার অবিসম্বাদিত কতৃত্ব পুনঃসংস্থাপনের জন্যে মহাত্মাজীর পক্ষে পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরুকে জয় করা ছিল অত্যাবশ্যক...মহাত্মার দিক থেকে এ মনােনয়ন কুশলতারই পরিচায়ক, কিন্তু বামপন্থী দলের পক্ষে এ মনােনয়ন হল দুর্ভাগ্যের বিষয়—কেননা এই ঘটনা থেকেই মহাত্মা এবং পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরুর মধ্যে একটা রাজনৈতিক বােঝাপড়া আরম্ভ হল এবং ফলে শেষােক্ত ব্যক্তির সঙ্গে কংগ্রেস বামপন্থী দলের ব্যবধানও বেড়ে চলল.•••••এবং রাষ্ট্রপতিরূপে তার নির্বাচন তার রাজনৈতিক জীবনে নতুন অধ্যায়ের সৃষ্টি করল। সেই থেকে পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরু মহাত্মার বড় সমর্থক হয়ে দাড়িয়েছেন।” লাহাের অধিবেশনের দুই মাস পূর্বে বড়লাট লর্ড আরউইন একটি ঘােষণায় বললেন যে ভারত ভােমিনিয়ন স্ট্যাটাস লাভ করুক-এটা তো বৃটিশ গবর্ণমেন্টের মূল নীতি এবং ১৯১৭ সালের ঘােষণার মধ্যেই একথা আছে। তিনি আরও আরও একটি ঘােষণায় জানালেন যে সাইমন কমিশনের রিপাের্ট প্রকাশিত হবার পর লণ্ডনে একটি গােলটেবিল বৈঠক বসবে। এই ঘােষণার পরে দিল্লীতে আবার একটি সবদলীয় সম্মেলন বসল এবং এই সম্মেলনে স্থির হল যে বড়লাটের ঘােষণার অকৃত্রিমতায় বিশ্বাস করে ভারতের জন্যে ঔপনিবেশিক স্বায়ত্তশাসনের ০৮ নেতাজী শাসনতন্ত্র রচনায় সহযােগিতার আশ্বাস দিয়ে একটি ইস্তাহার প্রকাশ করা হােক। এই ইস্তাহারে যারা সই করেছিলেন তাদের মধ্যে ছিলেন পণ্ডিত মতিলাল, জওহরলাল, মদনমােহন মালব্য, গান্ধীজী, ডাঃ আনসারী, শ্রীযুক্তা সরােজিনী নাইডু প্রভৃতি। সুভাষচন্দ্র মােটই এ ইস্তাহারের পক্ষে ছিলেন না। তাঁর আন্তরিক ইচ্ছা ছিল কংগ্রেস সংগ্রামের পথে এগিয়ে যাক। তিনি এই ইস্তাহারে সই করতে অস্বীকৃত হলেন এবং নিজে ডােমিনিয়ন ষ্ট্যাটাসের বিরােধিতা করে একটি ভিন্ন ইস্তাহার প্রচার করলেন। সুভাষচন্দ্র ছাড়া এই ইস্তাহারে অমৃতসরের ডাঃ কিচলু, পাটনার অধ্যাপক আবদুল বারি প্রভৃতি সই করেছিলেন। এর কিছু পরে তৎকালীন কেন্দ্রীয় ব্যবস্থা পরিষদের সভাপতি শ্রীযুক্ত ভি, জে, প্যাটেলের মধ্যস্থতায় গান্ধীজী ও মতিলাল নেহেরুর সঙ্গে বড়লাটের সাক্ষাৎকার হল। কিন্তু কোন লাভজনক প্রস্তাব না থাকায় তারা হতাশ চিত্তে শূন্যহাতে লাহাের কংগ্রেসে ফিরে এলেন। মহাত্মা গান্ধী লাহাের অধিবেশনে নিজে পূর্ণ স্বাধীনতার প্রস্তাব আনলেন। ১৯২৯এর লাহাের অধিবেশন থেকে পূর্ণ স্বাধীনতা লাভ হল কংগ্রেসের মূল লক্ষ্য। এর কিছুদিন পূর্বে বড়লাটর গাড়ীতে বােমা নিক্ষেপ করা হয়েছিল। সৌভাগ্যক্রমে তিনি বেঁচে গিয়েছিলেন। তার এই বিপন্মুক্তিতে অভিনন্দন জানিয়েও একটি প্রস্তাব স্বাধীনতা- প্রস্তাবের সঙ্গে সংযুক্ত ছিল। সুভাষচন্দ্রের নেতৃত্বে কংগ্রেসের বামপন্থী তরুণ দল এর তীব্র বিরােধিতা করলেন। তৎসত্বেও প্রস্তাবটি ভােটাধিক্যে গৃহীত হল। পূর্বেই বলেছি লাহাের কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন বামপন্থী তরুণ নেতা পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরু। ৪৯ নেতাজী সুভাষচন্দ্র ১৯২৭ সালে মান্দালয় থেকে ফিরে আসার পর থেকেই কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য ছিলেন। বিস্ময়ের বিষয় লাহাের অধিবেশনে তিনি নতুন রাষ্ট্রপতি পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরুর ওয়ার্কিং কমিটি থেকে বাদ পড়েন। কলিকাতায় ১৯২৮ সালে সুভাষচন্দ্রের যে স্বাধীনতার প্রস্তাব পরিত্যক্ত হয়েছিল, লাহাের কংগ্রেসে তাই গৃহীত হল। লাহাের কংগ্রেসে একটি সংশােধনী প্রস্তাবে সুভাষচন্দ্র আয়ল্যাণ্ডের সিন ফিনের ( বিপ্লবী আইরিশ দল) আদর্শে ভারতে বৃটিশ গবর্নমেন্ট-বিরােধী একটি জাতীয় সরকার গঠনের দাবী করেন। তা ছাড়া তিনি কংগ্রেসের তরফ থেকে দেশের শ্রমিক মজদুর, কৃষক ও ধুবশক্তি সংগঠনের ব্যবস্থা করতে নির্দেশ দেন। তার প্রস্তাব শেষ পর্যন্ত ভােটে টেকে নি। সংশোধনী প্রস্তাব উত্থাপন প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন : “নিজের গুণ দিয়ে আমার প্রস্তাবের বিচার করার জন্যে দেশবাসীরা আরও বার মাস সময় পাবেন । এ বিষয়ে আমার কোন সংশয় নেই যে আমারই প্রস্তাব কিংবা এরই অনুরূপ অন্য কোন প্রস্তাব আগামী কংগ্রেসে গৃহীত হবে। একমাত্র অনুতাপের বিষয় এই যে ইত্যবসরে অনেক মূল্যবান সময় নষ্ট হয়ে যাবে। কিন্তু তার ত আর উপায় নেই—কেননা রাজনৈতিক শিক্ষার গতি ধীর—বিশেষ করে যখন প্রায় সব প্রভাবশালী নেতার প্রভাবই থাকে বিপরীত পক্ষে।” সুভাষচন্দ্রের স্বাধীন গবর্ণমেন্ট সংগঠনের প্রস্তাব জাতীয় কংগ্রেস গ্রহণ করলেও, তিনি ১৪ বৎসর পরে আজাদ হিন্দ গবর্নমেন্ট গঠন করে তার আদর্শের বাস্তব রূপ বিশ্ববাসীদের চোখের সামনে তুলে ধরেছিলেন। লাহাের কংগ্রেসের পরে সুভাষচন্দ্র সমগ্র দেশে আপােষবিবােধ নেতাজী মনােভাব গড়ে তােলার কাজে আত্মনিয়ােগ করলেন। দেশের যুবশক্তি এবং শ্রমিক কৃষকদের সঙঘবদ্ধ করা ও জাগিয়ে তােলা হল তার কাজ । তিনি এই সময় বলেছিলেন : “কাল যদি আমাদের ডােমিনিয়ন ষ্ট্যাটাস দেওয়া ও হয়, তবু আমাদের কতব্য হবে আয়াণ্ডের মত আমাদের দেশের যুবশক্তিকে সাধারণতান্ত্রিক দলে গড়ে তােলা এবং স্বাধীনতার জন্যে আন্দোলন জাগিয়ে রাখা।” লাহাের কংগ্রেস আরও একাধিক কারণে উল্লেখযােগ্য। বাংলা- দেশের কংগ্রেসে এই সময় প্রচুর দলাদলি ছিল। সুভাষচন্দ্র এবং দেশপ্রিয় যতীন্দ্রমােহন সেনগুপ্ত দুজনেই ছিলেন দেশবন্ধুর সুযােগ্য বিশ্বাসভাজন শিষ্য। দেশবন্ধু যখন দেহত্যাগ করেন, সুভাষচন্দ্র তখন মান্দালয়ে বন্দী। যতীন্দ্রমােহন বাংলাদেশের একচ্ছত্র অধিনায়ক হয়ে দাঁড়ান। তিনি একাধারে বঙ্গীয় প্রাদেশিক রাষ্ট্রীয় সমিতির সভাপতি, ব্যবস্থাপরিষদে কংগ্রেস দলের দলপতি এবং কলিকাতা কর্পোরেশনের মেয়র ছিলেন। তা ছাড়া চরমপন্থী সুভাষচন্দ্রের তুলনায়, যতীন্দ্রমােহনের প্রতি কংগ্রেসের কতৃপক্ষের আস্থাও ছিল বেশী ! কিন্তু বাংলাদেশের জনগণের প্রীতি ছিল সুভাষচন্দ্রের উপর অত্যধিক। তাঁর জীবনে একাধিকবার তিনি তা প্রমাণিত করেছেন। তিনি কারাগার থেকে বেরিয়ে আসার পর যতীন্দ্রমোহনের দলের সঙ্গে তাঁর মতবিরােধ ও সঙঘর্ষ বাধতে লাগল। সে বৎসর প্রাদেশিক রাষ্ট্রীয় সমিতির নির্বাচনে সুভাষচন্দ্র সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। তাই নিয়ে বিরােধ বেধেছিল এবং মীমাংসার জন্যে লাহাের কংগ্রেসে প্রস্তাব উত্থাপিত হয়েছিল। তখন ডাঃ পটুভি সীতারামিয়াকে কংগ্রেস কতৃপক্ষ মধ্যস্থ নিযুক্ত করার মৃৈতাজী প্রস্তাব করেন। কিন্তু সুভাষচন্দ্র তাতে আপত্তি জ্ঞাপন করে জানান যে যদি পণ্ডিত মতিলালকে মধ্যস্থ নিযুক্ত করা হয়, তবে তাঁর রায় তাঁর বিরুদ্ধে গেলেও তিনি তা মেনে নেবেন। অবশেষে দেশপ্রিয় যতীন্দ্র- মােহনের সঙ্গে একটা মােটামুটি আপােষ-বা হয়েছিল। লাহাের কংগ্রেসে সুভাষচন্দ্র এই মর্মে আর একটি প্রস্তাব এনেছিলেন যে কংগ্রেসের সভাপতি তার ওয়ার্কিং কমিটি মনােনীত করেন, এ রীতি গণতন্ত্র-বিরােধী বলে, গণতন্ত্রসম্মত উপায়ে কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির সদস্যদের নির্বাচন ব্যবস্থা করা হােক। পণ্ডিত মতিলাল নেহেরুর দল এই প্রস্তাবের তীব্র প্রতিবাদ করায় প্রস্তাবটি ভােটে হেরে যায়। দক্ষিণপন্থীদের এই গণতন্ত্র-বিরােধী মনােভাবে বিক্ষুব্ধ হয়ে সুভাষচন্দ্র তাঁর দলবল সহ সভামণ্ডপ ত্যাগ করে চলে যান। ১৯৩০ খৃষ্টাব্দে গান্ধীজী প্রবর্তিত আইন অমান্য আন্দোলন আৰম্ভ হয়। এই সময় সুভাষচন্দ্র পর পর কয়েকবার কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন। সুভাষচন্দ্রের জীবনী বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে ভারতে থাকার সময় বৃটিশ গবর্ণমেণ্ট তার কার্যকলাপকে সব সময়েই ভীতির চক্ষে দেখতেন এবং তাকে, কারাপ্রাচীরের আড়ালে আটকাতে না পারলে গবর্ণমেন্টের যেন শান্তি হত না। ১৯২৯ খৃষ্টাব্দের আগষ্ট মাসে দক্ষিণ কলিকাতায় নিখিল ভারত লাঞ্ছিত রাজনৈতিক দিবস (All India Political Sufferers' Day) উপলক্ষে সুভাষচন্দ্র এক বিরাট শশাভাযাত্রা পরিচালনা করেছিলেন। সেই জন্যে তাঁর বিরুদ্ধে এক মামলা চলছিল। এই মামলায় ১৯৩০এর ২৩শে জানুয়ারী তিনি রাজদ্রোহের অভিযােগে ৯ মাস সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন। এই সময় আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে তিনি নেতাজী আটক থাকেন। ২১শে এপ্রিল আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে একটি দুর্ঘটনা ঘটে। এইদিন আলিপুর জেল থেকে মেছুয়া বাজার বােমার মামলার আসামীদের বিচারার্থ আদালতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। কিন্তু সরকারী কর্মচারীদের বিরুদ্ধে কতগুলো অভিযােগের প্রতিবাদ জানিয়ে আসামীরা কয়েদীদের গাড়ীতে প্রবেশ করতে অসম্মত হন। এই সংবাদে সাধারণ পাঠান কয়েদী, জেল কতৃপক্ষ এবং ওয়ার্ডাররা ঘটনাস্থলে এসে জড় হন। সুভাষচন্দ্র, যতীন্দ্রমােহন সেনগুপ্ত প্রভৃতি অন্যান্য রাজবন্দীরাও সেখানে এসে সমবেত হন। জেল সুপারিন্টেন্টে তখন জোর করে বােমার মামলার আসামীদের গাড়ীতে তােলার আদেশ দেন এবং সুভাষচন্দ্র প্রমুখ রাজবন্দীদের সেখান থেকে চলে যেতে বলেন। কিন্তু সুভাষচন্দ্র এই অন্যায় বলপ্রয়ােগের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জ্ঞাপন করায় সুপারিন্টেন্টে তাদেরও জোর করে অপসারিত করার আদেশ দেন। পাঠান কয়েদীরা একযােগে শ্ৰীযুক্ত বসু এবং তার সঙ্গী অন্যান্য রাজ- বন্দীদের উপর লাফিয়ে পড়ে। লাঠির আঘাতে শ্ৰীযুক্ত বস্তু অজ্ঞান হয়ে পড়েন এবং প্রায় এক ঘণ্টাকাল তিনি অজ্ঞান ছিলেন। এই ব্যাপারে অপর কয়েকজন রাজবন্দীও আহত হয়েছিলেন। এই নিয়ে সারা দেশে সরকারের বিরুদ্ধে এক তীব্র আন্দোলন চলে। গবর্ণমেন্ট দোষক্ষালনের জন্যে একটি সরকারী বিজ্ঞপ্তি প্রচার করেন। কিন্তু কেউ তা বিশ্বাস করে না। সমগ্র বাংলাদেশে আলিপুর জেলের সুপারিন্টে- ণ্ডেন্টের কাজের তীব্র সমালােচনা চলে। বেচারী সুপারিন্টেন্ডেন্ট বাধ্য হয়ে অন্য জেলে বদলী হয়ে আত্মরক্ষা করেন । জেলে থাকার সময়ই শ্ৰীযুক্ত বস্তু কলিকাতা কর্পোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হন।

নেতাজী ১৯৩০ এই বৎসর তিনি নিখিল ভারত ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হন এবং সভাপতিরূপে তিনি এই শ্রমিক প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের গভীর যােগাযােগ স্থাপন করেন। খৃষ্টাব্দের ২৩শে সেপ্টেম্বর তিনি আলিপুর জেল থেকে মুক্তি পান এবং ১৯৩১এর জানুয়ারী মাসে মালদহ জেলা ম্যাজিষ্ট্রেটের আদেশ ভঙ্গের দরুণ তিনি ৭ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন। ১৯২৯ খৃষ্টাব্দে লাহাের কংগ্রেসে পূর্ণ স্বাধীনতার প্রস্তাব গ্রহণের পর থেকে প্রতি বৎসর ২৬শে জানুয়ারী আমাদের দেশে স্বাধীনতা দিবস রূপে প্রতিপালিত হয়ে আসছে। ঐদিন নতুন করে স্বাধীনতার শপথ গ্রহণ করা হয় এবং সভা ও শােভাযাত্রাদির অনুষ্ঠান করা হয়। ১৯৩১ সালের ২৬শে জানুয়ারী সুভাষচন্দ্রের নেতৃত্বে কলিকাতায় এক বিরাট শশাভাযাত্রা বের হয়েছিল। পুলিশ এই শােভাযাত্রা অবৈধ ঘােষণা করে এবং শশাভাযাত্রাকারীদের উপর লাঠি চালায়। অবৈধ শােভাযাত্রার পরিচালকরূপে সুভাষচন্দ্র গ্রেপ্তার হন এবং বিচারে তার ছয়মাস কারাদণ্ড হয়। কিন্তু শীঘ্রই গান্ধী-আরউইন চুক্তি সম্পাদিত হওয়ায় পূর্ণ কারাদণ্ড ভােগের পূর্বেই তিনি মুক্তি পান। যখন কংগ্রেসের অংশ গ্রহণ না করার ফলে প্রথম গােল টেবিল বৈঠক ব্যর্থ হয়ে যায়, তখন উদারনৈতিক নেতা স্যার তেজ বাহাদুর সাপ্রু এবং ডাঃ এম, আর, জয়াকর, গান্ধীজী ও বড়লাটের মধ্যে একটা আপােষরফার চেষ্টা করেন। ফলে গান্ধীজী যারবেদা জেল থেকে বিনাসতে মুক্তি পান এবং বড়লাটের সঙ্গে তার যথারীতি সাক্ষাৎ হয়। উভয়ের মধ্যে একটি চুক্তি সম্পাদিত হয়—যার নাম গান্ধী-আরউইন . ৫৪ নেতাজী চুক্তি। এই চুক্তি অনুসারে গান্ধীজী অবিলম্বে আইন অমান্য আন্দোলন প্রত্যাহার করেন এবং বিলাতে কংগ্রেসের প্রতিনিধিরূপে দিতীয় গােলটেবিল বৈঠকে যােগ দিতে সম্মত হন। আর বড়লাট লর্ড আরউইন হিংসাত্মক কার্যের জন্যে কারারুদ্ধ এমন সব রাজবন্দী ছাড়া, অন্য সব রাজবন্দীকেই মুক্তি দিলেন। সুভাষচন্দ্রও মুক্তি পেলেন। মুক্তি পাবার পরেই সুভাষচন্দ্র গান্ধীজীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। বড়লাটের সঙ্গে গান্ধীজীর এই আপােষে চরমপন্থী নেতা রূপে তিনি খুসী হতে পারেন নি। গান্ধী-আরউইন চুক্তি সমর্থনের জন্যে ২৫শে মার্চ করাচীতে কংগ্রেসের একটি বিশেষ অধিবেশন আহত হয়। সুভাষচন্দ্র করাচী কংগ্রেসে যােগ দেন এবং সঙ্গে সঙ্গে নিখিল ভারত নওজোয়ান সম্মেলন ও নিখিল ভারত লাঞ্ছিত ৰাজনৈতিক সম্মেলনের সভাপতিত্ব করেন। সভাপতির অভিভাষণে তিনি গান্ধীজীর আপােস- মূলক মনােভাব এবং আইন অমান্য আন্দোলন বন্ধ করার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জ্ঞাপন করেন। তবে সঙ্গে সঙ্গে এই মর্মেও একটি বিবৃতি দেন যে দেশের সঙ্কটজনক অবস্থায় কংগ্রেসের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করা উচিত নয়। ১৯৩১ খৃষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে হিজলীর বন্দীনিবাসে রাজবন্দীদের উপর গুলি চালানাে হয় । ফলে দুইজন রাজবন্দী নিহত হন এবং অনেকে আহত হন। কারাকর্তৃপক্ষের এই অন্যায় অত্যাচারের প্রতিবাদে সুভাষচন্দ্র বঙ্গীয় প্রাদেশিক রাষ্ট্রীয় সমিতির সভাপতি পদে এবং কলিকাতা কর্পোরেশনের অল্ডারম্যান পদে ইস্তফা দেন। বাঙ্গলা কংগ্রেস নিয়ে নিখিল ভারত কংগ্রেস কতৃপক্ষের সঙ্গে তার মতভেদও নেতাজী চূড়ান্ত আকার ধারণ করেছিল । ১৯৩১এর ডিসেম্বর মাসে মহাত্মা গান্ধী বিলাতের গােলটেবিল বৈঠক থেকে রিক্ত হস্তে ফিরে আসেন। ২১শে ডিসেম্বর মহাত্মার অনুরােধে বােম্বাইতে কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির এক বিশেষ অধিবেশন হয় । ১৯২৯ থেকে সুভাষচন্দ্র কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য ছিলেন না—একথা আগেই বলা হয়েছে। তবে তিনি বােম্বাইর ওয়ার্কিং কমিটির অধিবেশনে যােগদানের জন্যে একটি বিশেষ আমন্ত্রণ লিপি পেয়ে বােম্বাই যান। বােম্বাইর অধিবেশন শেষ করে ১৯৩২ এর ২রা জানুয়ারী তিনি যখন কলিকাতা ফিরছিলেন, তখন কল্যাণ রেলওয়ে ষ্টেশানে ১৮১৮ খৃষ্টাব্দের ৩নং রেগুলেশনে গ্রেপ্তার হন। তখন তার স্বাস্থ্য অত্যন্ত খারাপ। তাকে প্রথমে মধ্যপ্রদেশের সিডনি সাবজেলে রাখা হয়—পরে জব্বলপুর জেল, ভাওয়ালী স্বাস্থ্যনিবাস, লক্ষৌ-এর বলরামপুর হাসপাতাল প্রভৃতি স্থানে স্থানান্তরিত করা হয়। এই ভাবে এক বৎসর কারাবাসের ফলে তার স্বাস্থ্য ভেঙ্গে পড়ে। তখন একদল সরকারী স্বাস্থ্য-পরীক্ষক তার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে রায় দেন যে তাকে অবিলম্বে চিকিৎসার জন্যে বিদেশে প্রেরণ করা কর্তব্য। বহু ভাবনা চিন্তার পর গবর্ণমেন্ট তাকে ইউরােপ যাবার সম্মতি দেন। তদনুযায়ী ১৯৩৩ খৃষ্টাব্দের ফেব্রুয়ারী মাসে সুভাষচন্দ্র ইউরােপ যাত্রা করেন।

ইউরােপে নির্বাসন ১৯৩৩ সালের ৮ই মার্চ সুভাষচন্দ্র অসুস্থ শরীরে ভিয়েনা পৌছেন। ভিয়েনায় তিনি একটি স্বাস্থ্যাবাসে বাস করতে থাকেন। ১৯৩৩ খৃষ্টাব্দে ইউরােপীয় রাজনীতির কথাও এই প্রসঙ্গে স্মরণযােগ্য। ইটালীতে মুসােলিনির ফ্যাসিষ্ট গবর্নমেন্ট সুদৃঢ় ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত। জার্মানীতে তখন গণতন্ত্রের অবসান হয়ে নাৎসীনায়ক হিটলারের অভ্যুদয় হয়েছে। সারা ইউরােপে তখন অসম্ভব কর্মচাঞ্চল্য। খাস অষ্ট্রিয়ায় তখন নামে ডাঃ ডলফাসের সাধারণতন্ত্র চললেও, রাজনৈতিক কতৃত্ব ছিল প্রিন্স ষ্টাৰহেমবার্গ, মেজর ফে প্রভৃতি অষ্ট্ৰীয় ফ্যাসিষ্টদের হাতে। এদের সঙ্গে নাৎসী জার্মানীর গভীর ষােগাযােগের কথা সুবিদিত। এই অবস্থায় সুভাষচন্দ্রকে ইউরােপে পাঠিয়েও বৃটিশ গবর্ণমেন্টের শান্তি ছিল না। তারা তার গতিবিধিকে যথাসম্ভব নিয়ন্ত্রিত করার প্রয়াস পেয়েছিলেন। তৎকালীন ভারত সচিব স্যার স্যামুয়ের হার কমন্স সভায় একটি প্রশ্নোত্তরে জানিয়েছিলেন যে ইউরােপে সুভাষচন্দ্রের ভ্রমণের অবাধ অধিকার নেই এবং জার্মানীতে তার প্রবেশ নিষিদ্ধ। স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারের জন্যে তিনি কিছুকালের জন্যে ভিয়েনাতেই থেকে গেলেন। প্রসিদ্ধ পার্লামেন্টারী নেতা, শ্ৰীযুক্ত ভি, জে, প্যাটেল ও ভগ্নস্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারের জন্যে সেখানে ছিলেন। সুভাষচন্দ্রের জ্বলন্ত স্বদেশপ্রেম দেখে তিনি অতি শীঘ্রই তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হলেন। শ্ৰীযুক্ত প্যাটেলের মৃত্যু পর্যন্ত তিনি তার সঙ্গী ছিলেন এবং নিজের অসুস্থতা সত্বেও তার কাছে সর্বদা থেকে যথাসাধ্য তার শুশষ করতেন। শ্ৰীযুক্ত নেতাজী ইউরােপে পদার্পণ করেই বুঝতে পেরেছিলেন যে সাধারণ ইউরােপীয়রা ভারত সম্বন্ধে কোন খােজই রাখে না—আর যদিইবা রাখে তবে তারা ভারত সম্বন্ধে ভ্রান্ত ধারণা পােষণ করে। তার কারণ হচ্ছে ভারত সম্বন্ধে বৃটিশদের ইচ্ছাকৃত অপপ্রচার এবং আমাদের তরফ থেকে তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানােরও চেষ্টা করা হয় না। শ্ৰীযুক্ত প্যাটেলও এই নির্মম সত্য বুঝতে পেরেছিলেন এবং এর প্রতিকারের জন্যে সচেষ্ট হয়ে উঠেছিলেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে ভারতের পক্ষ থেকে বৃটিশ অপপ্রচারের বিরুদ্ধাচরণ না করলে, এ প্রকার অপপ্রচার বেড়েই চলবে। এই বৈদেশিক প্রচার-কার্যের উদ্দেশ্যেই তিনি মৃত্যুর পূর্বে সুভাষচন্দ্রের নিয়ন্ত্রণাধীনে এক লক্ষ টাকা জাতিকে দান করে গিয়েছিলেন। বিদেশে বসেও সুভাষচন্দ্র পরাধীন ভারতের কথা ভুলতে পারতেন না। তিনি যখনই যেখানে যেতেন, তখনই সে দেশের সামাজিক আবহাওয়া, রাজনৈতিক পরিস্থিতি গভীর মনােযােগের সঙ্গে অনুধাবন করতেন এবং নিজের দেশের সঙ্গে তুলনা করতেন। অষ্ট্ৰীয়ায় তখন নামে মাত্র সাধারণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত থাকলেও রাজনীতি ক্ষেত্রে তখন নেতৃত্ব করছে ফ্যাসিষ্টরা। প্রিন্স ষ্টারহামবার্গ এবং মেজর ফে ছিলেন তাদের নেতা। সুভাষচন্দ্র সাগ্রহ মনােনিবেশ সহ ফ্যাসিষ্টদের। কার্যকলাপ, তাদের সামরিক বাহিনী সংগঠন প্রভৃতি লক্ষ্য করতেন। নিজে কলিকাতার মেয়র হয়েছিলেন বলে স্বায়ত্তশাসিত পৌরপ্রতিষ্ঠান- গুলাের কার্যকলাপ সম্বন্ধেও তার উৎসাহের অন্ত ছিল না। তিনি সােস্যাল ডেমােক্রাটদের দ্বারা পরিচালিত ভিয়েনা সহরের আভ্যন্তরীণ শাসনকার্য সম্বন্ধে জ্ঞানার্জনের প্রয়াস পেয়েছিলেন।

নেতাজী ১৯৩৩ খৃষ্টাব্দের মে মাসে সুভাষচন্দ্র এবং শ্রীযুক্ত প্যাটেল জানতে পারলেন যে গান্ধীজী সরকারের সঙ্গে আপােষ আলােচনা চালানাের জন্যে সত্যাগ্রহ আন্দোলন স্থগিত রেখেছেন। তখন প্রবাসস্থিত এই নেতৃদ্বয় একটি সংযুক্ত বিবৃতি প্রকাশ করে মহাত্মা গান্ধীর আপােষ-কামী মনােবৃত্তির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। এই বিবৃতির মূল বক্তব্য ছিল যে গান্ধীজীর সত্যাগ্রহ আন্দোলন বন্ধ রাখার অর্থ সে আন্দোলন ব্যর্থ হয়েছে। তাই বিবৃতিতে বলা হয়েছিল যে নতুন নেতৃত্বে ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের পুনর্গঠন অত্যাবশ্যক। আর কংগ্রেসকে একান্তই যদি ভেঙ্গে গড় না যায়, তবে কংগ্রেসের মধ্যেই চরমপন্থী আপােষবিরোধী শক্তিপুঞ্জের একটা সুসংবদ্ধ উপদল থাকা আবশ্যক। সুভাষচন্দ্র কংগ্রেস ত্যাগের পূর্বে একাধিকবার নিজে এই উপদলকে সঘবদ্ধ করার প্রয়াস পেয়েও ব্যর্থ হয়েছিলেন।• অস্ট্রিয়ায় স্বাস্থোদ্ধারের আশায় গেলেও, সুভাষচন্দ্র কখনও বসে থাকতেন না। তিনি সময় এবং সুযােগ পেলেই ইউরােপের বিভিন্ন দেশে ঘুরে বেড়াতেন এবং সেইসব দেশে ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ জাতীয় নেতা হিসাবে প্রচুর সম্মান পেতেন। বিদেশে বৃটিশ প্রচারের ফলে ভারত সম্বন্ধে যেসব ভ্রান্ত ধারণার সৃষ্টি হয়েছে, সুভাষচন্দ্র সুযােগ পেলেই বক্তৃতার সাহায্যে, সংবাদপত্রে বিবৃতির মারফং সে সব ভ্রান্ত ধারণা নিরসনের চেষ্টা করতেন। ভারতের পক্ষে এই প্রচার-কার্যে তিনি বিভিন্ন দেশস্থিত বৃটিশ কনসাল বা রাজদূতদের কাছ থেকে প্রবল বাধাও পেতেন। ১৯৩৩এর জুলাই মাসে তিনি চেকোস্লোভাকিয়ার রাজধানী প্রাগে গিয়েছিলেন এবং প্রাগের লর্ড মেয়র কতৃক বিপুলভাবে অভ্যর্থিত নেতাজী হয়েছিলেন। ডাঃ বেনেস ছিলেন তখন চেকোস্নােভাকিয়ার বৈদেশিক সচিব। তার সঙ্গে সুভাষচন্দ্রের সাক্ষাৎ ও আলাপ আলােচনা হয়েছিল। প্রাগ থেকে ভিয়েনায় ফিরে তিনি দেখতে পেলেন যে শ্রীযুক্ত প্যাটেলের স্বাস্থ্য ভেঙ্গে পড়েছে। তিনি তাকে নিয়ে ‘নিয়ন’ নামক স্থানে গেলেন। কিন্তু কিছু পরেই সেখানে শ্রীযুক্ত প্যাটেল দেহত্যাগ করলেন। তার শব সুভাষচন্দ্রেরই প্রচেষ্টায় ভারতে প্রেরিত হয়েছিল এবং তিনি নিজে মাসাই পর্যন্ত শবানুগমন করেছিলেন। ফিরে এসে তিনি এবার সুইটজালাণ্ডের জেনেভায় বাস করতে লাগলেন এবং তারপর কিছুকাল ফ্রান্সেও কাটিয়েছিলেন। এই সময় ইটালীতে একটি এশিয়াবাসী ছাত্র- সম্মেলন হয়। মুসােলিনি এই সম্মেলনের উদ্বোধন করেছিলেন এবং সুভাষচন্দ্র এতে অংশ গ্রহণ করেছিলেন। এই সময় তিনি ইটালীর রাজধানী বােমে কিছুদিন কাটিয়েছিলেন এবং ইটালীর যুব-আন্দোলন সাগ্রহে লক্ষ্য করেছিলেন। চেকোস্লোভাকিয়া ছাড়া রুমানিয়া, বুলগেরিয়া, যুগােস্লাভিয়া প্রভৃতি অন্যান্য বন্ধান রাষ্ট্রও তিনি ভ্রমণ করেছিলেন। সর্বত্র তিনি ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের বাণী বয়ে নিয়ে যেতেন। ১৯৩৪ খৃষ্টাব্দের প্রথমভাগে লণ্ডন প্রবাসী ভারতীয়রা একটি সর্বদলীয় রাজনৈতিক সম্মেলন আহ্বান করেছিলেন এবং সুভাষচন্দ্রকে তারা সভাপতি নির্বাচিত করেছিলেন। কিন্তু তখন জার্মাণী ভ্রমণ সম্বন্ধে সুভাষচন্দ্রের উপর নিষেধাজ্ঞা না থাকলেও ইংল্যাণ্ড, মাকিণ-যুক্তরাষ্ট্র এবং সােভিয়েট রাশিয়ার দ্বার ছিল তার কাছে রুদ্ধ। বহু চেষ্টা করেও তার ইংল্যাণ্ডে যাবার অনুমতি মিলল না। তাই তিনি বাধ্য হয়ে তার নেতাজী লিখিত অভিভাষণ পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। এই অভিভাষণেই তিনি সর্বপ্রথম তার সাম্যবাদ স’ গঠনের প্রস্তাব করেন। তখন ইউরােপীয় রাজনীতি প্রায় দুটো ভাগে ভাগ হয়ে গেছে। একদিকে সােভিয়েট কম্যুনিজমের আদর্শ, অপর দিকে সারা ইউরােপভরা ন্যাসীবাদ আর ফ্যাসিজমের ছায়া। সুভাষচন্দ্র তার সাম্যবাদ সম্মে’র রাজনীতিতে এই উভয় মতবাদের সংমিশ্রণ ঘটিয়েছিলেন। এসম্বন্ধে তিনি নিজেই বলে গেছেন : “আমার নিজের মত এই যে আমরা আজ যে বিভিন্ন আন্দোলন দেখছি তাদের মধ্য থেকে উপকারী ও ভাল অংশটুকু বেছে নিয়ে সেগুলাের মধ্যে সমন্বয় সাধনই ভারতের কাজ। এ উদ্দেশ্যে আজ ইউরোপ ও আমেরিকায় যে সব আন্দোলন ও গবেষণা চলছে সহানুভূতির দৃষ্টি নিয়ে আমাদের সেগুলি বিচার করতে হবে এবং নিজের মনের পূর্বজাত কোন কুসংস্কার বা ভাবপ্রবণতার জন্যে আমরা যদি কোন আন্দোলনকে অবহেলা করি, তবে তা মূঢ়তারই নামান্তর হবে।” এর কিছুকাল পরে নভেম্বর মাসে সুভাষচন্দ্র সংবাদ পান যে তাঁর পিতা অসুস্থ হয়ে পড়েছেন তার বাঁচার আশা কম। তখন তার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও তিনি পিতাকে শেষ দেখার জন্যে ভারতে আসতে মনস্থ করেন। আর, কোন বিষয় একবার মনস্থির করে ফেললে সুভাষচন্দ্রকে বাধা দেওয়া হত কঠিন ব্যাপার। সুতরাং তিনি অবিলম্বে বিমানযােগে ভারতে রওনা হলেন এবং ৩রা ডিসেম্বর করাচীতে এসে পৌছুলেন। কিন্তু তার পূর্বদিনই তাঁর পিতৃবিয়ােগ হয়ে গেছে। পিতাকে শেষ দেখা দেখবার সুযােগ তঁার হল না। তিনি দমদমে এসে পৌছুতে না পৌছুতেই তার উপর সরকার পক্ষ থেকে ৩৮২, নেতাজী এলগিন রােডে স্বগৃহে অন্তরীণ থাকার আদেশ জারী করা হল। তাঁকে ৭ দিনের মধ্যে ভারত ত্যাগের নির্দেশ দিয়েও একটি নােটিশ জারী করা হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে পিতৃশ্রাদ্ধের অনুষ্ঠান না হওয়া পর্যন্ত দেশে থাকার অনুমতি দেওয়া হয়। তবে নিজের পরিবারের লােজন ছাড়া বাহিরের অপর কোন লােকের সঙ্গে আলাপ-আলােচনা, পত্র বিনিময় প্রভৃতি নিষিদ্ধ করা হয়। এক কথায় বলা চলে তিনি স্বগৃহে বন্দী হয়ে থাকেন। ভারতীয় রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে সুভাষচন্দ্রকে ভারত গবর্ণমেণ্ট যে পূর্বাপর অত্যধিক ভয় করতেন, এ তার অন্যতম প্রমাণ। দেশে কিংবা বিদেশে সুভাষচন্দ্রকে কোনখানে রেখেই যেন গবর্ণমেন্ট নিজেকে নিরাপদ মনে করতেন না। পিতৃ-শ্রাদ্ধের শেষে ১৯৩৫ সালের ৮ই জানুয়ারী সুভাষচন্দ্র ভগ্নস্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারের আশায় আবার ফিরে গেলেন ইউরােপের নির্বাসিত জীবনে। এইবার সুরু হল তার নির্বাসিত জীবনের দ্বিতীয় ভাগ। নিবাসিত জীবনের প্রথম ভাগে ভগ্ন স্বাস্থ্য নিয়েও তিনি প্রচুর কাজ করেছিলেন একথা আমরা বলেছি। কিন্তু একটি বিশেষ উল্লেখযােগ্য বিষয়ের কথা বলা হয় নি। দুই বৎসর কাল ইউরােপে বাস করার সময় তিনি ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন সম্বন্ধে একটি মূল্যবান গ্রন্থ রচনা করেছিলেন—গ্ৰন্থখানির atta Indian Struggle 1920-34. এই গ্রন্থটিতে সুভাষচন্দ্রের পরিচিত ভারতীয় রাজনীতির ঘটনাবহুল ১৪ বৎসরের কৃতিত্ব ও অকৃতিত্বের বিষয় আলােচিত হয়েছে। তার সঙ্গে আছে তার ইউরােপ ভ্রমণে ভারত সম্বন্ধে অর্জিত অভিজ্ঞতার বর্ণনা। এই পুস্তকখানি ইংল্যাণ্ডের একটি উৎসাহী পুস্তক-প্রকাশক প্রতিষ্ঠান প্রকাশ করেন নেতাজী কিন্তু শীঘ্রই বইখানির ভারতে প্রবেশ নিষিদ্ধ হয়ে যায় । ১৯৩৯ সালে এই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহৃত হয়। এ সম্বন্ধে ক্লিাতের পার্লামেন্টে যে প্রশ্ন উঠেছিল, তদুত্তরে স্যার স্যামুয়েল হাের জানিয়েছিলেন যে পুস্তক খানিতে সন্ত্রাসবাদকে উৎসাহিত করা হয়েছে বলেই, সে পুস্তকের ভারতে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ভারত থেকে ইউরােপে প্রত্যাবর্তনের পথে তিনি ইটালীর নেপলস বন্দরে নামেন এবং রাজধানী রােমে কয়েকদিন কাটান। এই সময় আফগানিস্থানের নির্বাসিত আমীর আমানুল্লার সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয়। রােম থেকে তিনি ভিয়েনায় ফিরে যান এবং সেখানে তাঁর দেহে অস্ত্রোপচার করা হয় । কিছুদিন পরে অপেক্ষাকৃত সুস্থ হয়ে তিনি পুনরায় রাজনৈতিক কাজে আত্মনিয়োগ করেন। তখন তিনি সংবাদ পান যে বাঙ্গলা কংগ্রেসে তার নিজের অনুগামী দল এবং দেশপ্রিয় যতীন্দ্রমােহনের অনুগামী দলের মধ্যে বিভেদ বিদ্বেষের ফলে বাঙ্গলার রাজনৈতিক অগ্রগতি বিপন্ন হয়েছে। তিনি বিদেশ থেকে তাঁর দলকে বিরুদ্ধ দলের সঙ্গে সমান ভিত্তিতে আপােষরফা করার নির্দেশ পাঠিয়েছিলেন। ইউরােপে নির্বাসন কালে সুভাষচন্দ্র যখনই যেখানে কোন প্রকারে তাঁর স্বদেশকে অপমানিত হতে দেখেছেন, তখনই তিনি তার বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিবাদ জ্ঞাপন করেছেন। বিরােধী প্রচার-কার্যের বিরুদ্ধে সুভাষচন্দ্রের প্রতিবাদ জ্ঞাপনের কথা পূর্বেই বলেছি। এইখানে আর একটি ঘটনার উল্লেখ না করে পারছি । সুভাষচন্দ্র যখন ইউরােপে ছিলেন, তখন নাৎসী নায়ক হিটলার একটি বক্তৃতায় চূড়ান্ত জাতি-বিদ্বেষের বাণী প্রচার করেছিলেন। তাঁর নেতাজী বক্তৃতার মূল বক্তব্য ছিল যে শ্বেত জাতিপুঞ্জ কৃষ্ণাঙ্গ জাতিপুঞ্জের উপর আধিপত্য করার জন্যেই জন্ম গ্রহণ করেছে। হিটলারের এই বক্তৃতায় সমগ্র পৃথিবীর কৃষ্ণকায় জাতিপুঞ্জের মনে বিক্ষোভের সঞ্চার হয়। সুভাষচন্দ্র একটি বিবৃতিতে হিটলারের এই ঘৃণ্য বক্তৃতার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। তার বিবৃতি পড়ে হন্তদন্ত করে নাৎসীরা জানিয়েছিল যে ভারত কিংবা জাপানের বিরুদ্ধে হিটলারের মন্তব্য প্রযােজ্য নয়। কিন্তু নাৎসীদের প্রত্যুত্তরে সুভাষচন্দ্র সন্তুষ্ট হতে পারেন নি। ১৯৩৬ খৃষ্টাব্দের প্রথম দিকে সুভাষচন্দ্র আয়া ভ্রমণ করেন এবং আধুনিক আয়াণ্ডের জন্মদাতা ডি ভ্যালেরার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। আইরিশ বিপ্লবী দল এবং তার অধিনায়ক ডি ভ্যালেরার প্রতি তার আন্তরিক শ্রদ্ধা ছিল। তিনি ডাবলিনে নাগরিকবৃন্দের কাছ থেকে যথােচিত সম্বর্ধনা পেয়েছিলেন। ডি ভ্যালেরার সঙ্গে তার যে আলাপ আলােচনা হয়েছিল তা ছিল প্রধানতঃ আয়াণ্ড ও ভারতের রাজনৈতিক সমস্যা ঘটিত। একই বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের জাঁতাকলে নিষ্পেষিত আয়াণ্ড এবং ভারতের মধ্যে আত্মিক যােগ থাকা খুবই স্বাভাবিক। সুভাষচন্দ্র ডি ভ্যালেরাকে জানিয়েছিলেন যে আইরিশদের স্বাধীনতা-সংগ্রামে পরাধীন ভারতের পূর্ণ সহানুভূতি আছে। আর ডি ভ্যালেরার ভারতপ্রীতির কথা ত সর্বজনবিদিত। এই দুইটি দেশের মধ্যে গভীরতর সংযােগসাধনের উদ্দেশ্যে সুভাষচন্দ্র আইরিশ নেতাকে অনুরােধ করেছিলেন যে তিনি যেন ভারতীয় ছাত্র ও অধ্যাপকদের আইরিশ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নের সুযােগ সুবিধা করে দেন। ডি ভ্যালেরা সঙ্গে সঙ্গে এ প্রস্তাবে সায় দিয়েছিলেন। ডি ভ্যালেরা ছাড়াও ৬৪ ܀

No text on this page.

নেতাজী . সুভাষচন্দ্র কৃষি ও ভূমিবিভাগের মন্ত্রী, স্বায়ত্তশাসন বিভাগের মন্ত্রী, সিন ফিন দলের সভাপতি এবং রিপাব্লিকান দলের অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে আলাপ আলােচনা করেছিলেন। তার আয়াণ্ড ভ্রমণ খুবই সাফল্যমণ্ডিত হয়েছিল। ১৯৩৬ খৃষ্টাব্দে লক্ষৌ-এ ভারতীয় কংগ্রেসের বার্ষিক অধিবেশন হয়েছিল। এ অধিবেশনের নির্বাচিত সভাপতি ছিলেন পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরু। দীর্ঘকাল বিদেশে নির্বাসিত সুভাষচন্দ্র স্বদেশে ফিরে এ অধিবেশনে যােগদান করুন, দেশবাসীদের মনে এ আগ্রহ ছিল প্রবল। পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরু দেশবাসীদের এ আগ্রহের কথা সুভাষচন্দ্রকে জানান এবং তাঁকে কংগ্রেসের অধিবেশন উপলক্ষে ভারতে ফিরে আসার আমন্ত্রণ জানান। কিন্তু ভারত গবর্ণমেন্টের আদৌ ইচ্ছা ছিল না যে তিনি দেশে ফিরে যান। তাকে বলা হল যে তিনি ভারতে ফিরে গেলেই তাঁকে গ্রেপ্তার করা হবে। ভিয়েনার বৃটিশ রাজদূত সরকারী অনুজ্ঞা জানিয়ে তার উপর একটি নােটিশ জারী করেন। এ অবস্থায় সুভাষচন্দ্রের পক্ষে দুটি মাত্র পথ ছিল—হয় বৃটিশ কতৃপক্ষের আদেশ মেনে নেওয়া, নয়ত দেশবাসীদের ইচ্ছার সম্মান রেখে দেশে ফিরে গিয়ে বৃটিশদের হাতে বন্দী হওয়া। তিনি শেষােক্ত পথই বেছে নিলেন এবং অবিলম্বে কমটি ভার্ডি’ নামে ইটালীয় জাহাজে চেপে স্বদেশে রওনা হলেন। ১৭ই মার্চ ভারতে রওনা হবার পূর্বে তিনি বিলাতের ‘ম্যাঞ্চেষ্টার গার্ডিয়ান’ নামক পত্রিকায় একটি সুদীর্ঘ পত্র লিখে বৃটিশ গবর্ণমেন্টের অন্যায় আদেশের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জ্ঞাপন করেছিলেন। এখানে চিঠিটির অংশবিশেষ উধৃত করা হল :

নেতাজী “আমার শেষবারের কারাদণ্ড আইন ও ন্যায়ের দিক থেকে যথেষ্ট নিন্দনীয় ছিল। কিন্তু বতমানে আমি ভারতে ফিরে গেলে আমাকে কারাদণ্ডে দণ্ডিত করার যে প্রস্তাব করা হয়েছে, তা তুলনাবিহীন। বৃটিশ আইন ভারতে এই ভাবেই চলবে কি না এবং নতুন শাসনতন্ত্র ভারতে যে বিস্তৃততর স্বাধীনতা নিয়ে আসবে, এ তারই পূর্বস্বাদ কি না —এ প্রশ্ন কি আমি করতে পারি?” তার ভারতে ফিরে আসার সংবাদ বিদ্যুতের মত সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছিল। ১১ই এপ্রিল জাহাজটি বােন্সই বন্দরে পৌছুলল। সুভাষচন্দ্রের দর্শনলাভের আশায় সমুদ্রতীরে সহস্র সহস্র নরনারী ভীড় করে দাড়িয়েছে। কিন্তু তিনি তীরে পা দিতে না দিতেই তাকে ১৮১৮ সালের তিন আইনে গ্রেপ্তার করে আর্থার রােডের পুলিশ ফঁাড়িতে আটক রাখা হল। পরে তাকে যারবেদ কারাগারে স্থানান্তরিত করা হল। গ্রেপ্তারের পূর্বে তিনি বাণী দিয়ে গেলেন : “মুক্তির নিশান উডীন রাখুন।" তার গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে সমগ্র দেশ মুখর হয়ে উঠল। কংগ্রেস সভাপতি পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরু একটি প্রকাশ্য বিবৃতিতে এই গ্রেপ্তারের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানালেন। কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটি গ্রেপারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে একটি প্রস্তাব পাশ করলেন। কেন্দ্রীয় ব্যবস্থা পরিষদে বিরােধী দলের নেতা শ্ৰীযুক্ত ভুলাভাই দেশাই একটি মুলতুবী প্রস্তাব উত্থাপন করলেন এবং গবর্ণমেন্টের এই কাজ অত্যন্ত অবৈধ ও অন্যায় হয়েছে বলে কংগ্রেস সােস্যালিষ্ট পার্টি ও একটি বিবৃতি প্রকাশ করলেন। ইংল্যাণ্ডের কমন্স সভায়ও তার এই গ্রেপ্তারের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ উঠল। বিনা নেতাজী বিচারে সুভাষচন্দ্রকে এমনভাবে আটক রাখার পিছনে কোন ন্যায়সঙ্গত কারণ না থাকায় সরকারী কর্তৃপক্ষও বিব্রত হয়ে পড়লেন। কমন্স। সভায় সহকারী ভারত সচিব অজুহাত দিলেন যে সুভাষচন্দ্র ভারতের অন্যতম প্রধান সন্ত্রাসবাদী দলের সঙ্গে সংযুক্ত বলেই তাকে ধরে রাখা হয়েছে। কিন্তু এ সরকারী অজুহাতে গণমানসের সংশয় দূরীভূত হল সুভাষচন্দ্রের মুক্তি দাবী করে সমানেই আন্দোলন চলতে লাগল । একদিকে জনমতের চাপ, অপর দিকে আর একটি ব্যাপারেও গবর্নমেন্ট বিব্রত বােধ করতে লাগলেন। ১৯৩৫-এর ভারত শাসন আইন অনুসারে যে সাধারণ নির্বাচন হল, তাতে কংগ্রেস বেশীর ভাগ প্রদেশেই বিপুল সংখ্যাধিক্যে নির্বাচিত হল। এই শাসনতন্ত্র চালু করে প্রাদেশিক মন্ত্রীমণ্ডল গঠন করতে হলে কংগ্রেসের সাহায্য অপরিহার্য। ১৯৩৭এর মার্চ মাসে গবর্ণমেণ্ট সুভাষচন্দের উপর থেকে সকল নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়ে তাকে মুক্তি দিতে বাধ্য হলেন । আবার কারাবাসের ফলে সুভাষচন্দ্রের স্বাস্থ্য ভেঙ্গে পড়েছিল। কারামুক্তির পর তিনি কিছুকাল কলিকাতায় ডাঃ স্যার নীলরতন সরকারের চিকিৎসাধীন রইলেন। ৬ই এপ্রিল তাকে কলিকাতায় একটি বিরাট জাতীয় সম্বর্ধনা দেওয়া হল। ২৫শে এপ্রিল তিনি স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারের আশায় হিমালয়ের নিকটবর্তী ড্যালহৌসীতে বায়ুপরিবতনে গেলেন। সেখানে তিনি ডাঃ রণবীরের চিকিৎসাধীন ছিলেন। মাস পাঁচেক পরে শীতকালের সুত্রপাতে তিনি কলিকাতায় ফিরে এলেন এবং চিকিৎসকদের উপদেশে পূর্ণ স্বাস্থ্য অর্জনের আশায় তিনি ১৮ই নবেম্বর তারিখে আবার ইউরােপ যাত্রা করলেন। এবার তিনি নিবাসিত নেতাজী নন-তিনি সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে নিজের ইচ্ছায় ইউরােপে গেলেন। তিনি প্রথমে অষ্ট্রিয়ার বাদগাস্তিন নামক স্বাস্থ্যনিবাসে যান এবং সেখানে প্রায় দেড়মাস কাল থেকে ভালভাবে চিকিৎসা করান। ১৯৩৮ খৃষ্টাব্দের ১০ই জানুয়ারী তিনি লণ্ডনে পৌছেন এবং সেখানে তাকে রাজোচিত সম্বর্ধনা জানানাে হয়। তিনি একটি উদ্দীপনাময় বক্তৃতায় জানান যে কংগ্রেস প্রাদেশিক মন্ত্রীমণ্ডল গঠন করলেও ১৯৩৫এর ভারত শাসনতন্ত্রের দ্বিতীয়ভাগের যুক্তরাষ্ট্র গঠনের প্রস্তাব মেনে নেবে না। ১৯৩৮এর ১৮ই জানুয়ারী কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক আচার্য কৃপালনী ঘােষণা করেন যে সুভাষচন্দ্রকে হরিপুরা কংগ্রেসের ৫১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়েছে। কংগ্রেসের তরফ থেকে লণ্ডনে সুভাষচন্দ্রকে সংবাদ দেওয়া হয়। ২৪শে জানুয়ারী তিনি লণ্ডন থেকে ভারতে ফিরে আসেন।

রাষ্ট্রপতি সুভাষচন্দ্রকে অকস্মাৎ রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করা হয়েছিল এরূপ মনে করলে ভুল করা হবে। সমগ্র দেশের জনগণ সুভাষচন্দ্রকেই কংগ্রেস সভাপতিরূপে দেখতে চাইছিল। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের এই বীর সৈনিকের প্রতি দেশবাসীদের প্রীতি থাকা খুবই স্বাভাবিক। বিশেষ করে তার সভাপতিপদে নির্বাচন সম্বন্ধে বাঙ্গালীদের মনে খুবই আগ্রহ থাকা ছিল স্বাভাবিক। কেনন। ১৯২২ সালের গয়া কংগেসে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের পর আর কোন বাঙালী সভাপতি পদ অথচ দেশবন্ধুর পরও বাঙ্গলা দেশে দেশপ্রিয় যতীন্দ্রমােহন সেনগুপ্ত এবং দেশগৌরব সুভাষচন্দ্রের মত নেতা ছিলেন। যতীন্দ্রমােহনের যখন সভাপতি হবার সম্ভাবনা দেখা দিল, তখন অকস্মাৎ তিনি দেহত্যাগ করলেন। তাই সুভাষচন্দ্রের সভাপতি হওয়া সম্বন্ধে বাঙ্গালীদের মনে আগ্রহের অন্ত ছিল না। এ নিয়ে কংগ্রেস কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন নিবেদন যায় নি-এমনও নয় । ১৯৩৮ খৃষ্টাব্দে তারা দেশবাসীদের সে ইচ্ছা পূরণ করলেন। সে বৎসর কংগ্রেস প্রেসিডেন্ট পদের জন্যে চার জন প্রার্থীর নাম প্রস্তাবিত হয়েছিল : সুভাষচন্দ্র বসু, মৌলানা আবুলকালাম আজাদ, পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরু এবং খান আবদুল গফফার খা। এদের মধ্যে সুভাষচন্দ্র এবং সীমান্ত গান্ধী ছাড়া অপর দুইজন নেতা একাধিকবার কংগ্রেস সভাপতির পদ অলঙ্কৃত নেতাজী করেছেন। তাই তারা নীরবে সরে দাঁড়ালেন। আর সীমান্ত গান্ধীকে বলা চলে ত্যাগের হিমালয়। কংগ্রেস সভাপতির পদ ভারতে শ্রেষ্ঠ জাতীয় সম্মান। একাধিকবার এই শ্রেষ্ঠ জাতীয় সম্মান তাঁকে দিতে চাওয়া হয়েছে কিন্তু নীরব কর্মী সীমান্ত গান্ধীকে কিছুতে টলানাে যায় নি। মুখে মৃদু হাসি নিয়ে তিনি প্রতিবারই তা গ্রহণ করতে অস্বীকৃত হয়েছেন। এবারও তাই ঘটল। তিনি নীরবে সুভাষচন্দ্রের সমর্থনে সরে দাড়ালেন। গান্ধীজী কংগ্রেসে যােগদানের পর থেকে তার পরামর্শ নিয়েই কংগ্রেস সভাপতি নির্বাচিত করা হয়ে থাকে। এবারও তার ব্যতিক্রম হল না। তিনি সুভাষচন্দ্রের নির্বাচনই সমর্থন করলেন। ১৯৩৮ সালে গুজরাটের অন্তর্গত তাপ্তী নদীর তীরবর্তী হরিপুরে কংগ্রেসের ৫১তম অধিবেশন হল। ১৩ই ফেব্রুয়ারী নির্বাচিত সভাপতি এসে পৌছুলেন। সেবার কংগ্রেস-মণ্ডপের নামকরণ করা হয়েছিল পরলােকগত বিঠলভাই প্যাটেলের নামানুসারে বিঠল নগর। কংগ্রেসের ৫১তম অধিবেশনের প্রতীক হিসাবে সেবার কংগ্রেস-মণ্ডপের ৫১টি দ্বার নির্মিত হয়েছিল, ৫১টি জাতীয় পতাকা উত্তোলিত হয়েছিল এবং কংগ্রেস অধিবেশনে ৫১টি জাতীয় সঙ্গীত গীত হয়েছিল। তাছাড়া নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি সুভাষচন্দ্রকে বিরাট শশাভাযাত্রা সহকারে ৫১টি বলীবর্দবাহিত রথে করে সভাস্থলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। মােটকথা সেবার যেরূপ বিরাট সমারােহ ও উৎসবের মধ্যে জাতীয় মহাসভার অধিবেশন হয়েছিল, সেরূপ খুবই কম দেখা যায়। কংগ্রেসের অধিবেশন উপলক্ষে ভারতের বিভিন্ন প্রদেশ থেকে প্রায় আড়াই লক্ষ নরনারী উপস্থিত হয়েছিলেন। তখন ভারতের সাতটি প্রদেশে কংগ্রেস নেতাজী মন্তিমণ্ডলী কাজ করছেন। বিভিন্ন প্রদেশের প্রধান মন্ত্রী এবং অন্যান্য অনেক মন্ত্রীও এই অধিবেশনে উপস্থিত ছিলেন। ১৬ই ফেব্রুয়ারী নিখিল ভারত কংগ্রেস কমিটির অধিবেশনে বিদায়ী রাষ্ট্রপতি পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরু বিগত বৎসরের কাজের একটি বিবরণ পেশ করে নতুন রাষ্ট্রপতি সুভাষচন্দ্রকে আসন গ্রহণের অনুবােপ করলেন। তিনি বিপুল হর্ষধ্বনির মধ্যে আসন গ্রহণ করলেন। কংগ্রেসের সম্মুখে সেবার গুরুত্বপূর্ণ কাজও ছিল প্রচুর। একদিকে ইউরােপের ঘনায়মান যুদ্ধ পরিস্থিতি-অপর দিকে ভারতের অভ্যন্তরে কংগ্রেস-গবর্নমেন্ট বিবােধ। কংগ্রেস প্রদেশে প্রদেশে মন্ত্রিমণ্ডল গঠন করলেও সে বিরােধের অবসান হয়নি। দুইটি প্রদেশে-যুক্ত প্রদেশ এবং বিহারে রাজবন্দীদের মুক্তিপ্রসঙ্গ নিয়ে গবর্ণরের সঙ্গে কংগ্রেস মন্বিমণ্ডলের মত- বিরােধ দেখা দেওয়ায় প্রধান মন্ত্রী পণ্ডিত গােবিন্দবল্লভ পন্থ এবং শাযুক্ত শ্রীকৃষ্ণ সিংহ দের মন্ত্রিমণ্ডলের পদত্যাগ পত্র পেশ করেছিলেন। কংগ্রেসের বামপন্থী দল চাইছিলেন যে এ ব্যাপার নিয়ে কংগ্রেস সাতটি প্রদেশের মন্বিতই একযােগে ত্যাগ করে শাসনতান্ত্রিক অচল অবস্থার সৃষ্টি করুক। ১৯শে ফেব্রুয়ারী কংগ্রেসের সাধারণ অধিবেশন হল। বিপুল কমোন্মাদনা সুবিশাল জনস্রোতের মধ্যে হরিপুর যেন সেদিন নতুন করে প্রাণ পেল। বিপুল জয়ধ্বনির মধ্যে রাষ্টপতি সুভাষচন্দ্র জাতীয় পতাকা উত্তোলন করলেন । অভ্যর্থনা সমিতির সভাপতি শাযুক্ত দরবার গােপালদাস দেশাই একটি ছােট সুন্দর বক্তৃতায় রাষ্ট্রপতি এবং সমাগত অতিথিবৃন্দকে অভ্যর্থনা জানালেন। বক্তৃতাপ্রসঙ্গে তিনি ৭১ নেতাজী বলেছিলেন : “আমরা এমন একজনের সভাপতিত্বের আশীর্বাদ পেয়েছি যার স্বার্থত্যাগ, সেবা এবং লাঞ্ছনাভােগের ইতিহাস নিরবিচ্ছিন্ন। আমি আশা করি এবং প্রার্থনা করি যে আমাদের সভাপতির সুনিপুণ নির্দেশে আমরা যেন লক্ষ্যের দিকে আরও এগিয়ে যেতে পারি এবং আমাদের ইতিহাসে আরও গৌরবজনক অধ্যায় সংযােজনা করতে পারি।" এর পর রাষ্ট্রপতি সুভাষচন্দ্র সভাপতিরূপে তার চমৎকার লিখিত অভিভাষণটি পাঠ করলেন। আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পট ভূমিকায় ভারতের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ-সমন্বিত তার অভিভাষণটি হয়েছিল অপূর্ব। স্বদেশ এবং স্বজাতির গৌরবােজ্জ্বল ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে তার মনে যে সুদৃঢ় বিশ্বাস ছিল, অভিভাষণের প্রতি ছত্রে তা ফুটে বেরিয়েছিল । অর্জিাতিক রাজনীতিতে তখন যুদ্ধের ছায়া এসে পড়েছে প্রায়। দেশের আভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণে সুভাষচন্দ্র প্রচুর দূরদর্শিতা এবং বাস্তববােধের পরিচয় দিয়েছিলেন। কয়েকটি উল্লেখযােগ্য প্রস্তাব গৃহীত হবার পর হরিপুরের কংগ্রেস অধিবেশন শেষ হল । ১৯৩৮ খ্রষ্টাব্দে সুভাষচন্দ্রের স্বাস্থ্য খুব ভাল ছিল না। তিনি রাষ্ট্রপতিরূপে কংগ্রেসের কাজে পুরােপুরি আত্মনিয়ােগ করেছিলেন ; একদিনের জন্যে ও বিশ্রাম না নিয়ে তিনি কংগ্রেসের আদর্শ প্রচারের জন্যে ভারতের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত পর্যন্ত ট্রেণে, মােটরে এরােপ্লেনে করে ঘুরে বেরিয়েছিলেন। কংগ্রেসের সম্মুখে তখন বড় প্রশ্ন ছিল ১৯৩৫ খৃষ্টাব্দের নতুন ভারত শাসনতন্ত্রে প্রস্তাবিত যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাব গ্রহণ বা বর্জন। রাষ্ট্রপতিরূপে সুভাষচন্দ্র যে অসংখ্য বক্তৃতা १२ নেতাজী ১৯৩৯ এবং বিবৃতি দিয়েছিলেন তার প্রত্যেকটিতে তিনি যুক্তরাষ্ট্র গঠন প্রস্তাবের বিরােধিতা করেছিলেন। কংগ্রেস গ্রহণ করে নি বলে আজ পর্যন্ত বৃটিশদের প্রস্তাবিত যুক্তরাষ্ট্র পরিকল্পনা কার্যে পরিণত হয় নি রাষ্ট্রপতিরূপে হিন্দু-মুসলমান সমস্যা সমাধানের জন্যে সুভাষচন্দ্র লীগ- দলপতি মিঃ জিন্নার দ্বারস্থ হয়েছিলেন । কিন্তু জিন্ন। সাহেবের অযৌক্তিক দাবীর ফলে যেমনভাবে একাধিকবার গান্ধীজী ও পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরুর অপােষ প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে, তেমনইভাবে : সুভাষচন্দ্রের প্রচেষ্টাও ব্যর্থ হয়েছিল। বিহারের অবিসম্বাদী জননেত এবং কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য ডাঃ রাজেন্দ্র প্রসাদের সঙ্গে আলাপ- আলােচনা করে সুভাষচন্দ্র বিহার প্রবাসী বাঙালীদের দীর্ঘস্থায়ী কয়েকটি সমস্যার সন্তোষজনক সমাধান করতে পেরেছিলেন। এর ২১শে জানুয়ারী দ্বিতীয়বার রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবার কয়েকদিন পূর্বে সুভাষচন্দ্র কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতন ও নিকেতন পরিদর্শন করতে যান। শান্তিনিকেতনের আমকুণ্ডে স্বয়ং কবি গুরুর নেতৃত্বে তরুণ বাঙালী রাষ্ট্রপতিকে বিপুলভাবে সম্বর্ধিত করা হয়। কবিগুরুর সস্নেহ সাদর সম্বনার প্রত্যুত্তরে সুভাষচন্দ্র বক্তৃতা প্রসঙ্গে বলেছিলেন; “আমরা হয়ত আজ রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতার জন্যে আপ্রাণ চেষ্টা করছি; কিন্তু আমাদের আদর্শ বড়। আমরা চাই সব দিক দিয়ে আমাদের অখণ্ড জাতি সত্যে প্রতিষ্ঠিত হােক। এই যাত্রার পথে, এই সাধনার পথে রাষ্ট্রীয় স্বাধীনত। একটা সােপান মাত্র। ১৯৩৯ সাল সুভাষচন্দ্রের জীবনে একটা নাটকীয় বৎসর। কংগ্রেসের ইতিহাসেও এ বৎসরটি চিরস্মরণীয়। চরমপন্থী সুভাষচন্দ্রের নেতাজী সঙ্গে গান্ধীবাদের যে একটা আভ্যন্তরীণ বিরোধ আছে—এইবারই তা পরিস্ফুট হয়ে ওঠে। কংগ্রেস রাজনীতিতে গান্ধীজীর আবির্ভাবের পর হতে তিনি কংগ্রেসের প্রাণস্বরূপ হয়ে দাড়িয়েছেন। তারই ইচ্ছাক্রমে প্রতিবৎসর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে থাকেন। ফলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা না হওয়া একটা প্রথা হয়ে দাড়িয়েছে। রাষ্ট্রপতির পদের জন্যে বিভিন্ন প্রদেশ থেকে একাধিক নেতার নাম প্রস্তাবিত হলেও, শেষপর্যন্ত একজনের অনুকূলে সকলেই নাম প্রত্যাহার করে থাকেন। কাজেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় না। কিন্তু সুভাষচন্দ্র বরাবরই এ নীতির বিরােধী ছিলেন। রাষ্ট্রপতি ও তার ওয়ার্কিং কমিটি গণতান্ত্রিক মতে নির্বাচিত হােক—এ ছিল তার মনের ইচ্ছা। তিনি এই মর্মে কংগ্রেসে একবার একটি প্রস্তাব এনেছিলেন একথাও পূর্বে বলেছি। ১৯৩৯-এর নির্বাচনে রাষ্ট্রপতি পদের জন্যে তিনটি নাম উপস্থাপিত হয়েছিল—মৌলানা আবুলকালাম আজাদ, সুভাষচন্দ্র বসু ও ডাঃ পটুভি সীতারামিয়া। কংগ্রেস কতৃপক্ষের ইচ্ছা ছিল অন্ধ দেশের প্রাচীন কংগ্রেস নেতা ডাঃ সীতারামিয়াকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করা। কংগ্রেস কর্তৃপক্ষ ও গান্ধীজীর মনােভাব জেনে মৌলানা আজাদ যথাসময়ে নিজের প্রার্থীপদ প্রত্যাহার করে ডাঃ সীতারামিয়ার অনুকুলে একটি বিবৃতি দিলেন। কিন্তু সুভাষচন্দ্রের প্রার্থীপদ থেকে নাম প্রত্যাহার করার কোন লক্ষণই দেখা গেল না। তিনি স্থির করলেন যে দেশ ও জাতির জন্যে তিনি নির্বাচনে ডাঃ সীতারামিয়ার বিরুদ্ধে দাড়াবেন। যে কোন কারণেই হােক তার মনে ধারণা জন্মেছিল যে গান্ধীপন্থী বা দক্ষিণপন্থীরা বৃটিশ গবর্ণমেন্টের ৭৪ নেতাজী যুক্তরাষ্ট্র পরিকল্পনা গ্রহণ করতে চান বলেই তারা একজন দক্ষিণপন্থীকে রাষ্ট্রপতির পদে বসাতে চান। এই যুক্তরাষ্ট্র পরিকল্পনার বিরােধিতা করার জন্যেই তিনি চরমপন্থীদের পক্ষ থেকে নির্বাচনে দাঁড়াবেন বলে মনস্থির করলেন। মৌলানা আজাদের বিবৃতির পর তিনি একটি বিবৃতি প্রসঙ্গে দেশবাসীদের জানালেন : “মিথ্যা আনুগত্যবােধকে দূরে সরিয়ে রাখতে হবে, কেননা সমস্যাটি ব্যক্তিগত নয় । অন্যান্য স্বাধীন দেশের ন্যায় ভারতেও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা সুস্পষ্ট সমস্যা এবং কর্মতালিকার ভিত্তিতেই হওয়া উচিত। তবু যদি মৌলানা আজাদের মত প্রতিষ্ঠাবান নেতার আবেদনের ফলে বেশীর ভাগ প্রতিনিধি আমার পুননিবাচনের বিরুদ্ধে ভােট দেন, আমি তাদের নির্দেশ শিরােধার্য করে একজন সাধারণ সৈনিকের মত আমার দেশ ও কংগ্রেসের সেবা করব।” ১৯৩৯-এর রাষ্ট্রপতিত্ব নিয়েই সুভাষচন্দ্রের সঙ্গে দক্ষিণপন্থীদের বিরােধ বেধে গেল। তিনি তাদের আপােষকামী আখ্যা দেওয়ায় তারা যেন আরও বেশী চটে গেলেন। সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল প্রমুখ কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির কয়েকজন সদস্য প্রকাশ্যে ডাঃ পটুভির অনুকুলে সংবাদপত্রে বিবৃতি দিলেন। এইবার উভয় পক্ষ থেকে শুরু হল বিবৃতি প্রতিবিবৃতির ঝড়। ২৯শে জানুয়ারী রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের কথা। তার চারদিন পূর্বে সংবাদপত্রে প্রায় দশটি বিবৃতি প্রকাশিত হয়েছিল। কিন্তু সবচেয়ে মজা করলেন গান্ধীজী। তিনি প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদ্বয়ের কারও পক্ষ সমর্থন করেই কিছু বললেন না। কাজেই প্রতিনিধিরাও তার মনােভাব টের পেলেন না। নির্বাচনের শেষে অবশ্য বােঝা গেছিল যে তার মৌন সমর্থন ছিল ডাঃ পটুভি ৭৫ নেতাজী সীতারামিয়ার উপর । একথা যদি তিনি আগে জানাতেন তবে নির্বাচনে সুভাষচন্দ্রের সঙ্গে ডাঃ পটুভি হয়ত হারতেন না। বিভিন্ন বাকবিতণ্ডার মধ্য দিয়ে ১৯৩৯-এর ১৯শে জানুয়ারী কংগ্রেসের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পর্ব শেষ হল। ভােটগণনা হলে খাে গেল যে সুভাষচন্দ্র ডাঃ পটুভি সীতারামিয়াকে ভােট-যুদ্ধে পরাস্ত করে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন। সুভাষচন্দ্রের প্রাপ্ত ভােটের সংখ্যা ছিল ১৫৮০ এবং ডাঃ সীতারামিয়া পেয়েছিলেন ১৩৭৭ ভােট। নেতা হিসাবে সুভাষচন্দ্রের জনপ্রিয়তা নিঃসংশয়ে প্রমাণিত হল। নির্বাচনের ফলাফল ঘােসিত হবার পর পুননির্বাচিত রাষ্ট্রপতিকে কলিকাতায় বিপুলভাবে সম্বর্ধিত করা হল। নিচনে তিনি আনন্দিত হয়েছিলেন বটে কিন্তু নির্বাচন উপলক্ষে তার সঙ্গে গান্ধীবাদী নেতাদের যেরূপ বিরােধিতা হয়েছিল, তাতে তার মনে ধারণা জন্মেছিল যে এ নিয়ে কংগ্রেস বি:: বাবাও বনা। তাই তিনি খুব উল্লসিত হয়ে উঠতে পারেন নি। তা প্রত্যাশা করা গিয়েছিল, তাই হল । সুভাষচন্দ্র যেমন এ নির্বাচনকে নীতির দিক থেকে গ্রহণ করেছিলেন, গান্ধীজীও তেমনই নীভির দিক থেকেই গ্রহণ করেছিলেন। ডাঃ সীতারামিয়ার পরাজয়কে গান্ধীজী নিজের অর্থাৎ তার মতবাদের পরাজয় বলে গ্রহণ করলেন। বার্দৌলী থেকে একটি বিবৃতি প্রসঙ্গে তিনি ঘোষণা করলেন : “নির্বাচন দ্বন্দ্ব থেকে মৌলানা সাহেব তার নাম প্রত্যাহার করার পর আমার চেষ্টাতেই ডাঃ পটুভি নির্বাচন থেকে সরে দাড়াননি—অতএব এ পরাজয় তার চেয়ে আমারই অধিক । গান্ধীজীর এই ক্ষোভােক্তিতে নির্বাচক কংগ্রেস প্রতিনিধিরা বুঝতে নেতাজী t পারলেন যে নির্বাচনের পূর্বে মুখ না খুললেও গান্ধীজীর পূর্ণ সমর্থন ছিল, ডাঃ সীতারামিয়ার প্রতি। গান্ধীজীর এই বিবৃতি থেকে স্পষ্ট বােঝা গেল যে সুভাষচন্দ্র রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ভারতের রাষ্ট্রগুরুর আশীর্বাণী থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। ফলে তার বিরুদ্ধে কংগ্রেসের মধ্যেও চাকা ঘুরে গেল। আলােচ্য বিবৃতিতে গান্ধীজী সুভাষচন্দ্রকে নির্দেশ দিলেন যে তিনি যখন দক্ষিণপন্থী বা গান্ধীপন্থী নেতাদের সম্বন্ধে এত অনাস্থাশীল, তখন তিনি যেন শুধু বামপন্থীদের নিয়ে একটি একমতাবলম্বী ওয়ার্কিং কমিটি গড়ে তােলেন। তাতে তার কাজের সুবিধা হবে। গান্ধীজী সুভাষচন্দ্রের বিজয়কে নিজের পরাজয় বলে গ্রহণ করায় দেখা গেল যে ত্রিপুরী কংগ্রেসে ভােটাধিক্যে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি সুভাষচন্দ্রের সংখ্যা গরিষ্ঠতা নেই। গান্ধীজীকে বাদ দিয়ে সে কংগ্রেস চলতে পারেন কিংবা কংগ্রেসের মধ্যে থেকে ব্যক্তি বিশেষ গান্ধীনীতিকে বর্জন করতে পারে না একথা ভালভাবে প্রমানিত হল। গান্ধীজীর বিবৃতি পড়েই সুভাষচন্দ্র বুঝতে পেরেছিলেন যে নির্বাচনের মুখে আপােষকামী দক্ষিণপন্থীদের বিরুদ্ধে তার বিভিন্ন উক্তি এবং তৎপরে তার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ফলে যে পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে, তাতে শীঘ্রই কংগ্রেসের মধ্যে দক্ষিণপন্থী এবং বামপন্থীদের মধ্যে একটা সুস্পষ্ট ব্যবধান রচিত হতে পারে। এই দুর্দৈব যাতে না আসতে পারে তার জন্যে অসুস্থ শরীর নিয়েও তিনি হন্তদন্ত করে ১৫ই ফেব্রুয়ারী তারিখে ছুটে গেলেন ওয়ার্ধায়-গান্ধী-সন্দর্শনে। গান্ধীজীর সঙ্গে বহু আলাপ-আলােচনার পর তাঁদের দুজনের মধ্যে কি স্থির ৭৭ নেতাজী হয়েছিল তা জানা যায় নি। কিন্তু ওয়ার্ধ থেকে ফিরে সুভাষচন্দ্র যখন ১০৩ ডিগ্রী অরে শয্যাশায়ী তখন হঠাৎ জানা গেল যে কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির বারাে জন দক্ষিণপন্থী সদস্য একযােগে পদত্যাগ করেছেন। এটা ২১শে ফেব্রুয়ারীর ঘটনা। পদত্যাগী সদস্যদের মধ্যে ছিলেন সর্দার প্যাটেল, মৌলানা আজাদ, সীমান্ত গান্ধী, বাবু রাজেন্দ্রপ্রসাদ, শ্ৰীমতী সরােজিনী নাইডু, ডাঃ সীতারামিয়া এবং কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক আচাষ কৃপালনী। যখন পদত্যাগের সংবাদ নিয়ে এ টেলিগ্রাম এল তখন রাষ্ট্রপতি তার কলিকাতার বাড়ীতে প্রবল জ্বরে প্রায় হতচৈতন্য। দক্ষিণপন্থীদের এই অসহযােগ নীতিতে স্পষ্ট বােঝা গেল যে তারা নির্বাচিত রাষ্ট্রপতির সঙ্গে শক্তিপরীক্ষায় অবতীর্ণ হতে ইচ্ছুক। ত্রিপুরী কংগ্রেসে সে শক্তি-পরীক্ষা হয়ে গেল । এদিকে ত্রিপুরী কংগ্রেসের মাত্র দুই এক সপ্তাহ বাকী। অথচ রাষ্ট্রপতির স্বাস্থ্যের অবস্থা উদ্বেগজনক। একটু সুস্থ হবার পর ২৬শে ফেব্রুয়ারী সুভাষচন্দ্র আলােচ্য বারাে জন ওয়াকিং কমিটির সদস্যের পদত্যাগ পত্র গ্রহণ করলেন। না করে তার পক্ষে উপায়ান্তর ছিল না। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে পদত্যাগকারী সদস্যের বেশ ভেবে- চিন্তেই একাজ করেছিলেন। তিনি যদি তাদের পদত্যাগ পত্র প্রত্যাহারের অনুরােধ করেন, তাতে কোন কাজ হবে না। মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহে ত্রিপুরীতে কংগ্রেসের ৫১তম বার্ষিক অধিবেশন হল। এ অধিবেশন ও খুব জাঁকজমকপূর্ণ হয়েছিল। নির্বাচিত রাষ্ট্রপতিকে ৫২টি হস্তীবাহিত রথে করে বিরাট শশাভাযাত্রাসহকারে কংগেসনগরে নিয়ে যাবার ব্যবস্থা হয়েছিল। কিন্তু সবকিছু পণ্ড হয়ে ৭৮ নেতাজী গেল রাষ্ট্রপতির অসুস্থতার জন্যে। তার চিকিৎসকরা তাে তাকে কংগ্রেস অধিবেশনে যােগ দিতেই নিষেধ করেছিলেন। কিন্তু দুঃসাহসী সুভাষচন্দ্র কোন নিষেধই কানে তুললেন না। তিনি অসুস্থ শরীরে অ্যাম্বুল্যান্স গাড়ীতে ৬ই মার্চ নিঃশব্দে ত্রিপুরীতে প্রবেশ করলেন। তার বদলে তার বিরাট একটি প্রতিমূর্তিকে হস্তীবাহিত রথে স্থাপন করে শােভাযাত্রা বের করা হল। গান্ধীজী প্রায় প্রত্যেক কংগ্রেস অধিবেশনে যোগ দিলেও ত্রিপুরী কংগ্রেসে যােগ দেন নি। যখন ত্রিপুরী কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হচ্ছিল তখন তিনি দেশীয় রাজ্য রাজকোটে আমরণ অনশন করছেন। তাকে নিয়ে দেশব্যাপী উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা। গান্ধীজীর রাজকোট অনশনের কারণ রাজকোটের শাসনকতা ঠাকুর সাহেবের চুক্তি-ভঙ্গ। ঠাকুর সাহেবের সঙ্গে তাঁর রাজ্যের শাসন সংস্কার সম্বন্ধে সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের যে চুক্তি সম্পাদিত হয়েছিল তা তিনি পালন করতে অস্বীকৃত হয়েছিলেন। গান্ধীজীর অনুরােধ উপবােবও যখন তিনি শােনেন নি, তখন গান্ধীজী আমরণ অনশন আরম্ভ করেন। দেশের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত ঠাকুর সাহেবের চুক্তি ভঙ্গের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ উঠেছিল। রাষ্ট্র পতি সুভাষচন্দ্রের আহ্বানে ৫ই মার্চ নিখিল ভারত রাজকোট দিবস প্রতি পালিত হয়েছিল । এদিকে যখন এই অবস্থা ত্রিপুরীতে তখন অন্য নাটক অনুষ্ঠিত হচ্ছিল। ভােটাধিক্যে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি সুভাষচন্দ্র সহসা বিস্মিত হয়ে দেখলেন যে নিখিল ভারত রাষ্ট্রীয় সমিতিতে তার সমর্থকরা সংখ্যা- গরিষ্ঠ নন—সেখানে দক্ষিণপন্থীদের তরফ থেকে পণ্ডিত গােবিন্দবল্লভ পন্থ একটি প্রস্তাবে গান্ধীবাদে কংগ্রেসের আস্থা পুনজ্ঞাপন করলেন। এই ৭১ নেতাজী প্রস্তাবে বলা হল যে কংগ্রেস এপর্যন্ত গান্ধীজীর নির্দেশক্রমে পরিচালিত হয়ে এসেছে এবং ভবিষ্যতেও তার ব্যতিক্রম হবে না। কাজেই কংগ্রেস কর্মকর্তা পরিষদের উপর গান্ধীজী যাতে পরিপূর্ণ আস্থাশীল থাকতে পারেন, সেজন্যে রাষ্ট্রপতি যেন মহাত্মা গান্ধীর অনুমােদনক্রমে তার ওয়ার্কিং কমিটি নির্বাচিত করেন। সুভাষচন্দ্রের সমর্থকদের বিরােধিতা ও সংশােধনী প্রস্তাব সত্ত্বেও এই প্রস্তাব ভোটাধিক্যে গৃহীত হল। এমনই ভাবে নির্বাচিত সভাপতির স্বাধীন সত্তাকে সুদৃঢ় নিয়মের নিগড়ে বেঁধে দেওয়া হল। দুদিন পরে ১০ই মার্চ কংগ্রেসের সাধারণ অধিবেশন হল। পূর্বে রাষ্ট্রপতির স্বাস্থ্য সহসা অত্যন্ত খারাপ হয়ে পড়ে। জব্বলপুরের সাহেব সিভিল সার্জন তাকে পরীক্ষা করে বললেন যে অবিলম্বে তার চিকিৎসার জন্য তাঁকে হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা উচিত। কিন্তু সম্মুখের গুরুত্বপূর্ণ কাজ ফেলে রেখে তিনি কিছুতেই হাসপাতালে যেতে রাজী হলেন না। পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরু তার স্বাস্থ্যের উদ্বেগজনক অবস্থা দেখে তাকে হাসপাতালে যাবার অনুরােধ করায়, স্বাধীনতার এই বীর সৈনিক জবাব দিয়েছিলেন : “আমি জম্বলপুরের হাসপাতালে যাবার জন্যে এখানে আসি নি। অধিবেশন শেষ হবার পূর্বে কোথাও স্থানান্তরিত হবার চেয়ে আমি এখানে মরাই বেশী পছন্দ করি !” এ সংকল্পের বিরুদ্ধে আর কথা চলে ? কংগ্রেসের সাধারণ অধিবেশনেও পন্থ প্রস্তাব বিপুল ভােটাধিক্যে গৃহীত হল। যে কংগ্রেস সােস্যালিষ্ট পার্টি এতদিন সুভাষচন্দ্রকে সমর্থন করে আসছিলেন, শেষ মুহূর্তে তারাও সরে দাড়ালেন। এমনইভাবে ত্রিপুরী অধিবেশন শেষ হল। ৮০ নেতাজী সুভাষচন্দ্র পন্থ প্রস্তাব মেনে নিয়ে ভাবলেন যে তিনি মহাত্মাজীর সঙ্গে পরামর্শ করেই তার ওয়ার্কিং কমিটি মনােনীত করবেন। দিনের পর দিন চলে যেতে লাগল, কিন্তু তার স্বাস্থ্যের কোন উন্নতি দেখা গেল না। কাজেই তাঁর পক্ষে ওয়ার্কায় গিয়ে মহাত্মাজীর সংস্পর্শে আসা সম্ভব হয়ে উঠলনা। এই ভাবে কংগ্রেসে একটা সাময়িক অচল অবস্থার সৃষ্টি হল এবং তার জন্যে তাঁকে লােকনিন্দা ও কম সহ্য করতে হল না। অবশেষে তিনি ২৮শে এপ্রিল তারিখে কলিকাতায় নিখিল ভারত রাষ্ট্রীয় সমিতির অধিবেশন আহ্বান করলেন । কলিকাতার ওয়েলিংটন স্কোয়ারে এই ঐতিহাসিক অধিবেশন হল। দক্ষিণপন্থীরা ত্রিপুরীর মতই সংখ্যায় অধিক ছিলেন। গান্ধীজীও এই অধিবেশন উপলক্ষে এসেছিলেন। গান্ধীজী ও অন্যান্য কংগ্রেস নেতার সঙ্গে আলােচনা করে সুভাষচন্দ্র যখন বুঝলেন যে তাদের সঙ্গে আপােষরফা করা কোন ক্রমেই সম্ভব নয়, তখন তিনি স্বেচ্ছায় রাষ্ট্রপতির পদে ইস্তফা দিলেন যাতে জাতীয় কংগ্রেসের কাজে কোন বাধা সৃষ্টি হতে না পারে। পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরু তাঁকে পদত্যাগ পত্র প্রত্যাহারের জন্যে অনেক অনুরােধ করলেন। কিন্তু সে অনুরােধে কাজ হল না। তার কারণ সুভাষচন্দ্র যখনই কোন বিষয়ে একবার মনস্থির করে ফেলতেন, তখন সে বিষয় থেকে তিনি এক ইঞ্চিও নড়তেন না। ফলে সুভাষচন্দ্রের স্থলে বাবু রাজেন্দ্র প্রসাদ রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলেন এবং মহাত্মা গান্ধীর অঙ্গ- মােন ক্রমে তিনি তার ওয়ার্কিং কমিটি মনােনীত করলেন। প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে এবং পরে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করে সুভাষচন্দ্র জাতীয় কংগ্রেসের ইতিহাসে উল্লেখযােগ্য নজির সৃষ্টি করে গেছেন। ৮১ বিদ্রোহ, ফরওয়ার্ড ব্লক ও নিরুদ্দেশ রাষ্ট্রপতির পদে সুভাষচন্দ্র ইস্তফা দিলেন বটে—কিন্তু তিনি হাত পা গুটিয়ে বসে রইলেন না। নিখিল ভারত কংগ্রেসে তার মতাবলম্বীদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকলেও সুভাষচন্দ্র বুঝলেন যে দেশের একটা বিরাট অংশ তঁার নেতৃত্ব মেনে চলে। তিনি স্থির করলেন যে তাদের সবাইকে তিনি কংগ্রেসের অধীনে একটি বামপন্থী উপদলে সংঘবদ্ধ করবেন । তারই ফলে তার পদত্যাগের কিছুদিন পরেই জন্ম নিল ফরওয়ার্ড ব্লক। তিনি প্রথমে ফরওয়ার্ড ব্লককে কংগ্রেস- বিবােপী, ভিন্ন প্রতিষ্ঠান হিসাবে গড়ে তােলেন নি। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল ফরওয়ার্ড ব্লক কংগ্রেস সােস্যালিষ্ট পার্টির মতই একটা উপদল হিসাবে কংগ্রেসের মধ্য থেকে কাজ করে যাবে। সুভাষচন্দ্র নিজের জীবনের রাজনৈতিক আদর্শকে গান্ধীজী-প্রভাবিত কংগ্রেসের মধ্য দিয়ে রূপ দিতে পারেন নি। সেই রাজনৈতিক আদর্শকেই তিনি রূপ দিতে চাইলেন ফরওয়ার্ড ব্লকের মারফৎ। জনগণের কল্যাণে সাম্রাজ্যেবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামকে বাঁচিয়ে রাখাই ছিল ফরওয়ার্ড ব্লকের মূল উদ্দেশ্য। নিজের দলের রাজনৈতিক মতামত প্রচারের সুবিধার জন্যে তিনি ফরওয়ার্ড ব্লক’ নামক একটি ইংরেজী সাপ্তাহিকও প্রকাশিত করলেন। বেরুতে না পেরুতেই পত্রিকাখানি জনসমাজে বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল। অনেকের মনে ধারণা আছে যে বােধ হয় ত্রিপুরী কংগ্রেসের ৮২ নেতাজী ব্যর্থতার ফলেই সুভাষচন্দ্রের মনে ফরওয়ার্ড ব্লক সৃষ্টির তাগিদ এসেছিল। কার্যত কিন্তু তা সত্য নয়। এই জাতীয় একটি সাম্রাজ্য বাদের বিরুদ্ধে সতত সংগ্রামশীল দল গঠনের পরিকল্পনা বরাবরই তার মনে ছিল। কংগ্রেসের সঙ্গে তাঁর প্রথম সম্পর্ক স্থাপিত হবার পর থেকেই আমরা দেখে এসেছি যে যা-কিছু প্রচলিত বলেই তিনি তাকে স্পষ্ট মনে গ্রহণ করতে পারেন নি। তিনি নিজের বিচার বৃদ্ধির দ্বারা তাকে তুলিত করে তবেই তা গ্রহণ করতেন। এজন্যে তাকে বারবার করে কংগ্রেসের প্রচলিত নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করতে হয়েছে। কোন লড়াইয়ে তিনি জিতেছেন—কোনটায় বা হয়েছেন পরাজিত কিন্তু তাকে কখনও উদ্যমহীন হতে আমরা দেখি নি। যারা মনে করেন যে সুভাষচন্দ্র ব্যক্তিগত স্বার্থের জন্যে বারবার করে কংগ্রেস কতৃপক্ষের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ধ্বজা উত্তোলন করতেন, তাৰ! ভুল করেন। ব্যক্তিগত স্বার্থের বদলে তিনি দেশের স্বার্থকেই বড় করে দেখতেন। যখনই তার মনে হত যে কংগ্রেসের নীতি আপােষরফা পথে এগিয়ে যাচ্ছে, তখনই তিনি কম্বকণ্ঠে বিপ্লবের বাণী উচ্চারণ করতেন। নিখিল ভারত ফরওয়ার্ড ব্লক গঠন করে সুভাষচন্দ্র ঘূর্ণি বায়ুর মত ভারত ভ্রমণ করে বেড়াতে লাগলেন এবং সর্বত্র আপোষ-বিরােধী বাণী প্রচার করতে লাগলেন। ইউরােপে তখন আসন্ন মহাযুদ্ধের পূর্বাভাস দেখা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতি সম্বন্ধে তার তীক্ষ বােধ থাকায় তিনি বুঝেছিলেন যে এই যুদ্ধে সাম্রাজ্যবাদী বৃটেন ভীষণ ভাবে বিজড়িত হয়ে পড়বে এবং সেই সুযােগে সংগ্রাম করে ভারতকে তার নেতাজী প্রাপ্য স্বাধীনতা আদায় করে নিতে হবে। তিনি ঘােষণা করলেন যে কংগ্রেস নেতৃত্ব আপােষরফার পথে চলেছে এবং জনসাধারণ যেন তার দ্বারা ভ্রান্ত না হয়। কংগ্রেস কতৃপক্ষ অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে তার এই সব কংগ্রেস-বিরােধী উক্তিতে বিরক্ত হয়ে উঠলেন। ১৯৩৯-এর ২৪শে জুন বােম্বাইতে নিখিল ভারত কংগ্রেস কমিটির একটি অধিবেশন হয় এবং সে অধিবেশনে দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব গৃহীত হয়। একটি প্রস্তাবের বক্তব্য ছিল যে প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটির নির্দেশ ব্যতীত কেউ ব্যক্তিগত সত্যাগ্রহ করতে পারবে না। দ্বিতীয় প্রস্তাবে কংগ্রেস মন্ত্রিমণ্ডলের সঙ্গে প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটির সম্বন্ধের সীমারেখা নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছিল । এ দুটি প্রস্তাবের একটিও বিপ্লবী সুভাষচন্দ্রের মনঃপূত হয় নি। তার ধারণা হয়েছিল যে প্রস্তাব দুটি কার্যকরী হলে কংগ্রেস বিপ্লবের পথ থেকে শাসনতান্ত্রিকতার পথে এগিয়ে যাবে। তিনি তার অনুবর্তী কংগ্রেসসেবীদের আনােচ্য প্রস্তাব দুটির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রদর্শনের নির্দেশ দিলেন। সুভাষচন্দ্রের এই শৃঙ্খলাভঙ্গে কংগ্রেস কতৃপক্ষ বাধ্য হয়ে ১১ই আগষ্ট তারিখে ওয়ার্কিং কমিটির অধিবেশনে সুভাষচন্দ্রকে কংগ্রেস থেকে তিন বৎসরের জন্যে বিতাড়িত করে প্রস্তাব গ্রহণ করলেন। তার পূর্বে সুভাষচন্দ্রের সঙ্গে কংগ্রেস সভাপতির কয়েকটি পত্র বিনিময় হয়েছিল। সুভাষচন্দ্রকে কংগ্রেস থেকে বিতাড়িত করার ফলে বাংলার রাজনীতিতে নতুন সঙ্কট দেখা দিল। তিনি তখনও বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটির সভাপতি এবং বাংলা কংগ্রেসের উপর তার অপরিসীম প্রভাব। কংগ্রেস কতৃপক্ষের নির্দেশে তিনি প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটির সভাপতি ৮৪ নেতাজী পদ থেকে অপসারিত হলেন এবং তার পরিবর্তে নতুন সভাপতি নির্বাচনের নির্দেশ দেওয়া হল। পরলােকগত রাজেন্দ্র দেব সভাপতি নির্বাচিত হলেন কিন্তু তিনিও সুভাষচন্দ্রের নেতৃত্ব ও নির্দেশ মেনে চলবেন বলে ঘােষণা করলেন। ফলে কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটি সুভাষচন্দ্র- প্রভাবিত বাংলা কংগ্রেসকে বাতিল করে দিলেন এবং তার স্থানে একটি অ্যাড হক কমিটি গঠন করে বাংলায় কংগ্রেসের কার্য পরিচালনার ব্যবস্থা করলেন। এমনই ভাবে দেশপ্রিয় যতীন্দ্রমােহন সেন গুপের মৃত্যুর পর সুভাষচন্দ্রের নেতৃত্বে বাংলা কংগ্রেসের যে অন্তর্বিরােধ মিটে গেছিল, তা আবার নতুন করে দেখা দিল। বাংলার ব্যবস্থা পরিষদেও কংগ্রেস সদস্যদের দুটো দল হল—সুভাষচন্দ্রের অনুগামীরা তার অগ্রজ শ্ৰীযুক্ত শরৎচন্দ্র বসুর নেতৃত্ব মেনে চলতে লাগলেন, আর অ্যাড হক কংগ্রেস কমিটির অনুবর্তী আইন সভার সদস্যরা মেনে নিলেন শ্ৰীযুক্ত কিরণশঙ্কর রায়ের নেতৃত্ব। অক্টোবর মাসে সুভাষচন্দ্র গৌহাটি ভ্রমণে গিয়েছিলেন এবং সেখানে বিপুলভাবে সম্বধিত হয়েছিলেন । এই মাসেই তিনি নাগপুরে সাম্রাজ্যবাদবিরােধী সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেছিলেন। নবেম্বর মাসের প্রথম ভাগে তিনি দিল্লীতে নিখিল ভারত ছাত্র সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেছিলেন। ১৯৩৯-এর সেপ্টেম্বর মাসে জার্মানী পােল্যাণ্ড আক্রমণ করায় বিশ্ববিধ্বংসী দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সূত্রপাত হল । ইংল্যাণ্ড প্রকৃতই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ল এবং সুভাষচন্দ্রের আপােষ-বিরােধী সুর, আরও চড়া হয়ে উঠল। বিপ্লবী সুভাষচন্দ্র সারা ভারতে অপূর্ব প্রেরণার সঞ্চার করতে পেরেছিলেন। বাংলায় ত তাঁর অবিসম্বাদিত প্রভাব নেতাজী ছিলই—ভারতের অন্যান্য প্রদেশেও তিনি অনেক সুযােগ্য সহকর্মী পেয়েছিলেন। তারা কংগ্রেস ত্যাগ করেও তার সঙ্গে যােগ দিতে কুণ্ঠিত হন নি। তাঁর চরিত্রে যে সহজাত নেতৃত্ব ছিল, তার ফলেই এ অসম্ভব সম্ভব হয়েছিল। তাঁর সহকর্মীদের মধ্যে প্রসিদ্ধ ছিলেন বিহারের শ্রমিক নেতা স্বামী সহজানন্দ, পাঞ্জাবের সর্দার শাদূল সিং কবিশের, মধ্যপ্রদেশের হরিবিষ্ণু কামাথ, শীলভদ্র যাজী প্রভৃতি। ১৯৪০ এর প্রথম ভাগে সুভাষচন্দ্র স্থির করেন যে তিনি কলিকাতায় একটি কংগ্রেসভবন স্থাপন করবেন। উপযুক্ত একটি কংগ্রেস ভবনের অভাব কলিকাতাবাসীরা বহুদিন থেকেই অনুভব করে আসছিলেন। সুভাষচন্দ্র সেই অভাব মােচনে মনােনিবেশ করেন এবং উপযুক্ত অর্থ সংগ্রহ করে এই ভবনের স্থান সংগ্রহ করেন। স্বয়ং কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ এই ভবনের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন এবং এর নামকরণ করেছিলেন মহাজাতি সদন। সুভাষচন্দ্রের অভাবে তাঁর আরব্ধ মহাজাতি সদনের কাজ আর এগােয় নি—আজও সে কাজ অসমাপ্ত রয়ে গেছে। নেতাজীর সেই অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করার ভার কি অন্য কোন বাঙালী নেতা গ্রহণ করতে পারেন না ? যুদ্ধারম্ভের কিছু পরেই কংগ্রেস বৃটিশ গবর্ণমেন্টের কাছ থেকে তাদের যুদ্ধাদর্শ সম্বন্ধে এবং এ যুদ্ধে যােগ দিলে ভারতের স্বাধীনতা মিলবে কি না সে সম্বন্ধে সুস্পষ্ট ঘােষণা চায়। প্রার্থিত ঘােষণা না মেলায় একযােগে ৭টি প্রদেশের কংগ্রেস মন্ত্রিমণ্ডলী পদত্যাগ করেন এবং কংগ্রেস সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ সম্বন্ধে নিরপেক্ষ নীতি ঘােষণা করে।

নেতাজী ভারত গবর্ণমেণ্ট তখন একটির পর একটি অর্ডিন্যান্স জারী করে দেশের বুক থেকে ব্যক্তি-স্বাধীনতা লুপ্ত করে দেবার চেষ্টা করেন। ১৪ -এর ফেব্রুয়ারী মাসে সুভাষচন্দ্র ভারতের সর্বত্র গবর্ণমেন্টের এই দমনমূলক নীতির প্রতিবাদে জনগণের পক্ষ থেকে বিক্ষোভ প্রদর্শনের ব্যবস্থা করেন। মার্চ মাসে তিনি সমগ্র যুক্ত প্রদেশ ভ্রমণে বহির্গত হন। ১৯৪০ খৃষ্টাব্দে মৌলানা আবুল কালাম আজাদ কংগ্রেসের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন এবং এ বৎসর মার্চ মাসে রামগড়ে কংগ্রেসের অধিবেশন হয়েছিল। সুভাষচন্দ্র ও জাতীয় কংগ্রেসের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে রামগড়েই পাশাপাশি আপােষ-বিবােধী সম্মেলনের অনুষ্ঠান করে। এই উভয় অনুষ্ঠানই যারা চোখে দেখেছিলেন তারা বলেন যে সুভাষচন্দের আপােষবিরােধী সম্মেলন, জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশন থেকে কোন দিক দিয়েই হীন হয় নি এবং তার সম্মেলনে লােকও হয়েছিল অগণিত। এদিকে ইউরােপের যুদ্ধ তখন পুরাে দমে চলছে-হিটলার একটির পর একটি করে ক্ষুদ্র দেশগুলােকে গ্রাস করে চলেছেন। সুভাষচন্দ্র এই সুযােগে সাম্রাজ্যবাদী বৃটিশদের হাত থেকে শাসন ক্ষমতা কেড়ে নেবার জন্যে চঞ্চল হয়ে উঠলেন। তিনি সারা দেশে সংগ্রামের আহ্বান কণ্ঠে নিয়ে ঘুরতে লাগলেন। কিন্তু কংগ্রেস কর্তৃপক্ষ ১৯৪২-এর আগষ্ট মাসে গান্ধীজীর সুবিখ্যাত ০uit India প্রস্তাবের মধ্য দিয়ে যে সংগ্রাম শুরু করেছিলেন, সে সংগ্রামের জন্যে তারা তখনও তৈরী ছিলেন না। তাই সুভাষচন্দ্রের সঙ্গে তাঁদের স্পষ্ট মতবিরােধ দেখা দিল। তারাও সুভাষচন্দ্রের হঠকারী সংগ্রামশীল মনােবৃত্তির বিরুদ্ধে পাল্টা প্রচার শুরু করলেন। কংগ্রেস তার সমস্ত সংহত শক্তি নেতাজী ; সুভাষচন্দ্রের বিরুদ্ধে প্রয়ােগ করল। শ্ৰীযুক্ত রাজাগােপালাচারিয়ার সেই সময় একটি বক্তৃতায় বলেছিলেন যে সুভাষচন্দ্রের নৌকা ফুটো (Leaky boat); সে নৌকায় স্বাধীনতা-সমুদ্রে পাড়ি জমানাের চেষ্টা করলে জাতি সমুদ্রের মধ্যেই ডুবে মরবে । আর অভিজ্ঞ প্রবীণ গান্ধীজীর নৌকা নিরাপদ ও মজবুত ; জাতি যদি গান্ধীজীর নৌকায় পাড়ি জমায়, তবে আকাঙ্খিত স্বাধীনতা তাদের জুটবে। ১৯৪০-এর এপ্রিল মাসে সুভাষচন্দ্ৰ কলিকাতা কর্পোরেশনের অল্ডার- ম্যান নিযুক্ত হন এবং প্রধানত তারই উদ্যোগে কর্পোরেশনের ব্যাপারে মুসলিম লীগ ও সুভাষচন্দ্রের অনুবর্তী কংগ্রেস দলের মধ্যে একটা আপােষরফা হয়। জুন মাসে তিনি মধ্যপ্রদেশের নাগপুরে অনুষ্ঠিত নিখিল ভারত ফরওয়ার্ড ব্লকের একটি সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন। ২০শে জুন তিনি ওয়া গিয়ে গান্ধীজীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং দেশের বর্তমান অবস্থায় দেশবাসীদের কতব্য সম্বন্ধে উভয়েয় মধ্যে আলােচনা হয়। এই সাক্ষাৎকারের দুদিন পরে মুসলিম লীগের নেতা মিঃ জিন্না এবং হিন্দুমহাসভার নেতা বীর সাভারকরের সঙ্গেও তার রাজনৈতিক আলাপ আলােচনা হয়। এর পর তিনি কলকাতায় ফিরে আসেন এবং ড্যালহৌসী স্কোয়ার থেকে হলওয়েল মনুমেন্ট অপসারণের জন্যে আন্দোলন শুরু করেন। হলওয়েল মনুমেন্ট অপসারণ সুভাষচন্দ্রের রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কীতি। ড্যালহৌসী স্কোয়ারের উত্তর-পশ্চিম উত্তর-পশ্চিম কোণস্থিত এই মনুমেন্টটি আমাদের জাতীয় জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কলঙ্ক স্বরূপ ছিল । বাংলার হিন্দু এবং মুসলমান—উভয় সম্প্রদায়ই এই মনুমেন্টটিকে bb নেতাজী ১৯৪০ অপসারিত করতে চাইলেও, দুই একবার ব্যবস্থা পরিষদে বিক্ষিপ্ত বিঞ্ছিন্ন প্রচেষ্টা ছাড়া, এটি অপসারণের জন্যে কোন চেষ্টাই করা হয় নি। বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজদ্দৌলার নামে নৃশংসতার কলঙ্ক আবােপর জন্যে লর্ড কার্জন ‘অন্ধকূপ হত্যা’র স্মারকচিহ্ন রূপে এই হলওয়েল মনুমেন্টটি প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। ঐতিহাসিক গবেষণার ফলে পরে একথা নিঃসন্দেহে প্রমাণিত হয়েছে যে অন্ধকূপ হত্যা সম্পূর্ণ কাল্পনিক। ইতিহাসের বিরুদ্ধ রায় সত্বেও শাসক সম্প্রদায় হলওয়েল মনুমেন্ট অপসারিত করে সুবুদ্ধির পরিচয় দেন নি। তাই সুভাষচন্দ্র এর ২৯শে জুন তারিখে কলিকাতার হিন্দু মুসলমানদের একটি মিলিত সভায় ঘােষণা করলেন যে মনুমেন্ট অপসারণের জন্যে তিনি সত্যাগ্রহ আন্দোলন আরম্ভ করবেন। হিন্দু এবং মুসলমান সম্প্রদায় তার এ প্রস্তাব সর্বান্তকরণে সমর্থন করল এবং সর্বপ্রকার সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিল । সে সময়ে বাংলা। দেশে মন্ত্রিত্বের গদিতে বসেছিলেন মৌলবী এ, কে, ফজলুল হকের নেতৃত্বে মুসলিম লীগ। জুন মাসের মাঝামাঝি লীগ মন্তিমণ্ডলকে জানানাে হয়েছিল যে তারা যদি অবিলম্বে জনসাধারণের দাবী অনুযায়ী হলওয়েল মনুমেন্ট অপসারণের ব্যবস্থা না করেন, তবে সত্যাগ্রহ আরম্ভ হবে। লীগ মন্ত্রিমণ্ডলের তরফ থেকে কোন সাড়া না পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত সত্যাগ্রহের সিদ্ধান্তই গ্রহণ করা হয় । ২৯শে জুনের সভায় স্থির হয় যে ৩রা জুলাই সিরাজ-স্মৃতি দিবসে হলওয়েল মনুমেন্ট সত্যাগ্রহ আরম্ভ করা হবে। তৎপূর্বে ২রা জুলাই তারিখে অত্যন্ত অপ্রত্যাশিত ভাবে সুভাষচন্দ্রকে ভারতরক্ষা বিধান অনুযায়ী গ্রেপ্তার ০ নেতাজী করে অনির্দিষ্ট কালের জন্যে প্রেসিডেন্সী জেলে আটক করে রাখা হল। সারা দেশব্যাপী প্রতিবাদের ঝড় উঠল এবং কেউ এই সরকারী খামখেয়ালের কারণ নির্ধারণ করতে পারল না । ১ ই জুলাই তারিখে কমন্স সভায় প্রশ্নোত্তর প্রসঙ্গে ভারতসচিব আমেরী সাহেব ঘােষণা করলেন যে হলওয়েল মনুমেন্ট সত্যাগ্রহের ব্যাপারেই সুভাষচন্দ্রকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সত্যাগ্রহের নেতা এ ভাবে অকস্মাৎ গ্রেপ্তার হলেও সত্যাগ্রহ বন্ধ রইল না। নির্ধারিত দিনে হাতুড়ি হাতে নিয়ে সত্যাগ্রহীরা ড্যালহৌসী স্কোয়ারে হলওয়েল মনুমেন্টের সন্নিকটবর্তী হলেন এবং পুলিশের হাতে ধরা পড়লেন । এমনই ভাবে দিনের পর দিন সত্যাগ্রহ চলল। অবশেষে জনমতের চাপে পড়ে বাংলা গবর্নমেন্ট ড্যালহৌসী স্কোয়ার থেকে হলওয়েল মনুমেন্ট অপসারিত করতে বাধ্য হলেন। এ দিকে সুভাষচন্দ্রকে ছেড়ে দেবার কোনই লক্ষণ দেখা গেল না। ৩০শে আগষ্ট তারিখে তার বিরুদ্ধে সরকার পক্ষ থেকে দুটি মামলা দায়ের করা হল। দুটি মামলাই রাজদ্রোহের—একটি এপ্রিল মাসে মহম্মদ আলী পার্কে প্রদত্ত তার বক্তৃতার জন্যে, অপরটি ওরওয়ার্ড ব্লকে প্রকাশিত "The day of Reckoning? নামক প্রবন্ধের জন্যে। তার পর দিন আলিপুরে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিষ্ট্রের এজলাসেও তার বিরুদ্ধে আর একটি মামলা দায়ের করা হল। বাংলার জনগণ সুভাষচন্দ্রকে কত ভালবাসতেন তার নতুন প্রমাণ পাওয়া গেল অক্টোবর মাসে যখন কারারুদ্ধ সুভাষচন্দ্র কেন্দ্রীয় ব্যবস্থা পরিষদের একটি উপনির্বাচনে বিনা বাধায় সদস্য নির্বাচিত হলেন। কিন্তু নেতাজী তবু তাকে ছেড়ে দেওয়া হল না। এদিকে তার স্বাস্থ্যও ভেঙ্গে পড়ছিল। বিনা বিচারে তাকে এই ভাবে আটক করে রাখায় সুভাষচন্দ্র ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলেন। দেশবাসীরা তার মুক্তির জন্যে বহু আন্দোলন করল—কিন্তু কোনই ফল হল না। তখন সুভাষচন্দ্র এই সরকারী খামখেয়াল ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জ্ঞাপনের জন্যে অনশন-ধর্মঘটের সিদ্ধান্ত করলেন। ২৬শে নবেম্বর তারিখে তিনি তার সিদ্ধান্ত ও দাবী জানিয়ে বাংলার গবর, প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিমণ্ডলের কাছে একটি স্মরণীয় চিঠি লিখলেন। তিনি নিজে এই গুরুত্বপূর্ণ চিঠিটিকে তার “রাজনৈতিক দলিল” বলে উল্লেখ করে গেছেন। এতে তিনি প্রসঙ্গক্রমে লিখেছেন : “অনুষ্ঠিত অন্যায়ের কাছে বশ্যতা স্বীকার করা, অন্যায় করার চেয়েও ঘৃণ্য অপরাধ। কাজেই প্রতিবাদ আমি করবই।•••••প্রতিবাদের উপায় আছে মাত্র একটিবন্দীর হাতে শেষ অস্ত্র--অর্থাৎ অনশন ধর্মঘট বা উপবাস।” উপবাস।” সুভাষচন্দ্র স্থির করেছিলেন যে গবর্ণমেন্ট তার দাবী মেনে না নিলে তিনি আমরণ অনশন করবেন। এই চিঠিতেই দেশবাসীদের উদ্দেশ্যে প্রদত্ত বাণীতে তিনি বলেছিলেন : “দেশবাসীদের উদ্দেশ্যে আমি বলি-ভুলাে না যে মানুষের পক্ষে ক্রীতদাসরূপে থাকাই সব চেয়ে বড় অভিশাপ। ভুলাে না যে অন্যায় ও ভ্রান্তির সঙ্গে আপােষ করা ঘৃণ্যতম অপরাধ। এই প্রাকৃতিক নিয়মটি স্মরণ রেখাে-যদি পেতে চাও, তবে তােমাকে দিতে হবে। স্মরণ রেখাে যে মূল্য যাই দিতে হােক না কেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করাই সব চেয়ে বড় কাজ।” ৯১ নেতাজী বাংলা গবর্ণমেন্ট সুভাষচন্দ্রের চিঠি দেখে বুঝতে পারলেন যে এ চিঠি ভীতি প্রদর্শনের জন্যে লেখা হয় নি লেখা হয়েছে সুদৃঢ় অভিমত জ্ঞাপনের জন্যে। তবু আমলাতান্ত্রিক কতৃপক্ষ তাকে অনশন ধর্মঘট আরম্ভ করার পূর্বে মুক্তি দিলেন না। কিন্তু ভগ্ন স্বাস্থ্যে তিনি যখন প্রকৃতই ধর্মঘট শুরু করলেন, এবং দেশব্যাপী তার মুক্তির দাবী উঠতে লাগল, তখন আর তারা চুপ করে থাকতে পারলেন না। অনশন ধর্মঘট আরম্ভ করার পাঁচ সাতদিন পরেই ৫ই ডিসেম্বর তারিখে তঁাকে মুক্তি দেওয়া হল। তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে না ওঠা পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে মামলাও স্থগিত রাখা হল । মুক্তি পেয়ে তিনি তার এলগিন রােডের বাসায় এসে উঠলেন। এর পর রাষ্ট্রপতি মৌলানা আজাদের একাধিক বিবৃতির প্রত্যুত্তর তিনি দিয়েছিলেন। তা ছাড়া তিনি আর কোন রাজনৈতিক কার্য- কলাপে হাত দেন নি। নিজের গৃহ থেকে অকস্মাৎ উধাও হয়ে যাবার পূর্ব পর্যন্ত তিনি প্রায় অধিকাংশ সময় একা একাই কাটাতেন। বাইরের লােকের সঙ্গে ত দেখা করতেনই না-নিজের পরিবারের লােকজনের সঙ্গেও বড় বেশী দেখা সাক্ষাৎ করতেন ন। ১৯৪১এর জানুয়ারী মাসের প্রথম দিক থেকে তিনি মৌনব্রত অবলম্বন করেন এবং প্রধানত ফলমূল খেয়ে সন্ন্যাসীর মত জীবনই তিনি যাপন করতেন। তাঁর ঘরে প্রবেশের অধিকার কারও ছিল না। যারা তাকে জানতেন, তারা সুভাষ- চন্দ্রের এই আকস্মিক ভাবান্তরে বিস্মিত হয়ে গেলেন। কিন্তু তখন তাঁরা জানতেন না যে তাদের জন্যে আরও বিস্ময়কর সংবাদ অপেক্ষা করে আছে। ১৯৪১এর ২৬শে জানুয়ারী সহসা জানা গেল যে ১২

নেতাজী
সুভাষচন্দ্রকে তার ঘরে খুজে পাওয়া যাচ্ছে না। সমগ্র ভারত বিস্মিত
হয়ে সুভাষচন্দ্রের চমকপ্রদ অন্তধনের সংবাদ শুনল এবং সবাই ভাবতে
লাগল তরুণ ভারতের এই প্রিয় নেতা কোথায় গেলেন।
৯৩

নিরুদ্দেশের পর সুভাষচন্দ্রের নিরুদ্দেশ সম্বন্ধে সারা ভারতে জল্পনা কল্পনার অন্ত রইল না। সব চেয়ে বেশী বােকা বনে গেলেন ভারত গবর্ণমেন্ট। খাঁচার পাখী এমন ভাবে পালাবে তা তারা স্বপ্নেও ভাবতে পারেন নি। বৃটিশ গবর্ণমেন্টের সদাজাগ্রত চোখ এড়িয়ে সুভাষচন্দ্রের এই পলায়ন ভারতের ইতিহাসে একটি চমকপ্রদ ঘটনা। পর্বত-মূষিক মারাঠা বীর শিবাজী এমনই করেই অসুস্থতার ভাণ করে একদিন ঔরংজেবের বন্দীশালা থেকে পালিয়ে এসেছিলেন। সুভাষচন্দ্র ভারতকে স্বাধীন করার একটা বৃহত্তর উদ্দেশ্য নিয়ে দেশত্যাগ করেছিলেন, একথা সে সময় জানতে না পারায়, দেশবাসীদের মনে নানারূপ সংশয় দেখা দিল। কেউ ভাবল যে সুভাষচন্দ্রের সতত সংগ্রামশীল আপােষ-বিরােধী প্রচেষ্টায় বিব্রত বৃটিশ গবর্ণমেন্ট তাকে কৌশলে কোথাও স্থানান্তরিত করে গােপনে লােক চক্ষুর আড়ালে আবদ্ধ করে রেখেছেন যাতে তিনি যুদ্ধকালে ভারতে বৃটিশ বিরােধী মনােভাব সৃষ্টি করে যুদ্ধ-প্রচেষ্টায় ব্যাঘাত ঘটাতে না পারেন । আবার কেউবা মনে করলেন যে রাজ- নৈতিক জীবনের ক্ষুদ্রতা ও সংকীর্ণতায় বিরক্ত হয়ে তিনি ধর্ম-জীবনে শান্তিলাভের আশায় হিমালয়ের অজ্ঞাত অঞ্চলে যাত্রা করেছেন। সুভাষচন্দ্রের চরিত্রে মূলগত যে ধমভাব ছিল তার কথা যারা জানতেন, তঁাদের মনে এই ধারণাই দৃঢ়মূল হল। তরুণ সুভাষচন্দ্র এই ১১ নেতাজী ধর্মভারের প্রেরণায় একদিন গৃহত্যাগ করে মাস ছয়েকের জন্যে তীর্থে তীর্থে গুরুর সন্ধানে ঘুরে বেড়িয়েছিলেন। আবার তার মনে সেই ধর্মভাবের প্রেরণা ফিরে আসায় তিনি গৃহত্যাগ করেছেন-- এই ধারণা অনেকের মনে হল। আবার আর একদল লােকের মনে ধারণা হল যে তঁার মত জন্ম-বিপ্লবী কখনও যুদ্ধের সময় নিক্ষিয় অবস্থায় বৃটিশের কারাগারে সময় ক্ষেপ করতে পারেন না বলেই তিনি যে কোন প্রকারে হােক পালিয়ে বিদেশে চলে গেছেন। এদের ধারণাই শেষ পর্যন্ত সত্যে পরিণত হয়েছে। তার নিরুদ্দেশের পর প্রায় বৎসরকাল তার সম্বন্ধে কোন সঠিক সংবাদ পাওয়া যায় নি। এই রহস্যময় নিরুদ্দেশের সম্বন্ধে প্রথম আলোেক পাত করেন ভারত গণ- মেণ্টের স্বরাষ্ট্রবিভাগের সেক্রেটারী ১৯৪১এর ১০ই নভেম্বর তারিখে রাষ্ট্রীয় পরিষদে। তিনি ঘােষণা করেন যে সুভাষচন্দ্র রােম• কিংবা বার্লিনে আছেন। পরে পার্লামেন্টে ও অনুরূপ ঘােষণা করা হয়। ১৭ই নবেম্বর অক্ষশক্তির বেতার থেকে ঘােষণা করা হয় যে সুভাষচন্দ্র জার্মানীতে আছেন এবং জার্মাণ গবর্ণমেন্টের সঙ্গে চুক্তি করেছেন। এসব ঘােষণায় দেশবাসীদের মনের সংশয় কিন্তু ঘােচে নি। এদিকে সুভাষচন্দ্রের বিরুদ্ধে যে সব মামলা ছিল, ক্রমাগত তার দিন পিছিয়ে যেতে লাগল। গবর্নমেন্ট থেকে তার বাড়ী নীলামে বিক্রয় করার চেষ্টা হল কিন্তু ক্রেতার অভাবে নীলাম হল না। দেশবাসীর সুভাষচন্দ্রকে যে কত ভালবাসেন-এটা তার অন্যতম প্রমাণ। যেতে লাগল—সরকার পক্ষও তত তৎপর হয়ে প্রচার কার্যচালাতে লাগল যে সুভাষচন্দ্র ফ্যাসিষ্ট এবং তিনি বিদেশে গিয়ে ফ্যাসিষ্টদের যত দিন নেতাজী কাছে আত্ম বিক্রয় করেছেন। বিভিন্ন বৃটিশ সংবাদ সরবরাহ প্রতিষ্ঠান থেকে সুভাষচন্দ্র সম্বন্ধে নানারূপ সংবাদ প্রচার করা হতে লাগল এবং ভারত গবর্ণমেন্টের কৃপায় ভারতবাসীদের বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যে এই সব সত্য মিথ্যা সংবাদ ফলাও করে ঘােষণা করা হল। কলিকাতার অ্যাংলাে-ইণ্ডিয়ান দৈনিক পত্রিকা ষ্টেটম্যানে এমন মন্তব্যও করা হল যে কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট থাকার সময়ও সুভাষচন্দ্রের সঙ্গে ফ্যাসিষ্ট দেশগুলির সংযােগ ছিল এবং তিনি ভারতে পঞ্চম বাহিনী সংগঠনের উদ্দেশ্যে ফ্যাসিষ্ট ডিক্টেটরদের কাছ থেকে নিয়মিত অর্থসাহায্য পেতেন। ১৯৪২এর ১৯শে মার্চ কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক আচার্য পালনী একটি বিবৃতিতে ষ্টেটম্যানের এই জঘন্য মিথ্যা উক্তির তীব্র প্রতিবাদ করেছিলেন। এই রকম বিভ্রান্তিকর গুজবের মধ্যে সহসা ২৮শে মার্চ তারিখে ফরাসী সূত্র থেকে প্রাপ্ত একটি সংবাদের উপর ভিত্তি করে রয়টার ঘােষণা করলেন যে বিমান দুর্ঘটনায় সুভাষচন্দ্র নিহত হয়েছেন। এ সংবাদ ভারতবাসীরা সত্য বলে গ্রহণ করতে পারেনি। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই লণ্ডন থেকে একটি ঘােষণায় বলা হল যে আলােচ্য সংবাদটি সমর্থিত নয় এবং বিশ্বাসযােগ্য নয়। পরে জানা গেছে যে এ বিমান দুর্ঘটনার কথা সম্পূর্ণ কাল্পনিক । ১৯৪২এর এপ্রিল মাসে স্যার স্ট্যাফোর্ড ক্রিপস আপােষ প্রস্তাব নিয়ে ভারতে আসেন। তিনিও ঘােষণা করেন যে সুভাষচন্দ্র অক্ষশক্তির দেশে আছেন। আজাদ হিন্দ ফৌজের সৈন্য ও সেনানীদের সামরিক আদালতে বিচারকালে এবং মুক্তিপ্রাপ্ত আজাদী বীরদের মুখ থেকে আজ জার্মানী ও পূর্বএশিয়ায় ভারতের মুক্তি কল্পে সুভাষচন্দ্র যে অভাবিতপূর্ব প্রচেষ্টা

No text on this page.

No text on this page.

নেতাজী জানতে করেছিলেন, তার বহু কাহিনী আমরা জানতে পেরেছি। পেরেছি বিদেশে ভারতীয় সৈন্যবাহিনী সংগঠন করে তিনি ভারতের বৃটিশ শক্তিকে পরাজিত করার এক বিরাট প্রয়াস পেয়েছিলেন। যথাস্থানে ভারতের এই মুক্তি-যােদ্ধার সামরিক কীর্তি কলাপ বর্ণার প্রয়াস পাব। সুভাষচন্দ্র কি করে বৃটিশদের সদাজাগ্রত চোখ এড়িয়ে জার্মানীতে যেতে পেরেছিলেন সে কাহিনী এতদিন পর্যন্ত অজ্ঞাত ৫০ রহস্যচ্ছন্ন ছিল। তিনি আজাদ হিন্দ ফৌজের সৈন্য ও সহকর্মী কার, কাছে তার এই পলায়ন কাহিনী বলেন নি। তিনি কেন দেশ ছেড়ে এসেছেন এ প্রসঙ্গে তিনি ১৯৪৩এর জুলাই মাসে সিঙ্গাপুরে একটি বক্তৃতায় বলেছিলেন যে বহুদিন ইংরাজদের বিরুদ্ধে কংগ্রেস সেবকরূপে অহিংস সংগ্রামে নিরত থেকে তিনি বুঝেছিলেন যে বলপ্রয়ােগে ইংরেজদের হাত থেকে ক্ষমতা কেড়ে নিতে না পারলে, তারা স্বেচ্ছায় দেশ ছেড়ে যাবে না। তাই তিনি বিদেশে এসেছিলেন বিশ্ব যুদ্ধের সুযােগে ইংরেজদের প্রতিপক্ষের সাহায্য নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম চালানাের উদ্দেশ্যে। কর্মবীর সুভাষচন্দ্র তার কল্পনা ও অভীকে বাস্তবে রূপায়িত করে পরাধীন দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে নতুন কীতি স্থাপন করে গেছেন। আ জ সমগ্র বিশ্ব তাঁর কীর্তির বহর দেখে স্তম্ভিত। আরও যত দিন যাবে, ততই আজাদ হিন্দ ফৌজ ও আজাদ হিন্দ গবর্ণমেন্ট সম্বন্ধে নতুন নতুন কীর্তি কাহিনী প্রকাশিত হয়ে জগতকে স্তম্ভিত করে দেবে। যাই হােক, সুভাষচন্দ্র কেন দেশ ছেড়ে গেছেন তার অধীন সৈন্য ও সেনানীদের সেকথা জানালেও, তিনি কিভাবে দেশ ছেড়ে নেতাজী গেছেন, সেকথা কাউকে কোনদিন জানান নি। আজাদ হিন্দ ফৌজের একাধিক সৈন্য ও সেনানী এ প্রশ্ন তাকে করায় তিনি সংক্ষেপে তাদের জানিয়েছিলেন যে সেকথা তিনি বলবেন না, তার কারন যে উপায়ে তিনি একদা ভারত ত্যাগ করে এসেছিলেন, সেই উপায় তাকে আবার অবলম্বন করতে হতে পারে। সম্প্রতি কিন্তু সুভাষচন্দ্রের এই রােমাঞ্চকর পলায়ন কাহিনী প্রকাশিত হয়েছে। প্রকাশ যিনি করেছেন, তার নাম শ্ৰীযুক্ত উত্তম চঁাদ। ইনি কাবুলে ব্যবসায় করতেন এবং নিরুদ্দিষ্ট সুভাষচন্দ্র ভারত ত্যাগ করে যথ আফগান রাজধানী কাবুলে গিয়ে পৌছান, তখন ইনি তাকে ৪৩ দিন নিজের গৃহে লুকিয়ে রেখেছিলেন ও ইটালীর দূতাবাসের মারফ তার বার্লিনে যাবার সমস্ত ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। প্রথমে উত্তম চঁাদ সম্বন্ধে দুইচারটি কথা বলে, পরে এই রােমাঞ্চকর কাহিনী বর্ণন করছি। শ্রীযুক্ত উত্তম চদি সুভাষচন্দ্রকে আশ্রয় দিয়েছিলেন বলে, আজ লক্ষপতি থেকে তিনি পথের ফকির হয়ে দাঁড়িয়েছেন। শুধু তাই নয়—রাজকারাগারে তার উপর অত্যাচারও কম চলে নি : এক সময় তিনি নিজে রাজনৈতিক কর্মী ছিলেন। তিনি উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের নওজোয়ান ভারত সভার সম্পাদক ছিলেন এবং ১৯৩০ সালে কংগ্রেসের আইন অমান্য আন্দোলনে অংশ গ্রহণের ফলে তার দু’সর সশ্রম কারাদণ্ড হয়েছিল। পরে তিনি ব্যবসায়ে আত্মনিয়ােগ করেছিলেন এবং পেশােয়ারে তাঁর ব্যবসায়ের একটি শাখা-প্রতিষ্ঠান ‘াকলে ও তার প্রধান কর্মকেন্দ্র ছিল আফগানিস্থানের রাজধানী কাবুলে । এই কাবুলেই ১৯৪১-এর ৩রা ফেব্রুয়ারী তিনি পলায়িত বিপদগ্রস্ত নেতাজী সুভাষচন্দ্রকে স্বগৃহে আশ্রয় দিয়েছিলেন এবং তার অক্ষশক্তির দেশে যাবার সকল ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। শ্রযুক্ত বসু বালিনে পৌছানাের কিছুদিন পরেই উত্তম চাদের কার্যকলাপ বৃটিশদের গােচরীভূত হয় এবং তারা তার শাস্তিবিধানের জন্যে আফগান গবর্নমেন্টকে চাপ দিতে থাকেন। শক্তি-হীন আফগান গবর্ণমেন্টের পক্ষে শক্তিশালী বৃটিশদের চাপ সহ্য করা কঠিন। তাই তারা উত্তম। চঁাদকে আফগানিস্থান থেকে নির্বাসিত করেই খুসী হন না—তারাতাকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করে উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে এনে বৃটিশ পুলিশের হাতে তুলে দেন। ১৯৪২-এর ১লা জুন তিনি বৃটিশদের হাতে বন্দী হন এবং রাওয়ালপিণ্ডিতে একটি নির্জন কক্ষে তাঁকে আটক করে রাখা হয়। এইখানে বসে বসেই তিনি সুভাষচন্দ্রের পলায়ন কাহিনী রচনা করেন। সম্প্রতি এই কাহিনী প্রচারিত হয়ে জনসমাজে একটি অভূতপূর্ব সাড়া পড়ে গেছে। নেতাজীর আশ্রয়দাতা এই উত্তম চাদ আজ সর্বস্বান্ত হয়ে ভারতেই অবস্থান করছেন। তার দুর্দশার কথা তার নিজের মুখেই শুনুন : “কাবুলে আফগান গবর্ণমেন্টের হাতে বন্দী হবার কিছু পল্লই আমাকে ভারতে নির্বাসিত করা হয়েছিল। আমি কাবুলে যে সম্পত্তি ছেড়ে এসেছিলাম, তা ফিরে পাবার জন্য ভারত গবর্ণমেন্টের কাছে বহু আবেদন করেছিলাম । ১৯৪৫-এর ৩রা জানুয়ারী আমি ভারত গবর্নমেন্টের কাছ থেকে প্রাপ্ত একটি পত্রে জানতে পারি যে ১৯৪৩-এর ১৬ই ডিসেম্বর আফগান গবর্ণমেন্ট আমার সমস্ত অস্থাবর সম্পত্তি নীলামে বিক্রয় করেছেন। আমার সম্পত্তির মূল্য ছিল এক লক্ষ টাকা নেতাজী নি। কিন্তু বিক্রীত মূল্য দেখা যায় মাত্র ১২ হাজার টাকা। প্রকৃতপক্ষে অস্থাবর সম্পত্তির মাত্র এক তৃতীয়াংশ নীলামে চড়ানাে হয়েছিল—আর বিক্রীত মূল্যে দেখা যায় যে প্রতিটি বস্তু হাস্যকর ধরণের কম মূল্যে বিক্রয় করা হয়েছে। তাছাড়া, বিনা কারণে কয়েক প্রকারের ব্যবসায়ের মাল বাজেয়াপ্ত করে নেয়া হয়েছে। আমি গণনার বৈষম্য এবং বিক্রয়মূল্যের অন্যান্য ত্রুটি দেখিয়ে একটা স্মারকলিপি পাঠিয়েছিলাম, কিন্তু আজ পর্যন্ত তার কোন সন্তোষজনক উত্তর পাওয়া যায় নি কিংবা নীলামের বিক্রয়মূল্যও আমাকে দেওয়া হয় নি। আমাকে কাবুল থেকে তাড়িয়ে দেবার পূর্বে সম্পত্তির বিলি-ব্যবস্থা করার কোন সুযােগ বা সময় আমাকে দেওয়া হয় “আমার হিসাব বই এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট দলিলপত্রাদি আফগান গবর্ণমেন্টের কাছে আছে বলেই আমার কাবুল এবং পেশােয়ারের ব্যবসায়-প্রতিষ্ঠানের পক্ষে আফগানিস্থানে যাদের কাছে টাকা পাই, সে টাকা সংগ্রহ করার উপায়ও আমার নেই। আর্থিক দিক থেকে আমার সম্পূর্ণ সর্বনাশ হয়ে গেছে।” নেতাজীকে আশ্রয় দিতে গিয়ে দেশপ্রেমিক উত্তম চাদ এমনই ভাবে সর্বস্বান্ত হয়েছেন। দেশের স্বাধীনতার জন্যে তাঁর এই আত্মত্যাগের কথা দেশবাসীরা কখনও ভুলবে না। উত্তমাদের বর্ণিত কাহিনীতে দেখা যায় যে ভারতবর্ষে ২৬শে জানুয়ারী সুভাষচন্দ্রের গৃহত্যাগ কাহিনী প্রকাশিত হলেও, প্রকৃত প্রস্তাবে তিনি গৃহত্যাগ করেছিলেন ১৪ই জানুয়ারী এবং তার এ গৃহত্যাগ সুপরিকল্পিত। তঁার উদ্দেশ্য ছিল যে তিনি আফগানিস্থানের পথে রাশিয়ায় পৌছুবেন এবং রাশিয়ার ১০০ নেতাজী আশ্রয়ে থেকে যুদ্ধের সুযােগে বৃটিশ-বিরােধী প্রচার ও কাজের দ্বারা ভারতের স্বাধীনতাকে এগিয়ে দেবেন। ১৫ই জানুয়ারী রাত্রিবেল ট্রেণে মৌলবীর বেশে তিনি পেশােয়রের পথে রওনা হন। মৌলবী সাজার উদ্দেশ্যে তিনি প্রায় দেড় মাস ধরে সযত্নে গোঁফ দাড়ি বাড়তে দিয়েছিলেন। তিনি পেশােয়রে দুদিন ছিলেন । সেখান থেকে তার আফগানিস্থান যাবার সমস্ত ব্যবস্থা সম্পূর্ণ হবার পর তিনি ১৯শে জানুয়ারী হাঁটা পথে পেশােয়র ত্যাগ করেন। তাঁর সঙ্গে দুজন সশস্ত্র আফগান দেহরক্ষী ছিল আর ছিল রহমং খা-রূপী ভগৎব্রাম। সুভাষচন্দ্র নিজেও পাঠানের বেশ গ্রহণ করেছিলেন এবং নাম নিয়েছিলেন জিয়াউদ্দিন। তারা প্রথমে পূর্বপরিকল্পনা অনুসারে একটি উপজাতীয় সর্দারের আতিথ্য গ্রহণ করেন। সেখান থেকে দেহরক্ষী পাঠান দুজন ফিরে যায় এবং জিয়াউদ্দিন ও রহমং খা উপজাতীয় সর্দারের ছাড়পত্র নিয়ে তীর্থযাত্রার নামে আফগানিস্থান রওনা হন। পাথে বরফ, শীত ও পার্বত্য অঞ্চলের বন্ধুরতার জন্যে তারা খুবই কষ্ট পান। প্রায় দুদিন দুঃখকষ্টের পর তারা কোন রকমে কাবুলে এসে পৌঁছেন এবং একটা জঘন্য সরাইয়ে আশ্রয় গ্রহণ করেন। সুভাষচন্দ্রের ধারণা ছিল যে আফগানিস্থানস্থিত রুশ রাষ্ট্রদূতের কাছে নিজের পরিচয় দিলে, রাষ্ট্রদূত তার মস্কো পৌছানাের সকল ব্যবস্থা করে দেবেন। কাবুলে পৌছে তাদের প্রথম কাজ হল রুশ রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে সংযােগ স্থাপন করা। কিন্তু আফগান পুলিশের দৃষ্টি এড়িয়ে সােভিয়েট দূতাবাসে প্রবেশ করা কোনক্রমেই সম্ভব ছিল না। একদিন পথিমধ্যে রহমং খা রুশ রাষ্ট্রদূতের গাড়ী থামিয়ে তাকে কাবুলে ভারতের জাতীয় নেতাজী নেতা সুভাষচন্দ্রের উপস্থিতির কথা বলল এবং তার মস্কো যাবার ব্যবস্থা করতে অনুরােধ করল। কিন্তু রুশ রাষ্ট্রদূত অজুহাত দিলেন যে তিনি সুভাষচন্দ্রকে চেনেন না—কাজেই কিভাবে তাকে সাহায্য করবেন ? হতাশ হয়ে তারা আফগানিস্থানের জার্মান ও ইটালীয় দূতাবাসের খোঁজ নিতে লাগলেন। এমনই করে তাদের কয়েকদিন কেটে গেল। এদিকে ভারতবর্ষে সুভাষচন্দ্রের পলায়নের কথা রাষ্ট্র হয়ে গেছে এবং তাকে ধরার জন্যে ভারত গবর্নমেন্ট সচেষ্ট হয়ে উঠেছেন। প্রতি মুহূর্তে তাদের বিপদের আশঙ্কা। তার উপর যে সরাইয়ে তারা থাকতেন, সেখানে একটি দুষ্টবুদ্ধি আফগান গােয়ন্দা তাদের পিছু নিয়েছিল। তীর্থযাত্রায় যাবার জন্যে তাগাদা দিত এবং সেই সুযােগে তাঁদের কাছ থেকে জোর করে ঘুষ আদায় করত। এই গােয়েন্দার হাত থেকে বাঁচার জন্যেই রহম খা কাবুলের ব্যবসায়ী উত্তমর্চাদের খোঁজে যায়। রহমং খ-রূপী ভগৎরাম এক সময় উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের নওজোয়ান ভারত-সভার কর্মী ছিল এবং উত্তমাদ ছিলেন সম্পাদক। সেই সূত্রে ভগৎব্রাম কাবুলে উত্তমদের ব্যবসায়ের কথা জানত। উত্তমৰ্চাদের দোকান খুঁজে বের করে তার কাছে সুভাষচন্দ্রের কাবুলে উপস্থিতি এবং সরাইয়ে তাদের পিছনে আফগান গােয়েন্দা লাগার কথা বলল। উত্তমচাদ তখন নিজের গৃহে জিয়াউদ্দিনরূপী সুভাষচন্দ্রকে আশ্রয় দিতে সম্মত হলেন। ১৯৪১ এর ৩রা ফেব্রুয়ারী জিয়াউদ্দিন ও রহমৎ খা উত্তমূৰ্চাদের গৃহে গিয়ে উঠলেন। রুশ রাষ্ট্রদূতের কাছে হতাশ হয়ে সুভাষচন্দ্র ইটালীয় দূতাবাসের সঙ্গে সংযােগ স্থাপনের চেষ্টা করলেন এবং সহজেই সে সংযােগ স্থাপন রহমং খা ১০২ নেতাজী যত সম্ভব হল। ইটালীয় দূতাবাসের ভারপ্রাপ্ত কর্মচারী সিনাের কাবােনি ও তার স্ত্রী সুভাষচন্দ্রকে রােম কিংবা বালিনে নিয়ে যাওয়া সম্বন্ধে খুবই উৎসাহ প্রকাশ করলেন। সেই মর্মে তারা রােম ও বালিনে সংবাদও পাঠালেন। একদিক থেকে সুভাষচন্দ্র নিশ্চিন্ত হলেও তার বােম কিংবা বার্লিনে যাবার উৎসাহ ছিল না। তার বরাবর ইচ্ছা ছিল রাশিয়া যাবার । তাই পেশােয়র থেকে যারা, তাকে কাবুলে পাঠিয়েছিলেন, তারা রুশ দূতাবাসের সঙ্গে সংযােগ স্থাপনের ব্যবস্থা করে দিতে পারেন কিনা জানার জন্যে পেশােয়ারে খবর পাঠানাে হল। এদিকে সংবাদের প্রত্যাশায় কাবুলে বসে থাকাও নিরাপদ নয়। শীঘ্র তিনি ওদেশ থেকে বেরুতে পারেন ততই মঙ্গল। তাই অন্য উপায়ও চিন্তা করা হতে লাগল। উমাদের বর্ণিত কাহিনী থেকে দেখা যায় যে সুভাষচন্দ্রের অক্ষশক্তির প্রতি আদৌ কোন প্রীতির মনােভাব ছিল না। বরং তাকে বার্লিনে কিংবা রোমে যেতে হবে এ সম্ভাবনাকেই যেন তিনি ভাল চোখে দেখতেন না। কাবুলস্থিত একজন জার্মান ব্যবসায়ীর মারফং ইটালীয় দূতাবাসের সঙ্গে সংবাদ আদান-প্রদান চলতে লাগল । সিনাের কাবােনি যত শীঘ্র ব্যবস্থা করতে পারবেন ভেবেছিলেন, তা পারলেন না। তখন রােম কিংবা বালিনে যেতে হলে, মস্কোর পথে যেতে হত। বােধ হয় ছাড়পত্রের ব্যাপার নিয়ে রুশ কতৃপক্ষের সঙ্গে বিরােধের ফলেই বিলম্ব হচ্ছিল। রাশিয়ার সঙ্গে জার্মানী ও ইটালীর মৈত্রীচুক্তি তখনও বলবৎ থাকলেও, এদের মধ্যে পারস্পরিক সম্প্রীতি খুব বেশী ছিল না। যত বিলম্ব হচ্ছিল, সুভাষচন্দ্রও ততই অধীর হয়ে উঠেছিলেন। রুশ রাষ্ট্রদূতের হাতে ১০৩ নেতাজী দেবার জন্যে তিনি একখানা চিঠি লিখে উত্তমচাদকে দিয়েছিলেন। তার সম্বন্ধে রাশিয়ার সরকারী মনােভাব কি তাই জানাই ছিল, তার প্রধান উদ্দেশ্য। কিন্তু উত্তমচাদ কোন ক্রমেই সে চিঠি রুশ দূতাবাসে পাঠানাের ব্যবস্থা করতে পারেন নি। এদিকে উত্তমদ সুভাষচন্দ্রের মস্কো যাবার আগ্রহ দেখে অন্য পথের চিন্তা করতে লাগলেন। তিনি এম্' নামক একটি লােককে জানতেন। এই লােকটি এক সময় আফগান-রুশ সীমান্তের অধিবাসী ছিল এবং একটি লােককে হত্যা করে সে আফগানিস্থানে এসে পালিয়ে ছিল। আফগানিস্থান ও রাশিয়ার মধ্যে যে হাঙ্গো নদী প্রবাহিত, তার তীর পর্যন্ত তার যাতায়াত ছিল এবং উভয় দেশের মধ্যে লুকিয়ে যারা চোরাকারবার চালায় এরূপ অনেক লােকের সঙ্গেও তার পরিচয় ছিল। উত্তমদ সুভাষচন্দ্রের নাম না জানিয়ে এরই কাছে জানতে চাইলেন য়ে কোন লােক যদি গােপনে আফগান-সীমান্ত অতিক্রম করে রাশিয়ায় যেতে চায়, তবে টাকার বিনিময়ে সে তাকে সাহায্য করতে পারবে কি না। সে বলল নিশ্চয়ই পারবে। তার সঙ্গে ৭০০ আফগানী টাকায় রফা হল। তবে উত্তমদ তাকে জানালেন যে যিনি যাবেন, তিনি এখনও এসে পৌছান নি। এসে পৌছুলেই তাকে খবর দেওয়া হবে। সেদিন রাত্রে বাড়ী ফিরে উত্তমর্চাদ সুভাষচন্দ্রকে ‘এ’ এর কথা বললেন এবং তিনিও এ পরিকল্পনায় উৎসাহ প্রকাশ করলেন। সুভাষচন্দ্রের ভাব দেখে উত্তমষ্টাদ একটা জিনিষ স্পষ্ট বুঝতে পারছিলেন যে তার বার্লিন কিংবা রােমে যাবার আদৌ কোন ইচ্ছা ছিল না—ইচ্ছা ছিল মস্কো যাবার। ১০৪ নেতাজী কিন্তু বাধ্য হয়ে তাকে রােম-বার্লিন এক্সিসের সহায়তা নিতে হয়েছিল। তিনি কাবুল ত্যাগের সময় উত্তমদকে এমন কথাও বলে গিয়েছিলেন যে বার্লিন যাবার পথে মস্কোতে তার পক্ষে থেকে যাওয়া যদি সম্ভবও হয়, তবে তিনি বার্লিনে পৌছে সেখানকার রুশ দূতাবাসের মারফৎ একবার মস্কো যাবার চেষ্টা করবেনই। চেষ্টা তিনি হয়ত করেও ছিলেন কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যে তাঁর সে চেষ্টা সফল হয় নি। একথা ভুললে চলবে না যে সুভাষচন্দ্র ১৯৪১ এর মার্চ মাসের শেষে বার্লিন পৌছান এবং ১৯৪১ এর ২২শে জুন রুশ-জার্মান যুদ্ধ আরম্ভ হয় । ‘এ’ এর সঙ্গে আফগান সীমান্ত অতিক্রম করার ব্যবস্থা যখন প্রায় ঠিক ঠাক, এমন সময় ইটালীয় দূতাবাসের ভারপ্রাপ্ত কর্মচারী সিনাের কাবরানির চিঠিতে জানা গেল যে সুভাষচন্দ্রের বার্লিন যাবার সমস্ত ব্যবস্থা ঠিক হয়ে গেছে এবং তাকে নেবার জন্যে রােম থেকে লােক এসেছে। শেষ পর্যন্ত সুভাষচন্দ্র ইটালীয়দের সহায়তায় আফগানিস্থান ত্যাগ করাই সমীচীন মনে করলেন। তার কারণ এম’ এর সঙ্গে গেলে রুশসীমান্তে পৌঁছানাের পূর্বেই বিপদে পড়বার সম্ভাবনা আছে। তার পর রাশিয়ায় পৌছে রুশদের হাতেও বন্দী জীবন যাপনের সম্ভাবনা আছে। এ দুটি বিপদের কোনটিকেই তিনি স্বেচ্ছায় বরণ করতে রাজী ছিলেন না। কয়েকদিন পরে ইটালীয়দের তরফ থেকে তার ফটো নেওয়া হল। ১৯৪১এর ১৮ই মার্চ সুভাষচন্দ্র ক্যারাটিন নাম গ্রহণ করে দুজন জার্মাণ ও একজন ইটালীয়ের সঙ্গে মােটরে আফগান সীমান্তের দিকে রওনা হলেন। তারপর রুশভূমিতে পদার্পণ করে ২০শে মার্চ সুভাষচন্দ্র ট্রেনযােগে মস্কো রওনা হলেন। তার সঙ্গে নেতাজী যে জামাণরা ছিলেন তারা তাকে সােজা বার্লিন নিয়ে গেলেন। সুভাষচন্দ্র ১৮শে মার্চ বালিন পৌছান। কাবুল ত্যাগ করার মাস তিনেক পরে সুভাষচন্দ্র বালিন থেকে কাবুলে এক জাৰ্মাণ ভদ্রমহিলার কাছে একটি চিঠি লিখেছিলেন। তাতে উত্তমর্চাদের উদ্দেশ্যে সম্বন্ধে লেখা ছিল : “উত্তমচাদ নমস্তে। আপনি আমার জন্যে যা করেছেন সে জন্যে আমি খুব কতজ্ঞ। আমি সারা জীবনে সে কথা ভুলব না। জিয়াউদ্দিন।

স্বাধীনতার সৈনিক ১৯৪১ এর মার্চ মাসে জাৰ্মাণীতে পদার্পণ করার পর থেকে সুভাষচন্দ্রের জীবনে এক সম্পূর্ণ নতুন অধ্যায়ের সৃষ্টি হল। স্বাধীনতার এই বীর সৈনিক মাথার উপর বিরাট বিপদের ঝুঁকি নিয়ে বসে থাকার জন্যে স্বদেশ থেকে বিদেশে পালিয়ে যান নি-এ কথা সহজেই পরে নেওয়া চলে। তিনি গেছিলেন বৃটেনের শত্রুদের সাহায্য নিয়ে কিভাবে নিজের দেশ থেকে সাম্রাজ্যবাদের মূলােচ্ছেদ করবেন—সেই চেষ্টায় । কিন্তু তখন জাৰ্মাণী কাণত রাশিয়া এবং ইংল্যাণ্ড ছাড়। সমগ্র ইউরােপ বিজয়ী হলেও, ভারতের সীমান্ত থেকে যুদ্ধ তখনও অনেক দূরে। জার্মণী ও ইতালীতে ভারতীয় স্বাধীনতা লাভের জন্যে আজাদ হিন্দ ফৌজ সংগঠনে সুভাষচন্দ্রের প্রয়াস আজ কিছু কিছু জানা গেলেও তার অনেক কিছু আজও অজানা আছে। ব্ৰহ্ম সীমান্তে তার কার্যকলাপের ইতিহাস সমস্ত না জানা গেলেও অনেক বিস্তৃত বিবরণ পাওয়া গেছে। সে তুলনায় তাঁর ইউরােপ-প্রবাসী জীবনের কার্যকলাপ প্রায় অজ্ঞাত বললেও অত্যুক্তি হয় না। ১৯৪৩ এর মাঝামাঝি সাবমেরিণ সহযােগে ব্রহ্মাঞ্চলে পদার্পণের পূর্ব পর্যন্ত সুভাষচন্দ্র প্রায় দুই বৎসর কাল হিটলারের জার্মাণীতে সসম্মানে ছিলেন। এই কর্মবীর যে এ সময়টা নিশ্চিন্ত আরামে বসে কাটান নি—এটা ধরে নেওয়া চলে। বিগত বিশ্বযুদ্ধের দিক থেকে ১৯৪১ সালটি ছিল বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। আমরা জানি সুভাষ- চন্দ্রের রাশিয়ায় যাবার একটা অদম্য আকাঙ্ক্ষা ছিল। তিনি জামাণীতে ১০৭ নেতাজী পৌছিলে তার মত প্রতিষ্ঠাবান ভারতীয় জননেতাকে জাৰ্মাণ রাষ্ট্রনায়ক হিটলার সসম্মানে অভ্যর্থন করেছিলেন—একথা বােধ হয় সহজেই কল্পনা করে নেওয়া যায়। সুভাষচন্দ্রের মত জননেতাকে বৃটিশ-বিরােধী প্রচারকাযে ব্যবহার না করে তাকে রুশদের হাতে ছেড়ে দেবার অভিপ্রায় জার্মাণ কতৃপক্ষের মনে উদিত হবার কোনই কারণ নেই। তা ছাড়া সুভাষচন্দ্রের বালিন পৌছানাের মাত্র তিন মাসের মধ্যেই ১৯১১ এর ২২শে জুন জার্মাণী অকস্মাৎ রুশ-জামাণ অনাক্রমণ চুক্তি ভঙ্গ করে প্রায় ৫০ লক্ষ সৈন্য ও বিপুল সমরেপকরণ নিয়ে ১০ ০ ০ মাইল রণাঙ্গনে সােভিয়েট রাশিয়াকে আক্রমণ করে বসল। অতএব এর পর সুভাষচন্দ্রের রাশিয়ায় যাবার সকল আশা নিমূল হয়ে যাওয়াই স্বাভাবিক। রুশ-জার্মাণ যুদ্ধের সে তীব্রতা ও ভয়াবহতা কল্পনারও অতীত। এই ঘটনার মাত্র কয়েক মাস পরেই প্রাচ্যে বিশ্বযুদ্ধ আবার একটি উল্লেখযোগ্য মােড় ঘুরল। ১৯৪১ এর ৭ই ডিসেম্বর সুদূর প্রাচ্যে জাপান অকস্মাৎ আমেরিকার পার্লারে অতর্কিত আক্রমণ চালিয়ে একসঙ্গে আমেরিকা ও ইংল্যান্ডকে প্রত্যক্ষ সংগ্রামে আহ্বান করল। মাত্র তিন মাসের মধ্যে প্রশান্ত মহাসাগরে এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় জাপান সে বিজয়-সাফল্য অর্জন করল, তার তুলনা ইতিহাসে মেলে কিনা সন্দেহ। জাপানী বাহিনী যুগপৎ অভিমানে প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপাঞ্চল থেকে যেমন মার্কি শক্তির উচ্ছেদ করল, তেমনই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সিঙ্গাপুর, মালয় ও ব্ৰহ্ম সাম্রাজ্যবাদী বৃটিশদের অধিকার থেকে নিল কেড়ে। জাপবাহিনী ভারতব্ৰহ্ম সীমান্তে এসে দাড়াল থমকে। জাপবাহিনী ইংরেজবিরােধী যুদ্ধে অবতীর্ণ হবার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ১০৮ নেতাজী বাঙ্গলার রাজনৈতিক জীবনেও দেখা দিল তার প্রতিক্রিয়া। ডিসেম্বর ১৯৪১ সালে বঙ্গীয় ব্যবস্থা পরিষদে কংগ্রেস দলের দলপতি সুভাষচন্দ্রের প্রিয় মেজদাদা শ্ৰীযুক্ত শরৎচন্দ্র বসু ভারত গবর্ণমেন্টের আদেশে গ্রেপ্তার হলেন। সরকার পক্ষ থেকে জানানাে হল যে জাপানীদের সঙ্গে শ্ৰীযুক্ত বসুর যােগাযােগ আছে বলেই তাঁকে গ্রেপ্তার করা হল। জনসাধারণ বিস্মিত স্তম্ভিত হয়ে সরকারপক্ষের অভিযােগ শুনল, কিন্তু অন্তরে অন্তরে প্রতিবাদের ধ্বনি মুখর হয়ে উঠলেও, বাইরে তার প্রকাশ হল না। হবার কারণ যুদ্ধকালীন ভারতরক্ষা বিধানে জনগণের কণ্ঠ তখন অবরুদ্ধ। সরকারী বিজ্ঞপ্তির ধাঁচ দেখে জনগণের মনে একথা জাগল যে ভারতমাতাকে বৈদেশিক শৃঙ্খল মুক্ত করার জন্যে সুভাষচন্দ্র হয়ত বা জাপানেই গেছেন। এরপর এল ভারতের স্বাধীনত। সংগ্রামে ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ ১৯৪২ সাল। এই সালের মার্চ মাসে রেঙ্গুণ জাপানীদের করতলগত হল। সিঙ্গাপুর ও রেঙ্গুণের পতনে কলিকাতায় তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিল। যে কোন মুহূর্তে কলকাতায় বােমা পড়তে পারে—এই ভয়ে নাগরিকরা কলকাতা ছেড়ে চলে যেতে লাগল সুদূর মফঃস্বলে। জাপানের অস্বাভাবিক অগ্রগতিতে স্বয়ং বৃটিশ প্রভুরা পর্যন্ত ভয় পেয়ে গেলেন। তারা জানতেন যে এ সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধে জাতীয়তাবাদী ভারতের পূর্ণ সমর্থন তারা পান নি। কংগ্রেস স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে যুদ্ধের উদ্দেশ্য সুস্পষ্টভাবে ঘােষণা করলে, ভারতকে অবিলম্বে স্বাধীনতা দিয়ে সমান অংশীদাররূপে গ্রহণ করলে, কয়েন বৃটিশদের সঙ্গে পূর্ণ মাত্রায় সহযােগিতা করতে প্রস্তুত। যুদ্ধান্তের কিছুকাল পরেই প্রদেশে প্রদেশে কংগ্রেস মন্ত্রিমণ্ডল পদত্যাগ করে- নেতাজী ছিলেন। ফলে দুই একটি প্রদেশে লীগ মন্বিমণ্ডল ছাড়া অধিকাংশ প্রদেশেই চলছিল ৯৩ ধারার শাসন। সমগ্র ভারতে তখন রাজনৈতিক অচল অবস্থা। এই রকম দুর্দশায় পড়ে ১৯৭২ এর এপ্রিল মাসে এলেন স্যার স্ট্যাফোর্ড ক্রীপস ভারতের সঙ্গে একটা বােঝাপড়া করতে। তার পূর্বে মার্চ মাসেই নাকি রােম রেডিও থেকে ঘােষণা করা হয়েছিল যে ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের ভূতপূর্ব সভাপতি শ্ৰীযুক্ত সুভাষচন্দ্র বসু বার্লিনে এসেছেন এবং ফুয়েরার কতৃক রাজোচিত অভ্যর্থনায় অভিনন্দিত হয়েছেন। তাকে সামরিকভাবে স্বাধীন ভারতের প্রতিনিধি রূপে গ্রহণ করা হয়েছে। স্বাধীন ভারতের রাষ্ট্রদূতের পদমযাদা নিয়ে তিনি বার্লিনেই আছেন। এর পরের পরেই বার্লিন রেডিও থেকেও একটা অনুরূপ ঘােষণা করা হয়েছিল বলে প্রকাশ। মার্চ মাসের মাঝামাঝি সুভাষচন্দ্র বালিন রেডিও থেকে ভারতবাসীদের উদ্দেশ্যে তাঁর প্রথম বক্তৃতা দিয়াছিলেন। বালিন রেডিও থেকে ইতিপূর্বে আর কখনও কোন বিদেশীকে বক্তৃতা দেবার সুযােগ দেওয়া হয় নি বলে বেতার-ঘােষক জানিয়েছিলেন । অনেক ভারতবাসীই হয়ত সুভাষচন্দ্রের এই বেতার বক্তৃতা শুনেছিলেন এবং তার পরিচিত কণ্ঠস্বর শুনে আশ্বস্ত হয়েছিলেন। কিন্তু তখন ভারতরক্ষা বিধানাবলীর দ্বারা সমগ্র ভারত আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা ছিল বলেই তার বেতার বক্তৃতা নিয়ে খুব বেশী আলাপ আলােচনা হয় নি—জনসমাজে শুধু কাণাঘুসো চলত। সুভাষচন্দ্রের কণ্ঠে সেই চিরদিনের সংগ্রামের বাণী । তিনি দেশবাসীদের ইংরেজের সঙ্গে কোন প্রকার আপোষ বা না করতে অনুরােধ জানিয়েছিলেন- তাদের উৎসাহিত করেছিলেন সংগ্রাম চালানাের জন্যে। বৃটিশদের নেতাজী সঙ্গে আপােষরফায় ভারতের স্বাধীনতা ব্যাহত হবে এই ছিল তার সুচিন্তিত অভিমত। সুভাষচন্দ্রের এই বিরুদ্ধ প্রচারকার্যের জবাব স্বরূপই যেন এল ১৯৪২ এর এপ্রিল মাসে ক্রীপস প্রস্তাব। দিল্লীতে ১৭ দিন ব্যাপী আলাপ আলােচনার পর কিভাবে সে প্রস্তাব ব্যর্থতায় পর্যবসিত হল, দেশবাসীদের কাছে তা সুবিদিত। এই সময় সুভাষচন্দ্র বালিন রেডিও থেকে দ্বিতীয় বেতার-বক্তৃতা দিয়েছিলেন এবং সে বক্তৃতায় ক্রীপস প্রস্তাবের পরিপূর্ণ বিয়ােধিতা করেছিলেন বলে শােনা যায়। তিনি গ্রামে গ্রামে প্রতিরোধ বাহিনী গড়ে তুলে সাম্রাজ্যবাদ-বিরােধী সংগ্রামকে বাঁচিয়ে রাখার নির্দেশ দিয়েছিলেন। জামাণীতে তখন সুভাষচন্দ্র তার আজাদ হিন্দ ফৌজ গড়ে তুলেছিলেন কিনা জানা যায় না। তবে মনে হয় যে ক্রীপস প্রস্তাবের ব্যর্থতার পর ১৯৪১ এর ৮ই আগষ্ট জাতীয় কংগ্রেস বােম্বাইতে যখন তার সংগ্রামের বাণী ঘােষণা করেন, তখন সুভাষচন্দ্রও জার্মাণীতে আজাদ হিন্দ ফৌজ সংগঠনে ব্যস্ত ছিলেন। ৯ই আগষ্ট জাতীয় কংগ্রেসের নেতৃবৃন্দ গ্রেপ্তার হন এবং সারা ভারত তার প্রতিবাদে আন্দোলিত হয়ে ওঠে। এর পূর্বে জুলাই মাসে আফ্রিকায় লিবিয়ার যুদ্ধে জার্মাণ ফিল্ড মাশাল রােমেল অপরিসীম বীরত্ব দেখিয়ে ইংরেজ বাহিনীকে ভীষণ ভাবে পযুদস্ত করেছিলেন। তার হাতে বহু ভারতীয় সৈন্যও ধরা পড়েছিল। এই সুযােগ গ্রহণ করতে সুভাষচন্দ্র কালবিলম্ব করলেন না। তিনি ধৃত ভারতীয় বন্দীদের মনে নিজের জ্বলন্ত স্বদেশ- প্রেমেরবহ্নিশিখা জ্বালিয়ে তুললেন। বন্দীরা অনেকে স্বেচ্ছায় আজাদ হিন্দ ফৌজে যােগ দিলেন। জামাণীতেগঠিত আজাদ হিন্দ বাহিনীর সৈন্য সংখ্যা ১১১ নেতাজী কত ছিল, তা নিশ্চিত করে বলা শক্ত—কারও মতে ৭ হাজার, আবার কারও মতে বা ৪ হাজার। ১৯৪৩ সালের গােড়ায় সুভাষচন্দ্র যখন জামাণী ত্যাগ করে সাবমেরিণ যােগে প্রাচ্য রণাঙ্গনে পদার্পণ করেছিলেন, তখন তার সঙ্গে একই সাবমেরিণে এসেছিলেন তাঁর পাসাল সেক্রেটারী মেজর আবিদ হাসান। সম্প্রতি তিনি এবং নেতাজীর ষ্টাফ অফিসার মেজর এন. জি. স্বামী ভারতে এসে পৌঁছেছেন। মেজর হাসানের বিবৃতিতে প্রকাশ যে জাৰ্মাণীতে আজাদ হিন্দ ফৌজের সৈন্যসংখ্যা ছিল ৪ হাজার। উত্তর আফ্রিকায় ধৃত ভারতীয় যুদ্ধবন্দীরা ছাড়া জামাণী প্রবাসী ভারতীয়রাও এই জাতীয় বাহিনীতে যােগ দিয়েছিলেন। মেজর হাসান আজাদ হিন্দ ফৌজে যােগদানের পূর্বে জার্মাণীতে ছাত্র ছিলেন এবং মেজর স্বামী একটি জার্মান ফার্মে কাজ করতেন। পূর্বেই বলেছি যে হিটলার গবর্ণমেন্ট প্রথম থেকেই সুভাষচন্দ্রকে স্বাধীন ভারতের প্রতিনিধির সম্মান দিয়েছিলেন। সুভাষচনের নেতৃত্বে যখন আজাদ হিন্দ ফৌজ গঠিত হল, তখন সে বাহিনীর পদমর্যাদাও হল মৈত্রী-সূত্রে আবদ্ধ স্বাধীন দেশের সেনাবাহিনীর অনুরূপ। এই বাহিনীর একজন ভূতপূর্ব সৈন্যের বিবৃতিতে প্রকাশ যে শুধু হিটলার এবং অন্যান্য উচ্চ জার্মান রাজপুরুষরা নন, সমগ্র জার্মান জাতিই নেতাজীকে সম্ভ্রমের চোখে দেখত এবং ভারতীয় সেনাবাহিনীও তাদের কাছে যথােচিত সম্ভম পেত। ড্রেসডেনে আজাদ হিন্দ ফৌজের শিক্ষা-শিবির ছিল বলে প্রকাশ। সেখানে সুভাষচন্দ্রের সর্বাধিনায়কত্বে জার্মাণ সেনাপতিরা আজাদ হিন্দ ফৌজকে উচ্চতর রণকৌশল শিক্ষা দিতেন। আজাদ হিন্দ ফৌজের নিজস্ব বেতারকেন্দ্র ছিল এবং সৈন্যদের সুখ সুবিধা ও আমােদ-প্রমােদের ১১২ নেতাজী সর্বপ্রকার সুবন্দোবস্ত ছিল। এই মুক্ত সৈনিকটির বিবৃতিতে প্রকাশ যে হিটলার সুভাষচন্দ্রের ব্যবহারের জন্য ড্রেসডেনে একটি প্রাসাদোপম অট্টালিকা ছেড়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি বার্লিনেই বেশীর ভাগ সময় কাটাতেন। তাঁর ব্যবহারের জন্যে জামাণ ড্রাইভার-পরিচালিত এক বিশেষ মােটরেরও ব্যবস্থা ছিল। সুভাষচন্দ্রের মােটরে স্বাধীন ভারতের ত্রিবর্ণরঞ্জিত জাতীয় পতাকা সগৌরবে উড্ডীয়মান থাকত। এই আ ঈদ হিন্দ ফৌজকে উপযুক্ত শিক্ষা দিয়ে বিভিন্ন রণাঙ্গনে প্রেরণ করা হয়েছিল। তবে জানা যায় যে রুশ রণাঙ্গনে আজাদ হিন্দ ফৌজের কোন সৈন্য প্রেরণের অনুমতি সুভাষচন্দ্র দেন নি। শুধু জাৰ্মাণীতেই আজাদ হিন্দ ফৌজের আন্দোলন সীমাবদ্ধ ছিল এরূপ মনে করলে ভুল করা হবে। নেতাজীর স্বদেশপ্রেমের আশে অনুপ্রাণিত হয়ে ইটালীতেও ভারতীয় যুদ্ধবন্দীদের নিয়ে একটি গাতীয় বাহিনী সংগঠিত হয়েছিল। এই বাহিনী সংগঠনের উদ্দেশ্য ছিল--এদের ইটালীতে শিক্ষা দিয়ে ভারত সীমান্ত বা অন্যত্র-ইমার্কিন বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধার্থ প্রেরণ করা। জাৰ্মাণীতে অবস্থান করার সময়, সুভাষচন্দ্র একাধিকবার ইটালী পরিদর্শন করেছিলেন এবং সেখানে জনগণ ও ইটালী গবর্নমেন্ট কতৃক যথােচিত সম্বৰ্ধিত হয়েছিলেন—এ সংবাদও আজ জানা গেছে। কোচিন ষ্টেটের মিঃ অ্যান্টনি এলেজিমিল্লাম নামক এক ভদ্রলােক ১৯৩৫ থেকে ১৯৪২ পর্যন্ত ইটালীতে ছিলেন। তিনি Inside Italy নামক একটি প্রবন্ধে সুভাষচন্দ্র প্রসঙ্গে লিখেছেন : “মাঝে মাঝে সুভাষচন্দ্র বার্লিন থেকে বােমে আসতেন এবং সংবাদ- পত্রাদিতে তাঁর ব্যক্তিত্ব, ভাবধারা এবং কার্যাবলীর বিস্তৃত বিবরণ নেতাজী প্রকাশিত হত। আদর্শবাদের দিক থেকে সুভাষচন্দ্র ফ্যাসিজম এবং নাৎসীবাদ থেকে বহু দূরে থাকলেও বহু ইটালীয় তঁাকে সহজ বিশ্বাসে ভারতীয় ফ্যাসিষ্ট নেতা বলে মনে করত। রাজনীতি-সচেতন এবং জাতীয় ভাবধারায় অনুপ্রাণিত প্রত্যেক ভারতীয়ের মনে যে স্বপ্ন--- মাতৃভূমির সেই স্বাধীনতার দীর্ঘকাল পােষিত স্বপ্নকে বাস্তবে পরিণত করার জন্যে সুভাষচন্দ্র জামাণী ও ইটালীর কাছ থেকে, পরে জাপানের কাছ থেকেও, যা কিছু সাহায্য পেতেন, তা সঙ্গে সঙ্গে গ্রহণ করতেন। অনেক ইটালীয় মনে করত যে তিনি বাস্তববাদী এবং ভারতের সর্বাপেক্ষ। বেশী বাস্তববাদী রাজনীতিবিদ তারা ভারতের স্বাধীনতা লাভের জন্যে গান্ধীজীর শান্তিবাদে কিংবা পণ্ডিত নেহেরুর আদর্শবাদে বিশ্বাস করত না। ফ্যাসিষ্ট ইটালী ছিল মর্মে মর্মে ম্যাকিয়াভেলীর অনুগামী --কাজই সমস্ত ভারতীয় নেতার মধ্যে সুভাষচন্দ্রকেই তাদের নিকটতম বলে মনে হত। যুদ্ধের সময় সুভাষচন্দ্রকে কেন্দ্র করে কয়েকটি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছিল যার মধ্যে ভারতবন্ধু সমিতি বিশেষ উল্লেখযােগ্য। প্রচার কার্য এবং সংবাদ সংগ্রহের জন্যে পররাষ্ট্র দপ্তর এগুলােকে ব্যবহার করত। সুভাষচন্দ্রের গতিবিধি সম্বন্ধে কড়া সামরিক গােপনতা বজায় রেখে চলা হত। সময় সময় তিনি কোথায় আছেন, সংবাদপত্রাদিতে তার বিবরণ বেরুতে এবং তার কার্যকলাপ সম্বন্ধে সরকারী বিবরণও প্রকাশিত হত ! জাৰ্মাণীর সামরিক বিপর্যয় ঘটতে আরম্ভ করার সঙ্গে সঙ্গে, সুভাষচন্দ্রের নামও পিছনে পড়ে যেতে লাগল। এর পর আজাদ হিন্দ ফৌজের অপি- নায়করূপে ব্রহ্মে তার পুনরাবির্ভাব দেখা গেল। ১৯৪১ সালে অনেক ১১৪ নেতাজী ইটালীয় মনে করত যে সুভাষচন্দ্র ভারতের ডুচে বা ফুয়েরার হবেন এবং শক্তিশালী মুসংবদ্ধ কেন্দ্রীয় গবর্ণমেন্টের মারফৎ ভারতের বহুবিধ সাম্প্রদায়িক, সামাজিক এবং ধর্মসম্বন্ধীয় ব্যাধির অবসান ঘটাবেন। তঁার খ্যাতি ও মর্যাদা বেড়েই চলেছিল; তাঁর যশােভাগ্যে কখনও ভাটা পড়ে নি। অক্ষশক্তির গভর্নমেন্ট গুলি তার স্বাধীন চিত্ততার সম্বন্ধে সর্বদা সচেতন ছিলেন এবং ভাল ভাবেই জানতেন যে তিনি কখনও ফ্যাসিষ্ট এবং নাৎসীদের হাতে অস্ত্র কিংবা পুতুল বিশেষ হবেন না।” ইউরােপে জার্মাণী এবং ইটালীর সঙ্গে আচরণে সুভাষচন্দ্র যেমন তাঁর স্বাধীনচিত্ততা বরাবর বজায় রেখেছিলেন, পরে জাপানের সঙ্গে তার ব্যবহারেও এই স্বাধীন চিত্ততা পূর্ণমাত্রায় বিদ্যমান ছিল। কুটি দেখিয়ে তাকে দিয়ে বিবেক-বিরুদ্ধ কোন কাজ করিয়ে নেওয়া সম্ভব ছিল না—বৃটিশ গবর্নমেন্ট, জামান গবর্ণমেন্ট, ইটালীয় গবর্ণমেন্ট, কিংবা জাপান গবর্ণমেন্টের কেউ তা করতে পারেন নি। সুভাষচন্দ্রের নেতৃত্বের বিশেষত্ব এইখানে। যাই হােক, এবার ইটালীতে জাতীয় বাহিনী গঠনের কথা সমাপ্ত করি। ইটালীতে যে জাতীয় বাহিনী গঠিত হয়েছিল, সে বাহিনী কোন রণাঙ্গণে পাঠাবার পূর্বেই ইটালীর সামরিক কতৃপক্ষ এবং ইটালীস্থিত জাতীয় বাহিনীর কতৃপক্ষের মধ্যে বিরােধ দেখা দিল। ইটালীয়রা চাইল ভারতীয় সেনাবাহিনীর উপর প্রভুত্ব করতে । ভারতীয় কতৃপক্ষ এতে আপত্তি জানিয়ে জাতীয় বাহিনী ভেঙ্গে দিলেন। ফলে সৈন্যরা পুনরায় ইটালীয়দের হাতে বন্দী হল। লিবিয়ার যুদ্ধে যে অনেক ভারতীয় সৈন্য ধরা পড়েছিল, তাদের মধ্যে থেকে সৈন্য নেতাজী নিয়ে এই জাতীয় বাহিনী গড়ে তোেলার জন্যে মিঃ ইকবাল সইদাই এবং মিঃ নিরঞ্জন সিং বন্দীদের শিবিরে শিবিরে বক্তৃতা দিয়ে ফিরেছিলেন। সৈন্যরা দাবী করল যে ভারতের জন্যে ছাড়া অন্য কারও জন্যে তারা যুদ্ধ করবে না। একটি বক্তৃতা প্রসঙ্গে মিঃ সইদাই তাদের ভরসা দিলেন : “তােমাদের রণাঙ্গণ হবে ভারত সীমান্তে, লিবিয়ায় নয়।” এই ভরসায় সন্তুষ্ট হয়ে তখনই দুই হাজার সৈন্য স্বেচ্ছায় জাতীয় বাহিনীতে যােগ দিল। এমনই ভাবে ইটালীতে জাতীয় বাহিনীর সৃষ্টি হল। স্বেচ্ছা-সৈনিকদের অন্যান্য বন্দী-সৈন্যদের নিকট থেকে সরিয়ে নেওয়া হল এবং তাদের ইটালীতে পাঠান হল। ইটালীতে শিক্ষাশিবির স্থাপন করে তাদের সামরিক বিদ্যায় নিপুণতর করে তােলার প্রয়াস পাওয়া হল। প্রায় ১০০ সৈন্য নিয়ে গঠিত প্রথম একটি দল জাতীয় ত্রিবর্ণরঞ্জিত পতাকা উড়ােলন করে এই সংকল্প গ্রহণ করল : “ময় তেরেঙ্গে কো সাক্ষী দে কর প্রতিজ্ঞা করতা কি ভারতমাতাকে আজাদ করনে কি লিয়ে আংরেজোঁ অউর আমেরিকাননা কে বিরুধ, তন মন ধন সে লড়ঙ্গ।।” ১৯৪২ এর সেপ্টেম্বর মাসের মাঝামাঝি এই প্রথম দলকে উচ্চতর সামরিক শিক্ষার জন্যে পাঠানাে হল বােমে। সেখানে ইটালীয় অফিসাররা বিভিন্ন বিষয়ে এদের শিক্ষা দিয়েছিলেন। পরে কতিপয় ভারতীয় সৈন্যকে প্যারাশুটেও শিক্ষা দেওয়া হয়েছিল। এই স্বেচ্ছাসৈনিকরা শিক্ষা- শিবিরে থাকার সময় একজন ইটালীয় মেজর কোম্পানী কম্যান্ডারের সঙ্গে দেখা করে আদেশ করলেন যে মিত্রশক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্যে ভারতীয় সৈন্যদের লিবিয়ায় নিয়ে যেতে হবে। লিবিয়ায় তখন জার্মাণ নেতাজী ও ইটালীয় সৈন্যদের বিপদ সুরু হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে ভারতীয় সৈন্যদের কার্যকরী সমিতির এক অধিবেশন হল এবং এই সমিতি ঘােষণা করল যে নিজেদের নেতা ছাড়া, অন্য কারও আদেশে তারা এক পাও নড়বে না। কিন্তু ইটালীয় কতৃপক্ষ শিবিরে জাতীয় বাহিনীর সংগঠয়িতা মিঃ সইদাই-এর প্রবেশ নিষিদ্ধ করে দিলেন। ফলে ভারতীয় সৈন্যরা ইটালীয় সামরিক কতৃপক্ষের আদেশ লঙ্ঘন করল এবং ইটালীয়দের হাতে পুনরায় বন্দী হল। ইটালীর জাতীয় বাহিনীর এই হল পরিণতি। এদিকে ১৯৪২ সালের শেষ দিকে রুশ-রণাঙ্গনে স্টালিনগ্রাদের ঐতিহাসিক যুদ্ধে ব্যর্থ হয়ে হিটলারের জাৰ্মাণ বাহিনীর বিপর্যয় সুরু হল। জাৰ্মাণী নিজের যুদ্ধ নিয়ে এত বেশী ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল, যে ভারতের স্বাধীনতাযুদ্ধের প্রতি যথােচিত দৃষ্টি দেওয়া কিংবা আজাদ হিন্দ ফৌজকে যথােচিত সাহায্য করা তার পক্ষে সম্ভব হয়ে উঠছিল না। এই অবস্থায় সুভাষচন্দ্র ক্রমশ পশ্চাতের পটভূমিকায় পড়ে যেতে লাগলেন। কিন্তু তাঁর স্বদেশােদ্ধারের ব্রত তখনও অসমাপ্ত। তা ছাড়া সুভাষচন্দ্র একথাও বুঝতে পেরেছিলেন যে জাৰ্মাণীতে আজাদ হিন্দ ফৌজ সংগঠন করে কোন দিন তার পক্ষে হয়ত ভারত সীমান্তে পৌছানাে সম্ভব হবে না। অথচ ওদিকে ভারতব্ৰহ্ম সীমান্তে জাপানী বাহিনী ছিল দাড়িয়ে। মালয় ও ব্রহ্মে সুভাষচন্দ্রের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে ভারতীয় যুদ্ধবন্দীদের সহযােগিতায় ক্যাপটেন মােহন সিং গড়ে তুলেছিলেন একটি জাতীয় বাহিনী। মালয় ও ব্রহ্মের স্বাধীনতাকামী ভারতীয়দের নেতৃত্ব পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন টোকিওবাসী বীর বাঙ্গালী বিপ্লবী রাসবিহারী বসু। সুভাষচন্দ্রের মনে তীব্র আকাঙ্ক্ষা ছিল ব্রহ্ম ১১৭ নেতাজী রণাঙ্গনে উপস্থিত হবার। তা ছাড়া রাসবিহারী বসুর নিকট থেকেও তিনি একাধিকবার আহ্বান পেয়েছিলেন। এই অবস্থায় ১৯৪৩ সালের গােড়ায় সুভাষচন্দ্র স্থির করলেন যে তিনি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় যাবেন। একমাত্র সাবমেরিণ ছাড়া, এই দীর্ঘ পথ ভ্রমণ করা সম্ভব ছিল না। যুদ্ধকালে সাবমেরিণ ভ্রমণ যে কত বিপজ্জনক তা না বললেও চলে। কিন্তু দেশের উদ্ধার কামনায় তিনি এত ব্যাকুল হয়ে উঠেছিলেন যে পথের বিপদকে তিনি পরােয়া করলেন না। অবশেষে সুভাষচন্দ্রের ইচ্ছানুযায়ী জার্মাণ ও জাপানী গবর্নমেন্টের যুগ্ম প্রচেষ্টায় সুভাষচন্দ্রকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় নিয়ে যাবার জন্যে একটি বিশেষ সাবমেরিণের ব্যবস্থা করা হয়। পূর্বে সুভাষচন্দ্রের পান্যাল সেক্রেটারী যে মেজর হাসানের কথা উল্লেখ করেছি, তিনি এই সাবমেরিণে ছিলেন। বিবৃতি প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন যে ১৯৪৩ এর প্রথম দিকে তারা এই সাবমেরিণ যােগে যাত্রা করেন এবং প্রায় তিন মাস সমুদ্রবক্ষে যাপন করে জুলাই মাসে সর্বপ্রথম সুমাত্রার একটি বন্দরে পদার্পণ করেন। তারপর সেখান থেকে সুভাষচন্দ্র বিমানযােগে টোকিও যান। এই দীর্ঘস্থায়ী ভ্রমণের সময় অ্যাটলান্টিক মহাসাগরে এই সাবমেরিণটি একবার ভীষণ বিপদগ্রস্ত হয়েছিল। অ্যাটলান্টিক মহাসাগরের কোন এক স্থানে সাবমেরিণটি ভুল ক্রমে জলের উপর ভেসে উঠেছিল। ঐ সময় শত্রুপক্ষের একখানি ভাসমান বণতরীর দৃষ্টি পড়ে সাবমেরিণটির উপর। রণতরীখানি সবেগে সাবমেরিণটিকে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে অগ্রসর হয়। কিন্তু রণতরীখানি পৌছানাের পূর্বেই সাবমেরিণটি অতল জলে পুনরায় ডুবে যায়। এইভাবে সুভাষচন্দ্র প্রায় ১১৮ নেতাজী নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে যান। ভারত মহাসমুদ্রের বুকে তারা আর কোন বিপদের সম্মুখীন হন নি। এইভাবে সুভাষচন্দ্র জামণী থেকে এলেন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়। এইবার তার জীবনের সর্বাপেক্ষ। গৌরবময় অধ্যায় আরম্ভ হল। সুভাষচন্দ্র জাৰ্মাণী ত্যাগ করলে , জার্মাণীতে আজাদ হিন্দ ফৌজ ভেঙে যায় নি। জামাণ যুদ্ধের পরিসমাপ্তি পর্যন্ত এ বাহিনী অটুট ছিল। জানাণীর আত্মসমর্পণের পর এ বাহিনীর কতকাংশ ধরা পড়েছিল ইঙ্গ-মার্কিণ সেনাবাহিনীর হাতে। অপরাংশকে পূর্ব রণাঙ্গনে চলে যাবার আদেশ দেওয়া হয়েছিল বলে প্রকাশ। সেখানে তারা রুশবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে। অদ পর্যন্ত জাৰ্মাণ আজাদ হিন্দ ফৌজের অনেক সৈন্য ও সেনানায়কের কোন হদিস পাওয়া যায় নি। যখন এদের হদিস পাওয়া যাবে, তখন জার্মাণীতে সুভাষচন্দ্র ও আজাদ হিন্দ ফৌজের কার্যকলাপ সম্বন্ধে মন * অনেক তথ্য জানা যাবে।

আজাদ হিন্দ ফৌজ ও অস্থায়ী গবর্নমেন্ট সুভাষচন্দ্র জাৰ্মাণীতে আজাদ হিন্দ ফৌজের গােড়াপত্তন করেছিলেন মাত্র। অনুকূল পরিপার্শ্ব এবং যথােচিত সহায়ক ও সমর্থক পেলে এই আজাদ হিন্দ ফৌজ যে কি দুর্ধর্ষ রূপ পরিগ্রহ করতে পারে, তা তিনি দেখলেন ব্ৰহ্ম ও মালয়ে বিরাট আজাদ হিন্দ ফৌজ সংগঠন করে এবং আজাদ হিন্দ গবর্নমেন্ট স্থাপন করে। তার মধ্যে যে বিরাট সংগঠনী প্রতিভা লুকিয়ে ছিল অনুকুল ক্ষেত্র পেয়ে তার পরিপূর্ণ বিকাশ আমরা দেখতে পেলাম। ১৯৪৩ এর মধ্য ভাগ থেকে শুরু করে ১৯৪৫ এর মধ্যভাগ পর্যন্ত এই দুই বৎসর ব্ৰহ্ম রণাঙ্গনে সুভাষচন্দ্রের কার্য কলাপ ভারত গবর্নমেন্ট সুকৌশলে চেপে রেখেছিলেন। সুভাষচন্দ্র যে ব্ৰহ্ম রণাঙ্গণে এসেছেন,এ সংবাদ ভারতবাসীরা জানত এবং তার কার্যকলাপ সম্বন্ধে একটা কাণা ঘুসাে চলত। কিন্তু তিনি যে এত বড় একটা বিরাট সামরিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন তা ছিল আমাদের স্বপ্নেরও অগােচর। নয়া দিল্লীতে ১৯৪৫ এর ৫ই নবেম্বর লাল কেল্লায় মেজর জেনারেল শাহ, নওয়াজ, কর্ণেল পি, কে, সায়গল ও লেঃ কর্ণেল ধীলন নামক আজাদ হিন্দ ফৌজের বীর সেনানীত্রয়ের সামরিক আদালতে যখন বিচার শুরু হয়, তখন ভুলাভাই দেশাইর নেতৃত্বে কংগ্রেস থেকে এদের পক্ষ সমর্থন করা হয়। সাড়া দেশে নেতাজী সুভাষচন্দ্রের বীর বাহিনীর সম্বন্ধে অভূতপূর্ব সাড়া জাগে। এদের বিচার প্রসঙ্গে আজাদ হিন্দ ফৌজের বহু অমর কীর্তিকলাপ আজ নেতাজী ভারতবাসীরা জানবার সুযােগ পেয়েছে। এই বিচার উপলক্ষে ভারতের জাগ্রত জনসমাজে আজাদী বীরদের প্রতি যে সম্মান ও শ্রদ্ধার প্রকাশ দেখা গেছে, ভারতের ইতিহাসে তার তুলনা মেলে না। জাতিধর্ম নির্বিশেষে সম্মিলিত ভারতবাসীরা দাবী জানিয়েছে যে এই বীরদের মুক্তি চাই। ভারতীয় সেনাবাহিনীর অভিমত নিয়েও জানা গিয়েছিল যে আজাদী বীরদের বিচার তাদেরও কাম্য নয়। সম্মিলিত জাতীয় দাবীর সম্মুখে বৃটিশ শাসক সম্প্রদায় শেষ পর্যন্ত মাথা নােয়াতে বাধ্য হয়েছেন। শাহনওয়াজ, সায়গল ও ধীলন সামরিক আদালতের বিচারে মুক্তি পেয়ে জাতীয়তাবাদী ভারতবাসীদের কাছে সুবিপুল সম্বধনা পেয়েছেন। এদের বিচার প্রসঙ্গে দিল্লীতে লাল কেল্লায় এ সত্যও নিঃসংশয়ে প্রমাণিত হয়েছে যে নেতাজী সুভাষচন্দ্রের আজাদ হিন্দ ফৌজ সাম্রাজ্যবাদী জাপানীদের হাতে আদৌ ক্রীড়নক বিশেষ ছিল, না। এই আজাদ হিন্দ ফৌজ ছিল আজাদ হিন্দ বা স্বাধীন ভারত গবর্ণমেন্টের সেনাদল, যাদের নিজস্ব বৈশিষ্ট ও নিজস্ব রণকৌশল ছিল। নেতাজী প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন ভারত গবর্ণমেন্ট জাপান সহ নয়টি স্বাধীন রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছিলেন। একটা আধুনিক সভ্য ও স্বাধীন গবর্নমেন্ট পরিচালনা করতে গেলে যা কিছু দরকার, তার কোনটারই অভাব ছিল না এই গবর্ণমেন্টের। সর্বোপরি ছিল নেতাজী সুভাষচন্দ্রের গগনস্পর্শী ব্যক্তিত্ব যার কাছে জাপান পর্যন্ত মাথা নােয়াতে বাধ্য হত। বহু ক্ষেত্রে জাপানীদের অনুসৃত নীতির সঙ্গে আজাদ হিন্দ ফৌজ ও গবর্ণমেন্টের সংঘর্ষ বাধত। নেতাজী এই সব সংঘর্ষের সম্মুখীন হতে আদৌ কুষ্ঠিত হতেন না এবং বেশীর ভাগ ১২১ নেতাজী ক্ষেত্রে এই সব মতবিরােধে শেষ পর্যন্ত তার মতই প্রাধান্য বিস্তার যাক, আপাতত আজাদ হিন্দ ফৌজ ও আজাদ হিন্দ গবর্ণমেন্টের কথা পরে আলােচনার জন্যে রেখে, যে পরিস্থিতির মধ্যে সুভাষচন্দ্র জার্মণী থেকে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় এসে সমগ্র ভারতীয় সমাজের কতৃত্ব- ভার গ্রহণ করলেন এবং আজাদ হিন্দ ফৌজ সংগঠন করে ব্রিটিশ- বিরােধী সংগ্রাম চালালেন, তার কথা আলোচনা করা যাক। যে মালয়ে আজাদ হিন্দ সঘ ও আজাদ হিন্দ ফৌজের গােড়াপত্তন হয়েছিল, তার অবস্থাটা প্রথমে বিশ্লেষণ করা যাক। ভারতবর্ষের মত ব্ৰহ্ম এবং মালয় ও বৃটিশ সাম্রাজ্যের অন্তভূক্ত। ব্ৰহ্মবাসী, চীনা এবং মালয়বাসী ছাড়াও পূর্ব এশিয়ায় নানা কাজে রত প্রায় ত্রিশ লক্ষ ভারতীয় নরনারীর বাস। তাদের মধ্যে হিন্দু, মুসলমান, খৃষ্টান প্রভৃতি সব সম্প্রদায়ের লােকই আছে। ভারতের মত এই সব অঞ্চলেও বৃটিশদের সাম্রাজ্যবাদী শাসন ও শােষণ একই ধরণে বিদ্যমান বলে প্রবাসী ভারতীয় সমাজে স্বাভাবিক ভাবে বৃটিশ-বিরােধী মনােভাব প্রবল। ভারতের মত সেখানেও বৃটিশদের অত্যাচারের সীমা নেই। ১৯৪১ এর ডিসেম্বর মাসে জাপান বৃটেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘােষণা করার মাত্র দুমাসের মধ্যে সমগ্র মালয় জাপানীদের করতলগত হল। শ্বেতাঙ্গ সম্প্রদায় ছিল মালয়ের শাসক তারা যথাসময়ে নিজেদের স্ত্রীপুত্র এবং সঞ্চিত অর্থাদি নিয়ে সরে পড়ল। মালয়-প্রবাসী ভারতীয়দের যথাসময়ে সরে পড়ার সুযােগ পাওয়াত দূরের কথা, যথাসময়ে তাদের দুঃসংবাদ পর্যন্ত জানানাে হলনা। পিছনে ফেলে রেখে এল অসহায় নেতাজী ভারতীয় সৈন্যদের যেন জাপানীদের হাতে বন্দী হবার জন্যেই। যে সামরিক আদালতে শাহ নওয়াজ, ধীলন ও সায়গলের বিচারের ব্যবস্থা হয়েছিল, সেখানে আসামী পক্ষের সাক্ষীরূপে ক্যপ্টেন আরসাদের বিবৃতিতে প্রকাশ যে মালয়ে ভারতীয় সৈন্যদের জাপানীদের হাতে আত্মসমর্পণের সময়, সেনানায়ক কর্ণেল হান্ট বলেছিলেনঃ “এখন তােমরা যুদ্ধবন্দী এবং আমি তােমাদের জাপানী কতৃপক্ষের হাতে তুলে দিচ্ছি।” পূর্ব এশিয়ার ভারতীয় সমাজে এই বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদ-বিরােধী মনোভাব প্রবল বলেই তারা বৃটিশদের বিরুদ্ধে সংগ্রামশীল ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের একান্ত অনুরক্ত। সাম্রাজ্যবাদী জাতি হিসাবে জাপানীরা বৃটিশদের চেয়ে কমত নয়ই–বরং বেশী চালাক। তারা মালয় দখল করেই বুঝতে পারল যে ভারতীয়দের মনে দেশের স্বাধীনতা লাভের একটা তীব্র আকাঙ্খা আছে এবং বৃটিশ-বিরােধী মনােভাব আছে । তারা এই মনােভাবের সুযােগ নেবার সংকল্প করল । তারা ভারতীয় যুদ্ধবন্দী ও নাগরিকদের সঙ্গে কোন দুর্ব্যবহার করল না—বরং তাদের বৃটিশ-বিরোধী সংগ্রামে অনুপ্রাণিত করতে লাগল। জাপানী কতৃ পক্ষের হাতে যেসব ভারতীয় বন্দী ছিল, তাদেরও তারা ছেড়ে দিল । এই ভাবে তারা ভারতীয় সমাজের সহানুভূতি অর্জন করে তাদের সঙ্ঘবদ্ধ হয়ে ভারতের স্বাধীনতা লাভের জন্য সচেষ্ট হতে বলল । স্বদেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ ভারতীয় সমাজ এতে সাড়া দিল। তবে যারা এতকাল ধরে পরাধীনতার জালা মর্মে মর্মে অনুভব করেছে, নতুন সাম্রাজ্যবাদী শক্তির হাতে ক্রীড়নক হবার ইচ্ছা তাদের ছিল না। তাদের উদ্দেশ্য ছিল জাপানীদের সাহায্য নিয়ে নিজেদের কাজ হাসিল নেতাজী করা—অর্থাং বৃটিশ শক্তির হাত থেকে ভারত ছিনিয়ে নেওয়া এবং জাপানী অধিকৃত অঞ্চলে ভারতবাসীদের স্বার্থ অক্ষুন্ন রাখা। অপর পক্ষে জাপানের ইচ্ছা ছিল সম্পূর্ণভাবে তার অনুগত একটি জাপ- তাঁবেদার ভারতীয় বাহিনী সংগঠন। কিন্তু আজাদ হিন্দ ফৌজ বা আজাদ হিন্দ, গবর্নমেন্ট কখনও জাপানীদের সঙ্গে সহযােগিতা করার উদ্দেশ্য নিয়ে জন্মায় নি। ঘটনাচক্রে পড়ে নিজেদের স্বাধীনতা আন্দোলন সফল করার জন্যে জাপানীদের সাহায্য তাদের নিতে হয়েছে কিন্তু সে সাহায্যের যথােচিত মূল্যও তারা দিয়েছে। তাই দিল্লীর সামরিক আদালতে শাহনওয়াজ প্রভৃতির বিচার-প্রসঙ্গে সরকার পক্ষের প্রথম সাক্ষী লেঃ নাগ পর্যন্ত স্বীকার করেছেন : “ভারতের মুক্তির জন্যে বৃটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করাই ছিল আজাদ হিন্দ ফৌজের সাময়িক গবর্ণমেন্টের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল পূর্ব এশিয়ায় ভারতীয়দের জীবন, সম্মান ও সম্পদ রক্ষা করা।” শেষােক্ত উদ্দেশ্য থেকে স্পষ্টই বােঝা যায় যে নিজেদের মর্যাদা রক্ষার জন্যে ভারতীয়দের জাপানের বিরােধিতাও করতে হত। জাপানের সঙ্গে এ বিবােধ প্রথম থেকেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু তখন ইউরোপের জামাণীতে অনুরূপ প্রচেষ্টায় ব্রতী ছিলেন। মাঝে মাঝে বেতার-যােগে উৎসাহহাদ্দীপক স্বদেশপ্রেমের জ্বালাময়ী বাণী ও ভারতীয়দের মনে প্রেরণা জোগাতাে। তাই ১৯৪২ সালের মার্চ মাসে জাপানের টোকিওতে সুবিখ্যাত বাঙালী বিপ্লবী জাপান-প্রবাসী শ্রীরাসবিহারী বসুর নেতৃত্বে ভারতীয়দের একটি প্রতিনিধি-সম্মেলন বসল । পূর্ব উদ্দেশ্য। ১২৪ নেতাজী এশিয়ার স্বাধীনতা-আন্দোলনে এই বাঙালী বিপ্লবীর অসামান্য দানের মর্যাদা আজও আমরা দিতে পারি নি। সুভাষচন্দ্রের পূর্ব এশিয়ায় উপস্থিতির পর তার বিরাট ব্যক্তিত্বের সামনে শ্রীরাসবিহারী বসু ডুবে গেছিলেন বটে—কিন্তু সুভাষচন্দ্র আসার পূর্বে ভারতীয় সমাজে স্বদেশ প্রেমের জাগরণ তিনিই এনেছিলেন। দুঃখের বিষয় কিছুকাল পূর্বে টোকিওতে তাঁর মৃত্যু হয়েছে। যাই হোক, টোকিওর প্রতিনিধি সম্মেলনে পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশের ভারতীয় প্রতিনিধি উপস্থিতি থাকলেও এ সম্মেলন ভারতীয়দের ঠিক মনঃপূত হয় নি। তারা চাইল আরও বিস্তৃত ভিত্তিতে প্রতিনিধি সম্মেলন আহ্বান করতে। টোকিওতে আজাদ হিন্দ সঘ ( Indian Independence League) এবং আজাদ হিন্দ ফৌজ গঠন সম্বন্ধে যথারীতি প্রস্তাব গৃহীত হল। ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা অর্জনই ছিল হবে এ আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য। টোকিও সম্মেলনের মাস তিনেক পরে ১৯৪২এর জুন মাসে ব্যাংককে শ্রীরাসবিহারী বসুর নেতৃত্বে বৃহত্তর পরিধিতে অপর একটি প্রতিনিধি সম্মেলন হল। জাপান, ফিলিপাইন, কোরিয়া, মাঞ্চুরিয়া, সাংহাই, হংকং, ইন্দোচীন, নানকিং, ব্ৰহ্ম, শ্যাম, আন্দামান, ইন্দোনেশিয়া এবং মালয় প্রভৃতি বহু স্থান থেকে ভারতীয় প্রতিনিধিবর্গ এই সম্মেলনে যােগ দিয়েছিলেন। এই সম্মেলনে অখণ্ড ভারত, সাম্প্রদায়িকতার দোষ-মুক্ত জাতীয়তাবাদ, ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের নির্দেশ পালন, আজাদ হিন্দ ফৌজ গঠন প্রভৃতি বিষয়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব গৃহীত হয়। নিম্নলিখিত নেতাদের নিয়ে একটি কার্যকরী পরিষদ গঠিত হয় সভাপতি শ্রীরাসবিহারী বস্তু; সদস্য চতুষ্টয় : এ, রাঘবান, নেতাজী কেশব মেনন, ক্যাপ্টেন মােহন সিং এবং ক্যাপ্টেন গিলানী। মােহন সিং এর উপর আজাদ হিন্দ ফৌজ , সংগঠনের ভার দেওয়া হয়। সঙ্গে সঙ্গে নব গঠিত আজাদ হিন্দ সম্মের প্রতি জাপানীদের মনােভাব সুস্পষ্টল্ডাবে ঘােষণা করার দাবীও জানানাে হয়। এরকম স্বাধীন মনােভাব এবং স্বাধীন দাবীদাওয়া সাম্রাজ্যবাদী জাপানীদের কানে ভাল না শােনানােই স্বাভাবিক। । ক্যাপ্টেন মােহন সিং আজাদ হিন্দ ফৌজ সংগঠন করতে গিয়ে মালয়-প্রবাসী ভারতীয় সমাজ এবং বৃটিশদের পরিত্যক্ত ভারতীয় বাহিনীর কাছ কাছ থেকে আশাতিরিক্ত সাড়া পেলেন। তিনি নিজে বৃটিশ ভারতীয় বাহিনীরই উচ্চ পদস্থ কর্মচারী ছিলেন। মালয় ও ব্রহ্মের সর্বত্র আজাদ হিন্দ সঘের শাখা স্থাপিত হতে লাগল। ভারতীয়দের এই স্বনির্ভর স্বাধীন প্রচেষ্টা দেখে জাপানী সামরিক কতৃপক্ষ গেলেন ঘাবড়িয়ে। তারা এই আন্দোলনকে নিজেদের ইচ্ছা ও প্রয়ােজনানুযায়ী পরিচালনা করতে গিয়ে ব্যর্থকাম হলেন। ১৯৪২-এর। শেষ ভাগে জাপানী কতৃপক্ষের সঙ্গে আজাদ হিন্দ ফৌজের কতৃপক্ষের সংঘর্ষ চরমে উঠল। ব্রহ্মে ভারতীয়দের প্রতি জাপানীদের আচরণ এবং সলােমন দ্বীপপুঞ্জে ভারতীয় সৈন্য প্রেরণ নিয়ে যে বিবােপ বাধল, জাপানী কতৃপক্ষের কাছ থেকে তার যথােচিত উত্তর না পাওয়ায় আজাদ হিন্দ ফৌজের কার্যকরী পরিষদের সদস্য চতুষ্টয় পদত্যাগ করলেন এবং জাপানীরা নিজেদের প্রয়ােজনে আজাদ হিন্দ ফৌজকে ব্যবহার করতে চায় জেনে মােহন সিং ফৌজ ভেঙে দিলেন। এ হল ১৯৪২-এর ডিসেম্বর মাসের ঘটনা। জাপানীরা সঙ্গে সঙ্গে মােহন সিং, কেশব মেনন এবং অন্যান্য নেতাজী কতিপয় ভারতীয়কে কারারুদ্ধ করল। একা রাসবিহারী বসু আজাদ হিন্দ সঘের ভাঙা আসর জমিয়ে রাখার প্রয়াস পেলেন। কর্ণেল জে, কে, ভোঁসলের নেতৃত্বে আজাদ হিন্দ ফৌজ পুনর্গঠনের চেষ্টা করা হলেও জন-সমাজে পূর্বের মত সাড়া আর জাগল না। এই দুর্ঘটনার কয়েক মাস পরেই পূর্ব এশিয়ার ঘটনাকেন্দ্রে এসে দাড়ালেন নেতাজী সুভাষচন্দ্র বর্ষ। ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের ভূতপূর্ব সভাপতি বিরাট ব্যক্তিত্ববান সুভাষচন্দ্রের আবির্ভাবে পূর্ব এশিয়ার রাজনীতিতে নতুন প্রাণ ও নতুন আশার সঞ্চার হল। জাপানী সামরিক, কতৃপক্ষও সুভাষচন্দ্রের বিরাট ব্যক্তিত্ব ও জ্বলন্ত স্বদেশপ্রেমের কাছে মাথা নত করতে বাধ্য হলেন। সুভাষচন্দ্রের মত একজন প্রতিষ্ঠাবান বিপ্লবী কংগ্রেস-নেতার আবির্ভাবে সমগ্র পূর্ব এশিয়ায় নতুন প্রাণ ও প্রেরণার সৃষ্টি হল। ১৯৪৩ এর জুন মাসে সুভাষচন্দ্র কিভাবে সাবমেরিণ যােগে বালিন থেকে সুমাত্রার একটি বন্দরে পৌছেছিলেন, সে কথা আমরা পূর্বেই বলেছি। তিনি সেখান থেকে সরাসরি টোকিও যাত্রা করেন। টোকিও যাত্রার পিছনে নিশ্চয়ই একটা গুঢ় উদ্দেশ্য ছিল। সময় টোকিওতে তিনি কি করেছিলেন, না, করেছিলেন, তার কোন বিস্তৃত বিবরণ জানা যায় না। তবে পূর্ব এশিয়ায় তার ভাবী পরিকল্পনা সম্বন্ধে জাপ প্রধান মন্ত্রী তােজোর সঙ্গে আলাপ আলােচনা করে নিজের কর্মপন্থা স্থির করে ফেলেছিলেন। টোকিও বেতার-কেন্দ্র থেকে তিনি পূর্ব এশিয়ার ভারতীয়দের উদ্দেশ্যে একটি উদ্দীপনাময় বক্তৃতাও দিয়েছিলেন। বক্তৃতা প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন: “পাখীদের মধ্যে কাক, জীবজন্তুর মধ্যে খেকশিয়াল এবং মানুষের মধ্যে বৃটিশ সাম্রাজ্য- ১২৭ নেতাজী বাদীরা হচ্ছে সবচেয়ে বেশী ধূর্ত এবং নিষ্ঠুর। এই বৃটিশরাই যদি আমাকে প্রতারিত না করে থাকতে পারে, তবে আমি আপনাদের একথা বলছি যে পৃথিবীর আর কোন শক্তি আমাকে প্রতারিত করার কথা স্বপ্নেও ভাবতে পারে না। তা সত্বেও আমি আপনাদের মনের সন্দেহ সম্বন্ধে সম্পূর্ণ সচেতন। হে পূর্ব এশিয়ার ভারতীয়গণ, আপনাদের আমি হিন্দুস্থানের স্বাধীনতা রূপ মহৎকার্যের জন্যে পতাকার নীচে সমবেত হতে অনুরােধ জানাচ্ছি। ভারতবর্ষ একটি মাত্র দেশ- ভারতবাসীরাও একটি মাত্র জাতি। আমাদের একমাত্র পতাকা ত্রিবর্ণ রঞ্জিত পতাকা। আমাদের একমাত্র শত্রু বৃটেন। দিল্লী পর্যন্ত এগিয়ে চলুন এবং লালকেল্লার উপর ত্রিবর্ণ রঞ্জিত পতাকা উত্তোলন করুন। আমি প্রত্যাশা করি যে আপনারা হিন্দুস্থানের শৌর্য ও বীর্যের ঐতিহ্য অক্ষুন্ন রাখতে পারবেন।” সুভাষচন্দ্রের কণ্ঠ-নিঃসৃত এই জাতীয়তার অগ্নিমন্ত্র পূর্ব এশিয়ার ভারতীয় জনসাধারণের মনে বিপ্লবের আগুন জ্বালিয়ে তুলল—একথা বলাই বােপ হয় বাহুল্য। টোকিও থেকে সুভাষচন্দ্র ২রা জুলাই তারিখে ফিরে এলেন সিঙ্গাপুরে ( বৃটিশদের কবলমুক্ত করে জাপানীরা প্রাচ্যের এই গুরুত্বপূর্ণ বন্দরটির নতুন নামকরণ করেছিল শােনান)! ৪ঠা জুলাই সিঙ্গাপুরের জীবনে এক অভিনব দৃশ্য দেখা গেল। এই দিন সুসজ্জিত ক্যাথে বিল্ডিং-এর এক বিরাট জনসভায় সুভাষচন্দ্র আজাদ হিন্দ সঙ্ঘের সময় কতৃত্ব গ্রহণ করলেন। ক্যাথে বিল্ডং-এ প্রবেশের জন্যে সেদিন জনগণের কি বিপুল উৎসাহ ! জানা গিয়েছে যে একজন ভারতীয় ভদ্রলােক একটি আসন সংগ্রহের জন্যে সেদিন একলক্ষ টাকা দিয়ে- ১২৮

No text on this page.

No text on this page.

নেতাজী ছিলেন। ভারতের রহস্যময় জননেতা সুভাষচন্দ্রকে দেখার বিভিন্ন জাতি ও ধর্মের লক্ষ লক্ষ নর নারী ক্যাথে বিল্ডিং-এর বাইরে ভীড় করে দাড়িয়েছিল। উপস্থিত ভারতীয় প্রতিনিধিদের সুভাষচন্দ্র সেদিনের সভায় বুঝিয়ে দিলেন যে তিনি ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের একনিষ্ঠ সেবক রূপেই শ্রীরাসবিহারী বসুর হাত থেকে আজাদ হিন্দ সঘের কতৃত্বভার গ্রহণ করেছেন। দেশের অভ্যন্তরে জাতীয় কংগ্রেস যে বৃটিশ-বিরােধী সংগ্রামে নিরত বাইরে থেকে সেই সংগ্রামকে আরও শক্তিশালী করে ভােলাই হবে তার কাজ। হিন্দু মুসলমান, খৃষ্টান বৌদ্ধ নির্বিশেষে ভারতীয় মাত্রকেই তিনি এই স্বাধীনতা-সৎ গ্রামে যােগদানের আহ্বান জানালেন। সেদিন তিনি আরও ইঙ্গিত দিলেন যে শীঘ্রই আজাদ হিন্দ ফৌজ পূর্বাপেক্ষা অধিকতর সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে পুনর্গঠিত করা হবে এবং সেই সঙ্গে সাময়িক স্বাধীন ভারত গবর্ণমেন্ট বা আজাদ হিন্দ গবর্ণমেন্টও গড়ে তােলা হবে। মিত্র দেশের সঙ্গে সম্প্রীতির সম্পর্ক বজায় রাখা ছাড়া পূর্বএশিয়ার ভারতীয়দের স্বাধীনতা- সংগ্রামের সঙ্গে জাপানীদের আর কোন যােগাযােগ থাকবে না। এমন কি ভারত আক্রমণেও ভারতীয় জাতীয় সেনাবাহিনীই প্রধান অংশ গ্রহণ করবে, জাপানীরা সহায়তা করবে মাত্র। সেদিন বক্তৃতা প্রসঙ্গে ভারতীয়দের সম্বােধন করে তিনি ঘােষণা করেছিলেন : “তােমরা ঐতিহ্যগত দিক থেকে বীর ভারতীয়দের পুত্র এবং কন্যা। তােমরা আর ক্রীতদাস নও। আমি চাই তােমরা সমুন্নত শিরে বিচরণ কর। আমাদের শ্রেষ্ঠ নেতা গান্ধীজীর প্রতি যথােচিত সন্মান দেখিয়েও আমি বলছি যে শক্তি দিয়ে শক্তির জবাব দিতে হবে। ভীরুর মত ক্রীতদাসের নেতাজী জীবন যাপন করার চেয়ে মৃত্যুও ভাল। আমরা যদি এক লক্ষ জীবন বলি দিতে পারি। তবে ভারতে বৃটিশদের ক্রীতদাসত্ব থেকে আমরা আমাদের ৪০ কোটি ভ্রাতা ভগ্নীকে মুক্ত করতে পারি।” এইদিন থেকেই পূর্ব এশিয়ায় সুভাষচন্দ্রের প্রত্যক্ষ বৃটিশ-বিরােধী সংগ্রামের গােড়াপত্তন হল। তার কণ্ঠে ধ্বনিত হল ‘দিল্লী চলাে’ ‘দিল্লী চলে, ‘রক্ত চাই আরও রক্ত চাই। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের সৈনিক- দের তিনি জানালেন : “তুম হামকো খুন দো, ময় তুমকো আজাদী দ্যু।।” কথার সঙ্গে সঙ্গেই সুভাষচন্দ্র কাজে হাত দিলেন। ৫ই জুলাই সিঙ্গাপুরে নতুন করে আজাদ হিন্দ ফৌজ পুনর্গঠনের প্রস্তাব গৃহীত হল। মালয়ের ভারতীয় জন-সমাজে অভূতপূর্ব সাড়া পড়ে গেল। সৈন্য, অর্গ ও সামরিক অন্যান্য উপাদান নিজে থেকেই আসা সুরু করল । জুলাই সিঙ্গাপুরে আজাদ হিন্দ ফৌজের কুচকাওয়াজ উপলক্ষে ভারতের মুক্তি-সঃ গ্রামে ব্ৰতী সেনাদলকে লক্ষ্য করে সুভাষচন্দ্র যে বক্তৃতা দিয়েছিলেন, তার মধ্যে প্রসঙ্গ তাদের কির্তব্য নির্ধারণ করতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন : “আমি তােমাদের কর্তব্য স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি-কর্তব্য বিবিধ। অসুবলের দ্বারা এবং নিজেদের শােনিতৎসর্গ করে ভারতের স্বাধীনতা অর্জন করতে হবে। তারপর ভারত যখন স্বাধীন হবে, তখন স্বাধীন ভারতের জন্যে স্থায়ী সেনাবাহিনী গড়ে তুলবে তােমরাই। তখন কর্তব্য হবে ভারতের স্বাধীনতা রক্ষা করা। তােমরা আমাদের দেশরক্ষার শক্তি এমন অটল, ভিত্তির উপর স্থাপন করবে যেন আর কোনদিন আমরা স্বাধীনতা না হারাই। সৈনিক ১৩০ নেতাজী হিসাবে তোমাদের তিনটি আদর্শ হৃদয়ে পোষণ করতে হবে এবু, তদনুযায়ী নিজেদের জীবন পরিচালিত করতে হবে। বিশ্বস্ততা, কর্তব্য পালন এবং আত্মত্যাগ—এই তিনটি হবে তােমাদের আদর্শ। যেসব সৈনিক জাতির প্রতি বিশ্বস্ত থাকে, যারা কোন অবস্থাতেই কর্তব্য পালনে বিমুখ হয় না, যারা আত্মত্যাগের জন্যে সর্বদা প্রস্তুত তারা হয় অজেয়।” আজাদ হিন্দ ফৌজের প্রতি নেতাজীর এ উপদেশ যে ব্যর্থ হয় নি তার বহু প্রমাণ এপর্যন্ত আমরা পেয়েছি। যথেষ্ট সামরিক শক্তির অভাবে আজাদ হিন্দ ফৌজ অধিকতর শক্তিশালী ইঙ্গ- মার্কিণ বাহিনীকে পরাজিত করে মাতৃভূমির স্বাধীনতা অর্জন করতে পারে নি বটে---কিন্তু তারা আজও নেতাজীর উপদেশবাণী ভােলে নি। বৃটিশ কারাগৃহের অত্যাচার কিংবা বৃটিশ সামরিক আদালতে বিচার তাদের একটুও লক্ষ্য-চ্যুত করতে পারে নি। এরপর ঘটনা-চক্রের গতি দ্রুত আবতি হয়ে চলল। সুভাস: চন্দ্রের অপূর্ব সংগঠনী প্রতিভা ও সামরিক জ্ঞান দেখে সকলেই মুগ্ধ ও বিস্মিত হয়ে গেল। ১৯৪৩ এর ২৫শে আগষ্ট সুভাষচন্দ্র আজাদ হিন্দ ফৌজের সর্বময় কতৃত্ব গ্রহণ করেন। তিনি সিপাহী সালার বা ৪র্বাধিনায়ক (supreme Cominimilar) নির্বাচিত হন। সঙ্গে সঙ্গে তিনি সেনাবাহিনী পুনর্গঠনে এবং সেনাবাহিনীর শক্তি বৃদ্ধিতে মননানিবেশ করেন। সৈন্য ও সেনানায়কদের উপযুক্ত শিক্ষাবিধানের জন্যে তাঁর নেতৃত্বে মালয়, ব্ৰহ্ম এবং শ্যামের বহুস্থানে সামরিক শিক্ষা- শিবির গড়ে ওঠে। এই সব শিক্ষা-শিবিরের মধ্যে সিঙ্গাপুর, জোহার, সেৱেম্বার, ইপাে, পেনাং, জিত্রা, ব্যাংকক, এবং রেঙ্গুনের শিক্ষাশিবির ১৩১ নেতাজী গুলাে বিশেষ প্রসিদ্ধ। এই সব কেন্দ্রে পুরােপুরি ভারতীয়দের কতৃত্বে ভারতীয় অরিসাররাই সর্ব প্রকার শিক্ষাবিধান করতেন। আলােচ্য শিক্ষাকেন্দ্রগুলাের প্রত্যেকটি থেকে প্রতি ছয়মাসে ৩৫০০ করে সৈন্য তৈরী করার ব্যবস্থা হয়েছিল। জাতিধর্ম নির্বিশেষে পূর্ব এশিয়ার ভারতীয়রা আজাদ হিন্দ ফৌজে যােগদানের জন্যে এগিয়ে আসতে লাগল। এর প্রায় সঙ্গে সঙ্গে সুভাষচন্দ্র আর এক অভিনব কীতি স্থাপন করলেন। তিনি কর্ণেল লক্ষ্মী স্বামীনাথনের সহায়তায় ঝালীর রাণী বাহিনী নামক ভারতীয় নারী বাহিনীর গােড়া পত্তন করলেন। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে নারীদের দান যে কম নয়—একথা আশাকরি সকলেই স্বীকার করবেন। যথােচিত সমর-বিদ্যায় শিক্ষা পেলে ভারতীয় নারীরা যে যুদ্ধক্ষেত্রেও এগিয়ে যেতে পারে—এ বিশ্বাস সুভাষচন্দ্রের ছিল । তাই ঝাঁসীর রাণী বাহিনীর গােড়াপত্তন। সিঙ্গাপুরে নারীদের সামরিক বিদ্যা শিক্ষার জন্যে একটি শিক্ষা-শিবিরও খােলা হয়েছিল। দলে দলে ভারতীয় নারীরা আজাদ হিন্দ ফৌজে যােগ দিয়েছিল এবং সমর-ঘটিত বিভিন্ন বিষয়ে তারা যথােচিত কর্ম- কুশলতারও পরিচয় দিয়েছিল। সম্মুখ রণাঙ্গনে এগিয়ে যাবার জন্যেও এ নারীবাহিনীর আগ্রহের অন্ত ছিল না। তারা একাধিকবার এজন্যে সুভাষচন্দ্রের কাছে সরাসরি আবেদন জানিয়েছিল। এই বাহিনীর অধিনায়িকা কর্ণেল লক্ষ্মী দেশপ্রেম ও বীরত্বের পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে ছিলেন। এর নেত্রীত্বে রণাঙ্গনে নারী বাহিনী যুদ্ধে আহত কিংবা বােগাক্রান্ত আজাদ হিন্দ ফৌজের সৈন্যদের সেবায় অপূর্ব আত্মত্যাগ ও কর্তব্যপরায়ণতা দেখিয়েছিল। ঝাঁসীর রাণী বাহিনীর মত বালক ১৩২ নেতাজী বালিকাদের দ্বারা গঠিত বাল সেনাদলের ব্যাপারেও সুভাষচন্দ্রের তীক্ষ্ণ বুদ্ধি এবং অপূর্ব সংগঠন-নৈপুণ্যের পরিচয় পাওয়া যায়। এই আত্মঘাতী বালক সেনাদের প্রধান কাজ ছিল শত্রু পক্ষের ট্যাঙ্ক বংস এরা নিজেদের পিঠে মাইন বেঁধে শত্রুর ট্যাঙ্কের জন্যে অপেক্ষা করত। ট্যাঙ্ক এলে তারা তার নীচে শুয়ে পড়ত। মাইনের ক্রিয়ার ফলে ট্যাঙ্ক যেমন ধ্বংস হত, তেমনই এই বীর অভিমদের শেষ নিঃশ্বাস সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে যেত। এ ছাড়া সুভাষচন্দ্র আজাদ হিন্দ দল নামক একটি বেসামরিক প্রতিষ্ঠানও গড়ে তুলেছিলেন । তুলেছিলেন। শত্রুর কবলমুক্ত অঞ্চলে সামরিক ও বেসামরিক শান-ব্যবস্থা প্রবর্তনের জন্যে হয়েছিল এই দলের সৃষ্টি ! এদের জন্যেও ভিন্ন ধরণের শিক্ষার ব্যবস্থা ছিল । তিন চার মাসের মধ্যেই আজাদ হিন্দ ফৌজ, ঝাঁসীর রাণী বাহিনী এবং আজাদ হিন্দ দল যথেষ্ট শক্তি সঞ্চয় করল। এই বার সুভাষচন্দ্র একটি অস্থায়ী স্বাধীন ভারত গবর্নমেন্ট স্থাপনের প্রয়ােজনীয়তা বােধ করলেন। ২১শে অক্টোবর তারিখটি একটি স্মরণীয় দিবস। এই দিন সকাল থেকে সিঙ্গাপুরের মিউনিসিপ্যাল ময়দানে প্রায় লক্ষাধিক লােক সমবেত হয়েছিল। এদের মধ্যে নানাধর্ম ও জাতির লােক ছিল আর ছিলেন উচ্চপদস্থ জার্মান, জাপ ও ইটালীয় রাজকর্মচারীবৃন্দ। বহু উধ্বে সগৌরবে বিরাজমান ছিল ভারতের ত্রিবর্ণরঞ্জিত চরখালাঞ্ছিত জাতীয় পতাকা। প্রথমে আজাদ হিন্দ ফৌজ, ঝাঁসীর রাণী বাহিনী ও আজাদ হিন্দ দলের চিত্তাকর্ষক কুচকাওয়াজ হল। সিপাহী সালার রূপে নেতাজী তাদের অভিবাদন গ্রহণ করলেন। তারপর এই

নেতাজী
ঐতিহাসিক দিনে নেতাজী বাহির বিশ্বের কাছে সগৌরবে অস্থায়ী
ভারত গবর্নমেন্ট স্থাপনের সিদ্ধান্ত ঘােষণা করলেন। স্থির হল
যে ভারতের স্বাধীনতা-সংগ্রাম শেষে ভারতে জনগণের নির্বাচিত
প্রতিনিধিদের হাতে প্রকৃত শাসন ক্ষমতা না যাওয়া পর্যন্ত এই
গবর্ণমেন্ট নিজের কর্তব্য করে যাবেন। নিম্নলিখিত রূপে আজাদ হিন্দ
সাময়িক গবর্ণমেন্টের সচিব-সঘ গঠিত হয় ।
সুভাষচন্দ্র বসু ( রাষ্ট্রনায়ক, প্রধান মন্ত্রী এবং সমর ও পররাষ্ট্র সচিব)
কর্ণেল লক্ষ্মী স্বামীনাথন (নারী সংগঠন)
এ, এ, আয়ার ( প্রচার সচিব)
লেঃ কঃ এ, সি, চট্টোপাধ্যায় ( অর্থ সচিব।)
লেঃ কঃ আজিজ
আহমেদ
লেঃ কঃ এ, এ, ভগ
লেঃ কঃ জে, কে, ভোসলে
লেঃ কঃ গুলজার সিং
লেঃ কঃ এ, জেড, কিয়ানী সৈন্য বাহিনীর প্রতিনিধি
লেঃ কঃ এ, ডি, লােকনাথ
লেঃ কঃ এ, ডি, রাও
লেঃ কঃ আহসান কাদির
লেঃ কঃ শাহনয়াজ
এ, এম, সহায় (মন্ত্রীর পদমর্যাদা সম্পন্ন সেক্রেটারী)
রাস বিহারী বসু (প্রধান উপদেষ্টা )
১৩৪

নেতাজী করিম গণি দেবনাথ দাস ডি, এম, খ। উপদেষ্টা এ, ইয়েলাপ্পা আই, খিবি সর্দার ঈশ্বর সিং এ, এন, সরকার ( অইন উপদেষ্টা ) এর পরে পরেই আজাদ হিন্দ গবর্নমেন্ট সম্পূর্ণ বিধিসম্মত উপায়ে ইঙ্গ-মার্কিণ গবর্ণমেন্টের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলেন। অস্থায়ী গবর্নমেন্ট গঠনের দিন সিঙ্গাপুরে যে দৃশ্যের অবতারণা হয়েছিল, সেরূপ দৃশ্য কল্পনায়ও আনা যায় না। সেদিন গম্ভীর উদাত্ত বক্তৃতা প্রসঙ্গে সুভাষচন্দ্র ঘােষণা করলেন : “আমি একজন ফকির। ক্ষুধা, অসুবিধা এবং ভীষণ কঠিন যুদ্ধ ছাড়া তােমাদের আর কিছু আমার দেবার নেই। আমাদের জাতীয় পতাকা লাল কেল্লায় ওড়ানাের জন্যে লক্ষ্যস্থানে পৌছবার পূর্বে তােমাদিগকে সর্বস্ব ত্যাগ করতে হবে। পথ দীর্ঘ এবং কঠিন। আমার সঙ্গে যােগ দিতে আমি কাউকে বাধ্য করছি না। কিন্তু স্বদেশপ্রেমিক ভারতীয়রা নিজেদের কর্তব্য জানে। যাদের সাহস নেই এবং যারা চরম অসুবিধা সহ্য করতে পারবে না, তারা আজাদ হিন্দ সঘ এবং আজাদ হিন্দ ফৌজ ছেড়ে চলে যেতে পারে এবং আমি তাদের ভরসা দিচ্ছি যে তাদের বিরুদ্ধে সমালােচনা করা হবেনা। কেন না আমি চাই এমন পরীক্ষিত নরনারী যারা ইতিহাস তৈরী করতে পারে।” তার এই বক্তৃতা শ্রোতৃবৃন্দের মনে নেতাজী প্রভাব বিস্তার করেছিল যে জাপানীদের হাতে বন্দী বৃটিশ ভারতীয় বাহিনীর ভারতীয় সৈন্যরা বক্তৃতা-মঞ্চে ছুটে গিয়ে হাঁটু গেড়ে তার সামনে বসে পড়েছিল এবং স্বেচ্ছায় আজাদ হিন্দ ফৌজে যােগ দেবার আগ্রহ জানিয়েছিল। সুভাষচন্দ্রের জ্বালাময়ী বক্তৃতা তাদের চোখের সামনে দেশপ্রেম ও আত্মত্যাগের নতুন পথ খুলে দিয়েছিল। এর পর আজাদ হিন্দ গবর্ণমেন্ট এবং আজাদ হিন্দ ফৌজ সমানভাবে এগিয়ে চলল। আজাদ হিন্দ গবর্ণমেন্টকে নিম্নলিখিত স্বাধীন রাষ্ট্রগুলি সরকারী ভাবে স্বীকার ও সমর্থন করেছিল জাপান, জার্মাণী, ইটালী, স্পেন, শ্যাম, ব্ৰহ্ম, ফিলিপাইন, নানকিং, মাধুকুও ও আয়াণ্ড। আজাদ হিন্দ গবর্ণমেন্ট সংগঠন ও তার কার্যকলাপের যে ইতিহাস প্রকাশিত হয়েছে তাতে দেখা যায় যে এই গবর্ণমেন্টের কোন বিভাগের কোন অপূর্ণতাই ছিল না। কিন্তু প্রথম গবর্নমেন্ট গঠনের পর দেখা যায় যে আজাদ হিন্দ হিন্দ গবর্ণমেন্টের নিজস্ব কোন রাজ্য নেই। শীঘ্রই তদানীন্তন জাপ প্রধান মন্ত্রী জেনারেল তেজোর সৌজন্যে সে অভাবের পরিপূরণ হয়। ১৯৪৩ এর ৫ই ৫ ৬ই নভেম্বর টোকিওতে বৃহত্তর পূর্ব এশিয়ার একটি সম্মেলন বসে। নেতাজী সুভাষচন্দ্র উক্ত সম্মেলনে দর্শকরূপে মােগ দিয়েছিলেন। সেই সম্মেলনে সুভাষচন্দ্র প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন ভারত গবর্ণমেন্টের প্রতি জাপ গবর্ণমেন্টের আস্থা জ্ঞাপনের নিদর্শন স্বরূপ তােজো ঘােষণা করেন যে জাপান অধিকৃত আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের শাসন কতৃত্ব আজাদ হিন্দ গবর্ণমেন্টের হাতে ছেড়ে দেওয়া হল। টোকিও থেকে ফেরার পথে সুভাষচন্দ্র ফিলিপাইন দ্বীপপুঞ্জ পরিদর্শন করেছিলেন এবং সেখানে বিপুলভাবে অভ্যর্থিত নেতাজী হয়েছিলেন। ১৯৪৩ এর ৩১শে ডিসেম্বর তিনি আন্দামান দ্বীপপুঞ্জ পরিদর্শন করেন। বঙ্গোপসাগরের এই ক্ষুদ্র দ্বীপপুঞ্জে দাড়িয়ে তখন তাঁর প্রিয় জন্মভূমি বাঙ্গলার দিকে তাকিয়ে তিনি না জানি অন্তরে অন্তরে কত ব্যথাই পেয়েছিলেন। তার মনের সে ব্যাকুলতার ইতি- হাস কোনদিন কি জানা যাবে? যাই হােক, সুভাষচন্দ্র অতঃপর লেঃ কর্ণেল লােকনাথনকে আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের শাসনকতা নিযুক্ত করেছিলেন। যারা সুভাষচন্দ্র প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত আজাদ হিন্দ গবর্ণমেন্ট এ আজাদ হিন্দ ফৌজকে জাপ তাবেদার বলে মনে করেন এবং প্রমাণ করার প্রয়াস পান, ইতিহাস তাদের মিথ্যাবাদী ছাড়া আর কিছু বলবে না। সুভাষচন্দ্র গবর্ণমেন্ট প্রতিষ্ঠার পরে পরেই জাপান গবর্ণমেন্টের কাছে দাবী করলেন যে পূর্ব এশিয়ায় জাপ অধিকৃত সকল অঞ্চলের সমস্ত ভারতীয়ের উপর একমাত্র তার এবং তার গবর্ণমেন্টের পূর্ণ কতৃত্ব থাকবে। এই কতৃত্ব নিয়ে পূর্ব এশিয়ার জাপানী সেনা- নায়কদের সঙ্গে তার প্রায়ই বিরোধ বাধত। সু ভাষচন্দ্র এ ব্যাপার নিয়ে খাস টোকিওতে দরবার করেছিলেন এবং জেনারেল তোজোর গবর্ণমেন্টের পূর্ণ সমর্থন পেয়েছিলেন। তবু জাপানী তবু জাপানী সেনানায়ক তঁার সঙ্গে প্রতিনিয়ত সঘর্ষ বাবার চেষ্টা করতেন। শেষ পর্যন্ত এই সঙ্ঘর্ষ নিবারণের জন্যে জাপানের সরকারী কর্তৃপক্ষ একজন বিশেষ কর্মচারী নিয়ােগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। এমনই ভাবে নেতাজী পূর্ব এশিয়ার সমস্ত ভারতীয় সমাজের স্বার্থ রক্ষা করেছিলেন। তাই আজ মালয় ব্রহ্মের ভারতীয় জন-সমাজ নেতাজীর এত অনুরক্ত, নেতাজী তার প্রতি এত শ্রদ্ধাশীল। ১৯৪৪ সালের প্রথম ভাগে সুভাষচন্দ্র মালয় ও ব্ৰহ্ম বাসী ভারতীয়দের প্রচেষ্টায় আজাদ হিন্দ ব্যাঙ্ক স্থাপন করলেন। ইতিপূর্বে তিনি সামরিক কার্যকলাপের সুবিধার জন্যে সিঙ্গাপুর থেকে ব্রঙ্গে তাঁর কর্মকেন্দ্র স্থানান্তরিত করেছিলেন। স্থায়ী প্রধান কেন্দ্র ছিল সিঙ্গাপুরেই। আজাদ হিন্দ ফৌজের সৈন্য ও সেনানীদের কাছ থেকে জানা যায় যে এই সময় তিনি অমানুষিক পরিশ্রম করতেন। এক এক সময় তাকে এক যােগে ৩০ ঘণ্টা পর্যন্ত শুধু লিখতেও দেখা গেছে। মনের ভিতর কি জলন্ত স্বদেশপ্রেমের প্রেরণা থাকলে এরূপ পরিশ্রম করা সম্ভব তা সহজেই অনুমেয়। আজাদ হিন্দ ফৌজ কিংবা আজাদ হিন্দ গবর্ণমেন্ট কোন প্রকারেই জাপানীদের উপর নির্ভরশীল ছিল না। সুভাষচন্দ্র জাপানীদের উপর নির্ভর করতেন শুধু সমর-সম্ভার সরবরাহের জন্য। কিন্তু প্রতিটি জিনিসই যথোচিত অর্থমূল্য দিয়ে কিনে নেওয়া হত। কোন কাজের জন্যেই তার টাকার অভাব হত না—মালয়বাস ও ব্রহ্মবাসী ভারতীয়রা টাকাত দূরের কথা, তার আহ্বানে প্রাণ পর্যন্ত দিতে প্রস্তুত ছিল। একাধিকবার জনসভায় এমন দৃশ্য দেখা গেছে যে তার গলার ফুলের মালা বহু লক্ষ টাকায় নীলাম বিক্রয় হয়েছে। তিনি যে কত জনপ্রিয় ও শ্রদ্ধাভাজন ছিলেন:-এ তারই সামান্য নিদর্শন মাত্র। পূর্বেই বলেছি যে আজাদ হিন্দ গবর্ণমেন্ট ছিল সকল দিক থেকে পূর্ণাঙ্গ। এই গবর্ণমেন্টের নিজস্ব একাধিক বেতার-কেন্দ্র ছিল—নিজস্ব পত্র পত্রিকা ছিল। বেতার কেন্দ্র থেকে সুভাষচন্দ্র বহুবার বহু বক্তৃতা আজাদ হিন্দ ফৌজ বা আজাদ হিন্দ গবর্ণমেন্টের ১৩৮ নেতাজী হর, মাহিনা মধ্যে ধর্মগত বা দলগত সীণতা ছিল না। মাতৃভূমির মুক্তি বিধানই ছিল এই গবর্নমেন্ট ও সেনাবাহিনীর মূল লক্ষ্য। তাদের আদর্শ ছিল জাতীয় কংগ্রেস এবং জাতীয় কংগ্রেসের মুক্তি-প্ৰয়াস। তাই গান্ধী ব্রিগেড, নেহেরু ব্রিগেড, আজাদ ব্রিগেড প্রভৃতি বিভিন্ন সেনাবাহিনীর সৃষ্টি। আজাদ হিন্দ গবর্ণমেন্টের নিজস্ব ষ্ট্য ছিল—একথাও আজ জানা গিয়েছে। এমন একটি স্বয়ং সম্পূর্ণ, জাতীয়তার শ্রেষ্ঠ আদশে অনুপ্রাণিত গবর্ণমেন্ট ও সেনাবাহিনীকে যারা জাপ তাবেদার বলেন, তাদের মিথ্যাবাদী আখ্যা দেওয়া ছাড়া গত্যন্তর কোথায় ? সনা- বাহিনী ও গবর্নমেন্টের প্রতিটি কর্মচারীর বেতনের বৃদ্ধির হার প্রভৃতি সুনিদিষ্ট ছিল । এমন কি সামান্য একটি পাচকের চাকুরীরও যথারীতি গ্রেড ছিল । মাত্র অল্প দিনের প্রচেষ্টায় সুভাষচন্দ্র যে এমন একটি সুসংবদ্ধ গণমেন্ট এবং সুশিক্ষিত বিরাট বাহিনী গড়ে তুলতে পেরেছিলেন, তা সত্যই বিস্ময়ের উদ্রেক করে এবং তা চিরদিনই ইতিহাসের বিস্ময় হয়ে থাকবে। পরাধীন দেশের স্বাধীনতা- সংগ্রামের ইতিহাসে এর তুলনা মেলা সত্যই দুষ্কর। আজ জানা গেছে যে যুদ্ধের সময় কলকাতার বুকে জাপানীদের বিমান আক্রমণ যে ভয়ঙ্কর আকার ধারণ করে নি-- তার পিছনে ছিল নেতাজীরই প্রয়াস। ১৩৫০ এর দুর্ভিক্ষে বাঙ্গলা দেশের লক্ষ লক্ষ নরনারীর মৃত্যু সংবাদ পেয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন চঞ্চল। তাই বেতার মার তিনি আজাদ হিন্দ গবর্ণমেন্টের পক্ষ থেকে চাউল দিয়ে বাঙ্গলাকে সাহায্য করার প্রস্তাব করেছিলেন। কিন্তু এতগুলো, নরনারী ও শিশুর মৃত্যু প্রতিরােধ করতে না পারলেও, দেশত্যাগী শত্রু সুভাষচন্দ্রের নেতাজী । অযাচিত সাহায্য নিতে সেদিন বৃটিশ গবর্ণমেন্টের পদমর্যাদায় লেগেছিল। পূর্ব এশিয়ার ভারতীয়রা নেতাজীকে কেন শ্রদ্ধা করে এ সম্বন্ধে কুয়ালা লামপুরের শ্রীযুক্ত কে, বি, সুব্বায়ার একটি প্রবন্ধের অংশবিশেষ এখানে উধৃত না করে পারলাম না। “পূর্ব এশিয়ার ভারতীয়রা এবং আজাদ হিন্দ ফৌজের সৈন্যর। আবার তাদের রহস্যময় নেতাজীকে দেখতে পাবার ভরসা রাখে! তিনি কিভাবে বৃটিশ ভারত থেকে পালিয়েছিলেন, কি ভাবে বার্লিন থেকে টোকিও গেছিলেন এবং আবার কিভাবে সাম্রাজ্যবাদীদের ধোঁকা দিয়েছেন। আজও রহস্যাচ্ছন্ন। আমাদের নেতাজী না থাকলে বিগত ৪৪ সালে পূর্ব এশিয়ার ভারতীয় দের মধ্যে শতকরা ৯০ জনকেই মৃত্যু বরণ করতে হত। তিনি আমাদের জাতীয় অভিবাদন ‘জয় হিন্দ দিয়ে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন। তিনি আমাদের শুভ সুখ জৈনকি' নামে নতুন জাতীয় সঙ্গীত দিয়েছিলেন। ১২ থেকে ১৮ বছরের বালক বালিকাদের নিয়ে গঠিত আমাদের নেতাজীর ‘বালক সেনা যখন জনাক”। রাজপথ এবং গহন জঙ্গল দিয়ে মাচ করে যেতে, তখন তাদের দেখলে বিস্ময় লাগত। তারা ছিল ভাবী স্বাধীন ভারতের সেনাবাহিনীর আদর্শ বিশেষ। সমগ্র পূর্ব এশিয়ার ভারতীয় শিশুদের ‘কাজ খোঁজার বিদ্যা শিক্ষা দেওয়া হত না-তাদের জাতীয় এব যান্ত্রিক বিদ্যা শিক্ষা দেওয়া হত।” পূর্ব এশিয়ায় সুভাষচন্দ্রের আজাদ হিন্দ গবর্ণমেন্টের বিরাট প্রচেষ্টা আজ ইতিহাসের অঙ্গীভূত হয়েছে। তাঁর কার্যকলাপের যেটুকু আমরা জানতে পেরেছি, তাতেই আমাদের তাক লেগে গেছে। ১৪ ০ নেতাজী P এখনও তার কার্যকলাপের বহুলাংশই আছে অজ্ঞাত এবং অনাবিস্কৃত। মাত্র কয়েক পৃষ্ঠার মধ্যে তার ঐতিহাসিক প্রচেষ্টার সম্পূর্ণ পরিচয় দেওয়া সম্ভবপর নয় এবং আমি সে দুশ্চেষ্টাও করিনি। পাঠক পাঠিকাদের সামনে আমি নেতাজীর বিরাট প্রচেষ্টার একটা সাধারণ রূপ তুলে ধরার প্রয়াস পেলাম মাত্র। এইবার রণক্ষেত্রে আজাদ হিন্দ কোন প্রত্যক্ষ সমর প্রচেষ্টার একটা বিবরণ দেব । ১৪১ সংগ্রাম ও শান্তি সুভাষচন্দু আজাদ হিন্দ ফৌজ ভালভাবে পুনর্গঠন করার পর মাত্র বৎসর খানেক সময় পেয়েছিলেন ইংরেজ ও মার্কিন সেনাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালাবার। তার সেনাবাহিনী ও সমর-সজ্জা আশানুরূপ না। থাকলেও তিনি রণক্ষেত্রে বহু গুণে অধিক শক্তিশালী ইঙ্গ-মার্কিণ সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যে কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছিলেন, কোন ক্রমেই তা উপেক্ষা করা চলে না। আজাদ হিন্দ ফৌজের পরিপূর্ণ সামরিক শক্তি প্রকৃতপক্ষে কত ছিল তা নিশ্চয় করে বলা শক্ত। তার কারণ মুক্তিপ্রাপ্ত আজাদ হিন্দ ফৌজের সৈন্য ও সেনানীদের মুখ থেকে এ সম্বন্ধে নানারূপ কথা শােনা গেছে। কেউ বলেছেন ৫০ হাজার ও কেউ বলেছেন ৬৫ হাজার—আবার কেউবা বলেছেন পুরােপুরি এক লক্ষ। আমরা পুরােপুরি যদি এক লক্ষ ও পরে নিই—ত এ সংখ্যা ইঙ্গ-মার্কিণ সেনাবাহিনীর সংখ্যার তুলনায় কত নগণ্য ! তাছাড়া, আজাদ হিন্দ ফৌজের প্রয়ােজনানুরূপ সমর-সম্ভার, এরোপ্লেন, ট্রাক প্রভৃতি ছিল না। নেতাজী টাকা দিয়ে জাপানীদের কাছে—এ সব কিনে নিতেন। তারা প্রয়ােজন অনুযায়ী ট্যাংক, বিমান, ট্রাক প্রভৃতি সরবরাহ করতে পারে নি—বা ইচ্ছা করে করে নি। ইচ্ছা করে না করার কারণ, জাপানীরা নেতাজীর উগ্র স্বদেশপ্রেম এবং পূর্ণ স্বাতন্ত্রবোধকে সহ করতে পারত না। তিনি ওদের হাতের পুতুল হননি—এইখানেই ছিল তাদের প্রধান অভিযােগ। তাই কার্যত রণক্ষেত্রে জাপানীদের ১৪২ নেতাজী পূর্ণ সহযােগিতা আজাদ হিন্দ বাহিনী পায় নি। তবু যে আরাকান, কোহিমা ও ইম্ফলের যুদ্ধে এ বাহিনী নিছক স্বদেশপ্রেমের প্রেরণায় এত বীরত্ব দেখাতে পেরেছিল—সেটাই'ত বিস্ময়কর ! আজাদ হিন্দ বাহিনী মােটামুটি চারটি দল বা ব্রিগেডে বিভক্ত ছিল। একটি দলের নাম ছিল গান্ধী ব্রিগেড-সে দলের নেতা ছিলেন কর্ণেল কিয়ানী। দ্বিতীয় দলের নামকরণ হয়েছিল সুভাষ ব্রিগেড,—মেজর জেনারেল শাহ নওয়াজ ছিলেন এই দলের সেনানায়ক। তৃতীয় দলটি। নাম ছিল আজাত ব্রিগেড, এ দলের অধিনায়ক ছিলেন কর্ণেল মােহন সিং। আর কর্ণেল বলনের নেতৃত্বে যে চতুর্থ ব্রিগেড ছিল- তার নাম ছিল নেহেরু-ব্রিগেড ! সম্মুখ সমরে বীরত্ব ও আত্মত্যাগে এই ব্রিগেড কয়টি যে আদর্শ সৃষ্টি করে গেছে-তার তুলনা খুবই কম মেলে। তা সত্বেও যে এর শেষ প সংগ্রামে সয়লাভ করতে পারে নি -তার জন্যে সৈন্যরা দায়ী নয়—দায়ী জাপানীদের নিক্ষিতা এবং কোন কোন ক্ষেত্রে স্পষ্ট বিরােধিত, আজাদ হিন্দ ফৌজের সন সম্ভারের অভাব এবং ইঙ্গ-মার্কিণ শক্তিদ্বয়ের বিপুল সামরিক শক্তি। আজাদ হিন্দ ফৌজ বোধ হয় সর্বপ্রথম আরাকানের পার্বত্য প্রদেশেইলড়াই সুরু করেছিল ১৯৪৪ সালের ৪ঠা F-ব্রুয়ারী। সুভাষচন্দ এই আরাকান যুদ্ধের নামকরণ করেছিলেন “অগ্নি-শুদ্ধি” { Boi-ht of fir)। আরাকান যুদ্ধে একাধিক ক্ষেত্রে আজাদ হিন্দ ফৌজ বৃটিশ বাহিনীকে পরাজিত করেছিল এবং তাদের প্রভূত ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল । আরাকান যুদ্ধকে কোন ক্রমেই আজাদ হিন্দ ফৌজের চরম লক্ষ্য বলে ধরা চলে না। সুভাষচন্দ্র একে একটি পরীক্ষামূলক যুদ্ধ হিসাবেই গ্রহণ ১৪৩ নেতাজী করেছিলেন। আজাদ হিন্দ গবর্ণমেন্ট এবং আজাদ হিন্দ ফৌজের সর্বময় কতৃত্ব নেতাজী সুভাষচন্দ্র নিজের হাতে গ্রহণ করার মাত্র আট মাসের মধ্যেই আরাকান যুদ্ধ আরম্ভ হয়। রণাঙ্গণে আজাদ হিন্দ ফৌজ কিরূপ কৃতিত্ব দেখাতে পারে তার প্রথম অগ্নিপরীক্ষা হয় আরাকান রণাঙ্গনে। তাই নেতাজী আরাকান যুদ্ধের নামকরণ করেছিলেন ‘আজাদ হিন্দ ফৌজের অগ্নি-শুদ্ধি'। ১৯৪৪ এর ৪ঠা জুলাই থেকে ১০ই জুলাই পর্যন্ত নেতাজীর ক্ষমতাপ্রাপ্তির সম্বাৎসরিক উৎসব উপলক্ষে নেতাজী সপ্তাহ উদযাপিত হয়েছিল। এই উপলক্ষে সুভাষচন্দ্র আজাদ হিন্দ গবর্ণমেন্ট এবং আজাদ হিন্দ ফৌজের এক বৎসরের কার্যকলাপ সম্বন্ধে একাধিক বেতার-বক্তৃতা দিয়েছিলেন। একটি বক্তৃতা প্রসঙ্গে আরাকান যুদ্ধের যে বর্ণনা তিনি দিয়েছিলেন, তা এখানে উদ্ধৃত করে দিলাম : “আমাদের সমরােদ্যমের গতি বাড়িয়ে বৃটেন-আমেরিকার বিরুদ্ধে আমাদের যুদ্ধ- ঘােষণাকে কার্যকরী করে তােলার জন্য ১৯৪৪ এর জানুয়ারী মাস ব্যয়িত হয়েছিল। এরপর ৪ঠা ফেব্রুয়ারী আরাকান অঞ্চলে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রথমারম্ভ। আরাকান অঞ্চলের যুদ্ধকে আজাদ হিন্দ ফৌজের অগ্নি-শুদ্ধি ধলা চলে। এই পরীক্ষায় আমাদের সৈন্যরা পূর্ণ বিজয়ী হয়ে এসেছে। আজাদ হিন্দ ফৌজের সদস্যরা যে চরমতম অসুবিধা এবং কঠিন অবস্থার মধ্যেও বীরের মত যুদ্ধ করবে—এ বিষয়ে সকলেই এখন নিঃসংশয়। আরাকান যুদ্ধে আমাদের যেসব সৈন্য ও অফিসার বীরত্ব প্রদর্শন করেছেন, তাদের কয়েকজনকে সাময়িক গবর্ণমেন্টের তরফ থেকে সম্মানে বিভূষিত করার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল।” অতএব ১৪৪ নেতাজী আরাকান যুদ্ধকে আমরা সম্মুখ রণাঙ্গনে আজাদ হিন্দ ফৌজের বাস্তৰ মহড়া হিসাবে ধরে নিতে পারি। আরাকানের সাফল্যে উৎসাহিত হয়ে সুভাষচন্দ্র এবার ভারত-ব্রহ্ম সীমান্তে অভিযান শুরু করার পরিকল্পনা করলেন। তার মূল উদ্দেশ্য ছিল ভারতের মাটিতে পদার্পণ এবং বন্দীনী ভারত-জননীর শৃঙ্খল মােচন। তাই আরাকান যুদ্ধান্তের প্রায় মাস খানেক পরে-- আনুমানিক ৮ই মার্চ তারিখে আজাদ হিন্দ ফৌজ ইন্দো-ব্রহ্ম সীমাথের টিডিডম অঞ্চলে নতুন অভিযান শুরু করে। ব্ৰহ্মযুদ্ধে জাপানীরা তখন আত্মরক্ষামূলক সংগ্রাম শুরু করেছিল বলে আজাদ হিন্দ ফৌজ জাপানীদের কাছ থেকে আশানুরূপ সাহায্য পায়নি। ত। তারা। ইঙ্গমার্কিণ সেনাবাহিনীকে পশ্চাদপসরণে বাধ্য করে মণিপুর ও আসামের দিকে এগিয়ে এল। আজাদ হিন্দ ফৌজের সংগ্রামে শুরু হল এক গৌরবােজল অধ্যায়। মণিপুর ও আসামের যুদ্ধে প্রধানত আজাদ হিন্দ ফৌজের সৈন্যরাই যে অংশ গ্রহণ করেছিল, সুচতুর ব্রিটিশ সমর-কতার সুকৌশলে সে সত্য দেশবাসীদের কাছ থেকে লুকিয়ে রেখেছিলেন। ১৯৪৪ এর মার্চ মাসের মধ্যেই আজাদ হিন্দ ফৌজ যুদ্ধ করে ভারতের মাটিতে প্রথম পদার্পণ করে। তখন তার মনে যে প্রেরণা ও উৎসাহ পেয়েছিল— তা সহজেই অনুমেয়। এরূপ স্থির হয়েছিল যে আজাদ হিন্দ ফৌজ দেশের অভ্যন্তরে বেশ কিছুদূর এগিয়ে এলে এবং ব্রহ্মপুত্রের তীরে উপস্থিত হলে, সুভাষচন্দ্র তাদের সর্বময় কতৃত্ব গ্রহণ করবেন। তাই বলে সুভাষচন্দ্র রণাঙ্গণে সৈন্যদের পরিদর্শন করতে আসতেন না, এমন কথা মনে করলে ভুল হবে। সৈন্যরা যখনই কোনরূপ বিপদের সম্মুখীন হত, তখনই ১৪৫ ১০ নেতাজী নেতাজী নিজের সমস্ত বিপদ আপদের আশঙ্কা দূরে ঠেলে রেখে ছুটে আসতেন প্রত্যক্ষ রণাঙ্গনে এবং নানাভাবে তাদের সুখ সুবিধা বিধানের চেষ্টা করতেন। তবে প্রধান কর্মক্ষেত্রে তার উপস্থিতি ছিল প্রয়ােজনীয়। তিনি সেখানে থেকে নিত্যনতুন সমর-সম্ভার সংগ্রহ, সৈন্য সংগ্রহ, অর্থ সংগ্রহ প্রভৃতির ব্যবস্থা করতেন। যাই হােক, ১৯৪৪ এর মার্চ এপ্রিল মাসে ইন্দোব্রহ্ম সীমান্তের টিভিডম, কালাদন, হাকা, মণিপুর প্রভৃতি অঞ্চলে আজাদ হিন্দ ফৌজ বহুগুণে অধিক শক্তিশালী বৃটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে কৃতিত্ব অর্জন করেছিল। সৈন্যদের মনােবল দেখে স্বয়ং সুভাষচন্দ্র পর্যন্ত বিস্মিত হয়ে গিয়েছিলেন। এরপর প্রবল বর্ষা নামায় সৈন্যদের অগ্রগতি বন্ধ হয়ে যায় । এক বৎসর পরে নেতাজী সপ্তাহ উপলক্ষে সুভাষচন্দ্র এই যুদ্ধের আশাপ্রদ চিত্র আঁকলেও, এর মধ্যে একটা নৈরাশ্যের দিকও ছিল। ইন্দো-ব্রহ্ম সীমান্তের যুদ্ধে দেখা গিয়েছিল যে আজাদ হিন্দ ফৌজের সকল সদস্যই স্বদেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ ছিল না এবং দেশ ও জাতির প্রতি তাদের আনুগত্যও সমান ছিল না। অপেক্ষাকৃত বেশী ভীরু এবং বিশ্বাসঘাতক একদল সৈন্য মাঝে মাঝে দল ত্যাগ করে বৃটিশ পক্ষে যােগ দিচ্ছিল। এই নির্লজ্জ দেশদ্রোহিতা এবং বিশ্বাসঘাতকতার সন্ধান পেয়ে নেতাজী মর্মাহত হয়েছিলেন। সেনাবাহিনীর আভ্যন্তরীণ এই সব দুর্বলতা দূর করে, তাকে আরও সংহত, সুসমৃদ্ধ এবং কর্মনিপুণ করে গড়ে তােলার জন্যে ১৯৪৪ এর ৩০শে অক্টোবর একটি সময় পরিষদ গঠিত হয়। সমর পরিষদে নিয়ােক্ত ১১ জন সদস্য ছিলেন ঃ কর্ণেল ভোসলে, কর্ণেল কিয়ানী, লেঃ কঃ আহসান কাদির, লেঃ কঃ আজিজ আহমদ খাঁ, ১৪৬ নেতাজী লেঃ কঃ হবিবুর রহমান, লেঃ কঃ গুলজারা সিং, শ্রীরাঘবন, এস, এ, আয়ার, শ্রীপরমানন্দ, কর্ণেল এ, সি, চট্টোপাধ্যায়, সেক্রেটারী এবং শ্ৰী এ, ইয়েলাপ্পা সংযােজিত সদস্য। এই ভাবে ১৯৪৪ এর শেষ দিকে আবার নতুন উদ্যমে যুদ্ধ শুরু হয়। কিন্তু বর্ষার সময় যুদ্ধ স্থগিত রাখার ফলে ইঙ্গ-মার্কিণ সেনাবাহিনীর সুবিধা হয়েছিল বেশী। তারা ইন্দোব্রহ্ম রণাঙ্গণে বহু স্থান পুনরপিকার করে নিয়েছিল। পূর্বেই বলেছি যে জাপানীরা আত্মরক্ষামূলক সং গ্রামের নীতি অবলম্বন করায় তারা যুদ্ধে তেমন জোর দিচ্ছিল না—শৃঙ্খলার সঙ্গে ক্রমশঃ পশ্চাদপসরণ করাই ছিল তাদের অবলম্বিত নীতি। এর উপর বহু ক্ষেত্রে তারা আবার নেতাজীর আদেশ লঙ্ঘন করে নিজেদের সামরিক কৌশল দেখাতে গিয়েও নতুন বিপদের সৃষ্টি করেছিল। উদাহরণ স্বরূপ ডিমাপুর অবরােধের কথা বলা চলে। জানা গেছে যে ডিমাপুর অবরােধ না করে, সরাসরি দখল করাই ছিল নেতাজীর নির্দেশ। কিন্তু জাপানী সেনানায়ক তার নির্দেশ অমান্য করে নির্বুদ্ধিতার পরিচয় দেন এবং ফলে ডিমাপুর দখল করা আর সম্ভব হয়নি। ডিমাপুর আজাদ হিন্দ ফৌজের করতলগত হলে এ যুদ্ধের গতি পরিবর্তিত হয়ে যাওয়াও বিচিত্র ছিল না। তা ছাড়া, ক্রমশঃ যুদ্ধের গতি যতই জাপানীদের প্রতিকূলে চলে যাচ্ছিল, ততই তারা আজাদ হিন্দ ফৌজ ও গবর্ণমেন্টের প্রতি অসহযােগিতার মনােভাব দেখাচ্ছিল। এই অবস্থায় পড়ে আজাদ হিন্দ ফৌজের পক্ষে সীমাবদ্ধ সমরসামর্থ নিয়ে পশ্চাদপসরণ করা ছাড়া গত্যন্তর ছিল না। তবে তারা জাপানীদের মত বিনা যুদ্ধে ১৪৭ নেতাজী রণাঙ্গন পরিত্যাগ করত না। তারা পশ্চাদপসরণ করলেও, বিপক্ষে। প্রচুর ক্ষতি সাধন করত। ১৯৪৫-এর গােড়ায় যুদ্ধক্ষেত্রে আবার নতুন করে আজাদ হিন্দ ফৌজে দলত্যাগী বিশ্বাসঘাতকদের সন্ধান পাওয়া যায়। নেতাজী একটি বিশেষ নির্দেশনামায় এই বিশ্বাসঘাতকতা বন্ধ করার আদেশ দেন। কিন্তু পশ্চাদপসরণশীল আজাদ হিন্দ ফৌজ ক্রমশই অধিকতর বিপদের সম্মুখীন হতে থাকে। মিত্রবাহিনী যতই ব্রহ্মের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে থাকে, ততই বৃটিশ-প্রেমিক একদল ব্ৰহ্মবাসী মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে থাকে। তারাও আজাদ হিন্দ ফৌজের বিরােধিতা করতে থাকে। জাপানী আক্রমণের সম্মুখে মালয় ও সিঙ্গাপুরে বৃটিশরা একদিন ভারতীয় সেনাবাহিনীর সম্বন্ধে যে নৈর্ব্যক্তিক নিরাসক্তি ও দায়িত্বহীনতা দেখিয়েছিল, বৃটিশ আক্রমণের সম্মুখে জাপানীরাও শেষ পর্যন্ত আজাদ হিন্দ ফৌজের প্রতি তেমনি ঔদাসীন্যই দেখিয়েছিল। তখন তাদের তথাকথিত মিত্রতার সকল মুখােসই পড়েছিল খসে। কিন্তু এতে আজাদ হিন্দ ফৌজের গৌরব একটুও ম্লান হয় নি। অস্ত্র শস্ত্রের মধ্যে তাদের ছিল শুধু রাইফেল আর বেয়নেট। তাই ইঙ্গ-মার্কিণ শক্তিদ্বয়ের বিপুল ট্যাঙ্কবহর এবং বিমান বাহিনীর আক্রমণের মুখেও তারা যে বীরত্ব দেখিয়েছিল ইতিহাসে তার তুলনা 'মেলে কি না সন্দেহ। ইম্ফল ও ডিমাপুর অবরােধের সময়—একদিকে বর্ষা অপর দিকে খাদ্যাভাব এবং ম্যালেরিয়া রােগের আক্রমণ সত্ত্বেও আজাদ হিন্দ ফৌজের বীররা রণক্ষেত্র ত্যাগ করে নি। দিনের পর দিন তাদের ঘাস খেয়ে কেটেছে—এমন উদাহরণও বিরল নয়। ১৪৮ নেতাজী মাতৃভূমির স্বাধীনতার জন্যে যারা জীবনপণ করেছিল তারা সহজে শত্রুকে রেহাই দেয় নি কিংবা তার হাতে আত্মসমর্পণ করে নি। ১৯৪৫-এর গােড়ার দিকে ব্ৰহ্ম পুনরাধিকারের জন্যে মিত্রপক্ষ বিপুল রণসজ্জা নিয়ে অভিযান শুরু করল। সেই অভিযানের সম্মুখে জাপানীরা ক্রমশ ব্ৰহ্ম পরিত্যাগের নীতি অবলম্বন করল। নেতাজী সুভাষচন্দ্র জাপানীদের এই নীতি সমর্থন করতে পারেন নি বলে তাঁর সঙ্গে জাপানী রণনায়কদের প্রায়ই মতবিরােধ হত। সালের ২৩শে এপ্রিল জাপানীরা রেঙ্গুণ পরিত্যাগ করে যায়। সুভাষচন্দ্র তাদের সঙ্গে রেঙ্গুণ পরিত্যাগ করতে অস্বীকার করেন। নেতাজীর ব্যক্তিগত সেক্রেটারী মেজর হাসান (যিনি জার্মানী থেকে তার সঙ্গে একই সাবমেরিণে পূর্ব এশিয়ায় এসেছিলেন) বলেছেন যে তার আদৌ রেঙ্গুণত্যাগের ইচ্ছা ছিল না। নেতাজীর সামরিক সেক্রেটারী কর্ণেল মেহবুব আহমদ এই উক্তির সত্যতা স্বীকার করেছেন। সুভাষচন্দ্রের ইচ্ছা ছিল তিনি রেঙ্গুণে থেকে সম্মুখ সমরে শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত নন করে পরাধীন মাতৃভূমির ঋণ শােধ করে যান। তাই প্রবল বিমান আক্রমণের মুখেও তিনি মুহূর্তের জন্যে নিজের বিপদের কথা ভাবতেন না। কিন্তু তার রেঙ্গুণ ত্যাগ নিয়ে আজাদ হিন্দ ফৌজের সেনা নায়কদের সঙ্গে তার মতবিরােধ দেখা যায়। সুভাষচন্দ্র নাকি এই সময় মন্তব্য করেছিলেন : “ভারতে বহু মহামানব আছেন। ভারতের প্রয়ােজন ঐতিহ্যের—কাজেই আমি অটুট থেকে দেহরক্তের শেষ বিন্দু পর্যন্ত দান করে যেতে চাই।” কিন্তু অবশেষে সেনানায়করা তাকে অনেক বুঝিয়ে রেঙ্গুণ পরিত্যাগে সম্মত করেন। ১৯৪৫ সালের ১৪৯

নেতাজী
যাচ্ছি।
২৪শে এপ্রিল সুভাষচন্দ্র রেঙ্গুণ পরিত্যাগ করে যান।
পরিত্যাগের পূর্বে তিনি রেঙ্গুণবাসী ভারতীয়রা যাতে বৃটিশদের হাতে
বিপদে না পড়তে পারে তার জন্যে সম্ভাব্য সব ব্যবস্থা অবলম্বন করে
যান। রেঙ্গুণ পরিত্যাগের পূর্বে আজাদ হিন্দ ফৌজের সৈন্য ও
সেনানায়কদের উদ্দেশ্যে তিনি যে শেষ নির্দেশনামা প্রচার করেছিলেন,
নিম্নে তার প্রতিরূপ দেওয়া হল : “১৯৪৪-এর ফেব্রুয়ারী মাস থেকে
আপনারা যেখানে বীরােচিত সংগ্রাম চালিয়েছেন এবং এখনও
চালাচ্ছেন, আজ গভীর বেদনা নিয়ে আমি সেই ব্ৰহ্মদেশ ত্যাগ করে
ইম্ফল ও ব্রহ্মদেশে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রথম
চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু তা প্রথম চেষ্টাই মাত্র। আমাদের আরও
বহু চেষ্টা করতে হবে। আমি চির আশাবাদী। কোন অবস্থাতেই
আমি পরাজয় মেনে নেব না। ইম্ফলের সমতলভূমিতে, আরাকানের
অরণ্যাঞ্চলে, ব্ৰহ্মদেশের তৈলখনি ও অন্যান্য
তৈলখনি ও অন্যান্য অংশে শত্রুর বিরুদ্ধে
বীরত্বের কাহিনী আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে চিরকাল
লিখিত থাকবে।”
ইনক্লাব জিন্দাবাদ
আজাদ হিন্দ জিন্দাবাদ
জয় হিন্দ
(আঃ) সুভাষচন্দ্র বসু
আজাদ হিন্দ ফৌজের সর্বাধিনায়ক
T
১৯৪৫-এর ২৪শে এপ্রিল রেঙ্গুণ ত্যাগের পর আগষ্ট মাসের

নেতাজী ? মাঝামাঝি জাপানীদের চূড়ান্ত আত্মসমর্পণের পূর্ব পর্যন্ত সুভাষচন্দ্রের কার্যকলাপ এবং গতিবিধি সম্বন্ধে এখনও বিশেষ কিছু জানা যায় নি। ১৯৪৫ এর ১৪ই আগষ্ট জাপানীরা সরকারীভাবে আত্মসমর্পণ করে। নেতাজী তখন ছিলেন ব্যাঙ্ককে। মেজর হাসানের বিবৃতিতে প্রকাশ যে এর কয়েকদিন পরেই সুভাষচন্দ্র তার ষ্টাফ নিয়ে এবােপ্লেনযােগে সায়গন যান। তার উদ্দেশ্য ছিল জাপান যাওয়া। তার ৪াফে ছিলেন মেজর হাসান, কর্ণেল মেহবুব আহমদ, কর্ণেল হবিবুর রহমান প্রভৃতি। সায়গনে পৌছিলে জাপ কতৃপক্ষ জানান যে এরােপ্লেনে মাত্র দুজনের জন্যে স্থান পাওয়া যেতে পারে। নেতাজী হবিবুর রহমানকে তার সঙ্গে নিয়ে টোকিও যাত্রা করেন। এর কয়েকদিন পরে মেজর হাসান প্রমুখ অন্যান্যরা অন্য এবােপ্লেনযােগে টোকিও যাত্রা করেন। পথে নয় নামক স্থানে তাদের গতি বাধা প্রাপ্ত হয়। এইখানে তার ফরমােসা দ্বীপে এবােপ্লেন দুর্ঘটনায় সুভাষচন্দ্রের মৃত্যুসংবাদ পান। ১৯৪৫•এর আগষ্ট জাপ সংবাদ সরবরাহ প্রতিষ্ঠান সরকারীভাবে ফরমােসার তাইহকু বিমান ঘাঁটিতে সুভাষচন্দের বিমান দুর্ঘটনার সংবাদ দেন। বিমান দুর্ঘটনায় স্বাধীন ভারত গবর্ণমেন্টের অধিনায়ক সুভাষচন্দ্র এবং কর্ণেল হবিবুর রহমান -- উভয়েরই দেহ পুড়ে গিয়েছিল। নিজের দেহের কথা না ভেবে হবিবুর রহমান নেতাজীকে সাহায্য করতে এগিয়ে যান। পরে নেতাজীকে একটি হাসপাতালে এবং হবিবুর রহমানকে অপর একটি হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয় । এই সময় সুভাষচন্দ্র হবিবুর রহমানকে বলেছিলেন : “হবিব, আমার দেশবাসীদের বলল যে আমার দেশের ধা'নতার জন্যে আমি প্রাণ দিলাম। অবিলম্বে আমার দেশ স্বাধীনতা লাভ করবে—এই পূর্ণ বিশ্বাস নিয়েই আমি প্রাণত্যাগ করব।” ভারতের রাজনৈতিক জীবনের পরবর্তী ঘটনাবলী তার মুখের কথাকেই আজ সত্য বলে প্রতিপন্ন করতে চলেছে। সুভাষচন্দ্রের মৃত্যু বিষয়ে ভারতবাসীরা আজও নিঃসংশয় নয়। ব মুত্য হয়েছে—এর যেমন প্রত্যক্ষ প্রমাণ নেই, তার মৃত্যু হয় নাই তারও কোন সত্য প্রমাণ নেই। সত্য জানা সম্ভব ছিল একমাত্র হবিবুর রহমানের। কিন্তু হাসপাতাল থেকে আরােগ্য লাভ করে তিনি যখন নেতাজীকে দেখার জন্যে অপর হাসপাতালে যান, তখন ডাক্তারের মুখ থেকে শুনতে পান যে তার মৃত্যু হয়েছে এবং অন্ত্যেষ্টি ক্রিয়াও শেষ হয়েছে। তাই ভারতে আজ তাঁর মৃত্যু সম্বন্ধে প্রচুর দ্বিধাদ্বন্দ্ব আছে। এক দল লােক বিশ্বাস করেন—তার মৃত্যু হয়েছে অপর দলের ধারণা তিনি মাঞ্চুরিয়া বা অন্যত্র আত্মগােপন করে আছেন—যথা সময়ে আত্মপ্রকাশ করবেন। আজাদ হিন্দ ফৌজের অধিকাংশ সৈন্য ও সেনানায়করা শেষােক্ত মতাবলম্বী। সুভাষচন্দের মৃত্যুই হয়ে থাকুক, আর তিনি জীবিতই থাকুন—ভারতের স্বাধীনতার জন্যে তাঁর অমর কীর্তি আজ ইতিহাসের অঙ্গীভূত হয়েছে। তবে তিনি বেঁচে থেকে পরাধীন ভারতের শৃঙ্খল মােচন দেখে যান—ভারতবাসী মাত্রেরই অন্তরে এই ব্যাকুল বাসনা। সুভাষচন্দ্র ব্রহ্ম পরিত্যাগের পর—ক্রমে সমস্ত ব্ৰহ্ম ইঙ্গ-মার্কিণ সমর-কর্তাদের রতলগত হয় এবং আজাদ হিন্দ ফৌজের সৈন্য ও সেনানায়করাও বৃটিশদের হাতে ধরা পড়েন। দেশবাসীদের সম্মিলিত নেতাজী দাবীর চাপে আজ তাদের অধিকাংশই মুক্তি পেয়েছেন এবং প্রকৃত স্বাধীনতা সৈনিকের মত তারা ভারতের জাতীয় কংগ্রেসে যােগদান করে ভারতের স্বাধীনতা-সংগ্রামকে আরও শক্তিশালী করে তােলার সংকল্প জ্ঞাপন করেছেন। সুভাষচন্দ্রই তাদের এই নির্দেশ দিয়ে গিয়েছিলেন। নেতাজীর প্রতি তাদের ভক্তি, শ্রদ্ধা ও আনুগত্যের অন্ত নেই। সুভাষচন্দ্র তার বিরাট ব্যক্তিত্বের ছোঁয়াচ দিয়ে এদের অন্তরের সব মালিন্য মুছে দিয়ে সেখানে জালিয়ে দিয়েছেন স্বদেশপ্রেমের বহ্নিশিখা। হিন্দু মুসলমান শিখ নির্বিশেষে তারা সবাই ভুলে গেছেন সঙ্কীর্ণ সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধিতারা এক জাতি, এক প্রাণ ও একতার আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে উঠেছেন এবং আসমুদ্র হিমাচল নেতাজীর সেই মহান বাণীই বহন করে নিয়ে যাচ্ছেন। আজাদ হিন্দ ফৌজের জাতীয় সঙ্গীত, সমর-সঙ্গীত এবং ‘জয় হিন্দ’ আজ ভারতের প্রতি গৃহ মুখর করে তুলেছে। আর নেতাজী ও তাঁর বিশ্বস্ত অনুচরদের বুকের রক্ত দিয়ে সৃষ্টি করা এই ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকারের সামনে দাড়িয়ে কুচক্রী সাম্রাজ্যবাদীরা ত্ৰাসগ্রস্ত হয়ে উঠেছে।

ব্যক্তিত্ব ও রাজনৈতিক মতবাদ সুভাষচন্দ্রের জীবনের বহু ঘটনা আলােচনা প্রসঙ্গে আমি তার বিরাট ব্যক্তিত্বের কথা বলেছি। কিন্তু সে ব্যক্তিত্ব যে কত স্বতন্ত্র এবং কত বিরাট ছিল-তা যারা তাকে না দেখেছেন বা তার সঙ্গে না মিশেছেন তারা বুঝতে পারবেন না। তার বিরাট ব্যক্তিত্ব ছিল সর্বব্যাপকতার মতাবলম্বী অনুচরদের ত কথাই নেই, যারা তার বিরুদ্ধবাদী তারাও তার ব্যক্তিত্বকে সম্মান না করে পারতেন না। ভারতের রাজনীতি ক্ষেত্রে মহাত্মা গান্ধীর সমপয়ে ফেলা যায়—এমন দ্বিতীয় নেতা যেমন নেই, সুভাষচন্দ্রের সমপগয়ে ফেলা যায়—এমন দ্বিতীয় নেতাও নেই। তাই বয়সের দিক থেকে সুভাষচন্দ্র গান্ধীজীর পুত্রবং হলেও, গান্ধীজী পর্যন্ত তার ব্যক্তিত্বকে প্রশংসার চোখে দেখতেন। রাজনীতির বিচারে সুভাষচন্দ্র অপেক্ষা বড় কূটনীতিবিদ রাষ্ট্রনায়ক খুঁজে পাওয়া কঠিন নয়। কিন্তু তার মত সত্যসন্ধ নির্ভীক ত্যাগব্রতী স্বাধীনতার সৈনিক খুজে পাওয়া সত্যই দুষ্কর। আমার এক এক সময় মনে হয় যে সুভাষচন্দ্র যদি পরাধীন ভারতে না জন্ম কোন স্বাধীন দেশে জন্মাতেন, তবে তিনি রাজনীতির কুট খেলা নিয়ে আদৌ নাড়া চাড়া না করে হয়ত প্রতিভাবান সমর-কুশলী রণ-নেতা হতেন, নয়ত হতেন সত্যান্বেষী ধর্মোপাসক। রাজনীতির খেলা কূটবুদ্ধির প্রয়ােজনে সম্বয় সময় যে বাকাচোরাগলি-পথে বিচরণ বাঞ্ছনীয় হয়ে ওঠে সুভাষচন্দ্র তা বুঝতেন না কিংবা বুঝলেও সে পথে চলতে পারতেন না। রাজনীতির ১৫৪ নেতাজী ক্ষেত্রে যারা সাফল্য অর্জন করেন, তাদের কথা ও কাজে সময় সময় প্রচুর ব্যবধান দেখা যায়। সুভাষচন্দ্রের মধ্যে এ দুমুখাে নীতির হদিস মেলে না। তিনি কার্যক্ষেত্রে যেমন নির্ভীক ছিলেন, কথায়ও ছিলেন তেমনই স্পষ্টবাদী। এর ফলে তাকে যে বিপদে না পড়তে হত, তাও নয়—কিন্তু তার চরিত্রের এমন দৃঢ়তা ছিল যে কোন কিছুই তিনি পরােয়া করতেন না। সুভাষচন্দ্র ছিলেন একনিষ্ঠ শক্তির উপাসক। তাই শক্তির মন্ত্রই ছিল তার কাছে বড়। ঈশ্বরে অটুট বিশ্বাস রেখে দেশ ও জাতির মুক্তি কামনায় তিনি যে কোন বিপদকে হাসিমুখে বরণ করে নিতে পারতেন। তার জীবনের সাধনা ছিল একমুখী। যে মুহূর্তে তিনি বুঝেছিলেন যে পরাধীন ভারতকে যে কোন উপায়ে শৃঙ্খলমুক্ত করাই তার জীবনের মূল উদ্দেশ্য, সেই মুহূর্ত থেকে তার জীবনে আর অন্য চিন্তা, অন্য ধ্যান ছিল না। এমন কি আধুনিক বিজ্ঞানের মতে যে যৌন, প্রেরণা আমাদের জীবনের সমস্ত কাজ, সমস্ত চিন্তাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে, তাকেও তিনি ডুবিয়ে দিয়েছিলেন দেশমাতৃকার একনিষ্ঠ সেবায়। জীবনের প্রথমে রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি একদা কৌমার্যব্রতের আদর্শে জীবন গড়ে তুলেছিলেন। পরে জীবনের গতি ধর্মের দিক থেকে রাজনীতির দিকে মােড় ফিরলেও, তার জীবন যাপনের ধারা বদলায়নি। কিশাের বয়সে কিংবা যৌবনে সুভাষচন্দ্র ভুলেও কোন দিন কোন মেয়ের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন—এমন কথা তার শত্রুও বলতে পারবে না। রাজনৈতিক নেতৃত্ব করতে গিয়ে তাকে বহু নারীকর্মীর সংস্পর্শেই আসতে হয়েছে। আর তার মত সমুন্নতদেহ ।

নেতাজী দৃঢ়চরিত্র সুপুরুষ নারীর মনে রেখাপাত করবে এটা সহজেই ধরে নেওয়া যায়। বিস্ময়ের বিষয় এই যে তার দিক থেকে তিনি কোনদিনই নারীদের সম্বন্ধে সজাগ ছিলেন না। তার আত্মীয় পরিজনেরা তাকে বিয়ের কথা বললে তিনি স্বভাবসিদ্ধ গম্ভীরভাবে জবাব দিতেন যে সে বিষয়ে তার ভাববার সময় নেই। দেশের সেবায় উৎসর্গীকৃত এমন একমুখী জীবন সত্যই বিরল। এ বিষয়ে পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরু প্রমুখ অন্যান্য ভারতীয় নেতার সঙ্গে সুভাষচন্দ্রের চরিত্রের পার্থক্য লক্ষনীয়। দেশের মুক্তি-সাধনার ফাকে ফাকে এদের জীবনের ও চরিত্রের একটা গাহস্থ দিক আছে-রাজনীতির মরুভূমিতে আছে সহজ স্বাভাবিক বসবােধের মরুদ্যান। কিন্তু সুভাষচন্দ্রের মধ্যে এই শেষােক্ত বটির অভাব ছিল। এঁর চরিত্রে একটা প্রকলিগ গাম্ভীর্য ছিল এবং সর্বদা গভীর চিন্তা করতে গভীর সুরে কথা বলতেই তিনি ভালবাসতেন। সুভাষচন্দ্রের চরিত্রের আর একটি বড় বৈশিষ্ট ছিল এই যে কৈশােরে গুরুর সন্ধানে ব্যর্থকাম হয়ে ধর্মজীবন যাপনের আশা ছেড়ে দিলেও, ধর্মের মূলগত নীতি তার জীবনকে আষ্টেপৃষ্টে নিয়মের নিগড়ে বেঁধে রেখেছিল। তিনি ছিলেন নীতিবাদী, ঈশ্বর বিশ্বাসী, মিতাহারী এবং মিতাচারী। একটা সিগারেট পর্যন্ত তাকে কেউ কোনদিন খেতে দেখেনি। নিজের অনুচরদের তিনি যে আদর্শে অনুপ্রাণিত করতে চাইতেন, তার নিজের জীবন ছিল তারই প্রতিফলন। তাঁর চরিত্রের আর একটি বড় গুণ ছিল অনুগামীদের প্রতি তাঁর আন্তরিক প্রীতি, দায়িত্ব-বােধ এবং কর্তব্যজ্ঞান। তার রাজনৈতিক শিষ্যবৃন্দ থেকে সুরু করে আজাদ হিন্দ ফৌজের প্রতিটি সৈনিক এ উক্তির সত্যতা ।

নেতাজী সম্বন্ধে সাক্ষ্য দেবেন। আমরা আজাদ হিন্দ ফৌজের বহু সৈন্যের মুখ থেকে একাধিকবার শুনেছি যে নেতাজী একাধারে তাদের বন্ধু ও উপদেষ্টা ছিলেন। তার নিজের চরিত্রে যেমন সাম্প্রদায়িক সঙ্কীর্ণতা ছিল না, তেমনই আজাদ হিন্দ ফৌজের মধ্য থেকেও তিনি প্রথম থেকেই এ সঙ্কীর্ণতাকে দূরীভূত করেছিলেন। নিজের পদমর্যাদার জন্যে কোন অহমিকা বােধ তার চরিত্রে ছিল না। তিনি নিজে সর্বাধিনায়ক হলেও সাধারণ সৈনিকদের সঙ্গে একই খাবার এক সঙ্গে বসে সমভাবে বণ্টন করে খেতে তার কুণ্ঠা হত না। তিনি ইচ্ছা করলে জাপানীদের দেওয়া অনেক সুখ সুবিধা ভােগ করতে পারতেন। কিন্তু জাপানীরা তার সৈন্যদের জন্যে অনুরূপ সুবিধা দিতে পারবে না বলে, তিনি নিজে সব সুবিধা প্রত্যাখ্যান করতেন। এমন ঘটনার কথাও জানা যায় সে আজাদ হিন্দ ফৌজের সাধারণ একটি সৈনিকের গায়ে কোট ছিল না বলে, তিনি অকাতরে তাকে নিজের গায়ের মূল্যবান কোট খুলে দিয়েছিলেন। প্রকৃত সেনানায়কের চরিত্রে যে যে গুণ থাকা দরকার তার সবগুলােই সুভাষচন্দ্রের চরিত্রে ছিল—তার সঙ্গে ছিল অপূর্ব স্বদেশ- প্রেম এবং জাতিবর্ণ নির্বিশেষে মানব-প্রীতি। তার চরিত্রে এই সব অপূর্ব গুণের সমাবেশ হয়েছিল বলেই তিনি এত অল্প সময়ে আজাদ হিন্দ ফৌজের সৈন্য ও সেনানীদের মনে এত গভীর রেখাপাত করতে পেরেছিলেন এবং সামান্য দু বৎসরের মধ্যে তাদের আজীবনের শিক্ষা দীক্ষা ভুলিয়ে তাদের জীবনের গতি ফিরিয়ে দিতে পেরেছিলেন দেশাত্মবােধের মহান আদর্শের পথে। তাই তার মানস-সন্তান আজাদ হিন্দ ফৌজের বীর সৈন্য ও সেনানীরা আজও যখন তাদের নেতাজীকে ১৫৭ নেতাজী স্মরণ করেন তখন তারা শ্রদ্ধায় ভক্তিতে আপ্লুত হয়ে ওঠেন—বহু- দূরবর্তী নেতাজীকে স্মরণ করে তাঁদের চোখে মুখে নেমে আসে আবেগের বর্ণোচ্ছাস ! পূর্বেই বলেছি যে ভারতীয় রাজনীতিতে সুভাষচন্দ্র কোন শ্রেণীতে পড়েন না। প্রকৃতপক্ষে তিনি নিজেই নিজের শ্রেণী এবং তার রাজনৈতিক মতামত বিচার করতে তার মাপকাঠি দিয়েই তা করতে হবে । গান্ধীজীর মহান ব্যক্তিত্ব এবং জীবনাদর্শের প্রতি তার অকুণ্ঠ শ্রদ্ধা থাকলেও, তিনি তাঁর রাজনৈতিক মতবাদকে নিঃসংশয় চিত্তে মেনে নিতে পারেননি। পরাধীন দেশে রাজনীতি করতে গিয়ে সাময়িকভাবে গান্ধীবাদের সঙ্গে আপােষ করলেও সে আপােষ বেশী দিন টেকেনি—শীঘ্রই তার স্বমূর্তি প্রকাশ পেয়ে তাকে ভিন্ন পথে নিয়ে গেছে। প্রশ্ন উঠতে পারে, তবে তাঁর রাজনৈতিক মতবাদ কি ছিল ? এখানে সংক্ষেপে এই প্রশ্নের জবাব দেবার চেষ্টা করব। রাজনৈতিক জীবনের গােড়া • থেকেই সুভাষচন্দ্র ছিলেন চরম বামপন্থী—অর্থাৎ প্রত্যক্ষ সংগ্রামের পথে স্বাধীনতা-অর্জন প্রয়াসী । এ ক্ষেত্রে গান্ধীজীর সঙ্গে তার মত-বিরােধ সুস্পষ্ট। গান্ধীজীর রাজনীতিতে আপােষের স্থান ছিল এবং আছে। প্রয়ােজন হলে সত্যাগ্রহ এবং প্রয়ােজন হলে আপােষ-গান্ধীজী এ দুই পথকেই স্বীকার করেন। কিন্তু বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে আপােষের নাম শুনলেই সুভাষচন্দ্র যেতেন ক্ষেপে। তিনি সংগ্রাম ছাড়া অন্য পথ জানতেন না। সে স’ গ্রামের ব্যাপারেও আবার তার কাছে হিংসা এবং অহিংসার মধ্যে নীতিগত কোন ব্যবধান ছিল না। হিংসা দিয়ে ১৫৮ নেতাজী হিংসাকে জয় করার মধ্যে তিনি গান্ধীজীর মত, কোন নীতিগত বিরে দেখতে পেতেন না। প্রথম জীবনে তার উপর আয়ল্যাণ্ডের ডি ভ্যালেরার সিন্ ফিন্ দলের রাজনীতি খুব প্রভাব বিস্তার করেছিল । তাই তিনি একবার সিনফিনের আদর্শে সমান্তরাল স্বাধীন ভারত গবর্নমেন্ট স্থাপনের প্রস্তাব এনেছিলেন জাতীয় কংগ্রেসের সম্মুখে। তার এ পরিকল্পনা অবাস্তব বলে সেদিন জাতীয় কংগ্রেস কতুক নাকচ • হয়ে গেছিল। তার প্রায় ১৫ বৎসর পরে তিনি স্বাধীন ভারত গবর্ণ- মেন্ট স্থাপন করে প্রমাণ করে গেছেন যে ইচ্ছা এবং চেষ্টা থাকলে সমান্তরাল স্বাধীন গবর্ণমেন্ট স্থাপন আদৌ অসম্ভব কিংবা অবাস্তব নয়। ১৯৩০ খৃষ্টাব্দের দিকে আমরা সুভাষচন্দ্রের মধ্যে রাজনৈতিক মতবাদের বিবর্তন দেখি। তিনি তখন কিষাণ-মজদুর আন্দোলনের দিকে প্রথম মনােনিবেশ করেন। প্রকৃতপক্ষে সুভাষচন্দ্রই সর্বপ্রথম শ্রমিক কৃষকদের সঙ্গে জাতীয় কংগ্রেসের ব্যাপক গণ-সংযােগ ঘটিয়ে- ছিলেন। এর পরই আসে সুভাষচন্দ্রের ইউরােপে নির্বাসন কাল। ইউরােপে গিয়ে তিনি দেখতে পান যে সমগ্র ইউরােপ তার বিরুদ্ধবাদী দুইটি রাজনৈতিক আদর্শের টানাপােড়েনে দ্বিধা-বিচ্ছিন্ন। একদিকে পৃথিবীর এক ষষ্ঠাংশ ভূভাগ সােভিয়েট রাশিয়ায় চলছে কমুনিজমের পরীক্ষা, অপর দিকে ইউরােপের ইটালী ও জর্মাণীতে মুসসালিনি ও হিটলারের আবির্ভাবে দেখা দিয়েছে বিরুদ্ধবাদী রাজনৈতিক মতবাদ ফ্যাসিজম। ইংল্যাণ্ডের তথাকথিত পার্লামেন্টারী গণতন্ত্রের 'আদর্শ কোন দিনই সুভাষচন্দ্রের মনে কোন প্রেরণা জোগাতো না। তার নেতাজী মনের স্বাভাবিক প্রবণতা ছিল—কম্যুনিজমের দিকে, অথচ তিনি মূলত ধর্মবাদী ছিলেন বলে হুবহু কমুনিজম গ্রহণ তার পক্ষে সম্ভব ছিল না। তাই তার দৃষ্টি মৃদু ধরণের সমাজতন্ত্রবাদের উধ্বে কখনও পৌছাতে পারে নি। কম্যুনিজমের কোন কোন দিক তিনি মনে প্রাণে ঘৃণা করলেও, এই নতুন মতবাদের কোন কোন দিক তঁাকে আকৃষ্ট করেছিল। তাই তিনি নিজের সংশ্লেষণী ক্ষমতার বলে এই পরস্পর বিরােধী উভয় মতবাদের কয়েকটি বৈশিষ্ট নিয়ে নিজের ‘সাম্যবাদ সঘে’র আদর্শ গড়ে তুলেছিলেন। তাঁর The Indian Struggle নামে প্রসিদ্ধ পুস্তকে এই সাম্যবাদ সঙ্ঘের কথা আছে। এই আদর্শে তিনি ভারতে কোন বিশেষ দল অবশ্য তৈরী করতে পারেন নি। কংগ্রেসের সঙ্গে তার বিরােধের পর এবং তার দেশ ত্যাগের পূর্বে তিনি যে ফরওয়ার্ড ব্লক গঠন করেছিলেন, তার মধ্যে কিছু পরিমাণে নিজের আদর্শ প্রতিফলিত করার প্রয়াস পেয়েছিলেন। কম্যুনিজম এবং ফ্যাসিজমের মূলগত বিরোধ সত্বেও সুভাষচন্দ্র তাদের মধ্যে নীচের সাধারণ বৈশিষ্টগুলো খুঁজে পেয়েছিলেন : উভয় মতবাদেই ষ্টেটকে ব্যক্তির উপর স্থান দেওয়া হয়, উভয় মতবাদই পার্লামেন্টারী গণতন্ত্রের বিরােধী, উভয় মতবাদই মূলত পার্টির শাসনে বিশ্বাস করে, উভয়েই বিশ্বাস করে পার্টির একনায়কত্বে এবং সংখ্যালঘু দল যদি পার্টির বিরােধিতা করে, তবে উভয় মতবাদেই তার দমনের নীতি স্বীকৃত। এর উপর ভিত্তি করে সুভাষচন্দ্র যে মতবাদ তৈরী করেছিলেন তার মূল কথা হল দশটি : (১) ধনিক জমিদারদের স্বার্থের বদলে শ্রমিক কৃষাণদের স্বার্থ হবে বড়। (২) ভারতের পূর্ণ নেতাজী অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন হবে পার্টির মূল লক্ষ্য। (৩) পার্টির আদর্শ হবে ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্র, তবে কেন্দ্রের হাতে কয়েক বৎসরের জন্য ডিক্টেটর সুলভ ক্ষমতা রাখতে হবে । ( 4 ) দেশের কৃষি ও অর্থ- নৈতিক উন্নতির জন্যে রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা করতে হবে। (৫) জাতি প্রভৃতি বৈষম্যের বিলােপ করে নতুন সমাজ সংগঠন করতে হবে। (৬) আধুনিক জগতের সঙ্গে তাল রাখার জন্যে নতুন মুদ্রামাণ প্রচলিত করতে হবে। (৭) জমিদারী তুলে দিয়ে নতুন ভূমিব্যবস্থার প্রবর্তন করতে হবে। (৮) পার্লামেন্টারী গণতন্ত্রের আশ্রয় নিয়ে দঢ় সামরিক ব্যবস্থার দ্বারা সমগ্র ভারতের ঐক্য ও সংহতি বজায় রাখতে হবে । ( ৯) প্রস্তাবিত পার্টির কাজ শুধু ভারতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না—বিদেশী প্রচার কাস এবং বিদেশী প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় ভারতের স্বাধীনতাকে এগিয়ে আনতে হবে। (১০) এই পার্টির নেতৃত্বে দেশের সমস্ত বামপন্থী শক্তিকে একত্রিত করতে হবে। পুরােপুরি এই সব আদর্শ বজায় রেখে অবশ্য ভারতে সুভাষচন্দ্র কোন দল গড়ে তুলতে পারেন নি। এবে তার এই রাজ- নৈতিক আদর্শ থেকে তার মনের একটা সুস্পষ্ট চেহারা পাওয়া যায় । যুদ্ধকালে ভারতের আশু মুক্তির জন্যে সুভাষচন্দ্র ফ্যাসিষ্ট জাৰ্মাণী ও জাপানের সহায়তা নিয়েছিলেন বলে কেউ কেউ তাকে ফ্যাসিষ্ট প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করে থাকে । অথচ তিনি আদৌ ফ্যাসিষ্ট ছিলেন না। তবে দেশের মুক্তির জন্যে তিনি ফ্যাসিষ্ট, কনিষ্ট যে কোন দেশের সাহায্য নিতেই প্রস্তুত ছিলেন । প্রস্তুত ছিলেন। হাতের কাছে ফ্যাসিষ্ট জামাণী এবং জাপানকে পেয়েছিলেন বলে এবং তারা তাকে সাহায্য ১৬১ ১১ নেতাজী দিয়েছিল বলেই তিনি তা গ্রহণ করেছিলেন। আবার অনেকে তাঁর ক্ষমতাপ্রিয়তার নজির দেখিয়ে বলতে চান যে স্বাধীন ভারতে এক- নায়কের পদাধিকার করাই ছিল তার জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য। এর মত ভুলও আর কিছু হতে পারে না। সুভাষচন্দ্র বরাবর নিজেকে স্বাধীনতার সৈনিক বলেই মনে করতেন। তবু যে দেশে থাকতে কংগ্রেসের উপর কতৃত্ব স্থাপনের প্রয়াস তিনি পেয়েছিলেন, তার কারণ তিনি জানতেন যে ক্ষমতা তার হাতে না এলে, তিনি নিজের রাজ- নৈতিক কমতালিকা বাস্তবে পরিণত করে ভারতের স্বাধীনতাকে এগিয়ে আনতে পারবেন না। তাই বলে নিছক ক্ষমতাপ্রিয়তার বশে জাতীয় কংগ্রেসের নেতৃবৃন্দের বিরােধিতা করা তাঁর উদ্দেশ্য ছিল । সে উদ্দেশ্য তার যদি থাকত, তবে ভারতের বাইরে গিয়ে তিনি জাতীয় কংগ্রেসের আদর্শে তার আজাদ হিন্দ গবর্ণমেন্ট এবং আজাদ হিন্দ ফৌজকে গড়ে তুলতেন না। তিনি বরাবর আজাদ হিন্দ ফৌজের বৃটিশ-বিরােধী সংগ্রামকে বলেছেন দ্বিতীয় রণাঙ্গণ। তার মতে ভারতে ‘ভারত ছাড়ো আন্দোলনের দ্বারা কংগ্রেস মে বৃটিশ-বিরােধী সংগ্রাম সুরু করেছিল, বাইরে থেকে আজাদ হিন্দ ফৌজ গড়ে তিনি তারই শক্তি বৃদ্ধি করেছিলেন। তিনি একাধিকবার ঘােষণা করেছিলেন যে তার প্রতিষ্ঠিত গবর্ণমেন্ট একান্ত সাময়িক। ভারতের মুক্তিযুদ্ধ সাফল্য- মণ্ডিত হলে ভারতবাসীরা নিজেরাই তাদের শাসক-মণ্ডলী নির্বাচন করবে। ভারতের সর্বশ্রেষ্ঠ জননায়ক মহাত্মা গান্ধীর প্রতিও তাঁর ছিল অপরিসীম শ্রদ্ধা। যে মুহূর্তে আপােষের পথ ত্যাগ করে ভারত ছাড়াে’ ১৬২ নেতাজী মন্ত্রোচ্চারণ করে গান্ধীজী অন্ধকারে জাতির পথ নির্দেশ করেছিলেন, সেই মুহূর্তে বিদেশস্থিত সুভাষচন্দ্র অপেক্ষা অন্য কেউ বেশী খুসী হন নি। আজাদ হিন্দ বেতার-কেন্দ্র থেকে সুভাষচন্দ্র গান্ধীজীর উদ্দেশ্যে যে একাধিক বেতার-বক্তৃতা করেছিলেন, তার মধ্যে তার অপরিসীম শ্রদ্ধা ও ভক্তির নিদর্শন মেলে। নেতাজী সপ্তাহ উপলক্ষে প্রদত্ত একটি বক্তৃতায় তিনি গান্ধীজীর কাছ থেকে এই বলে আশীর্বাদ চেয়েছিলেন । “আমাদের জাতির জনক! ভারতের এই পবিত্র মুক্তিসংগ্রামে আমরা আপনার আশীর্বাদ ও শুভেচ্ছা প্রার্থনা করি।” মতবিরােধ সত্বেও জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ নেতার প্রতি তার এই রকম শ্রদ্ধা ছিল। ভারতে আদর্শবাদী রাষ্ট্রনেতা ও কূটনীতিবিদের অভাব নেই। কিন্তু সুভাষ- চন্দ্রের মত ত্যাগৱতী একনিষ্ঠ স্বদেশ-সেবক এবং সংগঠন-নিপুণ কর্মী আর একজনও আছেন কিনা সন্দেহ। তার আজাদ হিন্দ গবর্ণমেন্ট ও আজাদ হিন্দ ফৌজ আমাদের জাতীয় আন্দোলনকে বেশ কয়েক বৎসর এগিয়ে দিয়েছে। ক্ষয়িষ্ণু বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদ তার আঘাতে উঠেছে টলে । আজাদ হিন্দ ফৌজের আদর্শ আজ অসামরিক জনগণের জীবনকে প্রভাবিত তত করেছেই, অক্টোপাসের মত সে আদর্শ আন্ধু ভারতের নৌ, বিমান ও স্থল বাহিনীতেও তার বহুমুখী প্রভাব বিস্তার করেছে। সাম্রাজ্যবাদী বৃটিশরা আজ তাই আপােষ-কামনায় জাতীয়তাবাদী ভারতের দ্বারস্থ। আজ হােক, কাল হােট, ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা লাভ সুনিশ্চিত। জাতীয়তাবাদী ভারতের এই সাফল্যের মূলে নেতাজী ও তার আজাদ হিন্দ ফৌজের দান অপরিমেয়। তাঁর আজীবনের স্বপ্ন ও ধ্যান-ভারত মাতার শৃঙ্খল মােচন—আজ বাস্তবে নেতাজী পরিণত হতে চলেছে। কিন্তু তিনি আজ কোথায় ? স্বাধীন ভারতের সামাজিক রাষ্ট্রিক এবং অর্থনৈতিক জীবনকে ভেঙে গড়ার জন্যে সুভাষচন্দ্রের মত সংগঠন প্রতিভা সম্পন্ন নেতার প্রয়ােজন অপরিহার্য। তার প্রিয় জন্মভূমির প্রয়ােজনে আবার তাকে পাব কি? পাই আর নাই পাই—একটি বিষয় সুনিশ্চিত।' তার আদর্শ যুগ যুগ ধরে শুধু ভারতবাসী নয়—বিশ্বের স্বাধীনতাকামী জাতিমাত্রেরই মনে জাগাবে প্রেরণা, বুকে জাগাবে সাহস। পূর্ব এশিয়ায় তিনি যে সাম্রাজ্যবাদ-বিরােধী বিপ্লবের সঞ্চার করেছিলেন—তা ধীরে ধীরে পৃথিবীর নির্যাতিত নিপীড়িত পরাধীন সকল দেশে ছড়িয়ে পড়বে। বিশ্বমানবতার সর্বাঙ্গীণ মুক্তি না হওয়া পর্যন্ত বিশ্বের সংগ্রামশীল নির্যাতিত মানবের মধ্যে চিরসংগ্রামী নেতাজী যুগ যুগ ধরে মৃত্যুঞ্জয়রূপে বিরাজ করবেন। জয় হিন্দ!

------.-....
JKOT
Jours sincerel
Labhas Bar
-PHICE

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Netaji

Author
Bhoumik, Gopal
Title
Netaji
File name
Netaji
Text
OCR done
Citation
1946
Published
2009/08/14
Publisher
Sri Publishing Co., Kolkata
Language
Sanskrit
Pages
189
Library
Makardah Saraswat Library, Howrah
Classification
Biography
Keywords
Biography of Netaji Subash
DLI number
512988
Barcode
4990010020009.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
OMmN3BZek1i
Download PDF

Netaji