Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Shok-gatha

Debi,anangamohini · 2009/11/28

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

শােকগাথা।
শ্ৰীঅনঙ্গমােহিনী দেবী
প্রণীত।
কলিকাত,
৫নং শিবনারায়ণ দাসের লেন, কুন্তলীন প্রেসে
শ্রীপূর্ণচন্দ্র দাস কর্তৃক মুদ্রিত।
১৩১৩ সন।
১৯৬ রাখা।

No text on this page.

ভুমিকা। পাঠকগণ এই কবিতাগ্রন্থের প্রত্যেক কবিতায় রচয়িত্রীর কবিত্ব- শক্তির সবিশেষ পরিচয় পাইবেন। এই কবিতাগুলি, রাজকুমারী অনঙ্গমােহিনী দেবী, তাহার স্বর্গবাসী স্বামীর চরণে উৎসর্গ করিয়া- ছেন; এবং তাহারই স্মৃতিতে গ্রন্থের সকল গুলি কবিতা রচিত। যে ছবি সম্মুখে রাখিয়া এই শােক গাথা গুলি গীত হইয়াছে, সে দিকে তাকাইতে গেলে পাষাণ হৃদয়ও গলিয়া যায়- যাতনায় ক্লিষ্ট সেই বিবর্ণ বদন! আকুল বিষাদ ভরে হাতে হাত রাখি চেয়েছিল, অশ্রুপূর্ণ প্রভাহীন আঁখি। সে বিষাদ ছবি জাগে হৃদি দরপণে, ইত্যাদি। কবি যে আশায় বুক বাঁধিয়া শােকসন্তপ্ত জীবন যাপন করিতে- ছেন, সেই আশার কথা শুনিলে ও হৃদয় ব্যথিত হয়- মনে ভাবি হায় ! কভু কি তাহায়, এ আঁখি দেখিতে পাবে। হরষ দরশে, সে পদ পরশে, দুখ কি চলিয়া যাবে। কবি লিখিয়াছেন, যে তাহার হৃদয়ফলকে যে যথার্থ শােক-গাথা রক্তের অক্ষরে লিখিত আছে, তাহারি নকল শুধু এই শােক-গাথা !

i০ মানুষ যখন মৰ্ম্মাহত হইয়া কঁদে, তখন তাহার চোখের জলে সকলেরি প্রাণ ভিজিয়া যায়, উচ্চারিত শব্দ স্বভাবতঃই শশাকের আর্তনাদের অনুরূপ হয়, খুঁজিয়া পাতিয়া কথা জুড়িয়া তাহাকে প্রাণস্পর্শী করাইতে হয় না। এই জন্যই কবির ভাষা এত সরল হইয়াছে, ভাব এত সুবােধ্য এবং মর্মস্পর্শী হইয়াছে, এবং কবিতা- গুলি পড়িয়া মুগ্ধ হইতে হইতেছে। ত্রিপুরার রাজপরিবারে সরস্বতীর বিশেষ কৃপা। সঙ্গীতে, চিত্রে, কাব্যে, রাজপরিবারের সুখ্যাতি বঙ্গদেশব্যাপী। রাজপরি- বারের মহিলাগণও যে উহাতে অনুরাগিণী, এবং কবিত্ব প্রতিভায় দীপ্তিমতী, রাজকুমারী অনঙ্গমােহিনী দেবীর কবিতায় তাহা প্রতিষ্ঠিত হইতেছে। সম্বলপুর, ২৫শে শ্রবণ, ১৩১৩। } (স্বাঃ) ঐবিজয়চন্দ্র মজুমদার

নিবেদন।
নিয়তির নিদারুণ নিয়মাধীনে যে মহাপ্রলয় আমার জীবনে
ঘটিয়াছে, তাহারই করুণ উচ্ছাস সময়ে সময়ে কবিতার আকারে
প্রকাশ পাইয়াছে। এই কবিতাগুলি গ্রন্থাকারে প্রকাশিত
হইবে বলিয়া আমি আশা করি নাই। কেবল পরম পূজ্যপাদ
জ্যেষ্ঠ সহােদর শ্ৰীশ্ৰীযুত মহারাজা রাধাকিশাের মাণিক্য বাহাদুরের
উৎসাহে ও আমার স্নেহের ভ্রাতুস্পুত্ৰ শ্ৰীমান সুরেন্দ্রচন্দ্র দেববর্মার
যত্নেই “শােক-গাথা” মুদ্রিত হইল। শ্ৰীযুক্ত বিজয়চন্দ্র মজুমদার
মহাশয়ও অনুগ্ৰহ করিয়া ইহার আদ্যোপান্ত সংশােধনপূর্বক ভূমিকা
লিখিয়া দিয়াছেন। এই জন্য এই সকল সজ্জনের নিকট আমি
চির কৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ রহিলাম।
“শােক-গাথা” আমার জীবনের ঘাের বিষাদময়ী ঘটনার ও দীর্ণ
হৃদয়ের নিদর্শন মাত্র। সুতরাং ইহাতে কাহারও মনােরঞ্জন হইবে
বলিয়া আশা করি না।
আগরতলা-নূতন হাবেলী,
উজির বাড়ী।
অনঙ্গমােহিনী দেবী।

No text on this page.

পরম পূজনীয়
স্বর্গীয় উজির গােপীকৃষ্ণ দেববর্ম
স্বামী-দেবতার চরণ উদ্দেশে প্রেম ও প্রীতি
উপহার।
১
স্বামিন,
গিয়েছ স্বরগ পুরে !
কোথা গাে সে কত দূরে,
অজানা সে কোন্ দেশে করিতেছ বাস ?
পশিতে কি পারে তথা,
বিষাদ-বিরহ-গাথা,
বেদনার অশ্রুজল দুখের নিশ্বাস ?
২
পর পারে জীবনের,
গেছ চলে ! দুজনের
মাঝে আজি অন্তরাল সৃজিয়া অপার ;
নিয়ে গেছ সুখ আশা,
প্রেম প্রীতি ভালবাসা,
রাখিয়া গিয়েছ শুধু চির অশ্রুধার !

॥
হৃদয়ের ভাঙ্গা ঘরে,
বিষাদ বরষা ঝরে,
শােক-বায়ু হু হু করে সদা করে খেলা ;
গণিতেছি গত দিন,
একাকিনী সাথিহীন,
জানি না ফুরাবে কবে জীবনের বেলা !
৪
মৰ্ম্মবিদ্ধ শােক-বাণে,
সে ক্ষত আহত প্রাণে,
উৎসরে বােদন রূপে এ গীতি আমার।
লহ নাথ একবার,
দীর্ণ হৃদি বেদনার,
অশ্রুজল বিন্দু মাখা প্রেম-উপহার ।
আগরতলা-নুতন হাবেলী,
উজীর বাড়ী।
—অনঙ্গমােহিনী

সূচী। বিষয়। পৃষ্ঠা। ১৬ ••• ১। আঁখিজল ২। সান্ত্বনা ৩। চির স্মৃতি ৪। বর্ষা নিশায় ৫। ভালবাসার পরিণাম ••• ১১-১৩ ••• ••• ১৪-১৬ ••• ২১-২৪ ••• • • • ২৫-২৮ ••• •• ৭। বর্ষা উষায় ৮। পরাণ না যায় ৯। বিরহে ১০। নিশীথে ••• •• ••• । । । ৫ ০ ০ ৩৬-৩৮ ••• ••• ••• ৩৯-৪২ ১১। কল্পনা ১২। দিবা অবসান ••• ••• ৪৩-৪ ১৩। মৃত্যু ••• ••• ৪৭-৫২ ••• ••• ••• . . . ••• ••• ••• ••• । ••• ৬৯-৭১ ১৪। নীরব ••• ১৫। মরণ ১৬। বর্ষায় ১৭। বসন্ত জ্যোৎস্নায় ••• ১৮। নিশীথে ঝটিকা ১৯। চির-ঘুম ২। তরী যাত্রা ••• ২১। বিদায় ২২। স্মৃতি-চিহ্ন ২৩। সমদুঃখিনীর প্রতি *** ৭২-৭৩ ••• ৭৪-৭৬ • ৫ ০ ০ ৭৭-৮০ ৮১-৮৩ ••• ••• ৮৪-৮৭

No text on this page.

শােকগাথা ।
আঁখিজল
।
আয় প্রিয় আঁখিজল,
আয় চির
সাথী মাের
কর মম বক্ষল
শয়নে বিছানা পাের।
;
দিনমণি অস্তে যায়
রজনী আসিছে ধীরে
তুমি এস
পায় পায়,
রহি নয়ন তীরে।
সন্ধ্যার আঁধার ছায়
ঢাকি মুখ
সযতনে,
সুকরুণ সুরে গায়
তটিনী আকুল মনে !

শোেক-গাথা,
৪
বহি যায় ;
দীরঘ নিশ্বাস ফেলি
বায়ু ধীরে
ভুলি দিবসের কেলি
সকলেই কঁদে হায় !
কেহ না পাইবে টের,
এস অশ্রু এস কাছে ;
খুজে দেখি
দুজনের
প্রিয় ধন কোথা গেছে।
সে যখন গেল ওরে
জীবনের পর পার !
তােরে দিয়ে গেল মােরে
সখা রূপে উপহার ।
৭
•
তাই আমি দিবা রাতি
ভালবেসে তােরে ডাকি
করি তােরে চির সাথী
সতত নিকটে রাখি ।
২

আঁখিজল।
আগুন উঠিলে জুলি
প্রাণ যবে
পুড়ে যায়,
তুই অশ্রু বুকে
ঢালি
পড়িস্ নিবাতে তায়।
০
;
একেলা আপন ঘরে
বসে থাকি প্রাণাধিপ
জগৎ আঁধারে ভরে,
জ্বালি না সাঝের দীপ।
একাকিনী বিশ্ব ভুলি
আলিঙ্গিয়া
অন্ধকার
বাঁধি বীণা কোলে তুলি ;
জোড়ে না সে ছেড়া তার ।
১১
বীণা মাের নাহি বাজে
নীরবে বসিয়া থাকি
নীরবে
বিশ্বের মাঝে
ওরে অশ্রু তােরে ডাকি।
৩

শােকগাথা
১২
এ নিভৃতে এ আঁধারে,
আয় প্রিয় আঁখিজল ;
হেথা না
পশিতে পারে।
বাহিরের কোলাহল।
তুমি আমি দুজনায়
নিবিড় এ
নিরজনে,
বসিয়ে ভাবিব তায়,
শুধু তনময় প্রাণে।
১৪
হৃদয় শ্মশানে মম
স্মৃতির পাষাণ দিয়া,
রচিত মন্দিরােত্তম
রয়েছে উজলি হিয়া।
সে বিজন মন্দিরেতে
আছে গাে, দেবতা মাের ;
বসি প্রাণ
চরণেতে
ঢালে সদা আঁখি-লাের।
৪

আঁখিজল।
সে তত গেছে জীবনের,
খেলা করি অবসান ।
জানি না গাে, দুজনের
মাঝে কত ব্যবধান !
১৭
একদা ফুরাবে যবে,
জীবনের দীর্ঘ দিন
;
শােভিবে
সন্ধ্যার নভে
নব দীপ্তি সুরঙীন।
১৮
অন্ধকারে সমীরণ,
বহি যাবে সর সর ;
তাপ-দগ্ধ
হইবে শীতলতর।
এ জীবন
প্রখর দিবস শেষে
ব্যথিত কাতর প্রাণ
‘বিরাম লভিবে যে সে
দুখ হবে অবসান ।

শােকগাথা
সন্ধ্যার শ্যামল তীরে
ফুরাবে সুদীর্ঘ দিন ।
মুদিয়া
আসিবে ধীরে।
ক্লান্ত আঁখি জ্যোতি হীন ।
;
রহিবে না দীপ্তি ভাতি,
নিবে যাবে কোলাহল
তখনাে
সাথের সাথী।
রহিবি রে আঁখিজল ।
ও

সান্ত্বনা।
১
মন রে কি হেতু তাের এত অধীরতা
বুঝিতে না পারি,
আকুল হৃদয়ে তুই
দিবস রজনী সদা
কেন যে ঢালিস্ অশ্রুবারি ।
যার লাগি
পরাণ কাতর
সে কি পুনর্বার ;
আসিবে রে মােছাইতে তাের আঁখিধার
২
হের মন, প্রকৃতির মনােহর শােভা
আইল গােধূলি,
রঙীন আকাশে কিবা
ভাসিতেছে মনলােভা
সােনার বরণ মেঘগুলি।
ঝিরি ঝিরি
বহিছে বাতাস,
ফুটিতেছে ফুল,
আপন নীড়ের পানে উড়ে পাখিকুল।
৭

শােকগাথা
চেয়ে দেখ আজি হেথা আনন্দ উৎসব
সবে পুলকিত,
ওই শুন্ ওরে মন!
মৃদুল বংশীর রব
সাহানার মধু স্বরে গীত।
একেলা বসিয়া,
হৃদয় আমার !
ঢালিস্ অধীর প্রাণে বৃথা আঁখিধার !
তুই শুধু
৪
সন্ধ্যা যায় ধীরে ধীরে আইল যামিনী
নিবিড় আঁধার,
সুনীল বসনে পুন
সাজিছে প্রকৃতি রাণী
গলেতে পরিয়ে তারা-হার।
বিরলে বিজনে সদা তুমি,
কি যে খুঁজ মন ;
খুজিলে কি পাবি পুন হারান রতন।
৮

সান্ত্বনা
সুগভীর নিশীথিনী স্তব্ধ চারি ধার
নিদ্রায় মগন ;
নীরব নিশুতি যামে
ঘুমাও রে একবার
ওরে রে অধীর মাের মন ।
চির ঘুমে
ভালবাসা মম,
ঘুমায়েছে আগে ;
একাকী কেন বা মন, বল তবে জাগে ?
ফিরে আয় আয় মন, কোথা তুই যাস্
পাগলের পারা ?
হেরি মৃগ তৃষ্ণিকায়
মরুভূমি পানে ধা
কি হইবে ছুটে দিশাহারা !
কিছুতে না পারিলেম আমি,
বুঝাইতে তােরে ;
এরূপে কি চিরদিন জ্বালাইবি মােরে।

শােক-গাথা।
কেন বৃথা আঁখিনীর ঝরে সদা বল,
অবুঝ রে মন ?
তাের দুখে দুখী হয়ে
এক ফোঁটা অশ্রুজল,
ফেলাইতে কে আছে এমন !
তাের অশ্রুজল,
যাবে তাের সনে ;
তাের স্মৃতি আর কারাে রহিবে না মনে!
তাের দুখ
৮
ফুরায়ে এসেছে ক্ৰমে রৌদ্র-তপ্ত মাের
জীবনের বেলা !
অল্প আর আছে বাকি ;
তবে কেন মন তোের
ব্যাকুলতা? কর হে হেলা।
দিবস রজনী কত আর,
ভাবিব রে মন ?
ক্ষণেক ভুলিতে দাও হৃদয় বেদন!

চির স্মৃতি।
চির তরে চলে গেছে হৃদয়ের রাজ,
অতল বিষাদে মােরে ডুবাইয়ে আজ।
নিয়ে গেছে সুখ সাধ সুখের বাসনা,
রেখে গেছে জন্ম শােধ হৃদয় বেদনা।
সে মম পুষ্পিত শুভ্র বসন্ত জীবন,
গেছে যবে, সাথে গেছে আমার ভুবন !
নিশীথের সুখময় জোছনা-মগন,
মধ্যাহ্নের আলােময় উজ্জ্বল গগন ;
প্রভাতের মৃদু মন্দ মলয় বাতাস,
ধূসর-রক্তিম চারু সন্ধ্যার আকাশ ;
কুসুমিত সুবাসিত নিকুঞ্জ কানন,
ভ্রমর গুঞ্জিত সদা সুখের সদন।
এ সকলি গেছে চলে তারি সাথে সাথে
এৰে নিশা দেখা দেয় জীবন-প্রভাতে।
নিবে গেছে নয়নের শুভ্র দীপ্তি আলাে,
প্রাণে শুধু নেমে আসে ঘাের ছায়া কালাে
গিয়েছে সকলি মম কিছু নাহি আর,
রয়েছে কেবল স্মৃতি আর অশ্রুধার ।

শােক-গাথা ।
দিবস রজনী হৃদে জাগে নিতি নিতি,
কেবলি বিষাদময় সেই শেষ স্মৃতি।
জন্ম শােধ বিদায়ের বিষাদ-চুম্বন,
যাতনায় ক্লিষ্ট সেই বিবর্ণ বদন।
আকুল বিষাদ ভরে হাতে হাত রাখি
চেয়েছিল, অপূর্ণ প্রভাহীন আঁখি !
এ বিষাদ-ছবি জাগে হৃদি-দরপণে,
এ করুণ-গীতি ভাসে মৃদু গুঞ্জরণে
সমস্ত জীবনে মম, প্রভাতে সন্ধ্যায়
শুধু সেই স্মৃতি রেখা হৃদয়েতে ভায় !
হৃদয়ের রক্ত দিয়ে করিয়ে পােষণ,
রাখিয়াছি সেই স্মৃতি করি সযতন।
সদা সেই স্মৃতি নিয়ে আছি নিরালায়
স্মৃতি মােরে দিবানিশি হাসায় কাঁদায়।
স্মৃতি মম চির সখা মানস মােহন,
বিষাদ প্রাণেতে মাের সুখ বিনােদন।
এস তুমি চিরস্মৃতি, হাতে হাতে ধরে
বসি দোহে, অতীতের ধূলামাখা ঘরে !
নীরবে নয়নে দিয়ে মায়ার অঞ্জন
দেখাও হৃদয়ে মাের সে মনােরঞ্জন।
১২,

চির স্মৃতি।
একদা ফুরাবে যবে, দীর্ঘ তপ্ত-বেলা
সমস্ত জীবন শেষে, করি সাঙ্গ খেলা
বিরাম লভিবে প্রাণ, সে সময়ে স্মৃতি,
আসি তুমি ঢাল কানে অতীতের গীতি
জাগাও সে ছবি হৃদে অন্তিমেতে মাের
অবশেষে চোখে দিয়াে মােহ-ঘুম-ঘাের !

বর্ষা নিশায়।
১
আজিকে যামিনী,
মলিন চাদিনী
নীরব নিশুতি ধরণী
ভাঙ্গা মেঘ ভাসে চঁাদ আবরিয়া,
ঢালে রিমি ঝিমি রহিয়া রহিয়া,
আকুল সমীর বহিছে শ্বসিয়া,
প্রকৃতি সজল নয়নী;
আজি নিশি যেন,
বিরহিণী হেন
বিষাদ মলিন বরণী।
স্মৃতি নিরজনে,
হৃদি-দরপণে
দেখায় কুহক বাজীরে
অতীত-আঁধারে বিস্মৃতি-গুহায়,
চিরতরে যাহা ডুবে গেছে হায়,
স্মৃতি নব সাজে আনিয়ে তাহায়,
দেখায় কেন গাে আজিরে ;
তাই এ বিজনে,
ঝরৈ দু নয়নে,
আঁখিজল বিন্দু রাজিবে!
১৪

বর্ষা নিশায়।
৩
আর কত হায়,
ভুলাবে আমায়,
স্মৃতি গাে, হৃদয় বাসিনি,
দেখাইছ নিতি নবীন বরণে,
কত শত ছবি মানস নয়নে
শুনাও গাে শুধু সজনে বিজনে,
ঘুমান সে শােক-রাগিণী ;
কেন ক্ষণে ক্ষণে,
জাগাও পরাণে,
অতীতের শত কাহিনী।
৪
বরিষা নিশায়,
বসি নিরালায়,
চির সহচরি স্মৃতি রে,
জেগে উঠে শুধু আজি নিরজনে,
অতীতের কথা, আকুলিত মনে,
গায় মেঘ যেন মৃদু গরজনে,
তাহারি প্রণয়-গীতি রে ;
উনমাদ প্রাণে,
বায়ু বহি আনে,
তারি চির প্রেম প্রীতি রে ।

শােক-গাথা
আজি সাধ মনে,
বরষার সমে,
মিশাব এ প্রাণ, সজনী।
মেঘ সনে সদা পড়িব ঝরিয়া,
কঁদিব গাে শুধু গলিয়া গলিয়া,
দূর মেঘ সনে বেড়াব ভাসিয়া,
অয়ি চির-স্মৃতি সজনী
জীবনে মরণে,
তাহারি স্মরণে,
যাপিব দিবস রজনী
।
৬
ব্যাকুলিত মন,
ঝরে দুনয়ন,
আজি শুধু তার স্মরণে,
ভালবাসা, প্রেম, প্রীতি-ফুল-হার,
সযতনে রচি পূজা উপহার,
এ জীবন লয়ে করি অর্ঘ্যভার,
দিয়েছিনু যার চরণে;
ধূলার মাঝারে,
ফেলিয়ে তাহারে,
গেছে গাে, সে, সুখ-ভবনে।
তাই আঁখিজল,
ঝরে অবিরল,
শুধুই আকুল নয়নে !

ভালবাসার পরিণাম।
১
ভালবাসা, কেন তাের,
হেন পরিণাম ঘাের,
সদা ভাবি মনে ;
অমৃতের মধুরিমা,
বিষে হইবে রে সীমা,
বুঝিব কেমনে?
২
;
নর নারী মুগ্ধ প্রাণে ;
ধায় শুধু তাের পানে,
কি যে তব পরিণাম নাহি ভাবে মনে ;
হেরি মৃগতৃষ্ণিকায়,
যথা মরু পানে ধায়,
তৃষিত হৃদয়ে পান্থ মুগধ নয়নে ;
হায়! কি কুহক তাের, তাই ভাবি মনে
;
১৭

শােকগাথা।
যে পড়ে তােমার ফাঁদে
সেই জন শেষে কাঁদে,
আকুল অন্তরে ; •
পাশে যে রয়েছে তাের,
দারুণ বিচ্ছেদ ঘাের,
নাহি বুঝে নরে।
৪
অথবা মােহের ঘোরে,
বুঝেও বুঝে না তােরে,
হায় কেন সুখ সনে দুখের সৃজন;
ভালবাসা যেই খানে,
মৰ্ম্মাঘাত সেই খানে,
প্রেমের পশ্চাৎ কেন বিরহ বেদন;
হাসির সহিত হায় ! জড়িত রােদন।
নিষাদের বেণু ধ্বনি,
শুনি মুগ্ধ কুরঙ্গিণী,
ধায় শব্দ পানে!
১৮

ভালবাসার পরিণাম।
তেমনি কুহকে তাের,
পড়ে সবে হয়ে তাের,
মােহময় প্রাণে
হায় মরীচিকা সম,
}
সরে যাও দূরতম,
মিলাইয়া যাও কোথা স্বপনের প্রায় !
নিরাশ হৃদয় লয়ে,
নিরজন শূন্যালয়ে,
আকুল পরাণ শুধু কাঁদিয়া লুটায় ।
হৃদয়ের আশা-দীপ হৃদয়ে নিবায় !
৭
কে জানে রে ভালবাসা
হবি তুই প্রাণনাশা,
এ জীবনে যাের ;
ভাবি নাই আগে কেন,
হইবে রে শেষে হেন,
পরিণতি ঘাের !
১৯

শােক-গাথা।
হয়েছে রজনী ভাের,
ভেঙ্গেছে ঘুমের ঘাের,
গেছে সুখ স্বপ্ন এবে দুখ অবিরাম !
এখন শােকা যেন,
বিষাদ-বরষা হেন,
আবরি হৃদয়াকাশ ঝরে অবিশ্রাম!
হায় ! ভালবাসা, তাের অশ্রু পরিণাম।
২০

স্বপ্ন।
১
একদা রজনী শেষে,
মােহময় নিদ্রাবেশে,
দেখেছিনু সাধের স্বপন
যেন পূরণিমা নিশি,
উজলিত দশ দিশি,
সুহসিত ভূতল গগন।
নদী বহে কু কুল,
জন শূন্য উপকূল,
সুখ-সুপ্ত, জোছনা মগন,-
শুভ্রময়ী আধ ঘামি,
তটে বসি একা আমি,
কেঁদে যেন আকুল নয়ন।

শােক-গাথা
সে সময়ে ধীরে আসি,
বসিল মধুর হাসি,
হৃদয়ের দেবতা আমার,
কুহরিয়ে উঠে পিক,
ঢালি মধু চারিদিক,
বায়ু আনে ফুল-গন্ধ-ভার ।
ফুটিয়া উঠিছে ফুল,
উড়িছে মধুপ কুল,
বিহঙ্গম কলকণ্ঠে গায়,
কি জানি কি মােহ-ভরে,
কথা মম নাহি সরে,
কেবলি নয়ন ভেসে যায় !
-
শানি মধুর স্বরে,
চম্পক নিন্দিত করে,
মুছাইল সজল নয়ান,
কি কথা সে প্রেমাদরে,
বলেছিল হাতে ধ'রে,
মৃদু মন্দ সে মধুর তান ।
২২

স্বপ্ন।
সহসা জাগিনু হায় !
উষার আলোেক ভায়,
বিশ্ব যেন বিষাদে মগন,-
• ভেঙ্গেছে ঘুমের ঘাের,
হয়েছে গাে, নিশি ভাের,
চ'লে গেছে সাধের স্বপন
৪
যেন ইন্দ্র জাল-মায়া,
স্বপনের সেই ছায়া,
রেখে গেছে স্মৃতি দরপণে!
নিদ্রা মম বিনােদন,
এনে দেয় হারা ধন,
কেবলি বিষাদ জাগরণে!
কোথা সে মূরতি মায়া,
মােহন স্বপন ছায়া,
কোথা সেই শুভ্র উপকূল
কোথা সে বসন্ত নিশা,
চাদনী হসিত দিশা,
এবে প্রাণ বিষাদে আকুল !

শােক-গাথা
যথা,
মৃদু মধু হেসে হেসে,
বলেছিল কি কথা সে,
জাগিয়া মনেতে নাহি আর।
সুদূরের
গীত
বুঝা নাহি যায় কথা,
ভেসে আসে সুর শুধু তার !
সেরূপে মরম মাঝে,
প্রতিধ্বনি শুধু বাজে,
সে কণ্ঠের সুললিত তান!
বাজে শুধু সুর কানে,
কথা নাহি আসে প্রাণে,
তাই আজি কাঁদে মন প্রাণ ।
২৪

বর্ষা উষায়
কেন গাে আজিকে অয়ি উষা সতী,
অরুণ অধরে ফোটেনা হাসি ;
আমারি মতন তুমিও কি পতি
বিরহে পুষিছ বিষাদ রাশি?
২
কি ব্যথায় তব মলিন বয়ান,
কেন বা ভাসিছে নয়ন দুটি ;
দারুণ বিরহ বিষময় বাণ
রহিয়াছে কি গাে মরমে ফুটি ?
;
স্বরগের তুমি সতী দেববালা,
পবিত্র-হৃদয়া করুণাময়ী ;
বহিছ: কাহার নিদারুণ জ্বালা,
আপন হৃদয়ে মমতাময়ী ।

শােকগাথা।
৪
অথবা আমারি বিষাদ-ব্যথায়
ঝরে বুঝি তব কোমল আঁখি ;
তাই ঘুমাইতে আজি সাধ যায়
ওই স্নিগ্ধ কোলে মাথাটি রাখি ।
আসিয়াছি তাই উষা গাে সজনী,
কহিতে গাে কথা তােমারি সনে ;
যে দুখেতে দহি দিবস রজনী
শুনিবে কি তুমি সদয় মনে ?
আমার মতন আজি অভাগিনী
আছে কি সজনী আছে কি আর ?
আমারি মতন দিবস যামিনী
ঢালিছে কি কেহ নয়ন ধার ?
মুছিয়া ফেলেছি প্রেম-ভালবাসা,
মুছিয়াছি সখি, হরষ হাসি ;
চলিয়া গিয়াছে সুখ সনে আশা
আছে গাে যাতনা বিষাদ রাশি।

বর্ষা উষায়
আজিকে নিবিড় মেঘের আঁধারে
উষার মলিন আলােক ভায় ;
নিরাশা-হুতাশ ঘেরিছে আমারে
ম্লান মুখে আশা চলিয়া যায় ।
ডুবে যায় চাদ পশ্চিম গগনে
নিবু নিবু আললা মিশিয়া যায়
সরসীর নীল সলিল শয়নে
মূরছি কুমুদি পড়িছে হায় !
;
শীকর-স্নিগধ-সমীর নিরাশে
বহি বহি কোথা সুদূরে যায়।
মৃদুল নিনাদি নীরদ উদাসে
রহি রহি রহি ঝরিছে তায়।
আজিকে কেবলি সাধ হয় মনে
উষার কোলেতে মিশিয়া যাই
মেঘের মেদুর বাতাসের সনে
সুদূর আকাশে ভাসিয়া যাই।
২৭

শাক-গাথা।
১২
;
অথবা অকূল সাগরের তীরে
বসিয়া দেখিব তরঙ্গ মালা
সজনী গাে শুধু কহিব সমীরে
আমার অসহ মরম জ্বালা।

পরাণ না যায়।
১
পরাণ না যায়।
ধীরে ধীরে দিনমণি অস্তাচল গায়--
ওই নিবে যায়,
সােণার কিরণ রেখা,
আর নাহি যায় দেখা,
গভীর সাগর নীলিমায়।
তটিনী তরঙ্গ তুলি,
যেতেছে আপনা ভুলি,
মৃদু কুলু কুলু করি না জানি কোথায়
দিন যায় রাত যায়,
রবি শশী ডুবে যায়,
কেবলি যাতনা-জীর্ণ-পরাণ না যায় ।
২৯

শােকগাথা।
পরাণ না যায়।
যায় যায় দিন যায় ফিরে নাহি চায়—
কারাে মুখ পানে ;
বসন্ত শরত যায়,
নিদাঘ হেমন্ত যায়,
চলে যায় আপনার মনে।
;
কুসুম শুকায়ে যায়,
সুবাস চলিয়া যায়,
ঝরিয়া পড়িয়া শেষে মাটিতে মিশায় ;
সুখের দিবস যায়,
সুখের জীবন যায়,
বুঝি গাে দুখের শুধু পরাণ না যায় ।
;
পরাণ না যায়।
দিবস রজনী নিত্য লইয়া বিদায়--
কোথা চলে যায়
অসীম নীলিমাকাশে,
ক্ষীণ-রশি-তারা ভাসে,
নিৰে নিবে আঁধারে মিশায়।

পরাণ না যায়।
অনন্ত কালের স্রোতে,
ভেসে ভেসে নিরবেতে,
সুখের নবীন প্রাণ চিরতরে যায়
অতৃপ্ত কামনা হায়,
হৃদয়ে মিলায়ে যায়,
কেন গাে বিষাদময়-পরাণ না যায় ।
৪
পরাণ না যায় ।
স্নেহ প্রেম প্রীতি যায় ভালবাসা যায়—
ওই দ্রুত রথে ;
আশা যায়, হাসি যায়,
সুখ, হর্ষ চলে যায়,
জীবনের মহাযাত্রা পথে !
এমনি আপন মনে,
মিশি অনন্তের সনে,
কালের অসীম পথে সবে চলে যায় ।
ওই যায় চলে যায়,
সকলি চলিয়ে যায়,
কেবল দুখের মম পরাণ না যায় ।
৩১

বিরহে।
কে তুমি ডাকিছ মােরে
চির পরিচিত স্বরে,
শ্রবণে পশিছে তব
আকুল আহ্বান ;
কেন তুমি নিশি দিন
শ্রান্ত আঁখি নিদ্রাহীন,
হৃদয়ের কাছে বসি
শুধু গাও গান।
আছ সদা কাছে কাছে
ঘুরে ফিরে আসে পাশে,
ডাক শুধু বার বার
নাহি দেও ধরা ;
এই আছ এই নাই
বৃথা শুধু শূন্যে চাই,
কেবলি ব্যথিত প্রাণ
হয় দিশা হারা ।
৩২

বিরহে
কত মাস কত দিন
অনন্তে হয়েছে লীন,
গিয়েছ বিদায় নিয়ে
জনমের মত!
ফিরে আর আসিবে না
দেখিবে না জানিবে না,
তােমারি সােহাগ স্মরি
কাঁদি অবিরত।
থাক তুমি কত দূরে
কোন্ স্বপ্নময় পুরে ?
অচেনা সে পথ মম
অজানা সে দেশ ;
আকুল ব্যাকুল হিয়া
প্রাণ কাঁদে লুটাইয়া,
দেখাও সে পথ মােরে
আসি হৃদয়েশ।
৩
৩৩

শােকগাথা
এখনাে জীবন কুঞ্জে
প্রেমের কুসুম পুঞ্জে,
উথলি সুরভি ভাসে
আশার সমীরে।
জীবন মধ্যাহ্ন কাল।
শুভ্র আলােকের জাল,
প্রেমপুষ্প পরিমল
বহিছে সুধীরে।
সহসা বিরহ নিশি
তিমিরে আবরি দিশি,
করিল আঁধার মাের
জীবন আকাশ !
দুখের করাল করে
ছিন্ন প্রেম-পুষ্প ঝরে,
বহিছে প্রবলতর .
শােকের বাতাস।
৩৪

বিরহে
খেলা না হইতে শেষ,
গেছ চলে! দূর দেশ,
আকুল হৃদয় ভাসে
নয়নের নীরে !
দিন পরে যায় দিন,
গণি সদা শান্তিহীন,
একেলা বসিয়া আমি
জীবনের তীরে।
জানিবে না তুমি কভু
প্রাণ নাহি মানে তবু,
আশার কুহকে ভুলে
ভাবি মনে মনে ;
দেখিতেছ শুনিতেছ
তুমি সব জানিতেছ,
তাই রচি শােক-গাথা
সজল নয়নে।

নিশীথে।
১
কোথা তুমি হে হৃদয় দেব,
সুধামাখা জোছনায়, সুবাসিত মন্দ বায়,
জড়িত রয়েছে যেন তব প্রেম-প্রীতি ;
জাগিয়া উঠিছে
শুধু অতীতের স্মৃতি।
২
আজিকার চঁাদিনী যামিনী
ঢালি চঁাদ সুধারাশি, বেড়ায় গগনে ভাসি,
তব প্রেম-মাখা আজি চাদের কিরণ ;
তােমারি পরশ আনি দেয় সমীরণ ।
কলস্বরে বহিছে তটিনী,
তরঙ্গের মৃদু তানে,
মলয়ের মধু গানে,
আজি শুধু শ্রবণেতে ঢালি দেয় আনি ;
প্রেম-মধু-মাখা সেই মৃদুমন্দ বাণী।

নিশীথে।
৪
ফুটিয়াছে মাধবী মালতী,
সুবাসে আকুল হিয়া, উড়ে অলি গুঞ্জরিয়া,
কুহরে পঞ্চমে পিক লতার বিতানে,
আজি সুখ দুখ স্মৃতি জাগে শুধু প্রাণে !
৫
সুবাসিত মলয়ের সনে,
যেন মাের চারি পাশে,
ভাসিয়া ভাসিয়া আসে,
দরশ পরশ তব চির-পরিচিত,
আজিকে কোথায় তুমি হে চিরবাঞ্ছিত!'
থাকি তুমি কোন অন্তরালে
ভালবাসা, প্রেম, প্রীতি, বিরহ, মিলন স্মৃতি,
পাঠাও জোছনা বায়ু ফুল-গন্ধ সনে
অতীত কাহিনী তাই শুধু পড়ে মনে!
৭
ছাড়ি স্বর্গ-মুখ নিকেতন
এস দেব ক্ষণ তরে,
এ বিজন ভাঙ্গা ঘরে,
দীন হীন জীর্ণ বেশ বিহনে তােমার ;
দেখ আসি হৃদয়েশ ! আজি একবার।
৩৭

শােক-গাথা।
কোথা তুমি জীবন নির্ভর,
আছ তুমি কোথা যেন, শুধু মনে লয় হেন,
কাননে বিজনে খুঁজে দেখি একবার !
অবােধ অশান্ত মন বলে বার বার !
বৃথা হৃদে জাগিছে দুরাশা,
চলে গেছ চিরতরে ! আসিবে না আর ফিরে,
জানি তাহা তবু কেন অবােধ হৃদয়,
ডাকিয়া খুঁজিতে চায় সারা বিশ্বময় ।
সুখ রবি চির অস্তাচলে ।
দিবস যামিনী মাের,
কেবলি আঁধার ঘাের,
আঁধার আমার তরে চিরােজ্জ্বল রবি,
স্মৃতি-দরপনে শুধু ভাসে শােক-ছবি!
আসি যেন কোন্ মােহ-ঘােরে,
মরম-বেদনা-ভরে
সদা আঁখি জল ঝরে,
অশ্রুজল বিনা নাহি জুড়াবার স্থল !
সুহৃদ আমার এবে শুধু আঁখি জল!
مان

কম্পনা।
শত,
এস গাে কল্পনে এস গাে সজনী
ভাবের কুসুম ফোটায়ে
দেহে মিলি সখি দিবস রজনী
গাঁথিব গাে মালা মনের মত।
২
শােকবাণহত পরাণ আমার
রয়েছে বেদনা-বিষাদে লীন,
আঁধারেতে ঘেরা হৃদি চারিধার,
ভাষা ভাব রাশি হয়েছে হীন।
চলে যায়: যবে হৃদয় রতন
নিয়ে জগতের মাধুরি হাসি,
দিয়ে গেছে মােরে করি সযতন
বিরহ-বেদনা-বিষাদ রাশি।

শােক-গাথা।
৪
সে কুদিন হ’তে জগত আঁধার
ঢাকিছে দুখের নিবিড় ছায়,
সজনী গাে, এবে নয়নে আমার
নাহি সে সুখের আলােক ভায়।
ফোটে না মধুর কুসুম কাননে
বহে না মৃদুল মলয় বায়,
সে হতে গাে সখি প্রকৃতি আননে
সে মধুর হাসি দেখা না যায়।
পশিয়াছে হৃদে করাল নিদয়
শােক-দাবানল প্রখর বেশে,
হৃদয়ের আশা-কলিকা-নিচয়
খরতর তাপে শুকায়ে গেছে!
নাহি এবে প্রেম ভালবাসা প্রীতি
রহিয়াছে শুধু যাতনা ভার!
বাজে না প্রাণের প্রেমময় গীতি
বিনােদ বীণার ছিড়েছে তার।
৪০

কল্পনা
৮
দুখের অসীম যাতনা-পীড়নে
ভুলেছি সাধের কবিতা আমি,
ভুলেছি তােমারে অয়ি কলপনে
শােক-মােহে আছি দিবস যামি !
হৃদয় নিকুঞ্জ বিহনে তােমার
হয়ে গেছে সখি মরুর মত,
তােমারি পরশে ফুটিবে আবার
মধুর সুবাস কুসুম কত।
এস ধীরে হৃদে বিমল বদনে
দোলাইয়ে চারু অলক-রাজি,
ভাবের কুসুমে ভাষা আভরণে
সাজাব সাধের কবিতা আজি।
দুজনে কাননে বেড়াব গাহিয়া
হৃদয়ের গীতি আপন মনে,
অথবা দুজনে যাইব ভাসিয়া
অকুল সাগর তরঙ্গ সনে।
৪১

শােকগাথা
১২
এস তবে অয়ি মানসী প্রতিমা
সাথে করি শুভ্র কবিতা-পুঞ্জ,
তুমি এলে সখি হাসিবে চন্দ্রিমা,
জাগিয়া উঠিবে হৃদয়-কুঞ্জ।
আঁচল ভরিয়া তুলিব দুজনে,
ভাবময় ফুল কবিতা-মালা,
গাঁথিব দুজনে মিলি সযতনে
ভুলিব প্রাণের বেদনা-জ্বালা
৪২

দিবা অবসান।
আজিকে পরাণে মাের,
জাগে কি হুতাশ ঘাের,
স্মৃতি শুধু উঠে উচ্ছসিয়া ;
উদাস বাতাস যেন,
আকুল বিরহী হেন,
ভেসে যায়।
দূরে
নিসিয়া ।
২
পশ্চিম আকাশ নীরে,
ডুবে রবি ধীরে ধীরে,
ভেসে উঠে লােহিতীম রেখা ;
দিবসের চিতা হেন,
ক্ষণিক জ্বলিয়া যেন,
নিবে পুন নাহি যায় দেখা ।
b

শােক-গাথা
কখন দিবস মম,
প্রাণে ঢেলে ঘাের তম,
হয়ে গেছে চির অবসান ।
অন্ধকার সাথে করি,
ধীরে আসে বিভাবরী,
প্রাণ শুধু হয় ম্রিয়মাণ।
৪
••
জানিতে নারিনু হায় !
প্রাণ কাঁদে উভরায়,
কখন বা এল সন্ধ্যা মসি
খেলার যে সাথী যারা,
একে একে গেল তারা,
আমি শুধু আঁধারেতে বসি।
সম্মুখে আঁধার ছায়া,
বিস্তারি অনন্ত কায়া,
আবরিতে আসে যেন মােরে।
;
৪৪

দিবা অবসান
আকুল উদাস হিয়া,
উঠে শুধু উচ্ছসিয়া,
কি যেন বেদনা মােহ-ঘােরে।
ব
জীবনের খেলা নিয়ে,
লয়ে প্রীতিপূর্ণ হিয়ে,
ছিনু মােহ-বিচেতন ভরে ;
জানি না গাে কোথা দিয়া,
আঁধারে আবরি হিয়া,
গেছে মম রবি চির তরে।
৭
কোথা সে সুখের খেলা,
কোথা সে আনন্দ-মেলা,
খেলা মাের না হইতে শেষ ;
বিষাদে হৃদয় ভরি,
পরাণে আকুল করি,
বেলা মাের হয়ে গেছে শেষ!
৪৫

শােকগাথা
in
অতীতের খেলা ঘরে,
ধূলামাখা অন্ধকারে,
পড়ে আছি ক্ষত বক্ষ নিয়ে
বিস্মৃত-জীবন-ছায়া,
প্রাণে ঢালি মােহ-মায়া,
উঠে হৃদে কেবলি জাগিয়ে ।
আজি দিবা অবসানে,
কোথা হতে পশে কানে,
অতীতের মৃদু মৃদু গান ;
চারি পাশে তম ঘাের,
প্রাণ হয় শােকে ভাের,
আজি শুধু ঝরে দু’নয়ান !

১
ভাবি হায়! কেন এ জীবন;
সুখ দুখ আশা স্মৃতি,
বিরহ মিলন প্রীতি,
কেবলি কি নিশার স্বপন ?
মৃত্যুই কি জীবনের ঘাের পরিণাম ?
লভিবে কি তারি কোলে অনন্ত বিরাম ?
জীবন কি শুধু ভ্রান্তিময় ?
তবে কেন এত আশা,
এত প্রেম ভালবাসা,
চির তরে হবে যদি লয় ।
স্নেহ ভক্তি প্রীতিপূর্ণ মানব জীবন
হবে কি
মৃত্যুর
গর্ভে চির নিমজ্জন ?
৪৭

শােক-গাথা
উজলিত জীবনের বেলা ;
মৃত্যুর পরশে যেন,
ক্ষীণ শিখা দীপ হেন, .
নিবে যাবে আলােকের মেলা
শুধুই কি অর্থহীন মানবের প্রাণ ?
চির তরে হইবে কি অনন্ত নির্বাণ ?
৪
বৃথা কি জীবন মানবের ;
প্রেম প্রীতি স্নেহ মেলা,
ইহা কি স্বপন-খেলা,
একি শুধু লীলা বালকের ?
বালুকার খেলা ঘর ভেঙ্গে যায় ক্ষণে,
তেমনি জীবন শেষ হবে কি মরণে?
;
যদি শুধু ক্ষণিক জীবন
তবে কেন নীলাকাশে,
রবি শশী তারা ভাসে,
শােভা দীপ্তি করে বিকীরণ ?
৪৮

মৃত্যু।
কেন নিশা সুখ-সুপ্তি দেয় আসি নিতি ?
পাখী কেন ঢালে কানে মধু-কল-গীতি ?
কেন গন্ধবাহী সমীরণ
সুমধুর
ঝির ঝিরে,
বহি সদা ধীরে ধীরে,
স্নিগ্ধ করে মানব জীবন
উচ্ছসিত করে প্রাণে শত নব আশা ;
জাগায় হৃদয়ে নিত্য স্নেহ ভালবাসা।
;
৭
চির শােভাময়ী বসুন্ধরা
নবক্রম লতা কুঞ্জে,
বিকশিত ফুল পুঞ্জে,
গীত গন্ধ রূপ রস ভরা ;
শ্যামল স্নিগধ কোলে স্থান করে দান
মানবেরে, স্নেহময়ী মায়ের সমান।
৪
৪৯

শােক-গাথা
৮
নহে ইহা কেবল স্বপন;
মরণের অন্তরালে,
মণ্ডিত কিরণ-জালে,
আছে দেশ উজল ভবন ;
প্রাণে পশে সদা বিবেকের দেব-বাণী,
সে লােকে শুনিব পুন সেই মধু বাণী।
তথা সব অমর জীবন
নাহি মরণের শােক,
নাহি বিরহের দুখ,
তথা চির মহান্ মিলন ;
প্রতি নিশা উদে তথা মধু পূরণিমা,
কভু নাহি করে ম্লান অমা মলিনীমা।
গায় পিক তথা চির দিন;
নিদাঘের উষ্ণ জ্বালা,
বরষার অশ্রু ঢালা,
হেমন্তের হিমানী মলিন ;

মৃত্যু। নাহি তথা এ সকল সদা সুখ রাজে, তথা চির ঋতুরাজ বসন্ত বিরাজে। এ লােকের রহস্য অপার সুখ-দুখ-বিজড়িত, মায়া মােহ আবরিত, প্রতারণাময় এ সংসার। হেথা শুধু জীবনের পরীক্ষার স্থান, সে দেশে যাইয়ে হবে উন্নতি মহান ১২ তাই ভাবি মানব জীবন, নহে বালকের খেলা, ক্ষণিক মায়ার মেলা, এ নহে গাে নিশার স্বপন ; জীবনের পর পারে আছে নব দেশ- চির বিভাময়, নাহি মলিনতা লেশ। ৫১

শােকগাথা
হায়! কোথা সেই পরলােক ;
নবীন উজল বেশ,
চির সুখময় দেশ,
সদা স্নিগ্ধ বিমল আলােক
তথা যেতে এ হৃদয় অধীর আমার,
মনে হয় ইহলােক ঘাের কারাগার ।
১৪
কবে আমি যাব সেই দেশে;
মৃত্যু বিনা সে পথের,
সাথী নাহি মানবের,
এস মৃত্যু চির সুপ্তি বেশে;
যদিও করাল তুমি তবু মম প্রিয়,
পরশি মােহিয়ে মােরে সাথে করি নিয়াে ?

নীরব ।
নীরব আমার আঁধার ভবন,
নীরব আমার সাধের বীণা
নীরব শুধুই আমার ভুবন,
নীরব পরাণ শােকেতে লীনা !
।
২
নীরব প্রেমের নীরব ভাষায়,
নীরব প্রাণের নিরালা ঘরে ;
নীরবেতে পূজি হৃদি-দেবতায়,
নীরবেতে আঁখি সলিল ঝরে ।
••
নীরব আমার হৃদয়-মন্দিরে
নীরব আমার দেবতা আজি
নীরবে গাঁথিয়া অরপিৰ ধীরে,
নিরমল অশ্রু-মুকুতা-রাজি
.

শােক-গাথা
৪
নীরবে দেখিব পরাণ ভরিয়া,
নীরবেতে শুধু বাসিব ভাল
নীরব প্রাণের আঁধার ভেদিয়া,
ফুটিয়া উঠিবে প্রেমের আলাে
;
নীরবে হাসিব নীরবে কাঁদিব,
নীরবে নীরবে সহিব জ্বালা
নীরবে গাইব নীরবে ভাবিব,
নীরবে নীরবে গাঁথিব মালা।
নীরব আমার প্রেম-ভালবাসা,
নীরব আমার আকাশ ধরা ;.
নীরব আমার জীবনের আশা
শুধুই হৃদয় নীরবে ভরা !
নীরব আঁধার জীবন-আকাশে,
নাহি উদে রবি উজল বেশে ;
নীরব আমার হৃদয়-সরসে
নাহি ফোটে প্রেম-কমল হেসে।
৫৪

নীরব।
৮
নীরব আমার হৃদয়-কাননে,
নীরবে ঝরিছে কুসুম কলি ;
নীরব, আজিকে ডাকে না সঘনে
নীরব প্রাণের কোকিলা অলি ।
•
নীরবে বিষাদ অকূল সাগরে,
ভাসায়ে দিয়েছি জীবন-তরী
হতাশ বাতাসে নিয়ে যায় দূরে,
শােক-মেঘ নামে আঁধার করি।
১০
নীরব আমার প্রাণের সে বাঁশী,
মধুর ললিতে বাজে না আর ।
নীরব আমার হৃদয়ের হাসি,
অধরে ফুটিয়া উঠে না আর।
নীরব আমার শুধু চারি পাশ,
নীরবে হৃদয় ভরিয়া গেছে ।
নীরব আমার পরাণ উদাস,
নীরবতা আসে নীরব বেশে।

শােকগাথা।
নীরবে তাহারে অরচনা করি,
নীরবে তাহারি করিব ধ্যান ;
নীরবে প্রেমা পড়িবেক-ঝরি,
নীরবে সে পদে মিশাব প্রাণ।

মরণ।
১
কি কঠোর তুই রে মরণ,
জীবন জগত মাঝে যথা প্রেম-প্রীতি রাজে,
যথা চির-বসন্ত-জীবন ;
দারুণ বজর সম তুই
পড়িস তথায়,
কঠোর পরশে তাের ছারে খারে যায়।
২
চির-প্রেম-সুধা-মন্দাকিনী-
বহিতেছিল রে সুখে শত আশা লয়ে বুকে,
মধুময়ী প্রীতি-তরঙ্গিণী ;
মরুভূমে কর পরিণত
নিমেষে তথায়,
হুতাশে সে প্রবাহিনী শুকাইয়া যায়।

শােক-গাথা
সুখ-তরু আনন্দ-কাননে,
ভালবাসা-ফুলদলে
সুধাসিক্ত প্ৰেম-ফলে,
স্নেহ প্রীতি মধুর আননে;
হায় মৃত্যু কেন তুই তথা
নয়ন পলকে,
জ্বেলে দিস্ দাবানল ঝলকে ঝলকে !
৪
' রে অন্তক! ওরে নিরমম,
যে জন ডাকিছে তােরে ভাসি সদা আঁখি লােরে,
যেন তার প্রাণপ্রিয়তম ;
বধির হইয়া কথা তার
কর শ্রবণ ;
ভুলেও নাহিক চা’ ফিরায়ে নয়ন।
শূন্য করি হৃদি প্রাণ মন,
জ্বালাইয়ে শােকানল
দহিয়ে হৃদয় স্থল,
কিবা লাভ তাের রে মরণ ?

মরণ
অলখিতে প্রবেশি তস্কর
করিস্ হরণ ;
হৃদয়ের একমাত্র পরশ রতন।
ওরে কাল ওরে মন্দমতি,
প্রাণপূর্ণ আশা শত
ভাঙ্গিতেই সদা রত,
কেন তাের হেন রে কুমতি ;
বিমল কুসুম সম হৃদে
বজর কঠিন ;
;
হানিতে প্রয়াস তাের ওরে মতিহীন।
জীবন বাসনা সহ আশা
গ্রাসিতেছ নিতি কত মানব সন্তান শত,
দুর্নিবার তাের রে পিপাসা ;
ব্যথিতের করুণ বিলাপে
দয়া নাহি হয়,
মরণ রে, তাের কিবা কঠিন হৃদয়।

শােকগাথা।
সুখময় শান্তির আলয়,
তােমার পরশে হায় ! নিমেষে ভাঙ্গিয়া যায়,
মরু সম সব শূন্যময় ;
গাঢ়তম ঘাের অন্ধকার
করিয়ে নির্মাণ,
চির তরে সুখ-দীপ করিস্ নির্বাণ ।
;
নিদারুণ পরশে রে তাের,
থেমে যায় প্রেম-গীতি চলে যায় স্নেহ প্রীতি,
হুতাশ-তুফান বহে ঘাের ;
রে কৃতান্ত, এ জগতে তুই
চির-বিভীষিকা,
সুখের প্রান্তর মাঝে ধাধা-মরীচিকা !

বর্ষায়।
১
সখি,
সারা দিন আজি,
মেঘে মেঘে সাজি,
আঁধার গগন অতি
ঢাকিছে তপন,
;
আজি
মলিন বরণ,
যেন গাে প্রকৃতি সতী।
আজি মেঘ দল,
যেন
ঘন অবিরল,
বরিষয়ে বারি রাশি ;
পূরব বাতাস,
ফেলি দীর্ঘ শ্বাস,
চলিছে দিগন্তে ভাসি
৬১

শােকগাথা
ভাসে
অসীম গগনে,
আকুলিত মনে,
যেন মেঘ পথ হারা;
বিষাদিনী হেন,
দিগ-বধূ যেন,
শুধু কেঁদে হয় সারা।
আজি
সখি,
৪
আজি নিরজনে,
শুধু পড়ে মনে,
কবেকার কত স্মৃতি ;
পশে যেন কানে,
মৃদু মৃদু তানে,
অতীতের প্রেম-গীতি ।
;
আজি
ব্যাকুল বাতাসে,
দামিনী বিকাশে,
গরজে বারিদ ঘাের ;

বর্ষায়।
ওগাে,
বরষার গানে,
আজিকে পরাণে,
জাগে কি হুতাশ মাের ।
ট
সখি,
বসি এ নিবিড়ে,
ভাসি আঁখি নীরে,
আজি শুধু ভাবি মনে ;
জীবনের পারে,
পাব কি তাহারে,
মিলিব কি তার সনে।
মম
৭
পুন
মনে ভাবি হায়!
কভু কি তাহায়,
এ আঁখি দেখিতে পাবে ;
হরষ দরশে,
সে পদ পরশে,
দুখ কি চলিয়া যাবে ?
ওগাে,
৬৩

শােকগাথা।
সখি,
কভু ভাবি মনে,
পুন তার সনে,
মিলিব জীবন তীরে ;
কুসুম ফুটিবে,
সুবাস ছুটিবে,
পাখীরা গাইবে ধীরে।
হায় !
দহিয়ে হৃদয়,
যে মহা প্রলয়,
ঘটেছে জীবনে মাের!
সে মুখ দরশে,
সে প্রেম-পরশে,
ভুলিব সে দুখ ঘাের !
ওগাে,
লয়ে ফুল-বাস,
গাইবে বাতাস,
মিলন-মঙ্গল-গীতি ;
৬৪

বর্ষায়
সেই
অনন্ত মিলনে,
অসীম জীবনে,
ভুলিব বিরহ স্মৃতি
হইবে সুদিন,
আসিবে সে দিন,
দুখেরে চরণে দলি
মিশি প্রাণে প্রাণে,
অসীমের পানে,
উভয়ে যাব গাে চলি
১২
সখি,
আজি ভাবনার,
নাহি পাই পার,
কত উঠে পড়ে মনে ;
আসে ভাসি ভাসি,
শত ভাব রাশি,
আজি বরষার সনে !
যেন
৬৫

শােক-গাথা।
ওগাে,
প্রাণ শুধু মাের,
ভাবে হয় তাের,
হয়ে যাই দিশা হারা ;
গাঁথি মালা কত,
রচি গান শত,
তাই
যেন পাগলের পারা !
১৪
এই
ঘন বরষার,
আঁধার আঁধার,
মলিন প্রকৃতি কায়া ;
সখি গাে আমার,
শােক-অন্ধকার,
হৃদয়ের প্রতি-ছায়া !

বসন্ত জ্যোৎস্নায়।
বসন্ত জোছনা রাতি
উজল চঁাদের ভাতি,
মৃদু মন্দ বহে সমীরণ ;
তটিনী পিয়াস প্রাণে বহিছে সাগর পানে,
ভাসি যায় চাঁদের কিরণ।
;
২
হসিত তটিনী তীরে শুভ্র বালুকায় ধীরে,
মুরছিত জ্যোৎস্না অচেতন ;
নিঝুম নিশুতি নিশি স্বপ্ন-মােহময় দিশি,
প্রকৃতির স্তব্ধ নিকেতন।
কোথা কোন্ অতি দূরে বাজে বাঁশী মধু সুরে,
বেহাগের মৃদু মধু তান;
পশিয়ে সে সুর কানে,
কাহারে জাগায় প্রাণে,
ঝরে শুধু আকুল নয়ান।
৬৭

শােক-গাথা।
৪
ভাসে চাদ মাতােয়ারা ঝরিছে জোছনা ধারা,
তটিনীর শুভ্র উপকূল ;
ও পারে কানন ছায়া। জলে পড়ে ঝাঁপাইয়া,
বাতাসে ফুটিয়া উঠে ফুল।
কুসুম সুবাস সনে
কার কথা পড়ে মনে,
প্রাণ শুধু ভাবে হয় ভাের !
তটিনীর কল তানে কার গীতি পশে কানে,
চোখে শুধু আসে ঘুম-ঘাের !
চারি পাশে নীরবতা যেন শুধু আকুলতা,
অনিমেষ প্রকৃতি নয়ান
সুনীল আকাশ-নীরে ভাসে চাদ ধীরে ধীরে,
প্রাণে জাগে কাহার বয়ান।
৬

নিশীথে ঝটিকা।
আজিকে নিশি আঁধার দিশি
নিবিড় আধ রজনী,
বিষাদ মসি
অখিলে পশি
ছাইল আজি অবনী ।
২।
নভের নীলে
মেঘের নীলে
গিয়াছে যেন মিশিয়া,
নিশীথ যেন
বিরহী হেন
আঁধারে পড়ে ঝাপিয়া !
দোলায়ে ঘন
গহন বন
বাতাস বহে শ্বসিয়া,
কঁপায়ে মন
গরজে ধন
বিজলি উঠে হাসিয়া।

শােকগাথা
৪
নদীর পারে
বনের ধারে,
উড়িয়া যায় জোনাকী,
ঝরিছে পাতা
বিষাদে লতা
কাপিয়া উঠে চমকি।
৫
জলদ ঝরে
আঁধার করে,
বাতাস বহে ছুটিয়া,
তটিনী কোলে
তরণী দোলে
লহরী উঠে মাতিয়া ।
হৃদয় সম.
আজিকে মম
যামিনী মসি বরণা ;
আমারি যেন
ঝরিছে ঝর ঝরণা !
নয়ন হেন
৭
আমার এই
হৃদয়ে যেই
বিষাদ বারি উথলে,
তাহারি মত
লহরী কত
য়া যায় অকূলে !

নিশীথে ঝটিকা
৮
উদাস হেন,
আজিকে যেন
পরাণ কেন কাঁদে গাে ?
কাহার ছায়া
মূরতি মায়া
হৃদয়ে শুধু ভাসে গােয়
হারাণ-গীতি
হারাণ-স্মৃতি
মরমে উঠে জাগিয়া ।
কেবলি ধীরে
নয়ন নীরে
হৃদয় যায় ভাসিয়া !
৭১

চির-ঘুম।
১
ধীরে পােহইয়া যায় বিভাবরী,
পূরবে আলােক ভায় ;
কুসুমে কুসুমে উড়ে মধুকরী,
বহিছে দখিনা বায়।
২
সারানিশি আমি আছি গাে জাগিয়া,
মরম যাতনা নিয়ে
এস চির-ঘুম প্রাণ আবরিয়া,
রাখ চির-মােহ দিয়ে।
;
ভুলিয়া যাইব জীবনের মাের—
বিরহ মিলন স্মৃতি ;
ভাঙ্গিবে না কভু এই ঘুম-ঘাের,
সহিতে যাতনা নিতি ।
৭২

চির-ঘুম।
৪
পারি না বহিতে এ হৃদয় ভার,
পড়েছি গাে ক্লান্ত হয়ে ;
চাহি না জাগিতে এ জগতে আর,
অসীম যাতনা ল’য়ে !
ওই দেখ চঁাদ পড়িছে ঢলিয়া
জগত আঁধার করি ;
সাথে সাথে তারা যেতেছে নিবিয়া
একটি একটি করি ।
চেয়ে দেখ ওই নিশি হয় তাের,
দোয়েল দিতেছে সাড়া ;
এস চির-ঘুম, মােহ-মন্ত্রে মাের,
ঢেকে দেও আখি তারা।
৭

তরী-যাত্রা
১
জীবন-সাগর মাঝ,
ভাসিয়া চলেছি আজ,
ভাঙ্গা চোরা ক্ষুদ্র মম তরী ;
দুখের করাল ছায়, ছাইয়া আসিছে হায়,
শােক-বায়ু বহে হু হু করি ।
:
সুখ শান্তি একে একে, চলে গেছে চিহ্ন রেখে,
হৃদয়ের স্মৃতি-দরপণে!
সে চিহ্ন হৃদয়ে ধরি,
ভাসায়েছি জীর্ণ তরী,
চলিয়াছি অঞ সাথী সনে !
বিরহ-বিষাদ আসি, ছড়ায়ে আঁধার রাশি,
ঢাকিতেছে হৃদি চারিধার !
রবি অস্ত গেছে যবে,
বৃথা অন্ধকার নভে,
কেন চাহ হৃদয় আমার ?
৭৪

তরী-যাত্রা।
৪
ওই দেখ মন মাের,
আবরিছে ঘন ঘাের,
ক্রমে ক্রমে বাড়িছে আঁধার ।
সুদীর্ঘ তামসী মিশা, ঢাকে মম দশ দিশা,
এ নিশা কি পােহাবে গাে আর ?
আহত মুমূর্ষ, হিয়ে, শােক দুখ বােঝা নিয়ে,
একা আমি যাত্রী সাথীহীন।
জানি না তরণী হায়, কোথা মােরে নিয়ে যায়,
চলিতেছি উদ্দেশ্য বিহীন ।
আকুল জীবন নীরে,
জুলিয়া উঠিছে ধীরে,
দুখের বাড়ব চারিভিতে,
দগ্ধ প্রাণ হয় সারা, ঢালি শুধু আঁখি ধারা,
হায়! অশ্রু নারে নিবাইতে।
৭
বিরহের ঝটিকায়, নিবিয়া যেতেছে হায় !
আশা-দীপ উজল আমার ।
ডােবাে ডােবাে জীর্ণ-তরী,
বিষাদ-সাগর’পরি,
উথলে তরঙ্গ নিরাশার !

শােকগাথা
হে অসীম, বল না গাে, আর কত জানি না গাে,
এ পথের কোথা হবে শেষ!
প্রবল হতাশ-বায়, বাড়ে দিনে দিনে হায়,
অন্ধকার বেলা অবশেষ !
একদা আঁধার নীরে, ভাঙ্গা তরী ধীরে ধীরে,
ডুবে যাবে নীরবে নীরবে,
মিশিবে জলেতে যেন, জলের বুদ্বুদ হেন,
চিহ্ন তার কোথা নাহি রবে ।

বিদায়।
নিয়ে যাও প্রিয়তম
হিয়া ভরা প্রেম মাের,
দিয়ে যাও শােক-তম
বিরহ আঁধার ঘাের।
ভালবাসা সুখ হাসি
তুমি সব নিয়ে যাও,
শােক ব্যথা দুখ-রাশি
শুধু মােরে রেখে যাও।
যদি মম আঁখি লাের
ভিজায় চরণ তল,
এলান কুন্তলে মাের
মুছে কর নিরমল।
৭৭

শােক-গাথা
৪
ভুলে যদি কোন দিন
ব্যথা দিয়ে থাকি আমি,
ফিরি দুখ সীমা হীন
দেহ গাে হৃদয়-
য়-স্বামী
ভালবাসা প্রেম প্রীতি
সাথে করি নিয়ে যাও,
তব প্রেম চির-স্মৃতি
শুধু মােরে দিয়ে যাও।
দীর্ঘ তপ্ত পথে যদি
শ্রান্ত হও প্রিয়তম,
স্নিগধ এ প্রেম-নদী
দিবে শান্তি মনােরম।
আমার এ প্রেম আশা,
আলােকিবে তব পথ,
যােগাইবে ভালবাসা
প্রেম প্রীতি-ফুল-রথ ।
৭৮

বিদায়।
ভালবাসা প্রেম সনে
থাক সুখে হৃদয়ে !
নিতি নব সুখ মনে
বিচরি সে নব দেশ।
যাও তবে প্রিয়তম
সেই চির সুখধামে,
যথা বহে সুধা সম
মন্দাকিনী অবিরামে।
ভুলে যাও মরতের
ধূলার ক্ষণিক খেলা !
ফেলে যেয়াে জীবনের
রােগ শােক দুখ মেলা !
১১
উষার লােহিত আলাে
পূরব গগনে ভায়,
নিশীথের ছায়া কালাে
পশ্চিমে লুকায়ে যায় !

শােক-গাথা।
১২
এল কি বিদায় কাল ?
যাও তবে প্রাণাধিপ!
টুটে যায় স্বপ্ন জাল
নিবু নিবু আশা-দীপ!
তােমায় স্মরিয়া আমি
হুতাশে ধরিব প্রাণ,
যাপিব দিবস যামি
গেয়ে তব গুণ গান।
১৪
নিত্য ধামে বাস করি
থাক সুখে হয়ে তাের,
ঝরুক তােমারে স্মরি
সদা মম আঁখি লাের।
জীরণ বসন মত
ফেলিয়ে যেয়াে গাে স্বামি,
দিয়ে যাও দুখ শত
তথাপি তােমারি আমি।

স্মৃতি-চিহ্ন।
(স্বগীয় স্বামী দেবতার স্মৃতি-মন্দির স্থাপনােপলক্ষে
১
;
মরম ভিত্তিতে আজি, তব স্মৃতিচিহ্ন নাথ,
সযতনে করিনু স্থাপিত
কালের বিধানে হায়! ভাঙ্গিবে জগৎ তায়,
সকলি যে হইবে অতীত।
২
কিন্তু এ হৃদয়ে প্রভু, টুটিতে নারিবে কভু,
তব স্মৃতি হে চির-বাঞ্ছিত !
প্রণয়ের স্তম্ভ’পরে, রহিবে গাে চিরতরে,
এ মন্দির চির-সঞ্জীবিত।
নিভৃত হৃদয়ে মম, স্মৃতির মন্দির মাঝে,
চিরােজ্জ্বল মানস মূরতি;
ভকতি সুবাস ধূপে, উজলিত প্রেমদীপে,
প্রাণ ভরি করিব আরতি।

শােক-গাথা
৪
হৃদয়ের সুখ আশা, প্রাণপূর্ণ ভালবাসা,
দিয়ে প্রীতি কুসুমের হারে ;
পূজিব গাে অনুদিন, ধােয়াব ও পদ যুগ,
ঢালি সদা নয়নের ধারে ।
মিলনে—নয়ন মাঝে, একই মূরতি রাজে,
এক ঠাই সমীপেতে রয় ;
বিরহে-অসীমরূপ, হৃদয়েতে রহে গাঁথা,
শুধুই জগতরূপময়।
অনন্ত মূরতি তব, দশদিকে নব নব,
উঠিতেছে যেন গো ভাসিয়া;
ঘেরিয়া রেখেছ মােরে, শত শত বাহু ডােরে,
চারি পাশে রয়েছ ব্যাপিয়া।
৭
পাষাণে রচিত স্মৃতি, ধূলিতে মিলায়ে যাবে,
কালের কঠোরময় করে।
হৃদয়ের পাতে রেখা, গভীর উজল লেখা,
রবে মাের আজীবন তরে।
২

স্মৃতি-চিহ্ন
মানস নয়ন ভরি, দেখিব গাে অনুক্ষণ,
তব রূপ হে হৃদয়স্বামী।
ধেয়ানে পূজিব সদা, করি প্রেম উপাসনা,
যতদিন ভবে রব আমি ।

সমদুঃখিনীর প্রতি।
সখিরে-
কেন প্রাণ কাঁদে মম সদা,
যে জ্বালায় দিন যামি, দহিয়ে আছি গাে আমি,
সম দুখি বিনা কভু এ জগতে আর
কে বুঝিবে, কেন অশ্রু ঝরে অনিবার।
সখিরে--
সকলেই বলে গাে আমায়-
“এবে সে নহে তােমার,
আসিবে না ফিরে আর,
ভুল তারে বৃথা কেঁদে কি ফল এখন,
পরমেশে লবি কর সময় যাপন।”
p
সখিরে-
সে কি কভু ভুলিবার ধন ?
জানি আসিবে না কভু,
ভুলিতে নারিব তবু,
সেই মাের পরমেশ সেই নারায়ণ,
সে পদ অরচি সদা যাপিব জীবন।
৮৪

সমদুঃখিনীর প্রতি।
সখিরে
আছি তারে সদা ভালবেসে,
তাহা বিনা এ সংসারে,
আর কিছু চাহি নারে,
হউক সে অশরীরি নিরাধারময়,
তবু সে জীবনে মম ভুলিবার নয়।
সখিরে—
আশা কহে “মিলিবে আবার
সেই আশা-পথ চেয়ে,
আছি তারি ভাব নিয়ে,
নিরাশা-অনলে যদি হৃদি দহি যায়,
আশা-অশ্রু-ধারা আৱেঅমনি নিবায়।
সখিরে-
কি কহিব মরমের কথা,
পরাণের গাথা মাের,
হৃদয়ের ব্যথা ঘাের,
লিখিয়া কহিয়া তাহা নাহি হয় শেষ,
কেবলি দহিয়া উঠে শুধু হৃদি-দেশ!
৮৫

শােকগাথা।
৭
সখিরে-
চিরতরে এ জীবনে মাের,
পরাণের রক্ত দিয়ে,
লিখিত রয়েছে হিয়ে,
অসীম অকূল যেই মরমের ব্যথা,
তাহারি নকল শুধু এই শােক-গাথা !
৮
সখিরে-
মম সম এ জগতে যার,
ভাঙ্গা-চোরা মন প্রাণ, তারি কাছে পাবে স্থান,
অতৃপ্ত প্রাণের মম বিরহের স্মৃতি।
কবিতার রূপেই বেদনার গীতি
সখিরে-
কেন মাের পরাণ না গেল !
সুখ-দীপ চিরতরে,
নিবেছে আঁধার করে,
আঁধারে ডুবিয়া গেছে জীবনের বেলা ।
ফুরাইল জীবনের সুখ সাধ খেলা !

সমদুঃখিনীর প্রতি।
সখিরে--
ওই দেখ সন্ধ্যা এল নেমে,
আজি এই শেষ দিনে,
পূরবীতে বাজে বীণে,
বিদায় আজিকে সখি নিভিতেছে আলাে।
আবরি আসিছে নিশীথের ছায়া কালাে !
সখিরে—
আজি এই বিদায়ের দিনে
আমার মরম ব্যথা,
আমার এ শােকগাথা,
বসি নিরজনে সখি খুলি একবার
এক বিন্দু অশ্রুজল ফেল সাথে তার ।
সম্পূর্ণ।
৮৭

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Shok-gatha

Author
Debi,anangamohini
Title
Shok-gatha
File name
Shok-gatha
Text
OCR done
Citation
1906
Published
2009/11/28
Publisher
N.a.
Language
Sanskrit
Pages
106
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Poetry
Keywords
Debi,Anangamohini
DLI number
513276
Barcode
4990010020269.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
OTfl3mVUxud
Download PDF

Shok-gatha