Bally Sadharan Granthagar

Srirupsanatan

Bosu, Khirodprasad · 2009/10/26

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

শ্রীরূপসনাতন।
শ্ৰীক্ষিতীশচন্দ্র , বি-এ।

No text on this page.

শ্রীরূপসনাতন।
* * * * * * * * * *
স্ত্রীচরিত্রবতি)
JULY id
কালেন বৃন্দাবন-কেলি-বার্তা
সুপ্তেতি তাং খ্যাপয়িং বিশিষ্য
কৃপাতেনাভিষিষেচ দেবঃ
তত্রৈব রূপঞ্চ সনাতনঞ্চ।
শ্ৰীক্ষিতীশচন্দ্র বসু, বি-এ।
শ
- -
ব্রহ্ম চৰ্য্য বিদ্যালয়,
রচ,
১৩৪ ।
মুল্য বার আনা মাত্র।

উপহার
অন
তারিখ

এক ভক্ত-সাধু-শগােপীমােহন বন্দ্যোপাধ্যায়।

No text on this page.

/১৫৬ ভূমিকা। রসের সৃষ্টি এবং পুষ্টিসাধনই কাব্যের লক্ষ্য। জনসাধারণের প্রবৃত্তির অনুকুল লৌকিক ভাব অবলম্বনে বিকৃত রসের সৃষ্টি বা পুষ্টি দ্বারা লােকপ্রিয়কাব্য রচনা করিতে যে জাতীয় প্রতিভার আবশ্যক, শ্রীরূপসনাতনের বৈরাগ্যোজ্জ্বল চরিত্রকে আশ্রয় করিয়া কল্যাণময় অথচ হৃদয়গ্রাহী কাব্য রচনায় সে জাতীয় প্রতিভার স্থান নাই। বাস্তব জগতের নিখুঁত চিত্র অঙ্কনে কাব্যকলার বিকাশ সাধন হয় বটে, এবং তাহা দ্বারা পাঠক পাঠিকার রসাস্বাদনের বিচিত্র সামগ্রী গড়িয়া তােলা সম্ভব বটে, কিন্তু দেশের বর্তমান অবস্থায় কাব্য ও সাহিত্যে লােকের ভােগপ্রবৃত্তির ইন্ধন সংগ্রহ করিতে চেষ্টা না করিয়া বিশুদ্ধ রসাস্বাদনের ভিতর দিয়া নিৰ্ম্মল অথচ গভীর ভাবাত্মক রুচি গঠন করিতে চেষ্টা করা উচিত কিনা তাহা ভাবিয়া দেখা কর্তব্য। রাঁচি ব্রহ্মচর্য বিদ্যালয়ের অধ্যাপক শ্রীযুক্ত ক্ষিতীশ চন্দ্র বসু মহাশয়ের শ্রীরূপসনাতন নাটক পাঠ করিয়া মনে হয়, এই শ্রেণীর কাব্য দ্বারা নৈতিক শিক্ষা, ও সুধীজনের চিত্তবিনােদন এই উভয় উদ্দেশ্যই একসঙ্গে সাধিত হইতে পারে। মজাদার উপন্যাসে, লঘুভাবাত্মক গল্পসাহিত্যে অথবা আদিরসাশ্রিত দৃশ্যকাব্যে কল্পিত নায়ক নায়িকার ভাবভঙ্গী বর্ণনা করিয়া অথবা চমকপ্রদ জীবনবৃত্তান্ত লিপিবদ্ধ করিয়া মানুষের মনে উন্মাদনা সৃষ্টি করিবার যে যুগ চলিয়াছে, আমাদের মনে হয়, ভাবের প্রতিক্রিয়ার ধারা হিসাবে তাহার পরিবর্তনেরও সময় আসিয়াছে। কাব্য ও সাহিত্যে ভাবী যুগের সূচনার নিদর্শন স্বরূপই আজ আমরা শ্রীরূপসনাতন নাটকখানা লাভ করিয়াছি। বাঙ্গলার সাহিত্য ভাণ্ডারে এই ক্ষুদ্র দৃশ্যকাব্যের কোথায় স্থান হইবে তাহা নির্ণয় করা, বাঙ্গলার নৈতিক ও আধ্যাত্মিক অবস্থার ক্রমবিকাশের গতির উপর অনেকটা নির্ভর করে। তবে এই মাত্র বলা যাইতে পারে যে, এই উদীয়মান লেখক এই নাটক লিখিতে গিয়া যে প্রতিভার পরিচয় দিয়াছেন তাহা বর্তমান সাহিত্যক্ষেত্রে খুবই দুর্লভ। শ্রীরূপসনাতনের জীবনের ঘটনার ভিতর দিয়া তাহাদের চরিত্রের মাধুৰ্য্য ও গাম্ভীর্য বর্ণন, তাহাদের সাধারণ কথাবার্তার ভিতর দিয়া বৈষ্ণব দর্শনের মূলতত্ত্বগুলির সরল, সহজ অথচ চিত্তাকর্ষক বিবৃতি এবং সর্বোপরি ভক্তজনের আস্বাদন উপযােগী অনেক নিগুঢ় ভাবের বিশ্লেষণ-কৌশল এই গ্রন্থখানিকে নিশ্চয়ই সুধীজনের সমাদরের সামগ্ৰী করিয়া রাখিবে। গ্রন্থকার বর্তমান সাহিত্য জগতে সুপরিচিত না হইলেও বেশীদিন তিনি অপরিচিত থাকিবেন না ইহাই আমার বিশ্বাস। দৃশ্যকাব্যের বর্তমান সময়ে যে ভাবে ব্যবহার চলিয়াছে তাহাতে নগরের সীমা অতিক্রম করিয়া ক্ষুদ্র পল্লীগ্রামেও যুবকদের মধ্যে অভিনয়ের কলাকৌশল প্রদর্শন করিবার একটা প্রবল আকাঙক্ষা জাগিয়াছে। এই প্রকার অভিনয়ে যে শ্রেণীর নাটক অভিনীত হয় তাহার আভ্যন্তরিক রুচি এবং চরিত্র বর্ণনের উপর জনসাধারণের জাতীয় শিক্ষা অনেকটা নির্ভর করে। আমােক প্রমােদ একেবারে বন্ধ করিতে উপদেশ দিলে সেই উপদেশ কেহ গ্রহণ করিবে বলিয়া মনে হয় না। তবে আমােদ প্রমমাদের ধারা এরূপভাবে পরিবর্তন করা আবশ্যক, যাহাতে জন সমাজ উহা দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হইতে না পারে। বর্তমান বাঙ্গলা সাহিত্যে এরূপ নাটক খুব কমই আছে যাহা অভিনয় করিলে যুবকদের চিত্ত লঘু- ভাবের সাময়িক উত্তেজনায় ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। শ্রীরূপসনাতন নাটক রচনা করিবার সময় গ্রন্থকার সেই দিকে সম্পূর্ণ লক্ষ্য রাখিয়াছেন। বিদ্যালয়ের বালকগণের পক্ষেও এই নাটক অভিনয় করিলে কোনরূপ দুর্নীতির প্রশ্রয় পাইবার সম্ভাবনা নাই। অধিকন্তু বিশুদ্ধ আমােদ প্রমােদের ভিতর দিয়া, এবং ত্যাগ ও বৈরাগ্যের মহান আদর্শ অনুকরণ ব্যপদেশেও অনুশীলন করিতে গিয়া তাহাদের চরিত্রবল ও নৈতিকবল বৃদ্ধিই হইবে। শান্তরসের সঙ্গীত এবং কথাবার্তার ভিতর দিয়া বিশুদ্ধ সাত্ত্বিকভাবেই তাহাদের চিত্ত পূর্ণ হইবে। এই হিসাবেও শ্রীরূপসনাতন নাটক রচনা করিয়া গ্রন্থকার দেশের নৈতিক অবস্থার পরিবর্তন সাধনে যত্ন করিয়া ধন্যবাদের পাত্র হইয়াছেন। শ্রীরূপগােস্বামীর এবং শ্রীসনাতন গােস্বামীর জীবনের সব ঘটনা অথবা তাহাদের প্রচারিত সব তত্ত্বের বিবরণ প্রকাশ করা একখানা দৃশ্যকাব্যে সম্ভবপর নয়, গ্রন্থকারের তাহা উদ্দেশ্য ও নহে। বাঙ্গলার এই মহাপুরুষয়ের চরিত্রবল, নির্ভীকতা, নির্ভরভাব, ত্যাগ, বৈরাগ্য এবং ভগবৎপ্রেম আদর্শ হিসাবে আশ্রয় করিয়া যাহাতে বাঙ্গলার নরনারী আদর্শ জীবন গঠন করিতে পারে তদনুরূপ দৃশ্যের সমাবেশ করিয়া তিনি ক্ষান্ত হইয়াছেন। এই ঘটনা সমাবেশের কৌশলের মধ্যেই তাহার কবিপ্রতিভার পরিচয় পাওয়া যায়। হুসেন সাহের শ্রীসনাতনকে প্রলুব্ধ করিয়া রাখিবার প্রয়াস, এবং পরে অনিবৃত্ত সনাতনকে ভয় প্রদর্শন, ও কারাগারে নিক্ষেপ, এবং মনের দৃঢ়তার বলে সনাতনের মুক্তিলাভ, এন্থকার একটা সনাতন সত্যরূপে একাশ করিয়াছেন। সনাতনের সঙ্গী ঈশানের অর্থাসক্তি এবং বৈরাগ্যবলে দ্যর মনােয় সাধারণ ঘটনা হইলেও এরূপ চিত্তাকর্ষকভাবে তাহা বিবৃত হইয়াছে যে তাহাতে সনাতনের বনে ত্যাগ ও প্রেমের আশ্চৰ্য্য সমাবেশ ফুটিয়া বাহির হইয়াছে। কাধামে চন্দ্রশেখরের বাড়ীতে ভােট কম্বল ত্যাগ প্রভৃতি ক্ষুদ্র ঘটনার ভিতর দিয়া অকিঞ্চন অবস্থা প্রাপ্তির চিত্র যে ভাবে অঙ্কিত হইয়াছে তাহা লক্ষ্য করিলে বর্তমান সময়ের জীবনবীমা যাদিগণের অনেক শিক্ষা লাভ হইবে। শ্ৰীমন্মহাপ্রভুর সহিত মিলন চিত্রটি সর্বাপেক্ষা হৃদয়াকর্ষক হইয়াছে এবং ভক্তজনের নিত্য আস্বাদনের সামগ্রা হইয়া রহিয়াছে। শ্রীরূপসনাতনের জীবনের ভিতর যে পরমপুরুষের সন্ধানের নমিত্ত সর্ববধৰ্ম্ম বিসর্জনের তত্ত্ব রহিয়াছে তাহা নাটকখানির প্রত্যেক দৃশ্যেই লক্ষ্য করিবার বিষয়। পরম প্রেমাস্পদের আকর্ষণে আকৃষ্ট হইয়া ভক্ত কি ভাবে সর্বস্ব ত্যাগ করিয়া শ্রীভগবানের দিকে অগ্রসর হন তাহা পরম ভক্তের জীবনের ঘটনার ভতর দিয়া প্রকাশ করাই এই গ্রন্থের প্রধান লক্ষ্য। বৈষ্ণব বি ভঁহার মনােগত সেই উদ্দেশ্য সাধনে যে সফলতা লাভ রিয়াছেন ইহাই তঁাহার গ্রন্থ রচনার শ্রেষ্ঠ পুরস্কার। আশা মি সজ্ঞ পাঠকগণ এই দৃশ্যকাব্যের আভ্যন্তরিক রহস্যের কথা সুধাবন করিয়া ইহার বিচার করিবেন। পুরুলিয়া, শ্ৰীনিবারণ চন্দ্র দাশগুপ্ত। •ই ফাঙ্কন, ১৩৩৪।

JULY 19-10 (২) মানবের চরিত্র মােহনই হউক বা ভীষণই হউক, সমুজ্জ্বল ও চিত্তাকর্ষক লিপিমাধুরীতে তচ্চিত্র সুরঞ্জিত হইলে, উহা পাঠকের বা শ্রোতৃবৃন্দের হৃদয়ে প্রতিফলিত হইয়া যে প্রকার, যতদূর ও যতশীঘ্র সুমঙ্গল ফল সমুৎপাদন, অর্থাৎ পরিণাম শতকর বা অশুভসংঘটন দেখাইয়া সৎকর্মে প্রােৎসাহিত ও প্রবর্তিত করণ এবং অযুক্ত কর্মের প্রতি ঘৃণা, বিরক্তি ও অরুচি উৎপাদন পূৰ্ব্বক তাহা হইতে নিবৃত্ত করণ দ্বারা-লােক সকলের কল্যাণ সাধন করে, এমত আর কিছুতেই করিতে পারেনা। ইহা সর্বস্বীকৃত-সাধারণ সিদ্ধান্ত। বিশেষ ব্যক্তিগণের বুদ্ধিগ্ৰাহ বিশেষ-সিদ্ধান্ত এই যে- মহােত্তম-মহাজন গণের পূতচরিত্রের আলােচনায় – মানবজীবনের সারধন ভক্তির ও প্রেমের মহিমা জীবহৃদয়ে জাগিয়া উঠে, এবং সেই মহিমার মলয়ানিলে ভক্তিপ্রেমের গন্ধ স্পর্শ ও গুণ বিন্দুর কণিকা পর্যন্ত প্রাণে সঞ্চার করণ দ্বারা ধৰ্ম্মজীবনের শ্রেষ্ঠতা সমুচ্চতা, লােকদুঃশাতীততার অনুভবে বুক ভরিয়া, ধৰ্ম্মজীবনের ভিত্তি প্রবর্তন করে দেয়,–এতদূর মহাভাগ্য পর্যন্ত তারা লাভ হয়। এই গ্রন্থের নায়ক-ঐপাদ সনাতন গােস্বামী ও শ্রীপাদ রূপ গােস্বামীর ভুবন পাবন আদর্শ চরিত্র-পূর্বোক্ত সৰ্ব্ব-সৌভাগ্যের দুই মহানিধিস্বরূপ। এই অতুলনীয়-ভ্রাতৃযুগল-প্রতিকূল to ; ভাবাপন্ন-বড়পরিবারে বাস করিয়া, মুসলমান নবাবের প্রধান পাত্র-মন্ত্রী হইয়া, নবাবকে পর্যন্ত আয়ত্বাধীন করিয়া, অতুল ঐশ্বৰ্য্য সম্পদের ও অপরিসীম প্রভুত্বের অধিকারী হইয়াও—দম্ভ, দর্প, অভিমান, ক্রোধ, পারুষ্যাদি ভগবদ্গীতােক্ত—আসুরীসম্পদে মত্ত হন নাই। জগৎকে দেখাইয়া গিয়াছেন আমুরীসম্পদ মলিন মনের বিকাসক্তৃত; এইগুলির অধীন হইলে—মহানুষ্ঠান- সম্পাদনের শক্তিতে বঞ্চিত এবং মানবজীবনের সার্থকতা ও ভগবৎ কৃপালাভে বিফল-মনােরথ হইতে হয়। অধৰ্ম্ম এবং অন্যায় ভগবৎপ্রসাতার পরম অন্তরায়। মানবীয় সর্বোচ্চসাধনের শিক্ষাদানেও এই ভ্রাতৃযুগল মহা- মণির ন্যায় পরমপ্রভাবান্বিত। ভক্তি সিদ্ধান্তের এবং রস- সিদ্ধান্তের পরিজ্ঞানেই মানবজীবনের সর্বোচ্চতা ও সার্থকতা। অতএব শ্রীপাদ সনাতন গােস্বামী শ্রীমদ্ভাগবত দশমস্কন্ধের বৈষ্ণব তােষণীনামা টিপ্পনী, দশমচরিত ও বৃহদ্ভাগবতামৃতাদি গ্রন্থে বিশুদ্ধ ভক্তিসিদ্ধান্ত, ভক্তিসাধনের ও ভক্তিরস আস্বাদনের সমুৎকৃষ্ট পদ্ধতি প্রচার দ্বারা এবং তদনুজ ও পরম প্রিয়তম-শিষ্ণ পূজ্যপাদ শ্রীমৎ রূপ গােস্বামী-ভক্তিরসামৃতসিন্ধু, উজ্জ্বল নীলমণি, বিদগ্ধ মাধবনাটক প্রভৃতি মুখাদ্য বৈষ্ণব গ্রন্থাবলীতে সুবিশুদ্ধ রসের সিদ্ধান্ত ও তদাস্বাদনের প্রকার পদ্ধতি প্রচার দ্বারা জগদ্গুরু। এই মহা সত্যটি কৃতগ্ন ও অবিবেকী ব্যতীত সকলকেই স্বীকার করিতে হইবে। কিন্তু একালের একটি অসাধারণত্ব এইষে-যে বিষয়ে যাহার যােগ্যতা ও অভিজ্ঞতার যত অভাব, ততই সেই বিষয়ে তাহার • গ্রন্থ লেখার আগ্রহ অধিক। তার ফলে নিজ নিজ রুচির অনুরূপ কল্পনার-মলিনতাময় রেখা পাত দ্বারা প্রচলিত বিদেশী-সভ্যতানু- মােদিত প্রাকৃত-সত্ত্ব-সংমিশ্র-রজোগুণের বার্ণিশ বিলেপনে অনে- কেই ধৰ্ম্মজগতের পূর্ণাদর্শ শুদ্ধসত্ত্বগুণাশ্ৰিত মহাপুৰুষ বৃন্দের অনিন্দ্য সুন্দর বন্দনীয় চরিত্র কলঙ্কিত করিয়া ফেলেন। সেদুঃখে আমাদের ন্যায় বহু বৈষ্ণবের প্রাণ জর্জরিত। কি আর কহিব ? ভুবনমঙ্গলাবতার শ্রীমহাপ্রভুর সর্বলােক পাবন সুমঙ্গল চরিত্রে পৰ্য্যন্ত কলঙ্ক কালিমার আঁচড়। ইহার ভিতরে আমরা একটি আনন্দের সংবাদ দিতে সমর্থ হইয়া সুখানুভব করিতেছি। সে সংবাদ—এই নাটক খানির রচয়িতা, প্রশংসিত-গ্রাজুয়েট হইয়াও ভক্তিশাস্ত্রাভিজ্ঞ পণ্ডিত, এবং সদগুরুর ও সদ্বৈষ্ণবের সঙ্গগুণে বৈষ্ণবপ্রবর বর্গের চরিত্র ও ভক্তি-সিদ্ধান্ত-রসকীৰ্ত্তনের সুরতালে সুপটু, সুতরাং ইহা বলা বাহুল্য যে এ গ্রন্থখানি সর্বশ্রেণীর লােকের সমাদরের বস্তু ও উপকার সাধক নিশ্চয়ই হইবে। আমার অবসর অতি অল্প, এই ভূমিকা লিখিতে অনুরুদ্ধ হইয়া পরমপূজনীয় গােস্বামীযুগলের পূর্কোল্লিখিত গ্রন্থগুলির অপূৰ্ব্বতা উপাদেয় ও তন্নিহিত শিক্ষা সকলের কিছু কিছু বিশ্লেষণ করিয়া বলিবার সাধ উপজাত হইলেও সময়াভাবে সে সৌভাগ্য ঘটিতে পারিলনা। দুঃখ রহিয়া গেল। এই স্থানেই পাঠক মহােদয়- গণের চরণে আমার বিদায় দণ্ডবৎ। বৃন্দাবন, ৭ ফান, ১৩০৪। বৈষ্ণবজনকিঙ্কর শ্রীকৃষ্ণপদ দাস।

নিবেদন। শ্রীল রূপসনাতন গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধৰ্ম্মের দুই বিরাট স্তম্ভ। তাহারা গ্রন্থাদি সংস্কৃত ভাষাতে লিখিয়া গিয়াছেন এবং জীবের প্রয়ােজনীয় তত্ত্ব ও শ্রীভগবানের ও তৎপার্যদের লীলাদি ভিন্ন অন্য কোন অবান্তর কথা তাহাদের কোন গ্রন্থে সন্নিবেশ না করায় বর্তমান যুগে বাংলাদেশে তাহাদের সুপ্রতিষ্ঠিত ধৰ্ম্মের পুনরভুথানকালেও তাঁহাদের পূর্বজীবনের বিশেষ ঘটনাবলীর সন্ধান পাওয়া দুষ্কর। তাঁহাদিগের পূর্বজীবন সম্বন্ধে শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত, শ্রীচৈতন্যভাগবত, ভক্তমাল, ভক্তিরত্নাকর, ও শ্রীচৈতন্যচন্দ্রোদয় নাটকাদি গ্রন্থে যে সামান্য উল্লেখ আছ, তাহাই মাত্র অবলম্বন করিয়া ১৩৩০ সালের চৈত্রমাসে এই গ্রন্থ লেখা আরম্ভ হয় এবং ১৩৩১ সালের চৈত্রের মধ্যে সমাপ্ত হয়। শ্রীরূপসনাতনের পরম পবিত্র তেজস্বী জীবন কৰ্ম্ম, জ্ঞান, ভক্তির মিলনক্ষেত্র ; তাহাদের ঈশ্বরানুরাগ ও বিষয় বৈরাগ্যের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত যাহাতে দেশের নরনারীর মধ্যে শ্রদ্ধা আনয়ন করিতে পায়ে, এবং সর্বপ্রকারের স্কুল কলেজের ছাত্রেরা ইহার অভিনয়ে হৃদয়ে পবিত্র প্রেরণা লাভ করিতে পারে সেদিকে বিশেষ দৃষ্টি রাখিয়া এই গ্রন্থ লেখা হইয়াছে। ১৩৩৪ সালের মাঘমাসে বর্তমান গৌড়ীয় বৈষ্ণব সমাজের মুকুটমণি প্রাতঃস্মরণীয় মহারাজা স্যর শযুক্ত মণীন্দ্র চন্দ্র নন্দী বাহাদুর প্রতিষ্ঠিত রাঁচি ব্রহ্মচর্য্য বিদ্যালয়ের দশম বার্ষিক উৎসবে ব্রহ্মচারীবৃন্দ কর্তৃক ইহা সর্ব প্রথমে অভিনীত হইয়াছে। ;

লেখক জীবনে অভিনয় দর্শনের সুযােগ বিশেষ পান নাই- তজ্জন্য যথেষ্ট ভুল ত্রুটি থাকার সম্ভাবনা। যেন তেন প্রকারে শ্রীভগবানের নাম লইয়া ও মহাভাগবতের গুণকীৰ্ত্তন করিয়া আত্মশােধন করাই তাহার এই গ্রন্থলেখার উদ্দেশ্য। যাহাদের প্রেরণা, সহানুভূতি ও সাহায্য পাইয়া এই গ্রন্থ মুদ্রিত হইল তাহাদের চরণে কোটি নমস্কার। অলমতি বিস্তরেণ ইতি বিনীত গ্রন্থকার। এই গ্রন্থের বিক্রয়লব্ধ অর্থ নিত্যধামগত মদীয় পরমারাধ্য শ্রীগুরুদেবের নিরাশ্রয় পরিবারের সেবায় ব্যয়িত হইবে। গ্রন্থকার।

পরিচয়। হুসেন শাহ গৌড়ের বাদশাহ। কেশব ছত্রী ঐ বিশ্বস্ত হিন্দু কর্মচারী। ফকীর মুসলমানবেশী কোন দিব্যদৃষ্টি সম্পন্ন হিন্দু সাধক (শ্রীগৌরাঙ্গের কৃপাপ্রাপ্ত) ধুনিরাম ঐ শিষ্য। সেবাম সন্তোষ ; সাকর মল্লিক রূপের পূর্বাশ্রমের দুইটি নাম। অমর ; দীর খাস সনাতনের পূর্বাশ্রমের দুইটি নাম। নৃসিংহানন্দ শ্রীগৌরাঙ্গের ভক্ত। শীনিত্যানন। শ্রীগৌরাঙ্গ। শ্রীহরিদাস ঠাকুর। বল্লভ রূপসনাতনের ভ্রাতা। জীব বল্লতের পুত্র। ঈশান সনাতনের পুরাতন ভৃত্য। ছদ্মবেশী মদনগােপাল। হবুসেখ কারারক্ষক। শ্রীকান্ত সনাতনের ভগ্নীপতি। চন্দ্রশেখর শ্রীগৌরাঙ্গেয় ভক্ত (কাশীবাসী)। গ্রামবাসিগণ ; চোপদার; প্রধান মিস্ত্রী; ভিখারী; রাজ ভৃত্যগণ ; কোতােয়াল; দূত; ভক্তগণ ; রাজকর্মচারী ; রাজবৈষ্ট ; ভুইয়; গণৎকার। ৫ ০ ০ ০ ০ ০ ;

শ্রীরূপসনাতন
প্রথম অঞ্চ
১ম দৃশ্য।
"জান-গৌড় ( বাংলার রাজধানী), রাজ প্রাসাদ, বাদশাহের কক্ষ।
কাল–অপরাহু।
সিংহাসনে আসীন গৌড়েশ্বর বাদশাহ হুসেন শাহ সৈয়দ,
পার্শ্বে উপবিষ্ট কেশবছত্রী
হুসেনশাহ। সুদূর আফগান থেকে যখন দুরন্ত পিপাসা
বুকে নিয়ে ভারতের দিকে ছুটে এসেছিলাম, সে যে কি উদ্দাম
প্রেরণা, কি বিপুল আবেগ,—তার টানে যখন দিগ্বিদিগ, হারা হয়ে
হিন্দুস্থানের এক প্রান্ত হতে অপর প্রান্ত অতিক্রম করেছিলাম
তখন একবারও ভাবিনি যে, চিরশান্তির নিত্যনিকেতন, প্রকৃতির
বৈচিত্রময়ী লীলার ক্রীড়াপুত্তলি, সােণার বাংলার সিংহাসনই আমার
শেষ লক্ষ্য হবে-
(সহসা মুণ্ডিতমস্তক জনৈক ফকীরের প্রবেশ)
ফকীর। বাংলার বাতাসে, জ্যোৎস্নামাখা তার শরৎ আকাশে,
তার সে মৃদুপ্রবাহিনী তটিনীর কুলুকুলুনাদে যে মধু মাখা আছে,
তার সে বসন্ত উদ্যানের পাগল পাপিয়ার কুহুতানে, সরলা
১

রূপসনাতন পল্লীবালার উদাস আকুল চাহনীতে যে পাগলকরা মদিরা অড়ান আছে, পারবে কি তুমি হুসেনশাহ তার পবিত্র মর্যাদা রাখতে। তার দুকুলভাজা বেগ সাম্লাতে ? হুসেনশাহ। কে আপনি অতর্কিত প্রবেশকারী ফকীরবেশ । উজ্জ্বল তেজোব্যঞ্জক বিস্ফারিত চক্ষে কি অপার শান্তির স্নিগ্ধ আভা, কি প্রগাঢ় স্থির সৌম্যমূর্তি অথচ বিশ্বভেদী কি তীক্ষ্ণদৃষ্টি- কেশব। জাহাপান, ইনিই সেই সাকুৰ্ম্মার সিদ্ধ ফকীর। পরম জ্ঞানী, পরম ভক্ত, কর্মবীর। অন্ধ আতুরের পরম আশ্রয়। আপনার পরম শুভাকাঙক্ষী। ফকীর। শােন হুসেনশাহ, হিন্দুস্থানের কোন সিংহাসনে ব’সে হিন্দুদ্বেষী পাঠান নৃপতির পক্ষে শান্তিরাজ্য স্থাপনের আশা বাতুলের উন্মত্ত প্রলাপ বই আর কিছু নয় ;—শূন্যে সৌধ স্থাপনের কল্পনার ন্যায় সে আশা অলীকতার মাঝখানে ডুবে যাবে; হিন্দুমন্দির ভূমিসাৎ করা, হিন্দুর পূজাপদ্ধতি বন্ধ করার চেষ্টা তার প্রথম সােপান ; তােমার এ বাংলার সিংহাসন হিন্দু- রাজা সুবুদ্ধিরায়ের কৃপালব্ধ, হিন্দুমন্ত্রী পুরন্দর বসুর বুদ্ধিচালিত, বাংলার তক্তে ব’সে আজ তুমি তা ভুলতে চলেছ। কিন্তু সাবধান, “নিমকহারাম বেইমান পাঠান” নাম নিয়ে যেন ধসে যেওনা, ধাপে ধাপে যেন নেমে যেওনা। অদৃষ্ট দেবতা তােমার প্রসন্ন, ভাগ্য আজ তােমার অনুকূল, কিন্তু প্রতিকূল হতে পলকের চেয়ে, এক নিমেষের চেয়েও বেশী সময় লাগেনা, সে কথা যেন স্মরণ থাকে। ২ রূপসনাতন } ; হুসেনশাহ। ফকীর সাহেব, গােস্তাকি মাফ ক’বেন আপনার অবিদিত কিছুই নেই; এই হিন্দুজাতটাকে আজ পর্যন্ত আমি একটুও বুঝতে পালাম না। আমরা তাদের ভায়ের মত বুকে তুলে নিতে কতবার চেষ্টা করেছি, কিন্তু পারিনি। কি যে একটা ব্যবধান, একটা প্রবল ধাক্কা এসে সব চেষ্টা সব কৌশল ভেঙ্গে চুরে গুঁড়াে করে দিয়ে গেছে। তাদের উন্মুক্ত হৃদয়ে শিশুর সারল্য, বিস্ফারিত নেত্রে সহস্র সূর্যের জ্যোতি, বক্ষে প্রলয়কালীন ঝঞ্চার দুর্বার সাহস দেখে বিস্ময়ে, শ্রদ্ধায়, পায় লুটিয়ে পড়তে ইচ্ছা করে, কিন্তু আবার ক্ষুদ্র তুচ্ছ স্বার্থের জন্য, যখন দেখি তারা শাঠ্য, জুয়াচুরি, ধাপ্পাবাজি করতে এতটুকু দ্বিধা বােধ করে না, তখন ঘৃণায়, ক্ষোভে সর্বশরীর কেঁপে ওঠে, শিরায় রক্ত উষ্ণ হয়ে ওঠে, মনে হয় ছুটে গিয়ে তার টুটি চেপে ধরে একেবারে নিঃশেষ করে দেই। ফকীর। বাদশাহ এইখানেই যে তােমার একটা মস্তবড় ভুল রয়ে গেল। তােমার ভাববার ধারাটাকে একটুখানি বদলে দাও; হিন্দু পর, তাকে আপন কৰ্ত্তে না গিয়ে আপন হিন্দু, তাকে পর হ’তে দিওনা। যে মুহুৰ্ত্ত হ’তে তুমি তাকে আপন বলে জাবে, দেখবে—তার চরিত্রের অসম্পূর্ণতা, তার শৌর্য বীৰ্য্য হীনতার ছায়াটুকুও তােমার দৃষ্টির গণ্ডী থেকে দূরে সরে গেছে। দেখ হুসেনশাহ, বিশাল এই হিন্দুজাতি। বিশাল মহীরুহ দেখেছ। তার বিশালতার প্রাচীনতার সঙ্গে সঙ্গে বহু পরাঙ্গপুষ্ট পরগাছায় আশ্রয়ীভূত হয়ে সে নিস্তেজ হয়ে পড়ে, শ্রীরূপসনাতন আজ ভারতেরও সেই দশা; জগৎজোড়া তার সে আত্ম ত্যাগের কাহিনী আজ স্বার্থের কালিমায় ম্লান হয়ে গেছে, যার বীরপদভরে একদিন পৃথিবী টলমল ক’ত্ত, জাতীয় অশান্তি নিরসনের জন্য যারা হাসতে হাসতে সখার মত মৃত্যুকে আলিঙ্গন ক—এতটুকু বিষাদের ছায়া দেখা দিত না,আজ তার ঠিক তেমনটি নেই; ঘৃণিত কপটতা, নীচ সঙ্কীর্ণতা, বীভৎস মড়কের মত এসে তাদের ঘিরে ধরেছে, তাদের মাথা তুলতে দিচ্ছেনা। তুমি তাদের রাজা, —আজ তারা তোমার দ্বারে তাদের ভগ্ন বাহুর ক্ষীণ শক্তি, উদ্দাম হৃদয়ের পূত ভক্তি, আর ঝাকুল বক্ষের বিপুল সাহস নিয়ে ছুটে এসেছে, তােমায় তাদের মাতৃপূজার পুরােহিত পদে বরণ ক’ত্তে; -তুমি শুধু বাংলার রাজা নও, গৌড়ের বাদশাহ নও, এই তাদের মাতৃপূজার পুরােহিত ; এই আত্মত্যাগ সাধনায় দীক্ষিত সাধক। হুসেনশাহ। আপনার কথায়, আপনার চাহনিতে যে পবিত্র প্রেরণা রয়েছে, যে পরাক্রান্ত তেজের উন্মাদিনী মুচ্ছনা রয়েছে, তার স্পন্দন আমার বুকের মাঝে স্পষ্ট বােধ হচ্ছে,আমার এই বাহুতে সহস্র কেশরীর বিক্রম এনে দিচ্ছে, হৃদয় বিপুল উৎসাহে যেন দুই পাঁজর ভেঙ্গে লাফিয়ে উঠছে। ফকীর। ঐ দেখ, তােমার অদৃষ্ট আকাশে দুইটী অপূর্ব সৌম্যমূর্তি,-কি স্থির, কি শান্ত, যেন অসীমের ধ্যানে বিভাের, বিশ্বের প্রেমে পাগল, উজ্জ্বল প্রতিভায় জ্যোতিষ্মান-জ্ঞানভক্তির পবিত্র সঙ্গম কল্লোলে আত্মহারা; ঐ দেখ তারা, এই মাতৃপূজার ৪ এপসনাতন ; উপাদান ল’য়ে, ফলপুষ্পে ভালি ভরে তােমারই মন্দির দ্বারে আসছে। হুসেনশাহ। আমি বুঝতে পাচ্ছিনা ফকীর সাহেব, এ মূর্তি কার, মানব না দেবতা ? ফকীর। মানববেণী দেবতা তারা, জ্ঞানমণ্ডিত শীর্ষ, হৃদয়ে প্রেমভক্তির উৎস-দেহ, মন জীবসেবায় পূত, বাংলার ব্রাহ্মণ তারা-প্রাণহীন অাচারের গণ্ডী ম্লান লজ্জায় তাদের পার করে দিয়েছে, কর্তব্যের উন্মাদ আহ্বান আজ তাদের বুকের মধ্যে বেজে উঠেছে ; তাদের নাম- হুসেনশাহ। (ব্যগ্রতা সহকারে ) কি নাম তাদের ফকীর সাহেব ? ফকীর। (একটু স্থির থাকিয়া, বর্তমান নাম অমর ও সন্তোষ গােপন করিয়া বলিলেন) তাদের নাম শ্রীরূপসনাতন; তােমার এ রাজ্যের উত্তরােত্তর সম্পদবৃদ্ধি তঁাদের আনুকূল্যের সাথে জড়ান আছে; প্রেম ধৰ্ম্মের গূঢ় অবতাররূপী কোন অদ্ভুত সন্ন্যাসীর দর্শনে বিষয়বীতশ্রদ্ধ না হওয়া পর্যন্ত এই দেবতা ভ্রাতৃদ্বয় তােমার দুই বিপুল বাহুস্বরূপে তােমারই রাজ্যের হিতসাধনে ব্যাপৃত থাকবেন—তারপর—তারপর—(ভাবজড়িত কণ্ঠে) থাক সে কথা। ( সহসা প্রস্থান) হুসেনশাহ। আশ্চৰ্য্য এই ফকীর, ভীমকাস্তির কি অপূর্ব সমাবেশ—শিশুর সরলতার সাথে বজ্ৰকাঠিন্যের কি গূঢ় সংমিশ্রণ ঝটিকার মত এসে আমার সামনে থেকে একটা তামসী পর্দ ;

রূপসনাতন
তুলে দিয়ে, একটা স্বপ্নের রাজ্য, একটা আশার কানন দেখিয়ে
দিয়ে তেমনি ঝটিকার মত চলে গেলেন, আর আমি স্তকিত,
বিস্মিত, চমৎকৃত হয়ে গেলাম ! কি শুনলাম। একি সব বাস্তব
না অলীক ? রূপসনাতন ? বাংলার শ্রেষ্ঠ ব্রাহ্মণ ? কেশব,
জান তুমি এই রূপসনাতন কে ? সমগ্র বাংলা তন্ন তন্ন করে
খুঁজে দেখ কোথায় তাদের বসতি।
কেশব। জো হুকুম, জাহাপনা।
(আলােক স্তম্ভ নির্মাতা প্রধান মিস্ত্রী ও চোপদারের প্রবেশ
ও কুণীশ করণ)
কেশব। জাঁহাপনার আদেশে আলােকস্তম্ভ নির্মাতা প্রধান
মিস্ত্রী ও চোপদার সমাগত।
হুসেনশাহ। গৌড়ের গগনস্পর্শী আলােকস্তম্ভ নির্মাণ কাৰ্য্যে
তুমি যথেষ্ট কলাবিদ্যা কৌশলের পরিচয় দিয়েছ, তার জন্য
উপযুক্ত পুরস্কার পাবে।
শুনেছি সকলেরই
নয়ন আকৃষ্ট করেছে। উর্দ্ধে উন্মুক্ত নীল আকাশ, দূরে সুদূরে
স্বাধীন উদার সাগর কল্লোল, দুই অসীমের মাঝখানে দাড়িয়ে আছে
তার রত্ন খচিত গগনচুম্বি চূড়া; চল চল একবার সেই খানে
দাঁড়িয়ে পৃত শ্রদ্ধায়, অবনত শিরে হৃদয়ের সব অবসাদ উম্মাদনা
সেই অসীমতায় ক্ষণকালের জন্য ডুবিয়ে দেই।
( সকলের প্রস্থান)
স্তম্ভের সৌষ্ঠব
।

শ্রীরূপসনাতন
দ্বিতীয় দৃশ্য।
স্থান-আলােকস্তম্ভের চুড়া, সময়-অপরাহ্ন।
উপবিষ্ট-সেনশাহ, কেশবছত্রী, প্রধান মিস্ত্রী ও চোপদার ।
( দূরে গীত )
দূরে কার ওই গীত শুনা যায় ।
কে যেন গাহিছে, সকলিত মিছে,
যা কিছু দেখিছ সব শূন্যময়।
যে পথের ভিখারী মুষ্টি ভিক্ষা করি,
দ্বারে দ্বারে ঘুরি জীবন কাটায়,
অদৃষ্টেরি খেলা, কি কুহক মেলা,
কাল তারে রাজার আসনে বসায়।
বাজীকরের বাজী, আজ রাজা সাজি,
হয়তো কাল তারে ভিখারী বানায়।
আবার মূদলে আঁখি, দেখি সবই ফাঁকি,
রবি শশী তারা শূন্যে শূন্যময়।
হুসেনশাহ। কেশব, আকাশের গায় জমাট বাঁধা কাল কাল
মেঘ দেখেছ ? আমরা বুঝি তাদেরও আজ ছাড়িয়ে উঠেছি।
রত্নরাজি খচিত অভ্রভেদী কুতুবমিনারও বুঝি আজ আমাদের
নীচে পড়ে আছে, বাদশা নামদার জেন্নাতবাসী কুতুবউদ্দিন অমরধাম
থেকে দেখবেন, একদিন তারই বাহুবল প্রতিষ্ঠিত এই ভারত
সাম্রাজ্য হুসেনশাহের উদার শাসন নীতিতে, অপত্যনিৰ্বিশেষ
প্রজাপালনে, শান্তির কোমল ক্রোড়ে বিশ্রাম লাভ কচ্ছে,

রূপসনাতন অশান্তির রেখাটুকুও তাতে থাকবে না। গৌড়েশরাে জগদীশ্বরােবা বলে ভারতের এক প্রান্ত হতে অপর প্রান্ত তার বিজয়গাথা ঘােষণা কৰ্বে। সিদ্ধ ফকীর তারই ইঙ্গিত করে গেছেন, জাঁহাপনা। দুর্বার বিক্রমের সাথে প্রাণারাম প্রজাপ্রীতির সম্মেলনে যার হৃদয় পূত, বক্ষ স্ফীত, খােদাতালা তার সহায়, এই অকস্মাৎ ফকীরের আগমন তার প্রথম নিদর্শন। হুসেনশাহ। এই আলােকস্তম্ভের গগনস্পর্শী শিখর থেকে সমগ্র বাংলা একখানা অঙ্কিত চিত্রের মত দেখা যাচ্ছে, সন্ধ্যার অস্তোমুখ তপনরশ্মি তার খরস্রোতা নদীগুলিকে রক্তিমরাগে রঞ্জিত করেছে, আর এদিকে স্নিগ্ধ শান্ত চন্দ্রমা বিমল জ্যোৎস্নায় তার অঙ্গ ভরে দিয়েছে। স্তম্ভের মর্মর প্রস্তরগুলি এই দু’য়ের মাঝখানে দাড়িয়ে কি অতুল শােভ ধারণ করেছে ! ধন্য কারিগর, তােমার শিল্পনৈপুণ্যের যথেষ্ট পরিচয় দিয়েছ, স্তম্ভের গায়ে খােদিত চিত্রগুলি তােমার স্থাপত্য বিদ্যার চাতুর্য ঘােষণা কচ্ছ। প্রধান মিস্ত্রী। জাহাপানার মেহেরবাণী। দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রম করে বহু দূর দূরান্ত থেকে পাথর যােগাড় করেছি, হাজার হাজার লােকের দিনরাত্তির মেহমতে ইমারত প্রায় শেষ হয়েছে। থামের কাজ দেখে যখন জাঁহাপনা সন্তুষ্ট হয়েছেন তখন নিশ্চয়ই বেশ মােটা রকমের পুরস্কার পাৰ আশা করি। হুসেনশাহ। কেশব, মন্ত্রীকে জানাবে, এই মিস্ত্রী আমার কোষাগারে প্রবেশ করে তার অভিরুচিমত ধনরত্ন মণিমাণিক পসনাতন গ্ৰহণ কৰে যেন কোন বাধা দেওয়া না হয়, আর সঙ্গে দু'চারজন সশস্ত্র প্রহরী দিয়ে তাকে নির্বিঘ্নে স্বগৃহে পৌছে দেবে। কেশব। জাঁহাপনা মহানুভব ! হুসেনশাহ। উপযুক্ত পাত্রকে পুরস্কৃত করা কি মহানুভবতার পরিচয় কেশব ? তাছাড়া, স্তম্ভের শােভা এত মধুর হয়েছে যে, আমার সমস্ত ভাণ্ডার দিয়ে দিলেও তার উপযুক্ত পুরস্কার হয় না। জগতে মানুষ আসে, হয়ত কেউ দুদিনের জন্য একটা উল্কার মত দুনিয়ায় বিপ্লব উপস্থিত করে অনন্তের মাঝে বিলীন হয়ে যায়-- পড়ে থাকে শুধু তার জগৎকম্পি স্মৃতি—তার অতুল কীর্তি। এ দুনিয়ার মালিক আমি নই, আমাকেও বিদায় নিতে হবে; কিন্তু এই সৌন্দৰ্য্যসার সৌধ, এই সুৰ্যকিরণে ঝলমল রজতগিরিসদৃশ স্তম্ভ হয়তাে কিছুদিনের মত আমার স্মৃতি, আমার কীর্তি বাংলার বুকে জাগিয়ে রাখবে ;-তার গগনচুম্বি চূড়ায় নীলপতাকা উড়ে উড়ে বলবে,-আফগানের সেই নিগৃহীত ত্যক্ত হুসেন, নির্ভীক বীরত্বের লােহিত পতাকাধারী হুসেন, স্বাধীন বাংলার মসনদে বসে এই কীর্তিস্তম্ভ রেখে গেছেন। আর তার মসলা যুগিয়েছে, সেই কীৰ্ত্তি সৌধের উপাদান হয়েছে এই বাংলার হিন্দু মিস্ত্রী ; হয়ত আমার সাথে তার স্মৃতিটাও এর গায় জড়িয়ে থাকবে। সুতরাং তার এই মহান কাৰ্য্যের উপযুক্ত পুরস্কার সামান্য হতে পারে না। মিস্ত্রী। খােদাৰ, জাহাপানার মেহেরবাণীই আমার যথেষ্ট পুরস্কার।

জপসনাতন
হুসেনশাহ। কি সুন্দর। শ্বেত প্রস্তরগুলির পাশে মসৃণ
কৃষ্ণপ্রস্তরগুলির শােভা শিল্পীর মহিমা প্রচার ক’চ্ছে।
মিন্ত্রী। খােদাবন্দ, অনেক খুঁজেছি, ভারতের না খুঁজেছি
এমন জায়গা নেই, কত অর্থই না ব্যয় করেছি, তবু কয়েক খান
লাল পাথর যােগাড় কর্তে পাল্লাম না। ঐ থামের চূড়ার মাঝে
মাঝে একখানা করে লাল পাথর বসাতে পাল্লে যা শােভা হত,
দেখলে কেউ চোখ ফেরাতে পাত্ত না—অবাক হয়ে চেয়ে থাকত।
কয়েক খানা মাত্র লাল পাথর পেলেই আরাে সুন্দর কত্তে
পাত্তাম।
হুসেন। পাৰ্তাম! পাত্তাম !! বেইমান, আগে বলতে
পার নি। এই নাও তােমার শিল্পনৈপুণ্যের সর্বোৎকৃষ্ট
পুরস্কার ! জাহান্নামে যাও।
( পদাঘাত করিয়া স্তচুড়া হইতে মিস্ত্রীকে ভূতলে নিক্ষেপ, সঙ্গে
সঙ্গে মিস্ত্রীর মৃত্যু, পরে ঘুর্ণিত চক্ষু চোপদারের
দিকে পাতিত করিয়া কহিলেন)
সাকুৰ্ম্মা (একটি গ্রামের নাম )-
চোপদার। যাে হুকুম জাঁহাপান।
( বলিয়া লম্বা কুর্ণিশ করিয়া কম্পিত চোপদার সেই
মূর্তিমান ধৰ্ম্মরাজের নিকট হইতে পলাইল।)
অন্তরালে গান
ঐ
ডুবে যায়, যায় যায় যায়।
জীবন তরীখানি আজ অবেলায় ডুবে যায়।

লীরূপসনাতন
ভবনদীর কুলে কুলে,
চলেছিল পাল তুলে
কেবা আজ দিল ঠেলে
মাঝ দরিয়ায়।
এখনাে সবে সকাল,
কাটেনি কু-আশা জাল,
কালাকাল বুঝে না কাল
এই দুনিয়ায়।
তৃতীয় দৃশ্য
সাকুৰ্ম্মা গ্রাম-সিদ্ধফকীরের আশ্রম,
কাল-সন্ধ্যা।
ধুনিরাম ও সেবারামের প্রবেশ।
ধুনিরাম। দেখ ভাই, ফকীরের কাছে অনেকদিন কেটে
গেল। ভজন সাধন কিছুই হ’ল না। খালি কোথায় মড়া,
কোথায় ওলাউঠা, কোথায় বসন্ত, যা কেউ ছোঁয়না,-ভয়ে
পালায়,—তাই ঘেটে ঘেটে শরীরটা অপবিত্র হয়ে গেল।
গঙ্গাস্নান করলেও এ কাটবে না।
সেবারাম। আমার কিন্তু ভাই তা মনে হয় না। আমি যখন
রােগীর শিয়রে বসে তাকে বাতাস করি, তার মাথায় হাত বুলিয়ে
দেই, তখন তার মুখের সেই কাতর নির্ভরতা, তার সেই সরল

রূপসনাতন
ছল ছল চোখ দেখলেই আমার প্রাণটা যেন কেমন হয়ে যায়।
এমনি বাইরে যে সব মানুষ দেখি, সব যেন মুখােশ পরা, ভেতরে
একভাব, বাইরে আর একভাব। কিন্তু ব্যাধির কোলে শুয়ে
মানুষ যে কতসরল, কত সুন্দর হয় তা আমি প্রাণে প্রাণে বুঝি ;
তখন শ্রদ্ধায় মানুষের পায়ে মনে মনে কোটি নমস্কার করি।
ধুনিরাম। কিন্তু এই কত্তেই কি এখানে এসেছিলে ?
কোথায় একটু ভগবানের নাম ক’ব, ছাই মেখে ধুনি জ্বালিয়ে
বােম বােম্ করে রাত্তিরের পর রাত্তির কাটাব, তা না, মড়া
ধাঁট আর রােগীর গু ফেল। আচ্ছা ফকীরের পাল্লায় পড়া
গেছে বাবা !
সেবারাম। ফকীর আমায় একদিন বলেছিলেন, যে এক
সাধু ভগবানকে পাবার জন্যে চোখ বুজে তিনদিন তিনরাত্তির
ধরে মেরুদণ্ড খাড়া করে বসে মন্ত্র জপ কচ্ছিলেন, এমন সময়
একটি কুষ্ঠ রােগগ্রস্থ ভিখারী তার কাছে এসে বার বার ভিক্ষা
চাইতে লাগলেন।
কয়েকবার চীৎকার করে ডাকতেই সাধুটি
তাকে চোক রাঙিয়ে দূর হয়ে যেতে বলেন।
তখন সেই
কুষ্ঠরােগী গম্ভীর ভাবে তাকে বললে—“ওগাে, তুমি যাকে ডাকছ
আমি সেই ; কিন্তু তুমি একটি নিরাশ্রয় রােগীকে আশ্রয় দেওয়া
দূরের কথা একমুষ্টি ভিক্ষা দিতে পারনা, এত ক্ষুদ্র তােমার মন,
তুমি সে বৃহৎকে পাবে কি করে ? যে দিতে পারে সেই পায় ।
তার ওপর, ভেবে দেখ, তুমিও এক রকমের রােগী, -দেহের না
হয় মনের। তােমার মনটা কি নানাবােগের খনি নয় ? তাই
১২

রূপসনাতন
তুমি চিরব্যাধিহয় ভগবানকে চাচ্ছ। তোমার যদি বিপন্নের
দিকে মুখ তুলে চাইবার প্রবৃত্তি না থাকে তবে তােমার ভব
বিপদ সাগর হতে পার হবার আশা কৰ্বার কোন অধিকার নেই।
(ফকীরের প্রবেশ)
ফকীর। ঠিক বলেছ সেবাম। আমার ঠাকুর কি বলেন
ভারত ভূমিতে হৈল মনুষ্য জন্ম যার।
জন্ম সার্থক কর করি পরউপকার। (চৈঃ ভাঃ)
ধুনিরাম। কিন্তু দেখুন, আমার একটা বড় গােলমাল ঠেকে।
লােকে নিজের নিজের কৰ্ম্মানুসারে রােগ-ভােগ করে-আর
সে তো ভগবানেরই ব্যবস্থা। তার ওপর হাত দিতে যাওয়া ত’
আমাদের খােদার উপর খােদ্দারি করা।
ফকীর। আর দয়া, দাক্ষিণ্য, প্রেম, সহানুভূতি, পরােপকারের
প্রবৃত্তি প্রভৃতি যে সৎভাব মানুষের মধ্যে দিয়েছেন সে কি বৃথা?
ধুনিরাম। বৃথা কেন হবে? দুনিয়ার কুটো গাছটাও বৃথা
নয়। কিন্তু এ দুটোর মিলও ত’ খুঁজে পাচ্ছিনে।
ফকীর। এর মিল খুঁজলেই পাওয়া যায়। দেখ, সুখ দুঃখ
বিধানের কর্তা তুমিও নও, আমিও নই। আমাদের কর্তব্য,
আমাদের বৃত্তিগুলিকে সদভিমুখে চালনা করা। যদি বল সকলেই
নিজ নিজ কৰ্ম্মফল ভােগ করে-কৰ্ম্মই তাদের বিধা,—তাহলে
মনেরেখ’ শব্দের প্রতিধ্বনির মত প্রেম প্রেমই প্রদান করে,

রূপসনাতন
ক্রোধ ক্রোধই আনয়ন করে, হিংসা হিংসাই জন্মায়। ঐ যে
খেতে পায় না মানুষ, দুয়ারে দুয়ারে কুকুরের মত ভয়ে ভয়ে
ভিক্ষাপাত্র নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, মনেরেখ’ ও এম্নি করে কুকুরের
মত কত ভিখারীকে ফিরিয়েছে,ঐ যে নিরাশ্রয় রােগী যন্ত্রণায়
ছটফট ক’চ্ছে, মনে রেখ ও নিজের শরীরের আরামের জন্য কত
রােগীর যন্ত্রণার প্রতি ক্ষেপও না করে চলে গিয়েছে -আর
ওই যে বাজার ছেলে ভােগ সুখে দিন কাটাচ্ছে, ও সকলের
ভােগ সুখের জন্য নিজ ভােগ-সুখ বিসর্জন দিয়েছিল ; ঐ যে
নিলিপ্ত সাধক, যার কাছ থেকে সমস্ত ভােগবাসনা দূরে সরে
গেছে, ও কত জন্ম জন্ম ধরে নিজের সমস্ত ভােগ প্রবৃত্তিকে
সংযত করে জীবের যাবতীয় সেবায় আত্মাহুতি দিয়ে এসেছে।
মৃত্যুর সাথে সাথে সব শেষ হয়ে যায় না—জন্মও এই প্রথম নয়।
ওই নিরাশ্রয়, আৰ্ত্ত, রুগ্ন শত শত জীব গুরুরূপে শিক্ষা দিচ্ছে-
“স্বকৰ্ম্ম ফলভুক পুমা”। আর সেই কৰ্ম্মই কাল—সেই কালই
ভগবান।
( প্রস্থান)
ধুনিরাম। শুনলে? আবার সব গুলিয়ে গেল। এই
রইল বাবা বাঘছাল, এই রইল চিটে। চল, সেই মড়াটা
পুড়িয়ে এসে, তার ছােট মেয়েটার খাবার ব্যবস্থা করা যাকগে।
সেবারাম। তার জন্য কাপড় আর খাবার আমি এনে রেখেছি।
আহা তিন বৎসরের মেয়ে একেবারে নিরাশ্রয় হ’ল ।
( সকলের প্রস্থান)
১৪

রপসনাম
চতুর্থ দৃশ্য।
স্থানরামকেলি গ্রাম, অমর ও সন্তোষের গৃহ।
কালরাত্রি।
সন্তোষ একাকী।
সন্তোষ।
(গীত)
(আমার) জীবন-কুঞ্জ রেখেছি শূন্য তব আশাপথ চাহিয়ে।
মরম বেদনা রেখেছি লুকায়ে তুমি এসে দেবে মুছায়ে ।
নয়নে রেখেছি তার ধারা
চৰণ দিবগো বােয়ায়ে।
শ্রবণে পশিবে নূপুর ধ্বনি গােপনে রেখেছি সাজায়ে ।
বক্ষে রেখেছি আসন করে
হৃদয় রেখেছি পরশ তরে
মােহন মুরলী ধরিয়ে করে
এস চরণে চরণ রাখিরে ।
কই তেমন করে ত ভালবাসতে পালাম না; যত ভালবাসতে
যাই ততই দেখি আমার ভালবাসা ত হয় নি ; যে ভালবাসে সেকি
কতটা ভালবাসলাম তা ভাবে, না ভাববার অবকাশ পায়। তার
ভালবাসা আসে বর্ষার দামােদরের বাণের মত, দুকূল ভাসিয়ে
বিজয়ােল্লাসে চলে যায় ;—এতটুকু ভাববার, পেছন ফিরে
দেখবার অবসর দেয় না; আর আমি মাপতে বসেছি প্রতি-
মূহুর্তে কতখানি ভালবাসলাম, তার বিনিময়ে কতখানি প্রতিদান
পেলাম ; যতক্ষণ এই হিসেব নিকেশ, কেনা বেচা আছে ততক্ষণ
১৫

রূপসনাতন প্রেমজগতের দ্বার রুদ্ধ। সে জগতে বিধিনিষেধের স্থান নেই, জ্ঞানান্বেষণ, বিচারণার কোলাহল নেই, আছে কেবল আস্বাদন, অশব্দ নীরব আস্বাদন, সে যে প্রেম রসের সিন্ধু, অখিল রসাতের অফুরন্ত উৎস— হৃদয় জুড়িয়া সেথা রসের হিলােল বয়। কেবল মিলন কথা মিলনেরি অভিনয় ॥ আনন্দেরি সুধাগীতি গার সেথা নিতি নিতি মধুর মিলন রাতি সেথা চিরদিন রয়। আনন্দ মন্দির সে যে সকলি আনন্দ ময়। (সহসা অমরের প্রবেশ) অমর। তুমি তাকে প্রেমময় বল—রসময় বল—আনন্দময় বল—কিন্তু রােগশােকের মর্মন্তুদ বিষজ্বালা, বিষধর সর্পের মৃত্যু দংশন প্রভৃতি দুঃখবেদনার যা হ’তে উৎপত্তি তাকে শুধু মধুময় বলি কিরূপে? শুধু প্রেমময় বলি কিরূপে? আবার হতাশার অকূল সাগরে যাঁর আশার কোমল হাত দেখা দেয়, মায়ের প্রাণে যিনি মূর্তিমতী ক্ষমারূপে, স্নেহের অনন্তবর্ষী উৎস- রূপে বিরাজ করেন ;-আকাশের নীলিমায়, নৈশচন্দ্রমায়, পাখীর পাখায়, কুসুমের সুষমায় যার সৌন্দৰ্য্য মাধুৰ্য্য শতধারে ফুটে উঠেচে তাঁকে মধুময় না বলে পারি কিরূপে? ১৬ শ্রীরূপসনাতন (সহসা ফকীরের প্রবেশ ও গীত) { তুমি ) নিঠুর মধুর দারুণ করুণ দুখদ সুখদ শ্যামছে। মৃদুল কঠোর, শ্যামল গৌর অনিন্দ্য আনন্দ ধামহে ॥ স্বরূপ আবরি ঘন মায়াজালে, শঠ নিঠুরতা জগতে জানালে, (ওগো) বিরহ বেদনা বাড়ালে বাড়লে চিতচোর গুণধাম হে। { দিলে ) দাবদাহ চিতে সােহাগ বাড়াতে আপন মাধুরী সবারে জানাতে আপনি আসিলে জগতে বিলাতে (তােমার) অমৃত মাখান নাম হে। তাকে যত নিঠুর বলি তিনি কি তত নিঠুর? তার বিরহের দাব- দাহেও যেন আনন্দ মাধুর্যের একটা অপূর্ব আস্বাদন রয়েছে বজ্ৰাদপি কঠোর তিনি, দুর্বিষহ দারুণ তিনি তার কাছে, যে তার মিলনমন্ত্রে দীক্ষা পায় নাই,তার অখিল রসামৃত মােহন মূরতি দেখে নাই। তার স্বরূপ, জগৎ প্রপঞ্চের অন্তরালে লুক্কায়িত, তার সেই গােপবেশ বেণুকর যার নয়নযুগ একবার দেখেছে—সেই “কস্তুরীতিলকং ললাটফলকে বক্ষস্থলে কৌস্তুভ, সর্বাঙ্গে হরিচন্দনং করলে বেণুঃ করে কঙ্কণং, ব্রজেন্দ্র নন্দনঃ শ্যামঃ গােপালচুড়ামণিঃ- রূপ যার নয়নপথে একবার পড়েছে, জন্মের মত সে বিকিয়ে গেছে তার চরণযুগে; চির সময়, চিরমধুময় তিনি তার কাছে। २ ১৭ •• রূপসনাতন কথা তার মধুমাখা, নয়নে রূপের মধু, পরশ পীযুষ ঢালা, অধরে সােহাগ হাসি- অমর। পাগল প্রেমিক বল বল- গীত। আকুল আনমনে সে শ্যাম পথ পানে বৃথা কি যাবে মাের কেবল চেয়ে থাকা ? সে মম চিতচোর শুধু কি নয়ন লাের বরষি লুকায়ে রবে দিবে না তিলেক দেখা ? পরাণ কেবলি চায় জীবন যায় যায়, হেরি বারেক তায় সে মুখ মধুমাখা। শ্যাম যমুনা কুলে লে নীপ তরুমূলে মুরলী মধুরােলে আর কি হবে দেখা ? ফকীর। আনন্দের পুত্তলি তিনি, লীলারসবিগ্রহ ধারণ করে যখন আসেন, তখন তার চিরপ্রিয় যাঁরা, চিরসােহাগের চির আদরের যাঁরা, তাঁদের প্রাণের গােপন তারে, একটা অজানার বেদনা, একটা ব্যাকুলতার সাড়া পড়ে যায়—বিষয়ের শতগুণ বাঁধন, মায়ার লােহার শৃঙ্খল আপনা হতেই খসে পড়ে যায়, প্রাণে প্রাণে তাঁর আকুল আহ্বানের গােপন অনুভূতি,পাগল করা বাঁশীর মােহন তান অহর্নিশ তাদের ব্যাকুল করে তােলে-ঐ আকাশের গায় হের আনন্দলহরী, অনলে অনিলে জলে হের অভিনব আনন্দ- মূচ্ছ না—ওই শাখে পাখী ডাকিয়া কহিছে-নদী কুলুতানে কহে বারবার (প্রস্থান) ১৮

রূপসনাতন
অমর। দাড়াও ফকীর, আর একটুখানি দাড়াও। বলে
যাও,-ব’লে যাও, কি কহে অনলে অনিলে সাগরে
(বলিতে বলিতে প্রস্থান)।
।
পঞ্চম দৃশ্য।
স্থান—সাকুৰ্ম্মা গ্রামের পথ ; কালরাত্রি।
( চোপদারের প্রবেশ ও ক্ষিপ্তের ন্যায় ইতস্ততঃ ভ্রমণ
এবং আপন মনে কথা বলা )।
চোপদার। বাবা ! দোহাই ভগবান, এবার থেকে ঠিক
তােমায় ডাকবাে ! এখনও আমার বুকের ভেতর ধড়াস ধড়াস
ক’রছে। বেটা যেন সাক্ষাৎ যম! পূব্বি পুরুষের পুণ্যিফলে
নেহাৎ পৈত্রিক জান্টা র’ক্ষে পেয়েছে। তানাহলে ত’ মিস্ত্রীর
দশা হয়েছিল আর কি।
*
(জনৈক গ্রামবাসীর প্রবেশ )
চোপদার। তুমি আবার কে বাবা—কোথেকে আসছ
সােণা ?
গ্রামবাসী। কি হে ভায়া, বেজায় শীত লেগেছে বুঝি ?
অমন ছুটোছুটি কচ্ছ কেন হে ? তা মন্দ নয়।
তা মন্দ নয়! একটু ছুটোছুটি
করে শীতের দিনে শরীরটা গরম করে নেওয়া মন্দ নয়।
১৯

রূপসনাতন
এ শীত
চোপদার। যা বলেছ বাবা, শীত বলে শীত।
একবার লাগলে পাঁচ মিনিটেই সব বরফ-চোখের মণি বরফ,
নাক বরফ, কাণ বরফ, হৃৎপিণ্ড বরফ, কথা বলাও বরফ।
পরেই সে বরফ আগুনে পুড়ে জল না হয়ে একেবারেই ছাই।
বুঝলে হে বাপু, সে কেমন শীত? (একটু অন্যমনস্ক ভাবে )
আঃ কি চা’লটাই চেলেছে? মাথা আছে বটে; বাবা, নইলে
কি আর কোথাকার একটা সেপাই অমন করে সুবুদ্ধিরায়ের
মাথায় হাত বুলিয়ে তুড়িমেরে বাংলার সিংহাসনটা বাগিয়ে
নিলে।
গ্রামবাসী। লােকটা বিড় বিড় করে বলে কিগাে ! ক্ষেপে
গ্যাছে নাকি? নাকি রাস্তা ভুলে গ্যাছে! হ্যাগাে, কোথায়
যাবে বল ত ?
চোপদার। (আপনমনে) সাক্ষাৎ দুষমণের হাত থেকে
যখন একবার র’ক্ষে পেয়েছি, তখন আর ওমুখে ফিরছি নে, একে-
বারে পায়ে আকার। (গ্রামবাসীর দিকে তাকাইয়া কি বললে
বাবা, কোথায় যাব ? সে জায়গার নামটা ঠিক জানা নেই বাবা ।
যেখানে গেলে আর না দুষমনের হাতে পড়তে হয় বাবা।
( আবার অন্যমনস্ক ভাবে) নাঃ, বেটা জানে বটে, দাবার চালটা
শিখেছিল। হাজার হলেও একটা নতুন জাতের ছেলে ত?
গ্রামবাসী। বেটা আপনা আপনিই কি সব ব’কে যাচ্ছে-
পাগল নাকি? ওহে এখানে পাগলামি টাগলামি খাটবে না
যাদু-আস্তে আস্তে সােজা পথ দেখ বাবা। নইলে বুঝতেই ত’

শ্রীরূপসনাতন
পাচ্ছ ? (লাঠি দেখাইয়া) এই ভূতের ওঝার সঙ্গে একবার ভাব
করিয়ে ছেড়ে দেব।
চোপদার। (অন্যমনস্ক ভাবে ) অত টাকাহীরে, মণি,
মাণিকি, কোষাগার ভৰ্ত্তি-অতধন কি প্রাণে ধ’রে দিতে পারে ?
বলে ফেলেছে কি করে ? একটা ছুতাে খুজছিল, যেমি পাওয়া
অম্নি ক্যাৎ করে ধরা।
গ্রামবাসী। আরে, আবার হীরে মণিমাণিক্যর কথাও বলে
যে ? না বাবা, গতিক সুবিধে দেখ ছিনে। বুজরুগির ভেতর
মনে হচ্ছে অনেক কিছু আছে।
চোপদার। (অন্যমনস্ক ভাবে ) নাঃ চালটা বেশ চেলেছ ;
একেবারে সবদিক সামাল, কবেকার একটা ভাঙ্গা পােডড়া থাম,
দিন নেই রাত নেই, লােকে লােকারণ্য করে কত দেশ দেশান্তর
থেকে কত সামগ্রী এনে, কেমন সুন্দর করে গড়া হয়ে গেল,
অম্নি মিস্ত্রীটাকে কুপােকাৎ। কিন্তু বাবা, ধম্মে সইবে না। মরে
ভূত হয়ে ঘাড়ে চাপবে।
অমরের প্রবেশ
অমর। কিম্বা প্রাণাপেক্ষা প্রিয় পুত্র হয়ে এসে মায়ার
বাঁধনে বেঁধে ধন প্রাণ দুইই আদায় করে নেবে।
চোপদার। এই যে ঠাকুর, ঠিক বলেছ। তােমায় দেখে
একজন ভাললােক, পণ্ডিত বলে মনে হচ্চে—আমায় বলতে পার
ঠাকুর—দেখত’ আমার হাতটা একবার দেখত’ (হস্তের তাল
প্রদর্শন) কি কল্লে এ যাত্রা এই জানটা র’ক্ষে পায় ?

অমর। তােমার বেশ-ভূষা দেখে মনে হচ্চে তুমি মুসলমান
বাশার কোন কর্মচারী। তা” এমন করে দণ্ড হাতে ল’য়ে
রাস্তায় ছুটোছুটি ক’চ্ছ কেন? চোখদুটো ঠেলে যেন মাথায়
উঠেছে, কপালে ঘৰ্ম্ম ছুটেছে, মাথার চুলে এক বােঝ। ধূলাে ;
কেউ তােমায় তাড়া করেছে নাকি ?—যেন ভয় পেয়ে প্রাণের
দায়ে ছুটেছ।
চোপদার। ঠাকুর,আট ক্রোশ রাস্তা উদ্ধশ্বাসে ছুটে এসেছি-
বুক ধড়ফড় কচ্ছে—গলা শুকিয়ে গেছে, একটু জল দিয়ে আগে
প্রাণটা বাঁচাও, তারপর সব বলছি।
অমর। আহা, এই পাশেই ত’ আমাদের বাড়ী, তুমি এতক্ষণ
এখানে ছুটোছুটি না করে কেন আমাদের বাড়ীতে এলেনা! চল,
পিপাসা দূর করে একটু বিশ্রাম কৰ্বে। তারপর তােমার কথা
সব শুনবাে। (আপন মনে) জানিনা কেন; এই রাজভৃত্যের
আকস্মিক আগমনের মধ্যে, কি যেন একটা রহস্য রয়েছে বলে
মনে হচ্ছে। ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের যেন একটা উত্তাল তরঙ্গ
আমায় ভাসিয়ে নেবার জন্য আকুল হয়ে ছুটে আসছে। ভগবান,
তুমি যদি মাঝি থাক, কি ভয় সাগরে।
করম ধরম হবে বরিলে তােমারে।
( সকলের প্রস্থান)।
২২

রূপসনাতন
যষ্ঠ দৃশ্য।
স্থান—গৌড়ের বাদশাহের প্রাসাদকাল রাত্রি।
(কেশব ছত্রীর সহিত বাক্শাহের প্রবেশ)
বাদশাহ। তারপর
কেশব। তারপর জাহাপানার আদেশে চোপদার পার্শ্ববর্তী
সাকুৰ্ম্মা গ্রামে উপস্থিত হয়ে কি ক’ত্তে হবে জানা না থাকায়
এদিক ওদিক ছুটোছুটি কচ্ছিল, এমন সময় একজন স্থানীয় ব্রাহ্মণ
পণ্ডিতের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয়।
বাদশাহ। (ব্যগ্রতাসহকারে ) ব্রাহ্মণ একাকী ছিলেন না।
সঙ্গে তার কোন ভ্রাতাও ছিলেন ?
কেশব। এই ব্রাহ্মণের আরও কয়েকটি তেজস্বী সহােদর
আছেন। সংস্কৃত এবং পারসীতে তাদের পাণ্ডিত্য অগাধ। বঙ্গের
অদ্বিতীয় পৌরাণিক পণ্ডিত সর্বানন্দ সিদ্ধান্ত বাচস্পতির কৃতী
শিষ্য তারা, তারই কাছে পুরাণশাস্ত্র অধ্যয়ন করেছেন, সপ্তগ্রামের
সৈয়দ ফকীরউদ্দিনের কাছে তারা আরবীভাষা শিক্ষা করেছেন,
তারা পারসী ভাষাতেও এতদূর জ্ঞানলাভ করেছেন যে বড় বড়
মৌলবী মোল্লা কাজী তাদের কাছে বিচারে পরাজয় স্বীকার
বাদশাহ। ( বাধা দিয়া) কেশব ! সিদ্ধ ফকীরের সেই
তেলেগর্ভ ভবিষ্যদ্বাণী যেন এখনও আমার কানে বাজছে, আমার
२७

শ্রীরূপসনাতন মনে হচ্ছে এই ব্রাহ্মণই সেই রূপসনাতনের একজন হবেন- তারপর ? কেশব। তারপর ব্রাহ্মণ জিজ্ঞাসা করলেন তােমায় সাকুৰ্ম্মায় আসবার জন্য অনুমতি দিবার সময় গৌড়েশ্বর কোথায় ছিলেন। বাদশাহ স্তম্ভের চূড়ায় ছিলেন শুনে জিজ্ঞাসা কলেন স্তম্ভের কাজের কিছু অবশেষ আছে কি না ? স্তম্ভ এখনও শেষ হয়নি শুনে, উপস্থিত কোন রাজমিস্ত্রী নিযুক্ত নাই জেনে বলেন- এই গ্রামে অনেক সুদক্ষ রাজমিস্ত্রী আছে, স্তম্ভের কাজ শেষ কার জন্য রাজমিস্ত্রীর প্রয়ােজন এবং সেইজন্য বাদশাহ তােমাকে এখানে পাঠিয়েছেন। তুমি কয়েকজন ভাল মিন্ত্রী সঙ্গে নিয়ে গৌড়ে ফিরে যাও। তাঁর কথামত চোপদার কয়েকজন মিস্ত্রী সঙ্গে এনেছে। বাদশাহ। যারা যুক্তি ও কারণ উপলব্ধি করে কার্য্যের নিরূপণ কৰ্তে পারেন, তারা সামান্য লােক নন কেশব! আমার এই বিশাল রাজকার্যের জন্য তারা সম্পূর্ণ উপযুক্ত। কেশব, আমার মনে হচ্ছে সিদ্ধপীর এদেরই ঈঙ্গিত করে গেছেন। তারাই আমার বাহু, তারাই গৌড়সিংহাসনের ভিত্তি। বৃদ্ধ মন্ত্রী গুণরাজখার মুখে তাদের ভূয়সী প্রশংসা বারবার শুনেছি। ধীর শান্ত তাদের ত্যাগ-বীৰ্য্য জ্ঞান-মণ্ডিত মূৰ্ত্তি আমার চোখের সামনে ভাসছে ;-যাও কেশব, গৌড় আজ তাদের পেয়ে ধন্য হবে। সসমে দুই ভ্রাতাকে গৌড়রাজ্যে নিয়ে এস— কেশর। জো হুকুম জাঁহাপান। (কেশবের প্রস্থান) ২৪ ঐরূপসনাতন বাদশাহ। (আপন মনে) ( আপন মনে) প্রবল জিগীষার উন্মাদনা, ঐশ্বর্যের লােলুপ আকাঙক্ষা, যেন আপনা হতে আজ আমার খসে পড়ে যাচ্ছে—দুর্জয় বিক্রমের সার্থকতার যেন এক অভিনব ছবি আজ আমায় শিথিল করে দিচ্ছে ; বেজে উঠছে হৃদয়ে সেই বিপুল বাজনা, কিন্তু তার সাথে কই রণক্ষেত্রের রুধির রঞ্জিত ভৈরব মূর্তি আজ দেখছি না, সূৰ্য্য সম শাণিত অস্ত্রের ঝন্‌ঝনা ত’ শুনছি না ? বিপুল বক্ষেতে কই তেমন উষ্ণ শােণিত প্রবাহিত হচ্ছে না ! ( সহসা ফকীরের প্রবেশ) ফকীর। সৈয়দ হুসেন, তােমার যুদ্ধের সাধ ত মিটে গেছে, আজ তুমি প্রজাপুঞ্জের পালক পিতা, সহস্র সন্তান নিয়ে আজ তােমার অঙ্গ পুলক ভরা, চক্ষু অশ্রুসিক্ত, হৃদয় আনন্দে উৎ ফুল্ল। সন্তানের হাসিমাখা মুখ দেখবার তােমার এত সাধ । তবে কেন তুমি হিন্দুর দেশে মুসলমান হয়ে এসেছিলে ? ভাবের মিলন হলে হৃদয়ের বিনিময় হয়। পাগল তুমি, তাই ধ্বংসের কৃপাণ হস্তে নিয়ে, ভীতির বজ্রধ্বনি করে, বাংলার হৃদয় কেড়ে নিতে চেয়েছিলে ? শােন হুসেন, সাধনার নাশ নেই, প্রাণের টান শূন্যে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসে না, তার পরিণতি, তার সার্থ- কতা আছেই আছে। তাই আজ অস্ত্রের ঝনঝনা রুধির পিপাসা তােমায় বিচলিত ক’চ্ছে না, দুরন্ত জিগীষা তােমায় উন্মাদনা দিচ্ছে না--তাই হের ওই শান্তমূরতি স্নিগ্ধ মধুর রূপ, আসে তব পাশে ল’য়ে প্রীতি ডাল, পূজা উপাদান, বাঁধিতে তােমারে স্নেহ २०

শ্রীপসনাতন
প্রীতির বাঁধনে। ধন্য হবে গৌড়, তুমিও ধন্য, আজ পবিত্র
মে।
(প্রস্থান)
সেন। কে তুমি ফকীর, আমার বক্ষের মাঝে লুক্কায়িত
কথা আজ এম্নি করে আমায় খুলে বলে গেলে ? ( ঈষৎ স্থির
থাকিয়া) না, না, স্বাধীন সিংহ আমি, তেজোবীৰ্য্যশক্তির দুরন্ত
উপাসক, বাংলার বাতাস আমায় নির্জীবতা এনে দিচ্ছে, তার
স্বভাব সুলভ কমনীয়তা যেন আমায় শান্তির বাতাস দিয়ে ঘুম
পাড়িয়ে দিচ্ছে, কিন্তু তা হবে না, আফগান শিশু স্থির লক্ষ্যে
পোঁছবার পূর্বে পথের মাঝে ঘুমােতে জানে না-বাসনার হুতাশন
নিৰ্বাপিত না হওয়া পর্যন্ত তার বিরাম নেই; ভারত, সমগ্র
ভারত যেদিন আমার পদভরে নুইয়ে পড়বে, গিরিরাজ হিমালয়
হ’তে সুদূর জলধিতট পর্যন্ত যেদিন আমার বিজয় পতাকা স্বাধীন
বাতাসে হেলে দুলে উড়তে থাকবে, সেইদিন, সেইদিন আমার
দুরন্ত বাসনার বিপুল আহুতির শেষ হবে। তার পূর্বে নয়।
( প্রস্থান)
*
১#
.
১াল,
২৬

দ্বিতীয় অঙ্ক।
১ম দৃশ্য।
স্থান-অমর ও সন্তোষের গৃহ।
কালরাত্রি। ঝড় বৃষ্টি ও শিলাপাত আরম্ভ।
অমর।
( অমর ও কেশবছত্রীর প্রবেশ)
এত গভীর রাত্রি, এই ঝড়, শিলাবৃষ্টি, আপনার
সহসা আগমনে শঙ্কার উদয় হচ্ছে—গৌড়েশ্বরের কোন বিপদ
হয় নি ত ?
কেশব। শঙ্কার বিশেষ কারণ না থাকলেও বাদশা একটু
বিপন্ন হয়ে আপনার পরামর্শ চেয়েছেন ;-আপনাকে এখনই
আমার সঙ্গে যেতে হবে, বাইরে শিবিকা প্রস্তুত, অনুগ্রহ করে
গাত্রোখান করুন।
অমর। বিষয়টি আগে থাকতে জানা থাকলে একটুখানি
ভাববার অবকাশ পাওয়া যায়। আপনার যদি জানা থাকে, এবং
কোন বাধা না থাকে তাহলে ঘটনা কি আমাকে বলুন।
কেশব। সমস্যা কঠিন বলেই মনে হয়। আজ সন্ধ্যায়
গৌড়েশ্বরের গায়ে কোন স্থানে একটী চিহ্ন দেখে রাজমহিষী
জিজ্ঞাসা কলেন কিসের চিহ্ন ? বাদশাহ প্রথমে গােপন
কারই চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু রাজ্ঞীর আগ্রহাতিশয্যে বলেন
যে আলাউদ্দিন হুসেনশা যখন গৌড়ের রাজা ছিলেন ; তার
২৭

এরূপসনাতন অধীনে সুবুদ্ধি রায় নামে একজন হিন্দু জমীদারের নিকট বাদশাহ কাজ কৰ্ত্তেন ! সুবুদ্ধি রায় তাকে একটি জলাশয় খনন করবার ভার দেন, ঐ কাৰ্য্যে তার ত্রুটি দেখে তাকে শাসন করবার নিমিত্ত কশাঘাত করেছিলেন। ঐ চিহু সেই কশাঘাতের। শুক্বামাত্রই ৰাজ্ঞী ক্রোধে, অভিমানে অগ্নিস্ফুলিঙ্গের মত জ্বলে উঠলেন। জিজ্ঞাসা কলেন সে সুবুদ্ধিরায় কি এখনও জীবিত আছে?” গৌড়েশ্বর বলেন । তিনি বেঁচে আছেন। অমর। শুনেছি আলাউদ্দিন হুসেন শাহের রাজ্যচ্যুতি সম্বন্ধে তিনিই বাদশাহের একজন প্রধান সহায় ছিলেন এবং চিরদিনই তার পক্ষাবলম্বন করে আসছেন। কেশব। অভিমানহত রাজ্ঞী বলেন এক্ষনি তার প্রাণ- দণ্ড করা হােক। বাদশাহ বললেন তা হতে পারে না, তিনি আমার পােষণকর্তা, বিশেষতঃ তার কোন দোষ ছিল না। তিনি আমার দোষেই আমাকে দণ্ডবিধান করেছিলেন। তারই অনুগ্রহে আমি আজ গৌড় সিংহাসনের অধীশ্বর, চিরদিন আমাকে প্রতি- পালন করে আসছেন, আমার শুভার্থে চিরদিনই আমার সাহায্য করে আসছেন, এমন উপকারী প্রভুর প্রাণনাশ কৰ্ত্তে হবে একথা আমি মনেও স্থান দিতে পাব না। অমর। ধন্য গৌড়েশ্বর ! এমন না হলে কি বিধাতা সুপ্রসন্ন হন । তারপর ? কেশব। তারপর, রাজ্ঞীও ছাড়বার পাত্রী নন, তিনি বললেন সুবুদ্ধিরায়ের প্রাণদণ্ড না হলে আমি আত্মহত্যা ক।

শ্রীরূপসনাতন
অমর। গৌড়েশ্বর
দেখছি বিষম সঙ্কটেই পড়েছেন।
কেশব। এখন উপায় ! বাদশাহের ইচ্ছা, সুবুদ্ধিরায়ও
প্রাণে বাঁচেন, রাজ্ঞীও প্রসন্ন হন এমন কোন উপায় আজ
আপনাকে কর্তেই হবে।
অমর-বড় চিন্তার বিষয়। দেখা যাক ভগবানের কি
ইচ্ছা? শিলাবৃষ্টি এখন থামবে না—গৌড়েশ্বরও উৎকণ্ঠিত হয়ে
আছেন, চলুন আর বিলম্ব করা উচিত নয়। (উভয়ের প্রস্থান।)
( ভিখারীর গান গাহিতে গাহিতে প্রবেশ
গীত।
কে জানে কোন অজানা সূত্র ধরে
তােমার করুণা আসে।
কাহার নয়ন অন্ধ করে
তােমার ওরূপ ভাসে।
নিৰ্মম তব কঠোর আহ্বানে,
কত কোমলতা ভরা কে জানে,
ফাকি দিয়ে মায়া পিশাচীর ফাসে
নে যায় তােমারি পাশে।
তােমার করুণা আসে।
বাহিরে নিঠুর বড় দাগাবাজ
বড় চঞ্চল, বড়ই নিলাজ
বড় ব্যথা দিয়ে করে আপনার
এ মােহ সংসার নাখে।
তােমার করুণা আসে।
( প্রস্থান

এরূপসনাতন
(দুইজন রাজ ভৃত্যের কথােপকথন করিতে করিতে প্রবেশ)
১ম ভৃত্য। বড় বাঁচা বেঁচে গেছে।
২য় ভৃত্য। মন্ত্রী অমরের বুদ্ধির বলিহারী যাই।
১ম। হ্যা বাবা, জাত গেলে ত আশ্চিত্তি আছে-প্রাণ
গেলে প্রাশ্চিত্তি কৰ্ব্বে কে ? রাজা সুবুদ্ধিরায়কে শেষটা
করােয়ার জল খাইয়ে জাত মেরে দিলে !
২য়। আরে বাবা, তবু জান্টা ত’ রক্তে পেয়েছে। ভাগ্যিস
অমরকে ডেকেছিলেন, নইলে আব্দেরে রাণী সুবুদ্ধিরায়ের দফাটা
সেরেছিল আর কি ?
১ম। কি নেমকহারামি দেখেছ ? যে লােকটা ছেলের মত
মানুষ করে এসেছে, আজীবন মঙ্গল কামনা করে আছে, যার
কৃপায় আজ তুমি রাজমহিষী, তারই কি না প্রাণদণ্ড? তাও
বিনা অপরাধে ?
২য়। আরে নেমকহারাম বলে নেমকহারাম ! যাকগে,
কেউ আবার কোথেকে শুনতে পেলে আমাদেরও জান যাবে। রায়
মশায় যে প্রাণে বেঁচেছেন এই আমাদের ঢের। মন্ত্রী মশায়কে ত
পেঁৗছে দিয়ে গেলাম-রাত্তিরের আর অল্পই আছে, জল ঝড়ও
থেমেছে, চল একটুখানি ঘুমােনাে যাকগে।
( উভয়ের প্রস্থান)
( অমর ও সন্তোষের প্রবেশ )
সন্তোষ। তা শুনে ফকীরণী কিছু বলে নি ?
অমর। অনেক অনুনয় বিনয় যুক্তির পর যখন রাঙ্গী,

রূপসনাতন
সুবুদ্ধি রায়মহাশয়ের জাতিনাশের আদেশ দিয়েই নিরস্ত হলেন
তখন রাত্রি প্রায় তৃতীয় প্রহর অতীত হয়েছে। গত রাত্রে
ফিরবার পথে অামার পাল্কী বেহারার শব্দ পেয়ে, ফকীর
সন্দেহ ক'লে যে এই ভীষণ দুর্যোগে পথে শব্দ হয় কার ?
তখন ফকীরণী ব’ললে কোন শেয়াল কুকুর হবে।” তা শুনে
ফকীর ব’ললে “না, শেয়াল কুকুর হতে পারে না, এই ভীষণ
বৃষ্টি, শিলাবর্ষণ, মেঘের গভীর গর্জন, এ দুর্যোগে বনের শেয়াল
কুকুর তার গর্ত ছাড়বে না। এ নিশ্চয়ই কোন চাকর, মনীবের
কাজে যাচ্ছে। তাদের জীবন মরণ, পুত্র কন্যার পরমায়ু সব
মনিবের কৃপা কটাক্ষের উপর নির্ভর করে ; তাদের দুর্যোগ
সুযােগ নেই।” ভাই, ফকীরত’ ঠিকই বলেছে। আমাদের
অবস্থাত' এইই। না, আর নয়, ভগবান তােমায় ভুলে সাধ
করে দাসত্বের শৃঙ্খল পরে রয়েছি। খুলে দাও প্রভু, তােমার
দয়াল নামের সার্থকতা দেখাও।
প্রস্থান।
দ্বিতীয় দৃশ্য।
স্থান গৌড় রাজদরবার, কাল—অপরাহ।
সিংহাসনে সমাসীন হুসেনশাহ, পার্শ্বে উপবিষ্ট কেশবছত্রী।
হুসেন। কেশব, অমর সন্তোষের বুদ্ধিমত্তার চমৎকারিতা ও
উজ্জ্বল প্রতিভার কথা দেশময় ছেয়ে পড়েছে। তাদের বিজ্ঞতায়,
দূরদর্শিতায়, ধীর বিচারণায়, মহানুভব দিল্লীশ্বরেরও চিত্ত চমৎকৃত
০৪২। :

শ্রী রূপসনাতন হয়েছে। আমার মনে হয় শুধু চমৎকৃত, বিস্মিত নয়, ভীত উদ্বেলিতও হয়েছে—সুদূর ভবিষ্যতের দিকে দৃষ্টিপাত করে বিচক্ষণ বাদশাহ কোরকেই কণ্টক উৎপাদনে সচেষ্ট হয়েছেন। কেশব। দিল্লীশ্বরের বিচক্ষণতা প্রশংসাহ। হুসেন। শুধু প্রশংসাই নয়, অনুকরণীয়। বাংলার গগনে নবীন মেঘের সঞ্চার দেখে ঝড় উঠবার পূর্বেই তিনি সতর্ক হচ্ছেন-হায়! বালির বাঁধ দিয়ে সাগর সামলাতে প্রয়াস পাচ্ছেন। এদিকে হুসেনের বক্ষে যে ঝটিকাবিক্ষুব্ধ দুরন্ত সাগর গর্জন কচ্ছে। দিল্লীশ্বর জানেন না তার একটা প্রবল ঢেউ এসে ভাসিয়ে দেবে তার সিংহাসন, তলিয়ে দিয়ে যাবে তার রাজ্যপাট। দিল্লীশ্বর বাংলার রাজাকে সন্তুষ্ট রাখবার জন্য অমর সন্তোষের প্রতিভার পুরস্কারস্বরূপ তাদের দবীরখাস ও সাকরমল্লিক নাম দিয়ে স্বাক্ষরিত পাঞ্জা পাঠিয়ে দিয়েছেন। চালটা বেশ বিচক্ষণই হয়েছে। হুসেন-কারুণ্য কোমলতায় শিথিল হও না; বজ্রের মত কঠিন, মৃত্যুর মত দুৰ্বার হতে হবে। অমর সন্তোষ পাঞ্জা পেয়েছেন ? হুসেন। তাদের ডেকে এনে, সাদরে পাঞ্জা প্রদান করেছি। দেখ কেশব, তাদের দেখলেই যেন আমি কেমন হয়ে যাই। সরলতায় গড়া দুখানি দেহ, লাবণ্যে মাধুর্যে যেন ভরা ; তাদের নিরন্তর ছলছল উজ্জ্বল চক্ষে পাণ্ডিত্যের সব কর্কশতা, আভি- জাত্যের সব দাম্ভিকতা যেন একেবারে তলিয়ে গেছে। সন্তোষের ভাষা, ভাৰ, চাহনি, গমনভঙ্গী সব যেন আর এক জগতের, মুখের ৩২

রূপসনাতন
কথাগুলি যেন সুধার নিঝর। অমরের জ্ঞান প্রতিভার সৌধ যেন
আকাশ ছাড়িয়ে উঠছে কিন্তু এতটুকু অভিমান নেই; কিন্তু
কেশব, নিনে দেখেছি, কি যেন একটা অন্তঃসলিল বিষাদের
প্রবাহ তাদের ভাসিয়ে নিয়ে চলেছে—জানিনা কোথায় এর শেষ,
পরিণতি এর কোন সুদূর সাগরে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলা-
ভূমি-শান্তপল্লী কানাইনাটশালায় তাদের সুন্দর বাসস্থান নির্মিত
হয়েছে।
মনােরম উদ্যান, সুন্দর সরােবরে পল্লীর সৌন্দৰ্য কেমন
স্নিগ্ধ মধুর হয়েছে। ( দূরে কোলাহলের শব্দ, কাণ পাতিয়া শুনিয়া
বিস্ময়ে) এত কোলাহল কিসের কেশব ।
(সহসা কোতােয়ালের প্রবেশ ও কুণিশকরণ )
হুসেনশাহ। সংবাদ কি ? এত কোলাহল কিসের ?
কোতােয়াল। জাঁহাপান, আজ প্রভাতে গৌড়ে এক অদ্ভুত
হিন্দু সন্ন্যাসী এসেছেন, সঙ্গে তার লক্ষ লােক, সব সময়ে কীৰ্ত্তনে
বিভাের, এ কোলাহল সেই মহাসংকীৰ্ত্তনের।
হুসেনশাহ। কেমন সে সন্ন্যাসী ? তার গতিবিধি লক্ষ্য
কয়েছ ?
কোতােয়াল। হাঁ জাঁহাপনা, এমন অদ্ভুত সন্ন্যাসী আমি
কখনও দেখি নি। এর সৌন্দৰ্য্য মদনকেও হার মানিয়েছে,
গায়ের বরণ কঁচা সোেণার মত উজ্জ্বল, শরীর প্রকাণ্ড, নাম
শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য। তাকে দেখলে মনে হয় কোন রাজার ছেলে
সন্ন্যাসী হয়ে বেড়াচ্ছেন ; তার সমস্ত গায়ে কদমফুলের মত কাটা

রূপসনাতন
।
দিচ্ছে, ক্ষণে ক্ষণে অত্যন্ত ঘাম আর কম্প হচ্ছে। দুই হাত তুলে
হরিনাম গান কচ্ছেন। কখন যে খান আর কখন যে শােন, তা
দেখি নি। চারিদিক থেকে দেখতে লােক সমাগম হচ্ছে, আশ্চর্য
এই যে, যে আসছে সে আর ঘরে ফিরে যাচ্ছে না। আমি অনেক
সন্ন্যাসী, যােগী, জ্ঞানী দেখেছি কিন্তু এমন অদ্ভুত সন্ন্যাসী কখনও
দেখি নি। স্বচক্ষে যা দেখেছি অকপটে নিবেদন কলম।
হুসেনশাহ। আচ্ছা যাও।
( কোতােয়ালের প্রস্থান)
কেশব, কে এই সন্ন্যাসী? অসংখ্য লােক ছায়ার মত তার
অনুগামী হয়েছে, যেন এক বিশাল সেনানী রণােম্মদে দিগ্বিদিগ
জ্ঞানহারা হয়ে ছুটেছে।
কেশব। (স্বগত) বাদশাহের হিন্দুদ্বেষ মনের কোণে প্রায়ই
উকি মারে, কি জানি আবার কখন কি খেয়াল চাপে, কথাটা
একটু চেপে যাওয়াই ভাল। (প্রকাশ্যে ) হাঁ জাঁহাপান, একজন
হিন্দু সন্ন্যাসী এই পথে তীর্থপৰ্যটনে চলেছেন, তিনি বৃক্ষতলে
বাস করেন ; ভিখারী সন্ন্যাসী মাত্র।
হুসেনশাহ। তুমি গােপন করলে কি হবে কেশব,
আমি কি তার কথা শুনি নি ? সূৰ্য্য আকাশে উঠলে তাকে
হাত দিয়ে কি কেউ ঢেকে রাখতে পারে ? আমি কি শুনি নি,
যবন হরিদাস কাজীর মার খেয়েও কোন পরশমণির স্পর্শ পেয়ে
হিন্দু ধর্ম প্রচার ক’চ্ছেন, কার অমৃত স্পর্শে নবদ্বীপের কাজীর
চিত্ত হ’তে কীৰ্ত্তন-বিদ্বেষ একেবারে দূর হয়েছে।
আমি
৩৪

রূপসনাতন
বুঝেচি তিনি ভিক্ষুক নন; হিন্দু যাঁকে কৃষ্ণ বলে, মুসলমান যাকে
খােদা বলে সম্বােধন করে, তিনিই সন্ন্যাসী হয়ে এখানে দেখা
দিয়েছেন। আমি গৌড়ের রাজা, আর তিনি এই বিশ্বের রাজা।
দেখনা, স্বেচ্ছায় লক্ষ লােক তার আজ্ঞাপালনে উন্মুখ। তিনি যে
ঈশ্বর স্বয়ং, এ সম্বন্ধে বিন্দুমাত্রও সংশয় নেই। তুমি কোতােয়ালকে
আমার আদেশ জানাও যেন এই প্রেমিক সন্ন্যাসীর উপর কেহ
কোনরূপ অত্যচার না করে। তিনি স্বাধীন ভাবে আমার এই
বিস্তৃত রাজ্যে যথেচ্ছ বিচরণ কৰ্বেন।
কেশব। (স্বগত) অব্যবস্থিতচিত্ত বাদশাহের কথায় নিশ্চিন্ত
থাকা কখনই যুক্তিযুক্ত নয়, যাই গােপনে তাদের অন্যত্র গমনের
পরামর্শ দেই।
( প্রস্থান)
(দবীর খাসের প্রবেশ ও অভিবাদন )
হুসেন। এই যে দবীর খাস, তােমারই প্রতীক্ষা কছিলাম।
সমগ্ৰ গৌড় তােলপাড় করে কে এক সন্ন্যাসী নাকি রাজপথ দিয়ে
চলেছেন—সঙ্গে তার অগণন লােক, সব উন্মত্ত, আত্নহারা,
জান কি ইনি কে?
দবীর খাস। গৌড়েশ্বর, মহীয়সী কৃপা যার স্বচ্ছসলিলের মত
শতধারে বয়ে যাচ্ছে—যার কণালভে আজ আপনি এই গৌড়ের
সিংহাসন পেয়ে ধন্য, প্রীতি যার মুখমণ্ডলে, অরুণ নয়নকমলে
উচ্ছসিত হয়ে উঠেছে, হৃদয়ের যার প্রেমের তুফান দুকুলভাঙ্গা
বেগে সমগ্র ভারত ভাসিয়ে ছুটেছে, স্নিগ্ধ করুণ চাহনি যার
ক

এপসনাতন অভাগার প্রাণে ভরসা দেয়, নৈরাশ্যের বক্ষে শান্তির ধাৱা বহায়, মূৰ্ত্তি পরিগ্রহ করে আজ স্বয়ং তিনি আপনার দ্বারে সমাগত। ভাগ্যবান্ আপনি, পুণ্যপুঞ্জ আপনার অসীম, তাই কোটি জনমের সাধনার ধন, যােগিজনের চিরবাঞ্ছিত নিধি আজ আপনার রাজ্যে অবতীর্ণ হয়েছেন। আমায় কেন জিজ্ঞাসা ক’চ্ছেন গৌড়েশ্বর, আপন হৃদয়ের অভ্যন্তরে একবার অনুসন্ধান করে দেখুন, আপনি নরাধিপ, শ্রীবিষ্ণু অংশ সস্তুত, এই সন্ন্যাসী শ্ৰীকৃষ্ণচৈতন্য কে আপনার মনে হয় ? আপনার চিত্ত যা বলে তিনি তাই। হুসেন। দবীর খাস, আমারও মনে হয়, এই সন্ন্যাসী সাক্ষাৎ ঈশ্বর। রাজা আমি, প্রজাপুঞ্জের জীবন মরণের কর্তা, তথাপি আমার সৈন্যগণ যদি দীর্ঘকাল বেতন না পায়, আমাকেই নিঃশেষ কৰ্বার চেষ্টা করে, আর এই সন্ন্যাসী দরিদ্র, কাউকে কপর্দক দিবার সামর্থ্য নেই, তথাপি লক্ষ লক্ষ লােক আহার নিদ্রা পরিত্যাগ করে এর সঙ্গে সঙ্গে আজ্ঞাবহ হয়ে ফিরছে। ঈশ্বর শক্তি ব্যতীত সামান্য জীবে কি এ সম্ভব ? দবীর খাস। আজ বুঝলাম গৌড়েশ্বর, আপনার ভাগ্যের সীমা নেই, বুঝলাম কেন শ্রীচৈতন্যশশী সহসা গৌড় ধন্য করে উদয় হয়েছেন। (স্বগত) তথাপি অব্যবস্থিতচিত্ত বাদশাহে বিশ্বাস নেই। ( উভয়ের প্রস্থান) ৩৬

রূপসনাতন
তৃতীয় দৃশ্য।
স্থান-কানাই নাটশালা, সনাতন সাগরের তীর।
কাল—গভীর রাত্রি।
(দবীর খাদের প্রবেশ।)
দবীরখাস। আনন্দের বিপুল
আনন্দের বিপুল স্পন্দন আর ভীতির তপ্ত
শ্বাস আমাকে অধীর করে তুলেছে। আশা নৈরাশ্যের ঘাত
প্রতিঘাতে আমি স্থির হতে পাচ্ছি না। অখিল ব্রহ্মাণ্ডের পতি
হরি আজ জীবের দুঃখে পথের কাঙাল সেজেছেন। যশােদা-
দুলাল, ব্রজের নীলমণি আজ ভিখারীর সাজে দ্বারে দ্বারে যেচে
যেচে প্রেয়সীর ভাণ্ডার খুলে প্রেম বিতরণ ক’চ্ছেন। শুনছি নাকি
ব্রাহ্মণ শূদ্র মানেন না, উচ্চনীচ দেখেন না, ধনী দরিদ্র গণেন না ;
প্রেমের বন্যায় দেশ ভাসিয়ে চলেছেন। কিন্তু (অপােমুখে)
আমরা বিষয়কূপে পতিত, দাম্ভিকতার মূর্তি, ঘোর অহমিকায় গড়া
তনু—তার করুণামৃত বৃষ্টিতে সারা বিশ্ব তৃপ্ত হচ্ছে, আমরাই
কি শুধু বাদ যাব ? আমাদের মত পতিত কোথায় আর পাবে
প্রভু ? আমাদের উদ্ধার না কর্শে তােমার পতিতপাবন নামে
কলঙ্ক থেকে যাবে।
( সাকর মল্লিকের গান গাহিতে গাহিতে প্রবেশ )
গীত
আমায় ব্যাকুল প্রাণে যে জন ডাকে
আমি তারই ই।
৬৭

পসনাতন
ও তার শয়নে স্বপনে, নিজা জাগরণে
প্রেমে বাধা রই।
বাহুলতায় তারে বাঁধি
তারই সাথে হাসি কাদি,
পথপানে নিরবধি
তারই চেয়ে রই।
কই, তেমন করে ত ডাকা হয়নি, চোখের জলে, হৃদয় ভরে,
আমার যা সব তার জন্য ত তেমন করে রাখা হয়নি, ব্যাকুল
হয়ে পথের পানে ত’ তেমন করে চেয়ে থাকা হয়নি ;-না, না,
প্রাণভরে ডাকা হয়নি, আমি আবার ডাকি-
এস, এস,-সখা এস,
আমার ভীত, ব্যথিত, তৃষিত চিত
তুমি এস।
(সনােদনস্বরে) তুমি এস, তুমি এস, তুমি এস।
আমার জীবন তপ্ত মরু
বারি ধারারূপে এস।
ওগাে অন্তর ধন অন্তরে ফিরে এস।
হে আমার চিরসুন্দর, হে আমার হৃদয়রতন, হে আমার প্রাণের
ঠাকুর, আমি আবার তােমায় ডাকি; যাই, যাই আমি নয়ন মুদে
তােমার দলিতাঞ্জন জিনি কান্তি দেখি-
(দবীর খাস কতৃক সাকর মল্লিককে ধারণ)
দবীর খাস। ভাই, যে পরম করুণ ঠাকুর, আমাদের

রূপসনাতন মােহগর্তে পতিত দেখে “পরব্যসনিনী শ্লোক শিক্ষা দিয়ে কৃপার রজ্জতে বেঁধেছিলেন, যার আশ্বস বাণীতে, যার পথ চেয়ে আমরা বিষয় বিষ্ঠাতেও ধৈর্য্য ধরে আছি, সেই নদীয়া উদয়গিরির পূর্ণ শশধর, সন্ন্যাসীকুলশিয়ােমণি শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য আমাদের রামকেলি গ্রামে এসেছেন। কোটি কোটি ভূতভাবন ভক্ত, তার দর্শনে আত্মহারা হয়ে তাকে ঘিরে রয়েছেন- আর—“তাহা প্রভু নৃত্যকরে প্রেমে অচেতন।” আমরা অনাচারী, আমাদের শরীর অস্পৃশ্য ; কে এমন পরম দয়াল আছেন, একবারের জন্যও তার কাছে আমাদের নিয়ে যাবেন ? সাকর মল্লিক। দাদা, যারা অধম পতিত জনার ঘরে ঘরে গিয়ে যেচে যেচে প্রেমসুধা বিতরণ ক’চ্ছেন, ত্রিভুবনের পামর, পঙ্গু, অধম, জড়, আতুর, দীন সকলকে নির্বিচারে উদ্ধার করবার জন্য হরিনামের নৌকা সাজিয়ে পঁড়ি মাঝি হয়ে বেরিয়েছেন ;- মদ্যপ যবনের মার খেয়ে যাদের করুণার ধারা শতধারে উছলিত হয়, আরও প্রেমভরে তাদের কোল দেন ;—যাঁরা প্রভুর শ্রীমুখের আদেশে গ্রামে গ্রামে পথে পথে গেয়ে বেড়াচ্ছেন- বল কৃষ্ণ ভজ কৃষ্ণ লহ কৃষ্ণ নাম। কৃষ্ণ মাতা কৃষ্ণ পিতা কৃষ্ণ ধনপ্রাণ। তােমা সব লাগিয়া কৃষ্ণের অবতার। হেন কৃষ্ণ ভজ সব ছাড়ি অনাচার। জাদা, চলুন সেই পতিত জনার বন্ধু নিত্যানন্দ হরিদাস ঠাকুরের

এরূপসনাতন
চরণতলে শরণ লই। তাদের অপার করুণা ; তারা নিশ্চয়ই
কৃপা করে প্রভুর কাছে নিয়ে যাবেন।
দবীর খাস। ঐ শােন, দূরে নামের অমৃত বৃষ্টি হচ্ছে-
আর বিষয় রৌরবে পড়ে তার পূতিগন্ধে আমরা ভুলে আছি।
ঐ তার কীৰ্ত্তন আহ্বান ; চল ভাই,
বিষবৎ লাগে এই রাজকীয় বেশ।
অখিলের নাথ আজ দ্বারের ভিখারী,
ধূলায় ধূসর তনু,
দীন হীন পথের কাঙাল হয়ে
ডাকে বার বার।
(পরিচ্ছদ ত্যাগ, গলে বস্ত্র ও মুখে দুই গােছ তৃণ ধারণ)
দবীরখাস। সাধ করে মায়ার ফাস গলায় পরেছি—দুল
মানব জনম পশুত্বে পরিণত হয়েছে।
(জনৈক দূতের প্রবেশ)
(দবীর খাস ও সাকর মল্লিকের নৃতন বেশ দেখিয়া চিনিতে না পারিয়া)
মহাশয়, রাজমন্ত্রী দবীর খাস ও সাকরমল্লিক দুই
ভাই এইখানে ছিলেন, তারা কোন দিকে গিয়েছেন ব’লতে
পারেন। আমি তাদের জন্য নদীয়ার মহাপুরুষদের সংবাদ
আনুতে গিয়েছিলাম। তারা মহাসঙ্কীৰ্ত্তন করে ক্লান্ত হয়ে একটু
বিশ্রাম ক’চ্ছেন। আর সেই দুই ঠাকুর যাঁদের জগাই মাধাই
তাড়া করে মেরেছিল, তারা একটু নির্জনে বসে আলাপ ক’চ্ছেন,
৪০

শ্রীরূপসনাতন
এই সময় গেলে তাদের কাছে যাওয়া যাবে। লােকের ভিড়ও
একটু কমেছে। কিন্তু এঁরা দুজন গেলেন কোথায় ? আপনাদের
চোখে জল কেন?
দবীর খাস। দূত, আমরাই সেই হতভাগ্য দুইজন, আমরা
কি মানুষ? মায়ার দাস হয়ে পশুর মত উদর পূরণ করে দিন
কাটাচ্ছি।
চল আমরা প্রস্তুত হয়েছি—আমাদের সেই দুই
ঠাকুরের কাছে নিয়ে চল।
( সকলের প্রস্থান)
চতুর্থ দৃশ্য।
স্থানরামকেলি গ্রাম
কাল—গভীর রাত্রি।
(নৃসিংহানন্দ, শ্রীনিত্যানন্দ ও শ্রীহরিদাস ঠাকুর উপবিষ্ট )
নিত্যানন্দ। সঙ্কীৰ্ত্তন তরঙ্গ বুঝি আজ রাত্রের মত থামলাে।
দেখ এই রামকেলি গ্রামটি কি সুন্দর ! ওই গৌড়নগরীর অট্টালিকা
শ্রেণী, চঁাদের কিরণ পড়ে যেন হাসছে। নিকটে কোন পুষ্পেদ্যান
নেই তবু নাসায় কিসের সৌরভ পাচ্ছি। নদীয়ানাথ এই পথ দিয়ে
শ্রীবৃন্দাবন চলেছেন, লক্ষ লক্ষ লােক তার সাথে কীৰ্ত্তন তরঙ্গ
তুলে ছুটেছে-
নৃসিংহানন্দ। কিন্তু আমি নিশ্চয় করে বলছি, প্রভু
এবার শ্রীবৃন্দাবন যাবেন না।
নিত্যানন্দ। শ্ৰীবৃন্দাবন যাবেন না?
নৃসিংহানন্দ। না,প্রভু কানাই নাটশালা থেকে ফিরে আসবেন।
র
৪১

পসনাতন
নিত্যানন্দ। নীলাচল হ’তে শ্ৰীবৃন্দাবন লক্ষ্য করে এই
এতদুর রামকেলি গ্রাম পর্যন্ত তবে এলেন কিসের জন্য? তুমি
কেমন করে জানলে প্রভু এবার শ্রীবৃন্দাবন যাবেন না ?
নৃসিংহানন্দ। প্রভু শ্ৰীবৃন্দাবন যাবেন শুনে আমি মনে মনে
কুলিয়া থেকে তার জন্য রত্ন দিয়ে পথ বাঁধিয়েছিলাম, সেই
রতনের পথের পরে বৃন্তহীন সুগন্ধ সুকোমল পুষ্পের শয্যা
করেছিলাম ; পথের দুই দিকে বকুলের সারি ; মাঝে মাঝে
দুইপাশে দিব্য পুষ্করিণী
রত্নবাঁধা ঘাট তাহে প্রফুল্ল কমল।
নানাপক্ষী কোলাহল মৃধা সম জল ।
শীতল সমীর বয় নানাগন্ধ নিয়া।
কানাইর নাটশালা লইনু বাঁধিয়া ॥
আগে মন নাহি চলে পারেনা বান্ধিতে।
পথবান্ধা নাহি যায় হইনু বিস্মিতে। (চৈঃ চঃ)
তাই আমার নিশ্চয় মনে হচ্ছে আপনারা পরে দেখবেন,
প্রভু এবার শ্রীবৃন্দাবন যাবেন না।
নিত্যানন্দ। তাহলে এখানে আবার তার নিশ্চয়ই কোন
গুঢ় অভিপ্রায় আছে। (হরিদাস ঠাকুরের প্রতি চাহিয়া ) ঠাকুর,
তুমি তােমার প্রভুর মরম জান।
কোন্ রঙ্গ হবে আজ
কি সঙ্কল্প মনে ?
৪২

রূপসনা
কোন্ রামানন্দ লাগি
আইলা এখানে।
{ শ্রীহরিদাস নিত্যানন্দ প্রভুর দিকে চাহিয়া মৃদু মৃদু হাসিতেছেন,
এমন সময় গলে বস্ত্র বাধিয়া, দুই গােছ। তৃণ দন্তে ধরিয়া
দবীর খাস ও সাকর মল্লিকের আগমন।
এবীর খাস।
করুণার সিন্ধু প্রভু দুইজন,
প্রেমামৃতের পূর্ণ কুন্ত ল’য়ে দুই করে
নাম নৌকা সাজাইয়া ঘাটে ঘাটে গিয়া
পতিত পাষণ্ডী জনে বিতরিলে বলে
কীৰ্ত্তন তরঙ্গ রঙ্গে ভাসালে সকলে।
অন্ধ বধির জড় মােরা দুইজন
বিষয় বিষ্ঠার কৃমি ঘেরে আছে সদা ;
পাপক্ষালি প্রেম দিবে, এ ভরসা
ল’য়ে, আসিয়াছি তােমাদের
চরণ কমলে, আত্ম সমর্পিতে।
বড় আশা প্রাণে
গাে ও পতিত বন্ধু, এ পতিত
বঞ্চিত না হবে।
হরিদাস। ক্রীপাদ, এরা দুইজন গৌড়ের বাদশার মন্ত্রী,
কর্ণাটদেশী ব্রাহ্মণ, পরম পণ্ডিত, মহাভাগবত। আমার মনে হয়,
৪৩

এপসনাতন
প্রভুর সহসা এখানে আগমন এদেরই জন্য। চলুন, এদের
প্রভুর কাছে নিয়ে যাই।
নিত্যানন্দ। ভাইরে, হরিদাস শ্রীগৌরসুন্দরের কৃপার মুর্তি,
সেই সাক্ষাৎ কৃপা যখন পেয়েছ-তখন আর ভয় কি। চল সেই
ভুবন মঙ্গল পতিত পাবন, প্রভুর কাছে তােমাদের নিয়ে যাই,
তােমাদের দৈন্য দেখে প্রাণে বড় আনন্দ পেয়েছি, তােমরা তার
পূর্ণ কৃপা লাভ কৰে ।
( সকলের প্রস্থান)
(শ্রীগৌরাঙ্গের প্রবেশ )
শ্রীগৌরাঙ্গ। এই ত সেই রামকেলি, কাহা
মাের রূপ সনাতন। শুনিয়াছি
বাড়ীর নিকটে, অতি নিভৃত স্থানেতে,
কদম্বকানন, রাধাশ্যাম কুণ্ডতাতে।
সে বসি বৃন্দাবন লীলা করে ধ্যান,
ধরে ধৈর্য নেত্রে ধারা অনুক্ষণ।
মদন মােহন সেবায় প্রাণ সমর্পিত
তাঁর সনে কত কথা, কত খেদ
কহিব বা কত।
আমার দর্শন লাগি উৎকণ্ঠিত মন।
হেথা, তাদের মিলিতে সদা কাঁদে মাের প্রাণ।
কিবা দৈন্যমাখা পত্রী পাঠাইল মােরে।
কিবা সে বিনয় স্মরি হৃদয় বিদরে
৪৩

রূপসনাতন
গৌড়ের যবন রাজা, হ'য়ে চমৎকৃত
সনাতন রূপ গুণে, দিলা রাজ্যভার
মন্ত্ৰীকরি, ম্লেচ্ছভয়ে করিলেন
রাজ্য অঙ্গীকার।
সর্বশাস্ত্র চর্চা সদা ল’য়ে ভক্তগণ।
ন্যায় সুত্র বেদান্তাদি খণ্ডন স্থাপন।
তথাপি ম্লেচ্ছর সঙ্গ শান্তি নাহি দেয়।
অতি শুদ্ধাচারী পিতা পিতামহ
ভার, যে যবনের স্পর্শে করেন
প্রায়শ্চিত্ত আচার ; হেন যবনের
সঙ্গ নিরন্তর হয়, তাই সদা
আপনারে ম্লেচ্ছ মনে লয়।
যবে মগ্ন হন দৈন্য সমুদ্র মাঝারে,
ম্লেচ্ছ হতেও নীচ বলি মানে আপনারে।
বিরাজ হয়ে মহাশেদ যুক্ত মনে,
আপনাকে বিজ্ঞান কভু নাহি করে।
হরি হরি, ওই বুঝি আসিছেন তারা, মরি মরি, দন্তে তৃণ,
গলে বাস, সূৰ্য্যসম ভাস্বর বরণ, দৈন্যমাখা কাতর নয়ন
রামানন্দ দ্বারে কন্দর্প দর্পনাশ।
দামােদর দ্বারে নিরপেক্ষ পরকাশ
হরিদাস বারে সহিষ্ণুতা জ্ঞাপন
নিত্যানন্দ দ্বারে নাম প্রেম বিতরণ,
৪

রূপসনাতন
সনাতন রূপ দ্বারে দৈন্য প্রকাশিৰ
বৈরাগ্যের শেষ সীমা জগতে দেখাব।
( নিত্যানন্দ, হরিদাস, দবীর খাস ও সাফর মল্লিকের প্রবেশ)
নিত্যানন্দ। ( ধীরে ধীরে ) দেখিয়াছি, প্রভু তব উদ্বিগ্ন নয়ন,
বুঝিয়াছি, কেন তব হেথা আগমন।
এই নাও দবীর খাস, সাকর মল্লিক,
দুই প্রেম তরঙ্গিণী, আসিয়াছে
শ্রীগৌরাঙ্গ সমুদ্রে মিলিতে
(দবীর খাস ও সাকর মল্লিকের মহাপ্রভুর চরণতলে জাং
পাতিয়া উপবেশন ও করজোড়ে উক্তি )
জয় জয় শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য দয়াময়।
পতিত পাবন জয় জয় মহাশয়।
জয় দীন বৎসল জগতহিতকারী।
জয় জয় পরম সন্ন্যাসীরূপ ধারী ।
পতিত তারিতে প্রভু তােমার অবতার।
মােরা বহি জগতে পতিত নাহি আর।
জগাই মাধাই দোহে ক'রেছ উদ্ধার।
কিন্তু তাহে কোন শ্রম হয়নি তােমার।
তারা ত’ ব্রাহ্মণ জাতি নবদ্বীপে ঘর ।
নীচ সেবা নাহি করে, নহে নীচের কূপর ॥
জগাই মাধাই হ'তে কোটি কোটি গুণ।
অধম পতিত পাপী মােরা দুইজন।
৪৬

রূপসনাতন
শ্লেচ্ছাতি, ম্লেচ্ছসঙ্গী, করি ম্লেচ্ছকৰ্ম্ম।
গােব্ৰাহ্মণ দ্রোহীর সঙ্গে মােদের সঙ্গম ।
আমাদেরি কৰ্ম্ম হাতে গলায় বান্ধিয়া।
কুবিষয় বিষ্ঠাগত্তে দিয়াছে ফেলিয়া।
মােদের উদ্ধারিতে বলী নাই ত্রিভুবনে।
পতিত পাবন তুমি, কেবল তােমা বিনে ।
মােদের উদ্ধারিয়া যদি দেখাও নিজ বল
পতিত পাবন নাম তবে সে সফল।
তব দয়া পাইবার যােগ্য মােরা নই।
কেবল তোমার গুণে মনে লােভ হয় ।
বামন হইয়া চাদ ধরিবারে আশ।
কৃপা কল্পতরু মোদের করনা নিরাশ ।
শ্রীগৌরাঙ্গ। বিনয়ের খনি দুই ভাই,
তােমরা চিরদিনই আমার আপনার জন।
আজ হতে তােমাদের নাম “রূপ সনাতন”।
তােমরা দৈন্য ছাড়, তােমাদের দৈন্যে আমার প্রাণ ফেটে
যায়। তােমাদের দৈন্য পত্রী পেয়ে তােমাদের অন্তর জেনে সেই
শ্লোক লিখে পাঠিয়েছিলাম, আজ ছুটে এসেছি। গৌড়ের নিকটে
আমার আবার আর কোন প্রয়ােজন ছিল না; শুধু তােমাদের
দুজনকে দেখবার জন্যই আমি এখানে এসেছি। ভাল হ'ল
তােমরা দুই ভাই আমায় দেখা দিলে, ঘরে যাও, কোন ভয় নেই।
জন্মে হয়ে তােমরা
তােমরা আমার নিত্যপ্রিয়।
অচিরাতে কৃষ্ণ
৪৭

রূপসনাতন
তােমাদের উদ্ধার কনে।
ভক্তগণ, আপনারা সকলে এদের
কৃপা করে উদ্ধার করুন।
( এই বলিয়া মহাপ্রভু দুজনের মাথায় দুই হাত দিলেন।
সকলে একসঙ্গে হরিবােল বলিয়া উঠিলেন।
রূপ সনাতন সকলের চরণধূলি লইলেন।)
সনাতন। প্রভু, আমার একটি নিভৃতে নিবেদন আছে।
শ্রীগৌরাঙ্গ। বল কি নিবেদন (এক পাশে সরিয়া আসিলেন।)
সনাতন। প্রভু, গৌড়রাজ যদিও আপনাকে ভক্তি করেন
তথাপি তাকে বিশ্বাস নেই। আপনি এখানে আর বেশীক্ষণ
থাকবেন না—ভয় হয় পাছে কেউ কোন বিপদ ঘটায়।
আপনি তীর্থে যাচ্ছেন, তীর্থ যাত্রায় এত লােক সংঘট্ট কি ভাল ?
যাঁর সঙ্গে লক্ষ কোটি লােক চলে, তার বৃন্দাবন যাত্রায় শান্তি
হয় না।
শ্রীগৌরাঙ্গ। ঠিক বলেছ সনাতন, এত লােক সঙ্গে গেলে
আমি বৃন্দাবনে সুখ পাব না। একলা যাব কিম্বা সঙ্গে মাত্র
একজন থাকবে।
রূপসনাতন। অধম পতিত ব’লে ভুলিওনা প্রভু।
(চরণে প্রণাম )
শ্রীগৌরাঙ্গ। শীঘ্রই আবার তােমাদের সঙ্গে মিলিত হব।
(রূপসনাতনের বিদায়)
৪৮

শ্রীরূপসনাতন
পঞ্চম দৃশ্য :
স্থান-কানাই নাটশালা, রূপসাগরের তীর।
কাল-সন্ধ্যা।
১ম।
(দুইজন গ্রামবাসী ভদ্রলােকের প্রবেশ।)
১ম। রাজা সুবুদ্ধি রায়কে নিয়ে কাশীর পণ্ডিতরা কি
কাণ্ড করেছে শুনেছ?
২য়। না, তুষানলের ব্যবস্থা নাকি ?
প্রায় সেই রকমই, বড় আশা করে রায় মশায়
কাশী গিয়েছিলেন প্রায়শ্চিত্তের ব্যবস্থার জন্য।
২য়। অত বড় জ্ঞানী, মানী রাজা! অদৃষ্টের ফেরটা দেখ,
দুনিয়ার কিছু বলবার যা নেই ! তারপর ?
১ম। তারপর, পণ্ডিতেরা অনেক মাথা ঘামিয়ে, কমিয়ে
সমিয়ে ব্যবস্থা দিলেন, উত্তপ্ত ঘৃতপানে জীবনত্যাগ ।
মুসলমানের কয়রায়ার জল পান করে, যে হিন্দুর জাত একবার
গিয়েছে, স্বেচ্ছায়ই হােক আর অনিচ্ছায়ই হােক, তাকে হিন্দু-
সমাজে স্থান ত দেওয়া যেতে পারেই না, তার ওপর অপরের
শিক্ষার জন্য এইরূপ ব্যবস্থাই নাকি সমীচীন।
২য়। তেজস্বী সুবুদ্ধি রায় নিশ্চয়ই এতে সম্মত হন নি ?
১ম। না সেই সময়ে কাশীধামে এক হিন্দু সন্ন্যাসী
এসেছিলেন, তার পাণ্ডিত্যে নাকি সমস্ত ভারত স্তম্ভিত
হয়ে গেছে
৪৯

রূপসনাতন
২য়। ওঃ বুঝেছি, সে আমাদের নদীয়ার নিমাই পণ্ডিত
আহা! প্রাণখানি যেন প্রেমে গড়, চোখে অবিরল জলধারা।
এই সে দিন এখানে এসেছিলেন, সাকর মল্লিক, দবীর খাস
মন্ত্রী দুজনকে কৃপা করে রূপসনাতন নাম দিয়ে গেছেন।
তারপর ?
১ম। সেই পরমকরুণ সন্ন্যাসী তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে
চোখের জলে তাকে স্নান করিয়ে বলে দিলেন—ভাই,তুমি নিরন্তর
কৃষ্ণ নাম কর, কৃষ্ণ কৃপাময়, তার নামাভাসেই জীবের সমস্ত
পাপরাশি সূৰ্যোদয়ে তিমির রাশির ন্যায় দূর হয়ে যায়-
এক নামাভাসে তােমার পাপদোষ যাবে।
আর নাম লইতে কৃষ্ণ চরণ পাইবে।
তবে একটা কথা মনে রেখ
অনিন্দক হইয়া সদা নাম লবে মুখে।
নিরন্তর ভাসিবে তবে কৃষ্ণ প্রেমে সুখে ।
তােমার সংসার বন্ধন ঘুচে গেছে, শ্রীকৃষ্ণ ভজনেই জীবের
সার্থকতা, তুমি শ্রীবৃন্দাবনে যাও, লুপ্ত তীর্থের উদ্ধার কর, আর
নিরন্তর কৃষ্ণনাম কোরো। রায় মশায় সে পরশমণির পরশ
পেয়ে দেহ গেহ, জাতি, কুল, মান সব ভুলে তাতে আত্মসমর্পণ
করেছেন। শুনছি তিনি মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় তখনই সেই প্রেমিক
সন্ন্যাসীর চরণধূলি শিরে নিয়ে মথুরা যাত্রা করেছেন—সেখানে
গিয়ে অতি দীন নিকিঞ্চন হয়ে, কস্থা, করঙ্গ, কৌপীন লয়ে “হা
কৃষ্ণ, হা কৃষ্ণ” বলে ব্ৰজের পথে পথে বেড়াচ্ছেন আর ক্লান্ত

রূপসনাতন কাঠুরিয়া ব্রজবাসীর কাঠের বােঝা ব'য়ে তাদের কৃপায় সামান্ত শুকননা চানা খেয়ে জীবন ধারণ কচ্ছেন। ২য়। ধন্য সুবুদ্ধি রায়, তােমার ভাগ্যের বলিহারি যাই দেখ ভাই, কোন্ সূত্রে যে জীবের ভাগ্যের উদয় হয়, তা বুঝে ওঠা ভার। প্রকাণ্ড জমিদারী, পুত্র, পরিজন, নাম, যশ সক পড়ে রইল । ১ম। তাই ত ভাই, ডাক যখন আসে, তখন এম্নি করেই আসে; ভগবান ত আর দেশ কালের অধীন নন। বৈরাগ্যও কানাে হাতধরা নয়! ২য়। কৃপাময়ের কৃপা ! একেবারে ঘাের বিষয় কূপ থেকে যেন কেশে ধরে টেনে তুললেন। ১ম। এম্নি করেই ত তিনি বরাবর তুলে আসছেন, মানুষের আর ক্ষমতা কতটুকু। দু দশ বছর জপ ধ্যান করে, কিম্বা দু চারটে যজ্ঞ পূজা করে, কি দুচার দশখানা শাস্ত্রগ্রন্থ পড়ে কি আর তাকে পাওয়া যায় ? তাকে পাওয়ার অধিকারী কেউ কখনও হতে পারে না ভাই। তিনি দয়া করে যার কাছে আসেন, সেই তাকে পায়। যতটুকু জানান ততটুকুই জানতে পারে। দেখনা গৌড়ের মন্ত্রী দবীর খাস সাকর মল্লিককে বাদশা রাজ্যের সমস্ত ভার দিয়েও কি বেঁধে রাখতে পাচ্ছেন ? যে দিন সেই সন্ন্যাসী এখানে এসেছিলেন, স্নেহ- সিঞ্চনে তাদের স্নান করিয়েছিলেন, সে দিন থেকে তাদের প্রাণ মন তিনি কেড়ে নিয়ে গিয়েছেন—শয়নে স্বপনে তারা তারই

রূপসনাতন
চিত্তন করেন। আমরাও ভাগ্যবান্ যে এমন মহাপুরুষের সঙ্গ
লাভ করেছি। ঐ যে—বল্লভের পুত্র জীব আর প্রিয় ভৃত্য
ঈশান এদিকেই আসছে। এ বালককে দেখলে মনে হয় যেন
কোন জাতিস্মর মহাপুরুষ। এস আমরা এইখানেই বসি।
(উপবেশন )
(ঈশানের সহিত জীবের প্রবেশ)
;
জীব। ঈশান দা, তুমি সে সন্ন্যাসীকে দেখেছ ?
ঈশান। দেখেছি ভাই ; দেখেছি বলেইত মজেছি;
লােকে ব’লছে তিনিই নাকি ব্রজের কানাই। শুনতে পাই,
ব্ৰজের গােয়ালিনীরা লাজ, কুল, মান, ভরম, সরম সব তার
পায় জন্মের মত বিকিয়ে দিয়েছিল, তবে গােপন ভাবটা তবুও
সেখানে ছিল, সেখানকার সব কথা সবাই জানত না,-মা
নন্দরাণী দান মান লীলাদির কথা, সখাগণ শ্রীরাস লীলার কথা
সব জানতেন না। দেবী পৌর্ণমাসীর লুকোচুরি সবাই ধর্তে
পারে নি। এবার কিন্তু আর কোন লুকোচুরি নেই, এবার
আর শুধু গয়লার মেয়ে নয়, আস্ত আস্ত পুরুষগুলাে, বড় বড়
দিগ্বিজয়ী পণ্ডিতগুলাে, কত রাজার ছেলে সব একজোটে পাগল
হয়েছে, তার ঢেউ আমাদের এখানেও এসেছে, বুঝিবা সংসার
ধরম ভেসে যায়।
জীব। যায় যাবে, আমরাও আসব। কিন্তু যদি তলিয়ে
যাই, তাহলেত দম ফেটে মরে যাব।
স

শীপসনাতন
ঈশান। আর যদি সেখানে বেশ বাতাস খেলে ? সে
সাগরের ভেতরে বাইরে বাতাস, ঢেউএর তালে তালে নাচবে
ভাসবে আবার ডুববে।
জীব। আর স্রোতের টান যদি খুব বেশী হয়, তার ওপর
যদি আবার নীচের দিকে টান থাকে।
ঈশান। অন্তটান না থাকলে ডুববে কেন ? না ডুবলেই
বা রতন মিবে কেন ? আর স্রোত সেইখানেই বেশী যেখানে
বাতাস প্রবল। সে বাতাসের বহর ক্রমেই যেমন বাড়ে-শ্রোতও
তেমনি বাড়ে, তখন আর সাম্লান যায় না, তখনই আপন হার
হয়ে যায়। ওস্তাদজি তােমায় যে গান শিখিয়েছেন তার মধ্যেই
এই কথার ইঙ্গিত আছে।
জীব। ঈশান , ওস্তাদজির সব গানের মানে আমি বুঝিনে,
তবু গানগুলি এত ভাল লাগে যে পাইতে আরম্ভ কলে আর
ছাড়তে ইচ্ছে করে না। আচ্ছা ঈশানা, ওস্তাদজি শুনেছি
মুসলমান, কিন্তু তিনি হিন্দুর মত থাকেন কেন ? তাকে দেখে
মনে হয় যেন কোন নিষ্ঠাবান্ হিন্দু। তার একটা গান গাইব ?
ঈশান। অমৃতে আর কার অরুচি হয় ! গাও না একটা শুনি।
(শিলাখণ্ডে উভয়ের উপবেশন )
গীত।
জীব।
এ যে আকুল তুফান ভাসিয়ে নেয় মোরে।
কোথা পায়ের মাঝি, রাখ গাে আজি
নায়ে তুলে নাও পারে।

রূপসনাতন
আগে ছিল ধীরে প্রেমের টান,
আশায় আশায় ভাসিয়ে দিলাম ।
এল ওই হঠাৎ হড়কা বা
এখন জাত কুল মান সবই নে যায়
বেজায় জোর করে
শেষটা বুঝি ডুবিয়ে দিল অকুল সাগরে।
( রূপের প্রবেশ)
রূপ। জীব, এ গান তােমায় কে শেখালে? সঙ্গীতের
ভিতর কি সুন্দর ইঙ্গিত। প্রেমের স্বভাবই এই। বসন্তের
মলয় হিল্লোলের মত সে ধীরে ধীরে আসে, জীবের কাণে কাণে
তাকে পাবার সন্ধান বলে দিয়ে যায়। তার সে প্রথম আহ্বানে
শুধু একটুখানি আনন্দের কম্পন আছে। ধীরে তার স্রোতে
যেই পৰ্বত প্রমাণ অনর্থের বােঝ ভেসে যায়, প্রবাহের পথে বাধা
দেবার আর কিছু থাকে না, তখন স্রোতের টান প্রবল হতে
প্রবলতর হতে থাকে, হঠাৎ জীব একবার চমকে ওঠে, ভাবে
আমার একি হল? এত’ আমি আগে জান্তাম না। কিন্তু
তার সেই প্রেমাস্বাদনে লােলুপ চিত্ত আর নিজেকে সামলাতে চায়
, দেহ গেহ, ধন জন খুটি ছেড়ে দিয়ে, আপনহারা হয়ে সেই
প্রবাহে গা ভাসিয়ে দেয়। সেই প্রবাহ নিয়ে যায় তাকে
প্রেমানন্দের সিন্ধুতে। সেখানকার মাঝি, আনন্দচিন্ময়রসসমুজ্জ্বল,
কালাে বরণ—সে তখন তাকে কি বলে জান?
৫৪

এরূপসনাতন
গীত।
এই ত রয়েছি আমি তোমারে ঘেরি
তােমারই দরশ আশে, তােমারই আশে পাশে সদাই ঘুরি।
তােমারই সুধাগীতি, আবেগ ভরা প্রীতি,
শুনি শুনি দিবারাতি, নীরবে ঝুরি।
নীরবে মুছায়ে দেই নয়ন বারি।
আপনহারা হয়ে আমারই পথ চেয়ে,
আমারই লাগি আছ জীবন ধরি।
সারি সাগর কত, আসিয়াছ পথ এত,
আমি কি দূরে দূরে থাকিতে পারি ?
এই যে দেখনা আছি বুকেতে ধরি।
( কিছুক্ষণ সকলেই নীরব )
রূপ। (স্বগত) জীব শিশুকাল হতেই ধীর, গম্ভীর।
এই শিশুর লক্ষণগুলি সবই সুন্দর, যেন শ্রীগৌরসুন্দরের চরণ
পূজার কুসুম,-অনাঘ্রাত
সৌরভ,অর্জ
প্রস্ফুটিত। তীক্ষ্ণ
প্রতিভার সাথে কোটিসমুদ্রের গাম্ভীৰ্য, শৈশব সরলতার মাঝে
প্রগাঢ় শ্রদ্ধার কি মধুর সমাবেশ ! স্থির, বিশাল অপাঙ্গে
ত্যাগের, বৈরাগ্যের কি স্পষ্ট অভিব্যক্তি।
( জীব রূপের নিকট আসিয়া তাহার হাত ধরিলেন)
জীব। জ্যেঠা মশায়, আপনার সুধাকণ্ঠের গান ত আমি
অনেকবার শুনেছি, কিন্তু আজ আমার বুকের মধ্যে এমন ক’চ্ছে
কেন? আপনার সুরের রেশগুলি যেন ঘুরে ঘুরে আমার বুকের
মধ্যে করুণ সুরে বেজে উঠছে, গানের আনন্দের সংবাদ আমার

এরপসনাতন প্রাণে যেন শশাকের ভাব জাগিয়ে দিচ্ছে। যেন কি ছিল, কি নেই ; আমার বুকের ভিতর থেকে কে যেন কি কেড়ে নিয়ে যাচ্ছে। আমি আটকে রাখতে পাচ্ছিনে। রূপ। (স্বগত) শুদ্ধ, নির্মল চিত্তে স্বচ্ছ দর্পণের মত ভবিষ্যতের ছবি ফুটে ওঠে। চিরবিদায় যখন একটি একটি করে মায়ার বাঁধন কাটতে থাকে, তখন বাস্তবিকই প্রাণে বড় লাগে। কিন্তু বিদায় ত’ সবাই একদিন দেয়ই। একই বস্তুর এ পিঠ মিলন ও পিঠ বিদায়। তাই জন্ম যে দিন হয়, মৃত্যুও তার সাথে সাথে এসে লুকিয়ে থাকে। তবু মৃত্যুর অভিনিবেশ কি ভীষণ ভীতিপ্রদ । কি দারুণ কষ্টকর !! ( জীবকে বক্ষে জড়াইয়া ধরিয়া) প্রাকৃত সম্বন্ধ মায়ার সম্বন্ধ,—আনন্দ চিঘনবপু, নবকিশাের, নটবর মায়াগন্ধ শূন্য। এক দিকে পুঞ্জীভূত দুঃখের মর্মভেদী যন্ত্রণা, অন্যদিকে নিত্যনবনবায়মান আনন্দাষুধির অনন্ত প্রবাহ;-একদিকে নিত্যহতাশার, বিরাট হাহাকারের তমসাচ্ছন্ন অতল আবৰ্ত্ত, অন্যদিকে সুরেন্দ্র নীলদ্যুতি ভুবন- মােহনিয়ার বংশীর রসময়ী কলগীতি ! এ দুয়ের মাঝখানে মাস সঁড়িয়ে কি দেখছি!—দেখছি, উপায়হীন এক পরম করুণ, রসিকশেখর গৌরকান্তি নরবপু, স্বকারুণ্যের অবধি দেখাবার জন্যে একের বাঁধন ধীরে ধীরে খুলে দিয়ে অন্যের বিপুল স্রোতে ভাসিয়ে দিচ্ছেন, আমিও চলেছি তার অঙ্গুলি সঙ্কেতে, তারই প্রদর্শিত পথে। ঐ আমায় ডাকছেন—যাই প্রভু, আর একটুখানি, একটু এরূপসনাতন বাকী। তােমার চরণাশ্রিত অগ্রজের চরণধূলি মাথায় নিয়ে যাই যেন এ আত্মসমর্পণ যজ্ঞে আর কোন বিঘ্ন উপস্থিত না হয়। বিদায় দাও, জীব, শ্ৰীমন্মহাপ্রভুর কৃপা হলে আবার দেখা হবে। জানি তােমার কোমল প্রাণে বড় ব্যথা লাগবে ; সরল প্রাণ অন্তর্যামী, তাই এখনই ভাবী বিদায়ের ক্রন্দনের সুর তােমার বুকে বেজে উঠছে। কিন্তু কি করি বল বাপ! আমি ত আমাতে নেই, আমায় গােরা গুণনিধি একবার দেখা দিয়ে পাগল করে দিয়ে গেছেন ; ওই আবার আমায় ডাকছেন। যাই প্রভু যাই। গমনােহুত। ( সহসা বল্লভের প্রৰেশ ) বল্লভ। ( হাত ঘােড় করিয়া) দাদা, আমায় ক্ষমা করুন, আমার প্রতি যে আদেশ করেছেন, দাদা ফিরিয়ে নিন। আমি হতভাগ্য, আপনার আদেশ পালন কর্তে পালাম না। সেই শিখিপুচ্ছমৌলী, বেণুকর, গােপবেশ, ত্রিভঙ্গভঙ্গিমরূপ ধ্যান ক’রবার চেষ্টা করলাম, কিন্তু যতবারই ভাবতে যাই, ততবারই ফুটে উঠছে সেই নবদুর্বাদলনিভ, ইন্দীবরলােচন জানকী- বল্লভের মােহন মূরতি, তাঁর চরণ হতে কত গঙ্গার ধারা বয়ে যাচ্ছে, পদনখে কতশত কোটা চাদের মেলা বসেছে। হাসি যেন নবীন মেঘে শত বিজলীর খেলা, নয়নকোণে তাঁর বিশ্ব- পাগল করা কটাক্ষ। ( সনাতনের প্রবেশ ও বল্ল ভকে আলিঙ্গন দান ) সনাতন। ( আলিঙ্গন দিয়া) বলিহারি ভাই বল্লভ ;

রূপসনাতন
এস তােমায় স্পর্শ করে ধন্য হই—পূত হই। আর ভাই
তােমায় কৃষ্ণমূৰ্ত্তি ধ্যান করতে হবে না। বৈদেহীবল্লভের
শ্রীচরণে তােমার যে নিষ্ঠা হয়েছে এর এক কণা পেলেও আমরা
ধন্য হতাম।
রূপ। ভাই বল্লভ, আজ তুমি যে অপূর্ব ইষ্টনিষ্ঠা দেখালে
জগতে এ চিরদিন ঘােষিত হবে। ভক্তবাঞ্ছাপূর্ণকারী ভগবান্
ভক্তের মনমােহনিয়া। তার মনের মতটি হয়ে তিনি
তার কাছে আসেন;—তার বরবিননাদিয়া রূপ ভক্তের অভি-
লাষের ছাঁচে গড়া। যে তাকে যে ভাবে দেখতে ভালবাসে
তিনি তার কাছে সেই ভাবেই আসেন। লঙ্কায় তিনি গরুড়কে
বংশীবদন মূর্তি দেখালেন, কংস কারাগারে বসুদেব দৈবকীকে
চতুর্ভুজ মুর্তি দেখিয়েছিলেন, আর ব্রজের গােপিনীর ঘরে তিনি
দ্বিভুজ, মুরলীধর, বাঁকা আখি বাঁকা ঠাম।
গীত।
বাকা নয়ন শ্যামের বাঁকা শিখি পাখা।
বাঁকা চরণ দুটি চলে আঁকা বাঁকা।
বাঁকা যমুনার জলে,
বাকা কদম্ব তলে,
হিয়ার উপরে দোলে
বনম বাকা
সনাতন। ভাই রূপ, ভাই বল্লভ, সংসারের নিষ্পেষণে
তনু জর জর হয়ে গেল—কৃষ্ণ বৈমুখ্য আর প্রাণে সয় না।
এবার সংসার মুক্তির জন্য কোন শাস্ত্র-নিপুণ ব্রাহ্মণ দ্বারা

রূপসনাতন
শ্রীকৃষ্ণমন্ত্রের পুরশ্চরণ করাও,-মন্ত্রশক্তির বলে বিষয়ের বাঁধন
আপনা হতে খুলে যাবে।
রূপ।
দাদা, প্রাণচোর গৌরসুন্দরের গতিবিধি জানবার
লােক নীলাচলে প্রেরিত হয়েছিল সে ফিরে
এসেছে। প্রাণবন্ত আমার বনপথে শ্রীবৃন্দাবন যাত্রা করেছেন ;
ব্রজের কানাইয়া ব্ৰজে গেলে আবার কি নূতন রঙ্গ হয়
দেখবার জন্য আমার প্রাণ বড় ব্যাকুল হয়েছে। বিনােদিয়া
রঙ্গিয়া আমার, বুঝি বা আবার তেমনি করে বাঁশ ধরে
কদমতলে দাঁড়ান, আবার তেমনি করে বাঁশী বাজান।
অরুণ ছাড়িয়া বুঝি পীতবাস পরে,
দণ্ড ছাড়ি পুনঃ বুঝি বাঁশী লয় করে।
কীৰ্ত্তন ছাড়িয়া কিবা মুরলী বাজায়,
দাম সুদাম সাথে গােধন চরায়,
কিবা পুন ধরে করে গিরি গােবর্ধন,
কঁহা মেরে প্যারী ৰলি করে ক্রন্দন।
গৌরাঙ্গ বিধু তিলে তিলে, পলে পলে আমায় আত্মসাৎ
করে নিচ্ছেন, আমি আর থাকতে পাচ্ছি না ; ঐ দেখুন
আকাশে চাঁদ উঠেছে, কি স্নিগ্ধ মধুর বাতাস, গাছে গাছে
ফুল ফুটেছে ; গৌরসুন্দর, এমন সময় তুমি কোথায়? এক
বার এস প্রভু নয়ন ভরে তােমায় দেখি।
সনাতন। নদী যখন সাগরের পানে উধাও হয়ে ছােটে
কার সাধ্য তার গতি রোধ করে।

জিপসনাতন
রূপ। দাসকে অনুমতি করুন, একবার ছুটে যাই,
আর যে পারি না।
সনাতন। বালাচন্দ্র দ্বীপের ও ফতেয়াবাদের বাটীর
বিষয় সম্পত্তি ব্রাহ্মণ বৈষ্ণবের সেবায় দান করা হয়েছে। এখন
এক সাথে তিনজন গৌড় ছাড়লে বঙ্গেশ্বর অনুসন্ধান পেয়ে
পথে বিঘ্ন ঘটাতে পারেন। পুরশ্চরণের পরেই তােমর জীবন
সর্বস্ব গােরাশশীর চরণ স্মরণ করে যাত্র। কর, আমি সুযােগ
বুঝে পরে যাব।
(একত্রে গত)
জয় জয় জয় শ্রীশচীনন্দন ভকতবৎসল হরি।
জগন্নাথ সুত, চির অনতি প্রেম প্ৰকটকারী ।
জম অরুণ বসন করুণ বচন,
ঢুলু ঢুলু দুটি কমল নয়ন,
পরমদয়াল পতিত পাবন
দণ্ড কমণ্ডলু ধারী।
দু নয়নে ঝরে প্রেম-সুধা-ধারা
হাসে কাদে গায় পাগলের পারা
জয় জয় রাধা প্রেমরস ভাের
মহা সঙ্কীৰ্ত্তনকারী।
(গাহিতে গাহিতে প্রস্থান)

তৃতীয় অঙ্ক।
১ম দৃশ্য।
স্থান-কানাই নাটশালা, সনাতনের নিভৃত গৃহ।
কালরাত্রি।
(কয়েকজন ভক্ত সহ সনাতন শ্রীমদ্ভাগবত আলােচনা করিতেছেন)
ভক্ত। এই ব্রজলীলার গুঢ়রসকথা কেমন করে আমাদের
কাছ পর্যন্ত এল ?
সনাতন। এই যে মােহন খেলা, হয়ে গেল
যেন গােপনে। সারা জগৎ গভীর
ঘুমে অচেতন, জাল না কেউ
কখন্ তিনি এলেন, কোথায় বসে
কোন রাগিণীর আলাপ করে গেলেন,
কোন্ সুরে মােহন বাঁশী বেজে গেল।
শান্ত আভীর পল্লীর
নিভৃত নিকুঞ্জে, একাদশ বর্ষ ধরে,
কত ছলে তিনি কত কথা বলে গেলেন,
কয়েকজন সরলা গােপবালা, আর
গােঠের রাখাল ছাড়া কোলাহলময়
জগৎ সে কথা শুনল না।
তারপর কোন একদিন

রূপসনাতন
সে লীলামৃত রস পান করে শুক,
ভােরপুর হয়ে অধরে করে নিয়ে
এসেছিলেন জগতে বিলাতে। কিন্তু,
অনেক খুজে পাত্র হ’ল তঁার, এক রাজা,
যাঁর হৃদয় হতে কেটে গেছে সংসারের
বিষম বাঁধন, খুলে গেছে বাসনার
কঠিন শৃঙ্খল, থেমে গেছে হৃদয়ের
শত কোলাহল; আজ মরণের উপকূলে
প্রায়ােপবেশনে, চিত্ত তার শুদ্ধ শান্ত,
চারি পাশে বসি যতিগণ, ধীর স্তব্ধ
মৌন ; ঋষিগণ ধ্যানস্তিমিত লােচন ;
প্রবাহিত
সম্মুখেতে শাস্তিদায়িনী,
পতিতপাবনী সুরধুনী, সব স্থির শান্ত।
কোলাহলময় জগতে সে বারতা
সে দিনও গেল না। আকাশে, বাতাসে,
জলকণে, প্রতি অণু পরমাণু সাথে
মিশে র’ল সে গীতি, সে ঝঙ্কার অতি
গােপনে। উঠেছিল বেজে আবার সেদিন,
সেই কৃষ্ণবোতীরে লীলাশুকের
হৃদয় বীণায়, থেমে গেছে যবে তার,
যৌবন কালবৈশাখীর ঝড়, মিটে গেছে
যত অন্ধ পিয়াসে আকুল ছুটাছুটি।

রূপসনাতন হৃদয় যখন স্নিগ্ধ শান্ত তখনই উঠিল বাজি সেই “কলবেণুকণিত”, তখনই প্রেমমাখা চোখে তার উঠিল ফুটিয়া সেই “বহোত্তংসবিলাস- কুন্তলভরং, মাধুৰ্যমগ্নানন”, সেই “প্রােগ্মীলম্নবযৌবনং, প্রবিলসবেণু- প্রণাদামৃতং, গােপাভিরারাধিত জগমেকাভিরামাদ্ভুতং জ্যোতিঃ।” সেদিনও জগতের আর কেউ দেখল , শুনল না, কেউ জাল না। শুধু শুনেছিল গুরু সােমগিরি আর চিন্তামণি। আমাদের বাংলায় সে ঢেউ কেমন করে এল? সনাতন। পাঁচ হাজার বরষ আগের সেই গীতিরস, সেই নিত্যলীলা, সেই গােলােকের মন্দাকিনী, গােপ গােপীর হৃদয়ের পূত অনুভব, ধ্যানযোগে উঠিল ফুটিয়া জয়দেব প্রাণে, বাংলার অজয়ের তীরে। কত বরষ বরষ ধরি কোথা লুকাইয়া ছিল সেই প্রেমরস, সহসা সেদিন জয়দেব হৃদে দিল দেখা।

জিপসনাতন
;
তারপর, দূরে মিথিলায়, কবি
বিদ্যাপতির মােহন সুরে, রাজসভা
মুখরিত করি, উঠিল বাজিয়া
সে লীলার প্রতিধ্বনি; ক্রমে নানুরের
বনবীথি বিকম্পিত করে, দেখা দিলা
“পীরিতি” মন্ত্রের ঋষি চণ্ডীদাস।
তারপর দেখা দিল একজন,
হৃদয়ভরা আকুলতা নিয়ে, কঁদিতে
কাদাতে, নাম তার শ্ৰীমাধবেন্দ্রপুরী।
কে আজ তেমন করে কাঁদাবে গলাবে,
ভুলায়ে দেবে সব দম্ভ অহঙ্কার
জগতের কোল থেকে টেনে নিয়ে জীবে
প্রেমে ভাসাবে মাতাবে ?
ঐ দেখ কেঁদে কেঁদে
চলে যায় সাধু একজন, তার সাথে
কাদিছে সকলি। কাদেতাে অনেকে ;
কিন্তু একের ফ্রন্দনে যবে সহস্রের
প্রাণ ওঠে কেঁদে, সেত’ নয়
মায়ার ক্রন্দন, সে যে সত্যের তরে,
নিত্যের তরে প্রাণের আকুলী।
(গান গাহিতে গাহিতে ছদ্মবেশী মদনগােপালের প্রবেশ )
ছদ্মবেশী। আজ প্রেম জোয়ার বয় প্রেমের দরিয়ায়।

রূপসনাতন
দেখ দেখ নৃতন রঙ্গ নদীয়ায় ।
চণ্ডীদাসের বনবীথি
লীলাশুক আর বিদ্যাপতি
জয়দেবের সুধাগাতি
একসাথেতে মিশেছে ধরায়,
দেখনা ব্ৰজের বাঁকা,
আজিকে কাঙ্গাল সখা
রাই রূপে তার অঙ্গ ঢাকা,
প্রেমের দায়ে ধূলাতে লুটায়।
ব্রজের সেই গােপ খােপীরা,
আজও তার সঙ্গী তারা,
লাজ কুল মান ছেড়ে সবাই
আসতেছে ওই নদীয়ায় ।
সনাতন। বালক, সে প্রেমজোয়ারে কি এ জনমে ভাতে
কেমন করে তাতে ঝাঁপ দিতে হয় তা জানি
।
ছদ্মবেশী । তিনি বড় দয়াল, পরমকরুণ, রসময় ; কৃপা
করে নিজহাতে শরণাগতের হৃদয়মন্দির আগে মাজ্জিত করে
শুদ্ধ করেন, তারপর তার ভুবনমােহন বেশে তাতে উদিত হন,
ক্রমে তাকে আত্মসাৎ করে নেন--পরশমণির পরশে সব
সােণী হয়ে যায়। কিন্তু যাক সে কথা, তােমার আকাশে কিন্তু
ঝড় উঠেছে, শক্ত করে হাল ধরে থেক’, পরীক্ষার আগুন জ্বলে
পাব ?

আপনার
উঠেছে, স্থির থেকো, যেন বিশ্বাস হারিয়ােনা। তিনি বিপদবারণ,
তকতবৎসল।
(প্রস্থান)
(জনৈক রাজকর্মচারীর প্রবেশ )
কর্মচারী। (অভিবাদন করিয়া) উজীর সাহেব, পর পর
তিন দিন আপনাকে রাজসভায় অনুপস্থিত দেখে গৌড়েশ্বর
চিন্তিত হয়ে পড়েছেন। না যাওয়ার কারণ জাবার জন্য
আমাকে পাঠিয়েছেন। রাজকার্য্যে এমন অসময়ে এসে আপনাকে
বাধা দিলাম, আমার অপরাধ নেবেন না।
সনাতন। (স্বগত) রাজার প্রতিই আমার কাল হয়েছে।
এই কাল বন্ধন না কাটতে পার্লে দেখছি নিস্তার নেই। যাতে
আমার প্রতি তার অপ্রীতি ঘটে, তার উপায় কৰ্ত্তে হবে।
( প্রকাশ্যে ) বঙ্গেশরকে আমার সম্মান অভিবাদন জানিয়ে
বলবে, আমি অত্যন্ত পীড়িত হয়ে পড়ায় রাজকার্য্যে আর
যোগদান ক’তে পাচ্ছি না।
কর্মচারী। যে আজ্ঞে । ( অভিবাদনান্তে প্রস্থান)
কত জনমের তপস্যার ফলে লােকে ভগবানের
দর্শন পায়। সেই অখিলের নাথ, যােগীর আরাধ্য ধন, কত
দিন ধরে নদীয়ায় নরদেহে কত খেলা খেলে গেলেন। নদীয়ার
ব্রাহ্মণভক্তগণ, আপনারা ত তা প্রত্যক্ষ করেছেন। আপনাদের
ভাগ্যের সীমা নাই, আপনাদের চিত্ত গৌরপ্রেমে গৱগর, সে

গেই গােরাপায় বিক্রীত। আপনারা আপনারা আমায় কৃপা করুন, আপনাদের কৃপা পেলে আমি আমার জীবন সর্বশ্বের কাছে যেতে পার্ক। জনৈক ব্রাহ্মণ। আপনারা দুই ভাই আমাদের ইহকাল পর- কালের সুখশাস্তির বিধাতা ছিলেন ;-প্রচুর অর্থ দিয়ে আমাদের পুত্র কন্যা সংসার প্রতিপালন করেছেন, ভাগবত আদি সগ্রন্থ শুনিয়ে মনের ময়লা দূর কর্তে সর্বদা চেষ্টা করেছেন। আমরা নদীয়ার ব্রাহ্মণ বটে, কিন্তু বড় অন্ধ বধির, বড় অলস অৰশ, চিরপ্ত, জাগতে চাইনি। আমাদের দুয়ারে দুয়ারে এসে সে দেবতাভিখারী কেঁদে কেঁদে প্রেম যেচে গেছেন, আমরা শুনিনি, চিনিনি, ঘুম ভাঙতে চাইনি। আজ তার একটুখানি সাড়া কাণে পেঁৗছেছে, এমন সময় অনাথ আমরা আমাদের ফেলে কোথায় যাবেন ? (রাজবৈদ্যের প্রবেশ ও অভিবাদন ) সনাতন। কি সংবাদ বৈদ্যরাজ ? অকস্মাৎ এতরাত্রে আগমন। রাজবৈদ্য। মনি, আপনার অসুস্থতার সংবাদ পেয়ে গৌড়াধিপ বড় উদ্বিগ্ন হয়ে, আপনাকে দেখবার জন্য আমাকে পাঠিয়েছেন। আপনাকে দেখে ত’ বােধ হচ্ছে, আপনার শরীর বেশ সুস্থই আছে। সনাতন। (স্বগত) হায় বঙ্গেশ্বর। তোমার স্নেহে গরল- সনাতন মাখা আছে, পান কৰ্ত্তে আর সাহস হয় না। (প্রকাশ্যে ) হাঁ বৈদ্যরাজ, আমার কঠিন পীড়াই হয়েছে, তবে সে পীড়া দেহের নয়, মনের। আমার মন সান্নিপাতগ্রস্ত, সে গৌর রূপের পূর্ণ- সিন্ধু পান কৰ্বার জন্য আকুল হয়েছে, কিন্তু দুর্দৈব বৈদ্য তাকে এক বিন্দুও পান কর্তে দিচ্ছে না। মন আমার অত্যন্ত অস্থির, আর আমি রাত কাৰ্য চালাতে পাৰ্বে বলে মনে হয় না। গৌড়েশ্বরকে বলবেন—এখন আমায় রাজকাৰ্য্য থেকে অবসর দিলে সুখী হব। রঙ্গেবৈদ্য। কিছু অপরাধ নেবেন না, আমি তাহলে যেতে পারি ? সনাতন। আচ্ছা আসুন (অভিবাদন) (রাজবৈদ্যের প্রস্থান) সনাতন। (আপনমনে) রাজকন্মের কলকোলাহলের মধ্যে চিত্ত স্থির করা দেখছি একপ্রকার অসম্ভব। আর সেই সেদিনের ব্রজবিপিনের রসঝঙ্কার হতে আরম্ভ করে আজ পর্যন্ত সর্বত্রই দেখছি, তাঁর পাগলকরা বাঁশী বাজে তার কাণেই, যার চিত্ত অনেক ধরে টানাটানি ছেড়ে দিয়ে, শুধু তাকে নিয়ে তন্ময় হয়ে গেছে, তার মােহন মূরতি দেখা দেয় সেইখানেই, যেখানে হৃদয়ের লক্ষ বাসনার উন্মাদনা থেমে গেছে। (সহসা হসেনবাহের প্রবেণ) হুসেনশাহ। কিন্তু তাই বলে দবীরখাস, তুমি রাজ্যভার ফেলে যেতে পাৰ্বে না।

রূপসনাতন
সনাতন। (গাত্রোখান করিয়া) একি গৌড়েশ্বর স্বয়ং
এসেছেন।
( ভক্তদিগের গাৱোখান-ভক্তদিগের প্রতি) আপনারা
মদনমােহনজীর মন্দিরে গিয়ে একটু অপেক্ষা করুন।
( ভক্তগণের প্রস্থান)
হুসেনশাহ। মন্ত্রিন, কয়েকদিন ধরে তােমার অনুপস্থিতিতে
রাজকার্য্যের বিশেষ বিশৃঙ্খলা হয়েছে। তুমিই আমার দক্ষিণ
বাহু। তােমার এক ভাই ত দরবেশ হয়ে চলে গেছে, এখন
তুমিও বসে থাকলে এ বিশাল রাজ্য রক্ষা পাবে কিরূপে? সত্বর
সভায় গিয়ে কাৰ্যাদির পর্যবেক্ষণ কর।
সনাতন। বঙ্গেশ্বর, সেই প্রথম সাক্ষাৎকারের দিন থেকে
আজ পর্যন্ত, আপনি আমাদের অগ্রজের মত স্নেহের চোখে দেখে
আসছেন, আপনার ঋণ অপরিশােধ্য। কিন্তু নয়াধিপ, আমার
চিত্ত বড় অশান্ত হয়েছে। এই অবস্থায় গুরুতর রাজকাৰ্য্য
পৰ্যবেক্ষণ করা আমার দ্বারা হবে বলে বােধ হয় না।
হুসেনশাহ। বুঝলাম যাতে আমার রাজ্য উচ্ছন্ন যায়, এই
তােমার অতি প্রায়। আমি ত তােমার ধর্ম কর্মের কোন বাধা
দেই নি, বরং সহায়তাই করেছি। তবে কেন তুমি রাজকাৰ্য্য
পরিত্যাগ কর্লে ? তাছাড়া রাজকাৰ্য্য কি ধৰ্ম্ম কর্মের মধ্যে
নয় ?
সনাতন। হ। গৌড়েশ্বর, রাজকাৰ্য্য ধৰ্ম্ম কর্মেরই অন্তর্গত।
যখন জিজ্ঞাসাই কলেন তখন বলি-ধৰ্ম্ম কর্ম কৰ্বার আগে
জানতে হয় ধর্ম কি। তাকে বলে শ্রবণরূপ জান, তারপর কর্ম

সনাতন
অর্থাৎ আচরণ বা সাধন, যার ফলে হয় অনুভূতি বা আস্বাদন।
এই অনুভূতি বা আস্বাদনই জীবের লক্ষ্য। সেও যেমন বহুবিধ,
কৰ্ম্মও তেমন বহুবিধ, তার আবার ভিন্ন ভিন্ন স্তর আছে।
আপনার কথিত স্তরে আমার কৰ্ম্ম আমাকে অনেক দিন ফেলে
রেখেছিল, আজ সেই দীনবৎসল ঠাকুর কৃপা করে আমায় অন্য
স্তরে নিয়ে যাচ্ছেন। আপনি অনুগ্রহ করে আমার স্থানে অন্য
লােক নিযুক্ত করে আমায় অবসর প্রদান করুন। আমা দ্বারা
যে আর রাজকার্য হবে সে বিশ্বাস আমার নাই।
হুসেনশাহ। তুমি কি উন্মাদ হলে দবীরখাস? ওদিকে
তােমার এক উচ্ছ, ঙ্খল ভাই জানােয়ার পশু বধ করে দর ন্যায়
রাজ্যের সর্বনাশ সাধন ক’চ্ছে, আর এক জন সমস্ত ফেলে
ফকীর হয়ে চলে গেল, এখন তুমিও যদি উদাসীন থাক,
তাহলে আমার রাজ্য চলবে কেমন করে?
সনাতন। যার কৃপায় রাজ্য লাভ করেছেন, তিনিই
চালাবেন। আপনার এই বিশাল রাজ্যে ত’ অনেক উপযুক্ত
ব্যক্তি আছেন।
হুসেনশাহ। তা জানি, কিন্তু তােমাদের হিন্দুদের কি
কৃতজ্ঞতা ব’লেও একটা কিছু নেই। নেমকহারামি কি
তােমাদের ধর্ম । কি ! চুপ করে রইলে যে ? ভেবে
দেখ মন্ত্রী, স্থিরচিত্তে ভেবে দেখ, গৌড়ের বাদশা আজ তােমার
দুয়ারে ভিখারী ।
সনাতন। (স্বগত) এ মন্দ ভিখারী নয় ; এরই নাম
৭০

ৰাজনীতি। দান্তিক পাঠান আজ স্বার্থসাধনের জন্য শেষ
মুহুর্ত পর্যন্ত কি বিনয়েরই না ভান কচ্ছে! কি ঘৃণিত কৌশল।
ঐ দৃষ্টির অন্তরালে আমি দেখতে পাচ্ছি বল প্রয়ােগের শেষ
প্রয়াস, নিষ্ঠুর অত্যাচারের দৃঢ় সঙ্কল্প, মৃত্যুর করাল ব্যাদান।
সরল জয়চন্দ্র সেদিন মহম্মদ ঘােরীর চোখে এ ছবি দেখতে পায়নি,
বিশ্বাসী বীর পৃথীরাজ তার মিষ্টকথায় বিষ মাখা বােকেনি।
জাতি দিয়ে, ধৰ্ম্ম দিয়ে, যথাসর্বস্ব দিয়ে সেবা করে এলাম,
আজ কপর্দক শূন্য হয়ে বিদায় চাচ্ছি, তাতেও নেমকহারাম
হলাম । কিন্তু আর নয়! এ শরীর যাওয়াই এখন আমার
মঙ্গল। এ পাপ দেহে ভগবানের উদয় হবে না, তার বিরহ
যাতনাও আর সহ্য হয় না।
হুসেন। বিস্ফারিত নয়নে কি ভাবছ দবীর খাস ? ঐ
দেখ, চিরশত্রু উড়িষ্যা লােলুপ নেত্রে চেয়ে আছে। মন্ত্রী বীর
খাসের পদত্যাগের সাথে সাথে বিদ্রোহ ঘােষণা কর্বে ; আর
সমগ্র বাংলা কত আশা নিয়ে তােমার মুখপানে চেয়ে আছে।
সনাতন। (স্বগত) এখনও মৰ্যাদার, এখনও দায়িত্বের
প্রলােতন! ( প্রকাশ্যে ) বঙ্গেশ্বর, আমায় বৃথা অনুরােধ
ক'ছেন। আমা হতে আর রাজকাৰ্য্য সাধন হবে না।
হুসেন। { উত্তেজিত স্বরে) দবীর খাস, তুমি ভুলে গেছ,
কার সঙ্গে বাদ প্রতিবাদ কচ্ছ। জান, মনে আছে তােমার, কি
সূত্রে আমার কাছে এসেছিলে ?
সনাতন। জানি বাদশাহ, স্পষ্ট মনে আছে, আপনার

এরূপসনাতন
পদাঘাতে রাজমিস্ত্রীর আলােক স্তন্ত হতে পতন ও মৃত্যু
সূত্রে।
হুসেন। তােমার কি
তােমার কি মৃত্যু ভয়ও নেই ?
সনাতন। তার পরিচয় ত’ অনেকবার পেয়েছেন বাদশাহ !
কিন্তু সে এক দিন, আজ আর একদিন। আজ আমি জীয়ন্তে মরা
হয়ে আছি, কৃপাপ কর্মের জন্য আমার হৃদয় অনুতাপানলে
দিবানিশি দগ্ধ হচ্ছে। বঙ্গেশ্বর, শূল ব্যাধিগ্রস্ত ব্যক্তিকে
দেখেছেন? সে মনে করে যেন মরলেই বাঁচে। আমারও অন্তরে
আজ শূল-মহাব্যাধির সৃষ্টি হয়েছে, এখন আমার মরণই মঙ্গল।
হুসেন। ! এ ধৃষ্টতা আর সহ্য হয় না। সয়তানকে
উপযুক্ত শাস্তি দিতে হবে। কোতােয়াল!
( কোতােয়াল ও প্রহরীদ্বয়ের প্রবেশ)
কোতােয়াল। হাজির জাঁহাপনা।
হুসেন। বন্দী কর; অন্ধকার কারায় নিক্ষেপ কর্বে।
বিশ্বস্ত সর্দার হবুসেখ কারারক্ষক থাকবে। ( প্রস্থান)
সনাতন। ( ধীরে ধীরে জ্বালা যন্ত্রণায় পাপের প্রায়শ্চিত্ত
হলে, ভােগে কৰ্ম্মের ক্ষয় না হলে, চিত্তের শুদ্ধি সাধন হয়
,প্রেম কুসুমও ফোটে না। নাও নাথ, এম্নি করে আমায়
উপযুক্ত করে নাও। কোতােয়াল, আমায় শৃঙ্খলাবদ্ধ কর।
কোতােয়াল। উচু পদ, ধন সম্পত্তি, রাজার অনুগ্রহ সব
যেন ভেল্কি ; যেন পুতুল খেলা ভােজবাজী। উজির সাহেব,
१२

রূপসনাতন
আমি নেমকহারাম হতে পাৰ্বনা। বাপের মত স্নেহে আপনি
আমাদের পালন করে আসছেন, সে ঋণ এ জীবনে শােধ হবে না।
আমি আপনাকে শৃঙ্খল পরালে আমার এ হাত খসে পড়বে।
সনাতন। তুমি বাদশাহের অন্নে পালিত ভৃত্য, তার
আদেশ পালন না ক'লে তােমার জীবনের আশঙ্কা আছে।
পুত্র কন্যা নিয়ে ঘর সংসার কর, আমার জন্য বিপদে পড়লে
তারা নিরুপায় হবে।
কোতােয়াল। উজির সাহেব, সে হবে না। আপনার
বদলে আমি কারাগারে যাচ্ছি—আপনি স্বচ্ছন্দে চলে যান।
সনাতন। আমার এখনও সময় হয়নি কোতােয়াল ; তুমি
ছাড়লে কি হবে ? যিনি ছাড়বার তিনি ত এখনও ছাড়েন নি।
তুমি আমায় শৃঙ্খলাবদ্ধ কর।
কোতােয়ালী (স্বগত) একি বিপদে ফেলে ভগবান,
কি করি? এমন দেবতার মত মানুষ, নিরপরাধ, তাকে বন্দী
ক’ত্তে হবে। এর চেয়ে আমার মরণই ভাল ছিল। আমি
পানা বন্দী কত্তে। (প্রকাশ্যে ) উজির সাহেব, আমি
পানা বন্দী কত্তে।
সনাতন। কোতােয়াল, তুমি ত’ কোনদিন আমার কথার
অবাধ্য হও নি, আজ কেন এমন ক’চ্ছ, আমি বলছি তুমি আমায়
বন্দী কর।
কোতােয়াল। হা ভগবান, আমার অদৃষ্টে এই ছিল।
(সনাতনকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করণ ও উভয়ের প্রস্থান)
৭৩

দ্বিতীয় দৃশ্য।
স্থান-কারাগৃহ। কাল-প্রভাত।
( ধ্যানমগ্ন সনাতন)
সনাতন। (চকু মুদ্রিত, দুই গত বহিয়া জলধারা বহিতেছে)
নির্জনতা দিয়েছ নাথ, স্বাধীনতা দাও নি। আজ কেন এমন
হচ্ছে। চোখ বুজলেই দেখছি আমার মদনগােপাল লৌহদণ্ড
ধরে বাইরে দাঁড়িয়ে যেন আমায় কি ব’লছে। না না, তুমি ।
যেও না, আমি যে আঁধার কারার প্রাচীর ঘেরা, আমি কেমন
করে তােমার সাথে যাব ? আঁ্যা চলে গেল! আমায় বৃন্দাবন
যেতে বলে গেল। সেইখানে গিয়ে আবার দেখা দেবে বলে
গেল।
( চক্ষু মেলিয়া) এই ত সেই কারাগার,
লােহার শৃঙ্খলে যথা বন্ধ চরণকর,
বলে পাষাণ চাপা বরষের পর
বরষ তারা কেঁদেছিল ; মরণ বেদনা
মাঝে, বক্ষ বিদারিশােক জ্বালা সয়ে
ফেলেছিল প্রতপ্ত নিঃশ্বাস, বৃন্দাবন
বিহারীর পথ চেয়ে ;
ওঃ! লীলাবিহারী স্বয়ং ভগবান
যার জঠর হ'তে আবির্ভূত হয়ে
প্রেম পীযুষমাখা যােলে ডাকিলেন
৭৪
।।

মা মা বলে, সেই তিনি অন্ধকার
কারা মাঝে-সশস্ত্র প্রহরী ঘেরা ;
বক্ষোপরি প্রচণ্ড পাষাণ, অন্তরে
হাহাকারের উষ্ণ প্রস্রবণ, নয়নেতে
উৎকণ্ঠার তীব্র চাহনী! ওঃ কি যে
সে পাষাণ ভেদী করুণ ক্রন্দন ।
আজ পুন এই অন্ধকার কারা মাঝে
বাজিতেছে কাণে মাের সেই সেদিনের
করুণ বিলাপ। ওই সেই ধ্বনি-
নারায়ণ, শ্রীবৎসলাঞ্ছন,
একাদশ বরষ কাটিল, সেই তুমি
গেছ ব্ৰজপুরে, ভুলেছ কি বাপ,
হেথা শৃঙ্খলিত তৰ জনক জননী
পাষাণে আবদ্ধ। বুক ফেটে যায়
ভাবিলে পরাণে, রাজপুত্র তুমি, কৌস্তভ
ভূষণ, কংসভয়ে নির্বাসিত হলে
গােপকুলে, রাখালের সনে গােঠে
কর গােচারণ। দেখে যাও এসে হেথা
একবার, মাের বঙ্গে বহে ক্ষীরধারা
দুনয়নে নীর।
এস এসরে কেশব,
কুম কোমল হাতে, মাের আঁখি
মুছে দাও, মা মা বলে ডাক একবার জুড়াক পরাণ।

রূপসনাতন
ওগাে নিষ্ঠুর, যারা তােমার আপন, তারে কি এমি করে
যে নয়নের মণিকে তিলে আঁখির আড়াল
কলে প্রাণ ফেটে যেত, যার মুখপানে চাইলে দেহ গেহের স্মৃতি
ভেসে যেত, যাকে শতবার ভূষণ পরিয়েও মা যশােদার তৃপ্তি
হত না, গােঠের বেলা ব্রজের কঙ্করপথে পাছে পাছে পাগল
হয়ে ছুটে যেতেন, সেই তঁাকে তুমি কোন্ পরাণে ফেলে চলে
গেলে ? আহার নিদ্রা ছেড়ে, “হা গােপাল” বলে তার যে ক্রন্দন,
তা শুনলে পাষাণও ফেটে যায়—প্রতি প্রভাতে গােঠের বেলায়
বরষার ধারে তার আঁখি অন্ধ হয়ে আসে, তিনি আপন মনে
বলেন—কানাইরে, ঐ দেখ, তাের গােষ্ঠে যাবার বেলা হ’ল ;
ঐ দেখ ধেনুর পাল, আমার ঘরের চারি পাশে হাস্বা হাম্বা
করে তােরে খুঁজে বেড়াচ্ছে। ঐ তাের সখা শ্রীদাম সুদাম,
সুবল মধুমঙ্গল এসেছে, তারা শীগগির করে তােকে নূপুর
পায়ে, মােহন বেণু হাতে দিয়ে সাজিয়ে দিতে বলছে।
আমি তাদের কি বলি বল ?
তারা ভাবছে আমি বুঝি
তােকে বনের জানােয়ারের ভয়ে ঘরে লুকিয়ে রেখেছি। ঐ
অলঙ্কারের কোটা ভরা পড়ে রয়েছে, একবার আয় বাপ, তেমনি
করে সাজিয়ে দেই। না না, আর তোকে গােঠে যেতে হবে
। ননীর পুতুলকে এই প্রচণ্ড রােদে কোন প্রাণে বনে
পাঠিয়ে দিতাম ? তাই বুঝি, বাবা আমার অভিমান করে
মথুরায় বসে আছ? যাও গােপাজ তাকে নিয়ে এস, আৰু
আমি বনে পাঠাব না।
৭৬

রূপসনাতন
(সহসা হুসেনশাহের প্রবেশ)
সৈনশাহ। কার সঙ্গে কথা ক’চ্ছ দবীরখাস?
সনাতন। অকে, বাদশাহ, কি আমার মনের স্বাধীনতা-
টুকুও কেড়ে নিতে এসেছেন? ঐ টুকু গেলেই আমি ফকীর
হতে পারি।
হুসেন। সত্য বলছি মন্ত্রী, তােমায় কষ্ট দিতে আমার প্রাণ
চায় না। তুমি আমার বিপদের বন্ধু। তােমায় বন্দী করে অবধি
আমার প্রাণে শান্তি নেই। আজ বিপন্ন হয়ে আবার তােমার
শরণাগত হয়েছি।
সনাতন। (স্বগত) আবার মায়াজাল ? আর
পরীক্ষা ক'ৰ্বে নাথ ?
হুসেন। মন্ত্রী, একদিন ছিল যখন তুমি আমার বিপদে পাগল
হয়ে যেতে, নিজের প্রাণ দিয়েও আমায় মুক্ত কত্তে চেষ্টা কতে,
আর আজ একবার জিজ্ঞাসাও করুছনা আমি কি সঙ্কটে পড়েছি।
সনাতন। (স্বগত) ও কি ভ্রান্তি ! নিজে সঙ্কটের
কুন্তীপাকে পড়ে দন্তভরে আর একজনার সঙ্কট দূর কত্তে গেছি
হুসেন। (স্বগত) সরল হৃদয় মন্ত্রী আজ মর্মাহত।
( প্রকাশ্যে ) দবীর খাস, তােমারই পরামর্শানুসারে পুরন্দর বসুকে
মন্ত্রীপদে নিযুক্ত করেছি। তুমি ত জান, তার ভাই ঐকান্ত বসু
উড়িষ্যার সীমান্তে কর আদায় করে। শুনছি নাকি প্রজারা আর
কর দিতে চায় না; সে তার অত্যাচারেই হােক, বা অন্য কোন
কারণেই হােক। পুরন্দর বসু বলেন যে বিদ্রোহী প্রজাদের

বিরুদ্ধে যুদ্ধ করাই উচিত।
করাই উচিত। বেগমসাহেবা তােমাকে বড় শ্রদ্ধা
করেন, তিনি বলেন শ্রীকান্ত পুরন্দরেই ভাই, সুতরাং এ বিষয়ে
শুধু তার কথা না শুনে প্রবীণ বিশ্বস্ত মন্ত্রী বীরখাসের পরামর্শও
একবার নেওয়া উচিত। এ সম্বন্ধে তােমার কি মত?
সনাতন। (স্বগত) ইষ্টসিদ্ধি হলেই চলে যাবে।
কারাগারের মধ্যেও নিস্তার নেই। ( প্রকাশ্যে) গৌড়েশ্বর ।
আমার যতদূর বিশ্বাস, একান্তের দোষেই প্রজারা কর দিতে
চাচ্ছে না। একান্তকে অন্য কাজে নিযুক্ত করে তার পরিবর্তে
আর এক ন কর্মচারীকে পাঠালেই যখন কর আদায়ের সম্ভাবনা
দেখা যাচ্ছে, তখন আর অনর্থক যুদ্ধবিগ্রহের প্রয়ােজন কি—শুধুই
লোকক্ষয় আর বহুব্যয়।
হুসেনশাহ। যদি তাইই হয়, তবে তুমিই এর ব্যবস্থা কর।
সনাতন। আমার আশা ত্যাগ করুন্ বঙ্গেশ্বর।
হুসেন। তােমার আশা আমি কিছুতেই ত্যাগ ক’ত্তে পান।
তুমি কালই কারামুক্ত হয়ে উড়িষ্যার কর আদায়ের সুবন্দোবস্ত
ক'ৰ্বে।
( প্রস্থান)।
সনাতন। শত্রুরূপে যদি শত্রু আসে কি হয় তাহাতে ;
প্রাণপণে যুঝিবে সকলি। কিন্তু মিত্রবেশে
ববে আসে গুপ্ত গরি, বিপদ তখনি।
স্বরূপেতে হবে আসে কাছে পাপ,
সতর্ক যে, দূরে তারে করে পরিহার ।
৭।

কিন্তু যদি পরি আসে পুণ্যের পােষাক,
বিপদ তখনি। লঙ্কার সমরে যবে
ব্যুহ রচি বীর অঞ্জনাকুমার,
রক্ষিছেন রঘুনাথে, সুমিত্রানন্দনে।
রাবণের পুত্র দুষ্ট সে মহীরাবণ,
বিভীষণ বেশ ধরি ভুলাইয়া বীর
হনুমানে, হরি নিলা মায়াবী তার
হৃদয় রতনে। রে মায়া, কারামুক্তি
প্রলােভনে ডুবাইতে চাহ পুন
বিষয় বিষ্ঠায় ? ধন্য তােরে, আর
ধন্য সেই, তাের এই মােহ-কলিল
যে পারে তরিতে।
( পুনরায় হুসেনশাহের প্রবেশ)
হুসেন। দবীরখাস, আর একটা কথা তােমায় বলতে ভুলে
গেছি। আজ সকালে এক ব্রাহ্মণ একখানি কাগজ নিয়ে আমার
কাছে এসেছিলেন। কয়েকদিন পূর্বে সেই ব্রাহ্মণের পৈত্রিক
সম্পত্তি, কর না দেওয়ায় আমি দখল করে নিয়েছিলাম, ব্রাহ্মণ
অনেক অনুনয় বিনয় করেছিলেন, কিন্তু কয়েক বৎসর ধরে এন্নি
করে রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে আসছেন বলে তার কোন কথায় কান
সেই নি। তাকে রাজ দরবার থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল।
ব্রাহ্মণ চোখের জল ফেলতে ফেলতে চলে গিয়েছিলেন। আজ
আবার সেই ব্রাহ্মণ একটা কাগজে কি একটা ধাঁধ লিখে নিয়ে

আমার কাছে এসেছেন—বলছেন কে নাকি এক দরবেশ এইটে আমাকে দিতে বলে দিয়েছে। কিন্তু, লেখাটা দেখে, সাকর মল্লিকের হাতের লেখা বলে মনে হচ্ছে, ( পাঠ )—- - ই- === সভার সমস্ত আমীর ওমরাও মৌলবী পণ্ডিতকে দেখালাম-- কেউ এর অর্থ কৰ্তে পারেন নি। দেখ দেখি তুমি কিছু বুঝতে পারকি না ? ( কাগজ প্রদান ) সনাতন। (স্বগত) তাইত-এ লেখা ভাই রূপের হাতেরই। (প্রকাশ্যে ) গৌড়েশ্বর, এ লেখা সাকর মল্লিকেরই এটি একটি প্রাচীন সংস্কৃত শ্লোক- যদুপতেঃ ক গত মথুরাপুরী, রঘুপতেঃ ক গতােত্তর কোশলা, ইতি বিচিন্ত্য কুরুষ মন স্থিরং ন সদিদং জগদিত্যবধারয় । এর অর্থ হচ্ছে, কোথায় গিয়েছে সেই ষদুপতির সুন্দর মথুরাপুরী, আর রঘুপতি শ্রীরামচন্দ্রের উত্তর কোশল ; এজগতের কিছুই থাকবে না এই সার জেনাে, তবে কেন এ ও তার জন্য মন অস্থির কর । হুসেন। ই বুঝেছি, ব্রাহ্মণ, তুমি ভাগ্যবান ; তুমি এর ।

শ্রীরূপসনাতন
যথার্থ ভাব বুঝেছ তাই এই শ্লোক আমায় দিয়ে তার উত্তর আর
নিয়েই চলে গিয়েছ। আমিও যে বুঝি নি তা নয়, তবু
আমাকে (কিছুক্ষণ নীরব থাকিয়া )—থাক। ( প্রস্থান)
( কারারক্ষক বুসেখের সঙ্গে ঈশানের প্রবেশ)
হবু। ঈশান, দেখ আমার গর্দান আর তােমার তিনহাজার
মুদ্রা, এ দুটো সমান না হলেও, উজির সাহেবের মুখ চেয়ে
তােমায় নিয়ে এলাম। বেশ আস্তে আস্তে কথা বােলল।
ঈশান। কিন্তু, এই যে বাদশাহ কারাগৃহে এসেছিলেন
তুমি ত’ তখন ছিলে ;-তবু তুমি কেন বলছ যে, প্রভুর
কারামুক্তির কথা তুমি শােন নি?
হবু। সে সব আমি শুনি টুনিনি। জদি জদি কাজ
সেরে নাও, বাদশা এসে পড়লে তােমাকেও এইখানেই থাকতে
হবে।
ঈশান। তাহলে ত আমি বাঁচি। প্রভু কারায় বন্দী, বাইরে
কি আমার শান্তি আছে।
হবু। তাহলে আর কি হল? দুজনেই পচবে। তার
চেয়ে একটা ব্যবস্থা ক’তে যদি পার তাহলে বুঝি যে হাঁ তুমি
প্রভুভক্ত। (স্বগত) টাকাটা না ফস্কায়।
ঈশান।-আচ্ছা সেখ সাহেব, এমন মানুষ দেবতা তুমি আর
কোথাও দেখেছ?
হবু।-ঈশান, উজির সাহেবের কাছে আমরা চিরঋণী।

এক্সপন্সনাতন
খােদাতালা তাকে আর কষ্ট দেবেন না। ঐ দেখ দুচোখে নদী
বয়ে যাচ্ছে, এমন মানুষ জিলাপীর না হয়ে যায় না।
সনাতন। কে? ঈশান। এই কারাগারের মধ্যে তুমি
কেমন করে এলে ?
ঈশন-কারারক্ষক সেখ সাহেবের সঙ্গে এসেছি। আপনার
কষ্ট দেখে সেখ সাহেবেরও হৃদয় গলে গেছে। একজন মুদী
আপনাকে দেবার জন্য এই পত্রখানি আর এক থলি মুদ্রা দিয়ে
গেছে, তা থেকে সেখ সাহেবকে আমি কিছু দিয়েছি আর
এতেই সব আছে।
সনাতন। কৈ-পত্র দেখি।
ঈশান।
(পত্র প্রদান )
সনাতন। (পত্র পাঠ) “প্রভু, বনপথে বৃন্দাবন যাত্রা
করেছেন। তার পদপঙ্কজ স্মরণ করে আমরা দুজনেও চলেছি।
আপনার কারামুক্তির জন্য এই বণিকের কাছে দশ হাজার মুদ্রা
রেখে গেলাম।”-( আপন মনে) মদনগােপাল বৃন্দাবনে যাবার
আদেশ করেছেন। আমাদের পাপ, পুণ্য, ধৰ্ম্ম, অধৰ্ম্ম, সুখ, দুঃখ
সমস্তই তার পায়ে বিক্রীত ;-এ জীবন তার সেবায় উৎসগীকৃত।
এ উৎকোচ প্রদান তারই সেবার অঙ্গ। একান্ত শরণাগতের
সমস্ত পাপ তার করুণার ধারায় ধুয়ে যায়-
সৰ্ব্ব ধম্মান পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজ।
অহং ত্বাং সর্বপাপেভ্যো মােক্ষয়িষ্যামি মা শুচঃ ৪
২

ঈশান। প্রভু, গৌড়েশ্বরকে পুরন্দর বস্তু এখনই মন্ত্রণা
দিলেন যে দবীর খাসকে তুমি বন্দী করে রেখেছ সে এখন
তােমার শত্রু, তার পরামর্শ শুনলে তােমার সর্বনাশ হবে।
গৌড়েশ্বরও তাই বুঝেছেন, তিনি পুরন্দরের মন্ত্রণায় যুদ্ধ যাত্রাই
স্থির করেছেন। আজই অপরাহ্নে তিনি সদরপথে উড়িষ্যায়
যাত্রা কবেন। তিনিও শুনলাম আপনাকে কারামুক্তির আদেশ
দিয়ে গেলেন; কিন্তু সর্দার হবুসেখ নাকি তা জানে না। এদিকে
বাদশাও ত’ এখন আর ফিরছেন না। আপনার এ কঠোর যন্ত্রণা
ত’ আমাদের আর সহ্য হয় না। বণিক ওই মুদ্রা দিয়ে গেছে,
ওই অর্থ দিয়ে এই নরক যন্ত্রণা হতে মুক্ত হয়ে আসুন। ( অ
বিসর্জন)
সনাতন। ঈশান, স্থির হও। সর্দার।
হবু। আদেশ করুন, উজির সাহেব। (স্বগত) ঐ
থলি দেখছি আজ আমার কপালে নাচছে।
সনাতন। আমি যে জন্য কারাগারে আছি তাত’ তুম সবই
জান।
হবু। আজ্ঞে, হাঁ হুজুর।
সনাতন। গৌড়েশ্বর আমাকে মন্ত্রীর কাজে বহাল রাখবার
জন্যই এত শাসন ক’চ্ছেন, কিন্তু আমাকে দিয়ে যে আর কোন
রাজকার্য নির্বাহ হবে সে আশা আর নেই।
হবু। না, আপনার দ্বারা আর এ সব পাপ কাজ হবে না
উজির সাহেব।

সনাতন
সনাতন। পূর্বে আমি তােমার যে সমস্ত উপকার করেছি,
তার বিনিময়ে আজ তােমার কাছে একটি ভিক্ষা চাচ্ছি। তুমি
ত’ শাস্ত্রে সুপণ্ডিত ও পরম ধাৰ্ম্মিক। যদি নিজের ধন দিয়েও
কোন বন্দীকে মােচন করা যায়, আল্লা সেই মােচন-কর্তাকে
সংসার বন্ধন থেকে মুক্তি দেন। আমি তােমাকে পাঁচ হাজার
মুদ্রা দিচ্ছি, আজ তুমি আমাকে কারাগার থেকে মুক্ত করে
দাও। পুণ্য, অর্থ তােমার দুইই লাভ হবে।
হবু।
আমার দেখছি উভয় সঙ্কট, একদিকে রাজ ভয়, অন্য
দিকে নেমকহারামি।
সনাতন। গৌড়েশ্বর উড়িষ্যায় যাত্রা ক’ছেন। শীঘ্র এখন
ফিরবার সম্ভাবনা নেই। এর মধ্যেই আমি তার রাজ্যের সীমা
ছাড়িয়ে যাব। ফিরে এসে তিনি যদি আমার কথা জিজ্ঞাসা
করেন, বলো—বা শৌচকৃতের জন্য গঙ্গাতীরে গিয়েছিল—
দেখে তাতে ঝাপ দিয়েছে, আর দেখিনি। আমিও গঙ্গা পার
হয়ে চলে যাব।
হবু। কোথায় যাবেন বলুন?
সনাতন। তোমাদের দরবেশ হয়ে মক্কায় চলে যায় না ।
আমিও তেমনিই হব।
হবু। (স্বগত) মােটে পাঁচ হাজার ? বাকী টাকাটা
কি করে যাবে? (প্রকাতে) আমার সাহস হচ্ছে না।
সনাতন। আরও দুই হাজার পাৰে।
৪ে

রূপাতন
হবু। আচ্ছা, আজ শেষরাত্রে। আমি কিন্তু গঙ্গার কুল
পৰ্যন্ত সঙ্গে যাব।
ঈশান। হ্যা সেখ সাহেব, তাই যেও। (উর্দ্ধে করঘােড়ে)
দয়াময়, মুখ তুলে চাও।
( সকলের প্রস্থান)
তৃতীয় দৃশ্য।
স্থান—পাড়া পর্বত। কাল-সন্ধ্যা।
(ভুইয়া ও গণৎকারের প্রবেশ)
ভুইয়া। দেখিস্ গুণতে ভুল করিসনে যেন। চেহারাটা
দরবেশের মত দেখাচ্ছে। আচ্ছা, সঙ্গের লােকটা হিন্দু না ?
গণৎকার। কি যে বলেন মশাই, তার মাথা মুণ্ডু নেই।
বরাহ মিহিরের ব্যাটারা আমার ঠাকুর্দার কাছে জ্যোতিষ, শিখত,
আর বাবার গণনায় ঠাকুর্দাও পেরে উঠত না। সেই বাবার
তল্পিতল্পা ঝেড়ে যা কিছু ছিল সব মেরে নিয়েছি, এমন কি সারস্বত
ব্যাকরণটা পর্যন্ত। তবু কিনা আপনি সন্দেহ করেন আমার
গুণতে ভুল হবে ?
ভু। আঁা, সারস্বতের কথা কই তুই এতদিন বলিনি ত ?
গ। মুলমন্ত্র কারাে ব’লতে গুরুর না থাকে। সারস্বত
হচ্চে জ্যোতিষ শাস্ত্রের মূলমন্ত্র। তাই এতদিন বলিনি।
ভু। তবে এখন বললি যে?

গ। শিষ্যকে মন্ত্র দেওয়ার বিধি আছে কিনা? আপনি
যে সেদিন বললেন আমার কাছ থেকে জ্যোতিষ, শিখবেন।
তাই সারস্বতটাই প্রথমে শেখাই, তার পর খিল হরিবংশগুলাে
ধীরে ধীরে শিখাব।
ভু। আচ্ছা, ঝাঁ করে দুটো নিয়ম বলে দে দেখি।
গ। ঝ। ক'রে বলে দিলেই হ’ল আর কি ? এ কি
রসগােল্লা যে মাত্র দুইটি অঙ্গুলি দিয়া, হেলায়, ঘৃণায়, তাচ্ছিল্য
ভরে উর্দ্ধে তুলিয়া, অত্যন্ত বিরক্তির সহিত একটা প্রকাণ্ড
হাঁ করিয়া, টপাস করিয়া ফেলিয়া দিয়া, চক্ষু মুদ্রিত করিয়া
কোনমতে গলাধঃকরণ করিলেই হইল। এই জ্যোতিষশাস্ত্র
সকল শাস্ত্রের সার ;-ইহা কামধেনু, না, গরু বলাটা ঠিক
হ’লনা। ইহা কল্পতরু-ছিঃ ছিঃ শাস্ত্র গাছ হবে কেন ?
উপমা যারা দেয়, তাদের দেখছি মোটেই বসবােধ নেই।
ইহা চিন্তামণি। মশায়, আজ আমার ভাব এসে গেছে, ঠেকাতে
পাচ্ছিনে। তবে শুনুন একটা বক্তৃতা। শুধু সারস্বত আর
খিলহরিবংশ নয়, আজ আমার যেখানে যেখানে চোখ পড়ছে,
সব জ্যোতিষ শাস্ত্রের রেখাপাত বলে মনে হচ্ছে। গীতা
বলুন, ভাগবত বলুন, বেদ বলুন, বেদান্ত বলুন, পুরাণ বলুন,
কাব্য বলুন,-সব জ্যোতিষ শাস্ত্র। ইহার প্রমাণ চান? আমি
চীৎকার করিয়া বলিতে পারি, বর্জনাদে বলিতে পারি, গৰ্জ্জুন
করিয়া বলিতে পারি—ইহা নিশ্চয় নিশ্চয়, নিশ্চয় জ্যোতি,
শাস্ত্র। বলুন, আর কিছু প্রমাণ চাই?

জানান
ভু। একি আবার অদ্ভুত প্রমাণ।
গ। অদ্ভুত ? শঙ্কর বলুন, রামানুজ বলুন, মধ্বমুনি
বলুন, নিম্বাদিত্য বলুন, সকলেরই ঐ একই প্রমাণ। সকলেই
আমার মত প্রমাণ দিয়েছেন যে, যে না মানে সে নিশ্চয়ই
নাস্তিক, নিশ্চয় পাষণ্ড, সে ঘাের নরকে যাবে। মানবে না !
চালাকি ? চালাকি দ্বারা কোন মহৎ কাৰ্য্য হয় না। বেদান্তের
একই সূত্র—সকলেই লাল, নীল, হলদে, রংএর চশমা পরে সব
লাল, নীল, হলদে দেখছেন। আমি সে চশমা ভাঙ, বনা।
আলবৎ ভাবনা। নিয়ে আসুন যে কোন শাস্ত্র, আমি
জ্যোতিষশাস্ত্রের চশমা পরে তার এক পৃষ্ঠায় বর্গীয় জ’এ য ফলা
ওকার “জ্যো” আর এক পৃষ্ঠায় যদি ত’এ হ্রস্ব ইকার “তি” আর
এক পৃষ্ঠায় যদি মূর্ধন্য “ষ” না দেখাতে পারি, তাহলে আমি
এক পয়সাও বখরা নেব না। নিয়ে আসুন না-আমি ওই
পঞ্চতন্ত্রেরই আনব্যাখ্যা, ভক্তি ব্যাখ্যা, যৌগিক ব্যাখ্যা, আধ্যাত্মিক
ব্যাখ্যা, জ্যোতিষ ব্যাখ্যা, সব করে দিচ্ছি।
ভু। ঠিকই ত’। তারা কথায় কথায় নরকং গচ্ছে”
বলে দেবেন আর আমরা নরকে যাব ? দেখ, এই ডাকাতি
বিদ্যেটাও তাহলে জ্যোতিষ শাস্ত্র ত’?
গ। নিশ্চয়ই। আমার মত জ্যোতিষী না পেলে আপনি
কি এমন পাকা ডাকাত হতে পাত্তেন ?
ভু। আচ্ছা, অনেক ত’ শুনলাম
গ। হু । কি অনেক শুনলেন ?
১৭

পানাতন
কুছ, মােজ আয়া কোরাে।
কুছ রােজ শুনা কোনাে।
তব, ভেদ বাৎলায়েঙ্গে”
আরে! এসে পড়বে, শীগগির দুটো মন্ত্র বল !
গ। চোঃ কুঃ ভিস্ তিস্।
ভু। ভিস্ ভিস্ কিরে ?
আগে শুনুন না মশাই, চোঃ মানে চোর, আর
কু মানে কুকুর, এই চোরে আর গেরস্তর কুকুরে যদি দেখা
হয়ে যায়, তাহলে চোর আর চেঁচায় না, ফিস্ ফিস্ করে
কথা কয়, তাই ভি ভিস। তাহলে এ থেকে কি শিখলেন?
না, কেউ ফিস ফিস করে কথা কইলে বুঝবেন যে সে চোর,
তার পিছনে কুকুর লেগেছে।
ভু। আরে রাখ, তাের চো কু ভিস্ ভিস্।
পড়ল, এসে পড়ল, শীগগির গুণে দেখ, ওদের কাছে
টাকাকড়ি কিছু আছে কিনা।
গ। (কর গুণিয়া) এই চো-কু-
ভিভিস, টেন-বা-
অর্থাৎ (চীৎকার করিয়া) অনেকগুলি স্বর্ণখণ্ড।
ভু। আরে চুপ চুপ, লুকো, লুকো।
( ঈশান ও সনাতনের প্রবেশ )
ঈশান। দুইরাত দুইদিন ক্রমাগত হেঁটে এসেছেন, সন্ধ্যাও
হয়ে আসছে, সামনে পর্বত; আজকের মত এইখানে
বিশ্রাম করুন।

সনাতন। বিশ্রাম! আচ্ছা। (উপবেশন; চক্ষু মুদ্রিত করিয়া)
ঈশান, ঐ দেখ দিগন্ত প্রসারী, স্থির গম্ভীর নীল জলধি-আর
তার কূলে আমার কনককান্তি সজল নয়ন, প্রেমে ঢলঢল নবীন
সন্ন্যাসী গৌরসুন্দর। বামকরতলে কপােল বিন্যস্ত করে প্রভু
আমার অপােবদনে বসে আছেন, আর নয়ন যুগল হতে
অশ্রুমালা গলদেশ বে’য়ে পড়ছে (ধ্যানমগ্ন ওন)
ঈশান। সম্মুখে ভীষণ পাহাড়, জঙ্গল ; রাত্রিও আঁধার
হয়ে আছে।
জন প্রাণীর সাড়া শব্দ নেই যে, রাস্তার
একটুখানি সন্ধান জেনে নেব। ওঃ অবিশ্রান্ত চলে চ'লে
শরীর অবশ হয়ে পড়েছে, এদিকে বাইরের জগতের কোন
হুস নেই। পথের কষ্টে, রৌদ্রের তাপে, অনাহারে, অনিদ্রায়
মুখখানা একেবারে বিবর্ণ হয়ে গেছে। কারাগারের নিদারুণ
যন্ত্রণার পরই এই কঠোর পথক্লান্তি। আমি এদিকে দেখি
যদি একটু জল পাই। ( অগ্রসর হওন)
ভু। ওরে, এদিকে আসছে। দাড়া ব্যাটা, তুই কোন
কথা কইবিনে। (সম্মুখে অগ্রসর হই য়) হ্যাগাে তােমরা কোথায়
যাবেগে? জল খুঁজছ? এইখানেই ভাল পুকুর আছে।
ঈশান। এই যে, এতক্ষণে বুঝি ভগবান্ মুখ তুলে
চাইলেন ; (সনাতনের কাছে গিয়া ) দেখুন, কৃপাময় কৃপা
করে দুজন বন্ধু
পাঠিয়ে দিয়েছেন।
আসুন আপনারা
এইদিকে।
স। আপনারা আমার বিপদের বন্ধু।

গ। না মশাই, ইনি এখানকার ভূঁইয়া, জমীদার লােক। ভু। চোপরাও ! আপনার বনপথে এসে অনেক কষ্ট পেয়েছেন। আসুন, এই নিকটেই আমার গরীবখানা আছে, আজ সেইখানে বিশ্রাম ও আহারাদি কনে। স। আমি রাজবন্দী, কারাগার থেকে পালিয়ে রাজ- পথ ছেড়ে বনপথে এসেছি; আমার প্রাণের ঠাকুর শ্রীবৃন্দা- বনের পথে গেছেন, কতক্ষণে তার চরণে পৌছাব সেই চিন্তায় আমার ক্ষুধা নেই, তৃষ্ণা নেই, শরীরে একটুও ক্লেশবোধ নেই! আপনি অনুগ্রহ করে আমায় এই রাত্রেই পর্বত পার করে বনপথ দেখিয়ে দিন, আমি চিরদিন আপনার কাছে ঋণী হয়ে থাকব। গ। বাঃ, আর আমাদের খাটুনিটা বুঝি বৃথা যাবে? ভু। আরে, চোপ, রও। (সনাতনের প্রতি। সে কি হয় মশাই ? আমার পরম ভাগ্যে আপনার মত মহাপুরুষ অতিথি পেয়েছি। আমি কি ছাড়তে পারি? এই পাশেই ভাল পুকুর আছে, স্নান টান করে একটু সুস্থ হন, আমি আপনাদের আহারাদির সুবন্দোবস্ত করে দিচ্ছি, রাত্রে লােক দিয়ে পার ( সনাতন ও ঈশান স্নানের জন্য পুকুরের দিকে যাইতে যাইতে ) আজ আমি নিঃস্ব ফকীর, তবু এই ভুইয়া আমার এত সম্বর্ধনা করে কেন? ঈশান, ঐ আদর আপ্যায়ন ভাল লাগছে না। তােমার কাছে কি কিছু অর্থ আছে ?

ঈশান। হাঁ প্রভু, আমার নিকট ৭টি স্বর্ণ মুদ্রা আছে।
ও বুঝেছি, কেন মৃত্যুর সহচর সঙ্গে করে এনেছ?
ওদের দিয়ে দিও।
( প্রস্থান)
ভু। ভাল করে গুণে দেখ, এরা কারা, আর, কটা মােহর
আছে ?
গ। (মাটিতে খড়ি দিয়া আঁকিয়া) চপাৎ ঝ শ, ঝতে জবা
—অর্থাৎ রাজার মন্ত্রী, সঙ্গে ভৃত্য, আর আটটা মােহর।
ভু। রাজমন্ত্রী না হলে অমন দিব্য চেহারা, কেমন—ধীর
গম্ভীর।
গ। আজ সকালে কার মুখ দেখেছিলেন বলুন ত ?
ভু। তা বলে তাের নয় ।
গ। আমার কখনও হতে পারে ? অত ছােট নয়।
আমার পুত্রের খুল্লতাতের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার। সে যা হােক,
বখরাটা।
( সনাতন ও ঈশানের প্রবেশ)
‘। চুপ চুপ আছে।
স। মহাশয়, আমার এই সঙ্গীর কাছে ৭টা সােণার
মােহর ছিল, অনুগ্রহ করে এই নিয়ে আমাদের শীঘ্র পার
করে দিন, আমাদের সময় চলে যাচ্ছে।
ভু। (হাসিয়া) আরও একটা মােহর তার কাছে আছে।
ঠিক করেছিলাম, আজ রাত্রেই আপনাদের হত্যা করে মােহর
কটা নেব; কিন্তু যখন নিজে থেকেই দিয়ে দিলেন তখন
১১

এপসনাতন
বােঝা গেল যে আপনারা ডাকাতি করে কারু টাকা মেরে
নিয়ে যাচ্ছেন না। আপনারা সৎলােক ; এমন লােকের
কোন উপকার কতে পাল্লেও পুণ্য আছে। আপনারা আহারাদি
ক'রে নিন, আজ রাত্রেই আপনাদের লােক দিয়ে পার করে
দিচ্ছি। আমার ত’ অভাব নেই, আমি মােহর চাই নে।
স। দেখুন, আবার কেউ হয়তাে মােহরের জন্য হত্যা
কত্তে আসবে। আপনি অনুগ্রহ করে নিয়ে আমাদের প্রাণ
রক্ষা করুন। ( যাইতে যাইতে ঈশানের প্রতি) ঈশান, তােমার
কাছে আর মোহর আছে?
ঈশান। একটা আছে প্রভু।
স। এই মােহর নিয়ে তুমি দেশে ফিরে যাও।
ঈশান। (পায়ে পড়িয়া কাদিতে কাদিতে) আমায় এ নিষ্ঠুর
আদেশ কৰ্ব্বেন না, আমার বড় সাধ আজীবন চরণ সেবা করি।
স। দেশে যাও তার নাম নিও, তার কৃপায় বঞ্চিত
হবে না।
( সকলের প্রস্থান)

রূপসনাতন চতুর্থ দৃশ্য। স্থান-হাজিপুরের উদ্যান। কালরাত্রি। ( ছিন্ন কস্থা ও কয়ােধারী সনাতন উপবিষ্ট ) সনাতন। (গীত দেখা দাও দেখা দাও হে প্রাণরমণ । হে আমার চিরসখা হৃদয়রঞ্জন। বড়সাধ প্রাণে হেরিব নয়নে অপরূপ রূপ একটি বার। সে রূপ পরশে পুলক হরষে সার্থক হবে নয়ন ধার। প্রাণ জ্বলে যায় এস এ সম নহিলে বুঝিবা না রহে জীবন। দেখা দাও দেখা দাও পরশ রতন। আজ ত আর পারি না, আমার প্রতি অঙ্গ যেন তার জন্য পাগল হয়ে উঠেছে, আমি ত আর সামলাতে পাচ্ছিনা। তার অঙ্গের পরশ লাগি বক্ষ, রূপের পরশ লাগি চক্ষু, বাণীর লাগি শ্রবণ, অঙ্গের সৌরভ লাগি নাসা, আর নাম সুধার পরশ লাগি রসনা-আলিঙ্গন পরশ লাগি বাহ- পরশ আকুল প্রতি অঙ্গ মাের ওগো পর রতন হেমার চির সখা হয় নি।

(একান্তের প্রবেশ )
কা। উদ্যান থেকে যেন কার কান্নার সুর শুনতে পাচ্ছি।
পরিচিত সুর বলে মনে হচ্ছে। এত’ বাংলার ভাষা। বাঙ্গালী
কণ্ঠ। হরিহরছত্রের মেলায় দেশের আর কেউ এসেছে নাকি ?
( কান পাতিয়া শােনা)
স। ওগাে তুমি কত দূরে, হে সুন্দর, হে চির মধুর
এ কণ্ঠ যেন মন্ত্রী দবীরখাসের বলে মনে হচ্ছে।
( একটু অগ্রসর হইয়া) কে এ কয়ােয় কচ্ছাধারী, আপন মনে গান
ক’চ্ছে আর দুই চোখ দিয়ে অবিরল ধারে জল পড়ছে।
শ্রীকা।
স। (সুরে) আর কতদূর সেই বৃন্দাবন ?
কোন্ পথে গেছ কোথা লুকায়েছ
করুণামাখান প্রাণ ভকত জীবন
দেখা দাও দেখা দাও হে প্রাণরমণ।
শ্রীকা। (কাছে গিয়া চিনিতে পারিয়া) ভাই, তুমি এখানে
এ বেশে কেন ? কর্ণাটের রাজবংশের মুখােজ্জ্বলকারী, বাংলার
ভাগ্যবিধাতা মন্ত্রী দবীরখাস আজ ধুলিধূসরিত ছিন্নকন্যধারী উদাসী
কেন? তােমার এ দুঃখীর মত মুখ দেখে বুক ফেটে যাচ্ছে।
দবীরখাস, বাস্তবিকই তাহলে তুমি মন্ত্রীত্ব ছেড়ে দিয়েছ। তুমি
কি উন্মাদ হয়েছ ? বাদশাহ মেহবশেই তােমাকে বন্দী করে-
ছিলেন। কিন্তু তুমি কেমন করে কারাগার থেকে এলে, আর
তােমার এ বেশই বা কেন ?
৯৪

ক্রকা।
স। বাস্তবিকই আমি উন্মাদ হয়েছি। কারারক্ষককে
অর্থ দিয়ে কারাগার থেকে পলায়ন করে বনপথে এই পর্যন্ত
এসেছি। চলেছি আমার জীবনসৰ্বম্বের সন্ধানে।
তা বেশ করেছ। কিন্তু তুমি ঘরে ফিরে চল।
ঘরে বসেই মদনগােপালের সেবা করবে। কত লােকেত ঘরে
ব’সে তার পূজা করে তাকে পেয়েছে।
স। শ্রীকান্তরে,
পরাণে আমার বড়শি বিধায়ে
ঘরের বাহির করিল যে,
আমিত তাহার, যা কিছু আমার,
আপন করিয়ে লইল সে।
দেহ গেহ মাের, কিছুই না জানি
কে কোথা ছিলাম জানি না আর,
গােরাগুণনিধি সন্ধানে চলেছি
জীবনে মরণে হয়েছি তার।
ঐকা। তােমাকে ত আমি চিরদিনই জানি, পর্বতের মত
স্থির, সমুদ্রের মত গম্ভীর কিন্তু আলােড়িত হলে সাধ্য কার
রোধ করে। কিন্তু আমার একটা নিবেদন,এ মলিন বেশ তুমি
ত্যাগ কর, এই দারুণ শীতে এই শালখানি নাও, আর কিছু অর্থ
সঙ্গে রাখ কি জানি কখন কি বিপদ হয়।
স। পরাণ গৌরাঙ্গ আমার কেঁদে কেঁদে যায়।
হা কৃষ্ণ হা কৃষ্ণ বলে ধূলাতে লুটায়।

রূপসনাতন
শত ছেড়া কাঁথা গায়
দ্বারে ভিক্ষা মাগি খায়
শীতাতপ সমভাবে
তার অঙ্গে বয়ে যায় ।
কোন্ প্রাণে বল মােরে
ওরে ভাই শ্রীকান্তরে
দিতে হবে হায় আজ
রাজ পরিচ্ছদ গায় ।
একা। উঃ এত ভালবাসা, এমন বৈরাগ্যও মানুষের হয় ?
(সনাতনের হাতে ধরিয়া) ভাই তােমার হাতে ধরি, একটি কথা
রাখ। এ শাল, এ অর্থ নিয়ে তােমার কাজ নেই। কিন্তু
এই হাড়ভাঙ্গা শীতে তুমি কেমন করে বাঁচবে? অন্ততঃ এই
ভােটকম্বলটি গায় দাও।
স। ভাই শ্রীকান্ত, তােমায় কেমন করে বােঝাব?
আমার অন্তরে যে আগুন জ্বলছে তাতে আমার একটুও শীতবােধ
নেই। তবু দাও তােমার মনস্তুষ্টির জন্য কম্বল গায় দেই।
আর হয়তাে তােমার সঙ্গে দেখা হবে ন! (কান্তের রােদন)
এখন আর কেঁদনা, আমায় শীঘ্র করে গঙ্গাপার করে দাও, আমি
বৃন্দাবন যাব।
(উভয়ের প্রস্থান)।

রূপদান
পঞ্চম দৃশ্য।
স্থান-বারাণসী। কাল-প্রভাত।
(চন্দ্রশেখরের বাটীর সম্মুখ।)
সনাতন। লােকমুখরিত
লােকমুখরিত এই সেই বারাণসী, অন্নপূর্ণা
বিশ্বনাথের প্রিয়লীলাভূমি। পাদধৌত করি বহে ঐ সুরধুনী, কি
আনন্দে ছুটে চলে, ফিরে নাহি চায়। এই ত সেই চন্দ্রশেখরের
গৃহ। দ্বারে কেহ নাই। প্রভু মাের আছেন এখানে। দীন
আমি, বিষয়ী নারকী, কোন গুণে পাব দেখা ? বসি এইখানে
ধ্যান করি সে চরণ। (উপবেশন) কি পবিত্র অঙ্গসৌরভ
বহি মানিল, চিত্ত মাের করিছে চঞ্চল, ধ্যান ভাঙ্গি দেয়। নাসা,
তাের সাধ মিটিল প্রথমে। কোথা দয়াময়!
কোথা দয়াময়! আছ তুমি কাছে ?
( ধ্যানমগ্ন হওন।) .
(চন্দ্রশেখরের প্রবেশ)
চন্দ্র। (স্বগত) কই দ্বারে কোন বৈষ্ণব দেখছি না।
প্রভু যে বললেন “দ্বারে যে বৈষ্ণব আছেন তাকে আন।” এত
একজন কে অতি মলিন, জীর্ণ শীর্ণ অবস্থায় বসে আছে। মুখে
দাড়ি,-বােধ হয় কোন দরবেশ হবে। যাক, প্রকাশানন্দের
ব্যবহারে দেখছি শাপে বর হ’ল। যে রকম লােকের ভিড়
হচ্ছিল, প্রভুকে একটুও স্থির হতে দিচ্ছিল না, সন্ন্যাসীপ্রধান
কাশী যেন ভেঙ্গে এসে পড়েছিল। প্রকাশানন্দ কাশীর সন্ন্যাসীদের
৭

বলেছে—চৈতন্য ভয়ে পালিয়ে গেলো। মনে করেছিলাম
বুকি আর আসবে না। শুনছি আবার এসেছে তা আসুক,
তােমরা দেখে, সে এদিকে কখনও ঘেসবে না, ঠিক দূরে দূরে
থাকবে। তবে তােমরা
তবে তােমরা তার কাছেও যেওনা। লােকটার
তারি শক্তি আছে। সার্বভৌমের মত প্রচণ্ডলােককে যখন
ভুলিয়েছে, তখন তােমাদের ভােলাবে, সে আর আশ্চৰ্য্য কি?
কিন্তু তার মত পালন ক’তে গেলে তােমাদের ইহকাল, পরকাল
দুইই নষ্ট হবে। ফলে, সন্ন্যাসীরা আর আসছে না। আমরা
একটু প্রাণভরে তাকে দেখ বার, তার মুখের কথা শুনবার
অবকাশ পেয়েছি। যাই, তঁাকে বলিগে কোন বৈষ্ণব তো এখানে
নেই।
( প্রস্থান)
( চন্দ্রশেখরের পুনরাগমন )
চন্দ্র। প্রভু বললেন “দ্বারে যিনি আছেন তাকেই নিয়ে
এস।” আশ্চৰ্য্য। রাজ রাজেশ্বরগণ চেষ্টা করেও যাঁর দর্শন
পায় না, তিনি আপনিই এই দরবেশকে আছেন। (সনাতনের
নিকট গিয়া) প্রভু, আপনাকে ডাকছেন।
স। (হ, আশা, ভয়, ভক্তি মিশ্রিত ভাবে) প্রভু আমাকে
ডাকছেন। আপনার ভুল হয়েছে। প্রভু আমাকে ডাকবেন
কেন! আর কাকে ডাকছেন।
চন্দ্র। না, আপনাকেই ডাকছেন।
স। (আপন মনে) আমাকে চকিতের মত একবার মাত্র

দেখেছেন। তাও রাত্রিতে! লক্ষ লক্ষ ভুবন পাবন ভক্তে প্রভু
সেবা ক’চ্ছেন ; আমি অস্পৃশ্য পামর, আমার কথা কি তার
মনে থাকতে পারে? থাকলেই বা এমন পাষণ্ডকে তিনি
ডাকবেন কেন? (চন্দ্রশেখরের প্রতি) ঠাকুর, আপনার ভুল
হয়েছে, আপনি ভিতরে আর একবার জিজ্ঞাসা করে আসুন প্রভু
কাকে ডাকছেন। (স্বগত) আমি এসেছি এ সংবাদ ত কই
প্রভুকে আমি পাঠাই নি।
চন্দ্র। আপনাকেই ডাকছেন, আপনি আমার সঙ্গে চলুন।
( উভয়ের প্রস্থান।)
ষষ্ঠ
দৃশ্য।
স্থান—চন্দ্রশেখরের বাটার অভ্যন্তর।
( সানয়নে শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য প্রভু বসিয়া আছেন। চন্দ্রশেখরের সঙ্গে
সনাতন দুই গােছ তৃণ হাতে লইয়া ও এক গােছ দাতে ধরিয়া কাদিতে
কাদিতে গৌরাঙ্গের পায়ের কাছে পড়িলেন।)
সনাতন। (সঞ্জলন করুণ সুরে)-
তােমার অভয় চরণ ভুলিয়া
কৰ্য্য বিষয় ভােগে ফিরি।
কামাদি চর রোগে সা
নীচসঙ্গে সুখ বুদ্ধি করি।

मनाउन
নীচ ব্যবহারে মতি রতি,
নীচ কর্মে সদাই উল্লাস।
এ দুর্লভ জন্ম আমার
শুধুই হইল উপহাস ।
চরণে শরণ লই আজ
করুণা কটাক্ষ কর মােরে।
পতিত জনার বন্ধু নাম
আজ হতে ঘুষুক সংসারে ॥
( গৌরাঙ্গ উঠিয়া তাঁহাকে আলিঙ্গন দিতে গেলেন;
সনাতন একটু পিছাইয়া গেলেন।)
সনাতন। প্রভু, কোটি কোটি ভূভাবন ভক্তের পবিত্র আশ্রয়
—ও চরণ, ও অঙ্গ, আমার পরশে মলিন হয়ে যাবে,
আমার এ অঙ্গ পাপ কালিমায় ভরা, আপনার স্পর্শের যােগ্য
নয়, আমাকে স্পর্শ ক’বেন না প্রভু।
( মহাপ্রভু সনাতনকে ধরিলেন—দু’জনের রােদন। অনত্মর সনাতনের
হাত ধরিয়া মহাপ্রভু আপনার পাশে বসাইলেন ও এহস্তে
তার অঙ্গ মার্জনা করিতে লাগিলেন।)
সনাতন। (কর যােড়ে) প্রভু, শুনেছি নদীয়ার পথে
একদিন দুরন্ত মদ্যপ জগাই মাধা’য়ের পাপ ল'য়ে ওই সােণার
অঙ্গ ক্ষণেকের জন্য ম্লান হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু আমায় স্পর্শ
কল্পে বুঝি একেবারেই কাল হয়ে যায়। তারা পাষণ্ড ছিল,

কিন্তু প্রতারক ছিল না ; আমরা জেনে শুনেও ঘাের পাপে
লিপ্ত হয়ে আছি।
প্রভু। সনাতন, তুমি দৈন্য ছাড়, তােমার দৈন্তে আমার
বুক ফেটে যায়।
“তােমায় স্পর্শি আত্ম পবিত্রিতে
ভক্তি বলে তুমি পার ব্রহ্মাণ্ড শােধিতে।” (চৈঃ চঃ)
তােমায় নয়নে দেখলে চক্ষু, স্পর্শ করলে অঙ্গ, আর
তােমার গুণ গাইলে জিহ্বা সার্থক হয়।
অক্ষোঃ ফলং ত্বদৃশ দর্শনং হি,
তন্বঃ ফলং ত্বাদৃশ গাত্রসঙ্গ।
জিহ্বাফলং ত্বাদৃশ কীৰ্ত্তনং হি !
সুদুল্লতাঃ ভাগবতাঃ হি লােকে।
দেখ সনাতন, পতিতপাবন দয়াল কৃষ্ণের দয়া দেখ।
মহা রৌরব থেকে তােমাকে উদ্ধার কলেন।
“কৃপার সমুদ্র কৃষ্ণ গম্ভীর অপার।” (চৈঃ চঃ)
সনাতন। প্রভু, আমি কৃষ্ণ জানিনা। আমি জানি আপনি
আমাকে বিষয় :কূপ থেকে কেশে ধরে টেনে তুলে এনেছেন।
(স্বগত) মনে করেছিলাম দেখা হলে প্রাণ খুলে কত কথা
ব’লব, কতদিন মনে মনে কেমন করে কোন কথা বলবাে
ঠিক করে রেখেছিলাম, কিন্তু এখন যেন জানাবার কিছু পাচ্ছিনা,
* ব’লবার কিছু দেখছি না।

প্রভু। তােমার কারামুক্তির কথা সব ধীরে ধীরে শুনবাে। প্রয়াগে তােমার দুই ভাই রূপ অনুপমের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল। তাদের সঙ্গে কৃষ্ণকথা-রসে দশদিন বড় আনন্দে কাটিয়েছিলাম। আমি কাণী চলে এসেছি আমি কাশী চলে এসেছি ,তারা শবৃন্দাবন গেছেন। (চন্দ্রশেখরকে দেখাইয়া) ইনি চন্দ্রশেখর, এর স্নেহে আমাকে এর গৃহেই থাকতে হয়। গৃহেই থাকতে হয়। আর তপনমিশ্র আমাকে নিত্য ভিক্ষা করান। ( সনাতনকে দেখাইয়া দেখাইয়া চন্দ্রশেখরের প্রতি চাহিয়া) ইনি সেই রূপ অনুপমের জ্যেষ্ঠভ্রাতা, নাম সনাতন,জ্ঞান বৈরাগ্য দৈন্যের এতেই স্থিতি-কৃষ্ণের কৃপায় বিশাল রাজ্য, অতুল ঐশ্বৰ্য্য গৃহ পরিজন সব মলবৎ পরিত্যাগ করে দরবেশ বেশে চলে এসেছেন। যাও সনাতন, ক্ষের করিয়ে এস। চন্দ্রশেখর, এর এই বেশ দূর করে দাও। (স্বগত) সনাতনের গায়ে মূল্যবান ভােম্বলটি এখনও রয়েছে—বিষয় ব্যাধির শেষ একটু র’য়ে গেছে। (ভোট- কলের প্রতি বার বার দৃষ্টিপাত)। ( চশেখর ও সনাতনের প্রস্থান।) (মহাপ্রভুর উপবেশন) বাসুদেব সার্বভৌম পাইসু নীলাচলে, রায় রামানন্দ লাগি গেলাম দক্ষিণে, রূপ সনাতল লাগি এলাম রামকেলি এ পাইলাম যাের ভই ঘুনাথে। আরও একজন রয়েছে হেয়।

তার সুরে প্রাণ মােৰ করিছে আকুলি;
জ্ঞানাতিমান বালুকায় রেখেছে
ঢাকিয়া, অন্তঃসলিলা ফন্য প্রায়,
হৃদয়ের প্রেম উৎসরণ প্রাণের
প্রবােধ আমার। কতক্ষণে মিলিব
তােমায় ?
পাঠায়েছি বৃন্দাবনে প্রাণ প্রিয় সঙ্গী
মাের প্রিয় লােকনাথে, বহুদিন আগে,
আমা লাগি ঘুরে সে দক্ষিণে।
ফিরে আসি শুনিবে যখন সেথা মাের
আগমন, প্রাণ বুঝি ত্যজিবে শােকেতে।
পাঠায়েছি ভূগর্ভেরে, সুবুদ্ধি, রূপেরে
এবে সনাতনে প্রেরিব সেথায়। ত্যাগ
বৈরাগ্যের আদর্শ মহান, প্রেম পথের
প্রথম সােপান,
-জানাইবে জগতে ইহারা।
অনিকেতন রবে এরা, একএক
বৃক্ষতলে একএক রাত্রি শয়ন, কভু
বিপ্রগৃহে স্কুলভিক্ষা কভু মাধুকরী,
শুক রুটি ছানা চিবায় ভােগ পরিহরি,
করােয় মাত্র হাতে, কথা ছেড়া বহিবাস।
কৃষ্ণকথা, কৃষ্ণনায়, নৰ্ত্তন উল্লাস।
১০

পানাতন সার্ধ-সপ্ত প্রহর কৃষ্ণভজন, চারিও শান, নামকীৰ্ত্তন প্রেমে, সেহ নহে কোন দিনে। কভু ভক্তিরসশাস্ত্র করিবে লিখন পাণ্ডিত্যের অবধি মাের রূপ সনাতন। ( চন্দ্রশেখর ও মুণ্ডিতকেশ, কষ্যধারী সনাতনের প্রবেশ ) মরি মরি, সহস্র সূর্যের সম ভাস্বর বরণ, দৈন্য কারুণ্য মাখা-নয়নে প্রেমের অশ্রু বৈরাগ্য অন্তরে—কৃষ্ণ যারে কৃপা করে এই মত করে। ( প্রকাশ্যে ) সনাতন, তােমার ভােটুকম্বলটি কোথায় গেল? সনাতন। প্রভু, যে দিন থেকে শুনেছি, আপনার গায় ছেড়া কাঁথা, দ্বারে ভিক্ষা মেগে খান, সে দিন থেকে রাজ- পােষাক রাজভােগ বিষবৎ লাগত, ছেড়া কঁাথা গায় দিয়ে অপার আনন্দ পেতাম।–আসবার পথে ভগ্নীপতি শ্রীকান্তের অনুরােধ এড়াতে না পেরে ঐ ভােকম্বলটি নিয়েছিলাম। আপনি কয়েকবার কম্বলের দিকে চাইতেই আমি বুঝেছিলাম যে, আপনি এ অধমকে নিয়ে যা ক’ত্তে চান, মূল্যবান কম্বল তার বিঘ্ন, তাই গঙ্গার ঘাটে এক গৌড়িয়া কথা শুকোতে দিয়েছে দেখে তাকে বললাম এই ভােট নিয়ে তােমার কথাটা আমাকে দাও। গৌড়িয়া বিশ্বাস কত্তে পারেনি, ব’ললে প্রাচীন হয়েও আমার সঙ্গে উপহাস ক’চ্ছেন কেন? বহুমূল্য ভােট দিয়ে ছেড়া কঁাথা কেন নেবেন?” আমি তাকে ভােটকম্বল দিয়ে তার কঁাথা খানি নিয়েছি। ১৪ এরূপসনাতন প্রভু। হ্যা, আমি বিচার করে দেখলাম, কৃষ্ণ তােমার বিষয়রােগ খণ্ডালেন, সদ্বৈদ্য ত’ রােগের শেষ রাখেন না, তবে তিনি কেন তােমার শেষ বিষয় ভােগ রাখলেন ? তিন মুদ্রার ভােট গায় মাধুকরি গ্রাস। ধৰ্ম্মহানি হয় লােকে করে উপহাস। (চৈঃ চঃ) সনাতন। প্রভু, আপনিই আমার কুবিষয় রােগ খণ্ডালেন, আপনার ইঙ্গিতেই শেষ বিষয় ভােগ দূর হ’ল। প্রভু, নীচ সঙ্গে ত’ জীবন কাটালাম, নিজের হিতাহিত কিসে হয় তা কিছুই জানিনে, ভগববহির্মুখ গ্রাম্য ব্যবহারই শিখেছি- আপনি কৃপা করে যখন আমাকে উদ্ধার কলেন এখন আমার কি কৰ্ত্তব্য তাই বলুন ;- কে আমি ? কেন আমায় জারে তাপত্রয় ? ইহা নাহি জানি কেমনে হিত হয়। (চৈঃ চঃ) প্রভু! কি করে সাধ্য সাধন তত্ত্ব জিজ্ঞাসা কত্তে হয় তা ত’ জানিনা, আপনি কৃপা করে সব তত্ত্ব আমাকে বলুন। প্রভু। সনাতন, তােমার উপর কৃষ্ণের পূর্ণ কৃপা বর্ষিত হয়েছে, তােমার তাপত্রয় নেই, তুমি কৃষ্ণশক্তিধর, সব তত্ত্ব গান ; জেনেও আরও দৃঢ় ভাবের জন্য জিজ্ঞাসা করা সাধুর জগতে ভক্তি প্রবর্তন ক’ব্বার তুমি যােগ্যপাত্র- শুন তােমাকে ক্রমে ক্রমে সব তত্ত্ব বলি ;- কেতুমি ?

জীবের স্বরূপ হয় কৃষ্ণের নিত্যদাস। কৃষ্ণেৱ তটস্থা শক্তি ভেদাভেদ প্রকাশ ॥ (চৈঃ চঃ) এ দাস বেতনভােগী স্বার্থাকাঙ্ক্ষী দাস নয় ;—আত্মনিবেদিত আপনভােলা অশুল্ক দাস। কৃষ্ণ সুখৈকগত প্রাণ, কৃষ্ণার্থে অখিল চেষ্টা যার, আমি কৃষ্ণের, কৃষ্ণ আমার, এই নিত্য সম্বন্ধ ভাব- যুক্ত জীব কৃষ্ণের নিত্যদাস। কৃষ্ণের স্বাভাবিক তিন শক্তি পরিণতি। চিচ্ছক্তি, জীবশক্তি, আর মায়া শক্তি। (চৈঃ চঃ) কেন জীবে জারে তাপত্ৰয় ? কৃষ্ণ ভুলি সেই জীব অনাদি বহির্মুখ। অতএব মায়াজারে দেয় সংসার দুখ । কভু স্বর্গে উঠায় কভু নরকে ডুবায়। দণ্ড্যজনে রাজা যেন নদীতে চুবায়। (চৈঃ চঃ) কেমনে হিত হয় ? সাধু শাস্ত্র কৃপায় যদি কৃষ্ণোন্মুখ হয়। সেই জীব নিস্তরে, মায়া তাহারে ছাড়িয়। দৈবী হে গুণময়ী মম মায়া দুরত্যয়। মামেব যে প্রপদ্যন্তে মায়ামমতাং তরন্তি তে। মায়া মুগ্ধ জীবের নাহি স্বতঃ কৃষ্ণজ্ঞান। জীবের কৃপায় কৈল কৃষ্ণ বেদ পুরাণ। শাস্ত্র গুরু আত্মারূপে আপন জানান। কৃষ্ণ মাের প্রভু ত্রাতা জীবের হয় জ্ঞান।

বেদশাস্ত্রে কহে, সম্বন্ধ অভিধেয় প্রয়োজন।
পুরুষার্থ শিরােমণি প্রেম মহা ধন।
কৃষ্ণ মাধুৰ্য সেবানন্দ প্রাপ্তির কারণ।
কৃষ্ণসেবা করে কৃষ্ণরস আস্বাদন।
কৃষ্ণের স্বরূপ বিচার শুন সনাতন।
অয় জ্ঞানতত্ত্ব ব্ৰজে ব্রজেন্দ্র নন্দন।
স আলি, সব অংশী, কিশাের শেখর।
চিদানন্দ দেহ, সাশ্রয় সর্বেশ্বর।
স্বয়ং ভগবান কৃষ্ণ গােবিন্দপর নাম।
সর্বৈশ্বৰ্য পূর্ণ ঘাঁর গােলােক নিত্যধাম ।
জ্ঞান যােগ ভক্তি তিন সাধনের বশে।
ব্ৰহ্ম আত্মা, ভগবান ত্রিবিধ প্রকাশে। (চৈঃ চঃ)
(গীত)
কফের যতেক খেলা, সর্বোত্তম নলীলা
নরবপু তাহার স্বরূপ।
গোপবেশ বেঞ্চকর নবকিশাের নটবর
নর লীলার হয়,অনুরূপ।
কষ্ণের মধুর রূপ তন সনাতন।
ধে রূপের একক, ডুবায় সব ত্রিভুবন,
সব প্রান্ত করে আকর্ষণ।
রূপ দেখি আপনার, কৃষ্ণের হয় চমংকার,
অশ্বদিতে মনে উঠে কাম।

পেশাজন
মৌভাগ্য যার নাম, সোনালি ও
এইরূপ তার নৃিত্যধাম।
চড়ি গােশ মনােরথে
মথেন নয়
নাম ধ'রে মদন মােহন।
তিনি পঞ্চশর দর্প বরং নব কর্ণ
রাস করে লইয়া গােপীগণ।
নিজসম সখা সঙ্গে
গোগণ চরণ রু
বৃন্দাবনে স্বচ্ছন্দ বিহার।
যার বেণুধ্বনি শুনি, কাবর জম প্রাণ
পুলক কম্প বকে আধার।
মধুর মধুরং বপুর বিভাে
মধুর মধুরৎ বদনং মধুরং।
মধুগন্ধি মৃদুস্মিতমেতদহে
মধুর মধুরং মধু মধুরং।
{ মহাপ্রভুর বাহ্যজ্ঞান লােপ ও সনাতন কর্তৃক ধারণ।
১০৮

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Srirupsanatan

Author
Bosu, Khirodprasad
Title
Srirupsanatan
File name
Srirupsanatan
Text
OCR done
Citation
1927
Published
2009/10/26
Publisher
Bhramhacharya Vidyalaya, Ranchi
Language
Sanskrit
Pages
133
Library
Bally Sadharan Granthagar
Classification
Bengali Plays.
Keywords
Rupsanatan
DLI number
513347
Barcode
4990010020333.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
OUfKyCTYvcN
Download PDF

Srirupsanatan