Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Dada O Didi
Front matter
No text on this page.
দাও দিদি।
( রঙ্গনাট্য )
[ কহিনুর থিয়েটারে অভিনীত ]
শ্ৰীক্ষীরােদপ্রসাদ বিদ্যাবিনােদ প্রণীত।
২০১ নং কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট হইতে
শ্রীগুরুদাস চট্টোপাধ্যায় কর্তৃক
প্রকাশিত।
WILKINS
TOWLEDGE
POINE
IS
কলেজ স্কোয়ার কলিকাতা,
জে, এন, বস্তু দ্বারা মুদ্রিত ।
১৩১৪ ।
মূল্য ০ চারি আনা
No text on this page.
প্রস্তাবনা।
রঙ্গ-পট।
শ্রী-রঙ্গিনীগণ।
গীত।
চন্দ্র কিরণ মাথে।
রবি ভ্রমে ভাই ভুলােনা ভুলােনা,
নিশীথে চলনা বিপথে।
ওই যে দেখিছ
মৃদু শশাঙ্ক
ওই যে দেখিছ তারা,
ওরাই তােমারে, ফেলিয়া আঁধারে
করিবে হে দিশেহারা।
কোন পথে যাবে কেহ না বলিবে
কেহ না লইবে সাথে ।
যা ছিল তােমার যা আছে তােমার
তাই লয়ে সুখী হও হে
থাকিতে চরণ
করিতে ভ্রমণ
কেন পরে ভর দাও হে
রবিত জাগিবে যেমন জাগে হে
প্রতি অরুণিম প্রাতে
দিবসের চলা
দিবসে সার হে
কি হেতু চলিছ রাতে।
No text on this page.
দাদা ও দিদি।
প্রথম দৃশ্য।
চন্দ্রদ্বীপ।
চন্দ্রদ্বীপবাসিগণ।
১ম পুরুষ। প্রাণ যায়—বাঁচবার কি উপায় ?
২য় পু। নিরুপায় -কাজ দাও, কাজ দাও করে সমস্ত দেশ
ঘুরে এলুম, কোথাও কাজ পেলুম না।
১ম পু। যা! তাহলে উপায়। খেতে না পেয়ে প্রাণ যায় ।
কোথাও কাজ মিললাে না ?
৩য় পু। কোথায় মিলবে ! দেশময় পাহাড়, দেশময় বরফ।
গাছে বরফ, ফলে বরফ, ফুলে বরফ। খােরাক বরফ চাপা। সমস্ত
দিন রাত কুড়ল দিয়ে বরফ চেলা কলুম-ফুরুতে পারলুম না
খােরাক পেলুম না--প্রাণ যায় !
সকলে। প্রাণ যায় বাঁচবার কি উপায়।
৪র্থ পু। যার যার কাছে খােরাক আছে, তার তার কাছে
গিয়েছি, কাজ চেয়েছি কিন্তু হায়! কেবল গাল খেয়েছি।
সকলে। পাহাড় কাটো-খােরাক সন্ধান কর।
২য় পু। কেটেছি, কেটেছি—দিন রাত কেটেছি—হপ্তা হা
-
৪
দাদা ও দিদি।
কেটেছি। অনাহারে মরিয়া হয়ে কেটেছি। পাথরের ওপর পাথর,
খােরাক নেই।
১ম স্ত্রী। খাই খাই করে দিন গেল, তবু থােক না এলাে!
২য় স্ত্রী। চোখের জল জমে বরফ হ’লতবু খােরাক না
এলাে !
৩য় স্ত্রী। হাতের যন্ত্র হাতে এটে গেল, তবু থােক না
( তক্ষকের প্রবেশ )
পুরুষগণ। এই আমাদের চাই আসছে । খবর নাও-খবর
-কোথায় খােরাক খবর নাও।
স্ত্রীগণ। চাই! কাম দাও—খােরাক দাও।
তক্ষক। ভাই, সন্ধান করে হতাশ হয়ে এলুম --কোথাও
কাজ মিললাে না!
স্ত্রীগণ। মিললাে না।
সমস্ত দেশ ঘুরে এলুম – কোথাও থােরক মিললো
,
পুরুষগণ। তাহলে উপায় আর যে আমরা বাঁচি না !
এ দ্বীপে আর আমাদের খােরাক নেই। সমস্ত দেশ
বরফে ছেয়ে গেছে। সূর্যের কিরণে বরফ ঝরছে, ঘর বরফ, পথ
বরফ, পাহাড় বরফ। ফল বরফ, ফুল ধরফ, শস্য বরফ।
শুনে আমাদের প্রাণ পর্যন্ত বরফ হয়ে জমে গেল।
তক্ষক। চাদে আর আমাদের ঠাই নেই। এই বেলা মানে
মানে পথ দেখ—দেশের সন্ধান কর ।
স্ত্রীগণ।
দাদা ও দিদি। সকলে। কোথায় দেশ-কোথায় দেশ। ১ম স্ত্রী। ওগাে! সে সােণার দেশ কোথায় বলে দাও। তক্ষক। একটু অপেক্ষা কর। প্রিয়তমা শঙ্খিনীর ওপর দেশের সন্ধানের ভার দিয়েছি। তিনি অতি আকুল প্রাণে, সজল নয়নে চক্ষে দুরবীণ, লাগিয়ে দেশের সন্ধান করছেন। (শঙ্খিনীর প্রবেশ) গীত। ওগাে মিলেছে সন্ধান। আঁধারে আঁধারে ঘুরে চেয়ে দেখি বহু দূরে আকাশে ভেসেছে এক স্থান। কিবা রমণীয় কিবা কমনীয় কিবা সুধাসম লােভনীয় ভেসে এলাে গান ওগাে আকুল করিল মাের প্রাণ। শঙ্খিনী। মিলেছে—মিলেছে--হট্টমালা-হট্টমালা। সকলে। কোথায় কোথায় ? স্ত্রী। হট্টমালা-হট্টমালা-নাম শুনেই পেটের আল অর্ধেক কমে গেল। সকলে। কোথায় চাই রাণী—কোথায় ? তক্ষক। হট্টমালা ? কই দেখি। (শঙ্খিনীর নিকট হইতে দূরবীণ গ্রহণ) সকলে। দেখ চাই! শিগ্গির দেখ। তক্ষক। তাইত, তাইত ! একি! একি সােণার দেশ-
দাদা ও দিদি।
সােণার ঠাট, সােণার মাঠ, সােণার বাট–সােণার জলে নাম লেখা
হট্টমালা !
স্ত্রী। ওগাে ! আমি একবার দেখি—ওগাে! আমি
একবার দেখি।
তক্ষক। দেখ—দেখ—(হাস্য) দেখ প্রিয় সুন্দরি ! দূরবীণ
নিয়ে চোক ভরে, প্রাণ ভরে দেখ। (দূরবীণ দান )
সকলে। বস্ ব-মিলেছে—মিলেছে।
স্ত্রীগণ। (দেখিতে দেখিতে) চল যাই হট্টমালার দেশে।
তক্ষক। ব্যস্ত হয় না, ব্যস্ত হয়াে না। যাবাে বললেই যাওয়া
হবে না। আকাশ সাগরে ভাসতে হবে—অনেক ক্ষীরসমুদ্রের ঢেউ
খেতে হবে। অনেক নক্ষত্র তারা উল্কার ভেতর দিয়ে, তয়ে তয়ে
তরী বেয়ে নিয়ে যেতে হবে। তােমর এক কাজ কর । সবাই
মিলে হাতাহাতি করে, শিগগির আমাদের একটা বেলুন তইরি
করে দাও।
সকলে। বেশ বেশ-চল চাই, তােমাদের জন্যে বেলুন তইরি
করে দিই গে।
গীত।
চল যাই হটমালার দেশে।
তারা গাই বলদে চষে
তারা হীরেয় দাত ঘসে
রুইমাছ পটোল তাদের ভারে ভারে আসে।
সই চুপ করে ওই রয়েছে বসে
দিচ্ছে তুলে অনুমেরু গরাসে গরাসে ।
।
তারা চোখ বুজে
দাদা ও দিদি।
দ্বিতীয় দৃশ্য।
হট্টমালা।-চন্দ্রালােকিত উদ্যান।
চন্দ্রবিন্দু ও চিত্রলেখা ।
চিত্র। মহারাজ।
চন্দ্র। কি প্রাণেশ্বরী।
চিত্র। কি সুন্দর রজনী ।
চন্দ্র। কি তর তর গামিনী কাদম্বিনী।
চিত্র। তার পৃষ্ঠে আরােহণ করে তরতর করে কি ভেসে-
যাওয়া চাদ।
চন্দ্র। ঠিক বলেছ, ওইটে আমি এতক্ষণ দেখতে পাইনি।
কেন না আমি মনে করেছিলুম, চাদ আমার পশ্চাদ্ভাগে ঘুরচে !
চিত্র। ঠিক যেন রাসােদ্যানে, ঘন মেঘের বরণ কালাচঁাদের
কঁাধে, অভিমানিনী কৌমুদী-বরণী রাধা। অর্থাৎ আমি যেরূপ
পতিপ্রেম-পাগলিনী—তাতে আমার অবস্থার সঙ্গে চাদের অবস্থার
কতকটা মিল খাচ্ছে।
চন্দ্র। অর্থাৎ, উঁদকে দেখে তােমার মনে হচ্ছে যেন আমার
কাধে চেপে তুমি বৃন্দাবনে মালপাে খচ্ছি ।
চিত্র। আমার অমন নীচু নজর নয়। মথুরা বৃন্দাবন ? বাড়ীর
দোরগােড়ায় ? আরে ছি ! আমার একেবারে নীলগন—তাতে
আরােহণ—আর চাঁদের বুকে সন্তরণ! ছি তুমি বড় গদ্যময়
আমার এই অপূর্ব প্রেমময় কবিতাময় ভাবটা বুঝতে পারলে না
কেমন করে পারবাে ! মা বসুমতী করুণাময়ী, ভারে
.
দাদা ও দিদি। ভারে ধনরত্ন শস্য সম্পদ ঢেলে দিচ্ছেন--অতি সামান্য আয়াসে বৃক্ষে বৃক্ষে ফল, বাগানে বাগানে ফুল, ক্ষেতে ক্ষেতে ধান-অল্পে সন্তুষ্ট পরিশ্রমী প্রজা ভারে ভারে ক্ষীর দই, অন্ন বস্ত্র এনে তােমাকে জোগাচ্ছে,--এমন সুখের সময়েও যে তােমার সহসা চাঁদে চড়বার সাধ হবে, তা কেমন করে বুঝবে! চিত্র। পতির কঁাধে চড়া, ওত সতীদের মৌরসী করা সাধ। স্বয়ং সতীরাণী দাঙ্গায়ণী জীবন্তে সুবিধে করতে পারলেন না বলে, মরে পতির কাঁধে চেপে ত্রিভুবন ঘুরে বেড়িয়েছিলেন—এত একটা জানা কথা। শেষে জন্ম পালটে পতির বুকে চেপে, হাত খানেক লােল-রসনা বার করে জগতের সতীকে বুঝিয়েছিলেন, তােমর সব অম্লান বদনে পতির বুকে পা দিতে পার, তােমাদের সকলের লজ্জার ভার আমি নিজে গ্রহণ করে, এই জিভ বার করে বসেছি। আর রাধাসতীর কথাত তুমি নিজেই প্রকাশ করে ফেলেছ। সে কি ভাব! 'মনে হচ্ছে তার এখনও ভাবাবেশে প্রাণটা যেন তেউড়ে মেউড়ে উঠছে। ও বাবা ! তেউড়ােনা, তেউড়ােনা-পূৰ্ব্ব যুগে ওর নাম ছিল ভাবাবেশ, আর বর্তমান যুগে ওর নাম হয়েছে ভূতে পাওয়া। ওর অসুধ বড় সুকঠোর—-খড়ম- চিত্র। এখনও ইচ্ছে হচ্ছে, তােমার স্কন্ধে আরােহণ করে ওই চাদের কাছে উড়ে যাই। চন্দ্র। বটে, বটে-তার পর । চিত্র। তার পর তােমাকে বলে লাভ কি ? তােমাতে কি আর রসমাধুৰ্য আছে যে, বললে বুঝবে ! চন্দ্র। • কেন থাকবে না -এই তুমি সেখানে গিয়ে কি
मामा ७ मिनि।
করবে বলি শােন না--তুমি সেই চন্দ্রিকা কিরণে অঙ্গ মিশিয়ে টপ্পা
গাইতে গাইতে, চঁাদের গায়ে ঢু মারবে, অবশেষে চাদের নােলক
হয়ে দুলতে দুলতে আমাকে দেখা দেবে আর গাইবে—‘বঁধু কি
আর বলিব আমি,
চিত্র। উঃ! চাদটা যেন আজ কেমন কেমন হাসছে।
চন্দ্র। আসল কথা-হট্টমালাটা তােমার আর ভাল
চিত্র।
লাগছে না।
কেমন করে লাগবে ! হট্টমালার সব ভাল, কেবল
বারােমাস চাদের আলাে নেই।
চন্দ্র। ঠিক বলেছ, এতকাল এ কথাটা আমার মনেই হয়নি।
আমাদের এই যে একটা প্রকাণ্ড অভাব তাতো আমরা জানতুম না।
চিত্র। ফি অমাবস্যায় অন্ধকার ।
দেখ দেখি চাদের কত বড় অন্যায়। বড় জোর না হয়
দু’টো একটা অমাবস্যা ফাক দে।
চিত্র। তার ওপরে বাদলা না হলে ধান হয় না ।
চন্দ্র। ঠিক বলেছ, বাদলা না হলে ধান হয় না।
চিত্র। ওদিকে ক্ষেতে ধানও গজাবে, এদিকে কাদায় হাঁটু
বুড়ে যাবে। ছি, ছি, দু’মুটো চালের জন্যে পদপঙ্কজে পঙ্ক!
চন্দ্র। ঠিক বলেছ প্রাণেশ্বরী! তােমার কৃপায় আমি এখন
হট্টমালার নানা দোষ দেখতে পাচ্ছি। ধান হবিত গাছে হ, না হয়
পাহাড়ে হ।
চিত্র। অতদূধই বা কেন, একেবারে মরাইয়ের ভেতর গিয়ে হ
—মাঠে কেন? ধানটাও হবার সময় হবে, আর মেঘে মেদিনী
ছেয়ে ফেলবে।
দাদা ও দিদি।
চন্দ্র। মেঘ হলি, সময় বুঝে হলি। রদ্দর মাথায় লাগলাে-
অমনি এসে ছাতা ধরলি ।
চিত্র। আর চাদও উঠলাে, অমনি ফর ফর করে উড়ে গেলি।
চন্দ্র। মনটা যখন নিঝুম মেরে গেছে, তখন গুড় গুড় করে
দু’টো মিষ্টি আওয়াজ দিয়ে মনটা আবার চাঙ্গা করে দিলি।
চিত্র। হ’লবা দু’টো ইলশে গুড়নি-
চন্দ্র। বস্। হট্টমালার দেখছি নানা দোষ।
চিত্র। চঁাদে বােধ হয় বাবােমাসই আলাে ?
চন্দ্র। কোনও রকমে চাদে একবার যাওয়া যায়
চিত্র। রাবণ রাজা ম’ল, স্বর্গের সিড়িটে করে মরত।
চন্দ্র। বেশ, আমরাই না হয় সিড়ি প্রস্তুত করি।
( ত্রিজটার প্রবেশ।)
ত্রিজা।
ও বাবা! ফানুষের ভেতর মানুষ !
চিত্র। কি বলছি।
ত্রিজটা। তাইত বলি, চিপ করে শব্দ হ'ল কেন ? ও বাবা !
ফানুষের ভেতর মানুষ।
চন্দ্র। • ফানুষের ভেতর মানুষ কি ?
ত্রিজটা।
ও বড় ঠাকুর--ও ঠাকুরাণ ! দেখবে এস দেখবে
এস—ফানুষের ভেতর মানুষ। ঢিপ করে শব্দ হ’ল শুনে ভাদ্দর
মাসের পাকা তাল পড়েছে মনে করে কুড়তে গেলুম। গিয়ে কি
লজ্জা ! ফানুষের ভেতর মানুষ।
উভয়ে। আরে মল ! কি পাগলের মতন বলছি।
ত্রিজটা। হাত দিয়ে দেখি যেন ব্রহ্মতাল—নেড়েচেড়ে দেখি
मामा ७मिमि
যেন কুপাে—তুলতে দেখি শুশুক --কালাে কালাে, ফুলে ফুলে,
গােলালে গােলালাে-তারপর দেখি --ও বাবা! এক জোড়া
মানুষ এক পরী, এক পরা। আহা কি চেহারা ! কি মিষ্টি
হাসি--কি রূপসী! এস এস, দেখবে এসে দেখবে এসাে। বলে
আমরা চাদের দেশ থেকে এসেছি।
উভয়ে। যা বলিস্ কি !
ব্রিজটা। দেখবে এস-দেখবে এস।
তৃতীয়
দৃশ্য।
পল্লী-পথ ।
কৰ্ম্মানন্দ।
কৰ্ম্ম। জাননা মুখ ! এ অসন্তোষের পরিণাম কি ! এমন
ফল-জল-শস্যপূর্ণ বসুন্ধরা, এমন কুসুম-কানন-বাহিনী স্রোতস্বিনী,
এমন মরীচিমালীর সপ্তবর্ণ-রঙ্গময়ী শিখরিণী – এতেও তােমাদের
মন উঠল না । এমন ওষধিপূর্ণ উপত্যকা, সুবর্ণশিপূর্ণ শৈলমালা,
মুক্তাপূর্ণ জলনিধি-এ পেয়েও তােমাদের তৃপ্তি হ’লনা। তাই
যার বহিরাবরণ শুধু সুন্দর-নিৰ্ম্মম কঠোর অভ্যন্তর, একপাশ্বে তরু
লতা শূন্য, জীবন্ত চির অনাবৃত, চির অন্ধকার কবলিত তুষার
প্রান্তর-উত্তাপহীন প্রাণহীন সেই চন্দ্রলােকে যেতে তােমাদের সাধ
হ’ল! তবে যাও। ভগবান কারও ঐকান্তিক কামনা কখন
অপূর্ণ রাখেন না। যা পেতে চাচ্ছ, তা তােমার দ্বারদেশে এসে
দাদা ও দিদি।
উপস্থিত হয়েছে। তাকে আলিঙ্গন কর, আর বক্ষের পঞ্জরে পঞ্জরে
সে সাগ্রহ আলিঙ্গনের ফলভােগ কর। প্রচণ্ড ঝড়ের সঙ্গে ঘনাবর্তে
কাদম্বিনী তােমাদের অদৃষ্ট আকাশ আচ্ছন্ন করতে আসছে।
অন্ধকারে, সে দুর্দিনে কৰ্ম্ম লয় পাবে, ধৰ্ম্ম শুধু নামে অবস্থিতি
করবে। থাকবে কি—অবসন্ন-হস্তপদ কৰ্ম্মহীনের মুখবিনির্গত
কতকগুলাে নিরর্থক বাণী। শুধু ভিখারীর সম্বল—সমস্বরে তারস্বরে
চীৎকার। আশ্রয়হীন সম্বলহীন ভিখারীর সে দুর্দিন আমি চোখের
ওপর দেখতে পাচ্ছি।
( কমলার প্রবেশ।)
কমলা। তাইত। আমার মনটা কেমন কেমন করছে কেন?
শরীরটা এমন থাকচে থাকচে অবসন্ন হচ্ছে কেন? চোক দুটো
কেমন যেন পলক ভারে জড়িয়ে আসছে। একি! চাঁদ যেন
কঁপছে—প্রকৃতিও যেন উঁদের কিরণে আপনাকে প্রপীড়িত বােধ
করছে। তরুপত্রের মৃদুল পবনভারও যেন সহ্য হচ্ছে না—যেন
বিরক্তি সহকারে বলছে, কি কর—আমাদের একটু নিশ্চিন্ত হয়ে
নিদ্রা যেতে দাও। কেন এমন হল! এমন হাস্যময়ী প্রকৃতি
প্রফুল্ল চন্দ্র কিরণেও হঠাৎ এমন ম্লান হ’ল কেন ? তাইত ! পিতা
যে আমার যােগে বসেছিলেন। তাঁর যােগভঙ্গ করলে কে।
এমন ত কখন হয়না। পিতার আমার এমন অসময়েত ধ্যানভঙ্গ
হয়না। পিতা গেলেন কোথায় ! কে তাঁর আশ্রমপীড়া উৎপন্ন
কৰ্ম্ম। কমলা।
কমলা। কে, পিতা ?
দাদা ও দিদি
কৰ্ম্ম। কি দেখছ ?
কমলা। কেন পিতা এমন দেখছি—চালােকেও আকাশ
স্নান, প্রকৃতি বিষগ্ন, আপনার ধ্যান ভঙ্গ ।
কৰ্ম্ম।
চল হিমালয়ে যাই।
কমলা। তাহলে এই যে বসুন্ধরা বক্ষে মলিনতা, এই যে
কৌমুদী অঙ্গে বিষাদ রেখা, এই যা সব দেখছি, একি তবে আমার
চোখের দোষ নয় ?
কৰ্ম্ম। যা দেখছ, তা সত্য। এখনও দেখতে পাচ্ছ, এর
পরে আর পাবে না। চক্ষু জলে ভরে যাবে। চল হিমালয়ে
যাই।
কমলা। এখানে থাকা কি আপনার অসুবিধা বােধ হবে ?
কৰ্ম্ম। হবে কি, এখনি হচ্ছে। দূরে একটা কোলাহল
শুনতে পাচ্ছনা ?
কমলা। তাইত পিতা, এ কিসের কোলাহল ?
কৰ্ম্ম। অসন্তোষের কোলাহল। এরা আর এত সুখেও মুখ
পাচ্ছেনা, দেশ আর এদের ভাল লাগছেনা। এরা একেবারে
চন্দ্রলােকে যেতে চায়। সুতরাং তুমিও এখানে আদর পাবে না,
আমিও পাবনা।
কমলা। আপনি যেখানে আদর পাবেন না, আমিত সেখানে
স্থানও পাবনা।
কৰ্ম্ম। তাহলে আমার ব্যবহারের সামগ্রীগুলাে সংগ্রহ কর।
নিয়ে সূর্যোদয় হতে না হতে এস্থান ছেড়ে যাই চল।
কমলা। যথা আজ্ঞা।
[ প্রস্থান।
২
১৪ দাদা ও দিদি। (পুরুষ ও স্ত্রীগণের প্রবেশ।) === সকলে। চল্ চল্—ওইদিকে-ওইদিকে। ১ম স্ত্রী। আরে মর মিনসে ঘাড়ে পড়ি কেন ? ১ম পুরুষ। আরে ম মাগী ! ঘাড় নিয়ে পথে বেরিয়েছি কেন-ঝাড়া হাত পায়ে থােকসসা আসতে পারিনি। সকলে। চ চ- (এ উহাকে সে তাহাকে ঠেলিয়া কোলাহল করিতে করিতে গমন) ২য় পুৰুষ। ওরে পথের মাঝে কে একজন রাস্তা আগলে দাড়িয়ে আছে। সকলে। ঠেলে চল—ফেলে চল। [ কৰ্ম্মানন্দকে ভূমে ফেলিয়া প্রস্থান। কৰ্ম্ম। বেশ, প্রারম্ভেই এই। আর বিলম্ব করলে, আরও কত দুর্দশা হবে, তার ঠিক কি। (জনৈক পুরুষ ও জনৈকা স্ত্রীর প্রবেশ) যা’—সব মাটী হ’ল—সবাই আগে পৌছুল, সব সামগ্রী লুঠ হয়ে গেল, আমিই কিছু পেলুমনা ! হতভাগা মাগীর জন্যে আমি সময়ে বেরুতে পারলুমনা, আমিই ফঁাক পড়ে গেলুম। স্ত্রী। ওগাে ! আস্তে আস্তে, আমি চলতে পারছিনা। পুরুষ। তােকে আর চলতে হবেনা, তুই খোঁড়া হয়ে পড়ে থা, আমি একেবারে নিশ্চিন্ত হই। আমি কি তাের জন্যে সব খােয়াব-কত লােকে কত কি আনছে, আর আমিই কেবল ফাঁক পড়ে গেলুম। চলে আয়-চলে আয়।
দাদা ও দিদি।
স্ত্রী।
স্ত্রী। ওগাে তােমার পায়ে পড়ি।
পুরুষ। আরে দুত্তোর পায়ে পড়ি।
স্ত্রী। ওগাে তােমার দু’টী পায়ে পড়ি।
পুরুষ। একটা হ’লনা, আবার দু’টো, নে, তবে পড়,
আমার পায়েই পড়!
স্ত্রী। দাড়ালে কেন?
পুরুষ। তাইত, তাইত—দাড়ালুম কেন! এমন পথের মাঝে
বালির গদি, এমন স্থানে না শুয়ে আমি দাড়াসুম কেন! (শয়ন)
নে পা মেলিয়ে দিয়েছি—পড়।
ও কি, তুমি পাগল হলে নাকি !
পুরুষ। আবার পা—গােল! তাহলে আমি বেনের পুটুলি
হলুম-নাও, এই বারে তুমি পরীক্ষা কর—পা লম্বা কি
গােল।
এ যে দেখছি, আকাঙ্ক্ষার প্রারম্ভেই স্ত্রীপুরুষে বিবাদ।
কি বাপু ! তুমি পথের মাঝে শুলে কেন ?
পুরুষ। তােমার কি চোক খারাপ হয়েছে-একি পথের
মাঝ -- এ দুগ্ধফেননিভ সুকোমল শয্যা-এখানে শুয়ে কত সুখ,
শুয়ে তুমি একবার পরীক্ষা করে দেখতে পার।
কৰ্ম্ম। যেরূপ মত্ত হয়ে চলেছে, তাতে পথে শােয়াই তােমা-
দের পরিণাম দেখছি।
স্ত্রী। ওগগা ! মশা’য়, বুঝিয়ে-ভুলিয়ে, আমার স্বামীকে
তুলে দাও না গা।
তােমার স্বামী যেরূপ ক্রুদ্ধ হয়েছেন, তাতে তার
ওঠবার ত লক্ষণ দেখছি না।
কৰ্ম্ম।
কৰ্ম্ম ।
দাদা ও দিদি।
স্ত্রী।
ওর যে অন্যায়, সবাই স্ত্রী পুরুষে যাচ্ছে—ও কেবল
আমায় ফেলে যাবে।
কৰ্ম্ম। কোথায় যাচ্ছ ?
স্ত্রী। নদীর ধারে কি একটা ফানুষ পড়েছে--তার ভেতর
থেকে নাকি একটা বাছুর আর একটা গাই বেরিয়েছে। সবাই
বলছে, কৈলাস থেকে নাকি কপিল নেবে এসেছেন, যে যা চাচ্ছে,
সে তাই পাচ্ছে।
পুরুষ। দেখ দেখি মশা’য় ! সবাই সব পেলে, আর আমি
ওর জন্যে ফাক পড়ে গেলুম।
কৰ্ম্ম। তােমরা কি আনতে যাচ্ছ ?
পুরুষ। এইবারেই ত গণ্ডগােল, আনবার জন্যে বাড়ী ছেড়ে
ও ছুটে এলুম-কিন্তু কি আনতে যাচ্ছি, তাতো জানি না। বল
না কি আনতে যাচ্ছিস্?
স্ত্রী। আমি যাচ্ছি তাের সঙ্গে, তুই কি আনতে যাচ্ছিস
তা আমি কি জানি। যা আনবি, তার ভাগ পাবে।
পুরুষ। দেখলে, ছােট লােক বেটীর আক্কেল দেখলে~-পথের
মাঝে ভদ্রলােকের সামনে আমাকে ব্যভ্রম করে ফেললে ! তােমার
জন্যে আমি রাস্তায় কাদামেখে পড়ে রইলুম, আর কি আনতে যাচ্ছি
আমি বলবাে !
স্ত্রী। বলবাে-আমি বলবাে ? কাদা মাখার গুমাের দেখাচ্ছ ?
তবে আমিও এই কাদা মেখে পড়ে রইলুম।
কৰ্ম্ম। বলি, যাচ্ছ যখন, তখন একটা অভাব অনুভব করেছ ত?
অবশ্য করেছি।
কৰ্ম্ম। কি অভাব?
।
পুরুষ।
দাদ। ও দিদি। স্ত্রী। এইবারে ঠিক হয়েছে—ব মিনসে তাের কিসের অভাব? পুরুষ। তাই ত! কিসের অভাব ! ধানভরা মরাই, ফল- ভরা গাছ, পুকুর পােরা মাছ, গরু বাছুর, ছেলে পুলে, গয়না কাপড়, টাকাকড়ি, এই এমন পেছনে-ছােটা স্ত্রী, আমার কিসের ০ কৰ্ম্ম। কি অভাব জান না, তবু অভাব পূরণ করতে পাগলের মতন ছুটেছ ? পুরুষ। ওইটুকুই ত মজা। দেখছ না, আমি কি একা ছুটছি, দেশশুদ্ধ লােক ছুটেছে। স্ত্রী। বুঝেছি মশা’য় ! চল্ বেআক্কেল ঘরে চল্। পুরুষ । বটে! আমি চলে যাই, আর সবাই মজা ভােগ করুক। কৰ্ম্ম । ভগবান সমস্ত উপভােগ্য বস্তু তােমাকে দান করে- ছেন --মূখ! তথাপি তুমি আবার কি ভােগ করতে চলেছ ? পুরুষ। আমি তােমায় বলি, আর তুমি আগে গিয়ে আত্মসাৎ কর। কি ভােগ ?--কৰ্ম্মভােগ। কৰ্ম্ম। তথাস্তু, তাই ভােগ কর। [ প্রস্থান। স্ত্রী। কি করলি মিনসে ! ঠাকুরের অভিশাপ খেলি! পুরুষ। খুব করেছি, তােমার মতন অমন পিছু-ডাকা স্ত্রী যেখানে, সেখানে কি আর সীতাভােগ খাব। নে—চল, কৰ্ম্মই ভােগ করিগে চল। শুধু আমার নয়, আমার মতন যে যে এ । মরীচিকার অন্বেষণে চলেছে, তারই কৰ্ম্মভােগ। [ উভয়ের প্রস্থান।
১৮ দাদা ও দিদি। ( কমলার পুনঃ প্রবেশ) গীত। যাই যাই চলে যাই আর হেথা ঠাই নাই। এরা আমায় ফেলে নেশার ঘােরে মেতেছে সবাই, আমি কেঁদে পাছে ফিরি, আমারে দেয় দূর করি, বলে কোথা হতে এলাে আপদ বালাই। আমি যাই চলে যাই--- আমার সাধের যাতা, সাধের চাকা, সাধের চর্কা খানি, আমার সাধের মাকু, সাধের হাল, সাধের নেই ছেনি ; মামার সাথের সাথী তারা আমার প্রাণের বােন ভাই- তারাও চলে আমার সনে, তাই শােকের সীমা নাই । চতুর্থ দৃশ্য- ? নদীতীরস্থ উপবন—অদূরে ব্যোমযান। শঙ্খিনী ও চন্দ্রদ্বীপবাসিগণ । তক্ষক, গীত। আহা এমন সােনার দেশ। হেথা নাইকো দুখের লেশ। স্ত্রীগণ -হেথা গাছে গাছে লতায় পাতায় ফলেছে সন্দেশ ( থােলাে থােলে )
দাদা ও দিদি।
১৯
পুরুষগণ—ভােগ করতে ভাই, কেউ কোথাও নাই--
আছে কটী মেষ।
স্ত্রীগণ
তবে কাজ কর না শেষ
এলিয়ে চিকন কেশ,
সকলে- মনের মতন বেশ ক'রে ঐ চল সােণার দেশ।
তক্ষক। যাও ভাই সব, যতক্ষণ না আমরা ফিরি ততক্ষণ ওই
জঙ্গলের ভিতর লুকিয়ে থাক।
[ তক্ষক ও শঙ্খিনী ব্যতীত সকলের প্রস্থান।
তক্ষক। বস্ ! আর কি, আর কি, এতদিনে আমাদের
পরিশ্রম সার্থক, জন্ম সার্থক।
শঙ্খিনী। আমাদের দেশের বরফ সার্থক, পেটের ক্ষিধে
সার্থক। পেটের জ্বালায় আমরা দুরবীণ কসেছি, হট্টমালাকে
গ্রেপ্তার করেছি।
তক্ষক। জিজ, ঝাংষ জুগগাপিষা, চিকিমিষা, বিজীঘিষা-
শঙ্খিনী। ও বাবা! ও কিগাে ! বুকটো ঢিপ ঢিপ করে
ও কিগো !
তক্ষক। ওই এখন আমাদের মূলমন্ত্র গাে! ভয় কি, ভয় কি,
মূলমন্ত্র শুনে কাতর হও কেন? তােমাকেও এই মন্ত্র অভ্যাস
করতে হবে, দিবানিশি জপ করতে হবে।
শঙ্খিনী । আওয়াজ শুনেই যখন প্রাণ চমকে উঠল, তখন জপ
করবো কেমন করে ? অর্থ টা কি বুঝিয়ে বল ।
তক্ষক। জিংঘা অর্থাৎ কিনা জিঘাংবা, অর্থাৎ মূলমন্ত্র হচ্ছে
সংহার—সব খেতে হবে। এখানকার মাটী থেকে আরম্ভ করে
উঠেছে।
দাদা ও দিদি। মানুষ পশু পক্ষী ঘর বাড়ী—এমন কি উপরে খেচরদের মধ্যে ঘুড়ী আর নীচে চতুস্পদদের মধ্যে তক্তপােষ পৰ্য্যন্ত উদরগত করে হট্টমালার নাম সুধা দিয়ে গণ্ডুষ করতে হবে । বুঝেছে, কিন্তু জুগগাপিষা, অর্থাৎ জুগুপ্সা অর্থাৎ মূলমন্ত্র গােপন করে রাখতে হবে-কাক পক্ষী পর্যন্ত কেউ যেন এ মনের কথা জানতে না পায়, জানবাে কেবল তুমি আর আমি,—তা হলে সঙ্গে সঙ্গে করতে হবে চিকিমিষা অর্থাৎ চিকিৎসা - বােঝাতে হবে, তােমাদের বিষম বােগ-তােমরা অসুধ না খেলে আর বাঁচবে না। আর যেমন অসুধ ধরা,অমনি বিজীগি - অর্থাৎ সমস্ত দেশটী—(ইঙ্গিতাভিনয়) বুঝেছ ? শঙ্খিনী। বা! বা! কি কঠোর শ্রবণভেদী শব্দের ভেতর কি মধুর অর্থ, যেন বরফ-চাপা কমলমধুর কুল্পী। জিঝঝাংষা, জুগােপিষা। তক্ষক। চিকিমিষা–বিজীগিষা---কিন্তু প্রাণেশ্বরী সাবধান এ মহামন্ত্র যেন কোন রকমে প্রকাশ না হয়। শঙ্খিনী। বা! এ কি একটা প্রকাশ করবার কথা- পরপুরুষের সঙ্গে রসালাপ যেরূপ স্বামীর কাছে গােপনীয়, এও তদ্বৎ- তক্ষক। এই তাহলেই তুমি ঠিক বুঝেছ - বস্তবে আরকি—জিং, জুগােপিষা—মুখে এক, প্রাণে আর। শঙ্খিনী। চিকিমিষা বিজিগীষা--মুখে রােগের প্রতীকার, প্রাণে অস্ত্র ক্ষুরধার। তাহলে আর কেন--এস আবিষ্কারে অগ্রসর কি মিষ্টতীব্র—মাটীতে সােণার গন্ধ-দেখছনা একি দেশ ! এ যে একটী সােণার চাদর মােড়া, গােলাপী আতরের
দাদা ও দিদি।
পালঙ্ক। ক্ষীরের ওড়ন, মধুর পাড়ন-গায়ে জড়াও, প্রাণে
জড়াও, দেদার খাও।
তক্ষক। নাকুর বদলে চাকু পেলুম টাক ডুমাডুম ডুম ।
শঙ্খিনী। আর চাকুর বদলে মাকু পেলুম টাকডুমাডুম
ডুম।
গীত।
প্রাণ আর ধৈর্য মানে না-
দেখেই তােমায় প্রাণ জ’লে যায় ও আমার চাদের কোনা।
তুমি লুকিয়ে আছ এতদূরে, আমরা খুজে মরি ঘুরে ঘুরে,
তাইতে এলুম তােমার ঘরে করবাে বলে আনা গােন।
তক্ষক। চুপ চুপ—লােক আসছে-লোক আসছে।
শঙ্খিনী। আসুক --আমার প্রাণে প্রেমের অকুল পাথার
প্রবেশ করেছে।
তক্ষক। বলকি -বলকি-তাহলে আমার বেন ভেসে
যাবে।
পঙ্খিনী। যাক্-আমি তােমায় ফুৎকারে চন্দ্রলােকে পাঠিয়ে
দেব।
তক্ষক। এলাে-এলাে–করকি, শুনে ফেলবে।
শঙ্খিনী। কি করি প্রাণেশ্বর। এখানকার মাটার গন্ধে যে
নেশায় বোঁদ হয়ে গেছি।
তক্ষক । বোদ হলে হবেনা--ধৈৰ্য্য চাই, ধৈৰ্য্যচাই। দেখ
যদি কোন রকমে হট্টমালাবাসীরা আমাদের মনের কথা জানতে
পারে, তাহলে বিষম বিপদ ঘটবে—বুঝেছাে মদিরাক্ষী। যদি
দাদা ও দিদি।
নেশায় বোঁদ হয়ে, কোনও প্রকারে আত্মপ্রকাশ করে ফেল, তাহলে
তােমার এ বিশ্বপ্রেমের ফল প্রত্যাশী হয়ে, সবাই মিলে ধরে তােমা
থেকে কলম বার করে যে যার নিজের বাগানে পুতে ফেলবে।
আর এদিকে (সুরে) আদরে আমাকে দড়ী দিয়ে নাকে
সেই গাছের গােড়ায়-চক্ষে ঠুলি—এস বঁধু এস বঁধু বলি
কত বুলি বলে দেবে ঘুরিয়ে
অমনি মরমে যাবলাে মরিয়ে।
শঙ্খিনী। বেশ, ধৈৰ্য্যই ধারণ করলুম।
তক্ষক। ধৈৰ্য্যধর, ধৈৰ্য্যধর --আর বল জিংষা, জুগােপিষা
শঙ্খিনী। চিকিমিষা, বিজিগীষা।
গীত।
তক্ষক।
জিজ ঝাং জুগােপিষা,
শঙ্খিী। চিকিমিষা বিজিগীষা
উভয়ে এসেছি পেটের দায় হট্টমালায় করতে মােরা বাসা।
জিজ ঝাংষা ইত্যাদি)
এখানে পেটটা খুব চলবে ভাল—নাইকো কিছু মানা,
শঙ্খিনী। দেখছনা গাে চারদিকেতে চরচে ভেড়ার ছানা,
এদের সব কটাকে ফেললে গালে মজা হবে খাসা।
( জিজ, ঝাংষা ইত্যাদি -- )
এরা পেটটা ভােরে খেয়ে খেয়ে হয়ে গেছে টোসা,
শঙ্খিনী।
তাই যত পারি নেব শুযে-রাখব ফেলে খােসা,
আহা এদের তরেই মােদের এত কষ্ট করে আসা।
( জিজঝাংষা ইত্যাদি)
উভয়ে ।
*
উভয়ে।
দাদা ও দিদি।
চিত্র।
দেখছনা ওই
(চন্দ্রবিন্দু, চিত্রকলা ও ভৃত্যের প্রবেশ )
ভৃত্য। ওই প্রভু! ওই। ওঁরা দু’জনে আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ
করবার জন্যে, ওই অবস্থান করছেন।
চল চল—প্রাণেশ্বর ! দেখা করবে চল।
চন্দ্র। ধীরে ধীরে রাণী-ধীরে আমার কোমর ধরে।
দূরে
রসাল গাছের গােড়ায় ফানুষ বাঁধা—তােমায়
দেখেই দুলছে, ঢাউস হয়ে ফুলছে—যেন হেলতে হেলতে দুলতে
দুলতে বলছে-
এস এস প্রিয়ে এস একটু তাড়াতাড়ি
তােমায় নিয়ে এক দৌড়ে চাদের কাঁধে চড়ি।
শঙ্খিনী | প্রাণরক্ষক তক্ষক -ঠিক বলেছিলে, মেষেরই দেশ
বটে। দর্শনমাত্রেই জীব সড় সড় করছে।
তক্ষক। চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকো—কি করে দেখ।
ওরে কি
হাসিমাখা—একটী।
চন্দ্র। রসমরি! তাহলে তুমি এগােয়, যেহেতু তুমি বড়
রসাল ভালবাসাে।
চিত্র। তাই যাচ্ছি—কিসের ভয় !
চন্দ্র। শুধু তুমি গেলেত হবে না, আমারওত যাওয়া চাই।
চিত্র। যাওয়া চাইত সঙ্গে এস।
চন্দ্র। সঙ্গে যদি একান্তই যেতে হয়, তাহলে তােমার
আঁচলটা দাও।
চিত্র। ছি! তুমি বড় ভীরু।
২৪ দাদা ও দিদি চন্দ্র। আরে ভীরু নয়,--সাবধান। চিনিনি শুনিনি-কখন দেখিনি—ক্ষিধে পেলে কি খায়, তা জানিনি—তুমি আমার ননীর পুতুল, তার মুখের কাছে যাবে--কি জান আঁচলটা হাতে থাকা ভাল—যদি ভুলে তােমাকে মুখের ভেতর পূরে ফেলে তাহলে আঁচল আমার হাতে-ঘ্যাচ করে এক টান মারবাে-আর হড়াৎ করে, তুমি বেরিয়ে পড়বে। তার পরেই, দে তার পরেই দে ছুট -কিন্তু তুমি আমার চেয়ে একটু দ্রুতগামিনী কিনা—আঁচলটা হাতে রইল, তােমার সঙ্গে ছুটতে না পারি, গড়তে গড়াতে যাব। ( ভৃত্যের অগ্রগমন ) ভৃত্য। বেশ আমি এগিয়ে যাচ্ছি-এই আমাদের রাজা রাণী এসেছেন। তক্ষক। য়া—রাজা রাণী' (অগ্রসর হইয়া অভিবাদন করিতে করিতে ) প্রভু ! হটমালেশ্বর ! হটমালেশ্বরী- আমরা পদের দর্শন করতে চন্দ্র। বটে! বটে!-ই-ই-প্রেয়সী-বিদেশী প্রেম পিয়াসী কর কি–কর কি --সাধুভাষা -- সাধুভাষা । চন্দ্র। আচ্ছা আচ্ছা-আপনারা যখন প্রেমপ্রয়াসী হয়ে, এই রাত্রি শেষে, শারদীয় মাসে, আমাদের দেশে এক নিশ্বাসে, একটী ফানুষে চেপে আগমন করেছেন--- এবং নিজগুণে কৃপা করে, এই অধীন ও অধিনীকে দর্শন দিয়েছেন- চিত্র।
मामा ७मिति। २९ চক্র। চিত্র। তাহাতে অত্রানন্দ পর। চন্দ্র। কিন্তু আমরা যে স্বকীয় বিদ্যাবুদ্ধি বলে, এই ভুবনমণ্ডলে আপনাদের দম্পতীকে সম্প্রতি কোনও আনন্দ প্রদান করতে পারি-- চিত্র। তাহাতে সম্যক সন্দেহ। চন্দ্র। তাহলে এই দীনের পর্ণকুটীরে পদার্পণ করে তার পূৰ্বজন্মার্জিত পুণ্যপুঞ্জে-- চিত্র। গুঞ্জরিত অলির ন্যায়-- চন্দ্র। কিছুদিন উপবিষ্ট হয়ে, অক্লিষ্টভাবে চিত্র। মধুপান করুন। তাহলে -করুণাময় আর করুণাময়ীর কোথা থেকে • আগমন হচ্ছে? তক্ষক। আজ্ঞে মহারাজ! আমরা চন্দ্রদ্বীপ থেকে আছি। চন্দ্র। যা! চন্দ্রদ্বীপ ! প্রাণেশ্বরী। শীঘ্র এঁদের সম্বর্ধনা কর—এরা তােমার শ্বশুরের দেশ থেকে আসছেন। চিত্র। বটে-বটে! তাই বুঝি ওকে দেখে আমার প্রাণটা কুটুম্বু কুটুসু করছে—আসুন—আসুন। তক্ষক। চন্দ্রদ্বীপ শ্বশুর বাড়ী কি রকম ? চন্দ্র। আমার নয়-এর। তা বুঝি জানেন না—আমি যে চন্দ্রবংশ । তক্ষক। বটে-বটে। চিত্র। আমাদের কুটুম্বু! আসুন আসুন- তক্ষক। আমাদের রাজা কোনও রকমে জেনেছেন যে, হট্টমালার রাজা ও রাণী বড়ই কষ্ট পাচ্ছেন, তাই তিনি বল্লেন দাদা ও দিদি। শীঘ্র তােমর বেলুনে চেপে, হট্টমালায় গিয়ে তাঁদের দুঃখ দুর কর। চন্দ্র। সুখী হলুম। চিত্র। বেলুন - ওর নাম বেলুন—তাইত ভাবি রুটী বেলবার সময় আমার প্রাণটা এত উড়, উড়, করছিল কেন ? বেশ-বেশ শুনে বড়ই কিন্তু আমাদের যে কি দুঃখ সেটা বুঝতে পারলুম না ! তক্ষক। তা পারবেন না-হাজার চেষ্টা করলেও পারবেন না। চন্দ্র। বটে! তাহলে সে বেজায় দুঃখ। আমরা জানতে পারবে না সেটা জানবে কে ? তক্ষক। জানবাে আমরা শঙ্খিনী। আর জানাবো আমরা- চন্দ্র। আর আমরা কেবল দুঃখু ভােগ করব ? বাঃ বাঃ! কি দুঃখু -তাইত ভাবি—আমাদের কি একটা বিপুল দুঃখু—অথচ বরতে গেলেই ফসকে যায় বাঃ! বাঃ! চিত্র। তাইত ভাবি ! খাই দাই ঘূৰ্তি করি—তবু কেন-- তবু কেন—আরও স্ফুর্তি করি না। ঘুম পায় ত— আরও পায় না কেন? আবেশে গা টলেত আরও টলে না কেন? স্ফুৰ্ত্তিতে বুক ফোলে ত আরও ফোলে না কেন? তক্ষক। এই—এই বারে কতক কতক বুঝতে পেরেছেন। খেয়ে ক্ষিধে মরে যাবে ? দিবারাত্রি খাব না ? শঙ্খিনী। ঘুমিয়ে ঘুমের নেশা যাবে—বারাে মাস ঘুমুবাে না! তক্ষক। এই দেখুন আপনার হাতের দুঃখু—ছড়ি নেই (চন্দ্র- বিন্দুর হস্তে ছড়ি দান ) দাদা ও দিদি। २१ শঙ্খিনী। এই দেখুন আপনার বুকে দুঃখু—ঘড়ী নেই .( চিত্রলেখাকে ঘড়ী দান ) তক্ষক। এই দেখুন আপনার পায়ে দুঃখু—মােজা নেই শঙ্খিনী। এই দেখুন আপনার নাকে দুঃখুচমা নেই (নানা ভাবে চন্দ্রবিন্দু ও চিত্রকলাকে সজ্জিত করণ ) চিত্র। তাইত প্রাণেশ্বর ! এ সব ত আমাদের কিছু ছিল না। চন্দ্র। তাইত প্রাণেশ্বরী! এতকাল বড় দুঃখেই ত দিন যাপন করেছি। তক্ষক।' এখনও হয়েছে কি আপনাদের অনন্ত দুঃখুঘরে চলুন একটী একটা করে দেখিয়ে দিইগে। চন্দ্র। চলুন-চলুন- ( নাগরিকগণের প্রবেশ ) M এস এস–এগিয়ে নিয়ে যাবে এস~~ এরা এসেছেন- আমাদের দুঃখে কাতর হয়ে, এরা এতকাল পরে যুগলরূপ ধরে এসেছেন। নাগরিকগণের গীত । এসেছেরে তারা, তারা দুটী এসেছে রে তাদের পরের প্রেমে নয়ন ঝরে, পকেট ভরে তারা এসেছেরে তারা চন্দ্রলােকের দাদাদিদি, মােদের শােকে নিরবধি-এসেছেরে-- তারা কড়া প্রেমে বাঁধাবাঁধি-—তারা এসেছেরে তারা হ’তে ঝ ঝ ঝ ঝরেছেরে তারা এসেছেরে ॥
২৮ দাদা ও দিদি। পঞ্চম দৃশ্য। গ্রাম-পথ। কৃষকগণ। গীত। ওরে অসবতী শুনাে নাে ও ভরা যৌবনেনি নিছুপ থাওন যায়— উমুর ঝুমুর কত্তিছে যে পরাণ তােমার পায়, ( ও কলিজারে ) বরা বাদরে গ্লাহ ডাকছে গাঙে বান- হােলা হুকায় কান্দার পাড়ে বুছি আমন ধান, হালের মুঠি করছিরে সমান (ওরে হায় )। আমার দুহিন-দারি ঘর বাধছি ব্যাৎ পাতায় (ও কলিজারে ) আলান পালান উজার হইল গাে-কে হঁাচবে পানি আমার কাইদা ইদা নানির ওগাে চৈক্ষে পড়ছে ছানি ( ও কলিজারে ) r
দাদা ও দিদি।
ষষ্ঠ দৃশ্য।
প্রাঙ্গণ।
পুরস্ত্রীগণ
২য় স্ত্রী।
১ম স্ত্রী। নে বােন, শিগগির শিগগির হাতের কাজ গুনে।
সেরে নে। মােড়লরা সব মাঠ থেকে তেতে পুড়ে আসবে, তাদের
আবার সেবা করতে হবে।
২য় স্ত্রী! হাঁ দিদি ! আজকে নাকি মাঠে ভাল কাজ হচ্ছে
না। যাে বয়ে যাচ্ছে, ধান বােনা হচ্ছে না।
১ম স্ত্রী। কই তাতে আমি জানি না। তুই কি করে জানলি?
ছােট মােড়ল এই মাত্র এসেছিল--হাতে পায়ে
কাদা মেখে—এসেই আবার এক জোড়া বলদ নিয়ে মাঠে ছুটে
গেল। আমি বল্লুম, এলে আর গেলে যে—সে বললে কি করবাে
--- মাঠে আজ অর্ধেক কৃষাণ আসেনি তারা সব সহরে কি একটা
হুজুক দেখতে গেছে। এ দিকে যাে বয়ে যায়-কাজেই
নাঙ্গল না ধরলে নয়।
৩য় স্ত্রী। কই আমি ত তার কিছু জানি না। সহরে কি
হয়েছে ?
২য় স্ত্রী। সহরে কোথা থেকে না কি কে এসেছে।
অন্যান্য স্ত্রীগণ। কে এসেছে গা ! কে এসেছে ?
২য় স্ত্রী! তাতো জানি না—কোথা থেকে নাকি কিসে
করে কে এসেছে --
১ম স্ত্রী। তা যে আসুক—কৃষেণগুলো এলো না কেন ?
দাদা ও দিদি।
(কেশিনীর প্রবেশ )
কেশিনী। তারা এতকাল ঘুমঘােরে অচেতন হয়ে মাঠে চাষ
করছিল-এখন তাদের সেই বহুকালের ঘুম ভেঙ্গেছে, তারা
সুচেতন হয়ে সুখশয্যায় শয়ন করেছে।
১ম স্ত্রী। ওমা! কে তুমি ?
কেশিনী। কে আমি, এখনও সম্পূর্ণ ঠিক করে বলতে পারছি
-যে হেতু এখনও আমার পরীক্ষা চলছে ৪ উপরে চঁাদ আমাকে
টানছেন---আর নিচে টানছেন, মাধ্যাকর্ষণ—এখন উপরে যদি
আবােহণ করি, তাহলে আমি উল্কাপাত -- আর নীচেয় যদি নেবে
যাই, তাহলে একেবারে আগ্নেয়গিরির অগ্নগম।
১ম স্ত্রী। ওমা! তাইত ! কে—মকর !
কে। আর মকর নেই—এখন একেবারে চকোর, আকাশে
আরােহণ করে চাদের সুধা খেয়ে বেড়াচ্ছি—
৩য় স্ত্রী। তাইত ! তাইত ! তােমার এ কি বেশ!
কে। এখন এই বেশ। তােমরা কি করছ- কাজ! ছি ছি !
আর কর না—আমরা এত কাল অন্ধকারে ডুবেছিলুম, তাই নিজের
সুখ দুঃখ কি তা বুঝতে পারিনি। কাজ অসভ্যে করে, যে সভ্য
সে আমার মতন পােষাকে পরিচ্ছদে কেবল আমােদ আহলাদে
লাটিমটী হয়ে ঘুরে বেড়ায়।
৪র্থ স্ত্রী। এ বেশ তুমি কোথায় পেলে বােন ?
কে। কেমন, এ বেশ তােমার চক্ষে ঠেকছে কেমন ?
১ম স্ত্রী। ঠেকছেত ভাল, কিন্তু ভাই বােপে টেকবে না।
কে। না টেকে তােমার আমার কি ! চরকা না ঘুরিয়ে, তত
দুলিয়ে, মাকু না চালিয়ে-সুতাে না সরিয়ে, চোক না ক্ষরিয়ে,
t
मामा ७ मिनि
-আর বেশি কত বলব-মন না মরিয়ে, যদি ঘরে বসে,
ঘরে বসে, পায়ের
ওপর পা দিয়ে, যদি ওই রকম সামগ্রীর জোগান পাই, তাতে
তােমার ওই ট্যাকসই শাড়ী কাপড়ের মুখে ছাই, তাতে লাভ কি ?
এস বােন সকলেই আমরা এই বেশ পরিধান করি।
স্ত্রীগণ। ও দিদি ! আমরা পরবাে-আমরা পরবাে।
১ম স্ত্রী। রস—ব্যাপার খানা বুঝতে দাও--
সকলে। আর আমাদের ব্যাপার বুঝতে দেরি সইছে না—
আমাদের দেখতে দেখতে আলু থালু বেশ-শিথিল কবরী
কে। বুঝি—দুঃখ বিভাবরী পােহাল।
১ম স্ত্রী। কোথায় পাওয়া যায়, না জানলে কেমন করে
আনিয়ে দোবাে ?
কে। ও রাম! এখনও এ জিনিষ কোথায় পাওয়া যায় জাননা?
১ম স্ত্রী। তােমরা বােন সহুরে --আমরা পাড়াগেয়ে ভূত--
আমরা এ সব খবর তােমাদের কাছে পেলে কোথা পাবাে।
তােমাদের আচার ব্যবহার দেখবো, তবেত বােন শিখবাে।..
ও মা! এটা পাড়াগাঁ-তাইত বলি—পথে আসতে
আসতে জুতাের গােড়ালী বসে যাচ্ছে কেন-নাকে কি একটা
বেজায় বিকুটে বেমানান-বেওয়ারিশ গন্ধ লাগছে কেন।
১ম স্ত্রী। সে সে কি বােন --গােবরের গন্ধ--পুণ্যগন্ধ –এ
তােমার নাকে বিধকুটে হয়ে গেল !
কে। গােবর ! কি ভীষণ পুতিগন্ধময় নাম—একটা বনচারী
চতুষ্পদ জন্তুর পরিপাকবশিষ্ট, অতি নিকৃষ্ট-তাই ! ছি ছি ছি ।
তাই, এই ঘরের ভেতরে মেজের ওপরে—( নাসিকায় সুগন্ধ রুমাল
সঞ্চালন )
দাদা ও দিদি। | কে। --- সকলে। আ!আ ! -প্রাণ মেতে গেল ! কি গন্ধ --কি গন্ধ। ১ম স্ত্রী। তাইত ---এ কি গন্ধ ! এখন বুঝতে পাচ্ছ। তােমাদের স্বামীরা, অর্থাৎ তোমাদের সােয়ামীরা, তােমাদের কি অন্ধকারে ঘুমের ঘােরে আবৃত করে রেখেছে। ২য় স্ত্রী। তাইত - এত আমরা কিছু জানি না – আ -- আমরা কই কোথায়—প্রাণ মাতােয়ারা--আঁখি দিশেহারা ১ম স্ত্রী। র’সর’স-ব্যস্ত হয় না -আগে ওঁরা আসুন- জিজ্ঞাসা করি- কে। ওঁরা --- ওঁরা কি—বােন—তুমি কি অদম্ শব্দের বহু বচনের প্রেমে আকৃষ্ট হয়েছ ? ১ম স্ত্রী। ওঁরা কি জান না?--স্বামী। কে। স্বামী ! ও! (হাস্য) বুঝেছি-স্ব শব্দের উত্তর মী প্রত্যয়-স্ব মানে আমি—আর মীন্ মানে মৎস্য। অর্থাৎ যিনি আমার মৎস্য-হকরা, ভেটকী মৎস্য-বঁড়শীতে গাঁথ---আর ছিপে খেলাও – তাকে আবার জিজ্ঞাসাই বা কি আর ভয়ই বা কি। ১ম স্ত্রী। বেশ ভাই- এ সব কোথায় পাওয়া যায় বল । কে। তােমাদের প্রভুরা কি খবর রাখেননি যে, আমাদের দুঃখ দূর করবার জন্য চন্দ্রলােক থেকে দাদা দিদি নেমে এসেছেন। ১ম স্ত্রী। কই তাতে আমরা কিছুই শুনিনি। কে। আমাদের দুর্দশা দেখে, তাদের কেবল নােলায় জল ঝরছে।
--
দাদা ও দিদি।
।
সকলে। ও মা সে কি : নােয় জল ঝরছে।
কে। তা বুঝি জান না—এরা হট্টমালার লােক নয় যে পরের
দুঃখে চখে জল ঝরবে। আমাদের দেখে এদের যতই প্রাণ
ফুপিয়ে উঠছে, ততই রসনা দিয়ে ঝর ঝর করে জল ঝরছে। সরমার
পুত্রদের দেখনি-মেহনৎ হলে তাদের গা ঘামে নাজিব
ঘামে।
২য় স্ত্রী। শুনেছি, অপ্সরাদের চোকের পরদা নেই—কাজেই
চোকে জল থাকবার জায়গা নেই।
৩য় স্ত্রী। ব’স, বােন বস।
১ম স্ত্রী। ব’স মকর ব’স ।
কে। (হাস্য ) ববব ! বলাে কি --বসা জন্মের মতন হয়ে
গেছে।
১ম স্ত্রী। সেকি—কোমরে বাত হয়েছে নাকি ?
কে। সে সব কিছু নয় সুস্থ সবল, সুকোমল, সরল--তা
নয় -এ পােষাক পরা অবধি বসা কাৰ্য শেষ হয়েছে। এক খাড়া,
না হয় পড়া—আর বসতে হয়ত বড় জোর ত্রিশূন্যে ত্রিশঙ্কুর মত
পা ঝুলিয়ে ঘাড় হেলিয়ে আকাশ পথে অবস্থান করতে হয়।
১ম স্ত্রী। সেকি গাে?
কে। এইও খানসামী ।
নেপথ্যে। হাউ ডাউ—
১ম স্ত্রী। ওরে বাবা ! পেতনী নাকি।
কে। ভয় নেই, ভয় নেই--ও আমার নিযুক্ত সেবিকা--এখন
থেকে নিয়ম হয়েছে, মনিব যখন চাকর চাকরাণীকে ডাকবে, তখন
তারা হাউ ডাউ বলে উত্তর দেবে। দোলন কেদারা লে আও।
=
৩৪ { দাদা ও দিদি। ( বালিকার প্রবেশ ) বালিকা। উই হুই (প্রস্থান) কে। আর যেমনি হুকুম করা হবে, তখনই বলবে উই হুই- যে আজ্ঞে—যাে হুকুম-কি আজ্ঞা করছেন—এই রকম যােগরূঢ় শব্দগুলাে একেবারেই ব্যবহার করতে পাবে না- ওতে শ্রুতিমুলের কুণ্ডল কিছু বেশি দোদুল্যমান হয়। (কেদারা লইয়া বালিকার পুনঃ প্রবেশ ও কেদারা রাখিয়া প্রস্থান।) তােমাদের এখানে বসবার সুবিধে হবে না বলে, আমি এই সকল সামগ্রী সঙ্গে এনেছি। (কেদারায় বসিয়া ) গীত। কিবা হেলিছে দুলিছে অঙ্গ কিবা পদতল, দোলে ঝলমল, যেন কমল করিছে রঙ্গ, ছিল একখানি দেহবৃষ্টি, এই দেখ সই, গুড়িয়ে গাড়িয়ে হয়ে গেল একমুষ্টি। হকরে দাও কি দৃষ্টি ? একি নয়নে নয়নে রঙ্গ ? আনাড়ীর চোকে সুধার ঝেকে মদন দিয়েছে ভঙ্গ । সকলে। বস—বস- একটু জল খাও- জল ! হা হা! তােমাদের এই তরঙ্গহীন রসহীন জল কি মানুষে খায়। খানসামী! পাণি লেআও- (সােড়ার বােতল লইয়া বালিকার প্রবেশ ও বােতল খােল) সকলে। ওগাে--বােতলে বান ডেকেছে-পালাও পালাও- ঘর সামলাও ঘর সামলাও- দাদা ও দিদি। (নেপথ্যে -ভয় নেই ভয় নেই) কে। ভয় কি -- ভয় কি–( পানকরণ ) সকলে। ওমা সেকি-ঢেউ খেয়ে ফেললে। ২য় স্ত্রী। তাইত তাইত গভীর গর্জনে বান ডেকে এলাে, আর তাই কিনা তুমি খেয়ে ফেললে ! ( মণ্ডলের প্রবেশ ) মণ্ডল । কি হয়েছে -কি হয়েছে ? ১ম স্ত্রী। আবার কি হবে ! দেখছ না—কে বসে রয়েছে। দেখছ না ? ১ম মণ্ডল। তঁা! তাইত—তাইত-দেবী ! নমামি পুটুলিং দেবীং সবােতলাং উড়ম্বরীং মার্জনী কলসােপেতাং ধুচুনি শশাভিত- মস্তকাং। ( প্রণাম ) কে। কি ! আমায় এখনও এরা চিনতে পারলে না। { মণ্ডল-ভ্রাতৃগণের প্রবেশ ) ভ্রাতৃগণ। কাকে কাকে ? মরুক -আমি চললুম। ভ্রাতৃগণ। হ ---যেয়ােনা যেয়ােনা। [ কেশিনীর প্রস্থান। পুরুষগণ। কোথায় ? কে উনি-কে উনি ? ২য় স্ত্রী। কে উনি--যােগে যাগে তােমরা তাড়িয়ে দিলে—চল খুঁজে আনাে-ধরে আনে। আমরা সাজবাে--অমনি করে সাজবাে -আর আঁধারে থাকবেনা ---হাতে গােবর মাখবােনা—হাঁড়িতে হাত দেবনা-আকাশে দোল খাবাে-বােতলে বান ডাকাবাে আর তেষ্টা পেলে ঢেউ খাবাে –চল চল—এনে দেবে চলল। /
দাদা ও দিদি
গীত।
t
আমরা ঢক্ ক'রে ঢেউ খাব
হৃদ্ বােতলের ছিপি খুলে ফোয়ারা ছােটাব।
উঠবে খুলে তরল প্রাণ--
প্রেম নদীতে ডাকবে বান--
টুপ করে এক ডুবসাঁতারে কুলের পারে যাব ।
তােমরা বঁধু বসে এ পারে—
মাথা খুড়বে—হাত পা ছুড়বে--
দেখবে হাঁ করে ।
আমরা তুড়ি দিয়ে পড়ব সরে -
চখের পরে – দিন দুপুরে—হাত ধরে (ওগাে দাদা-দিদির হাত ধরে)
আর থেকে থেকে অড়িনয়নে চাব ( তােমাদের দেখতে সাজা)।
সপ্তম দৃশ্য।
অরুণ-রঞ্জিত উপত্যকা ।
তক্ষক ও শঙ্খিনী।
শঙ্খিনী। আমার ক্ষিধে পেয়েছে !
তক্ষক। সেকি! এই যে ভােরে বিছান থেকে উঠে জলযােগ
করলে !
শঙ্খিনী। কই, কি খেয়েছি—মনে নেই।
তক্ষক। সেকি ! মনে নেই -তিনটে মােষ, দশটা বরা,
একুশটো ছাগল -এর কি একটাও তােমার মনে নেই।
দাদা ও দিদি।
শঙ্খিনী।
একদম মনে নেই।
তক্ষক। একশাে একটা ভেড়া ?
শঙ্খিনী। কই --স্মরণে আনতে পারছি না।
তক্ষক। আড়াই হাজার ডিম ?
শক্ষিনী। কিঞ্চিৎ ক্ষীণস্মৃতি জাগছে—জাগছে আর মিলিয়ে
যাচ্ছে—বােধ হচ্ছে আমি যেন
কিছুই খাইনি। আমার ক্ষিধে
পেয়েছে !
তক্ষক। হুঁ হাঁ - চুপকর -চুপকর পথের মাঝে নিজমুর্তি
প্রকাশ কর না।
শঙ্খিনী। ওগাে । আমার ক্ষিধে পেয়েছে।
তক্ষক। পথের মাঝে এখন কি পাব তা তােমাকে খেতে
দেবাে।
শঙ্খিনী। কি অন্ধ ! দেখতে পাচ্ছ না। আকাশে ঝাকে
ঝাঁকে লাখে লাখে পাখী বনে বনে দলে দলে হরিণ—মাঠে হাজার
হাজার ভেড়া-জলে ঝাঁকে ঝাঁকে মাছ--
তক্ষক। থামাে থামাে -ব্যস্ত হয় না— সমস্ত দেশটী যখন |
খেতে হবে, তখন রয়ে বসে ধীরে ধীরে খেতে থাকো। যে রকম
করে ভেড়া ছাগল মৃগ মহিষাদি খেতে আরম্ভ করেছ, তাতে ওঁরা
আর বেশি দিন দলে দলে ঝাঁকে ঝাঁকে চরছেন না। দুদিন পরে
দেখবে সব ফঁক! তখন এদের ইহকাল পরকাল খাওয়া ভিন্ন
আর গতি থাকবে না।
কতকটা এগিয়েছি-সব মােড়ল
বেটাদের মাতাল করে তুলেছি। এরই মধ্যে কত বেটার যকৃৎ
পেকেছে, অর্ধেক বেটাদের হাত পা কঁপছে—ব্যস্ত কেন—ব্যস্ত
কেন ।
৩৮
দাদা ও দিদি।
শঙ্খিনী। বুড়াে হাড়ও খেয়ে বড় সুবিধে হবে না।
তক্ষক। কি, কচি ? কচি ?
শঙ্খিনী। গােড়ায় কোপ না মারলে কি আগাছা মরে।
তক্ষক। বটে! তাই ব’ল না—ওই যে—মনে করতে না
করতেই—ওইযে ।
( বালকগণের প্রবেশ )
গীত।
ঐ সােণার বরণ অঙ্গে মেখে রবি উঠেছে।
ঝক্ ঝর ঝর ঝরছে সােণা -- সব ভরে গিয়েছে।
সােণার লতা, সােণার পাতা, সােণার ফল ফুল,
সােণার ধানে সােণার নদীর ভরা দুই কুল,
যতদূর চলে আঁখি সবই সােণাময় দেখি,
দিকে দিকে কঁাচা সােণা ঢেলে দিয়েছে—
সােণায় সােণায় খেলা ভাল মিলেছে।
শঙ্খিনী। আহা হা ! কাদের ছেলেরে ! তােরা কাদের
নয়ন-মণি, অঞ্চলের নিধি ?
১ম বালক। আমরা আমাদের মায়ের নয়নমণি, অঞ্চলের
নিধি।
শঙ্খিনী। যাদুধন! তারা তােমাদের মা নয়, ডাকিনী ।
কেমন করে তারা এই ভােরে তােমাদের বিছান থেকে তুলে
দিলে ?
২য় বালক। আমরা রােজইত এমনি সময় উঠি।
মাঠে যাই, গরু চরাই।
'
দাদা ও দিদি।
শঙ্খিনী। যা এই সময়ে বােজ তােমরা মাঠে যাও।
তক্ষক। কি সর্বনাশ! গরুচরাও ( উভয়ের ক্রন্দন )
৩য় বালক। হাগা, তােমরা কঁদছাে কেন ?
উভয়ে। ( ক্রন্দনের সুরে) তােমরা গরু চরাও !
১ম বালক। গরু চরাই তুলল ক্ষেত থেকে তুলল তুলি -
ক্ষেতে কলসী করে জল ঢালি-
---
তক্ষক। আবার জল ঢাল।--
শঙ্খিনী। তােমাদের হাতে ব্যথা করেন?
২য় বালক। সময় সময় করে তবে অভ্যাস হয়ে গেছে।
তক্ষক। ছিছিছি -- এই বয়সে তােদের মা তােদের এত কষ্ট
-
শঙ্খিনী। আহা! পায়ে চিড় খেয়েছে-হাতে কড়া পড়েছে
গায়ে ময়লা, ধুলাে
৩য় বালক। তােমরা কে ?
শঙ্খিনী। আমরা—আমরা—তােমাদের দাদা দিদি।
তক্ষক। কিসের জন্যে তােরা এমন দুঃখু করিস ভাই ?
১ম বালক। আর কিসের জন্যে-দুমুঠো খাবার জন্যে।
তক্ষক। যা! এই তুচ্ছ জিনিষের জন্যে এত মেহনৎ—আয়
আমরা তােদের খাবার দিই। (লজেঞ্জেস প্রদান )
শঙ্খিনী। এই কচি হাতে এত মেহনৎ !—খা যাদু খা --
পেটভরে খা।
বালকগণ। (খাইতে খাইতে) তাহলে আমরা কি করবাে ?
তক্ষক। তােমরা কেবল বসে বসে খাবে—
বলিকগণ। আর আমাদের কাজ করবে কে ?
৪০
দাদা ও দিদি।
তক্ষক ও শঙ্খিনী। আমরা করবাে। বােজবােজ তোমাদের
কাজ করবাে আর তােমরা বসে বসে কেবল খাবে--
বালকগণ। বাবা! কি চমৎকার কি মজা!
১ম বালক। ক’য়ে আকার দিলে কা
বালকগণ। দাদা দিদি খেটে মরুক-তােরা মাঠে চরে খা।
তক্ষক। খেতে খেতে জাহান্নমে যা’ ।
২য় বালক। ক'য়ে ই কার দিলে কি-
বালকগণ। আমরা এবার অঙ্গ ঢেলেছি।
তক্ষক ও শঙ্খিনী। আমরাও হট্টমালা গালে তুলেছি।
৩য় বালক। কয়ে উকার দিলে কু।
বালকগণ। আমরাও কাজে লাগাই ফু।
শঙ্খিনী। তাহলেই হট্টমালায় ভূ।
[ সকলের প্রস্থান।
( ফেলু ও ভেলুর প্রবেশ )
ফেলু। ওরে ভাই! কেন মিছে তকরার করি—এখনও
বলছি সােণাটুকু নে।
ভেলু। ওরে ভাই ! কেন মিছে মাথা খারাপ করিও
আমার পাওনা নয়, তাের জিনিষ তাের কাছে রেখে দে।
ফেলু। তুই বুঝতে পারছি না –এ তাের।
ভেলু। তুই বুঝতে পারছি না--এ তাের।
ফেলু। ওরে ভাই, আমাকে পাপে ডােবাসনি।
ভেলু। তবে কি পাপে ডুববাে আমি-তােমার সােণা
আমি ব্যবহার করে কি নরকে যাবাে ? আর তুমি স্বর্গে বসে
দাদা ও দিদি।
১১
ব’সে আমার নরকভােগটা দেখবে। ভ্যালা আমার হিতকারী বন্ধু
এলেন? যাও, যাও—পথ ছাড়। উনি পেলেন সােণা কুড়িয়ে
আমি তাই নিতে যাবাে।
ফেলু। আমি কি আমার বাবার সােণা কুড়িয়ে পেলুম যে
ঘরে নিয়ে যাবাে?
ভেলু। কার বাবার সে তুমি বােঝগে !-
ফেলু। তাের জমীতে কুড়িয়ে পেয়েছি, সে আর কার বাবার
হবে !
ভেলু। আমার বাবা এমন বােকা ছিল না যে, জমীতে সের
খানেক সােণা পুতে রেখে দেবে। ও তাের ধন-- যক্ষি তাের জন্যে
আগলে বসেছিল, তুই যেমন গেলি, অমনি তাের হাতে তুলে দিলে।
ফেলু। দোহাই ভাই—তাের পায়ে পড়ি—নে।
ভেলু। দোহাই ভাই—তাের পায়ে পড়ি ছেড়েদে—আমার
ঢের কাজ আছে—পাঁচখানা বঁটা, তিনখানা কাস্তে, একখানা
নাঙ্গলের হাল—আজ আমাকে তইরি করতেই হবে—সন্ধ্যে বেলায়
খদ্দেরকে দিতেই হবে -এখন থেকে কাজ শুরু না করলে পেরে
উঠবাে না -কথার খেলাপ হবে।
ফেলু। ওরে ভাই, আমাকেও যে দু’জোড়া কাপড় বুনতে
হবে--এখন থেকে আরম্ভ না করলে পিরবাে কেন ? নে ভাই নে।
(পরস্পরে অনুরােধাদি।)
( তক্ষকের প্রবেশ)
তক্ষক। ঝগড়া কেন-ঝগড়া কেন—কি হয়েছে ?
ফেলু। এই—এই—ঠিক হয়েছে—বলুনত মশায়—বিচার
করুন ।
ই দাদা ও দিদি। তক্ষক। মশাই নয়রে ভাই, -আমি তােদের দাদা। কিসের বিচার—বল, এখনি করছি। ফেলু। বেশ দাদা! বিচার করত। ভেলু। আচ্ছা, বেশ বেশ, কর ত দাদা। এই লােকটী এক- তাল সােণা কুড়িয়ে পেয়েছে—পেয়ে বলে কিনা এ তােমার সােণা। উভয়ে। তক্ষক। বটে-বটে! ও কুড়িয়ে পেয়েছে—পেয়ে তােমায় দিতে চাচ্ছে ? ভেলু। হাঁ-দেখ দেখি কি অন্যায় ! ফেলু। দাদা-সেই সঙ্গে আমার কথাটাও শােনো। সােণা আমি কুড়িয়ে পেয়েছি সত্য, কিন্তু এই ব্যক্তির জমী থেকে পেয়েছি। তক্ষক। বেশ, আমি বিচার করে দিচ্ছি। করত দাদা, দয়া করে বিচার করে দাও। তক্ষক। আর বিচার আমিইবা করবাে কেন—বিচার একটু বাদে তােমরাই করতে পারবে।—এই নাও দেখি, এই জিনিষ দু’জনে একটু একটু করে টুক করে খেয়ে ফেল দেখি । এ কি । এ হচ্ছে চন্দ্রসুধা পান করা মাত্র অমরত হবেই, সেই সঙ্গে দিব্যচক্ষুও খুলে যাবে। এ জিনিষ যে কার, যেমনি পানটি করা অমনি বােঝা? উভয়ে। বটে, বটে! কই দাও দাদা—শিগগির দাও। তক্ষক। এই নাও। ( মণ্ঠদান।) উভয়ে। তক্ষক।
দাদা ও দিদি।
উভয়ে। ( পান করিয়া বা ! বা ! একি মজা! একি মজা!
তক্ষক। ঠেকছে কেমন ঠেকছে কেমন ? ,
ফেলু। ঠেকছে ঠেকছে—একি ঠেকছে-এযে প্রাণে একে-
বারে ফাল পাড়ছে-তেরে রেরে..
ভেলু। গিজিঘিনি
গিজিঘিনি - ঝ! দেভাই-এইবারে
আমার সােণা দে ।
ফেলু! বাকি প্রাণসখা ।
ভেলু। এই যে আমাকে দিতে আসছিলি ।
ফেলু। যে দিতে আসছিল, সে শালা চলে গেছে।
রেরে
ভেলু। বটে ! আমার জমীর সোণা--
ফেলু। ধন ধনা ধন ধনা দর্পনারয়ণ ঘরে গিয়ে চিবিয়ে
মারাে ছাঁচি পানের দোনা। আর কেন তুমি এইখানে শুয়ে
পড় - আমি চললুম।
ভেলু। চলবি কিরে শালা – দিয়ে যা।
ফেলু। বলি কিরে শালা --দেয়কে।
তক্ষক। হা হা কর কি কর কি—আমি পাইয়ে দিচ্ছি
দেখি (সােণা লইয়া ) এ তােমারও নয়:-তােমারও নয়--আমি
মেহনৎ করে বিচার করে দিলুম--এ আমার—যাও—এইবারে
যথাস্থানে যাও। (ফেলু ও ভেলুকে বহিষ্করণ)
( নারিকেল লইয়া শঙ্খিনীর প্রবেশ)
শঙ্খিনী
কি করলে !
ও দু’টো মারামারি করে মরছেল
কেন ?
৪৪ দাদা ও দিদি। শেষ কেল্লা জয় করলুম। শঙ্খিনী। বেশ করেছ--আমিও হাট করে এই ফল নিয়ে এলুম। তাতী তাত ভেঙ্গেছে-কামার মত্ত হয়ে আপনার পায়ে চোপ মেরেছে—কুমাের জালার ভেতর মাথা ঢুকিয়ে বসে আছে— চাদের সুধা খেয়ে সকলেই উন্মত্ত -হাট ভেঙ্গে চূরে ছায়খার- খদ্দেরের হাহাকার। এই নাও-কাৰ্য্যশেষের পুরস্কার স্বরূপ ফল খাও। তক্ষক। বাবা! কি সুন্দর ফল । এ দেখছি একটা বড় গােছের মেওয়া ! শঙ্খিনী। খেয়ে দেখ, নইলে বুঝবে কি করে। তক্ষক। (ছােবড়া চিবাইতে চিবাইতে ) আরে গেল একি! এতে রস কই—আরে দূর--একি! এ কোথায় পেলে ? শঙ্খিনী। খাও খাও--একটু ধীরভাবে--অধ্যবসায় সহকারে খেতে আরম্ভ কর-রস পাৰে। তক্ষক। ( চিবাইয়া) আরে দূর। শঙ্খিনী। ফেলনা ফেলনা এই নাও--আঁটী খাও—এর সব রস আঁটীতে। তক্ষক। ( আঁটী চিবাইয়া) হাঁ এথেকে রস না বেরুক ঘী বেরুবার সূচনা হয়েছে--এর বাড়ী তােমার মাথায় এক ঘা বসিয়ে দি-কি বল ? শঙ্খিনী। সেকি প্রাণেশ্বর ! তােমাকে কি আমি রহস্য করলুম- এ হচ্ছে তােমার কাচেঁর পুরস্কার। (নারিকেল শস্য দান।) তক্ষক। (খাইয়া) বা ! ব!---সরবৎকে সরবৎ-বরাটীকে গােটী--বা বা !
দাদা ও দিদি।
৪৫
শঙ্খিনী। আবার হয় কোথায় জান-অমািদের চাদের কাছ
বরাবর—আমি ঠকেছিলুম-তাই তােমাকে ঠকিয়ে আমােদ
করলুম। যাক্ • এইবারে কর্তব্য কি ?
তক্ষক। আবার কর্তব্য কি! আমাদের ভাই ভগিনী সব
সতৃষ্ণনয়নে আমাদের আগমন প্রতীক্ষা করছে-চল তাদের নিয়ে
আসি।
শঙ্খিনী। ওই তােমার প্রিয় মেষ সম্প্রদায় --- সুধার গুণে এক
একটী বাঘ হয়ে ছুটে আসছে।
( উল্লাস করিতে করিতে নাগরিকগণের প্রবেশ)
সকলে। এই যে এই যে—দাদা-দিদি--
১ম নাগরি। আমাদের কাজের দফা রফা করে পালিয়ে এলে
চলবেনা।দিদি দাদা--সুধা-সুধা।
সকলে। সুধা --সুধা-আরও সুধা।
তক্ষক। এই যে ভাই, আনতে চলেছি।
সকলে। শিগগির --শিগগির---বিলম্ব সইছেনা-সুধা--সুধা।
শঙ্খিনী। আমরা সবে একটী জোড়া তােমরা সুধা খাবে
ঘড়া ঘড়া কোথা পাব ? আরও দু’পাঁচ জোড়া-সঙ্গী আনি--
তারপর তােমাদের সুধাসাগরে ভাসিয়ে দেব।
সকলে। দাও দাও শিগগির দাও।
গীত।
স্ত্রীগণ।
সুধার সাগরে সাঁতার দেও।
পুরুষগণ। খেয়েছি কাজের মাথা -- ধরেছি শুধুই কথা---
যখন কাজ নাইকো হেথা বগল বাজাও বগল বাজাও।
দাদা ও দিদি।
স্ত্রীগণ।
প্রাণের মাঝে উঠছে ঢেউ, সুখটা কি বুঝলেনা কেউ
পুরুষগণ। ন বােঝ ছিপি খুলে বােতলে জমে যাও।
স্ত্রীগণ।
সুধার গুণে মরুভূমে বড় বড় গাছ,
পুরুষগণ। নদীতে পাখী, আকাশে হাঙর কুমীর মাছ,
স্ত্রীগণ।
বেড়াল ডাকে কুহু কুহু-
পুরুষগণ। আর কোকিল ডাকে ম্যাও
সকলে।
উন্নতির এমন নজীর আর কি চাও আর কি চাও
রঙ্গ-পট
অষ্টম দৃশ্য
চন্দ্রদ্বীপবাসিগণ।
গীত।
অসম্ভব পীরিতের কথা -
তার ওপর নীচে গণ্ডগােল, নাইকো মুণ্ডু নাইকো মাথা,
হাত বাড়িয়ে দিতে গেলুম কোল,
পীরিত ফুলে হােল ঢােল।
(ঘােল হুররে বােল
পীরিত ধরতে গেলুম পিছলে গেল
মৰ্ম্মে মৰ্ম্মেরইলাে গাঁথা।
দাদা ও দিদি। ৪৭ চল - ভিতরে চল - ভােজ তক্ষক। চল, লাগাও -ভােজ লাগাও। ( সকলের প্রস্থান। ( চন্দ্রবিন্দু ও ভৃত্যের প্রবেশ ) ভৃত্য। প্রভু! প্রভু। চন্দ্র। কিরে?—কিরে ? ভৃত্য। আনন্দ-আনন্দ! চিত্র। কিসের আনন্দরে ! ভৃত্য। তা এখনও ঠিক করতে পারিনি। কিন্তু ভারী আনন্দ। কোথায় রে ? ভূ। আপনার ঘরে। চিত্র। কে করছে রে ? ভৃত্য। তা বলতে পারছি না। জানবার জন্যে গিয়েছিলুম- কিন্তু জানতে পারলুম না! আমায় ঠেলে তাড়িয়ে দিলে। চাকর- দের কাউকে খাটাচ্ছে—কাউকে তাড়াচ্ছে—কিন্তু ভারী আনন্দ! কে তাড়িয়ে দিলে ? আমার ঘর থেকে তােকে কে তাড়িয়ে দিলে? ভৃত্য। দুটো ধাক্কা খেয়েইত আহলাদে চোক বুজে গেল—কে তাড়িয়ে দিলে দেখতে পেলুম না ! ভারী আনন্দ—প্রভু! ভারী আনন! আপনাদের ঘরে মহা ধুম লেগে গেছে। চন্দ্র। ওরে আমার ঘরে ধূম কিরে! চল চল—চল। ( তক্ষক ও শঙ্খিনীর প্রবেশ) কে এত রাত্রে আমার ঘরে হুটোপাটী করে ? ,
৪৮
দাদা ও দিদি।
তক্ষক। কেও—আপনি ? এসেছেন—ভালই হয়েছে।
আমাদের সব ভাই ভগিনীরা এসেছেন।
চন্দ্র।
এসেছেন?
তক্ষক । এসেছেন।
চন্দ্র। তা হােলেত আনন্দের কথাই বটে!
শঙ্খিনী। আমরা আপনাকে কি বলে যে ধন্যবাদ দেবাে তা
বুঝতে পারছিনা।
দরকার নেই—দরকার নেই। ও না বােঝাই ভাল
তক্ষক। তাদের সব ভােজের আয়ােজন করেছি।
বেশ করেছেন, বেশ করেছেন -আমাদের অপেক্ষা
রাখেননি বেশ করেছেন।
শঙ্খিনী। তারা এসেই আপনার ঘরটাই পছন্দ
ফেলেছেন।
চন্দ্র। বটে -বটে! কি অনুগ্রহ ! কি অনুগ্রহ !
তক্ষক। আপনাদের ঘরেই তাদের নিশাভােজের স্থান
করেছি।
( চিত্রলেখার প্রবেশ )
চিত্র। তা বেশ করেছেন । কিন্তু আমাদের শয়ন ঘরটায়
ভােজের ব্যবস্থা না করলে কি হত না ?
শঙ্খিনী। ছি ছি -ভগিনী! অমন
কথা
কইবেন না।
চন্দ্র । ছি ছি ! উগ্র হয়ে কথা কমােনা ব্যগ্র হয়ে চুপ
কর। আমাদের পূর্বপুরুষের সৌভাগ্য যে তাঁরা এসেছেন।
চিত্র। এসেছেন ভালই করেছেন -তাবলে কি
উগ্র হয়ে
দাদা ও দিদি।
চন্দ্র।
শঙ্খিনী। হ হ --মনেও পাপ কথা আনবেন না। আপনি
দেখছি ভাল রকম আদব জানেন না। সেখানে, সব মহিলারা
আছেন। আপনারা অসন্তুষ্ট জানলে, তারা আর খাবেন না।
চন্দ্র। ওরে বাবা ! খাবেন না কি! তাহলে আমার পিতৃ-
পুরুষ চটে লাল হয়ে যাবেন। চল প্রিয়তমে! অতিথির সৎকার
করিগে চল।
তক্ষক। ও বাবা ! তা হবে না !
ওরে বাবা ! কি করে ফেলেছিলুম রে!
তক্ষক। সর্বনাশ করে ফেলেছিলেন। ওরে বাবা! ও কথা
মুখেও তুলবেন না। সেখানে মহিলা আছেন।
শঙ্খিনী । আপনাদের এ কুৎসিত ব্যাধিপূর্ণ দেহ দেখলেই
তারা ভিরমি যাবেন।
চন্দ্র। যা এত কোমল তারা এত কোমল ! প্রাণে কি
তাদের ভিরমি কুসুম জড়িয়ে আছে।
চিত্র। তা হলে আমরা কি করব ?
শঙ্খিনী। হাঁ -আন্তে কথা কন -আপনার কর্কশবাক্যে
তাঁদের কানে তালা লাগবে।
চন্দ্র। ধীরে ধীরে প্রাণেশরি-ধীরে-বুঝি এতক্ষণ লেগেই
গেছে।
চিত্র। আমার ঘরে অতিথি, আর আমরা বাইরে এড়িয়ে
থাকবাে?
শঙ্খিনী। ভগিনী! আপনি বড়ই বাড়াবাড়ি করছেন।
সুতরাং যন্ত্রণাজনক আবশ্যকতার তলায় পড়ে, আমরা আপনাকে
স্থানত্যাগ করাতে বাধ্য হবে।
দাদা ও দিদি।
তক্ষক। এই ঠিক কথা বলেছ -ইনি দেখছি কিছুতেই মীমাং-
সার ভেতর আসতে চাচ্ছেন না। কেউ আছ—( সিপাহীর প্রবেশ)
এই এদের দুজনকে ধরে বাগান বাড়ীতে পূরে রেখে এস।
সি। যাে হুকুম হুজুর !
এই
হুজুর !
চলিয়ে-
শঙ্খিনী। হুঁ হুঁ - সেখানে জায়গা নেই—সেখানে আমার
প্রিয়ু খানসামারা অবস্থান করছে।
চন্দ্র। এরি মধ্যে, ছেড়ে আসতে না আসতে- বা! বা! কি
আনন্দ! কি আনন্দ!
তক্ষক। তা হলে, গােয়ালবাড়ী -
শঙ্খিনী। ও বাবা ! সেখানে প্রিয় ছাগমেষ, আর কুকুট
পেরু সডিম্ব বিরাজ করছেন।
তক্ষক। ভ্যালা আপদ ! তাহলে এদের কোথায় রাখি!
আমাদের অমূল্য সময় সব নষ্ট হচ্ছে যে !
চন্দ্র। তাহলে এক কাজ করুন না কেন আমাদের
দু’টাকে একটু মসলা সিক্ত করে, একটা সঘত উত্তপ্ত কটাহে বার
দুই উলটে পালটে নিয়ে উদরের একপাশে রেখে দিন না কেন ?
শঙ্খিনী। হয়েছে—ওই দূরে বটগাছের তলায়, ওই যে সুদৃশ্য
সুহাস্য চিত্রপটতুল্য বট—ওর তলায় ।
তক্ষক। ঠিক বলেছ। আসুন প্রিয়বন্ধু-ওই বটবৃক্ষের
তল একেবারে প্রকৃতির
লীলাস্থল—সেখানে যুগলে বসে
সুশীতল সমীরণ সেবন করতে করতে বিমল আনন্দ উপভােগ
করবেন চলুন।
চন্দ্র। বা! বা! চলুন চলুন। এখনি আহ-প্রাণ একে-
বারে পাগল হয়ে আগে থাকতেই ওর তলায় গিয়ে ডিগবাজী খাচ্ছে।
দাদা ও দিদি।
শঙ্খিনী। প্রিয় ভগিনী-আপনাকে আমরা কত প্রকাণ্ড
ভালবাসি এই এক কথাতেই বুঝে নিন—আপনাদের সুখী করতে
আমরা সজল চক্ষে আপনাদের প্রকৃতির বৃক্ষে নিক্ষেপ করলুম।
চত্র। বদ-কি ভালবাসা -কি ভালবাসা !
নবম দৃশ্য।
গ্রাম্য-পথ।
বেদিনীগণ।
গীত।
তােরা কে নিবি সােণার চাদ
আমরা বেদিনী বেদে কোমর বেঁধে --
পেতেছি চাদ ধরা ফাদ ।
গাছের ডালে লুকিয়ে পাখী প্রেমের কথা কয়,
আমাদের প্রাণেতে না সয় ;
আমরা ধরে তারে খাঁচায় পুরি নাইক’ তাতে দাদ ফরিয়াদ
এ ফঁাদে বাে দুটী পা,
চাদের কিরণ শক্ত বাধন বাঁধলেত আর খুলবে না,
যদি সাধ থাকে আয় এই ফাঁকে
কেন পড়ে যাবি বাদ ।
দাদা ও দিদি। দশম দৃশ্য। শ্মশান সন্নিকটস্থ বটবৃক্ষ। ( তক্ষক ও চন্দ্রবিন্দুর প্রবেশ ) 2 তক্ষক। আমি দেখছি, বটগাছের তলাও -আপনার যােগ্য- স্থান নয়। চন্দ্র। না, কেমন করে হবে—ওপরে ছাওয়া আছে। তক্ষক। বুঝুন—আপনি প্রাকৃতিক রৌদ্রের উত্তাপ পাচ্ছেন । চিকিৎসকে বলেছেন রােদ্দর না পেলে আপনার রােগ সারবে না। আপনার দেহে কতকগুলাে কীটাণু আছে, তারা ছায়া পেলেই পুত্র কন্যা প্রসব করে। পাছে তারা আমাদের ঘরে খড়া বেয়ে ওঠে তাই আপনাকে একেবারে নীলাকাশ তলে ( রাখতে এসেছি। চন্দ্র। আহা! আমার কি উপকারই করছেন। কীটাণু বেটারা--পাজী বেটারা-তােদের যে আমি দেখতে পাচ্ছি না। দেখতে পেলে কাণমলে তােদের কাণ ছিড়ে দিতুম – তক্ষক। এই তাহলেই আপনি ঠিক বুঝেছেন তার ওপর আপনি বড় দুৰ্বল—কখন আছেন কখন নেই—যমমন্দিরে আপ- নাকে অতি শীঘ্রই যেতে হবে চিকিৎসক বলেছেন, আপনার সেখানে চলে যেতে বড় কষ্ট হবে। তাই আমি আপনাকে সে পথের খানিকটে এগিয়ে দিতে এসেছি। চন্দ্র। কি উপকারই করছেন-এই এতটা পথ আমি যে কি করে হেঁটে আস্তুম তাই ভেবে আকুল হয়ে পড়েছিলুম।
দাদা ও দিদি।
তক্ষক। আপনি আমাদের যে এতকাল পরে বন্ধু বলে চিতে
পেরেছেন, তার জন্যে আপনাকে ধন্যবাদ। আপনি ভাবিত হবেন
। মনে করছেন যে আপনি একলা এখানে এসেছেন—তা নয়।
আপনি আমাদের বন্ধু, পাছে লােকজনের অভাবে কষ্ট পান তাই
আপনার অনেক আত্মীয় স্বজনকে আগেই এ শ্মশানে পাঠিয়েছি-
তারা আপনার অভ্যর্থনার জন্যে ব্যর্থ হয়ে অপেক্ষা করছে—আরও
বহুলােক আপনার পিছন পিছন আচে। (করমর্দন করিয়া
তক্ষকের প্রস্থান।
চন্দ্র। অজ্ঞাত কুলশীল অতিথিকে আশ্রয় দিয়েছিলুম, তার
ফল এই শ্মশান। বেশ, আতিথ্যধৰ্ম্মের যদি এই ফল, তাহলে
দুঃখ কি।
এখানে সকল দুঃখের অবসান। যদি আর এক পা
এগুই তাহলেই নয়—কিন্তু যদি এখান থেকে ফিরি, তাহলে নূতন
জীবন। কি করবাে ? ফিরবাে--না—এগুবাে।
এগুলে এখনি
মৃত্যু----ফিরলে-- বড় জোর মৃত্যুভয়। তাহলে ফিরি—এখনি মরব ?
যখন সকল জাতিই বিদ্যুৎবেগে উন্নতির পথে চলেছে, তখন আমরাই
কেবল আমাদের হট্টমালাকে নিয়ে শ্মশানের আগুনে ঝাপ দেব ।
, ফিরি! ফেরবার বল কি পাব না। তবে অন্যে পায় কি
কে দেয় কোন অমৃত প্রবিনী থেকে শক্তিস্রোত
প্রবাহিত হয় ? শুনেছি তিনি শ্মশানেই বাস করেন। তাহলে
শ্মশানেশ্বরী আমাকে ফিরিয়ে দাও।
( কমলার প্রবেশ)
করে ?
গীত।
এমন অসময়ে ঘুম ভাঙালে কে ?
কোন গগনের সীমা হতে কে মােরে ডাকে ?
৫৪
দাদা ও দিদি।
করুণ লােদন করলে আকুল
উথলে উঠে নদীর দুকুল
ভাসায় আমাকে।
এ অবেলায় দেখছি আমায় ফেলে বিপাকে-
(আমি) দেখছি যেন আমার তারা
এত দিনে মাতৃহারা
বুঝতে পেরে কেঁদে সারা জননীর শশাকে।
কমলা। ফেরবার মন করেছে---আর কাল বিলম্ব কর না।
ফিরে এস মহারাজ!—ফিরে এস। দেবতার ঘুম ভেঙ্গেছে--সম্পদ
আবার তােমাকে আশ্রয় দেবার জন্যে ব্যগ্র হয়েছে। ডাকো
মাকে ডাকো।
চন্দ্র। মাতৃভূমি ! এখনও যে তুমি আছ মা! তুমি নিরাশ্রয়কে
আশ্রয় দিয়ে রেখেছ--ক্ষুধা পেলে এখনও আহার দিচ্ছ—তৃষ্ণায়
মাতৃস্তন্যের ন্যায় শীতল নীরধারা নিঝর স্রোতের সঙ্গে বর্ষণ করছ।
তুমি যখন আছ, তখন আমার নেই কে! এই যে আমি দেখতে
পাচ্ছি—দীর্ঘনিশান্তে নব প্রভাতে জাগরিত পুত্র কন্যার উল্লাস
কলরবে ভরা আমার বিশাল সংসার। মা ! ঐ সংসারে আমায়
ফিরিয়ে নাও
( কৰ্ম্মানদের প্রবেশ )
কৰ্ম্ম। শুধু ফিরলে হবে না। যখন শ্মশানে এসেছ তখন
এই পূণ্যাগ্নিসেবিত ভূমির পূজা কর---এখানে সকল স্বার্থ বলি
দাও। আলস্য ঔদাস্ত --মান অভিমান-সমস্তই এই পূণ্যানলে
আহুতি প্রদান কর। দিয়ে ফেরে, আর পশ্চাতে চেয়ােনা-আর
শ্মশানকে সম্মুখ কর না।
দাদা ও দিদি।
( পট পরিবর্তন)
উজ্জ্বল দৃশ্য।
সুজলা সুফলা শিল্প-সেবিতা হট্টমালা ।
মধ্যে সহচর-সহচরীগণ পরিবৃতা দেশ-লক্ষ্মী।
শ্রী-রঙ্গিণীগণের প্রবেশ ও গীত।
দীঘল রজনী পরে ভেদিয়া আঁধারে
হারানিধি ফিরে এল ঘরে ।
হাতে নে বিজয় ভার গেঁথে নে কমল হার
কাঞ্চন তােরণ দ্বার খুলে দেরে খুলে দেরে ।
আসে হৃদয় রাজা
সাজাগগা রচনা ভারে ভারে। ( শিল্প )
তুলে নে তুলে নে শ্যামল আসনে
পূণ্যঘন শিরে ঢেলে দেরে ঢেলে দেরে।
যবনিকা।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.