Bally Sadharan Granthagar
Pancha Pradip
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
পঞ্চ-প্রদীপ।
বা
( পাঁচটী নানাভাবপূর্ণ সুন্দর গল্প-কথা )
ক্যাটা;" মল্লভূমি
বাঁকুড়া জেলা হইতে
শ্রীনলিনীকান্ত মজুমদার
রচিত ও প্রকাশিত।
TA
সন ১৩১৯ সাল, ১৫ই আশ্বিন।
কলিকাতা, ৬ নং ভীম ঘােষের লেন,
গ্রেট ইডিন প্রেস হইতে
এ, সি, বসু কর্তৃক মুদ্রিত।
মুল্য ॥ আট আনা মাত্র।
No text on this page.
উৎসর্গ।
কুলের-তিলক, বংশের গৌরব,
৮ রজনীকান্ত সরকার,
যিনি বাঙ্গালা দেশের এক অন্ধকারময় পল্লীগ্রামে
একটা ক্ষুদ্র কুটীরমধ্যে জন্মগ্রহণ করিয়া
নিজ প্রতিভায় জন্মভূমির মুখ আলােকিত করিয়াছিলেন,
নিয়তির কঠোর বিধান উপেক্ষা করিয়া
যিনি বন্ধুহীন, অর্থশূন্য এই হতভাগ্যকে
কোলে তুলিয়া লইয়াছিলেন,
তাঁহার চরণ-উদ্দেশে
আমার এই ক্ষুদ্র পুস্তকখানি
অর্পণ করিয়া
ধন্য হইলাম।
১৫ই আশ্বিন, ১৩১৯।
কাটা, মাভূমি। শ্রীর।
খ্রী
No text on this page.
নিবেদন। সূর্যোদয় হইতে রাত্রি এক প্রহর পর্যন্ত কঠিন পরিশ্রম না করিলে যাহার উদরাম্নের সংস্থান হয় না, তাহার পক্ষে সাহিত্য পথের পথিক হইবার আশা দুরাশা মাত্র। জানি আমি সাহিত্য- ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠা লাভ করিবার চেষ্টা আমার মত লােকের পক্ষে বাচালতা ভিন্ন আর কিছুই নহে। কিন্তু তবুও আমি মানুষ। মানুষ আশার দাস। পাঠকবর্গের প্রতি বিনীত নিবেদন, এই পুস্তক মুদ্রাঙ্কনকালে আমাকে দারুণ মানসিক কষ্ট ভােগ করিতে হয়, তাহার উপর সময়ের অত্যন্ত অভাব; সেইজন্য এই প্রথম সংস্করণে দুই একটা স্থানে দোষ রহিয়া গেল। সেজন্য আপনারা আমায় ক্ষমা করিবেন। যদি কখনও এই পুস্তক পুনর্মুদ্রাঙ্কনের উপযুক্ত বিবেচনা করি, কখনও পাঠকবর্গের নিকট সহানুভূতি পাইয়া অন্য নুতন পুস্তকে হাত দিতে পারি—তখন সে বিষয়ে যত্নবান হইব। নহিলে আমার এই প্রথম প্রয়াসেই আশার শেষ হইবে। আমার দোষের জন্য সহৃদয় পাঠকবর্গ আমাকে মার্জনা করিবেন। পরিশেষে কৃতজ্ঞতা সহকারে জানাইতেছি যে, গ্রেট ইডিন প্রেসের স্বত্বাধিকারী ঐযুক্ত সুরেশচন্দ্র বসু মহাশয়ের জ্যেষ্ঠ পুত্র আমার পরম হিতার্থী শ্ৰীযুক্ত মনােহরচন্দ্র বসু যদি আমাকে সহােদরের মত ভাল না বাসিতেন, তাহা হইলে এই পুস্তক যে আরও কতকাল আমার ভাঙ্গা ঘরে পড়িয়া থাকিত তাহা জানি না। ইতি-গ্রন্থকার।
No text on this page.
filiar
পঞ্চ-প্রদীপ।
অভিসম্পাত।
“বৌদিদি ! আর তুমি এত পরিশ্রম কর না। আয়নাট
নিয়ে একবার দেখ দেখি কি হয়ে গেছ ?”
“ঠাকুরপাের ঐ এক কথা, আমি পরিশ্রম না করলে
সংসারের কাজ কি করে সব হবে ?
কেন বড় বৌদিদি ত রয়েছেন, তার ত দিব্যি শক্তি আছে,
উনি কাজ করতে পারেন না?”
“না ভাই ওর মাথার ব্যায়াম আছে, কাজ করলেই সেই
ব্যায়ারা বাড়ে, তা ছাড়া উনি কখনতো কাজকর্ম করেন
নাই, এত কাজ কি কতে পারেন ?
পঞ্চ-প্রদীপ।
“উনি না পারেন একটা ঝি রাখা উচিত; তােমার কিন্তু এত
পরিশ্রম সহ হবে না, তুমি আসন্ন-প্ৰসৰা, মাঝে মাঝে অসুখ হচ্ছে,
তোমাকে বাঁচতে হবেতো।”
ভ্রাতৃজায়া নিৰ্ম্মল ও দেবর যতীন্দ্রের মধ্যে সন্ধ্যার সময় এইরূপ
কথাবার্তা হইতেছিল,—এমন সময় বড় বধূ কিরণশশীর আগমনে
তাহাদের কথাবার্তা বন্ধ হইয়া গেল। বােধ হয় তাহারা উভয়েই
কিরণকে ভয় করিত, নইলে তাহাকে দেখিয়া তাহাদের মুখ
বিবর্ণ হইল কেন ?
পরস্পর ভয়চকিতনেত্রে পরস্পরের প্রতি
চাহিল কেন?
কিরণ বলিল, “ঠাকুরপাের বুঝি আর পড়া শুনা
নাই।” এই কথা শুনিবা’মাত্র ঠাকুরপো” প্রস্থান করিল, পরে
নিৰ্মলার প্রতি চাহিয়া কিরণ বলিল, “মেজবৌ তাের বাপের বাড়ীর
তত্ত্ব এসেছে দেখিছিস ?”
নির্মুলা ধীরে ধীরে বলিল, “দেখেছি।”
বড় বধূ বলিল, “মরণ-আর কি? একটু লজ্জাও হয় না,
ভদ্রলােকের বাড়ীতে এমন তত্বও করে ?”
নিলার মুখখানি ম্লান হইল, শরৎকালীন পূর্ণচন্দ্রের উপর
যেন একটা শিথিল মেঘ ভাসিয়া উঠিল। নিৰ্মলা বলিল, “দিদি,
বাবা আর কোথা পাবেন ?” তাহার কথা অার শেষ হইতে
পাইল না, কিরণের আকস্মিক গর্জনে তাহার ক্ষীণকণ্ঠ আর
শুনিতে পাওয়া গেল না।
কিরণ বলিল, “গয়না বিক্ৰী কৰে-খেয়েই সব ফুরিয়ে
দিয়েছে, তত্ব করৰার টাকাও আর নাই।”
নির্মল| আর সহ করিতে পারিল না ; অথচ কিরণের সম্মুখে
কথা কহিবারও শক্তি নাই। সে ধীরে ধীরে প্রস্থান করিল।
=
পঞ্চ-প্রদীপ।
৩
নাই।
M
নির্মলার এই নীরব প্রস্থানে কিরণের মন উঠিল না, কিছুক্ষণ
তিনি আপন মনে কত কি বকিলেন। পরে আশৈশব পিত্রাল
বাসিনী প্রৌঢ়। শ্যামার সহিত এই কথারই চর্বিত চর্বণে মিযুগ
হইলেন। আমাদের সে গালাগালি শুনিবার অবসব নাই আর সখ ও
যাহা ইচ্ছা তাহারা বলিতে থাকুন,-এই অবসরে নিলার
একটু পরিচয় দিয়া রাখি।
২
নিম্মলার পিতার নাম জগন্নাথ দত্ত। তিনি একজন সঙ্গতিপয়
ভদ্রলােক। পশ্চিম প্রদেশে ঠিকাদারী কাৰ্য্য করিয়া যথেষ্ট অর্থ
উপার্জন করিয়াছিলেন, সংসারে তাঁহার সহধর্মিণী ও একমাত্র
কন্যা নিৰ্মলা ব্যতীত অপর কেহ ছিল না। তবে অবস্থাপন্ন
লােকের গৃহে দুই একটা উপসর্গ জোট ; তাহার বাড়ীতেও যে
সেরূপ দু’একজন ছিলেন না, তাহা নয়।
নিৰ্মলার শ্বশুর ঈশ্বরচন্দ্র সরকার মহাশয় বুদ্ধি করিয়া এক
কন্যার পিতাকে বৈবাহিক করিলেন। বিবাহের সময় তিনি
পণ গ্রহণের কথা উত্থাপন করেন নাই। তিনি বােধ হয় মন
মনে ভাবিয়াছিলেন, এক নির্মূলা ভিন্ন দত্ত মহাশয়ের অন্য সন্তান
তাহার পুত্র দেবেই (যিনি দত্ত মহাশয়ের জামাতা
হইবেন) শরের সমস্ত সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হইবেন। যদি
তিনি সেই সময় পণ গ্রহণের কথা উথাপন করিতেন, তাহা হইলে
বােধ হয় নিৰ্মলার অদৃষ্ট অন্য বর্ণে চিত্রিত হইত। নির্মলাৰ
বিবাহের কিছুদিন পরে তার মাতৃদেবী স্বর্গলাভ করিলেন।
পত্নীশোকে জগন্নাথবাবু অধীর হইয়া কাজকর্ম ছাড়িয়া দিলেন।
তিনি এই ঠিকাদারী কাৰ্য্যে বিস্তর অর্থ ফেলিয়াছিলেন, সহসা
নাই।
৪
পঞ্চ-প্রদীপ।
কাৰ্য্য ত্যাগ করায় প্রায় সমস্তই নষ্ট হইল। কারবারী লােকমাত্রেই
ঋণগ্রহণ করিয়া কারবার করিয়া থাকেন। জগন্নাথবাবুরও
কিছু ঋণ ছিল। টাকা আদায় করিবার জন্য মহাজনেরা নালিশ
করিল এবং বিষয় সম্পত্তি, এমন কি পৈতৃক বাড়ীখানি পর্যন্ত
বিক্রয় করিয়া আসল টাকা এবং তাহার সুদ কড়ায় গণ্ডায়
হিসাব করিয়া লইয়া জগন্নাথবাবুকে অব্যাহতি দিল। তিনি
সৰ্বস্বান্ত হইলেন। তাহার পর এক বিক্রেতা একখানি
১২০০ (বারশত) টাকার হ্যাণ্ডনােট আনিয়া তাহাকে দেখা-
ইলেন। তাহার মাথায় যেন আকাশ ভাঙ্গিয়া পড়িল। আর
তাহার বিষয় নাই, অর্থ নাই, এমন কি পৈতৃক বাসভবনখানি
পর্যন্ত নাই,—যাহার দ্বারা তিনি এই ঋণ হইতে মুক্ত হন।
মহাজন ও আদালতের আশ্রয় গ্রহণ করিলেন। তঁাহার নামে
ওসারেট বাহির হইল। নিৰ্মলা শুনিল বারশ টাকার জন্য তাহার
পিতাকে কারাগার যাইতে হইবে।
সে তাহার সমস্ত অলঙ্কার
উন্মােচন করিয়া পিতার হস্তে দিল। পিতা কন্যার অলঙ্কার বিক্রয়
কমিয়া ঋণ হইতে মুক্ত হইলেন।
পুনরায় কার্য করিবার দত্ত মহাশয়ের আর শক্তি ছিল না।
কন্যাকে শ্বশুরগৃহে পাঠাইয়া দিয়া আপনি এক আত্মীয়ের গৃহে
আশ্রয় গ্রহণ করিলেন। কিছুদিন পরে নির্মলার শ্বশুরের মৃত্যু
হইল। তিনি যতদিন বাচিয়াছিলেন, ততদিন নিৰ্মলাকে কেহ
অস্কারের কথা কিছু বলে নাই। তাহার
তঁাহার বড় বধূ, বড় লােকের মেয়ে, ১০০ (একশত) টাকা
বেতনের বড় বাবুর স্ত্রী, শ্রীমতী কিরণশশী অভাগিনী নিৰ্মলাকে
সেই অলঙ্কারের জন্য মর্মপীড়া দিতে লাগিলেন। সে মর্মবেদনা
মৃত্যুর পরেই
পঞ্চপ্রদীপ। ৫ } নির্মল। একদিন সহ করে নাই, প্রতিদিন উঠিতে বসিতে, লােকসমাগমে তাহাকে সুস্থ করিতে হইত। সংসারে শ্বাশুড়ী ছিলেন না, সুতরাং বড়বধূ গৃহিণী। কে তাহার কথায় উচ্চবাচ্য করিবে ? কন্যার অলঙ্কার বিক্রয় করিয়া হতভাগ্য বুদ্ধ জগন্নাথ নিশ্চিন্ত ছিলেন না; এক সময়ে তিনি যথেষ্ট অর্থ উপার্জন করিয়াছিলেন। এবার কন্যার জন্য অপরের আশ্রয়ে একটী সামান্য কাব্য করিতে সঙ্কল্প করিলেন; কিন্তু অকর্মণ্য বুদ্ধকে কে কাৰ্য্য দিবে। বিশেষতঃ তাহার হৃদয় চূর্ণ হইয়া গিয়াছি। কেবল প্রবল কর্তব্যের তাড়নায় আবার কাৰ্য্য করিতে আসিলেন। কিন্তু অর্থ বড় দুর্লভ। শরীরের এক এক বিন্দু রক্তের মূল্য এক একটা পয়সা, তঁাহার আর রক্ত নাই, পয়সা কোথায় পাইবেন ? কেবল অস্থি আর মাংস থাকিলে পয়সা পাওয়া যায় না। দিনকতক কৰ্ম্মের পর কর্তাবাবু বলিলেন, “আপনার অবস্থা খারাপ হইয়াছে আর আপনার শক্তি নাই, আপনি যান, আমরা অন্য লােক দেখি।” হতভাগ্য বৃদ্ধের মাথায় আকাশ ভাঙ্গিয়া পড়িল। তিনি তপা হইতে বিদায় হইলেন, অনেক স্থানে চাকরী অন্বেষণ করিলেন, কিন্তু সকল স্থানেই সেই এককথা; শেষে বৃদ্ধ চোখের জল ফেলিতে ফেলিতে পুনরায় সেই আশ্রয়দাতা নিখিল বাবুর গৃহে আশ্রয় গ্রহণ করিলেন। তার কর্মজীবন আজ শেষ হইল। অদৃষ্ট, তােমার গতি বড় বিবর্তনশীল ! কাহাকে কখন কোন্ পথে লইয়া যাও তাহ মানবের মর-চক্ষুর অতীত। এই জগন্নাথ একদিন কত প্রতিপালন করিয়াছেন, কত অশয়হীনকে আশ্রয় দিয়াছেন, কত নিম্নের আহারের সংস্থান ৬ পঞ্চ-প্রদীপ। করিয়াছেন, আর আজ তিনি তােমারই চক্রে একমুষ্টি উদরামের জন্য,-বৃদ্ধবয়সে একটু আশ্রয়ের জন্য অপরের দ্বারস্থ। তাহারই সঙ্গে সঙ্গে বলি, “বিধাতা, তােমার রচনার বাহাদুরি আছে। যখন যাহাকে তেল, তথন উন্নতির একটা সােপান হইতে অপর সােপানে এবং তথা হইতে একটী একটী করিয়া উচ্চতম শৃঙ্গে লইয়া যাও, কিন্তু যখন ডুবাইতে আরম্ভ কর, তখন আর ভূপৃষ্ঠে ও তাহার স্থান নাই, বােধ হয় পাতালেও তাহাকে স্থান দাও না। তােমার অন্ধ-নয়ন তাহার দুর্দশা দেখিতে পায় না, তােমার বধির শ্রবণেন্দ্রিয় সে হাহাকার শুনিতে পায় না। আমি আবার বলি, “তােমার এ রচনার বাহাদুরি আছে”। পরের আশ্রয়ে থাকিয়া ৩, শক্তিবিহীন হইয়াও বৃদ্ধ জগন্নাথ মাঝে মাঝে কন্যাকে দেখিতে আসিতেন। তাহাকে ভূষণবিহীন দেখিয়া চক্ষের জল ফেলিতেন; কিন্তু নিৰ্ম্মল। একদিনের জন্য ও তাহার নির্যাতনের কথা বুদ্ধ-উপায়বিহীন পিতাকে শুনিতে দেয় নাই। অলঙ্কারের জন্য কত লাঞ্ছনা ভোগ করিয়াছে, সমস্ত গৃহস্থের বিরাগভাজন ও ঘৃণার পাত্রী হইয়াছে, তবু সে পিতাকে দেখাইত যে শ্বশুরালয়ে খুব সুখে আছে। বােধ হয় এই অলঙ্কারের জন্মই সে স্বামীর সােহাগ পর্যন্ত হারাইয়াছিল। কেন যে দেবেন্দ্র ইদানীং নিৰ্মলাকে ভালবাসিত না, তাহার কারণ বিশেষ জানতে পারা যায় না। তবে বােধ হয় জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা ও ভ্রাহঙ্গয়া কিরণশশী তাহার উপর বিরক্ত, তাই তাহা এত অনাদর এত তাচ্ছিল্য। দেবেন্দ্র ভ্ৰাতৃভক্ত, কিন্তু প্রকৃত ভ্ৰাতৃভক্তিপরায়ণ ইয়া যে স্ত্রীর প্রতি অসৎ ব্যবহার করিত তাহা বলিতে পারি না।
পঞ্চ-প্রদীপ। ৭ বড় বন্ধু, ভক্তি ভ্রাতা বা ভ্রাতৃজায়াকে নয় ; ভক্তি অর্থকে নতুবা যে সহধর্মিণী, তাহাকে কে সামান্য দুই এক খানা অলঙ্কারের জন্য এত তাজি ল্য করে ? কিরণশশী বড়লােকের মেয়ে, সংসারের কাজকর্ম কিছু জানিতেন না, বা জানিলে ৭ করিতেন না। আজ মাথাধরা, কাল পেটের ব্যায়াম ইত্যাকার অসুখের দোহাই দিয়া তিনি সংসারের কার্য হইতে প্রায়ই অব্যাহতি পাইতেন। এখন নিৰ্ম্মল। আসন্ন প্রসব, তথাপি তাহার নিস্তার নাই। এই অবস্থায় এত কাৰ্য্য করিয়া ও হাস্যময়ী নিৰ্ম্মলার মুখ প্রস্ফুটিত শতদলের মত প্রফুল্ল, স্বামীর অনাদরেও স্বামীর প্রতি ভক্তিমতী। সে অলঙ্কারের জন্য কখনও ক্ষুন্ন হয় নাই। কিরণ বড়লােকের মেয়ে, বড় লােকের স্ত্রী, এক গা গহনায় অঙ্গ ঢাকিয়া রাখিতেন, আর তাহার পার্শ্বে নিরাভরণা নিৰ্ম্মল হাসিমুখে বসিয়া থাকিত। যে প্রকৃত সুন্দরী তাহার আবার ভূষণের প্রয়ােজন কি ? এস দেখি কিরণ! একবার অঙ্গরাগে দেহখানি রঞ্জিত করিয়া, কবরী হইতে পদ প্রান্ত পর্যন্ত অলঙ্কার-খচিত অঙ্গ পানি নীলাম্বরী শাটীতে অদ্ধাবৃত করিয়া নিলার পার্শ্বে দাড়াও দেখি-- তােমার কৃত্রিম বেশভূষা তাহার নিকট মান হইয়া যাইবে। চম্পক- পুষ্পবিনিন্দিত তাহার কান্তি, অনিন্দ্যসুন্দর তাহার মুখাবয়ব, আপাদবিলম্বিত তাহার ঘনকৃষ্ণ চিকুরকলাপ। নির্মলার অঙ্গ- রাগের প্রয়ােজন কি ? তােমার ও ছাইভস্মগুলা উহার সম্মুখে আনিও না, নির্মলার নির্মাল্য নষ্ট করিও না। ৪ ভগ্নহৃদয় বৃদ্ধ জগন্নাথ অনেকদিন কন্যার খোঁজ লইতে পারেন পঞ্চ-প্রদীপ। নাই। তাহার আর পথ চলিবার শক্তি নাই। কাজেই কন্যাকে দেখিতে আসিতে পারেন নাই। নিখিল বাবুর জামাতা তঁাহাকে দুইটা টাকা দিয়া প্রণাম করিয়াছিলেন। বৃদ্ধ সেই দুইটা টাকায় একখানি সাড়ী ও কিছু মিষ্টান্ন কিনিয়া কন্যার বাড়ীতে পাঠাইলেন। সেই দেড় টাকার কাপড় ও আট আনা মিষ্টি দেখিয়া কিরণশী সমস্ত গ্রামের লােককে নিমন্ত্রণ করিল এবং তঁাহাদের সম্মুখে নিৰ্মলার পিতার স্বর্গের পথ সুগম করিতে লাগিল। এই সংবাদ যে শুধু সে ক্ষুদ্রগ্রামখানির মধ্যে সীমাবদ্ধ রহিল তাহা নহে, ইংরাজ কোম্পানীর ডাকযােগে সুদূর বিদেশে,যথায় দেবেন্দ্র ৪০ টাকা বেতনের চাকরী করিতেন তথায় প্রেরিত বড় বধুর পত্র পাইয়া দেবেন্দ্র নির্মলাকে কেবল এই কয়টা কথা লিখিয়া একখানি পত্র দিলেন-“নিৰ্মলা তুমি মর তাহা হইলে বােধ হয় আমি শান্তি পাইব।” নিৰ্মলা দেবের পত্রের কিছু উত্তর দিল না। সে মনে মনে স্বামীকে শান্তি দিবার জন্য মৃত্যু স্থির করিল। তাহাকে মৃত্যুর জন্য অন্ত কিছু করিতে হইল না। তাহার মৃত্যুর জন্ত অহিফেন বা রজুর প্রয়ােজন নাই। তাহাকে যে পরিশ্রম করিতে হইত, তাহাতেই প্রতি মুহুর্তে শ্বাসরুদ্ধ হইয়া তাহায় মৃত্যু সম্ভব। সে এতদিন কেবল চেষ্টা করিয়া স্বামীর জন্য প্রাণী কোনরূপে লুকাইয়া রাখিয়াছিল। আজ স্বামীর কথায় নিভৃত কক্ষের অর্গল উন্মুক্ত হইল। সেদিন সে এত পরিশ্রম করিল যে সন্ধ্যার সময় মূৰ্জিত হইয়া পড়িয়া গেল। বড় বধূ বলিলেন, “ও সব কিছু না, কেবল আমাকে কাজ করার ফনি।” কালী দাসী' (ইনি ফুলশয্যার পঞ্চ-প্রদীপ। দিনে বিধবা হইয়াছেন এবং তাহার পরদিন হইতে পিতার অন্নের সদ্ব্যবহার করিয়া ও গ্রামের লােকের সহিত ঝগড়া করি। সময় কাটান) বলিল, “জান না বৌদিদি ওসব এই যে কি বলেখিটের না পিটের কি লােগ ঐ উলবােনা ভাতারকে পত্র লেখার মত একটা ঢং এসেছে। তােমাদের মেজ বৌএর বােধ হয় একবার একটু ইচ্ছে হয়েছে”—এইরূপ বলিতে বলিতে তাহারা কক্ষ হইতে নিষ্কন্ত হইলেন। নিৰ্মলার মূৰ্ছায় বাড়ীর মধ্যে একটা হুলুস্থুল পড়িয়া গেল। পাঠাগারে পাঠ-নিরত যতীন্দ্রের কর্ণে সেই শব্দ বাজিবা মাত্র সে ব্যস্তভাবে তথায় ছুটিয়া আসিল এবং নির্মলার শুশ্রুষায় নিযুক্ত হইল। প্রায় ১৫ মিনিট যতীরে শুনার পর নির্মলার চৈত হইল। সে দেখিল, যতীন্দ্র ব্যতীত তাহার নিকট কেহই নাই। বাহিরে একটা হুলস্থূল পড়িয়া গিয়াছে। বুঝিতে পারিল যে তাহারই কথা হইতেছে। অভাগিনী আর উঠিল না কেবল যােড়হস্তে দীননেত্রে ঈশ্বরকে বলিল, “ভগবান আর কেন, এইখানে যবনিক। ফেলে দাও।” তার পর বিকম্পিত প্রাণের কদ্ধ আবেগ তপ্তদীর্ঘশ্বাসে তরল হইয়া তাহার নয়নপ্রান্তে দেখা দিল। নিৰ্মলার চৈতন্থ হইয়াছে দেখিয়া ক্ষণকাল পরেই যতীন্দ্র তথা হইতে ধীরে ধীরে প্রস্থান করিল। এবার নির্মলা কঁদিবার সময় পাইল। স্বামীর পত্রখানির কথা মনে হইল। আর সে নয়ন বারি থামিল না। উচ্ছাময়ী নদীর মত মুখমণ্ডল ও বক্ষস্থল প্লাবিত করিয়া ছুটিতে লাগিল। তবে কঁাদ নির্মলা, কাদ! হায় অভাগিনী তােমার স্বামী আছে, পিতা আছেন, তবুও আজ তুমি পথ-প্রদীপ। অনাধিনী ! কে তােমার নয়নজল মুছাইয়া দিবে ? ত েকান, যদি ভগবান ইচ্ছা করেন এ জল থামিবে-নহিলে কার ? নির্মলা কঁদিতেছে, এমন সময়ে যতীন্দ্র পুনরায় তথায় উপস্থিত হইল। এই শত্রুপূর্ণপুরী মধ্যে সেই তাহার একমাত্র হিতাকাঙ্ক্ষী এবং তাহাকে জননী-মত ভক্তি করিত। যতীন্ ডাকিল, ‘বৈৗদিদি”। তাড়াতাড়ি নির্মলা মলিন অঞ্চলে মুখ মুছিল; কিন্তু কোন উত্তর দিতে পারিল না। মুতী বলিল “বৌদিদি তুমি কাঁদছ।” নিন। অতি কষ্টে অশুসংবরণ করিয়া বলিল “না কঁদি নাই।” যতীন-কাদ নাই বৌদিদি? তােমার চোখ যে ফুলে গেছে ? খ যে লাল হয়ে গেছে? কেন বৌদিদি কঁচো ? নিলা কথা কহিতে পারিল না। যতীন—তুমি কেঁদো না; প্রসব হলেই তােমাকে গিয়ে দাদার ছে রেখে আসবাে। ) নির্মলা আর পায়ে তাহার সেই যুগ্মভুরুবিশিষ্ট স্কুল- ভারাক্রান্ত কাতর নয়ন যেন টল টল করিয়া উঠিল; বুঝি চক্ষু ফাটিয়া জল বাহির হইল। যতীনও কাঁদিল। অনেকক্ষণ পরে নির্মল। বলিল, ভাই তােমার আমার সমান কষ্ট। ঈশ্বরকে ডাকি তিনি আমাদের কষ্ট দূর করবেন। ঈশ্বরের নাম শুনিয়া যতীন চমকিয়া উঠিল। নিলার পানে চাহিয়া বলিল, “বললাম বৌদিদি ওনাম মুখে এনােনা। সয়তান, কু। তার নাম করলেও লােকে কষ্ট পায়।”
পং-এীল।
।
নিৰ্মলা।-ছি ভাই ওকথা বলতে নাই। আমরা নিজ নিজ
কৰ্ম্ম সারে
করি ; সে-সুন্ন্য তার দোষ দেওয়া
মহাপা, ঈর দয়াময়।
উত্তেজিতকণ্ঠে যতীন্ন রলিল, “আমি বলছি ঈশ্বর তােষামোদী।
তিনি যদি দয়াময় তবে তোমার কষ্ট কেন? তুমি তাে
কোন অপমানকে অপমান বলনি? আসন্ন প্রসব তুমি, হাসিমুখে
এত পরিশ্রম কছ ;-সতী তুমি! স্বামীর নিকট লাঞ্ছিত হয়ে
তাঁর প্রতি তােমার ভক্তি অটল তবু তোমার এত কী? আয়
ও সয়তানী, যে স্বার্থ ভিন্ন কিছু বােকেন, পরের অনিষ্ট না
করলে যে জলগ্রহণ করে না, একটি পয়সা যে শােকের
বুকে ছুরি মাতে পারে, তার এত সুখ, এই প্রভুত্ব ? আমি
আবার বলচি বৌদিদি “ঈশ্বর তোষামােদকারী”,
হয়ে যদি তিনি দয়াময় হন, তবে তিনি না। তাহলে আমি
তঁার অস্তিত্ব পৰ্য্যন্ত স্বীকার করতে চাই না। এমন সময়ে বিশে
আকস্মিক গজ্জনে তাহাদের মুখের ঈশ্বর ভয়ে মুখেই লুকাইলেন।
কিরণ হাসিতে হাসিতে বলিল, “দেখ মেজবৌ বেশ হযেছিল,
সেই সেদিন যাত্রা শুতে গিয়েছিলাম সেই রাধিকা যেমূৰ্ছ।
গিয়েছিলো। তােয়ে। ঠিক তেল্পিই হয়েছিল। বেশ শিখেছিস।”
যতীন ৰা নিৰ্মলা তাহার কথার কেহই উত্তর করিল না।
কিরণ বলিল, “এখনতে হয়েছে। এবার ওঠে ভাত চাপাতে
হবে; কুটননা কুটে আমার হাতে ব্যথা হয়েছে, আমি আর
পারি না।”
নির্মলা বলিল, “দিদি আজ আমার বড় মাথা ঘুরছে, আর
আমি আর পাবাে না।”
১২ পঞ্চপ্রদীপ। নির্মলার কথা শুনিয়া কিরণ একেবারে আলিয়া গেল, বলিল- শরীর তো তােমার তিরিশ দিনই খারাপ হয়। সংসারে এত কাজ কে করে ? তবে তােমার বাপকে কি সােয়মীকে লেখ তারা একটা ঝি পাঠিয়ে দিক ? এই বলিয়া দাবার ঘােড়ার চালের মত একলাফে আড়াই ঘর চলিতে চলিতে তর্জন গর্জন করিয়া কিরণ অন্তর্হিত হইল। যতীন নির্মলার চক্ষে জল দেখিয়া আর দাড়াইতে পারিল না। আর অভাগিনী নির্মল অশ্রুসিক্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলিয়া আবার বলিল, “ভগবান আর কেন, এইখানে আমার কষ্টের অবসান কর।” উক্ত ঘটনার দুই দিন পরে নিৰ্ম্মল। একটা পুত্রসন্তান প্রসব করিল। নবকুমারের মুখ দেখিয় অভাগিনী সব দুঃখ, সব জ্বালা • ভুলিয়া গেল। আবার তাহার বাচিতে ইচ্ছা হইল। একদিন দুইদিন করিয়া পুরটী সাতদিনের হইল। বিধাতা ভাঙ্গা কপালই ভাঙ্গেন। তঁাহার চক্ষে নিৰ্মলার এ সুখ সহ্য হইল না।' আটদিনের দিন অন্ধবিধাতা অভাগিনীর পুত্রটাকে গ্রাস করিল। সঙ্গে সঙ্গে নির্মলারও সুতিকা ব্যায়াম ধরিল। একদিন কাটিল, দুইদিন কাটিল, পাড়ার দুই একজন লােক কিরণকে ডাক্তার আনাইবার পরামর্শ দিল। কিরণ বলিল, টাকা তো হাতে নাই, মেজ ঠাকুরপােকে লিখেছি। এই কথা নিৰ্ম্ম লা শুনিল। সে 'একবার দেবেন্দ্রকে দেখিবার জন্য ছটফট করিতে লাগিল। যতীন্ নিৰ্মলার পিতাকে পানিতে লােক পাঠাইল এবং দেবেঙ্গকে আসিবার জন্য
পঞ্চ-প্রদীপ।
টেলিগ্রাম করিল। বৃদ্ধ পিতা জগন্নাথ কন্যার পীড়া শুনিয়া তথা
ছুটি । আসিলেন এবং ভাল ডাক্তার নিযুক্ত করিলেন। কিন্তু
অভাগিনীর জীবন-প্রদীপ তখন তৈলঙ্গ কে তাহাকে
করিবে? পুত্রের মৃত্যুর পাঁচদিন পরে অভাগিনী স্বামীর একখানি
পত্র পাইল। পত্রখানি যতীনের নামে লেখা। দৈবে লিখিয়াছে,
যতীন্! আমার বলিতে যা আছে তাই দিয়া তুমি নিৰ্মলাকে
ডাক্তার দেখাইবে। এমন কি প্রয়োজন বিবেচনা করিলে আয়,
বিক্রয় করিবে আমি গিয়া তোমায় খণশেষ করি।
আমার নির্মুলা যেন অযরে পালায় না।”
নিল। স্বামীর সেই পত্র দেখিল। “আমার নিল।” এই
ইটা কথা হইতে আর চক্ষু ফিয়িল না। শুধু কপােল বহিয়া
জলধারা বহিতে লাগিল। সম্মুখে পিতাং নিকটে ডাক্তার, অভাগিনীর
সংজ্ঞ নাই। নির্মলা মনে মনে বলিল,-শেষ মুহুর্তে আমি স্বামীর
পূর্ণ ভালবাসা পাইয়াছি আর আমার মৃত্যুতেও দুঃখ নাই।
আবার তাহার বাচিতে সাধ হইল। আবার আমার নিল।”
ভাল করিয়া দেখিতে গেল কিন্তু তাহার দৃষ্টি ক্রমশঃ কী হইতে
ক্ষীণতর হইয়া আসিতেছে, শেষে পত্রখ্যাত অবশ হস্তখানি তাহার
বুকের উপর পড়িল। সব শেষ হইল-“নির্মলা মরিল। মলি কি ?
না সে শান্তি পাইল। তাহার জীষনব্যাপিনী মালা আ
হইল। সে জুড়াইল। এলিল কে?-বৃদ্ধ হততাগ্য জগন্নাথ।
পাঠক একবায় দেখ ! ওই দূরে, মৃত্যুর মহিমশয্যায়
মহিমাময়ী নির্মা। ওই যে, তাহার খলিতৰুণৰধ্যে দিয়ে
ঔজ্জল্য। ওই দেখ তাঁহার মুখমণ্ডল মৃত্যুতে কেমন পাখি
৩াধর কেন হয়, আর তাহার পার্কে হতাগ্য জগন্না।
***
পঞ্চ-প্রদীপ।
NA:
এ এ এ
কার ললাটে করয় রক্ষা করিয়া কেমন স্থির ! দৃষ্টি কি
উদাসভাবপূর্ণ! কি গভীর দীর্ঘশ্বাস ! কি ঘন-কম্পিত বক্ষস্থল !
এই আগ্নেয়গিরি ফাটিল। ওই হাহাকারে দিগন্তু পৃর্ণিত হইল,
নয়নসলিলে মৃতকন্যার মুখমণ্ডল সিক্ত করিল।
আবার স্থির।
কতকগুলি লােক আসিয়া নিৰ্মলার মৃতদেহ শ্মশানে লইয়া
গেল। আবার সেই হৃদয়বিদারক হাহাধ্বনি উঠিল। ওই বুঝি
সে করুণ-দৃশ্যে পৃথিবী কাটিয়া যায়।
৭
নির্মলার মৃত্যুর পর দেবেন্দ্র বাড়ী আসিল। সে , যাহাই
হউক মানুষ পিশাচ নয়। তাহার মনুষ্যত্ব আছে। পত্নী
মৃত্যুতে সে খুব কাতর হই। একদিন সে বিষন্নভাবে বসিয়া
ছিল আটদশটা স্ত্রীলােক তাঁহার সম্মুখে অন্ধ চক্রাকারে বসিয়া
তাহাকে সান্ত্বনা দিবার চেষ্টা করিতে ছিল।
কিরণ বলিল—এমন তো অনেকেরই হয়, তার’জন্য আর না
খেয়ে সারাদিন চুপ করে বসে থাকলে কি হবে। আবার ভাল
বৌ আনবো। আমি আশীর্বাদ কচি তুমি সুখী হবে।
ঠিক এই সময় কি একটা বিকট শব্দ হইল। সকলেই
কৌতুংক্রান্ত হইয়া চাহিয়া দেখিল উন্মত্ত জগন্নাথ তাহাদের
সম্মুখে দাঁড়াইয়া আছে।তাহার পশ্চাতে যতীন্দ্রনাথ।
জগন্নাথ তীরবেগে তাহাদের নিকটে আসিয়া দাঁড়াইয়া
লিল, “আশীর্বাদ ? আর আমার ? কে নেবে? কে সহ
চতে পারবে? এসো, এসাে, আপন আপন বুক দিয়ে সংসারটা
ছেয়ে ফেল। তােমরা আমার সোনার প্রতিমাকে পুড়িয়ে ছাই
পঞ্চ প্রদীপ।
করে দিয়েচো, ছাই ভস্মে তোমাদের সংসার আবৃত হয়ে যাক্।
আমার অভিসম্পাতে তৈয়বকুটা
ভৈরবকুটা শীঘ্রই এই স্থানে একটা
ভীষণ দৃশ্য দেখিয়ে দেবে।”
উপস্থিত সকলেই চক্ষু নত করিয়া ছিল, বুদ্ধের দিকে চাহিত
কাহারো সাহস হইতে ছিল না। বৃন্ধের কণ্ঠস্বর শেষ হইবার
পর সকলেই এন্তে সম্মুখে চাহিল। কিন্তু সে তখন অদৃশ্য
হইয়াছে। তাহার অভিসম্পাতের বিভীষিকাময়ী প্রতিনি
তাহাদের চারিদিকে অলক্ষে আস্ফালন করিতে লাগিল।
মিলন। ১ পৌষ মাস। রাত্রি দ্বিতীয় প্রহর অতীত হইয়াছে। একটি ছোট নদীর উপর একখানি দ্বিতল অট্টালিকার একটি ক্ষুদ্র কক্ষে বসিয়া একটি বিংশবর্ষীয় যুবক পাঠে নিমগ্ন। তাহার সম্মুখে একটি দেওয়ালগিরি জ্বলিতেছিল। দেওয়ালগিরি বলি কে যেমন বিবিচিত্র-সুশােভিত, ঘসাকাচের সানুষবেষ্টিত, ডবল শিপাযুক্ত মূল্যবান আলােকধর মনে করিবেন না। সময়ে উহার মূল্য চারি টাকা ছিল কিন্তু আজ সে বিগত বৈভব উপায় বিহীন বৃদ্ধের মত,--পথে সেল দিলেও কেহ লইবে না। গর নিম্নে দুইটা পার্শ্বে পীচটী তালি দেওয়া এবং ফানুষটির পটা দিয়া এমন অবস্থা হইয়াছে যে সেইটা কাচের কি কাগজের ফানুষ তাহা শীঘ্র বুঝিতে পারা যায় না। এই আলোকটা সম্মুখে রাশিয়া যুবক একমনে পুস্তক পাঠ করিতেছিল। একে পৌষ মাস তাহাতে আবার কয়েকদিন হইতে বাদলা হওয়ায় শীতের প্রকোপ বৃদ্ধি হইয়াছে তাহাতেও দেখিতেছি অধ্যয়নরত যুবকের লা:ট শুত্র মৌক্তিকের ন্যায় কয়েকটী দবিন্দু। একি! এ প্রবল শীতে যুবকের ললাটে স্বেদবিন্দু দেখা যায় কেন? তবে কি সে পাঠে ডুবিয়া গিয়াছে।
পঞ্চ-প্রদীপ।
০
তাই কি এই দারুণ শীতের পরাক্রম বুঝিতে পারে নাই ? যুবক!
ধন্য তোমার সাধনা, এ কঠোর সাধনায় সিদ্ধি অবশম্ভাবী।
ক্রমশঃ আলােকের জ্যোতি হ্রাস হইয়া আসিতে লাগিল।
বােধ হয় তৈলাধার শূন্য হইয়া আসিয়াছে, তবে তো যুবকের
সাধনার বিঘ্ন হইবে ? তবে তো ধ্যান ভঙ্গ হইবে? হায়! যদি
সাধনার অন্তরায় না থাকিত তবে বােধ হয় অনেকেই সাধক
হইতে পারিতেন।
আলােকটা নিৰ্বাপিত হইয়া গেল। যুবকের ধ্যান ভঙ্গ
হইল। সে উঠিয়া পার্শ্বের কক্ষের সম্মুখে গিয়া দরজায় ধাক।
দিতে লাগিল। অনেকক্ষণ কেহই তাহার কথার উত্তর দিল না।
অনেক ভাকাডাকির পর রুক্ষ্মস্বরে কে বলিল, “লােকের একটু
ঘুমাবারও যো নাই; কেন, কি হয়েছে?”
যুবক বলিল, “আমার আলােতে তেল নাই, আপনার
আলােটা এক বার দিন।”
সেই ব্যক্তি গৃহের মধ্য হইতেই বলিল, “কে এ শীতে গায়ের
ঢাকা থোলে ? আমি পারবোনা; আর পড়ে না, শশা ও গে।”
হায় স্বার্থপর জীব! তােমার মনে কি একটুও সহানুভূতি
নাই? একজন এই রাত্রে নিজ ব্রত সাধনের জন্য প্রাণ উৎসর্গ
করিতেছে আর তুমি একটু শীতের ভয়ে একবার দরজা উন্মুক্ত
করিতেও কাতর ?
যুবকের আর রাত্রে পড়া হইল না। ক্ষুন্নমনে বিছানায়
শুইয়া পড়িল।
এমন সময়ে মৃদুস্বরে কে ডাকিল “প্রভাত”।
যুবক তাড়াতাড়ি উঠিয়া দরজা খুলিয়া বলিল, “রো!”
এত রাত্রে তুমি এখানে কেন ?
পঞ্চ-ীপ।
সুরবালা বলিল, “তুমি জকছিলে?”
প্রভাত।-“আমি তো তােমাকে ভাকি নাই ? আমার
আলােতে তেল ছিলনা বলে সরকার মহাশয়কে ডাকছিলাম।”
সুরবালা।-আলো পাওনি ?
প্রভাত।-না, তিনি দরজা খুলে দিলেন না।
সুরবালা।-তুমি ঘুমিয়ে পড়োনা আমি আছি।
এই বলিয়া দ্বাদশবর্ষীয়া বালিকা সুরবালা ছুটিল। একটু পরে
একটা বাতি আনিয়া বলিল, “এই নাও, পড়; তুমি আমাকে
বলনি কেন, আমি তােমাকে বাতি বা তেল এনে দিতাম।”
প্রভাত।-তুমি যে এত রাত্ৰি পৰ্য্যন্ত আমাকে বাতি দিবার
জন্য জেগে বসে আছ তা কে জানে?
সুরবালা।-আমরা তাে এখনাে ই নাই।
মা এই খেতে
বসেছেন, আমি তার কাছে বসে ছিলাম, তােমার ডাকাডাকি
;
এনে এলাম।
প্রভাত মনে মনে বলিল, “তোমাদের ঋণ আমি জীবনে
পরিশোধ কন্তে পাঝো না।” প্রকাশ্যে বলিল, 'যা ও শোওগে
“তুমি পড়” -এই বলিয়া বালিকা চলিয়া গেল। যুবক আবার
পড়িতে বসিল।
২
দরিদ্রের গৃহে প্রভাতের জন্ম। শৈশবেই হতভাগ্য পিতৃয়েই
হইতে বঞ্চিত হইয়াছিল। সংসারে বিধবা জননী ভিন্ন আর
অপর কেহ ছিল না। তিনি ৰুই সৃষ্ট কোন মতে দিমপাত
করিতেন।
বর্ধমামের খ্যাতনামা উকীল, মহিমচন্দ্র ঘােষ প্রভাতের পিতার
পঞ্চ এপ। বন্ধু ছিলেন। তঁাহারই গৃহে থাকিয়া প্রতাত লেখা পড়া করিত। তাঁহার স্ত্রী শ্রীমতী যামিনীও তাহাকে পুত্রের মত মেহ করিতেন। সকলের অধিক মহিমবাবুর কন্যা সুরবালা তাহাকে জ্যেষ্ঠর মত ভালবাসিত। তাহার জন্য প্রভাতকে কোন জিনিসের জন্য কষ্টবােধ করিতে হইত না। সকাল ছয়টার সময় প্রতাত যখন পড়িতে বসিত, সুরবালা চায়ের পিয়ালা হাতে লইয়া তাহার নিকট উপস্থিত হইত। তাহার স্নান করিবার পূর্বে পাচকের সহিত সুরবালার প্রায়ই ঝগড়া হইত। বিদ্যালয়ের কঠোর পরিশ্রমের পর প্রভাতের যখন বাড়ী আসিবার সময় হইত, বালিকা আসনের সম্মুখে খাবারের পাত্রটী নামাইয়া পথপানে চাহিয়া থাকিত। প্রভাতও তাহাকে ভগ্নীর মত স্নেহ করিত, হিলে এত ভালবাসা কি করিয়া পাইবে ? মহিমবাবুর একটি কনিষ্ঠ ভ্রাতা ছিলেন, তাহার নাম, জীবনচ। জীবনবাবু বিদ্যাশিক্ষা করেন নাই। কোন কাজ-কৰ্ম্ম করিতেন না। তিনি ধূমপানে, মাদক-সেবনে, এবং বারনারী-সেবায় বিশেষ পারদর্শী ছিলেন। বর্ধমানের মত মগরে এই সব বিষয়ে তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ বলিয়া তাহার খ্যাতি ছিল। তিনিও প্রভাতকে মাঝে মাঝে ভালবাসিতেন। যখন তামাক সাজিবার প্রয়ােজন হইত কি অঙ্গসেবার দরকার হইত, তখন তিনি তাহার গায়ের ও পায়ের মাপ লইতেন কিন্তু মাপ লওয়া পৰ্য্যন্তই হইত কাৰ্য্যে বিশেষ কুলাইত না। সে অ প্রভাত কখনাে অসন্তুষ্ট হয় নাই, সে জানিত মহিমবাবু তাহার যে উপকার করিতেছেন জীবন দিলেও তাহার পরিশােধ হয় না। এইরূপে প্রভাতের দিন চলিতে লগিল, ক্রমশঃ তাহার
:
পঞ্চ-প্রদীপ।
~~~
নির্বাচনী পরীক্ষার সময় হইয়া আসিল। এই পরীক্ষার পর
তাহাকে প্রবেশিকাসমুদ্রে দাড়াইতে হইবে। এখন সে পরীক্ষায়
পাশ করিবার কথা তত ভাবে নাই, তবে একটা চিন্তাঝড়
তাহাকে আকুল করিয়া তুলিয়া ছিল। তাহার ফিয়ের টাকা
কে দিবে? দুই এক টাকার কথা নয়, যে মহিমবাবুর নিকট
চাহিয়া লইবে দশটী টাকার প্রয়ােজন। মহিমবাবু তাহাকে
যথেষ্ট অনুগ্রহ করেন সে জানিত তিনি তাহাকে এই টাকা দিবেন
কিন্তু চাহিবে কিরূপে।
নির্বাচনী-পরীক্ষা দিয়া প্রভাত প্রথম স্থান অধিকার করিল।
বেলা ১০টার সময় জীবনবাবু আহার করিয়া বাহিরের গৃহে
শয়ন করিলেন। অতিরিক্ত বেলায় আহার করিয়া ভাত হজম হইবে
না বলিয়া বােধ হইল। তিনি প্রভাতকে একটা সােডা আনিতে
বলিলেন। প্রভাত সােডা আনিয়া দিল তিনি তাহা পান করিয়া
মাথায় হাত বুলাইতে বলিলেন। প্রভাত এইবার আপনার কথা
উত্থাপন করিবার সময় পাইল। সে জানিত জীবনবাবুর হাতে
যথেষ্ট অর্থ আছে, সে সমস্তই উনি বাজে নষ্ট করিতেছেন আর
তঁাহার এত প্রয়ােজনেও কি ১০টা টাকা দিবেন না। তাই
স কথাটা তুলিতে সাহস করিল।
জীবনবাবুই অগ্রে কথা তুলিলেন, তিনি বলিলেন, প্রভাত
তােমার পরীক্ষার খবর পেয়েছ ? ·
প্রভাত, আমি প্রথম হয়েছি।
প্রভাতের কথা শুনিয়া জীবনবাবু, আলাদিত হইয়া বলিলেন
বা বেশ ফলত করেছ।
প্রভাত বলিল,-কিন্তু আবার একটি গােলযোগে পড়েছি।
পঞ্চ-প্রদীপ। জীবন,-গােলযােগ আবার কি ? প্রভাত,—ফিয়ের জন্য ১০ টা টাকা চাই কোথায় পাই তাই ভাবছি। জীবন,-তার জন্য আবার ভাবনা কেন? জীবনবাবুর কথা শুনিয়া প্রভাত খুব আহলাদিত হইল, আহলাদে ও আশায় তাহার বুক দুর দুর করিয়া কাঁপিয়া উঠিল, পরক্ষণেই জীবনবাবু বলিলেন তুমি দাদাকে বল এখনি দেবেন। তাহার শেষ কথাটা প্রভাতে বেগ-কম্পিত-বক্ষে একটি ধাক্কা লাগিল; একটুকু পরে সে বলিল, যদি আপনি একটু অনুগ্রহ করেন- জীবনবাবু তাড়াতাড়ি উত্তর করিলেন, আমি! আমার হাতে এখনত টাকা নাই। প্রভাত দীর্ঘনিশ্বাস ত্যাগ করিয়া আকাশপানে চাহিল। মানব, যদি দীর্ঘনিশ্বাসের অর্থ বুঝিতে পারি, যদি মানুষ হইয়া মানুষের বেদনা অনুভব করিতে শিক্ষা করিয়া থাক, তবে দেখ,-এই যে দীর্ঘনিশ্বাসে স্তব্ধসমীরণ কম্পিত হইয়া উঠিল, ওই যে একত্রীভূত- বায়ু চূর্ণ হইয়া গেল দেখ তাহার উপর স্পষ্টাক্ষরে কি শিখি রহিয়াছে। “অভাগা চাহিতে হয়। সাগর কায়ে যায়।” হতভাগার পানিখাদ বাতাসেই মিশিয়া গেল। দেখিল না। জীবনবাবু পার্শ্ব পরিবর্তন পার্শ পরিবর্তন করিয়া বলিলেন, “তুমি যাও আমার ঘুম পেয়েছে।” হায়! ঐশ্বর্যশালী, তুমি টাকা লইয়া খেলা কর । পথে টাকা ছড়াইয়া যাও। বারানার করে তােমার সেই ভাতারের
পঞ্চপ্রদীপ।
অর্গল আপনা হইতে খসিয়া পড়ে, তেলামাথায় তেল দিতে
তােমার অর্থ আকাশে উছিয়া আসে, অার দরিদ্রকে সাহায্য করিবার
সময় পৃথিবীর অভাব আসিয়া তােমাকে ছাইয়া ফেলে, তখন
তােমার একটি পয়সার মূল্য অনেক বেশী। অনাথ দরিদ্রের
প্রয়ােজনে তােমার দৃঢ়মুষ্টি আরােও দৃঢ়তর হয়।
প্রভাত উঠিল, ছল ছল চক্ষে নিজ কক্ষে প্রবেশ করিল। এমন
সময় সুরবালা আসিয়া বলিল, “প্রভাত তােমাকে না ডাকচেন।”
প্রভাত একদিনের জন্যও সুরবালার প্রতি বিরক্ত হয় নাই।
আজ একটু রিক্ত হইল এবং প্রবল অনিচ্ছাসত্ত্বেও সুরবালার
মাতার নিকট গমন করিল।
সুরবালার মাতা যামিনীদেবী বলিলেন,-বাবা এভাত! তােমার
টাকার দরকার তো আমা বলনি কেন ?
প্রভাত কথা কহিতে পারিল না।
তুমি পরীক্ষায় সকলের উপর হয়েছে। শুনে, আমি খুব খুসী
হয়েছি। এই নেয় তােমার ফিয়ের টাকা। এই বলিয়া তিনি
প্রভাতের হাতে ১০টি টাকা দিলেন।
টাকা হাতে করিয়া প্রভাত আর দাড়াইতে পারিল না।
অতিরিক্ত আনন্দে তাহার মাথা ঘুরিতে লাগিল সে বসিয়া পড়িল।
যামিনী বুঝিলেন,-অতিরিক্ত আহলাদে প্রভাতের মাথার ঠিক
নাই। তিনি তাহাকে কোলে করিয়া মুখে ও মাথায় জল
দিলেন। একটু পরে প্রভাত ডাকিল “মা”।
প্রভাত পদিনেই বুঝিতে পারিল জীবনবাবুর সহিত তাহার
যে কথাবার্তা হইয়াছিল তাহা সুরবালা জননীর নিকট বলিয়াছিল।
সে মনে মনে বালিকার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাইল।
+
পঞ্চ-প্রদীপ।
~~....
যামিনী দেবীর দান নিষ্ফল হইল না। প্রভাত পরীক্ষায়
সমগ্ৰ ছাত্ৰমগুলির মধ্যে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করিল। তাহা
মহিমবাবু শুনিলেন, যামিনী দেবী শুনিলেন, আনন্দময়ী সুরবালাও
শুনিল, তানিয়া সকলেই বিস্মিত হইয়া গেল।
আর প্রভাত সেই সংবাদ পাইয়া জননীর পদ প্রান্তে প্রণাম
করিয়া, মহিমবাবুর ও যামিনীদেবীর চরণ বন্দনা করিল।
আর প্রভাতের হতভাগিনী বিধবা জননী! আজ তুমি কত
সুখী। তুমি কত ভাগ্যবতী, যাহার কাছে যাইতেছ ; তাহারি
মুখে পুত্রের গৌরবের কথা শুনিতেছ। তােমার ইহা অপেক্ষা
সুখের বিষয় আর কি আছে?
প্রভাত বর্ধমানে আসিলে অনেকেই তাহার সহিত দেখা
করিতে আসিল। সকলের সহিত • দেখা করিবার পর
কামিনীদেবী তাহাকে আহার করিতে ডাকিয়া পাঠাইলেন।
বাসায় আসিয়া অবধি প্রভাতের সহিত সুরবালার দেখা হয়
নাই। আহার করিতে
আসিয়া ও
সে তাহাকে দেখিতে
পাইলনা। সরল মেহময় যুবক
কামিনীদেবীকে জিজ্ঞাসা
করিল, “সুরো কোথায় ?” তিনি একটু হাসিয়া বলিলেন,-“কি
জানি বােধ হয় ঘুমিয়েছে।”
প্রভাত আশ্চর্য্য হইল। একি ? যে সুরবালা প্রভাতের
কাছে ছায়ার মত থাকিতে ভালবাসিত, প্রভাতের একটু প্রশংসা
শুনিতে উৎফুল্ল প্রাণে তাহাকে সংবাদ দিতে আসি, আজ
তাহার এত সুখের দিনে সেই সুরবালা কোথায়।
প্রভাতচ আসিয়া আহার করিয়া নীচে আসিবার জন্য
উঠিল। দীর্থ দরদালান পার হইয়া সিড়িতে পা দিল, এমন
২৪
পঞ্চ-প্রদীপ।
সময়ে সুরবালার কণ্ঠস্বর তাহার কর্ণে প্রবেশ করিল।
চন্দ্র পা টিপিয়া টিপিয়া আসিতে আরম্ভ করিল।
ঠিক সেই সময়ে সুরবালাও উপরে উঠিতেছিল, সে একেবারে
আসিয়া প্রভাতের সম্মুখে
পড়িল।
তাহাকে দেখিবামাত্র
কিশােরীর সুন্দর মুখখানি গোলাপ ফুলের মত লাল হইয়া উঠিল
একবার সে পলাইবে মনে করিল, কিন্তু পলান হইল না।
ভাবিল পলাইলে প্রভাত কি মনে করিবে?
অথচ গাম্ভীৰ্যটও রহিল না। কিশােরী লজ্জাবনত মুখখানি
ফিরাইয়া একপার্শ্বে সরিয়া দাড়াইল।
প্রভাত ভাবিল, বােধ হয় সুরবালা তাহার উপর রাগ
করিয়াছে, তাই কথা কহিতেছে না। উনার বিংশবর্ষীয়
ফুক এয়ােদশবর্ষীয়া কিশোরীর হস্ত ধারণ করিয়া ডাকিল
‘সুরাে ?”
সুরবালা কথা কহিল না। তাহার মুখখানি আরো লাল
হইয়া গেল, ললাটে ঘর্মবিন্দু দেখা দিল ।
প্রভাত আবার জিজ্ঞাসা করিল,-তুমি রাগ করেছ ?
সুরবালা আর দাড়াইল না। তাড়াতাদি এভাতের হাত
ছাড়াইয়া পলাইল।
সুবালা পলাইল কেন? সরলা কিশােরীরর এত লজ্জাই বা
তবে বােধ হয় যামিনীদেবী ও মহিমবাবু তাহার
সহিত প্রাতের বিবাহ দিবার কথা কহিতে ছিলেন, তখন সে
নিয়া থাকিবে। তাই এত লজ্জা।
সুবালা উপরে যাইলে
যামিনীদেবী তাহাকে হাসিতে হাসিতে বলিলেন,-য়ে তোকে
এত ডাছিল যা কি বলছে শুনে না।
কি জন্য?
পঞ্চ-প্রদীপ-+..
।
সুরবালা কথার উত্তর না দিয়া মুখ নামাইয়া একেবারে গিয়া
ছাদে উঠল।
প্রভাত এই নুতন সংবাদ কিছুই শুনে নাই। সে ভাবিতে
লাগিল, সুরবালা তাহার সহিত কথা কহিল না কেন?
সুরবালাকে দেখিয়া তাহারও মনে যেন একটা নূতন ভাবে
সঞ্চার হইল। যথায় উদারতা ছিল, তবীয় সঙ্কীর্ণত আসিয়া ধীরে
ধীরে তাহার উপর আধিপত্য বিস্তার করিতে আরম্ভ করিল।
সুরবালার একটা নূতন ছবি তাহার মনে অঙ্কিত হইয়া গেল এবং
সেই সময় হইতে তাহার মনে যেন একটা অপরিচিত ভাবে
উদয় হইল। প্রভাত বুঝিতে পারিল না, এ পরিবর্তনের কারণ
কি? অার কিশোরীর সেই লজ্জাবনত মুখখানি, শঙ্কিত, কম্পিত
ও চঞ্চলতাপূর্ণ গতি তাহার মন হইতে মুছিল না। ধন্য
প্রজাপতি ঠাকুর, কেনন দুইটা নিরীহ জীবের নয়নের সম্মুখ হইতে
উদার অন্বেলিত সারল্যপূর্ণ-দৃশ্যপটখানি অপসারিত করিয়া
সহসা একটা নূতা ছবি আনিয়া দিলে, তােমার কিছু কিছু
বাহাদুরি আছে,
তোমার বিধাত। তিনি
তােমাকে সুধু অহারের সুবিধার জন্য চারিট বন দান
করিয়াছেন কি ? দেখ, প্রজাপতি ঠাকুর, একটা কাজ কর দেখি,
ঐ যে কিশােরী এয়াশরখা পার হইয়া চতুর্দশ প্রবেশ
করিবার জন্য অল-রঞ্জিত চরণখানি তুলিয়াছেন, যিনি গল্পটা
পড়িতে পড়িতে একটু একটু হাসিতেছেন এবং মুক্তাবিনিন্দিত
পুক্তির অধর টিপিয়া, নাসিকাবিলম্বিত মুক্তাটি নাড়িয়া
ললাটের উপর ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত চুকুন্তল গুলি সরাইয়া তাহার
পর একটি দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া আবার পাঠে মনঃ সংযোগ
নতুবা যিনি
২৬ :
পঞ্চ-প্রদীপ।
করিবার চেষ্টা করিতেছেন তাহার একটা উপায় করিয়া দাও
দেখি। তাহা হইলে নববিবাহিতার অলঙ্কার-শিঞ্জিনীতে তােমার
বিজয়বাৰ্তা জগতে ঘােষিত হইবে।
যথাসময়ে প্রভাত কলিকাতায় পড়িতে আসিল। প্রথম
মাসের বৃত্তি ২০ কুড়ি টাকা পাইবামাত্র জননীকে ৭ সাত
টাকা পাঠাইয়া দিল। সেই মাস হইতে সে নিয়মমত মাসিক
সাতটি করিয়া টাকা তাহার মাতাকে পাঠাইয়া দিত। এইরূপে
তাহার দিন কাটিতে লাগিল।
বাল্য-প্রণয়ের উপর বিধাতার অভিসম্পাত আছে। বাল্য
কালে অনেকে অনেককে ভালবাসিয়া থাকেন, কিন্তু সকলেই
সকলকে পায় কি ? যদি পাইত, তাহা হইলে সংসার স্বর্গ
হইত।
প্রভাতের কলিকাতা যাত্রার কিছুদিন পরে একদিন
হঠাৎ মুঙ্গেরের অবিবাহিত যুবক ডেপুটি ম্যাজিষ্ট্রে যুক্ত
বীরেন্দ্রনাথ দত্তের সহিত সুরবালার বিবাহ হইয়া গেল।-সে
ডেপুঢ়ীর স্ত্রী হইল। প্রভাতের মনের আশালতিকা অঙ্কুরেই
ও হইয়া গেল।
সুরবালার সহিত বিবাহ হইল না বলিয়া প্রভাতের প্রাণে
একটা আঘ:ত লাগিয়াছিল কিন্তু তাহাতে উদ্যমবিহীন হইল না।
পরবর্তী এক, এ; বি, এ; এম, এ পরীক্ষায় বিশ্ববিদ্যালয়ের
সর্বোৎকৃষ্ট সম্মানে ভূষিত হইয়া কর্মবীর সাধক এতচ
সাধনার পরকীয়া দেখাইল। কঠোর সাধনা সে সিদ্ধিলাভ করিল।
এই ছয় বৎসর সময়ের মধ্যে প্রভাতের বুকে আর একটা
দারুণ আঘাত লাগিয়াছিল। তাহার মাতৃদেবী তাহাকে সংসারে
একা রাখিয়া স্বর্গধামে গমন করিয়াছিলেন। সংসারে কোন
পঞ্চ-প্রদীপ।
স্ত্রীলােক ছিলনা বলিয়া এবং মনের দারুণ অশান্তিবশতঃ প্রভাত
চন্দ্র বিবাহ করে নাই। বিবাহের কথা উথাপিত হইলেই যে
কথাটা উড়াইয়া দিত। প্রথম কলিকাতা আলি বার পর হইতে
সে বর্ধমান আর যায় নাই, সুতরাং মহিমবাবু, যামিনীঠকুরাণী
কিম্বা সুরবালার সহিত তাহার দেখা হয় নাই। তবে পত্রাদিদ্বারা
সংবাদাদি লইত। মহিমবাবু বা যামিনঠাকুরাণী বিবাহের কথা
লিখিলে প্রভাত উত্তর দিত, কিছুদিন পরে বিবাহ করিব।
তাহার বিবাহ না করিবার যথার্থ কারণ কেহ জানিল না, জানিল
একজন-সে সুরবালা”। প্রভাত বিবাহ না করায় সে মনে
আঘাতও পাইয়াছিল। সে ভাবিত আমি তাহার জীবনের সুখ
শান্তি নষ্ট করিলাম। এই সময় সুরবালার স্বামী ধীরেন্দ্রনাথ
বর্ধমানে বদলী হইয়া আসিলেন। • তাহার একবার কলিকাতা
যাইবার প্রয়ােজন হইলে সুরবালা প্রভাতকে একখানি পত্র
লিথিয়া তাহার হাতে নিল এবং যে কোনরূপে প্রাতকে
বর্ধমানে আনিবার হুকুম জারি করিল।
সে পত্রখানিতে লিখাছিল :-
“প্রভাত দাদা! তােমাকে আগে প্রভাত বলিয়া ডাকিতাম,
কিন্তু এখন তুমিও বড় হয়েছ, আমিও বড় হয়েছি, শুধু নাম ধরে
ডাকিতে লজ্জা করে, তাই প্রভাত দাদা লিখিলাম।
তােমার নিকট আমি কি অপরাধ করেছি, কাছে
থাকিয়াও একবার দেখা করিতে সময় পাওনা। এত পড়ায় ব্যস্ত
তুমি ? আজ তুমি আর সেই প্রভাত নাই ? শিক্ষিত সমাজে
উজ্জ্বল হীরকখণ্ডের দীপ্তির মত তােমার যশ ছড়িয়ে পড়েছে।
তাই বলে কি আমাকে ভুলে গেলে?
পঞ্চ-প্রদীপ।
একবার ছােট বােনটার কথা মনে করে আসিবে। যদিও এক
মায়ের গর্ভে আমাদের জন্ম হয় নাই, তথাপি একই মাতার
মেহসিক্তকোলে আমরা উভয়েই প্রতিপালিত। একবার কি
আসিবেনা? তােমার নিকট একটা কথা শুনতে আমার ইচ্ছা হয়,
কিন্তু আমি মেয়েমানুষ আমার ইচ্ছার মূল্য নাই।
আজই একবার এসাে। আমার স্বামী, তােমায় নিয়ে
আসিবেন। ইতি-
তোমার ভগ্নী-“সুরে।।”
প্রভাত সুরবালার পত্র পাইল, কিন্তু বর্ধমানে আসিল না ।
ধীরেন্দ্রবাবুর নিকট আপনার পরিচয় পৰ্যন্তও দিলনা।
এই সময় সুপ্ত বঙ্গদেশে একটা ভৈরব-গর্জন শুনিতে পা ও
গিয়াছিল। সেই ভৈরব-র্জনে বঙ্গদেশে একটা ভীষণ অগ্নি
বলিয়া উঠিয়া বিশ্বকে চমকিত করিয়া তুলিয়া ছিল। “বন্দে মাতরম্”
মন্ত্রের প্লাবনে সাবিহীন দেশখানি উচ্ছাসময়ী নদীর মত নাচিয়া
উঠিয়াছিল।
দলে দলে বালক, যুবক ও বৃদ্ধগণ স্বদেশ-মঞ্জ
প্রচারের জন্য দেশ বিদেশে ছুটিয়াছিলেন।
এই স্বদেশী প্রচার সঙ্কল্পে বর্ধমানে একটা মহা সভার অধি-
বেশন হয়। এই সভায় বক্তৃতা করিবার জন্য “প্রভাত” আহত
হইলেন।
বিশাল সেই জনসমাগম, সেই গগনভেদী কোলাহল, সেই
মহামন্ত্রের উচ্চ ধ্বনি এবং আরােল ; সেই মহাসভার একটি
পার্শে মহিমবাবু জামাতার সহিত বক্তৃতা শুনিবার জন্য উপবিষ্ট।
তপ হইতে নিতে পাওয়া গেল, শ্রীযুক্ত প্রভাতচন্দ্র দত্ত
এইবার বক্তৃতা করিতে . উঠিবেন। তিনি অনিমেষনেতে
২৯ পঞ্চ-প্রদীপ। ummin minine মঞ্চের প্রতি চাহিলেন। তাহার প্রতিপালিত দরিদ্র “প্রতাতচন্দ্র আজ ভদ্রোচিত বৈশে ভূষিত হইয়া মণ্ডপে দাড়াইল। প্রতাতচত বক্তৃতা আরম্ভ করিলেন। তাহার উৎসাহময়ী বাণীতে তাহার হৃদয়ের মধ্যে বিদ্যুৎ ছুটিতে লাগিল। বিশাল জনতার মিলিত করতালি ধ্বনিতে সভাতল মুখরিত হইল। তাহার উত্তেজময়ী বাণীতে তীষণ কোলাহল যেন সতাতল হইতে কোথায় সুকাইয়া পড়িল। সেই লক্ষ লােক সমাগত मागाभा কেবল এক বক্তৃতার ভৈরবগঞ্জন ভিন্ন আর অন্য কোন শব্দ শুনিতে পাওয়া গেল না। আত্মহারা শ্রোতাগণ মাঝে মাঝে এক একবার কেবল করতালিধ্বনি ও তাহার সঙ্গে সঙ্গে ‘বন্দে মাতরম্ বলিয়া গৰ্জন করিয়া উঠিতে ছিল। অর্ধ ঘণ্টাকাল বক্তৃতা করিয়া প্রভাত চন্দ্র নিজ আসন পরি- গ্রহণ করিলেন। সতাভঙ্গ হইলে সকলেই চলিয়া গেল। মহিমবাবু জামাতাকে বাড়ী যাইতে বলিয়া প্রভাতের পচাৎ পশ্চাৰ চলিলেন। কিছুদূর গিয়া প্রভাতের দৃষ্টি পশ্চাতে পড়িল। তিনি মহিমবাবুকে দেখিতে পাইয়া তাঁহার পদ প্রান্তে পড়িলেন। মহিমবাবু আদর করিয়া তাহাকে কোল দিলেন। সেদিন প্রভাতচ আর পরিত্রাণ পাইলেন না। মহিমবাবু তাহাকে ধরিয়া বাড়ীতে আনিলেন। এদিকে ধীরেন্দ্রবাবু বাড়ীতে আসিয়াই শাশুড়ীঠাকুরাণী ও সুরবালার নিকট প্রভাতের বক্তৃতার প্রশংসা আয় করিয়া দিলেন। যামিনীঠাকুয়ণী শুনিয়া কতই আহলাদিত হইলেম। তাহার পালিতপুর প্রভাতচন্দ্র আজ বরণীয় ব্যক্তিবৃন্দের মধ্যে আসন পাইয়াছে।
৩০
পঞ্চপ্রদীপ।
কিন্তু
সকলে যখন প্রভাতের সাধনার কথা লইয়া ব্যস্ত এবং
সুরবালা প্রভাতের সম্বন্ধে একটা নুতন চিন্তায় নিমগ্না। সেই সময়
মহিমবাবু প্রভাতচন্দ্রের হাত ধরিয়া তথায় উপস্থিত হইলেন।
সন্ধ্যার সময় মহিমবাবু বাহিরের গৃহে বসিলেন। ধীরেন্দ্রনাথ
এক বন্ধুর বাটীতে দাবা টিপিতে গেলেন। সুরবালা ও সময় বুঝিয়া
মায়ের সহিত চুপি চুপি কি পরামর্শ করিয়া প্রভাতচন্দ্রকে ডাকিতে
পাঠাইল। প্রভাত আসিলে, তাহাকে আহার করিতে বসাইয়া
তাহার কাছে বসিল।
প্রভাতচন্দ্র ভদ্রলােকের মত একবার “সুরবাল কেমন আছ”
জিজ্ঞাসা করিয়াই আহারে মনঃসংযোগ করিলেন।
সুরবালা ছাড়িবার পাত্রী নহে, সে বলিল,-“দাদা, তুমি কি বিয়ে
করবে না ?” প্রভাত বিষ, বিপদে পড়িল। এইজন্যই বেচার।
বর্ধমানে আসতে চাহে নাই। সুরবালার কথায় কি উত্তর দিবে
তাঁহা সে খুঁজিয়া পাইল না । সুরবালা আবার জিজ্ঞাসা করিল
“দাদা কি বিয়ে করবে না?” প্রভাত আতা আমতা করিয়া
বলিল, না, তা বলছি না।”
সুরবালা।-তবে কি বােলছ ?
প্রভাত উত্তর করিল না।
সুরবালা বলিল,-প্রভাত দাদা! তােমার বিবাহ না করবার
কারণ আমি বুঝিয়াছি। তুমি জগতের কাছে সে কথা লুকিয়ে
রাখিলেও
সুরবালার নিকট
সে কথা লুকাতে পারিবেনা।
গানের ইচ্ছ। যদি অন্য রকম হইত তাহা হইলে বােধ হয় তুমি
সুখী হইতে। কিন্তু আর কি তোমার কোনরূপ সুখী হইবার
উপায় নাই ?
পঞ্চ-প্রদীপ।
প্রভাত ভূমিপানে চাহিয়া ধীরে ধীরে বলিল, “সুরবালা ! আমি
চিরকাল অবিবাহিত থাকিব ইহাই আমার ইচ্ছ। অনেকক্ষণ
উভয়ের মধ্যে কেহ কথা কহিল না। শেষে সুরবালা বলিল,-
প্রভাত দাদা ! ভগবান্ আমায় সংসারে সব মুখ দিয়েছেন।
দেবােপম পিতা, স্নেহময়ী জননী, উন্নতচেতা স্বামী, তােমার মত
দেশের অলঙ্কারস্বরূপ ভ্রাতা, সবই আমি পেয়েছি, কিন্তু তবু তােমার
জন্য আমি মনে একদিনও শান্তি পাই নাই। আমায় বিম
দেখে অনেক সময় আমার স্বামী কারণ জিজ্ঞাসা করেন, আমি
তঁাকে মিথ্যাকথা বলে চাপ দিয়া রাখি। তুমি কি তােমার
ভগ্নিকে একটু শান্তি দেবে না ?
প্রভাত কোন কথা কহিল না। সুরবালা উঠিয়া তাহার
হাতে ধরিয়া বলিল,-বল তুমি বিবাহ করবে ?
প্রভাতচন্দ্ৰ পূৰ্বের মত নীরব। এমন সময়ে যামিনীঠাকুরাণী
একটি চতুর্দশবর্ষীয়া কিশােরীর হাত ধরিয়া তাহাদের সম্মুখে
আসিলেন। প্রভাতের দৃষ্টি আরোও আনত হইল। যামিনীঠাকুরাণী
বলিলেন,-এইটা সুরার ননদ। এর নাম-“বীণা,” এরসঙ্গে
তােমার বিয়ে দেবাে।
যামিনীঠাকুরাণীর কথাও যা, কাৰ্য্যও তাই। তাহার দুইদিন
পরে, প্রভাত চন্দ্রের সহিত বীণার বিবাহ হইয়া গেল। এতদিন
প্রভাত সংসারী হইলেন।
বীণাপানি সুন্দরী ও গুণবতী। কিন্তু তাহার মত স্ত্রী পাইয়া ও
প্রভাত প্রাণে শান্তি পাইল না। বাল্যকাল হইতে তাহার
সংসারে আসক্তি ছিলনা। বিবাহ করিয়া সংসারে লিপ্ত হওয়া
দূরে থাক, ঘাের বৈরাগ্য আসিয়া তাহার মনকে যেন সংসার
5S৭
পরে
পঞ্চ-প্রদীপ।
হইতে আয়ো দূরে টানিয়া লইয়া যাইতে লাগিল। বিবাহের কিছু
দিন পরে প্রভাতচঞ্জ কলিকাতা যাইবার নাম কমিয়া হরিদ্বার
যাত্রা করিল। সে সন্ন্যাসী হইবার আশায় আসিয়াছিল। তথায়
গুরু মিলিল, কি আশা পূর্ণ হইল না। গুরু তাহাকে নব
বিবাহিত জানিয়া গৃহে ফিরিতে আদেশ করিলেন। অগত্যা
প্রভাত আবার দেশে ফিরিল। একমাত্র পাঠ ভিন্ন অন্য কোন
কার্য্যে তাহার মনের দৃঢ়তা ছিল না।
প্রভাত আইন-পরীক্ষার জন্য পূর্বেই প্রস্তুত হইয়াছিলেন।
কলিকাতায় আসিয়াই পরীক্ষা দিবেন স্থির করিলেন। তাহার মত
ছাত্রকে বিফল মনােরথ হইতে হইল মা। সে পরীক্ষাতেও
তাহার নাম সমগ্ৰ ছাত্ৰমণ্ডলীয় শীর্ষস্থামে লিখিত হইল। এই
সময়ে ফরিদপুরে একটা স্বদেশী সভা হয়। প্রতচন্দ্র সেই
সভায় নিমন্ত্রিত হইলেন। ।
লােকনাথ মিত্র ফরিদপুরের এক জম প্রসিদ্ধ ডাক্তার। সভায়
কাৰ্যাদি শেষ হইবার পর তিনি প্রভাতচন্দ্রের সহিত একটু পরিচয়
করিতে আসিলেন। কিছুক্ষণ আলাপ পরিচয়ের পর লােকনাথবাবু
প্রভাতকে নিমন্ত্রণ করিয়া নিজবনে লইয়া গেলেন।
রাত্রি নয়টা বাজিয়াছে এমন সময়ে লােকনাথবাবু প্রভাত
চত্রের নিকটে আসিয়া বলিলেন, আমার একটা রােগীয় অবস্থা
বড় খারাপ, তাই যাইতেছি বােধ হয় রাত্রে আজ আর আসিতে
পারিব না। আপনি নিশ্চিন্ত হইয়া থাকিতে পারেন, এই বলিয়া
তিনি প্রস্থান করিলেন।
প্রভাতচত্রের শয্যার উপর একখানি নেপােলিয়াম যােনা-
পাটির জীবনচরিত
জীবনচয়িত পড়িয়াছিল।
পড়িয়াছিল। তিনি সেই পুস্তকখানি
পঞ্চ-প্রদীপ। লইয়া পাঠ করিতে আরম্ভ করিলেন। এমন সময়ে সহসা যুবতীর অলঙ্কার শব্দে তাহার একাগ্রতা ভঙ্গ হইল। তিনি চাহিয়া দেখিলেন, একটা স্ত্রীলােক তাহার সম্মুখে দাঁড়াইয়া আছে। তিনি দেখিয়া বিস্মিত হইলেন। ভাবিতে লাগিলেন এ কোন দেশীয় সভ্যতা। নির্জন কক্ষে গভীর রাত্রে অপরিচিত যুবকের সম্মুখে যুবতী রমণীর আগমন কি এই দেশের নীতিসঙ্গত। তাঁহার বিস্ময় আরও বাড়িয়া উঠিল। স্ত্রীলােকটা: তাহার পানে চাহিয়া বলিল,-আমার মুখপানে চেয়ে আছেন যে ? প্রভাতচন্দ্র লজ্জিত হইলেন এবং দৃষ্টি অবনত করিয়া রহিলেন। স্ত্রীলােকটা পুনরায় বলিল,-আপনার খাবার দেওয়া হইয়াছে আনুন। প্রভাতচন্দ্র জীবনে এমন বিপদে কখন পড়েন নাই তিনি সামান্য বিষয়ে বিচলিত হইবার যুবক নহেন। যুবতীর কথামত প্রভাতচন্দ্র তাহার অনুগমন করিতে লাগিলেন। যুবতী তাহাকে পথ দেখাইয়া লইয়া চলিল। দুইটা কক্ষের মধ্য দিয়া গিয়া একম উঠান পার হইবার পর একটা দুধ ফুলবাগানের মধ্যে উপস্থিত হইলেন। যুবতী অর্থে অগ্রে যাইতেছিল। প্রতচন্দ্র বাগানের মধ্যস্থিত স্থানে আসিয়াছেন, এমন সময়ে তাহার পৃষ্ঠ কতকগুলি ফুল আসিয়া পড়িল। তিনি চমকিত হইয়া পশ্চাতে চাহিলেন, কিন্তু কিছুই দেখিতে পাইলেন না। সমুখে চাহিলেন, সঙ্গিনী যুবতী ও সেই সময়ের মধ্যে অদৃশ্য হইয়া গিয়াছে। তাহার বিস্ময়ের সীমা রহিল না। কিছুক্ষণ এদিক ওদিক ঘুরিয়া শেষে নিকটস্থ একটা মঞ্চে বসিবার উপক্রম করিতেছেন, এমন সময়ে সঙ্গিনী যুবতী তাহার সম্মুখে আসিয়া দাড়াইল এবং ৩৪ পঞ্চ-প্রদীপ। বলিল,-আনুন আপনার খাবার যে ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে। প্রভাত চন্দ্রের কথা কহিবার সাহস হইতেছিল না, তিনি মন্ত্রচালিতের ন্যায় তাহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ চলিলেন। বাগান পার হইয়া তাহারা অন্দর মহলে প্রবেশ করিলেন। তথায় রমণী কি পুরুষ কেহই ছিলেন না। সঙ্গিনী যুবতী তাহাকে ইঙ্গিত করিয়া আসনে বসিতে বলিল এবং আহাৰ্য্য আনিয়া দিয়া প্রস্থান করিল। প্রজাতন্দ্ৰ আহারে বসিলেন। নানারূপ উপাদেয় খাদ্য তাহাকে দেওয়া হইয়াছিল, কিন্তু তিনি নিশ্চিন্ত হইয়া আহার করিতে পারিলেন না। একটু পরে তাহার মনে হইল কে যেন পশ্চাতে ফি, ফিচ, করিয়া কথা কহিতেছে। তিনি তৎক্ষণাৎ পশ্চাতে চাহিলেন। একটী দরজার পাশে চার পাঁচটা স্ত্রীলােক দাড়াইয়া ছিল। তাহার ভীতিপূর্ণ-দৃষ্টিতে তাহারা সকলে হাসিয়া উঠিল। প্রভাতচন্দ্র একটু অপ্রতিভ হইলেন এবং কষ্টে সৃষ্টে আহার্যদ্রব্য কিছু কিছু আহার করিলেন। হপধাত করিবার পরেই সঙ্গিনী তঁাহাকে সঙ্গে লইয়া অন্য টা কক্ষে প্রবেশ করিল। গৃহ মধ্যে একটী পালঙ্কের উপর শয্যা প্রস্তুত ছিল, তথায় শয়ন করিবার জন্য তিনি আদিষ্ট হইলেন। সঙ্গিনী তাহাকে দরজা বন্ধ করিতে নিষেধ করিয়া প্রস্থান করিল। প্রভাতচন্দ্র শয়ন করিয়া ভাবিতে লাগিলেন, এ দেশের লােক খুব ভদ্র সন্দেহ নাই, তবে একটু অসভ্য। প্রায় অর্ধঘণ্টা পরে একটা বৃদ্ধ। আসিয়া গৃহ মধ্যে প্রবেশ করিলেন। তিনি এভাতচন্দ্রের সম্ভাষণ, অভিবাদন বা নিমন্ত্রণের অপেক্ষা না করিয়া শয্যার উপর উপবেষণ করিলেন। তাঁহাকে শয্যার উপর বসিতে দেখিয়া প্রভাত অনুন, বসুন বলি
পঞ্চ-প্রদীপ।
শয্যা হইতে তাড়াতাড়ি নামিয়া দাড়াইলেন।
বৃদ্ধা, তঁাহার
হস্তে ধরিয়া বসাইলেন। পরে তঁাহার নাম কি, কোন
জেলার মধ্যে কোন গ্রামে বাড়ী, বাড়ীতে কে কে আছে, পিতার
নাম কি এবং বিদ্যা কতদূর ইত্যাদি পরিচয় লইলেন। পরে
বলিলেন,-তােমার বিবাহ হয়েছে ?”
প্রভাত।-আজ্ঞে না।
বৃদ্ধা।-তবে আমার একটী নাতনি আছে তাকে বিবাহ কর।
প্রভাত।-আমি বিবাহ কোরব না মনে করেছি।
বৃন্ধ।মনে করার কথাটা মনেই থাক, আজ ভাল লগ্ন আছে।
এই কথা বলিবাম। উলুধ্বনিসহ দুইটী শঙ্খ বাজিয়া উঠিল।
প্রভাত দেখিয়া বিস্মিত হইল।
প্রভাত শয্যা হইতে নামিয়া বলিল,আমাকে মাপ করিবেন,
অামি বিবাহিত।
বৃদ্ধা।-তাহাকে পুনরায় শয্যায় বসাইয়া বলিলেন, “তুমি
বিবাহিত!
প্রভাত।আজ্ঞে হ্যা।
বৃদ্ধা।-সে স্ত্রী তােমার কোথায় ?
প্রভাত।-দেশে আছে।
বৃদ্ধা।-তাকে তুমিতো ভালবাস না।
ওভাতচন্দ্র মনে মনে বলিলেন,-বৃদ্ধাটি চর।
বৃদ্ধা।-কথা কহিতেছে না যে?
প্রজাতন্ত্র হতবম্ব হইলেন। তিনি কি বলবেন কিছুই স্থির
করিতে পারিলেন না। এমন সময় পূর্বোক্তা সঙ্গিনী একটা
অবগুণ্ঠিত রমণীকে লইয়া আসিয়া এভাতের পার্কে বসাইল।
৩৬ পঞ্চ-প্রদীপ। AAAA অনেক বৃদ্ধা বলিল,-এইটা আমার নাত বেয়ের দেন। জায়গায় পাত্র খুজিয়াছি কিন্তু কোথাও সুবিধা মত পাই নাই। আমাদিগকে কন্যাদায় হইতে উদ্ধার কর। প্রভাতের সর্বশরীর তখন বর্ষাক্ত। বৃদ্ধ আবার বলিলেন,—ইহাকে বিবাহ কর, মন্ত্র আমি পূর্বেই পড়িয়া রাখিয়াছি। এই বলিয়া বৃদ্ধা ও সঙ্গিনী গৃহ হইতে প্রস্থান করিলেন । তাহারা গৃহ হইতে বহির্গত হইবামাত্রই এভাতচন্দ্র শয্যা হইতে নীচে নামিলেন এবং দরজা টানিয়া দেখিলেন, বাহির হইতে তাহা বন্ধ করিয়া দেওয়া হইয়াছে। তিনি এই সাঁওতালের দেশ হইতে অব্যাহতি পাইবার জন্য মনে মনে বুদ্ধি আঁটিতেছেন- এমন সময়ে অব গুষ্ঠিত ধীরে ধীরে অবগুণ্ঠন উন্মােচন করিল। পঞ্চদশবর্ষীয়া পূর্ণাঙ্গ যুবতীর স্বর্গীয় সৌন্দর্য্যে সেই কফপানি উজ্জ্বল হইতে উজ্জ্বলতর হইয়া উঠিল। “অবগুষ্ঠি তা” ধীরে ধীরে নামিয়া আসিয়া প্রভাতকে প্রণাম করিয়া তাহার সম্মুখে দাড়াইল। এভাত সেই যুবতীকে প্রণাম করিতে দেখিয়া সরিয়া দাড়াইল। এইসময় প্রভাতের দৃষ্টি একবার অবগুণ্ঠিতার মুখের দিকে পতিত হইল। প্রভাত যে পূর্ব হইতেই বিস্মিত হইয়াছিল সে বিষয়ে সন্দেহ নাই কিন্তু “অবগুণ্ঠ তাকে দেখিয়া তাহার আর জাগ্রতাবস্থা বলিয়া বােধ হইল না। তিনি ভাবলেন এই সমস্ত ঘটনা তিনি বোধ হয় নিদ্রার ঘোরে স্বপ্ন দেখিতেছেন। অনেকক্ষণ তিনি কোন কথা কহিলেন না, বােধ হয়, তাহার কথা কহিবার শক্তি ছিল না। তিনি একদৃষ্টে অব গুষ্ঠিত” পানে বিস্ফাৱিত নেত্রে চাহিয়া রহিলেন।
পঞ্চ-প্রদীপ।
“অব গুষ্টি ত” নতমুখী হইয়া রহিল। প্রতাত ধীরে ধীরে
তাহার নিকট আসিলেন তাহার হস্তখানি নিজহস্তে লইয়া
বলিলেন, “বীণা তুমি-তুমি এখানে কেন ?”
“অবগুণ্ঠিত।” মুধ আরও নত করিল। প্রতাত তাহাকে
অদির করিয়া ডাকিয়া বলিল, “এস বীণা, আর তোমায় আমি
কখনও ত্যাগ করিব না।” এই বলিয়া যুবতীর সেই রক্তপষ্মানিত
কম্পিত-অধর-প্রান্তে একটা গাঢ়চুম্বন অঙ্কিত করিয়া দিল।
এমন সময় নারীকণ্ঠে উলুধ্বনিসহ আবার শঙ্খ বাজিয়া উঠিল।
সেই শব্দে উভয়েই চমকিত হইল। বীণা স্বামীর ভুজপাশ হইতে
অব্যাহতি লাভ করিয়া বাহিরে আসিল। প্রজাতন্ত্র শয্যার
উপবেশন করিলেন।
বীণা বাহিরে আসিবার পরই সুহাসিনী ও সুরবালা কমধ্যে
প্রবেশ করিয়া প্রবাহকে প্রণাম করিল। তাহাকে দেখিরা.
প্রভাত বুঝিলেন সুরসাল। এই সমস্ত কাণ্ড করিয়াছে।
প্রভাত যখন সুরবালার সহিত কথা কহিতে ব্যস্ত সেই সময়
পূর্বোক্ত “সতিনী” আসিয়া প্রভাতচকে নমস্কার করিয়া বলিলেন,
একিরূপ সত্যতা মহাশয় ? ভদ্রলােক বুঝিয়া আপনাকে বাড়ীতে
আনিলাম আর আপনি আমাদের কুলবালা কুলবধুর সহিত
এইরূপে আলাপ করিতে আরম্ভ করিলেন। আপনাদের স্বদেশী
প্রচারের মধ্যে এইরূপ চরিত্রবান বীরপুরুষ কয়টি আছেন ?
পরে সুরবালার প্রতি চাহিয়া বলিল,-বৌদিদি! তােমার একি
আক্কেল তাই, অপরিচিত পুরুষের সহিত , একাকী-হাইয়া
কথাবার্তা কহিতেছ।
বেচারী প্রভাতচত্র কোন উত্তর করিতে পারিল না। যাহা
পঞ্চ-প্রদীপ।
হউক এই সময়ে সেই বৃদ্ধা আসিয়া সমস্ত গােলযোগ মিটাইয়া
দিলেন। গােলমাল মিটিবার পর আবার অব গুষ্ঠী তা বীণা আসির।
প্রভাতন্ত্রের শয্যার অর্ধাংশ
শয্যার' অৰ্দ্ধাংশ অধিকার করিল। প্রভাত
তাহার মুখে শুনিলেন, সুরসিকাসঙ্গিনী তাহার জ্যেষ্ঠ। ভগিনী,
লোকনাথবাবু তাহার ভগ্নীপতি এবং বৃদ্ধ লােকনাথবাবুর
পিতামহী।
প্রসিদ্ধ বক্তা যুক্ত প্রভাতচন্দ্র সেই রাৱে জাগিয়া জাগিয়া
অনেক স্বপ্নই দেখিবেন।
jvA/
আগন্তক। রক্ষা কর, রক্ষা কর, স্ত্রীলােকের সর্বনাশ হয় রক্ষা কর।” “কে রক্ষা করিবে ?--এই নির্জন বনমধ্যে,-এই দুৰ্যোগময়ী রজনীতে কে তােমায় রক্ষা করিতে আসিবে ?” গভীর অরণ্য। সূচীভেদ্য অন্ধকারমঙ্গী ভীষণ রাত্রি । বিশ্বাসি ঝটিকা প্রবাহিতা। সমুখে উন্মাদিনী কল্লোলিনী। দুই পার্শ্বে ও পশ্চাতে অগণিত বৃক্ষশ্রেণী। ঘটনাস্থলে এক এস্তা যুবতী প্রাণপণে চীৎকারনিরত, আর তাহার মহস্তে ধরিয়া এক যুবক তাহারই মুখপানে চাহিয়া স্থির। যুবকের দৃষ্টি এত তীক্ষ্ণ যে বােধ হয় সে অন্ধকারের মধ্য দিয়া ও যুবতীর মুখের উপর পড়িতেছে। আর যুবতীর চীৎকার এত উচ্চ যে সেই ভীষণ ঝটিকার হু হু শব্দকেও পরাজিত করিয়া দূরে ছুটিতেছে। পার্শ্বে একখানি ভগ্ন- পাল্কী পড়িয়াছিল, এবং তাহার পার্শে কয়েকজন অর্ধমৃত বাহক যন্ত্রণায় ছটফট করিতেছিল। যুবতী উচ্চস্বরে চীৎকার করিল, “রক্ষা কর, রক্ষা কর, স্ত্রীলােকের সর্বনাশ হয় রক্ষা কর।” যুবক বলিল,-কে রক্ষা করিবে ? এই নির্জন বন মধ্যে, এই দুর্যোগময়ী রজনীতে কে তােমায় রক্ষা করিতে আসিবে সরলা ?” “সতীর ধর্ম, রক্ষা করিবার জন্য অস্ত্রের অভাব হয় না। পিশাচ!—সাবধান।” সেই মুহুর্তে বিদ্যুৎ চমকিত হইল। বিদ্যুতা- লােকে যুবক দেখিল, সম্মুখে জটাজুট সমন্নিত রুদ্ররূপী এক
৪
পং-প্রদীপ।
স্যাসী, তাহাকে সংহার করিবার অই যেন অতর্কিতভাবে
কথায় উপস্থিত হইয়া ত্রিশূল উন্নত করিয়াছেন।
বােধ হইল
যেন স্বয়ং মহাদেবই সতীধৰ্ম্ম ৰক্ষা মানসে তথায় উপস্থিত
হইয়াছেন।
আগন্তুককে দেখিবামাত্ৰ মুৰকের দৃষ্টি শিথিল হইয়া রমণীর
হস্ত হইতে স্বলিত হইয়া পড়িল। সে তিলাé বিল না করিয়া
দ্রুতবেগে তথা হইতে প্রস্থান করিল।
আবার বিদ্যুৎ চমকিল, ক্ষণ প্রভার উজ্জ্বলালােকে অন্ধকার
কানন ক্ষণেকের জ ঝলসিত হইয়া উঠিল। যুবতী আবার
সন্ন্যাসীকে দেখিতে পাইল। সে তঁাহার পদপ্রান্তে পতিত হইয়া
কাতরকণ্ঠে বলিল,-আমায় রক্ষা করুন।
আগন্তুক স্নেহচক স্বরে বলিলেন,-তাই আসিয়াছি। আপনার
কোন ভয় নাই, আপনি এই পাল্কীর মঞ্চে উঠি ৰনুন, আমি
ই মাথায় করিয়া লইয়া যাইতেছি। আপনার শরমহাশয়ের
সহিত আমার আলাপ আছে, তাহার নাম কমলাকান্ত মুখো-
পাধ্যায়। আমি তাঁহার বাড়ী জানি তাহার নিকটেই লইয়া
যাইব। আগন্তুকের সহিত শশুরের আলাপ আছে শুনিয়া যুবতী
আশ্বস্ত হইল, সে সন্ন্যাসীর কথামত পাল্কীতে উঠিয়া বসিল।
অপূৰ্ব্ব কৌশলে পাল্কীটি মাথায় লইয়া সেই অন্ধকার ভেদ করিয়া
সন্ন্যাসী চলিলেন।
সুবর্ণগ্রামের জমিদার কমলাকান্ত মুখোপাধ্যায় অতিপয় রুক্ষ
মেজাতের লােক ছিলেন। সংসারে একমাত্র পুঞ্জ -দেবীপ্রসাদ,
পুত্রবধূ-সরলা, বিধবা তাগিনেয়ী কামিনী ও একটী বিধবা ভগ্নী
(কামিনীর জননী) ভিন্ন অপর কেহ ছিল না। কামিনীর আর
পঞ্চ-প্রদীপ একটা ভয়ী ছিল, তাহার নাম যামিনী। যামিনী ও তাহার স্বামী গােপীনাথ, মাঝে মাঝে সুবর্ণগ্রামে আসিয়া ২১ মাস করিয়া থাকিত। বিধবা ষোড়শী-যুবতী কামিনীর উপর ষ্ট-চরিত্র গােপীনাথের কুদৃষ্টি পড়িল। হতভাগিনী জানিল না যে পাপাত্মা গােপনে তাহার সর্বনাশ সাধমের পন্থা অনুসন্ধান করিতেছে। সে বালিকা- বয়সেই বিধবা হইয়াছিল বলিয়া মাতার নিকট অতিরিক্ত আদর পাইত। মাতারই কথায় বিধবা যুবতী ভগ্নীপতিকে মাঝে মাঝে ঠাট্টা বিদ্রুপ করিতে যাইত। গুণধর ভগ্নীপতি সুযােগ বুঝিয়া হতভাগিনীর সর্বনাশ করিল। পাপকর্ম অধিকদিন সুকান থাকে না। ২৫ দিন পরেই এই ঘটনা দেবীপ্রসাদ স্বচক্ষে দেখিলেন। তিনি তৎক্ষণাৎ ভগ্নীপতির গলাধাক্কা দিয়া বাড়ী হইতে বাহির করিয়া দিলেন। স্ত্রীলােক যতদিন পবিত্র থাকে, ততদিন সে স্নেহময়ী, সজ্জাশীলা ; সামান্য কারণেই ত্রাসিতা কুরঙ্গিণীর মত চঞ্চলা। কিন্তু যেদিন পবিত্র রেখার অতিক্রম করিল, সেইদিন হইতে সে হৃদয়হীনা পিশাচী। সেইদিন হইতে দয়া, মায়া, স্নেহ, লজ্জা, ভয় প্রভৃতি স্ত্রীলোকের ভূমণগুলি তাহার নিকট হইতে চিরদিনের জন্য একে একে বিদায় গ্রহণ করে। সেইদিন হইতে সে কাল ভুজঙ্গিণী অপেক্ষাও ভয়ঙ্করী। নষ্টচরিত্র। কামিনী তাহার প্রবৃত্তি দমন করিয়া রাখিতে পারি না। মনে মনে কাৰ্য্যসিদ্ধির যুক্তি করিতে লাগিল। একদিন রাত্রে সকলেই যখন ঘুমাইয়া পড়িয়াছিল, সেই সময় সে একটা বিকট চীৎকার করিয়া উঠিল। তাহার চীৎকার শুনিয়া সকলেই ছুটিয়া আসিল। কমলাকান্ত তাহায় সহসা চীংকারের কারণ জিজ্ঞাসা করিলেন। রাক্ষসী অম্লান বদনে ৪২ পঞ্চ-প্রদীপ। বলিল,-“দাদা আমার গৃহে আসিয়া আমার নিদ্রিতাবস্থায় অঙ্গস্পর্শ করিয়াছিল।” সেই মুহূর্তেই কর্তব্যপরায়ণ পিতাকর্তৃক নিরপরাধ পুত্র নিৰ্বাসিত হইলেন। তখন সরলা তথায় ছিল না। দেবী প্রসাদ সেই রাত্রেই পিতৃগৃহ হইতে সরলার সহিত দেখা করিতে চলিলেন। সরলার পিত্রালয় নিকটবর্তী গ্রামে। সেই রাত্রেই তিনি তাহাকে সমস্ত ঘটনা জানাইলেন ! সরলা চতুর্দশবর্ষীয়া বালিকা মাত্র, তখন তত বুঝিবার শক্তি ছিল না। সে বলিল,-বােধ হয় তুমি কামিনী ঠাকুর্জির ঘরে গিয়েছিলে। দেবী প্রসাদ বলিলেন,-আমি সত্যাসত্য নির্ধারণের জন্য তােমার নিকট আসি নাই সরা! পিতার আজ্ঞায় আমি গৃহ হইতে নির্বাসিত হইয়া তােমার নিকট বিদায় লইতে আসিয়াছি। সরলা বালিকা ; সে দেবীপ্রসাদের মনের ভৈরবী ছায়া দেখিতে পায় নাই তাই কথা কহিল না। দেবী প্রসাদ আবার বলিলেন,-তবে চলিলাম, যদি বাঁচি দেখা হইবে।-“নইলে এই শেষ।” কি ভাবিয়া সরলা তথা হইতে চলিয়া গেলেন। দেবীপ্রসাদ ও দাড়াইলেন না। একটু পরেই সরলা তাহার ভ্রাতৃজায়ার সঙ্গে তথায় আসি। উপস্থিত হইল, কিন্তু দেবী প্রসাদকে দেখিতে পাইলনা। ঠিক এই সময়ে বাহিরে তাহাদেরই অট্টালিকাপার্শ্বে পূর্ণ সলিল। নদীবক্ষে ঝপাৎ করিয়া কি একটা শব্দ হইল। উভয়েই চাহিয়া দেখিল, দেবীপ্রসাদ জলে ভাসিয়া যাইতেছে। তাহারা চীৎকার করিয়া উঠিল। লােকজন ছুটিল, কিন্তু দেবীপ্রসাদকে খুঁজিয়া পাইল না। সকলেই বুঝিল, সে ঘূর্ণিতে ডুবিয়া গিয়াছে।
পঞ্চ প্রদীপ দেবী প্রসাদের মৃত্যু সংবাদ কমলাকান্তের নিকট পৌছিল। পুত্রের মৃত্যু সংবাদে তঁাহার কর্তব্যের বাধ ভাঙ্গিয়া গেল। তিনি গড়াগড়ি দিয়া কঁদিতে লাগিলেন। সেই করুণ ক্রন্দনপূর্ণ জমীদার ভবনে কেবলমাত্র একজন হাসিল। সে-“পিশাচী কামিনী।” এতদিন পরে গােপীনাথ আবার আসিল। পিশাচ পিশাচী আবার পাপবাসনা চরিতার্থ করিতে লাগিল। কিছুদিন থাকিতে থাকিতে সরলার উপর গােপীনাথের দৃষ্টি পড়িল। সে বুঝিল, কামিনী এ বাড়ীতে থাকিলে এই নূতন উদ্দেশ্য সিদ্ধ হইবে না। তাই স্বাধীনভাবে গৃহস্থালী করিবার ভাণ করিয়া সে কামিনীকে গৃহ হইতে লইয়া গিয়া নিকটবর্তী এক পল্লীতে লুকাইয়া রাখিল, কামিনী তথায় রহিল। কিন্তু গােপীনাথ পূৰ্ববং শ্বশুরবাড়ী আসিতে ঝাগিল। পরে গোপীনাথ,- একদিন সরলা পিত্রাণয় যাইবে শুনিয়া আট জন লাঠিয়াল সঙ্গে গন্তব্য পথের জঙ্গলে লুকাইয়া রহিল। তাহার পরের ঘটনা পাঠক জানেন। এখনও আকাশ মেবাচ্ছঃ তপন ও টিপ, টিপ, করিয়া বৃষ্টি পড়িতেছিল এবং অন্ধকার, আকাশতল ক্ষণিকের তরে উদ্ভাসিত করিয়া মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ ছুটিতেছিল। বাহিরের গৃহে একখানি চেয়ারে বসিয়া বৃদ্ধ কমলাকান্ত কি ভাবিতেছিলেন। তাঁহার চক্ষে জল পড়িতেছিল মাঝে মাঝে সেই জল মুছিয়া তিনি আবার সেই অন্ধকার পানে চাহিতেছিলেন। কিন্তু এ অন্ধকারে বৃদ্ধের ক্ষীণদৃষ্টি কি দেখিবে। এ অন্ধকার মনুষ্যের অদৃষ্টের মত নিবিড়। এমন সময় সেই অন্ধকারের মধ্য দিয়া তাহার সম্মুখস্থ আলােকের সম্মুখে সেই সন্ন্যাসী একখানি পাল্কী মাথায় করিয়া আসিয়া পঞ্চ-প্রদীপ। দাড়াইলেন। বৃদ্ধের পার্শ্বে একটি ভৃত্য বসিয়াছিল, সে পাল্কী বাহককে দেখিবামাত্র সভয়ে রাম, রাম শব্দ করিতে করিতে উৰ্বশ্বাসে পলাইল, বৃদ্ধ ও আশ্চর্যান্বিত হইলেন। তিনি মনে মনে ভাবিতে লাগিলেন একি মানুষ না অসুর। একাকী একটা পাল্কী মাথায় করিয়া আনিল। পাঠক, বােধ হয় বিস্মিত হইবেন, কিন্তু এখনও বাঙ্গলাদেশে এমন শক্তিশালী পুরুষ দুই একজন আছেন, যাহারা ভূমি হইতে আরােহীসহ এক খনি পাল্কীকে অনায়াসে তুলিয়া লইতে পারেন। আগন্তুক বলিলেন,—এই আপনার পুত্রবধূ আপনার জামাতা কর্তৃক পথে আক্রান্ত হইয়াছিলেন ইহাকে গ্রহণ করুন। বৃদ্ধ সহসা সেই সন্ন্যাসীবাহিত পাল্কী মধ্যে পুত্রবধূকে দেখিয়া এবং সন্ন্যাসীর কথা শুনিয়া স্তম্ভিত হইলেন। আগন্তুক আর কোন কথা কহিলেন না।' বৃদ্ধের পানে চাহিয়া তিনি স্ফটিক, স্তম্ভের মত দাড়াইয়া রহিলেন। সহসা মেঘগর্জনে তাহার সেই ঐকান্তিকতা দূর হইল। তিনি আর দাড়াইলেন না। সেই নিবিড় অন্ধকারে মিশিয়া গেলেন। বৃদ্ধ অবাক হইয়া চাহিয়া রহিলেন। কামিনী বাল-বিধবা। জননী ঔদাসীন্যে তাহার চরিত্র অন্য ভাবে গঠিত হইয়াছিল। ভগ্নীপতির সহিত বিংশবর্ষীবয়সে স্নেহময়ী জননীর সাধের সংসার ত্যাগ করিয়া সোণাপুর গ্রামে গােপনে বাস করিতে লাগিল। প্রথম কিছুদিন গােপীনাথ প্রায়ই তাহার নিকট আসা যাওয়া করিতেন; পরে যে জন্য কামিনীকে অপহরণ করিয়াছিলেন, যেই কার্যের জন্য অন্যত্র ব্যস্ত হইলেন- যেদিন রাত্রে তিনি ঝটকা ও ঝঞ্জায় গভীর বনমধ্যে সরাঝে ;
পঞ্চ-প্রদীপ। ৪৫ \/\/\. আক্রমণ করেন, ঠিক সেইদিন তেমনি সময়ে আবদুল লতিফ নামে এক মুসলমান্ তিনজন অনুচরসহ কামিনীর গৃহে প্রবেশ করিল। কামিনীর ধর্ম নষ্ট হইয়াছিল মাত্র। সে যাহাই হউক কলঙ্কিনী হউক আর কুলের বহিষ্কৃত হউক হিন্দু ছিল। সেই রাত্রে মুসলমান কর্তৃক তাহার মর্যাদা নষ্ট হইল। অলঙ্কারপত্র এবং নগদ অর্থ্যাদি যাহা ছিল সমস্তই অপহৃত হইল। হতভাগিনী সঙ্গালাভ করিয়া দেখিল,-সে সর্বস্বান্ত হইয়াছে। তাও সে কি জানিত যে তাহার এত দুর্দশা হইবে, সে কি জানিত ইন্দ্রিয় সুখের পরিণাম এত ভীষণ, সে কি জানিত পাপের প্রায়শ্চিত্ত এত ভয়ানক। যদি জানিত তাহা হইলে কি এ পথে পার্পণ করিত? এই কি পাপের পরিণাম ? না কুলত্যাগিনীর পরিণাম আরও ভীষণ ? কামিনী স্বভাবতঃ সুন্দরী ছিল। কিছুদিনের জন্য সে আর এক যুবকের অঙ্কশায়িনী হইল। কিন্তু এবার ইচ্ছায় নয়, ক্ষুধার তাড়নায় নূতন নায়কের সহিত কলিকাতায় আসিল। কিছুদিন উভয়ে একত্ৰ থাকিয়া নায়কের পিপাসা মিটিলে সে আবার পরিত্যক্ত হইল। তাহার পর জঘন্য বেশ্যাবৃত্তি অবলম্বন করিল। তৎফলে কতক গুলি কুৎসিৎ রোগ তাহার দেহে প্রবেশ করিল। রূপও গেল, সৌন্দর্য্য ও গেল, যৌবন ও যায় যায় হইয়া উঠিল। এইবার পিশাচী কি করিবে ? যেদিন গভীর রাত্রে স্নেহময়ী জননীকে ফাকি দিয়া ইন্দ্রিয়ের পিপাসা মিটাইবার জন্য চলিয়া আসিয়াছিল, সেদিন একবারও ভাবিয়াছিল কি? সেই পাপের এই ভীষণ প্রায়শ্চিত্ত ? সেদিন জানিতে কি যে জঠোর আলার অস্থির হইয়া সমস্ত রাত্রি তােমায় পথে দাড়াইয়া থাকিতে হইবে।
৪৬ পঞ্চ-প্রদীপ। incarna And A^^^ আজ তুমি দাঁড়াইয়াছ,-তােমার পরিধানে নীলাম্বরী শাটী, তােমার কবরীতে সদ্য প্রস্ফুটিত চম্পকপুষ্প। পুষ্পবিনিন্দিত হস্তে পুষ্পের তােড়া, তাম্বুল-রাগরঞ্জিত অধরপ্রান্তে হাসি—নয়নে বিলাস- ভঙ্গিমাযুক্ত অপাঙ্গ-দৃষ্টি, বােধ হয় ভাবিতেছ তােমাকে ভাল সাজিয়াছে। কিন্তু কামিনী তােমার ঐ বাহ্যিক সৌন্দর্য্যের মধ্যে অন্তরের গাঢ় কালিমা কি দেখা যায় না। ঐ হাসির মধ্যে তােমার জঠরের জ্বালা কি লুকাইয়া রাখিতে পারিয়াছ ? তুমি পিশাচী, এখনও কুলত্যাগের উপযুক্ত শাস্তি তােমার হয় নাই। আরও কঠোরতর দও তােমার জন্য প্রস্তুত রহিয়াছে। সরলাভে বঞ্চিত হইয়া হতাশ প্রেমিক গােপীনাথ বাড়ী ফিরিলেন। গােপনে সরলার সন্ধান লইয়া তাহাকে পাইবার জন্য পুনরায় চেষ্টা করিতে লাগিলেন। কামিনীর কথা বােধ হয় তখন আর তাহার মনে ছিল না, মনে থাকিলেও তাহাকে দেখিতে যাইবার সময় ছিল না, কিম্বা সময় থাকিলেও বুঝি ইচ্ছা হইত না। অনেকদিন যাইল, কিন্তু স্মৃতি--পাপীর মন হইতে মুছিলনা। সে আবার সরলাকে পাইবার জন্য চেষ্টা করিতে লাগিল। এবার আয়ােজন কিছু গুরুতর। প্রায় একশতজন লাঠিয়ালসহ গােপীনাথ অমাবস্যার রাত্রে কমলাকান্তের সর্বনাশ করিবার জন্য অগ্রসর হইল। আজ অমাবস্যা। সন্ধ্যার সময় কমলাকান্ত একটু জলযােগ করিয়া বাহিরে আসিয়া বসিলেন, এমন সময়ে এক সন্ন্যাসী আসিয়া তাহার সম্মুখে দাড়াইয়া তাহাকে প্রণাম করিল, কমলাকান্ত শশব্যস্তে বলিলেন,-ঠাকুর কি কর কি কর, তুমি আমায় প্রণাম করিতেছ কেন?”
পঞ্চ-প্রদীপ।
৪।
।
সন্ন্যাসী।আপনি পিতৃতুল্য, তাই প্রণাম করিতেছি।
বিশেষতঃ আপনি ব্রাহ্মণ আপনার প্রণাম গ্রহণের অধিকার আছে।
‘আপনি আমার পিতৃতুল্য” – এই কথাটি শুনিয়া কমলাকান্ত
দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিলেন শুষ্ক কপোলে দুই বিন্দু অশ্রু ঝরিল।
সন্ন্যাসী বলিলেন,-বাবা আপনি কঁদছেন কেন ?
আর স্থির থাকিতে পারিলেন না। তিনি উচ্চৈস্বরে চীৎকার
করিয়া বলিয়া উঠিলেন,-“বল বল, আবার বল, অনেকদিন কেউ
আমায় এমন ভক্তিপূর্ণম্বরে বাবা বলে নাই। বল, সন্ন্যাসী আবার
বল। সন্ন্যাসী একটু ইতস্ততঃ করিলেন। তিনি বলিলেন,-
“আপনার পুত্র বুঝি মারা গিয়াছে।”
বৃদ্ধ।-না, না মিথ্যা কথা, কে বলিল মারা গিয়াছে ? সে
তীর্থ ভ্রমণে গিয়াছে। বলনা সন্ন্যাসী, তুমি কি আমার পুত্রের
সংবাদ জান ?
সন্ন্যাসী।-না, আমার সঙ্গে তো তার আলাপ নাই।
বৃদ্ধ হতাশ হইলেন। কিছুক্ষণ পরে সন্ন্যাসী বলিলেন, আমি
বুঝিতে পারিলাম না আপনার মত বৃদ্ধ পিতাকে কঁাদাইয়া
আপনার পুত্র তীর্থ ভ্রমণে গিয়াছেন, সে তীর্থ ভ্রমণে কি পুণ্য
সঞ্চয় হইবে? তবে কি তিনি কোনরূপ অনুরাগে গৃহত্যাগ
করিয়াছেন।
বৃদ্ধের কোঠর-গত চক্ষু উজ্জ্বল হইল। তিনি কম্পিত স্বরে
বলিলেন,-কি ব’লচ ?
সন্ন্যাসী।—তিনিও যুবক, তাই বলিতেছি কোন কামিনীর
প্রতি আসক্তই কি তাহার গৃহ ত্যাগের কারণ ? বৃব্ধ দাড়াইয়া
উঠিলেন। কিছুক্ষণ ইতস্তত পদসঞ্চারণ করিয়া বলিলেন,-“আমার,
‘৪৮
পঞ্চ-প্রদীপ।
পুত্র সাধু। পর নারীকে জননীর মত দেখিত, আমি মােহে পিশাচীর
কুহক না বুঝিতে পারিয়া তাহাকে বিনা অপরাধে নির্বাসিত করিয়া-
ছিলাম”। এই বলিয়া বৃদ্ধ হােহে শব্দে কাঁদিয়া উঠিল।
সন্ন্যাসী।যখন আপনি নির্বাসিত করিয়াছিলেন তখন,
তাহার দোষ ছিল নিশ্চয়ই আপনি অপত্য-স্নেহের বশবর্তী
হইয়া সে দোষ ভুলিয়া গিয়াছেন। বৃদ্ধ স্থির হইয়া দাড়াইলেন।
সন্ন্যাসীর প্রতি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চাহিয়া বলিলেন,-আমার পুত্রের
, চরিত্রে কালিমা। সন্ন্যাসীঠাকুর আমি এতদিন অমান্ধ হইয়াছিলাম
কিন্তু আজ অামার সে ভ্ৰম কাটিয়াছে।
আমি নিদাঘ-তপ্ত
দ্বি প্রহরে শৈত্য অনুভব করিতে পারি কিন্তু আমার পুত্রের
চরিত্রে আমার আর কিছুমাত্র সন্দেহ নাই।
সন্ন্যাসী এক বার দাড়াইলেন। একবার এদিক ওদিক
ফিরিলেন। পরে বুদ্ধকে বলিলেন,-আজ আপনার গৃহে রাত্রে
একটু আশ্রয় পাইব কি ?
বৃদ্ধ আগ্রহের
সহিত বলিলেন,-অামার সৌভাগ্য।
আগন্তুক সেই রাত্রে কমলাকান্তের অতিথি হইলেন।
অতিপিকে ভোজন করাইয়া কমলাকান্ত অভিমুখে
প্রান করিলেন। আগন্তুক বাহিরে কিছুক্ষণ ভ্ৰমণ করিয়া
একটী তুলসীমঞ্চের নিম্নে উপবেশন পূর্বক গভীর চিন্তায়
নিমগ্ন হইলেন। এমন সময়ে একটা
তঁাহার
ধ্যান ভগ্ন হইল। চমকিত হইয়া উঠিয়া দেখিলেন, প্রায় কুড়ি
জন দীর্ঘকায় কৃষ্ণবর্ণ পুরুষ লাঠি হস্তে দরজার সম্মুখে দাঁড়াইয়া
আছে। . আর দেখিলেন, তাহাদের অগ্রে নরপিশাচ গােপীনাথ।
পিশাচের মুক্তি দেখিয়া তাহার করে আপনা আপনি ত্রিশূল
।
প-প্রদীপ।
উঠিল ।
তিনি যেন কোন দৈবশক্তির বলে চালিত হইয়া
গােপীনাথের সম্মুখে দাড়াইলেন।
গােপীনাথ তাহাকে দেখিয়া বিস্মিত, ভীত ও স্তম্ভিত হইয়া
গেল। এ কে ? ইহাকে যে
পূর্বে কোথাও দেখিয়াছি।
পরক্ষণেই তাহার মনে হইল সেই রাত্রে সেই গভীর বন
মধ্যে সরলার ধৰ্ম্মরক্ষা করিবার জন্য এই সন্ন্যাসীইতে তাহার
পৈশাচিক দৃষ্টির সম্মুখে
বুক পাতিয়া দিয়াছিল।
গােপীনাথের মুখে কথা বাহির হইল না। হত নলি
না, পদদ্বয় নিশ্চল হইয়া গেল।
সন্ন্যাসীকে দেখিয়া দশ বার জন লােক চীৎকার করিয়া
তাহাকে আক্রমণ করিতে আসিল। সন্ন্যাসীও ত্রিশূল ধরিলেন,
বিলম্বিত জটাকলাপ ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত হইতে লাগিল। বিদ্যুতের
মত তঁাহার করে ত্রিশূল ঘুরিতে লাগিল। একে একে ৫৭ জন
লােক গতাসু হইল। তাহাদের চীৎকারে কমলাকান্ত ও
পরিবারবর্গ সকলে জাগ্রত হইয়া ছাদে উঠিলেন, সকলেই জিত।
চারিদিকে পিপীলিকার মত অস্ত্রধারী মনুষ্য, আর তাহাদের
প্রতিদ্বন্দ্বী একমাত্র সন্ন্যাসী। তঁাহাৱা সকলে সন্ন্যাসীর সাহায্যের
জন্য ঈশ্বরকে ডাকিতে লাগিলেন।
লাঠিয়ালগণ পয়সার লােভে ডাকাতি করিতে আসিয়াছিল,
তাহারা প্রাণ দিতে আসে নাই। পনের ষোলজন ভূতশাস্ত্রী
হইবার পরে আর কেহই তথায় দাড়াইল না, সকলেই উসে
পলায়ন করিল। পারিল না। কেবল হতভাগ্য গােপীনাথ।
লাঠিয়ালগণ পলাইল দেখিয়া, সন্ন্যাসী গােপীনাথের সম্মুখে
আসিয়া বাজাইলেন।
বলমুষ্টিতে তাহার ধারণ করি।
পঞ্চ-প্রদীপ।
বলিলেন,-পিশাচ, আজি ও তোমার পাপ ইচ্ছা নষ্ট হয় নাই,
তাই আবার এখানে আসিয়াছ ?
গোপীনাথের হস্ত তখন অবশ হইয়াছিল, ভয়ে মুখে কথা
বাহির হইল না।
লােকজন পলাইয়াছে দেখিয়া কমলাকান্তের দরোয়ান, ভৃত্য
এবং অন্যান্য সকলে তথায় আসিয়া জুটিল। কমলাকান্ত আসিলেন,
কুলাঙ্গনগণও দূরে দাঁড়াইল। যামিনী দেখিল, তাহার স্বামীর
মৃত্যু নিকট। সে স্বামীর নিকট কখন ও তিলমাত্র আদর পায় নাই।
সধবা হইয়াও চিরদিন স্বামী সুখে বঞ্চিত, তথাপি সে হিন্দু-
ললনা,-সে পতিব্রতা। তাই স্বামীর বিপদে ঘৃণা, লজ্জা, ভয় সব
ত্যাগ করিয়া ছুটিয়া গিয়া সন্ন্যাসীর পদদ্বয় ধরিয়া স্বামীর প্রাণভিক্ষা
চাহিল।
যামিনীর কাতরতায় সন্ন্যাসী বলিলেন,-যাও পিশাচ, সতীর
কথায় আজও তোমায় ক্ষমা করিলাম। কিন্তু ভবিষ্যতের জন্য
সাবধান হও।
এমন সময়ে উন্মাদিনী তরঙ্গিনীর মত গর্জন করিতে করিতে
খলিতকেশা, অর্ধনগ্নবেশ। এক পাগলিনী হাসিতে হাসিতে
তঁাহাদের সম্মুখে আসিয়া দাড়াইল। উন্মাদিনী বলিল,-কি
গােপীনাথ চেয়ে আছ যে, আমায় চিনিতে পারিতেছ না? তা আর
পারিবে কেন? আমি পিশাচী, আমি রাক্ষসী, আমি কামিনী।
সকলেই নিস্তব্ধ। কমলাকান্ত তাহার মুখপানে চাহিয়া
অবাক। গােপীনাথ তাহার পানে চাহিয়া নিৰ্বাক্। এমন
কি সন্ন্যাসী পৰ্য্যন্ত সহসা তাহাকে দেখিয়া স্তম্ভিত। অমানিশার
ভীষণ অন্ধকারে তাহার
তাহার মুখমণ্ডল স্পষ্ট দেখিতে পাওয়া
পঞ্চ-প্রদীপ। যাইতেছিল না, কিন্তু অগ্নিময় গােলকের মত তাহার চক্ষুর সেই অন্ধকারে দপ দপ করিয়া অলিতেছিল। উন্মাদিনী সন্ন্যাসীর প্রতি চাহিয়া বলিল,-এই যে দাদা এসেছ ! পিশাচীকে ক্ষমা কর। পরে কমলাকান্তের প্রতি চাহিয়া বলিল,-মামা! দাদাকে চিনতে পারছেন না? আমি মরিব বলিয়া আমার চক্ষুর জ্যোতিঃ উজ্জল হইয়াছে। আপনার সম্মুখে সন্ন্যাসী বেশে দাদা দাড়াইয়া আছেন। উন্মাদিনী পুনরায় গােপীনাথের প্রতি চাহিয়া বলিল,-পিশাচ! তুমি আমায় অনেক যন্ত্রণা দিয়াছ। অনেক সময় অশান্তিতে আত্মহত্যা করিতে গিয়াছিলাম, কিন্তু তখনও আমার কষ্টের অবসান হয় নাই বলিয়া, আমি ইচ্ছা পূর্ণ করিতে পারি নাই। এধনা রােগাক্রান্ত হইয়া ক্ষুধার জ্বালায় একমুষ্টি উদরায়ের জন্য পরের ধারে ভিক্ষা করিতে গিয়াছিলাম। কেহ আমায় ভিক্ষা দেয়। নাই, লাথি মারিয়া দূর করিয়া দিয়াছে। পদাহতা ভুঙ্গিনীর মত তৎক্ষণাৎ তােমার গৃহ , লক্ষ্য করিয়া ছুটি। উদ্দেশ্য তোমার রক্তে জঠর জালার শান্তি করিব। তােমার বাড়ীতে আসিয়া শুনিলাম, সরলার সর্বনাশ করিবার জন্য তুমি এখানে আসিয়াছ। অমনি বিদ্যুতের মত তেজে, বাতাসের মত দ্রুতবেগে এখানে ছুটিয়া আসিয়াছি। উঃ! বড় জ্বালা। এই বলিয়া উন্মাদিনী কটিদেশ হইতে এক ভীষণ ছুরিক। বাহির করিল। নিমেষের মধ্যে তাহার হস্ত উপরে উঠিল এবং উল্কাবেগে গােপীনাথের বুকে সেই ছুরি কা বসাইয়া দিয়া তাহার জীবনের লীলাখেলা সব শেষ করিয়া দিল। কামিনী সেই রক্তাক্ত ছুরিক। গােপীনাথের বুক হইতে টানিয়া বাহির করিয়া বিকট হাস্য করিয়া উঠিল।
-প্রদীপ।
minnair
খাইল না।
আবার সেই ছুরিকা উদ্ধে উঠিল। নক্ষত্ৰবেগে কামিনীর
বুকে বসিল ; কামিনী পড়িয়া গেল।
এই ঘটনা এত অল্প সময়ের মধ্যে এত অতর্কিত ভাবে হইল
( কাহারও মুখ হইতে একটি কথা কহিবার সময় ছিলনা বা
কেহ এক পা অগ্রসর হইতে পারিল না।
কামিনীর বৃদ্ধা জননী ছুটিয়া আসিয়া তাহার বুকের উপর
আছাড় খাইয়া পড়িল। কামিনী ক্ষীণকণ্ঠে বলিল,-মা, চলিলাম।
সন্ন্যাসী একটু জল তাহার মুখে দিতে গেলেন, কিন্তু সে
কেবল কাদিতে কাদিতে জোড়হস্তে জড়িতরে
বলিল,-দাদা, আমায় ক্ষমা কর। বৌদিদি, আমায় ক্ষমা ।
যামিনী-অভাগিনী-ওঃ-মা –। আর কথা বাহির হইল না।
কেবল শতধারে চক্ষের জল পড়িতে লাগিল। কমলাকান্ত
কালিয়া ফেলিলেন। সকলেই চীৎকার করিয়া কাদিতে লাগিল।
আগন্তুক দেবীপ্রসাদের চক্ষেও জল-বিন্দু দেখা দিয়াছিল।
যামিনী পূর্ব হইতেই মূর্হিত হইয়াছিল। তাহার আর
সংজ্ঞা হইল না। তাহারও জীবন শেষ হইল।
সেই ভীষণ দুর্ঘটনার মধ্যে বৃদ্ধ কমলাকান্ত আবার পুত্র
ফিরিয়া পাইলেন। বিধবাবেশধারিণী সরলা আবার সধবা হইল।
-।
##
En
৪০
প্রায়শ্চিত্ত।
১
চপলার বয়স এখন তের বৎসর। বাঙ্গালীর বাড়ীতে মেয়ে
আর অবিবাহিত। রাখা চলে না। তাই তাহার পিতা হরেন্দ্র
নারায়ণ বসু পাত্ৰ সন্ধান করিতে আরম্ভ করিলেন । छिनि
ঘটককে ডাকিয়া বলিলেন,-পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত নগদ দিব ।
উচ্চ বংশ চাই, কুলীন চাই, পাশকরা জামাই চাই, জামায়ের
পিতার বিষয় থাকা চাই। অনেক সন্ধানের পর ঘটক ঠিক
সেইরূপ একটা পাত্র খুঁজিয়া বাহির করিলেন। কন্যা-
কর্তা সেই পাত্রে কন্যা দান সঙ্গত বলিয়া বিবেচনা করিলেন।
কিন্তু কন্যার মাতা তাহাতে আপত্তি করিলেন। তিনি বলিলেন,-
সং-বংশীয় একটা দরিদ্র পুত্রের সহিত কন্যার বিবাহ দিয়া কন্যা
ও জামাতাকে গৃহে রাখিবেন। বড় লােকের বাড়ীতে মেয়ে
দিলে মেয়ের সঙ্গে আর সম্বন্ধ থাকে না।
গৃহিনীর ইচ্ছাই পূর্ণ হইল। সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের সহিত
ত্রয়ােদশবর্ষীয়া চপলার বিবাহ হইল। সত্যেন্দ্র এখন স্বাবিংশ
বয়স্ক যুবক। উচ্চবশে তাহার জন্ম। তাহার পিতামহ নাকি
৫৪ পঞ্চ-প্রদীপ। কোন রাজবাড়ীর দেওয়ান ছিলেন। বাড়ীতে দোল, দুর্গোৎসব, অতিথি সেবা প্রভৃতি সৎকর্মের অনুষ্ঠান হইত। কিন্তু কাল- চক্রে সেই সংসার এখন অন্ধকারময় হইয়াছে। বাল্যকালে সত্যেও দাস-দাসীর কোলে পালিত হইয়াছিল। তাহার পিতা তাহার অঙ্গে এক সময় হাজার টাকার অলঙ্কার পরাইয়াছিলেন । কিন্তু দৈব দুর্বিপাকে এখন সে পরের আশ্রিত। পরের আশ্রয়ে থাকিয়া অধ্যবসায়শীল সত্যেন্দ্র প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইল। তাহার পর সন্ধানী ঘটক মহাশয়ের কৃপায় চপলার সহিত তাহার বিবাহ হইল। বিবাহের পর হরেন্দ্রবাবু তাহাকে বিদ্যাশিক্ষা করিবার জন্য কলিকাতা পাঠাইলেন। সত্যেন্দ্র কলিকাতার পড়িতে লাগিল, এবং তাহার মধ্যেই অবকাশমত শশুর গৃহে আসিয়া নবপরিণীতাকে “মনের মত করিয়া লইবার চেষ্টা করিত। একটা কথা বলিতে ভুলিয়াছি। চপল তাহার পিতার একমাত্র সন্তান। তাই সে বড় আদরের মেয়ে ছিল। এয়ােদশ বৎসর পর্য্যন্ত সে এক এক দিন তাহার পিতার বসিবার বাহিরের ঘরে আসিয়া আব্দার করিত। জমীদারের এক কন্যা বলিয়া চপলা সব বিষয়েই একটু একটু স্বাধীনতা পাইয়াছিল। তাহার পিতা তাহাকে একটা হারমােনিয়ম দিয়াছিলেন, সে তাহা বাজাইয়া গান করিত। আলমারি আলমারি পুস্তক কিনিয়া দিয়াছিলেন, চপলা তাহা পড়িত। ইহা ছাড়া উলের ফুল তােলা, লৈ প্রস্তুত করা ও তাহার জানা ছিল। সংসারের কাজ-কর্ম সে কখনো দেখি না। আর দেখিবার প্রয়ােজনও হইত না বলিয়া পিতামাতাও দেথিতে দিতেন না পাঠিকা, হয়তো পঞ্চ-প্রদীপ। . ..A । বলিতে পারেন, কেন ইহাতে নিন্দা করিবার কি আছে? আপনারা বলিতে পারেন, লেস্ তো আমরাও তৈয়ারী করি। নভেল তো আমরাও পড়ি। হারমােনিয়ম তো আমরাও বাজাই। তায় দোষ কি ? ক্ষমা করিবেন, আপনাদিগকে নিন্দা করা আমার ইচ্ছা নয়। ইহাও জানা আছে আপনাদের নিন্দা করিলে আমার মহা পাপ হইবে। কিন্তু চপলার দেহে উক্ত তিনটী ব্যতীত আরও একটি অতিরিক্ত লােগ ছিল।-“সেটি অহঙ্কার।” সে তাহার বরের ( চতুদশবর্ষীয়ার পতিকে স্বামী বলিলে ব্যাকরণ দুষ্টতা হইয়া পড়ে তাই বর বলিলাম) নিকট প্রায়ই পিতার সম্পত্তির বড়ই করিত। এবং সেই সঙ্গে তাহার দারিদ্র্যের কথা তুলিয়া উপহাস করিতেও লজ্জা বোধ করিত না। চপলার জননী একদিন এই কথা জানিতে পারিয়া চপলাকে অনেক তিরস্কার করিয়াছিলেন। তাহাতে হরেন্দ্রবাবু গৃহিনীকে বলিয়াছিলেন, এখন। চপলা ছেলে মানুষ ওর কি বুদ্ধি আছে ? তোমার আপনার কথা মনে করনা ; মনে করনা; বয়েস হলেই সব সেরে যাবে। পিতামাতার আদরের কোলে পালিত হইতে হইতে চপল। পঞ্চদশ বৎসরে উপনীত হইল। . ২ চপলা এখন পঞ্চদশবর্ষীয়া । বসন্ত-প্রভাতে কুসুমিত-কুঞ্জ- বনের মত শশাভাময়ী নবীনা যুবতী। আষাঢ় মাসের সন্ধ্যা বেলা সে আপনার কক্ষে বসিয়া বসিয়া কি ভাবিতেছিল। এমন সময় কনকলতা আসিয়া পচাব্দিক হইতে তাহার চক্ষু টিপিয়া ধরিয়া জিজ্ঞাসা করিল,-আমি কে বল দেখি?
পঞ্চপ্রদীপ।
চপলা চক্ষু হইতে কনকের করয় ছাড়াইয়া বলিল,-মরণ
আর কি! এত রঙ্গ কেন ?
কনক।-আমি মনে করেছিলাম তুই চিন্তে পাবি না।
চপলা বলিল,-তারপর এমন সময়ে তাের বড় যে অবসর হ’ল?
কনক।একটা কথা জিজ্ঞাসা করিতে এলাম। সত্যেনবাবু
আজ এত বিমর্ষ-মুখ নামিয়ে রয়েছেন কেন? দেখে মনে হয় যে
কি দুঃখ হয়েছে। তুই কিছু বলেছি না কি? এত বড় হলি
তবু তো তাের বুদ্ধি হলাে না।
চপলা।-আমি আবার
কি বলবো।
পরীক্ষাতে ফেল
হয়েছে খবর এসেছে, তাই এমন করে বেড়াচ্ছে।
কনক।-(আশ্চর্য্য হইয়া) সত্যেনবাবু ফেল হয়েছে ?
তাের মিছে কথা।
চপলা।-কেন, ওকে কি আর ফেল হতে নাই
সম্বৎসর
ইয়ারকি দিয়ে বেড়িয়েছে তো তার ফেল হবে না তো কি ?
এমন সময় গৃহিণী আতাহাদের বাক্যালাপ বন্ধ করিয়া
দিলেন। গৃহিণী একটু হাসিতে হাসিতে কনকলতাকে সম্ভাষণ
করিয়া তাহার পর চপলাকে বলিলেন,-আমার বড় মাথা ধরেছে
তুই একবার সত্যেনের খাওয়ার কাছে বসগে। একে আজকে তার
মন খারাপ।
চপল মুখ নামিয়ে বলিল,-আমি পাব্বোনা,তুমি যাও।
গৃহিণী কন্যাকে অনেকবার বলিলেন, কিন্তু কন্যা সম্মত
হইল না দেখিয়া চলিয়া গেলেন। দুই একটা কথাবার্তার পর
কনকও প্রস্থান করিল। চপলা হারমােনিয়ম লইয়া বসিল।
তখন রাজি নয়টা বাজিয়াছে। আকাশ ঘন মেঘাচ্ছন্ন।
?
ফ-প্রদীপ।
পৃথিবী স্থির যেন একটা মহাপ্রলয়ের অপেক্ষা করিতেছে।
বাতাসে একটী পাতাও কাঁপিতেছে না। একটা সামান্য শব্দ ও
পৃথিবীর সেই গাম্ভীৰ্য্য নষ্ট করিতে সাহসী নয়।
এই গভীর নিস্তব্ধতার মধ্যে চপলা হারমােনিয়মের স্বরে
গল। মিশাইয়া গান ধরিল,
“আমার কঠোর প্রাণ আমারে দলিতে চায়।
আমারি রচিত ছবি ছলে মােরে ছলনায়।”
উঠিয়া নামিয়া কাপিয়া কাপিয়া, চপলার কণ্ঠস্বর ছুটিল। সেই
কণ্ঠস্বরে নিম্পদ পবন জাগিয়া উঠিয়া ধীরে ধীরে সেই স্বরলহরীকে
তুলিয়া তুলিয়া নামাইয়া নামাইয়া বহিতে লাগিল। হারমােনিয়মের
উপর চপলার নব প্রস্ফুটিত চম্পক-পুষ্পেরসত অঙ্গুলিগুলি নাচিতে
লাগিল। চপলা কণ্ঠস্বর আরও একটু ইচ্চে তুলিয়া গাহিল ;-
“আমারি রােপিত লতা ধরেছে কণ্টক ফুল,
আমারি আনিতা নদী উথলিয়া উঠে কুল,
ছুটেছে আকুল মােহ হৃদয়ের তুলনায়।
আমার তরণী লয়ে চলেছে অকূলে বয়ে,
আমারে ধরিতে গিয়ে ভাসায়েছি আপনায়,
আমারি আশার ডােরে বেঁধেছি আমারি পায়।”
এই সময় বিষন্নমুখে সত্যেন্দ্রনাথ সেই গৃহে প্রবেশ করিলেন।
সত্যেন্দ্র অবিয়াছিল আজ সে নিশ্চয় চপলার নিকট সহানুভূতি
পাইবে। চপলা বালিক। তাই সে এতদিন তাহার সহিত ভাল
করিয়া কথা কহিত না আজ এই মনােকষ্টের দিনে চপল।
তাহাকে সান্ত্বনা দিবে। তাই সে চপলার সম্মুখে দাঁড়াইয়া
তাহার মুখপানে চাহিল।
পঞ্চ-প্রদীপ।
সত্যেন্দ্র আশ্চর্য্য হইল সে মুখে বিষাদের চিহ্নমাত্রও নাই
সহানুভূতির রেখা পর্যন্তও সে মুখে প্রকাশ পায় নাই।
বুঝিল চপলা তাহার দুঃখের অংশ গ্রহণ করে নাই। তাহার
বড় দুঃখ হইল। সে একদৃষ্টে চপলার মুখপানে চাহিয়া রহিল।
চপলার গান এখনও থামে নাই সে গাহিতে ছিল।
আমার কঠোয় প্রাণ আমারে দলিতে চায়।
আমারি রচিত ছবি ছলে মােরে ছলনায়।”
গান থামিল। হারমােনিয়মের সুর ধীরে ধীরে বাতাসে
বিলীন হইয়া গেল। চপলা উঠিয়া একটা পান মুখে দিয়া শয়ন
করিল।
সত্যেন্দ্র চপলার পাশে বসিয়া ডাকিল-চপলা।
চপলা বিরক্তিসূচক স্বরে বলিল,-“আঃ!
অামার ধুঃ
পেয়েছে।”
সত্যেন্দ্র এই উত্তরে সন্তুষ্ট হইল না; সে বলিল
তােমার রােজই পায় আর ঘুমের অভাবে। তো বড় দেখিনা-একটা
কথা জিজ্ঞাসা করবো।
চপলা বলিল—‘কি।
এই একটা মাত্র ক্ষুদ্র কথা শুনিয়া সত্যেন্দ্রর বুকে বিদ্যুৎ
চুটিয়া গেল। মুহূর্তের জন্য সে সমস্ত দুঃখ ভুলিয়া গেল। সত্যেন্দ্র
জিজ্ঞাসা করিল, “আমি ফেল হয়েছি বলে তুমি কি দুঃখিত হয়েছ ?”
চপলা,-কথা কহিল না।
সত্যেন্দ্র,বলিল পাশ ফেল তো আর আমার নিজের হাত
নয়। যা কপালে ছিল হয়েছে।”
চপলা একটু ‘মহাজনী’ সরে উত্তর করিল পাশ ফেল আবার
সে বলিল ঘুমাতে
পঞ্চ-প্রদীপ।
৫৯
কপাল কি ? পড়লে পাশ হতে, ভাল করিয়া পড় নাই-তাই
দেল হইয়াছ।”
ক্ষত স্থানে সামান্য আঘাত লাগিলে অস্থির হইতে হয়।
কথাটা সত্যেন্দ্রর বুকে বড় বাজিল। তবু সে বলিল আবার
পড়িব?”
চপলা,-তােমার ইচ্ছা।
সত্যেন্দ্র,-তুমি কি বল ?
চপলা,-আমার আর বলা বলি কি ? পড়তে তোমার আর
কষ্ট কি ? বাবাকে টাকা দিতে হয় তঁারই কষ্ট।
সত্যেরে মুখ আরও গম্ভীর হইল। সে বলিল চপলা’
তােমার যদি আমার সঙ্গে বিবাহ না হইত তাহা হইলে বােধ
হয় তুমি সুখী থাকিতে।”
চপল,-কথা কহিল না।
সত্যেন্দ্র,-বলিল ‘আমিও তোমাকে বিবাহ করিবার জন্য
কাহারো পায়ে ধরিয়া সাধি নাই। অন্যত্রে বিবাহ হইলে বােধ
হয় আমিও সুখী হইতাম।
হইতাম। চপলা এবার উঠিয়া বসিল, সে
বলিল কে তােমার পায়ে ধরিয়া সাপিয়াছিল, সত্যেন্দ্র পুনরায়
বলিল ;-আমি কালই বাড়ী যাইব।
চপল,-যাওনা কেউতো তোমাকে ধরে বসে নাই।
সত্যেন্দ্র,-না কেউ বসে নাই সে কথা সত্য, কিন্তু চপ।
তোমার নিকট ভালবাসা না পেলেও আমি তোমাকে এত ভালবেসে
ফেলেছি যে তােমায় ছেড়ে আমি কোথাও স্থির থাকতে পারি না।
তাই তােমার নিকট এত লাঞ্ছিত হইয়াও এখানে আছি।
চপলা বলিল, পাকবে না তো যাবে কোথা?
কৰে।
পঞ্চ-প্রদীপ।
কুক্ষণে কথাটা তাহার মুখ হইতে বাহির হইল সন্দেহ নাই।
আকাশে কড় কড় শব্দে মেঘ ডাকিয়া উঠিল সেই শব্দে পৃথিবী
চমকিয়া উঠিল। সভয়ে বিদ্যুৎ ছুটিয়া গিয়া মেঘের কোলে
লুকাইল।
চপলা সম্মুখে চাহিল দেখিল সত্যেন্দ্র নাই। কথাটা বলিয়া
তাহার মনে হইল বড় খারাপ কথা বলিয়াছি। সে গৃহমধ্যে
এদিক ওদিক দেখিল তাহার পর বাহিরে আসিয়া চারিদিকে চাহিল
তাহার মনে হইল, যেন অন্ধকার তাহাকে গ্রাস করিতে
আসিতেছে।
কিছুক্ষণ পরে সে শুইয়া পড়িল কিন্তু নিদ্রা হইল না।
প্রভাতে হরেন্দ্র বাবু সন্ত শুনিয়া সত্যের সন্ধানে অনেক
লোক পাঠাইলেন। কলিকাতার বাসাতেও লোক ছুটিল কিন্তু
কেহই সত্যেরে সংবাদ দিতে পারিল না।. চপলা শুনিতে
পাইল সত্যেন্ত্রের কোন সংবাদ পাওয়া যায় নাই। পিতামাতা,
কর্তৃক তিরস্কৃত হইয়া সে দিন আর হারয়ােনিয়াম বাজাইল না।
একবার লে প্রস্তুত করিতে গেল কিন্তু তাহাতে ভুল হইতেছে
দেখিয়া রাখিয়া দিল। তাহার পর পুস্তক লইয়া বসিল। কিন্তু
পুস্তকও ক্রমশঃ ভারি হইয়া হাত হইতে পড়িয়া গেল পুস্তক
বইতে দৃষ্টি উকে উঠিল। চন্দ্র দেখিল, তারা দেখিল, অসীম
অনন্ত আকাশ দেখিল, কিন্তু কিছুতেই তৃপ্তি হইল না।
শয্যায় শুইয়া উপাধানে মুখমণ্ডল রক্ষা করিয়া ভাবিতে লাগিল।
অভাবে না পড়িলে মানুষ জিনিসের মূল্য বুঝিতে পারে না
এই দুঃখ।
প-প্রদীপ।
৪
চপলার নিকট উপেক্ষিত হইয়। সত্যেন্দ্র সেই গভীর অন্ধকার
ভেদ করিয়া চলিল। তাহার নগ্ন পদ, অনাবৃত মস্তক তথাপি
শান্তি নাই এক মাইল দুই মাইল করিয়া সেই রাত্রিতে সে পঞ্চদশ
মাইল পথ অতিক্রম করিল।
তাহার পর রাত্রি প্রভাত হইল। কোথায় যাইবে কিছু
স্থির করিতে পারিল না তাহার নিকটে ৫টি টাকা ছিল সেই
অর্থ সাহায্যে বারাণসীতে আসিয়া উপস্থিত হইল।
সেই সামান্য অর্থে কিছুদিন চলিল। তাহার পর ভিক্ষা না
করিলে আর দিন চলে না। অনশনে অর্ধাশনে দিন কাটি।
শেষে তাহার শরীরে আর এত কষ্ট সহ হইল না। হঠাৎ
তাহার অসুখ হইয়া পড়িল।
এই কালীবাসের সময় তাহার একটা বন্ধু মিলিয়াছিল তাহার
নাম নবীনচজ। নবীন বিমাতার কর্কশ ব্যবহারে উৎপীড়িত
হইয়া সন্ন্যাস অবলম্বন করিয়াছিল। এখন এই রুশয্যায় নবীনই
সত্যেয়ের একমাত্র সহায়। সে সর্বদা সত্যেন্দ্রর কাছে অহায়
সেবা কহি।
সত্যেরে অর ক্রমশঃ বাড়িতে লাগিল। একদিন
নবীনকে বলিল একটু কাগজ আর দুয়াত কলম ও আমি
একখানি পর লিখিব।
নবীন-কাগজ প্রভৃতি দিলে পর সত্যেন্দ্র পত্র লিখিতে আরম্ভ
করিল। কত লিখিল কত কাটিল, চক্ষের জলে কত অক্ষর লিঙ্ক
গেল, পরে পত্ৰ শেষ করিয়া শিয়ােনা লিখিয়া নবীনকে ডাকঘরে
প্রখানি দিয় আপিত যদিল। নবীনচন্দ্র বন্ধুর পত্র লইয়া চলিল।
পঞ্চ-প্রদীপ।
তখন ভাদ্র মাস। সেদিন গঙ্গার ‘ধা ছাষাড়ী বাণ ডাকিবার
দিন। গঙ্গার ধারে পথের লােকের জনতা ভেদ করিয়া যাইতে
নবীনের বিলম্ব হইল। ডাকঘর হইতে ফিরিবার সময় দেখিল
তখন বাণ আসিয়া পড়িয়াছে। দুই কূল ছাপাইয়া জল
ছুটিয়াছে। কতকর আসিয়া সম্মুখ পানে চাহিয়া সহসা নবীন
বজ্রাহতের মত দাড়াইয়া গেল। একি ? কোথায় তাহাদের
কুটীর ? কোথায় তাহার রুগ্নশয্যাশায়িত বন্ধু সত্যেন্দ্র।
গঙ্গার জলে সেইস্থান পরিপূর্ণ হইয়াছে। আপনার বিপদের
আশঙ্কা না করিয়া সে ভরা গঙ্গায় লাফ দিল। কুটীরের নিকটে
গিয়া অনেক খুঙ্গিল কিন্তু বন্ধু মিলিল না।
৫
স্বামী পরিত্যক্তা পিতামাতা কর্তৃক তিরস্কৃত। চপলা, একদিন
দুইদিন করিয়া দুইমাস কাটাইল। এখন সে বুঝিয়াছে স্ত্রীলােকের
সংসারে স্বামীই অবলম্বন। পিতামাতা শৈশবের সহায় ; যৌবনের
অবলম্বন স্বামী। এখনো চপলা পিতামাতার একমাত্র আদরিণী
এখনাে তাহারা তাহাকে সেইরূপই স্নেহ করেন, তবু কেন
যে মাঝে মাঝে সত্যেন্দ্রর কথা লইয়া তাহাকে তিরস্কার করেন,
আবার তাহার ছল ছল চক্ষু দেখিয়া মুখ ফিরাইয়া কাৰ্যান্তরে
চলিয়া যাম।
চপলার এখনো পূর্বের সবই আছে তবু যেন কিছুই নাই।
তাহার আর সাজসজ্জা নাই, সেই
সেই কোকিলাঞ্ছিত কণ্ঠস্বর
স্বরবিহীন, মিষ্টকণ্ঠ থাকিলেও এখন তাহা আর তেমন মধুর
রাগী আলাপ করিতে পারে না। কিম্বা রাগিণী খেলিলেও
তাহা তত মিষ্ট লাগে না। সে এখনও দুই একবার গান গাহিতে
পঞ্চ-প্রদীপ।
১৩
......
যায় কিন্তু গান মনে হয় তো সুর হয় না, আবার শুরু হয়।
গান ভুলিয়া যায়। অসমাপ্ত কার্পেট আসনখানি মাটিতে গড়াগড়ি
যাইতেছে, কুণ, কাটা, উল, লেস প্রভৃতি কোথায় কি আছে
তাহার ঠিক নাই। দুই একখানা পুস্তক এদিক ওদিক পড়িয়া
আছে, কিন্তু যত্ন না পাওয়ায় তাহাতে উই ধরিয়াছে।
চপলা এখনাে তেমি সুন্দরী কিন্তু তাহার যেন আর সে
উজ্জ্বলতা নাই, কেশদাম তেমি তরঙ্গায়, কিন্তু বিন্যাসের অভাবে
যেন রুন্ম হইয়া পড়িয়াছে। মুখমণ্ডল তেমি সুন্দর কিন্তু তাহাতে
হাসি নাই। নয়নদ্বয় তেম্নি উজ্জ্বল কিন্তু তাহাতে যেন একটা
উদাস-নিষ্প্রভ দৃষ্টি বাহির হইতেছে ।
ভাদ্রমাসের মেঘের পানে চাহিয়া চপলা কি ভাবিতেছিল।
এমন সময় দাসী আসিয়া তাহার হাতে একখানি পত্র দিল।
পত্র পাইয়া চপ এমন করে কেন ? তাহার হাত কঁপে কেন ?
চক্ষুদ্বয় আপনাপনি মুদিত হইয়া আসে কেন ? ঘন ঘন দীর্ঘশ্বাস
পড়ে কেন? পত্রখানি হাতে করিয়া সে বসিয়া পড়িল ইহারই,
বা কারণ কি ?
পত্রখানি খুলিয়া চপলা পড়িতে লাগিল।
বারাণসী ।
“চপলা! অনেকদিনের পর আজ আবার তোমাকে পত্র
দিলাম। ইচ্ছা হয় পড়িও নহিলে পােড়াইয়া ফেলিও।
এখন আমি বারাণসীধামে বিশ্বেশ্বরের চরণাশ্রিত। এখন
ভক্ষা আমার জীবিকা, তরুতল আমার বাসভূমি, তবুও একবার
তামাকে দেখিতে ইচ্ছা হয়। পূর্বে ও ইচ্ছা হইত, কিন্তু আজ
সই ইচ্ছ। বড় বলবী। তাহার কারণ আজ আমি রুশয্যায়
পঞ্চ-প্রদীপ।
» «
শায়িত।
যায় ?
এখানে একটা বন্ধু পাইয়াছি, তিনি দিবারাত্রি আমার
শয্যাপার্শ্বে বসিয়া আছেন, তঁাহার জন্য কোন কষ্ট পাই নাই।
তবুও তােমাকে দেখিতে ইচ্ছা হয় কেন ? অনেকবার সেই
ইচ্ছা দমন করিবার চেষ্টা করিয়াছি, কিন্তু বৃতি বেগবতী উচ্ছাসময়ী
নদীর মত আমার সমস্ত চেষ্টাকে ভাঙ্গিয়া চুরিয়া কোথায় লইয়া
আমি অবসন্ন-প্রাণে আকাশ পানে চাহিয়া দীর্ঘশ্বাস
ফেলি। আমি আজ বড় দুর্বল। বাঁচিবার আশা নাই, আর
সাধও নাই। যাহার সব ফুরাইয়াছে, তাহার আর বাঁচিবার
সাধ কেন ?
যদি বাচি একবার তােমাকে দেখিয়া আসিব কিন্তু
টুর হইতে, কি জানি যদি আমাকে দেখিলে তােমার কষ্ট হয়?
যদি বঁচি, আবার পত্র দিৰ, নহিলে এই শেষ। চপলা বিদায়
আজ আসি ইতি—
হতভাগ্যপত্যে।”
পত্রখানি পড়িয়া বালিকার বুক ভাঙ্গিয়া গেল। সে পত্রখানি
বুকে রাখিয়া উপাধানে মুখ গু’জিয়া কাদিতে লাগিল।
ক্রমে রাত্রি হইল। গৃহিণী কক্ষমধ্যে আসিয়া দেখিলেন,
চপলা মুখ গুজিয়া আছে। তিনি তাড়াতাড়ি কন্যাকে ফেলে
লইয়া দেখিলেন, চক্ষের জলে তাহার বক্ষস্থল ভাসিয়া গিয়াছে।
জননীকে দেখিয়া চপলা স্বামীর পত্রখানি লুকাইর চেষ্টা
কলি। কিন্তু পারিল না। তিনি পত্রখানি দেখিয়া বুঝিলেন,
সত্যেন্দ্র এই পত্র লিখিয়াছে। তিনি তৎক্ষণাৎ সত্যেরে ঠিকানা
নিয়া হরেন্দ্রবাবুকে বলিলেন।
হরেন্দ্রবাবু সেই রাত্রেই কাশী যাত্ৰা করিলেন। তথায় গিয়া
বহু কষ্টে নবীনচন্দ্রকে খুঁজিয়া বাহির করিকেন কিন্তু ইহাতে
শুনিল। . পঞ্চপ্রদীপ। ৬৫ 1 তাহার সব আশার শেষ হইল। তিনি শুনিলেন, সত্যেন্দ্র গঙ্গায় ভাসিয়া গিয়াছে। চপলা ও. এ কথা পঞ্চদশবর্ষীয়া মীনা যুবতী প্রায়শ্চিত্তর জন্য কঠোর ব্রহ্মচর্য অবলম্বন করিল। গঙ্গার বাণে রুঃ সত্যেন্দ্র ভাসিয়া গেল সে সন্তরণ পটু ছিল কিত অনেকদিনের উপবাসে তাহার শরীর অবসন্ন হইয়াছিল বলিয়। প্রবল তরঙ্গের সহিত যুদ্ধ করিতে পারি না। স্রোতের উপর দিয়া ভানিয়া যাইতে লাগিল। নদীর উপর এক খানি নৌকা ভাসিতে ছিল, আরােহীগণ উ সাবিনী নদীর উপর সত্যেন্দ্রকে দেখিয়া, তীরবেগে নৌকা আনিয়া তাহাকে তুলিয়া লইল। তখন তাহার আর কো। সংজ্ঞা ছিল মা। যখন চৈতন্য হইল, সত্যেন্দ্র দেখিল—একটি অপরিচিত কক্ষে সে এক টি শয্যায় শায়িত। তাহার চারিদিকে অপরিচিত জনাকয়েক লোক বসিয়া আছে। ক্রমে সে জানিতে পারি, এক ধনী ব্যক্তি, নোকরােহণ করিয়া যাইতেছিলেন, নদীবক্ষ হইতে তিনিই তাহাকে রক্ষা করিয়াছেন। কিছুদিন তথায় থাকিয়া সত্যেন্দ্র তাহার জীবনদাতার অনুমতি লইয়া তথা হইতে পুনরায় যাত্রা করিল। আজ বিজয়া দশমী । পিতামাতাকে ভেজন করাইয়া যোগিনী চপল একাকিনী নিজ শয়ন গৃহ প্র:বশ করি। বাতায়ন-পথ উন্মুক্ত করিয় যে পথে সত্যে দ মিয়া, সেই পথ- পানে চাহিঙ্গা রহিল। কত কল্পনা অবিল, কত ভাগি গেল
পঞ্চ-প্রদীপ।
বালিকা কত কদিন, তাহৰ পৰু সন্তাপহারিণী নিদ্রার কোলে
আশ্রয় লাভ করিল।
নিদ্রাবেশে যে স্বপ্ন দেখিল সে যেন কাশী গিয়াছে। তথায়
জাহ্নবী-কূলে এক বটবৃক্ষমূলে দেখিল, এক সন্ন্যাসী। বালিকা
তাহাকে দেখিবামাত্র চিনিতে পারিল সে সত্যেক। অপরাধিনীর
মত চপল তাহার পদদ্বয় ধরিতে গেল। চপলাকে দেখিবামাত্র
সত্যেন্দ্রও যেন ছুটিয়া পলাইতে লাগিল। চপলাও কঁাদিতে
কাদিতে ছুটিল। অনেকদূর পিয়া একটি ছােট নদী দেখিতে
পাইল। সত্যে এক লাফে নদী পার হইয়া গেল, চপল।
পারিল না। তখন সে কান্দিতে লাগিল। সে চীৎকার করিয়া
বলিয়া উঠিল,-আমায় দয়া কর, কখনাে কোন অপরাধ করিব না।
সহসা কাহার কণ্ঠস্বরে তাহার নিদ্রাভঙ্গ হইল। সে দেখিল,
কে তাহাকে কোলে করিয়া বসিয়া আছে।
সেই অন্ধকারে
পলার নয়নের জ্যোতি ভাসিয়া উঠিল দেখিল,-সে সত্যেন্দ্রনাথ।
সত্যে বলিল,-চপআমায় ক্ষমা কর।
বালিকার মুখে কথা সরিল না। তাহার অবশ মস্তক
পকেন্দ্রের বুকের উপর পড়িল,
সে জড়িতস্বরে বলিল,-
আমায় ক্ষমা।”
বালিকার, চক্ষে তখন অবিরল ধারে অ বহিয়া সত্যেন্ত্রের
বহুল সিক্ত করিতেছিল। সত্যেন্দ্র ধীরে ধীরে তাহার চক্ষুর জল
মুছাইয়া দিয়া ডাকিল,-চপলা ! আমার চপলা। চপলা কিছুই
উত্তর দিতে পারিল না, কেবল অশপূর্ণ চক্ষে সত্যেন্দ্রর মুখপানে
চাহিয়া রহিল।
পথিক।
সন্ধাকাল। বৈশাখের তপ্ত সূৰ্য্য পশ্চিমদিগন্তে ডুবিয়া
গিয়াছে। সন্ধ্যার ধূসর ছায়া আসিয়া রক্ত-কলােজ্জল নদী সৈকত
ও উপত্যকাকে আবৃত করিয়া ফেলিল। আমি পথ অতিক্রম
লাগিলাম । সন্ধার পূর্ব হইতেই হাস্যবিকসিত মুখে চিন্তার
ছায়ার মত দুই এক খণ্ড মেঘ নীল আকাশের কোলে খেলিয়া
বেইতেছিল। রজনীর গভীরতার সঙ্গে সঙ্গে মেঘ ও ক্রমশঃ
ঘনতর হইয়া আসিতে লাগিল। সম্মুখে রাত্রি, মাথার উপর
মেঘ দেখিয়া পথিকের কিরূপ ভয় হয়, তাহা সহজেই অনুমেয়।
আমার গন্তব্য স্থান এখনও অনেক দুর। মধ্যে আশ্রয় পাইবার
স্থান ছিল না। পশ্চাতে একটা ক্ষুদ্র নদী, ফিরিয়া যাইবার ও
উপায় নাই। পার্শ্ববর্তী জঙ্গল মধ্যে হিংস্র জন্তুর আশঙ্কা আছে ।
সুতরাং সেই স্থানেও থাকিতে পারিলাম না। অগত্যা আমায়
পথ চলিতে হইল।
এইরূপে প্রায়
এক ঘণ্টা আসিলাম।
আকাশের পানে
চাহিতে সাহস হইল না। এমন সময় সে। সে শব্দে বায়ু বহিল।
পবনের আকস্মিক গর্জনে চকিত হইয়া আকাশপানে চাহিলাম।
কি ভয়ানক, মেঘ যেন মাটিতে আসিয়া পড়িতেছে। শােণিত
লােলুপা অসির মত তাহার মাঝে বিদ্যুত চমকিতেছে। আকাশে
পঞ্চ-প্রদীপ। . চন্দ্র নাই। নক্ষত্রসমূহ যেন ভয়ে লুকাইয়া পড়িয়াছে। সমস্ত জগৎ ঘন অন্ধকারাচ্ছন্ন। সম্মুখে, পশ্চাতে, পার্শ্বে, উদ্ধে, নিয়ে কোথাও কিছু দেখিতে পাওয়া যায় না। উপত্যকায় বৃক্ষসমূহ, আকাশভেদী শৈলগালা সকল কেই যেন সর্ব গ্রাসিনী নিশা গ্রাস করিয়াছে। বাতাসের সহিত যুদ্ধ করিতে করিতে ছুটিতেছি, এমন সময় আমার পায়ে একটা আঘাত লাগিল। আমি পড়িয়া গেলাম। সেই মুহূর্তে কি হৎ চমকিল, দেখিলাম একটা নর মূর্তি। তাহাকে দেখিবামাত্র “ঠাককুমার সেই পুরাতন ভূতের গল্প মনে পড়িয়া গেল। সভয়ে রাম রাম’ বলিয়া আমি দৌড়িবার উপক্রম করিলাম। এমন সময় ক্ষীণ কণ্ঠে উচ্চারিত হইল “মা গাে”। তাহার সেই দীর্ঘশ্বাস কম্পিত কাতর আর্তনাদ কাণে বাজিব। মাত্র আমি দাড়াইলাম। এক কার পশ্চাতে চাহিলাম তখন অার বোধ হয় আমার ভূরে ভয় ছিল না। আমি ভাবিলাম বাস্তবিক যদি এ মানুষ হয়। এই দুর্যোগে এ ঝক্কায় মুচ্ছিত হইয়া পড়িয়া আছে কেন? আমি আর স্থির থাকিতে পারিলাম না, তাহার নিকটে সিয়া দাঁড়াইলাম। দেখিলান,-একটা নর- মূৰ্তি একটা ঝোপের পার্শ্বে পড়িয়া আছে। তাহাকে দেখি। ডাকিলাম-কে তুমি? অামার কথায় সে তাড়াতাড়ি উঠিয়া বসিয়া জিজ্ঞাসা করিল, কে তুমি? তাহার কথায় ও ভাবে বুঝি নাম, লােকটাও আমার মত ভয় পাইয়াছে। অন্ধকার মরণের সম্মুখে ঈমদা- লোকিত জীবনের শেষ সীমায় যে দণ্ডায়মান, কিম্বা যাতনায় উৎপীড়িত হইয়া যে দিবারাত্রি মৃত্যুর কামনা করিতেছে, সেও ত্যুকে ভয় কর্মে।
পঞ্চ-প্রদীপ।
৬৯
আমি বলিলাম, আমি মানুষ। তুমি এমন করিয়া পড়িয়া
কেন ?
সে কঁদিতে কাদিতে বলিল,-আমার পা ভাঙ্গিয়া গিয়াছে।
এমন সময় ঝটিকা-আলােড়িত বৃক্ষপত্রের মধ্য দিয়া আলােক
রশ্মি দেখা গেল। ভাবিলাম নিকটে গ্রাম আছে।
তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলাম,তুমি আমার কাধে ভর দিয়া
যাইতে পারিবে ?
সে বলিল,-যদি অনুগ্রহ কয়েন চেষ্টা কষিয়া দেখি ।
সে আমার স্কন্ধে ভর দিয়া দাড়াইবার চেষ্টা করিল। মৃত্তিক
হইতে প্রায় একহস্তপরিমিত উচ্চে উঠিয়া আবার পড়িয়া গেল।
তাহার কাতর ক্রন্দনে আমার বড় দয়া হইল। আমি
বলিলাম,-উপায় ?
সে দৃঢ়ভাবে বলিল,-উপায় আছে, তাই ! দয়া করিয়া করিবে
কি ? এই বলিয়া সে আমার পা জড়াইয়া ধরিল।
আমি তাহার হাত সরাইয়া বলিলাম,-বলনা ভাই,
বিপদে তুমি আমার বন্ধু, আমিও তােমার বন্ধু। বল, আমায় কি
করিতে হইবে ?
সে অকম্পিতকণ্ঠে বলিল,-“তোমার হাতে লাঠি আন্থে।
আমার মাথায় মার। বিধাতার অনেক মার খাইয়াছি, কিন্তু এ
প্রাণ বাহির হয় নাই। সংসারের আঘাত অনেক সহ্য করিয়াছি,
তবুও বুক ফাটে নাই।
কিন্তু যদি এই শ্রান্ত ক্লান্ত মৃতকল্প
অবস্থায় মৃত্যু সম্ভব হয় আমায় মারিয়া ফেল।” .
সে আমার পায়ে ধরিয়া আবার বলিল,-মার ভাই আঘাতে
আমার মাথা চূর্ণ হয়। এই ঝটিকা তাড়নে দূরে মিশিয়া যাক।
৭। পঞ্চ-প্রদীপ। * •...\ ....\ AAAAAA পৃথিবীতে কেহ আমার জন্য কাঁদিবে না, আমার মৃত্যুতে সংসারের কোন ক্ষতি নাই। আমি স্তম্ভিত হইয়া রহিলাম। মাথার উপর সে। সে শব্দে ঝটিকা গর্জন করিতেছিল। দূরে আকাশ-কোলে ঘন কৃষ্ণ কাদম্বিনী বিশ্বাসী কড় কড় নাদে উপত্যকা কম্পিত হইতেছিল। সে আবার বলিল - এস ভাই তােমার অনন্ত পুণ্য হইবে। নরহত্যা মহাপাপ বটে, কিন্তু আমার মত হতভাগ্যকে হত্যা করার পাপ নাই। আমার যাতনার অবসান কর। অামার অজ্ঞাতসারে জানি না কখন দুই বিন্দু অশ্রু আমার নয়নে ঝরিয়াছিল। তাহাকে আর কিছু বলিবার অবসর দিলাম না। কোন আপত্তি না শুনিয়া তাহাকে কোলে তুলিয়া লইয়া সেই অন্ধকারে ঝটিকার সহিত যুদ্ধ করিতে করিতে এক আলােক লক্ষ্য করিয়া চলিলাম। এইরূপে প্রায় ১৫ মিনিট আসিবার পর বিদ্যুতের আলােকে দেখিলাম, সম্মুখে একটা প্রকাণ্ড নদী। ভাবিলাম—সর্বনাশ কি হইবে? এই আলােক কোথা হইতে আসিল ? নদীবক্ষে বিদ্যুতের প্রতিবিম্ব দেখিয়া আলােক মনে করিয়াছিলাম। মরীচিকা কখনও দেখিনাই। পুস্তকে পড়িয়াছি--সৌরকর- ঝলসিত বারিবিহীন মরুক্ষেত্রে মরীচিকা দেখা যায়। আমি কি গভীর অন্ধকারে নদীবক্ষে আলােক-মরীচিকা দেখিলাম । সেই নদীতীরে দাড়াইয়া আছি, এমন সময় পার্শ্বে আর একটা আলোক দেখা গেল। আর মনে হইল কে যেন দূরে গম্ভীর কণ্ঠে মল্লার রাগিণীতে একটা গান গাহিতেছে। আপনারা কি কেহ কখনও এইরূপ অন্ধকারে একটু আশ্রয়ের জন্য লালায়িত হইয়াছেন। কখনও কি নীলক্ষে বিদ্যুৎদীপ্তি - তবে কি
পঞ্চ-প্রদীপ।
৭১
. * * * * * *
দেখিয়া আলোকত্ৰমে তথায় উপস্থিত হইয়া আশভ্রষ্ট হইয়াছেন ?
পরে আবার সেই নির্জনে, সেই গন্তীরনদী নদীকূলে মনুষ্যের
কণ্ঠ শুনিয়াছেন ? যদি এই অবস্থায় কেহ কখনও পড়িয়া
থাকেন, তাহা হইলে বুঝিবেন, তখন আমার মনের ভাব কি
হইয়াছিল। আমার মনের ভাব আমি বুঝাইতে পারিলাম না।
তখন আমি ভয়ে, হতাশে, উদ্বেগে, বিস্ময়ে, আশায় ও আহাদে
অধীর হইয়াছিলাম ।
আমি তাহাকে পৃষ্ঠে করিয়া সেই নদীর ধারে ধারে চলিতে
লাগিলাম। নদীর তথন কি ভয়ঙ্করী মূর্তি ! উহা যেন সজীব
হইয়া উঠিয়াছে। আমাদিগকে ধরিয়া উদর পূরণ করিবার জন্য
তাণ্ডব নৃত্য করিতে করিতে মাঝে মাঝে লােলুপ তরঙ্গ বিস্তার
করিতেছিল।
আমার ভয় হইল। আরও দূর দিয়া যাইতে
লাগিলাম।
সঙ্গীত ক্ৰমশঃ স্পষ্ট হইয়া আসিতেছিল। আমি অনেক গান
শুনিয়াছি। কিন্তু এত সুন্দর হৃদয়প্লাবিনী রাগিণী কখনও শুনি
নাই। সমস্ত বনভূমি মুখরিত করিয়া নদীসৈকতের উপর দিয়া
দূর পরপারে তাহার প্রতিধ্বনি বাজিতে ছিল।
আমরা আলােকের নিকটে আসিলাম। দেখিলাম, একটা
বিস্তৃত শাখাশােভিত তমালবৃক্ষের তলদেশে এক সন্ন্যাসী
অজিনাসনে উপবিষ্ট। হােমালােকে তঁাহার মুখমণ্ডল যেন রক্তবর্ণ।
দীর্ঘ জটাকলাপ পৃষ্ঠে ও স্কন্ধে লম্বিত। তাহার নিকট উপস্থিত
হইবামাত্র আমার কপালকুণ্ডলার কাপালিকের কথা মনে হইম।
গেল। ভয়ে মনে মনে দুর্গা নাম জপ করিতে লাগিলাম।
মুহুর্তের মধ্যে “নবকুমারের সমস্ত জীবন মনে পড়িয়া গেল।
পঞ্চ-প্রদীপ। । যাহা হউক সন্ন্যাসী কাপালিক নহেন বুঝিলাম। তিনি পূজা সমাপ্ত করিয়া আমাদের পরিচয় গ্রহণ পূর্বক নিকটস্থ কুটীরে আশ্রয় দিলেন, এবং আহার করিবার জন্য কতকগুলি চিড়ে, এক হাঁড়ি দুগ্ধ ও কতকটা গুড় দিলেন। চিড়ের উপর কখনও আমার ভক্তি ছিল না, কিন্তু সেদিন দেখিলাম, অভক্তি অপেক্ষা ক্ষুধার শক্তি অধিক। উদর পূরণ করিয়া উভয়ে আহার করিয়া অগ্নির সম্মুখে বসিলাম। পার্শ্বে একখানি কম্বল বিস্তৃত ছিল। শত ভাঙ্গিবার পর উভয়ে সেই কবলে বসিলাম। এতক্ষণ পরে দুইজনে কথাবার্তার সময় পাইলাম। পূর্বে তাহার কাতরােক্তি গুনিয়া তাহার জীবনী নিতে বড় ইচ্ছা হইয়াছিল। আমি জিজ্ঞাসা করিলাম,-ভাই তােমার নাম কি ? সে বলিল,-আমার নাম “পথিক” এইমাত্র জানিও। আমার উদ্বেগ আরও বাড়িল। আমি বলিলাম,যদি তােমার আপত্তি না থাকে, তবে তোমার দুঃখের কথা আমায় বল। তোমার ইতিহাস শুনিতে আমার বড় কৌতুহল হইয়াছে। আপত্তি আর কি তবে ইহার পূর্বে কাহাকেও কখনও জীবনের কথা বলি নাই। এবার বুঝিতেছি দিন নিকট হইয়াছে। বিশেষতঃ তোমার কৌতুহল আমি নিবারণ করিব। শুনিয়া যাও- এই বলিয়া পথিক আরম্ভ করিল, “চব্বিশ পরগণা জেলার এক ক্ষুদ্র পল্লীতে এক সতিপন্ন গৃহস্থের গৃহে আমার জন্ম। , আমার পিতা সেই পল্লীগ্রামের জমীদার। আমার একটি অগ্রজ ভ্রাতা ও দুইটি ভগ্নী আছেন। আমিই আমার পিতামাতার কনিষ্ঠ সন্তান। আমার অঙ্গ লেখাপঢ়া শিক্ষা কনে নাই। সেই ?
পঞ্চ-প্রদীপ।
বাল্যকাল হইতে আমার শিক্ষার ভার পিতার উপর পড়িয়াছিল।
পাঠে আশাতীত উন্নতি দেখিয়া বাবা এবং মা আমায়
ভালবাসিতেন। যখন আমার বয়ক্রম চতুর্দশ বৎসর তখন আমি
প্রথম বিদ্যালয়ে প্রবেশ করি।
। কলিকাতায় আমাদের একখানি বাড়ী আছে, অামাকে পড়াইবার
জন্য বাবা কলিকাতার বাড়ীতে আনিলেন। আমাকে বিদ্যালয়ে
পাঠাইবার জন্য গাড়ীঘোড়া ক্রীত হইল। আমার তত্ত্বাবধানের
নিমিত্ত গৃহশিক্ষক নিযুক্ত হইলেন। ইহার পূর্বে আর আমি
ভাল করিয়া কলিকাতা দেখি নাই। যদিও দুই একবার
আসিয়াছিলাম, গঙ্গার ঘাট আর কালীবাড়ী , তাহাও আবার
যাতায়াতের সময় মেয়েদের সহিত গাড়ীর দরজা জানালা বন্ধ
করিয়া বস্তাবন্দী’র মত যাইতাম আর তথায় উপস্থিত হইয়া
গাড়ীতেই বসিয়া থাকিতাম। এই পর্যন্ত আমার কলিকাতা
সম্বন্ধে জ্ঞান ছিল। চতুর্দশ বৎসর বয়সের সময় সেই সাবধানতার
আবরণ উন্মুক্ত হইল,-আমি ভাল করিয়া এই মহানগরীর দৃশ্য
দেখিলাম। দেখিলাম-উন্নতিশীল ধনীবৃন্দের অগণিত পর্বতপ্রমাণ
সৌধশ্রেণী, বিস্তৃত, রাজপথে কর্মব্যস্ত লোকারণ্য। দেখিলাম
মনুষ্যসমূহ
দিবারাত্রি
ছুটিতেছে। কাহারও পাশে চাহিবার
অবকাশ নাই। এখানে পল্লী গ্রামের জড়তা নাই। এখানকার
লােকে অপরের চর্চায় সময় অতিবাহিত করে না। কেবল কাৰ্য্য,
কাৰ্য্য লইয়াই ব্যস্ত।
ব্যস্ত। সমস্ত নগরীখানি যেন কর্মময়ী। আমার
মনে বড় উৎসাহ হইল। তখন আমার কাৰ্য্য অধ্যয়ন। পাঠে
দ্বিগুণ উদ্যম বাড়িল। বর্ষের শেষে আমি পরীক্ষায় প্রথম স্থান
অধিকার করিলাম। মা ও বাবা আমায় কত আদর করিলেন।
৭৪
পঞ্চ-প্রদীপ।
পিতামাতার স্নেহাশতে অভিষিক্ত হইয়া আমি প্রবেশিকা পরীক্ষার
জন্য প্রস্তুত হইতে লাগিলাম।
একে একে দিন কাটিতে লাগিল। পরীক্ষার সময় নিকটে
আসিল। আমি পরীক্ষা দিলাম।
এই বলিয়া পথিক দীর্ঘনিশ্বাস ছাড়িল। তাহার মুখপানে
চাহিলাম। তাহার চক্ষুদ্বয় অশ্রুসিক্ত।
পথিক বলিল,-“সুরো দিন শেষ হইল, শুন এবার আমার
দুঃখের কাহিনী।”
আমি বলিলাম, “পূৰ্ব কথা স্মরণে যদি কষ্ট বোধ হয় তবে
অাজ আর না, অন্য দিন শুনিব।”
সে আমার কথা শুনিয়া একটু হাসিল। তাহার সেই হাসি
দেখিয়া আমি শিহরিয়া উঠিলাম। এ কি হাসি ?-এ হাসি
জাগ্নেয়গিরির অগ্নি উদগমের পূর্বে তাহার সূক্ষ্মশৃঙ্গের ক্ষণেক
প্রজ্জ্বলনের মত ভীষণ, কাদম্বিনীর কড়মড় নিনাদের পূর্বে বিদ্যুৎ
চমকের মত তীব্র, স্তব্ধ জগতের ভীষণ নিস্তব্ধতার মধ্যে বিশ্বয়কারী
অগ্নির আকস্মিক বিকাশের পূর্বে ধূম উদগীরণের মত ভয়ানক।
সে আমার মুখপানে চাহিয়া বলিল,--যে দুর্ঘটনা বুক পাতিয়া সহ
করিয়াছি, তাহা আবৃত্তি করিতে এ বুক ফাটিবে না। কিন্তু
পূথিবীর মত ক্ষমাশীল হও, নহিলে আমার গলা টিপিয়া মারিয়া
ফেলিবে, পৰ্ব্বতের মত কঠিন হও, নহিলে আমার কথায় তােমার
বুক ফাটিয়া যাইবে, আকাশের মত উদার হও, নহিলে ঘৃণায় মুখ
ফিরাইয়া লইবে।
আমার আর কথা কহিবার সাহস হইল না। সম্মুখে ভূহু
শব্দে অগ্নি জলিতে ছিল, বাহিরে কড় কড়নাদে মেঘগর্জন
পঞ্চ-প্রদীপ।
নাই।
করিতেছিল। কুটীর মধ্যে আমরা দুইজন ব্যতীত আর কেই
ছিল না।
সে বলিল!-
“পরীক্ষায় পর দীর্ঘ অবকাশের মধ্যে পড়াশুনা করিবার
কিছু ছিল না। একদিন জনকয়েক বন্ধু মিলিয়া থিয়েটার দেখিতে
যাইলাম। তাহার পূর্বে আর আমি কখনো থিয়েটার দেখি
এক গায়িকার একটি সঙ্গীতে আমি মুগ্ধ হইলাম।
অতিনয় সমাপ্ত হইলে সকলে বাড়ী আসিলাম। গানটা কিন্তু
আমি ভুলিতে পারিলাম না। সেই মােহিনী ঝঙ্কার যেন সৰ্ব্বদা
আমার কাণে বাজিতেছিল। আবার সেই গান শুনিতে ইচ্ছা
হইল। একটা বন্ধুর নিকট সেই কথা বললাম। সে আমাকে
লইয়া গায়িকার ভবনে গান শুনিতে গেল। তথায় গিয়া দরজা
পা দিয়া আমার বুক কাঁপিতে লাগিল; মাথা ঘুরিতে আরম্ভ হইল,
আমি ঘর্মাক্ত হইয়া গেলাম। আর অগ্রসর হইতে পারিলাম না,
বুকের মধ্যে ইচ্ছা অনিচ্ছার প্রবল দ্বন্দ্ব বাজিল। শেষে গায়িকা
আসিয়া ইচ্ছার পক্ষ সমর্থন করার ইচ্ছারই জয় হইল, গায়িকা আমার
হাতে ধরিয়া লইয়া গিয়া বসাইল। আমি তাহার গান শুনিলাম
ভিজিলাম-মজিলাম—একেবারে ডুবিয়া গেলাম। পিতা মাতার
বহু আশার মূলে কুঠারাঘাত করিলাম আর আমার আপনার
ইহকাল পরকাল নষ্ট করিলাম।
কিছুদিন পরে পরীক্ষার সংবাদ বাহির হইল আমি বৃত্তি পাইয়া
পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইলাম। পিতামাতার আহলাদ আর ধরে না।
তাহারা তখন জানিতেন না যে তাহাদের প্রবঞ্চক পুত্র অধঃপাতে
গিয়াছে। কলেজে প্রবেশ করিলাম। কিন্তু এবার আমায় গাড়ী
৭৩
পঞ্চ-প্রদীপ।
;
•
কলেজের সম্মুখে না দাঁড়াইয়া গায়িকার দ্বারে দাড়াইত। আমি
চারিটা বাজিবার পর কলেজ হইতে বাড়ী ফিরিতাম। মানুষ
মানুষের চক্ষে ধূলা দিতে পারে ; ঈশ্বরের চক্ষে পারে না। সংসর্গ
দোষজনিত একটা ঘৃণিত ব্যারামে আমি আক্রান্ত হইলাম
সকলেই আশ্চর্য্য হইলেন। যাহা হউক বা অল্পদিনের মধ্যে
বুঝিতে পারিলেন, আমি অধঃপাতে গিয়াছি।
কলিকাতার পনের মাইল পূর্বে আমাদের জমীদারী আছে।
সংশােধনের নিমিত্ত বাবা আমাকে ভয় ইয় গেলেন। তিনি
আমার নিকটেই রহিলেন। কিন্তু গত ছয় মাসের মধ্যে
একেবারে অধঃপতনের চরম সীমায় নামিয়া গিয়াছিলাম; আমি
আমার উচ্ছ জ্বল চরিত্রকে সংযত করতে পারিতাম না। তথায়
এক কুলীন ব্রাহ্মণ যুবকের সহিত আমার বন্ধুত্ব হইয়াছিল। সেই
বন্ধুর এক বিবাহিত। অথচ স্বামী পরিত্যক্ত। ষােড়শ বর্ষ বরস্ক।
গী ছিল। আমি তাহার সর্বনাশ করিলাম। আমাদের পাপের
ফলস্বরূপ, তাহার একটি পুত্র হইল। আমি পিশাচ! সেই
সূতিকাগার প্রস্তর সম্মুখে সাত সন্তানকে হত্যা করিলাম।”
পণিকের কণ্ঠস্বর কম্পিত শুনিয়া তাহার পানে চাহিলাম।
তাহার চক্ষুদ্বয় জ্বলিতেছিল। উদ্বেলিত সমুদ্রের হুহুঙ্কারের মত
তাহার দীর্ঘশ্বাস বহিতেছিল, তাহার করদ্বয় তখন দৃঢ়মুষ্টিবদ্ধ।
“বাবা শুনিলেন, আমাকে বাড়ীতে লইয়া গেলেন। স্বভাব
পরিবর্তনের জন্য বিবাহ দিলেন।
দিলেন। কিছুদিনের জন্য আমার
স্বভাব পরিবষ্টিত হইল। আবার আমি পড়িতে আরম্ভ করিলাম।
প্রিয়তমা ভাৰ্যার অমায়িক আচরণে আমি মুগ্ধ হইয়াছিলাম। যখন
সমস্ত পল্লীখানি নিশীথে ঘুমাইয়া পড়িত, আমি তাহার সহিত
পঞ্চ-প্রদীপ। ছাদে উঠতাম—দেখিতাম সেই তরঙ্গিণী সেইরূপ মৃংকলনাদিনী, বৃক্ষসমূহ সেইরূপ ফলপুষ্প সুশােভিত, বিস্তৃত মাঠ সেইরূপ শস্য শ্যামল। সেই দেখিয়া আর আমার অধঃপতনের কথা মনে করিয়া আমি মনে মনে কতই লজ্জিত হইতাম। আমার স্ত্রী আমায় কাৰ্য্যে উৎসাহিত করিবার জন্য কত যত্ন করিতেন। কিছুক্ষণ ভ্রমণের পর ছাদ হইতে নামিয়া প্রিয়তমার কোমল ভুজবল্লীতে মাথা রাখিয়া ঘুমাইয়া পড়িতাম। এইরূপে দিন কাটিতে লাগিল। এক দিন রাত্রে (তখন বােধ হয় নয়টা বাজিয়াছিল) আমি একাকী বাহিরের ঘরে বসিয়াছি, সম্মুখে বাতি জ্বলিতেছিল। একখানি ম্যাকবেথ” আমার হাতে ছিল। আমি সেই সদ্যপ্রসূত সন্তানহত্যার কথা ভাবিতেছিলাম। বাহিরেও তাই এইরূপ অন্ধকার সেই রাত্রি ! এমনই চক্ষু ঝলসিত করিয়া সেদিনও কালমেঘে বিদ্যুৎ খেলিতে ছিল, এমনই কড়কড়নাদে সেদিনেও মেঘ ডাকিতেছিল। আমি অতীত কথা ভাবিতেছিলাম। সহসা দেখিলাম, অৰ্দ্ধ উন্মুক্ত বাতায়নপার্শ্বে একটী রমণী-মূৰ্ত্তি। বিদ্যুলােকে তাহার অস্পষ্ট ছবি দেখিয়া শিহরিয়া উঠিলাম। সে সেই রাক্ষসী,-যে সয়তানী উপপতির দ্বারা সূতিকাগৃহে আপন সদ্য প্রসূত পুত্রকে হত্যা করাইয়াছিল। তাহার বুকে যেন সেই সন্তানের ছবি দেখিলাম। আমার বুক কাপিয়া উঠিল। পুস্তক হাত হইতে পড়িয়া গেল, আমি মূচ্ছিত হইয়া শয্যায় পড়িয়া যাইলাম। যখন সংজ্ঞা পাইলাম, দেখিলাম রাক্ষসীর বুকে আমার মাথা রহিয়াছে। যে পিশাচী অকম্পিত বক্ষে নির্ণিমেষ নেত্রে পুত্রহত্যা দেখিয়াছে, আবার আমি তাহার কবলিত হইলাম, আবার পঞ্চপ্রদীপ। বিলাম । এক বৎসর সেই কুহকিনীর কুহকারণ আমার চক্ষু আবৃত করিয়া রাখি। তাহার পর যখন পিশাচীর আচরণে আমায় চমক ভাঙ্গি, তখন আবার একবার সংসারের পানে চাহিলাম । কি দেখলাম-দেখিলাম করুণ দৃশ্য। আমার সােণার সংসার একটা মহাশ্মশানে পরিণত হইয়াছে। আমার প্রিয়তমা ভাৰ্য্যা উদ্বন্ধনে গতপ্রাণা, স্নেহময়ী জননী রুগ্নশয্যাশায়িনী, পিতা চিস্তাক্লিষ্ট, ভ্রাতা আমায় দেখি মুখ ফিরাইলেন। ভ্রাতৃজায় ও ভগ্নীগণ আমার সহিত কথা কহিলেন না। আমায় দেথিয়া বাবা “দূর দুর” করিয়া তাড়াইয়া দিলেন। মাকে দেখিতে পাইলাম না । বড় ইচ্ছা হইল তাহাকে একবার দেখিব। সকলকে কত অনুরােধ করিলাম- কিন্তু কেহই আমার কথা শুনিল না। বাবার পদতলে পড়িলাম। তিনি পাদুকা প্রহার করিতে করিতে দূর করিয়া দিলেন। দ্বারবানের নিকটও অপমানিত হইলাম। তবুও মাকে দেখিবার ইচ্ছা গেলনা। বাড়ীর পাশে পাশে ঘুরিতে লাগিলাম। বাড়ীর যে সব লােক আমায় দেখিয়া ভয়ে মাথা নােয়াইত, আজ তাহারা আমাকে পদাঘাত করিয়া চলিয়া গেল। পরদিন শেষ রাত্রে (বাবা যে সময় বাগানে বেড়াইতে আসিতেন) আসিয়া নির্জনে বাবার পায়ে ধরিয়া বলিলাম, বাবা আমায় একবারমাত্র মাকে দেখিতে দিন, তারপর যা দণ্ড দিকে গ্রহণ করিব। একবার ভিন্ন আর মাকে কখনও দেখিতে চাহিব না। এইবারের মত আমায় মাকে দেখান। বাবা কথা কহিলেন না। আমার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা আসিয়া ঘােড়ার চাবুকের দ্বারা আমায় প্রহার করিতে লাগিলেন। সৰ্বাঙ্গ ফাটিয়া রক্ত
পঞ্চ-প্রদীপ।
৭৯
ছুটিতে লাগিল ! এমন সময় দূরে দেখিলাম, মা আমার দুই ভগ্নীর
স্কন্ধে ভর দিয়া তথায় আসিতেছেন। আমি তখন মাটিতে
পড়িয়াছিলাম।
আমার উঠিবার
সামর্থ্য ছিল না। আমার
সৰ্ব্বাঙ্গে রক্ত দেখিয়া মুমূর্ষ, জননী অবলম্বন
ত্যাগ করিয়া
ছুটিয়া আসিয়া আমার মাথা তাহার কোলে তুলিয়া লইলেন।
তাহার দুর্বল অঙ্গপ্রত্যঙ্গ অপত্যস্নেহের বলে পূর্ণ হইয়াছিল।
আমি বিস্ফারিত নয়নে জননীর সেই মহিমাময়ীমূর্তি দেখিলাম ।
আর তার পীযুষ বাণী শুনিলাম। সহস্র বেত্রের বিষাক্ত বেদনা
আর আমার অনুভব হইতে ছিল না।
প্রায় পাঁচ মিনিট সব নীরব। বাবা চুপ করিয়াছিলেন।
বেত্র হস্তে দাদা স্থির। করুণ। পূর্ব স্নেহস জল নয় না ভগ্নীদ্বয় নীরব,
হতভাগ্য আমি মার কোলে সংজ্ঞাহীন।
প্রায় পাঁচ মিনিট পরে সহসা মা পড়িয়া গেলেন। তাঁহার
লুন্ঠিত মস্তক আমি আমার কোলে লইলাম। এই সমস্ত শেষ
হইল। মা স্বর্গধামে চলিলেন। আমি মার মৃতদেহ স্কন্ধে করিয়া
একাকী শ্মশনাভিমুখে চলিলাম, কেহ আমার প্রতি চাহিতে সাহস
করিল না।
অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সমাপ্ত করিয়া চিত। ভস্ম সর্বাঙ্গে মাখিলাম।
তাহার পর এই প্রায়শ্চিত্তের জন্য বাহির হইয়াছি। এখন দারুণ
শীতে অনাবৃত মস্তকে থাকা আমার ব্রত, রৌদ্রে বিনা কাৰ্য্যেও
বেড়ান আমার কর্ম, যে কোনরূপে হউক জীবনকে কী
দেওয়াই আমার পাপের প্রায়শ্চিত্ত।
পথিক চুপ করিল। তাহার মুখ, গম্ভীর, চক্ষু স্থির, একটা
দীর্ঘ নিশ্বাসেও তাহার বক্ষস্থল কম্পিত হইতেছিল না।
ছুটিয়া
৮,
পঞ্চ-প্রদীপ।
w.
বাহিরে বৃষ্টির বেগ তখনও হ্রাস হয় নাই। আকাশ তেমনই
ঘনকৃষ্ণবর্ণ, ভূমিচুম্বী মেঘমাল। তেমনই গর্জনশীল, প্রকৃতি তেমনই
আলােড়িত।
পথিক বাহিরে গেল। অনেকক্ষণ পর্যন্ত আসিল না দেখিয়া
আমিও বাহিরে আসিলাম, কিন্তু তাহাকে দেখিতে পাইলাম না ।
আমার বােধ হইল যেন সে অন্ধকারে মিশিয়া গিয়াছে, ভয়ার্ল্ড
হইয়া ডাকিলাম, ‘পথিক’ নয়নয় ঝলসিত করিয়া বিদ্যুৎ চুটিল।
আমি আবার ডাকিলাম,-পথিক’; মেঘ কড় কড় করিয়া ভাকিয়া
উঠিল, পথিক ফিরিল না।
প্রভাতে যখন আমি নদীতীরবর্তী পথ ধরিয়া যাইতেছিলাম,
দেখিলাম তীরে একটী মনুষ্যের মৃত দেহ। ভাল করিয়া দেখিয়।
বুঝিলাম এই আমার সেই বন্ধু “পথিক” ।
সন্ন্যাসীর সাহায্য লইয়া তাহার সংকার করিলাম। তাহার
পরদিন সেই আশ্রম ত্যাগ করিবার সময় সেই হতভাগ্যের
নিৰ্বাপিত চিতাপানে চাহিয়া একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলিলাম। আর
যুক্ত করে উনেত্রে ভূমে জানু পাতিয়া বলিলাম, “ভগবান্ ।
হত ভাগ্যের আত্মা যেন তােমার চরণে শান্তি পায়।”
সমাপ্ত।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.