Maju Public Library, Howrah
Kadambori
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
MW. HOWRAH.
কাদম্বরী।
পাতা গুটিবেন না
(মহাকবি বাণভট্ট রিচিত সংস্কৃত গদ্য গ্রন্থের অনুবাদ।
কলিকাতা সংস্কৃত কলেজের ভূতপূর্ব অধ্যাপক
স্বর্গীয় পণ্ডিত হতে বিরত্ন বিরচিত।
LIBRAR
A0
২ নীচরণ গতের ৪ট, ববাসী ইলেকট্রো মেসিন প্রেসু হইতে
জনটবর চক্রবর্তী কর্তৃক
মুদ্রিত ও প্রকাশিত।
সন ১৩১৭ সাল।
মূল এমন।
No text on this page.
কদময়ী । অখন্ড হেন সমুদায় ইহার কণ্ঠস্থ। ইহার নাম বৈশম্পায়ন। ভূমণ্ডলস্থ সমস্ত নপতি অপেক্ষা আপনি বিদ্বান্ ও গুণগ্রাহী। এই নিমিত্ত আমাদিগের স্বামি-দুচ্ছি তা আপনার নিকট এই শুকপক্ষী আনন করিয়াছেন। অনুগ্রহপূর্বক গ্রহণ করিলে ইনি আপনাকে চরিতার্থ বােধ করেন। এই বলিয়া সম্মুখে পিঞ্জর রাখিয়া কিঞ্চিৎ দূরে দণ্ডায়মান হইল। পিঞ্জরমধ্যবর্তী শুক দক্ষিণ চরণ উন্নত করিয়া মহারাজের জয় হউক বলিয়া আশীর্বাদ করিল। রাজা কে মুখ হইতে অর্থযুক্ত সুস্পষ্ট বাক্য শ্রবণ করিয়া কিস্মিত ও চমৎকৃত হইলেন। অনত্র সুমার- পালিতকে সম্বােধন করিয়া কহিলেন দেখ অমাত্য! পক্ষিতি সুস্পষ্টরূপে বর্ণেচ্চারণ করিতে ও মধুররে কথা কহিতে পারে। আমি জানিতাম পক্ষী ও পশুজাতি কেবল আহার, নিদ্রা, ভয় প্রভৃতিরই পরন্ত, ইহাদিগের বুদ্ধিশক্তি অথবা বংশক্তি কিছুই নাই। কিন্তু কে এই ব্যাপার দেখিয়া অতি আশ্চৰ্য বােধ হইতেছে। প্রথমতঃ ইহাই আশী যে, পক্ষী মনুষ্যের মত কথা কহিতে পারে। দ্বিতীয়তঃ আশীদ প্রয়ােগের সময় ব্রাহ্মণেরা যেরূপ দক্ষিণ হস্ত তুলিয়া আশা করেন, শুকপক্ষীও সেই সেইরূপ দক্ষিণ চরণ উন্নত করিয়া যথাবিহিত আশীদ করিল। কি আশ্চর্য্য! ইহা বুদ্ধি ও মনােবৃত্তিও মনুষ্যের মত দেখিতেছি। রাজার কথা শুনিয়া কুমারুপালিত কহিলেন মহারাজ! পজিতি যে মনুষ্যের ায় কথা কহিতে পারে ইহা আশ্চর্যের বিষয় আহে। লােকে শুক সারিকা এতৃত পক্ষীদিগকে অতিশয়সহকারে শিক্ষা দেয় এবং ত্বও পূর্বজন্মার্জিত সংস্কারবশতঃ অনায়াসে শিখিতে পারে। পূর্থে উঠিক মনুষ্যের মত সুস্পষ্টরূপে কথা কহিতে পারি; কিন্তু শাপে এক্ষণে উহাদিগের কথার জড়ত জন্মিয়াছে। এই কয় ৪ কাদম্বরী। কহিতে কহিতে সভাতসূচক মধ্যাহ্নকালীন শঙ্খধ্বনি হইল। স্নানসময় উপস্থিত দেখিয়া নরপতি, সমাগত মুজাদিগকে সম্মানসূচক বাক্য প্রয়ােগ দ্বারা সন্তুষ্ট করিয়া বিদায় করিলেন, চালকন্যাকে বিশ্রাম কফিতে আদেশ দিলেন এবং তামূলকরস্কবাহিনীকে কহিলেন তুমি বৈশম্পায়নকে অন্তঃপুরে লইয়া যাও ও স্নান ভােজন করাইয়া দাও । অনন্তর আপনি সিংহাসন হইতে গাত্রোখানপূর্ধক কতিপয় পুং সমভিব্যাহারে রাজভবনে প্রবেশ করিলেন। তায় স্নান, পুজা, আহার প্রভৃতি সমুদায় কৰ্ম্ম সমাপন করিয়া শয়নাগারে প্রবেশ পুর্বক শষ্যায় শন করিয়া বৈশম্পায়নের আনয়নের নিমিত্ত প্রতীহারীকে আদেশ দিলেন। প্রতীহারী আজ্ঞা মাত্র বৈশম্পায়নকে শয়নাগারে আনয়ন করিল। রাজা জিজ্ঞাসিলেন বৈশম্পায়ন! তুমি কোন দেশে কিরূপে জন্ম গ্রহণ করিয়াছ? তােমার জনক জননী কে? কিরূপে সমস্ত শাস্ত্র অভ্যাস করিলে? তুমি কি জাতিস্মর অথবা কোন মহাপুৰুষ, ষােণ- বলে বিহগষেশ ধারণ কবিয়া দেশে দেশে ভ্রমণ করিতেছ, কিংবা অভীষ্ট দেবতাকে সন্তুষ্ট করিয়া বৰুপ্রাপ্ত হইয়াছ? তুমি পূৰ্ব্বে কোথায় বাস করিতে ? কি রূপেই ৰা চণ্ডালস্তগত হইয়া পিবদ্ধ হইলে ? এই সকল শুনিতে আমার অতিশয় কৌতুক জন্মিয়াছে, অতএব তোমাৰ আদ্যোপান্ত সমুফায় বৃত্তান্ত বৰ্ণন করিয়া আমার কৌতুকাবিষ্ট চিত্তকে পরিতৃপ্ত কর। বৈশম্পান রাজার এই কথা শুনিয়া মিন বাক্যে কহিল যদি আমার জন্ম বৃত্তান্ত শুনিতে মহারাজের নিতান্ত কৌতুক জন্মিয়া থাকে শ্রবণ করুন। ভাষণের মধ্যস্থলে লিঙ্কাচনের নিটে এক অটবী আছে। উহাকে বিদ্যালী । ঐ আট ধীর মধ্যে গোলারী নদীর তীরে ভগৱাৰ কাদম্বরী। অগন্ধ্যের আশ্রয় ছি। যে স্থানে ত্রেতাবতার ভগবান রামচ পিঙ্গ আজ্ঞা পালনের নিমিত্ত সীতা ও লক্ষণের সহিত পঞ্চবটাতে পর্ণ শালা নিৰ্মাণ করিয়া কিঞ্চিৎ কাল বাতি করিয়াছিলেন। যে স্থানে দুৰ্বত শাননপ্রেরিত নিশাচর মারীচ কনক মৃগরূপ ব্যর পূষ্ণ - কীর নিকট হইতে রামচন্দ্রকে হরণ করিয়াছিল । যে স্থানে মৈথিলী- বিয়োগবিধুর রাম ও লক্ষ্মণ সানয়নে ও গলা বচন নানাপ্রকার বিলাপ ও অসুতাপ করিয়া ওব্রস্থ পশুপাদিগকেও দুঃখিত ও পরিতাপিত করিয়াছিলেন। ঐ আশ্রমের অনতিদূরে পম্পানামক সরােবর আছে। ঐ সমােবরের পশ্চিম তীরে ভগবান্ কামা শর দ্বারা যে সপুতল বিজু করিয়াছিলেন তাহার নিকটে এক প্রকাণ্ড শালমলী বৃক্ষ আছে ; বৃহৎ এক অজগর সর্প সর্বদা ঐ বৃক্ষের মূলদেশে বেষ্টন করিয়া থাকাতে, নেপ হ যেন আলবাল রহিয়াছে। ইহার শাখা প্রশাখ। সফল এরূপ উন্নত ও বিস্তৃত, বোধ হয় যেন, হপ্ত প্রসারণ পূৰ্ব্ব গগনমণ্ডলে দৈর্ঘ্য পরি- মাণ করিতে উঠিতেছে। স্বৰূদেশ এরূপ উচ্চ, বােধ হয় যেন, একেবারে পৃথিবীর চতুর্দিক অবলােকন করিবার আশয়ে মুখ আড়াইতেছে। ঐ তরুর কোটরে, শাখা, স্বদেশে ও বলৰিবরে কুলার নিৰ্মাণ করিয়া ক শারিকা প্রভৃতি নানাবিধ পক্ষিগণ মুখে বাস করে। তৰু অতিশয় প্রাচীন ; সুতরাং বিপন্ন হইয়াও পক্ষিশাবকদিগের দিবানিশি অবস্থিতি প্রযুক্ত সর্বদা নিবিড়পল্লকীর্ণ বোধ হয়। কোন কোন পঞ্জি শাবকের পক্ষোভেদ হয় নাই তাহাদিগকে ঐ বৃক্ষের মত বলিয়া ভ্রান্তি জন্মে। পক্ষীরা রাত্রিকাশে বৃক্ষকোটরে আপন আপন নীড়েনি মায়। প্রভাত ছুইলে আহায়ের অন্বেষণে শ্রেয় বন্ধ হইয়া গগনমার্গে উডীন তৎকালে বােধ হয় যেন, হরিদ্বর্ণ দুর্বাদলপরিপূর্ণ ক্ষেত্র আকাশ- মার্গ দিয়া চলিয়া যাইতেছে। তাহারা দিগদিগন্তে গমন করিয়া আহার কাদম্বরী। দ্রব্য অন্বেষণ পূর্বক আপনারা ভােজন করে এবং শাক দিগের নিমিত্ত পুটে করিয়া খাদ্য সামগ্রী আনে ও যত্বপুৰুক আহার করাইয়া দেয়। সেই মহীরুহের এক জীর্ণ কোটরে আমার পিতামাতা বাস করিতেন। কালক্রমে মাতা গর্ভবতী হইলেন এবং আমাকে প্রসব করিয়া সূতিকা- পীড়ায় অভিভূত হইয়া প্রাণ ত্যাগ করিলেন। পিতা তৎকালে বৃদ্ধ হইয়াছিলেন আবার প্রিয়তমা জার বিয়ােগশােকে অতিশয় ব্যাকুল ও দুঃখিতচিত্ত হইলেন তথাপি স্নেহবশতঃ আমাকেই অবলম্বন করিয়া অামার লালন পালন ও রক্ষণাবেক্ষণে যত্নয়ন হইয়া কানক্ষেপ করিতে লাগিলেন। তঁাহায় গমন করিবার কিছুমাত্র শক্তি ছিল না। তথাপি আস্তে আস্তে সেই আবাসতলে নামিয়া পক্ষিকুলায়ভ্রষ্ট যে যৎকিঞ্চিৎ আহায় দ্রব্য পাইতেন আমাকে আনিয়া দিতেন, আমার আহাৱাবশিষ্ট যাহা থাকিত আপন ভােজন করিয়া যথাকংি জীবন ধারণ করিতেন। একদা প্রভাতকালে চন্দ্রমা অস্বগত হইলে, পক্ষিগণের বলবে অরণ্যানী কোলাহলময় হইলে, নবােদিত সুবির আতপে গগনমণ্ডল লােহিত হইলে, গগনাঙ্গনষিক্ষিপ্ত অন্ধকার রূপ ভরাশি দিনকরের কিরূণরূপ সমার্জনী দ্বারা দূরীকৃত হইলে, সর্ষিমণ্ডল অবগাহন মানসে মানসসরােবরতীরে অবতীর্ণ হইলে, শাল্মলীবৃক্ষস্থিত পক্ষিগণ আহা- রে অন্বেষণে অভিমত প্ৰদশে প্রস্থান করিল। পক্ষিশাবকেরা নিঃশকে কোটরে রহিয়াছে ও আমি পিতার নিকটে বসিয়া আছ এমন সময়ে ভয়াবহ মৃগয়াকোলাহল শুনিতে পাইলাম। কোন দিকে সিংহ সকল গভীর স্বরে গর্জন করিতে লাগিল; কোন প্রদেশে দুরঙ্গ, কুরঙ্গ, মাতঙ্গ প্রতি বনচর পশু সকল বন অন্দোলন করিয়া বেড়াইতে লাগিল। কোন স্থানে ব্য, ভল্লক, বরাহ প্রভৃতি ভীষণাকার জন্তু সকল ছুটাছুটী করিতে লাগিল; কোন স্থানে মহিষ, গণ্ডর প্রভৃতি বৃহৎ বৃহৎ ও জ্বগণ অতিবেগ কাদম্বরী। দোঁড়িতে লাগিল। ও তাহাদিগের গাত্রঘর্ষনে বৃক্ষ সকল ভূগ্ন হইতে অবস্থা হইল। মাতঙ্গের চীংকারে, ভুবঙ্গের হ্রেষারবে, সিংহের গর্জনে ও পক্ষীদিগের কলরবে বন অকুল হইয়া উঠিল এবং তরুগণও ভয়ে কাপিতে লাগিল। আমি সেই কোলাহল শ্রবণে ভরবিহ্বল ও কম্পিতকলেবর হইয়া পিতার জীর্ণ পক্ষ পুটের অন্তরালে লুকাইলাম । তথা হইতে ব্যাধদিগের ঐ বরাহ যাইতেছে, ৫ হরিণ দৌড়িতেছে, ঐ করভ পালা- ইতেছে ইত্যাদি নানাপ্রকার কোলাহল শুনিতে পাইলাম। মৃগয়াকোলাহল নিবৃত্ত হইলে অরণ্যানী নিস্তব্ধ হইল। তখন আমি পিতার পক্ষপুট হইতে আস্তে আস্তে বিনির্গত হইয়া কোটর হইতে মুখ বাড়াইয়' যে দিকে কোলাহল হইতেছিল সেইদিকে দৃষ্টিপাত করি- লাম। দেখিলাম কৃতান্তের সহােদরের ন্যায়, পাপের সারখির ন্যায় নরকের দ্বারপালের ন্যায়, বিকটমূৰ্ত্তি এক সেনাপতি সমভিব্যাহারে যমদূতের ন্যায় ব তক গুলি কুকপ ও কদাকার, শবরসৈন্য আসিতেছে। তাহাদিগকে দেখলে ভূতবেষ্টিত ভৈরব ও দূতমধ্যবর্তী কালান্তকের সূরণ হয়। সেনাপতির নাম মাতজক পশ্চাৎ অবগত হইলাম। সুরাপানে দুই চক্ষু জবাবণ, সর্বশরীরে বিন্দু বিন্দু রক্তকণিকা লাগিয়াছে ; সঙ্গে কতকগুলি বড় বড় শিকারী কুকুর আছে। তাহাকে দেখিয়া বােধ হইল যেন, কোন বিকটাকার অসুর বয় পশু রিয়া খাইতে আসিয়াছে। শবরসৈন্য অবলােকন করিয়া মনে মনে বিবেচনা করিলাম যে, ইহারা কি দুরাচার ও দুস্কাষিত। জনশূন্য অরণ্য ইহাদিগের বাসস্থান, মদ্য মাংস আহাৱ, ধনু ধন কুকুব সুহৃৎ, ব্যাঘ্ৰ ভক্ষুক প্রভৃতি হিংস্র জন্তুর সহিত একত্র বাস এবং পশুদিগের প্রাণবধ করাই জীবিকা ও ব্যবসায়। অন্তঃকরণে দয়া লেশ নাই, অধর্মের ভয় নাই ও সদাচারে প্রবৃত্তি নাই। ইহারা আধুযিগতি পথ অবলম্বন করিয়া সকলের নিকটেই নিন্দাস্পদ ও ঘৃণা- কাম্বরী। স্পদ হইতে, সহে নাই। এইরূপ চিন্তা করিতেছিলাম এমন সময় মৃগয়া শ্রাদূর করিবার নিমিত্ত তাহারা আমাদিগের আবাস- তরুতলের ছায়ায় আসিয়া উপবিষ্ট হইল। অনতিদূরতি সজােৰ হইতে জন্ম ও মৃণাল নিয়া পিপাসা ও ক্ষুধাশক্তি করিল। আত্তি দূর করা চলিয়া গেল। শষৰ সৈন্যের মধ্যে এক বৃদ্ধ সে দিন কিছুই শিকার করিতে পারে নাই ও মাংস প্রকৃতি কিছুই পায় নাই; সে উহাদিগের সঙ্গে না গিয়া তরুতলোয়মান থাকিল। সকলে বৃষ্টিপথের অগােসর হইলে, রক্ত- বর্ণ দুই চক্ষুয়া সেই তরুর মূল অবধি অগ্রভাগ পর্যন্ত এক নিরী- ক্ষণ করিল। রিল। তাহার নেত্ৰপাতমান্তেই কোটতি পক্ষিশাবকদিগের প্রাণ উড়িয়া গেল। হায়, নৃশংলের অসাধ্য কি আছে। লােপান- শ্রেণীতে পদক্ষেপ পুর্বক অট্টালিকা যে রূপ অনায়াসে উঠা যায়, নৃশংস কণ্টকাকীর্ণ হরানােহ সেই প্রকা মহীরুহে সেইরূপ অবলীলাক্রমে আরােহণ করিল এবং কোটরে কর প্রসারিত করিয়া পক্ষিশাবকদিগকে ধরিয়া একে একে কহির্গত করিয়া প্রাণসংহারপূর্বক ভূতলে নিক্ষেপ করিতে লাগিল। পিতার একে বৃদ্ধ বয়স, হাতে অকস্মাৎ এই বিষয় সঙ্কট উপস্থিত হওয়াতে নিতান্ত ভীত হলেন। ভয় কলেবর বিশ কঁপিতে লাগিল এবং তাদেশ শুষ্ক হইয়া গেল। ইতস্ততঃ দৃষ্টিনিক্ষেপ করিতে লাগিলেন কিন্তু প্রকারের কোন উপায় না দেখিয়া আমাকে পক্ষপুটে আচ্ছাদন করলেন ও আপন বলে নিয়ে লুকাইয়া রাখি- আমাকে যখন পক্ষপুটে আচ্ছাদন করেন তখন দেখলাম ভঁহার মন খুগল হইতে জলধারা পড়িতেছে। নৃশংস ক্রমে ক্রুমে আমাদিগের কুলায়েয় সমীপবর্তী হইয়া কালসর্পাকা মাকর কোটয়ে এমণিত করিয়া পিতাকে ধৰিল। তিনি চষ্ণুপুট যারা যথাশক্তি আঘাত কাদম্বরী। ও দংশন করিলেন, কিছুতেই ছাড়িল না। কোট হইতে বহির্গত করিল, যংপয়ােনাস্তি যন্ত্রণা দিল, পরিশেষে প্রাণ বিনষ্ট করিয়া নিয়ে নিক্ষেপ করিল। পিতার পক্ষ দ্বারা আচ্ছাদিত ও ভয়ে সঙ্কুচিত হইয়াছিলাম বলিয়া আমাকে দেখিতে পাই না। ঐ তরুতলে শুল্ক পরাশি একত্রিত ছিল তাহারই উপর পতিত হইলাম, অধিক আয়াত লাগিল না। অধিক বয়স না হইলে অন্তঃকরণে স্নেহেব সঞ্চার হয় না কিন্তু ভয়ের সঞ্চার জন্মাবধিই হইয়া থাকে। শৈশৰ প্রযুক্ত আমার অন্তঃ- করণে মেহসঞ্চার না হওয়াতে কেবল ভয়েরই পরতন্ত্র হইলাম। প্রাণ পরিত্যাগের উপযুক্ত কালেও নিতান্ত নৃশংস ও নির্দয়ে ন্যায় উপরুত পিতাকে পরিত্যাগ করিয়া পালাইবার চেষ্টা করিতে লাগিলাম। অস্থির চরণ ও অসমগ্লোদিত পক্ষপুটের সাহায্যে আস্তে আস্তে গমন করিবার উদ্যাগ করতে বারংবার ভূতলে পড়িতে ও তথা হইতে উঠি পানি- লাম। ভাবিলাম বুঝি এ যাত্রায় কৃতান্তের করালগ্রাস হইতে পরিত্রাণ হইল। পরিশেষে মদ মন্দ গমন করিয়া নিকটস্থিত এক তমাল তরুর মুলদেশে লুকাইলাম। এমন সময়ে সেই নৃশংস চাল শাল্মলীর হইতে নামিয়া পক্ষিশাবকদিগকে একত্রিত ও লতাপাশে বন্ধু করিল এবং যে পথে শৰৱসৈন্যেরা গিয়াছিল সেই পথ দিয়া চলিয়া গেল। দূর হইতে পতিত ও ভয়ে নিতান্ত অভিভূত হওয়াতে আমার কলেবর কম্পিত হইতেছিল; আবার বলতী পিপ্পালা কষে করিল। ক্ষণে পিশাচ অনেক দূর গিয়া থাকিবে এই সম্ভাবনা করিয়া মুখ বাড়াইয় চতুর্দিক অবলােকন করিতে লাগিলাম। কোন দিকে কোন শব্দ শুনিবামাত্র অমনি শঙ্কিত হইয়া পদে পদে বিপদ আশঙ্কা করিয়া মলমূল হইতে নির্গত হইলাম ও আস্তে আস্তে গমন করিবার উদ্যোগ করিতে লাগিলাম। যাইতে যাইতে কখন বা পার্শ্বে কখন কাদম্বরী। • বা সম্মুখে পতিত হওয়াতে শরীর ধূলিধূসরিত হইল ও ঘন ঘন নিশ্বাস বহিতে লাগিল। তখন মনে মনে চিন্তা করিলাম কি আশ্চর্য ! যত দুর্দশা ও যত কষ্ট সহ্য করিতে হউক না কেন, তথাপি কেহ বন- তৃষ্ণা পরিত্যাগ করিতে পারে না। আমার সমক্ষে পিত। প্রাণত্যাগ করিলেন, স্বচক্ষে দেখিলাম, আমিও বৃক্ষ হইতে পতিত হইয়া বিকশ্ৰিয ও মৃত প্রায় হইয়াছি; তথাপি বাঁচিবার বিলক্ষণ বাসনা আছে। হায়, আমার তুল্য নির্দয় আর কে আছে ! মাতা প্রসবসময়ে প্রাণত্যাগ করিলে পিতা জায়াশোকে নিতান্ত অভিভূত হইয়াও কেবল আমাকেই অবলম্বন করিয়া আমার লালন পালন করিতেছিলেন এবং অত্যন্ত স্নেহ প্রযুক্ত বৃদ্ধ বয়সেও তাদৃশ বিষম ক্লেশ সহ্য করিয়া আমারই রক্ষণা, ক্ষণে নিযুক্ত ছিলেন। কিন্তু আমি সে সকল একবারে বিস্মৃত হইলাম। আমার পর কৃতঘ্ন আর নাই ; আমার মত নৃশংস ও দুরাচার এই ভূমণ্ডলে কাহাকেও দেখিতে পাই না। কি আশ্চর্য ! সে রূপ অবস্থাতে আমার জল পান করিবার অভিলাষ হইল। দূর হইতে সারস ও কল- হংসের অনতিপরিস্ফুট কলরব শুনিয়া অনুমান করিলাম সরোবর দূরে আছে। কি রূপে সরােবরে যাইব, কি রূপে জলপান করিয়া প্রাণ বাঁচাইব অনবরত এই রূপ ভাবিতে লাগিলাম। এমন সময়ে মধ্যাহ্নকাল উপস্থিত। গগনমণ্ডলের মধ্যভাগ হইতে দিনমণি অগ্নিস্ফুলিঙ্গের স্যায় প্রচণ্ড অংশসমূহ নিক্ষেপ করিতে লাগিলেন। রৌদ্রে উত্তাপে পথ উত্তপ্ত হইল। পথে পদক্ষেপ করা কাহার সাধ্য। সেই উত্তপ্ত বালুকায় আমার পা দগ্ধ হইতে লাগিল। কোন প্রকারে মরিবার ইচ্ছা ছিল না কিন্তু সে সময়ে এরূপ কষ্ট ও যাতনা উপস্থিত হইল যে বিধাতার নিকট বারংবার মরণের প্রার্থনা করিতে হইল। চতুর্দিক অন্ধকার দেখিতে লাগিলাম। পিপাস’য় কণ্ঠ শুল্ক ও অঙ্গ অবশ হইল।
কাদম্বরী। সেই স্থানের অনতিদূরে জাবালি নামে মে পবিত্র মতপ মহর্ষ বাস করিতেন। তাহার পুত্র হারীত কতিপয় বয়স্ক সমভিব্যাহারে সেই দিক্ দিয়া সরােবরে স্নান করিতে যাইতেছিলেন। তিনি এরূপ তেজস্বী যে, হঠাৎ দেখিলে সাক্ষাৎ সূর্যদেবের স্যায় বােধ হয়। তঁাহার মাকে জটাভার, ললাটে ত্রিপুণ্ড্রক, কর্ণে ফি ম'লা ৰাম করে কমণ্ডলু, দক্ষিণহস্তে আষাঢ় দু®, স্কন্ধে কাজিন ও গদেশ যজ্ঞোপবীত। তাহার প্রশান্ত আকৃতি দেখিবামাত্র বােধ হইল যে, পরম কারুণি ভূতভাবন ভগবান্ ভবানীপতি আমার রক্ষার নিমিত্ত ভূতলে অবতীর্ণ হইলেন সাধু দিগের চিত স্বভাবই দয়া। আমার সেইরূপ দুশি। ও যন্ত্রণা দেখি। তাহার অন্তঃকরণে করুণােদয় হইল এবং আমাকে নির্দেশ করিয়া বয়স্ক দিগকে কহিলেন দেখ দেখ এক টী শুকশিশু পথে পতিত রহিয়াছে । বােধ হয়, এই শাল্মলীতরুর শিখরদেশ হইতে পতিত হইয়া থাকিৰে। ঘন ঘন নিশ্বাস বহিতেছে ও বারংবার চষ্ণুপুট ব্যাদান করিতেছে। বােধ হয় অতিশয় তৃষ্ণাতুর হইয়া থাকিবে। জল না পাইলে আর অধিক ক্ষণ চিবে না। চল আমরা ইহাকে সরােবরে লইয়া যাই। জলপান করাইয়া নিলে ব চিলেও বাটিতে পারে। এই বলিয়া আমাকে ভূতল হইতে তুলিলেন । তঁাহার করস্পর্শে আমার উত্তপ্ত পাত্র কিঞ্চিৎ সুস্থ হইল অনন্তর রাে: বরে লইয়া গিয়া আমার মুখে উন্নত চষ্ণুপু; বিস্তৃত করিয়া অঙ্গুলির অগ্র ভাগ দ্বারা বিন্দু বারি প্রদান করিলেন। জলপান করিয়া পিপাসা শান্তি হইল। পরে আমাকে স্নান করাইয়া নলিনীপত্রের শীতল ছায়ায় ৰাইয়া রাখিলেন। অনন্তর ঋষিকুমারো স্নান ন্তৈ অর্থ প্রদানপূর্বক ভগবান্ ভাস্করকে প্রণাম করিলেন এবং আর্দ্র বন্ধু পরিত্যাগ ও পবিত্র নৃতন বসন পরিধান পূর্বক আমাকে গ্রহণ করিয়া তপােবনাভিমুখে মন্দ মন্দ গমন করিতে লাগিলেন।
কাদম্বরী। তপােবন সন্নিহিত হইলে দেখিলাম তত্ৰন্থ তরু ও লতাসকল কুসুমিত, পল্লবিত ও ফলভরে অবনত হইয়া রহিয়াছে। এলা ও লবঙ্গলতার কুসুমগয়ে দিক আমােদিত হইতেছে। মধুকর ঝঙ্কার করিয়া এক পুষ্প হইতে অন্য পুষ্পে বসিয়া মধুপান করিতেছে। অশােক, চম্পক, কিংশুক সহকার, মল্লিকা, মালতী প্রভৃতি নানাবিধ বৃক্ষ ও লতার সমাবেশে এবং তাহাখিগের শাখা ও পল্লবের পরস্পর সংযােগে মধ্যে মধ্যে রমণীয় গৃহ নিশ্রিত হইয়াছে। উহার অভ্যন্তরে দিনকরের কিরণ প্রশে করিতে পারে না। মহর্ষিগণ মন্ত্রপাঠপুৱক প্ৰলিত অনলে ঘৃতাহুতি প্রদান কাৰঙেছেন এবং প্রদীপ্ত অগ্নিশিখায় উত্তাপে বুকের পল্লভ সকল মলিম হইয়া যাইতেছে। গন্ধবহ হােমগন্ধ বিন্তারপূর্বক মন্দ মন্দ বহিতেছে । মুনিকুমারো কেহ ৰা উচ্চৈঃস্বরে বের উচ্চারণ, কেহ বা প্রশান্ত ভাবে শাস্ত্রের আলােচনা করিতেছেন। মৃগকৰ নিৰ্ভৰু চিত্তে বনের চতুর্দিকে খেলিয়া (বড়াইতেছে। শুকমুখভ্রষ্ট নীরকণিকা তরুতলে পতিত রহিয়াছে। পােবন দেখিয়া আমার অন্তঃকরণ আহলাদে পুলকিত হইল। অভ্য- ভরে প্রবেশিয়া দেখিলাম রক্তপল্পবশোভিত রাশােকর ছায়ায় পরিস্কৃত পবিত্র স্থানে বেত্রাসনে ভগবান্ মহাতপা মহর্ষি জালি বসিয়া আছেন। যান্য মুনিগণ চতুর্দিকে বেষ্টন করিয়া উপবিষ্ট রহিয়াছেন। মহর্ষি অতি প্রচনা, এর প্রভাবে মস্তকের জটাভার ও গাত্রের ললাম সকল ধৰণ বর্ণ, কপালে ব্রিবলী, গস্থল নিম্ন শিরা ও পরের অস্থি সকল বহির্গত এবং খেতবর্ণ লােমে কর্ণ বিবর আচ্ছাদিত। তাহার প্রশান্ত ও গভীর আকুতি লেখবামাত্র বােধ হয় যেন, তিনি করুণারসের প্রবাহ, মা ও সন্তোষের আধার, শান্তিলতার মুল, ক্রোধভূঙ্গের মহামন্ত্র, সৎপথের দশ ও সৎ ভাবের আশ্রয়। তঁাক দেখিয়া আমার অন্তকর।
কাদম্বী। একপ ভয় ও বিস্ময়ে আবির্ভাব হইল। ভাবিলাম মহর্ষির কি প্রভাব। ইহার প্রভাবে পােবনে হিংসা, দ্বেষ, বৈর, মাৎসর্য্য, কিছুই নাই। ভুজঙ্গের আতপাপিত হইয়া শিথীর শিখাকলাপের ছায়ায় সুখে সুন করিয়া আছে। হরিণ শাবকেরা সিংহশাবকের সহিত সিংহীর স্তনপান করিতেছে। কত সকল কড়া করিতে করিতে ৩৩ দ্বারা সিংহকে আক বণ করিতেছে। মৃগকুল অষ্যাকুলচিতে বুকের সহিত এক চরিতেছে । এবং শুষ্ক বৃক্ষও মুলিত হইতেছে বােধ হয় যেন, সত্যযুগ কলিকা- লের ভয়ে পলাইয়া তপােবনে আসিয়া অৰস্থিতি করিতেছে। অনন্তর ইতস্ততঃ বৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়া দেখিলাম আশ্রমস্থিত শুরুগণের শাখায় মুনিগণের বহুল শুকাইতেছে। কমণ্ডলু ও অশালা ঝুলিতেছে এবং মুলদেশে বসিবার নিমিত্ত বেদী নির্মিত হইয়াছে। বােধ হয় যেন, বা সকলও তপখিবেশ ধারণপুর্বক তপস্যা করিতে আরম্ভ করিয়াছে। এই সকল দেখিতেছিলাম এমন সময়ে মুনিকুমার হারীত আমাকে সেই রজাশােকর ছায়ায় বসাইয়া পিতার চরণারবিন্দ না পূর্বক স্বতন্ত্র এক আসনে উপবিষ্ট হইলেন। অন্যান্য মুনিকুমারেরা মদ্দর্শনে সাতিশয় কৌতুকাবিষ্ট ও ব্যগ্র হইয়া হারীতকে জিজ্ঞাসা করিলেন সখে। এই শুকশিশুটা কোথায় পাইলে ? হরীত কহিলেন স্নান করিতে যাই- বার সময় পথিমধ্যে দেখিলাম এই শুকশিশু আপন কুলায় হইতে পতিত হইয়া ভূতলে বিলুণ্ঠিত হইতেছে। ইহাকে তাদৃশ বিষম দুরবস্থাপন্ন দেখিয়া আমার অন্তঃকরণে কপােয় হইল। কিন্তু যে বৃক্ষ হইতে পতিত হইয়াছিল তাহাতে আমােণ করা আমাদিগের অধ্য বােধ হওয়াতে সঙ্গে করিয়া লইয়া আসিয়াছি। এই স্থানে থাকুক, সকলকে মত্বপূর্ষক ইহার রক্ষণাবেক্ষণ করিতে হইবেক। হারীতের এই কথা শুনিয়া ভগবান্ জাবালি কুতুহলাক্রান্ত হইয়া কাদম্বরী। আমার প্রতি চক্ষু নিক্ষেপ কবিনে। তঁাহার প্রশান্ত দৃষ্টিপাতমত্রেই আমি আপনাকে চরিতার্থ ও পবিত্র জ্ঞান করিম। তিনি পরিচিতের ন্য য় আমাকে বারংবার নেত্রগােচর করিয়া কহিলেন এইপক্ষী আপন দুস্কর ফলভােগ করিতেছে। সেই মহর্ষি কায়দশী ; তপস্যার প্রভাবে ভূত, ভবিষ্যৎ, বর্তমানের ন্যায় দেখেন এবং জ্ঞানচক্ষু দ্বারা সমস্ত জগং করতলখিত বস্তুর ন্যায় দেখিতে পান; সকলে তাহার প্রভাব জানিতেন, তঁাহার কথায় কাহারও অবিশ্বাস হইল না। মুনিকুমারের ব্যগ্র হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন এ কি দুষ্কৰ্ম্ম করিয়াছে, কিরুপেই বা তাহার ফল ভােগ করিতেছে ? জন্মান্তরে এ কোন জাতি ছিল, কেনই বা পী হইয়া জন্ম গ্রহণ করিল। অনুগ্রহ পূর্বক ইহার দুস্কৰ্ম্ম বৃত্তান্ত বর্ণন করিয়া আমাদিগের কৌতুকাক্রান্ত চিত্তকে পরিতৃপ্ত করুন। মহর্ষি কহিলেন সে কথা বিস্মযজনক ও কৌতুকাবহ বটে, কিন্তু অতি ঘী, অল্পক্ষণের মধ্যে সমাপ্ত হইবেক না। এক্ষণে দিবাবসান হইতেছে, আমাকে স্নান কমিতে হইবেক। তােমাদিগেরও দেবানসময় উপস্থিত। আহারাদি সমাপন করিয়া সকলে নিশ্চিন্ত হইয়া বসিলে আমি ইহার আদ্যোপান্ত সমস্ত বৃত্তান্ত বর্ণন কবি। আমি বর্ণন করিলেই সমুদায় জন্মান্তর বৃত্তান্ত ইহার স্মৃতিপথারঢ় হইবেক। মহর্ষি এই কথা কহিলে মুকুিমারেয়া পাত্রে খান পূর্বক মান পূজা প্রভৃতি সমুদায় দিবস- ব্যাপার সম্পন্ন করিতে লাগিলেন। মে দিৰাৰসাম হইল। মুনিজনের রক্তচন্দনহিত যে অর্ঘ্য দান ঝিয়াছিলেন সেই রক্তদানে অনুলিপ্ত হইয়াই কেম, রবি বক্তবর্ণ হই লেন। রবির কিরণ ধরল পর্ধত্যগ কষ্মিা কমলনে, কমন ত্যাগ কম্মিা তফশিরে এবং তদনন্তর পর্বতশৃঙ্গে আরােহণ করিল। বােধ হইল যেন পর্বতশিখর কর্ণ মণ্ডিত হইয়াছে। রৰি হস্তগত হইলে কাবরী। স্যা উপস্থিত হইল। সন্ধ্যা সমীবণে তরুশাখা সকল সঞ্চালিত হইলে বোধ হইল যে, তরুগণ বিহগদিগকে নিজ নিজ বুলায়ে ৩াগমন করি- বার নিমিত্ত অঙ্গুলীসঙ্কেত দ্বারা আহ্বান করিল। বিহুগকুলও কলরব করিয়া যেন তাহার উত্তর প্রদান করিল। মুনিজনের ধ্যানে বসি ন এবং বদ্ধাঞ্জলি হইয়া সন্ধ্যার উপাসনা করিতে লাগিলেন। হন হােমধেনুর মনােহর দুগ্ধধারাধ্বনি আশ্রমের চতুর্দিক ব্যাপ্ত করিল। হরিদ্বর্ণ কুশদ্বারা অগ্নিহোত্ৰৰেদি আচ্ছাদিত হইল। দিনের বেল, য দিনকরের ভযে গিরিগুহার অভ্যন্তরে লুকাইযা ছিল; এই সময় সমন পাইয়া অন্ধকৰ তথা হইতে সহসা বহির্গত হইল। সন্ধ্যা ক্ষয এ । হইলে তাহার শােকে দু খিত ও তিমবুকপ মলিন বলে অষগুতি হইযা ভািবরী আগমন করিল। ভরেব প্রতাপে গ্রহগণ : ৭ ন্যায় ভয়ে লুকাই যা ছিল, অন্ধকার পাই যা অমনি গনমার্গে বহি, ও হইল। পূৰ্ব্বদিকভাগে সুধাংশুর অ শু অল্প অল্প দৃষ্টিগোচর হওয় তে বােধ হইল যেন, প্রিয়সমাগমে আহলাদিত হইয়া পূর্ব দিক্ শনবিক শ পূর্বক মন্দ মন্দ হাসিতেছে। প্রথমে বলাম, এমে অত্র, জমে ক্রমে সম্পূর্ণমণ্ডল শশধর প্রকাশিত হওযাকে সমুদর তির বিষ্ট হই। গেল। কুমুদিনী বিকাসিত হইল । মন্দ মন্দ স্কার্মরণ সুখান অ' শ্রম মুগগণকে অ হলাদিত করিল। জীবলোক আসে, বুক গন্ধময় ও পােবন জ্যোৎস্নাময় হ ল। ক্রমে ক্রমে চার কাণ্ড । হইল। হরীত আহারাদি সমাপন ববিয়া আ ম কে লাখ ঋষিকুমাদিগের সমভিব্যাহারে পিতার সন্নিধন উপস্থিত হতেন। দেখিনে বিমি বেত্রাসনে বসিয়া আছেন, তালপাদনামা শিষ্য তা বৃন্ত ব্যঞ্জন করতে নে। হারীত পিত'র মুখে কৃতাও লিপুটে দা.মান হইয়া বিনয় বচনে
কাদম্বরী।
কহিলেন ত! আমরা সকলে এই শিশুর বৃত্তান্ত শুনিতে অতি-
শয় উৎসুক। আপনি অনুগ্রহ পূর্বক বর্ণন করিলে কৃতার্থ হই
মনিকুমারেরা সকলেই কৌতুকাক্রান্ত ও একাগ্রচিত্ত হইয়াছেন
দেখি মহাষ কথা আৰম্ভ করিলেন ।
কথারম্ভ। অন্তি দেশে উজানী নামে নগরী আছে। যে স্থানে ভুবনত্রণের স স্থিতিসংহারকারী মহাকলিভিধান ভগবান্ দেবাদিদেব মহাদেব অব- বৃত্তি করেন। যে স্থানে শিপ্রানদী তরঙ্গরূপ কুটী বিস্তারপু ক াণী- রীর প্রতি উপহাস করিয়া বেগবতী হইয়া প্রবাহিত হইতেছে : তথ’ তারাপীড় নামে মহাযশস্বী তেজস্বী প্রবাল প্রতাপ নরপতি ছিলেন। তিনি অর্জুনের ন্যায় নি বলে অখণ্ড ভুমণ্ডল জয় ও প্রজাগণের রেশ দূর করিয়া মুখে রাজ্য ভােগ করেন। তাহার গুণে বশীভূত হইয়া লক্ষ্মী কমবন তুচ্ছ করিয়া নারায়ণষঃস্থল পরিত্যাগ করিয়া তাহাকেই গঢ় জালিঙ্গন করিয়াছিলেন ; সরস্বতী চতুর্মুখের মুখপরম্পরায় বাস করা ক্লেশকর বােধ করিয়া তাহারই রসনামগুলে সুখে অস্থিতি করিয়া- ছিলেন। তাঁহার অমাত্যের নাম শুনস। শুকনাস ব্রাহ্মণকুলে এ গ্রহণ করেন। তিনি সকল শাস্ত্রের পারদর্শী, নীতিশাস্ত্রপ্রয়ােগকুশল, ভূভারবারণাম, অগাধবুদ্ধি, ধীরপ্রকৃতি, সত্যবাদী ও জিতেন্দ্রিয় তাঁহার পত্নীর নাম মনারম। ইরে বৃহস্পতি, নলের সুমতি, দশরথের বশিষ্ঠ ও রামচন্দ্রের বিশ্বামিত্র যেরূপ উপদেষ্টা ছিলেন; শুকনাসও সেই রপ রাজকার্ষপৰ্যালােচনাবিষয়ে রাজাকে যথার্থ সদুপদেশ দিতেন মন্ত্রীর বুদ্ধি এরূপ তীক্ষ্ণ যে জটিল ও দুরবগাহ কেন ক সঙ্কট উপস্থিত হইলেও বিচলিত বা প্রতিহত হইত না। শৈশবাবধি অকৃত্রিম প্রণয় সার হওয়াতে রাজা তাহাকে কোন বিষয়ে অবিশ্বাস করিতেন না। তিনিও বিশু শঃকরণে নৃপতির হিত কার্য অনুষ্ঠানে তৎপর ছিলেন। পৃথিবীতে তুলা প্রতিদ্বন্দী ছিল না এবং এভাগের উৎপাত ও ১৮ কাদম্বরী। * অমুখ আকাশকুসুমের গায় অলীক পদার্থ হইয়াছিল, সুতাং সকল বিষয়ে নিশ্চিন্ত হইয়া শুকনাসের প্রতি রাজ্যশাসনের আত্ম সমর্পণ পূর্বক রাজ। যৌবনসুখ অনুভব করিতেন। কখন জলবিহার, কখন বনবিহার, কখন বা নৃত্য, গীত, বাদ্যের আমােদে সুখে কাল হরণ করেন। শুকনা সেই অসীম সাম্রাজ্যকাৰ্য্য অনায়াসে সুশৃঙ্খলরূপে সম্পন্ন করতেন। তঁাহার অপক্ষপাতিতা ও সদ্বিচারগুণে প্রজারা অত্যন্ত বশীভূত ও অনুরক্ত হইয়াছিল। তারাপড় এই রূপে সকল সুখের পার প্রাপ্ত হইয়াও সন্তানমুখাব- লোকনরূপ সুলত না হওয়াতে মনে মনে অতিশয় দুঃখিত থাকেন। সন্তান না হওয়াতে সংসারে অরণ্য জ্ঞান, জীবনে বিড়ম্বনা জ্ঞান ও শরীর ভারমাত্র বলিয়া যােধ হইয়াছিল এবং আপনাকে অসহায়, অনা শ্রয় ও হতভাগ্য বিবেচনা করিতেন। ফলত তাঁহার পক্ষে সংসার অসার ও অন্ধকার রূপে প্রতীয়মান হইয়াছিল। নৃপতির বিলাসবতী- নাম্নী পরমরূপবতী পত্নী ছিলেন। কলপের রতি ও শিবের পার্বতী যেরূপ পরমপ্রণয়িনী, বিলাসবর্তীও সেইরূপ পরম প্রণয়াস্পদ ছিলেন। একদা মহিষী অতিশয় দুঃখিত অন্তঃকরণে অন্তঃপুরে বসিয়া আছেন, এমন সময়ে নরপতি তথায় উপস্থিত হইয়া দেখিলেন, মহিষী বামকালে কপােলদেশ সংস্থাপিত করিয়া বিষম বদনে রােদন করিতেছেন; অঙ্গের ভূষণ এক হইতে উন্মােচন করিয়া ফেলিয়া দিয়াছেন; অলরাগ বা অঙ্গসংস্কার কিছুমাত্র নাই। সখীগণ নিঃশব্দে ও দুঃখিত চিত্তে পার্শ্বে বসিয়া আছে। অতঃপুরবৃদ্ধারা অনতি দূরে উপবিষ্ট হইয়া প্রবেধবাক্যে আশ্বাস প্রদান করিতেছে। রাঙ্গা গৃহের মধ্যে প্রবেশ করিলে মহিষী আসন হইতে উঠিয়া সম্ভাষণ করিলেন। রাজাকে দেখিয়া তাহার দুঃখ দ্বিগুণতর হইল ও দুই চক্ষু দিয়া অশ্রুধারা পড়িতে লাগিল। মহিষীর কাদম্বরী। ১ আকস্মিক শােক ও লােদনের কারণ কিছু বুঝিতে না পারিয়া নরপতি মনে মনে কত ভাবনা, কত শঙ্কা ও কল্পনা করিতে লাগিলেন। পরে আসনে উপবিষ্ট হইয়া যসমদ্বারা চক্ষুর আল মুচিয়া দিয়া মধুর বাক্যে জিজ্ঞাসা করিলেন। প্রিরে! কি নিমিত্ত বামকরে বামগণ্ড সংস্থাপন করিয়া বিষয় বদনে ও দীন নয়নে রােদন করিতেছ? তােমার দুঃখের কারণ কিছু জানিতে না পারিয়া আমার অন্তঃকরণ অতিশয় ব্যাকুল ও বিষয় হইতেছে। আমি কি কোন অপরাধ করিয়াছি ? অথবা অন্য কেহ প্রজ্বলিত অনলশিখা হস্তক্ষেপ করিয়া থাকিবেক; যাহা হউক শশাকের কারণ বর্ণন করিয়া আমার উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা দূর কর। রজা এত অনুনয় করিলেন, বিলাসবতী কিছুই উত্তর দিলেন না বরং আরও শােকাকুল হইয়: রােদন করিতে লাগিলেন। রাজ্ঞীর তাস্কুল- করঙ্কবাহিনী বদ্ধাঞ্জলি হইয়া নিবেদন করিল মহারাজ! আপনি কোন অপরাধ করেন নাই এবং রাজমহিষীর নিকটে তান্তে অপরাধ করিবে এ কথাও অসম্ভব। মহিষী যে নিমিত্ত রোদন করিতেছেন তাহা শ্রবণ করুন । সন্তানের মুখাবলােকন রুপ সুখলাভে বপিত হইয়া রাণী বহুদিবসাবধি শােকাকুল ছিলেন। কিন্তু মহারাজের মনঃপীড়া হইবে বলিয়া এত দিন দুঃখ প্রকাশ করেন নাই; মনে র খ মনেই গােপন করিয়া রাখিয়াছিলেন। অদ্য চতুর্দশী, মহাদেবের পূজা দিতে মহা- কালের মন্দিরে গিয়াছিলেন ; তথা মহাভারত পাঠ হইতেছিল, তাহা তেই শুনিলেন সন্তানবিহীন ব্যক্তিদিগের সদগতি হয় না; পুত্র না জন্মিলে পুন্নাম নরক হইতে উদ্ধারের উপায়ান্তর নাই; পুত্রহীন ব্যক্তির ইং লােকে সুখ ও পরলোকে পরিত্রাণ পাইবার সম্ভাবনা নাই ; তাহার জীবন, ধন, ঐশ্বৰ্য, সকলই নিল। মহাভারতের এই কথা শুনিয় অবধি অতি উন্মনা ও উৎকণ্ঠিত হইলেন। বাটা আসিলে সকলে ;
কাদম্বরী। নানাপ্রকার এবােধবাক্যে সান্ত্বনা করিল ও অাহার করিতে অনুরোধ করিল; কোন ক্রমেই শান্ত হইলেন না ও আহার করিলেন না। সেই অবধি কাহারও কোন কথার উত্তর দেন না, কাহারও সহিত আলাপ করেন না। কেবল বিষন্ন বদনে অনবরত নােঙ্গন করিতেছেন। এক্ষণে যাহা কর্তব্য করুন। তাম্বুল করঙ্কবাহিনীর কথা শুনিয়া রাজা ক্ষণকাল নিস্তব্ধ ও নিরুত্তর হইয়া রহিলেন। পরে দীর্ঘ নিশ্বাস পরিত্যাগ করিয়া কহিলেন দেব। বৈষাক্ত বিষয়ে শােক ও অনুতাপ করা কোন ক্রমেই বিধেয় নহে। মনুষ্যেরা যত ষত্ব ও যত চেষ্টা করুক না কেন, দৈব অনুকূল না হইলে কোন প্রকারে মনােরথ সফল হয় না। পুত্রের আলিঙ্গনে শরীর শীতল হইবে, মুখারবিন্দদর্শনে নেত্র পবিত্র হইবে, অপরিস্ফুট মধুর বচন শ্রবণে কর্ণ জুড়াইবে এ ফি পুণ্য কৰ্ম্ম করিয়াছি। জন্মান্তরে কত পাপ করিয়া থাকিব, সেই জন্যে এত মনস্তাপ উপস্থিত হইতেছে। দৈব অনুকূল না হইলে কোন অভীষ্টসিদ্ধির সম্ভাবনা নাই। অতএব দৈব- কর্শে অত্যন্ত অনুরক্ত হও। মনােযােগ পূর্বক গুরুভক্তি, দেবপূজা ও মহর্ষিঙ্গিণের পরিচর্যা কর। অবিচলিত ও অকৃত্রিম ভক্তিপূর্বক ধর্ম- কর্মের অনুষ্ঠান কর । পুরাণে শুনিছি মগধদেশের রাজা বৃহদ্রশ সন্তানলাভের আশয়ে চণ্ডকৌশিকের আরাধনা করেন এবং তাহার বর- প্রভাৰে জরানামে প্রবলপরাক্রান্ত এক পুত্র প্রাপ্ত হন। রাজা দশরথও মহষি ঋষ্যশৃঙ্গকে প্রসন্ন করিয়া রাম, লক্ষ্ম, ভরত, শত্রুঘ্ন নামে মহা- বলপরাক্রান্ত চাৰি পুত্র লাভ করেন। ঋষিগণের আরাধনা কখন বিফল হয় না, অবশ্যই তাহার কল মর্শে, সন্দেহ নাই। একান্ত অনুরক্ত হইয়া ভক্তিসহকারে দেব ও মহর্থিদিগের অর্চনা কর তাহাতেই মনােরথ সফল হইবেক। হায়! কত দিনে সেই শুভ ৰমের কাদম্বরী। উদয় হইবে, যে দিনে মেহময় ও প্রতিম সন্তানের সুধাময় মুখ অবলোকন করিয়া জীবন ও নয়ন চরিতার্থ করিব। পরিজনেরা আনন্দে পূর্ণ পাত্র গ্রহণ করিবে। নগর উসময় হইয়া নৃত্য গীত বালের কোলাহলে পরিপূর্ণ হইবেক। শশিকলা উদিত হইলে গগনমণ্ডলের যেরূপ শােভ হয়, কত দিনে দেবী পূহু ক্রোড়ে করিয় সেইরূপ শােভিত হইবেন। নিয়পত্যতা এক্ষণে অতিশয় ক্লেশ নিতেছে। সংসার অরণ্য ও জগৎ শুন্য দেখিতেছি। রাজ্য ও ঐ নিল যে ধ হইতেছে। কিন্তু অপ্ৰতিবিধেয় বিষয়ে শোক ও দুঃখ করা বৃথা বলিয়াই ধৈৰ্য্যাবলম্বন পূর্বক যথা কঞ্চিৎ সংসারধাত্রা নির্বাহ করিতেছি। এইরূপ নানা প্রবােধবাকে আশ্বাস দিয়া স্বহস্তে মহিষীর নেত্রল মোচন করি। দিলেন। অনেক ক্ষণ অন্তঃপুরে থাকিয়া পরে বহির্গত হইলেন। রাজা অন্তঃপুর হইতে বহির্গত হইলে বিলাবতী এবােধবাক্যে কিঞ্চিৎ শান্ত হইয়া গান ভােনাদি সমাপন করলেন। যে সকল অভ- রণ ফেলিয়া দিয়াছিলেন তাহা পুনৰ্বাৰ অঙ্গে ধরণ করিলেন। তদবধি দেবতার আরাধনা, ব্রাহ্মণের সেবা ও গুরুজনের পরিচর্যায় অতিশয় অনুরক্ত হইলেন। দৈবকর্মে অনুরক্ত হইয়া চণ্ডিকার গৃহে প্রতিনি ধূপ গুগ্গুল প্রভৃতি সুগন্ধ দ্রব্যের গঙ্ক বিস্তার করেন। দিবসবিনেবে তথায় সাশনে শয়ন করিয়া থাকেন। প্রতিদিন প্রাতকালে ব্রাহ্মণ দিগকে স্বর্ণপাত্র দান করেন। কৃষ্ণপক্ষীয় চতুর্দশ রজনীতে চতুপথে তোদিগের বলি উপহার দেন। অশ্বথ প্রভৃতি বনস্পতিদিগকে প্রদ- ক্ষিণ করেন। ষোড়শােপচারে ধীদের পূজা দেন। ফলতঃ যে যেরূপ তের অনুষ্ঠান করিতে কহে, অতিশয় ক্লেশস’ধ্য হইলেও অ্য, তৃষ্ণায় উহার অনুষ্ঠান করেন, কিছুতেই পরান্মুখ হয়েন না। অথবা সিদ্ধ পুরুৰ দেখিলে সমাদর পূর্বক সন্তানের গণনা করান।
২২ কাদম্বরী। শাকারেরা কহেন ত্তিতে যে সকল স্বপ্ন দেখেন এভাতে পুরী দিগকে তাহার ফলাফল জিজ্ঞাসা করেন। এইরূপে কিছুদিন অতীত হইলে, একদা রাত্রিশেষে রাজা স্বপ্নে দেখিলেন বিলাসবতী সৌধশিখরে শয়ন করিয়া আছেন, তাঁহার মুখ- মওতেপুর্ণচন্দ্র প্রবেশ করিতেছে। স্বপ্নদর্শনানন্তর অমনি জাগরিত হইয়া শীঘ্র শষ্যা হইতে উঠিলেন। অনন্তর শুকনাসকে আহবান করিয়া তাহার সাক্ষাতে স্বপ্নবৃত্তান্ত বৰ্ণন করিলেন। শুকনা শুনিয়া অতিশয় আঙ্কা- দিত হইলেন ও প্রীতিপ্রফুল্লবদনে কহিলেন মহারাজ। বুঝি অনেক কালের পর আমাদিগের মনােরথ পূর্ণ হইল। অচিরাৎ আপনি পুত্র- মুখ নিরীক্ষণ করিয়া আনন্দিত হইবেন, সন্দেহ নাই। আমিও আজি বুজ- নীতে স্বপ্নে প্রশান্তমুর্তি, দিব্যাকৃতি এক ব্রাহ্মণকে মনােরমার উৎসঙ্গে বিকসিত পুণ্ডরীক নিক্ষেপ করিতে দেখিয়াছি। শুভ ফলােদয়ে পূর্বে শুভ লক্ষণ সকল দেখিতে পাওয়া যায়। যদি আমাদিগের, চির্থিত মনাের সম্পন্ন হয়, তাহা হইলে, ইহা অপেক্ষা আহলাদের বিষয় কি আছে ? রাত্রিশেবে যে স্বপ্ন দেখা যায় তাহা প্রায় বিফল হয় না। রাজমহিষী বিলাসবতী অচিরাৎ পুত্রসন্তান প্রসব কৰিযে, সন্দেহ নাই। রাজা মন্ত্রীর স্বপ্নবৃত্তান্ত শ্রবণে অধিকতর আহলা- দিত হইলেন এবং তাহার হস্তধারণ পূর্বক অন্তঃপুরে এনেশিয়া উভয়ে আপন আপন স্বপ্নবৃত্তান্ত বর্ণন দ্বারা রাজমহিষীর আনন্দোৎপাদন করিলেন। কিছু দিন পরে বিলাসবতী গর্ভবতী হইলেন। প্রতিৰিয় পতিত হইলে সরােবর যেরূপ উজল হয়, পারিজাত রুম বিকশিত হইলে নক্ষনবনের যেরূপ শােভা হয়, বিলাসবতী গর্ত করিয়া সেইরূপ অপুর্ব প্রাপ্ত হইলেন। দিন দিন গর্তের উপায় কাদম্বরী হুইতে লাগিল। সলিলভারাক্রান্ত মেঘমালার ন্যায় বিলাসবতী গর্ভভারে মন্থরগতি হইলেন। মুখে বারংবার জন্তিকা ও জল উঠিতে লাগিল। ১রীর অলস ও পাণ্ডুবর্ণ হইল। এই সকল লক্ষণ নিরীক্ষণ করিয়া পরি- জনেরা অনায়াসেই বুঝিতে পারিল রাণী গর্ভিণী হইয়াছেন। একদা প্রদোষ সময়ে শুকনাস ও রাজা রাজভবনে বসিয়া আছেন এমন সময়ে কুলবৰ্জনানামী প্রধান পরিচারিকা তথায় উপস্থিত হইয়া রাজার কর্ণে মহিষীর গর্ভসঞ্চারের সংবাদ কহিল। নরপতি শুভ সংবাদ শুনিয়া আনন্দের পরাকাষ্ঠা প্রাপ্ত হইলেন। বালাদে কলেবর রোমা- কিত ও কপেলিমুল বিকসিত হইয়া উঠিল। তখন হর্ষোৎফুল লােচনে শুকনাসের প্রতি দৃষ্টিপাত করাতে তিনি রাজার ও কুলবর্ধনার আকৃতি দেখিয়াই অনুমান করিলেন রাজার অভীষ্টসিদ্ধ হইয়াছে । তথাপি সন্দেহনিবারণের নিমিত্ত জিজ্ঞাসা করিলেন মহারাজ ! স্বপ্নদর্শন কি সফগ হইয়াছে ? রাজা কিঞ্চিৎ হাস্য করিয়া কহিলেন যদি কুলবর্ধনার কথা মিথ্যা না হয় তাহা হইলে স্বপ্ন সফল বটে। চল আমরা স্বয়ং গিয়া জানিয়া আসি। এই কথা বলিয়া গাত্র হইতে উন্মােচন করিয়া শুভ সংবাদের পারিতেবিকস্বরূপ বহুমূল্য অলঙ্কার কুলবর্ধনাকে দিয়া বিদায় করিলেন। আপনারাও মহিীর বাসভবনে লিনে। যাইতে যাইতে রাজার দক্ষিণ লােচন স্পন্দ হইল। তথায় গিয়া দেখিনে মহিষী গর্ভোচিত কোমল শয্যায় শয়ন করিয়া আছেন, গর্ভে সন্তানের উদয় হওয়াতে মেধাবৃতশাশমণ্ডলশালিনী রজ- নীর স্যায় শােভা পাইতেছেন। শিরােভাগে মঙ্গলকস রহিয়াছে, তুর্দিকে মণির প্রদীপ জ্বলিতেছে এবং গৃহে খেত সর্ষপ বিকীর্ণ আছে । রাণ রাজাকে দেখিয়া সম্রমে শষ্যা হইতে উঠিবার চেষ্টা করিতেছিলেন, বাজা বারণ করিয়া কহিলেন প্রিয়ে। আর কষ্ট পাইবার প্রয়ােজন নাই।
২৪ কাদম্বরী। বিনা অভ্যুথানেই যথেষ্ট আদর প্রকাশ হইয়াছে। এই বলিয়া শয্যা এক পার্শ্বে বসিলেন। শুকনাস স্ব একস্থানে উপবেশন করিলেন। রাজা মহিষীর আকার প্রকার দেখিয়াই গর্ভলক্ষণ জানিতে পারিনে ; তথাপি পরিহাস পুর্বক কহিলেন বিয়ে! শুকনাস জিজ্ঞাসা করিতেছেন কুলবর্ধন। যাহা কহিয়া আসিল সত্য কি না ? মহিষী লজ্জায় নমুখী হইয়া কিঞ্চিৎ হাস্য করিলেন। বারংবার জিজ্ঞাসা ও অনুরােধ করাতে কহিলেন কেন আর আমাকে লজ্জা দাও, আমি কিছুই জানি না । এই বলিয়া পুনর্বার অধােমুখি হইলেন। এইরূপ অনেক পরিহাসকথার পর শুকনা আপন আলয়ে প্রস্থান করিলেন। ক্রমে ক্রমে গর্ভের উপচয় হওয়াতে মহিষীয় যে কিছু গর্ভদোহ হইতে লাগিল রাজা তৎক্ষণাং সম্পাদন করিতে লাগিলেন। প্রসবসময় সমাগত হইলে মহিষী শুভদিনে শুভলয়ে এক পুত্রসন্তান প্রসব করিলেন। নরপতির পুত্র হইয়াছে শুনিয়া নগরবাসী লােকের আহলাদের পরিকীমা রছিল । রাজবাটা মহােৎসবময় নগর আনন্দময় ও পথ কোলাহলময় হইল। গৃহে গৃহে নৃত্য, গীত, বাদ্য আরম্ভ হইল। নরপতি সানন্দ চিত্তে দীন, দুঃখী, অনাং প্রভৃতিকে অথদান করিতে লাগিলেন। যাহ আকাঙক্ষা করিল তাহাকে তাহাই দিলেন। কারাবন্ধুকে মুক্ত ও ধনহীনকে ঐশ্বৰ্য্যশালী করিলেন। গণকেরা গণনা দ্বারা সুভ লগ্ন স্থির করিয়া দিলে নরপতি পুত্র মুখ নিরীক্ষণ করিবার নিমিত্ত মন্ত্রীর সহিত গৃহে গমন করিলেন। দেখিলেন সূতিকাগৃহের দ্বারদেশে দুই পায়ে সলিলপূর্ণ দুই মঙ্গললস, স্তন্তের উপরিভাগে বিচিত্র কুসুমে এগিত মঙ্গলমালা। পুঞ্জীবর্গ কেহ বা ধষ্ঠী দেবীর পূজা করিতেছে, কেহ বা মাতৃকাগণের বিচিত্র মূর্তি চিত্রপটে শিখিয়েছে। ব্রাহ্মণের মন্ত্র পাঠ পূর্বক সূতিকাগৃহের অভ্যন্তরে শান্তি কাম্বরী। জল নিক্ষেপ করিতেছেন। পুরােহিতের নারায়ণের সহস্র নাম পাঠ কমিলা শুভ ত্যয়ন করিতেছেন। রাজা জল ও অনল স্পর্শ পুক সূতিকাগৃহের অভ্যন্তরে প্রবেশ করিলেন। দেখিলেন রজার মহি. বী অঙ্কে শয়ন করিয়া সূতিকাগৃহ উজ্জল করিয়া রহিয়াছেন। দেহ, এভায় দীপপ্রভা তিরােহিত হইয়াছে। এরূপ অঙ্গসৌষ্ঠব ও বগলাৰণা যে হঠাৎ দেখিলে বােধ হয় যেন, সাক্ষাৎ কুমার রাজকুমাররুপে অব হইয়াছেন। রাজা নিমেষশূ, লোচনে বারংবার দেখিতে লাগিলেন, কিন্তু অন্তঃকরণ তৃপ্ত হইল না। যত বার দেখেন অদৃষ্টপূর্ব ও অভিব শােধ হয়। সম্পূহ ও প্রীতিবিস্ফারিত নেত্র দ্বারা পূনঃপুনঃ অষলােবন করিয়া নব নব আনন্দ অনুভব করিতে লাগিলেন এবং আপনাকে চরিতার্থ ও পরমসৌভাগ্যশালী জ্ঞান করিলেন। শুকনাস সতর্কত' পুর্বক বিবিসিত নয়নে রাজ চুম'য়ে অঙ্গ প্রত্যঙ্গ বিলক্ষণ রূপে পরীক্ষা করিয়া কহিলেন মহারাজ! দেখুন কুমারের অঙ্গে চক্রবর্তী, ভূপতির লক্ষণ সকল লক্ষিত হইতেছে। করতলে শঙ্খচক্ররেখা, চরণতলে পতাকারেখা, প্রশস্ত ললাট, দীর্ঘ লোচন, উন্নত নাসিকা, লােহিত অধর, এই সকল চিহ্ন দ্বারা মহাপুরুষলক্ষণ প্রকাশ পাইতেছে। মন্ত্রী রাজকুমারের এইরূপ রূপ বর্ণনা করিতেছেন এমন সময়ে, মঙ্গশক- নামা এক পুব প্রবেশিয়া রাজাকে নমস্কার করিল ও হর্ষোৎফুললোচনে কহিল মহারাজ! মনােরমার গর্ভে শুকনসের এক পুত্রসন্তান জন্ম- আছে । নরপতি এই শুভ সংবাদ শ্রবণ কধিয়া অমূতবৃষ্টিতে অভিষিক্ত হইলেন এবং আহলাদিত চিত্তে কহিলেন, আজি কি শুভ দিন, কি = সংবাদ শুনিলাম! বিপ বিপদের ও সম্প সম্পদের অনুসন্ধান করে এই জনপ্ৰবাদ কখন মিথ্যা নহে। এই বলিয়া প্রীতিবিকসিত মুখে হাসিতে হাসিতে সমাগত পুরুষকে শুভ সংবাদের অনুরূপ পরিতােধিক কাদরী। লিয়া বিলায় করিলেন। পরে নর্তক, বাদক ও গায়কগণ সমভিব্যা, হারে শুকনাসের মন্দিরে গমন করিয়া মহামহােৎসবে প্রবৃত্ত হই লেন। এম দিবসে পবিত্র মুহূর্তে কোটি কোটি গাভী ও সুবর্ণ শ্রাহ্মসাৎ করিয়া ও দীন দুঃখীকে অনেক ধন দিয়া নরপতি পুত্রের নামকরণ করিলেন। স্বপ্নে দেখিয়াছিলেন পূর্ণচন্দ্র রাজ্ঞীর মুখমণ্ডলে প্রবেশ করিতেছে সেই নিমিত্ত পুত্রের নাম চন্দ্রাগুড় রাখিলেন। মন্ত্রীও ব্রাহ্মণপাচিত সমস্ত ক্রিয়া সম্পাদন পূর্বক রাজার অভিমতে আপন পুত্রের নাম বৈশম্পায়ন রাখিলেন। ক্রমে চূড়াকরণ প্রভৃতি সমুদায় সংস্কার সম্পন্ন হইল। বুম'রে ক্রীড়ায় কালক্ষেপ না হয় এই নিমিত্ত রাজা নগরের প্রান্তে শিবানীর গায়ে এক বিদ্যামন্দির প্রস্তুত করাইলেন। বিদ্যামন্দিরের এক পাশ্বে অশালা ও নিমে ব্যায়ামশালা প্রস্তুত হইল। চতুর্দিক উন্নত প্রাচীর দ্বারা পরিবৃত হইল। অশেষৰিদ্যাপারদশী মহামহােপাধ্যায় অধ্যাপকগণ অতিযদ্ধে আনীত ও শিক্ষাপ্রদানে নিয়ােজিত হইলেন। নরপতি শুভ দিনে অপু চাপড় ও মন্ত্রিপুত্র বৈশম্পায়নকে তাহাদিগের নিকটে সমর্পণ করিলেন। প্রতিদিন মহিষীর সহিত খয় বিদ্যামন্দিরে উপস্থিত হইয়া তত্ত্বাবধান করিতে লাগিলেন। রাজকুমার এরূপ বুভিমান ও ছুর ছিলেন যে, অধ্যাপকগণ তঁাহার নব ন বুদ্ধিকৌশল দর্শনে চমৎকৃত ও উৎসাহিত হইয়া সমধিক পরিশ্রম স্বীকার পুৱক শিক্ষা দিতে লাগি লেন। তিনিও মন ও ক্রীড়াবিহিত হইয়া ক্রমে ক্রমে সমস্ত বিদ্যা অধ্যয়ন করিলেন। তাঁহার হৃদয়দর্পণে সমুদায় কলা সংক্রান্ত হইল। অল্পকালের মধ্যেই শশা, বিজ্ঞানশাস্ত্র, রাজনীতি, ব্যায়াম- কেশন, অস্ত্র ও গীৰিা, সর্বশেষ এবং কাব্য, নাটক, ইতিহাস প্রভূতি সমুদা শিখিলেন। ব্যায়ামভাবে শরীর এরূপ লয় হইল কাদরী। ২৭ যে, করন্থ সকল সিংহের যারা আক্রান্ত হইলে যেরূপ নড়িতে চড়িতে পারে না, সেইরূপ তিনি ধরিলেও এক পা চলিতে পারি না। ফলতঃ এরূপ পন্থাক্রান্ত ও শক্তিশালী হইলেন যে, দশ জন বলবান পুরুষ যে মুর তুলিতে পারে না, তিনি অবলীলাক্রমে সেই মুগর পুর্বক ব্যায়াম করিতেন। ব্যায়াম ব্যতিরেকে আয় সকল বিদ্যায় বৈশম্পায়ন চাপড়ের অনু, রূপ হইলেন। শৈশবাবধি একত্র বাস একত্র বিদ্যাভাস প্রমুক্ত পরস্পর অকৃত্রিম প্রণয় ও অকপট মিত্রতা জন্মিল। বৈশম্পায়ন ব্যতিরেকে রাজকুমার এক মুহূর্তও একাকী থাকিতে পারিতেন না। বৈশম্পায়নও সর্বদা রাজকুমারের নিকটবর্তী থাকিতেন। এইরূপে বিদ্যালয়ে বিদ্যা ভ্যাস করিতে করিতে শৈশবকাল অতীত ও যৌবনকাল সমাগত হইল। চন্দ্রোদয়ে প্রদোষের যেরূপ রমণীয়তা হয়, গগনমণ্ডলে ইমু উদিত হইলে বর্ষাকালের যেরূপ শােভা হয়, কুসুমমামে কলপাপের যেরূপ এ হয়, যৌবনারম্ভে রাজকুমার সেইরূপ পরমরমণীয়তা ধারণ করলেন। বক্ষস্থল বিশাল, উরুযুগল মাংসল, মধ্যভাগ ক্ষীণ, ভুজদ্বয় দীর্থ, স্কন্ধদেশ স্থূল এবং স্বর গম্ভীর হইল। উমরূপে বিদ্যাশিক্ষা হইলে আচার্য্যেরা বিদ্যালয় হইতে গৃহে যাইবার অনুমতি দিলেন। তদনুসারে এ চাপীড়কে বাটীতে আনাইবার নিমিত্ত শুভ দিনে অনেক তুরঙ্গ, মাতঙ্গ, পাতি সৈন্ত, গম ভিব্যাহারে দিয়া সেনাধ্যক্ষ বলাহককে বিদ্যামন্দিরে পাঠাইয়া দিলেন। সমাগত অন্যান্য রাজগণও চাপড়ের দর্শনলালসায় বিদ্যালয়ে গমন করিলেন। বলাহক বিদ্যামন্দিরে প্রবেশিয়া রাজকুমারকে প্রণাম করিয়া কৃতাঞ্জলি নিবেদন করিল কুমার! মহায় কহিলেন “আমাদিগের মােরখ পুর্ণ হইয়াছে। তুমি সমস্ত শা, সফল কলা ও সমুদায় আষুধ কাদম্বরী। বিদ্যা অভ্যাস করিয়াছ। এক্ষণে আচার্য্যেরা বাটীতে আসিতে অনুমতি দিয়াছেন। প্রজারা ও পরিজমেরা দেখিতে অতিশয় উৎসুক হইয়াছে। অতএব আমার অভিলাষ, তুমি অবিলম্বে বাট আসিয়া গর্শনােক পরিগিকে গর্শন জিয়া পরিতৃপ্ত কর এবং ব্রাহ্মণদিগের সমাদর, মানি লােকের মানরক্ষা, সন্তানের মা প্রজাদিগের প্রতিপালন ও বন্ধুবর্ণের আনলোৎপাদন পূর্বক পরম সুখে রাজ্য সম্ভোগ কর।” আপনার আরাে হণের নিমিত্ত মহাৱা ত্রিভুবনের এক অমূল্য র স্বরূপ, বায়ু ও গরুড়ের জায় আবেগগামী। ইস্রাধনামা অপূর্ব যােক প্রেরণ করিয়াছেন। ঐ যেটক সাগরের প্রবাহমধ্য হইতে উখিত হয়। পারদেশের অধিপতি মহারত্ব ও আশ্চৰ্য্য পদার্থ বলিয়া উহা মহারাজকে উপহার দেন। অনেক অনাবিং পণ্ডিতেরা কহিয়াছেন, উচ্চৈঃশ্রবার যে সকল সুলক্ষণ নিতে পাওয়া যায়, উহারাও সেই সকল লক্ষণ আছে। মূলতঃ ইয়ুথ সাপ্ত ঘোটক নয়। আমরা ঐরূপ ঘােটক কখন দেখি নাই। ঘরদেশে বহু আছে অনুমতি হইলে আনয়ন করা যায়। দর্শনা লিষী রাজারাও সাক্ষাৎ করিতে আসিয়া বাহিরে আপনার প্রতীক করিতেছেন। বলাহক এই কথা কহিলে চাপড় গম্ভীর স্বরে আদেশ করিলেন ইন্দ্রানুষকে এই স্থানে লইয়া আইস। আজ্ঞামাত, অতি বৃহৎ স্থূলকায়, মহাতেজী, প্রচণ্ডবেগশালী, কলস ইস্রায়ুধ আনীত হইল। ঐ ঘােটক এরূপ বলিষ্ঠ ও তেজস্বী যে, দুই বধু পুরুষ উভয় পার্শ্বে মুখের বগা এরিয়াও উন্নয়নের সময় মুখ নিম করিয়া রাখিতে পারে না। এরূপ উচ্চ যে, উন্নত পুরুষেরাও কর প্রসারিত করিয়া পৃষ্ঠদেশ স্পর্শ করিতে পারে না। চাপড় পুলক্ষণসম্পন্ন অদ্ভুত অ অবলােক করিয়া অতিশয় বিপন্ন হইলেন। মনে চিন্তা করিলে অনু ও বঙ্গ।
কাম্বরী। সাগর মন্থন করিয়া কি রত্ন লাভ করিয়াছেন? দেরাজ ইন্দ্র ইহার পৃষ্ঠে আরোহণ করেন নাই তাহার ত্রৈলােক্যাধিপত্যই বিফল । জনিধি তাহাকে সামা উচ্চৈঃশ্রবা ঘােটক প্রদান করিয়া প্রতারণা করিয়াছেন। দেবাদিদেব নারায়ণ যদি ইহাকে নেত্রগােচর করেন, বােধ হয় পক্ষিরা গরুড়ের পৃষ্ঠে অবােহ জন্য তাহার আর অহঙ্কার থাকে না। পিতার কি আধিপত্য। ত্রিভুবনদুর্লভ এতাদৃশ বত্ব সকল তিনি সংগ্রহ করিয়াছেন। ইহার আকার ও লক্ষণ দেখিয়া বােধ হইতেছে এ প্রকৃত যেটক নয়। কোন মহাত্মা শাপগ্রস্ত হইয়া শশ্বরূপে অবতীর্ণ হইয়া থাকিবেন। এইরূপ চিন্তা করিতে করিতে আসন হইতে গাত্রোখান করি অখের নিকট উপস্থিত হইয়া মনে মনে নমস্কার ও আরোহণ জন্য অপরাধের ক্ষমা প্রার্থনা পূৰ্ব্বক পৃষ্ঠে আরােহণ করিলেন ও বিদ্যালয় হইতে বহির্গত হইলেন। বহিঃস্থিত অখারূঢ় নৃপতিগণ চন্দ্ৰাপীড়কে দেখিবামাত্র আপনাদিগকে কৃতার্থ বােধ করিলেন এবং সাক্ষাৎকার লালসায়ক্রমে ক্রমে সকলেই সম্মুখে আহিতে লাগিলেন। বলাহক একে একে সকলের নাম ও বংশের নির্দেশ পূৰ্ব্বক পরিচয় দিয়া দিল। বুজ কুমার মিষ্ট সম্ভাষণ দ্বারা যথােচিত সমাদর করিলেন। তাহাদিগের সহিত নানাপ্রকার সদালাপ করিতে করিতে গুখে নগরাভিমুখে গমন কঠিতে লাগিলেন। বন্দিগণ উচ্চৈঃস্বরে সুললিত মধুর প্রবন্ধে তিপাঠ করিতে লাগিল। ভূতের চামর ব্যন ও মস্তক ছত্র ধারণ করিল। বৈশম্পায়নও অঙ্ক তুঙ্গমে আরােহণ করিয়া রাজকুমারের পশ্চাৎ পশ্চাৎ চলিলেন। চাপড় ক্রমে ক্রমে নগরের মধ্যবর্তী পথে সমাগত হইলেন। নগৰু- বী সমন্ত কার্ঘ্য পরিত্যাগপূর্বক রাজকুমারের সুকুমার আকার অব লােকন করিতে লাগিল। নগরস্থ সমস্ত বার বার উটিত "ওয়ায় বোধ .
কাদম্বরী। হইল যেন, মগরী চত্ৰাপীড়কে দেখিবার নিমিত্ত একেবারে সহস্র সহ নেত্ৰ উমলন করিল। চাপড় নগরে আসিতেছেন শুনিয়া রমণীগণ অতিশয় উৎসুক হইল এবং আপন আপন আয়ব্ধ কৰ্ম্ম সমাপন না করি- যাই কেহ বা অলক্তক পরিতে পরিতে, কেহ বা কেশ বধিতে বাধিতে বাটায় বহির্গত হইয়া, কেহ বা প্রসাদোপরি আরােহণ করিয়া এক দৃষ্টিতে পধু পানে চাহিয়া রহিল। একবারে সােপানপরম্পরায় শত শত কামিনী জনের অসমে পাদনিক্ষেপ করায় প্রাসাদমধ্যে একপ্রকার অভূতপূর্ব ও অশ্রুতপুর্ব ভূষণণব্দ সমুংপন্ন হইল। গবাক্ষ জালের নিকটে কামিনী গণের মুখপরস্পর বিকসিত কমলের ন্যায় শােভা পাইতে লাগিল। স্ত্রীগণের চরণ লইতে আর্দ্র অলক্তক পতিত হওয়াতে ক্ষিতিল পল্লবময় বােধ হইল। তাহাদিগের অঙ্গশোভায় নগর লাবণ্যময়, অলঙ্কারপ্রভাষ দিঘলয় ইন্দ্ৰায়ুধময়, মুখমণ্ডলে ও লােচনপরস্পরায় গগনমণ্ডল চন্দ্রময় পথ নীলােৎপলময় বােধ, হইতে লাগিল। রাজকুমারের মােহিনী মুক্তি দেখিয়া বিলাসিনীগণ চমৎকৃত ও মােহিত হইয়া পরস্পর পরিহাসপূৰ্ব্বক কহিতে লাগিল সখি! এই পৃথিবী তে সেই ধন্য ও সৌভাগ্যবতী ; এই পুরুষরতু যাহার কর গ্রহণ করিবেন। আহ! এরূপ পরম সুন্দর পুরুষ ত কখন দেখি গই। বিধি বুঝি পুরুষনিধি করিয়া ইহার সৃষ্টি করিয়া থাকিবেন। যাহা হউক, আজি আমরা অঙ্গবিশিষ্ট অনঙ্গকে প্রত্যক্ষ করলাম। ফলতঃ নিৰ্ম্মল জলে ও স্বচ্ছ স্ফটিকে যেরূপ প্রতিবিম্ব পতিত হয়, সেইরূপ কামিনীগণের হৃদয়দর্পণে চন্দ্ৰাপীড়ের মােহিনী মুক্তি প্রতিবিম্বিত হইল। রাজকুমার ক্ষণকাল পরে তাহাদিগের দৃষ্টির অগােচর হইলেন, জয়ের অগোচর কোন কালেই হইতে পারিলেন না। রাজ- কুমার রাজবাটীর সমীপবর্তী হইলে পপৗরাঙ্গনারা পুষ্পবৃষ্টির গায় তঁাহার মকে মঙ্গল জাঞ্জলি বর্ষণ করিল।
কাদম্বরী। ফ্রমে দ্বারদেশে উপস্থিত হইয়া ঘােটক হইতে অবতীর্ণ হইলেন । বলা- হক অগ্ৰ অগ্রে পথ দেখাইয়া চলিল। রাজকুমার বৈশম্পায়নের হস্ত ধারণপুর্বক রাজভবনে প্রবেশ করিলেন। দেখিলেন শত শত বঙ্গবন্ দ্বার- পাল অস্ত্র শস্ত্রে সজ্জিত হইয়া দ্বারে দণ্ডায়মান আছে। দ্বাৰদেশ অতিক্রম করিয়া দেখিলেন কোন স্থানে ধনু, বাণ, তরবারি প্রভৃতি নানাবিধ অস্ত্র শয়ে পরিপূর্ণ অস্ত্রশালা ; কোন স্থানে সিংহ, গণ্ডার, করা, করভ, ব্যাস্ত্র, ভন্ন ক প্রভৃতি ভঙ্কর শশুসমাকীর্ণ পশুশালা ; কোন স্থানে ন নাদে ণীয়, সুলক্ষণ সম্পন্ন, নানা প্রকার অশে বেষ্টিত মন্থরা;কোন স্থানে কুরী কোকিল, র জহংস, চাতক, শিখণ্ডী, শুক, শারিকা প্রভৃতি পক্ষিণের মধুর কোলাহলে পরিপুর্ণ পক্ষিশালা ; কোন স্থানে বেণু, বীণা, মুজ, মৃদঙ্গ প্রভৃতি নানাবিধ বাদ্যযন্ত্রে বিভূষিত সঙ্গীতশালা ; কোন স্থানে বিচিত্র- শেভিভ চিত্রশালকা শােভা পাইতেছে। ত্ৰিম ক্রীড়াপৰ্বত, মনােহর সমাের, সুরমা জলযন্ত্র, রমণয় উপবন স্থানে স্থানে রহিয়াছে। অশেষ- দেশভাষাজ্ঞ নীতিপরায়ণ ধার্মিক পুরুষেরা ধৰ্ম্মাধিকরণমন্দিরে উপবেশন পূৰ্ব্বক ধৰ্ম্মশাস্ত্রের মানুসারে বিচার করিতেছেন। সমাগত পুরুষেরা বিবিধরত্নাসনভূষিত সভামণ্ডপে বসিয়া আছেন। কোন স্থানে নবীর নৃত্য, গায়কের। সঙ্গীত ও বন্দিগণ শুতিপাঠ করিতেছে। জলচর পক্ষী সকল কেলি করিয়া বেড়াইতেছে, বাকবালিকাগ ময়ূর ও ময়ূরীর সহিত ক্রীড়া করিতেছে। হরিণ ও হরিণ গণ মানুষ সমাগমে ত্রস্ত হইয়া ভয়চকিত লােচনে বাটীর চতুর্দিকে দৌড়িতেছে। অনন্তর ছয় প্রকোষ্ঠ অতিক্রম করিয়া সপ্তম প্রকোষ্ঠের অভ্যন্তরে প্রবেশিয়া মহারাজের আবাসগৃহের নিকটবর্তী হইলেন। অন্তঃপুর- পুরী রাজকুমারকে দেখিবামাত্র আনন্দিত মনে মঙ্গলাচরণ করিতে লাগিল। মহারাজ পরিস্কৃত শষ্যমণ্ডিত পৰ্যঙ্কে বিষয় আছেন, শরীর .
কাদম্বরী। রক্ষাধিক অস্ত্রধারী দ্বারপালেরা সতর্কতা পুক প্রহরীর কাৰ্য করি- তেছে ; এমন সময়ে চাপড় পিতার নিকট উপস্থিত হইলেন। “মহা. জ অবলােকন করুন” দ্বারপাল এই কথা কহিলে, রাজা দৃষ্টিপাত পূর্বক বৈশম্পায়নসমভিব্যাহারী চাপড়কে সমাগত দেখিয়া সাতিশয় আনন্দিত ইলেন। কারণ পূর্বক প্ৰণত পুত্রকে গাঢ় আলিঙ্গন করিলেন। তাহার স্নেহবকসিত লােচন হইতে আনন্দাশ্রু নির্গত হইতে লাগিল। বৈশম্পায়নকে ও সমাদরে আলিহন করিয়া আসনে উপবেশন করিতে কহিলেন। ক্ষণকাল তথায় বসিধা রাজকুমার জননীর নিকট গমন করিলেন। পুবৎসলা বিলাসৰতী নিগ্ধ ও ঋতি প্রফুল্ল নয়নে পুলকে পূঃপুনঃ নিরীক্ষণ করিয়া তাহার মন্তক আঘ্রাণ ও হন্তদ্বারা গ'স্পর্শ পূর্বক আপন উৎস দেশে বসাইলেন ও মেহসংবলিত মধুর বচনে বলিলেন বৎস! তােমাকে নানা বিদ্যায় বিভূষিত দেখিয়া নয়ন ও মন পরিতৃপ্ত হল। এক্ষণে বধূসহচারী দেখিলে সকল মনােরথ পূর্ণ হয়। এই কথা কহিয়া লজ্জা বনত পুত্রের কপােলদেশে চুম্বন করিতে লাগিলেন। রাজকুমার এইকপে সমস্ত অন্তঃপুরবাসিনীদিগকে ক্ষন দিয়া আহলাদিত করিলেন। পরিশেষে শুকনাসের ভবনে পস্থিত হলেন। অমাতের ভান ও এরুপ সমৃদ্ধি সম্পন্ন যে, রাজবাটী হইতে বিভিন্ন বােধ হয় না। শুকনাস সােমপে বদি আছেন। সমাগত সাম ও ভূপতিগণ চতুর্দিকে বেন করিয়া রহিয়াছেন; এমন সময়ে চাপড় ও বৈশম্পায়ন তথায় প্রবেশিত। সকলে সসম্রমে গাতোখান পূর্ষক সমাদরে সম্ভাষণ করল। শুকনাস প্ৰণত পুত্র ও রাজকুমারকে যুগপৎ, আলিঙ্গন করিয়া পম পরিতুষ্ট হইলেন। পরে রাজনন্দনকে সম্বােধন করিয়া কহিলেন বৎস চাপীড়। অদ্য তােমাকে কৃতবিদ্য দেখিয়া মা- - কাদম্বরী। আজ যেরূপ সন্তুষ্ট হইয়াছেন শত শত সাম্রাজ্যলাভেও তাদৃশ সন্তোষের সন্তান। নাই। আজি গুরুজনের আশীর্বাদ ও মহারাজের পূজন্মজ্জিত সুকৃতি ফলিল। আজি কুলদেবতা প্রসন্ন হইলেন। প্রজাগণ কি ধন্য ও পুণ্যবান। যাহাদিগের প্রতিপালনের নিমিত্ত তুমি ভূমণ্ডলে অবতীর্ণ হইয়াছ। বসুমতী কি সৌভাগ্যবতী! যিনি পতিভাবে তােমার আরাধনা করিলেন। ভগবান যেরূপ নানা অবতার হইয়া ভূভার বহন করিয়া থাকেন, তুমিও সেইরূপ যৌবরাজ্যে অভিষিক্ত হইয়া ভূভার বহন ও প্রজাদিগের প্রতিপালন কর। রাজকুমার শুকনাশের সভায় কণ কাল অস্থিতি করিয়া মনােমার নিকট গমন ও ভক্তিপূৰ্ব্বক তঁাহাকে নমস্কার করিলেন। তথা হইতে বাটা আসিয়া স্নান, ভােজন প্রভৃতি সমুদায় কৰ্ম্ম সম্পন্ন করিয়া মহারাজের আজ্ঞানুসারে শ্রীমণ্ডপনামক প্রসাদে গিয়া বিশ্রাম করিতে লাগিলেন। মণ্ডপের নিকটে ইন্দ্ৰায়ুধেয় বাস- স্থান নির্দিষ্ট হইল। দিবাবসানে পিঙ্গুল লােহিত বর্ণ হইল, সন্ধ্যারাগে রক্তবর্ণ হইয়া চক্র বা কমিথুন ভিন্ন ভিন্ন দিকে উৎপতিত হওয়াতে বােধ হইল যেন, বিরহ- বেদনা স্মৃতিপথারূঢ় হওয়াতে তাহাদিগের হৃদয় বিদীর্ণ হইয়াছে ও পাত্র হইতে রক্তধারা পড়িতেছে। সম্মানিত ব্যক্তিরা বিপদকালেও নীচ পদীতে পদার্পণ করেন না, ইহাই জানাইবার নিমিত রবি অস্তগমন- কালেও পশ্চিমাঞ্চলের উন্নত শিখর অশ্রর করিগেন। দিনকর অস্তগত হইলেন কিন্তু রজনী সমাগতা হয় নাই। এই সময়ে তাপের বিগম ও অকারের অনুদয় প্রযুক্ত লােকের অন্তঃকরণ আনন্দে প্রফুল্প হইল। সূৰ্য্যরূপ সিংহ অস্তাচলের গুহাশায়ী হইলে ধ্বান্তরূপ দস্তিষুধ নিয়ে জগৎ আক্রমণ করিল। নলিনী দিনমণির বিরহে অনিরূপ অশ্রুজল পরি- ভ্যাণ পূর্বক কমলরূপ নেত্র নিমীলন করিল। বিহঙ্গমকুল কোলাহল কাদম্বরী। করিয়া উঠিল। অনন্তর প্রজ্বলিত প্রদীপশিখা ও উজ্জ্বল মণির স্বালােকে রাজবাটীর তিমির নিবন্ত হইয়া গেল। চন্দ্রপীড় পিতা মাতার নিকটে নানা কথা প্রসঙ্গে ক্ষণ কালক্ষেপ করিয়া আহারাদি করিলেন। পরে আপন প্রাসাদে আগমন পূর্ধক কোমলশয্যামণ্ডিত পৰ্যঙ্কে সুখে নিদ্র গেলেন। প্রভাত হইলে পিতার অনুমতি লইয়া শিকারী কুকুর, শিক্ষিত হস্ত", সেগমা অর্থ ও অসংখ্য অারী বীরপুরুষ সমভিব্যাহারে করিয়া মৃগয়ার্থ বনে প্রবেশিলেন । দেখিলেন উদারস্বভাব 7িংহ সম্রাটের ন্যায় নির্ভয়ে গিরি গুহায় শধুন করিয়া আছে । হিংস্র শানূল ভয়ঙ্কর আকার স্বীকার পূর্বক পশুদিগকে আক্রমণ করিতেছে। মৃগকুল ত্রস্ত ও শশব্যস্ত হইয়া ত্বরিত বেগে ইতস্ততঃ দৌড়িতেছে। বন্য হস্তী দলবদ্ধ হইয়া চলিতেছে। মহিষ- কুল রক্তবর্ণ চক্ষু দ্বারা ভয় প্রদর্শন করিয়া নির্ভয়ে বেড়াইতেছে। বরাহ, উল্ল ক, গণ্ডার প্রভূতির ভীষণ আকার দেখিলে ও চীংকার শব্দ শুনিলে কলেবর কশিত হয়। নিবিড় বন, তথায় সূর্যের কিরণ প্রায় প্রবেশ করিতে পারে না। বু’জকুমার এতাদৃশ ভীষণ গহনে প্রবেশি। ভল্ল ও নাচ ধারা ভল্লক, সারঙ্গ, শূকর প্রভৃতি বহুবিধ বন্যপশু মারিয়া ফেলিলেন। কোন কোন পশুকে আঘাত না করিয়া কেবল কৌশলক্রমে ধরিলেন। মৃগয়াবিষয়ে এরূপ সুশিক্ষিত ছিলেন যে উড্ডীন বিহবলীকেও অবলীলা- ক্ৰমে ৰণবিদ্ধ করিতে লাগিলেন। বেলা দুই প্রহর হইল। সূর্যমণ্ডল ঠিক মস্তকের উপরিভাগ অমিময় কিরণ বিস্তার করিল। সূর্যের আতপে মৃগয়াজ শ্রমে একান্ত ক্লা হওয়াতে রাজ চুমারের বারিতে পরিপুত হইল। স্বেদা শরীরে বিবিধ কুসুমরে পড়িত হওয়াতে ও বিন্দু বিন্দু রক্ত লাগাতে যেন অঙ্গে অঙ্গরাগ ও রক্তচন্দন লেপন } কাদম্বরী। করিয়াছেন, বােধ হইল। ইন্দ্ৰায়ুধের মুখে ফেনপুঞ্জ ও শরীরে স্বেজল বহির্গত হইল। সেই রৌদ্রে স্বহস্তে নব পল্লবের ছত্র ধরিয়া সমভিব্যাহারী রাজগণের সচিত মুগয়ার কথা কহিতে কহিতে বাটা প্রত্যাগমন করি- লেন। দ্বারদেশে উপস্থিত হইয়া তুরঙ্গ হইতে অবতীর্ণ হইলেন। তথায় মুগয়াবেশ পরিত্যাগ ও ক্ষণকাল বিশ্রামের পর স্নান করিয়া অঙ্গে অঙ্গরাগ লেপন ও গট্টবসন পরিধান পূর্বক আহারমণ্ডপে গমন করিলেন। আপনি আহার করি স্বহস্তে ইয়ুধের ভােজনসামগ্রী আনিয়া দিলেন। দিন এইরূপে অতিবাহিত হইল। পর দিন প্রাতঃকালে আপন প্রাসাদে বসিয়া আছেন এমন সময়ে কৈলাস নমক ককী স্বর্ণালঙ্কারভূষিতা এক সুন্দরী কুমারীকে সঙ্গে করিয়া তথায় উপস্থিত হইল, বিনীত বচনে কহিল কুমার! দেব আদেশ করিলেন, এই কন্যাকে আপনার তাম্বুলকৱস্থবাহিনী করুন। কুলুতদেশীর রাজার দুহিতা, নাম পত্রলেখা। মহারাজ বুলত রাজধানী জন্ধ করিয়া এই কন্যাকে বন্দী করিয়া আনেন ও অল্প পুবপরিচারিকার মধ্যে নিবেশিত করেন। রাণী পরিচয় পাই?। আপন কন্যরি স্যায় লালন পালন ও রক্ষণাবেক্ষণ করিছেন এবং অতিশয় ভাল 'বাপি থাকেন ইহাকে সামান্য পরিচারিকার স্থায় জ্ঞান করিবেন না। সখী ও শিষ্যার ন্যায় বিশ্বাস করিবেন। রাজকন্যার সমুচিত সমাদর করিবেন। ইনি অতিশয় সুশীল ও সরস্বভাব এবং এরূপ গুণবর্তী যে আপনাকে ইহঁার গুপে অবশ্য বশীভূত হইতে হইবেক। আপাতত ইহঁ কুলশীলের বিষয় কিছুই জানেন না বলিয়া কিঞ্চিৎ পরিচয় দিলাম। 'কীর মুখে জননীর আজ্ঞা শুনিয়া নিষেশূন্স লােম পত্রলেখাকে দেখিতে লাগিলেন। তাহার আকার দেখিয়াই বুঝিলেন ঐ কন্যা সামান্য কন্যা নহে। অনন্তর জননীর আদেশ গ্রহণ করিলাম কাদম্বরী। 4 বলিয়া ক°কীকে বিদায় দিলেন। পত্ৰলেখা তামূলকঙ্কবাহিনী হইয়া ছায়ার ন্যায় রাজকুমারের অনুবৰ্ত্তিনী হইল। রাজকুমারও তাহার গুণে প্রত ও প্রসন্ন হইয়া দিন দিন নব নব অনুরাগ প্রকাশ করিতে লাগিলেন। কিছু দিন পর রাজা চন্দ্ৰাপড়কে যৌবরাজ্যে অভিষেক করিতে অভিলাষ করিলেন। রাজকুমার যুবরাজ হইবেন এই ঘােষণা সর্বত্র প্রচারিত হইল। রাজবাটী মহােৎসবময় ও নগর আনন্দকোলাহলে পরিপূর্ণ হইল। অভিষেকের সামগ্ৰীসম্ভার সংগ্রহের নিমিত্ত লােক সকল দিগদিগন্তে গমন করিল। একদা কার্যক্রমে চাপড় অমাত্যের বাটাতে গিয়াছেন; তথায় শুক.. তাঁহাকে সম্বােধন করিয়া মধুর বচনে কহিলেন কুমার ! তুমি সমস্ত শাস্ত্র অধ্যায়ন ও সমুদায় বিদ্যা অভ্যাস করিয়াছ, সকল কলা শিখিয়াছ, ভূমলে জন্মগ্রহণ করিয়া যাহা জ্ঞাতব্য সমুদায় জানিয়াছ। তােমার অজ্ঞাত ও, উপদেষ্টব্য কিছুই নাই। তুমি যুবা, মহারাজ তোমাকে যৌবরাজ্যে অভিষিক্ত ধনসম্পত্তির অধিকারী করিতে ইচ্ছা করিয়াছেন। সুতরাং যৌবন, ধনসম্পত্তি, প্রভুত্ব, তিনেরই অধিকারী হইলে। কিন্তু যৌবন অতি বিষম কাল । যৌনরূপ বনে প্রবেশিলে বন্য জন্তুর ন্যায় ব্যবহার হয়। যুবা পুরুষো কাম, ক্রোধ, লােভ প্রভৃতি পশুধৰ্ম্মক সুখের হেতু ও স্বর্গের সেতু জ্ঞান করে। যৌবনপ্রভাবে মনে এক প্রকার তম উপস্থিত হয় উ কিছু তেই নিরত হয় না। যৌবনের আনন্তে অতি নিল বুদ্ধিও বর্ষাকালীন নদীর ন্যায় কলুষিত হয়। বিষয়তৃষ্ণা ইন্দ্রিয়গণকে আক্রমণ করে । তখন অতিগহিত অসৎ কর্মকেও দুষ্কর্ম বলিয়া বােধ হয় না। তখন লােকের প্রতি অত্যাচার করিয়া স্বার্থসম্পাদন করিতেও •া বােধ হয় না। বুরাপান না করিলেও চক্ষুর দোষ না থাকিলেও ধনে কাদম্বরী। যতা ও অন্ধতা জন্মে। ধনমদে উন্মত্ত হইলে হিতাহিত বা সং সদ্বিবেচনা থাকে না। অহঙ্কার ধনের অনুগামী। অংস্কৃত পুরুষেরা মানুষকে মানুষ জ্ঞান করে না। আপনাকেই সর্বাপেক্ষা গুণবন, বিদ্বান্ ও প্রধান বলিয়া ভাবে, অন্যের নিকটেও সেইরূপ প্রকাশ করে। তাহার স্বভাব এরূপ উদ্ধত হয় যে, আপন মতের বিপরীত কথা শুনিলে তৎক্ষণাৎ খঙ্গহস্ত হইয়া উঠে। প্রভুত্বরূপ হলাহলের ঔষধ নাই। প্ৰভুজনের অধীন লােকদিগকে মাসের ন্যায় জ্ঞান করে। আপন সুখে সন্তুষ্ট থাকিয়া পত্রের দুঃখ সন্তাপ কিছুই দেখতে পায় না। তাহা প্রায় স্বার্থপর ও অন্যের অনিষ্টকারক হইয়া উঠে। যৌবরাজ্যে, যৌবন প্রভুত্ব ও অতুল ঐশ্বৰ্য, এ সকল কেবল অনর্থপরম্পরা। অসামাঞ্চ- ধীশক্তিসম্পন্ন ব্যক্তিরাই ইহার তরঙ্গ হইতে উত্তীর্ণ হইতে পারেন। তীক্ষবুদ্ধিরূপ দৃঢ় নৌকা না থাকিলে উহার প্রবল প্রবাহে মগ্ন হইতে হয়। একবার মগ্ন হইলে এর উঠিবার সামর্থ্য থাকে না সংশে জন্মিশেই যে,সৎ ও বিনীত হয় এ কথা অগ্রাহ। উর্বর ভূমিতে কি কণ্টকীবৃক্ষ জমে না? চন্দনকাঠের ঘর্ষণে যে অগ্নি নির্গত হয় উহার কি আহশক্তি থাকে না? ভদৃশ বুদ্ধিমান্য ব্যক্তিরাই উপদেশের যথার্থ পাত্র। মুখকে উপদেশ দিলে কোন ফল হয় না। দিবাকরের কিরণ কি স্ফটিকমপির স্থায় মৃৎপিণ্ডে প্রতিফলিত হইতে পারে? সদুপদেশ অমূল্য ও অসমুদ্রসম্ভত রহু। উহা শরীরের বৈরূপ্য প্রভৃতি জর'র কাৰ্য প্রভৃতি করিয়াও বুদ্ধত্ব সম্পাদন করে। ঐশ্বর্যশালীকে উপদেশ দেয় এমন লােক অতিবিরল। যেমন গিরিগুহার নিকটে শব্দ করিলে প্রতিশব্দ হয় ; সেইরূপ পাশ্ববর্তী লােকের মুখে প্রভুবাক্যে, প্রতিধ্বনি হইতে থাকে । অর্থাৎ প্রভু যাহা কহেন পরিষদের তাহাই যুক্তিযুক্ত বলিয়া অঙ্গীকার করে। প্রভুর নিতান্ত অসঙ্গত ও অন্যায় কথাও পারিষদদিগের নিকট সুসঙ্গত ও কাদম্বরী। । ব্যায়ানুগত হয় এবং সেই কথার পুনঃপুনঃ উল্লেখ করিয়া তাহারা প্রভু কতই প্রশংসা করিয়া থাকে। তাহার কথার বিপরীত কথা বলিতে কাহারও সাহস হয় না। যদি কোন সাহসিক পুরুষ ভয় পরিত্যাগ করিয়া তঁাহার কথা অন্যায় ও অমুক্ত বলিয়া বুঝাইয়া দেন তথাপি তাহা গ্রাহ হয় না। প্রভু সে সময় বধির হন অথবা ক্রোধান্ধ হইয়া অত্মমতের বিপরীতদীর অপমান করেন। অর্থ অনর্থের মূল। মিথ্যা অভিমান, অকিঞ্চিৎকর অহঙ্কার ও বৃথা ঔদ্ধত্য প্রায় অর্থহইতে উৎপন্ন হয়। প্রথমতঃ লক্ষ্মীর প্রতি বিবেচনা করিয়া দেখ। ইনি অতিদুঃখে । লন্ধ ও অতিযত্নে রক্ষিত হইলেও কখন এক স্থানে স্থির হইয়া থাকেন না। রূপ, গুণ, বৈদগ্ধ্য, কুশল, কিছুই বিবেচনা করে না। রূপবা, বান্, বিদ্বান, সদ্বংশজাত, সুশীল ব্যক্তিকেও পরিত্যাগ করিয়া জঘন্য পুরুষাধমের আশ্রয় লন। দুরাচার সম্মী যাহাকে আশ্রয় করে, যে বানপালনগর ও সুব্ধ প্রকৃতি হইয়া দূতক্রীড়াকে বিনােস, পশু- ধর্মকে রসিকতা, যথেষ্টাচারকে প্রভুত্ব ও মৃগয়াকে ব্যায়াম বলিয়া গণমা করে। মিথ্যা অতিবাদ করিতে না পারিলে ধনীদিগের নিকট জীবিকা লাভ করা কঠিন। যাহারা অকাৰ্যপরাঘুখ ও ৰদ্ধাঞ্জলি হইয়া ধনে পরকে জগদীশ্বর বলিয়া বর্ণনা করে, তাহারাই ধনিগণের সন্নিধানে বসিতে পায় ও প্রশংসাভাজন হয়। প্রভু স্ততিবাদককে যথার্থী বলিয়া জ্ঞান করেন, তাহার সহিতই আলাপ করেন, তাহাকেই সদ্বি- বেচক ও বুদ্ধিমান্ বলিয়া ভাবেন, তাহার পরামর্শক্রমেই কাৰ্য করিয়া থাকেন। স্পষ্টবক্তা উপদেষ্টাকে সিন্দুক বলিয়া অবজ্ঞা করেন, নিকটে বসিতে দেন না। তুমি দুরবাহ নীতিপ্রয়ােগ ও দুর্বোধ রাজতন্ত্রের ভার- গ্রহণে প্রবৃত্ত হইয়ছ, সাবধান, যেন সাধুদিগের উপহাস্পদ ও চাটুকারের প্রতারণাস্পদ হইও না। চাটুকারের প্রিয় বচনে তােমার যেন ভ্রান্তি জয়ে কাদম্বরী। ; না। যৰ্থবাদীকে নিন্দুক বলিয়া যেন অবজ্ঞা করিও না। রজারা আপন চকে কিছুই দেখিতে পান না এবং এরূপ হতভাগ্য লােক দ্বারা পরিবৃত থ কেন, প্রতারণা করাই যাহাদিগের সম্পূর্ণ মানস। তাহারা প্রভুকে প্রতারণা করা আপন অভিপ্রায় সিদ্ধ করিতে পারিলেই চরিতার্থ হয় ও সর্বদা উহারই চেষ্টা পায়। বাহ ভক্তি প্রদর্শন পূর্বক আপনাদিগের দুষ্ট অতি প্রায় গোপন করিয়া রাখে, সময় পাইলেই চাটুবচনে প্রভুকে প্রতা- রিত করিয়া লােকের সর্বনাশ করে। তুমি স্বভাবতঃ ধীর ; তথাপি তোমাকে বারংবার উপদেশ দিতেছি, সাবধান, যেন ধন ও যৌবন মঙ্গে উম্মত্ত হইয়া কর্তব্য কর্মের অনুষ্ঠান পরাঘুখ ও অসদাচরণে প্রবৃত্ত হইও না। এক্ষণে মহারাজের ইচ্ছাক্রমে অভিনব যৌবরাজ্যে অভিষিক্ত হইয়া কুলক্রমাগত ভূভার বহন কর, অতিমণ্ডলের মস্তক অবনত কর,এবং সমুদায় দেশ জয় করিয়া অখণ্ড ভূমণ্ডলে আপন আধিপত্য স্থাপন পূৰ্ব্বক প্রজাদিগের প্রতিপান কর। এইরূপ উপদেশ দিয়া অমাত্য ক্ষান্ত হইলেন। চাপড় শুকনাসের গভীর অর্থযুক্ত উপদেশবাক্য শ্রবণ করিয়া মনে মনে উহারই আন্দোলন করিতে করিতে বাটী গমন করিলেন। অভিষেকসামগ্রী সমাহৃত হইলে অমাত্য ও পুরােহিতের সহিত রাজা শুভদিনে ও শুভলগ্নে তীর্থ, নদী ও সাগর হইতে আনীত মন্ত্রপূত বারি দ্বারা রাজকুমারের অভিযেক করিলেন। লতা যেরূপ এক বৃক্ষ হইতে শাখা দ্বারা বৃন্তর আশ্রয় করে, সেইরূপ রাজসংক্রান্ত রাজ- শ্রী শ, শত্রুমে যুবরাজকে অলম্বন করিলেন। পবিত্র তীজলে স্নান কৰি রাজকুমার উজ্জ্বল শ্রী প্রাপ্ত হইলেন। অভিষেকানন্তর ধবল বসন ও উজ্জ্বল ভূবণ ও মনেহয় মাল্য ধারণ পূর্বক অঙ্গে সুগন্ধি গন্ধদ্রব লেপন করিলেন । এর সভামণ্ডপে প্রবেশ পূর্বক, শশধর যেরূপ সুমেরুশৃঙ্গে আরােহণ ৪০ কাদম্বরী। করিলে শােভা হয়, যুবরাজ সেইরূপ রত্নসিংহাসনে উপবেশন করিয়া সভার পরম শােভা সম্পাদন করিলেন। নব নব উপায় দ্বারা প্রজাদিগের সুখ সমৃদ্ধি বৃদ্ধি ও রাজের নিয়ম সংস্থাপন করিয়া পরম সুখে যৌব- রাজ্য সভোগ করিতে লাগিলেন। রাজাও পুত্রকে রাজ্যভার সমৰ্পণ করিয়া নিশ্চিন্ত হইলেন। কিছু দিনের পর যুাজ দিগ্বিজয়ের নিমিত্ত যাত্ৰা করিলেন। বন- ঘণ্টার ঘাের ঘর্ঘর ঘােষের ন্যায় দুন্দুভিধ্বনি হইল। সৈন্যগণের কলরৰে চতুর্দি বাপ্ত হইল। রাজকুমার স্বর্ণালঙ্কারে ভূষিত করেণুকায় আরােহণ করিলেন। পত্রলেখাও ঐ হস্তিনীর উপর উঠিয়া বসিল। বৈশম্পায়ন আর এক করিণীপৃষ্ঠে আরােহণ করিয়া রাজকুমারের পার্শ্ববর্তী রুণ কালের মধ্যে মহীল তুময়, দিওল মাতঙ্গম, অন্তক আতপত্রময়, সমীরণ মদগন্ধময়, পথ সৈন্যময় ও নগর জয়শব্দময় হইল। সেনাগণ সুসজ্জিত হইয়া বহির্গত হইলে তাহাদিগের পাদবিকেলে মেদিনী কঁাপিতে লাগিল। শাণিত অস্ত্র শ েদিনকরের করপ্রভা এতিবিম্বিত হওয়া বােধ হইল যেন, শিখিকুল গগনমণ্ডলে শিখাকলাপ বিস্তীর্ণ করিয়া রহিয়াছে, সৌদামিনী প্রকাশ পাইতেছে, ইন্দ্রধনু উদিত হইয়াছে। করীদিগের বংহিত, অশ্বদিগের হ্রেষরব, দুন্দুভির ভীষণ শৰু ও সৈলিগের কলরবে বােধ হইল যেন, প্রলয়কাল উপস্থিত। ধূলি উখিত হইয়া গগনমণ্ডল অন্ধকারাবৃত করিল। আকাশ ও ভুমির কিছুই বিশেষ রহিল না। বােধ হইল যেন, সৈভার সহ করিতে না প রিয়া ধরা, উপরে উঠিতেছে। এক একবার এরূপ কলরব হয় যে কিছুই হইলেন। গুন: যায় না। কতক দূর যাই সন্ধ্যার পুর্বে যুবরাজ এক রমণীয় প্রদেশে গচ্ছিত হইলেন। সে দিন তথাম্ব বাসস্থান নিরুপিত হইল। সেনাগণ আহা কাদম্বরী। রাদি করিয়া পটগৃহে নিদ্রা গেল। রাজকুমারও শয়ন করিলেন। প্রত্যুষে সেনাগণ পুনৰ্ব্বার শ্রেণীবদ্ধ হইয়া চলিল। য ইতে যাইতে বৈশম্পায়ন রাজকুমারকে সম্বােধন করিয়া কহিলেন যুবরাজ! মহারাজ যে দেশ জয় করেন নাই, যে দুর্গ আক্রমণ করেন নাই, এরূপ দেশ ও দুর্গই দেখিতে পাই না। আমরা যে দিকে যাইতেছি, দেখিতেছি সকলই তাহার রাজ্যের অন্তর্গত। মহারাজের বিক্রম ও ঐশ্বৰ্য দেখিয়া আশ্চৰ বােধ হইতেছে। তিনি সমুদায় দেশ জয় করিয়াছেন, সকল রাজাকে অপর অধীনে রাখিছেন, সমুদায় বহু সংগ্রহ করিয়াছেন। অনন্তর যুাজ পরাক্রান্ত ও বলশালী সৈন্য দ্বারা পু, দক্ষিণ, পশ্চিম, উত্তর ক্রমে ক্রমে অবশিষ্ট সকল দেশ জয় করিয়া কৈলাম পর্বতের নিকটবর্তী হেমজটনামক কিরাতদিগের সুৰেপুরনাঙ্গী নগরীতে উপস্থিত হইলেন। সংগ্রামে কিরাতদিগকে পরাজিত করিয়া পরিশ্রান্ত ও একান্ত ক্লান্ত সেনাগণকে কিঞ্চিৎকাণ বিশ্রাম করিতে আদেশ দিলেন। আপনি ও তথায় আরাম করিতে লাগিলেন। একদা তথা হইতে মৃগম্বার্থ নির্গত হইয়া একটি কিন্নর ও একটি কিন্নরী বনে ভ্রমণ করিতেছে দেখিঙ্গেন। অদৃষ্টপূর্ব অদৃষ্টপূৰ্ব কিমিথুন দর্শনে অত্যন্ত কৌতুকাক্রান্ত হইয়া ধরিবার আশষে সেই দিকে অশ্ব চালনা করিলেন। অ বায়ুবেগে ধাবিত হইল। কিরমিথুনও মানুষ সর্শনে ভীত হইয়া দ্রুত বেগে পলায়ন করিতে লাগিল। শীঘ্র গমনে কেহই অপারগ নহে। ঘােটক এরূপ দ্রুতবেগে দৌড়িল যে, কিন্নমিথুন এই থরিলাম বলিয়া রাজকুমারের ক্ষণে ক্ষপে বােধ হইতে লাগিল। এ দিকে কিন্নরমিথুনও প্রাণপণে দৌড়িয়া গিয়া এক পর্বতের উপরি আরােহণ করিল। ঘােটক তথায় উঠিতে পাল্লিল না। রাজকুমার পর্বত্রে উপত্যকা কদম্বরী। হইতে উর্ষ দৃষ্টে দেখিতে লাগিলেন। উহারা পর্বতের শৃঙ্গে আরােহণ পুর্বক ক্রমে ক্রমে বৃষ্টিপথের অগোচর হইল। কিমিথুনগ্রহণে হতাশ হইয়া মনে মনে কহিলেন কি দুস্কৰ্ম্ম করিয়াছি; কিনমিথুন কিরূপে ধরিব, ধরিয়াই ৰা কি হইবে, এক বারও বিবেচনা হয় নাই। বােধ হয় সেনানিবেশ হইতে অধিক দূর আসিয়াছি। এনে কি করি, কিরূপে পুনৰ্ব্বার তথায় যাই। এ দিকে কখন আসি নাই, কোন্ পথ দিয়া যাইতে হয় কিছুই জানি না। এই নির্জন গহনে মানবের সমাগম নাই। কোন ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসা করিয়া যে, পথের নিদর্শন পাইব তাহারও উপায় নাই। শুনিয়াছি সুবর্ণপুরের উত্তরে নিবিড় বন, বন পায় হইলেই কৈলাসপৰ্বত। কিন্নরমিখুন যে পৰ্বতে আরোহণ করিল বােধ হয়, উহা কৈলাস পর্বত। এক্ষিণদিকে ক্রমাগত প্রতিগমন করিলে স্কন্ধাবারে হছিবার সম্ভাবনা। অদৃষ্টে কত কষ্ট আছে বলিতে পারি না। আপনি কুৰ্ম্ম করিয়াছি কাহার দোষ দিৰ, কেই বা ইহার ফলভােগ করিবে, যেরূপে হউক যাইতে হইবেক। এই স্থির করিয়া ঘােটককে ক্ষিণদিকে ফিরাইতেন। তখন বেল দুই হর। দিনকর গগনমণ্ডলের মধ্যবর্তী হইয়া অতিশয় উত্তাপ জিতেছেন। পঙ্কিগণ নীরব, বন নিস্তব্ধ, ঘোটক অতিশয় পরিশ্রান্ত ও প্রাক্তকুলের। আপনিও তৃষ্ণাতুর হইয়াছেন দেখিয়া তরুতলের ছায়ায় অশ্ব বাঁধিলেম এবং হরিদ্বর্ণ দূর্বাদলের আসনে উপবেশন পুৰ্ব্বক ক্ষণকাল বিশ্রামের পর জলপ্রাপ্তির আশয়ে ইতস্ততঃ দৃষ্টিপাত করিতে লাগিলেন। এক পথে তীর পদচিহ্ন ও মদচিহ্ন রহিয়াছে এবং কুমুদ, কলার ও মৃণাল ছিন্নভিন্ন হইয়া পড়িত আছে দেখিয়া স্থির করিলেন গিরিচর করিযুখ এই পথে জল পান করিতে যায়, সন্দেহ নাই। এই পথ দিয়া যাইলে অবশ্য জলাশয় পাইতে পারি।
কাদম্বরী। অনন্তর সেই পথে চলিলেন। পথের দুই ধারে উন্নত পাপ সকল বিস্তৃত শাখা প্রশাখা আর গগন আকীর্ণ করিয়া রহিয়াছে। বােধ হয় যেন, বাহু প্রসারণ পূর্বক অঙ্গুলি সঙ্কেত দ্বারা তৃষ্ণার্ত পথিকদিগকে জলপান করিবার নিমিত্ত ডাকিতেছে। স্থানে স্থানে কুঞ্জবন ও সভা- মণ্ডপ, মধ্যে মধ্যে স্ব ও উজলশিলা পতিত রহিয়াছে। নানাবিধ রমণীয় প্রদেশ ও বিচিত্র উপবন দেখিতে দেখিতে কতক দূর যাইয়া বারিশীকরসম্পৃক্ত সুীতল সমীরণস্পর্শে বিগতরুম হইলেন। বােধ হইল যেন, তুষারে অবগাহন করিতেছেন। সরােবর নিকটবর্তী হওয়াতে মনে মনে অতিশয় আলাদ জলিল। অনন্তর মধুপানমুক্ত মধুকর ও কেলিপর কলহংসের কোলাহলে আহুত হইয়া সরোবরের সমীপবর্তী হইলেন। চতুর্দিকে শ্ৰেবন্ধ তরুমধ্যে ত্রৈলােক্যলক্ষ্মীর দর্পণস্বরূপ, বসুন্ধরাদেবীর স্কটিকগৃহস্বরূপ, অচ্ছেদনামক সয়ে নেত্রগােচর করিলেন । সরােবরের জল অতি নিল। জলে কমল, কুমু, কলার প্রভৃতি নানাবিধ কুসুম বিকসিত হইয়াছে। মধুকর গুন্ ধ্বনি করিয়া এক পূষ্প হইতে অন্য পুষ্পে বসিয়া মধুপান করিতেছে। কণহংস সকল কলরব করিয়া কেলি করিতেছে। কুসুমের মুরভিরেণু হণ করিয়া শীতল সমীরণ নানাদিকে সুগন্ধ বিস্তার করিতেছে। সরােবরের শােভা দেখিয়া মনে মনে চিন্তা করিলেন, কিঃমিথুনের অনুসরণ নিষ্ফল হইলেও এই মনােহর সরােবর দেখিয়! আমার ত্রে যুগল সফল ও চিত্ত প্রসন্ন হইল। এত:দৃশ রময় বস্তু কখন দেখি নাই, দেখিব না; শােধ হয়, ভগবান্ ভবানীপতি এই সরােবরের শোভায় মোহিত হইয়া কৈলাসনিৰাস পরিত্যাগ করিতে পারেন না। অমর সাবরের দক্ষিণ তীরে উপস্থিত হইয়া অশ্ব হইতে অবতীর্ণ হইলেন। পৃষ্ঠ হইতে পৰ্যাণ অপনীত হইলে ইন্দ্ৰায়ুধ এক বার ক্ষিতিলে লুি কাদম্বরী। ঠিত হইল। পরে ইচ্ছাক্রমে গান ও জল পান করিয়া তীরে উঠিলে রাজকুমায় উহার পশ্চাদ্ভাগের পাদৰয় পাশ দ্বারা আবদ্ধ করিয়া দিলেন। সে ভীরপ্ররূঢ় নবীন দূৰ্ব্বা ভক্ষণ করিতে লাগিল। রাজকুমারও সাে- বরে অবগাহন পূর্বক মৃণাল ভক্ষণ ও জলপান করিয়া তীরে উঠিলেন। এক লতামগুপমধ্যবর্তী শিলাতলে নলিনীপত্রের শষ্যা ও উত্তরীয় বরে উনান প্রস্তুত করিয়া শয়ন করিলেন। অ কাল বিশ্রামের পর সরসীর উত্তর তীরে বীণাতন্ত্রীঝঙ্কার- মিশ্রিত সঙ্গীত শুনিলেন। বায়ুধ শব্দ শুনিবামাত্র কবল পরিত্যাগ পুর্বক সেই দিকে কর্ণপাত করিল। এই জনশূণ্ঠ অরণ্যে কোথায় সঙ্গীত হইতেছে জানিবার নিমিত্ত রাজকুমার যে দিকে শত্ব হইতে ছিল সেই দিকে দৃষ্টিপাত করিলেন; কিন্তু কিছুই দেখিতে পাই লেন না। কেবল অকুট মধুর শব্দ কর্ণকুহরে অমৃত বর্ষণ করিতে লাগিল। সঙ্গীত শ্রবণে ফুতুহলাক্রান্ত হইয়া ইত্ৰায়ুধে আরােহণ পূর্বক সরসীর পশ্চিম তীর দিয়া শব্দানুসারে গমন করিতে আরম্ভ করিলেন। কতক দূর গিয়া, চতুর্দিকে পররমণীয় উপবনমধ্যে কৈলাসাচলের এক প্রত্যক্ষ পর্বত দেখিতে পাইলেন। ঐ পর্বতের নাম চন্দ্রপ্রত; উহার নিয়ে এক মন্দিরের অভ্যন্তরে চরাচরগুরু ভগবান্ শূলপাণির প্রতিমূর্তি প্রতিষ্ঠিত আছে। ঐ প্রতিমার সম্মুখে পাশুপতধারিণী, নিম্মমা, নিরহঙ্কার', নির্থৎসর; অমানুষকৃতি, অষ্টাদশবর্ষীয়া এক কন্যা বীণাবাদন পূর্বক তালয়বিশুদ্ধ মধুর স্বরে মহাদেবের জুবাদ করিয়া গান করিতেছেন। কন্যার দেহভায় উপবন উজ্জ্বল ও মন্দির আলােকময় হইয়াছে। তাহার স্কন্ধে জটাভার, গলে রাজমালা ও গাত্রে ভস্ম, লেপ। দেখিবামাত্র বােধ হয় যেন, পার্বতী শিবের জরানা মিত ইয়াসন।
কাদরী। . রাজকুমার শাখায় ঘোটক বাঁধিয়া ভক্তিপূর্বক ভগবান ত্রিলােচনকে সাষ্টাঙ্গ প্রণিপাত করিলেন। নিমেষশূন্য লােচনে সেই অঙ্গনাকে নিরীক্ষণ করি। মনে মনে ভাবিলেন কি আশ্চর্য্য। কত অসস্তাবিত ও অচিন্তিত বিষয় স্বপ্নকল্পিতের আয় সহস' উপস্থিত হয়, তাহা নিরূপণ করা যায় না। আমি মৃগয়ায় নি ক্রমে কিন্নরমিথুনের অনুসরণে প্রবৃত্ত হইয়া কত ভয়ঙ্কর ও কত রমণীয় প্রদেশ দেখিলাম । পরিশেষে গীতধ্বনিরব অনুসারে এই স্থানে উপস্থিত হইয়া এই এক অদ্ভুত ব্যাপার দেখিতেছি। কন্যার যেরূপ মনােহর আকার ও মধুর স্বর, তাহাতে কোন ক্রমে মানুষী বােধ হন না, দেবকন্যা সন্দেহ নাই। ধরণীতলে কি সৌদামিনীর উদ্ভব হইতে পারে ? যাহা হউক, যদি আমার দর্শনপথ হইতে সহসা অন্তর্হিত না হয়, যদি কৈলাসশিখরে অথবা গগনমগুলে হঠাৎ আরােহণ না করেন, তাহা হইলে, আমি ইহার নাম, ধাম ও তপস্যায় অভিনিবেশের কারণ, সমুদায় জিজ্ঞাসা করিয়া জানিব। এই স্থির করিয়া সেই মন্দিরের এক পার্থে উপবেশন পূর্বক সঙ্গীতসমাপ্তির অবসর প্রতীক্ষা করিয়া রনিলেন। সঙ্গীত সমাপ্ত হইলে বীণা নিস্তব্ধ হইল। কন্যা গাত্রোত্থান পূর্বক ভক্তিভাবে ভগবান্ ত্রিলোচনকে প্রদক্ষিণ করিয়া প্রণাম করিলেন। অনন্তর পবিত্র নেপাত দ্বারা রাজকুমারকে পরিতৃপ্ত করিয়া সাদর সম্ভা- ৰণে স্বাগত জিজ্ঞাসা করিলে ও বিনীত ভাবে কহিলেন মহাশয়! আশ্রমে চলুন ও অতিথিংকার গ্রহণ করিয়া চরিতার্থ করুন। রাজকুমার গম্ভাষণ মাত্রেই আপনাকে পরিগৃহীত ও চরিতার্থ ৰােখ করিয়া ভক্তি পূর্বক তাপমীকে প্রণাম করিলেন ও শিষ্যের ন্যায় তাঁহার পশ্চাৎ পচাৎ চলিলেন। যাইতে যাইতে চিন্তা করিলেন, তাপমী আমাকে দেখিয়া অতর্হিত হইলেন না; এতুত দাক্ষিণ্য প্রকাশ করিয়া অতিথিসৎকার গ্রহণ কাদম্বরী। মরিতে অনুরোধ করিলেন। বােধ হয় জিজ্ঞাসা করিলে অত্ম বৃত্তান্তও বলতে পারেন। কত দূর যাইয়া এক গিরিগুহা দেখিলেন। উহার পুরোভাগ তষালবনে আবৃত ; তথায় দিনমণি দৃষ্টিগােচর হয় না। পার্থে নিঝর- বারি ঝঝ র শকে পতিত হইতেছে, দূর হইতে উহার শব্দ কি মনোহর ! অভ্যন্তরে বল্কল কমণ্ডলু ও ভিক্ষাকপাল রহিয়াছে, দেখিবামাত্র মনে শান্তিরসের সঞ্চার হয়। তাপসী তথায় প্রবেশিয়া অৰ্যসামী অপহরণ পুর্বক অর্ঘ্য অনম্বন করিলে রাজকুমার মধু মধুর সম্ভাষণে কহিলেন ভগবতি। প্রসন্ন হউন, আপনকার দর্শনমাত্রেই আমি পবিত্র হইয়াছি এবং অর্থ প্রদত্ত হইয়াছে। অত্যাদর প্রকাশ করায় প্রয়ােন নাই। আপনি উপবেশন করুন। পরিশেষে তাপসীর অনুরােধ এড়াইতে না পান্নিয়া রাজকুমার যথাবিহিত অর্ঘ্য গ্রহণ করিলেন। দুই জন দুই শিলা- তলে উপবিষ্ট হইলেন। তাপসী রাজকুমারের পরিচয় জিজ্ঞাসা করিলে তিনি আপন নাম, ধাম ও দিগ্বিজয়ের কথা বিশেষ করিয়া কহিলেন এবং রিমিথুনের অনুসরণক্রমে আপন আগমন বৃত্তান্ত আদ্যোপান্ত বর্ণনা করিনে। অনতর তাপসী ভিকাকােল গ্রহণ করিয়া শ্রমন্থিত কুতলে ভ্রমণ করাতে তাহার ভিক্ষাভাজন, বৃক্ষ হইতে পতিত নানাবিধ সুস্বাদু ফলে পরি- পূর্ণ হইল। চাপড়কে যেই সকল ফল ভক্ষণ করিতে অনুরোধ করিলেন। চাপড় ফল ভক্ষণ করিবেন কি, এই আশ্চর্য ব্যাপার দোয়া তাহার অতিশয় বিস্ময় জন্মিল। মনে মনে চিন্তা করিলেন কি আশ্চর্য! এরুপ বিস্ময়কর ব্যাপার ত কখন দেখি নাই। অথবা তপয় গলাধ্য কি আছে। ওপাজব বীভূত হইয়া অচেতনেও কামন। সগ করে, সন্দেহ নাই। অনন্তর তাপৗর রোধে সুস্বাদু কাদম্বরী। ৪৭ নানাবিধ ফল ভক্ষণ ও শীতল জল পান করিয়া পরিতৃপ্ত হইলেন। হইলেন। তাপ সীও আহার করিলেন ও সন্ধ্যাকাল উপস্থিত হইলে যথাবিধ শার উপাসনা করিয়া এক শিলালে উপবেশন পূৰ্ব্বক বিশ্রাম করিতে লাগিলেন। চাপড় অবসর বুবিয়া বিনবাক্যে কহিলেন ভগবতি। মানুষ- দিগের প্রকৃতি অতি চঞ্চল, প্রভুর কিঞ্চিং প্রসন্ন তা দেখিলেই অমনি অধীর ও গর্বিত হইয়া উঠে । আপনার অনুগ্রহ ও প্রসন্নতা ফর্শনে উৎসাহিত হইয়া আমার অন্তঃকরণ কিছু জিজ্ঞাসা করিতে অভিলাষ করিতেছে। যদি আপনার ক্লেশকর না হয়, তাহা হইলে, আত্মবৃত্তান্ত বর্ণনা দ্বারা আমার কৌতুকাক্রান্ত চিত্তকে পরিতৃপ্ত করুন। কি দেবতা- দিগের কুল, কি মহর্ষি দগের কুল, কি গন্ধৰ্ব্বদিগের কুল, কি অপরাদিগের কুল, আপনি জন্মপরিগ্রহ দ্বারা কোন কুল উজ্জ্বল করিয়াছেন ? কি নিমিত্ত কুসুম কুমার, নবীন বয়সে অয়াসসাধ্য তপস্যায় প্রবৃত্ত হইয়া ছেন ? কি নিমিত্তই বা দিব্য আশ্রম পরিত্যাগ করিয়া এই নির্জন বনে একাকিনী অবস্থিতি করিতেছেন ? তাপী বিঞ্চিং কাল নিক্ক থাকিয়া পরে দীর্ঘ নিবাস পরিত্যাগ পূৰ্ব্বক রােদন করিতে আরম্ভ করিলেন। চন্দ্ৰাপীড় তাহাকে অশ্রুমুখী দেখি। মনে মনে চিন্তা করিলেন এ আবার কি! শােক, তাপ কি সকল শরীরকেই অশ্র..করিয়াছে ? যাহা হউক, ইহারা বাষ্পসলিমপতে আমার, আরও কৌতুক জন্মিল। বােধ হয়, শেকের কোন মহৎ কারণ থাকিবেক। সামান্য লােক এতাদৃশ পবিত্র মূর্তিকে কখন কলুষিত ও অভিভূত করিতে পারে না। বায়ুর অঘাঙ্কে কি বসুধা চলিত হয় ? চাপড় আপনাকে শোকদ্দীপনহেতু ও হুজ্জত অপরাধী বােধ করিয়া মুখপ্রক্ষালনের নিমিত্ত প্রস্রবণ হইতে জল আনিয়া দিলেন ও সান্ত্বনাবাক্যে নানাপ্রকার বুঝাইলেন। তাপসী চাপড়ের কাদম্বরী। সান্ত্বনা বাক্যে রােদনে ক্ষান্ত হইয়া মুখপ্রক্ষালন পূর্বক কহিলেন রাজপুত্র। এই পাপীয়সী হতভাগিনীর অশ্রোতব্য বৈরাগ্য বৃত্তান্ত শ্রবণ করিয়া কি হইবে? উহা কেবল শোকানল ও দুঃখার্ণব। যদি শুনিতে নিতান্ত অভিলাষ হইয়া থাকে, শ্রবণ করুন। লেবুলোকে অপরাগণ বাস করে শুনিয়া থাকিবেন। তাহাদিগের চতুর্দশ কুল। ভগবান্ কমলযােনির মানস হইতে এক কুল উৎপন্ন হয়। দেব, অনল, জল, ভূতল, পবন, অমৃত সূৰ্য্যরশ্মি, চকিরণ, সৌদামিনী, মৃত্যু ও মকরকেতু এই একাদশ হইতে একাদশ কুল। দক্ষপ্রজাপতির , কন্যা মুনি ও অরিষ্টার সহিত গন্ধৰ্ব্বদিগের সমাগমে আর দুই কুল উৎপন্ন এই সমুদায়ে চতুর্দশ কুল। মুনির গর্ভে চিত্ররথ জন্মগ্রহণ করেন। দেবরাজ ইন্দ্র আপন সুন্মধ্যে পরিগণিত করিয়া প্রভাব ও কীর্তি বৰ্দ্ধন পূর্বক তাহাকে গন্ধৰ্ব্বলােকের অধিপতি করিয়া দেন। ভারতবর্ষের উত্তরে কিম্পূরুষবর্ষে হেমকূট নামে বর্ষপৰ্বত তঁাহার বাস- হন। তথায় তাহার অধীনে সহস্র সহস্র গর্বলোক বাস করে। তিনিই চৈত্ররথ নামে এই রমণীয় কানন, অচ্ছেদনামক ঐ সবােবর ও ভবানীপতির এই প্রতিমূর্তি প্রস্তুত করিয়াছেন। অরিষ্টার গর্ভে হংস নামে জগদ্বিখ্যাত গন্ধর্ব জন্মহণ করেন। গন্ধর্বরাজ চৈত্ররথ ঔদার্য্য ও মহত্ব প্রকাশ পূর্বক আপন রাজ্যের কিঞ্চিৎ অংশ প্রদান করিয়া উঁহাকে রাজ্যাভিষিক্ত করেন। তঁাহারও বাসস্থান হেমকুট। গৌরী নামে এক পরমসুন্দরী অপরা তাহার সহধর্মিণ। এই হতভাগিনী ও চিরদুঃখিনী তাহাদের একমাত্র কন্যা। আমার নাম মহাথে। পিতা- মাতার অন্য সন্তান-সন্ততি ছিল না। আমিই একমাত্র অবলম্বন ছিলাম। শৈশবকালে ৰীণার ন্যায় এক অঙ্ক হইতে অন্যারে যাইতাম, ও পরিস্ফুট মধুর বচনে সকলের মন হরণ করিম। সকলে জেহপত্র কাদম্বরী। ৪১ হইয়া পরমপবিত্র বাল্যকাল বাল্যক্ৰীড়ায় অতিক্রান্ত হইল। যেরূপ বসন্তকালে নব পল্লবের ও নব পল্লবে কুসুনের উদয় হয় সেইরূপ আমার শরীরে যৌবনের উদয় হইল। একদা মধুমাসের সমাগমে কমলবন বিকসিত হইলে; চূহ কলিক অঙ্কুরিত হইলে ; মলমারুতের মন্দ মন্দ নিলে আহাদিত হইয়া কোকিল সহকারশাখায় উপবেশনপূর্বক সুস্বরে ??রব করিলে ; অশাক কিংশুক প্রস্ফুটিত, বকুলমুকুল উদগত এবং ভ্রমরের ঝঙ্কারে দকি প্রশিব্দিত হইলে ; আমি মাতার সহিত এই আচ্ছাদ’ রোবরে গান করিতে আনিয়াছিলাম। এখানে আসিয়া মাহর ৩ার, বিচিত্র রু ও রমণীর লতাকুঞ্জ অবলোকন করিয়া ভ্রমণ করিতেছিলাম। ভ্রমণ করিতে করিতে সহসা বন,নিলের সহিত সমাগত অতি সুঃভি পরিমল অঘ্রাণ বরিলাম । মধুবরের ন্যায় সেই সুরভিগন্ধে অন্ধ হইয়া তদনুসরণ ক্রমে কিঞ্চি দর মন করিয়া দেখিলাম অতি তেজী, পরমু রূপান, সুকুমার এক মন মার সরােবরে স্নান করিতে আসিতেছেন। তঁহার সভি, ব্যাহারে অর একজন তাপসকুমার খাছেন । উভয়েরই এরূপ সৌন্দর্য্য ও সৌকুমাৰ্য ৰােধ হইল যেন, রতি সৃতি প্রিয় সহচর বসন্তের সহিত মিলিত হইয়া ক্রোধ চশেখরকে প্রসন্ন করিবার নিমিত্ত তপস্বিবেশ ধারণ করিয়াছেন। প্রথম মুনিকুমারের কর্ণে অতস্থিন্দিনী ও পমিল- বাহিনী এক কুসুমঞ্জরী ছিল। ঐরূপ অশৰ্য কুসুমঞ্জরী কে কখন দেখে নাই। উহার গন্ধ অঘ্রাণ করিয়া স্থির করিলাম উহার পদে ন আমােদিত হইয়াছে। অনন্তর অনমিষ চেনে মুনিবুমারের মোহিনী মুওিঁ নেত্রগাের করিয়া •িস্মিত হইলাম। ভাবিলাম বিধাতা বুকি কমল ও চন্দ্রমণ্ডল সৃষ্টি করিয়া ইহার দাবি নির্মাণের কৌশল অভ্যাস করিয়া থাকিবেন। উরু ও বাহুযুগল সৃষ্টি কৰিবঃ পুর্বে মাগুরু ও কাদম্বরী। মৃণালের সৃষ্টি করিয়া নির্মাণ কৌশল শিখিয়া থাকিবেন। নতুবা সমা- নাকার দুই তিন বস্তু সৃষ্ট করিবার প্রয়ােজন কি ? ফলতঃ মনিকুমারের রূপ যতবার দেখি তত বারই অভিনব বােধ হয়। এইরূপ তাহার রমণীয় রূপের পক্ষপাতিনী হইয়া ক্রমে ক্রমে কুসুম শরের শরসন্ধানের পথবভিনী হইলাম। কি মুনিকুমারের রূপসম্পত্তি, কি যৌবনকাল, কি বসন্তকাল, কি সেই সেই প্রদেশ, কি অনুরাগ, জানিনা কে আমাকে উন্মাদন করিল। বারংবার মুকুিমারকে সম্পূহ লােচনে দেখিতে লাগিলাম। বােধ হইল যেন, আমার হৃদয়কে রজ্জবদ্ধ করিয়া কেহ আকর্ষণ করিতেছে । অনন্তর স্বেদ সলিলের সহিত লজ্জা ফলিত হইল। মকবুজের নিশিত শপাভয়ে ভীত হইয়াই যেন, কলেবর কম্পিত হইল। মুনি- কুমারকে আলিঙ্গন করিবার আশয়েই যেন শরীর রােমাঞ্চকুপ কর প্রসারণ করিল। তখন মনে মনে চিন্তা করিলাম শান্তুপ্রকৃতি তাপসজরে প্রতি আমাকে অনুরাগিণী করিয়া দুরাত্মা মন্মথ কি বিসদৃশ কৰ্ম্ম করিল। অঙ্গনাজনের অন্তঃকরণ কি বিমুঢ় ! অনুরাগের পাত্ৰা” এ কি ছুই বিবেচনা করিতে পারে না। তেজঃপুঞ্জ, অপােরাণি, মুকুিমারই বা কোথায় ? সামান্য জন সুলভ চিত্তবিকারই বা কোথায় ? বােধ হয়, ইনি আমার ভাব ভঙ্গী দেখিয়া মনে মনে কত উপহাস করিতেছেন। কি আশ্চৰ্য্য চিত্ত বিকৃত হইয়াছে বুঝিতে প রিয়াও বিকার নিবারণ করিতে সমর্থ হইতেছি না। দুরাত্মা কর্পের কি প্রভাব। উহার প্রভাবে কত শত কন্যা লজ্জা ও কুলে জলাঞ্জলি দিয়া স্বয়ং প্রিয়তমের অনুগামিনী হয়। অনঙ্গ কেবল আমাকেই এরূপ করিতেছে এমন নহে, কল শত কুলবালাকে এইরূপ অপথে পদার্পণ করায়। যাহা হউক, মদনশ্চেষ্টিত পরিস্ফুট রূপে প্রকাশ না হইতে হইতে এখান হইতে প্রস্থান করাই শ্রেয়। কি জানি পাছে ইনি কুপিত হইয়া শপ দেন।
কাদম্বরী। শুনিয়াছি মুনিজনের প্রকৃতি অতিশয় রােষপরবশ। সামান্য অপরাধেও তাহারা ক্রোধান্বিত হইয়া উঠেন, ও অভিসম্পাত করেন। অতএব এখানে আর আমার থাকা বিধেয় নয়। এই স্থির করিয়া তথা হইতে প্রস্থান কবির অভিলাষ করিলাম। মুনিজনেরা সকলের পুজনীয় নমস্য বিবচনা করিয়া প্রণাম করিলাম। আমি প্রণাম করিলে পর কুমাশাসনের অগ্যতা, বসন্তকালের ও সেই সেই প্রদেশের মীতা, ইন্দ্রিয়গণের অবাধ্যতা, সেই সেই ঘটনার ভবিতব্য এবং আমার ঈদৃশ ক্লেশ ও দৌর্তাগ্যের অবশ্য ন্তাবিত প্রযুক্ত আমার স্থায় সেই মুনকুমার ও মোহিত ও অভিভূত হইলেন। স্তম্ভ, স্বেদ, রােমাঞ্চ, বেপথু প্রভৃতি সাকি ভাবে লক্ষণ সকল তাহার শরীরে স্পষ্টরূপে প্রকাশ পাইল। তাহার অন্তঃকরণের তদানীন্তন ভাব বুঝিতে পারিয়া তাহার সহচর দ্বিতীয় ঋষি কুমারের নিকটে গমন ও ভক্তিভাবে প্রণাম করিয়া জিজ্ঞাসিলাম ভগবন্! ইহার নাম কি ? ইনি কোন তপােধনের পুত্র? ইহার কর্ণে (য কুসুমমমী দেখিতেছি উহা কোনৃতকুর সম্পত্তি ? আহা উপর কি সৌরভ। আমি কখন ঐরূপ সেভ আপ্রাণ করি নাই। আমার কথায় তিনি ঈষৎ হাস্য করিয়া কহিলেন বালে! তােমার ইহা জিজ্ঞায় করবার প্রয়ােজন কি ? যদি শুনিতে নিতান্ত কোতুক জন্মিয়া থাকেশ্রণ কর। শ্বেতকতু নামে মহাতপা মহর্ষি দিব্য লােকে বাস করেন। তাঁহার রূপ জগদ্বিখ্যাত। তিনি একদা দেবার্চনার নিমিত্ত কমলকুসুম তুলিতে মন্দাকিনীপ্রবাহে অবতীর্ণ হইয়াছিলেন। কমলাসনা লক্ষ্মী তাহার রূপ লাবণ্য দেখিয়া মােহিত হন। তথায় পরস্পর সমাগমে এক কুমা, জন্মে। ইনি তােমার পুত্র হইলেন গ্রহণ কর বলিয়া লক্ষ্মী শ্বেতকেতুকে সেই পুত্র সন্তান সমর্পণ করেন। মহর্ষি পুত্রের সমুদায় সংস্কার সম্পন্তু কবি গীকে জন্মিয়াছিলেন বলিয়া পুণ্ডরীক নাম রাখেন। যার কথা কাদম্বরী। জিজ্ঞাসা করিতেছ, ইনি সেই পুণ্ডরীক। পূর্বে অনুর ও সুরগণ যখন ক্ষীর সাগর মন্থন করেন, তৎকালে পারিজাত বৃক্ষ তথা হইতে উদগত হয়। এই কুসুমমঞ্জরী সেই পারিজাবকের সম্পত্তি। ইহা যেরুপে ইহার শ্রবণগত হইয়াছে তাহাও শ্রবণ কর। অদ্য চতুর্দশী, ইনি ও আমি ভগবান্ ভবানীপতির অর্চনার নিমিত্ত ননবনের নিকট দিয়া কৈলাস- পর্বতে আসিতেছিলাম। পথিমধ্যে নন্দনবনের অধিষ্ঠাত্রী দেবতা এই পারিজাতকুসুমঞ্জরী হস্তে লইয়া আমাদের নিকটবর্তনী হইলেন, প্রণাম করিয়াইইকে বিনীত বচনে কহিলেন ভগব! আপনার যেরূপ আকার তাহার সদৃশ এই অলঙ্কার, আপনি এই কুসুমমঞ্জরীকে শ্রবণমণ্ডলে স্থান দান করিলে আমি চরিতার্থ হই। বনদেবতার কথায় অনাদর করিয়া ইনি চলিয়া যাইতেছিলেন, আমি তাহার হস্ত হইতে মঞ্জরী লইয়া কহিলাম সখে! দোষ কি ? বনদেবতার প্রণয় পরিগ্রহ করা উচিত, এই বলিয়া ইহার কর্ণে পরাইয়া দিলাম। তিনি এইরূপ পরিচয় দিতেছিলেন এমন সময়ে সেই তপােধনব! কিঞ্চিৎ হা করিয়া কহিলেন অরি কুতুহলাক্রতে! তােমার এত অE - সন্ধানে প্রয়োজন কি? যদি কুসুমমঞ্জরী লইবার বানাইয়া থাকে, গ্রহণ কর, এই বলিয়া আমার নিকটবর্তী হইলেন এবং আপনার কর্ণদেশ হইতে উনােচন করিয়া আমার শ্রবণপুটে পরাইয়া দিলেন। আঘার গণ্ডস্থলে তাহার হস্ত স্পর্শ হইবামাত্র অন্তঃকরণে কেন অনিশীয় ভাবােদয় হওয়াতে তিনি অবণেন্দ্রিয় হইলেন। কর- এলস্থিত অক্ষমালা হস্থিত লজ্জার সহিত গলিত হইল জানিতে পারিকেন না। জমালা তাহার পাণিতল হইতে ভূতলে পড়িতে না পড়িতেই আমি ধরিলাম ও আপন র আভণ কৰিলাম। এই সময় ছ থার্থি আসিয়, বলিল কর্তৃারিকে? দেবী শান দিয়া তোমায় কাদম্বরী। অপেক্ষা করিতেছেন, তোমার আর বিলম্ব করা বিধেয় নয়। নবতা কারণ একুশের আহ্বাতে যেরুপ কুপিত ও বিরক্ত হয়, আমি সেই গীৰ বাক্যে বিরক্ত হইয়া, কি করি, মান্য অপেক্ষা করিতেছেন গুনিয়া, সেই যুবাপুরুষের মুখমণ্ডল হইতে অতি কষ্টে আপনার এয়াগকৃষ্ট নেত্র যুগল আস্কর্য করিয়া স্বার্থ গমন করিলাম। কিঞ্চিৎ দৃয় গমন করিলে, দ্বিতীয় ঋষিকুমার সেই তপােধনবার এ চিত্ত বিকার দেখিয়া এখয়কোপ একাশপূর্বক কহিলেন সখে পুণ্ডরীক ? একি তােমায় অন্তঃকরণ এরূপ বিকৃত হইল কেন ? ইন্দ্রিয়পরত লােকেরাই অপষে পদার্পণ করে। নির্বোধেরাই সদ- দ্বিবেচনা করিতে পারে না। মুঢ় ব্যক্তিরাই চঞ্চল চিত্তকে স্থির কৱিতে অসমর্থ। তুমিও কি তাহাদিগের স্থায় বিবেচনাশূন্য হইয়া কর্শে অনুরক্ত হইবে ? তোমার আজি অভূতপূর্ব এরূপ ই- ধিকার কেন হইল ? ধৈৰ্য, গম্ভীৰ্য্য, বিনয়, লজ্জা, জিতেন্দ্রিয়তা এতৃতি তােমার স্বাভাবিক সদ্গুণ সকল কোথায় গেল? কুলক্রমাগত ব্রহ্মচর্য, বিষয়বৈরাগ্য, গুরুদিগের উপদেশ, উপস্যায় অভিনিবেশ, শাস্ত্রের আলােচনা, যৌবনের শাসন, মনে যীকরণ, সমুদায় একবারে বিস্মৃত হইলে ? তােমার বুদ্ধি কি এইরূপে পরিণত হইল ? ধৰ্ম্মশাস্ত্রাভ্যাসের কি এই গুণ দর্শিল ? গুরুজনের উপদেশে কি এই উপকার হইল ? এতদিনে বুঝিলাম বিবেকশক্তি ও নীতিশিক্ষা নিস্ফল, জ্ঞানাভ্যাস ও সদুপদেশে কোন ফল নাই, জিতেত্রিয়তা কেবল কথামাত্র যেহেতুক ভব- দৃশ ব্যক্তিকেও অনুরাগে কলুষিত ও অজ্ঞানে অভিভূত দেখিতেছি। তােমার অক্ষমালা কোথায় ? উহ করতল হইতে গলিত ও অপহৃত হইয়াছে দেখিতে পাও নাই ? কি আশ্চর্য! এক বরে জ্ঞানশুন্য ও চৈতন্থশূন্য হইয়াছ? ঐ অনা বালা অক্ষমালা হরণ করিয়া পলায়ন দিম্বরী। } করিতেছে এবং মন হরণ করিবার উদ্যোগে আছে, এই বেলা সাবধান হও। অপােধনযুবা কিঞ্চিৎ লজ্জিত হইয়া, সখে! কি হেতু আমাকে অন্যরূপ সম্ভাবনা করিতেছ। আমি ঐ দুর্বিনীত কন্যার তমালা হল- পরাধ ক্ষমা করিব না বলিয়া ভ্রকুটীভঙ্গি দ্বারা অলীক কেপ প্রকাশ পূৰ্ব্বক আমাকে কহিলেন চপলে! আমার অক্ষমালা না দিয়া এখান হইতে যাইতে পাইবে না। আমি তাহার নিরুপম রূপলাবণ্যের অনু- রাগিণী ও ভাবভঙ্গির পক্ষপাতিনী হইয়। এরূপ শূন্যহৃদয় হইয়াছিলাম যে, অক্ষমালা ভ্রমে কণ্ঠ হইতে উন্মােচন করিয়া আমার একালীমালা তাহার করে প্রদান করিলাম। তিনিও এরূপ অন্যমনস্ক হইয়া আমার মুখ পানে চাহিয়াছিলেন যে, উহা অক্ষমালা বলিয়াই গ্রহণ করিলেন। মুনিকুমারের সন্নিধানে স্বেদজলে বারংবার স্নান করিয়া পরে সরােবরে স্নান করিতে গেলাম। স্নানানর মুনিকুমারের মনােহারিণী মূর্তি মনে মনে চিন্তা করিতে করিতে বাটী গমন করিলাম। অন্তঃপুরে প্রবেশিয়া যে দিকে নেত্ৰপাত করি, পুণ্ডরীকের মুখপুণ্ড রীক ভিন্ন আর কিছুই দেখিতে পাই না। মুনিকুমারের অদর্শনে এরূপ অধীর হইলাম যে, তৎকালে জাগরিত কি নিদ্রিত, একাকিনী কি জনে- কের নিকটবর্তিনী ছিলাম ; মুখের অবস্থা কি দুঃখের দশা বটিয়াছিল ; উৎকণ্ঠা কি ব্যাধি দ্বারা আক্রান্ত হইয়াছিলাম ; কিছুই বুঝিতে পারি নাই। ফলতঃ কোন জ্ঞান ছিল না। একবারে চৈতন্য শূন্য হইয়া- ছিলাম। তৎকালে কি কর্তব্য কিছুই স্থির করিতে না পারিয়া, কেহ যেন আমার নিকট না যায় পরিচারিকাদিগকে এইমাত্র আদেশ জিয়া প্রশ্বাসের উপরিভাগে উঠিলাম। যে স্থানে সেই ঋষিকুমারের সহিত সাক্ষাৎ হইয়াছিল সেই এদেশকে মহাৱাধিষ্ঠিত, অমৃতরসাতি বিক্ত দেয়ালকৃত বােধ করিয়া বারংবার বৃষ্টিপাত করিতে লাগিলাম।
কাদম্বরী। দেখিতে খেতে এরূপ উন্মত ও ভ্রান্ত হইলাম যে, সেই দিক হইছে যে অনিল ও পক্ষী সকল আসিতেছিল হাদিগকেও প্রিয়তমের সংবাদ জিজ্ঞাসা করিতে ইচ্ছা জন্মিল। আমার অন্তঃকরণ তাহার প্রতি এরূপ অনুরক্ত হইল, যে তিনি যে যে কৰ্ম কৰিতেন, তাহাতেও পক্ষপা হইয়া উঠিল। তিনি তপস্বী ছিলেন বলিয়া তপস্যায় আর বিদ্বেষ থাকি না। তিনি মুনিবেশ ধারণ করিতেন সুতরাং মুনিবেশে আর গ্রাম্যতা রহিল না। পারিজাতকুম তঁাহায় কৰ্ণে ছিল বলিয়াই মনােহর হই। সুরলোক তাহার বাসস্থান বলিয়াই রমণীয় বােধ হইতে লাগিল। ফলত নলিনী যেরূপ রবির পক্ষপাতিনী ; কুমুদিনী যেরূপ চলমার পক্ষপাতিমী, ময়ূরী যেরূপ জলধরের পক্ষপানিী, আমিও সেইরূপ ঋষিকুমারের পক্ষ- পাতিনী হইয়া নিমেহম্ভ দৃষ্টিতে সেই দিক দেখিতে লাগিগাম । আমার তাম্বুলকরঙ্কবাহিনী তরলিকাও স্নান করিতে গিয়াছিল। সে অনেকক্ষণের পর ষাটী অ মাকে আসিয়া কহিল ভাবিকে ! আমরা সরােবর তীরে যে দুই জন তাপসকুমার দেখিয়াছিলাম, তাহাদিগের একজন যিনি তােমার কর্ণে কলপাপের কুসুমমঞ্জরী পরাইয়া দেন, তিনি গুপ্ত ভাবে আমার নিকট আসিয়া সুমধুর বচনে জিজ্ঞাসা করিলেন বলে । যাহার কর্ণে আমি পূষ্পমঞ্জরী পরাইয়া দিলাম ইনি কে? ইহার নাম কি ? কাহার অপত্য কোথায় বাগমন করিলেন ? আমি বিনীত বচনে কহিলাম ভগবন। ইনি গন্ধর্বের অধিপতি হংসের দুহিত, নাম মহা- তো। হেমকূট পৰ্বতে গলােক বাস করেন তথায় গমন করিলেন। অনন্তর অনিমিষ নােচনে ক্ষণকাল অনুধান করিয়া পুনর্বার বলিলেন ওয়ে! তুমি বালিকা বট; কিন্তু তােমার আকুতি দেখিয়া যােব তেছে চলতি নও। একটা কথা বলি শুন। আমি কৃতাঞ্জলিপুটে লণ্ডায়মান হইয়া সমাদয় প্রদর্শনপূর্বক বিষয়ে নিৰেন করিয়া ৫৬ কাদম্বী। মহাভাগ! আদেশ দ্বারা এই মুদ্র জনের প্রতি অনুগ্রহ প্রকাশ করিবেন ইহার পর আর সৌভাগ্য কি? ভদৃশ মহাজ্ঞরা মদ্বিধ ক্ষুদ্র জরে প্রতি কটাক্ষপ ত করিলেই তাহারা চরিতার্থ হয়। আপনি বিশ্বাস পূর্বক কোন বিষয়ে আদেশ করিলে আমি চিৰঞ্জীত ও অনুগৃহীত হইব, বন্দেহ নাই। আমার বিন গর্ত বাক্য শুনিয়া সখীর কায় উপকারিণীর ন্যায় ও প্রাণদামিনীর স্থায় আমাকে জ্ঞান করি। গ্ধি দৃষ্টি দ্বারা প্রসন্নতা প্রকাশ পূর্বক নিকটবর্তী এক মালরুর পল্লব গ্রহণ করিয়া পল্লবের রসে আপন পরিধেয় বন্ধুদের এক খণ্ডে নখ দ্বারা এই পত্রিকা লিখিয়া আমাকে দিলেন। কহিনে আর কেহ যেন জানিতে না পারে, মহাশ্বেতা যখন একাকিনী থাকিবেন তঁাহার করে সমৰ্পণ করি। আমি হর্ষোৎফুল্ল লােচনে তালিকার হস্ত হইতে পত্রিকা গ্রহণ করি- লাম। তাহাতে rি খিত ছিল হংস যেমন মুক্তামালায় মৃণাভ্রমে প্রতি হয় তেমনি আমার মন মুক্তামঃ একাবলীমালায় প্রতারিত হইয়া তোমার প্রতি সাতিশয় অনুরক্ত হইয়াছে। পথভ্রান্ত পথিকের দিগ্ভ্রম, মুকের জিহ্বাচ্ছে, অম্বন্ধ জড়প্রলাপ, নাস্তিকের চার্বাক শাস্ত্র, উমন্তের সুরাপান যেরূপ ভয়ঙ্কর, পত্রিকাও আমার পক্ষে সেইরূপ ভস্কর বােধ হইল। পত্রিকা পাঠ করিয়া উন্মত্ত ও অবশেয়ি হইলাম। পুনঃ পুনঃ জিজ্ঞাসা করিতে লাগিলাম তলিকে! তুমি তঁাহাকে কোথায় কিরূপে দেখিলে? তিনি কি কহিলেন? তুমি তথায় কত ক্ষণ ছিলে? তিনি অামাদের অনুসরণে প্রবৃত্ত হইয়া কত দূর পর্যন্ত আসিয়াছিলেন ? প্রিয় 'জন সম্বদ্ধ এক কথা বারংবার বলিতে ও শুনিতে ভাল লাগে। আমি পজিদিগকে তথা হইতে বিদায় করিয়া কেবল তরণিকার সহিত মুনি- বুমারসম্বন্ধু কথায় দিবসক্ষেপ করিলাম । দিব বসানে দিবাকরের বিরহে পূৰ্বদিক আমার স্যার মলিন হইল।
কাদম্বরী। বীর হৃদন্বের ন্যায় পশ্চিম দিকের রাগ বৃদ্ধি হইতে লাগিল। দুই এক ৩ বেলা আছে এমন সময়ে ছত্রধারিণী আসিয়া কলি ভর্তৃষানিকে। অফা জান করিতে গিয়া যে দুইজৰ মুনিবুমার দেখিয়াছিলাম তঁহাদের একন ঘায়ে দণ্ডায়মান আছেন। বলিলেন অক্ষমালা লইতে আমি যাচ্ছি। মুমিকুমার এই শব্দ শ্রবণ মাত্ৰ অতি মাত্র বান্ত হইয়া কহিলাম জস্ব কে করিয়া লইয়া আইস। যেরূপ রূপের সহায় যৌবন, যৌবনের হা করতেন, মককেতনের সহায় বসন্তকাল, বসন্তকালের সহায় মনপবৰ, সেইরূপ তিনি পীকের সা, নাম কপিল দেখিবাষত্র চিনিলাম। তাহার বিষন্ন আকার দেখিয়া বোধ হইল যেন, কোম অভিপ্রায়ে অমিকে কিছু বলতে আসিয়াছেন। আমি উঠয়া প্রণাম কৰিয়া সমাদরে আমন প্রদান করিলাম। আসনে উপবেশন করিলে চরণ ধৌত করিয়া দিলাম। অনন্তর কিছু বলিতে ইচ্ছা করি। আমর নিকটে উপবিষ্ট তালিকার প্রতি দৃষ্টিপত করাতে আমি তাহার দৃষ্টিতেই অভিপ্রায় বুঝিতে পানিয়া বিনবাক্যে কহিলাম ভব! আম হইতে ইহাকে ভিন্ন ভাবিবেন না। যাহা আদেশ করিতে অভিলাষ হয় অশঙ্কিত ও অসঙ্কুচিত চিত্তে আজ্ঞা করুন। কপিল কহিলেন রাজপুত্র ! কি কহিব, লজ্জায় বাক্যৰ্ত্তি হইতে- এছন।। কদমুলফলাশী বনবাসীর মনে অনঙ্গবিলাস সঞ্চারিত হইবে ই। স্বপ্নের অগোচর। শান্তস্বভাব তাপসকে প্রণয়পৰেশ কষিয়া বিধি কি বিড়ম্বন করিলেন! দগ্ধ মন্মথ অনায়াসেই লােকদিগকে উপহাসম্পদ ও অবজ্ঞা করিতে পারে। অতঃকরণে একবার অনঙ্গবিলাস সঞ্চারিত হইলে আর ভদ্রতা নাই। তখন প্রগাঢ়ধীশক্তিসম্পন্ন লােকেরাও শিশু সার ও অপদার্থ হইয়া ধান। তখন আর লজ্জা, ধৈর্য, বিন, গান্ধী। কিছুই থাকে না। বন্ধু যে পথে পদার্পণ করিতে উদ্যত হইয়াছেন, জানি কাদম্বরী । না, উহা কি বলধারণের উপযুক্ত, কি জটাধারণের সমুচিত, কি তপস্যার অনুরূপ, কি ধর্মের অল, কি অপবর্গলাভের উপায়। কি দৈবদুর্বিপাক উপস্থিত না বলিলে চলে না, উপায়ান্তরও শরণার ও দেখি না, কি করি বলিতে হইল। শাস্ত্রকারো লিখিয়াছেন স্বীয় প্রাণবিনাশেও যদি সুহৃদের প্রাণরক্ষা হষ্ক তথাপি তা। কৰ্তব্য ; সুতরাং আমাকে লজ্জায় জলাঞ্জলি দিতে হইল। তােমার সমক্ষে রােষ। ও অসন্তোষ প্রকাশপূর্বক বন্ধুকে সেইপ্রকার তিরস্কার করিয়া আমি তথা হইতে প্রস্থান করিলাম। স্নানান র সরােবর হইতে উঠিয়া তুমি বাটী আসিলে, ভাবিলাম বন্ধু এক্ষণে একাকী কি করি- তেছেন, গুপ্তভাবে একবার দেখিয়া আদি। অনন্তর আস্তে আস্তে আসিয়া বৃক্ষের অন্তরাল হইতে দৃষ্টিপাত করিলাম ; fন্তু তাহাকে দেখিতে পাইলাম না। তৎকালে আমার অন্তঃকরণে কত বিতর্ক, কত সন্দেহ ও কতই বা ও উপস্থিত হইল। এক বার ভাবিলাম অনজের মােহন শরে মুগ্ধ হইয়া বন্ধু বুঝি, সেই কামিনীর অনুগামী হইয়া থাকিবেন। আবার মনে করিলাম সেই সুন্দরীর মনের পর চৈতন্যোদয় হওয়াতে লজ্জার আমাকে মুখ দেখাতে না পারিয়া বুঝি কোন স্থানে লুকাইয় আছেন; কি আমি ভংনন :করিয়াছি বলিয়া ক্রু হইয়া কোন স্থানে প্রস্থান করিয়াছেন; কিম্বা আমাকেই অন্বেষণ করিতেছেন। ২ামর দুইজনে চির কাল একত্র ছিলাম, কখন পরস্পর বিরহদুঃখ সহ্য করিতে হয় নাই, সুতরাং বন্ধুকে না দেখিয়া যে কত ভাবনা উপস্থিত হইল তাহা বাক্য দ্বারা ব্যক্ত করা যায় না। পুনর্ধার চিন্তা করিলাম বন্ধু আমার সমক্ষে সেইরূপ অধীরতা প্রকাশ করিয়া অতিশয় লক্ষিত হইয়া থাকিবেন। জায় কে কি না কতে? কত লোক লজায় হস্ত হইতে পরিত্রাণ পাইবার নিম ক সহপায় অবলন করে। জলে, অনলে উন্নয়নে প্রত্যাগ কাদম্বী। করিয়া থাকে। যাহা হউক, নিশ্চিন্ত থাকা হইবে না অন্বেষণ করি। ক্রমে তরুলতাগহন, চন্দনীথিকা, লতামণ্ডপ, সরোবরের কৃল সর্বত্র অন্বেষণ করিলাম, কুত্রাপি দেখিতে পাইলাম না। তখন স্নেহকাতর মনে অনিষ্ট শঙ্কাই প্রবল হইয়া উঠিল। পুনর্বার সতর্কতা পূর্বক ইতস্ততঃ অন্বেষণ কফিতে করিতে দেখিল ম সােবরের তীরে নানাবিধলতাবেষ্টিত নিভৃত এক লগহনের অভান্তর বন্তী শিলাতলে বসিয়' বাম কবে ব'ম গও সংস্থাপন পূর্ল ক চিন্তা কতে- ছেন। দুই চক্ষু মুদ্রিত, নেহলে কপােলযুগল ভাসিছে। ঘন ঘন নিশ্বাস বহিতেছে। শরীর স্পরহিত, কাশূিন্য ও পানুবর্ণ। হঠাৎ দেবিলে চিত্রিতের ন্যায় যােব হয় । এরূপ জ্ঞানশূন্য যে কল্পপদপের কুমমমঞ্জরীর অবশিষ্টরে গন্ধলােভে ভ্রমর ঝঙ্কারপূর্বক বারংবার কর্ণ বদিতেছে এবং লতা হইতে কুসুম ও কুসুমরে গাত্রে পড়িতেছে বাপি সংজ্ঞ। নাই কলেবর এরূপ শীর্ণ যে সদা চিনিতে পার যায় না। তদবস্থাপন্ন তাঁহাকে ক্ষন কাল নিরীক্ষণ করিয়া অতিশয় বিষয় হই, লাম। উদ্বিগ্ন চিত্তে চিন্তা করিলাম মরকেতুর কি প্রভাব ? ব্যক্তি ইহার শরসন্ধানের পথবৰ্ত হয় নাই সেই ধন্য ও নিরুদ্বেগে সংসার- যাত্রা সংবরণ করিয়া থাকে। এক বার উহার বণপাতের সম্মুখবর্তী হইলে আর কোন জ্ঞান থাকে না। কি আশ্চর্য! ক্ষণকালের মধ্যে এরূপ জ্ঞানরাশি ঈদৃশ অবস্থান্তর প্রাপ্ত হইয়াছেন। ইনি শৈশবাবৰি ধীর ও শান্ত প্রকৃতি ছিলেন। সকলে আদর্শস্বরূপ জ্ঞান করিয়া ইহার স্বভাবে অনুকরণ করিতে চেষ্টা করিত ও গুণের কথা উল্লেখ করিয়া যথেষ্ট এশংসা করিত। অজি কিরূপে বিবেকশক্তি ও তপঃপ্রভাবের পাছৰ করিয়া এবং গাম্ভীর্যের উম্মলন ও ধৈর্যের সমুচ্ছে করিয়া লক্ষ মন্মথ এই অসামা সংখভাসম্পন্ন মহাত্মাকে ইতর অ োয় অভিভূত যে কাদম্বরী। উম্মম্ভ করিল। শাস্ত্রকাররা কহেন নির্দোষ ও নিষ্কলঙ্ক রূপে যৌবনকাণ অতিবাহিত করা অতি কঠিন কৰ্ম্ম। ইহার অবস্থা শাস্ত্রকারলিশের কথাই সরমা করিতেছে। এইরূপ চিন্তা করিতে করিতে নিকটবর্তী হইলাম এবং শিলালের এক পাশে উপবেশন করিয়া জিজ্ঞাসা কবিতায় স! তােমাকে এরূপ দেখিতেছি কেন? বা আজি তোমার কি খ আছে? তিনি অনেক ক্ষণের পর নান উন্মীলন ও দীর্ঘ নিখাস পরিত্যাগ- পূর্বক, সখে! তুমি আদ্যোপান্ত সমুদয় বৃত্তান্ত অবগত হইও অজ্ঞেয় স্থায় কি জিজ্ঞাসা করিতেছ ! এই মাত্র উত্তর দিয়া চােদন করিতে লাগলেন। তঁাহার সেইরূপ অবস্থা ও আকাৰ দেখিয়া স্থির করিলাম, একলে উপদেশ দ্বারা ইহার কোন প্রতিকার হওয়া সম্ভব নহে। কিন্তু অন্মার্গপ্রবৃত্ত সুহৃদকে কুপথ হইতে নিবৃত্ত কর। সর্বতােভাবে কর্তব্য কৰ্ম্ম। যাহা হউক আর কিছু উপদেশ দি। এই স্থির করিয়া তাহাকে বলিলাম সখে! হাঁ আমি সকলই অবগত হইয়াছি; কিন্তু ইহাই খ্রিজ্ঞাসা কর তুমি যে পদবীতে পদার্পণ করিয়াছ উহা কি সাধুসম্মত, কি ধর্ম- শাস্ত্রোপদিষ্ট পথ ? কি তপস্যার অঙ্গ? কি স্বর্গ ও অপবর্গ লাভের উপায়? এই বিগাহঁত পথ অবলম্বন করা দূরে থাকুক এরূপ সঙ্কল্পকেও মনে স্থান দেওয়া উচিত নয়। মূঢ়েয়াই অনঙ্গপীড়ায় অধীর হয়। নির্পোধেরাই হিতাহিত বিবেচনা করিতে পারে না। তুমি কি তাহা- দিগের ন্যায় অসং পথে প্রবৃত্ত হইয়া সাধুদিগের নিকট উপহাস্পদ হইবে ? ধুবিহিত পথ অবলম্বন করিয়া মুখাভিলাষ কি? পরিণাম বির বিষয়ভােগে যাহারা সুখপ্রাপ্তির আশা করে,ধর্মবুদ্ধিতে বিতা- বৰে তাহণিগের জলমে করা হয়, তাহারা কুবলয়মালা বলি; অসিঙ্গ গলে দেয়, মহারত্ব বলিয়া অনন্ত অঙ্গার স্পর্শ করে, মৃণাল বলিয়া মত্ত হার দম্ভ উৎপাটন করতে যায়, বন্ধু বলিয়া কালসর্প খাত। খি- ;
কাদম্বরী। করে স্থায় জ্যোতি ধারণ করিয়া ও খদ্যোতের ন্যায় আপনাকে দেখাই তেছ কেন? 'সাগরের ন্যায় গীস্বভাব হইয়াও উন্মার্গপ্রস্থিত ও উদ্বেল ইন্দ্রিয়স্রোতের সংযম কতেছ না কেন? এক্ষণে আমার কথা রাখ, ক্ষুভিতচিত্তকে সংযত কর, ধৈৰ্য্য ও গাম্ভীর্য এবলম্বন করিয়া চিত্তবিকার দূর করিয়! দাও। এইরূপ উপদেশ দিতেছি এমন সময়ে ধারাবাহী অশ্রুবারি তাহার নেযুগল হইতে গলিত হইল । আমার হস্ত ধারণপূর্ধক বলিলেন সখে! অবিক কি বলিব, আশীবিষবিষের স্যায় বিষম কুসুমশরের সর- সন্ধানে পতিত হও নাই, মুখে উপদেশ দিতে ২। যাহার ইলিয় আছে, মন আছে, দেখিতে পাই, শুনতে পায়, হিতাহিত বিবেচনা করিতে পারে, সেই উপদেশের পত্র। আমার তাহা কিছু নাই। আমার নিকট ধৈৰ্য, গাম্ভীৰ্য, বিবেচনা এ সকল কথাও অস্তগত হইয়াছে। এ সময় উপদেশের সময় নয় ; যাবত জীবিত থাকি এই অচিকিৎসনীয় রােগের প্রকারের চেষ্টা পাও। আমার অঙ্গ দগ্ধ ও হদয় জর্জরিত হইতেছে। এক্ষণে যাহা কৰ্তব্য কর, এই বলিয়া নিস্তব্ধ হইলেন। যখন উপদেশ বাক্যের কোন ফল দৰ্শিল না এবং দেখিলাম তাহার হৃদয়ে অনুরাগ এরূপ দৃঢ়রূপে বদ্ধমূল হইছে যে, তাহা উম্মুলত কর। নিতান্ত অসাধ্য, তখন প্রাণরক্ষার নিমিত্ত সরােবরের সরস পাল শীতল কমলিনীদল ও স্নিগ্ধ শৈবাল তুলিয়া শৰা কৰিষা দিলাম এবং তথা শয়ন করাইয়া কম্বীপ দ্বারা বাল করিতে লাগিলাম। কালে মনে হইল দুরাত্মা দগ্ধ মদনের কিছুই অসাধ্য নাই। কোথায় বা দাসী তপন্থী কোথায় বা বিলাসরণি পর্ণকুমারী। ইদ্বিগের মনে পরস্পর অনুরাগ সঞ্চার হইবে ইহা স্বপ্নের অগোচর। ত্ব ও যদি হইৰ এবং মাধবীলতা তাহাকে অপম কম্বিয়া ও ই শাক এনে ই কাদম্বরী। | বিশ্বাস ছিল ? চেতনার কথা কি, অচেতন তরু লতা প্রভৃতিও উহার আজ্ঞার অধীন। দেবতারাও উহার শাসন উল্লজন করিতে পারেন না। কি আশ্চর্য! দুরাত্মা এই অগাধ গাম্ভীৰ্য-সাগরকেও ক্ষণকালের মধ্যে তৃণের ন্যায় অনার ও অপদার্থ করিয়া ফেলিল। এক্ষণে কি করি, কোন দিকে যাই, কি উপায়ে বান্ধবের প্রাণরক্ষা হয়। দেখিতেছি মহাশ্বেতা ভিন্ন আর কোন উপাধু নাই। বন্ধু স্বভাবতঃ ধীর, প্রগলভতা অবলম্বন করিয়া আপনি কাচ তাহার নিকট যাইতে পারিবেন না। শাকারেরা গর্চিত অকাৰ্য্য দ্বারা সুদের প্রাণরক্ষা কৰ্ত্ত্য বলিয়া থাকেন ; সুতরাং অতি লজ্জাকর ও মানহানিকর কৰ্ম্মও আমার কর্তব্য- পক্ষে পরিগণিত হইল। ভাবিলাম যদি বন্ধুকে বলি যে, তােমার মনােরথ সফল করিবার জন্য মহ.শ্বে তার নিকট চলিলাম, তাহা হইলে পাছে লজ্জাক্রমে বারণ করেন এই নিমিত্ত তাহাকে কিছু না বলি। ছল ক্রমে তােমার নিকট আসিয়াছি। এই সমদের সমুচিত, সেই রূপ অনুরাগের সমুচিত ও আমার আগমনের সমুচিত যা হয় কর, বলিয়া কি উত্তর দি শুনিবার অাশয়ে আমার মুখপানে চাহিয়া রহিলেন। আমি তাহার সেই কথা শুনিয়া সুখময় হ্রদে, অমৃতময় সরোবরে নিময় হইলাম। লজ্জা ও হর্ষ একদা আমার মুখমণ্ডলে আপন আপন ভাব প্রকাশ করিতে লাগিল। ভাবিলাম অনঙ্গ সৌভাগ্যক্রমে আমার ন্যায় তাহাকেও সম্ভাপ দিতেছে। শান্তস্বভাব তপস্বী কপিঞ্জল স্বপ্নেও মিথ্যা কথা কহেন না। ইনি সত্যই কহিতেছেন, সন্দেহ নাই। এক্ষণে আমার কি কর্তব্য ও কি বক্তব্য এরূপ ভাবিতেছি এমন সময়ে প্রতিহারী আসিয়া কহিল ভর্তৃদারিকে! তোমার শরীর অসুস্থ হইয়াছে মহাদেবী দেখিতে আসিতেছেন, কপিল এই কথা শুনিয়া সত্বরে গাত্রোখানপুৰ্বক কহিলেন রাজপুত্রি! ভগ ভুবনচুড়ামা কাদম্বরী। কেবল এইমাত্র দিনমণি হস্তগমনের উপক্রম করিতেছেন। আর আমি অপেক্ষা করিতে পারি না। যাহা কৰ্তব্য করিও, বলিয়া আমার উত্তরবাক্য না শুনিয়াই শীঘ্র প্রস্থান করিলেন। তিনি প্রস্থান করিলে, এরূপ অন্যমনস্ক হইছিলাম যে, জননী আসিয়া কি বললেন কি করিলেন কিছুই জানিতে পারি নাই। মরণ হয় তিনি অনেক ক্ষণ আমার নিকটে ছিলেন। যিনি আন আলয়ে প্রস্থান করিলে উর্কে দৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়া দেখিলাম দিনমণি অস্থত হইয়াছেন চতুর্দিক অন্ধকারে '} , তরণিকাকে জিজ্ঞাসা করলাম তলিকে! তুমি দেখিতেছ না আমার হৃদয় আকুল হইয়াছে ও ইন্দ্রিয় বিকল হইয়া যাইতেছে ? কি কর্তব্য কিছুই বুঝতে পারিতেছি না। কপিল যাহা বলিয়া গেলেন স্বকর্ণে শুনিলে। এক্ষণে যাহা কৰ্ত্তব্য উপদেশ দাও। যদি ইতর কন্যার ন্যায় লঞ্জ', ধৈৰ্য, বিনয় ও বুকে জলাঞ্জলি দিয়া জনাব দ অবহেলন ও সদ চার জন করিয়া, পিতা মাতা কর্তৃক অননুজ্ঞাত হইয়া শং অভিসারিকাবৃত্তি অবলম্বন করি, তাহা হইলে, গুরুজনের অতিক্রম ও কুলমৰ্যাদার উল্লম্বন জন্য অধৰ্ম্ম হয়। যদি কুলধর্মের অনুরোধে মৃত্যু অঙ্গীকার করি তাহা হইলে প্রথম পরিচিত, সমাগত, কপিলের প্রণয় ভঙ্গ জন্য পাপ এবং আশা ভঙ্গ দ্বারা সেই তপােধন যুবর কোন অনিষ্ট ঘটিলে ব্ৰহ্মহত্যা ও তপস্বিহত্যা জন্য মহাপাতকে লিপ্ত হইতে হয়। এই কথা বলিতে বলিতে চন্দ্রোদয় হইল। নবােদিত চশ্নে অলোক অন্ধকার মধ্যে পতিত হওয়াতে বােধ হইল যেন জাহ্নবীর ঃ যমুনার জলের সহিত মিলিত হইয়াছে। সুধাংশু সমাগম যামিনী জ্যোৎস্নারূপ কশন প্রভা বিস্তার করিয়া যেন আহলাদে হাসিতে লাগিল। চন্দ্রোদয়ে শাখীৰ্যশালী সাগরও সুব্ধ হইয়া তরূপ বাহু প্রসারণপুৰ্ব্বক ৰেলা কাদম্বরী। ? আলিঙ্গন করে। সে সময়ে অবলার মন চঞ্চল হইবে আশ্চর্য্য কি চন্দ্রের সহায়ত' ও মানিলের অনুকূলতায় আমার হৃদয়স্থিত মদনানল প্রবল হইয়া জ্বলিয়া উঠিল। চন্দ্রের দিকে নেত্রপাত করিয়াও চারিদিকে মৃত্যুমুখ দেখিতে লাগিলাম। অন্ধকারে লক্ষ্য স্থির করিতে না পারিয়া কুসুমচাপ নিস্তব্ধ হইয়াছিল । এক্ষণে সময় পাইয়া শাসনে শরসন্ধান : পূর্বক বিরহিণীদিগের অন্বেষণ করিতে লাগিল। আমিই উহার প্রথম লক্য হইলাম। নেত্রযুগল নিমীলিত ও অঙ্গ অবশ করিয়া মুচ্ছ! অজ্ঞাত সারে আমাকে আক্রমণ করিল। তরকা সভয়ে ও সসস্ত্ৰমে গাত্রে नोउम চন্দনজল সেচনপূর্বক তালবৃন্ত দ্বারা বীজন করিতে লাগিল। ক্রমে চৈতন্য প্রাপ্ত হইয়া নখুন উন্মীলনপূর্বক দেখিলাম তলিকা বিষ - বঙ্গনে ও দীন নয়নে রোদন করিতেছে। আমি লােচন উর্মীলন করলে আমাকে জীবিত দেখিয়া অতিশয় হৃষ্ট হইল, বিনয়বাক্যে কহিল ভদধিকে! লজ্জা ও গুরুজনের অপেক্ষা পরিহারপূর্বক প্রসন্নচিত্তে আমাকে পাঠ ইয়া দাও, আমি তে’মার তচোরকে এই স্থানে আনিতেছি। অথবা যদি ইচ্ছা হয় চল, তথায় তােমাকে লইয়া যাই। তোমার আন্ত এরূপ সাংঘাতিক সঙ্কট পুনঃ পুনঃ দেখিতে পারি না। তলিকে! আমিও আর এরূপ ক্লেশকর বিরহবেদনা সহ কবিতে পারি না। চল, প্রাণ থাকিতে থাকিতে সেই প্রাণবল্পতের শরণাপন্ন হই। এই বলিয়া তলি কাকে অবলম্বন করিয়া উঠিলাম। এ সঙ্গ হইতে অবাহ করিবার উপক্রম করিতেছি এমন সময় মুক্তি পােচন স্পণ হইল। দুনিমি দর্শনে শঙ্কাতুর হইয়া ভাবিলাম এবার কি। মঙ্গলকর্মে অমঙ্গলের লক্ষণ উপস্থিত হয় কেন ? ক্রমে রুমে শশধর আকাশমণ্ডলের মধ্যবর্তী হইয়া সুধাসফিলের স্যায় চন্দন • সে গা জোৎ7 বিস্তার করলে, তুষগুল কৌমুদী' হইয় শ্বেতবর্ণ কাদশা। দীপের আয় ও চন্দ্রলােকের ব্যয় বােধ হইতে লাগিল। কুমুদিনী বিকসিত হইল। মধুর মধুলােভে তথায় বসিতে লাগিল। নানাবিধ তুমরেণু হরণ করিয়া সুগন্ধ গন্ধবহ দক্ষিণ দিক হইতে মন্দ মন্দ বহিতে লাগিল। ময়ুরগশ উন্মত্ত হইয়া মনােহর স্বরে গান আরম্ভ করিল। কোকিলের কলরবে চতুর্দি ব্যাপ্ত হইল। আমি কণ্ঠস্থিত সেই অমালা ও কাস্থিত পারিজাতমধুরী ধারণ করিয়া, রক্তবর্ণ বসনে অবগুণ্ঠিত হইয়া গুরমিকার হন্তধারণপূর্বক প্রাসাদের শিখরদেশ হইতে নামিলাম। সৌভাগ্যক্রমে কেহ আমাকে দেখিতে পাই না। প্রমদবনের নিকটে যে বার ছিল তাহা উদঘাটন পূর্ধক বাটী হইতে নির্গত হইয়া প্রিয়তমের সমীপে চলিলাম। যাইতে যাইতে ভাবিলাম অভিসারপথে প্রতি ব্যক্তির দাস দাসী ও বাহ আড়ম্বরের প্রয়োজন থাকে না। যে হেতু কন্দর্প সদর্পে শরাসনে শরসন্ধান পূর্বক অগ্রে অগ্রে গমন করিয়া সহায়তা করেন। চন্দ্র পথ আলােকময় করিয়া পথপ্রদর্শক হন। হৃদয় পূরবী হইয়া অভয় প্রদান করে। কিঞ্চিৎ দূর যাইয়া তলিকাকে কহিলাম, হরলিকে। চন্দ্র যেরূপ আমাকে তাঁহার নিকটে লইয়া যাইতেছেন, এমনি তাহাকে কি আমার নিকট হইয়া আসিতে পারেন না? তলিকা হাসিয়া বলিল, ভর্তুজারিকে! চন্দ্র কি জন্য আপনার বিপক্ষের উপকার করবেন ? পুণ্ড রীক যেরূপ তোমার রূপলাবণ্যে মােহিত হইয়াছেন, চন্দ্রও সেইরূপ তেমার নিরুপম সৌন্দৰ্য্য দর্শনে মুগ্ধ হইয়া প্রতিবিম্বচ্ছলে তােমার পাত্র- স্পর্শ ও কর দ্বারা পুনঃপুনঃ চরণ ধারণ করিতেছেন। বিরহীর বায় ইহার শরীরও পাণ্ডুবর্ণ হইয়াছে। ওংকালােচিত এই সকল পরিহাসবাক্য কহিতে কহিতে সরােবরের নিকটবর্তী হইলাম। কৈলাস পর্বত হইতে প্রবাহিত চত্ৰকান্ত মণির বশে চরণ খেতি করিড়েছিলাম এমন সময়ে সৰােবরের পশ্চিম তীরে রােধনধ্বনি শুনিলাম : কি দূর এs.
কাদম্বরী। সুস্পষ্ট কিছু বােঝা গেল না। আগমনকালে দক্ষিণ চক্ষু স্পন্দ হওয়াতে মনে মনে সাতিশয় শঙ্কা ছিল, এক্ষণে অকস্মাৎ ব্রোদনধ্বনি শুনিয়া নিতান্ত ভক্ত হইলাম ভয়ে কলেবর কাপিতে লাগিল। যে দিকে শব্দ হইতেছিল ঊৰ্ধশ্বাসে সেই দিকে দৌড়িতে লাগিলাম। অনন্তর নিঃশব্দ নিশীথপ্রভাবে দূর হইতেই ‘হা হতােহস্মি—হ দগ্ধোহস্মি—হায় কি হইল-রে দুরাত্মন্ পাপকাঠি পিশাচ মদন! কি কুকর্ম করিলি—আঃ পাপীয়সি দুর্বিনীতে মহাশ্বেতে! ইনি তােমার কি অপকার করিয়াছিলেন—রে দুশ্চরিত্র চন্দ্র চণ্ডাল! এক্ষণে তুই কৃতকাৰ্য্য হইলিরে দক্ষিণানিল ! তাের মনােরথ পূর্ণ হইল-হা পুত্রবৎসল ভবন শেতকেতো! তােমার সর্বস্ব অপহৃত হইয়াছে বুঝতে পারিতেছ না? হে ধৰ্ম্ম। তােমাকে অতঃপর কে আশ্রয় করিবে ? হে তপঃ। এতদিনের পর তুমি নিরাশ্রয় হইলে। সরস্বতি ! তুমি বিধবা হইলে । সত্য! তুমি অনাথ হইলে। হায়! এত দিনের পর সুরলােক শূন্য হইল। সখে! ক্ষণকাল অপেক্ষা কর আমি তােমার অনুগমন করি। চিরকাল একত্র ছিলাম, এক্ষণে সহায়হীন, ও বান্ধবিহীন হইয়া কিরূপে এই দেহ ভার বহন করিব। কি আশ্চর্য্য! অজন্মপরিচিত ব্যক্তিকেও অপর্কিচিতের খাব, অদৃষ্টপূর্বের ন্যায় পরিত্যাগ করিয়া গেলে ? যাইবার সময় একবার জিজ্ঞাসাও করিলে না? এরূপ কৌশল কোথায় শিখিলে এরূপ নিষ্ঠুরতা কাহার নিকট অভ্যাস করিলে? হায়! এশ সুহৃৎশূন্য, সহােদশু হইয়া কোথায় যাইব? কাহার শরণাপন্ন ব? কাহার সহিত আলাপ করিব? এত দিনের পর অন্ধ হইলাম। শূক্ত দেখিতেছি। সকলই অন্ধকারময় বােধ হইতেছে। লায়তুত জীবনে আর প্রয়ােজন কি? সখে! একবার আমার কথা র দা। একবার নয়ন উন্মীলন কর। আমি আমি তােমার প্রফুট কাদরী। সুখকমল এক বার অবলােকন করিয়া জন্মের মত বিদায় হই। আমার সহিত তােমার সেই অকৃত্রিম প্রণয় ও অকপট সৌহার্দ কোখায় গেল? তােমার সেই অমৃতমর বাক্য ও মেহময় সৃষ্টি স্বরণ করিয়া আমার বক্ষঃস্থল বিদীর্ণ হইতেছে।” কপিল আৰ্ত্তৰৱে মুক্তকণ্ঠে এইরূপ ও অন্য রূপ নানা প্রকার বিলাপ ও পরিতাপ করিতেছিলেন শুনিতে পাইলাম। কপিঞ্জলের বিলাপবাক্য শ্রবণ করি। আমার প্রাণ উড়িয়া গেল। মুক্তকণ্ঠে রােদন করিতে করিতে দ্রু-বেগে দৌড়িলাম। পদে পদে পাকস্থলন হইতে লাগিল ; তথাপি গতির প্রতিষেধ জম্মিল না । তথায় উপস্থিত হইয়া দেখিলাম, যাহার শরণাপন্ন হইতে বাটীর বহির্গত হইয়া- ছিলাম; তিনি সরােবরের তীরে নতামগুপমধ্যবর্তী শিলাতল শৈবালচিত শয্যায় শয়ন করিয়া আছেন। কমল, কুমুদ, কুবলয় প্রভৃতি নানাবিধ কুসুম, শয্যার পার্শ্বে বিক্ষিপ্ত রহিয়াছে। মৃণাল ও কদলীপ চতুর্দিকে ধিকীর্ণ আছে। তাহার শরীর নিস্পন্দ; বােধ হইল যে, এনােযােগ- পুর্বক আমার পদশব্দ শুনিতেছেন ; মনঃক্ষোভ হইয়াছিল বলিয়া যেন, একমন। হইয়া প্রণাম দ্বারা প্রায়শ্চিত্ত করিতেছে ; আমা হইতেও আর এক জন প্রিয়তম হইল বলিয়া যেন, ঈৰ্য্যা-প্রযুক্ত প্রাণ দেহকে পরিত্যাগ করিয়া গিয়াছে। ললাটে ত্রিপুক, স্কুধে বক্কলের উত্তরীয়, গলে একাবলী মাল , হস্তে মৃণালবন ধারণ পূর্বক অপূর্ব বেশ রচনা করিয়া যেন, আমার সহিত সমাগমের নিমিঃ নমনা হইয়া মন্ত্র সাধন করিতেছেন। কপিল তঁাহার কণ্ঠ ধারণ করিয়া রােদন করিতেছেন। অচিমৃত সেই মহাপুরুষকে এই হতভাগিনী ও পাপকারিণী আমি গিয়া দেখিলাম । আমাকে দেখিয়া কপিঞ্জলের দুই চক্ষু হইতে অশ্রুতে বহিতে লাগিল; দ্বিগুণ শােকাবো হইল। অতিশয় পরিতাপপূর্বক হা হতােহম্মি কালিয়া : অারও উচ্চৈঃস্বরে রােদন করিতে লাগিল।
কারী। তখন মূর্খ আরা আক্রান্ত ও মেয়ে নিত অভিভূত হইয়া যােঞ্জ হইল যে, অন্ধকারময় পালে অবতীর্ণ হইদেছি। আদনায় কোথায় গেলাম, কি বলিলাম, কিছুই মনে পড়ে না। স্ত্রীলােকের প্রায় পাষাণ- ময় এই অঙ্কই হউক, এই হতভাগিনীকে দীর্ঘ শােক ও চির কাল দুঃখ সহ করিতে হইবে বলিয়াই হউক, দৈরে অত্যন্ত প্রতিকূলতাৰশতাই বা হউক, জানি না, কি নিমিত্ত এই অভাগিনীর প্রাণ বহির্মত হইল না। অনেক ক্ষণের পর চেতন হইয়া ভূতলে বিলুতি ও ধূলিধূসরিত আঙ্গুদে অবলােকন করিলাম। প্রাণের প্রাণ ত্যাগ করিয়াছেন আমি জীবিত আছি, প্রথমতঃ ইহা নিতান্ত অসম্ভাব্য, অবিশ্বাস্য ও স্বল্পকলিত যােখ হইল। কিন্তু কপিঞ্জলের বিলাপ শুনিয়া সে ভ্রান্তি দূর হইল। তখন স্থা হতাস্মি বলিয়া আর্তনাদ ও পিতা, মাতা, সখীদিগকে সম্বােধন করিয়া উচ্চৈঃস্বরে বিলাপ করিতে লাগিলাম। হে জীবিতের! এই 'অনাথাকে পরিত্যাগ করিয়া কোথায় গেলে? তুমি তালিকাকে জিজ্ঞাসা কর আমি তােমার নিমিত্ত কত কষ্ট ভােঙ্গ ও কত ক্লেশ সহ করিয়াছি। তােমার বিরহে এক দিন যুগসহস্রের ন্যায় বোধ ইতেছে। প্রসন্ন হও, এক বার আমার কথার উত্তর দাও। আমি লজ্জা, ভয়, কুলে জলাঞ্জলি দিয়া তােমার শরণাপন্ন হইতে আসিয়াছি, তুমি রক্ষা না কমিলে আর কে রক্ষা করিবে ? এক বার নেত্র উন্মীলন করিয়া এই অভাগিনীর প্রতি দৃষ্টি পাত কর, তাহা হইলে কৃতার্থ হই। আমার আর উপায়ান্তর নাই। আমি তােমার ভক্ত ও তােমার প্রতিই সাতিশয় অনু- বক্ত; তােমা বই আর কাহাকেও জানি না। তুমি দয়া না করিলে আর কে গয়া করিবে ? আঃ এখনও জীবিত আছি। না পিতা জাতার বশবর্তিনী হইলাম, না বন্ধুবর্গের ওয় রাখিলাম, না আত্মীয়গণের অপেক্ষা করিলাম। সমুদার পরিত্যাগ কৃষি ঋগ আয় ইতে আসিয়াছি, সেই প্রাণের কোথায়? তিনি কি আমায় মাগি প্রাণত্যাগ করিয়াছেন ? অয়ে কৃত প্রাণ! তুই আমাকে খাতনা বিস্? —এই হতভাগিনীয় মৃত্যু নাই! যমও এই পাপকারিকে স্পর্শ করিতে ঘৃণা করেন। কি জয় আমি তােমাকে তাদৃশ অনুরঃ গেঞ্জি গৃহে গমন করিয়াছিলাম। আর গৃহে প্রয়োজন কি? পিতা, মাতা, বন্ধুজন ও পরিজনের ভয় কি? হায়-এক্ষণে কাহার শরণাপন্ন হই। কোথায় বাই। এৰি বনদেবতে ভগবতি ভবিতব্যতে ! অ বন্ধরে। করুণা প্রকাশ করিয়া মিতের জীবন প্রদান কর। গ্রহাবিষ্টায় ন্যায়, উমর স্থায় এইরূপ কত প্রকার বিলাপ করিয়াছিলাম। সকল এক্ষণে স্মরণ হয় না। আমার বিলাপ শ্রবণে অজ্ঞান পশু পক্ষীরাও হাহাকার করিয়াছিল এবং পল্লবপাচ্ছলে তরুণেরও অশ্রুপাত হইয়াছিল। এতক্ষণে পুন জীবিত হইয়াছেন মনে করিয়া প্রাণেশ্বরের হৃদয় স্পর্শ করিয়া দেখিলাম, কিন্তু জীবন কোথায় ? প্রাণবায়ু একবার প্রয়াণ করিলে আর কি প্রত্যশত হয় ? দৈব প্রতিকূল হইতে আর কি শুভগ্রহ সঞ্চার হয়। আমার আগমন পর্যন্ত তুই প্রিয়তমের প্রাণরক্ষা করিতে পারি নাই যপিয়া একালী মালাকে কত তিরস্কার করিলাম। প্রসন্ন হও, প্রাণেশ্বরের প্রণয়ন কর বলিয়া কপিলের চরণ ও তরণিকায় কণ্ঠ ধারণ পূর্বক ঈীন- বনে মােন করিতে লাগিলাম। সে সময়ে অশ্রুতপুর্ব, অশিক্ষিতপূর্ণ, অনুপদিপু, যে সকল করুণ বিশাপ মুখ হইতে নির্গত হইয়াছিল তাহা চিন্তা করলেও আর মনে পড়ে না। সে এ সময়, তখন সাগরের তরঙ্গের স্থায় দুই চক্ষু দিয়া অনবরত অশ্রুধারা পড়িতে লাগিল ও ক্ষণে ক্ষণে মুচ্ছা হইতে লাগিল। এইরূপে অতীত আত্মবৃত্তান্তের পরিচয় দিতে দিতে অতীত শােক দুঃখের অবস্থা স্মৃতিসংবর্তিনী হওয়াতে মহাশ্বেতা মুর্হাপন্ন ও চৈতন্য কাদরী। } শুত হইয়। যেমন শিলাতল হইতে ভূতলে পড়িতেছিলেন অমনি চাপড় কর প্রসারিত করিয়া ধরিলেন এবং অশ্রুজলাৰ্জ দীয় উত্তরীয় বঙ্কল খান্না বীজন করিতে লাগিলেন। ক্ষণকালের পর সংজ্ঞা প্রাপ্ত হইলে চাপড় বিষন্ন বদনে ও দুঃবিতচিতে কহিলেন, কি দুষ্কর্ম করিছি। আপনার নির্বাসিত শােক পুনরুদ্দীপিত করিয়া দিলাম। আর সে সকল কথার এখােন নাই; উহা শুনিতে আমার কষ্ট বােধ হইতেছে। অতি- ক্লান্ত দুরবস্থাও কীর্তনের সময় প্রত্যক্ষানুভূতের ন্যায় ক্লেশজনক হয়। যাহা হউক পতনােন্মুখ প্রাণকে, অতীত দুঃখের পুনঃপুনঃ স্মরণরূপ হুতাশনে নিক্ষিপ্ত করিবার আর আবশ্যকতা নাই। মহাশ্বেতা দীর্ঘ নিশ্বাস পরিত্যাগ এবং নির্বেদ প্রকাশ পূর্বক কহি রাজকুমার! সেই দারুণ ভয়ঙ্করী বিভাৰবীতে যে প্রাণ পরিত্যাগ করিয়া যায় নাই, সে যে কখন পরিত্যাগ করিবে এমন বিশ্বাস হমু না। আমি এরূপ পাপীয়সী, যে, মৃত্যুও আমার দর্শন পঞ্চ পরিহার করেন। এই নির্দয় পাষাণময় হৃদয়ের গােক দুঃখ সই অলীক। ও নির্লজ এবং আমাকে স্বয়ং মিলনে অগ্রগণ্য করিয়াছে। যে শােক অবলীলাক্রমে শ করিয়াছি, এক্ষণে কথা যারা তাহা ব্যক্ত করা কঠিন কৰ্ম্ম কি ? যে হলাহল পান করে, হলাহলের স্মরণে তার কি হইতে পারে ? আপনার সাক্ষাতে সেই বিম বৃত্তান্তের যে ভাগ বৰ্ণনা করি, তাহার পর এরূপ লােকোজীপক কি আছে যাহা বলিতে ও শুনতে পারা যাইবে না। দুয়াশাত্মতৃষ্ণিকা অবলম্বন করিয়া এই অকৃতজ্ঞ দেহভার বহন করিতেছি এবং সেই ভয়ঙ্কর ব্যাপারের পর প্রাণধারণের হেতুভূত যে অদ্ভুত ঘটনা ইয়াছিল তাহাই এই রাতের পরভাগ, শ্রবণ করুন। এই কন্স ৰিলাশের পর প্রাণপরিত্যাগ করাই শেখরের বিরহের প্রায় কিন্তু বি করিয়া তুলিকাকে কহিলা, অয়ি নৃশংসে। আর কখন কাদম্বরী। রােদন কৰিব, কতই বা যন্ত্রণা সহিব ? শীঘ্ৰ কাষ্ঠ আহরণ করিয়া চিতা সাজাইয়া দাও, জীবিতেশ্বরের অনুগমন করি। বলিতে বলিতে মহাপ্রমাণ এক মহাপুরুষ চন্দ্রমণ্ডল হইতে গগনমণ্ডলে অবতীর্ণ হইলেন। তঁাহার পরিধান শুভ্র বসন, কর্ণে লুবর্ণকুণ্ডল, বক্ষস্থলে হার ও হন্তে কেয়ুর। সেরূপ উজল আকৃতি কেহ কখন দেখে নাই। দেহপ্রভায় দিগ্বলয় আলােকময় করিয়া গগন হইতে ভূতলে পদার্পণ করিলেন। শরীরের সৌরভে চতুর্দিক আমােদিত হইল। চারিদিকে অমৃত বৃষ্টি হইতে লাগিল। পীবর বাহুযুগল দ্বারা প্রিয়তমের মৃত দেহ আকর্ষণ পূর্বক “বসে মহােেত! প্রাণত্যাগ করিও না, পুনৰ্ব্বার পুরীকের সহিত তােমার সমাগম সম্পন্ন হইবেক” গম্ভীর স্বরে এই কথা বলিয়া গগনমার্গে উঠিলেন। আকস্মিক এই বিস্ময়কর ব্যাপার দর্শনে বিস্মিত ও ভীত হইয়া কপিঞ্জল ইহার তত্ত্ব জিজ্ঞাসা করিলাম। কপিঙ্গল আমার কথায় কিছু উত্তর না দিয়া “রে দুরাত্ম! বন্ধুকে লইয়া কোথায় যাইতেছিস্ রোষ প্রকাশ পূর্ধক এই কথা কহিতে কহিতে তাহার পশ্চাৎ ধাবমান হইলেন। আমি উন্মুখী হইয়া দেখিতে লাগিলাম, দেখিতে দেখিতে তঁাহার। তারাগণের মধ্যে মিশাইয়া গেলেন। কপিঞ্জ- শের অদর্শন, প্রিয়তমের মৃত্যু অপেক্ষাও দুঃখজনক বােধ হইল। যে ঘটনা উপস্থিত ইহার মর্ম বুঝাইয়া দেয় এরূপ একটা লােক নাই। তৎকালে কি কর্তব্য কিছুই স্থির করিতে না পারিয়া জিজ্ঞাসা করিলাম, তবলিকে! তুমি কি ইহার কিছু মর্ম বুঝিতে পারিয়াছ? স্ত্রীস্বভাবসুলভ ভয়ে অভিভূত এবং আমার মরণশঙ্কায় উদ্বিগ্ন, বিষন্ন ও কম্পিত কলেবর হইয়া অলিকা ঋলিত গা বচৰে বলিল, ভর্তৃদারিকে! না, আমি কিছুই বুঝিতে পারি নাই। এ অতি আশ্চর্য ব্যাপার। আমার বােধ হয় ঐ মহাপুরুষ মানুষ নহেন। যাহা বলিয়া গেলেন তাহাও মিথ্যা হইবে না।
৭২ কাদম্বরী। মিথ্যা কথা দ্বারা প্রতারণা করিবার কোন অভিসন্ধি দেখি না। এরুপ ঘটনাকে আশা ও নাসের আম্পদ বলিতে হইৰেক; যাহা হউক, এক্ষণে চিতাধিয়ােহণের অধ্যবসায় হইতে পান্মুখ হও। অন্ততঃ কপিঞ্জলের আগমন কালপর্যন্ত প্রতীক্ষা কর। তাঁহার মুখে সমুহায় বৃত্তান্ত অযত হইয়া যাহা কর্তব্য পরে করিও। জীৰিততৃষ্ণার অলঙ্ক্ষতা ও স্ত্রীজনমুলভ ক্ষুদ্র প্রযুক্ত আমি সেই দুরাশায় আকৃষ্ট হইয়া তালিকার বাক্যই যুক্তিযুক্ত স্থির করিলাম। আশা কি অসীম প্রভাব! বাহার এভাবে লােকেরা তরঙ্গাকুৰ ভীষণ সাগর পার হইয়া অপরিচিত ও অজ্ঞাত দেশে প্রবেশ করে, যাহার প্রভাদ্ধে অতি দীন হীন জনেরও মুখমণ্ডল উজ্জ্বল থাকে ; যাহার প্রভাবে পুত্ৰকলত্ৰাদিয় বিরহ-দুঃখও অবলীলাক্রমে সহ্য করা যায় ; কেবল সেই আশা হাবলম্বন দেওয়াতে জনশূন্য সরােবরতীরে যাতনাময়ী সেই কাল যামিনী কঞ্চিৎ অতিবাহিত হইল। কিন্তু ঐ যামিনী যুগশতের চায় বােধ হইয়াছিল। প্রাতঃকালে উঠিয়া সরােবর আন করিলাম। সংসারের অসারতা, সমুদায় পদার্থের অনিত্যতা, আপনার হতভাগ্যতা ও বিপৎপাতের অপ্রকারিতা দেখিয়া মনে মনে বৈরাগ্যোদয় হইল। এবং প্রিয়তমের সেই কমণ্ডলু, সেই অক্ষমালা সই ব্রহ্মচর্য অবলম্বন- পূর্ব অবিচলিত ভক্তি-সহকারে এই অনাখনাথ ত্রৈলােক্যনাথের শরণা- প হইলাম। বিষয়-বাসনার সহিত পিতা-মাতার দেহ পরিত্যাগ করিলা। ইন্দ্রিয় সুখের সহিত বন্ধুদিগের অপেক্ষা পরিহার করিলাম । পর দিন পিতা মাতা এই সকল বৃত্তান্ত অবগত হইয়া পরিজন ও বন্ধুজনের সহিত এই স্থানে আইসেন ও নানাপ্রকার নানাবাক্যে ৰােৰ বিয়া খাল খনন করিতে অনুৰােধ করেন। কিন্তু যখন দেখিলে কাদম্বী। কোন একারে অবলম্বিত অধ্যবসায় হইতে পয়াম্মুখ হইলাম না, ভ অামার গমন-বিষয়ে নিতান্ত নিরাশ হইয়াও অপত্য স্নেহের নবশতঃ অনেক দিন পর্যন্ত এই স্থানে অবস্থিতি করিলেন ও প্রতিদিন নানাপ্রকার বুঝাইতে লাগিলেন । পরিশেষে হতাশ হইয়া দুঃখিত চিতে ৰাটী গমন করিলেন। তদবধি কেবল অশ্রুমােচন কারা প্রিয়তমের প্রতি ভজ্ঞতা প্রদর্শন করিয়েছি। জপ করিবার ছলে তাহার গুণ গণনা করিয়া থাকি। বহুবিধ নিয়ম দ্বারা পরাভূত এই জঙ্ক শরীর শােষণ করিতে। এই গিরিগুহায় বাস করি, ঐ সরােবরে ত্রিসন্ধ্যা স্নান করি, প্রতিদিন এই দেবাদিদেব মহাদেবের অর্চনা করিয়া থাকি। হরলিকা ভিন্ন আর কেহ নিকটে নাই। আমার ন্যায় পাপকামিণ ও হতভাগিণী এই ধণীতলে কাহাকেও দেখিতে পাই না। পাপকর্মের একশেষ করিয়াছি, ব্রহ্মহত্যার ভয় রাখি নাই। আমাকে দেখিলে ও আমার সহিত আলাপ করিলে দুরদৃষ্ট জন্মে। এই কথা বলিয়া পাণ্ডুবর্ণ বল দ্বারা মুখ আচ্ছাদন করিয়া বাষ্পাকুল নয়নে রােদন করিতে আরম্ভ করিবেন। যােথ হইল যেন, শরৎকালীন শুভ্র মেঘ চন্দ্রকে আবৃত করিল ও বৃষ্টি হইতে লাগিল। • মহাশ্বেতার বিনয়, দাক্ষিণ্য, সুশীলতা ও মহানুভবতায় মােহিত হইয়া চপীড় তাহাকে এখমেই স্ত্রীর বলিয়া জ্ঞান করিয়াছিলেন । আবার আদ্যোপান্ত আত্মান্ত বর্ণনা দ্বারা সরলতা প্রকাশ ও পতিতা- ধৰ্ম্মের চমৎকার দৃষ্টান্ত প্রদর্শন করাতে বিধাতার অলৌকিক সৃষ্টি বলিয়া বােধ হইল ও সাতিশয় বিস্ময় জন্মিল। তখন প্রতি ও প্রসন্নচিতে কহিলেন, যাহার স্নেহের উপযুক্ত কর্মের অনুষ্ঠানে অসমর্থ হইয়া কেবল অশ্রুপাত আরা লঘুতা প্রকাশ করে তাহাই অকৃতজ্ঞ। আপনি অকৃত্রিম প্রণয় ও অকপট অনুরাগের উপযুক্ত কৰ্ম্ম করিয়াও কি অষ্ণ আপনাকে অকৃতজ্ঞ ও ক্ষুদ্র মনে করিতেছেন? বিশুদ্ধ প্রেম প্রকাশের নবীন তাহাতে ৭৪ কাদম্বরী। ১ ; পথ উদ্ভাবনকে অপরিচিতের তার আজন্ম-পরিচিত বান্ধবজনের পরি- ত্যাগ এবং অকিঞ্চিৎকর পদার্থের ন্যায় সাংসারিক সুখে জলাঞ্জলি প্রদান করিয়াছেন; ব্রহ্মচর্য অবলম্বন পুৰ্ব্বক তপস্বিনী-বেশে জগদীশ্বরের আরাধনা করিতেছেন; অনন্যমনা হইয়া প্রাণেশ্বরের সহিত সমাগমের উপায় চিনা করিতেছেন। এতব্যতিরিক্ত বিশুদ্ধ প্রণয় পরিশােধের আর পন্থা কি? শাস্ত্রকারের অনুমরণকে কৃতপ্রকাশের প্রণালী বলিয়া নির্দেশ করেন উহা ব্যায়ােহ মাত্র । ব্যক্তিরাই মােহবশতঃ ঐ পথে পদার্পণ করে। ভর্তা উপরত হইলে তাহার অনুগমন করা মুখত প্রকাশ মাত্র। উহাতে কিছুই উপকার নাই। না উহা মৃতব্যক্তির পুনজীবনের উপায়, না তাহার শুভলােক প্রাপ্তির হেতু, না পরস্পর দর্শন ও সমাগমের সাধন। জীবগণ নিজ নিজ ধর্মানুসারে শুভাশুভ লোক প্রাপ্ত হয় ; সুতরাং অনুমরণ দ্বারা যে পরস্পর সাক্ষাৎ হইবে তাহার নিশ্চয় কি? লাভ এই, অনুমৃত ব্যক্তিকে আত্মহত্যা জন্য মহাপাপে লিপ্ত হইয়া ঘাের নরকে চিরকাল বাস করিতে হয় । বরং জীবিত থাকিলে সৎকর্ম দ্বারা স্বীয় উপকার ও শ্রাদ্ধতৰ্পণাদি দ্বারা উপতের উপকার করিতে পারা যায়, মরিলে কাহারও কিছুই উপক' নাই। অনুমরণ পতিব্রতার লক্ষণ নয়। দেখ, রতি, পতির মরণের পর ত্রিলােচলের নয়নানলে আত্মার আহতি প্রদান করেন নাই। শূরসেন রাজার দুহিতা পৃথা, পাণ্ডুর মরণেও অনুমৃতা হয় নাই। বিরাট রাজার কা উত্তরা, অভিমন্যুর মরণে আপন প্রাণ পরিত্যাগ করেন নাই। এতরাষ্ট্রের কন্যা দুঃশলা, জয়খের মরণােতর অর্জুনের শরানলে আপনাকে আহতি দেয় নাই। কিন্তু উহারা সকলেই পতিব্রতা বলিয়া জগতে বিখ্যাত। এইরূপ শত শত পতিজাগা যুবতী পতির বলেও জীবিত ছিল নিতে পাওয়া যায়। তাছাৱাই যথার্থ কাদম্বরী। ৭৫ বুদ্ধিমতী ও ধর্মের গতি বুঝিতে পারিয়াছিল। বিবেচনা করিলে স্বার্থপর লােকোই দুঃসহ বিরহ যন্ত্রণা সহ্য করিতে না পারিয়া অনুমরণ অবলম্বন করে। কেহ ৰা অহঙ্কা প্রকাশের নিমিত্তে এই পথে প্রবৃত হয়। • ফলত ধৰ্ম্মবুদ্ধিতে প্রায় কেহ অনুমৃত হয় না। আপনি মহাপুরুষকর্তৃক আশ্বাসিত হইয়াছেন, তিনি যে মিথ্যা কথা দ্বারা প্রতারণা করিবেন এমন বােধ হয় না। দৈব অনুকূল হইয়া আপনার প্রতি অনুকম্পা প্রকাশ করিবেন, সন্দেহ নাই। বিলে পুনৰ্ব্বার জীবিত হয়, এ কথা নিতান্ত অসস্তাবিত নহে। পূর্বকালে গন্ধরাজ বিশ্বাবনুর ঔরসে মেনকার গর্ভে প্রমা নামে এক কন্য। জন্মে। ঐ কন্যা আশীবিষদষ্ট ও বিষৰেণে উপত হইয়া- ছিল, কিন্তু রুনামক ঋষিকুমার আপন পরমায়ুর অর্ধেক প্রদান করিয়া উহাকে পুনর্জীবিত করেন। অভিমনুর তনয় পরীক্ষিত অশ্বত্থামার অস্ত্র দ্বারা আহত ও প্রাণবিযুক্ত হইয়াও পরমকারুণিক বাংদেবের অনুকম্পায় পুনর্বার জীবিত হন। জগদীখর সানুগ্রহ ও অনুকূল হইলে কিছুই অসাধ্য থাকে না। চিন্তা করিবেন না, অচিরাৎ অভীষ্ট সিদ্ধ হইবেক। সংসারে পদার্পণ করিলেই পথে পদে বিপদ আছে। কিছুই স্থায়ী নহে। বিশেষতঃ দন্ধ বিধি অকু- ত্রিম প্রণয় অধিক কাল দেখিতে পারেন না। দেখিলেই অমনি যেন ঈর্ষান্বিত হন ও তৎক্ষণাৎ ভঙ্গের চেষ্টা পান। এক্ষণে ধৈর্য অবলম্বন করুন ; অনিন্দনীয় আত্মাকে আর মিথ্যা তিরস্কার করিবেন না। এইরূপ নানাবিধ সান্ত্বনাবাক্যে মহাশ্বেতাকে ক্ষান্ত করিনে। মনে মনে মাশের এই আশ্চর্য ঘটনাই চিন্তা করিতে লাগিলেন। ক্ষণকাল পরে পুনর্বার জিসা করলেন, ভদ্রে! আপনার সমকি হাবিব ও দুঃখের অংলভাগিনী পবিচারিকা লিকাণে কোথায়?
কাদম্বরী। ; মহাশ্বেতা কহিলেন, মহাভাগ! অপ্সরাখিগের এক কুল গণ্ডি ইতে সমুদ্ভূত হয়, আপনাকে কহিয়াছি। সেই কুলে মদিরা নামে এক কন্যা জন্মে। গন্ধর্বের অধিপতি চিত্রয়ণ তাহার পাণিগ্রহ ফয়েল এবং তাহার গুণে বীভূত হইয়া য-চাময় প্রভৃতি প্রদান পূর্বক তাঁহাকে মহিষী করেন। কালক্রমে মহিষী গর্ভবতী হইয়া বর্ষাকালে এক কন্যা প্রসব করেন। কন্যার নাম কাদম্বরী; কাদম্বরী নিৰ্ম্মল ও শশিকলা ঃ ক্রমে ক্রমে বৃদ্ধি প্রাপ্ত হইঘা এরূপ রূপবতী ও গুণবতী হইলেন যে, সকলেই তাহাকে দেখিলে আনন্দিত হইত ও অত্যন্ত ভাল বাসিত। শৈশবাবধি একত্র শয়ন, একত্র অশন, একর অবস্থান প্রযুক্ত আমি কাদম্বীর প্রয়পাত্র ও জেহু- পাত্র হইলাম ; সর্বদা একত্র ক্রীড়া কৌতুক করিতাম, এক শিক্ষকের নিকট নৃত্য, গীত, বাদ্য ও বিদ্যা শিখিতাম ; এক শরীরের মত দুই জনে একত্ৰ থাকিতাম। ক্রমে এরূপ অকৃত্রিম সৌহার্দ জন্মিল যে, আমি তাহাকে সহােয় ন্যায় জ্ঞান করিতাম; তিনিও আমাকে আপন হৃদয়ের জ্ঞায় ভাবিতেন। এক্ষণে আমার এই দুরবস্থা শুনিয়া প্রতিজ্ঞা করিয়াছেন, আবৎ যখে এই অবস্থায় থাকিবেন, তাবৎ আমি বিবাহ করিব না। যদি পিতা, মাতা অথবা বন্ধুবর্গ বলপূর্বক আমার বিবাহ দেন তাহা হইলে অনশনে, হুতাশনে অথবা বন্ধনে প্রাণত্যাগ করিব। শর্গ কাজ চিত্ররণ ও মহাদেবী মণীরা পরম্পরায় কন্যার এই প্রতিজ্ঞা শুনিয়া অতিশয় সুখিত হইয়াছেন। কিন্তু এক অপত্য, অত্যন্ত ভাল বাসে, সুতাং ভঁহার প্রতিজ্ঞার বিরুদ্ধে কোন কথা উখাপন করিতে পারেন লাই। যুক্তি করিয়া অদ্য প্রভাতে জীয়ােদনামা এক কধুকীকে আমার নিকট পাঠাইয়াছিলেন। তাঁহার যারা আমাকে বলি পাঠান, ‘ বস মহাশ্বেতে! ভােদা ব্যতিরেকে কেহ কাদম্বরীকে সান্ত্বনা করিতে ।।।
কাদম্বরী। ৭৫ সমর্থ নয়! সে এইরূপ প্রতিজ্ঞা করিয়াছে, এণে যাহা কর্তব্য হয় কর।” আমি একজনের গৌরব ও মিত্ৰতাৰ অনুরােধে ক্ষীরােদের সহিত তলিকাকে কাদম্বরীর নিকট পাঠাইয়াছি। বলিয়া গিয়াছি, সখি । একেই আমি মরিয়া আছি, আবার কেন যন্ত্রণা বাড়াও। তোমার প্রতিজ্ঞা শুনিয়া অত্যন্ত দুঃখিত হইলাম। আমার জীবিত থাকা যদি অভিপ্রেত হয়, তাহা হইলে গুরুজনের অনুরােধ কদাচ উজান করিও না। তলিকাও তথায় গেল, আপনি এখানে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। মহাশ্বেতা এইরূপ পরিচয় দিতেছেন এমন সময়ে নিশানা গগনমতলে উদিত হইলেন। তারাগণ হীরকের vায় উল কিরণ বিস্তার করিল। বোধ হইল যেন, যামিনী গগনের অন্ধকার নিবা- সুণের নিমিত্ত শত শত প্রদীপ প্রজ্বলিত করিলেন। মহাশ্বেতা শীতল শিলাতলে পৰের শষ্যা পাতিয়া নিদ্রা গেলেন। চাপড় মহাশ্বেতাকে নিদ্রিত দেখিয়া আপনিও শন করিলেন এবং বৈশ- শায়ন কত চিন্তা করিতেছেন, পত্ৰলেখা কত ভাবিতেছে, অন্যাক সমভিব্যাহারী লােক আমার অনাগমনে কত উদ্বিগ্ন হইয়াছে ; এই রূপ চিন্তা করিতে করিতে নিদ্রাগত হইলেন। প্রভাত হইলে মহাশ্বেতা পাত্রোখালপূর্বক সন্ধ্যোপাসনাদি সমুদায় প্রাতঃকৃত্য সমাপন করিয়া জপ করিতে আর করিলেন। চা- পীড়ও ভাভিক বিধি যথাবিধি সম্পাদন করিতেছেন, এমন সময়ে পনৰাহু, বিশালবঃস্থল, করে তরবারিধারী, বল, বােড়শবর্ষবয়স্ক, কেয়ুরনামা এক গন্ধৰ্ব্বদারকের সহিত তালিকা ওখায় উপস্থিত হইল। অপরিচিত চন্দ্ৰাপীড়ের অলৌকিক সৌন্দৰ্য্য চৰ্শৰে নিশ্চিত মুইয়া, ইনি কে? কোথা হইতে আসিলেন। এইরূপ চিন্তা করিতে, ৭৮ কাদরী। করিতে মহাশ্বেতার নিকটে গিয়া বসিল। কেয়ুৰকও এক শিলা- তলে উপবিষ্ট হই। জপ সমাপ্ত হইলে মহাশ্বেতা তালিকাকে জিজ্ঞাসি- লেন, অরলিকে । প্রিয়সখী কাদম্বরীর কুশল ? আমি যাহা বলিয়া দিয়াছিলাম তাতে ত সম্মত হইয়াছেন ? কেমন, তাহার অভিপ্রায় কি বুঝিলে ? তালিকা কহিল, তত্ত্বারিকে ! হাঁ কাদম্বরী কুশলে আছেন, আপনার উপদেশ আপনার উপদেশ বাক্য শুনিয়া রােদন করিতে করিতে কত কথা কহিলেন। এই কেয়ুরকের মুখে সদায় এ ন করুন। কেমূবক বদ্ধাঞ্জলি হইয়া নিবেদন করিল, কাদম্বরী প্রণয় প্রদর্শন পূর্বক সাদর সম্ভাষণে আপনাকে কহিলেন, “প্রিয়শখি! যাহা তলিকার মুখে বলিয়া পাঠাইয়াছ উহা কি গুরুজনের অনুরােধ ক্ৰমে, অথবা আমার চিত্ত পরীক্ষার নিমিত্ত, . কি অদ্যপি গৃহে আছি বলিয়া তিরস্কার করিয়াছ? যদি মনের সহিত উহা বলিয়া খাক, তােমার অন্তঃ করলে কোন অভিসন্ধি আছে, সন্দেহ নাই। এই অধীনকে একবারে পরিত্যাগ করিবে ইহা এত দিন স্বপ্নেও জানি নাই। আমার হৃদয় তােমার প্রতি যেরূপ অনুরক্ত তাহা জামিয়াও এইরূপ নিষ্ঠুর বাক্য বলিতে তােমার বিন্দুমাত্র লজ্জা হইল না? আমি জানিতাম, তুমি স্বভাব মধুরভাষিণী ও প্রিয়বাদিনী । এক্ষণে এরূপ পরুষ ও অপ্রিয় কথা কহিতে লেখার শিখিণে। আপাততঃ মধুর রূপে প্রতীয়মান, কিন্তু অবসান বিয়স কৰ্ম্মে কোন ব্যক্তির সহ প্রবৃত্তি জন্মে না। আমি ত প্রিয়সীর বু নিতান্ত দুঃখিনী হইয়া আছি। এসময়ে কিরূপে অকিঞ্চিৎকর বিবাহের আড়র করিয়া আমােদ প্রমোদ করিব। এ সময় আমাদের সময় নয় বলিয়াই সেইরূপ প্রতিজ্ঞা করিয়াছি। বিসখীর দুঃখে দুঃখি.অন্তঃকরণে পুখের আশা কি? সদ্যেগেই বা কাদম্বরী। ৭১ স্পৃহা কি? মানুষের ত কথাই নাই, পশুপক্ষীরাও সহচরের দুঃখে দুঃখ প্রকাশ করিয়া থাকে। দিনকরের অস্তগমনে নলিনী মুকুলিত হইলে তৎসহবাসিনী চক্রবাকাও চক্রবাকাও প্রিয়সমাগম পরিত্যাগ পূর্বক সার। রাত্রি চীৎকার করিয়া দুঃখ প্রকাশ করে। যাহার প্রিয়সী বনবাসিনী হইয়া দিন যামিনী সাতিশয় কেশে কাল যাপন করিতেছে, গে, মুখের অভিলাষিনা হইলে লােকে কি বলিবে? আমি তোমার নিমিত্ত গুরুবচন অতিক্রম লজ্জা ভয় পরিত্যাগ ও কুলকাবিরুদ্ধ সাহস অবলম্বনপূর্বক, দুস্তর প্রতিজ্ঞা অবলম্বন করিয়াছি; এক্ষণে যাহাতে প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ না হয় ও লােকের নিকট লজ্জা না পাই, এরূপ করিও।” এই বলিয়া কেয়ূরক ক্ষান্ত হইল। কেয়ুবকের কথা শুনিয়া মহাশ্বেতা মনে মনে ক্ষণকাল অনুধ্যান করিয়া কহিলেন, কেয়ুবক! তুমি বিদায় হও, আমি স্বঘ্নং কাদম্বরীর নিকট যাইতেছি। কেয়ূরক প্রস্থান করিলে চাপড়কে কহিলেন, রাজকুমার। হেমকূট অতি রমণীয় স্থান, চিত্রথের রাজধানী অতি আশ্চৰ্য্য, কাদম্বরী অতি মহানুভাব।। যদি দেখিতে কৌতুক হয় ও আর কোন কাৰ্য্য না থাকে, আমার সঙ্গে চলুন। অদ্য তথায় বিশ্রাম করিয়া কল্য প্রত্যাগমন করি- বেন। আপনার সহিত সাক্ষাৎ হইয়া অবধি আমার দুঃখভারাক্রান্ত হয় অনেক সুস্থ হইয়াছে। আপনার নিকট স্ববৃত্তান্ত বৰ্ণন করিয়া আমার শােকের অনেক লাঘব হইয়াছে। আমি অকারণমিত্র আপনার জয় পরিত্যাগ করিতে ইচ্ছা হয় না। সাধু-সমাগমে অতি দুঃখিত চিও আলাদিত হয়, এ কথা মিথ্যা নহে। আপনার গুণে ও সৌজন্যে অতি- শ, বশীভুত হইয়াছি, যতক্ষণ দেখিতে পাই তাহাই লাভ। চাপড় কহিলেন, ভগৰতি! দর্শন অবধি আপনাকে শরীর প্রাণ সমৰ্পণ করিয়াছি। এক্ষণে যে দিকে লইয়া যাইবেন সেই দিকে যাইব ও যাহা আদেশ কৰি ।
কাদম্বরী। বেন হাতেই সম্মত আছি। অনন্তর মহাশ্বেতাসমভিব্যাহারে গন্ধ- নগরে নিলেন। নগরে উত্তীর্ণ হইয়া রাজভবন অতিক্রম করিয়া ক্রমে কাদম্বরীর ভবনের স্বদেশে উপস্থিত হইলেন। প্রতীহারীরা পথ দেখাইয়া অগ্রে অগ্রে চলিল। রাজকুমার অসংখ্য সুন্দরী কুমারীপরিবেষ্টিত অন্তঃপুরের অভ্যন্তরে প্রবেশ করিলেন। কুমারীগণের শরীরপ্রভায় অন্তঃপুর সর্বদা চিন্তিময় বোধ হয়। তাহারা বিনা অলঙ্কারেও সর্বদা অলকৃত। তাহা- দিগের আকস্রিাত শােচই কণোৎপল, হসিতচ্ছবই অঙ্গরাগ, নিশ্বাসই সুগন্ধি বিলেপন, অথবদ্যুতিই কুকুলেপন, ভুজলভাই চম্পকমালা, করতলই লীলাকমল এবং অঙ্গুলিখাগই অলক্তরস। রাজকুমার কুমারীগণের মনে- হর শরীরকান্তি দেখিয়া বিস্ময়াপন্ন হইলেন। তাহাদিগের তানবিদ্ধ বেণুর ঝঙ্কারমিলিত মধুর সঙ্গীত শ্রবণে তঁাহার অন্তঃকরণ আনন্দে পুলকিত হইল। ক্রমে কাদম্বরীর বাসগৃহের নিকটবর্তী হইলেন। গৃহে অভ্যন্তরে প্রবেশিয়া দেখিলেন, কন্যাজনেরা নানা বাদ্যযন্ত্র লইয়া চতুর্দিকে বেষ্টন করিয়া বসিয়াছে; মধ্যে সুচাৰু পৰ্যঙ্কে কাদম্বরী শয়ন করিয়া নিকটবর্তী কেমূল্পককে মহাশ্বে তার বৃত্তান্ত ও মহাশ্বেতার আশ্রমে সমাগত অপরিচিত পুরুষের নাম, বয়স, বংশও তথায় আগমনহেতু সমুদায় জিজ্ঞাসা করিতেছেন। চামরধারিণী অনবরত চামর বীজন করিতেছে। শশিকলা দর্শনে জলনিধির জল যেরূপ উল্লাসিত হয়, কাদম্বরীদর্শনে চপীড়ের স্থায় সেইরূপ উল্লাসিত হইল। মনে মনে চিন্তা করিতে শাখিলেন, আহা! আজি কি রমণয় ঃ দেখিলাম। এরূপ সুন্দরী কুমারী # কখন নেপথের অতিথি হয় নাই। আজি নয়নমুগল সফল ও চিত্ত চরিতার্থ হই। জন্মান্তরে এই লোচনযুগল কত ধৰ্ম্ম ও পুথ্য কৰ্ম্ম করিয়া ছিল; সেই ফকে কাদম্বরী মনােহর মুখারবিল দেখিতে পাইল। বিধাতা কাদম্বরী। ৮১ আমার সকল ইন্দ্রিয় লােচনময় করেন নাই কেন ? তাহা হইলে, সকল ইলি কারা এ বার অবলােকন করিয়া আশা পূর্ণ কবিতাম। কি আশ্চৰ্য্য! যত বার দেখি তত আরও দেখিতে ইচ্ছা হয় । বিধাতা এরূপ রূপাতিশয় নির্মাণের পরমাণু কোথায় পাইলেন ? বােধ হয় যে, সকল পরমাণু দ্বারা ইহার রূপ লাবণ্য সৃষ্টি করিয়াছেন, তাহারই অবশিষ্ট অংশ দ্বারা কমল, কুমুদ, কুবলয় প্রভৃতি কোমল বস্তুর সৃষ্টি করিয়া থাকি- বেন। ক্রমে গন্ধকুমারীর ও রাজকুমারের চারি চক্ষু এক হইল। কাদম্বরী রাজকুমারকে দেখিয়া মনে মনে কহিলেন কেয়ুরক যে অপরিচিত যুবা পুরুষের কথা কহিতেছিল, বােধ হয়, ইনিই সেই ব্যক্তি। আহা! এরূপ সুন্দর ত কখন দেখি নাই। গন্ধৰ্ব্বনগরেও এরূপ রূপাতিশয় দেখিতে পাওয়া যায়ু না। এইরপে উভয়ের সৌন্দর্য্যে উভয়ের মন আকৃষ্ট হইল। কদম্বরী নিমেষশূন্য-লােচনে চাপীডের রূপ লাবণ্য বারংবার বলােকন করিতে লাগিলেন; কিন্তু পরিতৃপ্ত হইলেন না। যত বার দেখেন মনে নব প্রীতি মে। বহু কালের পর প্রিয়সখী মহাশ্বেতাকে সমাগত দেখি কাদরী আনন্দসাগরে মগ্ন হইলেন ও সহসা গাত্ৰোথান করিয়া সস্নেহে গাঢ় আলিঙ্গন করিলেন। মহাশ্বেতা প্রত্যাশিন করিয়া কহিলেন সখি! ইনি ভারতবর্ষের অধিপতি মহারাজ তারাপীড়ের পুত্র, নাস্থ চাপড়। দিগ্বিজয়বেশে আমাদের দেশে উপস্থিত হইয়াছেন। দশমমাত্র আমার নয়ন ও মন হরণ করিয়াছেন; কিন্তু কিরূপে হরণ করিয়া जाश বুঝিতে পারি নাই। প্রজাপতির কি চমৎকার নির্মা কৌশল। একস্থানে সমুদায় সৌন্দর্ঘ্যের সুন্দররূপ সমানে করি- ছেন। ইনি বাস করেন বলিয়া মর্ত্যলোক এক্ষণে আইনের গোৱৰাখিত হইয়াছে। তুমি কখন সকল বিদ্যা ও মন খুলে ;
৬২ কাদম্বরী। এক স্থানে সমাগম দেখ নাই, এই নিমিত্ত অনুৱেধবাক্যে বশীভূত করি। ইহাকে এখানে আনিয়াছি। তােমার কথাও ইহার সাক্ষাতে বিশেষ করিয়া বলিয়াছি। তুমি অদৃষ্টপূৰ্ব এই লজ্জা পরিত্যাগ করিয়া, অপরি চিত এই অবিশ্বাস দূর করিয়া, অজ্ঞাতকুলশীল এই শঙ্কা পরিহার করিয়া, অসঙ্কুচিত ও নিঃশঙ্কচিত্তে সুইদের স্থায় ইহার সহিত বিশ্ৰন্ত আলাপ কর এই বলিয়া মহাশ্বেতা চাপীড়ের শরিচ দিয়া দিলেন। মহাশ্বেতা ও কাদম্বরী এক পৰ্যঙ্কে উপবেশন করিলেন। রাজকুমার ও এক সিংহাসনে বসিলেন। কাদম্বরীর সঙ্কেত মাত্র বেণুর, বীণাশব্দ ও সঙ্গীত নিবৃত্ত হইল। মহাশ্বেতা স্নেহসংবলিত মধুর বচনে কাদম্বরীর অনাময় জিজ্ঞাসা করিলেন। কাদম্বয়ী বলিলেন, সকল কুশল। মনােতবের কি অনির্বচনীয় প্রভাব! প্রণয়পরায়ুখ ব্যক্তির অন্ত করণও উহার প্রভাবের অধীন হইল। কাদম্বরীর নিরুৎসুক চিন্তেও রাগ অকাতরে প্রবেশি। তিনি মহাতার সহিত কথা কহেন ও লক্রমে এক একবার চাপড়ের প্রতি কটাক্ষপাত করেন। মহা- তাে উভয়ের ভাবভঙ্গি দ্বারা উভয়ের মনােগত ভাৰ অনায়াসে বুঝতে পারিলেন। কাদরী তাম্বুল দিতে উদ্যত হইলে কহিলেন, সখি। চাপড় আগন্তুক, আগন্তুকের সম্মান করা অগ্রে কর্তব্য; চাপড়ের হতে অগ্রে আমূল প্রদান করিয়া অতিথি-সৎকার কর, পরে আমরা ও করিব। কাদরী ঈষৎ হাস্ত করিয়া মুখ ফিরাইয়া আস্তে আস্তে কহি- লে, প্রিয়দখি। অপরিচিত ব্যক্তির নিকট প্রগলভতা প্রকাশ করিতে আমার সাহস হয় না। লজা যেন আমার হত রিয়া তাকূল দিতে বারণ করিতেছে; অতএব আমার হইয়া তুমি রাজকুমারের করে মূল প্রান । মহাশ্বেতা পরিহাসপূর্বক কহিলেন, আমি তোমার প্রতিনিধি হতে পারি না। শাবি না। আপনার কর্তা কর্ম পনিই সম্পাদন কর।
কাদম্বরী। ৰংৰাৰ অনুরােধ করাতে কাদম্বরী অগত্যা কি কয়েন, লজ্জায় মুকুলিতাক্ষী হইয়া আঙ্গুল দিবার নিমিত্ত কর প্রসারণ করিলেন। চাপড়ও হস্ত বাড়াইয়া তাল ধরিবেন । এই অবসরে একটা শারিকা আসিয়া ক্রোধভরে কহিল, তদারিকে। এই দুর্বিনীত বিহগাধমকে কেন নিবারণ করিতেছ না? যদি এ আমার গাৱস্পর্শ করে, শপথ করিয়া বলিতেছি এ প্রাণ রাখিব না। কাদম্বরী শারিকার প্রণয়কোপের কথা শুনিয়া হাসিতে লাগিলেন। মহাশ্বেতা কিছু বুঝিতে না পারিয়া শারিকা কি বলিতেছে এই কথা মদলেখাকে জিজ্ঞাসিলেন। মঙ্গলেখা হাসিয়া বলিল, কাদম্বরী পরিহাস নামক শুকের সহিত কালিন্দীনাম্নী এই শারিকার বিবাহ দিয়াছেন। অদ্য প্রভাতে তালিকার প্রতি পরিহাসকে পরিহাস করিতে দেখিয়া শারিকা ঈর্ষান্বিত হইয়া আর উহার সহিত কথা কহে না, উহাকে দেখিতে পারে না এবং স্পর্শও করে না। আমরা সান্ত্বনাবাক্যে অনেক বুঝাইয়াছি কিছুতেই ক্ষান্ত হয় না। চন্দ্ৰাপীড় হাসিয়া কহিলেন হ। আমিও শুনিয়াছি, পরিহাস তালিকার প্রতি অত্যন্ত অনুরক্ত। ইহা জানিয়া শুনিয়া শারিকাকে সেই বিহগাধমের হস্তে সমর্পণ করা অতি অন্যায় কৰ্ম্ম হইয়াছে। যাহা হউক, অন্তু সেই দুর্বিনীত দাসীকে এক্ষণে এই দুষ্কর হইতে নিবৃত্ত করা উচিত। এইরূপ নানা হাস্য পরিহাস হইতেছে এমন সময়ে কী আসিয়া •লিল, মহাশ্বেতা। গন্ধরাজ চিত্ররথ ও মহিষী মদিরা আপনাকে অহ ন করিতেছেন। মহাশ্বেতা তৰায় যাইবার সময় কাদম্বরীকে জিজ্ঞাসিছেন, সবি! চাপড় এক্ষণে কোথায় থাকিবে ? কাদম্বরী কহিলেন প্রিসবি! কি জন্য তুমি এরূপ জিজ্ঞাসা করিতেছ? দর্শন অধি আমি চাপড়কে মন, প্রাণ, গৃহ, পরিজন সমুদায় সমর্পণ করিয়াছি।
r৪ কাদম্বরী। ইনি সমুদায় বস্তুর অধিকারী হইয়াছেন। যেখানে রুচি হয় থাকুন। “তােমার প্রাসাদের সমীপবন্তী ঐ প্রমদনে ক্রীড়াপঝতের প্রস্থদেশ মণিমন্দিরে গিয়া চাপড় অবস্থিতি করুন।” এই কথা বলিয়া মহাশ্বেতা চলিয়া গেলেন। বিনােদের নিমিত্ত কতিপয় বীণাবাদিক ও গায়িকা সমভিব্যাহারে দিয়া কাদম্বরী চন্দ্ৰাপীড়কে তথায় যাইতে কহিলেন। কেয়ুরক পথ দেখাইয়া অগ্ৰ অগ্রে চলিল। তাহার গমনের পর কাদম্বরী শয্যায় নিপতিত হইয়া জাগ্ৰদবস্থায় স্বপ্ন দেখিলেন, যেন লজ্জা আসিয়া কহিল চপলে! তুমি কি কুকৰ্ম্ম করিয়াছ? আজি তােমার এরূপ চিত্তৰিকার কেন হইল? কুলকুমারীদিগের এরূপ হওয়া কোন ক্রমেই উচিত নয়। লজ্জা-কর্তৃক তিরস্কৃত হইয়া মনে মনে কহিলেন অমি মােহান্ধ হইয়া কি চপলতা প্রকাশ করিয়াছি! একজন উদাসীন অপরি- চিত ব্যক্তির সঙ্গে নিঃশঙ্কচিতে কত ভাব প্রকাশ করিলাম। হার চিত্তবৃত্তি, অভিপ্রায়, স্বভাব কিছুই পরীক্ষা করিলাম না। তিনি কিরূপ লােক কিছুই জানিলাম না । থচ কঁাহার হস্তে মন, প্রাণ, সমুদায় সমর্পণ করিলাম। লােকে এই ব্যাপার শুনিলে আমাকে কি বলিবে? আমি সখীদিগের সমক্ষে প্রতিজ্ঞা করিয়াছিলাম, ৰং মহাশ্বেতা বৈধব্যদশার ক্লেশ ভােগ করিবেন, ততদিন সাংসারিক মুখে বা অলীক আমোদে অনুরক্ত হইব না। আমার ১ ই প্রতিজ্ঞা আজি কোখায় রহিল। সকলেই আমাকে উপহাস কৰিৱে, সন্দেহ নাই, নিতা এই ব্যাপার শুনিয়া কি মনে করিবেন? মাতা কি জবিকেন? প্রিয়সখী মহাশ্বেতার নিকট কি বলিয়া মুখ দেখাইব। যাহা হউক, আমায় অত্যন্ত লঘুহৃদয় ও চপল প্রকাশ হইয়াছে। বুঝি আমার মপলখা প্রকাশ করাইবার নিমিত্তই প্রজাপতি ও রতিপতি মন্ত্রণাপূর্বক ই উদাশীল পুরুষকে এখানে পাঠাইয়া থাকিবেন। অকরণে একর কাদম্বরী। অনুরাগ সঞ্চার হইলে তাহা জালিত করা দুঃসাধ্য। কাদম্বরী এইরূপ ভাবিতেছিলেন এমন সময়ে প্রণয় যেন সহসা তথায় আসিয়া কহিল, কাদম্বরি। কি ভাবিতেছ? তােমার অলীক অনুরাগ ও কপট মিত্রতায় বিরক্ত হইয়া চাপড় এখান হইতে প্রস্থান করিতে উদ্যত হইয়াছেন। গন্ধৰ্ব্বকুমারী তখন আর স্থির থাকিতে পারিলেন না। অমনি শয্যা হইতে ত্বরায় উঠিয়া গবদ্বার উদঘাটনপূৰ্ব্বক একদৃষ্টে ক্রীড়াপর্বতের দিকে চাহিয়া রহিলেন। চাপড় মণিমন্দিতে প্রবেশিয়া শিলাতলবিন্যস্ত শয্যায় শয়ন করিয়া মনে মনে চিন্তা করিলেন, গন্ধৰ্ব্বরাজদুহিতা আমার সমক্ষে যেরূপ ভাবভঙ্গি প্রকাশ করিলেন, সে সকল কি তাহার স্বাভাবিক বিলাস, কি মকরকেতু আমার প্রতি প্রসন্ন হইয়া প্রকাশ করাইলেন। র্তাহার তৎকালীন বিলাস- চেষ্টা স্মরণ করিয়া আমার অন্তঃকরণ চঞ্চল হইতেছে। আমি যখন সেই সময় তাহার প্রতি দৃষ্টিপাত করি, তখন মুখ অবনত করিয়াছিলেন। যখন অন্যাসক্তদৃষ্টি হই, তখন আমার প্রতি কটাক্ষপাতপূৰ্ব্বক চুলক্রমে মন্দ, মন্দ হানিয়াছিলেন। অনঙ্গ উপদেশ না দিলে এ সকল বিলাস প্রকাশ হয় না। যাহা হউক, অলীক সঙ্কল্পে প্রতারিত হওয়া বুদ্ধিমানের কর্ম নহে। অগ্রে তাহার মন পরীক্ষা করিয়া দেখা উচিত। এই স্থির করিয়া : সমভিব্যাহারিণী বীণাবাদিনী ও গায়িকাদিগকে গান বাদ্য আরম্ভ করিতে আদেশ দিলেন। গান ভঙ্গ হইলে উপবনের শােভা অবলােকন করিবার নিমিত্ত ক্রীড়াপর্বতের শিখরদেশে উঠিলেন। কাদম্বরী গবাক্ষদ্বার দিয়া দেথিত পাইয়া মহাশ্বেতার আগমন দর্শনচ্ছলে তথা হইতে প্রাসাদের উপরিভাগে আরােহণ করিয়া! হৃদয়বলতের প্রতি অনুরাগসঞ্চারের চিহ্ন অরূপ নানাবিধ অনলীলা ও মুনােহর বিলাস প্রকাশ করিতে লাগিলেন। হাতেই এরূপ অন্যমনস্ক হইলেন যে, যে ব্যপদেশে আমাদের শিধরদেশে কাদম্বরী। উঠিলেন তাহাতে কিছুমাত্র মনােযােগ রহিল না। মহাশ্বেতা আসিয়া প্রতিহারী দ্বারা সংবাদ দিলে সৌধশিখর হইতে অবতীর্ণ হইলেন ও স্নান ভােজন প্রভৃতি সমুদায় দিবসব্যাপার সম্পন্ন করিলেন। চাপড় মণিমন্দিরে স্নান ভােজন সমাপন করিয়া মরকত-শিলাতলে বসিয়া আছেন, এমন সময়ে তমালিকা, তালিকা ও অন্যান্য পরিজন সমভি- ব্যাহারে কাদম্বরীর প্রধান পরিচারিকা মদলেখা আসিতেছে দেখিলেন। কাহারও হন্তে সুগন্ধি অঙ্গরাগ, কাহারও করে মালতীমালা, কাহারও বা পাণিতলে ধবল দুকূল এবং এক জমের করে এক ছড়া মুক্তার হার। ঐ হারের এরূপ উজ্জ্বল প্রভা যে চন্দ্রোদয়ে যেরূপ দিঙ্গুল জ্যোৎস্নাময় হয়, উহার প্রভায় সেইরূপ চতুর্দি আলােকময় হইয়াছে। মদলেখা সমীপ বৰ্ত্তিনী হইলে চাপড় যথোচিত সমাদর করিলেন। মলেখা বহন্তে রাজকুমারের অঙ্গে অঙ্গরাগ লেপন করিয়া দিল, বস্ত্রযুগল প্রদান করিল এবং গলে মালতীমালা সমর্পণ করিয়া কহিল রাজকুমার! আপনার আগমনে অনুগৃহীত, আপনার সরল স্বভাব ও প্রকৃতিমধুর ব্যব- হারে বশীভূত এবং আপনার অহঙ্কারশুন্য সৌজয়ে সন্তুষ্ট হইয়া কাদম্বরী বংসভাবে প্রণয়সঞ্চারের প্রমাণস্বরূপ এই হার প্রেরণ করিয়াছেন। তিনি আপনার ঐশ্বৰ্য্য বা সম্পত্তি দেখাইবার আশয়ে পাঠান নাই। ইহা কেবল শুদ্ধ সরলস্বভাবতার কাৰ্য বিবেচনা করিরা অনুগ্রহপূর্বক গ্রহণ করুন। রত্নাকর এই হার বরুণকে দিয়াছিলেন। বরুণ গন্ধর্বরাজকে এবং গন্ধর্ব- রাজ কাদম্বরীকে দেন। অমৃতধন সময়ে দেবগণ ও অসুরগণ সাগরের অভ্যন্তর হইতে সমস্ত বস্তু গ্রহণ করিয়াছিলেন, কেবল ইহাই শেষ ছিল; এই নিমিত্ত এই হারের নাম শেষ। গগনমণ্ডলেই চন্দ্রের উদয় শােভা- কম হয়, এই বিবেচনা করিয়া রাজকুমারের কর্থে পরাইয়া দিবায় নিমি এই হার পঠাইয়াছেন। এই বলিয়া ফাপীড়ের কণ্ঠদেশে হার পায় । - কাদম্বরী। দিল। চন্দ্রপীড় কাদম্বরীর সৌজন্তু ও দাক্ষিণ্য এবং মদলেখার মধুর বচনে চমৎকৃত ও বিস্মিত হইয়া কহিলেন, তােমাদিগের গুণে অতিশয় বশীভূত হইয়াছি। কাদম্বরীর প্রসাদ বলিয়া হার গ্রহণ কহিলাম। অনন্তর সন্তোষজনক নানা কথা বলিয়া ও কাদম্বরীসহ নানা সংবাদ শুনিয়া মদলেখাকে বিদায় করিলেন। কাদম্বরী চলাপীড়ের অদর্শনে অধীর হইয়া পুনর্বার প্রাসাদের শিখরদেশে আরােহণ করিলেন। দেখিলেন, তিনিও উজ্জ্বল মুক্তাময় হার ক ধারণ করিয়া ক্রীড়াপর্বতের শিখরদেশে বিহার করিতেছেন। গন্ধর্ব- নন্দিনী কুমুদিনীর শ্যাষ চন্দ্রসদৃশ চন্দ্ৰাপীড়ের দর্শনে মুখবিকাশ প্রভৃতি নানা বিলাস বিস্তার করিতে লাগিলেন। ক্রমে দিবাবসান হইল। সূর্যা- মণ্ডল, দিম্মুণ্ডল ও গগনমণ্ডল রক্তবর্ণ হইল। অন্ধকারের প্রাদুর্ভাব হওয় তে দর্শনশক্তির হ্রাস হইয়া আসিল। কাদম্বরী সৌধশিখর হইতে ও চাপড় ক্রীড়াপঝতের শিখরদেশ হইতে নামিলেন। ক্রমে সুধাংশু উদিত হইয়া সুধাময় দীধিতি দ্বারা পৃথিবীকে জ্যোৎস্নায় করলেন। চাপড় মণিমন্দিরে শয়ন করিয়া আছেন, এমন সময়ে কেয়ূরক আসিয়া কহিল রাজকুমার ! কাদম্বরী আপনার সহিত সাক্ষাৎ করিতে আসিতেছেন । তিনি সসম্রমে গাত্রোখানপুর্বক সখীজন সমভিব্যাহারে সমাগত গন্ধর্বরাজপুত্রীর যথােচিত সমাদর করি- লেন। সকলে উপবিষ্ট হইলে বিনীতভাৱে কহিলেন দেবি! তােমার অনুগ্রহ ও প্রসন্নতা দর্শনে অত্যন্ত সন্তুষ্ট হইয়াছি। অনেক অনুসন্ধান করিয়াও এরূপ প্রসাদ ও অনুগ্রহের উপযুক্ত কোন গুণ আমাতে দেখিতে পাই না। ফলতঃ এরূপে অনুগ্রহ প্রকাশ করা শুদ্ধ উদার স্বভাব ও সৌজন্যের কাৰ্য, সন্দেহ নাই। কাদম্বরী তাহার বিনয় বাক্যে অতিশয় এজিত হইয়া মুখ অৰনত করিয়া রহিলেন। অনন্তর, ভারতব, উলী কাদম্বরী। 1. নগরী এবং পাপীড়ের বন্ধু, বান্ধব, জনক, জননী ও রাজ্যসংক্রান্ত নানা- বিধ কথা প্রসঙ্গে অনেক রাত্রি হইল। কেয়ুবককে চাপড়ের নিকটে থাকিতে আদেশ করিয়া কাদম্বরী শয়নাগারে গমনপূর্বক শয্যায় শয়ন করিলেন। চাপীড়ও নুশীতল শীলাতলে শয়ন করিয়া কাদম্বরীর নির- ভিমান ব্যবহার, মহাশ্বেতার নিস্কার স্নেহ, কাদম্বরীপরিজনের অকপট সৌজন্য, গন্ধৰ্ব্বনগরের রমণীয়তা ও সুখ সমৃদ্ধি মনে মনে চিন্তা করিতে কতে যামিনী যাপন করিলেন। তারাপতি সমস্ত রাত্রি জাগরণ করিয়া প্রভাতে নিভৃত প্রদেশে নিদ্রা যাইবার নিমিত্ত যেন অস্তাচলের নির্জন প্রদেশ অন্বেষণ করিতে লাগিলেন। প্রভাতসমীরণ মালীকুমেয় পরিমল এহণ করিয়া প্তো- খিত মানবগণের মনে আলাল বিতরণপূর্বক ইতস্ততঃ বহিতে লাগিল। প্রদীপের এভায় আর প্রভাব রহিল না। পরে অগ্র হইতে নিশার শিশির মুক্তার ন্যায় ভূতল পড়িতে লাগিল। তেভীর অনুরও কন- সে শত্রুবিনাশে সমর্থ হয়, যেহেতু সূ সাথি অরুণ উদিত হইয়াই অন্ধকার নিরস্ত করিয়া দিলেন। শত্রুবিনাশে কৃতসল্প লােকেরা রমণী বস্তুকেও অতিপক্ষপাতী দেখিলে তৎক্ষণাৎ বিনষ্ট করে, যেহেতু অরুণ তিমিরবিনাশে উদ্যত হইয়া সুদৃশ্য তারাগণকেও অদৃশ্য করিয়া দিলেন। প্রভাতে কমল বিকসিত ও কুমুদ মুকুলিত হইতে আইলে উভয় কুসুমের সমান শােভ হইল এবং মধুকর কলরব করিয় উভয়েতেই বগিতে লাগিল। অরুণােদয়ে তিমির নিরস্ত হইলে চক্রবাক প্রিয়মার সন্নিধানে গমনের উদ্যাগ করিতেছে, এমন সময়ে বিরহকাতরা চক্রবাকী প্রিয়তমের নিকটে আসিয়া উপস্থিত হইল। দিবাকরের উদয়ের সময়ে বােধ হইল যেন, বিগঙ্গনারা সাগরগর্ভ হইতে দুর্ণের ওজু দ্বারা মেস তুলিতেছে। দিবাকরের লােহিত কিরম জলে প্রতিফলিত হওয়াতে যে কাদম্বরী। হইল যেন, বাড়বানল সলিলের অভ্যন্তর হইতে উখিত হইয়া সিম্বল শাহ করিবার উদ্যােগ করিতেছে। চিরকাল কাহারও সমান অবস্থা থাকে না, প্রভাতে কুমুদষন শ্রীভ্রষ্ট, কমলন শেভাবিশিষ্ট, শশী অন্তগত, রবি উদিত, চক্রবাক প্রীত ও পেচক বিষন্ন হইয়া যেন, ইহাই প্রকাশ করিতে লাগিল। চন্দ্রপীড় গাত্রোখানপূর্বক মুখ ধৌত করিয়া প্রাতঃকৃত্য সমাপন করিলেন। কাদম্বরী কোথায় আছেন জানিবার নিমিত্ত কেয়ুবককে পাঠাই- লেন। কেয়ুর প্রত্যাগত হইয়া কহিল মন্দর-প্রসাদের নিম্নদেশে অঙ্গনসৌধবেদিক য় মহাশ্বেতা ও কাদম্বর। বসিয়া আছেন। চত্ৰাপীড় তখায় উপস্থিত হইয়া দেখিলেন কেহ বা রক্তপটতধারিণী কেহবা পাশুপত ব্রত বিশ্ব তাপসী ; বুদ্ধ, জীন, কার্তিকে প্রভৃতি নানা দেবতার তিপাঠ করিতেছেন। মহাশ্বেতা সারি সন্তুষণ ও আসন দান দান দর্শনাগত গন্ধপুরীদিগের সম্মাননা করিতেছেন। কাদম্বরী মহাভারত শুনিতেছেন। তথায় আসনে উপবিষ্ট হইয়া মহাশ্বেতার প্রতি দৃষ্টিপাত পূর্বক কিঞ্চিহাস্য করিনে। মহাশ্বেত চন্দ্ৰাপীড়ের অভিপ্রায় বুঝিতে পানিয়া কাদম্বরীকে কহিলেন, সখি! সঙ্গিগণ রাসুকুমারের বৃত্তান্ত কিছুই জানিতে না পারিয়া অত্যন্ত উদ্বিগ্ন আছেন, ইনিও তাহাদের নিকট যাইতে নিতান্ত উৎসুক। কিন্তু তোমার গুণে ও সৌজতে বশীভূত হইয়া বইবার কথা উল্লেখ করিতে পারিতেছেন না। অতএব অনুমতি কর, ইনি খায় গমন করুন। ভিন্নদেশী হইলেও কমলিনী ও কমলবান্ধবের গায় এবং কুমুদিনী ও কুমুদনাথের স্যায় তােমাদিগের পরস্পর প্রীতি অবিচলিত ও চিরস্থাহিনী হউক। সখি! আমি দর্শন অবধি রাজকুমারের অধীন হইয়াছি, অনুরােধের এয়ােন্স কি? রাজকুমার যাহা আদেশ করিবেন, আহাতেই সন্মত আছি।
কাদম্বরী। অন- কাদম্বরী এই কথা কহিয়া গন্ধৰ্ব্বকুমারদিগকে ডাকাইয়া আদেশ করিলেন, তােমরা রাজকুমারকে আপন স্কন্ধাবারে রাখিয়া আইস। চাপড় গাত্রোখানপূর্বক বিনয়-বাক্যে মহাশ্বেতার নিকট বিদায় লইলেন । ওর কাম্বরীকে সম্বােধন করিয়া কহিলেন, দেৰি ! বহুভাষী লােকের কথায় কেহ বিশ্বাস করে না। অতএব অধিক কথায় প্রয়ােজন নাই। পরিজনের কথা উপস্থিত হইলে আমাকেও এক জন পরিজন বলিয়া স্মরণ করিও। এই বলিয়া অন্তঃপুরের বহির্গত হইলেন। কাদম্বরী প্রেমস্নিগ্ধ চক্ষুদ্ব এক দৃষ্টে দেখিতে লাগিলেন। পরিজনেরা বহিন্তোর পর্যন্ত অনুগমন করিল। কন্যাজনেরা বহিত্তোরণের নিকট হইতে প্রতিনিবৃত্ত হইল। চাপড় কেয়ুরক-কর্তৃক আনীত ইন্দ্ৰায়ুধে আরােহণ করিয়া কাদম্বরীপ্রেরিত গন্ধৰ্ব্ব কুমারগণ সমভিব্যাহারে হেমকূটের নিকট দিয়া গমন করিতে আরম্ভ করি লেন। যাইতে যাইতে সেই পরমসুন্দরী গন্ধৰ্ব্বকুমারীকে (কবল অঃকরণ মধ্যে অবলােকন করিতেছিলেন, এমন নহে, কিন্তু চতুর্দিক্ তন্ময়ী দেখি- লে। তোমার বিরহবেদনা সহ করিতে পারিব না বলিয়া যেন কাদম্বরী পশ্চাৎ পশ্চাৎ আসিতেছেন, দেখিতে পাইলেন। কোথায় মাও যাইতে পাইবে না বলিয়া ষেন, সম্মুখে পথ রােধ করিয়া দণ্ডায়মান আছেন, দেখি লেন। ফলতঃ যে দিকে দৃষ্টিপাত করেন, সেই দিকেই কাদম্বরীর রূপলাবণ্য দেখিতে পান। ক্রমে অচ্ছেদসরােবরের তীরে সন্নিবিশিষ্ট মহাশ্বেতার শ্রমে উপস্থিত হইলেন। তথা হইতে ইন্দ্ৰায়ুখের ক্ষুরচিহ্ন আমারে অনেক দূর যাইয়া আপন স্কন্ধাবার দেখিতে পাইলেন। গন্ধৰ্ব্বকুমার- দিগকে সন্তোষজনক বাক্যে বিদায় করিয়া স্কারে প্রৰেশিলেন। রা মাকে সমাগ দেখিয়া সকলে অতি আলাদিত হইলেন। 'লে ও বৈশম্পায়নের সাক্ষাতে গুঝলােকের সমূায় সমৃদ্ধি ৰন কৰিলে। দি কাদম্বরী। মহাতা অতি মহানুভাবা, কাদম্বরী পরমসুন্দরী, গন্ধর্বলােকের ঐশ্বর্যের পরিসীমা নাই, এইরূপ নানা কথা-এসকে দিন হইল। কাদম্বরীর রূপলাবণ্য চিন্তা করিয়া যামিনী যাপন করিলেন। পর দিন এজাতকালে গা মণ্ডপে বসিয়া আছে, এমন সময়ে কেয়ূরক আলিয়া প্রণাম করিল। রাজকুমার প্রথমতঃ অবিস্তৃত নেত্রযুগদ্বারা, ভতর এলাৰিত বাহুযুগল দ্বারা কেয়ুরফকে আলিঙ্গন করিরা মহাশ্বেত', কাদম্বরী এবং কাদম্বরীর সখীজন ও পরিজনদিগের কুশল বার্তা জিজ্ঞাসিলেন। কেয়ুরক কহিল রাজকুমার ! এত আদর করিয় যায়- দিশের কথা জিজ্ঞাসা করিতেছেন, তাহাদিগের কুশল সন্দেহ কি! কাঞ্চ স্বরী বদ্ধাঞ্জলি হইয়া অনুনয়পুর্বক এই বিলেপন ও এই তাল গ্রহণ করিতে অনুরােধ করিয়াছেন। মহাশ্বেতা বলিয়া পাঠাইয়াছেন, “রাজকুমার। যাহারা আপনাকে নেপথের অতিখি করে নাই, তাহারাই ধন্য ও সুখে কালযাপন করিতেছে। যে গন্ধর্বগর আপনি উৎসবময় ও আনন্দময় দেখিয়া গিয়াছেন, তাহা এফলে আপনার বিরহে দীন বেশ ধারণ করিয়াছে। আমি সমুদয় পরিত্যাগ করিয়াছি, রাজকুমারকে বিস্মৃত হইবার চেষ্টা শাইতেছি, কিন্তু আমার মন ধারণ না মানিয়া সেই চন্দ্রমুখ গোখতে সর্বদা উৎসুক। কাদম্বরী দিবসৰিভাবী আপনার প্রফুল্ল মুখমল মরণ করিয়া অতিশয় অসুস্থ হইয়াছেন। অতএব আর এক বার গন্ধনগরে পদার্পণ করিলে সকলে চরিতার্থ হই।” শেষনামক হার শয্যায় বিস্মৃত হইয়া ফেলিয়া আসিয়াছিলেন, তাহা আপনাকে দিবার নিমিত্ত এই চামরধারিণীর করে পাঠাইয়াছেন। কেয়ুরকের মুখে কারীর ও মহা- শোের সন্দেশৰাক্য শ্রবণ করিয়া রাজকুমার অতিশয় আনন্দিত হইলেন হতে হয় বিলেপন ও তাম্বুল গ্রহণ করিলেন। অনন্তর কেয়ুকের সহিত মরায় গন করিলেন। যাইতে যাইতে পশ্চাতে কেহ আসিতেছে কাদম্বরী। কিনা মুখ ফিরাইয়া বারংবার দেখিতে লাগিলেন। প্রতীহারীরা তাহার অভিপ্রায় বুঝিতে পারিয়া পরিজনদিগকে সঙ্গে যাইতে নিষেধ করিল। আপনারাও সঙ্গে না গিয়া দূরে দণ্ডায়মান রহিল। চাপড় কেবল কেয়ূরকের সহিত মান্দুরায় প্রবেশিয়া ব্যগ্র হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন কেয়ু- বুক! বল, আমি তথা হইতে বহির্গত হইলে গন্ধরাজকুমারী কিরূপে দিবস অতিবাহিত করিলেন? মহাশ্বে কি বলিলেন ? পরিজনেরাই বা কে কি কছিল? আমার কোন কথা হইয়াছিল কি না? কেয়ূরক কহিল রাজকুমার! শ্রবণ করুন, আপনি গন্ধর্বনগরের বহির্গত হইলে কাদম্বরী পরিজন সমভিব্যাহারে প্রাসাদশিখরে আরােহণ করিয়া অপনার গমনপথ নিরীক্ষণ করিতে লাগিলেন। আপনি নেত্রপথের অগােচর হইলেও অনেকক্ষণ সেই দিকে নেত্র - পাত করিয়া রহিলেন। অনন্তর তথা হইতে নামিয়া যেখানে আপনি ক্ষণ, কাল অবস্থান করিয়াছিলেন, সেই ক্রীড়াপর্বতে গমন কধিলেন। তথায় খাইয়া চাপড় এই শিলাতলে বসিয়াছিলেন, এই স্থানে স্নান করিয়া ছিৰে, এই স্থানে ভােজন করিয়াছিলেন, এই মরকত শিলায় শয়ন করিয়া- ছিলেন, এই সকল দেখিতে দেখিতে দিবস অতিবাহিত হইল। দিবাক সানে মহাশ্বের অনেক প্রত্নে যৎকিঞ্চিৎ আহার করিলেন। রবি অন্ত- গত হইলেন; রুমে চশ্রোদয় হইল। চন্দ্রোদয়ে চন্দ্রকান্তমণির ন্যায় তাহার দুই চক্ষু দিয়া জলধারা পড়িতে লাগিল। নেত্র মুকুলিভ করিয়া কপােল কর প্রদানপূর্বক বিষন্নবদনে কত প্রকার চিন্তা করিতে লাগি বেন। ভাবিতে ভাবিতে অতি কষ্টে শয়নাগারে প্রবেশিলেন। প্রবেশমাত্রে শয়নাগার কারাগার বােধ হইল। সুশীতল কোমল শয্যাও উত্তপ্ত বালুকার গায় গাত্ৰ দাহ করিতে লাগিল। প্রভাত হইতে না হই গেই আমাকে ভাকাইয়া আপনার নিকট পাঠাইয়া দিলেন।
কাদম্বরী। গন্ধৰ্ব্বকুমারী পূৰ্ব্বরাগজনিত বিষম দশার আভির্ভাৰ শ্ৰণে আহলা- দিত ও কাতর হইয়া রাজকুমার আর চঞ্চল চিত্তকে স্থির করিতে পারি। লেন না। বৈশম্পায়নকে স্বন্ধাবারের রক্ষণাবেক্ষণের ভার দিয়া পত্ৰলেখার সহিত ইন্দ্ৰায়ুধে আরােহণপূৰ্ব্বক গন্ধৰ্ব্বনগরে চলিলেন। কাদম্বরীর বাটীর দ্বারদেশে উপস্থিত হইয়া ঘােটক হইতে জামিলেন। সম্মুখগত এক ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসিলেন গন্ধরাজকুমারী কাদম্বরী কোথায় ? সে প্রণতিপূৰ্ব্বক কহিল ক্রীড়াপর্বতের নিকটে দীঘিাতীরস্থিত হিমগৃহে অধিষ্ঠান করিতেছেন। কেয়ুক পথ দেখাইয়া চলি। রাজকুমার প্রমদবনের মধ্যদিয়া কিঞ্চিৎ দূর যাইয়া দেখিলেন, কদীদল ও তরুপল্লবের শােভায় দিমশুল হরিদ্বর্ণ হইয়াছে। তরুগণ বিকসিত কুসুমে আলােকময় ও সমীরণ কুসুমসৌরভে সুগন্ধময়। চতুর্দিকে সােবর, অভ্যন্তরে হিমগৃহ। বােধ হয়, যেন, অরুণ জলক্রীড়া করিবার নিমিত্ত ঐ, গৃহ নিৰ্মাণ করিয়াছেন। তথায় প্রবেশ মাত্র বােধ হয় যেন তুষারে অবগাহন করিতেছি। ঐ গৃহে সুশীতলশিলাতলবিস্ত শৈবাল ও নলিনীদলের শয্যায় শয়ন করিয়াও কাদম্বরীর গাত্রদাহ নিবারণ হইতেছে না, প্রবেশিয়া দেখিলেন। কাদম্বরী রাজকুমাকে দেখিবামাত্র অতিমাত্র সন্ত্ৰমে গত্রে- খান করিয়া যথােচিত সমাদর করিলেন। মেঘামে চাতকীর যেরূপ আলা হয়, চাপীড়ের আগমনে কাদম্বরী সেইরূপ অলাদিত হইনে। সকলে আসনে উপবিষ্ট হইলে ইনি রাজকুমারের মূল করস্কবাহিনী ও পরমপ্রীতিপাত, ইহার নাম পত্ৰলেখা, এই বলিয়া কেয়ুবক পত্ৰলেখাৰ পৰিচয় দিল। পত্ৰলেখা বিনীতভাবে মহাশ্বেতা ও কাদম্বরীকে প্রণাম করিল, ভঁহার যখখাচিত সমাদর ও সম্ভাষণপূর্বক ধারণ করিয়া আপন সমীপদেশে বসাইলেন এবং সখীর ন্যায় জ্ঞান করিতে লাগিলেন। চাপড় ত্রিখনার তদনীন্তন অবস্থা দেখিয়া মনে মনে ফি- কাদম্বরী। এখনই বল। লেন, আমার হৃদয় কি দুর্বিদগ্ধ ! মনাের ফলােমুখ ইয়াছে তা বিশ্বাস করিতেছে না। ভাল, কৌশল করিয়া দেখা যাক, এই স্থির করিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, দেবি। তােমার এরূপ অপরূপ ব্যাধি কোথা হইতে সমুখিত হইল? তােমাকে আজি এরূপ দেখিতেছি কেন? মুখ কমল মলিন হইয়াছে, শরীর শীর্ণ হইয়াছে, হঠাৎ দেখিলে চিনিতে পারা বায় না। যদি আমা হইতে এ রােগের প্রকারের কোন সম্ভাবনা থাকে আমার দেহ দান বা প্রাণদান করিলেও যদি সুস্থ হও, আমি এখনই দিতে প্রস্তুত আছি। কাদম্বরী বালা ও ভাংমুগ্ধা ইয়াও অঙ্গের উপদেশ প্রভাবে রাজকুমারের বচনচাতুরীর যথার্থ ভাৰাৰ্থ বুঝি- লেন। কিন্তু লজ্জা প্রযুক্ত বাক্য দ্বারা উত্তর দিতে অসমর্থ হইয়া ঈষৎ হাস্য করিয়া সমুচিত উত্তর প্রদান করিলেন। মদলেখা তাহারই ভাবা ব্যও করিয়া কহিল, রাজকুমার। কি বলিব, আমরা এরূপ অপরূপ ব্যাধি ও অদ্ভুত সন্তাপ কখন কাহারও দেখি নাই। সাপিত ব্যাক্তির নলিনীকমলয় হতাশনের গায়, জ্যোৎস্না উত্তাপে চায়, সমীরণ বিষে তার বােধ হয়, ইহা আমরা কখনও শ্রবণ করি নাই। জানি না, এ রোগের কি ঔষধ আছে। প্রণয়ােম্মুখ যুবজনের অন্তঃকরণ কি সন্দিগ্ধ ! কাদম্বরীর সেইরূপ এ শেখিয়া ও মদলেখার সেই রূপ উত্তর শুনিয়াও ছাপীড়ের চিত্ত সন্দেহদোলা হইতে নিবৃত্ত হইল না। তিনি ভাবিলেন, যদি আমার প্রতি কাদম্বরীর যথার্থ অনুরাগ আফিত, এ সময় শষ্ট করিয়া ব্যক্ত করিতেন। এই স্থির করিয়া যাবে তার সহিত মধুরালাপগর্ভ নানাবিধ কথাপ্রসঙ্গে ক্ষণকাল ক্ষেপ করিয়া পুনৰ্ব্বার স্কান্ধাবারে চলিয়া গেলেন। কাদম্বৰীর অনুরােধে কেবল পত্র- লেখা তথাৰু থাকিল। কাপড় অাবারে এনেশিয়া উরিনী হইতে আগত এক বার্তা- কাদম্বরী। বহকে দেখিতে পাইলেন। প্রতিবিম্ফারিত লােচনে পিতা, মাতা, বন্ধু, বান্ধব, প্রজা, পরিজন প্রভৃতি সকলের কুশলবার্তা জিজ্ঞাসিলেন। সে প্রণাতপুৰ্ব্বক দুইখানি লিখন তঁাহার হস্তে প্রদান করিল। বুজ পিতৃ-প্রেরিত পত্রিকা অগ্রে পাঠ করিয়া তদনন্তর শুকনাশ-প্রেরিত পত্রের অর্থ অবগত হইলেন। এই লিখিত ছিল, “বহু দিবস হইল তােমরা বাটী হইতে গমন করিয়াছ। অনেক কাল তোমাদিগকে না দেখিয়া আমরা অতিশয় উৎকণ্ঠিতচিত্ত হইয়াছি। পত্রপাঠ মাত্র উজ্জয়িনীতে না পঁহুছিলে, আমাদিগের উদ্বেগ বৃদ্ধি হইতে থাকিবে। বৈশম্পায়নও যে দুইখানি পত্র পাঠাইয়াছিলেন তাহাতেও এইরূপ লিখিত ছিল। যুব- রাজ পত্র পাইয়া মনে মনে চিন্তা করিলেন কি করি, একদিকে গুরুজনের আজ্ঞা, আর দিকে প্রণয়প্রবৃত্তি। গন্ধরাজতনয়া কথা দ্বারা অনুর গ প্রকাশ করেন নাই বটে, কিন্তু ভাব-ভঙ্গির দ্বারা বিলক্ষণ লক্ষিত হইয়াছে। ফলতঃ তিনি অনুরাগিণী না হইলে আমার অন্তঃকরণ কেন তাহার প্রতি এত অনুরক্ত হইবে? যাহা হউক, এক্ষণে পিতার আদেশ অতিক্রম করা হইতে পারে না। এই স্থির করিয়া সমীপস্থিত বলাহকের পুত্র মেঘনাদকে কহিলেন, মেঘনাদ ! পত্ৰলেখাকে সমভিব্যাহার করিয়া কেয়ূবক এই বানে আসিবে। তুমি দুই এক দিন বিলম্ব কর, পত্ৰলেখা আসিলে তাহাকে সঙ্গে লইয়া বাটী যাইবে এবং কেয়ুবককে কহিবে যে, আমাকে যায় বা যাইতে হইল। এজন্য কাদম্বরী ও মহাশ্বেতার সহিত সাক্ষাৎ করিতে পারিলাম না। এক্ষণে বােধ হইতেছে তাঁহাদিগের সহিত আলাপ পরিচয় না হওয়াই ভাল ছিল। অলপ পচিম হওয়াতে কেবল পরম্পর যাতনা সহ কৰা ৰই আর কিছুই লাভ দেখিতে পাই না। যাহা হউক, গুরুজনের আজ্ঞার অধীন হইয়া আমার শরীর উজ্জয়িনীতে চলিল, অতঃকরণ যে গন্ধর্বনগরে হিল, ইহু কাদম্বরী। । বলা বাহুল্য মাত্র। অসজ্জনের নাম উল্লেখ করিবার সময় আমাকেও যেন এক একবার স্মরণ করেন। মমৎমাকে এই কথা বলিয়া বৈশম্পা যুনকে কহিলেন, আমি অগ্রসর হইলাম ; তুমি রীতিপুৰ্ব্বক স্কন্ধাবার লইয়া আইস। রাজকুমার পার্শ্ববর্তী বার্তাবহকে উজ্জয়িনীর বৃত্তান্ত জিজ্ঞাসা করিতে করিতে চলিলেন। কতিপয় অশ্বারােহীও সঙ্গে সঙ্গে চলিল। ক্রমে একা পাপ ও লতামণ্ডলীসমাকীর্ণ নিবিড় অটবী মধ্যে প্রবেশিলেল । কোন স্থানে গজভগ্ন বৃক্ষশাখা পতিত হওয়াতে পথ ধক্র ও দুর্গম হইয়াছে। কোন স্থানে বৃক্ষমণ্ডলীর শাখা সকল পরস্পর সংলগ্ন ও মূলদেশ পরস্পর মিলিত হওয়াতে দুপ্রবেশ দুর্গ সংস্থাপিত রহিয়াছে। স্থানে স্থানে এ একটা কূপ, উহার জল বিবর্ণ ও বিস্বাদ। উহার মুখ লতাজালে এরূপ আচ্ছন্ন যে, পথিকেরা জল তুলিবার নিমিত্ত লতা দ্বারা যে বুজুরচনা করিয়াছিল কেবল তাহার খারাই অনুমিত হয়। মধ্যে মধ্যে গিরিনদী আছে ; কিন্তু জল নাই। তৃষ্ণার্ত পথিকের উহার শুল্ক প্রদেশ খনন করাতে ছোট ছােট কূপ নিৰ্ম্মিত হইয়াছে। এই ভয়ঙ্কর কান্তার অতিক্রম করিতে জিসান হইল। দূর হইতে দেখিলেন, সম্মুখে এক বক্তবর্ণ পতাকা সন্ধ্যাসমীরণে উড্ডীন হইতেছে। রাজকুমার সেই দি লক্ষ্য করিয়া কিঞ্চিৎ দূৰ গমন করিলেন। যেৰিলেন, চতুর্দিকে থর্ক্সবক্ষের বনমধ্যে এক মন্দিরে ভগবতী চণ্ডিকার প্রতিমা প্রতিষ্ঠিত আছে। রচনলিপ্ত রক্তোৎপল ও বিশ্বদল সম্মুখে বিক্ষিপ্ত রহিয়াছে। বড়দেশীয় এক ধার্মিক তথায় উপবেশন করি কান বা যকন্যার মন অনুরাগ সঞ্চারের নিমিত্ত ক্লাজমালা জপ, কখন ৰা দুর্গার' তিপাঠ করিতেছেন। তিনি আরাকী, কালগ্রাসে পড়ি হইবার এধিক বিল নাই, তথাপি ভগবতী পার্বতীর নিকট কখন বা লশ্বরী। ক্ষিশাপথের অধিরাজ্য কখন বা ভূমণ্ডলের আধিপত্য কামনা কর্মিতেছে। কখন ৰা প্ৰেয়সীৰীকরণ তন্ত্রমন্ত্র শিখিতেছেন ও ঔীর্থদর্শনসমাগত।। বৃদ্ধা পরিব্রাজিকাদিগের অঙ্গে বশীকরণচূর্ণ নিক্ষেপ করিতেছেন। কখন বা হস্ত বাজাইয়া মস্তক সঞ্চালনপূৰ্ব্বক মশকের ন্যায় গুণ গুণ শব্দে গান করিতেছেন। জগদীশ্বরের কি আশ্চর্য্য কৌশল! তিনি যেরূপ একস্থানে সমুদায় সৌন্দর্ঘ্যের সমাবেশ করতে পারেন, সেইরূপ তাহার কৌশলের সমুদায় বৈরূপ্যও এক হানে সন্নিবিষ্ট হইয়া থাকে। দ্রাবিড়দেশীয় ধাৰ্ম্মি কই তাহার প্রমাণস্বরূপ। তিনি কাণ, খঞ্জ, বধির ও রান্ধ; এরূপ লদের যে রাক্ষসের ন্যায় রাশি রাশি ভােজন করিয়াও উদর পূর্ণ হয় । শুলতারচিত পুষ্পকরণ্ডক ও আশিক লইয়া বনে বনে ভ্রমণ ও বৃক্ষে বৃক্ষে আরােহণ করাতে বানরগণ কুপিত হইয়া তাঁহার নাসা-কর্ণ- ছিন্ন করিয়াছে এবং ভল্লকের তীক্ষ্ণ নখে গাত্ৰ-বিক্ষত হইয়াছে। রাজ- কুমারের লােক জন তথায় উপস্থিত হইব। মাত্র তিনি তাহাদের সহিত কলহ আরম্ভ করিলেন। চাপড় মন্দিরের সন্নিধানে উপস্থিত হইয়া তুরঙ্গম হইতে অবতীর্ণ হইলেন। ভক্তিভাবে দেবীকে প্রদক্ষিণ করিয়া সাষ্টাঙ্গ প্রণিপাত করিলেন। কাদম্বরীর বিরহে তাহার অন্তঃকরণ অতিশয় উৎকণ্ঠিত ছিল, দ্রাবিড়দেশীয় ধার্মিকের আমােদজনক ব্যাপারে কিঞ্চিৎ সুস্থ হইল। তিনি স্বয়ং তঁাহ র জন্মভূমি, জাতি, বিদ্যা, পুত্র, বিভব, বিষয় ও প্রব্রজ্যার কারণ সমুদয় জিজ্ঞাসা করিতে লাগিলেন। ধাৰ্মিক আপনার শোৰ্য, বীৰ্য, ঐশ্বৰ্য্য, রূপ, গু বুদ্ধিমত্তা " রূপে পরিচয় দিলেন যে, তাহা শুনিয়া কেহ হা নিবারণ করিয়া রাখিতে পারে না। অনন্তর বুৰি অন্তগত হইলে অগ্নি খালিম্বা ও খােটকের পণ বৃক্ষশাখায় রাখিয়া সকলে মিয়া গেলে, রাজকুমার শয়ন কবির, কেবল গন্ধর্বর চিন্তা করিতে লাগিলেন।
কাদম্বরী। এতে চণ্ডিকার উপাসককে যথেষ্ট ধন দিয়া তথা হইতে বহির্গত হইলেন। কতিপয় দিনে উজ্জাম্বিনীনগরে পঁহুছিলেন। রাজকুমারের আগমনে নগর আনন্দময় হইল। তারাপীড় চাপীড়ের আগমন বার্তা শ্রবণে সাতিশয় আনন্দিত হইয়া সভাস্থ রাজমণ্ডলী সম- ভিব্যাহারে স্বয়ং প্রত্যুগমন করিলেন। প্রণত পুত্রকে গাঢ় আলিঙ্গন করিয়া তাহার শরীর শীতল হইল। যুবরাজ তথা হইতে অন্তঃপুরে প্রবেশিয়া প্রথমতঃ জননীকে, অনন্তর অবরােধকামিনীদিগকে, একে একে প্রণাম করিলেন। পরে জামাতের ভবনে গমন করি শুকনাস ও মনােরমার চরণ বন্দনাপূর্বক, বৈশম্পায়ন পশ্চাৎ আসিতেছেন সংবাদ দিয়া, তাহাদিগকে আহলাদিত করিলেন] বাটী আসিয়া জননীর নিকট আহারাদি সমাপন করিয়া, অপরাহ্নে মণ্ডপে আসিয়া বিশ্রাম করিতে লাগিলেন। তথায় জীবিতেশ্বরী গন্ধরাজকুমারীর মােহিনী মূর্তি স্মৃতি শখারূঢ় হইল; পত্রলেখা আসিলে প্রিয়তমার সংবাদ পাইব এই মন্ত্র আশা অবলম্বন করিয়া কঞ্চিৎ কালযাপন করিতে লাগিলেন। কিছুদিন পরে মেঘনাদ ও পত্ৰলেখা আসিয়া উপস্থিত হইল। বুৰ- রাজ”অতিশয় আহলাদিত হইয়া পত্ৰলেখাকে মহাশ্বেতা ও কাদম্বরীর কুশল- বার্তা জিজ্ঞাসা করিলেন। পত্ৰলেখা কহিলেন, সকলেই কুশলে আছেন। প্রিয়তমার সংক্ষেপ সংবাদ শ্রবণে যুবাজের মন পরিতৃপ্ত হইল না । তিনি ব্যগ্র হইয়া জিজ্ঞাসিলেন, পত্রলেখে! আমি তখা হইতে আগমন কৰিলে তুমি তথায় কত দিন ছিলে, হ্মরাজপুত্রী কিরূপ তােমার আদর করিয় ছিলেন, কি কি কথা হইয়াছিল ? সমুদায় বিশেষরূপে বর্ণনা কর। পত্রলেখা কহিল, শ্রবণ করুন। আপনি আগমন করিলে আমি ভয় যে কয়েক দিন ছিলাম, গন্ধকুমারীর নৰ নৰ প্ৰসাদ অনুভব করিম। আমােদ আছে পরম সুখে দিবস অতিবাহিত করিয়াছি। তিনি কাদশ্বরী। ; মাথাব্যতিরেকে এক দও থাকিতেন না। যেখানে যাইতেন, আমাকে সঙ্গে লইয়া যাইতেন। সর্বদা আমার চক্ষুর উপর তাহার নয়নােৎপল ও আমার করে তাহার পাণিপল্লব থাকিত। একদা প্রমদবচনবেদিকা আরােহণপূর্বক কিছু বলিতে অভিলাষ করিয়া বিষন্নবদনে আমার মুখ পাশে অনেক্ষণ চাহিয়া রহিলেন। তৎকালে তাহার মনে কোন অনির্ব- চনীয় ভাবােদয় হওয়াতে তাহার কম্পিত ও রােমাঞ্চিত কলেবর হইতে fলু বিন্দু স্বেদজল নিঃসৃত হইতে লাগিল। কিন্তু কিছুই বলিতে পারিলেন ল। আমি তাহার অভিপ্রায় বুঝিতে পারিয়া জিজ্ঞাসা করিলাম, দেবি ! কি বলিতেছেন বলুন। কিন্তু তাহার কথা স্ফুৰ্ত্তি হইল না ; কেবল নয়ন- যুগল হইতে জলধারা পড়িতে লাগিল। এ কি! অকস্মাৎ এরূপ দুঃখের কারণ কি? এই কথা জিজ্ঞাসা করাতে বনাঞ্চলে নেত্ৰজল মােচন করিয়া কলেন, পত্ৰলেখে ! দর্শন অবধি তুমি আমার প্রিয়পাত্র হইয়াছ। আমার হৃদয় কাহাকেও বিশ্বাস করিতে সম্মত নহে ;কিন্তু তােমাকে অত্যন্ত বিশ্বাস করিয়াছে। তােমাক মনের কথা না বলিয়া আর কাহাকে বলিব। প্রিয়সখাকে আত্মদুঃখে দুঃখিত না। করিয়া আর কাহাকে আত্মদুঃখে দুঃখিত করিব? কুমার চাপড় লােকের নিকটে আমাকে নিন্দনীয় করিলেন ও যৎপরােনাস্তি যন্ত্রণা দিলেন। কুমারীজনের কুমধুমার অন্তঃকরণ যুবজনেরা বলপূর্বক আক্রমণ করে, কিছুমাত্র দয়া করে না। এক্ষণে গুরুজনের অননুমােদিত পথে পদার্পণ করিয়া রিপে নিস্ক সঙ্ক কুলে জলাঞ্জলি প্রদান করি। কুলক্রমাগত জা ও বিনয়ই বা কিরূপে পরিত্যাগ করি। যাহা হউক, জগদীশ্বরের নিকটে এই প্রার্থনা, জন্মান্তরে যেন তােমাকে প্রিয়সখীরূপে প্রাপ্ত হই। আমি প্রাণত্য’গ দ্বারা কুলের কলঙ্ক নিবারণ করিব, অভিলাষ করিয়াছ। আমি তাহার দুর বগাহ অভিপ্রায়ে প্রবেশ করতে না পারিয়া বিষ কাদম্বর। বনে বিজ্ঞাপন করিলাম, দেবি! যুবরাজ কি অপরাধ করিয়াছেন, আপনি তাহাকে এত তিরস্কার করিতেছেন কেন? এই কথা শুনিয়া রোষ প্রকাশপূর্বক কহিলেন, ধুর্ত প্রতিদিন স্বপ্নাবস্থায় আমার নিকট উপস্থিত হইয়া আমাকে কত কুপ্রবৃত্তি দেয়, তাহা ব্যক্ত করা যায় না। কখন সঙ্কেতস্থাননির্দেশ পুক মদনলেখন প্রেরণ করে; কখন ৰ দূতীমুখে নানা অসংপ্রবৃত্তি দেয়। আমি ক্রোধান্ধ হইয়া অমনি জাগ- রিত হই ও চক্ষু উন্মীলন করি, কিন্তু কিছুই দেখিতে পাই না। কাহাকে তিরস্কার করি, কাহাকেই বা নিষেধ করি, কিছুই বুঝিতে পারি না। এই কথা দ্বারা অনায়াসে কাদম্বরীর সঙ্কল্প ব্যক্ত হইল। তখন আমি হাসিতে হাসিতে কহিলাম, দেবি! একজনের অপরাধে অস্ত্রের প্রতি দোষারােপ করা উচিত নয় । আপনি দুরাত্মা কুসুমচাপের চাপন্যে প্রতারিত হইয়াছেন, চন্দ্ৰাপীড়ের কিছুমাত্র অপরাধ নাই। কুসুমচাপই হউক, তার যে হউক তাহার রূপ, গুণ, অভাব কি প্রকার বর্ণনা কর, তাহা হইলে বুঝিতে পারি, কে আমাকে এত যাতনা দিতেছে। তিনি এই কথা কহিলে বলিলাম, সে দুরাত্মা অনঙ্গ, তাহার রূপ কোথায় ? সে জ্বালাবতী ও ধূমপটল বিস্তার না করিয়াও সভাপ প্রদান ও অশ্রু গত করে। ত্রিভুবনে প্রায় এরূপ লােক নাই, যাহাকে তাহার শরের শরব্য হইতে না হয়। কুসুমচাপের যেরূপ স্বরূপ বর্ণনা করিলে, বােধ হয়, আমি তাহার বাণপাতের পথৰী হইয়া থাকিব। এক্ষণে কি কৰ্তব্য উপদেশ দাও। এই কথা শুনি। আমি এবােধ বাক্যে বলিলাম, দেবি কত শত বিখ্যাত অবলাগণ ইচ্ছাপুৰ্ব্বক স্বয়ংবরবিধানে প্রবৃত্ত হইয়া আপন অভিলাষ সম্পাদন করিয়া থাকেন; অথচ লােকসমাজে নিন্দনীয় হয়েন না। আপনিও স্বয়ংবিধানের আয়ােজন করুন ও এখানি পত্রিকা লিবিয়া দেন। সেই পত্রিকা দেখাইয়া আমি রাজকুমকে ' কাদর্শী। অনিয়া আপনার মনেরখ পূর্ণ করিতেছি। এই কথায় অতিশয় হ হইয়া ঐতিপ্রফুল্লনয়নে ক্ষণকাল অনুধ্যান করিয়া কহিলেন, তাহা অতিশয় সাহসকারিণী, যাহারা স্বয়ংবরে প্রবৃত্ত হয় ও মনোগত কথা প্রিয়তমের নিকট বলিয়া পাঠায়। কুমারীজনের এতাদৃশ প্রাঙ্গুলভ্য ও সাহস কোথা হইতে হইবে? কি কথাই বা বলিয়া পাঠাইব! তুমি আমার অতান্ত প্রিয়, এ কথা বলা গােনরুক্ত। আমি তােমার প্রতি মাতি- শয় অনুরক্ত, বেশ-বনিতারই ইহা কথা দ্বারা ব্যক্ত করিয়া থাকে। তোমা ব্যতিরেকে জীবিত থাকিতে পারি না, এ কথা অনুভববিরুদ্ধ ও অবিশ্বাস্য। যদি তুমি না আইস, আমি স্বয়ং তোমার নিকট যাইব, এ কথায় চাপল্য প্রকাশ হয়। প্রাণ পরিত্যাগ দ্বারা প্রণয় প্রকাশ করিতেছি, এ কথা বাপাতত অসম্ভব শোধ হয়। অবশ্য একবার আসিবে, এ কথা বলিলে গর্ব প্রকাশ হয়। তিনি এখানে আসিলেই বা কি হইবে, যখন হিমগৃহে তাহার সহি সাক্ষাৎ হইয়াছিল, তিনি কত কথা কহিলেন ; আমি তাঁহার সময়ে একটা মনের কথা ব্যক্ত করিতে পারিলাম না। আমার সেই মুখ, সেই অন্তঃকরণ, কিছুই পরিবর্তন হয় নাই। পুনৰ্ব্বার সাক্ষাৎ হইলেই যে মনোগত অনুরাগ প্রকাশ করিয়া তাহাকে প্রণয়-পাশে বন্ধ করিতে পারি. হারই বা প্রাণ কি? হা হউক, এক্ষণে সখীজনের স্বাহ কর্তব্য, কর। এই বলিয়া আমাকে পাঠাইয়া দিলেন। ফলতঃ গন্ধর্থ-রাজকুম। সেইরূপ অবস্থা দেখিয়া তৎকালে তথা হইতে আপ- লার প্রত্যাগমন করায় নিতান্ত নিঃমেহতা প্রকাশ হইয়াছে। এটি যুব- রাজের উপযুক্ত কৰ্ম্ম হয় নাই। এই কথা বলিয়া পত্ৰৰে ক্ষান্ত হইল। চপ ভাবতঃ বীরপ্রকৃতি হইরাও কাদম্বরীর আদ্যোপান্ত বিরহ-বা শৰৰে সাতিশয় অধীর হইলেন; এমন সময়ে প্রতীহারী শিল্প কলি, যুবরাজ। পত্ৰলেখা আসিয়াছে, এই সংবাদ শুনিয়া মহি কাদম্বরী। পত্রলেখায় সহিত জাপনাকে অন্তঃপুরে প্রবেশ করিতে আদেশ করিলেন। অনেকক্ষণ আপনাকে না দেখিয়া অতিশয় ব্যাকুল হইয়াছেন। চাপড় মনে মনে কহিলেন, কি বিষম সঙ্কট উপস্থিত ! একদিকে গুরুজনের মেহ, আর দিকে প্রিয়তমার অনুরাগ। মাতা না দেখিয়া এক ও থাকিতে পারেন , কিন্তু পত্ৰলেখার মুখে প্রাণেশ্বরীর যে সংবাদ শুনিলাম ইহাতে আর বিলম্ব করা বিধেয় নয়। কি করি কাহার অনুরােধ রাখি। এইরূপ চিন্তা করিতে করিতে অন্তঃপুরে প্রবেশিলেন। গন্ধর্বনগয়ে কি রূপে যাইবেন দিন-যামিনী এই ভাবনায় অতিশয় ব্যাকুল হইতে লাগিলেন। কতিপয় বাসর অতীত হইলে একদা বিনােদের নিমিত্ত শিপ্রানদীর তীরে ভ্রমণ করিতেছেন এমন সময়ে দেখিলেন অতি দূরে কতকগুলি অশ্বারােহী আসিতেছে। তাহাৱা নিকটবত্তী হইলে দেখিলেন অগ্রে কেয়ুর, পশ্চাতে কতিপয় গন্ধর্বদারক। রাকুমার কেয়ূরককে অবলােকন করিয়া পরম পুলকিত হইলেন এবং প্রসারিত ভুজযুগল দ্বারা আলিন করিয়া সাদর সম্ভাষণে কুশল-বার্ত। জিজ্ঞাসিলেন। অনন্তর তা হইতে বাটী আনিয়া নির্জন গন্ধৰ্ব্বকুমারীর সন্দেশবার্ত। জিজ্ঞাসা করাতে কহিল, আমাকে তিনি কিছুই বলি দেন না, আমি মেনদের নিকট পত্র- লেখকে রাখি। ফিরি, নেম এ জকুমার উজ্জয়িনী গনন কৰিয়ছেন এই সংবাদ দিলাম । মহাশ্বেত শুনি. উ:স্থ ও দীর্ষ নিবাস পরিত্যাগ-পূৰ্ব্বক কেৰল এইমাত্র কহিলেন, হাঁ উপযুক্ত কৰ্ম্ম হইয়াছে। এবং তৎs গাৰোখান করিয়া আপন আশ্রমে চলিয়া গেলে। কাদম্বরী নিবামাত নিমীলিতনে ও মুশূন্য হইলেন। অনেক গুণের পর নয়ন উন্মীলন করিয়া লেখাকে কহিলেন, মলেখে। চাপড় যে কৰ্ম্ম করিয়াছেন আর কেহকি এরূপ করিতে পারে। এই বলিয়া শয্যায় শয়ন করিলেন। তার কাহাল ছি কোন দৃষ্টিপাত কাদরী। কহেন নাই। পর দিন এভাত কালে আমি তথায় গিয়া দেখিলাম, কান বরী সংজ্ঞা, কেহ কোন কথা কহিলে উত্তর দিতেছেন না। কেবল নয়ন-যুগল হইতে অনবরত অশ্রুধারা পতিত হইতেছে; আমি তাহার সেইরূপ অবস্থা দেখিয়া অতিশয় চিন্তিত হইলাম। এবং তাহাকে না বলিয়াই আপনার নিকট আসিয়াছি। গন্ধর্বকুমারীর বিরহবৃত্তান্ত নিতেছেন এমন সময়ে মুচ্ছা রাজকুমারের চেতনা হরণ করিল। সকলে সসম্রমে তালবৃন্ত বীজন ও শীতল চন্দনজল সেচন করতে অনেক ক্ষণের পর চেতন হইলেন। দীর্ঘ নিশ্বাস পরিত্যাগ- পূৰ্ব্বক কহিলেন, কাদম্বরীর মন আমার প্রতি এরূপ অনুরক্ত 'তাহা আমি পূর্বে জানিতে পারি নাই। এক্ষণে কি করি, কি উপায়ে প্রিয়তমার প্রাণ রক্ষা হয়। বুঝি, শুরাত্মা বিধি বিশৃঙ্খল ঘটনা ঘটাইয়া আমাকে মহাপাপে লিপ্ত ও কলঙ্কিত করিবার মানস করিয়াছে। এ সকল দৈববিড়ম্বনা সন্দেহ নাই। নতুবা নিবৰ্থক কিন্নরমিথুনের অনুসরণে কেন প্রবৃত্তি হইলে, অচ্ছেদসহােবরেই বা কেন যাইৰ, মহাশ্বেতার সঙ্গেই বা কেন সাক্ষাৎ হইবে, গন্ধষ্ণনগরেই বা কি অন্য গমন করিব, আমার প্রতি কাদ- স্বরীর অনুরাগসঞ্চারই ব কেন হইবে! এসকল বিধাতার চাতুরী সন্দেহ নাই। নতুবা অসম্ভাবিত ও স্বপ্নকল্পিত ব্যাপার সকল কিরূপে সংঘটিত হইল। এইরূপ ভাবিতে ভাবিতে দিবাবসান হইল। নিশা উপস্থিত হইলে জিজ্ঞাসিলেন, কেয়ুরক! তােমার কি ৰােধ হয়, আমাদিগের গমন পৰ্য্যন্ত কদম্বরী জীবিত থাকিবেন ? তাহার সেই পরম সুন্দর মুখচন্দ্র আর কি দেখিতে পাইব? কেয়ূরক কহিল, রাজকুমার! এই সংসারে আশাই জীবনের মূল। আশা আশ্বাস প্রদান না করিলে কেহ জীবিত কিতে পারে না। লোকেরা আশালতা অৰলন করিয়া দুধসাগরে নিতান্ত নিমগ্ন হয় না। আপনি নিতান্ত কাতর হইবেন না, ধৈৰ্য্যাবশন ৩ পূর্বক গমনের উপায় দেখুন। আপনি য় যাইবেন এই আশা অহন করিয়া গন্ধৰ্ব্বকুমারী কালক্ষেপ করিতেছেন, সন্দেহ নাই। অনন্তর রাজকুমার কেয়ূরককে বিশ্রাম করিতে আদেশ দিয়া কি রূপে গন্ধৰ্বপুর যাইবেন তাহাই চিন্তা করিতে লাগিলেন। ভাবিলেন, যদি পিতামাতাকে না বলিয়া তাহা দিগের অজ্ঞাতসারে গমন করি, তাহা হইলে কোথায় সুখ কোথায় বা শ্রেয়। পিতা যে রাজ্যভার দিয়াছেন, সে কেবল দুঃখভার, প্রতিদিন পৰ্যবেক্ষণ না করিলে বিষয় শঙ্কটের হেতুভূত হয়। সুতরাং তাহাকে বলিয়া কিরূপে যাওয়া হইতে পারে ? বলিয়া যাওয়া উচিত; কিন্তু কি বলিব! গন্ধরাজকুমারী আমাকে দেখিয়া প্রণয়পাশে বদ্ধ হইয়াছেন, আমি সেই প্রাণেশ্বরী ব্যতিরেকে প্রাণ ধারণ করিতে পাবি না, কেয়ুরক আমাকে লইতে আসিয়াছে, আমি চলিলাম, নিতান্ত নিলর্জ ও অসারের ভায় এ কথাই বা কিরূপে বলিৰ ? বহু কালের পর বাটী আসিয়াছি, কি বাপদেশেই বা আবার শীঘ্র বিদেশে যাইব? পরামর্শ জিজ্ঞাসা করি এরূণ একটা লােক নাই। প্রিয়সখ। বৈশম্পায়নও নিকটে নাই। এইরূপ নানাপ্রকার চিন্তা করিতে করিতে রাত্রি প্রভাত হইল। প্রাতঃকালে গাস্ত্রোপনপূর্বক বহির্গত হইয়া শুনিলেন, স্বন্ধাবার গশ- পুরী পৰ্যন্ত আসিয়াছে। শত শত সাম্রাজ্যলাভেও যেরুপ সন্তোষ না হয়, এই সংবাদ শুনিয়া তাদৃশ আহাদ জন্মিল । হর্ষোৎফুল্ল-নয়নে কেয়ুবককে কহিলেন, কেয়ুরক! আমার পরম মিত্র বৈশম্পায়ন আসিতে- ছে, আর চিন্তা নাই! কেয়ূরক সাতিশয় সন্তুষ্ট হইয়া কহিল, রাজকুমার মেৰেদিয়ে যেরূপ বৃষ্টির অনুমান হয়, পূর্বদিকে আমােক দেখিলে যেরূপ রবির উদয় জানা যায়, মলয়ানিল বহিলে যেরূপ বসন্তকালের সমাগম বােধ হয়, কাশকুসুম বিকসিত হইলে যেরূপ শারদারত সূচিত হয়, সেইরূপ ই ও খুটনা অচিরাৎ আপুর গন্ধর্বনগরে গমনের সূচনা করিতেছে।
কারী। ? গাজকুমারী কাদম্বরীর সহিতও আপনার সমাগম সম্পন্ন হইবে, সন্দেহ করিবেন না। কে কখন কি চলমাকে জ্যোৎস্না রহিত হইতে দেখিয়াছে ? লন্ত উদ্যান কি কখন কাহারও দৃষ্টিপথে পতিত হই- যাছে ? কিন্তু বৈশম্পায়ন আসিতেও তাহার সহিত পরামর্শ করি আপনার গর্ধনগরে যাত্রা করিতে বিলম্ব হইবে বােধ হয়। কাদম্বরীর যেরূপ শরীরের অবস্থা তাহা রাজকুমারকে পূর্বেই নিবেদন করিয়াছি; অতএব আমি অগ্রসর হইয়া আপনার আগমনবার্তা দ্বারা তাহাকে আশা প্রদান করিতে অভিলাষ করি। কেয়ুকের মায়ানুগ মধুর বাক্য শুনিয় চাপড় পৰম পরিতুষ্ট হইলেন। কহিলেন কেয়ুবক! ভাল যুক্তিযুক্ত কথা বলি এতাদৃশী দেশকালজ্ঞতা ও বুদ্ধিমত্তা কাহারও দেখিতে পাওয়া যায় না। তুমি দ্র গমন কর এবং আমাদিগের কুশল সংবাদ ও আগমনবার্তা দ্বারা প্রিয়তমার প্রাণরক্ষা কর। এত্যয়ের নিমিত্ত পত্রলেখাকেও তােমার সহিত পাঠাইয়া দিতেছি। পরে মেঘনাদকে ডাকাইয়া বলিলেন, মেঘনাল। পূর্বে তােমাকে যে স্থানে রাখিয়া আসিয়াছিলাম, পত্রলেখা ও কেয়ুবককে সমুভি- ব্যাহারে লইয়া পুনর্বার খায় যাও। নিম বৈশম্পায়ন আদিতে- ছেন, তাহার সহিত সাক্ষাৎ করিয়া আমিও তথায় যাইতেছি। মেঘনাদ ৫ অজ্ঞ। বলিয়া গমনের উদ্যোগ নিতে গেল। রাজকুমার কেয়ূরককে গাঢ় আলিঙ্গন করিয়া মূল্যের কাভৰুণ পারিতােষিক দিলে। বাষ্পকুল লােচনে কহিলেন, কেয়ুক। তুমি প্রিয়তমের কোন সন্দেশবাক্য আনিতে পার নাই, সুতরাং এতিসন্দেশ তােম কি বলিয়া দিৰ। পত্ৰলেখা ৰাইতেছে, ইহার মুখে প্রিয়তমার যাহা নিতে ইচ্ছা হয়, নিবেন। লেখাকে সম্বােধন করিয়া কহি- যে, পত্রলেখে! তুমি সাবধানে যাইবে। গন্ধৰ্ব্ব নগরে পঁহুছিয়া আমার ১০০ কাদম্বরী। নাম করিয়া কারীকে কহিবে যে, আমি বাটা আসিবার কালে তেমা- দিগের সহিত সাক্ষাৎ করিয়া আসিতে পারি নাই তজ্জ, অত্যন্ত অপরাধী আছি। তােমরা আমার সহিত যেরূপ সরল ব্যবহার করিয়াছেলে, আমার তদরূপ কী করা হয় নাই। এক্ষণে স্বীয় উদাৰ্যগুণে ক্ষমা করিলে অনুগৃহীত হই। পত্রলেখা, মেঘনা ও কেয়ুবক বিদায় হইলে রাজকুমার বৈশম্পায়নের সহিত সাক্ষাৎ করিতে অতিশয় উৎসুক হইলেন। তঁাহার আগমন পৰ্যন্ত প্রতীক্ষা করিতে পারিলেন না। আপনিই স্কন্ধারে যাইবেন স্থির করিয়া মহারাজেয় আদেশ লইতে গেলেন। রাজা প্রণতপুত্রকে সয়েহে আলি- স্নান করিয়া গাত্রে হস্তস্পর্শপুর্বক শুকনাসকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, অমাত্য। চাপড়ের শাজি উদ্ভিন্ন হইয়াছে। এক্ষণে পুত্রবধুমুখা- বলােকন দ্বারা আত্মাকে পরিতৃপ্ত করিতে বাঙ্খা হয়। মহিষীর সহিত পরামর্শ করিয়া সন্মান্তকুলজাত উপযুক্ত কন্যার অন্বেষণ কর। মন্ত্রী কহি- লেন, মহারাজ। উত্তম কর বটে। রাজকুমার সমুদায় বিদ্যা শিখিয়াছেন, উত্তম রূপে রাজ্য শাসন ও প্রজা পালন করিতেছেন। এক্ষণে নববধূর পাণিগ্রহণ করেন, ইহা সকলের বাহা। চাপড় মনে মনে কহিলেন, কি সৌভাগ্য! গন্ধর্বইমারীর সহিত সমাগমের উপায়চিন্তাসমকালেই পিতার বিবাহ দিবার অভিলাৰ হইয়াছে। এই সময় বৈশম্পায়ন আসিলে প্রিয়- তমার প্রাণিবিষয়ে আর কোন বাধা থাকে না। অন স্কন্ধারের এত্যুদগমনের নিমিত্ত পিতার আদেশ প্রার্থনা করিলেন। রাজাও সম্মত হই- লেন। বৈশায়নকে দেখিবার নিমিত্ত এরূপ উৎসুক হইয়াছিলেন , সে রাত্রি নিদ্রা হইল না। নিশীব সময়েই প্রস্থানসূচক বলি করিতে আদেশ দিলেন। শঙ্খধ্বনি এই মাত্র সকলে সজ হইয়া রাজ শবে বহির্গত হইল। পৃথিবী জ্যোময়, চতুর্দি আলােকয়। সে সময় কাদম্বরী। পথ চলায় কোন ক্লেশ হয় না। চাপড় দ্রুতবেগে অর্থে অগ্রে চলি- লেন। রাত্রি প্রভাত না হইতেই অনেক দূর চলিয়া গেলেন। স্কন্ধাবার যে স্থানে সন্নিবেশিত ছিল, প্রভাতে ঐ স্থান দেখিতে পাইলেন। গাঢ় অন্ধকারে আলোক দেখিলে যেরূপ আহাদ জন্মে-দূর হইতে স্কন্ধাবার নেত্র গােচর করিয়া রাজকুমার সেইরূপ আনন্দিত হইলেন। মনে মনে কল্পনা করিলেন, অতর্কিত রূপে সহসা উপস্থিত হইয়া বন্ধুর মনে বিস্ময় জন্মাইয়া দিব। ক্রমে নিকটবর্তী হইয়া স্কন্ধাবারে প্রবেশিলেন। দেখিলেন, কতকগুলি স্ত্রীলােক এক স্থানে বসিয়া কথা বার্তা কহিতেছে। তাহাদিগকে জিজ্ঞাসা করিলেন বৈশম্পায়ন কোথায় ? তাহারা রাজকুমারকে চিনিত না সুতরাং সমাদর বা সম্রম প্রদর্শন না করিয়াই উত্তর করিল কি জিজ্ঞাসা করিতেছ, বৈশম্পায়ন এখানে কোথায় ? আঃ কি প্রলাপ কহিতেছি, রােষ প্রকাশ- পূর্বক এই কথা বলিয়া রাজকুমার তাহাদিগের যৎপরোনান্তি তিরস্কার করিলেন। কিন্তু তাহার অন্তঃকরণ নিতান্ত ব্যাকুল ও চঞ্চল হইয়া উঠিল। অনন্তর কতিপয় প্রধান সৈনিক পুরুষ নিকটে আসিয়া বিনীত- ভাবে প্রণাম করিল। চাপড় জিজ্ঞাসা করিলেন বৈশম্পায়ন কোথায় ? তাহারা বিনয়-বচনে কহিল যুবরাজ! এই তরুতলের শীতল ছায়ায় উপ- বেশন করুন, আমরা সমুদায় বৃত্তান্ত বৰ্ণন করিতেছি। তাহাদিগের কথায় আরও উৎকণ্ঠিত হইয়া জিজ্ঞাসিলেন আমি স্কন্ধাবার হইতে বা গমন গিলে কি কোন সংগ্রাম উপস্থিত হইয়াছিল ? কি কোন অসাধ্য ব্যাধি বন্ধুকে কলিত করিয়াছে ? কি অত্যাহিত ঘটিয়াছে? শীঘ্র বল। তাহারা সসমে কর্ণে করপে করিয়া কহিল না, না, অত্যাহিত ৰা অম- জলের আশঙ্কা করিবেন না। রাজকুমার প্রথমে ভাবিয়াছিলেন বন্ধু খ শায় নাই, এক্ষণে সে ভাবনা দূৰ ইল ও শােকা আকাশ Sot . পরিণত হইল। তখন গদগদ বচনে কহিলেন, তবে বৈশম্পায়ন কোথায় আছেন, কি নিমিত্ত আসিলেন না? তাহারা কহিল, রাজকুমার। শ্রবণ করুন। আপনি বৈশম্পায়নকে স্কন্ধাবার লইয়া আসিবার ভার দিয়া প্রস্থান করিলে, তিনি কহিলেন পুরাণে শুনিয়াছি অহােসরােবর অতি পবিত্র তীর্থ। অশেষ ক্লেশস্বীকার করিয়াও লােকে তীর্থ দর্শন করিতে যায়। আমরা সেই তীর্থের নিকটে আসিয়াছি, অতএব এক বাব না দেখিয়া এখান হইতে বাওয়া উচিত নয়। অচ্ছেদসরােবরে স্নান করি এবং তত্তীরস্থিত ভগ, ব শশাঙ্কশেখরকে প্রণাম ও প্রদক্ষিণ করি' যাত্রা কর, বাইবেক। এই বসিয়া সেই সােবর দেখিতে গেলেন। তথায় বিকসিত কুসুম, নির্মল জ, রমণীয় তীরভূমি, শ্ৰেণীৰ তরু, কুসুমিত লতাকু দেখিয়া বােধ হইল যেন, বসন্ত সপরিবারে ও মুবান্ধবে তায় ৰাস করিতেছেন। ফজ তাদৃশ রমণীয় প্রদেশ ভুমণ্ডলে অতি বিরল। বৈশম্পায়ন তথা ইতস্কৃত দৃষ্টিপাতপূর্বক এক মনােহর লতামণ্ডপ দেখিলেন। ঐ লতামণ্ডপের অভ্যন্তরে এক শিলা পতিত ছিল। পরমপ্রীতি পাত্র মিত্রকে বহু কালের পর দেখিলে অন্তঃকরণে যেরূপ ভাবােদয় হয়, লতামণ্ডপ দেখিয়া বৈশম্পা বুনের মনে সেই রূপ অনির্বচনীয় ভাবােদয় হইল। তিনি নিমেষশূন্য- ননে সেই দিকে দৃষ্টিপাত করিয়া রহিলেন। ক্রমে নিতান্ত উন্মনা হইতে লাগিলেন। পরিশেষে ভূতলে উপৰিঃ হইয়া যামকরে বামগণ্ড সংস্থাপন পূর্বক নানাপ্রকার চিন্তা করিতে লাগিলেন। তঁাহার আকার দেখিয়া ৰােখ হইল যেন, কোন বিস্মৃত বস্তুর স্মরণ করিতেছেন। তঁাহকে সেই উন্মনা দেখিয়া আমরা মনে করিলাম বুঝি রমণীয় তামণ্ডপ ও মনন- হয় সরে ইহার চিত্তকে বিকৃত করিয়া থাকিবেক। যৌবনকাল কি বিকাল। এইকালে উত্তীর্ণ হইলে আর লজ্জা, ধৈৰ্য কিছুই থাকে কারী। না। যাহা হউক, অধিক ক্ষণ এখানে আর খাকা হইবে না। শাস্ত্র- কারের কহেন বিকারের সামগ্ৰী শীঘ্র পরিহার করাই বিধেয়। এই স্থির করিয়া কহিলাম মহাশয় ! সরােবর দর্শন হইল, এক্ষণে পাত্রোখান- পুর্বক অবগাহন করুন। বেলা অধিক হইছে। স্কন্ধাবার সুসজ্জ হইয়া আপনার প্রতীক্ষা করিতেছে। আর বিলম্ব করিবেন না। তিনি আমাদিগের কথায় কিছুই প্রত্যুত্তর দিলেন না, চিত্ৰপুত্তলিকার স্যায় অনিমিষ নয়নে সেই লতামণ্ডপ দেখিতে লাগিলেন। পুনঃপুনঃ অনুরােধ করাতে রােষ ও অসন্তোষ প্রকাশপূৰ্ব্বক কহিলেন আমি এখান হইতে যাইব না। তােমরা স্কন্ধাবার লইয়া চলিয়া যাও। তাহার এই কথার ভাবার্থ কিছু বুঝিতে না পারিয়া নানা অনুনয় কৰিলাম ও কহিলাম দেব ! চন্দ্ৰাপীড় আপনাকে স্বাব:ব লইয়া যাইবার ভার দিয় বাম গমন কয়িয়াছেন, অতএব আপনার এখানে বিলম্ব করা অবিধেয়। আপনি বৈরাগ্যের কথা কহিতেছেন কেন ? এই জনশূন্য অরণ্যে আপ- নাকে একাকী পরিত্যাগ করিয়' গেলে যুবরাজ আমাদিগকে কি বলবেন? অাজি আপনার এরূপ চিত্তবিভ্রম দেখতেছি কেন ? যদি আমাদিগের কোন্ অপরাধ হইয়া থাকে, কমা প্রার্থনা করিতেছি। এক্ষণে স্নান করুন। তিনি কহিলেন, তােমরা কি নিমিত্ত আমাকে এত প্রবােধ দিতেছ। আমি চাপড়কে না দেখি একদণ্ড থাকিতে পারি না, ইহা অপেক্ষা আর আমার শীঘ্র গমনের কারণ কি আছে। কিন্তু এই স্থানে আসিয়া ও এই লতামণ্ডপ দেখিয়া আমার শরীর অবসর হইয়াছে ও ইন্দ্রিয় বিকল হইয়া আসিতেছে ; যাইবার আর সামর্থ্য নাই। যদি তােমরা বলপূর্বক লয়া যাও, বােধ হয়, এখান হইতে না যাইতে যাইতেই আমার প্রাণ দেহ হইতে বহির্গত আমাকে লইয়া যাইবার আর আগ্রহ করিও হইবেক। না।
কাদম্বরী। তােমরা কাবার সমভিব্যাহারে বাটা গমন কর ও চাপড়ের মুখচন্দ্র অবলােকন করিয়া সুখী হও। আমার আর সে মুখারবিল দেখি- বার সম্ভাবনা নাই। এরূপ কি পুণ্যকৰ্ম্ম করিয়াছি যে, চিরকাল মুখে কালক্ষেপ করিব অকস্মাৎ আপনার এ আবার কি ব্যায়ােহ উপিস্থত হইল ? এই কথা জিজ্ঞাসা করাতে কহিলেন, আমি শপথ করিয়া বলিতেছি, ইহার কারণ কিছুই জানি না। তােমাদিগের সঙ্গেই এই প্রদেশে আসি- ছি। তােমাদিগের সমক্ষেই এই লতামণ্ডপ দর্শন করিতেছি। জানি না কি নিমিত্ত আমার মন এরূপ চঞ্চল হইল। এই কথা বলিয়া তথা হইতে গাত্রোখানপূর্বক যেরূপ লােকে অনন্যদৃষ্টি হইয়া নষ্ট বস্তুর অন্বেষণ করে, সেইরূপ লত-গৃহে, তরুতলে, তীরে ও দেবমন্দিরে ভ্রমণ করিয়া যেন, অপহৃত অভীষ্ট সামগ্রীর অনুসন্ধান করিতে লাগিলেন। আমরা আহার করিতে অনুরােধ করিলে কহিলেন, আমার প্রাণ আপন প্রাণ অপেক্ষাও চা- পীড়ের প্রিয়তর। সুতরাং সুহৃদের সন্তোষের নিমিত্ত অবশ্য রক্ষা করিতে হইবেক। এই কথা বলিয়া সরােবরে স্নান করিয়া যৎকিঞ্চিৎ ফল মুল ভক্ষণ করিলেন। এইরূপে তিন দিন অতিবাহিত হইল। আমরা প্রতিদিন নানাপ্রকার বুঝাইতে লাগিলাম। কিছুতেই চঞ্চল চিত্তকে স্থির করিতে পারিলেন না। পরিশেৰে তঁাহার আগমন ও আনয়ন বিষয়ে নিতান্ত নিরাশ হইয়া কতিপয় সৈন্য তাহার নিকটে রাখিয়া, আমরা স্কন্ধাবার লইয়া আসিতেছি। রাজকুমারের অতিশয় ক্লেশ হইবে বলিয়া পুর্বে এ সংবাদ পাঠান যায় নাই। অসন্তাবনীয় ও অচিন্তনীয় বৈশম্পায়নবৃত্তান্ত এৰণ করিয়া চন্দ্ৰাপীড় বিস্মিত ও উদ্বিগ্নচিত্ত হইলেন। মনে মনে চিন্তা করিলেন প্রিয়সবার সৎ এরূপ বৈরাগ্যের কারণ কি? আমিত কখন কোন অপরাধ কাদম্বরী। ১১১ লইয়া এবং করি নাই। কখন অপ্রিয় কথা কহি নাই। অন্তে অপরাধ করিয়ে ইহাও সম্ভব নহে। তৃতীয় আশ্রমেরও এ সময় নয়। তিনি অদ্যাপি গৃহস্থাশ্রমে প্রবিষ্ট হন নাই। দেব পিতৃ ঋষি ঋণ হইতে অদ্যাপি মুক্ত হন নাই। এরূপ অবিবেকী নহেন যে, কিছুমাত্র বিবেচনা না করিয়া মুখের ন্যায় উন্মার্গগামী হইবেন। এই রূপ চিন্তা করিতে করিতে এক পটগৃহে প্রবেশিয়া শয্যায় শয়ন করিলেন। ভাবিলেন যদি বাটীতে না গিয়া এইখান হইতে প্রিয়নুহৃদের অন্বেষণে যাই, তাহা হইলে পিতা, মাতা, শুকনাস ও মনোরম। এই বৃত্তান্ত লিয়া ক্ষিপ্ত প্রায় হইবেন। তাঁহাদিগের . অনুজ্ঞা শুকনাস ও মনােরমাকে প্রবোধ বাক্যে আশ্বাস প্রদান করিয়া বাটী হইতে বন্ধুর অন্বেষণে যাওয়াই কৰ্ত্তব্য। যাহা হউক, বন্ধু অন্যায় কৰ্ম্ম করিয়া আমার পরম উপকার করিলেন। আমার মনােরথ সম্প- দনের বিলক্ষণ সুযােগ হইল। এই অবসরে প্রিয়তমাকে দেখিতে পাই। এইরূপে প্রিয়সুহৃদের বিরহবেদনাকেও পরিণামে শুভ ও সুখের হেতু জ্ঞান করিয়া দুঃখে নিতান্ত নিমগ্ন হইলেন না। স্বয়ং যাইলেই প্রিয় সুহুংকৈ আনিতে পারিবেন, এই বিশ্বাস থাকাতে নিতান্ত কারও হইলেন না। অনন্তর অরদি সমাপন করিয়া পটগৃহের বহির্গত হইলেন। দেখি- লেন সূর্যদেব অগ্নিস্ফুলিঙ্গের ন্যায় কিরণ বিস্তার করিতেছেন। গগনে দৃষ্টিপাত করা কাহার সাধ্য। একে নিদাষকাল, তাহাতে বেলা ঠিক দুই প্রহর। চতুর্দিকে মাঠ ধূ ধূ করিতেছে। দিগুল যেন জ্বলিতেছে, বােধ হয়। পক্ষিগণ নিস্তব্ধ হইয়া নীড়ে অবস্থিতি করিতেছে। কিছুই শুনা যায় না, কেবল চাতকের কাতর আর এক এক বার শ্ৰৰণগোচর হয়। মহিষকুল পঙ্কশেষ পঙ্গলে পড়িয়া আছে। পিপাসায় শুক হরিণ ও ১২ কাদরী। হরিণীগৰ সূৰ্যকিরণে জলভ্রম হওয়াতে ইতস্ততঃ দৌড়িতেছে। কুকুরগণ বারংবার জিহ্বা বহির্গত করিয়েছে। গ্রীষ্মের প্রভাবে বায়ু উত্তপ্ত হইয়া অনলের ন্যায় গাত্রে লাগিতেছে । গাত্র হইতে অনবরত শৰ্মবারি বিনি- গত হইতেছে। রাজকুমার জলসেচন দ্বারা আপন বাসগৃহ শীতল করিয়া ভথায় বিশ্রাম করিতে লাগিলেন। গ্রীষ্মকালে দিবসের শেষভাগ অতি রমণীয়। সূর্যের উত্তাপ থাকে না। মন্দ মন্দ সন্ধ্যা সমীরণ অমৃতবৃষ্টির ন্যায় শরীরে সুখস্পর্শ বােধ হয়। এই সময় সকলে গৃহের বহির্গত হইয়া সুশীতল সমীরণ সেবন করে, প্রফুল্ল অন্তঃকরণে তরুগণের শ্যামল শােভা দেখে এবং সিঙ্গুলের শােভা দেখিয়া সাতিশয় আনন্দিত হয়। রাজ- তুমার সন্ধ্যাকালে পটগৃহের বহির্গত হইলেন এবং আকাশমণ্ডলের চমৎ কার শােভা দেখিতে লাগিলেন। নিশীথসময়ে চন্দ্রোদয়ে পৃথিবী জ্যোৎস্না- ময় হইলে প্রয়াণসূচক শঙ্কধ্বনি হইল। স্কন্ধাবাস্থিত সেনাগণ উচ্ছ- যিনীদর্শনে সাতিশয় সমুংসুক ছিল। শঙ্কধ্বনি শুনিবামাত্র অমনি মুসজ্জ হইয়া গমন করিতে আরম্ভ করিল। যামিনী প্রভাত হইবার সময় স্থা- বার উজ্জয়িনীতে আসি। পছছিল । বৈশম্পায়নের বৃত্তান্ত নগরে পূর্বেই প্রচারিত হইয়াছিল। পৌরজনেরা রাজকুমারকে দেখিয়া হা হতােহস্মি ! বলিয়া রোদন করিতে লাগিল। রাকুমার ভাবিলেন পৌরজনের। যখন এরূপ বিলাপ করিতেছে, না জানি, পুত্রশোকে মনােরমা ও শুকনাসের কত দুঃখ ও ক্লেশ হইয়া থাকিবে। ক্রমে রাজবাটীর বারদেশে উপস্থিত হইয়া অখ হইতে অবতীর্ণ হই- লেন। রাজা বাটীতে নাই, মহিষীর সহিত শুকনাসের ভবনে গিয়াছেন এই কথা শুনিয়া তথা হইতে মন্ত্রীর ভনে গমন করিলেন। দেখিলেন সকলেই বিষয়। “হ বৎস! নিৰ্ম্মানুষ, ব্যালসঙ্কুল, ভীষণ গহনে কি রূপে আছ। সুর সময় কাহার নিকট খাদ্যদ্রব্য প্রার্থনা করিতেছ! তৃষ্ণার সময় ৰুে কা। লিঙ্গন করিতেছে। যদি তােমার নির্জন বনে বাস করিবার অভিলাষ ছিল, কেন আমার সঙ্গে করিয়া লইয়া যাও নাই? ল্যাবধি কখন তােমার মুখ কুপিত দেখি নাই, দেখি নাই, অকস্মাৎ পোেদয় কেন হইত? এরূপ বৈরাগ্যের কারণ কি? তােমাৰ সেই প্রচুর মুখ কমল না দেখিয়া আমি আর জীবন ধারণ করিতে সমর্থ নহি।* মনের কাতারে অন্তঃপুরে এইরূপ নানাপ্রকার বিলাপ করিতেছেন, শুনিতে পাইলেন। অনন্তর বিষনবদনে মহারাজ ও শুকনা- সকে প্রণাম করিয়া আসনে বসিলেন। বাজা কহিলেন বৎস চাপড়। তোমার সহিত বৈশম্পায়নেয় । যেরূপ প্রণয় তাহা বিল অবগত আছি। কিন্তু তাহার এই অনুচিত কর্ম লৈবিয়া আমার অন্তকর তােমার ফোৰ সন্তাবনা করিতেন। রাজায় কথা সমাপ্ত না হইতেই শুকনাস কহিলেন দেব! যদি শশধরে উষ্ণত, অনুতে উগ্রতা ও হিমে পাহশক্তি জন্মে, তথাপি নিৰ্দোৰস্বৰ চাপড়ের দোষশঙ্কা হইতে পারে না। একের অপরাধে অন্যকে শী যান করা অতি অধ্যায় মাতৃদ্রোহী, পিতৃঘাতী, কত, { দুরাচাৰ, দুষিতের দোষে দূশীল চাপড়ের দোষ সম্ভাবনা করা উচিত নয়। যে, পিতা মাতার অপেক্ষা করিল না, রাজাকে গ্রাহ কৰি, না, মিত্র তার অনুরোধ রাখিল না, জাপীড় হার কি করিবেন। তাহার কি একবারও ইহা মনে হইল না যে, আমি পিতা মাতার একমাত্র জীবন- নিন, আমাকে না গেণিয়া কি রূপে তাঁহারা জীবন ধারণ করিবে। এ বুঝিলাম কেবল আমাদিগকে দুঃখ দিবা নিমিত্তই রে ভূত এম এ করিয়ালি। বলিতে বলিতে শেকে একনামের এক কুৰিত গজল অকালে পরিপুষ্ট হইল। রাজা তা সেই সব দেখি কৰিলে ! যেন রে আনা কৰ্ম্ম।
১১। কাদম্বরী। অনল প্রকাশ, অনল দ্বারা রবির একাশ, অম্মবিধ ব্যক্তি কর্তৃক মাের পরিবেধনও সেইরূপ। কিন্তু বর্ষাকালীন ওলাশয়ের ন্যায় তোমার মন কলুষিত হইয়াছে। কলুষিত এনে বিবেকশক্তি স্পষ্টরূপে প্রকাশিত হয় না। সে সময়ে অদূরদশীও দীপদীকে অনায়াসে উপদেশ দিতে পারে। অতএব আমার কথা শুন। এই ভূমণ্ডলে এমন লােক অতি বিল বাহার যৌবনকাল নির্বিকার ও নির্দোষে অতিক্রান্ত হয়। যৌবন- কাল অতি বিষম কাল। এই কলে উত্তীর্ণ হইলে শৈশবের সহিত কনের প্রতি স্নেহ বিগলিত হয়। বক্ষঃস্থলের সহিত বাঞ্ছা ৰিীf. হয়। বাহুযুগলের সহিত বুদ্ধি বুল হয়। মধ্যভাগের সহিত বিনয় বীণ হয়। এবং অকারণেই বিকারের আবির্ভাব হয়। বৈশম্পায়নের কোন দোষ নাই, ইহা কালের দোষ। কি জন্য তাহার বৈরাগ্যোদয় হইল, তাহা বিশেষরূপে না জানিয়া দোষপণ করাও বিধেয় নয়। অগ্রে হাকে আনয়ন করা যাউক। তার মুখে সমুদা বৃত্তান্ত অবগত হইয়া যাহ! কৰ্তব্য, পরে করা যাইবেক। শুকনাস কহিলেন মহারাজ। সল্য প্রযুক্ত এরূপ কহিতেছেন। নতুবা, যাহার সহিত এব ত্ৰ ৰাস, একত্র বিদ্যাভ্যাস ও পরম সৌহার্দে কালযাপন হইয়াছে; পর প্রতি- পত্র সেই মিত্রের কথা অগ্রহ করা অপেক্ষা আর কি অধিক অপরাধ হইতে পারে ? চাপড়ি নিতান্ত ছুত হইয়া বিনচনে কহিলেন অত। এ সল আমারই দোষ, সন্দেহ নাই। এক্ষণে অনুমতি করুন আনি, স্বীয় 'পাপের প্রাদুশ্চিতের নিমিত্ত, আচ্ছাদসয়েবয়ে গমন করি এবং বৈশম্পায়, নকে নিবৃত্ত করিয়া আনি। অনন্তর পিতা, মাতা, শুকনাস মনাে- মায় নিট বিদায় লইয়া ইয়ুবে আরােহণপূর্ষক বন্ধুর অন্বেষণে লেন। • নিলীর তীয়ে সেদিন আহিতি কঞ্জি, কৱিা, জণী ।
কাদশমী। প্রভাত না হইতেই সমভিব্যাহারী লােকদিগকে গমনের আদেশ দিলেন ; আপনি অগ্রে অর্থে চলিলেন। যাইতে যাইতে মনে মনে কত মনে রথ করিতে লাগিলেন। মূহুরে অজ্ঞাতসারে তথায় উপস্থিত হইয়া, সহসা কণ্ঠধারণপূর্বক কোথায় পলায়ন করিতেছ বলিয়া প্রিয় সখার লজ্জা ভঞ্জন করিয়া দিব। তদনন্তর মহাশ্বেতার আশ্রমে উপস্থিত হইব। তিনি আমাকে দেখিয়া সাতিশয় আস্থাপিত হইবেন, সন্দেহ নাই। সহাশ্বেতার আশ্রমে সৈয় সামন্ত রাখিয়া হেমকূট গমন করিব। অধ্যায় প্রিয়তমার অফুর মুখকমল দর্শনে নয়নযুগল চরিতার্থ কৰিব ও মহাসমারােহে তঁাহার পাণিগ্রহণ করিয়া জীবন সফল ও অস্ত্র কে পরিতৃপ্ত করিব। অনন্তর প্রিয়তমার অনুমতি লইয়া মদলেখার সহিত পরিণয়-সম্পান দ্বারা বন্ধুর সংসাবৈরাগ্য নিবারণ করিয়া দিব। এইরূপ মনের করিতে করিতে ক্ষুধা, তৃষ্ণা, পথশ্রম ও জাগরণ জন্য ক্লেশকে ক্লেণ বােধ না করিয়া দিন-যামিনী গষন কবিতে তাগিলেন। পথে বর্ষাকাল উপস্থিত। নীলবর্ণ মেঘমালায় গগনমল আচ্ছা- দিত হইল। দিনকর আর দৃষ্টিগােচর হয় না। চতুকে মেষ, দশ দিক্ অন্ধকার। দিবা রাত্রির কিছুই বিশেষ রহিল না। ধনটাৰ ঘোর তর গভীর গর্জন ও ঋণভার সহ প্রভা ভয়ানক হইয়া উঠিল। মধ্যে মধ্যে বাখাত ও শিলাবৃষ্টি। অনবরত মুলধারে বৃষ্টি হওয়াতে, नको সকল বর্ধিত হইয়া উভয় কূল ভগ্ন করিয়া ভীষণ বেগে প্রবাহিত হইল। সৰে, পুষ্টি, নদ, নদী পরিপূর্ণ হইয়া গেল। চতুৰুি জলময় ও পৰ পকাশ। ময়ূর ও ময়ুরীগণ আহলাদে পুলকিত হইয়া নৃত্য আৰম্ভ করিল। ক, মালতী, কেতকী, কূট প্রভৃতি নানাবিধ তৰু ও লতার আন্দোলিত করিয়া বলিললিক কার বৃন্ধ শিকারপূর্বক ৰায় উৎকলাপ শিখিকুলের শিখাকশাপে আঘাত করিতে বিকশি কুম গল। কোন দিকে কোরব, কোন দিকে তেকৰ, গগনে চাতকের আৰ, চতুর্দিকে ঝাষায়ু ও ধারার গভীর শব্দ এবং বাৰে বালে গিৰিলি রের পতনশব্দ। গগনমণ্ডলে আর চন্দ্রমা গৃষ্টিগােচর হয় না। নবণ আর দেখিতে পাওয়া যায় না। এইরূপে বর্ষাকাল টপতি হইয়া কালসর্পের গায় চাপড়ের পথরােধ করিল। ইত্ৰ চাপে তড়িদ সংযােগ করিয়া গভীর গর্জনপূর্বক ৰারিরূপ শর বৃষ্টি করিতে লাগিল। অড়ৎ যেন তর্জন করিয়া উঠিল। বর্ষাকাল সমাগত দেখি, ত্রা সাতিশয় উদ্বিগ্ন হইলেন। ভাবিছেন এ আবার কি উৎপাত! আমি প্রিয় সুহৃৎ ও বিআর সমাগমে সমুৎসুক হুইয়া, এণপণে ত্বরা করি। ইতেছি। কোথা হইতে গলদকাল ফল দি অকার করিয়া বৈর- নিৰ্যাতনের আশৰ উপস্থিত হইল ? অথব, বিদ্যুতের আলােপ আলােকময় করিয়া, মেষপ চন্দ্রাতপ যারা তো নিবারণ করিয়া, আমার দৰাৰ নিমিই বুঝি, অলদকাল সমাগত হইয়াছে। এই সময় পথ হরির সময়। এই হির করিয়া গমন করিতে আরম্ভ কৰিলে। মাইতে যাইতে পখিমধ্যে, মেঘনাদ আসিতেছে দেখিতে পাইলেন এবং জিজ্ঞাসা করিলেন মেষ। তুমি অচ্ছোসনােৰয়ে শৈপাকে দেয়া? তিনি তথায় কি নিমিত্ত আছেন, জিজ্ঞাসা করি। জের জিজ্ঞামায় কি উত্তর দিলেন। তাহার কিরুণ অভিএয় লে, বাতে ফিৱিা মালিকের কি না। আমি এনকে ঋই নি কি বলিবে। গেমার কি দােষ হয়, আমাদিগের গান ফেনী কিনলে কি ! শোন আসি। তাঁহার সহিত মানৰ কৰি, ৰ পৰ मन कहिपरि। कृषि बाम গি । এৰি । মামি কারী। গেল। আমি আসিবার সময়, বৈশম্পায়ন বাটা খান নাই, অচ্ছাে সােবরের তীরে অবস্থিতি করিতেছেন, ইহা কাহারও মুখে শুনি নই। তাঁহার সহিত আম'র সাক্ষাৎ হস্তু নাই। আমি অচ্ছোসরােবর পর্যন্ত যাই নাই। পথিমধ্যে পত্ৰলেখা ও কেয়ুবক কহিলেন মেঘনাদ। বর্ষাকাল উপস্থিত। তুমি এই স্থান হইতেই প্রধান কর। এই ভীষণ কালে একাকী এখানে কদাচ থাকিও না। এই কথা বলিয়া আমাকে বিয়ে করিয়া দিলেন। রাজকুমার মেঘনাদকেও সঙ্গে করিয়া লইলেন। কিছু দিন পরে অচ্ছেদসরোবরের তীরে উপস্থিত হইলেন। পূর্বে যে স্থানে নির্মল এল, বিকসিত কুনুম, মনােহর তীর ও বিচিত্র লতাকুঞ্জ দেখিয়া প্রত ও একুচিত হইয়াছিলেন, এক্ষণেবিষন্ন চিত্তে তথায় উপস্থিত হইয়া প্রিয় করবেষণ করিতে লাগিলেন। সমভিব্যাহারী লােকদিগকে সতর্ক হইয়া অনুসন্ধান করিতে কহিলেন। আপনিও তরুগহন, ভূমি ও লতামণ্ডপ তন্ন তন্ন কুরিয়া দেখিতে লাগিলেন। যখন তাহার অবস্থানের কোন চিহ্ন পাইলেন না, তখন ভগ্নোৎসাহচক্তে চিন্তা করিলেন পত্র লেখার মুখে আমার আগমন সংবাদ শুনিয়া বন্ধু বুঝি এখান হইতে প্রস্থান করিয়া থাকবেন। এখানে থাকিলে অব অবস্থানচিহ্ন দেথিঙ্গে পাওয়া যাইত। বােধ হয়, তিনি নিরুদ্দেশ হইয়াছেন। এক্ষণে কোথায় যাই, কোথায় গেলে বন্ধুর দেখা পাই। যে আশা অবলম্বন করিয়া এত দিবেন ধারণ করিয়াছিলাম,তহায় মূলচ্ছে হইল। “শরীয় শ ইইই চরণ আর চলে না। চলে না। এক বারে গোসাহ হাতি, গিগাগরে ময় হই। কলই অকার দেখিতেছি। • আয় | পৰিগী !ি' - সে || * * * কাদরী। ৰােখ হয়, মহাশ্বেতা সৰ বলিতে পারেন। এই স্থির করিয়া ইস্রায়ু আরােহণপূর্বক তথায় চলিলেন। কতিপয় পরিচারিকাও সঙ্গে সঙ্গে গেল। আসিবার সময় মনেরখ করিয়াছিলেন মহাশ্বেতা আমার মনে সাতিশয় সন্তুষ্ট হইবেন এবং আমিও আহলাদিতচিতে তাহার সহিত সাক্ষাৎ কবি। কিন্তু বিধাতার কি চাতুরী! ভৰিতবতার কি প্রভাব। মনুষ্যেরা কি অন্ধ এবং তাহাদিগের মনােরথ কি অলীক। চাপড় বন্ধুর বিয়ােগে দুঃখিত হইয়া অনুসন্ধানের নিমিত যাহার নিকট গমন করিলেন, দূর হইতে দেখিলেন তিনি শিলাতলে উপবিষ্ট হইয়া অধমুখ রোদন করিতেছেন। তলিকা বিষয়বদনে ও দুঃখিতমনে তঁাহাকে ধরিয়া আছে। মহাশ্বেতার তাদৃশ অবস্থা দেখিয়া যৎপরােনান্তি ভীত হইলেন। ভাবিলেন বুঝি কাদম্বরীর কোন অত্যাহিত সুটিয়া থাকিবে। নতুৰা পত্ৰলেখার মুখে আমার আগমনবার্তা শুনিয়াছেন এ সময় অবশ্য হৃষ্টচিত্ত থাকিতেন। চাপড় বৈশম্পায়নের নুসন্ধান না পাওয়াতে উদ্বিয় ছিলেন, তাতে আবার প্রিয়তমার অমঙ্গলচিন্তা মনােমধ্যে প্রবেশ করাতে নিতান্ত কাতর হইলেন। শূন্য হৃদয় মহাশ্বেতার নিকটবর্তী হইয়া শিলাতলের এক পার্কে বসিলেন ও তলিকাকে মহাশ্বেতার শােকের হেতু জিজ্ঞাসিলেন। তলিকা কিছু বলিতে পারিল না, কেবল দীন নানে মহাশ্বেতার মুখ পানে চাহিয়া রহিল। মহাশ্বেতা বসনাঞ্চলে নেত্ৰজল মােচন করিয়া কাতরস্বরে কহিলেন মহাভাগ ! যে নিষ্করুণা ও নির্লজা পূর্বে আপনাকে পারুণ শােৰুবৃত্তান্ত শ্রবণ করাইয়াছিল, সেই পাপয়দী এক্ষণেও এক অপূর্ব ঘটনা প্রবণ করাইতে প্রস্তুত আছে। কেয়ূরকের মুখে আপনার উজ্জয়িনীগমনের সংবাদ শুনিয়া মংপরােনাৰি দুঃখিত হইলাম। চিত্ররথের মাের, মণিরাজ বাজা ও বাপকা সিন্ধি না হওয়াতে সমধিক বৈরাগ্যোয় - হইল এবং কাদম্বরী হেপাশ ভেদ করিয়া তৎক্ষণাৎ আপন আশ্রমে আগমন করিলাম। একদা আশ্রমে বসিয়া আছি এমন সময়ে, রা- কুমারের সময়স্ক ও সশাকৃতি সুকুমার এক ব্রাহ্মণকুমারকে দূর হইতে দেখিলাম। তিনি এরূপ অন্যমনস্ক যে তঁাহার আকার দেখিয়া বােধ হইল যেন, কোন প্রর্নষ্ট বস্তুর অন্বেষণ করিতে করিতে এই দিকে আসি- তেছেন। ক্রমে নিকটবর্তী হইয়া পৰিচিতের ন্যায় আমাকে জ্ঞান করি, নিমেষশূনয়নে অনেক ক্ষণ জামার প্রতি দৃষ্টিপাত করিয়া তুহিনে। অনন্ত মূস্বরে বলিলেন মুরি! এই ভূমণ্ডলে বয়স ও আকুতির অবিসংবাদী কৰ্ম্ম করিয়া কেহ নিন্দাস্পদ হয় না। কিন্তু তুমি তাহার বি শীত কৰ্ম্ম কৰিতেই। তোমার নবীন বয়স, কোমল শরীর ও শিরীষ কুসুমের ন্যায় সুকুমার অবয়ব। এ সময় তোমার তপস্যার সময় নয়। মৃণালিনীর তুহিনপাত যেরূপ সাংঘাতিক, তােমার পক্ষে তপস্যার আড়াও সেইরূপ। তােমার মত নবযুবতীরা যদি ইলিখে জালি দিয়া তপ- স্যায় অনুরক্ত হয়, তাহা হইলে, মকরকেতুর মােহন শর কি কাৰ্যকর হইল ? শশধরের উদয়, কোকিলের কলরব, বসন্তকালের সমাগম ও বর্ষা ঋতুর আড়ম্বরের কি ফলোদয় হইল ? বিকসিত কমল কুমিত উপবন ও মলয়ানিল কি কর্মে লাগিনে ? দেব পুণ্ডরীকের সেই দারুণ ঘটনাবধি আমি সকল বিষয়েই নিরুৎসুক ছিলাম। ব্রাহ্মণকুমারের কথা অগ্নিশিখার ক্ষান্ত আমার গা দাহ করিতে লাগিল। তাহার কথা সমাপ্তি না হইতেই বিরক্ত হইয়া তথা হইতে উঠিয়া গেলাম। দেবতাদিগের ওনার নিমিত্ত কুসুম তুলিতে লাগিলাম । তথা হইতে তলিকাকে ডাকিয়া কহিলাম ঐ দুৰ্বত্ত ব্রাহ্মণকুমারের অসঙ্গত কথা ও কুটিল ভাবভঙ্গী দ্বারা বােধ হইতেছে, উহার অভিপ্রায় ভাল নয়। উকে খর। কর, যেন আর এখানে না, আইসে। যদি আইলে ভাল - দুইৰে ৰ। তালিকা ভয়দর্শন ও অর্থন শনিক বারণ করিয়া কহিল তুমি এখান হইতে চলিয়া যাও, পূনর্বার আর আসিও না। সেই হতভাগ্য সে দিন ফিরিয়া গেল বটে কিন্তু আপন সক্ষম একবারে পরিত্যাগ করিল না। একদা নিশসময়ে চন্দ্রোদয়ে দিগ্বলয় জ্যোৎস্নাময় হইলে তলিকা শিলাতলে শম্বন করিয়া নিত্রায় অর্ধেতন হইল। গ্রীষ্মের নিমিত্ত হার অভ্যন্তরে নিম্না না হওয়াতে আমি বহিঃস্থিত এক শিলা- তলে অঙ্গ নিক্ষেপ করিয়া গগনােদিত সুধাংশুর প্রতি দৃষ্টিপাত করিয়া রছিলাম। মন্দ মন্দ সমীরণ গাত্রে সুধা বৃষ্টির ন্যায় বোধ হইতে লাগিল । সেই সময়ে দেব পুণ্ডরীকের বিস্ময়কর ব্যাপার স্মৃতিপথারূঢ় হল। জাহার গুণ স্মরণ হওয়াতে খেদ করিয়া মনে মনে কহিলাম আনি কি হগিনি! আমার দুর্ভাগ্যবশতঃ বুঝি, দেশবাক্যও মিথ্যা হইল। কই। প্রিয়তমের সহিত সমাগমের কোন উপায় দেখিতেছি না। কপিল সেই গমন করিয়াছেন, অদ্যাপি প্রত্যাগত হইলেন না। এইরুপ শানা- প্রকার চিন্তা করিতেছি, এমন সময়ে দূর হইতে পদসঞ্চারের শব্দ শুনিতে পাইলাম। যে দিকে শব্দ হইতেছিল সেই দিকে দৃষ্টিপাত করিয়া জোৎ- নার আলোকে দূর হইতে দেখিলাম দেই ব্রাহ্মণকুমার উম্মতের স্তম্ভ দুই বাহ প্রশাকিত করিয়া দৌড়িয়া আসিতেছে। তাহার, তাহার: সেইপ ভক্ষর আকার দেখিয়া সাতিশয় শঙ্কা জলি। ভবিলাম কি পাপ! মৈটা শাসিয়া সহল যদি গাৱ স্পর্শ করে, তৎক্ষণাৎ এই অপ বত্র কলেবর পরিত্যাগ করিব। এ দিনে প্রাণেশ্বরের পুনর্দর্শন প্রত্যাশার মুলােচ্ছ । হইল। এত কাল বৃণা কষ্ট ভোগ করিলাম। এই চিন্তা করতেছি, এমন সময়ে নিই সিক্স কহিল, - নি। নে, বুয়ে প্রকাশ সহায় কৰা আৰাৰে বা করিতে আলো এসে আমার জানাই - ১২১ । আহার সেই কার কথা শুনিয়া আমার রোষানল এলিত হইয়া ঠল। ক্রোধে কলেবর কঁপিতে লাগিল। নিশ্বাসবায়ুর সহিত অগ্নিস্ফুলিঙ্গ বহির্গত হইতে লাগিল। ক্রোধে তর্জন গর্জনপূর্বক ভৎসনা করিয়া কহিলাম রে হায়! এখনও তাের মন্তকে বজ্জাত হইল না, এখনও তাের জিহ্বা ছিন্ন হইয়া পতিত হইল ন', এখনও তোর শরীর শত শত খণ্ডে বিভক্ত হইয়া গেল না? বোধ হয়, শুভাশুভ কর্যের সাক্ষীভূত পঞ্চমহাভূত দ্বারা তাের এই অপবিত্র অস্পৃশ্য দেহ নির্শ্বিক হয় নাই। তাহা হইলে, এতক্ষণে তাের শরীর অনলে ভস্মীভূত, জলে অপ্লিাবিত, রসাতলে নীত, বায়ুবেগে শতধা বিভক্ত ও শশনের সহিত মিলিত হইয়া যাইত। মনুষ্যতে আশ্রয় করিয়াছি, কিন্তু তােক তির্থ- পূজাতির চায় যথেষ্টাচ রী দেখিতেছি। তাের হিতাহিত জ্ঞান ও কার্ধ- কাৰ্যবিবেক কিছুই নাই। তুই একান্ত তিগ্ধৰ্ম্মাক্রান্ত। তির্যাজ তি- “মই তাের পতন হওয়া উচিত। অনন্তর সর্বসাক্ষীত ভগবান্ চমর মতি নেপাত করিয়া কৃতাঞ্জলিপুটে কহিলাম ভগব। সর্বসনি। দেব পুরীকে দর্শনাবধি যদি অন্য পুরুষের চিন্তা না করিয়া থাকি, যদি কামনােৰাতে তাহার প্রতি ভক্ত থাকে, শদি আমার এক পবিত্র ও নিস্কলঙ্ক হয়, তাহা হইলে, আর বচন সত্য হউক অর্থাৎ তি” জাতিতে এই পাপিষ্ঠের পতন হউক। আমার কথার অবদানে, জানি না, কি মদনজরের প্রভাবে, কি আত্মহকৰ্ম্মর দুর্বিপাকবশত কি আমার শপের সাম,ে সেই ব্রাহ্মণকুমার অচেতন হইয়া ছিন্নমূল তর ব্যাঙ্ক ভূতলে পতিত হইল। তাহার সঙ্গিগণ কাতরখরে হা হতােশি! বলিয়া শরিয়া উঠিল। তাদের মুখে শুনিলাম তিনি আপনার মিত্র। এই নিয়া না থােমুখী হইয়া ঘাখে রােকন করিতে লাগিলেন। ও মন বিশীলন মহাশ্বেতার কলিতেছিলেন' ক ১২ কারী। সমা হইলে কহিলেন ভগবতি। এ জন্মে কালীমাগম ভাগ্যে এটা উঠিল না। জন্মান্তরে স্বাহাতে সেই প্রফুল্ল মুখাবি দেখিতে পাই এরূপ যত্ন করিও। বলিতে বলিতে তাহার হৃদয় বিদীর্ণ হইল। যেমন শিলা- ভাল হইতে ভূতলে পড়িতেছিলেন, অমনি তালিকা মহাশ্বেতাকে ছাড়িয়া শশব্যন্তে হন্ত বাড়াইয়া ধরিল এবং কাতরম্বরে কহিল ভর্তুজারিকে! দেখ দেখ কি সর্বনাশ উপস্থিত ! চাপড় চৈতন্যশূন্য হইয়াছেন। মৃতদেহের স্যায় গ্রীব। ভগ্ন হইয়া পড়িতেছে। নেত্র নিমীলিত হইয়াছে। নিশ্বাস বহিতে ছ না। জীবনের কোন লক্ষণ নাই। এ কি দুর্দৈব-এ কি সর্বনাশ-হা লেব, কাদম্বরীপ্রাণবল্লভ। কাদম্বরীর কি দশা ঘটিল।" এই বলিয়া এলিকা মুক্তকণ্ঠে রােদন করিয়া উঠিল। মহাশ্বেতা সসমে চাপড়ের প্রতি চক্ষু নিক্ষেপ করিলেন এবং সেইরূপ অবস্থা দেখিয়া হতবুদ্ধি ও চিতিতের ন্যায় নিশ্চেষ্ট হইয়া রহিলেন। আপাপীয়সি ; দুষ্টতাপসি ! কি করিলি, জগতের চ হরণ করিলি, মহারাজ তারাপীড়ের সৰ্বৰ অপহৃত হইল, মহিষী বিলাসবতীর সর্বনাশ উপস্থিত হইল, পৃথিবী অনাথা হইল! হায় এত দিনের পর উজ্জয়িনী শূন্য হইল! এক্ষণে প্রজারা কাহার মুখ নিরীক্ষণ করিবে, আমরা কাহার শরণাপন্ন হইব। এ কি বিন মেঘে বজ্রাঘাত! চাপড় কোথায় ? মহারাজ এই কথা জিজ্ঞাসা করিলে আমরা কি উত্তর দিব। পরিচারকেরা হা হতােহম্মি । বলিয়া উচ্চেঃস্বরে এইরূপে বিলাপ করিষ্যা উঠিল। ইন্দ্ৰায়ুধ চাপড়ের প্রতি দৃষ্টিপাত করিয়া রহিল। তাহার নয়নযুগল হইতে অজন্দ্র অশ্রুবারি বনিগত হইতে লাগিল। এ দিকে পত্ৰলেখার মুখে চাপড়ের আগমনবার্তা শ্রবণ করিয়া কামীর আনন্দের আর পরিসীমা রহিল না। প্রাণেরের সমাগমে এরূপ সমুৎসুক হইলেন যে, তঁহার আগমন পূৰ্যন্ত এভীক্ষা করিতে পারি- কাদম্বরী। ১২৩ লেন না। প্রিয়তমের এমন করিবার মানসে উজ্জ্বল বেশ ধারণ করিলেন। মণিময় অলঙ্কারে ভূষিত হইয়া গাত্রে অয়াগ লেপনপূর্বক কঠে কুসুমমালা পরিলেন। সুসজ্জিত হইয়া কতিপয় পরিজনের সহিত বাল, বহির্গত হইলেন। যাইতে যাইতে মদলেখাকে জিজ্ঞাসিলেন মদ- লেখে! পত্ৰলেখার কথা কি সত্য, চাপড় কি আসিয়াছেন? আমার ত বিশ্বাস হয় ন,। তাঁহার তৎকালীন নির্দয় আচরণ স্মরণ কৰিলে তঁাহার আর কোন কথায় শ্রদ্ধা হয় না। আমার হৃদয় কম্পিত হইতেছে। পাছে তঁাহার আগমনবিষয়ে হতাশ হইয়া বিষন্ন চিত্তে ফিরিয়া আসিতে হয় । বলতে বলিতে দক্ষিণ চক্ষু স্পন্দ হইল। ভাবিলেন এ আর কি। বিধাতা কি এখনও পরিতৃপ্ত হন নাই, আবারও দুঃখে নিক্ষিপ্ত করিবেন। এইরূপ চিন্তা করিতে করিতে মহাশ্বেতার আশ্রমে উপস্থিত হইলেন। দেখিলেন সকলেই বিষয়, সকলের মুখেই দুঃখের চিহ্ন প্রকাশ পাইতেছে। অনন্তর ইতস্ততঃ দৃষ্টিপাত করি। পূস্পশূন্য উদ্যানের ন্যায়, পল্লবশূন্য তরুর ন্যায়, বারিশূন্য সরোবরের ন্যায়, প্রাণশূন্য চাপড়ের দহ পতিত রহিয়াছে, দেখিতে পাইলেন দেখিবামাত্র মূৰ্ছাপন্ন হইয়া ভূতলে পড়িতেছিলেন, অমনি মদলেখা ধরিল। পত্ৰলেখা অচেতন হইয়া ভূতলে বিলুণ্ঠিত হইতে লাগিল। কাদম্বরী অনেক ক্ষণের পর চেতন হইয়া সস্পৃহলােচনে চা- পীড়ের মুখচত্র দেখিলেন এবং ছিন্নমূল লতার ন্যায় ভূতলে পতিত হইয়া শিরে কাঘাত করিতে লাগিলেন। মঙ্গলেখা কাদম্বরীর চরণে পতিত হইয়া আস্বরে কহিল তত্ত্ব ফারিকে! আহা তােমা এই মদিরা ও চিত্ররথে কেহ নাই। তােমার হৃদয় বিদীর্ণ হইল, বোধ হইতেছে। প্রসন্ন হও, ধৈৰ্য্য অবলম্বন কর। মরুরেখার কথায় হাস্থ করিয়া কহিলেন অয়ি উন্মত্তে ! ভয় কি ? আমার হৃদয় পাষাণে নিৰ্ম্মিত, তাই. কি তুমি এখনও বুঝিতে পার নাই ।
কাদরী। ইহু ঘর অপেক্ষা কঠিন, তাহা কি তুমি জানিতে পার নাই। যখন এই ভয়র ব্যাপার দেখিবামাত্র বিদীর্ণ হয় নাই, এখন আর বিদীর্ণ হই নার আশঙ্কা কি? হা এখনও জীবিত আছি। মক্কিবার এমন সময়, আৰু ৰুৰে পাই, সমুদায় দুঃখ ও সকল সভাপ শান্তি হইবার দিন উপস্থিত হইয়াছে। আহা আমার কি সৌভাগ্য! মারবার সময় এণে- খয়ের মুখমল দেখিতে পাইলাম। জীবিতেশ্বরকে পুনর্বার দেখিতে পাই, এরূপ প্রত্যাশা ছিল না। কিন্তু বিধাতা অনুকূল হইয়া তাহা ঘটাইয়া দিলেন। তবে আর বিলম্ব কেন? জীবিত ব্যক্তিরাই পিতা, মাতা, বন্ধু, বান্ধব, পরিজন ও সখীগণের অপেক্ষা করে। এখন আর তাহাদিগের অনুরােধ কি ? এত দিনে সকল ক্লেশ দূর হইল, সকল তনা শাস্তি হইল, সকল সন্তাপ নির্বাণ হইল। যাহার নিমিত লজ্জা, ধৈৰ্য, কুলমৰ্যাদা পরিত্যাগ করিয়াছি ; বিনয়ে জলাঞ্জলি দিয়াছি; গুরু জনের অপেক্ষা পরিহার করিয়াছি ; সখীদিগকে যৎপরােনান্তি যাতনা দিয়াছি; প্রতিজ্ঞ| জন করিয়াছি ; সেই জীন প্রাণের প্রাণ ভ্যাগ করিয়াছেন, আমি এনও জীণিত আছি। সখি! তুমি আবার সেই কর, জোর প্রাণ রাখিতে অনুরােধ করিতেছ। এ সময় সুখে মরিবার গময়, তুমি বাধা দিও না। যদি আমার প্রতি প্রিয়সীর স্নেহ থাকে ও হামার প্রিয় কার্য করিতে ইচ্ছা হয়, ও হা হইল শাকে পিতা মাতার হাতে কেহ অবসান না হয়, বাসভবন সূ দেখি সখীজন ও পরিজনেরা যাহাতে দিগদিগন্তে স্থান না করে, এক্ষপ করিও। এমধ্যবর্তী সহকারপােতকের সহিত - পার্শনিী মাধবীলতার বিৰং বিও। সাবান, যেন রােপিত অংশ- প, বালপাৰ কেইন না করে। এ নিয়ে কম ফেলি আছে, তারা শাৰ পাই নি। কালি শা ;
কারী।
এ পরিহাস শুককে যা হইতে মুক্ত করিয়া নিও। আমার প্রতি
পাত্র হরিণাকে কোন ভুলােবৰে বাধিয়া আসিও। নকুলীকে আপন
অঙ্কে সর্বদা বাৰিও। ক্রীড়াপর্বতে যে জীঞ্জীৰকমিথুন এবং আমার
পাহচরী যে হংসুশাবক আছে, তাহারা যাহাতে বিপন্ন না হয়, এরূপ
তত্ত্বাবধান কবিও।
বনমানুষী কথন গৃহে বাস করে না ; অতএব
তাহাকে বনে মাড়িয়া দিও। কোন তপশীকে ক্রীড়াপর্বত প্রদান
করিও। আমার এই অঙ্গের ভূষণ গ্রহণ কর, ইহা কোন দীন
ব্রাহ্মণকে সমর্পণ কৰিও ; বীণা অন্য সামগ্রী, যাহা তােমার রুচি হয়
আপনি রাখি। আমি এক্ষণে বিদায় হইলাম, আইস, একবার
অষের শােধ আলিঙ্গন ও কঠগ্রহণ করি শরীর শীতল করি।
চাকরণে, চক্ষন বসে, শীতলজলে, সুতল শিলাতলে, কমলিনীপত্রে,
কুমুদ কুবল ও শৈবালের শয্যায় আমার মাত্র দগ্ধ ও জর্জরিত হইয়াছে।
এলে এৰেৰে কঠ গ্রহণপূর্বক উজ্জ্বলিত চিতানলে শরীর নির্বা-
পিত করি। মালেখাকে এই কথা বলিয়া মহাশ্বেতার কণ্ঠ ধারণপূর্বক
কহিলেন প্রিয়দখি! তুমি আশারূপ মৃগতৃষ্ণিকায় মােহিত হইয়া ক্ষ
ক্ষণে ণাধিক যন্ত্রণা অনুভব করিয়া মুখে জীবন ধারণ করিতেছ।
এই অভাগিনীর আবার সে
আশাও নাই। এক্ষণে গগীরের
নিকট প্রার্থনা, বেন জন্মান্তরে বিসখীর দেখা পাই। এই বলিয়া
ত্রাপড়ের চরণ কে ধারণ করিলেন। স্পর্শমাত্রে চাপড়ের
দেহ হইতে উল জ্যোতি উদাত হইল। জ্যোতির উজ্বল আলােকে
কাল সেই এদেশ কেমুনীময় বােধ হইল।
এর অন্তরীক্ষে এই বাণ বিনির্গত হইল বংশে মহাগে।
মা কর আকাশে তুৰি জীবন ধারণ করিয়ে।
কেন গরি সাক্ষাৎ হইলে, সন্দেহ করিও না। পুকে
কারী। শরীর আমার তেঙ্গস্পর্শে অবিনাশী ও অবিকৃত হইয়া মদীয় লোকে আছে। চাপড়ের এই শরীরও মতেজোময় ও অবিনাশ। বিশেষতঃ কাদম্বরীর স্পর্শ হওয়াতে ইহার আর ক্ষয় নাই। শাপ, দোষে এই দেহ জীবনশূন্য হইয়াছে, যােগিশরীরের স্কার পুনর্বার জীবাত্মা সবুক হইৰে । তােমাদের প্রত্যয়ের নিমিত্ত ইহা এই স্থানেই শাকিল, আর্থিসংস্কার বা পরিত্যাগ করিও না। যত দিন পুনর্জীবিত না হয়, এবত্বে রক্ষণাবেক্ষণ কষ্টিও। আকাশবাণী শ্রবণানন্তর সকলে বিস্মিত ও চমৎকৃত হইয়া চিত্রিতের ন্যায় নিমেষশূগোচনে গগনে বৃষ্টিপাত করিয়া রহিল। চাপড়ের শরীরে জ্যোতিঃপর্শে পত্ৰলেখার মুস্থাপন ও চৈতন্যোদৰ হইল । তখন সে উত্তার ন্যায় সহস। গাত্রোপন করিয়া, ইস্রাধের নিকটে অতি বেগে গমন করিয়া কহিল রাজকুমার প্রস্থান করিলেন, তােমার আর একাকী একা উচিত নয় । এই বলিয়া বুকের হস্ত হইতে বলপূর্বক বা গ্রহণ করিয়া তাহার সহিত অচ্ছেদসৱােৰৰে কাম্প প্রদান করিল। ক্ষণকালের মধ্যে জলে নিমগ্ন হইয়া গেল। অনতর জটাধারী এক তাপসকুমার সহসা এমধ্য হইতে সমুধিত হইলেন। তাহার মন্তকে শৈবাল লাগাতে ও পাত্র হইতে বিন্দু বিন্দু বারি পতিত হওাতে প্রথমে বােধ হইল, যেন মানুষ। মহাশ্বেতা সেই তাপসকুমারকে পরিচিত্তপূর্ব ও পূর্ব বােধ করিয়া একাঠিতে খিতে লাগিলেন। তিনিও নিকটে আসিয়া মৃদুস্বরে কহিলেন গন্ধর্বরাষপুলি! আমাকে চিনিতে পা ? হাতে শােক, বিস্ময় ও আনন্দের মধ্যবহিনী হই, মসন খাত্রেখান করিয়া সাষ্টাঙ্গ প্রণিপাত কবিলেন। গগনে কহিলেন ভক কপি। এই ... হতভাগিনীকে সকল বিষ গট ভাখিরা * আপনি কোথায় ছিলেন ?
কারী। ১২। এত কাল কোথায় ছিলেন ? আপনার প্রিয়সখাকে কোথায় রাশিয়া আসিতেছেন ? মহাশ্বেতা এই কথা জিজ্ঞাসা করিলে কাদম্বরী, কাম্বরীর পরিজন ও চাপড়ের সঙ্গিগণ, সকলে বিস্মষাপন্ন হইয়া তাপসকুমারের প্রতি দৃষ্টিপাত করিয়া রহিল। তিনি প্রতিবচন প্রদান করিতে আরম্ভ করিয়া কহিলেন রাজপুত্র! অবহিত হইয়া শ্রবণ কর। তুমি সেইরূপ বিলাপ ও পরিতাপ করিতেছিলে, তোমাকে একাকিনী রাখিয়া “রে দুরা- সুন্! বন্ধুকে লইয়া কোথায় যাইতেছিস” এই কথা বলিতে বলিতে অপহরণকারী সেই পুরুষের সঙ্গে সঙ্গে চলিলাম। তিনি আমার কথায় কিছুই উত্তর না দিয়া স্বর্গমার্গে উপস্থিত হইলেন। বৈমানিকেরা বিস্ময়ে: কুল্ল নয়নে দেখিতে লাগিল। দিব্যাঙ্গনার ভয়ে পথ ছাড়িয়া দিল । আমি ক্রমাগত পশ্চাৎ পচাৎ চলিলাম। তিনি চলে কে পৈতি হইলেন। তয় মহােদয়নামী সভার মধ্যে চন্দ্রকান্তমণিনিশ্মিত পৰ্যঙ্কে প্রিয়সার শরীর সংস্থাপিত করিয়া কহিলেন কপিল! আমি চন্দ্রম', জগতের হিতের নিমিত্ত গগনষগুলে উদিত হইয়া কাৰ্য সম্পাদন করিতেছিলাম। তােমার এই প্রিয় বয়স্ক বিরহবেদনায় প্রাণত:গ করি- ঝর সময় বিপরাধে আমাকে এই বলিয়া শাপ দিলেন “রে দুরাক্ষ্মন্ । যেহেতু তুই কর দ্বারা সম্ভাপিত করিয়া বল্পভার প্রওি সাতিশয় অনুরক্ত এই ব্যক্তির প্রাণ বিনাশ করিলে; এই অপরাধে তােকে এই ভূতলে বরংবার জন্ম গ্রহণ করিতে হইবে এবং আমার ন্যায় অনুরাগপৰশ হইয়া প্রিয়াবিয়ােগে দুঃসহ যন্ত্রণা অনুভব করিতে হইৰেক।” বিনা- পরাধে শাপ দেওয়াতে আমি ক্রোধান্ধ হইলাম এবং বৈনিৰ্যাতনের নিমিত্ত এই বলিয়া প্রভিশাপ প্রদান করিলাম “রে মু! তুই এবার এরূপ যত ভােগ ফরিলি, বারংবার তােকে "এইরুপ যাতনা ভোগ জারী। ; করিতে হইবে।” ক্রোধ শান্তি হইলে খাম করিয়া দেখিলাম আমার কিরণ হইতে অপরাদিগের যে কুল উৎপন্ন হয়, সেই কুলে গৌরীন স্ত্রী গন্ধকুমারী জন্ম গ্রহণ করেন ; তাহার দুহিতা মহাথে এই মুনিমারকে পতিৰূপে বরণ করিয়াছে। তখন সাতিশয় অনুতাপ হইল। কিন্তু শাপ গিয়াছি, আর উপায় কি? এক্ষণে উভযে, পাপে উভয়কেই মর্ত্যলােকে দুইবার জন্ম গ্রহণ করিতে হইবেক, সন্দেহ নাই। যাবৎ পাপের অবসান হয়, তাবৎ তােমার বন্ধুর মৃতদেহ এই স্থানে থাকিবে। আমার সুধা- ময় করস্পর্শে ইহা বিকৃত হইবেক না। শাপাখসানে এই শরীরেই পুনৰ্ব্বায় প্রাণসঞ্চার হইবেক, এই নিমিত্ত ইহা এখানে আনিয়াছি। মহাশ্বেতাকে জাশ শ প্রদান করিয়া আসিয়াছি। তুমি এক্ষণে মহর্ষি বেংকেতু নিকটে গিয়া এই সকল বৃত্তান্ত বিশেষ করিয়া তাহার সময়ে বন কর। তিনি মহাপ্রভাবশালী অবশ্য কোন প্রতিকার করিতে পারিবেন। চর আদেশানুসারে আমি দেমাগ দিয়া থেকে নিকট যাই, সেছিলাম। পথিমধ্যে অতি কোপনস্বভাব এক বিমানচারীর উন্নয়ন কতে তিনি জাতঙ্গী ৱা নােম একাশপূর্বক আমার প্রতি ত্রে- পাত করিলেন। তাঁহার আকার দেখিয়া বােধ হইল যেন, রােষানলে আমাকে অঙ্ক করিতে উদ্যত হইয়াছেন। অন “দুরাত্ম! তুই মিথ্যা ভপােবলে গর্বিত হইয়াছি, তুরঙ্গমের স্যায় অবদানপূর্বক আমার উ ৰ কৰিলি। অতএ তুম হইয়া ভূতলে অগ্রহণ কর।” তনি র্শনপূর্বক এই বলিয়া শাপ এন করিলেন। আমি বাংলায়নে লিপুরে নানা অন করিয়া কহিলাম ভগব। বয়গেছি, কে হয়। এই দু করিলতি, অৰযুৱি নাই। এ এ এন করিতেছি। এল । ঋণ সংস্থা করল। তিনি সময় শণ হয় । তুমি খুজবে ' কাদম্বরী। ১২১ -- অতীণ হইয়া যাহার বহন হইবে, তাহার মরণান্তে স্নান করিয়া আপনার স্বরূপ প্রাপ্ত হইবে। আমি বিনয়পূৰ্কক পুনৰ্ব্ব র কহিলাম ভগবন! শাপ- দোষে চম মর্তলােকে জন্মগ্রহণ করিবেন । আমি যেন খান বাহন হই। তিনি ধ্যান প্রভাবে সমুদয় অবগত হইয়া কহিলেন “, উ হিনী নগরে তারাপীড় রাজ' অপত্য প্রাপ্তির আশয়ে ধর্ম কর্শের ১৭ করিতেছেন। চন্দ্রমা হারই অপত্য হইয়া ভূতলে অবতীর্ণ ওই । তােমার প্ৰিৰ বয়স্য পুণ্ডরীক পৰিও মন্ত্রী শুকনাসের ঔ:: ? : গ্রহণ করিবেন। তুমিও রাসুম'র পে অবতীর্ণ চনের বাহন 'ব?” তাহার কথা ভাবসানে ও নুদুর প্রবাহে নিপতিত হ'লম । তুরমরূপ ধারণ কয়াি তীরে উঠ-!ম। তুরঙ্গম হইলাম না, নি জুমার জন্মান্তরীণ সংস্থার বিনষ্ট হল না। আমিই চু** { ' কিন্নরমিখুনের অনুগামী করি এই হানে অ'সিয়াছিলাম । - ৬ চমের অবতার। যিনি জন্মান্তরীণ অনুরাগের পরতন্ত্র হইয়া = = প্রণয়াভিল'যে এই প্রদেশে অসিছিলেন ও তােমার শাপে বিনষ্ট a ছেন, তিনি আমার প্রিয় বয়স্য পুণ্ডীকের তবতার । মহাশ্বেতা কপিঞ্জলের কথা নিয়া হ। দেব! জন্মান্তরেও তুমি মোৰ প্রণয়ানুরাগ বিস্মৃত হইতে পার নাই। আমারই অন্বেষণ করিতে বিয়ে এই স্থানে আগমন করিয়াছিলে ; আমি নৃশংসা রাক্ষসী বারবার তামার বিনাশের হেতুভূত হইলাম ! দগ্ধ বিধি আমাকে আপন প্রয়োজন সু- দনের সাধন করিবে বলিয়াই কি এত দীর্ঘ পরমায়ু প্ৰদান পক আমার নির্মাণ করিয়াছিল। কপিঞ্জন্স প্রবোধক্যে কহিলেন গ. রাজপুলি! শাপদোষে সেই সেই ঘটনা হইয়াছে, তোমার দোষ কি? এক্ষণে যাহাতে পরিণাম শ্রেয়ঃ হয়, তাহার চেষ্টা পাও। যে ব্রত অঙ্গী কার করিয়াছ, তাহাতেই একান্ত অনুরক্ত হও। তপস্যায় অসাধ্য কিছুই কাদম্বরী। নাই। পার্বতী যেরূপ তপস্থার প্রভাবে পশুপতির প্রণয়িী হইয়াছিলেন, তুমিও সেইরূপ পুণ্ডরীকের সহধর্মিণী হইবে; সন্দেহ করিও না। কপি- ঞ্জলের সান্ত্বনাবাক্যে মহাশ্বেতা কান্ত হইলেন। কাদম্বরী বিষয় বদনে জিজ্ঞাসা করিলেন ভগব! পত্ৰলেখাও ইত্ৰায়ুধের সহিত জলপ্রবেশ করিয়াছিল। শাপগ্রস্থ ইন্দ্ৰায়ুধরূপ পরিত্যাগ করিয়া আপনি স্বরূপ প্রাপ্ত হইলেন। কিন্তু পত্ৰলেখা কোথায় গেল, শুনিতে অতিশয় কৌতুক ন্মি- য়াছে; অনুগ্রহ করিয়া ব্যক্ত করুন। কপিঞ্জল কহিলেন জলপ্রবেশানন্তর যে যে টন হইয়াছে তাহা আমি অবগ ! নহি। চশের অবতার চাপড় পুণ্ডরীকে অবতার বৈশম্পায়ন কোথায়ু জন্মগ্রহণ করিয়াছেন এবং পত্ৰলেখা কোথা গিয়াছে, জানিবার নিমিত্ত কালত্রয়দর্শী ভগবান্ শ্বেত- নিকট গমন করি । এই বলিয়া পিঞ্জল গগনমার্গে উঠিলেন। তিনি প্রস্থান করিলে রাজপরিজনেরা বিস্ময়ে শােক সন্তপ বিস্মৃত হইল। চন্দ্র পীছের ও বৈশম্পায়নের পুনরুজ্জীবন পর্যন্ত এই স্থানে থাকিতে হইবেক স্থির করিয়া বাসস্থান নিরূপণ করিল ও তথায় স্থিতি করিতে লি। কাদম্বরী মহাশ্বেতাকে কহিলেন, প্রিয়সবি! বিপাত এই হত, ভাগিনীদিগকে দুঃখের সমান অংশভাগিনী করিয়া পরস্পর দৃঢ়তর সখ্য বন্ধন করিয়া দিলেন। অজি তোমাকে প্রিসখি বলিয়া সম্বােধন করিতে লজ্জা বোধ হইতেছে না। ফলতঃ এত দিনের পর আজি আমি তােমার যথার্থ প্রিয়সখী হইলাম । এক্ষণে কর্তব্য কি উপদেশ দাও। কি করিলে শ্রেঃ হইবে, কিছুই বুঝিতে পারিতেছি না। মহাশ্বেতা উত্তর করিলেন প্রিয়দখি। কি উপদেশ দিব। আশাকে কে অতিক্রম করিতে পারে না। আলােকদিগকে যে পথে লইয়া যায়, লােকেরা সেই পথে যায়। আৰি ৰুে কথামাত্রেয় আশ্বাসে প্রাণত্যাগ করিতে পারি নাই। তুমি কপিলের মুখে সমুদায় বৃন্তু বিশেষ রুপে অবগত হইলে। যাৰ কাদম্বরী। চাপড়ের শরীর অবিকৃত থাকে, তাবৎ ইহার রক্ষণাবেক্ষণ কর। ফল প্রাপ্তির আশয়ে লােকে অপ্রত্যক্ষ দেবতার কাষ্ঠময়, মৃন্ময়, প্রস্তরময় প্রতিমাও পুজা করিয়া থাকে। তুমি ত প্রত্যক্ষ দেবতা চন্দ্রমার সাক্ষাৎ মত্তি লাভ করিয়াছ। তােমার ভাগ্যের পরিসীমা নাই। পূৰ্ক রক্ষা ও কিভাবে পৰিচৰ্যা কর। মদলে। ও ওলকা ধরাধরি করিয়া শীত, বাত, অতণ ও বৃষ্টির জল • আগে এমন স্থানে, এক শিলার উপর চাপীড়ের মৃতদেহ আনিয়া ল। যিনি নানা বেশ ভূষায় ভূষিত হইযা হযেৎফুল্ল লােচনে প্রিয় ওমের সহিত সাক্ষাৎ করতে অানিছিলেন, তাঁহাকে এক্ষণে দীন বেশে • দুখত চিত্তে ৩৬ধিনীর আকার অঙ্গীকার করিতে হইল। বিকসিত ব, সুগন্ধি চন্দন মুবতি ধপ, যাহ। উপভোগের প্রধান সামগ্রী ছিল, ৩' গ্রণে দেবনায় নিযুক্ত হইল। এক্ষণে নিঝরকারি দর্পণ, গিরি- কই। গৃহ লত। সখা বৃক্ষগণ রঞ্চ, তরুণধা চাপ ও কোরব তী Fর হইতে আগমন রাতে ও সামেই দুঃসহ শােক। নলে পতিত হওয়াতে কাদম্বরা কণ্ঠ শুদ্ধ হইযাছিল , তথাপি পান না কিছুই করলেন না। সবাববে স্নান করিযা পবিত্র দুকূল *রি ধান কারন এ, প্রিয়তমেব পদদ্বয় অঙ্গে ধারণ কবি দিবস অতিবা- frশু করিলেন। রুনী সমাগত হইল। একে বর্যাকাণ, তাহাতে অন্ধ- কারারত বনী। চতুর্দিকে মেষ, মুষলধারে বৃষ্টি, ক্ষণে ক্ষণে বজ্রের নির্যাতি ও মনে মনে বিদ্যুতের দুঃসই আলােক। দ্যোতমালা অন্ধক- প্রছন্ন মণ্ডলীকে গাব করিয়া আরও ভয়ঙ্কর করিল। গিরিনিঝরের পত মশ, ভেকে কে পাহল ও ময়ূরের কোরবে না আকুল হইল। কিছুই দেখা যায় না। কিছুই কর্ণগােচর হয় না। কি ভয়ানক সময়! এ সময়ে জনপদবাসী সাহসী পুরুষের মনেও ভয়সঞ্চার হয়। কিন্তু কাল { ১৩২ কাদরী। স্বরী সেই অরণ্যে প্রিয়তমের মৃত দেহ সম্মুখে রাখিয়া সেই ভয়ঙ্করী বর্ষা- বিভাবরী বাপিত করিলেন। প্রভাতে অরুণ উদিত হইলে প্রিয়তমের শরীরে দৃষ্টিপাত করিয়া দেখিলেন অঙ্গ প্রত্যঙ্গ কিছুমাত্র বিশ হয় নাই; বরং অধিক উজ্জ্বল বোধ হইতেছে। তখন আলাদিত চিত্তে মদলেখাকে কহিলেন মলেখে! দেখ, দেখ! প্রাণেশ্বরের শরীর যেন সৰ্জীব বােধ হইতেছে। মদলেখা মিমেষশূন্য নয়নে অনেক ক্ষণ নিরীক্ষণ করিয়া কহিল ভর্তৃদারিকে! জীবনবিরহে এই দেহ কেবল চেষ্টাশুম্ভ ; নতুৰা সেই রূপ, সেই লাবণ্য, কিছুমাত্র বৈলক্ষণ্য হয় নাই।কপিঞ্জল যে শাপবিবরণ বর্ণন করিয়া গেলেন এবং আকাশবাণী দ্বারা যাহা ব্যক্ত হইয়াছে, তাহা সত্য, সংশয় নাই। কাদম্বরী নন্দিত মনে মহাশ্বেতাকে, তদনন্তর চাপীড়ের সঙ্গিগণকে সেই শরীর দেখাইলেন। সঙ্গিগণ বিস্ময়বিকসিত নয়নে যুবরাজের শরীরশােভা দেখিতে লাগিল। কৃতাঞ্জলিপুটে কহিল দেবি ! মৃত দেহ অবিকৃত থাকে, ইহা আমরা কখন দেখি নাই, শ্রবণও করি নাই। ইহা অতি আশ্চর্য ব্যাপার সন্দেহ নাই। এক্ষণে আপনার প্রভাবলে ও তার ফলে ধুবরাজ পুনর্জীবিত হইলে সকলে চরিতার্থ হই। দিনও সেইরূপ উজ্জ্বল শরীরসৌষ্টব দেখিয়া আকাশবাণীর কোন অংশে আর সংশয় রহিল না। তখন কাদম্বরী কহিলেন মদলেখে! আশার শেষ পর্যন্ত এই স্থানে অবস্থিতি করিতে হইবেক। অতএব তুমি বাট যাও ও এই বিস্ময়াবহ ব্যাপার পিতা মাতার কর্ণগােচর কর। তাহাৱা যাহাতে বিরূপ না ভাবেন, দুঃখিত না হন এবং এখানে না আইসেন, এরূপ করি। এখানে আসিলে তাহাদিগকে দেখিয়া শােকাষেঙ্গ ধারণ করিতে পারি না। সেই বিষম সময়ে অমঙ্গলওয়ে আমার নেত্ৰমুগল , অষ্টকে অরুণ বহির্গত হয় নাই। এক্ষণে জীবিতখের পুনঃপ্রাপ্তি কাদম্বরী। বিষয়ে কিসন্দিগ্ধচিত্ত হইয়াও কেন বন্ধ রােদন দ্বারা প্রিয়তমের অমঙ্গল ঘটাইব ? এই বলিয়া মদলেখাকে বিদায় করিলেন। মঙ্গলেখা গন্ধর্বনগর হইতে প্রত্যাগত হইয়া কহিল তদারিকে ! তােমার অভীষ্টসিদ্ধ হইয়াছে। মহারাজ ও মহিষী আদ্যোপান্ত সমুদায় শ্রবণ করিয়া সস্নেহে কহিলেন “বৎসে কাদরি। চন্দ্ৰসমীপবর্তিনী রোহিণীর ন্যায় তােমাকে জামাতার পাশ্ববৰ্ত্তিনী দেখিব ইহা মনে প্রত্যাশা ছিল না। স্বাভিলষিত ভর্তাকে স্বয়ং বরণ করিয়াছ, তিনি আবার চলমার অবতার শুনিয়া সাতিশয় আনন্দিত হইলাম। শাপাবসানে জামাতা জীবিত হইলে, তঁাহার সহচারিণী তােমাকে দেখিয়া জীবনের সার্থকতা সম্পাদন কৰিব। এক্ষণে আকাশবাণীর অনুসারে ধর্ম কর্মের অনুষ্ঠান কর। যাহাতে পরিণামে শ্রেয়ঃ হয় তাহার উপায় দেখ।” মদলেখার মুখে পিতা মাতার স্নেহসংবলিত মধুর বাক্য শুনিয়া কাদম্বরীর উদ্বেগ দূর হইল। ক্রমে বর্ষাকাল গত ও শরৎকাল আগত হইল। মৈথের অপগমে দিণ্ডল যেন প্রসারিত হইল। মার্তণ্ড প্রচণ্ড কিরণদ্বারা পঙ্কময় পর শুষ্ক করিয়া দিলেন। নদ নদী, সবােবর ও পুষ্করিণীর কলুষিত সলিল নিৰ্ম্মল হইল। মরালকুল নদীর সিকতাময় পুলিনে সুমধুর কলরব করিয়া কেলি করিতে লাগিল। গ্রামসীমায় পিঞ্জর কলমমরী ফলভরে অবনত হইল। শুকশারিকা প্রভৃতি পক্ষিগণ ধাশীষ মুখে করিয়া শ্রেণীবদ্ধ হইয়া গগনের উপরিভাগে অপুর্ব শােতা বিস্তার করিল। কাশকুসুম বিকসিত হইল। ইন্দীবর, কলার, শেফালিকা প্রভৃতি নানা কুসুমের গন্ধযুক্ত ও বিশদবারিণীকরসম্পৃক্ত সমীরণ মন মন্দ সঞ্চারিত হইয়া জীবগণের মনে আলাে জন্মিয়া দিল। সকল অপেক্ষা এলের একা ও কমলনের পােতা উজ্জ্বল হইল। এই কান কি গমণীয়। লােকে গতায়াতের কোন ক্লেশ থাকে না। যে দিকে মেলা করা যায়, খাদ্যমন্ত্রীর শােভা নয়ন ও মনকে পরিতৃপ্ত করে। জন্ম দেখিলে আল জমে। চন্দ্রোদয়ে রজনীর সার্ভিশয় শোভা হয়। লভােমণ্ডল সর্বদা নিৰ্ম্ম থাকে। ভীষণ বর্ষাকালের অপগয়ে শরৎকালে মনাে৪ শােভা দেখিয়া কাদম্বরীর দুঃখভারাক্রান্ত ‘চত্তও অনেক সুস্থ হইল। একদা এমঘনাদ আসিয়া কহিল দেবি! যুবরাজের বিলম্ব হওয়াতে মহারাজ, মহিষীও মন্ত্রী অতিশয় উদ্বিগ্ন হইয়া অনেক দূত পাঠাইয়াছেন। আমরা তাহাদিগকে সমুদায় বৃত্তান্ত শ্রবণ করাইয়া বাটা যাইতে অনুরােধ করাতে কহিল আমরা এক বার যুবরাজের অধিকৃত আকৃতি দেখিতে অভি দাষ করি। এত দূর আলিয়া যদি তদবস্থাপন্ন তাহাকে দেখিয়া না যাই, মহারাজ কি বলিবেন, মহিষীকে কি বলিয়া বুঝাইব? এক্ষণে যাহা কর্তব্য করুন। উপস্থিত বৃত্তান্ত শ্রবণ করিলে শ্বশুরকুলে শােক তাপের পরি- সীমা থাকিবে না। এই চিন্তা করিয়া কাদম্বরী অত্যন্ত বিষন্ন হইলেন। সাভাতুল লোচনে গগদ বচনে কহিলেন হাঁ, তাহারা অমুক্ত কথা কহে নাই। যে অদ্ভুত, অলৌকিক ব্যাপার উপস্থিত, ইহা স্বচক্ষে দেখিলেও প্রত্যয় হয় না। না দেখিয়া মহারাজের নিকটে গিয়া তাহারা কি বলিৰে ? কি বলিয়াই ৰা মহিষীকে বুঝাইবে ? যাহাকে ক্ষণমাত্র অবলােকন করিলে আর বিস্মৃত হইতে পারা যায় না, ভূতেরা তাহার চিরকালীন স্নেহ কিরূপে বিস্মৃত হইৰে? পীঘ্র তাহাদিগকে আনয়ন কর। যুবরাজের অবিকৃত শরীর শােঙ্গ দেখিয়া তাহাদিগের আগমনশ্রম সফল হউক। অনন্তর দূতগণ আশ্রমে এনেশিয়া কালীকে প্রণাম করিল ও ফল নয়তে রামারের অগোষ্ঠব দেখতে লাগিল। কাদম্বরী কহিলেন তােমরা মেসুল শেকাগে পরিত্যাগ কর। নিরবধি মুখকেই দুৰ বলিয়া গণনা কর উচিত; কিন্তু ইহা সেরূপ নয়;ইহাতে পরিণামে মঙ্গলের প্রকাশ আচ্ছ। এই বিস্ময়কর ব্যাপারে শােকের অবসর নাই। এরূপ টা কে কল দেখে নাই, শ্রবণও করে নাই। প্ৰাণবায়ু প্রয়াণ করিলে শরীর অৰিকৃত থাকে ইহা আশ্চর্যের বিষয়। এক্ষণে তােমরা প্রতিগমন কর এবং উৎ- কতিচেতা মহারাজকে এইমাত্র বলিও যে, আমরা অচ্ছােসরােবরে যুব- রাজকে দেখিয়া আসিতেছি। উপস্থিত ঘটনা প্রকাশ করিবার প্রয়ােজন নাই। প্ৰকাশ করিলে মহারাজের কখন বিশ্বাস হইবে না, প্রত্যুত শােকে তাহার প্রাণবিগমের সম্ভাবনা। ‘দূতেরা কহিল দেবি! হস্তু আমরা না যাই, অথবা গিয়া না বলি, ইহা হইলে এই ব্যাপার অপ্রকাশিত থাকিতে পারে; কিন্তু দুই অসম্ভব। বৈশম্পায়নের অন্বেষণ করিতে আসিযা যুবরাজের বিলম্ব হওয়াতে মহারাজ অতিশয় ব্যাকুল হইয়া আমাদিগকে পাঠাইয়াছেন। আমরা না যাইলে বিষম অনর্থ ঘটিবার সম্ভাবনা। গিয়া তনয়বার্তা শ্রবণলাল মহারাজ, মহি ও শুকনাসের উৎকণ্ঠিত বন অবলােকন করিলে নির্বিকার চিত্তে স্থির হইয়া থাকিতে পারিব, ইহাও অসম্ভব। কাদম্বরী কহিলেন হাঁ, অলীক কথায় প্রভুকে প্রতারণা করাও পরিচিত ব্যক্তির উচিত নয়, তাহা বুঝিয়াছি। কিন্তু গুরু জনের মনঃপীড়া পরিহারের আশয়ে ঐরূপ বলিয়াছিলাম। যাহা হউক মেঘনাদ! দূতদিগের সমভিব্যাহারে এরূপ একটা বিশ্বস্ত লােক পাঠাইয়া দেও, যে এই সমুদায় ব্যাপার স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করিয়াছে এবং বিশেষ রূপে সমুদায় বিবরণ বলিতে পারিবে। মেঘনাদ কহিল দেরি! আমরা প্রতিজ্ঞা করিয়াছি, যতদিন যুবরাজ পুনর্জীবিত না হইবেন তাৰং ব্যবৃত্তি অবলম্বন করিয়া বনে বাস কৰিৰ ; কাচ পরিত্যাগ করিয়া যাইৰ না। সেই ত্যই ভূত, যে আশংকালের স্যায় বিপৎকালেও প্রভুর সহবাৰী হয়। কিন্তু আপনার আজ্ঞা প্রতিপালন করাও আমাদিগের কষ্য কৰ্ম্ম। এই বলিয়া ত্বরিত কনামা এক বিশ্বস্ত সেবককে ডাকাইয়া দূতগণের সমভিব্যাহারে রাজ ধানী পাঠাইয়া দিল। এ দিকে মহিষী বহু দিবস চাপড়ের সংবাদ না পাইয়া আতশয় উদ্বিগ্ন ছিলেন। একদা উপযাচিতক করিতে দেবমন্দিরে সমাগত হইয়াছেন এমন সময়ে, পরিজনেরা আসিয়া কহিল দেবি ! দেবতারা বুঝি এত দিনে প্রসন্ন হইলেন ; যুবরাজের সংবাদ আসিয়াছে। পরিজনের মুখে এই কথা শুনিয়া মহিষীর নয়ন আনন্দবাস্পে পরিপ্লত হইল। শাবক এই হরিণীর ন্যায় চতুর্দিকে চঞ্চল চকু নিক্ষেপ করিয়া গদগদ বচনে কহিলেন, কই কে আসিয়াছে! এরূপ শুভ সংবাদ কে শুনাইল ? বৎস চাপড় ত কুশলে আছেন ? মনের ঔৎসুক্য প্রযুক্ত এই কথা বারংবার বলিতে বলিতে স্বয়ং বার্তাবহদিগের নিকটবর্তিনী হইলেন। সজল নয়নে কহিলেন বৎস! শীঘ্র চন্দ্ৰাপীড়ের কুশল সংবাদ বল। আমার অন্তঃকরণ অতিশয় ব্যাকুল হইয়াছে। চলাপীড়কে তােমরা কোথায় দেখিলে ? তিনি কেমন আছেন, শীঘ্র বল। তাহারা মহিষীর কাতরতা দেখিয়া অত্যন্ত শােকাকুল হইল এবং প্রনামব্যপদেশে নেত্ৰজল মােচন করিয়া কহিল আমরা অচ্ছােয়ােৰরতীরে যুবরাজকে দেখিয়াছি। অন্যান্য সংবাদ এই ত্বরিক নিবেন করিতেছে, শ্রবণ করুন। মহিষী তাহাদিগের বিষ আকার দেখিয়াই অমঙ্গল সন্তাৰনা করি- তেছিলেন তাহাতে আর ত্বরিতক আর আর সংবাদ নিবেদন করিতেছে এই কথা শুনিয়া বিষন্ন হইয়া ভূতলে পড়িলেন। শিরে করাঘাত পূৰ্ব্বক হা আম্মি বলিয়া বিলাপ করিয়া কহিলেন ত্বরিক আর কি বলিবে? মা- দ্বিগের বিষয় যান, কাতৰ ফল ওহর্ষ আগমনেই সকা ব্যক্ত হইয়াছে। স। দেক। আশন। তাের কি না। কেন উনি }} । ** বাটা আসিলে না। শীঘ্র আসিব বলিয়া গেলে,কই তােমাখলে কী কোথায় রহিল! কখন আমার নিকট মিথ্যা কথা বল নাই, এবারে কেন এতা- রণা করিলে! তােমার যাত্রার সময় আমার অন্তঃকরণে শঙ্কা হইয়াছিল, বুঝি সেই শঙ্কা সত্য হইল। তােমার সেই প্রফুল্ল মুখ আর দেখিতে পাইব না? তুমি কি এক বারে পরিত্যাগ করিয়া গিয়াছ? বৎস! এক বার আসিয়া আমার অঙ্কের ভূষণ হও এবং মধুর স্বরে মা বলিয়া ডাকিয়া কর্ণকুহরে অমৃত বর্ষণ কর। এই হতভাগিনীকে মা বলিয়া সম্বোধন করে, এমন আর নাই। তুমি কখন আমার কথা উল্লম্বন কর নাই, এক্ষণে আমার কথা শুনিতেছ না কেন? কি জন্য উত্তর দিতেছ না? তুমি এমন বিবেচনা করিও না যে, বিলাসবতী চাপীড়ের অস্তগমনেও জীবন ধারণ করিবে। ত্বরিতকের মুখে তােমার সংবাদ শুনিতে ভয় হইতেছে। উহা যেন শুনিতে না হয়। এই বলিয়া মহিষী মােহ প্রাপ্ত হইলেন। বিলাসবতী দেবমন্দিরে মােহ প্রাপ্ত হইয়া পড়িয়া আছেন, শুনিয়া মহারাজা অতিশয় চঞ্চল ও ব্যাকুল হইলেন। শুকনাসের সহিত তথায় উপস্থিত হইয়া দেখিলেন কেহ কদলীল দ্বারা বীজন, কেহ জলসেচন, কেহ বা শীতল পাণিতল দ্বারা মহিষীর গাত্র স্পর্শ করিতেছে। ক্রমে মহিষীর চৈতন্যোদয় হইল এবং মুক্ত কণ্ঠে হা হতাম্মি বলিয়া রােদন করিতে লাগিলেন। রাজা প্রবােধবাকে কহিলেন দেবি! যদি চন্দ্রপীড়ের অত্যা- হিত ঘটিয়া থাকে, নােদন দ্বারা তাহার কি প্রতীকার হইবে? বিশেষত সমুদায় বৃত্তান্ত শ্রবণ করা হয় নাই। অগ্রে বিশেষ রূপে সমুদায় এক করা যাউক, পরে যাহা কৰ্তব্য করা যাইবেক। এই বলিয়া কৃতিকে ভাকাইলেন। জিজ্ঞাসিলেন হৃতিক! চাপড় কোথায় কিরূপ আছেন? বাটী আসিবার নিমিত্ত পত্র লিখিয়াছিলাম আসিলেন না কেন? ইৰ দিয়াছেন? হৃতিক, ধুবরাজের ব্যাট হইতে গমন অবধি হয় - বিলার পর সমুদায় বৃত্তান্ত বর্ণন করিল। রাজা আর শুনিতে না পারিয়া আর্ত ঘরে বারণ করিয়া কহিলেন ক্ষান্ত হও—কান্ত হও! আর বলিতে হইবে না। যাহা শুনিবার শুনিলাম। হ বৎস! হৃদয়বিদারণের ক্লেশ তুমিই অনুৰ কৰিলে। বন্ধুর প্রতি যে রূপে প্রণয় প্রকাশ করিতে হয়, তাহার দৃষ্টান্ত পৰে লায়মান হইয়া পৃথিবীর প্রশংসাপাত্র হইলে। মেই প্রকাশের নবীন পথ উদ্ভাবিত করিলে। তুমিই সার্থক মহাপুরুষ আমরা পাপিষ্ঠ, নির্দয়, নরাধম। যেন কৌতুকাবহ উপন্যাসের ব্যায় এই দুর্বিষহ দারুণ বৃত্তান্ত অবলীলাক্রমে শুনিলাম, কই কিছুই হইল না। অন্তে ভীরু প্রাণ! ব্যাকুল হইতেছি কেন? যদি স্বয়ং বহির্গত না হই এবার বলপূর্বক তােকে বহির্গত করিব। দেবি ! প্রস্তুত হও, এ সময় কালক্ষেপের সময় নয়। চাপড় একাকী যাইতেছেন শী তাঁহার সঙ্গী হইতে হইবে। আর বিলম্ব করা বিধেয় নয়। আঃ হতভাগ্য নাস! এখনও বিলম্ব করিতেছ? প্রাণপরিত্যাগের এরূপ সময় আর কবে পাইবে? এই বেলা চিতা প্রস্তুত কর। প্রজ্বলিত অনলশিখা আলিঙ্গন কুরিয়া তাপিত এ শীতল করা যাউক। ত্বরিত ভয়ে বিনীত বচনে নিষেন করিল মহারাজ! আপনি যেরূপ সম্ভাবনা ও শঙ্কা করিতেছেন সেরূপ অল্প। ঘুবরাজের শরীর প্রাণবিযুক্ত হইয়াছে, কিন্তু অনির্বচনীয় অনাবশত অবিকৃত আছে। এই বলিয়া আকাশবাণীর সমুদায় বিবরণ, ইয়ুথের কপিঙ্গলরূপধারণ ও শাপবৃত্তান্ত অবিকল বর্ণন করিল। উহা করিয়া রাজাশােক বিস্ময়রসে পরিণত হই। তখন বিস্মিত মে কনাসের প্রতি দৃষ্টিপ্রাত করিলেন। অফ শােকার্ণবে নিমগ্ন হইয়াও শুকনাস ধৈৰ্যাবলম্বনপূর্বক সাক্ষাৎ নিশির ন্যায় রাজাকে বুঝাইতে লাগিলেন। কহিলেন মহারাজ। চির এই সংসারে প্রকৃতির পরিণা, শীলের ইচ্ছ, তােত করে 1 কাশ্বরী। • পরিপাক অথবা স্বভাবশতঃ নানাপ্রকার কাৰ্যের উৎপত্তি হয় ও নামাখি ঘটনা উপস্থিত হইয়া থাকে। শাকারেরা এরূপ অনেক ঘটনা বর্ণনা করিয়াছেন, যাহা যুক্তি ও তর্কশক্তিতে আপাততঃ অলীক রূপে প্রতীয়মান হয়; কিন্তু বস্তুতঃ তাহা মিথ্যা নহে। ভুজ দৃষ্ট ও বিবেগে অভিভূত ব্যক্তি মন্ত্র প্রভাবে জাগরিত ও বিষমুক্ত হয়। মােগপ্রভাবে যােণীর সকল ভূমণ্ডল করতলস্থিত বস্তুর স্থায় দেখিতে পান। ধ্যানপ্রভাবে লােক অনেক কাল জীবিত থাকে। ইহার প্রমাণ আগম, রামায়ণ, মহাভারত প্রভৃতি সমুদায় পুরাণে অনেকপ্রকার শাপবৃত্তান্তও বর্ণিত আছে । নহুষ রাজর্ষি অগস্ত্য ঋষির শাপে অজগর হইয়াছিলেন। বশিষ্টমুনির পুত্রের শাপে সৌদাস রাক্ষস হয়েন। শুক্রাচার্যের শাপে যযাতির যৌবনাবস্থায় জরা উপস্থিত হয়। পিতৃশাপে ত্রিশঙ্কু চণ্ডালকুলে জন্ম পরিগ্রহ করেন। অধিক কি, জুম্মমরণরহিত ভগবান নারায়ণও কখনও জমদগ্নির আত্মজ, কখন বা রঘুবংশে অবতীর্ণ হইয়াছিলেন। কথন বা মানবের ঔরসে জন্ম পরিগ্রহ করিয়া লীলা প্রচার করিয়া থাকেন। অতএব মনুষ্যলােকে দেবতাদিগের উৎপত্তি অশীক বা অসম্ভব নয়। আপনি পূৰ্বকালীন নৃপগণ অপেক্ষা কোন অংশে নূন নহেন। চন্দ্রমাও চক্রপাণি অপেক্ষা সমধিক ক্ষমতাবানু নহেন। তিনি শাপদোষে মহারাজের ঔরসে জন্মগ্রহণ করিবেন, ইহা নিতান্ত আশ্চর্য্য নয়। বিশেষতঃ স্বপ্নবৃত্তান্তু বিবেচনা করিয়া দেখিলে আর কিছুই সন্দেহ থাকে না। মহিষীর গর্ভে পূর্ণ শশধর প্রবেশ করিতেছে আপনি স্বপ্নে দেখিয়াছিলেন। আমিও স্বপ্নে পূরীক দেখিয়াছিলাম। অমৃতদীধিতির অমৃতের প্রভাব ভিন্ন বিনষ্ট দেহের অধিকার কিরুপে সবে? এক্ষণে ধৈৰ্য্য অবলম্বন করুন। শাপও পরিণামে আমাদিগের বর হইবে। আমাদের সৌভাগ্যের পরিনীয় সই। শাপাৰমানে বন্ধুসমেত চাপড়পধারী ভগবান কারী। চন্দ্রমার মুখচন্দ্র অবলােকন করিয়া জীবন সার্থক হইবে। অভাষের সময়, মােকতাপের সমষ নষ। এক্ষণে পুণ্য কর্মের অনুষ্ঠান ককন, শীঘ্ৰ শ্ৰেষঃ হইবে। কর্মের অসাধ্য কিছুই নাই। শুকনাস এত বুঝাইলেন, কিন্তু বাজার শােকাচ্ছন্ন মনে প্রবােধের উদয় হইল না। তিনি কহিলেন শুকনাস। তুমি যাহা বলিলে যুক্তিসিদ্ধ বটে, আমার মন প্রবােধ মানিতেছে না। আমিই যখন ধৈৰ্য্য অবলম্বন করিতে সমর্থ নহি, মহিষী স্ত্রীলোক হইয়া কি কপে শােকাবেগ পরিত্যাগ করিবেন। চল, আমরা তথায় যাই, স্বচক্ষে চাপীড়ের অবিকৃত অঙ্গ- শােভা অবলােকন করি। তাহা হইলে শশাকের কিছু শৈথিল্য হইতে পারে। মহিষী কহিলেন তবে আর বিলম্ব করা নয়। শঘ্র যাইবার উদ্যোগ করা যাউক। এমন সময়ে এক জন বৃদ্ধ আসিয়া কহিল দেবি। চাপীড ও বৈশম্পাষনের নিকট হইতে লােক আসিযাছে, সংবাদ কি জানিবার নিমিত্ত মনােরমা এই মন্দিবের পশ্চাদ্ভাগে দণ্ডায়মান আছেন। মনােরমার আগমনবার্তা শ্রবণ করিয়া নরপতি অতিশয় শােকাকুল হইলেন। বাষ্পকুল নয়নে কহিলেন দেবি। তুমি স্বয়ং গিযা সমুদাষ বৃত্তান্ত তঁাহার কগােচর কর এবং প্রবােধবাক্যে বুঝাইয়া কহ যে, তিনিও আমাদিগের সমভিব্যাহারে তথা যাইবেন। গমনের সমুদায় আঘােজন হইল। জা, মহিষী, মন্ত্রী, মন্ত্রী পত্নী সকলে চলিলেন। নগরবাসী লােকেরা, কেহ বা নরপতির প্রতি অনুরাগবশতঃ কেহ বা চাপীড়ের প্রতি স্নেহ- প্রযুক্ত, কেহ বা আশ্চর্য্য দেখিবার নিমিত্ত সুজ্জ হইয়া অনুগমন করিতে ও হইল। রাজা তাহাদিগকে নানাপ্রকার বুঝাইয়া ক্ষাত কলেন। কেবল পরিতারকের সঙ্গে চলিল। কিয় দিন পরে আছােসরােবরের তীরে উপস্থিত হইলেন। তথা কাজ কারী ও মহাশ্বেতার নিকট প্রশ্নে সংবাদ পাঠাইয়া পরে কারী। ১ আপনার আশ্রমে উপস্থিত হইলেন। গুরুজনের আগমনে লজ্জিত হইয়া মহাশ্বেতা মন্দিরের অভ্যন্তরে প্রবেশিলেন। কাদম্বরী শশাকে বিহ্বল হইয়া মুচ্ছাপন্ন হইলেন। নব কিশলয়ের ন্যায় কোমল শয্যায় শয়ন করিয়াও পুর্বে যাহার নিদ্রা হইত না, তিনি এক্ষণে এক প্রস্তরের উপর পতিত হইয়া মহানিদ্রায় অভিভূত হইয়াছেন দেখিয়া, মহিষীর শােকের আর পরিসীমা রহিল না। বারংবার আলিঙ্গন, মূখ চুম্বন ও মস্তক আঘ্রাণ করিয়া, হা হতাম্মি বলিয়া উচ্চৈঃস্বরে বিলাপ করিতে লাগিলেন । রাজা বারণ করিয়া কহিলেন দেবি! জন্মান্তরীণ পুণ্যফলে চাপীড়কে পুত্র রূপে প্রাপ্ত হইয়াছিলাম বটে, কিন্তু ইনি দেবমূর্তি, এ সময়ে স্পর্শ করা উচিত নয়। পুত্র কলত্ৰাদির বিবহই যাতনাবহ। আমরা স্বচক্ষে চন্দ্ৰাপীড়ের অনিন্দজনক মুখচন্দ্র দেখিতে পাইলাম আর দুঃখ সন্তাপ কি? যাহার প্রভাবে বৎস পুনর্জীবিত হইবে, যার প্রভাবে পরিণামে শ্রেয় হইবে, যিনি এক্ষণে একমাত্র অবলম্বন, তােমার বধূ সেই গন্ধৰ্ব্ব- রাজপুত্রী শশাকে জ্ঞানশূন্য হইয়াছেন দেখিতেছ না ? যাহাতে ইহার চৈতন্যোদয় হয় তাহার চেষ্টা পাও। কই। বন্ধু কোথায় ? বলিয়া- রাণী সম্রমে কাদম্বরীর নিকটে গেলেন এবং ধনিয়া তুলিয়া ক্রোড়ে বসাইলেন। বন্ধুর মুখশশী মহিষী যত বার দেখেন ততই নয়নযুগল হইতে অশ্রুজল নির্গত হয়। তখন বিলাপ করিয়া কহিলেন আহা! মনে করিয়াছিলাম চাপীড়ের বিবাহ দিয়া পুত্রবধূ লইয়া পরম সুখে কালক্ষেপ করি, কিন্তু জগদীশ্বরের কি বিড়ম্বনা, পরমপ্রতিপাত্র সেই বধূর বৈধব্যদশা ও পঘিবেশ দেখিতে হইল। হায়! যাহাকে রাজভবনের অধিকারিণ করিব ভাবিয়াছিলাম তাহাকে বনবাসিনী নিতান্তু দুঃখিনী দেখিতে হইল। এই বলিয়া বারংবার বন্ধুর মুখ চুয়ন করিতে লাগিলেন। রাপর অশ্রুজলও পাতিল স্পর্শে কারীর * কাদম্বরী। চৈতায় হইল। তখন নয়ন উন্মীলন পূর্বক লজ্জায় অবনতমুখী হইয়া,একে একে গুরুজনদিগকে প্রণাম করিলেন। বৈধষ্যদশা শীঘ্র দূর হউক বলিয়া সকলে আশবাদ করিলেন। রাজা মলেখাকে ডাকিয়া কহিলেন বৎসে! তুমি বন্ধুর নিকটে গিয়া কহ যে, আমরা কেবল দেখিবার পাত্র আসিয়া দেখিলাম। কিন্তু যেরূপ আচার করিতে হয় এবং এত দিন যে রূপ নিয়মে ছিলেন আমাদিগের অাগমনে লজ্জার অনুরােধে যেন তাহার অন্যথা না হয়। বধূ যেন সর্বদা বৎসের নিকটবর্তিনী থাকেন। এই বলিয়া সজিগণ সমভিব্যাহারে আশ্রমের বহির্গত হইলেন। আশ্রমের অনতিদূরে এক লতামণ্ডপে বাসস্থান নিরূপণ করিয়া সমুদায় নৃপতিগণকে ডাকাইয়া কহিলেন ভ্রাতঃ! পুৰ্ব্বে স্থির করিয়াছিলাম চাপীড়ের বিবাহ দিয়া তাহাকে রাজ্যভার সমর্পণ করি তৃতায় আশ্রমে প্রবেশ করিব। এবং জগদীশ্বরের আরাধনায় শেযদশা অতিবাহিত হইবেক। আমার মনােরথ সফল হইল না বটে, কিন্তু পুনর্বার সংসারে প্রবেশ করিতে আস্থা নাই। তােমরা সহােদরতুল্য ও পরম সুহৃদ। নগরে প্রতিগমন করিয়া সুশৃঙ্খল রূপে রাজ্য শাসন ও একা পালন কর। আমি পরলােকে পরিত্রাণ পাইবার উপায় চিন্তা করি। যাহারা পুত্র কিংবা ভ্রাতার প্রতি সংসারভার সমৰ্পণ করিয়া ৰূমে পঃমেশ্বর আরাধনা করতে পারে তাহারাই ধন্য ও সার্থক। অকিঞ্চিৎকর মাংসপিণ্ডময় শরীর দ্বারা যৎকিঞ্চিৎ ধৰ্ম্ম উপার্জিত হইলেও পরম লাভ বলিতে হইবেক। ধৰ্ম্মঞ্চ ক্যতিরেকে পরলােকে পরিত্রাণের উপায়ান্তর নাই। তােমরা এক্ষণে বিদায় হও এবং আপন পন আলয়ে গমন করিয়া সুখে রাজ্যভােগ কর। আমি এই স্থানেই জীবনক্ষেপ করিব, মানস কৰিছি। এই বলিয়া সকলকে বিদায় করিলে এবং গুৰণি ভৰিবেশ জগদীশ্বরের আরাধনায় কাদম্বরী। হইলেন। । তরুমূলে হবুদ্ধি, হরিণশাবককে সুতন্নে সংস্থাপন পূর্বক সস্ত্রীক শুকনাসের সহিত প্রতিদিন চাপড়ের মুখচন্দ্র দর্শন করিয়া সুখে কালক্ষেপ করিতে লাগিলেন। মহর্ষি জাবালি এই রূপে কথা সমাপ্ত করিয়া হাস্য পূর্বক মুনিমার- দিগকে কহিলেন দেখ । আমি অন্যমনস্ক হইয়া তােমাদিগের অভিপ্রেত উপাখ্যান অপেক্ষা অধিক বলিলাম । যাহা হউক, যে মুনিতনয় মদনবাণে আহত হইয়া আত্মকৃত অবিনয় অন্য মর্তলােকে শুকনাসের ঔরসে জন্ম গ্রহণ করিয়াছিলেন এবং তদনর মহাশ্বেতার শাপে তির্যগজাতিতে পতিত হন, তিনি এই। এই কথা বলিয়া অঙ্গুলি দ্বারা আমাকে নির্দেশ করিয়া দেখাইয়া দিলেন। তঁাহার কথাবসানে জন্মান্তরীণ সমুদায় কৰ্ম্ম আমার স্মৃতিপথারূঢ় এবং পূৰ্বশিক্ষিত সমুদায় বিদ্যা আমার জিহ্বাগ্ৰবৰ্ত্তিনী হইল। তদবধি মনুষ্যের ন্যায় সুস্পষ্ট করা কহিতে লাগিলাম। বােঞ্চ হইল যেন এতদিন নিদ্রিত ছিলাম এক্ষণে জাগরিত হইলাম। কেবল মনুষ্যদেহ হইল না, নতুবা চাপড়ের প্রতি সেইরূপ মেহ, মহাশ্বেতার প্রতি সেইরূপ অনুরাগ এবং তাহার প্রাপ্তিবিষয়েও সেইরূপ ঔৎসুক্য জন্মিল। পক্ষোঙে না হওয়াতে কেবল কায়িক চেষ্টা হইল না। পূর্ব পূর্ণ জন্মের সমুদায় বৃত্তান্ত স্মৃতিপথারূঢ় হওয়াতে পিতা, মাতা, মহারাজ তারাপীড়, মহিষী বিলাসবতী, বয়স্ক চাপড় এবং প্রথম সুহৃদ কপিল সকলেই এককালে আমার সমুৎসুক টিতে পদ প্রাপ্ত হইলেন। তখন আমার অন্তঃকরণ কিরূপ হইল কিছু বলিতে পারি । অনেক ক্ষণ চিন্তা করিলাম, মনে কত ভাবের উদয় হইতে লাগিল। মহর্ষি আমার অবিনয়ের পরিচয় দেওয়াতে তঁাহার নিকট লজ্জিত হইলাম। লজ্জায় অােবদন হইয়া বিনয়বচনে জিজ্ঞাসিলাম ভগব! আপনার অনুকম্পা পুৰ্বজন্মবৃত্তান্ত আমার স্মৃতিপথৰঞ্জী } করা। হইহে ও সমুদায় মুহগণকে মনে পড়িয়াছে। কিন্তু উহা স্মরণ না হওয়াই ভাল ছিল। এক্ষণে বিরহবেদনায় প্রাণ যায়। বিশেষতঃ আমার মণসংবাদ শুনিয়া যাহার হৃদয় বিদীর্ণ হইয়াছিল, সেই চা- পড়ের অদর্শনে আর প্রাণ ধারণ করিতে পারি না। তিনি কোথায় জন্মগ্রহণ করিয়াছেন অনুগ্রহ পূর্বক বলিয়া দেন। আমি তিগজাতি হইয়াছি, তথাপি তাহার সহিত একত্র বাস করিলে আমার কোন ক্লেশ থাকিবে না। মহর্ষি আমার প্রতি নেত্ৰপাত পূর্বক স্নেহ ও কোপগর্ভ বচনে কহিলেন দুরাত্ম! যে পথে পদার্পণ করিয়া তাের এত দুর্দশা ঘটিয়াছে, আবার সেই পথ অবলম্বন করিবার চেষ্টা পাইতেছিস্? অদ্যাপি পক্ষোভেদ হয় নাই, অগ্রে গমন করিরার সামর্থ হউক পরে তাহার জন্মস্থান বলিয়া দিব। . তাত! প্রাণধাৰণ করিতে পারা না যায় এরূপ বিকার, মুনিকুমারের মনে কেন সহসা সঞ্চারিত হইল? পরম পবিত্র দিব্য লােকে জন্মগ্রহণ করিয়া অত্যন্ত্র পরমায়ু কেন হইল? আমাদিগের অতিশয় বিস্ময় জন্মিয়াছে অনুগ্রহ পূর্বক ইহার কারণ নির্দেশ করিলে চরিতার্থ হই। হারীতের এই কথা শুনিয়া মহর্ষি কহিলেন অপত্যোৎপাদনকালে মাতার যেরূপ মনােৰুক্তি খাকে সন্তানও সেইরূপ মনােবৃত্তি প্রাপ্ত হইয়া ভূমিষ্ঠ হয়। পুণ্ডরীকের জন্মকালে লক্ষ্মী বিপুপরতন্ত্র হইয়াছিলেন, সুতরাং পুণ্ডরীক ৰে, রিপু কর্তৃক আক্রান্ত হইয়া অকালে কালগ্রাসে পতিত হইয়াছেন আশ্চর্য নহে। শাস্ত্রকারের কহেন কারণের ৭ কাৰ্য সংক্রামিত হয়। কিন্তু শাপাবসানে ইহার দীর্ঘ পরমায়ু হইবেক। আমি পুনর্বার জিজ্ঞাসা করিলাম ভগব! কি রূপে আমি দীর্ঘ পরমায়ু প্রাপ্ত হইব তাহার উপায় বলিয়া দেন। তিনি কহিলেন ইহার পর ক্রমে ক্রমে লায় জানিতে পারিয়ে। .
উপসংহার। । কথায় কথায় নিশাবসান পূর্ব দিক ধূসরষর্ণ হইল। পম্পা- সরােবরে কলহংসগণ কলব করিয়া উঠিল। প্রভাতসমীরণ তপােবনের তরুণব কম্পিত করিয়া মন্দ মন্দ বহিতে লাগিল। শশধরের আর প্রভা হিল না। দূর্বাদলের উপর নিশায় শিশির মুক্তাকলাপের স্থায় শােভা পাইতে লাগিল। মহর্ষি বােমবেলা উপস্থিত দেখিয়া গাত্রোত্থান করিলেন। মুনিতুমারেরা এরূপ একাগ্রচিত্ত হইল্প কথা শুনিতেছিলেন এবং শুনিয়া এরূপ বিস্ময়াপন্ন হইলেন যে, মহর্ষিকে প্রণাম না করিয়াই এজাতকৃত্য সম্পাদন করিতে গেলেন। হারী: আমাকে লইয়া আপন পর্ণশালায় রাখিয়া নির্গত হইলেন। তিনি বহির্গত হইলে আমি চিন্তা। করিতে লাগিলাম, এক্ষণে কি কর্তব্য, যে হে প্রাপ্ত হইয়াছি, ইহা অতি অকিঞ্চিৎকর, কোন শৰ্ম্মের যোেগ্য নয়। অনেক প্রকৃত না থাকিলে মনুষ্যদেহ হয় না। তাহাতে আবার সর্বশ্রেষ্ঠ ব্রাহ্মণকুলে জয়লাভ করা অতি কঠিন কৰ্ম্ম ; ব্রাহ্মণকুলে জন্ম গ্রহণ করিয়া তপশিবেশে অগীরের আরাধনা ও অপবর্গের উপায় চিন্তা করা প্রায় কাহারও ভাগ্যে টিয়া উঠে না। দিব্যলােকে নিৰাসের ত কথাই নাই। আমি এই সমুদায় প্রাপ্ত হইয়াছিলাম ; কেবল আপন মেয়ে হারাইয়াছি। কোন কাৰে যে উদ্ধার পাইৰ তাহারও উপায় দেখিতেছি না। স্বামী বক্ষবশখের সহিত পুনৰ্ব্বার সাজা হইযায় কিছুমাত্র সন্তাবনামাই এ যেয়ে কোন প্রয়ােজন নাই। এরাণ পরিত্যাগ করাই শ্রেয়। আমাকে এক গুম হইতে দুখানি কই রাখার সুখ বিধার কানসই সব হউক। " কাদম্বরী। এইরূপ চিন্তা করিতেছিলাম এমন সময়ে, হরীত সহা= বদলে আমার নিকট আলিয়া মধুর বচনে কহিলেন ভ্রাতঃ! ভগবান্ খেকেতুর নিকট হইতে তােমার পূর্ব মুহৎ কপিঞ্জল তােমার অন্বেষণে আসিয়াছেন। বাহিরে পিতার সহিত কথা কহিতেছেন। আমি আহলাদে পুলকিত হইয়া কহিলাম কই, তিনি কোথায়। আমাকে তাহার নিকট লইয়া চল। বলিতে বলিতে কপিল আমার নিকট আসিলেন। তাঁহাকে গো মায় দুই চক্ষু দিয়া আনন্দাশ্রু নির্গত হইতে লাগিল। বলিলাম শখে পিল! বহু কাল তােমার সহিত সাক্ষাৎ হয় নাই। ইচ্ছা হইতেছে গাঢ় আলিঙ্গন করিয়া তাপিত হৃদয় শীতল করি। লিমাত্র তিনি আপন বলে আমাকে তুলিয়া লইলেন। আমার দুর্দশা দেখিয়া নাফন করিতে লাগিলেন। আমি প্রবােথবকে কহিলাম সখে! তুমি আমরায় অজ্ঞান হ। তােমার গভীর প্রকৃতি কখন বিচলিত হয় নাই। তােমার মন কখন চঞ্চল দেখি নাই। এক্ষণে চঞ্চল হইতেছে কেন? থৈ অবলম্বন কর। আসলপরিগ্রহ দ্বারা শ্রান্তি পরিহার = পিতার স্কুল ওঁ বুল। তিনি কখন এই হতভাগ্যকে কি স্মথ করিয়া থাকেন। আমার গাঙ্গণ বৈদুর্বিপাকের কথা শুনিয়া কি বলি- গেল? কােণ ভিন্ন স্কুপিত থাকিবেন। কণিকালেৰেন মূখান পূর্বক শান্তি দূর করিয়া কৰিলে মন খান বি মানিয়ে যা রূৱত থাকী একাকায় নির্মিত একি জিক্স - দিন। নিয়ে জালে আৰি কােমল পরশ নিয়া যায় নিকষ্ট গুণ মলি। গায়ে নিজে ও শিল্প বিলে সপি- ' লা উশা ই আমি কেন আই আই। হয় এ শিখে নিন কোন ক্ষের নাই।
কাদরী।
১৭
;
অতএব আমরই দােষ বলিতে হইবেক। এই দেখ, বংস পুণ্ডরীকে
আয়ুষ্কর কর্ম আরম্ভ করিয়াছি, ইহা সিদ্ধয় ; যত দিন সমাপ্ত না হয়
তুমি এই স্থানে অবস্থিতি কম; বলিয়া আমার ভজন করি দিলেন।
আমি তখন নির্ত চিত্তে নিবেদন করিলাম তাত। এরীক নে বানে
ৰ প্ৰহণ কৰিয়াঅনুগ্রহ পূর্বক আমাকে প্রায় বাইতে অনুমতি
ল। তিনি বললেন বৎস। তােমার মা একাতিতে পতিত
এৰে তুমি তাঁহাকে চিনিতে পারিবে না। তাঁহার
তােমাকে দেখিয়া মি বলিয়া প্রত্যভি হইবে না। অন্য এতঃকালে
আমাকে জাকিয়া কহিলেন বৎস! তােমার সমহর্ষি নাবালির আশ্রমে
আছেন। পূর্বজশে সমুদায় বৃন্তু তাঁহার স্মৃতিগৰী হইয়ছে;
এক্ষণে তােমাকে দেখলেই চিনিতে পারিবেন।
অতএব তুমি তাহার
নিকটে যা! যত দিন আরব্ধ কৰ্ম সমাপ্ত না হয়, তাৰ তাহাকে জব
‘শি নামে থাকিতে কহিও। তােমার মাতা সী দেবীও সেই কর্মে
ব্যাপৃত আছেন। তিনিও আবার প্রয়ােগ পূৰ্বৰু উহাই বলিয়া দিলেন।
কপিল, এই কথা বলিয়া ছবিত চিত্তে আমার গাৱ শ মিতে
শেক। আমিও তাঁহার যেটকরূপ ধারণের সময় যে যে ক্লেশ হইয়াছিল,
তাহার উল্লেখ করিয়া দুঃখ প্রকাশ করিতে লাগিলাম। এব্যাংকাল উ
স্থিত হতে আহারাদি কৰিয়া ৰে। ৰা সেই কর্ণ গাও না হয়
তাও এই খানে থাক। আমিও সেই কর্মে ব্যাপৃত শিল্প আয়
যাইতে হইবেক, চলিলাৰ বলিয়া বিষয় হইলেন। দেশি মেয়ে
উঠিলে ও জনে হইলেন।
স্থায়ী যত্ন পূর্বক আমার শন পালন কৰিছে শায়ল।
মইল এ গঙ্গোকে হারাতে পা কৰািয় কি কি ?
রূক্ষ কাল মুলে দিয়া বিল এলজিৰ সামঞ্জ
১৮ কাদম্বরী। বার মহাশ্বেতার বাৰে যাই। এই স্থির করিয়া উত্তর দিকে গমন করিতে লাগিলাম। গমন করা অভ্যাস ছিল না, সুতরাং কিঞ্চিৎ দূর যাইয়াই অতিশয় শ্রান্তি বােধ । পিপাসায় কপােষ হইল। এৰু সরােবরের সমীপবর্তী আধুনিকুঞ্জে উপবেশন করিয়া শ্রান্তি দূর করিলাম। সুস্বাদু ফল ভক্ষণ ও সুশল জল পান করিয়া কুৎপিপাসা শান্তি হইলে, নি- কর্যশ হইতে লাগিল। পপুটের অন্তরালে চঞ্চুপুট নিবেশিত করিয়া মুখে নিদ্রা গেলাম। জাগরিত হইয়া দেখি জালে বন্ধ হইয়াছি। সমুখে এক বিকটাকার ব্যাধ গণ্ডায়মান। তাহার ভীষণ মূর্তি দেখিয়া কলেবর কম্পিত হইল এবং জীবনে নিরাশ হইয়া ব্যাংকে সম্বােধন করিয়া কহিলাম ভদ্র। তুমি কে কি নিমিত্ত আমাকে ভালব করিলে ? যদি আমিষলােভে বন্ধ করিয়া থাক, নিদ্রাবস্থায় কেন প্রাণ বিনাশ কর নাই? যদি কৌতুকের নিমিত্ত ধরিয়া থাক, কৌতুক নিবৃত্ত হইল এক্ষণে জাল মােচন করিয়া দাও। নিরপরাধে কেন আর যন্ত্রণা দিতেছ ? আমার চিত্ত প্রিয়জন সর্শনে অত্যন্ত উৎকণ্ঠিত, আর বিলম্ব সহে না। তুমিও প্রাণী বট, বল্লভ এনের অদর্শনে মন কিরূপ চঞ্চল, জানিতে পার। কিরাত কহিল আমি চাল বটি, কিন্তু আমিষলােভে তােমাকে আলবদ্ধ করি নাই। আমাদিগের স্বামী পণদেশের অধিপতি। তঁাহার কন্যা শুনিয়াছিলেন জাবালি মুনির আশ্রমে এক আশ্চর্য শুকপক্ষী আছে। সে মনুষ্যের মত কথা কহিতে পারে। শুনিয়া অবধি কোকা, ক্রোপ্ত হইয়াছিলেন এবং অনেক ব্যক্তিকে পরিবার আদেশ দিয়াছিলেন। অনেক দিন অনুসন্ধানে ছিলাম। আমি সুযােগক্রমে জাল করিয়াছি। এক্ষণে লইয়া গিয়া তাঁহাকে প্রদান করিব। তিনিই তােমার বন্ধন অথবা মােচয়ে প্রভু। কিরাতের ঋথায় সাতিশয় বিষয় হইলাম। বিলাল আশিক্ষি হতভাগ। প্রথমে ছিলা ফিলােসী ঋৰি; তাহার পর কাদম্বরী। ১৪৯ সামান্য মানব হইলাম; অবশেষে শুকজাতিতে পতিত হইয়া জালবদ্ধ হই লাম ও চণ্ডালের গৃহে যাইতে হইল। তথায়ু চণ্ডালবালকের ক্রীড়া- সামগ্রী হইব এবং ফ্লেচ্ছ জাতির অপবিত্র অন্নে এই দেহ পােষিত হইবেক। হা মাতঃ ! কেন আমি গর্ভেই বিলীন হই নাই। হা পিতঃ! আর ক্লেশ সহ করিতে পারি না। হা বিধাতঃ ! তােমার মনে এই ছিল। এই বলিয়া বিলাপ করিতে লাগিলাম। পুনৰ্বার বিনয়বচনে কিরাতকে কহিলাম ভ্রাতঃ! আমি জাতিস্মর মুনিকুমার, কেন চণ্ডালের অলিয়ে লইয়া গিয়া আমার দেহ অপবিত্র কর ? ছাড়িয়া দাও, তােমার যথেষ্ট পুণ্যলাভ হইৰেক। পুনঃপুনঃ পাদপতনপুরঃসর অনেক অনুনয় করিলাম ; কিছুতেই তাহার পাষাণময় অন্তঃকরণে দয়া জন্মিল না। কহিল রে মােহা। পর- ধীন ব্যক্তিরা কি স্বামীর আদেশ অবহেলন করিতে পারে ? এই বলিয়া পকনাভিমুখে আমাকে লইয়া চলিল। কতক দূর গিয়া দেখি, কেই মৃগবন্ধনের বাগুরা প্রস্তুত করিতেছে। কেহ ধনুর্বাণ নিৰ্মাণ করিতেছে। কেহ বা কূটজাল রচনা করিতে বিধি- তেছে। কাহার হতে দে, কাহার হতে লোহ। । সকলেরই আকায় ভয়ঙ্কর। মুরাপানে সকলের চক্ষু জবাব। কোন স্থানে মৃত হরিণশৰক পতিত রহিয়াছে। কেহ বা তীর ছুরিকা দ্বারা মৃগমাংস খণ্ড খণ্ড করিতেছে। পিঞ্জরবদ্ধ পক্ষিগণ ক্ষুৎপিপাসায় ব্যাকুল হইয়া চীংকার করিতেছে। কেহ এক বিন্দু বারি গান করিতেছে না। এই সকল দেখিয়া অনায়াসে বুঝিলাম উহা চণ্ডালরাজের আধিপত্য। উহার কাল যেন থমালয় বােধ হইল। ফলতঃ তথায় এরূপ এক লােক দেখিতে পাইলাম না, যাহা অন্তঃকরণে কিছুমাত্র করুণা আছে। কিরাত তলকার হতে আমাকে সমর্পণ করিল। ক গভির সন্তুষ্ট হইয়া কাপিত্রে আমাকে বন্ধ করিয়া রাখিল। পিঞ্জৰ ইয়া শিম কারী। যদি বিনত পূর্বক কন্যার নিকট আত্মমােচনের প্রার্থনা করি, তাহা হইলে, যে নিমিত্ত আমাকে ধরিয়াছে তাহারই পরিচয় দেওয়া হয়; অর্থাৎ মনুষ্যের দায় স্পষ্ট কথা কহিতে পারি বলিয়া ধরিয়াছে, তাহাই সপ্রমাণ করা হয়। যদি না কহি, তাহা হইলে শঠত করিয়া কথা কহিতেছে ভাবিয়া অধিক না দিতে পারে। যাহা হউক, বিষম সঙ্কটে পড়ি লাম। কথা কহিলে কান মােন করিবে না, বরং না কহিলে অব করিয়া ছাড়িয়া দিলে দিতে পারে। এই স্থির করিয়া মৌনাবলম্বন করি- লম। কথা কহাইৰার জন্য সকলে চেষ্টা পাইল, আমি কিছুতেই মৌন- ভঞ্জন করিলাম না। যখন কে আঘাত করে কেবল উচ্চৈস্বরে চীৎকর করিয়া উঠি। চালক ফল ল প্রভৃতি খাদ্য দ্রব্য আমার সম্মুখে দিল, আমি পাইলাম না। পর দিনও ঐরূপ আহারসামগ্রী আনিয়া দিল। আমি ভক্ষণ না করাতে কহিল পক্ষী ও পশুজাতি সুধা না লাগিলে খায় , ইহা অতি অসম্ভব বােধ হয়, তুমি জাতিস্মর, ভক্ষাভক্ষ্য বিবেচনা করিতেছ; অর্থাৎ চণ্ডালস্পর্শে খাদ্য দ্রব্য অপবিত্র হইয়াছে বলিয়া আমায় করিতেছ না। তুমি পূৰ্বৰে যে থাক, এক্ষণে পক্ষিজাতি হইয়া। চণ্ডালস্পৃষ্ট বস্তু ভক্ষণ করিলে পক্ষিজাতির দুরদৃষ্ট জন্মে না। বিশেষত আমি বিশুদ্ধ ফল মূল আনয়ন করিয়াছি, উচ্ছিষ্ট সামগ্রী আনি নাই। নীচজাতিস্পৃষ্ট ফল মূল ভক্ষণ করা কাহারও পক্ষে নিষিদ্ধ নহে। কারো লিখিয়াছেন পানীয় কিছুতেই অপবিত্র হয় না। অতএব তোমার পান ভােজনে বাধা কি? চলকুমারীর গায়ানুগত বাক্য শুনিয়া বিস্মিত হলাম এবং ফল ভক্ষণ ও পান বার ক্ষুৎপিপাসা শান্তি করিলাম ; কিন্তু কথা কহিলাম না। ক্রমে যৌবন প্রাপ্ত হইলাম। একদা বিরের অভ্যন্তরে নিতে আছি, কাগতিয় দেখি, পিয় দু পর অপু যা কাদরী। ১৫ কাছে। চণ্ডালদারিকাকে মহাৱাত যেরূপ রূপলাবণ্য সম্পন্ন দেখিতেছেন ঐরূপ আমিও দেখিলাম। খিয়া অতিশয় বিস্ময় জন্মিল। সমুদা বৃত্তান্ত জিজ্ঞাসা করিয়া আনিব ভাবিয়াছিলাম। ইতিমধ্যে মহারাতে নিকট আনীত হইয়াছি। ঐ কথা কে, কি নিমিত্ত চালক বলিয়া পরিচয় দেয়, আমাকেই বা কি নিমিত্ত ধরিয়াছে মহারামের মিই বা কি জন্য আনয়ন করিয়াছে, কিছুমাত্র অবগত নহি। রাজা শূদ্রক, কে এই দীপ উপাখ্যান শ্রবণ করিয়া শেৰ বৃত্তান্ত শুনিবার নিমিত্ত অতিশয় কৌতুকাক্রান্ত হইলেন। প্রতাহায়ীকে আজ্ঞা ছিলেন শ সেই চালককে ইয়া আইস। এতীহারী যে আজ্ঞা বলিয়া কন্যাকে সঙ্গে করিয়া আনিল। কম্বা শয়নগরে এবেশি প্রগলভ বচনে কহিল ভুবনভূষণ, নােহিপতে, কাদম্বরীলােচনাশ, চন্দ্র! ওকের আপনার পূর্বজন্মবৃত্তান্ত অবগত হইলে। পক্ষা অনুরাগা হইয়া পিতার আদেশ উলঙ্গন পুর্বক মহাশ্বেতার নিকট যাইতেছিল তাহা শুনিলেন। আমি ঐ দুরাত্মার জননী লক্ষী, মহা কালশী দিব্য চক্ষু দ্বারা উহাকে পূনৰ্মার অপথে পদার্পণ করিতে দেখিয়া আমাকে কহিলেন তুমি ভূতলে গমন কর এবং যাবৎ আয় কৰ্ম্ম সমাপ্ত না হয় তাবৎ তােমার পুত্রকে তথা বন্ধ করিয়া রাখ এবং যাহাতে অনুতাপ হয় এরূপ শিক্ষা দিও। কি জানি যা কৰ্ম্মদোষে আবার তীর্যজাতি অপেক্ষাও এ কোন নীচ জাতিতে পতিত হয়। দুক্ষয়ে সাধ্য কিছুই নাই। আমি মহুষিৰ ৰচনানুসারে উহাকে বর করিয়া রাখিয়াছিলাম। অদ্য কর্ণ সমাপ্ত হইয়াছে এই নিমিত্ত তোমাদিগের পর মিলন করিয়া দিলাম। এক্ষণে জরামরণাদিদুঃখসঙ্কুল এই দেহ পরিত্যাগ করিয়া আপন আপন অতীয় বস্তু লাভ কয়, এই বলিয়া লক্ষ্মী অর্জিত হইলেন। লক্ষ্মীর বাক্য নিৰামাত্র ব্যঙ্গা জন্ম বৃত্তান্ত শমূখায় স্মরণ হই।
কাদম্বরী। তখন মকরকেতু কাদম্বরীকে তাঁহার স্মৃতিপথে উপস্থাপিত করিয়া শরাশনে শর সন্ধান করিলেন। তখন গন্ধকুমারী কাদম্ববীর বিরহবেদনা রাজার হৃদয়ে অতিথয যন্ত্রণা দিতে লাগিল। এদিকে বসন্তকাল উপস্থিত। সহকারের মুকুলমঞ্জবী সঞ্চালিত করিয়া মলয়ানিল মন্দ মন্দ বহিতে লাগিল। কোকিলের কুহুরবে চতুর্দি ব্যাপ্ত হইল। আশােক, কিংশুক কুকবক চম্পক প্রভৃতি তরুগণ বিকশিত কুসুম দ্বারা দিণ্ডল আলােকময় করি। অলিকুল বকুলপুষ্পের গন্ধে অন্ধ হইয়া ঝঙ্কার পুর্বক তাহার - র্দিকে ভ্রমণ করিতে লাগিল। তকগণ পল্লবিত ও ফলভরে অবনত হইল। কমলবন বিকশিত হইয়া সবােবরের শােভা বৃদ্ধি করিল। ক্রমে মদন- মহােৎসবের সময় সমাগত হইলে, একদা কাদম্বরী সায়াছে সরােবরে স্নান করিষা ভক্তিভাবে অনঙ্গদেবের অর্চনা করিলেন। চাপড়ের শরীর ধোঁত ও মার্জিত করিয়া পাত্রে হরিচন্দন লেপন করিয়া দিলেন এবং কণ্ঠদেশে কুমমালা ও কর্শে অশােকৱক পদ্মাইয়া দিলেন। উত্তম বেশ ভূষ ভূষিত করিয়া সম্পৃহ লােচনে বারংবার নিরীক্ষণ করিতে লাগিলেন। একে বসন্ত কাল হাতে নিন প্রদেশ। রতিপতিও সময় বুঝিয়া অমনি শর নিক্ষেপ করিলেন। কাদরী উন্নত ও বিতচিত্ত হইয়া জীবিতভ্রমে যেমন চন্দ্ৰপীড়ের মৃত দেহ গাঢ় আলিঙ্গন করি উপক্রম করিতেছেন, অমলি চাপড় পুনর্জীবিত হইয়া উঠিলেন। কাদম্বরী ভয়ে কঁপিতেছেন, সাপী সম্মোধন করিয়া কহিলেন ভীড়। ভয় কি? এই দেখ, আমি পুনর্জীবিত হইয়াছি। আবি শাবসান হইয়াছে। এতদিন বিদিশা নগরীতে শূদ্রক নামে নরপতি ছিলাম, অন্য সে শরীর পরিত্যাগ করিয়াছি। তােমার প্রিয়জখী মহাতাের মনােরখও আজি সফল হইবেক। আজি পুখীকও বিগভশাপ হইয়াছেন। নিতে প্রনিঙে চন্দ্রলােক হইতে পুরক কােন এীণ হইলেন। তাঁহার কাদম্বরী। ১৫ গলে সেই একাৰী মালা ও বামপার্শ্বে কপিল। কাদরী প্রিয়সখীকে প্রিয় সংবাদ শুনাইতে গেলেন, এমন সময়ে পুণ্ডরীক চাপীড়ের নিকটে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। চাপড় সমাদরে হত ধারণ ও কণ্ঠ গ্রহণ পূর্বক মৃদু মধুর বচনে বলিলেন সখে! তােমার সৌহার্দ কখন বিস্মৃত হইতে পারিব না। আমি তােমাকে বৈশম্পন্নন বলিয়াই জ্ঞান করিব। তােমাকে আমার সহিত মিত্ৰতা ব্যবহার করিতে হইবেক। গন্ধরাজ, চিত্ররথ ও হংসকে এই শুভ সংবাদ শুনাইবার নিমিত্ত কেমূরক হেমকূটে গমন করিল। মদলেখা আহলাদিত হইয়া তারাপীড় ও বিলাসবতীর নিকটে গিয়া কহিল আপনাদের সৌভাগ্যবলে, যুবরাজ আজি পূনর্জীবিত হইয়াছেন। রাজা, রাণী শুকনাস ও মনােরমা এই বিস্ময়কর শুভ সমাচার শ্রবণে পরম পুলকিত হইয়। শীঘ্র 'আশ্রমে উপস্থিত হইলেন। চাপড় জনক জননীকে সমাগত দেখিয়া বিনীত ভাব প্রণাম করিবার নিমিত্ত মস্তক অবনত করিতেছিলেন রাজা অমনি ভুযুগল প্রসারিত করিয়া ধরিলেন। কহিলেন বৎস! জন্মান্তৰীণ পূণ্যফলে তােমাকে পুত্ররূপে প্রাপ্ত হইয়াছি বটে; কিন্তু তুমি সাক্ষাৎ ভগবান্ চন্দ্রমার মূর্তি। তুমিই সকলের নমস্য ; তােমাকে দেখিয়া আজি দেবগণ অপেক্ষাও সৌভাগ্যশালী হইলাম। আজি জীবন সার্থক ও ধৰ্ম্ম কী সফল হইল। বিলাসবতী পুনঃপুনঃ মুখচুম্বন ও শিরােম্রাণ করিয়া সমেহে পুত্রকে ক্রোড়ে করিলেন। তাহার কপােলযুগল হইতে আনন্দাশ্রু বহিতে লাগিল। অনন্তর শুকনাস ও মনােরমাকে প্রণাম করিলেন। তাঁহারাও যথােচিত স্নেহ প্রকাশ পূর্বক যথাবিহিত আশর্বাদ করিলেন। ইনিই বৈশম্পায়নরূপে আপনাদিগের পুত্র হইয়াছিলেন বলিয় চত্ৰাপীড় পুণ্ডরীকের পরিচয় দিলেন। পুণ্ডরীক জনক জননীকে ভক্তিভাবে প্রণাম করিলেন। কপিল কহিলেন কনাস! মহর্ষি থেকে আপনাকে কাদম্বরী। { ১৪ । বলিয়া পাঠাইলেন “আমি পুণ্ডরীকের লালন পালন করিয়াছি বটে, কিন্তু ইনি তােমার প্রতি সাতিশয় অনুরক্ত। অতএব তােমার নিকটেই পাঠাই তেছি। ইহাকে বৈশম্পায়ন বলিয়াই জ্ঞান করিও, কদাচ ভিন্ন ভাবিও না।” শুকনাস কহিলেন মহর্ষির আদেশ গ্রহণ করিলাম। তিনি স্বাহা আজ্ঞা করিয়াছেন তাহার অন্যথা হইবেক না। বৈশম্পায়ন বলিয়াই আমার জ্ঞান হইতেছে। এইরূপ নানা কথায় বুজনী প্রভাত হইল। প্রাতকালে চিত্ররথ ও হংস মদিরা ও গৌরীর সহিত তথায় আসিয়া উপ- স্থিত হইলেন। সমুদায় গন্ধৰ্ব্বলােক আহলাদে পুলকিত হইয়া আগমন করিল। আহা! কি শুভ দিন! কি আনন্দের সময় ! সকলের শােক মুখ দূর হইল । আপন আপন মনােরথ সম্পন্ন হওয়াতে সকলেই আহলাদের পরাকাষ্ঠা প্রাপ্ত হইলেন। গন্ধৰ্ব্বপতির সহিত নরপতির এবং হংসের সহিত কনাসের বৈবাহিক সম্বন্ধ নির্ধারিত হওয়াতে তঁাহারা নৰ নৰ উৎসব ও আমোদ অনুভব করিতে লাগিলেন। কাদম্বরী ও মহা- খে চিরপ্রার্থিত মনােরথ লাভ করিয়া সাতিশয় আনন্দিত হইলেন। আপন আপন প্ৰিয়সীৰ অভিলষিত সিদ্ধি হওয়াতে মদলেখা ও প্রতিকার সমুদায় ক্লেশ শান্তি হইল। চিত্ররথ সাদর সম্ভাষণ কহিলেন মহারাজ! সকল মনােরথ সফল হইল। এক্ষণে এই অধীনের সদনে পদার্পণ করিলে চাপড়কে কাদরী প্রদান ও রাজ্য দান করিয়া চরিতার্থ হই। তারাপীড় উত্তর করিলেন গন্ধর্বরাজ। যেখানে সুখ, সেই গৃহ। আমি এই আশ্রমকেই মুখের ধাম ও আপন আল বলিয়া স্থির করিয়াছি। প্রতিজ্ঞা করিয়াছি এই নেই জীবন যাপিত করি। তুমি বধূসহিত চাপড়কে আপন আলয়ে ইয়া যাও, বিবাহ-মহােৎসব নির্বাহ কর। আমি এই আমের কাদম্বরী ; থাকিলাম। চিত্ররথ ও হংস জামাতা ও কন্যাকে আপন আপন আল লইয়া গেলেন ও মহাসমারােহে মহামহােৎসব আরম্ভ করিলেন। পরি- শেষে উভযেই জামাতার প্রতি আপন আপন রাজ্যভার সমর্পণ করিয়া নিশ্চিত হইলেন। এই রূপে চাপড় ও পুণ্ডরীক প্রিয়তমাসমাগমে পরম সুখী হইয়া রাজ্যভােগ করেন। একদা কাদম্বরী বিষমুখী হইয়া চাপীড়কে জিজ্ঞাসা করিলেন নাথ! সকলেই মরিয়া পুনর্জীবিত হইল; কিন্তু সেই পত্ৰলেখা কোথায় গেল জানিতে বাসনা হয়। চন্দ্ৰাপীড় কহিলেন প্রিয়ে। আমি শাপগ্রস্ত হইয়া মর্তলােকে জন্মগ্রহণ করিলে, রােহিণী আমার পরিচৰ্যার নিমিত্ত পত্রলেখারূপে অবতীর্ণ হইয়াছিলেন। তাঁহাকে পুনর্বার চন্দ্রলােকে দেখিতে পাইবে। এই বলিয়া তাহার কৌতুক ভঞ্জন করিয়া দিলেন। হেমকূটে কিছু কাল বাস করিয়া আপন রাজধানী উজ্জয়িনী নগরে গমন করিলেন। তথাষ পুণ্ডরীকের প্রতি রাজ্যশাসনের ভায় দিয়া কখন গন্ধলােকে, কথন চন্দ্রলােকে, কখন পিতার আশ্রমে, কখন বা পরমরমনীয় সেই সেই প্রদেশে বাস কবিয়া সুখ সম্ভোগ করিতে লাগিলেন। সম্পূর্ণ। PUBLIC MAJU Estd. 1902 '1wRAH
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.