Makardah Saraswat Library, Howrah
Upanishader Alo Ed. 2nd
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
ADVANCEMENT OF LEARNI
উপনিষদের আলাে
১৮৪২১
শ্ৰীমহেন্দ্রনাথ সরকার
অধ্যাপক, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়
OF
CALCUTTI
UNIVERSITY
কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কতৃক প্রকাশিত
১৯৪১
প্রথম সংস্করণ, ১৯৩৯
দ্বিতীয় সংস্করণ, ১৯৪১
and
Published by the University of Calcutta
Printed at Sree Saraswaty Press Ltl., 32, Upper
Circular Road, Calcutta, by S. N. Guha Ray, B.A.
শ্রীযুক্ত শ্যামাপ্রসাদ মুখােপাধ্যায়ের করকমলে
No text on this page.
উপনিষদের আলো প্রকাশিত হল।
এতে উপনিষদের
সার কথাগুলি সহজ ও সরলভাবে বলবার চেষ্টা করেছি।
তত্ত্ব গভীর, বাংলা ভাষায় এর আলােচনাকে সুখকর করতে
চেয়েছি।
বইটি লিখতে বসে আমি আমার ছাত্র শ্ৰীমন্ দেবীপ্রসাদ
| শ্রীমান্ অরবিন্দের অনেক সাহায্য পেয়েছি। শ্রীমান্
প্রসাদ বইখানিকে সুন্দর ও সহজ করবার জন্য খুব
পরিশ্রম করেছে।
কল্যাণভাজন শ্ৰীমন্ হরিদাস রায়,
শ্রীমান্ সুভাষ মুখােপাধ্যায় ও মহম্মদ রকিবও আমাকে যথেষ্ট
সাহায্য করেছে। তাদের আন্তরিক স্নেহ জানাচ্ছি। ধন্যবাদ
দিয়ে তাদের আন্তরিকতার অমৰ্যাদা করতে চাই নে।
বন্ধুবর শ্রীযুক্ত নলিনীকান্ত গুপ্ত মহাশয় আমার এ বইয়ের
নামকরণ করে দিয়েছেন। তাঁকে শ্রদ্ধা জানাচ্ছি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ধ্বতন উপাধ্যক্ষ মহােদয় এ বইটি লিখবার
জন্য আহ্বান করে’ ও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত করে’
আমাকে অনুগৃহীত করেছেন। তিনি বাংলা
ভাষাকে
সমৃদ্ধিসম্পন্ন করতে আগ্রহান্বিত। বাঙ্গাৰী মাত্রই তার
সেবাকে চিরকাল কৃতজ্ঞ অন্তরে স্মরণ করবে। ইতি
‘শারদপূর্ণিমা
কলিকাতা
গ্রন্থকার
১৩৪৫ সাল
No text on this page.
দ্বিতীয় সংস্করণ
- *
“উপনিষদের আলাের দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হল।
অল্প সময়েই প্রথম সংস্করণ শেষ হয়েছে। এ সংস্করণ কিছু
পরিবর্ধিত হয়েছে।
দ্বিতীয় সংস্করণের প্রুফ দেখিবার ভার আমার ভূতপূর্ব
ছাত্ৰী শ্ৰীমতী অরুণা সিংহ গ্রহণ করেছিলেন।
তাকে
কৃতজ্ঞতা ও স্নেহ জানাচ্ছি।
ফান্ধুনী পূর্ণিমা
কলিকাত।
গ্রন্থকার
১৩৪৭ সাল
No text on this page.
উপনিষদের আলাে
অবতরণিকা
ভারতের অধ্যাত্ম শাস্ত্রের ভেতর উপনিষদের মত পুস্তক
বিরল। ভারতের কেন, সমস্ত জগতের অধ্যাত্ম-ভাণ্ডারে
এমন অলৌকিক জ্ঞানপূর্ণ অবদান আর দেখতে পাই নে ।
পরমতত্ত্ব সম্বন্ধে এতে কখন কবিত্বে, কখন কথােপকথনে, কখন
বিচারে, যেমন সরল অথচ গভীর, আনন্দদায়ক অথচ জ্ঞান প্রদ
উপদেশ আছে, অন্য কোথাও তা আছে কি না সন্দেহ।
উপনিষদের আলােচনায় কি প্রাচ্যে, কি প্রতীচ্যে, সৰ্ব্বত্রই
মনীষীরা পেয়েছেন জ্ঞান ও অধ্যাত্ম-প্ৰসাদ।
ব্ৰহ্মবিদ্যা ভারতের অতুলনীয় সম্পদ। এই ব্ৰহ্মবিদ্যার
আকর উপনিষদ। আচার্য্যেরা উপনিষদকে অবলম্বন
করে ব্রহ্মবাদ স্থাপিত করেছেন। বাদরায়ণের ব্রহ্মসূত্র
উপনিষদের বাক্যকে নিয়েই। আচার্য্য শঙ্কর লিখেছেন,
উপনিষদের আলাে
এই সূত্রগুলি বেদান্ত-বাক্যের পুষ্পস্তবক। উপনিষদের
এমন গাম্ভীর্য ও সারবত্ত্বা যে পরবী আচার্য্যেরা এরই
তত্ত্বানুসন্ধানে দর্শন শাস্ত্র রচনা করেছেন।
উপনিষদ মন্ত্রের
এত প্রতিষ্ঠা কেন? শঙ্কর, রামানুজ,
বল্লভ প্রভৃতি আচার্য্যেরা উপনিষদ-বাক্যের প্রামাণ্য স্বীকার
করেছেন। তত্ত্ব উদ্ভাসিত করবার জন্য তাঁদের মনীষাকে
প্রয়ােগ করেছেন। শুধু এদেশের চিন্তা ও অনুভূতির
ধারাকেই উপনিষদ প্রেরণা দেয়নি, পাশ্চাত্যের মনীষীরাও
এর প্রেরণা পেয়েছেন। প্লটিনাসের মধ্যে পাই উপনিষদের
স্পষ্ট ছায়া। তারপর সােপেনহার, এমারস, দয়স,
উপনিষদের অনুপ্রেরণা পেয়েছেন। পাশ্চাত্যে অধ্যাত্মানু-
ভূতির গভীরতা এসেছে উপনিষদের আলাে পাবার পর
থেকেই। তত্ত্ব একজাতির বা এক দেশের বিশিষ্ট সম্পদ
হলেও, এ কথা মানতে হবে যে বিভিন্ন মানুষের বা জাতির
ভাবধারার সঙ্গে পরিচয় হলে মনের দ্বার খুলে যায়।
উপনিষদের গভীরতা, প্রবীণতা ও শালীনতা দেখে মনে হয়
যে উপনিষদ অধ্যাত্ম-বিদ্যার চির-আশ্রয় ।
উপনিষদের সত্য চিরন্তন
চিরন্তন সত্য। ভারতের চিন্তাধারায়
প্রাচীন আচাৰ্যদের উপনিষদ
তাবলম্বন ;
একালের
আচাৰ্যদের
ও অবলম্বন উপনিষদ।
রাজা রামমােহন
এবং মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের সাধনার ভিত্তি ছিল উপনিষদ ।
বিবেকানন্দ, শ্ৰীঅরবিন্দ রবীন্দ্রনাথের চিন্তাধারার
অবতরণিকা
মুল উৎস উপনিষদে। রবীন্দ্রনাথ একবার আমাকে
লিখেছিলেন, “উপনিষদের তত্ত্বকে আমি জীবনের সাধনা
বলে গ্রহণ করেছি।” শ্রীঅরবিন্দ তার যােগসাধনার প্রথম
সন্ধান পেয়েছেন ঈশা উপনিষদে। উপনিষদে অধ্যাত্ম
জীবনের এমন সার তত্ত্ব নিহিত আছে যা আজও ব্ৰহ্মবিদ্যার
অনুশীলনে আর ব্রহ্মানুভূতির তৎপরতায় উদ্বোধিত করে।
সেখানে অধ্যাত্ম জীবনের চরম পরিণতি। পরবর্তী যুগের
সমস্ত ভারতীয় আদর্শগুলি উপনিষদে সূত্রাকারে আছে।
কি জ্ঞানবাদ, কি ভক্তিবাদ, কি অধ্যাত্মযােগ, উপনিষদে সব
পথগুলির নির্দেশ দেখতে পাই। হিন্দুর সকল চিন্তাধারাই
যেন উপনিষদের ব্যাখ্যা। তত্ত্ব-গবেষণায় অনেক নতুন
তথ্যের উদ্বোধন হলেও, সিদ্ধান্তের দৃষ্টি উপনিষদকে অতিক্রম
করতে পারেনি। তার কারণ মানুষের দিব্য প্রেরণার ও
চেতনার উন্মুক্ত গতি উপনিষদে যেমন প্রকাশ পেয়েছে, আর
কেথাও তেমন পায়নি। অধ্যাত্ম রাজ্যে প্রবেশ পথ অতি
সূক্ষ্ম। সেখানে বিচার বিতর্কের চেয়ে আবশ্যক হচ্ছে
অন্তঃবেদনার জাগরণ,-অনুভূতির সূক্ষ্মতায়, বিজ্ঞানের
দিব্য দ্যোতনায়। তত্ত্ব বিচার বুদ্ধিকে নিয়মিত করে, কিন্তু
বিজ্ঞানের ধারা স্বচ্ছ না হলে মানুষ দিব্য জ্ঞানের অধিকারী
হতে পারে না। উপনিষদের প্রত্যেকটি মন্ত্র প্রসাদগুণ ও
ভাব-গাম্ভীর্যে পূর্ণ-এর শক্তি ও দীপ্তি মানুষকে মহিমময়
সত্তার বোধে পূর্ণ করে। সরল ও সহজ কথায় এত গভীর
তত্ত্বের সংবেদন আর কোথাও দেখি নে'।
উপনিষদের আলো
উপনিষদকে বলা হয় আরণ্যক। অরণ্যের গভীর শান্তির
ভেতর ধ্যানলােকে তত্ত্বের প্রকাশ। ঊর্ধমানস স্তর থেকে
অবতরণ করে অমল জ্যোতি, এই জ্যোতি দেয় অধ্যাত্ম
সত্যের দৃষ্টি। সত্য নিজের মহিমায় প্রতিষ্ঠিত ; বিশ্বশক্তি ও
বিশ্ব প্রাণের সূত্র এই সত্যেই বিধৃত।
ধ্যানের গভীরতায়
চিত্তের বৃত্তিগুলির উন্মীলন, বিশ্ব-বিকশিত চেতনার সঙ্গে
অন্তরের যােগ। যােগ দেয় সত্যের উদ্দীপ্তি।
সত্য অতঃচেতনাতে নিহিত, তার উদ্ধার
কৰ্তে হয়
অন্তঃচেতনায় সমাহিত হয়ে। অন্তঃচেতনা দিব্য-চেতনার
সঙ্গে নিত্যযুক্ত। দিব্য-চেতনা হতে অবতরণ করে সত্যের
মহিমা, জ্ঞানের অরুণালােক, আনন্দের সংবাদ।
সত্যের ভাবনা নয়, সম্যক দৃষ্টি। ভাবনার গভীরতা দেয়
শ্রদ্ধা। শ্রদ্ধা সত্যের বিস্তৃতি। ধারণ-সামর্থ্য প্রতিষ্ঠিত হলে হয়
জীবন সত্যের প্রতিষ্ঠা। উপনিষদ সত্যকে শুধু নির্ণয়
করেনি। সত্যকে ধারণ করেছে প্রজ্ঞালােকে। উদ্ধ।
চেতনার সত্তায় জেগে উঠে উপনিষদের তত্ত্ববােধ। প্রসাদগুণে
উপনিষদ অতুলনীয়।
সংখ্যায় উপনিষদ হচ্ছে একশো আট । একশাে আটের
বদলে কেউ একশাে বারও বলেন। সব উপনিষদই অবশ্য
সমান প্রামাণ্য নয়। তবে ঈশা, কেন, কঠ, প্রশ্ন, মাণ্ডুক্য,
মুণ্ডক, ঐতরীয়, তৈত্তিরীয়, ছান্দোগ্য, বৃহদারণ্যক, এই দশটির
প্রামাণিকতা সম্বন্ধে কোন সন্দেহ থাকতে পারে না।
৪
অবতরণিকা উপনিষদের শ্রেণী বিভাগ করা অসম্ভব নয়। তত্ত্বের গভীরতায় এবং ভাষায় তারতম্যে বৃহদাণ্য, ছান্দোগ্য, তৈত্তিরীয় ঐতরেয়, ঈশা, কেন, কঠ, প্রশ্ন, মুণ্ডক, মাণ্ডুক্য এইগুলিই প্রধান। কিন্তু এদের ভেতরও ভাষা ও ভাবের গাম্ভীর্য্যে বৃহদারণ্যক, ছান্দোগ্য, তৈত্তিরীয়, ঈশা, কেন, কঠ, মঙুক প্রথম শ্রেণীর। ৩ বিষয়-বস্তুর দিক দিয়েও উপনিষদের বিভাগ নির্ণয় করা যেতে পারে। সব উপনিষদেরই বিষয় এক নয়। বিশেষত, পরের যুগে উপনিষদগুলির ভাষা ও বিষয় প্রথম যুগের উপনিষদগুলি থেকে ভিন্ন। শুধু একরকম ব্ৰহ্মবিদ্যাই সব উপনিষদ শিক্ষা দিয়েছে, একথা বলা দুঃসাহসের পরিচয়। তাই জীব- গােস্বামী পাদ তার ষট্সন্দর্ভ গ্রন্থে উপনিষদগুলিকে ব্ৰহ্মতত্ত্বপর ও ভাগবততত্ত্বপর বলে নির্দেশ করেছেন। বৃহদারণ্যকে বা মাক্যে ব্রহ্ম তত্ত্বের মীমাংসা আছে ; কতকগুলি উপনিষদ যােগতত্ত্ব নিরূপণ করেছে, যেমন তেজবিন্দু, নাদবিন্দু, ধ্যানবিন্দু। অবশ্য একথা খুবই সত্যি যে প্রত্যেক উপনিষদে আছে জ্ঞানের কথা, অনুশাসনের কথা। তবুও কতকগুলিতে তত্ত্বের মীমাংসার চেয়ে কবিতার ও ছন্দের ভেতর দিয়ে তত্ত্বের প্রকাশই আছে বেশী । অনেক গুলিতে বিশেষতঃ ঈষা, কেন, কঠ, শ্বেতাশ্বতরে—আছে অনুপম কবিত্ব। সত্য যখন প্রত্যক্ষ হয়, তখন তার প্রকাশ হয় ছন্দে ; সত্যবােধ অনুপ্রাণিত করে সমস্ত জীবনকৈ। ছন্দের ভেতর দিয়ে অবতরণ করে সত্যের দীপ্তি। এই দীপ্তি বুদ্ধিকে উপনিষদের আলাে সত্যের অবলম্বন করে জীবনকে অনুপ্রাণিত করে তত্ত্বে। স্বাভাবিক ভাষা ছন্দ। তত্ত্ববােধের সঙ্গে ছন্দের সম্বন্ধ ঘনিষ্ট। ছন্দোময় জীবন সত্যের বিস্তৃতি। জীবন সত্যে প্রতিষ্ঠিত হলে তার সমস্তটাই ছন্দোবদ্ধ হয়। অরূপ সত্যের মূর্ত প্রকাশ ছন্দ। সত্য “নিজের মহিমায় স্থিত”—প্রজ্ঞানঘন, আনন্দঘন। পাঠ শেষ । উপনিষদ তত্ত্বালােচনায় প্রায়ই ছন্দের কথাটি ভুলে যাই। এক শান্তি মন্ত্রে উপনিষদের পাঠ আরম্ভ, আর এক মন্ত্রে সে এর কারণ সুগভীর । মন্ত্র-ছন্দের সঙ্গে চিত্ত- স্বাচ্ছন্দ্যের নিকট সম্বন্ধ । ছন্দ চিত্তে ব্যাপকবােধ জাগিয়ে তােলে ও সত্যকে ধারণ কব্বার সামর্থ্য দেয়। ছন্দের সুকোমল আঘাতে গভীর অনুভূতির দ্বার খুলে যায়। সমস্ত জীবনই তখন পল্লবিত হয়ে ওঠে নবীনভাবে। সত্যবােধ যতদিন না সমস্ত জীবনের ওপর প্রভাব বিস্তার করে, তাকে দিব্য করে তােলে, ততদিন সত্যের প্রতিষ্ঠা হয় না। সত্য বােধই দেয় সত্য প্রতিষ্ঠা। সত্য প্রতিষ্ঠা পরম কাম্য। এতে জীবনের পার্থিব ভাব ও ভাষা সম্পূর্ণ রূপান্তরিত হয়ে যায়। সত্যের ছন্দ যখন জীবনের ভেতর প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন সত্তার সব স্তর উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। তখন সত্যের বিরাট-রূপের পরিচয়।
অবতরণিকা
বিশ্ববিকশিত জীবনের দিব্য মূচ্ছনার ভেতর দিয়ে পরিচিত হই
সত্যের কল্যাণ মূর্তির সঙ্গে।
ছন্দের নানা রূপ। সত্যের ছন্দ আছে, সুন্দরের ছন্দ আছে,
জ্ঞানের ছন্দ আছে, আনন্দের ছন্দ আছে।
কিন্তু সকলের
ভেতর দিয়ে ফুট হয় সত্যের দ্যোতনা; ছন্দত সত্যের অনন্ত
প্রকাশভঙ্গী। জীবনের অনুভূতি যেখানে যত গভীর, ছন্দও
সেখানে তত উদার ও বিকাশশীল।
ছন্দ অনুভূতির রূপ।
উপনিষদের তত্ত্ব যেমন গভীর, এর ছন্দও তেমনি গম্ভীর।
প্রত্যেক মন্ত্রটির, প্রত্যেক শ্রুতিটির, ছন্দ-বিন্যাস অনন্ত সঙ্গতি-
সম্পন্ন। তাই ভাবেরও ভাষার ঐশ্বর্য্যে উপনিষদ পূর্ণ ।
স্বাধ্যায় সম্পন্ন হয়ে বেদপাঠে প্রবেশ করতে হত। মন্ত্রের
ছন্দোবদ্ধ উচ্চারণই স্বাধ্যায়। স্বাধ্যায়ের ভেতর দিয়ে প্রত্যেক
শব্দটির শক্তির প্রকাশ। বেদমন্ত্র শুধু শব্দযােজনা নয়, এতে
আছে স্বরের অভিব্যঞ্জনা—প্রতি স্বরভঙ্গী ভাবের দ্যোতনায়
ভরা। বাক্য অর্থ প্রকাশ করে, স্বর ও ধ্বনি ভাবের স্ফুরণ করে।
বাক্যের অর্থ আছে, স্বরেরও অর্থ আছে, কিন্তু সে অর্থ এত
সূক্ষ্ম, যে স্বরতরঙ্গ যতক্ষণ না মূর্ত হয়ে ওঠে, ততক্ষণ ধ্বনি ও
স্বরের দ্যোতনা চিত্তে স্ফুর্ত হয় না।
মানুষের অনুভূতি ছন্দের সূক্ষ্মতররূপ গ্রহণ করে। সূক্ষের
ভেতর পাই জীবনের সুষ্ঠু বিকাশ। এই সূল্পের ধারণাকে
উজ্জ্বল কার জন্যই ছন্দের প্রয়ােগ।
শব্দের ভেতর ধৃত হয়ে
ত
উপনিষদের আলো
থাকে জ্ঞানের অপার্থিবরূপ, সে রূপ আমাদের মানস প্রত্যক্ষের
কাছে ধরা পড়ে না। অতিমানসের কাছে তা সুস্পষ্ট। তাই
ছন্দের সূক্ষ্মরূপের সঙ্গে তত্ত্বের নিত্য সম্বন্ধ। তাকে প্রত্যক্ষ
করি অতি-মানসচেতনার স্তরে। এই স্তরে চেতনাকে উন্নীত
কার কৌশল হল মন্ত্র। উপনিষদ নিতে চেয়েছে চেতনাকে
উৰ্দ্ধ হতে আরে উর্দ্ধতর স্তরে, যেখানে চেতনা স্বয়ং অধিষ্ঠিত,
নাম রূপ ক্রিয়া (world of appearance) থেকে স্বয়ং
উন্মুক্ত। মুক্ত চেতনাই উপনিষদের লক্ষ্য। কিন্তু চেতনার
এরূপ অবস্থিতি জ্ঞানের কাছে ধরা পড়ে না। মন্ত্রদ্বারা
অন্তঃকরণকে এমন সূক্ষ্ম অবস্থায় ও সূক্ষ্মানুভূতিতে নিয়ে যেতে
,
পারি, সত্যের যেখানে পরিচয়।
উপনিষদ বিচারশাস্ত্র নয়, সত্যদৃষ্টি। তাই তার অনুশীলনে
দরকার আছে বিশ্বের কল্যাণরূপের নিবিড় পরিচয়। বিচার
যত দৃঢ় হােক না কেন, চিত্ত স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ না হলে সত্যানুভূতির
পথ খোলে না। এ জন্যে চাই জীবনের ভেতর কল্যাণস্পৃহা
ও কল্যাণদৃষ্টির প্রেরণা। সত্যানুভূতি স্বভাবতই মানুষের
পক্ষে সুকঠিন, কারণ সত্তার সব স্তর হতে কল্যাণস্পৃহা মূর্ত
হয়ে ওঠে না। প্রাণ, মণ, চিত্ত কল্যাণস্পৃহায় পূর্ণ হলে দিব্য
জীবনের ছন্দে সত্তা ভরে ওঠে; তখন জড়তা, চাঞ্চল্য,
সংকীর্ণতা দূর হয়ে যায়, পরিচয় হয় অতিমানসানুভূতির।
উপনিষদের তত্ত্ব বােঝার যােগ্যতা তখনই লাভ করি।
উপনিষদের তত্ত্বাবধারণ করতে হয় ধ্যানের প্রশান্তিতে, সেখানে
চিত্তের অধিকার অবসিত।
•
অবতরণিকা প্রাণের কম্পন স্থির না হলে, মন ভাবনাশূন্য না হলে, সত্যসাধনা সিদ্ধ হয় না। বিষয় সংস্পর্শ থেকে মন ও প্রাণ মুক্ত না হলে ব্ৰহ্মানুভূতির দিকে অগ্রসর হওয়া যায় না। প্রাণ ও মন ছন্দায়িত হলে বিজ্ঞান ও আনন্দের সঙ্গে পরিচিত হই। ধ্যান নিয়ে যায় উন্মুক্ত, মহিমান্বিত সত্যের দিকে। উপনিষদের আলােচ্য বিষয় উপনিষদের দুটো দিক : একটা তত্ত্বের দিক, আর একটা সাধনার দিক। দুটোই প্রধান। তত্ত্বের সন্ধান সাধনার দিকে আকৃষ্ট করে। সাধনা দেয় অন্তদৃষ্টি ও স্বাচ্ছন্দ্য, যার ভেতর দিয়ে শুদ্ধ ও সূক্ষ্ম বােধের উন্মেষ । ধ্যানস্নাত ও ধ্যানমগ্ন হয়ে তত্ত্ব আহরণ করতে হয়। কল্লোলহীনচিত্ত সত্য প্রকাশের প্রশস্ত ক্ষেত্র। উপনিষদকে বলে জ্ঞানশাস্ত্র। এখানে চরম তত্ত্বের নির্ণয় দেখতে পাই। উপনিষদের ঋষিরা চেয়েছিলেন জীবচেতনা ও ব্ৰহ্মচেতনার একত্ব প্রতিপন্ন কর্তে। জ্ঞানের দৃষ্টিতে এই হল পরম পুরুষার্থ। দ্বৈতবাদী ও বিশিষ্টাদ্বৈতবাদীরা এ কথা স্বীকার করেন না। তারা বলেন জীব ও ব্রহ্মে ভেদ আছে উপনিষদকে অবলম্বন করে চিন্তার মােটামুটি দুটিরা এদেশের দর্শনের ভেতর প্রবেশ করেছে। একটি অদ্বৈতবাদ, অন্যটি দ্বৈবাদ। দ্বৈতবাদের নানারূপ। বিশিষ্টাদ্বৈতবাদ, শুদ্ধাদ্বৈতবাদ, ভেদা-ভেদবাদ ইত্যাদি। এইগুলি অবশ্য একটি বিষয়ে একমত। তার। নিবিশেষ অদ্বৈতবিবােধী।
উপনিষদের আলাে
ব্ৰহ্ম এক, বহুকে নিয়েই, বহুকে বাদ দিয়ে নয়। মানুষ
যখন পরম সত্তাকে ধ্যানের ভেতর দিয়ে লাভ করে তখন
তাকে বিশ্বগরূপে পেয়েও বিশ্বাতীতরূপে পেতে চায়।
এ কথা ঠিক, যদিও প্রাচীনেরা তা স্বীকার কৰ্ত্তেন না যে, সব
উপনিষদে একই তত্ত্ব নির্ণীত হয় নি। এমন সব উষনিষদ
আছে, যেখানে অদ্বৈতবাদ পূর্ণরূপে প্রতিষ্ঠিত । এমন উপনিষদও
আছে যেখানে শুধু উপাসনার কথা, সেখানে রাম, গােপাল বা
নৃসিংহকে বলা হয়েছে পরমতত্ত্ব। কতক গুলিতে কৰ্ম্মপূৰ্ব্বক
উপাসনার কথা—হয়ত তত্ত্বের কথা আছে মাত্র একটি মন্ত্রে ।
এই জন্যেই দার্শনিকেরা বুদ্ধির কৌশলে উপনিষদগুলিকে
নিজেদের মতানুযায়ী ব্যাখ্যা করেছেন।
অবশ্য শুধু
উপনিষদের মন্ত্রগুলির আলােচনায় একটি স্থির সিদ্ধান্ত পাওয়া
একেবারে অসম্ভব নয়।
উপনিষদের রহস্য শুধু দার্শনিক বিচার দিয়ে বােঝা যায় না,
কারণ দর্শনতত্ত্বের আলােচনা করে মননের দ্বারা। বিচারের
একটি রূপ আছে, সে রূপকে সে অতিক্রম কৰ্তে পারে না।
বুদ্ধি বিচার করে, কিন্তু তার পেছনে থাকে অনুভূতি।
অনুভূতির রূপকে অবলম্বন করে বিচার প্রণালী প্রস্তুত হয়।
উপনিষদ ছন্দের দ্বারা অনুভূতির স্তরবিশেষকে প্রস্ফুটিত
করে। ক্রমােচ্চস্তরে আরােহণ কৰ্বার উপায় এতে আছে ।
এই অতিমানসচেতনার যে স্তর যার কাছে বিকশিত, তিনি
সেই স্তরের দৃষ্টিকে অবলম্বন করে বিচার প্রণালী রচনা
১০
অবতরণিকা করেন। বিচার দেয় বুদ্ধির উৎকর্ষ, অনুভূতি দেয় তত্ত্বের সংবাদ। এইজন্যে উপনিষদে অপরা ও পরা বিদ্যার ভেদ করা হয়েছে। পরাবিদ্যা সম্পূর্ণ বিচারমূলক নয়, অনুভূতি- মূলক। উপনিষদ শুধু ব্ৰহ্মবিচারে আবদ্ধ হয়ে থাকে নি। উপাসনায় ও ধ্যানের ভেতর দিয়ে স্বরূপের বিকাশই এর লক্ষ্য, যদিও এই বিকাশের চরম-লক্ষ্যে পৌছিবার আগেই নানা অলৌকিক রহস্যের সঙ্গে পরিচয়। চেতনার পূর্ণ জাগরণ ও চেতনায় অবস্থিতি এই বিদ্যার চরম ফল। পূর্ণভাবে চেতনায় প্রতিষ্ঠিত হবার পূর্বে অন্তরের সমতা ও শুদ্ধি ব্যাপক চেতনার পরিচয় দেয়। ব্যাপকবােধের প্রতিষ্ঠা উচ্চস্তরে উপনীত হবার যােগ্যতা দেয়। এই জন্যেই উপনিষদে সগুণ ব্রহ্মবিদ্যার পরেই নিগুণ ব্রহ্মবিদ্যা। সগুণে প্রতিষ্ঠিত হলে এমন অবস্থা আর এমন শক্তি পাই যে নিগুণকে আয়ত্ত করা সহজ হয়। আচার্য্য শঙ্করের নিগুণ ব্রহ্মবিদ্যা এদেশে প্রাধান্যলাভ করেছে। সগুণ ব্রহ্মবিদ্যা সম্পন্ন হলে যে ধৃতি ও শক্তি অর্জিত হয়, তার দিকে তত অবহিত নই। মায়াময় বিশ্ব, এই মতবাদে উপাসনার স্থান থাকলেও তত্ত্ববােধে তার স্থান নেই। উপাসনা বুদ্ধি স্বচ্ছ করে, কিন্তু অজ্ঞানকে নাশ করে না। ফল হয়েছে, তত্ত্বসম্পন্ন হবার জন্যে সগুণ ব্রহ্মবিদ্যার সঙ্গে অল্পই পরিচিত হচ্ছি। তত্ত্বজিজ্ঞাসায় দরকার অন্তরের নির্মলতা। তত্ত্ববিচার দেয় সত্যবােধ। কিন্তু এর জন্যে চাই ১১
উপনিষদের আলাে
সগুণ
বুদ্ধির একাগ্রতা ও ঔজ্জ্বল্য। উপাসনা দুইটি দেয়। নির্মল
হলে বিচারসম্পন্ন হয়েও ব্ৰহ্মসম্পন্ন হওয়া যায় না।
ব্ৰহ্মবিদ্যা অন্তর দীপ্ত করে তােলে, অভয়ে প্রতিষ্ঠা করে।
চিত্তের সূক্ষ্ম পরিণাম প্রকাশ করে অদৃশ্য ও অলৌকিক জগৎ।
উপনিষদ-বিদ্যার গাম্ভীর্য এই জন্যেই এত বেশী ।
উপনিষদের উপাসনা শুধু দেবতার ধ্যান নয়।
নিশ্চিতভাবে ব্ৰহ্মচেতনার জাগরণ এবং তাতে অবস্থিতি।
ধ্যান আমাদের চেতনাকে সংকীর্ণতা থেকে মুক্তি দেয়, বিরাট
চেতনার প্রকাশ করে। উপাসনা দেয় চৈতন্যের যথার্থ
জাগরণ। মানুষের সত্তার একটি স্বাভাবিক বৃত্তি আছে
আনন্দানুভূতির দিকে। এই হ’ল মানুষের প্রকৃত রূপ। তাই
মানুষ প্রকৃতির শত প্রেরণায় তৃপ্ত হতে পারে না। সে চেয়েছে,
একটা অনাবৃত সত্তার অনুভূতি। এতেই তার পরম তৃপ্তি।
কৰ্ম্মানুযায়ী মানুষের একটি বিশিষ্ট রূপ আছে। কৰ্ম্ম দেশকালে
কর্তৃত্ব বুদ্ধিকে নিয়ে প্রকাশিত হয়। মানুষ ব্যক্তিত্বে উদ্বোধিত
হয়ে কর্ম সংস্কারে আচ্ছন্ন হয়। উপনিষদ মুক্তি দেয় এই
কৰ্ম্মগ্রন্থি থেকে ।
কৰ্ম্ম-মীমাংসা
মানুষের কর্মপ্রেরণা তার স্বাভাবিক ধৰ্ম্ম। কর্মের ভেতর
দিয়ে মানুষ চেয়েছে তার ভােগবাসনার তৃপ্তি । বাসনা
১২
অবতরণিকা মানুষকে চালিত করে নবীন সৃষ্টির পথে, তাকে দেয় ভােগ সম্ভার। কর্মের ভেতর দিয়ে মানুষ যে মানুষী বৃত্তিই উপভােগ করে, তা নয়, সে দিব্য বিত্তও ভােগ কর্তে পারে । এই দিব্য ভােগের জন্যই কৰ্ম্ম-মীমাংসার সৃষ্টি হয়েছিল। সাধারণ কর্ম ও শাস্ত্রীয় কর্মের মধ্যে ভেদ আছে। সাধারণ কৰ্ম্মে এমন কোন অপূৰ্ব্বতা নেই যা তাকে দিব্যসম্পদ দিতে পারে। শাস্ত্রীয় কৰ্ম্ম সূক্ষ্ম ভাবনার ওপর প্রতিষ্ঠিত। সে একটা শক্তি উদ্বোধিত করে যাতে মানুষ হয় দিব্য ভােগের অধিকারী। কৰ্ম্ম-মীমাংসা উচিত অনুচিতের সন্ধান দেয়, কিন্তু কর্মপ্রেরণা। স্কুল ভােগকে অবলম্বন করে উদ্বোধিত হয় না। তার ভেতর থাকে সূক্ষ্মভােগের বীজ ও শক্তি। ভাবনার সূক্ষ্মতা দেয় ভােগের সূক্ষ্মতা। এই সূক্ষ্মভােগ সম্বন্ধে আমরা প্রায়ই উদাসীন। তার কারণ সূক্ষ্মভােগ কার শক্তির উৎপত্তি সূক্ষ্মানুভূতি থেকে। কৰ্ম্ম-মীমাংসা যে পার্থিব জীবনের ভােগকে নিয়েই ব্যস্ত থাকে তা নয়। তার ভেতর আছে একটা সূক্ষ্মতর জীবনের সাড়া আর সূক্ষ্মতর বােধের সঞ্চরণ। এই বােধ ও সাড়াকে অবলম্বন করেই স্বর্গের কল্পনা। কল্পনা বলে ত্যাগ করলে চলবে না। মানুষের অন্তঃকরণ যখন ভাবনায় ও মন্ত্রাদিতে প্রজ্জ্বলিত হয়ে ওঠে, তখন তার কাছে জেগে ওঠে এক সূক্ষ্ম জগতের জীবন-লহরী ও তার ভােগ-বৈচিত্র্য। সাধারণত কৰ্ম্মের সম্বন্ধ ইহলােকের সঙ্গে, প্রাণস্তরের তৃপ্তির সঙ্গে, কারণ কর্ম জীবকেন্দ্রে প্রতিষ্ঠিত এবং আমাদের জীবত্বের সাড়া প্রাণস্পন্দনে প্রকাশিত। প্রাণের আরাম, প্রাণের পুষ্টি, প্রাণের গতিই জীবত্বের একে কিন্তু উপনিষদের আলাে প্রথম নিদর্শন, বিশেষত সৃষ্টির স্তরে। ক্রমবিকাশের স্তরে মানুষ এখনও জীব জগত থেকে উচুতে উঠতে পারেনি। মানুষের জ্ঞান বিজ্ঞান সত্ত্বেও তার অন্তরসত্তা প্রাণাভিমুখী ও ইন্দ্রিয়াভিমুখী। এই প্রাণের বৃত্তি তাকে অস্তিত্বের বােধ দেয়। ইন্দ্রিয়বৃত্তি দেয় ভােগ তৃপ্তি। আমাদের জ্ঞান সেই জন্যে এই দুই সঞ্চারকে অতিক্রম করে সূক্ষ্মতর জগতের সত্তাকে গ্রহণ করতে পারে না। কর্মেই প্রাণের প্রতিষ্ঠা, কৰ্ম্মই দেয় এর পূর্ণ দৃষ্টি। এই জন্যে কৰ্ম্মের দ্বারা প্রাণ- কেন্দ্রকে অতিক্রম করতে পারিনে। শাস্ত্রীয় কৰ্ম্মের শক্তি এই পর্যন্ত। জীবসত্তাকে সে যতই সংস্কৃত করুক, কখনও তাকে ভােগস্পৃহা থেকে মুক্তি দিতে পারে না। এই জন্যে শুভ কৰ্ম্মের দ্বারা পুণ্যবিশেষ অর্জিত হলেও তার ক্ষয় হয়। কৰ্ম্ম কোন স্থায়ী ফল দেয় না, দিতে পারে না। কারণ তার উৎপত্তি হয় আসক্তি থেকে। আসক্তি প্রাণের সঙ্গে গৃঢ়ভাবে সংবদ্ধ। যেখানে প্রাণ আসক্তির সংকীর্ণতা থেকে মুক্ত, সেখানে প্রাণের সঙ্গে বিরাট সত্তার পরিচয়। সেখানেই পাই প্রাণের সরলতা ও অনন্ত জীবনের স্বাচ্ছন্দ্য। কিন্তু সাধারণত প্রাণের সাড়া আসক্তির সংকীর্ণ বেগ থেকে মুক্ত হয় না। তাই প্রাণ তার বিরাট ছন্দকে উদ্বোধিত করে জ্ঞানের পথ মুক্ত করতে পারে না। লৌকিক কৰ্ম্ম ও অলৌকিক কৰ্ম্ম দুয়েরই উৎপত্তি প্রাণের বেগ থেকে। অলৌকিক কৰ্ম্মের ভােগ সূক্ষ্ম হলেও জ্ঞানময় ও বিজ্ঞানময় সত্তার সাড়া জাগাতেপারে না। উপনিষদে তাই কর্মের প্রশংসা দেখতে পাইনে। আত্মজ্ঞান শূন্য মানব প্রাণকেন্দ্রেই সংবদ্ধ। ১৪ অবতরণিকা উপাসনা বিজ্ঞান মানুষের ভেতর আরও সূক্ষ্ম সংবেগ আছে, যেখানে সে প্রাণের স্থূল সংক্ষোভ থেকে মুক্ত। তখনই উপাসনার আরম্ভ। উপাসনার ভেতর আছে সত্যানুসন্ধানের সংবেদ। মানুষের অন্তর-সত্তাকে সে দীপ্ত করে, জীবনের উচ্চস্তর প্রকাশের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। প্রাণের উদ্ধ-গতি সঞ্চারে, বিজ্ঞানের সূক্ষ্মবিকাশে অলৌকিক জ্ঞান ও শক্তি উপাসনার নিত্য প্রাপ্তি হলেও উপনিষদ শক্তির চেয়ে জ্ঞানকেই বরণ করে নিয়েছে। জ্ঞান দেয় সত্যে প্রতিষ্ঠা, শক্তি দেয় ঐশ্বর্যে প্রতিষ্ঠা। যার শক্তিতে সমস্ত বিশ্ববিধৃত ও অনুপ্রাণিত, উপাসনা তার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। দিব্যজীবনের, দিব্যজ্ঞানের, দিব্যানু- প্রেরণায় পূর্ণ করে। সত্তার সমস্ত স্তর বিরাট পুরুষের বিশ্ব- লীলার ছন্দে অনুপ্রাণিত করে। উপাসনার উৰ্দ্ধতর স্তরে মানুষের জ্ঞান এমনি চেতনার অবকাশ লাভ করে যে ক্রমশঃ মানবচেতনা অনুভব করে বিশ্বচেতনার সঙ্গে তার অভিন্নতা। সেই চেতনাকে অবলম্বন করে চেতনার অতিমানসরূপের পরিচয়। ছনের আকর্ষণে সগুণ ব্রহ্মের সন্ধান। অনন্তরূপ, অনন্তছন্দ মুখরিত হয় জীবনের উল্লাসে। কিন্তু এত বিভূতিসম্ভারেও চেতনা তৃপ্ত হয় না। তার লক্ষ্য থাকে চেতনার একত্ব অনুভূতি ও প্রতিষ্ঠার দিকে। সত্তার বিরাটত্বের অনুভূতির চেয়ে তার স্বরূপকে জানাই বড়। উপাসনা যে বিজ্ঞানের অবকাশ দেয়, তার ভেতর দিয়ে উপনিষদের আলাে সত্যের বিশ্বরূপের সঙ্গে সাক্ষাৎকার হলেও, মানবাত্মা ও পরমাত্মার ভেতর যদি কিছুও ব্যবধান ব্যবধান থাকে তা হলে উপনিষদের চরম সঙ্গে পরিচয় হয় । উপাসনা ব্রাহ্মী শক্তিতে ও দীপ্তিতে আমাদের পূরণ করলেও, জীব ও ঈশ্বরের ব্যবধান পূর্ণরূপে তিরােহিত করতে পারে না, চায়ও না। কারণ তার স্থিতি এখানে। উপাসনা চায় দিব্যজীবনের সব বিভূতি ও ঐশ্বর্যা। এজন্যেই কখনাে কখনাে ঈশ্বরীয় স্থিতির সঙ্গে সে প্রতিষ্ঠা করে অভিন্নতা, —সে অভিন্নতা শক্তির অভিন্নতা, সত্তার অভিন্নতা নয়। উপাসনা ঈশ্বর-শক্তির সংবেগে জীবকে ঈশ্বর ভাবাপন্ন করতে পারে। কিন্তু তার নিরুপাধিক স্বরূপের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে পারে না। কথাটি পরিষ্কার করতে হবে। ঈশ্বরের জ্ঞানের ও শক্তির সীমা নেই। সীমা থাকলে তাকে ঈশ্বর বলা যেতে পারে । তার সত্তা সর্বত্র বিকশিত। তার সংকোচ হতে পারে ! সবই ঈশ্বরের জ্ঞানে প্রতিষ্ঠিত। তিনি মুক্তির কারণ- অনাদি, অব্যয়। তিনি তার অপ্রতিহত শক্তিতে বিশ্ব নিয়ন্ত্রিত করেন। বিশ্ব উর্ণনাভের জালের মন তার থেকেই জীব ও ঈশ্বরের পার্থক্য এই জ্ঞান ও শক্তির সীমা ও অসীমত্ব নিয়ে নির্ধারিত হয়। জীবের জ্ঞান ও শক্তি সসীম ঈশ্বরের তা অসীম। •• ** ১৬
অবতরণিকা
জীবের এই সীমাবােধ তাকে ক্ষুদ্র করেছে।
এ সীমার
বেষ্টনী তাকে বদ্ধ করেছে সংস্কৃতির প্রবাহে। কিন্তু তার
নৈসর্গিক আস্পৃহা জ্ঞানের ও শক্তির সংকীর্ণতা থেকে মুক্তি।
এই আস্পৃহার জন্যেই সে ঈশ্বরের সঙ্গে যুক্ত হতে চায় ।
কোন প্রবৃত্তির প্রেরণাই তাকে তৃপ্ত করতে পারে না।
কারণ তাদের উৎপত্তি হয় জীবনের প্রাথমিক প্রেরণা থেকে।
এ প্রেরণা স্বভাবের সহজ সংস্কার। তার সঙ্গে উচ্চতর
চেতনার কোন সম্বন্ধ নেই। প্রাথমিক প্রবৃত্তির প্রেরণায় জীব
বিষয় হতে বিষয়ান্তর ভােগ করে।
মানুষ কেবল শরীর ও প্রাণ নয়, তার সব চেষ্টার মূলে আছে
একটা বিকশিত হবার আশৃহ।
এ বিকাশের বেগ উৎপন্ন
হয় প্রাণস্তরে, মনস্তরে, বিজ্ঞানস্তরে, আনন্দস্তরে। সুল
বিকাশে তার স্বভাবের তৃপ্তি নেই। তাই সূক্ষ্ম বিকাশের
জন্যে সে চায় ঈশ্বরের সম্বন্ধ। উপাসনায় তা স্ফুর্ত হয়ে
ওঠে। ভাবনার আতিশয্যে ক্রমশঃ ঈশ্বরের শক্তি ও জ্ঞানের
সঙ্গে পরিচয়।
সিদ্ধির রূপ
এখানে সিদ্ধির দুটো পথ। উপাসনা দ্বারা ক্রমশঃ ঈশ্বরের
শক্তিকে আকর্ষণ করে সত্তাকে পূর্ণ করতে পারি এবং
নানাবিধ যােগৈশ্বর্যের অধিকারী হতে পারি।
যােগের পথ। এ পথে শক্তির নানারূপ আবেগ অধিকৃত
১৭
উপনিষদের আলাে হয়, দিব্য বিভূতি বিকশিত হয়ে ওঠে, মানুষ তার প্রবৃত্তির সংস্পর্শ ও সংবেগ থেকে উত্তীর্ণ হয়। কিন্তু যােগের এটিই মুখ্য ফল নয়। সে ফল ঈশ্বর-জ্ঞান ও শক্তির পরিচয়। প্রকৃতির অধীনতাই জীবত্ব, প্রকৃতির ওপাের কর্তৃত্বই ঈশ্বরত্ব। উপাসনার ফলে জীবে কখনও ঈশ্বরত্বের আবেশ হয়। উপাসনার দ্বারা জ্ঞানের ও শক্তির আতিশয্যে পূর্ণ হই। উপাসনা বিশ্বের কল্যাণছন্দে আমাদের উদ্ভুদ্ধ করে এবং প্রাণের ও বিজ্ঞানের স্পন্দনের পরিচয় করিয়ে দেয়। সে অতিক্রম করতে পারে না এই ছন্দোময় জীবনের কল্যাণ- মূর্তি,—তার প্রতিষ্ঠা সেখানেই। মানুষের অন্তৰ্জীবনের ছন্দ আছে। প্রকৃতির ছন্দ আছে। সঙ্গে প্রাণশক্তির নিগূঢ় সম্বন্ধ। সৃষ্টি ছন্দেরই বিকাশ। ছন্দোবদ্ধ প্রাণসঞ্চার সৃষ্টিকে এত মধুর করেছে। সৃষ্টির সব স্তরেই এক অন্তর্নিহিত ছন্দের প্রেরণা আছে । এই ছন্দের ধারাই সৃষ্টির সকল স্তরে প্রকাশিত হয়ে সমগ্র বিশ্বকে একসূত্রে গ্রথিত করেছে। প্রাকৃতজগতের ভেতর দিয়ে যে জীবন ও ছন্দের প্রকাশ, তাকে উপনিষদের ভাষায় বলা যেতে পারে অধিভূত। আর অন্তৰ্জীবনের ভেতর যে ছন্দ অনুভূত হয়, তাকে বলা যেতে পারে অধ্যাত্ম। বহিঃপ্রকৃতির আর অন্তঃপ্রকৃতির এই ছন্দের ভেতর একটা গৃঢ় সম্বন্ধ আছে। গৃঢ় সম্বন্ধ আছে। তার কারণ এক অনবচ্ছিন্ন জীবনধারাই প্রকাশিত হচ্ছে অন্তঃ ও বহির্জীবনের ভেতর দিয়ে। গভীর ছন্দের ভেতর দিয়ে প্রকাশিত অনন্ত ১৮ অবতরণিকা জীবনধারা ভেদবােধ অপসারিত করে। । জীবনের এই অধ্যাত্ম ও অধিভূত প্রকাশ ভিন্ন আরও উচ্চতর প্রকাশ আছে অধিদৈব জগতে। অধিদৈব জগত অধ্যাত্ম ও অধিভূত জগতের সমন্বয়কেন্দ্র। সেখানে চৈতন্যের সূক্ষ্মতা, দীপ্তি ও প্রাণের সুখময় কম্পন। অন্তৰ্জীবন ও বহির্জীবনের ছন্দ এক হয়ে যায়। এই অধিদৈব জীবন স্বচ্ছ, প্রকাশশীল। উপাসনা অন্তঃ ও বহির্জীবনের মধ্যে এই অধিদৈব জীবনের সম্বন্ধ প্রতিষ্ঠা করে। ধ্যানস্তর থেকে জ্ঞানের দিকে এগিয়ে দেয়। উপাসনার প্রত্যক্ষ ফল সমস্ত বিশ্বের একটি দিব্যরূপ। সাধক এই দিব্যরূপের ভেতর দিয়ে ঈশ্বরতত্ত্বের বিরাটত্ব ধারণা করতে থাকে। তার অন্তর দীপ্ত হয় ঈশ্বরপ্রকাশে, * উপনিষদে প্রায়ই অধ্যাত্ম, অধিভৃত, অধদৈব এই তিনটি কথার উল্লেখ আছে। এদের অর্থ জানা উচিত। একই চৈতন্যের এই তিনটি রূপ। চৈতন্য এক হলেও, তার প্রকাশ হয়। অনু: বহিবিশ্বে । অন্তরে, বিশেষতঃ অন্তরের নানাবিধ ক্রিয়ার ভেতর দিয়ে, অধ্যাত্ম, বাহিরে শব্দ, স্পর্শ, রূপ ও ভৃতবস্তুসমূহের ভেতর দিয়ে অধিভূত, আর অন্তরীক্ষে সূৰ্য্য, চন্দ্রমা, গ্রহাদির ভেতর দিয়ে, তার প্রকাশ হয় অধিদৈব । 599147 subjective, gfrio objective i অধিদৈব এ দুটির সমন্বয় । সূৰ্য্য, চন্দ্রমা ইত্যাদির সঙ্গে আমাদের অন্তঃ ও বহিঃজগতের একটি পারস্পরিক সম্বন্ধ ( correspondence) আছে ; যেমন বুদ্ধির সঙ্গে সূর্যের, মনের সঙ্গে চন্দ্রমার, চোখের সঙ্গে (তেজের, ঘ্রাণের সঙ্গে গন্ধের। ধ্যানের একটি ভূমিকায় এ সম্বন্ধের জ্ঞান হয়।
উপনিষদের আলাে
ফুৰ্ত্ত হয় তার শক্তিতে। এ অবস্থায় মানুষ ব্ৰহ্মপ্রতিষ্ঠা
লাভ করে, কিন্তু ব্রহ্মের সঙ্গে অভিন্ন হতে পারে না।
উপনিষদের দৃষ্টিতে এ জ্ঞানও পরাজ্ঞান নয়, জীবত্বের পরিধি
থাকা পর্যন্ত মানুষ ব্রহ্মে স্থিতি লাভ করতে পারে না।
আরােহণের পথে যত সুন্দর জীবনের বিকাশ হােক না
কেন, যত সূক্ষ্মজ্ঞানের গভীর আধার হই না কেন,
সমস্ত প্রকাশকে পেরিয়ে সত্য সেখানে নিজের মহিমায় (“স্বে
মহিমি”) স্থিত, উপাসনায় সেখানে পৌছিয়ে দিতে পারে না।
উৰ্দ্ধ হতে উৰ্দ্ধতর লােকের স্বচ্ছতা, শুভ্রতা, প্রজ্ঞা বুদ্ধিকে
উদ্ভাসিত করলেও অনাবৃত জ্ঞান প্রকাশিত হতে পারে না।
এখানেই তার লাঘবতা। তখন আবশ্যক হয় ব্রহ্মের সঙ্গে
অভিন্ন ভাবনা; এই ভাবনা আমাদের মুক্ত করে বিশ্বলীলার
ও বিশ্বসৃষ্টির স্পন্দন থেকে। যে সনাতন অবিদ্যা ব্রহ্ম ও
জীবের ভেদ সৃষ্টি করেছে তাকে অপসারিত করে মুক্তির
চরম সার্থকতা দেয়।
সাধনার দুটী পথ—একটী সদ্যমুক্তির, আর একটা ক্ৰমমুক্তির ।
মুক্তি বলতে বুঝি জ্ঞানের ও শক্তির ক্ষুদ্রতার অপসারণ।
অবস্থা এমনি যেখানে জীবত্বের
সব সংবেগ, সংকীর্ণতা
অতিক্রম করে বৃহত্তর ও দিব্যতর জীবনের সন্ধান পাই।
সাধক লাভ করে দৈবী সম্পদ। তখন জীবনের ভেতর দিয়ে
প্রকাশিত হয় ভাগবত মূচ্ছনা। জীবন লীলায়িত হয়ে ওঠে
ব্রাহ্মী ছন্দে। জীবনধারার অভিব্যক্তি মানবেই শেষ হয়নি,
তার আরও উর্ধবিকাশ আছে--এবং মানুষ উপাসনার দ্বারা
২০
অবতরণিকা
সেই অলৌকিক পথে আরােহণ করে। এই হ’ল তার দিব্য
সিদ্ধি। এই পথে যােগজ শক্তির বিকাশ। তপঃশক্তিতে
ইচ্ছা হয় অপ্রতিহত। এরূপ অবস্থা বিশেষকেও মুক্তি বলা হয়।
কারণ এখানে পাই সংকীর্ণ জীবনের সমস্ত খৰ্ব্বতা থেকে
পরিত্রাণ। কিন্তু অবিদ্যা থেকে এও প্রকৃত মুক্তি দেয় না।
আত্মস্বারাজ্যে প্রতিষ্ঠিত হলে দেশ, কাল, কৰ্ম্ম থেকে আমরা
সম্পূর্ণরূপে স্বাধীন হই।
স্বাধীন হই। আত্মস্বারাজ্য শ্রেষ্ঠতম মুক্তি।
সিদ্ধির শক্তি এখানে অকিঞ্চিৎকর। এই আত্মস্বরাজ্যই
চরম প্রাপ্তি, এখানে অবিদ্যা অপসারিত। আত্মবিকাশ
স্পন্দনশূন্য, স্বপ্ৰভায় উদ্ভাসিত—শিব, শান্ত, অদ্বৈতম্ ।
বিশ্বছন্দের উদ্ধে প্রজ্ঞালােক উদ্ভাসিত ; ছন্দ, ভাষা, স্পন্দন
অন্তৰ্হিত। সে ব্যক্ত নয় অব্যক্তও নয়। ব্যক্তাব্যক্তের অতীত।
বিশ্বচক্রের বিবর্তন শান্ত, শক্তি নিৰ্বাপিত, বিশ্বলীলা স্তব্ধ।
এই সত্য, এই মহিমা, এই অভয়। উপনিষদ বিদ্যায় এই
অভয় প্রতিষ্ঠা।
ব্ৰহ্ম কী
এবং
ব্রহ্ম
সমস্ত উপনিষদে মাত্র দুটী প্রশ্ন--ব্রহ্ম কী ?
সাধনা কী? প্রথমটী করে তত্ত্বনির্ণয়, দ্বিতীয়টী দেয় তত্ত্ববােধ ।
?
উপনিষদ অন্তরে তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করে, অজ্ঞান দূরীভূত করে।
আচাৰ্য শঙ্কর উপনিষদ শব্দের এই রকম ব্যাখ্যা করেছেন।
অজ্ঞান জ্ঞানের আবরণ। অবিদ্যার অপসারণ বিদ্যালাভের
উপায়। একমাত্র উপনিষদই ব্রহ্মজ্ঞান দিতে পাবে।
মনন
এই ব্ৰহ্মতত্ত্বের উপদেশ আচার্যের মুখে শুনতে হয়। শ্রবণ
বিষয়ে অনুপ্রবেশ দেয় ? বিষয়ে অনুপ্রবিষ্ট হলে
করি। শ্রুতি অনুকূল বিচারের নাম মনন। মননের দ্বারা
বুদ্ধি উজ্জ্বল হয়। তত্ত্ববিষয়ে সকল সংশয় দূরীভূত হয়।
তখন তত্ত্বধ্যানে মগ্ন হই। ধ্যান দেয় তত্ত্বের সাক্ষাৎ জ্ঞান।
উপনিষদ ব্রহ্মবিদ্যা শুধু যুক্তির উপর স্থাপিত হয়নি।
যুক্তির অনন্ত রূপ। তার দ্বারা স্থির সিদ্ধান্তে উপনীত
হওয়া যায় না। শ্রুতিতে যুক্তির কথা থাকলেও, অনুভূতি
ও আপ্তবাক্যের ওপর বেশী আস্থা স্থাপন করা হয়েছে।
২২
ব্ৰহ্ম কী
শ্রবণের সার্থকতা উপলব্ধি হলেই গুরুর কাছে যাই ও প্রশ্ন
করি-ব্ৰহ্ম কী ?
তৈত্তিরীয় উপনিষদে প্রশ্নোত্তরচ্ছলে এই বিদ্যা অতি
সরলভাবে নিরূপিত হয়েছে। ভৃগু তার পিতা বরুণের
কাছে গিয়ে ব্ৰহ্ম কী জানতে চাইলেন। পিতা উপদেশ
দিলেন, “যা থেকে বিশ্ব উৎপন্ন হয়, উৎপন্ন হয়ে জীবিত
থাকে, যাতে আবার প্রবিষ্ট হয়, তাকে জান, তাই ব্ৰহ্ম।”
সকল কার্য্যেরই কারণ আছে ; কিন্তু যা প্রথম কারণ,
তার আর কারণ থাকতে পারে না। যা বিশ্ব-কারণ,
তাকে শ্রুতিতে ব্ৰহ্ম বলা যায় । ব্ৰহ্ম শব্দটীর অর্থ বৃহৎ ;
যার চেয়ে বৃহত্তর আর কিছু হতে পারে না, তিনিই ব্ৰহ্ম ।
তিনিই বিশ্বসৃষ্টির একমাত্র কারণ। বিশ্ব উৎপন্ন হয়ে ব্রহ্মেই
বিধৃত আছে। সৃষ্ট হয়েও জগৎ ব্রহ্ম থেকে পৃথক হয় নি।
বিশ্বাধারে তিনি নানা রূপ নিয়ে প্রকাশিত হলেও, কখনও
বিশ্ব থেকে পৃথক হননি। তার শক্তি ও সত্তা সর্বত্র প্রকাশিত।
সৃষ্ট জগৎ তারই ভিন্ন মূর্তি। তিনি সৃষ্টিকর্তারূপে জগৎ সৃষ্টি
করে দূরে দাড়িয়ে থাকেন নি, জগতের ভেতর প্রবিষ্ট হয়ে
জগতকে অনুপ্রাণিত করেন। জড়জগৎ, প্রাণজগৎ, চিন্ময়
জগৎ সকলের ভেতর প্রবিষ্ট হয়ে তিনি সত্তারূপে, প্রাণরূপে,
জ্ঞানরূপে, আনন্দরূপে প্রকাশিত হচ্চেন। জলে বুদবুদের
মত ব্রহ্মে উৎপন্ন হয়ে ব্রহ্মেই লয় হয়।
সৃষ্টি, ব্রহ্মে স্থিতি, ব্রহ্মেই তার লয়।
বিশ্বানুপ্রবেশ, লয় বিশ্বের ব্রহ্মানুপ্রবেশ।
ব্রহ্ম হতে
সৃষ্টি ব্রহ্মের
উপনিষদের আলাে
সামান্যরূপে এইভাবে তত্ত্বনির্ণয় করে সেই তত্ত্বের পূর্ণ প্রকাশ
করবার জন্যে ভৃগু ও তার পিতা বরুণের মধ্যে একটি বিশদ
আলােচনা হয়। সেই আলােচনায় নানা বিষয়ের অবতারণা
হয়েছে। তাতে নানা জ্ঞাতব্য বিষয় আছে। ভৃগু তপস্যা
করে এসে বল্লেন, যা থেকে এই বিশ্বের উৎপত্তি, যাতে
বিশ্বের বিস্তৃতি এবং যাতে বিশ্বের অনুপ্রবেশ তাই যদি ব্রহ্ম
হয়, তবে অন্ন হবে ব্রহ্ম। কারণ “অন্নে এই প্রাণীরা
উৎপন্ন, অন্নে জীবিত, অন্নেই তিরােহিত হয়।” পিতা
বল্লেন আবার তপস্যা করতে। দ্বিতীয়বারের তপস্যায় ভৃগু
জানলেন “প্রাণ ব্ৰহ্ম । প্রাণে এই জগৎ উৎপন্ন, প্রাণে
স্থিত এবং প্রাণেই তিরােহিত হয়।” বরুণ কিন্তু সন্তুষ্ট
হলেন না, আবার তপস্যা করতে বলেন। এবার ভৃগু জানলেন
“মন ব্ৰহ্ম। মনে বিশ্ব সৃষ্ট, মনে বিশ্ব স্থিত, মনেই
তার লয়।” বরুণ কিন্তু আবার তপস্যা করতে বললেন,
চতুর্থবারে ভৃগুর মনে হ’ল “বিজ্ঞান ব্ৰহ্ম । বিজ্ঞানে
বিশ্বের উৎপত্তি, বিজ্ঞানে ধৃতি, বিজ্ঞানেই পুনঃ প্রবেশ।”
বরুণ বল্লেন আবার তপস্যা করতে, এবারের তপস্যায়
ভৃগু বুঝলেন, “আনন্দ ব্ৰহ্ম ।
আনন্দে এই ভূতসকলের
উৎপত্তি, আনন্দে স্থিতি, আনন্দেই অনুপ্রবেশ।” এই বিদ্যাকে
ভার্গবী-বারুণী বিদ্যা বলা হয়েছে।
সূত্রাকারে উপনিষদের তত্ত্ব বলা হ’ল। মানুষের তত্ত্বজিজ্ঞাসা
হলেই
সৃষ্টির মূল অনুসন্ধান করে। দৃষ্টি ক্রমশই
গভীর ও সূক্ষ্ম হয়। স্কুল দৃষ্টিতে মনে হয়—অনই ব্ৰহ্ম,
২৪
ব্ৰহ্ম কী
অন্নই তত্ত্ব। অন্নকে জগতের উৎপত্তির ও স্থিতির কারণ
বলা হয়েছে। এ অন্ন কিন্তু স্কুল অন্ন নয়।
এ হচ্ছে শক্তি
বা শক্তির সেই রূপ যা জড়জগতে ক্রিয়াশীল এবং জড়-
জগতের সমস্ত ক্রিয়ারই নিরূপক ।
জড়জগতে অণুপরমাণুর
সমাবেশ আছে, সৃষ্টবস্তুর রূপ আছে, আকার আছে। এর
থেকেই বােঝা যায় এই শক্তির কোন বিশেষ রূপ বিশ্বের
বিধৃতির ও বিকাশের কারণ। এই শক্তিই অন্ন। অন্ন কথাটী
এখানে ব্যাপকভাবে গ্রহণ করা হয়েছে। অন্নের দ্বারাই
আমরা জীবিত থাকি, অন্নের দ্বারাই আমরা • পুষ্ট হই।
অন্নই বিশ্ব-কারণ। এ শক্তির এমন কোন যােগ্যতা
নেই যা প্রাণরূপে প্রকাশিত হতে পারে। অন্নদৃষ্টি সত্যের
নিম্নতম দৃষ্টি। এ দৃষ্টি শক্তির জড়বিকাশকেই লক্ষ্য করে।
এর সূক্ষ্মতর বিকাশকে লক্ষ্য করে না।
শক্তি আরও উদ্ধা পৰ্য্যায়ে প্রাণ, মন, বিজ্ঞানরূপে প্রকাশিত।
অন্নের পর নির্দেশ করা হ’ল প্রাণই ব্ৰহ্ম । প্রাণও
শক্তি-বিশেষ। শক্তি যখন জড়ের ক্রিয়া অতিক্রম করে
প্রাণসঞ্চার করে, তখন সৃষ্টি আরও সূক্ষ্মস্তরে উন্নীত
হয়। অচেতন শক্তির ক্রিয়ার স্থলে প্রাণনক্রিয়ার আকুঞ্চন
প্রসারণ ও বর্ধনের পরিচয় পাই। প্রাণের দৃষ্টিতে সমস্ত
জগত জীবিত বলে মনে হয়। অন্নের জগত থেকে প্রাণের
জগতের এই প্রভেদ। প্রাণজগতে একটী কেন্দ্র নিয়ে
শক্তির প্রকাশ দেখতে পাই। সৃষ্টির স্তরে এ এক নবীন
বিকাশ। স্কুল জগতে প্রাণহীন ও চেতনাহীন শক্তির সঞ্চরণ
২৫
উপনিষদের আলাে অত্যন্ত অস্পষ্ট। সেখানে জড়তা বেশী। কিন্তু প্রাণস্তরে শক্তির প্রকাশ স্ফুটতর। প্রাণ কেন্দ্রগত সঞ্চারণে আত্মপ্রকাশ করে। জীবাণুতে এই প্রাণের ক্রিয়া সুস্পষ্ট। বাইরের সঙ্গে সম্বন্ধ বিস্তার করেও শক্তি এখানে কেন্দ্রগত। প্রাণের রূপ এ ভাবেই বুঝি। উপনিষদে প্রাণকে বিশ্বতত্ত্ব বলে গ্রহণ করা হয়। একে সৃষ্টির পুংতত্ত্ব ( Positive Principle) বলা যায় । প্রশ্নোপনিষদে বলা হয়েছে, প্রজাপতি সৃষ্টিকাম হয়ে প্রাণ ও রয়ি সৃষ্টি করলেন। প্রাণ পুংতত্ত্ব, রয়ি স্ত্রীতত্ত্ব। প্রাণ রয়িকেই অবলম্বন করে নানাবিধ সৃষ্টির বিকাশে লীলায়িত হয়। এ প্রাণ মহাপ্রাণ। বার্গসঁর ভাষায় তাকে Elai Vital বলা চলে। উপনিষদে প্রাণ শব্দকে অনেকরূপে গ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু শক্তি যখন প্রাণন ক্রিয়ারূপে প্রকাশিত হয় তখনই তাকে মূলতঃ প্রাণ বলে। কিন্তু তত্ত্বের এইটেই চরম দৃষ্টি হতে পারে না। প্রাণময় বিশ্বে পাই জীবনের সাড়া ও স্পন্দন, কিন্তু এখানেও পাইনে উচ্চতর বিকাশের রূপ। প্রাণ ও অন্নের ভেতর সম্বন্ধ আছে। প্রাণের স্থূল রূপ অন্ন । একই তত্ত্বের ক্রিয়াত্মক অংশ প্রাণ, জড়াত্মক অংশ অন্ন। প্রাণস্পন্দনের আধার অন্ন । প্রাণস্পন্দের মন্দীভূত অবস্থা প্রাণকে পাশ্চাত্য দার্শনিকের ভাষায় Life Principle বলা চলে, রয়িকে বলা চলে Matter। i
ব্ৰহ্ম কী
অন্ন। শক্তির স্তব্ধীভূত অবস্থা জড়।
প্রাণ।
স্পন্দনরূপা শক্তি
।
প্রাণদৃষ্টিকে অতিক্রম করে সত্যকে (তত্ত্বকে ) মন বলা
হয়েছে। মন সঙ্কল্লাত্মক, ইচ্ছার আশ্রয় । সঙ্কল্পের সঙ্গে
প্রাণের ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ । সঙ্কল্পের জাগরণে প্রাণের চাঞ্চল্য।
মন প্রাণ একত্রে
ক্রিয়া করে।
এদের বলতে পারি
প্রাণমনশক্তি (Vital-Mental Principle)। প্রাণ সঙ্কল্পের
সঞ্চারণে ক্রিয়াশীল হয়, তা অনুভবসিদ্ধ । মন এখানে
উচ্চতর বিজ্ঞান নয় । মন সঙ্কল্প বিকল্প করে। সূক্ষ্ম প্রাণের
সাথে এর সম্বন্ধ। তাই একে প্রাণের ভেতর চেতনার সাড়া
বলে গ্রহণ করা যেতে পারে, অথচ এই চেতনা বিজ্ঞানজগতের
মত সুস্পষ্ট ও প্রণালীবদ্ধ নয়। এদের ছন্দ আছে।
দেয় এদের স্বচ্ছতা। স্বচ্ছতার অভাব থেকেই অনেক সময়
এদের ক্রিয়া ও প্রকাশ হয় অস্পষ্ট। ছন্দোবদ্ধ প্রাণে মনের
সুষ্ঠু বিকাশ।
ছন্দই
মনকে অতিক্রম করে বিজ্ঞানজগতের
বিজ্ঞানজগতের পরিসর। বিজ্ঞান
মন হতে সূক্ষ্মতর সত্তা। এখানে আছে বােধের স্থির ও সত্য
দৃষ্টি। এই স্তরে বােধের স্বচ্ছতায় পাই চিতির স্পন্দন
( Idee-force ) মনের আলাে অস্পষ্ট, বিজ্ঞানের আলাে
স্পষ্ট, ভাস্বর ও দীপ্ত । কোন অস্পষ্ট ধারণা বা ভাবনা
এখানে নেই, নেই কোন সঙ্কল্পের ক্রিয়া। সঙ্কল্প ক্রিয়াত্মক,
বিজ্ঞান প্রকাশাত্মক। এই প্রকাশ ক্রিয়াহীন নয়। ক্রিয়াশীল
২৭
উপনিষদের আলাে হয়েও সে প্রকাশশীল। সঙ্কল্প ক্রিয়াশীল, কিন্তু প্রকাশশীল নয়। তত্ত্বচিন্তায় এইভাবে বিজ্ঞানকেও কখন বিশ্বসত্তা বলা হয়। প্রকাশশীল সত্তাই বিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠা। বিজ্ঞানের জগত চিতিশক্তির আলােকে উদ্ভাসিত। এখানে প্রাণের স্পন্দন স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ, ইচ্ছা সংকল্পের সংকীর্ণত হতে ইহা চিতিশক্তির মূৰ্ত্ত বিকাশ । প্রাণ ও মনের স্থিরতায় বিজ্ঞানের সূক্ষ্মতত্ত্বের প্রকাশ। জ্ঞানই শক্তিরূপে প্রকাশিত বিজ্ঞানে শক্তির স্পন্দন আলােকিত। তত্ত্বের পর্যায়ে আরও ঊর্ধে আরােহণ করলে সত্তার আনন্দ- রূপ প্রকাশ হয়। আনন্দই ব্ৰহ্ম। ব্ৰহ্ম। প্রকাশের রমণীয়তা ও কমনীয়তা দেয় আনন্দ। আনন্দ বিকাশের উল্লাস। সে বিকাশ বাধাহীন। পূর্ণতম বিকাশেই আনন্দের প্রতিষ্ঠা। অন্তহীন অবকাশে, বাধাহীন প্রকাশেই আনন্দের স্থিতি। আনন্দ, প্রাণ, মন, বিজ্ঞান এর চেয়েও সূক্ষ্মতর তত্ত্ব। সে দেয় ঋতময় বােধের সঙ্গে সুখময় বােধ। ঋত, প্রজ্ঞা ও আনন্দই পরম প্রতিষ্ঠা। এই আনন্দদৃষ্টি অলৌকিক দৃষ্টি । মানসভূমিতে সে প্রতিষ্ঠিত নয়, অতিমানস চেতনায় প্রতিষ্ঠিত। বিশ্ব আনন্দোদ্ভূত ও আনন্দধুত। এ সংবেদ ( feeling) নয়—বিশ্বতত্ত্ব, পরম সত্য। আনন্দেই প্রাণ- মন সঞ্জীবিত। জ্ঞানের বিকাশ আনন্দেই। আনন্দই জীবনের মূল সূত্র। আনন্দই জীবন, জীবনই আনন্দ। এই আনন্দ- সংবাদ তৈত্তিরীয় উপনিষদের পরম বক্তব্য। আনন্দের ২৮ ব্ৰহ্ম কী দৃষ্টি দিব্যদৃষ্টি ও দিব্যানুভূতি। পূর্ণসত্তার জ্ঞানেই মানুষ তার ক্ষুদ্রত্বকে অতিক্রম করে। পূর্ণজ্ঞান দেয় আনন্দে প্রতিষ্ঠা। তখন মানুষ তার সাধারণ মানসজ্ঞানকে অতিক্রম করে শুদ্ধবােধে প্রতিষ্ঠিত হয়, বিশ্বের অন্তঃসত্তা অনুভব করে। তখন সে অজ্ঞানের আবরণ থেকে মুক্ত হয়ে আনন্দে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এই অমৃত, এইই কল্যাণ। হয়েছে। এই বৃহদারণ্যকে এই আনন্দের কথা স্ফুটতর হয়েছে । আনন্দ তৈত্তিরীয় শ্রুতিতে বিশ্বসত্তারূপে নির্ণীত হয়েছে। আনন্দ ব্রহ্ম উপনিষদে একটা সুন্দর আখ্যায়িকা আছে। ঋষি যাজ্ঞ- বন্ধ্যের দুই পত্নী, মৈত্রেয়ী ও কাত্যায়নী। যাজ্ঞবল্ক্য প্রব্রজ্যা গ্রহণ করতে সঙ্কল্প কল্লেন। তিনি তার দুই পত্নীকে সম্পত্তি ভাগ করে দিতে চাইলেন। মৈত্রেয়ী বল্লেন, “যা আমায় অমৃত দেবেনা তা নিয়ে কি করবাে ?” মৈত্রেয়ীর ধনসম্পত্তি ও বিত্তের প্রতি কোন আকাক্ষা নেই দেখে যাজ্ঞবল্ক্য বললেন, “মৈত্রেয়ী, তুমি চিরকালই আমার প্রিয়। আজ আরও প্রিয় হলে। তােমাকে অমৃতের উপদেশ দিচ্ছি।” তারপর যাজ্ঞবল্ক্য উপদেশ দিলেন, “পতি যে জায়ার কাছে প্রিয় তার কারণ পতি নয়, পতির ভেতর জায়া নিজের স্বরূপ দেখে বলেই। তেমনি জায়া যে পতির প্রিয় তার কারণ জায়া নয়, জায়ার ভেতরে পতি নিজের স্বরূপ দেখে বলেই। আসলে আত্মাই পরম প্রিয়। আত্মসম্বন্ধশূন্য হয়ে কেউই প্রিয়
উপনিষদের আলাে
নয়। আত্মপ্রীতি পরম প্রীতি, সে প্রীতি অহেতুকী প্রীতি।
বস্তু-প্রীতি আনন্দেরই প্রকাশ।
এই বিরাট বিশ্ব, তার অপরূপ দৃশ্য, তার রূপরাশি, তার অনন্ত
অবকাশ—সমস্তই আমাদের
আমাদের অন্তরে আনন্দ
আনন্দ জাগায়।
বিশ্বব্যাপী আত্মাকেই আমরা এর ভেতরে দেখতে পাই। তাই
এরা আত্মারই বিশ্বরূপ। যে আনন্দ বিশ্বের মূলে, সে
আনন্দ আমাদের হৃদয়-গুহায়ও।
সে আনন্দই আত্মা।
বিশ্ব-আত্মা আমার আত্মা, আমার আত্মাই বিশ্ব-আত্মা।
আত্মাই পরমাত্মা। আত্মা আনন্দ বলেই প্রেমাস্পদ।
পরমাত্মা আত্ম-স্বরূপ বলেই পরম প্রীতির বিষয়। মানুষ
চায় আনন্দ, তার স্বরূপই আনন্দ। তার ভেতর আছে
আনন্দের আপৃহা, আর সে আনন্দ পায় সত্তার বিকাশে ।
আত্মার বিশ্বরূপ জাগায় বিশ্ব প্রীতি। বিশ্ব প্রীতির মূলে
আত্মপ্রীতি। আত্মারই ছায়া বিশ্ব। বিশ্ব আত্মারই রূপ।
সত্য, জ্ঞান, আনন্দ
সত্তার রূপ আনন্দরূপ। উপনিষদের পরম বক্তব্য এই।
প্রথম দৃষ্টিতে ব্রহ্মকে সত্তা (Existence) রূপে প্রতীত হয়।
সকলের মূলে এক অবিভক্ত সত্তা। বিভক্ত সত্তা অপূর্ণরূপ।
অবিভক্ত সত্তা সত্যের রূপ। অনবচ্ছিন্ন সত্তা বলতে বাধাহীন
উদার স্থিতিকে বুঝি। স্থিতিরূপতা সত্তার প্রধান লক্ষণ।
কিন্তু এ সত্তা শুধু স্থিতিরূপই নয়, ইহা সঞ্চারশূন্য জ্ঞান ও
০
ব্ৰহ্ম কী আনন্দ। চৈতন্যের ও আনন্দের সঞ্চার যেখানে, সেখানে সত্য কেন্দ্ররূপে (Centralised ) স্ফুরিত হয়। হয়। জ্ঞানের ও আনন্দের বিকাশ ও সঞ্চরণ কেন্দ্রস্থ সত্তাকে নিয়ে সম্ভব। এটা সৃষ্টির প্রাথমিক ক্ষণ। সৃষ্টির অর্থ—সত্তার কেন্দ্রীভূত অবস্থা প্রাপ্তি ও শক্তির মূর্তবিকাশ। কিন্তু সৃষ্টির উর্ধে সত্তার অখণ্ড অবিভাজ্য স্বরূপে আনন্দ ও জ্ঞানের সঞ্চার নাই। এখানে আছে আনন্দ ও জ্ঞান স্বরূপতা,—সত্তাস্বরূপ, স্পন্দনশূন্য জ্ঞান ও আনন্দ। উদ্বেলতাশূন্য নির্বিশেষ দীপ্তি ও প্রসার। দীপ্তি জ্ঞান সূচক। প্রসার আনন্দ সূচক। আবরণ শূন্যতাই আনন্দের রূপ। আনন্দের সংবেদ এখানে নাই। সংবেদশূন্য আনন্দই আনন্দের স্বরূপ। এরূপ আনন্দ সত্তার নামান্তর। উদ্বেলিত আনন্দের স্থানে শাশ্বত আনন্দ। সঞ্চার শূন্য p আনন্দ ব্রহ্মানন্দ। অখণ্ড সত্তার জ্ঞান নিরুপাধিক। দীপ্তি স্বরূপ জ্ঞানের স্ফুর্তি নাই, বিষয় নাই। প্রজ্ঞা স্বরূপে প্রজ্ঞালােকের প্রভা নাই । স্থূল সূক্ষ্ম লােকের আলােক স্পন্দন নাই। যে প্রজ্ঞার লহরী- মালায় বিশ্ব ও বিশ্বাতীত সূক্ষ্ম জগৎ উদ্ভাসিত, যে প্রজ্ঞায় ‘ঋতম্ ধৃত, সেই প্রজ্ঞার অতীত এই প্রজ্ঞারূপ। এই নিৰ্ম্মল শান্ত জ্যোতি প্রজ্ঞান ঘন। স্পন্দন রহিত প্রজ্ঞাই ব্ৰহ্মজ্ঞান। ব্ৰহ্মকে যখন জ্ঞান স্বরূপ বলি, তখন তার প্রকাশরূপতাকেই লক্ষ্য করি। যখন আনন্দ স্বরূপ বলি তখন তার রমণীয়তাকে লক্ষ্য করি। নিম্মুক্ত নিরাবরণ প্রকাশ পরম রম্য ।
উপনিষদের আলাে
ব্রহ্ম ও রস
তৈত্তিরীয় শ্রুতিতে রস কথাটি ব্যবহৃত হয়েছে। ব্রহ্মকে
‘রস বলা হয়েছে। রস’ বলতে সাধারণত এমন কিছু বুঝি
যা আমাদের ভেতরে আনন্দকে বাড়িয়ে দেয়। জীবনের মূলে
আছে রস। রস প্রাণকে সঞ্জীবিত করে। এই রসই
আনন্দ ; আনন্দের সঙ্গে প্রাণের ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ। আনন্দ
যেখানে পূর্ণ, প্রাণ সেখানে প্রশান্ত। আনন্দে প্রাণের পুষ্টি ।
প্রাণের উপজীব্য আনন্দ। আনন্দের অভাবে প্রাণের চাঞ্চল্য।
তখন তার রসসঞ্চার হয় না। ব্ৰহ্মই রস, এই রসকে লাভ
করে আমরা আনন্দকে লাভ করি। শ্রুতি বলেছেন জীবনের
মূলে আছে আনন্দ রস—‘আকাশ আনন্দ না হলে কে প্রাণ
ধারণ করত ?
বিশ্বে সকলের মূলে এই রস আছে বলেই তারা আনন্দ
দেয়। রূপ, রস, গন্ধ, শব্দ, স্পর্শের আকর্ষণ এখানে।
যেখানে আনন্দ, ব্ৰহ্মরস সেখানে। বিষয়ের আনন্দও ব্রহ্মানন্দ,
তবুও সেখানে নাই তার পূর্ণবিকাশ। তাই সে চিরন্তন
আকর্ষণের কারণ হয় না। তাতে পাইনে পূর্ণতৃপ্তি। কারণ,
আনন্দ এখানে বিষয়কে অবলম্বন করে প্রকাশ পায়।
সৃষ্টির স্তরবিশেষে আনন্দের বিকাশ হয় ভিন্নরূপে।
তৈত্তিরীয় শ্রুতিতে মানুষের আনন্দ, গন্ধর্বের আনন্দ,
দেবতার আনন্দ, ইন্দ্রের আনন্দ, প্রজাপতির আনন্দের উল্লেখ
এই সব আনন্দলোেক ব্ৰহ্মানন্দেরই ছায়া এবং
আছে।
ব্ৰহ্ম কী লাভ। এইখানে যে আনন্দ অনুভূত হয় তাও ব্রহ্মানন্দ। পূর্ণ-ব্রহ্মানন্দ এই স্তরে বিকশিত হয় না বলেই এই সব স্তরকে অতিক্রম করতে হয়। তবেই হয় ব্রহ্মানন্দের উপনিষদে আনসাধনার এই বিশেষত্ব। রূপ, রস, শব্দ, স্পর্শ, গন্ধ থেকে আরম্ভ করে সৃষ্টির সব স্তরে একই আনন্দের বিকাশ। বিষয়কে বিষয়রূপে না দেখে আনন্দরূপে দেখলে, বিষয় ব্রহ্মানন্দের দিকে বাধা না হয়ে বরং উপায় হয়। এই দৃষ্টি বিষয়দৃষ্টি নয়, এ ব্ৰহ্মদৃষ্টি। বিষয়ের ভেতর একটি অনুপম সৌন্দর্য্য ও মাধুৰ্য পাই। এইভাবে বিষয়ের বিষয়রূপ অপসারিত বিশ্বের সকল বস্তু ও সকল সঞ্চারের ভেতর দিয়ে হয় আনন্দের প্রকাশ। অন্তঃস্বচ্ছতা ও ঔজ্জ্বল্যে এই আনন্দ-বিশ্ব উদ্ভাসিত। আনন্দরূপ বিশ্ব দেয় ব্রহ্মানন্দের সন্ধান- আনন্দত বিশ্বের ধ্যানে ব্ৰহ্মানন্দের , প্রতিষ্ঠা। আনন্দ- সাধনার প্রাপ্তি ব্ৰহ্ম । আনন্দ সাধনার বৈশিষ্ট্য এই যে আনন্দই সাধনা, আনন্দই সাধ্য। বিশ্বদৃশ্যের আনন্দমূৰ্ত্তিকে অবলম্বন করেই আনন্দস্বরূপকে প্রাপ্ত হই। আনন্দ দেয় অমৃত। আনন্দের সঙ্গে সব আনন্দের যােগ আছে । বলেই সকল আনন্দের ভেতর আত্মানন্দকে পাই। আত্মানন্দের ভেতরে সব আনন্দের নির্যাসকে দেখি। আনন্দসংবেদনের দুটি স্তর। একটি বিশ্বের সকল বস্তুর ভেতর দিয়ে আনন্দের অনুভূতি। স্কুলে, সূক্ষ্ম ও কারণ- সত্তায় এই আনন্দ বিদ্যমান। অন্তরের সূক্ষ্ম সংবেদন। বিকশিত হয়, ততই আনন্দের সূক্ষ্মবিকাশ অনুভব
উপনিষদের আলাে
।
করি। দ্বিতীয়টি কম্পন ও স্পন্দন থেকে মুক্ত হয়ে আনন্দের
আনন্দ মাত্র রূপ অনুভূতি। আনন্দ এখানে ঘনীভূত। এই
অনুভূতি শ্রেষ্ঠতম অনুভূতি। আনন্দ এখানে শুধু রস নয়,
রসঘন।
আত্মা, পরমাত্মা, ব্রহ্ম
উপনিষদের তত্ত্বের সুস্পষ্ট ধারণার জন্য ব্ৰহ্ম, আত্মা ও পরমাত্মা
শব্দ তিনটির সঠিক অর্থ জানা আবশ্যক। ব্ৰহ্ম শব্দের অর্থ
বৃহৎ বা ব্যাপক হলেও তাকে প্রজ্ঞার দৃষ্টিতে সকল অবকাশের
আশ্রয়রূপে গ্রহণ করা হয়।
এই জন্য তার স্বরূপের
মানসিক ধারণা হতে পারে না। শ্রুতি বলেছেন, ‘মন যাকে
মনন করতে পারে না। তাকে আশ্রয় রূপেও কল্পনা করা
যায় না, কারণ তিনি সম্বন্ধের অতীত। কাল ও দেশের
অতীত তত্ত্ব।
নিরুপাধিক সন্মাত্রস্বরূপ। তিনি কিছুরই
কারণ নন। দ্বৈতের কোন ভাণ তাতে নাই। সৃষ্টির
উগমও নাই।
ব্ৰহ্ম ভিন্ন যখন আর কোনও তত্ত্ব স্বীকৃত হয় না, এ জন্য বলতে
হয়—এ বিশ্ব তাঁরই প্রকাশ, তিনি এর অন্তরে অন্তর্যামী। এ
কথা না বললে-ব্ৰহ্ম ভিন্ন অন্য কিছু থেকে বিশ্ব রচনা কল্পনা
তাতে ঔপনিষদিক তত্ত্ববােধে বাধা হয়, ব্রহ্মের
বিরাটত্বের ব্যাঘাত হয় ও অপরিচ্ছিন্ন স্বভাবের হানি হয়।
সৃষ্টির দিক দিয়ে তিনি সকল কারণের কারণ, তিনি বিশ্বপ্রাণ,
করতে হয়।
ব্ৰহ্ম কী নাই। বিশ্বপ্রজ্ঞা। তঁার থেকে পৃথক হয়ে বিশ্বের কোন অস্তিত্ব এই ভাবে তাকে পরমাত্মা বা ঈশ্বর বলা হয় । পরমাত্মা বিশ্বের অন্তরে থেকে বিশ্বকে দীপ্ত ও নিয়মিত করেন। তিনি বিশ্বাত্মা, বিশ্বকর্তা, বিশ্বনিয়ন্তা। ব্ৰহ্ম উপাধি গ্রহণ করে পরমাত্মা। উল্লসিত হয়ে দেশ কালে বিশ্বরূপে বিবর্তিত ঈশ্বর বা পরমাত্মা ব্রহ্মের সগুণ মূর্তি। বিরাটের অন্তরে তিনি অন্তর্যামী। মর্ত্যলােকে ও অমৃতলােকে তিনি অধিবাসী। স্কুল, সূক্ষ্ম, কারণ বিশ্ব তার সত্তায় সত্তাবান্। তার আলােয় আলােকিত । বিশ্বের অন্তর হতে শান্ত দীপ- শিখার ন্যায় বিশ্ব প্রকাশিত করেন। হন। পরমাত্মার অবস্থিতি সর্বত্র। আত্মার অবস্থিতি অন্তরে। এ অর্থে আত্মা শব্দ জীবাত্মবাচক । কিন্তু এ অর্থ ভিন্ন আত্মা শব্দকে ব্ৰহ্ম অর্থে ব্যবহার করা হয় । উপনিষদের দৃষ্টিতে ব্ৰহ্ম আত্মা হইতে অভিন্ন। আত্মা যখন ‘সত্যস্য সত্যম্ তখন তার স্বরূপকে ব্ৰহ্মরূপে বুঝতে হবে। শ্রুতিতে এ ব্যবহার সুস্পষ্ট। আত্মা হৃদনিবাস হলেও অন্তর হতে ভিন্ন। অন্তরস্থ হয়েও তিনি অন্তরের দ্বারা পরিচ্ছিন্ন হন না। তার সার্বভৌমিক স্বরূপ কখনও • লুপ্ত হয় না। এই নিরুপাধিক স্বরূপে তিনি ব্রহ্ম হতে অভিন্ন। ব্ৰহ্ম উপাধি দ্বারা আচ্ছন্ন হয়ে পরমাত্মারূপে, আত্মারূপে প্রতিভাত হন। বস্তুতঃ পরমাত্মা ও আত্মা স্বরূপে ব্ৰহ্ম । ০ উপনিষদের আলাে আত্মার একত্ব যাজ্ঞব্য মৈত্রেয়ী সংবাদে আত্মার একত্ব প্রতিপন্ন করা হয়েছে। একই আত্মবস্তু সকল পদার্থে অনুগত। আত্মভিন্ন হয়ে কারুরই স্বাধীন সত্তা নেই বলে আত্মসত্তা সর্বত্রই অখণ্ডরূপে প্রতিভাত। যেমন শঙ্খধ্বনিকে শঙ্খ বাদ দিয়ে গ্রহণ করা যায় না, যেমন বীণার ঝঙ্কারকে বীণা বাদ দিয়ে গ্রহণ যায় না, তেমনি এই বিশ্বের বিকাশকে— যাবতীয় বস্তুসমূহকে—আত্মসত্তা থেকে ভিন্নরূপে গ্রহণ করা যায় না। কারণ তারা সবই আত্মসত্তার প্রকাশ। ভিন্নরূপে প্রতীয়মান হলেও তারা আত্মা বা ব্রহ্মের সঙ্গে অভিন্ন। যেমন অগ্নি হতে বহির্গত তেজ, ধূম, শিখা, অগ্নিরই রূপ, তেমনি এই বিশ্ব, তার অনন্ত সম্ভার, । নামরূপ ক্রিয়া) ব্রহ্মেরই রূপ। এই বিশ্ব শ্বাসপ্রশ্বাসের মত স্বতঃই ব্ৰহ্মসত্তা থেকে উদ্ভূত হয়ে তাতেই প্রকাশিত হচ্চে । এক প্রশান্ত স্থিতি থেকে লীলায়িত ঢেউএর মত নামরূপ ক্রিয়াত্মক জগত উৎপন্ন হচ্ছে। ব্রহ্মের বিবৰ্ত্ত এই জগত। এই বিশ্ববৈচিত্র্য ব্ৰহ্ম থেকে অভিন্ন। কি সৃষ্টিতে, কি স্থিতিতে, কি সংহারে কোন কালেই এই বৈচিত্র্য ব্ৰহ্ম থেকে ভিন্ন নয়। আত্মা স্বত স্থিত, স্বতস্ফূর্ত। ভূমা-বিদ্যা নারদ সনৎকুমার সংবাদ ছান্দোগ্য উপনিষদে গভীর রহস্য পূর্ণ। নারদ নানা বিদ্যায় বিভূষিত থেকেও তৃপ্তি লাভ করতে
ব্ৰহ্ম কী
শুনেছি শুধু
পারেন নি। তিনি ঋষি সনৎকুমারের কাছে গিয়ে বলেছিলেন
“ভগবন, আমি মন্ত্রবিৎ, আত্মবিৎ নই।
আত্মবিদেরাই শােক থেকে মুক্ত। আমি শােকমগ্ন, আমাকে
শােক থেকে মুক্ত করুন।” সনৎকুমার উত্তর করলে “ভূমাই
সুখ, অল্পে সুখ নাই।”
সনৎকুমার দুটী শব্দ ব্যবহার করেছেন : ভূমা ও অল্প।
ইন্দ্রিয় গ্রাম যে সব বিষয় উপস্থিত করে, তাকেই অল্প বলা
হয়। আমরা দেখি, শুনি ; কোন বিষয় বিশেষক নিয়ে
আমাদের জ্ঞান, সমগ্র সত্তাকে নিয়ে নয়। এ জ্ঞান অল্পেরই
জ্ঞান। ভূমা জ্ঞান অসীমেরই জ্ঞান। অল্পের জ্ঞান অশোক
হবার কোন সন্ধান দেয় না। এইজন্যে তিনি নারদকে
অসাধারণ জ্ঞানের কথা বলেছিলেন। কিন্তু সহসা বলেন
নি। বুদ্ধিকে ক্রমশঃ সূক্ষ্ম থেকে, সূক্ষ্মতর তত্ত্বে উপনীত
করে’ শেষে তত্ত্বের অবতারণা করেছিলেন। যা সৰ্ব্ব
উপাধিশূন্য, নিৰ্বিশেষ, তাই ভূমা। ভূমা শব্দের অর্থ বিরাট,
অপরিচ্ছিন্ন। সনৎকুমারের ভাষায় এ ভূমার জ্ঞান এমনি
যে, এখানে অন্য কিছু দেখা যায় না, অন্য কিছু শােনা
যায় না, অন্য কিছু জানা যায় না। যেখানে অন্যকে দেখা
যায়, শশানা যায়, জানা যায়, তাই অল্প। যা ভূমা, তাই
অমৃত; যা অল্প, তাই মর্ত্য। নারদ প্রশ্ন করলেন “ভগবন,
এ ভূমা কিসে প্রতিষ্ঠিত ?”
সনকুমার উত্তর দিলেন,
“মহিমায়।” সম্বন্ধশূন্য হয়ে, অতিমানস অনুভূতিতে এ
মহিমা পরিস্ফুট। এ জ্ঞানের ভেতর কোন সম্বন্ধ নেই বলেই
উপনিষদের আলাে
এই ভূমাকে অন্তরে, বাহিরে, চতুর্দিকে, উর্ধে, অধে কল্পনা
করা হয়েছে। পরাজ্ঞান বিশ্ববােধকেও অতিক্রম করে।
থাকে শুধু বােধিসত্তা। এখানে আত্মক্রীড়া, আত্মমিথুন,
আত্মানন্দ অবস্থার প্রপ্তি।
ভূমার অনুভূতির দুটি স্তর। অন্তরে বাহিরে এক অখণ্ড
প্রকাশে এর পরিচিতি। বিশ্বময় অবকাশে এর পরম শূর্তি।
সেই অবকাশ ও স্ফুর্তির লয় যেখানে-সেখানে ভূমার স্বরূপ
প্রতিষ্ঠা।
জ্ঞানীর আত্মাতেই গভীর রতি। জ্ঞানী বিষয়ের আবরণমুক্ত
হয়ে বিচরণ করে। সকল আকাঙ্ক্ষা, সকল স্পৃহা, চঞ্চল
আকর্ষণ হতে মুক্ত হয়ে আত্মরাজ্য প্রাপ্ত হয়। জীবত্বের
ক্ষুদ্রতা ও অল্পতা, ঈশ্বরত্বের বিরাটত্ব ও অপ্রতিহত শক্তির
অধিকার থেকে জ্ঞানী মুক্তাত্মার অনুপম স্বাধীনতার আনন্দে
তৃপ্ত হয়। দ্বিতীয় কিছুই থাকে না–থাকে শুধু উদার অসীম
প্রশান্তি, সকল উপাধির বন্ধন মুক্তি, দুঃখ থেকে মুক্তি,
বিশ্ববিজ্ঞান থেকে মুক্তি। এ মুক্তি আনন্দ স্বরূপ, শূন্য নয়।
আনন্দ, কেন না পূর্ণসত্তার স্বরূপ বিকাশ এখানে। সকল
উপাধির লয়ে আত্মস্বারাজ্যের প্রতিষ্ঠা।
উপনিষদ ব্ৰহ্মকে নানা দিক থেকে দেখেছে, তার কিছু পরিচয়
পাওয়া গেল। এবার দেখব সৃষ্টির ভেতর তিনি কি ভাবে
অবতরণ করেন, কি সম্বন্ধ তঁার দেশ ও কালের সঙ্গে।
ব্ৰহ্ম কী
দেশ, কাল ও ব্রহ্ম
বৃহদারণ্যক উপনিষদে গার্গী ও যাজ্ঞবল্ক্যর কথােপকথনে দেশ,
কাল ও ব্রহ্ম সম্বন্ধে চমৎকার কথা পাই। সহজ হবে বলে
নীচে সেই কথােপকথনের কিছুটা তুলে দিলুম।
গার্গী—এই পৃথিবীর ও অন্তরীক্ষ লােকের মধ্য, উদ্ধ ও
অধঃ দেশ কার দ্বারা ব্যাপ্ত।
যাজ্ঞবল্ক্য—আকাশের দ্বারা।
গার্গীভূত, ভবিষ্যৎ ও বর্তমান কার দ্বারা ব্যাপ্ত ?
যাজ্ঞবল্ক্য—কালের দ্বারা।
। কাল আবার আকাশের দ্বারা
ব্যাপ্ত।
গার্গী-আকাশ কার দ্বারা ব্যাপ্ত ?
যাজ্ঞবল্ক্য—অক্ষয়, অবিনাশী ব্রহ্মের দ্বারা, যিনি স্কুল নন,
সূক্ষ্ম নন, অজর অমৃত।
যাজ্ঞবল্ক্য এখানে একটি গভীর প্রশ্নের অবতারণা করেছেন
—দেশ ও ব্ৰহ্ম নিয়ে। সঙ্গে সঙ্গে কালের কথাও এসে
গেছে। দেশে হয় সব বস্তুরই অবস্থিতি। কালে হয় ঘটনার
পারম্পর্য। এ থেকে বােঝা যায় যে স্থিতি আকাশকে
অবলম্বন করে এবং গতি কালকে অবলম্বন করে। কাল
যেখানে নেই সেখানে গতিকে বুঝিনে।' একথা স্পষ্ট।
কিন্তু উপনিষদে আকাশকে যত বড় করে দেখা হয়েছে,
কালকে তত বড় করে নয়। যাকে অবলম্বন করে সব বস্তুর
পরিস্থিতি হয়, তার ভেতর স্থিতিরূপ যতটা পরিস্ফুট অন্যত্র
উপনিষদের আলাে ততটা নয়। এই আকাশই ব্ৰহ্মবােধের রূপ। গতি ও স্থিতির ভেতর কোনটা প্রাথমিক তা নিয়ে অনেক তর্ক থাকলেও সাধারণভাবে বুঝি স্থিতিকে অবলম্বন করেই গতি থাকে। আকাশ তাই পরম স্থিতি নয়—অনন্ত আকাশ যাতে অবস্থিত, তাই ব্ৰহ্ম। এই তত্ত্ব ফুটে উঠেছে যাজ্ঞবল্ক্যর কথায়। পরমকারণসত্তা ছান্দোগ্য উপনিষদে একটি আখ্যায়িকা আছে। ঋষি আরুণি তার পুত্র শ্বেতকেতু গুরুগৃহ থেকে ফিরে এলে তাকে প্রশ্ন করুলেন “যাকে জানলে সব জানা যায় তাকে কি জেনেছো ?” পুত্র উত্তর দিলেন, “না।” তখন অরুণি পুত্রকে উপদেশ • দিলেন কাৰ্য কারণ তত্ত্বনিয়ে। কাৰ্য্য কারণের বিকার, কারণ ভিন্ন নয়। কাৰ্য- গুলির আকার ভিন্নপ্রকারের বলেই কাৰ্য্যকে কারণাপেক্ষা ভিন্ন বলেই মনে হয়, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে কারণ হতে কার্যের সত্তা পৃথক নয়। ঘট কাৰ্য, মৃত্তিকা কারণ। দেখতে দুইই ভিন্ন, কিন্তু স্বরূপে ঘট ও মৃত্তিকা আকারভেদ মাত্র। বিকার সত্য নয়, সত্য হ’ল কারণ। স্বর্ণ কারণ ; বলয়, মুকুট, বিকার মাত্র। কাৰ্যকারণের এই দৃষ্টি অবলম্বন করে অরুণি বল্লেন, এই বিশ্ব কাৰ্য, ব্ৰহ্ম কারণ। জগত ব্রহ্মেরই রূপ। কাৰ্যরূপে ৪০
ব্ৰহ্ম কী
এর নাম, রূপ, ক্রিয়া আছে। কারণ রূপে এই ব্ৰহ্ম। নাম,
রূপ, ক্রিয়া বিকার মাত্র। সৃষ্টি কারণের কাৰ্যনুপ্রবেশ।
সৃষ্টির ব্ৰহ্ম ভিন্ন কোন কারণ নেই বলে তাকে অদ্বিতীয়
বলা হয়েছে।
সাধারণতঃ কারণ বলতে দুটী কারণ বুঝি, উপাদান
কারণ ও নিমিত্ত কারণ। ঘটের উপাদান কারণ মৃত্তিকা,
নিমিত্ত কারণ কুম্ভকার। উপাদানকে বিবিধ ভাবে সন্নিবেশিত
করে নানা রূপ দেয় কুম্ভকার।
জগতসৃষ্টিতে উপনিষদ
কখনও দুই পদার্থ স্বীকার করে না। ব্রহ্ম ভিন্ন জগতের
কোন কারণ নেই। ব্ৰহ্মই উপাদান কারণ, ব্রহ্মই নিমিত্ত
কারণ। জগত ব্রহ্মেরই বিবর্ত। তিনি জগত সৃষ্টি করেন,
অথচ সৃষ্টিতে তার স্বরূপের কোন পরিণতি হয় না। সৃষ্টিতে
তিনি বহুরূপে প্রকাশিত হলেও তার স্বরূপের বিচ্যুতি হয় না।
তিনি সৃষ্টির পূর্বেও যেমন থাকেন, সৃষ্টির পরেও তেমনি
থাকেন। তার স্বরূপে কোন পরিবর্তন নেই। স্বরূপ:
এক ও অভিন্ন হয়েও তিনি সৃষ্টিতে বহুরূপে প্রকাশিত।
গার্গী-যাজ্ঞবল্ক্য সংবাদে একথা আরও স্পষ্ট হয়েছে। গার্গী
ব্রহ্মজিজ্ঞাসু হয়ে জনকের সভায় উপস্থিত হন। সেখানে তিনি
কাৰ্য কারণ সূত্রকে অবলম্বন করে স্কুল হতে সূক্ষ্ম সত্তার
অবতারণা করেন। কারণ সত্তা কাৰ্য্য সত্তা থেকে ব্যাপক
ও সূক্ষ্ম । এটা প্রত্যক্ষ। ঘট কাৰ্য, মৃত্তিকা কারণ, ঘট
থেকে মৃত্তিকার সত্তা ব্যাপক। পৃথিবীর কারণ জল, জলের
কারণ অগ্নি, অগ্নির কারণ বায়ু, বায়ুর কারণ অন্তরীক্ষ।
৪১
উপনিষদের আলাে ভাবে স্কুল থেকে সূক্ষ্মর দিকে অগ্রসর হই কারণ-সত্তার অন্বেষণে। যাজ্ঞবল্ক্য অন্তরীক্ষ লােকেরও সূক্ষ্মতর আশ্রয়ের কথা বলতে লাগলেন। অন্তরীক্ষ লােক গন্ধৰ্ব্ব লােকের দ্বারা, গন্ধৰ্ব্বলােক আদিত্য লােকের দ্বারা, আদিত্য লােক নক্ষত্রলােকের দ্বারা, নক্ষত্রলােক দেবলােকের দ্বারা, দেবলােক ইন্দ্রলােকের দ্বারা, ইন্দ্রলােক প্রজাপতিলােক দ্বারা ব্যাপ্ত। এই প্রজাপতিলােক পরিব্যাপ্ত সূক্ষ্মতর ব্রহ্মলােকের দ্বারা। ব্ৰহ্মলােকই পরম সূক্ষ্ম । গার্গী জিজ্ঞাসা করলেন, এই ব্ৰহ্মলোেক কোথায় অবস্থিত ? যাজ্ঞবল্ক্য এ প্রশ্নের গভীরতা উপলব্ধি করে গার্গীকে আর প্রশ্ন করিতে নিষেধ করলেন কারণ ব্ৰহ্ম কাৰ্য-কারণ শৃঙ্খলার অতীত। কথা উঠতে পারে তিনি পূর্ণ হয়েও কি করে, বিশ্ব সৃষ্টি করেন ? এক হয়েও কিরূপে বহুরূপে প্রকাশিত হন? শ্রুতি বলেন- ব্রহ্মের একটি শক্তি আছে, ‘মায়া”। মায়াকে তাবলম্বন করে তিনি এক হয়েও বহুরূপী হন। “ইন্দ্র মায়া দ্বারা বহুরূপ গ্রহণ করেন।” মায়া মায়া ব্রহ্মের সৃজন শক্তি। তিনি এ শক্তিকে অবলম্বন করেই বিশ্ব সৃষ্টি করেন। যে শক্তির দ্বারা অসীম থেকে সীমার উৎপত্তি, ' সেই শক্তিই মায়া। সৃষ্টি অসীমের সীমায় প্রকাশ, দেশ কাল রহিত বস্তুর দেশ কালের ভেতর বিকাশ।
ব্ৰহ্ম কী
এ শক্তিকে অবলম্বন করে তিনি পরম কারণ, কারণের কারণ।
শক্তি তারই চেতনায় বিধৃত হয়ে সৃজন করে। এই জন্যে
সৃষ্টিতে আছে আনন্দের উন্মেষ। সৃষ্টিতে আনন্দের কোন
স্বরূপচ্যুতি হয় না। অথচ তার স্মৃৰ্ত্তি হয় অনন্তরূপে। সৃষ্টি
তারই সঞ্চার। যে শক্তি এই একরূপ তত্ত্বকে বহুরূপে দেখায়
সে বিস্ময়ের বস্তু, সে শক্তি কৌতুকময়ী। সৃষ্টি ব্ৰহ্মশক্তির
কৌতুকক্রীড়া। আনন্দের সঞ্চার ভিন্ন, অন্তর উন্মেষ ভিন্ন
এর কোন কারণ নেই— থাকতে পারে না। পূর্ণের বিশ্বরূপে
প্রকাশ, তার খেলা বা লীলা। লীলার কৌতুকময়ী শক্তিই
মায়া। এর স্বরূপ রহস্য পূর্ণ । পূর্ণকে, অখণ্ডকে কেমন করে
খণ্ডরূপে দেখায়, বুদ্ধির কাছে তা বিস্ময়কর। মায়ার কিন্তু
কাৰ্য এই। এ রহস্য চিরকাল বিস্ময়াবৃত।
ব্ৰহ্ম নিজ স্বরূপে পূর্ণ হলেও তার ভেতর বিশ্ব বিকাশের সঞ্চার
আছে। এই সঞ্চারের দ্বারা তিনি কোন কিছু অবলম্বন না
করেই জগৎ সৃষ্টি করেন। একদিকে তিনি যেমন শান্ত, অপর
দিকে তিনি তেমনি সকল ক্রিয়া ও শক্তির আশ্রয়। উদার
অবস্থিতির ভেতর গতির স্ফুর্তি। ঘনীভূত সত্তার ভেতর অনন্ত
মূর্ত প্রকাশ। ব্ৰহ্ম শক্তির অতীত হয়েও শক্তির আশ্রয় ।
মায়া এই শক্তি। মায়াকে তাবলম্বন করে তার বিশ্ব-বিভূতির
বিকাশ – জ্ঞানে, রসে, শক্তিতে।
৪৩
উপনিষদের আলাে
সংবর্গ বিদ্যা
ব্ৰহ্মশক্তি যে জগতের মূল থেকে সৃষ্টি, স্থিতি ও সংহার
করেছেন, তা সংবর্গ বিদ্যায় সুস্পষ্ট হয়েছে । এ বিদ্যার বিষয়
ছান্দোগ্যোপনিষদে আছে। এই বিদ্যা বিশ্বকে দুই ভাগে
বিভাগ করেছে—অন্তবিশ্ব ও বহির্বিশ্ব।
এ দুই বিশ্বই
ক্রিয়াশীল। অন্তঃশক্তি প্রাণ’, বহিঃ শক্তি বায়ু। অগ্নি যখন
নির্বাপিত হয়, তা লীন হয় বায়ুতে। সূর্য যখন অস্তমিত
হয়, তাও বায়ুতে হয় লীন। এ হল শক্তির অধিদৈব ভাব।
যখন পুরুর নিদ্রিত হয়, তখন বাকশক্তি, ইন্দ্রিয়শক্তি, চক্ষু,
শ্রোত্র, মন--সকলই প্রাণে প্রবেশ করে। অন্তর্জগতে যা
প্রাণ, বহির্বিশ্বে তাই বায়ু । প্রাণ ও বায়ু একই শক্তির দুই
বিকাশ ।
এর থেকে বােঝা যায় যে শক্তি বিশ্বের বিধৃতি ।
প্রাণ ও বায়ু শক্তির রূপ বিশেষ। এই শক্তি ‘মায়া'।
এই শক্তি সকল বিশ্বে বিরাজ করে। সেই প্রাণ, সেই বায়ু,
সেই বিশ্বাধার। ব্ৰহ্মতে ওতপ্রােতভাবে সে বিদ্যমান। বিশ্ব
এই শক্তির পরিণতি। এই শক্তিকে সংবর্গবিদ্যায় প্রাণ ও
বায়ু বলা হয়েছে। মায়া ছাড়া জগতে কিছুর কোন ক্রিয়া
হয় না। মায়া বিশ্ব শক্তি।
অন্তর্যামী বিদ্যা
ব্ৰহ্ম অন্তর্যামী পুরুষ, তার বিশ্বরূপ আছে। তিনি অন্তরের
অন্তর্যামী–বিশ্বের ও অন্তর্যামী। ইনি যখন তারে থেকে
৪৪
ব্ৰহ্ম কী নিয়মন করেন তখনই তখনই হয় ইহার অধ্যাত্মরূপ। শ্রুতি বলেছেন- “যিনি প্রাণে থেকে প্রাণের অভ্যন্তরে বর্তমান, প্রাণ যাকে জানতে পারে না, প্রাণ যার শরীর, তিনি অন্তর্যামী, অমর আত্মা।” “যিনি বাক্যে থেকে বাক্যের অভ্যন্তরে রয়েছেন, যাকে বাক্য জানতে পারে না, বাক্য যাঁর শরীর, তিনি অন্তর্যামী, অমর আত্মা।” “যিনি চক্ষুতে থেকে চক্ষুর অভ্যন্তরে রয়েছেন, চক্ষু, যাকে জানতে পারে না, চক্ষু যার শরীর—তিনি চক্ষুর আন্তর্যামী, অমর আত্মা।” “যিনি কর্ণে থেকে কর্ণের অভ্যন্তরে রয়েছেন, কর্ণ যাকে জাতে পারে না, কর্ণ যার শরীর—তিনি কর্ণের অন্তর্যামী, অমর আত্মা।” “যিনি মনে, বুদ্ধিতে ও বীৰ্যতে থেকে, মন, বুদ্ধি ও বীর্যের অভ্যন্তরে রয়েছেন, যাকে মন, বুদ্ধি ও বীৰ্য্য যাকে জানতে পারে না, মন বুদ্ধি ও বীৰ্য্য যার শরীর--তিনি অন্তর্যামী, অমর আত্মা।” ৪৫
উপনিষদের আলাে
“যিনি স্পর্শেন্দ্রিয়ে থেকে স্পর্শেন্দ্রিয়ের অভ্যন্তরে রয়েছেন,
যাকে স্পর্শেন্দ্রিয় জানতে পারে না, স্পর্শেন্দ্রিয় যার শরীর,
তিনি স্পর্শেন্দ্রিয়ের অন্তর্যামী, অমর আত্মা।”
তার অধিভূত রূপের প্রকাশ হয়, ভূত পদার্থের সংস্পর্শে।
যিনি শব্দ-স্পর্শ- রূপাদির অভ্যন্তরে আছেন, অথচ শব্দস্পশাদি
ভূত সকল যাকে জানতে পারে না, ভূত সকল যার শরীর
তিনি ভূতসকলের অন্তর্যামী, অমর আত্মা।
তার আধিদৈবিক রূপের কথা এখন বলা হচ্ছে। তিনি
পৃথিবী, জল, অগ্নি, অন্তরীক্ষ, বায়ু, দ্যুলােকে, সূর্য, চন্দমা,
তারকা, আকাশ, আলােক, অন্ধকারে থাকাতেও তারা তাকে
জাতে পারে না। এরা তার শরীর, তিনি এদের অন্তর্যামী,
অমর আত্মা।
একই আত্মা অন্তর্যামী রূপে ব্যষ্টিতে ও সমষ্টিতে আছে।
তিনি আমাদের অন্তরে অন্তর্যামী, বিশ্বের অন্তরে অন্তর্যামী।
সূক্ষ্ম ও দিব্যতে তিনি অন্তর্যামী, ব্যষ্টির অন্তর্যামী, সমষ্টির
অন্তর্যামী।
চিত্ত প্রদীপ্ত হলে আমরা এই অন্তর্যামী পুরুষকে অনুভব
করতে পারি। প্রথমে অন্তঃসত্তায় তাকে উপলব্ধি করি ।
অবশেষে স্কুল
সূক্ষ্ম বিশ্বে তঁাকে অনুভব করি। সংবর্গ
বিদ্যা ও অন্তর্যামী বিদ্যা ব্রহ্মের বিশ্বরূপের সঙ্গে আমাদের
ও
৪৬
ব্ৰহ্ম কী
পরিচয় করিয়ে দেয় (cosmic divine )। কিন্তু এতেই
তার স্বরূপের শেষ হয় না। তার নিজের স্বরূপে তিনি
fototo ( transcendent divine ) i
মধু বিদ্যা
বৃহদারণ্যকোপনিষদে মধুবিদ্যার কথা বলা হয়েছে।
বিশ্বের সব পদার্থের আনন রূপ আছে। সকলের ভেতরই
ব্রহ্মানন্দের ফুৰ্ত্তি হয়।
এই আনন্দ থাকে ওতপ্রােত
ভাবে। মধুবিদ্যায় বিশ্বের একটি আনন্দরূপের ছবি দেওয়া
}
হয়েছে।
এ শুধু আনন্দের আনন্দমাত্র অনুভূতি নয়, আনন্দের
আনন্দে বিশ্বে উদ্বেলিত। সকলে আনন্দ,
সকলেই অন্যের ভেতর আনন্দ আস্বাদ করে ।
প্রত্যেক
উৎসব।#
হয় প্রত্যেকের আনন্দ।
* “পৃথিবী মধু, ভূত সকল পৃথিবীর মধু। অপ ধু, ভৃত সকল মধু।
অপ ভূত সকলের মধু, ভূত সকল অপের মধু। অগ্নি মধু, ভূত সকল মধু,
অগ্নি সকল ভূতের মধু, ভৃত সকল অগ্নির মধু। বায়ু মধু, ভূত সকল শুধু ;
বায়ু সকল ভূতের মধু, ভূত সকল বায়ুর মধূ। আদিত্য মধু, ভূত সকল
মধু ; আদিত্য সকল ভূতের মধু, ভূত সকল আদিত্যের মধু । দিক মধু,
ভূত সকল মধু ; দিক সকল ভূতের মধু ; ভূত সকল দিকের মধু। চন্দ্র
মধু, ভূত সকল মধু; চন্দ্র ভৃত সকলের মধু, ভূত সকল চন্দ্রের মধু।
বিদ্যুত মধু, ভূত সকল মধু ; বিদ্যুত ভূত সকলের মধু ; ভূত সকল
৪৭
উপনিষদের আলাে
এ বিশ্বময় আনন্দবােধ ব্ৰহ্মজ্ঞানের ভূমিকা। ব্ৰহ্মানন্দের
বিশ্বাতীত স্বরূপের অনুভূতির পূর্বে এরূপ অবস্থা সাধক লাভ
করে থাকেন। এখানেও অধ্যাত্ম, আধিদেব, অধিভূত বিশ্বের
অনুভূতি হয়। উপনিষদের দৃষ্টি খুলে গেলে এই আনন্দকেই
আমরা সৰ্বত্ৰ অনুভব করি, কি অন্তর সত্তা, কি বিশ্বসত্তা, কি
বিশ্বাতীত সত্তায়। মধুবিদ্যা আনন্দ ছন্দে পূর্ণ। এই ছন্দে
চিত্ত বিশ্বময় আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে উঠে। বিশ্বময় আনন্দ
মূর্তির প্রতিষ্ঠা হয়। আনন্দ উদ্ভাসিত সৃষ্টির সব স্তরে ও
ছন্দে। মধুবিদ্যা এই উদ্বেল আনন্দের রূপ সঞ্চার করে।
এই বিদ্যায় প্রতিপন্ন হয়েছে যে প্রত্যেক পদার্থের অন্তরে এক
তেজোময় পুরুষ আছেন, যিনি অমৃতময়।
তিনি অন্তরে
আছেন বলে সকলে তেজোময় ও আনন্দময় । পৃথিবীতে
তিনি অন্তর্নিহিত আছেন বলেই পৃথিবী আনন্দময়, শরীর
তেজোময়, আনন্দময়। অপে তিনি বর্তমান, তাই অপ
অমৃতময়। রেতে তিনি বর্তমান বলেই রেত তেজোময়,
অমৃতময়। বায়ুতে তিনি আছেন তাই বায়ু তেজোময় ও
অমৃতময়।
প্রাণে তিনি আছেন বলেই প্রাণ অমৃতময়।
বিদ্যুতের মধু। মেঘ মধু, খৃত সকল মধু ; মেঘ সকল ভূতের মধু, ভূত
সকল মেঘের মধু। আকাশ মধু, ভূত সকল মধু; আকাশ সকল ভূতের
মধু, ভূত সকল আকাশের মধু। ধৰ্ম্ম মধু, ভূত সকল মধু; ধৰ্ম্ম সকল
ভূতের মধু, ভৃত সকল ধর্মের মধু ; সত্য মধু, খৃত সকল মধু; সত্য ভূত
সকলের মধু, ভৃত সকল সত্যের মধু । মানুষ মধু, ভূত সকল মধু ;
মানুষ ভূত সকলের মধু, ভূত সকল মানুষের মধু । আত্মা মধু, ভৃত সকল
মধু, আত্মা সকল ভূতের মধু ; ভূত সকল আত্মার মধু।”
}
৪৮
ব্রহ্ম কী আদিত্যে,দিকে, চন্দ্রে, বিদ্যুতে, মেঘে, আকাশে—তিনি আছেন বলেই তারা তেজোময়, অমৃতময়; তেমনি চক্ষু, কর্ণ, মন, ব, শব্দ, হৃদয়ে আছেন বলেই তারা দীপ্তিময় ও অমৃতময়। পদার্থের (ভূত সকলের) অন্তরে এক দীপ্তি আছে ; প্রত্যেক অধ্যাত্ম শক্তির অন্তরে আছে এক দিব্য চেতনা। চেতনার বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে অন্তরে ও বাইরে এরূপ দিব্য আনন্দের পরিচয়। তৈত্তিরীয়ােপনিষদের ব্রহ্মানন্দ বল্লীর শেষদিকে স্কুল ও সূক্ষ্ম বিশ্বের আনন্দের কথা বলা হয়েছে। আনন্দতত্ত্ব হলেও বিশ্বের সকলেই ব্ৰহ্মানন্দ অনুভব করতে পারে না। সৃষ্টিতে প্রত্যেক পদার্থ আনন্দের মাত্রাকে অবলম্বন করে বাঁচে। স্থল বিশ্বের আনন্দ ব্যষ্টিও সমষ্টিরূপে স্কুলের, অন্তরে উপলব্ধ হয়। সূক্ষ্ম বিশ্বের সূক্ষ্মবিশ্বের অন্তরে ব্যষ্টি ও সমষ্টির আনন্দ উপলব্ধ হয়। স্কুল ও সূক্ষ্ম ভেদে—এ আনন্দের পর্যায় আছে। মানুষের আনন্দ, গন্ধবের, দেবতার, পিতৃগণের, আজানজ দেবগণের, কর্মদেবগণের, ইন্দ্রের, বৃহস্পতির, প্রজাপতির, হিরণ্যগর্ভের আনন্দ সূক্ষ্মরূপের আরােহক্রম। সূক্ষ্ম হতে সূক্ষ্মতর স্তরে আনন্দের সঞ্চরণ অধিকতর। সত্তার স্বচ্ছতা ও নমনীয়তা ও ব্যাপকতার সাথে আনন্দের নিবিড় ০ ১। যারা স্মৃতিবিধান অনুযায়ী কম করে’ দেবত্ব প্রাপ্ত হন। ২। যারা বেদবিধান অনুযায়ী কম করে’ দেবত্ব লাভ করেছেন। ৪৯ উপনিষদের আলাে সম্বন্ধ। চিত্তের স্বচ্ছতায় এরূপ বিশ্বের প্রকাশ। এ কল্পনা নয়—সত্য দৃষ্টি। চিতি পুরুষের ( Psychic Self) দৃষ্টিতে এ আনন্দ বিশ্ব উদ্ভাসিত। প্রত্যেক বস্তুর আনন্দ রূপের এখানে পরিচয়। । বৈশ্বানর বিদ্যা সত্যের বিশ্বমূর্তির কথা আগেই বলেছি। তার বিশ্বরূপের ভাবনা বৈশানর বিদ্যায় আরও পরিষ্কার হয়েছে। এই বিশ্বরূপ এক একটি অবয়বে বদ্ধ নয়। সূৰ্য, চন্দ্র, গ্রহরাশি— সকলই তার রূপ হলেও ব্যষ্টিরূপে এরা তার বিশ্বমূর্তি নয়। সমগ্র বিশ্ব বিরাটের রূপ। এই পুরুষ প্রাণে, বাকে, মনে, বিজ্ঞানে প্রকাশিত, তার সত্তা গ্রহমণ্ডলে ব্যাপ্ত। তিনি সৰ্ব্বভূতস্থ, সময়। এই বৈশ্বানর পুরুষের ভাবনা শুধু বিশ্বেই আবদ্ধ নয়। তার ভাবনা ব্যক্তি বিশেষের ওপােরে হতে পারে। মানুষ তার ইন্দ্রিয় ও শক্তির সঙ্গে আধিদৈবিক শক্তি অভিন্ন দেখে নিজেকে বৈশ্বানর পুরুষ রূপে ভাবনায় লিপ্ত হতে পারে। ভাবনা ব্ৰহ্ম-দৃষ্টির উৎকর্ষ সাধন করে। ব্ৰহ্ম ভাবনায় সিদ্ধি লাভ করতে হলে সৰ্বত্ৰ ব্ৰহ্ম সত্তার অনুভব হওয়া দরকার। এই এই ব্রহ্মানুভূতির জন্যে বুদ্ধির সাধারণ সংকীর্ণতা থেকে মুক্ত হওয়া প্রয়ােজন। এই জন্যে জগতে যেমন ব্ৰহ্মদৃষ্টি স্থাপন করা দরকার, তেমনি দরকার আমাদের সত্তার ব্যাপক দৃষ্টি স্থাপন করা। দু’য়ের ভেতর একটি ঐক্য স্থাপন করাও আবশ্যক। ব্রহ্মবিজ্ঞান পূর্ণরূপে স্ফুর্ত হবার ৰহ্ম কী পূৰ্ব্বে প্রত্যেক পদার্থে অনুসৃত ব্ৰহ্মসত্তার পরিচয় আবশ্যক। এরূপ দৃষ্টি মানস দৃষ্টির অতীত। বিশ্বের অন্তর রূপের পরিচয়। এরূপ দৃষ্টি স্থাপন করতে পারলে স্বাভাবিক সঙ্কীর্ণতা থেকে মানুষ মুক্ত হয়। ব্ৰহ্মদীপ্তিতে অন্তর উজ্জ্বল হয়ে অন্তরে বাহিরে—এক দিব্য জ্ঞান লাভ করে। জ্যোতির্ময় সত্তার সঙ্গে পরিচিত হয়ে, জ্ঞানে পূর্ণ হয়। বিশ্বময় একই সত্তার হয় অনুভূতি—জ্ঞানদীপ্ত, ভাস্বর। হিরণ্যগর্ভ সৃষ্টিতে অনেক স্তর থাকলেও একটা শৃঙ্খলা আছে। শৃঙ্খলা- সূত্র নিয়ে সমষ্টিবােধের বিকাশ। এই সমষ্টিবােধ অব্যক্ত বােধ। কিন্তু সমষ্টিবােধ ব্যষ্টিরূপে প্রকাশিত : ব্যষ্টির বিকাশ সৃষ্টির একটি স্তর। এই বিকাশের প্রথম পুরুষ হিরণ্যগর্ভ। এরই সঙ্গে ব্যষ্টিজীব জগতের (world of personality) সম্বন্ধ। সৃষ্টির অব্যক্ত ও ব্যক্ত রূপ আছে। ব্যক্ত রূপই ব্যষ্টিরূপ। এই ব্যষ্টিজগতের ভেতর আছে জীবজগৎ। জীবজগৎ চেতনাকে কেন্দ্র করেই বিকশিত। হিরণ্যগর্ভের সৃষ্টির সঙ্গে ব্যক্তি, জগতের স্ফুরণ। হিরণ্যগর্ভ মুখ্য জীব, অন্য জীবেরা গৌণ। একই অক্ষর পুরুষ সূক্ষ্ম হিরণ্যগর্ভরূপে ও স্থল বিরাটরূপে সৃজনের সঞ্চারে শান্ত আত্মার ভেতর উদ্বেল অবস্থার
উপনিষদের আলাে
সূচনা। অব্যক্তের ব্যক্তিরূপে প্রকাশিত হবার উপক্রম।
অব্যক্তের প্রথম প্রকাশ হিরণ্যগর্ভ। হিরণ্যগর্ভ সূক্ষ্মরূপে
অভিব্যক্ত ; স্কুলরূপের অভিব্যক্তিকে বিরাট বলা হয়।
হিরণ্যগর্ভ পুরুষের অনুভব সূক্ষ্মরূপেই হয়ে থাকে। উপনিষদে
স্থূল সূক্ষ্ম জগতের কথা প্রায়ই দেখতে পাওয়া যায়। তার
কারণ বিশ্ব বলতেই স্কুলকে যেমন বােঝায়, তেমনি স্কুলের
অন্তরে সূক্ষ্মজগতকে বােঝায়। সূক্ষ্মর প্রকাশই স্থল ; স্কুলে
যা অস্পষ্ট, সূক্ষ্ম তা সুস্পষ্ট। হিরণ্যগর্ভ পুরুষ বাষ্টি হলেও
—সকলের সাথে অভিন্ন, তার জ্ঞান ও সত্তা সূক্ষ্ম অপ্রতিহত।
তার ব্যক্তিত্ব থাকলেও সে ব্যক্তিত্ব সূক্ষ্মজগতে সর্বত্র প্রসারিত।
চেতনার ব্যক্তিরূপ অবলম্বন করে সৃষ্টির অপূৰ্ব্ব প্রকাশ। এই
ব্যষ্টিজগতে জ্ঞানের ও বিজ্ঞানের যে পরিমাণ বিকাশ হবার
সম্ভাবনা অন্য কোথাও তা নেই। সৃষ্টিধারার একদিকে
চেতনার অস্ফুট বিকাশ, আর এক দিকে ফুট বিকাশ। জড়-
জগতে চেতনার অস্ফুট বিকাশ থাকলেও তার উপাদান এমন
নয় যে সেখানে চেতনা মূর্ত হয়ে বিকশিত হতে পারে। আর
উদ্ধচেতনা সবিশেষ রূপে প্রকাশিত হলেও তাতে ব্যষ্টিত্বের
স্ফুরণ হয় না, আকাশের মত সে অপরিচ্ছন্ন। ব্যষ্টিত্বের
ভেতর একটা পরিচ্ছন্ন ভাব।
তা হলেও
উপনিষদের দৃষ্টিতে চেতনা ভিন্ন সত্তা নেই।
সৃষ্টির উধে ও অধস্তরে চেতনার একরূপ প্রকাশ নেই।
উধে চেতনা "অমূর্ত হয়েও ক্রিয়াশীল
ও সর্বব্যাপী।
এখানে ব্যষ্টি সমষ্টি বােধ নেই। অধস্তরে চেতনার অস্ফুট
ব্ৰহ্ম কী প্রকাশ, ব্যক্তিত্বে মূর্ত হয়ে প্রকাশিত হয় না। ব্যক্তিত্বের সঞ্চার মনুষ্য জগতেই হয়, এখানে চেতনায় আমি বােধ সুস্পষ্ট। এই আমিত্বের বােধ ব্যক্তিত্বের মূলে। এই ব্যক্তিত্বের সুষ্ঠু প্রকাশ হিরণ্যগর্ভে। অস্পষ্ট জ্ঞান সেখানে নেই। স্মৃতির সমুজ্জ্বলিত প্রকাশে হিরণ্যগর্ভ পূর্ণ। ব্যক্তি- ত্বের নানা স্তর আছে। জ্ঞানের স্বচ্ছতার তারতম্য নিয়ে স্তর বিভাগ। হিরণ্যগর্ভ প্রথম শরীরী হলেও, তার অন্তর- দীপ্তি ব্যষ্টিজগতের সকলের অপেক্ষা অধিক। হিরণ্যগর্ভ পুরুষ-চেতনার প্রাথমিক ব্যক্তিবােধ। তার সঙ্গে সঙ্গে সকল ব্যষ্টিজীবের সম্বন্ধ আছে, কারণ ইনি হলেন মুখ্য ব্যক্তি। এই সম্বন্ধ প্রত্যক্ষীভূত। কিন্তু ইনি ঈশ্বর নন, ইনিও জীব। সূক্ষ্ম জ্ঞানবিজ্ঞানের ইনি আধার, প্রকাশশীল ও স্বচ্ছ। এর ব্যক্তিত্বে চেতনার ফুটতর প্রকাশ। কারণ ইনি ব্যক্তিচেতনার মূল আশ্রয়। এর বিকাশ হয় সৃষ্টির কোনো কালে, ইনি আদিম পুরুষ নন। আদিমপুরুষের অসৃষ্টব্যক্তিত্ব ( ulcreated personality) আছে। কিন্তু তার ব্যক্তিত্বের অর্থ এই যে তঁার মত আর কেউ নেই। তিনি সবিশেষ বলেই ব্যক্তি-তঁাকে পুরুষােত্তম বলা যায়। স্থূল ও সূক্ষ্ম, দৃষ্ট ও অদৃষ্ট পদার্থ অবস্থান করে। কিন্তু হিরণ্যগর্ভের ব্যক্তিত্ব এ রকম নয়, তার জ্ঞান ও শক্তি গৌণ। জীবের অপেক্ষা অধিক হলেও ঈশ্বরের দৃষ্টিতে তার সীমা আছে। তিনি তাঁর জীবভাবকে অতিক্রম কৰ্ত্তে পারেন । সত্তাতিশয্যে তার উজ্জ্বলতা, স্বচ্ছতা, জ্ঞান, শক্তি, উপনিষদের আলো সাধারণ জীবের চেয়ে অনেক বেশী। যােগযুক্ত, জ্ঞাননিষ্ঠ, কল্যাণরত তিনি। ঈশ্বরের সঙ্গে যুক্ত। তাই ঈশ্বরীয় জ্ঞানধারার সঙ্গে পরিচিত। এই সব কারণে তাকে হিরণ্যগর্ভ বলে—তার অন্তর তেজোময়। সৃষ্টজগতে হিরণ্যগর্ভের স্থান। নিত্য স্ফুরিত জ্ঞান ও কল্যাণে পূর্ণ ঈশ্বর হিরণ্যগর্ভকে অতিক্রম করেন। হিরণ্যগর্ভ সৃষ্ট, ঈশ্বর নিত্য। প্রলয়ে হিরণ্যগর্ভের লয় হয়, কিন্তু ঈশ্বরের লয় হয় না। সুষ্ঠু ব্যক্তিত্বের নিষ্কলঙ্ক বিকাশ হিরণ্যগর্ভে। শব্দ ও ব্রহ্ম উপনিষদে শব্দব্রহ্মের কথা আছে । প্রাচীনকাল থেকে শব্দ ও অর্থের সঙ্গে একটি নিবিড় সম্বন্ধ স্বীকার করা হয়। শব্দ অর্থকে জ্ঞাপন করে। ঘট, পট, মঠ এরা শব্দ ; এদের বিষয় হচ্ছে ঘট-বস্তু, পট-বস্তু, মঠ-বস্তু। কিন্তু প্রাচীন শব্দশাস্ত্রে শব্দের কারণ ও কাৰ্যাবস্থা স্বীকার করা হয়। সৃষ্টবস্তুর একটা সংজ্ঞা আছে। এই সংজ্ঞা শব্দ বা নাম। কিন্তু এ শব্দ সাধারণ শব্দ। এ শব্দ ভিন্নও পরা শব্দ আছে, তা অনাদি, সৃষ্টির প্রারম্ভ থেকেই বিদ্যমান। তাকে কানে শােনা যায় না। এ হ’ল নিঃশব্দের শব্দ (Voiceless Voice )। শব্দ শাস্ত্রের আচার্যের একেই বস্তু বলেছেন। বিশ্বের প্রাথমিক অবস্থা বাত্ময় বিশ্ব। নামরূপ ক্রিয়াই বাস্তব বিশ্ব। বিশ্বসৃষ্টির প্রথম স্পন্দনই শব্দ বা নাদ। নাদে বিন্দুর উৎপত্তি। সাধারণ দৃষ্টিতে রূপ যেমন বস্তু থেকে
ব্রহ্ম কী
পৃথক, যােগজ দৃষ্টিতে কিন্তু বস্তু রূপ থেকে পৃথক নয়।
পদার্থের সূক্ষ্মরূপের বিচার করলে দেখি, শব্দ সমাবেশ ভিন্ন
অর্থ বলে কোন কিছুই নেই। শব্দ-তরঙ্গ সূক্ষ্মরূপ ও সংজ্ঞা
(forin and ilanie) প্রাপ্ত হয় এবং বস্তুর মত অবভাসিত
হয়। বস্তুতঃ শব্দ তরঙ্গ ভিন্ন বস্তুর কোন সত্তা নেই।
শব্দতরঙ্গই সৃষ্টির মূল। বাকের স্কুল বিকাশ অর্থ। বাকের
সূক্ষ্মরূপে শব্দই নিহিত আছে। বাই শব্দ।
বাই শব্দ। বাকের সূক্ষ্ম
সঞ্চার হয় রূপে, রূপের ভাবনায় ও সংজ্ঞায় প্রকাশ। প্রজ্ঞা
বাক্ রূপেই প্রকাশিত হয়। এই বাক্কে অবলম্বন করে
প্রজ্ঞালােকে আরােহণ করতে পারি।
বাক্ ও অর্থের সম্বন্ধ বলা হয়েছে। এই যে সম্বন্ধ এর
সংযােগ হয়েছে সৃষ্টির আদিম অবস্থা থেকে। তাই কেউ
কেউ বলেন এই সংযােগ ঈশ্বরের ইচ্ছাকৃত। ঈশ্বরের
ইচ্ছাকৃত বলার চেয়ে নৈসর্গিক বলাই আরও ভাল ।
ইচ্ছা করলেও এই সম্বন্ধের বিচ্যুতি কখনও হয় না।
ঈশ্বর
স্থল বস্তু এখানে কিছু নেই। যা আছে তা নাম ও রূপ।
তাই বাষ্ময় জগতই জগতের প্রকৃতরূপ। বস্তু রূপ জগতের
পেছনে থাকলেও অপার্থিব—তা সৃষ্টির মূল উৎস। এই
বাষ্ময় বিশ্বে প্রবেশ করতে পারলে সাধারণ বস্তুবােধের
সীমাকে অতিক্রম করি।
শব্দ বিকশিত হবার আগে প্রাণের সঞ্চার হয়। প্রাণই
বিশ্ব প্রকাশের শক্তি। অব্যক্তের ব্যক্তপ্রকাশ প্রাণের
উপনিষদের আলাে
কম্পনে। প্রাণের কম্পন আকাশকে অভিঘাত করে’ শব্দ
তরঙ্গ সৃষ্টি করে। এই জন্যেই প্রত্যেক শব্দের একটা রূপ
আছে। প্রাণকম্পন ও আকাশের ব্যাপ্তির তারতম্য অনুযায়ী
এই রূপের বিকাশ। কোন শব্দে প্রাণের কম্পন হয় গুরু,
কোথাও বা লঘু ! মন্ত্রের উৎপত্তি প্রাণের আকাশের ওপাের
অভিঘাত থেকে। প্রাণের কম্পন ও অভিঘাত যত ধীর
( শব্দ যত সূক্ষ্ম হবে ), আকাশের ওপাের অভিঘাতও তত
শান্ত। এই অভিঘাতের তারতম্যানুসারে মন্ত্রের স্বরূপ
মস্ত্রের দ্বারা মহাপ্রাণে ও সূক্ষ্মাকাশে কম্পনের
সঞ্চার। প্রত্যেক মন্ত্রটি এরূপ শক্তির দ্যোতক। তার
ভেতর এমন শক্তি আছে যে আমাদের চেতনাকে ক্রমশঃ
উর্ধাভিমুখে নিয়ে যায় এবং বৃহত্তর বােধে প্রতিষ্ঠিত করে।
মন্ত্রের কাজ এই। আমাদের স্বাভাবিক চেতনা থাকে বিষয়ে
আকৃষ্ট ও বদ্ধ। অপরিচ্ছন্ন চেতনার স্বাভাবিক বৃত্তি অনুভব
করি নে। এই অনুভব
এই অনুভব বিকাশের জন্যে শব্দ বা মন্ত্রের
প্রয়ােজন। চেতনার অবকাশে প্রতিষ্ঠিত হবার শব্দ একটি
কৌশল মাত্র।
নির্ণয়।
উপনিষদ শব্দ-ব্রহ্মবাদকে এই জন্যই গ্রহণ করেছে। ব্রহ্ম
শব্দরূপে প্রকাশ পান। শব্দ তঁার প্রতীক। এই শব্দ
প্রণব (ওঁ)। অনুভবসিদ্ধ ব্যক্তিরা বলে থাকেন এর
এমন শক্তি আছে যে আমাদের চেতনাকে স্কুল ও সূক্ষ্ম বিষয়
থেকে মুক্ত করে মহা অবকাশের বোধে প্রতিষ্ঠিত করে।
মহাকাশে সব বিশ্ব লীন হয় । থাকে মাত্র অবকাশ, নাদ
1
ব্ৰহ্ম কী
ও চেতনা। আমরা স্থল আকাশ ( Physical Space )
থেকে মুক্ত হয়ে চেতনার অবকাশে (Spiritual Space)
প্রবিষ্ট হই। কঠোপনিষদে বলা হয়েছে এই অবলম্বন শ্রেষ্ঠ,
এই অবলম্বন পর, এই অবলম্বনকে জেনে ব্ৰহ্মলােকে মহিমা
প্রাপ্ত হয়, ব্ৰহ্মভূত হয় ; সগুণ নিগুণ ব্ৰহ্ম প্রাপ্ত হয়।
এই অবকাশের সাক্ষীই আত্মা। শব্দের একটি কেন্দ্রাভিমুখী
আছে। সেই শক্তি বিক্ষিপ্ত চেতনাকে কেন্দ্রে
প্রতিষ্ঠিত করে। এমন
কি
চেতনাকে অন্তঃকরণের
সংকীর্ণ সীমার গণ্ডী থেকে মুক্তি দেয় ও তার স্বাভাবিক
অসীমত্বের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। এ ভাবে শব্দ-ব্রহ্ম
সাধনা ব্ৰহ্মনিষ্ঠা ও স্থিতির কারণ হয়। চেতনা সাধারণতঃ
কাল ও দেশের ভেতর দিয়ে বিশ্ব প্রকাশ করে।
এ কিন্তু
দেশ ও কালের ব্যবধানের অতীত। চেতনার পূর্ণ সাড়া
হলে মনে করি চেতনা অসীম, অন্তকরণ চৈতনার উপাধি
মাত্র।
এই উপাধি থেকে মুক্ত হলে চেতনার স্বরূপ
আপনি প্রকাশ পায়। শব্দ ব্ৰহ্ম-প্রতিষ্ঠা দেয় বলেই তাকে
শব্দ-ব্ৰহ্ম বলা হয়। অবশ্য সব শব্দের এশক্তি নেই। যার
আছে তাকেই শব্দ-ব্ৰহ্ম বলা হয় ।
ব্ৰহ্ম সগুণ ও নিগুণ
আগে যে সব বিষয়ের অবতারণা করেছি তা থেকে ব্রহ্ম-স্বরূপ
সম্বন্ধে একটা ধার হওয়া উচিত। সে ধারণাকে আরও
উপনিষদের আলাে
সুপষ্ট করবার চেষ্টা করব। উপনিষদে মূর্ত ও অমূৰ্ত্ত ব্রহ্মের
কথা বলা হয়েছে।
ব্ৰহ্মকে জগতের সঙ্গে সম্বন্ধ দ্বারা নির্ণয় করা যায় এবং
তাকে সকল সম্বন্ধশূন্য স্বরূপেও জানা যায়। যখন তার শুদ্ধ
স্বরূপের কথা হয় তখন তিনি উপাধিশূন্য, নিগুণ। নিগুণ
বলতে বুঝি তার স্বরূপে তিনি আছেন—আর কিছু নেই।
এমন কি কোন গুণ বা ধৰ্ম্মও না। তিনি স্বরূপে সৎ, চিৎ
এবং আনন্দ—সচ্চিদানন্দই তার স্বরূপ, ধৰ্ম নয়।
বস্তুর দুটোদিক,সত্তা আর ধর্ম। ফুলের গুণ সৌন্দৰ্য্য,
সৌরভ, কোমলতা। কিন্তু এই গুণগুলিই ত’ ফুল নয়—
তার একটা সত্তাও আছে যাতে এই গুণগুলি সন্নিবিষ্ট ।
সাধারণতঃ প্রত্যেক পদার্থেরই এই রকম দুটী দিক।
গুণগুলি পদার্থের বৈশিষ্ট্য। সত্তারূপে একটি ফুলও যা
একটি ফলও তা। ফুলের সত্তাও সত্তা, ফলের সত্তাও সত্তা।
গুণই দেয় সত্তার বৈশিষ্ট্য। জলের শৈত্যগুণ জলকে অগ্নি
থেকে পৃথক করে। কিন্তু সত্তারূপে তাদের কোন ভেদ
নেই। জল-সত্তা সত্তা, অগ্নি-সত্তাও সত্তা।
।
ধৰ্মী-ধৰ্ম্ম সম্বন্ধ নিগুণে থাকে না।
নিগুণ শব্দে
শব্দে গুণের
অভাব বুঝােয়। এই ধৰ্ম্মবিহীন সত্তা ব্রহ্মের আছে।
কেউ কেউ বলেন যে ব্রহ্মে সৎ, চিৎ, আনন্দ ধৰ্ম্মরূপে থাকে।
অবশ্য
৫৮
ব্ৰহ্ম কী এ ভাবকে অবলম্বন করে তারা ব্রহ্মের নিগুণ স্বরূপ মানেন এবং তারা নিগুণ শব্দের অর্থ করেন গুণের আতিশয্য, অভাব নয়। ব্রহ্মে এত দিব্য গুণ আছে যার নির্ণয় হয় না। এমতে ব্রহ্ম সগুণ। উপনিষদ ব্ৰহ্ম সম্পর্কে যেখানেই গুণের কথা বলেছে, সেইখানেই সগুণ ব্রহ্মের কথা। যদি ব্রহ্মের গুণাতিশয্যই নিগুণবােধক হয় তবে নিগুণ কথাটি নিরর্থক কারণ গুণাতিশয্যকে সগুণ শব্দ দ্বারাও বােঝা যেতে পারে মানস জ্ঞানের স্বভাববশে সৎ, চিৎ, আনন্দকে পৃথকভাবে বুঝতে চেষ্টা করি। কিন্তু পদার্থের এই ধৰ্ম্মকল্পনা তার স্বরূপ কল্পনা নয়। সৎই চিৎ, চিৎই আনন্দ। ব্রহ্মের মানস ও অতিমানস ধারণা আছে। মানস ধারণা সৎ, চিৎ আনন্দের বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পায় ; প্রত্যেক গুণটি নিজস্ব স্ফুর্তি আছে। মানস ধারণা গুণকে তত্ত্ব হতে পৃথক করে করে দেখে—সম্পূর্ণ অভিন্নরূপে দেখেনা। পূর্ণ অভিন্নরূপে দেখলে তত্ত্ব ও তত্ত্বগত গুণের কোন ভেদ থাকেনা। গুণে স্মৃৰ্ত্তি আছে। অনন্ত-কল্যাণ গুণাকর রূপে তিনি প্রতীত হন কিন্তু গুণের স্ফুর্তি যেখানে নাই সেখানে সত্তার প্রকাশ। এ অখণ্ড প্রকাশে সক্রিয় গুণের কোন অবভাস হয় না বলে ব্ৰহ্ম নিগুণ। গুণের বৈশিষ্ট্য প্রতিভাত হয় না বলেই ত অতিমানস। বৈশিষ্ট্য মানস প্রত্যক্ষের বিষয়, সামা অতিমানসের বিষয়। ব্রহ্মের সগুণ ধারণা, মানস ধারণা নিগুণ অতুিমানস ধারণা। অতিমানস হলেও ইহা স্বরূপভূ
উপনিষদের আলাে
ধারণা। গুণ সত্তাকে অধিকার করে থাকে ; সত্তা গুণকে
অধিকার করে থাকে না।
উপনিষদে পরম সত্তাকে আনন্দ বলে গ্রহণ করার ভেতর
একটা বিরাট দৃষ্টি আছে। আনন্দকে মনে করি বিষয়
বিষয়ীর সম্বন্ধ থেকে উৎপন্ন। কিন্তু এতে দৃষ্টির প্রসারতা
নেই। সৃষ্টিতে আনন্দকে অনুভব করি, স্থিতিতে আনন্দকে
অনুভব করি।
আনন্দের ধারণা সাধারণত এ দুই স্তরে
নিবদ্ধ। কিন্তু উপনিষদে আনন্দকে বলা হয়েছে তত্ত্ব।
তত্ত্বে আনন্দ না থাকলে, প্রকাশেও আনন্দ থাকে না।
সৃষ্টিতে আনন্দ বহুধা প্রকাশ পায়—নামে, রূপে, ক্রিয়ায়
কিন্তু ব্ৰহ্মে আনন্দের কোন রূপ নেই, সঞ্চরণ নেই। প্রকাশ
ও আনন্দ অভিন্ন। যেখানে প্রকাশ নেই আনন্দও সেখানে
নেই। পূর্ণ প্রকাশই আনন্দস্বরূপ। সত্তা, প্রকাশ ও
আনন্দকে পৃথক করে বুঝি বলেই
বলেই এদের অভিন্নভাব
ধারণা করা
কিন্তু ব্রহ্মের নিরাবরণ
ভেতর প্রকাশ ও আনন্দ অভিন্ন হয়েই থাকে। যারা
ব্রহ্মের এই অপ্রাকৃত স্বরূপের ভেতর গুণভেদ স্বীকার
করেন, তাঁদের মতে ব্রহ্মের তিনটি গুণ (attributes )।
এই স্বীকৃতির মূলে আছে মানসানুভূতি, যা আমাদের
সত্তার, চেতমার ও আনন্দের বৈশিষ্ট্য অনুভব করিয়ে
দেয়। কিন্তু জ্ঞানের যে ভূমিকায় সত্তা আনন্দরূপে ও
চেতনারূপে প্রতিভাত, তার সঙ্গে পরিচয় নেই বলেই এ
কথা বলি।
কঠিন।
ব্ৰহ্ম কী
ব্রহ্মশক্তি ও দেবশক্তি
ব্ৰহ্মই শক্তির আধার। জগতের সকলের শক্তিই ব্ৰহ্মশক্তি।
সূৰ্য, চন্দ্রমা, বরুণ সকল দেবগণের শক্তিও ব্রহ্মশক্তি।
প্রত্যেকের শক্তিকে নিজস্ব কল্পনা করা যে ভুল এ বিষয়ে
উপনিষদে সুন্দর একটি আখ্যায়িকা আছে। দেবাসুর
সংগ্রামে দেবতার জয়ী হয়ে এলে তাদের ভেতর অভিমান
উপস্থিত হয়। তারা মনে করেন তাদের শক্তির দ্বারাই
সংগ্রামে জয় লাভ হয়েছে। তখন এক যক্ষ তাদের কাছে
এসে উপস্থিত হল।
এ যক্ষ কে দেবগণ বুঝতে পারলেন না।
তখন তারা
অগ্নিকে বল্লেন, “জাতবেদ! তুমিই আমাদের মধ্যে তেজস্বী,
তুমি দেখত এ যক্ষ কে ?
যক্ষ তাকে
অগ্নি স্বীকৃত হয়ে যক্ষের কাছে গেলেন ।
জিজ্ঞাসা করলে—“তুমি কে ?”
অগ্নি উত্তর করলেন—“আমি জাতবেদা।”
যক্ষ প্রশ্ন করলে—“কী তােমার শক্তি ?”
অগ্নি উত্তর করলেন—“পৃথিবীতে যা কিছু আছে আমার
শক্তির দ্বারা দহন করতে পারি।”
তখন যক্ষ একগাছি তৃণ অগ্নির সামনে ধরে বল্লে—“এই
তৃণগাছ দগ্ধ করত।”
উপনিষদের আলাে
অগ্নি যথাবিধি শক্তি প্রয়ােগ করলেন, কিন্তু তৃণ দগ্ধ
করতে সক্ষম হলেন না।
অগ্নি তখন দেবগণের কাছে ফিরে গিয়ে বল্লেন, “কে এ
যক্ষ তা জানতে পারলাম না।”
তখন দেবগণ বায়ুকে বল্লেন “তুমি একবার যাও দেখ ত
এ যক্ষটি কে ?”
বায়ু উপস্থিত হলে যক্ষ জিজ্ঞাসা করলে—“তুমি কে ?”
বায়ু জবাব করলে--“আমি বায়ু।”
প্রশ্ন হল—“কী তােমার শক্তি ?”
“আমি সব কিছু উড়িয়ে নিয়ে যেতে পারি।”
তখন একগাছি তৃণ রেখে যক্ষ বললে—“বেশ !
তৃণগাছটিকে উড়িয়ে নিয়ে যাও ত দেখি।”
বায়ু তার যথাযযাগ্য শক্তির ব্যবহার করলেন বটে, কিন্তু
তৃণগাছ বিন্দুমাত্রও স্থানচ্যুত হ’ল না। বায়ু প্রতিহত হয়ে
গিয়ে দেবতাদের বল্লেন যে তিনি যক্ষের বিষয় কিছুই
জানতে পারলেন না।
তখন দেবগণ ইন্দ্রকে বল্লেন, “তুমি যাও, দেখ কে এই যক্ষ।”
ইন্দ্র স্বীকৃতি জানিয়ে, সেখানে উপস্থিত হলে, যক্ষ তিরােহিত
হ’ল-ইন্দ্র তাকে দেখতেই পেলেন না। তিরােহিত হয়ে
সে যক্ষ আকাশমণ্ডলে হৈমবতী বিদ্যারূপে প্রতিষ্ঠিত হলেন।
এই হৈমবতীই ব্ৰহ্ম শক্তি। ইনি ‘মায়া”।
৬২
ভ্রম ক।
সকল শক্তির মূলে এই শক্তি। দেবতাদের আত্মশক্তির
অভিমান দূর করবার জন্যে এ আখ্যায়িকাটির অবতারণা।
বিশ্বশক্তিই মায়া। পাছে কারও মনে হয় তার নিজে শক্তিতে
সে মহীয়ান, এইটেই সংশােধন করে দেয় উপনিষদের সুন্দর
উপনিষদে সর্বত্রই চেষ্টা হয়েছে ক্ষুদ্রকে ত্যাগ করে
বিরাটকে বরণ করার। নিজের শক্তির ওপাের অভিমান
হলে বিরাট দৃষ্টি নষ্ট হয়ে যায়। বিরাটের সংস্পর্শচ্যুতি হলে
কোন শক্তিই থাকে না। শক্তির বিরাট দৃষ্টি বা ব্ৰহ্মদৃষ্টি
আমাদের প্রভূত শক্তিসম্পন্ন করে।
গল্পটি।
জীব ও ব্রহ্ম
উপনিষদে চারিটি বাক্য আছে, যাকে মহাবাক্য বলা হয় ।
মহাবাক্য চরম সত্যকে প্রকাশ করে—বিশেষতঃ জীব-ব্রহ্ম
সম্বন্ধ বিষয়ে। এই চারিটি বাক্য হচ্ছে, “অয়মাত্মা ব্রহ্ম”
প্রজ্ঞানং ব্ৰহ্ম,” “অহং ব্ৰহ্মাস্মি,” “তত্ত্বমসি”।
চারিটি মহাবাক্য।
চারিটি বেদের
শ্রুতিবাক্য পৰ্যালােচনা করে জীব-ব্রহ্ম সম্বন্ধ মীমাংসায়
উপনীত হতে হবে। সাধারণতঃ জীব ও ঈশ্বরের স্বরূপ বর্ণনা
করতে গিয়ে বলা হয় জীব অল্পজ্ঞ, ঈশ্বর সর্বজ্ঞ। জীব
ব্যষ্টিচেতন, ঈশ্বর সমষ্টিচেতন। ঈশ্বর থেকে জগৎ সৃষ্টি
হয়েছে। এই বিশ্ব সৃষ্টির আগে সরূপেই থাকে, সেই সৎ
এক ও অদ্বিতীয়। দ্বিতীয় কোন পদার্থের সৃষ্টিতে প্রয়ােজন
উপনিষদের আলাে
হয় না। উপনিষদে পুনঃ পুনঃ বলা হয়েছে যদিও জীব ঈশ্বর
থেকে পৃথক তবুও আত্মা পরমাত্মার স্বরূপ। মহাবাক্যগুলি
এই সত্যের পরিচয়।
মহাবাক্যগুলির অর্থ পরিষ্কার হওয়া উচিৎ। জীব অল্পজ্ঞ,
তার বেদনা আছে, ক্রিয়া শক্তি আছে, জ্ঞান আছে। এগুলি
তার অহংবােধের ভেতরই প্রকাশ হয়। আমি জ্ঞানী, আমি
কৰ্ত্তা। এই বােধ তার প্রকৃত স্বরূপ। এই “আমি”
বােধকে অবলম্বন করে তার জ্ঞান, ইচ্ছা, ক্রিয়া।
“আমি” কি? এই প্রকৃত প্রশ্ন। এবং এই “আমি”
জ্ঞানের বিভিন্ন অবস্থায় কেমন ভাবে প্রকাশ পায় তাই
হল দ্রষ্টব্য।
জীবত্ব আমাদের ওপাের আরােপিত । অবস্থাবিশেষে থাকে,
অবস্থাবিশেষে থাকে না। এই আরােপিত জীবকে নিয়েই
ঈশ্বরের সঙ্গে সম্বন্ধের কথা উঠতে পারে। কারণ সম্বন্ধ
ব্যক্তিতে। যেখানে ব্যক্তিত্বের লয় সেখানে সম্বন্ধের কথা ওঠে
। সেইজন্যে জীব ও ঈশ্বরের সম্বন্ধের কথা তখনই হয়, যখন
আমরা জীবের ও ঈশ্বরের ব্যক্তিত্বের কথা
মনে করি।
ব্যক্তিত্ব (personality) কথাটি দর্শনের বড়
কথা।
কারণ একে অবলম্বন করে আমাদের ব্যবহার।
তাই জীবের সঙ্গে বিরাট ব্যক্তি ঈশ্বরের সম্বন্ধের কথা।
উপনিষদে এই ব্যক্তিবােধ স্বীকৃত হয়েছে,
স্বীকৃত হয়েছে, স্বপ্নে ও
জাগরণে। অতএব এই দুই অবস্থাকে নিয়ে ঈশ্বরের ও
৬৪
ব্ৰহ্ম কী
ব্যক্তিববাধের কথা আছে। ব্যষ্টি সমষ্টিচেতনাকে
নিয়েই জীব ও ঈশ্বরের ভেদ। এই দুই অবস্থাতেই ব্যষ্টি
ভাবকে অবলম্বন করে জীবের সঙ্গে ঈশ্বরের সম্বন্ধ দেখান
হয়েছে। ঈশ্বরকে কখনও অন্তর্যামী পুরুষ বলা হয়েছে।
থেকে বােঝা যায় ঈশ্বরের অস্তিত্ব আমাদের
অনুসূত। স্বপ্ন-জগতে সূক্ষ্ম বিশ্বে বিচরণ করি।
করি। সমষ্টি-
চেতন এখানে সমষ্টি-স্বপ্নের অধিষ্ঠাত্
পুরুষ। জ্ঞানের
প্রসারতায় সমষ্টিগত চেতনার সকল শক্তি ও ঐশ্বৰ্য্যর সঙ্গে
পরিচিত হই। এই পরিচয় প্রত্যক্ষ পরিচয়। যদিও
উপনিষদে ঈশ্বরােপাসনার কথা অনেক আছে, তার কিন্তু
লক্ষ্য হচ্ছে জীবকে ঈশ্বরের সঙ্গে অভিন্নভাবে প্রতিষ্ঠিত
করা।
অভিন্নভাবে প্রতিষ্ঠা করেই ঈশ্বরের উপাসনা করতে
ভেদ বুদ্ধিকে উপনিষদ স্বীকার করেনি।
জীব ব্ৰহ্ম সম্বন্ধ নিয়ে পরবর্তীকালে উপনিষদকে অবলম্বন
করে’ নানাবিধ মত প্রচারিত হয়েছে।
সম্বন্ধ নির্ণয় তিনটি
ন্যায়ের দ্বারা করা যায়। একটি ভেদ ন্যায়, একটি ভেদাভেদ
স্যায়, একটি অভেদ ন্যায়।
ভেদ ন্যায় সকল বিষয়েই পরস্পর ভেদকে অবলম্বন করে ।
বিষয় বিষয়ীতে ভেদ, গুণ গুণীতে ভেদ, জ্ঞাত জ্ঞেয়তে ভেদ,
নানা ভেদের ধারণা করা হয়। এই মতে জীব ও ব্রহ্মে
নিত্য ভেদ বৰ্ত্তমান। কখনও এই ভেদ নষ্ট হবে না।
জ্ঞানের দৃষ্টিতে তাদের মতে দুটি বস্তু বিভিন্ন এবং পরস্পর
উপনিষদের আলাে
পৃথকভাবেই বিবাজ করে।
এই হল মধ্ব সম্প্রদায়ের
মত।
ভেদাভেদ ন্যায় পদার্থের ভেতর চিরন্তন ভেদকে গ্রহণ
করে না। ভেদ ও অভেদকে সমন্বয়
সমন্বয় দৃষ্টিতে দেখে।
অভেদ ও ভেদ পরস্পর সংবদ্ধ। অভেদের ভেতর ভেদ
থাকে। ভেদ অভেদেরই কোন বিশেষ ভাবকে বা রূপকে
ব্যক্ত করে। ভেদ অভেদের সঙ্গে যুক্ত। যারা ভেদাভেদবাদী
তারা জীবকে ঈশ্বর থেকে অত্যন্ত ভিন্নও বলেন না, অভিন্নও
বলেন না। তাদের মতে ঈশ্বর অঙ্গী, জীব তার অঙ্গ।
ভেদাভেদবাদীর মতে জীব ও ঈশ্বর দুইই সত্য, পৃথকরূপে নয়
অপৃথকরূপে। ব্ৰহ্ম অবয়বী, জীব অবয়ব। এই হল
রামানুজ সম্প্রদায়ের মত।
তা ছাড়াও অভেদ ন্যায় আছে। এই ন্যায় ভেদাভেদের
একত্র অবস্থিতি স্বীকার করে না। অভেদ ও ভেদ পরস্পর
পৃথক। অভেদে কখনও ভেদ থাকতে পারে না। ভেদটা
প্রতিভাস মাত্র, অভেদই সত্য। অভেদবাদীরা এক অখণ্ড
সত্যের মহিমা ঘােষণা করেন। উপনিষদে জীব ও ঈশ্বরের
কথা বলা হলেও পরমতত্ত্বের কথা তখনই বলা হয়েছে যখন
তাদের একত্বের প্রতিপাদন করা হয়েছে।
এই একত্ব
চৈতন্যের একত্ব। জীবতত্ত্ব ও ঈশ্বরতত্ত্ব একই চৈতন্যের উপাধি-
ভেদ মাত্র। এই উপাধিকে বাদ দিলে এক চেতন সত্তাই
থাকে। উপনিষদে জীব ও ঈশ্বরের অভিন্ন ভাবে ভাববার কথা
ব্ৰহ্ম কী আছে। তাদের স্বরূপকে অবলম্বন করেই অভিন্ন ভাবনা হয়। তাদের কোন শক্তিকে অবলম্বন করে নয়। ভাবনার গভীরতায় জীবের ব্যাপক বােধের অনুভূতি তার শক্তির বিকাশ হলেও, স্বরূপের প্রকাশ নয়। তত্ত্বমসি জীব ও ব্রহ্মের আলােচনা আগেই করেছি। দ্বৈত, বিশিষ্টাদ্বৈত, ও অদ্বৈতবাদের দিক দিয়ে এই বাক্যের অর্থ বিভিন্ন। দ্বৈত- বাদ জীব ও ব্রহ্মের ভেদ মানে। (তত্ত্বমসিকে অতত্ত্বমসি বলে ব্যাখ্যা করেন, অর্থাৎ জীব ব্ৰহ্ম হতে ভিন্ন ও ব্রহ্মে আশ্রিত)। বিশিষ্টাদ্বৈতবাদ “তৎ”ও “ম”, ঈশ্বরও জীবের সঙ্গে একটি সম্বন্ধ স্থাপিত করেন; এই মতে জীবের সঙ্গে ঈশ্বরের নিত্য সম্বন্ধ। বিশিষ্টাদ্বৈত মতে তত্ত্বমসি বাক্যের অর্থ, “তুমি তাহার”। অদ্বৈত বাদে অর্থ, “তুমি তাই।” দার্শনিক সিদ্ধান্ত যা হােক না কেন অধ্যাত্ম জীবনে এই বাক্যের একটি গভীর অর্থ আছে। সন্ধন্ধ নির্ণয় করে বিশেষ’ ও ‘অদ্বৈতের সমন্বয় সম্ভব কিনা সেটি দর্শনের বিচাৰ্য। অধ্যাত্ম জীবনের অনুভূতি সম্বন্ধমূলক হতে পারে, কিন্তু সম্বন্ধবােধই অধ্যাত্ম জীবনের সবটা নয়। সম্বন্ধবােধ মানস বুদ্ধি প্রসূত, অধ্যাত্ম জীবনের অনুভূতি মানস বুদ্ধির অতীত। দ্বৈতবাদ, বিশিষ্টাদ্বৈতবাদ, অদ্বৈতবাদকে দার্শনিক মীমাংসা- রূপে সাধারণতঃ গ্রহণ করা হয়। কিন্তু এদের একটা ৬৭ উপনিষদের আলাে অধ্যাত্মানুভূতির দিক আছে। কোন দার্শনিক মীমাংসা শুধু তত্ত্বের বিশ্লেষণে পরিতৃপ্ত হয় না। সে মানব জীবনের গভীরতম অধ্যাত্ম রহস্য সম্বন্ধে কোন সুচিন্তিত ধারণা প্রতিষ্ঠা করতে বাধ্য। নইলে জীবনের পক্ষে সে কার্যকরী হয় না। মানুষের সত্তার গভীরতা থেকে উত্থিত হয় একটা আস্পৃহা বিপুলতর জীবন ও বােধের দিকে। এই আস্পৃহাকে ভারতীয় চিন্তাধারা শ্রদ্ধা করে, কারণ জীবনের মূলে আছে এইরকম একটি অসীমের প্রেরণা। কি দ্বৈতবাদী, কি বিশিষ্টাদ্বৈত- বাদী, কি অদ্বৈতবাদী সকলেই বিরাট ও ভূমার অনুভবকেই অধ্যাত্ম জীবনের পরম সম্পদ বলে মনে করেছেন। কিন্তু এই ভূমাকে আস্বাদন ও অনুভব করবার প্রণালী হচ্ছে বিভিন্ন । । দ্বৈতবাদী বিরাটকে গ্রহণ করলেও জীবাত্মাকে পরমাত্মা থেকে পৃথক করেছে সর্বকালের জন্যে, এমন কি মুক্তির অবস্থাতেও। পরমাত্মা কখনও জীবাত্মার সঙ্গে অভিন্ন হতে পারে না, যদিও জীবাত্মা পরমাত্মাকেই মুক্তিভূমিতে আস্বাদ করে। পরমাত্মার সঙ্গে জীবের ভেদ-কল্পনা করা হয়। প্রত্যেক জীবের একটা জগত আছে। তারই ভাবানুযায়ী পরমাত্মাকে গ্রহণ করে। পরমাত্মানুভূতিজনিত সুখ, কল্যাণের আশ্রয় জীব হলেও জীবত্বের ভেদ চিরকাল থেকে যায় । ও আনন্দের বিশিষ্টাদ্বৈতবাদী এই বিরাট চেতনসত্তা অনুভূতিকে অধ্যাত্ম-জীবনের পরমবস্তু বলে গ্রহণ ৬৮ ;
ব্ৰহ্ম কী করেছে, এবং জীবের সঙ্গে ঈশ্বরের নিকট সম্বন্ধ স্বীকার করেছে। অধ্যাত্মজীবনে জীব বিরাটকে শুধু অনুভব করে না, আস্বাদ করে আপনার প্রিয়রূপে। এই প্রিয়ভাবনাই দেয় আনন্দ ও অধ্যাত্ম জীবনের উৎকর্ষ। নানা রসে জীবনকে করে সমৃদ্ধ। সম্বন্ধবােধ দেয় জ্ঞান, প্রিয়বােধ দেয় আনন্দ। এই প্রিয়বােধেই আত্মীয়তার প্রতিষ্ঠা। আত্মভাব প্রতিষ্ঠিত হলে প্রিয়ভাবের সঞ্চার । পরমাত্মার সঙ্গে আত্মভাব যত দৃঢ় হয়, প্রিয়ভাব বা রতি তত গাঢ় হয়। এই প্রীতি বা রতিই হল অধ্যাত্ম জীবনের স্বরূপ। দ্বৈত ও বিশিষ্টাদ্বৈতবাদে এই মমত্ব ভাব অধ্যাত্ম জীবনের মূলে থাকলেও, ভেদ জ্ঞানকে একেবারে লােপ করে না। দ্বৈতবাদী পরমাত্মার সঙ্গে প্রিয়বােধ প্রতিষ্ঠিত করলেও জীবকে চিরকাল ভিন্ন রূপে গ্রহণ করে। জীবের স্বরূপই সেবক। কিন্তু সেব্য, সেবক ভাবের ভেতরে যে একটা একত্বের সূত্র আছে, যাকে অবলম্বন করে সেব্য, সেবক ভাবের ভেতর রস ও আনন্দ সঞ্চার হয়, সে দিকটা তারা দেখেন না। বিশিষ্টাদ্বৈতবাদীরা এই প্রেমসূত্রকে অবলম্বন করে ঈশ্বরের সঙ্গে একত্ব ভাবনা প্রতিষ্ঠিত করেন। যিনি প্রিয়, তার ভেতর আমাকেই পাই—তিনিও আমার ভেতর তাকেই পান। প্রিয়ের ভাবনা এই দুইকে এক, করে। যেখানে দুইএর ভেতর এই একত্ব বুদ্ধি প্রতিষ্ঠিত না হয় সেখানে প্রিয়ের ভাবনা পরিপূর্ণরূপ নিতে পারে না। অধ্যাত্ম-
উপনিষদের আলাে
জীবন ভেদকে অতিক্রম করেই চলতে চায়, কারণ ভেদ
দূরত্ব সৃষ্টি করে, অথচ অধ্যাত্ম জীবনের মূল হচ্ছে দূরত্বকে
সরিয়ে দেওয়া। এই একত্ব অনুভব স্পৃহাই দিয়েছে অধ্যাত্ম
জীবনের ভিত্তি, তাই পরতত্ত্বকে প্রিয় বলে গ্রহণ করলেই
তার সঙ্গে সাযুজ্যের প্রতিষ্ঠা হয়। সাযুজ্য শুধু সম্বন্ধ নয়,
তার ভেতর আছে একাত্ম ভাবের সঞ্চার । ভেদ থাকার
জন্যেই প্রিয়কে পাবার আবেগ। শক্তি সঞ্চারের দ্বারা জীবে
ঈশ্বরের বিরাট রূপের বিকাশও হয়। কিন্তু তার সত্তার সঙ্গে
পূর্ণরূপে এক হওয়া যায় না।
ঈশ্বরানুভূতি বহুরস পূর্ণ । জীব এই রসের অনুভব করে।
অথচ এইরূপ ভােগ করে অভিন্ন হয়ে। আদান প্রদান
আনন্দ যজ্ঞের রীতি। এই বিশ্ব উল্লাসের ফুর্তিতে পূর্ণ।
এই আনন্দ-যজ্ঞে , আত্ম নিবেদন করে ঈশ্বরের সারূপ্য
লাভ করা জীবের চরম শান্তি। এই আনন্দযজ্ঞ, বিশ্বযজ্ঞ ।
জীব তার ক্ষুদ্রতা, তার দেশ কালের জ্ঞানের সীমাকে
অতিক্রম করে। বিশ্ববােধে ঈশ্বরের যন্ত্র হয়ে বিশ্বযজ্ঞ
উদযাপন করে ;
করে ; বিশ্বাতীত যজ্ঞে জীব মুক্ত হয়েও হয়
ঈশ্বরের সেবা ও সুখের কারণ : বিশ্ব যজ্ঞের কাল আছে।
বিশ্বাতীত যজ্ঞের ও আনন্দোৎসবের কোন কাল নেই।
সৰ্বকালে সে নিত্য আনন্দে পূর্ণ। এখানে শক্তির আবেগ
এত গভীর যে জীব ও ঈশ্বরের ভেদবােধ সর্বদা প্রকাশ পায়
প্রেমের ও শক্তির আবেগে এই ভাব হয় ক্ষণিক।
এটি স্থায়ী নয়।
কারণ তত্ত্বতঃ ব্ৰহ্ম ও জীবের অভিন্নভাব
।
৭০
ব্ৰহ্ম কী
তারা স্বীকার করেন না। এবং তত্ত্বতঃ অভিন্ন হলে প্রেমের
কোন ক্রিয়া থাকে না। জ্ঞানের দৃষ্টিতে একটি বিরাট
সমন্বয়ের বােধ এই অবস্থায় স্মৰ্ত্ত হয়।
এখানেই অদ্বৈতবাদের বিশিষ্টাদ্বৈতবাদ থেকে তফাৎ।
অদ্বৈতবাদী বলেন, প্রেমের উপজীব্য আনন্দ-আনন্দই রস।
আত্মা আনন্দস্বরূপ। প্রেমের স্বাভাবিক গতি আত্মার
দিকে। এই আত্মবােধের স্ফুরণ সকলের ভেতর, তাই তারা
প্রিয়। আত্মবােধ বা স্পর্শ যেখানে নেই, সেখানে প্রিয়ভাবও
নেই। আত্মার প্রিয়ত্ব অদ্বৈতবাদে যেরূপ স্বীকৃত হয়েছে,
অন্য বাদে সে রকম হয়নি। অন্যত্র পরমাত্মাকে
প্রিয়রূপে গণ্য করা হয়েছে, অদ্বৈতবাদেও পরমাত্মাকে
প্রিয় বলা হয়েছে। পরমাত্মা আত্মা থেকে অভিন্ন এবং
আত্মারই স্বরূপ। অদ্বৈতবাদে আত্মা পরমত্মার অভিন্ন অবস্থাই
আনন্দের স্বরূপ অবস্থা, নিরুপাধিক অবস্থা। নিরুপাধিক
আনন্দে প্রীতি স্বাভাবিক, তা সত্যিকরে প্রীতিরই রূপ।
এই সব অবস্থা ভিন্ন “তত্ত্বমসি” বাক্যের আর একটা অর্থ করা
হয়। এখানে সত্তার অভিন্নতা অপেক্ষা শক্তির অভিন্নতাকে
গ্রহণ করা হয়। পরমাত্মার ইচ্ছায় জীবের ইচ্ছাকে মিলিয়ে
শক্তিপূর্ণ হওয়াই এর লক্ষ্য। একে শক্ত্যাদ্বৈত বলা যায় ।
একেই অহংগ্রহ উপাসনা বলে। এতে জীবকেই পুষ্ট করা
হয়, ঈশ্বরের শক্তি ও ইচ্ছাকে আকর্ষণ করে। এখানে জীবের
ব্যক্তিত্ব বা ঈশ্বরের ব্যক্তিত্বের লয় করা হয় না। কিন্তু জীবের
৭১
উপনিষদের আলাে ইচ্ছা, ঈশ্বরের ইচ্ছার সঙ্গে হয় অভিন্ন—ফলে জীব নানা শক্তিতে বিভূষিত হয়। অহংগ্ৰহােপাসনা দেয় শক্তি, ঈশ্বরের শক্তির সঙ্গে একত্ব। প্রেম দেয় আনন্দের সঙ্গে একত্ব, জ্ঞান দেয় সত্তার ও চিতের সঙ্গে একত্ব। জ্ঞান, ইচ্ছা প্রেমের স্বাভাবিক গতি হচ্ছে ব্ৰহ্মানুভূতির দিকে। ইচ্ছা ঈশ্বরের ইচ্ছার সঙ্গে একত্ব লাভ করতে পারলেই তার কৃতার্থতা। ব্ৰহ্মানন্দ লাভ করে প্রেম পুষ্ট। জ্ঞান সত্তার অপরিচ্ছিন্নত্বের অনুভূতিতে পূর্ণ। এ সব অনুভূতির তারতম্য থাকে। নিস্তরঙ্গ ব্ৰহ্মসত্তা ক্রিয়াশীল হয় না, তাই সে ভূমিতে ইচ্ছার কোন পরিচয় পাওয়া যায় না। প্রেমের কোন বিকাশ এখানে নেই—যদিও থাকে, তা নিরূপাধিকের। ইচ্ছা ও প্রেম, এদের বিকাশ হয় সগুণ ভূমিতে। এই বিভিন্ন প্রকারের অভিন্নত্ব “তত্ত্বমসি” বাক্যে নিহত আছে। কিন্তু জীব ও ঈশ্বরের পূর্ণ অভিন্নত্ব সগুণে সম্ভব হয় না। বাক্যকে নিগুণের দ্যোতক রূপে গ্রহণ করা হয়েছে। আমাদের সত্তার ভেতরে পূর্ণপ্রকাশ উপলব্ধি করবার জন্যে একটি অন্তর্নিহিত প্রেরণা আছে। ঈশ্বর ও ব্রহ্ম-ভূমিকা লাভ হয় এই প্রেরণা থেকে; এই প্রেরণায় সত্তা পূর্ণভাবে জাগ্রত হয়। কিন্তু তার জাগরণের শেষ-ভূমিকা অদ্বৈত জ্ঞান। কারণ জীবের আবরণ সেখানেই উন্মােচিত। অপ্রতিহত ইচ্ছা প্রেমৰ্ত্তি, বিশ্ববিজ্ঞান—এরা সকলেই আমাদের সীমাবদ্ধ জীবনের সংবেগ থেকে মুক্তি দেয়, কিন্তু তখনও থেকে যায় জীবত্বের সীমা। জীবত্ব যতই পুষ্ট হােক না কেন, তার লাঘবতা দূরীভূত হয় না, যদি এ জন্যে এ ৭২
ব্ৰহ্ম কী
সে তার নিরুপাধিক স্বরূপে প্রতিষ্ঠিত না হয়। জীবন-কল্লোল
সেখানে অপসারিত, মেঘমুক্ত আকাশের মত, বন্ধনমুক্ত
আত্মা তখন বিরাজ করে নিজের মহিমায়। এটা শূন্য নয়,
পূর্ণ নয়—শূন্য ও পূর্ণের অতীত—শান্তং শিবং অদ্বৈতং ।
আত্মা ও জ্ঞানের ভূমিকা
বৃহদারণ্যক উপনিষদে যাজ্ঞবল্ক্য জাগ্রত, স্বপ্ন, সুষুপ্তির
বিশ্লেষণ করেছেন। এ বিষয় গভীর ও নিগৃঢ়। তত্ত্ববিদ্যাও
অনুশীলনের জন্যে তা বােঝা দরকার।
জ্ঞানের চারিটি ভূমিকা আছে। আত্মতত্ত্বে প্রতিষ্ঠিত হতে
হ'লে জাগ্রত, স্বপ্ন, সুষুপ্তি ও তুরীয়—এই চারিটি ভূমিকার
সুস্পষ্ট বিবরণ জানা দরকার। জ্ঞানই আত্মা। কিন্তু এই
সত্য ও সিদ্ধান্তকে বুঝতে হলে জ্ঞানের যে সব স্তর আছে
তার বিশ্লেষণ আবশ্যক। সামান্যরূপে জ্ঞান আমাদের সব
অবস্থায় থাকে। জাগ্রত-জ্ঞানও জ্ঞান, স্বপ্ন-জ্ঞানও জ্ঞান,
কিন্তু এদের ভেতর জ্ঞানের সামান্য ভাব থাকলেও কেউ
স্বরূপ নয়।
বিজ্ঞেরা মানুষের অন্তঃসত্তার ভেতর স্বতঃসিদ্ধ বস্তু অনুভব করে
থাকেন। সেই হচ্ছে “আমি-বােধ” (Self-consciousness)
এই “আমি-বােধ” আমার জ্ঞানের মূল ভিত্তি। আমার জ্ঞানের
দিয়ে এই “আমি”র স্বতঃসিদ্ধ ফুর্তি।
উপনিষদের আলাে
অনুভবসিদ্ধ, এ বিষয়ে কোন সংশয় নেই। এই “আমি”
জ্ঞানের কেন্দ্র। ইতস্ততঃ-বিক্ষিপ্ত জ্ঞান এই “আমি”তেই লাভ
করছে তাদের শৃঙ্খলা । সংশয়েও ফুৰ্ত্ত হয় এই বােধ।
জ্ঞানের অন্তঃকেন্দ্র “আমি” হলেও, আমাদের বােধে শুদ্ধ
“আমি”র (কেবল জ্ঞান-স্বরূপ আমি) সব সময় বিকাশ
হয় না। জ্ঞানের অবস্থান্তর আছে। এই অবস্থাগুলির পৰ্য্যা
লােচনা করলে বুঝতে পারবে যে সর্বত্র জ্ঞানে এই “আমি-
বােধ” অনুত হলেও, এর স্বরূপ সর্বত্র প্রকাশ হয় না।
জ্ঞান বিষয় প্রকাশ করলেও শুধু বিষয় প্রকাশ করাই তার
স্বরূপ নয়। আলােকের স্বভাব অন্ধকার নাশ করা। কিন্তু
আলােকের স্বরূপ তাই নয়। আলােকের স্বরূপ দীপ্তি,
জ্ঞানের স্বরূপ প্রকাশ। আলােকের কাছে যেমন কিছু
থাকলে তা আপনই প্রদীপ্ত হয় তেমনি জ্ঞানের কাছে বিষয়
থাকলে স্বতঃই তার প্রকাশ হয়। কিন্তু এই জন্যে বিষয়
প্রকাশ করাই জ্ঞানের স্বরূপ একথা বলা চলে না। বিষয়
আর জ্ঞানের সম্বন্ধ নিত্য নয়। জ্ঞান বিষয়কে অপেক্ষা
করেই থাকে। সে স্বতঃস্ফুর্ত। এই স্বতঃস্ফূর্ত জ্ঞানের
অনুভূতি দেয় আত্মরাজ্য। এ জ্ঞানের সঙ্গে পরিচয়
বড় হয় না। চিত্ত বিষয়ের প্রতি ধাবিত, বিষয়কে অতিক্রম
করে জ্ঞানের স্বরূপের দিকে অবহিত নয় ।
যাজ্ঞবন্ধের কথার সার মৰ্ম্ম এই যে জ্ঞানের নিজের একটা
রূপ আছে যা স্বয়ংজ্যোতি, যা স্বপ্রকাশ। সাধারণতঃ
৭৪
ব্ৰহ্ম কী
আমরা বিষয়প্রকাশরূপী জ্ঞানকে অনুভব করি।
স্বরূপকে জানি না।
জাগ্রত অবস্থায় জ্ঞানের কী রূপ? জাগ্রত ভূমিতে দেখি,
শুনি, আম্রাণ করি ; জ্ঞান এখানে ইন্দ্রিয়ের ভেতর দিয়ে
বিষয়ের সংবেদন দেয়। এতে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য রূপ, রস, গন্ধ,
স্পর্শ, শব্দের জ্ঞান হয়। রূপের জ্ঞান কিন্তু রূপ নয়, শব্দের
জ্ঞানও শব্দ নয়। জ্ঞান বিষয় হতে ভিন্ন, যদিও এতে
আছে বিষয়ের প্রকাশ।
রূপ, রস, শব্দ, গন্ধ, স্পর্শ
ভিন্ন জাগ্রত ভূমিতে বিষয়ের কিছু জানি না; কতকগুলি
স্পন্দনই চেতনার ভেতর দিয়ে প্রকাশিত হয়। কিন্তু
জ্ঞানে এই স্পন্দন ভিন্ন আর কোন পদার্থ অনুভূত হয়
। স্পন্দনের কারণ থাকতে পারে কিন্তু আমাদের
জ্ঞানে সেই কারণের পরিচয়
কারণের পরিচয় পাই না। আমাদের
অন্তর্বেদনাই সৃষ্টি করে জ্ঞানের জগৎ। প্রত্যেক জ্ঞাতার
এক একটা জগৎ আছে। জ্ঞাতৃত্ব ও জ্ঞান বিভিন্ন । জ্ঞান
যখন কেন্দ্রীয়ভূত হয়ে’ ক্রিয়াশীল হয়, তখনই জ্ঞাতৃত্বের
অনুভূতি জাগে। আমাদের জগৎ এই কেন্দ্রকে নিয়েই সৃষ্ট।
জাগ্রত জ্ঞানের দুটী অবস্থা
অবস্থা দেখতে পাই-কখন তাতে
স্পন্দন থাকে, কখন থাকে না। স্পন্দনই জ্ঞানের ক্রিয়া।
এই ক্রিয়া বিষয় প্রকাশ করে।
কিন্তু জ্ঞানের এই ক্রিয়া
অন্তঃকরণ ও ইন্দ্রিয়কে আশ্রয় করেই। অন্তঃকরণ সংযােগ
হলেই জ্ঞান হয় জ্ঞাতা। আগেই বলেছি জ্ঞানের স্বরূপে
এই জ্ঞাতৃত্ব নেই।
৭৫
উপনিষদের আলাে
জাগ্রত অবস্থায় জ্ঞান জ্ঞাতারূপেই প্রতিভাত, কেননা তখন
অন্তঃকরণযুক্ত হয়ে বিষয়কে দেখি, স্পর্শ করি, শ্রবণ করি।
একথা সত্যি হলেও জ্ঞানের উন্মুক্ত স্বরূপের কখনও বিনাশ
হয় না। জ্ঞাতারূপেও জ্ঞান উন্মুক্ত যদিও এর প্রকাশ সর্বত্র
সুস্পষ্ট নয়। জ্ঞানের কোন পরিধি নেই, কোন বিশেষ কেন্দ্র
নেই। কিন্তু তার পরিধি আছে, কেন্দ্র আছে।
জাগ্রত ভূমিতে এই পেরিধিবিহীন জ্ঞানের সঙ্গে আমাদের
পরিচয় না হলেও, কখনও কখনও জ্ঞানের সাক্ষীরূপের
পরিচয় পাই। সাক্ষী দেখে মাত্র, বিষয় গ্রহণ করে না।
বস্তুতঃ সে শুধু দুশি। সাক্ষী স্পন্দনহীন জ্ঞান।
••
একটি ফুলের
জাগ্রত অবস্থায় একের জগৎ অন্যের জগৎ থেকে ভিন্ন
কিন্তু এই বিভিন্ন জগৎ একটি জগতেরই অনুসন্ধান দেয়—
ব্যবহারের বিষয় একটা সাধারণ জগৎ।
সংবেদনা দু’জনের বিভিন্ন হতে পারে, কিন্তু একটি বিষয়কে
নিয়েই তাদের সংবেদনা। বিষয় বহু নয়, যদিও সংবেদনা
বহু। সংবেদনাকে অতিক্রম করে একটি জগৎ আছে। কিন্তু
এরকম জগৎ থাকলেও তার প্রকাশ জ্ঞানে। পদার্থ আছে
অথচ তার জ্ঞান নেই—এ অসম্ভব। জ্ঞানই অস্তিত্বের সাক্ষী।
সমগ্ৰ বিষয়ের বােধ এইজন্যে এক সমগ্র জ্ঞানের ভেতরই
স্ফুর্ত। এই সমষ্টি-জ্ঞানে বিশ্ব বিধৃত। ব্যষ্টি-ও সমষ্টি-জগৎ
নিয়েই বিশ্ব । সমষ্টি-জগৎ বিরাট চেতনায় স্থিত, ব্যষ্টি-জগৎ
খণ্ডচেতনায় প্রতিভাত। এই ব্যষ্টি ও সমষ্টি ও সমষ্টি-জগতের
৭৬
ব্ৰহ্ম কী একটা সূক্ষ্মরূপ আছে, যা ইন্দ্রিয়-প্রত্যক্ষ নয়। সেটা প্রকাশিত হয় স্বপ্নলােকে। স্বপ্নলােকে সংবেদনা আছে, কিন্তু সে সংবেদনা সংস্কারের, বিষয়ের নয়। তখন ইন্দ্রিয়ের সঙ্গে অন্তঃকরণের কোন যােগ থাকে না। নানাবিধ ; মনের নানা স্তর থেকে তার উৎপত্তি। তাই স্বপ্ন জগতের তত্ত্বনির্ণয়ে মনােবিদের মধ্যে অনন্ত বৈচিত্র্য। অন্তঃকরণের প্রসারিত সত্তার পূর্ণরূপের পরিচয় না থাকায় স্বপ্নজগতের সম্যক ধারণা পাই না। উপনিষদে স্বপ্নজগৎ সম্বন্ধে ধারণা এই-স্বপ্ন সংস্কারের সৃষ্টি। এই সংস্কার অন্তকরণেই। নিদ্রাভিভূত হলে বিষয় থেকে অন্তঃকরণ বিচ্ছিন্ন হয়, তখন ইন্দ্রিয় ক্রিয়া করে না। এই অবস্থায় অন্তঃকরণের সূক্ষ্ম সংস্কারগুলি স্বপ্নরূপে প্রকাশিত হয়। স্বপ্ন জগৎও জগৎ। এই জগতের দ্রষ্টা ও ডােক্তা আত্মা । স্বপ্নের সৃষ্টি বলে এর কোন খর্বতা নেই। অন্তঃকরণ ইন্দ্রিয়ের ভেতর দিয়ে বিষয়-অভিমুখী হয় বলেই আমরা জাগ্রতকে স্বপ্নের চেয়ে বেশী প্রাধান্য দিই। সূক্ষ্মদৃষ্টিতে কিন্তু স্বপ্ন বলেই স্বপ্নসৃষ্টি মিথ্যে নয়। বরং সৃষ্টির মায়াময় রূপ স্বপ্নেই বুঝি। স্বপ্নের দুটি অবস্থা। এক রকম স্বপ্নে আমরা স্বপ্নজগতকে ভােগ করি—যা কিছু শুনি, যা কিছু দেখি, তা থেকে আনন্দ লাভ করি। এরূপ স্বপ্নে বিষয়ই প্রাধান্য লাভ করে। আত্মা এই বিষয়কে ভােগ করে। আর এক রকম স্বপ্নে ৭৭ উপনিষদের আলো আত্মা জগতকে দেখে, কিন্তু ভােগ করে না। কোন সুখ- দুঃখে আত্ম লিপ্ত হয় না। অবিশ্রান্ত ধারায় স্বপ্নজগতের সৃষ্টির প্রবাহ বয়ে যায় ; আত্মা উদাসীনরূপে তা দেখে। সৃষ্টির দুটী রূপ—একটী বাস্তব রূপ, আর একটী মায়িক রূপ। বাস্তব রূপে এই বিশ্বদৃশ্য প্রকৃত সত্য এবং ঈশ্বর এর সৃষ্টি করেন। মায়িক সৃষ্টি স্বপ্নসৃষ্টি। তার প্রকাশ আছে, উপস্থিতি আছে, কিন্তু বাস্তবতা নেই। মায়িক রূপে এই দৃশ্য থাকলেও তা সত্য নয়। তার উপাদান মায়া, রূপও মায়া। মায়িক, কেন না একে দেখি, স্পর্শ করি, অনুভব করি ; তবু এর কোন বাস্তব রূপ নেই। এই আছে অথচ নেই। বাস্তব সৃষ্টি চিরকালই আছে, চিরকালই থাকবে। মায়িক সৃষ্টি কখনও হয়নি, থাকবেও না, অথচ একে আমরা দেখি। এর মায়িকত্ব এখানেই—সে জ্ঞানের বিষয় হয়েও সত্য হয় না। মায়িক সৃষ্টির আর এর বিশেষেত্ব আছে। সেটা হচ্ছে কোন বাস্তব উপাদানকে গ্রহণ না করেই সৃষ্ট হওয়া। উপাদানকে গ্রহণ করলেই সৃষ্টি নিত্য সত্য হয়ে পড়ে। কিন্তু সৃষ্টি যেখানে শক্তির কেন্দ্রচ্যুতি, সেখানে বাস্তব উপাদান নেই। এ সৃষ্টি একটা বিকাশ মাত্র, সে বিকাশের মূলে কোন উপকরণ নেই। স্বপ্লবিকাশের মত এ অবাস্তব। উপনিষদে এইজন্যে ঈশ্বরকে ‘মায়ী” বলা হয়েছে। ব্যষ্টি —স্বপ্ন ব্যষ্টি-সংস্কারের পরিণতি। পরিণতি। সমষ্টি-স্বপ্ন সমষ্টিগত সংস্কারের পরিণতি। ৭৮ ব্ৰহ্ম কী এই জাগ্রত ও স্বপ্নবস্থা ব্যতিরেকে আর একটা অবস্থা আছে। তার নাম ‘সুষুপ্তি’। সুষুপ্তিতে সংস্কারের কোন ক্রিয়া থাকে না। সুষুপ্তিতে অন্তঃকরণও শান্ত হয়, কেবল প্রাণের ক্রিয়া থাকে। জাগ্রতে বা স্বপ্নে বিষয় আছে। সুষুপ্তির কোন বিষয় নেই। বিশেষ জ্ঞানের কোন সঞ্চায় থাকে না। বিষয়ের অভাবই তার বিষয়। বিষয় হতে নিম্মুক্ত বলে বােধ এখানে প্রশান্ত, উদার, কিন্তু অজ্ঞানের আবরণ থেকে মুক্ত নয়। এ জ্ঞানের স্বরূপ “আমি কিছু জানিনে।” মাণ্ডুক্য-উপনিষদে জাগ্রৎ চেতনাকে “সুলভূক”, স্বপ্ন- চেতনাকে “প্রবিবিক্তভূ”, সুষুপ্তিচেতনাকে “আনন্দভূক্” হয়েছে। একটি স্থল বিশ্বের জ্ঞান, অপরটি সূক্ষ্ম বিশ্বের, অন্যটি কারণ বিশ্বের জ্ঞান। একটির উপাদান স্কুল বস্তু, অপরটির সংস্কার, অন্যটির অবিদ্যা। এ বিশ্বগুলি সমষ্টিরূপে গৃহীত হয়েছে। হয়েছে। জাগ্রতে সমষ্টি সুলবিশ্ব, এক সমষ্টি চেতনায় উদ্ভাসিত। চেতনা এখানে সমষ্টি স্থল জগতে অনুসৃত হয়ে স্কুল বিশ্বের প্রকাশ করে। তেমনি সূক্ষ্ম বিশ্বে সমষ্টি সংস্কারের জ্ঞান সমষ্টি সূক্ষ্ম চেতনায়। সুষুপ্ত বিশ্বের জ্ঞান সমষ্টিগত করণ চেতনায় । জ্ঞানের সর্বত্রই বিষয় আছে, স্থল সূক্ষ্ম ও, কারণ ; যদিও সুষুপ্তিতে জ্ঞানের কোনও বিশিষ্ট বিষয় নেই, নিৰ্বিশেষ অবিদ্যাই বিষয়। ৭৯
উপনিষদের আলাে
অবিদ্যার ( মায়া বা শক্তির ) সবিশেষ, নিৰ্বিশেষ রূপ আছে।
সবিশেষরূপ স্কুল ও সূক্ষ্ম বিশ্বে মূর্ত। নিৰ্বিশেষ রূপ কারণ
রূপ। সক্রিয় হলেও কোনও মূৰ্ত (concrete) রূপ নেই।
কাৰ্য বিশ্বে সৃষ্টিতে অবিদ্যা মূর্তরূপে প্রকাশ পায়। কারণ
বিশ্ব নিৰ্বিশেষ উপাধি নিয়ে থাকে। এ ভূমিকায় চেতনাকে
আনন্দভুক বলা হয়েছে ; সকল বিষয়ের পরিচ্ছিন্নতা হতে
মুক্ত বলেই একটি আনন্দের অবভাস হয়। বিষয়াকার বৃত্তি
হতে মুক্ত বলেই একটি অমূৰ্ত্ত আনন্দের সংবেদনা এখানে
আছে। কিন্তু অবিদ্যার সম্পূর্ণ তিরােধান নেই বলে এ
ভূমিকাতে পূর্ণজ্ঞান বা আনন্দের বিকাশ নেই।
হয়।
সুষুপ্তি ছাড়াও আর একটি অবস্থা আছে-তুরীয় ।
এ ভূমিতেও জ্ঞানের কোন বিষয় নেই। শুধু জ্ঞানই আছে।
এ নিৰ্বিষয় জ্ঞানই চরমানুসন্ধান। এ একটি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র
অবস্থা। বিষয়-বিষয়ী বােধ হতে সে মুক্ত। অবস্থায়
মানুষ হয় অশােক ও অভয় । মানুষ তৃপ্ত, শান্ত ও সমাহিত
সে দেয় জীবত্বের সীমা-সংকীর্ণতা থেকে চিরমুক্তি।
সুষুপ্তিতে বিষয়ের জ্ঞান নেই, তুরীয়তেও নেই। সুষুপ্তিতে
বিষয়ের অভাবের জ্ঞান আছে, কিন্তু তুরীয়তে তাও নেই।
তুরীয়ের এখানেই সুষুপ্তির থেকে পার্থক্য। আচার্য্যেরা
বলেন, সুষুপ্তিতে অবিদ্যার বৃত্তি আছে, তুরীয়তে কোন
বৃত্তিই নেই। দুইই অবশ্য বিষয়-বিষয়ীর জ্ঞান হতে
মুক্ত,
কিন্তু এখানেই তাদের তফাৎ। বেদান্তের ভাষায় বলতে
গেলে কথাটা দাড়ায় এই যে স্বপ্ন ও জাগ্ৰত-ভূমিতে
৮০
ব্ৰহ্ম কী অবিদ্যার বিশেষ আকারে ভাণ হয়,সুষুপ্তিতে তার কোন আকার থাকে না। তুরীয়তে অবিদ্যার, কি সবিশেষ কি নিৰ্বিশেষ, কোন ভাবই থাকে না। থাকে আত্মজ্যোতি। ছান্দোগগ্যাপ- নিষদে ইন্দ্ৰবিয়ােচন সংবাদে এর আলােচনা হয়েছে। আত্মাই আলাে বৃহদারণ্যক উপনিষদে আত্মজ্যোতি সম্বন্ধে এই উপাখ্যানটি দেখতে পাই। জনক-জীব কোন্ আলাের সাহায্যে কাজ করে ? যাজ্ঞবল্ক্য–সূর্যের আলােতেই সব কাজ নিষ্পন্ন করে। জনক—আকাশে সূর্যের আলাে যখন না থাকে ? যাজ্ঞবল্ক্য—তখন চন্দ্রালােকের সাহায্য নেয়। জনক--আর যখন চন্দ্রের আলােও পাইনে ? যাজ্ঞবল্ক্য—অগ্নির আলােকে তখন বিশ্ব আলােকিত। জনক—আর যখন অগ্নিও থাকে না? যাজ্ঞবল্ক্য—আত্মজ্যোতিতে বিশ্ব তখন প্রকাশিত। যাজ্ঞবল্ক্য এ । “ব: বুঝ' , আত্মজ্ঞানই সব জ্ঞানের আধার, সকল ভূমি ! এই আত্মজ্ঞান প্রতিফলিত হয় বলেই অবস্থা- বিশেষের জ্ঞান পাই। সকল জ্ঞানই আত্মাকে অপেক্ষা করে হয়। কিন্তু আত্মজ্ঞান কাউকেই অপেক্ষা করে না— স্বয়ংজ্যোতি সে। ৮১
ব্ৰহ্ম কী
আত্মার রূপ
উপনিষদের আলােচনায় জীবাত্মা ও পরমাত্মায় তফাৎ নেই।
আত্মার স্বরূপ হচ্ছে, উপনিষদের ভাষায়, সাক্ষী, চেতা, কেবল
ও নিগুণ। আত্মার চেতন স্বরূপ আগেই লক্ষ্য করেছি,
তার নিগুণ স্বরূপকে নিয়েও আলােচনা করেছি।
‘কেবল’, কারণ তাঁর সত্তাই একমাত্র সত্তা; তিনি সাক্ষী।
তিনি
আত্মার সাক্ষীরূপকে ভাল করে বুঝতে হবে, এর ওপরেই
উপনিষদ বিদ্যার সাধনা ও সিদ্ধি দুইই নির্ভর করে। সাক্ষী
উদাসীন দ্রষ্টা, তার ক্রিয়া নেই, জ্ঞান আছে।
সব জ্ঞানেরই
সাক্ষী আছে, সাক্ষী জ্ঞানের রূপ। জাগ্রতে সাক্ষী আছে, স্বপ্নে
সাক্ষী আছে, সুষুপ্তিতে সাক্ষী আছে। প্রত্যেক জ্ঞানের দুটি
রূপ একটি বিষয়-প্রকাশ ও বিষয়-ভােগ করার ধৰ্ম্ম, আর
একটি বিষয়ের প্রতি উদাসীনতা। যে জ্ঞান বিষয়ভােগ করে
সে সাক্ষী নয়, যে সব ভােগ দেখে অথচ ভােগ করে না সেই
সাক্ষী। ( অবশ্য দেখা ক্রিয়াও এখানে নেই, তবু উপযুক্ত
ভাষার অভাবে “দেখা” কথাটি ব্যবহার করতে বাধ্য হই।)
বিষয়ের সঙ্গে তার কোনও সংস্পর্শ হয় না বলেই সাক্ষী-
চেতনার রূপ:সব অবস্থাতেই এক—শুদ্ধ জ্ঞান ও অবভাস।
০
উপনিষদে এই সাক্ষীর কথা খুব অল্প বলা হলেও তার স্বরূপ
ব্রহ্মের স্বরূপ, এ কথার যথেষ্ট ইঙ্গিত দেখতে পাই। এই
সাক্ষী-চেতনা অধিগম হলেই উপনিষদ-বিদ্যা লাভ করবার
পথ সহজ হয়।
৮২
ব্ৰহ্মবিদ্যা কী ? ভারতের চিন্তার ও সাধনার চরম লক্ষ্য তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা। কঠোপনিষদের প্রেয় ও শ্রেয় মার্গের কথা তুলেই তা পরিষ্কার করা হয়েছে। নচিকেতা ও যমের কথােপকথনে এ তত্ত্বের অবতারণা। প্রেয়মার্গ সুখের পগ্ন, শ্রেয়মার্গ মঙ্গলের পথ। প্রেয় মার্গ দেয় সুখ ও ভােগ। শ্রেয়মার্গ দেয় মুক্তির আনন্দ। প্রেয়মার্গের ফল সংসার, শ্রেয়মার্গের ফল মুক্তি। প্রেয়মার্গের সাধনা যাগযজ্ঞাদির সাধনা। তা দেয় সূক্ষ্মভােগ স্বর্গাদি লােকে। এ সুখের সাধনায় মানুষ পায় নানাবিধ ঐশ্বৰ্য্য ও ভােগ, কারণ তার বেশী এর লক্ষ্য নয়। অন্তর- লােকের সূক্ষ্মতাসম্পাদনের দ্বারা কামনাকে পূর্ণ করাই পথের লক্ষ্য। এতে আছে সম্পদ ও ঐশ্বৰ্যপ্রাপ্তি—নেই জ্ঞানের প্রশান্তি। শ্ৰেয়মার্গের সাধনা ব্ৰহ্মসাধনা। এতে ভােগ নেই, আছে মুক্তি। ইন্দ্রিয়ের শাসনের দ্বারা, চিত্ত-সংযমের দ্বারা ব্ৰহ্মানুসন্ধানে তৎপর হয়ে ব্রহ্মসন্নিধি ও ব্রাহ্মীস্থিতি লাভ করা পরম শ্রেয়। প্রেয় সাধনার ভেতর আছে মানুষী ও ৮৩
উপনিষদের আলাে
দৈবী বৃত্তি, শ্রেয় সাধনার ভেতর ব্রাহ্মীবৃত্তি। সত্য লাভে
চিত্তবিশ্রান্তি। পরম সুখ তাই। প্ৰেয়ের অনুসন্ধানে আছে
সূক্ষ্মভােগের আস্পৃহা ও চিত্তের চিরন্তন ভােগমুখী বৃত্তি।
এই শ্রেয় প্রতিষ্ঠার জন্যে দরকার অন্তঃসত্তার স্বচ্ছতা।
দর্শন দেয় সত্যের পরিচয়। সাধনা দেয় সত্যপ্রতিষ্ঠা।
সত্য-জিজ্ঞাসার সঙ্গে চিত্তশুদ্ধির সম্বন্ধ। মানুষের স্বাভাবিক
সংস্কার চালিত হয় প্রবৃত্তির নানা প্রেরণায়। এই
সব প্রেরণা থেকে মুক্ত হয়ে সত্য-জিজ্ঞাসুর চিত্তবিশ্রান্তির
আবশ্যক। চিত্ত
হলে জ্ঞানের সূক্ষ্ম
চিন্তা ও অনুভূতির দ্বার উন্মুক্ত হয় না।
উন্মুক্ত হয় না। প্রাণের ও
মনের স্তরে আছে কত আবর্জনা, কত বিরুদ্ধ সংস্কার যা
সত্যদৃষ্টির পথে বাধা। এই আবর্জনারাশি থেকে মুক্ত
হতে পারলে সত্য প্রতিষ্ঠা হয় না। মন, প্রাণ, হৃদয়
বিশুদ্ধতায় পূর্ণ না করতে পারলে সত্যের বিমল শান্তি,
অপরিমেয় তৃপ্তি, অপরাজেয় শক্তি লাভ করতে পারি না।
প্রাণের বিশুদ্ধি দেয় শক্তি, বিজ্ঞান ও মনের বিশুদ্ধি দেয়
দৃষ্টি, হৃদয়ের বিশুদ্ধি দেয় ধূতি।
সাধনার কথা ইতিপূৰ্বেই ইঙ্গিত করেছি। উপনিষদের
সাধনা প্রধানতঃ জ্ঞানের সাধনা। অবশ্য যােগের সাধনা
ও ভক্তির সাধনাও এতে আছে। বিচারের পথে পাই জ্ঞানকে,
ধ্যানের পথে পাই যােগকে। জ্ঞান বুদ্ধির জড়তাকে নাশ
করে যােগযুক্ত করে।
যােগ তপঃশক্তির সঞ্চার করে।
৮৪
ব্ৰহ্মবিদ্যা কী
মানুষের অন্তরে সত্যলাভের আশৃহা থেকে যে বৃত্তির
স্ফুরণ তার নাম শ্রদ্ধা। শ্ৰদ্ধা সত্যকে ধারণা করবার
শক্তি দেয়। সত্য-অনুসন্ধান ও সত্য-জিজ্ঞাসার সঙ্গে যদি
সত্যের ধারণাশক্তি না থাকে তবে সত্য-প্রতিষ্ঠা হয় না।
সত্যকে আহরণ করাই মুখ্য কথা নয়, সত্যকে ধারণ করাই
মুখ্য কথা। সত্যের চিন্তা দেয় সত্যের আকর্ষণ ; আকর্ষণ
দেয় ধৃতি । এই আকর্ষণ ও ধৃতি হল শ্রদ্ধা। চিত্তের
সাত্ত্বিক উৎকর্ষ থেকেই এই শ্রদ্ধার প্রতিষ্ঠা। উপনিষদে
বলা হয়েছে যাদের দেবতার ওপাের ও গুরুর ওপাের
পরম ভক্তি আছে তাদের কাছেই
কাছেই সত্য প্রকাশিত।”
এই শ্রদ্ধা অন্তঃসত্তাকে দৈবী সম্বদে পূর্ণ করে’ চিত্তকে
উন্মুক্ত করে। শ্রেষ্ঠ শ্রদ্ধা এক অলৌকিক সম্পদ।
শক্তি স্বতঃই সত্যাভিমুখী। কি জ্ঞানের পথ, কি যােগের
পথ–সকলই শ্রদ্ধার ওপাের প্রতিষ্ঠিত। শ্রদ্ধা দেয় জ্ঞান,
জ্ঞান দেয় সত্যের অকুণ্ঠ দৃষ্টি। শ্রদ্ধা থেকে আসে
ধারণা। ধারণার গভীরতা থেকেই ধ্যানের উৎপত্তি।
যােগের দুটি রূপ আছে। ঈশ্বরের সঙ্গে যোগ এবং ব্রহ্মের
সঙ্গে যােগ। উপাসনার যে যােগ তাতে আমাদের অন্তর
স্বচ্ছ হয়ে ঈশ্বর-সত্তাকে ও শক্তিকে অনুভব করে এবং তার
সঙ্গে যুক্ত হয়।
D
সর্বগত, বিভু, পুরাণ-পুরুষকে তখন জানতে পারা যায় ।
ঈশ্বরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তার অসীম সত্তার, বিরাট শক্তির,
৮৫
উপনিষদের আলাে ; অপরিমেয় আনন্দের জ্ঞানলাভই যােগের চরমাবস্থা নয়। কারণ তখনও থেকে যায় তার সঙ্গে জীবাত্মার পার্থক্য-বােধ ; কখনও সাধক ঈশ্বরীয় শক্তি দ্বারা এমন অভিভূত হয় যেন কোন পার্থক্যের বােধ থাকে না। এটি অবস্থা বিশেষ। পার্থক্য স্বরূপতঃ থেকেই যায়, তবে যােগের গভীরতায় তা ফুৰ্ত্ত হয় না। এ অবস্থা অধ্যাত্ম-জীবনের অতি উচ্চ অবস্থা, সাধক এই অবস্থায় তার নিজের জীবনের সাক্ষাৎভাবে অনুভব করে ঈশ্বরের সত্তা ও সংযােগ। ক্রমশঃ সে দিব্য- ভাবের বিভূতি ও ঐশ্বর্যের অধিকারী হয়। কিন্তু এই ঐশ্বৰ্যাদি তার লক্ষ্য নয় । তার লক্ষ্য ঈশ্বরের সঙ্গে যুক্ত হওয়া। যুক্ত হবার যে আনন্দ ও স্থিতি তা ঐশ্বর্য্যে নেই। যােগৈশ্বৰ্য্য প্রকৃতির উপর কর্তৃত্ব করবাব ক্ষমতা। ঈশ্বর-সংযােগে প্রকৃতির আবরণ দূর হয়। ঈশ্বর-সংযােগের ঈশ্বরের পরমাত্মার রূপ বা শক্তি বিশেষের বিকাশ হয়। যখন এই বিশ্বরূপের বিকাশও রুদ্ধ হয়, তখন সাধক তার ভেতরে ধ্যাতা ও ধ্যেয়কে হারিয়ে ফেলে। এক প্রশান্ত অমল জ্যোতির প্রকাশ হয়, যার উদয় নেই, অস্ত নেই, যা স্বয়ংপ্রভ, শাশ্বত, নিৰ্বিশেষ। জ্ঞানের এই হ’ল শিখর। কোন শক্তির স্পন্দন এখানে নেই, থাকে অথচ এ চিত্তের স্তব্ধভূমিও নয়। চিত্তের সক্রিয় ও নিষ্ক্রিয় ভাবের সঙ্গে এর কোন সম্বন্ধ নেই। সে বাক্যের অতীত, মনের অতীত, সূক্ষ্ম ও কারণ-জ্ঞানেরও অতীত যােগদৃষ্টিতে জ্ঞানের অনেক সূক্ষ্ম ভূমিকা আছে যেখানে বা অত্যুচ্চ শিখর। ৮৬
ব্ৰহ্মবিদ্যা কী
স্থূল জগৎ নেই, শক্তির তরঙ্গ যেখানে লীলায়িত। কিন্তু
নির্বিকার প্রশান্তির স্তর নেই। স্কুল, সূক্ষ্ম, কারণ জগতের
কোন স্পন্দন সেখানে নেই, ব্যক্তব্যক্তের অতীত সে।
এই হল ঔপনিষদ ব্রহ্মবিদ্যা।
ঔপনিষদ ব্ৰহ্মবিদ্যা মানুষের স্বরূপের সঙ্গে পরমাত্মার স্বরূপের
কোন ভেদ স্বীকার করে না। এই জন্যে মুক্তির ভূমিতে
মানুষ উপলব্ধি করে আত্মার যথার্থ স্বরূপ তার মিথ্যা
রূপকে ত্যাগ করে। এই মুক্তি অবস্থান্তর প্রাপ্তি নয়,
নিত্যস্থিতি। তাই উপনিষদে মুক্তিকে স্বরূপস্থিতি বলা
হয়েছে। পরবর্তীকালে একেই স্বারাজ্যসিদ্ধি বলা হয়েছে।
আত্মার স্বরূপই স্বারাজ্য। এখানে মানুষ সকল ভয় থেকে
উত্তীর্ণ হয়। জ্ঞানই মুক্তির প্রতিষ্ঠা। প্রাণ এখানে স্তব্ধ ও
শান্ত, মন সংকল্প-বিকল্পহীন, সত্তাস্পন্দন রহিত—আকাশের
মত স্তব্ধ ও মৌন, তবু ভাস্বর।
;
মুক্তির উপায়
মুক্তি যখন অজ্ঞানের তিরােভাব, তার ধান উপায়
অজ্ঞানের অপসারণ ; জীব ও ব্রহ্মের ঐক্যবােধ প্রতিষ্ঠা।
জ্ঞানই মুক্তির শ্রেষ্ঠ উপায়। এই হল মুখ্য, মার্গ। জ্ঞানই
অজ্ঞানের নাশ করে, আলােই অন্ধকারকে করে দূর।
ভাবনাকে অবলম্বন করে প্রতিষ্ঠিত হয়। জ্ঞানমার্গে মুখ্য
ভাবনা ‘আমি ব্ৰহ্ম। এই ভাবনা আমাদের অন্তঃকরণে
৮৭
উপনিষদের আলো বিরাটবােধ প্রতিষ্ঠা করে। করে। ব্ৰহ্মাকাররূপে একটী বৃত্তির উদয় হয়। এই ভাবনা জীবভাবকে ক্রমশঃ অপসারিত করে এবং ব্রহ্মস্থিতি প্রতিষ্ঠা করে। জ্ঞান বস্তুতন্ত্র, বস্তুকে প্রকাশ করাই তার ধর্ম। আমাদের জ্ঞানের পরিধি বিস্তার লাভ করলেও তার আত্মকেন্দ্রচ্যুতি হয় না। আত্মাই তত জ্ঞান। ভারতের সাধনার এই চরম সম্বন্ধে অনেকেই উদাসীন। অনেকেই বলেন, এরূপ লক্ষ্যে কোনই লাভ নেই। জীবনের সকল আকর্ষণ এখানে স্তব্ধ, এবং সে জীবনে কার্যকরী হয়ে জীবনের সুখ বৃদ্ধি করে না। জীবনের চরম আদর্শ হবে জীবন—এর পূর্ণ সংবেগ, এর পূর্ণ তৃপ্তি, এর নিত্য কমনীয় বিকাশ। মুক্তি যখন সাবলীল জীবন- ছন্দকে অতিক্রম করে তখন তার সার্থকতা কোথায় ? আপাততঃ কথাটি ঠিক বলে মনে হয়। কিন্তু পৰ্যালােচনা করলে এর সারবত্তা বুঝতে পারি না। মানুষের চরম লক্ষ্য হতে পারে প্রধানতঃ তিনটী :-১) ক্রম-অভ্যুদয়ের গতি (২) ঈশ্বরের সঙ্গে, সকল আত্মার সঙ্গে সংস্থিতি (3) মুক্তি। গতিবাদীরা প্রথম লক্ষ্যকে গ্রহণ করেন ; এরা জীবনের নানা বিকাশ ও অত্যুদয়ের পূর্ণতা দেখতে চান ; এর ভেতর প্ৰকটা জীবনের লীলায়িত বিকাশের আস্পৃহা আছে, কিন্তু এতে কোনাে স্থির লক্ষ্য পাই না। চলাই যদি জীবনের স্বরূপ হয়, তবে তা চিত্তে একটি কবিত্বময় ৮৮
ব্ৰহ্মবিদ্যা কী
যে
প্রেরণা জাগিয়ে তুলেও কোন স্থির সিদ্ধান্ত দেয় না।
জীবন হচ্ছে পথ। দার্শনিক দৃষ্টিতে এর কোন বিশেষ
অর্থ নেই। জীবনের অভিজ্ঞতা বলে দেয় যাকে
আমরা নবীন বলি সেটি প্রাচীনেরই পুনরাবৃত্তি। একটি
অনির্দিষ্টের দিকে ধাবিত হওয়ার ভেতর কৌতুকময় কল্পনার
সঞ্চার থাকতে পারে। কিন্তু জীবনের সৃষ্টিধারা কি শুধুই
গতি? জীবনের সকল আকর্ষণ কি শুধুই গতির ওপরে ?
জীবন কি চায় না এই অনিশ্চিত গতি হতে মুক্ত হয়ে
বিরাটের স্বরূপকে জাতে? গতি আমরা চাই না, চাই
ব্যাপকত্ব, বিরাটত্ব—যে বিরাটের ভেতর জীবনের সকল
প্রবাহ, সব স্পন্দন গরীয়ান, মহীয়ান হয়ে ওঠে।
এই জন্যে ভারতের সাধনা কোনদিন কেবল গতিকেই
লক্ষ্য বলে গ্রহণ করেনি। গতির চেয়ে ছন্দের কথাই
সাধনায় বড়। জীবনের ছন্দের ভেতরে পাই নানা বৈচিত্র্য,
এবং সব বৈচিত্র্যের ভেতর দিয়ে পাই একটা সুসঙ্গতি ও
স্বাচ্ছন্দ্য।
সমষ্টিবােধের এই স্বাচ্ছন্দ্য যখন মানস-প্রত্যক্ষের কাছে
প্রকাশিত হয় তখন ব্যক্তিগত জীবনের সকল সংকীর্ণতা,
ক্ষুদ্রতা অতিক্রম করে, বিরাট জীবনের আনন্দ ও রসকে
অনুভব করি। বুদ্ধি এই বিরাটের স্বরূপকৈ ধারণা করে,
প্রাণ এর ছন্দে পূর্ণ হয়। এরূপ দৃষ্টিকেই মুক্তি বলা
উপনিষদের আলাে হয়। মুক্তি সত্যিই ব্যক্তিগত জীবনের ক্ষুদ্র আকুতি ও ক্ষুদ্র বাসনা থেকে নিষ্কৃতি। ক্ষুদ্রতার তিরােধান হওয়া মাত্রই বিরাট বিজ্ঞানের সূত্র পারি। ভারতীয় দৃষ্টিতে এরূপ আদর্শকেও গ্রহণ করা হয়েছে। এরূপ আদর্শে সমষ্টিগত চৈতন্যের সঙ্গে বিশ্বের সকল সত্তার এবং ঈশ্বরের সঙ্গে আমাদের পূর্ণ সংযােগ। মুক্তির এই ভূমিতে আমাদের সমস্ত বৃত্তিই অনন্তের অভিমুখী হয়। জীবনের চেষ্টা হয় সকল প্রকাশ ও গতির ভেতর দিয়ে অনন্তকে বরণ করা, আস্বাদ করা। ব্ৰহ্ম- স্বরূপ না হলেও, এ অবস্থায় জীব ব্রহ্মে বিচরণ করে। । কিন্তু ভারতীয় দৃষ্টির এখানেই শেষ নয়। এ মুক্তি সংকীর্ণ জীবন হতে মুক্তি হলেও ব্রহ্মরূপ হওয়া নয়। কালের অতীত হয়ে পরিপূর্ণ চেতনার সন্ধান এ দেয় না। উপনিষদে এরূপ মুক্তির কথা থাকলেও একে সাধনার চরম লক্ষ্য বলে গ্রহণ করা হয় নি। কাল ও দেশের অতীত সৰ্বসম্বন্ধশূন্য হয়ে চেতনার স্বরূপে অবস্থিতিকেই চরম মুক্তি বলে, গ্রহণ করা হয়েছে। চেতনার বিকাশ ছন্দে ; কিন্তু জীবনের ছন্দের যেখানে লয় সেখানেই উচ্চতর সত্তার সন্ধান। জীবনের সকল চাঞ্চল্য যেখানে তিরােহিত, জ্ঞানের স্ফুরণ সেখানে নিত্য এবং সত্য
ব্ৰহ্মবিদ্যা কী
সেখানে পূর্ণরূপে উদ্ভাসিত। ব্রহ্মের ও জীবের সেখানে
কোন ভেদ থাকে না, থাকতে পারে না। এরূপ অবস্থার
নাম সদ্যমুক্তি চেতনার স্বরূপে স্থিতি। এরূপ মুক্তিতেই
কাল এবং দেশের অতীত হয়ে চেতনার স্বরূপকে উপলব্ধি
এ স্বরূপ আমাদের আত্মার স্বরূপ। জ্ঞানের এরূপ
কাল ও দেশগত সংকীর্ণত হতে মুক্তিই চরম মুক্তি।
করি।
মুক্তির উপায় সম্বন্ধে পূৰ্বেই কিছু আভাষ দিয়েছি।
আত্মার সঙ্গে পরমাত্মার অভেদ বুদ্ধি প্রতিষ্ঠাই মুক্ত হবার
শ্রেষ্ঠ উপায়। কিন্তু এতাে সহজে হয় না। এর জন্যে
সাধনের প্রথম ভূমিকাতে চিত্তশুদ্ধি দরকার। চিত্তশুদ্ধি বাহ্য
ও অন্তর ইন্দ্রিয় নিয়মিত করে। একেই বলে ‘শম’ ও ‘দম'।
এই শম ও দম দূরীভূত করে ইন্দ্রিয়ের চাঞ্চল্য। উপাসনা
দেয় মনের একাগ্রতা। উপাসনা গভীর হলে হয় ধ্যান ও
ধারণা। তা থেকে চিত্ত সমাহিত হয়। সমাহিত চিত্তে
জ্ঞানের স্ফুরণ।
যাজ্ঞবল্ক্য ও জনকের কথােপকথনে সাধনা সম্বন্ধে আরাে
স্পষ্ট উপদেশ পাই। যাজ্ঞবল্ক্য বাকে, প্রাণকে, চক্ষুকে,
মনকে, বুদ্ধিকে ব্ৰহ্মরূপে উপাসনা করবার উপদেশ
দিয়েছেন।
এরা ব্রহ্মের রূপ নয়, কিন্তু এদের ব্রহ্মরূপে
ধারণা করবার ইঙ্গিত সর্বত্র আছে। বিশ্বের যাবতীয়
শক্তিকে ব্ৰহ্মদৃষ্টিতে দেখলে তাদের অন্তর্নিহিত শক্তির
৯)
উপনিষদের আলাে পূর্ণ বিকাশ হয়। প্রত্যেক বস্তু বা শক্তির ভেতর অনুগত আছে ব্ৰহ্মসত্তা। এই ব্রহ্মরূপ দৃষ্টিতে তাদের সত্তার ও শক্তির পূর্ণ স্ফুরণ। ব্ৰহ্মদৃষ্টি ব্যাপকদৃষ্টি। এই দৃষ্টি থাকলে সকল পদার্থের ব্রহ্মরূপের সঙ্গে পরিচিত হওয়া যায়। উপনিষদে বিশ্বের সকল পদার্থের ভেতর ব্রহ্মদৃষ্টি স্থাপিত করার প্রয়াস আছে। ব্ৰহ্ম ভিন্ন অন্য কোন সত্তা উপনিষদ স্বীকার করেন না। প্রত্যেকের ভেতর এই বিরাট ব্ৰহ্মদৃষ্টি যতই প্রতিষ্ঠিত হয়, ততই তাদের হয়, ততই তাদের রূপ বদলে যায়। ব্ৰহ্মবােধে গ্রহণ করতে পারলে তাদের সূক্ষ্মতার, রমণীয়তার প্রকাশ হয়। এইরূপে প্রাণ, মন, বুদ্ধি, প্রভৃতি অধ্যাত্ম শক্তিগুলির, আকাশ, বায়ু, অগ্নি, সূৰ্য্য, চন্দ্রমা, বরুণ প্রভৃতি অধিভূত শক্তিগুলিরও ব্ৰহ্মদৃষ্টিরূপে উপাসনার উপদেশ উপনিষদে আছে। এই উপাসনার দ্বারা এদের ব্ৰহ্মরূপ শক্তিরূপ জানা যায়। সাধকের নানাবিধ যােগৈশ্বৰ্য্য লাভ হয়। শক্তিগুলির সংকোচ দ্রবীভূত হয়। সাধক নানাবিধ সূক্ষ্মজ্ঞানের আধার হয়। প্রাণের, মনের ও বুদ্ধির সূক্ষ্মতা ও সমতা সম্পন্ন হলে হয় অব্যাহত শক্তি। উপাসনা এইভাবে শক্তি জাগ্রত করে তােলে। তখন সপ্তান্ন বিদ্যায় এর ছায়া দেখতে পাই। কিরূপে বিষয়দর্শনের স্থলে ব্ৰহ্মদর্শন হয় তার জন্য এ বিদ্যার অবতারণা। সাত প্রকার অন্নের কথা এ বিদ্যায় উল্লেখ আছে। ভােজ্যদ্রব্য, ৯২
ব্রহ্মবিদ্যা কী
জল, হুত, প্রহুত, মন, বাক্য, প্রাণ এই সপ্ত অন্ন । যারা
দেবতার উপাসক তারা ভেদবুদ্ধি সম্পন্ন। তারা দেবতার
উদ্দেশ্যে যজ্ঞাদি করে থাকে। দেবতার উদ্দেশ্যে হােমাদিকে
হুত বলা হয়। অবশিষ্ট যা সকল ভূতকে বলিরূপে দেওয়া
হয় তা প্রহুত। নিষ্কামভাবে এ দেবজ্ঞের অনুষ্ঠান করতে
হয়। ইহলােকে বা পরলােকের সুখকামনার নিষেধ আছে।
অন্ন ও জল প্রাণিমাত্রের উপজীব্য।
যারা ব্ৰহ্ম জিজ্ঞাসু ও ব্রহ্মসাধনা তৎপর তারা সকল বিষয়ে
ব্ৰহ্মদৃষ্টি অভ্যাস করেন। তারা ব্ৰহ্মপ্রাপ্তির কামনায় ব্রহ্ম
কর্মে লিপ্ত হন। দ্রব্যাত্মক যজ্ঞের স্থলে ব্ৰহ্মভাবনাত্মক
যজ্ঞ সম্পাদন হয়। পদার্থের স্বতন্তুরূপ ব্ৰহ্মবুদ্ধিতে লয়
হয়। পরবর্তীকালে এরূপ সাধনাকে দৃশ্যমার্জনা বলা
হয়েছে।
সপ্তান্ন বিদ্যার সূক্ষ্ম মৰ্ম্ম এই। দেবকৰ্ম্মে এক টি শক্তির সঞ্চার
হয়। এই শক্তিকে লাভ করে, ইষ্ট সাধনা হয়। কিন্তু
ব্ৰহ্মদৃষ্টি স্থির থাকলে এই শক্তির ভেতর ব্রহ্মের সন্ধান
করা হয় ; শক্তির আশ্রয় ত ব্ৰহ্ম । এই দৃষ্টি দেবাত্ম
শক্তির রূপ পরিবর্তন করে
সাধক নিজেকে
ব্ৰহ্মরূপে দেখে। দেবতাকে ব্রহ্মরূপে দেখে। অগ্নিকে
ব্রহ্মরূপে দেখে। এরূপ ভাবনায় ব্ৰহ্মবােধের উন্মেয়।
এরূপ ভাবে প্রাণের, মনের ও বাক্যের চেষ্টাকে ব্ৰহ্মরূপে
দেখবার ইঙ্গিত করা হয়েছে।
উপনিষদের আলাে এরূপে উপাসনাদ্বারা এদের স্বরূপ বুঝতে পারি । এবং ক্রমশাই বুদ্ধির সূক্ষতায় কারনুন্ধানে প্রবৃত্ত হই। একই শক্তি, প্রাণ, মন, বুদ্ধি ইন্দ্রিয়রূপে পরিণত হচ্ছে। উপনিষদে এই শক্তিকে প্রাণ বলা হয়েছে, কখনও বা অব্যক্ত বলা হয়েছে—এই অব্যক্ত বা প্রাণ পরমাত্মা দ্বারা বশীভূত হয়ে বিশ্বরূপে পরিণত হয়। ব্ৰহ্ম ছাড়া স্বতন্ত্র সত্তা নেই। কাৰ্যরূপে নানা ভেদসম্পন্ন হলেও কারণরূপে এক। এই ভাবে উপাসনাদ্বারা কার্যের ভেতর কারণের সন্ধান পাই। উপাসনা উপাসনা বিদ্যাবিশেষ। অন্তঃকরণকে নির্মল করে উপাসনা বিষয়ের স্বরূপ-বােধ প্রতিষ্ঠা করে। প্রাণ, মন বুদ্ধিতে মনঃসংযােগ করে তাদের সূক্ষ্মসত্তার ভেতর কারণের সংবেগ অনুভব করি। এই উপাসনা একরূপ তত্ত্বানুপ্রবেশের কৌশল। এদের প্রত্যক্ষ দৃষ্টি প্রত্যেক পদার্থের মূল কারণের সঙ্গে সম্বন্ধ স্থাপিত করে। অধ্যাত্ম ও অধিদৈব শক্তিগুলির পরস্পর সম্বন্ধ। এ সম্বন্ধ গভীর—এই সম্বন্ধকেই অবলম্বন অবলম্বন করে উপাসনা দ্বারা প্রভূত শক্তি লাভ করা যায়। প্রাণােপাসনার দ্বারা বিশ্ব- প্রাণের পরিচয়, বুদ্ধির উপাসনার দ্বারা বিশ্ববিজ্ঞানের পরিচয়। এই অধ্যাত্ম ও অধিদৈবের পরস্পরানুযােগিতার ভেতর সাধক পায় বিশ্বজগতের সন্ধান। উপনিষদের উপাসনার বৈশিষ্ট্য এখানে ; একটা ভাবাবস্থা নয়, এ দেয় বিরাটের জ্ঞান। অন্তঃশক্তির সঙ্গে বহিঃশক্তির একটা সামঞ্জস্যসূত্র আছে। এই সূত্রের ধারণা করতে পারলেই সাধক নিজের অধ্যাত্মশক্তিকে জাগিয়ে । ১৪ ব্ৰহ্মবিদ্যা কী অধিদৈবশক্তির অধিকারী হতে পারে। এটি শক্তিবিজ্ঞানের পথ। এ পথ মানুষের শক্তিগুলিকে ফুৰ্ত্তি দেয় এবং মানুষ ক্রমশঃ তার ভেতর পায় ঈশ্বরীয় শক্তির সাড়া ও ক্রিয়া। ঐশ্বৰ্য্যবােধের ভেতর থাকে একটি বিরাট রূপের জ্ঞান। অন্তঃজগতের ক্ষুদ্রতা ক্রমশঃ অপসারিত হয়ে সাধকের ভেতর বিরাটের সত্তা জাগ্রত হয়। উপনিষদের সাধনার (এমন কি উপাসনা প্রকরণেও) থাকে একটি অভেদ দৃষ্টি। এই দৃষ্টি ক্রমশঃ আমাদের ভেতর বিশ্বশক্তিকে উদ্বুদ্ধ করে। প্রাণ বিশ্ব-প্রাণের, মন বিশ্বমনের, বুদ্ধি বিশ্ববুদ্ধির সঙ্গে একত্বপ্রাপ্ত হয়ে বীর্যে পূর্ণ হয়, জ্ঞানে দীপ্ত হয়। উপাসনা শুধু অভেদ দৃষ্টি দেয় না। উপাসনা দেয় সাধকের একটা বৃহত্তর স্বরূপের মানস-প্ৰত্যক্ষ। অন্তর বাহির ভেদ যখন লয়প্রাপ্ত হয় তখনই সাধক বিশ্বের অন্তর্যামী পুরুষের সঙ্গে হৃদয়ের অন্তর্যামী পুরুষের অভিন্নতা অনুভব করে। বলতে পারে, আমি সূৰ্য্যে, আমি চন্দ্রমায়। প্রাণ, মন, বুদ্ধিকে অতিক্রম করে সাধক সূক্ষ্ম অবস্থায় উপনীত হয়ে এই বিশ্বাত্মবােধে প্রতিষ্ঠিত হয়। বিশ্বশক্তির সঙ্গে আত্মশক্তির অভিন্নতাবােধে সাধকের অগ্রগতি। সাধকের অন্তঃকরণের শুদ্ধি হলেই তেজোময় ভাব প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন তার ভেতর প্রত্যেক শক্তির বিরাটরূপের ধারণা জাগে। এই ধারণা বিশেষ শক্তির কেন্দ্রও প্রতিষ্ঠা করে। এই ধারণা দৃঢ় হলে সাধকের কাছে প্রতিভাত হয় বিশ্ব-চক্রের শৃঙ্খলা, গতি ও নিয়ামক শক্তি। এই জন্যই উপনিষদে উপাসনার একটা বিশেষ অর্থ আছে। প্রাণের, মনের, বুদ্ধির
উপনিষদের আলো
শুদ্ধতায় বিশ্বজ্ঞানের উৎপত্তি। তার আছে বিশ্বরূপের
সংবেদনশক্তি। এই সংবেদন শক্তি দেয় বিরাট বা ঈশ্বরের
প্রজ্ঞা।
ব্ৰহ্মসন্ধানে অন্তর বৃত্তিগুলিকে, প্রকৃতির শক্তিগুলিকে
ব্ৰহ্মরূপে ভাবনা করা হয়েছে। এতে সমস্ত শক্তিগুলির
সঙ্গে পরিচয়, এমন কি এদের সাৰ্বভৌমিকতার অনুভূতি।
এইভাবে বাক্, প্রাণ, মন, বিজ্ঞান সকলকেই ব্ৰহ্ম বলা
হয়েছে এবং ব্ৰহ্মবােধে তাদের উপাসনার কথা আছে। তাতে
ব্ৰহ্মস্বরূপের অবতারণা না হলেও, অন্তরের বিকাশ হয়।
এ ভাবে পরিজ্ঞান হলে একটা সমষ্টি জ্ঞানের অধিকারী হই।
বাক্য হয় দিব্য প্রজ্ঞার ঘূর্তি, প্রাণ হয় অসীম শক্তির আধার,
বিজ্ঞান হয় বিশ্ববিজ্ঞানের আধার। জ্ঞান, সাধারণ ভাবকে
অতিক্রম করে একটা অসাধারণ রূপ নেয় এবং বিরাটের
অববােধে আমাদের পূর্ণ করে। জিত্ব, উদঙ্ক, বৰ্ক, গর্দভী-
বিপীত, সত্যকাম, বিদগ্ধ জনককে যে সব উপদেশ দিয়েছিলেন
তার সারমর্ম
বাক্হ্ম, প্রাণব্রহ্ম, চক্ষুব্রহ্ম,
শ্রবণশক্তি ব্ৰহ্ম, মনব্ৰহ্ম, বুদ্ধিব্ৰহ্ম । এ থেকে প্রত্যেক
বৃত্তি ও শক্তিকে যে ব্রহ্মরূপে গ্রহণ করে তার ভাবনা
দ্বারা ব্ৰহ্ম-সংযােগ অনুভব করা যায়, এ কথা শ্রুতিতে
নির্দেশ করা হয়েছে। প্রত্যেক শক্তিকে ব্রহ্মরূপে দেখা
ব্ৰহ্মবােধের সহায়ক। বিশেষরূপে বিজ্ঞানােপাসনা,
প্রাণােপাসনা ও বাক্-উপাসনার কথা বলা যেতে পারে।
এদের ভেতর একটা সূক্ষ্ম সম্বন্ধ আছে। বিজ্ঞানে উদ্ভাসিত
এই।
ব্রহ্মবিদ্যা কী প্রাণ-সঞ্চার বারূপে প্রকাশ পায়। বাক্যের সঙ্গে বিজ্ঞানের ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ । ; উপনিষদের সাধনায় একটা স্বাভাবিকতা আছে। সেটি হচ্ছে আমাদের স্বরূপের ভেতর বিরাটের আস্পৃহা। এই আস্পৃহার পরিচয় পেলে সাধনা অত্যন্ত সহজ হয়। তখন স্পষ্টানুভূতি হবে, অন্তরের কোন ক্ষুদ্র আশয়ে আমরা তৃপ্ত হইনে, হতে পারিনে ; কারণ তা আমাদের স্বভাব- বিরােধী। আমাদের স্বভাব হচ্ছে, স্বভাব হচ্ছে, বিরাটকে অনুভব করা—শুধু অনুভব করা নয়, বিরাট হওয়া। উপনিষদের সাধনার আকর্ষণ ও বৈশিষ্ট্য এখানেই। উপনিষদের সাধনা একটা স্তরে “নেতি” “নেতি” সাধনা থাকলেও একে শুধু অভাবমূলক সাধনা বলা যায় না। উপনিষদ ব্রহ্মের বিশ্বরূপ দেখেছে বলে, তার সাধনার ভেতর বিরাজীবনের আকর্ষণ আছে। এই সাধনা ব্ৰহ্মকে পৰ্বত্র পায়, কিন্তু এতেই তৃপ্ত হয় না। এই ব্রহ্মদৃষ্টিতে অন্তরে ব্রহ্মাকর্ষণ, পরিণতিতে ব্রহ্মের ঐক্যলাভে। এ অবস্থা এমনি যে সাধক এখানে ব্ৰহ্মদৃষ্টিকে অতিক্রম করে ব্রহ্মের সঙ্গে অভিন্ন হয়। সাধনার জীবনে এই পরিণতি চরম। এই প্রকৃত তত্ত্বানুভূতি। উপনিষদের সাধনার আরম্ভ বিষয়ে ব্রহ্মদৃষ্টি থেকে। ব্ৰহ্মদৃষ্টি স্থাপন হ'লে আত্মদৃষ্টিও স্থাপিত হয়। ব্ৰহ্মদৃষ্টি পদার্থের আনন্দময় স্বরূপ আমাদের কাছে উপস্থিত করে। আমাদের
উপনিষদের আলো
অন্তঃকরণও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে একটি দিব্য দীপ্তিতে। ক্রমশঃই
স্থূলভাব—কি বিষয়ের, কি অন্তঃকরণের—দূরীভূত হয়। এবং
সকলের ভেতর দিয়ে ব্রহ্মসংস্পর্শ অনুভব করি। এটি কল্পনা
নয়।
ইহা সত্যদৃষ্টি ও অনুভূতি। এরূপ অবস্থা লাভ
হলে সাধক আরও উচ্চস্তরে উপনীত হয়। এরূপ দৃষ্টিলাভ
হলেও সাধকের অন্তরের অনেক বাধা অপগত হয়। সে হয়
স্বচ্ছ। স্বচ্ছ অন্তর ভিন্ন পদার্থের ব্ৰহ্মরূপ অন্তরে প্রতিফলিত
হয় না। অন্তরেও ব্ৰহ্মদৃষ্টি করতে হয় ; তাতেই অন্তর সত্ত্বের
শক্তিতে পূর্ণ হয়। এ জন্যই উপনিষদে প্রাণ, মন, বিজ্ঞানের
উপাসনার কথা বলা হয়েছে এবং তত্ত্বগুলির, আকাশ, বায়ু,
বরুণ, অগ্নির উপাসনার কথা আছে। উদ্দেশ্য সবগুলিকেই
ব্ৰহ্মময় করে তােলা। এতে সাধক জ্ঞান ও শক্তি দুই-ই লাভ
করে।
উপাসনার উদ্দেশ্য শুধু আনন্দ সঞ্চার নয়, উপাসনা আনে
জ্ঞানের বিকাশ। তত্ত্ববােধ ভিন্ন শুধু ভালােচ্ছাসের স্থান
উপনিষদের উপাসনায় নেই। এই জন্যই প্রত্যেক উপাসনাটি
বিজ্ঞানবিশেষ। ইহারা অনুভূতির
অনুভূতির স্তরবিশেষে সত্যের
কোন রূপ প্রকাশ করে। এক এক বিদ্যায় এক এক
উপলব্ধির কথা আছে। উপাসনায় স্কুলে ব্ৰহ্মবােধ হতে
পারে, স্কুলে ব্ৰহ্মবােধ স্থিতিলাভ করলে সূক্ষে ব্রহ্মবােধ হতে
থাকে। স্কুল সূক্ষ্ম বিশ্বে ব্রহ্মস্বরূপতা সুস্পষ্ট হলে আরও
সূক্ষ্মানুভূতির অভিমুখে গতি হয়। এইরূপে নানাবিধ লােক
অতিক্রম করে’, বিরাট ও হিরণ্যগর্ভলােক অতিক্রম করে’
ব্ৰহ্মবিদ্যা কী
সগুণ ব্রহ্মানভূতিতে মগ্ন হই। প্রাণের, মনের বিজ্ঞানের উর্ধে
এ লােক ; জ্ঞানময়, ঋতময়, আনন্দময় সত্তায় এ লােক পূর্ণ।
এখানে উপাসনার ফলগুলি নির্ণীত হচ্ছে। প্রাণােপাসনা
দ্বারা প্রাণশক্তির ধারণা বর্ধিত হয় এবং বিশ্ব প্রাণের শুদ্ধতার
ও শান্তিকে লাভ করি। প্রাণশক্তি শান্ত হওয়ায় বৃত্তিও
শান্ত হয়ে আসে। শুধু কি তাই? বিশ্বপ্রাণের সঞ্চারে
আমাদের স্বভাবজাত প্রবৃত্তিও শান্তভাব ধারণ করে এবং
বিশ্বপ্রাণের নিস্তরঙ্গ অবস্থাকে অনুভব করে আনন্দ লাভ
করে। উদ্বেলিত প্রাণশক্তি শান্ত হলে তার শক্তি বৃদ্ধি হয় ও
জ্ঞানসাধনার পথ খুলে যায়। এই জন্যেই প্রাণােপাসনার
আবশ্যক।
তেমনি মনের উপাসনায় আমাদের সূক্ষ্মপ্রাণ, সংকল্প, বিকল্প,
শান্ত হয়ে আসে। সংকল্পের গতি হয় অপ্রতিহত।
সূক্ষ্ম
বিজ্ঞান দেয়
বিশ্ববিজ্ঞানের পরিচয়। এই শক্তিগুলি
সম্যক নিয়মিত হলে অন্তঃকরণের
অন্তঃকরণের স্বচ্ছতা ও সূক্ষ্মতার
সঙ্গে বিরাটের সত্তা ও শান্তিকে অনুভব করি।
হ’তে সূক্ষ্মতর, স্বচ্ছ হতে স্বচ্ছতর লােকের প্রকাশ হয়।
উদ্ধলােকগুলির মানসানুভূতি বেদ্য নয়, অথচ সত্তার
শুচিতায় ও স্বচ্ছতায় স্বতঃই প্রকাশিত। 'এই উৰ্দ্ধগতির
শেষ সীমা সগুণ ব্ৰহ্মপ্রাপ্তি এবং ‘অপহতপাপমা’ ব্ৰহ্মলােকে
অবস্থিত। এখানে শান্তি, জ্ঞান, বৈরাগ্য, ঐশ্বর্য্যে সাধক
উপনিষদের আলো
এই
পূর্ণ হয়। উপাসনামর্গে সাধকের দিব্যপথে গতি
হল দেবযানমার্গ ।
নানাবিধ উপাসনার মধ্যে দহর আকাশের উপাসনা অত্যন্ত
সুখকর ও ফলপ্রসূ। অন্তরের অন্তরতম প্রদেশে
প্রদেশে এক
তেজোময় অবকাশের অবস্থিতি। একেই দহরাকাশ বলে।
এ আকাশে প্রবেশের দ্বার হৃদয়-গুহা, ধ্যানের প্রশস্ত ক্ষেত্র
এই। জমধ্যে ধ্যানের কথা যােগ শাস্ত্রে আছে—কিন্তু
হৃদয়াকাশে ধ্যান উপদ্রব রহিত ও অনায়াস সাধ্য।
দহরােপাসনা
সিদ্ধি।
এতে সাধক হৃদয় গুহায় অবস্থিত হয়। (হৃদি হেষঃ আত্মা)।
দহরকাশে মন বিলীন করে ব্রহ্মধ্যান করতে হয়। হৃদয়
ধ্যানের প্রশস্ত ক্ষেত্র ; একে আনন্দ-গুহাও বলা হয়। এখানে
গভীর ধ্যানে তত্ত্বের প্রকাশ।
প্রকাশ। সঙ্কল্পানুযায়ী সব ইচ্ছার
হৃদয়কে কেন্দ্র করে ধ্যান করলে সাধকের
কাছে অতি শীঘ্রই একটা অখণ্ড স্বচ্ছ ব্যপকতার প্রকাশ
হয়। হৃদয় বলতে আমরা হৃদয়ের অবকাশই বুঝব।
অবকাশের সীমা নেই। ধ্যান গভীর হলেই এর উপলব্ধি
পাই। শুধু তাই নয়, ধ্যানের গভীরতায় এই হৃদয়-গুহা হতে
উদ্ধে প্রসারিত একটি সূক্ষ পথের অনুসন্ধান পাওয়া যায়।
সাধক এই পথে বিচরণ করতে সক্ষম হলে তেজোময় সত্তার
সঙ্গে পরিচিত হয় ; এবং ইচ্ছানুযায়ী শরীর হতে নিষ্ক্রান্ত
১০ ০
ব্রহ্মবিদ্যা কী হতে পারে। এই পথ অতি সূক্ষ্ম, কিন্তু এর পরিজ্ঞান থাকলে সাধকের জ্ঞান হয় অপরিসীম, গতি হয় অপ্রতিহত কারণ এই পথে তাদের দিব্য জগতের সঙ্গে সম্বন্ধ, যার কোন তথ্য মনের দ্বারা বা বুদ্ধি-দ্বারা বুঝতে পারি না। দহরাকাশে চিন্তার ফলে সাধক অধ্যাত্মানুভূতি সম্পন্ন হয় ; এবং তার অলৌকিক জ্ঞান হয় যা সত্যে উদ্ভাসিত, সতত প্ৰকাশশীল । কৰ্ম্ম একে স্পর্শ করতে পারে না। সাধারণ বিজ্ঞান একে বুঝতে পারে না। এ স্বতঃস্ফুর্ত ও দিব্য। এই ভাবে অহংকারের নাশ হয়। তখন অনুভব করি এক সৰ্বব্যাপী অস্মিতা * বােধের প্রকাশ। এই বােধ দ্যোতনশীল। এ বােধকে সূত্র করেই জ্ঞানের বৃহত্তর ও দিব্যতর সত্তার প্রকাশ। শ্রুতিতে আছে “প্রাণের অন্তরে যিনি বিজ্ঞানময় মহান আত্মা, যিনি অন্তর হৃদয়কাশে অবস্থিত, তিনি সকলের অধিপতি, ঈশান।” অন্যত্র আছে, সমাধি দ্বারা পাপপুণ্যের অতীত আত্মজ্ঞ, বিজ্ঞানময় সৰ্বাধিপতি ব্রহ্মলােক স্বরূপ হয়েন। উপাসনায় সিদ্ধ হলে বিশ্বব্যাপী জ্ঞানের পরিচয়। এ জ্ঞান অস্মিতাকে দ্বার করেই হয়। অস্মিতা বােধ অত্যন্ত সূক্ষ্ম “অস্মিতা” কথাটি পাতঞ্জল ব্যবহৃত হয়েছে। অস্মিতা আমিময় জ্ঞান বৃত্তি। এই বৃত্তি অত্যন্ত স্বচ্ছ ও সুখময়। এই বােধে সম্যক প্রতিষ্ঠা হলে হৃদয় হতে উৰ্দ জ্ঞান বিকাশ ক্রমশ বিশ্বময় বােধে পর্যবসিত হয়। বিরাট পুরুষের পরিচয় হয়। যােগশাস্ত্রে একেই হিরণ্যগর্ভ পুরুষ বলা হয়েছে। ১০১
উপনিষদের আলাে
বােধ। এই অস্মিতা সূত্রের সাথে বিরাট মহানাত্মার সম্বন্ধ
আছে। এই বিরাটের সাক্ষী হতে পারলে ব্ৰহ্মবােধ প্রতিষ্ঠা
হয়। সেখানে লীন হয় কেন্দ্রীভূত ‘অস্মিতা। অস্মিতার
অনুসন্ধান দেয় অপার্থিব জ্ঞানের পথ। অস্মিতার সাক্ষী-দৃষ্টি
দেয় দিব্য জ্ঞানের বিভব ও বিস্তৃতি হতে মুক্তি। জ্ঞানপথের
সাধক এইভাবে উপাসনাকে অবলম্বন করেও স্থিতি গ্রহণ
করতে পারে।
প্রণবােপাসনা
ধ্যানকে সরস ও সরল করবার জন্যে উপনিষদে প্রধান উপদেশ
হচ্ছে ব্রহ্মের কোন প্রতীক ( চিহ্ন) অবলম্বন করে’ উপাসনা।
প্রণব গায়ত্রী মন্ত্র, বহু প্রতীক্ আছে। সকল পদার্থই
প্রতীক হতে পারে। কন্তু সাধারণ প্রতীক ও মন্ত্র প্রতীকের
ভেতর একটু পার্থক্য আছে। সাধারণ প্রতীক্ কোন
ভাবনা জাগায় না, বরং ভাবনা দ্বারা তাদের করতে হয়
প্রাণবন্ত। কিন্তু গায়ত্রী, প্রণব মন্ত্রের ভেতর আছে অন্তর্নিহিত
শক্তি যা আমাদের ভাবনাকে সাহায্য করে, এবং আমাদের
বৃত্তিকে দিব্য করে ও রমণীয় করে তােলে। ভাবনার সঙ্গে
মন্ত্রের ছন্দের যােগ হওয়াতে ধ্যান হয় গভীর ও সহজ।
মন্ত্রাচার্যেরা বলে থাকেন, প্রত্যেক মন্ত্রটি শক্তি বিশিষ্ট।
শক্তি অন্তঃকরণে শান্ত ও সূক্ষ্মভাবে প্রতিষ্ঠা করে’ জ্ঞানের
সুদৃঢ় ভিত্তি রচনা করে।
১০২
U
ব্ৰহ্মবিদ্যা কী শব্দের তরঙ্গ চিত্তে ভাবনা জাগিয়ে তােলে। এটি মানস প্রত্যক্ষ। মন্ত্র সূক্ষ্মপদার্থের দ্যোতক, অলৌকিক অনুভূতি ও জ্ঞান দেয়। এরূপ অলৌকিক অনুভূতিকে অবলম্বন করে শিষ্টেরা বলে থাকেন, ‘প্রণব’ ব্রহ্মের জ্ঞাপক। এই মন্ত্র অন্তঃকরণকে এমন ভাবে ছন্দোবন্ধ করে যে ক্রমশঃ সূক্ষ্ম ও কারণ জগতকে প্রকাশ করে কারণাতীত ব্ৰহ্ম বােধ দেয়। শব্দসাধনা অধ্যাত্মরাজ্যে আজও বৰ্ত্তমান। এ সাধনায় অন্তঃকরণের পরিণতি সহজেই হয়। অন্তঃকরণের সূক্ষ্মাবস্থাগুলি খুব শীঘ্রই খুব শীঘ্রই প্রকাশিত প্রকাশিত হয়। প্রত্যেক মন্ত্রের আকর্ষণী শক্তি আছে। চিত্তের সূক্ষ্ম-পরিণতির সঙ্গে জ্ঞানের সূক্ষ্ম ভূমিগুলির প্রকাশ। মন্ত্রের অন্তর্নিহিত শক্তি চিত্তের সব আবর্জনা দূরীভূত করে। প্রাণ, মন-কেন্দ্র হতে চেতনাকে করে বিজ্ঞান তউর্দ্ধকেন্দ্রে উন্নীত করে, বিশ্বাধারের অপরােক্ষ জ্ঞানের সঞ্চার করে। এ কল্পনা নয়, সত্য প্রতিষ্ঠা। সত্য প্রতিষ্ঠা। বিশ্বছন্দে জ্ঞানের পরিসর বাড়িয়ে দিব্য মৰ্যাদায় মণ্ডিত করে। প্রণব মন্ত্র এরূপ যােগবিভূতি সম্পন্ন করলে ও এর পরমস্থিতি কিন্তু এখানেই নয়। কিন্তু এখানেই নয়। এর এমন শক্তি অাছে যে সত্তার স্বচ্ছতা-সম্পাদন করে ; 'মহাপ্রাণের নিস্তরঙ্গ নিথর অবস্থাকে অতিক্রম করিয়ে মৌনস্তব্ধতায় প্রতিষ্ঠিত করে। ব্রহ্মই সনাতন স্তব্ধতা। এই স্তব্ধতায়, এই শান্তিতে, সৃষ্টির উল্লাস নেই, ধ্বংসের বিক্ষোভ নেই, স্থিতির সমতা নেই। এখানে চেতনা সকল উপাধিশূন্য, নির্বিকার। এ সাধনার বৈশিষ্ট্য এই যে জ্ঞানের নিয়ম- ।
উপনিষদের আলাে
ভূমিকা উচ্চতম ভূমিকা পৰ্যন্ত সকল ভূমিকার
সঙ্গে আমাদের সাক্ষাৎ করিয়ে দেয়। দেয় ঈশ্বরের
জ্ঞান ও ব্ৰহ্মস্থিতি। এই উচ্চতম অবস্থা সম্ভব হয়, যখন
সাধক সাধনার পথে অবলম্বন করে উদাসীন দৃষ্টি এবং
কোন অবস্থা-বিশেষের শক্তি, ভূতি ও আনন্দে আকৃষ্ট হয় না।
চিন্মাত্র সত্তার অবস্থিতি যখন পরম লক্ষ্য, তখন সাধনার
অবস্থা-বিশেষ হতে উদ্ভূত হয় যে দীপ্তি ও শক্তি তার দিকে
আকৃষ্ট হলেই
হলেই সাধনার শক্তি অবরুদ্ধ হয়ে আসে।
সাধক মুক্তির চরম স্থিতি হতে চ্যুত হয় । তাই সাধকের
সকল অবস্থাতেই অবলম্বন করে চলতে হয় একটা শান্তি,
অচঞ্চল, আসক্তিহীন দৃষ্টি। তাই তাকে রক্ষা করে জীবনের
সকল আবৰ্ত্ত হতে। এরূপ সাধনা সম্ভব হলে বিজ্ঞান,
আনন্দ, অস্মিতা, সকল অবস্থাকে অতিক্রম করে সাধক
নিরুপাধিক সত্তা ও চেতনায় প্রতিষ্ঠিত হয়। এই হল
পরম ধৃতি।
প্রকৃত ব্ৰহ্মজ্ঞানের অধিকারী হতে হলে অন্তঃকরণের কোন
অবস্থাতে অনুরক্ত হ'তে নেই। সাধনার পথে নানা মনােরম
বিকাশ হয় অন্তরে। সাধকের এরূপ বিকাশেরও সাক্ষী হতে
হয়। এরূপ বিকাশে আকৃষ্ট হলে জ্ঞানের নিব্বিকার ভাবের
লাভ হয় না।
এইজন্যেই সাক্ষী ভাবকে সাধকের সব
অবস্থাতেই রেখে চলতে হয়। বেদান্তবিদেরা এই জন্যেই
সাক্ষীতে প্রতিষ্ঠিত হবার উপদেশ দিয়েছেন। অনাবৃত
চেতনায় যে সুখ তা কোথাও নেই। স্বচ্ছতা ও সূক্ষ্মতা-সম্পন্ন
১০৪
ব্ৰহ্মবিদ্যা কী
হলেই তার পরিণতি হয় বিরাটে। এ বিরাট জীবনের যে
সম্পদ আছে তার ওপােরও ঔদাসীন্য না থাকলে ব্ৰহ্ম
প্রতিষ্ঠার অপরিমেয় শান্তি পাওয়া যায় না। সাক্ষীসূত্রকে
ধরে রাখতে হয়। নতুবা মূল শক্তির আকর্ষণে এই পরমপদ
হতে হয় চ্যুতি। জ্ঞানের সাধনায় যত এই সাক্ষীর ঔদাসীন্যকে
রাখতে পারা যায়, ততই আমরা অগ্রসর হই। বিশ্বপ্রকৃতি তার
সমস্ত ঐশ্বৰ্য্য নিয়ে উপস্থিত হয়। পরা বৈরাগ্য স্থাপিত হলে,
সে ঐশ্বৰ্য্য আর আমাদের আকৃষ্ট করে না। তখনই প্রকৃতি
দেয় আমাদের মুক্তি। আত্মরূপে অবস্থিত হয়ে সাধক
তার স্বরূপ উপলব্ধি করে এবং স্বরূপে স্থিত হয়। এই
“মহিমা।”
গায়ত্রী
ছান্দোগ্য উপনিষদে গায়ত্রী সাধনার কথা আছে। গায়ত্রী
ছন্দ। ব্রহ্মোপাসনার এই প্রধান অবলম্বন। আচার্য শঙ্কর
বলেছেন অনেক প্রকার ছন্দ আছে, তার মধ্যে গায়ত্রী ছনই
ব্ৰহ্মজ্ঞানের প্রধান দ্বার।
এদেশে পরবর্তীকালে উপাসনা-বিজ্ঞান আরও প্রণালীবদ্ধ হয়েছে। প্রত্যেক
উপাসনার ছন্দ, মন্ত্র ও দেবতা আছে। মন্ত্র করে শক্তি সঞ্চার ।
প্রাণ, মন, বিজ্ঞানের ছন্দ প্রকাশ করে। ছন্দবদ্ধ অন্তরে, হয় দিব্য জ্ঞানের
বিকাশ।
দেবতা হয় এ দিব্য প্রকাশ। ব্ৰহ্ম উপাসনার গায়ত্রী ও প্রণব
প্রধান ভিত্তি। প্রণব সংযুক্ত করে করতে হয় গায়ত্রীর উপাসনা।
১৪
উপনিষদের আলাে
“গায়ত্রী বারূপা (
বাবৈ গায়ত্ৰীতি)”। শিষ্টেরা বলে থাকেন
এ মন্ত্রের গান করলে মুক্তি হয় বলেই একে গায়ত্রী বলে।”
গায়ত্ৰীমন্ত্রে বিরাটের স্বরূপের দ্যোতনা করা হয়েছে।
এ মন্ত্র বিরাটের উপাসনা। বিরাটের রূপকে
রূপকে প্রকাশ
করে। এ মন্ত্রে এমন ছন্দ যা অন্তঃসত্তাকে বিশাল ভাবে পূর্ণ
করে ; প্রাণ ও মনকে শান্ত করে, তার ভেতর জাগিয়ে তােলে
বিরাট সত্তার স্পন্দন। এ স্পন্দন হতে হয় বিরাটের জ্ঞান।
;
প্রত্যেক মন্ত্রের এরূপ স্পন্দন সৃষ্টি করবার শক্তি আছে।
এ স্পন্দনের ভেতর থাকে একটি
ভেতর থাকে একটি স্বাচ্ছন্দ্য।
কারণ
মন্ত্র ছন্দে যুক্ত।
মন্ত্র বিশেষে ছন্দের রূপ হয় ভিন্ন। সব মন্ত্রই একরূপ ধৃতি
জাগায় না। যে, সব মন্ত্র শক্তির ছন্দকে জাগায় তারা
দ্যোতনশীল, জ্ঞানের দিকে তারা নিয়ে যায়।
মন্ত্র আনন্দের বিস্তৃতি জাগায়। মন্ত্রশান্ত্রে যারা কুশল তারা
এ জন্যেই মন্ত্রের বিভাগ অতি নিপুণভাবে করেন।
গায়ত্ৰীমন্ত্র অত্যন্ত গম্ভীর । এর ছন্দ বিকাশশীল, অন্তরকে
ক্ষুদ্র বিষয়ে অভিনিবেশ থেকে উন্মুক্ত করে বিরাট বােধে পূর্ণ
করে। অন্তরকে স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ ও প্রসারিত করে ।
এ গায়ত্ৰীমন্ত্রের এমনি ছন্দ যে অতিমাসানুভূতি সহজে
প্রতিষ্ঠিত হয়—বিশ্বচেতনা ও বিশ্বাতীত চেতনার সঙ্গে
১০৬
ব্রহ্মবিদ্যা কী
পরিচিত হই। মুক্তির কল্যাণস্পন্দনের সঙ্গে যুক্ত করে
এ মন্ত্র। তখন সূক্ষ্ম বিজ্ঞানের সঞ্চার।
গায়ত্ৰীমন্ত্রের তিনটি বিভাগ । চেতনার সূক্ষ্ম লােকে,
স্কুল লােকে ও অন্তঃজগতে প্রকাশকে অবলম্বন করে এ
বিভাগ নির্ণয় করা হয়েছে। ব্ৰহ্মচেতনা সৃষ্টিতে সূক্ষ্ম
লােকে প্রকাশিত,
প্রকাশিত, স্থূল
স্থূল লােকে
লােকে প্রকাশিত, অন্তরেও
প্রকাশিত। গায়ত্ৰীমন্ত্র এ প্রকাশের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে
দেয়। অন্তশ্চেতনা, বহিশ্চেতনা ও সূক্ষ্ম চেতুন সবই এক
চেতনার বিকাশ—এটিরই স্মরণ ও বােধ করিয়ে দেয়
গায়ত্ৰীমন্ত্র। গায়ত্ৰীমন্ত্র বিশ্ব-চেতনা (যার প্রতীক হল
‘সবিতা’) ও জীব-চেতনার ভেদকে অপসারিত করে দেয়।
যখন অন্তরদীপ্তির ও বিশ্বদীপ্তির সম্বন্ধ হয়, তখন অন্তর হয়
বিশ্ববিজ্ঞানে পূর্ণ। সে যুক্ত হয় বিশ্ব-ছন্দে। যে কল্যাণ মূর্তি
সবিতৃ মণ্ডলের ভেতর দিয়ে প্রকাশিত তার সঙ্গে হয়
নিবিড় পরিচয়। অন্তরে ও বাহিরে কল্যাণরূপকে অনুভব
করি।
তখন স্বচ্ছতায় ও স্বাচ্ছন্দ্যে জীবন হয় পূর্ণ। বিশ্বের
ও অন্তর সত্তার কল্যাণতম রূপে সাধক তৃপ্ত হয়। সূক্ষ্ম
চেতনার সঞ্চারে সুখময় বিশ্বের অনুভূতি সুস্পষ্ট।
সপ্ত লােক
উপনিষদের সপ্ত লােকের কথা আছে,ভু, ভূব, স্বঃ, মহ, জন,
তপ, সত্য। এই লােকগুলিকে তাদের প্রকাশ ও স্বচ্ছতা
১০৭
উপনিষদের আলাে অনুযায়ী তিন ভাগে বিভক্ত করা যায়। ভূলােক, ভুবলােক, স্বলোক প্রথম বিভাগ। মহলেকি দ্বিতীয় বিভাগ। জন, তপ ও সত্যলােক আর এক বিভাগ। শ্রীঅরবিন্দ এভাবে এস্তরগুলির সম্বন্ধে একটি সুন্দর মন্তব্য প্রকাশ করেছেন। এ লােকগুলির ঊর্ধ্ব, মধ্য, অধঃ বিভাগ আছে। উৰ্দ্ধতমলােক সত্যলােক, তপলােক, জনলােক। সত্যলােকে সত্যের প্রকাশ। শুদ্ধ সন্মাত্র স্বরূপকে নিয়ে সত্যলােকের পূর্ণ বিকাশ। সত্যলােকে পরম সত্তা অখণ্ড ভাবে প্রকাশিত। এই সত্তা সকলের সঙ্গে অভিন্নরূপে প্রতীত হয়। তপলােকে জ্ঞানশক্তির পূর্ণ প্রকাশ । এ লােকের আশ্রয় চিৎশক্তি। জনলােকে সত্যের আনন্দরূপের প্রকাশ, এই আনন্দ আনন্দঘন নয়, আনন্দের বিকাশ, আনন্দের মূর্তরূপ। সচ্চিদানন্দে সত্তার, চেতনার ও আনন্দের প্রকাশ ভিন্ন আর কিছুই নেই। এ সকল লােক তমিস্রার অতীত,জ্ঞানময় ও আনন্দময়। নিম্নস্তরগুলি হচ্ছে ভূ, ভুব ও স্বলোক। এই তিনটি স্তর অন্ন, প্রাণ মনের ভূলােকে ও ভুবলােকে প্রকৃতির স্থূল রূপের প্রকাশ। এ দুটি স্তর অন্ন ও প্রাণের ভূমি।' তৃতীয় স্তরটি মনের ভূমি। তার ওপােরের ভূমি মহলের্ণক। সেটি বিজ্ঞানের ভূমি। এই বিজ্ঞানলােক মানসলােকের অতীত। মানসলােকে আছে দুটি স্তর, একটি উর্দ, একটি মানসলােকের সঙ্গে প্রাণের প্রাণের জগতের জগতের ( vital world) খুব world) খুব ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ। উর্দ মানসলােকে জ্ঞান, সংজ্ঞা ও তাদের সম্বন্ধ স্ফুর্ত। চিন্তা জগতের (thonght world ) কাৰ্য্য প্রণালী অধঃ। অধঃ Sob ব্রহ্মবিদ্যা কী অবতরণ এখানে বিকশিত। বিজ্ঞান জগৎ (Idea world ) এখান থেকে প্রসূত। এখানে আছে অতিমানসের অনুভূতি। এই অনুভূতি মানসলােকের স্তরে কখনও কখনও করে এবং তখন একটা উদ্ধস্তরের সংবেগ মানস জগতে সূর্ত হয়—এই সব সংবেগগুলিকে সাধারণত বলা হয় বেদবাণী। মানসস্তরে অবতরণ করলে বিজ্ঞানের নিজের অতিমানস রূপটির কিঞ্চিৎ লাঘব হয়। মানস স্তরে বােধ নানাবিধ মূর্তি নিলেও সেগুলি চিন্তার প্রকার রূপেই (concepts) থেকে যায়। বিজ্ঞানলােকে এই মূর্তি- গুলি হয় প্রত্যক্ষ। তখন সে মূর্ত ও উদ্ভাসিত অতিমানস প্রজ্ঞালােকে। বিজ্ঞানলােকে ধারার সঙ্গে পরিচয়। তপঃ, জন, সত্যলােকের সঙ্গে স্থল 'ও সূক্ষ্ম সৃষ্টির কোন সম্বন্ধ নেই। বিজ্ঞানলােকের সঙ্গে উদ্ধলােকের ও অধঃলােকের বিজ্ঞানা- লােকের সত্য মূর্ত হয়ে ওঠে। তার রূপ ভাবমাত্র নয় (concept বা idea নয় ), লীলায়িত, স্ফুর্ত (spirit forim )। সৃষ্টির সম্বন্ধ। এই হৃদয়-গুহা থেকে উদ্ধ প্রসারিত পথ দিয়ে সাধক মহলেক ও তদুর্ধ্বলোকে করে প্রবেশ । যােগের পথে সাধক অবস্থা থেকে অবস্থান্তর প্রাপ্ত হয় এবং শেষ ভূমিতে সর্বশক্তিমত্তা প্রাপ্ত না হলেও সৰ্ব্বজ্ঞত্ব প্রাপ্ত হয়। তার দৃষ্টি কালকে অতিক্রম করে। তিনি ত্রিকালজ্ঞ ১০৯ উপনিষদের আলাে হন। সিদ্ধভূমিতে কালের অনুভূতি থাকেনা। কালই আমাদের জ্ঞানকে করেছে সীমাবদ্ধ। কালকে অতিক্রম করলে যুগপৎ বিশ্বের সব পদার্থের জ্ঞান হয়—এই জ্ঞান ঈশ্বরজ্ঞান, এজন্যেই বলা হয়েছে ঈশ্বরজ্ঞান অবাধিত। বস্তুর পরিণতি কালকে অবলম্বন করেই হয়। ঈশ্বরদৃষ্টিতে কাল সক্রিয় নয়, কালের ব্যবধান সে দৃষ্টিতে নেই, এ জন্যেই তিনি ত্রিকালজ্ঞ। যােগ বিভূতি বা ঐশ্বৰ্য্য হচ্ছে স্কুলে কারণ বা সূক্ষের বিকাশ। স্কুলের ভেতর সূক্ষের বিকাশ বিস্ময় উৎপন্ন করে, কারণ স্কুল জগতের কাৰ্য প্ৰণালীর সঙ্গেই আমরা পরিচিত, স্কুলের অন্তরালে সূক্ষ্ম জগতের জ্ঞান আমাদের নেই। এজন্যে যােগবিভূতিকে অত্যাশ্চার্য্য বলে মনে হয়। বস্তুতঃ যাদের দৃষ্টি সূক্ষ্ম তারা একে আশ্চৰ্য্য মনে করেন না। মুক্ত পুরুষেরা এরূপ কালের অতীত হয়ে প্রকৃতির ওপাের কর্তৃত্ব করেন। তারা প্রকৃতির পরিণতির নিয়ম ও প্রক্রিয়া সূক্ষ্মভাবে অনুভব করেন বলেই তাদের ইচ্ছানুযায়ী প্রকৃতির পরিণতি। এই-ই মুক্ত পুরুষের ঐশ্বৰ্য্য। এ কল্পনা নয়। মানুষ স্বভাবতঃ প্রকৃতির অধীন ; প্রকৃতির ওপাের স্বাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা না করতে পারলে সাধনার শেষ হয় না। প্রকৃতির কর্তৃত্বকে অতিক্রম করাই সাধনার উদ্দেশ্য কি ব্ৰহ্মনিৰ্বাণে, কি ঈশ্বরসাযুজ্যে প্রকৃতির অধিকারকে অতিক্রম করবার কথা সুস্পষ্ট। তাই মুক্ত পুরুষের ঐশ্বৰ্য্য তার অতিমানবত্বেরই জ্ঞাপক। ১১• ব্ৰহ্মবিদ্যা কী যারা মুক্ত পুরুষের ঐশ্বৰ্য্যকে গ্রহণ করতে পারেন না, তারা যােগদৃষ্টিসম্পন্ন নন। আদর্শবাদের দিক দিয়ে অনেক কথা আছে, কিন্তু মানবীয় রূপের অতিক্রম হলে আদর্শ হবে না, এ দৃষ্টি বিচারসহ নয়। মানবত্বের সীমাকে অতিক্রম করে ঈশ্বরীয় শক্তি ও জ্ঞান লাভ করাই লক্ষ্য। মুক্ত পুরুষেরা ঈশ্বরের সান্নিধ্য ও ঈশ্বর শক্তির সাথ ঐক্য অনুভব করেন। এ জন্যেই তাদের শক্তি অনেক সময়েই দুর্বোধ্য। সাধনায় সত্তাতিশয্যের স্বচ্ছতায় মানুষের স্বাভাবিক সংকীর্ণতা হতে মুক্তি। তখনি ঐশী শক্তির আবির্ভাব। মুক্তি ও ঈশ্বর উপনিষদে তপস্যা ও শ্রদ্ধার কথা আছে। তপস্যা ও শ্রদ্ধা সম্পন্ন হয়ে, মুমুক্ষুরা অরণ্যে বাস করেন এবং যােগে সেখানে গমন করেন যেখানে অমৃত অব্যয় আত্মার বিরাজ। আরাে বলা হয়েছে যাদের দেবে ও গুরুতে পরাভক্তি আছে তাদের জন্যই এই পথ। ভক্তি শুধু দিব্য বুদ্ধিই দেয় না, আকর্ষণ দেবপ্রসাদ। এই দেবপ্রসাদই দেয় দেবপ্রসাদ হলে ঈশ্বরের সঙ্গে যুক্ত হতে পারি। এই যােগসূত্রকে অবলম্বন করে কেউ কেউ ঈশ্বরসাযুজ্য প্রাপ্ত হন। কেউ বা ঈশ্বর থেকে পর। বিজ্ঞান লাভ করে ব্রহ্ম- নির্বাণ প্রাপ্ত হন ১১১
উপনিষদের আলাে
ঈশ্বরের ভেতর মানুষকে মুক্ত করবার স্পৃহা আছে।
এ তার জীবের প্রতি প্রেম। জীবকে তিনি বরণ করে
নেন তাঁর প্রেমের দ্বারা। ঈশ্বরের জ্ঞান, ঐশ্বৰ্য, প্রেম
ও শক্তি কিছুরই অভাব নেই। ঈশ্বরের প্রেমকেই যারা
মুক্তির কারণ বলে মনে করে তাতে আকৃষ্ট হন, তারা ঈশ্বরের
একাংশই দেখেন, তার পূর্ণ বিরাট স্বরূপের আর কিছুই
অনুভব করতে পারেন না। মুক্তির জন্যে প্রেম অবশ্যম্ভাবী
হতে পারে কিন্তু মুক্তির উর্ধভূমিকায় যে জ্ঞানের উদারতা,
শক্তির বিশালতা ও আনন্দের উদ্বেলতা আছে তাকে
জাতে না পারলে ঈশ্বরের সম্যক্ পরিচয় হয় না। বিশুদ্ধ
অন্তরে এই ধারণা হয়। ঈশ্বর-কৃপা জ্ঞানের পরিপন্থি-
গুলিকে সরিয়ে কল্যাণে প্রতিষ্ঠা করে। শ্বেতাশ্বতর
উপনিষদে ও কৌষিকী উপনিষদে মুক্তির জন্যে ঈশ্বর কৃপার
কথা আছে। তার অভিধ্যান দেয় চিত্তশুদ্ধি, শুদ্ধচিত্তে
তিনি প্রকাশ করেন অনন্ত শক্তি, কিন্তু তার শ্রেষ্ঠতম দান
হচ্ছে জ্ঞানের চরম বিকাশ ।
জীবন্মুক্ত
সবচেয়ে বড় আশার কথা হচ্ছে এই, ব্রহ্মবিদ্যা বা ব্ৰহ্মজ্ঞান
এ জীবনেই লাভ করা যায়, এ আশ্বাস শ্রুতি থেকে পাই।
জীবন্মুক্তি বলতে গেলে মুক্তির উদার তৃপ্তি ও অতুলনীয় শান্তিকে
জীবনে অনুভব করাই বুঝি। জীবন সাধারণতঃ বেদনা,
বিজ্ঞান ও আনন্দের ভেতর দিয়ে সঞ্চারিত হয়। জীবন্মুক্তের
১১২
ব্ৰহ্মবিদ্যা কী এ-সবের সঞ্চার নেই। তার বােধ ব্ৰহ্মবিজ্ঞানে বিকশিত, আনন্দ অপরিসীম সত্তায় মগ্ন, তিনি সর্বকালেই ব্ৰহ্মসম্পন্ন, শুধু ব্ৰহ্মসম্পন্ন নন ব্রহ্মের সহিত অভিন্ন। জ্ঞানের পূর্ণ বিকাশে উপাধির লয়, অখণ্ডচেতনার স্ফুরণ। এ অখণ্ডচেতনার বােধেই মুক্তি। ব্ৰহ্মনিৰ্ব্বাণ শুধু সঙ্কোচশীল বৃত্তি হতে মুক্তি নয়, শুধু বৃত্তির প্রসার নয়। স্থিররূপে চেতনার অখণ্ডত্বের প্রতীতি। এই প্রতীতিতে উপাধির লয় । উপাধির ব্যর্থতা প্রতিপন্ন হলেও সহসা উপাধি বিদীর্ণ হয় না। উপাধি কৰ্ম্ম প্রসূত। কর্মবীজ প্রজ্বলিত জ্ঞানে ধ্বংস হলেও যে সংস্কারে বর্তমান শরীর ধারণ, ভােগ ভিন্ন তা ক্ষয় হয় না। সেই জন্য জ্ঞানীর শরীরের অনুবৃত্তি হয়, জাগ্রতের উত্থান হয় । কিন্তু পূৰ্ব্ববৎ আমিত্ববােধের সঞ্চার চিরতরে স্তিমিত হয়। জ্ঞানের বিকাশ হলেই ব্যবহার সর্বত্র সমান হয় না। ব্যবহার নিয়মিত হয় পূৰ্ব্বসংস্কারের দ্বারা। পূৰ্ব্বসংস্কারগুলি জীবন্মুক্তর জীবনেও ক্রিয়াশীল হয়, যদিও সে সংস্কার ভেতরে কোন উল্লাস বা অবসাদ সঞ্চার করে না। জ্ঞান প্রতিষ্ঠা হলেও জ্ঞানের এমন শক্তি নেই যে সমস্ত সংস্কারকে উম্মলিত করে এবং এ জন্যেই জীবন্মুক্তের নানারূপ ব্যবহার দেখা যায় যদিও তার অন্তর জ্ঞানে পূর্ণ ও আনন্দে সমাহিত। তার চেতনার বিলয় কখনও হয় না; সক্রিয় হ'লেও সে শান্ত। চিত্তের নিরােধ বা বিক্ষেপ জীবন্মুক্ত পুরুষের জীবনে থাকে না। তার চিত্তনিরােধও নেই, চিত্ত প্রারদ্ধ ভােগের ক্ষয় করে। ১১৩
উপনিষদের আলাে
বিক্ষেপও নেই। তিনি মুক্ত। জ্ঞানের প্রতিষ্ঠা সহজভাবেই
চিত্তের ওপাের ক্রিয়া করে। চিত্তে আসে শান্তি, প্রাণে
আসে ধৃতি, কিন্তু জ্ঞানী উদাসীন চেতনায় নিমগ্ন।
উপনিষদে জ্ঞানীর শ্রেণীবিভাগ আছে : ব্রহ্মবিং, ব্রহ্মবিৎবর,
ব্রহ্মবিৎবরীয়ান, ব্ৰহ্মবিৎবরিষ্ঠ। কিন্তু প্রকৃত পক্ষে, এ শ্রেণী-
বিভাগ যথার্থ নয়— জ্ঞানীর কোনও শ্রেণী নেই। জ্ঞান
সত্য প্রতিষ্ঠা, তা সর্বত্রই সমান। কিন্তু জীবনের গতির
সঙ্গে সত্য প্রতিষ্ঠার একটি সম্বন্ধ আছে, ধ্যানের শান্তির
ভেতর যে গভীর জ্ঞান লাভ করা যায় তাকে পূর্ণরূপে ধারণ
করতে হলে সত্যের কেবল অনুভূতিই যথেষ্ট নয়, তাকে এমন
দৃঢ় করতে হয় যে জীবনের অঙ্গীকরণে তা হয়ে উঠবে
অভিন্ন। এরই তারতম্যের অনুযায়ী জীবন্মুক্তের স্তরবিভাগ।
জ্ঞান ও যােগ
যােগ দেয় ঈশ্বরসান্নিধ্য, জ্ঞান দেয় ব্রহ্মপ্রতিষ্ঠা। কিন্তু যােগ
অর্থে যদি বুঝি মানুষের সহজ বৃত্তিগুলিকে নিয়মিত করা,
তাকে বিশেষভাবে কার্যকরী করে সুখের পথ অধিকার করা,
তাহলে অত্যন্ত ভুল বােঝা হবে। যােগ পথে অনেক সিদ্ধি
আসতে পারে, কিন্তু উপনিষদের যােগের লক্ষ্য এমন কিছু
নয়। মানুষকে জ্ঞানের পথে নিয়ে যাওয়ার জন্যেই যােগের
আবশ্যকতা। ' এবং এর শেষ পরিণতি সেখানেই।
যে জ্ঞান দেয় তা দিব্য—মানবীয় বৃত্তিগুলিকে দূরীভূত করে
যােগ
১১৪
ব্ৰহ্মবিদ্যা কী সে ভাগবতী বৃত্তি স্থাপিত করে। এইজন্যেই এ পথে যে জ্ঞান উদ্ভাসিত হয় তা প্রকৃতির স্বরূপের সন্ধান দেয় এবং তার তুচ্ছ স্বরূপের সন্ধান পেয়েই যােগমার্গে সাধক অগ্রসর হয় প্রকৃতির অতীত ঈশ্বর উপলব্ধির দিকে। যােগ দেয় মহিমা, জ্ঞান দেয় অভয়। ব্রহ্ম-নিৰ্বাণ মুখ্য মুক্তিমার্গে যারা বিচরণ করেন, তাদের উদ্দেশ্য থাকে অদ্বৈত জ্ঞানের পর ব্রহ্মনিৰ্বাণ। তাদের কাছে ঐশ্বৰ্য্য ও মহিমা প্রতিভাত হলেও তারা সে বিষয়ে উদাসীন। যদি কিছুতে তারা নিযুক্ত হন তাে তার উদ্দেশ্য প্রারব্ধ কৰ্ম্মের ক্ষয়—কিম্বা অধিকারিক পুরুষের বেলায়, কোন বিশ্বকল্যাণ সাধন করা। কিন্তু এ বিষয়ে তাদের কোন ইচ্ছে থাকে না ; স্বতই হতে থাকে। জ্ঞান প্রতিষ্ঠার পর কর্মের কোন অবসর নেই—বিশেষতঃ যারা নির্বিশেষ জ্ঞানকেই জীবনের ভিত্তি করেন। কিন্তু যােগমার্গে মুক্ত পুরুষ প্রকৃতির সব স্তরে ইচ্ছামত বিচরণ করতে পারেন; তঁার সাধনার লক্ষ্য হচ্ছে হৃদয়াভ্যন্তর হতে প্রসূত হয়ে যে জ্যোতি ধারা সমস্ত সূক্ষ্ম জগৎ প্রকাশ করে, সেই ধারাকে অবলম্বন করে হিরণ্যগর্ভ লােককে ভেদ করে ব্রহ্মসন্নিধি লাভ করা, এবং স্বেচ্ছায় এই মার্গে গমন করা। এই পথের আবরণ উন্মুক্ত হলে সাধকের ‘ভূলােক হতে “ব্রহ্মলােক” পর্যন্ত জ্ঞান হয় এবং সাধক ক্রমশঃ উচ্চতর লােকের গতিধারা ও শক্তি ধারার সঙ্গে
উপনিষদের আলাে
পরিচিত হন। তখন তার মানসলােকের অস্পষ্টভাব দূরীভূত
হয়, কোন সংকল্প বিকল্প থাকে না। তাঁর সমস্ত সত্তা তখন
আলােড়িত হয় ব্রহ্ম শক্তিতে।
আত্মপ্রতিষ্ঠা ঔপনিষদ সাধনার চরম লক্ষ্য। অন্তঃহৃদয়ে
আত্মা পৃথিবীর চেয়ে বড়, অন্তরীক্ষের চেয়ে বড়, দিব্য
দ্যোতনশীল জগতের চেয়ে শ্রেষ্ঠ, শ্রেষ্ঠ সৰ্ব্বলােকের চেয়ে।
এই আত্মাকে জানতে পারলে মানুষ সর্বগ্রন্থি হতে মুক্ত হয়।
আত্মস্মৃতি জাগরিত হলে অন্তরের সকল গ্রন্থি—যাদের
অবলম্বন করেই ব্যক্তিত্ব,—ছিন্ন হয়, মানুষ মুক্তির পরমপদ
প্রাপ্ত হয়। এ জন্যেই মুখ্য মুক্তিমার্গে মুক্ত পুরুষের
নিষ ক্রামণের কথা বলা হয় নি কারণ মুক্তপুরুষের কোথায়
নিষ ক্রামণ হবে–তার সত্তা ব্ৰহ্মসত্তা।
মুক্তপুরুষের ঐশ্বৰ্য্য ও গতি
।
মুক্তপুরুষের ঐশ্বায্যের কথা শ্রুতিতে আছে ।
মুক্তপুরুষের
ইচ্ছা অপ্রতিহত । তিনি কামনা করলেই সে কামনা সিদ্ধ
হয়। প্রকৃতি সকল সম্পদকে তার কাছে প্রকাশিত করে
পিতৃলােক, দেবলােক প্রকাশিত হয়। মুক্তপুরুষের জ্ঞান
অপ্রতিহত। কখনও কখনও মুক্তপুরুষ ঈশ্বরের মত শক্তি
লাভ করেন। মুখ্য মুক্তির পথে এরূপ শক্তি ও ঐশ্বৰ্য্য না
থাকতে পারে, কারণ এই তার লক্ষ্য নয়। এ ঐশ্বৰ্য্য
উপাসনার ফল, গৌণ মুক্তির পথে অবশ্যম্ভাবী বিকাশ । মুখ্য
১১৬
ব্ৰহ্মবিদ্যা কী মুক্তিমার্গে এরূপ বিকাশ অসম্ভব নয়, কিন্তু সাধক সে দিকে আকৃষ্ট হন না। তার গতিকে তিনি রুদ্ধ করেন না। তার দৃষ্টি নিবদ্ধ থাকে সমস্ত বিভূতির অতীত ব্রাহ্মীস্থিতির দিকে। গৌণ মুক্তিমার্গে সাধক নানাবিধ বিভূতিসম্পন্ন হলেও—জগৎ ব্যাপারের ওপাের তার কোন কর্তৃত্ব থাকে না। প্রকৃতির নানান্তরের জ্ঞানসম্পন্ন হয়েও বিশ্বধারার কোন পরিবর্তন তিনি করতে পারেন না। তার ওপাের তার কোন অধিকার নাই। সে অধিকার ঈশ্বরের। জ্ঞানের উচ্চস্তরে উঠলে সাধক জানতে পারেন বিশ্বব্যাপার এমনি কৌশলে নিয়মিত যে এতে হস্তক্ষেপ করবার কিছুই নেই। সংকীর্ণ দৃষ্টিতে জগৎ ব্যাপারে যে সব বিশৃঙ্খলা ও বৈষম্য দেখতে পাওয়া যায় গভীর দৃষ্টিতে তাদের একটি সামঞ্জস্য উপলব্ধ হয় । জ্ঞানের সীমা যত বেড়ে ওঠে, ততই সব বৈষম্যের স্বরূপকে বুঝে সৃষ্টির কৌশলে আশ্চর্য হই। বিরাট দৃষ্টিতে সকল বৈষম্য দূর হয়। যােগপ্রতিষ্ঠা বুদ্ধিকে এরূপ দৃষ্টি দেয়। এরূপ দৃষ্টিসম্পন্ন হয়ে’ চিত্ত বিশ্রান্তি লাভ করে। যােগদৃষ্টিও জ্ঞানদৃষ্টির ভেতরে যেটুকু শক্তির কথা আছে তাও ক্রিয়াশীল হয় বিশ্ব- বিধানকে অবলম্বন করেই। মানুষের অসীম শক্তি হলেও তার একটা সীমা আছে। এবং সে সীমা এই যে জগৎ ব্যাপারের ওপাের তার কোন কর্তৃত্ব থাকে না। 0 যারা উপাসনামর্গে বিচরণ করেন এবং দিব্যজ্ঞানে ও শক্তিতে অনুপ্রাণিত হন তাদের হয় উর্ধগতি। তাদের মলিন সংস্কার ১১৭ উপনিষদের আলাে বিলীন হয়। তারা দিব্যসংস্কার প্রাপ্ত হন এবং তদনুযায়ী হয় তাঁদের শক্তি। উপাসনার দ্বারা চিত্ত দিব্যভাবে অনু- প্রাণিত হয় এবং উদ্ধলােকের দিব্যসঞ্চার হয়। শুধু তাই নয়, একটি সূক্ষ্ম আলােক ধারাকে অবলম্বন করে তারা উর্ধলােকের সঙ্গে সাক্ষাৎভাবে সম্বন্ধ স্থাপন করেন। উপনিষদের ভাষায় তারা দেবযানমার্গে গমন করেন। এই ঊর্ধলােক জ্যোতির্ময়, শুভ্র। এই পথকে অবলম্বন করে তারা ব্ৰহ্মলােকে প্রতিষ্ঠিত হন। এ পথে যারা বিচরণ করেন তাদের অন্তরীক্ষলােক ও তদুপরি লােকের জ্ঞান হয়। লােকগুলিতে জীবনসংবেগ ধীর ও শান্ত। জ্ঞান উদার, প্রাণ ছন্দময়, বিজ্ঞান অব্যাহত। এ জন্যেই একে দিব্যমার্গ বলা হয় ; দেহাবসানে এই মার্গে বিচরণশীল পুরুষের উৰ্দান্নয়ে গতি হয়। উদ্ধলােকে অবস্থিত অমানবক পুরুষের দ্বারা আদৃত ও নীত হন, কৌষা- তকী উপনিষদে এই কথা আছে। যতই সাধক ঊর্ধ্বলােকে বিচরণ করতে থাকেন, তিনি ততই দিব্যতেজোসম্পন্ন হন। অশরীরী দিব্যপুরুষের সঙ্গ প্রাপ্ত হন। কিন্তু এই তার গতির শেষ নয়। তার গতির শেষ হয় ব্রহ্মলােকে। এই ব্ৰহ্মলােক হতে সাধকের আর পুনরাবৃত্তি (পুনরাগমন) হয় । এই মার্গে বিচরণশীল সাধক হিরন্ময় কোষে প্রবেশ করেন, এবং সে কোষ ভেদ করে ব্রহ্মলাভ করেন। মুক্তির সন্ধন্ধে দুটী ধারণা উপনিষদে সুস্পষ্ট—একটি ব্ৰহ্ম- ১১৮ ব্ৰহ্মবিদ্যা কী ; নিৰ্বাণ, আর একটি ব্রহ্মসাযুজ্য। প্রথমটি যাজ্ঞবল্ক্যর উপদেশে সুস্পষ্ট; দ্বিতীয়টি কৌষিতকী ব্রাহ্মণ ও ছান্দোগ্যে বিশেষতঃ দহরবিদ্যার শেষ দিকে সুস্পষ্ট। এদের ভেতর তেমন কোন বিরােধ নেই। ঈশ্বরকৃপা অপ্রতিহত জ্ঞান, অপরিমেয় সত্তার সন্ধানের পথ খুলে দেয়। অবস্থাবিশেষে দুটিতে দুরকম অভিজ্ঞতা; কিন্তু দ্বিতীয়টি হতে প্রথমটিতে উপনীত হওয়া যায়। ; একথা নিঃসন্দেহ যে সাধকের যােগমার্গে ও উপাসনামর্গে ঈশ্বরের দিকে গতি হয় এবং উর্দ হতে উৰ্দ্ধতর লােকের ভেতর দিয়ে তিনি ঈশ্বরসাযুজ্য লাভ করেন। পৰ্যাঙ্কবিদ্যার নির্ণয় করতে গিয়ে একথা বলা হয়েছে। যারা সগুণ ব্রহ্মবিদ্যাতে কুশল, তাদের গতির, পথে চন্দ্রলােক, বিদ্যুৎলােক, বরুণলােক, ইন্দ্রলােক, প্রজাপতিলােকের দর্শন হয় ; পরিশেষে তারা ব্ৰহ্মলােক প্রাপ্ত হয়ে ব্রহ্মসাযুজ্য লাভ করেন । এই লােকগুলি সম্বন্ধে ধারণা সুস্পষ্ট নয়। তবে চেতনার সূক্ষ্ম বােধের সঙ্গে এরূপ স্তরের অনুভূতি। এ সব স্তর জ্যোতিতে, শক্তিতে, প্রশান্তিতে পূর্ণ। এরা অতিমানসের স্তর বিশেষ এবং এ সব বােধে অস্তিত্বের সূক্ষ্ম স্তরগুলি প্রকাশিত। উর্ধ মানস চেতনায় এসব লােকে অমানব ১১৯
উপনিষদের আলাে
পুরুষের সাক্ষাৎকার।
তারা আরও উচ্চতর স্তরে সাধককে,
চালিত করে। চিতি-পুরুষের (psychic self) ক্রিয়া
শীলতায় এ সব লােকগুলির পরিচয়।
এই চৈত্য পুরুষের জাগরণের সঙ্গে সূক্ষ্ম জগতের নানা স্তরে
প্রকাশ। এ স্তরগুলির কথা সংক্ষেপে উপনিষদে বলা হয়েছে।
চৈত্যপুরুষের সঙ্গে বিরাটপুরুষের (cosmic-self ) একটি
সম্বন্ধ ( correspondence) আছে। চৈত্যপুরুষের অনুভূতির
গভীরতায় লােকবিশেষের প্রকাশ। এই লােকবিশেষের
সূক্ষ্মতা অনুযায়ী নানারূপ অনুভূতি। তবে এই মার্গে তেজ,
স্বচ্ছতা, প্রকাশ, ঘূর্তির সঞ্চার। শুধু তাই নয়—অন্তঃসত্তাও
ক্রমশঃ প্রকাশশীল ও আবরণমুক্ত হয় এবং এ সব লােকের
স্পন্দনকে অনুভব করে। সূক্ষ্ম বেদনার বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে
এই সব সূক্ষ্ম লােকের অনুভূতি জাগে। কিন্তু দেবযানমার্গেও
সাধক এইরূপ জ্ঞান নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে পারে না। তাদের
এ সব স্তরগুলি অতিক্রম করে যেতে হয়। সাধকের আবশ্যক
হয় সচেতন থাকা। চেতনার সঞ্চার ঠিক থাকলে সাধকের
অন্তঃ প্রেরণা তাকে উর্ধদিকেই নিয়ে যায়,
তার ব্রহ্মসাযুজ্য লাভ হয়, তার
আপৃষ্ঠা ও সত্তার
অস্ফুট বেদনাই তাকে চরম ঈশ্বরানুভূতির দিকে অগ্রসর
করিয়ে দেয়। ভূমাতেই সাধকের তৃপ্তি, অন্তরের এই
ভূমার আপৃহাই ঈশ্বরসাযুজ্য দিয়ে দেয়। জীব ঈশ্বরে লীন
হয়ে তার বাঙ্গরূপে, তার জ্ঞান, আনন্দ ও ঐশ্বর্যের
অধিকারী হয়।
যতক্ষণ
১২০
ব্রহ্মবিদ্যা কী । ; এই মার্গও সূক্ষ্ম প্রাণের মার্গ। সূক্ষ্ম প্রাণকে গ্রহণ করে সাধক এরূপ বিকাশের অধিকারী এ মার্গে কোথাও লয়ের কথার উল্লেখ নেই। এ মার্গে ব্রহ্মের সঙ্গে আত্মার অভেদ ভাবনা থাকলেও সেই ভাবনা পূর্ণ অভিন্নত্বের ভাবনা নয় বলে এ মার্গে সাধক ব্ৰহ্মনিৰ্ব্বাণ প্রাপ্ত হয় না। তার জ্ঞান ও সত্তা অসীম ও উদার স্বরূপকে অনুভব করলেও, বিকাশ বিশ্বময় হলেও, পূর্ণরূপে নিস্তরঙ্গ নয়। জ্ঞান স্বচ্ছ, আবরণ শূন্য। বিশ্বসত্তা, বিশ্বাতীতসত্তা এই জ্ঞানে উদ্ভাসিত। এখানে কল্লোল আছে, কিন্তু তা শান্তিপূর্ণ ; জ্ঞান আছে, কিন্তু সতত প্ৰকাশশীল; জীবন আছে, কিন্তু নেই স্তব্ধতা। ছন্দ আছে, অনাহত সঙ্গীত আছে, মৌন নীরবতা নেই। প্রাণে উদ্বেলিত, বিজ্ঞানে উদ্ভাসিত, ছন্দে মুখরিত, আনন্দে লীলায়িত জীবনই এরূপ স্তরে প্রকাশিত। কিন্তু জীবনের সকল সঙ্গীতধারা যে অপরিমেয় শান্তির ভেতর নীরব হয়ে যায়, সে মৌন উল্লাসহীন স্তব্ধতা, সে অসঙ্গ আত্মার পরিচয় এখানে হয় না। এখানেই সাধক সকল গ্রন্থি হতে মুক্ত হয় । জীবত্বের পরিধি যতই প্রসারিত হােক কেন তার স্বরূপকে অপসারিত করতে না পারলে তার ক্ষুদ্রতার পূর্ণ বিস্মৃতি হয় না। অবস্থা সম্পূর্ণরূপে পৃথক অনুভূতি দেয়, এ সময় মানুষ চিত্তের সকল সংবেদন ও বেগ হতে পায় পূর্ণ বিশ্রান্তি। বিশ্বের সকল স্মৃতি হতে বিচ্যুতিই মুক্তি, স্মৃতি জীবন ধারাকেই অবলম্বন করে থাকে, স্মৃতি অপগত হলে মুখর জীবনও স্তব্ধ হয়। 'জীবনসঙ্গীতের মধ্যে আছে স্তব্ধতা, এই ১২১ উপনিষদের আলাে স্তব্ধতাকে অবলম্বন করে, অনাহত সঙ্গীতের ছন্দ প্রতিষ্ঠিত। গৌণ মুক্তিমার্গে জ্ঞানের পরিধি ক্রমশঃই বিস্তৃত হয়। ক্রম- উৰ্দ্ধলােকের জ্ঞান নিম্নভূমিকার জ্ঞানকে রূপান্তরিত করে। এই সব লােকের ভেতর সম্বন্ধসূত্র আছে। নিম্নকার ভূমিকা উৰ্দ্ধভূমিকার শক্তিদ্বারা সঞ্চারিত। রূপান্তরিত করে উদ্ধপথে আরােহণ করতে পারি। এ ভাবে সত্তা ও জ্ঞান এই যে স্তর বিভাগ এও জ্ঞানের অবস্থা বিশেষ, এ অবস্থাগুলি আমাদের রূপান্তরিত জ্ঞানের প্রকাশ । যারা এই দৃষ্টি- সম্পন্ন তারা ব্ৰহ্মকে সমস্ত বিশ্বেই ওতপ্রােত ভাবে দেখেন, কারণ সমস্ত সত্তাই যে ব্রহ্মরূপ। কিন্তু ব্ৰহ্মদৃষ্টি মূল লক্ষ্য, এবং সে দৃষ্টি খুলে গেলে সৰ্বত্ৰ ব্ৰহ্মানুভূতি হয়। কৌষিকী উপনিষদে দেবযানমার্গে বিচরণশীল পুরুষের আহ্বানের একটি সুন্দর চিত্র আছে। ঈশ্বর দিব্য শক্তি- গুলিকে দেবযানমার্গের সাধকদের যােগ্য সম্মান দিতে বলেন। তারা এরূপ মুক্তপুরুষের কাছে উপস্থিত হয়ে, তাকে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এরূপ আহুত হয়ে ব্রহ্মলােকাভিমুখে অগ্রসর হন। তাতে যথাক্রমে “ব্ৰহ্মশব্দ”, “ব্ৰহ্মরস”, “ব্ৰহ্মতেজ”, “ব্ৰহ্মযশঃ”, প্রবেশ করে। রূপক ভাবে এখানে গভীর অনুভূতির কথা বলা হয়েছে। প্রকৃতির অতীত হয়ে মুক্তপুরুষের চৈতন্য যখন অধঃপ্রকৃতির সীমা অতিক্রম করে, তখন তার দিব্যস্বচ্ছতা, দিব্যানন্দ, ব্রহ্মবিদ্যা কী দিব্যতেজ প্রাপ্তি হয়। চেতনার এরূপ বিকাশ মুক্তাত্মার দিব্য স্বরূপের বিকাশ। তার অনুভূতি সকলই দিব্য। সন্ন্যাস যােগ উপনিষদগুলি পৰ্যালােচনা করলে স্পষ্ট হবে যে ব্ৰহ্মসাধনা, ব্রহ্মবিচার সকল আশ্রমেই হতে পারে। শিষ্য ব্ৰহ্মবিদ্যার জন্যে গুরুর কাছে সমাসীন হতেন। এমন কি পুত্রও পিতাকে গুরুর স্থানে বরণ করে ব্রহ্মবিদ্যা লাভ করতাে। নৈষ্ঠিক ব্রহ্মচারী যে রকম ব্ৰহ্মবিচার করতেন, গৃহস্থাশ্রমীও করতেন সেই রকম বিচার। জাতিধর্ম ও আশ্রমধর্ম নির্বিশেষে ব্রহ্মবিদ্যা নিষ্পন্ন হত। ব্ৰহ্মবিদ্যার কারণ অধ্যাত্মযােগ। সে আশ্রম ধর্মকে অপেক্ষা করে না, অপেক্ষা করে জ্ঞানকে। জ্ঞানের প্রধান কারণ সুদৃঢ় ভাবনা, বুদ্ধির ঔজ্জ্বল্য ও সম্যক্ দৃষ্টি। তার সঙ্গে আশ্ৰম ধৰ্ম্মের কোন সম্বন্ধ নেই। শুদ্ধ সংযত পুরুষেরাই জ্ঞানের অধিকারী। জ্ঞানের আর কোন বিশেষ কারণ নেই। একাগ্রবৃত্তি, যােগ ও ধ্যান জ্ঞান লাভের সহায়ক। উপনিষদে অনেক গৃহস্থাশ্রমী জ্ঞানীর উল্লেখ আছে । জনক, যাজ্ঞবল্ক্য ও অন্যান্য ঋষিরা গৃহধৰ্ম্মানুষ্ঠান করতেন। সন্ন্যাসের কথা উপনিষদে কমই আছে। জ্ঞান বাইরের অবস্থাকে আশ্রয় করে থাকে না, আশ্রয় করে না আশ্ৰম ধৰ্ম্ম, সংস্থিতির উপনিষদের আলাে ব্যবস্থা। জ্ঞান তত্ত্বের বিকাশ। একথা স্বীকার করূতে হবে যে বাইরের অবস্থা অনুকূলরূপে বা প্রতিকূলরূপে জ্ঞান সঞ্চয়ে সাহায্য করে বা বাধা জন্মায়। ব্ৰহ্মবিদ্যা লাভ করবার জন্যে অন্তঃকরণের বিষয়াকর্ষণ হতে বিমুক্তি আবশ্যক।' বিষয়রত চিত্তে জ্ঞানের নির্মল বিকাশ হয় না। আশ্রম বিশেষে এই আকর্ষণ বেশী বা কম। ব্রহ্মচৰ্য্য আশ্রমে বা বানপ্রস্থ বা সন্ন্যাস আশ্রমে জ্ঞানের বাধা খুব কম। ব্রহ্মচর্য রক্ষাদ্বারা ওজঃ শক্তির বৃদ্ধি হয়, চিত্তের ওপাের প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠা হয়। হৃদয়গুহায় প্রবিষ্ট সাধক ব্ৰহ্মধ্যানের অধিকারী। ব্ৰহ্মচর্য ব্ৰহ্মজ্ঞানের প্রতিষ্ঠা। এতে শরীর, মন, প্রাণ সবই দৃঢ় হয়। তাদের ভেতর আসে সমতা। সমতাই দেয় উচ্চতর ধ্যান ও জ্ঞানের অধিকার। এ জন্যই উপনিষদে এর এত প্রশংসা। ব্রহ্মচর্য প্রতিষ্ঠার ভেতর থাকে ব্রহ্মজ্ঞানের আস্পৃহা। আম্পৃহা দেয় প্রেরণা। ব্রহ্মচর্য জীবনকে পরিচালন করবার একটা কৌশল। মনের সঙ্গতিসম্পন্ন ভাবনা, প্রাণের ছন্দোময় গতি, শরীরের স্বাচ্ছন্দ্য। এতে সূক্ষ্ম বুদ্ধির জাগরণ হয়। জীবনের বিভিন্ন স্তরের মধ্যে সামঞ্জস্য আনতে পারলে এর সুন্দর বিকাশ ও পরিণতি দেখা যায়। এজন্যেই ব্রহ্মে চরণ করার কথা পুনঃ পুনঃ উপদেশ দেওয়া হয়েছে। এই ব্রহ্মে চরণ জীবনের উচ্চতম কল ও কৌশল। এ দেয় বুদ্ধির উন্মেষ, অন্তরের বিকাশ, ছন্দোবদ্ধ জীবনের পরম সুখ ও শান্তি। জীবনে ছন্দের একবার প্রতিষ্ঠা হলে, তা আর নষ্ট হয় না। ১২৪ ব্ৰহ্মবিদ্যা কী গৃহস্থাশ্রমে এই ছন্দোময় জীবনের আবশ্যকতা অত্যন্ত বেশী, এখানে হৃদয়ে হৃদয়ে ছন্দের ক্রীড়া হতে থাকে। একটি ছন্দ মূর্ত হয় নানা ব্যক্তির ভেতর দিয়ে। এ আশ্রমে ছন্দ লাভ করতে পারে না। একটা সহজ গতি-কারণ তা অবরুদ্ধ থাকে প্রাণস্তরের কোন আকর্ষণে। বিজ্ঞানের ছন্দে অধিরােহণ করলেও প্রাণের আকর্ষণ থেকে নিম্মুক্ত হয় না। তাই গৃহস্থাশ্রম ভিন্ন অন্যান্য আশ্রমের কথাও বলা হয়েছে। সেখানে প্রাণের কোন স্বাভাবিক আকর্ষণ নেই। প্রাণের ছন্দ বিজ্ঞানের ছন্দে পূর্ণ। বিরাট জীবনের স্পন্দন, আনন্দ ও আকর্ষণ এখানেই। প্রাণ তার চেষ্টাকে এই বৃহত্তর জীবনের আস্বাদ দেয়। প্রাণের চেষ্টার চেয়ে প্রাণের আরাম আরও বেশী সুখপ্রদ। প্রাণায়াম দেয় এই বিশ্রান্তি। যদি বিষয় ভােগের আকর্ষণ প্রাণে থাকে তবে প্রাণের স্বাচ্ছন্দ্য প্রতিষ্ঠা হয় না। বিষয় ভােগ হতে উপরত হলে প্রাণ পায় উচ্চ শক্তি ; সে শক্তিই দেয় ব্রহ্মবিজ্ঞানের অধিকার। সন্ন্যাসে ও বানপ্রস্থে প্রাণের বিতৃষ্ণা থেকে বিমুক্তি। সন্ন্যাস আশ্রমে জীবনের গতি স্বাধীন, উন্মুক্ত। সকল আকর্ষণ মুক্ত হয়ে ’ চেতনার বিরাট অবকাশের ভেতর প্রাণের স্বচ্ছন্দে বিচরণ। তখন উন্মুক্ত চেতনার সঙ্গে প্রাণের ছন্দের মিল। জড়তা, চাঞ্চল্য রহিত হয়ে প্রাণ স্ফূৰ্ত্ত হয় এক সহজ গতিতে। ক্ষুদ্র আকর্ষণ থেকে মুক্ত হওয়ায় এর ভেতর সঞ্চারিত হয় বিশ্ব- আকর্ষণ ও বিশ্বগতি। জ্ঞান কেন্দ্রে প্রতিষ্ঠিত হয়ে সকল বিশ্বে আত্মারই প্রকাশ দেখে। প্রাণ, মন হয় বিরাটের ছন্দে পূর্ণ, অনুভূতির গভীর স্তরে নিমগ্ন। আশা আকাঙ্ক্ষার উপনিষদের আলাে অভিসন্ধানে এরূপ চিত্ত-স্বাচ্ছন্দ্য হয় না। জ্ঞান স্বাচ্ছন্দ্য ও অভয়। সন্ন্যাসযােগে এই স্বাচ্ছন্দ্যের শ্রেষ্ঠ পরিণতি। বিরাট জীবনের ছন্দ এরূপ স্বাচ্ছন্দ্যেই প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু এর মুখ্য ফল আত্ম-প্রতিষ্ঠা, নিরন্তর আত্ম-স্মৃতি ; স্বাভাবিক জীবনের কিঞ্চিৎ আকর্ষণ থাকলেও এই স্মৃতি সম্ভব হয় না। সাধারণ জীবনের বিস্মৃতি হতে হয় এই স্মৃতির সঞ্চার । আত্ম-স্মৃতির জন্যেই সন্ন্যাস আবশ্যক। যাজ্ঞবল্ক্য এই আত্মজ্ঞানে পূর্ণ প্রতিষ্ঠা লাভের জন্যে প্রব্রজ্যা গ্রহণ করেছিলেন । পরিপূর্ণ আত্মপ্রতিষ্ঠা হলেই সংসারের বােধ নষ্ট হয়ে যায়। বৃহদারণ্যক উপনিষদে বলা হয়েছে :——“এই আত্মাকে জেনে ব্রাহ্মণের পুত্র, বিত্ত, ধনের স্পৃহ হতে মুক্ত হয়ে ভিক্ষাচৰ্য্যা গ্রহণ করেন। মানুষের এষণার ভেতর এই তিনটিই প্রধান। এদের মূলে আছে জীবত্বের আকর্ষণ, এ আকর্ষণ হতে মুক্ত হবার [ক্ত হবার জন্যে সন্ন্যাসযোগের ব্যবস্থা হয়েছে।” সন্ন্যাস দু রকম হতে পারে। জ্ঞান লাভের জন্যে সন্ন্যাস, পূর্ণ জ্ঞানে প্রতিষ্ঠিত হবার জন্যে সন্ন্যাস। প্রথমটিকে বলা হয় বিবিদিষা-সন্ন্যাস, দ্বিতীয়টিকে বলা হয় বিদ্বৎ-সন্ন্যাস। বিবিদিষা-সন্ন্যাসের মূলে আছে ব্রহ্মবিজ্ঞানের আস্পৃহা, বিদ্বৎ-সন্ন্যাসের মূলে আছে ব্রাহ্মীস্থিতির আশূহ। জ্ঞান লাভ হলেও জ্ঞানের স্থিতির জন্যে আবশ্যক হয় কৰ্ম্মবিরতি। ১২৬
ব্ৰহ্মবিদ্যা কী
জ্ঞানকে দৃঢ় করতে হলে জীবনের সকল বেগ এমন কি সকল
ছন্দেরও অবসান করা দরকার।
জ্ঞান মৌন প্রতিষ্ঠা। এ জন্যেই অন্তরের সকল গ্রন্থির
উন্মােচনের প্রয়ােজন। বিদ্বৎ-সন্ন্যাস এই অধিকার দেয়।
জীবনের স্বাধীন গতিও এখানে শান্ত। যেখানে জীবনের
সকল ছন্দের বিরাম জ্ঞানী সেখানে জাগ্রত।
১২৭
উপনিষদ ও বর্তমান ভারত বৰ্তমান সময়ে সভ্যতার দৃষ্টি ও লক্ষ্য নিরূপণ করা কঠিন। নানা ভাবধারার সঙ্গে আমরা পরিচিত হচ্ছি। দার্শনিকেরা অভিব্যক্তির ধারার সংঘর্ষের মধ্যে দিয়ে বিরাট বােধের সন্ধান পাচ্ছেন। সৃষ্টি অগ্রসর হচ্ছে একটা সমষ্টি চেতনার দিকে, যার ফলে সত্য, সুন্দর, শিবের বিকাশ হবে। অভিব্যক্তি ধারার উৰ্দ্ধগতিতে সৃষ্টি এখন উচ্চতর স্তরে উপনীত হচ্ছে। বৈজ্ঞানিকেরা কিন্তু বলেছেন সৃষ্টি ধ্বংসের পথেই যাচ্ছে। সৌরলােকের নাকি এমন কিছু পরিবর্তন হচ্ছে যার জন্যে বিশ্বধ্বংসের আশঙ্কা আছে। অন্যদিকে কবির দৃষ্টি মানবত্বের অভিনব মূৰ্ত্তি দেখতে পেয়েছে, সে গাইছে মানবের জয়গান । বৈজ্ঞানিকের দৃষ্টি বা দার্শনিকের দৃষ্টিতে বিশ্বের গতির রূপ যাই হােক না কেন, বর্তমান সভ্যতার প্রধান কথা হচ্ছে মানবের অধিকারের কথা। সকল দেশেই মানব সমাজ- সংস্থিতির পরিবর্তন চলছে। মানুষ তাকে বুঝতে চাচ্ছে মানুষের অধিকার নিয়ে। শুধু জ্ঞানের কথাতেই সে পরিতৃপ্ত নয়, সে চাইছে এমন কোন প্রাপ্তিকে যা তাকে শুধু একটা কল্পলােকের আদর্শ দিয়ে তৃপ্ত করবে না, তাকে মণ্ডিত করবে মানবত্বের পূর্ণ মহিমায়। মানুষ অলীক নয়, সে এখানে চায় ১২৮
উপনিষদ ও বর্তমান ভারত
সব প্রাপ্তিকে। আজ সে চাইছে তাকে বুঝতে, তার শত
দুৰ্বলতা, কুসংস্কার থেকে মুক্ত হয়ে শুভ্র ও অখণ্ড মানবত্ব
লাভ করতে। “সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই”
এই হয়েছে আজ সভ্যতার কথা। এই কথাটি আজ রূপ
নিচ্ছে শুধু সমাজে নয়, দর্শনেও। প্রাচীন কালের দর্শনের
গতি ছিল এক বিশ্বাতীত সত্তার দিকে যেখানে মানুষ মুক্ত হয়
তার খর্বতা থেকে। সেখানে সে পেত অশরীরী বাণী ও
সত্য, সুন্দর, মঙ্গলকে। মানুষ তৃপ্তি খুজেছে সেখানে কারণ
সেইখানেই সে পেত তার স্বরূপকে।
একালের দার্শনিকেরা এ কথাকে অস্বীকার করেননি। তবে
তারা বলেন সভ্যতার ক্রমবিকাশে এই মৰ্ত্ত নিচ্ছে অমৃতের
রূপ। এই অমৃতকে রূপ দেবার জন্যই মানবসমাজে সব চেয়ে
আজ বড়াে হয়েছে মানুষের অধিকারের কথা, মানুষের মুখের
কথা। তাই আজ সাম্যবাদের অবতারণা। সকলের ভেতর
সুখের ও আত্ম-বিকাশের সমান সুযােগ দেবার কথা হচ্ছে।
ধনী ও নিধনের শ্রেণীবিভাগ নষ্ট করে মানুষকে সমান
অধিকার দিয়ে সকলেরই বিকাশের পথ উন্মুক্ত করতে হবে।
সমাজতন্ত্রবাদীদের কথা এই। আর যারা সমাজতন্ত্রবাদী
ন তারা জাতিবিশেষের সামর্থ্য ও শক্তিকে স্ফূৰ্ত্ত করে’
শক্তিমানের যােগ্যতা ও প্রতিষ্ঠাকে স্থাপন করতে চাইছেন।
সকল মানবেরই সমান অধিকার নেই, হতেও পারে না।
প্রকৃতি বৈষম্যই সৃষ্টি করে ; প্রকৃতিগত বৈষম্য নষ্ট
১২৯
উপনিষদের আলো
গুণ
করলেই মানব সমাজের বৈচিত্র্য নষ্ট হয় এবং শক্তির ক্রমশঃ
হ্রাস হয়। শক্তির সঞ্চার প্রকৃতিগত বৈষম্য থেকে—এই
বৈষম্য থাকবার জন্যেই মানুষের ভেতর আছে একটা তীব্র
আকাক্ষা, যার ফলে তার যােগ্যতা অর্জনের চেষ্টা।
ও শক্তিগত অধিকারের ফলে মানব সমাজে উচ্চ নীচ
পরিস্থিতি সকল সময় বিদ্যমান থাকবে। সাম্যবাদের মূলে
যে দৃষ্টি আছে তা অস্বাভাবিক। গুণ-বৈষম্য অস্বীকার করে
বলেই তা সমাজের হিতকর নয়।
অবশ্য বর্তমান জগতে একথাগুলি প্রধানতঃ উঠেছে অর্থ ও
সাম্রাজ্য সমস্যা নিয়ে। জার্মানী ও ইতালী তাদের জাতীয়
গৌরবে উদ্বুদ্ধ—রাশিয়া সাম্যবাদে। কিন্তু এ দুইএর ভেতর
বর্তমান আছে একটা রাজনৈতিক পরিস্থিতির কথা। রাশিয়া
সমস্ত জগতে মানুষের ভেতর শ্রেণী বিভাগ চায় না এবং সকল
মানব সমাজকে আহ্বান করেছে বিশ্ব-মানবসঘ সৃষ্টি ক'রে
একই ভাবে অনুপ্রাণিত করতে। অনেক বিষয়ে পার্থক্য
থাকলেও এদের প্রধান পার্থক্য হচ্ছে মূল লক্ষ্য নিয়ে।
ইতালী ও জাৰ্মানী প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে তাদের জাতির
অভুদয় ।
তার শক্তিকেই জাতির শ্রেষ্ঠত্বের পরিচয় বলে
মনে করে। রাশিয়া চাইছে সকল জগত থেকে অর্থনৈতিক
অসামঞ্জস্য দূর করে ধনীও শ্রমিক বিভাগ লােপ করতে।
০
জার্মানীর ও ইতালীর বর্তমান রাষ্ট্র দৃষ্টির পশ্চাতে একটা
দার্শনিক দৃষ্টি আছে। ইতালীতে জেটিলে, জার্মানীতে
১৩০
উপনিষদ ও বর্তমান ভারত
নীটশে ও বর্তমানে অ্যালবার্ট লিবার্ট ( Albert Liebert)
রাষ্ট্রের আধ্যাত্মিক ভিত্তি রচনা করেছেন। জেটিলে বলেন,
একটা গভীর আধ্যাত্মিকতার দ্বারা ফ্যাসিজিম পরিচালিত।
ফ্যাসিজিম শুধু একটা দার্শনিক মতবাদ নয়, এটি ভাবনার
নবীন প্রেক্ষা নয়, জীবনের নবীন
-জীবনের নবীন গতি। আধ্যাত্মিকতা
এর স্বরূপ ও প্রধান বিশেষত্ব ( Fascism & Culture )
জেটিলের মতে সক্রিয় চৈতন্য বিশ্বের অন্তরে বিরাজ কচ্ছেন।
সৃষ্টি তারই বিকাশ, চেতনার ধর্ম প্রকাশশীলতা, স্বচ্ছতা ও
ক্রিয়াশীলতা। এই অবিশ্রান্ত আত্মপ্রকাশের গতি অনন্তে
প্রসারিত। ইহার কোন চ্যুতি নাই। এ গতি ক্রমশঃই
মানুষে স্ফুর্ত হচ্ছে, এ গতিতে মানুষে ঈশ্বরে এক গভীর
সম্বন্ধ। অধ্যাত্মশক্তিকে সমর্পণ দ্বারা যত আকর্ষণ করতে
পারা যায়, ততই বিরাটের শক্তিতে পরিচালিত হওয়া যায়।
ইন্দ্রিয়-গ্রামের ও মনের সঙ্কীর্ণতা হতে মুক্ত হতে না পারলে
অন্তরের গভীরতম প্রদেশে এ শক্তির স্ফুরণ সম্ভব নয়। একে
পূর্ণরূপে জানাবার এবং পূর্ণ বিকাশের আহ্বান করবার জন্য
মানসিক 479947 (intellectual concepts ) woto
হতে হবে।
মন তার চিন্তা প্রণালীর ( thought collcepts ) ভেতর
তা হতে মুক্ত হয়ে সে অন্তরতম শক্তির প্রেরণাকে
অনুভব করতে পারেনা।
এ শক্তির স্বৈরগতি কিছুর দ্বারা
নিয়ন্ত্রিত হয় না ।
এ গতি যার ভেতর যত প্রকাশিত, সে তত
১৩১
উপনিষদের আলাে উচ্চ অবস্থা প্রাপ্ত, মানব নয় অতিমানব। অতিমানব অধ্যাত্ম শক্তিতে উদ্দীপ্ত, পরিচালিত। সাধারণতঃ বিজ্ঞানের দৃষ্টি একটা বাস্তবতার ভেতর আবদ্ধ, সে সত্যের অনুসন্ধান সেখানেই করে। মানুষের জ্ঞানের বিষয় হয়ে এ জগৎ উদ্ভাসিত, তার সত্তা জ্ঞানের অতিরিক্ত। কিন্তু যারা অধ্যাত্মবাদী তারা জ্ঞানের অতীত জগৎকে সত্য ও বাস্তব বলে স্বীকার করেন না। মানুষের সত্তা বিজ্ঞানের উর্দ্ধে স্থিত। স্বাধীনতা তার স্বরূপ, স্বতন্ত্র তার বিকাশ। এই চেতনার স্ফুর্তিই সৃষ্টি, বিজ্ঞান বিশ্বের মূল শক্তির স্বরূপ এখনও ধরতে পারেনি। তার শক্তি ও ক্রিয়া একটা স্থিতিশীল বাস্তব বিশ্বে আবদ্ধ। ফ্যাসিষ্ট দর্শন এরূপ স্থিতিশীলতার স্থানে চেতনার স্বাধীন গতিতে বিশ্বাসবান। এই অধ্যাত্মশক্তি কার্যকারণ নিয়ন্ত্রিত বিশ্ব হতে মুক্ত। তিনি বলেছেন, এই অতীন্দ্রিয় জগতের সংবাদ আমেরিকার উইলিয়াম জেমসের ভেতর দেখতে পাওয়া যায় । ইন্দ্রিয় ও বুদ্ধির জগত হতে সম্পূর্ণ বিভিন্ন পরিধির জগতে আমাদের সত্তা বিলীন হয়, একে অনুভূতির অপ্রাকৃত ভূমিকা বলা যেতে পারে; আদর্শের প্রেরণার ইহাই প্রসূতি। আমাদের নিবাস স্থান এই অপ্রাকৃত বিশ্বে, ব্যবহার জগতে নয়, কিন্তু অপ্রাকৃত বলেই ইহা পূর্ণরূপে প্রাকৃত হতে ভিন্ন নয়-- ইহা অবশ্যম্ভাবিরূপে প্রাকৃত জগতে অব্যর্থভাবে ক্রিয়াশীল দিব্য শক্তি দ্বারা এই উর্ধলােক হতে 611a11 6262 0977.9 I ( The Varieties of Religious Experience page 519 ) ১৩২
উপনিষদ ও বর্তমান ভারত
জন্ ডুইই বলেন (Jolin Dewy) আধ্যাত্মিক সত্তাই সার সত্য।
প্রাকৃত, অপ্রাকৃতের বিভেদ সার্থকতা শূন্য। প্রাকৃত বলতে যা
বুঝি তা সত্যিই অপ্রাকৃত। বিজ্ঞান প্রকৃতির স্বরূপের পরিচয়
দেয়, প্রকৃতির স্বরূপ বুঝতে হ’ল, অধ্যাত্ম বিজ্ঞানে প্রবেশ
করতে হবে এবং এই দৃষ্টিতে জ্ঞানের অতিরিক্ত প্রকৃতির
কোন বাস্তবতা নাই।
জাৰ্মাণীতে হেগেলের বিজ্ঞানবাদের চেয়ে সেপেনহারের
শক্তিবাদের দর বেশী । অন্ততঃ জাতীয় জীবন এই
শক্তিবাদকে তাবলম্বন করে আত্মপ্রকাশে তৎপর। নীটশে
মানবের ভেতর অতিমানবের প্রকাশ দেখতে পেয়েছেন, এই
অতিমানব বিশ্ব শক্তির প্রতীক, মানব স্থিতির উর্দ্ধে তার
স্থান। জাতীয়তা বােধকে অতিক্রম করে বিশ্বমানবের কথাটি
তার ভিতর বেশ পরিস্ফুট নয়। হেগেলে অতিমানববাদ
সুস্পষ্ট নয়। ব্যক্তির অতিমানবত্ব তার দার্শনিক দৃষ্টির সহিত
সুসঙ্গত হতে পারে না। রাষ্ট্রের আধ্যাত্মিক স্বরূপতা স্বীকার
করলেও, দান্তের ন্যায় বিশ্বসাম্রাজ্য বােধে তিনি উদ্বোধিত
তার মতে বিরাটের অভিব্যক্তি রাশিয়ান ষ্টেটেই
নন।
আবদ্ধ।
p
নব্য হেগেলবাদ ( Neo llegeliailisli) ব্যাখ্যাত আলবার্ট
লিবাট ( Albert Liebert) হেগেলের জ্ঞানকে ( resoll)
অধ্যাত্মশক্তির : পৰ্য্যায়ভুক্ত করেছেন। জ্ঞান মানুষের
ভেতর অধ্যাত্মবহ্নি। এই অধ্যাত্মবহ্নিতে অতিমানব দীপ্ত।
উপনিষদের আলাে তিনি সাধারণ বুদ্ধির অতীত, দিব্যশক্তি সমতি। এইরূপ শক্তি সমন্বিত পুরুষই জগতের স্বাভাবিক পরিচালক। বিশ্ব চেতনার আত্মধ্যানে উদ্ভূত, জগৎ এরই লীলায় স্পন্দিত। প্রেমে সনাতন দ্বন্দ্বের ( Dialectic ) সমন্বয় । প্রেমের ভেতর দিয়েই জীবন ফুৰ্ত্ত হয় বিশ্ব সমন্বয়ে । প্রেমে সার্বভৌমিক জীবনছন্দের বিকাশ, এতে কোথাও একটু অসামঞ্জস্য দেখতে পাওয়া যায় না। শক্তির বিকাশ দ্বন্দ্ব রহিত নয় তার কাজই হচ্ছে অনমনীয়কে নমনীয় করে’ আত্মপ্রতিষ্ঠা করা। প্রেম সর্বত্র সমতা প্রতিষ্ঠা করে। আনন্দে বিশ্বের সমন্বয় উল্লাসে জাগায়ে তুলে। নীটশের অতিমানব প্রতিষ্ঠা ও শক্তির মূর্তি; শ্ৰী, সৌন্দৰ্য, বিশ্বছন্দের ফুর্তি নয় । •• নীটসে খৃষ্টের আদর্শকে নিন্দা করেছেন। তার মতে খৃষ্টের ভাব ও আদর্শ মানুষকে দুর্বল করে এবং জীবন যাত্রার পথে মানুষকে অনুপযােগী করে তােলে। নীটশের অতিমানব বীৰ্য্য ও শাের্যের প্রতীক, অমানুষিক শক্তিতে পূর্ণ ; তার দৃষ্টি বদ্ধ ভােগও ঐশ্বর্যের দিকে, অনন্ত প্রসারিত প্রীতি ও শ্রদ্ধার দিকে নয়। বুদ্ধ বা খৃষ্ট নীটশের মতে অতিমানব নন্। যে ধৰ্ম্ম বা মতবাদ জীবন যাত্রায় মানুষকে অশক্ত করে সেই ধৰ্ম্মকে তিনি শ্রদ্ধার অবদান দিতে রাজী নন্। অসীম ক্ষমতার অধিকারী হয়ে বিশ্বমানবের ওপাের কর্তৃত্ব করা, বিশ্ববিধানের নেতৃত্ব করাই হল এরূপ অতিমানবের বিশেষত্ব। ১৩৪
উপনিষদ ও বর্তমান ভারত
মানুষের এরূপ অভ্যুদয় সম্ভব ইচ্ছাশক্তির অনুশীলনের দ্বারা।
সৃষ্টির অসামঞ্জস্যকে দূরীভূত করে বিশ্ব শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা
করা শক্তির কাজ, কিন্তু উদার সত্যের দৃষ্টি
সত্যের দৃষ্টি সম্পন্ন না
হলে শক্তিমান স্ফীত গর্বে মহিমার স্থানে লাঘবতাকেই
বরণ করে নেয়। শক্তি জ্ঞানের মহিমা হতে চ্যুত হলেই
বিশ্বাত্মবােধ শূন্য হয়।
সত্য হতে শক্তিকে যারা পৃথক করে দেখেছেন তার।
আধ্যাত্মিকতার নামে ধর্মান্ধতাকেই প্রশ্রয় দিয়েছেন। এরূপ
শক্তির স্ফুর্তিতে জ্ঞান বিজ্ঞানের সঞ্চার নেই। প্রাণের সঙ্কুচিত
বৃত্তিতেই এর উৎপত্তি। সত্যে বিধৃত শক্তি সামঞ্জস্যের
আশ্রয় ও কারণ। সত্য পূর্ণ সমন্বয়ের মূর্তি। বিরুদ্ধ শক্তিকে
সমন্বয় করেই সত্য জয়শ্রী মণ্ডিত। সকল বিরোধের অবসান
সত্যের স্বরূপে। সত্য আজ খণ্ডিত বলেই সভ্যতার এত
গ্লানি, তাই জাতি সংঘর্ষে বিশ্বমানবের' অন্তর দলিত।
সভ্যতার ইতিহাসে সত্যের ছন্দ মূচ্ছিত, স্বতঃ ফুর্ত মানবতার
সুষমা বিদূরিত। যেখানে শক্তি সত্যে আশ্রিত সে আধারের
একটি উচ্চতা ও ব্যাপকতা আছে। সে বিশ্বকে দলিত
ও মথিত করে না। তার প্রজ্ঞাচক্ষুতে আত্মস্বরূপ্নে বিশ্বকে
দেখে, বিশ্বের মধ্যে আত্মরূপকে দেখে। এ কথা খুবই
ঠিক। অতিমানবের ভেতর যেমন আছে সত্তা জ্ঞান ও
শক্তির উচ্চত, তেমনি আছে প্রেমের ব্যপকতা।
বিরাট
বােধে, এরূপ পুরুষের অন্তর বিশ্ব মৈত্রীতে
উদ্বোধিত ।
উপনিষদের আলাে
অতিমানব সাধারণ মানুষ থেকে ভিন্ন, প্রকৃতির সম্পূর্ণ
বিরােধী ( cotra-lattural) হয়ে নয়, বরং প্রকৃতির প্রভাবকে
অতিক্রম করে’ ( super-latural )।
এ জন্যেই আধ্যাত্ম
জীবনে প্রাকৃত জীবনের সকল ভয়, সন্দেহ দূরীভূত হয়।
হল শান্তির জীবন, ছন্দের জীবন । এ হল জীবনের
সাবলীল গতি। ছন্দ প্রকাশিত জীবনের সঙ্গীতে, জীবনের
রূপবৈচিত্রে।
অধ্যাত্ম জীবনের আপৃহা উচ্চ থেকে
উচ্চতর অনুভূতির সঙ্গে অশরীরী তত্ত্বের দিকে ধাবিত।
অধ্যাত্ম জীবন জ্ঞানে, ধ্যানে, ও ও সৌন্দর্য্যে প্রকাশিত
সর্বত্রই সে অতীন্দ্রিয় সত্তায় বিকশিত, সহজ বুদ্ধির দ্বারা
অধিকৃত। হিন্দুর দৃষ্টি এখানে নিবদ্ধ । এরূপ বিশ্বছন্দ শূন্য
হলে প্রকৃত আধ্যাত্মিকতার স্বরূপ চুতি হয়। জার্মানী ও
ইটালীতে হয়েছে তাই। উদারতার স্থানে এসেছে সঙ্কীর্ণতা।
সেপেনহার শক্তিবাদের আদর্শে এত আকৃষ্ট ছিলেন যে
তিনি একস্থানে বলেছেন, “উদারতা ও বিচার বুদ্ধির উন্মেষে
মানুষ শক্তির শাসন ( authority) অবজ্ঞা করতে থাকে,
মানব সমতও প্রজাতন্ত্রবাদ ষ্টেটকে ধ্বংস করেছে।” বস্তুত
ষ্টেট ( কি জাৰ্মাণী বা কি ইতালীতে) সমষ্টিবােধর প্রতীক
নয়, ইহা শক্তিমানের শক্তি ব্যুহ, তারই ভেতর দিয়ে জাতীয়
সমাজের পরিচলনা ।
জার্মণী ও ইতালীর এরূপ অধ্যিাত্মিক শক্তিবাদের স্থানে
রাশিয়ার সমাজতন্ত্রবাদের
প্রতিষ্ঠা।' ফ্যাসিজম হতে
উপনিষদ ও বর্তমান ভারত
০ ০
বলসেভিজিমের পার্থক্য বিশেষ করে দুটি বিষয় নিয়ে একটি
শক্তির স্বরূপ বিচারে, আর একটি সমাজের গঠন বিষয়ে।
রাশিয়া শক্তির অধ্যাত্মরূপের স্থানে জড় রূপকেই গ্রহণ
শক্তির প্রাথমিক রূপে চেতনার স্বতঃ ঘূর্তি
নেই। মার্কসের ভাবধারায় হেগেলের ছায়া থাকলেও,
হেগেল হ’তে তার মত সম্পূর্ণ রূপে ভিন্ন। বিশেষতঃ
তত্ত্বের দিক দিয়ে ও ইতিহাসের স্বরূপ বােধের দিক দিয়ে।
করেছে।
সৃষ্টির
হেগেলের মতে বিশ্বসৃষ্টি চেতনার আত্মপ্রকাশ।
সহজ প্রেরণা সেখানে। মার্কসের মতে চেতনা স্বতঃস্ফূর্ত
নয়। জড়জগতের সম্বন্ধে মানুষের নানা প্রবৃত্তির উৎপত্তি।
এগুলির সমষ্টি জ্ঞানের স্বরূপ। জ্ঞান বলে কোন পদার্থ
বিশ্বের মূলে নেই। সত্তা { Being ) জ্ঞানের উদ্বোধক।
জ্ঞান সত্তার উদ্বোধক নয় ।
বলশেভিজ ও ফ্যাসিজম এর এখানে মূলগত ভেদ।
ফ্যাসিজম স্বতঃসিদ্ধ জ্ঞানের অস্তিত্বে বিশ্বাসী। বিষয়বস্তু
অপেক্ষা না করে জ্ঞান স্বপ্ৰভায় উদ্ভাসিত। সৃষ্টি প্রারম্ভে
জ্ঞান বিষয়-বিষয়ী বােধে বিকশিত। বিষয়কে অপেক্ষা
করে উৎপত্তি হয় না। বলশেভিক মতে বিষয় নিরপেক্ষ
জ্ঞানের অস্তিত্ব স্বীকৃত হয় না। বিষয় প্রধান-জ্ঞান
অপ্রধান। বিষয় সংস্পর্শে চেতনার জাগরণ। বিষয় সমন্ধ
ছিন্ন হলে চেতনার নিমীলন। বিষয় অতিরিক্ত হয়ে চিতি-
স্পন্দন ( Idee force) কিছু নেই। চিতি স্পন্দনের বিকাশ,
-
১৩৭
#
১৮
উপনিষদের আলাে
মানস রূপ ধারা ( Ideas or concepts ), বস্তুতঃ বিষয়েরই
অবভাস। বিষয় মানসমূৰ্ত্তি নেয়। তার ভেতর অবৈষয়িক স্থির
বিজ্ঞানের কোনও রূপ নেই।
মানুষ স্পন্দনাত্মক বিশ্বে অবস্থিত। বাহিরের স্পন্দনের
আঘাতে তার জ্ঞানের ঘূর্তি। এ স্পন্দন বাস্তব পদার্থ ।
জ্ঞান ইহার প্রতিক্রিয়া। এই স্পন্দন ক্রমশঃ নবীন বিকাশ
প্রাপ্ত হয় যা এর প্রাথমিক স্বরূপে নেই। শক্তি হতে প্রাণ,
প্রাণ হতে মন, মন হতে বিজ্ঞান। শক্তির স্পন্দন ক্রমশঃ
ভিন্ন রূপ গ্রহণ করে। এ রূপগুলাে এক পৰ্য্যায় ভুক্ত না
হলেও, শক্তির স্পন্দন হতে সকলে উদ্ভূত। একই শক্তির
বিভিন্ন বিকাশ। প্রাচীন হতে নবীনের অভ্যুদয়, কিন্তু নবীন
প্রাচীনের পূর্বানুবৃত্তি নয়। একেই বলে নবাগম অভিব্যক্তি-
978'( Theory of Emergent Evolution )! চেতনার
কোন নিত্যস্থিতি এতে স্বীকৃত হয়নি।
.চনা অভ্যুদয়
পর্যায়ে একটি নবীন ঘূর্তি। শক্তিবিজ্ঞান, প্রাণবিজ্ঞান,
মনােবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান অভিব্যক্তিবাদে এগুলি বিজ্ঞানের
ক্রমিক বিকাশ।
এই নবাগম অভিব্যক্তিবাদে সৃষ্টিতে স্বাতন্ত্র্য প্রকাশ স্বীকৃত
হয়। বীজে সমগ্র বিশ্ব অনুস্ত হয়ে থাকে না—প্রকৃতি
একই পথ সৰ্ব্বত্র তানুসরণ করেনা। প্রকৃতি স্বৈরগতি।
গতির কোনও নিয়ম নেই। তার প্রকাশ 'এক পথ অনুসরণ
করে না। এফ. এঞ্জেলস্ ( F. Engels ) বলেছেন--প্রকৃতি
তার
১৩৮
উপনিষদ ও বর্তমান ভারত
এক সনাতন গতিকে অবলম্বন করে অভ্যুদয়ের বিকাশে
বৈচিত্র্যহীন পুনরাবৃত্তি সঞ্চার করেন। কিন্তু বাস্তব ও নবীন
ইতিহাস রচনা করে। বিশ্বের মূলে কোনও বিজ্ঞানশক্তি বা
অধ্যাত্মশক্তি নেই। ষ্ট্যালিন ( Stali) বলেন বিশ্ব স্ফুর্ত
হচ্ছে জড়াত্মিকা প্রকৃতির উন্মেষ তানুযায়ী । এর জন্য কোনও
বিশ্বাত্মিকা অধ্যাত্মশক্তির প্রয়ােজন নেই। ( Dialectical
and Historical Materialism by Staliu ). cafaat
( Lenin ) বলেছেন ‘চেতনা সত্তারই অবভাস। “প্রকৃতি
সমষ্টিগতভাবে পুরাতনের পুনরাবৃত্তি করলেও সৃষ্টির ক্রম
উচ্চতার পর্যায়ের দিকেই ধাবিত,” (gel's Socialist
Utopian & Scientific ) ইতিহাস নবীনের ক্রমিক বিকাশ,
সনাতনের শাশ্বত কহিনী নয়।
দার্শনিকতায় ফ্যাসিজম ও বলশেভিজ ম পূর্ণ বিরুদ্ধমত।
এইজন্য তাদের সামাজিক সংস্থিতিও বিভিন্ন । ইটালী ও
জামাণীতে অধ্যাত্মশক্তি শীর্ষস্থানে। এইজন্য ফ্যাসিষ্ট ষ্টেটের
একটা আধ্যাত্মিক রূপ আছে ! জড়শক্তিকে অবলম্বন করে
অধ্যাত্মশক্তি ফুৰ্ত্ত হতে চায়। এটা লক্ষ্য হলেও চেতনার
দ্বারা জড়ের কোন রূপান্তরের কথা শুনতে পাই না।
তাধ্যায়ের নামে ফ্যাসিষ্ট ষ্টেট পূর্ণভাবে শক্তিরই আধার
হয়েছে। সে শক্তির আধ্যাত্মিকতা হয়ত জাতীয় গৌরবের
ভেতর দিয়ে প্রকাশিত হচ্ছে। তার ভেতর বিশ্বচ্ছন্দের
অন্ততঃ কোন প্রকাশ নেই। রাশিয়াতে বাস্তব সুখসম্পদের
কথা এত বড় হয়েছে যে রাশিয়া কোন স্বপ্ন-বিলাসী অমরার
উপনিষদের আলো
সুখের কল্পনা করেন। সােভিয়েটে ফ্যাসিষ্ট ষ্টেটের ন্যায়
কোন আধ্যাত্মিকতার রূপ নাই। এরূপ আধ্যাত্মিক
বিকাশের দিকে সােভিয়েটের কোন লক্ষ্যই নাই। ষ্ট্যালিন
বলেছেন রাশিয়াতে মার্কসিজম ও লেনিনিজ-এর শক্তির
মূলীভূত কারণ এই যে ইহা বাস্তব জীবনের জড়সম্পদ বৃদ্ধি
ভিন্ন অন্য কোনও চেষ্টা করেনি। (Dialectic & Historical
Materialism. PP18-19 )
দার্শনিকতা, যাহা হউক, জার্মণী ও রাশিয়ার লক্ষ্য ফলত?
একই,এমন সমাজ বিধান রচনা—যাতে মানুষের শক্তি
বৃদ্ধি হয়ে প্রভূত সুখ সম্পদ হতে পারে। রাশিয়ার
স্বপ্ন এই যে বিশ্বে মানুষের সমান অধিকার দিয়ে,
মানুষের সব অভাব দূরীভূত করে, অখণ্ড মানব সমাজ
রচনা করা। অর্থনৈতিক বৈষম্য থেকে উৎপন্ন হয় যত
সমাজব্যাধি, উচ্চনীচের সংস্থিতি। প্রকৃত মানবতা সাম্যের
বেদীতে প্রতিষ্ঠিত। জামণী ও ইটালীর দৃষ্টিতে প্রকৃতির
বৈষম্য আছে, এবং প্রকৃতিগত বৈষম্য নিয়ে মানব সমাজে
শ্রেণী বিভাগ স্বাভাবিক।
রাশিয়ার আশৃহ প্রাণের পূর্ণ বিকাশ। জামণী ও ইটালীর
আধ্যাত্মিকতার দিকে দৃষ্টি থাকলেও ফ্যাসিষ্ট ষ্টেটের
বিকাশের ভেতরে কোনও অধ্যাত্ম ঘূৰ্ত্তির পরিচয় নেই।
প্রাণস্তরের বিকাশকে অতিক্রম পারে নেই।
এজন্যই ফ্যাসিষ্ট ষ্টেট ও সেভিয়েট দুই-ই নিগড়বদ্ধ সমাজের
করতে
১৪০
উপনিষদ ও বর্তমান ভারত
ছবি (mechanised society)। মুক্তি ও সমতার ছন্দে
সমাজ শক্তি স্পন্দিত নয়।
জীবনে একটি অস্পৃহা আছেই। কিন্তু এই অস্পৃহার রূপ
নিয়ে ভিন্ন মতের সৃষ্টি হয়েছে—পাশ্চাত্যের অনেকের দৃষ্টি এ
রূপকে প্রাণের সঙ্গে সংযুক্ত করে। ভারতের দৃষ্টি এ রূপকে
আত্মার সঙ্গে সংযুক্ত করে। এ জন্যে ভারতে এ রূপকে এবং
তার সংবেদনাকে চিরকাল আত্মার স্বচ্ছ বিকাশের সঙ্গে স্থান
দিয়েছে। উচ্চ অভিব্যক্তির ভেতর একটি দিব্য আস্পৃহা
আছেই। আশৃহ প্রাকৃত নয়,
স্বরূপ
অপ্রাকৃত। অপ্রাকৃত বলেই সে প্রাকৃতকে নিজের ছন্দের
দ্বারাই রূপান্তরিত করে তােলে। এখানে ভারতীয় দৃষ্টির
বিশেষত্ব।
মানুষের ভেতর আছে যে প্রাণের প্রেরণা তাকেই অবলম্বন
করে মনম্বীর সন্ধান পেয়েছেন আরও উচ্চতর বিকাশের
দৃষ্টি । ফলে পাশ্চাত্যে অনেকের দৃষ্টি এ জড় শক্তির আকর্ষণ
থেকে মুক্তি পায়নি। তাদের ভাবধারার ভেতর জড়েরই স্থান
প্রধান। জড়প্রকৃতি বিশ্ব-মাতৃকা। তাকে অতিক্রম করে
চেতনার ও অধ্যাত্মরূপের অভিব্যক্তির আস্পৃহা উৎপন্ন হয়।
জড়ের ভেতর চেতনার ক্রিয়া আছে; কিন্তু চেতনা জড়
থেকে বিকশিত হয় না। উপনিষদের দৃষ্টি জড় বলে কোন
পদার্থ ই স্বীকার করে না; চেতনার বিকাশই বিশ্ব, এ
বিকাশের তারতম্য ভেদে জুড়তার জ্ঞান হয়— কারণ সেখানে
১৪১
উপনিষদের আলাে
পূর্ণ চেতনার সঞ্চার নেই । চেতনার সঞ্চার হলেই জড়তা
নষ্ট হয়ে যায়। চৈতন্যের বিকাশের তারতম্য থাকলেও
চৈতন্যে ভিন্ন বস্তু নেই। স্বভাব বিচুতির জন্য মানুষের
চেতনার সীমার অনুভূতি—এই স্বভাবের পূর্ণ পরিস্থিতি
তার পরম পরম কাম্য। এই পরিস্থিতি দেয় তাকে
তার বিরাট স্বরূপের অনুভূতি, যা জ্ঞানে স্বচ্ছ, আনন্দে পূর্ণ,
সকল বন্ধন হতে মুক্ত।
একে ঈশ্বর
উপনিষদের এ মতের ছায়া Plotinus সুস্পষ্ট।
Plotinus অদৃশ্য ও অব্যক্তের উপাসনাই করেছেন। পরতত্ত্ব
জ্ঞানে বা ধ্যানে পাওয়া যায় না। এর স্বরূপ জ্ঞাতা ও
জ্ঞেয়ের অতীত। এ তত্ত্ব তা নয়, সে সব শক্তি নয়, যা ধ্যানে
বা অলৌকিক দর্শনে (vision) পাওয়া যায়।
বলে ভাবলেও, এর স্বরূপঙ্ক্ষতি হয়। ঈশ্বরে সত্তার ব্যক্তিত্ব
আছে। এ কিন্তু নির্ব্যক্তি। বিশ্বস্থ বিজ্ঞানের (Cosmic
Ideation ) o warfa fauhota ( Eternal Silence )
পৰ্যায়ে স্থান নেই। বিজ্ঞান-পুরুষের জ্ঞান একে নির্ণয়
করতে পারে না। এ সনাতন স্তব্ধতা সকল বিজ্ঞানের অতীত।
এইখানেই : ঔপনিষদ বিদ্যা লাভ করে চরম সার্থকতা।
ঔপনিষদ বিদ্যার এই শ্রেষ্ঠ রূপ। এ বিদ্যাকে অধিকৃত
করবার জন্যে সত্তার সব স্তরে জাগিয়ে তুলতে হয় বিরাটের
অনুভূতি। বিরাটের অনুভূতি প্রাণে, মনে, বিজ্ঞানে
প্রতিষ্ঠিত হয়ে বিশ্ব প্রাণ, বিশ্বমন, বিশ্ববিজ্ঞানের পরিচয় দেয়।
সামর্থ্যে, জ্ঞানে, বিজ্ঞানে, পূর্ণ করে। এর প্রত্যেক স্থিতিই
১৪২
উপনিষদ ও বর্তমান ভারত উচ্চতর স্থিতির দিকে অগ্রসর করিয়ে দেয়। ঔপনিষদ বিদ্যা এরূপে আমাদের সত্তার সব লাঘবতা দূর করে ব্রহ্মতেজ, ব্রহ্ম শক্তিতে পূর্ণ করে । ৩ পাশ্চাত্য অধ্যাত্মবাদীরা যে শক্তিস্ফূর্তিকে জীবনের চরম সার্থকতা বলে মনে করেন তা বস্তুতঃ দিব্যশক্তি নয়। দিব্য- শক্তির আবির্ভাবে প্রাকৃত দ্বন্দ্বের, অসমতা ও অস্বাচ্ছন্দ্যের তিরােধান। শক্তি সাধারণ রূপে ইচ্ছাতে বিকশিত। ইচ্ছার স্বরূপ বাধা জয় করে বিকশিত হওয়া। কিন্তু, অধ্যাত্মশক্তি লীলায়িত ঘূৰ্ত্তি। যখন জড়তা ও রূঢ়তা, অনমনীয়তা স্বতঃ স্ফুর্ত বিকাশে বাধা দেয়, ইচ্ছার তখন স্ফুট প্রকাশ। বিশ্বের অন্তরে এমন শক্তি ক্রিয়াশীল যা বিশ্বকে সকল মলিনতা হতে মুক্ত করে প্রাণের ছন্দে, জ্ঞানের দীপ্তিতে, আনন্দে উল্লাসে পূর্ণ হয়। এরূপ শক্তির বিকাশে মানব সমাজের অন্তরে জড়তা ও কাঠিন্য দূরীভূত হয়। বিশ্ব সত্তার উদ্বোধনে ঋষিসংঘ প্রতিষ্ঠিত হয়। ভারতের সভ্যতার ভিত্তি তপােবনে বা নৈমিষারণ্যে, রাষ্ট্রে নয়। কত রাষ্ট্রের উত্থান ও পতন হয়েছে- কিন্তু ঋষিসংঘের এই আদর্শ এখনও অম্লান, এবং ইহা সমাজকে উদ্বোধিত করছে মহামানবতার দিকে। সাম্রাজ্যগৌরব ভারতবর্ষ কখনও করেনি, মানব সমাজের ভেতর সনাতনকে অনুভব করা, সনাতনকে বরণ করাতেই তার দৃষ্টি নিবদ্ধ। ৭ বর্তমান ভারতও এ দৃষ্টি হতে বিচ্যুত হয় নি, যদিও তার জীবনে সকল দিকে নবীনতার ক্ষুক্তি হচ্ছে। ভারতের সমাজ ১৪৩
উপনিষদের আলাে
প্রাচীন সংস্থিতিকে ত্যাগ না করলেও সমাজে নবীন ভাব
প্রবিষ্ট হচ্ছে।
রামমােহন রায়ের সময় হতে এ পর্যন্ত
একটা নূতন ভাব ধারা ভারতবর্ষে, বিশেষতঃ বাংলা দেশে,
প্রচারিত
হয়েছে। প্রাচীন সমাজের পরিস্থিতিকে এ
ভাবধারা সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করিতে পারেনি। মানবত্বের
মহিমা এবং সমাজে গতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করবার প্রচেষ্টা
রামমােহন রায়ের সময় হ'তে আরম্ভ । বিবেকানন্দ,
রবীন্দ্রনাথ, শ্রী অরবিন্দ সকলেই ভারতের নবজাগরণের সাহায্য
করেছেন। বিবেকানন্দের দৃষ্টি বেদান্তের মধ্যে নিবদ্ধ
থাকলেও, তিনি এ অদ্বৈত বেদান্তের ভেতর মানবের মহিমা ও
অখণ্ড ভারতবর্ষের একটা মানস-রূপ দেখেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ
তার বিশ্বমানবের আদর্শের ভিত্তি পেয়েছেন ব্রহ্মের বিশ্বরূপে।
শ্ৰীঅরবিন্দর জাতীয়তা বােধের মূল ভিত্তি হচ্ছে ভারতের
প্রাচীন আদর্শ। তিনি চাইছেন দেব-বুদ্ধিকে স্থাপিত করে
সমাজকে দিব্যসম্পদে ও বিভূতিতে পূর্ণ করতে, জীবনের
ভেতর অধ্যাত্ম শক্তি ও সামর্থ্যকে জাগিয়ে তুলে, মানব সমাজকে
বিশেষতঃ ভারতের অন্তঃসত্তাকে এ অাদর্শে অনুপ্রাণিত করে’
ঋষিসংঘ স্থাপন করতে। রবীন্দ্রনাথ তার স্বদেশী
সমাজে জ্ঞানদীপ্ত, পূতচরিত্র, বিশাল হৃদয় ব্রাহ্মণের
ওপাের সমাজের নেতৃত্বভার অর্পণ করেছেন। বাল গঙ্গাধর
তিলক গীতার নিষ্কাম ধর্মের ভেতর বর্তমান ভারতের মুক্তির
পথ দেখে, জাতিকে কৰ্ম্মপ্রতিষ্ঠাদ্বারা শক্তিমান করতে
চেয়েছিলেন। তারও আদর্শ ছিল জ্ঞানে, কৰ্ম্ম প্রতিষ্ঠা।
কৰ্ম্মসন্ন্যাস প্রকৃত সন্ন্যাস নয়। নিষ্কাম কৰ্ম্মই প্রকৃত সন্ন্যাস।
১৪৪
উপনিষদ ও বর্তমান ভারত
মহারাষ্ট্রে এরূপ দৃষ্টির সঙ্গে পরিচিত হই। রামদাস
স্বামীর দাসবােধে, গীতার জ্ঞানেশ্বরী টীকাতেও এর ছায়া
আছে। এরূপে প্রাচীনের আদর্শের সঙ্গে পূর্ণ সংযােগ
সূত্র রক্ষা করে' নবীন জাতীয়তার উদ্বোধন হয়েছে।
০
উপনিষদের ঋষিসংঘের আদর্শে হিন্দু সমাজ
হিন্দু সমাজ আজও
অনুপ্রাণিত। সমাজ জীবনের পরিণতি সেখানে। ব্ৰহ্মওজঃ--
সম্পন্ন পুরুষেরা সমাজের স্বাভাবিক পরিচালক। ওজঃ শক্তি-
সম্পন্ন হলে মানুষ বিশ্বছন্দে চালিত হয়।
বর্তমান ভারতের নেতৃত্ব করছেন মহাত্মা গান্ধী। বিরাট
মানবত্ববােধ সম্পন্ন তিনি। তাঁর দৃষ্টিতে বিশ্বের অন্তর্নিহিত
শক্তি প্রেমস্বরূপ। বিশ্বকল্যাণে উদ্বুদ্ধ ভারতবর্ষে মানবপ্রীতি,
মানবশ্রদ্ধা তিনি বিশেষ ভাবে প্রচার করেছেন।
ভারতের অগণিত অস্পৃশ্য সমাজকে তিনি পূত ও পবিত্র
করে তাদের জন্যে শ্রদ্ধার ও অধিকারের দাবী করেছেন।
গান্ধীজির এই মানবকল্যাণের স্পৃহা তার রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক
আন্দোলনে দিয়েছে এক অভিনব রূপ।
গান্ধীজি অখণ্ড মানবত্ব বোধে অনুপ্রাণিত। এতে অনুপ্রাণিত
হয়ে তিনি হিন্দু সমাজের বর্ণ বৈষম্য দূর করতে যেমন তৎপর
তেমনি বিশ্বে রাষ্ট্রবৈষম্য দূর করতে উৎসাহান্বিত। ভারতের
রাষ্ট্ৰীয় আন্দোলনকে তিনি মানবতার বেদীতে উন্নীত করতে
জগতের ইতিহাসে অহিংসা ও প্রেমের দ্বারা রাষ্ট্রীয়
চেষ্টিত।
১২২
উপনিষদের আলাে ব্যাপারের মীমাংসার চেষ্টা এই প্রথম। তঁার এই অবদান ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। আজ বিশ্ব-সভ্যতা বিপন্ন। পাশ্চাত্যে শক্তিবাদ ও বিজ্ঞান এমন প্রতিষ্ঠালাভ করছে যে শক্তির আতিশয্যে উদার সত্যের জ্ঞান স্তিমিত, অমান প্রেম সঙ্কুচিত। হিংসা এমন রূপে মানব সমাজকে গ্রাস করেছে যে অহিংসার সাধনায় সিদ্ধ না হলে সমাজ ও ধর্ম নষ্ট হবে। তাই আইষ্টাইন বলেছেন, “নির্যাতিত জাতির স্বাধীনতা সংগ্রামে তিনি (গান্ধী ) এক অভিনব নৈতিক উপায় উদ্ভাবন করেছেন, একান্ত নিষ্ঠা অপরিসীম শক্তির সাহায্যে তার পরিচালনা করছেন। মানব জাতির সৌভাগ্য ক্রমে আমাদের আমাদের সমসাময়িক এমন একটি জ্যোতিষ্কের অভ্যুদয় অভ্যুদয় হয়েছে যার আলােকে অনাগত ভবিষ্যতের বহুদূর পর্যন্ত আলােকিত হবে”। সমগ্র ভারতবর্ষে তিনি যে বিরাট সামাজিক সমস্যার মীমাংসা করতে চাইছেন তা সম্পূর্ণ নতুন না হলেও তা সত্যই প্রাচীন- পন্থীর দৃষ্টি হতে পৃথক। রামমােহন রায় থেকে মহাত্মা গান্ধী পর্যন্ত সকলেই ভারতবর্ষে একটা নবীন সুরের প্রবর্তন করতে চেষ্টা করেছেন। বর্ণাশ্রম ধর্মকে অনেকেই ত্যাগ করেন নি, গান্ধীও করেন নি। কিন্তু প্রাচীন সংস্থিতির বর্ণাশ্রম ধর্মের যে রূপ পাওয়া যায়, এরা, বিবেকানন্দ, শ্ৰীঅরবিন্দ, গান্ধী তা স্বীকার করেন নি। বর্ণাশ্রম প্রকৃতির স্বাভাবিক ব্যবস্থা গুণগত বিধান। কিন্তু এর দ্বারা মানব . সমাজে কোন স্থিতিশীল ও অপরিবর্তনশীল জাতিসংঘ প্রস্তুত হয় না। ১৪৬ উপনিষদ ও বর্তমান ভারত রাজা রামমােহন সংস্কৃত সম্পন্ন ব্যক্তিকেই ব্রাহ্মণ বলতেন। ব্রাহ্মণ জাতি নয়, মানবত্বের শ্রেষ্ঠ ও শুভ্র বিকাশ ( রাজার বজ্ৰসূচী উপনিষৎ দ্রষ্টব্য)। এসব আলােচনা থেকে বােঝা যায়, ভারতীয় দৃষ্টির ভেতর একটা ধারাবাহিক সূত্র আছে। একত্ব- বােধের ভেতর বৈচিত্র্যানুভূতি, সকল বৈচিত্র্যের মধ্যে সামঞ্জস্যের দৃষ্টি । ভারতীয় জীবনধারার এই বৈশিষ্ট্য। বৈচিত্র্যকে অস্বীকার করে নয়, তার ভেতর দিয়ে এককে অনুভব করেই রচিত হয়েছে সমাজের ভিত্তি। এ বৈচিত্র্যকে স্বীকার না করলে সমাজজীবন প্রতিষ্ট হয় না। একে সামঞ্জস্য করবার চেষ্টাতেই হয় সমাজের নানা রূপের সৃষ্টি। কোন সমাজেই এক স্থিতিশীল রূপ নেয় না, নিলেও বেঁচে থাকে না। গতিশীল সমাজ চিরকালই বেঁচে থাকে বৈচিত্র্যকে বুঝে, তার বিকাশ, প্রকার, ভেদকে সামঞ্জস্য, করে। ০ সমস্ত জগতের ও ভারতের এই বৰ্তমান পরিস্থিতির ভেতর ব্রহ্মবিদ্যার উপযােগিতা আছে কিনা তাই বিবেচ্য। বহুতর পরিবর্তনের দিয়ে মানবকল্যাণ ধৰ্ম্মের আদর্শ আজ সকলে গ্রহণ করছেন। সত্যই মানব জগতে এমনি একটা সময় এসেছে যে সার্বভৌমিক ধৰ্ম্মের স্থানে মানব ধৰ্ম্ম প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। এই যুগে ভারতবর্ষ নবীন ভাবে উদ্বোধিত ও অগ্রসর হলেও তার সনাতন দৃষ্টি কোথায় তাই আমাদের আলােচনার বিষয়। ১৪৭
উপনিষদের আলো
মানুষের ধৰ্ম্মের দুই রূপ। একটি শাশ্বত, আর একটি
অনিত্য। একটি মানুষের প্রকৃত সত্তার পরিচায়ক, অপরটি
কাল ও দেশানুযায়ী পরিস্থিতির ব্যবস্থা। কাল বিশেষের
ব্যক্তিত্ব স্বীকার করতে হয়, একেই কালধৰ্ম্ম বলে ( time
spirit)। কাল বিশেষে ও দেশ বিশেষে মানুষের ভাবনা ও
পরিস্থিতি বিভিন্ন । শক্তির বিশেষ ভাব গ্রহণ করেই
সভ্যতার বৈশিষ্ট্য। কালের ধৰ্ম্মে সমাজ রূপ নিচ্ছে
নানা ভাবে। তার পরিচয় নিত্যই পাচ্ছি। বর্ণাশ্রম ধর্মের
আধুনিক রূপের শৈথিল্য সুস্পষ্ট।
কিন্তু এ দেশকালের বৈশিষ্ট্যকে অতিক্রম করে মানুষের চিত্ত
কালের অতীত সনাতন সত্যের সঙ্গে পরিচিত হতে চাচ্ছে,
কারণ মানুষের মূল সেখানে। শুধু কি তাই,
শুধু কি তাই, সৃষ্টির ভেতর
দিয়েও
ও সত্যের অনন্ত প্রকাশ ও রূপের কোন লাঘব হয়নি।
মূর্তবিশ্বে সত্যের অমূর্ত রূপের পরিচয়। বিশ্বাতীত
হয়েও সত্য বিশ্বস্থ । কোন দেশ ও কালে সত্যের বিকাশ
বিশেষের ভেতর দিয়ে ফুৰ্ত্ত হয় তার বিরাট সংবেদনা।
কারণ, তাই তার স্বরূপ। স্বরূপ চ্যুতি সত্যের কখনই হয় না।
ভারতবর্ষের সভ্যতার বিকাশ হয়েছে এ সনাতন সত্যকে
অবলম্বন করে।
এ তামস স্থিতি নয়—চেতনার স্থিতি।
বিপুল সঞ্চয়ে যে পরিমাণ মানব সমাজে সুখ সম্পাদনের
কথা ছিল তা হয়নি। বরং বৈষম্য সৃষ্টি করেছে সর্বত্র,
শ্বাশ্বত ও দিব্যমানব ধর্ম হতে আমরা চ্যুত হয়েছি।
১৪৮
উপনিষদ ও বর্তমান ভারত উপনিষদের দৃষ্টি দেয় এ বিশালতা যেখানে মানুষের অন্তঃসত্তা এক সত্তারূপেই প্রতীত, প্রতীত, যেখানে বিশ্বমানবের মৈত্রী পূর্ণরূপে প্রতিষ্ঠিত। মানবের এই তাখণ্ড বােধ উপনিষদ যেমন দেয়, জগতের সাহিত্যই সেরূপ দেয় না। এজন্যেই বর্তমান সভ্যতার মধ্যে ভারতে ব্ৰহ্মদৃষ্টির আবশ্যকতা এখনও রয়েছে। সকল দেশের মানব সমাজ আজ নানাসূত্রে একত্রিত হচ্ছে। কিন্তু এ ব্ৰহ্মদৃষ্টির ভিত্তিতে মানব সমাজে একীকরণবােধ ফুট নয় বলেই আজ নানাবিধ কোলাহলের সৃষ্টি। বর্তমানে উপনিষদ দৃষ্টির আমাদেরও বিশেষ আবশ্যকতা আছে। নবীন জীবনের ঊষার আলোেক ভারতের দিগন্ত সমুদ্ভাসিত। নবীন আশায় উৎফুল্ল হয়ে ভারত আজ মানবসংঘে যােগদান করবার জন্যে উৎসুক। এ পুণ্যদিনে ভারতের দৃষ্টি কি শুধু তার জাতীয় মুক্তির দিকে বদ্ধ থাকবে ? না বােধিসত্বের ন্যায় ভারত তার বিশ্বকল্যাণের স্পৃহা নিয়ে বিশ্বসভায় যােগদান করবে ? ভারতের কল্যাণবাণী ও বিশ্বাত্মার সন্ধান শুধু ভারতেই বদ্ধ থাকবেনা--এই হবে মানব সভ্যতার প্রধান ভিত্তি। এর রচনা ভারতে আরম্ভ আরম্ভ হয়েছে বিবেকানন্দ বলেছিলেন “মূখ ভারতবাসী, অজ্ঞান ভারতবাসী আমার ভাই।” রবীন্দ্রনাথের মানসলােকের ভারততীর্থ বাস্তবেরই পরিচয়। এ ভারতে নানা ধর্মের বেদী রচিত হয়েছে—এ ভারতে নানা সভ্যতার সংমিশ্রণ হয়েছে কিন্তু ভারতের শান্ত তপােবনে যে • বিরাট ছন্দে অখণ্ডাত্মার বধে দেব, মানব, সকলেই উদার মহনীয় সত্ত্বার বিরাটানুভূতিতে মগ্ন হতেন, ৮ ১৪৯ উপনিষদের আলাে সে ছন্দের প্রতিষ্ঠা আবশ্যক হয়েছে বিশ্বের অন্তরে। কোন সভ্যতা অন্তরের দীপ্তি ভিন্ন, বাইরের কোন সংযােগ সূত্রে অখণ্ড মানব সমাজ গঠিত করতে পারেনা। এ সমতার বাণী ভারতের শ্রেষ্ঠ বাণী হলেও মােগ্যতার দৃষ্টি হতেও ভারত কখনও চ্যুত হয়নি। যােগ্যতা না থাকলে সমতার বাণীর কোন অর্থ থাকে না। এ যােগ্যতা অর্জন করবার জন্যেই উপনিষদে যােগানুশাসনের কথা। জ্ঞান দেয় সমতা, যােগ দেয় শক্তি। এ শক্তির আধার হচ্ছে ছন্দ- প্রতিষ্ঠিত প্রাণ, মন ও বিজ্ঞান। এ ছন্দোবদ্ধ জীবনে বিশ্বছন্দ বিধৃত। বিশ্বছন্দে শক্তির পূর্ণ স্ফুরণ। সমতার ওপার ছন্দ প্রতিষ্ঠিত বলেই শান্তির সঙ্গে সূক্ষ্ম শক্তির উদ্বোধন। সম বুদ্ধির স্বরূপ সৰ্ব্বত্র এক হলেও ছন্দের তারতম্য অনুযায়ী যােগ্যতার নির্দেশ। ছন্দের গৌরবে জীবন যােগ্যতায় পূর্ণ হয়। ছন্দ যেখানে ব্যাপক, শুভ্র মানবত্ব সেখানে স্বতঃ স্ফুর্ত। ছন্দের বেগ এরূপ অবস্থা লাভ করতে পারে যে, মানবত্বের স্থানে অতিমানবত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। এ মানব দিব্যশক্তির বিকাশে পূর্ণ, সমতবুদ্ধিতে প্রতিষ্ঠিত। পুরুষ বিশেষকে উপনিষদের ভাষায় ঋষি বলা হয়। উদার জ্ঞানের সঙ্গে অলৌকিক শক্তির সংমিশ্রণই ঋষিত্বের নিদর্শন। জীবনের মূলে আত্মশক্তি বর্তমান থাকার জন্যে ভারতীয় সভ্যতার লক্ষ্য হচ্ছে আত্মানুভূতির ওপাের সমতা ও যােগ্যতা স্থাপন করা। 'এ যােগ্যতা শুধু সৃজন শক্তি নয়; এ বিশ্বের সঙ্গে ঐক্যের অনুভূতি। চেতনা অন্তর্যামী। । এর নিবাস এরূপ উপনিষদ ও বর্তমান ভারত অন্তরে ও বিশ্বকেন্দ্রে। উপনিষদ জীবনের সব চাঞ্চল্য ও সব গতিকে অতিক্রম করে এই শান্ত শিব স্বরূপ তত্ত্বের আরাধনা করেছে। এ তত্ত্বের বিরাট দৃষ্টিতে সব আকাক্ষা ও কামনা নিয়মিত হয়ে গতির উর্দ্ধে স্থিতি লাভ করি। এ স্থিতি সর্বত্র বিদ্যমান, অখণ্ড। এই অখণ্ড স্বরূপে প্রতিষ্ঠিত হ'লে হৃদয়ের, বুদ্ধির আবরণ অনুষ্ঠিত হয়। চেতনার সমতার দৃষ্টি লাভ হয়। এই উন্মুক্ত চেতনায় পরিস্থিতি লাভ করতে পারলে গতির অবরােধ হয় না। জীবনের গতি স্বচ্ছ, সরল, সরস, শুভ্র ও ছন্দ যুক্ত হয়। অন্তঃকরণ প্রচ্ছন্ন বাসনা হতে মুক্ত হয় । ক্ষীণ সত্তা হতে মুক্ত হয়ে অসীমের সত্তায় প্রতিষ্ঠিত হই। এ প্রতিষ্ঠা শুধু অপরিচ্ছন্ন বােধিতে প্রতিষ্ঠিত করে না, অন্তরকে শুদ্ধ প্রেমে পরিপূর্ণ করে। আত্মপ্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিই প্রকৃত প্রেমিক। প্রেম হৃদয়ের বৃত্তি। হৃদয় যখন জীবত্বের সংস্কার হতে মুক্ত তখন সেখানে আত্ম জ্ঞান উদ্ভাসিত, প্রেম প্রতিষ্ঠিত। প্রেম আত্মার বিশ্বদৃষ্টি। আত্মার এ উদার দৃষ্টির ওপাের সমাজ সংস্থিতির ব্যবস্থা। সমাজ অসীমের ছায়া, অখণ্ড মানবত্ব বিরাটের প্রতীক। হিন্দুর দৃষ্টিতে মানব সমাজ অখণ্ড সমাজ, এর কোন দেশগত পরিধি নেই। মানব সমাজের সমতা ব্ৰহ্মদৃষ্টির ওপােরই নির্ভর করে। যেখানে সমতা অন্য কোনরূপে প্রতিষ্ঠিত হয় সেখানে তার ফল ক্ষণস্থায়ী। বৈষম্য প্রকৃতি ধৰ্ম্ম, সাম্য জ্ঞানের ধর্ম। বৈষম্য শক্তির ধর্ম। শক্তির অন্তরালে জ্ঞানের এ সমতার ১৫১
উপনিষদের আলাে
দৃষ্টি না থাকলে প্রকৃতির বৈষম্যের দ্বারা মানুষ আকৃষ্ট হবে
এবং সে বৈষম্য ভেদ নীতির প্রবর্তন করবেই।
উপনিষদের দৃষ্টি সকল বৈষম্যকে অতিক্রম করেছে জ্ঞানের
‘দৃষ্টিদ্বারা এবং এ জ্ঞানকে অবলম্বন করে খণ্ডের ভেতর সন্ধান
পেয়েছে অখণ্ডের, বৈষম্যের ভেতর সন্ধান পেয়েছে পরম
সমতার, সকল স্ফুর্তির ভেতর সন্ধান পেয়েছে নিত্য ফুৰ্ত্তির।
এ দৃষ্টি স্ত্রী পুরুষের ভেতর, ব্রাহ্মণ, বৈশ্য, ক্ষত্রিয়ের ভেতর
প্রতিষ্ঠিত করতে পারে মৈত্রী, সমতা ও শান্তি। শ্বেতাশ্বেতর
উপনিষদে পরতত্ত্বকে লক্ষ্য করে বলা হয়েছে, তুমি স্ত্রী, তুমি
পুরুষ। বৃহদারণ্যক উপনিষদে উক্ত হয়েছে, যে ব্রাহ্মণ,যে ক্ষত্রিয়,
তাকে ব্ৰহ্ম হতে ভিন্ন মনে করে সে সত্য হতে চ্যুত হয়।
বৈশ্য তাকে ব্ৰহ্ম হতে ভিন্ন মনে করে সে মিথ্যার আচরণ করে।
যে
অভিন্নতায় অনুভূতি যখন শুদ্ধ হয়ে জাগ্রত হয়, তখন মানুষ
তার প্রকৃতিগত বৈষম্য বা সংকীর্ণতা হতে মুক্ত হয়ে বিরাটের
অনুসন্ধান পায়। এ বিরাটের অনুভূতিই সমাজ সংস্থিতির
প্রধান ভিত্তি। বৈষম্যকে অতিক্রম করতে পারলে
বিরাটের ভেতর অখণ্ড মানব সমাজের মূর্তি দেখতে পাই।
বিরাটের অনুভূতি জীবনের সকল বিকাশকেই ছায়িত করে,
বৈশিষ্ট্যের ভেতর সমতার দৃষ্টি স্থাপন করে। উপনিষদের এই
উদার দৃষ্টির আবশ্যকতা আজকার দিনেও আছে। রাশিয়ার
মানব সমাজের দৃষ্টি খাটি অখও দৃষ্টি নয়।
বৈষম্যকে অনৈসর্গিক উপায়ে সান্য করবার চেষ্টা করছে।
উপনিষদ ও বর্তমান ভারত
সত্যের সাম্য মূৰ্ত্তির সঙ্গে রাশিয়ার পরিচয় নেই। বাঁচবার
অধিকার বা ইচ্ছা ( Right or will to live) প্রাণ স্তরের
স্বাভাবিক ধৰ্ম্ম হলেও, একেই ভিত্তি করে কোন বিরাট
সমাজ রচিত হয় না, যদি মানুষের সত্তার অভিন্নতা জাগ্রত
হয়।
রাশিয়ার সমাজ বিধানে অখণ্ড মানব সমাজ বিধানের কথা
থাকলেও তার প্রতিষ্ঠা প্রাণস্তরে। তাই বাঁচবার অধিকারের
কথা সেখানে বড়। প্রাণস্তরের সমতা বিধান করা জ্ঞানের
উর্দ্ধ আলােকের সাহায্য ভিন্ন হবে না। প্রাণ স্বাভাবিক
স্বৈর গতি। তাকে নিয়মিত করতে পারে অন্তরের আলো।
বাইরের বিধান নয়, সেই বিধান যতই সুসঙ্গত হােক্
না কেন।
প্রকৃতির বৈষম্যকে জ্ঞানের সাম্য দ্বারা নিয়মিত করতে না
পারলে, যে কল্প লােকরচনায় রাশিয়া উদ্বদ্ধ, তা সত্য হয়ে
প্রতিষ্ঠিত হবে না। মানুষ অন্তর্বহিঃপ্রকৃতিতে ক্রিয়াশীল।
সমাজ জীবনের সম্বন্ধ ও প্রতিক্রিয়ার ফলেই তার সবটার
বিকাশ হয় না। অন্তরে বিকাশের শক্তি রয়েছে যা স্বতঃ
স্ফুর্ত।
যােগ্যতানুযায়ী নির্বাচন প্রথার কিছু সত্য থাকলেও তার
ভেতর এ ব্ৰহ্মদৃষ্টির সমতার অভাব আছে। ব্যক্তিবিশেষের
সামর্থ্যানুযায়ী সভাতার রচনা যতই সুন্দর হােক,তার দ্বারা
উপনিষদের আলো
সকলের ভেতর একটা ব্যাপক দৃষ্টি এবং জ্ঞানের সমতার
প্রতিষ্ঠা হয় না। এজন্যেই বর্তমান সমাজ সংস্থিতির ব্যবস্থা
চমকপ্রদ হলেও তার ভেতর কোন গভীর দৃষ্টির পরিচয়
পাইনে।
কোন বিরাট সভ্যতা গড়ে তুলতে হলে, আবশ্যক হয় দুটি
উপাদান—যােগ্যতা ও সমতা। যােগ্যতা দেয় শক্তি, সমতা
দেয় অখণ্ড দৃষ্টি ও শান্তি। যােগ্যতার দ্বারা মানুষ ক্ষমতা
অর্জন করতে পারে, এবং সর্বশক্তি প্রতিষ্ঠিত করে প্রভুত্ব
স্থাপন করতে পারে। সমদৃষ্টি না থাকলে যােগ্যতা ক্লেশেরই
কারণ হয় এবং যে স্বচ্ছ ব্যাপক দৃষ্টির আবশ্যক হয় কোন
গঠন-কাৰ্য্যে, অনেক সময় তার অভাব হয় ।
যােগ্যতা মানুষকে সাধারণ স্থিতি অপেক্ষা উচ্চতর স্থিতিতে
প্রতিষ্ঠিত করে কিন্তু তা দুঃখের ও অত্যাচারের কারণ হয় যদি
সে যােগ্যতার সঙ্গে না থাকে সমদৃষ্টি। সমদৃষ্টি দেয় হৃদয়ের
ব্যাপকতা, যােগ্যতা দেয় শক্তি। সমদৃষ্টির সঙ্গে যােগ্যতার
সংমিশ্রণে প্রকৃত আদর্শের সৃষ্টি । কি ব্যক্তিগত, কি
সমাজগত জীবনে এ দুয়েরই আবশ্যকতা অত্যন্ত বেশী, একটির
অভাবে সমাজ পুষ্ট হতে পারে না। বর্তমান সভ্যতা এই
সমদৃষ্টিহীন হওয়াতে তার হয়েছে যত বিপদের কারণ।
শক্তির রূপ জড় বা চেতন, তার একটি দার্শনিক সার্থকতা
থাকলেও জীবনের পক্ষে শক্তিবাদের প্রকৃত অর্থ হচ্ছে জাতিকে
উপনিষদ ও বর্তমান ভারত সকল রকমে জীবিত ও শূৰ্ত্ত করা, প্রাণ ও বিজ্ঞান শক্তিকে জাগ্রত করে, জীবনের পূর্ণ বিকাশের পথ প্রস্তুত করা। বিষয়ে রাশিয়া ও জাৰ্মাণী বা ইতালীর দৃষ্টি প্রায় একরূপ, কিন্তু শক্তিবাদের যে চরম পরিণতি, অতিমানববাদ, দার্শনিক সিদ্ধান্ত হিসাবে রাশিয়া তাকে স্বীকার করে নি। কিন্তু তার রাষ্ট্রীয় পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে এরূপ এক অতিমানবের দ্বারা। রাশিয়ার মূলনীতি যে সাম্যবাদ ( অর্থনৈতিক ও সামাজিক) তা জাৰ্মাণীতে ও ইতালীতে নেই। মানবমাত্রেরই সমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং সমান সুখের অধিকার তারা স্বীকার করেন না। জগতে রাশিয়াতে মানুষের ধর্ম সম্বন্ধীয় পরিস্থিতি স্বীকৃত হয় না। তার কারণ এর মূলে মানুষের যে চিন্ময়-ব্যক্তিত্ব আছে তা গৃহীত হয় না। মানুষের অভিব্যক্তি, সমাজের অভুদয়, সকলই সম্পন্ন হয় জড়শক্তির ও অর্থনৈতিক সংস্থানের দ্বারা। মানুষের কোন নৈতিক ও স্বাধীন কর্তৃত্ব নেই। তার কর্মস্পৃহা ও শক্তি নির্ণীত হয়, বাইরের অবস্থার সমাবেশে ; অন্তঃকরণের কোন ধৰ্ম্মবুদ্ধির প্রেরণায় নয়। মানুষকে এইভাবে অবস্থার দাস করা হয়েছে। সমাজ সংস্থিতির কথা যাই হােক না কেন ইউরােপের এ সব সংস্থিতির ভেতর যে দৃষ্টি আছে তা শক্তির দৃষ্টি, এ দৃষ্টি দিয়েছে তার সংস্থিতির বিশেষত্ব। যে সমতা বা বৈষম্যের প্রতি শ্রদ্ধা দেখান হচ্ছে তা শক্তিরই সমতা বা বৈষম্য। মানুষ প্রকৃতির
উপনিষদের আলো
এরূপ
বিবর্তনে উৰ্দ্ধতম বিকাশ। অধুনা পাশ্চাত্যে যাঁরা অধ্যাত্ম
জীবনের সুষমায় আকৃষ্ট, তারাও বলেন মানুষের ভেতর সহজ
প্রবৃত্তিই (instinct) মানুষকে পরিচালিত করে।
সহজ জীবনের উদ্ধা বিকাশ আছে ; এই বিকাশ দেয় জীবনের
ভেতর একটি স্বাচ্ছন্দ্যের বােধ। কিন্তু এ বিকাশের মূল
প্রাণের সংবেগ এবং তার তৃপ্তি প্রধানতঃ প্রাণ স্তরে।
অধুনা ইউরােপের কোন কোন মনীষী ধৰ্ম্ম-জীবনের বিকাশ
সম্বন্ধে এরূপ মতই প্রকাশ করছেন। এই অভিব্যক্তি প্রাকৃত
হলেও তার ভেতর একটি নবীন ধারা প্রকাশিত হয়। সৃষ্টি
ভিন্ন আর একটি অন্তর্মুখী গতি আছে।
সত্যের দৃষ্টি এবং স্থিতি।
এ বরণ করে নেয়
যাহক, মুক্তি সংকীর্ণতার অপসারণ। জীবনের ছন্দ সেখানে
উন্মুক্ত এবং বিশ্বব্যাপী। বিশ্বছন্দে প্রতিষ্ঠিত হয়ে বিশ্বদৃষ্টি সম্পন্ন
পুরুষই অনন্ত শক্তির আধার। জ্ঞানে এর প্রতিষ্ঠা, শান্তি
ও ছন্দ এর প্রকাশ, শক্তি এর বিধতি। আত্ম-দৃষ্টি শক্তির মূলে।
এই আত্মদৃষ্টি দেয় পরমসমতা, সত্তার পরিসরতা হতে দেয়
শক্তির উদ্বোধ। আত্মশক্তিই বিরাট শক্তি। এ শক্তি যেখানে
পরিস্ফুট, যেখানে প্রজ্ঞা, মেধা, শ্ৰী পূর্ণভাবে বিরাজিত।
আধ্যাত্মিক যােগ্যতা দেয় আত্মদৃষ্টি। আত্মদৃষ্টিতে দিব্যশক্তির
প্রতিষ্ঠা; সেখানে ইচ্ছা অপ্রতিহত, তার গতি বিশ্ব-কল্যাণে।
জীবনের বিকাশের যতটা উর্ধে স্থিতি ততই প্রসারতার বৃদ্ধি।
এজন্যেই উপনিষদে জ্ঞানী পুরুষের নানা ঐশ্বর্যের কথা আছে।
ঐশ্বৰ্যশালী পুরুষ তার জ্ঞান ও শক্তিতে পূর্ণ শক্তি প্রয়ােগ
;
১৫৬
উপনিষদ ও বর্তমান ভারত আবশ্যক হলে সমাজ সংস্থিতি বিধানের জন্যে এরা অনায়াসে তার প্রয়ােগ করেন। আবশ্যক হলেও অপ্রতিহত বিশ্বকল্যাণ ভিন্ন এদের ইচ্ছাশক্তির প্রয়ােগ হয় না। ইচ্ছা নিত্য জ্ঞানে প্রতিষ্ঠিত বলেই এদের ইচ্ছা স্বার্থানুসন্ধানে প্রযুক্ত মানুষের জীবন শক্তির রূপে মূর্ত হয়ে ওঠে। শক্তিই দেয় জীবনে সাবলীল গতি ও নানা ঘূর্তি। শক্তির ঘূর্তি জীবনকে করেছে নানা সম্পদে পূর্ণ। জীবন যখনই হারিয়ে ফেলে তার উন্মুক্ত ভাব, তখনই শক্তির সঞ্চার হয় সংকুচিত। শক্তি উন্মুক্ত বিধৃতিতে প্রতিষ্ঠিত। 'ক্ষুদ্রকে, অল্পকে অবলম্বন করে শক্তি ক্রিয়াশীল হয় না। এ উন্মুক্ত স্থিতি ভিন্ন শক্তির বিরাট রূপের বিকাশ হয় না। এ জন্যেই মুক্ত পুরুষ স্বাধীন- ভাবে বিচরণ করেন, কারণ তার স্থিতি ও গতি দুই-ই উন্মুক্ত। বিশ্বের কল্যাণে উদ্বুদ্ধ, তিনি বিশ্বাত্মবােধে প্রতিষ্ঠিত। এ যােগ্যতার এবং সমতার সমন্বয় সাধন মানব সমাজে বিশেষরূপে আবশ্যক। কিরূপে এ সমন্বয় সাধন করতে হয় এবং কিরূপে এদের প্রয়ােগ করতে হয় তাও উপনিষদে আমরা যেমন পাই অন্য কোথাও তেমন পাইনে। ছন্দ সূক্ষ্ম শক্তির স্ফুরণ করে। চিত্ত-ছন্দই সকল শক্তির মূলে। অন্তঃস্তরের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়ে, দিব্যশক্তিতে বিভূষিত করে। এমন কি বিশ্বশক্তির সাথে দেয় অভিন্নতা। এরূপ জাগরণ ব্ৰহ্মতেজ সম্পন্ন করে। সম্পন্ন এ ব্ৰাহ্মী শক্তির স্পর্শে বিরাট উপনিষদের আলো ব্যক্তিত্বের স্ফুরণ। কিন্তু এ শক্তির জাগরণে সমতা একটুও নষ্ট হয় না। শক্তি জ্ঞাননিষ্ঠ। দিব্য-শক্তির জাগরণে স্বরূপের অসীমের সাথে পরিচয়। অসীমবােধে প্রতিষ্ঠিত শক্তি বিশ্ব- কল্যাণে নিয়ােজিত। আত্মস্থিত পুরুষই শক্তির পূর্ণ কেন্দ্র। ' এটা শুধু বিষয় হতে উপরতি নয়। এ বিষয়ের আকর্ষণ বিকর্ষণ হতে মুক্তি। এ মুক্তি হলেই আত্ম-রতি পুরুষ আত্মক্রীড়া করে। কখনও জ্ঞান, ধৰ্ম্ম প্রতিষ্ঠা করে। কখনও সুন্দর ও শিবের ছন্দ কল্যাণ ও সুষমায় প্রতিষ্ঠা করে। বৰ্ত্তমান ভারত পাশ্চাত্য ভাবধারার সাথে পরিচিত হয়ে অগ্রগতির প্রতি আকৃষ্ট, নবীন সমাজ ব্যবস্থায় তৎপর। কৰ্ম্মে ও সংগঠনে নবীন স্ফুর্তির আবশ্যকতা আছে কিন্তু তত্ত্বের উদ্দীপনাকে ও সাধনাকে বাদ দিয়ে নয়। প্রাণ শক্তির দৃঢ়তার ও নবীন সৃজন স্পৃহার সঙ্গে নৈমিষারণ্যের ভাগবত ছন্দের পূর্ণ সংযোগ ' আবশ্যক। এ ছন্দ হাবলে ভারত তার জীবন হারাবে। রজঃশক্তি সাত্ত্বিকী প্রভায় মণ্ডিত হলেই জয়শ্ৰী কৰ্ম্মে, জ্ঞানে, অধ্যাত্মবিদ্যায় বিকশিত হবে। প্রাণের প্রেরণা, বুদ্ধিৰ ঔজ্জ্বল্য, আধ্যাত্মিক প্রবণতার সমন্বয়ে পৃথিবীর কল্যাণ। উপনিষদের অখণ্ডজ্ঞানের আলােকে অখণ্ড মানব সংঘের প্রতিষ্ঠা অত্যন্ত প্রয়ােজন। আত্মমুক্তি ও বিশ্বকল্যাণ ভারতের চির আচরিত ধৰ্ম্ম । ভারতের সমাজের নেতৃত্ব করেছেন জ্ঞানদীপ্ত, প্রেমপুলকিত ত্যাগীরাই। এদের দৃষ্টান্ত ভারতের সামাজিক জীবন ছিল মহামানবতায় উদ্বুদ্ধও মানব কল্যাণ সাধনে নিযুক্ত । ১৫৮ উপনিষদ ও বর্তমান ভারত উপনিষদের এ দৃষ্টি পূর্ণরূপে প্রতিষ্ঠিত হলে রবীন্দ্রনাথের ভারত তীর্থের কল্পনা সত্য হবে। মহাত্মা গান্ধীর অহিংসা এবং সত্যব্রত সিদ্ধ হয় একাত্ম অনুভূতির দীপ্তিতে। উপনিষদের যােগশক্তি প্রতিষ্ঠিত হলে ভারত শক্তির আধার ও আশ্রয় হবে। শ্ৰীঅরবিন্দের স্বপ্ন, দিব্য মানব সংঘের হবে প্রতিষ্ঠা। ০ উপনিষদ বিদ্যা শুধু তত্ত্ব নির্ণয় করে না। সত্তার সব স্তরকে ছন্দোবদ্ধ করে তত্ত্বের প্রকাশ করে। উপনিষদে সমগ্র জীবনকে সঙ্গতিসম্পন্ন করবার কৌশল আছে—তত্ত্বদৃষ্টি এর লক্ষ্য। সঙ্গতি এ দৃষ্টি লাভ করবার উপায় ।এ জন্যেই জ্ঞানের সঙ্গে যােগের গৃঢ় সম্বন্ধ রয়েছে। যোগ দেয় জীবনের শিল্প, সেই শিল্পে জীবন গঠিত হয়ে স্বচ্ছ বিকাশে পূর্ণ হয়। সত্য এতেই বিধৃত। জীবন যখন বিশ্ব-ছন্দে ধৃত, তখন তত্ত্বের পরম দৃষ্টি ।
No text on this page.
বিষয় ও শব্দ-সূচী উইলিয়াম জেমস ০ বিষয় পৃষ্ঠা বিষয় পৃষ্ঠা অতিমানব ১৩৪ অদ্বৈতবাদ ৯, ৬৬, ৬৭, ৭১, ৭২ উপাসনা ১২, ১৫, ১৬, ১৮, ২৩, অধ্যাত্মযােগ ৯৫, ৯৬, ৯৮, অধিভূত, অধ্যাত্ম, অধিদৈব শক্তির এফ, এঞ্জেলস ১৩৮, ১৩৯ ব্রহ্মরূপে উপাসনা ১৯, ৯২, উপাসনা ও তার ফল ও লাঘবতা ২০ উপনিষদ ৯৪, ৯৫ ১, ২, অপরাবিদ্যা ১। ব্ৰহ্মতত্ত্বপর অভেদ ন্যায় ২। ভগবৎতপর অরবিন্দ ৩, ৪৬, ১৫৯ ৩। যােগতত্ত্বপর অস্মিতা ১০১ উপনিষদের সংখ্যা অগ্নি ঋষি আধুনিক বাংলার ও ভারতের ঋষিসংঘ ১৪৩, ১৪৪, ১৪৫ প্রেরণা ১৪৩-১৫০ ঐতরেয় আনন্দ আত্মা ২৯, ৩০, ৩১ कई আনন্দের পর্যায় কৰ্ম্ম ( কৰ্ম্ম-মীমাংসা ও ভােগ ) আনন্দ ও আনন্দঘন ১৩, ১৪ আত্মমিথুম কারণ, নিমিত্ত, উপাদান ৪১ আত্মরাজ্য ৩৮ কাৰ্য্য কারণ-সম্বন্ধ ৪ ০ আলবার্ট লিবার্ট কেন আরণ্যক ক্রম-অভ্যুদয় ও গতি bb ইন্দ্র ৬২ গতিশীল ও স্থিতিশীল সমাজ ১৪৪-৪৮ ঈশা ৩, ৫ গান্ধী ১৪৫, ১৪৬ ৬ ৩২, ৩৩ ৩০, ৩৪ ৩৮ . ৪ • পৃষ্ঠা ১০ ১৩৮ ৫ ১৩৪ বিষয় পৃষ্ঠা বিষয় গায়ত্রী উপাসনা দেবেন্দ্রনাথ গৃহস্থাশ্রম ১২০ দ্বৈতবাদী চিতি বা চৈত্য পুরুষ ১২০ ধ্যানবিন্দু ছন্দসৃষ্টি ও প্রাণশক্তি নবাগম অভিব্যক্তিবাদ ৭, ৮, ১৮, ১৯ নাদ ছান্দোগ্য নাদবিন্দু জন ডুইই ১৩৩ নিটুশের অতিমানববাদ জনলােক নিগুণ জীবাত্মা ও পরমাত্মার সম্বন্ধ :- নির্গুণ ব্রহ্মবিদ্যা অদ্বৈতবাদের দৃষ্টিতে ৭১ নিঃশব্দের শব্দ দ্বৈতবাদীর দৃষ্টিতে ৬৮ নেতি নেতি বিশিষ্টাদ্বৈতবাদীর দৃষ্টিতে ৬৮,৬৯ নৈমিষারণ্য জাগ্রত জ্ঞান ৭৩, ৭৪ পরাবিদ্যা জ্ঞানবাদ পরাশ জ্ঞানীর শ্রেণী বিভাগ পর্যঙ্কবিদ্যা জীবগােস্বামীপাদ পুরুষােত্তম Sob ৫৭-৫৯ ১১, ১২ ৭°, ৫৪ ลง ১৪৩ ১১ ১১৪ ১১১ জীবন মুক্ত ১১২, ১১৩ প্রজ্ঞালােক ৪ প্লটীনাস ২, ১৪২ Sob প্রেয় ৮৩ জেটিলে তপঃলােক তুরীয় জ্ঞান তেজবিন্দু তৈত্তিরীয় ৮, ৮১ দহরকাশ দহরােপাসনার ফল প্রাণের, মনের, বিজ্ঞানের উপাসনার ফল ৯৮, ৯৯ প্রণববাপাসনা ১০২,০৩, ১০৪ প্রাচীন ও আধুনিক দর্শনের গতি ফ্যাসিজিম ১৩৭, ১৩৯ বলশেভিজিম্ ':৩৭, ১৩৯ বাক ও অর্থ ১০১ ১১৯ দয়সন দিব্য পুরুষ ১১৮ দেবযানমার্গ ১০, ১১৮, ১২০ ভূমা-বিদ্যা ১০৭, বিজ্ঞান পুরুষ ৩৩ 8२, 8७ বিষয় পৃষ্ঠা বিষয় পৃষ্ঠা বায়ু বাত্ময় বিশ্ব ৪ ভূলােক ১০৮ বাস্তব ও মায়িক সৃষ্টি ৭৮ ভেদন্যায় বাদরায়ণ ১ ভেদাভেদন্যায় ৬৫, ৬৬ বিবিদিষা ও বিদ্বৎ সন্ন্যাস ১২৬ মার্কসের মতবাদ ১৩৭ ১৪২ মন্ত্র মন্ত্র ও অতিমানসচেতনার বিশিষ্টাদ্বৈতবাদী ১০ সম্বন্ধ ) বিষয়ে আনন্দ দৃষ্টি মহর্লোক ১০৭, ১০৮ বিন্দু ৫৪ মহাবাক্য ৬৩, ৬৪ বিবৰ্ত্ত ৪২ মায়া বিবেকানন্দ ৩, ১৪৩, ১৪৯ ৭৮ বৃহদারণ্যক ৫ মাণ্ড,ক্য ব্যষ্টি জগৎ-জীবজগৎ মুক্ত পুরুষ ও বিশ্বকর্তৃত্ব ১১০, ১১৬ ব্ৰহ্মদৃষ্টিতে প্রাণ, মন ও বিজ্ঞান ১১৬ প্রভৃতির উপাসনার ফুল ৯৬ মুক্তি ( সদ্য ও ক্রম) ২১, ৯১ ব্রহ্ম শব্দের অর্থ মুক্তি ও ছন্দ ৮৯, ৯০ ব্ৰহ্ম আনন্দ মুণ্ডক ব্ৰহ্ম নির্বাণ মূৰ্তব্রহ্ম ব্ৰহ্ম প্রাণ ২৪, ২৫, ২৬ যােগ ব্ৰহ্ম বিজ্ঞান ২৪, ২৮ যােগ,—১। ঈশ্বরের সঙ্গে ৮৫, ৮৬ ব্ৰহ্ম মন ২৭ ২। ব্রহ্মের সঙ্গে ৮৬, ৮৭ ব্ৰহ্ম-সগুন ও নিগুণ ৫৭, ৫৮, ৬০ যােগৈশ্বৰ্য্য ৮৬ ব্রহ্মচর্য ১২৪ ১২৫ ব্ৰহ্ম-সাযুজ্য ১১৩, ১১৯ রবীন্দ্রনাথ ৩, ১৪৯, ১৫৯ ব্রহ্মসূত্র ১ রামমােহন ২, ১৪৪, ১৪৭ ব্রাহ্মণ ১৪৪, ১৪৭ রামানুজ ভুবলােক ১০৭, ১০৮ লেনিন মুক্ত পুরুষের ঐশ্বৰ্য্য ৩১, ৩২, ৫ ৮৪, ৮৫, ৮৬ রস ও আনন্দ L . .
• পৃষ্ঠা ৮২, ১০২ ৭৮, ৭৯, ৮০ ৪ ০ ৫৫, ৭৭ বিষয় পৃষ্ঠা বিষয় ১, ২ সাক্ষী ৪ সুষুপ্তি জ্ঞান স্থিতি ও গতি ষ্ট্যালিন সুল ও সূক্ষ্ম আকাশ সগুণ ব্রহ্মবিদ্যা ১১, ১২ স্বপ্ন জ্ঞান সপ্তান্নবিদ্যা ৯২, ৯৩ সবিতৃ-মণ্ডল ১০৭ স্বাধ্যায়। সভ্যতার উপকরণসমতা ও স্বারাজ্যসিদ্ধি যােগ্যতা ১৫৪ হিরন্ময় কোষ সমতা ও যােগ্যতার সমন্বয় হিরণ্যগর্ভ সাধনা হৈমবতী ৭ ৮৭ ১১৮ ১-৫৪ ৯৮৪২ ২৭-২-৪৪
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.