Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Puspanjali
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
পুস্পাঞ্জলি
শ্রীনবকৃষ্ণ ভট্টাচাৰ্য প্রণীত
নারায়ণ লাইব্রেরী
২৭, কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট, কলিকাতা
মূল্য পাঁচ সিকা
= প্রকাশক- শ্রীরাধারমণ বন্দ্যোপাধ্যায় ২৭, কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট, কলিকাতা প্রিন্টার শ্ৰীমনীন্দ্রনাথ ভাণ্ডারী ইমুনারায়ণ প্রিন্টিং ওয়ার্ক ১৫, রায়বাগানটি, কলিকাতা
উৎসর্গ
পরমারাধ্যা
স্বর্গীয়া মাতৃদেবীর
চরণেদ্দেশে
সেবকের
এই অকিঞ্চিৎকর
পুস্পাঞ্জলি
হইল
No text on this page.
নিবেদন পুষ্পাঞ্জলি প্রকাশের কোন আশাই ছিল না, আমার সুহৃদ খ্যাতনামা গ্রন্থকার স্বর্গীয় নারায়ণদাস বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয়ের সুযােগ্য কনিষ্ঠ পুত্র আমার পরম স্নেহভাজন শ্ৰীমন্ রাধারমণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আগ্রহই ইহার প্রকাশের মূল। এই কার্যের জন্য আমি তাহার নিকট একান্ত বাধিত। পাঠকগণ দেখিবেন, অর্ধ শতাব্দী বা তৎপূর্বের রচনাও ইহাতে আছে। আমার জ্যেষ্ঠ পুত্র শ্রীমান্ সুকুমার বহুদিন পূৰ্ব্ব হইতে বহু স্থানে ঘুরিয়া এগুলি সংগ্রহ করিয়াছেন। তন্মধ্যে কলিকাতার সুবিখ্যাত “চৈতন্য লাইব্রেরি” হইতেই অনেকগুলির কিনারা হইয়াছে। তিনি যে দিনই গিয়া- ছেন, উক্ত লাইব্রেরির কর্তৃপক্ষ মহাশয়গণ অবাধে তাহাকে বহু পুরাতন মাসিক পত্র বাহির করিয়া দিয়াছেন। এইরূপ অনুগ্রহের জন্য আমি তাহাদের নিকট বিশেষভাবে ঋণী এবং কৃতজ্ঞ। মাসিক পত্রের মধ্যে সুবিখ্যাত “ভারতী” পত্রিকাতেই আমার কবিতা প্রথম প্রকাশিত হয়। তখন আমি কলিকাতা সংস্কৃত কলেজিয়েট স্কুলে প্রথম শ্রেণীতে পড়িতাম—নিজের লেখার উপর নিজের বিশ্বাস ছিল না। এজন্য প্রথম কয়েকটি লেখা কবিবর (অধুনা বিশ্বকবি) শ্ৰীযুক্ত রবীন্দ্রনাথের নিকট পাঠাই। তিনি দেখিয়া বিশেষ সন্তোষ প্রকাশ করেন এবং উহাতে সংশােধনের কিছুই নাই এইরূপ মত প্রকাশ করিয়া “ভারতী”র সম্পাদিকা মহাশয়ার নিকট পাঠাইয়া দেন। সম্পাদিকা মহাশয়া ও ঐগুলি আনন্দের সহিত প্রকাশ করেন। এজন্য সম্পাদিকা মহাশয়ার নিকট, বিশেষত • কবিবরের নিকট আমি বিশেষভাবে ঋণী। সম্পাদিকা মহাশয়া এক্ষণে স্বৰ্গত। কবিবরের নিকট আমি যে উৎসাহ পাইয়াছি, তজ্জন্য তাহার নিকট আমার আন্তরিক শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জানাইতেছি। ১২৯১ সালে সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্রের তত্ত্বাবধানে তদীয় জ্যেষ্ঠ জামাত (অধুনা স্বর্গীয় ) রাখালচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয়ের সম্পাদকতায় মাসিক পত্ৰ “প্রচার” বাহির হইলে দ্বিতীয় বর্ষ হইতে আমি তাহাতেও কবিতা লিখিতে থাকি। রাখাল বাবু আমার কবিতার বড়ই আদর করিতেন, ইহাতে আমি যথেষ্ট উৎসাহিত হই। এই উপলক্ষে পূজ্যপাদ সাহিত্য- সম্রাটের নিকট অনেক উপদেশ লাভ করিয়াও আমি কৃতার্থ হইয়াছিলাম। তাহারা উভয়েই এখন দিব্যধামে গত, সুতরাং তাহাদের নিকট সাক্ষাৎ- ভাবে এ ক্ষুদ্র হৃদয়ের কৃতজ্ঞতা জানাইয়া শান্তিলাভে বঞ্চিত হইতেছি। সােমপ্রকাশ, নববিভাকর, এডুকেশন গেজেট প্রভৃতি সাপ্তাহিক পত্রেই আমি সৰ্ব্বপ্রথম কবিতা লিখিতে আরম্ভ করি। এই সকল পত্রের সম্পাদক মহাশয়গণের অনুগ্রহ আমার চিরস্মরণীয়। সাপ্তাহিক পত্রগুলির কবিতা কিন্তু আমি কিছুই সংগ্রহ করিতে পারি নাই। পরিশেষে বক্তব্য, কয়েকটি কবিতার স্থলবিশেষ পরিবর্জিত এবং কোন কোনটির কোন কোন স্থান কিঞ্চিৎ পরিবত্তিত হইয়াছে। অনেকগুলি লেখা অর্ধ শতাব্দীর বা তাহারও পূর্বের রচিত, এজন্য তাহাদের উৎপত্তির পরিচয় দিতে গিয়া, ভূমিকাটি “বারাে হাত কাকুড়ের তেরাে হাত বীচি” হইয়া দাড়াইল, পাঠক-পাঠিকাগণ সদাশয়গুণে মার্জনা করিবেন। কলিকাতা, শ্রীনবকৃষ্ণ ভট্টাচার্য্য ১৯শে কার্তিক, ১৩৪১ সূচিপত্র ••• ১ ••• ৪ ০ ০ ০ ••• ১২ ০ ০ ০ ••• বীণাধ্বনি ( জন্মভূমি-মাঘ, ১২৯৮) বর্ষ-বিবর্তন ( প্রচার-বৈশাখ, ১২৯৫) বঙ্গ-জননী (মাসিক বসুমতী-ভাদ্র, ১৩৪১) ধরাসুন্দরী (ভারতী—বৈশাখ, ১২৯২) নিরুদ্দেশের পথে (প্রবাসী-কার্তিক, ১৩৩৯ ) বর্ষার মেঘ (পাক্ষিক সমালােচক-ভাদ্র, ১২৯১) আশুতােষ ( মাসিক বসুমতী-জ্যৈষ্ঠ, ১৩৩৯) ... মা ( প্রচার-আশ্বিন, ১২৯৫) প্রকৃতি (প্রকৃতি—সাপ্তাহিক পত্রিকা) মুকোচুরি ( ভারতবর্ষ-কার্তিক, ১৩২৩) বাঁশী (মাসিক বসুমতী-অগ্রহায়ণ, ১৩২৯ অন্তিম আদেশ (মাসিক বসুমতী-ভাদ্র, ১৩৪১) সংসার-সঙ্গিনী ( প্রচার-আষাঢ়, ১২৯৫) ফুলের খেলা (প্রতিভা—মাসিক পত্র) গাঁথা মালা (প্রচার-বৈশাখ, ১২৯৫) অমর-সঙ্গীত (প্রচার-অগ্রহায়ণ, ১২৯৫) ••• ••• ১৯ ২২ ২৫ ২৯ ৩১ " ••• ••• ৪৪ ৪ ৪ ••• ৩ ye ••• ৬২ ••• ৬৮ 92 ৭৪ ••• ৭৭ ৮০ ৮২ ৮৪ ••• অমানুষের প্রতি ফুলের হাসি (প্রচার-আষাঢ়, ১২৯৩) মহাভিক্ষা (ভারতী-ভাদ্র, ১২৯৪) নববর্ষ (ভারতী—বৈশাখ, ১২৯৩) অশ্রুবিন্দু-উপহার ( ভারতী—আষাঢ়, ১২৯৩) ••• প্রভাতে (ভারতী—অগ্রহায়ণ, ১২৯৭) সন্ধ্যায় (ভারতী--অগ্রহায়ণ, ১২৯৭) রূপের সাগরে (কল্পনা—জ্যৈষ্ঠ, ১২৯৪) শারদীর আবাহন (মাসিক বসুমতী-আশ্বিন, ১৩৪১ ) ••• তারা (প্রচার-অগ্রহায়ণ, ১২৯৩ ) অতৃপ্তি (প্রচার-আষাঢ়, ১২৯৪) কোথা মা (ভারতী) বসন্ত ( সখা-১৮৯৩) হরিষে বিষাদ (মাসিক বসুমতী-আশ্বিন, ১৩৩৪ ) সান্ত্বনা (প্রচার-চৈত্র, ১২৯২) দ্বন্দ্বশেষ (বার্ষিক শিশুসাথী-১৩৩৬) চিঠি আসায় (ভারতবর্ষ-ভাদ্র, ১৩৪১ ) চিঠি না আসায় (ভারতবর্ষ-ভাদ্র, ১৩৪১) শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস ( মাসিক বসুমতী--অগ্রহায়ণ, ১৩৪১ ) রামমােহন প্যারীচরণ ( মাসিক বসুমতী-কার্তিক, ১৩৪১ ) ‘দেব • • ৯৪ । ••• ১০২ ১১০ ১১১ ১১৩ ১১৪ • • • ১১৫ ৮ । । ৫ ০ ০ ১১৬
•••
১১৭
•••
১১৮
১১৯
•••
১২০
১২১
বঙ্কিমচন্দ্র (মাসিক বসুমতী-কার্তিক, ১৩৪১) ...
হরপ্রসাদ (মাসিক বসুমতী-অগ্রহায়ণ, ১৩৩৮)
হেমলতা দেবী (মাসিক বসুমতী-অগ্রহায়ণ, ১৩৪১)
আচাৰ্য্য প্রফুল্লচন্দ্র (মাসিক বসুমতী—পৌষ, ১৩৩৯ )
গিরিশচন্দ্র ( মাসিক বসুমতী-অগ্রহায়ণ, ১৩৩৯)
অমৃতলাল ( মাসিক বসুমতী-শ্রাবণ, ১৩৩৬)
চিত্তরঞ্জন (মাসিক বসুমতী-শ্রাবণ, ১৩৩২)
সুখের চরম (বার্ষিক বসুমতী-১৩৩৩ )
মােহিনী ( বার্ষিক বসুমতী-১৩৩৪)
বাসন্তী-নিদ্রা (ভারতী—জ্যৈষ্ঠ, ১২৯৪)
শেষ। প্রচার-চৈত্র, ১২৯৫)
০ ০
১২৩
১২৪
. ।
•••
•••
১২৬
•••
১২৭
No text on this page.
পুস্পাঞ্জলি
বীণা ধ্বনি
এসেছি কুহকে ভুলি
আকুল পরাণ মন,
গুঞ্জরে হেথা কি অলি,
হাসে কি কমল-বন ।
হেথা কি সুনীল জলে
নীলাকাশ ভাসি’ চলে,
উজল মুকুতা ফলে
রবি-করে অগণন—
গুঞ্জরে হেথা কি অলি,
হাসে কি কমল-বন!
২ পুস্পাঞ্জলি ৮ হেথা কি বিরাজে চির- মধু চির-মধুময়, বাসিত সুবাসে ধীর মলয় কি হেথা বয় ; শ্বেত শতদল সরে কাপে কি সমীর-ভরে, মরাল-মরালী করে তালে তালে সন্তরণ- গুঞ্জরে হেথা কি অলি, হাসে কি কমল-বন। হেথা কি না ভাসে নর কিন্নর নয়ন-পথে, বীণা-রব ওঠে শুধু দূর পদ্মবন হ’তে ; জলে নভ-নীলিমায় সে সুধা মিলা’য়ে যায়, তীরে উপবন-ছায় গেয়ে ওঠে পিকগণ--
পুস্পাঞ্জলি
গুঞ্জরে হেথা কি অলি,
হাসে কি কমল-বন।
এ কি সে বিজনে দিব্য
মানসের সরােবর,
তীরে কি সে উপবন
স্বপনের মনােহর ;
এ নিকুঞ্জে শুনি’ গান
চিরধন্য হয় প্রাণ,
চিরতৃষা অবসান
পানে কি এ সুধা-ধন ?--
গুঞ্জরে হেথা কি অলি,
হাসে কি কমল-বন?
জন্মভূমি-মাশ, ১২৯
বর্ষ-বিবর্তন
আমি এসেছি আবার
বাসনা গাহিয়ে গান
সুরসে জুড়াতে প্রাণ,
শুনা’তে নূতন সমাচার
এসেছি আবার ?
আমি এসেছি আবার
তরুরে ছেয়েছি ফল-মুকুলে,
ধরণী ঢেকেছি শ্যাম দুকূলে,
পরা’য়েছি লতিকায়
অঙ্গ বেড়ি’ ফুল-অলঙ্কার
এসেছি আবার!
রূপ-রস-গন্ধে ধরাতল
করিয়াছি আনন্দে চঞ্চল
ভুঞ্জিতে মঙুল ফুলে,
গুঞ্জন-রত অলিকুলে
কুঞ্জে এনেছি ডেকে,
ওই শােন মধুর ঝঙ্কার
এসেছি আবার !
পুস্পাঞ্জলি
45 + + + +++
আমি নীলিমা দিয়েছি ঢেলে আকাশে,
সুরভি দিয়েছি ঢেলে বাতাসে;
নন্দন বনের পাখী
যতনে এনেছি ডাকি
থেকে থেকে কুহুতানে
মােহ আনে হৃদয়ে সবার
এসেছি আবার!
জগৎ এ সাধনার
অবিচ্ছিন্ন সুখ হেথা নাই ;
আঁধার বিরাজে আগে পাছে,
তাতেই আলােক ফুটিয়াছে;
তাই এ বিমল প্রাতে যতনে এনেছি সাথে
সুখ-মুল দুঃখ বিধাতার--
এসেছি আবার !
আমি এসেছি আবার
জানি নে—গাহিয়ে গান সুরসে জুড়াতে প্রাণ
অথবা শুনাতে হাহাকার
এসেছি আবার!
প্রচার-বৈশাখ, ১২৯৫
বঙ্গ-জননী (প্রবাসী-বঙ্গসাহিত্য-সম্মেলন উপলক্ষে লিখিত) - “বন্দে মাতরম্”-বঙ্গ-জননী আমার- সুজলা সুফলা শস্যশ্যাম রূপ ঘর। দেবতাত্মা হিমালয় শিরে যার শােভাময়, পদতলে লােটে বঙ্গসাগর অপার, সন্তানের শুভ তরে, সতত যাঁহার ক্ষরে জাহ্নবী যমুনা দুই স্তনে ক্ষীরধার- বন্দে মাতরম্-বঙ্গ-জননী আমার। সুধন্য বৈষ্ণব কবি, শাক্ত শৈব আদি সবি গেয়েছেন তব গান তােমারি ভাষায়, শুনে সে ললিত গান আজিও জুড়ায় প্রাণ, উচ্ছসিয়া উঠে হৃদি অনন্ত আশায়। নিজ নিজ মনঃপূত তার পরে কত সুত, অলঙ্কারে সাজাইল শ্রীঅঙ্গ তােমার, তাহাদের দিব্য দান মােহিছে সবার প্রাণ, দেশে দেশে আজি তব সুষমা প্রচার।
পুষ্পাঞ্জলি
কত ভক্ত ধৰ্ম্মনিষ্ঠ
দিব্যলােক-উপদিষ্ট
চারিদিকে প্রচারিল তব মহাবাণী,
কত সুত শক্তিমান্ রাখিতে তােমার মান
প্রাণাহুতি দিল দান নিজে ধন্য মানি'।
কৃষক শ্রমিক আর
কত সুত শিল্পকার
হস্তজাত দ্রব্যে তব করিয়াছে পূজা,
তুষ্ট হয়ে বড় মনে,
নিয়েই তা সযতনে,
দশ হস্ত প্রসারিয়া তুমি দশভুজা।
আয়ু যশ ধন মান
তাদের করেছ দান,
হে বরদায়িনী মাতা মাের বঙ্গভূমি,
সবারে করিয়া ধন্য, নিজ বক্ষ-সমুৎপন্ন
দেছ অন্ন অকাতরে অন্নপূর্ণা তুমি।
কত দিক্-দেশ হতে
এসেছে সমুদ্রপথে
কত জাতি কত কষ্ট করিয়া স্বীকার,
তারাও তােমার দান লয়ে বাঁচায়েছে প্রাণ,
ভুবন জুড়িয়া তব যশের প্রচার।
আজি মা অন্নের তরে, ছুটি দেশ-দেশান্তরে,
নিজ কর্মদোষে, হায়, ভিখারীর মত,
পুস্পাঞ্জলি
An
তবুও ক্ষণেক তরে
ভুলিতে পারি নে তােরে,
হৃদয়ের অন্তস্তলে জাগগা মা সতত।
তােমার শ্যামল মাঠ, দীঘি সরােবর ঘাট,
তােমার সে সুশীতল বটতরু-ছায়,
কত জনমের মম আছে কি যে অনুপম,
সেইখানে ছুটে যেতে তাই মন চায়।
তােমার সে রবি শশী
দেখি এখানেও বসি,
পরিচিত মধ্যে এরা—আর কিছু নাই, •
হেথাও উদার-মন
রয়েছেন বন্ধু-জন
শৈশবের সাথী কিন্তু খুঁজিয়া না পাই।
কি যে দুঃখ মাের চিতে, নাহি পারি প্রকাশিতে,
বুঝিবার শুধু ইহা নহে বুঝাবার,
‘বন্দে মাতরম্-বঙ্গ-জননী আমার ।
মাসিক বসুমতী-শ্রাবণ, ১৩৪১
ধরাসুন্দরী
ব, ধরাসুন্দরী, শুনি
কার প্রেমে তার এত হাসি,
কার তরে সাজালি অঙ্গ
দিয়ে গুচ্ছ ফুলের রাশি।
সুন্দর বসন্ত বাসে
তনুখানি আবরিলি,
মলয় মধুর শ্বাসে
গন্ধে ভুবন ভরে দিলি ।
সােহাগেতে দুলে দুলে
সমীর-ভরে এলি খেয়ে,
মধুর কাকলী করে
পাখীর মুখে উঠলি গেয়ে !
নবপল্লব অধরে তাের
বাড়িয়ে দিলে শােভা অতি,
প্রভাত-কিরণ ঢেলে দিলে
মুখে তাের সুবর্ণজ্যেতি ।
পুস্পাঞ্জলি
রূপ দেখে তাের মধু খেতে
প্রজাপতি এলাে কত,
ফুলে ফুলে ঘােষণা তাের
দিয়ে গেলাে মধুব্রত !
দেখে তাের কুন্তলের শােভা,
গেয়ে কোকিল অধীর হলাে,
আকাশের চাদ নীরব রাতে,
মুখখানি চুমিতে এলাে!
মনে পড়ে দুঃখে শােকে
বর্ষায় কত কেঁদেছিলি,
অবিশ্রান্ত নয়ন-জলে,
বুকখানি তাের ভাসিয়ে দিলি ?
এই ত দিনেক দুদিন আগে
ছিলি শীতে সঙ্কুচিত,
নিশির শিশির বুকে স’য়ে
হয়েছিলি অর্ধমৃত !
আবার এমন সঞ্জীবনী
আচম্বিতে কোথায় পেলি,
পুস্পাঞ্জলি
* * * * * *
* * *
অসাড় দেহ উঠলাে জেগে,
গেয়ে ভুবন ভরিয়ে দিলি ।
কে দিলে তাের আঁধার প্রাণে
ঢেলে মন জোছনা-রাশি?
ব, ধরাসুন্দরী, শুনি
কার প্রেমে তাের এত হাসি ।
ভারতী-বৈশাখ, ১২৯২
নিরুদ্দেশের পথে
বালিকা গেল কোথা চলিয়া,
খেলিতে এসে খেলা ফেলিয়া !
খেলার ঘর-বাটী
সাজানাে পরিপাটি
ভরেছে কুটি-মাটি পড়িয়া,
খেলানা ভাঁড় পড়ি
যেতেছে গড়াগড়ি,
ধূলার চিনি যায় উড়িয়া
সেদিকে কেহ আর
চাহে না একবার,
চাহিলে আঁখি যায় ধাধিয়া,
পিপিড়া সারি দিয়ে
সেখানে শুধু গিয়ে
ফিরিয়া আসে বুঝি কঁদিয়া!
প্রভাতে পাখী গায়, যেন বা ডাকে তারে,
আকাশে ওঠে চাদ—সে যেন খোজে কারে,
পুষ্পাঞ্জলি
*
৩১
সঁঝের তারা দুটি
ভাবিছে বুঝি উঠি’
আকাশ-পারাবার অকূলে,
কোথা সে গেল চ'লে--
‘দেখেছি আগে’ বলে
গণিত যে গো কচি আঙুলে।
নিখিল চরাচর
এখানে কেহ পর
ছিল না এতটুকু বুকে তার,
চোখেতে যখনি যা
পড়িত, তখনি তা
করিয়া নিত সে যে আপনার।
তাহারি চারাগাছে
মালতী ফুটিয়াছে,
সােহাগ যেন সে গো কার চায়,
লুঠিতে ফুল-বাস
পবন আসি শাস
ফেলিয়া করে যেন হায় হায় !
১৪
পুস্পাঞ্জলি
• ৮২%।
,
পাখীটি খায়-দায়,
নহে সে সুখী নয়,
বিষাদে থাকে দাঁড়ে বসিয়া,
একটি বুলি আর
শুনি নে মুখে তার,
রেখেছে বুকে শােক পুষিয়া !
সে যে গাে কোন্ পুরে,
গিয়াছে কত দূরে,
কাহারে কিছু নাহি বলিয়া,
সকলে তাই তারা
খুঁজিয়া হয় সারা
যেন গাে স্নেহরসে গলিয়া।
এ যে গাে ভাঙা ঘরে
বরষ-বারি ঝরে,
ঝটিকা বহে হু হু করিয়া,
গ্রাসিতে গৃহপাট,
ডুবায়ে পথ-ঘাট
গরজি’ আসে যেন দরিয়া
পুস্পাঞ্জলি
ভুলিতে যত চাই, ভুলিতে নাহি পারি,
মনে যে নিশিদিন জাগে গগ কথা তারি ;
সে কি মােদের কথা
ভাবিয়ে পায় ব্যথা,
যে গেছে এ হৃদয় দলিয়া-
বালিকা গেল কোথা চলিয়া!
প্রবাসী--কার্তিক, ১৩৩৯
বর্ষার মেঘ নিদাঘ-পীড়িত তপ্ত বসুমতী শীতল করিয়া সলিল-পাতে, ফল-ফুল-শস্যে ভেটিতে ধরণী বেড়াই আমরা পবন-পথে। থাকি, বহুদূরে দূরদৃষ্টি রাখি, সন্ সন্ করে’ বহিয়া যাই ; -প্রতপ্ত প্রদেশ দেখিলে অমনি হৃদয়ের ভারে থেমে দাড়াই। নেমে গিয়ে তবে ধরণীর কাছে ঝম ঝম্ করে ঢেলে দি জল ; আত্ম-দেহ-নাশ ?- তবু কত সুখ- ধরণী তখনি হয় শীতল ।
পুস্পাঞ্জলি
১৭
~~~~~~~~
****
খর রবি-তাপে
তরুলতাগুলি
ক্রমে ক্ষীণতর বিষাদময়
ঢেলে দিলে শিরে ধারা সুশীতল,
ভিজিয়া ভিজিয়া প্রফুল্ল হয়।
বিষম উত্তাপ
গায়ের জ্বালায়
পশুপাখীগুলি কাতর-প্রাণ ;
গা বেয়ে পড়িলে
নব-মেঘ-জল
শরীর কাঁপায়ে সমাধে স্নান।
আধ-ফোটা কলি হুতাশে শুকায় ;
ক্ষীণ লতিকায় বিষাদে কাটে,
বরষার জলে
মিটা’য়ে পিপাসা
প্রাণ ভরে হেসে ফুটিয়া উঠে।
ফল-শস্য বিনা
ধরা মরুময়-
কাতর ভুবন আকাশ চাই;
দেখিতে না পারি
সে ভাব তাদের
অমনি গলিয়া পড়িয়া যাই।
১৮ পুষ্পাঞ্জলি * * * • • • • • • • ভালবাসি মােরা তরুলতাগুলি আধেক ফুটন্ত কুসুমদল, আকাশের পাখী, কাননের পশু- সমানে সমগ্র ধরণীতল। তাই সে তৃষিত বিশীর্ণ ব্যাকুল যাইতে যাইতে দেখিলে কারে, কাদি দুঃখে তার সাধি আত্ম-নাশ- ঢেলে দিই জল অজস্রধারে। নিজ ক্ষয় সাধি- ক্ষতি কি তাহায় ? বিনাশে ত কারে করি না দুখী ? ভালবাসা মােরা চাহি না কাহারাে, ভালবেসে মােরা নিজেই সুখী। পাক্ষিক সমালােচক-ভাদ্র, ১২৯১
আশুতােষ
(নবম বার্ষিক স্মৃতিপূজা উপলক্ষে লিখিত)
বর্ষ পরে বর্ষ গত-আজি সেই দিন,
যে দিন ধ্বনিল তূর্য, বঙ্গের মানব-সূর্য
মহাদেব-মহাদেহে হইলা বিলীন।
বিনা মহাজ্যোতি তাঁর বঙ্গভূমি অন্ধকার,
সমগ্র ভারত অন্ধতমসে মলিন।
গঠিতে জ্যোতিষ্ক নিজ মহাজ্যোতি দিয়া,
যে মানব-সূৰ্য্য কায়-মন সমর্পিয়া
অনুদিন ছিলা রত,
তার সেই মহাব্রত
কে করিবে উদ্যাপন না পাই ভাবিয়া
সে শক্তি, সে সাধনা কি আসিবে ফিরিয়া ?
।
পুস্পাঞ্জলি কৰ্ম্ম-কৰ্ম্ম—শুধু কৰ্ম্ম-কৰ্ম্মের জীবন, জাগ্রতে নিদ্রায় কৰ্ম্ম-কর্মের স্বপন; সমগ্র এ পৃথিবীর মাঝে যত কৰ্ম্মবীর, তাদেরি বরেণ্য তিনি ছিল এক জন বাঙ্গালী হারালাে তারে বিধি-বিড়ম্বন। সে যে গাে ছিল না শুধু বিদ্বান্ ধীমান্না আদর্শ-চরিত্ৰ মৰ্তভূমে মূর্তিমান্ ; কর্তব্যের কঠোরতা, পরদুঃখ-কাতরতা, সে দেহে অপূর্বভাবে লভেছিল স্থান, যেন সেথা দুই-ই মুখ্য, দুই-ই প্রধান। ছিলা নিজে অনন্ত সে গুণের সাগর, গুণ-গ্রহণেতে ছিলা তেমনি তৎপর ; অতি তুচ্ছ ক্ষুদ্রগুণ- আবিষ্কারে সুনিপুণ হেন জন সুদুর্লভ সংসার-ভিতর— আকৰ্ষিতে লৌহ যেন চুম্বক-প্রস্তর।
পুস্পাঞ্জলি
শত্রু-মিত্রে অভেদে করিতে ব্যবহার,
মনে দ্বিধা-বােধ কিছু ছিল না তাঁহার,
সত্য ন্যায় তার কাছে, উচ্চ মান পাইয়াছে,
অন্যায়ের কাছে কিন্তু ব্যাঘ্র-অবতার,
‘বাঙ্গালার বাঘ’ খ্যাতি করে তা প্রচার।
পাশ্চাত্ত্য বিদ্যায় লভি অখণ্ড সম্মান,
বেছে নিয়েছিলা নিজে প্রাচ্যের যে দান ;
আচার-ব্যভার-বেশ, স্বদেশীর একশেষ,
স্বদেশীয় ভাষার উন্নতি তরে প্রাণ
কেঁদেছিল করেছেন তাহারাে বিধান।
;
নমি আজি সেই কম্মিকুলের তিলক,
বিচার-আসনে সূক্ষম ন্যায়-বিচারক ;
নবীনের অনুরক্ত,
প্রবীণের প্রিয় ভক্ত,
নমি বঙ্গ-বিশ্ববিদ্যালয়-প্রসাধক,
স্বরাজের একনিষ্ঠ প্রচ্ছন্ন সাধক।
মাসিক বসুমতী-জ্যৈষ্ঠ, ১৩৩৯
월
আকুল নয়ন-নীর
মুছে দাও;
তাপিত পীড়িত হৃদি
আজি গাে জুড়াব বলে
মা বলে এসেছি কাছে-
ফিরে চাও ,
আকুল নয়ন-নীর
মুছে দাও।
জগতে আসিয়ে কেঁদে
চলে যাই,
মা বলে ডাকিলে নাহি
সাড়া পাই।
পুস্পাঞ্জলি
সংসারে আনিয়া মােরে,
আপনি দাঁড়ায়ে সরে,
দেখিতে কি খেলা, মা গাে
তুমি চাও;
আকুল নয়ন-নীর
যুছে দাও।
ভক্তি-বিহীন হীন
প্রাণ মন,
শক্তি-বিহীন ক্ষীণ
এ জীবন।
জ্ঞান-ভক্তি-কৰ্ম্ম-হীন
করিয়া আমারে দীন,
জননী, তুমি কি মনে
সুখ পাও ;
আকুল নয়ন-নীর
মুছে দাও।
২৪
পুস্পাঞ্জলি
•
আমার এ প্রিয়তম
দেহ প্রাণ,
ধরায় করেছ মােরে
তুমি দান
জীবনের কাজ যাহা,
তুমিই করায়ে তাহা,
আবার স্নেহের কোলে
তুলে নাও;
আকুল নয়ন-নীর
মুছে দাও।
প্রচার-আশ্বিন, ১২৯৫
প্রতি
অনাদি অনন্ত
ব্যোম-বক্ষঃস্থলে
মহারাজ্য প্রকৃতির,
কোটি জড়পিণ্ড
ক্রীড়াপর সেথা
ভীম বেগে অশনির।
বাঁধি
কোটি গ্রহে ক্রীড়া
প্রকৃতির অনিবার,
নরের বিস্ময়
বিপুলা ধরণী
নখাগ্রে বিরাজে তার।
এক সূত্রে
ইঙ্গিতে তঁাহার
অনন্ত শরীরে
পৃথ্বী কোটি লীন হয়,
জন্মে কোটি পৃথী
ইচ্ছামাত্রে পুনঃ
অতুল সৌন্দৰ্য্যময়।
পুস্পাঞ্জলি সৃজন-বিনাশে নির্বিকার চিত্ত নাহি সুখ-দুঃখ-স্রোত, পূৰ্ণানন্দময় প্রাণে নিত্য তার সুখ দুঃখ ওতপ্রােত। কোটি সূৰ্য্য চন্দ্র নক্ষত্রমণ্ডলে রচিত আসন তঁার, প্রতি অণু-দেহে পূর্ণস্থিতি, তবু সরূপে অরূপ সার । স্বর্গ মর্ত্য তাঁর স্নেহময় ক্রোড়, জীবের মনােজ্ঞ বাস, স্বর্গ মর্ত্য তাঁর বদন-প্রসার- বিনাশের কালগ্রাস। এ হেন বিচিত্র ক্রীড়াময়ী যিনি, মানবের ক্ষীণ মন, জানি কি মন্ত্রে, কি ভাবে পূজিবে তারে করি আবাহন।
পুস্পাঞ্জলি
২৭
কোন্ হৃছ স্তবে
রসনা বর্ণিবে
অনন্ত মহিমা তার,
সে অচিন্ত্য রূপ
হবে প্রতিভাত
ধ্যানে কোন্ কল্পনার ?
ক্ষুদ্র ক্ষীণজ্যোতি
দৃষ্টি ল'য়ে নর
করে বিশ্ব পরিমাণ,
শ্রবণ-যন্ত্রের
স্থূল-শক্তি যােগে
শশানে সে বিশ্বের গান।
সীমাবদ্ধ জ্ঞান
এস্ত অনুক্ষণ
ভ্রম সংশয়েতে তার,
কি সাধ্য নরের
হবে সে এ কূট
রহস্য-সমুদ্র পার !
নাহি জানে শিশু কি অনন্ত প্রেম
স্নেহময়ী মার বুকে,
বিস্ময়-বিমূঢ়
অনিমেষ মার মুখে।
শুধু চেয়ে রয়
২৮ পুস্পাঞ্জলি ••• । ' --- তেমনি আমরা- ব্রহ্মাণ্ডের জীব- মা তােমার শিশু যত, কি যেন কুহকে মা তােমার পানে চেয়ে থাকি অবিরত। ঘুচা মা প্রকৃতি, জড়তা নেত্রের, হৃদয়ের মােহ-কূপ, অসীম অনন্ত ব্ৰহ্মাণ্ড ব্যাপিয়া হেরি মা তােমার রূপ। সাগরে মা তাের, মিলাইয়া প্রাণ মম, গাহি মহাযােগে- ব্রহ্মাণ্ড-স্বরূপ ব্ৰহ্মময়ী নমােনমঃ। অনন্ত সৌন্দৰ্য- প্রকৃতি (সাপ্তাহিক পত্র)
লুকোচুরি
লুকোচুরি কেন এত আর,
চোখে চোখে সদা রাখি, তবু দিতে চাও ফঁাকি,
আমি কি বুঝি নে কিছু তার !
তুমি বটে ভাব মনে মনে,
মনােভাব রেখেছ গােপনে
হৃদয় সে নিরজন,
সেথ রম্য ফুলবন,
সন্ধান করিবে সাধ্য কার ?
কিন্তু সে তােমার ভুল,
সেথা যে ফুটেছে ফুল,
প্রতি শ্বাসে আসে গন্ধ তার,
সেথা যে গাহিছে পিক, কানে বাজিতেছে ঠিক
দূরাগত সঙ্গীত সুধার !
পুস্পাঞ্জলি
অয়ি মুগ্ধে, অয়ি সঙ্কুচিতে,
পারিবে না আমারে ছলিতে ;
তােমার হৃদয়-মাঝে,
যে সুর যখনি বাজে,
ঝঙ্কারে তা হৃদয়ে আমার ;
তবে যে বলি নে ফুটে, বিজয়ের-দীপ্তি টুটে,
পাছে কর মুখখানি ভার!
ভারতবর্ষ-কার্তিক, ১৩২৩
বঁশী
জাগাে জাগাে, ব্রজবাসী,
বাঁশী বাজে ওই,
এমন মধুর ধ্বনি
শুনি নন ত কই!
কে বাজায় কোথা হতে,
বুঝি নে ত কোন মতে,
শুধু গাে শ্রবণ-পথে
সুধা ঢালে, সই,
জাগাে জাগাে, ব্রজবাসী,
বাঁশী বাজে ওই।
নীরব নিঝুম নিশি,
নিশীথ গভীর,
জোছনা ঢালিয়ে দেছে
আলসে শরীর।
পুষ্পাঞ্জলি
এমন মধুর রেতে,
ওই শােন কান পেতে,
বাজিছে চরণে কার
মধুর মঞ্জীর,
সে ধ্বনি পবন বহে
ধীর-অতি ধীর।
বাঁশী শুনে ফোটে বনে
রাশি রাশি ফুল,
উছাসে যমুনা বয়
উছলিয়া কূল।
কুহরিয়া উঠে পিক,
শিহরিয়া উঠে দিক,
স্থাবর জঙ্গম ঠিক
সমান আকুল,
কি জানি কি ভাবে প্রাণে
কিসে আনে ভুল !
আমার হিয়ার মাঝে
কেমনে কোথায়
পুস্পাঞ্জলি
৩
•
কি কথা লুকানাে ছিল
তাই বাঁশী গায়।
লুকানাে তা ছিল কি যে,
জানি নে তা আমি নিজে,
কি মন্ত্রে কেমনে খুঁজে
বাঁশী তা শুনায় !
কে বাঁশী বাজায়, ও গো,
কে বাঁশী বাজায় ।
সে কোন্ গহন বনে
ভুবন-মােহন,
বাজায় জানি নে, সখী,
বাঁশরী এমন।
তমালের তলে খুঁজি,
সেথা বঁধু আছে বুঝি,
খুঁজি কালিন্দীর কূলে
নিল যতন,
সে মাের পরাণ-বঁধু
জানি কেমন !
৩
৩৯
পুষ্পাঞ্জলি
star এ
s
আমি ব’লে নই, ও গাে,
আমি ব'লে নই,
আপনা হারায় কে না
বঁশী শুনে ওই ।
জড়ের
অধিক
হেন,
তােমরা ঘুমায়ে কেন,
ওঠ ওঠ, প্রাণসখা,
ওঠ প্রাণ-সই
জাগাে জাগাে, ব্রজবাসী,
বাঁশী বাজে ওই ।
মাসিক বসুমতী-অগ্রহায়ণ, ১৩২৯
অন্তিম আদেশ
(ধীবরের গৃহে ভগবান্ শাক্যসিংহের কথিত কাহিনী
অবলম্বনে লিখিত )
ছিল কাশীধামে
ব্ৰহ্মদত্ত নামে
বড় রাজা একজন,
অতিশয় কর
দারুণ নিষ্ঠুর
ঈর্ষা-ক্রোধ-পরায়ণ।
তখন কোশলে,
হীন অতি বলে
দীঘিতি নামেতে রাজা,
সন্তানের মত
স্নেহে অবিরত
পালিতেন নিজ প্রজা।
ব্ৰহ্মদত্ত তার
রাজ্য ছারখার
করিল সবলে গিয়া,
বুঝিয়া গতিক,
দীঘিতি সস্ত্রীক
বাঁচিলেন পলাইয়া।
পুস্পাঞ্জলি
খাটিয়া দুজন
দীঘাভূ বলিয়া
কাশী-প্রান্তবাসী
পরম বিশ্বাসী
ছিল এক কুকার,
তাহার আলয়
করিল আশ্রয়,
তার বৃত্তি করি সার।
কিছুদিন পর
সেখানে সুন্দর
পুত্র প্রসবিল রাণী,
করে উপার্জন,
দিন যাপে তিন প্রাণী।
আনন্দে গলিয়া,
ছেলেটিকে তারা ডাকে,
রাজ্য হারাইয়া, তাহাকেই নিয়া,
পূৰ্ব্বকথা ভুলি থাকে।
বছরের পর
কতই বছর
এইরূপে হলাে পার,
একদা নিষ্ঠুর
ব্ৰহ্মদত্ত ক্রর
সন্ধান পাইল তাঁর।
বিলম্ব নিমেষ
করি’, আদেশ
দিল অনুচরগণে,
ত্বরা করি গিয়া
আনিতে বাঁধিয়া
রাজা রাণী দুইজনে।
পুষ্পাঞ্জলি
সম্মুখে হাজির
তাদের ধরিতে
চলিল ত্বরিতে
রাজ-সেনা বহুজন,
মশক মারিতে
কুমার-বাড়ীতে
কামানের আয়ােজন!
কুম্ভকার-গৃহ
হইতে নিরীহ
রাজা ও রাণীরে টানি
ক্রর নৃপতির
করিল তাহারা আনি'।
ব্রহ্মদ ভূপ
বিচার-বিদ্রুপ
করিল আদেশ দান,
“এই দণ্ডে নিয়া
বধ্য ভূমে গিয়া
বধ’ এ দুটার প্রাণ।”
আমাত্রে তার
যমদূতাকার
অনুচর অগণিত,
বেড়িয়া দুজনে
করিল সে ক্ষণে
বধ্যভূমে
উপনীত।
পিতা ও মাতায়
ধরে লয়ে যায়
যখন রাজানুচরে,
পুস্পাঞ্জলি
কোন সমাচার
জানিত না তার
দীঘাভূ ছিল না ঘরে।
গ্রাম-মাঝে ঢুকে
শুনি’ লােকমুখে
এই নিদারুণ কথা,
রুদ্ধশ্বাসে, হায়
বধ্যভূমে ধায়,
যথা তার পিতা মাতা।
শান্ত অচঞ্চল
বদন-মণ্ডল
পিতার দেখিল গিয়া,
পিতা কহে তায়,
উদ্দেশে আশিস্ দিয়া
“মাের বলিবার কিছু নাহি আর,
মাত্র শেষ অনুরােধ
বৎস দীঘা,
হিংসায় হিংসার শােধ।”
মধুর ভাষায়
লইও না কভু
এ কথা শুনিয়া
বন-মধ্যে গিয়া
দীঘাভূ কঁদিল কত,
বনের মাঝার
কয় দিন তার
এইরূপে হ’ল গত।
পুষ্পাঞ্জলি অতি সুমধুর কয় দিন পরে ফিরিয়া নগরে, রাজ-হস্তিশালে গিয়া, মাহুতেরে তুষি। হল বড় খুসি তারি কাছে কাজ নিয়া। একদিন ভােরে আধ-ঘুম-ঘােরে যখন নগরবাসী, দীঘাভূ তখন মানস-মােহন বাজায় আপন বাঁশী। সে বাঁশীর সুর পশিল রাজার কানে, কহিয়া সেবকে বংশীবাদকে কাছে ডাকাইয়া আনে। তুষ্ট নরপতি হয়ে তার প্রতি কহিলেন তারে পাছে, “শরীর-রক্ষক হামার সেবক হয়ে থাকো মাের কাছে।” রহিল দীঘাভূ- কাজে তার কভু তিল ক্রটি নাহি হয়, নানা গুণে তার ক্রমশ রাজার হৃদয় করিল জয় ।
পুস্পাঞ্জলি একদিন রাজা শিকারেতে যা যা আবশ্যক, সব নিয়ে, সঙ্গী সেনা সনে চলিলেন বনে, রথে বসি’ বার দিয়ে। দিলা নরপতি দীঘাভূর প্রতি রথ-চালনের ভার, বেগে তীরবৎ চালাইল রথ, দীঘাভূ আদেশে তাঁর। সঙ্গী সেনা হতে গিয়া ভিন্ন পথে পশিল নিবিড় বনে, কে বুঝিবে আর অভিসন্ধি তার ছিল কি যে মনে মনে। বেলা দ্বিপ্রহর নৃপতি কাতর ক্ষুধায় তৃষ্ণায় অতি, হয়ে নিদ্রাতুর অঙ্কে দীঘাভূর মাথা রাখে শীঘ্রগতি। কিছুক্ষণ পরে ঘাের নিদ্রাভরে ব্ৰহ্মদত্ত অচেতন, দীঘাভূর আঁখি যেন রক্ত মাখি’ প্রকাশিল সেইক্ষণ- পুস্পাঞ্জলি ১ , , , কোষ-মুক্ত অসি “এই দুরাচার বধেছে আমার পিতা মাতা হিতকামী, উষ্ণ রক্তে এর তর্পণ তাদের করিব আজিকে আমি।” উঠিল ঝলসি” মুষ্টিবদ্ধ করি’ তায়, ভূপতির বক্ষ করি’ স্থির লক্ষ্য বিদীর্ণ করিতে যায়, সহসা সে ক্ষণে পড়ে গেল মনে শেষ পিতৃ-অনুরােধ- “বৎস দীঘা, লইও না কভু হিংসায় হিংসার শােধ।” হস্তে অসি স্থির, বদন গম্ভীর, সহসা গেল সে থামি’-- মিটাইতে ক্রোধ, শেষ অনুরােধ লঙ্ঘিব পিতার আমি । এখন সময় রাজা জাগি কয় স্বপ্ন দেখি ঘুমঘােরে, ৪২ পুষ্পাঞ্জলি “যায় প্রাণ যায়, না দেখি উপায়, দীধাভূ, বাঁচাও মােরে !” কহিল দীঘাভূ- “ভয় নাই, প্রভু, রাখিয়াছি তব প্রাণ, পিতার আদেশ মনে পড়ি’ শেষ হইয়াছি সাবধান।” পরে সমুদয় চক্ষু হ’ল স্থির নিজ পরিচয় দীঘাভূ বাজারে বলে, অন্তিম আদেশ পিতার বিশেষ কহিল নয়ন-জলে। ক্রর ভূপতির জানি না সহসা কেন, হৃদয় পাষাণ, কর্দম সমান গলিয়া কোমল যেন! কহে ক্র-রাজ- “জীবনের কাজ, নাহি বুঝিয়াছি আগে, বুঝিলাম শুনি’ জীবনের শেষভাগে। সাধুর কাহিনী,
পুষ্পাঞ্জলি
• • • • • •
•••••••••
যাইতেছে জ্বলে
অনুতাপানলে
এ মাের কঠিন হিয়া,
সাধু, সাধু-সুত,
যাও যাও দ্রুত,
পিতৃরাজ্য লহ গিয়া।”
মাসিক বসুমতী-ভাদ্র, ১৩৪১
সংসার-সঙ্গিনী
দাড়াও আলােকময়ী,
এ ঘোর সংসার-পথে-
এ ঘাের নিশীথে আমি
পথ-হারা বন-ভূমে,
শ্রান্ত ক্লান্ত পা দুখানি
বন-ভূমি চুমে চুমে,
অবসন্ন দেহ প্রাণ
চাহিছে বিরাম-স্থান,
কাতরে বহিছে বারি
নিদ্রাতুর আঁখি হতে
দাড়াও সংসার পথে।
দাড়াও আনন্দময়ী,
এ ঘোর সংসার-পথে-
হেথা যে দুর্বল প্রাণে
আশার নিরাশ-খেলা,
পুস্পাঞ্জলি
৪৫
প্রাণের আনন্দ নাশে
সারা-নিশি সারাবেলা ;
পেয়ে ও আনন্দধারা
হাসে চন্দ্র, ফুটে তারা,
ঢাল সে আনন্দ-সুধা
নিরাশ শরণাগতে--
দাড়াও সংসার-পথে !
দাড়াও করুণাময়ী,
এ ঘাের সংসার-পথে-
করুণার তরে আমি
আকুল জগত ঘুরে,
এখানে পেয়েছি দেখা
জগতের অতি দূরে,
বিশদ করুণা-রেখা
যেন ও ললাটে লেখা,
যেন ও হৃদয় মগ্ন
জগতের মহাব্রতে-
দাড়াও সংসার-পথে !
৪৬
পুস্পাঞ্জলি
দাড়াও মঙ্গলময়ী,
এঘাের সংসার-পথে---
জগতের কাৰ্য্য যত
তােমার করুণা লভি’,
আশা হয় মনে যেন
সাধিতে পারিব সবি ;
এ বিশ্বে ঢালিতে প্রীতি,
প্রতিরাশি মূর্তিমতী,
তােমারে এ কোন্ বিধি
মিলাইল কোথা হতে
এ ঘাের সংসার-পথে ।
প্রচার-আষাঢ়, ১২৯৫
ফুলের খেলা
সে কোন্ ফুলের খেলা ফুলের বনে,
কি স্বপনে দেখেছিনু, জাগে তা মনে।
সেই একদিন হায়,
মধু-নিশি যায় যায়,
ঢল ঢল জোছনায় সুখ-শয়নে,
নদী-কূলে ছিনু শুয়ে কুসুম-বনে।
রজত-মল্লিকা পাশে,
ঘুমায়ে ঘুমায়ে হাসে,
ধীরে বায়ু যায় আসে প্রমােদ-ভরে,
জোছনা-মাখান জল,
বয়ে যায় কল কল,
পিক-বধূ ঢালে মধু শ্রুতি-কুহরে।
জানি কি মােহ মাখি মুদিয়া আসিল আঁখি,
কি দেখিনু, চমকিকে এ বুঝি না,
কুসুম-কোমল করে
মধুর বিলাস-ভরে
বাজাইয়া গেল মাের হৃদয়-বীণা।
৮
পুষ্পাঞ্জলি
L: A GA
নয়ন মেলিয়া চাই, আর না দেখিতে পাই,
জোছনায় নাই-নাই কুসুম-বনে,
কোথায় খুঁজিব চোর, হয় নাই নিশিভাের,
তখনাে যে ঘুম-ঘাের ছিল নয়নে।
প্রতিভা
গাঁথা মালা
সই রে জুলিনু মিছে,
বাসনা হইল সার ।
সারা বন বুলে বুলে,
বন-ফুল তুলে তুলে,
গাঁথিনু চিকণ মালা
দিব কারে উপহার ?-
সই রে জুলিনু মিছে,
বাসনা হইল সার ।
হৃদয়ে বাসনা ভরে
গাঁথিলাম যার তরে,
সে কোথা চলিয়ে গেছে
জানি নে ত কিছু ভার ;
কেন তবে গেঁথে মালা
মিছে বাড়াইনু জ্বালা,
.
পুস্পাঞ্জলি
হৃদয় ডুবায়ে দিনু
শােক-হ্রদে নিরাশার
সই রে জ্বলিনু মিছে,
বাসনা হইল সার ।
আগে ত জানি নে মাল।
গাঁথিলে কঁদিতে হবে,
কঁদিতে সাধনা করে
কে মালা গাঁথিত তবে ?
এত আশা ল'য়ে মনে,
কে আসিত ফুল-বনে,
লতিকারে ব্যথা দিতে
কে হরিত ফুল তার ?
সই রে জ্বলিনু মিছে,
বাসনা হইল সার ।
গেয়ে এসেছিল অলি
চুমিতে কুসুম-কলি,
পুস্পাঞ্জলি
ফিরে তারা চলে গেল
করে সবে হাহাকার,
তরু-তলে ফেলে গেল
বিরলে নয়নাসার !
আমি যেন তাই নিয়ে,
মালা গেঁথে তাই দিয়ে,
দুয়ারে দাঁড়ায়ে আছি
আশা-পথ চেয়ে তার,
সই রে জ্বলনু মিছে,
বাসনা হইল সার ।
;
অতি অবশেষ নিশি,
শেফালি পড়িছে খসি’,
উষারে জাগাতে আসি
ডাকে বায়ু বারেবার
আলসে আকাশগায়
मान চাদ
ডুবে যায়,
তারা-মালা পড়ে খসে-
যামিনীর গাঁথা হার!
পুস্পাঞ্জলি
* *
* ress
আমি শুধু সারা নিশি
প্রহর গণিমু বসি”,
ফুল-দল পড়ে খসি’,
ফুরায় সুরভি তার,
সই রে জ্বলিনু মিছে
বাসনা হইল সার !
প্রাণের মাঝারে আজি
উথলে যমুনা-জল,
কি দিয়ে কেমনে সখী
রােধিব তাহারে বল্ !
জীবন সে কোন্ পুরে,
আলয় খুঁজিছে দূরে,
হৃদয় যে ভেঙেচুরে
হয়ে গেল একাকার,-
সই রে জ্বলিনু মিছে,
বাসনা হইল সার ।
প্রচার-বৈশাখ, ১২৯৪
অমর-সঙ্গীত
এলাহাবাদে জাতীয় মহাসমিতির চতুর্থ অধিবেশন
উপলক্ষে লিখিত]
এখনাে কে আছ অবসন্ন-প্রাণ,
উঠ, জাগ---শােন ভারত-সন্তান,
মৰ্ত্তভূমে আজি কি অমর-গান
অনন্ত উচ্ছ্বাসে বহিয়া যায় ;
দেখহ চাহিয়া কি বা অনুরাগে,
কি সিদ্ধি লভিতে, কোন্ মহাযাগে,
শত শত ভক্ত শিলিয়া প্রয়াগে
প্রমত্ত আজি এ মহাপূজায় !
ভেদিয়া নিবিড় অভেদ্য আঁধার,
অনন্ত আকাশে যেন পূর্বাশার
ভাতিবে কি রবি তেজঃপুঞ্জাকার
সমগ্র ভারতে কঁপিছে গান ;
৫৪
পুস্পাঞ্জলি
শত শত ভক্ত বৈষম্য ভুলিয়া,
অপূৰ্ব্ব বিস্ময় পুলকে পূরিয়া,
প্রতীক্ষায় তাই আছে দাড়াইয়া
সে পদে কি অর্ঘ্য করিবে দান
বুঝি সে আলােকে ঘুচাতে বিষাদ,
স্বর্গ হ’তে ক্ষরি’ আসে আশীৰ্বাদ,
ভারতে ছুটিছে সংবাদ,
চরাচর সুখী হইবে তায়--
এখনাে কে আছ অবসন্ন-প্রাণ,
উঠ, জাগ—শােন ভারত-সন্তান,
মর্ত্যভূমে আজি কি অমর-গান
অনন্ত উচ্ছাসে বহিয়া যায়।
ব্যাপিয়া অনাদি অনন্ত সময়,
দেখ কত জাতি এই বিশ্বময়,
এ শুভ মুহূর্ত করিয়া আশ্রয়
জাগিল—গাহিল অমর-গান ;
পুস্পাঞ্জলি
দিব্য মুখজ্যোতি অমনি হেরিয়া,
কোটি কোটি প্রাণী বিস্ময়ে পূরিয়া,
সসম্ভ্রমে সবে চাহিল ফিরিয়া-
দেখিয়া হইল মােহিত-প্রাণ।
অতুলিত স্নেহ প্রকাশি' জননী-
ফল-ফুল-শস্যে শোভিত ধরণী----
লয়ে সুতচয়ে বুকেতে আপনি
হাসিল -- জগৎ আনন্দময় ;
দিব্যালােক ব্যাপ্ত হইল এ ভুবি,
দীপ্ত গ্রহ গেল সে আলােকে ডুবি,
ভূতলে ধ্বনিল অমর-দুন্দুভি,
ভূলােকে ঘােষিল দ্যুলােক-জয়।
বসুধা-বিখ্যাত বৃটনের বরে,
আসে কি সে দিন ভারত-ভিতরে,
শত শত ভক্ত তাই যােড়করে
দাড়াইয়া সবে রােমাঞ্চকায়—
পুস্পাঞ্জলি এখনাে কে আছ অবসন্ন-প্রাণ, উঠ, জাগ—শােন ভারত-সন্তান, মর্ত্যভূমে আজি কি অমর-গান অনন্ত উচ্ছ্বাসে বহিয়া যায় । এস এস ভাই হিন্দু মুসলমান, এস বৌদ্ধ জৈন পারসী খৃষ্টান, • এ ব্ৰহ্মমুহূর্তে করি’ গাত্ৰোথান বন্ধুভাবে মিলি সবে দাঁড়াই ; এ প্রাণ পূরিয়া অপূৰ্ব আশায়, করি স্তুতিগান অমর-ভাষায়, তমঃপুঞ্জ ভেদি’ যদি এ উষায় সে রবি উদয় দেখিতে পাই। অষ্টাবিংশ কোটি কণ্ঠে তুলি লয় গাহিতে পারিলে জননীর জয়, জাগে কি জীবনে মরণের ভয়- অসার সংসার-ভাবনা ছার-
পুস্পাঞ্জলি
মহাষজ্ঞ মাতৃ-ক্লেশ-বিমােচন,
মাতৃপূজা কোটি কোটি দেবার্চন,
ইহ-পর-লােকে কি আছে তেমন
বাঞ্ছিত নরের বল না আর ?
এস, ডাকি তাই পারসী খৃষ্টান,
এস বৌদ্ধ জৈন হিন্দু মুসলমান,
ভুলি জাতিগত দ্বেষ্য অভিমান
এ মহা-উৎসবে ডুবিয়া যাই ;
একই দেশমাতৃগর্ভে জনমিয়া,
রাজ-কুল-রাজেশ্বরী ভিক্টোরিয়া-
একচ্ছত্র রাজ্যে শাসিত হইয়া,
একত্র কেন না হইৰ ভাই ?
শুভক্ষণে দেখি সুমঙ্গলময়
আজি এ ভারতে মহা অভিনয়,
প্রফুল-বদনে বলি’ জয় জয়
জাগ নারী-নর পুলক-প্রাণ ;
পুষ্পাঞ্জলি রাখি’ পূর্ণ কুম্ভ, রচি আমসার সুশশাভিত কর গৃহ গৃহদ্বার, প্রীতি-নীরে ধুয়ে কর পুনর্বার পবিত্র মাতার পূজার স্থান। অষ্টাবিংশ কোটি কণ্ঠে তুলি লয়, এস সবে গাহি জননীর জয়, জীবনে না রবে মরণের ভয়, অসার সংসার-ভাবনা ছার- মহাযজ্ঞ মাতৃ-ক্লেশ-বিমােচন, মাতৃপূজা কোটি কোটি দেবার্চন, ইহ-পর-লােকে কি আছে তেমন বাঞ্ছিত নরের বল না আর? গাঢ় তমঃপুঞ্জ সমাচ্ছন্ন দিশি, কাটিয়াছে বহু সুপ্ত ঘাের নিশি, আঁধারের সাথে গিয়াছিল মিশি’ প্রাণের সাধনা কামনা বল ;
পুষ্পাঞ্জলি
পূরবে নিরখি কনক-কিরণ,
জাগিয়া আবার আজি কত জন,
মেলিয়া নবীন প্রফুল্ল নয়ন
হেরিছে সমগ্র ধরণী-তল।
বসুধা-বিখ্যাত বৃটনের বরে
আসিছে সুদিন ভারত-ভিতরে,
দাড়াইয়া আজি তাই যােড় করে
দেখ কত ভক্ত রােমাঞ্চ-কায় ;
এখনাে কে আছ অবম-প্রাণ,
উঠ, জাগ --শােন ভারত-সন্তান,
মভূমে আজি কি অমর-গান
অনন্ত উচ্ছ্বাসে বহিয়া যায় ।
প্রচার-প্রহায়ণ,
অমানুষের প্রতি শুধু খেয়ে খেলে হেসে অবহেলে দিন কেটে গেলে হয় এ নয়, এ নয় মানুষের কথা--~-- কখনই এ তো নয়। তাই যদি হবে পশু ও মানবে প্রভেদ কোথায় তবে ? কি কাজ ভবনে ? যাও চলে বনে, পশুদের সাথে রবে। ঈশ্বরের দান আত্মা সুমহান, বিবেক বিগ্রহ তায়, জ্ঞান ভক্তি প্রেম, যা কিছু সকলি টেনে ফেল দরিয়ায়। মানুষের ভাষা কলঙ্কিত আর করিও না কথা কয়ে, যাও, বনে যাও- কর গে চীৎকার, বনচর পশু হয়ে।
পুস্পাঞ্জলি
। ।
*******
।
দুর্লভ রতন,
বিরাজে সম্মুখে--
মনুষ্য-জীবন
হেলার সামগ্রী নয়।
সাজে না ইহাতে
শুধু বাজে কাজে
সময়ের অপচয়।
জ্ঞানের সমুদ্র
রত্ন কর আহরণ,
চেয়ে দেখ ওই
কঁদে চারিদিকে
কত দীন দুঃখী জন।
ক্ষুদ্র নহ তুমি,
তুমি শক্তিমান্,
ঘুচাও তাদের দুখ,
বুঝিবে তা হলে, আছে যে কোথায়
জীবনে প্রকৃত সুখ ।
নরদেহ ধরি’
জন্মিয়াছ যদি,
ধরাে না পশুর বেশ,
মানুষ হয়েই
করে যাও তুমি
মানুষের কাজ শেষ।
ফুলের হাসি
আঁধারে আজি ফুল ফুটিলি কেন বল,
কি সুখ প্রাণে তাের লুকায়ে পরিমল ।
তাের এ রূপরাশি,
তাের এ সুধা-হাসি
আঁধারে মিশাইয়ে লভিলি কোন্ ফল---
আঁধারে আজি ফুল ফুটিলি কেন বল্ !
তুই ফুটিবি বলে প্রবাসে যেতে যেতে,
সাঁঝের রবি-খানি আপনি আড়ি পেতে,
মেঘের আড়ে থেকে চাহিল তাের পানে,
চাহিল বার লােহিত দুনয়ানে ;
সােনার কর দিয়ে অতুল সুষমায়
সাজালে কভু সাধে আপনি তাের কায়,
বিষাদে কত বার করিয়ে কত ভাণ,
গাছের আড়ে গিয়ে জানালে অভিমান ;
পুস্পাঞ্জলি
১ । ।
৬. - * - 4
««
* * *
==
তুষিতে তার প্রাণ তবু ত উঠিলি না-
কই রে, ফুলবালা, তুই ত ফুটিলি না।
চুমিতে পরিমল
আকুল অলিদল
কত না আশা করে এখানে এসেছিল,
পাখীরা নেচে নেচে,
পাখীরা গেয়ে গেয়ে,
ঘুরিয়ে তাের পাশে সকলে ফিরে গেল।
নদীতে ছুটে ছুটে আকুল ঢেউগুলি,
ধরিতে হাসি তাের আসিল মুখ তুলি'।
চাহিয়ে তাের পানে কত না আশা করে,
হতাশে চলে গেল মিশিতে পারাবারে।
কাতর সে সবারে ভাল ত বাসিলি না,
কই রে, ফুলবালা, তুই ত হাসিলি না।
তিমিরে বস্তুমতী হইলে নিমগন,
শীতল জলকণা বহিয়া সমীরণ,
নিসাড়ে নিরিবিলি আসিয়া গুটি গুটি,
মুছায়ে দিল তাের অলস আঁখি দুটি ;
অমনি ধীরে ধীরে দেখিলি তুই চেয়ে,
করিল সুধা-হাসি অধর তাের বেয়ে।
পুস্পাঞ্জলি
• • •'।
খেলিলি বায়ু সনে সরমে ফিরে ঘূরে,
কখনাে কাছে তার, কখনাে গিয়ে দূরে ;
শ্যামল কিসলয় তাের সে কেশ-ভার,
লুকালি তার মাঝে মুখানি কত বার।
হাসিয়া সমীরণ আসিয়া পুন দুলে,
সােহগে চুমি’ তবে ঘােমটা দিলে খুলে
অমনি হেসে তুই হইলি ঢ ঢ--
আঁধারে আজি ফুল, ফুটিলি কেন বল্।
প্রচার-আষাঢ়, ১২৯৩
মহাভিক্ষা
অনন্ত কালের স্রোতে
ভেসে যায় দিবা রাত্রি,
চলে যায় আলাে অন্ধকার,
জানি নীরবে কোথা
গঠিছে অনন্ত কাল
আলােক-আঁধার-পারাবার।
না জানি নীরবে টুটি”
অনন্তে মিশিছে কোথা
কোটি কোটি জীবের বাসনা,
জানি লভিছে কোথা
বিজনে বিশ্রাম-সুখ
পথশ্রান্ত প্রাণের যাতনা।
অনন্তে অসীমে শুয়ে,
গভীর বিজন-মাঝে
জগতের নেত্রজল দিয়ে,
পুস্পাঞ্জলি
জানি খেলিছে কোথা,
স্বপনে নিদ্রিত কাল
রােদন-সমুদ্র বিরচিয়ে
এ আমি অসীম মাঝে
ক্ষুদ্র---ক্ষুদ্রতম
অতি-
পবনের পরমাণু প্রায়,
জানি কিসের তরে
প্রাণে মহাভিক্ষা লয়ে
ছুটিয়াছি জাগ্রতে নিদ্রায়।
পুঞ্জ পরমাণুময়
বিশাল বিশ্বের এই
প্রতি অণু-পরমাণু-কাছে,
প্রতিদিন-প্রতিক্ষণ,
স্বপ্নময়-মােহময়
কি ভিক্ষা আমার যেন আছে।
কে যেন গঠিছে নিত্য
তাহাদের সাথে মোর
সংযােগের অচ্ছেদ্য বন্ধন,
পুষ্পাঞ্জলি এ আত্মা ঢাহিছে তাই আগ্রহে সে সকলের প্রতি আত্মা করিতে চুম্বন। তারাও আসিয়া তাই জ্ঞাত বা অজ্ঞাতসারে প্রাণে মাের যেতেছে মিশিয়া, অনুদিন অনুক্ষণ- তিলেক বিশ্রাম নাই, ব্যস্ত আছে আমারেই নিয়া। জানি না ত আমি কিছু আমার এ মহাভিক্ষা, তাহাদের এই মহাদান, অনন্ত কালের পুনঃ অঙ্গুলি-সঙ্কেতে কবে চিরতরে হবে তাবসান। ভারতী-ভা, ১২৯৪
নববর্ষ
আকাশ-তলে সাগর-জলে,
পেতে বিশাল রঙ্গভূমি,
নেচে নেচে গেয়ে গেয়ে
দিচ্চ দেখা কে আজ তুমি ?
ভবিষ্যতের তান্ধকারে
তােমার সকল অঙ্গ ঢাকা,
আশার চোখে দেখচি কেবল
মুখখানি ও হাসিমাখা ।
আচ ব'লে তুমিই কি হে
নব-দূর্বাদলে মিলে,
মাঠে ঘাটে হরিণ
আসনগুলাে বিছিয়ে দিলে ?-
গুল্ম-তরু-লতা গুলাে
বনের মাঝে সাজিয়ে মঠ,
চার দিকেতে খুলে দিলে
নানা রঙের দৃশ্যপট ?
পুষ্পাঞ্জলি
ভিতর থেকে বেরিয়ে এলো
চেনা চেনা পাখীগুলি,
অভিবাদন করতে কি তাই
নিয়ে কিচির-মিচির বুলি ?
এস এস, নববর্ষ,
সবাই সুখী তােমায় দেখে,
হাসিমাখা মুখটি কিন্তু
ঐ খানেতে এস রেখে।
একটু আগে, যার সনে এই
কোলাকুলি করলে সুখে,
এসেছিল সেও অবিকল
তােমার মত হাস্যমুখে।
রঙ্গ কত করবে ব'লে
লোভ দেখালে শত শত,
প্রকৃতি তার এগিয়ে এসে
দৃশ্যপট ঐ খুললে কত।
গান শােনাতে অলি এলো,
রূপ দেখাতে ফুল-বালা,
পুস্পাঞ্জলি
লতা এলো ঘােমটা টেনে
মাথায় ফুলের বরণডালা।
এই রকমে চোর সে চতুর
সঙ্গে নে তার সঙ্গী কটা,
জুটেপুটে লাগিয়েছিল
অভিনয়ের বড্ড ঘটা।
গেল যখন, দেখি তখন
হিসেব ক'রে কি ছাই চুলল,
অভিনয় সে করে গেছে
বিয়ােগান্ত নাটকগুলাে।
হাতে মাথা রাখতে দেখি
চক্ষু যেন হয়ে ফুটো,
তপ্ত জলের ধারা বয়ে
ভিজে গেছে গণ্ড দুটো।
মাথায় আবার ছােট বড়
একশাে আগুন জ্বেলে দেছে,
বুকের মাঝে হাত দে দেখি,
কি-যেন-কি হারিয়ে গেছে!
আরেকটা কাজ এই করেছে
দেখিয়ে সে তার বাহাদুরি,
পুস্পাঞ্জলি
৭১
তলে তলে করে গেছে,
একটা বছর আয়ু চুরি!
এই বলে নয় একটা শুধু,
অমনতর এলে কত,
কালের গায়ে আঁচড় রেখে
পালিয়ে গেলো চোরের মত।
শায় মজে মুখ চেয়েছি,
জানি নে যে চিনির ছুরি,
একুশে ঢোখের মাঝখানেতে
প্রাণের ঘরে করলে চুরি।
তাই বলি, তুই লােভ দেখিয়ে
আর কেন ভাই জালা মিছে,
আজও আমার জ্বচে পরাণ,
কামড়ে গেছে কালের বিছে।
তুইও যত করবি ভাল,
জানতে আমার নেইকো বাকি,
নূতন বছর শুনতেই বেশ,
ভিতরেতে সবই কি!
ভারতী-বৈশাখ, ১২৯৩
অবিন্দু-উপহার
দয়াময়, কোথা তুমি, কোথা তুমি, এস-না হে,
পরিশ্রান্ত বড় আজি দাড়াতে পারি নে আর,
তােমারি আদেশে, নাথ,
সংসার ভ্রমিতে গিয়ে,
এনেছি তােমার তরে অশ্রুবিন্দু উপহার।
নানা খেলা পেয়ে সেথা, তােমারে ভুলিয়ে গিয়ে,
কত যে পেয়েছি জ্বালা, কি কব হে--কি কব হে;
এ ক্ষুদ্র হৃদয় মম,
যাতনা অনন্তোপম,
বল নাথ-বল নাথ, কত সহে- কত সহে !
দিশাহারা হয়ে আমি কত দিকে চেয়েছি যে,
কাতরে, আকুল প্রাণে কেঁদেছি যে কত বার,
দেখিতে কি পেয়েছি হে দেখা কি দিয়েছ, নাখ—
দশ দিকে দেখেছি যে অন্ধকার অন্ধকার !
কত মরু মরীচিকা
পেয়েছি জীবন-পথে,
কব কি তােমারে আমিনা জান কি তুমি তার
পুষ্পাঞ্জলি
১e ,
তােমার রাজত্বে ঘুরে,
নিরবধি পেয়েছি যা,
এনেছি তােমার তরে অশ্রুবিন্দু উপহার।
পাপী যে তাপী যে আমি, বড় জ্বালা সয়েছি যে,
তাপিত ব্যথিত হৃদে দিওনাক ব্যথা আর,
দয়ার ভিখারী আজি,
দুয়ারে দাড়ায়ে তব,
দয়াময়, দাও এসে নামাইয়ে দুখ-ভার।
দিয়েছিলে যত কিছু,
সব ফেলে এসেছি হে,
পারি নে আনিতে হেথা বিন্দুমাত্র আমি তার,
তােমারি আদেশে, নাথ,
সংসার ভ্রমিতে গিয়ে,
এনেছি তােমার তরে অশ্রুবিন্দু উপহার ।
ভার-~-মা, ১২৯৩
প্রভাতে
দেখ কে দাড়ায়ে হােথা
প্রভাতে কুসুম-বনে,
প্রভাত-কুসুম-শোভা
ফুটিছে কুসুমাননে।
জিনিয়া ঊষার বিভা,
ললাটে লাবণ্য কি বা,
ফুটাইছে যেন দিবা
সে কিরণ বরিষণে।
শিশুর আনন্দে যেন
মাখায়ে মায়ের গেই,
যুবার উৎসাহ দিয়া
গঠিত সে চারু দেহ ;
চাহিলে সে মুখ পানে,
হৃদি ভেসে যায় গানে,
এ বিশ্ব মিশায় প্রাণে--
বাহিরে থাকে না কেহ
পুস্পাঞ্জলি
।
=
দেখে যেন হাসি তার
হেসে ফোটে বনে ফুল,
শুনে সে ললিত বীণা
গেয়ে ওঠে পাখীকুল ;
মধুর নিশ্বাস-বাসে,
অলি আসি ভ্রমে পাশে,
ধরা সে সঙ্গীত-ভাষে
জেগে ওঠে প্রাণাকুল।
আকাশের কোলে কোলে
সাগরের তীরে তীরে,
তারি কথা গেয়ে যায়
বায়ু যেন ধীরে ধীরে ;
সুদূর মমঘের ঘর
ছাড়ি যেন রবি-কর
হাসে তার কেশ’পর
মুকুট সাজা'তে শিরে ।
পুস্পাঞ্জলি
শ্যামল পল্লব পত্র
ল’য়ে পুষ্প উপহার,
আগ্রহে প্রকৃতি থাকে
মুখপানে চেয়ে তার ;
সদানন্দময় চিত
সদা তার প্রমুদিত,
মধু ঋতু
বিরাজিত
হৃদয়ের চারি ধার। .
প্রাণের বাসনা যত
ছড়াইয়া ফুলবনে,
চির ফুল ফুলে মালা
গাঁথিছে আপন মনে ;
স্বর্গীয় সুরভি ঘ্রাণ
জাগাইছে হৃদে গান,
যেতেছে মিশিয়া প্রাণ
স্বপ্নময় জাগরণে।
ভারতী-অগ্রহায়ণ, ১২৯৭
সন্ধ্যায়
দেখ কে শয়িত হোথা
সন্ধ্যার বারতা লয়ে,
প্রাণের শাণিত বহে
নয়নের অশ্রু হয়ে ।
কথা-বার্তা হেথাকার
ফুরায়ে গিয়েছে তার,
কোথাকার সমাচার
মনে পড়ে রয়ে বয়ে
আকাশ-সমুদ্র-পারে
কি আছে তা ভাবে মনে,
গগনে ফুটিছে তারা
আনমনে তাই গণে;
৭৮
পুস্পাঞ্জলি
বায়ু-স্পর্শে অনিবার
কেঁপে ওঠে হৃদি তার,
সভয়ে অদূরে কার
পদধ্বনি যেন শােনে
হৃদি-ফুলবন ছিন্ন
সােভাশূন্য একেবারে,
শুষ্ক চিতাকাষ্ঠ-রাশি
জাগে শুধু চারিধারে ;
বিশ্বের জীবন গ্রাসি”
উঠিছে ধ্বংসের হাসি,
নাচিছে মরণ আসি
হৃদয়ের দ্বারে দ্বারে।
জীবন-সর্বস্ব শূন্য
দিবসের ঘাের রণে,
আঁধারে পথের সঙ্গী
খোঁজে তাই প্রাণপণে ;
পুস্পাঞ্জলি
আকুল হৃদয় তার
বিক্ষোভিত পারাবার,
নাহি শ্রান্তি ঝটিকার
দীর্ঘশ্বাস ক্ষণে ক্ষণে
একক
;
নাহি কি দেবতা মর্তে
আসি' এ সাগরতীরে,
আশার সুবর্ণদণ্ড
সঞ্চালিতে সিন্ধু-নীরে ;
আনিয়া স্বর্গের বর,
ঘুচাতে আর্নের ডর,
মস্তকে সঞ্চালি’ কর
শান্তি দিতে ধীরে ধীরে ।
রই-অগ্রহায়ণ, ১২৯৭
বাপের সাগরে
অসার অনিত্য রূপের সাগরে
কেন, মূঢ়, তুমি ডুবিতে চাও?
বাসনা করিয়ে সংসার-পাথারে
আপনা আপনি হারায়ে যাও!
অনন্ত দুর্লভ জীবন তােমার,
হৃদয় তােমার শােভার ভাণ্ডার,
কি সুখের তরে—কোন্ প্রয়ােজনে,
সাধের সর্বস্ব বিষাদে ছাও,
বাসনা করিয়ে সংসার-পাথারে
আপনা আপনি হারায়ে যাও।
এ যে
কেন
হেথা
ল’য়ে অশ্রুজল হৃদয়ের সাথী,
করুণার গান গেয়ে দিবারাতি,
মিছে কাজ নিয়ে করে মাতামাতি
বিফলে জীবন কাটা’য়ে দাও?
অসার অনিত্য রূপের সাগরে
কেন, মূঢ়, তুমি ডুবিতে চাও?
পুস্পাঞ্জলি
n
অকিঞ্চন তুমি কাঁদ যার তরে
ঘৃণিয়া তােমায় সে চায় অপরে,
অপর আবার তারে ঘৃণা করে
তদন্যে বায়ে—জান না তাও ?
মােহ-ঘােরে কেন সংসার-পাথারে
আপনা আপনি হারায়ে যাও!
এ যে
স্বপনের খেলা, স্বপনের হাসি,
কানে বাজে শুধু স্বপনের বাঁশী,
উদাস পরাণ শুনিতে ও গান
আকুল হইয়া নিয়ত ধাও?
অসার অনিত্য রূপের সাগরে
কেন, মূঢ়, তুমি ডুবিতে চাও !
কল্পনা—জ্যৈষ্ঠ, ১২৯৪
শারদীয় আবাহন
সুপ্রসন্ন ছায়াপথ
বাহি’ শরতের রথ
নামিয়া আসিল ধরাতলে,
দীর্ঘ বরষার পর
স্বর্ণবর্ণ রবি-কর
ধরণীর বুকে ঝলমলে।
পাখী গায় কলভাষ,
চামর দুলায় কাশ,
জলে ফোটে কুমুদ কমল,
চরণ-পূজার তরে শেফালী মীরবে ঝরে,
স্থলপদ্মে শােভিল ভূতল।
রক্তজবা ওঠে ফুটি, নীলের মাধুরী লুঠি’
ফুটিল অপরাজিতা রঙ্গে,
এস মা অপরাজিতা বঙ্গে।
হরিত শস্যের ক্ষেত্র দেখিলে জুড়ায় নেত্র,
বিছাইয়া দিয়াছে আসন,
এ আসনে যারে চাই, ভাবিয়া ত নাহি পাই,
কি নামে করিব আবাহন।
পুস্পাঞ্জলি
২৯
ব্যাপ্ত যিনি বিশ্বময়,
সৃষ্টি স্থিতি আর লয়
হার ইচ্ছার পরিণাম,
ক্ষুদ্ৰাদপি ক্ষুদ্র জ্ঞান লয়ে তুচ্ছ চিন্তা ধ্যান
মানব কি দিবে তার নাম ।
তাই নাম দূরে রাখি’ শুধু ‘মা’ বলিয়া ডাকি,
মা গাে পূর্ণ কর অভিলাষ,
দেখায়ে পুণ্যের পথ,
চালাও এ মােরথ,
পাপের প্রগতি কর নাশ।
মাসিক বসুমতী-আশ্বিন, ১৩৪১
তারা
নীরব নিথর
আকাশ-সাগরে
রচিয়ে আনন্দ-মেলা,
কে তােরা রূপসী, জেগে সারানিশি,
কৌতুকে করিস খেলা ?
আকাশের কোলে কতই হাসি-
কতই গাহিস্ গান,
আঁধারের কোলে ফুটিয়ে উঠি-
আঁধারে জুড়াস্ প্রাণ।
অনন্ত আকাশে
নিশির শিশিরে স্নান,
সারা নিশি জেগে
আনন্দে করিস
নিশির শিশির পান।
উজল প্রখর
তপন-কিরণ
নয়নে সহে নি বলে,
মুদি আঁখিপাতা
ঘুমায়ে পড়ি
দিবসে নভের কোলে।
নিশির কুসুম
পুস্পাঞ্জলি
সুখের প্রদেশে
বুঝি বা তােদের
নড়ে না। একটি শাখী,
মুখের স্বপন
ভাঙ্গিতে তােদের
ডাকে না একটি পাখী।
অতি মৃদু বায়
তরু-কোলে মৃদু
হেলে না একটি লতা,
কানে কানে বুঝি দুটি প্রাণীতেও
কহে না একটি কথা।
ততাদের সুদূর
সুনীল রাজ্যেতে
অবনীর কলরব,
পশিবার তরে
বাসনা মালেতে
মরে ঝরে পড়ে সব।
এ হেন বিজনে
শয়ন রচিস্
ঘুমাতে দিনের বেলা,
স্বপনের মাঝে । প্রাণে জাগে তবু
আঁধারের সনে খেলা।
সন্ধ্যার আরতি
পবন বহিলে,
প্রদোষে বাজিলে বীণা,
মিটি মিটি আঁখি ঢাহিয়ে দেখি
তপন ডুবেছে কি না।
পুস্পাঞ্জলি সেই শুভক্ষণ দেখিলে অমনি মিলে সহচরী দল, ছুটোছুটি করে আসিয়ে সাজা সুনীল গগন-তল। সকলে তখন, আনন্দ উছাসে, আঁধারে পূরিয়ে তান, অসীমের কোলে শয়ন রচিয়ে, অনন্তে গাহি গান ! ততাদের সঙ্গীত- সুধার ক্ষরণে অধর নাহিক নড়ে, অনিমিখ ওই ভাবের আঁখিতে পলক নাহিক পড়ে। নীরবতা সেথা কান পেতে যেন শােনে সে সঙ্গীত বসে, স্তুতিবাদ-ছলে নীরবতা তার মুখ হতে পড়ে খসে। অনন্ত অসীম দিগন্তের কোলে ফুটে, ভেদিয়া অনন্ত আঁধারের স্তর অসীম অনন্তে ছুটে। তবু সে সঙ্গীত পুস্পাঞ্জলি সংসারের জ্বালা তাসীমে বিলাতে আকাশের পানে চাই, আঁধারে তোদের সে সঙ্গীত নি’ কি-যেন-কি হয়ে যাই। আঁধারের কারা ভেদিয়া যে আমি এসেছি আঁধার হতে, সারা দিন রাত গেয়ে গেয়ে ভেসে চলেছি আঁধার-স্রোতে। কত নদী বন- দেশ দেশান্তর তাচল সমুদ্র-পারে, পৃথিবী ছাড়িয়ে সুদুর অসীমে, পৃথিবীর কোন্ ধারে- জানি নে ত কিছু সে আবার কোন অজানা আঁধার দেশে, ভাসিয়ে ভাসিয়ে গাহিয়ে গাহিয়ে গিয়ে যে ঠেকিব শেষে ! জীবনের পথে খুঁজি আমি তাই একটি সঙ্গীত-সাথী-- অনন্ত আঁধারে পথ দেখাইতে একটু আলােক-ভাতি।
পুস্পাঞ্জলি . এ এ এ | = a + তাের সে আমার আলােকের মালা আধারের ধ্যানে রত, নিরখি তােদের প্রাণে আমি তাই পাই সে সান্ত্বনা কত। আয় রে আমার সঙ্গীতের সাথী, আমারে নে হােথা তুলে, সংসারের মায়া- অসার বাসনা-- সব যাই আমি ভুলে। ও অনন্ত ধ্যান- অনন্ত সমাধি ঢেলে দে আমার প্রাণে, নীল নভ-কোলে বিভাের হইয়ে জুড়াই এ জ্বালা গানে। প্রচার-অগ্রহায়ণ, ১২৯৩
অতৃপ্তি
বাঞ্ছিত আমার তুমি হে---
তুমি প্রাণময় !
আমি চাহি না তােমারে বঁধু
এখানে,
এখানে তোমারে চেয়ে,
এখানে তােমারে পেয়ে,
পেয়েছি বেদনা বড়
পরাণে
আর চাহি না তােমারে বঁধু
এখানে :
হেথা
দেখিয়া পূরে না বঁধু
বাসনা,
হৃদয়ে শুকায়ে মরে
কামনা।
১০
পুস্পাঞ্জলি
তিলেকে ফুরায় হাসি,
বাজে না প্রাণের বাঁশী,
ঢাকে সুখ আঁধারের
বিতানে--
চাহি না তােমারে বঁধু
এখানে।
হেথা বিরহ মাখান নীল
আকাশে,
হা হা রব ওঠে শুধু
বাতাসে;
প্রাণের আকুল গান
কেঁদে হয় অবসান,
প্রেমের সমাধি হয়
শ্মশানে,
আর চাহি না তােমারে বঁধু
এখানে !
পুস্পাঞ্জলি
সেথা জীবন জুড়াব যদি
দেখা পাই,
মরণ চরণ-তলে
দেয় ঠাই ;
গঠি চির-বিনােদন
বাসনার উপবন,
পরাণ মাতাব সেথা
সে গানে—
আর চাহি না তােমারে বঁধু
এখানে !
প্রচার-তাষ,
কোথা
মা
কোথা মা, কোথা মা শান্তি রাণী,
দারুণ তৃষ্ণায় প্রাণ
হয় বুঝি অবসান,
ঢেলে দে মা শান্তি-সুধা আনি'।
দুর্গম পৰ্বতে এ যে অরণ্যে হারানু পথ,
সম্মুখে অনন্ত গুহা অন্ধকার ভবিষ্যৎ ;
জ্যোতিঃ-শূন্য তাপরাশি যেন মা গ্রাসিতে আসি
আপনার দিকে লয় টানি।
কি ঘাের নেশায় মেতে কি এক স্বপন-ভরে,
অসুখের মাঝে যেন ছুটেছি সুখের তরে ;
পদে পদে দুঃখ সহি,
তবুও নিবৃত্ত নহি,
কি রহস্য কিছু ত না জানি।
পুস্পাঞ্জলি
........
ভাঙ্গি’ পড়ে গিরিচূড়া যেন শত বজাঘাতে,
মাঝে মাঝে শুনি ধ্বনি—কঁপে মা হৃদয় তাতে ;
ভয়ে সারা হই প্রাণে, শুনিতে না পাই কানে
আশার অমৃতময় বাণী !
পেলে মা করুণা-বিন্দু দুখ-সিন্ধু যাব ভুলে,
বারেক বিপন্ন দেখে চাহ গাে ম মুখ তুলে ;
জীবন সফল করে দেখি মা নয়ন ভরে
স্নেহ-মাখা তাের ও মু'খানি ।
ভারতী
আমি
আমায়
এসেছি আবার
নবীন ঊষায়
অরুণ-কিরণ মাখি;
মনের দুয়ার
খুলিয়ে আমায়
ডেকেছে বনের পাখী
বিটপী ডেকেছে
বিষাদ সহিয়া,
মলয় ডেকেছে
মধুরে বহিয়া,
ডেকেছে লতিকা
আদর করিয়া
ফুটায়ে কুসুম-আঁখি !
আবার
পুস্পাঞ্জলি
মধুর গুঞ্জরি
এসেছে ভ্রমর
খুঁজিতে আমারে
কানন-ভিতর,
আবার খুঁজিয়া আমারে
নলিনী কাতর
সলিল-শয়নে থাকি।
মানস আমার
করিতে তােষণ
কোকিলে ভাষিছে
মধুর ভাষণ,
আবার ধরণী পেতেছে
হরিত আসন,
আমি দেখিতে পাই নে তা কি ?
সং-১৮৯ ,
হরিষে বিষাদ
আলাদী বিষন্ন
দুঃখেই কাটে দিন-~-
ছেলেটির আয়-উপায় কম,
ঠাকুরকে কত ডাকে,
মুখ তুলে নাহি চান,
কোলেও না টেনে নেয় যম।
এ দুঃখ-কষ্টও
বরঞ্চ সহে তার,
সব চেয়ে বড় তার দুখ,
বুড়াে হতে যায় সে
পেলে নাকো দেখতে
নাতির যে চাদােনা মুখ।
তবু নয় গর্ভিণী,
যােলয় পা দিল বৌ,
হায় এ কি ঠাকুরের সাজা,
আবাগীর বেটিটাকে কেন ঘরে আলেম,
শেষকালে হলাে কি না বাঁজা !
পুস্পাঞ্জলি ৯৭ আধলা ও গােরুটার সেবায় গতর গেল-- এত করে ভগবানে ডাকি, সে-ও না গাভীন হলাে কপালের দুর্ভোগ- বােয়ের বাতাস পেলে না কি ? মনের বিষাদ লয়ে আহলাদী সদা রয়, কষ্টেই কাটে তার দিন, পারিল জানিতে শেষ বৌটি পােয়াতী তার, গােরুটিও হয়েছে গাভীন। কে দেখে আনন্দ তার, তুলসীতলায় গিয়ে কহে কত মানসিক করি, গড় করে, মাটি খায়— এত দিন পরে বুঝি মুখ তুলে চাহিলে হরি । হেনকালে একদিন পাড়ায় গণক এলাে, ছিটে-ফেঁটা নামাবলী গায়, মুখে হরি-হরি বােল, কঁধে চাউলের ঝুলি, বগলেতে পুথি শােভা পায়।
১৮
পুষ্পাঞ্জলি
পাড়ার যতেক মেয়ে সবাই আসিল ছুটে
এসেছেন গণক ঠাকুর,
যার যা অভাব আছে, যার যা মনের ব্যথা,
সব তিনি করিবেন দূর।
কেহ বা দেখায় হাত, কেহ করে প্রণিপাত
ভক্তিতে ভূমিতলে লুটে,
গণক এসেছে শুনে, ফেলিয়া হাতের কায,
আহলাদী গেল সেথা
গলায় কাপড় দিয়ে গণকে প্রণাম করি’
সমুখে দাড়ায় যােড়হাত,
গণক গম্ভীরভাবে তার দিকে চেয়ে কয়-
“প্রসন্ন মা তােয় জগন্নাথ।”
আলাদী ধীরে কয় “প্রসন্ন ত বটে বাবা,
তবে কি না পাব কি সুদিন—
আশীর্বাদ কর প্রভু
বউটি পােয়াতী মাের,
গােরুটিও হয়েছে গাভীন।”
পুস্পাঞ্জলি
১৯
এক পাশে ছিল বউ, শাশুড়ীর ইসারায়
গণকে করিল প্রণিপাত,
“এইটি আমার বউ” আহলাদী দিল বলে,
দেখাইল তঁারে তার হাত।
গণক দেখিয়া কয়~~~ “কি সুন্দর হস্তরেখা,
সব শুভযােগের উৎপত্তি,
বলে রাখি শশা বেটী অখণ্ড্য আমার বাক্য,
পুত্র হ'বে রাজচক্রবর্তী।”
আনন্দে ডগ-মগ
আহলাদী আশা পেয়ে
জিজ্ঞাসে কথাটি গােরুর,
খড়ি পেতে একমনে গণক বলিল গণে
“হবে তার বকুনা বাছুর।
গণকের কথা শুনে,
আশ্বাস পেয়ে মনে,
আহলাদী আহলাদে মগ্না,
বউটির হবে এক
চাদপারা ছেলে, আর
গাইটির হবে এক বা।
পুষ্পাঞ্জলি
ঠাকুরকে গড়-করা,
হরির সে মাটি-খাওয়া,
একদম্ বেড়ে গেল তার,
যার তার কাছে সেই
যখন তখন বলে,
“ঠাকুরের সেবাই ত সার।
হরি যে গাে দয়াময়,
মুখ তুলে যদি চান,
দুঃখ কি তবে আর থাকে ?
মানুষের পাপ মন, সবাই তা বােঝে কই,
দিনান্তে ভঁয় নাহি ডাকে।”
হেনকালে একদিন
তােরবেলা শােনে লােকে
আহলাদী কঁদে ডাক ছেড়ে,
বউ তার কন্যা
প্রসবের পরেতেই
গাইটিও বিয়ায়েছে এঁড়ে।
এর পর থেকে তার
মাটী-খাওয়া গড়-করা
সব গেল গােল্লার তল~
যে হরি না কথা শােনে, • অনুরােধ নাহি রাখে,
সে হরিতে কিবা আছে ফল ?
পুষ্পাঞ্জলি
5. as
আহলাদী বলে রাগে “সাধে হয় খিষ্টান’
জগতে ঠাকুর নাই আর,
আবাগ। সে গণককে
মুখখানা পুড়িয়ে দি তার ?”
পাই যদি দেখতে
বসুমতী-অশ্বিন, ১৩০৪
সান্ত্বনা
কে তােমরা কঁদ মাের তরে—
কে তােমরা সংসারের জীব,
আমি ত গাে তােমাদের নই ;
একদিন ছিনু তােমাদের,
কেঁদেছিনু তােমাদের মত,
সংসারের দুঃখ বুকে সই।
মায়ার স্বপনে আত্ম ভুলে
যত দিন ছিনু আমি হােথা
দেখে শুনে তােমাদের মুখ,
তােমাদের আনন্দ-উল্লাসে
তােমাদের মােগ-শােক-দুঃখে
পেয়েছি গো বহু দুঃখ সুখ।
পুষ্পাঞ্জলি
src=
হােখা যে রব না চিরদিন
জানিতাম এ কথা তখননা,
কিন্তু মনে পায় নি তা ঠাই,
প্রবাসে হইয়ে আত্মহারা
ভুলিলাম নিজের সম্বল,
আজও তাই কত ব্যথা পাই।
আপনার কাজ ভুলে গিয়ে,
অসার ভাবনা ভেবে ভেবে
তােমরাও কেঁদ না গাে আর,
মাের মত বড় ব্যথা পাবে,
কাতর হইবে বড় প্রাণে,
দুঃখের না হবে প্রতীকার।
তােমাদের স্নেহের পুতলী,
তােমাদের স্নেহহারা হয়ে
এসেছি ব'লে কি পাও বাথা ?
হেথা কি গাে স্নেহের অভাব ?-
অবারিত অনন্ত স্নেহের
কোলে আমি শুয়ে আছি হেথা
১১৪
পুষ্পাঞ্জলি
১ ।
. * *
।। - • • • • • •
.
মায়ার শিকল কেটে দিয়ে,
অসার বাসনা ছুড়ে ফেলে
এসেছি গো আপনার দেশ,
তােমাদের অনিত্য ভাবনা
এখানে আমার কিছু নাই,
নাই কিছু সংসারিক ক্লেশ।
খুলে ফেল মায়ার শৃঙ্খল,
ছেড়ে দাও অসার ভাবনা,
তোমরাও মােরে ভুলে যাও,
জগতের গতি এইরূপ,
চিরদিন এইরূপ হবে,
তবে কেন কেঁদে কষ্ট পাও।
প্রচার- চৈত্র, ১২৯২
দ্বন্দ-শেষ
মহারাণা প্রতাপ তাহার সহােদর
শক্তসিংহ আর সঙ্গে বহু অনুচর
মৃগয়ায় করিল গমন ;
বন্য এক বরাহ সম্মুখ দিয়া তাঁর
দ্রুতগতি ছুটিয়া চলিল ভীমাকাৰ,
প্রতাপ নিরখিয়া,
আনন্দে উম্মত্ত হিয়া
করিলেন শেল-নিক্ষেপণ।
ঠিক সেই ক্ষণে আচম্বিতে,
অন্যদি হইতে চকিতে
আর এক শেল আসি বরাহের গায়
বি ধিল—বরাহ পড়ি’ ভূতলে লুটায়
১০৬
পুস্পাঞ্জলি
বরাহ ভূতলে লুটোপুটি,
দেখিবারে সবে আসে ছুটি,
মহারাণা আসিলেন কৌতুক উল্লাসে,
শক্তসিংহ আসি’ তার দাড়াইলা পাশে।
রাণা কন--“অব্যর্থ সন্ধান,
তাই অতি দ্রুত ধাবমান
বরাহেও অবহেলে করিনু বিনাশ”-
শুনি’ শক্তসিংহ বীর হাসে মৃদু হাস।
রাণ দেখি’ ক’ন তাই,
“কি হেতু হাসিলে, ভাই ?”
শক্তসিংহ দৃঢ়স্বরে কহিলা তখন
“মাের শেলাঘাতে হল বরাহ নিধন।”
নিজ বাক্য রাখিবার তরে,
বিতণ্ডা তখন পরস্পরে,
ক্ৰমে ক্রোধে অগ্নিমূৰ্ত্তি হইলা দু'ভাই,
ক্ষিপ্তপ্রায়—দিগ্বিদিক্ জ্ঞান আর নাই ।
পুস্পাঞ্জলি
তখন প্রতাপসিংহ রােষে,
হাত দিলা নিজ অসি-কোষে,
অনুজে কহিলা-“ভাল, কার কত শিক্ষা,
এস, দ্বন্দ্বযুদ্ধে হােক তাহার পরীক্ষা।”
শক্তসিংহ ক্ষিপ্ত সিংহ প্রায়
উৎসাহে সম্মতি দিলা তায়;
“সহজ উপায় সঙ্গে থাকিতে এমন,
মিছামিছি বিতণ্ডার কি বা প্রয়ােজন ?”
বীরােচিত সৌজন্যে তখন,
অগ্রজের চরণ-বন্দন
করিলেন বীরবর শক্তসিংহ গিয়া---
আশিসিলা রাণা তার শিরে হাত দিয়া।
অশ্বপৃষ্ঠে উঠি' তার পরে,
দুই জনে তরবারি করে
পরস্পর পরস্পরে করেন আঘাত,
দোহার সর্বাঙ্গ বাহি’ হয় রক্তপাত ।
১০৮
পুস্পাঞ্জলি
চারিদিকে বহু লােক হায়,
দাঁড়াইয়া হতভম্ব প্রায়,
এ কি হ’ল—এ কি এরা করে দুই ভাই,
গেল—গেল—এইবার আর রক্ষা নাই।
•
হেন কালে কুল-পুরােহিত
রুদ্ধশ্বাসে আসি’ উপস্থিত
দূর হতে কাণ্ড দেখি’ মনে ভয় বাসি’
দাড়াইলা উভয়ের মাঝখানে আসি।
“কি কর--কি কর, বৎসগণ,
এ যে কুলক্ষয়ের লক্ষণ;
ক্ষমা দাও, ক্ষান্ত হও, রাখ অনুরােধ,
ভেবে দেখ কার প্রতি কে করিছ ক্রোধ !”
অনুনয় করি বিধিমত,
এইরূপে বুঝাইলা কত,
কিন্তু তাঁর কাতরতা, বহু অনুনয়
টলাইতে না পারিল কাহারাে হৃদয়।
পুষ্পাঞ্জলি
তখন দারুণ ব্যথা মনে
পেয়ে তিনি কহিলা দু'জনে
“বৎসগণ, রক্ত যদি এত প্রিয় হয়,
লহ রক্ত রাখ শিশােদীয় কুলক্ষয় !”
এত বলি’ ছুরিকা লইয়া
নিজ বক্ষে দিলা বসাইয়া,
বেগে রক্তধারা ছােটে,
ব্রাহ্মণ ভূতলে লােটে,
হিতৈষীর এইরূপ আত্মবলিদানে,
কি ভীষণ অনুতাপ দেখা দিল প্রাণে,
অবনত উভয়ের উদ্যত কৃপাণ,
উভয়ে নিস্তব্ধ যেন অচল পাষাণ !
লাকি শিশুসাথী–১৩৩৬
চিঠি আসায়
চিঠির উপর কেবল আসে চিঠি,
লিখতেও ত এত সময় পায়,
কেবল চিঠি লিখতেই কি তবে
ফয়রা করে বিদেশেতে যায় ?
আমাদের কি কাজ নাইকো ঘরে,
ব'সে ব'সে পড় বাে কেবল চিঠি,
জবাব দিতে থাক্বাে পরে পরে,
বুঝে ত কেউ দেখবে না কো ইটি।
পােষ্ট কাড় আর টিকিটগুলাে ছাই,
কিনতেও ত খরচ আছে তাতে,
মানুষটির আর যােড়া মিলে নাই--
পয়সা যেন কামড়াচ্ছে হাতে !
ভারতবর্ষ-ভাদ্র, ১৩৪১
চিঠি না আসায়
রাত পােহালে বৃহস্পতিবার
ন’ দিন হবে-
বুধে-বুধে আট-দিন আজ যায়,
কোনও খবর এলো না কই তার,
কালকে তবে
বিপিন, কি তুই যাবি কঙ্কাতায় ?
বিদেশেতে আখ ছারই ত যায়,
চিঠি দিতে
কিন্তু এমন করে না ত দেরি,
চিঠির উপর চিঠি আসে ঠায়,
খবর পেতে
পেতে ঠিক চিঠি আসে ফেরই।
১১২
পুষ্পাঞ্জলি
আমরা বরং করি তাতে ঘৃণা
দেখি দোষই—
চিঠি লেখা লােকটার এক বাই,
আজ বুধবার—আট-আট-দিন কি না
সেই মানুষই
কাগের মুখেও খবর দিল নাই !
ভারতবর্ষ-ভাদ্র, ১৩৪১
শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস
বেদ-বেদান্তাদি শাস্ত্র বহু পরিশ্রমে
যত্নে চৰ্চ্চা করি’ যাহা না বুঝে বিদ্বান,
পড়িয়া তুমি, দেব, তাবলীলাক্রমে
পেয়েছিলে সে জ্ঞানের নিগুঢ় সন্ধান।
শাস্ত্রের কঠিন মৰ্ম্ম তােমার মুখে
বাহিরিত যবে হয়ে সহজ সরল
চলিত দৃষ্টান্ত সহ, ধরিতে তা বুকে
জ্ঞানী মূখ সমভাবে হয়েছে পাগল।
নানা জাতি, নানা শ্রেণী, নানা মত তাই,
নানা রূপ মুক্তিপথ নানা ধৰ্ম্মমতে,
কালীকৃষ্ণ শিব-রামে ভেদ মাত্র নাই,
সাধনায় নিজে তাহা দেখালে জগতে।
সধৰ্ম্ম-সমন্বয় তােমার জীবনে,
করিল বিস্মিত মুগ্ধ বিশ্ববাসী জনে।
মাসিক বসুমতী-অগ্রহায়ণ, ১৩৪১।
রামমােহন
বাঙ্গালার বহুবিধ হিতব্রতে ব্ৰতী
কৃতিপুত্রগণ-নাম করিতে স্মরণ,
সর্বাগ্রে সবার দৃষ্টি পড়ে তব প্রতি
প্রতিভার বরপুত্র হে রামমােহন।
বহুভাষাভিজ্ঞ তুমি, বিভিন্ন জাতির
ধর্মশাস্ত্রজ্ঞানে ছিলে বৃহস্পতি প্রায়,
বিদেশীয় ভাব-বন্যা যখন অস্থির
করিল এ বঙ্গ, তুমি রক্ষিলে তাহায়।
হিন্দুশাস্ত্র মন্থি তুমি একেশ্বরবাদ
আনি’ দিলে বাঙ্গালীর জীবন-প্রভাতে,
নিবারিলে সতীদাহ নিষ্ঠুর প্রমাদ
ঘটিত প্রায়শঃ যাহা পর-প্রেরণাতে।
বঙ্গভাষা বাঙ্গালীর প্রাণবস্তু জানি
দিয়াছ তারেও রূপ তুমি মহাজ্ঞানী।
প্যারীচরণ
প্রদীপ্ত পাণ্ডিত্যপূর্ণ হৃদয়-ভাণ্ডার,
কালিমার লেশশূন্য চরিত্র নির্মল,
সারল্যের প্রতিমূৰ্ত্তি, দয়ার আধার
একাধারে দেখাইতে আদর্শ উজ্জ্বল
এসেছিলে ধরি’ তুমি মানব-আকার
স্বর্গ হতে দীন বঙ্গে, স্নিগ্ধ সুশীতল
মন্দাকিনী-ধারা বহি’ বক্ষের মাঝার--
সুরাবিষে মত্ত যেথা যুবকের দল।
নর-নারী উভয়ের হিতব্রত সার
করেছিলে একমাত্র জীবন-সল,
ছাত্রগণে পিতৃতুল্য দিয়া ব্যবহার
ফুটাইলে তাহাদের হৃদয়-কমল।
তব সম সর্বগুণে গুণী মহাত্মার
দেখা কি মিলিবে পুনঃ এ বঙ্গে আবার !
মাসিক বসুমতী-কার্তিক, ১৩১।
ভূদেব জ্ঞানের সমুদ্র, শাস্ত্রে দৃঢ় ভক্তিমান, সংযমের প্রতিমূৰ্ত্তি,-সমাজ-সংসার- স্বদেশ-চিন্তায় নিত্য নিয়ােজিত প্রাণ করেছে তাম্বৰ্থ নাম ভূদেব তোমার। বিজাতীয় ভাবে মত্ত তার্কিকের দল এদেশীয় সামাজিক সাংসারিক সুখ নাশিতে আইল যবে হইয়া প্রবল, দাড়ালে বিরুদ্ধে তুমি পেতে দিয়ে বুক। কৰ্ম্মযজ্ঞে সদা রত, লক্ষ্য মহত্তর, অবিচল ভক্তি পিতৃপুরুষের নামে, অর্পি স্বােপার্জিত দেশহিতে দাতৃবর, নিশ্চিন্ত হইয়া তাই গেলে দিব্যধামে। শ্রেষ্ঠ বােদ্ধা, শ্রেষ্ঠ ভক্ত, শ্রেষ্ঠ কৰ্ম্মবীর, ধন্য তুমি সুপুত্র এ বঙ্গ-জননীর।
বঙ্কিমচন্দ্র
( আবির্ভাবে )
সুজলা সুফলা শস্যশ্যামলা জননী
গ্রহবশে শীর্ণা যবে মগ্না দুঃখ-কূপে,
সপ্তকোটি পুত্র তার শুধু ভাগ্য গণি
নিদ্রা যায় আলস্যের অবতার-রূপে,
সে সময়ে দেবতার আশীর্বাদ-বাণী
স্বর্গ হতে ল'য়ে নামি’ দেবদূত তুমি
দেখা দিলে ঘুচাইতে মার দুঃখ গ্লানি,
জাগাইতে মহামন্ত্রে সুপ্ত বঙ্গভূমি।
আদিত্য-উদয়ে যথা জাগে জীবনােক—
পূর্ণ হয় ধরাতল হর্ষ-কলরবে,
তােমার উদয়ে তথা, ও হে পুণ্যশ্লোক,
সচেতন হইল এ বঙ্গবাসী সবে-
পশু-পক্ষী নর-নারী স্থাবর-জঙ্গম
গাহিয়া উঠিল উচ্চে “বন্দে মাতরম্”।
মাসিক বসুমতী-কাত্তিক,
হরপ্রসাদ ( প্রয়াণে ) প্রবীণের শেষ, নবীনের যাত্রা শুরু সেই সন্ধিক্ষণে, খ্যাত পণ্ডিতের কুলে জন্ম লভি তুমি হে কোবিদকুল-গুরু, সুধন্য করিলে দেশ প্রতিভা অতুলে। ভারতী দিলেন তব কণ্ঠে মণিহার- নানা ভাষা-প্রীতিভরে সহাস্যবানে, স্বদেশের পুরাতত্ত্ব করিতে উদ্ধার দিলেন অতুল শক্তি সুপ্রসন্ন মনে। শিরে ধরি সে আদেশ প্রিয় পুত্র তাঁর দিলে বহুশ্রমে ডালি হার চরণে, ভাষায় নবীন শক্তি করিয়া সঞ্চার পূজিলে তাহারে নব মন্ত্র উচ্চারণে। তাই কৰ্ম্মক্লান্ত দেহ দেখিয়া তােমার লইলেন যত্নে মাতা কোলে আপনার। মাসিক বসুমতী-অগ্রহায়ণ, ১৩৩৮।
শ্ৰীমতী হেমলতা দেবী
(স্বর্গীয় বিদ্যাসাগর মহাশয়ের জ্যেষ্ঠ কন্যা, স্বর্গীয় সুরেশচন্দ্র ও যতশাল
সমাজপতি ভ্রাতৃদয়ের মাতা)
কে মা তুমি, দেবাঙ্গন, বিধবার বেশে,
জগতের মাতৃস্নেহ বুক ভরে লয়ে
বিরাজিছ বঙ্গই-কোণে একদেশে
লােক-লােচনের দৃষ্টি-বহির্ভূতা হয়ে।
সতত ঈশ্বর-চিন্তা, ঈশ্বরে নির্ভর,
তাহারি আদেশ যেন পালিতে যতনে,
শ্রমে ক্লান্তি নাই, দুঃখ-কষ্টে নাহি ডর,
দিয়াছ এ সবি বলি তাহার চরণে।
নিজপুত্র-পরপুত্রে স্নেহ সমভাগে
নিরখি’ বিধাতা বুঝি পরীক্ষার তরে,
তব পুত্রদ্বয়ে পাশে নিলা ডাকি আগে,
কিংবা বাড়াইতে তব নিৰ্বেদ অন্তরে ?
বুঝি না নিগুঢ় তত্ত্ব-মা গো শুধু জাগে
তােমার চরণ-পদ্ম হৃদি-সরােবরে।
মাসিক বসুমতী--অগ্রহায়ণ, ১৩০১।
আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র
( জন্মতিথি-উৎসব উপলক্ষে )
ব্রহ্মচর্য্য-ব্ৰতনিষ্ঠ ধার্মিক-প্রবর,
স্বদেশ-কল্যাণে আত্মনিবেদিতপ্রাণ,
সরস্বতী-বরপুত্র, বৈজ্ঞানিক-বর
দ্বিসপ্ততিতম বর্ষে আজি আগুয়ান।
জয়ন্তী উৎসব তাঁর প্রতি প্রতিষ্ঠানে
মহানন্দে আজি তাই হয় অনুষ্ঠিত,
কিন্তু তিনি সর্বকালে আর সৰ্ব্বস্থানে
প্রশংসা বা নিন্দায় না হন বিচলিত।
লয়ে সদানন্দময় বালকের প্রাণ
একাগ্র মনেতে নিজ সাধনায় রত,
শুধু স্বদেশের হিত উদ্দেশ্য মহান
একমাত্র তপ তাঁর জীবনের ব্রত।
কোন-প্রলােভনে তপ টলে না কো ভার,
স্থির লক্ষ্য—অচল অটল নির্বিকার।
মাসিক বসুমতী-পৌষ, ১৩২৯।
গিরিশচন্দ্র
অধ্যক্ষ শ্ৰীযুক্ত গিরিশচন্দ্র বসু মহাশয়ের শীতিতম জন্মতিথি উপলক্ষে )
হে সুধী, মঙ্গল-শঙ্খ আর হুলুধ্বনি
ঘােষিছে অশীতিতম জন্মতিথি তব,
শুনিতে না চাহ নিজ প্রশংসার ধ্বনি,
তাই এই উৎসব এ বঙ্গে অভিনব।
পাশ্চাত্যের জ্ঞান-রত্নে হৃদয়-ভাণ্ডার
পূর্ণ করি বাণী-বরপুত্র মনােমত,
জ্ঞান-বিতরণ নিজ জীবনের সার
করিয়া, লইলে বাছি' সেই মহাব্রত।
আহারে বিহারে ব্যবহারে পরিচ্ছদে,
স্বদেশীর সমাদর জীবনে তােমার
দেখাইল বঙ্গবাসিজনে প্রতিপদে
জাতীয়তা কি যে বস্তু, কি যে মূল্য তার।
হে সাধুসত্তম, শান্ত জ্ঞান-পারাবার,
পূর্ণ শত বর্ষ আয়ু হউক তােমার।
মাসিক বসুমতী-অগ্রহায়ণ, ১৩৩৯।
অমৃতলাল
(বিয়ােগে )
হে বৃদ্ধ-নবীন যুবা, কৌতুক-সাগর,
বাগ্মিবর, নাট্যাচাৰ্য, নটচূড়ামণি,
দণ্ডিতে ভণ্ডেরে তুমি রচিলে বিস্তর
ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের কাব্য অমৃতের খনি।
জাতি-সম্প্রদায়-ভেদ তােমার গােচর
ছিল না, ছিল না ভেদ জ্ঞানী কিংবা ধনী,
বুঝিলে অন্যায় তুমি তীব্র শ্লেষ-শর
বিধেছ সবার বক্ষে অমনি তখনি ।
স্বদেশীয় ভাবে মত্ত ওহে যাদুকর,
তব সিদ্ধ যাদুমন্ত্র-প্রভাব এমনি,
গুণে তার বঙ্গ ব্যাপি’ বহু নারী-নর
স্তব্ধ হয়েছিল যথা মন্ত্রমুগ্ধ ফণী ।
শুভ্র কেশে শুভ্র বেশে যাও কবিবর,
বহে যথা শুভ্র স্বচ্ছ অমৃত-নিঝর।
মাসিক বসুমতী-শ্রাবণ, ১৩৩৬।
চিত্তরঞ্জন
( প্রয়াণে )
নারায়ণে ভক্তিমান্ জ্ঞানী কৰ্ম্মবীর
হে মহাপুরুষবর, ইন্দ্রালয়ে আজি
চলিলে করিয়া সাঙ্গ কৰ্ম্ম পৃথিবীর
দুন্দুভি জানায় বার্তা সুরপুরে বাজি।
একদা প্রভূত শক্তি করি কেন্দ্রীভূত
সৃজিলা তােমারে ধাতা-অভিনব দান—
মরণে সে শক্তি হয়ে বিসর্পিত দ্রুত
প্রতি বঙ্গবাসি-হৃদে লভিলেক স্থান।
একতায় সে বিচ্ছিন্ন শক্তিরাশি যবে
একীভূত হবে—হবে মঙ্গল মহান,
উদিবে স্বরাজ-সূৰ্য্য, কিরণ-বৈভবে
অযুত বিদ্যুত-দীপ্তি করি’ পরিম্নান।
কোটি কণ্ঠে নর-নারী গাহিবেক তবে
তব জয়- মহােৎসাহে অতুল গৌরবে।
মাসিক বসুমতী-শ্রাবণ, ১৩৩২।
সুখের চরম আজি মনে পড়ে, নাথ, পূৰ্ব্বকথা যত কোথা তুমি, কোথা আমি--বিধির ঘটনে কেমন মিলিনু দেহে---পূর্ণ অনুগত হইলাম পরস্পর ভেদ নাহি মনে। তার পরে কত দিন বাহুর বন্ধনে বাঁধিয়াছ অধিনীরে সােহাগে সে কত, কি মধু দিয়াছ ঢালি’ মধুর চুম্বনে, ত্রিদিবে নাহিক কিছু বুঝি তার মত। কিন্তু হয় নাই, নাথ, পূর্ণ মাের সুখ- জাগিছে হৃদয়ে তবু অতৃপ্তি বিষম, ৩ব কোলে মাথা রাখি, দেখি’ হাস্যমুখ মরিবারে পারি যদি মৃত্যু মনােরম, বাসনার পরিতৃপ্তি, মরণে কৌতুক, সেই দিন হবে মাের সুখের চরম। বার্ষিক বসুমতী-১৯৭১।
মােহিনী
অনন্ত সুষমাময়ী বিশাল ধরণী
তৃপ্তি-সুখ-সৌন্দর্য্যের বিপুল সম্ভার
আদরে আপন বক্ষে ধরেন জননী
জীবের মঙ্গল হেতু-স্নেহে অনিবার।
হাসে চন্দ্র, ফোটে ফুল, পিক-কুহুধ্বনি
শ্রবণে অমৃত ঢালে ভ্রমর-গুঞ্জন,
বহে স্নিগ্ধ মলয়ের পবন আপনি
জন্মান্তর-স্মৃতি যেন পরশে জীবন।
কি অভাব এর মাঝে ছিল নাহি জানি--
জানিতাম এ ধরায় এই মাত্র সবি,
তুমি আসি সে সমস্যা পূরাইলে, রাণী,
দেখালে নূতন দৃশ্য—সম্মােহন ছবি।
জানি না, মােহিনী, তুমি দেবী কি মানবী,
জানি মাত্র করিয়াছ অকবিরে কবি ।
বার্ষিক বসুমতী, ১৩৩।
বাসন্তী নিদ্রা
( স্থানে স্থানে গুরু উচ্চারণ করিয়া পঠিতব্য)
বিজনে বাসন্তী দেবী সন্তোষে ঘুমায়,
ফল-ফুল-মুকুল-শােভিত কল্প তরুর ছায়ায়।
চরণ-তলে অদূরে নীল তটিনী বহে তর তর,
সুদূরবন-হৃদয় লুঠ’ মলয় ভাষে সর সর,
বনজ ফুল ঝর ঝর ঝরিয়ে পড়ে গায়।
ধরণী-নব-সংগঠনে শ্রান্তি-ভরে অবনতা,
ললাটে স্বেদবিন্দু ঝরে, অঙ্গ বেড়ি অলসতা,
বীজনে বসন্ত-লতা কুন্তল দোলায়।
ধবল চারু চন্দ্র-কর ধরণী-বুকে পড়ে ঢলি’
শ্যামল বন পুলকে হাসে,উছাসে হাসে ফুলকলি ;
কুহরে পিক, সিহরে অলি, পাপিয়া গীত গায়।
শ্যামল ছায়ে খুঁজি’ খুজি’ জোছনা আসি পড়ে মুখে,
মুদিত আঁখি নিচল দেখি স্বপন খেলা করে বুকে,
মিলিত ষড়ঋতু সুখে প্রণতি করে পায়।
ভারতী-জ্যৈষ্ঠ, ১২৯৪।
শেষ
গােকুলে মধু ফুরায়ে গেল,
আঁধার আজি কুঞ্জবন,
( আর) গাহে না পাখী, ফুটে না কলি, নাহিক অলি-গুঞ্জরণ ।
দুলাতে মৃদু লতিকা বনে, খেলিতে নব-কলিকা সনে,
মধুরতর নাহি সে আর সমীর-ধীর-সঞ্চরণ।
কাননে ঢালি জোছনারাশি ভাসে না চাদ গােকুলে আসি,
নাহি সে হাসি প্রমােদশি, নাহি সে সুখ-সম্মিলন।
জলদে শশি-মাধুরী ঢাকা, বিষাদ যেন সকলে মাখা,
শ্রীহীন তরু, শ্রীহীন লতা, হীন চারু পুষ্পবন।
অমিয় স্বর-লহরে মাখি’
স্তবধ করি পশু-পাখী,
মধুরভাষী আর সে বাঁশী গাহেঁ না গীত সম্মােহন।
যমুনা পানে চাহিলে ফিরে, কপােল ভাসে নয়ন-নীরে,
পরাণে শুধু উছলি উঠে সুনীল জলে সন্তরণ।
নিবিড় বনে তমাল-ছায়, কোকিল-বধূ গীত না গায়,
সারিকা-শুক বিরস-মুখ বিগত প্রেম-সম্ভাষণ।
১২৮
পুস্পাঞ্জলি
অধীর ব্রজবালকদল,
খায় ধেনু তৃণ কি জল,
সজল আঁখি উরখ-মুখে কৰিছে কি যে অন্বেষণ।
প্রেমিক কে সে মধুরভাষী বধিয়ে গেল গােকুলবাসী,
ব্রজে কি আর বাঁশরী তার গা’বে না গীত সঞ্জীবন?
অধীর প্রাণে বিষম ক্লেশ, কেমনে করি এ দুখ শেষ
বিনে শ্রীহরি কেমনে করি নয়ন-বারি সম্বরণ।
প্রচার-চৈত্র, ১২৯৫।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.