Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Mahatrishna Kabya

2009/10/20

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

মহতৃষ্ণা কাব্য।
ভয়ে ভয়ে লিখি কি লিখিব আর,
নহিলে শুনিতে এ বীণা ঝঙ্কার।”
হেমচন্দ্র
কলিকাতা
শ্রাবণ
সম্বৎ ১৯৪২।
হাওড়া ভিটোরিয়া প্রশ্ন নং ৩, বংশাল ষ্ট্রীট
কলিকাতা।
১৮৮৫।

No text on this page.

ভুমিকা আজ আমি অকুল পাথারে ভাসমান,আজ আমি চতুর্দশবর্ষীয় সামান্য ক্ষীণচেত বালক হইয়া, দুস্তার কবিতাম্বুধি মথনে উদ্যত, এই কি আমার কাজ? কখনই নয়, আমার এ অলীক আশা,-এ প্রযত্ন, কখনই সুবুদ্ধির পরিচায়ক নয়, সমস্তই আকাশ কুসুম। কিন্তু কি করি, হৃদয় উচ্ছল পূর্ণ ; এ বিষম উচ্ছাস অদমনীয়। পাঠক, আজ উন্মত্ত বালক আপনার করে তাহার হৃদয়োচ্ছাস পূর্ণ ক্ষুদ্র পুস্তক অর্পন করিতেছে, স্নেহ নেত্রে দৃক পাত করুন। নিরাশা-সমীর-তাপিত আশালতায় কৃপানীর দান করুন। বিনয়াবনত- গ্রন্থকার-

দ্রষ্টব্য
যখন এক সময় প্রায় সমস্ত ভারত মুসলমানদিগের
অধীন হয়, সেই সময়ের ভাব অবলম্বনে এই মুদ্র পূন্তক
রচিত হইল ; আধুনিক সময়ের সহিত ইহার কোন
সংশ্রব মাত্র নাই।

উৎসর্গ পত্র।
পরমারাধ্য পূজ্যপাদ ভক্তিভাজন মাদ্যশ্রেষ্ট
শ্ৰীযুক্ত বৈকুণ্ঠনাথ বা
পিতাঠাকুর মহাশয়
আচরণাম্বুজে।
পিতঃ,
আজ আপনার অবােধ সন্তান বিভ্রান্ত চিত্তে ভবদীয়
চরণ কমলে, সামান্য উপহার উৎসর্গ করিতেছে,
পিতৃস্নেহ প্রদর্শন করতঃ প্রসন্ন
চিতে গ্রহন করুন। ইতি
চিরস্নেহাভিলাষী।
সেবক
রামকৃষ্ণপুর হাওড়া ।।
শ্রাবণ সম্বৎ ১৯৪২ শ্ৰী

No text on this page.

মহাতৃষ্ণা কাব্য।
প্রথম সর্গ।
গভীরা রজনী। ভীষণ তমসে ঢাকা
ধরণী হৃদয় ; প্রকৃতি কামিনী যেন
গ্রাশিতে মেদিনী, তমময় বাস পরি
ভীষণ মূরতী ধরি, ভ্রুকুটি ভঙ্গিতে
করাল বদন করিয়ে বিস্তৃত সুখে
আছয়ে দাড়ায়ে,—বদনে ক্ষরিছে ঘন
শােণিতের ধার। যে দিকে নয়নযুগ
হতেছে পতন, সুধুই আঁধার, ঘাের
ভীতিপ্রদ। সে আঁধার ভেদি ভীমকায়
শৃঙ্গধর, নামেতে কৈলাশ, ছুঁতে যেন
অনন্ত অম্বরে, আছয়ে দাড়ায়ে হায়
গরবের ভরে, উচ্চ করি শিবরাদেশ।
শৃঙ্গধর পদতলে, জাগিছে নিবিড় বন
তমজালে ঢাকা ; নীরব নিথর সব।
অনন্ত বিটপী শ্রেণী রয়েছে দাড়ায়ে
পল্লব বল্লরীসহ নিশ্চল হইয়ে ;

২
মহাতৃষ্ণা কাব্য।
ঘুমাইছে ফুল কুল গভীর নিদ্রায়
মুদিয়ে নয়ন ; অভাগী কুমুদী সুধু
না হেরে শশাঙ্ক, খুলিয়ে নয়ন হায়!
চাহি আছে এক মনে গগনেরি পানে,
লজ্জাভয় নিদ্রা ভুলি পাগল অন্তরে
সরসী পুলিনে,-শােকানলে দহে হৃদি।
খদ্যোতের পাতি শােভিছে বিটপ’পরে
ধরি মনােহর শােভা, চমকে সুন্দর ;
বিতরিয়ে ক্ষীণভাতি কেহবা উঠিছে
অম্বরের পানে, বিরামু লভিছে কেহ
তরু শিরােপরে, নিশীথে লুটিতে মধু,
নিদ্রাতুর ফুলদল পানে, কেহ ধায়
চোর মধুকর বেশে, নিঃশব্দে নীরবে,
সরসী পুলিনে কেহ, হেরিতে বয়ান
নিজ, গরবের ভরে, তেয়াগিয়ে নিজ
সহচর দলে।
নীরব নিথর সব ;
সুধু ক্ষণে ক্ষণে মলয় সমীর বয়
মধুর স্বননে, চুম্বি সুখে ফুল কুল,
সুচারু বদন শােভা নয়নে নেহারি।
অদূরে অস্ফুট স্বরে ঝর ঝর করে
ঝরিছে নিৰ্বরবারি, হায় ! অবিরত
কল কল নাদে, কঁদিয়ে কঁােিদয় সুধু

প্রথম সর্গ।
•
অবিরাম গতি-বলে, স্রোতস্বতীরূপে
চলে যায় বারি রাশি কে জানে কোথায়,
অনন্তের তরে ; নাহি আসে ফিরে পুন।
তটিনীর তটে বলি কঁদিছে চকোর,
বিধুর বিরহে বিধুর অন্তরে মরি !
নাইকো চন্দ্রমা, নাহি সে মধুর ছটা
চকোরের হৃদে উথলিছে শােকধার,
চেয়ে আছে শূন্য প্রাণে সুধু শূন্য পানে,
যেতেছে বহিয়ে অবিরত ধারে হায় !
আঁখিবারি, স্রোতস্বতীবারি রাশি সহ
মিশিয়ে মিশিয়ে ! হেরিল চকোর হায়,
দূর নতলে, অনন্ত তারকা রাজি
মধুর মধুর হাসে না হেরে চন্দ্র মা,
(প্রিয়জনতার) উপহাসি তারে যেন ।
তাহেরি নমিল শির নিমিল নয়ন
বিধূর চকোর ; ক্ষণ পরে পুনঃ হায়,
খুলিল নয়ন দ্বার, আবার হেরিল,
হসিত তারকাদল তটিনী সলিলে,
আবার বাড়িল বিষম অন্তর জ্বালা,
খসিয়ে পড়িল পুনঃ নয়ন সলিল
স্রোতস্বতী নীরে, কঁদিতে কঁদিতে গেল
চকোর চলিয়ে ; তাহেরি পেচক যেন
;

৪
মহাতৃষ্ণা কাব্য।
।
উপহাসি তারে, ধ্বনিল কর্কশ স্বরে
গহন কাননে ; ঝিল্লিদল তার সনে
মিলাইয়ে তান ডাকিয়ে উঠিল হায়!
পুরিল গহন সুধু ঝিল্লিদল রবে,
যেনরে প্রকৃতি মােহিতে মহীরে, করে
ধরি, সপ্তম্বরা ঝঙ্কারিল তান লয়ে।
গহন কানন মাঝে জাগিছে শাদুল
ভমে ক্ষুধা ক্লিষ্ট হয়ে ; হুঙ্কারি ভৈরবে
কভুধায় বেগে বিটপী নিকর পানে
পাগলের প্রায় ; শৈল-শৃঙ্গোপরে কভু,
কভু বা তটিনী তটে, তৃষাতুর চিতে
বারিপান আশে ; পলাইয়ে যায় কভু
সেথাহতে, ভাবিয়ে অনল, বারি মাঝে
হেরি, মৃদুল তারকা ছটা, দূর বনে,
সশঙ্ক হৃদয়ে;
গগন বিতান পানে
চেয়ে থাকে কভু, তারকা আলী হেরি,
ক্ষুধা তৃষ্ণা ভয় ভুলি, কভু বা কানন পানে
নেহারে কুরঙ্গ, দূরিতে জঠর জ্বালা।
ধরণী আঁধার ঘাের, ভীম নগতল
আঁধারে আবৃত, আঁধার বিশাল বন,
অনন্ত তারকা শুধু, ফটে আছে যেন
পদল প্রায়, ধীর সমীরণ ভরে

প্রথম সর্গ।
হাসিছে মৃদুল হালি, অনন্ত বিশাল
নীল-নভ-সর-নীরে, কভু বা দুলিছে
মৃদু মেঘ উৰ্ম্মিবলে বিকচ কমল
দল। অভ্রভেদী ভুঙ্গচয় দাড়াইয়ে
আছে, প্রশারিয়ে কর, ধবল তুষার
রাশি মস্তকে বহিয়ে, ছিড়িতে কমল
রাজি, নভসর হতে, পরিতে গলেতে
গাথি চারুমালা হৃদি-মন-প্রাণ-হারী।
তুঙ্গচয় আশ হেরি, হেরিয়ে গরব,
উচ্চতম ভুঙ্গ শৃঙ্গে শােভে হরালয়
করী পৃষ্ঠাপরে, ভুলিয়ে ত্রিদিব ভেদি
হেমময় চারুচুড়া মাণিক্য খচিত,
যেন বা খৰ্বিতে শৃঙ্গধর বৃথা গৰ্ব্ব,
ঘুচাইতে মােহ অন্ধকার, প্রকাশিয়ে
জ্ঞান জ্যোতি। হাসে মৃদু মধুময় হাসি
চারুদিশি, অহরহ, চন্দ্রম জিনিয়ে
চারু সৌধালােকে, হাসে শৈল শৃঙ্গচয়,
গগন বিতানে উঠে সে মধুর ছটা,
গভীর তিমির নাশি, প্রভা বিতরিয়ে ।
সৌধ পাশে শােভে প্রমােদ উদ্যান চারু,
নন্দন উদ্যান জিনি বৈজয়ন্তধামে।
বিতর মধুর শােভা, হাসি হাসি মুখে
–

--
মহাতৃষ্ণা কাব্য।
ফুটে আছে ফুল কুল তথা, চারু আঁখি
বিকাশিয়ে, (ফোটে যারা দিবস যামিনী,
নাহি ম্লান হয় কভু তপন তাপে:ত
অথবা মুদয়ে তাঁখি শশাঙ্ক দর্শনে )
নধর পল্লব সহ, ফল তরু শাখে ;
ফুটেছে কমল গুলি সুচারু সরসেঃ
কুমুদিনী সহ, স্বর্গীয় বিভায় সবে,
স্বর্গীয় পুলকে মাতাইয়ে মননাপ্রাণ,
চেয়ে আছে কার প'নে কহিতে না পারি
ভুলিয়ে জগত যেন। অদূরে চকোর
বসিয়ে আপন মনে, পুলক হৃদয়ে
মুদিত নয়নে, করে হায় সুধাপন,
কারে ভাবি রয় বসি কেবল কহিবে ?
স্বগীয় সমীর স্বর্গীয় সুরভি বয়ে
সঞ্চরে মৃদুল, তাম্লান কুসুমচয়
কাপায়ে ধীরেতে, কঁপাইয়ে ফুল কুল
শাখা, বিটপী আবলী ।
মধুর বসন্ত
তথা বিরাজে সতত মুৰ্তীমান হয়ে,
করয়ে পুলক কৈলাশ নিবাসীগণে,
চারু মনােহারী বেশে দিবস'যামিনী
অনন্ত স্বর্গীয় সুখ বিরজে তথায় ।
দিবানিশি অহরহ সুখের তরঙ্গ,
:

প্রথম সর্গ।
তথা, পবিত্র ভাবেতে, বহে নিরন্তর
শান্তি স্রোতহী হৃদে, কভু না শুকায়
সে শান্তি তটিনী, মৃদুল তরঙ্গরাজি
লভে বিরাম কভু, তটিনী উরসে।
বয়ে যায় স্রোতস্বতী ; নবীন তরঙ্গ
মালা নব ভাবে সাজি, উঠে নিরন্তর।
উচ্চঢ়ড় ভীমকায় মহেশ আগার
মাঝে, জাগে রম্য গৃহাবলী, সারি সারি
তার মাঝে, জাগে চারুম গৃহ এক
মধুর সজ্জায় হইয়ে শােভিত হায়
মধুর ভাবেতে, উর্দদেশে ঝালে ঘন
অম্লান কুসুম মালা সৌরভ বিতরি;
চারু চন্দ্রাতপ অপূর্ব ঝালর কাটা
অনীলের ভরে মৃদুল মৃদুল দোলে,
বৈদুর্য মুকুতা মণি হিরক খচিত ,
সমুজ্জ্বল দীপাবলী শােভে সারি সারি
গৃহমাঝে, বাজে নভে ত্রিদিব বাদি
মধুর নিক্কণে; ত্রিদিব বাসন্তী বায়ু,
বহে ধীরে ; গৃহতলে হৈম সিংহাসনে
নগেন্দ্র নন্দিনী সতী ভূতনাথ সহ,
শােভে একাসনে, সুবর্ণ রজত পাশে
শােভিছে মধূর ; আঁটাদৃঢ় কীৰ্ত্তিবাস

৮
মহাভৃষ্ণা কাব্য।
*
কীৰ্ত্তিবাস কটিতটে, জটাজুট জাল
শােভে শিরােপরে, গরজিছে ফণীদল
থাকিয়ে থাকিয়ে, অঙ্গেতে বিভূতি মাখা,
দীপিছে ললাটদেশে নব শশীকলা।
চিত্রভানু সহ, উজল নয়ন ত্রয়।
বামপাশে শােভে সতী নগরাজবালা
( আহা কি মধুর শােভা) অপূৰ্ব্ব মেখলা
পরা, কাঞ্চন শিঞ্জিনী রাতুল চরণে
শােভে, উজলতা বিকাশিয়ে , শােভে করে
সুচারু কঙ্কণ, গলদেশে চারু হার
উজলতাময় ; বিতরে কিরণ রাশি
মধুর ভাবেতে রতন খচিত চারু
কনক কীরিট, মহেশ ভাবিনী শিরে,
জিনি ভানু, চিরদীপ্তিময় ; ত্রিনয়ন
শােভে ভালাে পরে। অপূৰ্ব্ব মধূর ছটা
মধুর মাধুরী, হায়রে কেমনে বল
ছার কবিতায় ছার কবিতায় আঁকে হায় ?
চপলা প্রকৃতি কল্পনার গতি বলে,
নিজ্জীব লেখনী ধরি বল কি কুহকে
আঁকিব হৃদয় পটে সে মধুর ভাব,
বর্ণিব অপূৰ্ব ছটা হৃদি বিমােহন
সে স্বর্গীয় ভাব আঁকিতে হৃদয়ে,
কারী ?

প্রথম সর্গ।
৯
বিতরিতে পূত ছটা কাব্য ছটা সহ,
ধরিয়ে লেখনীবর তপারগ কবি ।
দাড়ায়ে বিজয়া জয়া সিংহাসন পাশে,
চুলায় চামর দোহে, অদূরে দাড়ায়ে
নন্দী ভীম পরাক্রম ভীষণ ত্রিশূল
করে, গৃহ দ্বারে ; ভাবিছে নয়ন মুদি
সারাৎসার পরাৎপর বিভুর চরণ।
উঠিল সঙ্গীততান সহসা মধুরে,
গাইল বিজয় জয়া পবিত্র সঙ্গীত,
রাখিয়ে চামর দোহে করে ধরি বীণা,
মধুময়ী সপ্ত স্বরা ; তান লয় তুলি ,
স্বর্গীয় আরবে, উঠিল ত্রিদিব পথে
সে গীত লহরী, ঝঙ্কারিল সপ্ত স্বরা,
ঝঙ্গারিল বীণা ; ভাসিল সবার মন
সে সঙ্গীত স্রোতে, ভাসিল মহেশ
ভাসিলা পাৰ্বতী সতী ; নিশ্চল হইয়ে
রহিল দাড়ায়ে নন্দী, চুম্বিল ভুতল
ভীষণ ত্রিশূল ; ধ্বলি উৎসাহে ঘন
হর ভালে শশিকলা ; উঠিল ধ্বকিয়ে
চিত্রভানু ; নিশ্চল সমীর! রম্যেদিনে
অস্ফুটকুসুমকলি ফুটিল সহসা,
চুম্বিল ধরণীতল ফুটন্ত কুসুম

মহাতৃষ্ণা কাব্য।
রাজি ;
;
উৎসাহ হৃদয়ে, নিদ্রাবেসে পাখী
শাখে, কুজনিল মিলি, সরসী সলিল
সহনা নিশ্চল হ’ল ; রহিল চকোর হায়
মুদিত নয়নে, সব ভুলি, ক্ষণকাল তরে ।
ধীরে ধীরে ধীরে মধুর সঙ্গীত তান
লভিল বিরাম, নীরবিল সপ্তস্বরা
মধুময়ী বীণা ; ধীরে ধীরে নিদ্রাদেবী
উমাকান্ত উমা পদে আসিয়ে নমিল
সভয়ে ; হরভালে বিধু হারাল বিভা ;
কিন্তু উমা আঁখি ব্রয় ধ্বকিল আবার,
জ্বলিল নয়ন তারা, ভয়ে পলাইল
দূরে নিদ্রা-দেবী, ভীষণ চিন্তার চিহ্ন
ললাট কুঞ্চন রেখা হল প্রকটিত
উমা ভালে। কহিলা মহেশ কর ধরি
পাৰ্ব্বতীর কতক্ষণ পরে মধুম্বরে,
চল প্রিয়ে বিশ্রাম আগারে, চল যাই,
অভিগে বিরাম, নিদ্রা কুহকিনী ধীরে
শান্তি যবনিকা নয়ন দুয়ারে মাের
দেয় ফেলি, বারিবারে তারে নারি আজি
কোনমতে, কেন প্রিয়ে নগেন্দ্র নন্দিনী
বসি অধোমুখে, কি ভাব সহসা তব
আবির্ভাব হৃদে ?” উত্তরিলা শিবজায়া

প্রথম সর্গ।
১১
;
অমিয় মধুর কণ্ঠে, কলকণ্ঠ জিনি,
জিনি বাঁশরি ঝঙ্কার -“প্রিয় প্রাণেশ্বর
পার্বতী হৃদয়ধন!
হয়েছে চঞ্চল
আজি এ জীবন, হেমময় ভারতেরে
হেরিতে নয়নে। হয়েছে পিপাসা ঘাের :
তৃষিত জীবন ; বিদাও দাসিরে নাথ !
ভারত নন্দনগণে বহু দিন হল
নাহি হেরি বিচঞ্চল প্রাণ নরলােহ
বহুদিন নাহি পাই দূরিতে পিপাসা,
তেই সাধি তব পদে বিদাও দাসিরে।”
হাসিল শঙ্কর।
দূরে গেল নিদ্রাদেবী
ক্ষণকাল তরে ; চমকি উঠিল বিধু,
ধ্বকিল আবার কহিলা
মধুরে হর
সতীর উদ্দেশি “বিধুমুখি একি ভাব
আবির্ভাব হৃদিমাঝে হইল সহসা ? ..
হল কি মাতিতে পুন ভীষণ সংগ্রামে
উদিত হৃদয়ে আশ ; দলিতে দানব
দল, দুৰ্বার সমরে, অথবা ত্যজিতে
দাসে পুনঃ ছল করি, দহিতে আবার
বিষম বিরহানলে ?” ক্ষণকাল পরে
কহিলা পাৰ্বতী আবার মধুর স্বরে,
“কান্ত হৃদি বিমােহন। যত বারি তত
।

মহাতৃষ্ণা কাব্য ।
বিষম বাসনা বেগে নারি নিবারিত,
ভুলিতে বাসনা করি ভারত ভাবনা,
কিন্তু হায় তত ভীষণ প্রবাহ বহে,
ডুবায়ে সকলি, অবােধ পরাণ মাের
না মানে প্রবােধ ; পিপাসা দূরিত নারি,
ক্ষম অপরাধ নাথ, বিদাও দাসিরে ;
ভুলিতে কি পারি কভু তপনে কমল,
শশাঙ্কের ভাল বা অভাগী কুমুদী ?
নীরবিল মহাদেবী, হেরিলা শঙ্কর
সতীর নয়ন জ্বলে উৎসাহে মাতিয়ে
ধ্বক ধ্বকি বহ্নি প্রায়, তাহেরি কহিলা
ধীরে—* জীবন ততষিনী যাও ভারতেতে
নাহি দুঃথ তায়, কুভাগ্য ফেরেতে কিন্তু
যেন হে আবার ভুলাে না অধম দাসে,
ডুবাও না পুন মােরে বিষাদ সাগরে।
নীরবিলা উমাকান্ত ; উমার হৃদয়
পুরিল উল্লাসে ; নাচিল ধমনীশিরা,
ধ্বকিল নয়ন এবে আবার মধুরে ।
যাচিল বিজয় জয়া মহেশ সকাশে
মহেশ ভাবিনীসহ, উরিতে ভারতে ;
অনুমতি তায় দিলেন ঈশান সুখে।
প্রণমিল সবে তাঁহার চবণ যুগে ;

প্রথম সর্গ। • হরষ অন্তর, নাচিল হৃদয় তন্ত্রী । সহসা আসিয়ে নিদ্রা আবরিল হর- আঁখি এয়, মায়াময়ী ঘাের মায়াজালে মােহিলা সবারে ; ঘুমাইল সিংহাসনে শশাঙ্কশেখর, স্তিমিত চন্দ্ৰমাকলা হইল ললাটে, চিত্রভানু প্রভাশূন্য। বিভােরে ঘুমাল ফণী । ঘুমাইল নন্দী দ্বারদেশে, করে ধরি ভীষণ ত্রিশূল তালবৃক্ষ সম ; সঞ্চরিল সমীরণ সুমন্দে, কুসুম সুরভি বহি ; দুলিল চারু চন্দ্রাতপ সহ, অম্লান কুসুম মালা ঊর্দ্ধদেশে, মৃদুল অনীল বলে ; প্রভাহারা রত্নরাজি। মােহিল মায়ায় মায়াময়ী মহাদেবী, সবাকার, মন ; অচেতন র’ল সবে, ঘুমাল গভীরে। মহেশ ভাবিনী সতী ত্যজিল কৈলাশ সখীগণ সহ ঊরিতে ভারত হৃদে। —ঃ) ইতি প্রথম সর্গ ০ ০ খ

মহাতৃষ্ণা কাব্য।
দ্বিতীয় সর্গ ।
—(- -)—
মহেশ মন্দির ত্যজি নগেন্দ্র নন্দিনী
হৈমবতী, সখীগণ সনে, মাতি হর্ষে,
পশিলা অম্বর পথে, মনােল্লাসে সবে
সুমন্দে ; ‘জয় জয়’ রব মধুরভাবে
কলকণ্ঠ জিনি বিজয় জয়ার কণ্ঠে
হয়ে আন্দোলিত পুরিল অম্বর স্থল ;
ছুটিল সমীর বহিতে সে স্বর সুধা
ত্যজি ফুল কুলে, মধুর সৌরভ পুর্ণ ।
ঈাড়াইলা মহেশ্বরী দূর শূণ্য পথে
বায়ুভরে, দাড়াল বিজয়া জয়া, সতী
সনে অপুৰ্ব্ব মধুর ভাসেতে সহসা
গগন প্রাঙ্গন, হ’ল মরি বিশোভিত ।
চাহিলা ঈশানী বিকচ-কমল-অক্ষে
সুদূর ভারত পানে , হেরিলা নয়নে,
বিকশিত চারু শােভা ভারত হৃদয়ে,
;

মহাতৃষ্ণা কাব্য।
•
সজ্জিত মােহন ভাবে অনন্ত নগরী
মালা; শােভিছে অসংখ্য সৌধ, তুলি চূড়া
গগনেরি পথে ; চারু রাজমাৰ্গৰ্চয়
উজলিত দীপালােকে চন্দ্রকর জিনি;
দুলিছে কুসুম মালা কিনলয়দাম
সহ প্রতি গৃহ দ্বারে, প্রমােদ উদ্যান
অগণিত, শােভিছে ভারত বক্ষে ; চারু
স্রোতস্বতী চয়, তুলি ধীর উৰ্ম্মিরাজি
ধাইছে মধুরে, উড়িছে কেতন কত
প্রতি গৃহ চড়ে, মৃদুল সমীর ভরে
দুলিয়ে দুলিয়ে ; অপূৰ্ব্ব মধুর হাসি,
প্রতিভাত এবে সুচারু ভারত আস্তে।
হরষে পূরিল এবে, অম্বিকা হৃদয় ;
কত যে কল্পনা মরি সুখ বিজড়িত,
উমা হৃদি-স্থল করি হায় বিভাসিত,
চঞ্চলিল প্রাণ নারেরে কল্পিতে তায়
এ কবি কল্পনা। বাড়িল জননী তৃষা,
অধৈর্য হল চিত, চিন্তিলা ক্ষণেক
মুদি আঁখি, সহসা অপুৰ্ব্ব আস্ত বিভা
হল অপনিত, মিশাল লাবণ্য ছটা
কান্তি কুমনীয়। সহসা ধরিল উমা
দনুজ-দলনকারী মুরতী ভীষণ,

দ্বিতীয় সর্গ ।
।
মুখেন্দু মলিন ভাতি, এলায়ে পড়িল
সুদীর্ঘ চিকুর দাম, চুম্বিয়ে চরণ।
শােভিল করেতে, শাণিত কৃপানবর,
অন্য করে, গগণ বিতানভেদী, ঘাের
শৃঙ্গ ; দুলিল গলেতে ভীম মুণ্ডমালা
পরশি চরণ, কটীতটে বাঘাম্বর
হল বিশােভিত, রতন খচিত বাস
লুকাল সহসা, জ্বলিল নয়ন যুগ।
হেরিয়ে বিজয়া জয়া শিবানী মূরতী
ত্যজি পূৰ্ব্ব বেশ, তারাও ধরিল হায়
ভীষণ মূরতী, তাদেরাে করেতে অসি
শােভিল সহনা, ঘুরিতে লাগিল ঘন
পলকে পলকে ;-
উজলিল নভদেশ ।
ছুটিল মুকুট ভাতি অলি ভাতি সহ,
অনন্ত বিমানে, চঞ্চলা চপলা প্রায় ;
ভাসিল ভারত হৃদি সে বিভা ছটায় ।
সহসা মিলিল আঁখি বিহগ নিচয়
নীড় মাঝে, কুজনিল মধুম্বরে ; ভানুভাতি
ভাবি, উজল কৃপান ভাসে, শশধর
কর জিনি, উজল কিরীটকৰে, নিদ্রা
ত্যজি কেহ, শুনাতে মধুর গীত তপনে
অম্বরের পথে, নিজ নীড়াশ্রম ছাড়ি
==
৮

মহাতৃষ্ণা কাব্য।
বাহিরিল ধীরে, তুলিয়ে সুতান লয় ;
কিন্তু রে ধাধিল আঁখি উজল বিভায়,
পশিল সভয়ে নীড়ে ত্যজিয়ে সঙ্গীত,
মুদিল নয়ন, হৃদি আশা লুকাইল
হৃদি মাঝে। বিধূর চকোর পিতে বিধু-
সুধা, বিধুর অন্তরে, চাহিল অম্বর
দেশে, আঁখি মেলি ; কিন্তু হায়! তার আশ
মিশাল নিরাশ নীরে ; ভালুকর জিনি
হেরি কররাশি, সভয়ে মুদিল নেত্র,
বিধূনিল মরি, ডুবিল শােকের নীরে
আবার ধীরেতে। সহসা কহিলা সতী
মহেশ-হৃদয়-বাল ঘুরায়ে রূপান
উদ্দেশি বিজয়া,-“দেখ সই আঁখি মেলি,
আনন্দ সাগরে ভাসে সােনার ভারত,
হাসে চারু হৰ্ম্মমালা, শিরােপরে ভুলি
জয় কেতুরাজি ; ওই দেখ বায়ু বলে,
ফল ফুলে গাঁথা মালা দোলে দ্বারে দ্বারে ;
উজলিয়ে রাজ মার্গ, অনন্ত নগরী চয় ;
জ্বলে দীপমালা আহা কি মােহন সাজে,
দেখ সারি সারি ; অমর নগরী জিনি
হয়েছে মধুর শােভা, ভাসিছে আজিকে
সমগ্র ভারত বাসী সুখের সাগরে

১৮
দ্বিতীয় সর্গ।
পিয়ে স্বাধীনতা-মধু, তেঁই সে আজিকে
বুঝি এ মধুর শোভা ; না হলে বল রে
বহে হায় কার প্রাণে এ সুখ-লহরী,
হৃদয় মলিন যার পেতে তাপিত।
চল রে সবাই মিলে উরিয়ে ভারতে,
জাগাই ভারত বাসী, এ ঘাের পিপাসা
চলরে নিভাই, পিয়ে আজি নরলােহ
প্রাণভরে ; বল সবে মিলে উচ্চরবে,
‘জয় জয় জয় কঁাপাও অস্বর তল ;
চলরে ভারতে ; সহেনা বিলম্ব আর ;
চল যাই কুরুক্ষেত্রে পূণ্যগুঞ্জময়
রণাঙ্গনে, তুষেছিল মােরে যথা যত্নে
ক্ষত্রিয় নিকর, রণের শােণিত দানে
মাতিয়ে সমরে, করি সবে আত্মত্যাগ।”
নীরবিলা শ্যামা, অমনি উঠিল নভে
‘জয় জয়’ স্বর, নাদিল ৰিজয়া জয়া।
সহসা উঠিল বাজি ঘাের শৃঙ্গর
গভীর আরবে , ‘জয় জয়, রব সহ
লুকাইল নভে জ্বলন্ত চপলা ছটা,
ধাইলা অভয়া বিজয় জয়ার সনে
লক্ষিয়ে ভারত; পূণ্য পুঞ্জময় দূর
কুরুক্ষেত্র রণাঙ্গনে, মাতিয়ে হরষে।

মহাতৃষ্ণা কাব্য।
১৯
বাড়িল দ্বিগুণ বিভা, -ঝল মল করি
পাবক কণিকা, খসিতে লাগিল ঘন ,
ধাধিয়ে নয়ন, যেন বা দহিতে বিশ্বে
খর বিভা জালে ; অথবা তপন যেন
গভীর নিশীথ পেয়ে, হয়ে মাতােয়ারা,
রতন কিরীট পরি, ধাইছে উল্লাসে,
নভ ভাবি উদিতে মরতে, বিকাশিয়ে
প্রভা জাল ঘন, সহলােচন মেলি
বিশ্ব দগ্ধকারী, আরােহি সুবর্ণ রথে।
মুহুর্ভে পশিলা সতী কুরুক্ষেত্র হৃদে,
বাজাইল। শৃঙ্গ গভীর আরবে পুনঃ,
ঘাের প্রতিধ্বনি হ’ল ভেদি শব্দ বহ,
ভেদিয়ে ত্রিদিব ; ছুটিল সমীর ভয়ে
নভ মার্গ দিয়ে, ছুটিল শৃঙ্গ নিঃস্বন।
কঁপিল সহসা পৃথ্বী চরণ প্রহারে,
চঞ্চল হইল হৃদি, কঁাদিলা সহসা
হৃদি ভার-ভরে, রমাপতি রমা পদে
জানাতে এ দুঃখ কথা, হৃদয়ের ভার
প্রতিকার তরে, চলিলা পৃথ্বী সুন্দরী,
চলিলা সুন্দরী হেন ঘাের নিশাকালে
ভিখারিণী প্রায়, ভাসি দুঃখ-নেত্ৰ-নীরে
চঞ্চল চরণ যে’তে বাধিল চরণে;
;
*

দ্বিতীয় সর্গ।
ভয়েতে অবশ দেহ, জীবন আকুল ।
উথলিল সিন্ধু বারি, ঘাের উৰ্ম্মিরাজি
গভীর গর্জনে উঠিতে লাগিল ঘন,
জলচর জীবকুল হইল চঞ্চল,
হইল চঞ্চল পাশী পয়ােনিধিরাজ
আবাস মন্দির মাঝে ; হেরিলা সভয়ে
উথলিছে সিন্ধুচয়, রতন খচিত
লড়িতেছে গৃহচূড়। ভাবিলা জলেশ,
সহসা প্রলয় কাল উপস্থিত আসি,
কুলক্ষণ আজি তেঁই হতেছে উদিত।
করেতে লইলা পাশ সত্বরে সভয়ে,
চিন্তিলা কেমবে গােলক বিহারী নাথে ;
বিবিধ চিন্তার স্রোত বহিল হৃদয়ে ।
অমর নগরী চারু কাপিল সে রবে-
গভীর শৃঙ্গের স্বনে, উঠিল জাগিয়ে
অমর নগরবাসী ; ত্যজিয়ে শয়ন
বাহিরিল বেগে সভীত অন্তর সবে,
হেরিল মরতে ভীষণ প্রলয়ােদয় ।
দ্বাদশ তপন জিনি উঠিছে কিরণ
মুহুর্মুহুঃ নিনাদিছে দেব শৃঙ্গবর।
সুরাঙ্গনগণ কুসুম শয়নাে’পরে
ছিলরে লভিতে, শান্তিপ্রদ নিদ্রা-কোলে

মহাতৃষ্ণা কাব্য।
২১
সুখ সুবিমল, নলীন নয়ন মুদি
স্বপন আবেসে হেরিতে ছিলরে কত
প্রেম-চিত্র-রাজি হৃদি প্রাণ মন-হর ;
খেলিতে ছিল রে, ত্রিদিব নন্দনানিল
চারু হৃদোপরে, যােগায়ে সুরভি রাশি ;
ফুল-কুল-দল সুন্দর মালিকা গাঁথা,
কাপাইয়ে হৃদরে মৃদুল মৃদুল।
সহসা ভাঙ্গিল ঘুম, টুটে গেল ধীরে
নিদ্রাবেস, অপনিত সুখ ছবি নেত্র দ্বার
হতে; শ্যামার হুঙ্কারে, শৃঙ্গের আরবে
কঁপিল হৃদয়, নিরাশে ভাসিল হৃদি।
সুর রাজগৃহে শচীপতী সুরেশ্বর
ছিলেন শয়ান ; সহসা ভাঙ্গিল নিদ্রা,
চঞ্চল হৃদয়, অম্লান কুসুম মালা
গল হতে, পড়িল ছিড়িয়ে ; বাতায়ন
পথে, দেখিলা চাহিয়ে ভীত সুরদল ;
জেগেছে সবাই এ ঘাের নিশীথ কালে,
আসিছে ত্বরিতে, বিরাম মন্দির পানে
তাহেরি ত্যজিয়ে শয্যা, খুলি গৃহদ্বার,
জানিয়ে বারতা ঘাের, সুরদল লয়ে
আরােহিস্যন্দনে চলিলা গােলকপুরে
নারায়ণ পাশে, জানাইতে এ বারতা।
.

২২ দ্বিতীয় সর্গ । গােলােক ভবন-মাঝে নিদ্রিত কেব কমল শয়নে ; পদতলে বসি রমা কেসব-বাসনা, পতি-পরায়ণা সতী । রমা-রূপে উজলিছে মরি! গৃহতল, উজলয়ে যথা রত্ন রাজি তমে ঢাকা খনির হৃদয়ে, বিকাশি উজল ছটা। অঙ্গ-পরিমলে আমােদিত গৃহতল, (কি ছার ফুল সৌরভ সে সৌরভ কাছে ) ভূমিছে ভ্রমর দল দলে দলে আসি ত্যজি মধুম মধুর সুরভি পূর্ণ, লুটিবারে রমা-অঙ্গ-পরিমল মরি। উন্মাদ অন্তরে। গাইছে বিহগচয় সুবৰ্ণ পদপোপরি, জাগিএ নিশীথে, রমাপতি রমা গুণ-গান মধু সুরে । কুজিছে বসন্ত সখা গোলােক কাননে, বিতরিয়ে স্বর সুধা ; মাতায়ে কানন- স্থলী, মাতিয়ে উল্লাসে। মধুর সকলি ; নাহি পশে কভু হেথা হৃদি দগ্ধকারী, শােক তাপ, জরা মৃত্যু আদি যত দুঃখ, বঞ্চে হেথা সবে সুখে কাল, দিবানিশি ভাসে সবে, উল্লাস সাগরে, গায় পাখী পবিত্র সঙ্গীত সদা, কাননে নিকুঞ্জে।

মহাতৃষ্ণা কাব্য।
সহসা জাগিল রমাপতি ; ত্যজি শয্যা
উঠিল সত্বরে, চঞ্চলিল প্রাণ মন,
অভিনব ভাব কিবা উদিয়ে অন্তরে।
সুধিলা কেব-হৃদয়-বাস কমলা :-
“কহ হে প্রাণেশ, ত্যজিয়ে শয়ন কেন
উঠিলে সহনা, দংশেছে কি তােমা নাথ
উন্মত্তভ্রমর, যাহে প্রাণ বিচঞ্চল ?”
উত্তরিলা রমাপতি,-“কিছার বল লল
এ জ্বালার কাছে, ভ্রমর দংশন জ্বালা
প্রাণময়। যে জ্বালায় প্রাণ মন কাঁদে
আজি মাের রে প্রেয়সি, বর্ণনে না যায়
সে কঠোর জ্বালা ; ভকত স্মরণে আজ
কাদেলাে হৃদয়,—চিত-পদ্ম টলে ঘন
চিন্তার তরঙ্গে, নারিরে স্থিরিতে তায়”
নীরবিল রমাপতি; সহসা পশিল
অস্ফুট করুণ স্বর-ললনা ক্রন্দন,
গােলােক ভবন মাঝে ; বাজিয়ে উঠিল
যেন রে সহসা, মুরুজ, মন্দিরা, বীণা,
বাঁশরী, রবাব, সমতানে সমম্বরে
মৃদুল ঝঙ্কারে, সকরুণে, অমঙ্গল
বার্তা ঘেষি যেন বিশ্বে কাদায়ে পরাণ ।
ধীরে ধীরে ধীরে কমললােচনা সতী
'

২৪
দ্বিতীয় সর্গ।
;
পৃথ্বী সুন্দরী, গােলক ভবন মাঝারে
পশিলা সভয়ে ; প্রণমিলা ভক্তি ভরে
হরিপ্রিয়া হরিপদে ; কিন্তু হায় মরি
সরিল মুখে ভাষ, কঁদিলা নীরবে ;
বিকচ-নলীন-নেত্রে সুধু অশ্রুধার,
তিতিয়ে অম্বর, বহিতে লাগিল হায় !
কঁাদিলা অধীর চিতে হৃদি ভার ভরে।
“কহলাে তনয়ে আরম্ভিলা রমাপতি ;
“এ ঘাের নিশীথে কেন, উপস্থিত হেথা
কেনবা নয়নে ঝরে বল তুশ্রুধার,
বারিধার প্রায় ? কিবা হৃদি-ভাব পুন
হৃদয়ে তােমার, বল মােরে বিবরিয়ে,
প্রতিকার করি তার, কিহবে কঁদিলে
বৎসে, অবােধ ললনা প্রায় তিতি ধরা ?”
মাধব আশ্বাসে, আশ্বাসিত হয়ে মরি
বসুধা সুন্দরী, মুছি ধীরে অশ্রুধার
সুবৰ্ণ আঁচিলে, উত্তরিলা ক্ষণপরে:
( ভারতী সুন্দরী যেন ঝঙ্কারিলা বীণা)
“পিতঃ, কতবার, বাঁচায়েছ তনয়ারে,
কত রূপ করে, হরি এ হদয় ভার ;
বিপদ সাগরে কত, শ্ৰীপদ তরণী
দিয়ে ব্রাণিলে হে তুমি, বহুকাল আমি
ক

মহাতৃষ্ণা কাব্য। আছি সুখে; নাহি হৃদি ভার, নাহ পিতঃ, দুৰ্ম্মদদনুজদল, কব্বর নিকর দিতে হে যন্ত্রনা আর অভাগী হৃদয়ে ; শান্ত এ হৃদয় পিতঃ ; কিন্তু আজি হায়, ভীম ভারে হৃদি মম হ’ল গাে চঞ্চল- বাড়িল মন-বেদনা, দনুজ দলনী অভয় চরণাঘাতে, কঁাপিছে ভারত, কপিছে হৃদয়, দারুণ বেদনা চিতে, যাহা হয় কর পিতঃ, তার এ বিপদে।” এত বলি শিহরিলা পদ্মাক্ষী বসুধা ভাবি ভয়ে, অশ্রুবিন্দু অলক্ষে ঝরিল আঁখি হতে পুনঃ,রহিলা দাড়ায়ে সতী। কতক্ষণ পরে উত্তরিলা বনমালী ; “বুঝেছি নন্দিনি, হৃদয় বেদনা তব ; মুহূর্তেকে বধিতাম অন্য অরি হলে সুদর্শনাঘাতে, কিন্তু আজি বল মােরে, কেমনে বা বারি বৎসে, কৃতান্ত রূপিনী তন্ময়ী শ্যামারে, কে রে বারিবে আজি? কে বল দাড়াবে আজি বিশ্বদগ্ধকারী পাবক সন্মুখে, কিন্তু হায়, পুত্রি তোমা এই লও, করিলাম মম বল দান, য,ওগাে ফিরি মরতে, নির্ভীক হৃদয়ে। গ

দ্বিতীয় সর্গ।
3
সবে।
এত বলি রমাপতি বিষ্ণুতেজ দানে
পুরিলা পৃথী-অন্তর নবীন উৎসাহে।
পশিল জনঃকল্লোল, সহ সে হৰ্ম্ম
তলে, পশিল অনিল দ্রুত সঞ্চরণে,
অগ্রগামী হয়ে, বহি সে কল্লোল হায় !
চমকিল রমাপতি, কেশব-বাসনা,
বসুধা, সে রবে। সহসা পশিল ইন্দ্র
স্বরীম্বর, সুরসহ, রমানাথ গৃহ
মাঝে, প্রণমিল সবে, হরি হরিপ্রিয়া
চরণে সভীত চিতে রহিল দাড়ায়ে
কতক্ষণ পরে শচীপতি ইন্দ্র,
কমল লােচনে সুধিলা অধীর হয়ে ;
“রক্ষ দেব রমাপতি, রক্ষ সুরদলে,
রক্ষ হে ত্রিদিব ধামে, নহে যায় আজি
সব ভস্ম হয়ে, অভয়া-নয়ন-দাবে।
হে নাথ! অমর-নগরী, দেব-উদ্যান,
ফল পুষ্পে বিকসিত চারু তুরুচয়,
মণি-মুক্তা-রত্ন-বখচিত সৌধমালা,
যায় বুঝি ভষ্ম হয়ে, শ্যামার কটাক্ষে।
তুমি না রাখিলে দেব, এ সুর নিকরে
যায় আজি সব, রাখিবারে নাহি কেহ।
এখনাে কঁপিছে প্রাণ শ্যামার হুঙ্কারে

মহাতৃষ্ণা কাব্য।
२१
ধাধিছে নয়ন, জগত দহনকারী
ভীষণ পাবক ভাসে, আকুল পরাণ ।”
উত্তরিলা গােলকবিহারী—“হে বাসব
কেন এত ভীত মন, ভুলেছ
কি সব
পুরব সমর কথা, দৈত্য-দল সহ ?
যাও তুমি নির্ভীক অন্তরে সুরদল
সহ, ফিরিয়ে নগরে; যাও বায়ু পতি,
আবর ত্বরিতে সুন্দর অম্বরতল
নিয়ােজিয়ে মেঘ দাম, তাহলে নারিবে,
পশিবারে অমর নগরে, অভয়ার
উজল কিরণ রাশি; মুক্ত কর ত্বর
নিগড় আবদ্ধ বায়ুদলে কারাগার
হ’তে, মাতুক তাহারা রঙ্গে ; নভদেশে
হক প্রধাবিত, তাহলে নারিবে কভু
ভীষণ স্বনন, কঁাপাবারে সুর হৃদি
পরশিতে অমর নগরী। যাও সবে
নিকেতনে ফিরি, কাল ব্যাজে নাহি ফল,
যাও গাে তনয়ে তুমি মরত ভূবনে।”
নীরবিল হরি।–ফিরিল সবাই গেহে
আনন্দ অন্তরে কেশব, কমলা-পদ
বন্দিয়ে খেতে, চলি গেলা সুরেশ্বর
সুর দলে লয়ে অমর নগরী পানে
3
।

২৮
দ্বিতীয় সর্গ ।
চলিলা পৃথী সুন্দরী মরত ভুবনে,
উজলিয়ে দিশিচয় ; খসিল তারকা
যেন নভ কোল হতে বিতরি বিভাগ।
ঘুমালেন হরি পুনঃ কমল শয়নে ;
ঘুমাইলা হরিপ্রিয়া পতি পদতলে
মুদি আঁখি, ভাবে নাথে ; আইলে যামিনী
যথা ফোটা কমলিনী মুদিয়ে নয়ন
ভাবিয়ে নাথেরে নিজ ঘুমায় সরসে ।
বাজিল আবার শৃঙ্গ গভীর আরবে
ধরাতলে, শ্যামা-করে। প্রহারিলা পদ
ধরণী হৃদয়ে, উঠিল বাজিয়ে কাঞ্চী
শিঞ্জিনী আবার। হেরিলা অভয়া সতী
নিরব নিথর সব ; না জাগিছে কেহ
শৃঙ্গের স্বননে ঘাের ;
সবাই ঘুমায়
অনন্ত শয়নে যেন। নাহি বাজে বীণা
সুদূর নগর মাঝে, নাহি জাগে কেহ
মাতিয়ে উল্লাসে ; তাহেরি বিস্ময়ে সতী
হইলা মগন ; কতক্ষণ পরে পুন
বাজাইয়ে শৃঙ্গর, ভেদি নতল
কহিল অভয়া উচ্চে ভারত নন্দনে ,-
“কোথারে আজিকে ভরত নন্দন,
কর রে কর রে তৃষা নিবারণ ;

মহাভৃষ্ণা কাব্য।
২৯
কেন রে কেন রে, বল ঘুম ঘােরে,
অচেতন এবে সবাকার মন।
সমর সলিলে ভাসারে পরাণ,
কর রে সবাই মােরে লােহ দান ;
জয় জয় রবে, পরে নীল নভে,
করে ধরি উড়া বিজয় নিশান।”
বাম করে ধরি বিজয় নিশান,
অন্য করে ধরি শাণিত কৃপণ,
নির্ভীক অন্তরে, মাতরে সমরে,
কর রে আজিকে মােরে লােহ দান।
“উহু উহু উহু অসহ্য যাতনা,
পিপাসার জ্বালা হৃদয়ে সয়না
নিভারে নিভারে, এ ঘাের ভূষারে,
উহু উহু হৃদি মাঝে অসহ্য বেদনা।
;
সমর অনল বিনে এ পিপাসা,
মিটিবে কভু ; না পুরিবে আশা
হৃদি না মুড়াবে, যাতনা রহিবে,
রহিবে হৃদেতে বিষম নিরাশা।”
তাই বলি আজি ভারত নয়,
লরে যতনে রণের নিলয়
:

দ্বিতীয় সর্গ ।
দেরে রে আহুতি, স্থির করে মতি,
পুনঃ পুনঃ পুনঃ শরহবি তায়।'
“সে অনলবিভা উঠুক গগনে,
পুড়ে যাক বিশ্ব পবিক দহনে ;
জ্বলুক জ্বলুক, ঘাের হুতভূক,
জ্বলুক সে অগ্নি সবার জীবনে।”
“সুনীল নভেরে ছাও শরজালে,
ছুটাও দামিনী সবে রণস্থলে ;
বধরে ধরে, অরতি নিকরে,
অরি মুণ্ড সব চরণেতে দলে।”
সেই কুরুক্ষেত্র পূত রনাঙ্গন,
এই না জাগিছে সম্মুখে ভীষণ ;
কিন্তু কোথা আজ, যে মধুর সাজ,
কোথা সে প ব ররে বাজন ?”
“কোথা জয়কেতু, কোথা শরাসন,
কোথা রথ বাজী কুন্ত অগনন
জ্বলন্ত চপলা, কোথা করে খেলা,
কোথা আজি হায় জ্বলন্ত বচন ?”
‘ভুবন বিখ্যাত কোথা বীরগণ,
কোথা ভীষ্মচাৰ্য, কোথা আজি দ্রোণ ;

মহাতৃষ্ণা কাব্য ।
কোথা অশ্বত্থামা, পার্থ খ্যাত না,
কোথা ভদত্ত রণে হুতাসন।
“কই ভীম আজ কোথা দুর্যোধন,
জ্বাল রে আবার রণ তাসন ;
ছুটারে দামিনী, গগন-কামিনী,
ধরিয়ে কৃপাণ ধরি শরাশন।”
“ওহো ওহাে ওহাে পিপাসা প্রবল,
ধূধূ ধূধূ জ্বলে হৃদয় অনল ;
নিভারে যতনে, নর লােহ দানে,
কররে জীবন অজি রে শীতল।”
“নিদ্রা ক্রোড়ে কিরে এখনো রহিবি,
অলীক স্বপন এখনাে দেখিবি ?
মােহে বস হয়ে, নিদ্রা ক্রোড়ে রয়ে,
আকাশ কুসুম আজো কি গাথিব ।
“উঠরে ত্যজিয়ে আলস্য শয়ন,
হৃদি ভরে বাজা রণের বাজন
বাজা বাজা ভেৰি, প্ৰাণ মন ভরি,
নাচরে সমরে উড়ায়ে কেতন।
;
“জয় জুয়” রবে হৃদয় জুড়াও,
সমর সাগরে জীবন ভাসাও
;

०२
দ্বিতীয় সর্গ।
মাতাও পরাণ ধর রে কৃপান,
জয় স্বাধীনতা ‘বলি সবে গাও।
নীরবিলা সতী মহেশ ভাবিনী,
নীরব হইল মধুময় ধ্বনি ;
কেহ না জাগিল, কেহ না উঠিল,
জাগিয়ে রহিল অনন্ত যামিনী ।
ঘাের শৃঙ্গবর আবার বাজিল,
উৎসাহ উগারি আবার গাহিল,
“জয় জয় জয়, স্বাধীনতা জয়,
কিন্তু রে কেহই তবু না জাগিল ।
;
শৃঙ্গরব পুনঃ গগনে মিশাল
হৃদয়ের আশা হৃদয়ে রহিল
‘জয় জয় বলি, প্রাণ মন খুলি
খুলিয়ে কৃপন কেহ না জাগিল।
গভীরা প্রকৃতি নিরব হইল,
শৃঙ্গরব আর নাহি রে উঠিল ;
সুধু সমীরণ, ভুলিয়ে স্বনন,
মধুর ভাবেতে বহিতে লাগিল
সমীরের সাথে গভীর ভাবেতে,
শ্যামা দীর্ঘ শ্বাস লাগিল বহিতে ;

মহাতৃষ্ণা কাব্য।
নানা দুঃখ হয়, পুরিল হৃদয়,
দহিলে অন্তর বিষম তৃষাতে।
ধ্বক ধ্বকি ঘন নয়ন জ্বলিল,
নানা দুঃখজাল হৃদি আবরিল ;
আবার আরার, শৃঙ্গের ঝঙ্কারি,
শ্যামা রব নভে আবার উঠিল ।
“একি আজি হেরি কেন রে নয়নে,
কেহ না জাগিলি কহ কি কারণে ;
ঘুমায়ে রহিলি, আঁখি না মেলিলি,
জাগিলি হায় গভীর নিম্বনে।
বাক্য বজ্রনাদ গভীর স্বননে,
কাপে তারা রাজি সুদূর গগনে ;
উথলে সাগর, নিশ্চল সমীর,
শুধু কি তােদর না পাশে শ্রবণে।
;
সংসারের জ্বালা আজ কিরে ভুলে,
রয়েছিস সবে শশাণের কোলে
তাই কি রে তােরা, হয়ে জ্ঞান হারা,
জয় জয় রবে নভ দেশে তুলে,
‘‘নাহি গা’স আজি খুলে মন প্রাণ,
ধরিয়ে করেতে উজল কৃপাণ;

দ্বিতীয় সর্গ ।
৩৪
}
অসার জীবন, দিতে বিসর্জন,
জ্বালিয়ে সুখেতে রণ হুতাশন।”
জয় জয় সবে বল সমম্বরে,
বিদার বিদার সুদূর অম্বরে ;
নিরবে থেকোনা, ঘুমায়ে রয়ােনা,
মাত একবার মাত রে সমরে।
“কেন অসি আজ ঘুমায় পিধানে,
কেন নাহি ধায় লােহ পানে ;
কেন নাহি তােষে, আজি মােরে আশে,
রণােধ মাের নরলোহ দানে।”
“বাজা বাজা বীণা সবে উঠি আজ,
শয্যা ত্যজি উঠি পর বীর--সাজ ;
কুসুম ভূষণ, কর উন্মােচন,
পাক শােভা শিরে মনােহার তাজ।”
“রণ শৃঙ্গ বাজা মাতায়ে ভুবন,
সপ্তম্বরা ধরি গা’করে চরণ ;
বাজাক ললনা, মধুময়ী বীণা,
ভরুক সুতানে অনন্ত গগন।”
“প্রতি হৃদি স্থরে সে মধুর ভাব
মধুময় বেশে হােক আবির্ভাব ;

মহাতৃষ্ণা কাব্য।
৩৫
যাতে করে হয়, পরাণ মাতায়,
হয় প্রজ্বলিত ঘাের রণ দাব।”
“উহু, উহু ঘাের হৃদয় যাতনা,
এ বিষম জ্বালা হৃদয়ে সয়না
ভারত নন্দন, ত্যজিয়ে শয়ন,
জাগ একবার যুড়াতে যাতনা ।”
“হ’ল দগ্ধ প্রাণ অন্তর অনলে,
নিভেনা নিভেনা এ জ্বালা সলিলে,
এ ঘাের অনল, নিভিবে কেবল,
মন দুখহারী সমর অনলে।”
“তাই বলি সবে জাগ একবার,
ছুটারে ভারতে শােণিতের ধার,
এ যাতনা তবে, নিভিবে নিভিবে,
হলে নয়নে বহিরে রে ধার।”
নিরবিল উমা নগেন্দ্র নন্দিনী,
গগণে উঠিল ঘাের শৃঙ্গধ্বনি ;
নাদিল বিজয়া, নির্ভীক হৃদয়,
সহ প্রিয় জয়া সুচারু ভালিনী।
:
সম স্বরে দোহে উঠিল গরজি ;
•চমকিল নভে চারু তারারাজি ;

প্রথম সর্গ।
চমকিল ধরা, ভয়েতে অধীরা,
চমকিল সিন্ধু সুখ আশ ত্যজি।
জয় জয় রবে ভরিল গগন,
ভয়াকুল চিতে পলাল পবন ;
ত্রিদীব আলয়ে, দেবতা নিয়ে,
সবে পুনঃ হ’ল ভয়েতে মগন।
আবার আবার ভীষণ নিন,
বধির হইল যেন রে শ্রবণ ;
সহসা পিধানে, ঝন ঝন স্বনে,
বাজিল সবার কৃপাণ ভীষণ ।
দেখিতে দেখিতে বিভা পরকাশি,
উজলিল ঘন আভাময় অলি ;
সবাকার করে, উজলি অম্বরে,
অভেদ্য অনন্ত তমজাল নাশি।
ঘন ঘন ঘন নয়ন ধাঁধিল,
সবাকার অসি ঘুরিতে লাগিল ;
মরতে চপলা, হের করে খেলা,
সবার নয়নে পাবক জ্বলিল।
ঘূরিল কৃপাণ স্বন স্বন করি,
বলিল বদন সবার উগরি

মহাভূষা কাব্য।
জয় জয় জয়, স্বাধীন জয়,
নিভাৱে পিপানা সবে অলি ধরি।”
গাহিল সবাই, চরণ টলিল,
অাবার মেদিনী হইল ঢল ;
থর থর করে, লভীত অন্তরে,
বাসুকী পন্নগ পাতালে কঁপল।
তাব'র আবর শৃঙ্গের ঝ তার,
আবার বহল জয় জয় ধর ;
হারি সবে, কঁ পাইরে নভে,
ধরণী হৃদয়ে ঢরণ-এহার ।
দুরু দুরু পুন: কঁ পিল ধৱী,
শ্যামার চর। বাজিল শিঞ্জিনী
উজলিল আঁখি, নীরব নিরখি,
সোনার ভারতে যতেক পরাী।
ধীরে ধীরে ধীরে সবাই থামিল,
ভূতল চপলা ভূতলে লুকাল ;
দাড়াল অভা, ঘোর চিন্তা-ছায়া,
আসয়ে সহ। বদন ঢাকি।
তাই হেরি ধীরে বিজয় সুধিল:
কেন ২িয় সই কেন হেন হ’ল ?

দ্বিতীয় সর্গ।
সহসা বদন, বিভাতি বিহীন,
কেন বা স্বজনি আঁখি ছল ছল ?”
“যার নামে হয় শান্তির উদয়,
অশান্তি পূরিত হৃদে মায়াময়
তার চিত হল, কেন লাে চঞ্চল,
হৃদি হ’তে শান্তি কেনবা বিলয় ?”
“প্রান্তরের পারে চেয়ে আছ কেন,
দীর্ঘ শ্বাস কেন হতেছে পতন ?
কিসেরি লাগিয়ে, রয়েছ চাহিয়ে,
শূন্য প্রায় আজি কেনবা জীবন ?”
নীরব বিজয়া, নীরব সকলি,
নগেন্দ্র-নন্দিনী আঁখিযুগ খুলি ;
প্রান্তরের পারে, সুচারু নগরে,
রহিলা চাহিয়ে আপনারে ভুলি।
বহুক্ষণ সতী চাহিয়া রহিল,
কতক্ষণ পরে নয়ন ফিরাল ;
আবার হৃদয়, ডুবিল চিন্তায়,
প্রান্তরের পানে আবার চাহিল।
শূন্য প্রাণে সতী চাহিয়ে রহিল,
কত যে ভাবনা হৃদয়ে পশিল ;

মহাতৃষ্ণা কাব্য ।
নব নব দুখে, হৃদি পূর্ণ শােকে,
চিন্তা স্রোতে সব ভাসিয়ে চলিল।
চাহিতে চাহিতে, চাহিতে নারিল,
ঘাের শােক-উৎস হৃদে উথলিল ;
নীরবে নীরবে, শােকের প্রভাবে,
আঁখি হ'তে বারি ঝরিয়ে পড়িল ।
তা’ হেরিয়ে জয়া সুধিলা শ্যামারে:-
একি একি সই একি বা হেরিরে ?
কেনবা নয়ন, বরষে জীবন,
কেন বল চিত পূর্ণ শােক-ভারে ?”
“প্রান্তরের পারে যত আঁখি ধায়,
শােক-ত-নীরে কেন পূরে যায় ?
কেন সই বল, পরাণ পাগল,
নেত্রে ঘন কেন নীরদ উদয়।”
নীরবিল জয়া ; কত ক্ষণ পরে,
চহিলা অভয়া মুছি আঁখি ধারে ;
শােক মাখা স্বরে, কহিল দোহারে,
লক্ষ্য করি সুচারু নগরে:-
“দেখলাে সজনি ওই শােভা পায়,
সুচারু নগরী অলকারি প্রায় ;

৪০
দ্বিতীয় ।
শোভে দীপ মালা ; হের করে খেলা,
ওই নভদেশে চারু কেতু চয়।”
“কিন্তু আজি কোথা সে অতুল শোভা,
সে স্বাধীন ভাব হৃদি-মন-লোভ?
সকলি যেন রে, আচ্ছন্ন মিরে,
সকলি আজিকে হারায়েছে বিত)।”
৩
“দেখ দেখ সই! দেখ চাহিয়,
সকলি গিয়েছে বিলয় হইয়ে ;
সব মরুময়, পিশাচ আয়,
শশ্মাণের প্রায় হয়েছে পড়িয়ে।”
;
“পূৰ্ব্ব শোভা অজি মলিন হয়েছে,
দুরন্ত কালেতে সকলি হ’রেছে ;
অনন্তের তরে, অনন্ত উদরে,
ধীরে ধীরে ধীরে সকলি প’শেছে।”
‘আজিকে সবাই হয়েছে অধীন,
তেঁই সে সবার হৃদয় মলিন ;
তেঁই আজি সবে, রয়েছে নীরবে,
তেঁই নে আজিকে পুৰ্ব্ব শােভা হীন।”
“তারি তরে হের অর্ধেন্দু শােভিত,
উড়িছে কে তন করি পত পত ;

মহাতৃষ্ণা কাব্য।
৪১
গগন বিনে, আপনারি মনে,
করিয়ে সবার পরাধীন চিত।”
‘স্বজনি, স্বজনি, এরা যদি হত,
স্বাধীন-হৃদয় সে স্বাধীন-চত,
তাহলে কি আজ, পরে ফুলসজ,
মােহের শয়নে শুইয়ে রহিত ?”
“দেখিত রে কি রে অলীক স্বপন,
ছায়াবাজি প্রায় নয়ন-রঞ্জন ;
আকাশ প্রসুন, ভরি প্রাণ মন,
করিত কি সই আজ রে গ্রন্থন ?”
“মায়া প্রলােভনে বৃথা আজ ভুলে,
থাকিত কি শুয়ে মােরে অবহেলে?
মুদিয়ে নয়ন, আবরি শ্রবণ,
ভুলিয়ে গৌরব, পুর্ব সুখ ভুলে ?”
“তাহলে কি আজ চারু রণাঙ্গন,
থাকিত পড়িয়ে শ্মশাণ মতন?
তাহলে কি আজ, চারু রণসাজ,
ভূতল-ধূলিতে হ’ত রে লুণ্ঠন ?”
“এরা যদি আজ হ’ত রে স্বাধীন,
যদি নাহি হ'ত হৃদয় মলিন
•

১২
দ্বিতীয় সর্গ।
আজি রে তাহলে, মন প্রাণ খুলে,
গাইত সবাই ভারত-সুদিন।”
“আজিকে তাহলে ত্যজিয়ে শয়ন,
উগারি বদনে জ্বলন্ত বচন,
সমরে মাতিত, জীবন ভাত,
ভাসাত অনন্ত স্রোতেতে জীবন।”
“তাহলে আজিকে সুদূর অম্বর,
ভেদিত সঘন জয় জয় স্বর ।
উড়িত কেতন, রণের বাজন,
বাজিত উৎসাহে হৃদি-প্রাণ-হর।”
“আজিকে তাহলে ত্যজিয়ে পিধান,
শূন্য পথে ঘন উঠিত কৃপাণ ;
ঘুরিত সঘনে, শন শন্ স্বনে,
উজলি বিভাসে গগন বিতান।”
“চমকিত ঘন ভূতলে চপলা,
রণাঙ্গনে ঘন করিত রে খেলা
নয়ন ধাধিত ; নভ উজলিত,
লুকাত নভেতে চারু রামালা।”
‘রণস্থলে হত কুলিশ নিস্বন,
অস্ত্রাঘাতে হত রুধির বর্ষণ ;

মহাতৃষ্ণা কাব্য।
খরশাণ অসি, অরিদল নাশি,
ধরিত আজিকে লােহিত বরণ।”
“কিন্তু রে সে সুখ ওই টুটে গেল,
ওই হের সবে ঘুমায়ে রহিল ;
কেহ না জাগিল, কেহ না উঠিল,
মনের বাসনা মনেতে মিশাল।”
‘চললে স্বজনি যাই হেথাহ’তে,
রাজস্থানে চল, যদি পারি চিতে
সলিল সিঞ্চিতে, যাতনা দূরিতে,
ঘাের তৃষা,-জ্বালা ধীরেতে নিভাতে।”
“যা’দের শূরত্বে এই রণাঙ্গন,
করেছে রে হায়, কীরতি স্থাপন ;
তারা নাই আজ, পরি বীর সাজ,
কে মাতাবে ধরা উজলি ভূবন?”
“এরাই কি হায় তাদের সন্ততি ?
তবে কোথা হৃদে সে আৰ্য-শকতি ?
সিংহের নন্দন, শৃগাল মতন,
অরির চরণে করে আজ নতি।”
“ওই থানেশ্বর মরুভূমি প্রায়,
নীরবে নিথরে হের পড়ে রয় ।

৪৪
দ্বিতীয় সর্গ।
যাহার সুযশ, পূরি দিশি দশ,
এখনাে জগতে ধীরে ধীরে বয়।”
“কিন্তু কোথা আজ বল রে তাহারা,
ভারত-আকাশ-সমুজ্জ্বল তারা ;
যুঝেছিল যারা, হয়ে মাতােয়ারা,
রেখেছে সুযশ পুরিয়ে এ ধরা।”
“চল সই চল, চল রাজস্থানে,
চল পঞ্চনদে বিখ্যাত ভুবনে ;
চললে সবাই, পিপাসা যুড়াই,
ভুষিবে লাে তারা মােরে লােহদানে
“বলি তারা তারা সঘনে তাহারা,
মতিবে সমরে হয়ে মাতােয়ারা ;
গাইবে সমরে, ধরি তরবারে,
‘জয় জয় তারা দুঃখতাপ হরা।
“গভীর নিনাদে যখন বাজা’ব,
নভ-ভেদী শৃঙ্গ; যখন নাদিব
‘জয় জয় বলি, অসি ধনু তুলি,
মাতরে সমরে। যবে আশ্বাসিব ”
“ভারত তনয়ে মাতিতে সমরে,
তখনি অমনি পুরিয়ে অম্বরে,

মহাতৃষ্ণা কাব্য।
৪৫
বীণ সপ্তম্বর, মন-প্রাণ হরা,
বাজিয়ে উঠিবে সবে সমম্বরে।”
“তাই বলি সই, চল রাজ স্থানে,
জ্বলিছে হৃদয় পিপাসা-দহনে ;
চল রাজস্থানে, নরলােহ দানে,
ভুষিবে সবাই আনন্দিত মনে।”
‘এখানে থাকিলে বাড়িবে যাতনা,
বাড়িবে সুধুই মরম বেদনা ;
জ্বলিবে নিয়ত, দহিবে এ চিত,
অন্তর অনল ; হৃদি যুড়াবে না।
নীরবিল উমা গণেন্দ্র-জননী,
সহসা হইল চঞ্চল পরাণী ;
কহিল বিজয়া, চাহিয়ে অভয়া,
মধুর স্বরেতে কোকিল-গঞ্জিনী:-
।
“চল সই যদি পরাণ চঞ্চল,
নিশীথিনী বুঝি ওই বা পােহা’ল
আসি অন্য দিন, এমিব ভূবন,
লাশ শিখরে চল ফিরে চল।”
নীরব বিজয়া ; ক্ষণকাল পরে,
কহিলা অভয়া, শােক পূর্ণ-স্বরে

৪৬
দ্বিতীয় সর্গ।
“যাও সখি যাও, গৃহে ফিরে যাও,
যা’ব না এখন ফিরিয়ে আগারে।”
“আজি এ ভরতে একাকী ভ্ৰমিব,
জয় জয় রবে, সবারে মাতাব ;
আপনি মাতিব, পরাণ যুড়াব,
স্বাধীন সঙ্গতী ভারতে গাহিব।”
এত বলি সতী চঞ্চল চরণে,
পশিতে উদ্যতা সুদূর গগনে ;
বিজয়া তাহেরে, চিন্তাকুল স্বরে,
কহিল শ্যামারে আকুল পরাণে:-
“দাড়াও স্বজনি কোথা একা যাবে,
হেথা আমি কেন সখীরে ত্যজিবে ?
যাইবে বিজয়া, প্রিয় সখী জয়া,
'ভব সনে হায়, তুমি যেথা যাবে।”
কহিতে কহিতে সবাই অম্বরে,
পশিল ধীরেতে চিন্তিত অন্তরে ;
ধরাতলে বিভা, অপরূপ শােভা,
দেখিতে দেখিতে মিশাইল ধীরে।
নীরব পুনঃ ধরি ধরি ধরি,
পশিল রে মধুময় ভাব ধরি ;

মহাতৃষ্ণা কাব্য।
৪৭
কিন্তু ক্ষণ তরে, সুদূর অম্বরে,
এই ক’টা কথা ভুতলেতে উরি,
হল প্রতিধ্বনি মধুর স্বননে:-
“কুরুক্ষেত্র বানী দেখরে নয়নে ;
দেখ একবার, ফেলি আঁখিধার
তােদের জননী যায় রাজস্থানে।
এসেছিনু হেথা তৃষা নিভাবারে,
অন্তর বাসনা রহিল অন্তরে ;
তৃষা না নিভালি, প্রাণ না যুড়ালি,
যাই চলি যাই ভাসি অাঁখি নীরে।”
“ঘুমে মত্ত হয়ে রহিলি পড়িয়ে,
থাক রে সবাই বিভােরে ঘুমায়ে ;
উদিলে সুদিন, মাতাস ভূবন,
রণবাদ্য নাদে-গগন ভরিয়ে।”
সহসা মধুর আরাব মিশাল,
শামা ও শ্রুধার ধরায় ঝুরিল ;
পল্লব কাপিল, বিটপী দুলিল,
ধীরে ধীরে নিশি পােহাতে লাগিল ।
ঃ)রক্তে
ইতি দ্বিতীয় সর্গ

মহাতৃষ্ণা কাব্য।
তৃতীয় সর্গ ।
পোহাইছে বিভাবরী । ধীরে ধীরে ধীরে
নিবিড় তমা ছায়া, যেতেছে চলিয়ে ;
মিশিতেছে ধরে, অনন্ত গনপথ।
ধরে ধরে জাগে বিশাল অবনীতল ;
জাগিছে প!দ পাজি সুরম্য উদ্যানে,
নয়ন-রঞ্জন চারু ; অথবা নিবিড়
গহনে। জাগিছে ব্রততীদাম, সুচারু
ফুল তরুচয় ; ধীরে ধীরে নিদ্রা ত্যজি,
জাগিতেছে ফুলকুল,—চাহিছে মধুরে
কোমল নয়ন খুলি, অম্বরের পানে,
কভু বা প্রান্তর পারে, হালি মৃদু মৃদু ;
ঢলিয়ে পড়িছে কভু নিদ্রার অলসে।
মুদিছে নয়ন সরে সুচারু কুমুদী,
বিরস বদনে মরি, নিদ্রার তলসে।
ফটিতেছে কমলিী ভানু-প্রিয় সতী
নয়ন বিকাশি, নিশারে নীহারে মরি,

মহাতৃষ্ণা কাব্য।
০
;
ভাসা’য়ে হৃদয় ; তিতি যেন ত, নীরে
ভানুর বিরহে, অনন্ত যামিনী সতী ।
সহসা উরিলা এবে সখীগণ সহ
হরজায়া নগবালা, নয়ন রঞ্জন
আরাবলী নগােপরে ধীরে ধীরে ধীরে ;
শােভিল চরণ-তলে চারু রণাঙ্গন
হলদিঘাট ; সুচারু উষার আলােকে
হইয়ে মণ্ডিত পাদপ বেষ্টিত চারু,
নীরব নিথর সব মরুভূ সমান।
কতক্ষণ পরে গভীর আরাবে পুনঃ,
বাজাইলা শৃঙ্গর ভেদি ব্যোম-পথে
ব্যোমকেশ-জায়া ; ‘জয়জয়’ রবে ঘন
ভরি কণ্ঠ, সমস্বরে, কোকিল-নাদিনী
গাইল বিজয়। জয়া ; হ’ল প্রতিধ্বনি ।
নীরবিল শৃঙ্গবর ; মধুর আরাব,
‘জয় জয়’ স্বন মিশাইল নভদেশে।
সহসা বিষাদ-ঘন আবরিল আসি
শ্যামা-হৃদাকাশ ; অধৈর্য হল চিত,
বরিয়ে পড়িল ভুমে ঘন-বারি প্রায়--
অাখি বারি। বহিল হৃদয়ে ধীরে ধীরে
স্রোতস্বতী প্রায় ; গভীর মরম-দেশ
দুঃখ শরাঘাতে ঘন, হ’ল রে বিকল ।

তৃতীয় সর্গ।
অনিবার অশ্রুধার ঝরিতে লাগিল ;
দাড়ায়ে রহিলা শ্যামা পাগলিনী প্রায়
নির্বাক হইয়ে। দাড়ায়ে রহিল জয়া
বিজয়া সুন্দরী, নীরবে অস্পন্দ ভাবে
শ্যামা সহ, নদীতটে ; খরশাণ অসি
পড়িল ভুতল তলে ; শ্যামা দুঃখ সহ
নব দুঃখ-রাশি আমি, দোহার হৃদয়
করিল চঞ্চল ;-বহিল নয়নে ধার।
ধীরে ধীরে ধীরে পশিল অবনীধামে
সুখময়ী উষা-সতী, লুকাল গগনে
অনন্ত তারকা মালা, যেন বা সভয়ে,
অথবা ঘুমের ঘোরে লভিতে বিরাম,
নিজ নিজ নিকেতনে পশিল হরষে
সবে, খুলি রাখি হীরক-মুকুট রাজি।
লুকাল তমসা-জাল ; স্বনিল সমীর
শন্ শন্ স্বরে, চুম্বি ধীরে ফুলরাজি,
কাপাইয়ে কিসলয়, ভুলিয়ে তরঙ্গ
স্রোতস্বতী নীরে মৃদুল মৃদুল মরি!
জাগিল বিহগকুল অনিল পরশে ;
ত্যজিয়ে কুলায় কেহ উঠি ব্যোম-পথে,
ছড়াইল সুধাধার, গাইল চাতক,
অনম্বর গায় মিশি, গাইল পাপিয়া,

মহাভৃষ্ণা কাব্য।
শ্যামা, মধুময় তানে, বিভুগুণ গান ;
জাগিয়ে উঠিল যেন অনন্ত অবনী ।
চমকিলা নগবালা, হেরিলা নয়নে,
পশিয়াছে ধরাধামে চারু উষা-সতী
রয়েছে দাড়ায়ে পাশে, প্রিয় সখী জয়া
বিজয়া ; বহিছে ঘন নয়নাধার
তিতিয়ে বসুধাতল, পড়ে আছে অসি
ভূতলে লুটিয়ে, হয়ে চারু করত।
ক্ষণ তরে পুনঃ সতী মুদিলা নয়ন,
আবার পশিল দুখ মরম মাঝারে।
চাহিয়ে বিজয়া জয়া কতক্ষণ পরে
সুধিলা শ্যামারে সুধাকণ্ঠে:—“কহ দেবী
র’বে কতক্ষণ আর বল রাজস্থানে ;
হের আঁখি মেলি সই, আগত প্রদোষ,
বিগতা-শশাঙ্ক প্রিয়া ; উদিছে দিনেশ
বিকাশি মধুর কর রঞ্জি প্রাচীদিশি ;
প্রভাত সমীর বয়, কুজনে বিহগ ।
চল যদি অভিলাষ পরাণ-স্বজনি,
আবাসে যাইনাে ফিরি,বিলম্বেতে আর
নাহি প্রয়ােজন হেথা।” উন্মিলি নয়ন
উত্তরিলা সতী, উদ্দেশি বিজয়া সখী:-
“নাহি যাব এবে কভু ফিরিয়ে আলয়ে,

তৃতীয় সর্গ ।
•
যাও দেহে ইচ্ছা যদি ; যুড়াব পিপাসা,
যুড়াব জীবন জ্বালা জাগায়ে জগতে।
কতক্ষণ পরে সুধার সুধারে জয়
সুধিলা শ্যামারে:-“যদি নাহি যাবে দেবি
কৈলাশে, নেহার নয়নে পোহায় নিশি
চারু তমময়ী, উজলিছে প্রাচীপ্রান্ত
কনক-কিরণ মজাল বিনাশিয়ে ;
কর ইচ্ছা যাহা হয় তন্ময়ী অভয়া।”
নীরবিলা জয়া ; কতক্ষণ পরে শ্যামা
কহিলা উৎসাহে মাতি ;-“এই দেখ জয়া
আবার আঁধারে ঘাের ঢাকিরে ধরণী,
ডুবা’য়ে তপনে নব চারু নভ-কোলে।”
এত বলি ত্যামা রাতুল চরণ যুগে
ধরণী হৃদয়োপরে হারি সবলে
চাহিলা কুটী-অক্ষে দূর নভদেশে ;
ভুলিলা কৃপাণ শূণ্যে, জয় জয় রবে
করে ধরি শৃঙ্গর নাদিলা ভৈরবে ।
সহ টলিল পৃথ্বী চরণ প্রহারে ;
নিবিড় নীরদ দাম আসিয়ে সঘনে
ছাইল গগনকায়, গভীর নিম্বনে
উঠিল গরজি ; চমকিল ক্ষণ প্রভা
কাদম্বিনী ক্রোড়ে ঘন উজলি অম্বর

মহাভৃষ্ণা কাব্য। বিকাশি চঞ্চল ছটা। নভ-প্রান্তদেশে ছিল তম লুকাইয়া তপন শঙ্কায়, অভয়া ঈক্ষণে বেগে পশিল ধরায়, জল-স্থল-শূন্যপথ ছাইল ত্বরিতে, আঁধারে পুরিল দিশি, না চলে নয়ন। চমকিল তারারাজি ঘুম ঘােরে পুনঃ গগন বিতানে, জাগিয়ে উঠিল ক্ষণ- পরে, ভীম প্রভঞ্জন বহিল সঘনে ছিড়ি কিনলয় দল, চারু ফুলকলি নয়ন রঞ্জন, উপাড়িয়ে মহীরুহ, উড়াইয়ে ভীম বেগে চারু ধ্বজ চয় দূর সৌধ-শির হতে, সুদূর নগরে নিভাইয়ে হায়, উজলিত দীপাবলী কুসুম ভূষিত চারু-রাজ-মার্গ মাঝে। সহসা কিরণমালী ডুবিল গগনে, নিবারিয়ে নব কর নবীন বয়সে। সহ প্রলয় কাল উদিল জগতে চমকিল বিশ্ববাসী সশঙ্ক হৃদয়ে, উথলিল সিন্ধু জল, চমকিল নভে বৈজয়ন্ত ধামে নির্ভীক অমর কুল, প্রকৃতি মূরতী হেরি জগত মাঝারে ; সশঙ্কে স্মরিল সবে শঙ্কট তারণ ;

তৃতীয় সর্গ।
কেশব-চরণ যুগ প্রণমি উদ্দেশে।
ভয়াকুল জীবকুল পশিল আবাসে,
নীরবিত
মধুময় সংগীতের তান
গগন বিতানে ; সহসা বিহগচয়
আকুল অন্তরে নেহারি আঁধার ঘাের,
ত্যজি গীত কেহ পশিল কুলায় মাঝে,
কাহার ধাধিল আঁখি দামিনী প্রভায়,
মােহিত হইয়ে কেহ পড়িল ভূতলে,
ভীষণ কুলিশ-নাদে, হরিল চেতনা।
ভীম প্রভঞ্জন বলে কেহবা উড়িয়ে,
পড়িয়ে তটিনী নীরে হারাল জীবন।
ঘন ঘন নভ পথে স্বনিল পবন
গভীর হুঙ্কারে, জগত তাড়না করি ;
কুলিশ নিচয় ঘন, কড় কড় রবে
ব’ধিরি শ্রবণ-যুগ পড়িল ভূতলে ।
হানিল নীরদ দাম সঘনে দামিনী
আঁখি পথে, মড় মড়ি চুম্বিল ভূতল
তরুচয়, সহ কিসলয়, চারু ফুল ফল ।
সঘনে বসুধা সতী লাগিল কঁপিতে।
সহসা ডুবায়ে ঘাের প্রভঞ্জন স্বনে,
কুলিশ আরবে, বাম করে শৃঙ্গর
ধরি খামা, বাজাইল। ভীমতম রূপ,
.

মহাতৃষ্ণা কাব্য।
বামেতর করে খরশণ অবির,
মরতে বিজলি প্রায় ঘুরিল সঘনে
বিতরি চঞ্চল টা, উপহাসি যেন
গগনচপলা নিবিড় নীরদ-অঙ্কে।
গাইল বিজয়া জয়া মিলি সমস্বরে-
জাগ জাগ আজ ভারত সন্তান,
জননীরে সবে’কর লােহদান
জাগ রাজস্থান, জগত প্রধান,
রাখ আজি উঠে জননীর মান।
“দেখ আজি উঠে দাড়ায়ে দুয়ারে,
তােদের জননী ভূষিত অন্তরে ;
যাচিছে শােণিত, যুড়াবারে চিত,
দেখ একবার উঠিয়ে দেখরে।
জননী-নয়নে ঝরে অশ্রুধার,
দেখরে চাহিয়ে দেখ একবার ;
এতে ও কি হায়, না দহে হৃদয়,
না পরশে দাব উৎসাহ-আগার ?”
“তােরাইনা তারা নির্ভীক অন্তরে,
‘তারা তারা’ বলে সবে তার স্বরে,

তৃতীয় সর্গ ।
ভেদিয়ে গগন, ভুলিয়ে কেতন,
মাতিভিস রণে অসি ধরি করে ?”
কুমারিকা হতে হীমাদ্রীর শিরে,
তোরাইনা তারা জয় জয় স্বরে,
জয়কেতু ভুলি, প্রাণ মন খুলি,
গাইতিস সদা অসি করে ধরে।”
তােদেরি না শিরে কিরীট উজল,
করিত সতত ঝাল ঝাল ঝাল ;
নয়ন ধাধিত, ভারত ভাসিত,
প্রতপে ধরণী হ’ত রে চঞ্চল ?”
উঠ উঠ সবে ত.জিয়ে শয়ন,
খেল একবার জ্ঞানের নয়ন।
দেখ একবার, সকলি আঁধার,
ভীষণ আঁধারে সকলি মগন ।
“ঘুমে থেকে উঠে খােল সবে অলি,
এখনি গগনে তমজাল নাশি,
উদিবে তপন, হেমের বরণ,
হাসিতে হাসিতে বিভাতি বিকাশি
“বাজিবে যখন রণের বাজন,
‘জয় জয়’ রব উগারিয়ে ঘন ;

মহাতৃষ্ণা কাব্য।
ছুটিবে পবন, তুলিয়ে স্বনন,
আনন্দে উৎসাহে হইয়ে মগন।”
“যখন মাতিবি সবাই সমরে,
খরশাণ অসি শরাসন ধরে,
ভুলি দেহ আশ, করি অরি নাশ,
গাইবি যখন জয় জয় স্বরে,
“যদি হয় তাহে হৃদি হীনবল,
যদি বা পরাণ হয় রে চঞ্চল ;
যদি তাতে হায়, ভাঙ্গে রে হৃদয়,
কিসে দুঃখ তায় বল দেখি বল ?”
“কর হতে পড়ে যদি অসি খসে,
হৃদয়ের জ্যোতি দুখতম নাশে ;
কিসে দুঃখ তায়, পুরিবে হৃদয়,
অমনি, তখনি, ত্রিদিব-বিভাসে।”
“ত্রিদিব বিভায় হৃদয় ভরিবে,
দুঃখতম রাশি মিলাইয়ে যাবে ।
উজলতা ময়, সুচারু ছটায়,
হৃদি-অন্তঃস্থল আলােকিত হবে।”
যবে রণে সবে হয়ে প্রপীড়িত,
ডাকিবি মায়েরে,—“কোথা কোথা মাতঃ,

তৃতীয় সর্গ।
দাও দরশন, দাও মা চরণ,
যুড়াও জননি এপিত চিত,
তখনি জননী ল’বে কোলে তুলে,
সকল যাতনা যাবি তবে ভুলে ;
লভিবি বিরাম, যুড়াবে মরম,
ঘুমাবি তখন জননীর কোলে ।
“যবে মতি সবে সমর মাফরে,
ভেদিবি গগন, জয় জয় স্বরে ;
বাজাইবি বীণা, রণের বাজনা,
প্রতিধ্বনি তুলে অনন্ত অম্বরে ;
“চুম্বিবি যখন অসিরে অাদরে,
গাইবি যখন সুধার সুধারে ;
থুইবি হৃদয়ে, শরাসন লয়ে,
আনন্দের জোত বহিবে অন্তরে ;
“উদ্দেশে যখন শির নত করে,
‘তারা তারা’ বলি হরষ অন্তরে,
নমিবি চরণে, মধুময় তানে,
তুষিবারে মায়ে, তুষিতে অন্তরে।”
“তখনি অমনি ধরি ধরি ধরি,
বহিবে সমীর মৃদুল সঞ্চরি ,

মহাতৃষ্ণা কাব্য।
দোলায়ে কেতন, নয়ন মােহন,
চারু মধুময় নব বেশ ধরি।”
;
“হবে শিরােপ’রে পুষ্প বরিষা,
বৈজয়ন্ত ধামে গা’বে সুরগণ
মধুময়ী গান, ভুলিয়ে সুতান,
সুধার স্বননে ভরিবে গগন।”
;
তখন তপন আরাে উজলিবে,
পরিমলময় সমীর স্বনিবে ;
বিহগ নিচয়, ভরিয়ে হৃদয়,
আরাে মধুসুরে গগন কাপাবে।”
“তখন জগত গৌরব-বিভায়,
আরাে বিভাসিত হবেরে নিশ্চয় ;
হবে বিভাসিত, ভারতেরি চিত,
বিভাসিত হবে নভ সে ছটায়।”
“মুকুটের মণি হবে উজলিত,
মাতিবে উৎসাহে সবাকার চিত
গাইবে জগত, এ বিজয় গীত,
জয়কেতু নভে হবে হিল্লোলিত।”
উজলিবে অসি হরষে পিধানে,
সে বিভা কভু বা উঠিবে গগনে;

দ্বিতীয় সর্গ।
চারু শরাসন, হবে সংঘর্ষণ,
ছাইবে গগন কলম্ব-কিরণে।”
“শর ভূণাশ্রিত হয়ে না রহিবে,
শন্ শন্ রবে গগনে উড়িবে ;
ধাধিবে নয়ন, চপলা কিরণ,
রণবাদ্য শব্দ প্রতিধ্বনি হবে।”
“তবে কেন আর বল আর্যগণ,
এখন রহিলে ঘুমে অচেতন ;
জাগ একবার, জয় জয় ধর,
ছড়াও গগণে ভরি প্রাণ-মন।
‘ঝটিকা হেরিয়ে কেন ভীত মন,
এ নহে ঝটিকা সৌভাগ্য লক্ষণ ;
ওই যে চপলা, নভে করে খেলা,
ওরে হেরি কেন ধাধেরে নয়ন।”
"ওই যে চপল। গগনে বাকিছে,
মৃদু মৃদু হাসি ভারতে কহিছে ;-
‘‘ছুটাও ভারতে ; মাতাইয়ে চিতে,
জলন্ত চপলা” তেই সে হাসিছে।”
“ওই যে পবন তুলিছে স্বনন,
যাহার প্রতাপে কঁপিছে গগন ;

মহতৃষ্ণা কাব্য।
ওর ভয়ে কেন, বল ভীত মন,
কেন রে হ’তেছে শরীর কম্পন।”
ওতো সুধু হায় ভুলিয়ে স্বনন,
উগারিয়ে ঘন জ্বলন্ত বচন,
কহিছে গম্ভীরে, - ‘ভারত মবারে,
বহাও বহাও সংগ্রাম পবন।”
এই যে নীরদ গগনেরি কোলে,
রয়েছে দাড়ায়ে ঘন তম ঢেলে ;
ইের রে সে ঘন, য়ন রঞ্জন,
হের একবার আঁখিযুগ খুলে।”
এতাে সে নীরদ কভু হায়, নয়,
ছায়নি ভো’ এতে গান-হৃদয় ;
এ যে সুধু হায়, ভবিষ্য ছায়ায়,
ছেয়েছে ছেয়েছে 'দূর ভ-কায়।
ওই যে অশনি হতেছে পতন,
পয়ে সঘনে ধরণী, গগণ,
সুধু হায় বলে, ‘মন প্রাণ খুলে
কর সবে কর স্বাধীন গর্জন।
গগনে প্রায় অণি-নিস্বন,
হোক ? ভরতে পায়ে গগন ,

তৃতীয়
সর্গ।
জয় জয় রবে, পুরে নীল নভে,
হােক রে ভারতে মৃগেন্দ্র নিম্বন।”
তাই বলি আজ জাগ রাজস্থান,
রাখ সবে রাখ জননীর মান;
লহ উপদেশ, ছাড় নিদ্রবেশ,
জননীরে কর নরলােহ দান।”
মেহের শয্যাতে কি হবে ঘুমালে,
কি হবে বল রে আঁখি মুদে র’লে ?
খােল আঁখি খোল, তােল শির তােল,
গও সবে গও জয় জয় বলে।”
4
অন ন্ত গগনে সে মধুর ধ্বনি ।
দিবস যামিনী হােক প্রতিধ্বনি ;
পৰ্বত করে, কাননে, শিখরে,
হোক প্রবাহিত জয় জয় ধ্বনি।”
হােক প্রধাবিত সে সুৰব লয়ে,
সুচারু তটিনী আনন্দ হৃদয়ে ;
বহুক তীল, মৃদুল দুল,
সে সুম্বন দূরে লয়ে যাক ব’য়ে।”
জাগরে ভারত, চারু রাজস্থান,
জগতী তলেতে সুখময় স্থান ;

মহতৃষ্ণা কাব্য ।
শান্তি নিকেতন, হৃদয় রঞ্জন,
রাখ সবে উঠি মাতার সন্মান।
.
তাের যদি আজ রহিবি ঘুমায়ে,
মােহের শয়নে নয়ন মুদিয়ে,
তাহলে কি আজ, সভ্য সমাজ,
উঠবে জাগিয়ে কৃপণ খুলিয়ে ?
“তা'রা কিরে আজ জননী-চরণ,
পুজিতে পারিবে ছিটায়ে চন্দন ;-
হৃদয় চন্দন, ভরি প্রাণ মন ;
পারিবে কি আজ যুড়াতে জীবন?
তাই বলি পুনঃ জাগ রাজস্থান,
জাগ সবে জ ভারত সন্তান
থেকোনা ঘুমায়ে, অলস হৃদয়ে,
জাগ একবার ধররে কৃপান।”
নীরবিলা জয়া বিজয়া সুন্দরী ;
শুনিল পবন * শন্ করি ;
কতক্ষন পরে, ধীরে ধীরে ধীরে,
অাবার
বার উঠিল মধুর লহরী।
সুধিলা বিজয়া অভয়া বামারে,
বরযিয়ে সুধা ধামখা স্বরে :-

তৃতীয় সর্গ।
বল আজি সই, রাজস্থান কই,
কেনবা সকলি নীরব রয় রে।”
কেনবা সবাই মৃত প্রায় হয়ে,
বললো স্বজনি রয়েছে ঘুমায়ে ;
গভীর ঝঙ্কারে, কেন সমস্বরে,
বাজে বাঁশরী পরাণ মাতায়ে ?”
জাগাও স্বজনি তুমি রাজস্থান,
জাগাও সবারে করি জয় গান ;
ভেদি নভদেশ, দাও উপদেশ,
গভীর বাঙ্কাৱে মাতায়ে পরাণ।”
এস সবে মিলি আবার যতনে
জাগাই তাজিকে প্রিয় রাজস্থানে ;
জয় জয়’ রবে, মাতাইয়ে সবে,
মাতিব সবাই তাহাদের সনে।”
শয্যা ত্যজি উঠি যবে তারা সবে,
সমর সাগরে জীবন ভাসা’বে, ;
ধরিয়ে কৃপন, ‘বে জয় গান,
সখি তােমা মরি আনন্দে মাতিবে।
“তবে সবে মােরা সমরে পশিব,
অসি করে ধরি অরাতি দলিব ;

মহাভৃষ্ণা কাব্য।
জয় জয়’ স্বনে, সখি তােমা সনে,
সুখেতে মাতিয়ে রােহ পিব ।”
“তাই বলি সই জাগাও সবারে,
জাগাও সবারে উৎসাহে ঝঙ্কারে ;
শৃঙ্গ করে ধরে, নভভেদ করে,
ভাসাও হৃদয় উৎসাহ সাগরে
*
নীরব বিজয়া ; কতক্ষণ পরে
চাহিলা অভয়া ধীরে ধীরে ধীরে ;
উতপ্ত নিশ্বাস, বহিল বাতাস,
কহিলা শেষেতে মধুময় স্বরেঃ-
“তাই আয় সই আজ সবে মিলি,
জাগাই ভারতে, আয় সবে তুলি ;
শৃঙ্গের ঝঙ্কারে, সুধার সুধারে,
আয় সবে গাই জয় জয় বলি।”
নিদ্রিত ভারতে গভীর নীশিথে,
আয়রে জাগায়ে, সবাকার চিতে,
ধীরি ধরি ধরি, উৎসাহের বারি,
আয় সবে মিলে লাগিরে ঘিঞ্চিতে।”
“তাহলে ভারতে সবাই জাগিবে,
ধীরি ধীরি সবে চেতনা লভিবে

তৃতীয় সর্গ ।
.
ত্যজিয়ে শয়ন, বাজায়ে বাজন,
অসি করে ধরে সমরে নাচিবে ।
এত বলি তারা হয়ে মাতােয়ারা,
করেতে ধরিয়ে অসি খরধারা,
শৃঙ্গ বাজাইলা, আপনি মাতিল,
অনন্ত অম্বরে কঁপাইয়ে তারা।
শৃঙ্গের নিনাদ কাপিল গগন,
মুহুর্ভের তরে নীরব পবন,
সুকাল দামিনী, গগন রঙ্গিনী,
কাদম্বিনী কোলে মুদিয়ে নয়ন।
শন শন করি ঘুরিল রে অলি,
খসিতে লাগিল ঘন বিভা-রাশি,
ধ্বাকল নয়ন, ঘন ঘন ঘন,
যেন বা গভীর তমজাল নাশি।
সহসা অভয়া মাতিয়ে উল্লাসে,
উজলিয়ে দিশি স্বীয় রূপ ভাসে,
কহিলা সবারে, উৎসাহ ঝঙ্কারে,
পুরাতে বাসনা মিটাইতে আশে -
E
জাগ রাজস্থানে প্রাণের তনয় ;
জাগিয়ে উঠিয়ে গাও ভয় ভয় ;

মহাতৃষ্ণা কাব্য।
সমস্বরে মিলি, এ জগত ভুলি,
গাও একবার স্বাধীনতা জয়।”
কহু দিন হায় সে মধুর স্বর,
উঠেনি ভারতে কঁ পায়ে তাম্বর ;
পূরিয়ে হৃদয়, জ্বালিয়ে নিলয়,
শুনেনিকো মাের শ্রবণ নিচয়।”
* উঠ ত্যজি সবে আলস্য,-শয়ন,
ধররে ধররে জননী বচন ;
উন্মিলি নয়ন, ভারত নন্দন,
স্বাধীন সঙ্গীতে মাতাও জীবন।
4
উঠ বীরগণ, জাগরে চরণ,
বাজাও রে বীণা ভরি প্রাণ মন
গভীর বংঙ্কারে, সপ্তস্বর। ধরে,
•
মময় তনে পুর রে গগন।
কেন বীরগণ
ঘুমও বৃথায়,
কোষে অসি কেন বিভাের ব্রি য় ;
তুীরেতে কেন, শর অগনন,
রয়েছে পড়িয়ে লুটায়ে ধুলায়।”
স্বাধীন কেতন প ড়য়ে ধূলিতে,
অদ্ধে শােভিত ধ্বজ নভ পথে,

তৃতীয় সর্গ ।
কেন বা উড়ছে, সমীরে স্বনিছে,
চাহিয়ে বিমানে হরষিত চিত ?”
আৰ্যকেতু হায়, ধূলাতে লুটায়,
তিন খচিত ছিন্ন চার কায়
উজ্বল রতন, বিতরি কিরণ,
পরকে, পরে কেন শােভা পায় ?
;
*মস্তকের মণি হৃদয়ের ধন,
তারি-করে কিরে করিয়ে তপন,
যমান বিভােরে, বৃথা স্বপ্ন হেরে,
মায়ার প্রভাবে মুদিয়ে নয়ন ?”
জাগ রাজস্থান জাগ একবার,
ছড়াও ভারতে মৃতের ধর ;
জাগ বীরগণ, ভারত নন্দন,
জাগ সবে ধরি আলি খরধার।”
:
জাগ বাপ্পারাও অসম সাহসী,
নাচরে সমরে করে ধরি অসি
জাগ রায়মল্ল, বীর জনমল,
মাতরে সমরে অরিদল নাশি।”
যে বীরত্ব সবে দেখায়ে সমরে,
রেখেছ করতি ভুবন মাঝিরে,

মহতৃষ্ণা কাব্য।
;
অনন্তের তরে, জ্বলন্ত অক্ষরে
সে বীৰ্য আজিকে দেখরে আমারে।”
কোথায় আজিকে প্রিয় পৃথুরায়,
ভারত রতন প্রাণের তনয় ;
যে শােৰ্য প্রকাশি, অরিদল নাশি,
স্বাধীনতা তরে জ্বালিলে নিলয় ;
শােণিত প্রবাহে ভাসালে ধরণী,
ভারত-জননী-চরণ দুখানি;
পূজিলে যতনে, হৃদি-লােহ দানে,
পশিলে ত্রিদীবে ত্যজিয়ে ধরণী।”
‘পশিলে ত্রিদিবে ত্যজিয়ে ধরায়,
উজল রতনে শোভিয়ে হৃদয় ;
কুসুম-অসার, ধরি শিরাে’পর,
কুসুমেরি মালা পরিয়ে গলায় ;
••
সে মহত্ত্ব ভাজ দেখারে বাছনি,
চাহিছে দেখিতে তােদর জননী ;
গভীর ঝারে, বাজারে-ভেরীরে,
শুনে হােক যায় সুখীত পরাণী।”
“তুমিও প্রতাপ জাগ জাগ আজি,
এস রে সবাই রণসাজে সাজি

তৃতীয় সর্গ ।
সমস্বরে মিলে, হৃদি প্রাণ খুলে,
গাও গীত, ধ’রে জয়কেতু রাজি।”
জাগ বীরাঙ্গনা ভারত লল,
গাও সুখে, করে ধরি চারু বীণা ;
তন্ত করে ধরে,শাণিত অসির,
নাচরে সমরে বাজায়ে বাজনা
জাত পুত্ত জাগ জাগ রে বাদল,
কপ!ন ধরিয়ে নাশ অরিদল ;
সুকোমল করে, জয়কেতু ধরে,
সরি তমি ধনু নাশ তরিদল।”
হিমাদ্রী হইতে দূর সিন্ধুপ:রে,
বহুক সমীর জয় জয় স্বরে ;
উড়ুক কেতন, রণের বাজন,
বাজুক নিয়ত মন-প্রাণ-হরে।
উঠ জাগি সবে নিভারে যাতনা,
যুড়ারে মাের এ অন্তর বেদনা ;
নিভারে তৃষারে, ৰিম তুষার,
তার যে এ জ্বালা হৃদয়ে নয়।
হয়েছে চঞ্চল অচঞ্চল প্রাণ,
দুর চঞ্চলতা করি লোহদান ;

মহাতৃষ্ণা কাব্য।
ঢল ঢল ঢল, নরলােহ ঢাল,
অন্তর অনলে কররে নির্ধাণ।”
নীরবিলা উমা কতক্ষণ তরে,
শৃঙ্গর বর উঠিল অম্বরে
আবার ভবানী, ভবের ভাবিনী,
গাইল উল্লাসে মধুময় স্বরে ,
এখনো নীরব কেন রাজস্থান,
এখনাে সবার হৃদি কেন ম্লান ;
জয় জয় রবে, পুরে নীল নভে,
কেন নাহি ঘুরে আসি খরশাণ ?”
এখনাে না বাজে কেন সে বাজনা,
কেন না ঝঙ্কারে সপ্তস্বরা বীণা ;
রাজস্থান কেন, সুখ নিকেতন,
সে নিনাদ সহ আজিকে মাতেনা ?”
* গভীর শবদে তােপ অগনন,
সধূম অনল কহ কি কারণ ;
নাহিরে উগারে, কপামে ধরারে,
উগারিয়ে ঘন জ্বলন্ত বচন ?”
t;
“গজ বাজী রাজি কেন রে সমরে,
মাতা আজিকে গভীর হুঙ্কারে
;

৭২
ভূতিয় সর্গ।
সিংহনাদে কেন, কঁপে গগন,
রণ ভেরী তুরী কেন না বাজেরে ?”
কেন আজ বল পুর্বের মতন,
রাজস্থানে তার বাজে না বাজন ;
মধুর ব্যারে রাজ-মাগ’পরে,
কেন নাহি গয় বলরে চরণ ?”
* ওই সৌধমালা বিরাজে নগরে,
ওই চারু হাসি হাসিছে দেখরে ;
ওই উপবন, নয়ন মোহন,
রয়েছে দাড়ায়ে সোহাগের ভরে।”
ওই দূরে জাগে নিবিড় কানন,
তমসে আবৃত মূতী-ভীষণ ,
ঝর ঝর বরে, বিৱিতী ঝরে,
ওই যে বঁাড়ায়ে সেই মগ।”
গগন তলেতে ওই শোভে তারা,
দেখরে দেখরে যেন দিশাহারা ;
ওই যে পবন, ভুলিছে নন,
বহিছে যেন রে হয়ে জ্ঞান হারা
}
ওই যে কী বহিছে কল্লোলে,
দিল হামিঃ রাশি ঢেলে ;

মহাতৃষ্ণা কাব্য।
সুনীল অম্বরে, উজল তারারে,
নানা মেঘরাশি, করি নিজ কোলে।”
“ কিন্তু কোথা আজি সে রূপ বিভাস,
কোথা বা আজিকে সে স্বাধীন-হাস,
কোথারে সে ছটা, অপরূপ ঘটা,
কোথা বা আজিকে প্রকৃতি বিকাস।”
একদিন ওই সুদূর নগরে,
বাজিতরে বীণা ললনার করে ;
মধুময়ী তান, পরশি বিমান,
উঠিত নিয়ত মধুময় স্বরে।”
“ গাইত ললনা বীণারে বাজাত,
মন-প্রাণ খুলি স্বাধীন সঙ্গীত ;
গাইত নিয়ত, পরাণ মাতাত,
সমীর সে স্বর হরষে বহিত।”
দূর প্রাসেদেতে তোপের নিম্বন,
হ’তরে নিয়ত ভেদিয়ে গগন ;
লক্ষ লক্ষ অসি, মজাল নাশি,
থাকিত নিয়ত বিস্তারি বদন।”
রণের বাজন নিয়ত বাজিত,
সবার হৃদয় সুখেতে ভাসাত;

ভূতিয় সর্গ।
রাজপুতগণ, উড়ায়ে কেতন,
জয় জয় বলি গগন কঁােত।
“ওই শৈল শৃঙ্গে বসিয়ে চরণ,
ধরি সপ্তম্বরা শ্রবণ রঞ্জন ;
নিঝরিণী পাশে, আনন্দেতে ভেসে
স্বাধীন সঙ্গীত গাইত যখন,
“হৃদয়ের সনে বীণারে মিলায়ে,
গগন পথেতে সুতান তুলিয়ে ;
নিঝরিনী বারি, সহ ধরি ধরি
পূরুক সবার হৃদয় কামনা।”
যবেরে চরণ মাতিয়ে হৃদয়ে,
সুধা মাখা ধারা গগনে ভুলিয়ে,
পরাণের সনে, বাজাইয়ে বীণে,
গাইত যখন গৌরব স্মরিয়ে।
তখন গগনে তারা উজলিত,
ক্ষত্রিয় পরাণ প্রেমেতে ভাসিত;
হৃদয়ের স্তরে, অন্তর মাঝারে,
সে স্বাধীন নীতি মাজায়ে তুলিত।
গভীর উৎসাহে ধ্বকিত নয়ন,
সে স্বাধীন স্বর মাতা’ত জীবন ;
+

মহাতৃষ্ণা কাব্য।
জয় জয় স্বরে, মনেপ্রাণ ভরে,
গাইত উল্লাসে রাজপুতগণ।”
;
সে উল্লাস সহ ভাসায়ে জীবন,
ধরি করে বীণা নাচিত চরণ
গৌরবের বারি, ধরি ধরি ধরি,
বহিত নয়নে, অপূর্ব দর্শন।”
এই রণ স্থলে এক দিন সবে,
গাইত ক্ষত্রিয় জয় জয় রবে;
রণের বাজন, মতা’য়ে জীবন,
বাজিত রে হায় পুরে নীল নভে।”
শূন্য পথ হায় ছাইত কৃপাণে,
সুবৰ্ণ মণ্ডিত স্বাধীন কেতনে ;
দূর নভ-তল, হ’তরে উজল,
উজলতাময় অসির কিরণে।”
এক দিকে হায় রাজপুতগণ,
হইয়ে সবাই হরষিত মন ;
মাতাইয়ে চিতে, গৌরব গীতিতে,
পবিত্ৰ সজ্জায় দাড়াত চরণ।”
অন্য দিকে হায় দাড়াত অরাতি,
হেরিয়ে ক্ষত্রিয় বন বিভাতি;

৪
তৃতীয় সর্গ।
মুদিত নয়ন, উজল কিরণ,
মলিন হইত অরি-মুখ-জ্যোতি।”
“বাজিত, যখন রণের বাজন,
রনের বাসনা করিয়ে ঘােষণ ;
গাইত চরণ, রাজপুতগণ ;
রাখ স্বাধীনতা করি প্রাণ পণ।
“তখন 'অমনি রাজপুতগণ,
শূন্য পথে সবে ভুলিয়ে চরণ ;
ধরি শরাসন, খুলিয়ে কৃপান,
জয় ভারতের জয়’ করি গান,
৫
নভ পানে চাহি-জন্মভূমি পানে,
প্রাণ-আশ ভুলি মাতিত রে রণে
দলিত অরাতি; হৃদয়ের জ্যোতি,
অস্ত্র-জ্যেতি সহ উঠিত গগনে।”
অনন্ত নিদ্রায় অভিভুত কালে,
গাইত ক্ষত্রিয় যবে প্রাণ খুলে ;
অম্বরের পানে, ভুলিয়ে নয়নে,
ভুলি জীব-আশ, স্বরগ্রাম তুলে
“ যাই চলে যাই জনমের তরে,
, জন্মভুমি তােমা অাখি ভ'রে জেরে ;

মহাভৃষ্ণা কাব।
৭৭
মিটিল না আশা; না মিটে পিপাসা,
যাই চলে যাই অতৃপ্ত অন্তরে।
জন্মভুমি তরে দিনু প্রাণদান,
দিওমা তারিণি চরণেতে স্থান;
আর নাহি চাই, যাই চলে যাই,
দাও মা জননী চরণেতে স্থান।”
সে সময় হায় কিবা মুখময়,
উজলিত নভ সে চারু ছটায় ;
মাতিত ক্ষত্রিয়, স্বাধীনতা প্রিয় ;
আরো নব ভাবে পুরিত হৃদয়।
জাগ তবে জাগ ক্ষত্রিয় সমাজ,
ফেল দূরে দূরে বিলাসের সাজ;
ধর অসি হাসি, তিমির বিনাশি,
মাতরে সমরে মাত সবে আজ।
রতন খচিত ধুলায় লুঠিত,
জয়কেতু করে করে উত্তোলিত,
সিংহের স্বননে, কঁপায়ে বিমানে,
তােল জয় রব মাতাইয়ে চিত।
জাগ দূরে দূরে, ভারত সুন্দর,
জাগরে জ্বরেতে অবােধানগর ;
ܪ

৭৮
তৃতীয় সর্গ।
কমললােচন, ভারত রতন,
জাগ জাগ আজ মাতায়ে অন্তর।
কি আর হেরিছ বল হে নয়নে,
কি সুখ আর হে আঁকিছু গগনে ;
আর কেন বল, থাকহে নিশ্চল,
দেখ একবার মেলিয়ে নয়নে।
কৰ্ব্বর নিকর পশেছে ভারতে,
দলিছে সবারে আপন পদেতে;
দহিছে সকলি, ফুল্ল আশ-কলি,
পড়িছে ভুমেতে হৃদি বৃন্তহ’তে।
“ধরহে শ্রীরাম পুনঃ শরাসন,
করহে মােচন ভারত বন্ধন ;
রাক্ষস দলিয়ে, ভারত হৃদয়ে,
ধীরে ধীরে সিঙ্ক শান্তির জীবন।
হিমাদ্রী হইতে পয়ােনিধি পারে,
জাগরে সবাই সচেত অন্তরে ;
থেকোনা ঘুমায়ে, নয়ন মুদিয়ে,
জাগ জাগ সবে অসি করে ধরে।
“ জাগুক ভারত ছুটুক পবন,
‘শন্ শন্ করি তুলিয়ে স্বনন;

।
মহাতৃষ্ণা কাব ।
৭১
হৃদয় নাচুরু, পরাণ মাতুক,
তুলুক সকলে গগনে কেতন।
জয় জয় বলি বাজুক বাজনা,
ঝম বমি হােক অসির ঝঞ্চনা
হাসুক বিজলি, নভদেশে খেলি,
পূরুক সবার হৃদয় কামনা।
;
নীরব অম্বিকা গাইল বিজয়া,
তা’র সনে ধীরে গাইল রে জয়া ;
নাচিল কৃপাণ,—শাণিত কৃপন,
তালে তালে তালে তমস দূরিয়া
।
'জাগ জাগ জাগ ভারত আজ,
পর সবে মিলে রণের সাজ;
জাগ জাগ জাগ সবাই আজ,
শিয়রে দাড়ায়ে হের মা জননী ডাকেরে।”
কেনরে ঘূমা বৃথা রে বলু,
হৃদয় হারায়ে, হারা য়ে বল,
তাহের লভিল বলকি ফল,
উঠ উঠ সবে উঠ শয্যা ত্যজি উঠরে।”
নীরবিল দেহে নীরব সঙ্গীত,
চাহিল অভয়া তৃষাতুর-চিত ;

তৃতীয় সর্গ।
দূর গ্রাম পানে, সতৃষ্ণ নয়নে,
চহিলা ক্ষণেক দূর নভভিত।
;
সহসা বদন মলিন হইল,
নানা শােক জালে হৃদি আবরিল
পরাণ কাদিল, নয়ন সলিল,
নীরবে, নীরবে ঝরিয়ে পড়িল ।
কতক্ষণ পরে মুছি আঁখি করি,
কহিলা অভয়া ধরি ধরি ধরি ;
সম্বােধি ভারতে, বিচঞ্চল চিতে,
হৃদয়ের ব্যথা হৃদয়ে নিবারি।
-
“বুঝেছি ভারতে আজি, সকলি নীরবরে।
মােহের শয়নে আজি সবাই ঘুমায় রে।
পূবব গৌরব-জ্যোতি, আজিরে মলিন অতি,
পুৱব সুখের ভানু হৃদাকাশে নাইরে।
“ বিশাল ভারত তল মজালে ঢেকেছে।
ভয়ঙ্কর। অমানিশি ভারতেতে ঊরেছে।
জ্বলিত যে দীপাবলী, হৃদয়-পরাণোজলি,
সে উজল দীপালা একে একে নিভেছে।
“বাজিত যে রণবাদ্য হৃদি প্রাণ মাতায়ে,
নিনাদিত তুরী ভেরি নভদেণ কাপায়ে ।

মহাতৃষ্ণা কাব্য।
৮১
সে সকলি আজ হায়, চির তরে হয়ে লয়,
ধুলায় লুষ্ঠিত হয়ে, আছে ওই পড়িয়, ।”
“যাদের হৃদয়-বলে ধরাতল কঁাপিত,
করে ধরে জয়কেতু যারা সদা উড়াত;
সে সব বীরেন্দ্রদলে, বুঝেছি হরেছে কালে
গভীর তিমির জালে ঢাকি হায় ভারত।
তেঁই আশিরাসন আছে হায় পড়িয়ে,
তেই নাহি বাজে বীণা স্বরগ্রাম ভুলিয়ে ;
বীরসাজ তেই আজি, স্বাধীন কেতন রাজি,
পড়ে আছে চুম্বি ধরা লাজে শির লুকায়ে ।
এ সব নিদ্ৰীয় ঘাের আজি হায় যাবেনা,
শৃঙ্গের ঝঙ্কারে আজি ভারত জাগিবেনা;
হৃদয় মলিন অতি, মলিন হৃদয়-ভাতি,
খরতর রণস্রোতে ভাসিবারে চায় না।
বুঝিলাম আজি হায় মিটিবে না পিপাসা,
মিটিল আজি মেরি রুধিরের লালসা।
রণেরি আরাব ঘাের, মাতাল না আ৭ মাের,
হৃদয়ের আশজ্যোতি ঢাকি রে তমসা।
যারা প্রাণ যুড়াইবে তারাই ঘুমায় রে,
তবে আর এ পরাণ কে বল যুড়ায় রে।

৮২
তৃতীয় সর্গ।
কে তবে দুখিনী মায়ে, সমর রুধির দিয়ে,
নিভাইয়ে ঘাের তৃ। মাতে হয় সমরে।
জীবন রতন ধন, পর করে সঁপিয়ে,
বুঝলম •ি দ্রাবেসে আছ সবে পড়িয়ে।
পরপদ ধুলি ল’তে, আশ সদা জাগে চিতে,
তাধীনতা ভার সবে শিরােপার বহিয়ে।
ছি ছি কেন এ বাসনা মনােমাঝে জাগে রে ,
অরিপদ রেণু লতে, প্রাণ কেন ধায়রে ?
সিংহের তনয় হয়ে, মহত্বতা পাশরিয়ে,
ফেরু-দল দাস্যবৃত্তি কে করিতে চায়রে ?
‘ভুজঙ্গমদল তােরা কিসে হেন হইলি,
অরিপদতলে বল কি করিয়ে নমিলি ?
নত করি ঘাের ফণা, কিসে হল এ বসনা,
নমিতে অরির পদে যাহে হেন হইলি ?
।
ধীরে ধীরে জ্ঞান আঁখি খােল সবে আজিরে
দেখরে অম্বর পানে দেখ হায় চেয়ে রে।
কত নিশি কতদিন, কালনীরে হল লীন,
অনন্তের তরে/শরি ধীরে ধীরে ধীরেরে।
“তবু এ আশার নেশা আজো তাে’রে গেলন
তুাজতাে ভারত ভালে সে তপন উদেন।

মহাতৃষ্ণা কাব্য।
ভীষণ অমুসা ছায়, আজো নাহি চলে যায়,
কই আজ নাহি গায় সে ভারত ললা।-
কামিনী কোমলকরে তেঁই আজ হেথারে,
নাহি ঘােরে তরবারি শ শ স্বরে রে ।
বীরশিশু তেঁই আজ, পরিয়ে পবিত্র সাজ,
স্বাধীন সঙ্গীত গেয়ে অরি নাহি নাশে রে।”
“বুঝেছি ডুঝেছে সব ততলের অতলে,
ভাসিছে ভারত আজ নয়নের সলিলে ।
বীরত্ব-বিভব-লীলা, কৃপাণ কাৰ্ম্মক খেলা,
চির তরে ডুবে গেছে কালাম্বুধি-সলিলে।”
এত বলি শিবা সতী নীরবেতে কঁাদিল,
শােকের উচ্ছল ঘাের হৃদয়েতে ছুটিল।
কতক্ষণ পরে পুন, বাজিল সুস্বরে বীণ,
কোকিল গঞ্জিত ধার শব্দবহ মথিল ,
বুঝেছি এ ঘাের নিদ্রা আজ নাহি ভাঙিবে,
এ আশার ঘাের নেশা আজ নাহি ছুটীবে,
মলিন ভারত তল, আজ হবেনা উজ্জ্বল,
স্বাধীন-স্বাধীন ধার ভারতে । উঠিবে।
“নিদ্রিত ভারত বাণী তাই বলি সকলে,
মলিন হৃদয় লয়ে ডুবেনা রে ততল। •
-
৪

৮৪
তৃতীয় সর্গ।
ভয় কি ভয় কি বল, আবার হৃদয়-বল,
পশিয়ে হৃদয়-মাঝে মাতাবেরে সকলে।
চিরদিন কারে কভু সমান তো যায় না,
চিরদিন কভু নর সম সুখ লভেনা।
বিজেতা -কেতন চয়, চিরদিন নভ গায়,
বিপুল বিক্রম সহ কভু হায় শােভেন।
আজ যে নৃপতি হায় হেমময় ভবনে,
বিলাল লাল সে মাতি হরষিত পরাণে,
কাল সে কানন ভূমে, ভিখারীর বেশে ভ্রমে,
এইতাে বিধির খেলা হেরিতেছ নয়নে।”
যাও তব যাও সব দূর তুঙ্গ-শেখরে,
যাও যাও সবে মিলে গহনের মাঝারে ;
সুনীল পরােধী জলে, স্বাধীন কেতন তুলে,
বাণিজ্যের তরে সবে যাও যাও যাওরে।”
,
পড়িয়ে মােহের কোলে কেন বৃথা ভবনে,
কেন এত মায়া কর দারা সুত স্বজনে?
অরিদল দাস হয়ে, কি হবে ভবনে রয়ে,
অপি-রেণুতে কি পুরাইবে জীবনে ?
মুখে বল ভালবাসি ভারত জননী রে,
তার সাক্ষী এই কিরে দেখাইছ সবারে ?
1

মহতৃক কাব।
অরিপদে দাস হয়ে, দাসত্বের ডালি লয়ে,
“ভালবাসা” তরে কিরে এইরূপ ভ্রম রে।
“ছিছি ছিছি এ বাসনা-দাও সবে ডুবায়ে,
জরত --হৃদয় ব্যথা বাজে যদি হৃদয়ে,
এক্তা ডােরেতে বাধ, সবে প্রাণে; কাৰ্য্য সাধি,
ঘুচাও ভারত দুখ আ খিনীর মুছায়ে ।”
বণিকের জাতিপূর্ণ হয় রে যে দেশ রে,
সেই দেশে স্বাধিনতা ঝর ঝ ঝরে রে !
তাই বলি সবে যাও, দূর সিন্ধু পারে ধাও,
স্বাধীন রতন ধনে ভারত পুরাও রে।”
তা হলে ভারত ভালে নব জ্যোতি বিকাসি,
উদিবে মিহির পুন মজাল বিনাশি।
তাবার বীরত্ব লীলা, কৃপাণ কাৰ্ম্মক খেলা,
উদিবে ভারত মাঝে চারু শােভা বিকাসি।
৫ জননীর উপ-দশ ধরি, সবে হৃদয়ে,
দাসত্বর ডালি ফেলি তাধিনতা বহিয়ে,
স্বাধীন জীবন স্রোতে, ভারে সবাই চিতে
আবার ফুটিবে ফল এ মরভূ-হৃদয়ে।
ভগন হৃদয়ে যাই চনিয়ে আজ ক রে,
হৃদয়ের আশা মাের হৃদয় মিশাল বে

তৃতীয় সর্গ।
বহু দিন পরে পুন, করিব রে আগমন,
যুড়াস তখন হৃদি-এ ব্যথিত হৃদি রে
এত বলি সতী ধীরে ধীরে ধীরে,
সখী দুটী সনে পশিল অম্বরে ;
নয়নের ধার, ঝর ঝর ঝর,
ধরণি 'পরে পড়িল ঝরে।
দেখিতে দেখিতে সখি দুটী সনে,
লুকাল ঈশানী অনন্ত বিমানে;
নীহার আকার, নয়নের ধার,
পড়িল ভুতলে খসিয়ে রে।
গগন-তমসা গগনে লুকাল,
প্রকৃতি হাসনী ফুটিয়ে উঠিল
প্রভাত আইল, অরুণ উদিল,
শােভা-লহরি চলিল ছুটে।
সকলি হাসিল সকলি জাগিল,
উজ্জ্বল বরণে, জগত ভালি
ভারত ধুই, না জাগিল ওই,
ঘুমেতে ভূমে রহিল লুটে।
সমাপ্ত।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Mahatrishna Kabya

Author
Not Available
Title
Mahatrishna Kabya
File name
Mahatrishna Kabya
Text
OCR done
Citation
1885
Published
2009/10/20
Publisher
Howrah Victoria Press,calcutta
Language
Sanskrit
Pages
98
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Poetry
Keywords
Nagendra
DLI number
512892
Barcode
4990010019922.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
P4lXIvU3HKo
Download PDF

Mahatrishna Kabya