Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Mukoor

Ghosh ,ramanimohan · 2009/11/30

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

মুকুর।
শ্রীরমণীমােহন ঘােষ
প্ৰত।

কলিকাতা,
১১নং কর্ণওয়ালিস, ধ্রুট, ব্রাহ্মমিসন প্রেসে
শ্ৰকাৰ্তিকচরণ দত্ত দ্বারা
মুদ্রিত ও প্রকাশিত।
*সন ১৩০৬ সাল।

সূচীপত্র। পৃষ্ঠা। ** pr০ rs r ২ . এ এ ০ ০ ০ ১২ এ . * | ০ ০ ১৭ ** ০ ০ ০ * ৬ ২২ বিষয় দয়াসীনা मोक्ष উষায় সন্ধ্যায় যােগভঙ্গ দুটিকথা ভুল .. জিজ্ঞাসা মিনতি, বিকাশ পূর্ণিমায় জীবন-বসন্ত বর্ষা নিরাশ প্রত্যাখ্যান মালা জীবনাকাঙ্ক্ষা মৃত্যু অতিথি মনোরমা আগন্তুক স্মৃতি শ্রাবণে ২৪ ••• ২৭ ৮ র এ এ ৪০ ৩৫ e ৫০০ ৫ ৩৯ E০০ 8२ ০ ০ ৪৫ ০ ০ ০ ৪৮ ••• ০৩৫ ৪০০ ই ০ পৃষ্ঠা। ৫৪ E বিষয় প্রবাসে বিচ্ছেদের দিনে মেঘদূত আক্ষেপ বিরহ ০ ০ ০ ০০ ০ ••• ৫৭ ••• ... ০ ০ ০ 0 ৮ ০ ০ ৬৪ ৩৮ ০৫০ ৭১ ৭৭ ৭৮ ••• • ৫০০ ৮০ ৮২ . ০ ০ ০ ০৮৬ ৮৩ : জ্যোৎন্ম রাত্রে প্রেমের রাণী মুগ্ধ পুরাতন নূতন নিশীথে আঁখি কবির প্রেয়সী কবিতা-সুন্দরী কল্পনা-বিহঙ্গ কল্পনা-ভ্রমর কবির প্রতি নিবেদন জীবনের পথে ঋণী উপমা . তরীযাত্রা", মানসী ৮৬ ০ ০ ০ ০৫ ০ ০ ০ ০ ৪০ ৮৭ ৮৮ ০০ ০ ৯৪ ০০০ ০ ... ০০০ ০০ ••• ১৮ ০ ০ ০ ০ ০ ••• ১০০

কুকুর।
হৃদয়সীনা।
আমার শূণ্ঠ হৃদয়-আসনে
কে তুমি আসীনা আজি ।
ছিল এ চিত্ত জড়, অচেতন,
নিদ্রিত সাধ, বাসনা, বেদন;
আজি সেথা একি রাগিনী নূতন
আপনি উঠিছে বাজি’!
শুন্য হৃদয়-আনে মামার
কে তুমি আসীনা আজি।
-
আমার গােপন নােমন্দিরে
কে তুমি দেবতা অয়ি !
আমার এ চির আঁধার ভবন
আলােক-রশ্মি দেখেনি কখন,
সহসা কি শুভ কিরণে মগন
করিলে জ্যোতিৰ্ম্ময়ি।

২'
মুকুর।
আমার প্রাণের মন্দির মাঝে
কে তুমি আসীনা অয়ি।
আমার শুষ্ক হৃদয়-মরুতে
কে তুমি প্রেমের নদি!
ভরা বরষায় ভরি’ কূলে কূলে
যৌবনাবেগে আপনায় ভুলে
উছলিঙ্গে তরঙ্গ তুলে
ছুটিতেছ নিরবধি।
আমার শুষ্ক হৃদয়-মরুতে
কে তুমি অমৃত নদী :
কে তুমি আমার হৃদয়-কুঞ্জে
নবসন্ত-রাণি ।
চরণ-পরশে ধরণী আকুল
দিতেছে অর্ঘ্য শতকোটী ফুল,
বিহরে মলয়, গাহে পিককুল
অবসাদ নাহি মানি।
আমার হৃদয়-নিকুঞ্জবনে
অয়ি বস্তরাণি !
কে তুমি আমার মানস-রাজ্যে
চির সুষমার খণি!

হৃদয়াসীনা।
ত
ঊষা গােধূলির রঙীন আকাশে,
ইন্দুকিরণে, তারকার হাসে,
কোথা হতে আজি নব শােভ আসে ?
কে তুমি পরশমণি।
আমার এ দীন হৃদয়-রাজ্যে
তুমি সুষমার খণি।
কে তুমি আমার অন্তরে থাকি
সুধীরে বাজাও বীণা।
দিবানিশি শুধু গাহি সুমধুর
সান্ত্বনা ভরা স্বরগের সুর,
পরাণের যত ব্যথা কর দূর
আমার হৃদয়সীনা।
অন্তর মাঝে থাকি’ নিশিদিন
কে তুমি বাজাও বীণা!

e
৪
মুকুর।
সাধ।
সে উঠেছে ফুটি স্বর্ণকমল
আমার মানস সরসে ;
সাধ যায়, হয়ে মত্ত পান
সৌরভ তার বহি অনুগণ,
মধুকর হয়ে চারিধারে তার
গুঞ্জন করি হরয়ে।
সে আমার বনে কুসুম গুচ্ছ
ফুল্ল যূথিকা কামিনী ;
সাধ যায়, হয়ে বালরবির
ফুটাই তাহার শােভা মনােহর,
শিশিরবিন্দু হয়ে করি তারে
সিক্ত সারাটি যামিনী।
সে শােভিছে একং পূর্ণ ইন্দু
নিৰ্ম্মল নীল আকাশে ;
সাধ তাই, হয়ে সিন্ধু অতল
বক্ষে রাখিতে সে ছবি অমল,
চকোরের মত উড়িতে উদ্ধে
তাহার অগিয় সকাশে।

সাধ।
সে যে বসন্ত শােভার প্রতিমা
মাধুরী অতুল ভুবনে ;
সাধ তাই, হয়ে কোকিল সুরব
গাহিতে তাহার গুণ গৌরব,
অশোকের মত চরণ-পরশে
শােভিতে কুসুম ভূষণে।

;
মুকুর।
ঊষায়।
( ৩১ )
তুমি দাড়ায়েছ আসি’ ঊষার মতন হাসি
শিয়রে আমার,
অমৃত পরশে তব
করি’ সূপ্ত প্রাণে নক
চেতনা সঞ্চার।
নিশ্বাস-মলয় বায়
ধীরে লাগে আসি’ গায়,
ভেসে ভেসে আসে তার
পুষ্পগন্ধ সার।
শত বিহঙ্গের গানে
ভ্রমর-গুঞ্জর তানে
পশে আসি’ আজি কাণে
সঙ্গীত তােমার।
তুমি দাঁড়ায়েছ আসি’ ঊষার মতন হাসি’
শিয়রে আমার ।
উষার মতন তুমি
আলাে করি’ ধরাভূমি
হয়েছ উদয়,
অসীম তিমির টুটি, সহসা উঠেছে ফুটি’
• রূপ জ্যোতির্ময়।
না ভাঙ্গিতে ঘুমঘাের
চেয়ে দেখি নিশি ভাের,

ঊষায়
০
৭
জেগে উঠে মনে মাের
কি মহা বিস্ময়।
কিরণ-মণ্ডিত ভব,
একি হর্ষ-কলরব,
একি জাগরণ নব
আজি বিশ্বময় ।
উষার মতন তুমি
আলাে করি’ ধরাভূমি
হয়েছ
ঊষার স্বরূপ তব
হেরি মূর্তি অভিনব
ভরিয়ানয়ন ।
নিৰ্ম্মল ললাটতলে সিন্দুর বিন্দুর ছলে
তরুণ তপন ;
কণ্ঠে কুসুমের মালা,
করে ফুল্ল-ফুলডালা,
চরণে অলক্ত ঢালা
উদয় ।
সস্মিত বদন।
।
স্নাত, স্নিগ্ধ, শুভ্র, কান্ত,
শুচি শশাভা, দিব্য, শান্ত,
বিস্রস্ত অঞ্চল প্রান্ত
কনক বরণ।
উষার স্বরূপ তব
হেরি মূৰ্ত্তি অভিনব
ভরিয়ায়ন।

৮
মুকুর।
সন্ধ্যায়।
তুমি দেখা দাও এসে প্রখর দিবস শেষে
সন্ধ্যার মতন,
তাপিত দেহের পরে মলয় বীজনে করে
অমিয় সিঞ্চন।
এস তুমি সৌম্যকান্তি,
সঞ্চারি’ সান্ত্বনা, শান্তি,
দূর করি’ সর্ব ক্লান্তি
সকল বেদ।
* আন শুধু নীরবতা,
কহিয়া কোন কথা
কর পরাণের ব্যথা
গােপনে হরণ।
তুমি দেখা দাও এসে
প্রখর দিবস শেষে
সন্ধ্যার মতন।
আজি দেখা দাও এসে
সন্ধ্যার করুণ বেশে
মুগ্ধ করি’ মন,
অধনে নাহিক বাণী
সরম প্রতিমাখানি
বিশ্বে
অতুলন।
এস তুমি একবার
খুলে ফেলি”অলঙ্কার :
**

সন্ধ্যায়।
আলুলিত কেশ ভার
আনম্ৰ আনন।
প্রদীপ ধরিয়া করে
এস শুভ তাবসরে,
লইয়া আঁচল ভরে
সােণার স্বপন।
আজি দেখা দাও এসে স্যার*সুন্দর বেশে
মুগ্ধ করি’ মন।
এস তুমি ধীরে ধীরে
স্পর্শ করি’ ধরণীরে
অলস চরণে
;
দাঁড়াও সন্ধ্যার মত
আঁখি-পাতা করিনত
অসীম নির্জনে।
)
থেমে যা কলরব,
করি শুধু অনুভুব
নীরব মাধুরী তব
অবসন্ন মনে।
ললাটে বালে আঁকা,
কুসুম সৌরভ-মাখা,
তনু নীলবাসে ঢাকা,
দেখি দুনয়নে।
স্পর্শ করি’ ধরণীরে
: অলস
চরণে
এস তুমি ধীরে ধীরে

মুকুর।
= = = = = =
যােগ-ভঙ্গ।
বনদেবীদ্বয় মাঝে কুসুভরণা
আসে উমা তপােবনে অলস চরণা,
মূর্তিমতী বন্তের বনলক্ষ্মী যথা-
সুকুমারী সঞ্চারিণী পল্লবিনী লতা।
অশােক-বলয় করে, স্বর্ণ কর্ণিকার
শােভিছে কবরী মাঝে, গলে সিন্ধুবার
মুক্তামালা, কটিদেশে বকুলে রচিত
অপূৰ্ব্ব মেখলা ; লুব্ধ ভ্রমর তৃষিত
• নিশ্বাস সৌরভ মুগ্ধ, বেড়ায় উড়িয়া
বিম্ব অধরের কাছে ; সচকিত হিয়া
চঞ্চল দৃষ্টিতে বালা চাহি’ প্রতিক্ষণ
করধৃত নীলপদ্ম করি’ সঞ্চালন
নিবারণ করে তারে।--
এইরূপে যবে
‘প্রবোেি লতা-গৃহে, করিলা নীরবে
প্রণাম মহেশ-পদে,-নব কর্ণিকার
সুনীল-অলক-শােভী, কর্ণ অলঙ্কার
নবীন পল্লব, খসি’ পড়িল ভূতলে।
* কুমার সম্ভব, তৃতীয় সর্গ।

যােগ-ভঙ্গ। '১১ ২৪ আশীৰ্বাদ লভি’ যবে কুতূহলে যতনে গ্রথিত দিব্য পদ্মবীজ মালা আরক্তিম করপদ্মে লয়ে গিরিবালা • ধরিলা সম্মুখে, সেই প্রেমভক্তি-প্রভা- সমুজ্জ বরাননে পূর্ণ পুণ্য শােভা, কুমারী-হৃদয়-ক্ষদ্ধ চির অতুলন সৌন্দর্যের প্রতিচ্ছায়া, নেহারি,তখন সহসা শিবের চিত্তে কি মহা বিস্ময় উঠিল জাগিয়া ! মুগ্ধা উমার হৃদয় কি উচ্ছাসে গেল ভরে’! লজ্জারক্ত মুখে পুলক-অঞ্চিত দেহে শিবের সম্মুখে রহিলা দাড়ায়ে শুধু আনত নয়নে ! অমনি মুহূৰ্ত্ত তরে মহাদেব-মনে- শশীর উদয়ে সিন্ধু সলিলে যেমন- উপজিল অধীরতা !যােগীন্দ্র তখন বিধাধরা পাৰ্বতীর চন্দ্রমুখ পানে চাহিয়া রহিলা শুধু সতৃষ্ণ নয়াকে।

১২
মুকুর।
•
দুটি কথা।
তুমি কি বুঝিবে সখি আমার অন্তরে
নিশি দিন তৃপ্তি হীন কি যে ব্যাকুলতা,
কি চাহি বলিতে তােমা প্ৰেমাপুত স্বরে
মরম-আবেগ ভরা দুটি ক্ষুদ্র কথা !
কতদিন কতবার বেঁধেছি হৃদয়
কি কথা কহিতে অনুকূল অবসরে,
অমনি আসিয়া শত আশঙ্কা সংশয়
অধরের ভাষা মাের লইয়াছে হরে।
আজি নৰ বসন্তের বিজন নিশাতে
আসিয়াছি কাছে লয়ে আকুল হৃদয়,
আজ চাহি আপনারে দিতে তব হাতে
দেখাতে এ পরাণের নিভৃত নিলয় ।
হৃদয়ের অন্তস্তলে আজ দেখ নামি
সেই দুটি ক্ষুদ্র কথা-“ভালবাসি আমি।
!\
fit?IT! ।।TITদাগ।

ভুল।
'১৩
ভুল।
তােমারে যত দেখি
তৃষিত আঁখি তুলে
ও রূপ মাধুরীতে
আপনাই ভুলে’!
মধুর মুখ পানে
চাহিয়া থাকি যত,
ততই নব শােভা
নিরখি অবিরত।
কি মােহ-মাখা ওই .
নয়নশতদল।
নিমেষে ভুলে যাই
আকাশ ধরাতল।
নয়ন মুদি যদি,
আঁধারে উঠে ফুটি
অসীম স্নেহ ভরা
তােমরি আঁখি দুটি।

১৪
মুকুর। .
তােমারি মাঝে শুধু
আমারে পাই খুজি,
নছিলে আমি আর
কোথাও নাই বুঝি।
{
যতই করিপ্যান
তােমার নাহি কূল ;
যেন গাে তুমি ছাড়া
জগতে সবি ভুল!

জিজ্ঞাসা।
জিজ্ঞাসা।
প্রভাতে সাঁঝের বেলা
কতনা করেছি খেলা,
মুকুলিত উপবনে
তটিনীর তীরে
দূরে কে গাহিত গান
বাঁশীতে ধরিয়া তান?
বুঝি নাই ভাষা তার
চাহি নাই ফিরে।
আজি সে বাণীর স্বরে
পরাণ আকুল করে
বিকশিয়া উঠে মনে
নব সাধ, আশা ;
বল্ সখি, বল্ মােরে,
এ কি ভালবাসা ?
আজি মনে লয় হেন
হেন
মধু পূর্ণিমায় যেন
পুলক চঞ্চল হৃদি-
সমুদ্র আমার ;
আজি কোটী কোটী চোখে
সুবিমল চন্দ্রালোকে

মুকুর।
শুধু দেখিবারে চাহি
মূরতি তাহার।
তারি পথে থাকি চাহি
নয়নে নিমেষ নাহি,
কোটী কর্ণে শুনিলারে
চাহি তার ভাষা ;
বল, সখি, বল, মােরে--
এ কি ভালবাসা ?
।
'।
আজি হেন সাধ যায়
প্রাণ মন সঁপি 'তায়,
অধরে ফুটে না হায়
মরমের বাণী ।
শত কাজে অনিবার
মনে পড়ে মুখ তার
নিশীথে স্বপনে দেখি
তারি মুখখানি।
সারাদিন সারারাতি
সে যে কল্পনার সাথী,
তবু সদা জাগে প্রাণে
যেন কি পিপাসা।
ব সখি, বলু সখি,-
এ কি ভালবাসা ?

মিনতি।
১৭
মিনতি।
যা কিছু আমার ছিল,
দিয়েছি আমি,
চাহি নাই প্রতিদান
হৃদয়-স্বামি ।
আপনা সঁপিনু তব
চরণ পরে,
আপনি লয়েছ তুলে
করুণা করে,
.
নিয়েছ পরাণ, মন,
নবীন অশা,
জীবনের সুখ, সাধ,
বাসনা ভাষা ।
নিখিল বিশ্বের চির
মাধুজী নব
মুছিয়া নয়ন হতে
নিয়েছ সব।

১৮
মুকুর।
উছসিত প্রেম মাের
নিয়েছ হরে”
চাহি সকরুণ চোখে
নিমেষ ভরে।
সবস্ব দিয়েছি তো
কিছুনা রাখি,
লহ নাথ আজি তবে
যা আছে বাকি ।
সকলি নিয়েছ, কেন
রেখেছ বল,
বুক ভরা ব্যথা, আর
নয়ন-জল।

বিকাশ।
বিকাশ।
ওহে সুন্দর
মম অন্তরে
একি উচ্ছাস নব.
একি আকুল পুলক হিল্লোল, প্রিয়,
নব সঙ্গীতরব !
আজি
মধুময়
ধরা শােভা সৌরভে ভরা
নিভৃত আমার কুঞ্জকুটীরে
আজি কি মহােৎসব !
বিকশিত আজি নবগৌরবে
হৃদয়-কমল মম,
তাই উচ্ছসি যেন উঠিছে প্রাণের
লাবণ্য নিরূপম।
নবীন বাসনা কত ?
ফুটে উঠে’ অবিরত
চেয়ে আছে তব প্রমীলােকতরে
সূর্যমুখীর সম।
কতদিন, হায়! জেগেই রজনী
কন্তনা বিষাদভরে,

২
২০।
মুকুর।
উবু
পারনি বুঝিতে মােরে কত শত
ব্যগ্র প্রশ্ন করে।
কত নব ভালবাসা
আবেগপূর্ণ ভাষা
লজ্জাকাতরা বালিকার কাছে
বিফলে গিয়াছে মরে।
আজি ফেলে দিব
হীন লাজ আবরণ,
তুমি এস, হৃদয়েশ, 'হৃদি-মন্দিরে
হৃদি-মন্থন-ধন!
গোপন মরম মম দেখ অন্তরতম।
দেখ—কোন্ পদে পিয়াছি আমি
তরুণ জীবন মন!
মেন মূঢ় সে
বালিকা চিত্তে
দেখ--কি মুক্ত আশা।
‘আজি মিটাতে চাহে সে
প্রেমতৃষা তব
ঢালি’ চির-ভালবাসা !
চাহে সে পরাণ খুলে
কহিতে শ্রবণমূলে
যুগে যুগে যত প্রণয়িণীগণ
কহিয়াছে প্রেমভাষা !

বিকাশ।
২১
ওহে বাঞ্ছিত
দেখ আজি মাের
একি ব্যাকুলতা নব !
চাহে ক্ষুদ্র হৃদয়
পূরাইতে তব
আশা আকাঙ্ক্ষা সব !
রেখেছি বক্ষ ভরে সান্ত্বনা তব তরে,
ওগাে অতৃপ্ত ! আছে এহৃদয়ে
সৰ্ব্বতৃপ্তি হব।

মুকুর।
পূর্ণিমায়।
আজি পূর্ণিমার রাতে বসিয়া একাকী
মনে পড়ে কা’র মুখখানি
কা’র দু’টি ছল ছল প্রেমসিক্ত আঁখি
বাষ্পরুদ্ধ
বিদায়ের বাণী।
কাহার পরশ মাখি’ আজি এ কুটীরে
পশে আসি’ চাদের কিরণ,
কাহার সৌরভ লয়ে আজ ধীরে ধীরে
বহিছে মলয় সমীরণ।
আজি দুজনার মাঝে কত ব্যবধান।
বুঝি এই বিশদ জ্যোৎস্নায়,
মুক্ত জানালায় বসি’ আকুল পরাণ,
সেও আজ ভাবিছে আমায় !
এমনি চঁাদিনী-কত পূর্ণিমার নিশা
আসিয়া গিয়াছে কত বার,
• তবু মিটে নাই মাের পরাণের তৃষা
অনিমেষে দেখি’ রূপ, তার ।

পূর্ণিমায় ।
বুঝি বা হৃদয়ে তার এই পূর্ণ চাদ
জাগায়েছে নবু ব্যাকুলতা,
কহিতে চাহে সে টুটি’ সরমের বাধ
যত তার মরমের কথা।
আজি তার ভালবাসা, বাসনা বেদনা,
চন্দ্র করে আসিতেছে ভাস্ত্রি,
তাই জেগে উঠে প্রাণে কতনা কল্পনা
নয়নে উছুলে রাশি।

মুকুর।
জীবন-বসন্ত।
মম অন্তরে
নব বসন্তু
উদয় আজ,
এস, তুমি এস, চিরবাঞ্ছিত
হৃদয়-রাজ!
সুন্দর আজি নেহারি বিশ্ব,
কত নব শােভা সুচারু দৃশ্য,
প্রকৃতি যেন গাে পরিয়াছে নব
মােহন সাজ।
নব বসন্ত
মম অন্তরে
উদয় আজ।
আজি বহিতেছে আনন্দ-ধারা
আমার প্রাণে,
চারিদিক হতে সঙ্গীত নব
পশিছে কাণে।
মাখি’ নন্দন-কুসুমগন্ধ,
মধুর মলয় বহিছে মন্দ ;
অমিয়-লহরী উঠিছে উথলি
বিহগ-গানে।
কে অজি এ নব আনন্দরাশি
ঢালিছে প্রাণে!

জীবন-বসন্ত।
কত শােভাময়
আমার প্রাণের
গােপন গেই!
কি মাধুরী সেথা রয়েছে লুকান’
দেখেনি কেহ।
আজি মনে হয়, শতদল সম
বিকশিত যেন সে সুষমা মম ;
বাহিরিয়া আসি’ ঘিরেছে সে শােভা
এ হীন দেহ।
কত সুন্দর
আমার প্রাণের
গােপন গেই!
করে গুঞ্জন
আমার কুঞ্জে
পুঞ্জে পুঞ্জে
ফুটেছে ফুল,
কোকিল কুহরে,
ভ্রমর কুল।
আজি অন্তরে এস প্রিয়তম,
সার্থক কর ব্যর্থজনম,
এস অভিসারে, চিতরঞ্জন,
হৃদয়াকুল।
আজি এ কুঞ্জে
পুঞ্জ পুঞ্জে
ফুটেছে ফুল।
.

মুকুর।
মনে লয় যেন
যুগ যুগ ধরে
তােমারি তরে
বসে আছি আমি পথ পানে চাহি’
বিজন ঘরে।
আজ তুমি এস, হৃদয় রতন,
আমার সর্বসাধনার ধন ।
বিরহ-অশ্রু দাও মুছাইয়া
করুণ করে।
বসে আছি আমি যুগ যুগ ধরে
তােমারি তরে।
1,
এসগো আমার শত জনমের
বাসনারাশি।
আমার জীবন দেবতা! গােপন
হৃদয়বাসি !
আজি
আন অনন্ত নিবিড় মিলন ;
বসন্ত ফুলে গাঁথিয়াছি মালা,
লহগাে আসি।
এস তুমি,মাের
শত জনমের
বাসনারাশি।
চঞ্চল নব যৌবন,
;

বর্ষা।
২৭
বর্ষা।
আবার নব হরষভরে বরযা আসে ভুবনে
ফুল্ল করি’ তাপিত তরু লতিকা,
গগনপথে নবীন মেঘ বেড়ায় তাসি’ পবনে,
কাননে ফুটে কামিনী জাতী যুথিকা।
উচ্ছসিতা নিঝরিণী তুলিয়া শত লহরী
ছুটিয়া যায় যােবনর গরবে,
মত্ত বায়ে শ্যামল বন উঠিছে ঘন শিহরি,
বকুল গুলি ঝরিয়া পড়ে নীরবে ।
কদম্বের গন্ধ মাখি’ সিক্ত বায়ু আসিয়া
শীতল করে অঙ্গ খর পরুশে ;
কুঞ্জ হ’তে ভ্রমরতান শ্রবণে আসে ভাসিয়া,
সারকুল হরষে খেলে সরসে !
স্নিগ্ধ নব জলদজালে আবৃত দেখি নভসে
উল্লসিত চাতক যত পিপাসী,
রঙ্গভরে মত্ত শিখি নৃত্য করে বসে,
কলাপে তার ইন্দ্রধনু বিকাশি।

২৮
মুকুর।
নিবিড় করি' মেঘের ছায়া সন্ধ্যা আসে নামিয়া,
অন্ধকারে মিশিয়া যায় ধরণী,
কুলায়লীন বিহঙ্গের কাকলি যায় থামিয়া,
রজনী আসে তামসী মসীবরণী।
৫
কোথা গাে আজি বরষারাতে স্নিগ্ধ বনভবনে
তরুণী বালা–আকুল প্রেমপুলকে,
নীরনীল বস; পরি’ এসগাে অয়ি শােভনে,
কুসুমদাম জড়ায়ে নীল অলকে।
নিভৃত গৃহ কক্ষমাঝে এসগো অয়ি নায়িকা,
ললিত তনু---মালতীমালাধারিণী ;
মােহন বীণাযন্ত্রে অয়ি অমৃতময়ী গায়িকা,
বাজাও নব রাগিণী মনােহারিণী ।
কৃষ্ণ মেঘে কনকরেখা ফুটিয়া উঠি’ দামিনী
নিমেষ ভরে ঝলসি’ দেয় নয়নে,
বনাদে সুপ্ত গৎে চমকি’ পুর-কামিনী
কঁপিয়া উঠে মিলন-সুখ-শয়নে।
ব্যাকুল চিতে নিরখি’ আজি বাদল-ঘেরা আকাশে
পথিক-বধূ পথের গানে চাহিয়া,
ভাবিছে—কবে দয়িত তার আসিবে ফিরে’ সকাশে,
অশ্রু ঝরে কপােলতল বাহিয়া।

নিরাশ।
২৯
নিরাশ।
আজি জীবনের বসন্তরাতে
জীবন-দেবতা মম,
কেন গাে নিরাশা নয়ন তােমার
ঘিরেছে কুয়াশা সম !
মাগিছ কি আজ নীরব বিদায়,
স্বপ্ন আমার বুঝি ভেঙ্গে যায়,
ঘুচে যায় এই পূর্ণিমানিশি
কৌমুদীমনােরম !
চারিদিক হতে ছুটে আসে শুধু
তিমির নিবিড়তম !
কত আশা প্রেম তোমার হৃদয়ে
কত শােভা নিরূপম,
কোথা পাবে বল
মুনি ছায়া তার
ক্ষুদ্র হৃদর মম !
ভেবেছিলে তুমি, হৃদয় আমার
চির রহস্যমাধুরী-আধার,
তাই এত দিন রেখেছ যতনে
অমূল্য ধন সম ;
আজ বুঝি নাথ সহঙ্গা তোমার
ভাঙ্গিয়া গিয়াছে ভ্রম !
০

৩০ মুকুর। যখন প্রথম দাড়ালে আসিয়া মানস-কমলদলে, কত জনমের তপে সঞ্চিত কতনা পুণ্যফলে, চাহি নাই কিছু, ‘কহি নাই কথা, ফুটেনি ভাষায় মনােব্যাকুলতা ;- নীরবে রাখিনু হৃদয় পরাণ তােমার চরণ তলে, শুধু-দুটি নত নয়নের পাতা ভরে এসেছিল জলে । কি জানি তখন তুলে লয়ে মােরে নব অনুরাগভরে রেখেছিল কেন ‘শতমণিরাগ- দীপ্ত আসন পরে। কত কুসুমিত নব নন্দন আমার লাগিয়া করেছ সৃজন, শুনায়েছ কত প্রণয়ের গাথা স্নেহ-বিগলিত স্বরে, শত দুখ ব্যথা দিয়াছ মুছায়ে কমল-কোমল করে।

নিরাশ।
৩১
ভেবেছিলে বুঝি অন্তর মম
তৃপ্তি-নিঝরনব,
এসেছিলে তাই মিটাতে হেথায়
আকুল তৃষ্ণা তব ।
দেখেছ এখন—এ যে মরীচিকা,
কোথা সুধা,শুধু বাসনার শিখা!
দীনতা হীনতা যত কিছু
‘ছু মাের
আজুি দেখিয়াছ সব,
তাই বুঝি তবু মৰ্ম্ম আকুলি’
উঠে ক্রন্দন-রব!
ঘােরে।
যাবে, তবে যাও।হায় সখা, কেন
ভুল বুঝেছিলে মােরে ।
কেন মােরে-তব • মানসী প্রতিমা
ভেবেছিলে
ঘুম
সরম আকুল অধর নয়ন,
কহে নাই কভু ছলনা-বচনা
চাহেনি দেখায়ে স্বর্গ স্বপন
বাঁধিতে প্রণয় ডােরে।
শুধু দূরে থাকি’ ভাল বাসিয়াছি
গােপনে পাণ ভরে।

৩২
মুকুর।
উর্দু গগনে থাকে ধ্রুবতারা
জাগি’ সারা বিভাবরী,
তারি পানে চাহি’
অকূলে নাবিক
কুলে লয়ে যায় তরী।
তুমি ছিলে মাের আশার অতীত,
ধ্রুবতারা সম আকাশে উদিত
কাপনি আসিয়া ধরা দিলে কেন
মানব মূরতি ধবি’ ।
ছেড়ে যাবে আজি নিরাশ হৃদয়ে
হৃদয় দলন' করি’!
;

প্রত্যাখ্যান।
প্রত্যাখ্যান।
সে তখন ছিল বসি একাকিনী
দিবসের শেষে সরসীকূলে,
সুদূর আকাশে চাহি’ অনিমেষে
কি জানি কি মােহে ছিল সে ভুলে।
স্বচ্ছ, সরসী-আরসীর পরে
পড়েছিল তার দেহের ছবি,
সােণার কিরণ ছড়ায়ে গগনে
ডুবে গিয়াছিল শ্রান্ত রবি।
সান্ধ্য সমীর উপবন হতে
যুথি-পরিমল মাখিয়া আসি,
বহি যেতেছিল কৌতুকভরে
আকুলি’ তাহার কেশের রাশি।
সাঁঝের আলােকে নির্জনে, তার
শান্ত মূরতি স্বপন সম
নিরখি’ নিমেষে আকাশত
উঠেছিল জাগি’ পরাণে মম ।

৩৪
মুকুর।
এ হৃদয়খানি রাখি’ তার পায়
কহিলাম—“লহ করুণা করে’
সে কহিল শুধু “চাহিনাকো কিছু”-
শূন্য নয়নে, উদাস স্বরে।
ক
অমনি আঁধার ঢাকিল মেদিনী
ভ’ে এল আঁখি অশ্রনীরে
বুকভাঙ্গা ব্যথা বহিয়া মরমে
নীরবে ফিরিয়া আসিনু ধীরে।

মালা।
মালা।
খুলিতে উষ। স্বর্ণ-তােরণ,
আসি তটিনীর কূলে
বসিয়া বিরলে গাথি মালাখানি
নৰপ্ৰফট ফুলে।
তটিনীর মৃদুতান
বিহগের কলগান
যেন কোন দূর স্বপনের দেশে
টেনে নিয়ে যায় প্রাণ।
ঘােট ঘােট, ফুল—যেঙ্গ বিকশিত
আমার বাসনারাশি,
সৌরভ ছুটে সারা উপবনে
প্রভাত-সমীরে ভাসি”।
মালা গাঁথা শেষ হলে,
আঁখি ভরে আসে জলে ;
কে আমার হেন যতনের ধন
আদরে পরিবে গলে।

৩৬
মুকুর
যদি কারাে করে দেই এ সাধের
পুষ্পমাল্য মম,
হয়তাে সে চাহি দেখিবে—এ শুধু
খেলেনা তুচ্ছতম !
হয়তাে চরণতলে
দলিয়া যাইবে চলে
মালাখানি তাই দেই ভাসাইয়া
নিৰ্ম্মল নদীজনে।।
নিশি দিনমান না মানি বিরাম
তটিনী বহিয়া যায়,
আমার কোমল মালিকাও ভাসি
কি জানি কোথায় পায় !
কেহ কুতূহলভরে
কভু কি লইবে করে,
অথবা-অকূল সিন্ধুর পানে
যাবে চিরদিন ধরে’!
r

জীবনাকাঙক্ষা।
জীবনাকাঙ্ক্ষা।
সুন্দরী এ বসুন্ধরা অনন্তযৌবনা
গীতগন্ধ শােভার ভাণ্ডার,
হৃদয়ে জাগায় নিত্য নবীন বাসনা
স্নেহধারা ঢালে নাের।
তাই আজি পৃথিবীর চিরদিন তরে
ছেড়ে যেতে কঁাদে মাের প্রাণ,
বড় বৈদনার মত বাজিছে অন্তরে
মরণের করুণ আহ্বান।
পাই নাই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সুখস্বাদ,
স্বরহের বাঞ্ছিত যে ধন,
এখনাে মিটেনি তাই জীবনের সাধ
হে মরণ এস না এখন।
আজি এই জীবনের প্রথম প্রভাতে
আনিয়েনা সন্ধ্যা-আবরণ,
দিবা-অবসানে এস নূতন পােভাতে
সমাদরে কবি বরণ।

মুকুর।
কি জানি কখনাে ক্ষুদ্র মানব জীবনে
পাই যদি চির-ভালবাসা,
এখনও মত্ত আশা জাগে মাের মনে,
যদি কভু মিটে এ পিপাসা!
একটি হৃদয় মাঝে যদি বেঁচে থাকি,
তুরে মাের সফল জীবন';
কোন সাধ আর তবে থাকিবে না বাকি,
হে মরণ আসিয়াে তখন।

মৃত্যু।
•৩৯
সুখ-দুঃখ-বিজড়িত
এই নর জনমের
মৃত্যুই কি মহা পরিণাম,
যত আশা ভালবাসা
অতৃপ্ত বাসনারাশি,
তারি কোলে লভি
অনন্ত সাগরতীরে
বালুকার খেলা ঘর
যদি এই মানবজীবন,
তবে কেন তার তরে
এ বিশাল বসুন্ধরা
এত শােভা করে বিকীরণ ?
তবে কেন বাধে তারে
অযাচিত স্নেহপাশে,
রবি-শঙ্গী-গ্রহ-তায়াণে,
তবে কেন তার দেহে আনন্দ সঞ্চার করে
গন্ধবাহী মন্দ সমীরণ ?
রজনী
আসিয়া তবে
কেন তারে সযতনে
কোলে তুলৈ লয় নিতি নিতি,
প্রভাতে তাহার কানে পীযূষ বরিষে কেন
মধুর বিহগলগ্নতি ?

"
মুকুর।
কেন তবে তার চিত্তে
উচ্ছসিত হয় নিত্য
স্নেহ প্রীতি দয়া ভালবাসা,
কেন জাগে তার প্রাণে জীবন্ত কল্পনা শত,
দুর্নিবার সৌন্দৰ্য্যপিপাসা ?
কেন তার প্রিয়জন
মুগ্ধহৃদে মানে তারে
যেনু-নিচ পরাণ-পুতলী,
বাঞ্ছিতের সুখ লাগি কেন তবে অবহেলে
আপনার সুখ দেয় বলি ?
সকলি কি মহাভ্রান্তি--- ক্ষণিক স্বপন প্রায়
অর্থহীন মানবের প্রাণ,
মৃত্যুর পরশমাত্র
নিমেষে ভাঙ্গিয়া যায়,
তারপুর-অনন্ত নিৰ্ব্বাণ?
মৃত্যু কি স্বপনহীন • অনন্ত নিবিড় নিদ্রা,
অথবা সে মহা জাগরণ ?
ত্যু কি নিষ্ঠুর এক
মহান্ বিচ্ছেদ শুধু,
--অথবাসে অনন্তমিলন ?
.
মৃত্যু কি অনন্ত রাত্রি ,
চির-বিভীষিকা ভরা
গাঢ়ত অন্ধকারময় ?
অথবা, সে অবিচল
দিবালােকাভাস সম
এক মহা-জ্যোতির উদয় ?

মৃত্যু।
৪১
মৃত্যু কি অকূল সিন্ধু
উন্মত্ত, অশান্ত, সদা
বিক্ষোভিত তরঙ্গ-সঙ্কুল,
কিম্বা, চির কুসুমিত মলকুঞ্জে ঘেরা
সুশােভন শ্যাম উপকূল ?
মৃত্যু কি রাক্ষসী কুর গ্রাস করে অহর্নিশি
কোটী কোটী মানবদলান,
অথবা, সে নিজ ক্রোড়ে স্থান দেয় মানবের
স্নেহময়ী জননী সমান ?
p
কি যে মৃত্যু, নাহি জানি, চিন্তাক্লান্ত নরচিত্তে
চিরদিন রহস্য অপার। •
কিন্তু তারে ভালবাসি মােহিনী মূরতি তার
গড়িয়াছে কল্পনা আমার ।
জানি শুধু-ভগ্নপ্রায়, শুষ্ক, শূন্য হৃদয়ের
মৃত্যু-আশা কেবল সম্বল,
সংসার-সংগ্রামাহত
হতভাগ্য মানবের
একমাত্র আশ্বাসের স্থল।

।
৪২ :
মুকুর
অতিথি।
পথহারা আমি শ্রান্ত পথিক নবীন
এতেন দেশে
এসেছি তােমার দ্বারে আজি দীন হীন
দীর্ঘ দিন শেষে।
কেন করুণায় মাখি’
দুইটি কমল আঁখি
স্লালমুখ পানে চেয়ে
আছ অনিমেষে।
.
বুঝিতে কি চায় তুমি কোন্ দেশ হতে
বহি’ কোন্ স্মৃতি
কেন আসিয়াছি হেথা, ভাসি’ কোন্ স্রোতে,
( অজ্ঞাত অতিথি ;
আমার হৃদয়মাঝে
নীরবে সতত বাজে
নিরাশাআকুল কি যে
বিষাদের গীতি ।

অতিথি।
৪৩
স্বরগীয় সরলতা স্নেহের আধার
তােমার হৃদয়,
জাননা, বাহিরে এই কঠোর সংসার
দুঃখদৈন্যময়।
তাই কি বিস্ময় হেন
হেথায় এসেছি কেন
মেহহারা গেহহারা
আমি নিরাশ্রয় ।
গভীর বিশ্বাসভরা, ওগাে বিদেশিনি,
ও দুটি নয়ন,
নীরবে বরষে প্রাণে, নীরবভাষিণি,
মেহের কিরণ।
উদাস হৃদয়মাঝে
তাই আজ নব সাজে
ফুটে উঠে অভিনব •
মধুর
স্বপন।
০
চাহিয়া তােমার পানে ওগাে অকুন্ঠিতা,
আজি মনে হয়-
কখনাে কি আমাদের হে অপরিচিতা,
শ

।
৪৪
মুকুর।
ছিল পরিচয়।
জনম-অন্তরবাসী
কতনা কল্পনারাশি
সেন আজি আসি’ মাের
ছাইছে হৃদয়।
কে জানেআর কি দেখা হবে কোন দিন !
আজি নিশিশেষে
প্রভাতে বিদায় মাগি যাব স্নেহহীন
নবতর দেশে;
একটি
মধুর স্মৃতি
আঁকিয়া হৃদয়ে, নিতি
ভ্রমিব ভুবনমাঝে
ভিখারীর বেশে।

মনােরমা
৪৫
মনােরমা।
সেই—আর এই, আজ
হ’ল কত দিন ।
বরষ একটি দুটি
তরঙ্গের মত উঠি
কেমনে কালের বুকে
হয়েছে বিলীন।
সেকি তব মনে আছে
কখন ছিলাম কাছে ?
ফিরে আসিয়াছি আজ
দীন উদাসীন।
কি
নব
গৌরব তব
আজি, সুহাসিনী
.' সেই ছােট মিনি ।
সে বাল্য সারল্য আজ
গিয়াছে কোথায়,
কোথা গেল সেই খেলা, •
মালাগাঁথাপার বেলা
সে চাপল্য লেশ আর
দেখা নাহি যায়।
;

৪৬
মুকুর।
কোথা সে মধুর হাসি
মন্দার-কুসুমরাশি,
অশ্রু আর অভিমান
কথায় কথায়।
তুমি কি সে আমাদেরি
চির আদরিণী
স্নেহময়ী মিনি!
শিখিয়াছ এত দিনে
সংসারের রীতি-
সংশয় সঙ্কোচ কত
ভয় অবিশ্বাস শত ;
থামিয়া গিয়াছে সেই
সুধামাখা গীতি।
চাহিয়া তােমার পানে
আজ শুধু মাের প্রাণে
জেগে উঠ কত শত
সুমধুর স্মৃতি।
তুমি ছিলে স্বরগের
করুণারূপিণী
দৈববালা মিনি ।

মনােরমা
৪৭
পড়ি’ সরমের আভা
অরুণ উজ্জ্বল,
অমল আননে তব
আজি কি মাধুরী নব,
শরত-প্রভাতে যেন
ফুলশতদল;
ললিত লতিকাসম
হেরি ওই নিরূপম
তরুণ লাবণ্য, কেন
চোখে আসে জল !
দূরে থেকে চেয়ে দেখি
তােমার সুষমা
আজি, মনােরমা।

৪৮
মুকুর
আগন্তুক
তােমাদের দ্বারে আছি দাঁড়ায়ে একাকী,
আমি উপেক্ষিত, শ্রান্ত, দীন আগন্তুক ;
তােমাদের মাঝে আজি শাহ মােরে ডাকি
অজ্ঞাত অখ্যাত বলে’ হয়ােনা বিমুখ।
উৎসবের দিনে যবে হরষের গান .
বাজিবে সবার কণ্ঠে মঙ্গল মধুর,
তােমাদেরি সুখে তবে হরষিত প্রাণ
আমিও মিশাব তায়, ক্ষীণ কণ্ঠসুর।
যদি আসে বিষাদের দিন দুঃখময়,
তােমাদের চোখে ভাসে অএ ছল ছল,
আমিও সবার সাথে আকুল হৃদয়-
নীরবে ঢালিবে মাের নয়নের জল।
তােমাদের সু সুখী, ধিদে কাতর,
কৃর মােরে তােমাদেরি—করিয়ােনা পর।

স্মৃতি
স্মৃতি।
সে ছিল বিজন কুঞ্জ-ভবনে
কুসুম-মাসনে বসিয়া,
চঞ্চ: বায়ে, অঞ্চলখানি
পড়েছিল ভূমে খসিয়া।
তরুণ রবির অরুণ রশি
পড়েছিল আসি’ কাননে,
উষার মাধুরী স্নিগ্ধ উজল
কুটেছিল তার আননে।
ছিল ছড়ারে,
মুক্ত অলক পৃষ্ঠ-উপরে
মেঘস
কুসুমকান্তি, কোমলতা, ছিল
দেহলতা তার জড়ায়ে ।
চম্পককরে পুষ্পমালিক।
গাঁথিতেছিল সে যতনে,
জীবন্ত যেন স্বর্ণ-প্রতিমা
খচিত হীরকে রতনে

মুকুর। প্রস্ফুট ফুল মুক্তাবিমল শিশরবিন্দু পরিয়া অঞ্জলি যেন বনদেবতার- ‘পড়েছিল শিরে ঝরিয়া। গুঞ্জরি’ যেন সঙ্গীত শত উঠেছিল তার মরমে, নির্বাক মুখ, আঁখি-পল্লব আনত সােহাগে সরমে। : মুগ্ধ হৃদয়, লুব্ধ নয়ন ‘ডুবেছিল তার শােভাতে, সত্য, স্বপন, মিশেছিল সেই কোকিলকূজিত প্রভাতে।

শ্রাবণে।
শ্রাবণে।
আজি ঘন মেঘে ঢাকা শ্রবণ-গগন,
কোথায় লুকায়ে আছে মলিন তপন !
আজি যেন বসুমতী
ব্যথিত কাতর অতি,
যেন গাে প্রকৃতি সতী
বিষাদ-মগন ।
আজি মনে পড়ে তার সজল নয়ন।
মেঘ গরজন ঘন দামিনী বিকাশ,
আজিকে পরাণে মাের জাগে কি হুতাশ ?
কি যেন বেদনাভরে
উদাস আকুল স্বরে
অবিশ্রাম কেঁদে মরে.
ব্যাকুল বাতাস।
মনে পড়ে আজি শুধু তার দীর্ঘশ্বাস।
ধীরে ধীরে দীর্ঘ দিবা হয় অবসান ;
•কেন আজ শােকাল আমার পরাণ ।
এই যে দিগন্তগ্রাসী
নিবিড় নীরদরাশি
t

মুকুর।
আকাশে বেড়ায় ভাসি
উদাসীন, স্নান,
একি শুধু তার অশ্রুভরা অভিমান !
ঞ্চল !
আজি বাদলের ধারা বয়ে অবিরল,
আমার বিরহতপ্ত হৃদয় চঞ্চল
কত সুখময় স্মৃতি,
কত বুকভরা প্রীতি
কত প্রণয়ের গীতি,
পুণ্য'অশ্রুজল,
মনে পড়ে আজি মাের পরাণ বিকল।
-
মনে হয় আজি বিশ্ব নিতান্ত বিজন
একা বসি করিতেছি স্বপন সৃজন।
আজ শুধু পড়ে মনে-
কোন্ দিন এ জীবনে
আমাদের দুই জনে
প্রথম মিলন,
বাহিরে বিরামহীন বারিবরিষণ।

শ্রাবণে।
আজি ভরা বরষায় শুধু হয় মনে-
কভু কি মিলন হকেহেন শুভক্ষণে !
এমনি বরষা ঘন,
নিরজন এ ভুবন,
•এমনি আঁধার কোন
ক্ষু গৃহ-কোণে
প্রাণে প্রাণে মিশে যাব আমরা দুজনে !

৫৪
মুকুর।
প্রবাসে।
বরষে ঝর ঝর বারিধারা
যেন গাে দিগ্বধূ কেঁদে সারা।
দিবস আলােহীন,
মেঘেরা সারাদিন
গগনে ঘুরে যেন পথহারা।
।
সাঁঝের শেষ রেখা মিশে যায়,
তিমির অম্বরে বেগে ধায়।
কখন্ ম্লান ছবি
ডুবিয়া গেছে রবি;
আঁধার নামি আসি’ ধরা ছায়।
বাহিরে কেহ নাহি কোথা আর ;
জানাল পাশে বসি’, রুধি’ দ্বার।
কাহারমুখখানি
অমিয়-মাখা বাণী
ব্যাকুল মনে আসে অনিবার।
বাদলধারা ঝরে অবিরল,
নয়ন ভরি কেন আসে জল !

প্রবাসে।
কেবল পড়ে মনে
কাহার দুনয়নে
মধুর প্রেম লাজ ঢল ঢল ল!
পরন থেকে থেকে বহে বেগে,
বিজলি জ্বলি উঠে কাল মেঘে।
আজি সে একাকিনী
তামসী এ যামিনী
কেমনে নাহি জানি যাপে জেগে।

৫৬
••
মুকুর।
বিচ্ছেদের দিনে।
চাহি’ যবে মাের পানে কাতর নয়নে
নীরবে সে মাগিল বিদায়,
কি আর বলিব তারে ?–মাের ক্ষুদ্র মনে
কি আছে জানাতে বাকি তা’য় !
বিদায়ের দিনে সেই নয়ন তৃষিত
দেখিবে যে রূপ তার, ও উচ্ছসিত
অশ্রু আসি’ হ’ল অন্তরায়।
আজি হেন মনে হয় যেন তার কাছে
কত কথা বলা হয় নাই,
হৃদয়ে লুকান’ যেন কত কপ্পা আছে-
শেষ তার দেখিতে না পাই।
আজি তা’রপ্রেমভরা আঁখি ছল ছল,
কমল-আনখানি বিষাদ-কোমল,
মনােমাঝে জাগিছে সদাই।

মেঘদূত।
মেঘদূত।
কবে রামগিরি হ’তে কোন্‌ নিৰ্বাসিত
বিরহ-তাপিত
হত ভাগ্য যক্ষ,কোন্ প্রথম বর্ষায়,
তরুণী কান্তায়
জানাতে মরম বাথ,আকুল আবেগে
সেধেছিল মেঘে।
উজ্জয়িনী-রাজকবি মােহি’ বিশ্বলােকে
মেঘমন্দ্র শ্লোকে
বিশ্বের ব্যাকুল যত বিরহীর বাণী
মায়ামন্ত্রে আনি’
রেখেছে অমর করি’ অমৃত ভাষায়
সে প্রেমূ-ব্যথায়।
আজি বহু বর্ষ পরে,-একান্ত সুদূরে,
বঙ্গ-অন্তঃপুরে
অবরুদ্ধা বঙ্গবন্ধু, কান্তবিরহিনী
পড়ি' সে কাহিনী
প্রবাসী পতির তীব্র বিরহ বেদনে
ভাবে মনে মনে
কাব্যানুবাদ। শ্ৰীযুক্ত বরদাচরণ মিল কৃষ।

মনে ভাবে-নবমেঘ আসে বুঝি ভেসে
তাহারি উদ্দেশে,
মেঘ সনে পাঠায়েছে হৃদয়ের ভার
বুঝি প্রিয় তার!
চেয়ে থাকে—মুগ্ধহিয়া, বসি বাতায়নে,
সঘন গগনে
আজি বর্ষার দিনে তাই দুর্বিষহ
প্রিয়ের বিরহ ;
যক্ষের বিরহগাথা ধ্বনিত অন্তরে
আজি শূন্য ঘরে
নব-বিরহিণী মগ্ন মিলন-স্বপনে
.
সজল নয়নে।

আক্ষেপ।
আক্ষেপ।
.
এবার বসন্ত,
সখি,
হ’ল বুঝি অবসান !
যত ফুল ছিল বনে
ঝরে গেছে অযতনে,
তাই বুঝি নাহি আর
মত্ত
মধুপের
তান
মধুর মলয় আর
বহেনা সুরভি ভার,
তমালের ডালে বমি
কোকিল গাহেনা গান।
বিফলে বসন্ত হায়
হ’ল বুঝি অবসান।
বিরহ-বিধুর প্রাণে
চেয়ে চেয়ে পথ পানে,
বসন্তের শেষ চন্দ্র
'ল বুৰিত অস্তমান !

মুকুর।
এমন যামিনী, হায়,
বিফলে কাটিয়া যায় !
কোথা মিলনের অশ্রু,
অনুরাগ, অভিমান।
এবার বসন্ত, সখি,
৫ হ’ল বুঝি অবসান।
:
C
সেই যে কখন এসে
কেড়ে নিয়ে গেছে হেসে
আমার যা কিছু ছিল—
অবোধ হৃদয় প্রাণ ;
আর কি আসিবে ফিরে
ভাসিব প্রণয়-নীরে,
হেরিব সে রূপ-জ্যোতি
সারানিশি দিনমান !
এবার সন্ত, সখি,
হ’লবুঝি অবসান!
সে যে অমৃতের সিন্ধু,
শুধু তার এক বিন্দু
আমার তৃষিত চিত্ত
চাহৈ করিবারে পান।

আক্ষেপ
১
কখনাে নিমেষ তরে
সে কি হায় মনে করে
মলিন আনন মাের
জলভরা দুনয়ান।
এবার বসন্ত, সখি,
হ’ল বুঝি অবসান।
ভা'র গলে দিব বলে
বসন্ত কুসুম দলে
কতনা গাথি মালা,
শুকায়ে হয়েছে ম্লান !
যদি সে পথ ভুলে
চাহে যদি আঁখি তুলে
বসন্তের অবসানে
কি তারে করিব দান ।
বিফলে বসন্ত, সখি,
* হ'ল বুঝি অবসান ।

মুকুর।
বিরহ।
তুমি এস, আজি এস,
চিরদিন তরে কর আসি’ মাের
অসহ বিরহ শেষ।
তেমনি কুসুম ফুটেছে কাননে,
হাসিছে ইন্দু তেমনি গগনে,
শুধু নাহি দেখ, হেথা মাের মনে
তেমন সুখের লেশ।
মনে হয়, যেন
শত যুগ তােমা
ঘড়ি’ আছি, হৃদয়েশ !
আজ তাই আমি অতি দীনহীন,
কত না দুঃখ সহি নিশি দিন ;
দেখ আসি আজি শ্রীহীন মলিন
জীর্ণ আমার বেশ
কত সুখস্মৃতি আনিয়াছে আজি
দুখের াদিনী নিশা।
নাহি বুঝি কোথা এত ভালবাসা,
কেহ নাহি জানে এত প্রেমভাষা,
কারাে প্রাণে বুঝি নাহি এত আশা
আকুল
ল প্ৰণা-তৃষা!

বিরহ।
আজ কি গাে তব পশে না শ্রবণে
আমি হেথা রত কঁাদি।
দেখ আসি’, লয়ে অশ্রুসজল
হৃদয় মাধুরী চির উজ্জ্বল,
আছি পথ তব চাহিয়া কেবল
আশায় পরাণ বাঁধি।
পারিনি বুঝাতে ;
•
বুঝি আমি মােরে
আজ দেখ আসি ফিরে,
কারাে নাই এত মত্ত বাসনা
কোথাও পাবে না এত সান্ত্বনা
ধুয়ে দিব তব সৰ্ব্ব বেদনা
বিমুল অশ্রনীরে।
বিরহ-যাতনা
তুমি এস, এস ফিরে।
ঘুচাতে তীব্র

মুকুর
বসন্ত।
।
হিমে জর জর ধরণীর জৱা ঘুচায়ে
সযতনে তার শিশির-গশ মুছায়ে
শকর শীতল মন্দ মলয় পবনে
আসে বসন্ত ভুবনে।
সঞ্চার করি’ সুকোমল কর পরশে
নবীন জীবন নব যৌবন হরষে
স্থলে জলে বন-ভবনে,
নব গৌরবে বসন্ত আসে ভুবনে।
অম্বরে নীল উজ্জ্বল শােভা অমলা
পাদপ জড়িত পুষ্পিত লতা শ্যামলা,
মুগ্ধ নয়ন মিগ্ধ হরিত বরণে
নিখিল পূরিত কিরণে।
তটিনীর
কুল ঢাকা নব তৃণ দুকুলে,
আম্র কানন আবরিত নব মুকুলে
নব পৰাভরণে!
শশাভিত দুখন কিরণে শ্যামল বরণে।

বসন্ত।
উদ্দাম বায়ু বনে উপবনে বিহরে,
মৰ্ম্মর রবে ঘন তরুরাজি শিহরে।
স্বচ্ছ সলিলা চিরচঞ্চল-চরণ।
বহে ঝর ঝরণা।
পরিমলভরা ফুলকুসুম-অধরে
মত্ত মধুপ চুম্বন করে আদরে !
উপল-ব্যথিত-সরণা
বনপথে সদা বহে ঝঝর ঝরণা।
সহকার-শাধে পঞ্চম তানে হৰি
দিকে দিকে পিক সঞ্চারে সুধালহরী ;
অটবীতে শত বিহগকণ্ঠ-কাকলি,
গীতময় আজি সকলি ।
দোয়েল পাপিয়া গাহে প্রাণ খুলে মধুরে,
বৌ কথা-কুও অক্ষুনয় করে বন্ধুরে
বিরহি-চিত্ত বিকলি।
উঠে অটবীতে শভবিহঙ্গ-কাকলি।
আজিকে এসেছে মধুর
মাধবীজনী,
জাগ ত্বর, চলমঞ্জু কুঞ্জে, স্বজনি ;
নব সাধভরে কর কুরঙ্গ-লােচনা
বরসা রচনা।

৫
মুকুর।
নব বসন্তে এস নব অনুরাগিনী,
স্বর্ণবীণায় বাজাও মদির রাগিনী,
অমিয়সিক্ত-বচনা,
বাসরসজ্জা ফুলদলে কর রচনা।
.
আন চম্পক, অশােক, টগর, করবী,
নবমল্লিকা, বকুল, পাটল সুরভি,
সারা বন ফিরি’ যতনে চয়ন করিয়া
আন অঞ্চল ভরিয়া।
এসেছে যামিনী মুধুর ইন্দুশালিনী,
বকুলকুঞ্জে এসগাে বকুলমালিনী
বাসন্তী বাস পরিয়া।
বন হ'তে ফুল আন অঞ্চল ভরিয়া।
=”
চকোর চকোরী চঁাদের শুভ্র আলােকে
সুধাপান করি’ খেলা করে উড়ি’ পুলকে।
আজিকে মিলন
সুমধুর এই বিজনে
-
মধুর মলয়-বীজনে।
চখা আর চখী ব্যাকুল বেদনে জাগিয়া,
কঁদে আজরাতে প্রিয়-সমাগম লাগিয়া
নদীর দুপারে দুজনে।
আজিকে বিরহ দুঃসহ হেন বিজনে।

বসন্ত।
কে আছে তরুণী জাগিয়া শূন্য শয়নে
আজি বসন্তে অশ্রুকুল নয়নে।
হেন মধুরাতে প্রাণ-বল্লভ বিহনে
কে দহে বিরহ-দহনে।
সে কি পারেআজি থাকিতে প্রিয়ায় পাসরি,
ওই শােন বুঝি বেজে উঠে তার বাঁশরী
অদূরে গহনে গহনে !
আজি মধুরাতে কে দহে বিরহদহনে ?

জ্যোৎস্না রাত্রে। বিমল জ্যোস্না প্রবাহে ভাসিছে একি ধরণী ! . ফিরে এল কি সে মধু 'জনী রজত- বরণী । তেমনি মধুর মৃদু সমীরণ, শােভা সঙ্গীত গন্ধ তেমন, বহিয়া এনেছে আজি কোন্ মায়- তরণী ! আজি মিল জ্যোস্না প্রবাহে প্লাবিত ধরণী'। ৫ সেকি সেই মনে পড়ে কবে হেন মধুরাতে ইজনে মধু প্রথম মিলন, এমনি। বিজনে। কি মধুর সেই কৌমুদীরাশি, নব বিকশিত কুসুমের হাসি, কি যে সুধা ভাসি’ এসেছিল পিক- কূজনে। প্রম মিলন হে মধুরাতে দুজনে'। ০

জ্যোৎস্না রাত্রে।
সেই
মম মনােবনে মুকুলিত নব
কামনা
আশা, সংশয়, সুখ, দুখ, ভয়,
যাতনা ।
মুগ্ধভ্রমর গুণু গুণু সুরে
পদ্মমুকুলঘিরি’ যথা-উড়ে,
ঘুরেছে তােমায় ঘিরে মােৰ যত
বাসনা ;
মন-উপবনে মুকুলিত নৰ
কামশা।
যবে
কবে
পেয়েছি বিরাগ, অবহেলা, নাই
অরণে,
উন্মুখ প্রেম দলিয়াছ কবে
চরণে।
মনে নাই আজ পেয়েছি কখন
মূক অভিমান, কঠিন বচন।
শুধু জানি,আমি তােমারি, জীবন
মরণ।
পেয়েছি কিরাগ উপেক্ষা নাই
কবে
• মরণেণ,

৫ ৭০ মুকুর। মনে পড়ে, কবে সরম-অরুণ আননে, মধুযামিনীতে কুসুমকুঞ্জ- কাননে, কণ্ঠে আমার দিয়ে ফুলমালা বরণ করিয়া লয়েছিলে বালা, প্রীতৃি-সুকোমল হৃদয়-কমল- আসনে। সেই কুসুমিত বনে সম-অরুণ আননে। । আজি জ্যোস্নাপ্লাবিত সুনিভৃত এই নিশীথে, কঁদে পরাণ আমার তােমার পরাণে ‘মিশিতে । তাই আজ ফিরে এসেছি আবার, তুচ্ছ জীবন লহ উপহার, করুণাবিন্দু দান কর চির- তৃষিতে ; আজি জ্যো’মামগন নির্জন এই নিশীথে । *

প্রেমের রাণী।
৭১
০
প্রেমের রাণী
বুঝিতে পার না, সখি, কেন আমি আসি
শতবার, লয়ে এই পরাণ পিপাসী
তােমার কুতীরদ্বারে ; কেন চেয়ে থাকি
মূকসম, মেলি দু’টি তৃপ্তিহীন আঁখি
তােমার মুখের পানে!--কি সুখ স্বপন
মাঝারে নিমেষে চিত্ত হয় লিমগন
যখন তােমারে দেখি ! কেন বা নীরবে
অশ্রুবিন্দু ফুটে উঠে নয়ন পল্লবে!
কেন এত ব্যগ্র হয়ে থাকে কর্ণপুট
শুনিতে তােমার শুধু একটি অস্ফুট
সরমজড়িত ভাষা! হৃদয় আমার
কেন মুকুরের মত ওই সুকুমার
হৃদয়ের প্রতিবিম্ব করিতে ধারণ,
হেরিতে মাধুরী তব, চাহে সারাক্ষণ।
কেন হয় এ আগে উচ্ছসিত চিতে
তােমার দর্শনে, তুমি পারনা বুঝিতে ? •
কঠিন সংসারপথে প্রতিপদে সহি
শতব্যথা, অপমান, সারাদিন দহি
নিরাশার তীব্রতাপে, বিফলত-দুখে
জরজর মধ্যে প্রাণ, স্নান নত মুখে

१२
মুকুর।
-
আসি তব পাশে। অয়ি হৃদয়ের রাণি,
তখন হেরিয়া শুধু ওই মুখখানি
প্রেম-পবিত্রতা-মাখা, অতুল-সুরভি
নন্দন কুসুম সম, সরলতা-ছবি,-
তােমার মহিমা আমি করি অনুভব,
তথনি জাগিয়া উঠে তােমার গৌরব
আমার মানস-পটে নব দীপ্তিমান্ ;
তােমার লাবণ্যসুধা করি শুধু পান
অনিমি আঁখি ভরি’ ; ভুলি যত ব্যথা
লাঞ্ছনা, গঞ্জনা, অবিচার নির্মমতা
সংসারের। মনে হয়, এ ধরা নিষ্ঠুর
শােকতাপভরা নহে; হেথা সুমধুর
তােমার প্রেমের ধারা-সন্তাপহারিণী
স্বর্গচ্যুত মন্দাকিনী পীযূষবাহিনী--
বহে সদ। মনে হয়, স্বরগ-আবাস
অতি তুচ্ছ—নাহি যেথা হেন সুথ-আশ ।
তখনি মর্ত্যের দৈন্য হয় অবসান,
স্বরগেরাে চেয়ে তারে মানি মহীয়ান্।
-
প্রিয়তমে, নিশীথের ঘন অন্ধকার
ধীরে যবে নেমে আসে ঘিরি: চারিধার

প্রেমের রাণী। ; অসীম অম্বর হ'তে, সুপ্ত ধরণীরে করে গ্রাস, তুচ্ছ দীপ্নালােকিত কুটীরে পশেনা তাহার অধিকার ; সেথা হীন প্রদীপের শিখা দেখি পলায় মলিন অন্ধকার। সেই মত তােমার মুরতি বক্ষোমাঝে নিগ্ধ শান্ত সমুজ্জ্বল জ্যোতি জেগে থাকে অবিরত ; পারে না পশিতে পৃথিবীর অন্ধকার তাই মাের চিতে; তাই সেথা যত কিছু সুখ শান্তি আশা, তাই উছলিয়া উঠেহেন ভালবাসা নিরন্তর,—অন্তরের অনন্ত নিঝর- অমৃত-উৎসের মত, প্লাবি’ চরাচর। = আমার মানসেচেয়ে দেখ আজি তাই হাহাকার, করুণ ক্রন্দন, কিছু নাই অবশেষ।—কি অভাব আছে সে জ্যের তুমি যার রাণী, সখি ! লেপা ঐশ্বর্যের অক্ষয় আকর লক্ষ্মীর ভাণ্ডার সম চিরবিরাজিত। দেখ, এ হৃদয়ে মম তােমার হাসির রবিকরে মুকুলিত হয়ে উঠে কত আশা , কত প্রস্ফুটিত

৭৪
মুকুর।
আসে মনে,
সঙ্গীতে
বাসনা-কুসুম পরে তব অশ্রুকণা
শিশিরের মত পড়ি সৌন্দৰ্য কত না
করে সঞ্চারিত। প্রতি মেহসিক্তবাণী
কি অমৃত করে বরিষণ! নাহি জানি
কোথা হতে জন্মান্তের সুখস্মৃতিরাজি
উঠে যেন শত তন্ত্রী বাজি’
পরাণ-বীণার ! নিত্য নূতন
চির পুরাতন প্রেম চাহে বিকশিতে
আমার অন্তর মাঝে। তাই ব্যাকুলতা
জেগে থাকে প্রাণে মাের ;-মরমের কথা
ফুটে কি, ভাষায় কভু? হৃদয়-বিভব
হৃদয়ে লুকান থাকে, কেবল নীরব
অন্তরের প্রতিধ্বনি অন্তরের মাঝে
নীরবে দিবসনিশি সুমধুর বাজে।
আজ শুধু মনে হয়, এমন অকূল
প্রেমের কি আছে শেষ ! জীবনের ভুল
ভ্রান্তি শত শত যবে হবে অবসান
মরণের পর পারে, সুখ দুঃখ তান
পৃথিবীর শিবেনা কাণে, সেথাও কি
তােমার প্রেমের আঁখি থাকিবে না, সখি,

প্রেমের রাণী।
৭৫
আমার মানসাকাশে ধ্রুব জ্যোতি সম
সমুদিত,
দূর করি
য গাঢ়তম
অন্ধকার ? করিবে না সদা বরিষণ
অসীম সান্ত্বনা, আর স্নেহের কিরণ
আমার মলিন প্রাণে? অয়ি বরাননে,
আজি মাের মনে হয়, যেন তােমা’ সনে
অনন্ত কালের পরিচয় ! কোন্ শুভক্ষণে
হয়েছিল দুজনার নয়নে নয়নে
প্রথম পরাণ বিনিময়, তাহা আর
মনে নাহি পড়ে নেন এ প্রণয়-ধার
বহিয়াছে চিরদিন!—তাই এ বিশ্বাস,
এ প্রেমের নাহি আদি,-নাহি এর নাশ।
কি ভাবিছ নৈ, ওগো মানস-বাসিনি,
লজ্জান মুখে ? অগ্নিমধুরহাসিনী,
প্রণয়িণি মাের, কুহিয়ােনা কোন কথা
আজি তব এই সুমধুর মীরবতা
বড় ভাল লাগে প্রাণে ; যে প্রেমক্ষীরােদ
তােমার হৃদয়ে,যেন করি আজি বােধ
তরঙ্গ নীরবে তার লাগিছে আসিয়া
আমার সর্বাঙ্গমনে;গিয়াছে ভাসিয়া

মুকুর।
সৰ্ব্ব চঞ্চলতা মম। আজি, সখি, আমি
তােমার প্রেমের বলে যেন অন্তর্যামী,
অন্তরের প্রেম তব, মাধুরী অপার
করিতেছি অনুভব ; তাই আজি আর
কোন সাধ নাহি মাের । তােমার হৃদয়
কি মধুর চিরনব রহস্যনিলয়,
তুমি তা জান না, শুভে!—আপন সৌরভ
বিকশিত সুবিমল রূপের গৌরব
কুসুম জানে না যথা। আজি আমি জানি
হৃদয়-মাধুরী তৰ, হৃদয়ের রাণি,
অতুলন বিশ্বমাঝে। তাই আপনারে
আজি আমি মানি ধন্য ভুবন মাঝারে।

মুগ্ধ।
মুগ্ধ।
ঋবে
মাধুরী-বিভাের
হেরি মুখ তোর
মেলিঅনিমেষ আঁখি,
মনে হয়--অার জীবনে আমার
কোন সাধ নাই বাকি।
আমি
ভাবি হীন ধরা
উজল অমর
হেরি তাের মধু হাসি ;
আমি তাের রূপলীন দেখি নিশিদিন
নিখিলের শােভারাশি।
)
গবে
থাকি অতিদূরে
স্নেহহীন পুরে,
তখনও ভেরি স্মৃতি
তাপিত পরাণে
নব আশা আনে
বরিষে সান্ত্বনা প্রতি।
তেরি রূপের
যেন
সারা বিশ্বময়
ফুটে
হেন মনে হয় ভুল,
শ্যামল ভূতলে
নীলাকাশ-কোলে
তােৱি লাবণ্যের ফুল।

৭৮
মুকুর।
পুরাতন।
তুমি চির পুরাতন।
জনমে জনমে ছিলে তুমি মাের
বাসনার ধন।
যুগে যুগে যেন মূৰ্ত্তি তােমারি”
দেখেছে নয়ন।
মাের স্মৃতি-আলাে-রেখা
অতীত-তিমিরে পশে যত দূরে,
সেথা যায় দেখা
গৌরবে তুমি আছ সাথে, কভু
নহি আমি একা।
আমি জানি না কখন
ফুটেছিলে তুমি প্রথম প্রভাতে
কুসুম যেমন,
সৌরভ আর সুষমায় করি’
মুগ্ধ এ মন।
।
তাই হৃদয়-আলোকে
মুখখানি তব যেমনি আমার
পড়িয়াছে চোখে,
চিনিয়াছি তােমা’ আপনার বলে
অনন্তু লােকে।

নূতন। ৭৯ তুমি মূতন। নিত্য নূতন। প্রতিদিন তব শােভা নব ন করি দরশন ; যত দেখি, তত মনে হয়,-যেন দেখিনি কখন। আমি মেলি’ দুটি আঁখি তােমার নলিন-নয়নের পরে যত দেয় থাকি, মিটেনাকো সাধ,রহস্য তার তবু থাকে বাকি। - হৃদয় তােমার রেখেছে লুকায়ে যেন সযতনে মাধুরী অপার- প্রাণ-মনে যত করি অনুভব শেষ নাই তার রূপ নিরূপম সমগ্ৰ কভু উঠিবে কি ফুটি শতদল সম পূর্ণ তােমায় দেখিবে কি কভু কল্পনা মম !

৫
মুকুর।
নিশীথে।
হের কি মধুর নিশি কৌমুদীবসনা দিশি
চরাচর সুষুপ্তিমগন,
শান্ত তটিনীর বুকে
ঘুমায়ে পড়েছে সুখে
চন্দ্রমার চঞ্চল কিরণ।
উপবনে ফুটি’ শত
শুত্র পুষ্প অবিরত
চেয়ে আছে আকাশের পানে,
যেন কোন্ দেবতারে শােভা গন্ধ উপচারে
পূজা করে পরাণে পরাণে।
জন শূন্য পথ ঘাট
সুদূরবিস্তৃত মাঠ,
শব্দহীন নিখিল ভুবন,-
কভু নীড় হ'তে পাখী ঘুমঘঘরে উঠে ডাকি
দেখি কোন সুখের স্বপন।
চেয়ে দেখ চারিধার জন প্রাণী নাহি আর
বিশ্ব যেন বিজন, স্বজনি,
শুধু আমাদের তরে হেন চারু রূপ ধরে
আসিয়াছে আজি এ রজনী।

নিশীথে।
অসীম আকাশতলে হেথা শ্যাম দুৰ্ব্বাদলে
এস তুমি সৌন্দৰ্য্যরূপিনি!
নীরব নিশীথে আজি
এস নববেশে সাজি’
ধরি’ মুক্তি বিশ্ববিমােহিণী।
নষ্ণকেশ ভার খুলে দাও একবার,
মেল আঁখি-নীলােৎপল নব ;
কঠিন ধরার ভূমি, কুসুমিত কর তুমি
চরণ-অলক্তরাগে তব।
ফুটন্ত জ্যোছনা রাশি • উল্লাসে পড়ুক, আসি’
অনবগুন্তিত মুখ পরে,
মহিম মুরতিখান দেখি, সৌন্দর্য্যের রাণি,
অতৃপ্ত নয়ন দুটি ভরে।

মুকুর।
আঁখি
তােমার নয়ন, সখি,
নিৰ্ম্মল আকাশ,
প্রশান্ত নীলিমা তার।
‘স্বর্গের আভাস।
তােমার নয়ন, সখি,
সরসী অমল,
ফুটে’ তাহে স্নেহ প্রতি
লাজ শতদল।
তােমার নয়ন, সখি,
যেন ধ্রুবতারা,
আঁধারে যখনি মাের
চিত্ত দিশাহারা।
তােমার নয়ন পানে
তাই অনিমেষ
চেয়ে চেয়ে তবু সাধ
নাহি হয় শেষ ।

কবির প্রেয়সী।
৮৩
কবির প্রেয়সী
তােমারে গড়েছে বিধি-হেন মনে লয়,
ওগাে কবি-প্রিয়া,
তিল তিল নিখিলের সৌন্দর্য্য আহরি’
একান্তে বসিয়া ।
তাই তােমাপানে চাহি’ অতৃপ্ত নয়নে,
নিত্য নব গীতে
প্রকাশিতে চাহে কবি বিপুল বিস্ময়
ছন্দ রাগিনীতে।
তাই গৃহকোণে থাকি’ ধনমানহীন
সংসার মাঝারে,
স্বর্গ মত্ত হ’তে করে উপমা চয়ণ
বর্ণিতে তােমারে।
সত্যই কি এ সৌন্দৰ্য্য শ্রীঅঙ্গে তােমার
উঠেছে বিকশি
প্রশান্ত সন্ধ্যায় যুথা গগনের গায়
শােভে পূর্ণশশী।

৮৪
মুকুর
অথবা-এ শুধু স্বপ্ন, প্রদীপ্ত কল্পনা
কবি-হৃদয়ের
পড়েছে তােমার পরে, তাই নাহি শেষ
তব সৌন্দর্যের
৮।
প্রাবৃটের নভস্তলে—নঝুমেঘস্তরে
রবির কিরণ
পড়িয়া, বিচিত্ৰশােভা পূর্ণ ইনধনু
বিকাশে যেমন।
=tE
*

কবিতা-সুন্দরী।
;
এ
০
কবিতা-সুন্দরী।
ধীরে ধীরে পশে চিত্তে মাের সুকুমারী কবিতা-সুন্দরী,
করে তার কনককঙ্কণ,
চরণে মঞ্জীর মৃদু বাজে ;
চারু নীলাম্বরে ঢাকি' দেহ মণিমুক্তা-আভর পরি’
নববধূসম দেয় দেখা
আঁথিপাতা আনমিত লাজে ।
স্বচ্ছ -অৱগুণ্ঠনের ছায়ে ইনিভ সুন্দর আনন,-
পল্লবের অন্তরালে যেন • বিকশিত, কুসুমের হাসি,
মাঝে মাঝে কৌতূহলভরে, ছুটে আসি অধীর পবন
চকিতে ঘুচায়ে আবরণ
দেখে যায় দিব্য রূপরাশি ।
কখনাে নিমেষতরে যদি
দেখা হয় নয়নে নয়নে,
অমনি রক্তিমতর আভা ফুটে উঠে কোমল কপােলে
নতনেত্রে নির্বাক্ অধরে চলে যায় চঞ্চল চরণে,
অমল অঞ্চলখানি তার খসে পড়ি’ লুটে ধরাতলে।
জানিনা সে কখন্‌ আমারে করেছিল নীরবে বরণ,
তজাতে পরাণখানি মাের তেমুনে সে কল্টেছে হরণ ।

মুকুর।
কম্পনা-বিহঙ্গ।
আমার কল্পনা যেন মুক্ত বন-পাখী,
ভালবাসে নীলাকাশ, রবির কিরণ,
উড়ে যেতে চায় দূরে যেথা যায় 'আঁখি
মেলি’ তার লঘু পক্ষ বিচিত্রবরণ।
কত নব নব সাধ জাগে তার প্রাণে,
তাই প্রতিদিন ছাড়ি’ ধরণীর নীড়ে
নবীন উৎসাহে ধায় অনন্ত বিমানে
কতনা অজানা বনে'—দূর সিন্ধুতীরে।
পারেনা স্বাধীন পাখী সহিতে বন্ধন,
সােণার পিঞ্জরে তার রুদ্ধ হয় শ্বাস ;
সে চাহে দেখিতে খুজি’ কোথায় নন্দন,
অনন্ত বসন্ত করে কোন্ দেশে বাস।
লােকালয়েআসি তার থৈমে যায় গান,
বিজনে সে গাহ খুলি’ নিভৃত পরাণ।

কল্পনা-ভ্রমর
৮৭
কম্পনা-ভ্রমর।
p
আমার মানসকুঞ্জে কল্পনা-ভ্রমর
প্রতিদিন প্রাতে উঠি’ মধু-আহরণে
উড়ে যায়—যেথা শত পুষ্প মনােহর
বিকশিত হয়ে উঠে রবির কিরণে ।
প্রতি প্রস্ফুটিত ফুলে বেড়ায় উড়িয়া,
ফুল-পরিমল করে প্রাণভরে পান,
অর্ধস্ফট মুকুলের চৌদিকে ঘুরিয়া
অনুরাগভরে করে গুণ, গুণ, গান।
অতৃপ্ত নয়নে দেখে সৌন্দর্য্যের মেলা,
সুগন্ধি কুসুমরেণু লেগে থাকে গায়,
মধ্যাহে অলস পাখা-ভুলে থাকে খেলা
সুকোমল কুসুমের সুস্নিগ্ধ ছায়ায়।
সন্ধ্যাবেলা শ্রান্ত হয়ে ফিরে আসে গেছে,
মধুর সৌরভ শুধু মাখিতার দেহে।

মুকুর।
কবির প্রতি।
সুনীল আকাশ পানে মেলি’ অনিমেষ
বিমুগ্ধ নয়ন,
বিজন বকুল বনে
বসিয়া বিবশ মনে
কি নব স্বপনে কবি আছ নিমগন।
সম্মুখে তটিনী তুলি’ তরঙ্গ চঞ্চল
কোথা’ বহে যায়,
কুলু কুলু কলরােলে
কি কথা সে যার বলে,
কোকিল বকুলশাখে কি যে গান গায়।
দূর হতে বাঁশরীর কম্পিত মধুর
সুর আসে কাণে,
কাহার লুকান ব্যথা ভাষাহীন ব্যাকুলতা
ভেসে আসে যেন ওই সকরুণ হানে।
জ্যোৎস্না, মলয়, গীতি, ফুল-পরিমল,
এমর-গুঞ্জন,
মধুমাখা কুহু, একত্র করিয়া সক
কি স্বপনলােক কবি করিছ সৃজন।

কবির প্রতি।
নিভৃত হৃদয়ে তব কোন মায়াময়ী
মানসী মুরতি,
আকুল বাসনা, আশা, প্রাণপূর্ণ ভালবাসা
পূজা-উপচারে তারে করিছ আরতি ।
উঠ, কবি, ছেড়ে এস প্রিয় ঘুমঘাের,
অলস স্বপন ;
আকাশ-কুসুমে আর কত না গাঁথিবে হার,
এস ছেড়ে সুকোমল শ্যামল শয়ন।
ফেলে দিয়ে এস কাশী ভুলে যাও যত
প্রণয়ের গীতি,
প্রাণদান-প্রতিদান, বিরহ মিলন মান,
অনাদি,প্রেমের শত সুমধুর স্মৃতি।
চেয়ে দেখ চারিধারে ঘিরিয়া তােমায়
কঠিন সংসার,
কোথা প্রেম, কোথা স্নেহ, কোথা শান্তিময় গেহ,
কত দুঃখ কতশােক, কত হাহাকার !
এ নহে খেলার ঘর,-হেথা যে কঠোর
জীবন-সংগ্রাম,
এত নহে সুশােভন কল্পনার উপরন,
যুদ্ধ দ্বন্দ কোলাহল হেথা অবিরাম।
।
০

মুকুর।
;
চঁাদের কিরণ কোথা ?—দেখ প্রজ্জ্বলিত
দাবানল -শিখা
বসন্ত, মলয়, হায় ! নিমেষে মিলায়ে যায়
শুধু ছুটে আসে বেগে প্রমত্ত ঝটিকা।
এস, কবি, ছেড়ে তব মামস ভুবন
পৃথিবীর মাঝে,
থেকোনা অলস হয়ে আমার স্বপন লয়ে
রত হও সুকঠিন জীবনের কাজে।

নিবেদন
নিবেদন
এ নহে কুসুমকুঞ্জ স্বপনমণ্ডিত,
• এ যে গাে সংসার ;
তবু ভাঙ্গিয়ােনা তাের এঅলস ঘুমঘাের
মুছিয়ােনা আঁখি হতে অঞ্জন মায়ার ।
সমর-বিমুখ আমি, শান্তির ভিখারী,
অক্ষম-দুৰ্বল,
জনস্রোত দূরে রাখি, একাকী নির্জনে থাকি,
অবাধ কল্পনা শুধু আমার সম্বল।
কে আমারে সারাক্ষণ রেখেছে ভুলায়ে
বাঁধি মায়াভাের,
আমি হেথা দীনতা,
কুবেরভাণ্ডার সম
ঐশ্বৰ্য স্বপনে আনি’ কে দেখায় মােরে !
কঠোর জগতমাঝে চাহে মাের প্রাণ
ব্যর্থ ভালবাসা ;
দীনতা হীন যত চারিধার দেখি,তত
জেগে থাকে হৃদে মাের সৌন্দৰ্য্যপিপাসা।

মুকুর।
গােপন পরাণে প্রেম উঠে উচ্ছ সিয়া,-
কে জানিবে তায় ;
কত সাধ ফুল সম
নীরবে হৃদয়ে মম
ৰিফলে ফুটিয়া উঠি’ ঝরে পড়ে যায়।
নিখিলের শােভা লয়ে চাহি বিরচিতে
স্বর্গের আভাস ;
মলিন ধরায় থাক’ কেমনে দেখিবে আঁখি
কি মাধুরী ঢেকে রাখে সুন্দর আকাশ !
নীলিমার পর পারে আছে কোন্ দেশে
সৌন্দর্য্যের রাণী,
সকল কুসুম বার বহিছে সুরভিভার
সকল সঙ্গীত যার সুধাসিক্ত বাণী।
তাহারে দেখিতে যেন চাহে চিরদিন
ব্যাকুল নয়ন,
মুগ্ধ কুরঙ্গের প্রায় পরাণ শুনিতে চায়
সে মায়াময়ীর স্বর্ণবীণার নিক্কণ ।
তাহারি অঞ্চল ঘিরে আছে অবিচল
মেহ
মেহ প্রেম আশা,
অতৃপ্তি, আকাঙ্ক্ষা, তাই সকলি ভুলিতে চাই
লভি' তার সকরুণ স্নিগ্ধ ভালবাসা।

নিবেদন।
మల
।
যত তারে ধ্যান করি হৃদয়ে রাখিয়া,
মিটেনা তিয়াষ
যুত হই অগ্রসর
দেখি তারে দূরত,
পরশে ধরিতে যাই - বিফলপ্রয়াস।
আমারে ডেকোনা তবু সংসারের মাঝে,
থাক্ এ স্বপন,
জাগ্রত জগত ভুলি’ একান্তে গড়িয়া তুলি
সৰ্বসুখশান্তিময় মানস ভুবন।

৯৪
মুকুর।
জীবনের পথে।
এখনি চরণ কেন
সুদীর্ঘ এ জীবনের পথ,
এখনাে অনেক আছে বাকি,
ক্লান্ত হয়ে আসে হেন
দৃষ্টিহারা হয়ে আসে আঁখি !
মধ্যাহের খর রৌদ্রে যুদি
তাপিত বিকল হয় কায়া,
চারি ধারে শুধু মরু
নাহি কোথা গৃহ তরু,
নাহি থাকে বিন্দুমাত্র ছায়া ;
৫
3
'
প্রতি পদে বাধা বিঘ্ন ভয়
সদা যদি দেখা দেয় এসে,
তবু চলি’ প্রাণপণে সবল অটল মনে
যেতে হবে দীর্ঘ পথশেষে।
পথ দিয়া যা’রা যায় চলি’
সগৌরবে, গর্ববের ভরে,
করুণ নয়নকোণে
যদি এ অধম জনে
নাহি চায় নিমেষের তরে ;

জীবনের পথে।
৪
ছিল যারা নিতান্ত আপন,
তাহারাও হয় যদি পর,
নিঠুর কঠোর বাণী উপেক্ষার শর হানি’
শ্রান্ত তন্ন করে জৰজর ;
আজন্মের প্রিয় সঙ্গী যদি :
একে একে ছেড়ে যায় সবে,
তবু একা দীর্ঘ দিন সুপ্তি-তৃপ্তি-শান্তিহীন
লক্ষ্যপানে শুধু যেতে হবে।
একদা,মধুর সন্ধ্যাবেলা
ফুরাবে এ সুদুর্গম পথ,
চিরশান্তিনিকেতনে পশিব প্রফুল্ল মনে
পূর্ণ হবে জীবনের ব্রত।
আপনি বিজয়লক্ষ্মী আসি
কণ্ঠে শাের পরাইবে মালা,
তার সুকল্যাণ হাসি
বরষি’ অমৃতশি
ঘুচাইবে চির দুঃখজাল।
D

মুকুর
ঋণী।
"
আজি শুধু মনে হয় কোন্ শুভক্ষণে
তােমাদের শনে সে প্রথম পরিচয়,
চাহিয়া এ মুখপানে করুণ-নয়নে,
কে মনে করিলে বন্দী তৰুণ হৃদয় ।
কন্ট ককঙ্গরাবৃত সংসারের পথে
পড়ে ছিনু উপেক্ষিত, বিষ, একাকী,
তখন তােমরা সবে আসি’ কোথা হতে
হাতে ধরে তুলে’ মোরে মুছাইলে আঁখি
ঢেলে দিয়ে অবিরল স্নিগ্ধ ভালবাসা
সরল করুন, ক্ষমা, মধুর সান্ত্বনা,
ফুটালে হৃদয় মাঝে নব নব আশা,
শিখাইলে জীবনের মহান্ সাধনা।
অক্ষম, অধম আমি, চিরদনহীন
কেমনে শুধিব বল এ মেহের ঋণ ।
.

তরীযাত্রা।
৯৯
লােকালয় হতে কভু ভাসি’ ধীর পবনে
আসিবে বাঁশীর রব শ্রবণে ।
পূর্ণ নদীর বুকে
দুটি প্রাণী লয়ে সুখে
অবিরত স্রোতেমুখে ভেসে যাবে তরণী ;
জগৎ থাকিবে পড়ি’ এমনি।
e
প্রতিদিন আঁখি মেলি’ নব নব আলােকে
দেখিব নতুন দেশ পুলকে।
দুই জুনে ল’য়ে নিতি
প্রেমের স্বপন, স্মৃতি,
রচিব ভুবন নব, সারাদিন রজনী
ভাসিব তরণী
পরে,
সজশি।
বিশ্ব রহিবে ঘিরে’ শােভা তার বিকাশি-
ভেসে যার মোর দুটি প্রবাসী।
কিছু চাহিবনা আর,
ভুলে’ যার সংসার ;
ঝঞ্চা আসিলে কভু ডুবেদি তরণী,
সুপ্তি লভিব মাের, সজনি।
.
-~--

১৫০
মুকুর।
• মানসী।
আর কত বল
ভুলাবে আমারে
মানসকুঞ্জবাসিনি।
নবীন শোভায় নিত্য বিকশি
চিত্তগগনে পূর্ণিমা-শশী,
একিগো উঙ্গে খেলা কর বসি"
সুন্দর-শুভহাসিনি।
নব নব সাধ
জাগাও পরাণে
নীরব মঞ্জুভাষিণি !
I
হেরি রূপ তব
নিত্য নূতন
অয়ি নির্যবরণে
-মনে নাই কবে কোন্ সুলগনে
কোথা আমাদের দেখা দুই জনে ;
কি মূরতি ধর অয়ি বরাননে
নূপুর-মুখর চরণে
পশেছিলে আসি’ হৃদয়ে আমার
অাজ নাই তাহা স্মরণে।

মানসী ১০১ সংসার নিতি আসে মাের পাশে হাতে লয়ে মায়া-শিকলি, প্রকৃতি আমায় করে আবাহন দেখায়ৈ তাহার শােভা অগণন ; ১ পারে না বাঁধিতে কেহ মাের মন- তুচ্ছ নেহারি সকলি। উজ্জ্বল তব রূপ অতুলন জেগে থাকে হৃদ কেবলি। . তাই হেথা বসি বিজন বিপিনে বনমৰ্ম্মরপবনে, মানসে মুখ কল্পি’ দরশন, নি’ শুধু তব অমিয় বচন, ভুলে আছি আমি জীবন মরণ কঠিন মলিন ভুবন। •রেখেছ ভুলায়ে স্বর্গের নব স্বপনে। দিবস রজনী কত নব নব ছলনার পাশে রেখেছ হৃদয় বাধিয়।

১০২
.
মুকুর।
কখনাে মুক্ত
-
কভু মুখ ঢাক’ টানি’ আবরণ,
অবগুণ্ঠন,
কভু হাসি, কভু'আন অকারণ--
কখনাে বা উঠ কাঁদিয়া ।
কখন মোন,
কখনাে সােহাগে
সান্ত্বনা কর সাধিয়া।
;
।
কাছে থাকি'তবু থাকিব কি দূর ;-
কখনও চির জীবনে,
অয়ি মায়াবিনী অরুণ-অধ,
আকুল-অলকা, নীল-অম্বর,
বাহবন্ধনে দিবে না কি ধর
মৰ্ত্ত বাসর-শয়নে !
বাহিরিয়া আসি’
অন্তর হতে
থাকিবে, নয়নে নয়নে।
{
সমাপ্ত

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Mukoor

Author
Ghosh ,ramanimohan
Title
Mukoor
File name
Mukoor
Text
OCR done
Citation
1899
Published
2009/11/30
Publisher
Karttikcharan Dutta,kolkata
Language
Sanskrit
Pages
114
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Poetry
Keywords
Ghosh ,Ramanimohan
DLI number
512956
Barcode
4990010019980.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
P4vKd1DlhHO
Download PDF

Mukoor