Belgaria Sudha Smriti Pathagar

Mamatar Phansi

Mukhopadhayay,jatindranath · 2010/03/19

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

মমতার সৎ
ধা স্মৃতি লাইব্রেরী
গডিয়া - বসিরহাট।
২৪ শরণা।
গর্ণিাংখােপাধ্যeo
ক-ঐবিভূতিভূষণ চট্টোপাধ্যায়
কৃত্তিকা প্রেস
১৭ মদন মিত্র লেন, কলিকাতা।
১৩৩৩ বার।

কৃত্তিকা প্রেসে
ঐবিভূতিভূষণ চট্টেপেধ্যায় কর্তৃক মুদ্রিত।
১৭, মদন মিত্র লেন, কলিকাতা।

মন্তব্য। বলিবার বিশেষ কিছুই নাই,—ক্ষুদ্রের আবার বক্তব্য কি ? উপন্যাসখানি আমার স্ফুটনােম্মুখ উদ্যমের ফল,—অপরিণত মস্তিষ্কের প্রথম রচনা; সুতরাং, কুটী-বিচ্যুতির অসম্ভাব নাই। তবে শৈশবের বৃতি যেমন মধুর—এখানিও আমার নিকট তেমনই মধুর বলিয়া বােধ আবার অনেক স্থলে নিজের মধুর লাগিলে, অপরেরও তাহাতে মাধুর্য্যের সন্ধান মিলে,—অন্ততঃ, আংশিকও মিলে। হয়ত, আমার ধারণা ভ্রান্ত,—সকলের পক্ষে ইহা খাটে না। তাহাদের নিকট আমার বক্তব্য, এই গ্রন্থে আমার আন্তরিকতা আছে। বিশেষত, আজ এই উপন্যাস-প্লাবিত দেশে, সফরীর ফফরও পাঠক-পাঠিকার সহৃয়তায় সাচ্ছল্যে নিতান্ত উপেক্ষিত হইতেছে না, ইহাও আমার ন্যায় ক্ষু লেখকের পক্ষে নিতান্ত কম ভরসার বিষয় নহে। ভগবান যদি দিন দেন এবং এই ক্ষুদ্র উপন্যাসে যদি মুষ্টিমেয় পাঠক-পাঠিকারও কথঞ্চিৎ চিত্ত-বিনােদন করিতে সমর্থ হই, তাহা হইলে, আবার আর একদিন আর এক অর্ঘ্যের ডালা সাজাইয়া, সুধিমণ্ডলীর হৃদয়-মন্দিরের সান্নিধ্যে উপস্থিত হইব। পরিশেষে, অত্যন্ত গৌরব ও আনন্দের সহিত জানাইতেছি যে, সুপ্রসিদ্ধ প্রবীণ ঔপন্যাসিক, পরম ভক্তিভাজন শ্ৰীযুক্ত হরিসাধন মুখােপাধ্যায় মহাশয় এই ক্ষুদ্র গ্রন্থের ভূমিকা লিখিয়া দিয়া, আমার ন্যায় নগণ্য ব্যক্তির উপর তাহার স্নেহ যে কতটা নিবিড়, তাহা প্রতিপন্ন করিয়াছেন এবং সােদরপ্রতিম ক্রমান্ বিভূতিভূষণ চট্টোপাধ্যায় ভায়ার ঐকান্তিক শ্রম ও চেষ্টাই, এই গ্রন্থ- প্রচারে আমাকে সার্থকতার পথে অগ্রসর করিয়াছে। বাজিতপুর, বসিরহাট, ২৪পরগণা। যতীন্দ্রনাথ মুখােপাধ্যায়।

No text on this page.

ভুমিকা। শ্ৰমান্ যতীন্দ্রনাথ মুখােপাধ্যায় বিরচিত “মমতার ফাসি” নামক এই এ উপন্যাসখানির একটী ক্ষুদ্র ভূমিকা লিখিবার জন্য আমি অনুরুদ্ধ হইয়াছি। এই প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড উপন্যাস-বহুল সুগে একখানি ক্ষুদ্র উপন্যাসের ভূমিকা লেখা একটু শক্ত কথা। নবীন উদ্যোগ গ্রন্থকার এই ক্ষুদ্র উপন্যাসে যে কয়টা সুন্দর ও অসুন্দর চরিত্র চিত্ৰণ করিয়াছেন,সেগুলিকে আরও একটু প্রস্ফুটিত করিলে, একখানি বড় উপন্যাস হইত। আশা করি, আশা করি, প্রমান ভবিষ্যৎ সংস্করণে তাহাই করিবেন। জগতে শক্তিরূপিণী নারী দুই মূর্তিতে বিরাজ করিতেছেন। কোথাও তিনি দেবী,-সংসার-রক্ষাকারিণী ; কোথাও তিনি পিশাচী-রূপে সংসার- ধ্বংসকারি ;—কোথাও তিনি অশান্তির সংসার শান্তিময় করিয়া গড়ি তেছেন, আবার কোথাও তিনি চামুণ্ডা-মূৰ্ত্তিতে সুখের সংসার ভাঙ্গিয়া মার করিতেছেন। গ্রন্থকারের চিত্রিত বিধবা বঙ্গবন্ধু মিত্ৰগৃহিণী আদর্শ নারী-চরিত্র। তিনি পথ-পরিত্যক্ত, পিতৃ-বিতাড়িত কালীধনকে পথ হইতে কুড়াইয়া লইয়া গিয়া, যেরূপ মাতৃস্নেহে পালন করিয়াছিলেন,-“মমতার ফাসিতে যেমন ধীরে ধীরে আবদ্ধ হইয়াছিলেন ও শেষে তাহারই জন্য ঘটনা চক্রের মধ্য দিয়া আত্ম-বিসৰ্জন করিয়াছিলেন, এ কেবল দেবী-চরিত্রেই সম্ভব। এই দেবী-চরিত্রের পার্শ্বে কালসপিণী দত্তগৃহিণীকে রাখিয়া প্রকার মিত্ৰগৃহিণী অন্নপূর্ণার চরিত্রটা বেশ ফুটাইয়া তুলিয়াছেন। নারী-হৃদয়ের প্রচ্ছন্ন নারকীয় ভাব কতদুর ভীষণ ও শশাচনীয় হইতে পারে, তাহা দত্ত- গৃহিণীর প্রত্যেক কাৰ্য্যে ও কথায় পরিস্ফুট হইয়াছে। আর পতিপরায়ণা, পতি-হিতে একান্ত-সমপিত-প্রাণা কালীধনের পত্নী সুপ্রভা যেন কোন এক নুতন স্বর্গের দেবী। তবে বইখানির আকার ছােট বলিয়াই বােধ হয় গ্রন্থকার पूज এই মাধুৰ্য্যময়ী সাধ্বীকে নানা ঘটনার মধ্য দিয়া, পূর্ণ-শতদলের মত ফুটিয়া উঠিবার অবসর ও সুযােগ দান করেন নাই। তাহা না দিলেও, দুই একটা ঘটনার সমাবেশেই তাহার যে কোরক-মাধুরী জাগিয়া উঠিয়াছে, তাহাতেই প্রাণকে আকৃষ্ট করে। এই গ্রন্থের পুরুষ চরিত্রও নিন্দনীয় নহে। মিত্ৰগৃহিণীর সহিত মাতৃভক্ত কালীধনের কথােপকথনগুলি, তাহার কৃতজ্ঞতা ও পুত্ৰোচিত ব্যবহার স্থানে স্থানে বড় মর্মস্পর্শী। কালীধন-সুপ্রভার প্রেসচিত্র ও আত্মত্যাগের ইতিহাস বড় মনােজ্ঞ হইয়াছে। কালাধনের পিতা দত্তমহাশয়ের দ্বিতীয় পক্ষের দার- গ্রস্ত চরিত্র বেশ স্বাভাবিক এবং কালধিনের নিকট তাহার সঙ্কোচপূর্ণ অপ্র- তিভ ভাব,--তাহার মধ্য হইতে স্বভাবজাত পিতৃত্ব সে একেবারে নিৰ্ম্মল হয় নাই,তাহা প্রমাণিত করে। উপন্যাস-জগতে বৰ্তমান লেখক নবাগত হইলেও, তিনি সাহিত্য-ক্ষেত্রে একেবারে অপরিচিত নহেন। ইহার রচিত সারগর্ভ ও সুললিত প্রবন্ধ- কবিদি মধ্যে মধ্যে মাসিক বসুমতী, প্রবাসী, পল্লীবাণী, বঙ্গবাসী ও হিত- বাদী প্রভৃতি পত্রিকার পৃষ্ঠদেশ অলঙ্কত করিতে দেখিয়াছি। মােটের উপর, গ্রন্থকারের ভাষার একটা বাঁধুনী আছে, বর্ণনার একটা শক্তি আছে, মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণের একটা প্রচেষ্টা আছে এবং পল্লী রচিত্র ও চরিত্র অঙ্কনের একটা দক্ষতা আছে। সত্যই, উপন্যাসখানি আমার ভাল লাগিয়াছে । গ্রন্থকার আমার পরম স্নেহভাজন,সুতরাং, তাঁহার সম্বন্ধে একটা স্নেহের পক্ষপাত স্বভাবতই আসিতে পারে । তাহা হইলেও বলিব,—উপন্যাসখানি সাহিত্য-রস-পিপাসু-গণের নিকট সুখপাঠ্য ও উপভােগ্য হইবে, সন্দেহ নাই । শ্রীহরিসাধন মুখােপাধ্যায়।

অনেক দিনের সাধ-সাধনায়
তােমার পরশ পেয়ে,
নবীন এ বীণকারের বীণায়
উঠ লাে যে গান গেয়ে ?
কোন্ সুরে তার যন্ত্র বাঁধা,
এখনাে তায় যায় নি ধাঁধা,
তােমার সুরেই সুর মিলাতে
চলছে শুধু ধেয়ে ।
তােমার উদার সুরের তলে
বেসুর তাহার সুর,
সপে দিয়ে রইলাে বলে,
ভাবনা করে’ দূর,-
জানি,—তােমার সুর-সাগরে,
সুর-বেসুরা মিশলে পরে,
মিলন-গভীর মধুর সুরে
সবায় রাখাে ছেয়ে ।
নববর্ষ, প্রথম বাসর,
১৩৩৩
যতীন্দ্রনাথ

No text on this page.

মমতার ফাঁসি ( ১ ) পুরাতন পঞ্জিকা বাহির করিয়া বঙ্গবাসী নুতন পঞ্জিকার চির নূতনত্ব গৰ্ব্ব খর্ব করিয়াছে,--কিন্তু মিত্রদের ক্রমসংকীর্ণ, শৈবালাচ্ছন্ন, ভগ্নসােপান প্রাচীন পুষ্করিণীর ‘নতুন পুকুর' আখ্যা আজিও অক্ষুন্ন রহিয়াছে। জ্যৈষ্ঠ মাস,—ভয়ানক গরম ; আগুন-মাখা হাওয়া রহিয়া রহিয়া বহিয়া যাইতেছিল। মাৰ্ত্তগুদেব পূর্ণপ্রতাপে অনলধারা বর্ষণ করিতেছিলেন। আম- কাটাল-পাকান গরম,-বড় সােজা কথা ত নয়। সে দিন আবা একাদশী। মিত্ৰগৃহিণী শিব-পূজা করিয়া নতুন পুকুরে ফুল বিল্বপত্র দিতে আসিয়াছিলেন। মিত্ৰগৃহিণীর একটু পরিচয় আবশ্যক। নতুন পুকুরের উত্তর প্রান্তে ঐ যে ভগ্নপ্রাচীর,-পূজার দালানের গাত্রে একটী অশ্বখ বৃক্ষ শিকড় গাড়িয়া কর আদায় করিতেছে, ঐটীই গ্রামস্থ প্রাচীন জমিদার মিত্র মহাশয়দের বাটী। গৃহ আছে, কিন্তু গৃহী রামকমল মিত্র দ্বিতীয়বার দ্বার পরিগ্রহ করিয়াও নিঃসন্তান অবস্থায় অনন্তধামে চলিয়া গিয়াছেন। ইতঃপূর্বে প্রথমা গৃহিণী সীমন্তিনী নাম রক্ষা করিয়া স্বর্গারােহণ করেন, কিন্তু দ্বিতীয়ার ভাগ্যে সে সৌভাগ্য মমগরাসি। । ঘটিয়া উঠে নাই। মিত্ৰগৃহিণী উক্ত রামকমল মিত্র মহাশয়ের দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী। অল্প বয়সেই মিত্ৰগৃহিণী বিধবা হইয়াছেন। রৌদ্রক্লিষ্ট, অনশন-বিশুষ্ক মুখখানিতে এখনও যৌবনের ফুল্লসৌন্দৰ্য্য বিরাজ করিতেছে। তবে তাহাতে লালসার উদ্দীপনা নাই,—কি এক মধুর সৌম্যভাব প্রকাশ পাইতেছিল। বিষয়ের উত্তরাধিকারিণী হইয়া, মিত্ৰগৃহিণী দান-ধ্যান, ব্ৰত-উপবাস প্রভৃতিতে দিনাতিপাত করেন। প্রত্যহ শিবপূজা না করিয়া জল গ্রহণ করেন না, আর আজ ত একাদশী,—কথাই নাই। আমাদের দেশের কুললক্ষিগণের ধারণা, পুত্রবতী না হইলে নারী-জন্মের সার্থকতা সম্পাদিত হয় না। বস্তুতঃ; মাতৃত্ব-লাভেই রমণীর রমণীয়তা ; মাতৃত্ব হইতেই দাম্পত্য-জীবনের পূর্ণতা সংসাধিত হয়। স্রোতস্বিনী হেলিয়া দুলিয়া, দু'কূল প্লাবিত করিয়া চলিয়াছে,—পূর্ণচন্দ্র-কিরণ-বিম্বিত, কোটী-হীরক- সন্নিভ লহরীসভার বক্ষে লইয়া, অনন্তের কোলে লীন হইতেছে ; কিন্তু যদি সেই প্ৰবাহিণীর সলিলরাশি লবণাক্ততাপ্রযুক্ত শস্যশ্যামলতার অন্তরায় হয়, যদি তাহার তটযুগল তৃণবিহীন কর্দম-মরুর আধারস্বরূপ হয়, তবে সেই দ্রবময়ীর দ্রবত্বে লাভ কি ? তাহার জলরাশি তৃষ্ণাত্তের তৃষ্ণা নিবারণ করিতে পারে না,হাঙ্গর, কুম্ভীরের ভয়ে কেহ তাহার গর্ভে অবগাহন করিতে চায় । সে শুধুই সাগরে মিলিত হয় ;—বােধ করি, সমুদ্রও তাহাকে বক্ষে ধরিয়া শান্তিলাভ করে না ! নিরন্তর পুণ্যকৰ্ম্মনিরতা মিত্ৰগৃহিণীর হৃদয়েও এই দুঃখ বড়ই আঘাত করিত। হায় ! যদি তাহার পরমারাধ্য পতি-দেবতা তঁহাকে একটী সুকুমার শিশু উপহার দিয়া অস্তহিত হইতেন, তাহা হইলে তাহার বিয়ােগ-জনিত যন্ত্রণার কথঞ্চিৎ উপশম হইত। সেই দেবদত্ত আশীৰ্বাদ বক্ষে লইয়া, তিনি তঁাহার শােক-সন্তপ্ত জীবনে কয়েক মুহূর্তের জন্যও ত শীতলতা অনুভব করিতে মমতার ফাসি। পারিতেন। পূজার সমাপ্তি হইতে না হইতেই, প্রসন্ন হইয়া বরদান করিবার পূৰ্বেই তাহার আরাধ্য-প্রতিমা বিসর্জিত হইয়াছে,-জন্মান্তরীণ কর্মফল- রূপ ত্রুটীবশতঃ দেবতা আপনিই অন্তহিত হইয়াছেন! এই ব্যর্থ কামনার মর্মন্তুদ দুঃখে, মিত্ৰগৃহিণীকে মধ্যে মধ্যে বড়ই কাতর করিয়া তুলিত। তিনি শিবপূজা করতেন ;-পূজান্তে কাননা করিতেন -হে দেবাদিদেব ! আমি আর কিছুই চাহি না,আমায় এই বর দাও,—যেন পরজন্মে আমি আমার স্বামীকেই স্বামীরূপে পাইয়া চিরসুখিনী হই,-এ জন্মে মাতৃনামের অধিকারিণী হইতে পারিলাম না,—জন্মান্তরে যেন আমার সে সাধ অপূর্ণ না থাকে। সরােবরের সােপানপার্শ্বে, মনুষ্য-পদস্পর্শের সম্ভাবনা নাই এমন স্থানে মিত্ৰগৃহিণী তাম্রকুণ্ড হইতে শিবলিঙ্গসমেত ফুলবিল্বপত্রগুলি রাখিতে রাখিতে বলিতে লাগিলেন;~-“বাবা বিশ্বেশ্বর, আর কতদিন আমাকে এই যন্ত্রণার মধ্যে রাখবে ? পায়ে কি ঠাই দেবে না?” এমন সময় সহসা তাহার কর্ণে অতি ক্ষীণ কণ্ঠে ধ্বনিত হইল,-“মা-- তিনি সােপানের উপর দাড়াইয়া চকিত দৃষ্টিতে ইতস্ততঃ নিরীক্ষণ করিতে লাগিলেন। প্রথমে কিছুই দৃষ্টিগােচর হইল না। সিড়ি বহিয়া উপরে উঠিয়া দেখিতে দেখিতে, দেখিতে পাইলেন,—পুকুরের পশ্চিম তীরস্থ পথের ধারে আমগাছের ছায়ায় একটী কিশাের বালক ধূলায় পড়িয়া একবার এপাশ একবার ওপাশ করিতেছে। মিত্ৰগৃহিণী ত্বরিত গতিতে বালকের নিকটে আসিলেন। দেখিলেন, সুগঠিত-তনু বালকের গৌরকান্তি ম্লান ; মুখখানি রক্তিমাভ,-চক্ষু দিয়া দরবিগলিত অশ্রুপাত হইতেছে। পাংশুবর্ণ ওষ্ঠপুট এত শুষ্ক যে বালক বাকৃৰ্ত্তিতেও কষ্টবােধ করিতেছে। তিনি তাড়াতাড়ি পুষ্করিণী হইতে তাম্রকুণ্ড ভরিয়া জল আনয়ন করিয়া বালকের মুখে ধরিলেন। বালক পান করিল,একটু সুস্থ হইল। তখন ২ মমতার ফাসি। মিত্ৰগৃহিণী করুণ কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করিলেন ;-“এই দারুণ রৌদ্র, কার ছেলে তুমি বাছা, এ সময় পথের বাহির হয়েছ ?” বালক কাতরস্বরে উত্তর করিল ;---“মা, আমার কেউ নেই, তাই পথে পড়ে আছি। মাগো, তুমি আমার মা, হবে ? দেখ দেখি, আমার গায়ে হাত দিয়ে, আমার জ্বর হয়েছে।” মিত্ৰগৃহিণী বালকের গাত্র স্পর্শ করিলেন ;—সত্যই ত গা ধাধা করি- তেছে ! বলিলেন ;—“বাবা আমার কাধে ভর দেও,-ঘরে চলাে।” *: + --- কে বলে মাতৃত্ব কেবল গর্ভধারিণার হৃদয়েই সীমাবদ্ধ? ধরণীতলের যেখানেই খনন কর না কেন, সেই সাগর-মখলার সর্বত্রই জীবের জীবন-স্বরূপ জীবন লাভ করা যায় । সেইরূপ যেখানে অনুসন্ধান কর না কেন, স্ত্রীহৃদয়ে মাতৃস্নেহের পূত-মন্দাকিনী সৰ্ব্বত্রই প্রবাহিত হইতেছে। তবে কোথায় বা বীচিমালিনী জাহ্নবী-ধারার ন্যায়, আর কোথায় বা অন্তঃসলিলা ফনদীর ন্যায়। আমরা সে স্নেহ আকর্ষণ করিতে জানিনা বলিয়া, কখন কখন সেই হৃদয় মরুভূমির আকার ধারণ করে, তখনই স্ত্রী-হৃদয়ে পৈশাচিক নৃত্য দেখিতে পাই। একটী গান শুনিয়াছিলাম “ডাকার মত কই হয় ডাকা ? ভক্তিভরে ডাকূলে তারে শক্ত হয় তার লুকিয়ে থাকা।” কথাটা বড় ঠিক। আমরা ডাকিতে জানি না, তাই ডাকের সাড়া পাই না। নচেৎ যে নারী-জন্মের শৈশব হইতেই মাতৃলীলার অভিনয় আরম্ভ হয়,-কালে ;

মমতার ফঁাসি। তাহাতে সেই স্বভাব-সঞ্জাত মাতৃত্বের অভাব হইবে,—হই কি সম্ভব ? বাল্যে বালিকা পুতুল লইয়া খেলা করে,—পুতুলকে স্নান করায়, ঘুম পাড়ায়, স্তন্য দেয়,—“আমার পােকা, আমার ছেলে" বলিতে অজ্ঞান হয় কেন? কই, বালকে ত তাহা দেখিতে পাই না : মাতৃত্ব না হয় স্বভাব-বিরুদ্ধ,—পিতৃত্বও ত অভিনয় করে না ! তাহার কারণ বােধ হয় আর কিছুই নহে,-পুরুষ নিষ্ক্রিয়, আর প্রকৃতি ক্ৰিয়ালীলা। নারীতে প্রকৃতির প্রকৃতি পূর্ণ প্রকটিত হয়, তাই নারী আজন্ম-জননী ;—নরে তাহা হয় না,তাই নর আজন্ম জনকত্ব-লাভে বঞ্চিত। ; থাক্‌ সে কথা। এখন মিত্ৰগৃহিণী এই অজ্ঞাতকুলশীল বালকটীকে লইয়া বড় বিপদে পড়িয়াছেন। সে বড় বে-এক্তিয়ার করিয়া তুলিয়াছে। সেই জ্বর বাকিয়া ক্রমে বাতশ্লেষ্ম বিকারে আসিয়া দাঁড়াইয়াছে। মিত্ৰগৃহি- ণীর শুশযার ত্রুটী নাই ;—দেশের ভাল চিকিৎসক চিকিৎসা করিতেছেন। নিত্য-নৈমিত্তিক কাৰ্য্য ভিন্ন সকল সময় সেই করুণাময়ী রমণী রােগীর নিকট বসিয়া আছেন। কখন পাখায় বাস করিতেছেন,—কখন গায় হাত বুলাইয়া দিতেছেন, কখন মাথা টিপিয়া দিতেছেন,-একাকিনী সেই বিকারগ্রস্ত রােগীর সেবায় সারারাত্ৰ জাগিয়া বসিয়া আছেন। একদিন বালক বড়ই ভুল বকিতে আরম্ভ করিল। কখন বলে ;-“ভাই। ঘােরট্রপেষক কিরে ?” কখন বলে—“যাই হােক, অঙ্কে ফুলমার্ক।” আবার কখন বলে ;-“হিষ্টরী-জিওগ্রাফিতে যদি পাশ কতে পারি, তবে ফেল করে কে ?” একদিন রাত্রিতে বালক ভারি কান্না জুড়িয়া দিল ;-কঁদে আর বলে ; “বাবা তােমার পায়ে পড়ি, আর আমাকে মেরাে না, ফেল হওয়ার যন্ত্রণার উপর আর মারের যন্ত্রণা সহ্য কত্তে পারি না।” সে যেন শত বেত্রাঘাতের জ্বালায় ছটফট করিতে লাগিল। ।

মমতার-সি। ৬ = বালকের অবস্থা দেখিয়া মিত্ৰগৃহিণীর চক্ষু অশ্রুভারাক্রান্ত হইল। তিনি বালকের মস্তক নিজের অঙ্কের উপর লইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন ;- “অমন করছ কেন বাবা?” বাকের একটু জ্ঞান হইল -বলিল-“কে—মা !” মিত্ৰগৃহিণী বলিলেন ;-“হাঁ বাবা,-এই যে আমি?” বালক আশ্বস্ত হইল,দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলিয়া বলিল ;-“আঃ বাঁচলাম, তবে আর ভয় নেই।” মিত্ৰগৃহিণীর বুঝিতে আর বাকি রহিল না,—বালক এই বৎসর প্রবেশিকা পরীক্ষায় অকৃতকার্য হইয়া পিতার নির্যাতনে বাটী হইতে পলাইয়া আসি- আছে। কিন্তু তবু ভাবিলেন ;-“বিকার,—বিকারে অনেক ভুল বকে।” ( ৩ ) সুচিকিৎসায় ও অক্লান্ত পরিচর্যায় বালক সে যাত্রা রক্ষা পাইল। মিত্র- গৃহিণী বড়ই চিত্তপ্রসাদ লাভ করিলেন, কিন্তু বালকের রােগমুক্তির সঙ্গে সঙ্গে বিষন্নতার বৃদ্ধি দেখিয়া একটু বিমর্ষ ও চিন্তাযুক্ত হইলেন। একদিন বালক আহার করিতে বসিয়াছে। মিত্ৰগৃহিণী তাহার পার্শ্বে বসিয়া বাতাস দিতে দিতে জিজ্ঞাসা করিলেন “বাবা আজ আমি তােমাকে একটা কথা জিজ্ঞাসা কৰ্বো।” বালক বলিল ;-“কি কথা মা ?” মি। তােমার পরিচয় আজ আমাকে জানাতে হবে। বা। সে পরিচয়ে তােমার লাভ কি মা? এইটুকু জান, তুমি মা, আর আমি তােমার ছেলে।

মমতারসি। বু মি। পাগল, তা না হয় হল, কিন্তু তােমার প্রকৃত পরিচয় জানা আমার উচিত। এতদিন তুমি নিরুদ্দেশ হয়েছ, তােমার বাপ মা না জানি কত ভাবছেন। তাদের খবর দেওয়া ত দরকার। বা। মা, সে খবর ত আমিও দিতে পারি ? মি। তুমি যদি না দেও—আমার সংবাদ দেওয়া খুব উচিত। বা। কেন, ছেলেকে কি ভার-বােঝা বােধ হচ্ছে ? তবে কেন আমাকে গাছতলা থেকে কুড়িয়ে আলে? এত পয়সা খরচ করে রােগের সেবারই বা কি দরকার ছিল ? বালক খুব আবেগের সহিত এই কথা কয়টী বলিল। মিত্ৰগৃহিণী তাহার মুখের দিকে চাহিয়া হাসিতে হাসিতে বলিলেন ;- “অত কথা বলছিস কেন বাপু,আগে ভাত খেয়ে নে। তারপর যা হয় হবে।” দুষ্ট বালকও একটু হাসিল। “ক্ষণে দেখা” কথাটা বড় মূল্যবান। আমাদের শাস্ত্রে বিবাহ ব্যাপারে শুভক্ষণে শুভদৃষ্টির যে ব্যবস্থা আছে,—উহা অতি সমীচীন। শুভদৃষ্টির ফলে হৃদয়ে হৃদয়ে যে বিনিময়-কাৰ্য্য সংঘটিত হয়, তাহার আর প্রত্যাহার হয় না। কিন্তু শুধু দাম্পত্য জীবনেই যে ঐ কাৰ্য তাড়িৎ-শক্তির ন্যায়, তাহা নহে, সমস্ত হৃদয়েই এই তারহীন বার্তাযন্ত্র কাৰ্য্য করে। স্নেহ, ভক্তি, প্রেম, প্রীতি সকল প্রকার ভালবাসার সংবাদ এই বার্তাযন্ত্রে চালিত হয়। বরং বার্তাযন্ত্রে সংবাদ প্রেরণ ও প্রতিপ্রেরণের প্রয়ােজন হয়, হৃদ্যন্ত্রে তাহার কিছুই করিতে হয় না ;যে স্বর্ণ মুহূর্তে চারিটী চক্ষুর মিলন হয়, অমনি এক ধ্বনিতে দুইটা হৃদয় ঝঙ্কৃত হইয়া একযােগে দুইটা জীবনকে মধুময় করিয়া তুলে। শুভক্ষণেই মিত্ৰগৃহিণী বালকটাকে দেখিয়াছিলেন, বালকও অতি শুভক্ষণে মিত্ৰগৃহিণীকে দেখিয়া ‘মা’ বলিয়া ডাকিয়াছিল। অমনি উভয়ের অজ্ঞাতসারে

মমতার-ফাসি।
মাতৃত্ব ও পুত্ৰত্ব আসিয়া তাহাদের হৃদয় জুড়িয়া বসিল। মিত্ৰগৃহিণী পুত্র-সুখে
বঞ্চিত।। আহা! বালকেরও বুঝি মা নাই
আর একদিন সময় বুঝিয়া মিত্ৰগৃহিণী বালককে ধরিয়া বসিলেন,
?
বলিলেন ;-
৫
“দেখ বাপু,আমাকে আর রােজ রােজ ফঁাকি দিস্ নি,বল তাের
নাম কি ?”
বালক কি ভাবিয়া বলিল—“আজ বলবাে। কিন্তু মা, তুমি আগে আমার
কাছে এক কড়ার কর, আমি যা বলবাে, তুমি তাই শুনবে?”
মিত্ৰগৃহিণী উৎসুকভাবে বলিলেন ;—“শুবাে।” বালক আবার
বলিল,-“ঠিক ত—বল, আমার মনে কষ্ট দেবে না?”
মি। না।
বা। দেখ, দেখ, তা হলে কিন্তু আমি আবার পালাবে।
মি। না—তার পালাতে হবে না, তুই বল ।
( ৪ )
বালক বলিতে লাগিল ;-“পিতৃ-নিন্দা মহাপাপ। মা, তােমার নিকট
সমুদয় খুলে না বললে ত আমার প্রকৃত পরিচয় দেওয়া হবে না। আমার
জ্ঞান হওয়া থেকে জানি,বাবা মাকেও দেখতে পারেন না, আমাকেও
তাই। তিনি চক্রবর্তী বাবুদের সরকারে গােলদার আবাদে নায়েবী করেন।
তিনি বড় মদ খান,নেশার ঘােরে এক এক দিন মাকে আমার এমন

মুমতার ফঁাসি। মার মাৰ্ত্তেন যে, চোরকেও কেউ অত মার মারে না? যাক্, মার হাড় জুড়িয়েছে। আজ দুটী বছর আমি আমার মাকে হারিয়েছি। “ছ'মাস যেতে না যেতে বাবার সংসার অচল হয়ে উঠলাে,তিনি আবার বিয়ে করলেন। বিমাতা এলেন তার বয়সী। অতি সত্বরই তিনি তার সংসার বুঝে নিলেন। বাবাকে বুঝিয়ে দিলেন, কি বা নিজেই বুঝলেন, তা আমি বলতে পারি না,তবে আমি বুঝলাম, আমি তাদের একটী বােঝ। হয়েছি। তখন আমি সেকেণ্ড ক্লাশে পড়ি। ফাষ্ট ক্লাশে প্রমােশন পেয়ে, পাই পড়তে সময়, না হয় কিছু। মা ঠাকরুণের ফরমাসে আমার দিনে সময় পাওয়া ভার হত। রাত্রে তেল পুড়লে মা বকে, কোন কোন দিন রাগ করে আলােটা নিবিয়েও দিতেন! “যা হােক, এক রকম করে কষ্টে-সৃষ্টে টেষ্টে পাশ করান। ফির টাকা চাইতে বাবা বললেন,“দেখ, পাশ হবি, ঠিক বুঝিস্ ত টাকা জমা দে, নচেৎ মিছেমিছি টাকা নষ্ট কর্তে পারবি নি। আমি ক্লাশে মন্দ ছেলে ছিলাম না, পাশ কৰ্ত্তে পিরবাে বুঝে টাকা নিয়ে জমা দিলাম। কিন্তু ভাগ্যক্রমে পাশ কর্তে পারলাম না। ফেল হয়েছি শুনে বাবা ত আগুন। আমি বললাম- বাবা, পাশ ফেল বরাতে করে। আর বার আমি ভাল পড়তে পারি নি ;- এবার ঠিক পাশ হবাে। বাবা আমার কথার জবাব দিলেন ;—আমি আর যাড়ের খােরাক যোেগাতে পারবে না। যদি ভাল চা, আমার সঙ্গে চল,- বাবুদের সরকারে ঢুকিয়ে দি,-আর তা যদি না করিস,আমার বাড়ী থেকে আমি অকর্মণ্য ছেলের মুখ দেখতে চাই না। আমার রাগও হল, অভিমানও হল। আমি বলাম,বাবা, এ ষাড় কি তােমার কোনও কাজে লাগবে না? যদি মানুষ হতে পারি তবে বাড়ী আসলে, নতুবা এই শেষ, বলে বাবাকে প্রণাম কর্তে গেলাম। বাবা আমায় এক লাথি মারলেন, শেষে গলা ধরে বাড়ীর বার করে দিলেন। দূর হয়ে যা।

মমতার শসি। “মনে ভারি দুঃখ হল,—মার কথা মনে উঠতে লাগলাে, রাস্তার ধারে বসে খুব খানিক কাদলাম । শেষে মনে মনে এই প্রতিজ্ঞা করে বেরিয়েছি- যদি মানুষ হতে পারি, তবে গােবর্ধন দত্তের ভিটেয় পা দেবব, নচেৎ নপাড়ায় আর আসবে না, এমন কি কালীধন দত্তের নাম পর্যন্ত জগৎ থেকে মুছে ফেলবাে। “হায় ! মা যদি বেঁচে থাকতেন, তা হলে বাবা কি আমার উপর এতটা দুর্ব্যবহার কত্তেন? মার অভাবটা মনে বড়ই বাজতে লাগলাে। কি করবাে ?—পথ চলতে লাগলাম। সারাদিন হেঁটে এক গাছতলায় শুয়ে ব্রাত কাটালাম। সকালে ঘুম ভাঙতে দেখি,-সৰ্বাঙ্গ ব্যথা, জ্বরভাব। ভাবলাম,—পথ হেঁটে হয়েছে। তবু হঁটেতে হাঁটতে শেষে দারুণ রৌদ্রে একেবারে অবসন্ন হয়ে নতুন পুকুরের ধারে আম গাছতলায় অজ্ঞান হয়ে পড়লাম। কতক্ষণ এই ভাবে ছিলাম ঠিক বলতে পারি না। কিন্তু যখন জ্ঞান হল,—দেখি, তুমি আমার মা হয়ে আমার সামনে এসে দাঁড়িয়েছ !” বালক বলিতেছিল,আর তাহার গণ্ড বহিয়া অশ্রু গড়াইতে ছিল। মিত্ৰগৃহিণী অঞ্চল দিয়া মধ্যে মধ্যে সেই অশ্রু মুছাইতেছিলেন, আর নিজে কঁদিতেছিলেন। বালকের কথা শেষ হইলে বলিলেন ;—“বাবা কালী, আমিই তােমার মা,-তােমাকে আর কোথাও যেতে হবে না।” ০ [*] ( ৫ ) মিত্ৰগৃহিণী গ্রামের স্কুলে কালীধনকে ভর্তি করিয়া দিলেন। কালীধনও পূর্ণ উদ্যমে পাঠাভ্যাস আরম্ভ করিল। জগতে সচরাচর দুই শ্রেণীর চরিত্র-বিশিষ্ট মনুষ্য দেখিতে পাওয়া যায়। একরূপ লােক যত আঘাত খায়,যত বাধাবিশ্নের সম্মুখীন হয়, যত নির্যাতিত ১১ মমতার সি। ও অপদস্থ হয়, ততই তাহার উদ্যম দ্বিগুণ হইতে দ্বিগুণতর হইতে থাকে ;- উপলখণ্ডে প্রতিহত গিরি-স্রোতের ন্যায় তাহার উৎসাহ ও অধ্যবসায় তীব্রতর বেগে প্রধাবিত হয়। কিন্তু আর এক প্রকার লােক আছে, সে একেবারেই ঘাতসহ নহে,-বিঘ্ন-বিপত্তির মধ্যে সে দিশাহারা হইয়া যায়, নির্যাতনে সে মূহ্যমান্ হইয়া পড়ে। কিন্তু যদি উৎসাহ পায়, পরে যদি তাহাকে অনুপ্রাণিত করে, তাহা হইলে সে প্রদীপ্ত প্রদীপের ন্যায়ই উজ্জ্বল হইয়া উঠে এবং স্বীয় রশ্মিজালে দিগদিগন্ত আলােকিত করে। আয়াদের কালীধনের এই দ্বিতীয় শ্রেণীর চরিত্র। নিষ্পেষিত হইয়া তাহার প্রতিভা বর্ষাসিক্ত দীপ-শলাকার ন্যায় নিস্তেজ অবস্থায় ছিল, আজ নুতন আশ্রয়ে, নুতন উদ্দীপনার উত্তাপে প্রজ্বলিত হইয়া উঠিয়াছে দেখিতে দেখিতে পরীক্ষার সময় আসিল। পরীক্ষা দিয়া কালীধন গৃহে আসিয়া বলিল ;- “মা, এবার আমাকে কিছুতেই ফেল কত্তে পাব্বে না।” এ দিকে চক্রবর্তী বাবুদের বৈঠকখানায় বসিয়া নায়েব গােবর্ধন দত্ত মহাশয় নাকের ডগায় চশমা লাগাইয়া খবরের কাগজ পড়িতেছিলেন। প্রবেশিকা পরীক্ষার ফল বাহির হইয়াছে। হঠাৎ তাহার চক্ষে পড়িল,—প্রথম বিভাগের মধ্যেই,—দত্ত-কালীধন—চম্পাপুর হাই। দত্ত মহাশয় পার্শ্বে উপবিষ্ট-খাতাঞ্চি ত্রৈলােক্যবাবুকে বিস্ময়ের সহিত বলিয়া উঠিলেন ;-“ওহে,—দত্ত কালীধন চম্পাপুর হাই যে—সে কি।” খাতাঞ্চি মহাশয় বিদ্রুপব্যঞ্জক ঈষৎ হাসির সহিত বলিলেন ;-ও আর কিছুই নয়, গােৰ্দ্ধন দত্তের ছেলে কালীধন দত্ত, চাপাপুর হাইস্কুল থেকে ফাষ্ট ডিভিসনে পাশ হয়েছে।” অপ্রতিভ দত্ত মহাশয় বলিলেন ;-“তা ত বুঝলাম, কিন্তু সে যে চাপাপুরে আছে, ত—আমি এতদিন জানতে পারি নি !” খাঞ্চি মহাশয় অমনি উত্তর দিলেন ;-“তা তুমি জানবে কি করে?

মমতার ফাসি। জাতে দিলে ত জাবে?—জানতে চেষ্টা করেছিলে কি ?” দত্ত মহাশয় বলিলেন -“তা বটে,-তা বটে,—আমি তার পরেই আবাদে চলে এলাম,—নানা হাঙ্গামে ফিতেও দেরী হল ;-আর ছেলেটাও তখন বড় বেয়াদব হয়ে পড়েছিল।” খাতাঞ্চি মহাশয় অমনি মুখের উপর বলিলেন ;-“দেখ, দত্তজা, ও কথা বলল না,তােমার ছেলে বেয়াদব না তুমি বেয়াদব !” দত্ত মহাশয় কথাটা চাপা দেওয়ার উদ্দেশ্যে বলিলেন,—“তা যাই হােক, বাড়ী গিয়ে হেঁড়াটার খােজ নিতে হচ্ছে।” বাতাঞ্চি মহাশয় বলিলেন ;-“ভাই, অমন কাজটা করাে না। সে বেশ আছে—এখন আর তাকে ঘা দিও না। বাড়ীতেও কিছু বলল না, হিতে বিপরীত হবে। সে যখন ভাল বুঝবে, আপনি ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে আসবে।” দত্ত মহাশয় কি ভাবিলেন ;-বলিলেন ,-“আচ্ছা তবে তাই হােক।” ; ( ৬ ) শেষ রাত্রিতে এক পশলা বৃষ্টি হইয়া গিয়াছিল। প্রভাতে আকাশ নির্মল হইয়া বেশ রৌদ্র বাহির হইয়াছে। সদ্য প্রকৃতি সূৰ্যকরােজ্জ্বল গরদের শাটী পরিয়া বড় সুন্দর দেখাইতেছিল। মিত্ৰগৃহিণীও এইমাত্র স্নান করিয়া আসিয়া ঠাকুর ঘরে সিক্ত বসনে বসিয়া শিবলিঙ্গ গঠনে ব্যাপৃতা। পূৰ্বদিকের গবাক্ষ-পথ দিয়া সূর্যরশ্মি তাহার ঘনকৃষ্ণ উন্মুক্ত চিকুরজালের উপর ক্রীড়া করিতেছিল।

মমতার ফাঁসি। “মা, এমন সময় কালীধন আহলাদে নাচিতে নাচিতে আসিয়া বলিল আমি পনের টাকা বৃত্তি পেয়েছি।” মিত্ৰগৃহিণী হাসিতে হাসিতে ববিলেন -“কেমন আমার স্বপ্ন ফলেছে ? এখন যাও তােমার মাষ্টার মশায়দের বলে এস,আজ তাদের নিমন্ত্রণ।” কালীপন মিত্ৰগৃহিণীকে প্রণাম করিয়া, দ্রুতপদবিক্ষেপে বাহির হইয়া গেল। মিত্ৰগৃহিণী বাৎসল্যপূর্ণ দৃষ্টিতে কালীধনকে যতক্ষণ দেখিতে পাইলেন, দেখিতে লাগিলেন। পরে বলিলেন ;-“কালী আমার কে? পরের ছেলের জন্য আমার মন এমন হয় কেন? বিশ্বনাথ ! তিনি জীবিত থাকতে, আমি তােমার নিকট পুত্র কামনা কর্তাম। তাই কি এইভাবে আমাকে পুত্র- সুখে সুখী কচ্ছ? আজ আমার বড় আনন্দ,কালী আমার পনের টাকা জলপানি পেয়েছে।” “মার পােড়ে না মাসীর পােড়।” কালীনের পিতা বৰ্তমান থাকিতে, বিমাতা—তবুত বর্তমান থাকিতে যত আনন্দ কিনা মিত্ৰগৃহিণীর বক্ষে স্তুপীকৃত হইল ! হিন্দু পূৰ্ব্বজন্ম বিশ্বাস করে,—সম্পর্ক একজন্মের নহে, জন্ম-জন্মান্তরের। স্মৃতি যায়, কিন্তু কর্মজনিত বিধি-নির্দিষ্ট সম্বন্ধ কোথা হইতে কেমন করিয়া ঘূরিয়া ফিরিয়া লাগিয়া যায়, তাহা কে বলিতে পারে ? মিত্ৰগৃহিণী নিজহস্তে রন্ধন করিয়া নানাবিধ ব্যঞ্জনে কালীধনের শিক্ষক- গণকে পরিতােষরূপে ভােজন করাইলেন। শিক্ষকগণ কালীধনকে আশীর্বাদ করিয়া গৃহে ফিরিয়া গেলেন। সেইদিন মিত্ৰগৃহিণী কালীধনকে বলিলেন ;-“এইবার একবার বাড়ী থেকে এখন আর তােমার বাপের রাগ নেই। আরও তুমি পাশ করে বৃত্তি পেয়েছ শুনে খুসী হবেন।” অভিমানী পুত্র উত্তর দিল ;-“কেন মা, ছেলেকে বিদায় দিয়ে দিনকতক এক মনে শিবপূজা কৰ্ব্বে বলে কি যেতে বলছ ? , আর ত আমি বেশী দিন তােমার কাছে থাকতে পাছি না। ঘূরে এস। - মমতার সি। জুলাই মাসে কলেজ খুললেই কলকাতায় গিয়ে ভর্তি হতে হবে। তখন ত আর তােমাকে জ্বালাতন কৰ্বো না, খুব শিবপূজা করাে।” অভিমানিনী মাতা উত্তর দিলেন ;-“যা,আমি তােকে আর কিছুই বলবাে না। তুই কথায় কথায় শিবপূজা নিয়ে ঠাট্টা করি।” কালীধন হাসিতে হাসিতে বলিল ;--“মা-শিবপূজা কর কেন?” ভক্তি- পূর্ণম্বরে মাতা উত্তর দিলেন ;-“অভীষ্ট-লাভের জন্য।” কালীধন জিজ্ঞাসা করিল ;-“আচ্ছা আমাকে যে পেয়েছ, এও কি তােমার একটা অভীষ্ট ছিল ?” মাতা উত্তর দিলেন। “তা ঠিক জানিনা, তবে বােধ হয় তাই।” দুষ্ট পুত্র বলিল ;-“কিন্তু মা, একটা কথা বলি,—দেখাে,অভীষ্ট-সিদ্ধির পরে যেন শিবপূজায় অমনোেযােগী হয় না।” পুত্রের এই উক্তিতে মাতার মনে কি একটা খটকা লাগিল ;-প্রকাশ্যে বলিলেন ;-“যা, তাের আর আমাকে শিখাতে হবে না।” আবার ভাবিলেন, তাই ত? == ; ( ৭ ) যথা সময়ে কালীধন কলিকাতায় গিয়া কলেজে ভর্তি হইল এবং দ্বিগুণ উৎসাহে পড়াশুনা করিতে লাগিল। স্নেহের বস্তু দূরে যাইলে মানুষের মন অমন হয় কেন? যাহার সহিত অন্তরের বিনিময় হয়,--যাহার চিরসুন্দর ছবির ছাপ হৃদয়ের উপর প্রােজ্জ্বলভাবে অঙ্কিত হইয়া যায়, কালের অবিশ্রান্ত বারিপাতে যে ছবি ম্লান হইয়াও হইতে মমতার সি। চায় না,—এমন যে অতি নিকটের বস্তু,—চক্ষুর বাহিরে চলিয়া গেলে, মন চঞ্চল হয় কেন ?—প্রাণ ব্যাকুল হইয়া কঁদিতে ইচ্ছা করে কেন? মিত্র- গৃহিণী পুত্র-স্নেহের মােহে পড়িয়াছিলেন। নিৰ্ম্মল মােহ-তবু ভাল কি ? পার্বত্য প্রদেশের কূপজল-স্বাদু, স্বাস্থ্যকর ; কিন্তু পঙ্কিল গঙ্গোদকে মিশিয়া সমুদয় কূপজলে পরিণত করে,—তাহাতে দেবপূজা হয় না। ফলতঃ, কালীধন কলিকাতা যাওয়া অবধি, মিত্ৰগৃহিণীর সব কাজে কি এক শৈথিল্য আসিয়া উপস্থিত হইয়াছে। নিত্য-নৈমিত্তিক সর্ববিষয়ে কেমন যেন ঔদাসীন্য দেখা যাইতেছে। মিত্ৰগৃহিণী শিবপূজা করিতে বসেন,—শিবের ধ্যান করিতে করিতে কালীধনের মূর্তি তাহার মানস-নেত্রের সম্মুখে আসিয়া দাড়ায় ! তিনি প্রণতা হইয়া প্রার্থনা করেন ;---“বাবা, বিশ্বেশ্বর,--আমার কালীধনের ভাল কর !” দ্বিপ্রহরে মিত্ৰগৃহিণী মােজা বুনিতেছেন—কালীধনের জন্য, রুমাল তৈয়ারি করিতেছেন-কালীধনের জন্য। কোনদিন পত্র লিখিতে বসেন,-লিখেন,- “বাবা কালীধন, তুমি কেমন আছ? কবে ছুটী হইবে? কবে বাড়ী আসিতেছ?” কালীধনের আসিবার সম্ভাবনা থাকিলে, পূৰ্বদিন রাত্রি দ্বিপ্রহর অবধি মিত্ৰগৃহিণী ক্ষীরছাচ, চন্দ্রপুলী প্রভৃতি প্রস্তুত করিতেছেন। রামায়ণ ও মহাভারতের যথাক্রমে উত্তরাকাণ্ড ও দণ্ডীপৰ্ব পর্যন্ত পড়া হইয়াছে,আর ত পড়িবার সময় হয় না ! পূজার বন্ধে কালীধন বাড়ী আসিল। মিত্ৰগৃহিণী মহাব্যস্ত। স্বহস্তে নূতন নূতন দ্রব্যাদি রন্ধন করিয়া কালীধনকে খাওয়াইতেছেন। স্বহস্তে পুত্রের জন্য শষ্যারচনা করিতেছেন। কালীধন শায়িত,—নিজে শিয়রে দাঁড়াইয়া ব্যজন করিতেছেন—কখন মাথায় হাত বুলাইয়া দিতেছেন। একদিন কালীধন হাসিতে হাসিতে মাকে বলিল ;- “মা ! তােমার একি ভাব ? আমার জন্য যেন তুমি পাগল হয়েছ !”

মমতার সি।
;
মাতা উত্তর দিলেন
-“বাবা কালী, আমি কি এত বেশী করছি? ভেবে
দেখ দেখি,আজ যদি তাের মা থাক্‌তেন,“তুই বিদেশ থেকে বাড়ী এলে,
তাের জন্য তার মনের ভাবটা ঠিক এমনি হত কিনা—এর চেয়ে বেশী হত
কিনা? তার সেই সুখটুকু আজ আমার ভাগ্যে যদিও এসেছে, হারে,
তুই তার হন্তা হতে চা?”
কালীধন বর্ণিল ;-“না যদি জীবিত থাকতেন,—বােধ করি, তিনি এতটা
কৰ্তে পাৰ্ত্তেন না : শা, তুমি আমার মারও বেশী !”
মিত্ৰগৃহিণী বলিলেন ;-“ছিঃ ! ও কথা বলতে নেই। তিনি স্বর্গে
গিয়েছেন। স্বর্গ থেকে তিনি তােমাকে আশীৰ্বাদ কচ্ছেন, আর আমাকে,
তােমার জন্য তার সঞ্চিত মেহরাশির একটুখানি উপহার দিয়েছেন, তাই
তুমি আমার ছেলে,—আর আমি তােমার মা।"
কালীধন হাসিতে হাসিতে বলিল ;-“মা,-এ সব কথা তুমি পাও কোথা
থেকে? যাও, ভাত শুকিয়ে গেল, খাও গিয়ে।”
মিত্ৰগৃহিণী চলিয়া গেলেন। কালীধন অবাক হইয়া মাতৃমূর্তি নিরীক্ষণ
করিতে লাগিল।
;
( ৮ )
এইরূপে দিন যায়। দেখিতে দেখিতে কালীধন এবারও পাশ:হইয়াবৃত্তি:
পাইল। বলা বাহুল্য, মিত্ৰগৃহিণী অধিকতর আনন্দিত হইলেন। কালীধন;
বাড়ী আসিলে তিনি আবার তাহাকে একবার বাড়ী যাইতে অনুরােধ করি-
লেন। বলিলেন
*

১৭ মমতার ফঁসি। “বাবা, এবার ত একটু মানুষের মত হয়েছ। যাও,-বাড়ী থেকে দূরে এস।” কালীধন বলিল -“মা, ঐটাই তােমার মহৎ ভুল। আজকালের বাজারে, শুধু পাশ কলে,—শুধু লেখা-পড়া শিখলে কি মানুষ মানুষ হয়? এখন পয়সায় মানুষ মানুষ। এখনও ত আমি বাবার রােজগেরে বেটা হতে পারি নি। এখনও যে তাকে সঁড়ের খােরাক যােগাতে হবে !” কালীধন ঠিক কথাই বলিয়াছিল। কিন্তু মিত্ৰগৃহিণী বলিলেন,-ছি, বােকা ছেলে, এত লেখা-পড়া শিখলি, তবু তাের ছেলেমি বুদ্ধি গেল না! হারে,—ইংরিজি পড়লে কি বাপের ভুল ধরা স্বভাব হয়ে যায় ! ভেবে দেখ, দেখি, তাের বাপ ভুল করেছিলেন—না ঠিকই করেছিলেন ?” কালীধন মাতার পানে চাহিয়া কিছুক্ষণ পরে বলিল ;-“মা, আমার অপ- রাধ হয়েছে, আমায় মাপ কর। অমন কথা আর মুখে আববা না। কিন্তু মা,-তােমার পায়ে পড়ি,ডাক্তারিটা পাশ করে তারপর বাড়ী যাবে।” মিত্ৰগৃহিণী ছেলের স্বভাব জানিতেন। ও সম্বন্ধে আর বেশী কিছু বলিলেন না। কিয়ৎক্ষণ পরে অন্যান্য প্রসঙ্গের শেষে তিনি বলিলেন ;-“আচ্ছা কালী, আর একটা কথা বলবাে-রাখবি?” “কি কথা বলনা ?” “রাখবি ত বল ?” “তােমার কোন্ কথা রাখিনা মা?” “এই ত তােকে বাটী যেতে সাধছি—গেলি না।” “মা, আমাকে প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ কর্তে বল? “অমন প্রতিজ্ঞা:কর্তে নেই,—আর ও প্রতিজ্ঞাই নয়। যাক, এবার যে কথাটা বলবাে রাখবি?” কালী হাসিল, বলিল ;-“ওঃ ! বুঝেছি—ফঁাসি পরাবার চেষ্টা !”

মমতার ফাসি।
"
মিত্ৰগৃহিণী বলিলেন ;-“তাই।”
কালীধন গম্ভীর ভাবে বলিল ;-“মা, দেখতে পেয়েও শুনতে চাও ?”
মাতা এইবার একটু চটিলেন, বলিলেন ;-“দেখ, কালী,তাের কিসের
অভাব ? তার বাপ-মাও ছন্নছাড়া নয়। আমার এ অনুরােধ তােকে
রাখতেই হবে।”
কালীধন বলিল ;-“মা, তােমার কথা ফেল্পে আমার মহাপাপ। তবে
ক্লিটে বছর সবুর কর। আর একটা কথা,-বাবার মত নিয়ে এ কাজ করা
উচিত নয় কি?”
মিত্ৰগৃহিণী উৎসাহপূর্ণ কণ্ঠে বলিলেন ;-“এখন পথে এস। এইত বাবার
বেটার মত কথা। আচ্ছা তঁার মত আমিই নেব।”
;

মমর ফঁসি। পরদিন কালীধন মেডিকেল কলেজে ভর্তি হইতে কলিকাতায় চলিয়া গেল। দুপর-বেলা মিত্ৰগৃহিণী কালীধনের বাটীতে পত্র লিখিতে বসিলেন। তিনি লিখিলেন ;- সহায়। চম্পাপুর, ১৪ই আষাঢ়, বুধবার। দিদি, সাক্ষাৎ-সম্বন্ধে তােমার সহিত আমার কোনও আলাপ-পরিচয় নাই। কিন্তু ভগবানের অনুগ্রহে আমি তােমাদের কালীধনকে আমার পুত্ররূপে লাভ করিয়াছি, সেই সূত্রে আজ আমি তােমার ভগিনী। প্রায় পাঁচ বৎসর হইল, কালীধন আমার নিকটে আছে। আমি তাহাকে কি চক্ষে দেখিয়াছি, বলিতে পারি না। তাহার আবদার রাখিতে আমি এতদিন তােমাদিগকে কোনও সংবাদ দিতে সাহস করি নাই। ভয়,পাছে সে আবার পলায়। ছেলে বড় অভিমানী। আমি তাহাকে আমাদের গ্রামের স্কুলে ভর্তি করিয়া দিই। এখান হইতে পরীক্ষায় পাশ হইয়া ১৫ টাকা জলপানি পায়। তাহার পর কলেজে এল, এ, পাশ হইয়া ২৫ টাকা বৃত্তি পাইয়াছে। এই কথা লিখিতে আমার বুক আহলাদে দশ হাত হইতেছে। দিদি, ইহা আমাদের কত গৌরবের বিষয় ভাবিয়া দেখ দেখি? সম্প্রতি আমাদের গ্রামে তাহার জন্য একটা পাত্রীর সন্ধান করিয়াছি। মেয়েটী বড় সুশ্রী, গুণবতী। মেয়ের বাপের অবস্থা খুবই ভাল। বনিয়াদি ঘর।

মমতার ফঁসি। চাপাপুর ঘােষেদের নাম দেশ-বিখ্যাত। বিবাহে পাঁচ-সাত হাজার টাকা খরচ করিবে। এ বিবাহে কালীধনের মত আছে। কিন্তু সে বলে, যে বাপ মায়ের অমতে এ কাজ করিতে পারিবে না। কথাটা :ঠিক। তােমরা থাকিতে আমার একা এ কাজ করা উচিতও নয়। আমার বড়ই ইচ্ছা, কালীধনকে সংসারী করিয়া তােমাদের ছেলে, তােমাদিগকে ফিরাইয়া দিব। এক্ষণে এ বিবাহে যদি তােমাদের অমত থাকে, আমাকে জানাইও। আর যদি মত থাকে, দত্ত মহাশয়কে একবার অতি অবশ্য এখানে পাঠাইও। তিনি পাত্রী দেখিয়া ও কন্যাকে আশীৰ্বাদ করিয়া বাইবেন। শ্ৰীমান্ কালীধনের একান্ত ইচ্ছা, সে ডাক্তারী পড়িবে । মেডিকেল কলেজে ভর্তি হইয়াছে। শারীরিক কুশলে আছে। তােমাদের কুশল দিতে ঔদাস্ত করিও না। তুমি আমার অন্তরের ভালবাসা জানিও। আশীর্বাদের পাত্রকে আশী- ৰ্বাদ দিও, আর দত্ত মহাশয়কে আমার প্রণাম জানাইও। ইতি ঠিকানা রামকমল মিত্র মহাশয়ের বাটী। চম্পাপুর পাের ও গ্রাম। তােমার মেহাকাক্ষিণী অন্নপূর্ণা । পত্র লেখা সমাপ্ত হইলে সেই দিনই মিত্ৰগৃহিণী তাহা ডাকে রওনা করি- লেন। মনে মনে বলিলেন ;-“বিশ্বনাথ ! কালীর বাপ-মায়ের যেন সৎমতি হয় মমতার সি। (১০) দারুণ বর্ষা পড়িয়াছে। কথায় বলে,-“অভদ্রা বর্ষাকাল, হরিণ চাটে বাঘের গাল।” কিন্তু তাহাই বা বলি কি করিয়া? গ্রীষ্ম, বর্ষা, শীত এ তিনের “এ বলে আমায় দেখ, ও বলে আমায় দেখ।” যখন যিনি আসেন, মানুষকে বাপ, না বলাইয়া ছাড়েন না। তবে তাহার মধ্যে একটা কথা আছে। সেটা এই যে,আমরা অমনি একটুতেই বাপ বলিয়া বসি। বাঙ্গালা দেশের লােক আমরা, একটুতেই বঁচি নরি। যদি একটু গরম পড়িল,- অমনি বলি,-“বাপরে বাপ, কি গরমটাই পড়েছে, ঘামে ঘামে গা পচে গেল, একটু জল হলে বাঁচি।” যদি একটু বর্ষা আরম্ভ হইল, অমনি—“বাপ রে বাপ, কি জ্বালাতেই পড়া গেল, সূর্যের মুখ দেখবার উপায় নেই, দিন রাত্রি বৃষ্টি, কঁহাত পারা যায় ? এ ছি চ-কানুনি আর ভাল লাগে না।” তারপর যদি শীত মহাশয় আলিলেন,-অমনি—“উহুহু ! কি শীতরে বাবা, সৰ্বাঙ্গ কন্ কচ্ছে, গা খুলে বেড়াবার যাে নেই, কবে যে এ বালাই যাবে !” সুতরাং, এই তিন-ই আমাদের কাছে অভদ্র। ওই রকমই হয়,-“যার ছেলে যত পায়, তার ছেলে তত চায়। আমরা একবার ভাবিয়া দেখিনা,--সাহারার অগ্নি- লিপ্ত বালুকার উত্তাপে আফ্রিকার লােক কি করিয়া বাঁচে,—গগনস্পর্শি-গিরি- সানুদেশস্থ প্রদেশে নিত্যবর্যার অত্যাচারে মানুষ কি করিয়া জীবনধারণ করে, তুষারাচ্ছন্ন মেরুপ্রান্তে উৎকট শীতলতার মধ্যে মানুষ কি করিয়া রক্ষা পায় ? ভাবিব কি ?—আমরা যে মায়ের আহলাদে ছেলে ! অধঃপাতে গিয়াছিও সেই জন্য ! যাহা হউক, বর্ষা পড়িয়াছে। আজ দুই দিন ‘নীরধারার শ্রোতােভঙ্গ’ নাই। ন’পাড়ার গােবর্ধন দত্ত মহাশয় তাহার সহস্রছিদ্রযুক্ত-জলপ্লাবিত, দুচালা ঘরে, একপদ-ভগ্ন জল-চৌকীর উপর বসিয়া, দা-কাটা খাসগুড়ুক সেবন করি- তেছেন আর ঝিমাইতেছেন। } মমতার যশসি। গগাবর্ধন দত্তের আর সে সময় নাই। আজ প্রায় এক বৎসর হইল, তাঁহাকে নায়েবী কাৰ্যে ইস্তফা দিতে হইয়াছে। তাহার মুখে শুনা যায়, তিনি স্বেচ্ছায় কাজ ছাড়িয়াছেন। বার্ধক্য দেখা দিয়াছে, তাহার উপর বৃদ্ধ বাবুর দল একে একে গতাসু হওয়ায়, নব্য বাবুর দলে তঁহার মতের খাপ খায় না। কিন্তু লােক-পরম্পরায় প্রচার,-আবাদে কোনও এক খুনী মােকদ্দমায় প্রজারা তাহাকে আসামীশ্রেণীভুক্ত করে। জমীদারের অজস্র অর্থব্যয়ে তিনি প্রাণদণ্ড বা নিৰ্বাসন দণ্ড হইতে রক্ষা পান এবং মাত্র নয় মাস সশ্রম কারাবাস- সুখ সম্ভোগ করিয়া ফিরিয়া আসিলে বাবুরা দয়া-পরবশ হইয়া তাহাকে কার্য হইতে অব্যাহতি দিয়াছেন,—সুতরাং, নিষ্কর্মা অবস্থায় বাটীতে বসিয়া আছেন। বৃদ্ধবয়সে দত্ত মহাশয়ের বড় কষ্ট। তবু ভাগ্য ভাল, এ পক্ষে ষষ্ঠীঠাকুরাণীর অনুকম্পা হয় নাই। পরের ধনে পােদ্দারী করিয়া অর্থ লুঠিয়াছিলেন—খুব। কিন্তু মদে কিছুই রাখিতে পারেন নাই। আর রাখিবেন কি?—গৃহলক্ষ্মী চঞ্চলা। গৃহিণীর মুখের দাপটে তিনি ত তিনি,-গ্রামে লােক তিষ্ঠান ভার হইত। প্রায় বাহিরে বাহিরেই তাঁহার দিন গুজরান হইত। যদি কোনওদিন নেহাৎ আসিয়া পড়িতেন, অমনি রণরঙ্গিণী মূর্তি নিরীক্ষণ করিয়া তাহার মদের নেশা পৰ্যন্ত ছুটিয়া যাইত—কোনও কোনও দিন নিজেও মুক্তকচ্ছ হইয়া ছুটিয়া পলাইতেন! তবে তখন এমন অর্থাভাব ছিল না, এই কয়েক মাস প্রকৃত অভাব উপস্থিত দত্তগৃহিণীর নায়েব-গৃহিণী খেতাব খসিয়া যাওয়াতে বিষ-দাড়ও যেন একটু ভাঙ্গিয়াছে। তবু তিনি তাঁহার সেই নিৰ্ব্বিষ দন্ত দ্বারা, জেল-প্রত্যাগত স্বামীর মস্তক মধ্যে মধ্যে চৰ্বণ করিবার লােভসংবরণ করিতে পারেন নাই। অনন্যোপায় বৃদ্ধও সেই দংশনসুখ হইতে বীতরাগ হইবেন কি করিয়া ? হইয়াছে। •[*] মমর ফলি। ; (১১) কনাদ ও গােতমের মতে ভূত পাঁচটী,—ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ ও ব্যোম ; পাশ্চাত্য বৈজ্ঞানিকগণের মতেও পদার্থ পাঁচ প্রকার ;-Solia, Liquid, Energy, Ether ও Gas ;আবার আমরাও একটু চেষ্টা করিলে মাদকদ্রব্যকেও ঐরূপ পঞ্চ শ্রেণীতে বিভক্ত করিতে পারি । তবে বর্তমানে Solid, Liquid ও Gas এই ত্রিপদার্থ সৰ্ববাদি- সম্মত। একটু অনুধাবন করিয়া দেখিলে বেশ বুঝা যাইতে পারে যে, বর্তমান জগতে অহিফেন, মদ্য ও গঞ্জিকা এই ত্রিমাদকেরই বহুল প্রচার। যাহাহউক, এবম্বিধ গবেষণার ভার, গ্রন্থের কলেবর-বৃদ্ধির ভয়ে, বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিকের হস্তে ন্যস্ত করিয়া, মাত্র প্রথম ও দ্বিতীয় মাদকের বিষয় লইয়া স্থানে স্থানে যৎকিঞ্চিৎ আলােচনা করিব। আমাদের এই ভ্রাম্যমান্ জগতে জলের সহিত স্থলের বড়ই ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ ; মদ্যের সহিত আফিংএরও নৈকট্য খুব বেশী। সুতরাং, আমাদের দত্ত মহাশয় মদ্য ছাড়িয়া যে বর্তমানে আফিং ধরিবেন, তাহার আর বৈচিত্র্য কি? শুধু দত্ত মহাশয়কেই বা বলি কেন? অন্ততঃ, আমাদের এ দেশের অনেক মহা- শয়ই, প্রথমে সুরাদেবীর উপাসনা করিয়া, অর্থাভাবেই হউক বা শারীরিক সামর্থ্যাভাবেই হউক, পরিশেষে অহিফেনের চরণতলে জীবন বিকাইয়াছেন। শাস্ত্রে বলে,-অগ্রে জল, পরে স্থল ;-তঁাহারাও বুঝি সেইজন্য আগে জলচর, পরে স্থলচারী ! কিন্তু কি দুঃখের বিষয়, বর্তমানে দত্ত মহাশয়ের আফিংএর পয়সাও জুটে । তিনি সেই চালা ঘরে চৌকীর উপর বসিয়া ভাবিতেছিলেন -“তাইত হাতে এক ক্রান্তি নেই, কি করি? দু’মাত্রার মত আফিং আছে। এ বাদলায় কোথায় বা চাইতে যাই ? ছেলেটাকে তখন তাড়িয়ে দিলাম ভাল কাজ করিনি।”

মমতার ফাসি। হঠাৎ ছাতার উপর চালের জল পড়ার শব্দে তাহার তন্দ্রাভঙ্গ হইল। চাহিয়া দেখেন, হরকরা আসিয়াছে। পিয়ন তাহার হাতে একখানি খামের চিঠি দিয়া প্রস্থান করিল। পত্রের উপরিভাগ পড়িয়া জানিলেন,—চিঠি গৃহিণীর। অমনি ভীত চিত্তে বাড়ীর মধ্যে গিয়া বলিলেন ;-“ওগগা, পিয়ন তােমার একখানা চিঠি দিয়ে গেল।” গৃহিণী আশ্চৰ্য্যভাবে বলিলেন ;-“আমার চিঠি।” দত্ত মহাশয় ভয়ে ভয়ে বলিলেন -“এই দেখ না, দিদিমণি বলে পাঠ দিচ্ছে।" গৃহিণী উত্তেজিত স্বরে বলিলেন ;-“বুড়াের বাহাত্তরে ধরেছে। আমার আবার কোন্ চুলােয় কে আছে যে পত্র দেবে ? আমার যদি কেউ থাকলে, তা হলে তাের হাতে পড়বে কেন রে মিন্সে?” দত্ত মহাশয় একটু বিরক্ত ভাবে বলিলেন ;-“দেখ, তুমি সব তাতে টপ, করে অত চটো কেন? আগে দেখাে ব্যাপারটা কি? তা-না একেবারেই দত্তগৃহিণীও দ্বিগুণ চড়িয়া উত্তর দিলেন ;—“সাধ করে কি চটি, তােমার আক্কেলেই চটি। তুমি তেরকেলে বুড়াে মিন্সে, তােমার এই হুসটা হলনা যে, আমি লিখতে জানি নে, পড়তে জানি নে, ব্যাপারখানা কি করে বুঝবাে?” একটু আশান্বিত হইয়া দত্ত মহাশয় বলিলেন ;-“ওঃ তাই বল যে, চিঠি- খানা পড়তে হবে ; চশমা জোড়াটা নিয়ে এস দেখি।” দত্তগৃহিণী তাক্ হইতে ছাতাপড়া খাপওয়ালা, পরকলা-ভাঙ্গা একদিকে দড়িবাধা চশমা-জোড়াটি আনিয়া দত্ত মহাশয়ের হাতে দিলেন। দত্ত মহাশয় দুইবার করিয়া পত্রখানির আদ্যোপান্ত গৃহিণীকে শুনাইলেন। দত্তগৃহিণীও লক্ষ্মী মেয়েটার মত সব শুনিলেন। পরে চারি চক্ষুর মিলন হইল এবং আশার আলােকে উভয়ের মুখমণ্ডল ঈষদুদ্দীপ্ত হইয়া উঠিল।

২৫ মুমতার কাদি। (১২) আষাঢ়ের অপরাহু। বেলা বড় বলিয়া ও আকাশ মেঘমুক্ত থাকাতে কাঠফাটা রৌদ্রের তেজ তখনও তেমন কমে নাই। মিত্ৰগৃহিণী দ্বিতলের চিক-বিশিষ্ট বারাণ্ডায় বসিয়া, কালীধনের বিবাহে প্রয়ােজনীয় খুঞ্চিপােষ তৈয়ারী করিতেছেন—এমন সময় দপ্তরখানায় গােমস্তার সহিত তর্কে নিযুক্ত এক ব্যক্তির অপরিচিত কণ্ঠস্বর তঁাহার কর্ণগােচর হইল। তিনি তাহাদের এইরূপ কথাবার্তা শুনিতে লাগিলেন;- “দেখুন, এই গােবর্ধন দত্তের নামে এককালে বাঘে গরুতে এক ঘাটে জল খেয়েছে। তাআদায় অনাদায় কি রকম?” “আজ্ঞে যােল-আনা সম্পত্তির সম্পূর্ণ খাজনা কি আদায় হয়? তা হলে কি প্রজা বাঁচে ?” “সে কি কথা? প্রজা ত বাঁচে না, জমীদারও ত বাঁচা চাই ?” “তা এক রকমে চলে যায়। বিষয়ের মুনফা মােটা। খরচপত্রাদিও আগের মত তেমন নেই। সুতরাং, বেশী কড়াকড়ির দরকার হয় না।” “না-না সে ত ভাল কথা নয়। কড়াকড়ি না করলে-খাজনা বাকি ফেলে,—প্রজাকে আস্কারা দেওয়া হয়। শেষকালে সুদে আসলে সমুদয় খাজনা আদায় করাও কঠিন হবে। এতে জমীদারী কতদিন টিকবে ?” “যার বিষয় তিনিই বলেন, প্রজাপীড়ন করাে না;—মিষ্টিকথায় ক্রমে আদায় কর। বেশী গরীব হয়, নিতান্ত অপারগ হয়,দু’এক বছর রেহাই দেও।” “স্ত্রীলােক তিনি,—তিনি এ সব কি বুঝবেন? তঁার কথা সব মাতে গেলে কাজ চলে না। যা হােক, এখানে যা করলেন, কবুলেন, অন্য জায়গায় যদি চাকরী নিতে হয়, বড় বিপদে পড়বেন। ঠিক জাবেন,—সব জায়গায় এটী খাটবে না। কড়ায় গণ্ডায় আদায় দেখাতে হবে।”

মমতার ফাসি। “মশায়, কাপড় পরুতে শিখে এই সরকারে মাথা দিয়েছি, আর সেই মাথা সাদা হয়ে গেছে। আপনার মা-বাপের আশীর্বাদে বােধ করি, এইখানেই কাজ কৰ্ত্তে কর্তে মর্ত্তে পারব।” এই সময়ে একজন চাকরাণী আসিয়া বলিল,-“মা, দাদাবাবুর বাবা এসেছেন।” মিত্ৰগৃহিণী বলিলেন;—“উপরে ডেকে এনে কালীর ঘরে বসা।” মনে মনে বলিলেন;—এমন বাপের এমন ছেলে ! ধূলিময় চটী পায়ে, হেঁড়া ছাতা বগলে, জীর্ণ পিরাণ গায়ে, কোমরে উড়ানী বাধা দত্তমহাশয় উপরে আসিয়া কালীর ঘরে বসিলেন কার্পেটমণ্ডিত, সুচিত্রিত, প্রশস্ত প্রকোষ্ঠ। দেয়ালের গায়ে দুইটী প্রকাণ্ড আলমারী-বধানাে সােণার জলে নাম লেখা পুস্তকে পরিপূর্ণ। গৃহের মধ্য- স্থলে বনাতযুক্ত টেবিলে কলম ও দোয়াতদানি, ব্লটিংপ্যাড, পেপারওয়েটু ও ক্যাশ বাক্স প্রভৃতি যথাস্থানে ন্যস্ত। টেবিলের দুই পার্শ্বে দুইখানি স্প্রিংএর চেয়ার; নিম্নে মখমলের পা-দানি ও ছিন্নপত্রাদির আধার। গৃহের একপ্রান্তে পালঙ্ক, তদুপরি স্প্রিংএর গদী ও সুসজ্জিত পরিচ্ছন্ন শয্যা-সরঞ্জাম। অপর প্রান্তে কাষ্ঠের আলায় বস্ত্রাদি সংযত ভাবে রক্ষিত। দেয়ালে চারিদিকে চারি- খানি তৈলচিত্র। উত্তরে চিত্র-নিম্নে বাঙ্গালা অক্ষরে লিখিত “শ্রীরামকমল মিত্র”, পূৰ্বে “শ্রীশ্রীবিশ্বেশ্বরের মন্দির, দক্ষিণে “শ্রীমান কালীধন দত্ত” এবং পশ্চিমে “শ্ৰীমতী অন্নপূর্ণা দাসী”। শেষােক্ত তৈলচিত্ৰ মিত্ৰগৃহিণীর সধবা অবস্থার। গৃহাভ্যন্তরস্থ প্রত্যেক দ্রব্য চ চ ঝক ঝক করিতেছে, যেন এক- জনের সতর্ক ও সযত্ন দৃষ্টি এই গৃহটীর উপর প্রতিনিয়ত পড়িয়া রহিয়াছে। দত্তমহাশয় গৃহে প্রবিষ্ট হইয়া অবাক নেত্রে ইতস্ততঃ নিরীক্ষণ করিতে করিতে ভাবিতে লাগিলেন-“কালী কি এই ঘরে থাকে ? বেটার কপাল ত খুব ”

২৭
মমতার ফাসি।
বসিতে ইতস্ততঃ করিতেছেন দেখিয়া, ঘরদেশ হইতে পরিচারিকা
বলিল,-“আপনি ঐ চেয়ারে বসুন। একটু বিশ্রাম করে হাত ধুয়ে জল খান।”
অপ্রতিভ দত্তমহাশয় উপবিষ্ট হইলেন। বলিলেন-“আর হাত পা
ধুতে হবে না ' বাইরেই ও সব সেরে এসেছি।”
( ১৩ )
ক
জলযােগের পর কথাবার্তা চলিল। মিত্ৰগৃহিণী অন্তরাল হইতে ঝিয়ের
মুখ দিয়া বলাইতে লাগিলেন;-
“পত্র যথাসময়ে পেয়েছিলেন কি ? বাড়ীর সব ভাল ?”
“হাঁ, সেই পত্র পেয়েই ত এসেছি। কালী কোথা ?”
“আজ্ঞে, তিনি কলকাতায়
“ও: কবে আসবে ?”
“তার ঠিক নেই। মেডিকেল কলেজে ভর্তি হয়েছেন। আসতে দেরী
হতে পারে। আপনি মেয়েটীকে একবার দেখবেন কি? তা হলে আমা-
দের বাড়ীতে তাকে আনতে পারি।”
“না, তার দরকার কিছু নেই। আমি নিজেই গিয়ে দেখে আসবাে।
এখন পাওনা-থােওনা সম্বন্ধে যা লিখেছেন তাই-ই ঠিক,না কিছু গােলমাল
হবে ? আগে থেকে সেটা মিটান ভাল বলেই বিবেচনা কচ্ছি।”
“আজ্ঞে, যা লেখা হয়েছে, বরং তার বেশী দেবে ছাড়া কম দেবে না।
তবে ও সম্বন্ধে সেখানে আপনার বেশ কিছু বলতে হবে না। সে সব মা
ঠিক করবেন, কোনও গােলমাল হবে না।”

মমতার সি। “তা বেশ,তবে কি জান ?-আগে থেকে সব কাজ পাকাপাকি করে রাখাই ভাল। জানি কি,পরে কুটুম্বের সঙ্গে অসরস হতে পারে।” “সে জন্য আপনাকে ভাবতে হবে না। কুটুম্ব খুব ভালই হবে।” “তা—ভাল হলেই ভাল। তবে একটা কথা আছে—” “কি বলবেন বলুন?” “এই বিয়েটা এখানে” “ওঃ! বিয়েটা এখান থেকে না হয়ে, আপনার বাড়ী থেকে হওয়া ?” “হাঁ, তাই। জানেন কি ?—আমার একমাত্র ছেলে। এই আমার প্রথম ও এই শেষ কাজ। নিজের বাড়ীতে হলে অনেকটা আহ্লাদের হয়। গিন্নীর মতও তাই।” “মা বলছেন, তাঁরও মত বাড়ীতে থেকেই হােক। তবে মার ইচ্ছা, একটু জাকজমক হয়।” “ বেশ, তাই হবে। এখন দিন-স্থির সম্বন্ধে “তার এখনও দেরী আছে। এখন কথাটা পাকাপাকি নিয়ে বিষয়। দাদাবাবু বলেছেন,—তিন বছর পরে। তার পড়া অনেকটা এগিয়ে উঠবে। বিশেষ কিছু ক্ষতি হবে না। তখন বিয়ে হবে।” “তা হলে এখনও ঢের দিন বাকি ! তবে এত তাড়াতাড়ির দরকার ছিল কি ?” “দরকার:আর কিছু না। প্রথম, আপনাদের খোঁজ-খবর নেওয়া, আপ- নাদের মতামত জানা। দ্বিতীয়তঃ, আপনি একা মানুষ, সব দিক ত দেখতে হবে। তারপর গহনা-পত্র গড়াননা আছে,যােগাড়যন্ত্র করা আছে। ইনিও মেয়ে মানুষ, পরকে দিয়ে কাজ-কারবার,—এই সব।” দত্তমহাশয় ইতিমধ্যে একটু অন্যমনষ্ক হইয়া কি ভাবিয়া লইলেন;-পরে বলিলেন;—“সে ঠিক কথা,সময় থাকতে কাজে হাত দেওয়া খুবই ভাল।

মমতার ফাসি । আর সময়েরও একটু দরকার হয়ে পড়েছে,—আমার,- } “কি ?” “কথাটা হচ্ছে আর কিছু না—আমার ত এখন আর চাকরী-বাকরী নেই,—মনান্তর হওয়াতে ছেড়ে দিয়েছি। বুড়াে বয়সে আর পারি-ও না। তাই ভাবছি-একমাত্র ছেলের বিয়ে-সংসার বা ঘর-বাড়ীর অবস্থা অতি শশাচনীয়। করি কি?” “সে জন্য ভাবছেন কেন? যা আপাততঃ ৩৫০ টাকা দিচ্ছেন, এ আপনার ছেলের জলপানির টাকা। আরও ক্রমে ক্রমে পাঠাবেন। আপনি সব ঠিক করে ফেলুন। দত্ত মহাশয় নিরুত্তর। দাসী বলিল ;-“এখন আপনি কাপড় ছাড়ুন। আজ আর সেখানে গিয়ে কাজ নেই। আজ সন্ধ্যে হয়ে গেছে,আর কাল গেলেও চলবে।” দত্ত মহাশয় নিরুত্তর। ( ১৪) কন্যাকে আশীর্বাদ করিয়া নব পরিচ্ছদে দত্ত মহাশয় গৃহ-প্রত্যাগত হই- লেন। গৃহিণী প্রথমে স্বামীর আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করিয়া পরে বলিবেন “তবু ভাল যে ফিরেছ!” “কি রকম? “আমি বলি বুঝি মথুরায় গিয়ে রাজাই হলে।” “তা—যে অবস্থায় গিয়েছিলুম-তার তুলনায় এক রকম রাজা হয়ে এসেছি বলতে হবে বৈকি।”

মমতার সি। “সে কি ?” “একেবারে সাড়ে তিনটী শ।” “ই। একেবারে ধান ছাড়া গণ্ডা গণ্ডা। বুঝি আফিংএর মাত্রা একটু বেশী চড়িয়ে এসেছ ?” “বিশ্বাস না হয় এই দেখ।” বলিয়া দত্ত মহাশয় ফতুয়ার পকেট হইতে একটী নােটের তাড়া বাহির করিয়া গৃহিণীর সম্মুখে গণিতে লাগিলেন। অমা- তিমিরাচ্ছন্ন ঝটিকাসঙ্কুল বদনাকাশ ক্ষণিক মেঘমুক্ত হইল। তখন দত্ত মহাশয় আনুপূৰ্ব্বিক সমুদয় বর্ণনা করিলেন । পরে গৃহিণী বলিলেন, “তারপর কালীর সঙ্গে দেখা করেছিলে ?” “না—সে যে কলকাতায় পড়তে গেছে। আর এখন দেখা করেই বা লাভ কি ? যখন গাছ ধরেছি, তখন ডাল নত কৰ্তে কতক্ষণ ?” “তুমি বুড়াে হয়ে মর্তে চলেছ,-এই জ্ঞানটা হল না? ছেলের মনের ভাবটা কি-না জেনে নাচতে নাচতে বাড়ী এলে! এ ত দেখছি মাগী এক চাল চেলেছে। দেখে এলেনা ছেলে তাের—তােমার আছে কিনা? যদি নাও থাকে—হতে পারে কিনা ?” “সত্য বলতে কি গিন্নি, আমার তার কাছে যেতে বড় লজ্জা বােধ হল, তাই চেষ্টা করিনি। যাক, তারপর এই টাকা দিয়ে একটা বাড়ী আপাততঃ আরম্ভ করা যাক। আরও কমে আসছে। ভাবনা কি ? এবার অবস্থা ফিরে গেল।” “তােমার মাথা। এই বুদ্ধি নিয়ে তুমি নায়েবী কর্তে গিয়েছিলে, তাই তােমার কয়েদ হয়েছিল।” দত্ত মহাশয় মর্মাহত হইলেন,বলিলেন -“আচ্ছা ও কথাটা আর কতদিন বলবে ?” “বলব না? যতদিন বাঁচবে ততদিন বলবনা। কি কষ্টটাই না দিয়েছ ;

মমতার সি। আর কি কষ্টটাই না দিচ্ছ! দ্বিতীয় পক্ষে--- “থাক—এখন এই টাকায় কি কৰ্ত্তে বল ?” “ওরে মিন্সে এটা বুঝি না—আজ বাদে কাল আমার কি দশা হবে ? বাড়ীবাড়ী-বাড়ীত কেলের ! আমার ছেলে নেই, পুলে নেই, মজা করে উনি সিঙ্গে ফুকবেন, আর আমি দাসীবৃত্তি করে খাবাে !” “এই নাও সব,তুমি যা বােঝ করাে”—এই বলিয়া দত্ত মহাশয় নােটের তাড়াটি গৃহিণীর পায়ের কাছে ফেলিয়া দিলেন। নােটগুলি হাতে লইয়া গৃহিণী একটু নরম সুরে বলিলেন ;- “দেখ, বড় লােকের বাড়ী বিয়ে,আমার ছেলে আসবে চতুদ্দোলায়, আর আমি কাঠ-কুড়ানীর বেশে গিয়ে বউ বরণ করে ঘরে তুলবাে? হাগা লােকে গায় থুথু দেবে যে! বলি,-বাড়ীর এখন দরকারটা কি-তাই আমাকে বলত? এই যা আছে, একটু সারিয়ে-সুরিয়ে কাজ-চালানাে গােছ, কর। এইতেই কত জজ-ম্যাজিষ্টরের বিয়ে হয়ে যাবে। তুমি ভাবছ কি- তােমার কালী এখানে থাক্‌বে? কখনও না। যদিও থাকে, ঘােড়া হলে চাবুকের অভাব হবে না। আর আমার সাধ-আহাদ, তুমি যত দিন-তত দিন। তােমার শরীরটাও কাহিল হয়ে পড়েছে। আফিংখাের মানুষ—দুধেই জীবন।” দত্তমহাশয় মাথা চুলকাইতে চুলকাইতে বলিলেন;—“তা—যুক্তি মন্দ নয়। আর টাকাও ত আবার আছে।”

মুমর ফাসি।
অবকাশমতে কালীধন বাড়ী আসিল। মিত্ৰগৃহিণী বলিলেন;—“আর
কি?—সব ঠিক ঠাক।”
কা। কি রকম?
মি। মায় পাকা-দেখা শেষ। তােমার বাবা এসেছিলেন,—ওদিকে
বাড়ী আরম্ভ। বিয়ে বাড়ী থেকে হবে।
কা। সে কি ? আমি এখন বাড়ী যাব না।
মি। কেন? এখনও তােমার মানুষ হতে বাকি—কেমন করে বলি ?
তােমার বাবাকে ত আর তােমার খােরাক যােগাতে হবে না। তােমার জল
পানির যে সাড়ে তিন শ' টাকা ছিল, তাই আপাততঃ তাঁকে দিয়েছি
আর যা কিছু লাগে, আমিই না হয় তােমার বাবাকে দেবব,তারপর তােমার
বিয়ের বরপণ থেকে আমি সে টাকা নিলেও নিতে পারি। তােমার টাকা-
তেই সব, তবে যাবে না কেন?”
কালীধন সাশ্চর্য্যে বলিল;-“আমার টাকা? জলপানির টাকা, সেত
তােমার ?”
মিত্ৰগৃহিণী বলিলেন,-“সে আমার নয়, তােমার বাবার প্রাপ্য।”
কা। মা, না হয় তােমার কথাই মাক্লাম। কিন্তু মা ! যে গৃহে তােমার
মত মা নেই, সেখানে ত আমি যাব না।
মি। আমি গেলে ত যাবি ?
কা। যাবাে।
মি। তবে যা ঘরে গিয়ে কাপড়-চোপড় ছাড়।
মিত্ৰগৃহিণী চলিয়া গেলেন।
শরতের বৈকাল। ধবল মেঘপুঞ্জ সুনীল আকাশের ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত।
কালীধনের প্রকোষ্ঠ-লগ্ন উম্মুক্ত গবাক্ষ-পথ দিয়া স্বর্ণাভ সূৰ্য-কিরণ অতি

মমতার সি। ধীরে ধূলি-বিরল কার্পেটের উপর দিয়া রঞ্জিত দেয়ালের দিকে অগ্রসর হইতেছিল। কালীধন দ্বার ঠেলিয়া দেখিল—শিকল দেওয়া নাই। ভিতর হইতে অর্গল বদ্ধ। ডাকিল;-“মা” হাস্য-কম্পিত কণ্ঠ হইতে উত্তর আসিল ;—“যাই, খাবার নিয়ে যাচ্ছি।” ইতিমধ্যে খিল খুলিয়া গেল। কালীধন দ্বার খুলিয়া দ্বার-পথে দাঁড়াইয়া, সন্দেহপূর্ণ দৃষ্টিতে গৃহের মধ্যে চারিদিক লক্ষ্য করিতে করিতে দেখিল,—দ্বার- রুদ্ধকারিণী একটী একাদশবর্ষীয়া বালিকা নিতান্ত অপরাধিনীর ন্যায়, অৰ্ধক্ষুট- কমলতুল্য সুন্দর মুখখানি নত করিয়া, তাহার বামভাগে গৃহকোণে দাড়াইয়া আছে। কালীধন জিজ্ঞাসা করিল;—“তুমি কে?” অতি সঙ্কোচে-অতি নম্রকণ্ঠে উত্তর হইল;—“সুপ্রভা।” কালীধনের বুকের মধ্যে কি একটা স্পন্দন অনুভূত হইল। মায়ের কাছেই ত সে এই নাম শুনিয়াছে ! কখনও দেখে নাই,-আজ দেখিল। এই কি সেই সুপ্রভা ? কিন্তু তেমন করিয়া দেখিতে পারিল না। দেখিতে ইচ্ছা হইতেছে,দৃষ্টি যাইতে চায় না। কালীধনের এ কি হইল? কালীধন দ্বার- পাল হইল নাকি। কিয়ৎক্ষণ পরে সে একটু প্রকৃতিস্থ হইল। বােধ হয় ভাবিল,আমি ত ভারি বােকা ! স্বর্ণমুহূৰ্ত্ত হেলায় হারাইতেছি ! সে মৃদুহাশ্যে, বালিকার পানে চাহিয়া জিজ্ঞাসা করিল;-“তুমি এখানে কেন?” এবার সুন্দর নেত্রপল্পব ঈষৎ উন্নত হইল, সুগঠিত ওষ্ঠপুটেও একটু হাসির রেখা দেখা দিল। বালিকা বলিল ;-‘মাসিমা বসতে বললেন।”

মুমগর ফাসি। কালীধন সরিয়া দাঁড়াইল। জিজ্ঞাসিল ;-“দোর দিলে কেন?” বালিকা পলাইয়া গেল ! - 0 (১৬) স্নিগ্ধ-হাস্য-বিকশিত মুখে খাবারের থালা লইয়া মিত্ৰগৃহিণী প্রবেশ করিলেন ;-বলিলেন—“কিরে কালী—কেমন দেখলি?” কৃত্ৰিম ক্রোধপূর্ণ কণ্ঠে কালীধন বলিল—“মা তােমার একি পাগলামি !” সেইরূপ হাসিতে হাসিতে মাতা উত্তর দিলেন;—“কেন রে পাগলামিটা কি দেখলি? আগে মেয়েরা স্বয়ম্বরা হত। তারপর বাপ-মা পাত্র-পাত্রী পছন্দ কৰ্ত্তেন। আজকাল পাত্র নিজেই গিয়ে পাত্রী দেখে পছন্দ করে। ইংরিজি লেখাপড়া শিখছিস,ইংরিজি সভ্যতা শিখছি। আমি আর একটুর জন্য কথা রাখি কেন? এখন বলু—আমার পছন্দ সুন্দর হয়েছে কি না?” কালীধন বলিল;-“মা, যার সব সুন্দর, তার পছন্দও সুন্দর। আর পছন্দ হলেই বা উপায় কি ?” মিত্ৰগৃহিণী কহিলেন—“পছন্দ না হয়, এখনও বলু,সময় আছে, উপায় হবে।” কালীধন বলিল;-“তুমি বুঝি আমার মুখ দিয়ে পছন্দ হয়েছে’ এ কথা বার না করে ছাড়বে না ! এখন ক্ষিদে পেয়েছে, খাবারের থালাটা আমার সামনে দেও দেখি—আগে পেট ঠাণ্ডা করি।” মিত্ৰগৃহিণী তাড়াতাড়ি খাবারের থালাটা টেবিলের উপর রাখিলেন। বলিলেন-“এখন বলপছন্দ হয়েছে কি না ?”

মমতার সি।
কালীধন খাইতে খাইতে বলিল,-“আরও কি করে বলতে হবে মা?”
মিত্ৰগৃহিণী বলিলেন;—“দেখ , আমি তাের তেমন মা নই যে, মনে কবাট
দিয়ে বাইরে বাইরে প্রণাম করবি। পেটে ক্ষিদে মুখে লজ্জা আমার কাছে
খাটবে না। লজ্জা কচ্ছিস্ কেন বাবা? যে তােকে আরাধ্য জ্ঞানে পূজা
করবে, তুই যাকে সুখে-দুঃখে জীবনসঙ্গিনী কবি, তার বিষয়ে মতামত প্রকাশ
কন্ট্রে লজ্জা কিসের? যার উপর তাের সুখশান্তি নির্ভর কচ্ছে,তাকে
পছন্দ হল কি না বলতে লজ্জা কিসের বাবা ?”
কালীধন কৃত্রিম গাম্ভীৰ্যপূর্ণ কণ্ঠে প্রতি উত্তর দিল,-“সঙ্কোচটাই ত
স্বাভাবিক।”
মিত্ৰগৃহিণীও গাম্ভীৰ্যপূর্ণ কণ্ঠে উত্তর দিলেন-“দেখ, সব জায়গায় সঙ্কোচ
প্রকাশ কৰ্তে গেলে, অনেক সময় ঠত হয়। অনেক ক্ষেত্রে লজ্জা
সরলতায় আঘাত করে।”
কালীধন হাসিয়া বলিল;-“মা, তুমি এত জানলে কি করে?”
মিত্ৰগৃহিণী বলিলেন;—“তাের মত ছেলে পেয়ে। যশােদা নীলমণিকে
পেয়ে ধন্য হয়েছিলেন।”
কালীধন বলিল;—“ধন্যও হয়েছিলেন, শেষে কঁদতেও হয়েছিল।”
মি গৃ। সেকঁাদাও সুখের। তেমন কঁাদা ক’জন মা কেঁদেছে ?
কা। তুমিও কাঁদবে ত?
মি গৃ। সেই সুখের কান্না কঁার চেষ্টায় আছি। এখন ব–পছন্দ
হয়েছে কি না ?
কা। মা–ধন্য তুমি ।
মি গৃ। সেত আগেই বলেছি,-তােক পেয়ে আমি ধন্য।
কা। তােমাকে না পেয়ে, আমি তার চেয়ে ধন্য ।

মমতার ফসি মি গ আর তােকে স্বামী পেয়ে একজন শত ধন্য হতে আসছে, বল তুই তাকে ধন্য করবি ? বল পছন্দ হয়েছে ? কা। হয়েছে—খুব হয়েছে—যথেষ্ট হয়েছে,এখন হল ত ? মিত্ৰগৃহিণী থালার পানে চাহিয়া বলিলেন ;—“সন্দেশটা আবার রাখুলি কালীধন বিনা বাক্যব্যয়ে সন্দেশটা গালে পূরিয়া দিল (১৭) দেখিতে দেখিতে দুইটী বৎসর ছুটিয়া চলিয়া গেল। দত্ত মহাশয়ের চারি আনার পােষ্টকার্ড খরচে, মিত্ৰগৃহিণী আরও ষােলশত টাকা তাঁহার কবল-গত করিলেন। কিন্তু এই রাহুর উদর থাকিলেও বার্ধক্যবশতঃ পরি- পাক-শক্তি ক্ষীণ হইয়াছিল। বিশেষত, কেতু মস্তকবিশিষ্ট হওয়ায়, তাহাকে অবধি গ্রাস করিতে আসিল ! সুতরাং, তিনি ভীত চিত্তে রূপাদকে একটু চুষিয়া লইয়া কেতুকে দিলেন। কেতু দেখিলেন—চাদ খাইলেই ত ফুরাইয়া যাইবে;—আর খাওয়া অপেক্ষা চাদ দেখায় সুখ বেশী। তিনি তাহা হইতে গহনা প্রস্তুত করাইয়া দেখিতে লাগিলেন। কেতু-রূপিণী দত্তগৃহিণীর বাহার কি । আবার দেখাইবার অধিক আনন্দে আহার থাকে না,-আকণ্ঠ আনন্দে পূর্ণ হয়,—আকণ্ঠ পূর্ণ হইলে বাক্যে রুচি থাকে না, দত্তগৃহিণীরও মুখরতা কমিয়া গিয়াছে। গৃহিণী প্রসন্না,সুতরাং, রাহুরূপী দত্ত মহাশয়েরও বিষন্নতা কমিয়াছে। দেহধনু দেহষ্টিতে পরিণত হইয়াছে,ধনু যষ্টি হইলে মধ্যস্থল মােটা হইবারই কথা ।

মমর বলি। দত্ত মহাশয়ের দেহপুষ্টির আরও একটা প্রধান হেতু আছে। পূর্বে বলিয়াছি,-পঞ্চভূতের প্রথম ভূত ক্ষিতির সহিত, পঞ্চমাদকের শেষ বা চরম মাদক অহিফেনের সামঞ্জস্য আছে। পুরাকালে পৃথুরাজা রাজ্য-রক্ষাকল্পে গাভীরূপিণী বসুন্ধরাকে দোহন করিয়াছিলেন, এজন্য ক্ষিতির অপর নাম পৃথিবী। ইহাতেই বুঝা যায়, ক্ষিতির সহিত দুগ্ধের এবং দুগ্ধের সহিত মানবের এত আত্মীয়তা কেন? আবার ইহাতেই বুঝিতে পারা যায়, ভুমণ্ডলতুল্য অহিফেন-বটিকার সহিত দুগ্ধের আত্মীয়তা না থাকিয়া চলিতে পারে না। দুগ্ধের সহিত অহিফেন-সেবীর বড় ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। মধ্যে দত্ত মহাশয় অর্থাভাবে দুগ্ধলাভে বঞ্চিত ছিলেন, তন্নিবন্ধন কোষ্ঠকাঠিন্যের সহিত কায়া-কাঠিন্যের কারণ উদ্ভূত হইয়াছিল। এক্ষণে রূপচঁাদ-চোষণের ফলে, শুষ্ক তরু মুঞ্জরিত হইল। পীযুষ-পরিতৃপ্ত দত্ত মহাশয়ের এখন নাতিদীর্ঘ ভুড়ি হইয়াছে ! জলেই জল বাধে। সুখই সুখ চায়। খাইতে পাইলে শুইতে ইচ্ছা হয়। দত্ত মহাশয় বাটী খানিকেও একটু গুছাইয়া লইয়াছেন। তবে কোটা করেন নাই,—গৃহিণী বলিয়াছেন,-“কোটা-কেলের।” গ্রামে হুলস্থুল পড়িয়া গিয়াছে। গােবর্ধন দত্ত ঘরে বসিয়া হারাধন ফিরিয়া পাইয়াছে। কালীধন বড় লােকের বাড়ীতে প্রতিপালিত হইয়া, সুশিক্ষিত হইয়া, বড় ডাক্তার হইয়া, বাড়ী আসিতেছে। বড় লােকের বাড়ীতে তাহার বিবাহ,বড় ঘটা। গ্রাম শুদ্ধ লােক বরযাত্ৰ যাইবে;—ন’পাড়ায় যাহা কখনও হয় নাই, তাহাই হইবে । দত্তগৃহিণীর বাক্য-ঝঙ্কার কমিয়াছে,-দত্ত মহাশয়ের অবস্থাও ফিরিয়াছে। সুতরাং, তাঁহার মুতন আটচালায় সকাল-সন্ধ্যায় আর লােক ধরে না সমপন্থী বৃদ্ধের দল তাম্রকূটের জন্য অর্থব্যয় করেন না, হাটখােলার দোকান দারও বাঁচিয়াছে।

মমতার সি। একদিন সেই ধুমাচ্ছন্ন, হুক্কা-ধ্বনি-মুখরিত বৈঠকখানায় প্রাচীন মণ্ডলীর মধ্যে, রাজা-উজির মারিতে মারিতে, হঠাৎ পুত্র-শাসন বা পিতৃকৰ্তব্য সম্বন্ধে কথা উঠিল গদাধর ভট্টাচাৰ্য বলিলেন,-“ছেলে শাসন করেছে—আমাদের গােবর্ধন ভায়া,সার্থক শাসন বটে।” তিনকড়ি বসু বলিলেন,-“হঁ্যা। ছেলে মানুষ কর্তে হলে—খাওয়াবে হাতির ভােগে,-দেখাবে বাঘের দৃষ্টি।” গােবিন্দ সমাদ্দার বলিলেন,—“হাতির ভােগ আর খাওয়াতে হয় না, সে আপন হাতেই খায়,-তবে বাঘের দৃষ্টিটা চাই।” মদন মুখখাপাধ্যায় বলিলেন,-“হ, হাতির ভােগ চাই,—যাতে মস্তিষ্ক পরিষ্কার থাকে, বাঘের দৃষ্টিও চাই, যাতে চরিত্র নির্মল থাকে; আর তার সঙ্গে একটা চাই—সেটা বিরাজ মল্লিক বলিয়া উঠিলেন,—“তােমার সব তাতে পাণ্ডিত্য। ছেলে ত হল না,মজাও টের পেলে না। লাথির টেকি চড়ে ওঠে না হে, কুকুরকে আস্কারা দিতে নেই।” এমন সময় এক দুষ্ট বালক কোথায় বসিয়াছিল,-মল্লিক মহাশয়ের মুখের কাছে হাত নাড়িয়া বলিয়া পলাইল,-“এ আবৃসির মুখ বাবা, যা দেখাবে তাই দেখবে !” দত্ত মহাশয় সমাদ্দার মহাশয়ের পানে চাহিলেন,—বলিলেন- গােবিন্দা,দেখলে ?” সমাদ্দার মহাশয় বিরক্তিপূর্ণ কণ্ঠে বলিলেন-“ও শালার ছেলের কথা ছেড়ে দেও।” বালক সমাদ্দার মহাশয়েরই পুত্র । === মমতার ফাসি। ( ১৮ ) ক্রমে বিবাহের দিন নিকটবর্তী হইল। বিবাহের এক সপ্তাহ থাকিতে, মিত্ৰগৃহিণী উপযুক্ত অর্থসহ দত্ত মহাশয়ের নিকট লােক-মারফত সংবাদ দিলেন, তিনি যেন বরযাত্র, পুরােহিত ও নাপিত সমেত বিবাহের একদিন পূৰ্বে চম্পাপুর বাটীতে আসেন। এখানে গাত্রহরিদ্রাদি হইবে, পরে বিবাহান্তে সকলে একত্রযােগে নপাড়ায় উপস্থিত হইবেন। ওখানে ফুলসজ্জাদি সমারােহে সম্পন্ন হইবে। কালীধনের সময় অল্প, যাতা- যাতে সময় ও অর্থের ব্যয় অনর্থক। দত্ত মহাশয় ভাবিলেন, অত ঝঞ্চাটে কাজ কি ? যে সে প্রকারে অর্থ- গম হইলেই হইল। বরপণের টাকাটা হাত লাগিলে হয়। যথা সময়ে তিনি সাঙ্গোপাঙ্গ লইয়া উপস্থিত হইলেন। মিত্র-বাটীতে হাট বসিয়া গেল। তামাকের গুল, সিগারেটের ছাই, দগ্ধ-মস্তক দিয়াশালাই কাঠি, কাঠিবিহীন দিয়াশলাই বাক্স ও পানের পিকে বারাণ্ডা ও বৈঠকখানা ঐহীন হইয়া পড়িল। নৃত্য-গীত, রঙ্গ-রহস্য, আলাপ-পরিচয়, আদর- আপ্যায়ন ও সম্মান-সম্বর্ধনায় গৃহ মুখরিত হইয়া উঠিল। সেইদিন কালীধনও বাটী আসিল। সে বৈঠকখানায় প্রণম্যগণকে প্রণাম ও বাল্যসঙ্গিগণের সহিত মিষ্টালাপ সমাপ্ত করিয়া, বাহিরে আসিয়া দেখিল- পিতা দণ্ডায়মান। অমনি প্ৰণত হইয়া মুখ নত করিয়া দাড়াইল। দত্ত মহাশয়েরও মুখ অবনত। মাত্র বলিলেন,-“কালী—এই এলি ? আমরা আরও ভাবছি—তা যাবাড়ীর মধ্যে কাপড়-চোপড় ছাড়।” কেমন যেন অপ্রতিভ কণ্ঠে এই কথাগুলি বলিলেন। কালীখন কিছুই বলিল না—ধীরে ধীরে বাড়ীর মধ্যে চলিয়া গেল। পখে মিহি সহিত দেখা হইল। তিনি ছুটিয়া আসিয়া কালীর হাত

মমতার সি।
ধরিলেন—বলিলেন,—“এই যে কালী এসেছে। আমি কত খানা
ভাব ছিলাম। বৈঠকখানায সবার
বৈঠকখানায় সবার সঙ্গে দেখা করেছিস্? বাবার সঙ্গে
দেখা হয়েছে ?”
কা। হা ।
মি গৃ। প্রণাম করেছিস?
কা। হা।
মি গৃ। কি বললেন ?
কা। বেশী কিছু বলেন না। আচ্ছা মা, মা না থাকলে বাপের
ব্যবহার আর এক রকম হয়ে যায়—সেটা কি ঠিক ?
মি। আর এক রকম হওয়াটাই অন্যায়। যার মা নেই, বাপ, তার মা
ও বাবা, আর যার বাপ, নেই, মা তার বাবা ও মা। তােমার বাবা বড়
লজ্জিত হয়েছেন, তাই তােমার সঙ্গে বেশী কিছু বলতে পারেন নি। ক্রমে
সব ঠিক হয়ে যাবে। এস, একটু বিশ্রাম করাে।
পরদিন সন্ধ্যায় যথাযােগ্য আড়ম্বরের সহিত কালীধন বিবাহ করিতে
গেল। বরযাত্রীরা আসর-সজ্জা ও যত্ন-খাতির দেখিয়া মুগ্ধ হইলেন এবং দত্ত
মহাশয় বরসজ্জা, বরাভরণ ও বরপণ প্রদানের ব্যবস্থা দেখিয়া বিমুগ্ধ হইলেন।
পাঁচ হাজারী মহলের তহশীলে যে টাকা তিনি না দেখিয়াছেন, আজ
একযােগে তাহা তাহার হস্তগত হইল
বৈকালে বর, কনে, বরকর্তা, বরযাত্র প্রভৃতি সকলে মিত্রবাটীতে আসি-
লেন। আজ এইখানেই রাত্রিযাপনের ব্যবস্থা, প্রভাতে দেশে রওনা হইতে

ও মমর কাসি। হইবে। দত্ত মহাশয় বুঝিলেন, বরসজ্জা প্রভৃতি সমস্ত লইয়া গেলে, তাহার উঠানেও স্থান-সঙ্কুলান হওয়া কঠিন। মিত্ৰগৃহিণীর সহিত পরমর্শ করিয়া, একেবারে সব লইয়া গেলে জিনিষ তছরুপ হইতে পারে, সুতরাং, আবশ্যক দ্রব্যাদি বাদে সমুদয় রাখিয়া যাইবেন, স্থির হইল। মিত্ৰগৃহিণীর আজ আর আনন্দের সীমা নাই। কখন কালীর ঘরে যাই- তেছেন,কখন সুপ্রভার জন্য নির্দিষ্ট প্রকোষ্ঠে আসিতেছেন। আজ কালরাত্রি। নব দম্পতির পরস্পর মুখদর্শন নিষিদ্ধ। == (১৯) হেমন্তের কুয়াশাচ্ছন্ন প্রভাত। প্রাচী-গগন-প্রান্তে দিনমণি সঙ্কুচিত চিত্তে ম্লানারুণ ছটায় উদিত হইতেছেন। স্বল্প-নিদ্রালু দত্ত মহাশয় নিম্নতলস্থ বৈঠকখানা-সংলগ্ন বারাণ্ডার উপর পিরাণ গায়ে, মাথায় চাদ- রের পাগড়ী বাঁধিয়া, হুকাদেবীর আরাধনায় নিযুক্ত ছিলেন এবং মধ্যে মধ্যে কাশিয়া সর্দি উদগীরণ করিতেছিলেন। বরযাত্রিগণের অনেকে গাত্রোখান করিয়া গাডু-হস্তে বহির্গত হইতেছেন, কেহ কেহ উক্ত জল-পাত্রের প্রতীক্ষায় কেঁচার কাপড় গায়ে জড়াইয়া, দাঁড়াইয়া দাঁড়াইয়া হাই তুলিতেছিলেন। আট দশখানি গােযান আবরাহিগণকে বহন করিবার জন্য নত মস্তকে দণ্ডায়- মান। গাড়েয়ানেরা কেহ নিজাসনে বসিয়া, কেহ গাড়ীর ছৈএর পার্শ্বে হেলান দিয়া, গামছা-গায়ে দত্ত মহাশয়ের পদাঙ্ক অনুসরণ করিতেছিল, আর গরুগুলি তৃণ-বিরল প্রাঙ্গণে ইতস্ততঃ খাদ্যান্বেষণ করিতে কুরিতে ফোস ফোস্ করিয়া দীর্ঘনিবাস ছাড়িতেছিল।

মমতার গলি।
দত্ত মহাশয় ডকিলেন;-“কালী!”
কালীধন বাটীর ভিতর হইতে উত্তর দিল;-“আজ্ঞে ?”
দত্ত মহাশয় বলিলেন;—“আর দেরী কেন? শেষে গাড়ী পাওয়া
যাবে না।”
কালীধন উত্তর করিল;—“না—আর দেরী কি? ফটকে ওদের বলুন
জিনিষ-পত্র গাড়ীতে তুলুক।”
এমন সময়ে সদ্যস্নাতা মিত্ৰগৃহিণী ডাকিলেন;-“কালী!”
কালী বলিল—“এই যে মার স্নান হয়েছে। তাহলে আর দেরী করে
। ওদিকে বাবা তাড়া দিচ্ছেন।”
মিত্ৰগৃহিণী হাসিয়া বলিলেন—“আমি যে তাের আগে সেজে বসে আছি।
এখন চল একবার ঠাকুর ঘরে। হরে, তােদর বাড়ী পৌছুবাে কথ?
ভাবছি—শিবপুজোটা সেরে নেব কি না?”
কালীধন বলিল,-“মা, এখন শিবপূজো কর্তে গেলে সময় থাকে না।
এতক্ষণ সেরে নিলে হত। আমাদের পৌছুতে বেলা দু'টো। কি
করবে? সেখানে গিয়ে কল্পে চলবে না?”
মিত্ৰগৃহিণী বলিলেন-“তা ভিন্ন ত আর উপায়ও দেখি না।
আয়—ঠাকুরঘরে আয়যাত্ৰা কবি।”
এই বলিয়া তিনি দক্ষিণ হস্তে কালীধনের বাম হস্ত এবং বাম হস্তে
সুপ্রভার দক্ষিণ হস্ত ধরিয়া, ঠাকুর ঘরের নিকটবর্তিণী হইলেন। যাইতে
যাইতে দেখিলেন;-আঙ্গিনায় তখনও ঝটি পড়ে নাই। যেন তাহারই
তাচ্ছিল্যে শেফালি ফুলগুলি ধুলাকাদা মাখিয়া, কতক নােয়কের উপর,
কতক আঙ্গিনায় গড়াগড়ি যাইতেছে। ক্ষণিকের জন্য মিত্ৰগৃহিণীয় হৃদয়ে
উদ্যমহীনতার ছায়া পড়িল। তিনি কালীধনের হাত ছাড়িয়া শিকল খুলিলেন।

মমতার ফঁাসি। । গৃহে প্রবিষ্ট হইতেই একটী মূষিক কিচ মিচ করিতে করিতে ছুটিয়া পলাইল। তিনি পদে কিসের একটা স্পর্শ অনুভব করিলেন। গবাক্ষ উন্মুক্ত, কিন্তু কুয়াসাবৃত, ক্ষীণ সূর্যরশ্মি তখনও গৃহাভ্যন্তর আলােকিত করে নাই। মিত্ৰগৃহিণী দেখিলেন,—পদস্পৃষ্ট পদার্থ একটা বিল্বপত্র ; অমনি তাহার সৰ্বাঙ্গ শিহরিয়া উঠিল। তিনি কম্পিত হস্তে বিল্বপত্ৰটী মস্তকে স্পর্শ করিলেন। বলিলেন,—“তাই ত—কাল নানা কাজে এ গুলাে পুকুরে দিয়ে আসা হয়নি,-বড় অন্যায় কাজ হয়েছে।” গৃহের মধ্যে যাইতে আলােক অপেক্ষাকৃত উজ্জ্বল হইল। মিত্ৰগৃহিণী দেখিতে পাইলেন,-তাকুণ্ডে ফুল বিল্বপত্র নাই। মৃন্ময় শিবলিঙ্গ কয়টা কেহ বজ্ৰহীন, কেহ মস্তক-ছিন্ন, কেহবা পার্শ্ব-দষ্ট অবস্থায়, তাম্রকুণ্ডের অনতিদূরে পড়িয়া আছে। ফুল, বিল্বপত্র সমস্ত ঘরে ছড়াছড়ি। মিত্ৰগৃহিণী তাড়াতাড়ি সে গুলিকে তাকুণ্ডে রক্ষা করিতে করিতে বলিলেন—“ইদুরের বড় উপদ্রব,ঘরে কিছু রেখে শান্তি নেই।” কালীধন বলিল,-“মা, ইদুরের দোষ কি ? আজ কাল তােমার বড় ভােলা মন হয়েছে।” মিত্ৰগৃহিণী বলিলেন-“তা কি করি বল? যে দিকেই না দেখবাে- অগােছালাে হয়ে যাবে। এখন কি করি? এগুলাে পুকুরে দিয়ে আসতে পালে ভাল হত।” কালীধন বলিল,-“দেও আমার কাছে—আমি দিয়ে আসছি-নতুন পুকুরে তুমি এখন যেতে পারবে না।” মিত্ৰগৃহিণী বলিলেন-“থাক্ তােমার আর খালি পায়ে অত দূর যেতে হবে না। ঐ তাকের উপর তাম্রকুণ্ড উপুড় করে রেখে দিচ্ছি। নে— প্রণাম ক দেখি তােরা।”

মুমতার সি। কালীধন ও সুপ্রভা প্রণত হইল। পরিশেষে মিত্ৰগৃহিণী গলায় কাপড় দিয়া প্রণাম করিলেন। বলিলেন; “বাবা আশুতােষ ! অপরাধ নিয়াে না, কালীর আমার ভাল কর।” । ( ২০ ) দত্ত-গৃহে আসিয়া মিত্ৰগৃহিণী দেখিলেন,—যাহা ভাবিয়াছিলেন, তাহার কিছুই হয় নাই। দত্ত মহাশয় পুরাণাে মন্দির চুণকাম করিয়াছেন, কেবল বাহিরের চালাটী নূতন হইয়াছে। কালীধনও অবাক হইয়া গেল। ক্ষণকাল পরে বলিল,-মা, দেখলে যথা পূৰ্ব্বং তথা পরম্ !” মিত্ৰগৃহিণী বলিরুন ;-“থাক্‌ এখন “থাক্‌ এখন—তুই চুপ কর দেখি।” কালীধন আর কিছুই বলিল না। সে বরাবর পিতার উপর শ্রদ্ধাহীন। শুধু মিত্ৰগৃহিণীর একান্ত চেষ্টায় তাহার মন সামান্য পরিমাণে নরম হইয়াছিল। প্রেম-প্রীতি, ভক্তি-ভালবাসা জোর করিয়া হয় না, হৃদয়ের মধ্যে ব্যবধান পড়িয়া গেলে, তাহা মুছিতে যাওয়া ব্যর্থ চেষ্টা। কাপড়ে লােহার দাগ লাগিলে তাহা আর উঠে না। কালীধন কিছু বলিল না বটে, কিন্তু মা ভস্মে ঘৃতাহুতি দিয়াছেন ভাবিয়া, বড় দুঃখিত হইল। যাহা হউক, আমাদের দত্তগৃহিণী কিন্তু নুতন গহনা গায়ে দিয়া, মূতন বেনারসী চেলী পরিয়া, পুত্র-পুত্রবধুকে বরণ করিয়া ঘরে তুলিলেন। খুব ঘটা করিয়া ফুলশয্যা, বৌভাত সম্পন্ন হইল। এটো পাতে খানা ভর্তি হইল। কুকুরের চীৎকারে পার্শ্বস্থ গ্রাম অবধি মুখরিত হইল। ঘরে মমতার সি। মিঠাই-মিষ্টান্নের গন্ধে টেকা দায় হইল। গ্রামস্থ সকলে ধন্য ধন্য করিতে লাগিল। স্ত্রী, পুরুষ সকলে বলাবলি করিল;-“কালীধনের মা এসেছে, অমন মা আমরা কখনাে দেখিনি ;-রাতে-বাড়তে, দেখতে-শুতে, দিতে-থুতে সব তাতেই চমৎকার। দত্তর বাড়ী যেন মা অন্নপূর্ণা এসেছেন- তাই দত্তর অবস্থা ফিরেছে। শুছি, তার নামও নাকি তাই! আহা, এমন লক্ষ্মীও বিধবা হয়! কপাল—” ইত্যাদি। এই কথা দত্তগৃহিণীর কর্ণে পৌছিল। তিনি হিংসায় দগ্ধ হইতে লাগি- লেন। কিন্তু মুখ-নাড়া দিতে গেলে হাত-নাড়া আপনি আসে,-হাত নাড়িতে গিয়া দেখিলেন-তাগাবালা! তিনি বেশী কিছু বলিলেন না। অলঙ্কারে অহঙ্কার বাড়ে-ঝঙ্কারও বাড়ে। আবার সময় সময় অহঙ্কারও চুর্ণ হয়, ঝঙ্কারও কমিয়া যায়। হােমিওপ্যাথির মূলমন্ত্র,—যাহাতে উৎপত্তি, তাহাতেই নিবৃত্তি। বিবাহ মিটিয়া গেল। প্রত্যাবর্তনের পূর্বদিন মিত্ৰগৃহিণী দত্তগৃহিণীকে বলিলেন ;-“দিদি ! একটা কথা বলবাে?” দত্তগৃহিণী বলিলেন ;-“কি বলনা।” মিত্ৰগৃহিণী বলিলেন ;-“টাকা দিলাম বাড়ী কৰ্ত্তে, হলনা কেন দিদি?” দত্তগৃহিণী বলিলেন;—“ওই কথাই তােমাকে বলব বলবাে কচ্ছি, বলতে সময় পাচ্ছি না। এই শােন-কাটা আমাদের শনি। ছেলেকে দিলেন তাড়িয়ে। আমি ত কেঁদে আকুল—শয্যে নিলাম। শেষে ঔরও দুঃখ উথলে উঠলাে, খুঁজতে খুঁজতে গেলেন আবাদে। তার পরে পাগল মত হয়ে চাকরী ক্ষুইয়ে, বাড়ী এসে বসলেন। হাতে গাঁটে যা ছিল,গেল উড়ে। চিরকাল খরচ করে এসেছে—পারবে কেন? তাতে মাথার নেই ঠিক। বিষয়-আশয় যা ছিল সব ত ঘুচুলেন, শেষে বাড়ীখানা অবধি বন্ধক। ।

মমতার ফলি। তারপর তােমার পত্র পেলাম,—ভাই, যেন আগুনে জল ছিটিয়ে দিলে ! ‘ছেলে আছে—দুটো-দুটো পাশ করেছে, জলপানি পেয়েছে’ শুনে দিদি, তুমি যা লিখেছিলে ঠিক,—আমাদের বুকও দশহাত হয়ে উঠলাে। তােমার কাছে টাকা আনতে গেল। এনে বলে কিনা—ছেলে আমার মানুষ হয়েছে,-গাঁ শুদ্ধ, নেমন্তন্ন কৰ্বো, বাড়ী কৰ্বো, হন্ কৰ্বো, ত্যা কৰ্বো। আমি বললাম,-লােক খাওয়াবে,বাড়ী কৰ্ব্বে-কোথায় ? আগে বাড়ী খালাস করাে,—যাকে না দিলে নয়-দেও। তারপর যা হয় করাে। অনেক ঝগড়া-ঝাটির পর দিদি, এই যা দেখতে পাচ্ছ, নইলে এও দেখতে পেতে । আর আমরা আরও ভেবে দেখলাম, গ্রামের মধ্যে আমাদের কালী যা একটু মানুষ হয়ে উঠলাে। এ দেশের পােড়া কপাল !–শুন্‌ছ ত দিনে শিয়াল ডাকছে! বন, জঙ্গল,রাস্তা নেই, ঘাট নেই, ডাক্তার নেই, বঙ্গি নেই, নাপূতে নেই। যত ভূত-পেরেতের আড়া—এখানে কি মানুষ বাস করে? কালী আমাদের হয়ত কলকাতায় বাড়ী করবে। সে কি এখানে বাস করবে ?” ইতিমধ্যে কালীধন সেখানে আসিল। মিত্ৰগৃহিণী বলিলেন ;—“যাক—যা হবার হয়েছে। আমি তােমার শেষ কথার একটু উত্তর দিই। মানুষ হলে, দেশে বাস কৰ্ত্তে নেই, দেশের অবস্থা খারাপ বলে দেশ ছাড়তে হবে—এ কেমন কথা? বন, জঙ্গল, বাঘ, ভালুক, ভূত, প্রেত-কলকাতার কথা বলছ,-কলকাতায় ছিল না ? এখন কলকাতা সহর-বন-জঙ্গল কেটে সহর। মানুষ হলে, বন-জঙ্গল কেটে এই গ্রামও আবার সহর করে নেওয়া যেতে পারে। মানুষ হয়ে যদি গ্রামের ছেলে নিজের গ্রামের উন্নতি একটুও না কর্তে পারে, সে মানুষ হয়ে লাভ ? বড় খেতাব নিয়ে, জুড়ি-গাড়ী চড়ে, সাহেবের খানা খেয়ে মানুষ মানুষ হয় না, মানুষ মানুষ হয় দেশের সেবায়। আমার মতত্তমশায় এই ?

৪৭ মমতার ফসি। বরপণের টাকা নিয়ে বাড়ী আরম্ভ করুন।” পরে কালীধনের পানে চাহিয়া বলিলেন-“কি বলিস কালী, তাের কি মত?” কালী বলিল -“তােমার মতে অমত করার সাধ্য আমার নেই।” দত্তগৃহিণী হেট-মুণ্ডে বলিলেন ;—“তবে এবার তাই হােক।” ; ( ২১ ) চম্পাপুরে প্রত্যাগমন করিয়া কালীধন কলিকাতায় ফিরিয়া গেল। সুপ্রভা পিতৃগৃহে আনীত হইল। পরিণয়ের পর হইতে কালীধনের জীবনের মধ্যে এক অভিনব ভাবের মলয় হিল্লোল বহিতে লাগিল। কি এক অননুভূত প্রসন্নতা, কি এক বিশ্বপ্রীতি-পরিলিপ্ত কুসুমপেলব কোমলতা আসিয়া, ধীরে ধীরে তাহার চিত্ত অধিকার করিয়া বসিল। কে যেন তাহার অন্তরের অন্তস্তল ধ্বনিত করিয়া বলিতে লাগিল ;-“এই সৌন্দর্য্যের পথ, এই মাধুর্যের সােপান, এই ঔদার্যের বিশ্রামস্থান,—এইখানেই মানব-জীবনের—গার্হস্থ্য-জীবনের সার্থকতা।” কালীধন দেখিল,-সুপ্রভার সুন্দর মুখখানির মধ্যে এক স্বর্গীয় মাধুরী বিজড়িত আছে, যাহা তাহার জীবনকে মধুময় করিয়া তুলিয়াছে। ইতঃ- পূর্বে তাহার ধারণা ছিল,নারীপ্রেমের ঘূর্ণাবর্তে পড়িলে, জীবনের উচ্চা- কাঙ্ক্ষা খুশিমুষ্টির ন্যায় বিঘূর্ণিত হইয়া ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত হইয়া পড়ে ; নারী হৃদয়ের সহিত পুরুষের প্রতিভাসমূহ সংঘৃষ্ট হইয়া, তাহার পুরুষােচিত বীৰ্য্যবস্থা চূর্ণ হইয়া যায় ; দুস্থে অনিষেকের ন্যায়, রমণীর রমণীয়তায় পুরুষের ;

মমতাৰ সি। পুরুষত্ব নারীত্বে পরিণত হয়। সম্প্রতি তাহার সে সংস্কার 'অলীক বলিয়া বােধ হইতেছে। এখন সে বুঝিতেছে,-এককশক্তি অপেক্ষা যুক্তশক্তি উন্নতির পক্ষে অধিক সহায়ক। সুতরাং, যাহা তাহার প্রতিবন্ধক বলিয়া ধারণা হইয়াছিল—আজ দেখিল,—তাহাই তাহার পরম মিত্র। বস্তুতঃ, উৰ্বর হৃদয়ক্ষেত্রে অনুরাগের বীজ উপ্ত হইলে, তাহা হইতে অঙ্কুরিত ভালবাসারূপ বৃক্ষে বিশ্বপ্রেমের প্রসূনরাজি মুকুলিত হয়। ক্রমে মানবের উচ্চমনােবৃত্তিরূপ বল্লরীসমূহ সেই মহাম বেষ্টন করিয়া কুসুমসম্ভারে বিভূষিত হয়। কিন্তু সেই বীজ যদি লালসা-কীট-দষ্ট হয়, অথবা সেই হৃদয় উষর হয়, তাহা হইলে কিছুরই আশা করা যায় না। তাহাতে বীজ ও ক্ষেত্রজীবন উভয়ই ব্যর্থ হয়। এইজন্য অনুকূল ভাগ্যফলের প্রয়ােজন। কালীধনের সে ভাগ্যানুকূল্য ঘটিয়াছিল। সুপ্রভা বিলাসের উপকরণ-রূপে তাহার অঙ্কগত হয় নাই। সুতরাং, পরিণয় বা প্রাণ-বিনিময় সার্থক হইয়াছিল। কালীধন মধ্যে মধ্যে যখন চম্পাপুর আসিত, সেই সময় মিত্ৰগৃহিণী সুপ্রভাকে গৃহে আনিতেন। কালীধন দেখিত, ইহাতে পড়াশুনার কোনও ব্যাঘাত হয়না,বরং সহায়তা হয়। কালীধন ক্লান্ত হইয়া শয়ন করে,—সুপ্ৰভা শয্যা- পার্শ্বে বসিয়া বাতাস করে, কখন্ বা গায়ে হাত বুলাইয়া দেয় ; কখন্ বা জাগিয়া বসিয়া নিজে পড়ে এবং যথাসময়ে কালীধনকে পড়িবার জন্য ডাকিয়া দেয়। কোনও কোনও দিন কালীধন নিজেই উঠে, তখন সুপ্রভা ঘুমায় একদিন শীতকালে কালীধন অত্যন্ত শ্রান্ত হইয়া বাটী আসিয়াছে। সেদিন এত শীত যে, ঘরের মধ্যেও গায়ের কাপড় গায়ে দিয়া শীত মানায় না। কালী- ধনের গৃহের গবাক্ষসমূহ সার্সি-সমেত বদ্ধ। তবু সেই অববােধ ভেদ করিয়া, হিম-ঋতু বহমধ্যে প্রবেশ করিতেছিল। কালীধন নিদ্রিত, কিন্তু সেই ভীষণ শীতে সুপ্রভা চেয়ারের উপর বসিয়া, “দ্রৌপদীর স্বয়ম্বর” পড়িতেছে!

মমতার ফালি। রাত্রি দুইটা বাজিয়াছে, আজ তখনও সে কালীধনকে ডাকে নাই। পরিশ্রান্ত বলিয়া রাত্রি সাড়ে চারিটার সময় ডাকিয়া দিবে স্থির করিয়াছে। কিন্তু সহসা কালীধনের নিদ্রাভঙ্গ হইল। সে ঘড়ির দিকে চাহিয়া দেখিল,—দুইটা বাজিয়া সতের মিনিট। সুপ্রভাকে ডাকিল;-- সুপ্রভা চমকিয়া উঠিল, -বলিল—“কি—এখনি উঠলে যে? শরীরটা খারাপ,আর একটু ঘুমােও। ঠিক সময়ে আমি তােমাকে ডেকে দেব।” কা। তুমি উঠে এস,—এই শীতে রাত জেগে কি করে বসে আছ ? আজ আর তােমাকে ডাকতে হবে না। সুপ্রভা উঠিয়া আসিল, বলিল ;-“কেন—এই শীতে রাত জেগে তুমি বসে পড়তে পার, আর আমি তােমাকে পড়তে ডাকবার জন্য একটু বসে থাকতে পারব না! মাসিমার কাছে শুনেছি, স্ত্রী স্বামীর সহধম্মিণী মহাভারত পড়ছি—তাতেও তাই শিখছি। তুমি ঘুমােও—আমি তােমাকে ডেকে দেবাে এখন।” কা। তুমি আমার সহধর্মিণী, আবার অর্ধাঙ্গিণী, কাজেই তােমার কষ্ট দেখলে আমারও কষ্ট হয়। গ্রীষ্মকালে তুমি বসে বাতাস দেও, আর আমি মজা করে ঘুমুই, এ আমার বড় স্বার্থপরতা বলে মনে হয়। সুপ্রভা একটু হাসিয়া বলিল -“বটে। আগে গরমের সময় মাসিমা যখন তােমাকে বাতাস দিয়ে ঘুম পাড়াতেন, তখন স্বার্থপরতা বলে বােধ হত ,আর এখন কা। তা সে না হয় তুমি বাতাস দিও--আমি কিছু মনে করবে না। কিন্তু আজ আমি এইটুকু ভাবছি, তুমি আমাকে পড়তে ডাকবে বলে, রাত ই অবধি বসে পড়ছে,সাড়ে চারটা অবধি পড়বে ঠিক করেছ,--আর হলে এতক্ষশ ঘুমিয়ে আছি। আজ তুমি আমার শিক্ষয়িত্রী।

মমতার সি। সু। আমি তােমার দাসী। দাসীর সৌভাগ্যে যদি হিংসা হয়, তবে এস,-তুমিও পড়, আমিও পড়ি। কা। না, সুপ্রভা,তােমার সুন্দর মুখখানা আমার সামনে ফোটা ফুলটীর মত জেগে থাকলে আমার পড়ায় মন লাগবে না। এখন তুমি ঘুমােও—আমি পড়ি। সুপ্রভা হাসিয়া বলিল,-“তােমার জয়েই আমার সুখ।” কালীধন লেপ ছাড়িয়া উঠিয়া সুপ্রভার মুখচুম্বন করিল। ( ২২ ) কালীবন মেডিকেল কলেজ হইতে প্রশংসার সহিত উত্তীর্ণ হইল—এবং অস্ত্রবিদ্যায় পারদর্শিতার জন্য স্বর্ণপদক প্রাপ্ত হইল। বাড়ী আসিয়া মিত্ৰগৃহিণীকে বলিল,-“মা, সিংহগড় রাজার অধীনে একজন ভাল ডাক্তারের দরকার। তিন শ’ টাকা মাইনে, বাইরে প্রাকৃটিশও চলবে। কলেজের প্রিনসিপ্যাল আমাকে যেতে অনুরােধ কচ্ছেন। তুমি কি বলে ?” মিত্ৰগৃহিণী বলিলেন ;-“আমার মতে কিন্তু তােমার দেশে বসাই ভাল। দেশে ভাল ডাক্তার কবিরাজ নেই। বিনা চিকিৎসায় কত লােক মারা যায়। আর এক কথা, দেশে না থাকলে দেশে মন বসে না, দেশের উপকারও করা যায় না। এ বিষয়ে তােম'র বাপ-মায়ের মত কি জেনেছ ?” কা। মা, এবার আমি তােমার বড় সুবােধ ছেলে হয়েছি। বাবাকে তােমার বলবার আগেই পত্র দিয়েছি। বাবা লিখেছেন,—“তুমি পত্র-পাঠ ৫১ মমতার ফাসি। ঐ চাকরী গ্রহণ কর। তবে আমরা তােমার সঙ্গে থাকবে। দেশে আর আমার ভাল লাগছে না। আর বৃদ্ধ হয়েছি, এমন সময় তীর্থ-ধৰ্ম্ম করা দরকার। দেশে বসে কিছু হবে না, বরং তােমার কাছে থাকলে তার সুবিধা হবে।” তবে তুমি যা বলছ, সেটাও ঠিক,—পরের দাসত্ব না করে দেশে বসে যা করা যায়—তা গৌরবের। কিন্তু মা, একটু গুছিয়ে নিয়ে দেশে গিয়ে বলে ভাল:হয় না কি? মি গৃ। তা ঠি,দেশ গরীব। তােমার বাপ-মার তীর্থ-ধৰ্ম্ম করানও তােমার কর্তব্য। তবে ঐ চাকরীই নেও। কা। তা হলে কে কে যাবে সেখানে ? মি গৃ। সুপ্রভাকে নিয়ে যাও। আর তােমার বাপ মা যাচ্ছেন। কালীধন অভিমানপূর্ণ কণ্ঠে বলিল ;-“আর তুমি বুঝি যাবে না? তােমার তীর্থ-ধৰ্ম্ম করার অধিকার বুঝি আমার নেই ?” মিত্ৰগৃহিণী হাসিতে হাসিতে বলিলেন,—“অমনি ছেলের মান হল! বেশ করে ভেবে দেখ, দেখি—আমার যাওয়া কি উচিত? আর গেলেও কি চলে? তারপর আমি কাশীতে বাড়ী কিনেছি। শেষ জীবনটা সেখানেই কাটাবাে মনে কচ্ছি। সকাল সকাল বিশ্বেশ্বরের পায়ে আশ্রয় নিই। তােরা সুখে ঘর-সংসার কবু। আমি সেখান থেকে শুনে সুখী হবে।” কা। মা, তােমার সদুদ্দেশ্যে বাধা দেওয়ার ক্ষমতা আমার নেই। তবে কষ্ট হয়, তােমার কোলে মানুষ হয়ে উঠতে না উঠতে, তুমি ছেলেকে ঠেলে ফেলে দিচ্ছ। আশা ছিল, যে ঋণে তুমি আমাকে বেঁধেছ, যদি তার এক কণাও শােধ কর্তে পারি। কিন্তু তুমি আমাকে সে অবসরও দিতে চাইছ না! শুধু দিয়েই গেলে, প্রতিদানের সুযােগ আসতে না আতে পালিয়ে চল্লে ! আর আমি তােমার মত মাকে দূরে রেখে, মমর ফাসি। অকৃতজ্ঞ সন্তানের ন্যায় সুখে সংসার কৰ্বো ! মা, এ সংসার কার ? মি গৃ। তােমার-আমার ছেলের। কা। এ ছেলে পেয়ে ছিলে কোথা হতে? একদিন বলেছিলে, মনে পড়ে, শিবপূজার ফলে তুমি আমাকে পুত্ররূপে পেয়েছ ? মি গৃ। পড়ে,--এখনও বলি, তুমি আমার তাই। কা। তুমি তােমার সেই শিবপূজার ফলকে দূরে ফেলে, স্থির হয়ে থাকতে পাবে ? মি গৃ। তােকে পেয়ে তাের ওপর আমার যা কর্তব্য, আমি তা সাধ্যমত পালন করেছি। তােকে মানুষ করেছি, তােকে তাের বিয়ে দিয়ে সংসারী করেছি, তােকে তাের বাপ মায়ের সাথে মিলিয়ে দিয়েছি। এই কর্তে গিয়ে, তুইত কত দিন লক্ষ্য করেছি, আমি আমার ইষ্টদেবের সেবায় ত্রুটী করেছি। বাবা, আমি যে বিধবা। তাই ভয় হয়, এজন্মে এই হয়েছি, পর জন্মে আবার না জানি ভাগ্যে কি হবে ! কা। মা । বুঝি সব। কিন্তু ছেড়ে যেতে আমার প্রাণ ফেটে যায়। কেবল এই মনে হয়,—এমন প্রাণ ভরে মা বলে আর ত কাউকে ডাতে পাবাে না। মা তােমার মত আদর-যত্ন আমায় তুমি ছাড়া আর কি কেউ কর্তে পাবে ? কালীধনের চক্ষু অশ্রুসিক্ত হইল। মিত্ৰগৃহিণীও কাদিলেন। “বাবা আমার, আমি মধ্যে মধ্যে তােমার ওখানে যাবাে। ছিঃ ! কেঁদো না।” এই বলিয়া তিনি অঞ্চল দিয়া কালীধনের চক্ষু মুছাইয়া দিলেন। অর জয় হইল।

মমতার সি। ( ২৩ ) দত্ত মহাশয় বাড়ী ফাদিয়া বসিয়াছেন। গৃহিণী বলিয়াছেন,-“দুটো ঘরের বেশী যদি একখানা ইট গাড়ােত মুড়াে জ্বেলে দিয়ে বেরােববা।” অগত্যা তাহাই হইতেছে। ইতিমধ্যে সংবাদ আসিল,-কালীধন ডাক্তারী পাশ হইয়াছে, ৩০০ টাকার মাহিনার চাকরী ঠিক হইয়াছে। ইহা শুনিয়া দত্তগৃহিণী বলিলেন ;-“দেখলে আমার কথা খালাে কি না ? ওঁর কালী বাড়ী আছে—বাড়ীতে বসে ডাক্তারী কৰ্বে ! বয়ে যাচ্ছে তার। মাগী ন্যাকা বুঝিয়ে গেল—আমরা নাকে ভাত দিই কি না!” দ ম। তাত হল—এখন কি করবে বল ? দ গৃ। পুরুষ মানুষ হয়েছিলে কেন? বুঝতে পারছেন না কিছু ! এই হল--বড় লােকের বড় শিকার ! আর কি ?—এইবার ত এক বছরে পড়ানর খরচা উঠে যাবে। তারপর সব লাভ। কি ধড়িবাজ ! এই ধড়িবাজী যদি ভাঙতে পারি, তবে আমি কানাই দের মেয়ে। নেও—এখন তল্পী বাঁধে। কোটা এই ভাবেই থাক্। ছেলেকে ভূতে পেয়ে রেখেছে। সে ভূত আগে ছাড়াও তারপর যা হয় কোরাে। ছেলের সঙ্গে-সঙ্গে যেতে হবে,—ছেলেকে হাত কৰ্তে হবে,—মাগীটাকে তাড়াতে হবে। পেত্নী কল্লে, তবে মঙ্গল। নচেৎ তােমার দুঃখে শিয়াল কুকুর কঁদবে। দম। তবে তাই হােক। গৃহিণী গর্জিয়া বলিলেন;-“এ রাবণ রাজার স্বগগে সিড়ি দেওয়া নয়— যে কথা সেই কায। আজই লিখে দেও--‘চাকরী ছেড়ো না, আমরা তোর কাছে থাকুবাে, কোনও কষ্ট হবে না।”

মমর ফাসি। ৫ দত্ত মহাশয় সেই দিনই পত্রের উত্তর লিখিলেন। গৃহনির্মাণ স্থগিত হইল। পত্ৰ আসিলেই যাত্রা করিবেন বলিয়া, তৈয়ারি হইয়া বসিয়া রহিলেন। অল্প দিনের মধ্যেই সংবাদ আসিল ;-সত্বর চলিয়া আসিবেন। আজ দত্ত মহাশয়ের বৈঠকখানায় শেষ বৈঠক। বৃদ্ধের দল সকলেই বিমর্ষ—আজ এই চারি পাঁচ বৎসরের আস্তানা নিধুম হইবে ! কিন্তু তাহারা বুঝিতে পারিলেন না,-ইতিমধ্যে গ্রামের অকর্মণ্য যুবক-সম্প্রদায় এখানে একটী সখের যাত্রার আকৃড়া খুলিবে বলিয়া ঠিকঠাক করিয়াছে। ধূমের সহিত কত ‘ধুম’ চলিবে, তাহার ইয়ত্তা থাকিবে না। মদন মুখুয্যে মহাশয় বলিলেন ;-“ভায়া চললে ত। কিন্তু একটু বুঝে চলল। আজ কালের ছেলে-ভারি তেজী। তাতে তােমার ছেলের মত ছেলে। তার অমতে কোনও কাব কন্ট্রে যেয়াে না। সর্বদা মিষ্ট ব্যবহার কৰ্বে। আর এটা মনে রাখবে,-বার্ধক্যে পুত্ৰই পিতা, আর পিতাই মল্লিক মহাশয় বলিলেন ;-“হাঁ, ছেলেকে মশায়—মশায় কৰ্ত্তে হবে, ছেলের বােয়য় পদসেবা কর্তে হবে--তবে মন পাবে !” সমাদ্দার মহাশয় বলিলেন ;-“আজ কাল ত তাই হয়েছে,-ছেলের চেয়ে ছেলের বােয়ের পায়া ভারী! বধুমাতা যদি সন্তুষ্ট থাকলেন, তবেই মঙ্গল,-তবেই বাপ তিনি বাপ-মা তিনি মা। আর তা নইলে কোথাকার কে ?, হায় রে কলি।

মমতার কঁসি। মুখুয্যে মহাশয় বলিলেন ;-“দেখ, সেটা আমরাই করেছি। ছেলে বাপের অনুকরণ করে। তুমি যদি তােমার বাপকে ধরে মারাে, আর তােমার ছেলে যদি তাই দেখে-তা হলে সে কি তােমাকে দুধের বাটী দেবে ?” সমাদ্দার মহাশয় চড়িয়া উঠিলেন—বলিলেন -“আমি আমার বাবাকে মারি-বলে কোন্ শালা ?” মুখুয্যে মহাশয় উঠিয়া চলিয়া গেলেন। বসু ও দত্ত মহাশয় একবােগে ডাকিলেন ;-“ও মদন দা—আরে শােন শােন, তামাকটাই খেয়ে যাও।” মুখুয্যে মহাশয় আর ফিরিলেন না। ( ২৪ ) ছয় মাস হইল, কালীধন সিংহগড়ে আসিয়াছে। রসায়ন শাস্ত্রে বলে,- যে পদার্থের Valency অর্থাৎ আণবিক আকর্ষণ বেশ, সেই পদার্থ রাসায়নিক সংসক্তিবশতঃ মিশ্র পদার্থ হইতে, অপেক্ষাকৃত তুল্যশক্তিবিশিষ্ট পদার্থকে আকৃষ্ট করে এবং তাহার ফলে, অপেক্ষাকৃত হীনশক্তিবিশিষ্ট পদার্থ বিচ্ছিন্ন হইয়া যায়। আমাদের কালীধন, দত্ত মহাশয় ও দত্তগৃহিণীর সহিত এই নিয়মটা অনেকটা খাটিয়া গিয়াছে। তবে গৃহিণীর উপর দত্ত মহাশয়ের যে আকর্ষণ ছিল, সেটা বিজ্ঞানসম্মত কোনও আকর্ষণের অঙ্গীভূত নহে, উহা ছিল বিভীষিকাকর্ষণ ! যেমন প্রহৃত বালক ভীত হইয়া প্রহর্তা শত্রুরও কণ্ঠ-লগ্ন হয়, দত্ত মহাশয় এই বৃদ্ধ বয়সে সেইরূপ গৃহিণী-লগ্ন হইয়া- ছিলেন। কালীধন হার ঔরসজাত সন্তান, তাহার প্রতি তাঁহার স্বাভাবিক মমতার সি আকর্ষণ দিন-কতকের জন্য গৃহিণীর ভ্রকুটী-ভঙ্গীর অন্তরালে পড়িয়া, নিক্ষিয় অবস্থায় ছিল। এখন সেই কুটী-তাড়না কথঞ্চিৎ প্রশমিত হওয়ায় এবং তাহার উগ্রচণ্ডী অবধি কালীধনের প্রতি বাহভাবে প্রসন্ন হওয়ায়, সেই অন্তরালের যবনিকা ঈষৎ ছিন্ন হইল। অধিকন্তু, পূর্বকৃত দুর্ব্যবহারের তুষানল- সদৃশ অনুতাপ কালীধনের প্রতি তাঁহার সেই স্বভাব-সঞ্জাত আকর্ষণ আরও জাগরিত করিয়া তুলিল। প্রবণশক্তি কালীধন, অপেক্ষাকৃত তুল্যশক্তি দত্ত মহাশয়কে টানিয়া লইল—সুতরাং, গৃহিণী একটু দূরে পড়িলেন। গৃহিণী যে তাহা বুঝিতে পারিলেন না—এমন নহে,তবে কি জানি কি ভাবিয়া, মনের আগুন মনে চাপিয়া রাখিলেন। কিন্তু আগুন বেশীক্ষণ চাপিয়া রাখিলে, হয় তাহা নিবিয়া যাইবে, নচেৎ একটু একটু করিয়া জ্বলিয়া উঠিবে। দত্তগৃহিণীর মনের আগুন নিৰ্বাপিত হইল না, একটু একটু করিয়াই আত্মপ্রকাশ করিতে আরম্ভ করিল। একদিন কালীধন মাহিনা পাইয়া, তাহা আনিয়া পিতার হস্তে দিলেন। পিতা বৃদ্ধ, তাহার কাণ্ডজ্ঞান লােপ পাইয়াছে,—তিনি তাহা লইয়া নিজের নিকট না রাখিয়া, বাড়ীর মধ্যে আসিয়া সুপ্রভাকে বলিলেন ;-“মা, এই নেও, তােমার জিনিষ তুমি নেও।” সুপ্রভা সেই টাকাগুলি লইয়া, অদূরস্থিত শত্রুঠাকুরাণীর নিকট গিয়া বলিল ;-“মা, বাবা এই টাকাগুলাে দিলেন—রাখাে।” গৃহিণী রাগে গর গর করিতেছিলেন। তিনি থাবা মারিয়া সুপ্রভার হস্ত হইতে টাকা ও নােটগুলি মেজেয় ছড়াইয়া দিলেন। বলিলেন,-“আমি তােমাদের কে ? আমি এখানে দাসী-বিত্তি কত্তে এসেছি,দাসী-বিত্তি করেই চলে যাবে। আমার অত ঝঞ্চাটে দরকার কি? বুড়াের ভীমরতি ধরেছে বলে বাপু, তােমারও কি বুদ্ধি-শুদ্ধি নেই? তােমাকে রাখতে বল্লেন তুমিই রাখখা।”

৫৭
মমতার সি।
}
টাকাগুলি কুড়াইতে কুড়াইতে সুপ্রভা বলিল
কুড়াইতে সুপ্রভা বলিল ;-“মা, এ তােমার
ভারি অন্যায়। বাবা দিয়ে গেলেন,—তােমার ছেলের টাকা তুমি রাখবে
কে রাখবে?”
দত্তগৃহিণী বলিলেন -“আমার ছেলের টাকা হলে, টাকা এনে আমার
হাতেই দিত।”
সুপ্রভা বলিল ;-“এবার তুমি নেও। আমি তাকে বলবাে,-এবার
মাইনে এনে বেন তােমার হাতে দেন।”
দত্তগৃহিণী নিজের চিবুক স্পর্শ করিয়া বলিলেন-“ওরে কলি ছেলেকে
শিখাবেন ছেলের বউ ! বলে,-“তুমি আমার সব্বেশ্বরী, পা ধুয়ে দেও গণ্ডুষ
করি ! অমন মায়ের পােড়া কপাল না !”
দত্তগৃহিণী কপাল চড়াইতে লাগিলেন। বিপদ সঙ্গীন দেখিয়া সুপ্রভা
দত্তগৃহিণীর পা-দুখানি ধরিয়া বলিল ;-“মা, আমার অপরাধ হয়েছে,
আমায় মাপ করাে।”
বহুদিন-পরিচিত চীৎকার শুনিয়া, দত্ত মহাশয় ঘরে আসিয়া, এককোণে
দাড়াইয়া কাপিতে লাগিলেন। এমন সময় কালীধনও প্রবেশ করিল।
তাহার ব্যাপার বুঝিতে বিলম্ব হইল না। সে তাড়াতাড়ি গিয়া মাতার
পা জড়াইয়া ধরিল,—বলিল ;-“মা, অপরাধ আমারই। এমন কাজ আর
করবাে না। এবার আমায় ক্ষমা করাে।”
দত্তগৃহিণী শান্ত হইলেন
;

মমতার গলি। (২৫) ক সম্প্রতি কালীধন বড় বিপন্ন ! এক দুষ্ট-ক্ষত আজ প্রায় একমাস হইল, তাহাকে বড়ই যন্ত্রণা দিতেছে। চিকিৎসা-ব্যবসায় শ্লাঘার বিষয় বটে, কিন্তু এমন বিপজ্জনক,—এত দায়িত্বপূর্ণ কাৰ্য্য জগতে বিরল। অহিতুকি বিষধরের বিষদন্ত ভাঙ্গিয়া, তবে তাহার সহিত খেলা করে, কিন্তু ইহা কালকূটময় কালান্তকের সহিত খেলা বা রণাঙ্গ বলিলে অত্যুক্তি হয় না। নিজের জীবনকে তুচ্ছজ্ঞান করিয়া, এই কার্যে অগ্রসর হইতে হয়। আবার একটু অসাবধানতায় একটু তাচ্ছিল্যে পরের জীবন-সংশয় ঘটিবে, ইহা কি সহজ কথা ! কোনও এক রােগীর দূষিত ও পচনশীল ব্ৰণ অস্ত্র করিতে গিয়া, দুর্বিপাক- বশতঃ ছুরিকার অগ্রভাগ কালীধনের বামহস্তের অনামিকা অঙ্গুলির মস্তকে বিদ্ধ হয়। তৎক্ষণাৎ রােগীর ক্ষতদেশ সেলাই করিয়া না দিলে, পাছে তাহার কোনও প্রকার বিপদ ঘটে এবং সেখানে সহায়তাকারী উপযুক্ত চিকিৎসক উপস্থিত না থাকায়, ক্ষিপ্তহস্ততাসত্বেও নিজ ক্ষতের প্রতীকার করিতে কালীধনের একটু বিলম্ব হয়। ফলে, সেই ক্ষত নিরাময় না হইয়া, এক্ষণে পচিতে আরম্ভ করিয়াছে ; অঙ্গুলির এক সব আক্রমণ করিয়াছে এবং যত দিন যাইতেছে তত নীচে নামিয়া আসিতেছে। ব্যাপার গুরুতর বুঝিয়া, কালীধন রাজাকে এ বিষয় জানাইয়াছে। কর্মদক্ষতা-গুণে রাজা কালীধনকে প্রীতির চক্ষে দেখিতেন। তিনি এই কথা শুনিয়া সাহেব ডাক্তার আনাইয়া কালীধনের চিকিৎসা করাইতেছেন। পূর্ব হইতে ঔষধ-প্রয়ােগ চলিতেছিল। ডাক্তার সাহেবও আসিয়া নানাবিধ ঔষধ দিয়াছেন, কোনও ফল হয় নাই। অতঃপর দুইবার অালনাও ব্যর্থ হইয়াছে। অগত্যা অঙ্গুলিটাকে দেহ মমতার সি। হইতে বিচ্ছিন্ন করাই এখন ডাক্তার সাহেবের মত। কালীধনও তাহাতে না বলিতে পারে নাই। কল্য প্রত্যুষেই অস্ত্র হইবে । রাত্রিতে কালীধন বিছানায় পড়িয়া ছট্‌ফট্‌ করিতেছিল। সুপ্রভা বিষন্নভাবে পার্শ্বে বসিয়া বাতাস দিতেছিল। ক্ষণকাল পরে কালীধন বলিল,-“ও বড় যন্ত্রণা ! সু-” সুপ্রভা বলিল,-“কি করব বল?” কা। “তুমি একটু ফু দেও। হয়ত পাখার বাতাসের চেয়ে তােমার ফু ঠাণ্ডা। একটু ফু দেও সু- সুপ্রভা মস্তক অবনত করিয়া স্বামীর অঙ্গুলিতে ফু দিতে লাগিল। খানিক পরে কালীধন বলিল ;-“থাক্-আর দিতে হবে না—তােমার কষ্ট হচ্ছে।” সুপ্রভা ফু থামাইয়া বলিল ;-“হােক আমার কষ্ট,-“তুমি ত একটু আরাম পাচ্ছ ?” কালীধন বিষাদ-হাসি হাসিয়া বলিল ;-“আমারই ভুল, ফু দিয়ে কি ঘরের আগুন নিবান যায় ? ও কিছু হচ্ছে না, তােমার মুখ ব্যথা হচ্ছে মাত্র। থাক,তুমি বরং বাতাস দেও।” সুপ্রভা আবার বাতাস দিতে লাগিল। কালীধন একটু স্থির হইয়া বলিল ;-“তাইত, কাল আঙুলটা কেটে ফেলবে। কি আর হবে? দুষ্ট বলদের চেয়ে শূন্য গােয়াল ভাল।” সুপ্রভা চমকিয়া উঠিল, বলিল ;-“কি বললে—আঙুল কেটে ফেলবে?” কা। তা ভিন্ন আর উপায় কি ? সুপ্রভা কাঁদিয়া ফেলিল,-বলিল -“তাহলে কি হবে?” কা। হবে আর কি—সেরে যাবে। তােমার ভয় হচ্ছে ? ভয় কি ? আমি যে কত লােকের হাত পা কেটে দিয়েছি।

ক সু। ওগাে ভয় কচ্ছি না। তুমি যখন বলছ,—ভয় কি, তখন ভয় কওে যাব কেন? আমি ভাবছি,তােমার এমন সুন্দর দেহের একটা অঙ্গ-হানি হবে,—আমি তা কেমন করে দেখবাে ? কালীধন এত যন্ত্রণার মধ্যেও হাে হাে করিয়া হাসিয়া উঠিল,-বলিল ; “পাগলি, সামান্য একটা আঙুল গেলে লােকের কি হয় ? আর সৌন্দৰ্য্য ত অন্তরে,—বাহিরের সৌন্দর্য্যে কি আসে যায়?” সু। ও কথা বলে এখন আমি শুনব কেন ? সেদিন ঐ পাহাড়গুলাের নীচে সূর্য অস্ত যাচ্ছিল, তুমি আমাকে ডেকে দেখালে—আর বলে ; “ঐ দেখ, ভগবান পৃথিবীকে শুধু সুজলা-সুফলা করেন নি,—প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যে ভূষিত করেছেন। তেমনি মানুষের অন্তরের ও বাহিরের সৌন্দৰ্য্যও ভগবানের দান।” আজ তুমি সেই ভগবানের দেওয়া সৌন্দর্য্য হতে বঞ্চিত হতে যাচ্ছ। ভেবে দেখ দেখি—আমার কত কষ্ট ! কালীধন মুগ্ধ হইল । সে সুপ্রভার গণ্ডে চুম্বন অঙ্কিত করিয়া বলিল ;-“সু আমার, আজ আমাকে এই আঙ লের যন্ত্রণায় যত না অধীর করেছে, তােমার কথাগুলি তার চেয়ে বেশী আনন্দে অধীর করে তুলেছে। যেদিন তােমাকে আমি ঐ কথাগুলাে বলেছিলাম,—সেদিন এই সাহেব ডাক্তারের মুখে শােনা আমেরিকার আর একটী গল্প তােমার কাছে করেছিলাম, মনে পড়ে? তাই কতে পারলে উপায় হয়। কিন্তু সে বদ ফমাস। কি কবে বল ? ভগবানকে ডাক, তিনিই তােমার মনের অভাব দুর কৰ্ব্বেন।”

মমতার সি। = ( ২৬) বাসন্তী প্রভাত। সিংহগড়ের অদূরবর্তী পাহাড়-শ্রেণীর অন্তরাল হইতে দিনমণির বালারুণ-রশ্মি দৃষ্টিগােচর হইতেছিল। প্রাঙ্গণােপকণ্ঠস্থ শাল, পলাশ ও বন্য-কদম্ব বৃক্ষের শ্যাম পল্লবগুলি সুগন্ধ সমীরণভরে হেলিয়া দুলিয়া, মৰ্ম্মর ধ্বনি তুলিতে ছিল এবং প্রাঙ্গণ-মধ্যস্থ নাতি-বৃহৎ উদ্যান হইতে বেলা ও মল্লিকার মধুর সুরভি চতুর্দিক আমােদিত করিয়া ৰেড়াইতেছিল। এইমাত্র বৈঠকখানায় কালীধনের অঙ্গুলিচ্ছেদ সমাধা হইল। ডাক্তার সাহেবের সহকারী এখনও ব্যাণ্ডেজ-বন্ধনে নিযুক্ত। সাহেব হস্ত- প্রক্ষালন করিয়া, চেয়ারে বসিয়া এইমাত্র সিগারেটটা মুখে ধরাইয়াছেন, এমন সময় বাড়ীর মধ্যে পরিচারিকার চীৎকার শ্রুত হইল ;-“ওগাে তোমরা কে কোথা-এস গাে,আমার কথা শুনলে না, আনাজ কুটতে গিয়ে মা আঙুল কেটে দুখানা করে ফেলেছেন।” অদুরে দত্ত মহাশয় দণ্ডায়মান ছিলেন, চমকিত হইয়া ডাকিলেন ;- “সাহেব !” সাহেব বাঙ্গালা দেশে থাকিয়া বাঙ্গালা শিখিয়াছিলেন। তিনি গাত্রোখান করিলেন। এসিষ্ট্যান্ট কে বলিলেন;—“You better see Mr. Dutt. I've another call” (তুমি মিঃ দত্তকে দেখ, আমার আর একটা ডাক এসেছে।) ডাক্তার সাহেব দত্ত মহাশয়ের সহিত অন্দরে প্রবেশ করিয়া দেখেন- রক্তের নদী বহিয়া যাইতেছে ! তরকারিগুলি রক্তময়। বটীখানি রক্ত মাখিয়া কাৎ হইয়া আছে, আর তাহার পার্শ্বে সুপ্রভা রক্তাক্ত বসনে পড়িয়া আছে। তাহার শিথিল দক্ষিণ হস্তে বামহন্তের কর্তিত মধ্যমাঙ্গুলি। এখনও ক্ষতস্থান দিয়া রক্তস্রাব হইতেছে।

মমতার ফলি। “O God!”( হা ঈশ্বর !) বলিয়া সাহেব দৌড়িয়া গিয়া, বিচ্ছিন্ন স্থান চাপিয়া ধরিলেন এবং কালবিলম্ব না করিয়া, কর্তব্য কাৰ্য্য সম্পন্ন করি- লেন। অজস্র রক্তপাতে ও ভীষণ যন্ত্রণায়ও সুপ্রভার সংজ্ঞালােপ হয় নাই, কেবল মুখখানি পাংশুবর্ণ,—কিন্তু কি এক অনির্বচনীয় ভাবে পূর্ণ ! সাহেব বাঙ্গালায় বলিলেন ;-“বেটি, এ কি করিয়াছিস?” সুপ্রভা ক্ষীণকণ্ঠে বলিল ;—“সাহেব, শুনেছি—তুমি নাকি পায়ের খিল খুলে আবার জোড়া দিয়েছ ! এই নেও,-আমার আঙল, আমার স্বামীর আঙুলে পরিয়ে দিয়ে যাও।” সাহেবের মুখ লাল হইয়া উঠিল। তিনি কিয়ৎক্ষণ কিংকর্তব্যবিমূঢ়র ন্যায় দণ্ডায়মান রহিলেন। আজ ৪৫ বৎসর তিনি চিকিৎসা-ব্যবসায় করি- তেছেন, বােধ হয়, হাজার 0peration Case ( অস্ত্রোপচারের রােগী ) তাহার হস্তে নিরাময় হইয়াছে, কিন্তু এমন অদ্ভুত রােগী ত তিনি চক্ষে দেখেন নাই! এক দেহ হইতে দেহান্তরে প্রত্যঙ্গ সংযােজিত করা যায়, আমেরিকায় থাকিতে তিনি তাহার পরীক্ষা করিয়াছেন, জৰ্ম্মণীতে তিনি তাহাতে পূর্ণকাম হইয়াছেন, কিন্তু এমন ভাবের দেহ-সংযােগ তিনি তাহার জীবনে করেন নাই। ডাক্তার ধীরে ধীরে সুপ্রভার হস্ত হইতে শীর্ণ-স্নান অঙ্গুলিটা তুলিয়া লইয়া, তাহার চিহ্নিত লকেটে স্পর্শ করিলেন, পরে রুমাল বাহির করিয়া তাহাতে জড়াইয়া পকেটে রাখিলেন। তাহার পর সুপ্রভার মাথায় হাত বুলাইতে বুলাইতে বলিলেন ;-“বেটি, তুই আমার মা, বল আমার প্রার্থনা মঞ্জুর করিবি ?” সুপ্রভা বলিল ;-“কি সাহেব-বল ?” সাহেব বলিলেন ;-“দেখ, তুই যাহা করিয়াছি—এমন বড় কেহ করে । অঙ্গুলি কাটিয়াছি, কিন্তু কাটা ত ঠিক হয় নাই, ইহা " মমতার ফলি। তাের স্বামীর হাতে মিলিবে না, ইহা আমাকে দে, আমি পূজা করিব । মেমসাহেবকে দেখাইব,—ভারতবর্ষে এমন সুন্দর লেডী আছে। আর স্পিরিটে রাখিব—ঠিক থাকিবে। আমি যত দিন বাঁচিব-তাের নাম করিব—তাের পূজা করিব।” সুপ্রভা প্রথমে কিছুই বলিতে পারিল না,—সে সাহেবের মুখের পানে ফ্যাল ফ্যাল করিয়া চাহিয়া রহিল—আর যেন গভীর ব্যর্থতার ক্ষোভে তাহার অক্ষিপ্রান্তে দুইটা মুক্তবিন্দু ফুটিয়া উঠিল। সাহেবের চক্ষুতেও জল আসিল। তিনি সস্নেহে সুপ্রভার মুখমণ্ডল হইতে অবিন্যস্ত চূর্ণালকগুলি সরাইয়া দিতে দিতে, একদৃষ্টে :সেই সুন্দর মুখখানির প্রতি চাহিয়া, উত্তরের প্রতীক্ষা করিতে লাগিলেন। একটু সুস্থ হইয়া সুপ্রভ। ধীরে ধীরে বলিল ;-“সাহেব ! ও আঙ ল আমার ত নয়,—আমার স্বামীর।”

মমতার সি।
ক্রমেই সুস্থ
* -
তখন কালীধনের সংজ্ঞা ফিরিয়া আসিয়াছে, শরীরও অনেকটা সুস্থ
হইয়াছে। সাহেব আসিয়া বলিলেন "Well Mr. Dutt, how are
you ?” (মিঃ দত্ত, কেমন আছ?
কালীধন বলিল ;-"Thanks, getting well" ( 40977,
বােধ করছি।)
সাহেব বলিলেন,-“I see Mr. Dutt, you are fortunately
fortunate. I've never seen such an exemplary sweet-heart
as yours. She's sacrificed her middle finger for
your
sake!
She ought to be revered.” (মিঃ দত্ত, আমি দেখছি, তুমি বিশেষ
রূপে সৌভাগ্যবান্। আমি তােমার স্ত্রীর মত আদর্শ পত্নী কখনও দেখিনি। সে
তােমার জন্য তার মধ্যমাঙ্গুলিটা বলিদান দিয়েছে ! এরূপ নারী পূজার যােগ্য।)
কালীধন চমকিয়া উঠিল। সাহেব কাছে গিয়া দাড়াইলেন,বলিলেন,-
"Take nerve.
Remember you are a medical man. ( স্থির
হও, মনে রেখাে তুমি একজন চিকিৎসক।
কালীধন স্থির হইল। তখন সাহেব হাসিতে হাসিতে বলিলেন ;-
*Well Mr. Dutt, my fees Extra of course, for extra
labour and that from you,-not from the Rajah !" (01519
মিঃ দত্ত, আমার পারিশ্রমিক ? অবশ্য অতিরিক্ত পরিশ্রমের দর্শনীটার কথাই
বলছি। সেটা রাজার নিকট থেকে নয়—তােমার কাছ থেকেই চাই।)
কালীধন আশ্চৰ্য-ভাব-ব্যঞ্জক স্বরে বলিল ;-“Extra labour !”
( অতিরিক্ত পরিশ্রম !)

মমতার ফঁাসি। ; সাহেব গম্ভীর ভাবে বলিলেন ;—“Yes, extr: it is and for a teat extraordinary. I beseech thee, my friend, can you spare this token of divine love and self-sacrifice ?" ( $1,9 এক অসামান্য কার্যের জন্য অতিরিক্ত পরিশ্রম। প্রিয় বন্ধু ! আমি তােমার নিকট ভিক্ষা প্রার্থনা কচ্ছি,আমাকে এই স্বর্গীয় ভালবাসার ও আত্মােৎ- সর্গের নিদর্শনটী দেবে কি ?) এই বলিয়া সাহেব ডাক্তার রক্ত-মাখা রুমাল হইতে অঙ্গুলিটী বাহির করিলেন এবং কালীধনের পার্শ্বে বসিয়া, তাহার নিকট সমুদয় ঘটনা বিবৃত করিলেন। কালীধন বুঝিল, সাহেব যাহা বলিতেছেন— তাহা কোন অংশে অযৌক্তিক নহে। তখন তাহার হৃদয় গরিমায় পূর্ণ হইয়াছে,সে সাহেবের কথা ফেলিতে পারিল না,-অঙ্গুলি সাহেবকে লইতে বলিল। সাহেব রাজার নিকট আর ভিজিট লইলেন না,--দর্শনী-স্বরূপ সেই অঙ্গুলিটাই স্পিরিটের বােতলে পূরিয়া লইয়া গন্তব্যস্থানে চলিয়া গেলেন। তৎপরে এক মাস অতীত হইয়াছে। কালীধন ও সুপ্রভা দুইজনই নিরাময় হইয়াছে। দুইজনই যেন মানব-জীবনের উচ্চতর স্তরে উখিত হইয়াছে। মেঘ-নিম্মুক্ত আকাশের ন্যায় উভয়ের মুখমণ্ডলে চন্দ্ৰ-কান্তি বিভাসিত হইতেছিল। কালীধন একখানি ইজি চেয়ারে অর্ধশায়িত, আর সুভা তাহার পার্শ্বে একখানি চেয়ারে উপবিষ্ট। উভয়ে এইরূপ কথােপকথনে নিযুক্ত ছিল ; কা। তা আঙুল কেটে ছেলেমি কল্লে কেন ?

মমতার ফাসি।
সু। সহ্য কত্তে পারিনি। তােমার আঙুল যাবে,আর আমার
আঙল থাকবে !
কা। কালে-কালে মাঝেরটা কাটতে গেলে কেন?
সু। আমি একদিন মিলিয়ে দেখেছিলাম, তােমার অনামিকা আর
আমার মধ্যমা দেখতে প্রায় এক।
কা। ধন্য তুমি !
ধন্য তুমি ! ভাল কথা, সাহেব ডাক্তারের মেম তােমাকে
ধন্যবাদ জানিয়েছে।
ও ধন্যবাদ আমার প্রাপ্য নয়—তােমার। আর সবাই এত
ধন্য ধন্য কচ্ছে কেন, বুঝতে পাচ্ছি না! আমি এমন কি ধন্যবাদের কাষ
করেছি ! সে দেশের মেয়েরা আগে স্বামীর সহমৃতা হত, এখনও যে দেশের
মেয়েরা বিধবা হয়ে সারা জীবন কঠোর সংযমে কাটায়,—পিপাসায় ছাতি
শুকিয়ে গেলেও, একাদশীর দিন এক বিন্দু জল গ্রহণ করে না, সে দেশের মেয়ে
আমি, স্বামীর জন্য নিজের স্বার্থের জন্য সামান্য একটা আঙুল কেটে
ফেলেছি—একি এত বেশী হয়েছে !
সুপ্রভার মুখমণ্ডল গম্ভীর-গরিমাময়। তখন আকাশে পূর্ণচন্দ্র
উঠিয়াছে। সেই মধ্য প্রদেশের পূর্ণ সুধাকরের সুবিমল রজত কিরণ
বাতায়ন পথ দিয়া, অংসােপরে, বক্ষে ও চূর্ণ-কুন্তল-শােভিত অপ্রস, ললাটে
পড়িয়া সুপ্রভার সর্বাঙ্গ সুধাময় করিয়া তুলিয়াছিল। কালীধন দেখিল,
সুপ্রভার দেহ-দর্পণে সীতা ও সাবিত্রীর প্রতিবিম্ব পড়িয়াছে ! সে নিনিমেষ
নেত্রে কিয়ৎক্ষণ চাহিয়া চাহিয়া,অন্যমনস্কভাবে বলিল
“সু,তুমি আমার কে ?”
সুপ্রভা বলিল -“কতদিন জিজ্ঞাসা কৰ্ব্বে ?”
কা। আজ আবার জানতে ইচ্ছা হচ্ছে,বল , তুমি আমার কে ?
?

মমতার ফাঁসি।
সু। আমি তােমার অর্ধাঙ্গিণী ।
কালীধন সুপ্রভাকে বুকে টানিয়া লইয়া, আবেগময় কণ্ঠে বলিল ;-
“তুমি আমার সর্বাঙ্গিণী—হৃদয়ের একচ্ছত্রা রাণী।”
"
ইতিমধ্যে দত্তগৃহিণীর সহিত চাকরাণী ও বঁধুনী বামনের এক তুমুল
যুদ্ধ হইয়া গিয়াছে। তাহার বৃত্তান্ত এইরূপ ;-
একদিন দত্তগৃহিণী তরকারী কুটিতে কুটিতে বলিলেন,-“বামনটাকে
রােজ বলি,-বটীখানাকে একবার আগুনে পুড়িয়ে দিতে,—তা আর হল
। একজনকে খেয়েছে, কবে আবার আমাকে খাবে।”
বামনঠাকুর তখন বাধিতেছিল,—এই কথা শুনিয়া সে হাসিতে হাসিতে
বলিল ;-“কেন-ও বটী ত পবিত্র হয়ে গেছে ?”
দত্তগৃহিণী বলিলেন ;-“হাঁ, তা পবিত্র হয়েছে বই কি ! রান্নাঘরের
মধ্যে এসে ম্লেচ্ছ ঢুকলাে,ঘরের বােয়ের মাথায় কেমন হাতখানা বুলিয়ে
দিলে ! পবিত্র কত ;-মা গঙ্গা সুরধনি, পুরাণে মহিমা শুনি !”
ঝি অদুরে কুপ হইতে জল তুলিয়া, ছাড়া কাপড় গুলি কাচিতে ছিল,
সে সহসা বলিয়া বসিল
-“দিদিমপি ! ও কথা বলছ কেন? অমন অবস্থার
আর উপায় কি ? সাহেব খুব ভাল গাে-অমন সাহেব যদি আমার মাথায়
হাত বুলিয়ে দেয়, তাহলে আমি বত্তে যাই।”
দত্তগৃহিণী বলিলেন ;-“তা তাের আর কি বল ? তিন কুল খেয়ে ঝি-
বিত্তি কত্তে এসেছিবড়ে যাবিই তা
.

মুমর ফাসি। ঝি রাগিয়া বলিল ;-“দেখ দিদিমণি ! যা বল-তা বল, জাত-কুল ধরে কথা বল কেন? ঝি-বিত্তি কত্তে এসেছি বলে, অত কথা শুতে আসি নি।” দত্তগৃহিণী চড়িয়া বলিলেন ;-“মাগনা ঝি-বিত্তি কচ্ছিনা? বলবাে না-একশ’ বার বব। কোনা আর কুটনীর সব ভাতে ফোড়ন্ দেওয়াটী আছে।” তখন ঠাকুর চটিয়া বলিল ;-“দেখ মা, বেশী বেশী কথা বলাে না। আমরা তােমার অত কথা শুতে পারবাে না। আমরা তােমার খাই-ও না পরিও না,-তুমি অত চোক্‌ রাঙাবে কেন?” গৃহিণী অগ্নিশর্মা হইয়া বলিলেন ;-“বটে,“হারামজাদা—পাজি, আচ্ছা দাড়া, তােদের জব্দ করে দিচ্ছি”—এই বলিয়া বুক চাপড়াইতে চাপড়াইতে ও চীৎকার করিতে করিতে কালীধনের উদ্দেশে ছুটিলেন। ঠাকুর ও ঝি—“চল আমরাও যাচ্ছি”-বলিয়া পশ্চাদনুসরণ করিল। দত্তগৃহিণী কালীধনের নিকটে উপস্থিত হইয়া বলিলেন ;-“দেখ বাপু, হয় তােমার পিয়ারের ঝি-বামন নিয়ে থাক,আমাকে বিদেয় দেও; আর তা যদি না হয়,—ওদের শাসন কর। ওদের যত বড় মুখ না-তত বড় কথাবলে কিনা আমার খায় না পরে !” কালীধন ঝি ও বামনঠাকুরকে জিজ্ঞাসা করিল ;-“তােমরা ওই কথা ঔকে বুলেছাে ?” ঠাকুর বলিল ;-“হ। বলেছি, উনি গালাগালি দিলেন কেন? শেষে বাপ পর্যন্তও তুলেছেন। ঝি বলিল ;-“উনি আমার কুল তুলে গাল দিলেন কেন? বােল বন্দুতে বু যা মুখে আসে—তাই বলেন।” কালীধন দেখিল, মহা মুস্কিল। প্রতিবাদীর অপেক্ষা বাদীর দোষই বেশী ।

মমতার ফাঁসি কিছুক্ষণ পরে বলি –“দেখ ঠাকুর মশায়, তােমরা ওঁরই খাও—এটা মনে রেখাে। খবর, তােমরা ওঁকে বেশী কিছু বলবে না। ফের যেদিন শুবােতােমরা আমার মাকে অপমান করেছ,সেদিন তােমাদের চাকরী পাবে না। এবার তােমাদের ক্ষমা কল্লাম—খুব সাবধানে চলবে, বুঝলে ?” দত্তগৃহিণী বঙ্কিম দৃষ্টিতে ঝি ও বামনের পানে চাহিয়—“কেমন হয়েছে ?” বলিয়া চলিয়া গেলেন। ঝি ও বামনঠাকুর যাইতে উদ্যত হইল। এমন সময় কালীধন বলিল ;-“দাড়াও ঠাকুর মশায়, তােমরা তােমাদের গত মাসের মাইনেটা নিয়ে যাও।” এই বলিয়া মনিব্যাগ হইতে টাকা বাহির করিয়া প্রত্যেকের হস্তে দিল। তাহারা বাহিরে আসিয়া গণিয়া দেখিল,—দুইজনই দুইটী টাকা বেশী পাইয়াছে !

মমতার ফঁাসি। = = = = = = = (২৯) == আজ দেড় বৎসরের পর কালীধন মিত্ৰগৃহিণীকে পত্ৰ দিয়াছে। একটা রঞ্জুর দুই প্রান্ত ধরিয়া, দুই জনে সবলে টানাটানি করিতে করিতে, যদি সেই রঞ্জু সহসা ছিন্ন হইয়া যায়, তাহা হইলে আকর্ষণকারী দুই ব্যক্তিই ছিট কাইয়া, পরস্পরের দূরে গিয়া পড়ে। কালীধন ও মিত্ৰগৃহিণীর ঠিক তাহাই হইয়াছিল। আকর্ষণজনিত অভিমান দুজনেরই চিত্ত অধিকার করিয়া,—দুজনকেই তফাৎ করিয়া দিয়াছিল। কালীধন ভাবিল,—দেখি, মা আমার কোন ছেলেকে ছাড়িয়া চুপ। করিয়া বসিয়া থাকে -মিত্ৰগৃহিণীও ভাবিলেন, -দেখি, ছেলে আমার কেমন মাকে প্রাণ ভরিয়া মা বলিয়া না ডাকিয়াই বা কি করিয়া থাকে। দূরে অবস্থানের সময়ই আঁখির অন্তরালে পরীক্ষা করা করা মানবের স্বভাব। এক্ষণে ফল-প্রতীক্ষায় বসিয়া থাকিতে থাকিতে, যখন উভয়েই বিফল-মনােরথ হইলেন,-তখন উভয়েই দেখিলেন,—হৃদয়াকাশ অভিমানের জলদজালে সমাবৃত হইয়াছে। যে দেশে ছয় মাস দিন, ছয় মাস রাত্রি,—সেই মেরুপ্রান্তের লােক, দিনে হাসে, খেলে, কায করে, আবার আমাদের দেশের রাত্রির ঘুমও তাহারা দিনেই ঘুমায়। পক্ষান্তরে, রাত্রি আসিলে পূৰ্ব্ববৎ দৈনন্দিন কাৰ্যসমূহ সম্পাদন করে,-তাহার কোনও ব্যতিক্রম ঘটে না। দিবা ও নিশাগমের দীর্ঘ ব্যবধানের মধ্যে বােধ হয়, তাহাদের কেহ কেহ কিয়ৎকালের জন্যও দিন বা রাত্রির কথা বিস্মৃত হয়। কালীধনের বােধ করি সেই অবস্থা হইয়া- ছিল। সে এখন সেই মেরুপ্রান্তের রাত্রির মধ্যে অবস্থান করিতেছিল। দত্ত- গৃহিণীর নানাবিধ বিগহিত ব্যবহার তত্ৰত্য উৎকট শীতলতা,আর মমতার সি। সুপ্রভার স্বর্গীয় অনুরাগজড়িত মধুরিমা তত্ৰত্য সীমান্ত-তারকা (Aurora Borealis ) বােধ হয়, পূর্বোক্ত অশান্তির মধ্যেও,নানাবিধ দৈব-দুর্বিপাকরূপ ঘূর্ণাবর্তের মধ্যেও, সেই সীমান্ত-তারকার কান্তদ্যুতিই তাহাকে মুগ্ধ করিয়া রাখিয়াছিল,সেই জন্য মিত্ৰগৃহিণীর নিঃস্বার্থ স্নেহৰূপ বিভাকরের কবােষ্ণ কিরণমালার কথা তাহার মনে ছিল না। মিত্ৰগৃহিণী দেখিলেন,—পরের ছেলেকে মানুষ করিতে গিয়া, তিনি বড়ই জড়াইয়া পড়িতেছেন। স্বামীর অতুল ঐশ্বর্য-রূপ অগাৰ বারিরাশির মধ্যে আকণ্ঠ নিমগ্ন হইয়াও, শুষ্ক তালু সিক্ত করিবার উপায় তাহার নাই। এই শীতল সলিলে অবগাহন করিয়া স্বামী-বিয়ােগ-জনিত পিপাসার নিবৃত্তি হয় না, প্রলেপে এ রােগের উপশম নাই—বরং বৃদ্ধি হয়। হায় ! যিনি তাহাকে আকণ্ঠ নিমজ্জিত করিয়া গিয়াছেন, তিনি ত তাহাকে বার-পানের অধিকার দিয়া যান নাই ! তবে আকণ্ঠ ডুবিয়া লাভ কি ? প্রকারান্তরে, তিনিই ত তাহাকে তীরে উঠিতে বলিতেছেন। পূৰ্ব্বজন্মে হয়ত তিনি স্বামীর অনুজ্ঞা অবহেলা করিয়াছিলেন-তাই তিনি চলিয়া গিয়াছেন। এ জন্মেও যদি তাহার অনুজ্ঞা পালন না করেন, পর জন্মেও আবার দিতে হইবে। আবার ভাবিলেন,কালী মানুষ হইয়াছে—দূরে গিয়া বােধ হয় তাঁহাকে আর তাহার মনে নাই ;-ডালই হইয়াছে—আপনিই বন্ধন ছিন্ন হইয়াছে,—আর তাহাতে নিজেকে জড়াইবেন না—তিনিও তাহাকে ভুলিবেন। সেই জন্য আশুতােষকে তুষ্ট করিয়া, ভবিষ্যৎ জীবনে স্বামিসুখে চিরসুখিনী হইবার প্রত্যাশায় তিনি কাশীবাসিনী হইয়াছেন ; বিশ্বস্ত গােমস্তার হন্তে বিষয়-তত্ত্বাবধানের ভার ন্যস্ত করিয়া, শিবধামে শিবপূজা-নিরত হইয়াছেন। কিন্তু বহুক্ষণ প্রহৃত শিশু যেরূপ ক্রন্দন-নিবৃত্তির পরও ক্ষণে ক্ষণে ফেঁপাইতে থাকে, মিত্ৰগৃহিণীর মনও সেইরূপ মধ্যে মধ্যে ;

মমতার ফাসি। কালীধনের জন্য কাঁদিয়া উঠিত। অতি কষ্টে তিনি ধৈৰ্য্য ধারণ করিতেন। অধিকন্তু, পূর্বোক্ত অভিমান তাহাকে কতকটা স্থির রাখিয়াছিল। কিন্তু পুত্রলাভের সঙ্গে সঙ্গেই কালীধনের অভিমান টুটিল। দুঃখে অভিমান প্রবল হয়, কিন্তু সুখের বন্যায় অভিমানের আবর্জনা ভাসিয়া যায়। কালীধনের অভিমান ভাসিয়া গেল। তাহার উপর সুপ্রভার সনির্বন্ধ অনুরােধ সে কিছুতেই এড়াইতে পারিল না। সে আরও ভাবিয়া দেখিল,—যাহার মেহ-করুণার ছায়াতলে মানুষ হইয়া, আজ তাহার এই সুখের সন্ধান মিলি- যাছে,—সেই স্নেহময়ীকে তাহার ন্যায্য প্রাপ্য এই সুখের অংশ হইতে বঞ্চনা করা, তাহার পক্ষে কোনক্রমে সঙ্গত হইতে পারে না। সুতরাং, সে স্থির করিল,তাহাকে তাঁহার ভাগ বুঝাইয়া দিয়া, তাহার দায়িত্ব হইতে মুক্তিলাভ করিবেই। কালীধন মিত্ৰগৃহিণীকে লিখিল । এতদিন ভাবিয়াছিলাম, দেখি-মা হারে কি পুত্র হারে। আজ দেখিতেছি—পুত্ৰই হারিল। হারিবারই কথা,-মা যে পাষাণী ! মধ্যে মধ্যে আসিবে বলিয়াছিলে,—এ পর্যন্ত সময়ের মধ্যস্থল খুঁজিয়া পাইলে না? অনেক দিন মা অন্নপূর্ণার অন্ন খাই নাই। তাহার উপর চামুণ্ডার কোপে দেশে দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়াছে। তুমি না আসিলে এ দুর্ভিক্ষ দূর করে দুইটী বসন্ত চলিয়া গিয়াছে। শ্রীরামচন্দ্র শরতে অকাল-বােধন করিয়া- ছিলেন,-আমিও তাহাই করিতেছি কি ? রামচন্দ্র মাকে পাইয়াছিলেন, আমার কি সে সৌভাগ্য হইবে না ? মনে আছে কি ?—একদিন বলিয়াছিলে,-“তুমি মা যশােদা আর আমি তােমার নীলমণি।' আজ ছয়মাস হইল-তােমার নীলমণির একটা মমতার সি। নীলমণি হইয়াছে। যশােদা নীলমণির নীলমণি দেখিবার ভাগ্য করিয়া আসেন নাই,—দেখিতেও পান নাই। তােমার সে সৌভাগ্য হইয়াছে, একবার দেখিয়া যাইবে না ?--নীলমণির নীলমণিকে একবার কোলে করিয়া আশীর্বাদ করিয়া যাইবে না ? পূৰ্বে গােপাল মথুরার রাজা হইয়াছিলেন, আর যশােদা ‘গােপাল গােপাল’ বলিয়া দিয়া গােকুল ভাসাইয়াছিলেন। এবার যশােদা কাশী- বাসিনী, আয় গােপাল মা মা বলিয়া দিয়া আকুল হইতেছে। যদি ব্রজে আর না এস, পত্রে পদরজঃ পাঠাইও—তিন জনে মাখিয়া ধন্য হইব। ইতি- তােমার-কালী” ( ৩০ ) তীর্থগণাগ্রগণ্যা বারাণসী মহাদেবের ত্রিশূলের উপর অবস্থিত। সেজন্য কাশীতে ভূমিকম্প হইবার উপায় ছিল না। কিন্তু এখন হয়। পাতকীর পাপ- কর্দমে শূলপাণির ত্রিশূলে এমন মরিচা পড়িয়াছিল,—যে তাহাতে তাহার কাশীর ভার রক্ষা করা ভার হইয়াছিল। পিনাক বােধহয় ভাঙ্গিয়া পড়ি আছে—সুতরাং, বারাণসী ধরাশয্যা গ্রহণ করিয়াছেন। ভূমিকম্প হইবেইত ! এমন কাশীতেই যদি ভূমিকম্প হয়, তবে কাশীবাসিনী মিত্ৰগৃহিণীর আসনই বা টলিবে না কেন? কালীধনের পত্ৰ পাইয়া তিনি বিচলিত হইয়াছেন। বিশেষত, গত রাত্রিতে এক ভীষণ স্বপ্ন দেখিয়াছেন,-তাহাতে তাঁহাকে আরও কাতর করিয়াছে। দেখিয়াছেন, তিনি যেন শূন্যপথে শিব-দূতের পশ্চাতে পশ্চাতে চলিয়াছেন। উচ্চে,—অতি উচ্চে শুভ্রমে- মমতার সি। ৭ঃ . করালে তাহার পরমপূজ্য স্বামীদেবতার দিব্যকান্তি ধূন-বেষ্টিত অগ্নি- শিখার ন্যায় দীপ্তি পাইতেছে। দূতবর বায়ুগতিতে চলিয়াছেন, তিনিও যেন কি এক আকর্ষণে ছুটিয়া চলিয়াছেন। সহসা নিম্নে করুণ ক্রন্দনধ্বনি কত হইল। তিনি যেন মুখ নত করিয়া দেখিলেন, তাঁহার স্নেহের কালীধন তাহার অনুবর্তী। তিনি এক মুহূর্তের জন্য সেই শূন্যদেশে দণ্ডায়মান হইলেন। কিন্তু পরক্ষণে সম্মুখে চাহিয়া দেখিলেন,—সে শিবদূত অন্তহিত, স্বামী-মূর্তিও নিকষকৃষ্ণ ঘনাবরণে লুক্কায়িত হইয়াছে ! আবার নিম্নে চাহিয়া দেখিলেন, কালীধন অধঃপতিত হইতেছে,অতি দ্রুত দ্রুততর গতিতে উদ্ধপদ হইয়া পতিত হইতেছে,আর কঁদিতে কঁদিতে বলিতেছে,-“মা, এই আমি চলিলাম,-জন্মের মত চলিলাম,-আর দেখা হইবে না।” অমনি নিদ্রাভঙ্গ হইল। স্বপ্ন-দর্শনের পরদিন প্রভাতেই মিত্ৰগৃহিণী কালীধনের পত্র পাইলেন। অভিমাম ত চূর্ণ হইলই,—সাধনার পথ হইতেও বুঝি একটু দূরে সরিয়া পড়িলেন। মিত্ৰগৃহিণী ভাবিলেন ;-শিবপূজার অভীষ্ট-ফল পুত্রের প্রতি উদাসীনতার জন্যই তিনি ঐ স্বপ্ন দেখিয়াছেন। মনে ধিক্কার আসিল। বলিলেন ;-“কালীধন যথার্থই লিখেছে,আমি পাষাণীই ত?” অল্প দিন মধ্যে মিত্ৰগৃহিণী পুত্র-গৃহে উপনীত হইলেন। একদিন তিনি কালীধনের নবশিশুকে কোলে লইয়া আদর করিতে করিতে সুপ্রভাকে বলিলেন,-“এত কাণ্ড কল্লি তােরা,-আচ্ছা বাপু, তুইই কোন্ আমাকে একখানা পত্ৰ দিলি ?”

মুমতার ফাসি।
;
-
;
সুপ্রভা বলিল
-“মাসিমা, দেবাে কি ?—আমি লিখতে গেলে
তােমার ছেলে যে এসে বারণ কত্তেন,—বলতেন—“অমন কাটী করাে
—যােগমায়ার যােগ ভঙ্গ হবে।”
নিকটে কালীবন দাড়াইয়া হাসিতেছিল। মিত্ৰগৃহিণী তাহার দিকে
চাহিয়া বলিলেন,-এখন ছেলে হয়েছে, ছেলের দরদ বুঝতে পেরে
বুঝি আমাকে মনে পড়েছে ?”
কালীধন জবাব দিল ;-“মা, কুপুত্র যদিও হয়--কুমাত কখনাে নয়।”
মা বলিলেন ;-“তবে? তা যদি জালি, পত্র দিলি না কেন?”
পুত্র বলিল ;-“মা, দুটা উভয়ত।”
মা বুঝিলেন—বলিলেন
“ও—আমি তাের কুমাতা?”
পুত্র। আর অমি বুঝি তােমার কুপুত্র ?
মাতা। কে বলে ? অমন কুপুত্র কার আছে?
পুত্র। অমন কুমাত ক’জনের আছে ? তবে আসল কথা,যদি
কোনও কারণে তােমার মন শিবপূজা থেকে বিরত হয়, তাই তােমাকে পত্র
দিই নি। ছেলেটা হতে—মনটা একটু খুশী হল,-তােমাকে দেখাতে ইচ্ছা
হল। সুপ্রভাও ছাড়লে না, তাই তােমাকে আতে পত্র দিলাম। যাক্,
আবার কাশী যাচ্ছ কবে বল দেখি?
মাতা। কেন ? একদিন তুই বলেছিলি, তুই আমার ভার-বােঝা,
আর আজ বুঝি আমি তাের ভার-বােঝা হয়েছি ?
পুত্র। ভীমসেন জতুগৃহ-দাহের সময় কুন্তীদেবীকে মাথায় করে পলায়ন
করেছিলেন। মা ! আমিও যে তােমার স্নেহে বলীয়ান্-ভীমসেন।
মাতা হাসিলেন, বলিলেন,-“কি জানি, পরশুরাম আবার মাতৃহত্যাও করে-
ছিলেন

মমতার ফাসি।
;
পুত্র বলিল ;-“আমার বােধ হয়, পরশুরাম পিতার নিকট হতে মাতৃ
ভক্তি শিক্ষা করেছিলেন। কিন্তু আমি যে আমার মায়ের নিকট হতে
পিতৃভক্তি শিক্ষা করেছি।”
মা অন্য কথা পাড়িলেন।
“তা যেন হল—কিন্তু সুপ্রভার কি কচ্ছিস্? এমন সােণার বর্ণ কালী
হয়ে গেছে—তার কি ব্যবস্থা কচ্ছি ?”
কালীবন হাসিতে হাসিতে বলিল “নন্দরাণী ‘হা-গােপাল-যয-গােপাল
বলে কঁদতে কাঁদতে দেহত্যাগ করেছিলেন,উনি বােব হয় গােপাল কোলে
হাতে হাতে দেহত্যাগ কনে।”
সুপ্রভা কালীধনকে বলিল ;-“তােমাদের রেখে যেতে পারি ত সে আমার
সৌভাগ্য।”
মিত্ৰগৃহিণী শিহরিয়া উঠিলেন ;-“বালাই ষাট, আগে আমি যাব, তবে
ত তােরা। ভাল কথা নয় বাবা, একটু সাবধান হ। তারপর খােকার
ভাত দিবি কবে?”
কালীধন হাসিতে হাসিতে বলিল ;-“খােকার ভাত খেয়ে তারপর
যাবে ? তা হলে তােমার যেতে এখনও অনেক দেরী !”
“ হােক—করে দিবি বল?”
কালীধন ঈষৎ গম্ভীর ভাবে বলিল
“খােকার অন্ন-অন্নপূর্ণাই দেবেন।”
=

૧૧ মমর ফাসি। ( ৩১ ) মিত্ৰগৃহিণী আসা অবধি, দত্তগৃহিণীর পশার একদম মাটী ! বি ঠাকুরের সঙ্গে ত বনেই না,কালীধন ও সুপ্রভার সঙ্গে এতদিন যেমনটী ছিল, মিত্ৰগৃহিণী আসার পর হইতে ঠিক যেন তেমনটাও নাই। আবার মিত্ৰগৃহিণ উহাদের দুজনকে টানিয়া লইলেন দেপিয়া, মিত্ৰগৃহিণীর উপরও তাহার সুনজর পড়িল না। দত্তগৃহিণী ভাবিলেন ;-“যাও ছিল রয়ে বসে—তাও নিল বর্গী এসে,-এত বড় জ্বালা !” কিন্তু দত্তগৃহিণীর দোসর জুটি। দত্ত মহাশয়ই ঘূরিয়া ফিরিয়া গোঁজের গােড়ায় আসিলেন। এখন,-কালীন অপেক্ষা মিত্ৰগৃহিণীর Valency অর্থাৎ আণবিক শক্তি বেশী, সুতরাং, কালাধন দত্ত মহাশয় হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া, মিত্ৰগৃহিণীর সহিত মিলিত হইল। অগত্যা দত্ত মহাশয় তাহার- “অসময়ের সম্বল--লােটা আর কম্বল” -গৃহিণীকে সার করিলেন । কিন্তু তাই বলিয়া, কালীধন বা সুপ্রভা যে উহাদের প্রতি ঔদাসীন্য প্রদর্শন করিতে লাগিল, তাহা নহে। গৃহে পরমাত্মীয় আসিলে, গৃহস্থ যেমন পরিবারভুক্ত অন্যান্য পরিজনকে দেখে, তাহারা সেইরূপ দেখিতে লাগিল। কিন্তু এ ক্ষেত্রে সে ভাবে দেখিলে চলিবে কেন ? জামাতা শ্বশুর বাটী আসিলে, শ্বশ্রুঠাকুরাণী রুইমাছের মুড়াটী ছেলের পাতে দিয়া জামাতার পাতেই দেন,-ছেলে তাহাতে ক্ষুব্ধ না হইতে পারে, কেননা, তাহার ভগিনীপতি খাইতেছে। মিত্ৰগৃহিণীর বিষয়ে সে দৃষ্টান্ত খাটিবার কথা নয় । ভুক্তভােগী-ব্যথার ব্যথী না হইলে, মনের দুঃখ প্রকাশ করিয়া সুখ নাই। সেই জন্যই রামচন্দ্র গুহকচণ্ডালের সঙ্গে মিত্রতা করিয়াছিলেন, দুই জনই পিতৃকর্তৃক বিতাড়িত। দত্ত মহাশয় ও দত্তগৃহিণী আজ তুল্য- মমতাৰ ফঁাসি। দশায় পতিত হইয়াছেন, সুতরাং, পরস্পরের সহানুভূতি থাকিবারই কথা। তৰে পূৰ্বানুষ্ঠিত অকৃতজ্ঞতার জন্য দত্ত মহাশয়কে মধ্যে মধ্যে দত্তগৃহিণীর সেবাক্য সহ্য করিতে হইত। কেবল অভ্যস্ত ছিলেন বলিয়া, তাহা তাহাকে বিশেষ অস্থির করিতে পারি না। বিশেষত, আজ তিনি বড় বিপন্ন—বেচারীর আফিং ফুরাইয়াছে ! চাহিবারও উপায় নাই, কারণ সেদিন কালীধন বলিয়াছে,-“বাবা আপনি দিন দিন আফিংএর মাত্রা বড় চড়াচ্ছেন,-ও ত ভাল নয়। ওতে আপনার শরীর ক্রমেই খারাপ করে বেলুছ। মাত্রা কমিয়ে দিন। এই ভাগ করে দিলাম, এতে আপনার সাত দিন হবে।” কিন্তু দত্ত মহাশয় পাঁচদিনে তাহার সদ্ব্যবহার করিয়া বসিয়া আছেন ! আফিং মাত্রায় কম হইলে চলে, কিন্তু একেবারে বন্ধ হইলে মহামুস্কিল। তিনি নিতান্ত অপরাধীর ন্যায় দত্তগৃহিণীর নিকট বসিয়া আছেন, যদি মুস্কিল আসান হয়। মানসিক পরিবর্তন সংঘটিত হইলেও, দত্তগৃহিণী এখনও গৃহের কত্রী। কেবল গত মাসের উপার্জিত অর্থ কালীধন মিত্ৰগৃহিণীর নিকট দিয়াছে। তাহার কারণ, মিত্ৰগৃহিণী কালীবনের পুত্রের অন্নপ্রাশন দিতে ইচ্ছুক হইয়া- ছেন। বেশী টাকা ত সঙ্গে আনেন নাই। চম্পাপুর হইতে আনাইতেও দেরী হইবে। এইজন্য ঐ টাকা আপাততঃ ধারস্বরূপ লইয়া গহনা গড়াইতে দিয়াছেন। কিন্তু দত্তগৃহিণী তাহা উল্টা বুঝিয়াছেন। তিনি উপবিষ্ট দত্ত মহাশয়কে বলিলেন “আফিং ফুরিয়েছে, তা আমার কাছে বসে ন্যাজ নাড়লে কি হবে? যাও ,ছেলের মা এসেছে, তার কাছে যাও। আমি ত তার সৎমা। মা পেলে সৎমাকে কি মনে থাকে ? এখন মা-ই স—উড়ে এল চিল, জুড়ে নিল বিল।

মমতার ফাসি । দত্ত মহাশয় অপ্রতিভভাবে ঈষৎ বিরক্তিব্যঞ্জককণ্ঠে বলিলেন ;-“আহা আস্তে বলনা ছাই, ওরা শুলে কি ভাবে ?” অপেক্ষাকৃত উচ্চগ্রামে সুর চড়াইয়া দত্তগৃহিণী বলিলেন ;-“শুলে ত বয়ে গেল। ন্যায্য কথা বলতে আমি বাকেও ডরাই না। এই আমি খুব গলা করে বলছি,—ওগাে দিদি, তােমার ছেলের বাপের আফিং ফুরিয়েছে গা। আমার কাছে এসে ভিড় ভিড় কচ্ছেন। একটু আফিং দেও গাে- মাফিং দেও।” দত্তগৃহিণীর কথা শেষ হইতে না হইতে, দত্ত মহাশয় তাড়াতাড়ি বাহিরে উঠিয়া গেলেন। কিন্তু কথাগুলি মিত্ৰগৃহিণীর কর্ণগােচর হইল। তিনি অতি সরলচিত্তা। অতি বুদ্ধিমানও কুটীলের কূটনীতি বুঝিতে পারে না। তিনি বুঝিলেন,-পিতা উপযুক্ত পুত্রের নিকট আফিংএর কথা বলিতে সঙ্কোচ বােধ করিতেছেন। তিনি কালীকে ডাকিয়া বলিলেন ;-“হঁারে কালী, তাের বাপর আকিং ফুরিয়েছে,-আনিয়ে দিস নি?” কাশীধন বলল ;—“সে কি ? বেশী মাত্রায় আফিং খান বলে আমি নিজে মাত্রা ভাগ করে দিয়েছি,সে আফিং এখনও ত দুদিন হওয়ার কথা। আফিং অত খাওয়া কি ভাল ?” মিত্ৰগৃহিণী হাসিয়া বলিলেন ;-“দেখ,-বুড়ো বাপের ওপর আর ও ডাক্তারীটা চালাস নি। খাওয়া-দাওয়া গেছে। খান-আফিং আর দুধ। দে—দে আফিং আনিয়ে দে—মােটে আফিং নেই। আহা, কত কষ্ট পাচ্ছেন !” অগত্যা কালীধন আফিং আনিতে লােক পাঠাইল। F মুমতার ফঁাসি। (৩২) রাখালের পালে বাঘ পড়ার মত, সময় সময় অনেক হাসি-তামাসার কথা সত্য সত্যই ফলিয়া যায়। কালীবনের কথাও আজ সত্যে পরিণত হইতে চলিল। প্রসবের কালে সুপ্রভা অত্যন্ত কষ্ট পায়,—এমন কি, জীবন সংশয় ঘটে। ভাগ্যক্রমে সে সে যাত্রা রক্ষা পাইল, সন্তানেরও প্রাণহানি হইল না বটে, কিন্তু শিশু ভূমিষ্ঠ হইবার দিন কতক পরে, দুশ্চিকিৎস্য সূতিকা দেখা দিল। প্রথমে কালীবন নিজেই চিকিৎসা করিতেছিল। যখন বুঝিল, জরায়ুতে ক্ষত দেখা দিয়াছে, তখন সুপ্রভাকে নিজের চিকিৎসাধীনে রাখা যুক্তিযুক্ত বিবেচনা করি না। সেই সাহেব ডাক্তারকে আনিবার জন্য কলিকাতায় টোগ্রাম পাঠাইলা। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সংবাদ আসিল,সহসা কোনও কাস-ব্যপদেশে ডাক্তার সাহেব ভারত ছাড়িয়া চলিয়া গিয়াছেন। অগত্যা অন্য ডাক্তার আনাইয়া চিকিৎসা-কাৰ্য্য চলিতে লাগিল। মিত্ৰগৃহিণীর সিংহগড়ে আসিবার পূর্ব হইতেই সুপ্রভার অসুস্থতা আরম্ভ হইয়াছে। তবে খােকার অন্নপ্রাশন অবধি তাহার দেহ ভাঙ্গিয়া পড়ে নাই। বিদেশে,বঙ্গদেশের বাহিরে অন্নপ্রাশনে যতটুকু আড়ম্বর সম্ভব হইতে পারে, মিত্ৰগৃহিণী তাহার ত্রুটী করেন নাই। সেই সময় বেশী চলাচল ও নানাবিধ অনিয়মে, অন্নপ্রাশনের চারি পাঁচ পরে সুপ্রভার প্রবল জ্বর ও যন্ত্রণা বৃদ্ধি হইল—সুপ্রভা শয্যাশায়িনী হইল। জ্বরের প্রাবল্য দেখিয়া কালীধন ভীত হইল ও দুইজনে বিশেষ সাবধানে চিকিৎসা করিতে লাগিল। তথাপি রােগের বৃদ্ধি বই হ্রাস দেখা গেল না। মিত্ৰগৃহিণীর কাশী যাওয়া ঘুড়াইয়া গিয়াছে। তিনি এক প্রকার আহার নিদ্রা ত্যাগ করিয়া, অহােরাত্র রােগিনীর পরিচৰ্য্যায় নিযুক্ত আছেন।

মমতার ফাসি। আজ দুইদিন হইতে অবস্থা অত্যন্ত শােচনীয়। সুপ্রভার ১০৫ ডিগ্রী জ্বর ;-তাহার উপর অত্যধিক যন্ত্রণায় মুহূর্তে মুহূর্তে শ্বাসরােধের উপক্রম হইতেছে। সুপ্রভা আর বাচে না। সােণার কাল অকালে শুকাইবে,সােণার সংসার ছারখার যাইবে,-কালীধনের হৃদয় শ্মশান হইবে,–এই সকল মিত্ৰগৃহিণীর মনে উদিত হইতেছে, আর অব্যক্ত যন্ত্রণায় বুক ফাটিয়া যাইতেছে। যখন একান্ত অধৈৰ্য্য হইয়া পড়িতেছেন, তখন তিনি লুকাইয়া অশ্রুপাত করিতেছেন। লুকাইয়া-পাছে সুপ্রভা বুঝিতে পারে, ইহা তাহার বিদায়-অভিনন্দন । কালীধনের অবস্থার কথা আর কি বলিব ? উচ্চশিক্ষিত অভিভ ডাক্তার সে,--প্রতিদিন যে ব্যক্তি মৃত্যুকে লইয়া কন্দুক-ক্রীড়া করে,--আজ সে বড় অধীর। তবে সে অধীরতা বাহিরে নহে—হৃদয়ে ;-বক্ষে পীকৃত উচ্ছাস্ লুক্কায়িত রাখিয়া, সে স্থিরভাবে কর্তব্য কাৰ্য্য সম্পাদন করিয়া চলিয়াছে। কিন্তু আগ্নেয়গিরি সঞ্চিত অগ্নিরাশি কতক্ষণ চাপিয়া রাখিতে পারে ? বর্ষণণান্মুখ জলধর-দল স্নিগ্ধ-সমীর-স্পর্শে কতক্ষণ স্থির থাকিতে পারে? প্রাণের বস্তুর প্রাণবিয়ােগের সময় নিকট হইলে, হৃদয়ের অধিষ্ঠাত্রী-দেবীর বিসর্জনের বাদ্য বাজিলে, মানসী-বীণার প্রধান তন্ত্রী ছিন্ন হইবার উপক্রম হইলে, অতি-বড় দৃঢ়চেতারও ধৈর্য্যের বাঁধ শিথিল হইয়া পড়ে। ডাক্তার সে,-আসন্ন বিপদের করালমূৰ্ত্তি সে বহু পূর্বেই মনশ্চক্ষে নিরীক্ষণ করিয়া,—শুধু কর্তব্যের খাতিরে, এতদিন সহিষ্ণু হইয়া ছিল, কিন্তু আজ সুপ্রভার অবস্থা লক্ষ্য করিয়া, নিজেকে কিছুতেই স্থির রাখিতে পারিল না,শত চেষ্টা করিয়াও পারিল না। সে কঁদিল,বালকের ন্যায়ই আত্মহারা হইয়া কাঁদিয়া ফেলিল।

মমতার ফাসি। যখন মিত্ৰগৃহিণী বলিলেন ;-“কালী দেখ,--আজ সুপ্রভা যেন অনেকটা ভাল। জ্বরও নরম পড়েছে,কেমন জ্ঞানের মত কথা বলছে। তুই অমন করে চেয়ে রয়েছিস্ কেন ? দেখ না--অনেক ভাল।” তখন কালীধন একেবারে হাউ হাউ করিয়া কাঁদিয়া উঠিল,-“মা,-- তুমি বলছ—ভাল,—কিন্তু আমি দেখছি—ভাল নয়,—ওই শেষ ভাল।” এই কথা শুনিয়া মিত্ৰগৃহিণীও কঁদিয়া উঠিলেন। এমন সময় ডাক্তার বাবু ছুটিয়া আসিলেন---বলিলেন ;-“কালীবাবু, কি কচ্ছেন? শুধু বসে বসে কাঁদছেন ! এই ঔষধটা আগে খাইয়ে দি— কিন্তু সুপ্রভা অতি অতি ক্ষীণ স্বরে বলিল ;-“আর কেন ওষুধ নিয়ে আমার যাতনা বাড়াও ? আমাকে সজ্ঞানে সহজ অব- স্থায় সুখের মরণ মর্তে দাও। মাসিমা, থােকাকে আন। সবাইকে কালীধন ডাক্তার বাবুটীর হাত হইতে ঔষধের শিশিটা কাড়িয়া লইয়া ঘরের মেঝেয় ছুড়িয়া ফেলিয়া দিল ।

মমতার সি। ( ০৩ ) সুপ্রভা চলিয়া গেল,-বড় গৌরবের সহিতই চলিয়া গেল। এই অকাল- বৈধব্য-পরিপূরিত বঙ্গদেশের অনেক রমণীর তুলনায়, সুপ্রভা বড় ভাগ্যবতীর মরণই মরিয়াছে। স্বামীর কোলে মাথা রাখিয়া, সীমন্তিনী নাম সার্থক করিয়া, সুন্দর সাটী পরিয়া, পদতল অলক্তক-রাগ রঞ্জিত করিয়া, বুকের ধন, সুকুমার শিশু-রত্নকে বুকে ধরিয়া,সে কেমন সুন্দর সুচিরনিদ্রায় নিদ্রিত হইল। যে যায়--সে বেশ যায়,কিন্তু যাহার বায়,--তাহার যে সর্বনাশ করিয়া যায় ! আজ কালীধনের যে সৰ্ব্বনাশ হইয়া গেল, সমস্ত জগতের বিনিময়ে তাহা পূরণ হইবার নহে। যে সৌন্দৰ্য-প্রতিমা তাহার সমগ্র হৃদয়খানিবে সুন্দর করিয়া বসিয়াছিল, তাহার বিহনে হৃদয় কি আর সৌন্দর্য্যম হইবে? হৃদয়দেশ একবার মরুভূমি হইলে, আর তাহাতে শ্যামলতা আসে কি? তরু একবার ভস্মীভূত হইলে, আর তাহা মুঞ্জরিত হয় কি ? হিন্দুর বহুবিবাহ শাস্ত্র-সম্মত। বিশেষত, বিপত্নীকের দারপরিগ্রহ ধৰ্ম্ম- বিরুদ্ধ নহে। অন্যান্য জাতির শাস্ত্রেও উহা দূষণীয় নয়। অবশ্য, সামাজিক শৃঙ্খলার হিসাবে উক্ত প্রথা যুক্তিসঙ্গত বলা যাইতে পারে। কিন্তু পরিণয়ের উদ্দেশ্য যদি প্রাণ বিনিময় হয়, দান-প্রতিদান যদি প্রণয়ের রীতি হয়, তাহা হইলে, একবার বিনিময়-কাৰ্য্য সংঘটিত হইলে, একবার আদান-প্রদান হইয়া গেলে, উৎসৃষ্ট হৃদয় লইয়া পাত্ৰান্তরে পুনরর্পণ ও তাহার বিনিময়ে পর অপহরণ করিয়া, অকৃতজ্ঞতার ক্রীতদাস মানুষ কখনও সুখী হইতে পারে ? আবার যাহার যায়,—ভালটাই যায়। জগতের যেটা সুন্দর, যেটা লােকে বড় আপনার বলিয়া হৃদয়ে ধারণ করে,—সেইটাই আগে যায়। “যে নির্বংশ মমতার ফসি। হয়, তার পৌত্র মরে আগে”—ঠিক কথা। যেটী সুন্দর, সেইটীর উপরই কালের লােলুপ দৃষ্টি। কাদাইয়া কালের আনন্দ,ভালটী না লইলে মানু* কাদিবে কেন? এইজন্য আমাদের ধর্ম, মানবকে গৃহী হইয়াও সন্ন্যাসী থাকিতে বলে । গার্হস্থ্য-সন্ন্যাস মােক্ষ-লাভের প্রকৃষ্ট পন্থা। সংসারে সন্ন্যাসী হইলে, কাল মানবকে কঁাদাইতে পারে না,-শােক তাহাকে মুহ্যমান্ করিতে পারে না। মােহই ত বন্ধন,—সেই মােহ তাহাকে বশীভূত করিতে পারে না। কিন্তু সে বড় কঠিন,রাজষি জনক কয়জন হইতে পারে ? কুসুমের ন্যায় কোমল হইয়া পাষাণের ন্যায় কঠিন জগতে কয়জন হইতে পারে ? কালীধনও পারিল না। তাহার বুকে যেন একটী যুগ-প্রলয় হইয়? গেল,—আনন্দের প্রতিমূর্তি সে কালীধন আর নাই । সুপ্রভার অস্তিত্বের শেষ-নিদর্শন দেহ-রত্ন শ্মশানে ভস্মাবশেষ করিয়া আসিয়া কালীধন মিত্ৰগৃহিণীকে গাঢ় কণ্ঠে ডাকিল ;-“মা !” মিত্ৰগৃহিণী কঁদিতে কঁদিতে ছুটিয়া আসিয়া বলিলেন ;—“বাবা, এই যে আমি?” কালীধন বলিল,-উন্মত্তের মত বলিল ;-“এখনও তুমি এখানে আছ ?—কাশ যাওনি?” মিত্ৰগৃহিণী প্রথমে কিছুই বলিতে পারিলেন না। দুঃখের আবেগে, পুত্রের অভিমানপূর্ণ উক্তির কোনও যুক্তিপূর্ণ উত্তর তখন তাহার মাথায় আসিল না। তিনি শুধু কালীধনের হাত দুটা ধরিয়া, নীরবে অশ্রু বিস ৰ্জন করিতে লাগিলেন। পরে শশাকের উচ্ছ্বাস্ মন্দীভূত হইলে, একটু ধৈর্য্যধারণ করিয়া বলিতে লাগিলেন ;-“বাবা কালী! তুমি বিদ্বান- বুদ্ধিমান, কৃতী তুমি-অনেকের আদর্শ। তুমি যদি পুরুষ হয়েও এত মমব ফালি। বিহবল হও, তবে আমরা স্ত্রীলােক হয়ে কি করে সান্ত্বনা পাব ? আজ আমাদের প্রবােধ দেবে তুমি। তুমি অমন হলে চলে কি?” কালীধন বলিল,-“বুঝছি সব—জাছি সব,-জগতের এই রীতি তাও জানি। আমি শুধু ভাবছি-তুমি কেন আমাকে সংসারী করেছিলে? যদি সংসারীই করেছিলে, এমন রত্নের হার আমার গলায় পরিয়ে দিলে কেন ? আমায় কেন মানুষ কল্পে—কেন এমন ফাসি পালে মা ! কেন এমন ইচ্ছা করেছিলে মা ?” মিত্ৰগৃহিণী বলিলেন ;---“আমি ত কিছুই করিনি বাবা! তিনিই তােমাকে আমার কাছে পাঠিয়েছিলেন, তিনিই তােমাকে মানুষ কত্তে বলেছিলেন, তিনিই তােমাকে সংসারী কত্তে বলেছিলেন,—আবার তিনিই আজ তােমাকে সন্ন্যাসী করেছেন। সব তারি লীলা,--আমিত উপলক্ষ্য মাত্র। এখন এস, একটু ঠাণ্ডা হও। বেশীর ভাগ দুঃখ নিয়েই মানুষের জীবন,-তবু তার মধ্যে কায করে যেতে হবে। জগতের অনেক কায এখনও তােমার হাতে। শােকে অধীর হওয়া তােমার পক্ষে শােভন নয়। মানুষ যদি শশাকের যুদ্ধে হেরে যায়, তবে সে আর কিছুতেই জয়লাভ কতে পারে না—সে একেবারে অপদার্থ হয়ে বায়। তার সময় ফুরিয়েছে, সে চলে গেছে। চেষ্টা ত করেছিস যথেষ্ট। কি কবি,—সে থাকবার নয়, তাই সব ব্যর্থ। তবে সান্ত্বনা,তার স্মৃতি রেখে গেছে, তােকে এমন সােণার চাদ ছেলে দিয়ে গেছে। তার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখ—সব শীতল হয়ে যাবে। আয়—দেখবি এমন সময় শিশু ঘরের মধ্যে কাঁদিয়া উঠিল। কালীধন আর দ্বিরুক্তি করিল না,ধীরে ধীরে ঘরে আসিল। মিত্ৰগৃহিণী শিশুপুত্ৰটীকে মমর ফাসি। আনিয়া কালীধনের সম্মুখে ধরিয়া বলিলেন ;-“দেখ, দেখি,-সুপ্রভার মুখের ছবি এই মুখটুকুতে আছে কি না?” নির্বিকার শিশু পিতার মুখের দিকে নীলােৎপল-দল-তুল্য চক্ষু দুইটি বিস্ফারিত করিয়া, অতি সুন্দর হাসি হাসিল। পিতা সিক্ত-চক্ষে পুত্রকে বুকে লইয়া চুম্বন করিল ( ৩৪ ) নিরবচ্ছিন্ন সুখ বা নিরবচ্ছিন্ন দুঃখ মানুষের ভাগ্যে নাই,তাহা থাকিলে জগতের শৃঙ্খলা রক্ষিত হইত না। কালই প্রতিনিয়ত সেই শৃঙ্খলা রক্ষা করিয়া চলিয়াছে। তাই কালই মানুষকে কঁদায়,-তাহার হৃদয় ক্ষত- বিক্ষত করিয়া দেয়,--আবার কালই সেই ক্ষত নিরাময় করে। কিন্তু এত-বড় শক্তিশালী কাল,—যাহার অঙ্গুলি-তাড়নায়, কত সুপ্রতিষ্ঠিত সংসার চূর্ণ-বিচূর্ণ হইয়া যায়, কত পরাক্রান্তের প্রচণ্ড বিক্রম নিমেষে বিধ্বস্ত হইয়া ধরাশায়ী হয়, যাহার অভয়-স্পর্শে নিতান্ত নিঃস্ব-ও তাহার নৈরাময় রিক্ততার মাঝখানে, নবােঙ্গমের সাড়া পাইয়া, আবার পায়ে ভর দিয়া দাড়া- ইয়া উঠে,—সেই অমিত-প্রতাপ কালেরও পরাজয় আছে। কাল হৃদয়ের ব্যথা তাহার সুধা-প্রলেপে প্রশমিত করিতে পারে বটে,-বিরহ-জনিত শশাকের উদ্দাম উচ্ছ্বাসকে সে নিবৃত্ত করিতে পারে বটে, কিন্তু প্রকৃত হৃদয়ে কাল-দত্ত-আঘাত-জনিত ক্ষত নিরাময় হইলেও, শুধু যে দাগ থাকিয়া যায়,-তাহা নহে,—কিছু কিছু ব্যথাও থাকিয়া যায় ;-শােকের উচ্ছ্বাস স্তব্ধ মমতার ফাসি। ; হইলে, তাহার প্লাবন-চিহ্ন একেবারে বিলুপ্ত হয় না, সে হৃদয়ের কোনও না কোনও স্তরে তাহার ধ্বংসলীলার স্মৃতি জাগরূক রাখিয়া যাইবেই যাইবে। সুতরাং, কালক্রমে কালীধন শান্ত হইল। কিন্তু সুপ্রভার পুণ্যময়ী স্মৃতি তাহার হৃদয়-মর্মরে স্বর্ণাক্ষরে মুদ্রিত হইয়া, অমরত্ব লাভ করিল। ইতঃপূৰ্ব্বে কালীধন যে মৃৎপুত্তলিকা বুকে ধরিয়া খেলা করিয়াছিল, আজ তাহার প্রতি-- কৃতি সিংহাসনে বসাইয়া, দেবীজ্ঞানে পূজা করিতে আরম্ভ করিল। কালীধন আবার কার্য্যে প্রবৃত্ত হইল। একদিন মিত্ৰগৃহিণী কালীধনকে বলিলেন ;-“যা হবার তা ত হয়ে গেল, এখন আমার প্রিয়ধনের একটা ব্যবস্থা কর ।” “ও কথা কেন বলছ মা?” “এ ভাবে তাকে আর কত দিন রাখবি ?” “কেন? ছেলে ত তােমার কাছে রয়েছে। তুমি তার বাপ কে মানুষ কত্তে পেরেছ, আর তাকে মানুষ কত্তে পাবে না?” “বােকা ছেলে, আমি কি তাই বলছি ?” “তবে কি বলছ ?--আবার কি ব্যবস্থা করবাে ?” “দেখ ; -আমার মতে ছেলে-পুলেকে নীচ জাতের মেয়ের মাই খেতে দেওয়া ভাল নয়। আজ কাল সভ্যতার খাতিরে বাবুয়ানীর জন্য সাহেবদের দেখাদেখি, অনেক বড় লােকের বাড়ীতে যে-সে জাতের আয়া রাখা হয়। আমি ওটাকে ভাল বলে বুঝিনা। নীচবৃত্তি স্ত্রীলােকের বুকের রক্ত চুষে চুষে, ছেলেরও প্রবৃত্তি নীচ লােকের মত হয়ে যেতে পারে।” “মা, খুব ঠিক কথা বলেছ। মাতৃস্তন্যে শিশুর স্বাস্থ্য ও চরিত্র দুইই নির্ভর করে। মাতৃদুগ্ধের অভাবে যদি সেই শিশুকে হীনবংশীয়া পরস্ত্রীর স্তন্যপান করান হয়, তা হলে সেই পরস্ত্রীর যত বােগ, যত কুপ্রবৃত্তি ও কুনীতি সেই মমতার ফঁাসি। শিশুতে সংক্রামিত হতে পারে। মা, তুমি বড় মূল্যবান্ কথা বলেছ। কিন্তু এখন উপায় কি?” "উপায় আছে। আমাদের প্রিয়ধনের ছােট মামার একটা ছেলে পাঁচ মাস হয়ে মারা গেছে। আহা বউটা মর্মে মরে আছে। চাপাপুরে পত্র লেখ। তারা এসে আদর করে নিয়ে যাবে। বউটাও খানিকটা ঠাণ্ডা হবে, আমার প্রিয়ধনেরও কোনও কষ্ট হবে না।” “তাসে ভাল কথা। কিন্তু মা, আমি কি করে থাকবাে ? যখন প্রাণটা কেমন করে, একবার ওকে বুকে নিলেও সব জ্বালা ক্ষণকালের জন্য জুড়িয়ে যায় ;-ওকে ছেড়ে আমি কেমন করে থাকবাে ?” “তাই যদি বলি,-তা হলে আমিই বা কাশী গিয়ে, তােকে এই অবস্থায় ছেড়ে,--আমার প্রিয়ধনকে পরের কোলে দিয়ে কেমন করে থাকুববা?” কালীধন দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলিল। বলিল ;-“মা আমি তোের ছেলে,-তুই পারি ত আমিও পারব। আজই পত্র দেব।” দিন কতক পরে প্রিয়ধনের ছােট মামা সস্ত্রীক আসিয়া, পরম আগ্রহে প্রিয়ধনকে চম্পাপুরে লইয়া গেল। কালীধন প্রিয়ধনের ভবিষ্যতের পানে ঢাহিয়াই, এক প্রকার পাষাণে বুক বাঁধিয়া, তাহার সান্ত্বনার একমাত্র অবলম্বন, সুপ্রভার শেষ স্মৃতিকে দূরে পাঠাইয়া দিল। মিত্ৰগৃহিণী প্রিয়- ধনকে বুকে জড়াইয়া ধরিয়া, আকুল কঠে কঁদিয়া উঠিলেন,—কিন্তু যখনই তাহার অপ্লাবিত চক্ষু কালীধনের মুখমণ্ডলে আসন্ন ঝটিকার নিবিড় ৮৯ মমতার সি। মেঘের ছায়া লক্ষ্য করিল,অমনি তখনই তিনি সাবধান হইলেন ;তিনি প্রিয়কে তাহার ছােট মামিমাতার বক্ষে দিয়া, শুধু বলিলেন ;-“খুব সাবধানে রাখিস্ মা, আমার সুপ্রভা-কালীর সর্বস্ব আজ তাের কাছে গচ্ছিত রেখে নিশ্চিন্ত হলাম, দেখিস, যেন বাছার আমার কোনও কষ্ট না হয়। পরে কালীধনের পানে চাহিয়া বলিলেন ;-“কালী, ওদের তা হলে ট্রেনে তুলে দিয়ে আয়,গাড়ী আসবার সময় হয়েছে। বেশী দেরী করিসনি, আজ কিন্তু গীতায় অর্জুনের বিশ্বরূপ দর্শনটা আমাকে বেশ ভাল করে বুঝিয়ে বলতে হবে।” === 6 --- ( ৩৫ ) একদিন কালীধন আসিয়া সহসা মিত্ৰগৃহিণীকে বলিল ;-“মা, আচ্ছা স্ত্রীলােক বিধবা হলে ব্রহ্মচর্য পালন করে, আর পুরুষ বিপত্নীক হলে করেনা কেন?” মিত্ৰগৃহিণী ঈষৎ হাসিয়া বলিলেন ;-“আজ আবার তাের মনে এ কথা উদয় হল কেন?” “আগে তুমি বলাে—কেন? তারপর বলবাে।” “এত বই পড় ছি,জাছি, শুনছি,তবু সেই ছেলেবেলার মত আমার কাছে জাতে হবে ? আচ্ছা ছেলে বটে! আমি বেশী কি জানি ৰ ত? এইটুকু জানি, স্ত্রীলােক স্বভাবতঃ অবলা, আর পুরুষ স্বভাবতঃ সবল। সব বিষয়ে পুরুষের সাহস বেশ, সামর্থ্য বেশী, ধৈৰ্য্য বেশী। আরও মমতার সি। পুরুষের অনিয়মে সংসারে যত ক্ষতি হয়, স্ত্রীলােকের অনিয়মে তার চেয়ে ঢের বেশী ক্ষতি হয়। পুরুষ চঞ্চল হলে স্ত্রীলােক সংসারকে তবু খানিকট গুছিয়ে রাখতে পারে, কিন্তু স্ত্রীলােক চঞ্চলা হলে পুরুষের শত চেষ্টাতেও সে সংসারে আর আঁটি বাঁধে না। দেখনা কেন,-পুরুষ বেশ্যাসক্ত মাতাল হলে সংসার তবু চলে, কিন্তু স্ত্রী কুলটা হলে সে স’সার একেবারে উচ্ছন্ন যায়।” “মা, তােমার মুখে এই সব কথা শুনতে আমার বড় ভাল লাগে । তুমি যেটা বল, সেটা আমার প্রাণে বড় খেটে যায়। আচ্ছা, তুমি যে স্ত্রী- জাতিকে অবলা বলছ, কিন্তু ঐ স্ত্রীলােকই ত আবার শক্তিরূপিণী ?” “দেখ,—এখন আমি কি তাের সব কথার উত্তর দিতে পারি ? আমি কি-ই বা বুঝি,আর কি-ই বা জানি? তুই যে ঐ সেদিন রাত্রে পড়ছিলি,—সংস্কৃত বইখানা, আর আমাকে বাঙলা করে বুঝিয়ে দিচ্ছিলি, ‘প্রকৃতি হলেন পুরুষের ইচ্ছাশক্তি, কিন্তু পুরুষের সাহচর্য্যেই শক্তিমত হয়ে কার্য করেন। ওটা ধরে মিলিয়ে দেখ না, বােধ হয় বুঝতে পাবি।” “ও সব মুনি-ঋষিদের চালাকি। নিজের জাতকে প্রশ্রয় দেওয়াই তাদের } মিত্ৰগৃহিণী শিহরিয়া উঠিলেন ;-যুক্তকর কপালে স্পর্শ করিয়া বলি- লেন ;-“ছি, ও কথা বলতে নেই বাবা,তারা সংযমী, সংসারত্যাগী মহাপুরুষ,তাদের মুখ দিয়ে পক্ষপাতের কথা বেরুতেই পারে না। নারীকে তারা কখনাে নীচু আসন দেননি, আদ্যাশক্তি তাদের আরাধ্যা দেবী, গায়ত্রী তাদের আরাধনার মূলমন্ত্র। তারা ত্রিকালদর্শী ছিলেন। তারা যা বলে গেছেন তাই ঠিক। এখন তাের আসল কথা কি তাই বল ?”

মমতার ফসি। “দেখ মা, আমি এই মাছ-মাংসটা আপাতত ছেড়ে দেবাে মনে কচ্ছি। সুপ্রভা বলত,‘এ দেশে মাছ ত ন'মাসে ছ'মাসে পাওয়া যায়, একদিন দুদিন খেয়ে পাপ জড়ান কেন?' আমি তখন হেসে উড়িয়ে দিতাম, কিন্তু এখন দেখছি, সে যা বলত, কথাটা ঠিক। আর মাছ-মাংস খাই বলে এখানকার অনেক লােকে আমাকে ঘৃণা করে। এমন কি অনেক রােগী মরে গেলেও আমাকে দেখায় না।” “যদি সামান্য মাছ-মাংসের জন্য লােকের উপকারে ব্যাঘাত হয়, তা হলে ও গুলাে ছাড়তে দোষ কি ? কিন্তু তােদের ডাক্তারীতে বলে না---মাছ খেলে চোক্‌ ভাল থাকে ?” “এখানে দুধ-ঘিয়ের অভাব নেই—আর দুধ-ঘিয়ের তুল্য জিনিষ, বােধ করি দুনিয়ায় নেই। দুধ-ঘি খেলে ও চো ভাল থাকে। এ দেশে আতপ-চা’ল ভিন্ন অন্য চাল পাওয়া যায় না। বেশ হবে, ইচ্ছায়, অনিচ্ছায় ব্রহ্মচর্য চলবে।” মিত্ৰগৃহিণী একটু ভাবিলেন, পরে বলিলেন ;-“দেখ, কালী, আমি, ঠিক কচ্ছি কি?—তুই দেশে যা। দেশের লােক তাের পানে চেয়ে আছে । এখন গিয়ে দেশে বলে, তাের দ্বারা দেশের খুব উপকার হবে।” কালীধন বিস্ময়-ব্যঞ্জক কণ্ঠে বলিল ;--“সে কি না, আমি যে তােমার সঙ্গে কাশী যাবাে বলে ঠিক করেছি।” “পাগল,-তাই কি উচিত ? তাের বুড়ো বাপ-মা রয়েছে, তাদের মুখ তাকাবি না? এখনও তাের বয়স কি?” কালীধন একটু আবেগপূর্ণ স্বরে বলিল ;-“মা, কি বলছ তুমি ! আমি আবার বিয়ে কৰ্বো,-সংসারী হব? এই আঙুলটাতে যে আমাকে আত্ম- বলিদানের শিক্ষা দিয়ে গেছে তাকে ভুলে, আজ আমি অনায়াসে নূতন ঘর পাতিয়ে বসবো? তা হবে না, কালীধন তােমার ততটা অকৃতজ্ঞ নয় । ;

মুমতার সি। তুমি বলত—আমি দেশে যেতে রাজী আছি। কিন্তু বিয়ে আর কৰ্বে না । বিয়ে মানুষের একবারই হয়—দুবার হয় না।” মিত্ৰগৃহিণী সিক্ত-চক্ষে বলিলেন -“তবে তুই যা ভাল বুঝিস্ কর।” ( ৩৬) যে দিন এই কথা হইতেছিল,তাহার পূৰ্ব্ব রাত্রিতে, দত্ত মহাশয় ও গৃহিণী এইরূপ কথােপকথনে নিযুক্ত ছিলেন। প্রথমেই দত্তগৃহিণী কথা পাড়িলেন ;- “দিব্যি আফিং ঔছ, আর দাড়ি ডুবিয়ে দুধ খাচ্ছ। আর দাড়ি ডুবিয়ে দুধ খাচ্ছ। এ দিকে যে পর্দা ফাক হতে চলল,তার কিছু খােজ রাখ?” “কেন?—পর্দা ফঁাক হল আবার কিসে ?” “ভাগ্যি,—আমি তােমার ঘরে এসেছিলাম,নইলে তােমার দুঃখে শিয়াল কুকুর কঁদতে। ছেলে যে উদাসী হয়ে চলল। মাগীর সঙ্গে কাশী যাবে বলে ঠিক করেছে। রাতদিন মাগীর সঙ্গে ধৰ্ম্ম-পুরাণ নিয়ে ব্যাখ্যা হচ্ছে। আর দুধ জুটছে না, আমরক্ত হয়ে মর্তে হবে।” “ধৰ্ম্ম-পুরাণ নিয়ে ব্যাখ্যা কচ্ছে--তাতে কি ? আহা, বউটা সে দিন মারা গেছে। মনে একটু ঘা লাগবারই কথা। আমারও দু একদিন ওই রকম হয়েছিল। শেষে সব ঠাণ্ডা হয়ে গেল। তােমাকে বিয়ে কল্লাম— ব্যস্, সব ঠাণ্ডা। দু’দিন যাক্, বাড়ী নিয়ে বিয়ে দেব, সব ঠিক হয়ে যাবে।” “তােমার মাথা আর মুণ্ডু। বলে যুদ্ধ কবে—না কাল,তবে আমি আবাে পরশু। ছেলে ওদিকে ভেকু নেবার উষ্যঙ্গ করে বেরিয়ে চলল, মমতাৰ ফঁাসি। আর উনি বাড়ী নিয়ে যাবেন—বিয়ে দেবেন—এখনও যুক্তি অটুছেন—সব ঠিক হয়ে যাবে। মাগীটা দুধের সঙ্গে তােমাকে অবধি ওষুধ কল্লে ! মাগী- টাকে কম ভেবাে না। ঐ মাগীটাই কাল। চোকের উপর দেখলে ত, জল- জীয়ন্ত বউটা ধড়ফড়িয়ে মরে গেল। কেন জান ?ওই সব্বনাশী এল বলে।” “তুমি যা বছ—আমার সব যেন উল্টো বলে বােধ হচ্ছে।” “তা হবেই ত। আসন্নকালে বিপরীত বুদ্ধি আসন্নকালে বিপরীত বুদ্ধি হয়েই থাকে। ছেলেকে পড়িয়েছে, মানুষ করেছে,আর তুমি রাজা হয়েছ ! ছেলের বিয়ে দিয়েছে,-খুব ঘটা করেছে, তােমার হাতে টাকা গুজে দিয়েছে, আর তুমি বত্তে গিয়েছ ! কিন্তু ‘তেল দেও—সি দূর দেও, ভবী ভােলে না’-কানাই দের মেয়ে ভুলবার মেয়ে নয় । শকুনি উপরে উঠলেই সে বুঝতে পারে, কোথায় তার নজর । মাগী বেড়ায় ডালে ডালে—আমি বেড়াই পাতায়, মাগী ডুব দিয়ে জল খেতে চায়। বিয়ে দিয়ে যা করবে ভেবেছিল, তা হয়নি,-“উল্টো বুঝলি রাম’—হয়ে গেল। তাইত এসে ঘাড়ে জেতে বসলাে—বউটাকে খেলে,-ওমা দুধের বাছাটা ছিল,—পাছে কোনও বাগড়া পড়ে, তাকে পৰ্য্যন্ত মন্ত্রণা দিয়ে ভাগালে ! এখন আর কি ?—আপনি আর কোপনি!—আমাদের দুটোকে পগার পার কত্তে পাল্পে,ব্য- ভােগদখলের আর কেউ বাদী থাকবে না।” “আহা, ছেলেটা ছিল, -কোলে পিঠে কত্তাম। হ্যাগা, আমাদেরও তাড়িয়ে দেবে, বলেছে না কি ?” “পােড়া কপাল তােমার। শুছ কাশী যাবে—দুটোয় মিলে। তােমা- দের মাসােহারার বন্দোবস্ত কৰ্বে। বাড়ী গিয়ে কাশী থেকে টাকা আসছে টাকা আসছে করে, হা-পিত্তেশে বসে থেকো। তারপরে ক্রমে ক্ৰমে ৰাসি চুলাের ছাই আসতে আরম্ভ হবে। তখন তাই খেয়াে, আর হাই তুলে মমতার ফাঁসি। ও সর্বনাশ, তা হলে ত বড় বিপদের কথা বলতে হবে গিন্নি! তা হলে—তাই ত এখন কি করা যায় বল দেখি?” “এতক্ষণে,চোকে আঙুল দিয়ে বুঝিয়ে দিলে, তবে বুঝলেন। সাধে কি নায়েবী কত্তে গিয়ে জেল খেটেছিলে !” “আহা ছেড়ে দেও না,-কোন্ কালে কি হয়েছে, তাই নিয়ে দিন-রাত্রি খােটা ! এখন উপায় কি তাই বললা।” বসে। “উপায় ?—ছোঁড়াটাকে ভূত ছাড়িয়ে বাড়ী নিয়ে গিয়ে, বিয়ে দেওয়া ভিন্ন আর উপায় কি ? প্রথমে ভূত দিয়ে ভূত কিলােতে হবে। আগে মাগীটাকে মিষ্টি করে বলতে হবে। দেখছ ত, ছেলে মাগীর কথায় ওঠে ওকে দিয়েই, ছেলের বিয়ের মত করাতে হবে। শুনেছি নাকি,--মাগী গােড়ায় বলেছিল,-ছেলেকে দেশে বসতে। এখন সেই কথা তুলে,-কালীর বাড়ী যাওয়ার ব্যবস্থা কত্তে হবে। যদি মাগীটা সঙ্গে যায়--যাক্,--কায হাসিল করে, তারপর খেংরা মেরে তাড়াবাে। যদি তা না হয়, যদি কোনও বাগড়া দেয়,এখানেই যা হয়, একটা হেস্তনেস্ত করে যাবো। ও যে কেমন মাগী,—আর আমি যে কেমন কানাই দের কন্যে, সেইটী দেখিয়ে দিয়ে যাব।” “তাই ত গিন্নি, তা হলে আর দেরী নয়, কালই এর একটা ঠিকঠাক করে ফেলল। যদি কোনও গােলমাল হয়, এখন থেকে তার জন্য তৈরি হওয়া দরকার। আমি মদনদাকে কালই খবর দিচ্ছি, বাড়ী ঘর একটু সারিয়ে রাখতে। কালী বাড়ী যায় ভালই, না যায়, আমাদের ত সেই কুঁড়েতে মাথা গুঁজতে হবে। কিন্তু গিন্নি, কথাটা তুমিই ঐ মাগীকে বলল,-আমি দেখি যদি পারি, কালীকে একবার বলব।”

মমতার ফাসি। “তুমি যে মাগীকে বলতে পারবে না, তা আমি আগে হতেই জানি। তা হাে, আমিই বলব। কালই আমি মাগীর দৌড় কতদূর, বুঝে নেবাে। বাড়ী ত যাবই,কিন্তু ছেলে নিয়ে উনি যে মজা করে কাশীবাসী হবেন, কানাই দের মেয়ে থাকতে তা কখনই হবে না। তুমি কালীকে বুঝিয়ে বলল,—আর আমি মাগীর পিণ্ডি চটকাই। ভাল কথায় দেখবাে, না হয় তারপর-- এমন সময় দত্ত মহাশয়ের নাসিকা-গর্জন আরম্ভ হইল। দত্তগৃহিণ আর কিছু বলিলেন না,-তবে মনে মনে ভাবিলেন ;-“বুড়ো আফিং থায়,তবু এত ঘুম!--আগে ত ছিল না,এখানে এসে হয়েছে।” } ( ৩৭ ) দ্বিপ্রহর বেলায় মিত্ৰগৃহিণী ও কালীধনে কথা হইল । বৈকালে মিত্ৰগৃহিণী কালীধনের জন্য নিজে দুধ জ্বাল দিতেছেন, এমন সময় দত্তগৃহিণী আসিয়া তঁাহার নিকটে বসিয়া বলিলেন ; “দিদি, একটা কথা বলবাে?” “কি কথা বল না।” “বলছি কি ?—এ ভাবে আর কতদিন কাটবে?” “কি ভাবের কথা বলছ,আমি বুঝতে পাচ্ছি না, একটু খুলে বল।” দত্তগৃহিণী বিরক্তভাবে অথচ তামাসার ছলে হাসিতে হাসিতে বলি- লেন ;-“নেকি ! কিছু বুঝতে পাচ্ছেন না। কালীধনের বৈরাগ্যির কথা বলছি গাে- মমতার ফালি। ‘ও—তা বৈরাগ্য এমন কি? তাকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে এক রকম কা লাগিয়েছি। অনেকটা ঠাণ্ডা হয়েছে।” “তাত বুঝছি-কাযেও লেগেছে-ঠাণ্ডাও হয়েছে। তবে এই কে শুছি বেহ্মচারী হবে না কি হবে ? মাছ-মাংস ছেড়ে দিয়েছে ? এ সব কি ? মা বাপ বৰ্ত্তমান থাক্‌তে এ গুলাে করা কি ভাল? আমাদের মনে কত কষ্ট হয় বল দেখি?” “সে কথা কতকটা ঠিক বটে। কিন্তু কি করবো বােন্,সে খেয়াল ধরেছে। এখন বাধা দিতে গেলে হয়ত হিতে বিপরীত হবে। আর বলুছেও সে মন্দ কথা নয়। এখানকার লােকে মাছ-মাংস খায় না। খায়, তাকে বড় ঘৃণা করে। রােগী বিনা-চিকিৎসায় মরে—তবু তার কাছে আসে না। এত কষ্ট করে ডাক্তারী শিখে, যদি মাছ-মাংসের জন্য রােগী না পায়, তা হলে সে মাছ-মাংস খেয়ে লাভ কি ? আমার মতে অমন মাছ-মাংস খাওয়াই ভাল।” মতের বিরুদ্ধে কথা বলিলে কাহার না রাগ হয়? বিশেষত, দত্তগৃহিণীর ত নিশ্চয়ই হয়। কিন্তু তবু তিনি মনের আগুন মনে চাপিয়া বলিলেন ;- “তা যেন হল,—কিন্তু সংসারের অবস্থাটা ত বুঝছ ? এই অল্প বয়সে যদি ছেলে বেহ্মচারী হয়ে বেড়ালে, বিয়ে-থা না কল্পে—মা বাপ কি করে মুখে অন্ন তােলে বল দেখি?” মিত্ৰগৃহিণী বলিলেন ;-“দিদি সবই বুঝতে পাচ্ছি। এ অবস্থায় ছেলেকে দেখলে, বাপ মার প্রাণে ব্যথা লাগবারই কথা। কিন্তু কি করবে বল ? বিয়ে কত্তে সে একেবারেই নারাজ। আমি একবার তাকে বলেছি- আর তাকে বলতে পাৰ্বো না।”

মুমতার ফাসি। দত্তগৃহিণীর আর সহ হইল না,—তিনি দাড়াইলেন,-সক্রোধে বলি লেন ;-“তা ত পাৰ্বেই না। তা হলে যে তােমার বুকে তিগড়ি খোঁড়া হবে।” মিত্ৰগৃহিণী বিরক্তিপূর্ণ কণ্ঠে বলিলেন ;-“দিদি, ও কি রকম কথা বলছ তুমি ? ছেলে যদি আবার বিয়ে করে, আমার তাতে আহাদ বই দুঃখ হবে কেন ?” দত্তগৃহিণী গর্জিয়া বলিলেন ;-“থাক্ থা—আর ‘ছেলে ছেলে’ কত্তে হবে না। বলে ‘মার চেয়ে অধিক টানে, তাকেই বলে ডান্। ছেলে পেয়েছিলি কোথা হতে ?” মিত্ৰগৃহিণী স্তম্ভিত ! ক্ষণপরে বলিলেন ;-“ও আবার কি কথা দিদি ? তােমাদের ছেলে-তােমাদেরই ত আছে। তােমাদের ছেলে আমার কাছে ছিল--আবার তােমাদের কাছেই ত ফিরিয়ে দিয়েছি।” দত্তগৃহিণী উচ্চকণ্ঠে বলিলেন -“আমাদের ছেলে উনি দয়া করে আমা- দের ফিরিয়ে দিয়েছেন। তবে আবার কন্ধে এসে চেপেছিস কেন ?—শতেক খােয়ারি—” মিত্ৰগৃহিণী কঁদিয়া ফেলিলেন—বলিলেন ;-“দিদি,-তাই যদি তােমা- দের মনে ধারণা হয়ে থাকে, আমি আজই চলে যাবাে।” দত্তগৃহিণী দ্বিগুণ উচ্চকণ্ঠে বলিলেন ;-“যা যা—এখনই দূর হয়ে যা,- লজ্জা করে না,-ছেলে পাতিয়ে ছেলের সঙ্গে পীরিত কত্তে—” আর বলিতে হইল না। মিত্ৰগৃহিণীর হাত হইতে দুধের কাঠি খসিয়া পড়িল। তিনি চুল্লীপার্শ্বে মূৰ্হিতা হইলেন। ঝি আসিয়া তাড়াতাড়ি ধনিয়া ফেলিল এবং তাহার চক্ষে জলের ঝাপ্টা দিতে লাগিল।

মমতার ফসি। ঘটনাক্রমে ঠিক সেই সময় কালীধন বাড়ীর মধ্যে প্রবেশ করিল এবং দত্তগৃহিণীর শেষ কথা কয়টী স্বকর্ণে শুনিল। তাহার আর সহ্য হইল না। সে তৎক্ষণাৎ বজ্রনিনাদী কণ্ঠে কহিল ;-“মা, সাবধান, কাকে কি বলছ, তা তুমি জান ?” দত্তগৃহিণীও উত্তেজিত। দুগ্ৰহবশে তিনিও চীৎকার করিয়া উত্তর দিলেন ;-“যা বলেছি,--ঠিক বলেছি,আর একশ’বার বলবো। মাগীর কথা শেষ হইতে না হইতে কালীধন সিংহের মত আসিয়া দত্তগৃহিণীর উপর পড়িল-কিন্তু আক্রমণ ব্যর্থ হইল। দত্তগৃহিণী তখন নােয়কের সীমায় আসিয়া পড়াতে, উল্টাইয়া নীচে পড়িয়া গেলেন। এ দিকে বেগতিক দেখিয়া, দত্ত মহাশয় আসিয়া কালীধনের হাত দুইখানি ধরিলেন এবং কঁপিতে কাঁপিতে বলিলেন ;-“বাবা কালী, কার গায়ে হাত তুলছিস?” কালীধন হাত কাড়িয়া লইবার চেষ্টা করিতে করিতে বলিল ;- “হাত ছেড়ে দিন, যে আমার মায়ের নিন্দা করে, সে আমার কেউ নয়।” মিত্ৰগৃহিণীর মূচ্ছা স্থায়ী হয় নাই। তিনি একটু পরেই সুস্থ হইয়া চক্ষু চাহিয়া দেখিলেন,-ব্যাপার ভীষণ। তাড়াতাড়ি উঠিয়া দাঁড়াইলেন- ডাকিলেন—“কালীধন!” কালীধন মাতার পানে চাহিয়া, একেবারে কঁদিয়া ফেলিল,-বলিল “মা” মাতা শুধু বলিলেন ;--“আমার সঙ্গে এস।” মিত্ৰগৃহিণী ধীরে ধীরে অগ্রগামিনী হইলেন, আর অতি সুবােধ বালকের মতই কালীধন তাঁহার পশ্চাদনুসরণ করিল।

মধত সি। (৩৮) বারাণ্ডা হইতে পড়িয়া দত্তগৃহিণীর সংজ্ঞালােপ হইল না বটে, তবে উঠিতে একটু বিলম্ব হইল। তাহার প্রথম হেতু, কালীধনের জামদগ্ন্য-মূর্তি তাহাকে কিছুক্ষণের জন্য হতবুদ্ধি করিয়া রাখিয়াছিল ; দ্বিতীয় কারণ, তিনি পতন-নিবারণে চেষ্টা পাইয়া, বামহস্তে বিলক্ষণ আঘাতপ্রাপ্ত হইয়াছিলেন। যখন কালীধন চলিয়া গেল, তখন তিনি উঠিয়া বসিয়া দত্ত মহাশয়কে বলি- লেন ;-“দেখলে ?” কালীধন চলিয়া গেলে, দত্ত মহাশয় কিয়ৎক্ষণ বিমুঢ় হইয়া, দণ্ডায়মান রহিলেন। তাই ত, গৃহিণী যাহা বলিয়াছে, তাহা বর্ণে বর্ণে ঠিক ! কালীধন আমার কথা গ্রাহ্য করিল না, কিন্তু মিত্ৰগৃহিণী ডাকিতেই মন্ত্র-চালিতের ন্যায় চলিয়া গেল ! কিন্তু গৃহিণীর কথা কর্ণে প্রবেশ করিতে তাহার জ্ঞান হইল। তিনি তঁাহার সমীপবর্তী হইয়া বলিলেন ;-“দেখলাম বই কি।” “বল, আর দেখতে চাও?” “আর কি দেখবাে,যথেষ্ট হয়েছে।” “এখন আমি যা বলবাে-শুবে ?” “শুনবাে।” দত্তগৃহিণী বলিলেন ;-“এক কায করাে,আগে আমার হাতের কবজীতে একটা জলপটী দেবে এস।” কর্তা ও গৃহিণী দুইজনে তাহাদের ঘরে ঢুকিলেন এবং সে রাত্রে দুই জনের কেহই জলগ্রহণ করিবেন না,এই সংবাদ দত্তগৃহিণী নিজেই সশব্দে দ্বার অর্গল-বদ্ধ করিয়া, সকলকে বিশেষভাবে জানাইয়া দিলেন।

মমর বাসি। গৃহের মধ্যে গিয়া, কালীধন দিতে দিতে বলিল ;–“মা,-আর আমার এ জীবনে ফল কি? আজ তােমার মিথ্যাপবাদ আমাকে শুতে হল—আমার জন্মে ধিক্ !” মিত্ৰগৃহিণী সান্ত্বনা দিয়া বলিলেন ;-বাবা, গঙ্গার উপর দিয়ে সারি গেয়ে গেলে গঙ্গা তাতে অপবিত্র হন কি?” “গঙ্গা অপবিত্র না হতে পারেন, কিন্তু গঙ্গাভক্তের প্রাণে কতটা আঘাত লাগে।” “তাতে সারি নিবারণ হয় কি?” “যদি তা নিবারণ করবার ক্ষমতা না থাকে, তবে সে গঙ্গাভক্তের গঙ্গাপ্রাপ্তি হওয়াই উচিত।” “তার চেয়ে সারি গানে মন না দেওয়াই ভাল, অথবা যেখানে সারি গান শােনা যায় না, সেখানে যাওয়াই ভাল।” “তা হলে মা,আর আমি ওঁর কোন সংশ্রবে থাকব না। দেশে আমি যাবে না। যদি পায়ে ঠাঁই দেও—তােমার কাছেই থাকুবাে। আর তা যদি না দেও—যেখানে ইচ্ছা চলে যাবে।” মাতা বাৎসল্যপূর্ণ কণ্ঠে বলিলেন ;-“তুমি আমার ছেলে,-আর কোথাও যেতে হবে না—তুমি আমার কাছেই থেকে। কিন্তু তােমার বাপ মায়ের উপায় ?” কালীধন কিছুক্ষণ মিত্ৰগৃহিণীর মুখের পানে চাহিয়া শুধু বলিল,-“মা!” মিত্ৰগৃহিণী ঈষৎ ভৎসনাসূচক স্বরে বলিলেন ;-“ছি ছি, অমন কায কত্তে নেই। আগুনে হাত দিলে, ইচ্ছায় পােতে, অনিচ্ছায়ও পােড়ে।

মমতার সি। গুরুজন নিজে অপরাধী হয়ে, বিনা-কারণে অভিসম্পাত দিলেও লঘুর অমঙ্গল হয়-ই। আর তােমার বাবা ত কোনাে দোষ করেন নি।” কালীধন বলিল,-“মা, তবে আগে যা ঠিক করেছিলাম—তাই করব। ওঁদের বাড়ী পাঠিয়ে দি,-মাসােহারার বন্দোবস্ত করি--কেমন ?” মিত্ৰগৃহিণী একটু ভাবিয়া বলিলেন ;-“তবে আপাততঃ তাই করাে।” } ওদিকে রাত্রি তিনটা অবধি দত্তগৃহিণী ও দত্ত মহাশয়ের নানাবিধ জল্পনা- কল্পনা চলিয়াছে। কথায় কথায় দত্তগৃহিণী বলিয়া উঠিলেন ;-- “খুন করে জেলে গিয়েছিলে—আর এটা পারবে না?” “খুন আমি করিনি। আমি পাইকদের বলেছিলাম, প্রজাকে মারতে , মাতে কাছারী আনতে। তারা তাকে মেরে ফেলে তারপর আমার কাছে হাজির করেছিল।” “যাক্, সে যা হবার তা হয়ে গেছে । তােমার ত বেশী কিছু কত্তে হবে না—শুধু এনে দেবে। আমার যদি চিনে আবার ক্ষমতা থাকতাে, তাহলে তােমার পায়ে তেল দিতে যেতাম না। দোহাই তােমার—এতে আর অনত করাে না। আমার আর কি ?-তােমার ভালর জন্যই বলছি,শুধু এই টুকু করাে,একটু চিনে এনে দেও। এরপর আর সব আমি আমার এই ভাঙ্গা হাতখানা দিয়েই না হয় কৰ্বো। তাও পাব্বে না? তবে তুমি তােমার ছেলের চাকর হয়ে থাকো। মাগীর ঝাটা খেয়ে, আমি আর এস্থলে থাকবে না। দেখ, এখনও বলছি, তােমার ছেলে খারাপ নয়,

মমতার ফাসি
ঐ মাগীটাই যত নষ্টের মূল।
এখনও হাতে আছে, হাতছাড়া হলে আর
ফেরাতে পাৰ্বে না। তােমার অনন্ত দুগগতি হবে।”
দত্তমহাশয় অনেকক্ষণ চুপ করিয়া রহিলেন, পরে বলিলেন ;-“আচ্ছ।
দেখি কি কত্তে পারি।”
সেদিন আকাশের বড় দুযোগ।
জলদ-জালে আকাশ পরিব্যাপ্ত।
সারারাত্ৰ বিষম ঝড় ও প্রবল বৃষ্টির বিন্দুমাত্র বিরাম ছিল না।
দত্তমহাশয় আজ আর বাহিরে আসিলেন না। দ্বার খােলা নাই
দেখিয়া, চাকর তামাক সাজিয়া ফিরাইয়া লইয়া গেল। মিত্ৰগৃহিণী ও
দত্ত-দম্পতির খোজ লইতে সাহস করিলেন না।
( ৩৯ )
রাত্রি প্রভাত হইলেই, দত্তগৃহিণী আসিয়া মিত্ৰগৃহিণীর পদমূলে আছাড়
খাইয়া পড়িয়া দিতে দিতে বলিলেন ;-“দিদি, কাল রাগের
মাথায় তােমাকে কত কি বলেছি, তাতে কিছু মনে করাে না। আমার
অপরাধ হয়েছে, আমাকে মাপ কর। এই দেখ, আমি তার সাজাও
পেয়েছি,-পড়ে গিয়ে আমার হাত ভেঙ্গে দুখানা হয়ে গিয়েছে।”
মিত্ৰগৃহিণী দত্তগৃহিণীর অ-প্লাবিত মুখখানি দেখিয়া এবং বাহু-সন্ধিতে
সত্যসত্যই আঘাত লাগিয়াছে বুঝিতে পারিয়া, বড়ই ব্যথিত হইলেন।
তিনি তাহার হাত ধরিয়া উঠাইয়া বলিলেন ;-“যা হবার তা হয়ে গেছে।
তার জন্য আর পায়ে ধরবার দরকার কি দিদি। শুধু মুখে বললেই যথেষ্ট

হত। দিদি, তুমিও কিছু মনে করাে না। আহা, হাতােনা যে বড় ফুলেছে!” এই বলিয়া মিত্ৰগৃহিণী ডাকিলেন ;-*কালী।” তখনই কালীধন আসিয়া উপস্থিত হইল। মিত্ৰগৃহিণী তাহাকে বলিলেন ;-“তােমার মায়ের পায়ের ধূলাে নেও, আর পড়ে গিয়ে ওঁর হাতে আঘাত লেগেছে, আগে তার একটা ব্যবস্থা করাে।” কালীধন প্রণত হইল। পরে ঔষধ আনিবার জন্য পাশের ঘরে যাইতে দেখিল,-তাহার পিতৃদেব উকি মারিতেছেন, সে তাহাকেও প্রণাম করিল। দত্ত মহাশয় কিছু বলিলেন না, কেবল একবার দত্তগৃহিণীর প্রতি দৃষ্টিপাত করিলেন,-গৃহিণীও তাহাকে কি ইসারা করিলেন। কালীধন চলিয়া গেল। দত্ত মহাশয়ও সরিয়া গেলেন। এই ঘটনার পর হইতে দগৃহিণী দিব্য হাসিমুখে বেড়াইতে লাগিলেন, কিন্তু দত্ত মহাশয়ের সঙ্কোচপূর্ণ সন্নতদৃষ্টি, যেন কি এক অনিচ্ছাকৃত অপরাধ ও তাহারই বিষময় ফলস্বরূপ কোনও এক অনির্দেখ ভাবী অনর্থপাতের আশঙ্কাকে প্রচ্ছন্ন রাখিবার ব্যর্থ প্রচেষ্টায়, প্রায় সর্বক্ষণই অতি সন্তর্পণে ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত হইতে লাগিল। এই ভাবে দিবা অতিবাহিত হইল। কমে রাত্রি আসিল। কল্য হইতে রাত্রিতে আকাশের মরণ ধরিতে আরম্ভ হইয়াছে। আজও আকাশ মেঘাচ্ছন্ন। কিন্তু কল্যকার অণে অবস্থা আজ যেন আরও ভয়ানক।

অরফালি। } কাল কালীধনের বৃষ্টিতে ভিজিতে হইয়াছিল। আজ সে সকাল সকাল রােগী দেখিয়া ফিরিয়া আসিয়াছে। তাহার শরীর একটু অসুস্থও হইয়াছে। কিন্তু আজ তাহার মনটা যেন অপেক্ষাকৃত প্রফুল্ল। লুপ্তরত্ন পুনরুদ্ধৃত হইলে, মনে যে ভাবের সঞ্চার হয়, কালীধনের মনের ভাব আজ যেন তেমন-ই কালীধনের ঘরে টেবিলের উপর বাতি জ্বলিতেছে। সে চেয়ারে বসিয়া আমেরিকার একখানি মাসিক পত্রিকা সম্মুখে রাখিয়া, দোয়াত-কলম-ইয়াকি লিখিতেছে। লেখা সমাপ্ত হইলে কালীধন ডাকিল ;-“মা ।” পারে ঘর হইতে মিত্ৰগৃহিণী উত্তর দিলেন ;-“কি কালী, ডাকছিস?” কালীধন বলিল -“হাঁ, শীঘ্র একবার এখানে এস।” মিত্ৰগৃহিণী আসিলে কালীধন বলিল ;-“মা, আজ সে সাহেব ডাক্তারের সংবাদ পেয়েছি। আহ, তিনি ও তার মেম সেই ক্যালিডােনিয়া জাহাজে ছিলেন।” মিত্ৰগৃহিণী অতি ব্যাকুল কণ্ঠে বলিয়া উঠিলেন ;-“বলি কিরে । আহা তার পর তার পর ! তারাও তা হলে রক্ষা পান নি ?” কালীধন বলিল ;—“না। কিন্তু কি গৌরবের সহিত-ই তারা দুজনে জীবন বিসর্জন করেছেন—আর সেই সূত্রে আমার জীবনকে পৰ্যন্ত গৌর- বান্বিত করে গেছেন, শােন। এখনই আমি সেটাকে বাঙলায় তর্জমা করে ফেলেছি।” শােন ;- “এই প্রলয়-ব্যাপারে যে সকল মনীষী ও মহাত্মা চিত্ত-ঔদার্য্য ও আত্ম- ত্যাগের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করিষা, অনন্ত-শয্যায়, অনন্ত-নিদ্রায় নিদ্রিত হইয়াছেন, তাঁহাদের মধ্যে ডাক্তার বেরিংটন একজন। ইউরােপ, আমেরিকা ও এসিয়াখণ্ডের বিৱণ্ডলীর মধ্যে, বিশেষত, চিকিৎসক-সমাজে তাহার নাম জানেন না, এরূপ ব্যক্তি অতি বিরল। বার্ধক্যে স্বাস্থ্যভঙ্গ হওয়ায় মমতার বলি। দিনকতক সমূদ্র-বাস-বাসনায়, তিনি এই জাহাজে সস্ত্রীক অবস্থিতি করিতে ছিলেন। তুষার-পৰ্বতসংঘাতে অর্ণবপােত বিধ্বস্ত হইলে, লাইফ-বটে আরােহণ করিবার জন্য, যখন মিসেস বেরিংটনের নিকট পূৰ্ব্ব-বার্তা প্রদান করা হইল, তখন ডাক্তার বেরিংটনও তাঁহাকে অম্লানবদনে বিদায় দিতে চাহিলেন। কিন্তু মিসেস বেরিংটন স্বামীকে বলিলেন ;-“আমার জীবন তােমার জীবন অপেক্ষা কি এতই মূল্যবান্ ? তুমি বাঁচিয়া থাকিলে জগতের কত উপকার হইত, কত নুতন নুতন তথ্য আবিষ্কৃত হইত, বিজ্ঞানের কত উন্নতি হইত। তুমি চলিলে, আমি বাঁচিয়া কি কাষে আসিব?” ডাক্তার সাহেব উত্তর করিলেন ;-“ইংলণ্ডে আমাদের দুই কন্যা ও এক পুত্র আছে, তাহাদের তত্ত্বাবধানের ভার তােমার উপর।” ডাক্তার-পত্নী বলিলেন ;-“তাহাদের কোনও অভাব নাই। কন্যার তাহাদের সংসার বুঝিয়া লইয়াছে,-ছেলে লেখাপড়া শিখিয়া মানুষ হইয়াছে। ভগবান তাহাদের রক্ষণাবেক্ষণ করিবেন। বরং, দেখ ঐ যে লােকটী এক-পার্শ্বে অপােবদনে বসিয়া আছে,-আমি উহার ঘরের খবর লইয়াছি ;-বাড়ীতে উহার রুগ্না পত্নী, দুইটা শিশু পুত্র ও বৃদ্ধা মাতা আছে। ঐ ব্যক্তিই তাহাদের একমাত্র অবলম্বন। এস, আমরা আমাদের জীবনের বিনিময়ে ঐ লােকটীর প্রাণরক্ষার উপায় করি।” ডাক্তার- সাহেব চমৎকৃত হইলেন,-বলিলেন,-“তােমার এ ইচ্ছায় বাধা দিবার সামর্থ্য আমার নাই। কিন্তু প্রিয়তমে, এই মহানীতি তুমি কোথা হইতে শিখিলে?” মিসেস বেরিংটন উত্তর করিলেন ;-“একটী বঙ্গমহিলা স্বামীর অঙ্গুলির জন্য নিজের অঙ্গুলি বিসর্জন দিতে পারিল, আর আমি তােমার সহ- ধর্মিণী হইয়া, একটী পরিবারের স্তম্ভ-স্বরূপ এই লােকটার জন্য তােমার সহিত বাঞ্ছিত মরণ মরিতে পারিব না !” মিঃ বেরিংটন আর বাঙ নিষ্পত্তি না করিয়া, মমতার নি। তাঁহার পত্নীকে লইয়া, সেই লােকটীর উদ্ধার-পন্থার ব্যবস্থা করিতে, ক্যাপ্টেন সাহেবের কামরায় চলিয়া গেলেন। পরে প্রত্যাবর্তন করিয়া স্বামী স্ত্রী দুই- জনে পাশাপাশি উভয়ে উভয়ের হস্তধারণ করিয়া উপবিষ্ট হইলেন। উভয়ের দৃষ্টি টেবিলের উপরিস্থ একটী শিশির উপর নিবদ্ধ, শিশিটীর গাত্রে একটা কাগজের চিহ্ন! দেখিতে দেখিতে চিরবিদায়ের বাদ্য বাজিয়া উঠিল।” পড়িতে পড়িতে কালীধনের মুখখানি গরিমায় আরক্ত হইয়া উঠিল । চক্ষে পুলকা গড়াইতে লাগিল। পাঠ সমাপ্ত হইলে মিত্ৰগৃহিণী অশ্রু বিজড়িত কণ্ঠে কহিলেন ;-“তা হলে ঐ শিশিটার মধ্যেই বােধ হয়, মায়ের আমার আঙুলটী ছিল? কালীধন বলিল ;—“মা,-তাই-ই ঠিক। সুপ্রভার জীবনের শেষ-চিহ্ন যা ভস্মাবশেষ হয় নি,তা ঐ আদর্শ-দম্পতির জীবনের সঙ্গে অনন্ত-সাগরে বিলীন হয়েছে। মা, বল দেখি, আর কি বিয়ে কর্তে—আর কি সংসারী হতে সাধ যায় ?” মিত্ৰগৃহিণীর বাক্‌-শূর্তি হইল না। তখন তাহার চক্ষুও শুষ্ক ছিল না। কিন্তু তখন তিনি শুধু সেই আদর্শ ইংরাজ-দম্পতির কথা ভাবিতেছিলেন না। তিনি ভাবিতেছিলেন,তাহারই স্নেহ-সিঞ্চিত তরু কালীধন,—কি সুন্দর সে,—কি মহনীয় চরিত্র লইয়া সে তাহার সম্মুখে বিরাজ করিতেছে ! হায় ! সুপ্রভা-সৌভাগ্যবতী সে বটে, কিন্তু সে তাহার সৌভাগ্য পূর্ণভাবে সম্ভোগ করিয়া যাইতে পারে নাই। তিনি মুগ্ধ নেত্রে অনেকক্ষণ কালীধনের পানে চাহিয়া রহিলেন। ধীরে ধীরে বলিলেন ;-“না কালী,আর আমি তােকে কোনও দিন বিয়ের কথা ববাে না। তাের আর বিয়ে না করাই উচিত।”

মমতার পসি। ( ৪০ ) মিত্ৰগৃহিণী ও কালীধনের মধ্যে যে মাতা-পুত্রের সম্বন্ধ ব্যতীত, আর একটা নিবিড় অন্তরঙ্গতা উভয়ের অজ্ঞাতসারে ক্রমে ক্রমে পরিপুষ্ট হইয়া- ছিল, তাহার মুখ্য হেতু, মিত্ৰগৃহিণী পতিহীনা, আর কালীধন বিপত্নীক। দুজনের এই তুল্যদশায় অবস্থিতি, উভয়ের চিত্তকে উভয়েই সমবেদনার আকর্ষণে অতি নিকটে টানিয়া আনিয়া, পরস্পর পরস্পরকে এত দরদী করিয়া তুলিয়াছিল যে, কেহ কাহারও সান্নিধ্য ত্যাগ করিতে যেন কি এক ব্যথা অনুভব করিত। এই যে প্রগাঢ় আত্মীয়তা, ইহার সহিত মাতৃত্বের বিশেষ কোনও সম্বন্ধ ছিল না। স্বামী-সুখ-বঞ্চিত ও পত্নী-বিরহ-বিধুর দুইটী বুভুক্ষু চিত্তের ক্রন্দনের সুর তারা ও উদারা গ্রামের এক-ই পর্দায় ঝঙ্কৃত হইয়া, যেন কি এক মাধুর্যময় এক্যতানের সৃষ্টি করিয়াছিল । ক্রমে যতই দিন যাইতেছিল,—মিত্ৰগৃহিণী ততই যেন কালীধনের প্রতি ঝুকিয়া পড়িতেছিলেন। নারী হৃদয়ের প্রবণতা,-তাহার উপর তাহার বাৎসল্য পূৰ্ব্ব হইতেই তাহাকে অভিভুত করিয়া রাখিয়াছিল। কিন্তু তাহ-- তেও মধ্যে মধ্যে তাহার বৈরাগ্য-সঞ্চার হইত এবং সেই বৈরাগ্যের বশে তিনি কালীধনকে ত্যাগ করিয়া,-দূরে থাকিতে পারিতেন,—অন্ততঃ কিছু দিনের জন্যও। কিন্তু সুপ্রভার মৃত্যুর পর সে দিন হইতে, কালীধন সুপ্রভার প্রেম-গৈরিকে সমস্ত চিত্তটা আচ্ছন্ন করিয়া, এক অভিনব বৈরাগ্যের বার্তা ঘােষণা করিতে লাগিল,—সেইদিন হইতে কালীধনের উপর তাহার আকর্ষণ যেন অত্যধিক পরিমাণে বাড়িয়াই চলিল। তিনি ভাবিলেন, এই যে শােকাত্ত একটা হৃদয়,—ইহার সান্ত্বনা কোথায় ? মাতা নাই, বিমাতা মাতৃত্ব-রসে বঞ্চিতা, পিতা জীবনসীমান্তে মুখরা নারীর ক্রীড়নক মাত্র—তাহার ব্যক্তিত্ব নাই। তবে তাহার সান্ত্বনা কোথায় ? তখন তঁাহার সেই মমতার শাসি। ১৮ অতীতের স্মৃতি মনে জাগিয়া উঠিল। এই কালীধন,—পিতৃ-বিতাড়িত মাতৃহীন কালীধন, একদিন তাহারই ছায়াতলে আসিয়া সান্ত্বনা-লাভ করিয়া- ছিল। তিনিই ত তাহাকে এত বড়টা করিয়াছেন, মানুষ করিয়াছেন। আজ বয়সের অনুপাতে তাহার ত আবার সেই পূর্বাবস্থাই ফিরিয়া আসি- যাছে,সে ত আবার সেই তুল্য-সঙ্কটেই পতিত হইয়াছে। সুতরাং, তিনিই ত তাহার একমাত্র সান্ত্বনা-দাত্রী,তিনি ত এ অসময়ে তাহাকে ছাড়িয়া যাইতে পারেন না,—তাহাতে ত তাহারও শান্তি নাই। কিন্তু দত্তগৃহিণীর দুর্বিনীত ব্যবহার ও তাহার সহিত দত্ত মহাশয়ের জাড্য, তাহাকে বড় চঞ্চল করিয়া তুলিয়াছে। এরূপ বৈসাদৃশ্যের মধ্যে ব্যথিত হৃদয় লইয়া বাস কতদিন চলিতে পারে? প্রত্যহ একটা না একটা উপদ্রব লাগিয়াই আছে,“তুচ্ছ অবান্তর বিষয় লইয়া, প্রতিনিয়ত এইরূপ অশান্তির কুটা কতক্ষণ সহ করা যায় ? সহ করিলেও, ইহাতে ত প্রাণের ক্ষত আরাম হইবে না, বরং, এই পুনঃপুনঃ আঘাতে দুর্বল চিত্ত শীঘ্রই ভাঙ্গিয়া পড়িবে। তবে তিনি কালীধনকে এখানে--এই অসামঞ্জস্যের মধ্যে কি সান্ত্বনা দিবেন? এইরূপে তন্ন তন্ন করিয়া, যতই তিনি কালীধনের বিষয় পৰ্য্যালােচনা করিতে লাগিলেন,ততই তাহার ভবিষ্যতের পানে চাহিয়া, তাহার চিত্ত ব্যাকুল হইয়া উঠিতে লাগিল,—তিনি যেন ততই দিশাহারা হইয়া যাইতে লাগিলেন। তখন তাহার অনুক্ষণ চিন্তা হইল,—কি উপায়ে তিনি তাঁহার পক্ষ-পুটে আবৃত রাখিয়া, তাহাকে এই ঝঞ্চা-বিক্ষুব্ধ দুর্দিন হইতে রক্ষা করিবেন। হায়! তিনি বুঝিলেন না,-ঝঞ্চা শুধু শাবক ছিনাইয়া লইতে উদ্দাম আস্ফালন করে না, সে স-নীড় শাবকের মাতাকে পৰ্যন্ত বিধ্বস্ত করিয়া চলিয়া যাইতে পারে !

কিন্তু তিনি না বুঝিলেও, তাহার মন বােধ হয় বুঝিয়াছিল ; কেননা, মন আসন্ন বিপদের বার্তা পূৰ্ব্বাহ্নেই জানিতে পারে। নভস্তত্ববিদ যেমন রৌদ্র-করােজ্জল আকাশের এক প্রান্তে ক্ষুদ্র জলদ-খণ্ড নিরীক্ষণ করিয়া, বিপ্লবের ভবিষ্যদ্বাণী করেন, মানুষের মনও সেইরূপ হয়ত জন্মান্তরীণ অভিজ্ঞতা হইতে আহত সংস্কারের সাহায্যে, মানুষের জীবনে যে কোনও আগন্তুক দুর্দৈবের সংবাদ পূর্বাহ্নে জানিয়া, মানুষকে সতর্ক হইবার জন্য, নীরব বার্তা ঘােষণা করে। কিন্তু মােহান্ধ নর সে ইঙ্গিতে সাড়া দিয়াও অনেক সময় আত্মরক্ষা করিতে সমর্থ হয় না ; অধিকন্তু, প্ৰতীকারের পন্থা স্থির করিতে গিয়া, বিপদকে ক্রমশঃ সমুহ, সন্নিকট ও সঙ্গী করিয়া তুলে। যখন প্রবল ব্যাত্যায় তরণী টলমল করিয়া উঠে,তখন নাবিকের নিষেধ সত্ত্বেও, বিহ্বল-চিত্ত আরােহিগণ নৌকার ভার-কেন্দ্র স্থির রাখিবার ব্যর্থ- প্রচেষ্টায়, সকলেই একযােগে একবার এদিকে একবার ওদিকে ঝুকিয়া পড়ে এবং তাহাদেরই সেই স-সতর্ক চাঞ্চল্যের পরিণামে, অনেক সময় তরী উল্টাইয়া যায়, ঝটিকার সহিত যুঝিবার আর তাহার অবসর হয় না।

মুময় ফলি। (৪১) ? বিন্দু বিন্দু বারিপাত হইতেছে। ঝটিকা এত প্রবল যে, সেরাত্রে পথে বাহির হয় কাহার সাধ্য ? বাতাসের সহিত প্রস্তরখণ্ডসমূহ ইতস্ততঃ দুটাছুটি করিতেছে। কালীধনের বাটীর সম্মুখস্থ শাল, তমাল ও পলাশ বৃক্ষ-নিচয় পার্বত্য প্রদেশের ঝঞ্চাবাতে অভ্যস্ত হইয়াও, অদ্যকার ভীম- ব্যাত্যার আস্ফালনে, নিতান্ত ব্যাকুল হইয়া পড়িয়াছে। সেই জন্য আভূমি প্রণত হইয়া, প্রকৃতির প্রলয়ঙ্করী মূর্তির উদ্দেশে আত্মরক্ষার প্রার্থনা জানাইতেছে, কেহ প্রণাম করিতে করিতে, সাষ্টাঙ্গ প্রণিপাতপূৰ্ব্বক জীব-লীলা সম্বরণ করিতেছে! প্রকৃতির সে দিকে লক্ষ্য নাই—তাহার উদ্দাম নৃত্য সমভাবেই চলিয়াছে। সন্ধ্যার পরই দত্ত মহাশয় ও দত্তগৃহিণী দ্বার রুদ্ধ করিয়াছেন, কিন্তু রাত্রি বারটা বাজিল,—তাহারা এখনও ঘুমান নাই। দত্ত মহাশয় আফিং খান, তাহার আজ তাও আসিল না ! দত্তগৃহিণী কল্য রাত্রিতে হাতের যন্ত্রণায় ঘুমাইতে পারেন নাই,—দিবসেও ঘুমান নাই। আজ তিনিই বলিয়াছেন, ব্যথা নরম পড়িয়াছে, তবে তাহার চক্ষে নিদ্ৰা নাই কেন? প্রলয়ের বিভীষিকায় ও অট্টহাস্যে কি তাহাদের নিদ্রার ব্যাঘাত হইতেছে ? অন্তর্জগৎ ও বহির্জগতে একপ্রাণ আছে,—বােধ হয় তাহাই হইবে। তখন কালীধনের ঘরেও আলাে জ্বলিতেছিল। মিত্ৰগৃহিণী ও কালীধন তখনও কথােপকথন করিতেছিলেন। কিন্তু মিত্ৰগৃহিণী আজ ৰেন বড়ই অন্যমনা। তিনি কালীধনের কথায় জবাব দিতেছিলেন বটে, কিন্তু তাহাতে যেন কেমন এক অসম্বদ্ধ ভাব প্রকাশ পাইতেছিল। কালীধন প্রথমে তাহা তত লক্ষ্য করে নাই। সে বলিল ;-“মা, তা হলে ওঁদের নিকট ত আমার মনােভাব ব্যক্ত করা দরকার ?”

মমর ফাঁসি
.
মিত্ৰগৃহিণী অন্য দিকে চাহিয়া উত্তর দিলেন ;-“এত ব্যস্ত কি?”
“না মা, আর দেরী করা উচিত নয়।
এখানে থাকতে আমার
আর ইচ্ছা কচ্ছে না। যে স্থানে মাতৃনিন্দা হয়, সে স্থান শীঘ্র ত্যাগ
করা উচিত। আর তুমি বা এখানে কতদিন থাকবে? চল যাই,
কাশীধামে গিয়ে নিশ্চিন্ত হই।”
কাশীর নাম করিতে, সহসা মিত্ৰগৃহিণী যেন কেমন হইয়া গেলেন,
কিছুক্ষণ নিস্তব্ধ ভাবে থাকিয়া আবেগ-জড়িত কণ্ঠে ডাকিলেন,-“কালীধন !”
কালীধন সে অশ্রুতপূৰ্ব আহ্বানে চমকিয়া উঠিল এবং মিত্ৰগৃহিণীর
পানে বিস্ময়-বিস্ফারিত নেত্রে চাহিয়া রহিল।
মিত্ৰগৃহিণী ব্যাকুলভাবে বলিলেন ;-“কালী,-বল, আমার শেষ
অনুরােধ রাখবি?”
অধিকতর বিস্মিত হইয়া কালীধন উত্তর করিল ;-“মা, কোন
দিন তােমার কথা রাখিনি? আজ ও ভাবে কথা বলছ কেন?
বল—তােমার বক্তব্য কি?”
মিত্ৰগৃহিণী ব্যগ্র ভাবে বলিলেন ;-“বাবা, আমরা চাপাপুরে ফিরে
ৰাই চল।”
মিত্ৰগৃহিণীর এইরূপ মত-পরিবর্তনের কথা শুনিয়া কালীধন আরও
বিস্মিত হইল। সে বলিল-"এ আবার তােমার কি কথা মা।”
মিত্ৰগৃহিণী বলিলেন,-“দেখ, কাশী যেতে আমার আর মন সরছে
। কাশী গেলে আমি আর তােকে রাখতে পারবাে না। সেখানে
গেলে মন আর এক রকম হয়ে যায়। আমি একদিন বিশ্বেশ্বরের
আরতি দেখতে দেখতে, যেন বুঝতে পারলাম,-কালীধন আমার কে?
কেউ নয় ত। তবে তার জন্য কেঁদে মরি কেন? বিশ্বেশরই আমার

মময় কাসি। ১ ৫ সব। আর আমি কালীধনের জন্য ভাববাে না। সেই দিন থেকে তাের মা আমি পাষাণী হয়েছিলাম। কিন্তু একদিন এক ভয়ানক স্বপ্ন দেখলাম, আর সেই স্বপ্নে বেশ বুঝেছিলাম,আমি তােক ভুলতে গিয়ে ভাল কাষ করিনি,-আমারই তাচ্ছিল্যে হয়ত আমি তােকে হারাবাে। তারপরই তাের পত্র পেয়ে এখানে ছুটে আসি। তবু সুপ্রভাকে হারিয়েছি। সেও আমার তাচ্ছিল্যের ফল বলতে হবে। এখন আর আমি তােক ছেড়ে কোথাও যাবাে না। কাশী গেলে পাছে মনে আবার সেই ভাব আসে—তা হলে যে আমি তােক হারাববা—আমার সর্বনাশ হবে।” কালীধন হাসিতে হাসিতে বলিল;-“মা, আজ তােমার মুখে সম্পূর্ণ নূতন কথা শুনছি। কাশী গিয়ে তােমার মনে ত ভাল ভাবই এসেছিল ! জগতে কে কার ? সত্যই ত আমি তােমার কেউ নই, তুমিও আমার—” এইখানেই ভালবাসার দুর্বলতা! যে নিতান্ত আপনার বলিয়া সিদ্ধান্ত হইয়া যায়,তার মুখে ভালবাসার প্রতিকুলতা-জ্ঞাপক কোনও উক্তি বহির্গত হইলে, প্রীতি-বিমূঢ় চিত্ত একেবারে অধীর হইয়া পড়ে এবং দারুণ অভিমানের আর্তনাদ ঘৃষ্ট দীপশলাকার ন্যায় দপ করিয়া জ্বলিয়া উঠে। কালীধনের কথা শেষ হইতে না হইতে, মিত্ৰগৃহিণী উত্তেজিত কণ্ঠে বলিলেন ;-“কি বললি?—আমি তাের মা নই।” কালীধন মিত্ৰগৃহিণীর উন্মাদিনী মুর্তি নিরীক্ষণ করিয়া, স্তম্ভিত হইল, পরে অপ্রতিভাবে উত্তর করিল ;- “মা, আমি ভুল বুঝেছি,তুমি আমারই মা।” মিত্ৰগৃহিণী সেই ভাবে উত্তর করিলেন ;-“তবে?—আমার কাশতে কি সুখ ? যদি মা হয়ে তাকে হেলায় হারাই,তবে আমি তাের মা হয়েছি কি জন্য রে। শিবপূজা করে আমি তােক পেয়েছিলাম বটে, কিন্তু সেই = মমতার সি। শিবপূজা করে আমি তােকে হারাতে চাই না। তুই সংসারী না হস্ না হবি,—ততাকে প্রাণ থাকতে সন্ন্যাসী হতে দেব না। কাশী গেলে হয়ত তাের মন আর এক রকম হয়ে যাবে। তােকে আর পাবাে না। তার চেয়ে চল-চাপাপুরে যাই। আমার কাছে যেমন ছিলি, ঠিক সেইভাবে থাকবি। প্রিয়ধনকে বুকে করে দুজনের প্রাণ শীতল হবে।” কালীধন বলিল -“মা ! আজ যেন তুমি আর একজন হয়ে গেছ ? এ ত ভাল নয়। সন্তানের উপর এত আকর্ষণ কেন? কাশী চলো, পর- কালের কাব করাে। ।” মিত্ৰগৃহিণী মুক্তকণ্ঠে মুক্তকণ্ঠে কহিলেন ;-“আমি পরকাল চাই না,আমি তাকে চাই !!” কালীধনের মাথা ঘুরিয়া গেল। সে বুদ্ধদেবও নহে, শঙ্করাচাৰ্য্যও নং-চৈতন্যদেবও নহে; -সে মিত্ৰগৃহিণীর গর্ভজাত পুত্রও নহে। কলীধন,—মিত্ৰগৃহিণীর মােহময়-স্নেহ-পুষ্ট হৃদয়ের বন-বন্ধন !!! সে নিতান্ত নিরুপায়ভাবে উত্তর করিল -“মা,-তবে—আমি তােমার সঙ্গে চাপাপুরেই যাব।” আজ অশ্রুপ্ল মিত্ৰগৃহিণী,—এই প্রথম হাত বাড়াইয়া কালীধনের চিবুক স্পর্শ করিলেন ও অতি আগ্রহে সেই হস্ত নিজের ঠোটে ঠেকাইলেন। তাহার অঙ্গ শিহরিয়া উঠিল। কালীধনও যেন কি এক অনৎপাতের আশঙ্কায় কঁপিতে কঁপিতে তাহার পদধূলি গ্রহণ করিল। ঝটিকার বেগ ক্রমেই বাড়িতে লাগিল।

মমতার ফাসি। (৪২) উভয়েই অন্যমনস্ক। বহিঃস্থ ভৌতিক লীলার দিকে কাহারও নক্ষ ছিল না। অন্যমনস্কভাবে কালীধন বলিল ;—“রাত্রি অনেক হয়েছে।” অন্যমনস্কভাবে মিত্ৰগৃহিণীও বলিলেন ;-“ঐ সেলুফের উপর দুধ ঢাকা আছে, খেয়ে শুয়ে পড়ে। কালীধন বলিল -“আজ আমার তেমন ক্ষিদে নেই। ছােট বাটিটার দুধ আমি খাই?” মিত্ৰগৃহিণী বলিলেন ;-“তবে তাই খাও।” অন্যমনস্কভাবে দুগ্ধ পান করিতে করিতে, অধিকাংশ গলাধঃকরণ করিয়া, কালীধন চমকিয়া উঠিল,-বলিল ;---“এ কি ! মা, দুধ এ কেন?” মিত্ৰগৃহিণীরও যেন চমক ভাঙ্গল। তিনি তৎক্ষণাৎ কালীধনের কাছে গিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন ;---“কেন?—দুধ ত আমি নিজে জ্বাল দিয়ে, নিজে এ ঘরে এনে রেখে গেছি ! কি হয়েছে?” “মা,-এ যে—বিষ—সাংঘাতিক” বলিতে বলিতে কালীধন সেইখানেই ঢলিয়া পড়িয়া ছট্‌ফট্‌ করিতে লাগিল। মিত্ৰগৃহিণী তাড়াতাড়ি কালীধনের মস্তক স্বীয় উৰুদেশে লইয়া, চীৎকার করিয়া উঠিলেন ;- “ওগাে তােমরা এস গে,কালীধন আমার দুধ খেতে খেতে এমন হয়ে পড়ল কেন- ক্রন্দন-ধ্বনি শুনিবামাত্র দত্তগৃহিণী ও দত্ত মহাশয় ছুটিয়া আসিলেন এদিকে কি ভাবিয়া পাগলিনী মিত্ৰগৃহিণী বাটির বাকি দুধটুকু নিজের গালে ঢালিয়া দিলেন। তখন কালীধনের সংজ্ঞা লুপ্ত হইয়াছে, মুখ দিয়া ফেণ মমতার বালি। } নির্গত হইতেছে। মিত্ৰগৃহিণী কালীধনকে জড়াইয়া ধরিয়া, চীৎকার করিয়া বলিতে লাগিলেন ;-“ওগাে আমার কি হল গাে,তােমরা ডাক্তারখানায় খবর দেও গাে,আমার সর্বনাশ হল গােআমি বা ভেবেছিলাম, আমার তাই হল গাে- কিন্তু কে সংবাদ দিবে? বাসা হইতে ডাক্তারখানা একটু দূরে অবস্থিত। ঝি, চাকর প্রভৃতি বাহিরের ঘরে গভীর নিদ্রায় অভিভূত। তুমুল ঝটিকার ভীষণ গর্জনে মিত্ৰগৃহিণীর করুণ কণ্ঠধ্বনি তাহাদের কাহারও কর্ণকুহরে প্রবেশ করিল না। দেখিতে দেখিতে পুত্রগত-প্রাণা মিত্ৰগৃহিণীও কালীধনের পার্শ্বে ঢলিয়া পড়িলেন,-তাহার কণ্ঠরােধ হইল। কিন্তু দত্ত মহাশয় ও দত্তগৃহিণী কি করিলেন? আজ তাহাদেরই ত অধিক সৰ্ব্বনাশ সংঘটিত হইল ! একমাত্র পুত্রের জীবনের শেষ অবলম্বনের জীবন রক্ষার জন্য, তাহারা কি কোনও চেষ্টা করিলেন না? পুত্রকে বাড়ী লইয়া বাইবেন, বিবাহ দিবেন,—কত আশা, কত কল্পনা, কত যুক্তি,-সব ব্যর্থ হইতে বসিয়াছে, তাহার প্রতীকারের কোনও চেষ্টা করিলেন না? করিতেছেন বৈ কি ! ঐ যে দত্তগৃহিণী তাহার অর্ধহস্ত-পরিমিত বিকট জিহ্বা বিস্তার করিয়া দণ্ডায়মানা ! ভগ্নহস্ত অৰ্দোখিত। যেন করালবদনা চামুণ্ডা সন্তানের রক্ত পান করিতে আসিয়াছে—বুঝি-বাম-কর-ধৃত খর করবাল সন্তানের গলদেশে প্রােথিত হইয়াছে! কিন্তু ও কি! দত্ত মহাশয় তাহার কণ্ঠদেশ উন্মত্ত বিক্রমে চাপিয়া ধরিয়াছেন কেন ? আর তিনিই বা দত্ত মহাশয়ের লৌহ-হস্ত স্বীয় কণ্ঠ হইতে অপসারিত করিতে, বৃথা চেষ্টা করিতেছেন কেন? দশমহাবিদ্যার বগলাদেবী বসনা আকর্ষণ করিয়া, অসুরকে নিধন করিয়াছিলেন। আজ এ কি হইল! রণরঙ্গিণী নিজেই মমতার ফঁসি। অসুর-করে নিহিত হইতেছেন ! অসুর বলিতেছে ;-“রাক্ষসি ! যে জিব, দিয়ে তুই আমার ছেলেকে খেয়েছি, সেই জিব, আমি আর রাখব না।” রাত্রি প্রভাত হইল। উষার রক্তিম রায়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রকৃতির বীভৎস- লীলার অবসান হইল। ঝি চাকর প্রভৃতি শব্যাগ করিয়া,—বিয়ােগান্ত নাটকের শেষ দৃশ্য দেখিল। তাহারা তাড়াতাড়ি কঁপিতে কাপিতে, কঁদিতে কাদিতে ডাক্তার-- খানায় ছুটিয়া গেল। ডাক্তার আসিলেন,-রাজা আসিলেন,—পুলিস আসিলেন। আসিয়া দেখিলেন, গৃহস্থ সকলেই ভূলুণ্ঠিত। বৃদ্ধ দত্ত মহাশয় তখন মিত্ৰগৃহিণীর উরুদেশ হইতে কালীধনকে নিজ ক্রোড়ে লইয়া, উদ্ভ্রান্তভাবে রােদন করিতে ছেন,—আর বলিতেছেন ;-“বাবা, তুমি অভিমান করে চলে যেয়াে না আমি আর তােমাকে মাবো না, আমি আবার তােমার বিয়ে দেবাে, তুমি বাড়ী চলাে।” কিন্তু সকলে গৃহপ্রবিষ্ট হইতে, বৃদ্ধের দৃষ্টি তাহাদের উপর পড়িল। দত্ত মহাশয় উঠিয়া দাড়াইলেন,—বিকট, গগনভেদী চীৎকার করিয়া কহিলেন ;- “আমি–আমি—আমিই-খুন-খুন--খুন করেছি !” আবার কালীধনের পানে কাতর দৃষ্টিতে চাহিয়া করুণ কণ্ঠে কহিলেন ;—“বাবা,চলাে বাড়ী যাই,-চলাে আবার তােমার বিয়ে দেবাে।” পুলিশ অগ্রসর হইয়া দত্ত মহাশয়কে সরাইয়া লইল। ডাক্তার আসিয়া পরীক্ষা করিলেন ;-কালীধন আর নাই—দত্তগৃহিণী মরিয়াছেন,আর মিত্ৰগৃহিণীর এখনও আশা আছে ! তাহার শুশ্রষা চলিতে লাগিল।

মমতার ফসি৷ বন্ধন দৃঢ় হইলে, ছেদন ভিন্ন মােচনের উপায় থাকে না। প্রাক্তনের করিকায় সেই বন্ধন ছিন্ন হইল । ( ৪৩ ) বিচারে ঝি, চাকর প্রভৃতি নির্দোষ প্রমাণিত হইল। দত্ত মহাশয় পাগল ৰলিয়া প্রতিপন্ন হইলেন। সবিশেষ চেষ্টার ফলে মিত্ৰগৃহিণী প্রাণে মরিলেন । কিন্তু সেই যে তাহার বাকৃ-রােধ হইল, আর তাহার বাক্‌-শূৰ্ত্তি হয় নাই। প্রথমে অনেকেই চিত্ৰগৃহিণীর উপর সন্দেহ করিয়াছিল, কিন্তু ক্ষিপ্ত বৃদ্ধের দুই একটা কথায় সে ধারণা অন্তর্হিত হইল। কেননা, একদিন দত্ত মহাশয় বলিলেন,-“ও রে কালীধনের মা, ও কি ওর ছেলেকে মারতে পারে? তবে ও ছেলে দিতে চায় না, গিন্নী বলে,—মাগীটাকে সাবডাতে না পাকূলে, আমাদের ছেলে কিছুতেই আর আমাদের হবে না। ওকে মেরে,- ছেলে নিয়ে,-বাড়ী গিয়ে,—বিয়ে দিয়ে,হায়রে হায় !–খুন করেছি আমি, দত্তগিন্নীর স্বাণী !!" = মিত্ৰগৃহিণী বাঁচিলেন,—প্রাণে বাঁচিলেন,--বিচারেও বাঁচিলেন। ফাসি বাঁচিয়া-কাশীতেই আসিলেন ;-কালাধনকে নিধনপুরে পাঠাইয়া, আর চম্পা- পুরে গেলেন না। কালীনাম জপ করিবার জন্য বােধ করি চিরমৌনী হইলেন! কিন্তু তিনি কালীধনের চিতাগ্নিময় তাহার শ্মশান-হৃদয়ে শ্মশানচারী বিশ্বেশ্বরকে বসাইতে পারিলেন কি? এবার বােধ হয়, পারিলেন। আজকাল তঁাহার শরীর মগর লি। অত্যন্ত শীর্ণ হইয়া পড়িয়াছিল। একদিন বিশ্বেশ্বরের আরতি দেখিতে দেখিতে, হঠাৎ তাহার মূচ্ছ হয়-সে মুচ্ছা আর ভাঙ্গে নাই। মমতার ফঁাসি হইতে ইতঃপূৰ্বেই মুক্ত হইয়াছিলেন,—মুক্তি হয় নাই কি ? . “পাগলা দত্ত” অনেক দিন কাশীতে ছিলেন। মুখে সেই এক বুলি “বাবা,তুমি বাড়ী চলাে-আবার তােমার বিয়ে দেবাে।” কিন্তু মিত্ৰগৃহিণীর মৃত্যুর পর হইতে আর তাহাকে বড় দেখা যাহত না। শুনিতে পাওয়া যায়, একদিন রাত্রি দ্বিপ্রহরে, মদন মুখুয্যে মহাশয় তামাক সাজিতে উঠিয়া, শুনিতে পাইয়াছিলেন,-কে যেন বলিতেছে -“নদনদা মদনদা, একবার বেরিয়ে এসে,—আমরা ফিরে এসেছি।” ঘুমের ঘােরে মুখুয্যে মহাশয় দ্বার খুলিয়া বাহিরে আসিলেন, কিন্তু কাহাকেও দেখিতে পাইলেন না। কেবল অস্পষ্ট শুনিতে পাইলেন—দূরে কে যেন তাহার গুরুগম্ভীর কণ্ঠে বলিতে বলিতে চলিয়াছে ;-“বাবা তুমি বাড়ী চলাে-আমি আবার তােমার বিয়ে দেবাে।” মুখুয্যে মহাশয়ের আর বাহিরে দাঁড়াইতে সাহস হইল না,—তিনি দ্বার অর্গলবদ্ধ করিলেন। মিত্ৰগৃহিণীর মৃত্যুর কিছুদিন পরে তাহার গােমস্তা চম্পাপুরে ফিরিয়া আসিয়া, কালীধনের শমাতার নিকট একখানি উইল অপণ করিলেন। তাহাতে মিত্ৰগৃহিণী প্রিয়ধনকে তাহার সমস্ত সম্পত্তির উত্তরাধিকারী করিয়া গিয়াছিলেন। সমাপ্ত।

লেখকের আর একখানি ঐতিহাসিক উপন্যাস
আশমানতারা
শীঘ্রই সাহিত্যাকাশে ফুটিয়া উঠিয়া, উপন্যাস-জগতকে উদ্ভাসিত করিবে।
বর্তমান যুগের প্রধান সমস্যা—হিন্দু-মুসলমানে অনৈক্য ;
লেখকের নিপুণ লেখনীতে সেই সমস্যার মীমাংসা
ও উভয় জাতির বাঞ্ছিত মিলনের বার্তা
ঘােষিত হইয়াছে।
হিন্দু-মুসলমান দেশপ্রাণ ভ্রাতা ভগিনি-
গণ তুল্য-আগ্রহে প্রতীক্ষা করুন।

কৃত্তিকা প্রেস, ১৭, মদন মিত্র লেন, কলিকাতা। আমাদের এখানে সর্বপ্রকার ইংরাজি ও বাঙ্গালা পুস্তক,-তদ্ভিন্ন চেক, দাখিলা, বিবাহের প্রীতি-উপহার, হ্যাণ্ডবিল ও রসিদবহি প্রভৃতি যাবতীয় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মুদ্রণ- কাৰ্য, অতি যত্নসহকারে, যথাসাধ্য অল্প সময়ের মধ্যে এবং যথাসম্ভব সুলভ পারিশ্রমিকে সম্পাদিত হয়। ভদ্রমহো- দয়গণের নিকট বিনীত অনুরােধ,—কোনও কিছু ছাপাইবার প্রয়ােজন হইলে, আমাদের উপর তাহা সম্পাদনের ভার অৰ্পণ করিয়া, আমাদের উক্তি অতিরঞ্জিত কিনা, একবার পরীক্ষা করিয়া দেখিবেন। বিভূতিভূষণ চট্টোপাধ্যায় । s

আশমানতার সম্বন্ধে ভিন্ন ভিন্ন
পত্রিকার অভিমত।
আত্মশক্তি—এই সাম্প্রদায়িক বিরােধের সময় গ্রন্থকার
উপন্যাসের মধ্য দিয়া হিন্দু-মুসলমান সমস্যা সমাধান করিবার একটা
দৃষ্টান্ত দেখাইবার চেষ্টা করিয়াছেন। পুস্তকখানির লেখার ভঙ্গী
ভাল—উহা পাঠে পাঠকবর্গ আনন্দলাভ করিবেন। ৩০ আষাঢ়,১৩৩৪
Forward :- This is another production from
the pen of the author of "Mamatar Phansi".
The present book gives us an interesting story
of Raja Jadunarayan's conversion to Islam,
written in an elegant language and without
distorting the facts of history. The characters
portrayed in it give ample evidence of the talents
of this rising author. A spirit of good will
for both the Hindus and Mahomedans runs
throughout the book making its appearance all
the more
welcome at the
present moment.
July 11, 1927,

[ ২ ] বঙ্গবাণী :—তিনশো সাতাশ পৃষ্ঠাব্যাপী এই বৃহৎ উপন্যাসখানি প্রধানতঃ ঐতিহাসিক ঘটনা লইয়া লিখিত হইয়াছে। । বাঙ্গলার ইতিহাসে রাজা গণেশের নাম বিশেষভাবে প্রসিদ্ধ। হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যে বিরােধ ও মালিন্যের ভাব কাটিয়া গিয়া সমস্ত দেশব্যাপী যাহাতে সর্বধর্ম সমন্ময়ে একটা সাম্যের ভাব জাগিয়া উঠে, তাহার জন্য রাজাগণেশের চেষ্টা চিরস্মরণীয় তৎপুত্র যদুনারা- যুণও পিতার অবর্তমানে পিতৃপদাঙ্ক যথাসম্ভব অনুসরণ করিয়া চলিয়াছিলেন। এই ঘটনাটা অবলম্বন করিয়া লেখক তঁাহার সুন্দর লিখন ভঙ্গীর দ্বারা ঘটনা-বৈচিত্র্যে ও চরিত্রচিত্রণে পুস্তকখানিকে মনােরম করিয়া গড়িয়া তুলিয়াছেন। বর্তমানে সাম্প্রদায়িক বিরােধের অগ্ন্যুৎপাত দেশের মধ্যে ছড়াইয়া পড়িয়া হিন্দু ও মুসলমান দুইটা জাতিকে যেরূপভাবে বিধবস্ত প্রায় করিয়া তুলিয়াছে, তাহাতে জাতীয় উন্নতি সুদূরপরাহত। এই সমস্যা পূরণের জন্যই গ্রন্থকার সত্য ঘটনা অবলম্বনে এই পুস্তকের অবতারণা করিয়াছেন। গ্রন্থকারের চেষ্টা সফল হইয়াছে। নবাবনন্দিনী আশমানতারার চরিত্রটি বেশ সুসঙ্গত ও সাম্যের পিতা সাহাজাদা আজিমকে হিন্দু-মুসলমান সমস্যা পূরণের জন্য সে যখন বলিল “মনে কর বাবা, তোমার দুটী মেয়ে, একটা আমি আর একটা তুমি ইরাণ মরু-প্রান্তর থেকে কুড়িয়ে এনে মানুষ করেছ। এখন এই যে তেমাের দুটী মেয়ে, এর কোষ্টীকে তুমি বেশী ভাল বাসবে-আমাকে না তাকে ?” পিতা উত্তর দিলেন যে আশমানকে তিনি বেশী ভালবাসবেন। কন্যা রাগ করিয়া বলিল,-“আমি যে তােমার কাছে মেহেয় দাবি কত্তে পারি, আর সে যে মেহের ভিখারী বাবা! যে দাবী করে,সে জোর করে আদায় করে নিতে [ ৩ ] পারে। আর যে চায়,সে না পেলে ব্যথা পেয়ে ফিরে যায়। মানুষের প্রাণে ব্যথা দেওয়ার অধিকার ত মানুষের নেই।” গ্রন্থারম্ভেই এই যে মিলনের সূচনা, গ্রন্থের শেষ পর্যন্ত আশ- মানের চরিত্রে এ ভাব আমরা সম্পূর্ণ বর্তমান দেখিতে পাই। যদুনারায়ণ স্বদেশভক্ত প্রতিভাবান্ সাম্যের পরিপােষক। তাহার জীবনের প্রধান উদ্দেশ্য জাতি-বিদ্বেষের সমাধান, হিন্দু-মুসলমানের এক প্রাণতা-সাধন, হিন্দু-মুসলমানের মিলন। ত্রিপুরা দেবীর চরিত্রটী তেজোমণ্ডিত-আদর্শ হিন্দু ললনার সর্বগুণে অভিব্যক্ত। একদিকে মাতৃস্নেহে ভরপুর, অপর দিকে কর্তব্যে অটল অচল। চিত্রটা খুব চমৎকার। শ্রাবণ, ১৩৩৪ ভারতবর্ষ উপন্যাসখানি প্রাচীন গৌড়েতিহাসের একাংশ অবলম্বনে লিখিত। গ্রন্থকার ভূমিকায় বলিয়াছেন যে, এই গ্রন্থের উদ্দেশ্য, জাতীয় উখানের প্রধান অন্তরায় হিন্দু-মুসলমান- অনৈক্য—তাহারই সমস্যা-সমাধানসূচক কোনও দৃষ্টান্ত দাখিল করা। নিঃসঙ্কোচে বলা যায়, নবীন লেখক যে মহষ্টান্ত দাখিল করিয়া- ছেন, তাহার দ্বারা সুফল প্রসূত হইবে। হিন্দু-মুসলমানের এই যে অন্তর্বিরােধ দেশ মধ্যে আজকাল সংক্রামিত হইয়া পড়িয়াছে,-ইহার মূলােচ্ছেদ করিতে হইলে উহাদের পরস্পরের মধ্যে আন্তরিক সহা- ভূতির স্বর্ণশৃঙ্খল দ্বারা পরস্পরের বন্ধনের প্রচেষ্টা থাকা চাই। যদুনারায়ণ ( জালালুদ্দিন) বাঙ্গলার মশনদে বসিয়া কি ভাবে সাধু উপায় অবলম্বন করিয়া রাজ্য মধ্যে এই দুই পরাক্রান্ত জাতিকে শান্তিতে রাখিতে পারিয়াছিলেন—তাহার যথেষ্ট উপকরণ এই গ্রন্থে আসদের নবীন গ্রন্থকার সুন্দর ভাবে সন্নিবিষ্ট করিয়াছেন। তিনি যে সকল চিত্র দ্বারা তাহার আখ্যান বস্তুটাকে পরিস্ফুট করিবার চেষ্টা ১৩৪ [ ৪ ] করিয়াছেন, তাহা সফল হইয়াছে। তাহার যদুনারায়ণ, আশমানতারা ও কাসেমের চরিত্র সৌন্দর্য্য ও নিপুণতার সহিত অঙ্কিত হইয়াছে। লেখকের লেখার ভঙ্গী ও ভাষার উপর অধিকার প্রশংসনীয়। আমরা আশা করি, আজকালকার এই অশান্ত বঙ্গে এই শ্রেণীর গ্রন্থের বহুল প্রচার হইবে। ভাদ্র, প্রবাসী:-একটা বিশেষ মহদুদ্দেশ্য লইয়া গ্রন্থকার এই সুবৃহৎ উপন্যাসখানি লিখিয়াছেন। বর্তমানে হিন্দুমুসলমানের পরস্পরের মধ্যে যে বিরোধ ঘনীভূত হইয়া উঠিতেছে, যে সমস্যা আজ বাঙলার তথা ভারতবর্ষের বৃহত্তম সমস্যা, তাহারই সমাধানের চেষ্টা এই গ্রন্থে আছে। রাজা গণেশের পুত্র যদুনারায়ণ বা জালালুদ্দি- নের আমল লইয়া উপন্যাসখানি লিখিত। নানা ঘাত-প্রতিঘাত, নানা সমস্যার আলোচনায় বইখানি সুখপাঠ্য হইয়াছে। শেষ পর্যন্ত পড়িবার জন্য একটা আগ্রহ থাকিয়া যায়। গ্রন্থকারের ভাষার উপর দখল আছে। অগ্রহায়ণ, ১৩৩৪ Basumati :-In days when the tension between the Hindus and the Mahomedans runs rampant, the book has made its appearance. The author with his master-hand has tried his best to bring about the reconciliation and much credit may be given to him for his attempt. wife, Asmantara's devotion to her husband was exemplary all through ; as a follower of policy of conciliation, she strictly followed the principle of neutrality, creating no difference between the Hindus and the Mahomedans. As a Jadunarayan was the hero and the staunch follower of the policy of conciliation too. He inherited this spirit through his father Raja Gonesh and maintained it even up to the last moment of his life. In the Darbar, held by Raja Gonesh, with a view to determining the course to be taken in the internal struggle between Naserit and Azim Shah over the supremacy of the kingdom of Gour, we find Jadunarayan supporting the cause of the weak contrary to the will and principle of the Hindus ; he in his forceful speech said “The Mahomedans are not to be ignored. They have come to our land not with the object of quitting it, but to settle down here permanently and being known and turned as the sons of this To bear a spirit of vindictiveness towards them will be courting of meanness and dissensions. But on the contrary, the more you draw them nearer, the more they come nearer to soil too. your heart." As a son, he was dutiful to his parents and even when after his conversion into Mahomedanism, his mother Rani Tripura led an expedition against him, he and his wife Asman retired into the fort under the control of Kasem, his rival, making necessary arrangements for the [ u ] reception of his mother. As a husband, he seems to have done some injustice to his Hindu wife, Nabakishory by accepting Asmantara at the cost of his own caste and religion. But the noble cause which actuated him to do so was too high in estimation of his leaving his first wife. His love for Nabakishory ran through his heart till the last breath of his life. As a king, he looked to the interest of the Hindus and Mahomedans alike and deviated from the policy for the sake of which he embraced Mahomedanism, October, 3, 1927. never মমতার ফাসি সম্বন্ধে ভিন্ন ভিন্ন পত্রিকার মতামত দৈনিক বসুমতী * গ্রন্থকার এই পুস্তকে বাঙ্গালী সমাজের কতকগুলি চিত্র অঙ্কিত করিয়াছেন। বিধবা মিত্র- গৃহিণী বাঙ্গালী পরিবারের আদর্শ নারী-চরিত্র ; তাহার আত্ম- বিসর্জনের চিত্র যেমন এ দেশে দুভ নহে, তেমনই দত্তগৃহিণীর নারকীয় ভাবও আমাদের সমাজে সুলভ। কালীধন ও সুপ্রভার চিত্রও খুবই স্বাভাবিক। * * * লেখক যে পরে উপন্যাস-জগতে বিশেষ যশােলাভ করিবেন তাহা তঁাহার এই প্রথম উদ্যম দেখিয়াই বুঝিতে পারা যায়। আজকাল অধিকাংশ উপন্যাসে যে উচ্চ ঙ্খলতা দেখা যায়, এই পুস্তকে তাহা নাই। বঙ্গবাণী—নবীন লেখকের এই নূতন উদ্যম সবিশেষ অাশাপ্রদ। লেখকের ভাষার পারিপাট্য ও বর্ণনা-শক্তি প্রশংসনীয়। আশক্তি * দেবীরূপিণী অন্নপূর্ণার পাশে কুটীল দত্তগৃহিণীর Contrastটা বেশ স্পষ্ট হইয়া উঠিয়াছে। আমাদের সুপ্রভার চরিত্রটী বেশ লাগিয়াছে। কালীধনও व्रकुमाराम গড়া সত্যকার মানুষ-নেহাত কাঠের পুতুল নয়। গ্রন্থকারের ভাষার বঁধুনী আছে—আশা করি, অদূর ভবিষ্যতে তিনি প্রতিষ্ঠা অর্জন করিতে পারিবেন । The Servant-* * The characters depicted in this book are all living. The story is interesting and narrated in a nice style and diction abounbing in pathos and humours. The book heralds the day when the author will soon distinguish himself in the field of literature, .

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Mamatar Phansi

Author
Mukhopadhayay,jatindranath
Title
Mamatar Phansi
File name
Mamatar Phansi
Text
OCR done
Citation
1926
Published
2010/03/19
Publisher
Bibhutibhusan Chattopadhayay,kolkata
Language
Sanskrit
Pages
146
Library
Belgaria Sudha Smriti Pathagar
Classification
Bengali Essays
Keywords
Story
DLI number
511204
Barcode
4990010018373.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
PIRUH9sLbec
Download PDF

Mamatar Phansi