Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Srikrishna

Nag,manmothonath · 2009/12/19

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

‘। '৭
শ্রীকৃষ্ণ
দ্বারকা লীলা।
हिनि
উদ্ভবের প্রতি
উপদেশ
মেদিনীপুর হিতৈষী সম্পাদক
শ্ৰীমন্মথনাথ নাগ কর্তৃক
সালিত।
মেদিনীপুর হিতৈষী প্রেসে
মুদিত।
বাবাই দo আনার

No text on this page.

চিপত্র।
শ্রীকৃষ্ণের
ভবের প্রতি উপদেশ।
পৃষ্ঠা
১
১২
৪০
৫৪
বিষয়
ভূমিকা
দেবগণের আগমন
শ্রীকৃষ্ণ সমীপে উদ্ধবের আগমন
উদ্ধবের প্রতি উপদেশ
বদ্ধ মুক্তাদির লক্ষণ
ত্রিগুণের ধর্ম
ভক্তিযােগ
বানপ্রস্থাদি ধৰ্ম্ম
ভক্তিযোগ কথা
সংখ্য যোগ
ত্রিগুণের কাৰ্য্য
উপাসনা প্রণালী
সংক্ষিপ্ত জ্ঞানযােগ
সংক্ষিপ্ত ভক্তিবােগ
০
৯১
১১১
১৪২
১৪৭
১৫৮

No text on this page.

-- নিবেদন। - শ্রীমদ্ভাগবতের একাদশ অধ্যায় “উদ্ধবগীতা” নামে অভিহিত। পরম করুণাময় পরমেশ্বর বাসুদেব শ্রীকৃষ্ণ, মহাভক্ত কৃষ্ণপ্রাণ উদ্ধব মহােদয়কে লক্ষ্য করিয়া জীবকে যে উপদেশামৃত প্রদান করিয়াছেন তাহা যাহারা মহাভাগ্যবান্ তাহারাই হৃদয়ে ধারণা করিয়া জন্ম কর্ম সফল করেন। তাহা যে কি মনপ্রাণহর অনির্বচনীয় অপূৰ্ব পরম হৃদ্য ও ইহ পরকালের অভাবনীয় আয়ুষ্য পদার্থ তাহা বলিবার বা বুঝাইবার শক্তি আমার নাই। আমি চিনির বলদ। আপনারা ভােগী ভােক্তা, চিনি উপভােগ করিয়া পরিতৃপ্ত হউন। শ্রীমদ্ভাগবত সকলেই পাঠ করেন। অধিকাংশ ভাগবতের ভাষা বড়ই কঠিন ও দুর্বোধ্য। তজ্জন্য বিশুদ্ধ ভাষায় অনূদিত কয়েকটী ভাগবত অনুসরণ করিয়া এবং মহাভাগবত গােস্বামী মহােদয়গণের টীকা মিলাইয়া এই গবা ভাষাকে প্রাঞ্জল করিতে গিয়া যে আরও গবরাইয়াছে তাহাতে আর সন্দেহ নাই। তবে আশা আছে যে, ইহা পণ্ডিতদিগের জন্য নহে। কারণ তাঁহারা বহু ভাষ্য দেখিয়া আপনাদের জ্ঞাতব্য বিষয় অনায়াসেই অবধারণ করিতে পারেন। সেই ইচ্ছাতেই পণ্ডিতী বাঙ্গলাকে গবাদের বােধ্য ভাষায় যতটা গবরাইতে পারা যায় তাহার চেষ্টা করা হইয়াছে। তবে গবার যেমন হয়, বড়কে ছােট করা ! তাই যতটা ছােট কথায় ভাব প্রকাশ করা যায়,-টেকিকে তুল—শেষে নির্মল করিয়াছি। এজন্য গবা–সুতরাং ক্ষমাহ। এই উদ্ধবগী পঞ্চাশাের্ধদিগের শেষের সম্বল বলিয়া তাঁহাদিগের সঙ্গের সাথী করিবার জন্য ইহাকে শ্রীকৃষ্ণ দ্বারকালীলা গ্রন্থ হইতে পৃথক ও লঘু করা হইয়াছে। অর্থাৎ ইহা উদ্ধবগীতার ৫ পকেট সংস্করণ ! * দারিদ্রস্য ক ধৰ্ম্ম, ক চ ভজন বিধি ক স্থিতি সাধু সঙ্গে ? দরিদ্রের আর ভজনবিধি কোথায় ? ইহাই ধৰ্ম্ম, ইহাই ভজনবিধি এবং ইহাই সাধুসঙ্গ ! ইহাই মনের একমাত্র প্রবােধ। দাদার পদধূলি দিয়া কৃতার্থ করুন, ইহাই প্রার্থনা। ។ । মেদিনীপুর-হিতৈষী অফিস। প্রণত ভক্তজনদাস দাস চ দাস দাস শ্ৰীমন্মথ নাথ নাগ। ২৮ শে শ্রাবণ ১৩৩৬।

No text on this page.

পরিশিষ্ট। শ্রীকৃষ্ণের উপদেশ। মানুষ কত বড়, তাহার উপদেশেই তাহার প্রমাণ পাওয়া যায়। জগতে যত বড় বড় লােক জন্ম গ্রহণ করিয়াছেন, তাঁহাদের উপদেশই তাহার পরিমাপক। মানুষ সাধারণতঃ সাধারণ। তাহাদের চক্ষু সৰ্ব্বদাই অসাধারণ তান্বেষণ করিতেছে। সাধারণ মানুষ আহার, নিদ্রা ও মৈথুনে ব্যস্ত থাকে। ইহাই মানুষের সাধারণত্ব। মানুষ যখন যাহাতে ঐ তিনের ব্যতিক্রম দেখে, যখন তাহাকে ঐ তিনের সংযম সাধনার বিধি নিষেধ প্রবর্তনা করিতে দেখে, যখন তাহার অপূর্ব কথা বা উপদেশে আপনাদের হিতসাধনার অমৃতময়ী পন্থা দর্শন করিয়া আনন্দ বিস্ময়ে গলিয়া যায়, তখন তাহারা তাহাকে অপূর্ব মানব আখ্যায় সম্মানিত করিয়া তাহার অনুবর্তী হয়। আমাদের শাস্ত্র বলেন, যখন যাহাতে কিছু বিশেষত্ব দেখিবে, তখন বুঝিবে তঁাহাতে ভগবৎ কৃপা। ভগবৎ কৃপা ভিন্ন কেহ বড় হইতে পারে না। ভগবৎ কৃপাই অসাধারণত্বের পরিচায়ক। এইজন্য আমাদের শাস্ত্রে অসংখ্য অবতারের উল্লেখ আছে। আমাদের শাস্ত্র অসংখ্য অবতারের সমর্থক। সাধারণ মানব বিদ্যা, বুদ্ধি ও শারীরিক শক্তি প্রভৃতি বিষয়ে যেখানে কিছু বিশেষত্ব লক্ষ্য করে সেখানেই মস্তক নত করিয়া প্রাধান্য প্রদান করে। যখনই প্রাধান্য স্বীকার করে, তখনই তাহারা তাহার উপদেশ শুনিয়া তাহার অনুবর্তী হইতে চায়। এইরূপে সমাজ সংস্কারক, ধর্মপ্রচারক, ধৰ্ম্ম ও স্বাধীনতা সংস্থাপক ব্যক্তিবর্গ নিজ নিজ শক্তিবলে অসংখ্য অনুবর্তী বা সেবক সৃষ্টি করিয়া নব প্রেরণায় লােককে অনুপ্রাণিত করেন। 1;

প শ্রীকৃষ্ণ। হিন্দু, ইহকাল অপেক্ষা পরকালকেই বড় করিয়া দেখে। এইজন্য তাহায় ধর্মোপদেষ্টা চরণে আত্মবিক্রয় করিয়া ধন্ঠ হইতে চায়। এবং যেখানেই তাহারা আধ্যাত্মিক বিকাশের সন্ধান পায়, সেইখামেই পরমাত্ম লাভের সহজোপায় অন্বেষণ করে। তজ্জন্ত তাহারা মুনি, ঋষি, সাধু, সন্ন্যাসীর উপদেশ মস্তক পাতিয়া গ্রহণ করে। এইজন্য তাহারা ইহ জীবনের সর্বপ্রকার সুখবাঞ্ছা পরিত্যাগ করিতে বিন্দুমাত্রও কুষ্ঠিত নহে। কৃষ্ণস্তু ভগবান্ স্বয়ং। যাহাদের এত লােভ, “যাহারা ইহকালের সুখ ত দুরের কথা, দেহ পর্যন্ত বিসর্জন দিয়াও ধৰ্ম্ম চায়, তাহারা স্বয়ং ভগবানের অমৃতবাণী শুনিবার জন্য কতদুর লালায়িত, তাহা বলিয়া বুঝাইবার শক্তি কাহার? অবতায়দের সম্বন্ধে ভাগবত যাহা বলিয়াছেন, দুই এক কথায় তাহা আপনাদের নিকট বলিয়া শ্রীকৃষ্ণের উপদেশামৃত বুঝিবার চেষ্টা করিব। ভাগবতে বর্ণিত, উদ্ধবের প্রতি শ্রীকৃষ্ণের যে উপদেশ তাহা বুঝিবার অধিকারী আমার ন্যায় সাধারণ মানব নহে। যেমন ব্ৰহ্মবিদ উচ্চাধিকারী ভক্ত, উপদেষ্টা গুরুও তদ্রপ স্বয়ং ভগবান। সুতরাং সেইরূপ ভক্তের বােধ্য ভাষায় গুরুদেব যে উপদেশামৃত দান করিয়াছেন, পরম কারুণিক মহামতি ব্যাসদেব পণ্ডিতগণের জ্ঞান লাভ জন্য তাহা ভাগবতে প্রকাশ করিলেও এখনও তাহা ব্ৰহ্মবিদ যােগী ঋষি মুনিগণ ধ্যেয়। শুধু বাক্য, ব্যাখ্যা বা টাকায় তাহার মীমাংসা বা তাহা বােধগম্য হয় না। কাৰ্যতঃ সেই সব ধ্যান ধারণার জ্ঞান না থাকিলে তাহা সাধারণ বুদ্ধি ত দূরের কথা, ব্রহ্মচারীও দুর্বোধ্য। রীতিমত ব্রহ্মচর্য ব্যতীত তাহার এক একটা বাক্যের ধারণাও পণ্ডিতের বুদ্ধির অগম্য। সুতরাং সংসারের কীট আমি কেমন করিয়া তাহা বুঝাইব? তজ্জন্য গতানুগতিক ভাবে পণ্ডিতগণের টীকা দেখিয়া কেবল নকল করিয়া আপনাদের সমক্ষে ধরিতেছি; কৃপা পূৰ্ব্বক অধমের এ প্রয়াসের জন্য অপরাধ ক্ষমা করিবেন .. আমি চিনিবাহী বলদ। চিনিতে আমার অধিকার নাই। আপনাদে উপভােগের জন্যই আমি চিনির ভার বহন করিয়া আপনাদের দ্বারে উপস্থিত হইয়াছি। - পরিশিষ্ট। - = ধ্যায় কৃতে যজ যজ্ঞেঃ স্রেতায়াং দ্বাপরেহয়। যদাপ্নোতি তদাগােতি কলৌ সংকীৰ্ত্ত কেশবং ভাঃ সত্যযুগে তপস্যাদি, ত্রেতায় যজ্ঞ এবং দ্বাপরে অর্চনা দ্বারা মানব যে ফল লাভ করিয়াছে, কলিযুগে কেবল ভগবানের নাম-সংকীৰ্ত্তন দ্বারা সেই সমুদয় ফল লাভ করিবে, তাহাতে সন্দেহ নাই। ইহাই শাস্ত্রের উক্তি। ভাগবত বলিতেছেন :- E কলিং সভাজয়ন্ত্যাৰ্যা গুণজ্ঞাঃ সারভাগিনঃ। যত্র সংকীৰ্ত্তনেনৈব সর্বস্বার্থোপি লভ্যতে । নহত: পরমাে লাভ দেহিনাং ভ্রাম্যতামিম। যতাে বিতে পরমাং শান্তিং নস্যতি সংসৃত্তিঃ ॥ কৃদিষু প্রজা রাজন্ কলাবিচ্ছন্তি, সবং। কলো কিল ভবিষ্যন্তি নারায়ণপরায়ণাঃ। ভাং সারগ্রাহী গুণজ্ঞ বুদ্ধিমান প্রাচীন ব্যক্তিগণ কলিযুগেরই বিশেষ প্রশংসা করিয়া থাকেন; কারণ, কলিযুগেই অন্যান্য যুগাপেক্ষা কেবলমাত্র সংকীর্তন দ্বারাই জীব যাবতীয় অভীষ্ট লাভ করিতে পারে। এই ঘাের সংসার সমুদ্রে বিবিধ কর্ম বশতঃ অনবরত পরিবর্তনশীল জীবের পক্ষে নাম-সংকীৰ্ত্তন ব্যতীত আর অন্য উপায় নাই। কারণ কেবলমাত্র নাম- সংকীৰ্ত্তনের ফলে সংসারী জীব প্রাণ বিয়ােগের পরই অনন্ত শান্তি স্বরূপ, মুক্তিলাভ করিয়া থাকে। আর তাহাদিগকে জন্মমণাদি দুঃখ ভােগ করিতে হ না । হে রাজেন্দ্র ! কলিযুগে মুক্তির সুগম উপাত্ম থাকায় জীব ফত্যাদি, যুগ্ধ চতুষ্টয়ের মধ্যে কলিযুগেই জন্ম কামনা করেন। এবং কলিযুগেই নারায়ণপৰায়ণ ভগবদ্ভক্ত বহু লােক জন্ম গ্রহণ করিবেন। এমন যে কলি, এ যুগে মনুষ্য দেহধারী ভগবানের জৰু কৰ্ম্মাদি, লীল শ্রবণ ও কীৰ্ত্তন যেমন জীবের মুক্তির উপায়, তাহার উপদেশামৃতও তেমনই জীবের শ্রবণ, কীৰ্ত্তন ও প্রসাধীন বিষয়ের অমৃত প্রবাহ। শ্রীকৃষ্ণ বলিয়াছেন কৃষ্ণ। ** : ভক্তের মধ্যে আমি উদ্ধব। এমন যে মহামহীয়ান্ ভক্ত; তাঁহাকে যে উপদেশ দান, তাহার মহত্ত্ব, গুরুত্ব, মাধুৰ্য্য ও উপাদেয়ত্ব কত তাহা বিচার করিবার সাধ্য কাহার ? সে কর্ণামৃত জীব বহু বৎসরের বহু সাধনায় লাভ করে। কলি সৰ্ব্ব বিষয়েই অন্যান্য যুগ হইতে হেয় হইলেও নারায়ণপরায়ণ বহু ভক্তই এ যুগে নাম-সঙ্কীর্তনে বহু পাতকীকে উদ্ধার করিয়া শান্তি দান করিবার অধিকারী। এজন্য ভগবানের জন্মকৰ্ম্মলীলাগুণগান শ্রবণের আকাঙ্ক্ষা সহজেই সকলেরই হৃদয় অধিকার করিয়া আছে। তাই এ অধম ইহাকেই সুযােগ মনে করিয়া ভাগবতের সেই সৰ্বজন উপর্ভুক্ত হৃদয়মনােহারী উপদেশা- মৃত পান করিতে অভিলাষী হইয়াছে। কিন্তু এ অধম যে একান্তই তাহার অনধিকারী তাহা না বললেও চলে। কারণ- সর্বতাে মনসােহসঙ্গমাদৌ সঙ্গঞ্চ সাধুযু। দয়াং মৈত্রীং প্রশ্রয়ঞ্চ ভূতেম্বদ্ধা যথােচিতং। ভাঃ ভাগবতধৰ্ম্ম শিক্ষার জন্য সর্বাগ্রে দেহাদি যাবতীয় পদার্থ হইতে মন নিবােধ, ও সাধু ভগবদ্ভক্ত তাহা আসক্ত করা বিধেয়। দেশ, কাল ও বিত্তানুসারে ভূত সমূহের প্রতি দয়া, মৈত্রীভাব ও বিনয় প্রদর্শন কর্তব্য। শৌচং তপস্তিতিক্ষাঞ্চ মেনিং স্বাধ্যায় মার্জং। ব্রহ্মচর্য্যমহিংসাঞ্চ সমত্বং দ্বন্দ্ব সংজ্ঞয়াের। ভাঃ শৌচ, তপস্যা, ক্ষমা, মৌন, স্বাধ্যায়, সারল্য, ব্রহ্মচর্য, অহিংসা এবং সুখ দুঃখাদিতে হর্ষ শােকাদি বর্জন ; ৮ সর্বত্রাত্মেশ্বরাষীক্ষাং কৈবল্যমনিকেততাং। বিবিক্ত চীরসনং সন্তোষং যেন কেনচিৎ । ভা স্থাবরজঙ্গমাদি দৃশ্যমান পদার্থমাত্রেই ভগবৎ-স্বারূপ্য জ্ঞান ভাগবত ধর্মের প্রধান অঙ্গ। নির্জনবাস, গৃহাদিতে অভিমান ত্যাগ, পবিত্র চীরবসন পরিধান, এবং অনায়াস-লভ্য যদৃচ্ছ সমাগত অনুপ্রাপ্তিতে আনন্দ লাভ ;

পরিশিষ্ট। । শ্রদ্ধা ভাগবতে শাস্ত্রে অনিন্দাত্র চাপিহি। মনােবা কায়দগুঞ্চ সত্যং শমদমাবপি ভাঃ ভগবৎ প্রতিপাদক শাস্ত্রে শ্রদ্ধা এবং অন্যান্য শাস্ত্রের অনিন্দা, সত্য, শম্ ও জুমের অভ্যাসরূপ মনােবা ও কর্ম নিগ্রহ অভ্যাস প্রয়ােজন ; * ৮ - শ্রবণং কীৰ্ত্তনং ধ্যানং হরেরদ্ভুত কৰ্ম্মণঃ। জন্মকৰ্ম্মগুণানাঞ্চ তদর্থেহখিল চেষ্টিতং । L } । সেই বিপুলবিক্রম অদ্ভুতকৰ্ম্মা ভগবান্ জনার্দনের অবতারলীলা, জন্মকথা এবং কর্মকলাপাদি শ্রবণ, কীৰ্ত্তন ও সতত ধ্যান করা কর্তব্য। মানবের দেহযাত্ৰা সম্বন্ধীয় যাবতীয় কাৰ্য কেবল ভগবানের আরাধনার উদ্দেশ্যেই বিহিত বলিয়া অবধারণ করিতে হইবে। ইষ্টং দত্তং তপাে জপুং বৃত্তং যচ্চাত্মনঃ প্রিয়ং। দারান্ গৃহান্ সুতান্ প্রাণান্ যৎপরস্মৈ নিবেদন । ভাঃ বৈদিক যাগযজ্ঞ, স্মৃত্যুক্ত দানাদি, তপস্যা, একাদশ্যাদি ব্ৰত, মন্ত্র জপ বা লৌকিক আচরণ, অথবা আপনার যে কোন প্রিয় দ্রব্য,-এমন কি ধন, প্রাণ, স্ত্রীপুত্র, পরিবারবর্গকে ভগবানের আরাধনার উপকরণ রূপে রক্ষা যত্ন করা কর্তব্য। এবং কৃষ্ণাত্মনাথেষু মনুষ্যেষু চ সৌহৃদং । পরিচর্যা চোভয় মহৎযু নৃধু সাধুযু ॥ ভাঃ কৃষ্ণগত প্রাণ মনুষ্যগণের সহিত সখ্যতা, স্থাবরজঙ্গম উভয়বিধ" পদার্থ এবং মহাজন ভক্ত সাধু ব্যক্তির পরিচৰ্য্য করা কর্তব্য। পরস্পরাকথনং পাবনং ভগব্যশঃ। মিথােরতিৰ্মিথস্তুষ্টি নিবৃত্তিৰ্মিথ আত্মনঃ। ভা ভগবদ্ভক্তের: সংসর্গে পতিতপাবন, অবিদ্যাদি দোষ নিবৰ্ত্তক মায়া নিবারক ভগবানের অমল যশেয়াশি পরস্পর শিক্ষা করিবেন। হাতে স্পর্ধা বা অন্যদি } ৫ * 1 । শ্রীকৃষ্ণ। ima নাই। এই প্রকারে পরস্পর, ভগবদ যশের সংলাপে পরস্পরেরই রতি, তুষ্টি ও দুঃখােপশমন পূৰ্ব্বক নিবৃত্তি লাভ করিয়া থাকেন। সুরঃ স্মারয়ন্তশ্চ মিথােহঘৌঘহরং হরিং। ভক্ত্যা সংজাতয়া ভক্ত্যা বিভ্রত্যুৎপুলকাং তনুং। ভা সর্বপাপবিনাশন ভগবান্ শ্রীহরিকে সতত স্বয়ং হৃদয়মন্দিরে স্মরণ এবং পরস্পর প্রসঙ্গালাপ দ্বারা পরস্পরের মধ্যে তাহা উদ্বোধন করাইয়া সাধন ভক্তির অনুশীলনে যে প্রেম ভক্তির উদয় হয়, তাহাতে ভক্ত কলেবর সময় সময় রােমাঞ্চিত হইয়া উঠে। কচিক্রদত্যচ্যুতচিন্তয়া কচিদ্ধসন্তি নন্দন্তি বদন্ত্যলৌকিকাঃ। নৃত্যন্তি গায়ন্তনুশীলয়ন্ত্যজং ভবন্তি তৃষ্ণীং পরমেত্য নিবৃতাঃ ভাঃ অচ্যুত চিন্তায় সম্পূর্ণ নিবিষ্টচিত্ত হইয়া ভাবের উদ্বোধনে তিনি কখন রােদন, কখন হাস্য, কখন হর্ষ, কখনও বা অলৌকিক ভাবে উন্মাদের স্থায় অসদ্ধ প্রলাপােক্তি করিয়া থাকেন। সেই সারাৎসার হৃষীকেশের চিন্তায় তাহাদের চিত্ত এত নিমগ্ন হয় যে, কখন বাতুলের ন্যায় নৃত্য, কখনওবা পরমানন্দ লাতে নিবৃত বা পরমানন্দিত হইয়া স্তম্ভিত হইয়া যান। ইতি ভাগবতান্ ধৰ্ম্মান্ শিক্ষন্ ভক্ত্যা দুয়া। নারায়ণপরে মায়ামঞ্জস্তরতি দুস্তরাং। ডাঃ এই প্রকারে ভাগবত ধৰ্ম্ম শিক্ষা করিলে তদুৎপন্ন ভক্তির প্রভাবে নারায়ণ- পরায়ণ ব্যক্তি অতি সহজেই এই দুস্তরা মায়াকে নিঃসন্দেহে অতিক্রম করিয়া থাকেন। দেবর্ষি ভূতাপ্তণাং পিতৃণাং ন কিঙ্করো নায় মৃণী চ রাজ। সৰ্বাত্মনা যঃ শরণং শরণ্যংগতাে মুকুন্দং পরিহৃত্য কৰ্ত্তং ভার হোজ। যে ব্যক্তি কর্তৃত্বের মূল কারণ অহঙ্কার তত্ব (অভিমানকে ) .বিসর্জন দিয়া সংসারভয়হারী শরণাগতপালক মােদাতা ভগবান মুকুন্দের পরিশিষ্ট। সর্বতােভাবে শরণ গ্রহণ করেন, তিনি দেবতা, ঋষি, সাধারণ প্রাণী ও আত্মীয়- গজনবর্গের নিকট কৰ্তব্য পাশে বদ্ধ হন না। সুতরাং পঞ্চ যজ্ঞাদির অনুষ্ঠানে তাঁহাকে নিযুক্ত থাকিতে হয় না। জ্ঞান ও ভক্তির মাহাত্ম তঁাহাকে কাহারও নিকট ঋণী থাকিতে হয় না। স্বপদমুলং ভজতঃ প্রিয়স্য ত্যক্তান্তভাৰস্য হরিঃ পরেশঃ। বিকৰ্ম্ম যচ্চোৎপতিতং কথঞ্চিনােতি সর্বং হৃদি সন্নিবিষ্টঃ। ভাঃ ভগবান্ ব্যতীত দেহগেহাদি মমতাস্পদ পদার্থে যাহারা আসক্তি শৃষ্ঠ এবং তিনি ব্যতীত অন্য দেবতাতে যাহাদের ভেদ বুদ্ধি নাই, তাদৃশ বিমলচেতা ব্যক্তিগণ ধ্যানযােগে ভগবানের পদকমল নিরন্তর চিন্তা করায় ভক্তবৎসল হরি তাঁহাদের হৃদয়মন্দিরে সমাসীন হন। তাঁহারা যদি প্রমাদ বশতঃ হঠাৎ কোন নিষিদ্ধ কৰ্ম্মও করিয়া ফেলেন, তবে পরম করুণাময় ভক্তবৎসল হরি তৎক্ষণাৎ তাহাদের হৃদয়মন্দিরে আবিভূত হইয়া সকল পাপ দূর করিয়া দেন। পাঠক দেখুন, ভগবদ্ভক্ত কাহারা ! বিষয়াসক্ত মুঢ় আমি কোথায়, আর তাহারা কোথায়! তাহারা গােলােকে, আমি নরকে। তবুও প্রাণ ভগবং কথা শুনিবার জন্য ব্যাকুল ; তাই ভাগবতের অমৃতময়ী বাণী দুই একটী উদ্ধত করিয়া সেই আশা পুরণ করিবার চেষ্টা করিতেছি। ইহাতে আমার ভাবও নাই, ভাষাও নাই। সকলই ভাগবতের কথা, ভাগবতের ভাষা। পরম ভক্ত ভাগবতগণ ব্যাখ্যাদি দ্বারা যেরূপ আস্বাদন করিয়াছেন, তাহাদের চৰ্বিত সেই প্রসাদের শােভে গললগ্নীকৃতদাসে তাঁহাদের শ্রীচরণ প্রান্তে উপস্থিত হইবার সুযােগ অন্বেষণ করিতেছি। পাঠক! আপনাদের পদধুলিই আমার সম্বল। আপনারা যদি কৃপা করিয়া এ হতভাগ্যকে তাহাদের শ্রীচরণ প্রান্তে পৌছাইয়া দেন, তবেই কঞ্চিৎ আশ্বস্ত হইতে পারি। তাহাদের দাসানুদাস-দাস দাসানুদাস-দাস হইতে না পারিলেও তাঁহাদের শ্রীচরণ দর্শন করিয়া পরিতৃপ্ত হইব। এমন দিন কি হইবে? এ সুখ বাঞ্ছাও ভাল নয় ;-গবৎ কথার বিরতি জন্মিতেছে। কৃষ্ণপ্রাণ দেবর্ষি নারদ বসুদেবের প্রশ্নের উত্তরে বলিলেন : - কৃষ্ণ। দর্শনালিঙ্গনীলাপৈঃ শয়নাসনভােজনৈঃ। আত্মা বাং পাবিতঃ কৃষ্ণে পুত্রস্নেহং প্রকুততঃ । ভা কৃষ্ণরূপ পুত্রকে দর্শন, আলিঙ্গন, তাহার সহিত আলাপন, একত্র শয়ন, উপবেশন ও ভােজনাদি দ্বারা অবিরত পুত্রস্নেহ করায় আপনাদের চিত্ত সম্পূর্ণ বিশুদ্ধ হইয়াছে এবং কৃষ্ণস্বরূপ প্রাপ্ত হইবার উপযােগিতাও লাভ কবিয়াছে। বৈরেণ যং নৃপতয়ঃ শিশুপালপৌণ্ড সাদয় গতিবিলাসবিলােকনাদৈঃ। ধ্যায়ন্ত আকৃতিধিয়ঃ শয়নাসদৌ তৎসাম্যমাপুনুরক্তধিয়াং পুনঃ কিং ॥ * কারণ কুষ্ণ রূপ অবলােকন, তাহার গতি ও ক্রিয়াদি দর্শনে তাকারে আকারিত চিত্ত শিশুপাল, দন্তবক্র ও সাদি নৃপতিবৃন্দ যখন শয়ন ও ভােজনাদি ফালে যে কৃষ্ণকে বৈরভাবে চিন্তা করিয়া তৎস্বারূপ্য লাভ করিয়াছে, তখন প্রেমের তরঙ্গে অনুরক্ত বুদ্ধিতে আসক্ত হইয়া আপনাদের ন্যায় শ্রেষ্ঠ ভক্তবৃন্দ যে, তৎপদবী লাভ করিবেন তাহাতে আর বিচিত্র কি ? মাপত্যবুদ্ধিমকৃথাঃ কৃষ্ণে সর্বাত্মনীশ্বরে। মায়ামনুষ্যভাবেন গৃঢ়ৈশ্বৰ্যে পরেহব্যয়ে। ভাঃ ভগবান্ শ্রীকৃষ্ণ জগতের আদিভূত মূল কারণ হইলেও তিনি যাবতীয় বিকারের অতীত; অথচ সৃষ্টি স্থিতি ও প্রলয়ের কর্তা এবং প্রকৃতিরও নিয়ামক। তিনি স্বীয় অচিন্ত্য যােগমায় শক্তিকে অবলম্বন করিয়া মনুষ্যবৎ লীলা করিবার অভিপ্রায়ে অবতীর্ণ হইয়াছেন মাত্র। অতএব তাহাতে তােমাদের প্রাকৃতিক অপত্যবৃদ্ধি করা কোনরূপে বিধেয় নহে। ভূরার রাজদ্যহন্তবে গুগুয়ে সতাং। অবতীর্ণস্য নির্বত্যৈ যশো লােকে বিতন্যতে। ভাঃ অবনীর ভারস্বরূপ রাজত্মবেশধারী অসুরগণের নিধন, এবং সাধু ভক্তগণের পরিশ্রাণ জন্য তিনি ধরণীতে অবতীর্ণ। লােকের মুক্তির জন্য তাহার যশঃ সংসারে বিস্তীর্ণ হইতেছে। -- 1। f } . { 7 এমন যে কুফ, উঁহার স্বমুখ কথিতু উপদেশ' কি আধুর, পাঠক তাহার আস্বাদ গ্রহণ করুন। . ভগবান্ আকৃষ্ণ কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের অবসানে মনে মনে চিন্তা করিতে লাগিলেন যে, যাদবগণ জগতে অজেয়। ইহাদিগকে ধ্বংস না করিলে ইহারা জগতে বিষম অনর্থ উৎপাদন করিবে। যখন ভূভার হরণের জন্য অবতীর্ণ হইয়াছি, তখন ইহাদিগকেও অবশিষ্ট রাখিব না।”, - ইহা চিন্তা করিয়া তিনি স্বয়ং সংহার- মুৰ্ত্তি পরিহ করত বসুদেবের গৃহে অবস্থান পূৰ্ব্বক বিশ্বামিত্র, অসিত, ক'; দুর্বাসা, ভৃগু, অঙ্গিরা, কশ্যপ, বামদেব, অত্রি, বশিষ্ঠ ও নারাদি ব্রাহ্মণগণকে নিমন্ত্রণ করিয়া তাহাদের দ্বারা ধৰ্মার্থ ক্রিয়াকলাপ সমাপন করাইয়া তাহাদিগকে পিণ্ডারক তীর্থে প্রেরণ করিলেন । পিণ্ডারক তীর্থের সন্নিকটে একদিন যাদবগণ ক্রীড়া করিতে করিতে জাতী তনয় সাম্বকে রমণীর বেশভূষায় সজ্জিত করিয়া উক্ত ঋষিগণের সন্নিকটে উপস্থিত হইয়া আপনাদের উদ্ধতভাব গােপন পূর্বক তাহাদিগকে কহিলেন, হে সৰ্ব্বদর্শি ব্রাহ্মণগণ ! আমাদের এই বনিতা গৰ্ভরতী হইয়াছেন। ইনি লজ্জা বশতঃ স্বয়ং বলিতে পারিতেছেন না, তজ্জন্য আমাদের দ্বারা জিজ্ঞাসা করিতে- ছে, ইহার গর্কে কি সন্তান হইবে ? সৰ্ব্বদর্শী ঋষিগণ তঁাহাদের ঔদ্ধত্যের উপহাস বুঝিতে পারিয়া আপনাদিগকে অপমানিত বােধ করত বিষম ক্রুদ্ধ হইয়া বলিলেন, রে দুর্বুদ্ধিগণ ? ইনি তোমাদের কুলনাশন মুষলই প্রসব করিবেন। মুনিগণের সেই অভিশাপে ভীত হইয়া তাহারা তৎক্ষণাৎ সাম্বের উদৱবস্ত্র উন্মোচন পূর্বক মুষল: নিরীক্ষণ করত অতিমাত্র বিস্মিত হইয়া বিলাপ করিতে লাগিলেন। এবং তাঁহাদিগকে উপহাস করিয়া কি সর্বনাশ করিলেন; তাহা চিন্তা করিতে করিতে মুষল লইয়া বিষন্নবদনে রাজসভায় প্রবেশ পূৰ্ব্বক যদুরাজ উগ্রসেনকে সমুদয় বৃত্তান্ত নিবেদন করিলে তিনি সেই মুষল চূর্ণ করাইয়া সমুদয় চুর্ণ সহিত চুর্ণাবশিষ্ট মুষল সমুদ্রে নিক্ষেপ করাইলেন। চুর্ণ সমুদয় জলে ভাসিয়া আসিয়া তীরে লাগিলে তাহাতে একা নামক এক জাতীয় তৃণ জন্সিল আর চূর্ণাবশিষ্ট মুষল এক মৎস্য গ্রাস করিয়াছিল। পরে সেই মৎঙ্গ এক ধীবরের জালে পড়িলে তাহার উদর হইতে উক্ত মুষল নির্গত হইল; এবং এক ব্যাধ তাহা লইয়া গিয়া তাহাতে পর নির্মাণ করাইল। [ ২ 1 } । • । * r শ্রীকৃষ্ণ। ব্ৰহ্মশাপের বিষয় অবগত হইয়া প্ৰতীকালে সমর্থ হইলেও উদাসীন এই সময়ের অপেক্ষা করিতে লাগিলেন। এদিকে স্বীয় নয় সনদি কুমারগণ, ইন্দ্রাদি দেবগণ এবং মরীচ্যাদি প্রজাপতিগণে পরিবৃত হইয়া কমলাসন ব্রহ্মা, ভূতগণে পরিকৃত ভগবান্ ত্রিলোচন, সাগশে পরিবেষ্টিত পুর, আদিত্যগণ, কগণ, অশ্বিনীকুমার, ঋভুগণ অগিস, কু, সাধ্য, বিদেবগণ, গন্ধর্ব অল্প, নাগগণ, সিদ্ধচারণ, গুগণ, ঋষিগণ, পিতৃগণ, বিদ্যার ও কিরগণ একত্র মিলিত হইয়া শ্রীকৃষ্ণকে দর্শন করিবার জন্য দ্বারা উপস্থিত হইলেন। এবং তাঁহার স্তব করুণান্তর ব্রহ্মা বলিলেন, হে অখিলাধার। সম্প্রতি আপনার দেককাৰ্য্য সাধনের আর কিছু বাকি নাই ; এবং যদুকুলও বিপ্ৰশাপে বিনষ্ট-প্রায় হইয়াছে। অতএব যদি ভাল বিবেচনা করেন, তবে স্বীয় পরমধাম বৈকুণ্ঠে গমন করুন। হে বৈকুণ্ঠনাথ। আমরা তােমায় কিঙ্কর; আমাদিগকে ও লােক সমূহকে রক্ষা এবং প্রতিপালন করুন। শ্রীকৃষ্ণ দেবগণকে অভিবাদন করিয়া বলিলেন, হে বিবুধের ! তােমাদের যাহা কিছু বক্তব্য তাহা সমস্তই আমি অবগত হইয়াছি। তােমাদের সক কাৰ্যই সমাধা করিয়াছি। পৃথিবীর ভারও অপনােদন করিয়াছি। কেবল যদুকুলের উপসংহার মাত্র অবশিষ্ট আছে। ইহা বল, বিক্রম, সাহস ও ধনাদি ঐশ্বৰ্যে সকলের অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ ও উন্নত। সুতরাং ইহারা সমুদয় জাতিকে পরাস্ত ও নিহত করিয়া আপনারা পরিব্যাপ্ত হইতে পারে। তীরভূমি যেমন সমুদ্রকে সীমাবদ্ধ করিয়া রাখে, আমিও তদ্রুপ ইহাদিগকে মৰ্য্যাদা অতিক্রম করিতে দিই নাই। এই বলদর্পিত যদুগণের বিপুল কুল সংহার না করিয়া যদি আমি এখান হইতে লােকান্তরে গমন করি তাহা হইলে ইহারা আপনাদের মৰ্য্যাদা অতিক্রম করিয়া সমুদয় লােক বিনষ্ট করিবে। মাহাহউক, সম্প্রতি বিশাপ প্রভাবে ইহাদের নাশ আরম্ভ হইয়াছে। এই কুল সম্পূর্ণ উৎসল্প ও নিৰ্ম্মল হইয়া গেলে আমি বৈকুণ্ঠে গমন করিব। হে ব্ৰহ্মণ ! সেই সময় তােমার ব্ৰহ্মলােক গমন করিব। শ্রীকৃষ্ণ এইরূপ বলিলে ব্ৰহ্মাদি দেবগণ তাঁহাকে প্রণামান্তর স্ব লােকে গমন করিলেন। ন ।

পরিশিষ্ট। - ব্ৰহ্মাদিদেবগণ প্রস্থান করিলে পর দুরকার নানাপ্রকার :উৎকট উৎপাত ও দুর্নিমিত্ত সমূহ উপস্থিত হইলে শ্রীকৃষ্ণের আদেশে খাদৰগণ প্রভাসে গমন করিলেন। মহাত্মা উদ্ধৰ তাদৃশ ভয়ানক উৎপাত দর্শন কৰিা শ্ৰীকৃষ্ণ সমীপে উপস্থিত হইয়া প্রণামান্তর বলিলেন, হে দেবদেবের সন্ধযােগফলদাতা পবিত্রকীৰ্ত্তিনুদেব! আপনি যখন বিপ্ৰশাপ অন্যথা করিতে সমর্থ হইয়াও তাহার প্রতিবিধানে যত্ন করিতেছেন না, তখন আমায় নিশ্চয় অনুমান হইতেছে যে, আপনি যদুকুল সংহার পূর্বক মালােক পরিত্যাগ করিবেন। হে কেশব! আমি কণাৰ্দ্ধকালও আপনার শ্রীচরণ পরিত্যাগ করিয়া থাকিতে পারিব না। অতএব হে নাথ! আমাকে ও আপাল্প ধামে লইয়া চলুন ! হে সদানন্দময় কৃষ্ণ! শ্রবণ-সুখকর অমৃতাপম পরমলায় আপনার লীলা সমূহ যাহাদিগের কর্ণকুহরে প্রবেশ করে, তাহারা ধনজনদি যাবতীয় বিষয়াসক্তিই যখন পরিত্যাগ করে, তখন নিত্যন্ত প্রিয়বােধে যে আমি এতকাল আপনার সহিত একত্র শয়ন, ভ্রমণ, উপবেশন, অবস্থান, গান, ক্রীড়া ও ভােজনাদি করিয়া আসিতেছি এবং প্রেমের পুলকে সেবা করিতেছি, সেই জমি আপনাকে বিদায় দিয়া কোন্ প্রণে নিশ্চিন্ত থাকিব? হে গােবিন! আমরা যে, তােমার প্রসাভোজী কির। উপলােগান্তে পরিত্যক্ত মাল্য, গন্ধ, বস্ত্র ও অলঙ্কারাদি ভােগ্য বিষয়ের প্রাপ্তিতে আমরা যখন চিরকা অলঙ্কৃত ও ভােগসুখ অনুভব করিয়া আসিতেছি তখন তােমার অঘটনঘটনপটীয়সী, মায়াকে অতিক্রম করিতে পারি, কে বিশ্বন্ধে সূন্দেহ নাই। হে মুক্তিদাতা, অপমার পরম ধামে গমন করা নিতান্তু সহজ নহে। পরমার্থদশী উৰ্দ্ধরেত.ঋষিগণ যােগাবলম্বন পূর্বক আহারাফিক সঙ্কোচ সাধন করত বাবদির যাবতীয় ক্লেশ সই করিম, এমন কি কাম ক্রোধাদি সমুদ চিত্তবৃত্তি নিরােধ পূৰ্ব্বক সকল ভােগে জলাঞ্জলি দিয়া যখন সম্পূর্ণ নিস্পাপ হন, কখই তােমায় পবিত্র মঙ্গলময় ব্ৰহ্মপদবীতে গমনে তাঁহাদে অধিকার জলে। কিন্তু হে মহাযােগি। আমরা এই ঘাের কৰ্ম্ম পথে 'দেখ মনুষ্যাদি বিভিন্ন ধােনি অবলম্বন পূৰ্ব্বক পরিভ্রমণ করিতে করিতে ভক্তগণের সহিত ভষণীয় | { f mas লীলাবার্তা শ্রবণ, উপদেশ গ্রহণ, গতি, হাস্য, অবলােকন ও পরিহাস প্রভৃতি মাননুকরণ স্মরণ এবং অমৃতায়মান বাক্য সকল কীৰ্ত্তন ও ধারণা করিয়াই এই দুস্তর সংসার দুঃখ অতিক্রম করিব তাহাতে সন্দেহ নাই। তাহা শুনিয়া ভগবান দেবকীনন্দন উদ্ধৰকে নির্জনে ডাকিয়া বলিলেন, আমার অন্তর্ধান সম্বন্ধে তুমি যাহা বলিতেছ তাহাই আমার অভিপ্রেত। ব্ৰহ্মা, শঙ্কর ও লােকপালাৰি দেববৃন্দ আমার বৈকুণ্ঠ গমনের প্রতীক্ষা করিতেছেন। ব্ৰহ্মার প্রার্থনানুসারে আমার অংশভূত বলরামের সহিত যে কার্যের জন্ত অবতীর্ণ হইয়াছিলাম সেই ভূভার-হরণ কাৰ্য্য প্রায় সম্পূর্ণ হইয়াছে। যে যদুকুল অবশিষ্ট দেখিতেছ, তাহাও সত্বর ব্রহ্মশাপে আত্ম-কলহে বিনাশ প্রাপ্ত এবং আজ হইতে সপ্তম দিবসের মধ্যে এই দ্বারকাপুরীও সমুদ্রগর্ভে নিমগ্ন হইবে । হে সাধে! আমি যে মুহূর্তেই পৃথিবী হইতে এই দেহ অন্তর্হিত করিব, তখনই কলির প্রচণ্ড প্রতাপে অভিভূত হইয়া এই লােকের আর কিছুমাত্র মঙ্গল থাকিবে না। তাদৃশ কলিযুগে মানবগণের প্রবৃত্তি সতত অধৰ্ম্ম পথেই ধাবিত হইবে। সুতরাং তােমার ন্যায় সাধু পুরুষের সে সময়ে সংসারে অবস্থান করা বিধেয় নহে। অতএব আত্মীয় স্বজনাদির প্রতি মমতা পরিত্যাগ করিয়া সর্বতোভাবে আমাতে চিত্ত সমর্পণ পূৰ্ব্বক সমদর্শী হইয়া পৃথিবী পর্যটন কর। যদিদং মনসা চা চক্ষুর্ভাং শ্রবণাদিভিঃ। নশ্বরং গৃহমানঞ্চ বিদ্ধি মায়ামনােময়ং। দেখ ! দর্শন, শ্রবণ, বাক্য ও মননাদি দ্বারা জগতের যে কোন পদার্থে চিত্ত অভিনিবিষ্ট হয়, সে সকলই মায়া-রচিত মনঃকল্পিত এবং নশ্বর বলিয়া জানিবে । আস্বাদন-“ইদং সৰ্ব্বং মায়ামনােময়ং” বলায় পদার্থের স্বরূপকে দুইরূপে নির্দেশ করা হইয়াছে। একটা মায়াময় অর্থাৎ মায়া হইতে ঈশ্বর কর্তৃক সৃষ্ট ; অঞ্চবটী জীবের মনঃকল্পিত। যেমন ঈশ্বর সৃষ্ট নারী সমুহে স্বৰূপতঃ কোন প্রভেদ না থাকিলেও মানবের মনঃকল্পনায় একই নারী কাহারও পত্নী, কাহারও ভগিনী, কাহারও মাতা, কাহারও পুত্রবধূ ইত্যাদি। • অতএব স আােেপযুক্ত T p । । দ এই ভেদ দর্শন পূৰ্ব্বক বিবিধ আচরণ, মনের কল্পনায়; গার: মূল নারীর সৃষ্টি ঈশ্বরের কল্পনায়, মায়া-রচিত। যদি আমরা নারীর সহিত অন্য সকলের ঐ; সমুদয় সম্বন্ধ লেপ-করি, তাহা হইলে দেখি, সে জাগতিক অসংখ্য নারীর ন্যায় একটী নারীমাত্র। তাহার পর চিন্তাকে আরও একটু অগ্রসর করিলে দেখি, সে মরণশল, তাহার দেহ নশ্বর, দেহ নাশের পর তাহার জীবাত্মা বা জীবচৈতন্য মাত্র অবশিষ্ট থাকে। ধর্মাধর্ম কৰ্ম্মাকর্মের ফল সে-ই ভােগ করে। আরও অগ্রসর হইলে, দেখি, কালে জীবচৈতন্য ঈশ্বরচৈতন্যে লীন হয়। সুতরাং দেখা যাইতেছে একমাত্র ঈশ্বরচৈতন্য বা পরমাত্মা ব্যতীত জগতের সমুদয়ই মায়াময় ও নশ্বর। পুংসােহযুক্তস্য নানার্থেভ্রমঃ সগুণদোষভা। কৰ্মকৰ্ম্ম বিকৰ্ম্মেতি গুণদোষধিয়ে ভিদা। ৬ । L প্রকৃত তত্ত্ব বিচারে অসমর্থ ব্যক্তির নিকট বিভিন্ন বস্তু বা ব্যক্তি বলিয়া যে ভিন্নার্থের প্রতীতি, তাহারই নাম ভ্রম। এই ভ্রমযুক্ত ব্যক্তিই পাপপুণ্য সুখদুঃখাদি গুণদোষের পাত্র হন। এবং সুখদুঃখাদিতে তাঁহার চিত্ত সতত আকুল থাকায় তাহাকে বিহিত, অবিহিত ও নিষিদ্ধ কর্মের অনুষ্ঠান জনিত বিবিধ ভেদ প্রতিপাদক বিধি বাক্যের অন্তর্ভূত হইতে হয় । অস্বিাদন—অতএব প্রয়ােজন মত পদার্থের উপর যে কোন গুণ বা দোষের আরােপ করা যায়, সে সকলই মায়াময়। কারণ কল্পনা অনুসারেই গুণ বা দোষের প্রতীতি জন্মে। কল্পনা, অনুরাগ অনুসারে ঘটে; এবং অনুরাগ বা দ্বেষ মায়ার প্রবাহে উৎপন্ন হয়। সুতরাং এক মায়াকে পরিত্যাগ করিতে পারিলে রাগ, দ্বেষ, কাম, ক্রোধ, ইষ্টানিষ্ট ইহার কিছুরই উপলব্ধি থাকে না। সমুদয়ই মায়ার খেলা বা মােহ বিস্তার মাত্র। মায়াস্তর অতিক্রম করিতে সমর্থ হইলে জগতে কোন কিছু কর্তব্যমাত্ৰ বােধও থাকিবে না। কারণ যাহার নিকট বমাত্রেই মায়াময় বলিয়া নির্ধারিত হইয়াছে তাহার. আর কাহার প্রতি কি কৰ্তব্য সাধিত হইবে? হিতাহিতই বা কি বিবেচিত দুইবে ? বেদবিধিতে যাহা কৰ্তব্যাকৰ্তব্য বলিয়া নির্ধারিত হইয়াছে, তাহা পরমার্থদশী নীর পক্ষে নহে ভ্রমে পতিত অদুরদর্শী জ্ঞানীর মঙ্গলের জন্যই তপু ব্যবস্থা।

শ্রীকৃষ্ণ যিনি গুণের প্রবাহ অতিক্রম করিয়াছেন, তাঁহার নিকট উৎকৃষ্ট বা নিকৃষ্ট ভাব কিছুই নাই। যাহারা গুণ প্রবাহে পতিত, তাহার বর্গেই যাউক বা নরফেই থাকুক, দুঃখ ভােগের হস্ত হইতে তাহাদের কোথাও নিস্তার নাই। উদযুক্তেন্দ্রিয়গ্রামে যুক্তচিত্ত ইদং জগৎ। আত্মনী বিতমাত্মানং ময্যধীশ্বরে। ৭ অতএব প্রথমতঃ ইন্দ্রিয়গ্রামকে নিরুদ্ধ করিয়া অন্তঃকরণকে বশীভূত কর। এবং এই ইন্দ্রিয়াদি জীবদেহকে আত্মস্বরূপ জীবচৈতন্তে ও জীচৈতন্যকে পরমাত্মভূত ঈশ্বরচৈতন্তে অবস্থিত অবলােকন কর। আদন—অতএব শান্তিপ্রদ মােক্ষপদ প্রাপ্ত হইতে হইলে প্রথমতঃ দৃশ্যমান জগতের তত্ব-বিচার পূর্বক জীবের আত্মস্বরূপে অবধারণ করা কর্তব্য। জীবমাত্রেরই আধারভূত ব্ৰহ্মতত্ব নিরুপিত হইলেই সাক্ষাৎ মােক্ষ লাভ হয়। গুণের ক্রিয়া,কর্ম। সুতরাং কর্মের দ্বারা গুণফল স্বর্ণভােগাদি সঞ্চিত হইতে পারে। কিন্তু গুণাতীত অগুণস্বরূপ মােক্ষ কখনও কর্মের দ্বারা ঘটিতে পরে পারে না। , জ্ঞানবিজ্ঞানসংযুক্ত আত্মভূতঃ শরীক্ষিণাং। আত্মানুভব তুষ্টাত্ম নান্তরায়ৈহিন্যদে। বেদ তাৎপৰ্য্য অবধায়ণ পূর্বক যখন তাহার উদ্দেশ্য বিষয়ে চিত্ত অভিনিবিষ্ট হয়, তখনই জীবের আত্মস্বরূপের প্রতীতি জন্মে। সুতরাং তৎকালে দেকান্দি যে কোন যােনিই অবলন স্বরূপ থাকুক না কেন, দেহনিঃ ব্যাপারে আর বিশৰ্যপ্ত বা অভিভূত হইতে হয় না। অর্থাৎ যখন জীৰ আত্মস্বরূপ উপলব্ধি করিতে পারে, তৃখন তাহার যে কোন দেহই থাকুক না কেন, কোন বিই আর তাহাকে অভিভূত করিতে পারে না। আস্বাদন-ভােগীর কর্মের প্রয়ােজন। নতুবা তােগসিদ্ধি হয় না। কিন্তু বিনস্পষ্ট যােগর আর কর্মের প্রয়োজন নাই। কেবাক্যের তাৎপর্য সংগ্রহের নাম জ্ঞান এবং তাৎপৰ্য অবধারণ পূর্বক উজে বিষয়ে অভিনিবেশের নাম বিজ্ঞান। এই বিন বলে যােগ সাতাম 5 পরিশিষ্ট ভগবানে আত্মসমর্পণ করিতে সমর্থ হওয়ায়, কি সাধারণ জীব, কি দেবতা, তাহাদের সকলকেই নিজ আত্মাতে আপন আত্মায় স্থায় দেখেন এবং দেবতাও যােগীর আত্মাকে আপন আত্মা বলিয়াই উপলব্ধি করেন। সুতরাং পরস্পর এক ভাবাপন্ন হওয়ায় কে কাহার অনিষ্ট বা ই করিবে ? এই বেদোক্ত বাগ যজ্ঞাদি না করিলেও দেবগণ যােগ অনিষ্ট কয়েন না; বরং একাত্মীভূত হওয়ায় যােগী তাঁহাদের প্রতিপ্রদই হন। দোষযুদ্ধ্যোভয়াতীতে নিষেধাম নিবৰ্ত্ততে। গুণবুদ্ধা চ বিহিতং ন কৰােতি যথার্ডক। বালকগণ যেমন দোষ গুণের প্রতি লক্ষ্য করে না; তদ্রুপ বিনি সােধ গুণ- ভীত মুক্ত পুরুষ, তিনি বালকের স্থায় “দোষ” ইহা বােধ করিয়া নিষিদ্ধ কাৰ্য্য হইতে নিবৃত্ত বা “গুণ ইহা বােধ করিয়াও বিহিত কাৰ্যে আসক্ত হন না। আস্বাদন-বিহিতাচরণের অভাব ঘটিলেও জ্ঞানবান্ বােগী কখনও স্বেচ্ছা- চারী ক্রয়কৰ্ম্মা হন না। কারণ, তাঁহার যখন কোন পদার্থের প্রতি দ্বেষ বা আসক্তিই থাকে না, তখন পূর্ব সংস্কার বশতঃ বরং দুদ্ধৰ্ম্ম হইতে সতত তাহার নিবৃত্তি আসাই সম্ভব। এবং অনাসক্তি বশতঃ কখনও প্রবৃত্তি আসার সম্ভাবনা নাই। তবে বালকের দ্বার উদ্দেশ্য বা সংকর বিহীন হইয়া কেবল দেহযাত্র। নির্বাহাৰ্থ তদুপযােগী কর্মে প্রবৃত্ত হন মাত্র। সর্বভূত সুহৃচ্ছান্তো জ্ঞানবিজ্ঞাননিশ্চয়। পশ্য মদাত্মক বিশ্বং ন বিপষ্ঠেত বৈ পুনঃ। তাহারা উভয়বিধ ইন্দ্রিয়গ্রামকে নিগ্রহ করিয়া শান্ত ও সৰ্ব্বভূতের সুরূপ সমদৃষ্টিসম্পন্ন হয়েন। এবং জ্ঞানবিজ্ঞানে সমৃদ্ধ হইয়া বিশ্ব-সংসার একমাত্র ( সারাৎসার পরমেশ্বর) আমাতে অবস্থিত জানিয়া ঘাের সংসার বিপদে পুনরায় বিপন্ন হন না। আস্বাদন-সেই যােগীর সকল ভূতে সমজ্ঞান থাকায় তাঁহারা কাহারও প্রতি অত্যাচার খটিবার সম্ভাবনা নাই। তিনি অদ্বিতীয় পরমব্রহ্মে জীবমাত্রেই সন্নিবেশ অবলােকন কত পুনরায় সংসার প্রবাহে পতিত হন না। ! , 1 কৃষ্ণ। ~~~~~~~~~~ ht তাহা শুনিয়া উদ্ধব বলিলেন, হে যোগেশ : যােগবিন্ন্যাস। যােগাত্ম। মােগসম্ভব ! জীব যে যোগনুষ্ঠানের জন্ত যত্নবান হয়, সে প্রবৃত্তিও আপনি তাঁহাদের হৃদয়ে উদয় করিয়া দেন। ঘােগ সাধনের উপায়ভূত কর্ম, ভক্তি ও জ্ঞান আপনিই যােগীর হৃদয়ে প্রদান করেন। এবং যােগসাধনে যােগীর হৃদয়ে যে পরমার্থ অষের উদয় হয়, তাহাও আপনার স্বরূপ মাত্র। মুক্তি লাভের নিমিত্ত সন্ন্যাস লক্ষণ, ত্যাগের বিষয় আপনি আমায় উপদেশ দিলেন বটে, কিন্তু বিষয়-আশয়ে যাহাদের চিত্ত নিরন্তর ব্যাপৃত, আপনার প্রতি তাহাদের লক্ষ্য থাকে না। তাদৃশ জনগণের পক্ষে কাম্য বিষয়ের পরিহার যে নিতান্তই অসম্ভব, তাহা আমার ধ্রুব বিশ্বাস। এইজন্য বলিতেছি আপনি যাহাকে ত্যাগ সম্বন্ধে উপদেশ দিতেছেন, সেই আমি সংসারে ঘাের আসক্ত ; দেহ, গেহ, পুত্রকলাদিতে মােহমুগ্ধ হইয়া আছি। অতএব আমি এমন অবস্থায় আপনার উপদেশ যেরূপে কাৰ্যকরী করিতে পারি, তাহাই বলুন। কারণ ব্ৰহ্মাদি যে কোন দেহধারী এই জগতে বিরাজ করিতেছেন, তাহারা সকলেই তােমার মায়ামােহিত হইয়া বিষয়াভিমুখী ও দেহ-গেহাদি অহঙ্কারে নিমগ্ন । আপনি ব্যতীত ইহার মীমাংসক আর কেহই নাই। শ্রীকৃষ্ণ বলিলেন পরম তত্ত্বানুসন্ধানকারী বিচক্ষণ ব্যক্তিগণ বিবেক বুদ্ধি দ্বারা অশুভ বাসনা হইতে সৰ্ব্বদাই আপনাকে রক্ষা করিয়া থাকেন। মনুষ্য দেহধারী পুরুষের কথা দূরে থাকুক, সাধারণতঃ জীবমাত্রের আত্মাই হিতাহিত জ্ঞান বিচারে প্রধান গুরু। কারণ সত্যপরায়ণ বিবেক প্রত্যক্ষ ও অনুমানাদির সাহায্যে জীবকে পরম পুরুষাৰ্থ স্বরূপ জীবতত্ত্ব উপলব্ধি মানব যখন আত্মনাত্ম বিচারক সাংখ্য জ্ঞান ও তগবদুপাসনা রূপ যােগমার্গে বিশেষ কুশলতা লাভ করত দেহাদি ইন্দ্রিয়গণকে সম্যক বশীভূত করিতে সমর্থ হয়, তখনই সৰ্বশক্তিমান্ সৰ্বেশ্বর আমাকে অবগত হইতে পারে। সমুদয় প্রাণীর মধ্যে মনুষ্যই আমার প্রিয়। বুদ্ধি প্রভৃতি এয়ােবিংশ তত্ত্বই জঙু। চৈতন্যস্বরূপের অনুগ্রহ ব্যতীত কখন বুদ্ধাদি জড় পদার্থে প্রকাশ-ভাব বা জ্ঞানের অভিব্যক্তি হয় না; ইত্যাদি যুক্তি ও অনুমান দ্বারা ইন্দ্রিয়াদির পরিশিষ্ট। ১৭ * অগোচর সর্বেশ্বর আমিই যে সকলের প্রবর্তক তাহা অপ্রমত্ত সমাহিত-চেত ব্যক্তিগণ এই পুরুষ দেহেই বিশেষরূপে নির্ণয় করিয়া থাকেন। সমুদয় পদার্থই জড়। জড়ে চৈতন্যশক্তির সন্নিবেশ না হইলে তাহা অচেতন। ধীমাগণ জীব-জগৎকে বিচার করিলে দেখেন, গােড়ায় সমুদয়ই জড় পদার্থ। জড় চৈতন্যযুক্ত হইয়াই সচেতন হইয়াছে। এই চৈতন্যের খেলাতেই জগতের অভিব্যক্তি। চৈতন্য ছাড়া জগৎ জড়। ইন্দ্রিয়াদি যাবতীয় বিষয় পরিমাপক পদার্থই জড়। একমাত্র চেতন তিনি। তাহার সত্তা বা অধিষ্ঠানেই সকলে কাৰ্য্য করে, নতুবা জড়ের ন্যায় নিরর্থক পড়িয়া থাকে। যাহার আবির্ভাব বা বিদ্যমানত-গুণে সকলেই স্ব স্ব সামর্থ্যের পরিচয় দেয়, তিনিই ব্রহ্মস্বরূপ। এইজন্য বিচারবুদ্ধিবিশিষ্ট মানব দেহাতিরিক্ত চৈতন্যের অনুসন্ধানে ধ্যানযােগাদি দ্বারা আত্মায় সমাহিত হন। তাহা হইতেই সমুদয় শক্তি জগতে বিচ্ছুরিত হইতেছে। অতএব এ স্থলে অনুকূল প্রতিকুল বিচারে আত্মবিবেকই যে আহােদ্ধারের উপায়, তৎসম্বন্ধে অমিততেজা অবধূত ও পরম বিবেকী যদুরাজের সংবাদ কহিতেছি শুন:- একদিন পরম ধাৰ্মিক যদু একটী তরুণ বয়স্ক পরম বিবেকী ব্রাহ্মণকে নিয়চিত্তে ইতস্ততঃ বিচরণ করিতে দেখিয়া বলিলেন, হে ব্ৰহ্মণ! আপনি ইন্দ্রিয়চরিতার্থের জন্য কোন কৰ্ম্মই করিতেছেন না, কাহার আশ্রয়ে আপনি জ্ঞানবান হইয়া বালকের ন্যায় বিচরণ করিতেছেন? মানুষ আয়ুঃ, শ্রী ও যশের জন্য ধৰ্মার্থকামাদির অনুষ্ঠান বা তৎসাধনের বিচারে প্রবৃত্ত হয়। কিন্তু আপনি এই তরুণ বয়স্ক, সামর্থ্যবান্ জ্ঞানী, কাৰ্যদক্ষ, শ্রীমান্ ও মিতভাষী হইয়াও জড়, উন্মত্ত ও পিশাচের ন্যায় আচরণ করিতেছেন; সম্পূর্ণ নির্লিপ্তের ন্যায় ব্যবহার করিতেছেন; জগতের কোন পদার্থের প্রতিই আপনার আকাঙ্ক্ষা নাই। সম্পূর্ণ নির্লিপ্ত হইয়া শান্তিপ্রস্রবণে ভাসমান লক্ষিত হইতেছেন। আপনি অনাসক্তচিত্তে সর্বক্ষণ যে পরমানন্দ উপভােগ করিতেছেন, তাহার কারণ জানিতে উৎসুক হইয়াছি; কৃপা পূৰ্ব্বক আকাঙ্ক্ষা পূরণ করুন। তাহা শুনিয়া ব্রাহ্মণ বলিলেন, হে রাজেন্দ্র ! আমি বুদ্ধি বলে যাহাদের নিকট হইতে যে সমুদয় উপদেশ শিক্ষা করিয়াছি, আমার তেমন গুরু অমেক ; [ ৩ ] ১৮ শ্রীকৃষ্ণ। তাহা আপনাকে বলিতেছি!—যথা পৃথিবী, বায়ু, আকাশ, জল, অগ্নি, চন্দ্র, সূৰ্য্য, পারাবত, অজগর, সমুদ্র, পতঙ্গ, মধুমক্ষিকা, হস্তী, ভ্রমর, হরিণ, মৎস্য, পিঙ্গলাবেশ্যা, কুররপক্ষী, বালক, কুমারী, শর-নির্মাতা, সর্প, মাকড়সা ও প্রজাপতি (আরসােলা) এই চব্বিশটী গুরু। পৃথিবীর সহিষ্ণুতা দর্শনে বুঝিলাম, ভূত সমূহ দৈবাধীন, প্রপীড়িত হইলেও সদাচার ও কর্তব্য-ভ্রষ্ট হওয়া উচিত নহে। পাদপ ও পৰ্বতের ন্যায় পরােপকারী হওয়া প্রয়োজন। বায়ু সুগন্ধ ও দুর্গন্ধ বহন করিয়া সর্বত্র বিরাজিত হইলেও যেমন সর্বদাই অনাসক্ত, তদ্রপ সংসারে সর্ববিষয়ের মধ্যেই অনাসক্ত ভাবে কালযাপন করা উচিত। দেহ-ধর্মে লিপ্ত হওয়া কৰ্ত্তৰ নহে। আকাশ যেমন সৰ্বত্ৰ সৰ্ব্ব পদার্থের বাহাভ্যন্তরে বিদ্যমান থাকিলেও তাহার চ্ছেদ, ভেদ ও সংসর্গ ভাব নাই ; মতিমাও তদ্রুপ আত্মাকে এক অবিচ্ছিন্ন, সর্বব্যাপী ও অসংস্রবী, অসীম ও বিরাট বলিয়া জানিবেন। জল যেমন সকলের মলিনতা দূর করে, তদ্রুপ স্বভাবতঃ উপকারী মধুরালাপী পবিত্ৰাত্মা মুনি, দর্শন, স্পর্শন ও ভগবদ্গুণ কীৰ্ত্তন দ্বারা মনুষ্যকে পবিত্র ও আনন্দিত করিবেন। অগ্নি যেমন শুচি অশুচি সৰ্ব্ব পদার্থকে ভক্ষণ করিয়াও অশুচি হন না, তদ্রুপ তপােদীপ্ত চিত্ত ধ্যানপরায়ণ অক্ষুব্ধহৃদয় যােগী ইন্দ্রিয় নিগ্রহ করত সৰ্বভুক হইলেও ভোগজনিত পাপে লিপ্ত হন না। যেমন অগ্নির নিজের কোন আকার নাই; কিন্তু যে কাষ্ঠ অবলম্বনে প্রকাশিত হন তাহার আকারেই আকারিত হন, তদ্রুপ সৰ্বময় অত্মা নিরাকার হইলেও প্রকৃতির বশে দেব-তিৰ্য্যগাদি যে কোন শরীরে প্রবেশ করেন, সেই আকার বিশিষ্ট বলিয়াই অনুমিত হইয়া থাকেন। যেমন অগ্নিদেব কাঠাদির অন্তরে নিহিত থাকিলেও সময়ে সময়ে প্রকাশিত হইয়া যাজ্ঞিক-পুরুষগণের আহুতি গ্রহণ পূর্বক তাহাদের পাপরাশি ধ্বংস করেন, তদ্রুপ মুনিগণ প্রচ্ছন্ন থাকিলেও সময়ে সময়ে আত্মপ্রকাশ করত আগমন করিয়া দানাদি গ্রহণে জীবের অমঙ্গল নাশ করিয়া থাকেন। যেমন দর্শনযােগ্য স্থানে অবস্থান জন্য চন্দ্রকলার হ্রাস বৃদ্ধি ঘটে বলিয়া অনুমান হয় ; প্রকৃত পক্ষে চন্দ্রের কোন হ্রাস বৃদ্ধি হয় না; তদ্রুপ কালগতিতে বিঘূর্ণিত জন্ম মরণাদি ভাব সমূহ কেবল দেহেতেই প্রকাশ পায়, আত্মার তাহাতে কোন বিকারই লক্ষিত হয় না।

পরিশিষ্ট। সূৰ্য্য যেমন জল বিশিষ্ট ভিন্ন ভিন্ন পাত্রে প্রতিবিম্বিত হইয়া বালক-বুদ্ধি লােকের নিকট বহুরূপে প্রতীয়মান হন, সেইরূপ এক পরমাত্মা বহু দেহে অধিষ্ঠিত থাকায় মূখগণ তাহাকে বহু বলিয়া অবধারণ করে। এক কপােত ও কপােতী সন্তানগণের মায়ায় অত্যন্ত মােহিত ছিল। একদিন তাহারা সন্তানগণের জন্য আহারান্বেষণে গমন করিলে এক ব্যাধ আসিয়া তাহাদের সন্তানগণকে জালে বদ্ধ করিল। তাহারা ফিরিয়া আসিয়া তাহাদের তদ্রুপ অবস্থা দেখিয়া অতি স্নেহপরায়ণা কপােঙী সন্তানম্নেহে কাতর হইয়া স্বেচ্ছায় সন্তানগণের নিকট উপস্থিত হইয়া জালবদ্ধ হইল। তাহা দেখিয়া কপোতও স্নেহভারাক্রান্তহৃদয়ে তৎক্ষণাৎ তাহাদের সঙ্গলাের্থ আকুল হইয়া জালে বদ্ধ হইল। ব্যাধ সানন্দচিত্তে তাহাদিগকে ধরিয়া লইয়া গেল। পারাবতের ন্যায় মােহমুগ্ধ অশান্তচিত্ত জীব স্ত্রীপুত্রাদির ভরণপােষণ মােহে বিষয় সম্ভোগকেই জীবনের সার জ্ঞান করিয়া আত্যন্তিক দুঃখের ফাঁস নিজেই গলায় পরে। মুক্তির প্রশস্ত দ্বারস্বরূপ মানবজন্ম লাভ করিয়া যাহারা বিহঙ্গমের ন্যায় মায়ামােহে সমাচ্ছন্ন হইয়া বিষয়সম্ভোগেই আসক্ত থাকে, তাহারা উন্নতির উচ্চ সােপানে আরােহণ করিলেও জ্ঞানীগণ তাহাদিগকে অধঃপতিতই বলিয়া থাকেন। স্বর্গ ও নরক উভয় স্থানেই প্রাণীদিগের ইন্দ্রিয় জনিত সুখ দুঃখ সমান ; সুতরাং পণ্ডিতগণ তাহা অভিলাষ করেন না। খাদ্য সুরস বা বিরস, অধিক বা অল্পই হউক, যদৃচ্ছাক্রমে উপস্থিত হইলেই উদাসীন হইয়া অজগরের ন্যায় তাহা গ্রহণ করিবে। যদি তাহা উপস্থিত হয়, তবে তাহা “দৈবের ইচ্ছা জানিয়া তাহার ন্যায় ধীর ভাবে নিরাহার ও নিরুদ্যম হইয়া দৈবের উপর নির্ভর করিয়া এক স্থানেই অবস্থান করিবে; আহার সংগ্ৰহাৰ্থ অন্য স্থানে যাইবে না। ইন্দ্রিয়, দেহ ও মনের সামর্থ্য সত্তেও কোন সামর্থ্যের প্রতি লক্ষ্য না করিয়া অসমর্থের ন্যায় নিশ্চল হইয়া কেবল পরমাত্মা চিন্তাতেই চিত্তকে অভিনিবিষ্ট রাখিতে হইবে। ইন্দ্রিয় থাকিতেও বিকলেন্দ্রিয়ের ন্যায় ভগবানের উপর নির্ভর করিয়া ইন্দ্রিয়ভােগ্যবিষয় হইতে বিরত থাকিতে হইবে। মুনি নিশ্চল সমুদ্রের ন্যায় গম্ভীর ও প্রশান্ত ভাব অবলম্বন করিবেন।

२० শ্রীকৃষ্ণ। { অন্তের উত্তেজনা বা আসক্তির কুহকে কোনরূপে উত্তেজিত বা ব্যাকুল হওয়া কৰ্তব্য নহে। বর্ষায় নদীগণ বিপুল জলরাশি লইয়া, সমুদ্রে মিলিত হইলে, সমুদ্র যেমন জলসম্পদে উন্মত্ত হইয়া তীর ভূমি অতিক্রম করে না এবং গ্রীষ্মে নদীগণ শুষ্কতােয়া হইলেও জলধি পরিশুষ্ক হয় না। তদ্রুপ সম্পদ বা বিপদে মুনিগণের হৃষ্ট বা ক্ষুব্ধ হওয়া উচিত নহে। নারায়ণে মনােনিবেশ পূৰ্ব্বক নিশ্চিন্তমনে দিনপাত করাই কর্তব্য। যে ব্যক্তি ভগবানের মায়াস্বরূপা কুহকিনী কামিনীকে দর্শন করিয়া অজিতেন্দ্রিয়ের ন্যায় তাহার হাবভাব ও বিভ্রমাদিতে প্রলােভিত হয়, সে প্রজ্বলিত হতাশনে রূপমুগ্ধ পতঙ্গের ন্যায়ই অচিরে বিনষ্ট হয়। যােষিদ্ধিরণ্যাভরণাম্বরাদিদ্রব্যেষু মায়ারচিতেষু মূখ। প্রলােভিতাত্মা হপভােগবুদ্ধ্যা পতঙ্গবন্নতি নষ্টদৃষ্টি। শুধু নারী কেন, যে কামিনী কাঞ্চন, দিব্যালঙ্কার ও দিব্যারাদি প্রলোভনের যে কোন মায়ারচিত বিষয়ে উপভােগ বুদ্ধিতে আসক্ত হয়, তাহার হিতাহিত জ্ঞান তিরােহিত হওয়ায় নিতান্ত মুগ্ধ পতঙ্গের ন্যায় নষ্ট হয়। । স্তোকং স্তোকং গ্রসেদ্গ্রাসং দেহে বৰ্ত্তেত যাবত। গৃহানহিংসন্নাতিষ্ঠেত্তিং মাধুকরীং মুনিং। যে পরিমাণ অন্ন ভােজনে দেহ রক্ষা হয়, তদ্রুপ অন্ন সংগ্রহ করা কর্ত্তব্য। মধুকর যেমন বহু পুষ্প হইতে অল্প অল্প মধু সংগ্রহ করিয়া উদর পূর্ণ করে, যােগীও সেইরূপ এক গৃহস্থকে উৎপীড়ন না করিয়া বহু গৃহস্থের নিকট হইতে অল্প অল্প করিয়া আপন আবশ্যক অন্ন সংগ্রহ করিবেন। মধুকর যেমন পুষ্পের সৌন্দর্যের প্রতি দৃষ্টি না করিয়া তাহার সার পদার্থ মধুমাত্র সংগ্রহ করে, তদ্রুপ বিচক্ষণ ব্যক্তিও ক্ষুদ্র বা বৃহৎ সকল শাস্ত্র হইতে সার সংগ্রহ করিয়া জ্ঞান সঞ্চয় করেন। সায়ন্তনং শস্তনং বা ন সংগৃহ্নীত ভিক্ষিতং। পাণিপাত্রোদরামত্রো মক্ষিকেব ন সংগ্রহী। সন্ন্যাসীর সঞ্চয়ী হওয়া উচিত নহে। এক দিনের উপযােগী ভিক্ষাই ৭ পরিশিষ্ট। f * 4 সংগ্রহ করা কর্তব্য। হস্তই তাহার ভােজনপাত্র, উদরই তঁাহার সঞ্চয়স্থালী। তাহার পৃথক সঞ্চয় ভাণ্ডের আবশ্যক নাই। সন্ন্যাসী সঞ্চয়ী হইলে মধুমক্ষিকার ন্যায় বিনষ্ট হইবেন। সায়ন্তনং শস্তনং বা ন সংগৃহীত ভিক্ষুক। মক্ষিকা ইব সংগৃহ্ন সহ তেন বিনশ্যতি । মধুজীবী যেমন মধুর অন্বেষণে মধুমক্ষিকাকে বিনষ্ট করত মধুচক্র হইতে মধু সংগ্রহ করে। সেইরূপ দুই এক দিনের অনুসঞ্চয়ী ভিক্ষুকও প্রবল শত্রুর হস্তে বিনষ্ট হন। পদাপি যুবতীং ভিক্ষুর্নস্পৃশেদ্দারবীমপি। স্পশ করীব বধ্যেত করিণ্যা অঙ্গসঙ্গতঃ। সন্ন্যাসীর পক্ষে রমণী সংস্রব অতীব দূষনীয়। সামান্য মাংসময়ী যুবতীর কথা দূরে থাকুক, দারুময়ী বা কাষ্ঠ নিৰ্ম্মিত যুবতীর মূর্তিকে চরণ দ্বারাও স্পর্শ করিবে না। যদি কখন রমণীর সঙ্গ প্রীতিকর বিবেচিত হয়, তাহা হইলে করিণী সংসর্গে বিমুগ্ধ হস্তীর ন্যায় তাহারও সংসার বন্ধন অনিবার্য হইয়া উঠে। জ্ঞানবান্ ব্যক্তির ভােগ্য-বুদ্ধিতে নারীতে আসক্ত হওয়া উচিত নহে। বরং তাহাকে আপনার মৃত্যুৰূপেই দর্শন করা উচিত। কারণ, বিমােহিতের ন্যায় নারীতে আত্মসমর্পণ করিলে বলবা হস্তী দ্বারা স্ত্রৈণ হস্তীর নিধনের ন্যায় স্ত্রী-সম্ভোগে দুৰ্বলচিত্তপুরুষ সহজেই প্রবল ব্যক্তি কর্তৃক নিহত হয়। লােভী ব্যক্তিগণ অতি কষ্টে যে ধন সংগ্রহ করে, তাহারা তাহার সদ্ব্যয় করিতে পারে না; এবং ক্ষয় হইবার ভয়ে নিজেও ভােগ করে না। ফলে মধুজীবিগণ যেমন মধু অন্বেষণে মধুচক্রের সন্ধান পাইয়া অনায়াসেই অহা আহরণ করে; তদ্রুপ, সন্ধান পাইয়া কৃপণের ধনও অন্য লােকে বলপূর্বক হরণ করে। গৃহস্থ সুখ-স্বচ্ছ ভাৰ্থ অতি কষ্টে যে-ধন সংগ্রহ করে, যতির-গুভাগমন হইলে . অনায়াসেই তাহার অগ্রভাগ তাহাকে প্রদান করে।

২২
শ্রীকৃষ্ণ।
বনবাসী যতির গ্রাম্য গীত শ্রবণ করা কর্তব্য নহে। বংশীধ্বনি শ্রবণে
বিমােহিত চিত্ত হরিণ যেমন মৃত্যুমুখে পতিত হয়, তদ্রুপ গ্রাম্য গীতে যতির চিত্ত
মােহিত হইলে তাহাকে সংসারে নিবদ্ধ করে।
নারীদিগের নৃত্য, গীতবাদ্য শ্রবণ ও দর্শনে মৃগী তনয় ঋষ্যশৃঙ্গ যেমন
তাহাদিগের ক্রীড়াপুত্তলি হইয়াছিল ; তদ্রুপ যে কোন ব্যক্তি নারীর ভাবে
মােহিত হয়, তাহাকে তাহাদের বশীভূত হইতে হয়।
জিহ্বয়াতিপ্রমাথিন্যা জনাে রসবিমােহিতঃ।
মৃত্যুম্বচ্ছত্যসদ্ধির্মীনস্তু বড়িশ্যৈথা ।
আমিষ লােভে মীন যেমন বড়িশ-বিদ্ধ হইয়া মৃত্যুমুখে পতিত হয়, তদ্রুপ
অসদুদ্ধি ব্যক্তি দুর্জয় রসনার তৃপ্তিসাধন জন্য নব নব ভােজ্যের নব নব
রসাস্বাদনে বিমােহিত হইয়া অচিরেই কালসদনে গমন করে।
ইন্দ্রিয়াণি জয়ন্ত্যাশু নিরাহারা মনীষিণঃ।
বর্জয়িত্ব। তু রসনং তন্নিরন্নস্য বর্ধতে।
ধীমান্ ব্যক্তিগণ কেবল আহার পরিত্যাগ করিয়া প্রায় সকল ইন্দ্রিয়কেই
সত্বর বশীভূত করিতে পারেন বটে, কিন্তু তাহাতে রসনেন্দ্রিয়ের রসানুরাগ যেন
উত্তরােত্তর পরিবর্ধিতই হইয়া থাকে।
তাবজ্জিতেন্দ্রিয়ােন স্যাদ্বিজিতেন্দ্রিয়ঃ পুমান্।
ন জয়েত্রসনং যাবজ্জিতং সং জিতে রসে।
তজ্জন্য রসনাকে জয় না করিয়া অন্য সকল ইন্দ্রিয়কে বশীভূত করিলে
তাহাকে জিতেন্দ্রিয় বলা যায় না। রসনাকে জয় করিলে সকল ইন্দ্রিয়কেই
অনায়াসেই জয় করা যায়। কারণ প্রলুব্ধ হইয়া বিবিধ রসসংযুক্ত খাদ্যে রসনা
পরিতৃপ্তি কৰিলে ইন্দ্রিয়গ্রাম তাহাতে “উনাের বলবান্ ও উদ্ধৃঙ্খল হইয়াই
উঠে। কিন্তু রসনা জয় করিয়া দেহ রক্ষাৰ্থ পরিমিতাহারে পরিতুষ্ট থাকিলে
ইন্দ্রিয় সমূহ ক্রমশঃ হীনবল ও বশীভূত হইয়া থাকে।
পিঙ্গলা বেশ্যা একদিন রাত্রিকালে বেশভূষায় সজ্জিত হইয়া রাজপথের
--

পরিশিষ্ট। পার্শ্বে বসিয়া উপপতির আগমন প্রতীক্ষা করিতেছিল রাত্রি স্বা সঙ্গে সঙ্গে বহু পুরুষ তাহার পার্শ্ব দিয়া চলিয়া গেল, কিন্তু কেহই তাহার নিকট উপস্থিত হইয়া অর্থ দান পূর্বক সম্ভোগ প্রার্থনা করিল না দেখিয়া, পিঙ্গলা অত্যন্ত চঞ্চল হইয়া উঠিল এবং ক্রমশঃ রজনী মৃত অৰ্তীত হইতে লাগিল তাহার চাঞ্চল্যও তত বৃদ্ধি পাইতে লাগিল। পরে চতুর্থ প্রহরে সে একান্ত হতাশ হইয়া গৃহে গমন করত শয্যায় শয়ন করিয়া চিন্তা করিতে লাগিল -“আমার ন্যায় হতভাগিনী আর নাই। কারণ যাহা হইতে কাম্য বস্তু সমূহের উদ্ভব হইয়াছে, যে হৃদয়স্বামীকে পাইয়া রমণানন্দ উপভােগ জন্য মুনিঋষিগণ কত কঠোর তপস্যায় সহস্র সহস্র বৎসর গুহায় ধ্যানে নিরত থাকেন, যাহাকে পাইলে জীবের আর উদ্বেগ আকাঙ্ক্ষা কিছুই থাকে না, আমি তাহাকে পরিত্যাগ করিয়া নশ্বর পুরুষের সম্ভোগ প্রার্থনায় আশার ছলনায় অসহ্য যন্ত্রণা ভােগ করিতেছি! ছি! ছি! আমাকে ধিক। কৃমি ক্লেদবিশিষ্টশরীর পুরুষ, আমায় কি সুখ দিতে পারে ? ভগবানের কৃপায় আজ আমার এই নীচ বাসনার অবসান হইল। আমার এ শরীর ভগবান্ ভিন্ন আর আমি কাহারও নিকট বিক্রয় করিব না।” সুহৃৎ প্রেষ্ঠতমম নাথ আত্মা চায়ং শরীরিণাং । তং বিক্রীয়াত্মমৈবাহং রমেহনেন যথা রমা । ভগবান্ নারায়ণ দেহীমাত্রেরই পরমপ্রিয় হিতকারী হৃদয়স্বামী ও আত্মা । অতএব দেহাদি সমৰ্পণ-পূৰ্ব্বক আত্ম বিনিময় দ্বারা ঐশ্বৰ্য্যস্বরূপা কমলার স্যায় তাহার সহিত বিহার করিব। কিয়ৎ প্রিয়ং তে ব্যভজন্ কামা যে কামদা নরঃ। আদ্যন্ত্রবন্তো ভাৰ্যায়া দেবা বা কালবিতাঃ ॥ কাম্যবিষয় ও কাম মনুষ্য বা দেবতা দ্বারা পত্নীর কবে কি সুখােদয় হইয়াছে? কারণ উহারা সকলেই ত উৎপত্তি ও বিনাশের হেতুভূত হইয়া কাল কর্তৃক সতত বিধ্বস্ত হইয়া থাকে। আহা! আজ আমি ধন্য ! কারণ আমার পূর্ব সঞ্চিত সুকর্মের ফলেই

২৪
শ্রীকৃষ্ণ।
বুঝি ভগবান্ আমার প্রতি প্রসন্ন হইয়াছেন। নতুবা আমার স্যায় পাপিয়সীর
হৃদয়ে আজ ভগবৎ স্মরণে বৈরাগ্যের উদয় হইবে কেন ? আজ সৰ্ব্ব কুবাসনা
পরিত্যাগ পূর্বক তাহার শরণ লইলাম। যথালব্ধ ভিক্ষা দ্বারা শরীর পােষণ
করিয়া তাহার নামকীর্তন করিয়াই জীবন কাটাইব। নারায়ণ ব্যতীত সংসার
কূপে পতিত, বিষয়বাসনারূপ বিষমােহে নষ্টবিবেক, কালরূপ মহাসর্পের করাল
কবলে কবলিত জীবগণকে আর কে উদ্ধার করিতে পারে ?
আত্মৈব হাত্মনাে গােপ্ত নির্বিতে যদাখিলাৎ ।
অপ্রমত্ত ইদং পশ্যেৎ গ্রস্তং কালাহিনা জগৎ।
যখন ভ্ৰম প্ৰমাদাদি পরিত্যাগ পূৰ্ব্বক সমগ্র জগৎকে কালকবলে কবলিত
নিরীক্ষণ করিবার শক্তি জন্মে, তখনই এই প্রপঞ্চ (মায়াময় পদার্থ) সকলের
আকর্ষণ বিনষ্ট হয়।
আশা হি পরমং দুঃখং নৈরাশং পরমং সুখং।
যথা সংছিদ্য কান্তাশাং সুখং সুধাপ পিঙ্গলা।
অতএব স্পষ্টই দেখা যাইতেছে যে, আশাই পরম দুঃখ এবং নিরাশাই
পরম সুখের কারণ। যেহেতু, পিঙ্গলা কান্তের আশা পরিত্যাগ করিয়াই সুখে
নিদ্রা গিয়াছিল।
পরিগ্রহহ হি দুঃখায় যদূষৎ প্রিয়তমং নৃণাং।
অনন্ত দুঃখমাপােতি তদ্বিদ্বান্ যকিঞ্চনঃ ॥
মনুষ্যদিগের যে যে বস্তু প্রিয়তম, সেই সেই বস্তুর আসক্তিই দুঃখের কারণ।
যে অকিঞ্চন তাহা জানিয়াছেন, তিনিই অনন্ত সুখ লাভ করেন।
সামিষং কুররং জবলিনােহন্যে নিরামিষাঃ।
তদামিষং পরিত্যজ্য স সুখং সমবিন্দত।
দেখ! যখন একটী কুরর পক্ষী একখণ্ড মাংস লইয়া গমন করে, তখন ।
সেই আমিষ খণ্ডের লোভে অসংখ্য মাংসাশী পক্ষী প্রাণবধর্থ তাহার

পরিশিষ্ট। পশ্চাদনুসরণ করে। কিন্তু বিপন্ন কুরর যখন বিপদ সমাগত দেখিয়া যেমন তাহা ফেলিয়া দেয়, অমনি তাহারা অতুল ব্যগ্রতা সহকারে তাহা গ্ৰহণার্থ বেগে গমন করে। এদিকে মাংসখণ্ড পরিত্যাগের সঙ্গে সঙ্গে কুয়রের বিপদও কাটিয়া যায়; সে নিশ্চিন্ত মনে অবস্থান করত শান্তি লাভ করে। ঐশ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব বলিয়াছেন “এক চিল একটা মাছ ধরে নিয়ে যাচ্ছিল, তা দেখে ঘত কাক চিল তার পিছু নিয়ে তাকে তাড়া কত্তে লাগলাে, সে কোথাও স্থির হতে না পেরে মাছটাকে ফেলে দিলে, কাক চিলগুলাে সব সেই দিকেই গেল। সে উচু গাছের উপর স্থির হয়ে বসে সেই মাছের জন্যে তাদের মারামারি দেখতে লাগল।--ত্যাগেই শান্তি। বিষয় আশয় থাকলেই লােকে লােভের বশে কেড়ে নেবার জন্যে ঐ রকমে জ্বালাতন করে প্রাণ অস্থির করে তুলে। তা থেকে সরে দাঁড়াও, আর তােমার পিছু কেউ লাগবে না। লাভের আশা না থাকলে কেউ লােত করে না। যদি শান্তি চাও, বিষয়, ত্যাগ করে তার উপাসনা কর। বিষয় নিয়ে থাকলে ঐরূপই আলাতন হতে হয়।” স্ত্রী পুত্র পরিবারৰন্ত গৃহীদের ন্যায় আমার কোন মানাপমান জ্ঞান নাই । তজ্জন্ত আমি পরমাত্মাতে চিত্ত সমৰ্পণ করিয়া তাহার প্রেমানন্দে নিরন্তর ভাসমান থাকিয়া বালকের ন্যায় সর্বত্রই সুখে বিচরণ করি। দ্বাবেৰচিন্তয়া মুক্তো পরমানন্দ আপ্লতে। যাে বিমুগ্ধ জড়াে বালাে যাে গুণেভ্যঃ পরং গতঃ। এজগতে দুইজন চিন্তা বিমুক্ত ও পরমানন্দে মগ্ন। তাহাদের একটা সম্পূর্ণ অনভিজ্ঞ বালক, অন্যটী গুণাতীত সৰ্বনিয়ন্তা পরমেশ্বরকে অভেদ চিন্তায় লাভ করিয়া পরমানন্দময় তিমি যােগী। কুমারীকে বিবাহ করিবার জন্য এক ব্যক্তি বান্ধবগণ সহিত তাহার বাড়ীতে উপস্থিত হন। কিন্তু কুমারীর বাড়ীতে সে সময় অভিভাবকগণ উপস্থিত না থাকায় সে নিজেই তাহাদের অভ্যর্থনা করিয়া তাহাদের ভােজনার্থ গােপনে ধান্য কুটিবার আয়ােজন করিল। এবং ধান্যে আঘাত করিবামাত্র তাহার হস্তস্থ শঙ্খবলয় সমূহের বিষম ধ্বনি হইতে লাগিল দেখিয়া সে ভাবিল, [ ৪ ] শ্রীকৃষ্ণ। এইরূপ ধ্বনি হইলে কুটুম্বগণ, আমি যে ধান্ত কুটতেছি ইহা জানিতে পারিবে । ইহা অত্যন্ত লজ্জার বিষয়। ইহা ভাবিয়া সে উভন্ন হস্ত হইতে এক এক গাছি বালা খুলিয়া ফেলিল। অতঃপর পুনরায় আঘাত করিলে আবার শব্দ হইল দেখিয়া দুই হন্তে দুই গাছি রাখিয়া অবশিষ্ট খুলিয়া ফেলিলে আর শব্দ হইল না। দ্বারা এই শিক্ষা লাভ হইল যে, বাসে বহুনাং কলহে ভবেদ্বাৰ্তা দ্বয়ােরপি। এক এব বসেত্তস্মাৎ কুমাৰ্যা ইব কঙ্কণঃ । অনেকে এক সঙ্গে বাস করিলে কলহ জন্মে ; দুই জনে থাকিলেও বৃথালাপে সময় যায়। অতএব কুমারীর কঙ্কণের ন্যায় একাকী বাস করিলে কলহ বা বৃথালাপের সম্ভাবনা নাই। মন একত্র সংযুঞ্জাজ্জিতশ্বাসাে জিতাসন। বৈরাগ্যাভ্যাসযােগেন প্রিয়মাণমতন্ত্রিতঃ ॥ প্রথমতঃ অলস্যাদি পরিত্যাগ পূর্বক আসন ও প্রাণকে জয় করা কর্তব্য। তাহাতে মনের বৃত্তি স্বতঃই নিবৃত্ত হইয়া আসে। কিন্তু পাছে পুনরায় বিষান্তরে সংযুক্ত হয় এই নিমিত্ত বৈরাগ্যের অভ্যাস করত সমাহিত চিত্তে কোন একটা লক্ষ্য বস্তুতে মনকে আবদ্ধ রাখা কর্তব্য। যস্মিন্মনাে লাস্পদং যদেতচ্ছনৈঃ শনৈমুঞ্চতি কৰ্মরেন্। সত্ত্বেন বৃদ্ধেন রজস্তম বিধূয় নির্বাণুমুপৈত্যনিন্ধনং। মন সহজেই বিলীন ও বিক্ষিপ্ত হইয়া থাকে। কিন্তু যদি পরমানন্দ স্বরূপ ভগবানে সেই মনকে সংযুক্ত করা হয়, তখন সে ধীরে ধীরে কৰ্ম্মবাসনা পরিত্যাগ করিতে আরম্ভ করিলে সেই সময় সত্ত্বগুণ ক্রমশঃ বর্ধিত হইয়া অজস্তমােগুণকে দূরীভূত করে। প্রজ্বলিত কাষ্ঠের অগ্নির ন্যায় চিত্ত আপনিই আপনাতে উপশমিত হয় অর্থাৎ কাষ্ঠ পুড়িয়া গেলে যেমন অগ্নি সহজেই নিবিয়া যায় ; তদ্রপ চিত্ত রজস্তমাদি গুণ মুক্ত হইয়া ধীরে ধীরে শান্তি লাভ করে।

পবিশিষ্ট। এইরূপে চিত্ত সময় পরমেশ্বরে স্থির হইলে তখন আর বাহ বিষয়ে আদৌ থাকে না। এক শর নির্মাতা শরের ঋজুতার প্রতি লক্ষ্য করিয়া এমনই তন্ময় হইয়াছিল যে, একজন রাজা অত্যন্ত জাক জমকের সহিত তাহার নিকট দিয়া গেলেও সে তৎসম্বন্ধে কিছুই জানিতে পারে নাই। মুনি সতত আত্মগােপন করিয়া একাকী নির্জনে বাস করিবেন। যখন তাহার নিজ দেহেরই স্থির নাই, তখন আর তাহার বাসগৃহ নির্মাণ জন্য নিরর্থক ক্লেশ বৃদ্ধির কারণ কি? সর্প যেমন চিরকাল পরগৃহে বাস করে, মুনিরও তদ্রুপ পরের আবাসে নির্বিবাদে কালাতিপাত করা কৰ্ত্তব্য। দেব নারায়ণ পূৰ্ব্ব সৃষ্ট এই জগৎ কল্পান্ত সময়ে কালশক্তি দ্বারা সংহার করিয়া আত্মাধার ও অখিলাশ্রয়রূপে এক ও অদ্বিতীয় হইয়া থাকেন। পরুমাত্মার অনুভব শক্তিস্বরূপ কালের প্রভাবে মায়াময় জগতের কারণ সত্ত্বাদি গুণ সমুহ সাম্য ভাব অবলম্বন পূৰ্ব্বক মূল প্রকৃতিতে বিলীন হইলে, প্রকৃতি পুরুষের নিয়ন্তা, ব্রহ্মাদি শ্রেষ্ঠ ও জীবাদি নিকৃষ্টগণের ফলরূপে প্রাপ্যসত্ত্বাদি উপাধি রহিত মােক্ষস্বরূপ সচ্চিদানন্দময় আদি পুরুষ তৎকালে কৈবল্য নামে অভিহিত হন। সেই চিদানন্দময় ভগবানই আবার আত্মানুভবরূপ কালশক্তি দ্বারা পুনরায় ত্রিগুণাত্মিক স্বকীয় মায়াকে সংক্ষোভিত করত প্রথমতঃ ক্রিয়াশক্তি প্রধান সূত্র স্বরূপ মহত্তত্ব সৃজন করেন। পরে এই বিচিত্র ত্রিগুণাত্মক বিশ্ব সংসারের উৎপত্তির কারণভূত অহঙ্কার তত্ত্ব উৎপাদন করিলেন। ইহাতেই এই বিশ্ব গ্রথিত রহিয়াছে এবং ইহাকেই প্রাণশক্তিরূপে প্রাপ্ত হইয়া জীব সংসদ্ধে বিচরণ করিতেছে। . যথাের্ণনাভিহৃদয়াদূৰ্ণাং সংতত্য বক্তৃতঃ। তয়া বিহৃত্য ভূয়স্তাং গ্ৰসত্যেবং মহেশ্বরঃ ॥ যেমন উর্ণনাভ (মাকড়সা) স্বীয় নাভিজাত উর্ণা (তন্তু বা সূত্র) মুখ দ্বারা প্রসারণ পূৰ্ব্বক জাল বিস্তার করে এবং সেই জালােপরি বিহার করত জালকে স্বয়ংই নিজমুখে সংগ্রহ করিয়া লয় ; ৫) পুনরায় সেই তুপ ২৮ শ্রীকৃষ্ণ। মহামহেশ্বর নারায়ণ আপনি মায়া দ্বারা এই বিশ্বের রচনা করিয়া ক্রীড়ান্তে পুনরায় তাহা স্বয়ংই গ্রাস করেন। যত্র যত্ৰ মনাে দেহী ধারয়েৎ সকলং ধিয়া । স্নেহাদ্দেস্তুয়াদ্বাপি যাতি তত্তস্বরূপতাং । দেহধারী জীব নিশ্চয়াত্মিকা বুদ্ধিযােগে গেহ, দ্বেষ বা ভয়াদি যে কোন কারণ বশতঃ বাহাতে যাহাতে সমগ্ৰ মন ধারণ করে, মরণান্তে তাহারই স্বরূপতা প্রাপ্ত হয়। কীটঃ পেশস্কৃতং ধ্যায় কুড্যাস্তেন প্রবেশিতঃ। যাতি তৎসাত্মতাং রাজন্ পূর্বরূপমসংত্যজ ॥ যেমন দুর্বল কীট (আরশােলা) বলবান্ পেশস্কার (কুমারিয়া পােকা) কর্তৃক ধৃত হইয়া তাহাকে চিন্তা করিতে করিতে জীবদ্দশাতেই তাহার রূপ ধারণ করে ; তদ্রুপ যাহারা একান্তে কোন বিষয় চিন্তা করেন, দেহান্তে যে তাঁহাদের সেই ধ্যেয়রূপ লাভ হইবে, তাহাতে আর সন্দেহ কি ? হে রাজন! এই সমস্ত গুরুর নিকট হইতে আমি যে সমস্ত উপদেশ পাইয়াছি, তাহা আপনাকে বলিলাম। এক্ষণে দেহ বিচারে আমার যাহা জ্ঞান লাভ হইয়াছে তাহা আপনাকে জানাইতেছি। হে রাজেন্দ্র ! দেহের পরিণাম কেবল দুঃখ। উৎপত্তি ও বিনাশ ইহার সঙ্গের সাথী। তথাপি ইহা আমার একজন গুরু। পরিণামে ইহা শৃগালাদির ভক্ষ্য বলিয়া নিশ্চিত থাকায় ইহার প্রতি আসক্তি শূন্য হইয়া বিচরণ করাই কর্তব্য। জায়াত্মজাৰ্থ পশুভৃত্য গৃহাপ্তবর্গা পুষ্ণাতি যৎপ্রিয়চিকীর্ষয়া বিম্ব। স্বান্তে সকৃচ্ছমবরুদ্ধধুনঃ সদেহঃ সৃষ্টাস্য বীজমবসীদতি বৃক্ষধৰ্ম্মঃ । যে দেহের ভােগলালসা পূরণ জন্য লােকে বিবিধ ক্লেশ সহ করত পুত্র, গৃহ, ক্ষেত্র, পশু, ভৃত্য ও বন্ধু বান্ধবাদি বিস্তার পূর্বক অতি কষ্টে ধন সঞ্চয় করিয়া চিরকাল তাহাদের ভরণ পােষণ করে ; পরমায়ুর পরিশিষ্ট। h অবসানে সে দেহও বিনষ্ট হইয়া যায়। সে বিনাশেও দে নাই। বৃক্ষ যেমন বিনাশের পূর্বে বৃক্ষোৎপাদনের বীজ সৃষ্টি করিয়া বিনষ্ট হয়, দেহও সেইরূপ দেহান্তর উৎপাদনের বীজ স্বরূপ বিবিধ কর্মের সৃষ্টি করিয়া বিনষ্ট হয়। জিহৈকতােহমুমপকৰ্ষতি কহিঁতৰ্ষা শিশ্নোহন্য তত্ত্বগুদরং শ্রবণং কুতশ্চিৎ ঘ্রাণােহন্যতশ্চপল কচ কৰ্ম্মশক্তিব্যঃ সপত্ন ইব গেহপতিং লুনন্তি। দেহাভিমানী জীবের নিগ্রহের সীমা নাই। যেমন বহুপত্নীবিশিষ্ট স্বামীকে সম্ভোগার্থ প্রত্যেক বনিতা তাহার এক এক অঙ্গ প্রত্যঙ্গ ধরিয়া স্ব স্ব অভিমুখে আকর্ষণ করত তাহাকে বিপন্ন ও বিপর্যস্ত করিয়া ফেলে, তদ্রুপ দেহাভিমানী মানবের প্রত্যেক ইন্দ্রিয় তাহার অনভিপ্রায়ে স্ব স্ব বিষয়াভিমুখে আকর্ষণ করত তাহাকে নিতান্ত বিপন্ন করিয়া তুলে ;-জি রসের প্রতি, তৃষ্ণা অন্য দিকে, শিশ্ন সম্ভোগে, ত্বক স্পর্শখে, উদর মুখাদ্যে, শ্রবণ সুখকর মধুর শব্দে, ঘ্রাণ মনােরম গন্ধে, চঞ্চল নয়ন রূপতৃষ্ণায় এবং পঞ্চ কৰ্ম্মেন্দ্রিয় পঞ্চ কাৰ্য্যে সতত নিয়ােগ করিয়া জীবকে বিমূঢ় করিয়া ফেলে। সৃষ্ট। পুরাণি বিবিধাজয়াত্মশক্ত্যা বৃক্ষান্ সরীসৃপপশূন খগদলশূকান। তৈস্তৈরতুষ্টহৃদয়ঃ পুরুষং বিধায় ব্রহ্মাবলােকধিষণং মুদমাপ দেবঃ । ভগবান্ স্বীয় মায়াশক্তি প্রকৃতি দ্বারা বৃক্ষাদি স্থাবর ও সরীসৃপ, পশু, পক্ষী, কীট এবং পতঙ্গাদি বিবিধ জীব দেহ রচনা করিয়া বিশেষ তৃপ্তি লাভ না করিয়া ব্ৰহ্মদর্শনােপযােগী বুদ্ধিবিশিষ্ট মানব সৃজন করিয়া বিশেষ আনন্দ লাভ করিলেন। লব্ধ। সুদুল ভমিদং বহুসম্ভবান্তে মানুষমর্থদমনিত্যমপীহ ধীর। তুর্ণং যতেত ন পতেদনুমৃত্যু যাবম্নিশ্রেয়সায় বিষয়ঃ খলু সর্বতঃ স্যাৎ ॥ বহু জন্মের পর সকল পুরুষার্থের সাধনভূত, সুদুর্লভ হইলেও অনিত্য এই মানব জন্ম লাভ করিয়া বােগাদি দ্বারা বিপন্ন হইবার পূর্বেই ইন্দ্রিয়গণকে শ্রীকৃষ্ণ। ~~~~ উচিত নহে। বশীভূত করিয়া সত্বর মােলাভাৰ্থ যত্ন করা কর্তৃব্য। কারণ মৃত্যু সততই দেহের অনুসরণ করিতেছে। অতএব বিষয়সম্ভোগাৰ্থ বৃথা কালক্ষেপ করা কারণ বিষয়ভােগ কাদি সকল যােনিতেই হইয়া থাকে। এই প্রকার বৈরাগ্য বলে আমার আত্মজ্ঞানের উদয় হইয়াছে। সেই সৌভশ্য বলেই আমি দেহ গেহাদির মায়া পরিত্যাগ পূৰ্ব্বক জগৎ পরিভ্রমণ করি। এক গুরুর নিকট হইতে সমুদয় জ্ঞান লাভের সম্ভাবনা নাই। কারণ, ব্ৰহ্ম এক অদ্বিতীয় হইলেও নানা ঋষি তাহাকে নানা ভাবে কীর্তন করিতেছেন। যদুরাজ অবধূতের বাক্য শুনিয়া সৰ্ব্ব সঙ্গ বিনিমুক্ত ও সমদশী হইয়া কালযাপন করিতে লাগিলেন। শ্রীকৃষ্ণ বলিলেন হে উদ্ধব! আমি বৈষ্ণব ধর্মের সম্বন্ধে যাহা যাহা বলিয়াছি, মদাশ্রিত ব্যক্তি তাহাতে সাবধান হইয়া মন হইতে বাসনা পরিত্যাগ পূৰ্ব্বক বর্ণমাদি কুলাচারের অনুষ্ঠান করিবে। বিশুদ্ধচিত্ত ব্যক্তিগণ সর্বদাই অবহিত হইয়া দর্শন করেন যে, বিষয়াসক্ত ব্যক্তিগণ বিষয়কে যথার্থ বােধ করিয়া যে যে কাৰ্য্য করে, তাহাতে বিপরীত ফলই ফলিয়া থাকে। স্বপ্নদর্শন কালে বা কল্পনা বলে মনােরাজ্যে যে সকল বিচিত্র ভােগ্য পদার্থের উদয় হয়, তাহা যেমন মিথ্যা ও বিফল ; তদ্রুপ দেহ বা ইন্দ্রিয়ের দ্বারা নানা প্রকার পদার্থে বুদ্ধির যে আরােপ, তাহা মিথ্যা ও কল্পনা মাত্র। পরমার্থতঃ তাহাতে কোন প্রকৃত ফল লাভ হয় না। অর্থাৎ মনকে অসার দেহ বা ইন্দ্রিয়ের ভােগ্য বিষয়ে সংযুক্ত না রাখিয়া পরমার্থ চিন্তায় নিরত রাখাই কর্তব্য। কারণ মনকে স্কুল বিষয়ে সংযুক্ত রাখিলে ক্ৰমশঃ আসক্তিই বাড়ে। আসক্তিই সর্বনাশের মূল। চিত্ত যত সুক্ষ্ম হইতে সূক্ষ্মতম কারণে নিয়ােজিত হইবে, ততই সে স্বাস্থ্য লাভ করিয়া সুস্থ ও অপরিচ্ছিন্ন শান্তি লাভের অধিকারী হয়। গীতায় উক্ত আছে, সমাহিতচেতা বােগীর বুদ্ধি এক ও শান্তিপ্রদা; সংসারীর বুদ্ধি অনন্ত বিষয়ে প্রসারিত হয় বলিয়া বহুবিষয়িনী ও দুঃখপ্রদা।

পরিশিষ্ট। পূর্ণং ঈশসহন্তু তিক্ত্যব্যক্তচিন্তকাঃ। অব্যক্ত কারণে ঘঁহারা চিত্ত সন্নিবিষ্ট করিতে পারেন, তাহারা দশ সহস্র বৎসর কাল নিরাময়ে আনন্দ উপভােগ করিয়া থাকেন। সর্বদোষশূণ্ঠ পরমানন্দপ্রদ ভগবৎ চিন্তায় চিত্ত যত সমাহিত হয়, ততই তাহার উৎকর্ষ সাধিত হয়; ততই সে সুক্ষ্ম হইতে সুহ্মের দিকে অনায়াসেই অগ্রসর হয় এবং অদ্ভুতপূৰ্বানন্দে নিমগ্ন হইয়া গলিয়া যায়। নিবৃত্তং কৰ্ম্ম সেবেত প্রবৃত্তং মৎপরস্ত্যজেৎ। জিজ্ঞাসায়াং সংপ্রবৃত্তো নাত্রিয়েৎ কৰ্ম্মচোদনাং । আমাকে প্রাপ্ত হইবার জন্তু যাহাদের আকাঙ্ক্ষা আছে, তাহাদের কাম কৰ্ম্ম পরিত্যাগ পূর্বক নিষ্কাম নিত্যনৈমিত্তিক কর্মের অনুষ্ঠান করা কর্তব্য। আত্মতত্ত্ব বিচারে যখন চিত্ত নিরন্তর নিবিষ্ট থাকিবে তখন আর নিষ্কাম কর্মের প্রতিও দৃষ্টি রাখিবার আবশ্যকতা নাই। এবং যমানভীক্ষং সেবেত নিয়মান্ মৎপরঃ কচ্চিৎ। মদভিজ্ঞং গুরুং শান্তমুপাসীত মদাত্মকং। অহিংসা, সত্য, অন্তেয়, ব্রহ্মচর্য ও অপরিগ্রহ এই পঞ্চের নিরন্তর অনুশীলনে যােগা যমকে বিশেষরূপে আয়ত্ত করা বৈষ্ণবের সর্বাগ্রে কর্তব্য। ভগবদ্ভক্তির অনুকূলে শৌচ, সন্তোষ, তপঃ, সাধ্যায় ও ঈশ্বরপ্রণিধান নামক নিয়ম যতদূর সম্ভব পালন করা উচিত। যিনি আমার তত্ত্ব অবগত আছেন, ক্রোধন্বেষাদিশূন্য নিতান্ত ভক্তিমান্ গুরুর নিকট জ্ঞানলাভার্থ উপস্থিত হইয়া তঁাহার সেবা করা বৈষ্ণবের প্রধান কাৰ্য্য। অভিমানশূন্য, মাৎসর্য্যহীন, কাৰ্যতৎপর মায়ারহিত, গুরু ও দেবতাতে ভক্তিমান পরদোষ দর্শনে সম্পূর্ণ উদাসীন, আসক্তিশূন্য ও সত্যবাদী হইয়া পুত্র, কত্র, গৃহ, ক্ষেত্র, স্বজন, বন্ধুবান্ধব ও ধনাদিতে, উপেক্ষা করত সর্বত্র সমদর্শী হওয়া বৈষ্ণবের কর্তব্য। তিনি যেন কোন বস্তুতে আত্মপর বােধে আসক্ত না হয়েন। শ্রুতি বলিয়াছেন “শ্য দেবে পরাভক্তি যথা দেবে তথা, গুরৌ। তস্যৈতে কৃষ্ণ। কঞ্চিতা হা প্রকাশক্তে মহাত্মামঃ।” যাহার দেবতা ও গুরুতে প্রগাঢ় ভক্তি আছে, সেই ব্যক্তিই যােগাদি মুক্তি সাধমের অধিকারী। যে উপযুক্ত গুরুর প্রতি ভক্তি করিয়া সকল বিষয়ের মায়া পরিত্যাগ করিতে পারে, সেই যথার্থ উপযুক্ত পাত্র। বিলক্ষণঃ স্থূলসূক্ষমহোদাত্মেক্ষিতা স্ব। যথাগ্নিদারুণণা জাহাদ্দাহকোহঃ প্রকাশকঃ । যেমন দাহ ( যাহা গ্ধ করে) প্রকাশক ( যাহা প্রকাশ করে) অগ্নি দাহ ( যাহাকে দগ্ধ করা হয়) ও প্রকাশ্য ( যাহাকে প্রকাশ করা হয়) কাষ্ঠ হইতে ভিন্ন পদার্থ, তদ্রুপ দর্শক (যিনি দর্শন করিতেছেন) ও স্ব-প্রকাশ ( যিনি স্বয়ং প্রকাশমান) আত্মা, স্কুল ও সূক্ষ্ম দেহ হইতে পৃথক। অর্থাৎ জীবাত্মা ও পরমাত্মা স্কুল ও সূক্ষ্ম দেহ হইতে সম্পূর্ণ পৃথক। স্ব-প্ৰকাশ চৈতন্য- স্বরূপ জীবাত্মা পঞ্চভূতময় স্কুল ও সূক্ষ্ম দেহে প্রবেশ পূৰ্ব্বক স্থূল ও সূক্ষ্ম দেহরূপে পরিচিত হইলেও যথার্থতঃ তাহা হইতে সম্পূর্ণ ভিন্ন পদার্থ। আস্বাদন-দেহ আত্মা নহে, সুতরাং দেহে আত্মজ্ঞান করা কর্তব্য নহে। এই শ্লোকে তাহারই বিচার করা হইয়াছে। জীবের স্থূল, সূক্ষ্ম ও কারণ ভেদে ত্রিবিধ দেহ। এই দেহত্র ৪ দৃশ্য পদার্থ সকলই অচেতন ও জড়। অতএব যিনি কেবল চৈতন্য স্বরূপে অবস্থান পূর্বক এই দেহকে সচেতন করত ভােগ্য পদার্থ সমূহকে উপলব্ধি করিতেছেন, তিনিই চৈতন্য স্বরূপ জীবাত্মা। স্বজাতীয় পদার্থ পরস্পর মিলিত হয়, কিন্তু কেহ কাহারও উপর প্রতিপত্তি করিতে পারে না। যিনি প্রতিপত্তি করেন, তিনি বিজাতীয় ও বিশেষগুণ- প্রাকৃতিক সকল পদার্থই জড় ও অচেতন। সুতরাং অজড় ( চিগয়) ও সচেতন ব্যতীত কখনই তাহার উপলব্ধি হওয়া সম্ভব নহে। সেই দেহাধিষ্ঠিত জ্ঞানস্বরূপ চেতমপদার্থই জীবাত্মা। ইনি স্বপ্রকাশ। ইনি যেমন অন্য বস্তুকে প্রকাশ ও উপলব্ধি করিতেছেন, সেইরূপ ইহাকে উপলব্ধি ও প্রকাশ করিবার জন্য প্রকৃতিক পদার্থের প্রয়ােজন নাই। তবে অপেক্ষা কেবল ঈশ্বর-চৈতন্যের। যেমন সূর্যের সহিত তাঁহার কিরণজালের সম্বন্ধ। পরমাত্মার সহিত জীবাত্মাও তদ্রুপ সম্বন্ধ। অবশ্য সূৰ্য্য হইতেই কিরণচ্ছটা পরিশিষ্ট ৩৩ প্রকাশিত হইলেও কিরণই যেমন সূর্যের অস্তিত্ব প্রতিপাদক, সেইরূপ পরমাত্মা দ্বারা জীবাত্মা প্রকাশমান হইলেও জীবাত্মার যে কিয়ৎ পরিমাণ প্রকাশ নাই, তাহা নহে। সূৰ্য কর্তৃক প্রকাশিত দর্পণাদি যেমন অন্যকে প্রকাশ করিতে পারে, , সেইরূপ চিত্তস্থ পরমাত্মা-প্রতিবিম্বরূপ জীবাত্মা চতুর্বিংশতি তত্ত্বকে সচেতন করিয়া বাহবস্তুকেও উপলদ্ধি করিয়া থাকেন। দেহাতিরিক্ত যে আত্মা, তাহার দৃষ্টান্ত স্বরূপ অগ্নি ও কাষ্ঠের উদাহরণ প্রদর্শিত হইয়াছে। বহি যখন কাঠকে দগ্ধ করে, তখন কাষ্ঠের আকারে স্বয়ং আকারিত হয় ; অথচ নিজ জ্যোতিতে কাষ্ঠকেও প্রকাশ করে। কাষ্ঠ এবং বহ্নি যে এক পদার্থ নহে, পরিণামেই তাহার যথেষ্ট পরিচয় পাওয়া যায়। কারণ একটা দাহ অপরটী দাহক। সেইরূপ প্রকাশ্য দেহাদি এবং প্রকাশক আত্মা সর্বত্র ব্যাপ্ত হইয়া দেহাদিকে উপলদ্ধি করিতেছেন। কিন্তু কাষ্ঠের অন্তরস্থ বহ্নি যে ঘর্ষণাদি দ্বারা আত্মপ্রকাশ করত উপাধিস্থান কাষ্ঠকেও দগ্ধ করিয়া ফেলে। সেইরূপ অবিদ্যাদশায় বিলুপ্তের ন্যায় অবস্থিত জীবচৈতন্য বিদ্যদশায় স্বপ্রকাশ হইয়া উপাধিস্বরূপ দেহত্রয়কে কাষ্ঠের ন্যায় বিনষ্ট করিয়া স্বপ্রকাশক আনন্দ স্বরূপ পরম চৈতন্যে প্রতিষ্ঠিত হন। অগ্নি যেমন কাষ্ঠে প্রবেশ করত আত্মরূপে পরিচিত না হইয়া কাঠের আকার অনুসারেই ক্ষুদ্র ও বৃহৎ আকার ধারণ করে এবং উৎপত্তি ও বিনাশ ধৰ্ম্মের অধীন হয়। সেইরূপ নিত্য, সত্য, বুদ্ধ ও মুক্ত স্বরূপ জীবাত্মা দেহে প্রবেশ করিয়া অনিত্যাদি দেহ ধৰ্ম্মের অধীনরূপে প্রতীত হন। যােহসে গুণৈর্বিরচিতো দেহােবয়ং পুরুষ হি। সংসারস্তন্নিবৃন্ধোহয়ং পুংসদ বিদ্যা চ্ছিদাত্মনঃ ॥ পরম পুরুষ ভগবানের মায়াগুণে যে সূক্ষ্ম ও স্কুল দেহ বিরচিত হয়, তাহাতেই জীবাত্মার অধ্যাসবশতঃ জীবের জন্মমরণরূপ সংসারবন্ধন ঘটিয়া থাকে। অতএব আত্মবিচারই এই সংসারবন্ধন ছেদনের প্রধান উপায় । আস্বাদন—কাষ্ঠের আকার অনুসারে অগ্নি ত্রিকোণ চতুষ্কোণ, দীর্ঘ, হ্রস্ব প্রভৃতি নানা আকার ধারণ করে। অধিক কাষ্ঠ দিলে অগ্নির বৃদ্ধি, অল্প কাষ্ঠ দিলে হ্রাস ইত্যাদি অগ্নির গুণ নহে, তাহা কাষ্ঠেরই আকার-ধৰ্ম্ম ! সুতরাং [ ৫ ] শ্রীকৃষ্ণ। ভস্মাচ্ছাদিদি হইলে অগ্নির হ্রাসাদি ধৰ্ম্ম, যেমন ভ্রমে অগ্নিতে আরােপ করা হয় । সেইরূপ দেহ-ধৰ্ম্ম,বিনাশাদি কেবল অজ্ঞানতা বশতঃই আত্মাতে আরােপ করা হয়। আবার, অগ্নি সংযােগে কাষ্ঠ প্রজ্বলিত হইলে যেমন ই হয়, কাষ্ঠের বিষয় কেহ চিন্তা করে না; তদ্রুপ দেহস্থ অবয়ব বিশেষের সংযােগেই দেহী-জীবাত্মার প্রতীতি হয়। অর্থাৎ করাঙ্গুলির চৈতন্য, পদাঙ্গুলির চৈতন্য বা শিয়ােদেশের চৈতন্য, সমস্তই এক ; কেবল উপাধি ভেদ মাত্র। সেইরূপ দেহ সমূহের ভেদ থাকিলেও পরম চৈতন্য এক, অভিন্ন ও অদ্বিতীয়। নানাত্ববাদ কেবল কানামাত্র। অতএব কাৰ্য কারণ সমূহে অবস্থিত নিষ্কল পরমাত্মাকে বিচার দ্বারা সম্যকরূপে জানিয়া যথাক্রমে দেহাদিতে যাথার্থ্য-বুদ্ধি ত্যাগ করিবে। অর্থাৎ আত্মস্বরূপের সম্যক জ্ঞানলাভ হইলে স্থূলসূক্ষ্মাদিক্রমে এই দেহে আত্মবােধ ক্রমশঃ তিরােহিত হয়। আচাৰ্য্য—নিম্নস্থ কাষ্ঠ (অরণি ), শিষ্য-উপরস্থ কাষ্ঠ, উপদেশ—মধ্যস্থিত মন্থন কাষ্ঠ স্বরূপ। আর বিদ্যা,-তাহাদিগের সংঘটনােক্তৃত সুখাবহ অনল স্বরূপ। আস্বাদন-কাঠাভ্যন্তরস্থ অগ্নির ন্যায় আত্মতত্ত্ব দেহাভ্যন্তরে অবস্থিত থাকিলেও সহজে তাহার পার্থক্য উপলদ্ধি হয় না। কিন্তু দুইখানি কাঠের পরস্পর ঘর্ষণে যেমন অন্তরস্থ হতাশন আত্ম প্রকাশ করত আধারভূত কাষ্ঠকেও ভস্মসাৎ করিয়া ফেলে ; তদ্রুপ আচাৰ্য্য ও শিষ্যের উপদেশাদি বাক্যরূপ সৎ- প্রসঙ্গের পরস্পর মিলনে যে বহ্নিরূপ বিদ্যার উদ্ভব হয়, তাহাতে দেহাদি যাবতীয় প্রাকৃতিক তত্ত্বের নিরাস (বহিষ্কার বা ত্যাগ) পূৰ্ব্বক কেবল আত্মতত্ত্বের অবভাসন (স্ফুরণ ) হইতে থাকে। অর্থাৎ আত্মা যে দেহ হইতে পৃথক বস্তু, এই জ্ঞান জন্মিলে দেহাদির প্রতি মায়া তিরােহিত হওয়ায় আত্মজ্ঞান জন্মে। এবং আমি যে দেহ নহি, এই বিচারবুদ্ধি জন্মিলেই দেহাদিসস্তৃত জাগতিক মায়া বা সুখ দুঃখাদি আর অভিভূত করিতে পারে না। বৈশারদী সাতিবিশুদ্ধবুদ্ধিধু নােতি মায়াং গুণসংপ্রসূতাং। গুণাংশ্চ সংদহ যদাত্মমেতৎ স্বয়ঞ্চ শাম্যত্যসমিদযথাগ্নিঃ ।

পরিশিষ্ট waaminen ~~~ ~~~~~~~~~~~~~~ আত্মজ্ঞান সম্বন্ধে অতি বিশুদ্ধা এই সুনিপুণা বুদ্ধি, সত্ত্বাদিগুণ ও দেহেন্দ্রিয়াদি কাৰ্য্য সমুহের জননী অঘটনঘটনপটীয়সী মহামায়ার নিবৃত্তি ঘটায়। সুতরাং বন্ধন স্বরূপ মায়ার তিরােধানে উক্ত বুদ্ধি ইন্ধনশূন্য হুতাশনের ন্যায় আপনাপনিই আত্মস্বরূপে প্রশমিত হইয়া থাকে। আস্বাদন—অগ্নি সৰ্বভুক। সমর্পিত সৰ্ব্ব পদার্থকেই আত্মসাৎ করেন। এমন কি যে কাষ্ঠদ্বয়ের পরস্পর ঘর্ষণে অগ্নি উৎপন্ন হয়, সেই কাষ্ঠদ্বয়কেও ভস্মসাৎ করিয়া ফেলেন। তদ্রপ গুরুশিষ্য-সংবাদে সমুৎপন্ন বিদ্যা ও অবিদ্যাকে ধ্বংস করিয়া স্বয়ং নিরিন্ধন বহ্নির ন্যায় আপনাতে আপনি উপশমি, হয়। গুণকাৰ্য্য দেহাদিতে অধ্যাসের ( আরােপের ) অভাবে অনধ্যস্ত (অনায়ােত) বিশুদ্ধ জ্ঞানই কেবল বিদ্যাবলে লক্ষিত হয়। জলের আবিলতা দূর করিবার জন্য ঘৃষ্ট নিৰ্ম্মালি ( নিৰ্মাল্য ফল) যেমন সলিলের ক্লেদ নিবারণের সঙ্গে সঙ্গে আপনিও অপসৃত হয়, সেইরূপ বিদ্যা সাহায্যে সমুৎপন্ন পরমাত্মসাক্ষাৎকাররূপ জ্ঞানের উদয়ে অবিদ্যার কাৰ্য্য দেহবন্ধনের নিবৃত্তির সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যাবৃত্তিও স্বয়ং নিবৃত্ত হয়। তৎকালে আবিলতা বর্জিত নিৰ্ম্মল সলিলের ন্যায় স্কুল ও সূক্ষ্ম দেহও অন্তর্হিত হওয়ায়, বিদ্যারও অভাবে কেবল পরমানন্দস্বরূপ জীবব্রহ্মের ঐক্যতাদ্যোতক পরমজ্ঞানের উদয় হয়। আত্মা এক, নিত্য, সত্য, স্বপ্রকাশ ও জ্ঞানস্বরূপ। দেহাদি উপাধি বশতঃ কর্তৃত্বাদি ধৰ্ম্ম আত্মাতে আরােপিত হয় মাত্র। আত্মা ব্যতীত যাবতীয় পদার্থ মায়াময় ও অনিত্য। অতএব সকল বিষয় হইতে অনাসক্ত হইলে জীব কেবল আত্মজ্ঞানের দ্বারাই মুক্তিলাভ করে । যদি সুখদুঃখভােগী জীবাত্মা সকলের নানাত্ব স্বীকার কর ; যদি স্বর্গাদি লােক, কালধৰ্ম্ম বােধক শাস্ত্র ও আত্মার অনিত্যতা মনে কর, যদি সমুদয় ভোগ্য বস্তুর যথাবৎ স্থিতিকে ধারারূপে নিত্য বলিয়া স্বীকার কর এবং যদি মনে কর যে তত্তৎ আকৃতির ভেদ দ্বারা বুদ্ধি উৎপন্ন হইয়া থাকে, সুতরাং অনিত্যা বলিয়া নাশ পায়, তাহা হইলেও দেহ সংযােগ ও কালের অবয়ব হেতু সমস্ত শরীরীর বারবার জম্মদি অবস্থা সকল হইতে পারে । আর তাহাতেও কর্ম সকলের কর্তা এবং সুখদুঃখ ভােগকারীর পরাধীনতা লক্ষিত হইতেছে।

শ্রীকৃষ্ণ। পরাধীনকে কে পুরুষাৰ্থ সাধনােদ্দেশে উপাসনা করিবে? বিশেষতঃ লােক যে, সকল কর্মই নিজ ইচ্ছানুসারে করে তাহা নহে; যেন কোন নৈসর্গিকভাবে অবশের ন্যায় অগ্রসর হইয়া অনিচ্ছা সত্তেও পরাধীনের ন্যায় তাদৃশ কৰ্ম্মে বৃত হয় এবং সুখ দুঃখাদি অনুভব করে। অতএব কাল, কৰ্ম্ম ও গুণের অধীন, পরাধীন জীবকে স্বতন্ত্রভাবে কে সুখ দুঃখ ভােগ কয়ায় ? কারণ দেখা যায়, কর্মকুশল জ্ঞানীর হৃদয়ে কিঞ্চিত্র সুখ নাই, সে সর্বদাই দুঃখকাতর ; আবার অনভিজ্ঞ মূর্থের হৃদয়েও দুঃখ নাই, সে সৰ্ব্বদাই আনন্দময় এবং প্রবন্ধ বশে প্রচুর ধনাদি ঐশ্বৰ্য্য উপভােগ করে। অতএব সুখ দুঃখ বস্তুর ধৰ্ম্ম নহে; অন্তঃকরণেরই ধৰ্ম্ম ও বৃত্তিবিশেষ মাত্র। বৃথা অহঙ্কার প্রভাবেই জীব আপনাকে সুখী বা দুঃখী বলিয়া মনে করে। অহঙ্কারই সুখ বা দুঃখ প্রদানের হেতু। লােকে সাধারণতঃ সুখলাভের হেতু এবং দুঃখ প্রতীকারের উপায় অবগত থাকিলেও, প্রধান দুঃখ সৰ্ব্বধংসকারী মৃত্যু নিবারণের উপায় সাক্ষাৎ সম্বন্ধে কেহই অবগত নহে। প্রাণদণ্ডাৰ্থ বধ্যস্থানে নীত কোন ব্যক্তির নিকট যেমন কোন ভােগ্য পদার্থই প্রীতিপদ বলিয়া উপলব্ধি হয় না, তদ্রুপ মৃত্যুকে পার্শ্বে বিদ্যমান নিরীক্ষণ করিয়া কোন্ ব্যক্তি বিষয় কামনায় আপনাকে সুখী মনে করিতে পারে? অথবা এমন কোন বিষয় আছে যাহা মৃত্যুভয়গ্রস্তকে সুখী করিতে = পারে ? বেদাদিতে স্বর্গাদি সুখ ভােগের যে সকল কথা শুনা যায়, তাহাতেও বিবিধ দুঃখ জড়িত আছে। সে স্থলেও পরস্পরের উৎকর্ষ নিবন্ধন বা অন্যের দ্বারা নিজের ক্ষতি জন্য দুঃখ, ভােগের দ্বারা ভােগ সমাপ্তি এবং পাপে ভােগক্ষয় নিবন্ধন দুঃখ অনিবার্য। এতদ্ব্যতীত বিবিধ বিড়ম্বনা ও বিপ্নবাহুল্যে কৃষিফলের ন্যায় স্বর্গাদি সুখসেব্য শ্ৰতভােগও সুখদানে অসমর্থ। সর্বপ্রকার বাধা বিপত্তিশূন্য হইয়া যদি ধৰ্ম্ম সম্যকরূপেও অনুষ্ঠিত হয়, তাহা হইলেও জীব পরম সুখ লাভ করিতে পারে না। ( আত্মজ্ঞান ব্যতীত জীবের পরম সুখলাভ হয় না।) এক্ষণে কোন্ ধর্মাচরণে কি সুখ লাভ হয় তাহা বলিতেছি, শ্রবণ কর।

পরিশিষ্ট। । । । যাজ্ঞিকুগণ যজ্ঞাদি দ্বারা ইন্দ্রাদি দেবতাগণের আরাধনা করিয়া স্বর্গলােকে গমন করেন। তথায় দেববৃন্দের ন্যায় অনুপম ভােগরাশি উপভােগ করিয়া থাকেন। ঐ সকল পুরুষ দেব-ললনাগণের মনােমুগ্ধকারী অপূর্ব মূৰ্ত্তি পরিগ্রহ করিয়া স্বীয় পুণ্যোচিত সুন্দর বিমানে আবােহণ করত স্তাবক গন্ধৰ্ব্বগণে পরিবেষ্টিত হইয়া বিচরণ করেন। কিঙ্কিনীজাল বিমণ্ডিত স্বেচ্ছাগামী বিমানে আরােহণ পূর্বক স্বর্গললনাগণে পরিবেষ্টিত হইয়া যখন তঁাহারা নন্দনকাননাদি স্বর্গের বিচিত্র ক্রীড়াকাননে বিহার করিয়া বেড়ান তখন পুণ্যক্ষয়ে পুনরায় যে তাহাদিগকে স্বর্গচ্যুত হইতে হইবে, সে চিন্তা করেন না। যদবধি পুণ্যের ভােগ সমাপ্তি না হয় তদবধি স্বর্গলােগ এবং পুণ্যক্ষয়ে প্রচণ্ডকাল কর্তৃক প্রচালিত হইয়া অধঃপতিত হন। বিষয়াসক্ত অসৎপথাবলম্বী লােকের সংসর্গে যদি কোন ব্যক্তি অধৰ্ম্মপথে বিষয় কামনায় ইন্দ্রিয়পরতন্ত্র হয় ও কামনাপরতন্ত্রহৃদয়ে ভােগলালসায় জীব- গণেরও উৎপীড়ক হইয়া উঠে; এবং শাস্ত্ৰ মৰ্যাদা লজন পূৰ্ব্বক বৃথা জীবহিংসা করত ভূতপ্রেতগণের তৃপ্তি সাধন করে, তাহা হইলে তাহাদিগকে নিরম্নগামী এবং তথা হইতে পাপে অভিভূত হইয়া তাহার অজ্ঞানপ্রচুর স্থাবরাদি যােনিতে জন্ম গ্রহণ করিতেও বাধ্য হয়। এইরূপে দেহের দ্বাৰা নানাপ্রকার দুঃসহ কষ্টকর কর্ম সম্পাদন পূর্বক দেহী পুনরায় তদুপযুক্ত শরীর ধারণ করিয়া থাকে। অতএব কৰ্ম্মবশ জীবের এই প্রকার পুনঃপুনঃ দেহ ধারণ ও অসহ্য দুঃখ কষ্টে দিনপাতে কি সুখ উৎপন্ন হইতে পারে ? লােকানাং লােকপালানাং মত্তয়ং কল্পজীবিনা। ব্ৰহ্মণােহপি ভয়ংমত্তে দ্বিপরাদ্ধ পরায়ুষঃ। ভােগ স্থান স্বর্গাদি ভুবন এবং কল্পান্তজীবী সমুদয় লােকপাল আমার ( কালরূপী ভগবানের ভয়ে ভীত। এমন কি দ্বিপরাদ্ধ বৎসর পরমায়ু ব্ৰহ্মাও কালরূপী ভগবান্ হইতে মৃত্যুভয়ে ভীত। t হইতে হয় ।

শ্রীকৃষ্ণ। আস্বাদন—হে উদ্ধব ! স্বর্গলাভে সুখ প্রাপ্তির কথা দূরে থাকুক, মূল স্বর্গও অনিত্য ও দুঃখমিশ্রিত। তত্ৰত্য লােকপালগণেরও কিছুমাত্র সুখ নাই। কারণ তাহারা কেহই স্বতন্ত্র নহেন, সকলেই এক অচিন্ত্য শক্তির প্রভাবে যন্ত্রচালিতের ন্যায় কৰ্ম্ম করিতেছেন। শ্রুতি বলিয়াছেন এই পরাৎপর পরমেশ্বরের ভয়ে ভীত হইয়াই সমগ্ৰ ব্ৰহ্মাণ্ড, তত্ৰত্য লােক ও লােকপালগণ স্ব স্ব কর্ম সম্পাদন করিতেছেন। সূৰ্য্য, চন্দ্র, বায়ু, বরুণ, অগ্নি ও মৃত্যু পৰ্য্যন্ত সকলেই সেই দণ্ডধারীর ভয়ে ভীত হইয়া কৰ্ম্ম করিতেছেন; কেহই নিজের ইচ্ছায় নির্ধারিত কর্মের অশ্যথাচরণেও সমর্থ হন না। এমন কি দ্বিপরাদ্ধ- কালজীবী বিশ্ববিধাতা ব্রহ্মা, তিনিও কালের বশে মৃত্যুমুখে পতিত হয়েন। অতএব প্রবৃত্তিমার্গে কোনরূপ সুখশান্তি নাই। নিবৃত্তি-পথই সকল শান্তির আকর। সুতরাং সর্ব প্রযত্নে প্রবৃত্তি-পথ পরিত্যাগ পূর্বক নিবৃত্তি-মার্গ অবলম্বনই শান্তিনিকেতন, মােক্ষম ও পরাৎপর পরমেশ্বর প্রাপ্তির একমাত্র উপায়। - গুণাঃ সৃজন্তি কৰ্ম্মাণি গুণােহনুসৃজতে গুণান্। জীবস্তু গুণসংযুক্তো ভুক্তে কৰ্ম্মফলাসে। সাদি গুণ সমুহ কর্মোৎপাদন করে । এবং গুণগণ ইন্দ্রিয় সমূহের উৎপত্তির হেতু ; আবার গুণকাৰ্য্যসস্তৃত ইন্দ্রিয়, দেহ ও অন্তঃকরণাদিতে অধ্যস্থ বা ওতপ্রােতভাবে অধিষ্ঠিত জীব (জীবাত্মা) উক্ত কর্মসমূহের ফল, সুখদুঃখাদি ভােগ করিয়া থাকে। যাবৎ সাৎ গুণবৈষম্যং বানামাত্মনঃ। নানাত্বমাত্মনাে যাবৎ পারতং তদৈব হি। যাবদস্যাস্বতন্ত্রত্বং তাবদীশ্বরতে ভয়ং। য এতৎ সমুপাসীরংস্তে মুহস্তি শুচাৰ্পিতাঃ । সাদিগুণত্রয়ের বৈষম্য জন্য যে পর্যন্ত অহঙ্কারাদি ইন্দ্রিয়বর্গের নানা ভাব বিদ্যমান থাকে, সে পর্যন্ত আত্মা (জীবাত্মা বা জীব) উপাধির তারতম্যে বহু হয়। আর যাবৎ জীবের বহুত্ব, তাবৎ তাহার কামাধীনতা, কর্মপরতাতা এবং কালরূপী ভগবানের নিকট ভয় সন্ত্রস্ততা।

পরিশিষ্ট। ৩৯ যে সকল ব্যক্তি এই গুণকাৰ্য্য সমুৎপন্ন দেহ, ইন্দ্রিয় ও পুত্ৰকলাদিতে আসক্ত হইয়া তাহাদের সেবায় মােহাচ্ছন্ন হয়, তাহারাই শােক সাগরে নিমগ্ন হইয়া পরম পরিতাপ ভােগ করে। আস্বাদন-জীবাত্মা মায়ার বশে অবশ হইয়া অস্বাতন্ত্রের গায় কাৰ্য্য এবং সুখ দুঃখাদি ভােগ করে। বিশেষ বিচার পূর্বক প্রণিধান করিলে জানা যায় যে, জীবাত্মা দ্বারা কোন কৰ্ম্মই সাধিত হয় না। ইন্দ্রিয়বর্গের দ্বারাই কৰ্ম্ম সমূহ সাধিত হইয়া থাকে। আত্মা ইন্দ্রিয়গণের কৰ্ম্ম প্রবর্তকও নহেন। সাদি গুণত্রয়ই কাম ক্রোধাদিরূপে ইন্দ্রিয়গণকে কর্মক্ষেত্রে প্রেরণ করে। তাহাতে আত্মার কর্তৃত্ব নাই। শাস্ত্র বলিয়াছেন, অসঙ্গোহয়ং পুরুষঃ। আত্মার ভােক্তৃত্বও ঔপাধিক কর্তৃত্ব ব্যতীত স্বভাবনিষ্ঠ সম্বন্ধ নহে। গুণসংযােগে অহঙ্কারতত্বে প্রতিবিম্বিত হওয়াতেই আত্মার ডােক্তৃত্বের কল্পনা হয় মাত্র। আত্মার বহুত্বও উপাধি নিবন্ধন। যেমন অগ্নি এক হইলেও,-লাল, কাল, সবুজ, শাদা প্রভৃতি কাচের রঙ্গ অনুসারে তাহাদের মধ্যস্থ আলােক লাল, কলি, সবুজ বা শ্বেত প্রভৃতি বিভিন্ন রূপেই প্রতিভাত হয় ; তদ্রুপ এক আত্মাই গুণকাৰ্য্য সস্তৃত দেহাদির বিচিত্রতা নিবন্ধন বিভিন্ন ও বহুরূপে প্রতীত হন। এই বহুরূপে প্রতীত হওয়াই অস্বাতন্ত্রের পরিচায়ক। এইজন্য যাহারা কর্মের উপাসনা বা কর্মকেই কর্তৃত্ব প্রদান করেন, তাহারা শোকদুঃখে জর্জরিত হইয়া ক্ৰমশঃ মায়ামােহেই অভিভূত হন। অতএব নিবৃত্তি মার্গাবলম্বনই একমাত্র দুঃখ, পরিত্রাণের উপায়। কাল আত্মগমাে লােকঃ স্বভাবাে ধৰ্ম্ম এব বা। ইতি মাং বহুধা প্ৰাহুগুণব্যতিকরে সতি। কাৰ্যোপলক্ষে মায়াক্ষোভ বা গুণত্রয়ের বৈষম্য ঘটিলে লােকে আমাকে কাপ, আত্মা, আগম (বেদাদি ধৰ্ম্ম কর্মোপদেশক শাস্ত্র) লােক (স্বর্গাদি ভােগস্থান।) পরিণাম-হেতুক স্বভাব এবং ভােগ-হেতুক ধৰ্ম প্রভৃতি নানারূপে বর্ণন করিয়া থাকে। আস্বাদন-পরমাত্মা নিত্য তাঁহার প্রভাবের নামই কাল। সুতরাং ১৬ শ্রীকৃষ্ণ। । * নিত্য ও সত্য বস্তুর প্রভাব বলিয়া কালও নিত্য ও সত্য। ভগবানের নিঃশ্বাস হইতে বেদের উদ্ভব এবং প্রলয়ে তাহা তাহাতেই লীন থাকে ; এইজন্য বেদ নিত্য। পরমাত্মশক্তিই প্রকৃতি বা মায়া নামে অভিহিত। সৃষ্টির অভিপ্রায়ে মায়াতে যখন গুণত্রয়ের বিক্ষোভ উপস্থিত হয়, তখনই জগতের সৃষ্টি। এবং গুণসাম্যে মায়াও ঈশ্বরে বিলীন হইলে এক পরমাত্মমাত্র বিদ্যমান থাকেন। এই মায়ারও প্রবৃত্তি ও নিবৃত্তি ভেদে রূপ দুই প্রকার। প্রবৃত্তিতে সৃষ্টি, নিবৃত্তিতে সংহার বা মােক্ষ। প্রবৃত্তি—অবিদ্যা, নিবৃত্তি—বিদ্যা। ইহাও ঈশ্বরের ইচ্ছাশক্তি সস্তৃত। যে নিয়মের অনুসরণে জীব সুখ স্বাচ্ছন্দ্য বা মুক্তি লাভ করে, তাহা কখন জীব বা জগৎকে আশ্রয় করিয়া থাকিতে পারে না যিনি জীব ও জগৎকে নিয়ন্ত্রিত করিয়া সংসার চালাইতেছেন, তিনি একমাত্র তাহাদের আশ্রয়। কারণ, তাহা গুণক্ষোভ ব্যতীত আর কিছুই নহে। গুণক্ষোভেই জগৎ ব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টি। তিনিই সর্ব সম্পদ ও সর্ব শক্তির মূলাধার। তিনি সর্ব পদার্থ সর্ব বিষয়েরই আদি কারণ। অতএব গুণবিক্ষোভ সদ্ভূত সমুৎপন্ন সৰ্ব্ব বিষয় পরিত্যাগ পূর্বক বিদ্যা প্রদর্শিত পথে অগ্রসর হইয়া তাহার শরণাপন্ন হওয়াই জীবের পরম পুরুষার্থ। বদ্ধ মুক্তাদির লক্ষণ। উদ্ধব বলিলেন হে বিভাে। গুণগণের সহিত সম্বন্ধ থাকিলে দেহী, দেহজাত, কর্ম ও সুখাদিতে কিরূপে বদ্ধ না হইয়া থাকিবে ? আর সম্বন্ধ থাকিলেই বা গুণগণ দ্বারা বদ্ধ হয় কেন ? এবং বদ্ধ ও মুক্ত কিরূপ ব্যবহার করেন, কি কি লক্ষণ দ্বারা উভয়কে জানা যায় ? একই আত্মা কিরূপে নিত্য বদ্ধ ও নিত্য মুক্ত হয় ? বদ্ধো মুক্ত ইতি ব্যাখ্যা গুণতে মে ন বস্তুতঃ। গুণ মায়ামুলত্বানু মে মােক্ষো ন বন্ধনং। শ্রীকৃষ্ণ বলিলেন হে উদ্ধব। বদ্ধ মুক্ত বলিয়া জীবাত্মার যে ব্যাখ্যা, তাহা শুধু সর্বাঙ্গি গুণ প্রভাব প্রযুক্ত উপাধি মাত্র । বস্তুতঃ জীবাত্মার প্রতি ঐরূপ কোন ।

পরিশিষ্ট। t কথাই প্রযুক্ত হইতে পারে না। কারণ গুণত্রয় মায়ামুলক । সুতরাং চৈতন্য- প জীবে বন্ধন বা মুক্তি কিছুই সঙ্গত নহে, ইহাই আমার অভিমত। শােকমােহে সুখং দুঃখং দেহাপত্তি মায়য়া। স্বপ্নে যথাত্মনঃ খ্যাতিঃ সংস্কৃতি নতু বাস্তবী । মায়া দ্বারাই শোক, মােহ, সুখ, দুঃখ এবং দেহােৎপত্তি হইয়া থাকে। স্বপ্নের ন্যায় সংসার ও বুদ্ধিকাৰ্যাদি সমুদয়ই অবাস্তব। অর্থাৎ মায়াকে বাস্তব মনে করিয়াই জীব-প্রমে পড়ে। আত্মা দ্রষ্টা মাত্র। তিনি ইহাদের কোন কিছুতেই সংসৃষ্ট নহেন। কারণ বিদ্যাবিদ্যে মম তনূ বিদ্ধদ্ধৰ শৰ্মীরিণাং। বন্ধমােকৱী আছে গায়য়া মে বিনিৰ্ম্মিতে ॥ হে উদ্ধব ! নিশ্চয় জানিও শরীরীদিগের বন্ধমােকারিণী বিদ্যা ও অসিন্যা আমার এই দুই আদ্যাশক্তি,আমারই মায়া দ্বারা বিরচিত। একস্যৈব মমাংশ জীববৈ মহামতে। বন্ধেহস্যবিছােনাদির্বিদ্বয়া চ তথেতরঃ। হে মহামতে! আমার অংশ স্বরূপ অদ্বিতীয় অনাদি এই জীব, অবিদ্যা বার বন্ধ এবং বিদ্যা দ্বারা মুক্ত হইয়া থাকে। হে বৎস! এক আশ্রয়ে অবস্থিত বিরুদ্ধ-ধৰ্ম্মসম্পন্ন বদ্ধ ও মুক্তের ( জীবাত্মা ও পরমাত্মার লক্ষণ বলিতেছি শুন। ইহারা উভয়েই সুন্দর পক্ষ বিশিষ্ট সদৃশ সখা ; যদৃচ্ছাক্রমে বৃক্ষে নীড় নিৰ্মাণ করিয়াছে। ইহাদের একট (জীবাত্মা) পিপ্পলান্ন ভক্ষণ করেন । (অর্থাৎ ভােগসুখে রত) অন্যটা (পরমাত্মা) নিরাহার (সংযত,-ভােগে উদাসীন) হইলেও বলীশ্রেষ্ঠ। যিনি পিপ্পলান্ন ভক্ষণ করেন না সেই বিদ্বান্, অাত্মা ও আত্মভিল্পকেও জ্ঞাত আছেন। যিনি পিঙ্গল ভক্ষণ করেন তিনি সেরূপ নহেন। (অর্থাৎ মায়মুগ্ধ!) যিনি অবিদ্যার সহিত সংযুক্ত, তিনি নিত্য-বন্ধ; আর যিনি বিদ্যাময় তিনি নিত্য-মুক্ত। স্বপ্লেখিত ব্যক্তির স্নায় [ ৬ ] ২ । ঐকৃষ্ণ। ~~~~~~~~ বিদ্বান্ দেহস্থ হইয়াও দেহস্থ নহেন; আর মূঢ়বুদ্ধি অপরটা স্বপ্নদর্শীর ক্ষায় দেহস্থ না হইয়াও দেহস্থ । ( নিদ্রাভঙ্গে স্বপ্নদৃষ্ট পদার্থের প্রতি যেমন আসক্তি জন্মে না, তদ্রুপ জীবন্মুক্ত ব্যক্তিও দেহস্থ ফলের প্রতি কোন আকাঙ্ক্ষা করেন না। কিন্তু নিদ্রিত ব্যক্তি যেমন স্বপ্নকে প্রত্যক্ষের ন্যায় উপলব্ধি করে, সেইরূপ মােহনিদ্রাভিভূত ভ্রান্ত মানব দেহে অধ্যাস [ দেহকে আত্মা বা আমি অমে আসক্তি ] বশতঃ তােগা- দিতে অভিভূত হয়।) যিনি নির্বিকার বিদ্বান্, তিনি ইন্দ্রিয় দ্বারা বিষয় ও গুণগণ দ্বারা গুণগণ গ্রহণ করিলেও আমি গ্রহণ করিতেছি, এরূপ মনে করিবেন না। আর অপণ্ডিত মােহমুগ্ধ জীব গুণজনিত কৰ্ম্ম দ্বারা কর্ম করত এই দৈবাধীন শরীরে বাস করিয়া আমি কর্তা” ইহা ভাবিয়া তাহাতে নিবদ্ধ হইয়া থাকে। বিদ্বান্ ব্যক্তি ভােগ্য বিষয় সমূহ ইন্দ্রিয়ের দ্বারা ভােগ করিয়াও, কেবল অনাসক্তির গুণে শয়ন, উপবেশন, ভ্রমণ, মজ্জন, দর্শন, স্পর্শন, ঘ্রাণ, শ্রবণ ও ভােজনাদি ক্রিয়াতে ব্যাপৃত থাকিলেও তত্তৎ কর্মে আবদ্ধ হন না। আকাশ যেমন সর্বত্র পরিব্যাপ্ত থাকিয়াও কোন স্থানে বদ্ধ নহে, সূৰ্য্য যেমন লােকলােচন হইয়াও লৌকিক সুখ দুঃখাদিতে লিপ্ত নহেন, এবং বায়ু সর্বত্র সঞ্চরণ করিয়াও যেমন কোন বিষয়ে মিলিত হয় না, তদ্রুপ প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিগণ প্রকৃতির অন্তরে বিদ্যমান্ থাকিয়াও তাহার কোন বিষয়ে আসক্ত হন না। অর্থাৎ প্রকৃতিতে অবস্থিতি করিয়াও আকাশ, সূৰ্য্য ও বায়ুর ন্যায় নিঃসঙ্গ হইয়া বৈরাগ্য-যােগ দ্বারা তীক্ষ্ণীকৃত সুনিপুণ বুদ্ধি-সংবর্ধনী-দৃষ্টি দ্বারা সৰ্ব্বসংশয় ছেদন করেন, এবং স্বপ্ন হইতে জাগরিত ব্যক্তির প্রায় জ্ঞানিগণ বৃথা ভেদ দর্শন হইতে নিবৃত্ত হন। যাহার প্রাণ, মন, ইন্দ্রিয় ও বুদ্ধি কোনরূপ স্বার্থ-বিষয়ে অভিসন্ধি বা সংকল্প শুন্য, তিনি দেহস্থ থাকিয়াও তাহার গুণগণ হইতে মুক্ত ; সুতরাং তিনি দেহনিধৰ্ম্মে বিব্রত হন না;—তিনি জীবন্মুক্ত। যস্যাত্মা হিংস্যতে হিং ৈযেন কিঞ্চিদ যদৃচ্ছ। অঞ্চতে বা কচিত্র ন ব্যতিক্ৰিয়তে বুধ। t পরিশিষ্ট। 1 - ; ১ নঃ নিদা পীড়-বাসুক পূজার্চনায় যাঁহার হৃদয়ে কোন ব্যথা বা আনন্দের উদয় না, তিনিই প্রকৃত পণ্ডিত। ন স্তুবীত ন নিতে কুর্বতঃ সাধ্বসাধু বা । বদতাে গুণদোষাভ্যাং বর্জিতঃ সমদৃঙ্গুনি। তিরস্কার বা পুরস্কার, প্রশংসা বা নিন্দাকারীর প্রতি যাহার সম্ভাষণ বা গ্লানি করিবার প্রবৃত্তি জন্মে না ; যিনি সর্বত্র সমদর্শী হইয়া দোষগুণ বিচারে সৰ্ব্বতােভাবে নিবৃত্ত হন, তিনিই প্রকৃত সাধু নামে অভিহিত। যাহার চিত্ত আত্মস্বরূপে নিবন্তর আসক্ত থাকায় ভাল মন্দ কোন কর্ম করিতেই অগ্রসর হয় না; বা যিনি শুভাশুভ বিষয়ের আলােচনা বা চিন্তা করেন , কেবল আত্মচিন্তায় নিরত থাকি জড়ের ন্যায় নিরভিমানে সর্বত্র বিচরণ করেন, তিনি মুনি বলিয়া সৰ্ব্বত্র আদৃত। কিন্তু যে ব্যক্তি শব্দ-ব্রহ্ম বেদ সমূহের অর্থ সংগ্রহ করিয়াও ধ্যানাদি যোগানুষ্ঠানে পরাৎপর পরব্রহ্মে আত্মসমর্পণ করিতে সম্মত হন নাই, তাহার শাস্ত্রাভ্যাস নিরর্থক; কারণ, দুগ্ধ প্রত্যাশায় নিরিন্দ্রিয় গাভী পালনের ন্যায় তাদৃশ কৰ্ম্মবিমুখ ব্যক্তির শাস্ত্রাভ্যাস কেবল পণ্ডশ্রম মাত্র। হে উদ্ধৰ । যাহারা দুগ্ধের আশায় বন্ধ্যা-দুগ্ধরহিতা গাভী পালন করে, অসতী ভাৰ্য্যাকে যত্ন, ও বিশ্বাস সহকারে গৃহে রাখে, শত্রু নিগৃহীত পরাধীন দেহের পরিপােষণে যত্ন করে, ঐহিক ও পারলৌকিক সাধনবিমুখ কুপুত্রের লালন পালনে বিশেষ চেষ্টা করে, সৎপাত্রে দানাদি না করিয়া কেবল দুষ্কীৰ্ত্তি ও পাপ-পথের প্রশ্রয়দাতা ধনকে যত্নাতিশয়ে সঞ্চয় মাত্র করে এবং ভগবৎ স্বরূপের রূপ, গুণ ও লীলাদির কীর্তন না করিয়া তৎবিরহিত গ্রাম্য কথা আলােচনায় দিন যাপন করে, তাহারা অনন্ত দুঃখ সাগরে নিমগ্ন হয়। যস্যাং ন মে পাবনমঙ্গ কৰ্ম্ম স্থিত্যুত্তপ্রাণনিবােধমস্য। লীলাবতারেপিত জন্ম বা স্যাদ্বন্ধ্যাং গিরং তাং বিভূয়ায় ধীরঃ । হে উদ্ধব! যে কথায় বিশ্ব সংসারের উৎপত্তি, স্থিতি ও প্রলয়ের সংক মদী ঐশ্বৰ্যবার্তা বা লীলাবরের অভিলষিত মদীয় জন্ম-বৃত্তান্তের আলােচনা ৪. না হয়, ধীমান্ বিবেকিগণ বন্ধ্যার স্থায় নিলা তাণী বাণী প করেন। এই প্রকার দেহাত্ম বিচারে দেহাধ্যাস (আসক্তি) বিসর্জন পূৰ্ব্বক দেবমাদি বিচিত্র দেহাদির প্রম যাহাদের অন্তর হইতে অন্তর্হিত হয়, তাহারাই সর্বব্যাপী পরিপূর্ণ ভগবৎ স্বরূপ আমাতে নিৰ্ম্মল মন সমর্পণ পূর্বক কৰ্ম্মপাশ হইতে অব্যাহতি লাভ করেন। যদ্বানীশাে ধারয়িং মনন ব্ৰহ্মনি নিশ্চলং। ময়ি সর্বাণি কৰ্ম্মাণি নিরপেক্ষ সমাচর। হে উদ্ধব ! পরাৎপর পরমেশ্বর আমাতে যদি মনকে নিশ্চল ভাবে সংযত করিতে না পারে, তাহা হইলে নিষ্কাম ভাবে বর্ণাশ্রম-বিহিত কৰ্তব্য কৰ্ম্ম সমূহের অনুষ্ঠানই সর্বতােভাবে বিধেয়। শ্রদ্ধালুর্মকথাঃ শৃণু সুভদ্রাঃ লােকপাবনী। গায়নুস্মরন্ কৰ্ম্ম জন্ম চাভিনয়ন্মুহুঃ না শ্রদ্ধা সহকারে পবিত্ৰকারিণী, পাপনাশিনী মদীয় লীলা কথা শ্রবণ, কীর্তন ও স্মরণ করা এবং আমার জন্ম ও অবতাররাচিত কৰ্ম্ম সমূহের অভিনয় করাই কর্তব্য। মদর্থে ধৰ্ম্মকামার্থানাচরম্মদপাশ্রয়ঃ । লভতে নিশ্চলাং ভক্তিং মযুদ্ধব সনাতনে । হে উদ্ধব। আমার প্রতির নিমিত্ত ধৰ্ম্মকানাদির সেবা করত মদৈকনিষ্ঠ হওয়া কর্তব্য। তাদৃশ অনুষ্ঠানশীল ব্যক্তি সৰ্ব্বকারণ সনাতন আমাতে অচলা ভক্তি লাভ করে, তাহাতে সন্দেহ নাই। সৎসঙ্গ লৰূয়া ভক্ত্যা ময়ি মাংস উপাসিতা । স বৈ মে দর্শিতং সত্তিরঞ্জ বিনতে পদং । সাধুগণের সংসর্গে তাদৃশ ভক্ত মদীয় ভক্তি লাভ করে । এবং তাহারা অন্তে সাধুগণেই প্রদর্শিত মদীয় অরূপ প্রাপ্ত হয়। - P t } = }

}
।
বলিলেন, হে উত্তমশ্লোক! কি প্রকার সাধু তােমার অভিপ্রেত
এবং নানাপ্রকার ভক্তির মধ্যে সাধুগণের আদরণীয় কোন প্রকার ভবদীয়
ভক্তি প্রার্থনীয় তাহা আমি অবধারণে অক্ষম।
আমি অত্যন্ত ভক্তি সহকারে আপনার শরণ লইতেছি, কৃপা পূর্বক তাহা
জ্ঞাপন করিয়া কৃতার্থ করুন।
ত্বং ব্ৰহ্ম পরমং ব্যোম পুরুষঃ প্রকৃতেঃ পরঃ।
অবতীর্ণোহসি ভগবান্ স্বেচ্ছাপিত্তপৃথপুঃ |
হে ভগন্! আপনি প্রকৃতির নিয়ন্তা পরাৎপর পরমব্রহ্ম, মহাকাশের
ন্যায় নির্লিপ্ত ভাবে থাকিয়াও স্বীয় ভক্তগণের বাঞ্ছা পূরণার্থ বিগ্রহ ধারণ পূর্বক
জগতে অবতীর্ণ হইয়া থাকেন।
কৃপালুরকৃতদ্রোহস্তিতিক্ষুঃ সৰ্বদেহিনাং।
সত্যসায়ােহনবদ্যাত্ম সমঃ সর্বোপকারকঃ
তাহা শুনিয়া শ্রীকৃষ্ণ বলিলেন, যিনি কৃপালু ও জীবমাত্রেরই প্রতি বিদ্রোহ
চরণে বিমুখ হইয়া সতত পরের অপরাধ সহ করিয়া থাকেন, সত্যই যাহার
একমাত্র সার ধন, যাহার অন্তঃকরণে কখন অসূয়াদি দোষজাল স্পর্শ করে না,
যিনি শত্রু বা মিত্রের প্রতি সমদৃষ্টি সম্পন্ন ও সর্বভূতের উপকারার্থ সর্বদা
যত্নবান,
কামৈরহতধীর্দান্তো মৃদুঃ শুচিরকিঞ্চন।
অনীহাে মিতভুক শান্ত স্থিররা মচ্ছরণে মুনিঃ ॥
Y
যাহার বুদ্ধি কখনও কামাদিতে অভিভূত হয় না, যিনি বাহেন্দ্রিয় সংযমন
পূৰ্ব্বক বিশুদ্ধভাবে ও কোমল হৃদয়ে ঐহিক ও পারলৌকিক কোন ভােগেরই
আকাঙ্ক্ষা করেন না, পরিমিত ভােজনে অন্তরিন্দ্রিয়ের জয় সাধনে স্থিরচিত্তে
য় ভক্তিতে দৃঢ় বিশ্বাস পূৰ্ব্বক মনন দ্বারা আমাতেই আত্মসমর্পণ করেন,
অপ্রমন্তো গভীরাত্মা ধৃতিমান্ জিতবড় গুণ।
অমানী মানদঃ কল্যো মৈত্রঃ কারুণিক কবি।

৪৬
যাহাদের স্বভাব উদ্ধত বা প্রমত্ত্ব নহে, যাদের প্রতিজ্ঞা স্থির, বিপদকালেও
যাহাদের বুদ্ধিভ্রংশ হয় না, যাহারা ক্ষুৎপিপাসা, শােকমােহ, জামৃত্যু প্রভৃতি
ষড়বিধগুণকে অতিক্রম করিতে সমর্থ হইয়াছে, নিজের মান বিসর্জন দিয়া
অন্যের মান রক্ষাৰ্থ সর্বদা যশীল, পরােগদেশে পণ্ডিত, মিতাঝপঙ্গ, কৃপালু
ও তত্ত্বজ্ঞ জগতে তাহারাই শ্রেষ্ঠ মানব।
আজ্ঞায়ৈবং গুণা-দোষান্ ময়াদিষ্টানপি সুকান্।
ধৰ্মান্ সংত্যজ্য যঃ সৰ্বান্ মাং ভজেৎ সতু সত্তমঃ ।
এই সকল গুণ এবং অনুরক্ত দোষ সমূহের স্বরূপ অবধারণ পূর্বক বেঙ্গোক্তি
এর উপদিষ্ট মদীয়, আদেশ রূপ স্ব স্ব বর্ণাশ্রমমাচিত যাবতীয় ধর্মের প্রতিও
উপেক্ষা করত কেবল আমারই ভজনে যাহারা নিরন্তর প্রবৃত্ত হন, তাঁহারাই
প্রকৃত সাধুপদবাচ্য, সন্দেহ নাই।
জ্ঞতা জ্ঞাত্বাথ যে বৈ মাং যাবা যাস্মি যাদৃশঃ।
ভজনন্যভাবেন তে মে 'ভক্ততমা মতাঃ ।
দেশকালদিতে আমি যেরূপ অপরিল্লি, সজীব হৃদয়ে যেরুপে অবস্থিতি
কনি এবং আমি যেরূপ সচ্চিদানন্দ বিগ্রহ, শাস্ত্র ও গুরুর উপদেষয়ে
আমার এই ভাব যাহারা বারম্বর স্বৰূপতঃ উপলব্ধি কৰিা অনন্যভাবে আমার
ভজনা করে, তাহারাই আমার অভিপ্রেত ভক্ত বলিয়া জানিবে ।
t
মল্লিঙ্গমক্তজনদর্শনস্পর্শনার্ড।
পরিচৰ্যাস্তুতিপ্রহগুণকৰ্ম্মানুকীৰ্ত্তনং।
হে উদ্ধ। আমার প্রতিমা ও. আমার ভক্তগণের, দর্শন, স্পর্শ, পূজা,
পরিচর্যা, স্তুতি নষঙ্কার-ও গুণকীর্তন,
মৎকথাশ্রবণে শ্রদ্ধা মসুজ্জামমুগ্ধব।
সলাভেপহরণং দানােত্মনিবেদনং।
মকর্মকথন মম।পর্বানুমােদ।
বাজিগেঠীতিমগুলােও:

পরিশিষ্ট। ১৭ '। ধাত্রাবলিবিধানাঞ্চ সার্ষিকপর্ব। বৈদিকী তান্ত্রিকী দীক্ষা মদীয়ব্রতধারণং । মমার্চা স্থাপনে শ্রদ্ধা স্বতঃ সংহত্য চোদ্যমঃ। উদ্যানােপবনাক্রীড়পুরমরিকৰ্ম্মণি। ? * মৎকথা শ্রবণে শ্রদ্ধা, মদীয় অনুধ্যান (লীলা চিন্তা প্রাপ্ত সর্বপদার্থ আমাকে সমর্পণ ও দাস ভাবে আত্ম-নিবেদন, আমার জন্ম কর্ম বিষয় আলােচনা, জন্মাষ্টমী প্রভৃতি পৰ্বেপলক্ষে গীতবাদ্য ও বাদ্যের দ্বারা সপরিবারে মিলিত হইয়া উৎসব করা, আমার প্রতিমা দর্শন জন্য তীর্থাদি ভ্রমণ, জন্মাষ্টমী ও একাদশী প্রভৃতি পৰ্ব দিনে পূজাদির ব্যবস্থা, বৈদিক ও তান্ত্রিক দীক্ষা অনুসারে মন্ত্র গ্রহণ এবং একাত্যাদি ব্রত পালন, আমার মূর্তি প্রতিষ্ঠার্থ বিশেষ আদর যত্ন করা, নিজে বা অন্যের দ্বারা আমরা উদ্দেশে পুষ্পেষ্মান, ফলােস্থান ও ক্রীড়া মন্দিরের প্রতিষ্ঠা, ব সংমার্জনােপলেভ্যাং সেকমণ্ডলবৰ্ত্তনৈঃ। গৃহশুষণং মহং দাসবদমায়য়া। ফলের আশা পরিত্যাগ পূর্বক ভৃত্যের ন্যায় বিষ্ণু মন্দিরের সম্মার্জন, গোময়াদি দ্বারা উপলেপন, জল দ্বারা ধৌত ও চিত্রাদি দ্বারা মন্দির সুশােভিত করা 'সতত 'সাধু ভক্তের অবশ্য কর্তব্য। অমানিত্বমদস্তিত্বং কৃতস্যাপরিকীৰ্ত্তনং। অপি দীপাবলােকং মে নােপযু্যান্নিবেদিতং । । আমি এই কাৰ্য্য করিয়াছি বলিয়া অহঙ্কার বা যক্ষা, প্রাধান্য লাভের চেষ্টা বা কোনরূপ দাম্ভিকতার ভাব হৃদয়ে রাখা কর্তব্য নহে। এলন কি আমি অমুক কৰ্ম্ম করিয়াছি বলিয়া স্বপ্নেও জগতে তাহার পরিচয় দেওয়া কর্তব্য নহে। এবং আমার উদ্দেশ্যে প্রদত্ত দীপালােকে নিজের কোন প্রয়ােজন সাধন করা কর্তব্য নহে। ( এমন কি ভগবদুদ্দেশে দীপ দান করিলেও তাহা নিজ ব্যবহারে লাগাইবে {

শ্রীকৃষ্ণ।
না। কিন্তু ভগবহুদ্দেশ্যে উৎকৃষ্ট নৈবেদ্য প্রসাদ গ্রহণে কোন দোষ নাই।
বরং তাহা ভক্তি পূর্বক গ্রহণ করিলে শেয়ােলাই হইয়া থাকে। বিষ্ণুর
উদ্দেশ উৎসর্গীকৃত নৈবেদ্য দ্বারা অষ্ট দেবতার পূজা হইতে পারে। কিন্তু অষ্ট
দেবতার উৎসৃষ্ট নৈবেদ্য দ্বায় বিষ্ণুর পুজা করিতে নাই।
স্টতমং ললাকে যচ্চাতিপ্রিয়মাত্ম
বেদয়েহং তদানিন্তায় করতে।
সকল লােকে যে যে বস্তু উত্তম বলিয়া জ্ঞান করে এবং যে যে বস্তু নিজের
অত্যন্ত প্রিয়তম, সেই সেই বস্তু আমাতে সমৰ্পণ কমিলে অমন্তে সমর্পণের অক্ষয়
মুখ লাভ হইয়া থাকে। (ভগবানকে কোন বস্তু দান করিলে তাহা আর নিজে
ব্যবহার করিতে নাই; তাহা ত্যাগ ও প্রেমের নিদর্শন।
সূৰ্যোংগ্নি ব্রাহ্মণ গাৰৰ বৈষ্ণবঃ খং মরুলং।
ভূরাত্মা সৰ্ব্বভূতানি ভদ্রপূজাপদানি মে।
সূৰ্যে9 বিদ্যুয়া য্যা হবিষাগ্নৌ যজেত মাং।
আতিথেন তু বিশ্বে গােঙ্গ ঘদিনা।
হে সৌম! সূৰ্য্য, অগ্নি, ব্রাহ্মণ, গাভী, বৈষ্ণব, আকাশ, অনিল, জল,
ভূমি, আত্মা ও ভূত সমূহই আমার পূজার উত্তম আধার।
বেদোক্ত সূক্ত মন্ত্র ও উপাসনাদি দ্বারা দিবাকরে, ঘৃতাহুতি দ্বারা হুতাশনে,
আতিথ্য সৎকারে ব্রাহ্মণে, তৃণাদি ভােজন দান ও গাত্র কয়নাদি দ্বারা
বৈষ্ণবে বন্ধুসৎকৃত্যা হৃদি খে ধ্যাননিয়া।
বায়ৌ মুখ্যধিয় তােয়ে দ্রব্যৈস্তোয়পুরঃসরৈঃ।
বন্ধুর স্থায় সম্মান প্রদর্শন পূর্বক বৈষ্ণবে, ধ্যানধারণাদি দ্বারা হৃদযাকাশে,
পিশ দৃষ্টিতে অনিলে এবং কুমাদিসহ জলাঞ্জলি প্রদানে সলিলে,
পুণ্ডিলে মন্তহৃদয়র্ভৈাগৈরাত্মানমাত্মনি।
ক্ষেত্রজ্ঞং সর্বভূতেষু সমনে যজেত মাং।

পরিশিষ্ট।
৪
।
।
মন্ত্রোচ্চারণ পূর্বক বীজদ্যাস করত ভূমিতে, শাস্ত্রবিহিত ভােগ প্রদানে নিজ
দেহে এবং আমি সৰ্বাশুৰ্য্যামী ক্ষেত্রজ্ঞ ইহা চিন্তা পূৰ্ব্বক সমদৃষ্টিতে সর্বপ্রাণীতে
আমারই আরাধনা করা কর্তব্য।
ধিষ্ণেধিতেষু মােপং শঙ্খচক্রগদাঘুজৈঃ।
ং চতুর্ভুজং শান্তং ধ্যায়ন্নৰ্চেৎ সমাহিতঃ ।
ইষ্টাপূৰ্ত্তেন মামেবং যাে যজেত সমাহিতঃ।
লভতে ময়ি সদ্ভক্তিং মৎস্মৃতিঃ সাধুসেবয়া ।
এই সমস্ত পূর্বোক্ত অধিষ্ঠানে মদীয় শঙ্খ, চক্র, গদা ও পদ্মধারী চতুভুজ
মূর্তি সমাহিতচিত্তে চিন্তা ও অর্চনা করা কর্তব্য।
যিনি বিশেষ একাগ্রতা সহকারে বেদোক্ত যাগ, যজ্ঞ ও মৃত্যুক্ত কূপ ও
আরামাদির প্রতিষ্ঠারূপ কৰ্ম্ম সমূহের দ্বারা আমার অর্চনা করেন, তিনি
নিঃসন্দেহে তাদৃশ সদনুষ্ঠান দ্বারা ভাগবতী মতি ও পরম ভক্তি লাভ করেন।
প্রায়েণ ভক্তিযােগেন সৎসঙ্গেন বিনােন্ধব।
নােপায়াে বিদ্যতে সম্যক্ প্রায়ণং হি সতামহং ।
হে উদ্ধব ! সাধুসঙ্গ, এবং ভক্তিযোেগ ব্যতীত সাধারণতঃ
জীবের উদ্ধার্থ অন্য কোন উপায়ই দেখিতে পাওয়া যায় না।
কারণ আমিই সাধুগণের একমাত্র আশ্রয়।
।
ন রােধয়তি মাং যােগাে ন সাংখ্যং ধৰ্ম্ম এব চ।
ন স্বাধ্যায়স্তপস্তাগগা নেষ্টাপূৰ্ত্ত ন দক্ষিণা।
ব্ৰতানি যজ্ঞন্দাংসি তীর্থানি নিয়মা যমাঃ ।
যথাবরুন্ধে সৎসঙ্গঃ সর্বসঙ্গাপহােহি মাং ।
শ্রীকৃষ্ণ বলিলেন যে, সর্বসঙ্গ নিবর্তক একমাত্র সাধুসঙ্গে আমাকে যেমন
আবদ্ধ করিতে পারে, যম নিয়মাদি যােগ, তত্ত্ববিবেকরূপ সাংখ্যজ্ঞান, পরােপ
[৭]

আকৃষ্ণ।
~~~~~~
~~~~~~~~
কারাদি ধৰ্ম, বেদাধ্যয়নাদি স্বাধ্যায়, চায়গাদি তপস্যা, সন্ন্যাসরূপ ত্যাগ,
অগ্নিহােত্রাদি বৈদিক কৰ্ম্ম এবং ইষ্টার্তাদি স্মাৰ্ত কৰ্ম্ম বা দানরূপ দক্ষিণা
অথবা উপবাসাদি ব্ৰত, দেবারাধনা, সরই মন্ত্রের জপ, তীর্থসেবা, শোঁচাদি
নিয়ম ও অহিংসাদি যমের অনুষ্ঠানে কখনই তেমন করিতে পারে না।
সংসঙ্গেন হি দৈত্যেয়া যাতুধানাঃ খগা মৃগাং।
গন্ধর্বাপরসসা নাগাঃ সিদ্ধাশ্চারণগুইকাঃ ।
বিদ্যাধরা মনুষুে বৈশ্যাঃ শূদ্রাঃ খ্রিয়ােহন্তজাঃ।
রজস্তমপ্রকৃতয়স্তস্মিংস্তস্মিন্ যুগে যুগে ?
কেবল সাধুসঙ্গের ফলে দৈত্যেয়, রাক্ষস, খগ, গন্ধর্ব, অপ্সরা, নাগ, সিদ্ধ,
চারণ, গুহক ও বিদ্যাধরগণ, মনুষ্য মধ্যে বৈশ্য, শূদ্র, নারী এবং অন্ত্যজ জাতি,
অধিক কি, রজঃ ও তম প্রকৃতি অনেক জীবজন্তুও সেই সেই যুগে মৎপদবী
লাভ করিয়াছে।
বহবাে মৎপদং প্রাপ্তাকায়াধবাদয়ঃ ।
বৃষপর্ব বলির্বাণাে ময়শ্চাথ বিভীষণঃ ।
সুগ্রীবে হনুমানৃক্ষো গজো গৃধ্রে বণিপথঃ।
ব্যাধঃ কুজা ব্ৰজে গােপ্যো যজ্ঞপত্নস্তথারে ।
অধিক কি, বৃত্রাসুর, হিরণ্যকশিপুতনয় প্রহলাদ, বৃষপৰ্ব্বা বলি, বাণ,
ময়দানব, বিভীষণ, সুগ্রীব, হনুমান, জাম্বুবান্, গজ, জটায়ুপক্ষী, তুলাধার
বণিক, ধৰ্ম্মব্যাধ, কুজা, ব্রজের গােপিকাকুল এবং যজ্ঞপত্নীগণও পরমগতি
প্রাপ্ত হইয়াছে।
}
তে নাধীতশ্রুতিগণা নােপাসীতমহত্তমাঃ ।
অব্ৰতাতপ্ততপসে মৎসঙ্গান্মমুপগতাঃ ।
ইহাদের মধ্যে কেহ বেদাদি শাস্ত্র অধ্যয়ন করে নাই, বা বেদার্থদশী পণ্ডিত
ও শুশ্রুষা করে নাই; কখন কোন ব্রত বা তপস্যারও অনুষ্ঠান করে
নাই। কেবল এক সৎসঙ্গের গুণে তাহারা সকলেই পরমগতি লাভ করিয়াছে।

পরিশিষ্ট। } কবল্লেন ছি ভাবের গােপো গাৰৰ নগা মৃগাঃ। মেহন্যে মুধিয়াে নাগাঃ সিদ্ধা মামীয়ুরঞ্জসা। কেবল মচ্চিত্ত ও মদগত প্রাণ হইয়াই গােপিকাগণ, গাভীকুল, যমলাৰ্জ্জুন, মৃগ, কালিয় সর্প এবং অন্যান্য মূঢ়বুদ্ধি জীবও মৎস্বারূপ্য প্রাপ্ত হইয়া কৃতার্থ হইয়াছে। যং ন যােগেন সাংখ্যেন দানব্রত তােহধ্বরৈঃ। ব্যাখ্যাম্বাধ্যায়সন্ন্যাসৈঃ প্রাপুয়াদযত্নবাপি। বিশেষ যত্নাতিশয়ে যােগের অনুষ্ঠান, সাংখ্য জ্ঞানের অনুশীলন, দান ব্ৰত, তপস্যা ও যজ্ঞাদির সুষ্ঠু আচরণ, ধৰ্ম্ম কীৰ্ত্তন, বেদাধ্যয়ন, বা সন্ন্যাস অবলম্বনেও লােকে যে ফল লাভ করিতে পারে না, সেই সৰ্ব্বফলশ্রেষ্ঠ মৎস্বরূপকে তাহারা এক সৎসঙ্গের গুণে অনায়াসে লাভ করিয়াছে। রামেণ সার্ফং মথুরাং প্রণীতে শ্বাফল্কিনা ময্যমুক্তচিত্তাঃ । বিগাঢ়ভাবেন ন মে বিয়ােগতীব্রাধয়ােহন্যং দদৃশ্যঃ সুখায়। অক্রুর সমভিব্যাহারে আমি বলরামকে সঙ্গে লইয়া মথুরায় গমন করিলে আমাতে অনুরক্তচিত্ত গোপীকুল আমার বিচ্ছেদরূপ দুঃসহ দুঃখে এরূপ নিপীড়িত হইয়াছিল যে, আমা ব্যতীত সংসারের কোন পদার্থই তাহাদের সে দুঃখ নিবারণ করিতে বা সুখ দানে সমর্থ হয় নাই। তাপ্তাঃ ক্ষপাঃ প্রেতমেন নীতা ময়ৈব বৃন্দাবনগােচরেণ। ক্ষণার্ধবত্তাঃ পুনরঙ্গ তাসাং হীনা ময়া কল্পসমা বভূবুঃ । হে প্রিয়তম! বৃন্দাবনে আমার অবস্থানকালে আমাকে প্রাণপ্রিয় বেধে আমার সহিত তাহারা যে সকল রাত্রি ক্ষণার্ধের ন্যায় অতিবাহিত করিয়াছি এক্ষণে আমার অদর্শনে সেই রাত্রিই তাহাদের নিকট এক এক করে স্যায় বোধ হইতেছে। তানাবিদয্যনুষঙ্গবন্ধধিয়ঃ মাত্মানমদস্তথেদ। যথা সমধৌ মুনয়োহজিতেয়ে নঃ প্রবিষ্টা ইব নামরূপে } শ্রীকৃষ্ণ। -- গােপীগণ আমাতে এরূপ ভাবে চিত্ত সমৰ্পণ করিয়াছিল যে, নিজ দেহ, পতি পুত্র প্রভৃতি যাবতীয় আমার বলিবার বস্তু, ইহলােক বা পরলােক-ইহা- দের কোন কিছুর প্রতিই তাহাদের দৃষ্টি ছিল না। যেমন মুনিগণ সমাধিযােগে আত্মবিস্মৃত হইয়া নাম রূপ ও অস্তিত্ব ভুলিয়া যান, নদী সমুদ্রে প্রবিষ্ট হইয়া আপন স্বরূপ হারাইয়া ফেলে, তদ্রুপ গােপিকাগণও আমাতে আত্মসমর্পণ করত মায়াময় ভাব পরিত্যাগ পূৰ্ব্বক আমাতেই প্রবিষ্ট হইয়া আমাময় হইয়া গিয়াছিল। মৎকামা রমণং জারমস্বরূপবিদোহবলাঃ। ব্ৰহ্ম মাং পরমং প্রাপুঃ সাচ্ছতসহস্রশঃ ॥ তাহারা আমার স্বরূপ অবগত নহে; বুদ্ধিহীন সামান্য নারীজাতি; তথাপি একমাত্র সৎসঙ্গের গুণে জারজ্ঞানে সঙ্গত হইয়াও তাহারা রতিসুখপ্রদ পূর্ণব্রহ্ম আমাকে অনায়াসে লাভ করিয়াছিল। । ; তস্মাত্ত্বমুদ্ধববাৎসৃজ্য চোদনাং প্রতিচোদনাং। প্রবৃত্তঞ্চ নিবৃত্তঞ্চ শ্রোতব্যং শ্রুতমেব চ। মামেকমেব শরণমাত্মানং সর্বদেহিনাং। যাহি সর্বাত্মভাবেন মােস্যা হকুতােভয়ঃ ॥ অতএব হে উদ্ধৰ ! তুমি কর্মোপদেশক শ্রুতি বা স্মৃতি, বিহিত বা নিষিদ্ধ কর্ম, এবং শুত বা কোন শ্রোতব্য বিষয়ের প্রতি আস্থা না করিয়া সর্বতােভাবে সর্বদেহীর অন্তরাত্মা এই আমারই শণাপন্ন হও; আমা হইতেই তুমি নির্ভয় হইবে। উদ্ধব বলিলেন, হে যােগীশ্বর ! আপনার উপদেশ শ্রবণ করিয়াও আমার মনে সন্দেহ জন্মিতেছে যে; কৰ্ম্ম ত্যজ্য কি অনুষ্ঠেয় ? অতএব আমার সন্দেহ দূর করুন। শ্রীকৃষ্ণ বলিলেন, আমি জীবের দেহবিবরে অলক্ষ্যভাবে অবস্থান করত অপরােক্ষ ভাবে ও পরমেশ্বররূপে জীবকে জীবিত রাখি। নাদ বিশিষ্ট প্রাণ- বায়ুযােগে আধার চক্রে প্রবিষ্ট হইয়া মনােগ্রাহ্ সূক্ষ্মরূপ অবলম্বনে প্রথম হ্রস্ব দীর্ঘাদি মাত্রা, পরে উদাত্তাদি স্বর এবং অবশেষে অকারাদি বর্ণ ও স্কুল বেদরূপে আমিই পরিণত হই। t পরিশিষ্ট। অনল যেমন সামান্যাকাশে অব্যক্ত উষ্মরূপেই বিদ্যমান থাকে, কিন্তু বল- পুৰ্ব্বক ঘৰণ করিলে কাষ্ঠ মধ্যে অতি সূক্ষ্ম ভাব ধারণ পূর্বক বায়ুর সাহায্যে প্রকৃষ্টরূপে পরিণত হইয়া ঘৃতাদির সংযােগে পরিবর্ধিত হয়, সেইরূপ বেদরূপা বাণীই আমার স্বরূপের অভিব্যক্তি জানিবে। এইরূপ বাগিন্দ্রিয়ের কাৰ্য্য কথন, হস্তের কাৰ্য্য গ্রহণ, পদের কাৰ্য্য গতি, পায়ুর কাৰ্য্য মলমূত্রাদি পরিত্যাগ, উপস্থের কৰ্ম্ম আনন্দোপভােগ, নাসিকার ঘ্রাণ, জিহ্বার রসাস্বাদন, চক্ষুর দর্শন, ত্বকের স্পর্শ ক্রিয়া, কর্ণের শ্রবণ, মনের সংকল্প, বুদ্ধির বিচার, অহঙ্কার তত্ত্বের অভিমান, প্রধানের বৃত্তিসূত্রণ, এতদ্ব্যতীত রজোগুণের কাৰ্য্য ইন্দ্রিয়বর্গ, সত্ত্বগুণের কাৰ্য ইন্দ্রিয়াধিষ্ঠিত দেবতাবর্গ এবং তমােগুণের আধিক্যে উৎপন্ন পৃথিব্যাদি মহাভূতবর্গ, এই সমুদয়ই এক মৎ- স্বরূপেরই অভিব্যক্তি মাত্র। গুণত্রয়ের আশ্রয়স্বরূপ এবং পদ্মযোনির কারণীভূত সৰ্ব্বচেতন-চেতয়িতা সনাতন অদ্বিতীয় পরম পুরুষ প্রথমতঃ এইরূপ অব্যক্ত ভাবেই বিরাজ করিতেন। পরে ক্ষেত্র লাভে বীজ যেমন বৃক্ষাদিরূপে শতধা প্রকাশ পায়, সেইরূপ কালক্রমে ইচ্ছাশক্তির উদগমে বিবিধ ইন্দ্রিয়াদি বিচিত্র ভাবে এক তিনিই অভিব্যক্ত হইতেছেন। যেমন সূত্র সমূহের দীর্ঘ পাতনে ওত এবং তিৰ্য্যপাতনে পােত থাকাই বস্ত্র, সেইরূপ সৰ্ব্বকারণ এক পরমপুরুষ ঈশ্বরেই সৃষ্টি সংহারের আতান বিতানেই এই পরিদৃশ্যমান ব্ৰহ্মাণ্ড সৰ্ব্বতােভাবে রচিত পরিদৃষ্ট হইতেছে। এই যে সমষ্টি ও ব্যষ্টিরূপ দেহের কথা বলা হইল, তাহাই প্রবৃত্তি স্বভাব আদিভূত সংসার বৃক্ষ; ইনি অদৃষ্টরূপ পুষ্প ও সুখদুঃখাদিরূপ ফল নিরন্তর প্রসব করিতেছেন এই বৃক্ষের পুণ্য ও পাপ নামে দুইটী বীজ আছে। কিন্তু ইহার বাসনারূপ মূল অনন্ত। সত্বাদি গুণত্রয় ইহার তিনটী কাণ্ড। পঞ্চ-মহাভূত ইহার পঞ্চ স্কন্ধ ; শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস ও গন্ধ ইহার পঞ্চরস ; দশবিধ ইন্দ্রিয় ও মন এই একাদশটা ইহার শাখা, জীবাত্মা ও পরমাত্মা ইহার দুইটা পক্ষী। বাত, পিত্ত কফ, এই তিনটা ইহার ত্রিবিধ ত্বক। এই বৃক্ষের ফল দুইটী সুখ ও দুঃখ। সূর্যমণ্ডল ভেদ করিয়া ইহা বিরাজ করিতেছেন। T শ্রীকৃষ্ণ। এই শরীর বৃক্ষের দুঃখত্মক ফলটী বিষয়াভিলাষী গৃহস্থণ ভােগ করে ; এবং বিবেকী অরণ্যচারীবৃন্দ ইহার সুখময় ফল ভােজন করিয়া থাকেন। মায়ার প্রভাবে বহুরূপে বিরাজমান এক পরমাত্মাকে যাহাৱা শুরু মুখে অবগত হইতে পারেন, তাহারাই প্রকৃত প্রস্তাবে কোর্থের তাৎপৰ্য অরপ্নরণে সমর্থ । এই প্রকারে সাবধান ও জিতেন্দ্রিয় পুরুষ গুরুসেবা দ্বারা যে ভগবদ্ভক্তি লাভ করেন এবং অদুৎপন্ন আত্ম-সাক্ষাৎকাররূপ তীক্ষ্ণ জ্ঞানকুঠারের তীব্র আঘাতে দেহদির আত্মাভিমান ছেদন করত যখন পাত্মাকে প্রাপ্ত হন, তখন আর তাহার শান্ত্রোক্ত সাধন সমূহের প্রয়ােজন থাকে না; তখন তিনি তাহা অনায়াসে পরিত্যাগ করিতে পারেন। সত্ত্বং রজস্তম ইতি গুণা বুদ্ধের্নচাত্মনঃ। সত্ত্বেনান্যতমৌ হ্যাৎ সত্ত্বং সনে চৈব হি। শ্রীকৃষ্ণ বলিলেন, সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ এই তিনটী, বুদ্ধিরই গুণ, আত্মার নহে। সত্বগুণের আধিক্যে রজঃ ও তমঃগুণ বিনষ্ট হইয়া যায় ; আর সত্ত্বগুণও স্বীয় সাত্ত্বিক বৃত্তির আচরণে স্বয়ং আপনাতে আপনিই প্রশমিত হয়। সত্ত্বাদ্ধৰ্ম্মো ভবেন্দ্বদ্ধাৎ পুংসে মদ্ভক্তিলক্ষণঃ। সাত্ত্বিকোপাসয়া সত্ত্বং অবােধৰ্ম্মর প্রবর্ততে । সত্ত্বগুণের বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে জীবের ভগবদ্ভক্তিরূপ ধর্মের উদ্রেক হয়। সাত্ত্বিক ভাবের উপাসনায় সত্ত্বগুণের বৃদ্ধি হয় এবং তাহাতেই ধৰ্ম প্ৰবৰ্ত্তিত হইয়া থাকে। ধৰ্ম্মো রজস্তমাে হ্যাৎ সত্ত্ববৃদ্ধিরনুত্তমঃ । আশু নশ্যতি তন্মুলাে হধৰ্ম্ম উভয়ে হুতে। • গুণত্রয়ের মধ্যে সত্বগুণই উৎকৃষ্ট ; এই গুণের বৃদ্ধিতে রজঃ ও তমঃগুণ ক্রমশঃ বিলুপ্ত হইয়া ধর্মের উন্নতি সাধন করে। সুতরাং রজো ও তমােগুণের বিনাশে তৎপন্ন অধর্ম সমূহও সম্পূর্ণ উন্মলিত হইয়া যায়। । ;

পরিশিষ্ট। } । আগমােহপঃ প্ৰজা দেশঃ কালঃ কৰ্ম্ম চ জন্ম চ। ধ্যানং মন্ত্রোহথ সংস্কারাে দশৈতে গুণহেতব। শাস্ত্র, সলিল, জনসমূহ, দেশ, কাল, কর্ম, জন্ম, ধ্যান, মন্ত্র এবং স এই দশটা গুণগণকে বর্ধিত করিয়া থাকে। তৎ সাত্ত্বিকমেবৈষাং যদ্যদ্ দ্ধাঃ প্ৰচক্ষতে। নিন্দন্তি তামসং তত্তদ্ৰাজসং তদুপেক্ষিতং । ইহাদের মধ্যে জ্ঞানিগণ যে যে বস্তুগুলির প্রশংসা করেন, সেইগুলিই জোৎপাদক আর যে গুলির নিন্দা করেন, সেগুলি তামস স্বভাব; এবং যে সমস্তকে উপেক্ষা করেন সেই সকল পদার্থকে রাজস বলিয়া জানিবে । সাত্ত্বিকাবে সেবেত পুমান্ সত্ত্ববিবৃদয়ে। ততো ধৰ্ম্মস্ততাে জ্ঞানং যাবৎ স্মৃতিরপােইনম্ ॥ সত্ত্বগুণের পরিবর্ধনাৰ্থ সেই সত্ত্ব-সাধক বিষয় সমুহের সেবা বা পঠন মনন আলােচনাদি করা কর্তব্য। সাত্ত্বিক বিষয়ের সেবা দ্বারা ধর্মোৎপন্ন হয়। এবং ধৰ্ম্ম হইতে আত্ম-পরমাত্ম সাক্ষাৎকাররূপ জ্ঞানের উদয় হইয়া যাবজ্জীবন তদ্বিষয়ক স্মৃতির প্রবাহে ‘অনিত্য দেহ গেহাদিতে আমি ও আমার এই মিথ্যাভিমান বিলুপ্ত হয়। বেণুসংঘর্ষণজ অগ্নি যেমন স্বীয় উৎপাদক বেণুবনকে দগ্ধ করত স্বয়ং আপনাতেই আপনি উপশমিত হয়, তপ গুণত্রয়ের পরস্পর অভিভাব্য অভিভাবক বা কাৰ্য কারণ সম্বন্ধে সমুৎপন্ন দেহ আপনা হইতে উৎপন্ন জ্ঞান দ্বারা স্বীয় হেতুভূত গুণগণকে নিরস্ত করিয়া আপনিও নিবৃত্ত বা লয় প্রাপ্ত হয়। উদ্ধব বলিলেন, হে কৃষ্ণ! বহুলােকই বিষসম্ভোগকে অনন্ত দুঃখের আকর বলিয়া অবগত থাকিলেও তবু কেন আপন পরিণামের প্রতি কিছুমাত্র দৃষ্টি না কমিথ্যা নিতান্ত নিকৃষ্ট কুকুর, গর্দভ ও অজের ন্যায় পুনরায় সেই ভােগ আর্মক্ত হয় ? ঐকৃষ্ণ বলিলেন, উদ্ধব। বিচারহীন প্রমও ব্যক্তির হৃদরে সর্বাগ্রে “আমি একটা মিথ্যা প্রমবুদ্ধির উদয় হয়। সেই অমবুদ্ধি হইতে তাহার সত্ত্ব- ৮ৈ প্রধান মনের অভিমুখে দুঃখের কারণ রজোগুণ অগ্রসর হইয়া তাহাকে অভিভূত করে। সুতরাং আবিষ্ঠা প্রভাবে বিমােহিতচিত্ত ব্যক্তি রজঃপ্রধান মনােমধ্যে “এই আমার ভােগ্য” বলিয়া ভােগবিষয়ক বৃত্তির উদয় হইলে সে তৎক্ষণাৎ বিষয়ের চিন্তায় নিমগ্ন হইয়া নানা দুঃখের আকর ভােগ বিলাসে প্রবৃত্ত হয়। রজোগুণের প্রচণ্ডবগৈ বিমােহিত অজিতেন্দ্রিয় পুরুষ কামের বশবর্তী হইয়া দুঃখপ্রদ ফল প্রত্যক্ষ করিয়াও ভােলালসা চরিতার্থ কদুপায়ক কৰ্ম্ম সমূহ অতি যত্নের সহিত সম্পাদন করিয়া থাকে। রজোন্তমােভ্যাং যদপি বিদ্বান্ বিক্ষিপ্তধী পুনঃ। মনাে যুঞ্জ দোষবৃষ্টি ন সজ্জতে। যাহাৱা দেহাদি হইতে আত্মাকে সম্পূর্ণ পৃথক বলিয়া অবগত আছেন, তাদৃশ জ্ঞানবানের হৃদয়ে যখন রজঃ ও তমঃগুণের উদয়ে চিত্ত বিক্ষিপ্ত হয়, তখন তঁাহার। অতি সাবধানতার সহিত বিষয়ের দোষ অনুসন্ধান পূর্বক চিত্তকে নিরুদ্ধ করত আর বিষয়ে আসক্ত হন না। আলস্যহীন সাবধানী ব্যক্তি আসন ও প্রাণৰায়ুকে জয় করিয়া পরমানন্দ অরূপ আমাতে চিত্ত সমর্পণ পূৰ্ব্বক ক্রমান্বয়ে তাহার ৰ্য্যৈ সাধন করিয়া থাকেন। যাবতীয় বিষয় হইতে চিত্তকে আকর্ষণ পূর্বক আমাতে সমাহিত করিতে পারাকেই মদীয় শিষ্য সনকাদি ঋষিগণ পরমযােগ নামে অভিহিত করিছেন। তা শুনিয়া উদ্ধৰ বলিলেন, হে কেশব! আপনি সনকাদি ঋষিগণকে যে উপদেশ দিয়াছেন, তাহা আমি শুনিতে ইচ্ছা করি ; অনুগ্রহ পূর্বক তাহা বলুন। শ্রীকৃষ্ণ বলিলেন, কোন সময়ে ব্রহ্মার মানসপুত্র সনকাদি ঋষি তাঁহার নিকট উপস্থিত হইয়া মােপ্ৰদ পরমযােগের বিষয়, তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করেন। সৃষ্টি বিষয়ে ব্রহ্মার চিত্ত বিক্ষিপ্ত থাকায় সদুত্তর দিতে না পারিয়া আমাকে চিন্তা করিলে আমি হংসরূপে তাহাদের নিকট উপস্থিত হই। আমাকে দেখিয়া তাঁহারা জিজ্ঞাসা করিলেন, আপনি কে? হংস বলিলেন, হে বিপ্রগণ ! পরমার্থভূত আত্মস্বরূপ জীবতত্বের অবগতির পবিশিষ্ট। ৫৭ এত আপনারা যদি আপনি কে” বলিয়া প্রশ্ন করেন, তাহা হইলে চৈতাংশের আত্মার একত্ব জন্য আপনাদের এরূপ প্রশ্ন সঙ্গত হয় না। এবং জীবমাত্রেরই আত্মার কোন ভেদ না থাকায়, কোন্ পার্থক্য অবলম্বনে যে আমি আপনাদের প্রশ্নের উত্তর দিব, তাহাও নিরুপণ করা যায় না। দেব মনুষ্যাদি শরীরেও যখন পঞ্চ-মহাভূত সমানভাবে সর্বত্র বিরাজ করিতেছে, তখন আপনাদের কে আপনি” বলিয়া প্রশ্নও নিরর্থক। মনসা বাচা দৃষ্ট্যা গৃহতেইন্যৈরপীন্দ্রিয়ৈঃ। অহমেব ন মতোহন্যদিতি বুধ্যধ্বমঞ্জসা। মন, বাক্য, চক্ষু বা যে কোন ইন্দ্রিয়ের দ্বারা যে কোন বস্তুকেই গ্রহণ করা যায়, সে সমস্তই একমাত্র আমি। আমি ভিন্ন জগতে আর অন্য কোন বস্তুই নাই, ইহা বিচার পূর্বক অবধারণ করুন। গুণোবিশতে চেতাে গুণাশ্চেতসি চ প্রজাঃ। জীবস্ত দেহ উভয়ং গুণাশ্চেতে মদাত্মনঃ। হে পুত্রগণ! বিষয়ে চিত্ত আসক্ত হয় এবং চিত্তে বিষয় বস প্রবেশ করে, সত্য। কিন্তু বিষয় ও চিত্ত এই উভয় একত্র মিলিত হইয়াই মদীয় অংশ সস্তৃত জীবের ভােগায়তন দেহ নির্মিত হয়, কেবল দেহ কখনও জীবের স্বরূপ নহে। গুণেষু চাবিশচ্চিত্তমভীক্ষং গুণসেবয়া। গুণাশ্চ চিত্তপ্ৰভবা মপ উভয়ং ত্যজেৎ । গুণ বা বিষয়-সম্ভোগ দ্বারা তৎসংস্কার নিবন্ধন চিত্ত বিষয়ের অভিমুখেই ধাবিত হয় এবং বিষয়সও বাসনারূপে চিত্তকে আশ্রয় করে। কিন্তু মজ্জপ— আমার স্বরূপের সাক্ষাৎকার লাভ করিতে পারিলেই চিত্ত ও বিষয়, এই উভয়ের হস্ত হইতেই পরিত্রাণ পাওয়া যায়। জাগ্রত, স্বপ্ন ও সুষুপ্তিও গুণ সমূহের প্রকার ভেদে বুদ্ধির এক একটা বৃত্তিমাত্র। জীব এই অবস্থা সমূহের অতীত। তিনি এই সমস্ত বৃত্তির সাক্ষীরূপে নিয়ত বিরাজ করেন। যে বুদ্ধির প্রভাবে দেবাদি বিভিন্ন যােনিতে ভ্রমণ ঘটে, তাহাই জীবের প্রকৃত [৮] শ্রীকৃষ্ণ । বন্ধন। এবং এই বন্ধনজনিত কাৰ্যবশে জীবকে এই প্রকার জাগ্রতাদি বিবিধ বৃত্তি ভোগ করিতে হয়। কিন্তু যদি জীব এই জাগ্ৰতাদি অবস্থায় অতীত তুরীয় স্বরূপ আমাতে অবস্থান করে, তাহা হইলে তৎক্ষণাৎ তাহার সংসার বন্ধন কাটিয়া যায়। এবং তখনই তাহার বিষয় ও চিত্ত এই উভয়েরই বিলােপ সাধন ঘটে। দেহাদিতে আমিত্ব-বােধের জঙ্গই জীবের বন্ধন ঘটে; এবং তজ্জন্য পরমার্থ স্বরূপের প্রতীতিও হয় না। সুতরাং জীব স্বভাবতঃ পরমানন্দ স্বরূপ হইলেও আপনাকে উপলব্ধি করিতে না পারিয়া প্রকৃতি বশে দুঃখেই নিমজ্জিত হয়। কিন্তু স্বীয় বন্ধনের কারণ অবগত হইয়া জীব যদি বিষয় হইতে চিত্তকে বিনিবৃত্ত করত তুরীয় স্বরূপ আমাতে অবস্থান পূর্বক দেহাভিমান ও ভােগচিন্তায় বিরত হয়, তবেই তাহার সৰ্বসার্থকতা। যুক্তি ও বিচার বলে যতদিন পুরুষের আত্মার নানাবে বুদ্ধি বিনিবৃত্ত না হয়, ততদিন সে জাগ্রতাবস্থায় স্বপ্নের ন্যায় এবং স্বপ্নাবস্থায় জাতের ন্যায় মিথ্যা প্রমমাত্র উপলব্ধি করে। সে জ্ঞানবানের ন্যায় প্রতীত হইলেও সম্পূর্ণ অজ্ঞান ও প্রশান্ধ। অসত্ত্বাদাত্মনােহন্যেষাং ভাবানাং তৎকৃত ভিদা। গতয়াে হেতবশ্চাত্য মৃষা স্বপ্নদৃশাে যথা । যখন আত্মা ভিন্ন দ্বিতীয় ভাব বা পদার্থান্তরের অস্তিত্বই নাই, তখন দেহাদি- নিষ্ঠভাব, বর্ণাশ্রমাদি বিচিত্র ভেদ, স্বর্গাদি ফল এবং তদুপায়ীভূত যাবতীয় কৰ্ম্মও আত্মার সম্বন্ধে স্বপ্নবৎ মিথ্যা মাত্র জানিবে। অর্থাৎ আত্মা এক ও অদ্বিতীয়। এই জ্ঞানই প্রকৃত জ্ঞান। একমাত্র ইহা উপলব্ধিই সত্য জ্ঞান। এতদ্ভিন্ন অন্য সমুদয়ই মিথ্যা ও মায়াময়। কারণ জগতে এক আত্মা ভিন্ন আর কিছুই নাই। যেমন স্বপ্নে পরমান্ন ভােজন করিলেও তাহাতে ক্ষুন্নিবৃত্তি হয় না; তপ আত্মসাক্ষাৎকারের দ্বারা -আত্মার একত্ব জ্ঞান না জন্মিলে জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য সিদ্ধ হয় না। বিরাট পুরুষকে অবগত হইবার ইহাই প্রাথমিক সংজ্ঞা। এবং মনে ইহা মুদ্রিত হইলেই চির-শাস্তি। ;

পরিশিষ্ট।
রামপ্রসাদ গাহিয়াছেনঃ-
}
L
মিটিবে মনের খেদ, ঘুচিবে সব ভেদাভেদ,
মা আমার আনন্দময়ী তিমিরে তিমিরহরা !
ভেদাভেদ যতক্ষণ না ঘুচিতেছে, ততক্ষণ মনের খেদ মিটিবে না ;ভূমানন্দের
উদয় হইবে না। ইহা সাধনার বিষয়। সাধনা ব্যতীত ইহা লাভের আশা
নাই। আত্মসাক্ষাৎকার না হইলে জাগতিক মায়ার ইন্দ্রজাল ধরা পড়িবে না ;
আসল জিনিষের সন্ধান পাওয়া যাইবে না।
রামপ্রসাদ গাহিয়াছেন -
ডুব দেরে মন কালী বলে,
হৃদি রত্নাকরের অতল জলে।
রত্নাকর নয় শূন্য কখন,
দু' চার ডুবে ধন না মিলে।
হৃদি রত্নাকরের অতল জলে না ডুবিলে সে ধন পাওয়া যায় না। আবার
দু’চার ডুবেও সে ধন মিলে না। রীতিমত দীর্ঘকাল সাধনায় সমাধি আয়ত্ত
করিতে না পারিলে সে ধন পাওয়া যায় না। সুতরাং তাহা কত দুর্লভ ও কত
তপস্যার ফল, তাহা সাধকেরই চিন্তাগম্য।
সৰ্ব্ব জীবে সমদর্শন, মুখের কথা নহে। আজকালকার তথাকথিত
পাশ্চাত্যশিক্ষিত বহু
বাবু চক্ষে নীল
চশমা আটিয়া সমদর্শনের স্বপ্ন
দেখেন! অখাদ্য কুখাদ্য আহার, জীবহিংসা, অগম্যাগমন যাহাদের নিত্য
নৈমিত্তিক কাৰ্য্য, তাহারাই সমতার অজুহাতে ব্রাহ্মণ চণ্ডালে এক পর্যায়ে বসাইতে
ব্যস্ত! কি মুখতা! সংস্কারের নামে তাহারা সমাজসংহারই করিয়া থাকেন।
তাহা যদি হইত, তবে এত সাধনার আবশ্যক কি ছিল ? যে জ্ঞান
হইলে সৰ্ব্ব জীবে সমদর্শন হয়, তাহাতে কি মাংস ও ডিম্বাদি ভােজন জন্য প্রাণী
হিংসার নির্মমতা থাকে ? না তাহাতে ব্রাহ্মণের উপর বিদ্বেষ এবং চণ্ডালের
প্রতি স্নেহ-ধারার উৎস উৎপন্ন হয় ?

শ্রীকৃষ্ণ। যিনি জাগ্রতাবস্থায় অনুক্ষণ বিনাশশীল নশ্বর পদার্থ সমূহকে চক্ষুদি সাহায্যে অনুভব করেন, তিনিই স্বপ্নাবস্থায় জাগ্রত অবস্থার চিন্তিত বিষয় সমূহকেই উপলব্ধি করেন। এবং গাঢ় নিদ্রাকালে সেই সমস্ত স্কুল ও সূক্ষ্মভাবে অনুভবের অভাবে কেবলমাত্র ক্ষীণ স্মৃতিতে জাগ্রত, স্বপ্ন ও সুষুপ্তি এই অবস্থায়ের সাক্ষীরূপে ইন্দ্রিয়াদি বাহ করণ ও বুদ্ধাদি অন্তঃকরণের বৃত্তি সমূহকে প্রত্যক্ষ করিয়া থাকেন। এইরূপ বিচারের দ্বারা গুণাধীন মনের এই জাগ্রত, স্বপ্ন ও সুষুপ্তিরূপ অবস্থায় কেবলমাত্র আমার অংশসভৃত জীবত্মার প্রতিই প্রযুক্ত হয় ; ইহা জানিয়া অনুমান ও বেদোক্ত যুক্তিরূপ তীক্ষ্ণ অসি দ্বারা সমুদয় সংশয়ের মুল ভিত্তি স্বরূপ অভিমানকে ছেদন করিয়া জীবমাত্রেরই হৃদয়ে অদ্ভুতরূপে নিত্য বিদ্যমান্ আমার স্বরূপকে ভজনা কর। জীবের সুখ ও দুঃখাদি যে কোন ভাব দেখা যায়, তাহা মনের বিলাস কল্পনা) মাত্র। তাহা অলাতচক্র বা বিঘূর্ণিত চক্রাকার অগ্নির ন্যায় চঞ্চল ও প্রান্তি দায়ক। এক বিজ্ঞানই (আত্মা) বহু প্রকারে প্রতীত হইতেছে। দেহ, ইন্দ্রিয় ও অন্তঃকরণ এই যে ত্রিবিধ ভেদ, ইহাও অবিদ্যা বা মায়া কল্পিত মাত্র। এইজন্য দেহাদি ইন্দ্রিয়বর্গ হইতে দৃষ্টি প্রতিনিবৃত্ত বা মন প্রত্যাহার করিয়া বিষয়ে (ভােগাদি বিলাস বিষয়ে) বিতৃষ্ণ (আকাঙ্ক্ষা শূন্য ) হওয়া প্রয়োজন। এবং মিজানলে (আত্মানন্দে) পরিতুষ্ট হইয়া নীরবে স্থিরভাবে নিরীহের ন্যায় অবস্থান করিলে ক্ষুৎপিপাসাদি (দেহ পরিপােষণের ধৰ্ম্মাদি জ্ঞাপক) যে সমুদয় বিষয় প্রতীত হইবে, তাহাও আত্মাতিরিক্ত দেহেরই ধৰ্ম্ম বলিয়া বুঝিলে আর ভ্রমে পড়িতে হয় না। দেহের পতন পৰ্যন্তই এই সমস্ত ভাবের সংস্কার মাত্র থাকে। অর্থাৎ আত্মার ক্ষুধাতৃষ্ণা, বিলাসব্যসনাসক্তি প্রভৃতি কিছুই নাই। আত্মচিন্তাই আত্মার ধর্ম। আমরা তদ্ব্যতীত যাহা কিছু করি,—অনুভব বা কল্পনা করি, তৎসমুদয়ই দেহের ধর্ম,মায়ার বিকার মাত্র ! ইহা জ্ঞানের দ্বারা হৃদয়ে মুদ্রিত হইলে আর পতনের আশঙ্কা থাকে না। আত্মজ্ঞানসম্পন্ন সিদ্ধপুরুষ যে দেহের সাহায্যে আত্মজ্ঞান লাভ করিয়াছেন;

পরিশিষ্ট। জ্ঞান লাভের পর কৃতকর্মপুণ্যে আর, সে দেহের প্রতি লক্ষ্য রাখেন না। মদিরামত্ত ব্যক্তির যেমন স্বীয় পরিধেয় বস্ত্রের প্রতি লক্ষ্য থাকে না; তজপ জ্ঞানীজন (জীবন্মুক্ত) আসনরূপে উপবেশনাদির আশ্রয়স্থল যে দেহ, তাহার 'প্রতিও আর কোন আস্থা রাখেন না। দেহােহপি দৈববশগঃ খলু কৰ্ম্ম যাবৎ স্বারকং প্রতিসমীক্ষত এব সাঃ । তং সপ্রপঞ্চমধিরূঢ়সমাধিযােগঃ স্বাপ্নং পুনর্ন ভজতে প্রতিবুদ্ধবস্তুঃ। প্রাণাদি ইন্দ্রিয়বর্গ সহিত দেহ দৈববশ বা প্রারব্ধ কৰ্ম্মের অধীন। সুতরাং দেহ স্বীয় কর্মের বশবর্তী হইয়া জীবিত থাকে মাত্র। যিনি পরম সমাধিতে আয়ােহণ এবং স্বরূপ সন্দর্শন করিতে সমর্থ হইয়াছেন, তিনি স্বপ্ন দর্শনের ন্যায় (অর্থাৎ স্বপ্নদৃষ্ট বিষয় বা বস্তু যেমন স্বভাবতই অলীক বলিয়া তাহার প্রতি আস্থা বা আসক্তি থাকে না। এই প্রপঞ্চ বা মায়াময় দেহের প্রতিও আর আসক্ত হন না। হে বিপ্রগণ! তােমাদের ধর্মোপদেশের জন্য যজ্ঞ নামে স্বয়ং বিষ্ণুই আমি এই হংসমূৰ্ত্তিতে তােমাদের নিকট আবিভূত হইয়া সাংখ্য ও যােগের এই পরম রহস্য বর্ণন করিলাম। হে দ্বিজশ্রেষ্ঠগণ! যখন আমিই যােগ, সাংখ্য, সত্য, ধর্ম, প্রভাব, সম্পদ, যশঃ ও ইন্দ্রিয় নিগ্রহের পরম ও প্রধান আশ্রয়, তখন প্রাকৃতিক গুণের অতীত সকলের হিতকারী, প্রিয় পরমাত্মা স্বরূপ নিৰপেক্ষ আমাকেই সাম্য ও অসঙ্গাদিগুণ সমূহ ভজনা করিয়া থাকে। অর্থাৎ আমিই সকলের আশ্রয় ; আমাতেই এই সমুদয় বর্তমান। আমাকে লাভ করিলে আর কিছুরই অভাব থাকে না। আমার এই প্রকার উপদেশে সনকাদি ঋষিগণের সন্দেহ ভঞ্জন হইল। তাঁহারা ভক্তি সহকারে আমায় অভিবাদন পূর্বক স্তব করিলে আমি ব্ৰহ্মার সমক্ষেই অন্তর্হিত হইয়া স্বীয় ধামে গমন করিললাম।

শ্রীকৃষ্ণ।
ভক্তিযােগ।
{
উদ্ধব বলিলেন, হে প্রভাে! নিরপেক্ষ ভক্তিযোগের কথাই আপনি কীৰ্ত্তন
করিয়াছেন। সেই ভক্তিযােগের প্রভাবে সর্ববিষয়ে আসক্তিশূন্য হইয়া
আপনাতেই চিত্ত সমর্পণ করা যায়।
* -
ময্যপিতাত্মনঃ সভ্য নিরপেক্ষ সর্ববতঃ ।
ময়াত্মনা সুখং যত্তৎ কুতঃ স্যাদ্বিষয়াত্মনাং।
অকিঞ্চনস্য দান্তস্য শান্ত সমচেতসঃ।
ময়া সন্তুষ্টমনসঃ সাঃ সুখময়া দিশঃ ।
শ্রীকৃষ্ণ বলিলেন হে উদ্ধব! সচ্চিদানন্দময় আমাতে আত্মসমর্পণ পূর্বক
বিষয়-সুখ-নিবৃত্তমনা নিস্কিঞ্চনব্যক্তি আমার পরমানন্দ স্বরূপের নিরন্তর স্ফুরণে
যে তৃপ্তি উপভােগ করেন, বিষয়াবিষ্ট-চিত্ত সাংসারিক জীবের সে আনন্দানুভবের
সম্ভবনা কোথায় ?
আকাঙ্ক্ষাশূন্য জিতেন্দ্রিয় উদারচেতা রাগন্বেষাদি বর্জিত ব্যক্তিগণ
আমাতে চিত্ত নিবেশ জন্য পরমানন্দ উপভােগ করিয়া সর্বত্র পরমাননা স্বরূপই
অবলােকন করিয়া থাকেন।
ন পারমেষ্ঠ্যং ন মহেন্দ্ৰধিষ্ণ্যং ন সার্বভৌমং ন রধিপত্যং।
ন যােগসিদ্ধীরপুনর্ভবং বা ময্যপিতাত্মেচ্ছতি মদ্বিনান্যৎ।
আমাগত প্রাণ ব্যক্তিগণ আমার স্বরূপ পরিত্যাগ করিয়া আর কিছুই
চান না। এমন কি ব্ৰহ্মত্ব, ইন্দ্ৰত্ব, সমস্ত পৃথিবীর আধিপত্য, রসাতলের
কর্তৃত্ব বা অণিমালঘিমাদি অষ্টৈশৰ্য্য বা মােক্ষ লাভও বাসনা করেন না।
ন তথা মে প্রিয়তম আত্মযােনি ন শঙ্করঃ।
ন চ সঙ্কৰ্ষণাে ন নৈবাত্মা চ যথা ভবান্।
হে উদ্ধব ! তােমার ন্যায় ভক্ত আমার যেমন প্রিয়, সেরূপ আর কেহ
নহে। ব্রহ্মা, শঙ্কর, সর্ষণ এবং ভাৰ্য লক্ষ্মী এমন কি আমার স্বরূপকেও
ভক্ত অপেক্ষা প্রিয় বলিয়া বােধ করি না।
।

পরিশিষ্ট।
।
নিরপেক্ষং মুনিং শান্তং নির্বৈরং সমদর্শনং।
অমুজাম্যহং নিত্যং পুয়েয়েতম্ভিরেণুভিঃ ।
আমি নিরন্তর নিষ্কাম, লােভক্ষোভাদি বর্জিত, মাৎসৰ্য্যহীন, সমদর্শী
মুনির অনুসরণ করিয়া থাকি এবং তদুপলক্ষে মদন্তবর্তী সমগ্ৰ ব্ৰহ্মাণ্ডই আমার
চরণ রেণু দ্বারা পবিত্র হয়।
আমাতে অনুরক্তচিত্ত রাগন্বেষাদিশূন্য সৰ্ব্বজীবহিতকামী, নিষ্কাম, নিরভিমান
ব্যক্তিগণ বিষয় বাসনা পরিত্যাগ পূৰ্ব্বক হৃদয় মন্দিরে আমার চিন্তাজনিত যে
অপূৰ্ব্ব সুখ অনুভব করেন, তজ্জাতীয় সুখ অন্য কেহই অনুভব করিতে সমর্থ
হয় না।
বাধ্যমনােহপি মক্তো বিষয়েরজিতেন্দ্রিয়ঃ ।
প্রায়ঃ প্রগল্ভয়া ভক্ত্যা বিষয়ৈনাভিভূয়তে।
আমার ভক্ত যদি ইন্দ্রিয় নিগ্রহে সম্পূর্ণ সমর্থ না হন, তাহা হইলেও
প্রতিক্ষণ বর্ধনশালিনী আমার ভক্তির প্রভাবে তিনি নিরন্তর রক্ষিত হন।
সুতরাং বিষয়াসক্তি তাঁহাকে বিশেষরূপে আকর্ষণ করিয়াও অভিভূত করিতে
পারে না।
যথাগ্নিঃ সুসমৃদ্ধাৰ্চিঃ করােত্যেধাংসি ভস্মসাৎ।
তথা মদ্বিষয়া ভক্তিরুদ্ধবৈনাংসি কৃৎস্নশঃ ।
হে উদ্ধব! যেমন প্রজ্বলিত হুতাশন কাষ্ঠ সমূহকে ভস্মসাৎ করিয়া ফেলে ;
নিশ্চয় জানিও, তদ্রুপ মদ্বিষয়িনী ভক্তিও ভক্তের যাবতীয় পাপকে বিনষ্ট
করে।
ন সাধয়তি মাং যােগাে ন সাঙ্খং ধৰ্ম্ম উদ্ধব।
ন স্বাধ্যায়স্তপস্ত্যাগগা যথা ভক্তিমমােজ্জিত ।
ভক্ত্যাহমেকয়া গ্রাহঃ শ্ৰদ্ধয়াত্মা প্রিয় সতাং।
ভক্তি পুনতি মন্নিষ্ঠা শপাকাপি সম্ভবাৎ।
প্রবৃদ্ধা (একনিষ্ঠাপ্রবল) ভক্তি আমাকে যেরূপ বদ্ধ করিতে পারে,

যােগ, সাংখ্য, ধর্ম, বদাধ্যয়ন, তপস্যা ত্যাগও আমাকে তেমন আবদ্ধ করিতে পারে না। সাধুর প্রেমধন পরমাত্মা স্বরূপ আমাকে গ্রহণ করিতে হইলে শ্রদ্ধা পূৰ্ব্বক এক ভক্তিই প্রয়ােজন। ভাগবতী ভক্তি অতি নিকৃষ্ট চণ্ডালেরও বিষয় বাসনা দুর করিয়া তাহার মুক্তির পথ প্রশস্ত করে। ধর্মঃ সত্যক্ষমােপেতে বিদ্যা বা তপন্বিতা। ম্যাপেমাত্মানং ন চ সম্যক পুনাতি হি। সত্য এবং দয়াদিযুক্ত যজ্ঞাদিধর্ম বা তপস্যাদি বিশিষ্ট শাস্ত্রাভ্যাসরূপ বিদ্যা ভক্তিহীন অন্তঃকরণকে কখনও পবিত্র করিতে সমর্থ হয় না। কথং বিনা রােমহর্ষং দ্রবতা চেতনা বিনা। বিনানন্দাশ্রুকয়া শুদ্ধ্যেদ্ভক্ত্যা বিনাশয়ঃ । বাগগদগদা দ্রবতে যস্য চিত্তং রুদতভীক্ষং হসতি কচি। বিল উদগীয়তি নৃত্যতে চ মদ্ভক্তিযুক্তো ভুবনং পুনাতি। নােমহর্ষ, চিত্তের আতা এবং আনন্দাশ্রুর উদগম ব্যতীত ভক্তির পরিচয় আর কি হইতে পারে ? এবং ভক্তি ব্যতীত অন্তঃকরণই বা কিরূপে বিশুদ্ধ হইতে পারে ? প্রেমের বশে হার বাক্য গদগদ হইয়া আসে, মন গলিয়া যায় অর্থাৎ বাহ্ন বিষয়ে চিত্ত আর অগ্রসর হয় না, আমার বিয়ােগানুমানে কখন নােদন করেন, আমার ক্রীড়া সহ স্মরণে কখন হাস্য করেন, নির্লজ্জের ন্যায় কখন বা উচ্চকণ্ঠে গান বা নৃত্য করেন, তাদৃশ ভক্তিমান্ পুরুষ সমগ্ৰ জগতের পবিত্রতা সাধন করেন, সন্দেহ নাই। যথাগিনা হেমমলং জহাতি ঋতং পুনঃ স্বং ভজতে চ রূপং। আত্মা চ কৰ্ম্মানুশয়ং বিধূয় মদ্ভক্তিযােগেন ত্যথাে মাং। সুবৰ্ণ যেমন অগ্নিদগ্ধ হইয়া মলিনতা পরিহার পূর্বক সমুজ্জল কান্তি ধারণ করে, সেইরূপ জীবও কেবল আমার প্রতি ভক্তিযােগের প্রভাবে সংসারের *

পরিশিষ্ট।
হেতুভূত কৰ্ম্ম-বাসনা পরিত্যাগ পূৰ্ব্বক সৰ্ব্বন্তর্যামী আমার মৎস্বরূপের ভজনা
করিয়া থাকে।
যথা যথাত্মা পরিমৃজ্যতেসৌ মৎপুণ্যগাথাশ্রবণাভিধানৈঃ।
তথা তথা পশ্যতি বস্তু সূক্ষং চক্ষুথৈবাঞ্জনসংযুক্ত।
পুনঃপুনঃ অঞ্জনযােগে চক্ষু যেমন স্বীয় দোষ পরিত্যাগ পূৰ্ব্বক সূক্ষ্ম বস্তু
সমূহ দর্শনে সমর্থ হয়, তােপ ( নিরন্তর) আমার পবিত্র গুণকথা শ্রবণ ও
কীৰ্ত্তনে চিত্ত যতই বিশুদ্ধ ভাব ধারণ করে, জীবও ততই ( সেই পরিমাণে )
অতি সূক্ষ্ম আত্ম-তত্ত্বাবধারণে সমর্থ হয়।
বিষয়ান্ ধ্যায়শ্চিত্তং বিষয়েষু বিজ্ঞসতে।
মামনুস্মরতশ্চিত্তং ময্যেৰ প্ৰবিলীয়তে।
যেমন নিরন্তর বিষয় চিন্তায় চিত্ত বিষয়েই আসক্ত হয়, তদ্রুপ ভগবৎস্বরূপ
মদীয় ভাৰ চিন্তায় জীবের চিত্তও আমাতে আসক্ত বা বিলীন হয়।
অতএব স্বপ্ন বা কল্পনার ন্যায় অলীক মায়াময় ও মিথ্যাভূত দেহেন্দ্রিয়াদির
চিন্তা পরিত্যাগ পূৰ্ব্বক শ্রবণ মননাদি দ্বারা মদ্ভাৰভাবিত মনকে আমাতে
সুস্থির রাখিবার চেষ্টা কর।
স্ত্রীণাং স্ত্রীসঙ্গিনাং সঙ্গ ত্যত্ত্বা দূরত আত্মবান্।
ক্ষেমে বিক্তি অসীন শ্চিন্তয়েন্মমতন্ত্রিতঃ ॥
আত্মবান্ ( সংযতচিত্ত ) কামিনী ও কামুকের সংসর্গ দূর হইতে পরিত্যাগ
পূৰ্ব্বক উপদ্রব শূন্ত নির্জন শান্তিময় স্থানে উপবেশন করত আমাকেই চিন্তা
করিবেন।
ন তথাস্য ভবেৎ ক্লেশাে বন্ধশ্চান্য প্রসঙ্গতঃ।
যােষিসঙ্গাথা পুংসস্তথা তৎসঙ্গিসঙ্গতঃ ।
হে উদ্ধব ! নিশ্চয় জানিও কামিনী ও কামুকের সহবাসে পুরুষের যেরূপ
অনিষ্ট ও পাপােৎপত্তি হয়, এমন অন্য কোন বিষয়ের সংসর্গে ঘটে না।
[ ৯ ]

শ্রীকৃষ্ণ। তাহা শুনিয়া উদ্ধব বলিলেন, হে পদ্মপলাশলােচন! যে প্রকারে যেরূপ গ্রহণে এবং ভবদীয় যে স্বরূপ অবলম্বনে মুমুক্ষুগণ আপনাকে চিন্তা করিয়া থাকেন, অনুগ্রহ পূর্বক আপনার সেই স্বরূপের ধ্যান বর্ণন করুন। সম আসন আসীনঃ সমকায়াে যথাসুখং। হস্তাবুৎসঙ্গ আধায় স্বনাসাগ্ৰকৃতেক্ষণঃ। সমতল ভূমিতে কুশ, অজিন ( মৃগচর্ম ) চেল (পট্টবস্তু) নির্মিত আসন উপর্যুপরি রাখিয়া তদুপরি উপবেশন করিতে হইবে। এবং মেরুদণ্ড ও গ্রীবাদেশ দণ্ডের ন্যায় সরল করত স্বস্তিকাদি যে কোন প্রকার আসন করিয়া বসিবে। অনন্তর উৎসঙ্গোপরি (ক্রোড়ে ) হস্তদ্বয় বিন্যস্ত (উপগ্বপরি স্থাপন) করিয়া অন্য পদার্থ হইতে দৃষ্টি সংবােধাৰ্থ কেবল নাসিকার অগ্রভাগেই দৃষ্টি রাখিবে। এবং ইন্দ্রিয়বর্গের প্রত্যাহার পূর্বক রেচক, পূরক ও কুন্তক প্রণালীর বিপর্যয় (অর্থাৎ একবার বাম নাসায় পূরক, উভয় নাসা বন্ধ করিয়া কুম্ভক, এবং দক্ষিণ নাসায় রেচক ; পরে দক্ষিণ নাসায় পূরক, উভয় নাসা বন্ধ করিয়া কুম্ভক ও বাম নাসায় রেচক ইত্যাদি) ক্রমে প্রাণবায়ুর পথকে পরিশােধিত করিবে। কমলনালের তন্তুর ন্যায় নিরবচ্ছিন্ন, ঘণ্টা নিনাদ স্বরূপ প্রণব (ওকার ) ধ্বনি মূলাধার হইতে দ্বাদশাঙ্গুল ব্যাপ্ত হৃদয় পর্যন্ত প্রাণবায়ুকে অবলম্বন করিয়া বিদ্যমান রহিয়াছেন। অতএব প্রাণরােধন-যােগে মূলাধার হইতে প্রণবকে আকর্ষণ পূর্বক হৃদয়ে স্থাপন করিতে হইবে। এই প্রণববিশিষ্ট প্রাণকে প্রত্যহ প্রাতঃ, মধ্যাহ্ন ও সায়াহ্নে যিনি দশবার করিয়া সংযম অভ্যাস করিতে পারেন, তিনি এক মাস মধ্যে প্রাণ নিরােধে • সমর্থ হন। পরে দেহের অভ্যন্তরে যে হৃৎপদ্ম উর্ধনাল ও অধােমুখে অবস্থিত রহিয়াছে, তাহাকে অধো বৃন্ত ও উৰ্দ্ধমুখ বিকসিত অষ্টপত্রে পৰিবেষ্টিত, মধ্যস্থলে কণিকা বিশিষ্ট, এইরূপ চিন্তা করিতে হইবে। এই কণিকাতে (পদ্ম মধ্যস্থ বীজকোষ ) প্রথমে সূৰ্য, তন্মধ্যে সােমমণ্ডল

পরিশিষ্ট।
জ
এবং তাহার মধ্যে অগ্নিমণ্ডল, এইরূপে উত্তরােত্তর নির্ধারণ পূর্বক তন্মধ্যে
আমার ধ্যানমঙ্গল পবিত্র যে অদ্ভুত স্বরূপের ধ্যান করিতে হইবে, তাহা
বর্ণন করিতেছি, শুন।
সমং প্রশান্তং সুমুখং দীর্ঘচারুচতুর্ভুজং।
সুচারুসুন্দরগ্রীবং সুকপােলং শুচিস্মিত।
সমানকর্ণবিন্যস্তফুরন্মকরকুণ্ডলং।
হেমাম্বরং ঘনশ্যামং শ্রীবৎসশ্রীনিকেতনং ।
শঙ্খচক্রগদাপদ্মবনমালাবিভূষিতং।
নূপুরৈবিলসৎপাদং কৌস্তুভপ্রয়াযুতং ।
দ্যুমকিরীটকটককটিসূত্রাঙ্গদাযুতং ।
সর্বাঙ্গসুন্দরং হৃদ্যংপ্রসাদসুমুখেক্ষণং ।
এই প্রকার আমার স্বরূপের আপাদমস্তক যাবতীয় অঙ্গপ্রত্যঙ্গে চিত্ত
ধারণ পূর্বক চিন্তা করিতে হইবে। সারথিরূপা বুদ্ধির সাহায্যে শব্দাদি
বিষয় প্রপঞ্চ হইতে সংকল্প-বিকল্পাত্মক মন ও তৎপ্রেরিত ইন্দ্রিয়বর্গকে প্রত্যাহার
পূৰ্ব্বক ধীর বিবেকী ব্যক্তি পরমানন্দমূৰ্ত্তি আমাতেই তাহা সম্পূর্ণরূপে স্থাপন
করিবেন।
তৎসবব্যাপকং চিত্তমাকৃষ্যৈকত্র ধারয়েৎ ।
নান্যানি চিন্তয়েভূয়ঃ সুস্মিতং ভাবয়েমুখং ।
তত্র লব্ধপদং চিত্তমাকৃষ্য ব্যোম্নি ধারয়েৎ।
তচ্ছ তত্ত্বা মদাবােহাে ন কিঞ্চিদপি চিন্তয়েৎ, ॥
সৰ্বব্যাপক চিত্তকে সৰ্ব্ব বস্তু হইতে আকর্ষণ পূর্বক আমার কোন একটা
অঙ্গে ধারণা করত অন্যান্য অঙ্গ পরিত্যাগ করিবে। তন্মধ্যে কেবল অপূর্ব
মৃদুমন্দ হাযুক্ত সুন্দর বদনই চিন্তা করা কর্তব্য।
যখন চিত্ত কেবল বদনে সুস্থির হইয়া অন্য চিন্তায় বিরত হইবে; তখন
চিত্তকে তথা হইতে আকর্ষণ পূর্বক আকাশবং সৰ্ব্বব্যাপক সর্বাধার ও নির্লিপ্ত

শ্রীকৃষ্ণ মদীয় স্বরূপে সমাহিত করিবে। এইরূপ ধ্যানের অভ্যাসে যােগী মৎস্বরূপ সহ অভেদ চিন্তনে সমর্থ হইবেন তখন সৰ্ব্বব্যাপকের সহিত অভেদ চিন্তায় ধ্যাত, ধ্যেয় ও ধ্যান এই ভেদ বুদ্ধিও পরিত্যাগ করিবেন। ইহাই নিরাকার ব্ৰহ্ম-চিন্তা! কেমন করিয়া সাকার হইতে নিরাকারে চিত্ত ধারণা করিতে হয়, ইহাই তাহার সদুপায়। সাকার নিরাকারের এই মূলসূত্র যাহারা অজ্ঞাত, তাঁহারাই সাকারের কথা শুনিয়া নাসিকা কুঞ্চন করেন। যাহারা এ মূলসূত্র অবগত নহেন, তাহাদের নিরাকারবাদীত্বের কল্পনায় সন্দেহের যথেষ্ট কারণ আছে। তাহারা যতই নিরাকারের ধূয়া তুলুন, কেমন করিয়া নিরাকারে চিত্ত সন্নিবেশ করিতে হয়, কেমন করিয়া ব্রহ্মের স্বরূপ উপলব্ধি করিতে হয়, তাহা তাহাদের অজ্ঞাত। প্রকৃত নিরাকারবাদী ব্রহ্মচিন্তা- তৎপর কে তাহা হৃদয়ঙ্গম করাও তাঁহাদের অসাধ্য। কেমন করিয়া ব্ৰহ্মচিন্তার সােপানে আরোহণ করিতে হয়, সাকারবাদী হিন্দুই তাহার মর্ম জানে। হিন্দু সাকারে ব্রহ্মত্বের আরােপ করিয়া ব্রহ্মেরই উপসনা করিয়া থাকে ;-মৃত্তিকা প্রস্তর বা কাঠের পূজা করে না। এ জ্ঞানও ভগবানের বহুকৃপালব্ধ। হিন্দুর এ ভাব বুঝিবার সাধ্য অন্যের নাই। যাহার আছে তিনি হিন্দু। হিন্দু হইয়া জন্মগ্রহণ না করিলে জন্মের সহিত এ ভক্তি বিশ্বাসও জন্মে না। এবং সমাহিতমতির্মামেবাত্মানমাত্মনি। বিচষ্টে ময়ি সর্বাত্মন্ জ্যোতিৰ্জোতিষি সংযুতং । এই প্রকারে সংযতচেতা যােগী তেজঃস্বরূপ মহাভূতে দীপজ্যোতির একত্র সন্নিবেশের ন্যায় পরমাত্মতত্বে ( সৰ্ব্ব আত্মার সংমিশ্রণের ন্যায়) স্বীয় আত্ম- স্বরূপেরও অভেদ দর্শন করেন। ধ্যানেনেথং সুতীব্রণ যুঞ্জতে যােগিনাে মনঃ। সংস্যত্যা নির্বাণং দ্রব্যজ্ঞানক্রিয়াভ্রমঃ । এই প্রকার সুতীব্র ধ্যানের প্রভাবে যােগীর চিত্ত শীঘ্রই দেহাদিতে আত্মম জন্য বৃত্তিম এবং কাৰ্যে কর্তৃত্বের ভ্রম হইতে নির্বাণ ৰা লয় প্রাপ্ত হয়। (অব্যাহতি লাভ করে।)

পরিশিষ্ট। জিতেন্দ্রিয় যুক্তস্য জিতশ্বাস যােগিনঃ। ময়ি ধারয়তশ্চেত উপতিষ্ঠন্তি সিদ্ধয়ঃ ॥ ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলিলেন হে উদ্ধব! জিতেন্দ্রিয় ও সমাহিতচেতা যােগী প্রাণায়াম পূৰ্ব্বক যদি নিরন্তর আমাতে চিত্ত সংযত রাখেন, তাহা হইলে সিল্কি সমূহ আপনা হইতেই তাহাদের নিকট উপস্থিত হয়। উদ্ধব বলিলেন হে অচ্যুত ! আপনি যােগেশ্বরদিগেরও সর্ব প্রকাব সিদ্ধির ফল প্রদান করিয়া থাকেন। আপনার কিছুই অবিদিত নাই, অতএব কিরূপ ধারণার সাহায্যে কোন সিদ্ধি লাভ হয় এবং সিদ্ধি কত প্রকার তাহা কৃপা, পূৰ্ব্বক বলুন। ভগবান্ বলিলেন সিদ্ধ পুরুষগণ সাধারণতঃ অষ্টাদশ প্রকার সিদ্ধির উল্লেখ করিয়া থাকেন, সুতরাং তল্লাভক ধারণাও অষ্টাদশ প্রকার। কিন্তু ইহাদের মধ্যে আটটী ভগবদাশ্রিত। বাকী দশটী গুণ কাৰ্য্যকে অবলম্বন পূর্বক উদিত হইয়া থাকে। সুতরাং তদ্বারা মাত্র সত্ত্বগুণেরই উৎকর্ষ সাধিত হয়। অণিমা মহিমা মূৰ্ত্তেৰ্লষিমা প্রাপ্তিরিন্দ্রিয়ৈঃ । কাম্যং তদৃষ্টে শক্তিপ্রেরণমীশিতা। অণিমা, মহিমা, ও ললিমা এই তিনটী দেহের সিদ্ধি ; ইন্দ্রিয়ের সহিত তত্তৎ বিষয়ের সম্যক সম্বন্ধ লাভের নাম প্রাপ্তি। পারলৌকিকাদি শ্রুত বিষয়ে এবং দর্শনমােগ্য পরােক্ষ পদার্থে দর্শন সামর্থ্যের নামে প্রকাম্য। পরকীয় ইন্দ্রিয় ও অন্তঃকরণাদিতে স্বীয় সামর্থ্য প্রয়ােগের নাম ঈশিতা। গুণেসঙ্গে ৰশিতা যৎকামস্তদবস্যতি । এ মে সিদ্ধয়ঃ সৌম্য অষ্টেী চৌৎপত্তিকীৰ্মতাঃ । ইন্দ্রিয় ও তৎকাৰ্য্যে সর্বদা সম্বন্ধ থাকিয়াও যে চিত্তের অনাসক্তি ভাব, তাহাকে বশিতা এবং ইচ্ছামাত্রেই পূর্ণমাত্রায় কামনা পরিপূরণ করিবার শক্তিকে কামাবসায়িত কহে। হে উদ্ধব। হে উদ্ধব। এই অণিমাদি অষ্ট প্রকার সিদ্ধি আমার স্বভাবজ ধৰ্ম্ম। আস্বাদন—প্রধানতঃ সিদ্ধি অষ্ট প্রকার। তন্মধ্যে অন্তরঙ্গ ভাবে আটটা ৭। শ্রীকৃষ্ণ এবং বহিরঙ্গ ভাবে দশটী। অন্তরঙ্গ অষ্ট প্রকার সিদ্ধি কেবল ঈশ্বরপ্রণিধানের ফলে আবিভূত হয় এবং ভগবদ্‌প্রাপ্তির পথই প্রশস্ত করে। আর, অন্যত্র চিত্ত সংযম করিলেও বহিরঙ্গা সিদ্ধি সমূহ লাভ করা যায়; কিন্তু তাহারা প্রধানতঃ ভােগপথই প্রশস্ত করে। অণিমা সিদ্ধি প্রভাবে যােগী স্বীয় দেহকে অণুব ন্যায় এমনই সূক্ষ্ম করিতে পারেন যে ইচ্ছা করিলে তিনি পাষাণ মধ্যেও প্রবিষ্ট হইতে পারেন। মহিমা, —ক্ষুদ্র হইলেও পৰ্বতাদির ন্যায় বৃহৎ হইবার ক্ষমতা। লঘিমা সিদ্ধি দ্বারা যােগী নিজ দেহকে এত লঘু করিতে পারেন যে, তারা সূৰ্য্য কিরণকে মাত্র অবলম্বন করিয়া সূৰ্য্যাদি ললাকে গমন করিতে পারেন। অঙ্গুলির অগ্রভাগ দ্বারা চন্দ্রকে স্পর্শ করিবার শক্তিকে প্রাপ্তি কহে। অর্থাৎ ইচ্ছা মাত্র দূরবর্তী পদার্থ নিকটে প্রাপ্ত হইবার সামর্থ্য। ইচ্ছার ব্যাঘাত না হওয়ার নামই কাম্য। অর্থাৎ যাহা ইচ্ছা হইবে তাহাই সুসিদ্ধ হইবে। ঈশিত্ব—সমুদয় পদার্থের উপর কর্তৃত্ব করিবার শক্তি। অর্থাৎ ঈশিত্ব লাভ হইলে ভূত ও ভৌতিক পদার্থের সৃষ্টিস্থিতি ও সংহারের উপরও সাধকের আধিপত্য জন্মে। তিনি ইচ্ছা করিলে পরমাণুকে পৰ্বত এবং পৰ্ব্বতকে পরমাণুতে পরিণত করিতে পারেন। বশিত্ব-সমুদয় পদার্থকে বশীভূত করিবার সামর্থ্য। কামাবসায়ি সত্য সংকল্পতা। এই শক্তি প্রভাবে অমৃতকে বিষ এবং বিষকে অমৃত করা যায়। অর্থাৎ এই শক্তি প্রভাবে ভূত সম্বন্ধে যােগীর হৃদয়ে যেরূপ ভাবের উদয় হয়, ভূত সমূহকে সেইভাবেই পরিণত হইতে হয়। এই অষ্ট প্রকার সিদ্ধি ভগবদ্ভাবে নিত্য সম্বদ্ধ। অনুৰ্ম্মিমত্বং দেহেহস্মিন্ দূরশ্রবণদর্শনং। মনােজবঃ কামরূপং পরকায়প্রবেশনং। স্বচ্ছন্দমৃত্যুদেবানাং সহ ক্রীড়ামুদর্শনং। যথাসংকল্পসংসিদ্ধিরাজ্ঞাপ্রতিহত গতিঃ । গুণ সম্বন্ধীয় সিদ্ধি কেবল দেহনিষ্ঠ মাত্র। যথা ক্ষুৎপিপাসা শূণ্ঠতা, দূরশ্রবণ, দূরদর্শন, মনােবেগের ন্যায় এই স্থূল দেহেরই অপূৰ্ব গমন সামর্থ্য, ইচ্ছাধীন রূপ পরিগ্রহ এবং নিজের ইচ্ছানুসারে পরদেহে প্রবেশের সামর্থ্য।

পরিশিষ্ট।
৭১
ইচ্ছামৃত্যু, দেবতা ও অপ্সরাগণের সাক্ষাৎকার লাভ ও তাহাদের ক্রীড়া
দর্শন, সংকল্পানুরূপ ফল প্রাপ্তি এবং অপ্রতিহত আদেশ এই দশবিধ সিদ্ধি
গুণ নিবন্ধনা।
ত্রিকালজ্ঞত্বমদ্বন্দ্বং পরচিত্তাভিজ্ঞতা।
অগ্নকান্ধুবিষাদীনাং
প্রতিষ্টম্ভোহপরাজয়।
এতদ্ব্যতীত ভূত ভবিষ্যৎ ও বর্তমানকাল সম্বন্ধীয় ব্যাপারের প্রত্যাক্ষানুভূতি
বা জ্ঞান। শীতােষ্ণাদি দ্বন্দ্বগুণে অভিভূত না হওয়া, পরচিত্তের ভাব অবধারণ
( thought reading) অগ্নি, সূৰ্য্য, জল ও বিষাদির স্তম্ভন এবং সর্বত্র
অপরাজিতের ন্যায় অনভিভূত থাকা ইত্যাদি আরও পঞ্চবিধ সিদ্ধি হইয়া থাকে।
কেবল নাম ও লক্ষণের উল্লেখ করিয়া যে সকল সিদ্ধি ও তদুপায়ভূত ধারণার
কথা বলিয়াছি, এক্ষণে যে ধারণার বলে যে সিদ্ধি যেরূপে উপস্থিত হয় তাহা
বলিতেছি, শুন।
ভূতসূক্ষাত্মনি ময়ি তন্মাত্রং ধারয়েন।
অণিমনিমবাপ্নোতি তন্মাত্রোপাসকো মম ।
মহত্তত্ত্বাত্মনি ময়ি যথাসংস্থং মনাে দধৎ।
মহিমানমবাপ্নোতি ভূতানাঞ্চ পৃথক পৃথক
পরমাণুয়ে চিত্তং ভূতানাং ময়ি রঞ্জয়।
কালসূক্ষমাত্মতাং যােগী লঘিমানমবায়াৎ।
ধারয়ম্মষ্যহংতত্বে মনাে বৈকারিকেহখিলং।
সৰ্বেন্দ্ৰিয়াণামাত্মত্বং প্রাপ্তিং প্লেতি মন্মনাঃ ।
মহত্যাত্মনি যঃ সূত্রে ধারয়েন্ময়ি মানসং।
কাম্যং পারমেষ্ঠ্যং মে বিশতেহব্যক্তজম্মনঃ ।
বিষ্ণো ধীশ্বরে চিত্তং ধারয়েৎ কালবিখ্রহে।
স ঈশিত্বমবাপ্নোতি ক্ষেত্রজ্ঞ ক্ষেত্ৰচোদনাং।
সূক্ষ্মভৃহায়ক আমার ভগবৎস্বরূপে ভূতসূক্ষ্মাকার মনের ধারণা করিলে
যোগী নদীয় তন্মত্রোপাসক অণিমা নাম্নী সিদ্ধি প্রাপ্ত হন।

-"
६३
কৃষ্ণ।
জ্ঞানশক্তিরূপ মহত্তত্বে উপহিত মদী ভাবকে অবলম্বন পূর্বক জ্ঞানশক্তি
স্বরূপ চিত্তকে অভে চিন্তায় নিবিষ্ট রাখিতে পারিলে মহিমা নাম্নী সিদ্ধি লাভ
এবং আকাশাদি মহাভূতের উপাধিতে অবস্থিত মদীয় স্বরূপ অবলম্বনে
প্রবৃত্ত যােগীর চিত্ত সেই ভূতের পৃথক পৃথক মহিমা লাভে সমর্থ হয়।
বায়ু প্রভৃতি পঞ্চভূতের পরমাণুপুঞ্জস্বরূপ আমায় ভাব অবলম্বনে অগ্রসর
ও সংযতচিত্ত যােগীর হৃদয় কাল
পরমাণু তুল্য হইবার সামর্থ্যরূপ লঘিম।
নামী সিদ্ধি লাভ করে।
সাত্ত্বিক অহঙ্কার তত্ত্বকে উপাধিরূপে গ্রহণ করিয়া মদীয় ভাবে একাগ্রতা
সহকারে চিত্ত সংলগ্ন করিতে পারিলে আমার উপাসক যােগী সকল জীবের
ইন্দ্রিয় ও অধিষ্ঠাত্রী দেবতাগণের সাদৃশ্য লাভে প্রাপ্তি নাম্নী উৎকৃষ্টা সিদ্ধির
অধিকারী হন।
ক্রিয়াশক্তি প্রধান সূত্ৰ সংজ্ঞক মহত্তে যিনি মনকে নিবিষ্ট করেন তিনি
মূল প্রাকাম্যে অধিকারী হন।
গুণত্রয়ের নিয়ন্তা কালস্বরূপ সৰ্বত্ৰব্যাপী মদীয় অচিন্ত্য শক্তিস্বরূপে যিনি
চিত্ত ধারণা করিতে পারেন, তিনি দেহরূপ ক্ষেত্র ও তদধিষ্ঠিত ক্ষেত্ৰজ্ঞের
জ্ঞান লাভে এতদুভয়ের সম্যক্ প্রেরণাশক্তি ঈশিত্বকে লাভ করিয়া থাকেন।
নারায়ণে তুরীয়াখ্যে ভগবচ্ছশব্দিতে।
মনে ময্যাদধদূযােগী মদ্ধৰ্ম্মা বশিমিয়াৎ ।
নিগুণে ব্রহ্মণি ময়ি ধারয় বিশদং মনঃ।
পরমানন্দমাগ্লোতি যত্র কামােহবসীয়তে।
শ্বেতদ্বীপপতৌ চিত্তং শুদ্ধে ধৰ্ম্মময়ে ময়ি।
ধারয় শ্বেততাং যাতি ষড়ৰ্ম্মিরহিতাে নরঃ ।
ময্যাকাশাত্মনি প্রাণে মনসা ঘােষমুহম্।
তত্ৰোপলব্ধা ভূতানাং হংসে বাচঃ শৃণােত্যসৌ।
চক্ষুষ্টরি সংযােজ্য ত্বষ্টারমপি চক্ষুষি।
মাং তত্র মনসা ধ্যায় বিশ্বং পশ্যতি দূরতঃ ।

পরিশিষ্ট। ভগবচ্ছব্দবাচ্য,জাগ্রত, স্বপ্ন সুষুপ্তি এই অবস্থায়ের অতীত তু নামক আমার নারায়ণভাবে যিনি চিত্ত সন্নিবিষ্ট করিতে পারেন, তিনি গুণ- সমুদ্ভূত সর্ববিষয়ে অনাসক্তিরূপা বশিতা নাম্নী সিদ্ধিকে অবলীলাক্রমে অধিকার করেন। গুণের অতীত মদীয় পরমবিশুদ্ধ ব্ৰহ্মভাবে পবিত্র ও বিরজ মনকে ধারণা করিলে পরমানন্দ প্রাপ্তিতে সমুদয় কামনা হইতে বিনিবৃত্ত হইয়া যােগী কামাবসায়িকা নাম্নী সিদ্ধির অধিকারী হন। গুণের পরতন্ত্রতাশূন্য বিশুদ্ধ ধৰ্ম্মময় অনিরুদ্ধ মূর্তিস্বরূপ আমার শ্বেতদ্বীপপতির রূপে চিত্ত সমাহিত করিতে সমর্থ হইলে যােগী ক্ষুৎপিপাসাদি ছয় প্রকার উৰ্ম্মি ( তরঙ্গ) সদৃশ ব্যাঘাতের বিড়ম্বনা হইতে নিষ্কৃতি লাভ করেন। আকাশের স্যায় নির্মল সর্বব্যাপক আমার প্রাণসংজ্ঞক পরমাত্মস্বরূপে প্রাণঘােষ চিন্তন পূর্বক মনােনিবেশ করিলে হংসরূপী জীব কেবল আকাশ স্বরূপেই অভিব্যক্ত সৰ্ব্বভূতের বাক্য বিদিত হইতে পারেন সূৰ্য্যরূপে চক্ষুর সন্নিবেশ ও চক্ষুর স্বরূপে সূৰ্যদেবের চিন্তন পূৰ্ব্বক তদুভয় স্বরূপে মদীয় ভাব পরিচিন্তন দ্বারা চিত্ত সংযত করিলে যােগী দূর হইতেই বিশ্ব-সংসার দর্শন করিবার সামর্থ্য লাভ করেন। মনাে ময়ি সুসংযােজ্য দেহং তদনুবায়ুনা। মদ্ধারণানুকাবেন তত্ৰাত্মা যত্র বৈ মনঃ ॥ যদা মন উপাদায় যদ্যপং বুভূষতি। তবেম্মনােরূপং মদ্যােগবলমাশ্রয়ঃ । পরকায়ান্ বিশন্ সিদ্ধ আত্মানাং তত্র ভাবয়েৎ। পিণ্ডং হি বিশেৎ প্রাণে বায়ুভূতঃ ষড়ঘি বৎ ॥ পাষ্ণাপীড্য গুদং প্রাণং হৃদুরঃকণ্ঠমূৰ্দ্ধ। আবােপ্য ব্রহ্মরন্ধ্রেণ ব্ৰহ্ম নীতােৎসৃজেত্তনুং। বিহরিষ সুরাক্রীড়ে মৎস্থং সত্ত্বং বিভায়েৎ। বিমানেনােপতিষ্ঠন্তি সত্ত্ববৃত্তীঃ সুরস্ত্রিয়ঃ । মন ও দেহকে তদনুকূল বায়ু সহকারে, আমাতে নিরুদ্ধ করিতে পারিলে [ ১ ] ৭৪ শ্রীকৃষ্ণ। সেই অভ্যস্ত মনকে যেখানেই অনুগত করা যায় তৎসঙ্গে দেহও সেই সঙ্গে গমন করিতে পারে। দেহাদি সংঘাত হইতে মনকে যখন পৃথক ভাবে মনােমাত্র চিন্তায় বশীভূত বা সংযত করা যায়, তখন সেই মনের প্রসাদে যখন যেরূপ মূর্তি ধারণের বাসনা জন্মে ভগবৎপ্রেমপরায়ণ সাধক তৎক্ষণাৎ সেইরূপ মূর্তি পরিগ্রহ করিতে পারেন। যিনি জীবনীশক্তিরূপ প্ৰাণবায়ু ও ইন্দ্রিয়বর্গকে সম্পূর্ণ বশীভূত করিতে সমর্থ হইয়াছেন, তিনি যদি পরদেহে প্রবেশ করিতে ইচ্ছা করেন, তাহা হইলে প্রথমতঃ নিজ দেহের অভিমান পরিত্যাগ পূৰ্ব্বক কেবল সৰ্ব্বদেহব্যাপ প্রাণ- শক্তিতে প্রণিহিত হইবেন। পরে প্রাণপ্রধান লিঙ্গশরীরকে আশ্রয় করিয়া, বায়ু সদৃশ রূপ ধারণ করত পুষ্পস্তচারী ভৃঙ্গের ন্যায় ঈপ্সিত পরদেহে আত্ম- স্বরূপের চিন্তা পূৰ্ব্বক তন্মধ্যে প্রবেশ করিতে পারিবেন। পাদমূলের দ্বারা মূলাধার গুহ্যদেশ নিরােধ পূৰ্ব্বক প্রাণােপাধি আত্মানুভূতি রূপ প্রাণশক্তিকে ক্রমান্বয়ে হৃদয়, বক্ষঃ, কণ্ঠ ও মূর্ধা দেশে আরােপ করত ব্ৰহ্মর দিয়া সগুণ বা নিগুণ ব্রহ্মস্বরূপে সালিত করিতে পারিলেই সাধক ইচ্ছানুযায়ী কলেবর পরিত্যাগ করিতে পারিবেন। যদি অমরবৃন্দের কেলিকাননে বিহার করিতে ইচ্ছা হয়, তাহা হইলে ভগবত্তি স্বরূপ বিশুদ্ধ সত্ত্বগুণে চিত্তের ধারণা করা কর্তব্য। এইরূপ চিন্তার প্রভাবে চিত্ত যখন তাদৃশ সত্ত্বময় হইয়া আসে, তখন সত্ব-প্রধান দেবললনাগণ বিমানসহ সেই সাধক সমীপে আপনারাই উপস্থিত হন । যথা সংকল্পয়েদ্বুদ্ধ্যা যথা বা মৎপরঃ পুমান্। ময়ি সত্যে মনাে যুঞ্জংস্তথা তৎসমুপাশ্নতে । যাে বৈ মস্তাবমাপন্ন ঈশিতুবশিতুঃ পুমান। ন কুতশ্চিহিতে তস্য চাজ্ঞা যথা মম। মদ্ভক্ত্যা শুদ্ধচিত্তস্য যােগিনাে ধারণাবিদ। তস্য ত্ৰৈকালিকী বুদ্ধিৰ্জন্মমৃত্যুপবৃংহিতা অগ্নাদিভিন হতে মুনেৰ্যোগময়ং বপু। মদ্যােগশান্তচিত্ত যাদসামুদকং যথা।

পবিশিষ্ট। মদ্বিভূতীরনুধ্যায় শ্রীবৎসাস্ত্রবিভূষণাঃ। ধ্বজাতপত্রব্যজনৈঃ স ভববদপরাজিতঃ। যাহারা আগ্রহ সহকারে একমাত্র সত্যসংকল্প আমাতে মন নিবিষ্ট রাখিতে পারেন, তাহারা বুদ্ধি পূৰ্ব্বক যখন যেখানে ও যে কোন প্রকারে যে কোন বস্তুকে মনে মনে প্রার্থনা করিবেন, তৎক্ষণাৎ সেই বস্তুই লাভ করিবেন। ভগবান্ স্বয়ং স্বতন্ত্র এবং সৰ্ব্বভূতের নিয়ন্তা; যাহারা আমার এই ভাবের প্রতি চিত্ত সংযত করিতে পারেন, তাহাদের আজ্ঞা আমার আজ্ঞার ন্যায় কোথাও কখনও প্রতিহত হয় না। ধারণাতে উত্তম পারদর্শী বিশুদ্ধচেতা মদীয় ভক্ত, ভূত, ভবিষ্যৎ ও বর্তমান সম্বন্ধীয় সকল বিষয়ের ভাব অনায়াসে অবগত হইতে পারেন। এমন কি জন্ম মৃত্যু সম্বন্ধীয় সমুদয় রহস্য যথার্থভাবে তাহাদের হৃদয়ে জাগরুক হয়। মৎস্যাদি জলচর জন্তু সমূহ যেমন অবাধে জলে বিচরণ করিতে পারে, জলের দ্বারা তাহাদের কোন অনিষ্ট ঘটে না। সেইরূপ ভগবদ্রুপ চিন্তায় যাহাদের চিত্ত শান্তি লাভ করিয়াছে, প্রাণায়ামাদি দ্বারা বশীকৃত তাদৃশ যােগীর যােগময় কলেবর অগ্নি প্রভৃতির সংযােগেও কখন বিনষ্ট হয় না। শ্রীবৎসলাঞ্ছনচিহ্নবিশিষ্ট . শঙ্খচক্রাদিধারী এবং ধ্বজা, পতাকা, ছত্র ও চামরাদি বিভূষিত মদীয় অবতার সমূহকে যাহারা অনুধ্যান করিতে পারেন, তাহাদের কখন কোথাও পরাজয় হয় না। উপাসকষ্য মামেবং যােগধারণয়া মুনেঃ। সিদ্ধয়ঃ পূর্বকথিত উপতিষ্ঠ্যশেষতঃ। জিতেন্দ্রিয়স্য দান্তস্য জিতশ্বাসত্মনাে মুনেঃ। মদ্ধারণাং ধারয়ত: কা সা সিদ্ধিঃ সুদুর্লভা। অন্তরায়া বদন্ত্যেতা যুঞ্জতে যােগমুওং। ময়া সম্পদ্যমান কালক্ষপণহেতবঃ । জন্মৌষধিতপােমন্ত্রৈর্যাবতীরিহ সিদ্ধয়ঃ। যােগেনাপগতি তাঃ সৰ্বা নানৈ র্যোগ গতিং ব্ৰজেৎ।

সর্বাসামপি সিদ্ধীনাং হেতুঃ পতিরহং প্রভু।
অহং যােগ সাংখস্থ ধর্মস্য ব্ৰহ্মবাদিনাং।
অহমাত্মান্তরাে বাহেনাবৃতঃ সৰ্বদেহিনাং।
যথা ভূতানি ভূতেষু বহিরন্তঃ স্বয়ং তথা ।
যে সকল ধ্যানপরায়ণ যােগী পূর্বকথিত যােগধারণা দ্বারা নিরন্তর আমার
ভাবের চিন্তা করেন, পূর্বোক্ত যাবতীয় সিদ্ধিই তাহাদের নিকট আপনা
হইতেই উপস্থিত হয়।
যাহারা প্রাণবায়ু ও ইন্দ্রিয়াদি রিপুগণকে পরাজয় করত আমাতে চিত্ত
ধারণে সমর্থ হইয়াছেন, তাদৃশ মুনির পক্ষে এতাদৃশী কোন সিদ্ধিই দুর্লভ নহে।
যাঁহারা সর্বোৎকৃষ্ট পরম যােগানুশীলনে যত্নবান্, তাহারা
এই সকল সিদ্ধিকে যােগপথের পরিপন্থী ও প্রতিবন্ধক বলিয়াই
কীৰ্ত্তন করিয়া থাকেন। কারণ যাঁহারা আমাকে লাভের
প্রত্যাশা করেন, তাঁহাদের পক্ষে এই সকল সিদ্ধি লাভের
নিমিত্ত যত্ন করা অনর্থক সময় অতিবাহন মাত্র।
এই সকল সিদ্ধির মধ্যে কোনটী জন্ম হইতেই পাওয়া যায়, কোনটী বা
ঔষধি ব্যবহারে, কোনটী তপােবলে বা মন্ত্রের প্রয়ােগে অথবা যােগবলে লাভ
করা যায় ; কিন্তু এমন কোন যােগ নাই যাহার বলে আমার সালােক্যাদি পদ
কোন ক্রমে পাওয়া যায়।
কারণ যে কোন সিদ্ধির কথা উল্লেখ করা হইল, সেই সমস্ত সিদ্ধির
নিমিত্ত-কারণ এক
আমি মাত্র। মােক্ষপদ, তল্লাভক জ্ঞান, তাহারও
অবান্তর হেতু ধৰ্ম্ম, যাহা বেদবিদ পণ্ডিতগণ নির্ণয় করিয়া থাকেন; সেই
সকলের পালক এবং প্রভু একা আমি মাত্র।
আমি জীবমাত্রেরই অন্তর্যামী হইয়া অন্তরে এবং কালরূপে বাহিরে নিরন্তর
বিরাজ করিতেছি। পঞ্চভূতাত্মক পদার্থের অন্তরে ও বাহিরে যেমন ভূতপঞ্চকই
নিরন্তর বিদ্যমান থাকে, সেইরূপ মদীয় স্বরূপ ব্যতীত জীব-জগতের পৃথক
অস্তিত্ব কখনই প্রতিপাদিত হইতে পারে না।
-
-(৩)-

পরিশিষ্ট। ৭৭ উদ্ধব বলিলেন, হে কৃষ্ণ! যাবতীয় অস্তিত্ব প্রতিপাদক পদার্থের রক্ষা, পালন, সৃষ্টি ও উৎপত্তি একমাত্র আপনার দ্বারাই সাধিত হইতেছে, কিন্তু আপনার উৎপত্তি বা বিনাশ নাই। আপনি আদ্যন্ত রহিত, নিরঞ্জন,-সাক্ষাৎ পরমব্রহ্ম । জগতে উৎকৃষ্ট বা নিকৃষ্ট যে কোন ভূত আছে, সকলের অন্তরে আপনি বিদ্যমান থাকিলেও শ্রবণ ও মননাদি সাধনহীন অশুদ্ধচেতা ব্যক্তিগণ আপনাকে অবগত হইতে পারে না; কেবল বেদান্তবিদ জ্ঞানী ব্যক্তিগণই আপনার পূর্বোক্ত পরমার্থ স্বরূপের উপাসনা করিয়া থাকেন। অতএব যে যে ভূতকে অবলম্বন করিয়া পরম বিবেকী ঋষিগণ ভক্তি পূর্বক আপনাকে চিন্তা করত চরম সিদ্ধি ভবদ্বিয়ষক ভক্তি ও জ্ঞান লাভ করিয়া থাকেন, অনুগ্রহ পূৰ্ব্বক তত্তৎ বিষয় আমার নিকট কীৰ্ত্তন করুন। হে ভূতভাবন! আপনি অপ্রকটিতভাবে সকল ভূতের অন্তরে বাস করিলেও তােমার মায়ায় বিমােহিতচিত্ত মানব তােমার ভাব ধারণে সমর্থ হইতেছে না। তুমি তাহাদিগকে দেখিলেও তাহারা তােমায় দেখিতে পাইতেছে না। হে সৰ্ববিভূতিস্বরূপ! বসুন্ধরা, স্বর্গলােক, রসাতল ও দিক সমূহে আপনি যে সমুদয় বিভূতি প্রদান করিয়াছেন, তাহা আমার নিকট বর্ণন করুন, আমি সকল তীর্থের আশ্রয়প্রদ ভবদীয় চরণকমলে শরণাগত হইয়া প্রণিপাত করিতেছি। ভগবান্ বলিলেন, হে উদ্ধব! তুমি যে প্রশ্ন করিয়াছ কুরুক্ষেত্র যুদ্ধকালে অর্জুনও এই প্রশ্ন করিয়াছিল। অহমাহােদ্ধবামীং ভূতানাং সুহৃদ ঘরঃ। অহং সৰ্বানি ভূতানি তেষাং স্থিত্যুবাপ্যয়ঃ । হে উদ্ধব! যে কোন পদার্থ এই ভূমণ্ডলে নিরীক্ষণ করিতেছ, আমিই সে সকলের পালক, সুহৃদ ও নিয়ন্তা। অধিক কি যাবতীয় ভূত ও তাহাদের সৃষ্টি, স্থিতি ও পালনাদি যে কোন ব্যাপার, সে সকলই একমাত্র আমি। আমি গতিশীল জীবের গতি এবং সর্বপরাজয়কারীর কাল! সত্ত্ব, রজঃ ও ৭ কৃষ্ণ। তমঃ এই গুণত্রয়ের সাম্যাবস্থা রূপ সৰ্বপ্ৰধান মূল প্রকৃতিও কেবল আমি মাত্র। গুণত্রয়বিশিষ্ট পদার্থ সমুহের গুণক্রিয়াস্ত্রসংজ্ঞক কাৰ্য্যশক্তি, মহৎ পদার্থের মহত্তত্ব একমাত্র আমি। আমিই জীবরূপে সর্বাপেক্ষা সূক্ষম ভাবে বিরাজ এবং দুর্জয় মন হইয়া জীবহৃদয়ে সতত সংকল্পাদি সংঘটন করিতেছি। বেদাধ্যাপকের মধ্যে সর্বপ্রধান হিরণ্যগর্ভ এবং মন্ত্রের মধ্যে ওঙ্কারাত্মক প্রণবরূপে আমাকেই জানিও। অক্ষর সমূহের মধ্যে অকার এবং ছন্দের মধ্যে পদত্রয়বিশিষ্ট গায়ত্রীরূপে আমিই বিরাজমান। অমরগণের মধ্যে পুরন্দর, বসুগণের মধ্যে পাবক, আদিত্যগণের মধ্যে বিষ্ণু এবং একাদশ রুদ্রের মধ্যে নীল লােহিত শঙ্কর মূর্তিতে সর্বত্রই আমি বিরাজ করিতেছি। আমি ব্ৰহ্মর্ষিগণের মধ্যে ভৃগু, রাজর্ষিগণের মধ্যে মনু, দেবর্ষিগণের মধ্যে নারদ, ধেনুৰ্গণের মধ্যে কামধেনু। আমি সিদ্ধেশ্বরগণের মধ্যে কপিল, পক্ষিগণের মধ্যে গরুড়, প্রজাপতিগণের মধ্যে দক্ষ, এবং সৰ্বাধীন রাজা অৰ্যমা মূর্তিতে পিতৃগণ সমীপে বিচরণ করিতেছি। দৈত্যকুল তিলক প্রহ, নক্ষত্র ও ওষধি মধ্যে চন্দ্র, যক্ষ ও কুবের আমার বিভূতি মাত্র। আমি গজেন্দ্র মধ্যে ঐরাবত, জলচর মধ্যে বরুণ, তেজস্বী ও দীপ্তিমানের মধ্যে দিবাকর, নরের মধ্যে ভূপতি। তুরঙ্গম মধ্যে উচ্চৈঃশ্রবা, ধাতুর মধ্যে কাঞ্চন, দণ্ডধারীর মধ্যে সৰ্ব্বসংযমনকারী যম, সর্পের মধ্যে আমিই বাসুকী। নাগেন্দ্রগণ মধ্যে আমি অনন্ত, শ্বাপদমধ্যে পশুরাজ, আশ্রম চতুষ্টয়ের মধ্যে সন্ন্যাস, বর্ণ-চতুষ্টয়ের মধ্যে ব্রাহ্মণ। স্রোতস্বতী তীর্থ মধ্যে গঙ্গা, জলাশয় মধ্যে সমুদ্র, অস্ত্র সমূহের মধ্যে ধনু এবং ধুনুদ্ধারীর মধ্যে ত্রিপুরাহা ত্রিলােচন। আমি বাসভুমি মধ্যে মেরুগিরি, দুর্গম স্থানের মধ্যে নগাধিরাজ হিমালয়, বনস্পতি মধ্যে অশখ এবং ওষধি মধ্যে, যব।

পরিশিষ্ট। আমি ঋত্বিক শ্রেষ্ঠ বশিষ্ট, ব্রহ্মষ্ঠগণের অগ্ৰমান্য বৃহস্পতি, সেনানী প্রধান কীৰ্ত্তিকেয় এবং সৎপথ-প্ৰবৰ্ত্তক ভগবান কমলাসন। যজ্ঞের মধ্যে ব্রহ্মযজ্ঞ, ব্রতের মধ্যে অহিংসা, সৰ্বশােধকের মধ্যে পবিত্র বায়ু, অগ্নি, সূৰ্য্য, সলিল, বাক্য ও আত্মারূপে এক আমিই বিচরণ যােগাঙ্গের মধ্যে আত্মসমাধি, জয়েচ্চুগণের মধ্যে নীতি, বিবেকিগণের পক্ষে আত্মবিদ্যা (অধ্যাত্মজ্ঞান) এবং আত্মখ্যাতিপ্রার্থিগণের পক্ষে বিকল্পরূপে আমিই পরিগৃহীত হই। নারীগণের মধ্যে মনুপত্নী শতরূপা, পুরুষের মধ্যে স্বায়ম্ভুব মনু, মুনির মধ্যে নরসখ নারায়ণ এবং ব্রহ্মচারীর মধ্যে আমিই সনৎকুমার। ধর্মের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ভূতাভয়প্রদ সন্ন্যাস, নির্ভয় স্থানের মধ্যে অন্তর্নিষ্ঠা, গুহের মধ্যে প্রিয়-বচন ও মেনরূপে আমিই অবস্থান করি। অপ্রমত্তের মধ্যে সম্বৎসরাত্মক কাল, ঋতুর মধ্যে বসন্ত, মাসের মধ্যে মার্গ- শীর্ষ (অগ্রহায়ণ ) এবং নক্ষত্রের মধ্যে আমিই অভিজিৎ। যুগ সমূহের মধ্যে সত্যযুগ, বিবেকিগণের মধ্যে দেবল ও অসিত, বেদ বিভাগকারী ব্যাসের মধ্যে কৃষ্ণদ্বৈপায়ন, তীক্ষ্ণবুদ্ধিশালীদিগের মধ্যে আমিই অসুরগুরু শুক্রাচাৰ্য্য। আনৈশ্বৰ্য্যাদি-বিশিষ্টগণের মধ্যে বাসুদেবরূপে আমিই চিত্তে অধিষ্ঠান করিতেছি, এবং হে উদ্ধব! ভক্তজন মধ্যে আমিই তােমার মূর্তিতে বিচরণ করিতেছি। আমি কপি শ্রেষ্ঠ হনুমান ও বিদ্যাধরাগ্রগণ্য সুদর্শন। আমি রত্নের মধ্যে পদ্মরাগ, সুদৃশ্যের মধ্যে পদ্মকোষ, ভিজাতির মধ্যে কুশ, হােমীয় পদার্থের মধ্যে গব্যঘৃত। ব্যবসায়ীর সম্পৎ, কপটীর ছলনা, ক্ষমাশীলের তিতিক্ষা এবং সত্যাবলম্বী ধীর ব্যক্তিগণের ধৈৰ্য্যকে আমারই বিভূতি বলিয়া জানিবে। ইন্দ্রিয়ের সামর্থ্য ওজঃ, মনের সামর্থ্য সহ (সহিষ্ণুতা ), দেহের সামর্থ্য বল, ভক্তগণের ভগবানে সমর্পিত কৰ্ম্ম এবং এমন কি বাসুদেব, সঙ্কৰ্ষণ, প্রদ্যুম্ন, অনিরুদ্ধ, নারায়ণ, হয়গ্রীব, বরাহ, নৃসিংহ ও ব্রহ্মা এই নব অবতারের মধ্যে শ্রেষ্ঠ আদি মূর্তি বাসুদেব বলিয়াই আমাকে জানিবে ।

৮ শ্রীকৃষ্ণ 1 আমি গন্ধর্বের মধ্যে বিশ্বাবসু, অক্ষরগণ মধ্যে পূৰ্ব্বচিত্তি, ভূধর মধ্যে স্থ্যৈ এবং পৃথিবীর মূলতত্ত্ব গন্ধতন্মাত্র। আমি জলের মধুর রস, তেজস্বীদিগের শ্রেষ্ঠ দিবাকর এবং সূৰ্য্য চন্দ্র ও তারকাগণের অন্তরস্থ প্রভাও আমি। আকাশের উৎকৃষ্টগুণ শব্দও আমি। ব্রাহ্মণসেবী ভক্তগণ মধ্যে আমি বলিরাজ, বীরপুরুষগণ মধ্যে বীরচূড়ামণি অর্জুনই আমি। ভূত সমূহের উৎপত্তি, স্থিতি ও সংহাররূপে একা আমিই বিরাজ করিতেছি। গতি, উক্তি, পরিত্যাগ, গ্রহণ ও আননরূপ পঞ্চকর্মেন্দ্রিয়ের কাৰ্য্য এবং শ্রবণ, স্পর্শন, দর্শন, আস্বাদন ও ঘ্রাণ রূপ পঞ্চজ্ঞানেন্দ্রিয়ের ব্যাপারও আমি। ইন্দ্রিয়াধিষ্ঠিত দেবতা নামে আমিই অভিহিত হই। শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস ও গন্ধ এই পঞ্চতন্মাত্র ; ক্ষিতি, অপ, তেজঃ, মরুৎ, ব্যোম এই পঞ্চমহাভূত; একাদশ ইন্দ্রিয়, অহঙ্কার-তত্ত্ব ও বুদ্ধি, পুরুষবাচ্য জীব ও প্রকৃতি এই পঞ্চবিংশতি তত্ত্ব এবং সত্ত্ব, রজঃ ও তমাে নামক প্রাকৃতিক গুণত্রয়, এবং তত্ত্বাতীত পরমব্রহ্ম, এই সকল নামে আমি একাই অভিহিত হইয়া থাকি। অধিক কি, তত্ত্বগ্রার গণনা লক্ষণ দ্বারা তাহাদের সম্যক্ প্রতীতি এবং তাহাদের নিয়ে যে তত্ত্বজ্ঞান জন্মে, ঐ সকলই আমার বিভূতির পরিচয় মাত্র। ময়েশ্বরেণ জীবেন গুণেন গুণিনা বিনা । সৰ্বাত্মনাপি সর্বেন ন ভাবে বিদ্যতে কচিৎ। আমি নিয়ন্তা ঈশ্বররূপে, ভােত্ত জীবরূপে, গুণত্রয় ভাবে, গুণময় মহত্তত্বাদিরূপে, সৰ্বভাবে এবং সকলের অন্তর্যামীরূপে নিয়ত বিরাজ করিয়া থাকি। আমি ব্যতীত দ্বিতীয় ভাবের অস্তিত্ব পৰ্যন্ত মিথ্যা ও কল্পনা মাত্র। হে উদ্ধব! এই জগতের পরমাণুপুঞ্জের সংখ্যা নির্ণয় করিতে পারি । কিন্তু আমা হইতে যখন এইরূপ কোটী কোটী ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্ট হইতেছে, তখন তন্নিষ্ঠ মদীয় বিভূতির নির্ণয় করা নিতান্তই অসম্ভব। দেখ ! প্রভাব, শ্ৰীঃ, কীর্তি, ঐশ্বৰ্য্য, হ্রী, ত্যাগ, আনন্দ, সৌভাগ্য, ক্ষমা, বীৰ্য্য ও বিজ্ঞান প্রভৃতি যেখানে যাহা কিছু পরিদৃষ্ট হয়, তাহা সমস্তই আমার বিভূতির পরিচয় মাত্র।

পরিশিষ্ট। ৮১ এই সমস্ত বিভূতির কথা অতি সংক্ষেপে তােমার নিকট কীৰ্ত্তন করিলাম বটে কিন্তু বাস্তাত্রে নিম্পাদিত নিরর্থক মনের বিকার জ্ঞানে ইহাদের প্রতি আস্থা করিও না। অর্থাৎ বিভূতিকে উপাদেয় জ্ঞান করিও না; বরং মনাে- বিলাস--কাল্পনিক জ্ঞানে উপেক্ষা করিও। বাচং যচ্ছ মনাে যচ্ছ প্রাণং যচ্ছেন্দ্রিয়ানি চ। আত্মানমাত্মনা যচ্ছ ন ভূয়ঃ কল্পসেহধ্বনে। বিবেক বুদ্ধিকে আশ্রয় করিয়া বাক্য, প্রাণ, ইন্দ্রিয়বর্গ ও চিত্তকে স্ব স্ব বিষয় হইতে প্রতিনিবৃত্ত কর। ইহাদের গতিকে রােধ করিতে পারিলে পুনরায় আর সংসারপথে ভ্রমণ করিতে হয় না। যে যতি চিত্ত ও ইন্দ্রিয়বর্গকে বুদ্ধি পূৰ্ব্বক বিষয় সম্ভোগ হইতে নিবৃত্ত না করেন, তাঁহাদের কঠোর তপস্যা, ব্রহ্মচাদি ব্রত ও দানাদি পুণ্যকর্ম সমূহ আমঘটস্থ সলিলের স্থায় অজ্ঞাতসারে বিনষ্ট হয়। তস্মাদ্ধচোমনপ্রাণান্ নিচ্ছেন্মপরায়ণঃ। মদ্ভক্তিযুক্তয়া বুদ্ধ্যা ততঃ পরিসমাপ্যতে। অতএব আমার উপর নির্ভর করিয়া ভক্তি সহকারে ইন্দ্রিয়, প্রাণ ও মনকে সৰ্ব্বতভাবে সংযত করা অবশ্য বিধেয়। তাহা হইলে এই দুর্লভ মানব জীবনের প্রধান কর্তব্য, “সংসার সমুদ্র হইতে উদ্ধার” অবশ্যই ঘটিবে । (৩) ৫ উদ্ধব বলিলেন, মানবগণ স্বর্ণাশ্রমমাচিত ধর্মের যেরূপ অনুষ্ঠান করিলে তদীয় প্রেম-লক্ষণা ভক্তি সহজেই লাভ করিতে পারে, তাহা কৃপা পূর্বক আমার নিকট কীর্তন করুন। শ্রীকৃষ্ণ বলিলেন, সৃষ্টির আদিকল্পে কৃত বা সত্যযুগে মানবগপের একটা সাধারণ বর্ণ ছিল ; যাহাকে তখন হংস নামেই অভিহিত করা হইত। তৎকালে অনুষগণ জন্ম হইতেই কৃতকৃত্য ছিলেন, এইজন্য তাহাকে কৃতযুগ বলে। [ ১১ ] ;

કર ঐকৃষ্ণ। প্রণবরূপী বেদ এবং চতুষ্পদ ধৰ্ম্মমূৰ্ত্তিতে বৃষরূপধারী আমিই তৎকালে বিরাজ করিতাম। মানবগণ নিস্পাপ ও তপােনিষ্ঠ ছিলেন এবং বিশুদ্ধস্বরূপ আমার হংস মূৰ্ত্তিরই উপাসনা করিতেন। হে মহাভাগ! ত্রেতাযুগের প্রারম্ভে বিরাটরূপ মদীয় হৃদয়পন্নে প্রাণশক্তি হইতে ঋক, যজুঃ ও সাম-লক্ষণ অবয়বত্রয় বিশিষ্ট মূল বিদ্যা বেদ বহির্গত হয়। এবং সেই এয়ীরূপ বেদ হইতে হােত, অধ্যু (যজুৰ্বেদজ্ঞ ঋত্বিক) ও উদপাত্র ( উচ্চৈঃস্বরে গানকারী) এই রূপত্রবিশিষ্ট যজ্ঞরূপে আমিই আত্মপ্রকাশ করি। বিপ্র-ক্ষত্রিয়-বিটশূদ্রা মুখবাহুরুপাদজা। বৈরাজা পুরুষাজ্জাতা য আত্মাচারলক্ষণাঃ । গৃহাশ্রমমা জঘনতাে ব্রহ্মচর্য্যং হৃদে মম। বক্ষস্থলাদনে বাসঃ সন্ন্যাসঃ শিরসি স্থিতঃ # অনন্তর মানসিক প্রবৃত্তি ও তদনুরূপ শামাদি আচারসহ ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র এই চারিবর্ণ যথাক্রমে আমার বিরাট মূৰ্ত্তির মুখ, বাহু, উরু ও পাদদেশ হইতে উৎপন্ন হইল। আমার এই বিরাট মূর্তির জ্যাদেশ হইতে গৃহস্থাশ্রম, বক্ষের নিম্নভাগ হৃদয় হইতে ব্রহ্মচর্য, বক্ষঃস্থল হইতে বানপ্রস্থ এবং শীর্ষদেশ হইতে সন্ন্যাসা- শ্রমের উদয় হইয়াছে। উক্ত বর্ণাশ্রমবিশিষ্ট মানবগণের উৎপত্তির ভূমি অনুসারে তাহার উৎকৃষ্ট ও নিকৃষ্ট প্রকৃতি লাভ করিয়াছে। অর্থাৎ মুখাদি উৎকৃষ্ট স্থান হইতে যাহাদের উৎপত্তি, তাহারা উৎকৃষ্ট ব্রাহ্মণ এবং শীর্ষোৎপন্ন সন্ন্যাসাশ্রমের অধিকারী। নিকৃষ্ট পাদাদি হইতে উৎপন্ন মানব শূদ্র এবং গৃহস্থাশ্রমের অধিকারী। তপ বাহূৎপন্ন ক্ষত্রিয় বানপ্রস্থাশ্রম এবং উরু-সমুৎপন্ন বৈশ্য ব্রহ্মচর্যাশ্রমের অধিকারী। শমাে দমস্তপঃ শৌচং সন্তোষঃ ক্ষান্তিরাজ্জবং। মঙক্তিশ্চ দয়া সত্যং ব্রহ্মপ্রকৃতয়ত্ত্বিমাঃ । .

পরিশিষ্ট। ৮৩ তেজো বলং ধৃতিঃ শৌৰ্যং তিতিক্ষৌদাৰ্য্যমুদ্যমঃ। স্থৈর্য্যং ব্ৰহ্মণ্যমৈশ্বৰ্যং ক্ষত্ৰপ্ৰকৃতয়মািঃ । আস্তিক্যং দাননিষ্ঠা চ অদন্তো ব্ৰহ্মসেবনং। অতুষ্টিরর্থোপচয়ে বৈশপ্রকৃতয়মািঃ । শুশ্রুষণং দ্বিজগৰাং দেবানাঞ্চাপ্যমায়য়া। তত্র লনে সন্তোষঃ শূদ্ৰপ্ৰকৃতয়ত্ত্বিমাঃ । ০ অন্তঃকরণের নিগ্রহরূপ শম, বাহেন্দ্রিয়ের নিগ্রহরূপ দম, তত্ত্বালোচনারূপ তপস্যা, শৌচ, সন্তোষ, ক্ষান্তি, নিষ্কপটতা, ভগবদ্ভক্তি, দয়া ও সত্য, এই কয়টী ব্রাহ্মণত্বের অভিব্যঞ্জক স্বভাবসিদ্ধ ধৰ্ম্ম। তেজঃ বল, ধৃতি, শৌৰ্য্য, তিতিক্ষা, উদারতা, ধন সঞ্চয়ার্থ উদ্যম, সত্য- সংকল্পতা, ব্রাহ্মণে ভক্তি এবং নিয়ন্ত্রণ ( দমন বা শাসন) সামর্থ্য, এই কয়টা ক্ষত্রিয়ত্বের পরিচায়ক স্বভাবনিষ্ঠ ধর্ম। গুরু ও বেদান্ত বাক্যে বিশ্বাস, দান করিবার নিষ্ঠা, পর প্রতারণা না করা, ব্রাহ্মণ-সেবা ও ধনবৃদ্ধিতে নিরন্তর উৎসাহ এই কয়টী বৈশ্যত্বের পরিচায়ক বৈশ্যের স্বভাবনিষ্ঠ ধর্ম। কাপট্য পরিত্যাগ পূৰ্ব্বক দেবতা এবং ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় ও বৈশ্য এই বর্ণত্রয় এবং গাভীর শুশ্রুষা ও তদুপলব্ধ বৃত্তি বা সামগ্রী দ্বারা সন্তুষ্টচিত্তে জীবিকা নিৰ্বাহ করাই শূদ্রের শূদ্ৰবৰ্ণত্বের পরিচায়ক ধর্ম। অশৌচমনৃতং স্তেয়ং নাস্তিক্যং শুষ্কবিগ্রহঃ । কামঃ ক্রোধশ্চ তষশ্চ স্বভাবােহন্ত্যাবসায়িং। অহিংসা সত্যমস্তেয়মকামক্রোধলােভ। ভূতপ্রিয়হিতেহা চ ধৰ্ম্মোহয়ং সাৰ্ববর্ণিকঃ ॥ অশৌচ, মিথ্যাব্যবহার, গুরুশাস্ত্রাদিতে অবিশ্বাসরূপ নাস্তিকতা, অনর্থক বিবাদ, তীব্র কাম, ক্রোধ ও লােভ এই সমস্ত বর্ণাশ্রমহীন নিকৃষ্ট লােকের স্বভাব।

৮৪
শ্রীকৃষ্ণ।
অহিংসা, সত্য, অস্তেয় ( সাধুতা) এবং কাম, ক্রোধ, লােভহীন ও
সৰ্ব্বজীবের প্রতি দয়া এই সমুদয় সৰ্ববর্ণেরই সাধারণ ধর্ম।
ব্রাহ্মণাদি বৰ্ণত্রয় গাধানাদি সংস্কার ক্রমে উপনয়নরূপ দ্বিতীয় জন্ম লাভ
করিয়া গুরুকুলে বাস করত ইন্দ্রিয়গ্রামকে সংযত করিবেন এবং গুরুর অনুমতি
ক্রমে বেদাধ্যয়ন করিবেন।
মেখলাজিনদণ্ডাক্ষব্রহ্মসূত্ৰকমণ্ডলুন।
জটিলােহধৌতদদ্বাসােহরক্তপীঠঃ কুশান্ দধৎ ।
স্নানভােজনহােমেচ জপােচ্চারেষু বাগ্যতঃ।
ন চ্ছিন্দ্যাখলোমানি কক্ষোপস্থাপি।
রেতাে ন বিকিরেজ্জাতু ব্ৰহ্মব্রতধরঃ স্বয়ং।
অবকীর্ণেহবগাহা যতা স্ক্রিপদাং জপেৎ ।
অগ্ন্যকাচাৰ্যগগাবিপ্রগুরুবৃদ্ধসুরা শুচিঃ।
সমাহিত উপাসীত সন্ধ্যে দ্বে যতবাণু জপন্ ।
ব্রহ্মচারী মস্তকে জটাভার ধারণ পূৰ্ব্বক মেখলা, অজিন, দণ্ড, অক্ষমালা,
ব্রহ্মসূত্র, কমণ্ডলু ও কুশা (রঞ্জু) গ্রহণ পূর্বক অবস্থান করিবেন। রক্তবর্ণ
পীঠাসনে উপবেশন বা দন্ত ও বস্তু ধৌত করিবেন না।
ব্রহ্মচারী স্নান, ভােজন, হােম, মন্ত্রজপ এবং মুত্র ও পুরীষ ত্যাগকালে
বাঙুনিষ্পত্তি বা কথা কহিবেন না, মৌন ভাবেই অবস্থান করিবেন। কক্ষ
ও উপস্থগত লােম এবং হস্তপদাদির নখ ছেদন করিবেন না।
ব্রহ্মচারীর বুদ্ধি পূৰ্ব্বক বীর্যপাত কখনই কর্তব্য নহে।
যদি অকস্মাৎ
কখন বীর্যপাত হয়, তবে জলে অবগাহন পূৰ্ব্বক স্নান এবং প্রাণায়াম পূর্বক
গায়ত্রী জপ করিবেন।
স্নানাদি দ্বারা পবিত্র হইয়া একাগ্রচিত্তে অগ্নিতে আহুতি প্রদান, সূৰ্যার্জন
এবং আচাৰ্য, গে, বিপ্র, গুরু, বৃদ্ধ ও দেবতাগণের সেবা করত সংযতেন্দ্রিয়
হইয়া উভয় সন্ধ্যা বেদমাতা গায়ত্রী জপ করিবেন।
আচাৰ্যং মাং বিজানীয়ান্নাবমতে কহিঁচিৎ।
ন মর্তবুদ্ধ্যাসুয়েত সর্বদেবময়াে গুরুঃ ।

পরিশিষ্ট। সায়ং প্রাতরুপানীয়ং ভৈক্ষ্যং তস্মৈ নিবেদয়েৎ । যচ্চাদপ্যমুজ্ঞাতমুপযুঞ্জীত সংযতঃ ॥ শুষমাণং আচাৰ্যং সদোপাসীত নীচবৎ। যানশয্যাসনস্থানৈর্নাতিদূরে কৃতাঞ্জলিঃ। এবংবৃত্তো গুরুকুলে বসেদ্ভোগবিবর্জিতঃ। বিদ্যা সমাপ্যতে যাবদ্বিতমখণ্ডিতং । আচাৰ্য্যকে ভগবানের স্বরূপ জ্ঞানে সম্মান করা কর্তব্য। মনুষ্য-বুদ্ধিতে কখন তাহাকে উপেক্ষা বা তঁাহার দোষ অনুসন্ধান করা কর্তব্য নহে। গুরুই সৰ্ব্বদেবতার আদর্শ স্থানীয় । ভিক্ষালব্ধ দ্রব্যাদি প্রাতঃ ও সায়ংকালে গুরুর সমীপে প্রদান করিবে। এমন কি যে কোন দ্রব্য সংগৃহীত হইবে তৎসমুদয়ই গুরুকে নিবেদন করা কৰ্ত্তব্য। তাহার প্রদত্ত সামগ্রী দ্বারা তাহার অনুমতিক্রমে জীবিকা নির্বাহ করিবে। আচার্যের সেবাকালে,-তাহার গমনকালে অনুগমন, তাহার নিদ্রা সময়ে অতি সাবধানে তৎসমীপে শয়ন, বিশ্রামকালে পাদসহনাদি জন্ত তৎসমীপে অবস্থান, এবং অতি নীচের ন্যায় কৃতাঞ্জলিপুটে নিরন্তর তাহার আজ্ঞার প্রতীক্ষা করা কর্তব্য। এই প্রকার ব্ৰতাবলম্বন করিয়া ভােগবাসনায় জলাঞ্জলি দিয়া যতদিন অধ্যয়ন কাৰ্য্য সমাপ্ত না হয়, ততদিন অবিচ্ছেদে এইরূপ ব্রহ্মচর্য অবলম্বন পূৰ্ব্বক ব্ৰহ্মচারীর গুরুগৃহে বাস করা কর্তব্য। বেদাদি শাস্ত্র সমূহ সমুজ্জ্বল মূর্তি ধারণ পূর্বক যেখানে নিয়ত বিরাজিত আছেন, ব্রহ্মচারী যদি সেই ব্ৰহ্মলােকে গমনের বাসনা করেন, তাহা হইলে তিনি অধ্যয়নের চরম সীমায় উপনীত হইবার নিমিত্ত গুরুকেই স্বীয় দেহ উৎসর্গ করিবেন। তত্ত্বালােচনা ব্যতীত অন্য কোন আশ্রমে অগ্রসর হইবার বাসনা যেন না করেন। সমগ্র বেদার্থে সম্যগ্ পারদর্শী সর্বত্র ভেদজ্ঞানশূক্ত পবিত্ৰহৃদয় ব্রহ্মচারী এই প্রকার আচরণে অগ্নি, গুরু, আত্মা ও ভূতমাত্রেরই অন্তরে পরমাত্মস্বরূপ আমার মুক্তিই অবলােকন করিয়া উপাসনা করিয়া থাকেন।

৮৬ শ্রীকৃষ্ণ। স্ত্রীণাং নিরীক্ষণ-স্পর্শ-সংলাপ-ক্ষেলনাদিকং। প্রাণিনাে মিথুনীভূতানগৃহস্থােহগ্রস্ত্যজেৎ | শৌচমাচমনং স্নানং সন্ধ্যোপাস্তিমমা…নং। তীর্থসেবা জপােহস্পৃশ্যাভক্ষ্যাহসং ভাষবর্জনং। গৃহস্থাশ্রমে গমন না করিয়া যে পর্যন্ত ব্রহ্মচর্য পালন করিবেন, তদবধি ব্রহ্মচারী যেন কামিনীর প্রতি কটাক্ষ, তাহাদিগকে আলিঙ্গনাদি দ্বারা স্পর্শ, তাহাদের সহিত গুহ সম্ভাষণ বা পরিহাসাদি না করেন । এবং মিথুনীভূত কোন পশু পক্ষী প্রভৃতি জীবকে দেখিলে তাহাদের প্রতি দৃষ্টিপাত না করিয়া তৎক্ষণাৎ সে স্থান হইতে পলায়ন করবেন। বাহাভ্যন্তরের শৌচ, ত্রিসবন, ( ত্রিসন্ধ্যা স্নান) সন্ধ্যোপাসনা, বিষ্ণুপূজা, তীর্থপৰ্যটন ও গায়ত্রী জপ দ্বারা সময় অতিবাহিত করিবেন। অস্পৃশ্য স্পর্শ, অক্ষ্য ভােজন বা অন্যায় আলাপ দ্বারা আপনাকে কলুষিত করিবেন না। সবাশ্রমপ্ৰযুক্তোহয়ং নিয়মঃ কুলনন্দন। মদ্ভাব সৰ্ব্বভূতেষু মনােবাক্কায়সংযমঃ। এবং বৃহদ্ব তধররা ব্রাহ্মণােহগিরিব জ্বলন্। মক্তস্তীব্রতপসা দগ্ধকৰ্ম্মাশয়ােহমলঃ ॥ হে কুলনন্দন উদ্ধব ! সৰ্ব্বভূতে ভগবদ্ভাব চিন্তা করা এবং মন প্রভৃতিকে উন্মার্গগামী হইতে না দেওয়াই সাধারণতঃ সকল আশ্রমেরই প্রধান ধর্ম । নৈষ্ঠিক ব্রহ্মচারী সমগ্র বেদের অর্থ অবধারণ পূৰ্ব্বক অবিচ্ছিন্ন তপস্যার বলে যখন চিত্তমালিন্য দূর করেন, তখন জলন্ত ত্রিশিপের (অগ্নির) ন্যায় মূর্তি ধারণ পূর্বক মক্ত (ভগবদ্ভক্ত) হইয়া জীবমুক্তি লাভ করেন। এই প্রকারে যথাযথ বেদার্থ অবগত হইয়া ব্রহ্মচারী যদি দ্বিতীয় আশ্রমে (গৃহস্থাশ্রমে ) প্রবেশ করিতে বাসনা করেন, তবে গুরুকে অভিলষিত দক্ষিণা প্রদান পূর্বক তাহার অনুমতি গ্রহণ পূর্বক সমাবর্তন (ব্ৰহ্মচর্যের পর গৃহস্থাশ্রমে প্রবেশকালে কর্তব্যাবধারণ পূর্বক দেবতা, ব্রাহ্মণ ও পিতৃগণকে সাক্ষী করিয়া নিয়মাধীন হইয়া পবিত্র জলে স্নান ) নামক গানের অনুষ্ঠান করিবেন।

পরিশিষ্ট। ৮ গৃহং বনং বা প্রবিশেৎ প্রব্ৰজেদ্বা দ্বিজোত্তম। আশ্ৰমাদাশ্রম গচ্ছেন্নান্যথা মৎপরশ্চরেৎ। গৃহার্থী সদৃশীং ভাৰ্যামুদ্বহেদজুগুষ্পিতা। যবীয়সীস্তু বয়স যাং সবর্ণামমুক্ৰমাৎ ব্রহ্মচারীর মনে যদি কামনা থাকে তবে গৃহস্থাশ্রম, চিত্ত নিষ্কাম হইলে বানপ্রস্থাশ্রম এবং সম্পূর্ণ জ্ঞান লাভে মুক্ত হইবার বাসনা হইলে সন্ন্যাসাশ্রমেরই আশ্রয় লওয়া কর্তব্য। ঈশ্বরপরায়ণ আস্তিক ব্যক্তির পক্ষে অনাশ্রমী ভাবে থাকা কখনই কৰ্তব্য নহে। স্বীয় অধিকারানুরূপ আশ্রমকে অবলম্বন করা অবশ্য কর্তব্য। গৃহী হইতে হইলে সকুলসম্ভবা লক্ষণযুগ চিত্তানুরূপা অল্পবয়স্কা সবর্ণা স্ত্রীর পাণিগ্রহণ করা কর্তব্য। যদি কামতঃ বনিতাভােগের বাসনা জন্মে, তবে সবর্ণাকে বিবাহ করিবার পর বিদি বৰ্ণত্রয় অসবর্ণ নিম্ন শ্রেণীর কন্যাকেও কামপত্নীরূপে গ্রহণ করিতে পারিবেন । যজ্ঞ, অধ্যয়ন, দান এই তিনটী কাৰ্য্য সাধারণতঃ দ্বিজপদবাচ্য ব্রাহ্মণাদি বর্ণত্রয়েরই অবশ্য কর্তব্য। যাজন, প্রতিগ্রহ ও অধ্যাপনা এই তিনটী কর্ম কেবল ব্রাহ্মণের জীবিকা নির্বাহাৰ্থ আদিষ্ট হইয়াছে। ব্রাহ্মণ যদি প্রতিগ্রহকে তপস্যা, ব্ৰহ্মতেজ ও যশের বিঙ্গ বলিয়া মনে করেন, তবে কেবল যাজন ও অধ্যাপনা দ্বারাই জীবিকা নির্বাহ করিবেন। যদি তাহাতেও দোষ দর্শন করেন, তবে ক্ষেত্র পতিত অস্বামিক শস্যাদি সংগ্রহরূপ শিল (উ) বৃত্তি অবলম্বন পূর্বক জীবিকা নির্বাহ করিবেন। } ব্রাহ্মণস্য তু দেহােহয়ং ক্ষুদ্রকামায় নেতে। কৃচ্ছ্বায় তপসে চেহ প্রত্যানন্তসুখায় চ। কারণ, ব্রাহ্মণের দেহ কখন অতি তুচ্ছ বিষয় সম্ভোগের জন্য উৎপন্ন হয় নাই। তিনি বৃত্তি-সঙ্কোচ দ্বারা ক্লেশ সহকারে ইন্দ্রিয়াদি নিবােধ পূর্বক তালােচনার্থই জন্ম গ্রহণ করিয়াছেন; এবং ভােগ-দেহ পরিত্যাগের পর অনন্তমুখ মােক্ষানন্দ তাহার জন্য অপেক্ষা করে।

৮৮ শ্রীকৃষ্ণ। শিলােঞ্চবৃত্তা পরিতুষ্টচিত্তে ধৰ্ম্মং মহান্তং বিরজং জুষাণঃ। ময্যপিতাত্মা গৃহ এব তিন নাতিপ্রসক্তঃ সমুপৈতি শান্তিং । পূর্বোক্ত শিলবৃত্তি (ক্ষেত্ৰপতিত ধান্যাদি সংগ্রহ) এবং উঃ (হট্টাদিতে পরিত্যক্ত পণ্য দ্রব্যের কণাদি সংগ্রহ) বৃতি দ্বারা জীবিকা নির্বাহরূপ অতি দুঃখে জীবন যাপনে পরিতুষ্টচিত্ত নিষ্কাম ব্রাহ্মণ দুষ্কর আতিথ্য-সৎকারাদি ধৰ্ম্মানুশীলনে ভগবানে চিত্ত সমর্পণ পূর্বক গৃহে অবস্থান করিলেও তাহাদের চিত্ত কখন বিষয়ে বিশেষরূপে আসক্ত হয় না। তাহারা অনায়াসেই পরম শান্তি লাভ করেন, সন্দেহ নাই। ។ সমুদ্ধরন্তি যে বিপ্রং সীদন্তং মৎপরায়ণং । তানুদ্ধরিয়ে নচিরাদাপট্ট্যো নৌরিবার্ণবাৎ । সর্বা সমুদ্ধরোজা পিতেব ব্যসনাৎ প্রজাঃ। আত্মানমাত্মনা ধীরাে যথা গজপতিৰ্গজান্। এবম্বিধাে নরপতিবিমানেনাকবচ্চসা। বিধুয়েহাশুভং কৃৎসুমিন্দ্রেণ সহ মােদতে। ঈশ্বরপরায়ণ ব্যক্তি এই প্রকারে বৃত্তি-সঙ্কোচ বশতঃ প্রায়ই অন্নকষ্ট পাইয়া থাকেন; কিন্তু যে ধনবান্ ব্যক্তি তাদৃশ ভক্তের অন্নকষ্ট নিবারণ করেন, আমি তাদৃশ অর্থশালী ব্যক্তিকে সমুদ্র পতিত নৌকার ন্যায় এই বিষম ভবসমুদ্র হইতে অনায়াসে রক্ষা করি। ভক্তসেবী এই প্রকার নরপতি এই জন্মে যাবতীয় পাপ বিনিৰ্ম্মক্ত হইয়া দিবাকর সদৃশ অতুল তেজোবিশিষ্ট বিমানে আরােহণ পূর্বক স্বর্গলােকে গমন করিয়া ইন্দ্রের সহিত সুখসম্ভোগ করেন। ** 4 সীদন্ বিলাে বণিগবৃত্তা পণ্যরেবাপদং তরে। খড়েন বাপদাক্রান্তে নবত্ত্যা কথঞ্চন ॥ বৈশবৃত্ত্যা তু রাজন্যো জীৰেমৃগয়য়াপদি। চরেদ্বা বিরূপেণ ন শবৃত্ত্যা কথঞ্চল ॥ ১ ka, .

পরিশিষ্ট। ৪ ব্রাহ্মণ যদি কোনরূপ বিপদে পতিত হইয়া স্বীয় বর্ণোচিত যজনাদি দ্বারা জীবিকা নির্বাহে অসমর্থ হন, তাহা হইলে বণিগবৃত্তি অবলম্বন পূর্বক বা লবণাদি অবৈধ দ্রব্য ব্যতীত অন্য কোন উপযুক্ত সামগ্রীর ব্যবসায়েরা লংসার ধাত্ৰা নিৰ্বাহ করিবেন; অথবা অস্ত্রধারণ পূৰ্ব্বক ক্ষত্রিয়ের বৃত্তি স্বীকার করিয়াও আপৎকাল অতিক্রম করিবেন ; তথাপি কুকুরের ন্যায় অতি নীচ দাস কৰ্ম্মে অগ্রসর হইবেন না। ক্ষত্রিয়ও যদি ঐরূপ দুরবস্থাগ্রস্ত হন, তাহইলে বৈবৃত্তি অবল বা কেবল মৃগয়া দ্বারা অথবা ব্রাহ্মণের বৃত্তি অধ্যাপনাদি অবলম্বন করিয়াও জীবিকা নির্বাহ করিবেন, তথাপি নীচসেবা দ্বারা অন্ন সংগ্রহ করা কোনক্রমে # বিধেয় নহে। } শূদ্ৰবৃত্তিৰ্ভবেদ্বৈশঃ শূদ্রঃ কারুকটক্রিয়াং। কামুক্তো ম হেণ বৃত্তিং লিষ্পেত কৰ্ম্মণ। আপৎকালে বৈশ্য, শূদ্ৰবৃত্তি অবলম্বন বা শূদ্রজনােচিত কারুকাৰ্যাদি দ্বারা জীবিকা নির্বাহ করিবে। কিন্তু বিপদকাল অতীত হইবামাত্রই তাদৃশ নিকৃষ্ট নিন্দিত কর্ম পরিত্যাগ করিবে। বেদাধ্যায়স্বধাহাবল্যন্নাদ্যৈযথোদয়ং। দেবর্ষিপিতৃভূতানি মােপাণ্যম্বহং যজেৎ। ঘদৃচ্ছয়ােপপনে শুক্লেনােপাজ্জিতেন বা । ধনেপীড়য় ভৃত্যান্ন্যায়েনৈবাহরেৎ ক্রতুন্। গৃহস্থগণ পঞ্চজ্ঞের অনুষ্ঠান জন্য বেদাধ্যয়নরূপ ব্ৰহ্মযজ্ঞের দ্বারা, ঋষিগণকে, খ (পিগুদানাদিরূপ) শ্রাদ্ধের দ্বারা পিতৃলােককে, স্বাহারূপ হােমের দ্বারা গণকে, বলি প্রদানে ভূতগণকে এবং অন্নপানাদি প্রদানে মনুষ্যগণকে আমারই স্বরূপ জ্ঞানে যেন নিত্য অর্চনা করেন। কোন প্রকার অভিন্ধি বা উদ্যম ব্যতীত নিজের ব্যক্তি দ্বারা যে ধন সংগ্রহ কয় যায়, তারা পােষ্যবর্গের উপযুক্তরূপ ভরণপােষণ নিৰ্বাহ করিয়া উদ্বৰ্ত্ত ধনের * ১২, 1 ET -- ৫ } ga দ্বারা যজ্ঞের অনুষ্ঠান করিবে, কিন্তু যজ্ঞ নির্বাহাৰ্থ ধন সঞ্চয়ের উদ্দেশ্যে যেন বর্গের জীবিকায় ক্লেশ দেওয়া না হয়। ? . = 1 কুটুম্বেযু ন সজ্জেত ন প্রমাছেৎ কুটুম্ব্যপি বিপশ্চিন্নশ্বরং পদেদৃষ্টমপি দৃষ্টবৎ । পুত্রধারাপ্তবৰ্ধনা সঙ্গম পান্থসঙ্গমঃ। অনুদেহং বিয়ন্ত্যেতে স্বপ্নে নিদ্রানুগগা যথা । এদিকে আবার পুত্রকন্সত্রাদি পরিজন পরিবেষ্টিত বলিয়াই যে অমনে তাহাদের প্রতি আসক্ত হইয়া পরমার্থ চিন্তায় উদাসীন হইবে তাহাও নহে। এবং স্বর্ণাদি পারলৌকিক সুখকেও ঐহিকের ন্যায় অকিঞ্চিৎকর আনে বুদ্ধিমান ব্যক্তি সতত বিবেচনা পূর্বক কার্য করিবেন। অর্থাৎ পুত্ৰকলত্রাদি পরিজন- বর্গের বা অনিত্য স্বর্গসুখ কামনার মােহে নিত্যসত্য অনখ ভগবানে আরাধনায় বিরত হইবে না। কারণ, স্ত্রী পুত্র বন্ধুবান্ধবগণের সমাগমকে পানিবাসের ন্যায় ক্ষণস্থায়ী ও স্থা বিবেচনা করিয়া তাহাদের প্রতি অত্যাসক্তি প্লয়িত্যাগ করাই কর্তব্য। অল্প যেমন নিদ্রারই অনুগমন করে, পরিজনবর্গও সেইরূপ তাহাকে ক্ষণস্থায়ী দেহেরই অনুগমন করিয়া থাকে মাত্র। ইখং পরিষ মুক্তো গৃহেৰতিখিস। ন গৃহের বধ্যত নিৰ্ম্মমাে নিরহঙ্কতঃ ॥ কৰ্ম্মভিগৃহমেধীয়ৈৱিষ্ট মামেবভক্তিমান। তিষ্ঠেনং বােধবিশেৎ প্রজাবান্ ৰা পৰিত্ৰজেৎ এই প্রকার বিবেচনা পূর্বক বিষয়ের মমতা ও দেহাদিতে অহঙ্কায় পরিত্যাগ কত যে ব্যক্তি অতিথির ন্যায় স্বীয় গৃহে জীবন্মুক্তভাবেবস্থানকরেন, তিনি আর কখন সংসারজালে জড়িত হন না। “ক্তিমান্ গৃহাশ্রমী এই প্রকারে গৃহস্থাশ্রম-নিয়মিত কলপ জায়া ভাবন আমার আরাধনা করিয়া সন্তানসন্ততিসহ গৃহই-বাম করুন | - . d '। - ।

৯১ -~~~ 1 মে পরিশিষ্ট। ~~~~~~~~~~~~~~ অৱলম্বন করত বনেই গমন করুন, বা সন্ন্যাসই অবলম্বন করুন, কই আঁকার তুল্যফলপ্রদ। হবে পুত্রৰা হইলে । ষাসক্ত মতিৰ্গেহে পুবিষৈণাতুরঃ। স্ত্রৈণ কৃপণধীমূঢ়ো মাহমিজি বধ্যতে। অহহ মে পিতরে বৃদ্ধে ভাৰ্যা বালাত্মজাত্মা। অনাথা মামৃতে দীনাঃ কথং জীবন্তি দুঃখিত। কিন্তু ব্যক্তি আসক্তি বশতঃ পুত্র বিত্তাদির স্নেহে নিতান্ত আকৃষ্ট হয়, তাদৃশ নারীপরতন্ত্র কুঞ্চিতহৃদয় মানব “আমি আমার এই মুখতার চিন্তাতেই আবদ্ধ হয়। তাহারা মনে করে অহহ! আমার জনক জননী নিতান্তই প্রাচীন, বনিতাও শিশুসন্তানবিশিষ্টা, পুত্রকন্যাগণ এখনও উপযুক্ত হয় নাই, ইহারা সকলে আমার অভাবে দীন দুঃখী অনাথের রায় কি প্রকারে জীবন যাত্রা নির্বাহ করিবে ? এই প্রকার গৃহচিন্তায় নিতান্ত আসক্তচিত্ত বিবেকহীন মানব, গৃহস্থাশ্রমে অতৃপ্তের ন্যায় অবস্থান করত নিরন্তর পুত্রকলত্রাদির চিন্তায় নিরত কালগ্রাসে পতিত হইয়া মরণান্তে ঘাের অন্ধতম নরকে প্রবেশ করে। } ভগবান্ শ্রীকৃষ্ণ বলিলেন, হে উদ্ধব! বানপ্রস্থাশ্রমে গমন করিতে হইলে হী ভাৰ্য্যার রক্ষণাবেক্ষণ ও ভরণ পােষণের ভার পুত্রের হস্তে ন্যস্ত করিয়া আইবেন; অথবা পত্মীকে সঙ্গে লইয়া অরণ্যবাসে জীবনের তৃতীয়াংশ পঞ্চাশ হইতে ৭৫ বৎসর পর্যন্ত জিতেন্দ্রিয় ভাবে কালযাপন করিবেন। বনজাত পবিত্র কন্দমূল ও ফলাদি রা জীবিকা নির্বাহ, অনায়াসলব্ধ বৃক্ষ বস্কল পরিধান ও তৃণাদি শুষ্কপত্র ও মৃগচৰ্ম্মাদি দ্বারা শয্যাদির কার্যনির্বাহ করিবেন। স্তরেকে, ওলাম, নখ ও স্মরণ করিবেন ; তাহার লা নিবারণ এবং দণ্ডধারণ করিবেন না। ত্রিসন্ধ্যা গাত্র মার্জিন ব্যতীত মুম্বলের ন্যায় কালে অরগাহর স্নান ও তুশয্যায় ভূমিতেই শয়ন করিবেন। -- } 1 t খ্রীষ্ম ঋতুতে পঞ্চাগ্নি তপস্যা অর্থাৎ মক্তকোপরি সূৰ্য্যদেব ও দেহের চারিদিকে চারিভাগে অপ্তি প্রজ্বলিত করত পঞ্চপ্রকার অগ্নিতে দেহ পরিভাপিত করিবেন। বর্ষাকালে আসার ( বৃষ্টিধারা) জলে এবং শিশির কালে আকণ্ঠ জলমগ্ন হইয়া বিশেষ তপস্যার অনুষ্ঠান করিবেন। অগ্নিপক কলমূল, কালপক্ট ফল ও ‘উদুখল বা প্রস্তর দ্বারা কুট্টিত দ্রব্য ভােজন করিবেন; কিন্তু উদূখলাদির অভাবে দন্তকেই উদূখল করিয়া ভােজন কাৰ্য্য সমাধা করিবেন ” দেশ কাল ও দ্রব্যের বলাবল বিবেচনা করিয়া যতি স্বীয় বৃত্তি সংগ্রহ করিবেন। কালান্তরে সংগৃহীত দ্রব্যের দ্বারা জীবিকা নির্বাহ করিবেন না। অর্থাৎ যতির আঁন্নাল্লি কোন দ্রব্য সঞ্চয় করা নিষিদ্ধ। বনৈশ্চরুপুরােডাশৈনিবপেৎ কালচোদিতাম্। নতু শ্রোতেন পশুনা মাং যজেত বনাশ্রমী। বনজাত নীরাদি দ্বারা প্রস্তুত চরু ও পুরােডাশাদি (যজ্ঞে পশু দেহে পরিবর্তে যবচূর্ণ মিশ্রিত রুটি ) প্রদান পূৰ্ব্বক নবান্নপ্রাশনা আগ্ৰহয়দি বৈদিক কৰ্ম্মকলাপের অনুষ্ঠান করা কর্তব্য। কারণ বনাশ্রমীর অার পশুহিংসাদি পূৰ্ব্বক শ্রৌত কৰ্ম্ম দ্বারা আমার অর্চনা করা বিধেয় নহে। জ্ঞানীদিগের নির্দেশানুসারে পূৰ্ব্ববৎ মুনির অগ্নিহােত, দর্শ ( অমাবশ্যা ) পৌর্ণমাস ও চাতুর্মাস্যাদি ব্ৰতানুষ্ঠান করা কর্তব্য। * যাবজ্জীবন এই প্রকার কঠোর তপস্যা দ্বারা মুনির দেহ শুষ্ণ ও জীর্ণশীর্ণ ১ হইয়া ধমনিব্যাপ্ত হয় বটে, কিন্তু এই প্রকার তপস্যায় আমার আরাধনা করিলে দেহ পরিত্যাগ পূৰ্ব্বক তিনি অনায়াসেই আমার সামােক্য-পদ প্রাপ্ত হয়েন। কিন্তু কি দুর্ভাগ্যের বিষয়। এইরূপ মােক্ষপ্র পরম হিতকর উৎকট তপস্যা লতিক্লেগে সমাৱা করিয়াও যাহারা সামান্য ফলের প্রত্যাশায় তাহা নিয়ােজিত ফলে জাহাদের ন্যায় ঘাের মুখ আর দেখা যায় না। বহুক্কাল বানপ্রস্থাবলম্বন করিয়াও যাহারা তীব্র বৈরাগ্যের অভাবে যথা + * - } F । বিশিষ্ট। - A শ নিয়মে সন্ন্যাসব্রতধারণে অসফর্থ এবং তৎপূৰ্বেই জরাগ্রস্ত হয়। পড়েন, তাঁহারা অমাতে চিত্ত সমাহিত করত হােমাদি যজ্ঞের সমাপলুৰ্ব্বক অতি প্রবেশ করিবেন। স্বর্গাদি ভুবন সমুহেই ধৰ্ম্ম-কৰ্ম্মাদির ফলভােগ ধৰ্ম্ম-কৰ্ম্মদির ফলভােগ হয়; কিন্তু ব্ৰহ্মলোক কিন্তু ব্ৰহ্মলােক হইতে কোন ভুবনই সুখদুঃখের সংমিশ্রণাবস্থা হইতে নিৰ্ম্মক্ত আছে। সুতরাং নরকব পরিত্যক্ত বােধে স্বৰ্গাদি ভােগপ্রদ ভুবনের প্রতিও যাহাদের বীতরাগ জন্মে, তাঁহারা অগ্নিহত্ৰাদি কৰ্ম্ম সমাপন পূৰ্ব্বক সন্ন্যাস গ্রহণ করিবেন। প্রথমতঃ যথাবিহিত নিয়মানুসারে শ্রদ্ধাষ্টক সমাপন পূর্বক প্রাজাপ বাগের দ্বারা ভগবানের আরাধনা করিবেন; পরে সমাহিত অন্তঃকরণে বর্ণাশ্রমাদি কৰ্ম্মকলাপ হােমাগ্নিতে সমর্পণ পূৰ্ব্বক ঋত্মিককে দক্ষিণা স্বরূপ আপনার সৰ্ব্বদান কত যাবতীয় পদার্থ হইতে সর্ব সম্বন্ধ বিচ্ছিন্ন করিয়া নিমুক্ত ন্যায় প্রব্রজ্যা বা সন্ন্যাসাবলম্বন পূৰ্ব্বক ভ্রমণ করিবেন। . বিপ্রস্য বৈ সন্ন্যসততা দেবা দারাদিরূপিণঃ। বিং কুর্ব্যয়স্তৃপ্যানাক্রম্য সমিয়াৎ পর । সন্ন্যাসাবলম্বন পূৰ্ব্বক আমাদিগকেও অভিক্রম করিয়া ব্ৰহ্মপদবীলাভ করিবে।” এইরূপ ঈর্ষা করত দেবতাগণ সেই ব্রাহ্মণের প্রভৃতিতে আবিষ্ট হইয়া তাহার সন্ন্যাস গ্রহণে আঁধাদান রিয়া থাকেন। সন্ন্যাসী ব্রাহ্মণ যদি আচরণার্থ বস্ত্র গ্রহণে নিতান্ত ইচ্ছা করেন। তাঁহ হইলে কৌপীন মাত্র আচ্ছাদিত হইতে পারে, মাত্র এইরূপ বস্ত্র গ্রহণ করিবেন ও পাত্র ব্যতীত অন্য যাহা একবার পরিত্যাগ করা হইয়াছে স্বথেষ্ট বিষয় উপস্থিত হইলেও তাহা পুনরায় গ্রহণ করিবেন মা। দৃষ্টিপূতং নসেৎ পাদং বস্ত্রপূত জলং পিবেৎ। সত্যপূতং বদোক্যাং মনঃপূতং সমাচরেৎ ॥ বিশেষ দৃষ্টি নিক্ষেপ পূৰ্ব্বক সৰ্ব্বত্র পাদবিক্ষেপ, ‘বং পূত ফরি। (ছকিয়া) জলপান করিবেন সত্যের উপর নির্ভর করিয়া কথা কহিকে * ; সম্যক বিচার পূর্বক আচরণ করিনে। , *এই ব্রাহ্মণ 7 + - 1 । f * * ।। = মৌনানীহানিয়ামা দণ্ডা দেহচেত ন হেঁতে যস্য সন্ত্যঙ্গ বেণুভি ন ভবে যতিঃ যাহারা বা মৌন, দেহদণ্ড অনীহা (কাম্যক ত্যাগ), অল্পকরণের দণ্ড,“প্রাণায়াম অভ্যাস কৃরিতে শিক্ষা করেন নাই, তাহাৱা- কেবল বেণুদণ্ড ধারণেই যতি বলিয়া পরিগণিত নহেন। যদিও যতি চারিবর্ণের গৃহেই ভিক্ষা করিতে পারেন, তথাপি ব্রাহ্মণগৃহই প্রশস্ত ; তন্মধ্যে পতিত ও নিন্দিত গৃহস্থকে পরিত্যাগ করিকেন। এবং প্রত্যহ সপ্তগৃহের অতিরিক্ত গৃহে কখনও-ভিক্ষা করিবেন না। গ্রামের বহির্ভাগস্থ জলাশয়ে গমন করিয়া অবগাহন পূৰ্ব্বক (পবিত্র হইয়া ) সংগৃহীত ভিক্ষান্ন, দেবতা ও অভ্যাগত ভূতে বিভাগ করিয়া দিবেন; পরে অভ্যুক্ষণাদি (জলসেচনাদি অর্থাৎ দেবতা-নিবেদনাদি) দ্বারা পবিত্ৰীকৃত অবশিষ্ট সেই অন্ন এমন ভাবে ভােজন করিবেন যেন কিছু অবশিষ্ট না থাকে। অর্থাৎ যতি সঞ্চয় করিবেন না। ৭। প । ৮ t একশ্চরেহীমেতাং নিঃসঙ্গঃ সংযতেন্দ্রিয়ঃ । আত্মীড় আত্মরত আত্মবান্ সমদর্শনঃ । বিবিক্ষেমশরণা **মত্তাকিমলাশয়ঃ । আত্মানাং চিন্তয়েদেকমভেদেন মুনিঃ ॥ ৫ ইন্দ্রিয়বর্গকে পরাজয় করত ভগবানে চিত্ত সমৰ্পণ : পূৰ্ব্বক সর্বত্র সমদৃষ্টিতে অনাসক্ত ভাবে একাকী ধীরের ন্যায় জগুতে বিচরণ করিবে। নির্জন ও নির্ভয়স্থানে বাস করত পরমাত্মাতে চিত্ত সমৰ্পণ করিলে বুদ্ধি ক্রমশঃ মার্জিত হয়; এবং মুর্নিতৎকালে আত্মাকে আমার স্বরূপ হইতে অভেদ ভাবে পরিচিন্তনে সমর্থ হন। বুধধ বালকবৎ ক্ৰীড়েৎ কুশলে জড়বচ্চরে। বদেদুম্মত্তবদ্বিদ্বান্ গােচৰ্যাং নৈগমশ্চরেৎ। * । , 1 স বেদারতাে ন স্যান্নপাষণ্ডী ন হৈতুক । দ ন কঞ্চিৎ পক্ষং সঁমাশয়েৎ | নােদ্বিজেতু জনাদ্ধীয়রা জনঃ “চোদ্বেজয়েতু। অতিবাদাংস্তিতিক্ষেত মাৰমতে কঞ্চন। L । এ } তৎকালে প্রকৃত জ্ঞানী হইলেও মানাপমানে তুল্যজ্ঞান করত স্বভাবার বালকের ন্যায় ক্রীড়া করিবেন। কাকাৰ্য্য বিচারে বিলক্ষণ, দক্ষ হইলেও ফলপ্রাপ্তির প্রতি কিছুমাত্র দৃষ্টি না করিয়া জড়ের ন্যায় বিচরণ করিবেন। বিদ্বান্ হইলেও উদ্দেশ্যের অভাবে উৰ্ম্মত্তের ন্যায় আলাপ করিবেন। এবং বেদার্থে বিলক্ষণ পটু হইলেও বৈধাচারের বহিভূত হইয়া স্বেচ্ছাচারীর দ্যায় আচরণ করিয়া থাকেন। তখন তিনি বেদোক্ত কৰ্ম্ম কাণ্ডের উপদেশার্থে আর উদ্যোগী হন না। অথচ শ্রুতি ও মৃত্যুক্ত আঁচারের বিরুদ্ধেও কখন কোন কাৰ্য্য বা কেবল তার্কিক হইয়া নিরর্থক বিবাদে কোন পক্ষকে আশ্রয় করেন না। তিনি লােকের আচরণে আপনাকে কখন উদ্বেজিত (উত্ত্যক্ত) মনে করেন না; কিম্বা নিজেও কোন ব্যক্তিকে কোন প্রকারে ক্লেশদান করেন না। অতি সহিষ্ণুতা সহকারে পরকৃত নিন্দাবাদ অনায়াসে সই করেন, এবং অন্যকে কখনও অবমানিত করেন না। দেইমুদ্দিশ্য পশুবদ্বৈৱং কুৰ্য্যায়, কেনচিৎ। একব পৰােহাত্মা ভূতেদাত্মবস্থিত । যয়েশপাত্রেয় ভূতাকোত্মকানি চ। স্বীয়, দেহের উপর অভিমান' করত প “দ্যায় কখন ষ্ঠের উপর চার করেন না। কারণ তিনি বিশেষ রূপে অবগত আছেন যে, এক আত্মাই ‘দেব মনুষ্যাদি সমস্ত দেহের অন্তরে এবং তাহার নিজের দেহেও অন্তর্যামীরূপে অৱস্থান করিতেছেন। এক চন্দ্র যেমুন বিভিন্ন জলপাত্রে বহু প্রতিবিহুরূপে পরিদৃষ্ট হল তপ দেহলে জীবকে বিভিন্নতার পরিচয় । 47 ১৬ শ্রীকৃষ্ণ। ম পরিস্ফুট হইলেও পরমার্থতঃ জীবাধিষ্ঠিত চৈত, এক ও অদ্বিতীয়। আবার অনুসন্ধান করিলে দেখা যায় যে, পাঞ্চভৌতিক দেহের রচনার উপাদান কারণ সকল দেহেই এক; ইহাদের ঔপাদানিক কোন বিভিন্নতাই নাই। অলব্ধ ন বিষীদেত কালে কালেহশং কচ্চিৎ। লব্ধ। ন হৃষ্যেতিমানুভয়ং দৈবতন্ত্রিতং । যতি কোন সময়ে কোন উপযুক্তরূপ ফলের অভাবে বিষন্ন এবং ফললাভ হইলেও আনন্দিত হন না। কারণ উক্ত ধীমান্ ব্যক্তি বিশেষরূপ অবগত আছেন যে, প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তি উভয়ই পূর্ব সঞ্চিত কর্মের অধীন। আপাততঃ যত্নে তাহার অন্যথা হওয়া প্রায়ই অসম্ভব। তথাপি নিশ্চেষ্টভাবে কালাতিপাত করা কখনই কর্তব্য নহে।' অন্ততঃ জীবিকামাত্র নির্বাহাৰ্থ যত্ন করা বিশেষ প্রয়ােজন। তাহাতে উদাসীন হওয়া কোন প্রকারে কর্তব্য নহে। কারণ ভােজন দ্বারা জীব প্রাণ ধারণ করিয়া থাকে। জীৱিত থাকিলেই মানুষ আত্মতত্ত্বের বিচার করিতে পারে এবং সেই বিচার বলেই সে আত্মতত্ত্বাবধারণ পূর্বক মুক্তিপদবী লাভ করে। অন্বীক্ষেত্মনাে বন্ধং মােঞ্চ আননিষ্টয়া। বন্ধ ইন্দ্রিয়বিক্ষোে মােক্ষ এষাঞ্চ সংযমঃ ॥ তস্মান্নিযম ষড়বর্গং অদ্ভাবেন চরেনি। বিরক্তঃ ক্ষুদ্রকামেভ্যো লক্বাত্মনি সুখং মহৎ। ইন্দ্রিয়ের বিক্ষেপই বন্ধন এবং তাহাদেয় সংযমই মােক্ষ।” এইরূপ জ্ঞাননিষ্ঠা যারা আপনার বন্ধন ও মুক্তির বিষয় বিলক্ষণ সতর্কতার সহিত বিচার করিবেন। মম ও জ্ঞানেন্দ্রিয়পঞ্চ (চক্ষু কর্ণাদি) এই ষড়বর্গন্ধে মিরােধ করত ভগবদ্ভাবেই বিচরণ করা মুনির বিশেষ কৰ্ত্তব্য। কারণ, তাহা হইলে তুচ্ছ বিষয় ভােগাকাঙ্ক্ষা সত্বরই দুরীভূত হইবে। অকাঙ্ক্ষা বর্জিত হইলেই যুক্তি অনায়াসেই মােক্ষ লাভ করেন। পুরগ্রামব্ৰজা সার্থান্ ভিক্ষার্থং প্রবিশংশ্চরেৎ। পুণ্যদেশসরিম্বৈনাশ্রমবতীং মহীং৷ * **

পরিশিষ্ট।
বানপ্রস্থাশ্রমপদেষভীক্ষং ভৈক্ষমাচরেৎ।
সংসিদ্ধ্যত্যাসম্মােহঃ শুদ্ধসত্ত্বঃ শিলান্ধ ॥
নৈতদ্বস্তুতয়া পশেদৃশ্যমানং বিনতি।
আসক্তচিত্তে বিরমেদিহামুত্র চিকীষিতা।
পবিত্র দেশ, সরােবর, গিরি ও কাননাদিতে পৰ্যটন পূর্বক যতি পুর, গ্রাম ও
গােষ্ঠাদি এবং যাত্রিক জনসমাজে জীবিকাৰ্থ ভিক্ষান্ন সংগ্রহ করিবেন।
বানপ্রস্থাশ্রমে নিরন্তর ভিক্ষাবৃত্তি অবলম্বন করাই সৰ্ব্বতােভাবে শ্রেয়।
শিলবৃত্তি দ্বারা সংগৃহীত অন্নে জীবন ধারণ করিলে সত্ত্বগুণ উদিত হইয়া অতি
সত্বর চিত্তমােহ দুরীভূত করে ।
ঐহিকের ভােগ্য পুত্ৰকলত্র বা অন্নপানাদি দ্রব্যকে বস্তুরূপে (পরমার্থরূপে) দর্শন
করা অবিধেয়। কারণ তাহা ক্ষণবিধ্বংসী। অতএব ঐহিক এবং পারলৌকিক
ভােগে অনাসক্ত হইয়া তৎসমুদয় সংগ্রহের সকল উদ্যম পরিত্যাগ করা
কর্তব্য।
যদেতদাত্মনি জগন্মনােবা প্রাণসংহিতং।
সর্বং মায়েতি তর্কেণ স্বস্ত্যক্ত। ন তৎ স্মরেৎ ॥
এই মমতাস্পদ জগৎ এবং অহঙ্কারাস্পদ মন, ইন্দ্রিয় ও প্রাণের সমষ্টি
এই কলেবর, এবং এই উভয় হইতে উৎপন্ন সুখ দুঃখাদি সমস্ত বস্তু কেবল মাত্র
মায়া দ্বারাই জীবচৈতন্যে কল্পিত হইয়াছে; এইরূপ বিচার দ্বারা চিত্তকে
আত্মনিষ্ঠ করত বিষয়াদির আসক্তি বিসর্জন পূৰ্ব্বক হৃদয় হইতে তাহাদের
ভাবকেও বিস্মৃত হইতে হইবে।
আননিষ্ঠো বিরক্তো বা মস্তক্তো বানক্ষেপকঃ।
সলিঙ্গানাশ্রমাংস্ত্যক্ত। চরেদবিধিগােচরঃ ।
ঐহিক ও পারলৌকিক ভােগে সম্পূর্ণ বীতরাগ বা উদাসীন, এমন কি
মােক্ষে পৰ্য্যন্ত আকাঙ্ক্ষা পরিত্যাগ পূর্বক যতি যখন জ্ঞাননিষ্ঠ বা ভগবানের
প্রকৃত ভক্ত হন, তখন আর তাদৃশ ভক্তকে শাস্ত্রোক্ত বিধি বা নিয়েতাে
[১৩]
}

শ্রীকৃষ্ণ। মুখােদ্দেশ্য। অধীন থাকিতে হয় না। তখন তিনি ত্রিদণ্ডাদি সহ আমােচিত যাবতীয় ধৰ্ম্মের অনুষ্ঠানে উদাসীন হইয়া যথেচ্ছ বিচরণ করিতে পারেন। [ প্রারন্ধের উপর নির্ভর করিয়া যতির প্রাণ ধারণের উপায়ে উদাসীন থাকা কোন মতে কর্তব্য নহে। অন্যান্য ভােগাদির বিষয়ে উদাসীন থাকিয়া কেবলমাত্র জীবিকার জন্য যত্নবান্ হইবেন। কারণ জীবনধারণ করাই ধৰ্মার্থকামমােক্ষ চতুৰ্ব্বর্গ সাধনের একমাত্র হেতু। ক্ষণবিধ্বংসী কৃমিকীটের ন্যায় কেবল জন্মমৃত্যুর অধীন হওয়াই মানব-জীবনের সার্থকতা নহে। ধর্মাচরণ পূর্বক ভক্তি লাভ করিয়া ভগবল্লাভই মানবজীবন ধারণের এই জন্যই প্রাণ রক্ষায় যত্নবান্ হওয়া কর্তব্য। এক জন্মেই যাহাতে জন্মমরণের হেতু রহিত হয়, তদুদ্দেশ্যে অবহিত হওয়াই মানবজীবনের সার্থকতা। এইজন্য পুরুষকার অবলম্বন করিয়া প্রারব্ধকে অতিক্রম করিতে উপদেশ দিতেছেন। কিন্তু আহারের উৎকৃষ্টাপকৃষ্ট ভাবের প্রতি লক্ষ্য করিবার আবশ্যক নাই। প্রারব্ধ বশে উৎকৃষ্ট বা অপকৃষ্ট যেরূপ অনুই সংগৃহীত হউক না কেন, তাহাই সন্তুষ্টচিত্তে ভােজন করা কর্তব্য। ( বিধর্মীয় ভােজন দ্রব্যের কথা বলা হইতেছে না ; বা যাহা আহার করিলে শরীর মনের উত্তেজনা বা সত্ত্বগুণের ব্যাঘাত জন্মে, তাহাও নহে; কেবল মাত্র যতির সত্ত্বগুণবর্ধক ভােজ্য দ্রব্যেরই উৎকৃষ্টাপকৃষ্টের কথা বলিতেছেন।) কেবল ভােজ্য দ্রব্য কেন, যখন যেরূপ বস্ত্র বা শয্যাদি লাভ হইবে, তাহাতেই মুনির সন্তুষ্ট থাকা সৰ্ব্বতােভাবে কর্তব্য। শৌচমাচমনং স্নানং ন তু চোদনয়া চরেৎ। অন্যাংশ্চ নিয়মান্ জ্ঞানী যথাহং লীলয়েশ্বরঃ । হে উদ্ধব । আমি সর্বৈশ্বৰ্য্যপূর্ণ পরমেশ্বর বলিয়া যেমন স্বেচ্ছানুসারে আচরণ করি, কোন নিয়মের অধীন হই না ; আমার প্রকৃত ভক্ত জ্ঞানীও কখন কোন নিয়মের বাধ্য নহেন। তিনি স্বেচ্ছানুসারে শৌচ আচমন, স্নান ও বর্ণাশ্রমপ্রাক্ত ধৰ্মকৰ্ম্মাদি নিয়ম সমূহের আচরণ করিয়া থাকেন। তাহাতে ভঁহার কোন প্রত্যয়ের আশঙ্কা থাকে না।

পরিশিষ্ট। ৯৯ www.mamanna, ন হি তস্য বিকল্পাখ্যা যা চ মদ্বীক্ষয়া হত। আদেহান্তা ক্বচিৎ খ্যাতিস্ততঃ সম্পদ্যতে ময়া। কারণ, উক্ত জ্ঞানী ব্যক্তির কোন ভেদ বুদ্ধি থাকে না। এবং যাহা কিছু ভেদবুদ্ধি পূৰ্বে ছিল, তাহা মদীয় সৰ্বাত্মজ্ঞানের অনুশীলন বা চৰ্চ্চায় সম্পূর্ণ বিনষ্ট হইয়াছে। এক্ষণে কেবল দেহত্যাগ পর্যন্ত দেহযাত্রাদি নিৰ্বার্থ আবশ্যক ভিক্ষা ও পর্যটনদিতে যে সামান্য ভেদবুদ্ধির পরিচয় দেখা যায়, তাহা কেবল প্রারব্ধ প্রতিবন্ধকের উচ্ছাস মাত্র। ব্যবহারত, তাদৃশ ভেদজ্ঞান তঁাহার হৃদয়ে প্রতিষ্ঠালাভে সমর্থ হয় না। দেহ পতনের অব্যবহিত পরেই তিনি যে মৎ-স্বারূপ্য লাভে মুক্ত হন, তাহাতে আর সন্দেহ নাই। পরিণামে অবশ্যম্ভাবী দুঃখপ্রদ কাম্য বিষয়ে সম্যক বীতরাগ ধীমান্ ব্যক্তি, যদি ভগবৎ প্রাপ্তির সাধন পূর্বে অবগত হইতে না পারেন, তাহা হইলে তিনি এই সময়ে শ্রোত্রীয় ও ব্রহ্মনিষ্ঠ গুরুর সমীপে গমন করিবেন। এবং কোনরূপ দোষানুসন্ধান না করিয়া যদবধি ব্ৰহ্মসাক্ষাৎকার না হয়, তদবধি শ্রদ্ধা, ভক্তি ও আদরাতিশয়ে পরমাত্মার প্রতিমূৰ্ত্তি জ্ঞানে সৰ্ব্বতােভাবে গুরুর পরিচর্যা করিবেন। যসংযতষড়গঃ প্রচণ্ডন্দ্ৰিয়সারথি। জ্ঞানবৈরাগ্যরহিতস্ত্রিদণ্ডমুপজীবতি । যে ব্যক্তির পঞ্চজ্ঞানেন্দ্রিয় ও মন বশীভূত নহে; অশ্বতুল্য ইন্দ্রিয়বর্গের পরিচালক বুদ্ধিও নিতান্ত প্রখর ও বিষয়াসক্ত এবং শাস্ত্রজ্ঞান ও বৈরাগ্যের সহিতও কোন সম্পর্ক রাখেন না, তাদৃশ যতির ত্ৰিদণ্ড ধারণ, কেবল জীবিকার্জনার্থ জনসমাজে পূজা প্রাপ্তির ছলনা মাত্র। সুরানাত্মানমাত্মস্থং নিতে মাঞ্চ ধৰ্ম্ম। অবিপকষায়ােহম্মাদমুগ্মচ্চ বিহীয়তে । যাহাদের বিষয়াসক্তিরূপ দুর্দম্য দুরিত নিবারিত হয় নাই, তাহারা অনর্থক সংসার ত্যাগ করিয়া সন্ন্যাস লইয়া যখন যজ্ঞাদির অনুষ্ঠানে দেবলােককে, ১০। শ্রীকৃষ্ণ। * ভােগসঙ্কোচে আপনাকে এবং জ্ঞানাভাবে হদিস্থ আমাকে বঞ্চনা করে, তখন আপনারাও ইহলােক ও পরলােকে বঞ্চিত হয়। ভিক্ষোধর্মঃ শমােহহিংসা তপ ঈক্ষা বনৌকস। গৃহিণণা ভূতরজ্যো দ্বিজস্যাচাৰ্য্যসেবন । ইন্দ্রিয়ের নিগ্রহরূপ শম ও অহিংসা এই দুইটী সন্ন্যাসীর ধর্ম। বানপ্রস্থ যতির পক্ষে চান্দ্রায়ণাদি তপস্যা ও তত্ত্ববিচারই উৎকৃষ্ট ধৰ্ম্ম বলিয়া অভিহিত। গৃহীর পক্ষে অন্নপানাদি দান দ্বারা ভূতগণের রক্ষা ও পঞ্চ মহাযজ্ঞের অনুষ্ঠান; এবং উপনীত ব্রহ্মচারীর প্রধান অনুষ্ঠেয় আচাৰ্য-সেবাই উৎকৃষ্ট ধৰ্ম্ম বলিয়া জানিবে। ব্রহ্মচর্য্যং তপঃ শৌচং সন্তোষাে ভূতসৌহৃদং। গৃহস্থাগৃতৌ গন্তুঃ সর্বেষাং মদুপাসনং। কিন্তু গৃহস্থের পক্ষে ব্রহ্মচর্য, তপস্যা, শৌচ, সন্তোষ, এবং ভূতগণের প্রতি সদা দয়া করিবার ব্যবস্থা কীৰ্ত্তিত আছে। তাহারা যদি উপযুক্ত ঋতুকালে ভাৰ্য্যা গমন করেন, তাহাতেও তাঁহাদের ব্রহ্মচর্য্যের কোন হানি হয় না। কিন্তু ভগবানের উপাসনা করা সকল বর্ণেরই সর্বপ্রধান ধর্ম । ইতি, মাং যঃ স্বধৰ্ম্মেণ ভজেন্নিত্যমনভা। সর্বভূতেষু মস্তাবাে মদ্ভক্তিং বিন্দতে দৃঢ়াং। যে ব্যক্তি সংসারের সকল কামনায় জলাঞ্জলি দিয়া স্বীয় বর্ণাশ্রম ধর্মের আচরণে আমাকে নিত্য ভজনা করেন, তিনি সৰ্ব্ব ভুতে মদীয়ভাব অবধারণ পূৰ্ব্বক অনুপমা ভক্তিলাভ করেন, সন্দেহ নাই। হে উদ্ধব! এই আচল ভক্তির প্রভাবে সেই ব্যক্তি সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টি ও সংহারকারী সৰ্ব্বকারণকারণ ও সৰ্ব্বলােকেশ্বর পূর্ণব্রহ্ম আমাকেই লাভ করিয়া থাকে। এই প্রকারে স্ব-ধর্মের অনুষ্ঠানে বিশুদ্ধচিত্ত গৃহস্থ ব্যক্তি আমার পরম তত্ত্ব অনায়াসেই অবগত হন। শাস্ত্রীয় জ্ঞান ও ব্রহ্মানুভূতির বলে তিনি সকল বিষয়ের আসক্তি পরিহার পূর্বক আমাকেই প্রাপ্ত হইয়া থাকেন।

পরিশিষ্ট। বর্ণাশ্রমবতাং ধৰ্ম্মষ আচারলক্ষণঃ। স এব মক্তিযুতে নিঃশ্রেয়সকরঃ পরঃ। বর্ণ ও আশ্রমবিশিষ্ট ব্যক্তিগণের পিতৃলােকাদি প্রাপ্তিরূপ ফলপ্রদ এই যে আচারলক্ষণ ধর্মের বিষয় অভিহিত হইল, যদি সেই ধৰ্ম্মাচার ভগবানের ভক্তিরসে সংমিশ্রিত হয়, তবে তাহাই আবার সকল সাধনের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করিয়া মােফল প্রদান করে। [ আস্বাদন-ব্রহ্মচারী, গৃহী, বানপ্রস্থী ও সন্ন্যাসীর করণীয় পৃথক পৃথক ধৰ্ম্মের উপদেশ প্রদত্ত হইয়াছে। গৃহস্থ ব্রাহ্মণ যে পূর্বোক্ত সকল কর্মেরই অধিকারী তাহাই প্রতিপাদিত হইয়াছে। এমন কি গৃহী হইয়া যদি তিনি ঋতুকালে মাত্র পত্নী গমন করেন, তবে তাহাতেও তাহার ব্রহ্মচর্য্য অক্ষুন্নই থাকে। কিন্তু ব্রহ্মচারী হইয়া যদি তাহার অকস্মাৎ বীর্যপাত হয়, তবে তাহাতে তাহার ব্রহ্মচর্য নষ্ট হয়। ইহাতে কেহ এমন না বুঝেন যে, গৃহস্থগণকে বিশেষতঃ—ব্রাহ্মণকে প্রশ্রয় দেওয়া হইতেছে। কারণ ব্রাহ্মণস্য তু দেহােয়ং ন কামার্থায় জায়তে। ইহক্লেশায় তপসে প্ৰেত্য চানুত্তমং সুখং। ব্রাহ্মণের দেহ কামচরিতার্থের জন্য উৎপন্ন হয় নাই। ইন্দ্রিয়নিগ্রহই ব্রাহ্মণের প্রধান কর্তব্য। ব্রহ্মচৰ্য্য বা সন্ন্যাস গ্রহণ করিলেই যে ব্রাহ্মণের কিছু বিশেষত্ব সম্পাদিত হয়, তাহা নহে; তিনি গৃহী হইয়াও সৰ্ব্বদাই সৰ্ব্ব কৰ্ম্মে সন্ন্যাসীর ন্যায় সংযত থাকিবেন। পরিণয় দ্বারা অযথা বীৰ্য ক্ষয় করিলে তিনি ব্রাহ্মণত্ব হইতে পতিত হইবেন। সকল বর্ণই গৃহস্থ হইয়াও নিষ্কামভাবে বর্ণ ও আমােচিত স্বধর্ম পালন দ্বারা একমাত্র ভগবানের আরাধনাই করিবেন। যদি গৃহী হইয়া প্রকৃত ধৰ্ম্মানুশীলনে সৰ্ব্বভূতে ভগবদ্ভাব অবলােকন করিতে সমর্থ হন, তবে তাহা অপেক্ষা মঙ্গলকর আর কিছুই নাই। বর্ণাশ্রম ও ধর্ম সমূহ সেই পরমাত্মা ভগবানের আরাধনার নিমিত্ত মাত্র। যে কোন উপায়ে উক্ত কার্যের সুগম পথ লাভ হয়, তাহাই অনুষ্ঠেয় । ভগবদ্ভক্তি বা ব্ৰহ্ম-সাক্ষাৎকার লাভ হইল না, অথচ নানা আশ্ৰম পৰ্যটন ও ঐকৃষ্ণ। বিবিধ কর্মের অনুষ্ঠান করা হইল, তাহা কেবল পণ্ডশ্রম মাত্র। দেবাৰ্চনা বা পিতৃলোকদির তুষ্টিসাধনাদি যে কোন কর্তব্যকর্মের অনুষ্ঠান করা হয়, দেবাদি সৰ্ব্বভূতে সেই পরমকল্যাণময় এক পরমেশই অন্তর্যামীরূপে সর্বত্র বিদ্যমান আছেন; এবং যাহারই অর্চনা করা যায়, তাহা একই পরমেশ্বরের অর্চনা ; এই ভাবটী সম্যক অবধারণ পূৰ্ব্বক যাহারা স্বধৰ্ম্মে অগ্রসর হন, তাহারাই যথার্থ চতুর; এবং তদ্রুপ জ্ঞানবিজ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তিগণ যে অন্তে মােক্ষলাভ করেন, তাহাতে আর সন্দেহ নাই। বর্ণাশ্রম-বিহিত যে সমুদয় আচারলক্ষণাদি ধর্মের বিষয় বর্ণিত হইয়াছে, তাহা যদি ভক্তিভাবে সম্পন্ন হয়, তবে তাহাতে মােক্ষলাভ ঘটে ; নতুবা ভক্তি বিহীন তৎকর্মে নির্দিষ্ট পিতৃলােকাদি ফল প্রাপ্তিই হইয়া থাকে। সুতরাং ফল সমাগমে সংসার-বন্ধন কখনও বিচ্ছিন্ন হয় না।] যে বিদ্যাশ্রুতসম্পন্ন আত্মবান্নানুমানিক। মায়ামাত্ৰমিদং জ্ঞাৱা জ্ঞানঞ্চ ময়ি সংসসেৎ । জ্ঞানিনস্তুহমেবেষ্ট স্বার্থে হেতুশ্চ সম্মত। স্বর্গ শ্চৈবাপবর্গশ্চ নান্যাথো মদৃতে প্রিয়। শ্রীকৃষ্ণ বলিলেন হে উদ্ধব যে ব্যক্তি প্রকৃত বেদান্তবিদ্যার অনুশীলন দ্বারা অপরােক্ষভাবে 'পরমার্থতত্ত্বের অবধারণ করিয়াছেন; এবং আমি ও আমার” এইরূপে প্রতীয়মান দেহ ও বিশ্ব সংসারকে কেবল মায়ার অধ্যাসে অবভাসিত ( প্রকৃত বস্তুকে অন্য বস্তুরূপে প্রতীয়মান অর্থাৎ মায়ার বিকার ) বলিয়া সিদ্ধান্ত করিতে পারেন এবং তৎসম্বন্ধীয় জ্ঞান স্বরূপ স্বীয় আত্মভাবকেও পরমাত্মভাবে সন্নিবেশ করিতে পারেন, তাদৃশ দিব্যদর্শী জ্ঞানী ব্যক্তির আমিই একমাত্র অভিলষিত বিষয়,-কার্যের ফল ও ফলের সাধনরূপে নির্ণীত হই। আমাকে পরিত্যাগ করিয়া তাহারা অন্য কোন বিষয়েরই প্রার্থনা করেন । এমন কি পরমাত্ম প্রাপ্তির অভাবে স্বর্গ বা অপবর্গকেও (মুক্তি) তাহারা কোনরূপ আদর করেন না। অর্থাৎ তক্ত স্বর্গ বা মুক্তিকে তুচ্ছ জ্ঞান করিয়া ভগবৎ প্রাপ্তি বা তাহার সেবাতেই আত্ম বিসৰ্জন করত ধন্য হইতে চাহেন।

পরিশিষ্ট
জ্ঞানবিজ্ঞানসম্নদ্ধাঃ পদং শ্রেষ্ঠং বিদুৰ্মম।
জ্ঞানী প্রিয়তমােহতে মে জ্ঞানেনাসৌ বিভৰ্ত্তি মাং ।
তপস্তীর্থং জপ দানং পবিত্ৰাণীতরাণি চ।
নালং কুন্তি তাং শুদ্ধিং যা জ্ঞানকলয়া কৃত ।
জ্ঞানবিজ্ঞানসম্পন্ন বিশুদ্ধহৃদয় তাদৃশ ব্যক্তি মদীয় পরমপদই লাভ করিয়া
থাকেন। জ্ঞানী জ্ঞানানুশীলনেই যখন আমাকে হৃদয়ে ধারণ করেন, তখন
কঁহা অপেক্ষা প্রিয়তম আমার নিকট আর কেহই নাই।
লেশমাত্র জ্ঞানের দ্বারা যেরূপ শুদ্ধি লাভ হয়, তাদৃশ শুদ্ধি কখন
তপস্যা, তীর্থদর্শন, মন্ত্রজপ, দান, পবিত্রকারী স্নানাদি বা অন্য কোন উপায়ে
পাওয়া যায় না।
তস্মাজ জ্ঞানেন সহিতং জ্ঞাত্বা স্বাত্মানমুদ্ধব।
জ্ঞানবিজ্ঞানসম্পন্ন ভজ মাং ভক্তিভাবিতঃ ।
অতএব হে উদ্ধব! তুমি জ্ঞানানুশীলনে প্রথমতঃ আত্মস্বরূপের অবধারণ
কর। পরােক্ষজ্ঞান ও অপরোক্ষানুভূতিতে চিত্ত সম্পূর্ণ হইলে ভক্তিপূর্ণ হৃদয়ে
আমারই ভজনা কর।
কারণ, জ্ঞান ও বিজ্ঞানরূপ মহাষজ্ঞের অনুষ্ঠানে মননশীল মুনিগণ স্ব স্ব
হৃদয় কন্দরে পরমাত্মস্বরূপ সৰ্ব্বজ্ঞপতি একমাত্র আমাকে চিন্তা করিয়াই পরম
সিদ্ধি মুক্তি লাভ করিয়া থাকেন।
অবিদ্যা নিবারণেদ্দেশেই নিষ্কাম কৰ্ম্ম, জ্ঞানযােগ ও বৈরাগ্যাদি জীবের
অবশ্য কর্তব্য কৰ্ম্ম বলিয়া বেদাদিতে বিহিত হইয়াছে। উক্ত সাধন সমূহ
দ্বারা অবিদ্যা দূরীভূত হইলে অার কোন সাধনের আবশ্যকতা থাকে না।
যেমন ভূতাদি দ্বারা আবিষ্টচিত্ত ব্যক্তি যতক্ষণ ভূতাদি রূপে আত্মপরিচয়
প্রদান করে, ততক্ষণ, তাহাকে প্রকৃতিস্থ করিবার জন্য মন্ত্র ও ঔষধদির
প্রয়ােজন হয়।
মন্ত্রাদি প্রয়ােগে তাহার সে ভাব অন্তর্হিত হইলে আর
কোন ঔষধেরই প্রয়ােজন থাকে না। তদ্রুপ দেহাদি প্রপঞ্চের অধ্যাসে
( মায়াজনিত ভ্রম বা মােহে এক বস্তুতে অন্য বস্তুর
অন্য বস্তুর আরােপে) বিশুদ্ধ

১০ শ্রীকৃষ্ণ। জ্ঞানমূৰ্ত্তি জীবরূপ যদবধি আমি দেহ, আমি গৃহস্থ, আমি অমুকীর স্বামী ইত্যাদি ভ্ৰমবুদ্ধিতে আবিষ্টের ন্যায় ভ্রান্ত থাকে, ততদধি তাহার সম্বন্ধে তর্ক নিবৰ্ত্তক ঔষধ তুল্য সাংখ্য, যােগ ও তপশ্যাদির প্রয়ােজন। যতক্ষণ তত্ব- জ্ঞানের উদয় না হয় ততক্ষণ জ্ঞানানুশীলন, যােগ তপস্যার প্রয়ােজন। জ্ঞানােন্মেষের নামই তপস্যা। মােহের বশে জীব পদার্থ বা বিষয়ে আসক্ত হয় । কারণ, অজ্ঞান জীবকে বিষয়ে এবং জ্ঞান ব্ৰহ্মে আসক্ত করে। ব্রহ্মের প্রতি আসক্তিই জীবের স্বভাবজ ধৰ্ম্ম। জ্ঞানের অভাবে অজ্ঞানের মােহে সে প্রকৃত বস্তুর সন্ধান না পাইয়া নশ্বর প্রাকৃত বিষয়ে আসক্ত হইয়া পড়ে। জ্ঞান দ্বারা মায়া অপমৃত হইলে আর সাধনের আবশ্যকতা থাকে না। কিন্তু জ্ঞানাদি সাধনের ন্যায় ভক্তি কখনও ত্যাজ্য নহে। কারণ জ্ঞান বলিলে এমন একটী বিষয় থাকে, যাহাকে অবলম্বন করিয়া জ্ঞাতার জ্ঞানবৃত্তি ঘটে। কিন্তু বিদ্বান্ সন্ন্যাসী মায়াময় জগৎ পরিহার পূর্বক অপরােহ্মানুভূতির জন্য স্বকীয় চৈতন্যস্বরূপ জ্ঞপ্তিভাবকে মাত্র অবলম্বন করেন। তখনও তাঁহার সে জ্ঞপ্তিভাব পরিচ্ছিন্ন বা সীমাবদ্ধ ; যেহেতু পরিচ্ছিন্ন পদার্থ অবলম্বনে তাঁহার যে জ্ঞান, সেই জ্ঞানকেই অবলম্বন করিয়া তাহার আত্মানুভূতি। এই সসীম পরিচ্ছিন্ন জ্ঞপ্তিভাবকে অসীমে মিশাইয়া দেওয়ার নামই ভক্তি। কারণ জ্ঞান বিচার দ্বারা পরমচৈতন্যের সীমা নির্ধারণ অসম্ভব জানিয়া বিদ্বান জীব পরমানন্দ স্বরূপ তাহাতেই আত্মবিসৰ্জন করিয়া বিচারবুদ্ধি পরিহার পূর্বক পরমানন্দ সাগরে ডুবিয়া যান। ইহাই জীবের জীবের একমাত্র একমাত্র কাম্য—ইহাই জীবের জীবনধারণােদ্দেশ্যের চরম পরিণতি। জ্ঞান বিচারের অধিকার মায়া পরিহারের সীমা পর্যন্ত ; তাহার উর্দ্ধে সে আর উঠিতে পারে না। পরমহংসদেব বলিয়াছেন ‘বিশুদ্ধ সত্ত্বও তথায় যাইতে পারে না। সে কেবল তাহার সীমায় দাঁড়াইয়া অঙ্গুলি নির্দেশ করিয়া পথ দেখাইয়া দেয় মাত্র। সচ্চিদানন্দ সাগরে ডুবিতে হইলে এ স্থান হইতেই জীবকে ‘তুমি যা কর” বলিয়া ঝম্প প্রদান করিতে হয়! ইহার নামই ভক্তি। এখানে বিচার বুদ্ধি ত নাই ই। আমিও নাই! যতক্ষণ আমি, ততক্ষণ বিচার। আমি যদি কোন কিছুতে আমাকে হারাইয়া ফেলি, তখন আর আমার বিচার থাকে ; তখন “তুমি যা কর” এই ভাবের সহিত বাসনাও সচ্চিদানন্দ সাগরে শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ পরিশি মূল। পায় ! বাসনা বিলুপ্ত হইলেই জীব শিব হয়। বাসনাই অনন্ত দুঃখের গােপীগণ সচ্চিদানন্দময় কৃষ্ণসাগরে ডুবিয়া সমুদয় বাসনা হারাইয়া ফেলিয়া কৃষ্ণময়ী হইয়াছিলেন বলিয়াই তাহাদের বিচার বুদ্ধির আবশ্যক হয় নাই। যেমন লাউ কুমড়ার আগে ফল হয়, পরে ফুল হয়, তদ্রপ গােপীদের বিচার বুদ্ধি না থাকিলেও কৃষ্ণময়ী হওয়ায় পদার্থের গুণে তাহাদের বিচারে পরিহৰ্তব্য বিষয় সমূহ আপনাপনিই ক্রমে ক্রমে অন্তর্হিত হইয়াছিল। এজন্য প্রথমতঃ বিচার বুদ্ধি হারাইয়া যাহারা “তুমি যা কর” বলিয়া ভক্তিসাগরে ঝাপাইয়া পড়েন, পদার্থের গুণে ক্রমে ক্রমে তাঁহাদের, বিচার না করিয়াও বিচার-বুদ্ধি-লব্ধ সমুদয় গুণই লাভ হয়। হে উদ্ধব ! দেহ, ইন্দ্রিয় ও অন্তঃকরণরূপ প্রকৃতির কাৰ্যভূত যে ত্রিবিধ বিকার তােমাতে আশ্রিত বলিয়া প্রতীত হইতেছে, ঐ সমস্তই মায়াময়। কারণ অবিদ্যা প্রভাবে স্বরূপ আবৃত হইয়া এই সকল বিকার কেবল মধ্যাবস্থায় প্রকাশিত হয় মাত্র। কারণ সৃষ্টির পূর্বে ও মােক্ষের পর ঐ সমস্ত কিছুই থাকে । অতএব যখন এই দেহাদির অবভাস পূর্বোক্ত বৈকারিক ভাব সমূহ তােমার স্বরূপের আশ্রয়ে প্রতীত হয়, তখন তাহাদের অধিষ্ঠানভূত ত্বদীয় স্বরূপের বৈলক্ষণ্য তাহাতে কি প্রকারে ঘটিতে পারে? যেমন রঞ্জুতে সর্পভ্রম হইলে তাহার আদি ও অন্তে রক্ষ্মই বৰ্তমান থাকে; কেৰল মধ্যাবস্থাতেই রজ্জুতে সর্পভ্রম হয়। ভ্রম অপনােদিত হইলে দেখা যায় তাহা সর্প নহে, রঞ্জু ! রঙ্কু আদিতে ছিল এবং ভ্ৰমাপনোদনের সেই রজ্জই থাকে, মধ্যে কেবল তাহাতে সর্পভ্রম হইয়াছিল। সর্পভ্রম জনিত বিকার যেমন সর্পভ্ৰমাধিষ্ঠিত রঞ্জুকে কিছুমাত্র বিকৃত করে না, তােপ দেহনিষ্ঠ বিকার (অর্থাৎ এই দেহই আমি বা জীবচৈতন্য বা জীবাত্ম এইরূপ ভাব ) জীবচৈতন্যে আরােপিত হইলেও তাহার কখন কোন ভাবান্তর উৎপাদিত হয় না অর্থাৎ তাহা যাহা ছিল তাহাই থাকে। কেবল মধ্যে দেহধারণজনিত বৰ্জ্জুতে সর্পভ্রমবৎ-বিকারমাত্র উপলব্ধি হয়। উদ্ধব বলিলেন, হে বিশ্বমুর্তে বিশ্বেশ্বর ! বৈরাগ্য বিজ্ঞানযুক্ত অনাদি বেদ- প্রতিপাদ্য পরম পবিত্র জ্ঞান যেরূপে বিস্তৃত হয় এবং ব্রহ্মাদি শ্রেষ্ঠ মতিমাগণের প্রার্থনীয় ভবদীয় ভক্তিযােগ যেরূপে প্রাপ্ত হওয়া যায়, অনুগ্রহ পূর্বক তাহাই কীৰ্ত্তন করুন। [ ১৪ } .

হে সর্বেশ্বর ! আধ্যাত্মিকাদি তাপত্ৰয়ে জর্জরিত হইয়া নিতান্ত হীনের ন্যায় এই ভীষণ সংসার পথে পতিত রহিয়াছি! পরমানন্দস্বরূপ অমৃতবর্ষী ভবদীয় চরণারবিন্দ ব্যতীত আমার ন্যায় জীবের পক্ষে শান্তিপ্রদ আশ্রয় আর নয়নগােচর হয় না। হে মহানুভাব! অতি তুচ্ছ এবং অকিঞ্চিৎকর বিষয় সম্ভোগের তীব্র আকর্ষণে আকৃষ্ট হইয়া এই ভীষণ সংসার কূপে পতিত হইয়াছি এবং কালরূপ বিষম সর্পের দারুণ দংশনে নিতান্তই মর্মাহত হইতেছি। অনুগ্রহপূর্বক ঈদৃশ ব্যক্তিকে উদ্ধার করুন এবং মােক্ষপ্রদ কথামৃতে এই অজ্ঞানাচ্ছন্ন মূঢ় জনে অভি- যিঞ্চিত করিয়া মােহ অপনয়ন করুন। ভগবান্ শ্রীকৃষ্ণ বলিলেন হে উদ্ধব! অজাতশত্রু রাজা যুধিষ্ঠির আমাদের সকলের সমক্ষে ধাৰ্মিকাগ্রগণ্য পরম ভাগবত মহামতি ভীষ্মকে তােমার এই প্রশ্নটীই জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন। ভারত-যুদ্ধের অবসানে ধৰ্ম্মরাজ যুধিষ্ঠির বন্ধুবর্গের নিধনে নিতান্ত বিহবল হইয়া বিবিধ ধর্ম বিষয়ক মীমাংসা শ্রবণ করত পরিশেষে এই মােক্ষ ধর্মের প্রশ্নই ভীষ্ম সমীপে উত্থাপন করেন। তৎকালে দেবব্রত ভীষ্মের মুখবিনিঃসৃত জ্ঞান, বিজ্ঞান, বৈরাগ্য, শ্রদ্ধা এবং ভক্তির দ্বারা পরিবর্কিত সেই সকল মােক্ষ ধৰ্ম্মের বিষয় আমি তােমার নিকট বর্ণন করিতেছি, শ্রবণ কর। নবৈকাদশ পঞ্চত্রী ভাবভূতেষু যেন বৈ। ঈক্ষেতাথৈকমপ্যেষু তজজ্ঞানং মম নিশ্চিতং । এতদেব হি বিজ্ঞানং ন তথৈকেন যেন যৎ । স্থিত্যুৎপপ্যয়ান্ পশোবানাং ত্রিগুণাত্মনাং। আদাবন্তে চ মধ্যে চ সৃজাৎ সৃজ্যং যদম্বিয়াৎ | পুনস্তৎপ্রতিসংক্রামে যচ্ছিষ্যেত তদেব সৎ | প্রকৃতি, পুরুষ, মহত্তত্ব, অহঙ্কার ও পঞ্চ তন্মাত্র এই নববিধ, পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয়, পঞ্চ কৰ্ম্মেন্দ্রিয় ও মন এই একাদশ প্রকার পঞ্চ মহাভূত এবং সত্ব, রজঃ ও তমঃ সৰ্বসমেত এই অষ্টাবিংশতি তত্ত্ব ব্রহ্মাদি স্থাবর পর্যন্ত যাবতীয় সৃষ্ট ভুতেই পরিশিষ্ট। ১০৭ অনুষ্যত রহিয়াছে বলিয়া যে জ্ঞান দ্বারা উপলব্ধি হয়, এবং এই তত্ত্বগ্রামের ভিত্তি স্থানে এক পরমাত্ম তত্ত্বকে অচল ও অক্ষুন্নভাবে প্রতিষ্ঠিত বলিয়া যে জ্ঞান নিশ্চয় করিতে পারে, এবং এই বিশ্বসংসার সেই পরমকারণের কেবল কাৰ্যমাত্র ; এই ত্রিবিধ ভাব যে জ্ঞান দ্বারা স্পষ্ট প্রতীত হয়, আমার মতে তাহাকেই জ্ঞান নামে অভিহিত করা যায়। অনন্তর যৎকালে এক পরমকরণ হইতে উৎপন্ন অনন্তভাবে পরিচিত এই বস্তুনিচয়ের বহুভাবের প্রতি লক্ষ্য পরিহার পূর্বক যে প্রধান কারণের অনুগতিতে ( অনুসরণে ) বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড প্রতীত হইতেছে, কেবল সেই ব্ৰহ্মমাত্রকে অপরােক্ষ- ভাবে যে জ্ঞানের দ্বারা অনুভূত হয় তাহাই বিজ্ঞানপদবাচ্য। ত্রিগুণাত্মক ভাবমাত্রেরই উৎপত্তি পালন ও ধ্বংস যিনি নিরন্তর লক্ষ্য করিতেছেন, সৃষ্টির পূর্বে আত্ম-স্বরূপে, প্রলয়ে আধার ভাবে এবং সৃষ্টির মধ্যা- বস্থায় অাশ্রয়রূপে এক সৃষ্ট পদার্থ অপর এক সৃষ্ট পদার্থেও যিনি উপাদানভাবে অনুষ্যত থাকেন, এবং সকল ভাবের সম্পূর্ণ অভাবাবস্থায় সর্বান্তকালে যিনি একাকী অবস্থান করেন, তিনিই পরমার্থভূত নিত্য বস্তু! তাহাকে পরিদর্শন করাই সৰ্ব্বতভাবে বিধেয়। শ্রুতিঃ প্রত্যক্ষমৈতিহমনুমানং চতুষ্টয়ং। প্রমাণেম্বনবস্থানাদিকল্পাৎ স বিরজ্যতে। কৰ্ম্মণাং পরিণামিত্বদাবির্যিাদমঙ্গলং। বিপশ্চিন্নশ্বরং পদেদৃষ্টমপি দৃষ্টবৎ। বেদবাক্য, প্রত্যক্ষ জনশ্রুতি, ও অনুমান এই প্রমাণ চতুষ্টয়ের দ্বারা স্থায়ীত্বের অপলােপে যাহা অকিঞ্চিৎকর এবং নশ্বর বলিয়া স্পষ্টতঃ উপলব্ধি হয়, তাদৃশ নাম মাত্রে প্রতীত প্রপঞ্চ বস্তুজাত হইতে বিবেকীর বিরত হওয়াই সৰ্ব্বতােভাবে কৰ্ত্তব্য। সুখপ্রদ কাৰ্যমাত্রেরই পরিণাম আছে; সুতরাং ব্রহ্মলােক পৰ্য্যন্ত যাবতীয় পারলৌকিক সুখও যে, ঐহিক সুখের ন্যায় দুঃখ জড়িত ও বিঘ্নপ্রদ তাহাতে আর সন্দেহ নাই, এইরূপ বিবেচনা করিয়া বিবেকগণ যেন পারলৌকিক সুখের প্রতিও অনাসক্তি প্রদর্শন করেন। হে পবিত্ৰহৃদয় উদ্ধব ! যদিও ভক্তিযােগের বিষয় তােমার নিকট পূৰ্বেই ১০৮ শ্রীকৃষ্ণ। চ বর্ণন করিয়াছি, তথাপি তাহাতে যখন তােমার সম্পূর্ণ তৃপ্তিলাভ হয় নাই, তখন আমি অত্যন্ত আনন্দিত হইয়া ভগবদ্ভক্তির শ্রেষ্ঠ কারণ সমূহ পুনরায় বর্ণন করিতেছি শ্রবণ কর। শ্রদ্ধামৃত কথায়াং মে শশ্বম্মদমুকীৰ্ত্তনং। পরনিষ্ঠা চ পূজায়াং তিভিঃ স্তনং মম ॥ অদিরঃ পরিচৰ্যায়াং সর্বাঙ্গৈরভিবন্দনং। মক্তপূজাভ্যধিকা সর্বভূতেষু মন্মতিঃ | ভগবানের অমৃতােপম লীলাকথা শ্রবণর্থ বিশেষ শ্রদ্ধা, সৰ্ব্বদা পরস্পরের নিকট উক্ত লীলা কথার অনুকীৰ্ত্তন, ষােড়শােপচারে ভগবানের পূজা করিবার যত্ন ও স্তব করা, বিষ্ণুমন্দির পরিমার্জনাদি জন্য বিশেষ আদর ও বিষ্ণু প্রতিমার সন্নিধানে প্রণাম করাই ভক্তজনের শ্রেষ্ঠ উপায়। কিন্তু সৰ্ব্বভূতের অন্তরে মদীয় ভাবের ঘূৰ্ত্তি অনুভব করিতে পারিলে সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ ফললাভ হইয়া থাকে, সন্দেহ নাই। কারণ, ইহা মঙক্ত হওয়া বা মদী ভক্তের সম্মান করা, এমনকি আমার পূজা অপেক্ষাও অধিক ফলপ্রদ, সন্দেহ নাই। মদর্থেঙ্গচেষ্টা চ বচসা মদগুণেরণং। ময্যর্পণঞ্চ মনসঃ সর্বকামবিবর্জনং। মদর্থেহৰ্থপরিত্যাগগা ভােগস্য চ সুখস্য চ। ইষ্টং দত্তং তং জপ্তং মদৰ্থং যদ্বতং তপঃ ॥ আমার আরাধনা উপলক্ষে তৎসম্বন্ধীয় দ্রব্যাদি সঞ্চয়ার্থ দেহকে সংযত ও নিয়মিত রাখিতে হইবে। এবং নিরন্তর ভগবদগুণানুকীৰ্ত্তনে বাগিন্দ্রিয়ের চরিতার্থতাসাধন করিবে। মনােমধ্যে যখন যে কোন কামনার উদয় হইবে, ভগবৎপ্রাপ্তির বিনিময়ে তাহাতেই তাহা সমৰ্পণ করিবে। আমার আরাধনা উপলক্ষে উপযুক্তরূপ অর্থব্যয় করা, পাছে আমার ভজনে ব্যাঘাত জন্মে, তজ্জন্য ভােগসুখ বিসর্জন দেওয়া, বৈধ যজ্ঞাদি কৰ্ম্ম, দান, হােম, ব্ৰত, জপ ও তপস্যাদি যে কোন আয়াসসাধ্য কাৰ্য করা হয়, সে সমস্তই আমার উদ্দেশে সমর্পণ করিলে ভক্তি জন্মে। 1 পরিশিষ্ট। এবং ধর্মৈমনুষ্যানামুদ্ধবাত্মনিবেদিনাং। ময়ি সংজায়তে ভক্তিঃ কোহদ্যোর্থেহস্যাবশিষ্যতে ॥ যদাত্মত্মর্পিতং চিত্তং শান্তং সত্ত্বোপবৃংহিতং। ধৰ্ম্মং জ্ঞানং সবৈরাগ্যমৈশ্বৰ্য্যঞ্চাভিপছতে । হে উদ্ধব। এই সকল কৰ্ম্ম করিবার সঙ্গে দেহ, গেহ, পুত্র, কলত্র, ধন ও বিত্তাদিতে মমতা ও অভিমান পরিত্যাগ পূৰ্ব্বক সমস্ত আমাতে সমর্পণ করিলে মদীয় ভাগবতী ভক্তি লাভ হয়। সুতরাং তাদৃশ ভক্তের সাধন ফলের আর কি বাকি থাকে ? সত্ত্বগুণ সুসংযুত ও বৈষয়িক সৰ্ব্বপ্রকার চিন্তাবেগশূন্য প্রশান্ত চিত্ত যখন পরমাত্মস্বরূপ আমাতে সমর্পিত হয়, তখনই সাধক ধৰ্ম্ম, জ্ঞান, বৈরাগ্য ও ঐশ্বর্য লাভ করিয়া থাকেন। যদর্পিতং তদ্বিকল্প ইন্দ্রিয়ৈঃ পরিধাবতি। রজস্বলঞ্চাসন্নিষ্ঠং চিত্তং বিদ্ধি বিপৰ্যয়ং। সেই চিত্ত আবার রজোগুণে পরিবর্ধিত হইয়া যখন ইন্দ্রিয়ের পরিচালনায় দেহ গেহাদি কাল্পনিক বিষয়ের প্রতি ধাবিত এবং অনিত্য ভােগে অভিভূত হয়, তখন তাহার অধৰ্ম্ম, অজ্ঞান, অবৈরাগ্য ও অনৈশ্বৰ্য্যরূপ বিপৰ্যয় ভাব উপস্থিত হয়। ধৰ্ম্মো মক্তিকৃৎ প্রােতো জ্ঞানঞ্চৈকাত্মদর্শনং। গুণেঘসঙ্গে। বৈরাগ্যমৈশ্বৰ্য্যঞ্চাণিমাদয়ঃ । যাহাতে আমার প্রতি ভক্তি জন্মে তাহাই ধৰ্ম্ম ; ভূত সমূহে এক পরমাত্মজীবের উপলব্ধিই জ্ঞান ; গুণেতে অনাসক্তির নামই বৈরাগ্য ; এবং অণিমাদিকেই ঐশ্বৰ্য্য কহে। উদ্ধব কহিলেন হে শনিসূদন প্রভাে শ্রীকৃষ্ণ! যম কয় প্রকার ? নিয়মই বা কাহাকে বলে ? শম দম তিতিক্ষা ও ধৃতি বলিলে কি বুঝায় ? তাহা বর্ণন করুন। দান, তপস্যা, শৌর্য, সত্য এবং ঋতই বা কাহাকে বলে? ত্যাগ শব্দের প্রকৃত অর্থ কি ? কোনটীকে অভিপ্রেত ধন বলা উচিত ? যজ্ঞ কাহাকে বলে, তাহার দক্ষিণাই বা কিরূপ ?

১১০
শ্রীকৃষ্ণ।
?
হে শ্ৰীমন্ বল বলিলে কি বুঝায়? দয়া; ভগ, লাভ, পরাবিদ্যা, হ্ৰী শ্ৰী, সুখ
বা দুঃখ কাহাকে বলে ?
এ জগতে পণ্ডিত কে ? মূর্থই বা কে? পথ কাহাকে বলে ? বিপথই বা
কোনটী ? স্বর্গ ও নরক কাহাকে বলে ? জগতে বন্ধু কে? এবং আমাদের গৃহই
বা কোথায় ?
প্রকৃত ধনী কাহাকে বলা যায় ? হে সাধুজনপ্রতিপালক! আমার এই
সমুদয় প্রশ্নের এবং ইহার বিপরীত অশমাদি বিষয়ের যথার্থ উত্তর দান করিয়া
কৃতার্থ করুন।
অহিংসা সত্যমস্তেয়মসঙ্গো হ্রীরসঞ্চয়ঃ।
আস্তিক্যং ব্রহ্মচঞ্চ মৌনং স্থৈর্যক্ষমাভয়ং।
শৌচং জপস্তপাে হােমঃ শ্ৰদ্ধাতিথ্যং মদনং।
তীর্থাটনং পরার্থেহা তুষ্টিরাচাৰ্যসেবনং।
এতে যমাঃ সনিয়মা উভযােদশস্মৃতাঃ ।
পুংসামুপাসিতাস্তাত যথাকামং দুহন্তি হি।
ভগবান্ কহিলেন, অহিংসা, সত্য, অন্তেয়, অনাসক্তি, খ্রীঃ অপরিগ্রহ, আস্তিক্য
ব্রহ্মচর্য্য, মৌন, সত্যসংকল্পতা, ক্ষমা ও অভয় এই দ্বাদশীর নাম যম।
আর শৌচ, মন্ত্রজপ, তপস্যা, হােম, শ্রদ্ধা, আতিথ্য, ঈশ্বর প্রণিধান,
তীর্থসেবা, পরােপকার, সন্তোষ ও আচাৰ্য শুশ্রুষা এই দ্বাদশটী নিয়ম নামে
অভিহিত।
দ্বাদশটী করিয়া উভয়স্থলে কথিত নিয়মসহ যমের বিষয় আমি তােমার নিকট
বর্ণন করিলাম। হে প্রিয় উদ্ধব! এই কয়েকটী যদি সুষ্ঠু ভাবে অনুষ্ঠিত হয়, তাহা
হইলে সাধক যাহা অভিলাষ করিবেন, সেই সকল ফলই লাভ করিবেন।
শমাে মনিষ্ঠতা বুদ্ধের্দম ইন্দ্রিয়সংযম,
তিতিক্ষা দুঃখসংমর্ষে জিপেস্থজয়ােধূক্তি ।
দণ্ডন্যাসঃ পরং দানং কামস্ত্যগন্তপঃস্মৃতং।
স্বভাববিজয় শোৰ্যং সত্যঞ্চ সমদর্শনং।
!

পরিশিষ্ট।
১১১
বুদ্ধির ঈশ্বর-নিষ্ঠিত ভাবের নামই শম, ইন্দ্রিয় সংযমকে দম, দুঃখ সহিষ্ণুতাকে
তিতিক্ষা এবং জিহ্বা ও উপস্থ জয়ের নামই ধৃতি ।
জীবের প্রতি বিদ্রোহাচরণ ত্যাগের নামই শ্রেষ্ঠ দান; এবং কামনা পরিহার
করাই প্রকৃত তপস্যা, বাসনাই জীবের স্বভাব, সেই বাসনাময় স্বভাবকে জয়
করিবার সামর্থ্যই শোৰ্য্য এবং সমস্বরূপ পরমব্রহ্মের সম্যক সন্দর্শনই পরম সত্য।
অন্যচ্চ সুনৃতা বাণী কবিভিঃ পরিকীর্তিতা ।
কর্মসঙ্গমঃ শৌচং ত্যাগং সন্ন্যাস উচ্যতে।
ধৰ্ম্ম ইষ্টং ধনং নৃণাং যজ্ঞােহং ভগবত্তমঃ।
দক্ষিণা জ্ঞানসন্দেশঃ প্রাণায়ামঃ পরং বলং।
কবিগণ সুন্বত বাণীকেই ঋত নামে কীৰ্ত্তন করিয়াছেন। লৌকিক এবং অলৌকিক
ব্যাপারে কর্তৃত্বাভিমান পরিত্যাগের নামই শৌচ এবং ঐহিক ও পারলৌকিক
ভােগকে উপেক্ষা করার নামই ত্যাগ।
ধৰ্ম্মই মনুষ্যের প্রধান ধন। পরমেশ্বর স্বরূপ আমিই মনুষ্যের যজ্ঞ;
এবং জ্ঞানােপদেশই এই যজ্ঞের দক্ষিণ।। যাহাতে মনকে দমন করা যায়, সেই
প্রাণায়ামই পুরুষের পরম বল বলিয়া জানিও।
ভগাে ম ঐশ্বরে ভাবােলাভাে মক্তিত্তম।
বিদ্যাত্মনি ভিদাবাদে জুগুপ্সা হ্রীরকৰ্ম্ম ।
শ্রীগুণা নৈরপেক্ষাদ্যাঃ সুখং দুঃখসুখাত্যয়।
দুঃখং কামসুখাপেক্ষা পণ্ডিতে বন্ধমােক্ষবিৎ ॥
আমার ঐশ্বৰ্যাদি ছয়টীগুণই পুরুষের ভগ অর্থাৎ ভাগ্য নামে পরিকীর্তিত।
ভাগবতী ভক্তিই জীবের উত্তম লাভ। আত্ম স্বরূপে জীব সমূহের অভেদ চিনই
প্রকৃত বিদ্যা এবং নিষিদ্ধ বা কুৎসিত কৰ্ম্ম পরিহারের প্রবৃত্তিই যথার্থ স্ত্রী অর্থাৎ
লজ্জা নামে অভিহিত।
নৈরপেক্ষাদি গুণগ্রাম পুরুষের ভূষণ স্থানীয় ঐ, সুখ বা দুঃখের অনুসন্ধান না
করাই পরম সুখ ; কামসুখের অপেক্ষা করাই দুঃখ ; এবং বন্ধন ও মােক্ষের ভাব
অর্থাৎ মায়ার প্রকৃত নহত যিনি অবগত হইয়াছেন তিনিই পণ্ডিত।

১১২ শ্রীকৃষ্ণ। মুখে দেহাদ্যহদ্ধি পন্থা মন্নিগমঃ স্মৃতঃ। উৎপশ্চিত্তবিক্ষেপঃ স্বর্গঃ স্বত্ত্বগুণােদয়ঃ । নরকস্তমউন্নাহে বন্ধুগুরুরহং সখে। গৃহং শরীরং মানুষং গুণটো হাঢ্য উচ্যতে । যাহর দেহাদিতে অহংবােধ, সে-ই মূখ। যে উপায়ে ভগবৎ স্বরূপের সন্দর্শন ঘটায়,—তাহাই পথ। চিত্ত বিক্ষেপে যে প্রবৃত্তি-মােহ উপস্থিত হয় তাহাই উৎপথ। সত্ত্বগুণের উৎকর্ষই স্বর্গ নামে অভিহিত। তমােগুণের আধিক্যই জীবের নরক বলিয়া কীৰ্ত্তিত। হে সখে! মানব যখন পরমেশ্বর স্বরূপ আমাকে গুরুজ্ঞানে অবলম্বন করেন, তখন তাহার বন্ধু লাভ হয়। অপূৰ্ব্ব নরদেহই জীবের শ্রেষ্ঠ গৃহ এবং গুণবান্ ব্যক্তি জগতে ধনী বলিয়া কথিত। দরিদ্রে যসন্তুষ্টঃ কৃপণাে যােহজিতেন্দ্রিয়ঃ । গুণেধসক্তধীরীশাে গুণসঙ্গোবিপৰ্যয়ঃ । যে ব্যক্তি সর্বদা অসন্তুষ্ট সেই যথার্থ দরিদ্র। যে আপন ইন্দ্রিয়বর্গকে শাসন করিতে পারে নাই সে-ই বস্তুতঃ কৃপণ। যে সর্বদা বিষয়াসক্ত সে অস্বতন্ত্র, এবং যাহার বুদ্ধি বিষয়ে আকৃষ্ট হয় না, তিনিই স্বতন্ত্র পুরুষ। এক্ষণে দোষ গুণ লক্ষণের বহু বিস্তারের প্রয়ােজন কি ? সংক্ষেপত গুণ ও দোষের প্রতি দৃষ্টি করাই দোষ; এবং এতদুভয় পরিত্যাগ করাই গুণ, ইহাই অবধারণ কর। উদ্ধব বলিলেন হে কৃষ্ণ! গুণ দোষের যে ভেদজ্ঞান তাহা আপনার বেদ হইতেই পরিজ্ঞাত হওয়া যায় ; আপনা হইতে তাদৃশ বিচার কখনই সম্ভব নহে। কিন্তু আবার বেদেই ভেদ দৃষ্টি নাশ করিতে বলেন ; ইহাতেই আমার ভ্রম জন্মিতেছে। শ্রীকৃষ্ণ বলিলেন, হে উদ্ধব ! মানবগণের কল্যাণ জন্য জ্ঞান, কৰ্ম্ম ও ভক্তি এই ত্রিবিধ উপায়,আমি ব্ৰহ্ম, কৰ্ম্ম ও দেবতাকাণ্ডের দ্বারা স্পষ্টই প্রকাশ করিয়াছি। এই তিনটী ব্যতীত শ্ৰেয়ােলাভের অন্য কোন উপায় নাই। যাহারা অনাসক্তি বশতঃ ফল কামনা পরিত্যাগ পূৰ্ব্বক কৰ্ম্মপথ পরিত্যাগ করিতে মনস্থ করেন, তাহাদের পক্ষে জ্ঞানযােগই ফলপ্রদ ; কিন্তু যাহাদের মনে আসক্তি আছে, তাদৃশ বিলাসী ব্যক্তির পক্ষে কৰ্ম্মযােগই শ্রেয়স্কর। ?

পরিশিষ্ট
যদৃচ্ছয়া মৎকথাষ্ঠে জাতশ্রদ্ধস্তু যঃ পুমা।
ন নিৰ্বিপ্পো নাতিসক্তো ভক্তিযােগােহস্য সিদ্ধিদঃ ॥
যে সকল ব্যক্তি সুকৃতির বলে মদীয় কথামৃতে নিমগ্ন হইয়া
শ্ৰদ্ধাসহকারে তাহা শ্রবণ করে ; বিষয়ে নিতান্ত বিরক্ত নহে এবং
মিতান্ত আসক্তও নহে, তাহাদের পক্ষে ভক্তিযােগই যথার্থ
ফলপ্রদ।
তাবৎ কৰ্ম্মাণি কুৰ্ব্বীত ন নির্বিঘেত যাব।
মৎকথাশ্রবণাদৌ বা শ্রদ্ধা যাবন্ন জায়তে।
কৰ্ম্মাদিতেও চিরকাল অনুরক্ত থাকা বিধেয়, নহে। আমার লীলাকথা
শ্রবণে যে পৰ্যন্ত শ্রদ্ধা না জন্মে এবং ভােগে বিরক্তি বা অনাসক্তি না আসে, সে
পৰ্য্যন্ত কর্মকলাপে নিবিষ্ট থাকা কর্তব্য।
স্বীয় বর্ণাশ্রমবিহিত ধৰ্ম্মানুশীলনে যাহারা নিষ্কামভাবে যজ্ঞাদির দ্বারা
ভগবানের অর্চনা করে এবং কোন নিষিদ্ধ কৰ্ম্মে রত না হয়, তাহাদিগকে স্বর্গ
বা নরক এই দুইটীর কোনটীতেই গমন করিতে হয় না। অর্থাৎ তাহার
কৰ্ম্মানুযায়ী ফলভােগার্থ সংসারেই বিচরণ করে।
নিষিদ্ধ কর্ম পরিত্যাগ পূৰ্ব্বক পবিত্র ভাবে স্বধৰ্ম্মে অবস্থান করিলে সৌভাগ্যের
বিকাশে জীব এই নরদেহেই বিনা আয়াসে মদীয় বিশুদ্ধ অপরােক্ষ জ্ঞান ও তক্তি
লাভ করিয়া থাকে।
স্বর্গিণােহপ্যেতমিচ্ছন্তি লােকং মিরয়িণস্তুথা।
সাধকং জ্ঞানভক্তিভ্যামুভয়ং তদসাধকং।
নারকী জীবের ন্যায় স্বর্ণবাসিগণও সর্বদা এই নরদেহের আকাঙ্ক্ষা করিয়া
থাকেন। কারণ এই নরদেহেই জীব জ্ঞান ও ভক্তি লাভ করিয়া থাকে।
যেহেতু দেৱ-দেহ বা নরক-দেহে ইহা লাভের সম্ভাবনা নাই।
ন নরঃ স্বর্গতিং কান্নেরকীঞ্চ বিচক্ষণঃ।
নেমং লােঞ্চ কাঞ্জেত দেহাবেশাৎ প্রমাতি ।
[১৫]
৭
}
--

গ্রীকৃষ্ণ। বিচক্ষণ ব্যক্তি কখন স্বৰ্গফল বা নরকগতির আকাঙ্ক্ষা করেন না এবং ফল- প্র বলিয়া নরদেহেরও প্রার্থনা রাখেন না। কারণ তাহারা জানেন যে, দেহ লাভ হইলেই মমতা হেতু তাহাতে অভিমান জন্মে। অতএব দেহ সম্বন্ধে এই সমস্ত অনৰ্থ অবগত হইয়া এবং দেহ পরমার্থসস্তৃত ফলের প্রাপক হইলেও মরণশীল নশ্বর বলিয়া জানিয়া বিশেষ সতর্ক হওয়া উচিত; এবং যাহাতে মৃত্যুর পূর্বে দেহাদি সমর্থ থাকিতেই মােক্ষ লাভ হয়, তাহাতে বিশেষ যত্নবান্ হওয়া কর্তব্য। যেমন পক্ষিগণ যে বৃক্ষে কুলায় নির্মাণ করিয়া সুখে বাস করে যম সদৃশ নির্মম ব্যক্তি কুঠারাঘাতে তাহা ছেদন করিলে তাহারা তাহা পরিত্যাগ করিয়াই নিশ্চিন্ত হয় তপ তীব্র কাল স্রোতে পরমায়ু নিয়ত ছিন্ন ভিন্ন হইতেছে ; ইহা অবগত হইয়া কম্পিত কলেবরে যাহারা দেহ গেহাদির মমতা বিসর্জন পূৰ্ব্বক আত্ম- স্বরূপের অবধারণকল্পে সৰ্ব্বসংকল্প বিবর্জিত হন, তাহারাই প্রকৃত পরমানন্দ লাভ করেন। নৃদেহমাদ্যং সুলভং সুদুল্লভং প্রবং সুকল্পং গুরুকর্ণধারং। ময়ানুকূলেন নভস্বতৈরিতং পুমা ভবান্ধিং ন তরেৎ স আত্মহা । আহা! মানবদেহের ন্যায় ভবসাগর উত্তীর্ণ হইবার সুন্দর ও সুদৃঢ় ভেলা আর দ্বিতীয় নাই। সকল ফলের মূল স্বরূপ এই নরদেহ সুদুল্লত হইলেও যদি অকস্মাৎ পাওয়া যায়, এবং তাহা আশ্রয় করিবামাত্র গুরুদেব কর্ণধাররূপে তাহাকে সুপথে পরিচালিত করেন এবং ভগবান অনুকূল প্রভঞ্জনের ন্যায় তাহার গতিকে সুগম করিয়া রাখেন, তাহাহইলে তাদৃশ নরদেহ লাভ করিয়াও যাহারা ভবসাগর উত্তীর্ণ না হয়, তাহারাই প্রকৃত আত্মঘাতী । যদায়ম্ভেযু নিৰ্বিরে। বিরক্ত সংযতেন্দ্রিয়ঃ । অভ্যাসেত্মনাে যােগী ধারয়েদচলং মন। কৰ্ম্মারম্ভের সময় বিবিধ ক্লেশ দর্শনে যখন যােগীর চিত্ত উদ্বিগ্ন হয় এবং তাহার ফলের প্রত্তিও তাহার বিরক্তি জন্মে, তখন ইন্দ্রিয় সমূহকে সংযত করত আত্ম- চিনের অত্যাস পরমগুরু আমাতে অটলভাবে মনের ধারণা করা বিধেয়। = পরিশিষ্ট। ১১৫ ধাৰ্যমাণং মনাে যৰ্হি ভ্রাম্যদাশ্বনবস্থিতং.। অতন্বিতােহনুরােধেন মার্গেণাত্মবশং নয়েৎ ॥ এই প্রকারে আমাতে মনের ধারণা করিবার কালে, যদি কখনও চিত্তচাঞ্চল্য নিবন্ধন চিত্ত বিষয়ান্তরে প্রধাবিত হইয়া প্রতিষ্ঠাচ্যুত হয়, তাহাহইলে তৎক্ষণাৎ তাহাকে বলপূৰ্ব্বক নিরােধ করিতে সচেষ্ট না হইয়া কঞ্চিৎ ভােগাৰ্থ প্রশ্রয় দেওয়াই উচিত। এবং অতি সাবধানে তাহার অনুকূল পথে কিয়ৎ পরিমাণে তাহার আকাঙ্ক্ষা পূরণ করিয়া ক্রমশঃ সেই মনকে নিজের বশীভূত করা কর্তব্য। মনােগতিং ন বিজেজ্জিতপ্রাণাে জিতেন্দ্রিয়ঃ । সত্ত্বসম্পন্নয়া বুদ্ধা মন আত্মবশং নয়েৎ ॥ কিন্তু মনের নিরােধকার্যে যেন কখনও উপেক্ষা করা না হয়। সর্বদা প্রাণায়ামের অনুষ্ঠানে সাত্ত্বিক বুদ্ধি বলে মনকে বশীভূত করিবার জন্য যত্ন করাই বিবেকীর অবশ্য কর্তব্য। এষ বৈ পরমাে যােগাে মনসঃ সংগ্রহঃ মৃতঃ। হৃদয়জ্ঞত্বমন্বিচ্ছন্নদান্তস্যাতে মুহুঃ । একটী অদান্ত বা অশিক্ষিত অশ্বকে শিক্ষিত করাইতে হইলে যেমন অখ- চালক কখনও বলপূর্বক অশ্বের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কাৰ্য্য করে না; বরং অশ্বের ইচ্ছানুরূপ গতির সঙ্গে সঙ্গে আপনার অভিপ্রায়ানুরূপ শিক্ষা তাহাকে ক্রমশঃ শিক্ষিত করিয়া লয় ; তদ্রুপ মনােবৃত্তির অনুরূপ গতিতে পৰিচালিত হইয়াই প্রয়ােজনানুরূপ শিক্ষায় মনকে নিবৃত্ত করিতে হইবে। বলপূর্বক সম্পূর্ণ বিরুদ্ধ ভাবে তাহার নিয়মন নিতান্তই অসম্ভব ; কারণ মনের নিরােধ অত্যন্ত দুরূহ। শাস্ত্রকারগণ এই মনােনিবৃত্তিকেই পরমযােগ বলিয়া একবাক্যে স্বীকার করিয়াছেন। সাঙ্গেন সর্বভাবানাং প্ৰতিলােমনুলােমত। ভবাপ্যয়াবনুধ্যায়েন্মনাের যাবৎ প্রসীদতি। আদিজ্ঞানবান্ সাংখ্যাচার্য্যের বিচার প্রণালীকে অবলম্বন পূর্বক মহত্তাদি হইতে দেহ পৰ্য্যন্ত তত্ত্বগ্রামের অনুলােম গমনে উৎপত্তি এবং প্রতিলােম গমনে ১১৬ শ্রীকৃষ্ণ। অর্থাৎ ক্ষিতাদির কারণে বিলীন হইবার প্রথাতে জগতে নিরন্তর যে ধ্বংস পরিদৃষ্ট ও অনুমিত হইতেছে, ইহার নিরন্তর চিন্তাতেও মন সত্বর নিশ্চল হইয়া থাকে। অর্থাৎ সাংখ্যাচাৰ্য্য বলিয়াছেন- প্রকৃতে মহাংস্ততােহহঙ্কার স্তস্মাগণশ্চ ঘােড়শকঃ। তস্মাদপি ষােড়শকাৎ পঞ্চভ্যঃ পঞ্চভুতানি। এই বিশ্ব সংসার এক প্রকৃতির পরিণামে উৎপন্ন হইয়াছে, এবং প্রতিলােম পৰিণামে সেই মূল প্রকৃতিতেই বিলীন হইবে। প্রকৃতি হইতে একটী মহান্ অর্থাৎ বিচারশক্তিরূপ মহত্তত্ত্ব উৎপন্ন হয়। পরে বাষ্পের ক্রমানুসারে তুষার, মেঘ, জলবিন্দু ও শিলার উৎপত্তির ন্যায় বিচারশক্তি ক্রমশঃ বিচারাত্মক অভিমান অর্থাৎ অহঙ্কারতত্ত্বে, অহঙ্কার তত্ত্ব, মন ও একাদশ ইন্দ্রিয় পঞ্চতন্মাত্রে এবং পঞ্চতন্মাত্র পঞ্চমহাভূতে পরিণত হইয়া এই বিরাট ব্রহ্মাণ্ড ও জীবদেহ সৃষ্টি করিয়াছে। এবং ধ্বংসকালে প্রতিলােম গমনের দ্বারা ক্ষিতি জলে, জল বায়ুতে, বায়ু আকাশে, আকাশ অহঙ্কারে, অহঙ্কার মহানে এবং মহান্ প্রকৃতিতে বিলীন হইয়া এই ব্যক্ত সংসার পুনরায় অব্যক্তরূপে বিলীন হয়। এই চিন্তাতেই মন ক্রমশঃ বিষয়াশক্তি হইতে নিবৃত্ত হইয়া শান্তি লাভ করে। আস্বাদন- আমাদের যােগশাস্ত্রের প্রথমেই আছে মনকে সংহার করিবার জন্য যােগী ধনুকে শর সংযােগ পূৰ্ব্বক গুণ আকর্ষণ করিলে মন হাঃ হাঃ করিয়া উচ্চ হাস্য করিয়া উঠিল! তাহা শুনিয়া তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন ব্যাপার কি ? মন বলিল, আমাকে সংহার করিবে? আমি অমর! এ শরে আমি মরিব না, মরিবে তুমি ! তাহা শুনিয়া যােগী একান্ত মনে চিন্তা করিয়া বুঝিলেন, ঠিকই বটে। মন ত মরিবে না। মনকে সংহারের এ ত অস্ত্র নয়। অতএব কোন অস্ত্রে ইহাকে সংহার করা যায় ইহা চিন্তা করিতে করিতে তিনি শম, দম, আসন, নিয়ম, প্রাণায়াম, ধ্যান, ধারণা নিদিধ্যাসন প্রভৃতি অস্ত্র আবিষ্কার করিলেন। বল প্রয়োগে মনকে সংহার করা যায় না। মন যাহা চায় ধীমান্ তাহাকে পরিশিষ্ট। ১১৭ প্রথমত তাহাই দিয়া বিবেক শিক্ষক দ্বারা ক্রমশঃ তাহাকে আপনার অভিলষিত পথে আময়ন করিতে হয়। কঠিন লৌহের উপর প্রবল বেগে আঘাত করিলে তাহা ভাঙ্গিয়াই যায় ; তাহাতে অভিলষিত দ্রব্য গঠন করিতে হইলে তাহাকে অগ্নির উত্তাপে কোমল করিতে হয়। মনকেও তদ্রুপ তাহার আকা- ঙ্কিত বিষয়ে লইয়া গিয়া ভােগের আপাতঃ-মধুরতা সাবধানে উপলব্ধি করাইতে হয়। উত্তেজনার পর অবসাদ প্রাকৃতিক নিয়ম। এই নিয়মে ভােগের পর তাহার অবসাদ আসিবে। উত্তেজনা অন্তর্হিত হইলেই অবসন্ন জীব স্বতঃই কৃতকার্যের পরিণাম চিন্তা করে। তখন মনকে ভােগের অসারতা প্রদর্শন করাইয়া স্বপথে ফিরাইয়া আনিতে হয়। ইহারই নাম অভ্যাসযােগ। তবে সাবধান হইতে হইবে যেন বিবেক-প্রহরীর কোন কর্তব্যচ্যুতি না ঘটে। মনের নিগ্রহ নিতান্তই দুরূহ। বহুকালের অভ্যস্ত মনের উপর নির্ভর করিয়া নিশ্চিন্ত থাকাও যায় না। যেমন বন্য পশু পক্ষীকে বহুকাল শৃঙ্খলে বদ্ধ করিয়া উত্তম রূপে শাসন করিলেও শৃঙ্খলমুক্ত হইলে তাহারা নিজ মুর্তি ধারণ করিতে ক্ৰটী করে না, তদ্রুপ মনও নিগ্রহের পথে বিশেষরূপ নিগৃহীত হইলেও অবসর পাইলে সে স্বীয় পরাক্রম প্রকাশ করিতে ক্রটি করে না। বরং সংযত রাখিবার প্রতিশােধ লইবার জন্যই যেন সে পূৰ্ব্বাপেক্ষা দ্বিগুণ প্রতাপে ভােগমার্গে অগ্রসর হয়। তখন তাহাকে নিগ্রহ করিবার যত্ন নিতান্তই নিস্ফল হয়। তথাপি যােগীর পক্ষে নিরুৎসাহ হওয়া বিধেয় নহে। কারণ বিচিত্রতা উৎপাদন করাই প্রকৃতির বিশেষত্ব। মন একবার উত্তেজিত হইলে তাহাকে কথঞ্চিৎ প্রশ্রয় না দিয়া তৎক্ষণাৎ তাহা নিবারণের চেষ্টা ফলপ্রসূ নহে। যেমন প্রবল জলপ্রবাহ বঁধ ভাঙ্গিয়া নির্গত হইলে স্রোতের বেগ ক্রমশঃ প্রশমিত হয়, তদ্রুপ ভােগের দ্বারা উত্তেজনার অবসান হইলে অবসাদ আসে। সেই সময় বিচার' দ্বারা তাহাকে স্বাভিলষিত পথে আনয়ন করা সহজ হয়। এই সংসারকে আপনার অধীনে আনয়ন করা যিনি প্রয়ােজন মনে করেন, তাহাকে প্রথমতঃ সংসারের অধীনতা স্বীকার করিতে হয় ; নতুবা তাহাকে করতলগত করা যায় না। নীতিজ্ঞগণ বলিয়াছেন, যদি শত্রুকে দমন করিবার বাসনা থাকে তাহাহইলে প্রথমতঃ তাহাকে স্কন্ধে করিয়া নৃত্য কর ; পরে অবসরমত কোন পাষাণ ভূমিতে নিক্ষেপ করিয়া তাহার প্রাণ সংহার করিও।

১১৮ যাহার প্রবল পরাক্রমে জীব বদ্ধ হইয়া এই সংসার কারাগারের অভ্যন্তরে জন্মজন্মান্তর ভােগ্ন করিতেছে, তাদৃশ মহাপরাক্রান্ত মনরূপ শত্রুকে স্ব-বশে আনয়ন করিবার জন্য বিশেষ যত্নের প্রয়ােজন। যেমন রাজাকে বশীভূত করিতে হইলে অমাত্যবর্গ প্রথমতঃ তাহার চিত্তবৃত্ত্যানুযায়ী কাৰ্য্যই করিয়া থাকেন, তদ্রুপ ইন্দ্রিয়বর্গের অধীশ্বর মনের নিরােধ করিতে হইলে প্রথমতঃ তাহার অনুগমন করাই কৰ্ত্তব্য। যে যতই শক্তিমান্ হউক না কেন, ক্রমশঃ শক্তির অপব্যয়ে এক সময় না এক সময় তাহার শক্তিহীনতা উপস্থিত হইবেই হইবে। ইহাই প্রাকৃতিক নিয়ম। প্রবল শত্রুরও যদি সেই শক্তিহীনতা ঘটে, তাহা হইলে একজন নিতান্ত হীনবলের দ্বারাও সেই অতিপ্রবলের সহজেই পরাভব ঘটিয়া থাকে। যেমন অশ্বচালক অদান্ত অশ্বকে তাহার (অশ্বের) ইচ্ছানুযায়ী পরিচালিত করিয়া ক্রমশঃ পরিচালনার পদ্ধতি পরিবর্তন পূৰ্ব্বক বশে আনয়ন করে, তপ ধীরতাসহকারে ধৈৰ্য্যচ্যুত মনকে স্ববশে আনয়ন করাই কৰ্ত্তব্য। মনের ধৈৰ্য- চ্যুতি দর্শন করিয়া একেবারে অধীর হইয়া তাহার নিরােধে উদ্যত না হইয়া কথঞ্চিৎ প্রশ্রয় দানে তাহার অনুগমন করাই কর্তব্য। মন যেমন জীবকে সংসারের কীট করিতে পারে, তেমনি স্বর্গের অতীত যতিগণের বিহারভূমি পরমপদেও লইয়া যাইতে পারে। মনের অপরাধ নাই। তাহার চালককেই হুসিয়ার হইতে হইবে। চালকের দোষ গুণেই তাহার বৈষম্য বা শান্তি উপলব্ধি হয়। অতএব চালনার দোষ গুণ কি তাহাই বিচার পূর্বক সাবধানতা অবলম্বন করিলেই অচিরে শ্রেয় লাভ হয়। মনের সংগ্রহ বা সংযমই পরমযােগ। যখন উত্তেজনা রহিত হইয়া কথঞ্চিৎ শান্তভাব অবলম্বন করে তখন এই নশ্বর জগতের উৎপত্তি ও বিলয়ের ধারা চিন্তা করিলেই মন আপনাপনি শান্ত হই বিষয়াসক্তি শূন্য হয়। মন আসক্তি শূন্য হইলেই অনায়াসে পরমপদ লাভ মন (৩)- পরিশিষ্ট। ভক্তিযােগ কথা। নিবিঃস্য বিরক্তস্য পুরুষদ্যোক্তবেদিনঃ। মন স্ত্যজতি দৌরাত্মং চিন্তিতসমুচিন্তয়া। যাহাদের মন কাৰ্যারম্ভ সময়ে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হয় এবং কাৰ্যফললাভের আশা পােষণ করিয়া ধৈৰ্য্য ধারণ করিতেও পারে না, তাহারা যদি সৰ্ব্বদা গুরূপদিষ্ট পন্থার আলােচনায় বিচারিত তত্ত্বের সম্যক ধারণা করেন, তাহা হইলে তাহাদের মৰ দৌরাত্ম্য বিসর্জন পূৰ্ব্বক অনায়াসে বিষয়াসক্তি পরিত্যাগ করিয়া থাকে। যমাদিভিযোগপথৈরাম্বীক্ষিকা চ বিদয়া। মমার্চেপাসনাভির্বা নান্যৈযোগ্যং স্মরেম্মন। যমাদি অষ্টাঙ্গ যােগের অনুশীলনে আত্মতত্ত্ব বিচাররূপ আম্বীক্ষিী বিদ্যার আলােচনায় এবং ভক্তিসহকারে আমার প্রতিমূৰ্ত্তির উপাসনাদি রূপ যে কোন এক উপায়ে ধ্যানাধিষ্ঠিত পরমাত্মারূপ আমাকে সতত চিন্তা করিলে, মন যত সহজে নিবৃত্ত হয়, এরূপ আর অন্য কোন উপায়ে হয় না। ১ তত্ত্ব বিচারকালে স্বাধীন চিন্তার অনুগমন করা বিধেয় নহে। কারণ, যখন যাহার অধীনে থাকা যায় তখন তাহাকে সম্যক অবধারণ করা দুঃসাধ্য। যাহাকে অবধারণ করিতে হইবে তাহার অধিকারকে অতিক্রম করা প্রয়ােজন। অতএব সংসার বা তত্ত্বগ্রামকে বিচার করিতে হইলে তাহাকে অতিক্রম করা আবশ্যক। এবং অতিক্রম করিলে আয় বিচারের প্রয়ােজন থাকে না। কারণ জ্ঞানের জণ্ঠ বিচার; জ্ঞান হইলে আর বিচারের প্রয়ােজন কি ? অতএব ভ্রান্ত জীবের যখন সকল বিচারই ভ্ৰমমূলক, তখন অভ্রান্তের বিচার অনুসরণ করাই ভ্রম নিবারণের উত্তম উপায়। সুতরাং নিজের স্বাধীন বিচাখে জলাঞ্জলি দিয়া অভ্রান্ত গুরু ও শাস্ত্র বিচারের অনুসরণ করাই অবক্ষয়ের একমাত্র উপায়।

শ্রীকৃষ্ণ। শ্রুতি বলিয়াছেন - যস্য দেবে পরাভক্তি ষষ্ঠ দেবে তথা গুরো। তস্যৈতে কথিতা হৰ্থাঃ প্রকাশন্ত মহাত্মনঃ । ভগবদারাধনার বলে গুরুগণ জ্ঞানের চরম সীমায় আরােহণ পূর্বক সংসারের মঙ্গল কামনায় আৰ্য-বিজ্ঞান বলে যে সকল তত্ত্ব-বিচার' আবিষ্কার' ও প্রচার করিয়াছেন, অনন্তমনে তাহারই অনুসরণ করা মুমুক্ষুর অবশ্য কর্তব্য। তাহাদের প্রম প্রমাদ নাই। সুতরাং তাহা মমােজয়েরই অত্যুত্তম কল্প। যমাদি অষ্টাঙ্গ যােগ এবং তত্ত বিষয়ের বিচার পূর্বক জীবাত্মা পরমাত্মার.ঐক্যাবধারণ ও মূর্তি পুজার দ্বারা ঈশ্বরে।আত্ম সমর্পণ, এই ত্রিবিধ উপায়, স্বতন্ত্র বা যুক্তভাবে জীবের মুক্তি-সাধক বটে; কিন্তু মনের নিগ্রহ সর্বাগ্রে প্রয়ােজন। যেমন উত্তম বীজ হইলেও ক্ষেত্রের দােষে তাহা কোনরূপ ফল উৎপাদন করে না, সেইরূপ উপদেশ বা সাধন উৎকৃষ্ট হইলেও এক মনােভূমির দোষেই সব নিস্ফল হইয়া যায়। অতএব মনের নিৰ্বেদ অর্থাৎ অনাসক্তিভাব পূর্ণমাত্রায় উদয় হইলে আর কর্মের প্রয়াে- থাকে না। কারণ, মনের নিবৃত্তির জন্যই যাবতীয় কৰ্ম্ম। যদি কুৰ্যাৎ প্রমাদেন মােগী কৰ্ম্ম বিগহিতং। যােগেনৈব দহেদংহাে নান্যও কদাচন। যদি যােগী প্রমাদ বশতঃ কখনও কোনরূপ নিন্দিত বা অন্যায় কাৰ্য্যও করিয়া ফেলেন, তথাপি তজ্জনিত পাপ উক্ত ভক্তিযােগেই বিনষ্ট হইয়া যায়। পাপ ধ্বংস জন্য যােগসাধন ব্যতীত যােগীকে প্রায়শ্চিত্তাদি আর অন্য কোন ক্লেশপ্রদ কৰ্ম্ম করিতে হয় না (পূৰ্বেও উক্ত হইয়াছে যে— স্বপামূলং ভজতঃ প্রিয় ত্যক্তান্তভাব হরিঃ পরেশ। বিকৰ্ম্ম যচ্চোৎপতিতং কথঞ্চিননাতি সর্বং হদি সন্নিবিষ্টঃ॥”) মেমন সূর্যোদয়ে নীহার রাশি আপনাপনিই অদৃশ্য হয়, সেইরূপ ঈশ্বরপরায়ণ ব্যক্তিগণ, কেবলমাত্র ভক্তিবলেই যাবতীয় পাপ হইতে মুক্তিলাভ করিয়া থাকেন।

পরিশিষ্ট স্বে সেহধিকারে যা নিষ্ঠা স গুণঃ পরিকীৰ্ত্তিতঃ। কৰ্ম্মণীং জাত্যশুদ্ধানামনেন নিয়মঃ কৃতঃ। দোষগুণবিধানেন সঙ্গানাং ত্যাজনেচ্ছয়া । ক্রিয়া স্বভাবতই অশুদ্ধ। তথাপি বিষয়াসক্তি বর্জন জন্ত দোষগুণ বিচার পূৰ্ব্বক ক্রিয়ার ব্যবস্থা করা হইয়াছে। অর্থাৎ স্ব স্ব অধিকারানুরূপ কর্মের আলােচনায় গুণ এবং পরধর্মের অনুষ্ঠানই দোষ বলিয়া কথিত। আস্বাদন নিত্য নৈমিত্তিকাদি কর্মের অনুষ্ঠানে সত্ত্বগুণের উদ্রেক হয় এবং রজঃ ও তমাে- গুণের নিবৃত্তি ঘটে। সুতরাং ঐ সকল কর্ম গুণ বলিয়া শাস্ত্রাদিতে কথিত হইয়াছে; এবং হিংসাদি যে সকল কর্মের অনুষ্ঠানে সত্ত্বগুণের অবিশুদ্ধি ৰা ব্যত্যয় ঘটে, তাহাকেই দোষ কহে। পাপানুষ্ঠান অন্য কৃচ্ছু চান্দ্রায়ণাদি প্রায়শ্চিত্তের ব্যবস্থাকে গুণ বা উপকার বলিয়া স্বীকার করিতে হইবে। বৈধ কর্মে গুণ এবং অবৈধ কার্য্যে দোষ কীৰ্ত্তন করিয়া কেবল কর্মের সঙ্কোচ করা হইয়াছে মাত্র। কারণ কৰ্ম্মমাত্রই দোষযুক্ত। কেবল আসক্তি বর্জনার্থ কৰ্ম্মের বিধি ও নিষেধ উক্ত হইয়াছে। কারণ, পুরুষ-স্বরূপে কোন বিধি বা নিষেধ নাই। কারণ পুরুষ নিত্য, শুদ্ধ ও চৈতন্যস্বরূপ। তবে কেবল প্রবৃত্তিই পুরুষের অশুদ্ধি এবং নিবৃত্তিই তাহার স্বরূপাবস্থা। পুরুষে আরােপিত প্রবৃত্তিই তাহার মালিন্য। সহসা সেই মালিন্য হইতে পুরুষের পৃথকভাবে অবস্থান করা দুরূহ। এই জন্য বিধি নিষেধ পুরুষের প্রবৃত্তি সঙ্কোচ পূৰ্ব্বক নিবৃত্তি আনয়নের জন্য উপায়রূপে নির্দিষ্ট হইয়াছে। কারণ বেদ কখনও প্রবৃত্তিধৰ্ম্মের প্রশ্রয় দেন নাই। যেমন স্ত্রৈণ পুরুষের পক্ষে বিবাহের বিধি ও পরদার গমন নিষেধ ; সেইরূপ প্রবৃত্তি- পরায়ণ পুরুষের পক্ষেই এই বেদোক্ত ব্যবস্থা। যাহারা স্ত্রীকামী নহেন, তাহাদের পক্ষে ঐরূপ বিধি নিষেধ অনাবশ্যক। যাহাদের কামনা আছে, বেদ নিত্যনৈমিত্তিক ও প্রায়শ্চিত্তাদি ব্যবস্থা দ্বারা তাহাদের চিত্তস্থ কামনাই সঙ্কোচ করিয়াছেন মাত্র। অতএব যাহাদের হৃদয় প্রশান্ত, কামনার উদ্দীপনা নাই, তাহাদের পক্ষে করেও উপদেশ নাই। [ ১৬ শু শ্রীকৃষ্ণ। } জাতশ্রদ্ধো মৎকথাসু নিৰ্বিণঃ সর্বকৰ্ম্ম। বৈদ দুঃখাত্মকান্ কামা পরিত্যাগেহপ্যনীশ্বরঃ ততাে ভজেত মাং প্রীতঃ শ্রদ্ধালুদৃঢনিশ্চয়ঃ। জুষমাণশ্চ তান্ কামান্ দুঃখেদর্কাংশ্চ গহয় ॥ যে ব্যক্তির ভগবৎকথা শ্রবণেই বিশেষ শ্রদ্ধা জন্মে এবং তদ্ব্যতীত সকল কৰ্ম্মের উদ্যমকেই উদ্বেগকর জ্ঞান হয়, তিনি যাবতীয় ভােগকে দুঃখপ্রদ জানিয়াও যদি তাহা পরিত্যাগ করিতে অপারগ হয়েন, তাহা হইলে তিনি যেন প্রথমতঃ মনােমধ্যে এই স্থির সিদ্ধান্ত করেন যে, এক ভক্তিবলে জগতের সমস্তই লাভ করা যায়। তিনি অবশভাবে এই সমস্ত দুঃখপ্রদ বিষয়প্রপঞ্চ যে ভােগ করিতেছেন, তজ্জন্য আপনাকে নিন্দা করত প্রসন্নচিত্তে ও শ্রদ্ধা সহকারে ভােগের সঙ্গে সঙ্গে যেন সৰ্বভােগপ্রদ আমাকে (ভগবানকে) ভজনা করেন। (ঈশ্বরে আত্মসমর্পণ পূৰ্ব্বক ভােগ করিলে বিষয়ের দোষ প্রতীত হয় । তখন তঁাহার বশীকারসংজ্ঞ বৈরাগ্যে ক্রমশঃ অধিকার জন্মে।) প্রােক্তেন ভক্তিযােগেন ভজতে মাসকৃম্মুনেঃ। কামা হৃদয্যা নশ্যন্তি সর্বে ময়ি হৃদি স্থিতে পূর্বোক্ত ভক্তিযােগের দ্বারা যে মুনি আমাকে নিরন্তর ভজনা করেন আমি তাঁহার হৃদয়ে সতত উদিত থাকি। সুতরাং আমার অবস্থানে তাহার চিত্তগত যাবতীয় বাসনাই সমুলে বিনষ্ট হয়। ভিষ্যতে হৃদয়গ্রন্থিচ্ছিদ্যন্তে সর্বসংশয়াঃ। ক্ষীয়ন্তে চাস্য কৰ্ম্মাণি ময়ি দৃষ্টেখিলাত্মনি । আমি জীবমাত্রেরই অন্তরাত্মা ; মদীয় সাক্ষাৎকার লাভ হইলে ভক্তগণের দেহাদিতে অহঙ্কাররূপ হৃদয়-গ্রন্থি দূর হয় ; অসম্ভাবনাদি বিবিধ সংশয় অপ- ননাদিত হয় এবং ভক্তের যাবতীয় কৰ্ম্মাদি বিনষ্ট হইয়া যায়। ( কামনাই বন্ধনের মূল। কামনাকে যতই বিতাড়ন করা যাউক, সে সুযােগ বুঝিয়া অজ্ঞাতসারে জীবের হৃদয়-মন্দিরে প্রবেশ করিয়া থাকে। তাহাকে বিতাড়িত করিতে হইলে তক্তিরূপ কৌশল অবলম্বন করা কর্তব্য। যেমন সুবিশাল পরিশিষ্ট। ১২৩ বনে অসংখ্য জীব বাস করে, এক একটী করিয়া তাহাদিগকে হত্যা করত বন জীব শূন্য করা একেবারে অসম্ভব ; এবং তাহা সম্ভব হইলেও তাহাদিগকে নিঃশেষ করাও কল্পনাতীত। কিন্তু সেই বনে একটী সিংহ প্রবেশ করিলে যেমন অসংখ্য জীব সিংহের আগমনেই বন ত্যাগ করিয়া পলায়ন করে। তদ্রুপ আমাদের হৃদয়ৰূপ মহাবনে বাসনারূপ অসংখ্য জীব বাস করে ; তাহাদিগকে বিতাড়িত করিতে হইলে যদি ভক্তিরূপ কৌশলে একবার পরমতত্ত্ব পুরুষসিংহ শ্রীহরিকে তথায় আনয়ন করা যায়, তাহা হইলে কামনা সজ্য আপনাপনিই বুথ- ভ্রষ্ট হইয়া সূর্যোদয়ে নীহারের ন্যায় সহসা অদৃশ্য হইবে। ভগবানের কৃপা ব্যতীত কামনাকে নিঃশেষ করা জীবের পক্ষে একান্তই অসম্ভব। অভিমান বা অহঙ্কারই তাহার বাসা! ভগবানের দর্শনে অহঙ্কার দূরীভূত হয়; যাবতীয় সংশয় অপ- নােদিত এবং প্রারব্ধ পর্যন্ত যাবতীয় কর্মজাল বিনষ্ট হয়। সুতরাং ভাবদর্শনেই কামনার নিঃশেষে নিবৃত্তি ঘটে ! ) তস্মান্মদ্ভক্তিযুক্ত যােগিনো বৈ মদাত্মনঃ। ন জ্ঞানং নচ বৈরাগ্যং প্রায় শ্রেয়াে ভবেদিহ। অতএব আমাতে আত্মসমর্পণ পূৰ্ব্বক যাহারা প্রকৃত ভক্ত হইয়াছেন, তাদৃশ যােগীর পক্ষে প্রকৃত বিচাররূপ জ্ঞানযােগ বা বিষয়-বিতৃষ্ণারূপ বৈরাগ্য আর শ্রেয় সাধনের পক্ষে গণনীয় হইতে পারে না। আস্বাদন–কর্মী, জ্ঞানী ও ভক্তভেদে পরমপদ প্রাপ্তির অধিকারী তিন প্রকার। তন্মধ্যে পূর্বোক্ত দুইজন অন্যের অপেক্ষা করেন। কেবল ভক্তের আর কোন অপেক্ষা নাই। বরং কেবল ভক্তির প্রসাদে অভিমানাদি সংসার কারণ সমূলে ধ্বংস হইয়া যায়। অভিমানাদি নিবৃত্তির জন্য জ্ঞান বা বৈরাগ্যের আবশ্যক করে না। যাহাদের চিত্ত ভগবানে সমর্পিত হইয়াছে, তাহাদের পক্ষে জ্ঞান বা বৈরাগ্য আর শ্রেয়ে সাধনের মধ্যেই গণনীয় নহে। কারণ জ্ঞান দেহাতিরিক্ত আত্মার অনুসন্ধান এবং বিষয় হইতে বিনিবৃত্ত করিবার জন্য বৈরাগ্য দ্বারা জীবের চিত্তে সত্ত্বগুণের উৎকর্ষ স্থাপন করে মাত্র। অতএব যাহারা ভগবানে আত্মসমর্পণ পূর্বক গুণাতীত ভগবানের নিরন্তন চিন্তায় নিজেরাও তৎস্বারূপ্য লাভে গুণাতীত হইয়াছেন, তাঁহাদের আর সর্বোৎকর্ষক জ্ঞান বৈরাগ্যের প্রয়ােজন কি ? যে জ্ঞানবৈরাগ্য ভক্তিপথ প্রদর্শনের অতএব ১২৪ শ্রীকৃষ্ণ। প্রদর্শক স্বরূপ, তাহারা তাহাদিগকে অনায়াসেই অতিক্রম করিতে পারেন। অর্থাৎ তক্ত ভক্তির প্রসাদে অনায়াসেই জ্ঞান-বৈরাগ্যের পারে চলিয়া যান। ভােজনকালে যেমন প্রতিগ্রাসে তুষ্টি, পুষ্টি ও ক্ষুধার নিবৃত্তি হয়। তদ্রুপ ভক্তিতে ভগবদনুভব রূপ জ্ঞান ও বিষয়ে অনাসক্তিরূপ বৈরাগ্য আপনা হইতেই উৎপন্ন হইয়া থাকে। যৎ কৰ্ম্মভির্যপসা জ্ঞানবৈরাগ্যতশ্চ যৎ। যােগেন দানধৰ্ম্মেণ শ্রেয়ােভিরিতরৈরপি। সর্বং মক্তিযােগেন মন্তুক্তো লভতেইঞ্জসা। স্বৰ্গাপবর্গং মদ্ধাম কথঞ্চিদ যদি বাঞ্ছতি ॥ ন কিঞ্চিৎ সাধবো ধীরা ভক্ত যেকান্তিনাে মম। বাঞ্ছন্ত্যপি ময়া দত্তং কৈবল্যমপুনর্ভবং। যাহারা আমার প্রকৃত ভক্ত, একমাত্র আমারই শরণ লইয়া চিত্ত ও ইন্দ্রিয়- সমূহ সংযম পূৰ্ব্বক অতি শান্তভাবে অবস্থান করেন, তাদৃশ সাধু ব্যক্তিগণ অন্য ফলের কথা দুরে থাকুক, মৎপ্রদত্ত সংসার নিমুক্তিরূপ মােক্ষপদকেও প্রার্থনা করেন না। তবে ভােগ দশাতে কোন অভাবের বশে যদি কখনও কোনরূপ ভােগবাসনার উদয় হয়, তাহা হইলে যজ্ঞাদি কর্মকাণ্ড বা কৃচ্ছ চান্দ্রায়ণাদি তপস্যা দ্বারা জ্ঞানযােগ, বৈরাগ্য, দান, ধর্ম বা অন্য যে কোন শ্রেয়ঃসাধন মার্গাবলম্বনে তাহারা যে কোন ফল লাভ করিতে পারেন ; অধিক কি! স্বর্গ, অপবর্গ এবং মদীয় ধাম বৈকুণ্ঠ পৰ্যন্তও তিনি এক ভক্তিবলেই অনায়াসে লাভ করিয়া থাকেন। আস্বাদন—শস্ত্র বাক্য ন হি সাংখ্যসমং জ্ঞানং ন হি যােগসমং বলং।” তত্ত্ববিচার পূর্বক জগতের মূল কারণ প্রকৃতিকে পুরুষ-স্বরূপ হইতে পৃথকভাবে নিরূপণ করাই প্রকৃত জ্ঞান। এই জ্ঞান অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ জ্ঞান আর নাই এবং যােগ অপেক্ষা বলও নাই। কারণ এতদুভয় দ্বারা মন দৌরাত্ম পরিত্যাগ পূর্বক শান্ত হয়। অন্য যে কোন সাধনে যে সকল ফল লাভ সম্ভব, একমাত্র ভক্তির প্রসাদে তাহার সমস্তই হইয়া থাকে। বিশেষতঃ অন্য সকল পরিশিষ্ট। ১২৫ উপায়ই কষ্টসাধ্য, কিন্তু ভক্তি অনায়াসসাধ্য! ভক্তি স্বর্গ- ভােগ প্রদান করে এবং ক্রমশঃ সত্ত্বগুণের উৎকর্ষ ঘটাইয়া অন্তে মুক্তিই প্রদান করে। বিচিত্রকেতু প্রভৃতির যে সকল উপাখ্যান শাস্ত্রে বর্ণিত আছে তাহাতে সর্বত্র ভক্তিকেই উন্নতি বা মুক্তি লাভের অপূৰ্ব্ব সােপান রূপে বর্ণন করা হইয়াছে। শুকদেব মাতৃগর্ভে দ্বাদশ বর্ষ বাস করিয়াও বহির্গত হইতে চাহেন নাই। পরে তাহার প্রার্থনায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ মায়া আকর্ষণ করিয়া লইলে তিনি ভূমিষ্ঠ হইলেন। শুকদেবের ন্যায় জ্ঞানীও মায়ার ভয়ে ভূমিষ্ঠ হইতে পারেন নাই ; পরে ভক্তিবলে ভগবানের কৃপালাভ করিয়া তিনিও কৃতার্থ হইয়াছিলেন। সকল সাধনেই কোন না কোন বাঞ্ছা আছে ; কিন্তু ভক্তিতে ভগবান্ ব্যতীত অন্য কিছুই বাঞ্ছনীয় নাই। কর্মের দ্বারা বৈরাগ্য জন্মে ; বৈরাগ্য হইতে জ্ঞান লাভ হয় এবং জ্ঞান দ্বারা ভগবৎসাক্ষাৎকাররূপ মুক্তি ঘটে। কিন্তু ভক্তির ঐরূপ কোন অবান্তর ফল নাই এবং তাহা কোন উন্নতিরও অপেক্ষা করে না। নৈরপেক্ষ্যং পরং প্ৰাহুনিঃশ্রেয়সমনল্পকং। তস্মামিরাশিযষা ভক্তির্নিরপেক্ষস্য মে ভবেৎ। সর্বপ্রকার বিষয়ের অপেক্ষাকে উপেক্ষা করত যাহাদের চিত্ত সম্পূর্ণ নিষ্কাম- ভাব ধারণ করে, তাহাদেরই পক্ষে যখন ভাগবতী ভক্তি অবশ্যম্ভাবিনী ; তখন প্রকৃত নৈরপেক্ষ (সৰ্ব্বাপেক্ষাহিত্য) ভাবই সৰ্ব্বপ্রধান ও উৎকৃষ্ট পুরুষার্থ সাধক; ইহাই অভিজ্ঞ বৃদ্ধদিগের অভিমত। আস্বাদন : ভগবদ্ভক্তিতে কোন প্রার্থনা নাই ; কারণ ভক্তির লক্ষ্য ভগবান বা ইষ্ট । তিনি গুণের অতীত। ভগবান্ ব্যতীত সকল বিষয়ই সত্ত্ব, রজঃ ও তমােগুণে গঠিত। সুতরাং বিষয়ের যে কোন ভাবে দৃষ্টি করিলে দোষেরই উদ্ভব হয়। ( দোষ গুণ অর্থে বিধি নিষেধ !) বৈধ ক্রিয়ায় গুণ এবং নিষিদ্ধ কর্মে দোষই সূচিত হয়।

৯২৬ কৃ। ভক্তের চিত্ত সমগুণ সম্পন্ন। তঁাহার কাহারও প্রতি দ্বেষ বা স্বার্থানুবােধ কাহারও প্রতি অনুগ্রহ বা নিগ্রহের সম্ভাবনা নাই। সুতরাং তাহাদের কোন কর্মে স্বার্থসূচক কোন অভিসন্ধি থাকে না। অতএব বৈধ বা নিষিদ্ধ বলিয়া তাহাদের পক্ষে কোন কর্মের বিধানও নাই। 1 re ন ময্যেকান্তভক্তানাং গুণদোষােবা সাধুনাং সমচিত্তানাং বুদ্ধেঃ পরমুপেয়ুষাং। এবমেন্ময়াদিষ্টান তিষ্ঠন্তি মে পথঃ । ক্ষেমং বদন্তি মৎস্থানং যদ্ব হ্ম পরমং বিদুঃ। আমার একান্ত ভক্ত সমচিত্ত জ্ঞানিগণ প্রকৃতির অতীত আত্মস্বরূপকে অবধারণ করিতে সমর্থ হন। সুতরাং তাদৃশ জিতেন্দ্রিয় সাধুগণ গুণ বা দোষ হইতে উৎপন্ন পুণ্য বা পাপে আর লিপ্ত হন না। পূর্বোক্ত প্রকারে মদুপদিষ্ট নিষ্কাম কৰ্ম্মযােগ, জ্ঞানযােগ ও ভক্তিযােগরূপ মৎপ্রাপ্তির এই ত্রিবিধ সাধনকে যাহারা অনন্যমনে অনুসরণ করেন, তাহারা সৰ্ব্ব শাস্ত্র প্রসিদ্ধ পরমব্রহ্মকে সাক্ষাৎকার করিতে পারেন এবং অন্তে যেখানে কাল বা অনিত্য কর্মের কোন ভয় নাই, আমার সেই পরমলােকে গমন করেন। আস্বাদন :- যাহাদের চিত্ত যােগাবলম্বনে সমাহিত এবং প্রখর ভক্তির বেগে মালিন্য বিরহিত হইয়াছে, এবং বৃত্তির অভাবে পরমপুরুষ পরমাত্মার স্বরূপ সন্দর্শনেই যে ভক্ত নিরন্তর অবস্থান করিয়া থাকেন, তিনি প্রকৃতির অতীত। প্রাকৃতিক গুণের ক্রিয়া আর তাহাকে স্পর্শ করিতে পারে না! সুতরাং বিধি নিষেধের করণ বা অকরণে কোন প্রত্যবায় বা পুণ্যের সহিতও তাঁহাদের কোন সম্পর্ক নাই। অথচ বৈধ কৰ্ম্ম সম্পাদনের যে ফল তাহা ত তাহারা লাভ করিয়াই থাকেন। তদ্ব্যতীত মুক্তি ও বৈকুণ্ঠলােকও অনায়াসে লাভ করেন। -(0) পরিশিষ্ট। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ কহিলেন, হে উদ্ধব ! ভক্তিযােগ, জ্ঞানযােগ ও নিফাম কৰ্ম্মযােগরূপ ভগবৎ প্রাপ্তির ত্রিবিধ উপায়কে উপেক্ষা করিয়া যাহারা চঞ্চল ইন্দ্রিয়গ্রামের সাহায্যে অতি তুচ্ছ বিষয়-সম্ভোগেই পরিতৃপ্ত হয়, তাহারাই বিবিধ যােনিতে আশ্রয় লইয়া অনন্ত সংসার পথে পরিভ্রমণ করিতে থাকে। স্ব স্ব অধিকারানুরূপ সম্বন্ধ অবলম্বন পূর্বক অবস্থান করাই গুণ এবং নিজের অযােগ্যতার প্রতি লক্ষ্য না করিয়া পরের অধিকারে পদার্পণ করিবার যত্নই দোষের কারণ। অধিকারী অনধিকারী ভেদে দোষগুণের এইরূপ মীমাংসা হইয়া থাকে। ( যে পর্যন্ত প্রকৃতির অন্তর্ভুক্ত থাকা যায় তদবধিই অধিকারের সীমা। পুরুষ প্রকৃতির অতীত। তাহাকে ধারণা করিতে পারিলে প্রকৃতির স্তরকে অতিক্রম কবা যায়। তখন আর শুভাশুভ কোন কর্মেরই অপেক্ষা থাকে না ভগবান বলিয়াছেন— সৰ্ব্ব ধর্মান্ পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজ। অহং ত্বাং সর্বপাপেভ্যো মােক্ষয়িষ্যামি মা শুচ । দেহধৰ্ম্ম, ইন্দ্রিয়ধৰ্ম্ম ও চিত্তাদির ধর্মকে উপেক্ষা করিয়া তাহাদের অধীনতাকে অস্বীকার করত এক ভগবানের অধিকারকে যে স্বীকার করে, ভগবান তাদৃশ জীবকে সংসারের গভীর গহ্বর হইতে স্বয়ং উত্তোলন করিয়া থাকেন। ) সাধারণ দৃষ্টিতে বস্তু সম্বন্ধে দ্রব্যের সমরূপত্ব হইলেও যােগ্যাষােগ্য ভেদে বস্তুর শুদ্ধি অশুদ্ধি, গুণ দোষ এবং শুভাশুভের মীমাংসা হইয়া থাকে। যােগ্য শুদ্ধ বস্তুর সংস্রবে ধৰ্ম্ম এবং অযােগ্য অশুদ্ধ পদার্থের মিলনে অধৰ্ম্ম উৎপন্ন হয় । অধিকারানুরূপ উপাদেয় পদার্থের সংযােগে গুণ এবং অনধিকার নিবন্ধন হেয় পদার্থের সংযােগে দোষােৎপাদিত হইয়া থাকে। আপৎকাল উপস্থিত হইলে হেয় বস্তুও ব্যবহারার্থ গ্রাহ হইয়া থাকে কিন্তু আপং বিমুক্ত হইবামাত্র তাহাকে দূষিত জ্ঞানে বর্জন করাই শ্রেয়। জীবন রক্ষার জন্য দূষিত পদার্থও শুভের মধ্যে পরিগণিত ; কিন্তু জীবনােপায় সংগৃহীত হইলে দূষিত পদার্শ্বকে দূষের মধ্যে গণনা করিতে হয়। হে অনঘ! যাহারা ধৰ্ম্মরূপ ধুরধারণে প্রস্তুত, তাহাদের জন্য আমি মনু প্রভৃতির মূর্তিতে অবতীর্ণ হইয়া এই শ্রেষ্ঠ আচার সমুহের প্রবর্তন করিয়াছি।

১২৮ ব্ৰহ্মাদি স্থাবর পর্যন্ত প্রাণীবর্গের সম্বন্ধে ভূমি, জল, অগ্নি, বায়ু ও আকাশ এই অত্মসহিত পঞ্চভুতই শরীরারম্ভক নিৰ্বিশেষ কারণরূপে নির্দিষ্ট হইয়াছে। এই সমস্ত প্রাণীর স্বার্থসিদ্ধির জন্য প্রবৃত্তি ও নিবৃত্তির নিয়মন দ্বারা ধৰ্ম্মাদি বর্গ চতুষ্টয়ের সংগ্রহ প্রয়ােজন হইল; সুতরাং দেহের উপাদান কারণ সর্বত্র এক হইলেও বিষম—যথা ব্রাহ্মণক্ষত্রিয়াদির নাম ও রূপ বেদের দ্বারা. কল্পিত হইয়াছে। হে সাত্তম! জীবের মধ্যে যে কেবল দেহনিষ্ঠ তারতম্যই ঘটিয়াছিল তাহা নহে; দেশ ও কাল ভেদে বস্তু সম্বন্ধে এবং স্বভাবানুসারে কর্ম সন্ধেও আমি গু। ও দোষের বিধান করিয়াছি। যে যে বিষয়ের সম্ভোগ হইতে চিত্তকে নিবৃত্ত করা যায়, সেই সেই বিষয় হইতে তাহার অব্যাহতি ঘটে। এই নিবৃত্তিরূপ ধৰ্মই মানবের শােক, মােহ ও ভয় হইতে রক্ষা পাইবাব প্রধান উপায় এবং মঙ্গলের একান্ত নিদান। বিষয় সমূহে কেবল রমণীয়তার আবােপই পুরুষের পক্ষে তৎপ্রতি আসক্তির কারণ। আসক্তি হইতেই কামনার উদ্রেক হয়; এবং কামনাই পরস্পরের মধ্যে কলহ উৎপাদনের হেতু। কলহ হইতে ক্রোধ এবং ক্রোধ হইতে মােহ উৎপন্ন হইয়া থাকে। মােহেই স্মৃতিশক্তির বিলােপ ঘটে। স্মৃতিবিহীন মনুষ্য অপদার্থে পরিণত, মুচ্ছিত বা মৃতের ন্যায় হয়। সুতরাং পরমার্থে তাহার কিছুমাত্র দৃষ্টি থাকিতে পারে না। বিষয়ের প্রতি অভিনিবেশ বশত: মসুষ্য জীবাত্মা ও পরমাত্মার স্বরূপ অবধারণে সমর্থ হয় না। বৃক্ষ যেমন রস শােষণ পূর্বক জীবিত থাকে জীবনের উদ্দেশ্যে প্রবেশ করিতে পারে না; তা যেমন কেবল পরের উত্তেজনার্থই কাৰ্য্য করিয়া থাকে, নিজের কোন স্বার্থানুসন্ধান করে না; তদ্রুপ লক্ষ্যহীন কাৰ্যাকাৰ্য্য বিবেকহীন ব্যক্তির জীবন ধারণ নিরর্থক। বেদাদিতে স্বৰ্গাদি ফল লাভ বিষয়ক অনেক উক্তি আছে বটে, কিন্তু কৰ্ম্মানুষ্ঠান দ্বারা সেই সকল ফলপ্রাপ্তিই যে জীবের পুরুষার্থ, তাহা নহে। কর্মে কুচি উৎপাদন জন্য তাহা কেবল প্রলােভন মাত্র। যেমন চিকিৎসক বালককে ঔষধ খাওয়াইবার জন্য তাহাকে লাভু দিয়া থাকেন , তপ পরমপুরুষার্থ মােক্ষ পরিশিষ্ট। ১২ লাভের উদ্দেশেই আপাতঃমনােরম ও সুখপ্রদ স্বর্ণদিভােগের লোেভ বেদাদিতে বিহিত হইয়াছে। পশু ও হিরণ্যাদি ভােগ্যপদার্থ, বলবীৰ্যসম্পন্ন স্বকীয় দেহ এবং পুত্র কলত্ৰাদি স্বজনগণই প্রকৃত প্রস্তাবে দুঃখের কারণ হইলেও মরণধৰ্ম্মশীল মােহান্ধ মানষ স্বভাবতই এই সমস্ত বিষয়ে নিরতিশয় প্রেম করিয়া থাকে। অতএব যাহারা যথেচ্ছ কৰ্ম্মানুষ্ঠানে কখন দেবাদি যােনি, কখনও বা অতি নিকৃষ্ট তামসিক বৃক্ষাদি বােনি লাভে নিরন্তর দুঃখের ভীষণ পথেই পরিভ্রমণ করিয়া থাকে, তাদৃশ অজ্ঞানাঙ্ক অথচ বেদবাক্যে বিশ্বস্ত ব্যক্তিগণকে সর্বজ্ঞ বেদ আবার কিরূপে বিষয়াসক্তিরই উপদেশ দিবেন? বেদের দৃঢ় অভিপ্রায় অবগত না হইয়া কতকগুলি বালকমতি নির্বোধ ব্যক্তি স্বর্গীদি ফলশ্রুতির প্রশংসা করিয়া তদুদ্দেশ্যেই কর্মে অগ্রসর হইয়া থাকে; কিন্তু সারজ্ঞ জ্ঞানী ব্যক্তিগণ সেরূপ ব্যক্ত করেন না। কামাকুলিতচিত্ত মানবগণই নিতান্ত সঙ্কোচমনা ও লােভপরতন্ত্র হয়। তাহারা পুষ্পস্থানীয় স্বর্গাদি ভােগকেই মােক্ষরূপ চরমফল জ্ঞান করত অগ্নিসাধ্য কৰ্ম্মে অভিনিবেশ পূৰ্ব্বক ভােগরূপ ধূমমার্গের অনুসরণ করে। স্বকীয় পরম তবের কোনরূপ অনুসন্ধান করে না। হে প্রিয় উদ্ধব ! : অন্ধকারে আবৃতলােচন পুরুষ যেমন নিকটবর্তী পদার্থকেও অবলােকন করিতে পারে না, সেইরূপ কৰ্ম্মশাস্ত্রাবলম্বনে প্রাণভর -তৎপর ভােগাভিলাষী মানবগণ যে পরাৎপর পরমেশ হইতেই এই জগৎ উৎপন্ন হয় এবং যিনি ইহার বিচিত্রতা সাধন করেন, সেই আমি অন্তর্যামীরূপে সকলের হৃদয়াকাশে সুপ্রতিষ্ঠিত থাকিলেও তাহারা কোন প্রকারে আমায় অবধারণ করিতে পারে না। এই সকল ব্যক্তি আমার অস্পষ্ট মত অবধারণ না করিয়া যদি হিংসাদি কাৰ্যেই রত হয়, তাহা হইলে ধৰ্ম্মাদির উৎকর্ষ সাধক যজ্ঞের হিংসা কেন না করিবে ? ক্রমশঃ হিংসাবৃত্তির উদ্রেকে হিংসাকাৰ্য্যই তাহাদের প্রিয়তম হইয়া উঠে। সুতরাং ঐ সমস্ত খল প্রকৃতি মানব আপনাদের সুখেচ্ছায় যজ্ঞে নিহত পশুগণের [১৭] শ্রীকৃষ্ণ। মাংস দ্বারা নিজেদের তৃপ্তি সাধন এবং যজ্ঞের দ্বারা পিতৃলােক, দেবতা ও ভুপতি গণের আরাধনা করিয়া থাকে। কেবল শ্রুতিসুখকর স্বপ্নেপম মিথ্যাভূত মায়াময় ক্ষণবিধ্বংসী স্বৰ্গাদি পর- লােকের প্রত্যাশায় এবং ঐহিক সুখাভিলাষ হৃদয়ে বহন করত বণিকের ন্যায় মূল সম্বল পরমার্থ তত্ত্বকেও বিসর্জন দেয়। যাহারা সত্ত্বাদি গুণত্রয়ের অন্তর্গত তাহারা উক্ত ত্রিগুণময় ইন্দ্রিয়াদি দেবতা- গণেরই আরাধনা করিয়া থাকে। সুতরাং গুণাতীত পূর্ণব্রহ্ম আমার আরাধনা করে না। এই জীবনে যজ্ঞাদির অনুষ্ঠানে দেবতাগণের অর্চনা করিয়া জীবনান্তে স্বর্গ- লোকে অতুল ঐশ্বৰ্য্য ভােগ করিব, অনন্তর পুণ্যক্ষয়ে তথা হইতে আগমন করত মর্ত্যধামে শ্রেষ্ঠকুলে জন্মগ্রহণ পূর্বক বিপুল ঐশ্বর্যশালী গৃহস্থরূপে বিহার করিব, এইরূপ পুষ্পসদৃশ রমণীয় বেদবাক্যের প্ররােচনায় প্রলুদ্ধ হইয়া দেহ গেহাদিতে আসক্তচিত্ত লােভপরতন্ত্র মানবগণের চিত্তে মদীয় ভগবদ্ভাবের বার্তা কিছুমাত্র স্থান পায় না। সনাতন বেদ যদিও কৰ্ম্ম, দেবতা ও ব্রহ্মভেদে কাণ্ডত্ৰয়ে বিভক্ত আছে বটে, কিন্তু পরমাত্মস্বরূপ পরমব্রহ্ম তাহার সর্বত্রই প্রতিপাদ্য বিষয়। ব্ৰহ্মই সকলের সার ও আত্মস্বরূপ। তদ্ব্যতীত অন্য কোন বস্তুই যে নাই, তাহাই সমগ্র বেদের প্রতিপাদনীয় অর্থ। ঋষিগণও পরােক্ষ বাদের পক্ষপাতী ; এবং প্রকৃত অর্থের অস্পষ্টতা প্রতিপাদন করাই আমার অভিপ্রায়। কর্মকাণ্ডে বিধি-বাক্যের দ্বারা যাহা কিছু বিধান করা হইয়াছে, দেবতা- কাণ্ডে মন্ত্র-বাক্যের দ্বারা যাহা কিছু প্রকাশ করা হইয়াছে এবং জ্ঞানকাণ্ডে নিষেধ-বাক্যের দ্বারা যাহা প্রতিষেধ করা হইয়াছে সে সকলই আমি! বেদের সার তাৎপৰ্য এক আমাতেই সন্নিবিষ্ট এবং ইহলােকে আমি ব্যতীত অন্য পৃথক জ্ঞাতাও আর কেহ বিদ্যমান নাই। আমিই জ্ঞাতারূপে সর্বত্র বিরাজ করিতেছি। বেদাদিতে আমারই কৰ্ম্মরূপ বিধান ও দেবতারূপ প্রকটন বিহিত হইয়াছে। এবং আমারই অসৎ স্বরূপের প্রতিষেধ পূৰ্ব্বক সৎ স্বরূপের প্রতিষ্ঠা সংস্থাপিত হইয়াছে। ইহাই বেদের অবধারণীয় তাৎপৰ্য্য। শব্দময় বেদ পরমার্থ-স্বরূপ পরিশিষ্ট। ১৩১ আমাকে অবলম্বন করিয়া মায়াময় দ্বৈতপ্রপঞ্চকে পরিহার পূৰ্ব্বক অদ্বৈতস্বরূপ মদীয় ভাব প্রতিপাদনেই শেষ হইয়াছে। । 1 অনাদি অবিদ্যাবিশিষ্ট জীবাত্মার আপনা হইতে আত্মজ্ঞানের উদয় হয় না। পরমাত্মা অজ্ঞানে উপহিত নহেন। তিনি স্বতঃসিদ্ধ জ্ঞানবান্ এবং জীবের জ্ঞানদাতা পরমেশ্বর। দেহের সম্পর্কে জীব ও ঈশ্বরের মধ্যে পরস্পরের কোনরূপ বৈলক্ষণ্য নাই। এতদুভয়ের ভেদকল্পনা সম্পূর্ণ নিরর্থক। সত্ত্বগুণ হইতে জ্ঞানের উদয় হয় সুতরাং জ্ঞানও প্রাকৃতিক গুণের মধ্যে গণনীয়। স্থিতি, উৎপত্তি ও লয়ের হেতুভূত সত্ত্বাদি গুণত্রয় প্রকৃতি হইতে সমুৎপন্ন হইয়াছে ; আত্মার সহিত উক্ত গুণগ্রামের কোন সম্পর্ক নাই। এই গুণত্রয়ের সাম্যাবস্থাই প্রকৃতি। অতএব সত্ত্বগুণের বৃত্তিস্বরূপ জ্ঞানও প্রাকৃতিক গুণ হইতে সমুৎপন্ন হওয়ায় গুণের অন্তভূতই স্বীকার করিতে হইবে। রজোগুণের বৃত্তি কাৰ্য্য করা এবং তমােগুণের বৃত্তিতে মােহস্বরূপ মূল অজ্ঞান আবশকে আনয়ন করে। রজঃ তম গুণ হইতে সমুৎপন্ন কৰ্ম্ম এবং অজ্ঞান প্রকৃতির ত্যন্তরস্থ বিবেচনায় তৎসঙ্গেই গণনীয়। এই গুণত্রয়ের সাম্যাবস্থার ব্যতিক্রম জনিত প্রধান গুণই কালরূপী ঈশ্বর। সূত্ৰ সংজ্ঞক মহত্তত্ত্বই জীবের স্বভাব বলিয়া পরিগণিত হয়। সুতরাং প্রকৃতি, মহত্তত্ব এবং ঈশ্বর এই ত্রিবিধকেই কেহ কেহ তত্ত্ব বলিয়া স্বীকার করেন। পুরুষ নামে জীব এবং ঈশ্বর এই উভয়কেই নির্দেশ করা যায়। অতএব পুরুষ, প্রকৃতি এবং প্রকৃতি হইতে পর্যায়ক্রমে মহত্তত্ব, অহঙ্কার, আকাশ, বায়ু তেজঃ, আপ ও ক্ষিতি এই নয়টীকে আমি তত্ত্ব বলিয়া উল্লেখ করিয়াছি। চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা ও ত্বক পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয়। বাক্, পাণি, পাদ, পায়ু ও উপস্থ-পঞ্চ কৰ্ম্মেন্দ্রিয় এবং উভয়াত্মক মন এই একাদশটাকে আমি তত্ত্ব বলিয়া প্রকাশ করিয়াছি। এতদ্ব্যতীত শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস ও গন্ধ এই পাঁচটি ইন্দ্রিয়ের বিষয় এবং s ন ১৩২ গতি, উক্তি, মল ও মূত্ৰাদি ত্যাগ এবং শিল্পাদি কৰ্ম্মেন্দ্রিয়ের কাৰ্য্য সমূহকে আর পৃথক তত্ত্ব বলিয়া অবধারণ করা যায় না। আকাশাদি পঞ্চমহাভূত এবং মন সহ একাদশ ইন্দ্রিয় এই বােড়শটা কাৰ্য্য ; মহত্ত্ব, অহঙ্কার এবং পঞ্চতন্মাত্র এই সাতটী কারণ স্থানীয়; এই উভয়ে মিলিত এয়ােবিংশতি তত্ত্বের কারণীভূতা প্রকৃতিই সৰ্বাদিগুণত্রয়ের তারতম্যে সৃষ্ট পদার্থের স্বরূপ ধারণ করে। কিন্তু পুরুষ কোন ভাবে পরিণত না হইয়া কেবল সাক্ষীভাবে অবস্থান করেন মাত্র। মহদাদি যে সমস্ত ব্যক্তভাব প্রকৃতি হইতে উৎপন্ন হয় , তাহারা কেবল পুরুষের ঈক্ষণ মাত্রেই সামর্থ্য লাভে পরস্পরে মিলিত হইয়া পরিণতি প্রাপ্ত হয় এবং প্রকৃতির সাহায্যরূপ বলের দ্বারা এই ব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টি করিয়া থাকে। আকাশাদি পঞ্চ মহাভূত, জ্ঞানস্বরূপ দ্রষ্টা জীব এবং এতদুভয়ের আধারভূত পরমাত্মা এই সাতটী পদার্থকেই জগতের মূল কারণতত্ত্ব বলিয়া কেহ কেহ নিরুপণ করিয়াছেন। এই মীমাংসায় প্রকৃতি প্রভৃতি কারণরূপে এবং ইন্দ্রিয়গ্রাম এই সাতটীর অন্তরে নিহিত আছে বলিয়াই তাহাদের আর পৃথক গণনা করা হয় না। এই সাত তত্ত্ব হইতেই দেহ, ইন্দ্রিয় ও প্রাণাদি উৎপন্ন হইয়া থাকে। যাহারা সৰ্বসমেত ছয়টি তত্ত্ব স্বীকার করেন, তাহাদের মতে পঞ্চ মহাভূত ও পরমপুরুষ এই ছয়টাই তত্ত্বৰূপে স্বীকাৰ্য। সেই পরমপুরুষ স্বকীয় স্বরূপ হইতে সমুৎপন্ন আকাশাদি সহ একত্র মিলিত হইয়া এই ব্রহ্মাণ্ড সৃজন করেন এবং জীবরূপে নিজেই অন্তৰ্য্যামিভাবে তদন্তরে প্রবিষ্ট হন। যেস্থলে কেবল চারিটা মাত্র তত্ত্ব স্বীকৃত হইয়াছে, সেস্থলে পরমাত্মার স্বরূপ হইতে উৎপন্ন আপ, অন্ন, তেজঃ ও আত্মা এই চাৰিটীকেই মাত্র লক্ষ্য করা হইয়াছে। এই চারিটী দ্বারাই এই অবয়ববিশিষ্ট স্কুল ব্রহ্মাণ্ডের জন্ম হইয়াছে, এইরূপই স্বীকার্য। সপ্তদশ সংখ্যক তত্ত্বের স্বীকারে আকাশাদি পঞ্চমহাভূত, শাদি পঞ্চতন্মাত্র, শ্ৰোত্রাদি পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয়, মন এবং আত্মা এই সপ্তদশ পদার্থকেই তত্ব বলিয়া স্বীকার করা হইয়াছে। যাহারা যােড়শ পদার্থ স্বীকার করিয়াছেন, তাঁহাদের মতে সংকল্পকারী মনের মধ্যেই পরিগণিত হইয়াছে। মনের অতিরিক্ত জীবকে আর পরিশিষ্ট ১৩৩ পৃথক তত্ত্ব বলিয়া স্বীকার করেন না। তত্ত্ব ত্রয়ােদশ বলিয়া যাহারা স্বীকার করেন, তাহারা তন্মাত্র ও পঞ্চমহাভূতকে একভাবে গ্রহণ করেন। এই পঞ্চ- ভূত, পঞ্চজ্ঞানেন্দ্রিয়, মন ও জীবের ভেদে দ্বিবিধ আত্মা, তাহাদের মতে এই ত্রয়ােদশ তত্ব। কেহ কেহ পঞ্চমহাভূত, পঞ্চজ্ঞানেন্দ্রিয় এবং আত্মা এই একাদশ তত্ত্ব স্বীকার করেন। নটী তত্ত্ব বলিলে অষ্ট প্রকৃতি এবং এক পুরুষ এই নয়টাকেই বুঝায়। এই প্রকারে ঋষিগণ ভিন্ন ভিন্ন প্রণালীতে যিনি যতই বিভিন্ন তত্ত্বের সংখ্যা করিয়াছেন তাহাদের সমুদয়ই ন্যায়সঙ্গত ও যুক্তিযুক্ত হওয়ায় কোনটাই অসঙ্গত নহে। উদ্ধব কহিলেন-হে কৃষ্ণ! জড় ও অজড় ভেদে প্রকৃতি ও পুরুষ পরস্পর সম্পূর্ণ বিভিন্ন; কিন্তু পরস্পর পরস্পরকে পরিত্যাগ করিয়া কখন না থাকায় তাহাদের ভেদ কখনও পরিলক্ষিত হয় না। প্রকৃতির কাৰ্য দেহে আত্মার উপলব্ধি এবং আত্মাতে দেহাদি প্রকৃতিরও উপলব্ধি হইয়া থাকে। হে ভগবন্! এই সংসারপ্রবাহে পতিত জীবগণের পরমার্থ জ্ঞান কেবল আপনার প্রসাদেই ঘটিয়া থাকে এবং ভবদীয় অবিদ্যাশক্তির প্রভাবেই জীব- গণ জ্ঞানভ্রষ্টের ন্যায় বিচরণ করে। স্বীয় মায়ার সামর্থ্য আপনি বিলক্ষণ অবগত আছেন। আপনি ব্যতীত অন্য কেহই তাহার যাথার্থ্য নির্ধারণে সমর্থ হয় না। ভগবান কহিলেন, হে পুরুষশ্রেষ্ঠ উদ্ধব! পুরুষ ও প্রকৃতির মধ্যে বিলক্ষণ পার্থক্য আছে। কারণ এই যে, দেহ, ইন্দ্রিয় ও অন্তঃকরণাদির মিলনে উৎপন্ন গুণক্ষোভকৃত জন্মাদি নানা বিকারবিশিষ্ট সৃষ্টি অবলােকন করিতেছ, এই সমস্তই মদীয় গুণময়ী প্রকৃতি, গুণত্রয়ের বৈষম্যে নানাভাবে ও কল্পনায় প্রস্তুত করিয়া থাকেন। এই বিকারও, -অধ্যায়, অধিভূত ও অধিদৈব ভেদে ত্রিবিধভাবে বর্ণিত হয়। যথা, দৃশক্তি চক্ষুকে অধ্যাত্মনামে, তাহার বিষয় রূপকে অধিভূত নামে, এবং চক্ষুর আশ্রয় গােলকরন্ধে, অধিষ্ঠিত সূৰ্যাংশস্বরূপ দিবাকরকে অধিদৈব ১৩৪ শ্রীকৃষ্ণ। নামে অভিহিত করা হয়। এ স্থলে এই তিনের পরস্পর সম্বন্ধ থাকিলেও সূর্যদেব যেমন অবিবােধে নভােমণ্ডলে অবস্থান করেন, সেইরূপ যিনি এই সমষ্টি অধ্যাত্মাদির কারণস্বরূপ আদিভৃত পরমাত্মা, তিনি এই সমগ্ৰ বিকার হইতে সম্পূর্ণ পৃথক থাকিয়াও সকল সিদ্ধির প্রকাশবিধানে স্বকীয়স্বরূপে স্বপ্রকাশভাবে অবস্থান করেন। যেমন চক্ষুর সম্বন্ধে অধ্যাত্মদি ভাবের নিরূপণ করা হয়, ত্বগাদিতেও, তদনু- রূপ ধারণা করা বিধেয়। যথা ত্বশক্তি-অধ্যাত্ম, স্পর্শতন্মাত্র অধিভূত এবং তদধিষ্ঠাত্রী বায়ুদেবতা ইহার অধিদৈব। শ্রবণশক্তি—অধ্যাত্ম, শব্দতন্মাত্র অধিভূত এবং তদধিষ্ঠাত্রী দিকসমূহ অধিদৈব। জিহ্বাশক্তি—অধ্যাত্ম, বস- তন্মাত্রা অধিভূত এবং বরুণ ইহার অধিষ্ঠাত্রী দেবতা। নাসাশক্তি-অধ্যাত্ম, গন্ধতন্মাত্র অধিভূত এবং অশ্বিনীকুমার ইহার অধিদৈব। সেইরূপ চিত্ত—অধ্যাত্ম, চেতয়িতব্য বিষয় তাহার অধিভূত এবং বাসুদেব অধিদৈব। তদ্রুপ মনেরও মননশক্তি, মন্তব্য বিষয় ও চন্দ্র ; বুদ্ধির শক্তি, বােধব্য বিষয় ও ব্রহ্মা এবং অহঙ্কারের শক্তি, বিষয় ও রুদ্রদেবতাকে পৰ্যায়ক্রমে অধ্যাত্ম, অধিভূত ও অধিদৈব ভেদে নিরুপণ করা কর্তব্য। গুণত্রয়ের বৈষম্যকারী পরমেশ্বর বা কালের প্রতাপে মূলকারণ উপাদানভূত। প্রকৃতি হইতে প্রথম প্রসূত মহতত্ত্ব সাত্ত্বিক, রাজসিক ও তামসিক ভেদে যে অহঙ্কার তত্ত্ব উৎপাদন করে, সেই প্রধান বিকারই প্রধান বিকারই স্বরূপ জ্ঞান আবরণ করত, আমি দেবতা বা মনুষ্য ইত্যাদি বিবেচনায় ভেদজ্ঞানের কারণ ঘটায়। কিন্তু যাতীয় ভেদের মূলে অবস্থিত যে পরমার্থভূত আত্মা দেবমনুষ্যাদি ভেনিষ্ঠ দেহের অন্তরে অবস্থান করিয়াও ভেদাতিরিক্ত ভাবে বিরাজমান করেন , কেবল তদ্বিষয়ক জ্ঞানের অভাবেই তৎসম্বন্ধীয় অস্তি নাস্তি প্রভৃতি ভেদজ্ঞান উপস্থিত হয়। আত্মসাক্ষাৎকারের উদয়ে ঐ বিবাদ রূপ ভ্রমের নিবৃত্তি হয়। কিন্তু সাক্ষাৎ সম্বন্ধে জীবের স্বরূপভূত এই পরমাত্মভাবের অবধারণে পরাজুখ জনগণের বুদ্ধি কখনও এই ভ্রমের হস্ত হইতে নিষ্কৃতি পায় না। উদ্ধব বলিলেন, হে প্রভাে! ভবদীয় স্বরূপ অবধারণে পরায়ুখ জনগণ পরিশিষ্ট ষেরূপে স্বকৃত কর্মের দ্বারা উৎকৃষ্ট ও অপকষ্ট দেহাদি লাভ করে এবং তােগান্তে আবার তাহা বিসর্জন করে, আত্মতত্ত্বে অভিজ্ঞ ব্যক্তিগণ যাহা অবধারণে সম্পূর্ণ অযোগ্য অনুগ্রহ পূর্বক তাহা কীর্তন করুন। আপনার মহামায়ায় প্রায় সকল লােকই জ্ঞানে বঞ্চিত হইয়াছে। আপনার পরম জ্ঞান ধারণা করে জগতে এমন লােক ননগােচর হয় না। . ভগবান্ বলিলেন, পঞ্চ কৰ্ম্মেন্দ্রিয়, পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয় এবং পঞ্চ তন্মাত্র এই পঞ্চদশ অবয়ব বিশিষ্ট জীবের মনােময় কর্মপ্রধান লিঙ্গদেহ এক দেহ পরিত্যাগ করিয়া মরণান্তে অন্য দেহ অাশ্রয় করে। জীবস্বরূপ আত্মা এই লিঙ্গ দেহ হইতে সম্পূর্ণ পৃথক হইলেও মনেরই অনুগমন করিয়া থাকে। কৰ্ম্মসংস্কারের বশবর্তী মন বেদাদিতে শ্রুত বা জগতে দৃষ্ট বিষয়ের অনুসরণে আকুল হইয়া বর্তমান দেহাদি বিষয়ের স্মরণে নিরস্ত এবং উপস্থিত বিয়য়ে আসক্ত কোনরূপ কৰ্ম্মসংস্কারের বশে উপস্থিত দেবতিযগাদি শরীরে আসক্তি বশতঃ অভিমানপূর্বক মন পূৰ্ব দেহাদিকে যে স্মরণ করে না, এই অত্যন্ত বিশ্বতির নামই সেই দেহ সম্বন্ধে জীবের স্বপ্নদর্শনকালে বা মনােময় কল্পনার স্রোতে ভাসমান হইয়া জীব যেমন স্বাপ্নিক দেহাদিতে আত্মভাবের অভেদ চিন্তায় তন্নিষ্ঠ সুখ ও দুঃখাদিতেই অভিভূত হয়, সেইরূপ বর্তমান দেহ বিস্মৃত হইয়া অভিমানবশতঃ অন্য দেহে আত্মভাবের অভেদ চিন্তাতেও জীবের মৃত্যু উপস্থিত হইয়া থাকে। স্বপ্নকালে যেমন কল্পনাপ্রবাহে পুরুষ নিজের বৰ্তমান দেহাদিকে স্মরণ করে না, এবং জাগ্রত দেহের স্থায় স্বাপ্নিক দেহের ভাবেই চালিত হয়, সেইরূপ জীব মৃত্যুতে এক দেহ হইতে দেহান্তরে গমন করে। মানব স্বপ্নকালে উৎকৃষ্ট বা নিকৃষ্ট কাল্পত দেহে অভিমান বশত তদুচিত সুখ দুঃখাদি ভােগ করে। সেইরূপ ইন্দ্রিয়পণের আশ্রয়ভূত সৃষ্ট দেহে মৃত্যুকালে কল্পনা করত জীব সাত্ত্বিক, রাজসিক বা তামসিক এই তিন প্রকার দেহ আশ্রয় করিয়া সংসার ভােগ করিয়া থাকে। হে প্রিয় উদ্ধব! এই দেহ সমূহের উৎপত্তি ও ধ্বংস প্রতিক্ষণেই ১৩৬ শ্রীকৃষ্ণ। ঘটিতেছে; কিন্তু অতি সূক্ষ্ম অলক্ষ্যবেগ কালের প্রভাবে তাদৃশ উৎপত্তি ও বিনাশ অবিবেকিগণ কিছুতেই অবধারণ করিতে পারে না। যেমন কাঠাদি দ্বারা প্রজলিত হতাশন প্রচণ্ড আকার ধারণ করিলেও কাঠারি ক্ষয়ে তাহার পরিণাম অবগত হওয়া যায়; যেমন প্রবল জলস্রোতে জলেব ক্রমশঃ হ্রাস দেখিয়া তাহার পরিণাম উপলব্ধি করা যায় এবং বৃক্ষাদির ফলপ্রসূশক্তির যেমন ক্রমশঃ হ্রাস ঘটিয়া থাকে, তদ্রপ দেহের বয়স ও অবস্থাদির বিষয় লক্ষ্য করিলে স্পষ্টই দেখা যায় যে জীবের অলক্ষ্যে দেহ নানা ক্ষয়ের মধ্য দিয়া ক্রমশঃ মৃত্যুর মুখগহ্বরে প্রবেশ করিতেছে। [ আস্বাদন :- যৌবনলাভে আনন্দের উদয় হয় বটে, কিন্তু বাল্যের ক্ষয়ে শেষ মৃত্যু যে নিকট হইতেছে জীব তাহা ভ্রমেও অনুভব করে না। দীপ কখন অ%ি; অর্থাৎ অগ্নি নহে এবং স্রোতও কখন জল নহে। তবে ব্যবহারিক কথায় দীপকে আলাে বা জলকে স্রোত নামে অভিহিত করা হয় । তদ্রুপ দেহ দর্শন করিয়া তাহাকে পুরুষ নামে অভিহিত করিলে তাহা কেবল পরমার্থ দৃষ্টিহীন অবিবেকী ব্যক্তির বৃথা বাক্যব্যয় ও অল্প বুদ্ধিরই পরিচয় দেয় মাত্র। আস্বাদন :- [ দীপ দর্শনে অগ্নি জলার অস্তিত্ব এবং জল দর্শনে স্রোতের কল্পনা করা হয় বটে; কিন্তু মুহূর্ত মধ্যে তাহাদের যে কত পরিবর্তন হইতেছে, তাহা কেহই লক্ষ্য করে না। সেইরূপ দেহ দেখিয়া তাহার অস্তিত্ব স্বীকার করা হইলেও প্রতি পলকে প্রতি নিমেষমাত্র কালে দেহগত অবয়বাদির যে কত পরিবর্তন ঘটে তাহা ক্ষুদ্রবুদ্ধি দর্শক কখন অনুমান করিতেও পারে না। প্রবল স্রোতে জলরাশি নিমেষ মধ্যে কোথায় চলিয়া যায় এবং অন্য স্থানের জল তথায় আসিয়া উপস্থিত হয় ; দীপের বর্তিকা বা বাতি বা সলিতা আশ্রয় করিয়া অফিঃ বা অগ্নি কত তৈলকে অগ্নিতে পরিণত করিয়া শূন্তে বিলীন হইতেছে। তাহার সংবাদ সামান্য দর্শক যেমন কিছুমাত্র রাখে না। তদ্রুপ নিমেষ মধ্যে দেহের কত অংশ বিনষ্ট হইয়া অন্নাদির সাহায্যে কত অংশ উপচিত হয়, সাধারণ পরিশিষ্ট। ১৩৭ যাবতীয় জয় মানব তাহার কোন সংবাদই রাখে না। শুধু জীব দেহ কেন ? দৃশ্য জগতের নিরন্তর উৎপত্তি ও বিনাশ কাল সহকারে অবিরাম ঘটিতেছে, অথচ অপরিণামদর্শী মানব তাহাকে চিরস্থায়ী বলিয়া মনে করত বাক্যেও তাহা প্রকাশ করিতেছে। মা স্বস্ত কৰ্ম্মবীজেন জায়তে সােহপ্যয়ং পুমান্। মিয়তে চামরাে ভ্রান্ত্যা যথাগ্নিদারুসংস্থিত। কেবল বীজভূত কৰ্ম্মসংস্কার অনুসারেই যে জীবের জন্ম ও মৃত্যু ঘটে তাহা নহে, তদ্ব্যতীত অপর একটী আশ্রয়ের প্রয়ােজন আছে ; তাহার নামই অজ্ঞান বা মায়া। তেজস্তত্ব সাধারণতঃ সৰ্বত্ৰ নিত্য বিদ্যমান থাকিলেও যেমন কাষ্ঠের সংযােগ বিয়ােগ দ্বারাই অগ্নিকে উৎপন্ন ও বিনষ্ট বলিয়া প্রতীত হয়, সেইরূপ অজ্ঞানতা নিবন্ধন দেহাদির অধ্যাস ( আরােপ) বশতঃই জন্ম মৃত্যু বিরহিত পরমার্থস্বরূপ আত্মারও জন্ম ও মৃত্যু কল্পিত হইয়া থাকে মাত্র। নিষেকগর্ভজন্মানি বাল্যকৌমারযৌবনং। বয়ােমধ্যং জরা মৃত্যুরিত্যবস্থাস্তনােনব। মাতৃগর্ভে প্রবেশ, অনন্তর বৃদ্ধি, তৎপরে জন্ম, তদনন্তর বাল্য, কৌমার, যৌবন, প্রৌঢ়, এবং তৎপরে বার্ধক্য, তদনন্তর মৃত্যু। এই নববিধ অবস্থা এক দেহেই অভিব্যক্ত হইয়া থাকে। আত্মার সহিত ইহার কোন সম্পর্ক নাই। এ মনােরথময়ী হ স্যোচ্চাবচাস্ত। গুণসঙ্গাপাদত্তে কচ্চিৎ কশ্চিজ্জহাতি চ । মানসিক সংস্কারভাবের তারতম্যেই উৎকৃষ্ট বা অপকৃষ্ট দেহের সৃষ্টি হইয়া থাকে। আত্মা দেহ হইতে সম্পূর্ণ পৃথক ; কেবল দেহাদিতে আত্মভাবের ভাবনা বশতঃই কখন তাদৃশ দেহকে গ্রহণ করেন, আবার পরে ভগবদনুকম্পায় তাহা পরিহারও করেন। পিতার মৃত্যু এবং ঔদ্ধদৈহিক ক্রিয়া দ্বারা ধ্বংস দর্শনে এবং পুলের জন্ম ও জাতকৰ্ম্মাদি নিরীক্ষণ পূর্বক উৎপত্তি অবলােকন করিলে স্বীয় দেহের যে উৎপত্তি হইয়াছে এবং কালক্রমে যে তাহার বিনাশ ঘটবে, তাহা স্পষ্টতঃই অবধারণ করা [১৮] শ্রীকৃষ্ণ। * 4 দেহের উৎপত্তি ও ধ্বংস যিনি অবধারণ করেন সেই আত্মা, নিশ্চয়ই দৃশ্য দেহ নহে। তিনি যে জন্মমরণাদি অবস্থার অতীত ও নিত্য: বিদ্য, সে বিষয়ে আর সন্দেহ নাই। তােৰীজবিপাকাভ্যাং যাে বিদ্বান্ জম্মসংযমৌ। ভরােৰ্বিলক্ষণে দৃষ্ট এবং দ্রষ্টা তনােঃ পৃথক। বীজ অঙ্কুরিত হইয়া তরুর জন্ম হয় এবং ফলােৎপাদনের পর সেই বৃক্ষের ধ্বংস ঘটে। যে ব্যক্তি এই উভয় অবস্থা আদ্যোপান্ত অবলােকন করে, সে যেমন সেই বৃক্ষ হইতে সম্পূর্ণ ভিন্ন দ্রষ্টারূপে পরিদৃষ্ট হয়, সেইরূপ দেহের তত্ত্বাবধারণকারী ক্ষেত্রজ্ঞ জীবও যে দেহ হইতে সম্পূর্ণ ভিন্ন তাহাতে আর সন্দেহ নাই। প্রকৃতেরেমাত্মানমবিবিচাবুধঃপুমন্।ি তনে স্পর্শসংমূঢ়ঃ সংসারং প্রতিপছতে। এই প্রকারে প্রকৃতির স্তর হইতে আপনাকে ভিন্ন বলিয়া অবধারণে অক্ষম স্বরূপানভিজ্ঞ পুরুষ পারমার্থিক দৃষ্টিতে দৃশ্যরূপ দেহাদি বিষয় সমূহে আসক্ত হইয়া জন্মমরণরূপ সংসার-স্রোতে পতিত হয়। সত্ত্বসঙ্গাদৃষীন্ দেবান জসাসুরমানুষ। তমসা ভূততিক্ত, ভ্রামিতাে যাতি কৰ্ম্মভিঃ । সত্ত্বগুণের কার্য্য, শমদমাদিত অভিনিবেশ বশতঃ তদনুরূপ সাত্ত্বিক কর্মের অনুষ্ঠানে চালিত জীব, দেব বা ঋষি যােনিতে জন্মগ্রহণ করেন ; তদ্রুপ রাজসিক কৰ্ম্মের দ্বারা অসুর বা মনুষ্য যােনিতে এবং তমােগুণের প্রেরণায় তামসিক কার্যের অনুষ্ঠানে পিশাচ ও নারকীয় তীৰ্য্যগ, যােনিতেই জন্মগ্রহণ করিয়া থাকে। যেমন অপরের নৃত্যগীত ও তানবাগাদি দর্শনে অন্য ব্যক্তি মনে মনে তাহার অনুকরণে ভালমন্দ বিচার করেন। তাঁথচ নিজে সেই, সেই কাৰ্যে ব্যাপৃত হন সেইরূপ আত্মা নিষ্ক্রিয় হইলেও বুদ্ধিকৃত ব্যাপার, দর্শনে আপনি যে তঁাহার অনুকরণে আসক্ত হন মাত্র। আস্বাদন ( অবিদ্যার প্রতি দৃষ্টি কৰিবামাত্র পুরুষ আত্মস্বরূপ বিস্মৃত হন এবং প্রকৃতি- তাকে অনুপাতে রোপ করিয়া প্রকৃতির ভাবে নাম প্রকারে বিভূষিত হন। * না ; } পরিশিষ্ট। ১৩৯ প্রকৃতির গুণানুসারে বিভিন্ন যােনিতে জন্মগ্রহণ করেন। বস্তুতঃ 'স্বয়ং 'শিকার বজ্জিত হইয়াও বিশ্বতের ন্যায় প্রতীয়মান্ হন।] মৌকাররাহণে নদীর তীব্র স্রোতে গমনকালে তীরস্থ তরুরাজি বিপরীত দিকে গমন করিতেছে বলিয়া যেমন প্রতীয়মান হয়, যেমন মস্তিষ্কের পীড়া নিবন্ধন দৃষ্টিশক্তির বিভ্রমে গৃহক্ষেত্রাদিকে ঘূর্ণিত বলিয়া বােধ হয়, সেইরূপ বুদ্ধি প্রভৃতি দেহের বিকারে আত্মাকে বিকৃত বলিয়া প্রতীত হয় মাত্র। মনোময় কল্পনাজাল এবং স্বপ্নদৃষ্ট পদার্থাবলি যেমন 'প্রকৃত প্রস্তাবে মিথ্যা বলিয়াই অবধারিত হয় ; হে উদ্ধব! 'তাত্মার বিষয়ানুভবরূপ সংসারঙ্গশা 'সেইরূপ কেবল দেহাদিতে আত্মস্বরূপের অধ্যাসে ( আরােপে) ঘটে মাত্র। নিদ্রিত পুরুষের সন্নিধানে কোন প্রকার বস্তু না থাকিলেও কেবল মনোময় ভাবই বস্তুরূপে স্বপ্নদ্রষ্টার নিকট যেরূপ অবভাসিত হয় ; তদ্রুপ পদার্থ না থাকিলেও মনে মনে পদার্থের চিন্তা করাতেই তন্নিষ্ঠ সুখদুঃখাদিতে আত্মস্বরূপ জীবের সংসার আনয়ন করিয়া থাকে। অতএব হে উদ্ধব ! নরকপাতনের প্রধান কারণীভূত অসদিন্দ্রিয়গণের দ্বারা আর বিষয় সম্ভোগ করিও না। অধিষ্ঠানভূত আত্মস্বরূপের অবধারণ করিতে অক্ষম হওয়াতেই এই সুখদুঃখাদি বৈকল্পিক ভ্ৰম উপস্থিত হয়। যদি দুৰ্জ্জন ব্যক্তিগণ কর্তৃক আক্ষিপ্ত, তিরস্কৃত, উপহসিত এবং অনর্থক নিন্দিতও হও, কি তাহারা যদি তােমার জীবিকাও ব্যাঘাত করে, তােমাকে বিতাড়িত বা বিষয় হইতে বঞ্চিত করে ; অধিক কি, যদি তােমার দেহ বিষ্ঠা- মূত্রাদি দ্বারাও প্রলিপ্ত করে তথাপি মূৰ্থ অসৎ লোকদিগের উৎপীড়নে আত্মনিষ্ঠা হইতে কখনও বিচলিত হওয়া বা তজ্জন্য মনােমধ্যে ক্লেশনুভব করাও কর্তব্য নহে। মুক্তির কামনা থাকিলে বিশেষ ধৈৰ্য্য সংস্কারে আপনাকে ভগবচ্চিন্তনে পরিমিষ্ঠিত রাখা সৰ্বলতভাবে বিধেয়। উদ্ধৰ বলিলেন, হে ভগবন্! বিশ্বপতৈ! ভবদীয় অবিদ্যারূপা প্রকৃতিশভিঃ অতি প্রবল; ভবদীয় পবিত্র গুণকথা শ্রবণ মননাদি ধর্মে মনােনিবেশ পূৰ্ব্বক ক্রোধন্বেষাদি দোয পরিহার পূর্বক যাহারা আপনাব শ্রীচরণে শরণাগত হইয়াছেন তাদৃশ লােক ব্যতীত এই সকল অত্যাচার অঙ্গে কেহ কখনও সহ করিতে পারে না। কৃষ্ণ বললেন হে বৃহস্পতি-শিষ্য 'উদ্ধব ! তুমি যে বলিয়াছ দুর্বিনীত ১৪০ শ্রীকৃষ্ণ। ~~~~~~~ ব্যক্তিগণের দুৰ্বাক্যবাণে বিতাড়িত মনকে সমাহিত করিতে পারে এমন সাধু ত জগতে নয়ন গােচর হয় না, ইহা সত্য বটে। কারণ অসৎ ব্যক্তিগণের মর্য- বিদারক পরুষবাণী যেমন হৃদয়কে বিদীর্ণ করে, প্রকৃত প্রস্তাবে মৰ্ম্মবিদারক বাণে বিদ্ধ হইলেও লােকে কখনও তাদৃশ বেদনা অনুভব করে না। ইহা বলিয়া ভগবান্ শ্রীকৃষ্ণ উদ্ধৰকে দুরাত্মাগণের দ্বারা বিবিধ প্রকারে উৎপীড়িত অত্যন্ত যন্ত্রণাপ্রাপ্ত এক অতি সহিষ্ণু যােগীর উপাখ্যান বলিলেন। উপাখ্যানটী অতি সংক্ষেপে এই যে, মালব প্রদেশে কৃষি বাণিজ্য প্রভৃতি দ্বারা অতি ধনশালী এক কৃপণ ব্রাহ্মণ ছিলেন। ধন নিজেও ভােগ করেন নাই এবং কাহাকেও ভােগ করিতে দেন নাই। তজ্জন্ত তাহার আত্মীয় স্বজনও তাহার প্রতি সন্তুষ্ট ছিল না। ক্রমশঃ তাহারা বলপূর্বক তাহার ধন হরুণ করিতে প্রবৃত্ত হইলে ব্রাহ্মণ অতি অনুপায় ও নিঃস্ব হইয়া অগত্যা বৈরাগ্য অবলম্বন করিলেন। বিপুল দুঃখে গৃহ হইতে বহির্গত হইয়া ব্রাহ্মণ অন্য কোন সহায় না পাইয়া ভগবানের স্মরণে অনির্দিষ্ট পথে চলিতে লাগিলেন। মানুষ যখন ধনজন বলশূন্য ও নিতান্ত নিঃস্ব হইয়া পড়ে তখন স্বভাবতঃই ভগবানে তাহার নির্ভবত আসে। তখন সে ত্রিজগতে “যাহার কেহ নাই তাহার তুমি আপনার !” বলিয়া তাহারই শরণাপন্ন হয়। তখন সে প্রতি কাৰ্যে প্রতি পদে তাঁহার সাহায্য সহানুভূতি,এমন কি তাহাকে অস্পষ্ট ছায়া বা রক্ষকরূপে অনুমান বা অবধারণ করত অতুল উৎসাহে তাহাতে মজিয়া যায়। ব্রাহ্মণের তাহাই হইল—ব্রাহ্মণ অসহায়ের সহায়ের সন্ধান পাইয়া জগদেকশরণ্য ভগবানে মজিয়া যত্র তত্র তাহারই ধ্যান ধারণায় নিমগ্ন থাকিতেন। এই অবস্থায় কত অসৎ ব্যক্তি কত যন্ত্রণা দিয়া তাহাকে উৎপীড়িত করিত, খাদ্য দ্রব্য অপবিত্র করিয়া দিত, কিন্তু ব্রাহ্মণ ভগবানে মন রাখিয়া অনায়াসে সকলই সহ করিতেন। ব্রাহ্মণ ধনজনহারা সহায়সম্পদশূন্য হইয়া প্রথমতঃ মনে মনে এইরূপ চিন্তা করিলেন যে, ধনার্জনে বিবিধ ক্লেশ ও চিন্তা আছে ; তাহার রক্ষার জন্যও ভয় ও যথেষ্ট দুশ্চিন্তা আছে ; তাহাতে প্রাণ হানিরও সম্ভাবনা। বিষয়ভােগের জন্য মানুষকে চুরি, হিংসা, মিথ্যা, দম্ভ, কাম, ক্রোধ, গৰ্ব্ব, মত্ততা, বৈষম্যদৃষ্টি, বৈরতা, স্পর্ধা, অসূয়া এবং স্ত্রী, দুত ও মদ্যপান এই পঞ্চদশ প্রকার অনর্থমধ্যে পতিত হইতে হয়। ।

পরিশিষ্ট ১৪১ পিতামাতা, পুত্র কলত্র, ভ্রাতা ও বন্ধু প্রভৃতি সকলের সহিতই ধন সম্পদ লইয়া কলহ উপস্থিত হয়। অতি স্নেহের পাত্রও শত্রু হইয়া দাঁড়ায়। ধনলােভে যাহারা প্রলােভিত হয় তাহারা অতি সামান্য কারণেও ধনবাকে হত্যা করিতেও কুষ্টিত হয় না। মনুষ্যজীবন দেবতাগণেবও প্রার্থনীয়। তন্মধ্যে আবার শ্রেষ্ঠ ব্রাহ্মণকুলে জন্মগ্রহণ করিয়া যে ব্যক্তি তাহার মর্যাদার প্রতি উপেক্ষা করত মুক্তিসাধনে যত্নবান না হয়, সে নিশ্চয়ই নিরম্নগামী হয়। জীবজগতে মানবযােনিই স্বর্গ ও মুক্তিলাভের শ্রেষ্ঠ দ্বার। তাদৃশ যােনি প্রাপ্ত হইয়া কোন্ বিবেকী পুরুষ দেহের অকিঞ্চিৎকরত্ব-ক্ষণবিধ্বংসিত্বের প্রতি লক্ষ্য করিয়াও অনর্থের আশ্রয়ীভূত ধনাদিতে আসক্ত হইয়া থাকে ? ভগবান্ কৃপা করিয়া বলপূৰ্ব্বক আমার ধন হরণ করাইয়া আমায় শ্রীচরণে স্থান দিয়াছেন। ইহা চিন্তা করিয়া ব্রাহ্মণ একান্তমনে সর্বপ্রকার দুঃখ, ত্যাগ করিয়া ভগবানের চিন্তায় আত্মনিয়ােগ করিলেন। হে উদ্ধব ! দান, স্ব স্ব বর্ণাশ্রমমাচিত কর্মের অনুষ্ঠান, যম, নিয়ম, অধ্যয়ন, তীর্থাদিতে গমন, একাদশ্যাদি ব্রতের অনুষ্ঠান এবং অন্য যে কোন ধর্ম সম্বন্ধীয় কাৰ্যের উল্লেখ শান্ত্রাদিতে দেখিতে পাওয়া যায়, মনের নিগ্রহ পৰ্য্যন্তই সেই সমুদায় কৰ্ম্মের বিধান। কারণ মনের নিগ্রহই পরমযােগ এবং জ্ঞান বলিয়া অভিহিত হইয়াছে। যে ব্যক্তির মন সমাহিত ও শান্তভাব অবলম্বন করিয়াছে, তাহার আর দানাদি নিত্য নৈমিত্তিক কর্মের প্রয়ােজন নাই। আর যদি দানাদি সৎকর্মের অনুষ্ঠানে মনের সংযম না হইয়া আলস্যাদিতে বৃথা সময় নষ্ট করে, তবে তাহার এই দানাদি পুণ্য কৰ্ম্ম দ্বারাও কোন ফল হয় না। ব্ৰহ্মাদি যে কোন দেবতা সকলেই মনের অধীন; অথচ মন কাহারও পরতন্ত্র নহে। মন সর্ব প্রধান। দেবতঃ সকলের অপেক্ষাও বলবান্ এবং ভয়ঙ্কর। মনের সদৃশ অন্য কাহারও সামর্থ্য অনুভূত হয় না। অতএব যে ব্যক্তি দুর্দান্ত মনের নিগ্রহ সাধনে সমর্থ হইয়াছেন, তিনিই সমগ্ৰ সংসারকে স্বীয় বশে আনয়ন করিয়াছেন; তিনিই দেববৃন্দেরও পূজাহ ও অভিবাদনের যােগ্য। ৩ 82 ক। যাহারা নিতান্ত অনভিজ্ঞ ও মূখ, কেবল তাহারাই এই অঙ্গবিক্রম মৰ্ম্ম- বিদারক দুর্জয় মনােরূপ শত্রুকে পরাজয় না করিয়া তাহার অধীনে অবস্থান পূর্বক সংসারে মর্ত্তমানবের সহিত নানা প্রকার বিদ্রোহ উৎপাদন করত কাহাকেও মিত্র, কাহাকেও শত্রু, কাহাকেও বা উদাসীন করিয়া তুলে। মনােনিষ্ঠ ভ্রান্তির বশেই জীব স্বীয় দেহে অহংজ্ঞানের প্রাবল্যে এবং পুত্রা- দিতে মমতা প্রকাশ পূৰ্ব্বক আমি, আমার, সে অপর প্রভৃতি আখ্যায় অন্ধের ন্যায় ঘাের অজ্ঞানপূর্ণ সংসারে ভ্রমণ করিয়া থাকে। অন্য লােক, দেবতা, আত্মা, গ্রহগণ, কৰ্ম্ম, কাল ইহারা মানবের সুখদুঃখের কারণ নহে; কারণ, একমাত্র অভিমান। অভিমানই সম্পর্কহীন সংসারকে আত্মস্বরূপে প্রতীত করায়। প্রকৃত পক্ষে আত্মার সহিত সংসারের কোন সম্বন্ধ নাই। জলে সূৰ্য প্রতিবিম্বের ন্যায় অন্তঃকরণে আত্মর অধ্যাস ঘটে; এবং জলকম্পনে প্রতিবিম্বের কম্পনের ন্যায় চিত্তে অভিমানের উদয়ে, চিত্তস্থ বাসনা- জালে এবং চিত্তবৃত্তি সমুৎপন্ন দেহাদিতে আত্মার অধ্যাস বশতঃ তন্নিষ্ঠ সুখদুঃখাদি দ্বন্দ্ব সমূহকে অাত্মা আপনাতে আরােপ করত সংসারে বদ্ধ হন। এই বিচার যাহার হৃদয়ে জাগরুক থাকে তাহাকে আর সংসারভয়ে ভীত হইতে হয় না? জীবশব্দবাচ্য পুরুষচৈতন্যে সুখদুঃখের উপলব্ধি অন্য কোন কারণে হইতে পারে না। স্বীয় উপাধিভূত মনের ভ্রমই যাবদীয় অনর্থের মূল। ইহার জন্যই শত্রু মিত্র বা উদাসীন প্রভৃতি বিচিত্র ভাব কেবল কল্পনা মাত্র। আত্মস্বরূপের অনবধানতাই ভীষণ সংসার আনয়ন করে । অতএব বিষম ভ্রমরূপ অবিদ্যা দ্বারাই যখন সংসার কল্পিত হয় তখন পরমাত্ম স্বরূপ আমাতে চিত্ত সমাহিত করত সর্ব প্রযত্নে মনেরই নিগ্রহ কর। (0) সাংখ্য-যােগ। ভগবান্ বলিলেন পূৰ্ব্ব পূৰ্ব্ব কপিলাদি আর্থ্যগণ কর্তৃক অবধাবিত যে অপূর্ব সাংখ্য শাস্ত্রের নাম শুনিয়াছ, এবং যে পরম তত্ত্ব অবধায়ণ করিলে জীৰ ভ্ৰম- নিবন্ধন অভিমান এবং মমতার হস্ত হইতে উদ্ধার পায়, আজ তােমায় সেই পরম তত্ত্ব সম্বন্ধে বলিতেছি শুন:- । । বহু হইব - 1 - সৃষ্টির পূর্বে যখন কোন যুগাদির নিরুপণ ছিলনা, সেই প্রলয় কালে দুই- রূপ জ্ঞান এবং দৃশ্যরূপ সমুদয়:পদার্থ অভিন্নরূপে জ্ঞানস্বরূপ এক পরমব্রহ্মেই বিলীন ছিল। সত্যযুগেও বিবেকী ব্যক্তিগণ এতদুভয়কে অভেদভাবেই গ্রহণ করিতেন। অবাত্মনসগােচর নির্বিকল্প সত্যস্বরূপ অদ্বিতীয় পরমার্থভূত পরমব্রহ্ম আমি * এই সংকল্পরূপা, মায়ার প্ররোচনায় প্রকৃতি পুরুষ এই দুইভাগে বিভক্ত হইলেন। এই দুইটীর এক অংশ দৃশ্য পদার্থ সমূহের মূল পদার্থ কার্যকারণাত্মিক প্রকৃতি, অটী চৈতন্যস্বরূপজ্ঞান, পুরুষ নামে অভিহিত। পুরুষের প্রেরণারূপ ভগবচ্ছক্তি মহাকালের উত্তেজনায় মূলা প্রকৃতির অন্তরে বিক্ষোভ উপস্থিত করে। এই বিক্ষুব্ধ প্রকৃতি হইতেই সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ এই গুণত্রয় উৎপন্ন হইল। এই গুণত্রয় হইতে ক্রিয়াশক্তি সম্পন্ন সূত্ৰাত্মা হিরণ্যগর্ভের উৎপত্তি হইল। এবং এই সূত্ৰাত্মার সহিত মিলিত হইয়া জ্ঞানশক্তি মহত্তত্ত্ব বুদ্ধি নামে অভিহিত হন। এই মহত্তত্ত্বের বিকারে অভিমান নামক অহঙ্কারতত্ত্বের উৎপত্তি হয় ; যাহার প্রভাবে দেহাদিতে অধ্যাস নিবন্ধন জীবের (আমি বলিয়া) ভ্রম জন্মে। এই অহঙ্কার আবার সাত্ত্বিক, রাজসিক, ও. তামসিক ভেদে ত্রিবিধ তন্মাত্র, দশেন্দ্রিয় ও মন, এই অহঙ্কারতত্ত্ব হইতে জন্মে। এই অহঙ্কারতত্বে চেতন, অচেতন এই উভয়ভাবই বিদ্যমান থাকে। শব্দাদি তন্মত্রের কারণস্থানীয় তামসিক অহঙ্কার হইতে ক্ষিত্যপতেজ। মরুদ্বোম নামক পঞ্চমহাভূত উৎপন্ন হইল। তৈজসিক অহঙ্কার হইতে দশবিধ ইন্দ্রিয়, সাত্ত্বিক অহঙ্কার হইতে দি, বাত, অর্ক, প্রচেতা, অশ্বিনীকুমারদ্বয়; বহ্নি, ইন্দ্র, উপেন্দ্র, মিত্রও চন্দ্র নামে একাদশ জন পূর্বোক্ত দশবিধ ইন্দ্রিয় ও মনের অধিপতি দেবত জন্মগ্রহণ করিলেন। পরমাত্মা স্বরূপ আমি কালরূপে সর্বত্র বিরাজ করি। আমার প্রেরণায়। পূর্বোক্ত সমষ্টি ভাব সমূহ পরস্পরের একত্র মিলনে আমার ক্রীড়াভূমি এই ব্রহ্মাণ্ড : উৎপাদন করিয়াছে। ব্ৰহ্মাণ্ড উৎপন্ন হইয়া যখন কারণ সলিলেই নিমগ্ন ছিল, তখন আমি নারায়ণ" E 14 - ১৫৪ শ্রীকৃষ্ণ। মুত্তিতে সেই ব্রহ্মাণ্ডে অবস্থিত ছিলাম। আমার নাভিকমল হইতে এই ব্রহ্মাণ্ড কোষপদ্ম এবং সেই পদ্মে কমলানন ব্রহ্মা উৎপন্ন হইলেন। এই ব্ৰহ্মাই বিশ্ব সংসার রচনা করিয়াছিলেন। প্রথমতঃ তিনি আমার নাভিকমলে উপবেশন পূৰ্ব্বক ঘােরতর তপস্যা করেন। এবং আমার অনুগ্রহে সফলমনােরথ হইয়া রজোগুণ দ্বারা অতলাদি সহ ভূলোক, অন্তরীক্ষলােকসহ ভুবলোক ও দেবলােক হইতে সত্যলােক পর্যন্ত স্বলোক এবং এই লােকপাল সহ সমগ্র ত্রিভুবন রচনা করিলেন । ইহাদের মধ্যে স্বর্লোক দেবগণের, ভুবলোক প্রেত পিশাচাদির এবং ভুলোক মানবগণের নিবাসস্থানরূপে নির্ণীত হইল। ভৃগু প্রভৃতি সিদ্ধ ব্ৰহ্মর্ষিগণ এই ত্রিভুবনের অতীত মহর্জনাদি লােকে বাস করিয়া থাকেন। তাসুর ও নাগগণের বাসার্থ কমলযােনি ভূমির নিয়ে অতলাদি লােকের সৃষ্টি করিলেন। মহলোকের নিম্নে পাতাল পর্যন্ত স্থান সমূহে গুণত্রয়বিশিষ্ট যাবদীয় বিষয় সন্নিবিষ্ট আছে। প্রাণায়ামাদি অষ্টাঙ্গ যােগ; বাণপ্রস্থাশ্রমের যতিধৰ্ম্মরূপ তপস্যা এবং সন্ন্যাশ্রমােচিত ধৰ্ম্মের ফলস্বরূপ রাগলােভাদিশূন্য মহঃ জন, তপঃ ও সত্য এই লােক চতুষ্টয় ভুবনয়ের উর্দ্ধে উৎপন্ন হইয়াছে। কিন্তু ভক্তিযোগের দ্বারাই জীব মৎস্বরূপীভূত বৈকুণ্ঠলােকেই গমন করিয়া থাকে। কালশক্তিস্বরূপ বিশ্ববিধানকারী সফলদাতা পরমেশ্বরের প্রেরণায় এই সমগ্র প্রাণী জগৎ সংসারস্রোতে পতিত থাকিয়া কখন সত্যলােক পর্যন্ত উৰ্দ্ধগতিতে উখিত, আবার কখনও বা স্থাবরযােনি পৰ্যন্ত নীচগতিতে অধঃপতিত হয়। অণু, বৃহৎ, স্থূল, এবং কৃশ বলিয়া যে কোন ভাব বা পদার্থ জগতে বিদ্যমান আছে, সেই সকলই পুরুষ এবং প্রকৃতি এই উভয়ের সংযােগেই উৎপন্ন হইয়াছে । যে কাৰ্য্যের যাহা আদি কারণ এবং অন্তেও সে যাহাতে বিলীন হয়, সম্প্রতি তাহার বর্তমান মধ্যাবস্থাও সেই কারণাতিরিক্ত অন্য কিছু নহে; যেমন সুবর্ণাদি তৈজস পদার্থ হইতে উৎপন্ন কুণ্ডলাদির অলঙ্কারভাব সুবর্ণাতিরিক্ত অন্য কিছু নহে, যেমন মৃন্ময় ঘটশরাবাদি মৃদাতিরিক্ত অন্য কিছু নহে, সেইরূপ আমার লীলা প্রকটনের নিমিত্ত প্রকাশমান্ বিকার সমূহও মূল কারণ হইতে কোন অংশে পৃথক নহে।

পরিশিষ্ট। = * । যে রূপকে উপাদান কারণভাবে স্বীকার করত ভাবান্তরের বৃদ্ধি হয়, সেই পূর্ববর্তী কারণরূপ মহদাদি তত্ত্ব যথন:তদুৎপন্ন অহঙ্কারতত্ত্বকে উপাদান করে, তখন সেই অহঙ্কারের পক্ষে মহত্তত্ত্বকেই সত্য কারণ নামে অভিহিত করা যায়। এই সত্য স্বরূপে প্রতীয়মান্ কাৰ্য্য সমূহের উপাদানভূতা প্রকৃতি, প্রকৃতির আধারভূত অধিষ্ঠা চৈতন্য স্বরূপ পুরুষ এবং গুণত্রয়ের অভিব্যঞ্জক কাল,. এই তিন:ভাবেই এক পরমব্রহ্ম স্বরূপ আমিই বিরাজ করিতেছি। এইপ্রকারে বিবিধ দেহে জীবস্বরূপে বিরাজমান পুরুষের ভােগসম্পাদনার্থ পিতাপুত্ৰাদিক্রমে বিপুল সৃষ্টি কেবল ঈশ্বরের সংকল্প ও স্থিতি কাৰ্য্যের পরি- সমাপ্তি পর্যন্ত নিরন্তর নিরবচ্ছিন্ন ভাবে চলিতে থাকে। কালরূপী আমার প্রতিপত্তিতে ব্রহ্মাণ্ড বিলীন হইবার উপক্রম হইলে লােক সমূহের বিভিন্ন কল্পের কল্পনাকারী স্বয়ং বিরাটও পঞ্চমহাভূরূপে বিশেষ বিশেষ বিভাগে পরিণত হইয়া থাকেন। মদেহ যে অন্নের দ্বারা উপচিত হয়, শতবর্ষ অনাবৃষ্টিতে সেই অন্ন ক্রমশ তা প্রাপ্ত হইয়া বিনষ্ট হইয়া যায়। তখন অন্ন বীজরূপে পরিণত হয় ; এবং বীজও ক্রমশঃ বিলীনপ্রায় হইয়া অঙ্গুয়ােৎপাদনের সামর্থ্য পরিত্যাগ এবং ভূমিরূপেই অবস্থান করে। ভূমিও গন্ধতন্মত্রে পরিণত হইয়া সূক্ষ্মরূপে অবস্থান করে। শতবৎসরকাল অতিবৃষ্টিতে গন্ধতন্মাত্রও জলে বিলীন হয়। পরে প্রখর জ্যোতির প্রকোপে জলরাশি শুষ্ক হইয়া কেবল রসতন্মাত্রায় অবস্থান করে এবং ক্রমশঃ জ্যোতিতে পরিণত হয়। জ্যোতিও বায়ুর প্রভাবে পরিণত হইয়া রূপ তন্মাত্রভাবে অবস্থান করে। রূপ বায়ুতে বিলীন এবং বায়ুও কেবল স্পৰ্শতন্মাত্রায় কিছুকাল অবস্থান করিয়াই আকাশে বিলীন হয়। আকাশও শব্দতন্মাত্রায় উপনীত হইয়া অহঙ্কারভাবে পরিণত হয়। এই প্রকারে তামস অহঙ্কারের সৃষ্টি প্রতিনিবৃত্ত হয়। পরে রাজস অহঙ্কারের কথা বলিতেছি শুন। তৎকালে ইন্দ্রিয়বর্গও স্ব স্ব অধিষ্ঠাত্রী দেবতারূপ কারণতত্ত্বে ক্রমশঃ আত্মসমর্পণ পূর্বক রাজস অহঙ্কারের সহিত অভেদভাবে বিদ্যমান থাকে। রাজসিক অহঙ্কার এবং তাহাতে আশ্রিত দেবতনিচয় সাত্ত্বিক অহঙ্কারস্বরূপ প্রবল পরাক্রম মনের অন্তরে বিলীন হয়। এ দিকে তামসিক অহঙ্কারের [১৯] { ১৪৬ । - অবশিষ্ট কাৰ্য্য শব্দতন্মাত্র এবং ভূতবর্গের দিকাৰণ অহঙ্কারও সাত্বিক মহত্বে বিলীন হয়। এই সাব্দিক মহত্তত্বের প্রভাবেই জগৎসংসার মােহিত। ইহা জড়াংশ পরিত্যাগ পূৰ্ব্বক জ্ঞান ও ক্রিয়াশক্তিই প্রকটন করিয়া থাকে। মহত্ত্বও স্বীয় গুণময়ভাব পরিত্যাগ করিয়া স্বীকাৰণস্বৰূপেই বিশ্রাম করে ; অর্থাৎ তৎকালে কেবল গুণত্রয়ই অবশিষ্ট থাকে। উক্ত গুণত্রয় কালসহকারে বৈষম্যভাব পরিত্যাগ করিয়া আপনাদের সাম্যাবস্থারূপ প্রকৃতিতে বিলীন হয়। এবং প্রকৃতিও উপতি-সংশ্রয় মহাকাল ৰিলীৰ হইয়া যায়। কালের অবসান-স্থলই সেই অদ্বিতীয় পরমপুরুষ। তিনি জদি স্বভাব- বিকার বর্জিত। মায়ারূপ উপাধির প্রবর্তক এবং প্রজ্ঞার উদয়ে সমগ্র জীবের জীবনদাতা। উৎপত্তি ও উপসংহাররূপ কার্যের অবসানে তিনি নিরুপাধিক আত্ম- স্বরূপেই অৱস্থান করেন। তঁাহার আর তদতিরিক্ত বিলীন হইবার স্থান নাই। যে ব্যক্তি এই প্রকার জগৎ, জীব ও পরমাত্মতত্ত্বের বিচার নিরন্তর করিয়া থাকেন, তাহার পক্ষে আমি ও আমার বলিয়া অনর্থক প্রমের সম্ভাবনা কোথায় ? দিবাকরের উদয়ে নভােমণ্ডলে যেমন তিমির রাশি স্থান পায় না; সেইরূপ বিচার- রূপ জ্ঞানহূর্যের আলােকে জ্ঞানী পুরুষের হৃদয়, মধ্যে ভেদজ্ঞান আর কোন প্রকারে প্রতিষ্ঠালা করিতে সমর্থ হয় না। হে উদ্ধর। আমি সর্বজ। আমি সর্বজ! কিছুই আমার কিছুই আমাৰ অবিদিত নাই। অবতারের মূলই আমি। আস্তানায়ু-বিচাররূপ যে সাংখ্য জ্ঞানের প্রসাদে সমূদয় হৃদয়গ্রন্থি দূরীভূত হয়, আমি স্বয়ং সেই জ্ঞানমার্গ তােমার নিকট বর্ণন করিলাম। ইহাতে উৎপত্তি ও সংহার উভয়ই বলা হইয়াছে।

পরিশিষ্ট। ১৪৭ ত্রিগুণের কাৰ্য্য। k অন্তরিন্দ্রিয়ের নিগ্রহরূপ শম, বাহেন্দ্রিয় নিগ্রহরূপ দম, তিতিক্ষা, স্বধর্মপালন রূপ তপস্যা, সত্যভাষণ, জীবের প্রতি দয়া, পূৰ্বানুসন্ধানরূপ স্মৃতি, যথালব্ধ ভােগে তুষ্টি, ত্যাগ, বৈরাগ্য, আস্তিক্যভাৰ, স্ত্রী অর্থাৎ অন্যায় কার্যে লজ্জা, দান, আজ্জব, বিনয়, এবং আত্মরতি প্রভৃতি গুণগ্রাম সত্ত্বগুণ হইতেই উদ্ভূত হয়। রজোগুণের প্রভাবে কাম, প্রাপ্তির নিমিত্ত প্রবৃত্তিরূপ ঈহা, দর্প, আকাঙ্ক্ষা, গৰ্ব্ব, আশীঃ তর্থাৎ ইষ্টলাভার্থ দেবার্চনা, অহংবােধে ভেদবুদ্ধি, বিষয়ভােগে সুখ, যুদ্ধাদি বীৰ্যপ্রকাশক কাৰ্যে উৎসাহ, যশের প্রার্থনা, স্তুতিপ্রিয়তা, হাস্যো- পহাস, প্রভাবের পরিচয় এবং অন্যায় পূর্বক বলের পরিচয়াদি বিবিধ বৃত্তি প্রকাশ পাইয়া থাকে। তমোগুণের প্রভাবে ক্রোধ, লােভ, মিথ্যাব্যবহার, হিংসা, যাচ্ঞা, বঞ্চনা, শ্রম, কলহ, শােক, মােহ, বিষাদ, দৈন্য, তন্দ্রা, প্রত্যাশা, ভয় এবং নিরুৎসাহাদি অন্যান্য বৃত্তির উদয় হইয়া থাকে। হে উদ্ধব! সত্ত্ব, রজঃ ও তমােগুণের পৃথক পৃথক বৃত্তি সমুদয় আমি পৃথক পৃথক ভাবে বর্ণন করিলাম। মিশ্রিতভাবে তাহাদের যেরূপ মিশ্রভাবের উদয় হয়, তাহাও বলিতেছি, শুন। আমি ও আমার বলিয়া মানবের যে বৃত্তির উদয় হয়, তাহাকেই গুণত্রয়ের মিশ্রভাবের বৃত্তি বলিয়া জানিবে। ইহাতে ইন্দ্রিয়, প্রাণ, ও মনের বৃত্তি সমূহ গুণত্রয়ের মিলনে সমুৎপন্ন এইরূপ অবধারণ করা যুক্তিসিদ্ধ। ধৰ্ম্ম, অর্থ ও কামসম্বন্ধীয় বিষয়ে মানব যখন প্রবৃত্ত হয় এবং তাহার ফলে শ্রদ্ধা, রতি ও ধনাদি লাভ করে, তখন তাদৃশ ব্যবহারকে হে উদ্ধব! গুণত্রয়ের মিশ্রভাবের পরিচয় বলিয়া জানিবে। যখন পুরুষ প্রবৃত্তিলক্ষণ গৃহস্থাশ্রমে নিষ্ঠাবান্ হইয়া স্বধর্মের অনুষ্ঠানে অগ্রসর এবং গৃহস্থাশ্রমে আসক্ত হয়, তখন সে সমস্ত কেবল গুণত্রয়ের একত্র সম্মিলনেই ঘটিয়া থাকে। শম দমাদি সদ্গুণের পরিচয়ে মানবকে সত্ত্বগুণবিশিষ্ট বলিয়া অবধারণ করা যায়, কম ক্রোধাদি বৃত্তির পরিচয়ে রজোগুণবিশিষ্ট বলিয়াই জানা যায়।

১৪৮ শ্রীকৃষ্ণ। বিষয় বাসনা পরিত্যাগ পূর্বক বিশেষ ভক্তি, সহকারে মানব যখন স্বীয় আমােক্ত কৰ্ম্মের অনুষ্ঠান দ্বারা ভগবৎস্বরূপ আমার আরাধনা করে, তখন তাদৃশ পুরুষ বা স্ত্রীকে সত্ত্বগুণবিশিষ্ট বলিয়াই অবধারণ করিবে। কিন্তু বিষয়সম্ভোগের প্রত্যাশায় যাহারা কর্মের অনুষ্ঠানে ভগবানের আরাধনা করে, তাহাদিগকে রজঃস্বভাব বলিয়া নিরুপণ করিতে হয়। আর যাহারা পরহিংসাদিকে লক্ষ্য করত আরাধনাদি ধৰ্ম্মকর্মে প্রবৃত্ত হয় তাহাদিগকে তামসিকপ্রকৃতি বলিয়া জানিবে। সত্ত্ব, রজঃ বা তমােণ কেবল জীবের উপরই স্ব স্ব প্রাধান্য বিস্তার করে ; ভগবৎস্বরূপ আমার উপর তাহাদের কোন প্রাধান্য নাই। কারণ জীবের চিত্তেই তাহারা উপচিষ্ট হয় এবং সেই সমুদয় গুণ-সমুৎপন্ন জীবের উপাধিভূত দেহ, ইন্দ্রিয়, মন, প্রাণ ও বুদ্ধি প্রভৃতি তত্ত্বসমূহের অন্তরে তন্ময়ভাবে আবদ্ধ জীব সংসারে ভ্রমণ করে। সত্ত্বগুণ স্বপ্ৰকাশৰ নিৰ্ম্মল ও ধৰ্ম্মজ্ঞানাদির উৎপাদক, পবিত্র ও সুখপ্রদ ; এই সত্ত্বগুণের উদয়ে যখন যে জীবের হৃদয়ে রজঃ ও তমােণ অভিভূত বা প্রভাব শূন্য হয়, তখন ধৰ্ম্ম ও জ্ঞানাদি সঞ্চয়ে সে সাধুসঙ্গে মিলিত হয়। রজোগুণের দ্বারা অন্য সংস্পর্গ উপস্থিত হয় ; ইহা অতি চঞ্চল ও ভেদপ্রদ। সুতরাং রজোগুণের উদয়ে জীবহৃদয়ে সত্ত্ব ও তমােগুণ আচ্ছন্ন হয়; তখন যশঃ ও ঐশ্বৰ্য্যাদির প্রার্থনায় কৰ্ম্ম করত জীব নিরন্তর দুঃখসাগরেই ভাসমান হইয়া থাকে। তমােগুণের আবির্ভাবে অজ্ঞানাবরণ প্রকটিত হইলে উদ্যম নষ্ট হয় এবং বিচারজ্ঞান রহিত হইয়া যায়। সুতরাং তমােগুণের উদ্রেকে সত্ব ও রজোগুণ অভিভূত হইলে জীব নিদ্রা, হিংসা ও আশাকুহকে মুগ্ধ হইয়া শােক ও মােহে জর্জরিত হইয়া পড়ে ! যখন চিত্ত নিৰ্ম্মল ও সুপ্রসন্ন হয়, ইন্দ্রিয়গ্রাম শান্তভাব ধারণ করে, দেহে রােগ শােক থাকে না এবং মনও আসক্তি পরিত্যাগ করে, তখনই তাহার হৃদয়ে পরমাত্মস্বরূপের প্রকটনস্থল সত্ত্বগুণের উদ্ভব হয়। কিন্তু সর্বদা কৰ্ম্মে ব্যতিব্যস্ত হইয়া যাহাদের চিত্ত নিরন্তর অস্থির থাকে এবং সর্বদা গ্লানিবােধ করে, দেহের শান্তি থাকে না এবং ইন্দ্রিয়গ্রামও নিরন্তর অতৃপ্ত ও মনও চঞ্চল থাকে, তাহা রজোগুণেরই লক্ষণ।

পরিশিষ্ট। ১৪৯, . – যখন চিত্ত বিচারাদি চেনক্রিয়ায় অক্ষম হইয়া ক্লান্ত হইয়া পড়ে, মনও সংকল্পাদি কাৰ্যে অসমর্থ হয়, তখন তমােগুণের প্রভাবে অজ্ঞানপ্রসূত জ্ঞানীভাবের , অহঙ্কার হৃদয়কে আচ্ছন্ন করিয়া ফেলে। সত্ত্বগুণের উদ্রেকে দেবতাগণের বল বৃদ্ধি হয়, রজোগুণের প্রাধান্যে অসুর • কুলের তেজ বৃদ্ধি পায় এবং তমােগুণের আধিক্যে রাক্ষসগণের প্রাধান্তের পরিচয় পাওয়া যায়। হে উদ্ধব! এই নিবৃত্তি, প্রবৃত্তি ও মােহস্বভাববিশিষ্ট দেবল, ; অসুর ও রাক্ষসভাব একমাত্র ইন্দ্রিয়গ্রামের উপরই ক্রমান্বয়ে প্রকটিত হইয়া থাকে। সত্ত্বের প্রাদুর্ভাবে জীব জাগ্রত হয়, রজোগুণের ফলে স্বপ্ন অনুভব করে এবং তমঃ প্রভাবে ঘাের নিদ্রাভিভূত হইয়া পড়ে। কিন্তু যিনি ত্রিবিধ অবস্থার অন্তরে অবস্থান পূর্বক সাক্ষীরূপে বিদ্যমান থাকেন, তিনিই প্রকৃত জীবের সৰ্বানু্যত নিত্যবিদ্যমান পরমার্থভাব। বেদার্থবিদ কর্মঠ ব্রাহ্মণগণ বিহিত কৰ্ম্মানুষ্ঠান দ্বারা উদ্ৰিক্ত সত্ত্বগুণের কল্যাণে উত্তরােত্তর উৎকৃষ্ট ব্ৰহ্মলােক পৰ্য্যন্ত সুখময় স্থানে গমন করিয়া থাকেন। তমােগুণের প্রভাবে জীব নিকৃষ্ট স্থাবর যােনিতে জন্মগ্রহণ করে এবং রজোগুণের আধিক্যে মধ্যবর্তী মনুষ্যযােনি লাভ করিয়া থাকে। সত্ত্বগুণের উদয়কালে যদি কোন ব্যক্তির মৃত্যু হয়, তাহা হইলে সে স্বর্গলাভ করে; রজোগুণের উদয়ে মৃত্যু হইলে সে মনুষ্যজন্ম লাভ করে। তমােগুণের প্রাবল্যে মৃত্যু হইলে জীবের নরক প্রাপ্তি ঘটে। কিন্তু যাহারা এই গুণত্রয়ের আক্রমণকে অতিক্রম করিতে পারেন, তাহাদিগকে আর সংসারপ্রবাহে পড়িয়া হাবুডুবু খাইতে হয় না! তাহারা অনায়াসে বিষ্ণুর পরমপদ মােক্ষলাভ করেন। ফলাকাঙ্ক্ষা পরিত্যাগ পূৰ্ব্বক নিত্য নৈমিত্তিকাদি বর্ণাশ্রমােক্ত কর্মের অনুষ্ঠান দ্বারা যাহারা ভগবৎস্বরূপ কেবল আমারই আরাধনা করেন, তাহাদের সেই কৰ্ম্মকে সাত্ত্বিক বলা যায়। যাহারা ফলের প্রত্যাশায় কৰ্ম্ম করে, তাহাদের সেই কৰ্ম্মকে রাজসিক এবং হিংসাদি লােকপীড়নের উদ্দেশে আচরিত কৰ্ম্মকে তামসিক নামে অভিহিত করা যায়। দেহাদি ব্যতীত আত্মসাক্ষাৎকাররূপ জ্ঞানকে সাত্ত্বিক জ্ঞান, দেহাদিকে আত্মা বলিয়া উপলব্ধিরূপ জ্ঞানকে রাজসিক এবং জাগতিক পদার্থের জ্ঞান বা !

১৫০ তাহাতে মমতার ভাবকে তামসিক জ্ঞান নামে অভিহিত করা যায়। কিন্তু পরমাত্মভাবের অনুভূতিকে নিগুণ জ্ঞান কহে'। অরণ্যই মানবের সাত্ত্বিক বাসস্থান। গ্রামবাসকে রাজসিক এবং দূত স্থানাদি কুইকপূর্ণ স্থানকে তামসিক বাসস্থান বলিয়া নির্দেশ করা যায়। বিষয়াসক্তিশূন্য কর্মের কর্না সাত্ত্বিক, ফলসন্ধিৎসু কর্মকর্তা রাজসিক এবং হিতাহিত বিবেক বর্জিত কৰ্ত্তা তামস নামে অভিহিত। কিন্তু যাহারা অভিমানে জলাঞ্জলি দিয়া পরমেশ্বরে আত্মসমর্পণ পূৰ্ব্বক কর্মের অনুষ্ঠান করেন, তাহারা গুণাতীত কৰ্ত্তা নামে অভিহিত হইয়া থাকেন। অধ্যত্মশাস্ত্র বিষয়ক বিশ্বাসকে সাত্ত্বিক দ্ধি, কর্মবিষয়ক বিশ্বাস রাজসী এবং অভিচারাদি অধৰ্ম্ম কর্মে বিশ্বাসের নাম তামসী শ্রদ্ধা। কিন্তু ভগবদারাধনাৰ্থ বিশ্বাস গুণাতীত শ্রদ্ধা নামে পৰিকীৰ্ত্তিত হইয়া থাকে। পবিত্র হিতকর এবং অনায়াসলভ্য ডোেজ্য দ্রব্য সাত্ত্বিক, কেবল ইন্দ্রিয়ের তৃপ্তিকর আহাৰ্য্য দ্রব্য রাজসিক এবং কুৎসিত, অপবিত্র, ব্যাধি উৎপাদক ভােজ্য তামসিক নামে অভিহিত। সাত্ত্বিকং সুখমাত্মােন্থং বিষয়ােথং তু রাজসং। তামসং মােহদৈন্যোখং নির্ণং মদপাশ্ৰয়ং। আত্মচিন্তায় যে তৃপ্তির উদয় হয় তাহা সাত্ত্বিক, বিষয়সম্ভোগে সমুৎপন্ন তৃপ্তি রাজসিক এবং মােহ বা দীনভাব হইতে উৎপন্ন সুখ তামসিক নামে অভিহিত। কিন্তু ভগবচ্চিন্তা-সঞ্জাত সুখে উক্ত গুণত্রয়ের কোন সংব নাই; তাহা গুণ সংস্রব রহিত নিগুণ আনন্দ। দ্রব্য, দেশ, ফল, কাল, জ্ঞান, কর্ম, কর্তা, শ্রদ্ধা, অবস্থা, আকৃতি অর্থাৎ উত্তরােত্তর উৰ্দ্ধগতি বা স্বর্গাদি প্রাপ্তি বিষয়ে জীব সম্বন্ধে যে কোন পদার্থ বা ভাবের বিষয় বন করিলাম, সহ সকলই উক্ত ভাবক্রয়ের অধীন এক জীবের পক্ষে সংসারপ্রদ। হে পুরুষশ্রেষ্ঠ উদ্ধব! এতদ্ব্যতীত প্রকৃতি এবং পুরুষে অধিষ্ঠিত যে কোন ভাব বা পদার্থ জষ্ঠ জগতে দেখা বা শুনা যায় বা বুদ্ধি দ্বারা অবধারণ করা যায় সেই সমস্তই'গুণত্রয়নিষ্ঠ মায়াময় বলিয়াই জানিবে। 1 রশি। যেনেমে নিজ্জিতাঃ সৌম্য গুণা জীবেন চিতজাঃ। ভক্তিযােগেন মমিষ্ঠো মস্তাবায়ােপপদ্যতে। হে সৌম! পুরুষেয় গুণ কৰ্ম্ম-সমুদ্ভূত যাবতীয় সংসাৱ পথই তােমার নিকট বর্ণন করিলাম। যে ব্যক্তি বিশেষ নিষ্ঠানুশীলনে হৃদয়জাত যাবতীয় গুণবৃত্তিকে স্বীয় অধিকারে আনয়ন করিতে পারেন তিনি ভগবানে অনুপমা ভক্তিলাভে জ্ঞানের চরম ফল মােক্ষ লাভও করিতে পারেন। । তস্মাৎ দেহমিমং লব্ধ জ্ঞানবিজ্ঞানসম্ভবং। গুণগঙ্গং বিনিধূয় মাং ভজন্তু বিচক্ষণাঃ। হে উদ্ধব । শাস্ত্রীয় জ্ঞান এবং পরমাত্মসাক্ষাৎকাররূপ বিজ্ঞানলাভের একান্ত আশ্রয় এই অপূৰ্ব্ব নবােনি লাভ করিয়া বৃথা কালযাপন কবিও না। এই প্রকার মানবজন্ম লাভ করিয়া বুদ্ধিমান্ ব্যক্তিগণের পক্ষে গুণসঙ্গ পরিত্যাগ পূৰ্ব্বক আমার ভজনা করাই সৰ্ব্বতােভাবে কর্তব্য। জ্ঞান বিজ্ঞানসম্পন্ন মেধাবী ব্যক্তিগণ অপ্রমত্তভাবে ইন্দ্রিয় নিগ্রহ করত বিষয়াসক্তি বিসর্জন পূৰ্ব্বক পরমাত্মস্বরূপ আমারই আরাধনা করিয়া থাকেন, এবং মননাদি সাহায্যে সত্ত্বগুণে পরিনিষ্ঠিত থাকিয়া অনায়াসে রজঃ ও তমােগুণকে জয় করেন। সঞ্চাভিজয়েদযুক্তো নৈরপেক্ষেণ শান্তধীঃ। সম্পদ্যতে গুণৈযুক্তো জীবাে জীবং বিহায় মাং। উপশমাত্মক সত্ত্বগুণের প্রশান্ত প্রবাহে শান্তচিত্ত যােগীর হৃদয়ে সত্বগুণের ক্রিয়াও নিবৃত্ত হইয়া যায় ! তখন জীবােপাধি লিঙ্গশরীর পরিত্যাগ পূর্বক গুণসঙ্গ হইতে নিম্মুক্ত জীব ভগবৎস্বরূপ আমাকে প্রাপ্ত হইয়া থাকে। জীবাে জীবেন নিমুক্তো গুণৈশ্চাশয়সম্ভবৈঃ। ময়ৈব ব্ৰহ্মণা পূর্ণো ন বহির্নান্তরং চরে । এই প্রকার লিঙ্গদেহ হইতে বিনিমুক্ত জীব চিত্তজাত বাসনার কুহক হইতে নিষ্কৃতি লাভ করিলে পূৰ্ণানন্দব্রহ্মস্বরূপেই নিৰ্বতি বা মােক্ষাভ করেন।

' • • শ্রীকৃষ্ণ। তৎকালে বাহিরের বিষয় সমূহ ও অন্তরের সংস্কারজাল আর তাঁহার চিত্তকে আকর্ষণ করতে পারে না। তিনি সংসার স্রোতের পরপারে উপনীত হয়েন। মল্লক্ষণমিমং, কায়ং লব্ধা মদ্ধৰ্ম্ম আস্থিত। আনন্দং পরমানমাত্মস্থং সমুপৈতি মাং। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলিলেন হে উদ্ধব! আমার পরমানন্দস্বরূপ ভগবদ্ভাব যে নরদেহে স্পষ্টতঃ লক্ষিত হইতে পারে, সেই মানবদেহ প্রাপ্ত হইয়া যে জন ভক্তি ও শ্রদ্ধাসহকারে সেই নিত্যানন্দস্বরূপ সৰ্বান্তৰ্য্যামী পরমাত্মাতে চিত্ত নিবিষ্ট করিতে পারেন, তিনি সেই পরমাত্মস্বরূপকেই আশ্রয়জপে প্রাপ্ত হইয়া থাকেন। গুণময্যা জীবযােন্যা বিমুক্তো জ্ঞাননিষ্টয়া। গুণেষু মায়ামাত্ৰেষু দৃশ্যমানেবস্তুতঃ। বৰ্ত্তমানােহপি ন পুমান্ যুজ্যতেহবস্তুভিগুণৈঃ । জীবের উপাধিভূত গুণময়ী মায়ার কুহক হইতে তিনি নিষ্কৃতিলাভ করেন। এবং হােদি প্রাকৃতিক তত্ত্বগ্রামে বিদ্যমান থাকিয়াও জীবস্বরূপ পুরুষ জ্ঞানা- চুশীলনে দৃশ্যমান প্রাকৃতিক কাৰ্যবৰ্গকে মায়াময় অবস্তু বলিয়াই স্থির করিয়া থাকেন। সুতরাং আত্মতিরক্ত যাবতীয় কোন গুণেই আর তিনি আসক্ত হন না। সঙ্গং ন কুৰ্যাদসং শিশ্নোদরতৃপাং কচ্চিৎ। তস্যানুগস্তমখন্ধে পতত্যন্ধানুগান্ধবৎ। শিশ্নেরপরায়ণ অসৎ ব্যক্তিগণের সহিত সংসর্গ করা কদাচ বিধেয় নহে। কারণ তাদৃশ দুষ্ট লােকের কথা দূরে থাকুক, তদ্রুপ একজন অসতের সঙ্গ করিলেও অন্ধ নির্দিষ্ট পথে দ্বিতীয় অন্ধের দুরবস্থার ন্যায় অসদনুবর্তী ব্যক্তিকে ঘাের অজ্ঞানপূর্ণ নরকার্ণবে পতিত হইতে হয়। বিপুলকীর্তি রাজচক্রবর্তী পুরুরবা ঐল উৰ্বশীর বিরহে সংজ্ঞাশূন্য প্রায় হইলেন। পরে উক্ত অপ্সরাকে প্রাপ্ত হইলে তাহার শােক নিবারিত হইল। তিনি শােকাপগমে শান্ত হইয়া বিরহকালীন দুঃখ ও সম্ভোগে অতৃপ্তি স্মরণ করত নিম লিখিত বিবেকপূর্ণ উক্তি করিয়াছিলেন । F পরিশিষ্ট। ১৫৩ যখন উর্বশী শয্যা হইতে উঠিয়া মহারাজ ঐলকে পরিত্যাগ করিয়া প্রস্থান করিতেছিলেন, তখন উর্বশীর বিরহে পুরুরবা বিহ্বল হইয়া উন্মত্তের ন্যায় উলঙ্গ বেশে “হে হৃদয়েশ্বরি! হে কঠোরহৃদয়ে। আমাকে পরিত্যাগ করিয়া যাইও না। দাড়াও দাড়াও” বলিয়া বিলাপ করত তাহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ ধাবিত হইয়াছিলেন । পরে গন্ধৰ্বলােকে উভয়ের পুনরায় মিলন ঘটিলে মহারাজ ঐল বহুকাল সঙ্গ- সুখ উপভােগ করিলেও, তাহার চিত্ত শান্ত হয় নাই। উর্বশীর প্রেমে রাজা এতই মােহিত হইয়াছিলেন যে, অতি তুচ্ছ ইন্দ্রিয়সুখে কত রাত্রি ও কত দিবা, কত মাস, কত বৎসর যে অতীত হইল তাহার কোন সংবাদই রাখেন নাই। নিদ্রিতের ন্যায় কামড়ােগেই জীবন অতিবাহিত করিয়াছিলেন। পরে বিবেকের উদয়ে মােহ অপগত হইলে তিনি অনুতপ্ত হইয়া মনে মনে বলিয়াছিলেন, অহহ! আমার ন্যায় কামাকুলিতচিত্ত বিবেকান্ধ ব্যক্তি কি মােহেই মুগ্ধ হইয়াছিল। আমি সেই স্বৰ্গবেশ্যার কণ্ঠ ধারণ করিয়া দুর্লভ জীবনের কি মহামূল্য সময়ই বৃথায় যাপন করিয়াছি! অপ্সরীর প্রেমে এতই মুগ্ধ হইয়া- ছিলাম, যে আমি দিবা রাত্রির সংবাদ ও জানিতাম না। আমার কি ভীষণ আত্ম- প্রমই উপস্থিত হইয়াছিল! এই মােহের বশে আমি রাজগণের সর্বশ্রেষ্ঠ রাজ- চক্রবর্তীর আসনে সার্বভৌমরূপে সম্মানিত হইয়াও কামিনীর ক্রীড়াপ্রদ একটী বানররূপে পরিণত হইয়াছিলাম । মহামহীয়ান্ রাজ্যৈশ্বৰ্য্যের সহিত রাজচক্রবর্তী ভাবকে তৃণের ন্যায় তুচ্ছ করিয়া রােদন করিতে করিতে উন্মত্তের ন্যায় উলঙ্গবেশে একটী কামিনীর পশ্চাদ্ধাবন করিয়াছি! গর্দভীর অনুসরণে পদতাড়িত গর্দভের ন্যায় উৰ্বশী কর্তৃক তিরস্কৃত হইয়াও যখন তাহার পশ্চাদ্ধাবনে বিরত হই নাই, তখন আমার মাহাত্ম্য, তেজ বা জগতের উপর প্রভুত্ব করিবার সামর্থ্য কোথায় ? যে ব্যক্তির মন সামান্য কামিনী কর্তৃক অপহৃত হয়, তাহাব কি দেবারাধনা, উপবাসাদি ক্লেশসহনতা, তপস্যা, দান, অধ্যয়ন, নির্জনবাস বা মোনাদিতে কোন ফললাভ হয় ? এই সংসারে সর্বশ্রেষ্ঠ প্রভুত্ব লাভ করিয়াও যখন আমি খণ্ড বা গর্দভের স্যায় নারীর প্রেমে অন্ধ বা তিরস্কৃত হইয়াও তাহার বশীভূত হইয়াছি, [ ২ ] ১৫৪ শ্ৰীকৃষ্ণ। তখন প্রকৃত শেয়ােলাভে অনভিজ্ঞ পণ্ডিতাভিমানী আমার ন্যায় মুখকে ধিক্‌! যেমন আজযুক্ত অনন্ত সমিঘের আহুতিতে হুতাশন উপশমিত না হইয়া উত্তরােত্তর পরিবর্ধিতই হইয়া থাকেন, তপ উৰ্বশীর অধরসুধা বহু সংখ্যক বৎসর পান করিয়াও আমার মনসিজ কাম কিছুমাত্র নিবৃত্ত না হইয়া বরং উত্তরােত্তর বৃদ্ধি প্রাপ্তই হইয়াছে। পুংশ্চলী কর্তৃক অপহৃত মদীয় চিত্তকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করিতে সেই আত্মারামগণের ঈশ্বর ভগবান্ অর্ধেক্ষজ ব্যতীত অন্য কাহাকেও সমর্থ বলিয়া বােধ হয় না। কি আশ্চৰ্য্য দেবী উর্বশী বিবিধ যুক্তিযুক্ত বাক্যে আমাকে অবােধ দিলেও আমি এতই নির্বোধ ও অস্থির-প্রকৃতি হইয়াছিলাম যে, আমার মনােগত মােহ কিছুতেই নিবারিত হয় নাই। উর্বশীর কোন দোষ নাই। আমার ন্যায় অজিতেন্দ্রিয় পুরুষের মােহমুগ্ধতাই সর্বনাশের একমাত্র কারণ। রজুতে সর্প- ভ্রান্ত ব্যক্তির নিজেরই দোষ ; তজ্জন্য রঞ্জু দোষী নহে। অতি মলিন দুর্গন্ধাদি বিশিষ্ট অশুচি নারীর কলেবরে পুষ্পসমূহের সুগন্ধি, বিশুদ্ধি ও সুকুমারাদি সুন্দর গুণগ্রামের আরােপ একমাত্র অবিদ্যার প্রভাবেই ঘটিয়া থাকে। যে ব্যক্তি, দেহটী কাহার সম্পত্তি,জন্মদাতা জনক জননীর ধন বা ভােগপ্রদ বলিয়া ভাৰ্যার সম্পত্তি, কিন্তু পােষণকর্তা প্রভুর বা আহুতিরূপে গ্রহণ করেন বলিয়া অগ্নির, বা শৃগাল কুকুরে ভােজন করে বলিয়া তাহা তাহাদের, অথবা দেহকৃত শুভাশুভ আত্মা জীবদেহস্থ হইয়া তাহা ভােগ করেন বলিয়া তাহা আত্মারই ধন, অথবা উপকারী সুহৃদের সম্পত্তি তাহা নির্ধারণ করিতে না পারে, সেই ব্যক্তিই এই নিকৃষ্ট কৃমিবিষ্ঠা বা ভস্মপরিণামী কামিনীর কলেবরে, “অতি সুন্দর নাসিকা ও মৃত্ন মধুর হাস্যযুক্ত পরম মনােহর বদনকমলালঙ্কত কি অপরূপ মনােমমাহিনী” বলিয়া মােহসাগরে নিমজ্জিত হয়। ত্বংসরুধিরস্নায়ুমেদোমড্ডাস্থিসংহতো। বিম্মুত্রপৃয়ে রমতাং কৃমীণাং কিয়দন্তরং। ত্বক, মাংস, রক্ত, স্নায়ু, মেদ, অস্থি ও মজ্জা এই সপ্ত ধাতু সংমিশ্রণে সমুৎপন্ন অথচ বিষ্ঠা ও মূত্রের আধাররূপে বিদ্যমান এই দেহে রমণ করিয়া মানব যদি পরিশিষ্ট। ১৫৫ = নিজের তৃপ্তি সাধন করে, তবে বিষ্ঠাভােজী কৃমির সহিত তাহার পার্থক্য কি ? উদ্যম সম্বন্ধে মানব ও কৃমি উভয়ের প্রবৃত্তি ও ভােগকে তুল্যরূপেই দেখা যায়। অথাপি নােপসজ্জেত স্ত্রী স্ত্রৈণেষু চার্থবিৎ। বিষয়েন্দ্রিয়সংযােগান্মনঃ ক্ষু্যতি নান্যথা। বিষয়ের সহিত ইন্দ্রিয়বর্গের মিলন না হইলে, জীবের মন কখন ক্ষুব্ধ বা উত্তেজিত হয় না। যে কোন উত্তেজনা মনােমধ্যে উদিত হয়, বিষয়ের সহিত ইন্দ্রিয়বর্গের সংযােগই তাহার প্রধান কারণ। অতএব বিবেকিগণের পক্ষে কামিনী সহবাস, বিশেষতঃ স্ত্রৈণ বা থ্রিজিত কামুক পুরুষের সংসর্গ কোন মতেই কৰ্ত্তব্য নহে। অদৃষ্টাদঞতাস্তাবান্ন ভাব উপজায়তে। অসংপ্রযুঞ্জতঃ প্রাণান্ শাম্যতি স্তিমিতং মনঃ। ইন্দ্রিয়বর্গ নিরােধ করত নিমীলিতলােচনে সমাসীন ব্যক্তিরও সময়ে সময়ে যে চিত্তচাঞ্চল্য পরিদৃষ্ট হয়, তাহা কখন পূৰ্বে দৃষ্ট বা শ্ৰত বিষয়ের সংস্রব ব্যতীত সম্ভব হয় না। কারণ পূৰ্বানুভূত বিষয়ের স্মরণেই পরে মনােগ্লানি জন্মিয় থাকে। অতএব ইন্দ্রিয়গ্রামের নিরােধ দ্বারাই মন ক্রমশঃ নিশ্চলভাব ধারণ করিয়া আত্মস্বরূপে উপশমিত হয়। পণ্ডিত বা আত্মানাত্ম বিচারে পারদর্শীদিগেরও যখন পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয় ও মন এই ষড়বর্গকে বিশ্বাস করা কর্তব্য নহে, তখন আমার ন্যায় বিচারহীন মানবের পক্ষে তাহাদিগকে বিশ্বাস করা কতদূর কৰ্ত্তব্য তাহা সহজেই অনুমেয়। অতএব ইন্দ্রিয় চরিতার্থের দ্বারা প্রীতিলাভের প্রত্যাশায় কামিনী ও কামুকের সঙ্গ করা সম্পূর্ণ অবিধেয়। ভগবান্ শ্রীকৃষ্ণ উদ্ধবকে সম্বােধন করিয়া বলিলেন হে পুরুষ- শ্রেষ্ঠ। নরদেবশিরােমণি মহারাজ ঐল এইপ্রকারে মনােনিষ্ঠ ভাব সমূহ প্রকাশ করিয়া উৰ্বশীর সহবাস পরিত্যাগ করিলেন এবং আপনার হৃদয়মন্দিরে নিয়ন্তু- রূপে নিত্য বিদ্যমান আমার পরমাত্মভাবের চিন্তায় পরম জ্ঞানলাভ করিলেন। তাহার সংসারমােহ দুরীভূত হইল এবং জন্মমরণরূপ সংসারস্রোত হইতে নিষ্কৃতি লাভ করিলেন।

১৫৬ শ্রীকৃষ্ণ। অতএব দূষিতের সঙ্গ পরিত্যাগ পূৰ্ব্বক সাধুগণের সঙ্গ করাই বুদ্ধিমান্ ব্যক্তির অবশ্য কর্তব্য। কারণ সাধুগণ বিবিধ উপদেশ দ্বারা সংসারী জীবের মনােগ্লানি ও সংশয় সহজে অপনােদন করিয়া থাকেন। সাধুগণ সংসারে কিছুরই প্রত্যাশা রাখেন না। তাহারা ভগবানে চিত্ত সমর্পণ পূর্বক শান্তচিত্তে কালযাপন করেন। তাঁহারা কাহাকেও শত্রু বা মিত্র মনে করেন না। সর্বত্র সমদৃষ্টি করত আত্মাভিমান ও মমতা বিসর্জন পূৰ্ব্বক হর্ষশােকাদি দ্বন্দ্ব রহিত হইয়া বাস করেন। তাহাদের হৃদয়ে পুত্র কলত্রাদির স্নেহ আর কখনও স্থান পায় না। তেষু নিত্যং মহাভাগ মহাভাগে মৎকথাঃ। সম্ভবন্তি হি তা নৃনাং জুতাং পুন্যঘং । হে মহাভাগ! তাদৃশ মহাভাগ্যবান্ সাধু পুরুষগণের সন্নিধানে আমার লীলা কথা নিত্যই আলােচিত হইয়া থাকে। মানবগণ শ্রদ্ধা ও ভক্তিসহকারে তাহা শ্রবণ করিলে পাপ হইতে অনায়াসে মুক্তিলাভ করেন। তা যে শূণন্তি গায়ন্তি হনুমােদন্তি চাদৃতাঃ। মৎপরাঃ শ্রদ্ধাশ্চ ভক্তিং বিন্দতি তে ময়ি ॥ ভক্তিং লব্ধবতঃ সাধােঃ কিমন্যদবশিষ্যতে। মযনন্তগুণে ব্ৰহ্মণ্যানন্দানুভবাত্মনি। যে সকল ব্যক্তি ঈশ্বরপরায়ণ হইয়া বিশেষ শ্রদ্ধাসহকারে সেই সকল লীলা কথা শ্রবণ এবং তাহা অনুমােদন করেন, তাহার। পরমার্থরূপ আমাতে ভক্তিলাভ করিয়া থাকেন। ভগবানের সামর্থ্য অনন্ত । তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ সৰ্ব্বকারণকারণ এবং পরমানন্দ রসের চরমবিগ্রহ। অতএব তাদৃশ ভগবানে যদি জীবের ভক্তিলাভ হয়, তবে আর তাহার অন্য কি লাভ অবশিষ্ট থাকে ? যেমন ভগবান্ হুতাশনের আশ্রয়ে শীত, অন্ধকার ও তজ্জনিত ভয়ের কোন আশঙ্কা থাকে না, সেইরূপ সাধুগণের সংসর্গে সংসারী জীবের অজ্ঞান, জড়তা এবং ভাবী সংসারভয় দূরীভূত হয়।

পরিশিষ্ট। ১৫৭ যেমন জলমগ্ন ব্যক্তির পক্ষে নৌকাই উৎকৃষ্ট অবলম্বন ও উদ্ধারের উপায়, সেইরূপ এই ঘাের সংসার সাগরে নিমক্ষমানবের পক্ষে শান্তচেতা ব্ৰহ্মবিদ সাধু- গণই পরম আশ্রয় বলিয়া জানিও। অম্নং হি প্রাণিনাং প্রাণ আৰ্তানাং শরণং ত্বহং। ধৰ্ম্মো বিত্তং নৃণাং প্ৰেত্য সন্তোহাগ্নিভ্যতােহরণং । যেমন অন্ন প্রাণিগণের জীবন ধারণের উপায়, আর্ত-পীড়িত বা বিপন্ন ব্যক্তির একমাত্র উৎকৃষ্ট অবলম্বনই যেমন আমি, এবং মৃত্যুর পর পরলােক- গত জীবের পক্ষে ইহ-সঞ্চিত ধৰ্ম্মই যেমন প্রধান সম্বল, সেইরূপ সংসারভয়ে ভীত ব্যক্তির পক্ষে সাধুকেই উৎকৃষ্ট অবলম্বন বলিয়া অবধারণ করিতে সন্তো দিশন্তি চক্ষুংষি বহিরকঃ সমুথিতঃ। দেবতাঃ বান্ধঃ সন্তঃ সন্ত আত্মাহমেব চ। সূর্যোদয়ে অন্ধকার দূরীভুত হইলে বাহ বিষয় যেমন সহজেই নয়নগােচর হয়, তদ্রুপ সাধুকৃপা লাভ হইলে জীবের অজ্ঞানান্ধকার দূরীভূত হইয়া সাধন ভজন জন্য জ্ঞানচক্ষু প্রস্ফুটিত হয়। অতএব ভক্তিমার্গের অনুশীলনকারী সাধু ইন্দ্রাদি দেবতার ন্যায় আরাধ্য, হিতকারী স্বজনবর্গের ন্যায় মাননীয়, আত্মার ন্যায় প্রিয়পাত্র এবং মৎস্বরূপ ইষ্টদেবতার ন্যায় সম্ভজনীয়। প্রতিমাতে যেমন দেবতার আবির্ভাব হয়, সাধুর মূর্তিতে সেইরূপ আমি জীবের সন্নিধানে আবির্ভূত হইয়া থাকি। সুনন্দন পুরূরবা এই প্রকার নিৰ্বেদ প্রকাশ করত উর্বর মােহ পরিত্যাগ পূৰ্ব্বক পরমাত্মচিন্তায় নিমগ্ন হইয়া অনাসক্ত ভাবে ভূমণ্ডলে বিচরণ করিতে লাগিলেন। (0) ১৫৮ শ্রীকৃষ্ণ। উপাসনা প্রণালী। । দ্বিজাতিগণ কর্মফলের প্রতি আসক্তি পরিত্যাগ পূৰ্ব্বক ভগবৎস্বরূপ আমার অৰ্চনা করিবার নিমিত্ত গন্ধপুষ্পদি বিবিধ উপচার দ্বারা প্রতিমা, স্থণ্ডিলে(ভূমিতে) সূৰ্য্যমণ্ডলে, জলে বা স্বীয় হৃদয়মন্দিরে ভক্তি পূর্বক আরাধনা করিতে পারেন। সর্বাগ্রে দন্ত ধাবন পূৰ্ব্বক স্নান করা বিধেয়। স্নানকালে বৈদিক ও তান্ত্রিক মন্ত্রের দ্বারা মৃত্তিকা ও গােময়াদি অঙ্গে লেপন করত দেহশুদ্ধির জন্য অবগাহন করিয়া স্নান করিবে। ব্রাহ্মণাদি বৰ্ণত্রয়ের মধ্যে যে বর্ণের যেরূপ সন্ধ্যাবন্দনাদির ব্যবস্থা আছে, যথাবিধি মন্ত্রাদি পূৰ্ব্বক সেই সকল সমাপন করিয়া কৰ্ম্মপাশমােচনী মদীয় পূজার অনুষ্ঠান করিবেন। শৈলী দারুময়ী লৌহী লেপ্যা লেখ্যা চ সৈকতা। মনােময়ী মণিময়ী প্রতিমাষ্টবিধা স্মৃতাঃ । শিময়ী, কাষ্ঠময়ী, সুবর্ণাদি ধাতুময়ী, মৃত্তিকা ও চন্দনাদি লেপনে প্রস্তুত, চিত্রপট,-সিকতাময়ী, মনােময়ী এবং মণিময়ী ভেদে অষ্টবিধ প্রতিমাতে আমার অৰ্চনার বিধান আছে। প্রাণ প্রতিষ্ঠাদি দ্বারা ভগবদ্ভাবের আবির্ভাব হয়। এইরূপ প্রতিমাও চলা ও অচল ভেদে দুই প্রকার। মনােময়ী জীবের হৃদয়প্রতিমাতে ভগবান্ নিত্য প্রতিষ্ঠিত। তাদৃশ নিত্য প্রতিষ্ঠিত প্রতিমাতে আর নিত্য আবাহন বা বিসর্জনের প্রয়ােজন নাই। অস্থিরা প্রতিমাতেই কেবল আবাহন ও বিসর্জনের আবশ্যক হয়। তন্মধ্যে শালগ্রাম শিলায় আবাহন বিসর্জন নাই। স্থণ্ডিলে এই দুইটাই প্রয়ােজন। মৃন্ময়ী, লেখ্যা ও চিত্রে স্নানের প্রয়ােজন নাই। কিন্তু লেপন নির্মিতা প্রতিমাতে স্নানের পরিবর্তে মাৰ্জন করিবে মাত্র। শাস্ত্রবিহিত এবং দেশ কাল ও বিত্তানুসারে সংগৃহীত দ্রব্যসমুদয়ের আয়ােজনে নিষ্কাম ভক্তিসহকারে প্রতিমা সমূহে আমার পূজা হইয়া থাকে।

পরিশিষ্ট। ১৫৯ . জীবের হৃদয়রূপ মননাময়ী প্রতিমাতে তগবদারাধনার্থ কোন উপচারের অপেক্ষা নাই; বিশুদ্ধ ভাবই তথায় পূজার উৎকৃষ্ট উপচার। হে উদ্ধব। প্রতিমাকে স্নান করাইয়া বেশভূষা দ্বারা শােভিত করাই সেব্য সেবকের তৃপ্তির কারণ। এবং প্রধান অঙ্গকে লক্ষ্য করিয়া তাহাতে অধিষ্ঠিত দেবতার উল্লেখ পূর্বক মন্ত্রোচ্চারণে প্রতিমার প্রাণাদি প্রতিষ্ঠা করা কর্তব্য। হুতাশনে সমিধ প্রদান, সূৰ্য্যে উপস্থাপন ও অর্থ প্রদান এবং জলে জলদি উপচার প্রদানে ভগবানের অর্চনা করিলেই তাহার প্রসন্নতা লাভ করা যায়। শ্রদ্ধমােপহৃতং প্রেষ্ঠং ভক্তেন মম বাৰ্য্যপি। ভূৰ্য্যপ্যশ্রদ্ধয়া দত্তং ন মে তােষায় কল্পতে। গন্ধে ধূপঃ সুমনসাে দীপােদ্যঞ্চ কিং পুনঃ। যদি ভক্ত সামান্য বারিমাত্রও শ্রদ্ধাসহকারে আমার উদ্দেশ্যে প্রদান করে, তাহা আমি সাদরে গ্রহণ করি। কিন্তু কেহ অশ্রদ্ধা পূৰ্ব্বক প্রচুর পরিমাণে অপূৰ্ব গন্ধাদি দ্রব্য প্রদান করিলেও তাহাতে আমার কিছুমাত্র তৃপ্তি উৎপাদন করিতে পারে না। তবে গন্ধ, পুষ্প, ধূপ, দীপ ও নৈবেদ্যাদি উপচার সামগ্রী বিশেষ শ্রদ্ধাসহকারে প্রদত্ত হইলে আমার যে তৃপ্তি সাধিত হয় তাহাতে আর সন্দেহ নাই। ভগবদারাধনার্থ উপবেশন করিবার পূৰ্বে পূজার দ্রব্য সমূদয় সংগ্রহপূর্বক আপনার নিকট প্রস্তুত রাখিবে ; এবং স্নানাদি দ্বারা পবিত্র হইয়া স্বয়ং পূৰ্ব্ব বা উত্তরাভিমুখে উপবেশন করত প্রতিমাকে সম্মুখে রাখিয়া কুশাদি নির্মিত বিহিত আসনে উপবেশন পূৰ্ব্বক ভগবানের আরাধনা আরম্ভ করিবে। পরে গুরুকে প্রণাম পূৰ্ব্বক অঙ্গ ও কন্যাস করিতে হয়; অনন্তর মূল মন্ত্র উচ্চারণ পূর্বক প্রতিমাতেও অঙ্গাসাদি করিয়া হস্ত মার্জন দ্বারা প্রতিমার অঙ্গ হইতে নিৰ্মাল্যাদি অপসারণ পূর্বক অঙ্গ সংস্কার করিবে, তদনন্তর একটী জল- পূর্ণ কুম্ভ ও প্রােক্ষণার্থ উদক পাত্র স্থাপন পূৰ্ব্বক চন্দন ও পুষ্পদির দ্বারা যথাবিধি তাহা সংস্কৃত করিবে। তাহার পর প্রােক্ষণীয় উদক পাত্র হইতে জল লইয়া পুজার স্থান, পূজার দ্রব্য এবং স্বীয় কলেবরে লােক্ষণ পূর্বক, পাদ্য, অর্ঘ ও আচমনীয়াৰ্থ তিনটা ;

১৬০ শ্রীকৃষ্ণ। 4 পাত্র পূর্ণ করিবে ; তদ্ব্যতীত শাস্ত্রোক্ত মাল্য দ্রব্যও ঐ পাত্ৰত্ৰয়ে প্রদান করিবে। পরে সেই পাঙ্গ, অর্থ ও আচমনীয় পাত্র করা দ্বারা স্পর্শ করত আচাৰ্য্য বা যজমান “ হৃদয়ায় নমঃ, শিরসে স্বাহা” এবং “শিখায় বষট্‌” এই মন্ত্র দ্বারা গায়ত্রী পাঠ পূৰ্ব্বক মন্ত্র পূত করিবে। তদনন্তর প্রাণায়াম করিবে। এই প্রাণায়াম দ্বারা কোষ্ঠগত বায়ু কর্তৃক শশাধিত আপারগত অগ্নি দ্বারা দগ্ধ এবং ললাটস্থ 'চন্দ্রমণ্ডলগত অমৃতক্ষরণে পুনঃ অমৃতামান্ দেহের অভ্যন্তরে হৃদয়পদ্মমধ্যে সিদ্ধসেৰিত জীবকলিকাস্বরূপ মদীয় সর্বোৎকৃষ্ট ভাগবতী মূর্তিকে প্রণবােচ্চারণ.পূৰ্ব্বক ধান করিবে। ধ্যানস্থ হইয়া স্বীয় জীবভাবের সহিত পরমাত্মভাবের অভেদ চিন্তনে ভগবত্তি দ্বাৱাই যখন নিজ দেহ সম্পূর্ণ ব্যাপ্ত অবধারণ করিতে পারিবে, তখন মানসােপচারে আত্মস্বৰূপেই আমার পূজা করিবে। এই প্রকারে ভগবদ্ভাবে তন্ময় হইয়া ভক্ত প্রতিমাতে আবাহন পূর্বক সেই ভাব তাহাতে স্থাপন করিবেন। তখন সেই হৃদয়াদি অঙ্গ প্রত্যঙ্গে মন্ত্র ও দেবতার উল্লেখ পূর্বক প্রতিষ্ঠিত প্রতিমাতে ভগবৎস্বরূপ আমার পূজা করিবেন। অনুন্তর ধর্ম, জ্ঞান, বৈরাগ্য ও ঐশ্বৰ্য্য এবং অধৰ্ম্ম, অজ্ঞান, অবৈরাগ্য ও অনৈশ্বৰ্য্য এই অষ্টবিধ দলে শােভিত, নববিধ শক্তিতে উপচিত ও সূৰ্যমণ্ডলের গায় উজ্জল কর্ণিকাকেশরে প্রতিভাত অষ্টদল পদ্মকে আমার আসনরূপে কল্পনা করত ভােগ ও মুক্তিলাভের কামনায় উভয় বেদ এবং তন্ত্রোক্ত মন্ত্র ও প্রকরণানুসারে গন্ধ, পুষ্প, ধূপ, দীপ ও নৈবেদ্যাদি উপচার নিবেদনে আমার বাহ পূজা সমাপন করিবে । তাহার পর সুদর্শন চক্র, পাঞ্চজন্য শঙ্খ, গদা, ধনুঃ, বাণ, অসি, ইল ও মুষল এই অষ্টবিধ অস্ত্র, গলদেশে কৌস্তুভমণি, বনমালা ও বক্ষস্থলে শ্রীবৎসলাঞ্ছিত চিহ্নকে যথাক্রমে পূজা করিবে। অনন্তর আবরণ দেবতার পূজা করা প্রয়ােজন ; যথা,নন্দ, সুনন্দ, গরুড়, প্রচণ্ড, চণ্ড, মহাবল, বল, কুমুদ, কুমুদেক্ষণ, দুর্গা, গণেশ, ব্যাস, 'বিশ্বসেন, গুরুগণ ও ইন্দ্রাদি লােকপালগণ মূল দেবতার অভিমুখে ও অষ্টদিকে স্ব স্ব স্থানে অবস্থান করিতেছেন; এইরূপ স্থির করত গন্ধাদি প্রদানে তাহাদেরও পূজা করিবে। ৭ পরিশিষ্ট। । যদি ঐশ্বৰ্য্য ও অর্থ সামর্থ্য থাকে তাহাহইলে প্রত্যহই চন্দন, উবীর তৃণ, কপূর, কুঙ্কুম, ও অগুরুমিশ্রিত সুগন্ধীকৃত জল দ্বারা মন্ত্রপূর্বক আমার স্নান করান বিধেয়। স্বর্ণ-ঘৰ্ম্ম নামক বেদোক্ত অনুবাক, মহাপুরুষ মন্ত্র এবং সহস্ৰশীর্ষাদি পুরুষ সূক্ত ও রাজনাদি মন্ত্রোচ্চারণ পূর্বক আমার স্নান করাইবে। তদনন্তর যাহাতে প্রেম ও ভক্তির উদয় হয়, তজ্জন্য বস্ত্র, উপবীত, আভরণ, তুলসীদল, মাল্য, গন্ধ ও অনুলেপনাদি দ্বারা ভক্ত আমার প্রতিমাকে ভূষিত করিবে। পূজক পাথ, আচমনীয়, গন্ধ, পুষ্প, অক্ষত, ধূপ, দীপ ও নৈবেদ্যাদি উপকরণ সমূহ বিশেষ শ্রদ্ধা সহকারে আমাকে অর্পণ করিবে। যদি ধন বল থাকে তাহা হইলে গুড়, পায়স, ঘৃত, তৈল, শলী (তিলততুল মিশ্রিত পিষ্টক বিশেষ ) পিষ্টক, মোদক, পরমান্ন, দধি, সূপাদি ব্যঞ্জন ও বিবিধ উপকরণ বিশিষ্ট নৈবেদ্যাদি প্রদানে নিত্যই আমার অর্চনা করিবে। সুগন্ধি তৈল দ্বারা গাত্র মার্জন, দন্তধাবন, আদর্শ (আয়না) প্রদর্শন, অভিষেক, অনুভােগ এবং নৃত্য গীতাদি উৎসবের সহিত যদি নিত্য আমার অর্চনা করিবার সামর্থ্য না থাকে তবে একাদশী প্রভৃতি পৰ্ব্বোপলক্ষেও আমার পূজা করিবে। স্ব স্ব গৃহােক্ত প্রকরণানুসারে মেখলা, গর্ত ও বেদির বিধানে কুণ্ড প্রস্তুত কত অগ্নি অধান পূৰ্ব্বক হুতাশন প্রজ্বলিত করিবে এবং হােমবিধি অনুসারে প্রজ্বলিত হুতাশনকে জোড়হস্তে জলবেষ্টন পূর্বক মিলিত করিয়া দিবে। পরে কুণ্ডের চতুর্দিকে কুশ দ্বারা আস্তরণ করত যথাবিধি তান্নাধান নামক কর্মের অনুষ্ঠানে প্রেক্ষণ করিবে। অনন্তর প্রেক্ষণীয় জলের দ্বারা প্রােক্ষণ- পূৰ্ব্বক অগ্নির উত্তর দিক হইতে হােমের দ্রব্যাদি নিকটে লইবে এবং অগ্নিস্বরূপে আমার মূৰ্ত্তি চিন্তা করিবে। তপ্তজাম্বুনন্দপ্রখ্যং শঙ্খচক্রগদাম্বুজৈঃ। লসচ্চতুভুজং শান্তং পদ্মকিঞ্জবাসসং । ক্ষুরকিরীট-কটক-কটিসূত্রবরাঙ্গদং। শ্রীবৎসবক্ষসং ভ্রাজৎ কৌস্তুভং বনমালিনং । ধ্যানকালে গলিসুবর্ণসদৃশ আভাবিশিষ্ট পদ্মকেশরের ন্যায় পীতবসনপরিহিত চতুভুজ.শঙ্খ, চক্র, গদা ও পদ্মধারী আমার মনোজ্ঞ মূৰ্ত্তি চিন্তা করিবে। [ ২ ] ।

১৬২ শ্রীকৃষ্ণ। মস্তকে কিরীট, গলদেশে কৌস্তুভ মণি ও বনমালা, বক্ষস্থলে শ্রীবৎসলাঞ্ছিত চিহ, হস্তে বলয়, কটিতে কটিসূত্র ও অন্যান্য দিব্যাভরণে ভূষিত আমার মূর্তি চিন্তা করিবে। এইরূপ আমার ধ্যান করিয়া, আমার অর্চনা করত ঘৃতাক্ত শুষ্ক সমিধ অগ্নিতে প্রদান করিবে। পরে প্রজাপতয়ে স্বাহা, ইন্দ্রায় স্বাহা এই মন্ত্রদ্বয়ে উত্তর দক্ষিণ পরিসন্ধি আরম্ভ করিয়া অগ্নির মধ্য হইতে পরিধ্যান পর্যন্ত ঘৃতক্ষরণরূপ আজ ভাগদ্বয় ঐ অঞ্চয়ে স্বাহা ও সােমায় স্বাহা”, এই মন্ত্র উচ্চারণ পূর্বক অগ্নিতে প্রদান করিবে। পরে ঘৃতাক্ত সমিধ লইয়া “ ওঁ নমাে নারায়ণায় স্বাহা ” এই মূল মন্ত্রের দ্বারা অগ্নিতে যথাসঙ্কল্পিত আহুতি প্রদান করিবে। তদনন্তর ঘােড়শ ঋক উচ্চারণ পূর্বক তাহার এক একটী দ্বারা এক একবার আহুতি প্রদান করিবে এবং পুরুষ সূক্তের দ্বারাও হােম করিবে। “ধৰ্মায় স্বাহা” ইত্যাদি স্বাহান্ত মন্ত্রে ধৰ্ম্মাদি প্রত্যেকের নামােচ্চারণ পূৰ্ব্বক পূজাক্রমে অগ্নিতে আহুতি প্রদান করিবে। পরে হােত “অগ্নয়ে স্বিষ্টি কৃতে স্বাহা” এই মন্ত্র দ্বারা স্পিষ্টিকৃত হােম সমাপন পূর্বক অগ্নিস্বরূপে বিদ্যমান হুতাশনরূপী ভগবানের অর্চনা, হােম এবং প্রণাম করিয়া নন্দাদি পার্ষদগণের উদ্দেশ্যে প্রদান করিবে। পুনৰ্বার পূজাস্থানে অগ্রসর হইয়া আসনে উপবেশন পূৰ্ব্বক নারায়ণস্বরূপ পূর্ণব্রহ্মকে স্মরণ করত যথাশক্তি মূলমন্ত্র জপ করিবে। এই প্রকারে অগ্নি মূৰ্ত্তিতে ও প্রতিমার ভাবে বাহ দৃষ্টিতে ভগবানের ভােজন সমাপন হইল, এই রূপ চিন্তা করত ভগবান্‌কে আচমনীয় প্রদান করিবে। অনন্তর শেষ নৈবেদ্য পার্ষদশ্রেষ্ঠ বিধসেনকে সমর্পণ করিবে। পরে বিবিধ কপূরাদি সুরভি দ্রব্য মিশ্রিত তাম্বুলাদি মুখবাসার্থ পদার্থ উৎসর্গ করিয়া পুস্পাঞ্জলি প্রদান পূৰ্ব্বক পূজা সমাপন করিতে হয়। উপগায় গৃণ নৃত্য কৰ্ম্মাণ্যভিনয়ম। মৎকথা শ্রাবয়ন্ শৃণু মুহূর্তং ক্ষণিকো ভবেৎ। অনন্তর আমার বিচিত্র লীলার অভিনয়ে গান, নৃত্য, বক্তৃতা, কথালাপ এবং অপরকে সেই সকল বিষয় শ্রবণ করাইয়া কিছুকাল উৎসবনিষ্ঠ থাকিবে।

পরিশিষ্ট।
১৬৩
~~~~
স্তবৈরুচ্চাবচৈঃ স্তোত্রৈঃ পৌরাণৈঃ প্রাকৃতৈরপি।
স্তব প্রসীদ ভগবন্নিতি বলেত দণ্ডবৎ।
কথন বা উচ্চকণ্ঠে কখন বা মৃদুস্বরে পৌরাণিক স্তোত্র এবং সেই সেই দেশ
ও ভাষাগত প্রাকৃতিক স্তৰ দ্বারা আমার স্তব করত প্রার্থনা পূর্বক বলিবে “ হে
ভগবন্! আমার প্রতি প্রসন্ন হউন ! * ইহা বলিয়া দণ্ডবৎ প্রণাম করিবে।
শিয়ােমৎপাদয়ােঃ কৃত্বা বাহুভ্যাঞ্চ পরস্পরং।
প্ৰপন্নং পাহি মামীশ ভীতং মৃত্যুগ্ৰহাৰ্ণবাৎ।
বদ্ধাঞ্জলি হইয়া মদীয় চরণ সমীপে মস্তক অবনত করিবে এবং বলিবে “হে
সর্বৈশ্বৰ্য্যসম্পন্ন প্রভাে পরমেশ্বর!
প্রভাে পরমেশ্বর! মৃত্যুরূপ ভীষণকুম্ভীরব্যাপ্ত সংসারসমুদ্র
অবলােকন করিয়া আমি বড়ই ভীত হইয়াছি, আপনার শ্রীচরণে শরণ লইলাম।
আমাকে এই ঘাের বিপদ হইতে রক্ষা করুন।
এইরূপ প্রার্থনার পর মদীয় নির্মাল্যকে আমার প্রদত্ত প্রসাদ জ্ঞানে আদরের
সহিত মস্তকে ধারণ করিবে; এবং আমার চিন্ময় মূৰ্ত্তিকে নির্জনে ধ্যান করিবে।
আর প্রতিমাতে সমর্পিত আমার তেজোময় স্বরূপকেই স্বীয় হৃদয়জ্যোতিতে
সমাহিত করিবে।
অৰ্চাদি মদীয় অনুষ্ঠানে কোনরূপ শ্রেষ্ঠত্বাদি তারতম্য নাই। কারণ
স্থাবরজঙ্গমাত্মক যাবতীয় পদার্থ এবং যাবতীয় জীবের হৃদয়মন্দিরে আমি নিত্য
প্রতিষ্ঠিত থাকি। তবে ভাবুকের শ্রদ্ধা ও ভাবনানুসারেই আমি প্রকটিত হই
বা অপ্রকটিত থাকি, এই মাত্র বিশেষ।
এই প্রকারে বৈদিক ও তান্ত্রিক পূজামার্গ অবলম্বন পূৰ্ব্বক আমার অর্চনা
করিলে মানব ইহ জগতে এবং স্বৰ্গাদি লােকে আমার প্রসাদেই অভীতি ফল
লাভে কৃতার্থ হইয়া থাকেন।
মদর্চাং সংপ্রতিষ্ঠাপ্য মন্দিরং কায়েদৃঢ়ং।
পুষ্পোদ্যানানি ম্যানি পূজাযাত্রাৎসবাশ্রিতা।
পূজাদীনাং প্রবাহাৰ্থং মহাপৰ্বস্বথাম্বহং।
ক্ষেত্ৰাপণপুর গ্রামান্ দত্ত্বা মৎসাষ্টি তামিয়াৎ ॥

১৩৪ শ্রীকৃষ্ণ। । পূজক যদি ধনশালী হয়, তাহা হইলে আমার উদ্দেশে সুদৃঢ় মন্দির প্রস্তুত করত তন্মধ্যে আমার বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করিবেন। এবং তৎসমীপে রম্য পুষ্পে- ঘানাদি প্রস্তুত করাইবেন। প্রত্যহ পূজা ও পৰ্বেপলক্ষে যাত্রাদির অনুষ্ঠানে জনসমাগম, বসন্তকালীন মহােৎসবাদি, নিত্য নৈমিত্তিক কৰ্ম্ম এবং তদুপযােগী কাৰ্য্যসমূহ যাহাতে চিরকাল চলিতে পারে তাহারও ব্যবস্থা করিবেন। যাহাতে এই সমস্ত কাৰ্যকলাপ নির্বিঘ্নে বহুকাল ধারাবাহিকরূপে চলে তাহার ব্যবস্থার জন্য ক্ষেত্র, আপণ, পুর ও গ্রামাদি দেবসেবায় সমৰ্পণ করিবেন। এই কাৰ্য্য দ্বারা ভক্ত মদীয় সাষ্টিত্ব ( মুক্তি বা সমান ঐশ্বৰ্য্য) লাভে কৃতার্থ হন। প্রতিষ্ঠয়া সার্বভৌমং সল্পনা ভুবনত্ৰয়ং। পূজাদিনা ব্ৰহ্মলোেকং ত্রিভিৎসাম্যতামিয়াৎ | ভগবানের বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করিবার ফলে সার্বভৌমপদ, মন্দির প্রতিষ্ঠার ফলে ভুবনয় এবং সাধারণতঃ পূজার ফলে মানব ব্ৰহ্মলােক প্রাপ্ত হইয়া থাকেন; এবং একত্র তিনটীর অনুষ্ঠানে মানব ভগবানের সারূপ্য লাভে অধিকারী হন। মামেব নৈরপেক্ষ্যেণ ভক্তিযােগেন বিন্দতি। ভক্তিযােগং স লভতে এবং যঃ পূজয়েত মাং॥ ফলাকাঙ্ক্ষা পরিত্যাগ পূৰ্ব্বক কেবল ভক্তি সহকারে আরাধনাদি কর্মের অনু- ঠান করিলে মানব মদীয় স্বরূপ ও ভক্তির স্বরূপ লাভ করিয়া থাকেন, সন্দেহ নাই। যঃ স্বদত্তাং পরৈদত্তাং হরেত সুরবিপ্রয়াের। বৃত্তিং স জায়তে বিড়ভুক্ বর্ষাণামযুতাযুতং । কিন্তু যে ব্যক্তি নিজ দত্ত বা পর প্রদত্ত দেবতা বা ব্রাহ্মণের বৃত্তি হরণ করে সে অনন্ত অযুত সংখ্যক বৎসর বিষ্ঠাভােজী কৃমি হইয়া নরকে জন্ম গ্রহণ করে। কৰ্জুশ্চ সারথে হেঁতাের মােদিতুরেব চ। কৰ্ম্মণাং ভাগিনঃ প্ৰেত্য ভূয়াে ভূয়সি তৎফলং। যে ব্যক্তি উক্ত কাৰ্যে কর্তার সাহায্য করে, যে উৎসাহ প্রদান করে, যে তাহা অনুমােদন করে, মরণান্তে তাহারা পূর্বোক্ত ফল লাভ করে। কারণ পরিশিষ্ট। তবে কৰ্ম্মের গুরুত্বানুসারে ফলেরও তাহাৱা সকলেই উক্ত কৰ্ম্মের ফলভাগী তারতমা অবশ্য স্বীকার্য। সংক্ষিপ্ত-জ্ঞানযােগ। ভগবান্ শ্রীকৃষ্ণ বলিলেন হে উদ্ধব। এই বিচিত্ররচনাবিশিষ্ট বিশ্বসংসার গুণত্রয়ের সাম্যাবস্থারূপ প্রকৃতি হইতেই সমুৎপন্ন হইয়াছে। মহাপুরুষ পরমাত্মার ঈক্ষণে জড় প্রকৃতিও চেতনের ন্যায় প্রসব ধর্ম প্রাপ্ত হইয়া এই অনন্ত জীবজগতের সৃষ্টি করিয়াছেন। সুতরাং এক পরমাত্মাই তুল্যরূপে সৰ্ব্বদেহে বিরাজ করিতেছেন। যে কোন অধিষ্ঠানে যে কোন স্বভাব বা কর্মের পরিচয় পাওয়া যায়, তাহা প্রকৃতি পুরুষের সত্তার পরিচয় ভিন্ন আর কিছুই নহে। সুতরাং সুকৰ্ম্ম দুষ্কর্মের কারণে কাহাকেও প্রশংসা বা তিরস্কার করা বিবেকী ব্যক্তির কর্তব্য নহে। পরস্বভাবকৰ্ম্মাণি যঃ প্রশংসতি নিতি । স আশু শ্যতে স্বার্থাদসত্যভিনিবেশতঃ । যে ব্যক্তি অন্যের স্বভাব বা কর্মে গুণ বা দোষ দেখিয়া প্রশংসা বা নিন্দা করে, সে আপন দেহ গেহাদিতে অভিমান বশতঃ আসক্ত হইয়া আত্মস্বরূপােপলব্ধি হইতে সত্বর বঞ্চিত হয়। রাজসিক অহঙ্কার সমুৎপন্ন ইন্দ্রিয় সমূহ নিদ্রিত হইলে দেহস্থ জীব যেমন মন মাত্র অবলম্বন পূর্বক মনােময় স্বপ্ন অনুভব করে; এবং মনও যখন নিদ্রিত হয়, তখন জীবও সংজ্ঞাশূন্য হইয়া মৃত্যু তুল্য নিদ্রার আশ্রয়ে বিশ্রাম লাভ করে । সেইরূপ যাহারা বহু কাৰ্যে সর্বদা ব্যস্ত থাকে, তাদৃশ বিষয়াসক্ত পুরুষ দেহাদিতে আসক্তি নিবন্ধন জন্ম মৃত্যুকে আলিঙ্গন করত পুনঃপুনঃ সংসারে ভ্রমণ করিয়া থাকে।

১৬৬ শ্রীকৃষ্ণ সমস্ত সংসারই মায়াময়, সুতরাং মিথ্যা ও কল্পিত। বাক্যের দ্বারা যাহা বলা যায়, চক্ষুরাদি প্রত্যেক ইন্দ্রিয়ের দ্বারা যে কোন প্রতীতি হয়, মনের দ্বারা যাহা স্মরণ বা কল্পনা করা যায়, সে সমস্তই দ্বৈতপ্রপঞ্চের অভিব্যক্তি মাত্র। সুতরাং যাহার আদ্যোপান্তই মিথ্যা ও মায়াময়, তদ্রুপ দৈতপ্রপঞ্চের অন্তরস্থ একটা ভাল, একটা মন্দ বলিয়া নিন্দা স্তুতির কিছুই নাই। কারণ তাহার ভালও মিথ্যা, মন্দও মিথ্যা। তথাপি দর্পণাদিতে প্রতিবিম্ব, শব্দের প্রতিধ্বনি এবং শুক্তিকাদিতে রজতাদির অধ্যাস, স্বরূপতঃ মিথ্যা হইলেও, যেমন কাৰ্যতঃ এই তিনের ফল ও কার্যকারিতা শক্তি প্রতীত হয় ; তদ্রুপ” পদার্থভাবে পরিণত দেহাদি বস্তুনিচয় ততঃ মিথ্যা হইলেও মুক্তি পর্যন্ত জীবকে সংসার ভয় প্রদান করিয়া থাকে! বেদান্ত বিজ্ঞানে এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডই পরমাত্মা বলিয়া অভিহিত আছে। কারণ তিনি একাকী সমস্তই হইতে এবং সকলই করিতে পারেন। তিনি নিজেই বিশ্বরূপে প্রকাশিত হইয়াছেন এবং ঈশ্বরূপে আপনাকে আপনিই মুক্ত করিতেছেন। প্রলয়ে নিজেই প্ৰলীন হইয়া সংসারকে সংহার করিতেছেন। যখন বেদাদি পরমাত্মাতিরিক্ত অন্য বস্তুর পৃথক সত্তাই স্বীকার করেন না, সলিলােখিত ফেনােগমের ন্যায় পরমাত্ম সত্তাতেই যখন অখিল সংসারের উত্তাসন নিরুপিত; তখন দেহ, ইন্দ্রিয়, ও অন্তঃকরণরূপ জীবাত্মাতে ত্রিবিধ ভাবের ঘূৰ্ত্তি দ্বারা কেবল তত্ত্বহীন ভ্রান্তিরই পরিচয় পাওয়া যায় মাত্র। ব্ৰহ্মস্বরূপ হইতে উৎপন্ন হইলেও এই ভাবত্রয় ব্রহ্মশক্তি মায়ারই কাৰ্য্য; কিন্তু তুমি ইহাদিগকে সত্ব, রজঃ, তম গুণের কাৰ্য্য বলিয়া জানিও। এতদ্বিদ্বান্ মদুদিতং জ্ঞানবিজ্ঞাননৈপুণং। ন নিতি ন চ স্তোঁতি লােকে চরতি সূৰ্য্যবৎ। জ্ঞানবিজ্ঞানের চরমসীমাস্বরূপ মৎকথিত এই ভাবকে যিনি সম্যক অবধারণ করিতে পারেন, তিনি আর কখনও পরের চরিত্র বা কর্মে দোষগুণ 'দেখিয়া নিলা বা প্রশংসা করেন না। তিনি দিবাকরের ন্যায় সর্বত্র তুল্য দৃষ্টিতেই দর্শন করিয়া জগতে বিচরণ করিয়া থাকেন।

পরিশিষ্ট। বিষয় ও ইন্দ্রিয়ের সংযােগ জনিত প্রত্যক্ষ জ্ঞান, চিহ্ন দর্শনে চিহ্নিত বিষয়ের জ্ঞাননিষ্ঠ অনুমান জ্ঞান এবং বেদাদি আপ্তবাক্যের প্রসাদল আত্মজ্ঞানরূপ স্বরূপানুভূতির উদয়ে এই বিশ্বসংসার যে পূৰ্বে ছিল না এবং পরেও আর থাকিবে না, তা সুস্পষ্ট অবধারণ করা যাইতে পারে। তখন সৰ্ব্বান্তে এক পরমাত্মাই সৰ্ব্বত্র সাক্ষীরূপে বিরাজ করেন। অতএব বিষয়াসক্তি বিসর্জন পুৰ্ব্বক নির্লিপ্ত ভাবে বিচরণ করাই বিবেকিগণের অবশ্য কর্তব্য। মৈবাত্মনাে ন দেহত্য সংস্কৃতিদ্ৰ ষ্টু দৃশ্যয়াের। অনাত্মসদৃশশারীশ কস্য স্যাপলভ্যতে। উদ্ধব বলিলেন হে প্রভো! দেহস্বরূপে দুইটী বস্তু দৃষ্ট হইয়া থাকে । একটা চৈতন্যময় পুরুষ, অন্যটী অচেতন দেহ। পুরুষ সৰ্বসাক্ষী, স্বতঃসিদ্ধ ও জ্ঞানবান্ ; তিনি কিছুতেই লিপ্ত নহেন। দেহ জ্ঞানহীন জড়পদার্থ। সুতরাং সুখ দুঃখাদি অনুভবরূপ সংসার এতদুভয়ের মধ্যে কোনটীরই হওয়া সম্ভব নহে। তথাপি জীবের জন্মমরণরূপ সংসারযন্ত্রণা উপভোগ হইতেছে। অতএব এই সুখ দুঃখাদির অনুভূতি রূপ সংসার, কাহার উপর প্রতিপত্তি করে, কৃপা পূর্বক তাহা আমায় বলুন। আত্মা গুণাতীত, বিশুদ্ধ জ্ঞানময়; সুতরাং ক্রিয়ানিষ্ঠ মালিন্য বা রাগাদি বিকারভাব তাহাতে সম্ভব নহে। অগ্নি যেমন ইন্ধনাদি দগ্ধ করত আত্মস্বরূপেই প্রকাশিত হয়, তদ্রুপ আত্মস্বরূপ চৈতন্যও অবিদ্যাকৃত আবরণে কখনও আবৃত থাকেন না। প্রকাশ জ্যোতিঃস্বরূপেই নিত্য বিদ্যমান থাকেন। আবার এদিকে দেহও কাষ্ঠ বা লােষ্ট্রের ন্যায় অচেতন জড় পদার্থ। অতএব এভয়ের । কাহার যে সংসার-যন্ত্রণাভােগ, আমি তাহা নির্ণয় করিতে পারি না। তদুত্তরে ভগবান্ শ্রীকৃষ্ণ বলিলেন দেহ, ইন্দ্রিয় ও প্রাণক্রিয়ার সহিত যখন আত্মার সম্বন্ধ ঘটে, তখন আত্মস্বরূপে সংসার প্রকৃত প্রস্তাবে মিথ্যা হইলেও অবিবেকীর নিকট সংসার সত্য ও ফলপ্রদরূপেই প্রতীয়মান হয়। অবিবেকী কখনই তাহাকে মিথ্যা বলিয়া উপলব্ধি করিতে পারে না। যে সকল ব্যক্তি নিরন্তর উৎকট বিষয়-চিন্তায় কালযাপন করে, তাহারা স্বপ্নে যেমন নিজ শিরচ্ছেদাদি প্রত্যক্ষের ন্যায় অনুভব করিয়া দুঃখিত হয় ; বিষয় শ্রীকৃষ্ণ। চিন্তায় ব্যাকুলহৃদয় মানবগণও আপনাদিগকে সেইরূপ কাল্পনিক সুখদুঃখের অনন্তস্রোতে ভাসমান বলিয়া নিয়ন্তয় অনুভব করে। স্বপ্নদর্শন কালে তাহা যেমন মিথ্যা বলিয়া ধারণা হয় না। স্বপ্নে যেমন ব্যাঘ্রাদির আক্রমণ বা স্বীয় শিরচ্ছেদ জনিত বিবিধ অনর্থ উপভােগ করিয়া নিদ্রাভঙ্গে জাগ্রত হইলে আর সে ভয় থাকে না, তপ অজ্ঞানীর পক্ষে সংসার অনর্থের কারণ হইলেও জ্ঞানীর পক্ষে তাহা তপ নহে। শােক, হর্ষ, ভয়, ক্রোধ, লােভ, মােহ ও আকাঙ্ক্ষারূপ বৃত্তি সমূহ কেবল অহঙ্কার হইতেই হয়। কারণ নিদ্রিত ব্যক্তিতে ইহাদের কোন চিহ্নই থাকে । তদ্রুপ জন্ম ও মৃত্যু শুধু দেহের উপরই প্রতিপত্তি করে। আত্মার সহিত ইহাদের কোন সম্বন্ধ নাই। দেহ, ইন্দ্রিয়, প্রাণ ও মনের উপর আত্মভাব-চিন্তাভিমানী আত্মাই তাহাদের অন্তরে অবস্থান পূর্বক জীব নামে অভিহিত হয়। সুতরাং আত্মা আপনার স্বরূপ সম্বরণে সমুদ্ভূত গুণ কর্মের পরিচয়েই আপনাকে পরিচিত করেন। এবং ইন্দ্রিয়াদি লিঙ্গদেহ বা মহত্তাদি কারণদেহকে উপাধি রূপে স্বীকার করত বিশ্ব, তৈজস, প্রাজ্ঞ এবং দেব, মনুষ্য ও তির্যগাদি নানা নামে অভিহিত হন। এবং তদনন্তর সর্বভূতের কলনকারী মহাকালরূপী পরমেশ্বরের বশীভূত হইয়া 'অনন্ত সংসার তরদের অনন্তভাবে ভাসমান হন। অমূলমেতদ্বহুরূপরূপিতং মনােবচঃ প্রাণশরীরকর্ম জ্ঞানাসিনােপাসনয়া শিতেন চ্ছিা মুনির্গাং বিচরত্যতৃষ্ণ। অঘটনঘটনপটীয়সী প্ৰচণ্ডা অবিদ্যা প্রভাবে দেবমনু্যাদি বহুরূপে প্রকাশমান স্বরূপতঃ অমূল ভিত্তিশূন্য অহঙ্কারই—মন, দশবিধ ইন্দ্রিয়, ইন্দ্রিয়বর্গের ক্রিয়া, প্রাণনশক্তি এবং উপাদানভূত দেহের রচনা করিয়া থাকে। অতএব অহঙ্কারের মুলােচ্ছেদ না করিলে সংসারযাত্রার নিবৃত্তি হয় না। গুরু ও ভগবানে ভক্তিই জ্ঞানলাভের শ্রেষ্ঠ উপায়। তীব্র ভক্তিপ্রভাবে অন্তরস্থ জ্ঞানরূপ শাণিত অসি দ্বারা অহঙ্কারের মূল কৰ্তন করিলে বিষয়াভিলাষ দূরীভূত হয়। তখন ভগবানে চিত্ত সমৰ্পণ পূর্বক যােগী সংসারে বিচরণ করিলেও আর তিনি অভিভূত হন না।

পখিশিষ্ট ১৬৯ . সৃষ্টির পূর্বে ও অন্তে বিনি সৎস্বরূপে বিরাজ করেন এবং সৃষ্টির পর অর্থাৎ ব্ৰহ্মাণ্ড প্রকাশিত হইলে যিনি উপাদান কারণ ও কালরূপে বিদ্যমান থাকেন ; বেদাধ্যয়ন, তপােনুষ্ঠান, স্বধৰ্ম্মানুশীলন, প্রত্যক্ষাব, গুরূপদেশ, অনুমান এবং তর্ক বিচারে যদি উক্ত বিবেক লাভ হয়, তবেই তাহাকে প্রকৃত জ্ঞান কহে। স্বর্ণপিণ্ড হইতে বিভিন্ন নামধারী নানাবিধ অলঙ্কার প্রস্তুত হইলেও তাহাদের একমাত্র উপাদান যেমন স্বর্ণ ভিন্ন আর কিছুই নহে, তদ্রুপ সৃষ্টির পূর্বে ও প্রলয়ে একরূপে বিদ্যমান আমিই এই সংসারের একমাত্র কারণ। তবে সৃষ্টিকালে বিবিধ নাম ও রূপে অভিহিত হই মাত্র। বিশ্বব্রহ্মাণ্ড কোনরূপে আমা হইতে পৃথক নহে। আমি যেমন সংসারের উপাদান কারণরূপে বিদ্যমান আছি, সৰ্বাভাসক মূৰ্ত্তিতেও তেমনি আমি ব্যতীত আর অন্য কেহই নাই। জীবের জাগ্রৎ, স্বপ্ন.ও সুষুপ্তি নামক অবস্থায়, বিজ্ঞানমূৰ্ত্তি মহত্তত্ত্ব, মহৎ ও অহঙ্কারের অবস্থাভূত গুণত্রয়, কারণ নামক অধ্যাত্ম ইন্দ্রিয়, কাৰ্য্যস্বরূপ অধিভুত ক্ষিত্যাদি এবং কর্তৃরূপ দেবতা- নিচয় ও গুণত্রয়র কাৰ্যজ্ঞাপক তিন প্রকারে অভিব্যক্ত জগৎ, যে তুরীয় চৈতন্যের দ্বারা প্রকাশিত হইতেছে এবং যােগী সমাধিকালে পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে যে তুরীয় চৈতন্যের স্বরূপ উপলব্ধি করিয়া থাকে, হে উদ্ধব! সেই পরমার্থস্বরূপ আমিই সৰ্বত্ৰ সৰ্বাভাসক (অবভাসক-একের অন্যরূপে প্রকাশরূপ মিথ্যা জ্ঞান অর্থাৎ এক বস্তুকে অন্য বস্তু বলিয়া প্রতীত করান রূপ জ্ঞান) রূপে অবস্থান করিতেছি। উৎপত্তির পূর্বে কোন কাৰ্য্য ছিল না এবং জগন্নাশের পরও কোন কাৰ্য্য থাকে না, মধ্যাবস্থা সৃষ্টিকালেও যাহা সুবর্ণবৎ স্বরূপ পরিহার না করিয়া বিভিন্ন নামে অভিহিত হয়, সেই নিস্ক্রিয় ও ক্রিয়মা অবস্থায় বিভিন্ন ভাবে বিদ্যমান সৰ্বা- বভাসক ভাবই ব্ৰহ্ম। কারণ যে কোন কাৰ্য্য অন্যের দ্বারা উৎপাদিত ও প্রকাশিত হয়, সেই সমুদয় কার্যের কারণ ও প্রকাশকরূপে একমাত্র আমিই অবস্থান করিতেছি। আমি কাৰ্যরূপে পরিণত না হইয়াও অলঙ্কারের উপাদান সুবর্ণের ন্যায় সৃষ্ট জগৎ হইতে কোন অংশে পৃথক নহি। এই যে পরিদৃশ্যমান্ সাত্ত্বিক, রাজসিক বা তামসিক পদার্থ সমূহ সৃষ্টির পূর্বে থাকিলেও সৃষ্টির সময়ে ব্রহ্ম কর্তৃক অবভাসিত হইয়া প্রকাশ পাইতেছে। [ ২২ ] ১৭০ শ্রীকৃষ্ণ। ~~~~~~ কিন্তু ব্রহ্মই সকলেরই উপাদান কারণ এবং প্রকাশক।''অতএব ঈশবিধ ইন্দ্রিয়, পঞ্চতন্মাত্র, মন-দেবতা ও পঞ্চমহাভূতাদি বিচিত্র সংসার রূপে এক পরাৎপর পূর্ণব্রহ্মই অবভাসিত হইতেছেন। অতএব প্রত্যক্ষ, অনুমান ও আপ্তবচনাদি ব্ৰহ্ম বিচারের উপায় দ্বারা তীক্ষ্ণ আত্মানাত্মবিবেকের বলে দেহাদিতে আত্মাভিমান পরিহার করিবে এবং আত্ম সম্বন্ধীয় সন্দেহের মুলােৎপাটন পূর্বক শান্তচিত্তে যাবতীয় ইন্দ্রিয় ক্রিয়া হইতে নিবৃত্ত হইবে এবং ভােগশক্তিকে বিসর্জন দিবে। পার্থিব দেহ, ইন্দ্রিয়বর্গ, ইন্দ্রিয়াধিষ্ঠাত্রী দেবতাগণ, প্রাণ, বায়ু, ক্ষিতি, আকাশ, জল, অগ্নি, অন্নময় মন, বুদ্ধি, চিত্ত, অহঙ্কার, শাদি পঞ্চমহাভূত এবং গুণত্রয়ের সাম্যাবস্থারূপ প্রকৃতি প্রভৃতি যাবতীয় পদার্থই স্কুল ঘটাদির দ্যায় জড় পদার্থ। ইহারা যে কখন আত্মা নহে, ইহা বিচার দ্বারা নির্ণয় করা কর্তব্য। সমাহিতৈঃ কঃ করণৈগুণাত্মভিগুণে ভবেৎ মৎসুবিবিক্তধাঃ। বিক্ষিপ্যমাণৈরুত কিছু দূষণং ঘনৈরুপেতৈর্বিগতৈরবেঃ কিং। যে ব্যক্তি আমার পবিত্র পরমাত্মস্বরূপের সম্যক অবধারণে বিশেষরূপে সমর্থ হইয়াছেন, তাহার পক্ষে সত্বাদি গুণ সমূহে বর্ধিত ইন্দ্রিয়বর্গের পরিপুষ্টি আদৌ ফলােপধায়ক নহে। কারণ দিবাকরের সন্নিধানে জলদজালের আগম নিগম যেমন কোন ক্ষতি বৃদ্ধির কারণ নহে, তদ্রুপ পরমার্থদর্শী বিবেকীর ইন্দ্রিয়বর্গ বিক্ষিপ্ত হইলেও প্রকৃত প্রস্তাবে তাহাতে কোন হানির সম্ভাবনা নাই। যেমন আকাশ- মণ্ডল অনল, অনিল, সলিল, ধূম বা ধূলি প্রভৃতি দ্বারা সমাচ্ছন্ন হইলেও তাহাতে লিপ্ত হয় না, তদ্রুপ দেহাদিতে অভিমান নিবন্ধন সংসারের হেতুভূত সত্ত্বাদিগুণ- মালিন্যে বা গুণোদ্ভুত বিষয়ের সংসবে প্রকৃতির অতীত অক্ষর পরমপুরুষ কখনই লিপ্ত হন না। পরমার্থতঃ জীবাত্মার সহিত সংসারের সংস্রব না থাকিলেও বিবেকহীন পুরুষের পক্ষে ভগবানে দৃঢ় ভক্তি করা নিতান্ত কর্তব্য। এবং ভগবদ্ভক্তির প্রাবল্যে বিষয়ানুরাগরূপ মনের আসক্তি যদবধি নিবৃত্ত না হয় তদবধি বিষয়াশক্তি কৰ্জন কৰ্তব্য।

পরিশিষ্ট। ১৭১ । । রােগ নিঃশেষে আরােগ্য না হইলে তাহা যেমন:পুনরায় প্রবল হইয়া দেহকে প্রপীড়িত করে, তদ্রুপ যাহাদের চিত্ত হইতে বিষয় ও কৰ্ম্ম বাসনা নিঃশেষে নিবৃত্ত না হইয়াছে তাদৃশ যােগী সর্বদাই যােগষ্ট হয়। পুত্ৰকলত্রাদি স্বজনবর্গের মূর্তিতে দেবতাগণ নানা বিঘ্ন উৎপাদন করিয়া কুযােগীদিগকে বহু প্রকার বিপদে ফেলিয়া যােগপথভ্রষ্ট করেন। তাদৃশ কুযযাগীগণও পূৰ্বাত্যন্ত যােবলের প্রভাবে জন্মান্তরে পুনর্বার যােগেরই অনুষ্ঠান করিয়া থাকেন। একবার ভ্ৰষ্ট হইলেও কাম্য কম্মের আলােচনায় পূর্বাভ্যন্ত যােগপথকে কখনও বিস্কৃত হন না। যাহারা অবিবেকী, তাহারা কোন না কোন প্রারব্ধ কর্মের ফলে অন্তর্যামীর প্রেরণায় পুনরায় কৰ্ম্ম করে, এবং তদ্বারা সংস্কারগ্রস্ত হয়; কিন্তু বিবেকী পুরুষ প্রাকৃতিক দেহে অবস্থান করিয়াও স্বরূপানন্দের অনুভূতিতে বীততৃষ্ণের ন্যায় বিচরণ করেন। যাদবধি দেহ পতন না হয়, তদবধি প্রারব্ধ মাত্র, ভোগ করিয়াই অগ্রসর হইতে থাকেন। কেবলমাত্র শরীররক্ষণােপযােগী কৰ্ম্মই করিয়া থাকেন; নূতন কৰ্ম্মের সংস্কারকে আর হৃদয়ে স্থান দেন না। সুতরাং তাহাদের সংসার-ভােগ সহজেই নিবৃত্ত হইয়া যায়। বিবেকী আত্মস্বরূপানুসন্ধিৎসু পুরুষ দেহের ভােগকামনায় কোন কর্ম করেন না। উপবেশন, শয়ন, বিষ্ঠামূত্রাদি ত্যাগ, ভােজন, দর্শন, স্পর্শনাদি সম্পর্কে কোন আকাঙ্ক্ষা উপস্থিত হইলেও তাহাকে ব্যথিত করিতে পারে না। দুষ্ট ইন্দ্রিয়গণের ভােগ্য শব্দাদি বিষয় সমূহ ' তৃপ্তি ও মুখভােগের প্রধান কারণ বলিয়া প্রসিদ্ধ থাকিলেও বিবেকী ব্যক্তিগণ বিবিধ অনুমান সাহায্যে তাহাদিগকে দুঃখ ও অতৃপ্তির কারণ বলিয়াই প্রতিপন্ন করেন। নিদ্রাভঙ্গে স্বপ্নদৃষ্ট পদার্থ সমূহ যেমন আপনাপনিই বিলীন হয়, কেবল সংস্কাররূপে মনে থাকিলেও লোকে তাহাদিগকে ব্যবহারােপযােগী মনে করে না; তদ্রুপ বিবেকগণ ইন্দ্রিয়-ভােগ্য পদার্থ নিচয়কে পুরুষার্থপ্ৰদবস্তু বলিয়া জ্ঞান করেন না। হে উদ্ধব। বদ্ধদশায় সত্ত্বাদি গুণত্রয় এবং তদনুরূপ কর্ম দ্বারা পরিবর্ধিত এই বিচিত্র দেহাদি এবং 'অভিমানরূপ অহঙ্কারকে আত্মার সহিত অভিন্নভাবে গ্রহণ করা হইয়াছিল কিন্তু আত্মজ্ঞানের প্রভাবে সে সমস্তই বিনিবৃত্ত হয়।

১৭২ শ্রীকৃষ্ণ। ; চৈতন্যস্বরূপ আত্মাকে দেহাদি প্রাকৃতিক পদার্থ কখনও আত্মভাবে গ্রহণ করিতে পারে না বা ত্যাগও করিতে পারে না। সূর্যোদয়ে যেমন নয়নের অন্ধকারই দূর হয়, নয়নের কোনরূপ অবস্থান্তর হয় না; তদ্রুপ পরমাত্মতত্ত্বজ্ঞান ও স্বরূপ সাক্ষাৎ দ্বারা বুদ্ধির মােহপ্রদ অজ্ঞানই নিবারিত হয় মাত্র ; তদ্ব্যতীত বুদ্ধির কোনরূপ অবস্থান্তর বা গঠন হয় না। এষ স্বয়ংজ্যোতিরজোহপ্রমেয়াে মহানুভূতিঃ সকলানুভূতিঃ। একোহদ্বিতীয়াে বচসাং বিরামে যেনেষিত বাগসবশ্চরন্তি ॥ আত্মা স্বপ্রকাশ এবং জন্মমণাদি ছয় প্রকার বিকারের অতীত। তিনি সৰ্বভাবময় এবং প্রত্যক্ষের ন্যায় সকল ভাবকে স্বয়ং অবলােকন করেন। তাহার সহিত অন্ত তুলনীয় পদার্থ কিছুই নাই। তাঁহার জ্ঞানের সীমা নাই। তিনি সকল পদার্থ ও ভাবকে গ্রহণ করিয়া থাকেন। অথচ প্রত্যক্ষাদি কোন প্রমাণের দ্বারা তাহাকে অবধারণ করা যায় না। কারণ যিনি অবধারণ করিবেন, সেই পদার্থ নিজেই তিনি। ইন্দ্রিয়াদি জ্ঞানের পথ সমূহ ভঁহাকে অবধারণ করিতে অক্ষম হইয়া প্রতিনিবৃত্ত হইলে স্পষ্টই উপলব্ধি হয় যে, যাহার প্রেরণায় জ্ঞানেন্দ্রিয় ও কৰ্ম্মেন্দ্রিয় প্রভৃতি করণবর্গ স্ব স্ব নির্দিষ্ট বিষয়ে প্রবর্তিত হয়, সেই পদার্থই তিনি। (দেহাদির সহিত দৃশ্যতঃ) অভিন্ন আত্মায় বিবিধ কল্পনার উদ্ভব হইয়া মনােনিষ্ঠ ভ্রমের উদয় হইয়া থাকে। কারণ মেরও একটী আশ্রয় আছে। মানসিক শ্রম বাহাকে আশ্রয় করিয়া আত্ম পরিচয় দেয়, তিনিই সত্যস্বরূপ সকলের আশ্রয়দাতা আত্মা। নাম ও রূপােপলক্ষিত ইন্দ্রিয়ের গ্রাহ পঞ্চভূতাত্মক দ্বৈত দেহাদিকে পাণ্ডিত্যাভিমানী ব্যক্তিগণ সত্য ও আত্মস্বরূপ বলিয়া জ্ঞান করেন এবং বেদবাক্যকে যে অর্থবাদ মাত্র বলিয়া স্বীকার করেন সে সমস্তই শ্রম ও ব্যর্থ বিতণ্ডারই পরিচয় মাত্র। প্রবর্তক যােগীর ঘােগধারণায় অগ্রসর হইবার সময় যদি তাহার দৈহিক কোন রােগাদির উৎপত্তি হয়, তাহা হইলে তাহার প্রতিকারের উপায় বলিতেছি, শুন। সন্তাপ ও শৈতাদি জনিত উৎপাত সমূহ নিবারণাৰ্থ সুৰ্য বা চন্দ্রে চিত্ত সমাহিত করা কর্তব্য। বায়ু জনিত রােগে আসনের সাহায্যে প্রাণায়াম করিতে - পরিশিষ্ট। ১৭ হয়। কোন প্রকার পাপগ্রহ বা সম্পাদি ভৌতিক উৎপাত উপস্থিত হইলে তপােনুষ্ঠান, মণিমন্ত্র ও ঔষধাদি প্রকরণে তাহা নিবারণ করা কর্তব্য। কামক্রোধাদি আভ্যন্তরিক রিপুর আবির্ভাবে মদীয় ভগবদ্ভাবে চিত্ত সন্নিবেশ ও আমার নাম সংকীর্তন করা কর্তব্য। অন্যান্য দুঃখপ্রদ উৎপাত উপস্থিত হইলে যােগেশ্বরগণের অনুসরণ করিলে ক্রমশঃ সকল দুঃখই নিবৃত্ত হয়। যাহারা জিতেন্দ্রিয় ধীর ব্যক্তি তাহারা এতদ্ব্যতীত অন্যান্য উপায় দ্বারা দেহকে জানােগাদি শূন্য করিতে পারেন। তরুণ বয়সে ধৈৰ্য্য ও স্থৈর্য ধারণ দ্বারা যথাবিধি যােগানুষ্ঠানে পরকায়াপ্রবেশাদি বিবিধ সিদ্ধি লাভ করিতে পারেন। কিন্তু তাদৃশ সিদ্ধিপ্রদ যােগানুষ্ঠানকে বিবেকিগণ বিশেষ আদর করেন না। কারণ বনস্পতি হইতে প্রতি বৎসর যেমন বহু সংখ্যক ফলের উৎপত্তি ও ধ্বংস হইয়া থাকে, সেইরূপ নিত্যসিদ্ধ আত্মা হইতে দেহরূপ বিবিধ অনিত্য ও নশ্বর সিদ্ধির উদয় ও ধ্বংসে কোন ফললাভই নাই। নিত্য প্রণায়ামাদি দ্বারা যােগানুষ্ঠানে যদি দেহ বিশেষ সুস্থ ও সবলও হয়, মতিমান্ ব্যক্তি সে সিদ্ধিপ্রদ যােগকে উপেক্ষা করিয়া ঈশ্বপরায়ণ (মৎপর ) হইয়া তদুদ্দেশ্যেই ভক্তিযােগের অনুষ্ঠানই করিয়া থাকেন। যাহারা আসক্তি বিসর্জন পূৰ্ব্বক ভগবানে চিত্ত সমাহিত করেন, তাহাদের আর কোনও বাধা বিপত্তির সম্ভাবনা থাকে না। তঁাহারা আত্মস্থ হইয়া সর্বদাই পরমানন্দ উপভােগ করেন। : ; সংক্ষিপ্ত ভক্তিযােগ। শ্রীকৃষ্ণ বলিলেন হে উদ্ধব! আমার পবিত্র শান্তিপ্রদ যে সকল ধর্ম শ্রদ্ধাতিশয়ে অনুষ্ঠান করত মানব দুর্জয় মৃত্যুর হস্ত হইতে অনায়াসে অব্যাহতি লাভ করিতে পারে, আমি সেই সমস্ত ভাগবত-ধৰ্ম্ম বলিতেছি শুন। কুৰ্যাৎ সানি কৰ্ম্মাণি মদৰ্থং শনকৈঃ স্মরন্। ময্যপিতমনশ্চিত্তে মদ্ধৰ্মাত্মমনােরতিঃ ॥ আমার ভক্তের প্রতি বিশেষ অনুরাগ প্রকাশ পূৰ্ব্বক আমার ধর্মে মন প্রাণ সমর্পণ করত সমুদয় কর্মের অনুষ্ঠান করিবে। । } ১৪ - দেশান্ পুণ্যানাশ্রয়েত মস্তক্তৈ সাধুভিঃ শ্রিভা। দেবাসুরমসুষুে মক্তচরিতানি । যে সকল স্থানে আমার ভক্ত সাধুব্যক্তিগণ নিয়ত বাস করেন, সেই সকল দেশই পবিত্র। সেই সকল স্থানে এবং দেশে বাস করা কর্তব্য। দেবতা, মনুষ্য, ও অসুরের মধ্যে যে কেহ আমার ভক্তির পরিচয় দিয়াছেন, তাহাদের সেই সকল আচরণের কথা সর্বদাই শ্রবণ করা কর্তব্য। * । পৃথক্ সত্ৰেণ বা মহং পর্বযাত্রামহােৎসবান। কারয়েন্ত্যগীতাদ্যৈমহারাজবিভূতিভিঃ । একাদশ্যাদি পৰ্বোপনক্ষে আমার উদ্দেশ্যে একাকী বা অন্যের সহিত সমবেত হইয়া ম্যুরাজোচিত অনুষ্ঠানে নৃত্য গীত্ব বাঙ্গাদির জন্য যাত্রামহােৎসবাদির আয়ােজন করিতে হয়। এই প্রকার বিবিধ কর্মের নিত্য অভ্যাসে যখন চিত্তের মালিন্য দূরীভূত হয়; তখন সাধক সৰ্ব্বভূতের অন্তর বাহিরে নির্লিপ্তভাবে বিদ্যমান সৰ্ব্বভূত আমাকে নিজের হৃদয়কমলে সুস্পষ্ট প্রতীকরিয়া থাকে। হে উদ্ধব! তুমি,বিচারে বিলক্ষণ পারদর্শী। এই চরাচর জগৎসংসায় সেই মহাবিভূতিবিশিষ্ট পরমেশ্বরের শক্তির খেল বলিয়া মনে মনে স্থিরসিদ্ধান্ত করাই প্রকৃত জ্ঞান। এই জ্ঞানলাভ হইলে ভেদবুদ্ধি অপােনজিত হয়। তখন ব্রাহ্মণের সহিত চণ্ডাল, ব্ৰহ্মপাপহারীর সহিত ব্রাহ্মণসেবী, দিবাকরের সহিত অংশুকণা এবং কুরকর্মার সহিত শান্তচিত্ত জীবের মধ্যে যাহাদের আর পরমার্থতঃ কোন ভেদ প্রতীত হয় না, তাহারাই সর্বত্র সমদর্শী পণ্ডিত নামে অভিহিত এবং জনসমাজে বিশেষ আদৃত হন। নরেন্বতীং মল্লবং পুংসসা ভাবয়তােহচিরাৎ। স্পর্ধাসূয়াতিরস্কারাঃ সাহঙ্কারা বিয়স্তি হি। যে ব্যক্তি মানবমাত্রেরই অন্তরে ভগদ্ভাবের ঘূর্তি নিরন্তর চিন্তা করিতে পারেন, তাহাকে আর স্বীয় দেহে অহঙ্কার নিবন্ধন বিবিধ দোষে লিপ্ত হইতে হয় না। স্পর্ধা, অসুয়া এবং তিরস্কার বৃত্তি তাহার চিত্ত হইতে সম্পূর্ণরূপে বিনষ্ট হইয়া যায়।

পরিমষ্টি। ~~ ক T * - । শ প ৭ = বিজয়মানান শ্রীড়া দৈহিক প্র দেখবৰাচগুলিােেখর স্বজন বা মানবের উপহাস বাক্যকে উপেক্ষা করত নিজের শ্রেষ্ঠতাও অন্যের অপকৃষ্টতার প্রতি লক্ষ্য না করাই সর্বতােভাবে কর্তব্য। লজ্জায় বশীভূত হইলে পদার্থাবধাগণের যোগ্যতা হ্রাস প্লান্তহয়।' অতএব লজ্জাদি বিসর্জন পূৰ্ব্বক কুকুর, চণ্ডাল, গৰু, গভে পৰ্যন্ত ভগবানের সত্তা:অক্ষ্য করিয়া তাহা দিগকে ভূমিতে বৎ প্রণাম করিবে। যাৰ সর্বেষু ভূতেষু মাবাে নােপজায়তে। তাদেবমুপালীত বাঘনঃকায়বৃতিভিঃ। যে পৰ্য্যন্ত জীবমাত্রেই ভগবদ্ভাবের ফুৰ্ত্তি সম্যক উপলব্ধি না হয়, তদবধি কায়মনােবাক্যে এই প্রকার উপাসনা কার্যে নিযুক্ত থাকা সৰ্ব্বততভাবে বিধেয়। সমগ্র ব্রহ্মাণ্ড ব্ৰহ্মময়, এইরূপ নিশ্চিত জ্ঞানই বিদ্যা নামে অভিহিত। সৰ্বত্ৰ ব্ৰহ্ম দর্শন করিলে (বা সৰ্বত্ৰ ব্ৰহ্ম বিদ্যমান এই জ্ঞান হইলে) চিত্ত বিষয়- বাসনা পরিত্যাগ করে। সুতরাং সাধক জাগতিক যাবতীয় বিষয় হইতে অনায়াসে প্রতিনিবৃত্ত হইতে পারেন। অয়ং হি সর্বকল্পানাং সচীনাে মতাে মম। মত্তারঃ সৰ্বভূতেষু মনােবাক্কায়বৃত্তিভিঃ। যাবতীয় উপায়ের মধ্যে কায়মনােবাক্যে সৰ্ব্বভূতে ভগবদ্ভাবের উপলব্ধি ( ভগবদ্দর্শন) করাই সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ ধর্ম ও যুক্তিযুক্ত উপায় বলিয়াই মনে করি। হে প্রিয় উদ্ধব ! নিষ্কাম ভগবদ্ধর্মে কোনরূপ বৈগুণ্য, ঘটে না। কারণ ইহার অনুষ্ঠানে কোন কামনাই নাই। ইহা গুণের অতীত। সুতরাং যত অনুষ্ঠিত হউক না, তদংশের যে ধ্বংস নাই তাহা আমিই ব্যবস্থা করিয়াছি। যাে যাে ময়ি পরে ধর্মঃ কল্পতে নিষ্ফলায় চেৎ। তদায়াসসা নিরর্থঃ স্যাত্তয়াদেরিব সত্তম। হে সাধদ! অতি নিকৃষ্ট কামাদি বৃত্তি নিচয়ও যদি ভগবদভিমুখে প্রযু হয় অর্থাৎ সেই সকল বৃত্তির নিয়ােগ-লক্ষ্যই যদি কেবল ভগবান হন, তাহা হইলে } ।

শ্রীকৃষ্ণ) । } { ৬ L , ০ 1 1 * তারা ধর্ম সঞ্চয়ই হইয়া থাকে। কংস কৃষ্ণভয়ে, গােপিকাকুল কামপরতন্ত্র এবং চেদিপতি শিশুপাল কেবল কৃষ্ণদ্বেষী হইয়াই অন্তে মােক্ষলাভ করিয়াছিল। ( দেবর্ষি নারদ ধুধিষ্ঠিরকে বলিয়াছিলেন- গােপ্যঃ কামায়াৎ কংসঃ দ্বেষাচ্চৈদ্যাদয়াে নৃপাঃ। সম্বন্ধাব্দ বৃষ্ণয়ঃ স্নেহা যুয়ং ভক্ত্যা বয় বিভাের। শ্রীকৃষ্ণবায়কালীলা ৯২ পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য) অহহ! আত্মস্বরূপে অস্তমাত্ৰ ক্ষণবংসী মায়াময় দেহের দ্বারা এই মনুষ্য জন্মেই অমৃতস্বরূপ পরামার্থভূত নিত্যধন আমাকে লাভ করাই বুদ্ধিমান ব্যক্তিগণের বিবেক-ফল এবং মনীষী ব্যক্তির চাতুৰ্য্য ফলের সম্যক্ পরিচয়। নৈতত্ত্বয়া দাম্ভিকায় নাস্তিকায় শঠায় চ। অশুশ্রুষােরভক্তায় দুর্বিনীতায় দীয়ং। এই পরমাত্মতত্ত্ব কখন দাম্ভিক, বেদবাক্যে অবিশ্বাসী, নাস্তিক, প্রবঞ্চক, ভক্তিহীন, দুনিীত এবং শ্রবশে অনিচ্ছুক ব্যক্তিকে প্রদান করা বিধেয় নহে। . শ্রীকৃষ্ণের এই সমস্ত উপদেশামৃত পান করিয়া যদুবংশ ধ্বংস ও কৃষ্ণান্তৰ্ধান- জনিত কৃষ্ণবিরহ চিন্তায় বিহ্বল হইয়া উদ্ধব শ্রীকৃষ্ণকে প্রদক্ষিণ পূর্বক সাশ্রনয়নে তঁাহার পাদুকাদ্বয় মস্তকে ধারণ করত বামম্বার প্রণাম পুরঃসর বরিকাশ্রমে প্রস্থান করিলেন। A" * - - -(o)- শ্রীকৃষ্ণাৰ্পিতমস্তু।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Srikrishna

Author
Nag,manmothonath
Title
Srikrishna
File name
Srikrishna
Text
OCR done
Citation
1929
Published
2009/12/19
Publisher
N.a
Language
Sanskrit
Pages
189
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Epic
Keywords
Nag,Manmothonath
DLI number
513343
Barcode
4990010020330.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
PNCYqOrg2RE
Download PDF

Srikrishna