Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Chabi O Gaan
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
छवि
গান
শ্রীরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
১৩২৯ সন
মূল্য চার আনা
প্রকাশক
ঐপাঁচকড়ি মিত্র
ইণ্ডিয়ান পাবলিশিং হাউস
২২, কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট, কলিকাতা।
কান্তিক প্রেস
২০ কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট, কলিকাতা।
শ্রীহরিচরণ মান্না দ্বারা মুদ্রিত।
यूजी ৫ ৮ ০ ••• ••• ... ••• ••• জাগ্ৰত স্বপ্ন ••• ••• ••• * * * ••• ৫০০ । দোলা একাকিনী গ্রামে আদরিণী । । । খেলা ••• এ ০ ০ ৪ ০ ০ ১৫ : ১৭ ••• LE . * * शुष বিদায় বিরহ সুখের স্মৃতি যােগ ১৯ ২১ ০ ০ ০ • ৭০ + + + ••• ২২ ৫ ০৬ ••• ••• ••• ২৪ পাগল ... p০০ ••• মাতাল . . বাদল •• ••• ••• ২৯ ৩১ ৩২ ৫০০ আর্তস্বর স্মৃতি-প্রতিমা আবছায়া ৩৫ ••• ... ০ ০ ০ ৩৮ ৪০ আচ্ছন্ন ••• •••
স্নেহময়ী
১৩
•••
৪৫
•••
•••
রাহর প্রেম
মধ্যাহ্নে
পূর্ণিমায়
পােড়ড়া বাড়ি
অভিমানিনী
•••
•••
•••
••
•••
•••
•••
•••
১১
pas
নিশীথ জগৎ
নিশীথ-চেতনা
০ ০ ০
ছবি
গান
কে ?
আমার
বসন্তের
প্রাণের পরে চলে গেল কে
বাতাসটুকুর মত।
ছুয়ে গেল নুয়ে গেল রে
ফুটিয়ে গেল শত শত।
সে যে
ফুল
ও ও ও ও
চলে গেল, বলে গেল না,
কোথায় গেল ফিরে এল না,
যেতে যেতে চেয়ে গেল,
কি যেন গেয়ে গেল,
আপন মনে বসে আছি
কুসুম বনেতে।
সে
ঢেউয়ের মত ভেসে গেছে,
চাঁদের আলাের দেশে গেছে,
যেখেন দিয়ে হেসে গেছে,
হাসি তার রেখে গেছে যে,
ছবি ও গান
মনে হল আঁখির কোণে
আমায় যেন ডেকে গেছে সে।
কোথায় যাব কোথায় যাব,
ভাবতেছি তাই একলা বসে।
আমি
সে
(म
(म
চাদের চোখে বুলিয়ে গেল
ঘুমের ঘোের।
প্রাণের কোথা দুলিয়ে গেল
ফুলের ভাের।
কুসুম বনের উপর দিয়ে
কি কথা যে বলে গেল,
ফুলের গন্ধ পাগল হয়ে
সঙ্গে তারি চলে গেল।
হৃদয় আমার আকুল হল,
নয়ন আমার মুদে এল,
কোথা দিয়ে কোথায় গেল সে।
সুখ স্বপ্ন
ওই
জানালার কাছে বসে আছে
করতলে রাখি মাথা।
তার
কোলে ফুল পড়ে রয়েছে
সে যে
ভুলে গেছে মালা গাঁথা।
ছবি ও গান
বুরু বুরু বায়ু বহে যায়
তার কানে কানে কি যে কহে যায়,
অধ’ শুয়ে আধ’ বসিয়ে
ভাবিতেছি আনমনে।
উড়ে উড়ে যায় চুল,
কোথা : উড়ে উড়ে পড়ে ফুল
ঝু ঝুরু কঁপে গাছপালা
সমুখের
উপবনে।
অধরের কোণে হাসিটি
আধখানি মুখ ঢাকিয়া,
কাননের পানে চেয়ে আছে
আধ-মুকুলিত আঁখিয়া।
সুদূর স্বপন ভেসে ভেসে
চোখে এসে যেন লাগিছে,
ঘুমধােরময় সুখের আবেশ
প্রাণের কোথায় জাগিছে।
চোখের উপরে মেঘ ভেসে যায়,
উড়ে উড়ে যায় পাখী,
সারাদিন ধরে বকুলের ফুল
ঝরে পড়ে থাকি থাকি।
মধুর আলস, মধুর আবেশ,
মধুর মুখের হাসিটি,
মধুর স্বপনে প্রাণের মাঝারে
বাজিছে মধুর বাঁশিটি।
ছবি ও গান
জাগ্রত স্বপ্ন
আজ
একেলা বসিয়া, আকাশে চাহিয়া,
কি সাধ যেতেছে, মন!
বেলা চলে যায়—আছিস্ কোথায় ?
কোন্ স্বপনেতে নিমগন ?
বসন্ত বাতাসে আঁখি মুদে আসে,
মৃদু মৃদু বহে শ্বাস,
গায়ে এসে যেন এলায়ে পড়িছে
কুসুমের মৃদুবাস।
অতি
সুদূর নন্দন-কানন-বাসিনী
সুখ-ঘুম-ঘােরে মধুর-হাসিনী,
অজানা প্রিয়ার ললিত পরশ
ভেসে ভেসে বহে যায়,
মৃদু মৃদু লাগে গায়।
বিস্মরণ-মােহে আঁধারে আলোকে
মনে পড়ে যেন তায়,
স্মৃতি-আশামাখা মৃদু সুখে দুখে
পুলকিয়া উঠে কায়।
অমি আমি যেন সুদূর কাননে,
সুদূর আকাশ তলে,
আমনে যেন গাহিয়া বেড়াই
সংযুর কলকলে।
ছবি ও গান
গহন বনের কোথা হতে শুনি
বাঁশির স্বর আভাস,
বনের হৃদয় বাজাইছে যেন
মরমের অভিলাষ।
বিভাের হৃদয়ে বুঝিতে পারিনে
কে গায় কিসের গান,
অজানা ফুলের সুরভি মাথান’
স্বরসুধা করি পান।
যেনরে কোথায় তরুর ছায়ায়
বসিয়া রূপসী বালা,
কুসুম-শয়নে আধেক মগনা,
বাকল বসনে অধেক নগনা,
সুখ দুখ গান গাহিছে শুইয়া
গাথিতে গাঁথিতে মালা।
ছায়ায় আলােকে, নিঝরের ধারে,
কোথা কোন্ গুপ্ত গুহার মাঝারে,
যেন হেথা হোথা কে কোথায় আছে
এখনি দেখিতে পাব,
যেনরে তাদের চরণের কাছে
বীণা লয়ে গান গাব।
শুনে শুনে তারা আনত নয়নে
হাসিবে মুচুকি হাসি,
ছবি ও গান
সরমের আভা অধরে কপােলে
বেড়াইবে ভাসি ভাসি
মাথায় বাঁধিয়া ফুলের মালা
বেড়াইব বনে মনে।
উড়িতেছে কেশ উড়িতেছে বেশ
উদাস পরাণ কোথা নিরুদ্দেশ,
হাতে ল’য়ে বাঁশি, মুখে লয়ে হাসি,
ভ্রমিতেছি আনমনে।
চারিদিকে মাের বসন্ত হসিত,
যৌবন-কুসুম প্রাণে বিকশিত,
কুসুমের পরে ফেলিব চরণ,
যৌবন মাধুবী ভরে।
চারিদিকে মােৰ মাধবী মালতী
সৌরভে আকুল করে।
কেহ কি আমারে চাহিবে না ?
কাছে এসে গান গাহিবে না ?
পিপাসিত প্রাণে চাহি মুখপানে
কবে না প্রাণের আশা?
চাঁদের আলােতে, বসন্ত বাতাসে,
কুসুম কাননে বাধি বাহুপাশে
সরমে সােহাগে মৃদু মধু হাসে
জানাবে না ভালবাসা?
আমার যৌবন-কুসুম-কাননে
ললিত চরণে বেড়াবে না ?
ছবি ও গান
আমার প্রাণের লতিকা বাঁধন
চরণে তাহার জড়াবে না ?
আমার প্রাণের কুসুম গাঁথিয়া
কেহ পরিবে না গলে?
তাই ভাবিতেছি আপনার মনে
বসিয়া তরুর তলে।
দোলা
ঝিকিমিকি বেলা ;
গাছের ছায়া কাপে জলে,
সােনার কিরণ করে খেলা।
দুটিতে দোলার পরে দোলেরে,
দেখে রবির আঁখি খােলেরে।
গাছের ছায়া চারিদিকে আঁধার করে রেখেছে।
লতাগুলি আঁচল দিয়ে ঢেকেছে।
ফুল
ধীরে ধীরে মাথায় পড়ে,
পায়ে পড়ে, গায়ে পড়ে,
থেকে থেকে বাতাসেতে ঝুরু ঝুরু পাতা নড়ে।
নিরালা সকল ঠাই,
কোথাও সাড়া নাই,
শুধু নদীটি বহে যায় বনের ছায়া দিয়ে,
বাতাস ছুয়ে যায় তারে শিহরিয়ে
ছবি ও গান
দুটিতে বসে বসে দোলে
কোথায় গেল চলে।
পাখীরা এল ঘরে,
কত যে গান করে,
দুটিতে বসে বসে দোলে।
হের, সুধামুখী মেয়ে
কি চাওয়া আছে চেয়ে
মুখানি থুয়ে তার বুকে।
কি মায়া মাখা চাদমুখে।
হাতে তার কঁাকন দুগাছি,
কানেতে' দুলিছে তার দুল,
হাসি-হাসি মুখখানি তার
ফুটেছে সাঝের জুই ফুল।
গলেতে বাহু বেঁধে
দুজনে কাছাকাছি,
দুলিছে এলােচুল
দুলিছে মালাগাছি।
আঁধার ঘনাইল,
পাখীরা ঘুমাইল,
সােনার রবি-আলাে আকাশে মিলাইল।
মেঘের কোথা গেল চলে,
দুজনে বসে বসে দোলে।
ছবি ও গান
ঘেঁসে আসে বুকে বুকে,
মিলায়ে মুখে মুখে
বাহুতে বঁধি বাহুপাশ,
সুধীরে বহিতেছে শ্বাস।
মাঝে মাঝে থেকে থেকে
আকাশেতে চেয়ে দেখে,
গাছের আড়ালে দুটি তারা।
প্রাণ কোথা উড়ে যায়,
সেই তারা পানে ধায়,
আকাশের মাঝে হয় হার।
পৃথিবী ছাড়িয়া যেন তারা
দুটিতে হয়েছে দুটি তারা।
একাকিনী
একটি মেয়ে একেলা,
সাঁঝের বেলা,
মাঠ দিয়ে চলেছে।
চারিদিকে সােনার ধান ফলেছে!
মুখেতে পড়েছে সাঁঝের আভা,
চুলেতে করিছে ঝিকিঝিকি।
কে জানে কি ভাবে মনে মনে
আনমনে চলে ধিকিধিকি।
ছবি ও গান পশ্চিমে সােনায় সােনাময়, ভর যেন এত সােনা কে কোথা দেখেছে। তারি মাঝে মলিন মেয়েটি কে যেনরে একে রেখেছে। মুখখানি কেনগো অমন ধারা কোন খানে হয়েছে পথহারা কারে যেন কি কথা শুধাবে, শুধাইতে ভয়ে হয় সারা। চরণ চলিতে বাধে বাধে শুধালে কথাটি নাহি কয়। বড় বড় আকুল নয়নে শুধু মুখপানে চেয়ে রয়। নয়ন করিছে ছল ছল , এখনি পড়িবে যেন জল। ঝেতে নিরালা সব ঠাই, মাঠে কোথাও জন প্রাণী নাই- দূরে অতি দূরে দেখা যায়, মলিন সে সাঝের আলােতে ছায়া ছায়া গাছপালাগুলি মেশে মেশে মেঘের কোলেতে। বড় তাের বাজিতেছে পায়, আয়রে আমার কোলে আয়।
ছবি ও গান
আ-মরি জননী তাের কে!
বরে কোথায় তাের ধর।
তরাসে চাহি কেনরে ।
আমারে বাসি কেন পর ?
গ্রামে
নবীন প্রভাত-কনক-কিরণে,
নীরবে দাঁড়ায়ে গাছপালা,
কাপে মৃদু মৃদু কি যেন আরামে,
বায়ু বহে যায় সুধা-ঢালা।
নীল আকাশেতে নারিকেল তরু,
ধীরে ধীরে তার পাতা নড়ে,
প্রভাত আলােতে কুঁড়ে ঘরগুলি,
জলে ঢেউগুলি ওঠে পড়ে।
দুয়ারে বসিয়া তপন কিরণে
ছেলেরা মিলিয়া করে খেলা,
মনে হয় সব কি যেন কাহিনী
শুনেছিনু কোন্ ছেলেবেলা।
প্রভাতে যেনরে ঘরের বাহিরে
সে কালের পানে চেয়ে আছি,
পুরাতন দিন হােথা হতে এসে
উড়িয়ে বেড়ায় কাছাকাছি।
ছবি ও গান
ঘর দ্বার সব মায়া ছায়া সম,
কাহিনীতে গাঁথা খেলা-ধূলি,
মধুর তপন, মধুর পবন
ছবির মতন কুঁড়ে গুলি।
কেহবা দোলায় কেহবা দোলে
গাছতলে মিলে করে মেলা,
বাশি হাতে নিয়ে রাখাল বালক
কেহ নাচে, গায়, করে খেলা।
এমনি যেনরে কেটে যায় দিন,
কারো যেন কোন কাজ নাই,
অসম্ভব যেন সকলি সম্ভব,
পেতেছে যেনরে যাহা চাই।
কেবলি যেনরে ভাত তপনে,
প্রভাত পবনে, প্রভাত স্বপনে,
বিরামে কাটায় আরামে ঘুমায়
গাছপালা, বন, কুঁড়েগুলি।
কাহিনীতে ঘেরা ছােট গ্রামখানি,
মায়াদেবীদের মায়া রাজধানী,
পৃথিবী বাহিরে কলপনা তীরে
করিছে যেনরে খেলা ধূলি।
ছবি ও গান
আদরিণী
একটুখানি সােনার বিন্দু, একটুখানি মুখ,
একা একটি বনফুল ফোটে ফোটে হয়েছে,
কচি কচি পাতার মাঝে মাথা থুয়ে রয়েছে।
চারদিকে তার গাছের ছায়া, চারূদিকে তার নিশুতি,
চারুদিকে তার ঝােপে ঝাপে, আঁধার দিয়ে ঢেকেছে,
বনের সে যে স্নেহের ধন আদরিণী মেয়ে,
তারে বুকের কাছে মুকিয়ে যেন রেখেছে।
একটুখানি রূপের হাসি আঁধারেতে ঘুমিয়ে আলা,
বনের মেহ শিয়রেতে জেগে আছে।
সুকুমার প্রাণটুকু তার কিছু যেন জানে না,
চোখে শুধু সুখের স্বপন লেগে আছে।
এটি যেন রবির কিরণ ভােরের বেলা বনের মাঝে,
খেলাতে ছিল নেচে নেচে,
নিরালাতে গাছের ছায়ে, আঁধারেতে শ্রান্তকায়ে
সে যেন ঘুমিয়ে পড়েছে।
বনদেবী করুণ-হিয়ে তারে যেন কুড়িয়ে নিয়ে
যতন করে আপন ঘরেতে।
থুয়ে কোমল পাতার পরে মায়ের মত স্নেহভরে
হেঁয় তারে কোমল করেতে।
১৪
ছবি ও গান
ধীরি ধীরি বাতাস গিয়ে আসে তারে দোলা দিয়ে,
চোখেতে চুম’ খেয়ে যায়।
ঘুরে ফিরে আশে পাশে বারবার ফিরে আসে,
হাতটি বুলিয়ে দেয় গায় ।
এল পাখী গাছের শাখে কাছে তাের বসে থাকে,
সারা দুপুরবেলা শুধু ডাকে,
যেন তার আর কেহ নাই, সারাদিন এটি তাই
স্নেহ ভরে তােরে নিয়েই থাকে।
ও পাখীর নাম জানিনে, কোথায় ছিল কে তা জানে,
রাতের বেলায় কোথায় চলে যায়।
দুপুরবেলা কাছে আসে, ফ্লারাদিন বসে পাশে
একটি শুধু আদরের গান গায়।
রাতে কত তারা ওঠে, ভােরের বেলা চলে যায়।
তােরেত কেউ দেখে না জানে না,
এককালে তুই ছিলি যেন ওদের ঘরের মেয়ে,
আজকে রে তুই অজানা অচেনা।
নিত্যি দেখি রাতের বেলা এটি শুধু জোনাই আসে
আলাে দিয়ে মুখ পানে তাের চায়।
কে জানে সে কি যে করে। তারা-জন্মের কাহিনী তাের
কানে বুঝি স্বপন দিয়ে যায়।
ভােরের বেলা আলো এল, ডাচেরে তাের নামটি ধরে
ছবি ও গান
১৫
আজকে তবে মুখখানি তােল তােল,
আজকে তবে আঁখিটি তাের খােল,
লতা জাগে, পাখী জাগে, গায়ের কাছে বাতাস লাগে,
দেখিরে-ধীরে ধীরে দোল, দোল, দোল।
খেলা
ছেলেতে মেয়েতে করে খেলা,
বাসের পরে, সাঁঝের বেলা।
ঘাের ঘোর গাছের তলে তলে,
ফাঁকায় পড়েছে মলিন আলো,
কোথাও যেন সোনার ছায়া ছায়া,
কোথাও যেন আঁধার কালাে কালো
আকাশের ধারে ধারে ঘিরে,
বসেছে রাঙ! মেঘের মেলা,
শ্যামল ঘাসের পরে,
আলো আঁধারের মাঝে মাঝে,
ছেলেতে মেয়েতে করে খেলা।
সাঝে,
ওরা যে কেন হেসে সারা,
কেন যে করে অমন্ ধারা,
ছবি ও গান
কেন যে লুটোপুটি,
কেন যে ছুটোছুটি,
কেন যে আহলাদে কুটিকুটি।
কেহ বা ঘাসে গড়ায়,
কেহ বা নেচে বেড়ায়,
সাঝের সােনা-আকাশে
হাসির সােনা ছড়ায়।
আঁখি দুটি নৃত্য করে,
নাচে চুল পিঠের পরে,
হাসিগুলি চোখে মুখে মুকোচুরি খেলা করে
মেঘের কাছে ছুটি পেয়ে
বিদ্যুতের এল ধেয়ে,
আনন্দে হলরে আ'পহার।
হাসি দেখে খেলা দেখে,
আকাশের একধারে থেকে
মৃদু মৃদু হাচে এটি তারা।
যেন
ওদের
ঝাউগাছে পাতাটি নড়ে না,
কামিনীর পাপড়িটি পড়ে না।
আঁধার কাকের দল
সাঙ্গ করি কোলাহল,
কালাে কালাে গাছের ছায়,
কে কোথায় মিশায়ে যায়-
আকাশেতে পাখীটি ওড়ে না।
ছবি ও গান
১৭
সাড়াশব্দ কোথায় গেল,
নিঝুম হয়ে এল এল
গাছপালা বন গ্রামের আশে পাশে।
শুধু খেলার কোলাহল,
শিশুকণ্ঠের কলকল,
হাসির ধ্বনি উঠেছে আকাশে।
কত আর খেলবি ও রে,
নেচে নেচে হাতে ধরে
যে যার ঘরে চলে আয় ঝা,
আঁধার হয়ে এল পথঘাট।
সন্ধ্যাদীপ জ্বলুল ঘরে
চেয়ে আছে তােদের তরে,
তোদের না হেরিলে মা-র কোলে,
ঘরের প্রাণ কঁাদে সন্ধে হলে।
ঘুম
ঘুমিয়ে পড়েছে শিশুগুলি,
খেলাধূলা সব গেছে ভুলি।
ধীরে নিশীথের বায় আসে খােলা জানালায়,
ঘুম এনে দেয় আঁখি-পাতে,
১৮
ছবি ও গান
শয্যায় পায়ের কাছে খেলেনা ছড়ান আছে,
ঘুমায়েছে খেলাতে খেলাতে।
এলিয়ে গিয়েছে দেহ, মুখে দেবতার গেহ
পড়েছেরে ছায়ার মতন,
কালো কালো চুল তার বাতাসেতে বার বার
উড়ে উড়ে ঢাকিছে বদন। .
তারার আলাের মত হাসিগুলি আসে কত,
আধ খোলা অধরেতে তার
চুম’ খেয়ে যায় কতবার।
সারারাত স্নেহ-মুখে তারাগুলি চায় মুখে,
যেন তারা করি গলাগলি,
কত কি যে করে বলাবলি।
যেন তারা আঁচিলেতে আঁধারে আলােতে গেঁথে
হাসিমাখা মুখের স্বপন,
ধীরে ধীরে স্নেহভরে শিশুর প্রাণের পরে
একে একে করে বরিষণ।
কাল যবে রবিকরে কাননেতে থরে থরে
ফুটে ফুটে উঠিবে কুসুম,
ওদেরে নয়নগুলি ফুটিয়া উঠিবে খুলি,
কোথায় মিলায়ে যাবে ঘুম।
প্রভাতের আলো জাগি, যেন খেলাবার লাগি
ওদের জাগায়ে দিতে চায়,
আলােতে ছেলেতে ফুলে এক সাথে আঁখি খুলে
প্রভাতে পাখীতে গান গায়।
ছবি ও গান
বিদায়
সে যখন বিদায় নিয়ে গেল,
নবমীর চদি অস্তাচলে যায়।
গভীর রাতি, নিঝুম চারিদিক,
আকাশেতে তারা অনিমিখ,
ধরণী নীরবে ঘুমায়।
হাত দুটি তার ধ’য়ে দুই হাতে,
মুখের পানে চেয়ে সে রহিল,
কাননে বকুল তরুতলে
একটিও সে কথা না কহিল।
অধরে প্রাণের মলিন ছায়া,
চোখের জলে মলিন চাদের আলাে,
যাবার বেলা দুটি কথা বলে
বন-পথ দিয়ে সে চলে গেল।
ঘন গাছের পাতার মাঝে,
আঁধার পাখী গুটিয়ে পাখা,
তারি উপর চাঁদের আলো শুয়েছে,
ছায়াগুলি এলিয়ে দেহ
আঁচলখানি পেতে যেন
গাছের তলায় ঘুমিয়ে রয়েছে।
গভীর রাতে বাসটি নেই ;
নিশীথে সরসীর জলে
কঁপে বনের কালো ছায়া,
২০
ছবি ও গান
ঘুম যেন ঘােষ্টা-পয়া
বসে আছে ঝোপে-ঝাপে,
পড়ছে ব'সে কি যেন এক মায়া।
চুপ করে হেলে সে বকুল গাছে,
রমণী একেলা দাঁড়িয়ে আছে।
এলােথেলাে চুলের মাঝে
বিষাদ-মাখা সে মুখখানি
চাদের আলো পড়েছে তার পরে,
পথের পানে চেয়ে ছিল, পথের পানেই চেয়ে আছে,
পলক নাহি তিলেক কালের তরে।
গেলরে কে চলে গেল, ধীরে ধীরে চলে গেল
কি কথা সে বলে গেল হায়,
অতি দূর অশথের ছায়ে
মিশায়ে কে গেল রে,
রমণী দাড়ায়ে জোছনায়।
সীমাহীন জগতের মাঝে আশা তার হারায়ে গেল,
আজি এই গভীর নিশীথে,
শূন্য অন্ধকার খানি,
মলিন মুখশ্রী নিয়ে
দাঁড়িয়ে রহিল একভিতে।
পশ্চিমের আকাশ সীমায়
চাদখানি অস্তে যায় যায়।
ছােট ছােট মেঘগুলি, শাদা শাদা পাখা তুলি
চলে যায় চাদের চুম’ নিয়ে,
আঁধার গাছের ছায়
ডুবু ডুবু জোছনায়
ম্লানমুখী রমণী দাড়িয়ে।
ছবি ও গান
..
বিরহ
ধীরে ধীরে প্রভাত হল,
আঁধার মিলায়ে গেল
উষা হাসে কনকবরণী,
বকুল গাছের তলে,
কুসুম রাশির পরে,
বসিয়া পড়িল সে রমণী।
আঁখি দিয়ে ঝরঝরে
অশ্রুবারি ঝরে পড়ে
ভেঙে যেতে চায় যেন বুক,
রাঙা রাঙা অধর দুটি কেঁপে কেঁপে ওঠে কত,
করতলে সকরুণ মুখ।
অরুণ আঁখির পরে,
অরুণের আভা পড়ে,
কেশপাশে অরুণ লুকায়,
দুই হাতে মুখ ঢাকে কার নাম ধরে ডাকে,
কেন তার সাড়া নাহি পায়।
বহিছে প্রভাত বায়
আঁচিল লুটিয়ে যায়,
মাথায় ঝরিয়ে পড়ে ফুল,
ডালপালা দোলে ধীরে, কাননে সরসী তীরে
ফুটে ওঠে মল্লিকা মুকুল।
পা দুখানি ছড়াইয়া
পূরবের পানে চেয়ে
ললিতে প্রাণের গান গায়,
গাহিতে গাহিতে গান,
সব যেন অবসান,
যেন সবকিছু ভুলে যায়।
২২
ছবি ও গান
প্রাণ যেন গানে মিশে, অনন্ত আকাশ মাঝে
উদাসী হইয়ে চলে যায়,
বসে বসে শুধু গান গায়।
সুখের স্মৃতি
চেয়ে আছে আকাশের পানে
জোছনায় আঁচলটী পেতে,
যত আলো ছিল সে চঁাদের
সব যেন পড়েছে মুখেতে।
মুখে যেন গলে পড়ে চাদ,
চোখে যেন পড়িছে ঘুমিয়ে,
সুকোমল শিথিল আঁচলে
‘ড়ে আছে আরামে চুমিয়ে।
একটি মৃণালকরে মাথা,
আরেকটি পড়ে আছে বুকে,
বাসটি ব’হে গিয়ে গায়
শিহরি উঠিছে অতি সুখে।
হহলে হেলে নুয়ে মুছে লতা
বাতাসেতে পায়ে এসে পড়ে,
বিস্ময়ে মুখের পানে চেয়ে
ফুলগুলি দুলে দুলে নড়ে।
ছবি ও গান
অতি দূরে বাজে ধীরে বাঁশি,
অতি সুখে পরাণ উদাসী,
অধরেতে স্খলিতচরণ।
মদিরহিল্লোলময়ী হাসি।
কে যেনরে চুমাে খেয়ে তারে
চলে গেছে এই কিছু আগে ;
চুমােটিরে বাধি ফুলহারে
অধরেতে হাসির মাঝারে,
চুমােতে
চাদের
চুমাে দিয়ে
রেখেছে রে যতনে সােহাগে।
তাই সেই চুমােটিয়ে ঘিরে
হাসিগুলি সারারাত জাগে।
কে যেনরে বসে তার কাছে
গুণ গুণ করে বলে গেছে
মধুমাখা বাণী কানে কানে,
পরাণের কুসুম কারায়,
কথাগুলি উড়িয়ে বেড়ায়,
বাহিরিতে পথ নাহি জানে।
অতি দূর বাঁশরির গানে
সে বাণী জড়িয়ে যেন গেছে,
অবিরত স্বপনের মত
ঘুরিয়ে বেড়ায় কাছে কাছে।
মুখে নিয়ে সেই কথা ক’টি
খেলা করে উলটি পালটি,
২৪
ছবি ও গান
আপনি আপন বাণী শুনে
সরমে মুখেতে হয় সারা,
কার মুখ পড়ে তার মনে,
কার হাসি লাগিছে নয়নে,
স্মৃতির মধুর ফুলবনে
কোথায় হয়েছে পথহারা।
চেয়ে তাই সুনীল আকাশে,
মুখেতে চাদের আলো ভাসে,
অবসান গান আশেপাশে
ভ্রমে যেন ভ্রমরের পারা।
যােগী
পশ্চিমে ডুবেছে ইন্দু,
সম্মুখে উদার সিন্ধু
শিরােপরি অনন্ত আকাশ,
লম্বমান জটাজুটে,
যােগীবর করপুটে
দেখিছেন সূর্যের প্রকাশ।
উলঙ্গ সুদীর্ঘকায়, বিশাল ললাট ভায়
মুখে তার শাস্তির বিকাশ,
শূন্যে আঁখি চেয়ে আছে, উদার বুকের কাছে
খেলা করে সমুদ্র বাতাস।
চৌদিকে দিগন্ত মুক্ত,
বিশ্বচরাচর সুপ্ত,
তারি মাঝে যোগী মহাকায়,
ছবি ও
ও গান
ভয়ে ভয়ে ঢেউগুলি,
নিয়ে যায় পদধূলি,
ধীরে আসে ধীরে চলে যায়।
মহা স্তব্ধ সব ঠাই, বিশ্বে আর শব্দ নাই
কেবল সিন্ধুর মহাতান,
যেন সিন্ধু ভক্তিভরে, জলদগম্ভীর স্বরে
তপনের করে স্তবগান।
আজি সমুদ্রের কূলে,
নীরবে সমুদ্র দুলে
হৃদয়ের অতল গভীরে,
অনন্ত সে পারাবার,
ডুবাইছে চারিধার,
ঢেউ লাগে জগতের তীরে।
যােগী যেন চিত্রে লিখা, উঠিছে রবির শিখা
মুখে তারি পড়িছে কিরণ,
পশ্চাতে ব্যাপিয়া দিশি, তামসী তাপসী নিশি
ধ্যান করে মুদিয়া নয়ন।
শিবের জটার পরে যথা সুরধুনী ঝরে
তারা চূর্ণ রজতের স্রোতে,
তেমনি কিরণ লুটে সন্ন্যাসীর জটাজুটে
পূরব-আকাশ-সীমা হতে।
বিমল আলােক হেন, ব্রহ্মলােক হতে যেন
ঝরে তার ললাটের কাছে,
মর্ত্যের তামসী নিশি, পশ্চাতে যেতেছে মি শি
নীরবে নিস্তব্ধ চেয়ে আছে।
সুদূর সমুদ্র নীরে, অসীম আঁধার তীরে
একটুকু কনকের রেখা,
२७
ছবি ও গান
কি মহা রহস্যময়,
সমুদ্রে অরুণােদয়
আভাসের মত যায় দেখা।
চরাচর ব্যগ্র প্রাণে,
পূরবের পথ পানে
নেহারিছে সমুদ্র অতল,
দেখ চেয়ে মরি মরি, কিরণ-মৃণাল পরি
জ্যোতির্ময় কনক কমল।
দেখ চেয়ে দেখ পূবে
কিরণে গিয়েছে ডুবে
গগনের উদার ললাট,
সহসা সে ঋষিবর আকাশে তুলিয়া কর
গাহিয়া উঠিল বেদ পাঠ।
পাগল
আপন মনে বেড়ায় গান গেয়ে,
গান কেউ শােনে, কেউ শােনে না।
ঘুরে বেড়ায় জগৎ-পানে চেয়ে
তারে কেউ দেখে, কেউ দেখে না।
সে যেন গানের মত প্রাণের মত শুধু
সৌরভের মত উড়ছে বাতাসেতে,
আপনারে আপনি সে জানে না,
আপনাতে আপনি আছে মেতে।
হরষে তার পুলকিত গা,
ভাবের ভরে টলমল পা,
ছবি ও গান
২৭
কে জানে
কোথায় যে সে যায়
দেখে কি দেখে না।
আখি তার
লতা তার গায়ে পড়ে,
ফুল তার পায়ে পড়ে,
নদীর মুখে কুলু কুলু রা”।
গায়ের কাছে বাতাস করে বা'।
সে শুধু চলে যায়,
মুখে কি বলে যায়,
বাতাস গলে যায় তা শুনে।
সুমুখে আঁখি রেখে,
চলেছে কোথা যে কে
কিছু সে নাহি দেখে শােনে।
যেখেন দিয়ে যায় সে চলে সেথায় যেন ঢেউ খেলে যায়,
বাতাস যেন আকুল হয়ে ওঠে,
ধরা যেন চরণ ছুয়ে শিউরে ওঠে শ্যামল দেহে
লতায় যেন কুসুম ফোটে ফোটে।
বসন্ত তার সাড়া পেয়ে সখা বলে আসে ধেয়ে,
বনে যেন দুইটি বসন্ত,
দুই সখীতে ভেসে চলে যৌবন-সাগরের জলে
কোথাও যেন নাহিরে তার অন্ত।
আকাশ বলে এস এস, কানন বলে বস বস,
সবাই যেন নাম ধরে তার ডাকে।
হেসে যখন কয় সে কথা মূচ্ছ। যায়রে বনের লতা,
লুটিয়ে খুঁয়ে চুপ করে সে থাকে।
২৮
ছবি ও গান
বনের হরিণ কাছে আসে সাথে সাথে ফিরে পাশে
স্তব্ধ হয়ে দাড়ায় দেহছায়।
পায়ের কাছে পড়ে লুট, বড় বড় নয়ন দুটি
তুলে তুলে মুখের পানে চায়।
আপনা-ভােলা সরল হাসি, ঝরে পড়ছে রাশি রাশি,
আপনি যেন জাতে নাহি পায়।
লতা তারে আটকে রেখে তার কাছে হাসতে শেখে,
হাসি যেন কুসুম হয়ে যায়।
গান গায় সে সাঁঝের বেলা মেঘগুলি তাই ভুলে খেল।
নেমে আসতে চায়রে ধরা পানে,
একে একে সাঁঝের তারা গান শুনে তার অবাক্ পারা
আর সবারে ডেকে ডেকে আনে।
আপনি মাতে আপন স্বর আর সবারে পাগল করে,
সাথে সাথে সবাই গাহে গান,
জগতের যা কিছু আছে সব ফেলে দেয় পায়ের কাছে
প্রাণের কাছে খুলে দেয় সে প্রাণ।
তােরাই শুধু গুলিনেরে কোথায় বসে রৈলি যে রে,
ঘরের কাছে গেল গগয়ে গেয়ে
কেউ তাহারে দেখ লিনেত চেয়ে।
গাইতে গাইতে চলে গেল, কত দূর সে চলে গেল,
গানগুলি তার হারিয়ে গেল বনে
দুয়ায় দেওয়া ততদের পাষাণ মনে।
ছবি ও গান
মাতাল
বুঝরে,
চাদের কিরণ পান করে ওর ঢুলু ঢুলু দুটি আঁখি,
কাছে ওর যেওনা,
কথাটি শুধায়োনা,
ফুলের গন্ধে মাতাল হয়ে বসে আছে একাকী।
ঘুমের মত মেয়েগুলি
চোখের কাছে দুলি দুলি
বেড়ায় শুধু নুপুর রণ-রণি।
আধেক মুদি আঁখির পাতা,
কার সাথে যে কক্ষে কথা,
শুচে কাহার মৃদু মধুর ধ্বনি।
অতি সুদুর পরীর দেশে-
সেখেন থেকে বাতাস এসে
কানের কাছে কাহিনী শুনায়।
কত কি যে মােহের মায়া,
কত কি যে আলােকছায়া,
প্রাণের কাছে স্বপন ঘনায়।
কাছে ওর যেওনা,
কথাটি শুধায়ােনা,
ঘুমের মেয়ে তরাস পেয়ে যাবে,
মৃদু প্রাণে প্রমাদ গণি,
ছবি ও গান
নূপুরগুলি রণ-রণি,
চাদের আলােয় কোথায় কে লুকাবে।
চল দূরে নদীতীরে,
বসে সেথায় ধীরে ধীরে,
এটি শুধু বাঁশরী বাজাও।
আকাশেতে হাসবে বিধু,
মধু কণ্ঠে মৃদু মৃদু
এটি শুধু সুখেরি গান গাও।
দূর হতে আসিয়া কানে
পশিবে সে প্রাণের প্রাণে
স্বপনেতে স্বপন ঢালিয়ে।
ছায়াময়ী মেয়েগুলি
গানের স্রোতে দুলি দুলি,
বসে রবে গালে হাত দিয়ে।
গাহিতে গাহিতে তুমি বালা
গেঁথে রাখ মালতীর মালা।
ও যখন ঘুমাইবে গলায় পরায়ে দিবে
স্বপনে মিশিবে ফুলবাস।
ঘুমন্ত মুখের পরে চেয়ে থেকো প্রেমভরে
মুখেতে ফুটিবে মৃদু হাস।
ছবি ও গান
৩১
বাদল
একলা ঘরে বসে আছি, কেহই নেই কাছে,
সারাটা দিন মেঘ করে আছে।
সারাদিন বাদল হল,
সারাদিন বৃষ্টি পড়ে,
সারাদিন বইচে বাদল বায়।
মেঘের ঘটা আকাশভরা,
চারিদিক আঁধার করা,
তড়িৎরেখা ঝলক মেরে যায়।
শ্যামল বনের শ্যামল শিরে,
মেঘের ছায়া নেমেছে রে,
মেঘের ছায়া কুঁড়ে ঘরের পরে,
ভাঙাচোরা পথের ধারে,
ঘন বাঁশের বনের ধারে,
মেঘের ছায়া ঘনিয়ে যেন ধরে।
বিজন ঘরে বাতায়নে,
সারাটা দিন আপন মনে,
বসে বসে বাইরে চেয়ে দেখি,
টুপুটুপু বৃষ্টি পড়ে,
পাতা হতে পাতায় ঝরে,
ডালে বসে ভেজে এটি পাখী।
তালপুকুরে, জলের পরে,
৩২
ছবি ও গান
বৃষ্টিবারি নেচে বেড়ায়,
ছেলেরা মেতে বেড়ায় জলে,
মেয়েগুলি কলসী নিয়ে,
চলে আসে পথ দিয়ে,
আঁধারভরা গাছের তলে তলে।
কে জানে কি মনেতে আশ,
উঠছে ধীরে দীর্ঘ-নিশাস,
বায়ু উঠে শ্বসিয়া শ্বসিয়া।
ডালপালা হাহা করে
বৃষ্টি-বিন্দু ঝরে পড়ে
পাতা পড়ে খসিয়া খসিয়া।
আর্তস্বর
শ্রাবণে গভীর নিশি, দিগ্বিদিক আছে মিশি,
মেঘেতে মেঘেতে ঘন বাধা,
কোথা শশি, কোথা তারা, মেঘারণ্যে পথহারা
আঁধারে আঁধারে সব আঁধা।
জ্বলন্ত বিদ্যুৎ অহি ক্ষণে ক্ষণে রহি হি
অন্ধকারে করিছে দংশন।
ছবি ও গান
কুম্ভকর্ণ অন্ধকার নিদ্রা টুটি বার বার
উঠিতেছে করিয়া গর্জন।
শূন্যে যেন স্থান নাই, পরিপূর্ণ সব ঠাই,
সুকঠিন আঁধার চাপিয়া।
ঝড় বহে, মনে হয়, ও যেন রে ঝড় নয়,
অন্ধকার দুলিছে কঁপিয়া।
মাঝে মাঝে থরহর
কোথা হতে মরমর
কেঁদে কেঁদে উঠিছে অরণ্য।
নিশীথ-সমুদ্র মাঝে
জলজসম রাজে
নিশাচর যেনরে অগণ্য।
কে যেন রে মুহুর্মুহু
নিশ্বাস ফেলিছে হুহু,
হু হু করে কেঁদে কেঁদে ওঠে,
সুদূর অরণ্যতলে ডালপালা পায়ে দলে
আর্তনাদ করে যেন ছােটে।
এ অনন্ত অন্ধকারে কে রে সে, খুজিছে কারে,
তন্ন তন্ন আকাশ-গর।
তা’রে নাহি দেখে কেহ শুধু শিহরায় দেহ
শুনি তার তীব্র কণ্ঠস্বর ।
তুই কিরে নিশীথিনী অন্ধকারে অনাথিনী
হাৱাইলি জগতেরে তাের ;
অনন্ত আকাশ পরি
ছুটিবে হাহা করি,
আলােড়িয়া অন্ধকার ঘাের।
তাই কিরে থেকে থেকে নাম ধরে ডেকে ডেকে
জগতেরে করিস্ আহ্বান।
৩৪
ছবি ও গান
শুনি আজি তাের স্বর,
শিহরিত কলেবর
কঁদিয়া উঠিছে কার প্রাণ।
কে আজি রে তাের সাথে ধরি তাের হাতে হাতে
খুজিতে চাহিছে যেন কারে!
মহাশূন্যে দাড়াইয়ে, প্রান্ত হতে প্রান্তে গিয়ে,
কে চাহে কঁদিতে অন্ধকারে !
আঁধারেতে আঁখি ফুটে ঝটিকার পরে ছুটে
তীক্ষ্ণশিখা বিদ্যুৎ মাড়ায়ে,
হুহু করি নিশ্বাসিয়া চলে যাবে উদাসিয়া
কেশপাশ আকাশে ছড়ায়ে।
উলঙ্গিণী উন্মাদিনী, ঝটিকার কষ্ঠ জিনি
তীব্র কণ্ঠে ডাকিবে তাহারে,
সে বিলাপ কেঁপে কেঁপে বেড়াবে আকাশ ব্যেপে
ধ্বনিয়া অনন্ত অন্ধকারে।
ছিড়ি ছিড়ি কেশ পাশ কভু কান্না, কভু হাস
প্রাণ ভরে করিবে চীৎকার,
বজ্র আলিঙ্গন দিয়ে
বুকে তােরে জড়াইয়ে
ছুটিতে গিয়েছে সাধ তার।
ছবি ও গান
স্মৃতি-প্রতিমা
আজ কিছু করিব না আর,
সমুখেতে চেয়ে চেয়ে গুন্ গুন্ গগয়ে গেয়ে
বসে বসে ভাবি একবার।
আজি বহু দিন পরে যেন সেই দ্বিপ্রহরে
সে দিনের বায়ু বহে যায়,
হা রে হা শৈশব মায়া, অতীত প্রাণের ছায়া,
এখনাে কি আছি হেথায় ?
এখনো কি থেকে থেকে উঠিরে ডেকে ডেকে,
সাড়া দিবে সে কি আর আছে ?
যা ছিল তা আছে সেই, আমি যে সে আমি নেই
কেনরে আসি মাের কাছে ?
কেনরে পুরাণ’ স্নেহে পরাণের শূন্য গেহে
দাড়ায়ে মুখের পানে চাস?
অভিমানে ছল ছল’ নয়নে কি কথা বল,
কেঁদে ওঠে হৃদয় উদাস।
আছিল যে আপনার সে বুঝিরে নাই আর,
সে বুঝিরে হয়ে গেছে পর,
তবু সে কেমন আছে, শুধাতে আসি কাছে,
দাড়ায়ে কঁপি থ থ ।
আয় রে আয় রে অয়ি, শৈশবের স্মৃতিময়ী,
আয় তাের আপনার দেশে,
ছবি ও গান
যে প্রাণ আছিল তেরি তাহারি দুয়ার ধরি
কেন আজ ভিখারিণী বেশে।
আওসরি ধরি ধরি বার বার চা ফিরি,
সংশয়েতে চলে না চরণ,
ভয়ে ভয়ে মুখ পানে চাহিস্ আকুল প্রাণে,
ম্লান মুখে না সরে বচন।
দেহে যেন নাহি বল, চোখে পড়ে-পড়ে জল,
এলােচুলে, মলিন বসনে ;
কথা কেহ বলে পাছে ভয়ে না আসিস্ কাছে,
চেয়ে র’স আকুল নয়নে।
সেই ঘর, সেই দ্বার, মনে পড়ে বার বার
কত যে করিলি খেলাধূলি,
খেলা ফেলে গেলি চলে, কথাটি না গেলি বলে,
অভিমানে নয়ন আকুলি।
যেথা যা গেছিলি রেখে, ধুলায় গিয়েছে ঢেকে,
দেখরে তেমনি আছে পড়ি,
সেই অশ্রু, সেই গান, সেই হাসি, অভিমান,
ধূলায় যেতেছে গড়াগড়ি।
তবে রে বারেক আয়, বসি হেথা পুনরায়,
ধূলিমাখা অতীতের মাঝে,
শূন্য গৃহ জনহীন পড়ে আছে কত দিন,
আর হেথা বাঁশি নাহি বাজে।
কেন তবে আসিবিনে, কেন কাছে বসিবিনে
এখনাে বাসিস্ যদি ভাল,
ছবি ও গান
আয়রে ব্যাকুল প্রাণে চাই দুই মুখপানে,
গােধূলিতে নিভ’-নিভ’ আলো।
নিভিছে সাঁঝের ভাতি, আসিছে আঁধার রাতি,
এখনি ছাইবে চারিভিতে,
রজনীর অন্ধকারে, মরণ সাগরপারে
কেহ কারে নারিব দেখিতে।
আকাশের পানে চাই, চন্দ্র নাই, তারা নাই,
একটু না বহিছে বাতাস,
শুধু দীর্ঘ দীর্ঘ নিশি, দুজনে আঁধারে মিশি-
শুনিব দোহার দীর্ঘশ্বাস।
একবার চেয়ে দেখি, কোন খানে আছে যে কি,
কোন্ খানে কুরেছিনু খেলা,
শুকান’ এ মালাগুলি, রাখি রে কণ্ঠেতে তুলি,
কখন্ চলিয়া যাবে বেলা।
আয় তবে আয় হেথা, কোলে তোর রাখি মাথা,
কেশপাশে মুখ দেরে ঢেকে,
বিন্দু বিন্দু ধীরে ধীরে অশ্রু পড়ে অশ্রনীরে,
নিশ্বাস উঠিছে থেকে থেকে।
সেই পুরাতন স্নেহে হাতটি বুলাও দেহে,
মাথাটি বুকেতে তুলে রাখি,
কথা কও নাহি কও, চোখে চোখে চেয়ে রও,
আঁখিতে ডুবিয়া যাক আঁখি।
ছবি ও গান
আবছায়া
তারা সেই, ধীরে ধীরে আসিত,
মৃদু মৃদু হাসিত,
তাদের পড়েছে আজ মনে,
তারা
কথাটি কহিত না,
কাছেতে রহিত না,
চেয়ে রৈত নয়নে নয়নে।
তারা
চলে যেত আনমনে,
বেড়াইত বনে বনে,
আনমনে গাহিত রে গান।
চুল থেকে ঝরে ঝরে
ফুলগুলি যেত পড়ে,
কেশপাশে ঢাকিত বয়ান।
কাছে আমি যাইতাম,
গানগুলি গাইতাম,
সাথে সাথে যাইতাম পিছু,
তারা যেন আনমনা,
শুনিতে কি শুনিত না,
বুঝিবারে নারিতাম কিছু।
কভু তারা থাকি থাকি
আনমনে শূন্য আঁখি,
ছবি ও গান
চাহিয়া রহিত মুখপানে,
ভাল তারা বাসিত কি,
মৃদু হাসি হাসিত কি,
প্রাণে প্রাণ দিত কি, কে জানে!
গাথি ফুলে মালাগুলি,
যেন তারা যেত ভুলি
পরাইতে আমার গলায়।
যেন যেতে যেতে ধীরে
চায় তারা ফিরে ফিরে
বকুলের গাছের তলায়।
যেন তারা ভালবেসে
ডেকে যেত কাছে এসে
চলে যেত করিত রে মানা।
আমার তরুণ প্রাণে
তাদের হৃদয় খানি
আধ জানা, আধেক অজানা।
কোথা চলে গেল তার,
কোথা যেন পথহারা,
তাদের দেখিনে কেন আর।
কোথা সেই ছায়া ছায়া
কিশাের-কল্পনা মায়া,
মেঘ মুখে হাসিটি উষার।
৪০
ছবি ও গান
আলোতে ছায়াতে ঘেরা
জাগরণ স্বপনের।
আশে পাশে করিত রে খেলা,
একে একে পলাইল,
শূন্যে যেন মিলাইল,
বাড়িতে লাগিল যত বেলা।
আচ্ছন্ন
লতার লাবণ্য যেন
কচি কিশলয়ে ঘেরা,
সুকুমার প্রাণ তার মাধুরীতে ঢেকেছে,
কোমল মুকুলগুলি
চারিদিকে আকুলিত
তারি মাঝে প্রাণ যেন লুকিয়ে রেখেছে।
ওরে যেন ভাল করে দেখা যায় না,
আঁখি যেন ডুবে গিয়ে কুল পায় না।
সাঁঝের আভা নেমে এল, জ্যোৎস্না পাশে ঘুমিয়ে প’ল,
ফুলের গন্ধ দেখতে এসেছে,
তারাগুলি ঘিরে বসেছে।
পূরবী রাগিণীগুলি
দূর হতে চলে আসে
ছুতে তারে হয়নাক ভরসা,
কাছে কাছে ফিরে ফিরে
মুখপানে চায় তারা,
যেন তারা মধুময়ী দুরাশা ;
ছবি ও গান ৪১ ঘুমন্ত প্রাণেরে ঘিরে স্বপ্নগুলি ঘুরে ফিরে গাঁথে যেন আলােকের কুয়াশা, ঢেকে তারে আছে কত, চারিদিকে শত শত অনিমিষ নয়নের পিয়াসা। ওদের আড়াল থেকে আবছায়া দেখা যায় অতুলন প্রাণের বিকাশ, সােনার মেঘের মাঝে কচি উষা ফোটে ফোটে পূরবেতে তাহারি আভাস। আলােক-ৰসনা যেন আপনি সে ঢাকা আছে। আপনার রূপের মাঝারি, রেখা রেখা হাসিগুলি আশে পাশে চমকিয়ে রূপেতেই লুকায় আবার। আঁখির আলােক ছায়া আঁখিরে রয়েছে ঘিরে, তারি মাঝে দৃষ্টি পথহারা, যেথা চলে, স্বর্গ হতে অবিরাম পড়ে যেন লাবণ্যের পুষ্পবারিধারা। ধরণীরে ছুয়ে যেন পা-দুখানি ভেসে যায় কুসুমের স্রোত বহে যায়, কুমেরে ফেলে রেখে খেলাধূলা ভুলে গিয়ে মায়ামুগ্ধ বসন্তের বায়। ওরে কিছু শুধাইলে বুঝিরে নয়ন মেলি দুদণ্ড নীরবে চেয়ে রবে, ৪২ ছবি ও গান অতুল অধর দুটি ঈষৎ টুটিয়ে বুঝি অতি ধীরে দুটি কথা কবে। আমি কি বুঝি সে ভাষা শুনিতে কি পাব বাণী সে যেন কিসের প্রতিধ্বনি, মধুর মোহের মত যেমনি ছুইবে প্রাণ ঘুমায়ে সে পড়িবে অমনি। হৃদয়ের দূর হতে সে যেনরে কথা কয় তাই তার অতি মৃদুস্বর, বায়ুর হিল্লোলে তাই আকুল কুমুদ সম কথাগুলি কঁপে থর থর। কে তুমি গো উষাময়ি, আপন কিরণ দিয়ে আপনারে করেছ গােপন, রূপের সাগর মাঝে কোথা তুমি ডুবে আছ একাকিনী লক্ষ্মীর মতন। ধীরে ধীরে ওঠ দেখি, একবার চেয়ে দেখি, স্বর্ণ-জ্যোতি কমল আসন, সুনীল সলিল হতে ধীরে ধীরে উঠে যথা প্রভাতের বিমল কিরণ। সৌন্দৰ্য কোরক টুটে এস গাে বাহির হয়ে অনুপম সৌরভের প্রায়, আমি তাহে ডুবে যাব সাথে সাথে বহে যাব উদাসীন বসন্তের বায় ।
ছবি ও গান
মেহময়ী
হাসিতে ভরিয়ে গেছে হাসি মুখখানি,
প্রভাতে ফুলের বনে
দাড়ায়ে আপন মনে
মরি মরি, মুখে নাই বাণী।
প্রভাত কিরণগুলি
চৌদিকে যেতেছে খুলি
যেন শুভ্র কমলের দল,
আপন মহিমা লয়ে
তারি মাঝে দাড়াইয়ে
কে তুই, করুণাময়ি বল।
স্নিগ্ধ ওই দু-নয়ানে
চাহিলে মুখের পানে
সুধাময়ী শান্তি প্রাণে জাগে,
শুনি যেন স্নেহবাণী,
কোমল ও হাতখানি
প্রাণের গায়েতে যেন লাগে।
তােরে যেন চিনিতাম, তাের কাছে শুনিতাম
কত কি কাহিনী, সন্ধেবেলা,
যেন মনে নাই, কবে কাছে বসি মােরা সবে
তোর কাছে করিতাম খেলা।
অতি ধীরে তাের পাশে প্রভাতের বায়ু আসে,
যেন ছোট ভাইটির প্রায়,
যেন তোর স্নেহ পেয়ে তোর মুখ পানে চেয়ে
আবার সে খেলাইতে যায়।
অমিয়-মাধুরী মাখি চেয়ে আছে দুটি আঁখি,
জগতের প্রাণ জুড়াইছে,
৪৪
ছবি ও গান
ফুলের আমোদে মেতে হেলে দুলে বাতাসেতে
আঁখি হতে মেহ কুড়াইছে।
কি যেন জান গাে ভাষা, কি যেন দিতেছ আশা,
আঁখি দিয়ে পরাণ উথলে,
চারিদিকে ফুলগুলি, কচি কচি বাহু তুলি,
কোলে নাও, কোলে নাও বলে।
কারে যেন কাছে ডাক, যেথা তুমি বসে থাক
তার চারিদিকে থাক তুমি,
তােমার আপনা দিয়ে হাসিময়ী শান্তি দিয়ে ,
পূর্ণ কর চরাচরভূমি।
তােমাতে পূরেছে বন,
পূর্ণ হল সমীরণ,
তােমাতে পূরেছে লতাপাতা।
ফুল দূরে থেকে চায়
তােমার পরশ পায়,
লুটায় তােমার কোলে মাথা।
তােমার প্রাণের বিভা চৌদিকে দুলিছে কিবা
প্রভাতের আলােকহিল্লোলে,
আজিকে প্রভাতে এ কি স্নেহের প্রতিমা দেখি,
বসে আছ জগতের কোলে।
কেহ মুখে চেয়ে থাকে, কেহ তোরে কাছে ডাকে,
কেহ তাের কোলে খেলা করে।
তুমি শুধু স্তব্ধ হয়ে
একটি কথা না কয়ে
চেয়ে আছ আনন্দের ভরে।
ওই যে তােমার কাছে সকলে দাড়ায়ে আছে
ওরা মাের আপনার লােক,
ছবি ও গান
৪৫
ওরাও আমারি মত তোর স্নেহে আছে রত,
জুই বেলা বকুল অশােক।
বড় সাধ যায় তােরে
ফুল হয়ে থাকি ঘিরে
কাননে ফুলের সাথে মিশে,
নয়ন কিরণে তাের
দুলিবে পরাণ মাের,
সুবাস ছুটিবে দিশে দিশে।
তােমার হাসিটি লয়ে হরষে আকুল হয়ে
খেলা করে প্রভাতের আলো,
হাসিতে আলােটি পড়ে,
আলােতে হাসিটি পড়ে,
প্রভাত মধুর হয়ে গেল।
পরশি তােমার কা,
মধুর প্রভাত বায়,
মধুময় কুসুমের বাস,
ওই দৃষ্টি-সুধা দাও,
এই দিক পানে চাও,
প্রাণ হোক প্রভাত বিকাশ।
রাহুর প্রেম
শুনেছি আমারে ভাল লাগে না,
নাই বা লাগিল তাের,
কঠিন বাধনে চরণ বেড়িয়া,
চিরকাল তােরে রব আঁকড়িয়া,
লৌহ শৃঙ্খলের ডাের।
ছবি ও গান
তুইত আমার বন্দী অভাগিনী,
বধিয়াছি কারাগারে,
প্রাণের শৃঙ্খল দিয়েছি প্রাণেতে
দেখি কে
খুলিতে পারে।
জগৎ মাঝারে, যেথায় বেড়াবি,
যেথায় বসিবি, যেথায় দাড়াবি,
কি বসন্ত শীতে, দিবসে নিশীথে,
সাথে সাথে তাের থাকিবে বাজিতে
এ পাষাণ প্রাণ অনন্ত শৃঙ্খল
চরণ জড়ায়ে ধরে,
একবার তােরে দেখেছি যখন
কেমনে 'এড়াবি মােরে।
চাও নাই চাও, ডাক নাই ডাক,
কাছেতে আমার থাক নাই থাক,
যাব সাথে সাথে, বব পায় পায়,
রব গায় গায় মিশি,
এ বিষাদ ঘোের, এ আঁধার মুখ,
হতাশ নিশ্বাস, এই ভাঙা বুক,
ভাঙা বা সম বাজিবে কেবল
সাথে সাথে দিবানিশি।
অনন্ত কালের সঙ্গী আমি তাের
আমি যে রে তাের ছায়া,
ছবি ও গান
৪৭
কিবা সে রােদনে, কিবা সে হাসিতে,
দেখিতে পাইবি কখন পাশেতে,
কখন সমুখে কথন পশ্চাতে
আমার আঁধার কায়া।
গভীর নিশীথে, একাকী যখন
বসিয়া মলিন প্রাণে,
চমকি উঠিয়া দেখিবি তরাসে
আমিও রয়েছি বসে তাের পাশে,
চেয়ে তাের মুখ পানে।
যে দিকেই তুই ফিরাবি বয়ান,
সেই দিকে আমি ফিরাব নয়ান,
যে দিকে চাহিবি, আকাশে, আমার
আঁধার মূরতি আঁকা,
সকলি পড়িবে আমার আড়ালে,
জগৎ পড়িবে ঢাকা।
দুঃস্বপ্নের মত, দুর্ভাবনাসম,
তােমারে রহিব ঘিরে,
দিবস রজনী এ মুখ দেখিব
তােমার নয়ন-নীরে
বিশীর্ণ-কঙ্কাল চির-ভিক্ষা সম
দাড়ায়ে সম্মুখে তোর
দাও দাও বলে কেবলি ডাকি,
ফেলিব নয়ন-লের।
৪
ছবি ও গান
কেবলি সাধিব, কেবলি কঁদিব
কেবলি ফেলিব শ্বাস,
কানের কাছেতে, প্রাণের কাছেতে
করিবরে হা-হুতাশ।
মাের এক নাম কেবলি বসিয়া
জপিব কানেতে তব,
কাটার মতন, দিবস রজনী
পায়েতে বিধিয়ে রব।
পূৰ্ব জনমের অভিশাপ সম,
রব’ আমি কাছে কাছে,
ভাবী জনমের অদৃষ্টের মত
বেড়াইব পাছে পাছে।
ঢালিয়া আমার প্রাণের আঁধার,
বেড়িয়া রাখিব তাের চারিধার
নিশীথ রচনা করি।
কাছেতে দাড়ায়ে প্রেতের মতন,
শুধু দুটি প্রাণী করিব যাপন
অনন্ত সে বিভাবরী।
যেন রে অকূল সাগর মাঝারে
ডুবেছে জগৎ তরী ;
তারি মাঝে শুধু মােরা দুটি প্রাণী,
রয়েছি জড়ায়ে তাের বাহুখানি,
যুঝি ছাড়াতে ছাড়িব না তবু,
সে মহা সমুদ্র পরি,
ছবি ও গান
পলে পলে তাের দেহ হয় ক্ষীণ,
পলে পলে তাের বাহু বলহীন,
দুজনে অনন্তে ডুবি নিশিদিন
তবু আছি তােরে ধরি।
রােগের মতন বাধিব তােমারে
নিদারুণ আলিঙ্গনে,
মাের যাতনায় হইবি অধীর,
আমারি অনলে দহিবে শরীর,
অবিরাম শুধু আমি ছাড়া আর
কিছু না রহিবে মনে।
গভীর নিশীথে জাগিয়া উঠিয়া
সহসা দেখিবি কাছে,
আড়ষ্ট কঠিন মৃত দেহ মাের
তাের পাশে শুয়ে আছে।
ঘুমাবি যখন স্বপন দেখিবি,
কেবল দেখিবি মােরে,
এই অনিমেষ তৃষাতুর আঁখি
চাহিয়া দেখিছে তোরে।
নিশীথে বসিয়া থেকে থেকে তুই
শুনিৰি আঁধার ঘােরে,
কোথা হতে এক কাতর উন্মাদ
ডাকে তাের নাম ধরে।
ছবি ও গান
সুধিজন পথে চলিতে চলিতে
সহসা সভয় গণি,
সাঁঝের আঁধারে শুনিতে পাইবি
আমার হাসির ধ্বনি।
হের অন্ধকার মরুময়ী নিশা,
আমার পরাণ হারায়েছে দিশা,
অনন্ত এ ক্ষুধা, অনন্ত এ তৃষা,
করিতেছে হাহাকার,
আজিকে যখন পেয়েছিরে তােরে,
এ চির-যামিনী ছাড়িব কি করে ?
এ ঘাের পিপাসা যুগ যুগান্তরে
মিটিবে কি কভু আর ?
বুকের ভিতবে ছুরীর মতন,
মনের মাঝারে বিষের মতন,
রােগের মতন, শোকের মতন
রব আমি অনিবার।
জীবনের পিছে মরণ দাড়ায়ে
আশার পশ্চাতে ভয়,
ডাকিনীর মত রজনী ভ্ৰমিছে
চিরদিন ধরে দিবসের পিছে
সমস্ত ধরণীময়।
ছবি ও গান
যেথায় অলােক সেইখানে ছায়া
এই ত নিয়ম ভবে,
ও রূপের কাছে চিরদিন তাই
এ ক্ষুধা জাগিয়া রবে।
মধ্যাহ্নে
হের ওই বাড়িতেছে বেলা,
বসে আমি রয়েছি একেলা।
ওই হােথা যায় দেখা, সুদূরে বনের রেখা
মিশেছে আকাশ নীলিমায়।
দিক্ হতে দিগন্তরে মাঠ শুধু ধূধূ করে,
বায়ু কোথা ব’হে চলে যায়।
সুদূর মাঠের পারে গ্রামখানি এক ধারে
গাছ দিয়ে ছায়া দিয়ে ঘেরা,
কাননের গায়ে বেন ছায়াখানি বুলাইয়া
ভেসে চলে কোথায় মেঘেরা !
মধুব উদাস প্রাণে চাই চারিদিক পানে,
স্তব্ধ সব ছবির মতন,
সব যেন চারিধারে অবশ অলস ভারে
স্বর্ণময় মায়ায় মগন।
এম খানি, মাঠ পাসি, উচুনিচু পথখানি,
দুয়েকটি গাছ মাঝে মাঝে,
ছবি ও গান
আকাশ সমুদ্রে ঘেরা সুবর্ণ দ্বীপের পারা
কোথা যেন সুদুরে বিরাজে।
কনক-লাবণ্য ল’য়ে যেন অভিভূত হয়ে
আপনাতে আপনি ঘুমায়,
নিঝুম পাদপ লতা, শ্ৰান্তকায় নীরবতা
শুয়ে আছে গাছের ছায়ায়।
শুধু অতি মৃদু স্বরে গুন্ গুন্ গান করে
যেন সব ঘুমন্ত ভ্রমর,
যেন মধু খেতে খেতে ঘুমিয়েছে কুসুমেতে
মরিয়া এসেছে কণ্ঠস্বর ।
নীল শূন্যে ছবি আঁকা রবির কিরণ মাখা,
সেথা যেন বাস করিতেছি,
জীবনের আধখানি যেন ভুলে গেছি আমি
কোথা যেন ফেলিয়ে এসেছি।
আনমনে ধরি ধরি বেড়াতেছি ফিরি ফিরি
ঘুমঘের ছায়ায় ছায়ায়,
কোথা যাব কোথা যাই সে কথা যে মনে নাই,
ভুলে আছি
মধুর মায়ায়।
মধুর বাতাসে আজি যেন রে উঠিছে বাজি
পরাণের ঘুমন্ত
ভালবাসা আজি কেন সঙ্গীহারা পাখী যেন
বসিয়া গাহিছে একেলাটি।
কে জানে কাহারে চায়, প্রাণ যেন উভরায়
ডাকে কারে “এস এস” বলে,
বীণাটি,
ছবি ও গান
কত নদী
কাছে কারে পেতে চায়, সব তারে দিতে চায়,
মাথাটি রাখিতে চায় কোলে।
স্তব্ধ তরুতলে গিয়া পা-দুখানি ছড়াইয়া
নিমগন মধুময় মােহে,
আনমনে গান গেয়ে দূর শূন্য পানে চেয়ে
ঘুমায়ে পড়িতে চায় দেহে।
দূব মরীচিকাসম ওই বন উপবন,
ওরি মাঝে পরাণ উদাসী,
বিজন বকুলতলে পল্লবের মরমরে,
নাম ধরে বাজাইছে বাঁশি।
সে যেন কোথায় আছে, সুদূর বনের পাছে,
সমুদ্রের পারে,
নিভৃত নিঝর তীরে লতায় পাতায় ঘিরে
বসে আছে নিকুঞ্জ আঁধারে।
সাধ যায় বাশি করে বন হতে বনান্তরে
চলে যাই আপনার মনে,
কুসুমিত নদী তীরে বেড়াইব ফিরে ফিরে
কে জানে কাহার অন্বেষণে।
সহসা দেখিব তারে, নিমেষেই একেবারে
প্রাণে প্রাণে হইবে মিলন,
এই মরীচিকা দেশে দুজনে বাসর বেশে
ছায়ারাজ্যে করিব ভ্রমণ।
বাঁধিবে সে বাহুপাশে চোখে তার স্বপ্ন ভাসে
মুখে তার হাসির মুকুল,
৫৪
ছবি ও গান
কে জানে বুকের কাছে আঁচল আছে না আছে
পিঠেতে পড়েছে এলোচুল।
মুখে আধখানি কথা চোখে আধখানি কথা
আধখানি হাসিতে জড়ান,
দুজনেতে চলে যাই কে জানে কোথায় চাই
পদতলে কুসুম ছড়ান।
বুঝিরে এমনি বেলা ছায়ায় করিত খেলা
তপােবনে ঋষি-বালিকারা,
পরিয়া বাকল বাস, মুখেতে বিমল হাস
বনে বনে বেড়াইত তারা।
হরিণ-শিশুরা এসে কাছেতে বসিত ঘেসে
মালিনী বহিত পদতলে,
দু-চারি সখীতে মেলি কথা কয় হাসি খেলি
তরুতলে বসি কুতূহলে।
কারো কোলে কারাে মাথা, সরল প্রাণের কথা
নিরালায় কহে প্রাণ খুলি,
মুকিয়ে গাছের আড়ে সাধ যায় শুনিবারে
কি কথা কহিছে মেয়েগুলি।
লতার পাতার মাঝে, ঘাসের ফুলের মাঝে
হরিণ-শিশুর সাথে মিলি,
অঙ্গে আভরণ নাই বাকল বসন পরি
রূপগুলি বেড়াইছে খেলি।
ছবি ও গান ওই দূর বনছায়া ও যে কি জানেরে মায়া, ও যেনরে রেখেছে লুকায়ে, সেই স্নিগ্ধ তপােবন চিরফুল্ল তরুগণ, হরিণশাবক তরু-ছায়ে। হােথায় মালিনী নদী বহে যেন নিরবধি, ঋষিকন্যা কুটীরের মাঝে, কভু বসি তরুতলে মেহে তারে ভাই বলে, ফুলটি ঝরিলে ব্যথা বাজে। কত ছবি মনে আসে, পরাণের আশেপাশে কল্পনা কত যে করে খেলা, বাতাস লাগায়ে গায়ে বসিয়া তরুর ছায়ে কেমনে কাটিয়া যায় বেলা। পূর্ণিমায় যাই—যাই-ডুবে যাই- আরো আরো ডুবে যাই- বিহবল অবশ অচেতন কোন্ খানে, কোন্ দূরে, নিশীথের কোন্ মাঝে, কোথা হয়ে যাই নিমগন ।
ছবি ও গান - হে ধরণী, পদতলে দিও না দিও না বাধা দাও মােরে দাও ছেড়ে দাও- অনন্ত দিবস নিশি এমনি ডুবিতে থাকি তােমরা সুদূরে চলে চাও। এ কিরে উদার জ্যোৎস্না, এ কিরে গভীর নিশি, দিশে দিশে স্তব্ধতা বিস্তারি। আঁখি দুটি মুদে গেছে কোথা আছি কোথা নামি কিছু যেন বুঝিতে না পারি। দেখি দেখি আরো দেখি অসীম উদার শূন্যে আরো দুয়ে—আরো দুরে যাই-- দেখি আজি এ অনন্তে আপনা হারায়ে ফেলে আর যেন খুঁজিয়া না পাই। তোমরা চাহিয়া থাক জোছনা-অমৃত পানে বিল বিলীন তারাগুলি। অপার দিগন্ত গাে, থাক এ মাথার পরে দুই দিকে দুই পাখা তুলি।
ছবি ও গান
গান নাই কথা নাই
শব্দ নাই স্পর্শ নাই
নাই ঘুম নাই জাগরণ।
কোথা কিছু নাহি জাগে
সর্বাঙ্গে জোছনা লাগে
সৰ্বাঙ্গ পুলকে অচেতন।
অসীমে সুনীলে শূন্যে
বিশ্ব কোথা ভেসে গেছে
তারে যেন দেখা নাহি যায়--
নিশীথের মাঝে শুধু
মহান্ একাকী আমি
অতলেতে ডুবিয়ে কোথায়।
গাও বিশ্ব গাও তুমি
সুদূর অদৃশ্য হতে
গাও তব নাবিকের গান -
শত লক্ষ যাত্রী লয়ে
কোথায় যেতেছ তুমি
তাই ভাবি মুদিয়া নয়ন।
অনন্তু রজনী শুধু
ডুবে যাই নিভে যাই
মরে যাই অসীম মধুরে,
বিন্দু হতে বিন্দু হয়ে
মিশায়ে মিলায়ে যাই
অনন্তের সুদূর সুদূরে।
ছবি ও গান
পােড়াে বাড়ি
চারিদিকে কেহ নাই, একা ভাঙা বাড়ি
সন্ধে বেলা ছাদে বসে ডাকিতেছে কাক,
নিবিড় আঁধার, মুখ বাড়ায়ে রয়েছে,
যেথা আছে ভাঙা ভাঙা প্রাচীরের ফাক।
পড়েছে সন্ধ্যার ছায়া অশথের গাছে,
থেকে থেকে শাখা তার উঠিছে নড়িয়া,
ভগ্ন ও দীর্ঘ এক দেবদারু তরু
হেলিয়া ভিত্তির পরে রয়েছে পড়িয়া।
আকাশেতে উঠিয়াছে আধখানি চাদ,
তাকায় চাদের পানে
গৃহের
আঁধার,
প্রাঙ্গণে করিয়া মেলা উৰ্দ্ধমুখ হয়ে
চন্দ্রালােকে শৃগালের করিছে চীৎকার ।
শুধাইরে, 'ওই তাের ঘাের স্তব্ধ ঘরে
কখন কি হয়েছিল বিবাহ উৎসব ?
কোনো রজনীতে কিরে ফুল্ল দীপালােকে
উঠেছিল প্রমােদের নৃত্যগীত রব ?
হােথায় কি প্রতিদিন সন্ধ্যা হয়ে এলে
তরুণীরা সন্ধ্যাদীপ জ্বালাইয়া দিত?
মায়ের কোলেতে শুয়ে চাদেরে দেখিয়া
শিশুটি তুলিয়া হাত ধরিতে চাহিত ?
ছবি ও গান
৫
বালকেরা বেড়াত কি কোলাহল করি ?
আঙিনায় খেলিত কি কোন ভাই বােন্ ?
মিলে মিশে স্নেহে প্রেমে আনন্দে উল্লাসে
প্রতি দিবসের কাজ হত সমাপন?
কোন্ ধরে কে ছিল রে ! সে কি মনে আছে ?
কোথায় হাসিত বধূ সরমের হাসি,
বিরহিণী কোন্ ঘরে কোন্ বাতায়নে
রজনীতে একা বসে ফেলিত নিশ্বাস ?
যে দিন শিয়রে তাের অশথের গাছ
নিশীথের বাতাসেতে করে মর মর,
ভাঙা জানালার কাছে পশে অতি ধীরে
জাহ্নবীর তরঙ্গের দূৰ কলস্বর
সে রাত্রে কি তাদের আবার পড়ে মনে
সেই সব ছেলেদের সেই কচি মুখ,
কত স্নেহময়ী মাতা তরুণ তরুণী
কত নিমিষের কত ক্ষুদ্র মুখ দুখ?
মনে পড়ে সেই সব হাসি আর গান,
মনে পড়ে—কোথা তারা, সব অবসান।
ছবি ও গান
অভিমানিনী
আমার
ওয়ে
অভিমানী মেয়ে
কেউ কিছু বােলাে না।
আমার কাছে এসেছে,
আমায় ভাল বেসেছে,
কেউ কিছু বােলো না।
'ওরে
এলােথেলো চুলগুলি ছড়িয়ে
ওই দেখ সে দাড়িয়ে রয়েছে।
নিমেষ-হারা আঁখির পাতা দুটি
চোখের জলে ভরে এসেছে।
গ্রীকাখানি ঈষৎ বাঁকানো
দুটি হাতে মুঠি আছে চাপি,
ঘােট ঘােট রাঙা রাঙা ঠোঁট
ফুলে ফুলে উঠিতেছে কপি।
সাধিলে ও কথা কবে না,
'ডাকিমে ও আসিবে না কাছে ;
ও--সবার পরে অভিমান করে
আপনা নিয়ে দাড়িয়ে শুধু আছে।
কি হয়েছে কি হয়েছে বলে
বাতাস এসে চুলগুলি দোলায় ;-
ছবি ও গান
---
রাঙা ওই কপােল খানিতে
রবির হাসি হেসে চুম খায়।
কচি হাতে ফুল দুখানি ছিল
রাগ করে ঐ ফেলে দিয়েছে,
পায়ের কাছে পড়ে পড়ে তারা
মুখের পানে চেয়ে রয়েছে।
আয় বাছা, তুই কোলে বসে বল
কি কথা তাের বলিবার আছে,
অভিমানে রাঙা মুখখানি
আন্ দেখি তুই এ বুকের কাছে।
ধীরে ধীরে আধ’ আধ’ বল
কেঁদে কেঁদে ভাঙা ভাঙা কথা,
আমায় যদি না বলিবি তুই
কে নিবে শিশু-প্রাণের ব্যথা।
নিশীথ জগৎ
জন্মেছি নিশীথে আমি, তারার আলোকে,
রয়েছি বসিয়া,
চারিদিকে নিশীথিনী মাঝে মাঝে হুহু করি
উঠিছে খসিয়া।
৬২
ছবি ও গান
পশ্চিমে করেছে মেঘ, নিবিড় মেঘের প্রান্তে
স্ফুরিছে দামিনী,
দুঃস্বপ্ন ভাঙিয়া যেন শিহরি মেলিছে আঁখি
চকিত যামিনী।
আঁধারে অরণ্যভূমি নয়ন মুদিয়া
করিতেছে ধ্যান,
অসীম আঁধার নিশা আপনার পানে চেয়ে
হারায়েছে জ্ঞান।
মাথার উপর দিয়া উড়িছে বাদুড় :
কঁদিছে পেচক,
একেলা রয়েছি বসি, চেয়ে শূন্যপানে,
পড়ে পলক।
আঁধারের প্রাণী যত ভূমিতলে হাত দিয়া
ঘুরিয়া বেড়ায়,
চোখে উড়ে পড়ে ধূলা, কোন্খানে কি যে আছে
দেখিতে না পায়।
চরণে বাধিছে বাধা, পাষাণে বাজিছে মাথা,
কঁদিছে বসিয়া,
অগ্নি-হাসি উপহাসি উল্কা-অভিশাপ-শিখা
পড়িছে খসিয়া।
তাদের মাথার পরে সীমাহীন অন্ধকার
স্তব্ধ গগনেতে,
ছবি ও গান
আঁধারের ভারে যেন ভুইয়া পড়িছে মাথা,
মাটির পানেতে।
নাড়লে গাছের পাতা চকিতে চমকি উঠে,
চায় চারিধারে,
ঘাের আঁধারের মাঝে কোথা কি লুকায়ে আছে
কে বলিতে পারে।
গহন বনের মাঝে চলিয়াছে শিশু
মা’র হাত ধরে,
মুহূৰ্ত্ত ছেড়েছে হাত, পড়েছে পিছায়ে
খেলাবার তরে,
অমনি হারায়ে পথ কেঁদে ওঠে শিশু
ডাকে মা-মা বলে,
“আয় মা, আয় না, আয়, কোথা চলে গেলি,
মেরে নে মা কোলে।
মা অমনি চমকিয়া “বাছা বাছা” বলে ছোটে,
দেখিতে না পায়,
শুধু সেই অন্ধকারে মা মা ধ্বনি পশে কানে
চারিদিকে চায়।
সহসা সমুখ দিয়া কে গেল ছায়ার মত,
লাগিল তরল,
কে জানে সহসা যেন কোথা কোন্ দিক হতে
শুনি দীর্ঘশ্বাস !
ছবি ও গান
দূরে-অতি
কে বসে রয়েছে পাশে ? কে ছুইল দেহ মাের
হিম-হস্তে তার ?
ওকি ও ? একি রে শুনি! কোথা হতে উঠিল রে
ঘাের হাহাকার ?
ওকি হোথা দেখা যায়—ওই
ও কিসের আলো?
ওকি ও উড়িছে শূন্যে ? দীর্ঘ নিশাচর পাখী ?
মেঘ কালাে কালাে ?
এই আঁধারের মাঝে কত না অদৃশ্য প্রাণী
কাঁদিছে বসিয়া,
নীরবে টুটিছে প্রাণ, চাহিছে তারার পানে
অরণ্যে পশিয়া।
কেহ বা রয়েছে শুয়ে দগ্ধ হৃদয়ের পরে
স্মৃতিরে জড়ায়ে,
কেহ না দেখিছে তারে, অন্ধকারে অশ্রুধারা,
পড়িছে গড়ায়ে।
কেহ বা শুনিছে সাড়া, উৰ্দ্ধকণ্ঠে নাম ধরে
ডাকিছে মরণে,
পশিয় হৃদয়মাবে আশার অঙ্কুর গুলি
দলিছে চরণে।
ওদিকে আকাশ পরে মাঝে মাঝে থেকে থেকে
উঠে অট্টহাস,
ছবি ও গান
ঘন ঘন করতালি, উনমদ কণ্ঠস্বরে
কাঁপিছে আকাশ।
আলিয়া মশাল আলো নাচিছে গাইছে তারা-
ক্ষণিক উল্লাস,
আঁধার মুহূৰ্ত্ত তরে হাসে যথা প্রাণপণে
আলেয়ার হাস।
অরণ্যের প্রান্তভাগে নদী এক চলিয়াছে
বাকি বাঁকিয়া,
স্তব্ধ জল শব্দ নাই-ফণী সম ফুসি উঠে
থাকিয়া থাকিয়া।
আঁধারে চলিতে পান্থ দেখিতে না পায় কিছু
জলে গিয়া পড়ে,
মুহূর্তের হাহাকার—মুহূর্তে ভাসিয়া যায়
থর-স্রোতভরে।
সখা তার তীরে বসি একেলা কাঁদিতে থাকে,
ডাকে উদ্ধশ্বাসে,
কাহারো না পেয়ে সাড়া শূন্যপ্রাণ প্রতিধ্বনি
কেঁদে ফিরে আসে।
নিশীথের কারাগারে কে বেঁধে রেখেছে মােরে
রয়েছি পড়িয়া,
কেবল রয়েছি বেঁচে স্বপন কুড়ায়ে লয়ে
ভাঙিয়া গড়িয়া।
ছবি ও গান
আঁধারে নিজের পানে চেয়ে দেখি, ভাল করে
দেখিতে না পাই,
হৃদয়ে অজানা দেশে পাখী গায় ফুল ফোটে
পথ জানি নাই।
অন্ধকারে আপনারে দেখিতে না পাই যত
তত ভালবাসি,
তত তারে বুকে করে বাহুতে বঁধিয়া লয়ে
হরষেতে ভাসি।
তত যেন মনে হয় পাছে রে চলিতে পথে
তৃণ ফুটে পায়,
যতনের ধন পাছে চমকি কঁদিয়া ওঠে
কুসুমের ঘাম।
সদা হয় অবিশ্বাস করেও চিনি না হেথা,
সবি অনুমান,
ভালবেসে কাছে গেলে দূরে চলে যায় সবে,
ভয়ে কাপে প্রাণ।
গােপনেতে অশ্রু ফেলে, মুছে ফেলে, পাছে কে
দেখিবারে পায়,
মরমের দীর্ঘশ্বাস মরমে রুধিয়া রাখে
পাছে শোনা যায়।
সখারে কঁাদিয়া বলে-“বড় সাধ যায় সখা,
দেখি ভাল করে,
তুই শৈশবের বঁধু চিরজন্ম কেটে গেল
দেখি না তােরে।
ছবি ও গান
বুঝি তুমি দূরে আছ, একবার কাছে এসে
দেখাও তােমায়।”
সে অমনি কেঁদে বলে—“আপনাকে দেখি নাই
কি দেখাব হায়।”
অন্ধকার ভাগ করি, আঁধারের রাজ্য লয়ে
চলিছে বিবাদ,
সখারে বধিছে সখা সন্তানে হানিছে পিতা,
ঘাের পরমাদ।
মৃত দেহ পড়ে থাকে, শকুনী বিবাদ করে
কাছে ঘুরে ঘুরে,
মাংস ল’য়ে টানাটানি করিতেছে হানাহানি
শৃগালে কুকুরে।
অন্ধকার ভেদ করি অহরহ শুনা যায়,
আকুল বিলাপ,
আহতের আত্তস্বর, হিংসার উল্লাস ধ্বনি,
ঘাের অভিশাপ।
মাঝে মাঝে থেকে থেকে কোথা হতে ভেসে আসে
ফুলের সুবাস,
প্রাণ যেন কেঁদে ওঠে, অশ্রুজলে ভাসে আখি
উঠেরে নিল।
ছবি ও গান
চারিদিক ভূলে যাই, প্রাণে যেন জেগে ওঠে
স্বপন আবেশ,
কোথারে ফুটেছে ফুল, আঁধারের কোন্ তীরে
কোথা কোন্ দেশ।
রুদ্ধ প্রাণ ক্ষুদ্র প্রাণী, রুদ্ধ প্রাণীদের সাথে
কত রে রহিব,
ছােট ঘােট সুখ দুখ, ছােট ছােট আশাগুলি
পুষিয়া রাখিব।
নিদ্রাহীন আঁখি মেলি পূরব আকাশ পানে
রয়েছি চাহিয়া,
কবে রে প্রভাত মুব, আনন্দে বিহঙ্গগুলি
উঠিবে গাহিয়া।
ওই যে পূরবে হেরি অরুণ-কিরণে সাজে
মেঘ-মরীচিকা,
রে না কিছুই নয়—পূরব শ্মশানে উঠে
চিতানল-শিখা।
ছবি ও গান
৩৯
নিশীথ-চেতনা
স্তব্ধ বাদুড়ের মত জড়ায়ে অযুত শাখা
দলে দলে অন্ধকার ঘুমায় মুদিয়া পাখা।
মাঝে মাঝে পা টিপিয়া বহিছে নিশীথ-বায়,
গাছে নড়ে ওঠে পাতা, শব্দটুকু শােনা যায়।
আকাশের পানে চেয়ে জাগিয়া রয়েছি বসি,
মাঝে মাঝে দুয়েকটি তারা পড়িতেছে খসি।
ঘুমাইছে পশু পাখী বসুন্ধরা অচেতনা,
শুধু এবে দলে দলে আঁধারের তলে তলে
আকাশ করিয়া পূর্ণ স্বপ্ন করে আনাগােনা।
স্বপ্ন করে আনাগােনা! কোথা দিয়ে আসে যায় ।
আঁধার আকাশ মাঝে আঁখি চারিদিকে চায় ।
মনে হয় আসিতেছে শত স্বপ্ন নিশাচরী
আকাশের পার হতে, আঁধার ফেলিছে ভরি।
চারিদিকে ভাসিতেছে চারিদিকে হাসিতেছে
এ উহারে ডাকিতেছে আকাশের পানে চেয়ে,
বলিতেছে, “আয় বােন, আয় তােরা আয় ধেয়ে।”
হাতে হাতে ধরি ধরি, নাচে যত সহচরী,
চমকি ছুটিয়া যায় চপল মায়ার মেয়ে।
যেন মাের কাছ দিয়ে এই তারা গেল চলে,
কেহবা মাথায় মোর, কেইবা আমার কোলে।
•
ছবি ও গান
কেহবা মারিছে উকি হৃদয় মাঝারে পশি,
আঁখির পাতার পরে কেহবা দুলিছে বসি।
মাথার উপর দিয়া কেহবা উড়িয়া যায়,
নয়নের পানে মাের কেহবা ফিরিয়া চায়।
এখনি শুনিব যেন অতি মৃদু পদধ্বনি,
ছােট ছােট নুপুরের অতি মৃদু রণরণি।
রয়েছি চকিত হয়ে আঁখির নিমেষ ভূলি-
এখনি দেখিব যেন স্বপ্নমুখী ছায়াগুলি।
অয়ি স্বপ্ন মােহময়ী, দেখা দাও একবার।
কোথা দিয়ে আসিতেছ, কোথা দিয়ে চলিতেছ,
কোথা গিয়ে পশিতেছ বড় সাধ দেখিবার।
আঁধার পরাণে পশি সারারাত করি খেলা,
কোন্ খানে কোন দেশে পালাও সকালবেলা।
অরুণের মুখ দেখে কেন এত হয় লাজ
সারাদিন কোথা বসে না জানি কি কর কাজ।
ঘুমঘুম আঁখি মেলি তোমরা স্বপন-বালা,
নন্দনের ছায়ে বসি শুধু বুঝি গাঁথ মালা।
শুধু বুঝি গুন্ গুন্ গুন্ গুন্ গান কর,-
আপনার গান শুনে আপনি ঘুমায়ে পড়।
আজি এই রজনীতে অচেতন চারিধার।
এই আবরণ ঘাের ভেদ করি মন মাের,
ছবি ও গান
স্বপনের রাজমাঝে দাড় দেখি এক বার।
নিদ্রার সাগর জলে মহা আঁধারের তলে,
চারিদিকে প্রসারিত এ কি এ নূতন দেশ,
একত্রে খরগ মৰ্ত্ত নাহিক দিকের শেষ।
কি যে যায় কি যে আসে, চারিদিকে আশেপাশে ;
কেহ কঁাদে কেহ হাসে, কেহ থাকে কেহ যায়,
মিশিতেছে, ফুটিতেছে, গড়িতেছে, টুটিতেছে,
অবিশ্রাম লুকাচুরি-আঁখি না সন্ধান পায়।
কত আলাে কত ছায়া, কত আশা, কত মায়া,
কত ভয়, কত শােক, কত কি যে কোলাহল,
কত পশু কত পাখী, কত মানুষের দল।
উপরেতে চেয়ে দেখ কি প্রশস্ত বিভাবরী,
নিশ্বাস পড়েনা যেন জগৎ রয়েছে মরি।
এক বার কর মনে আঁধায়ের সঙ্গোপনে
কি গভীর কলরব--চেতনার ছেলেখেলা-
সমস্ত জগৎ ব্যেপে স্বপনের মহা-মেলা।
মনে মনে ভাবি তাই এও কি নহেরে ভাই
চৌদিকে যা কিছু দেখি জাগিয়া সকালবেলা,
এও কি নহেরে শুধু চেতনার ছেলেখেলা।
স্বপ্ন, তুমি এস কাছে, মাের মুখপানে চাও,
তােমার পাখার পরে মােরে তুলে লয়ে যাও।
হৃদয়ের দ্বারে দ্বারে ভ্রমি মােরা সারানিশি,
প্রাণে প্রাণে খেলাইয়া প্রভাতে যাইব মিশি।
২
ছবি ও গান
ওই যে মায়ের কোলে মেয়েটি ঘুমায়ে আছে,
একবার নিয়ে যাও ওদের প্রাণের কাছে।
দেখিব কোমল প্রাণে সুখের প্রভাত হাসি
সুধায় ভরিয়া প্রাণ কেমনে বেড়ায় ভাসি।
ওই যে প্রেমিক দুটি কুসুম কাননে শুয়ে,
ঘুমাইছে মুখে মুখে চরণে চরণ থুয়ে।
ওদের প্রাণের ছায়ে বসিতে গিয়েছে সাধ,
মায়া করি ঘটাইব বিরহের পরমাদ।
ঘুমন্ত আঁখির কোণে দেখা দিবে আঁখি জল,
বিরহ-বিলাপ গানে ছাইবে মরম-তল।
সহসা উঠিবে জাগি, চমকি,শিহরি, কপি,
দ্বিগুণ আদরে পুনঃ বুকেতে ধরিবে চাপি।
ছােট দুটি শিশু ভাই ঘুমাইছে গলাগলি,
তাদের হৃদয় মাঝে আমরা যাইব চলি ।
কুসুম-কোমল হিয়া কভুবা দুলিবে ভয়ে,
রবির কিরণে কভু হাসিবে আকুল হয়ে।
আমি যদি হইতাম স্বপন-বাসনা-ময়।
কত বেশ ধরিতাম কত দেশ ভ্ৰমিতাম,
বেড়াতেম সাতারিয়া ঘুমের সাগরময়।
নীরব চন্দ্রমা তারা, নারব আকাশ ধরা,
আমি শুধু চুপি চুপি ভ্ৰমিতাম বিশ্বময়
প্রাণে প্রাণে রচিতাম কত আশা কত ভয়।
ছবি ও গান
এমন করুণ কথা প্রাণে আসিতাম কয়ে
প্রভাতে পূরবে চাহি ভাবিত তাহাই লয়ে।
জাগিয়া দেখি যারে বুকেতে ধরিত তারে
যতনে মুছায়ে দিত ব্যথিতের অশ্রুজল,
মুমু প্রেমের প্রাণ পাইত নূতন বল।
ওরে স্বপ্ন, আমি যদি স্বপন হতেম হায়,
যাইতাম তার প্রাণে, যে মােরে ফিরে না চায়।
প্রাণে তার ভ্ৰমিতাম, প্রাণে তার গাহিতাম,
প্রাণে তার খেলাতেম অবিরাম নিশি নিশি।
যেমনি প্রভাত হত আলােকে যেতাম মিশি।
দিবসে আমার কাছে কভু সে খােলে না প্রাণ,
শােনন না আমার কথা,বােঝে না আমার গান,
মায়ামন্ত্রে প্রাণ তার গােপনে দিতাম খুলি,
বুঝয়ে দিতেম তারে এই মাের গানগুলি।
পর দিন দিবসেতে যাইতাম কাছে তার,
তাহলে কি মুখপানে চাহিত না একবার ?
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.