Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Charitra-chitra
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
চরিত্র-চিত্র
সমাজসেবার আদশ
“পরের দুঃখে কাঁদতে শিখা-তাহাই শুধু চরম ,
মহৎ দেখে কাঁদতে জানা-তবেই কঁাদা ধন্য হয়।
করে জঙ্ক সহপাত ও ধর্মের জন্য জীবনদান,
সত্যের জন্য দৃঢ়ত, পরের জন্য নিজের প্রাণ।”
--দ্বি লাল।
কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষক
শ্রীসুনীতিবালা চন্দ, বিএ
যােগেশচন্দ্র দত্ত, এম-এ, বি-ভি
প্রণীত।
ডাক্তার দীনেশচন্দ্র সেন, ডি-লিট, রায় বাহাদুর
লিখিত ভূমিকা সহিত।
চক্রবর্তী, চাটার্জি এণ্ড কোঃ লিঃ
১নং কলেজ স্কোয়ার, কলিকাতা।
মূল্য এক টাকা।
প্রকাশক--
বিভূতিভূষণ নাগ
১২ বি, মুসলমানপাড়া লেন,
কলিকাতা।
প্রাপ্তিস্থান
চক্রবর্তী, চাটার্জি এণ্ড কোঃ লিঃ
১নং কলেজস্কোয়ার, কলিকাতা।
প্রিন্টার-শ্ৰীশশিভূষণ পাল,
মেকা প্রেস,
৯ নং বলরাম দে স্ট্রীট-কলিকাতা
উৎসর্গ-পত্র
কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় যাঁহার নিঃস্বার্থ সেবার অক্ষয়
কীৰ্ত্তি, বঙ্গে উচ্চশিক্ষা বিস্তার যাহার ঐকান্তিকী
চেষ্টার শুভময় ফল, যাহার প্রভাবে,
সংস্পর্শে ও আনুপ্রেরণায় শত
শত যুবকের জীবনধারা
পরিবর্তিত হইয়াছে,
সেই আদর্শ চরিত্র, নীতিমান্, একনিষ্ঠ দেশ-সেবক
শ্রীযুক্ত স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়
মহােদয়ের শ্ৰীকরকমলে
সমাজ-সেবার এই ক্ষুদ্র চিত্রখানি ভক্তিবিনম্ৰহৃদয়ে
অর্পণ করিলাম।
শ্ৰীসুনীতিবালা চন্দ
শ্ৰীযােগেশচন্দ্র দত্ত
No text on this page.
ভূমিকা শ্ৰীমতী সুনীতিবাল চন্দ, বি-এ ও শ্ৰীযুত যােগেশচন্দ্র দত্ত, এম-এ, বি-টি, প্রণীত “চরিত্র-চিত্র” নামক পুস্তকখানি পাঠ করিয়া প্রীত হইলাম। আজকাল বঙ্গসাহিত্যে বড়লােকদের জীবনচরিতের অভাব নাই। লেখকেরা সেইরূপ জীবনী লিখিতে যাইয়া কোনাে বড় লোেক কোন্ সনে কোথায় জন্মগ্রহণ করিয়া কি কি কাজ করিয়া গিয়াছেন, তাহার একটা ধারাবাহিক তালিকা দিয়া থাকেন। এই তালিকায় অনেক সময় ভাবুকতা বা প্রাণ থাকে না-সেই বড়লােকের বিশেষত্ব কি, তিনি কেন আমাদের পূজ, তাহা পরিষ্কারভাবে ফুটিয়া উঠে না। কিন্তু এই পুস্তকখানি সে শ্রেণীর নহে। লেখিকা ও লেখক বরণীয় ব্যক্তিদের জীবনচরিত শুধু চোখ দিয়া পড়িয়া যান নাই, তাহারা তাঁহাদের মহত্ত্ব প্রাণে প্রাণে অনুভব করিয়াছেন। তাহারা অনেক সময় জন্মতারিখ বা নিবাসস্থানাদির উল্লেখমাত্র না করিয়া কোন্ মহৎগুণে তাহারা আমাদের ভক্তিশ্রদ্ধার দাবী করিতেছেন, কৌতুহলােদ্দীপক ভাষায় মুখবন্ধেই সেই কথা পাড়িয়াছেন, এইজন্য বইখানি পড়িয়া আমরা সর্বদা বর্ণিত ব্যক্তিদের বিশেষত্ব কোথায় তাহার পরিচয় পাই। লেখিকা ও লেখক নিজে গুণমুগ্ধ হইয়া পাঠকগণকে মুগ্ধ করিয়াছেন, এইজন্য এই পুস্তকখানিতে তাহারা যে সকল চিত্র অঙ্কন করিয়াছেন, তাহারা যেন আমাদের সামনে আসিয়া দাঁড়ায়। আমরা কাহারও মাথায় জ্ঞানগরিমার কিরীট, কাহারও কপালে ত্যাগের শুভ্র চন্দনরেখা, কাহারও দানশীল মুক্তহস্তে অজস্ররত্নবর্ষণ যেন স্পষ্ট দেখিতে পাই। উদাহরণ স্থলে শুধু রামমােহন রায়ের কথা বলিব। সাধারণতঃ রাজা রামমােহন ব্রাহ্মধর্মের স্রষ্টা বলিয়াই পরিচিত, সাম্প্রদায়িক লোকেরা তাকে সেইভাবেই দেখিয়া থাকেন। কিন্তু এই পুস্তকের লেখিকা ও লেখক তাঁহার ধর্মমতগুলি লইয়া নাড়াচাড়া করেন নাই। রাজা রামমােহনকে তাহাৱা বৰ্তমান বঙ্গের যুগ-প্ৰবৰ্ত্তকরূপে আঁকিয়া দেখাইয়াছেন। আধুনিক সময়ে বাঙ্গালীরা যে সকল আশা ও উদ্যম লইয়া কাৰ্য্যক্ষেত্রে নামিয়াছেন, রামমােহন বাঙ্গালীর সেই সমস্ত আশা ভৱসা জাগাইয়া দিয়াছেন, রামমােহন আমাদের আধুনিক চেষ্টার শতমুখী গঙ্গাধারার হরিদ্বারস্বরূপ। লেখিকা ও লেখক এই পুস্তকখানিতে তাহাদের অশুদৃষ্টির বিশেষ পরিচয় দিয়াছেন। রবীন্দ্রবাবুর বিদ্যাসাগর প্রসঙ্গটি যে ভাবে, এই উপাদেয় আখ্যানগুলি কতকটা সেই ভাবের। পুস্তকের ভাষায় একটা গৌরব আছে; তাহা কোথায়ও অস্পষ্ট বা স্নান হইয়া পড়ে নাই। 1, বিশ্বকোষ লেন, কলিকাতা " } শ্রদীনেশচন্দ্র সেন ১লা জুন, ১৯২৩ ৭ নিবেদন এই প্রবন্ধগুলিতে তত্ত্বানুসন্ধানের পরিচয়প্রদানের বা প্রবন্ধো পুরুষ ও রমণীগণের জীবনবৃত্তান্তের আনুপূর্বিক বিবরণবর্ণনের কোনরূপ চেষ্টা করা হয় নাই। কতিপয় মহাপুরুষ ও বীররমণীর পুণ্যপূত জীবন- সম্বন্ধে যে সকল তথ্যপূর্ণ গ্রন্থ প্রকাশিত হইয়াছে, তাহা অধ্যয়নকালে যে সকল পবিত্র চিত্র মানসপটে স্বতঃই অঙ্কিত হইয়াছে, শুধু সেই সেই চিত্রগুলি কোমলমতি বালক বালিকাগণের সমক্ষে পরিস্ফুট করিবার উদ্দেশ্যে আমরা এই কাৰ্যে ব্ৰতী হইয়াছি। মহাপুরুষগণ জাতিবিশেষের বা ধৰ্ম্মবিশেষের সম্পত্তি নন; তাঁহারা দেশকালের অতীত, সমস্ত বিশ্বই তাহাদিগকে পাইয়া গৌরবান্বিত। তাই হিন্দুমুসলমান খৃষ্টান, দেশীয় বিদেশীয়, আধুনিক ও প্রাচীন, স্ত্রী-পুরুষ সকলের চরিত্র-চিত্ৰই এই গ্রন্থে প্রদত্ত হইয়াছে। যদিও সেবার নিখুত চিত্রাঙ্কনের ক্ষমতা বা যােগ্যতা আমাদের নাই, তথাপি মহচ্চরিত্রের আলােচনাজনিত আমােদভভাগের অধিকার সকলেরই আছে। তাই এই স্পর্ধার কার্যে হস্তক্ষেপ করিতে আমরা ইতস্ততঃ করি নাই। সদৃষ্টান্ত নীতিশিক্ষাপ্রদানের উৎকৃষ্ট উপায় এবং সাধুজীবনগঠনের প্রধান সহায়—এই বিশ্বাসের বশবর্তী হইয়াই প্রবন্ধগুলির অবতারণা করিলাম। এই সকল প্রবন্ধ পাঠ করিয়া যদি বালকবালিকাদের হৃদয়ে প্রবন্ধবর্ণিত ব্যক্তিদের বিস্তৃত জীবনীপাঠের আকাঙ্ক্ষার উদ্রেক হয় এবং পরহিতে আত্মশক্তি নিয়ােগ করিবার বিন্দুমাত্র বাসনাও উদিত হয়, তবেই আমাদের শ্রম সার্থক জ্ঞান করিব। কলিকাতা ~~~ শ্রীসুনীতিবালা চন্দ লীযােগেশচন্দ্র দত্ত জ্যৈষ্ঠ, ১৩৩০
No text on this page.
বিষয়-সূচী। বিষয় পৃষ্ঠ রাজা রামমােহন . ১। ভারতে নবযুগ-সূচনায় ২। উচ্চশিক্ষা বিস্তারে বিদ্যাসাগর ৩। মুসলমান সমাজের হিতসাধনে••• মহসীন ১*, ৪। লােক-শিক্ষাবিস্তারে ডেভিড হেয়ার হাওয়ার্ড ৩৫ . এলিজাবেথ ফ্রাই ৪২. t। কারাসংস্কারে ৬। আর্তের দুর্দশামােচনে ৭। মুসলমানসমাজে শিক্ষাবিস্তারে ৮। নৈতিক উন্নতিবিধানে ৯। শি-বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় ০৮ স্থার সৈয়দ আহম্মদ কেশবচন্দ্র ওবারলিন ১। সমাজসেবায় ১১। কগ্নের সেবায় বিবেকানন্দ ফ্লোরেন্স নাইটিংগেল পণ্ডিতা রমাবাই ১২। স্ত্রীজাতির মঙ্গলবিধানে ১০ ৪, ১৩। দেশ-সেবায় ৪ । . গােখলে ১৪। শিশুর শিক্ষায় ডাক্তার মন্টেসরী ১৫। পানদোষ-দমনে “পুসীফুট” জনসন
চিত্র-সূচী
পৃষ্ঠা
: { রাজা রামমােহন
১
২। বিদ্যাসাগর
১০
৩। মহসীন
১৭
৪। ডেভিড হেয়ার
२०
প্রবাসীর সৌজন্যে
৪২
৫। এলিজাবেথ ফ্রাই
। স্যার সৈয়দ আহম্মদ
বিবেকানন
৮। ফ্লোরেন্স নাইটিংগেল
প্রবাসী সৌজঞ্চে
t
.
...
রাজা রামমোহন
No text on this page.
চরিত্র-চিত্র।
--- =15
ভারতে মবযুগ-সূচনা,
রাজা রামমােহন।
“ভুলিতে হবে আপন,
ভুলিতে হবে স্বপন,
জাগাতে হবে জীবন,
তবে সে পারিবে
ছুটিতে ওদের সঙ্গে,
লিখিতে কালের সঙ্গে,
খেলাইতে এ তরঙ্গে
তবে সে পারিবে ;
জ্ঞানের শকতি ল’তে
জগতে যুঝিতে হবে,
তবে সে আসন পাবে,
সঙ্কল্প সাধিবে।
-হেমচন্দ্র।
এমন সময় ছিল, যখন হিন্দুসমাজ রাজা রামমােহনকে স্বধর্মত্যাগী
জ্ঞানে অবজ্ঞা করিত, যখন হিন্দুগণ তাঁহার মুখ দেখিলে নাসিকা কুঞ্চিত
করিত এবং তাহার নামােচ্চারণ করিতে দ্বিধাবােধ করিত। আনন্দের
২ চরিত্র-চিত্র। বিষয় এখন সেই ভাবের সম্পূর্ণ পরিবর্তন সংঘটিত হইয়াছে। এখন হিন্দুমাত্রই কৃতজ্ঞ অন্তরে রাজা রামমােহনের নাম স্মরণ করিতেছে। রামমােহনের জন্মভূমি রাধানগরে তাহার স্মৃতিরক্ষাৰ্থ যে বিরাট আয়ােজন চলিতেছে, দেশের গণ্যমান্য উচ্চপদস্থ অনেক হিন্দু সেই শুভানুষ্ঠানের উদযােক্তা ও পৃষ্ঠপােষক। হিন্দুমাত্রই বুঝিতে পারিয়াছে যে রাজা রাম- মােহন ভারতের সেই দুঃসময়ে আবির্ভূত না হইলে, হিন্দুধৰ্ম্ম অতীব শােচনীয় আকার ধারণ করিত। বস্তুতঃ প্রকৃত হিন্দুধর্মের গৌরবরক্ষার্থ তিনি যাহা করিয়া গিয়াছেন তাহা আমাদের ধারণার অতীত। তত্ত্বদশী প্রাচীন হিন্দুঋষিগণের অপূর্ব তত্ত্বজ্ঞানসমূহ প্রচার করিয়া এবং হিন্দুধর্মের উদারতা, গভীরতা ও বিশালতা দেখাইয়া একদিকে যেমন তিনি যুবকগণের প্রাণে স্বধৰ্ম্মানুরাগ উদ্দীপন করিয়াছিলেন, অপরদিকে তেমন তিনি হিন্দুশাস্ত্ৰসমুদ্র মন্থন করিয়া বিভিন্নধর্মাবলম্বীদিগের নিকট বেদান্ত ও একেশ্বরবাদ প্রচার করিয়া, প্রকৃত হিন্দুধর্মের গৌরব অক্ষুন্ন রাখিয়া- ছিলেন। সৰ্বসাধারণে হিন্দুর সারধৰ্ম্মের প্রচারার্থ সংস্কৃত ধৰ্ম্মপুস্তকসমূহ বাঙ্গালা ভাষায় অনুবাদ করিয়া তিনি বাঙ্গালা গদ্যসাহিত্যের সৃষ্টি করিয়াছিলেন। ধৰ্ম্মরাজ্যে তিনি যেরূপ ৰেদাদিশাস্ত্রচর্চার পুনরুদ্দীপন করেন, ভারতের সমাজক্ষেত্রেও তিনি তদ্রুপ নবপ্রাণের সঞ্চার করিয়া- ছিলেন। সর্বপ্রথম তিনিই ভারতবাসীর হৃদয়ে সমাজসংস্কারের ও অন্যান্য উচ্চ ভাবের বীজ বপন করেন ; ভারতে পাশ্চাত্য জ্ঞানবিজ্ঞানের বিস্তারকার্যে তিনিই অগ্রণী। এক কথায় ভঁহাকে নবভারতের জন্মদাতা বলিলেও অত্যুক্তি হয় না। পাশ্চাত্য জ্ঞানবিজ্ঞান দেশে প্রচারিত না হইলে, দেশের প্রকৃত উন্নতি সাধিত হইবে না, জগতের অন্যান্য মুসভ্য জাতির সহিত এতিদ্বন্দ্বিতা- গেলে কৃতিত্ব প্রদর্শন করিয়া ভারত তাহার পূর্ব গৌরব অক্ষুন্ন রাখিতে রাজা রামমােহন। সমর্থ হইবে না—ইহা তিনি বেশ উপলব্ধি করিতে পারিয়াছিলেন। তাঁহার দৃঢ় বিশ্বাস জন্মিয়াছিল যে, ইংরাজিশিক্ষা ব্যতিরেকে ভারতের ভবিষ্যৎ উন্নতি অসম্ভব। তাই তিনি ইংরাজিশিক্ষা প্রচারের এত পক্ষপাতী ছিলেন, এবং দেশে ইংরাজি বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাকল্পে প্রত্যক্ষ ও পরােক্ষ ভাবে নানা প্রকারে সহায়তা করিয়াছিলেন। রামমােহন রায় ১৮১৪ খৃষ্টাব্দে রংপুরের সরকারী কাৰ্য্য হইতে অবসর গ্রহণ করিয়া কলিকাতায় আসিয়া বাস করেন, এবং দেশহিতকর কাৰ্য্যে স্বকীয় শক্তি ও অর্থ নিয়ােগ করেন। উনবিংশ শতাব্দীর প্রথমভাগে দেশে শিক্ষার অবস্থা অতীব শােচনীয় ছিল। সাধারণের শিক্ষার জন্য কোনরূপ বিদ্যালয় ছিল না। সে সময়ে বৈষ্ণব কবিগণের রসমাধুৰ্যপূর্ণ পদ্যগ্রন্থ মানব হৃদয়ে অপূৰ্ব্ব প্রীতির সঞ্চার করিত সত্য, কিন্তু সরল গদ্যগ্রন্থের অভাবে বাঙ্গালাভাষা সম্পদশালী হইয়া উঠে নাই। বৈষ্ণবেরা বাঙ্গালা গদ্য বহুপূর্ব হইতে লিখিয়া আসিতেছিলেন, কিন্তু তাহা সাম্প্রদায়িক গণ্ডী অতিক্রম করিতে পারে নাই। এই বৈষ্ণবদিগের লিখিত গদ্য ও ন্যায়ের কয়েক খানি বঙ্গানুবাদ ছাড়া প্রাচীন বাঙ্গালা গদ্যের বড় কিছু একটা নমুনা পাওয়া যায় না। নবাগত সিবিলিয়ানদিগকে বাঙ্গালাভাষা শিক্ষা প্রদানের উদ্দেশ্যে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের পণ্ডিতগণ যে পাঠ্য পুস্তক রচনা করিয়াছিলেন, সেই সকল পুস্তকের ভাষা অতি দুর্বোধ্য ছিল। সরল ও প্রাঞ্জল ভাষায় রামমােহন রায়ই সর্বপ্রথম বাঙ্গালা গদ্য সাহিত্যে নানাবিষয়ে পুস্তক লিখিতে আরম্ভ করেন। এই জন্য রামমােহন রায়কে বাঙ্গালা গদ্য সাহিত্যের জনক’ বলা হইয়া থাকে। শিক্ষার অভাবে সমাজে যে সকল দোষ প্রবেশ করে, ভারত-সমাজেও তা অনুপ্রবিষ্ট হইয়াছিল। প্রকৃত শিক্ষার অভাবে লােকসকল চরিভ্রষ্ট হইয়া পড়িয়াছিল, মিথ্যাপ্রবঞ্চনা ও কপটাচর দৈনন্দিন ৪ চরিত্র-চিত্র। ঘটনায় পরিণত হইয়াছিল। শিক্ষালোকবর্জিত নরকুল নানাপ্রকার কুসংস্কার ও দুর্নীতির বশবর্তী হইয়া সমাজমুখে কলঙ্ককালিমা লেপন করিতেছিল। তখন যদিও সুদূর নির্জন গ্রামপ্রান্তে জ্ঞানপিপাসু পণ্ডিতমলার চতুষ্পঠীতে শাস্ত্রালােচনা হইত, তখন যদিও ধর্মপ্রাণ মৌলবীগণের মাদ্রাসায় ধর্মগ্রন্থের অধ্যয়ন ও অধ্যাপনা হইত, তথাপি দেশের অধিকাংশ লোকই অশিক্ষিত ছিল। কিন্তু শিক্ষাদান শাসনের প্রধান অঙ্গ—ইংরাজশাসকগণ একথা কখনও বিস্মৃত হন নাই। সেই জন্য তাহারা পূৰ্বপ্ৰবৰ্ত্তিত প্রথানুসারে সংস্কৃত, আরবী এবং পাশী সাহিত্যের শিক্ষাদানকল্পে অর্থব্যয় করিতে আরম্ভ করিলেন। ওয়ারেন্ হেষ্টিংস্ কলিকাতানগরীতে বহু অর্থব্যয়ে এক মাদ্রাসা স্থাপন করিলেন। সেই মাদ্রাসা অদ্যাপি বিরাজমান থাকিয়া ইংরাজ শাসকগণের শিক্ষার,গের ও বি:দ্যাৎসাহিতার পরিচয় প্রদান করিতেছে। অতঃপর ১৭৯: খৃষ্টাব্দে হিন্দু সাইন, সাহিত্য ও ধৰ্ম্ম সম্বন্ধে শিক্ষাদানের উদ্দেশ্যে কাশীর রেসিডেন্ট জনথান্ ডানের চেষ্টায় ও উদ্যোগে বারাণসী- ধামে এক সংস্কৃত কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। জাতিধর্মনির্বিশেষে সকলের সে কলেজে অধ্যয়নের অধিকার ছিল না, ব্রাহ্মণের প্রাধান্ত ও প্রাবল্য সেখানে পূর্ণমাত্রায় বর্তমান ছিল। কাজেই এইরূপ কলেজ দেশের জনসাধারণের শিক্ষার পক্ষে সবিশেষ উপযােগী ছিল না। পক্ষান্তরে ইংরাজ জাতির সংস্পর্শে ও খৃষ্টান মিশনারীগণের প্রভাবে দেশবাসীর প্রাণে পাশ্চাত্য জ্ঞানলাভের একটা আকাঙ্ক্ষা জাগিয়া রামমােহনরায়প্রমুখ দেশের চিন্তাশীল ব্যক্তিগণ দেখিলেন যে ভর বদগণ ইংরাজিভাষার ন্যায় একটি সজীব ভাষা আয়ত্ত করিতে পরিলে, সেই ভাবার সাহায্যে তাহারা পাশ্চাত্য জাতির ন্যায় জ্ঞান বিজ্ঞানে উন্নত হইয়া পৃথিবীর অন্যান্য সভ্যজাতির সমকক্ষ হইতে প্রয়াস উঠে।
রাজা রামমােহন। ২. পাইতে পারিবে। উচচগণিত, প্রাকৃতিক বিজ্ঞান, রসায়ন, শারীরস্থান বিদ্যা এবং অন্য প্রয়ােজনীয় বিজ্ঞানের আলােচনার পথও তাহাদের নিকট উন্মুক্ত হবে। তাই রামমােহন রায় কলিকাতার কতিপয় পদস্থ ও সমৃদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তির অগ্ৰণীরূপে ইংরাজশাসকগণকে এশিয়া মহাদেশে ফুয়ােপীয় শিল্পবিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠাকল্পে পুনঃ পুনঃ সনির্বন্ধ অনুরােধ করিতে লাগিলেন। রামমােহন তাঁহার স্বভাববাচিত দৃঢ়তা ও একাগ্রতা সহকারে কাৰ্য্যক্ষেত্রে অবতীর্ণ হইলেন। কলিকাতায় ইংরাজিশিক্ষা বিস্তারকল্পে এক তুমুল আন্দোলন উপস্থিত হইল। যে স্থানে ইংরাজি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার চেষ্টা ও আয়ােজন চলিতেছে, সেখানেই রামমােহন সহায়তাকল্পে উপস্থিত। শ্রীরামপুরে কেরী, মার্শমান প্রভৃতি মিশনারীগণ ইংরাজিশিক্ষা প্রচারকার্যে ব্রতী হইলেন; আর রামমােহন পশ্চাতে থাকিয়া তাহাদের সদনুষ্ঠানে সাহায্য ও সহানুভূতি প্রদান করিয়া তাহাদিগকে প্রােৎসাহিত করিতে লাগিলেন। এই সময় মহাত্মা ডাফ, কলিকাতায় একটি ইংরাজি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করিবার সংকল্প করেন। রামমােহন রায় ইহা জানিতে পারিয়া তখনই তাঁহার সাহায্যার্থ অগ্রসর হইলেন। তিনি উক্ত বিদ্যালয়ের জন্য ব্রাহ্মসমাজের গৃহ পর্যন্ত ছাড়িয়া দিলেন। গৃহে গৃহে ঘুরিয়া , সাহেবের বিদ্যালয়ের জন্য তিনি ছাত্র সংগ্রহ করিতে লাগিলেন এবং নিজে এত্যহ বিদ্যালয়ে যাইয়া কার্যের তত্বাবধান করিতে লাগিলেন। ধৰ্ম্ম সম্বন্ধে তিনি অতীব উদার মত পােষণ করিতেন। তাই ডাফ, সাহেবের বিদ্যালয়ের ছাত্রগণ যখন বাইবেল অধ্যয়ন করিতে আপত্তি উত্থাপন করিল, তখন রামমােহন রায় ছাত্রদিগকে সরলভাবে বলিলেন- “বাইকেল পড়িলেই খৃষ্টিয়ান হয় না, আমি আদ্যোপান্ত সমস্ত বাইবেল পাঠ করিয়াছি অথচ খৃষ্টিয়ান হই নাই, কোরাণ কোরাণ পাঠ চরিত্র-চিত্র। T) করিয়াছি অথচ মুসলমান হই নাই। আবার হােরেস উইলসন সাহেব হিন্দুশাস্ত্র পড়িয়াছেন, অথচ তিনি হিন্দু হন নাই। বিচারপূর্বক সত্য গ্রহণ করিবে।” ইহা শুনিয়া বালকগণের আপত্তি করিবার আর কিছু রহিল না। কলিকাতায় হিন্দুকলেজের প্রতিষ্ঠাব্যাপারেও রামমােহন অগ্রণী ছিলেন। তিনি ও ডেভিড হেয়ারই কলিকাতার শিক্ষান্দোলনের প্রাণস্বরূপ ছিলেন। তাহারা বৈদ্যনাথ মুখােপাধ্যায় মহাশয়ের সঙ্গে পরামর্শ করিয়া স্থির করিলেন যে, কলিকাতায় একটী উচ্চ ইংরাজি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা সবিশেষ প্রয়ােজনীয় হইয়া উঠিয়াছে। তাই তাহারা তদানীন্তন সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি, শিক্ষা- রাগী ও বিদ্যোৎসাহী স্যার হাইড, ইষ্ট মহােদয়ের সহানুভূতি প্রার্থ হইয়া তঁাহার শরণাগত হইলেন। সেই সহৃদয় মহাত্মা কলিকাতা বাসী ভদ্রলােকদিগকে তঁাহার আলয়ে আহবান করিয়া এবিষয়ে ইতিকৰ্ত্তব্য নির্ধারণ করিলেন। তদনুসারে ১৮১৭ খৃষ্টাব্দের ২৩শে জানুয়ারী কলিকাতা হিন্দুকলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। উক্ত বিদ্যালয়ের কাৰ্য্যপরিচালনার জন্য একটি কলেজ-কমিটি গঠিত হয়। উহাতে বিশজন দেশীয় ও দশজন য়ুরােপীয় সভ্য ছিলেন। রামমােহন রায় তাহাদের অন্যতম। কিন্তু যখন রক্ষণশীল হিন্দুগণ এবিষয়ে আপত্তি উত্থাপন করিলেন, তখন দেশহিতৈষী রামমােহন অম্লানবদনে কলেজের সমস্ত সংশ্রব ত্যাগ করিলেন। দেশের কল্যাণসাধন যিনি জীবনের ব্রতরূপে গ্রহণ করিয়াছেন, তিনি কি কখনও যশের কাঙ্গাল হইতে পারেন? উদারচেতা রামমােহন ধীর ও স্থির ভাবে লিখিয়া পাঠাইলেন, “আমি কমিটিতে থাকিলে যদি কলেজের লেশমাত্রও অনিষ্টের সম্ভাবনা থাকে, তবে আমি সে সম্মানের প্রয়াসী নহি।” দেশের লােক ইংরাজি শিক্ষালাভের অন্ত আগ্রহ প্রকাশ করিতে রাজা রামমােহন। থাকিলেও ইংরাজ শাসকগণ এ বিষয়ে সম্পূর্ণ উদাসীন ছিলেন। দেশীয় শিক্ষাপদ্ধতির বিরুদ্ধে হস্তক্ষেপ করিলে দেশে অসন্তুষ্টি ও অশান্তির সৃষ্টি হইতে পারে, এই আশঙ্কায় তাহারা পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রবর্তনকাৰ্য্যে সহায়তা করা সমীচীন বােধ করিলেন না। তাই তাহার প্রাচ্য জন বিজ্ঞানের প্রচারকল্পে অর্থব্যয় করিতে লাগিলেন। ১৮১৩ খৃষ্টাব্দে ভারতের পণ্ডিতমণ্ডলীর উৎসাহবন্ধনকল্পে এবং ভারতীয় সাহিত্যের উদ্ধারসাধন ও উন্নতিবিধানাথ প্রতিবৎসর একলক্ষ টাকা ব্যয় নির্ধারিত হয়। অবশেষে ১৮২৩ খৃষ্টাব্দে এক শিক্ষাকমিটি গঠন করিয়া গবর্ণমেন্ট ইহাদের হস্তে শিক্ষার ব্যয়-স্বরূপ সেই একলক্ষ টাকা অর্পণ করেন। সভ্যগণ সেই অর্থদ্বারা প্রাচীন সংস্কৃত ও আরবী গ্রন্থের মুদ্রাক্তন আর করিলেন, এবং প্রাচীন সাহিত্য-চৰ্চাৰত পণ্ডিতদিগকে সাহায্য ও প্রাচ্য সাহিত্য-শিক্ষার্থী ছাত্রদিগকে বৃত্তি প্রদান করিতে লাগিলেন। দিল্লী ও আগ্রায় সংস্কৃত কলেজ প্রতিষ্ঠিত হইল এবং কলিকাতায় অপর একটি কলেজ প্রতিষ্ঠার আয়োজন চলিতে লাগিল। এইরূপ অনুষ্ঠানে একদিকে দেশের প্রভূত উপকার সাধিত হইল সত্য, কিন্তু সেই সংস্কৃত শিক্ষা শুধু একদল ব্রাহ্মণের মধ্যে আবার থাকায় দেশের জনসাধারণ শিক্ষালােকবঞ্চিত রহিয়া গেল। সুতরাং সমাজহিতৈষী রামমোহন রায় সাধারণের পক্ষ অবলম্বন করিয়া গবর্ণমেন্টের উক্ত কার্যের তীব্র প্রতিবাদ করিয়া বলিলেন যে, ভারতে সমমােপযােগী প্রয়ােজনীয় জ্ঞানবিজ্ঞান-বিস্তারের চেষ্টা করা নিতান্ত কর্তব্য। য়ুরােপের সভ্য জাতিসমূহ যে জ্ঞানবিজ্ঞানের সাহায্যে উন্নতির উচ্চতম শিখরে আরােহণ করিয়াছেন, সেই সকল গান বিজ্ঞানের চর্চা করিয়া ভারতকেও উন্নতিসোপানে আরােহণ করিতে হইবে। শুধু সংস্কৃত সাহিত্যে সমস্ত চেষ্টা আবদ্ধ থাকিলে, বর্তমান চরিত্রচিত্র। যুগে ভারত উন্নতির পথে অগ্রসর হইতে পারিবে না। তাই সূক্ষ্মদর্শী রামমােহন পাশ্চাত্য সুসভ্য দেশসমূহের অনুকরণে ভারতবর্ষে জীবন- ধারণােপযােগী নিত্যপ্রয়ােজনীয় বিদ্যার আলােচনাৰ্থ নূতন ধরণের কলেজ প্রতিষ্ঠার জন্য গবর্নমেন্টকে বিশেষভাবে অনুরােধ করিলেন। তিনি শিক্ষাবিষয়ে স্বীয় অভিমত ব্যক্ত করিয়া তদানীন্তন গবর্ণর জেনারেল লর্ড আমহাষ্ট্রের নিকট এক সুদীর্ঘ ও সুযুক্তিপূর্ণ আবেদন প্রেরণ করিলেন। তাহাতে তিনি নির্ভীকচিত্তে প্রাচ্য শিক্ষানীতির প্রম দেখাইয়া, পাশ্চাত্য শিক্ষানীতি অনুসরণ করিতে গবর্ণমেন্টকে অনুরােধ করিলেন, এবং দেশবাসী জনসাধারণের অজ্ঞানান্ধকার দূরীকরণার্থ য়ুরােপীয় কলেজের অনুকরণে কতিপয় কলেজ প্রতিষ্ঠার প্রয়ােজনীয়তা নির্দেশ করিলেন। যদিও শুধু পাশ্চাত্য, জ্ঞানবিজ্ঞানের প্রচারকল্পে অর্থব্যয় করা লর্ড আমহাষ্ট সমীচীন বলিয়া গ্রহণ করিলেন না, তথাপি তিনি রামমােহন রায়ের আবেদন একেবারে প্রত্যাখ্যান করিতে পারিলেন না। তাই সংস্কৃত কলেজের সঙ্গে হিন্দুকলেজের জন্য একটা নূতন গৃহনির্মাণের প্রস্তাব তিনি গ্রহণ করলেন। সদাশয় গবর্ণর জেনারেল বাহাদুর হিন্দুকলেজের ব্যয় সঙ্কুলনার্থ মাসিক নয় শত টাকা সাহায্য দান করিতে প্রতিশ্রুত হইলেন। এইরূপে রামমােহনের ঐকান্তিক চেষ্টায় ভারতে ইংরাজিশিক্ষা- বিস্তারের পথ উন্মুক্ত হইল এবং ধীরে ধীরে ইংরাজশাসকগণ এ বিষয়ে সহানুভূতি প্রকাশ করিতে লাগিলেন। অবশেষে লর্ড বেন্টিঙ্কের শাসনকালে ভারতের বিভিন্ন স্থানে ইংরাজিবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হইলে, দেশে এক নবযুগের সূচনা হয়। এই নবযুগের প্রবর্তক রাজা রামমােহন রায়। ধৰ্ম্ম, শিক্ষা, সাহিত্য ও রাজনীতি প্রভৃতি ক্ষেত্রে ভারতে আজ যে নবজাগরণের ভাব আসিয়াছে, তাহার মূলে এই রাজা রামমােহন। ।
রাজা রামমােহন। তৎকালে তাঁহার ন্যায় প্রতিভাবান্ নিঃস্বার্থ কর্মীর আবির্ভাব না হইলে, ভারতের যে কি শোচনীয় অবস্থা উপস্থিত হইত, তাহা ভাবিতে গেলে শরীর শিহরিয়া উঠে। তাই রামমােহনের নামােচ্চারণমাত্রই আজ ভারতবাসীর হৃদয় ভক্তি ও কৃতজ্ঞতারসে আপ্লুত হয়।
উচ্চশিক্ষা বিস্তারে বিদ্যাসাগর। “সহস্র গন্ধে মাৰে এক চক্ষুস্মান নিজ চক্ষু আবরিয়া লতে কি আরাম ? সে চাহে সহস্রে দৃষ্টি করিবারে দান, সে চাহে দেখাতে সৃষ্ট আলেকের ধাম।” –কামিনী রায়। বঙ্গদেশে এক নব জাগরণার যুগ আসিয়াছে। আজ বাঙ্গালীর প্রাণে নবশক্তি সঞ্চারিত হইয়াছে। নব আশায়, নব আকাক্ষায় আজ বাঙ্গালীর হৃদয় উদ্বেলিত; আজ বাঙ্গালী স্বীয় মনােরাজ্য জ্ঞানালােকে উদ্ভাসিত করিতে ব্যর্থ। বাঙ্গালী আজ সম্যক্ হৃদয়ঙ্গম করিতে সমর্থ: হইয়াছে যে, জগতে সভ্যজাতির সমক্ষে আত্মসম্মান অক্ষুন্ন রাখিতে হইলে, তাহাকে উচ্চশিক্ষা প্রচারের পথ সুপ্রশস্ত, সহজলভ্য ও সুগম করিতে হইবে। তাই, বঙ্গদেশে এই উচ্চশিক্ষা-প্রচারকল্পে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় বহু চেষ্টা করিয়াছে ও করিতেছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে স্থানে স্থানে কলেজ প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে। অধুনা বঙ্গদেশে সৰ্বসমেত ছত্রিশটি কলেজ বিদ্যমান থাকিয়া উচ্চশিক্ষা প্রদান করিতেছে। কলেজে অধ্যয়নার্থ যুবকের সংখ্যা দিন দিন দ্রুতবেগে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হইতেছে। নব নব কলেজ প্রতিষ্ঠার আয়ােজনে দেশহিতৈষী ব্যক্তিবর্গ নিযুক্ত হইয়াছেন। উচ্চ শিক্ষার প্রতি জনসাধারণের এরূপ আগ্রহাতিশয্য দর্শন করিয়া দেশের কল্যাণকামী ব্যক্তিমাত্রই আনন্দ অনুভব করিতেছেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষগণের প্রতি তাঁহাদের আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করিতেছেন। বস্তুতঃ, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় বর্তমান ভারতের নালন্দায় পরিণত
বিদ্যাসাগর
শ
* * * + --- ॥r rm r = A -
No text on this page.
বিদ্যাসাগর। • হইয়াছে ! এই জ্ঞানকেন্দ্রে ভারতীয় ও য়ুরােপীয় জ্ঞানবিজ্ঞানের অপূর্ব সমাবেশ সাধিত হইয়াছে। একদিকে ভারতের নিজস্ব বেদবি পণ্ডিত, বৌদ্ধশ্ৰমণ ও আরবীপাশিভাষাভিজ্ঞ মৌলবীগণ, অপর দিকে পাশ্চাত্য জ্ঞানবিজ্ঞানবিদ পণ্ডিতসমূহ। এই সকল বুধমণ্ডলীর নিত্য কলরবে আজ কলিকাতার সারস্বত কুঞ্জ মুখরিত। ভারতের বিভিন্ন প্রদেশ হইতে আহূত প্রতিভাশালী পণ্ডিতগণ এখানে অধ্যাপকের আসনে আসীন। এখানে জাতিগত পার্থক্য নাই, এখানে দেশগত স্বাতন্ত্র নাই, এখানে ধর্মগত বৈষম্য নাই; আছে শুধু জাতিধৰ্ম্মনিৰ্বিশেষে জ্ঞানী ও গুণীর পূজা। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের খ্যাতি আজ ভারতের সীমাবন্ধন অতিক্রম করিয়া সুদূর য়ুরােপে বিস্তৃত হইয়াছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সুকৃতী সন্তান বিজ্ঞানাচাৰ্য্য স্যার জগদীশচন্দ্র আজ স্বকীয় সাধনাবলে উদ্ভিদবিজ্ঞানরাজ্যে এক নবযুগ আনয়ন করিয়া জগতের পণ্ডিতমণ্ডলীকে স্তম্ভিত করিয়াছেন। এই বিশ্ববিদ্যালয়েরই স্যার প্রফুল্লচন্দ্র ও তাহার উদীয়মান ছাত্র, উপযুক্ত গুরুর উপযুক্ত শিষ্য, নীলরতন-জ্ঞানচন্দ্র-মেঘনাদ-প্রমুখ যুবকগণ বিজ্ঞান- মৌলিক তত্ত্ব আবিষ্কার করিয়া দেশবিদেশে সুখ্যাতি অর্জন করিয়াছেন। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাক্তার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আজ দেশবিদেশে ভারতের যশঃপ্রভা বিকীর্ণ করিয়া বাঙ্গালী জাতিকে সভ্য জাতির চক্ষে বরেণ্য করিয়া তুলিয়াছেন। এই বিশ্ববিদ্যালয়েরই মেধাবী ছাত্র ডাক্তার ব্রজেন্দ্রনাথ শীল ভারতীয় জ্ঞানবিজ্ঞান ও দর্শনের মাহাত্ম্য প্রচার করিয়া ভারতের প্রাচীন সভ্যতার মর্যাদা রক্ষা করিয়াছেন। এই বিস্তামন্দিরের স্বনামধন্য ছাত্র স্যার আশুতােষ মুখােপাধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয়ে নবপ্রাণ প্রতিষ্ঠা করিয়া অলোকসামান্য প্রতিভা, অনন্যসাধারণ গঠনশক্তি, অদৃষ্টপূৰ্ব সাধনা ও অধ্যবসায়ের পরিচয় প্রদান করিয়াছেন। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিভাবান্ ছাত্র মহামহােপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ও রায় রাজ্যে নূতন নূতন চরিত্র-চিত্র। বাগদুর ডাক্তার দীনেশচন্দ্র সেন তাঁহাদের মৌলিক গবেষণা দ্বারা বঙ্গভাষা ও সাহিত্যের লুপ্তপ্রায় রত্ন সকল বিশ্বতি-গর্ভ হইতে উদ্ধার করিয়া বাঙ্গালীর জাতীয়তা রক্ষা করিয়াছেন। আর এই বিশ্ববিদ্যালয়ের যে সকল রত্ন তাহাদের উচ্চ আদর্শ ওঁ হান্ দৃষ্টান্ত পশ্চাতে রাখিয়া কর্মক্ষেত্র হইতে চিরতরে অবসর গ্রহণ করিয়াছেন, তাহাদের মধ্যে স্যার গুরুদাস বানার্জি অগ্রগণ্য। তাহার ধর্মনিষ্ঠা, নীতিপরায়ণতা ও শিক্ষাভিজ্ঞতার কথা ভাবিতে গেলে তাঁহাকে বর্তমান যুগের মনু বলিলেও অত্যুক্তি হয় না। তিনি উচ্চতম পাশ্চাত্য শিক্ষা লাভ করিয়াও ভারতের জাতীয় ধর্মভাব, আচারনিষ্ঠা, সরলতা ও বিনয়নম্রতা রক্ষা করিতে পারিয়াছিলেন বলিয়া এই বিশ্ববিদ্যালয় আজ তাহার গৌরবে গৌরবান্বিত। যে আইনজ্ঞ পণ্ডিত ডাক্তার রাসবিহারী অসাধারণ প্রতিভা, অগাধ পাণ্ডিত্য, কুট তর্কজাল, যুক্তিবাদ ও বিচারবুদ্ধি প্রদর্শন করিয়া প্রতীচ্যের সুবিজ্ঞ ব্যবহারাজীবেরও আতঙ্ক উপস্থিত করিয়াছেন, তিনিও এই বিশ্ববিদ্যালয়েরই অন্যতম কৃতিমান ছাত্র। পালিভাষালােচনার পথপ্রদর্শক, সংস্কৃত সাহিত্যের আজন্ম সেবক, জৈন ন্যায়ের সমালােচক, তিব্বতীয় ও জাৰ্মাণ ভাষার উপাসক, ডাক্তার সতীশচন্দ্র বিদ্যাভূষণও বিশ্ববিদ্যালয়েরই অকাল-কক্ষচ্যুত এক সমুজ্জ্বল নক্ষত্র। কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের এরূপ আরও অনেক কৃতী সন্তান আছেন। কিন্তু এই বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নতিকল্পে এবং দেশমধ্যে উচ্চশিক্ষা- বিস্তারের জন্য বর্তমান সময় যাঁহারা অক্লান্তভাবে পরিশ্রম করিতেছেন, তাহাদের মধ্যে স্যার আশুতােষের নাম সর্বাগ্রে উল্লেখযােগ্য। এই বিদ্যোৎসাহী পুরুষপুঙ্গবের জীবনব্যাপী সাধনার ফলে এবং সুতীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্ত, কাৰ্যদক্ষতা ও একনিষ্ঠতার গুণে আজ দেশমধ্যে উচ্চশিক্ষালাভের এক অতৃপ্ত আকাক্ষা সঞ্জাত হইয়াছে ; . তাঁহারই প্রেরণায় আজ শত শত বিদ্যাসাগর। যুবক উচ্চশিক্ষালাভে লালায়িত হইয়াছে। কিন্তু যিনি সর্বপ্রথম বঙ্গদেশে বাঙ্গালী পরিচালিত কলেজ স্থাপন করিয়া উচ্চশিক্ষা-প্রসারের সহজ ও সরলপথ প্রদর্শন করেন, তিনি আমাদের প্রাতঃস্মরণীয় পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর । বিদ্যাসাগরের নিকট বঙ্গদেশবাসী অশেষ প্রকারে ঋণী। কি সমাজ- সংস্কারব্যাপারে, কি বাঙ্গালা সাহিত্যক্ষেত্রে, কি লােকসেবায়, বিদ্যাসাগর যেরূপ উদার হৃদয়ের, অনন্যসাধারণ প্রতিভার এবং অক্লান্ত পরিশ্রমের পরিচয় প্রদান করিয়াছেন, তাহা স্মরণ করিয়া কৃতজ্ঞতাভরে মস্তক অবনত না করে, এরূপ লােক বঙ্গদেশে অতি বিরল। কিন্তু দেশে উচ্চশিক্ষা বিস্তারকল্পে তিনি যাহা করিয়াছেন, সেই ঋণ অপরিশোেধ্য। যে শিক্ষার প্রভাবে আজ আমরা মস্তক উত্তোলন করিতে সমর্থ হইয়াছি, যে শিক্ষার প্রভাবে আজ আমরা জগতের সভ্য জাতির জ্ঞানভাণ্ডার লুণ্ঠন করিতে প্রয়াস পাইতেছি, যে শিক্ষার প্রভাবে আমরা আমাদের জাতীয় গৌরব দেশবিদেশে প্রচার করিতে দৃঢ়সঙ্কল্প হইয়াছি, যে শিক্ষার প্রভাবে দেশের শিক্ষিত যুবকবৃন্দের মধ্যে অনুসন্ধিৎসাবৃত্তি জাগরিত হইয়াছে, এবং যে শিক্ষার প্রভাবে মৌলিক গবেষণায় অসাধারণ প্রতিভার পরিচয় প্রদান করিয়া কোন কোন বাঙ্গালী যুবক জগৎকে স্তম্ভিত করিয়াছে, সেই উচ্চশিক্ষা প্রসারের সহজ ও সরল পথ প্রদর্শন করিয়া বিদ্যাসাগর দেশের প্রভূত কল্যাণ সাধন করিয়াছেন। অধুনা কলিকাতা নগরীতে বাঙ্গালীপরিচালিত অনেক কলেজ দেখিতে পাওয়া যায়। উচ্চশিক্ষা প্রদানে দেশীয় অধ্যাপকবর্গ যে সম্পূর্ণ সক্ষম ও উপযুক্ত, সে বিষয়ে কাহারও মনে এখন আর সন্দেহের উদয় হয় না। কিন্তু এক সময় ছিল, যখন কেবলমাত্র দেশীয় অধ্যাপকের সাহায্যে কলেজ পরিচালনা এক অসম্ভব ব্যাপার বলিয়া বিবেচিত হইত, যখন বঙ্গদেশবাসী ১৪ চরিত্র-চিত্র। তাহাদের সন্তানগণের উচ্চশিক্ষার ভার নিজ হস্তে গ্রহণ করিতে দ্বিধা বােধ করিত, এবং নিজকে দুর্বল ও অক্ষম মনে করিয়া পরমুখাপেক্ষী হইয়া বসিয়া থাকিত। তখনও দেশে ইংরাজি বিদ্যালয় বহুলপরিমাণে প্রতিষ্ঠিত হয় নাই। যে গুলি প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল, তাহাতেও এত ব্যয়বাহুল্য হইত যে, দেশের মধ্যবিত্ত লােক অনেক সময় শিক্ষাব্যয় বহনে অসমর্থ হইয়া, শিক্ষাদানের ইচ্ছাসত্ত্বেও সন্তানকে উচ্চশিক্ষা হইতে বঞ্চিত রাখিত। মিশনারী প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়ে স্থলবিশেষে অপেক্ষাকৃত অল্প ব্যয়ে শিক্ষা প্রদত্ত হইত সত্য, কিন্তু জনসাধারণ, চিরন্তন ধৰ্ম্মসংস্কার নিবন্ধন, সে সকল বিদ্যালয়ে সন্তানদিগকে প্রেরণ করিতে ইচ্ছুক ছিল না। এরূপ সময়ে দেশে উচ্চশিক্ষা প্রচারের পথ সুপ্রশস্ত, সুপরিষ্কৃত ও সুগম করিবার জন্য মনস্বী ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর কাৰ্য্যক্ষেত্রে অবতীর্ণ হইলেন। তিনি দেশবাসীর পক্ষে শিক্ষা সহজলভ্য ও অল্পব্যয়সাধ্য করিবার জন্য দৃঢ়সঙ্কল্প হইয়া এবং নানাপ্রকার বাধাবিঘ্ন অতিক্রম করিয়া অমিততেজে সঙ্কল্পসাধনে অগ্রসর হইলেন। তাঁহার সাধনা সিদ্ধ হইল। কলিকাতায় সর্বপ্রথম বাঙ্গালীঅধ্যাপক-পরিচালিত কলেজ প্রতিষ্ঠিত হইল। বাঙ্গালীর সম্মুখে তিনি এক নূতন পথ প্রদর্শন করিলেন। তাহার প্রদর্শিত পথ অবলম্বন করিয়া বাঙ্গালী নগরে নগরে কলেজ প্রতিষ্ঠা করিয়া উচ্চশিক্ষার পথ উন্মুক্ত করিয়া দিল। কলিকাতায় বিদ্যাসাগর কলেজ এখনও বিদ্যমান থাকিয়া সেই মহাত্মার কীর্তি ঘােষণা করিতেছে, এবং দেশবাসী আজ সেই অক্লান্তকা নিঃস্বার্থ সমাজসেবক বিদ্যাসাগরের পুণ্যস্মৃতি স্মরণ করিয়া কৃতজ্ঞতাভরে মস্তক অবনত করিতেছে। কলিকাতায় এখন যে কলেজটি বিদ্যাসাগর কলেজ বলিয়া অভিহিত হয়, তাহার পূর্ব নাম মেট্রোপলিটান্ কলেজ। এই মেট্রোপলিটান্ কলেজ বিদ্যাসাগর। কলিকাতার বাঙ্গালীপরিচালিত কলেজের মধ্যে প্রাচীনতম। ইহা একটি উচ্চ ইংরাজি বিদ্যালয়রূপে সর্বপ্রথম স্থাপিত হয়। পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর পূর্ব হইতেই ইহার পরিচালনা-কমিটির সহিত বিশেষভাবে সংশ্লিষ্ট ছিলেন, এবং অবশেষে ১৮৬৬ খৃষ্টাব্দে তিনি এই শিক্ষালয়ের সমস্ত ব্যয়ভার ও দায়িত্ব নিজ স্কন্ধে গ্রহণ করেন। তদবধি দিন দিন বিদ্যালয়ের উন্নতি হইতে লাগিল । ছাত্রসংখ্যা ক্রমশঃ বৃদ্ধি পাইতে লাগিল। বিদ্যালয়ের পরিচালনায় বিদ্যাসাগরের এক অদ্ভুত ক্ষমতা ও অপূৰ্ব্ব কৌশল ছিল। তাঁহার সূক্ষ্ম দৃষ্টি এড়াইয়া, কাৰ্যে অবহেলা বা শৈথিল্য প্রকাশ করিবার কাহারও ক্ষমতা ছিল না ; অথচ তাঁহার সদয় ব্যবহারে সকলেই সন্তুষ্ট ছিল। শিক্ষকনিৰ্বাচনে তিনি সিদ্ধহস্ত ছিলেন। একবার আলাপ করিয়াই তিনি লােকের বিদ্যা, বুদ্ধি ও প্রতিভা সম্বন্ধে একটা সঠিক ধারণা করিতে পারিতেন। তাই তাহার বিদ্যালয়ে বঙ্গের সুশিক্ষিত ধীমান্ যুবকগণের সমাবেশ দেখিতে পাই। তাহার আত্মসম্মানবােধ ও স্বদেশপ্রীতি এত অধিক ছিল যে তিনি তাহার বিদ্যালয়ে য়ুরােপীয় শিক্ষক নিযুক্ত করেন নাই। এমন কি বিদ্যালয়টি যখন উচ্চশিক্ষাপ্রদানােপযােগী কলেজে পরিণত হইল, তখন তিনি দেশীয় লােক ভিন্ন আর কাহাকেও অধ্যাপক পদে নিযুক্ত করেন নাই। তাহার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল শিক্ষিত বাঙ্গালী যুবক য়ুরােপীয় শিক্ষিত যুবক অপেক্ষা কোনও অংশে হীন নহে। সুতরাং দেশীয় উপযুক্ত লােক পরিত্যাগ করিয়া বিদেশীয় অধ্যাপক নিযুক্ত করিতে গেলে বাঙ্গালীজাতির বিদ্যাবুদ্ধির উপর পরােক্ষে দোষারােপ করা হয়। বস্তুত বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষায় বিদ্যাসাগরের কলেজের সান্তাষজনক ফল দেখিয়া সকলেই বিস্মিত হইয়া পড়িল। বৎসরের পর বৎসর বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চ পরীক্ষায় বিদ্যাসাগরের কলেজের ছাত্রগণ কৃতি চরিত্রচিত্র। প্রদর্শন করিতে লাগিল। য়ুরােপীয় অধ্যাপক পরিপূর্ণ গবর্ণমেন্ট কলেজের ছাত্রগণের তুলনায় বাঙ্গালা-অধ্যাপক-পরিচালিত বিদ্যাসাগরের কলেজের ছাত্রগণ কোনও অংশে হীন ছিল না। বিদ্যাসাগরের কলেজের ছাত্রগণ প্রতিযােগিতা-পরীক্ষায় কখনও কখনও গবর্ণামেন্ট কলেজের ছত্রিদিগকে পরাজিত করিয়া সৰ্ব্বোচ্চ স্থান অধিকার করিত। যে সকল সুনিপুণ ও সুদক্ষ অধ্যাপকের মনােজ্ঞ অধ্যাপনা-প্রণালী-গুণে বিদ্যাসাগর-কলেজ দেশ- মধ্যে প্রতিষ্ঠা লাভ করিয়াছিল, তাহাদের মধ্যে স্বর্গীয় প্রসন্নকুমার লাহিড়ীর নাম সর্বাগ্রে উল্লেখযােগ্য। তাহার শিক্ষাদাননৈপুণ্যে আকৃষ্ট হইয়া বহু যুবক বিদ্যাসাগর-কলেজে প্রবিষ্ট হইল। ছাত্ৰাগমের সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যালয়ের অর্থাভাব দূর হইল, এবং অচিরেই বিদ্যাসাগর কলেজের সুনাম ও সুযশ দেশময় পরিব্যাপ্ত হইয়া পড়িল । যে বাঙ্গালী জাতি এক সময়ে নিজকে অক্ষম ও দুর্বল ভাবিরা শিক্ষার জন্য পরমুখাপেক্ষী হইয়া থাকিত, সে আজ তাহার সুপ্ত আত্মশক্তির পরিচয় পাইয়া আত্মনির্ভরশীল হইতে শিক্ষা করিয়াছে। বিদ্যাসাগর কলেজে স্বর্গীয় প্রসন্নকুমার লাহিড়ী প্রভৃতি বাঙ্গালী যুবক ইংরাজি ভাষার অধ্যাপকরূপে কৃতিত্ব প্রদর্শন করিয়া যে সুখ্যাতি অর্জন করিয়াছেন, বিদেশাগত ইংরাজিভাষাভাষী কয়জন অধ্যাপকের ভাগ্যে তাহা ঘটিয়াছে ? প্রতিভাশালী বাঙ্গালী যুবকদিগকে তাঁহাদের স্বভাবসিদ্ধ আত্মনিহিত শক্তির পরিচয় প্রদানের সুযােগ প্রদান করিয়া, বিদ্যাসাগর বাঙ্গালী জাতির ভবিষ্যৎ উন্নতির যে পথ উন্মুক্ত করিয়া গিয়াছেন, তাহার অনুসরণ করিয়াই বঙ্গে শত শত যুবক জগতের অন্যান্য সুসভ্য দেশের যুবকদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতাক্ষেত্রে অবতীর্ণ হইয়াছে। বিদ্যাসাগর যদি বাঙ্গালীর জাতীয় শক্তির উন্মেষসাধনে এইভাবে সহায়তা না করিতেন, তবে বাঙ্গালী জাতির গৌরব এত সমুজ্জ্বল আকার ধারণ করিত কি না সন্দেহ।
No text on this page.
। गमौन মুসলমান সমাজের হিতসাধনে মহসীন। “বিশ্বের উন্নতি লাশ, বিশ্বময় ভালবাসা ; বিশ্বের মঙ্গল সাধে কৰি আত্মদান, মরতে সে দেবােপন, উপাস্য নমস্ত মম, বসুধা কৃতার্থ ভারে কোলে দিয়ে স্থান।” -মানকুমারী। শতাধিক বর্ষ হইল মহাত্মা মহম্মদ মহসীন মহধাম ত্যাগ করিয়া অমরধামে গমন করিয়াছেন। কিন্তু আজও তাহার প্রাতঃস্মরণীয় পুণ্যপূত নাম প্রতিদিন প্রতিগৃহে সসম্মানে উচ্চারিত হইতেছে। বিশেষত মুসলমান সমাজ তাহার নিকট চিরকৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ। তঁাহারই অর্থ- সাহায্যে শত শত নিঃস্ব মুসলমান যুবক শিক্ষার অমৃদলাতে সমৰ হইয়াছে। তাহারই অর্থানুকূল্যে নানাস্থানে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় মুসলমান সমাজে শিক্ষাবিস্তারের পথ প্রশস্ত হইয়াছে। হুগলী কলেজ এবং কলিকাতা, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রাজশাহী মাদ্রাসা তাহারই অক্ষয়কীৰ্ত্তিন্ত- স্বরূপ দণ্ডায়মান। মহাত্মা মহম্মদ মহসীন তাহার ভগিনীর বিপুল সম্পত্তির অধিকারী হন। মহসীনের এই ভগিনীর নাম ছিল মনুজান খানুম। ইনি হুগলীর তদানীন্তন ধনকুবের আগামমাতাহেরের একমাত্র কন্যা। আগামাতাহের পারস্য হইতে দিল্লীতে আগমন করিয়া স্বীয় বুদ্ধিবলে তদানীন্তন মােগল- চরিত্র-চিত্র। সম্রাট আওরংজীবের প্রিয়পাত্র হন। সম্রাট তাহাকে যশােহর জেলায় ও বঙ্গের অন্যান্য স্থানে সুবিস্তৃত জায়গীর প্রদান করেন। অবশেষে তিনি দিল্লী পরিত্যাগ করিয়া বঙ্গদেশে আগমনপূৰ্ব্বক হুগলীনগরীতে স্বকীয় আবাসগৃহ নির্মাণ করেন। মৃত্যুকালে আগামমাতাহের তাহার প্রচুর ধনসম্পত্তি তাহার একমাত্র কন্যা খানুমকে প্রদান করিয়া যান, কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় তিনি নিজের স্ত্রীকে কিছুই দিয়া যান নাই। তাঁহার মৃত্যুর কিছুকাল পরে তদীয় বিধবা পত্নী হুগলীর হাজি ফজলুল্লা নামধেয় এক বণিকের সঙ্গে পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হন। মহম্মদ মহসীন এই ফজলুল্লার ঔরসজাত সন্তান। মহম্মদ মহসীন ও মনুজান খানুম উভয়েই হাজি ফজলুল্লার গৃহে একত্র ললিতপালিত হন। সুতরাং বাল্যকাল হইতেই তাহাদের মধ্যে এক গভীর স্নেহের ভাব সঞ্জাত হইয়াছিল ; তাঁহাদের বয়ােবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এই বন্ধন দিন দিন আরও দৃঢ়তর হয়। মহসীন গৃহে ধীয় ভগিনীর সহিত সিরাজী নামক এক সুপণ্ডিত শিক্ষকের নিকট আরবী ও পাশী শিক্ষা করেন। সিরাজী একজন অভিজ্ঞ ও বহুদশী লোেক ছিলেন। তিনি নানাদেশ পর্যটন করিয়া অবশেষে হুগলীতে আসিয়া উপনীত হন। যখন তিনি তাহার বিস্ময়কর ভ্রমণকাহিনী ওজস্বিনী ভাষায় ও সুললিতকণ্ঠে বিবৃত করিতেন, তখন মহসীন তন্ময় চিত্তে পরম কুতূহলে তাহা শ্রবণ করিতেন। এই সকল চিত্তাকর্ষক প্রমণবৃত্তান্ত শ্রবণ করিতে করিতে তাহার হৃদয়ে জ্ঞানস্পৃহা ও দেশ- ভ্রমণাঙ্কা বলবতী হইয়া উঠে। অবশেষে তিনি জ্ঞানার্জনমানসে হুগলী পরিত্যাগ করিয়া মুর্শিদাবাদে গমন করেন। সেই স্থানের প্রসিদ্ধ বিদ্যালয়ে পবিত্র কোরাণশাস্ত্র এবং আরবী ও পাশী সাহিত্য সম্বন্ধে যতদূর পর্যন্ত জ্ঞানলাভ করা সম্ভবপর মহসীন। ততদূর পর্যন্ত জ্ঞান অর্জন করিয়া দেশে প্রত্যাবর্তন করেন। এখানে তাহার বন্ধুবান্ধব তাঁহাকে উদ্বাহবন্ধনে আবদ্ধ হইয়া গার্হস্থ্য জীবন যাপন করিতে অনুরােধ করেন। কিন্তু সংসারধর্ম গ্রহণ করিয়া তিনি তাহার অতৃপ্ত জ্ঞানাকাঙ্ক্ষাকে বিসর্জন দিতে প্রস্তুত হইলেন না। তাঁহার মুক্ত আত্মা সারা জীবন মুক্ত পাখীর ন্যায় বিচরণ করিতে লালায়িত হইয়া উঠিল। কাজেই ভগিনীর বিবাহের ও সম্পত্তি রক্ষার আয়ােজন করিয়া দিয়া তিনি চিরকৌমার্য অবলম্বনপূর্বক প্রায় বত্রিশ বৎসর বয়সে দেশভ্রমণে বহির্গত হইলেন। মুর্শিদাবাদসহরে কতকদিন অবস্থান করিয়া, মহসীন উত্তরভারতের প্রধান প্রধান স্থানগুলি পরিদর্শন করিলেন। ভারতভ্রমণ করিয়াই তিনি পরিতুষ্ট হইলেন না। মহাপুরুষ মহম্মদের লীলাভূমি আরবদেশ দর্শন না করিয়া তাহার ন্যায় নিষ্ঠাবান্ ধর্মপ্রাণ মুসলমান কি দেশে প্রত্যাগত হইতে পারেন ? তাই তিনি ইসলামধর্মাবলম্বীর পরমপবিত্র তীর্থক্ষেত্র মক্কা ও মদিনায় উপনীত হইলেন। এই সময় হইতেই তাহার নামের সঙ্গে হাজি এই পুণ্যজ্ঞাপক আখ্যা সংযােজিত হইল। কয়েক বৎসর আরব দেশে কাটাইয়া, তিনি তুরস্ক ও পারস্যের ইতিহাসপ্রসিদ্ধ তীর্থস্থানসমূহ পরিদর্শন করেন। পুণ্যসঞ্চয়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি তৎকালপ্রসিদ্ধ নানাস্থানের জ্ঞানকেন্দ্রে অবস্থান করিয়া প্রচুর জনও অর্জন করিয়াছিলেন। এইরূপে প্রায় সাতাশ বৎসরকাল বিভিন্নদেশ পৰ্যটন করিয়া তিনি অগাধ পাণ্ডিত্য ও অভিজ্ঞতা লাভ করিলেন। অবশেষে তাহার শরীরে বার্ধক্যের লক্ষণসমূহ প্রকটিত হইল। পদভ্রমণজনিত শ্রমক যদিও মহসীন এতদিন অম্লানবদনে সহ করিয়াছেন, বার্ধক্যে উপনীত হওয়ায় সেই দেশ সহ করা এখন তাহার পক্ষে অসম্ভব হইয়া উঠিল। তিনি গৃহে প্রত্যাগমন করিবার জন্য, মুর্শিদাবাদ অভিমুখে রওনা হইলেন। ০ চরিত্র-চিত্র। আগমন-পথে তিনি লহ্মোসহরে আসিয়া উপস্থিত হন। এই স্থানটি সে সময়ে মােসলেম জ্ঞানচর্চার জন্য প্রসিদ্ধ ছিল। এই জ্ঞানকেন্দ্রে হাজি মহম্মদ মহসীন সমবেত পণ্ডিতমণ্ডলীর নিকট যথেষ্ট আদর অভ্যর্থনা লাভ করেন। এ স্থানের গুণগ্রাহী বিদ্যোৎসাহী নবাব মহসীনের প্রস্ত্র বিদ্যা- বুদ্ধি ও গভীর শাস্ত্রজ্ঞানদর্শনে বিস্মিত হইয়া তাহাকে গৌরবসূচক পদ ও যথােপযুক্ত বৃত্তি প্রদান করিতে প্রয়াসী হন। কিন্তু ধন, মান, যশ প্রভৃতি পার্থিব পদার্থে বিগতস্পৃহ হাজি মহম্মদ মহসীন সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করিয়া মুর্শিদাবাদে আসিয়া উপনীত হইলেন। তথায় জীবনের সন্ধ্যা শাস্ত্রালােচনা ও ধর্মচিন্তায় অতিবাহিত করিবেন স্থির করিয়া, তিনি সেইস্থানেই বাস করিতে লাগিলেন। কিন্তু মুর্শিদাবাদে অবস্থান মহসীনের ঘটিয়া উঠিল না। এদিকে তাঁহার ভগিনীও বার্ধক্যে উপনীত হইয়াছিলেন। এত বৃদ্ধ রসে তিনি তাঁহার বিপুল সম্পত্তির রক্ষণাবেক্ষণে সম্পূর্ণ অসমর্থ হইয়া একজন সুযােগ্য আত্মীয়ের অনুসন্ধান করিতেছিলেন। বিবাহের কিছুকাল পরেই তিনি বিধবা হন। তিনি যদিও নিঃসন্তান ছিলেন, তথাপি দ্বিতীয় বার বিবাহ করা সুবিবেচনার কাৰ্য্য বলিয়া মনে করেন নাই। তাহার সম্পত্তির কোন উত্তরাধিকারী ছিল না বলিয়া, তিনি মুর্শিদাবাদ হইতে ভ্রাতা হাজি মহম্মদ মহসীনকে আহ্বান করিয়া তাহার হস্তে সম্পত্তি অৰ্পণ করিবার প্রস্তাব করেন। বিষয়নিস্পৃহ মহসীন যদিও এই সকল বিষয়ব্যাপারে জড়িত হইতে চান নাই, তথাপি তিনি তঁাহার স্নেহশীলা ভগিনীর অনুরোধ এড়াইতে পারিলেন না। মহসীনের উপর সমস্ত সম্পত্তির ভার দিয়া মনুজান খানুম অনেকটা নিশ্চিন্ত হইলেন এক জীবনের অবশিষ্ট কয়েকটা দিন ধর্মচিন্তায় ও দানধ্যানে কাটাইতে লাগিলেন।
মহসীন। এইরূপ বিপুল সম্পত্তির অধিকারী হইয়াও, মহসীন অতি দীনভাবে দিন কাটাইতে লাগিলেন। তিনি অতিশয় ধর্মপরায়ণ ছিলেন । বিলাস-ব্যসন তাহাকে স্পর্শ করিতে পারে নাই। এই গৃহস্থ সন্ন্যাসী ঈশ্বনােপাসনায়, জ্ঞানালােচনায় ও নরসেবায় তঁাহার দেহ, মন ও প্রাণ সমর্পণ করিলেন। সামান্য আহার ও আড়ম্বরহীন বেশভুষায় পরিতুষ্ট থাকিয়া তিনি অপরিমিত অর্থ সঞ্চয় করিতে লাগিলেন। এই সঞ্চিত অর্থ তিনি সমাজসেবায় ও ধর্মকর্মে মুক্তহস্তে ব্যয় করিতে লাগিলেন। তাহার অপরিসীম দয়ার প্রভাব কি ধনী, কি নিধন, কি স্বধর্মী, কি বিধর্মী সকলেই অনুভব করিতে লাগিল। একদিন মহাত্মা মহসীন ভ্রমণ করিতে করিতে এক পর্ণকুটীরের নিকট আসিয়া উপস্থিত হইলেন। কুটীরখানি অতি ক্ষুদ্রায়তন ও জীর্ণশীর্ণ ; চালের খড় উড়িয়া গিয়াছে। ছিদ্রবহুল বেড়া বৃষ্টির গতি রােধ করিতে সম্পূর্ণ অক্ষম। ভগ্ন স্থানগুলি ছিন্ন বস্ত্রাদিদ্বারা আবৃত করিয়া রাখা হইয়াছে। ঘরখানা একদিকে হেলিয়া পড়িয়াছে, কখন যে ভূমিসাৎ হয়, তাহার স্থিরতা নাই। বাহিরে প্রাঙ্গণের এক পার্শ্বে ঘরের কোণে একটি উনন রহিয়াছে। সেখানে দুই একটা শূন্য হাঁড়ি গড়াগড়ি যাইতেছে। কোমলপ্রাণ মহসীনের দৃষ্টি সেদিকে আকৃষ্ট হইল। তিনি কিঞ্চিৎ অগ্রসর হইলেন। সহসা তাহার কর্ণকুহরে অস্ফুট ক্রন্দনধ্বনি প্রবিষ্ট হইল। তিনি আরও অগ্রসর হইলে শিশুর লােদন সুস্পষ্ট শুনিতে গাইলেন। ধীরে ধীরে অগ্রসর হইয়া কুটীরের দ্বারদেশে আসিয়া অন্তরালে থাকিয়া গৃহের অভ্যন্তরে দৃষ্টি নিক্ষেপ করিলেন। দেখিলেন কয়েকটা শিশু ক্ষুধায় কাতর হইয়া আহারের জন্য ক্রন্দন করিতেছে, তাহাদের বিধবা মাতা ঘরের একপার্শ্বে অবনত মস্তকে বসিয়া রহিয়াছে। নির্বোধ সরলপ্রাণ শিশুগুলি আহারের জন্য মাতার নিকট পুনঃ পুনঃ আব্দার, ২২ চরিত্র-চিত্র। করিতেছে। আর সেই নিরাশ্রয়া স্নেহময়ী জননী নিৰ্বাক্ নিস্পন্দ কাষ্ঠ পুত্তলিকার ন্যায় বসিয়া রহিয়াছে, তাহার গণ্ডস্থল বাহিয়া অবিরলধারে নেত্রবারি পতিত হইতেছে। এই দৃশ্য দেখিয়া মহসীনের দয়া-প্রবণ হৃদয় বিদীর্ণ হইয়া গেল। তিনি আকুলভাবে গৃহাভ্যন্তরে প্রবেশ করিলেন এবং কালবিলম্ব না করিয়া সেই ক্ষুধার্ত পরিবারের জন্য আহাৰ্য্য দ্রব্য আনয়ন করিয়া নিজে তাহাদিগকে পরিতােষের সহিত ভােজন করাইলেন। বৃদ্ধা রমণী এইরূপ অপ্রত্যাশিত সাহায্য লাভে কৃতজ্ঞ অন্তরে পরমেশ্বরকে ধন্যবাদ দিয়া এই দেচরিত্র হৃদয়বান্ মহাপুরুষের পদতলে লুটাইয়া পড়িল। মহাত্মা মহসীন অতঃপর আজীবন তাহাদের ভরণ-পােষণের ভার গ্রহণ করিবেন এইরূপ আশ্বাস প্রদান করিয়া অন্তর্হিত হইলেন। মহসীন নিজকে সঁহার বিপুল সম্পত্তির তত্ত্বাবধায়কমাত্র মনে করিতেন। তাই স্বকীয় সুখস্বচ্ছন্দের প্রতি তাঁহার দৃষ্টি ছিল না। তাঁহার ধৰ্ম্মকর্মে, জ্ঞানানুশীলনে ও সেবাব্রতে অন্তরায় উপস্থিত হইতে পারে, এই আশঙ্কায় তিনি দারপরিগ্রহ করিলেন না। নানাপ্রকার সৎকার্যে ও শুভানুষ্ঠানে অর্থব্যয় করিয়া তিনি বিপুল আনন্দ অনুভব করিতেন। তাঁহার মৃত্যুর পরেও যাহাতে এই সম্পত্তির আয় মানবজাতির কল্যাণসাধনে ব্যয়িত হয়, যাহাতে এই সম্পত্তি ধর্মসংক্রান্ত নানাপ্রকার হিতকর অনুষ্ঠানে নিয়ােজিত হয়, সেইরূপ বিধান করিবার জন্য বৃদ্ধবয়সে মহসীন ব্যাকুল হইয়া উঠিলেন। তাহার উদার প্রাণ বিশ্বমানবের দুঃখ, সন্দর্শনে বিচলিত হইয়া উঠিয়াছিল, এবং তাহাদের অভাবক্লেশ দূরীকরণার্থ তিনি জীবনব্যাপী সেবাব্রত গ্রহণ করিয়াছিলেন। তাঁহার অভাবে পাছে সেই সেবাব্রতের পথ রুদ্ধ হইয়া যায়, এই আশঙ্কা বহুদিন যাবৎ তাঁহার হৃদয় আলােড়িত করিতেছিল। তাই সময় থাকিতে তিনি এক অপূর্ব মহসীন। • জানপত্র লিখিয়া যান। এই দানপত্রে তিনি তাহার যথাসর্বস্ব ধৰ্ম্মকর্মে ও পরহিতার্থে উৎসর্গ করেন। ১০৬ খৃষ্টাব্দের ২৬শে এপ্রিল এই দানপত্র স্বাক্ষরিত হয়। ইহার প্রতিলিপি অদ্যাপি হুগলীর ইমামবারার প্রাচীর গাত্রে খােদিত থাকিয়া মহসীনের মহাপ্রাণতার পরিচয় প্রদান করিতেছে এবং দর্শকের হৃদয়ে যুগপৎ ভক্তি ও বিস্ময়ের সঞ্চার করিতেছে। মহসীন শােহর জেলার সমস্ত জমিদারী, ইমামবারা নামে হুগলীর বসতবাটী, এমন কি গৃহের সমস্ত আবাবপত্র, স্থাবর অস্থাবর সমস্ত সম্পত্তি ঈশ্বরের প্রিয়কাৰ্য্য সাধনােদ্দেশ্যে উৎসর্গ করেন। তাঁহার সম্পত্তির আয় কি ভাবে ব্যয়িত হইবে, তাহা তিনি মৃত্যুর পূর্বে দানপত্রে সুনির্দিষ্ট করিয়া যান। মহসীন বিধান করিয়াছিলেন যে, গবর্ণমেন্টের রাজ প্রদান করিয়া যে টাকা অবশিষ্ট থাকিবে, তাহা সমান নয় ভাগে বিভক্ত হইবে; তিন ভাগ পৰ্বদিন উপলক্ষে মােতওয়ালীদ্বয় শাস্ত্রানুমােদিত ধর্মকর্মে ব্যয় করিবে; চারিভাগ জনহিতকর অনুষ্ঠানে ব্যয়িত হইবে; দুইভাগ মাত্র মােতওয়ালীদ্বয় তাহাদের গ্রাসাচ্ছাদনের জন্য গ্রহণ করিবে। দানপত্র স্বাক্ষরিত হওয়ার পর ছয়বৎসর মহসীন জীবিত ছিলেন। হাতে মৃত্যুর পর তাঁহার প্রদত্ত সম্পত্তির অসদ্ব্যবহার না হইতে পারে, সেই উদ্দেশ্যে তিনি এই ছয় বৎসর দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রম করিয়া উহার শৃঙ্খলা বিধান করিয়া যান। এই সম্পত্তির সমস্ত প্রায়ই তিনি দানখয়রাত ও ধর্মানুষ্ঠানে ব্যয় করিতেন। স্বল্পতুষ্ট, সংসারবিরাগ, পরদুঃখকাতর, ধর্মপ্রাণ মহসীন নিজের গ্রাসাচ্ছাদনের জন্য মাসিক কেবলমাত্র একশত টাকা গ্রহণ করিতেন। তিনি যে সম্পত্তি দান করিয়া গিয়াছেন, রাজকীয় রাজস্ববাদে, তাহার আয় বর্তমানে প্রায় দেড়লক্ষ টাকা। ইহার কতকাংশ ধৰ্ম্মকার্যের জয় নির্দিষ্ট আছে, এবং অবশি ধংশ মুসলমান ছাগশের শিক্ষার সাহায্যকয়ে বষিত হইতেছে।
চরিত্র-চিত্র। তাঁহারই প্রদত্ত অর্থে আজ মুসলমান সমাজে শিক্ষার পথ বিস্তৃত হইয়াছে, তাঁহারই অর্থসাহায্যে মুসলমান যুবকবৃন্দ জ্ঞানবিজ্ঞানের আলােচনার এক অপূর্ব সুযােগ প্রাপ্ত হইয়াছে। এইরূপ অশ্রুতপূৰ্ব্ব, অতুলনীয় দানশীলতা মহসীনকে এই মন্ত্র জগতে অমর করিয়া রাখিয়াছে। এই নশ্বর জগতে ইহাই তাহার অবিনশ্বর কীৰ্তিচিহ্ন। কে বলে তাহার মৃত্যু হইয়াছে? আজিও তিনি বাঙ্গালীর হৃদয়ে গৌরবাসনে সমাসীন কীর্ভিস্থ স জীবতি'।
No text on this page.
=
tv ।''
পHিK
।
.
ls ।
।
।
TH
ዝ
বা
ATNINUNI MAIMINA FIT" "pupper AMA APA Arena AL
ডেভিড হেয়ার
লােকশিক্ষা বিস্তারে ডেভিড হেয়ার। “অভেদ খৃষ্টান হিন্দু, দ্বেষ নাই এক বিন্দু, নিরখে জগতে ভরা এক ভগবান্ , জ্ঞান সত্য নীতি পুজে, দলাদলি নাহি বুঝে, সে জানে সকলে এক মায়ের সন্তান।” —মানকুমারী। কলিকাতার শিক্ষার ইতিহাসে হেয়ার সাহেবের নাম চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে মুদ্রিত থাকিবে। শিক্ষাবিস্তারকল্পে স্বার্থত্যাগের এরূপ জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত ভারতে অতি বিরল। বিদেশী এবং ভিন্নধর্মাবলম্বী হইয়াও বঙ্গ- দেশবাসীকে তিনি যেরূপ অকৃত্রিম ও নিঃস্বার্থ প্রীতির চক্ষে দেখিতেন, এ দেশের কোন লােক তাহার দেশবাসীকে সে চক্ষে এ পর্যন্ত দেখিতে পারিয়াছে কিনা সন্দেহ। ডেভিড হেয়ার চিরকুমারব্রত অবলম্বন করিয়া ভঁহার সমস্ত হৃদয়টুকু দিয়া বঙ্গদেশকে ভালবাসিয়াছিলেন ; বঙ্গদেশবাসীর কল্যাণচিন্তা ভিন্ন সে হৃদয়ে আর কিছুই স্থান পায় নাই। তাহার উদার চিত্ত ভৌগলিক, সামাজিক প্রভৃতি সসীম বন্ধন ছিন্ন করিয়া সেই অসীম, অনন্ত প্রেমরাজ্যের সন্ধান পাইয়াছিল। তাই, নিজ দেশ, নিজ জাতি, নিজ সমাজ, এমন কি আত্মীয়স্বজন প্রভৃতির কথা বিস্মৃত হইয়া, বিশ্ব প্রেমিক হেয়ার একমনে, একপ্রাণে এ দেশের সেবায় জীবন বিসর্জন করিতে সমর্থ হইয়াছিলেন।
২৬ চরিত্রচিত্র। ১৮০০ খৃষ্টাব্দে পঞ্চবিংশতিবর্ষবয়স্ক হেয়ার অর্থসঞ্চয়মানসে কলিকাতায় আগমন করেন, এবং স্বীয় পরিশ্রম, সততা ও বুদ্ধি বলে অত্যল্পকালমধ্যেই ঘড়ির ব্যবসায়দ্বারা প্রচুর অর্থ উপার্জন করেন। তখন ব্যবসায়ক্ষেত্রে তাঁহার বিশেষ কোনও প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না; সুতরাং ইচ্ছা করিলে তিনি অপরিমিত ধনৈশ্বর্যের অধিকারী হইয়া বিলাসবিভবে সুখে কালযাপন করিতে পারিতেন। কিন্তু পাথিব সুখসম্পদে তৃপ্ত না হইয়া, তাঁহার মন উচ্চতর সুখের অনুসন্ধানে প্রবৃত্ত হইল। স্বার্থসম্পর্কচিন্তাবিহীন হইয়া পরসেবায় স্বীয় ধনমনপ্রাণ নিয়ােগ করিতে তিনি কৃতসঙ্কল্প হইলেন। জ্ঞানালােকবিহিত কুসংস্কারপন্ন কলিকাতাবাসী জনসাধারণের দুর্দশা দেখিয়া তাহার প্রেমপারাবার উথলিয়া উঠিল। উহার প্রবল তরঙ্গাভিঘাত সীন দরিদ্রের পর্ণকুটীর হইতে সঙ্গতিপন্ন গৃহস্থের প্রাসাদোপম গৃহ পৰ্যন্ত স্পর্শ করিল। কলিকাতাবাসী ধনী নিধন, জ্ঞানী অজ্ঞান সকলেই সেই মহান্দোলনের স্পন্দন অনুভব করিতে লাগিল। ১৮১৬ খৃষ্টাব্দের প্রারম্ভে হেয়ার স্বীয় ব্যবসায় পরিত্যাগ করিয়া কলিকাতায় শিক্ষাপ্রচার-ব্ৰত গ্ৰহণ করিলেন। তখন কলিকাতায় শিক্ষার অবস্থা অতীব শােচনীয়। প্রকৃত বিদ্যালয় বলিতে যা বুঝায়, সেইরূপ বিদ্যালয় কলিকাতা নগরীতে ছিল না বললেও অত্যুক্তি হয় না। ইংরাজিশিক্ষা প্রচলনের জন্য নূতন নূতন স্কুল প্রতিষ্ঠিত হইতেছিল সত্য, কিন্তু তাহাতে রীতিমত শিক্ষা প্রদত্ত হইত না। কতকগুলি ইংরাজি শব্দ আয়ত্ত করিয়া ভাঙ্গা ভাঙ্গা ইংরাজিতে কথা বলিতে পারিলেই যুবকগণ নিজদিগকে সুশিক্ষিত ও গৌরবান্বিত জ্ঞান করিত। বাঙ্গালা বিদ্যালয়ে অক্ষরযােজন, সংখ্যালিৰন ও সামান্তরূপ গণনা শিক্ষা দেওয়া হইত। তাহাতে বাঙ্গালা ভাষা বা সাহিত্য সম্বন্ধে ছাত্রগণের কোনরূপ জ্ঞান জন্মিত না। প্রয়ােজনীয় বিজ্ঞান বা নৈতিক জ্ঞান ডেভিড হেয়ার। সম্বন্ধে কোনরূপ শিক্ষারই বন্দোবস্ত ছিল না। সুতরাং বালকের চিত্তবৃত্তি বিকাশ—যাহা শিক্ষার প্রধান উদ্দেশ্য—তাহা অসম্পন্ন থাকিয়া যাইত। ভাষায় তাহার কোন অধিকার জন্মিত না বলিয়া সে শুদ্ধ করিয়া সামান্য একটি প্রবন্ধ পর্যন্ত লিখিতে পারিত না; এমন কি ছোট ছােট বাক্য পর্যন্ত বর্ণাশুদ্ধি দোষে পরিপূর্ণ থাকিত। ব্যাকরণের নিয়ম পালন করাতে দূরের কথা—একটি শব্দেরই বানান লেখকের ইচ্ছানুসারে বহুরূপ ধারণ করিত। যাহারা সাহিত্যের চর্চা করিতেন তাহারাও পার্শিশব্দবহুল দুর্বোধ্য ভাষা ব্যবহার করিতেন। মাতৃভাষার এরূপ অধধাগতি এই উন্নতির যুগে দুর্ভাগ্য ভারত ব্যতীত পৃথিবীর কুত্রাপি দৃষ্ট হয় না। মাতৃ ভাষাশিক্ষাই মানসিক উৎকর্ষসাধনের প্রথম স্তর। সেই শিক্ষা ব্যতিরেকে যখন বঙ্গের জনসাধারণ অজ্ঞানান্ধকারে আচ্ছন্ন ছিল, তখন তাহাদের -জ্ঞানচক্ষু উন্মীলনের জন্য একজন বিদেশাগত ব্যক্তি অগ্রসর হইলেন। ইহা কি তাহার মহাপ্রাণতার সমুজ্জ্বল পরিচয় নহে? বিশ্বপ্রেমিক হেয়ার সাহেব বঙ্গদেশে ইংরাজি শিক্ষাপ্রচারের জন্য যাহা করিয়াছেন, তাহার মধ্যে সঙ্কীর্ণচেতা সমালােচক, হয়ত, এই দেশে তাঁহার স্বদেশের ভাষা-প্রচারের একটি আকাঙ্ক্ষা লুক্কায়িত দেখিতে পাইবেন। কিন্তু বঙ্গদেশে বাঙ্গালাভাষা শিক্ষা-প্রচারােদ্দেশ্যে তিনি যাহা করিয়াছেন, তাহাতে যে স্বার্থের লেশমাত্র নাই ইহা একবাক্যে স্বীকার করিতে হইবে। বস্তুতঃ ডেভিড হেয়ার কোন দেশবিদেশের বা জাতি বিশেষের গৌরববর্ধনার্থ জন্ম গ্রহণ করেন নাই। তিনি বিশ্বমানবের সেবার জন্য প্রেরিত হইয়াছিলেন, এবং দেশকাল ও পাত্রপাত্র বিবেচনা করিয়া তাহাদের সেবায় আত্মনিয়ােগ করিয়া ভারতে এক উচ্চ আদর্শ রাখিয়া গিয়াছেন। দেশীয় পাঠশালায় শিক্ষাপ্রণালীর দুর্দশা দেখিয়া হেয়ার বিস্মিত ২৮ চরিত্র-চিত্র। হইলেন। বঙ্গীয় ছাত্রবর্গের অন্তনিহিত শক্তি সম্বন্ধে তিনি কখনও সন্দিহান ছিলেন না। তাঁহার ধ্রুব বিশ্বাস ছিল যে, পাঠশালায় শিক্ষা- প্রদানের সুবন্দোবস্ত হইলেই, ছাত্রগণ যথেষ্ট মানসিক ও নৈতিক উন্নতি সাধন করিয়া কুসংস্কারের হস্ত হইতে নিজদিগকে মুক্ত করিতে সমর্থ হইবে। তাই তিনি নিজের ব্যয়ে ঠঠনিয়ায় কালীতলার নিকট একটি অবৈতনিক বিদ্যালয় স্থাপন করিলেন। সেখানে তিনি নবােদ্ভাবিত উন্নত প্রণালীতে হিন্দু বালকগণের মানসিক উৎকর্ষবিধানের ব্যবস্থা করিলেন। কোমলমতি বালকগণের উপযােগী পুস্তক প্রণয়ন ও প্রচারের জন্য তিনি পণ্ডিত নিযুক্ত করিলেন। এইরূপে বঙ্গভাষা বিশুদ্ধভাবে লিখিবার ও পড়িবার সুবন্দোবস্ত হইল। বহু বালক ছাত্ৰশ্রেণীভুক্ত হইল। শিক্ষায় তাহাদিগের উৎসাহ- বর্ধনার্থ এবং নিয়মিতরূপে পাঠশালায় উপস্থিতির জন্য তিনি তাহাদের মধ্যে গুণানুসারে পুরস্কার বিতরণ করিতে লাগিলেন। ডেভিড হেয়ার বিষয়কাৰ্য পরিত্যাগ করিয়া প্রতিদিন এগারটা হইতে পাঁচটা পর্যন্ত পণ্ডিতদিগের কার্যের তত্ত্বাবধান করিতেন। হেয়ার সাহেবের বিদ্যালয়ের পণ্ডিতগণ ঘুরিয়া ঘুরিয়া অন্যান্য পাঠশালার শিক্ষকগণের সমক্ষে তাহাদের উন্নত শিক্ষাপ্রণালী প্রদর্শন করিতে লাগিলেন। যে সকল গুরুমহাশয় উন্নত শিক্ষাপ্রণালীতে শিক্ষা প্রদান করিতে প্রস্তুত হইলেন, তাহাদের উৎসাহবন্ধনের জন্য পুরস্কার প্রদত্ত হইল। এই সময়ে কলিকাতায় পরিচালিত বিদ্যালয় ও বিদ্যালয়পাঠ্য পুস্তকের বড়ই অভাব ছিল। এই অভাব দূরীকরণার্থ ১৮৯৭ খৃষ্টাব্দে কলিকাতায় দেশীয় ও য়ুরােপীয় গণ্যমান্ত লােক লইয়া “স্কুল বুক সোসাইটি” নামে একটি সমিতি গঠিত হয়। পরবৎসর দেশীয় যুবকগণের মধ্যে সুশিক্ষা বিতরণের উদ্দেশ্যে এবং মানসিক উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে তাহাদের নৈতিক উন্নতিবিধানকল্পে, তাঁহারা তাহাদের কর্তৃত্বাধীনে কলিকাতায় ডেভিড হেয়ার। ২১ কতিপয় বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সঙ্কল্প করেন। এই সঙ্কল্প কার্যে পরিণত করিবার জন্য ১৮১৮ খৃষ্টাব্দে কলিকাতায় “স্কুল সােসাইটি” নামে অপর একটি সমিতি গঠিত হয়। নূতন বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে কলিকাতায় পূৰ্ব্বপ্রতিষ্ঠিত দেশীয় বিদ্যালয়সমূহের সংস্কারসাধন এবং প্রতিভাসম্পন্ন যুবকগণের উচ্চ শিক্ষালাভের সুযােগ প্রদান—এই সভার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল। জ্ঞানবিস্তারকল্পে যে সকল অনুষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে, তাহাতে হেয়ার সাহেব যোগদান না করিয়া কি থাকিতে পারেন? তিনি এই উভয় অনুষ্ঠানের একজন উৎসাহী কর্মকুশল সভ্য-বিশেষতঃ তিনিই কলিকাতার স্কুল সােসাইটির প্রাণস্বরূপ ছিলেন। এই সমিতি কলিকাতার জনবহুল বিভিন্ন পল্লীতে চারিটি বিদ্যালয়-গৃহ নির্মাণ করেন। আরপুলিতে যে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল, তাহা হেয়ার সাহেবের অনুরােধে তাঁহারই হস্তে অর্পিত হয়। এই বিদ্যালয়টি নিজহস্তে গ্রহণব্যাপারে হেয়ার সাহেবের একটি মহৎ উদ্দেশ্য ছিল । যে সকল বালক তাহাদের পিতার দরিদ্রতানিবন্ধন শিক্ষাভাবে হীন জীবন যাপন করিত, তাহাদের ভবিষ্যৎ উন্নতির পথ উন্মুক্ত করিয়া দিবার জন্য তাহার প্রাণ কাঁদিয়া উঠিল। দরিদ্রবৎসল হেয়ার দরিদ্রের সেবার জন্য এই বিদ্যামন্দিরের “সেবাইত” নিযুক্ত হইলেন এবং নিজব্যয়ে আর কাৰ্য্য নিৰ্বাহ করিতে লাগিলেন। বঙ্গের খ্যাতনামা সুকৃতী সন্তান কৃষ্ণমােহন বন্দ্যোপাধ্যায় এই আরপুলি পাঠশালার গৃহতলে উপবেশন করিয়া কদলী- পত্রে লিখন অভ্যাস করেন। ১৮২৪ খৃষ্টাব্দে এই পাঠশালার নিকট একটি ইংরাজি স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়। পাঠশালার মেধাবী ছাত্রগণ এই ইংরাজি বিদ্যালয়ে প্রবেশের অধিকার পাইত, এবং এই প্রাথমিক ইংরাজি বিদ্যালয় হইতে ছাত্রগণ পরে হেয়ার সাহেবের উচ্চ ইংরাজি বিদ্যালয়ে প্রেরিত হইত। কিন্তু বাঙ্গালা চরিত্র-চিত্র। ভাষায় কিঞ্চিৎ জ্ঞানলাভ না করিয়া ছাত্রগণ যাহাতে পাঠশালা হইতে ইংরাজি বিদ্যালয়ে প্রবেশ করিতে না পারে, তৎপ্রতি হেয়ার সাহেবের বিশেষ দৃষ্টি ছিল। যে সকল বালক ইংরাজি স্কুলে প্রবেশের অনুমতি পাইত তাহাদিগকেও ভােরে এবং বিকালে সেই পাঠশালায় বাঙ্গালা অধ্যয়ন করিতে হইত। বাঙ্গালা ভাষার প্রতি বালকদের হৃদয়ে যাহাতে অবজ্ঞার সঞ্চার না হয়, তাহার জন্যই এইরূপ বিধান করা হইয়াছিল। ইহা কি হেয়ার সাহেবের দুরদর্শিতা ও প্রকৃত শিক্ষানুরাগের পরিচয় নহে? এইরূপে তাহার অক্লান্ত চেষ্টায় ও অকাতর অর্থানুকূল্যে আরপুলি বিদ্যালয় কলিকাতায় আদর্শস্থানীয় হইয়া উঠিল। কলিকাতার সন্ত্রান্ত ব্যক্তিগণও এই বিদ্যালয়ে তাঁহাদের সন্তানদিগকে প্রেরণ করিয়া ইহার প্রতি সহানুভূতি ও সমাদর প্রদর্শন করিতে লাগিলেন। আরপুলি বিদ্যালয়ের ইংরাজি বিভাগের সুখ্যাতি দিন দিন কলিকাতায় বিস্তৃত হইয়া পড়িল। বঙ্গদেশে উচ্চ ইংরাজিশিক্ষা প্রচারের জন্য হেয়ার সাহেব যাহা করিয়াছেন, তজ্জন্য দেশবাসী চিরকাল তাহার নিকট কৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ থাকিবে। কলিকাতায় যে স্কুলটি হেয়ার স্কুল নামে প্রসিদ্ধ, যে বিদ্যালয়ে পণ্ডিতবর রমেশচন্দ্র দত্ত, স্যার রমেশচন্দ্র মিত্র, ডাক্তার রাজেন্দ্রলাল, স্যার গুরুদাস, স্যার দেবপ্রসাদ, স্যার প্রফুল্লচন্দ্র, স্যার বিনােদচন্দ্ৰপ্রমুখ বঙ্গের খ্যাতনামা সন্তানগণ শিক্ষিত হইয়াছিলেন, তাহার মূলভিত্তি হেয়ার সাহেব স্থাপন করেন। কলিকাতায় হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠাব্যাপারেও তিনি সাহায্যের ত্রুটি করেন নাই। ১৮১৭ খৃষ্টাব্দের ২৩শে জানুয়ারী সােমবার গরাণহাট। গােরাদ বসাকের বাড়ীতে হিন্দু কলেজের সূচনা হয়। কিন্তু দীর্ঘ ছয় বৎসরের মধ্যেও ইহার জন্য কোনরূপ স্থায়ী গৃহ নির্মিত হয় নাই। অবশেষে বিভিন্ন স্থান পরিবর্তনের পর ১৮২৪ খৃষ্টাব্দের ২৫শে ফেরারী গভর্ণমেন্টের ঝয়ে সংস্কৃতকলেজের সঙ্গে ইহার জন্য এক গৃহ ডেভিড হেয়ার। নির্মিত হয়। ডেভিড হেয়ার কলেজ স্কোয়ারের উত্তর পার্শ্বস্থ ভূভাগ হিন্দু কলেজের গৃহ নির্মাণের জন্য দান করেন । হিন্দু কলেজের সুচনাকালে যে কমিটি গঠিত হয়, তাহাতে হেয়ার সাহেল্পে নাম না থাকায়, কেহ কেহ তাহাকে হিন্দু কলেজের সংস্থাপক- আখ্যা প্রদান করিতে কুষ্ঠিত হন। কিন্তু হেয়ার সাহেবের পরামর্শেই রামমােহন রায়, বৈদ্যনাথ মুখার্জি প্রভৃতি দেশীয় নেতৃবর্গ তদানীন্তন সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি স্যার হাইড ইষ্টের সহানুভূতি প্রার্থনা করেন। সুতরাং হিন্দু কলেজের প্রথম কমিটিতে প্রত্যক্ষভাবে তাহার নামের উল্লেখ দেখিতে না পাওয়া গেলেও, পরােক্ষভাবে তিনিই যে দেশীয় ও ঝুরােপীয় ব্যক্তিগণের মধ্যে একটা উৎসাহ-উদ্দীপনার সঞ্চার করিয়াছিলেন, তাহার যথেষ্ট প্রমাণ আছে। হিন্দুকলেজ প্রতিষ্ঠা-ব্যাপারে যে সকল য়ুরােপীয় ভদ্রলােক যথেষ্ট সহানুভূতি ও অনুরাগ প্রদর্শন করিয়াছেন, ডেভিড হেয়ার তাহাদের অন্যতম। কিন্তু তিনি নামের প্রত্যাশী না হইয়া স্বভাবতঃ নীরবে কৰ্ম্ম করিতে ভালবাসিতেন বলিয়া, তাহার নাম পশ্চাতে পড়িয়া রহিয়াছে। বস্তুতঃ হেয়ার সাহেব মানবজাতির দীন সেবকরূপে তাহার জীবনের নীরব সাধনা সম্পন্ন করিয়া গিয়াছেন। তাঁহার ন্যায় নিঃস্বার্থ কৰ্ম্মী জগতে বিরল। ভাের দশটার সময় নানাপ্রকার পুস্তক ও ঔষধে তাহার পাখী বােঝাই করিয়া, তিনি তাহার দৈনিক কার্যে বহির্গত হইতেন। সমস্ত দিন বিদ্যালয় পরিদর্শন করিয়া, অবশেষে সন্ধ্যাবেলায় তিনি গৃহে প্রত্যাগমন করিতেন। শেষ বয়সে হিন্দু কলেজ, পটলডাঙ্গা বিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজ—এই তিনটি বিদ্যালয় তাহার প্রধান কৰ্ম্মক্ষেত্র হইয়া উঠিল। বিদ্যালয় পরিদর্শনে যাইয়া তিনি সর্বপ্রথম রেজেষ্ট্রী দেখিয়া যে যে ছাত্র অনুপস্থিত আছে, তাহাদের নামের একটি তালিকা করিতেন। তারপর বভিন্ন শ্রেণীতে যাইয়া ছাত্রদের পাঠোন্নতি সম্বন্ধে অনুসন্ধান ও চরিত্র-চিত্র। শিক্ষকদের কার্যপ্রণালী পৰ্যবেক্ষণ করিতেন, এবং মেধাবী ছাত্রদিগকে পুরস্কার দিয়া, অলস ও অমনােযােগী ছাত্রদিগকে তিরস্কার করিয়া, পাঠে উৎসাহিত করিতেন। বিদ্যালয় পরিদর্শনকাৰ্য্য সমাপ্ত হইলে, যে সকল ছাত্র স্কুলে অনুপস্থিত থাকিত, তাহাদের অনুপস্থিতির কারণ জানিবার জন্য তিনি তাঁহার বিশ্বস্ত কর্মচারীকে পাঠাইতেন গৃহে বালকদের আচারব্যবহার কিরূপ, তাহারা কিরূপ লােকের সংসর্গে বাস করে, কিরূপ ক্রীড়াকৌতুকে যোগদান করে, অধ্যয়নে উপযুক্ত সময় ক্ষেপণ করে কিনা ইত্যাদি নানা বিষয় তিনি অনুসন্ধান করিতেন। মানসিক উন্নতি বিধানের সঙ্গে সঙ্গে বালকদের চরিত্রগঠন তাহার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল। এই উদ্দেশ্যে তিনি বালকদের সঙ্গে খুব মেশামিশি করিতেন। শুধু বিদ্যালয়গৃহে নয়, ক্ৰীড়াপ্রাঙ্গণে এবং পথেঘাটেও প্রায়ই তিনি বালকদের সঙ্গে আলাপ করিয়া বেড়াইতেন। এইরূপে ছাত্রদের উপর তাঁহার অপূৰ্ব্ব প্রভাব বিস্তৃত হইয়া পড়ে। তাহার ছাত্রগণই দেশের সামাজিক শাসন ও দণ্ডভয় তুচ্ছ করিয়া অগ্রণীরূপে মেডিকেল কলেজে ভৰ্ত্তি হইয়া বঙ্গদেশে ডাক্তারি শিক্ষার এক নবযুগ আনয়ন করে। হেয়ার সাহেব ছাত্রদের চরিত্র-সংশােধনে সিদ্ধহস্ত ছিলেন। তাহাদের নৈতিক অবনতির কারণ অধিকক্ষণ তাহার নিকট গুপ্ত থাকিতে পারিত ; শীঘ্রই তিনি তাহা ধরিয়া ফেলিতেন। যে বালক মােহে পতিত হইয়া চরিত্রভ্রষ্ট হইয়াছে তাহার প্রম নিরসন করিয়া, যাহার চিত্ত সন্দেহ দোলায় দুলিতেছে তাহার সন্দেহ অপনােদন করিয়া, যে বালক তাহার চরিত্র সংশােধনে একেবারে নিরাশ হইয়া পড়িয়াছে, আশ্বাসবাক্যে , তাহার হৃদয়ে আশার সঞ্চার করিয়া, অনুতপ্ত হৃদয়ে শান্তিবারি সেচন করিয়া- এক কথায় যে রােগের যে ঔষধ তাহার যথাযথ ব্যবস্থা করিয়া, তিনি পথভ্রান্ত যুবকদিগকে প্রকৃত পথ দেখাইয়া দিতেন। যুবকগণ যাহাতে , ডেভিড হেয়ার। সৰ্ব্বদা ন্যায়পথে থাকিয়া সত্যের ন্যদা অক্ষুন্ন রাখিতে পারে এবং সেই সতাস্বরূপের মহিমা ঘােষণা করিযা রাধামে স্বর্গরাজ্যের প্রতিষ্ঠা করিতে পারে, সেইজন্য তিনি সমস্ত জীবন অশ্রান্ত অক্লান্তভাবে চেষ্টা করিয়া গিয়াছে। কৰ্ম্মই ধৰ্ম্ম—ইহা তাহার জীবনের মূলমন্ত্র ছিল। তাই তিনি আত্ম বিস্মৃত হইয়া পরসেবায় সমস্ত ন, মন ও প্রাণ অর্পণ করিয়াছিলেন। বিদ্যার্থী কত নিঃস্ব বালককে তিনি অর্থদ্বারা সাহায্য করিয়াছেন, কত দরিদ্র বালকের গ্রাসাচ্ছাদনের ব্যয় তিনি নিজে বহন করিয়াছেন, কত অভাবগ্রস্ত বালককে তিনি নিজব্যয়ে পুস্তক সংগ্রহ করিয়া দিয়াছেন, কত দরিদ্র ছাত্রের রােগ-শব্যাপ উপবেশন করিয়া তিনি নিজহস্তে ঔষধ ও পথ্য প্রদান করিয়াছেন, কত দুঃস্থ পরিবারের শিক্ষিত যুবককে চাকুরীর সংস্থান করিয়া দিয়া দরিদ্রের নির্মম নিষ্পেষণ হইতে রক্ষা করিয়াছেন, তাহার ইয়ত্তা করা কঠিন। এই উদারহৃদয় মহাত্মার স্মৃতিরক্ষাৰ্থ আড়ম্বরপ্রিয় বাঙ্গালী অনেক কাৰ্য্যের অনুষ্ঠান করিয়াছে। সমাধিক্ষেত্রে তাহার স্মৃতিস্তম্ভ নির্মিত ও হেয়ারস্কুল প্রাঙ্গণে মৰ্ম্মরমূৰ্ত্তি প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে, এবং বিদ্যালয়গুহে প্রস্তরফলকে তাঁহার প্রশংসালিপি খােদিত ও তৈচিত্র স্থাপিত হইয়াছে। কিন্তু হেমায়ের অন্তর:আ ইহাতে পরিতৃপ্ত হইয়াছে কি ? হেয়ারের আরব্ধ কার্য্যের পরিসমাপ্তির জন্য বঙ্গবাসী কোনও অনুষ্ঠানের সুচনা করিয়াছে কি ? হেয়ারের আত্মা যে এখনও দরিদ্র অজ্ঞ জন- সাধারণের পল্লীতে পল্লীতে অতৃপ্ত আকাঙ্ক্ষা লইয়া ঘুরিয়া বেড়াইতেছে। তাহার আত্মার তৃপ্তিসাধনার্থ বঙ্গবাসা কি দদ্র জনসধারণের মধ্যে
চরিত্র-চিত্র।
শিক্ষাবিস্তারকার্যে অগ্রসর হইবে না? বঙ্গবাসীকে আর বিস্মৃত হইলে
চলিবে না যে
“এই সব মূঢ়, স্নান, মূক মুখে দিতে
ইবে ভাষা,
এই সব শ্রান্ত, শুষ্ক, ভগ্ন বুকে ধ্বনিয়া তুলিতে
হবে আশা।
কারা-সংস্কারে হাওয়ার্ড। পরের কারণে স্বার্থ দিয়া বলি, এ জীবন মন সকলি দাও। তার মত সুখ কোথায় কি আছে ? আপনার কথা ভুলিয়া যাও। আপনারে লয়ে বিব্রত রহিতে আসে নাই কেহ অবনী’ পরে, সকলের তরে সকলে আমরা, প্রত্যেয়ে আমরা পরের তরে॥” -কামিনী রায়। মহাপ্রাণ জন হাওয়ার্ড লণ্ডনের নিকটবর্তী এক ক্ষুদ্র পল্লীতে ১৭২৬ খৃষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি তীক্ষ্ণবুদ্ধিসম্পন্ন বা প্রতিভাবান্ ব্যক্তি ছিলেন না। কিন্তু য়ুরােপে তাহার নাম না জানে এরূপ লােক অতি বিরল। কয়েদীদিগের দুর্দশা দেখিয়া তাহার হৃদয়তন্ত্রীতে যে করুণ- সুর বাজিয়া উঠিয়াছিল, আহারে বিহারে, শয়নে স্বপনে, সেই এক সুবই তাহার প্রাণে আমরণ বাজিতেছিল। তিনি সমাজসেবায় মনপ্রাণ সমর্পণ করিয়াছিলেন, এবং তজ্জন্যই য়ুরােপীয় জনসমাজ এখনও কৃতজ্ঞ অন্তরে তঁাহার চরণতলে মস্তক অবনত করিতেছে। খৃষ্টীয় অষ্টাদশ শতাব্দীতে য়ুরােপে কারাগারের অবস্থা অতীব শশাচনীয় চরিত্র-চিত্র। ছিল। কারাগৃহগুলি একদিকে যেরূপ অপ্রশস্ত ও গবাক্ষবিহীন, অপর দিকে সেরূপ অপরিষ্কার ও অপরিচ্ছন্ন ছিল। তথায় সূৰ্য্যালােক-প্রবেশের বা বায়ু-চলাচলের পথ একপ্রকার ছিল না বলিলেও অত্যুক্তি হয় না। ধূলি, আবর্জনা ও পূতিগন্ধময় দ্রব্যে কারাগৃহগুলি এরূপ পরিপূর্ণ থাকিত যে, এমন কি য়ুরােপের তদানীন্তন পশুশালার অবস্থাও শুদ- পেক্ষা ভাল ছিল। জেলরক্ষকদের কোনরূপ নিরূপিত বেতন ছিল না। তাহারা কয়েদীগণের নিকট হইতে উৎকোচ গ্রহণ করিয়া স্বীয় উদর পূরণ করিত। এইরূপে যাহারা রক্ষক তাহারাই আবার ভক্ষকমূর্তি ধারণ করিত। তাহাদের অব্যাহত শক্তি সময় সময় স্বেচ্ছাচারিতা ও অত্যা- চারে পরিণত হইয়া কারারুদ্ধ হতভাগ্য ব্যক্তিগণের ক্লেশ ও যাতনার বৃদ্ধিসাধন করিত। অপ্রাপ্তবয়স্ক কোমলমতি বালকগণ জেলখানায় নরাধম, দুৰ্বত্তগণের সঙ্গে একগৃহে রক্ষিত হইত। তাহারা এইরূপে তাহাদের চরিত্রকে দিন দিন আরও কলুষিত করিয়া পাপপঙ্কে নিমগ্ন হইত। তখন অপরাধের গুরুত্ব বা লঘুত্বে, বয়সের আধিক্য বা অল্পতায়, অথবা স্ত্রীপুরুষ-ভেদে কয়েদীদিগকে বিভাগ করিয়া রাখিবার প্রথা ছিল না। কাজেই কারা- গৃহের মুখ্য উদ্দেশ্য সিদ্ধ হওয়া দূরে থাক, বরং বিপরীত ফলই প্রসূত হইত। বালকগণের চরিত্রসংশােধনের কোন চেষ্টাই হইত না, পক্ষান্তরে চরিত্র নষ্ট করিবার সুযােগ তাহাদের নিকট প্রসারিত করিয়া দেওয়া হইত। কারাবাসীদিগের ক্ষুৎপিপাসা নিবারণের যথোপযুক্ত বিধান ছিল না। আহাৰ্য্য দ্রব্যের পরিমাণ শরীররক্ষার সম্পূর্ণ অনুপযােগী ছিল। আবার তাহাদের জন্য যে পরিমাণ খাদ্যদ্রব্য নির্দিষ্ট ছিল, তাহার উপর জেল রক্ষকদের লােলুপ দৃষ্টি থাকায় অনেক কয়েদীকেই অর্ধভুক্ত অবস্থায় হাওয়ার্ড। থাকিতে হইত। কারাপ্রবেশকালে যাহারা সুস্থ, বলিষ্ঠ ও কর্মক্ষম খাকিত, মুক্তিকালে তাহারাই রুগ্ন, কঙ্কালসার ও কর্মশক্তিরহিত হইয়া বাহির হইত। কোন কোন জেলে পানীয় জলেরও সংস্থান ছিল না। কাজেই অনেক সময় হতভাগ্য কয়েদীগণ পিপাসায় শুষ্ককণ্ঠ হইয়া আর্তনাদ করিত। চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে চৌদ্দ পনর ঘণ্টা সময় কয়েদীগণ অপ্রশস্ত কারা-গৃহে অথবা বায়ু ও আলােক বিহীন মৃত্তিকানিয়স্থিত গহ্বরে আবদ্ধ থাকিত। সেই সকল স্থানের ভীষণ দৃশ্য কল্পনা করিতে গেলেও শরীর শিহরিয়া উঠে। অন্ধকূপ-হত্যার ন্যায় একরাত্রিতে অত লােকের প্রাণ নষ্ট হইত না সত্য, কিন্তু তিল তিল করিয়া সেই দুর্ভাগ্যদের জীবনী শক্তি একেবারে বিনষ্ট হইয়া যাইত। স্বাস্থ্যসম্বন্ধে এরূপ উদাসীনতার কুফল প্রতি জেলেই পরিলক্ষিত হইত। কারাজর নামে একপ্রকার সংক্রামক ব্যাধি কারাবাসিগণের সমক্ষে বিকট মুক্তি ধারণ করিয়া উপস্থিত হইত। তাহার ভীষণ আক্রমণে জেলকে জেল উজাড় হইয়া যাইত; অতি অল্পমাত্র লােকই তাহার করাল- কবল হইতে রক্ষা পাইত। কোনও কোনও সময় জেলরক্ষক ও অন্যান্য কর্তৃপক্ষগণ এই প্রাণনাশকর রােগের ভীষণ আক্রমণে অকালে কালগ্রাসে পতিত হইত। তৎকালে প্রতিবৎসর ঘাতকের হস্তে যত লােকের প্রাণবায়ু বহির্গত হইত, এই উৎকট রােগে তদপেক্ষা অধিক লােক শমনসদনে গমন করিত। কারাবাসিগণের এরূপ দুর্দশার দিনে, ইংলণ্ডে যখন পরসেবার ভাব সঞ্জাত হয় নাই, যখন সমাজের নিম্নশ্রেণীস্থ লােকদিগকে ন্যায়াধিকারে বঞ্চিত করিয়া পদদলিত করিবার হীন আকাঙ্ক্ষা সমাজহৃদয়ে আধিপত্য বিস্তার করিতেছিল, সমাজশক্তিকে উদ্বুদ্ধ, জাগ্রত ও উন্নত করিয়া তুলিতে যখন কেহই অগ্রসর হয় নাই, সমাজের ক্ষমতালােলুপ আভিজাত্য- ৩ চরিত্রচিত্র। - বর্গ যখন জনসাধারণের সুখদুঃখের প্রতি দৃষ্টিপাত না করিয়া শুধু নিজ নিজ বংশগরিমায় গর্বিত, ধনমদে মত্ত, এবং রূপজমােহে ও বিলাসব্যসনে নিমগ্ন ; ইংলণ্ডের সেই দুর্দশার দিনে, এক মহানুভব, ক্ষণজন্মা, দেবােপম পুরুষের আবির্ভাব হইল। হাওয়ার্ডের স্বভাবকোমল উদার হৃদয় কারারুদ্ধ ব্যক্তিদের দুঃখদুর্গতি ও লাঞ্ছনাপঞ্জনার করুণ কাহিনী শ্রবণ করিয়া বিগলিত হইল। ঘূণিত, দলিত, পশুবৎ আচরিত, ঘাের দুর্দশাগ্রস্ত মানবমণ্ডলীর উদ্ধারসাধনে তিনি কৃতসঙ্কল্প হইলেন, এবং অনন্যমনা ও অনন্তকৰ্ম্মা হইয়া সংকলসাধনে অক্লান্ত পরিশ্রম ও ঐকান্তিক যত্নসহকারে অগ্রসর হইতে লাগিলেন। জন হাওয়ার্ড য়ুরােপের একপ্রান্ত হইতে অপরপ্রান্ত পর্যন্ত প্রতি কারাগৃহে ঘুরিয়া কারাবাসীদিগের অবস্থা স্বচক্ষে দর্শন ও তাহাদের করুণ কাহিনী স্বকর্ণে শ্রবণ করিতে লাগিলেন। বিরাম নাই, বিশ্রাম নাই, দশবৎসরকাল তিনি এইরূপে য়ুরােপের বিভিন্ন দেশের জেল পরিদর্শন করিলেন । স্বাস্থ্যের প্রতি দৃষ্টি নাই, পথশ্রমে ঐক্ষেপ নাই, আহার নাই, নিদ্ৰা নাই, এক লক্ষ্য, এক ব্ৰত, এক সাধনা। তাহার সঙ্গে একজন মাত্র অনুচর ছিল। তিনি প্রতিদিন অশ্বারােহণে চল্লিশমাইল পথ অতিক্রম করিতেন। দিবাশেষে ক্লান্তি অপনােদনের জন্য কোনও সহরে আসিয়া উপস্থিত হইতেন। সেখানে সামান্য রুটি ও দুগ্ধ গ্রহণ করিয়া পরম তৃপ্তি লাভ করিতেন। তিনি আজীবন নিরামিষাশী ছিলেন-মমাংস কখনও স্পর্শ করিতেন না। এরূপ কষ্ট স্বীকার করিয়া মহাপ্রাণ হাওয়ার্ড কারাগৃহসমূহ পরিদর্শন করিতে লাগিলেন। জেলরক্ষকদের অনধিগম্য অন্ধতমসাচ্ছন্ন পূতিগন্ধময় কারাগৃহেও তিনি সানন্দ ও স্বচ্ছন্দচিত্তে গমন করিতেন। হাসপাতালে রােগীদের চিকিৎসা ও সেবাশুশ্রুষা কিরূপ হইতেছে, তাহা দেখিবার হাওয়ার্ড। জন্য তিনি নানাপ্রকার দুরারােগ্য রােগের আবাসস্থলেও গমন করিতে কোনরূপ কুণ্ঠা বােধ করিতেন না। তিনি জানিতেন যে এরূপ কাৰ্য্যে তাহার জীবন সদা সঙ্কটাপন্ন। কিন্তু পরদুঃখমােচন যাহার জীবনের ব্রত, তাহার, আবার মৃত্যুভয় কোথায়? তাহার বিশ্বাস জন্মিয়াছিল যে কারাগৃহের দুরবস্থা মােচনের জন্যই বিধাতা তাহাকে প্রেরণ করিয়াছেন। তাই হওয়ার্ডের প্রতি বাক্যে ও কর্মে ঈশ্বরবিশ্বাসের দৃঢ়তা পরিস্ফুট হইয়া উঠিয়াছিল। তিনি বলেন,-“আমি যাহা কিছু করিয়াছি, সমস্তই ভগবানের আদেশে করিয়াছি। আমি যতই দুর্বল ও সামান্য হইনা কেন, সেই প্রেমময় বিশ্বপতি আমাদ্বারা জগতে ইহাই প্রচার করিতেছেন যে, তিনি সর্বদা তাহার সৃষ্ট জীবের দুঃখমােচনে ব্যর্থ।” হাওয়ার্ড কারাগৃহ পরিদর্শনান্তে কারাকাহিনীসমূহ পুস্তকাকারে প্রকাশ করিতে লাগিলেন। গ্রন্থকাররূপে যশ উপার্জনের আকাঙ্ক্ষা তাহাকে একাৰ্য্যে প্রণােদিত করে নাই। কারাবাসিগণের দুর্দশার করুণকাহিনী প্রচার করিয়া লােকের সহানুভূতি আকর্ষণ করাই তাহার একমাত্র অভিপ্রয় ছিল। তাহাদের দুর্দশামােচনাৰ্থ তিনি তাহার সমস্ত সময় ও শক্তি নিয়োেগ করিয়াছিলেন। অবশেষে তিনি কৃতকার্য হইলেন, সাধারণের দৃষ্টি এদিকে আকৃষ্ট হইল। কৃপাপাত্র কারাবাসীদিগের প্রতি সহানুভূতির ভাব মানবহৃদয়ে সঞ্চারিত হইল। তাহার অবিরাম যত্ন, তাহার অক্লান্ত পরিশ্রম ও ঐকান্তিক সাধনায়, য়ুরােপীয় সমাজ কারাগৃহ- সংস্কারের প্রয়ােজনীয়তা উপলব্ধি করিয়া তৎসাধনে যত্নপর হইল। কেনি রাজা বা সম্রাটের বিরাগভাজন হইবার আশঙ্কায় নির্ভীকহৃদয় হাওয়ার্ড কারাগারের শােচনীয় কাহিনী বর্ণনা করিতে বিরত হন নাই। অষ্ট্ৰীয়ায় ভ্রমণকালে উত্তর অষ্ট্ৰীয়ার শাসনকর্তা ও তদীয় সহধর্শিণীর সঙ্গে একবার তাঁহার সাক্ষাৎকার হয়। সেই উচ্চবংশজাত শাসনক।
চরিত্র-চিত্র। গর্বভরে হাওয়ার্ডকে জিজ্ঞাসা করেন, “আমার রাজ্যের কারাগৃহ সম্বন্ধে আপনার মত কি?” স্বাধীনচেতা স্পষ্টবক্তা হাওয়ার্ড উত্তর করিলেন, “জৰ্ম্মণীর মধ্যে সর্বাপেক্ষা অধম। কারাগারসমূহের সংস্কার সাধনের উদ্দেশ্যে আমি আপনার পত্নীকে স্বচক্ষে ঐ সকল স্থান পরিদর্শন করিতে অনুরােধ করি।” সেই শাসকপত্নী বিস্মিত হইয়া দম্ভভরে উত্তর করিলেন, “আমি। আমি কারাগৃহে যাব ?” এই বলিয়া তিনি সদর্প পাদবিক্ষেপে সেই স্থান হইতে প্রস্থান করিলেন। বিশ্বসেবক হাওয়ার্ড মহিলার উক্তরূপ গর্বিত বাক্যে ও উদ্ধত ব্যবহারে ক্ষুব্ধ ও ক্রুদ্ধ হইয়া পশ্চাৎ হইতে তাকে বলিলেন, “মহােদয়ে, স্মরণ রাখিবেন আপনি একজন স্ত্রীলোেক ভিন্ন আর কিছু নন। মৃত্তিকাগর্ভে অন্ধকুপে অবরুদ্ধ হতভাগ্য স্ত্রীলােদিগের ন্যায়, আপনিও অচিরে মৃত্তিকাশয্যায় আশ্রয় গ্রহণ করিবেন। আপনার বিলাস- বেশসজ্জিত দেহ ও কারাবাসিনীর ছিন্নবস্ত্রপরিহিত দেহ এক মৃত্তিকায়ই লয়প্রাপ্ত হইবে।” পরমেশ্বরের বিধান রহস্যময় ও মানববুদ্ধির অতীত। যে নিঃস্বার্থ কৰ্ম্মে তিনি জীবন উৎসর্গ করিয়াছিলেন, অবশেষে উহাই তাহার জীবনের কালস্বরূপ হইয়া দাঁড়াইল। তিনি ১৭৮৯ খৃষ্টাব্দে ইংলও পরিত্যাগ করিয়া হাসপাতালের অবস্থা পরিদশদ্দেশ্যে হল্যাণ্ড, জার্মানি, প্রশিয়া ও রুশিয়া দেশ ভ্রমণ করিতে করিতে, ১৭৯০ খৃষ্টাব্দে রুশিয়ার অন্তর্গত নীপার নদীর মােহনায় চাস নামক স্থানে উপনীত হন। সে স্থানের কাসপাতাল পরিদর্শনকালে তিনি দুষ্টজ্বর রােগে আক্রান্ত হন এবং এরূপ রাগযন্ত্রণা ভােগ করিয়া সেই বৎসরের ২৩শে জানুয়ারী নশ্বর করিতে লাগিয়াগ করিয়া অমরধামে গমন করেন। রুগ্নাবস্থায়ও তাহার চির কারাগৃহেও বিঈশ্বরনির্ভরতা বিন্দুমাত্র হ্রাস পায় নাই। তঁাহার জনৈক বন্ধু রােগীদের চিকি রােগশয্যাপার্শ্বে উপবেশন করিয়া তাহাকে নানারূপ আশ্বাস- হাওয়ার্ড। ৪১ বাক্যে সান্ত্বনা দান করিতে চেষ্টা করিতেছিলেন, তখন তিনি ধীরভাবে উত্তর করেন, “ষ্টিম্যান, আমার আসন্ন মৃত্যুসম্বন্ধে কথােপকথন করাকে তুমি অপ্রীতিকর বিষয় বলিয়া মনে করিতেছ এবং আমার মন অন্যদিকে লইয়া যাইতে চেষ্টা করিতেছ। কিন্তু আমি ইহাকে মােটেই অপ্রীতিকর মনে করিনা। মরিতে আমার বিন্দুমাত্রও ভয় নাই, ববং আমি মৃত্যুকে সানন্দচিত্তে বরণ করিয়া লইতে প্রস্তুত আছি।” স্থিরপ্রতিজ্ঞ অক্লান্তকৰ্ম্মা হাওয়ার্ড স্বীয় লক্ষ্যসাধনে বিন্দুমাত্রও বিচলিত হন নাই। আহারেবিহারে, শয়নেস্বপনে, দেশেবিদেশে, সর্বত্র তাঁহার সেই এক লক্ষ্য, এক সাধনা। একবার তিনি কতিপয় বন্ধুর অনুরােধে ইটালীদেশে একস্থানে সঙ্গীত শ্রবণ উদ্দেশ্যে গমন করেন। সেই প্রাণােম্পাদক সুমধুর সঙ্গীতধ্বনিতে সকলেই বিমােহিত হন, সেই সুমি শুনলয়বিশিষ্ট সঙ্গীত সকলের কর্ণেই পীযুষধারা বর্ষণ করে। হাওয়ার্ডের মনের এককোণে সেই সঙ্গীতচিন্তা অলক্ষিতে প্রবেশ লাভ করিল। কিন্তু অচিয়ে তিনি তাঁহার দুৰ্বলতা ধরিয়া ফেলিলেন এবং প্রতিজ্ঞা করিলেন যে তিনি আর কখনও সঙ্গীত শ্রবণ করিবেন না। লক্ষ্যসাধনের চিন্তা যাহার চিত্তকে অধিকার করিয়া বসিয়াছে, সেই অনন্যমনা ও অনন্তকা হাওয়ার্ডের চিত্তে সঙ্গীতচিন্তা কি স্থান পাইতে পারে? তিনি এইরূপে সকল প্রকার আমােদমােদ ও সুখভােগ অম্লানবদনে বিসর্জন দিয়া লােকহিত-ব্ৰত গ্ৰহণ করিয়াছিলেন। সেই ব্রত উদ্যাপনে তিনি প্রাণপাত করিয়াছেন—কখনও লক্ষ্যভ্রষ্ট হন নাই। ধন্য হাওয়ার্ড! ধন্য তাঁহার সাধনা!
আর্তের দুর্দশা-মােচনে এলিজাবেথ ফ্রাই। আমরা নারী বিশ্বজননীর ছবি আমাদের শত্রু মিত্র নাই ; বরিষার ধারা সম অজস্র জননীপ্রেম সর্বত্র ঢালিয়া চল যাই।” মহাপ্রাণ হাওয়ার্ড যে মহৎ কাৰ্য্য আরম্ভ করিয়াছিলেন, তাহা সমাপ্ত হইবার পূর্বেই, বিধাতার দুয়ে ও দুর্লঙ্ঘ্য বিধানে তঁাহার জীবনলীলার অবসান হইল। ইংলণ্ডের মহাকাশ হইতে একটি সমুজ্জ্বল তারকা অন্তহিত হইল। য়ুরােপীয় সমাজের মুখে হাসি ফুটিয়া উঠিতে না উঠিতে, আবার অন্ধকারের করাল ছায়া পতিত হইল। য়ুরােপে কর্মের যে দুন্দুভি ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হইয়া সুপ্ত সমাজকে জাগরিত করিয়াছিল, নিরাশ প্রাণে আশার সঞ্চার করিয়াছিল, অসাড় নির্জীব জীবনে প্রাণের স্পন্দন জাগাইয়াছিল, তাহা হঠাৎ নীরব হইল। এইরূপ সময়ে হাওয়ার্ডের আরব্ধ কাৰ্য্য পরিসমাপ্তির মুখে লইয়া যাইবার জষ্টই যেন, বিধাতার শুভ ইচ্ছায়, ইংলণ্ডে একটি রমণীরত্বের আবির্ভাব হইল। ইনি এলিজাবেথ ফ্রাই নামে পরিচিত। ৭৮ খৃষ্টাব্দে ইংলণ্ডের অন্তঃপাতী নউয়িচ নামক স্থানে ইনি জন্মগ্রহণ করেন। এলিজাবেথ ফ্রাই বাল্যকাল হইতেই ধর্মপ্রাণ ও সেবাপরায়ণ ছিলেন। আত্মােন্নতি ও পরিহতসাধন তাহার জীবনের মূলমন্ত্র ছিল। জীবনের প্রথম ভাগেই স্বীয় চরিত্রের উন্নতি-সাধনার্থ তিনি তাহার সমস্ত শক্তি নিয়ােজিত করেন।
এলিজাবে ফ্রাই
No text on this page.
এলিজাবেথ ফ্রাই। ৪৩ পণ্ডিত-প্রবর সক্রেটিসের মহামূল্য উপদেশ-বাক্য অনুসরণ করিয়া জীবনের পূর্বাহেই তিনি নিজের আত্মার সঙ্গে প্রকৃত পরিচয়-স্থাপনের প্রয়াস পাইতে লাগিলেন। অকপটচিত্তে, পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে স্বকীয় চরিত্রের পর্যালােচনা করিয়া তিনি উহার দোষসমূহ সংশােধনে নিযুক্ত হইলেন। নিজের চরিত্রের দুৰ্বলতাসমূহ নিরীক্ষণ করিয়া তিনি অনেক সময় নিজেই লজ্জিত হইতেন। এলিজাবেথ ফ্রাই আক্ষেপ করিয়া বলিয়াছেন, “আমি রিপুপরতন্ত্র হইয়া জীবন কাটাইতেছি ; ইন্দ্রিয়সমূহের উপর আমার কিছুমাত্র প্রভুত্ব নাই। তাহারাই আমার উপর আধিপত্য বিস্তার করিয়া রহিয়াছে। আমি ইহা জানিতে পারিয়াও নিজেকে বশে রাখিতে পারিতেছি না ; অমার চরিত্রসংশােধনের সমস্ত চেষ্টাই ব্যর্থ হইয়া যাইতেছে।” পরক্ষণে তিনি প্রকৃত বীরমণীর ন্যায় সাহসে বুক বাঁধিয়া আবার দুও ইন্দ্রিয়গণকে বশে আনিবার জন্য রণচণ্ডীর দৃঢ়সঙ্কল্প লইয়া রণক্ষেত্রে অবতীর্ণ হইয়াছেন। তিনি প্রতিজ্ঞা করিতেছেন, 'আমি কখনও চপলতা প্রদর্শন করিব না, কখনও ক্রোধের বশবর্তী হইব না, অতিরঞ্জন প্রভৃতি দোষ হইতে সদা বিমুক্ত থাকিব ; আমি কখনও বিলাসিতার প্রশ্রয় দিব না, কখনও অলস চিন্তার আশ্রয় লইব না ; কুপ্রবৃত্তি দমন করিয়া সত্তিদ্বারা হৃদয়কে সুশশাভিত করিব; অযথা রহস্য বা কৌতুক করিয়া কাহারও মনে কষ্ট দিব না।” ধৰ্ম্মই মানব-জীবনের সার রত্ন। ইহাই মানুষকে উচ্চাসন প্রদান করিয়াছে। ধৰ্ম্মবুদ্ধি-প্রণােদিত হইয়াই মানব জগতের হিতানুষ্ঠান করিয়া স্মরণীয় ও বরণীয় হয় এবং অনাবিল আনন্দস্রোতে ভাসিতে থাকে। জীবনের ঊষাকালেই এলিজাবেথের হৃদয় ধর্মের এই স্নিগ্ধ জ্যোতিতে উদ্ভাসিত হইয়া উঠিয়াছিল। আড়ম্বরপূর্ণ বেশভূষা বা নৃত্যগীতাদি তরল আমােদপ্রমােদ লইয়া ব্যস্ত থাকিতে তিনি ভালবাসিতেন না। ধৰ্ম্মচিন্তা, ;
88 চরিত্রচিত্র। পরসেবা প্রভৃতি উদার-ভাবরাজি তাহার হৃদয়রাজ্য অধিকার করিয়া রাখিয়াছিল। সুতরাং তিনি বিশ্বমানবের সেবায় আত্মনিয়ােগ করিয়া মানবজীবনের প্রকৃত সার্থকতা সম্পাদন করিতে কৃতসঙ্কল্প হইলেন। কোন্ পথ অবলম্বন করিয়া তিনি জগতের প্রকৃত মঙ্গলসাধনে সমর্থ হইবেন, কি উপায়ে তিনি তাঁহার শক্তি-সামর্থ্য দেশের ও দশের কাজে নিয়ােগ করিয়া জীবন ধন্য করিবেন, তাহাই তঁাহার অনুসন্ধানের বিষয় হইল। হাওয়াডের তিরােভাবের সঙ্গে সঙ্গে ইংলণ্ডের কারাগারের অবস্থা আবার পূর্বাকার ধারণ করিল। কারাবাসিগণের উপর নৃশংস ও অমানুষিক অত্যাচার চলিতে লাগিল ; তাহাদের আর কষ্টের সীমা রহিল । উনবিংশ শতাব্দীর প্রথমভাগে গ্রেটব্রিটনে যে সকল কারাগার ছিল, অপরাধের তারতম্য না করিয়া তথায় সকল অপরাধীকে এক সঙ্গে রাখা হইত। কারাগারে নানাপ্রকার ব্যাধি ও সংক্রামক রােগের প্রাদুর্ভাব ছিল, কিন্তু ইহা সত্ত্বেও কারাগারগুলি পরিষ্কার ও পরিচ্ছন্ন রাখিবার কোন চেষ্টা হইত না। সুস্থ ও রুগ্ন ব্যক্তিদিগকে একত্রই রাখা হইত। ইহারই ফলে শত শত কারারুদ্ধ ব্যক্তি অকালে কালের করালগ্রাসে পতিত হইত। জেলের রক্ষকগণ অতি নির্দয়প্রকৃতির লােক ছিল। তাহাদের চরিত্রে সাধুতার লেশমাত্র ছিল না। অর্থলালসা-প্রণোদিত হইয়া তাহারা কারা- বাসিগণের নিকট হইতেও উৎকোচ গ্রহণ করিতে দ্বিধা বােধ করিত না। যাহারা তাহাদের মনস্তুষ্টিসাধনে অসমর্থ হইত, নিরপরাধ সাব্যস্ত হইলেও তাহারা জেল হইতে মুক্তি লাভ করিতে পারি না। কোন কোন কারাগার এমন জীর্ণ অবস্থায় পতিত হইয়াছিল যে, ইচ্ছা করিলে কয়েদীগণ অবলীলাক্রমে কারাগৃহ হইতে পলায়ন করিতে পারিত। এই জন্য তাহাদিগকে সুদৃঢ় লৌহশৃঙ্খলের সাহায্যে স্কুল কাষ্ঠ- ঋণ্ডে আবদ্ধ করিয়া রাখা হইত। কখনও কখনও লৌহশলাকাদ্বারাও এলিজাবেথ ফ্রাই। ৪৫ v অতীব নির্মমভাবে তাহাদের উপর উৎপীড়ন করা হইত। অধিকাংশ কারাগারই মূষিকের আবাসভূমি ছিল; আবার সেই ক্ষুদ্র জীবগুলির এতই দুঃসাহস যে, অনেক সময় তাহারা নিদ্রিত কারাবাসিগণের বদনমণ্ডল দস্তাঘাতে ক্ষতবিক্ষত করিয়া দিত। সুতরাং কারাবাসীদিগকে সেখানে অতি সন্তর্পণে ও সাবধানে রাত্রি যাপন করিতে হইত। কোন কোন জেলের কারাকক্ষগুলি মৃত্তিকার অনেক নীচে অবস্থিত ছিল। তাহাতে বায়ু ও আলােক প্রবেশের পথ ছিল না; এমন কি দিন মানেও তথায় ভীষণ অন্ধকার বিরাট দৈত্যের মত বিরাজ করিত। সেই সূচিভেদ্য অন্ধকারে আর্দ্র কক্ষ মধ্যে ভূমির উপর কারাবাসিগণকে শয়ন করিতে হইত। কোন কোন জেলে কয়েদীগণকে পরিমিত আহার পর্যন্ত প্রদান করা হইত না ; অৰ্ধাশনে বা অনশনে তাহারা দিনপাত করিত। এই দুঃসহ যন্ত্রণার হাত হইতে অব্যাহতি পাইবার জন্য তাহারা মদ্যাদি পান করিয়া পাপের স্রোতে গা ভাসাইয়া দিত। জেলে কোনও দানশীল ব্যক্তি উপস্থিত হইলে, কয়েদীগণ তাঁহাদের নিকট হইতে যে অর্থ পাইত তাহাতে মদ্য প্রভৃতি মাদকদ্রব্য ক্রয় করিত। এমন কি, জেলখানার তত্ত্বাবধায়কগণও তাহাদের এই পাপাচরণে প্রশ্রয় প্রদান করিত। তাহারা প্রকাশ্যভাবে কয়েদীগণের নিকট মদ্য বিক্রয় করিয়া অর্থ উপার্জন করিতেও কুণ্ঠা বােধ করিত না। জেলখানায় কয়েদীদিগকে অপরাধের তারতম্য বা বয়সের অম্লাধিক্য অনুসারে বিভিন্ন স্থানে রাখা হইত না। ভ্রান্তমতি অল্পবয়স্ক বালকদিগকে অনেক সময় ঘোর দুক্ৰিয়াসক্ত প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিগণের সঙ্গে মেষপালের ন্যায় এক সঙ্গে আবদ্ধ করিয়া রাখা হইত। এইরূপে বালকদের চরিত্র- সংস্কারের কোন লক্ষণই পরিদৃষ্ট হইত না, বরং তাহারা দিন দিন পাপের পথে অগ্রসর হইত।
৪৬ চরিত্র-চিত্র। কারারুদ্ধ ব্যক্তিগণ অনেক সময় পরস্পর মারামারি করিত। অনেক সময় তাহারা জানালার ভিতর হইতে হাত বাড়াইয়া দিয়া পথিকের অঙ্গ হইতে শিথিল বসন-ভূষণ কাড়িয়া লইত। রক্ষকগণ ইহাতে কোনরূপ বাধা প্রদান করিত না, বরং আনন্দ অনুভব করিত। একদিন একজন শাসনকর্তা অরক্ষিত অবস্থায় স্ত্রীলােকদের জেল পরিদর্শনের জন্য গমন করেন। কয়েদীগণের পার্শ্ব দিয়া যাইবার সময় তাহারা হঠাৎ তাহাকে আক্রমণ করিল এবং তাহার পরিহিত বস্ত্রাদি ছিন্ন ভিন্ন করিয়া ফেলিল। তিনি কিংকর্তব্যবিমূঢ়ের ন্যায় তাহাদিগের দিকে শূন্য অথচ করুণ দৃষ্টিতে চাহিয়া রহিলেন। তাহারা এতই দুর্দান্ত ছিল যে, ধর্মযাজকও তাহাদের নিকটবর্তী হইতে সাহস করিতেন না, জানালা হইতে দূরে নিরাপদ স্থানে দাড়াইয়া তিনি তাঁহার দৈনিক উপাসনা-কাৰ্য্য সমাধা করিতেন। যখন ইংলণ্ডের কারাগার-সমূহের এইরূপ শশাচনীয় অবস্থা, তখন এলিজাবেথ একদিন এক কারাগারের নিকট দিয়া যাইতেছিলেন। তখন শীতকাল। টিপ টিপ করিয়া বৃষ্টি পড়িতেছে। দারুণ শীতের কন্কনে হাওয়া গায়ে কাঁটা ফুটাইতেছে। কারাগারের উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে শৃঙ্খলাবদ্ধ একদল বন্দী পাথর ভাঙ্গিতেছে। এই দারুণ শীতেও তাহাদের গাত্র হইতে ঘৰ্ম্মবিন্দু ঝরিয়া পড়িতেছে। তাহাদের মুখ বিবর্ণ ; দেহ অস্থি-কঙ্কালসার ; মৃত্যুবিভীষিকা বদনমণ্ডলে প্রতিভাত। এই করুণ দৃশ্য এলিজাবেথের নয়নপথে পতিত হইলে, তাহার দয়াপ্রবণ পরদুঃখকাতর হৃদয়ে স্নেহ- পারাবার উথলিয়া উঠিল। এই দুর্দশাগ্রস্ত হতভাগ্যদের দুঃখদুর্গতি- মােচনের উপায় চিন্তা করিতে করিতে তিনি ভগ্নহৃদয়ে ও বিষঃবদনে গৃহে প্রত্যাগত হইলেন। তদবধি কারারুদ্ধ শৃঙ্খলিত বন্দিগণের দুঃখমােচনচিন্তা তাঁহার হৃদয়কে অধিকার করিয়া বসিল। তিনি স্বচক্ষে জেলখানার সমস্ত অবস্থা দেখিবার জন্য ব্যস্ত হইয়া এলিজাবেথ ফ্রাই। ৪৭ উঠিলেন। তাঁহার কুতুহল-চরিতার্থ করিবার জন্য একদিন তদীয় পিতা তাহাকে লইয়া নউমিচ-সংস্কার আশ্রমে গমন করেন। তথায় তিনি রমণীগণের যে ম্লান ছবি দেখািত পাইয়াছিলেন, তাহা জীবনে কখনও বিস্মৃত হন নাই। নারীজীবনের যে এইরূপ হীন শশাচনীয় পরিণতি ঘটিতে পারে, তাহা তিনি স্বপ্নেও ভাবেন নাই। এই লাঞ্ছিত ললনাগণের দুর্গতিমােচন ও উন্নতিবিধানের সহায়তাকল্পে তিনি তাহার ক্ষুদ্রশক্তিদ্বারা কি করিতে পারেন, তাহাই এখন তাহার চিন্তার বিষয় হইল । কয়েক বৎসর এইরূপে অতীত হইল। এলিজাবেথ নিজের জীবন কোন পথে পরিচালিত করিবেন, তাহা তখনও স্থির করিয়া উঠিতে পারিলেন না। অবশেষে সন্ন্যাসীর সরল জীবন তাঁহাকে আকৃষ্ট করিল। সমস্ত বিলাস-বাসনা ত্যাগ করিয়া তিনি সন্ন্যাসিনীর ব্রত অবলম্বন এবং কৃষ্ণবর্ণের বসন, শ্বেতবর্ণের উত্তরীয় ও অবগুণ্ঠন প্রভৃতি সন্ন্যাসােচিত চিহ্ন ধারণ করিলেন। এলিজাবেথের এই বৈরাগ্য-দর্শনে তাঁহার পিতা চিন্তান্বিত হইলেন। বিলাস-বৈভবপূর্ণ লণ্ডন-সহরের সম্মােহন চিত্র দেখাইয়া স্বীয় কন্যার মতি- গতি-পরিবর্তন-মানসে তিনি তাহাকে লইয়া লণ্ডনে আসিয়া উপস্থিত হন। সেখানে এলিজাবেথকে নৃত্যগীত ও নাট্যাভিনয় প্রভৃতি আমােদপ্রমােদ দেখাইয়া বিলাসব্যসনের পথে লইয়া যাইবার জন্য যথেষ্ট চেষ্টা করা হয়। হায়! অল্পবুদ্ধি মানব! তুমি অন্তর্মুখ, ঈশ্বরসাক্ষাৎকারপ্রয়াসী সাধু- সজ্জনকে পাপের লােভনীয় চিত্র দেখাইয়া বিপথগামী ও ধর্মহীন করিবার জন্য এত ব্যস্ত কেন? পুণ্যময় ধৰ্ম্মজীবনের প্রতি তুমি এত বিরাগভাব পােষণ কর কেন? জগতের ইতিহাসে সয়তানের এইরূপ প্রচেষ্টা বহুবার নিষ্ফল হইয়াছে; এবারও নিস্ফল হইল। এলিজাবেথের দৃঢ়সংকল্প অটুট রহিল। তাহার অপূর্ব সাধনার নিকট পাপ-প্রােভন পরাজয় স্বীকার ৪ চরিত্র-চিত্র। করিল। স্বকীয় স্বার্থসুখ বিসজ্জন দিয়া তিনি সমাজসেবায় আত্মনিয়ােগ করিলেন। দীনদরিদ্রই তাহার উপাস্য দেবতা হইল ; তাহাদের দুঃখ- দুর্গতিবিমােচনই তাহার জীবনের একমাত্র ব্রত হইয়া উঠিল। প্রতিদিন তিনি প্রতিবেশী বালক-বালিকাকে সমবেত করিয়া শিক্ষা প্রদান করিতে লাগিলেন। ছাত্রের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাইতে লাগিল। এমন সুন্দর শৃঙ্খলার সহিত তিনি তাহাদিগকে শিক্ষা প্রদান করিতে লাগিলেন যে, বন্ধুবান্ধবগণ তাহার শিক্ষা-কৌশল দেখিয়া বিস্ময় প্রকাশ করিতে লাগিল। এইরূপে তাহার নবজীবনের সূচনা হইল। তিনি প্রতিজ্ঞা গ্রহণ করিলেন যে, মানবকুলের কল্যাণার্থ জীবন উৎসর্গ করিবেন। এলিজাবেথ, ১৮০০ খৃষ্টাব্দে জোসেফ ফ্রাই-নামক একজন ভদ্রলােকের সঙ্গে পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হন। কিন্তু বিবাহবন্ধন তাহার পক্ষে মােহের বরূন হয় নাই। তিনি বিবাহিত জীবনের কর্তব্য পালন করিতে যাইয়া কীয় জীবনের প্রধান কর্তব্যের প্রতি কখনও উদাসীনতা প্রদর্শন করেন নাই। সমাজসেবার উদ্দেশ্যে তিনি ইতঃপূর্বে যে ব্ৰত ধারণ করিয়াছিলেন, তাহা তাহার হৃদয়ে সর্বদা জাগরূক ছিল। তিনি দারিদ্র- প্রপীড়িত, রােগক্লিষ্ট ব্যক্তিগণের সেবাকাৰ্যে দ্বিগুণতর উৎসাহসহকারে অগ্রসর হইলেন। পরিবারের সঙ্কীর্ণ গণ্ডী তাহার হৃদয়কে আবদ্ধ করিয়া রাখিতে সমর্থ হইল না। মানবকুলের দুর্দশার চিত্র তাহার সম্মুখে যতই উপস্থিত হইতে লাগিল, ততই তিনি তাহাদের দুঃখবিমোচনে উৎকণ্ঠিতা হইয়া উঠিলেন। একদিন পথিপার্শ্বে তিনি একজন ভিখারিণীকে দণ্ডায়মান দেখিতে পাইলেন। দুরন্ত শীতকাল : শীতবস্ত্রে গাত্র আবৃত করিয়াও এই এলিজাবেথ ফ্রাই। ৪৯ ; নিদারুণ শীতের প্রকোপ হইতে শরীর রক্ষা করা অসম্ভব। জীর্ণবসনা রমণী শীতে থ থ করিয়া কঁপিতেছে। এই করুণ দৃশ্য দেখিয়া এলিজাবেথের হৃদয় বিগলিত হইল। তিনি নিজের দেহ হইতে শীতবস্ত্র উন্মােচন করিয়া শীতার্ত রমণীকে দান করিলেন। আর একদিন সেই স্ত্রীলােকটি একটি রুগ্নশিশু ক্রোড়ে করিয়া পথের পার্শ্বে দাঁড়াইয়া ছিল। শিশুটি রােগযন্ত্রণায় ছটফট্ করিতেছিল; কিন্তু ভিখারিণীর সেদিকে দৃষ্টি নাই। সে তাহার ভিক্ষালভ্য অর্থের জন্য লালায়িত। মাতৃহৃদয় যে কিরূপে এত কঠিন হইতে পারে, তাহা সন্তানবৎসল। এলিজাবেথ ফ্রাই বুঝিতে পারিলেন না। এই শিশু তবে কি এই ভিখারিণীর নিজের সন্তান নয়?—এইরূপ সন্দেহের বশবর্তী হইয়া তিনি ভিখারিণীকে প্রশ্নের পর প্রশ্ন করিতে লাগিলেন। তাহার প্রশ্নের কোনরূপ সদুত্তর প্রদান করিয়াই ভিখারিণী অন্তর্হিত হইল, এলিজাবেথের সন্দেহ আরও বাড়িয়া উঠিল। তিনি গােপনে সেই রমণীর অনুসরণ করিলেন। সেখানে যাইয়া তিনি যে দৃশ্য অবলােকন করিলেন, তাহা অবর্ণনীয় ও অননুমেয়। তিনি দেখিলেন, একটি সঙ্কীর্ণ অন্ধকারময় গহ্বরে দশ পনরটি শিশু মেযের ন্যায় আবদ্ধ রহিয়াছে। রােগে ও অনাহারে তাহাদের দেহ কঙ্কালসার। এইরূপ অনাদৃত অবস্থায় চিকিৎসা ও শুশ্রুষার অভাবে তাহারা দারুণ যন্ত্রণায় ছটফট করিতেছে। এই শোচনীয় দৃশ্য দেখিয়া তিনি আর তথায় মুহূর্তকালও নিশ্চেষ্টভাবে দাঁড়াইয়া থাকিতে পারিলেন না। তৎক্ষণাৎ তিনি তঁাহার চিকিৎসকের গৃহাভিমুখে ধাবিত হইলেন। চিকিৎসককে সঙ্গে করিয়া পরদিন যখন তিনি সেস্থানে উপস্থিত হইলেন, তখন দেখিতে পাইলেন যে ভিখারিণী তাহার আশ্রিত শিশুগণসহ সেস্থান হইতে প্রস্থান করিয়াছে। তখন শিশুপালন ইংলণ্ডে একটি ব্যবসায়ের মধ্যে পরিগণিত ছিল।
চরিত্র-চিত্র। কঠোর জীবনসংগ্রামে কর্মব্যস্ত নরনারী স্বীয় শিশুপালনের ভার কোনও বৃদ্ধার উপর ন্যস্ত করিয়া কলকারখানায় শ্রমজীবীর কাৰ্যে রত থাকিত। সেই বৃদ্ধা শিশুদিগের মাতাপিতার নিকট হইতে তাহাদের প্রতিপালনব্যয়স্বরূপ কিছু কিছু অর্থ পাইত। অর্থোপার্জনই সেই বৃদ্ধার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল- সে শিশুদিগের জন্য কোনরূপ যত্ন লইত না। তাহার দুর্ব্যবহারে অনেক সময় শিশুগণ অকালে কালগ্রাসে পতিত হইত। কিন্তু সে তাহা গােপন করিয়া শিশুদের জনকজননীর নিকট হইতে অর্থ আদায় করিয়া লইত । এই সকল হৃদয়বিদারক দৃশ্য দর্শন করিয়া এলিজাবেথের হৃদয়ে উত্তরােত্তর করুণার উদ্রেক হইতে লাগিল। তিনি নিঃস্ব দুর্দশাগ্রস্ত লােকের উপকার সাধনে দৃঢ়সংকল্প হইয়া প্রকৃত বীরমণীর ন্যায় কাৰ্য্যক্ষেত্রে অগ্রসর হইলেন। এলিজাবেথ ফ্রাই দেশের যাবতীয় হিতকর অনুষ্ঠানেই যােগদান করিতেন। তিনি দেশের বিদ্যালয় প্রভৃতির সংস্কারসাধনে, শ্রমজীবীদিগের আবাসগৃহের উন্নতিবিধানে, দাসত্ব-প্রথার উচ্ছেদ-সাধনে এবং খনিব কাৰ্য্যে ও কারখানায় নিযুক্ত স্ত্রীলােক ও বালকবালিকাদিগের কষ্টলাঘব- ব্যাপারে যথেষ্ট সহায়তা করিয়াছিলেন। তাঁহার ন্যায় অক্লান্তকৰ্ম্ম একনিষ্ঠ সেবক জগতে অতি বিরল। যখন যে অবস্থায় যেখানেই অবস্থান করুন না কেন, তিনি কখনও দীনদরিদ্রের কথা বিস্মৃত হন নাই। এলিজাবেথ স্বামীর সহিত তাহাদের গ্রাম্য আবাসে অবস্থানকালে, প্রতিবেশিনী বালিকাদিগের অজ্ঞানান্ধকার দূরীকরণার্থ একটি বালিকাবিদ্যালয় স্থাপন করিয়াছিলেন। শীতার্তকে শীতবস্ত্র, রােগগ্রস্তকে ঔষধ, নিরন্নকে অন্ন প্রদান করিতে তিনি সর্বদাই মুক্তহস্ত ছিলেন। অশিক্ষিত, কুসংস্কারাচ্ছন্ন, দুর্নীতিপরায়ণ প্রতিবেশিনী- গণের চরিত্রের উন্নতি-বিধান করিয়া ধৰ্ম্মবুদ্ধি জাগ্রত করিবার জন্য, তিনি তাহাদের মধ্যে বাইবেল বিতরণ করিতেন।
এলিজাবেথ ফ্রাই। তাহার পল্লীবাটী হইতে প্রায় আধমাইল দূরে অনেক দুঃস্থ ও নিঃস্ব পরিবার বাস করিত। তাহাদের মধ্যে একবার বসন্ত রােগের প্রাদুর্ভাব হওয়ায় বহুলােক চিকিৎসা ও শ্রুষার অভাবে অকালে কালগ্রাসে পতিত হইল। তথাকার ধর্মযাজক একাকী তাহাদের দুর্দশামােচনে অসমর্থ হইয়া এলিজাবেথের সাহায্যপ্রার্থী হইল। সেবাধৰ্ম্মের একনিষ্ঠ-সেবিকা এলিজাবেথ তনুহূর্তে তথায় আসিয়া উপস্থিত হইলেন। এই নিঃসহায় ও নিরাশ্রয় লােকদিগের যন্ত্রণাদর্শনে এলিজাবেথের কোমল হৃদয় বিগলিত হইল। মূর্তিমতী দয়ারূপে তিনি তাহাদের গৃহে গৃহে গমন করিয়া সকলকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকিতে ও বসন্তরােগের প্রতিষেধক টীকা গ্রহণ করিতে অনুরােধ করিতে লাগিলেন। কোথাও বা রােগীর শয্যাপার্শ্বে বসিয়া তাহার গাত্রে পদ্মহস্ত বুলাইয়া, কোথাও বা অনশনক্লিষ্ট লােকদিগের মধ্যে অন্ন বিতরণ করিয়া, তাহাদের দুঃখ ও যন্ত্রণা লাঘব করিতে লাগিলেন। এইরূপে তাহার প্রাণপণ যত্ন ও সেবায় অনেক লােক মহামারীর হস্ত হইতে রক্ষা পাইল। এলিজাবেথের দয়া স্থানবিশেষে বা ব্যক্তি বিশেষে আবদ্ধ ছিল না। তাহার মাতৃহৃদয় সমভাবে সকলের জন্য ব্যাকুল হইত। একবার একদল ভ্রমণশীল অসভ্য জাতি তাহাদের গ্রামের ধারে পটবাস নির্মাণ করে। তাহাদের একটি শিশু হঠাৎ সাংঘাতিক পীড়ায় আক্রান্ত হইলে শিশুর অসহায় জনক জননী অত্যন্ত উৎকণ্ঠিত হইয়া উঠে। তখন সহসা তাহাদের মধ্যে একটি দেবীমুর্তির আবির্ভাব হইল। তিনি অসভ্যজাতীয় শিশুর শয্যাপাশ্বে জননীর স্থান অধিকার করিয়া বসিলেন। তাঁহার যত্নে ও সেবাশুশ্রুষায় শিশুটি শীঘ্রই রােগমুক্ত হইল। সরলপ্রাণ অসভ্যজাতীয় লােকগণ কৃতজ্ঞতাভরে দেবীরূপা এলিজাবেথের প্রতি ভক্তি ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন করিতে লাগিল। এইরূপে বহুবার তিনি দুঃস্থলােকের সাহায্য করিয়া হার মহানুভবতা ও সদাশয়র পরিচয় প্রদান করিয়াছেন।
চরিত্র-চিত্র। কিন্তু তঁাহার জীবনের সর্ব প্রধান কাৰ্য কারাসংস্কার। তিনি দেখিলেন হাওয়ার্ডের একাগ্র সাধনার ফলে য়ুরােপের কারাগারসমূহের যে সকল উন্নতি হইয়াছিল, হাওয়ার্ডের তিরোভাবের সঙ্গে সঙ্গে সে সকল অন্তর্হিত হইয়াছে। এই সকল কারাগারের মধ্যে আবার “ইংলণ্ডের কারাগারের অবস্থা আরও শোচনীয়। জেলখানায় অবরুদ্ধ হতভাগ্য ব্যক্তিগণের এরূপ দুঃখ-দুর্গতির কথা অবগত হইয়া এলিজাবেথের দয়াপ্রবণ হৃদয় স্বতঃই কঁদিয়া উঠিল। তিনি ঘুরিয়া ঘুরিয়া ইংলণ্ডের জেল সকল পরিদর্শন করিতে লাগিলেন। একবার তিনি লণ্ডন সহরের নিউগেট জেলখানায় যাইয়া উপস্থিত হন। তথাকার কয়েদীগণ এত দুর্দান্ত ছিল যে, সেই জেলের তত্ত্বাবধায়ক তাঁহাকে কারাবাসিগণের সম্মুখে যাইতে নিষেধ করেন। কিন্তু তাহার সনির্বন্ধ অনুরােধে অবশেষে তাহাকে কারাগারের ভিতর প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়। তিনি কারাগারে প্রবেশ করিয়া প্রথমে যাহা দেখিলেন, তাহাতে স্তম্ভিত হইলেন। স্বভাবকোমল স্ত্রীলােকগণ পৰ্য্যন্ত জেলখানার দুর্নীতির আব- হাওয়ায় তাহাদের স্বাভাবিক ধৰ্ম্ম পরিত্যাগ করিয়া,ঘাের দুর্দান্ত ও দুৰ্ব্বত্তের ন্যায় আচরণ করিতেছে। ঐ সকল স্ত্রীলােকদের অসংযত ব্যবহার, অশ্লীলভাষা, অশিষ্ট আচরণ দেখিয়া শুনিয়া তিনি মর্মাহত হইলেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় এই যে, এলিজাবেথের সৌম্যমূৰ্ত্তি ও আড়ম্বরহীন বেশভূষা সেই দুৰ্বত্ত কারাবাসিনীদিগকে যেন মন্ত্রমুগ্ধ করিয়া ফেলিল। তাহারা হাটু গাড়িয়া বসিয়া নিঃশব্দে এলিজাবেথের উপদেশবাণী ও স্তোত্র পাঠ শ্রবণ করিতে লাগিল। এমন কি কাহারও কাহারও চক্ষু হইতে অশ্রুধারাও বিগলিত হইল। এলিজাবেথকে অনেক শোক, তাপ ও দুঃখ ভােগ করিতে হইয়াছিল। তিনি অনেক আত্মীয়স্বজন এমন কি প্রাণ প্রতিম পুল্লধন পর্যন্ত হারাইয়া- এলিজাবেথ ফ্রাই। ছিলেন। আবার মাঝে মাঝে তাহাকে রােগের যন্ত্রণাও সহ্য করিতে হইয়াছিল। কিন্তু এই সকল বিপপাতে কখনও বিচলিত বা স্বীয় কর্তব্য- পথ হইতে বিচ্যুত না হইয়া তিনি কারাসংস্কারকার্যে অগ্রসর হইয়াছিলেন। কঠোর শাসন ও শাস্তির বিভীষিকাময় লীলাস্থল না হইয়া, কারাগার যাহাতে চরিত্র-সংশােধন-কাৰ্যে যথার্থ সহায়তা করিতে পারে, তদুদ্দেশ্যে সমাজহিতৈষী ব্যক্তিরই প্রাণপণ চেষ্টা করা উচিত—এই ধ্রুব বিশ্বাসের বশবর্তী হইয়া এলিজাবেথ সহানুভূতিপূর্ণহৃদয়ে সৰ্ব্বদাই কারাসংস্কার কাৰ্যে অগ্রসর হইয়াছেন। নিউগেট কারাগারের হতভাগিনীদের প্রতি তাঁহার প্রথম দৃষ্টি পড়িল। তিনি সময় সময় তথায় যাইয়া তাহাদের নিকট ধর্মগ্রন্থ পাঠ, কখনও বা তাহাদিগকে লইয়া সরলপ্রাণে প্রার্থনা, কখনও বা তাহাদের সন্তানদের রোগশয্যাপাশ্বে বসিয়া শুশ্রুষা করিতে লাগিলেন। এইরূপে তিনি তাহাদের আত্মীয়স্থানীয় হইয়া ধীরে ধীরে তাহাদের মধ্যে সুনীতিপ্রচার দ্বারা দুর্নীতির স্রোত রুদ্ধ করিলেন। সেখানে প্রকৃতি স্ত্রীলােকদিগের উপর তিনি যে ভাবে তাঁহার প্রভাব বিস্তার করিয়াছিলেন, তাহাতে তাহার বুদ্ধিমত্তার ও দূর- দর্শিতার যথেষ্ট পরিচয় পাওয়া যায়। কারাবাসিনীদিগের অপেক্ষা তিনি তাহাদের সন্তানদের শিক্ষা ও উন্নতির জন্য অধিকতর চেষ্টা করিতেন। মাতৃহৃদয় যতই কলুষিত ও পাপাসক্ত হউক না কেন, সন্তানের মঙ্গলাকাঙ্ক্ষা তাহাতে সৰ্ব্বদাই বিরাজ করে। তাই এলিজাবেথ ফ্রাই যখন কারাগারে বিদ্যালয় স্থাপন করিয়া তাহাদের সন্তানগণের ভবিষ্যৎ উন্নতির পথ উন্মুক্ত করিবার প্রস্তাব উত্থাপন করিলেন, তখন তাহারা সকলে সাগ্রহে উহার অনুমােদন করিল। কিন্তু অপরের সাহায্য ব্যতিরেকে এইরূপ বিদ্যালয়- পরিচালন অসম্ভব। তাই তিনি একটি সমিতি গঠন করিলেন। নিউগেট কারাগারের স্ত্রীকয়েদীগণের চরিত্রসংশােধন ও তাহাদের সুখস্বাচ্ছন্দ্য- ৫৪ চরিত্রচিত্র। বিধান এই সমিতির প্রধান কর্তব্য বলিয়া পরিগণিত হইল। তাহারা কারাবাসিনীদিগের বস্ত্রাভাব দূর করিতে এবং তাহাদের মধ্যে শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করিতে অগ্রসর হইলেন। তাহাদের হৃদয়ে ধর্মভাব জাগাইয়া তুলিবার জন্য এবং তাহাদের চরিত্রে মিতাচার, শ্রমশীলতা ও শান্তিপ্রিয়তা প্রভৃতি সদ্গুণরাজি প্রস্ফুট করিবার জন্য, এই সমিতির অধীনে নানা ভাবে নানা চেষ্টা চলিতে লাগিল। এলিজাবেথ ফ্রাই নিজ ব্যয়ে কারাবাসিনীদিগকে পরিধেয় ও শীতবস্ত্র ক্রয় করিয়া দিতেন; তাহাদিগকে সর্বদাই কোনও না কোন শিল্পকাৰ্য্যে নিযুক্ত রাখিতেন; এবং তাহাদের শ্রমজাত দ্রব্যের বিক্রয়লব্ধ অর্থের দ্বারা তাহাদের চা ও চিনি ক্রয় করিয়া দিতেন। কারাগারে তাহাদের সুখ- স্বাচ্ছন্দ্যের দিকে কেহই দৃষ্টিপাত করিত না। তাই এলিজাবেথ তাহাদের শয্যার জন্য মাদুর, ও শীত নিবারণের জন্য কম্বলের বন্দোবস্ত করিয়া দিলেন; এবং যাহাতে উপযুক্ত আহার ও পােষাক-পরিচ্ছদের সংস্থান হয়, তাহারও ব্যবস্থা করিলেন। এইরূপে এলিজাবেথের ঐকান্তিক যত্নে ও সেবায় অচিরেই কারাগারে একটা আশ্চৰ্য্য পরিবর্তন দেখা দিল। বিশৃঙ্খলার স্থানে শৃঙ্খলা, অশান্তির স্থানে শান্তি, দুর্নীতির স্থানে সুনীতি, শ্রমবিমুখতার স্থানে প্রমানুরাগ, অমিতাচারের স্থানে মিতাচার ধীরে ধীরে অধিকার বিস্তার করিয়া কারা- গারের নারকীয় বিভীষিকার অপনােদন করিতে লাগিল। সকলে বিস্ময়ের সহিত ইহা লক্ষ্য করিয়া এলিজাবেথের ভূয়সী প্রশংসা করিতে লাগিল। এলিজাবেথের যশঃ সৌরভ চতুর্দিকে পরিব্যাপ্ত হইল; তাঁহার দেশবাসী নানাভাবে তাহার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করিতে লাগিল। ওদিকে কারাসংস্কার-বিষয়ে পালিয়ামেন্টের দৃষ্টি আকৃষ্ট হওয়ায় একটি তদন্ত কমিটি নিয়ােজিত করা হইল। ;
এলিজাবেথ ফ্রাই। তারপর, ইংলণ্ডের বর্বরােচিত নিষ্ঠুর দণ্ডবিধি ভঁহার দৃষ্টি আকর্ষণ করিল। তৎকালে ইংলণ্ডে অতি কঠোর আইন প্রচলিত ছিল। সামান্য অপরাধের জন্য লােকের প্রাণদণ্ডের ব্যবস্থা পৰ্য্যন্ত হইত। নরহত্যার অপরাধে যেরূপ শাস্তি প্রদত্ত হইত, সামান্য জালের অপরাধেও তজ্জপ দণ্ড দেওয়া হইত। একবার একটি দরিদ্র স্ত্রীলােক তাহার শিশুর শীত নিবারণের জন্য একখণ্ড শীতবস্ত্র অপহরণ করে; এই অপরাধে সে প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত হইয়াছিল। এমন কি সামান্য একটি বৃক্ষ-কৰ্ত্তনের অপরাধেও বিচারকগণ ফাসীর হুকুম দিতে ইতস্ততঃ করিতেন না। হুজুগের মাথায় তৃণস্তুপে অগ্নি-সংযােগ করিয়া অনেক উচ্ছঙ্খল যুবক প্রাণ হারাইয়াছে। পথিপার্শ্বস্থ মৃতপ্রায় ছাগশিশুকে গৃহে লইয়া গিয়াও অনেক ক্ষুধাতুর ব্যক্তি চৌষাভিযােগে অভিযুক্ত হইয়া ফঁাসীকাছে দণ্ডিত হইয়াছে। এই সকল কঠোর ও নিষ্ঠুর শাসনের হস্ত হইতে অবােধ অশিক্ষিত জনসাধারণকে মুক্ত করিবার জন্য পরদুঃখকাতরা এলিজাবেথ যথাসাধ্য চেষ্টা করেন। এই সকল মূক জনমণ্ডলীর পক্ষ সমর্থন করিতে গিয়া অসভ্যজনােচিত আইনের সংস্কারসাধনের জন্য শাসকবর্গকে তিনি পুনঃ পুনঃ সনির্বন্ধ অনুরােধ করিয়াছেন। দুঃখের বিষয় জীবিতকালে তাহার সমস্ত চেষ্টা ফলবতী হয় নাই। কিন্তু তিনি তাঁহার দেশবাসীর হৃদয়ে সমাজসেবার যে অপূৰ্বভাব উদ্দীপিত করিলেন তাহা আর বিনষ্ট হইল না, বরং দিন দিন উজ্জ্বল হইতে উজ্জ্বলতর হইয়া দেশময় বিস্তৃত হইয়া পড়িল। দেশবাসীর কর্তব্যবুদ্ধি জাগরিত হইল ; জনসমূহ প্রসিদ্ধ নেতৃবর্গের অধীনে দলবদ্ধ হইয়া অত্যাচার ও অবিচারের বিরুদ্ধে যুদ্ধঘােষণা করিল। অবশেষে এলিজাবেথের সাধনা সিদ্ধ হইল; ইংলণ্ডে হত্যাপরাধ ভিন্ন অন্যান্য অপরাধের জন্য যে প্রাণদণ্ডের বিধান ছিল তাহা রহিত হইল। ইহাতেই এলিজাবেথের কর্মের অবসান হয় নাই। তিনি ইংলণ্ড ও ;
চরিত্র-চিত্র। স্কটল্যাণ্ডের হাসপাতাল ও পাগলাগারদসমূহ পরিদর্শন করিতে লাগিলেন। এই সকল স্থানে তিনি যে সকল টী দেখিতে পাইলেন, নির্ভয়ে সে সকল কর্তৃপক্ষের গােচরীভূত করিতে লাগিলেন। ইংলণ্ডে মতিচ্ছন্ন লােকদিগের প্রতি অমানুষিক অত্যাচার করা হইত ; হতভাগ্যদের অনেককে শৃঙ্খলিত করিয়া অন্ধকারময় গহ্বরে আবদ্ধ করিয়া রাখা হইত। কোন কোন পাগলাগারদে পাগলদিগের প্রতি পশুর ন্যায় আচরণ করা হইত ; তাহাদের খাদ্যদ্রব্য মৃত্তিকার উপর কাষ্ঠপাত্রে একত্র সন্নিবেশিত হইত। সকল বর্বরােচিত আচরণের বিরুদ্ধে এলিজাবেথ তীব্র প্রতিবাদ করেন। কারাসংস্কার-ব্যাপারে তিনি য়ুরােপের বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করিয়াছেন, এবং নৃপতিবৃন্দের ও রাজপুরুষগণের নিকট নির্ভয়ে ও স্বাধীনভাবে তিনি স্বীয় অভিমত প্রকাশ করিয়াছেন। তাঁহাদের অসন্তুষ্টির ভয়ে তিনি কখনও উচিত কথা বলিতে ইতস্তত করেন নাই। ফ্রান্সের রাজাকে তিনি পরিষ্কার বলিয়াছিলেন, “আপনি যখন কারাগার নির্মাণ করেন, তখন এই কথা মনে রাখিয়া নিৰ্মাণ করিবেন যে, সেই কারাগৃহে যেন আপনার নিজের সন্তানেরাও অবস্থান করিতে আপত্তি উত্থাপন করিতে পারে।” সার রবার্ট পীলকেও তিনি বলিয়াছিলেন, ‘উন্মুক্ত আকাশ- মার্গ কারাবাসিগণের নিকট রুদ্ধ করিও না—আলােকহীন কক্ষ নির্মাণ করিও না ; মনে রাখিও, তােমার সন্তানগণও এই কারাগারে আশ্রয় লইতে পারে।” বস্তুত কারাবাসীদিগকে অন্ধকূপে আবদ্ধ করিয়া রাখা, তিনি অমানুষিক অত্যাচার ও অবিচার বলিয়া মনে করিতেন। সুতরাং এই প্রথা নিবারণের জন্য তিনি আজীবন চেষ্টা করিয়াছিলেন। এইরূপে বহু হিতকর কাৰ্যের অনুষ্ঠান করিয়া এলিজাবেথ সকলের হৃদয় এলিজাবেথ ফ্রাই। অধিকার করেন। তিনি যেখানে যাইতেন, সেখানেই জনমণ্ডলী তাঁহার সৌম্যমূর্তি দর্শন করিয়া পুণ্যলাভ করিতে লালায়িত হইত এবং রাজপুরুষগণ পর্যন্ত তাহার প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করিতেন। নিঃস্বার্থ সেবাধর্ম ও আত্মত্যাগের প্রভাবে তিনি ধরাবক্ষে যে সুশােভন ও অক্ষর রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করিয়াছিনে, স্বার্থলোলুপ ও পাশববলদৃপ্ত মানব সেই- রূপ রাজ্য-সৃষ্টির কল্পনা মনেও আনিতে পারে কি না সন্দেহ। হতভাগ্য নরকুলের দুঃখ ও দুর্দশা-মােচনে এবং পতিতের উদ্ধার-সাধনে অর্ধশতাব্দী অক্লান্তভাবে ও একাগ্রচিত্তে পরিশ্রম করিয়া সমাজসেবায় আত্মনিয়ােগের যে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত তিনি জগদ্বাসীর সমক্ষে ধারণ করিয়াছেন, তাহা ইতিহাসের বক্ষে চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে দেদীপ্যমান থা মুসলমানসমাজে শিক্ষাবিস্তারে স্যার সৈয়দ আহম্মদ। “চাহেনা নিজের ইষ্ট, অতুল কর্তব্যনিষ্ঠ, ধরা প্রতিকূল হলে নহে কম্পমান ; জীবন সংগ্রামে নিত্য বিজয়ী তঁাহার চিত্ত, অনন্তে উড়িছে তার বিজয় নিশান”। -মানকুমারী। আলীগড় কলেজ স্যার সৈয়দ আহম্মদের সর্বপ্রধান কীর্তি। ভারতের যুক্তপ্রদেশের অন্তঃপাতী আলীগড় নামক স্থানে উক্ত কলেজ ১৮৭৫ খৃষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয়। ভারতীয় কলেজসমূহের মধ্যে ইহা সবিশেষ প্রসিদ্ধি লাভ করিয়াছে। প্রতিবৎসর শত শত জ্ঞানপিপাসু মুসলমান যুবক অধ্যয়নার্থ বিভিন্ন প্রদেশ হইতে এখানে সমবেত হইতেছে। বর্তমান সময়ে এখানে প্রায় একহাজার ছাত্রের বাসােপযােগী গৃহ নির্মিত হইয়াছে। এখানে অন্যান্য প্রয়ােজনীয় বিষয় ব্যতীত আরবীভাষা ও ইসলামধর্মসংক্রান্ত শিক্ষার যথোপযুক্ত বন্দোবস্ত আছে। পাশ্চাত্য জ্ঞানবিজ্ঞান যাহাতে প্রাচ্যজাতীয় ধৰ্মমতসংস্পর্শে সৰ্বাঙ্গসুন্দর হইয়া মুসলমান যুবকগণের চরিত্র- গঠনের সহায়তা করিতে পারে, তদুদ্দেশ্যেই এখানে প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের সমাবেশ সূচিত হইয়াছে। এই সূচনার মূলে স্যার সৈয়দ আহম্মদ ; তিনিই এই অনুষ্ঠানের প্রাণপ্রতিষ্ঠাতা।
স্থাৰ সৈয়দ আহম্মদ
No text on this page.
স্যার সৈয়দ আহম্মদ। স্থার সৈয়দ আহমদের শিক্ষাদীক্ষা সমস্তই প্রাচ্যভাবে নিষ্পন্ন হইয়াছিল। তিনি প্রাচ্যবিদ্যায় অগাধ পাণ্ডিত্যলাভ করিয়াছিলেন । কিন্তু প্রতীচ্য জ্ঞানবিজ্ঞানের প্রবেশদ্বার তাঁহার নিকট অর্গলবদ্ধ ছিল। নিজে ইরাজি ভাষায় অনভিজ্ঞ হইলেও তিনি ইংরাজি শিক্ষার বিশেষ পক্ষপাতী ছিলেন। ভারতীয় হিন্দুগণের মধ্যে ইংরাজি শিক্ষা প্রচারের জন্য রাজা রামমােহন রায় প্রভৃতি মনীষিগণ যেরূপ অক্লান্ত পরিশ্রম করিয়াছিলেন, ভারতীয় মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে য়ুরােপীয় জ্ঞানবিজ্ঞানের প্রচারকার্যে স্যার সৈয়দ আহম্মদও তদনুরূপ চেষ্টা ও যত্ন করিয়া গিয়াছেন। তাহার ন্যায় উদারভাবাপন্ন অথচ ধর্মনিষ্ঠ মুসলমান তৎকালে ভারতে ছিল না বলিলেও অত্যুক্তি হয় না। মুসলমান সমাজের মঙ্গলচিন্তা তাহার হৃদয়রাজ্য অধিকার করিয়াছিল ; স্বজাতির উন্নতিবিধান তাঁহার সাধনার প্রধান বিষয় হইয়াছিল। যে সময়ে স্যার সৈয়দ আহম্মদ শিক্ষাপ্রচারব্রত গ্রহণ করেন, সে সময়ে মুসলমানসমাজে শিক্ষার অবস্থা অতীব শশাচনীয়। সিপাহীবিদ্রোহের কুফল দেশময় পরিব্যাপ্ত হইয়াছে। আরবী ও পাশী সাহিত্যের চর্চা ধীরমন্থরগতিতে অগ্রসর হইতেছে। ভূগােল, আধুনিক বিজ্ঞান বা ইতিহাস- শিক্ষার প্রয়ােজনীয়তা মুসলমানগণ উপলব্ধি করিতে সমর্থ হয় নাই। কেবলমাত্র তর্কশাস্ত্র, দর্শনশাস্ত্র ও ধর্মশাস্ত্রই তখন মুসলমান সমাজের আলােচনার বিষয় হইয়া উঠিয়াছে। তখন রক্ষণশীল মুসলমানসমাজ ইংরাজিশিক্ষার ঘাের বিরুদ্ধবাদী, কারণ তাহাদের এই বিশ্বাস যে, ইংরাজি শিক্ষা ইস্লামধর্মবিরুদ্ধ এবং ইহার প্রভাবে তাহাদের জাতীয় ধৰ্ম্মৰ দিন দিন ক্ষুন্ন হইবে। কিন্তু সূক্ষ্মদর্শী সমাজহিতৈষী সৈয়দ আহম্মদ তাহার তীক্ষ্ণ অন্তদৃষ্টি প্রভাবে দেখিতে পাইলেন যে, ইংরাজিশিক্ষা ব্যতিরেকে মুসলমানজাতি চরিত্র-চিত্র। প্রতীচ্যের জ্ঞানভাণ্ডারের অমূল্য রত্নরাজি আহরণে সমর্থ হইবে না; ইংরাজিশিক্ষা মুসলমানসমাজে প্রবর্তিত না হইলে, অদূর ভবিষ্যতে তাহাদের জাতীয় উন্নতির কোন আশা নাই। তাই তিনি ইংরাজি ভাষার মধ্যদিয়া পাশ্চাত্য শিল্প, সাহিত্য ও বিজ্ঞান ইমধর্মাবলম্বিগণের মধ্যে প্রচার করিতে বদ্ধপরিকর হইলেন। “শিক্ষা, শিক্ষা, শিক্ষা”—ইহাই তাহার মূল মন্ত্র হইল। অনুদার-প্রকৃতি ও সঙ্কীর্ণমনা বহুলােক তাহার বিরুদ্ধে দণ্ডায়মান হইল। রক্ষণশীল মৌলবীসম্প্রদায় সৈয়দ আহম্মদকে তাহাদের ইসলাম ধৰ্ম্মের ঘাের শত্রু বলিয়া মনে করিতে লাগিল। তাহারা দলবদ্ধ হইয়া অতি জৰন্থ ভাবে এই মহাপ্রাণ উদারচেতা পুরুষের নানাপ্রকার ঈর্ষা- মূলক কুৎসা রটাইতে লাগিল। স্বাধীনচেতা সৈয়দ আহম্মদ সরল বিশ্বাস ও অপূৰ্ব তেজস্বিতার সহিত তাহার লক্ষ্য সাধনে অগ্রসর হইলেন। শত্র- পক্ষের ভীষণ আক্রমণ ও ভয়প্রদর্শন তাহাকে তাহার সঙ্কল্প হইতে বিন্দুমাত্রও বিচলিত করিতে পারিল না। তিনি দৃঢ়তাসহকারে, নির্ভীক হৃদয়ে, দ্বিগুণ উৎসাহে স্বকীয় শিক্ষামত প্রচার করিতে লাগিলেন। তাঁহার জীবন সঙ্কটাপন্ন জানিয়াও মুহূর্তের জন্য তিনি স্বীয় কৰ্ত্তব্যপালনে পশ্চাৎপদ হইলেন না। প্রতিপক্ষের বাধাবিঘ্ন যেন তাঁহার হৃদয়ে অযুত হস্তীর বল প্রদান করিতে লাগিল। অবশেষে এই মহাপুরুষেরই জয় হইল। ধীরে ধীরে মুসলমান ধৰ্ম্ম- বলম্বিগণ ইংরাজিশিক্ষার প্রয়ােজনীয়তা ও উপকারিতা বুঝিতে পারিল। তাহাদের অমূলক আশঙ্কা দূর হইল, এবং দেশের গণ্যমান্য বহুলােক তাহার সাহায্যার্থে অগ্রসর হইলেন। হায়দ্রাবাদের নিজাম, রামপুরের নবাব, নিজামমন্ত্রী স্যার সরজঙ্গ ও অন্যান্য সমৃদ্ধিশালী লােকের অর্থানুকূল্যে তাহার চিরপােষিত আলীগড় কলেজ স্থাপিত হইল। তাহার স্যার সৈয়দ আহম্মদ। মহদনুষ্ঠানে সহানুভূতি প্রকাশার্থ, হিন্দুরাজগণও সাহায্য প্রদান করিয়া তাহাদের উদারতার পরিচয় প্রদান করিলেন। সৈয়দ আহম্মদের কলেজে মুসলমান ছাত্রবৃন্দ তাহাদের ধর্মশাস্ত্র, আইনতত্ত্ব ও সাহিত্যের সঙ্গে সঙ্গে পাশ্চাত্য সাহিত্য ও বিজ্ঞানের আলােচনা আরম্ভ করিয়া, ভারতে মুসলমান জাতির নব অভ্যুদয়ের যুগ সূচনা করিল। সমাজহিতৈষণা, সরল বিশ্বাস ও সৎসাহসের বিজয়বাৰ্তা ভারতে প্রচারিত হইল। সৈয়দ আহম্মদ ১৮১৭ খৃষ্টাব্দে দিল্লী নগরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁহার পিতা দিল্লীর সম্রাট দ্বিতীয় আকবরের একজন মন্ত্রী ছিলেন। সৈয়দ আহম্মদ পঠদ্দশায়ই পিতৃহীন হন। তাঁহার বিদুষী মাতা পুত্রের ভবিষ্যৎ জীবনগঠনে যথেষ্ট সহায়তা করেন। মাতার সষত্ন শিক্ষাগুণে যৌবনেই তাঁহার হৃদয়ে উচ্চাকাঙ্ক্ষার বীজ উপ্ত হয়। যদিও পারিবারিক অস্বচ্ছলতা- বশতঃ অষ্টাদশ বর্ষ বয়সেই তিনি লেখাপড়া ত্যাগ করিতে বাধ্য হইয়া- ছিলেন, তথাপি অধ্যয়নস্পৃহা তাহার হৃদয়ে চিরজীবন বাবতী ছিল। তাহার সমসাময়িক ব্যক্তিগণের মধ্যে সৈয়দ আহম্মদ একজন শাস্ত্রাভিজ্ঞ সুপণ্ডিত বলিয়া পরিচিত। তখন দেশের অবস্থা অতীব শােচনীয়। ধ্বংসাবশিষ্ট মােগল সাম্রাজ্যের স্থলে তখনও ইংরাজশাসন সুপ্রতিষ্ঠিত হয় নাই। গৌরবচ্যুত, লুপ্তশক্তি মােগলনম্রাটগণ দেশে শান্তিরক্ষায় সম্পূর্ণ অসমর্থ ; যুদ্ধবিগ্রহ এবং অত্যাচার অবিচারের তাণ্ডবনৃত্যে ভারতবর্ষ প্রকম্পিত। ইংরাজবণিকগণ এই সন্ধিক্ষণে তাহাদের স্বার্থসংরক্ষণ নিয়াই ব্যস্ত ছিল, সুতরাং দেশের হিতকর অনুষ্ঠানে, বিশেষতঃ শিক্ষাবিষয়ে, তাহারা মনােযােগ প্রদর্শন করিবার সুযােগ পায় নাই। এইরূপ অবস্থায় দেশের ভাগ্যে যাহা ঘটিবার তাহাই ঘটিয়াছিল। শিক্ষার অভাবে জনসাধারণ কুসংস্কারাচ্ছন্ন হইয়া পড়িয়াছিল। প্রকৃত শিক্ষালয় বলিয়া কোনও অনুষ্ঠান তখন বিদ্যমান ছিল কিনা সন্দেহ।
চরিত্রচিত্র। সুতরাং স্বীয় গৃহেই জননীর তত্ত্বাবধানে সৈয়দ আহম্মদ সমস্ত শিক্ষা লাভ করেন। পিতার মৃত্যুর পর তাহার উপর প্রকাণ্ড সংসারের ভার পড়িল। বাধ্য হইয়া তিনি ইষ্টইণ্ডিয়া কোম্পানির অধীনে চাকুরী গ্রহণ করিলেন। অবশেষে প্রতিযােগিতাপরীক্ষায় কৃতিত্বের সহিত উত্তীর্ণ হইয়া, ১৮৪১ খৃষ্টাব্দে তিনি মুনসেফ পদে নিযুক্ত হন। সুবিচারকরূপে তিনি যথেষ্ট প্রতিপত্তি লাভ করেন এবং শেষে দিল্লীর সদর আমিনের পদে উন্নীত হন। এই স্থানে অবস্থানকালে গুরুতর রাজকার্যে ব্যাপৃত থাকিয়াও তিনি জ্ঞানানুশীল হইতে বিরত হন নাই। এই সময় তিনি কতিপয় গ্রন্থ রচনা করিয়া বিশেষ প্রসিদ্ধি লাভ করেন। তারপর ভারতে বিদ্রোহানল প্রজ্বলিত হইয়া উঠিল। দেখিতে দেখিতে অনলশিখা দেশময় ব্যাপ্ত হইয়া পড়িল। এই দুঃসময়েও ইংরাজ- শাসনের প্রতি মহামনা সৈয়দ আহম্মদের শ্রদ্ধাভক্তির বিন্দুমাত্র হ্রাস পরিলক্ষিত হয় নাই। তাহার চেষ্টায় বহু ইংরাজ পুরুষ ও রমর্শ প্রাণরক্ষা হয়। যখন বিদ্রোহানল নির্বাপিত হইল, তখন আবার প্রতিক্রিয়া আরম্ভ হইল। সিপাহীবিদ্রোহে লিপ্ত ছিল এই সন্দেহে, অথবা ঈর্ষাপরায়ণ ব্যক্তির অমূলক সংবাদের উপর নির্ভর করিয়া, ইংরাজগণ বহু ব্যক্তির প্রাণ- দণ্ডের আদেশ দিলেন। তখন ন্যায়পরায়ণ সত্যনিষ্ঠ সৈয়দ আহম্মদ তাহাদের পক্ষসমর্থনার্থ নির্ভীকহৃদয়ে দণ্ডায়মান দণ্ডায়মান হইলেন। নিরপরাধ ব্যক্তি যাহাতে কঠোর শাসনের হস্ত হইতে নিষ্কৃতি পাইতে পারে, তদুদ্দেশ্যে তিনি নানাভাবে চেষ্টা করিতে লাগিলেন। তাহার যত্নে ও চেষ্টায় আইনের কঠোরতা অনেকটা হ্রাস হইল এবং অনেক হতভাগ্য সে যাত্রায় রক্ষা পাইল। এ সময়ে নিঃস্বার্থভাবে নিঃসহায় দেশবাসীর উপকার সাধন করিয়া একদিকে যেমন তিনি অকৃত্রিম স্বদেশানুরাগের পরিচয় প্রদান স্যার সৈয়দ আহম্মদ। । মধ্যে একটা করেন, অপরদিকে নানাবিষয়ে রাজকর্মচারীর সহায়তা করিয়া তেমন তিনি রাজভক্তির পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করেন। একবার হার রাজভক্তির পুরস্কারস্বরূপ বাষিক দেড়লক্ষ টাকা আয়ের এক বিশাল সম্পত্তি তাহাকে প্রদান করিবার প্রস্তাব করা হইল। নিলোভহৃদয় সৈয়দ আহম্মদ অম্লান বদনে সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করিলেন। এই সম্পত্তি পূৰ্বে এক বিদ্রোহী সরদারের অধিকারভুক্ত ছিল। যে সম্পত্তি হইতে বঞ্চিত হইয়া একটি পরিবার দীনদশায় উপনীত হইয়াছে, সেই সম্পত্তির উপভােগবাসনা সৈয়দ আহম্মদের হৃদয়ে স্থান পাইল না। সিপাহীবিদ্রোহের ফলে ইংরাজ ও ভারতবাসীর অবিশ্বাসের ভাব সঞ্জাত হয়। ক্রোধ ও হিংসার বশবর্তী হইয়া পরস্পর পরস্পরকে ঘৃণা করিতে আরম্ভ করে। কাজেই উভয়ের মধ্যে সহানু ভূতির পরিবর্তে বিদ্বেষভাবই প্রবল হইয়া উঠে। সৈয়দ আহম্মদ বুঝিতে পারিয়াছিলেন যে, পরস্পর সম্বন্ধে পরস্পরের অজ্ঞতাই ইহার মূল কারণ। কিন্তু রাজা ও প্রজার মধ্যে এই অসন্তোষ ও বিদ্বেষভাব অচিরে যাহাতে দূরীভূত হয়, তদুদ্দেশ্যে প্রত্যেক কর্তব্যপরায়ণ দায়িত্বজ্ঞানসম্পন্ন ভারতবাসীর চেষ্টা করা উচিত। তাই সিপাহীবিদ্রোহের মূল কারণ আলােচনার প্রসঙ্গে অতি দক্ষতাসহকারে ভারতবাসী জনসাধারণের অকৃত্রিম রাজভক্তি ও ইংরাজ শাসনপ্রীতির বিষয় বর্ণন করিয়া তিনি ইংরাজ জাতির ভ্রান্ত ধারণা দূরীকরণে যথেষ্ট সহায়তা করেন। দেশবাসী জনসাধারণের অজ্ঞতা এবং ভারতের ব্যবস্থাপক সভায় ভারতবাসীর অনধিকার—এই দুই কারণ দূরীভূত হইলেই যে ভারতবাসীর মনঃক্ষোভের কারণ দূর হইবে এবং শাসক ও শাসিতের মধ্যে সম্প্রীতি ও সদ্ভাবের সূচনা হইবে, সৈয়দ আহম্মদ ইহা বিশেষভাবে রাজপুরুষগণের গােচরী- ভূত করেন। তাহার যুক্তির সারবত্তা অনুভব করিয়াই, বােধ হয়, ৬৪ চরিত্র-চিত্র। ভারতের প্রথম রাজপ্রতিনিধি, সদাশয় লর্ডক্যানিং ব্যবস্থাপক সভায় ভারতবাসীকে প্রবেশাধিকার প্রদান করিয়া, ভারতের ইতিহাসে এক নৃতন অধ্যায়ের সূচনা এবং রাজা প্রজার মিলনভূমির সূত্রপাত করেন। প্রাচ্য ও প্রতীচ্যভাবের আদানপ্রদানের সুব্যবস্থা ব্যতিরেকে,'ভারতে শাসক ও শাসিতের মধ্যে অবিচ্ছেদ্য বন্ধন স্থাপিত হইতে পারে না। তাই সৈয়দ আহম্মদ পাশ্চাত্য জ্ঞানবিজ্ঞান, ধর্ম ও সভ্যতা মুসলমান ধর্মাবলম্বী ভারতবাসীর অধিগম্য করিবার জন্য, উক্ত বিষয়সম্বন্ধীয় প্রধান ইংরাজি গ্রন্থসমূহ উর্দ, ভাষায় অনুবাদ করিতে মনন করেন। এই উদ্দেশ্যে তিনি এক সাহিত্য ও বিজ্ঞান সভার প্রতিষ্ঠা করেন। এই সভার উদ্যোগে ইতিহাস, জীবনচরিত, অর্থনীতি, কৃষি প্রভৃতি বিষয়ের বহু ইংরাজি গ্রন্থ অনূদিত ও প্রচারিত হয়। আলীগড় সহরের যে গৃহে ইহার অধিবেশন হইত, এখন সেই গৃহ আলীগড় কলেজের ছাত্রাবাসে পরিণত হইয়াছে। যদিও তিনি নিজে ইংরাজি ভাবে শিক্ষিত হন নাই, তথাপি ইংরাজ জাতির সংস্পর্শে আসিয়া ইহা বেশ বুঝিতে পারিয়াছিলেন যে, তাহ- দিগকে অনুকরণ করিয়া ভারতবাসী অনেক শিখিতে পারে। তাই তিনি ইংলণ্ডের আচারব্যবহার, শিক্ষাব্যবস্থা, শাসনপ্রণালী ও ধৰ্ম্মানুষ্ঠান প্রভৃতি বিষয়ে প্রত্যক্ষ জ্ঞানলাভের জন্য বিশেষ আগ্রহান্বিত হইয়া উঠিয়া ছিলেন। অবশেষে যখন তাহার দ্বিতীয় পুত্র গবর্নমেন্ট হইতে বৃত্তি পাইয়া শিক্ষার্থে ইংলণ্ডে গমন করেন, তখন তিনিও ইংলণ্ড দর্শনার্থে তাহার সঙ্গে গমন করেন। তথায় অবস্থানকালে তিনি ইংলণ্ডের শিক্ষা- ব্যবস্থা পরম যত্নসহকারে ও পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে অধ্যয়ন করেন এবং উহাকে ভারতের উপযােগী করিয়া এদেশে প্রবর্তন করিবার আকাঙ্ক্ষা হৃদয়ে পােষণ করিতে থাকেন। যে সতর মাস ইংলণ্ডে ছিলেন, সে সতর মাস স্থার সৈয়দ আহম্মদ। তিনি ইংলণ্ডের প্রধান প্রধান বিশ্ববিদ্যালয়গুলি পরিদর্শন করিয়া তথাকার অধ্যাপনাপ্রণালী অভিনিবেশসহকারে অধ্যয়ন করেন। তথাকার বিশ্ব- বিদ্যালয়সমূহের বিজ্ঞানসম্মত শিক্ষাপ্রণালী, উন্নত অবস্থা ও সুশৃঙ্খল ব্যবস্থা দেখিয়া তিনি অক্সফোর্ড ও কেজি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুকরণে ভারতে ছাত্রাবাস-সম্বলিত এক মুসলমান বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করিবার গল্প করেন। ইংলণ্ডে অবস্থানকালেই তিনি কলেজগৃহ ও ছাত্রাবাস প্রভৃতির নক্সা প্রস্তুত করেন, এবং দেশে প্রত্যাগমন করিয়া কি প্রণালীতে উক্ত বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালন করিবেন, তাহার ব্যবস্থা, স্বীয় উপযুক্ত পুত্রের সঙ্গে পরামর্শ করিয়া, পূর্বেই ঠিক করিয়া রাখেন। মুসলমানদের মধ্যে একটা ভ্রান্ত ধারণা ছিল যে, পাশ্চাত্য জ্ঞানবিজ্ঞান অধ্যয়ন করিলে তাহাদের ধর্মবিশ্বাস শিথিল হইবে। কি উপায়ে তিনি তাঁহার স্বধর্মাবলম্বিগণের এই ভ্রান্তি অপনােদন করিয়া তাহাদিগকে তদনুশীলনে প্রবর্তিত করিবেন, তাহা ভাবিতে লাগিলেন। দেশে প্রত্যাবর্তন করিয়া কি উপায়ে তিনি অর্থসংগ্রহ করিয়া আলীগড়ে একটি কলেজ প্রতিষ্ঠা করিয়া তাঁহার চিরপােষিত আশা পূর্ণ করিবেন, সেই চিন্তা দিবারাত্র তাহার হৃদয়রাজ্য আলােড়িত করিতে লাগিল। অবশেষে এই সকল বিষয় আলােচনা করিবার জন্য তিনি একটি শিক্ষাসমিতি গঠন করিয়া নিজেই তাহার সম্পাদকতার ভার গ্রহণ করেন। যথাসময়ে তাঁহাদের কার্যবিবরণী প্রকাশিত হয়। পাশ্চাত্য জ্ঞানবিজ্ঞানের প্রতি বিদ্বেষভাব পােষণ করিয়া রক্ষণশীল মুসলমান সম্প্রদায় যে, সমাজের ভবিষ্যৎ উন্নতির মূলে কুঠারাঘাত করিতেছে, তাহা তাহারা প্রতিপন্ন করেন। তাহারা ইহাও উপলব্ধি করেন যে, সরকারী বা মিশনারী স্কুল ও কলেজে যে শিক্ষা প্রদত্ত হয়, তারা মুসলমান যুবকগণের পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা লাভ হইতে পারে না; কারণ প্রাচ্য শিক্ষা চরিত্রচিত্র। ও সভ্যতাকে পুনর্জীবিত করা বিদ্যালয়সমূহের অন্যতম উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। তাই ইলাম ধর্মে আস্থাবান, ইসলাম জ্ঞানবিজ্ঞানের গৌরবে গৌরবান্বিত, অথচ পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রতি বিদ্বেষভাববিহীন ব্যক্তির কর্তৃত্বাধীনে যাহাতে মুসলমান যুবকগণ সৰ্বাঙ্গসুর জাতীয় শিক্ষা লাভ করিতে সমর্থ হয়, তদুদ্দেশ্যে তারা একটি কলেজ প্রতিষ্ঠার প্রয়াে- জনীয়তা ও উপযােগিতা উপলব্ধি করেন এবং উপযুক্ত পরিমাণ অর্থসংগ্রহের নিমিত্ত একটি কমিটি গঠন করিবার পরামর্শ প্রদান করেন। তদনুসারে ১৮৭২ খৃষ্টাব্দে একটি অর্থসংগ্রহ কমিটি গঠিত হয়। সৈয়দ আহম্মদ তাহার স্বভাবচিত উৎসাহ ও অধ্যবসায়সহকারে কলেজপ্রতিষ্ঠা স্বার্থমুখ বিসর্জন দিয়া অর্থসংগ্রহে প্রাণপণ চেষ্টা করিতে আরম্ভ করেন। তাহার একাগ্র সাধনায় দুই বৎসরের মধ্যেই প্রচুর পরিমাণ অর্থ সংগৃহীত হয় এবং তদ্বারা আলীগড়ে একটি বিদ্যালয় স্থাপিত হয়। এই বিদ্যালয়টি ১৮৭৫ খৃষ্টাব্দে কলেজে পরিণত হয়। ১৮৭৬ খৃষ্টাব্দে "সৈয়দ আহম্মদ সরকারী কাৰ্য্য হইতে অবসর গ্রহণ করিয়া আলীগড়ে অবস্থান করিতে আরম্ভ করেন, এবং অনন্যমনা ও অনন্যকৰ্ম্মা হইয়া তাঁহার প্রিয় কলেজের উন্নতিবিধানে প্রবৃত্ত হন। এই বৃদ্ধবয়সেও দেশের এক প্রান্ত হইতে অপর প্রান্ত পর্যন্ত নিজব্যয়ে ঘুরিয়া ঘুরিয়া তিনি স্বীয় ধর্মাবলম্বীকে পাশ্চাত্য শিক্ষার অনুরাগী করিতে চেষ্টা করিতে লাগিলেন। ইহা অপেক্ষা নিঃস্বার্থ সমাজসেবার উজ্জ্বলতর দৃষ্টান্ত আর কি হইতে পারে ? এইরূপ অপূৰ্ব স্বার্থত্যাগ ও একাগ্র সাধনার আদর্শে অনুপ্রাণিত হইয়া তাঁহার দেশবাসী আলীগড়ে কলেজ প্রতিষ্ঠার্থ অকাতরে ও মুক্তহস্তে তাহার সাহায্যভাণ্ডারে অর্থদান করিতে লাগিল। ভারতবাসী নিজের চেষ্টায়, নিজের অর্থে এবং নিজের পরিচালনায় স্যার সৈয়দ আহম্মদ। ৬৭ কিরূপে এরূপ একটি মহানুষ্ঠানের প্রতিষ্ঠা করিতে পারে, তাহা শুরি সৈয়দ আহম্মদ প্রত্যক্ষভাবে দেখাইলেন। পরমুখাপেক্ষী, আত্মশক্তিতে সন্দিহান, ভারতবাসীর হৃদয়ে এইরূপে আত্মদরবােধ জাগ্রত করিয়া এক স্বাবলম্বনের ভাব আনয়ন করিয়া, তিনি দেশের ও সমাজের যে কল্যাণ সাধন করিয়াছেন, তজ্জন্য দেশবাসী তাহার নিকট চিরকাল কৃতজ্ঞতা পাশে আবদ্ধ থাকিবে।
নৈতিক উন্নতিবিধানে কেশবচন্দ্র। “কাব্য নয়, চিত্র নয়, প্রতিমূর্তি নয়, ধরণী চাহিছে শুধু,হৃদয়, হৃদয় !” -অক্ষয় বড়াল। আত্মােন্নতি, পরহিতরতি ও ভগবদ্ভক্তি এই তিনটি মানবচরিত্রের প্রধান লক্ষণ। ইহাদের সামঞ্জস্যবিধানেই মানবজীবনের পূর্ণতা ও সার্থকতা। সেবক কেশবের জীবনে ইহাদের অপূর্ব সমাবেশ ও পূর্ণ- বিকাশ পরিলক্ষিত হয়। প্রথম জীবনে তিনি স্বকীয় চরিত্রগঠনের ব্যাপার লইয়া বিব্রত ; মধ্য জীবনে তিনি বঙ্গীয় যুবকগুণের নৈতিক উন্নতি বিধানা কাৰ্য্যক্ষেত্রে অবতীর্ণ ; জীবনসায়াহ্নে তিনি সংসারবিরাগী ভগবদ্ভক্ত। বিবেক ও বৈরাগ্য কেশবের আবাল্য মুদ, এবং বিশ্বাস তাঁহার আজীবন সঙ্গী ছিল। তাঁহার বদনমণ্ডলে ভগবদ্বিশ্বাসের বিমল বিভা সর্বদাই প্রতিভাত হইত। ভগবদ্বিধানে কেশবের অটল বিশ্বাস ছিল বলিয়া তিনি প্রার্থনাকে তাঁহার চিরসঙ্গী করিয়াছিলেন। সরল ব্যাকুল প্রার্থনার প্রত্যুত্তরে ঈশ্বরের বাণী অন্তরমাঝে প্রকাশিত হয়—ইহা তিনি নিজে প্রত্যক্ষভাবে অনুভব করিয়াছিলেন। তাহার জীবনবেদের প্রথম কথা প্রার্থনা। তিনি প্রত্যহ প্রত্যুষে এবং রাত্রিতে একটি লিখিত প্রার্থনা সাধন করিতেন। প্রার্থনা করিতে করিতে তিনি হৃদয়ে দুর্জয় বল লাভ করিলেন। সন্দেহ, অবিশ্বাস, পাপ ও প্রলােভন তাহার কেশবচন্দ্র। সঙ্কল্পের মূর্তি দেখিয়া ভয়ে পলায়ন করিল। বস্তুতঃ প্রার্থনা দুর্বল চিত্তে বলসঞ্চার ও ভগ্নোৎসাহ হৃদয়ে উৎসাহ প্রদান করে। তাই কেশবচন্দ্র বলিতেন—“প্রার্থনা কর বাঁচিবে, চরিত্র ভাল হইবে, যাহা কিছু অভাব পাইবে।” বিবেকের বাণী কেশবচন্দ্র বাল্যকাল হইতেই অনুসরণ করিয়া চলিয়াছেন। পাপবােধ তাহার এত প্রবল ছিল যে, সামান্য কোনও অন্যায় কাৰ্য্য করিলেই তাহার হৃদয় অনুতাপানলে দগ্ধ হইত, এবং তখনই তিনি ভগবানের ক্ষমা ভিক্ষা করিয়া প্রার্থনা করিতেন। এমনকি পাপের সম্ভাবনা দেখিলে তিনি ভয়ে অস্থির হইয়া উঠিতেন। এইরূপ প্রবল পাপবােধ ছিল বলিয়াই, তিনি পবিত্র জীবন যাপন করিয়া স্বর্গ- রাজ্যের অধিকারী হইয়াছিলেন। জাগ্রত নরক তাহার জাগ্রত স্বর্গের কারণ হইয়াছিল।” আহারবিহার, পােষাকপরিচ্ছদ, এবং কথাবার্তা সকল বিষয়েই কেশবচন্দ্রের অপূৰ্ব সংযম ছিল। জীবনের প্রথম ভাগেই বৈরাগ্যের ভাব তাঁহার চরিত্রে পরিলক্ষিত হয়। যে সময়ে হিন্দুকলেজের নীতিমা ছাত্রলী: ব্যস্ত মদ্যমাংস আহার করিতে দ্বিধা বােধ করিত না, যে সময়ে ৰাহ্মসমাজের আচাৰ্য উপাচার্যগণ পৰ্য্যন্ত মাংস ভক্ষণ করিয়া পরিতৃপ্তি লাভ করিতেন, তখনও সংযমী যুবক কেশবচন্দ্র দেশাচারের বিরুদ্ধে কিরূপে স্বকীয় বিবেকানুমােদিত পথ অনুসরণ করিয়া চলিয়াছেন, তাহা শুনিলে বিস্মিত হইতে হয়। একদিন মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের গৃহে কেশবচন্দ্রের নিমন্ত্রণ ছিল। মহর্ষি হিন্দুকলেজের শিক্ষিত যুবকগণের রুচির বিষয় অবগত ছিলেন, এবং তৎকালােচিত রীতি অনুসারে কেশব ও অন্যান্যের জন্য বিভিন্ন প্রকারের মাংসের আয়ােজন করিয়াছিলেন। মাংসই তখনকার যুবকগণের প্রিয় ৭ চরিক্ত চিত্র। 1 খাদ্য। মাংস ব্যতীত ভােজনক্রিয়া সম্পন্ন হইতে পারে, ইহা তাহাদের ধারণার অতীত ছিল। যথাসময়ে নিমন্ত্রিত শিক্ষিত ভদ্রলােকগণ সমাগত হইলেন। কেশবচন্দ্রও তথায় ঠিক সময়ে উপস্থিত হইলেন। সকলেই ভােজনে উপবেশন করিলেন। কিন্তু একি! যখন অন্যান্য শিক্ষিত ভদ্রলােকগণ পরম পরিতােষসহকারে ভোজনে রত, তখন কেশবচন্দ্র ভােজনপাত্র হইতে হস্ত উত্তোলন পূর্বক নিঃশব্দে উপবিষ্ট। ইহা দেখিয়া মহর্ষি বিস্মিত ও অপ্রস্তুত হইলেন। তিনি কেশবচন্দ্রের নিকট উপস্থিত হইয়া অবগত হইলেন যে, সে যুবক নিরামিষাশী, কখনও মাংস গ্রহণ করেন না। তখন তাড়াতাড়ি করিয়া কেশবের জন্য কিঞ্চিৎ ভাজি ও রুটির আয়ােজন করিয়া দেওয়া হইল। তিনি তাহা পরম তৃপ্তির সহিত ভক্ষণ করিলেন। সংযতাহারী কেশবের প্রতি মহযি দেবেন্দ্রনাথের প্রীতি ও আদর আরও বদ্ধিত হইল। মহাপুরুষই মহাপুরুষের চরিত্রের মৰ্যাদা ও মহত্ত্ব অনুভব করিতে সমর্থ হন। অষ্টাদশ বৎসর বয়সেই কেশবচন্দ্রের ধর্মজীবনের সূত্রপাত হয়। তখন হইতেই তিনি যৌবনের সুখভােগ বিষবৎ ত্যাগ করিয়া সরল সাধুজীবন কাটাইতে আরম্ভ করেন। তরল আমােদপ্রমােদকে তিনি নরকের পথজ্ঞানে অন্তরের সহিত ঘৃণা করিতেন। রিপুর উত্তেজনায় যে সময়ে যুবকগণ বিভ্রান্ত ও বিপথগামী হয়, সেই যৌবনেই স্বকীয় সাধনা ও সঙ্কল্পবলে কুপ্রবৃত্তিগুলিকে তিনি বশে আনিতে সম্পূর্ণ সক্ষম হইয়া- ছিলেন। সুখসম্পদের ক্রোড়ে তিনি বর্ধিত হইয়াছিলেন সত্য, কিন্তু তৎপ্রতি তিনি ক্ষেপও করিতেন না। যে সন্ত্রান্ত ও সম্পন্ন গৃহে তিনি জন্মগ্রহণ করেন, সেই পরিবারের অন্যান্য যুবকগণ যখন বেশভূষার আড়ম্বর লইয়া ব্যস্ত থাকিত, তখন তিনি সামান্য আচ্ছাদনে দেহ আচ্ছাদিত করিয়া পরিতুষ্ট হইতেন। যাহাতে গাম্ভীৰ্য্য বৃদ্ধি পায়, কুচিন্তার দিকে কেশবচন্দ্র। ৭ মন না যায়, এমন সকল পুস্তক তিনি মনােযােগের সহিত অধ্যয়ন করিতেন। তিনি সর্বদাই বলিতেন, “ঈশ্বরের হাতে যদি আপনাকে দেখিতে চাও, অন্তরের ভিতর যে জন্তু আছে তাহাকে মারিতে হইবে, কুপ্রবৃত্তি সকলকে তাড়াইতে হইবে।” অপূৰ্ব সংযম ও প্রাণপাত সাধনাদ্বারা কেশব অন্তরস্থিত কুপ্রবৃত্তিগুলিকে দমন করিয়া চরিত্রবলে বলীয়ান্ হইয়া উঠিলেন। বিশ্বাস, বিবেক ও বৈরাগ্যের উপাসক, কেশবচন্দ্র এখন বঙ্গের যুবকসম্প্রদায়ের নৈতিক উন্নতিবিধানে রত হইলেন। অচিরকালমধ্যে তিনি তাহাদের প্রাণে এক নবশক্তি ও নবভক্তির উদ্রেক করিলেন। ১৮৫৯ সনের ২৪শে এপ্রিল কলুটোলায় ব্রহ্মবিদ্যালয় স্থাপিত হইল। এখানে কেশবচন্দ্র ঈশ্বরের প্রিয়কাৰ্য্যসাধন এবং ধর্মের লক্ষণ সম্বন্ধে সুচারুরূপে উপদেশ প্রদান করিতে লাগিলেন। তদানীন্তন উচ্ছল যুবকগণকে নীতি ও বিবেকানুমােদিত পথে পরিচালিত করার উদ্দেশ্যেই তিনি এই অনুষ্ঠানের প্রতিষ্ঠা করিয়াছিলেন, এবং অপরিসীম উৎসাহ ও উদ্যমসহকারে কাৰ্য্যক্ষেত্রে অবতীর্ণ হইয়াছিলেন। তখন ব্রাহ্মসমাজ মৃতবৎ ছিল, এবং প্রাণহীন যন্ত্রের ন্যায় চালিত হইয়া শুধু কতকগুলি প্রণালীবদ্ধ কাৰ্য্য সম্পন্ন করিয়াই পরিতুষ্ট থাকিত। কেশবচন্দ্রের যােগ- দানের পর, উহা উদ্যম, উৎসাহ ও সৎকার্যের অলিয় হইয়া উঠিল। তিনি তৎকালীন যুবকগণের চরিত্রগঠনের জন্য নিতান্ত ব্যগ্র হইয়া উঠিলেন এবং তাহাদের নৈতিক অভাব দুরীকরণার্থ একটি ভ্রাতৃসভা প্রতিষ্ঠা করিলেন। এই সভায় নীতিবিষয়ক আলােচনা হইত। আললাচিত বিষয়গুলি দৈনন্দিন জীবনে কার্যে পরিণত করিতে সকল যুবকই প্রাণপণ চেষ্টা করিত এবং তাহাদের চেষ্টার ফল পরদিনের সভায় অকপট হৃদয়ে বিবৃত করিত। সেই সভায় যুবকগণের মধ্যে এক অপূর্ব উত্তেজনার ভাব ৭২ চরিত্র-চিত্র। পরিলক্ষিত হইত। কেশবচন্দ্রের অনন্ত-সাধারণ ব্যক্তিত্ব যুবকগণকে যেন মন্ত্রমুগ্ধ করিয়া রাখিয়াছিল। কেশবের ভগবদ্বিশ্বাস, কেশবের নীতিপরায়ণতা, কেশবের কব্যবুদ্ধি, এবং সর্বোপরি কেশবের উৎসাহ ও উদ্যম দিন দিন যুবকগণের মধ্যে অপূৰ্ব্ব প্রভাব বিস্তার করিল। তাহাদের জীবনধারা পরিবর্তিত হইয়া গেল এবং তাহারা স্বর্গরাজ্যের অনুসন্ধানে প্রবৃত্ত হইল। সত্যবাদিতা ও পরহিতরতি সেই সকল যুবকগণের চিরসঙ্গী হইয়া উঠিল। এই সকল যুবক লইয়া কেশবচন্দ্র উৎসাহভরে দেশহিতকর কাৰ্যে প্রবৃত্ত হইলেন। ব্রাহ্মসমাজে সেবার ভাব জাগিয়া উঠিল। আজকাল ৰাহ্মসমাজ দেশে শিক্ষা প্ৰচালােদ্দেশ্যে, দুঃস্থ লােকের সাহায্যকল্পে, এবং রােগীর শুক্রবার জন্য যে সকল অনুষ্ঠান করিয়াছে, তাহার বীজ কেশবচন্দ্ৰই ব্রাহ্মসমাজে রােপণ করিয়াছিলেন। শিক্ষাপ্রচার ও অন্যান্য জনহিতকর কাৰ্য্যকে তিনি ধর্মের অঙ্গ বলিয়া জ্ঞান করিতেন। সুতরাং ব্রাহ্মসমাজ যাহাতে ইহাদিগকে তাহাদের অন্যতম কৰ্তব্য বলিয়া গ্রহণ করে, তদুদ্দেশ্যে তিনি নানাভাবে চেষ্টা করিতে লাগিলেন। ইহার পূর্বে ব্রাহ্মসমাজ জনহিতকর কাৰ্যে আগ্রহের সহিত যােগদান করে নাই। তাই কেশবচন্দ্র বর্জগম্ভীর স্বরে বলিলেন, “ব্রাহ্মসমাজ যদি আমাদের হৃদয়ে প্রবিষ্ট হইয়া থাকে, তবে যেখানে যে প্রকারে হউক, দেশের যাহাতে মঙ্গল হয়, আমরা তাহাতে আপতিত হইব, এবং যাহার মঙ্গলানুষ্ঠানসাধনে তৎপর, তাহাদের সঙ্গে যােগ দিব।” এই বলিয়া তিনি ব্রাহ্মসমাজের এক বিশেষ সভায় প্রস্তাব করিলেন যে, যাহাতে দেশমধ্যে সাধারণের হিতকারিণী বিদ্যাশিক্ষার ব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়, তাহার সদুপায় অবলম্বন করা উচিত। আমাদের দেশে পূর্বে অনেকের এরূপ ধারণা ছিল যে, শিক্ষা- কার্যের উন্নতি ও প্রসার রাজপরুষগণের কাৰ্য। এই ভ্রান্ত ধারণার কেশবচন্দ্র। বশবর্তী হইয়া দেশবাসী জনসাধারণ অনেক সময় রাজপুরুষগণের মুখাপেক্ষী হইয়া বসিয়া থাকিত। তাই অন্যান্য সভ্যদেশের ন্যায় জন- সাধারণের প্রদত্ত অর্থে ও চেষ্টায় জ্ঞানবিজ্ঞানের উন্নতিকল্পে আমাদের দেশে তখনও বহু অনুষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত হয় নাই। সুতরাং এ বিষয়ে দেশবাসীর দায়িত্বজ্ঞান ও কর্তব্য-বােধ উদ্বুদ্ধ করিয়া তুলিবার জন্য কেশবচন্দ্র বক্তৃতাপ্রসঙ্গে বলিলেন- ‘রাজপুরুষেরা যতদূর করিয়াছেন, তাহার জন্য তাঁহাদের প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞ হওয়া উচিত। কিন্তু রাজপুরুষেরা যে সকলই করিবেন, ইহা সম্ভব নহে। তাহাদের হন্তে আরও নানাকাৰ্য্য রহিয়াছে। তাহারা আমাদের জন্য অন্নপৰ্যন্ত পাক করিয়া দিবেন, এরূপ প্রত্যাশা করা যাইতে পারে না। আমাদের আপনাদের যত্ন চাই, অর্থ চাই। বিদ্যা, বল, ধন, যিনি যাহা দিতে পারেন, সকলেই যদি কিছু কিছু করিয়া দেন, তবে সকলের দান একত্র হইলে কিনা হইতে পারে ? আমাদের যদি যথার্থ চেষ্টা থাকে তবে আমরা কিনা করিতে পারি? আমরা সকলেই ঈশ্বরের কর্মচারী, ভূত ; সত্যের প্রাসাদ নির্মাণ কর। আমাদের কাৰ্য। আমরা আপনাদিগকে যত অপদার্থ মনে করি, বাস্তবিক আমরা তাহা নহি। আমাদের অন্তরে ধৰ্ম্মের শিখা রহিয়াছে, আমাদের আত্মাতে ঈশ্বরের ভাব নিহিত আছে।” শিক্ষা বিষয়ে তাহার কতদুর অন্তর্দষ্টি ছিল, তৎকালপ্রচলিত শিক্ষাপ্রণালী সম্বন্ধে তাহার মন্তব্য পাঠ করিলেই উহা সহজে উপলব্ধি করা যায়। তাহার মন্তব্য বর্তমান শিক্ষাক্ষেত্রেও বিশেষ ভাবে প্রযােজ্য। তিনি বলেন- “এখনকার বিদ্যাশিক্ষা-প্রণালী অত্যন্ত দোষাহু, শিক্ষা দিবার ৭৪ চরিত্র-চিত্র। . যে যথার্থ তাৎপর্য তাহা সিদ্ধ হয় না; বুদ্ধিবৃত্তিসকল পরিচালিত হইয়া যাহাতে উন্নত হয়, সে প্রকার নিয়মে শিক্ষা দেওয়া হয় না; কেবল কতকগুলি সত্য উদরস্থ করাইয়া দেওয়া হয় মাত্র। যুবকেরা যৎকালে বিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করে, তখন বিদ্যার প্রতি তাহাদিগের অনুরাগ দেখা যায় বটে, কিন্তু যখন সংসারে প্রবিষ্ট হইয়া তাহারা অর্থসংগ্রহে প্রবৃত্ত হয়, তখন তাহাদের ভাব আর একপ্রকার হইয়া যায়। কেরাণীরাজ্যে একবার প্রবেশ করিলে তাহাদের সকল উৎসাহ নিৰ্বাণ হইয়া যায়।” জনসাধারণের মধ্যে শিক্ষাপ্রচারের প্রয়োজনীয়তা কেবশচন্দ্র বিশেষ ভাবে উপলব্ধি করিয়াছিলেন, এবং তজ্জন্য তিনি যথেষ্ট আগ্রহ ও ব্যাকুলতা প্রদর্শন করিয়াছেন। তিনি বলেন- “বিদ্যার দ্বার কেবল ধনী ও ঐশ্বর্যশালীর নিকট মুক্ত নহে। সাধা- রণ লােকের মন যখন অজ্ঞান ও কুসংস্কারে আচ্ছন্ন রহিয়াছে, তখন কতিপয় লােকের বিদ্যাবলে কি হইতে পারে ? জাতির শৃঙ্খল যাহা আমাদের হৃদয়কে অকাট্য বন্ধনে বদ্ধ করিয়া রাখিয়াছে, তাহা কিরূপে ভগ্ন হইবে? সাধারণ লােকের মন প্রস্তুত না হইলে, দেশের কুরীতির উচ্ছেদসাধন কখনই হইতে পারে না।” বর্তমান সময়ে স্ত্রীশিক্ষার আবশ্যকতা, বােধ হয়, কাহাকেও যুক্তি- তর্কের দ্বারা বুঝাইয়া দিতে হইবে না। স্ত্রীশিক্ষা ভারতীয় স্ত্রীজাতির উপযােগী কিনা সে সম্বন্ধে নানা প্রকার প্রশ্ন হইতে পারে, বর্তমান শিক্ষাপদ্ধতির সংস্কারসাধন অনেকের নিকট যুক্তিসিদ্ধ বলিয়া বােধ হইতে পারে। কিন্তু কেশবচন্দ্র এ সমন্ধে যে সত্য প্রচার করিয়াছিলেন, তাহা চিরকাল আদৃত হইবে এবং সে আদর্শ ভারতের বিভিন্ন সমাজকে স্ত্রীশিক্ষাক্ষেত্রে পরিচালিত করিবে। “এদেশে স্ত্রীলােকদিগের দুরবস্থা দেখিলে হৃদয় বিদীর্ণ হয়। অন্ধকার অধুনাপ্রচলিত কেশবচন্দ্র। ৭৫ কারাগারসমান অন্তঃপুরে যেমন আলােকের পথ রুদ্ধ থাকে, তাহাদের মনও তেমনি অজ্ঞান ও কুসংস্কারের অন্ধকারে আবৃত থাকে। সঙ্গে তাহাদের কোন সম্পর্ক নাই এবং তাহাদের সঙ্গেও দেশের উন্নতির কোন সম্পর্ক নাই। সেই অজ্ঞান ও কুসংস্কারের আবাসস্থান আমাদের অন্তঃপুরে যাহাতে বিদ্যার আলােক প্রবেশ করিতে পারে, তাহার উপায় হইলে দেশের মঙ্গল কখনই নাই।” বর্তমান সময়ে পল্লীস্বাস্থ্যের প্রতি লােকের দৃষ্টি পড়িয়াছে। ম্যালেরিয়া- গ্রস্ত গ্রামবাসিগণের দুর্দশামােচনের জন্য কিছু কিছু চেষ্টা চলিতেছে, এবং রােগীদিগের সেবা-শুশ্রুষ এবং চিকিৎসার বন্দোবস্তও স্থানে স্থানে হইতেছে। কৰ্ম্মীর দল বা সেবকসম্প্রদায় গঠিত হইয়াছে। সমাজসেবার এই ভাব বহু পূর্ব হইতেই পরদুঃখকাতর কেশবচন্দ্রের হৃদয়রাজ্য অধি- কার করিয়া বসিয়াছিল। তাই ১৮৮৩ শকে যখন বঙ্গদেশ জ্বরের প্রবল প্রকোপে উৎস যাইবার উপক্রম হইয়াছিল, সে সময় কেশবচন্দ্র সভাস্থলে মর্মস্পর্শী ভাষায় দেশবাসীয় দুঃখদুর্দশার কথা বিবৃত করিয়া বন্ধুগণকে তনােচনাথ প্রোৎসাহিত করিতে লাগিলেন। তিনি বলিলেন—“এ ভীষণ সময়ে উদাসীন থাকিলে আর চলিবে । এখন কি উদাসীন থাকিবার সময় ? যখন ভাগীরথীতীরস্থ অসংখ্য জনগণ এই বিষম বিপদে পতিত হইয়াছে, ভ্রাতাভগিনীরা চিকিৎসাভাবে, ঔষধাভাবে জরাজীর্ণ হইয়া পথেঘাটে জনশূন্য অবরােধে প্রাণত্যাগ করিতেছে। জিজ্ঞাসা কর তােমাদের হৃদয় কি উত্তর দেয়? আমরা যখন কথা কহিতেছি, এই সময়েই হয়ত কোন মাতা স্বীয় শিশুর মৃত শরীর ক্রোড়ে লইয়া আর্তনাদ করিতেছে, হয়ত কোন নিরীহ শিশু শয্যাশায়ী পীড়িত মাতার নীরস স্তন মুখে দিয়া বারংবার আকর্ষণ করিতেছে। নৌকায় ভ্রমণ করিতে করিতে জাহ্নবীর উভয় কূলে নয়নে কি চরিত্র-চিত্র । রহিয়াছে, ধূমে ; নিরীক্ষণ করিবে, না, রাশি রাশি পরিত্যক্ত শবশষ্যা উপর্যপরি বিস্তৃত অন্তরীক্ষ মেঘের ন্যায় আচ্ছন্ন হইয়াছে ; শােকানলের সহিত কালানলও মুহুর্মুহুঃ প্রজ্বলিত হইয়া অগণ্য শবদেহ ভস্মসাৎ করিতেছে । এবং ভীষণ আর্তনাদে আকাশ কম্পমান ও অনবরত অশ্রুজলে পৃথিবী সিক্ত হইতেছে ; বিষাদাকুলা মাতা মৃতপুত্র ক্রোড়ে লইয়া উচ্চরবে নােদন করিতেছে।” এইরূপ প্রাণস্পর্শী ভাষায় তিনি জনমণ্ডলীকে পরদুঃখমােচনে প্রােৎসাহিত করিতে লাগিলেন ; দুর্দশাগ্রস্ত লােকের সাহায্যকল্পে সকলকে অকাতরে অর্থদান করিতে অনুরােধ করিলেন। রােগক্লিষ্ট নিঃসহায় জনগণের দুঃখদুর্গতি নিবারণের জন্য তাঁহার প্রাণ কাঁদিয়া উঠিল তিনি আর স্থির থাকিতে পারিলেন না। চিকিৎসক নিযুক্ত করিয়া, ঔষধ ও পথ্যাদিসহ, পল্লীতে পল্লীতে প্রেরণ করিলেন। সেবাধৰ্ম্মের মাহাত্ম প্রচার করিয় তিনি যুবকগণকে অগ্নিমন্ত্রে দীক্ষিত করিয়া তুলিলেন। যুবকগণ নিঃস্বার্থভাবে রােগগ্রস্ত লােকের সেবাশুশ্রুষায় নিযুক্ত হইল। আর তিনি নিজে জ্বলন্ত উৎসাহসহকারে বিবিধ উপায়ে অর্থ সংগ্রহ করিতে লাগিলেন। কেশব কলিকাতার সমৃদ্ধিসম্পন্ন সন্ত্রান্তবংশে জন্মগ্রহণ করেন। যৌবনের প্রারম্ভেই তিনি সমস্ত সুখৈশ্বৰ্য্য পরিত্যাগপূর্বক সরল ও সহজ- ভাবে জীবনযাপন করিতে আরম্ভ করেন। বঙ্গের যুবকগণের মধ্যে সুনীতিসম্প্রসারণকল্পে তিনিই সর্বপ্রথম কাৰ্য্যক্ষেত্রে অবতীর্ণ হন। তাহারই দৃষ্টান্ত বঙ্গের শত শত যুবকের জীবনধারা পরিবর্তিত করিয়া দেয়। বলে তিনিই এক নবভাবের ও নবশক্তির সঞ্চার করেন। তাহারই অনুপ্রেরণায় অনুপ্রাণিত শত শত যুবক সমাজসেবায় আত্মনিয়ােগ করিয়া দেশের মুখ উজ্জ্বল করিয়াছেন।
শিশু বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায়
ওবারলিন।
জাতি দেশ বর্ণভেদ,
ধৰ্ম্মভে নাই,
শিশুর হাসির কাছে,
সৰি পড়ে থাকে পাছে,
যেখানে যখনি দেখি-তখনি জুড়াই।
নাহি পর, আপনার,
নাহি দুঃখ সুখ,
দেখিলে তখনি মন
মাধুরীতে নিমগন,
কি যেন উথলি ওঠে পূর্ণ করে বুক!”
-হেমচন্দ্র।
পাশ্চাত্য সভ্যজাতির বর্তমান শিক্ষার ইতিহাস পর্যালােচনা করিলে
আমরা দেখিতে পাই যে, তাহারা শিশুর শিক্ষাবিষয়ে যথেষ্ট আগ্রহ
প্রদর্শন করিতেছেন। ঋষিতুল্য ফ্রোবেলের “কুমার-কানন” শিক্ষা-পদ্ধতি
শিশুর শিক্ষারাজ্যে এক বিপ্লবের সূচনা করিয়াছে। সম্প্রতি ইটালীয় বিদুষী
রমণী ডাক্তার মন্টেসরী তাঁহার “কুমারালয়ে’’ শিশুশিক্ষার এক নব-পদ্ধতি
উদ্ভাবিত করিয়া “কুমার-কানন” শিক্ষা পদ্ধতিকে পরাজিত করিবার
উপক্রম করিয়াছেন। কিন্তু ইহাদেরও পূর্বে যে মহাত্মা সর্বপ্রথম য়ুরােপে
শিশুবিদ্যালয় স্থাপন করেন, এখানে সংক্ষেপে তাহার কথাই বলিব।
আদি শিশুবিদ্যালয়ের সংস্থাপক ও শিশুশিক্ষার পথ-প্রদর্শক
ওবারলিন মধ্য য়ুরােপের ষ্ট্ৰাৰ্গ নামক শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁহার
মাতাপিতা উভয়েই সুশিক্ষিত ও চরিত্রবান ছিলেন। তাহাদের ঐকান্তিক
৭৮ চরিত্র-চিত্র। যত্ন ও চেষ্টায় এবং তাহাদের সদুপদেশ ও সুশিক্ষার প্রভাবে বাল্যকালেই ওবারলিনের হৃদয়ে কোমল বৃত্তিসমূহ বিকশিত হইয়া উঠে। বিপন্নের দুঃখবিমােচন, নিঃস্ব জনের সহায়তাসম্পাদন এবং সমপাদিগের প্রতি সহানুভূতিপ্রদর্শন করিতে পারিলে, একদিকে যেমন তাঁহার পরদুঃখ- কাতর কুসুমকোমল হৃদয় নাচিয়া উঠিত, অপরদিকে কোনরূপ পাপাচরণ সন্দর্শন করিলে তাহার পাপদ্বেষী বজ্রকঠিন হৃদয় পাপবিনাশনে, অত্যাচার নিবারণে, নিগ্রহদমনে সংহারমূর্তি ধারণ করিত। তাঁহার মাতা পুত্রের চরিত্র-গঠনের জন্য বাল্যকালে সযত্নে যে বীজ রােপণ করেন, ভবিষ্যৎকালে তাহাই শাখা-প্রশাখা-বিশিষ্ট প্রকাণ্ড এক মহীরুহে পরিণত হইয়া অসংখ্য নিঃসহায় নরনারীর আশ্রয়স্থল হইয়া দাঁড়ায়। শিক্ষা-সমাপন করিয়া ওবারলিন পিতার ইচ্ছাক্রমে ধৰ্ম্মযাজকের পবিত্র জীবন গ্রহণ করিলেন। তিনি যে স্থানে পেষ্টর বা ধর্মযাজকের পদে নিযুক্ত হইলেন, সে-স্থানটি জানালােক-বঞ্চিত কতিপয় গৃহস্থের আবাসভূমি ছিল। একটি পার্বত্য প্রদেশে এই গ্রামটি অবস্থিত। এইস্থানের অধিবাসি- বৃন্দ সাধারণতঃ কৃষিজীবী। সুখস্বাচ্ছন্দ্যপরিপূর্ণ নগরের বিলাস-দ্রব্য তাহাদের নয়নপথে কখনও পতিত হয় নাই। তাহারা জীবনধারণােপযােগী সামান্য আহারে পরিতুষ্ট, নিরীহ ও ধর্মপরায়ণ; কিন্তু শিক্ষাভাবে তাহাদের হৃদয় অপ্রশস্ত ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন। স্থানটি স্ট্রাসবার্গ-নগর হইতে একদিনের পথ। যাতায়াতের কোনও বন্দোবস্ত ছিল না, নগরের সঙ্গে কোনরূপ সংবও ছিল না। কাজেই শিক্ষার অবস্থা এখানে অতীব শশাচনীয় ছিল। এই গ্রামে একটি ক্ষুদ্র পাঠশালা ছিল। পাঠশালার সেই অপ্রশস্তগৃহে শিশুগণ আবদ্ধ হইয়া থাকিত। তাহাদের পাঠোপযােগ পুস্তক অথবা উপযুক্ত অধ্যক্ষ ছিল না। ওবারলিনের পূর্বে ষ্টাউবার এই স্থানের পেষ্টর ছিলেন। তিনি একদিন ওবারলিন। - সেই পাঠশালায় যাইয়া উপস্থিত হইয়া একটি ছাত্রকে জিজ্ঞাসা করেন, “তােমাদের গুরুমহাশয় কোথায় ?” ছাত্র গৃহকোণে শায়িত এক বৃদ্ধ লােককে দেখাইয়া দিল। ৪াউবার তাহার নিকট যাইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “মহাশয়, আপনি ছাত্রদিগকে কি পড়ান?” সে বলিল, “কিছুই না।” “কিছুই না। এ কিরূপ কথা!” “আমি নিজে কিছুই জানি না। আমি আবার কি পড়াইব?” তখন ষ্টাউবার বলিলেন, “তবে আপনাকে গুরুপদে নিয়ােগ করা হইল কেন?” সেই বৃদ্ধ উত্তর করিল, “মহাশয়, আমি অনেক বৎসর এস্থানের শুকর- রক্ষক ছিলাম। যখন জরাবার্ধক্যপ্রযুক্ত সেকাৰ্য্যে সম্পূর্ণ অক্ষম ও অনুপযুক্ত হইলাম, তখন আমাকে এই শিশুদের ভারগ্রহণ করিতে পাঠাইয়া দেওয়া হইল।” শিক্ষার এইরূপ দুরবস্থা দেখিয়া দেখিয়া মর্মাহত হইয়া, ঔাউবার তনােচনে বদ্ধপরিকর হইলেন। কিন্তু শিক্ষা-ব্যবসায় সাধারণের চক্ষে এত হীন হইয়া পড়িয়াছিল যে, কেহই সেই কাৰ্য্য গ্রহণ করিতে অগ্রসর হইল না। তিনি অবশেষে এক কৌশল অবলম্বন করিলেন। স্কুল-মাষ্টার নাম উঠাইয়া দিয়া তাহাদিগকে তিনি এক নূতন আখ্যা প্রদান করিলেন। তদবধি তাহারা রীজেন্ট নামে অভিহিত হইতে লাগিল। তখন দলে দলে লােক আসিয়া সেই বীজেন্ট বা শান্তার পদের প্রার্থী হইল। তিনি গ্রামস্থ লােকদিগের শিক্ষা-বিধানের জন্য বর্ণমালা এবং আরও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পুস্তক প্রকাশ করিলেন। সেই রক্ষণশীল জনসমাজ কুসংস্কারের বশবর্তী হইয়া এই নব-প্রথার বিরুদ্ধাচারণ করিতে লাগিল। কিন্তু অবশেষে তাহাদের সেই মােহ অপগত হইলে লেখাপড়া শিখিয়া তাহারা বাইবেল পড়িতে সমর্থ হইল। এইরূপে ষ্টাউবার তাহাদের অজ্ঞানান্ধকার ও কুসংস্কার কঞ্চিৎ পরিমাণে দুর করিতে সমর্থ হইলেন।
চরিত্রচিত্র। ওবারলিন আসিয়া ষ্টাউবারের আরকার্য্যের পরিসমাপ্তি ও পূর্ণতা সম্পাদন করিলেন। তিনি বেশ বুঝিতে পারিলেন যে, অক্ষম বৃদ্ধের হস্তে শিক্ষার ভার থাকিলে কোনরূপ সুফল পাওয়া যাইবে না। তাই এক যুবকদল গঠিত হইল। শিক্ষাদানপ্রণালী ও অন্যান্ত জ্ঞাতব্য- বিষয়ে উপদেশ প্রদান করিয়া তিনি তাহাদিগকে শিক্ষাকাষের উপযােগী করিয়া তুলিলেন। এই উৎসাহী যুবকদল শিক্ষাব্ৰত গ্ৰহণ করিয়া শিক্ষার প্রভাব চতুর্দিকে চতুর্দিকে বিস্তার করিতে লাগিল। যে সকল অজ্ঞান মূঢ় লােক প্রথমে এই নৃতম সদনুষ্ঠানের বিরুদ্ধাচরণ করিয়াছিল, তাহারাও এখন নানাপ্রকারে এই অশেষ-কল্যাণকর বিধানের সহায়তা-সাধন করিয়া কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করিতে লাগিল। * বালকদের শিক্ষার সুবন্দোবস্ত হইলে সূক্ষ্মদর্শী ওবায়লিনের দৃষ্টি অন্যদিকে আকৃষ্ট হইল। বাল্যে উপনীত হইবার পূর্বেই, শিগুগণের শৈশবােপযােগী শিক্ষার প্রয়ােজন। কিন্তু তাহাদের শিক্ষার প্রতি মাতাপিতার কোনরূপ মনােযােগ ছিল না। বিশেষতঃ দিবাভাগে তাহাদিগকে জীবিকা নির্বাহের জন্য কঠোর পরিশ্রম করিতে হইত। কাজেই এই সকল শিশুগণের ভার কোনও বৃদ্ধ অক্ষম স্ত্রীলােকের উপর অর্পিত হইত। সেই বৃদ্ধাগণ নিজ নিজ অজ্ঞানতা ও শারীরিক দৌর্বল্য-প্রযুক্ত শিশুদিগকে উপযুক্তৰূপে রক্ষণাবেক্ষণ করিতে পারিত না। ওবারলিনের বিশ্বাস ছিল যে, মাতৃক্রোড় হইতে শিশুগণের শিক্ষা আরম্ভ হয়। শৈশবকালে শিশুগণ অনুকল্পবৃত্তির প্রভাবে ও ক্রীড়া কৌতুকের মধ্য দিয়া ভাল মন্দ, ক্রোধ ক্ষমা, পরিচ্ছন্নতা ও অপরিচ্ছন্নতা প্রভৃতি বিষয়ে শিক্ষালাভ করে। সুতরাং এই শৈশব অবস্থায় তাহাদের শিক্ষা-বিষয়ে মাতাপিতা অমনােযােগী হইলে বিষময় ফল উপস্থিত হইবে। এই দোষ অবধারণমাত্র কর্মপ্রিয়, সমাজসেবী, ওবারলিন শিশু- ওবারলিন। ১ বিদ্যালয়-স্থাপনােদ্দেশ্যে তাহার সমস্ত শক্তি নিয়ােজিত করিলেন। এই কাৰ্য্যে তিনি তাহার বিদুষী সহধর্মিণীর যথেষ্ট সহায়তা লাভ করিয়াছিলেন। তাহার পত্নী কোমল প্রকৃতির কতিপয় প্রাপ্তবয়স্ক মহিলা সংগ্রহ করিয়া তাহাদিগকে শিশু-বিদ্যালয়ের শিক্ষয়িত্রীর উপযােগী শিক্ষা প্রদান করিতে লাগিলেন। ওবারলিন কতিপয় শিশু বিদ্যালয় স্থাপন করিয়া শিশুদিগের শিক্ষার শিক্ষয়িত্রীদিগের হস্তে অৰ্পণ করিলেন। শিক্ষয়িত্রীগণের গ্রাসাচ্ছাদনের উপযুক্ত অর্থ প্রদান করিতে তিনি অসমর্থ ছিলেন। কাজেই প্রথমতঃ সপ্তাহে মাত্র একদিন করিয়া বিদ্যালয়ের কাৰ্য্য চলিতে লাগিল। অন্ত ছয় দিন জীবিকা নির্বাহের জন্য উক্ত মহিলাগণকে অন্যান্য কাৰ্য করিতে হইত। কিন্তু ওবারলিনের অক্লান্ত চেষ্টায় ও উদ্যোগে শীঘ্রই অর্থাভাব বিদূরিত হইল এবং শিক্ষাকার্যপরিচালনের যথেষ্ট উন্নতি সাধিত হইল। শিক্ষয়িত্রীগণ পূর্বেই শৈশৰশিক্ষার উপযোগী বিভিন্ন বিষয়ে নানা- প্রকার শিক্ষা লাভ করিয়াছিলেন। এখন তাঁহারা শিশুবিদ্যালয়ে তঁাহা, দের শিক্ষাপ্রসূত অভিজ্ঞতার ফলে ক্রীড়াকৌতুকের সঙ্গে সঙ্গে গৃহ- কম্মের মধ্যদিয়া অলক্ষিতভাবে শিশুদিগের মানসিক উৎকর্ষ বিধান করিতে লাগিলেন। ক্রীড়া-শীলতা ও চঞ্চত শিশুদিগের সহজ ধর্ম। তাহারা একটা কাজ ভিন্ন ক্ষণকালও স্থির হইয়া বসিয়া থাকিতে পারে । সুতরাং যখন তাহারা কোনরূপ ভাল কাজ দেখিতে পায় না, তখনই তাহারা নানাপ্রকার অকাজ করিয়া গৃহ বা বিদ্যালয়ের উৎপাত বর্ধন করে। এইরূপ অকাৰ্য্য-স্পৃহা দমন করিয়া, মঙ্গলজনক কার্যে তাহাদিগকে নিযুক্ত রাখিবার বন্দোবস্ত করা উচিত, এবং সেই কাজের ভিতরে যাহাতে স্বভাবতঃ আমােদপ্রিয় শিশুগণ একটু বিমল আনন্দ চরিত্র-চিত্র। অনুভব করিতে পারে, তাহার ব্যবস্থা করা আবশ্যক। তাই সূক্ষ্মদর্শী ওবারলিন অপেক্ষাকৃত অধিকবয়স্ক শিশুদিগকে তুলাধুনন শিক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা করিলেন; আর কোমলবয়স্ক বালিকাগণ সূতাকাটা, সেলাই ও বুননকার্য শিক্ষা করিতে লাগিল। যাহারা একেবারে ছোট ও এ সকল কার্যে অক্ষম ছিল, তাহারা বসিয়া বসিয়া বড় ভাইবােনদের কার্যা দর্শন করিয়া আমােদ অনুভব করিত। শিশুগণ যখন এইরূপ কার্যে ব্যাপৃত থাকিত, তখন শিক্ষয়িত্রীগণ তাহাদের নিকট বাইবেল বা অন্যান্য প্রাচীন পুস্তকের নানাপ্রকার গল্প বর্ণনা করিয়া তাহাদিগকে বুঝাইয়া দিতেন। কখনও কখনও বা তাহারা প্রাণিজগৎ-সম্বন্ধে নানাপ্রকার মনােহর গল্প করিয়া শিশুদের তৃপ্তিসাধন করিতেন। যে শিক্ষা পশিব প্রবৃত্তিসমূহ সংষত ও বশীভূত করিয়া শিশুচরিত্রে সত্যপ্রিয়তা, দয়াশীলতা এবং শান্তিপ্রিয়তা বিকশিত করিয়া তােলে, যে শিক্ষা পরম পিতা পরমেশ্বরের অসীম করুণা ও অপার মহিমার উজ্জ্বল চিত্র শিশুদিগের সমক্ষে উপস্থিত করে, যে শিক্ষা দৃষ্টজগতের সৌন্দৰ্য্যসজ্জা ও বিশ্বের মহামিলনমহিমা প্রকাশিত করে, সেইরুপ শিক্ষা যাহাতে অলক্ষিতভাবে শিশুচরিত্রে প্রভাব বিস্তার করতে পারে, ওবারলিনের শিশুবিদ্যালয়ে তজ্জন্য বিশেষ যত্ন ও চেষ্টা করা হইত। শিক্ষয়িত্ৰী শিশুদিগকে ধৰ্ম্মসঙ্গীত, স্তোত্র-পাঠ, ভূগােল ও উদ্ভি, স্কুল স্থূল বিবর শিক্ষা দিতেন। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, বিনয়নম্রতা এবং ভক্তিপরায়ণতার অভ্যাস গঠন করিয়া তুলিবার জন্য সবিশেষ যত্ন লওয়ঃ হইত। কুসুমরাজির সৌন্দৰ্য যাহাতে শিগুনন আকৃষ্ট করিয়া শিশু-প্রকৃতিকে কোমল ও মধুময় করিয়া তােলে, এবং যাহাতে কোমলমতি বালকগণের হৃদয়ে সৌন্দৰ্য্যস্পৃহা ও সৌন্দৰ্যবােধ দিন দিন ওবারলিন বৰ্দ্ধিত হয়, শিক্ষাপ্রদানকালে শিশুবিদ্যালয়ে সে বিষয়ে সবিশেষ দৃষ্টি রাখা হইত। ছয়বৎসর বয়স পর্যন্ত বুদ্ধিবৃত্তি ও নৈতিক গুণের বিকাশােপ যোগী এইরূপ শিক্ষা প্রদত্ত হইত। তাহাদের শিক্ষাদানপ্রণালী এত চিত্তাকর্ষক ছিল যে, শিশুগণ কখনও কোনরূপ বিরক্তি প্রকাশ করিত না। সপ্তবর্ষ বয়সে তাহারা প্রাথমিক শিক্ষালাভের জন্য পাঠশালায় প্রবেশ করিত। এই বালাজীবনে তাহারা শিশুবিদ্যালয়ের সুশিক্ষার মধুময় ফল উপভােগ করিত। অল্পায়াসে তাহারা তখন তাহাদের বাল্যকালােপযােগী শিক্ষা লাভ করিতে সমর্থ হইত। পূৰ্ব্বসঞ্চিত শিক্ষানুরাগ ও অনুসন্ধিৎসাবৃত্তি উত্তরােত্তর বিকশিত হইয়া উঠিত। ধর্মভাব ও নৈতিক জীবনের যে বীজ শিশুবিদ্যালয়ে উপ্ত হইত, তাহা এখানে অঙ্কুরিত হইয়া সুশােভন ভবিষ্যৎ জীবনের আভাস প্রদান কতি। ওবারলিন নিজে এই সকল শিশুবিদ্যালয়ের তত্ত্বাবধান করিতেন। সপ্তাহে একদিন তিনি বিদ্যালয়ের অপােগও শিশু ভিন্ন অন্যান্য সকল ছাত্রকে ডাকিয়া আনিয়া নিজ গৃহপ্রাঙ্গণে একত্র করিয়া তাহাদের পরীক্ষা গ্রহণ করিতেন। সপ্তাহে একদিন তিনি তাহাদের ধৰ্ম্মসঙ্গীত ও স্তোত্রপাঠ শ্রবণ করিতেন এবং তারপর ধর্মবিষয়ক নূতন উপদেশ প্রদান করিতেন। তাহার স্বর এত কোমল, চিত্তাকর্ষক ও স্নেহপূর্ণ ছিল যে, তাহার উপদেশ-বাক্যগুলি সকলে মন্ত্রমুগ্ধব শ্রবণ করিত। শিশুগণ তাঁহাকে এত ভালবাসিত যে, তাহারা ওবারলিনের উপদেশ- বাক্য শুনিবার জন্য ছয়দিন পর্যন্ত উদগ্রীব হইয়া থাকিত এবং সপ্তম দিনে তাহার সহাস্যবদন-নিঃসৃত কথামৃত সাদরে ও পরমপরিতােষ- সহকারে পান করিত।
১৪ চরিত্র-চিত্র। বারলিন শিশুদিগের ব্যবহারের জন্য তাহাদের পাঠোপযােগী মনােহর ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পুস্তক-পরিপূর্ণ পাঠাগার প্রতিবিদ্যালয়ে স্থাপন করিলেন। এই সময় তাহার মনে একটি সম্পূর্ণ নূতন মৌলিক চিন্তা উপস্থিত হইল। তাহার জীবিতকালে সকল স্থানে ইহা কার্য্যে পরিণত হয় নাই, কিন্তু স্কটল্যাণ্ড পরে তঁাহার উদ্ভাবিত অভিনব প্রণালী প্রবর্তিত করিয়া শিক্ষা-প্রচারের যথেষ্ট সহায়তা করিয়াছে। তিনি ভ্রমণশীল পাঠাগার যুবােপে প্রথম প্রবর্তিত করেন। কয়েকখানি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পুস্তক একটি পুস্তকাধারে তিন মাস পর্যন্ত এক গ্রামে থাকিত। সেই গ্রামের সমস্ত লােক সেই তিন মাস উক্ত পুস্তকসমূহ পাঠ করিয়া বিমল আনন্দ ও প্রয়োজনীয় জ্ঞান লাভ করিত। তিন মাস অন্তে সেই পুস্তকার অন্য এক গ্রামে স্থাপন করা হইত। এইরূপে সমস্ত গ্রামে তিন তিন মাস অন্তর এই পুস্তকধার ঘুরিয়া ঘুরিয়া বেড়াইত। আর গ্রামবাসিগণ নিজ নিজ বাড়ীতে বসিয়া জ্ঞানবৃদ্ধির ও আনন্দলাভের এই অপূর্ব সুযোগ পাইয়া ওবারলিনকে ধন্ঠ ধন্য করিত। ইহা প্রায় দেড় শত বৎসর পূর্বের কথা। যখন বঙ্গদেশে ইংরাজ- শাসনের সূত্রপাত হয়, সেই সময়ে জৰ্মাণ-রাজ্যে এই বিদ্যালয় স্থাপিত হইয়াছিল। সে সময় হইতে এ পর্যন্ত বঙ্গদেশে রাজনীতিক্ষেত্রে ও সমাজ- মধ্যে অনেক পরিবর্তন সংঘটিত হইয়াছে। কিন্তু শিক্ষাক্ষেত্রে ন্যূরাপে দেড়শত বৎসর পূর্বে যে সত্যটি আবিষ্কৃত হইয়াছিল, যে সত্যের প্রচারকল্পে উক্ত মহাদেশে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নশিক্ষা-সংস্কারক প্রাণপাত চেষ্টা করিয়াছেন, সেই সত্যটি এখনও আমরা উপলব্ধি করিতে পারি নাই। ইহা বিস্ময়ের বিষয় সন্দেহ নাই। ইহা আমাদের অপূর্ণ ও অঙ্গহীন শিক্ষারই পরিচায়ক। য়ুরােপের দৃষ্টান্ত অনুকরণ করিয়া আমেরিকা ও
ওবারলিন।
৮
জাপান এই দেড়শত বৎসরের মধ্যে শিক্ষারাজ্যে কত উন্নতি সাধন
করিয়াছে। আর আমরা বর্তমান-অন্ধ ভারতবাসী প্রাচীন শিক্ষা ও
সভ্যতার কাল্পনিক গৌরবে গৌরব অনুভব করিয়াই সন্তুষ্ট। তাই কবির
ভাষায় বলিতে ইচ্ছা হয়—
“আর ঘুমাইও না, দেখ চক্ষু মেলি',
দেখ দেখ চেয়ে অবনীমণ্ডলী
কিবা সুসজ্জিত, কিবা কুতূহলী
বিবিধ মানবজাতিরে লয়ে।”
সমাজসেবায় বিবেকানন্দ। "সত্যের হইব অনুচর, দুস্কৃতি, অনৈক্য, অনাচার, মিছ মান, মিছা অপমান, দেখিবনা রাখিবনা আর। পীড়িতের ঘুচাইব ভার, প্রতিষ্ঠিব ন্যায় সিংহাসন, পতিতের করিতে উদ্ধার উৎসর্গ করিব তনু মন।” কামিনী রায়। রামকৃষ্ণ মিশন ত্যাগ ও সেবাধৰ্ম্মের যে মহান্ আদর্শ ভারতের যুবক- গণের সমক্ষে ধারণ করিয়াছে, সেই আদর্শে অনুপ্রাণিত হইয়া আজ শত শত যুবক সন্ন্যাসব্রত অবলম্বনপূর্বক সমাজসেবায় দেহ-মন-প্রাণ উৎসর্গ করিয়াছে। “আত্মনাে মােক্ষর্থং জগদ্ধিতায় চ”—ইহাই তাহাদের বেদমন্ত্র হইয়াছে। নিঃস্বার্থভাবে পরসেবা করিতে পারিলেই তাহার নিজদিগকে কৃতার্থ জ্ঞান করে। দেশে মহামারী উপস্থিত হইল, আর রামকৃষ্ণ মিশনের সেবকদল নিজ নিজ জীবন বিপদাপন্ন করিয়া ব্যাধিগ্রস্তলােকের সেবা- শুশ্রুষায় নিযুক্ত হইল। শুনতে পাইল, কোন স্থানে কোন দূরদেশে লােকগণ অনাহারে মৃত্যুমুখে পতিত হইতেছে, অমনি রামকৃষ্ণ মিশনের সেবকদল দুর্ভিক্ষক্লিষ্ট লোকের সাহায্যার্থ ধাবিত হইল। খবর আসিল, উত্তরবঙ্গে প্রবল বন্যা দেশ প্লাবিত করিয়া গৃহস্থের আবাসগৃহ ভূমিসাৎ বিবেকানন্দ
No text on this page.
বিবেকানন্দ। ৮৭ . করিয়া গোমহিষাদি কোথায় ভাসাইয়া লইয়া গিয়াছে, আর অমনি কশ্মীর দল সেই দুর্দশাগ্রস্ত লােকের দুর্দশামোচনে অগ্রসর হইল। ব্রহ্মপুত্রের অষ্টমী-স্নানে, গঙ্গাসাগরতীর্থে, হরিদ্বারের কুম্ভমেলায়—যে যে স্থানে পুণ্য- প্রয়াসী লক্ষ লক্ষ লােক সমবেত হইতেছে। সেই সেই স্থানেই রামকৃষ্ণ মিশনের যুবকগণ দলবদ্ধ হইয়া তীর্থযাত্রীর সুখসুবিধার সুবন্দোবস্তের জন্য আহারনিদ্রা ত্যাগ করিয়া দিবারাত্র কঠোর পরিশ্রম করিতেছে। কত পিতৃমাতৃহীন অনাথ শিশুকে জাতিবর্ণনির্বিশেষে তাহারা আশ্রয়দান করিতেছে, কত নিরক্ষর লোকের অজ্ঞানান্ধকার ও কুসংস্কার দূরীকরণার্থ তাহারা প্রাণপণ চেষ্টা করিতেছে, তাহার ইয়ত্তা করা অসম্ভব। সমাজ-সেবার এই অপূৰ্ব্ব ভাবটি ধর্মপ্রাণ বীরহৃদয় বিবেকানন্দ হইতে ধীরে ধীরে তাহার শিষ্য প্রশিষ্যে বিস্তৃত হইয়া পড়িয়াছে। সুখের ক্রোড়ে লালিত-পালিত সুশিক্ষিত যুবক বিবেকানন্দ বৈরাগ্য ও ত্যাগের যে মহান আদর্শ নিজ জীবনে প্রদর্শন করিয়াছেন, তাহাই আজ শত শত শিক্ষিত যুবককে অনুপ্রাণিত করিয়া পরসেবার অগ্নিমন্ত্রে দীক্ষিত করিতেছে। নানাদেশ ভ্রমণ করিয়া বিবেকানন্দ বুঝিতে পারিলেন যে, ধর্মশাস্ত্রালােচনা ও ক্রিয়াকাণ্ড লইয়া ব্যস্ত থাকিলে পরমহংসদেবের শিষ্যগণ দেশের প্রকৃত মঙ্গল সাধন করিতে পারিবে না; তাহাদিগকে দেশের দুঃখদারিদ্র ও অজ্ঞানান্ধকার দূরীকরণের উপায় উদ্ভাবন করিতে হইবে। তাই স্যবদ্ধ হওয়ার প্রয়ােজনীয়তা তিনি প্রাণে প্রাণে অনুভব করিতে লাগিলেন। অবশেষে তাহার প্রস্তাবানুসারে ১৮৯৭ খৃষ্টাব্দে “রামকৃষ্ণ মিশন” সর্বপ্রথম গঠিত হইল। এই রামকৃষ্ণ মিশন” যে কতৃভাবে দেশের ও সমাজের সেবা করিতেছে, তাহা বলিয়া শেষ করা যায় না। উহাদের উন্নত ও উদার ধর্মভাবের কথা এখানে উল্লেখ নাই করিলাম। কিন্তু তাহারা সেবাধৰ্ম্মের যে উচ্চ আদর্শ সৰ্বসমক্ষে চরিত্র-চিত্র। উপস্থাপিত করিয়াছেন, তাহা জাতিধর্মনির্বিশেষে সকলেই আগ্রহভরে এহণ করিবে। বিবেকানন্দ সেবাধর্মকে কিরূপ উচ্চ আসন প্রদান করিয়াছেন, তাহা এই একটিমাত্র বাক্য হইতেই পরিস্ফুট হইবে- “ফিলসফি, যােগ, তপ, ঠাকুরঘর, আলােচাল, কলামূলা—এই সব ব্যক্তিগত ধৰ্ম্ম, দেশগত ধৰ্ম্ম ; পরােপকারই এক সাৰ্বজনীন মহাব্রত।” দরিদ্রকে নারায়ণজ্ঞানে সেবা করিয়া তিনি বিমল আনন্দ অনুভব করিতেন। রামকৃষ্ণপরমহংসদেবের জন্মােৎসব উপলক্ষে বেলুড়মঠে প্রতিবৎসর দরিদ্রনারায়ণের সেবার যে বিরাট আয়ােজন হইয়া থাকে, বিবেকানন্দই উহার সূত্রপাত করেন। সেই দিন বেলুড়মঠে যে মােহন দৃশ্য প্রকটিত হয়, তাহা দেবতারও উপভােগ্য। নানাস্থান হইতে, শিক্ষিত অশিক্ষিত, ধনী নিধন, বালক, যুবক ও বৃদ্ধ সেখানে সমবেত । সকলের বদনেই ধর্মের ছায়া প্রতিভাত। সংসারের দুঃখক, জ্বালাযক্ষ্মণ এবং পাপতাপের কথা মুহূর্তের জন্য বিস্মৃত হইয়া তাহারা ভগবানের নামগানে উন্মত্ত। কীৰ্ত্তনান্তে জাতিভেদ বিস্মৃত হইয়া সকলে প্রাঙ্গণে একসঙ্গে আহারে উপবিষ্ট। আহাৰ্য্য পদার্থে কোনরূপ মৎস্যমাংসের ব্যবস্থা নাই, আছে শুধু স্বচ্ছন্দ-বনজাত শকিশবজি। অহিংসা ও সমদর্শিতার ইহা অপেক্ষা উজ্জ্বলতর দৃষ্টান্ত আর কি হইতে পারে ? রুগ্ন ও আর্নের দুর্দশামােচনে বিবেকানন্দ সর্বদা ব্যর্থ ছিলেন। নিজের স্বাস্থ্যসুখ বিসর্জন দিয়া তিনি তাহাদের সেবায় রত থাকিতেন। ১৮৯৯ খৃষ্টাব্দে মাৰ্চমাসে বায়ুপরিবর্তনের জন্য তিনি দার্জিলিং গমন করেন। সেইখানে কিছুদিন অবস্থানের পর ধীরে ধীরে তাহার স্বাস্থ্যের উন্নতি হইতে লাগিল। এমন সময় হঠাৎ তিনি সংবাদ পাইলেন যে কলিকাতায় মহামারী ভীষণাকার ধারণ করিয়াছে। প্রত্যহ শত শত বিবেকানন্দ। লােক কালের করালগ্রাসে পতিত হইতেছে। ইহা শুনিয়া মহাপ্রাণ বিবেকানন্দের হৃদয়তন্ত্রীতে করুণ সুর বাজিয়া উঠিল। তিনি শৈল- শিখরে আর এক মুহূর্তও অবস্থান করিতে পারিলেন না। নিজের শারীরিক অসুস্থতাসত্ত্বেও অবিলম্বে কলিকাতায় প্রত্যাবর্তন করিলেন। বিবেকানন্দের তত্ত্বাবধানে রামকৃষ্ণ মিশনের কর্মীর দল রােগীর সেবায় নিযুক্ত হইল। ভগিনী নিবেদিতা আসিয়া বিবেকানন্দের পার্শ্বে দাড়াইলেন। কলিকাতায় একটি প্রশস্ত মুক্ত স্থান সংগ্রহ করিয়া তথায় তাহারা একটি ছােটখাট সেবাশ্রম নির্মাণ করিল। সেবকগণ বিভিন্ন দলে বিভক্ত হইল। একদল পল্লীতে পল্লীতে ঘুরিয়া প্লেগরােগ- স্ত নরনারীকে সেই আশ্রমে আনয়ন করিতে লাগিল। অপরদল আহারনিদ্রা ত্যাগ করিয়া তাহাদের শুশ্রুষায় রত হইল। তাহাদের অক্লান্ত পরিশ্রম ও প্রণিপাত সেবায় সেইবার বহুলােক মৃত্যুমুখ হইতে রক্ষা পাইল। মৃত্যুকে অগ্রাহ্য করিয়া কিরূপে দেবতাজ্ঞানে দরিদ্রের সেবা করিতে হয়, উহার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত কৰ্ম্মবীর বিবেকানন্দ দেশবাসীর সমক্ষে ধারণ করিলেন। সমগ্র মানবমণ্ডলী তাহাকে ধন্য ধন্য করিতে লাগিল। দেশবাসীর অজ্ঞানতা ও কুসংস্কার দেখিয়া তিনি ব্যাকুল হইয়া উঠিলেন। ভারতের দুর্দশা দেখিয়া তাহার হৃদয় বিদীর্ণ হইল। কতলােক শিক্ষার অভাবে অজ্ঞানান্ধকারে আচ্ছন্ন হইয়া হীন জীবন যাপন করিতেছে, কুসংস্কারের বশবর্তী হইয়া কত লােক প্রকৃত মনুষ্যত্ব হারাইয়া ফেলিয়াছে, হিতাহিতবিবেচনাশক্তির অভাবে কতলােক দুক্ৰিয়াসক্ত হইয়া সমাজমুখে কালিমা লেপন করিতেছে! ইহা দেখিয়া বিবেকানন্দের ন্যায় স্বদেশ- প্রাণ কর্মী তাহাদের উদ্ধারসাধনে অগ্রসর না হইয়া কি থাকিতে পারেন? ভাতের দরিদ্র ও অজ্ঞ লােকের অপরিসীম দুঃখদুর্গতির কথা ভাবিয়া চরিত্র-চিত্র। বিবেকানন্দের ভাবপ্রবণ হৃদয় বিগলিত হইল। তিনি আমেরিকা হইতে তাঁহার এক বন্ধুকে লিখিলেন- “এই যে গরীবগুলাে পশুর ন্যায় জীবন যাপন করছে, তার কারণ মুখতা। সকলে মিলে একটা যুক্তি কর। গােটাকতক ক্যামেরা, কতগুলি ম্যাপ, গ্লোব, কিছু রাসায়নিক দ্রব্য চাই। তারপর মস্ত একটা কুঁড়ে চাই। তারপর কতকগুলাে গরীবগুবাে জুটিয়ে আনা চাই। কোন্ দেশে কি হয়, কি হচ্ছে, দুনিয়াটা কি, তাদের যাতে চোক্ খুলে, তাই চেষ্টা কর। সন্ধ্যের পরে দিন দুপুরে কত গরীব মূখ আছে, তাদের ঘরে ঘরে যাও, চো খুলে দাও। পুতিপাতড়ার কৰ্ম্ম নয়- মুখে মুখে শিক্ষা দা” আমাদের দেশে একদল লােক আছেন, যাঁহারা সাধারণের শিক্ষা ও স্বাধীনতার বিরােধী। তাহারা মনে করেন যে সাধারণ লােক শিক্ষিত ইলে সমাজে একটা বিশৃঙ্খলা উপস্থিত হইবে এবং সমাজের উচ্চপদস্থ লােকের স্বার্থে ব্যাঘাত ঘটিবে। তদুত্তরে বিবেকানন্দ বলিতেছেন- “যাহার বলেন যে অজ্ঞ বা গরীবদিগকে স্বাধীনতা দিলে অর্থাৎ তাহাদের শরীর, ধন ইত্যাদিতে পূর্ণ অধিকার দিলে এবং তাহাদের সন্তানদের, ধনী এবং উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের সন্তানদের ন্যায়, জ্ঞানার্জনে এবং আপনার অবস্থা উন্নতি করিবার সমান সুবিধা দিলে, তাহারা উচ্ছল হইয়া যাইবে, তাহারা কি একথা সমাজের কল্যাণের জন্য বলেন অথবা স্বার্থে অন্ধ হইয়া বলেন ? ইংলণ্ডেও একথা শুনিয়াছি, ছােটলােকেরা লেখাপড়া শিখিলে আমাদের চাকুরী কে করিবে ? “মুষ্টিমেয় ধনীদের বিলাসের জন্য লক্ষ লক্ষ নারীর অজ্ঞতার অন্ধকারে ও অভাবের নরকে ডুবিয়া থাকুক ; তাহাদের ধন হইলে বা তাহারা বিদ্যা শিখিলে, সমাজ উচ্ছন্ন যাইবে !
বিবেকানন্দ। সমাজ কে ? লক্ষ লক্ষ তাহারা? না, এই তুমি আমি দশজন বড় জাত!! জনসাধারণের ধর্মশিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে কৃষি, শিল্প, বাণিজ্য প্রভৃতি কাৰ্যকরী শিক্ষা প্রচারের প্রয়ােজনীয়তা বিবেকানন বিশেষভাবে অনুভব করিয়াছিলেন। কিন্তু বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করিয়া জনসাধারণের মধ্যে শিক্ষাপ্রসারকাৰ্য সুসম্পন্ন হইবে কিনা, সে বিষয়ে তাহার ঘাের সন্দেহ ছিল। ভারতের লােক এত দরিদ্র যে তাহারা তাহাদের অপ্রাপ্তবয়স্ক পুত্রগণের সাহায্যে কিছু কিছু অর্থোপার্জনের লােভ সংবরণ করিতে পারে না। সুতরাং তাহাদের জন্য অবৈতনিক বিদ্যা- লয় স্থাপিত হইলেও তাহারা তথায় তাহাদের সন্তানদিগকে প্রেরণ করিবে কিনা সন্দেহ। তাই দরিদ্রের গৃহে গৃহে শিক্ষাপ্রচারের উদ্দেশ্যে যাহাতে একটি নিঃস্বার্থ কৰ্ম্মীর দল গঠিত হইতে পারে, সেই উদ্দেশ্যে সাহায্যপ্রার্থী হইয়া তিনি মহীশূরের ভূতপূৰ্ব্ব মহারাজকে লিখিলেন- “ভারতের সমুদয় দুর্দশার মূলে জনসাধারণের দারিদ্র। পাশ্চাত্য- দেশের দরিদ্রগণ পিশাচপ্রকৃতি, আর আমাদের দেবপ্রকৃতি। সুতরাং আমাদের পক্ষে দরিদ্রের উন্নতিসাধন অপেক্ষাকৃত সহজ। আমাদের নিম্নশ্রেণীর জন্য কর্ত্তব্য এই, কেবল তাহাদিগকে শিক্ষা দেওয়া।” জনসাধারণের মধ্যে শিক্ষাবিস্তার ভারতের ভবিষ্যৎ উন্নতির জন্য যতটা আবশ্যক, স্ত্রীশিক্ষাপ্রচারও ততটা প্রয়ােজনীয়। স্ত্রীজাতি ভারতের ভবিষ্যৎ বংশধরগণের জননী। তাহারা সুশিক্ষিত না হইলে, শুধু পুরুষের কি সাধ্য যে দেশকে উন্নত করিতে পারে? আমেরিকার স্ত্রীজাতির উন্নত অবস্থা দেখিয়া বিবেকানন্দের এই বিশ্বাস দৃঢ়তর হইয়াছিল। আমেরিকার রমণীগণ দেশের কল্যাণকর অনুষ্ঠানে যতদুর সহানুভূতি ও অনুরাগ প্রদর্শন করে, পুরুষগণ তাহার শতাংশের একাংশও করে কিনা সন্দেহ।
১২ চরিত্র-চিত্র। পুরুষগণ সাধারণতঃ অর্থের দাস, অর্থসঞ্চয়ই তাহাদের জীবনের প্রধান লক্ষ্য। তাই আমেরিকার নারীসম্বন্ধে বিবেকানন্দ বলিতেছেন- “ইহাদের রমণীগণ সকল স্থানের রমণীগণ অপেক্ষা উন্নত ; আবার সাধারণতঃ আমেরিকান্ নারী আমেরিকান্ পুরুষ অপেক্ষা অধিক শিক্ষিত ও উন্নত। পুরুষ অর্থের জন্য সমুদয় জীবনটাকেই দাসত্বশৃঙ্খলে আবদ্ধ করিয়া রাখে, আর স্ত্রীলােকেরা সবকাশ পাইয়া আপনাদের উন্নতি চেষ্টা করে। আর এরা কেমন স্বাধীন, সকল কাৰ্য্য এরাই করে। স্কুল কলেজ মেয়েতে ভরা। পৃথিবীর আর কোথাও স্ত্রীলােকের এত অধিকার নাই। ক্রমশঃ তাহারা সব তাহাদের হাতে লইতেছে ; আর আশ্চর্যের বিষয় এখানে শিক্ষিত মহিলার সংখ্যা শিক্ষিত পুরুষ হইতে অধিক। আমাদের পােড়া দেশে মেয়েদের পথে চার যাে নাই।” “জগতের কল্যাণ স্ত্রীজাতির অভ্যুদয় না হইলে সম্ভাবনা নাই; এক পক্ষে পক্ষীর উত্থান সম্ভব নহে। সেইজন্যই আমার স্ত্রীমঠ স্থাপনের জন্য প্রথম উদ্যোগ। উক্ত মঠ গার্গী, মৈত্রেয়ী এবং তদপেক্ষা আরও উচ্চতর ভাবাপন্ন নারীকুলের আধারস্বরূপ হইবে।” বিবেকানন্দের এই সঙ্কল্প কার্যে পরিণত করিবার জন্য তাহার উপযুক্ত শিষ্যা ভগিনী নিবেদিতা আত্মনিয়ােগ করিয়াছিলেন। ভারতরমণীগণের মধ্যে যে অপূৰ্ব শক্তি নিহিত রহিয়াছে, তাহা জাগ্রত করিয়া তুলিবার জন্য তিনি জাতীয়ভাবে শিক্ষাপ্রদানের উদ্দেশ্যে কলিকাতায় বােসপাড়ার একটি ছােট গলিতে এক ক্ষুদ্র বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করিয়াছিলেন। ভারতললনাগণের ত্যাগ ও প্রেমের যে মহান্ ভাব পরিবারের সঙ্কীর্ণ গণ্ডীর মধ্যে আবদ্ধ রহিয়াছে, উহা মানবজাতির কল্যাণার্থ বিস্তৃত ক্ষেত্রে প্রসারিত করিবার জন্য যেরূপ শিক্ষার প্রয়ােজন, সন্ন্যাসব্রতধারিণী মনস্বিনী নিবেদিতা সেইরূপ শিক্ষা প্রদানের শুভ সঙ্কল্প লইয়াই এই বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা বিবেকানন্দ। ১৩ করিয়াছিলেন। বিবেকানন্দের অনন্যসাধারণ চরিত্রবল, অলোকসামান্য সত্যানুরাগ, অপূৰ্ববৃষ্ট ত্যাগধর্ম ও সৰ্ববিজয়ী প্রেম নিবেদিতার হৃদয়ের উপর এক অপূৰ্ব্ব প্রভাব বিস্তার করিয়াছিল। আর ইংলণ্ডবাসিনী সেই বিদুষী রমণী, নিজ দেশ, নিজ সমাজ ও সুখসৌভাগ্য চিরতরে বিসর্জন দিয়া, তাহার গুরুর চিরপােষিত আশা পরিপূরণার্থ ভারতবর্ষকে তাহার নিজ দেশরূপে গ্রহণ করিয়া ভারতীয় স্ত্রীজাতির উন্নতিবিধানার্থ জীবন উৎসর্গ করিয়াছিলেন। ইংলণ্ড ও আমেরিকার এইরূপ আরও অনেক নরনারী দিগ্বিজয়ী বিবেকানন্দের শিষ্যত্ব গ্রহণ করিয়া তৎপ্রচারিত ধর্মমত ও তৎপ্রদর্শিত কর্মপথ অবলম্বন করিয়াছেন। শুধু ভারতে নয়, পৃথিবীর এক প্রান্ত হইতে অপর প্রান্ত পৰ্য্যন্ত, বিবেকানন্দের প্রভাব বিস্তৃত হইয়া পড়িয়াছে। বিবেকানন্দ উনচল্লিশ বৎসর মাত্র জীবিত ছিলেন। এই অল্প সময়ের মধ্যে তিনি এত শাস্ত্ররত্নের উদ্ধারসাধন ও এত হিতকর কাৰ্য্যের অনুষ্ঠান করিয়া গিয়াছেন যে, তাহা স্মরণ করিলে হৃদয়ে যুগপৎ বিস্ময় ও ভক্তির উদ্রেক না হইয়া থাকিতে পারে না। দর্শনের শুস্ক তত্ত্ব বা ভক্ত জীবনের কৰ্ম্মবিমুখ উদাসীনতা তাহাকে কর্মক্ষেত্র হইতে দূরে রাখিতে সমর্থ হয় নাই। তিনি একাধারে জ্ঞানবীর, কর্মবীর ও ধর্মবীর ছিলেন। ধর্মের বিজয়বাৰ্তা ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে তিনি কর্মের মাহাত্মও প্রচার করিয়াছেন। সত্যের অনুচর বিবেকানন পীড়িতের ও পতিতের উদ্ধারসাধনমানসে যে বিজয়দুন্দুভি নিনাদিত করিয়া সকলকে কর্মক্ষেত্রে আহ্বান করিয়াছিলেন, তাহা আজও বঙ্গময় প্রতিধ্বনিত হইতেছে। বঙ্গের গৃহে গৃহে যুবকের প্রাণে দরিদ্রনারায়ণের সেবার যে উদার ভাব জাগিয়া উঠিয়াছে, তাহা বিবেকানন্দেরই দান।
রুগ্নর সেবায় ফ্লোরেন্স নাইটিংগেল। “পরে সা ভালবাসে, পরের মুখের আশে চির আত্মবিৰ্জ্জুন, চির আত্মদান! ব্যখিতে পড়িলে মনে ধারা ব’য় দু'নয়নে, হৃদি তলে সদা চলে প্রেমের তুফান!” -মানকুমারী ; উনবিংশ-শতাব্দী দ্বিতীয় পাদ অতিক্রম করিয়া তৃতীয় পদে পদার্পণ করিয়াছে ; রুশিয়ার দক্ষিণে ক্রিমিয়া প্রদেশে তুমুল সংগ্রাম চলিতেছে। একপক্ষে রুশিয়া, অপর পক্ষে তুরস্কের সুলতান, ফরাসী ও ইংরাজ। দুর্বল তুরস্ককে ক্ষমতা-লােলুপ রাজ্য-পিপাসু জারের করালগ্রাস হইতে রক্ষা করিবার জন্য ইংরাজ আজ সুলতানের পার্শ্বে রণক্ষেত্রে দণ্ডায়মান। রুশিয়া আজ : তুরস্ককে তাহার স্বাধীনতাধনে বঞ্চিত করিয়া অধীনতা পাশে আবদ্ধ করিতে প্রয়াস পাইতেছে দেখিয়া, স্বাধীনতার লীলাভুমি ইংলণ্ডের অধিবাসিবৃন্দ ন্যায়ের ও সত্যের মর্যাদা অক্ষুন্ন রাখিবার জন্য স্বীয় মস্তকে বিপদ ডাকিয়া আনিয়াছে। বিরাম নাই, বিশ্রাম নাই, অনবরত যুদ্ধ চলিতেছে। কুশিয়া দেশে দুরন্ত শীত আরম্ভ হইয়াছে। তুষার-সমাচ্ছন্ন উত্তর প্রদেশ হইতে হিমবাত প্রবাহিত হইয়া যুদ্ধক্লিষ্ট, সৈনিকগণকে প্রপীড়িত করিতেছে। সঙ্গে সঙ্গে মুষলধারে বৃষ্টি পড়িতেছে। ফুক্ষেত্রে
।
.
ফ্লোরেন্স নাইটিসেল
No text on this page.
ফ্লোরেন্স নাইটিংগেল । বন্যাপ্লাবিত শিবির-মধ্যে একফুট পরিমিত জল দাঁড়াইয়াছে। সৈন্য- গণের দুর্দশার সীমা নাই। এমন সময়ে আবার ক্রিমিয়ার দক্ষিণে কৃষ্ণসাগরে ভয়ঙ্কর ঝড় উপস্থিত হইল। দেখিতে না দেখিতে সাগর- বক্ষ বিক্ষোভিত হইয়া উঠিল ; উত্তাল তরঙ্গমালা বেলাভূমিতে ভীম- বেগে আয়াত করিতে লাগিল। অর্ণবপােতসমূহ আত্মরক্ষায় বৃথা প্রয়াস পাইয়া সাগরগর্ভে বিলীন হইল। তীরভূমিতে সন্নিবেশিত শিবিরসমূহ প্রমত্ত প্রভঞ্জনের প্রচণ্ড প্রকোপ সহ্য করিতে না পারিয়া ভূমিসাৎ হইল। ইংলণ্ড হইতে যে সকল জাহাজ দুর্দশাগ্রস্ত সৈনিক- গণের আহার-সামগ্রী, পরিধেয় বস্ত্র, ঔযধ-পত্র ও অন্যান্য অতিপ্রয়ােজনীয় দ্রব্য বহন করিয়া আনন্দভরে যুদ্ধক্ষেত্রে আগমন করিতেছিল, দৈব বিড়ম্বনায় তাহারা এই কালান্তক ঝড়ে বিনষ্ট হইল। যুদ্ধক্ষেত্রে সৈনিক-পুরুষগণের অবর্ণনীয়, অননুমেয় ও অপরিসীম দুঃখ- দুর্গতি উপস্থিত হইল। শ্ৰমাবসন্ন যােদ্ধবৃন্দ ইন্ধনের অভাবে অপক অন্ন আহার করিয়া, কখনও বা অভুক্ত অবস্থায় দিন কাটাইতে লাগিল। হিমক্লিষ্ট কম্পিত কলেবর জীর্ণবস্ত্রে আবৃত করিয়া তাহারা অতিকষ্টে অর্ধমৃতবৎ রাত্রি যাপন করিত ; আদ্র ভূমিশয্যায় শ্রান্ত ক্লান্ত দেহ স্থাপন করিয়া কথঞ্চিৎ নিদ্রাসুখ উপভােগ করিয়াই তাহারা সন্তুষ্ট থাকিত। তথাপি জাতীয় গৌরব ও মৰ্য্যাদা-রক্ষার্থ তাহারা প্রকৃত বীরের ন্যায় অম্লানবদনে প্রাণপণ যুদ্ধ করিতে ক্ষান্ত হইল না। কিন্তু রক্তমাংসের শরীরে আর কত সহ হয়! অনশন-ক্লিষ্ট শ্রান্তক্লান্ত শীতার্ত সৈন্যগণ অচিরে পীড়াগ্রস্ত হইয়া পড়িল। শত শত রুগ্ন সৈনিক হাসপাতালের আশ্রয় গ্রহণ করিল। কিন্তু উপযুক্ত ঔষধ, পরিৰ্থিত বস্ত্র, সুপথ্য ও নিয়মিত শুশ্রুষার অভাবে বহু বীরপুরুষ অকালে মৃত্যুমুখে পতিত হইল। শুনিলে শরীর শিহরিয়া উঠে যে, যুদ্ধকালে চরিত্র-চিত্র। উপযুক্ত চিকিৎসা ও শুশ্রুষার অভাবে হাসপাতালে ১৮,০৫৮ জন লােক প্রাণত্যাগ করে। যুদ্ধক্ষেত্রে যাহারা নিহত হয়, তাহাদের সংখ্যা মাত্র ১,৫৯৮ জন। হাসপাতালের অবস্থা তখন কিরূপ শােচনীয় ছিল, ইহা হইতে তাহা সহজেই অনুমান করা যাইতে পারে। তথায় কয়েক- জনমাত্র শুশ্রুষাকারিণী ছিল। পীড়িত ব্যক্তিদিগের মধ্য হইতেই একে অপরের সহায়তা করিত। ঔষধ-পত্র ও অন্ত্রাদির অভাবে চিকিৎসকগণ নিরুপায় হইয়া পড়িয়াছিলেন। অতিপ্রয়ােজনীয় দ্রব্যাদির সরবরাহেরও কোনরূপ সুচারু বন্দোবস্ত ছিল না। সর্বত্র অভাব বিরাজ করিতেছিল। এই সকল হৃদয়বিদারক করুণ কাহিনী সংবাদপত্রে পাঠ করিয়া পরদুঃখকাতরা, স্নেহ-প্রবণা ফ্লোরেন্স নাইটিংগেলের প্রাণ কাঁদিয়া উঠল। তিনি হতভাগ্য পীড়িত সৈন্যগণের ক্লেশলাঘবে বদ্ধপরিকর হইলেন, এবং নিজে যুদ্ধক্ষেত্রে যাইয়া তাহাদের শুশ্রুষাভার গ্রহণ করিতে প্রস্তুত হইয়া যুদ্ধসচিবের নিকট স্বীয় অভিপ্রায় জ্ঞাপন করিলেন। ঠিক এই সময়ে যুদ্ধসচিবও অনন্যোপায় হইয়া আহত সৈনিকদিগের শুশ্রুষার ভার গ্রহণের জন্য কুমারী ফ্লোরেন্সের সাহায্য-প্রার্থনা করিয়া পত্র লেখেন। সুতরাং উভয়ে উভয়ের পত্র পাইয়া যার-পর-নাই বিস্মিত ও আনন্দিত হইলেন। দেশবাসী সকলে ফ্লোরেন্স নাইটিংগেলের মহাপ্রাণতার ভূয়সী প্রশংসা করিয়া তাহাকে তাহাদের ধন্যবাদ জ্ঞাপন করিল। অভিজ্ঞ ব্যক্তিগণ বলিতে লাগিলেন, উপযুক্ত হস্তে উপযুক্ত কার্যের ভার এতদিনে অর্পিত হইল। অচিরে যুদ্ধক্ষেত্রে আহত সৈন্যগণের স্নানদৃশ্য অপসারিত হইবে।” এই স্বদেশপ্রেমিকা নাইটিংগেল ইংলণ্ডের অন্তঃপাতী ডাবিয়ারের অন্তর্গত লিহাষ্ট ও হাম্পায়ারের অন্তর্গত এমূরে পার্কের ভূম্যধিকারী, উইলিয়াম এডওয়ার্ড নাইটিংগেলের সন্তান। ইটালির ফ্লোরেন্স নগন ফ্লোরেন্স নাইটিংগেল। ১৮২০ খৃষ্টাব্দের ৫ই মে, সোমবার, তিনি জন্মগ্রহণ করেন। ইনি মাতাপিতার মধ্যমা কন্যা। ফ্লোরেন্স নগরে ইহার জন্ম হওয়ায় ঐ নগরের নামানুসারে ইহারও নাম ফ্লোরেন্স রাখা হয়। মাতাপিতার তত্ত্বাবধানেই ইহার প্রথম শিক্ষা সমাপ্ত হয়। শৈশবকাল হইতেই স্থাবর-জঙ্গমাত্মক প্রকৃতির প্রতি তঁাহার অস্বাভাবিক অনুরাগ ও প্রতির ভাব দেখা যাইত। তাহার ক্রীড়াকৌতুকও বৈচিত্র্যময় ছিল। সেই বাল্য বয়সেই তিনি তঁাহার ক্রীড়াপুত্তলিকাগুলির শুশ্রুষা করিতেন ও তাহাদিগের আহত স্থানে বন্ধনী বাধিয়া দিতে যারপরনাই আনন্দ অনুভব করিতেন। পরবর্তী কালে তাহাকে যে কার্যের ভার লইতে হইবে স্বয়ং বিধাতৃ-পুরুষ যেন শৈশব হইতেই তাহার সঙ্গে সঙ্গে থাকিয়া তঁাহাকে সেই কাৰ্য্য শিক্ষা দিতেছিলেন। কথিত আছে কোনও এক দরিদ্র মেষপালকের একটি কুকুর সর্ব প্রথম রােগিরূপে কুমারীর শুশ্রুষা লাভ করে। জীব-জন্তু হইতে ক্রমে তিনি আর্ত-মানবের সেবায় আত্মনিয়োেগ করেন। যেস্থানে দুঃখ, ক্লেশ ও রোগের যাতনা, সেই স্থানেই সেই স্থানেই তঁাহার সৌম্য মূৰ্ত্তি বিরাজ করিত। মানবসেবায় সমুদয় শক্তি নিয়ােজিত করাই তঁাহার একমাত্র লক্ষ্য ছিল। তাই পিতার অধিকারভুক্ত প্রদেশের নিকটবর্তী বিদ্যালয়, রােগি-নিবাস, সংশোধনাগার ও জনসেবার অন্যান্য প্রতিষ্ঠান সমূহের কাৰ্যকলাপ তিনি মনােনিবেশসহকাৰে পরিদর্শন করিতেন। নাইটিংগেল অতিশয় ধর্মপরায়ণা ও স্নেহশীলা নারী ছিলেন। যৌবনের প্রথম ভাগেই, তিনি তাহার প্রতিবেশিনী বালিকাদিগকে বাইৰেল- শিক্ষাদিরার জন্য একটি ক্লাশ খােলেন এবং শিশুচিকিৎসার জন্য একটি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন। তৎপর তিনি ইংলণ্ডের ও অন্যান্য দেশের এক হাসপাতাল পরিদর্শন করিয়া এই সিদ্ধান্তে উপনীত চরিত্র-চিত্র। হন যে, ইংলণ্ডের হাসপাতালে শুক্ৰষাকারিণী সুশিক্ষিত নারীর যথেষ্ট অভাব রহিয়াছে। এই অভাব দূর করিয়া হাসপাতালের দুর্দশামােচনে তিনি বদ্ধপরিকর হইলেন। তখন জর্মন্টতে বিদ্যা শিক্ষা দিবার জন্য একটি সুপরিচালিত বিদ্যালয় ছিল। এই স্থানে আসিয়া দেখিলেন যে, শুষাসম্বন্ধে তিনি মনে মনে যে সকল ধারণা করিয়াছিলেন, তাহা এখানে কাৰ্যতঃ শিক্ষা দেওয়া হইতেছে। সুতরাং তিনিও নিজে রােগীর শুশ্রষা-বিষয়ক জ্ঞানলাভের জন্য এই বিদ্যালয়ের ছাত্রীশ্রেণীভুক্ত হইলেন। ছয়মাস এই বিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করিয়া তিনি সর্বোচ্চ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এই স্থান হইতে তিনি ফ্রান্সের প্যারিনগরে গমন করেন। তথায় সেবার বিবিধ বিধি ও মােগিনিবাস-পরিচালনা সম্বন্ধে শিক্ষা লাভ করিয়া ভগ্নস্বাস্থ্য লইয়া তিনি গৃহে প্রত্যাগত হন। একবৎসর বিশ্রামের পর তিনি স্বাস্থ্য লাভ করিলেন এবং স্বকীয় কার্যক্ষেত্রের অন্বেষণে প্রবৃত্ত হইলেন। অবশেষে তিনি আর্ত-মহিলা-সেবাসদনের প্রতিষ্টা করিয়া রােগীর সেবায় তাঁহার অধিকাংশ সময় ও অর্থ ব্যয় করিতে লাগিলেন। তাহার অক্লান্ত পরিশ্রমে ও কাৰ্যদক্ষতাগুণে দুই বৎসরের মধ্যে এই নূতন অনুষ্ঠান সম্পূর্ণরূপে সফলতা লাভ করিল। প্রথম চেষ্টা জয়যুক্ত হইয়াছে দেখিয়া, তিনি আত্মপ্রসাদ অনুভব করিতে লাগিলেন। অতিরিক্ত পরিশ্রমে আবার তাঁহার স্বাস্থ্যভঙ্গ হইল এবং তিনি বাধ্য হইয়া বিশ্রামলাভের জন্য পিতৃভবনে গমন করিলেন। ইহার কঘেক মাস পরেই যে দেবকাৰ্য্য সাধন করিয়া তিনি বিনশ্বর জগতে অবিনশ্বর কীৰ্ত্তি রাখিয়া গিয়াছেন, সেই কর্তব্যের আহ্বান আসিয়া উপস্থিত হইল। ১৮৫৪ খৃষ্টাব্দের ২৪শে অক্টোবর চৌত্রিশ জন ওষ-নিপুণা সঙ্গিনীসমভিব্যাহারে নাইটিংগেল কঠোর দায়িত্বভার ফ্লোরেন্স নাইটিংগেল। স্বীয় স্কন্ধে গ্রহণ করিয়া দেশবাসীর কৃতজ্ঞতাসূচক আনন্দকোলাহলের মধ্যে ক্রিমিয়ায় যাত্রা করিলেন। দেবগণের আশীর্বাদ তাহার মস্তকোপরি বর্ষিত হইতে লাগিল। এই শুক্রবাকারিণীদিগের মধ্যে অনেকে সামাজিক পদমর্যাদায় ও সৌভাগ্য-সম্পদে গৌরবান্বিত ছিলেন। নবেম্বর মাসের ৫ই তারিখে তাঁহারা স্কুটারীতে অবতরণ করেন। স্কুটারী-নগরী তুরস্কের রাজধানী কনস্তান্তিনােপলের কনস্তান্তিনােপলের অনতিদুরে বফোরাস প্রণালীর অপরতীরে অবস্থিত। এই স্থানে একটি বড় হাসপাতাল ছিল। তুরস্ক গবর্ণমেন্টের অনুমতিক্রমে ইহা আহত ইংরাজ সৈনিকের আবাসরূপে ব্যবহৃত হইতেছিল। হাসপাতালে প্রবেশ করিয়াই নাইটিংগেল এক লােমহর্ষণ দৃশ্য দেখিতে পাইলেন। সর্বত্রই বিশৃঙ্খলা। আহত সৈনিকপুরুষের রােগযন্ত্রণায় ছটফট করিতেছে। সেবাশুশ্রুষা করিবার লােক নাই। কেহ বা জ্বরাক্রান্ত, কেহ বা আমাশয়-রােগে শয্যাশায়ী, কেহ বা যুদ্ধে ভীষণভাবে আহত। রুগ্ন- ব্যক্তিগণের শষ্যা ধুলায় মলিন, বহুদিন যাবৎ তাহা পৰিষ্কৃত হইতেছে না। গৃহের দরজা-জানালার সুবন্দোবস্ত নাই, বিশুদ্ধ বায়ু ও সূর্যালােকের পথ রুদ্ধ। সৈন্যগণ দিন দিন ক্ষীণ ও ম্লান হইতেছে। নােগীদিগের উপযুক্ত পথ্যের পর্যন্ত সংস্থান নাই। মৃত্যুবিভীষিকা সকলের ম্লান মুখচ্ছবিতে প্রতিভাত হইতেছে। যাহারা :স্বার্থ বিসর্জন দিয়া এবং বন্ধুবান্ধব ও প্রাণপ্রিয় জীপুত্র পরিত্যাগ করিয়া, জাতীয় সম্মান ও দুর্বলের স্বাধীনতারক্ষাৰ্থ বিদেশে ভীষণ রণক্ষেত্রে শত্রুর সম্মুখীন হইয়া অপূৰ্ব তেজস্বিতা ও শৌর্যবীর্যের পরিচয় প্রদান করিতেছিল, অবশেষে তাহারাই আজ বিনা চিকিৎসায় ও বিনা যায় মৃত্যুদ্বারে আসিয়া উপনীত হইয়াছে। এই শােকাবহু-দৃশ্য দর্শনে চরিত্র-চিত্র। ; নাইটিংগেল একেবারে বিহ্বল হইয়া পড়িলেন। কিন্তু তিনি নিরাশ হইবার পাত্রী ছিলেন না। তাই ক্ষণমাত্র বিলম্ব না করিয়া স্বীয় সঙ্গিনীগণকে লইয়া তিনি উৎসাহভরে শুশ্রুষা-কাৰ্যে ব্যাপৃত হইলেন। একদল রুগ্ন- ব্যক্তিগণের গৃহ ও শয্যা পরিষ্কার করিয়া তাহাদের শুশ্রুষায় নিযুক্ত হইলেন; অপরদল লইয়া নাইটিংগেল স্বয়ং রন্ধনশালায় গমন করিলেন। পরম যত্নে স্বহস্তে রন্ধন করিয়া তাঁহারা রুগ্ন-সৈনিকগণকে পরিতােষের সহিত ভােজন করাইলেন। এইরূপে আহার-নিদ্রা ত্যাগ করিয়া রোগীর সেবায় তাঁহারা প্রাণমন সপিয়া দিলেন। রােগীর সেবায় মানুষ ইহার পূর্বে কখনও এইরূপ নিঃস্বার্থভাবে আত্মনিয়ােগ করিয়াছে কিনা সন্দেহ। রুগ্নব্যক্তিগণের রােগযন্ত্রণা লাঘবের উপায়-উদ্ভাবন-চিন্তায় কুমারী ফ্লোরেন্স তাঁহার সমস্ত সময় অতিবাহিত করিতে লাগিলেন। কখনও তিনি অঙ্গব্যবচ্ছেদ-ভীত রােগীর পার্শ্বে বসিয়া অভয় দিতেছেন, সৈনিক-পুরুষগণের শয্যা-পার্শ্বে উপবেশন করিয়া কখনও তাহাদের জন্য পত্র লিখিয়া দিতেছেন, কখনও বা তাহাদের পারিবারিক অবস্থা সম্বন্ধে নানাপ্রকার সহানুভূতিসূচক প্রশ্ন করিতেছেন। আর তাহারাও সরল অন্তঃকরণে সুখদুঃখের করুণ কাহিনী তাহাকে জ্ঞাপন করিতেছে। রুগ্ন ব্যক্তিগণের প্রফুল্লতা-সম্পাদনের জন্য তিনি নানাপ্রকার সুপাঠ্য-পুস্তক-পরিপূর্ণ পাঠাগার স্থাপন এবং তাহাদের আমােদ-প্রমােদের জন্য নানাপ্রকার প্রতিপ্রদ ক্রীড়ার অনুষ্ঠান করেন। রােগীর সেবায় নাইটিংগেল অপরিসীম বিমল আনন্দ অনুভব করিতেন; ইহাতে তাহার ক্লান্তিবােধ ছিল না। এমন কি প্রতিদিন এই সময় উপর্যুপরি ২০ ঘণ্টা পর্যন্ত তিনি এই কার্যে অতিবাহিত করিয়াছেন। হাসপাতালের কর্মচাবিবুল সৰ্ব্বদিনব্যাপী পরিশ্রমের পর ফ্লোরেন্স নাইটিংগেল। শ্রান্তক্রান্তদেহে যখন শয্যার আশ্রয় গ্রহণ করিয়া নিশ্চিন্তমনে নিদ্ৰাসুৰ উপভােগ করিত, যখন হাসপাতাল গাঢ় অন্ধকারে আচ্ছন্ন, নীরব ও নিস্তব্ধ সেই নিশীথ-সময়ে নাইটিংগেল, স্নেহবৎসলা ও উদ্বিগ্ন। জুননীর ন্যায়, প্রদীপ হস্তে একাকিনী ধীরপাদবিক্ষেপে কক্ষ হইতে কক্ষান্তরে গমন করিয়া রােগীদের অবস্থা নিজচক্ষে অবলােকন করিতেন। রােগযন্ত্রণাগ্রস্ত অর্থ নিদ্রামগ্ন সৈন্যগণ স্বর্গরাজ্যের দেববালার হস্তসংস্পর্শে যেন ক্ষণেকের তরে এক অবিমিশ্র আনন্দ উপভােগ করিত। কেহ বা সেই মূর্তিমতী দয়ার সুখশীতল ছায়া-সংস্পর্শে সকল রােগ-যন্ত্রণা মুহূর্তের জন্য বিস্মৃত হইত। তাহার সেবার সুব্যবস্থাগুণে রােগীদিগের মৃত্যু-সংখ্যা শতকরা ৪২ হইতে মাত্র ২ জনে পরিণত হইয়াছিল। তাহার প্রগাঢ়, কর্তব্যনিষ্ঠার কথা ভাবিলে বিস্ময়াবিষ্ট হইতে হয়। এই দারুণ পরিশ্রমে একবার তিনি স্বয়ং জ্বরাক্রান্ত হইয়া শয্যাশায়ী হইলেন, কিন্তু তথাপি তিনি সৈন্যদিগকে তথায় ফেলিয়া যাইতে স্বীকৃত হইলেন না। অবশেষে ১৮৫৬ খৃষ্টাব্দে সৈনিকগণ যখন ইংলণ্ডে প্রত্যাবর্তন করে, তিনিও সেই সময়ে স্বদেশে ফিরিয়া আসেন। কুমারী নাইটিংগেলের এই অলৌকিক সেবাপরায়ণতা ইংলণ্ডের ধনী নিধন, রাজা প্রজা সকলের হৃদয়ের শ্রদ্ধা-ভক্তি আকর্ষণ করিল। ফ্লোরেন্সকে একখানি যুদ্ধজাহাজে করিয়া স্বদেশে ফিরাইয়া আনিবার প্রস্তাব করা হইল এবং লণ্ডননগরী তাহার উপযুক্ত অভ্যর্থনার আয়ােজনও করিতে লাগিল। কিন্তু যাহারা ভগবৎপ্রেমে প্রেমিক, এবং সেই প্রেমেরই বশবর্তী হইয়া কৰ্ম্মক্ষেত্রে অবতীর্ণ হন, তাহারা যশ চাহেন না, সম্মান চাহেন না, নিজের কীৰ্ত্তি-চকা নিনাদিত করিতে চাহেন না; চাহেন কৰ্ম্মান্তে নীরবতা। তাই কুমারী নাইটিংগেল তাহার অভ্যর্থনার জন্য টি আয়ােজনের ব্যবস্থা হইতেছে ইহা যেই শুনিতে পাইলেন, ।
১০২ চরিত্র-চিত্র। অমনি তিনি নীরবে একখানি ফরাসী-পােতে আরােহণ করিয়া অপ্রত্যা- শিতভাবে স্বদেশে প্রত্যাগমন করিয়া দেশবাসীর সকল আয়ােজন পও করিয়া দিলেন। এখন তিনি লােকচক্ষুর অন্তরালে স্বীয় গ্রাম্য আবাসে অবস্থা করিতে লাগিলেন। দেশবাসী তাহার অক্লান্ত সেবায় মুগ্ধ হইয়া তৎপ্রতি সম্মান প্রদর্শনার্থ তাহার হস্তে যে ৫•••• পঞ্চাশ হাজার পাউণ্ড প্রদান করেন, তদ্বারা তিনি শুশ্রুষাকারিণীদিগের শিক্ষার নিমিত্ত নাইটিংগেল হাউস নামে একটি শিক্ষালয় ও কয়েকটি চিকিৎসাবিদ্যালয় স্থাপন করেন। সৈনিক-রোগিনিবাস, সৈনিক-চিকিৎসাবিদ্যালয় প্রভৃতি স্থাপনবিষয়েও তিনি বিশেষ সহায়তা করিয়াছিলেন। ১৮৫৮ খৃষ্টাব্দে তিনি সেবা-শুশ্রুষা সম্বন্ধে এক পুস্তক প্রকাশ করেন। এই পুস্তক পাঠ করিয়া ইংলণ্ডে দলে শক শুশ্রুষ-বিজ্ঞান অধ্যয়নে প্রবৃত্ত হয়। জীবনীশক্তি রক্ষার জন্য নির্মল বায়ু, আলােক, উপযুক্ত উষ্ণতা, পরিচ্ছন্নতা ও উপাদেয় পথ্য রােগীর পক্ষে অতীব প্রয়ােজনীয় এবং রােগীকে এই সকল অবস্থার মধ্যে রক্ষা করাই প্রকৃত সেবার কাৰ্য। এই তত্ত্ব তিনিই সর্বপ্রথম ইংলণ্ডে প্রচার করেন। কুমারী নাইটিংগেল দেশের স্বাস্থ্যবিষয়ক উন্নতিবিধানের জন্য প্রভূত পরিশ্রম করিয়াছিলেন। তখন কি স্বদেশে কি বিদেশে, নােগিনিবাস- স্থাপনের কথা হইলেই তাহার পরামর্শ জিজ্ঞাসা করা হইত। ১৮৯২ খৃষ্টাব্দে, নির্মল বায়ুচলাচল, জলনিঃসরণ, রােগবীজ-নাশের উপায়, পরিচ্ছন্নতা প্রভৃতি বিষয়ে কুটিরবাসীদিগকে উপদেশ দিবার নিমিত্ত কাউন্টি কাউন্সিল টেজিক্যাল ইনষ্ট্রাকশন কমিটী-নামক সভার সাহায্যে তিনি চতুর্দিকে লােক প্রেরণ করেন। ১৯০১ খৃষ্টাব্দে সম্রাট সপ্তম এডওয়ার্ড তাহাকে এক প্রশংসাসূচক উপাধি দান করেন। অবশেষে সুদীর্ঘ কর্মজী ফ্লোরেন্স নাটিংগেল। অন্তে ১৯১০ খৃষ্টাব্দে ৯০ বৎসর বয়সে এই মহীয়সী রমণী ইহশীলা সংবরণ করেন। নাইটিংগেল পরার্থপরতার যে সমুজ্জ্বল চিত্র প্রদর্শন করিয়াছেন, তা বর্তমান জগতে দুলভ। তাঁহার পুণ্যপূত স্মৃতিকাহিনী চিরদিন মানব হৃদয়ে ভক্তি, বিস্ময় ও আনন্দের উৎসস্বরূপ বিরাজিত থাকিৰে। তাহার স্বদেশপ্রেম, তাঁহার সেবাধর্ম ও তাঁহার সাধনা স্বার্থচিন্তাত মানবমণ্ডলীর জ্ঞানচক্ষু উন্মীলন করিয়া দিবে এবিষয়ে সন্দেহ নাই।
স্ত্রীজাতির মঙ্গলাবধানে রমাবাই সরস্বতী। ০) না জাগিলে সব ভারত ললনা, এ ভাত বার জাগে না লাগে না।” দ্বারকানাথ। ভারতীয় রমণীগণকে স্বৰ্গবিচ্যুত দেববালা বলিলেও, বােধ হয়, অত্যুক্তি হয় না। ধরাধামে স্বর্গরাজ্য প্রতিষ্ঠা করাই তাহাদের অভীতি। তাই কোমলতা, স্নেহমমতা, আত্মত্যাগ ও পরসেবার উজ্জ্বল মূৰ্ত্তি পরিগ্রহ করিয়া তাহার গৃহে গৃহে বিরাজ করিতেছেন। পরিবারভুক্ত লােকগণের সুখশান্তি-বিধানের জন্য তাহারা অহােরা ব্যস্ত। ভাল ভাল আহারসামগ্রী প্রস্তুত করিয়া কিরূপে তাহারা পরিবারস্থ আত্মীয়-স্বজনের মনস্তুষ্টি বিধান করিবেন, রােগে সেবা-শুশ্রুষ করিয়া কিরূপে স্বজনের রােগ-যন্ত্রণার লাঘব করিবেন, শশাকে সান্ত্বনা প্রদান করিয়া কি উপায়ে তাহারা শােক সন্তপ্তচিত্তে শান্তিবারি সেচন করিবেন, বিপৎকালে মন্ত্রণা দিয়া কিরূপে তাহারা অস্থিরচিত্তে স্থৈর্য্য-প্রদান করিবেন-এই সকল চিন্তাই তাঁহাদের হৃদয় সম্পূর্ণরূপে অধিকার করিয়া রাখে। নিজের কথা কখনও তাহারা ভাবেন না বা নিজের সুখ তাহারা কখনও অন্বেষণ করেন না। নিজের দুঃখ-কষ্টকে তাঁহার কষ্ট বলিয়াই গ্রাহ করেন না। পরিবারস্থ সকলকে সুখে রাখিতে পারিলেই তাহারা অপরিসীম আনন্দ অনুভব করেন ; পরসেবায় আত্মসুখ বিসর্জল রমাবাই সরস্বতী। করিতে পারিলেই তাঁহারা আত্মপ্রসাদ অনুভব করেন। ভারতীয় নারীর এই দুর্লভ চিত্র কোনও কোনও লােকের কামলাদোষদুষ্ট চক্ষে হয়ত পীড়নের চিত্র বলিয়া অনুমিত হইবে। কিন্তু যাহারা ভারতের নারী- চরিত্র অভিনিবেশ সহকারে অধ্যয়ন করিয়াছেন, তাহারা জানেন যে, ভারতীয় নারীগণ পরসেবায় আত্মনিয়ােগ করিতে পারিলে কিরূপ অভূতপূৰ্ব আনন্দসাগরে নিমগ্ন হন। কিন্তু দুঃখের বিষয় তাহাদের কাৰ্য্যক্ষেত্র স্বীয় পরিবারের সঙ্কীর্ণ গণ্ডীর মধ্যে আবব্ধ। তাঁহাদের স্নেহ- মমতা ও প্রেমরাজ্য শিক্ষাগুণে যেদিন বিস্তৃত আকার ধারণ করিবে, সেদিন ভারতের ভাগ্যাকাশ নিৰ্ম্মল ও মেঘনিন্মুক্ত হইবে। ভারতের নারীসমাজে পরসেবার যে নিঃস্বার্থভাব সুপ্ত রহিয়াছে, শিক্ষা-প্রভাবে তাহা জাগরিত হইলে জগতের যে কত কল্যাণ সাধিত হইতে পারে, তাহা অননুমেয়। ভারতীয় নারী নিঃস্বার্থভাবে সমাজের কত মঙ্গলসাধন করিতে পারে, তাহার সমুজ্জ্বল দৃষ্টান্তস্থল পণ্ডিতা রমাবাই সরস্বতী। দাক্ষিণাত্যে মেঙ্গালাের জেলায় অনন্ত শাস্ত্রী নামে একজন ব্রাহ্মণ বাস করিতেন। সংস্কৃত-ভাষায় তাহার অগাধ ব্যুৎপত্তি ছিল। তিনি নিজে একজন শাস্ত্রবিশারদ পণ্ডিত ছিলেন; কিন্তু ধৰ্ম্ম-সম্বন্ধে তিনি সৰ্ব্বদাই উদার মত পােযণ করিতেন। শাস্ত্রপাঠে স্ত্রীজাতির অধিকার নাই—এই অনুদার মতের পােষকতা তিনি কখনও করিতেন না। সুতরাং তিনি নিজের পত্নী লক্ষ্মীবাইকে সংস্কৃত ভাষা শিক্ষা দিয়া হিন্দু- শাস্ত্রের প্রবেশদ্বার তাহার সম্মুখে উন্মুক্ত করিয়া দেন। তদীয় ধৰ্ম্মপিপাসু পত্নী নারীজাতি-সুলভ অধ্যবসায় ও এক গ্রতা-বলে সংস্কৃত-শাস্ত্রে গভীর জ্ঞান লাভ করেন। এইরূপ শিক্ষিত মাতাপিতার গৃহে রমাবাই ১৮৫৮ খৃষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। বাল্যকালে তাহার শিক্ষার ভার তদীয় মাতার উপর অর্পিত চরিত্র-চিত্র। হয়। মায়ের চরিত্রের প্রভাব কন্যার উপর সম্পূর্ণরূপে বৰ্ত্তিয়াছিল। রমাবাই নিজমুখেই বলিয়াছেন যে, মায়ের স্নেহপূর্ণ সদুপদেশাবলীই তাহার ভবিষ্যজ্জীবনের আলোেকস্বরূপ হইয়াছিল। ষােড়শষ বয়ঃক্রমকালে তিনি আপিতাহীন হন; কিন্তু এই অল্পবয়সের মধ্যেই স্বীয় তীক্ষ্ণবুদ্ধিপ্রভাবে ও মাতাপিতার সুশিক্ষাগুণে তিনি সংস্কৃত-ভাষায় যথেষ্ট পারদর্শিতা লাভ করেন। তিনি আরও অনেকগুলি ভাষা শিখিয়াছিলেন। মরাঠী ত তাহার মাতৃভাষাই ছিল। এতদ্ভিন্ন তিনি দেশ ভ্রমণের সঙ্গে সঙ্গে কানারী, হিন্দুস্থানী ও বঙ্গভাষায় জ্ঞান অর্জন করেন। এতাবৎকাল তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন নাই। তিনি স্বীয় ভ্রাতার সহিত ভারতের বিভিন্ন তীর্থস্থান পৰ্যটন করিয়া নানাবিষয়ে অভিজ্ঞতা লাভ করিয়াছিলেন। ভ্ৰমণ করিতে করিতে অবশেষে তিনি কলিকাতায় আসিয়া উপস্থিত হন। এইখানে ভাটপাড়া, নবদ্বীপ প্রভৃতি বিদ্যাপীঠের পণ্ডিতগণের সঙ্গে ধর্মবিষয়ে তাহার নানাপ্রকার আলােচনা হয়। পণ্ডিতগণ তাহার অসামান্য শাস্ত্রজ্ঞান ও অকাট্য যুক্তিবল দর্শন করিয়া বিস্মিত ও বিমােহিত হন এবং তাহার গুণের উপযুক্ত পুরস্কার স্বরূপ তঁাহাকে “সরস্বতী” উপাধি প্রদান করেন। কিন্তু এখানে তাহার অদৃষ্টে এক দৈবদুর্ঘটনা উপস্থিত হয়; তঁাহার একমাত্র ভ্রাতা অকালে মৃত্যুমুখে পতিত হন। তিনি এই অসহায় অবস্থায় শ্রীহট্টনিবাসী এক বাঙ্গালী যুবকের সহিত পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হন। কিন্তু বিবাহিত জীবনের সুখ বহুদিন তাহার ভাগ্যে ঘটিয়া উঠে নাই। বিবাহের কয়েক বৎসর পরেই, একটি কন্যা-সহ তাঁহাকে নিঃসহায় অবস্থায় রাখিয়া তদীয় স্বামী পরলােক গমন করেন। রমাবাই শােকে দুঃখে অভিভূত হইয়া পড়িলেন, এবং নিজের জীবন তাঁহার নিকট দুর্বহ ভার-স্বরূপ প্রতীত হইতে লাগিল। কিন্তু এই দুঃখের মধ্যেও তিনি সুখের সন্ধান পাইলেন,-এই অশুভ ঘটনার রমাবাই সরস্বতী। ; মধ্যেও তিনি বিধাতার শুভ ইচ্ছা দেখিতে পাইলেন, এবং স্বকীয় স্বার্থমুখ বিসর্জন দিয়া পার্থে আত্মনিয়ােগ করিতে দৃঢ়সঙ্কল্প হইলেন। এই মহাসাধনায় আনন্দীবাই যোসী তাহার প্রধান সহায় হইলেন এবং অর্থসাহায্য ও নানাপ্রকার উৎসাহবাক্যে তাহাকে প্রােৎসাহিত করিতে লাগিলেন। ভারতীয় স্ত্রীজাতির দুর্গতিদর্শনে রমাবাই সরস্বতীর প্রাণ কাদিয়া উঠিল। তাহাদের দুর্দশামােচন তিনি জীবনের ব্রতরূপে গ্রহণ করিলেন, এবং স্ত্রীজাতির মধ্যে শিক্ষাবিস্তার করিতে তিনি প্রাণপণ চেষ্টা করিতে লাগিলেন। তিনি বুঝিয়াছিলেন যে শিক্ষা ব্যতিরেকে তাহাদের উন্নতির আশা দুরাশামাত্র। হিন্দুসমাজের বাল্যবিবাহপ্রথা স্ত্রীজাতির শিক্ষার পথে প্রধান কণ্টক ; সুতরাং তিনি এই কণ্টকের উচ্ছেদসাধনে কৃতসঙ্কল্প হইলেন। তাই তিনি কলিকাতা পরিত্যাগ করিয়া বিভিন্নস্থানে ভ্রমণ করিয়া বক্তৃতাদ্বারা জনসাধারণকে তাঁহার পক্ষসমর্থন করিতে কাতরপ্রাণে আহ্বান করিতে লাগিলেন। বােম্বাই শহরের অধিবাসিগণ তাহার গুৰকাৰ্য্যে সহায়তা করিতে অগ্রসর হইল। স্ত্রীশিক্ষার উন্নতি-সাধন ও বাল্যবিবাহ প্রথানিবারণ—এই দুই উদ্দেশ্য লইয়া তথায় আৰ্য-মহিলা- সমাজ নামে একটি সমাজও স্থাপিত হইল। কিন্তু ভারতের সমাজ তখনও মৃতপ্রায়। সেই মৃতপ্রাণে জীবন সঞ্চার করা এক দুরূহ ব্যাপার। রমাবাই দেখিলেন যে, নিজ দেশবাসীর মুখাপেক্ষী হইয়া বসিয়া থাকিলে, হয়ত, তাহার জীবন-ব্রত উদ্যাপিত হইবে না,হয়ত ইহা অঙ্কুরেই বিনষ্ট হইবে। তাই তিনি সুসভ্য ও সমুন্নত ইংরাজ-জাতির শরণাপন্ন হইলেন। তাহার আরব্ধকাৰ্যে উদার- হৃদয় ইংরাজগণের সহায়তা-লাভের আশায়, তিনি ১৮৮৩ খ্রীষ্টাব্দে ইংলণ্ডে গমন করেন। ইংরাজি-ভাষা ইতঃপূৰ্বেই তিনি কিছু কিছু জানিতেন।
sob চরিত্র-চিত্র। এখন তাহার পূর্ণতা সম্পাদন করিয়া তিনি চেটেনহাম মহিলা কলেজে সংস্কৃতের অধ্যাপকের পদ লাভ করিলেন। এই স্থানে তিনি বার বৎসর অবস্থান করেন, এবং নিজে ইংরাজি সাহিত্য, গণিত ও প্রাকৃতিক বিজ্ঞান অধ্যয়ন করেন। এই সময়ে তাঁহার শুভানুষ্ঠানের প্রধান উৎসাহদাত্ৰী শ্ৰীমতী আনন্দীবাই যােদী আমেরিকার ফিলাডেলফিয়ায় চিকিৎসাশাস্ত্র অধ্যয়ন করিতেছিলেন। তিনি রমাবাইকে আমেরিকায় যাইতে অনুরােধ করেন। তাঁহার সাদর আহ্বানে রমাবাই ইংলণ্ড হইতে আমেরিকায় গমন করেন। আমেরিকায় অবস্থানকালে তিনি সেই দেশের শিক্ষাব্যবস্থা বিশেষ ভাবে আলােচনা করেন; কারণ, ভারতে স্ত্রীজাতির মধ্যে শিক্ষাবিস্তারের প্রকৃষ্ট পথ তিনি তখনও খুজিয়া পান নাই। তখন স্বনামধন্য জৰ্ম্মাণশিক্ষা- সংস্কারক ফ্রোবেলের প্রবর্তিত কিন্ডারগার্টেন শিক্ষাপ্রণালী আমেরিকায় প্রচলিত হইয়াছিল। এই শিক্ষাপ্রণালী রমাবাইয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ইহ। ভারতীয় স্ত্রীজাতির পক্ষে সম্পূর্ণ উপযােগী বলিয়া, তিনি এই শিক্ষাপ্রণালী বিশেষভাবে অধ্যয়ন করেন। তিনি বলেন-“ফ্রোবেলের শিক্ষাপ্রণালীর মধ্যে আমি লৌকিক ও আধ্যাত্মিক শিক্ষার প্রকৃত সমাবেশ দেখিতে পাই। প্রথমতঃ, ফ্রোবেলের শিক্ষা প্রণালীতে বালকের জ্ঞানেন্দ্রিয়সমূহ পরিচালিত হয় এবং সঙ্গে সঙ্গে তাহার চিন্তাশক্তিরও উন্মেষ হয়। কাজেই এই শিক্ষাপ্রণালী দ্বারা শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য সুসম্পন্ন হয়। দ্বিতীয়ত, সত্যই ফ্লোবেলের শিক্ষা প্রণালীর প্রাণ, সুতরাং এই শিক্ষাপ্রণালী ভারতে অনুসৃত হইলে কুসংস্কারমূলক মােহন্ধকার হইতে ভারতসমাজ নির্মুক্ত হইবে, এবং বন্ধনােম্মুক্ত হইয়া ভারতললনা স্বীয় কাৰ্য্যক্ষেত্রে অবতীর্ণ হইতে সমর্থ হইবে।” তিনি আরও বলিতেন—“আমি ভারতের ভবিষ্যৎ বংশবগণের .
রমাবাই সরস্বতী। ১০৯ মাতৃহৃদয় অধিকার করিতে বাসনা করি। সন্তানের মঙ্গলেচ্ছা মাতৃহৃদয়কে যেরূপ আকর্ষণ করে, পৃথিবীর অপর কিছুই ইহাকে সেইরূপভাবে আকৰ্ষণ করিতে পারে না। কিণ্ডারগার্টেন-শিক্ষাপ্রণালী যদি তাহাদের সম্মুখে যথােপযুক্তভাবে সমুপস্থাপিত করা যায়, তাহা হইলে তাহারা বুঝিতে পারিবে যে, সন্তানের ভবিষ্যৎ উন্নতি অনেকটা জননীর উপর নির্ভর করে। যদি ভারতীয় রমণীগণ শিশুসন্তানগণের শিক্ষার জন্য বুদ্ধি ও বিবেচনা-পূৰ্ব্বক উপযুক্ত পরিমাণে যত্ন গ্রহণ না করেন, তবে তাহাদের সন্তানগণের অমঙ্গল সংঘটিত হইবে এ কথা হৃদয়ঙ্গম করিতে পারিলে, তাঁহাদের স্নেহপ্রবণ সন্তানবৎসল মাতৃহৃদয় স্বতঃই স্ত্রীজাতির শিক্ষার ও উন্নতির প্রতিবন্ধক দূর করিতে দৃঢ়ঙ্কল্প হইবে।" রমবাই এই বিশ্বাসের বশবর্তিনী হইয়া ভারতবর্ষে স্ত্রীজাতির মধ্যে কিণ্ডারগার্টেন শিক্ষাপ্রণালীর প্রচলন করিতে মনন করেন, এবং উক্ত শিক্ষা প্রণালী-সম্বন্ধে সাক্ষাৎভাবে জ্ঞানলাভের জন্য ১৮৮৬ খৃষ্টাব্দে আকরিকায় কিণ্ডারগার্টেন শিক্ষকদের এক ট্রেনিং স্কুলে ছাত্রীরূপে প্রবেশ করেন। তথাকার সুন্দর সুন্দর চিত্রসংবলিত, পুরু কাগজে বড় বড় অক্ষরে মুদ্রিত, শােভন মলাটযুক্ত শিশুপাঠ্য পুস্তকগুলি তাহার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। মারাঠা ভাষায় শিশুদের জন্য ঐ প্রকার পুস্তক প্রকাশ করিবার মানসে তিনি আমেরিকায় অনেক সুন্দর সুন্দর ছবি সংগ্রহ করেন। এখন বঙ্গদেশে নানাপ্রকার বিচিত্র চিত্র বক্ষে ধারণ করিয়া, বহু পুস্তক প্রকাশিত হইতেছে। পণ্ডিত বুমাবাই প্রায় তিনযুগ পূর্বে যে সত্যটি উপলব্ধি করিতে সমর্থ হইয়াছিলেন, বাঙ্গালী এতদিন পরে সে সত্যটি কার্যে পরিণত করিতে উদ্যত হইয়াছে।
১১• চরিত্র-চিত্র। মনে আমেরিকার ন্যায় স্বাধীন দেশের সংস্পর্শে আসিয়া এবং তথাকায় মীজাতির উন্নত অবস্থা দেখিয়া রমাবাইয়ের স্থির বিশ্বাস জন্মিল যে, শ্রীজাতির উন্নতি সাধন করিতে না পারিলে ভারতের উন্নতি সুদূরপরাহত। তাই তিনি ঘৃণিত, অবহেলিত ভারতীয় বিধবকুলের দুর্দশামােচনে বদ্ধপরিকর হইলেন। অনাথ আশ্রয়হীন বিধবাগণ আমাদের সমাজে কিরূপ দুর্বহ জীবনভার বহন করে, গলগ্রহস্বরূপ করিয়া আমাদের নিষ্ঠুর সমাজ তাহাদিগকে কিরূপ লাঞ্ছনা ও গঞ্জনা প্রদান করে, তাহা তিনি অবগত ছিলেন। উপযুক্ত শিক্ষা লাভ করিয়া বিধবাগণ যাহাতে স্বাধীনভাবে জীবিকার্জন করিয়া নিগ্রহের হস্ত হইতে মুক্তিলাভ করিতে সমর্থ হইতে পারে, তিনি তাহার উপায় নির্ধারণে নিযুক্ত হইলেন। অচিরকালমধ্যে তাহার কার্যপ্রণালী স্থিরীকৃত হইল। তিনি ভারতের বিভিন্ন স্থানে বিধবাগণের শিক্ষার জন্য বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করিতে কৃতসঙ্ক হইলেন। বিধবাগণের দুঃখদুর্দশামােচন তাহার জীবনের ব্রত হইল। ভারতে বিধবাশ্রম প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি আমেরিকায় অর্থসংগ্রহে প্রবৃত্ত হইলেন। হিন্দুবালবিধবাদের দুঃখ-নিবারণােদ্দেশ্যে আমেরিকায় বােষ্টল নগরে “মাবাই-সমিতি” নামে এক সমিতি প্রতিষ্ঠিত হইল। সুসভ্য আমেরিকাবাসীর সহানুভূতিলাভ-প্রয়াসে রমাবাই ‘উজাতীয় হিন্দুস্ত্রী নামে একখানি পুস্তিকা প্রণয়ন করেন। হিন্দুসমাজে বালবিধবাগণের জন্য কিরূপ কঠোর নিয়ম প্রবর্তিত আছে, উক্ত পুস্তকে তিনি তাহা প্রাণস্পশা ভাষায় বর্ণনা করেন। ভারত-সমাজে বিধবাকে কিরূপ হীনজীবন যাপন করিতে হয়, সমাজ তার উপর কিরূপ নির্মম ও কর্কশ ব্যবহার করে—তাহা তিনি সর্বত্র। এচার করিতে লাগিলেন। ইহার সঙ্গে বাল্যবিবাহ-প্রথা, বালিকাবধুর রমাবাই সরস্বতী। ১১১ প্রতি শাশুড়ীর অত্যাচার, শিশুকন্যা-হত্যা প্রভৃতি সামাজিক কুপ্রথা- সমূহও আমেরিকাবাসীর গােচরীভূত করিয়া ভারতীয় স্ত্রীজাতির দুঃখ মােচনে তাহাদের সহানুভূতি ও সহায়তা প্রার্থনা করেন। এইরূপে দুই বৎসরকাল আমেরিকার নগরে নগরে ভ্রমণ করিয়া তিনি অর্থসংগ্রহ করিতে লাগিলেন। প্রায় ষাট হাজার টাকা সংগৃহীত হইলে, তিনি তাহার অভীষ্ট কার্যের সূচনার জন্য দেশে প্রত্যাগমন করিলেন। ১৮৮৯ খৃষ্টাব্দের ১লা ফেব্রুয়ারী তিনি বােম্বাইনগরে পদার্পণ করেন এবং কালবিল করিয়া ১১ই মার্চ তারিখে তথায় ‘সারদা-সদন' নামে এক বিধবাশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন। এই বিধবামে ‘বাইবেল শিক্ষা দিবার জন্য অনেক মিশনারী বন্ধু তাহাকে অনুরােধ করেন। রমাবাই নিজেও কালে খৃষ্টধর্ম গ্রহণ করিয়া- ছিলেন , সুতরাং খৃষ্টধর্মের প্রতি তাঁহার স্বভাবতঃই একটা টান ছিল। কিন্তু যে উদার ভাব লইয়া তিনি কাৰ্য্যক্ষেত্রে অবতীর্ণ হইয়াছিলেন, সাম্প্রদায়িক ধর্মমতের সঙ্কীর্ণ গণ্ডী স্থাপন করিয়া তাহা অনুদার-বহু করিতে তিনি কিছুতেই সম্মত হইলেন না। বিশ্বমানবের সেবায় যিনি জীবন উৎসর্গ করিয়াছেন, জাতিধর্ম বা দেশকালের ভেদাভেদ কি তাঁহার হৃদয় স্পর্শ করিতে পারে? সাৰ্বভৌমিক প্রেমের বন্যা যে হৃদয়ে প্রবাহিত হইতেছে, সাম্প্রদায়িকতার ক্ষুদ্র বাধ কি সেখানে টিকিতে পারে? তিনি দেখিলেন যে, বিধবাশ্রমে বাইবেল-পাঠ বাধ্যতামূলক করিলে তাহার সমস্ত চেষ্টা পণ্ড হইবে—তাহার মহৎ উদ্দেশ্য নিষ্কল হইবে। খৃষ্টীয় ধর্মমত বিধবামে স্থান পাইলে, হিন্দুবিধবাগণ তথায় আশ্রয় গ্রহণ করিতে স্বীকৃত হইবেন না। সুতরাং ভারতের নিগৃহীত দুঃস্থ হিন্দুবিধবাগণের দুর্গতিবিমােচনে তিনি কিছুতেই সফলতা লাভ করিতে পারিবেন না। তাই বিধবাশ্রম প্রতিষ্ঠা করিয়া তথায় ভারতীয় চরিত্র-চিত্র। বিধবাদিগকে জাতিধর্মনির্বিশেষে স্বাধীনভাবে জীবিকার্জনের উপযােগী শিক্ষা প্রদান করাই তাহার জীবনের প্রধান লক্ষ্য হইল। তিনি মিশনারীগণের বিরুদ্ধাচরণ সত্বেও তাহার সঙ্কল্পসাধনে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হইয়া দ্বিগুণতর উৎসাহ-সহকারে স্থানে স্থানে ঘুরিয়া বিধবাশ্রম প্রতিষ্ঠা করিতে লাগিলেন। এইরূপে নারীহিত-কাৰ্যে তাহার পূতজীবন অতিবাহিত হইতে লাগিল। শেষ জীবনে তিনি এই বিধবা- আশ্রমটি তাহার জন্মস্থান পুনার অন্তর্গত কালগাঁও গ্রামে স্থানান্তরিত করেন। এই আশ্রমে ইদানীং নানা বয়সের প্রায় পনর শত নারী ও বালিকা শিক্ষা লাভ করিতেছে। এক্ষণে এই আশ্রমের নাম মুক্তিভবন রাখা হইয়াছে। এইরূপে লােকচক্ষুর অন্তরালে সমস্ত জীবন স্ত্রীজাতির সেবায় উৎসর্গ করিয়া অবশেবে ১৯২২ খৃষ্টাব্দের ৫ই এপ্রিল তিনি কর্মময় জীবন হইতে চিরতরে অবসর গ্রহণ করিয়াছেন ।
দেশ-সেবায় গােত্থলে। “যারে তুমি নীচে ফেল, সে তােমারে বাঁধিবে যে নীচে। পশ্চাতে রেখেছ যারে সে তােমারে পশ্চাতে টানিছে। বজ্ঞানের অন্ধকারে আড়ালে ঢাকিছ যারে, তোমার মঙ্গল ঢাকি গড়িছে সে ঘাের ব্যবধান।” -রবীন্দ্রনাথ। ভারতের একনিষ্ঠ স্বদেশসেবক, অক্লান্তকৰ্ম্মা গোপালকৃষ্ণ গােখলে, আজ কয়েক বৎসর হয়, ইহধাম পরিত্যাগ করিয়াছেন। কিন্তু তাহার পুণ্যপূত চরিতকাহিনী আজও ভারতবাসীমাত্রই আগ্রহভরে ও কৃতজ্ঞহৃদয়ে শ্রবণ করিতেছে। তিনি দেশবাসীর হৃদয়ে যে সিংহাসন প্রতিষ্ঠা করিয়া গিয়াছেন, তাহা আর কাহারও ভাগ্যে ঘটিয়াছে কিনা সন্দেহ। শুধু দেশবাসীই যে তাহার অভাব অনুভব করিতেছে, তাহা নহে। দেশের রাজপুরুষগণ পর্যন্ত তাহার অভাবে নিজদিগকে অভাবগ্রস্ত মনে করিতেছেন। কি গুণে দেশবাসী জনসাধারণের ও রাজপুরুষগণের হৃদয় তিনি সমভাবে আকর্ষণ করিতে সমর্থ হইয়াছিলেন ? বংশগৌরবে ? , তঁাহার ন্যায় সদ্বংশজাত ব্ৰাহ্মণ ভারতে অসংখ্য বিদ্যমান। ধনসম্পদে? না, তিনি গ্রাসাচ্ছাদনের অতিরিক্ত অর্থোপার্জনের চেষ্টা করেন নাই। বিদ্যাবত্তায়? না, তঁাহার ন্যায় অনেক বিদ্বান্ এদেশের মুখ উজ্জ্বল করিয়াছেন। তবে কি বাগ্মিতায়? না, তাহার ন্যায় বাগী সরস্বতীর কৃপায় ভারতে কম জন্মে নাই। তবে কি গুণে আজ ৮ ১১৪ চরিত্র-চিত্র। তিনি গণ্য, মান্থ ও বরেণ্য? তাঁহার অনন্যসাধারণ ত্যাগধৰ্ম্ম ও নিঃস্বার্থ দেশসেবা, তাঁহার স্বদেশহিতৈষণ ও স্বজাতিপ্রেম তাহাকে দেশেবাসীর নিকট দেবতুল্য করিয়া তুলিয়াছে। তিনি ভারতবাসীর সম্মুখে আত্মসংযম, সেবা ও ত্যাগধৰ্ম্মের যে উচ্চ আদর্শ রাখিয়া গিয়াছেন, তাহা পাশ্চাত্য-শিক্ষাভিমানী অসংযতচরিত্র যুবকগণকে সুপথে পরিচালিত করিবে, তাহা ভােগসুখত ব্যক্তিগণকে কশাষাতে জাগরিত করিয়া তুলিবে, তাহা মৃতপ্রাণ ভারতসমাজে চিরকাল বল সঞ্চার করিবে। তাঁহার ন্যায়নিষ্ঠা উচ্ছঙ্খল যুবকগণের হৃদয়ে ন্যায়ানুরাগ বর্ধিত করিবে, এবং এইরূপে দেশসেবা ও রাজসেবার মধ্যে বিরুদ্ধভাব দূর করিয়া সামঞ্জস্য বিধান করিবে। “ভারত-সেবকসম্প্রদায়” গােখলের সর্বপ্রধান কীত্তি। তিনি যে ভারত-সবক-সম্প্রদায় গঠন করিয়া গিয়াছেন, তাহার আদর্শ অতি উচ্চ ও মহান্ । রাজভক্তি ও স্বদেশপ্রীতি সেই আদর্শের মূলমন্ত্র। রাজভক্তিহীন স্বদেশপ্রীতি দেশের প্রকৃত উন্নতির সহায়তা না করিয়া সমাজে উচ্ছজ্জ্বলতার ভাব আনয়নপূর্বক অশান্তি ও অরাজকতার সৃষ্টি করে। তাই গােখলে “ভারত সেবক- সম্প্রদায়ের উদ্দেশ্য বর্ণনাকালে অতি সুস্পষ্ট ভাষায় বলিয়াছেন- “ভারত সেবকগণ” ব্রিটিশ শাসনকে ভারতের উন্নতিকল্পে বিধাতার শুভবিধান বলিয়া অকপটহৃদয়ে গ্রহণ করিতেছে। এই বিধাতৃবিধানের প্রতি উপযুক্ত সম্মান ও ভক্তি প্রদর্শন করিয়া, তদধীনে অন্যান্য ব্রিটিশ উপনিবেশের অনুরূপ শাসনপ্রণালী ভারতে প্রতিষ্ঠা করিবার জন্য বিধিম চেষ্টা করা ভারত সেবক-সম্প্রদায়ের অন্যতম উদ্দেশ্য। রাজপুরুষগণের কোনরূপ বিরুদ্ধাচরণ না করিয়া, প্রকৃত সেবক স্বীয় দৈশের উন্নতিসাধনে যত্নবান থাকিবেন। এইরূপে সংযতভাবে বিধিমৃত উপায় গােখলে। অবলম্বন করিয়া ভারতের ভবিষ্যৎ জাতীয় জীবন গঠন করিয়া তুলিতে হইবে।” বস্তুতঃ, গােখলে তাহার জীবনে এই আদর্শ হইতে বিন্দুমাত্রও বিচলিত হন নাই। তিনি স্বার্থমুখ বিসর্জন দিয়া অক্লান্তভাবে দেশের সেবা করিয়াছেন, এবং তজ্জন্য দুঃখকষ্ট অম্লানবদনে সহ করিয়াছেন। যেরূপ বিধানে দেশের প্রকৃত মঙ্গল সাধিত হইবে, তাহ নির্ভীকচিত্তে উচ্চপদস্থ রাজপুরুষগণের গােচরীভূত করিতে তিনি কুষ্ঠিত হন নাই। আবার যেরূপ অনুষ্ঠানে দেশের অকল্যাণ সাধিত হইবে বলিয়া তাহার স্থির বিশ্বাস জন্মিত, রাজপুরুষগণের সেইরূপ কাৰ্য্যাবলীর প্রতিবাদ করিতেও তিনি কখন পশ্চাৎপদ হন নাই। তাঁহার বিশেষ একটি গুণ ছিল যে, তিনি ধীর-স্থির ভাবে, যুক্তির পর যুক্তি অবলম্বন করিয়া, সংযতভাবে রাজকর্মচারিগণের ভ্ৰম প্ৰদৰ্শন করিতে চেষ্টা করিতেন, কিন্তু তাহাদের প্রতি তিনি কখনও বিদ্বেষভাব পােষণ করিতেন না। ভাবপ্রবণতার আশ্রয় না লইয়া বাস্তব ঘটনা অবলম্বনপূর্বক তিনি এরূপ দক্ষতার সহিত তাহার অকাট্য যুক্তিজাল বিস্তার করিতেন যে, রাজপুরুষগণ পৰ্য্যন্ত তাহার যুক্তির সারবত্তার ভূয়সী প্রশংসা না করিয়া থাকিতে পারিতেন না। এইজন্যই তিনি রাজপুরুষগণের নিকট এত সম্মানলাভের অধিকারী হইয়াছিলেন। তাঁহারা গােখ লেকে ভারত সাম্রাজ্যের একটি সুদৃঢ় স্তম্ভস্বরূপ জ্ঞান করিতেন। গােখলে ভবিষ্যৎ কালে যে একজন গণ্যমান্ত লােক হইবেন, ইহার সূচনা তাহার প্রথম জীবনেই সূচিত হয়। তিনি বিএ উপাধি লাভ করিয়াই “দাক্ষিণাত্য শিক্ষাদান-সমিতিতে যােগদান করেন। তিনি দরিদ্রের সন্তান ছিলেন ; সংসারে অর্থের অসচ্ছলতাজনিত অভাব যথেষ্ট বিদ্যমান ছিল। ইচ্ছা করিলে, তিনি স্বীয় বিদ্যা ও বুদ্ধি চরিত্র-চিত্র। বলে প্রচুর অর্থ উপার্জন করিয়া সুখে স্বচ্ছন্দে জীবন যাপন করিতে পারিতেন। কিন্তু শিক্ষালােকবঞ্চিত দুর্দশাগ্রস্ত সমাজের জন্য যাহার প্রাণ কাদিয়াছে, নিজের কথা ভাবিবার সময় তাহার কোথায় ? তাই তিনি সাংসারিক ভােগবিলাসের প্রতি সম্পূর্ণ অবজ্ঞা প্রদর্শন করিয়া, অম্লানবদনে প্রকৃত ত্যাগীর ন্যায় চিরদরিদ্রতাকে বরণ করিয়া লইলেন। পোষাকপরিচ্ছদ, আহারবিহার প্রভৃতি বিষয়ে সংযমের পরাকাষ্ঠা দেখাইয়া তিনি সমাজসেবকের প্রকৃত আদর্শ দেশবাসীর সম্মুখে ধারণ করিলেন। “দাক্ষিণাত্য শিক্ষা-সমিতি” গােখ লের অগ্রবর্তী কতিপয় সমাজ- হিতৈষী ব্যক্তির চেষ্টায় ও উদ্যোগে স্থাপিত হয়। দেশমধ্যে অল্প- ব্যয়ে শিক্ষাসম্প্রসারণকল্পে এই সমিতি গঠিত হয়। এই সমিতির অধীনে কতকগুলি বিদ্যালয় আছে। পুনার ফাগুসান কলেজও এই সমিতি- কর্তৃক পরিচালিত হয়। এই সমিতির আজীবন সভ্যগণ পরার্থপরতার সমুজ্জ্বল দৃষ্টান্তস্থল। দেশের সুশিক্ষিত ধীসম্পন্ন অনেক ব্যক্তি তাহাদের প্রতিষ্ঠিত ফাণ্ড সান কলেজে নামমাত্র বেতনে কাৰ্য্য গ্রহণ করেন। যত বড় বিদ্বান্ হউন না কেন, এখানে ৭৫ টাকা বেতনে বিংশতি বৎসর কাল কাজ করিতে তাহারা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন। কিছু দিন পূর্বে কেন্থি জের সিনিয়র বাংলার পুরুষােত্তম পঞ্জপে উক্ত কলেজের অধ্যক্ষ পদে সমাসীন ছিলেন। গােখলেও এই সমিতির আজীবন সভ্য ছিলেন এবং গ্রাসাচ্ছাদনের জন্য সামান্যমাত্র অর্থ গ্রহণ করিয়া ফাগুসান কলেজে অধ্যাপকতা করিতেন। শিক্ষাপ্রচারকাৰ্য্যকে তিনি জীবনের সুমহৎ ব্ৰতরূপে গ্রহণ করিয়া- ছিলেন সত্য, কিন্তু ইহাতেই তিনি তাহার সমুদয় শক্তি নিয়ােজিত করেন নাই। শিক্ষকতাকালে তিনি দেশসেবার প্রকৃত যােগৃতা লাভ গােৰলে। ১১৭ করিবার জন্য দেশের অভাব-অভিযােগ প্রভৃতি নানাবিষয়ের জটিল প্রশ্নসমুহ গভীর অধ্যবসায় ও যত্নসহকারে আলােচনা করেন, এবং অবশেষে অধ্যাপকতাকাৰ্য্য হইতে অবসর গ্রহণ করিয়া রাজ- নীতিক্ষেত্রে অবতীর্ণ হন। রাজনীতিচর্চাসম্বন্ধে তাহার এই বিশেষত্ব ছিল যে, তিনি বিষয়টি পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে আলােচনা করিয়া যে পৰ্যন্ত উহা সম্পূর্ণরূপে আয়ত্ত করিতে না পারিতেন, সে পর্যন্ত উহার সমালােচনায় প্রবৃত্ত হইতেন না। সুতরাং রাজনীতিক্ষেত্রে যখনই তিনি অবতীর্ণ হইতেন, তখনই প্রতিপক্ষ দলের মনে আতঙ্কের সঞ্চার হইত। তাহার গভীর জ্ঞান ও সূক্ষ্ম বিচারশক্তি, অকাট্য যুক্তি ৪ সৰ্ব্বতােমুখী প্রতিভার সুখ্যাতি লােকমুখে ধরিত না। গােখলে ভারতীয় ব্যবস্থাপক সভার সভ্য ছিলেন। তথায় তিনি দেশহিতকর অনেক প্রশ্নের অবতারণা করেন। সে সকল প্রশ্নের মধ্যে তাহার বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষাই সৰ্ব্বপ্রধান। তিনি যখন দেখিলেন যে, ভারতে হাজার করা ৫৯ জন লিখিতে পড়িতে পারে এবং ৯৪১ জনই নিরক্ষর, তখন তিনি দেশের জনসাধারণের অজ্ঞানান্ধকার দূর করিবার জন্য বদ্ধপরিকর হইলেন। এই প্রশ্নটি তিনি তাঁহার স্বভাবসুলভ ধীরতার সহিত আলােচনা করিতে লাগিলেন, এবং বিভিন্নদেশের প্রাথমিক শিক্ষাসম্বন্ধীয় ইতিহাস অধ্যয়ন আরম্ভ করিলেন। তিনি দেখিলেন আমেরিকায় এবং য়ুরােপের প্রায় সর্বত্র আইনের সাহায্যে বাধ্য করিয়া লােকদিগকে লেখাপড়া শিখান হয়। কিন্তু য়ুরােপ ও আমেরিকার অবস্থা এশিয়ার অবস্থা হইতে স্বতন্ত্র। তাই তিনি এশিয়ার দেশসমূহের শিক্ষার অবস্থা আলােচনা করিতে প্রবৃত্ত হইলেন। তিনি দেখিলেন জাপানে এবং এমনকি ফিলিপাইন দ্বীপপুঞ্জেও বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা, প্রচলিত আছে। প্রতিপক্ষদল ১১৮ চরিত্র-চিত্র। পাছে এই তর্ক তােলে যে, সে সকল দেশ হইতে ভারতের অবস্থা সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র, তাই তিনি ভারতের করদ ও মিত্র রাজ্যসমূহের শিক্ষার ইতিহাস হইতে দেখাইলেন যে, ভারতের মধ্যেই বরদারাজ্যে প্রাথমিক শিক্ষা অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক। এই সকল দেখাইয়া, তিনি ব্রিটিশ শাসিত ভারতে অবৈতনিক বাধ্যতামূলক শিক্ষা প্রচারের প্রস্তাব উত্থাপন করেন। দেশমধ্যে লােক- মত গঠন করিবার জন্য তিনি নানাস্থান ভ্রমণ করিয়া তাহার প্রস্তাবের পক্ষে যুক্তিপূর্ণ মতসমূহের বহুল প্রচার করেন। তাঁহার কাৰ্যকুশলতা, তাহার দৃঢ় সঙ্কল্প, তাঁহার অপূর্ব স্বার্থত্যাগ দেখিয়া জনসাধারণ আকৃষ্ট হইল। এমনকি রাজপুরুষগণ পৰ্যন্ত তঁাহার প্রস্তাবের মূলনীতিগুলি গ্রহণ করিতে ইচ্ছা প্রকাশ করিলেন। যদিও সেই প্রস্তাব এখনও সর্বত্র আইনে পরিণত হয় নাই, তথাপি গােখলে এ বিষয়ে দেশের অশেষ কল্যাণ সাধন করিয়া গিয়াছেন। অচিরেই তাঁহার চেষ্টা জয়যুক্ত হইবে বলিয়া আশা করা যায়। বিশেষরূপে না ভাবিয়া চিন্তিয়া, গােখলে কোনও বিষয়ে হস্তক্ষেপ করিতেন না। আবার যে বিষয়ে হস্তক্ষেপ করিতেন, সে বিষয়ের সমাধান করিতে বিপদের সম্মুখীন হইতেও তিনি ভীত বা সঙ্কুচিত হইতেন না। রাজপুরুষদিগকে অনর্থক বিব্রত করিয়া তুলিতে তিনি কখনও ব্যর্থতা প্রদর্শন করেন নাই, অথবা তাহাদের অসন্তোষ উৎপাদনের ভয়ে কখনও কর্তব্যকাৰ্যে পরায়ুখ হন নাই। গােখলের স্বদেশপ্রেমের আদর্শে বিদ্বেষভাবের লেশমাত্র ছিল না। রাজানুশাসনের প্রতি প্রজোচিত ভক্তি ও বিশ্বাস রাখিয়া, ভয় ও এলােভনের অতীত হইয়া তিনি প্রতিকার্য্যে স্বদেশহিতৈষণার প্রকৃত পরিচয় প্রদান করিয়াছেন। প্রকৃত কর্মীর আদর্শ গােখলে তাহার জ্বলন্তু ভাষায় এইরূপ গােৰলে। বর্ণন করিয়াছেন—“কর্তব্যপথ নানাপ্রকার বাধাবিঘ্নসঙ্কুল ; প্রলােভন পদে পদে আমাদিগকে বিপথগামী করিতে বিপথগামী করিতে চায় ; ব্রতধারীর সঙ্কল্পপরীক্ষার্থ নানাপ্রকার নৈরাশ্য পুনঃ পুনঃ আসিয়া উপস্থিত হয়। সাফল্যলাভের প্রধান কথা এই যে, উপযুক্ত সংখ্যক দেশবাসী দেশসেবাকে ধর্মের অঙ্গ মনে করিয়া আগ্রহ উৎসাহভরে তাহাতে মনপ্রাণ উৎসর্গ করিবে। দেশসেবাকে আধ্যাত্মিকভাবে পরিপুষ্ট করিয়া তুলিতে হইবে। স্বদেশপ্রেমে আমাদের হৃদয়কে এরূপভাবে পরিপূর্ণ করিয়া তুলিতে হইবে যে অভাব যেন তথায় স্থান পাইতে না পারে। দেশমাতৃকার সেবায় যথাসর্বস্ব উৎসর্গ করিবার সুযােগ পাইলে যে স্বদেশপ্রেম আাদে আত্মহারা হয়, বাধাবিঘ্ন বা বিপদ উপস্থিত হইলে যে হৃদয় কর্তব্যপথ হইতে পশ্চাৎপদ না হইয়া নির্ভীকভাবে তাহাদের সম্মুখীন হয়, যে ভগবঘিশ্বাস সকল অবস্থাতেই অচল ও অটল থাকে, এইরূপ জ্বলন্ত স্বদেশপ্রেম, এইরূপ নির্ভীক হৃদয়, এইরূপ গভীর বিশ্বাসকে সহায় করিয়া, প্রকৃত কৰ্মী তাহার কর্মক্ষেত্রে অবতীর্ণ হইবেন, এবং স্বকীয় দেশের সেবায় আত্মনিয়ােগ করিয়া ধৰ্মকৰ্ম্মজনিত আত্মপ্রসাদের ন্যায় অনির্বচনীয় সুখ ও আনন্দ অনুভব করিবেন।”
শিয় শিক্ষায় ডাক্তার মন্টেসরী। “মুদ্র এ মাখার’পর রাখগাে করুণ কর, উহারে করােনা অবহেলা ; এ ঘাের সংসার মাঝে এসেছে কঠিন কাজে, আসেনি করিতে শুধু খেলা।” -রবীন্দ্রনাথ। এই বিংশ শতাব্দীতে যিনি শিশুর শিক্ষারাজ্যে এক তুমুল আন্দোলন উপস্থিত করিয়াছেন, তিনি একজন বিদুষী রমণী। গত শতাব্দীতে ফ্রোবেলের ‘কুমার-কানন’ বিদ্যালয় যেরূপ সভ্যজগতের দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়াছিল, বর্তমান শতাব্দীতে এই রমণীর নব-প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয় সেইরূপ সমস্ত সভ্য-জাতির মনােযােগ আকর্ষণ করিয়াছে। বিভিন্ন দেশ হইতে বহু তত্ত্বপিপাসু নরনারী এই বিদ্যালয়ের কার্যপ্রণালী দেখিবার জন্য রােমনগরে আগমন করিতেছেন। যে ইতালী শিক্ষাদীক্ষা-ব্যাপারে এতদিন যুবরাপের অন্যান্য সভ্যদেশ ও আমেরিকার অনেক পশ্চাতে পড়িয়াছিল, আজ সেই ইতালী দেশের একজন রমণী শিক্ষারাজ্যের পথ-প্রদর্শকরূপে কাৰ্য্যক্ষেত্রে অবতীর্ণ হইয়াছেন। ইহা ইতালীর পক্ষে যেরূপ শ্লাঘার কথা, রমণীজাতির পক্ষেও তদ্রুপ গৌরবের বিষয়। এই রমণীর নাম মন্টেসরী। ইনি ঝােম-নগরের মহিলা ডাক্তার। চিকিৎসাকালে ইহাকে শিশুদিগের মস্তিষ্কের পরীক্ষা করিতে হইত। মস্তিষ্কের পরীক্ষাব্যাপারে তিনি যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন, তাহা ডাক্তার মন্টেসরী। ১২১ হইতে তিনি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, দুর্বল মস্তিষ্ক শিশুগণের শিক্ষাদানের প্রণালী স্বতন্ত্র ও বিভিন্ন হওয়া প্রয়ােজনীয়। এইরূপে শিশু লইয়া কাৰ্য্য করিতে করিতে তিনি শিশুদিগের বুদ্ধবৃত্তি ও মানসিক-শক্তি- সম্বন্ধে কতকগুলি সাধারণ তত্ত্ব আবিষ্কার করেন। পরীক্ষাগারে স্বকীয় গবেষণা-বলে তিনি যে সকল শিক্ষা-সূত্র উদ্ভাবন করেন, সে সকল অবলম্বন করিয়া, প্রকৃত বৈজ্ঞানিকের একাগ্রতা ও সমাজসেবকের হৃদয় লইয়া, তিনি শিশুর শিক্ষা-সংস্কারকার্যে ব্রতী হন। সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে দেখিতে গেলে তাহার নবাবিষ্কৃত তত্ত্বের ও ফ্রোবেলের শিক্ষাতত্ত্বের মধ্যে এত সৌসাদৃশ্য পরিদৃষ্ট হয় যে, কেহ কেহ মন্টেসরীর নব-প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়কে এক প্রকার কুমার-কানন-বিদ্যালয় বলিতেও ইতস্ততঃ করেন নাই। কিন্তু কোন কোন বিষয়ে যে মন্টেসরী নূতন কথা প্রচার করিয়াছেন, বিশেষতঃ ঐ সকল মূলসূত্রের প্রয়ােগ-বিষয়ে তিনি যে নূতন পথ অবলম্বন করিয়াছেন, সে সম্বন্ধে কোন প্রশ্নই উঠিতে পারে না। মন্টেসরীর প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়ের নাম “শিশুগৃহ”। “শিশুগৃহ” এই নামের একটা বিশেষ তাৎপৰ্য বা সার্থকতা আছে। এই বিদ্যালয়ে শিশুগণ নিজগৃহের ন্যায় স্বাধীনভাবে ও স্বেচ্ছামত যেখানে সেখানে বিচরণ করে। বিদ্যালয়-গৃহকে কারাগার-তুল্য অপ্রীতিকর স্থানে পরিণত না করিয়া, উহাকে সৰ্ব্বতােভাবে গৃহের ন্যায় চিরপ্রিয় ও আনন্দময় করিয়া তুলিবার জন্য সর্বপ্রকার চেষ্টা ও আয়ােজন করা হয়। এই শিশু-বিদ্যালয় একটি প্রকাণ্ড গৃহ-বিশেষ। এখানে বিশুদ্ধ বায়ু-চলাচলের সুন্দর বন্দোবস্ত আছে ; ঘরে ছােট ছােট টেবিল, চেয়ার সাজান রহিয়াছে। সেগুলি এত হাল্কা যে, শিশুগণ অনায়াসে ইচ্ছামত যেখানে সেখানে লইয়া যাইতে পারে। বাহিরের দিকে যথেষ্ট উন্মুক্ত স্থান ; সেখানে শিশুগণ ছুটাছুটি ও খেলা করে।
১২২ চরিত্রচিত্র। প্রতি প্রকোষ্ঠে মাত্র ত্রিশটি শিশুর শিক্ষার বন্দোবস্ত আছে। সেখানে একজন তত্ত্বাবধায়িকা বা শিক্ষয়িত্রী, ধীর স্থির প্রশান্ত মূর্তিতে অথচ অবহিতচিত্তে, বসিয়া আছেন। শিশুগণ নিজ নিজ ইচ্ছামত কাজ করিতেছে এবং কখনও কখনও শিক্ষয়িত্রীর নিকট উপদেশগ্রহণের জন্য নিজ হইতেই আগমন করিতেছে। শিক্ষয়িত্রী অনাহুতভাবে গায়ে পড়িয়া শিদিগকে কোন কথাই বলিতেছেন না। গৃহের এক কোণে একটি পিয়ানাে রহিয়াছে। কোনও শিশু পিয়ানাের পাশে বাজনার সঙ্গে সঙ্গে নৃত্য ও খেলা করিতেছে ; কোনও শিশু বা ক্লান্তি অনুভব করিয়া গৃহতলে বিস্তৃত সুকোমল গালিচার উপর শুইয়া পড়িতেছে। প্রাচীর-গাত্রে কোমলমতি শিশুদিগের চিত্তাকর্ষক ও শিক্ষাপ্রদ সুন্দর সুন্দর ছবি ঝুলান আছে। কোথাও বা শিশুদিগের জলসেচন- পরিপুষ্ট গাছপালা জানালার পশ্চাতে পাত্রবিশেষে সজ্জিত রহিয়াছে। কোথাও বা গৃহের এক কোণে হাত-মুখ ধুইবার জন্য জলপূর্ণ পাত্র আছে এবং উহার আশে পাশে কয়েকটি ছােট ছােট বাটী ও কলসী পড়িয়া রহিয়াছে। খেলিতে শেলিতে যখন হাতে মুখে মাটি লাগিতেছে, তখন শিশুগণ এখানে আসিয়া হাত-মুখ ধুইয়া পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হইতেছে। বস্তুত গৃহে মাতা শিশুগণের জন্য যে সকল ব্যবস্থা করেন, এখানে তাহার কোন ত্রুটি হইতেছে না। সুতরাং এ বিদ্যালয়ের ‘শিগুগৃহ” আখ্যাটি অতিশয় উপযােগী হইয়াছে। শিশুদিগের হৃদয়ে কর্তব্যজ্ঞান উদ্রেক করিবার জন্য এখানে অতি সুন্দর উপায় অবলম্বন করা হয়। বিদ্যালয়ের কাৰ্য আৰম্ভ করিবার পূর্বে শশুগণ বিদ্যালয়-গৃহ নিজ-হস্তে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে ; নিজেরাই হাতমুখ ধুইয়া পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হইয়া প্রাতঃকালীন বেশ-ভূষায় সজ্জিত হয়। তাহার পরস্পরকে ভাইবােনের ন্যায় ভালবাসে। কখনও কখনও কঠিন প্রশ্নের ডাক্তার মন্টেসরী। ১২৩ সমাধানের জন্য তাহারা দুই তিন জন মিলিয়া এক একটি দল করে; কখনও কখনও চারি পাচ জন মিলিয়া দল বাঁধিয়া খেলা করে; কখনও বা দশ বার জন মিলিয়া পিয়ানাের তালে তালে এক সঙ্গে নৃত্য করে। গৃহের বাহিরে ক্রীড়াপ্রাঙ্গণ। সেখানে নানাপ্রকার সজীব গাছপালা ও সুন্দর সুন্দর ফুলের গাছ সজ্জিত রহিয়াছে। খেলায় মাতিয়া শিশুগণ সেখানে দলে দলে ছুটাছুটি করিতেছে। পড়া-শুনা করিবার জন্য কেহই তাহাদিগকে খেলা হইতে বিরত হইতে বলিতেছে না। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় এই যে, এইরূপ সুবিধা ও স্বাধীনতা পাইয়াও তাহারা সর্বদা ক্রীড়া-রত থাকিতে চায় না। কতকক্ষণ পরে নিজ হইতেই তাহারা লেখা-পড়া ও গণনা প্রভৃতি কাৰ্যে মনােনিবেশ করে। স্বাধীনতার অপব্যবহার চিরাবরুদ্ধ শিশুগণ যেরূপ করে, ইহারা কখনও সেরূপ করে না। আর এই সকল শিশুগণ যখন পড়াশুনা ও গণনা প্রভৃতি শিক্ষাবিষয়ে নিযুক্ত হয়, তখন সেদিকে তাহাদের এত গাঢ় অভিনিবেশ হয় যে, তাহারা সেই অল্প সময়ের মধ্যে যে পরিমাণ শিক্ষা লাভ করে, নির্দিষ্ট নিয়মানু- যায়ী শিক্ষক-প্রদত্ত পাঠ হইতেও ছাত্রগণ সেরূপ শিক্ষা লাভ করিতে পারে । বস্তুতঃ শিক্ষার বিষয়গুলিকে নানাভাবে এরূপ চিত্তাকর্ষক করা হয় যে, শিগণ স্বতঃপ্রবৃত্ত হইয়া সে সকল বিষয়ে মনােযােগ প্রদান করে। জোর করিয়া তাহাদের মনােযােগ আকর্ষণের চেষ্টা করা হয় না; কারণ, প্রকৃত শিক্ষার দিক দিয়া দেখিতে গেলে উহার মূল্য অতি অল্প। মন্টেসরী বলেন- “প্রথমতঃ, শিশু নিজকেই নিজে শিক্ষা দিতে পারে; অপরের পক্ষে শিশুকে শিক্ষা দেওয়া অসম্ভব। শুনিয়া শিখা বা দেখিয়া শিখা অপেক্ষা, নিজে করিয়া শিখার মূল্য অনেক বেশী। সুতরাং শিশু প্রত্যেক বিষয় নিজের চেষ্টাদ্বারা শিক্ষা করিবে। স্বতঃপ্রবৃত্ত হইয়া ১২৪ চরিত্র-চিত্র। হইবে; ইচ্ছায় ইন্দ্রিয়-পরিচালনা করিয়া শিশু যাহা শিক্ষা করে, তাহাই তাহার জ্ঞানভাণ্ডারের সঞ্চয় দিন দিন বৃদ্ধি করে। পর-দত্ত শিক্ষায় তাহার জ্ঞানের উৎস বরং দিন দিন শুষ্ক হইয়া যায়। দ্বিতীয়ত, শিক্ষাপ্রণালীকে শিশুর উপযােগী করিবার চেষ্টা করিতে শিশুকে জোর করিয়া কোনও বিশিষ্ট কল্পিত শিক্ষাপ্রণালীর উপযােগী করিবার চেষ্টা স্বভাববিরুদ্ধ। তৃতীয়তঃ, শিক্ষার ব্যবস্থা এরূপ হওয়া বাঞ্ছনীয় যে, শিশু যেন শিক্ষা লাভ করিতে আগ্রহভরে নিজের ইচ্ছায় অগ্রসর হয়, এবং উহাতে সে যেন এরূপ আনন্দ উপভোগ করিতে পারে, যাহা তাহার পক্ষে অন্যত্র পাওয়া অসম্ভব।” প্রাতঃকাল হইতে বিদ্যালয়ের কাৰ্য্য আরম্ভ হয়। তখন শিশুণ সাধারণত মন্টেসরীর উদ্ভাবিত শিশুশিক্ষার উপযােগী নানাপ্রকার যন্ত্রপাতি লইয়া কাৰ্যে রত হয়। মধ্যাহ্নবেলা শিশুগণ নিজেরাই খাদ্যাদি পরিবেশনের বন্দোবস্ত করিয়া আহারে বসিয়া যায়। ভিন্ন ভিন্ন দিন ভিন্ন ভিন্ন দলের উপর এই ভার অর্পিত হয়। তাহারা আহারের টেবিল সাজাইয়া পানীয় ইত্যাদি আনয়ন করে এবং আহারের অন্যান্য দ্রব্য পরিবেশন করে। এই ছােট ছােট শিশুদিগকে টেবিল সাজাইতে দেখিলে মনে এক অপরূপ আনন্দের উদয় হয়। চারি পতি বৎসরের শিশুগণ ছুরি, চামচ, কাটা প্রভৃতি তাহাদের সঙ্গীদিগকে বিলাইতেছে ; কেই কেহ বা থালাতে করিয়া একবারে ৫৬টি জলপূর্ণ গ্লাশ লইয়া আসিতেছে । কেহ কেহ বা পাত্র ভরিয়া গরম সূপ লইয়া ভিন্ন ভিন্ন টেবিলে সঙ্গীদিগকে মােগাইতেছে। আশ্চর্যের বিষয়, কেহই কোনরূপ ত্রুটি দেখাইতেছে না। কোন গ্লাশ ভাঙ্গিয়া যাওয়া বা সূপ পড়িয়া যাওয়া প্রভৃতি কিছুই হইতেছে । এই সকল শিশুগণ কিরূপ ক্ষিপ্রতাসহকারে কাৰ্য্য কখিতেছে, ডাক্তার মন্টেসরী। এবং অপরেরা কিরূপ সুসংযতভাবে বসিয়া খাওয়া দাওয়া করিতেছে, তাহা দেখিলে আনন্দাশ্রু বিসর্জন না করিয়া থাকিতে পারা যায় না। আহারাদির পর আবার শিশুগণ নিজ নিজ ইচ্ছামত কাৰ্যে নিযুক্ত হয়। কেহ কেহ খেলার মাঠে দৌড়াদৌড়ি করে, কেহ কেহ ফুলের গাছে যত্নসহকারে জলসেচন করে, কেহ বা মনের সুখে আরামে যতক্ষণ ইচ্ছা ঘুমায়। কিন্তু অধিকাংশ শিশুই মন্টেসরীর উদ্ভাবিত যন্ত্রপাতি লইয়া নানাভাবে অতিশয় আনন্দসহকারে সমস্ত সময়টুকু কাটাইয়া দেয়। মন্টেসরীর উদ্ভাবিত যন্ত্রপাতিগুলি বিজ্ঞান-সম্মত-প্রণালীতে এরূপ যত্ন ও কৌশল-সহকারে নির্মিত যে, তাহাদের সাহায্যে আমােদপ্রমােদের সঙ্গে সঙ্গে অলক্ষিতভাবে তিন হইতে সাত বৎসরের শিশুগণ নিজ হইতেই অনেক শিক্ষা লাভ করিতে পারে। মন্টেরী বলেন-“প্রত্যেক শিশুর প্রকৃতি অপর শিশুর প্রকৃতি হইতে বিভিন্ন ও স্বতন্ত্র। আবার শিশুর প্রকৃতি চিরপরিবর্তনশীল ; নিত্যই নূতন। সুতরাং প্রকৃত শিক্ষা প্রদান করিতে হইলে এক এক জন শিশুর জন্য এক এক জন শিক্ষকের প্রয়ােজন।” সকলের পক্ষে যদিও ইহা সম্ভবপর না হউক, শিক্ষিত জনক- জননীগণ এই শিক্ষকের স্থান অধিকার করিতে পারেন। আমাদের দেশের জনক জননীগণ শিশুর শিক্ষার দিকে বড় একটা লক্ষ্য রাখেন না। তাহারা জানেন না বা জানিতে চান না যে, শিশুর শিক্ষার নিজহস্তে লইলে যত সহজে ও স্বভাবানুমােদিত পথে তঁাহারা উহাদিগকে শিক্ষা দিতে সমর্থ হইবেন, শিক্ষক শত শিক্ষিত হইলেও তাহা পারিবেন কি না সন্দেহ। শিশুর সরল মধুর বাক্য তাহাদের কর্ণকুহরে অমিয়ধারা বর্ষণ করে স্য, শিশুর সদা-প্রফুল্ল হাসিমাখা মুখখানি তাহাদের প্রাণে বিমল আনন্দের তরঙ্গ উত্তোলন করে সত্য, শিশুর সজীব চঞ্চলভাব তাহাদের ;
১২৬ চরিত্র-চিত্র। প্রাণে নবীন জীবন দান করে সত্য, কিন্তু তাহারা পদে পদে উহার প্রতি অবহেলা প্রদর্শন করে। শিশুর স্বাস্থ্যের প্রতি ঔদাস্ত প্রকাশ করিয়া তাহারা নানারূপে উহার অনিষ্ট সাধন করে, শিশুর স্বাধীনতার উপর নানাপ্রকার অস্বাভাবিক বন্ধন আরােপ করিয়া নানাভাবে উহার স্বাধীন প্রকৃতিকে ব্যাহত করে, এবং অজ্ঞানতাবশতঃ উহার মনােবৃত্তি ও চিত্তবৃত্তি বিকাশের পথে নিত্য নূতন বাধাবিঘ্ন উপস্থিত করে। বস্তুত, বঙ্গদেশে প্রথম পাঁচ বৎসর শিশুর কোন তত্ত্বাবধানই লওয়া হয় না। এই সময়ে না লওয়া হয় তাহার শরীরের যত্ন, ন সওয়া হয় তাহার মনের যত্ন। পরিমিত খাদ্য ও নিয়মিত ব্যায়ামের অভাবে যেরূপ তাহার শরীরের ক্রম-পৰিপুষ্টির ব্যাঘাত ঘটে, শিক্ষার প্রথম সােপান প্ৰণালীবদ্ধ ক্রীড়াকৌতুকের অভাবেও তদ্রুপ তাহার মনােবৃত্তি বিকাশের সুযােগ বিনষ্ট হয়। অবশ্য আমাদের দেশে শিশুজনােচিত নানাপ্রকার ক্রীড়াকৌতুকের প্রচলন আছে। কিন্তু তাহার মধ্যে না আছে কোনও ব্যবস্থা, না আছে কোনও প্রণালী। আমরা জানিনা যে, সে গুলির সাহায্যে কি উপায়ে অতি সহজে ও সরলভাবে শিশুদের পর্যবেক্ষণশক্তি, উদ্ভাবনশক্তি এবং কল্পনা ও বিচারশক্তির উন্মেষ সাধিত হইতে পারে। আমরা জানিনা, সেগুলির সাহায্যে কিরূপে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, শিষ্টাচার, সাহস, সাহচৰ্য্য, ধৈৰ্য্য ও অধ্যবসায় প্রভৃতি নৈতিক গুণগুলি তাহাদের হৃদয়ে বদ্ধমূল করা যায়। কিন্তু পাশ্চাত্য সভ্য জাতির বর্তমান শিক্ষার ইতিহাস পর্যালোচনা করিলে আমরা দেখিতে পাই যে, শিশুর শিক্ষাবিষয়ে তাহারা কত আগ্রহ দেখাইতেছে এবং কতরকমের আয়ােজন করিতেছে। যাহারা শিশুর স্বাস্থ্য ও শিক্ষাকেই তাহাদের জীবনের একমাত্র যক্ষেত্ররূপে গ্রহণ করিয়াছেন, যাহাদের জীবনব্যাপী সাধনার ফলে ডাক্তার মন্টেসরী । শিশুর শিক্ষারাজ্যে এক নবযুগের আবির্ভাব হইয়াছে, সে সকল অকৃত্রিম সাধক ও সমাজসেবকের মধ্যে ডাক্তার মেরিয়া মণ্টেরীর নাম সর্বাগ্রে উল্লেখযােগ্য। চিকিৎসা-ব্যবসায়দ্বারা তিনি রােম নগরে প্রভূত অর্থ উপার্জন করিতেছিলেন এবং স্বকীয় ব্যবসায়ক্ষেত্রে অল্পদিনের মধ্যেই যথেষ্ট খ্যাতি ও প্রতিপত্তি লাভ করিয়াছিলেন। ইচ্ছা করিলে, তিনি আজ রােম নগরের ধনিসম্প্রদায়ের মধ্যে উচ্চাসন লাভ করিতে পারিতেন। কিন্তু ধন-মান-যশ তাঁহাকে আবদ্ধ করিয়া রাখিতে পারিল না। সেবাৰত গ্রহণ করিয়া তিনি দরিদ্রের পল্লীতে পল্লীতে ঘুরিয়া তাহাদের শিশুসন্তান- গণের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের উন্নতিবিধানে রত হইলেন। শিশুর শিক্ষাই ‘াহার সাধনার একমাত্র বিষয় হইল। এই বিদুষী রমণীর প্রাণপাত চেষ্টা ও যত্নের ফলে, আজ পৃথিবী শিশুর শিক্ষাবিষয়ে এক নূতন তত্ব লাভ করিয়াছে। তাই আজ জগদ্বাসী তাহার পুণ্যপূত জীবনকাহিনী শ্রবণ করিয়া নিজকে কৃতাৰ্থৰ্ম্মন্য করিতে চায়।
পানদোষ দমনে
“পুসীফুট” জন।
“তােমার কাছে আরাম চেয়ে
পেলেম শুধু লজ্জা।
এবার সকল কাজ ছেয়ে
পরাও রণসজ্জা।
ব্যাঘাত আসুক নব নব,
আঘাত খেয়ে অচল রব,
।
বক্ষে আমার দুঃখে, তব
বাজবে জয়-ভঙ্ক।
দেবে। সকল শক্তি, ল’ব
অভয় তব শঙ্খ।”
—রবীন্দ্র নাথ।
যখন পুসীফুট জন কলিকাতায় আগমন করেন, তখন তাহার
সম্বৰ্ধনার্থ হাওড়া স্টেশনে য়ুরােপীয় ও ভারতীয় বহুসংখ্যক নরনারী
সমবেত হইয়াছিল। ষ্টেশনটি নানাপ্রকার পত্ৰপুষ্প ও পতাকা-
মালায় সুসজ্জিত করা হইয়াছিল। ১৯২১ সনের ১১ই অক্টোবর ভোর
বেলা ৬টা ৫৪ মিনিটের সময় যখন ট্রেন আসিয়া ষ্টেশনে উপস্থিত হইল,
তখন সমবেত জনমণ্ডলীর আনন্দধ্বনিতে গগনপবন ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত
হইয়া উঠিল। পুসীফুট জনসন গাড়ী হইতে অবতরণ করিলে,
তাহাকে পুষ্পমালায় বিভূষিত করিয়া কলিকাতাবাসী তাহাদের অভিবাদন
জ্ঞাপন করিল। চতুর্দিকে আনন্দবােল ও মঙ্গলসূচক শঙ্খধ্বনি বাজিয়া
“পুসীফুট” জন। ১২ উঠিল। যে কয়দিন তিনি কলিকাতায় ছিলেন, য়ুরােপীয় ও ভারতীয় সমাজ সভাসমিতি আহ্বান করিয়া নানাভাবে তাহার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করিল। এই পুসীফুট জনসন কে? কেনই বা তাহার প্রতি সম্মানপ্রদর্শন জাতিধর্ম-নির্বিশেষে কলিকাতাবাসী মিলিত হইয়াছিল। তিনি একজন আমেরিকাবাসী। তাহারই প্রাণপাত চেষ্টা ও অপূৰ্ব সাধনাবলে আমেরিকা আজ পানদোষক্ত হইয়া দিন দিন নৈতিক ও আর্থিক উন্নতির পথে আরও দ্রুতবেগে অগ্রসর হইবার প্রয়াস পাইতেছে। আমেরিকার অর্ধশিক্ষিত জনসাধারণ, গত কয়েক বৎসরের মধ্যে, আপাতমধুর পরিণামবিষ মাদকদ্রব্যের মােহ হইতে অব্যাহতি লাভ করিয়া দারি- রাক্ষসীর হস্ত হইতে নিতি ও পাপের সমােহন লােভন হইতে রক্ষা পাইতে যে অনেকটা সমর্থ হইয়াছে, তাহার মুলে এই পুসীফুট জন। প্রধানতঃ তাহারই উদ্যোগে আমেরিকাবাসী জনসাধারণ মদ্যপানের অপকারিতা হৃদয়ঙ্গম করিতে সমর্থ হইয়া তন্নিবারণে বদ্ধপরিকর হয়। তাহারই চেষ্টায় আমেরিকায় এক মাদকনিবারণী সভা গঠিত হয়। তাহার দেশময় এক প্রবল আন্দোলন উপস্থিত করেন। উহারই ফলে আমেরিকা পানদোষনিবারণী আইন বিধিবদ্ধ হয়। পানদোষনিবারণই পুসীফুট তাহার জীবনের প্রধান ব্রতরূপে গ্রহণ করিয়াছেন, এবং তদুদ্দেশ্যে তিনি দেশবিদেশে ঘুরিয়া বেড়াইতেছেন। কত সময় যে এজন্য তাহার জীবন সঙ্কটাপন্ন হইয়াছে, এজন্য কতভাবে যে তাহাকে বিপন্ন হইতে হইয়াছে, তাহা বর্ণনাতীত। তথাপি তাহার ক্ষেপ নাই। স্বীয় ব্ৰত-উদ্যাপনে বিপদাপদ তুচ্ছ জ্ঞান করিয়া তিনি অকুতােভয়ে অগ্রসর হইতেছেন। তাহার কাৰ্য্যক্ষেত্র এখন আর আমেরি কায় সীমাবদ্ধ নাই; তিনি সমস্ত পৃথিবীকে তাঁহার কাৰ্য্যক্ষেত্ররূপে গুণ ১৩০ চরিত্র-চিত্র। করিয়াছেন। মানবের সেবাই যাহার জীবনের উদ্দেশ্য, তাহার আবার দেশ বিদেশ কি? যেখানেই সুরারাক্ষসী তাহার বিকট বদন ব্যাদান করিয়া অপরিণামদর্শী নির্বোধ ব্যক্তিদিগকে গ্রাস করিতে অগ্রসর হইতেছে, সেখানেই তিনি উহার গতিরোেধ ও বিনাশসাধনে নির্ভীকচিত্তে অসিহস্তে “যুদ্ধং দেহি” বলিয়া উপস্থিত হইতেছেন। তাই তাহার এত সম্মান, তাই তাঁহার এত গৌরব। প্রায় তিন বৎসর হইল, আমেরিকায় আইনের সাহায্যে মদ-বিক্রয় বন্ধ করা হইয়াছে। ইহার জন্য পুসীফুট জনসনকে যে কত কৌশল অবলম করিতে হইয়াছে, কত পরিশ্রম স্বীকার করিতে হইয়াছে, কত কষ্ট সহ্য করিতে হইয়াছে, কত গঞ্জনা ভােগ করিতে হইয়াছে, কত বিপদের সম্মুখীন হইতে হইয়াছে, কত ত্যাগ স্বীকার করিতে হইয়াছে, তাহা পাঠ করিলে ভক্তিশ্রদ্ধার সুচন্দনে তাঁহাকে পূজা করিতে কাহার না ইচ্ছা হয় ? আমেরিকার কোনও এক ষ্টেটে মদবিক্রয়ের নিষেধাজ্ঞা প্রচারিত হইয়াছে, কিন্তু তথাপি আইন অমৰ্য্যাদা করিয়া তথায় গােপনে মদবিক্রয় চলিতেছে। তাই তথাকার গবর্নমেন্ট উইলিয়াম ইউজিন জনকে এই সকল আইনলঙ্ঘনকারী মদ্যবিক্রেতাদিগকে ধরিয়া দিবার জন্য প্রেরণ করিলেন। তখনও তাহার নাম “পুসীফুট” হয় নাই। যে ঘটনা হইতে উইলিয়াম ইউজিন্ “পুসীফুট” বলিয়া পরিচিত হয় তাহা এই স্থানে সংঘটিত হয়। এই প্রদেশের মদ্যবিক্রেতারা উইলিয়মের আগমনে অত্যন্ত সন্ত্রস্ত হইয়া উঠিল। তাঁহার ভয়ে উহাদের মদবিক্রয় এক প্রকার বন্ধ হইয়া গেল, এজন্য তাহার উপর উহার অত্যন্ত কষ্ট হইল। এমন কি একজন মদ্য, বিক্রেতা প্রকাশ্যে বলিয়া বেড়াইতে লাগিল যে উইলিয়ামকে একবার বাগে' পাইলে, সে তাহাকে খুন করিবে। উইলিয়াম ভীত হইবার লােক ছিলেন “পুসীফুট জনসন। ১৩১ ; বরং তিনি সেই ক্রোধােন্মত্ত মদ্যবিক্রেতাকে অপ্রতিভ করিতে যাইয়া, যে দুর্জয় সাহস ও অপূৰ্ব কৌশলের পরিচয় প্রদান করিয়াছিলেন, তাহ সকলকে বিস্মিত ও স্তম্ভিত করিয়াছিল। একদিন তিনি এক মাতাল সাজিয়া সেই দোকানে গিয়া উপস্থিত হইলেন। দোকানদার তাহাকে বেশ ভাল করিয়াই চিনিত। কিন্তু তিনি এমন কৌশলসহকারে মাতালের হাবভাব, চালচলন ও সাজসজ্জা অবিকল নকল করিয়াছিলেন যে, তাঁহাকে চিনিবার একেবারেই উপায় ছিল না। দোকানদার তাহাকে প্রকৃতই মাতাল মনে করিয়া লােভ পরতন্ত্র হইয়া তাহার নিকট গােপনে মদ বিক্রয় করিতে স্বীকৃত হইল এবং তাহার জন্য এক বােতল মদ আনিবার উদ্দেশ্যে গুপ্তভাণ্ডার-গৃহে প্রবেশ করিল। অসাবধানতাবশতঃ দোকানদার,তাহার পিস্তলটি জনের নিকটেই ফেলিয়া রাখিয়াছিল। জন এই সুযােগে পিস্তলটি হস্তগত করেন। দোকানদার আসিয়া জনসনের হন্তে মদের বােতল প্রদান করিলে, তিনি পিস্তলটি দোকানদারের কপাল বরাবর উদ্যোলন করিয়া আত্মপরিচয় প্রদান করিলেন। দোকানদার হঠাৎ এরূপ অপ্রস্তুত হইয়া লাজে ভয়ে জড়সড় হইয়া দাঁড়াইয়া রহিল। তদবধি তাঁহার নাম হইল “পুসীফুট” অর্থাৎ বেড়াল-পা। তিনি আত্মগােপন করিয়া বিড়ালের ন্যায় সেই দোকানে প্রবেশ করিয়াছিলেন বলিয়া মদ্যবিক্রেতারা বঙ্গভরে তাহাকে “পুসীফুট” আখ্যা প্রদান করে। পুসীফুট মদ্যপায়ীদিগের চক্ষুঃশাস ছিলেন। পানাসক্ত ব্যক্তিগণ মদ্যাভাবে একপ্রকার উন্মত্ত হইয়া উঠিয়াছিল। এক ফোটা মদের জন্য তাহারা চুরি পর্যন্ত করিতে ইতস্ততঃ করে নাই। একদা একটি লােকের মদ্য-পিপাসা অত্যন্ত বলবতী হইয়া উঠে। সে এক হােটেলে কিছু মই চায়, সেখানে মদ না পাইয়া সে এক ঔষধালয়ে যাইয়া উপস্থিত হয়।
চরিত্র চিত্র। সখানে মদ চাহিলে, ঔষধবিক্রেতা তাহাকে ডাক্তারের ব্যবস্থাপত্র খাইতে বলে। সে ডাক্তারের নিকট উপস্থিত হইল। রােগ না হইলে মদ ব্যবস্থা করতে পারেন না এই বলিয়া ডাক্তার তাহাকে বিদায় করিতে চান। তখন ভগ্নাশ হইয়া লােকটি জিজ্ঞাসা করে-“কিরূপ রােগ হইলে আপনি মদের ব্যবস্থা করিবেন ?” ডাক্তার বলিলেন, “সর্পদংশনে মদের ব্যবস্থা করিবার রীতি আছে।” কিছুকাল পরে সেই বেচারা আবার সেই ডাক্তারের নিকট আসিয়া উপস্থিত হইল। তাহার পায়ে এক ক্ষতচিহ্ন দেখাইয়া সে ডাক্তারের নিকট আবার মদের ব্যবস্থাপত্র চাহিল। সেই ক্ষতচিহ্ন লােকটির স্বহস্তকৃত কিনা তাহা বুঝিতে ডাক্তারের আর বাকী রুহিল না। তথাপি লােকটার মদ্যপানে এইরূপ আসক্তি দেখিয়া, একান্তই না পারিয়া তিনি এক ব্যবস্থাপত্র লিখিয়া দিলেন। আর সেই হতভাগ্য জীব ব্যবস্থাপত্র লইয়া হর্ষভরে ঔষধালয়ে দৌড়াইল এবং সেখান হইতে মদ কা করিয়া তাহার পান পপাসার তৃপ্তি সাধন করিল। এরূপ মদ্যপানাসক্ত ব্যক্তির সংখ্যা প্রথমতঃ আমেরিকায় বড় কম ছিল না। কিন্তু যখন তাহারা মদ্যপানের অপকারিতা উপলব্ধি করিতে পারিল, তখন তাহারাই আবার মদ্যপাননিবারণের জন্য বদ্ধপরিকর হইল। ধীরে ধীরে লােকের মতিগতি পরিবর্তিত হইল, এবং তাহারা পত্নী, পুত্র ও নিজদিগকে সুরারাক্ষসীর কবল হইতে মুক্ত করিবার উপায় খুজিতে লাগিল। যখন বুঝিতে পারি যে পাপাসক্ত হইর স্বকীয় পাশব প্রবৃত্তির চরিতার্থ করিতে গিয়া, তাহারা স্বদেশের উন্নতির মূলে কুঠারাঘাত করিয়াছে, সমাজের মুখে কালিমা লেপন কয়িয়াছে এবং নিজ নিজ পরিবারের দারিদ্রদুর বৃদ্ধি করিয়াছে, তখন তাহারা অনুতাপানলে * হইতে লাগিল। শীঘ্রই তাহাদের চৈতন্য ফিরিয়া আসিল এবং ভিতরকার মানুষ জাগিয়া উঠিল। পানদোষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘােষণা আছে ? “পুসীফুট” জনসন। ১৩৩ করিয়া নানাপ্রকার আন্দোলনাদির সাহায্যে অচিরেই তাহার সরকার বাহাদুরকে মদ্যপাননিবারণের আইন প্রণয়নে বাধ্য করিতে সমর্থ হইল। আমেরিকার সর্বসাধারণের মধ্যে এইরূপ কৰ্তব্যৰােধ ও দায়িত্বজ্ঞান জাগাইয়া ভােলা বড় সহজ ব্যাপার ছিল না। কিন্তু দৃঢ় প্রতিজ্ঞা ও কঠোর সাধনাবলে অসাধ্যও সাধিত হয়। উহাদের বলে মানুষ বাধাবি ও বিপদাপদ সমস্ত পদদলিত করিয়া গর্বভরে সিদ্ধিপথে অগ্রসর হয়। সুতরাং পুসীফুটের দৃঢ় সঙ্কল্প, অদম্য উৎসাহ, অমিত তেজ এবং অনন্যসাধারণ ধৈর্ম ও অধ্যবসায় জয়যুক্ত হইবে, তাহাতে আর আশ্চর্যের বিষয় কি বস্তুতঃ, অক্লান্ত চেষ্টা ও জীবনব্যাপী সাধনাবলেই পুসীফুট আমেরিকায় মদ্যপাননিষেধক আইন বিধিবদ্ধ করাইয়া জগৎসভায় শ্রেষ্ঠ আসন লাভে সক্ষম হইয়াছিলেন। এইরূপ আইন বিধিবদ্ধ হওয়ায় আমেরিকায় মদ্যপান এক প্রকার পােপ পাইয়াছে। উহার সুফল এই হইয়াছে যে, দেশের এক প্রান্ত হইতে অপর প্রান্ত পর্যন্ত ব্যবসায়বাণিজ্যের আশাতীত উন্নতি সাধিত হইয়াছে, এবং দেশের লােকের সঞ্চয়শক্তি বৃদ্ধি পাইয়াছে। আর্থিক ও নৈতিক উন্নতির পথে আমেরিকা উত্তরােত্তর দ্রুতবেগে ধাবিত হইতেছে। দশ বৎসর পূর্বে যে আমেরিকা পৃথিবীর অন্যান্য জাতির নিকট ঋণপাশে আবদ্ধ ছিল, আজ সেই আমেরিকার নিকট ঋণী নয় এরূপ জাতি য়ুরােপে নাই বলিলেই হয়। মদ্যপাননিবারণের ফলে আমেরিকার কলােরেভে নামক প্রদেশে এক বৎসরের মধ্যেই বহু নূতন সেভিংসব্যাঙ্ক স্থাপিত হইয়াছে। দেশে দিন দিন অপরাধীর সংখ্যা হ্রাস পাইতেছে, সুতরাং জেলের সংখ্যাও কমিয়া যাইতেছে। যে বৎসর মিশিগান প্রদেশে আইনের সাহায্যে মদ্যপান নিবারিত হয়, সেই বৎসরই সেই প্রদেশের জেলের সংখ্যা অৰ্দ্ধাধিক অর্থাৎ ৩টি কমিয়া গিয়াছে। আরও বিস্ময়ের কথা এই যে, আমেরিকায় ১৩৪ চরিত্রচিত্র। যুক্তরাজ্যের দক্ষিণভাগে প্রায় একলক্ষ ডলার অর্থাৎ প্রায় তিনলক্ষ টাকা ব্যয়ে একটি কারাগৃহ নির্মিত হয়। এই কারাগৃহটি নূতন ভাবে যতদূর উৎকৃষ্ট ও উপভােগ্য করিয়া প্রস্তুত করা সম্ভবপর তাহা করা হইয়াছিল। ইহার নির্মাণকাৰ্য শেষ হইতে না হইতেই, সেখানে মদ্যপাননিবারণের আইন প্রচলিত হইল। কাজেই সেই অজস্রঅর্থব্যয়ে নির্মিত সুরম্য কারাগৃহে অবরুদ্ধ করিয়া রাখিবার একটি অপরাধীও জুটিল না। কর্তৃপক্ষীয়- গণ বাধ্য হইয়া সেই কারাগৃহটিকে বিদ্যালয়গুহে পরিণত করিল। ইহা অপেক্ষা নৈতিক উন্নতির উজ্জ্বলতর দৃষ্টান্ত আর কি হইতে পারে ? এইরূপে আমেরিকায় কৃতকাৰ্যতা লাভ করিয়া পুসীফুট জন পানদোষনিবারণাৰ্থ ইংলণ্ডে আগমন করেন। এখানেও আমেরিকার লায় তঁহাকে অনেক লাঞ্ছনাগঞ্জনা সহ্য করিতে হইয়াছে। প্রথম যখন তিনি ইংলণ্ডে মদ্যপানের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সূচনা করিলেন, তখন একদল ছাত্র তাহার ঘাের বিরুদ্ধাচরণ করিতে লাগিল। তিনি যেখানেই সভা করিয়া মদ্যপানের দোষ প্রচার করিতে চেষ্টা করিতেন, সেখানেই তাহারা সেই সভা পণ্ড করিয়া দিবার জন্য সমবেত হইত। তিনি যখন সভাক্ষেত্রে গমন করিতেন অথবা সভাস্থল পরিত্যাগ করিতেন, তখন সেই সকল ছাত্রের দল তাহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ ধাবিত হইয়া তাহাকে উপহাস্পদ করিতে চেষ্টা করিত। ধর্মের বিরুদ্ধে অধর্মের, দেবতার বিরুদ্ধে দানবের, এইরূপ বিরুদ্ধাচরণের দৃষ্টান্ত ইতিহাসে বড় বিরল নয়। যে পাপীদের পরিত্রাণের জন্য যীশু ধরাধামে অবতীর্ণ হইলেন, সেই কৃতঘ্ন ব্যক্তিগণই আবার তাহাকে ক্রুশে আবদ্ধ করিয়া অতি নির্মমভাবে হত্যা করিল। হরিপ্রেম বিলাইতে গিয়া জগাই মাধাইয়ের কলসীর কাণায় নিত্যানন্দের দেহ ক্ষতবিক্ষত ও রুধিরাক্ত হইল; একেশ্বর বাদ প্রচার করিতে যাইয়া মহম্মদকে স্বীয় জন্মভূমি মক্কা পরিভাগ করিয়া •• “পুসীফুট” জন। মদিনায় আশ্রয় লইতে হইল ; হিন্দুধর্মের লুপ্ত শাস্ত্র উদ্ধার ও প্রচার করিতে যাইয়া রাজা রামমােহনকে কত লাঞ্ছিত হইতে হইল। উহাদের তুলনায় পুসীফুটের লাঞ্ছনা যে অতি সামান্য। পুসীফুটের লাঞ্ছনার এখানেই শেষ হয় নাই। যদি এইখানেই শেষ হইত, তাহা হইলে পুসীফুটের অপূৰ্ব ত্যাগের মাহাত্ম্য যে প্রচারিত হইত না, তাঁহার অগ্নিপরীক্ষা যে পরিসমাপ্ত হইত না; ধৰ্ম্মের মহিমা যে উজ্জ্বলমুর্তি পরিগ্রহ করিত না। তাই ভগবান্ যুবকদের হৃদয়ে সয়তানের অবাধরাজ্য- স্থাপনব্যাপারে কোনরূপ বাধা প্রদান করিলেন না। পাপলুব্ধ পানাসক্ত যুবকদল পুসীফুটকে নিগ্রহের উপর নিগ্রহ প্রদান করিতে লাগিল। অবশেষে একদিন কোন এক যুবক লােষ্ট্ৰাঘাতে তাহার এক চক্ষের মণি একেবারে নষ্ট করিয়া দিল। এইরূপ সৰ্ব্বাপেক্ষা প্রিয় পাত্র বা প্রিয় জিনিস প্রদান করিয়াই ভক্তগণ ভগবানের স্থায়ী আশীৰ্বাদ লাভ করেন। কপােতকে রক্ষা করতে যাইয়া আশ্রিত-বৎসল রাজা উশীনর নিজ দেহের মাংস প্রদান করিয়া- ছিলেন, ভগবানকে সন্তুষ্ট করিতে যাইয়া আব্রাহাম স্বীয় পুত্রকে বলি দিতে উদ্যত হইয়াছিলেন, অতিথির সৎকার করিতে যাইয়া দাতাকর্ণ নিজের পুত্রকে নিজহস্তে কৰ্ত্তন করিয়াছিলেন। তাই তাহাদের নাম ইতিহাসের পৃষ্ঠায় স্বর্ণাক্ষরে লিখিত রহিয়াছে। পুসীফুটের নাম চিরস্মরণীয় করিবার জন্যই, বােধ হয়, ভগবান্ তাহার একটি চক্ষুরত্ব গ্রহণ করিয়াছেন। চক্ষুরত্ব দান করিয়া পুসীফুটের বল আরও বাড়িয়া গেল। ভগবানের আশীৰ্বাদ তাহার মস্তকোপরি বর্ষিত হইল। দলে দলে লােক আসিয়া তাহার আরব্ধ কাৰ্য্যে সহায়তা প্রদান করিতে লাগিল। সুরাপানের বিরুদ্ধে ধৰ্ম্মযুদ্ধ প্রবলবেগে চলিতে লাগিল এবং অনিবার্য জয়লাভের চিহ্ন সূচিত হইল। • ১৩৬ চরিত্রচিত্র। ইংলণ্ডে আইনের সাহায্যে মদ্যপাননিবারণের আন্দোলন যখন চলিতেছিল, তখন ভারতবাসীর তখন ভারতবাসীর আহ্বানে তিনি একবার ভারতে আগমন করেন। ভারতের নানাস্থান পরিভ্রমণপূর্বক তাহার কর্মময় জীবনের অপূৰ্ব্ব ও অদ্ভুত কাহিনী বিবৃত করিয়া তিনি জনসাধারণের ভক্তি ও শ্রদ্ধা আকর্ষণ করেন। ভারতের লােক সর্বদাই মিতাচারী। হিন্দু ও মুসলমান উভয়ের ধর্মশাস্ত্রমতেই সুরাপান নিষিদ্ধ, তথাপি তাহাদের মধ্যে সুরাপানাসক্ত ব্যক্তির অভাব নাই। বঙ্গদেশে শিক্ষিত সমাজে এখন পানদোষ বড় দেখা যায় না। কিন্তু এমন এক সময় ছিল, যখন শিক্ষিত বাঙ্গালী-যুবক মদ্যপানকে শিক্ষা ও সভ্যতার অঙ্গস্বরূপ জ্ঞান করিত। অষ্টাদশ শতাব্দীর দ্বিতীয় পদে যখন এদেশে ইংরাজি শিক্ষা প্রবর্তিত হয়, তখন বঙ্গদেশের তীক্ষ্ণধী যুবক ছাত্রগণ পৰ্য্যন্ত এই সুরারাক্ষসীর হস্ত হইতে নিষ্কৃতি পান নাই। এইরূপ নৈতিক অধােগতি দর্শন করিয়াই নীতিমান ও ধর্মপ্রাণ কেশবচন্দ্র এবং প্যারীচরণ সুরাপানের বিরুদ্ধে এ দেশে সর্বপ্রথম আন্দোলন আরম্ভ করেন। যুবকদিগকে লক্ষ্য করিয়া নানা উপায়ে তাঁহারা মিচারসম্বন্ধে উপদেশ প্রদান করিতে থাকেন। তাঁহাদের “মাদকনিবারণী সভার মূলমন্ত্র এই—যাহাতে মস্তিষ্কের মত্ততা জন্মায় এরূপ কোনও দ্রব্য আস্বাদন করা দূরে থাক স্পর্শও করিব না। সুখের বিষয় তাহাদের সেই চেষ্টা বঙ্গের শিক্ষিত যুবক-সমাজে এখন অনেকটা ফলবতী হইয়াছে এবং সুরাপান শিক্ষিতসমাজ হইতে একপ্রকার লােপ পাইয়াছে। কিন্তু মস্তিষ্কের মত জন্মায় এরূপ দ্রব্যের মােহ হইতে এখনও বঙ্গীয় ছাত্রসমাজ নিজদিগকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত করিতে পারে নাই। ধুমপান মদ্যপানের শূন্য সিংহাসন অধিকার করিয়া অবাধে ছাত্র-সমাজে তাহার প্রভাব দিন দিন বিস্তার করিতেছে। তাহার প্রাধান্য এত বৃদ্ধি পাইয়াছে যে, শুধু যুবকদের কেন, এমন কি বালকদের মুখ হইতেও পথে ঘাটে, এম “পুসীফুট” জন। ট্রেনে ষ্টীমারে, অহরহঃ ধূমােদগীরণ হইতেছে। ছাত্রসমাজকে এইরূপ মত্ততা হইতে উদ্ধার করা অতীব প্রয়ােজনীয়। ইহাতে শুধু তাহাদের চরিত্রবল নয়, দৈহিক বলও নষ্ট হইতেছে। দুঃখের বিষয় পানদোষের লােপসাধনের জন্য দেশে বর্তমান সময়ে যেরূপ চেষ্টা চলিতেছে, ছাত্রসমাজে ধূমপাননিবারণের জন্য সেইরূপ কোনও বিশেষ চেষ্টা কাৰ্যতঃ হইতেছে না। যাহা হউক, অশিক্ষিত শ্রমজীবীদিগের মধ্য হইতে সুরাপান দুর করা সমাজহিতৈষী ব্যক্তিমাত্রেরই অবশ্য কর্তব্য। পুসীফুট সুরাপানের বিরুদ্ধে ঘাের আন্দোলন করিয়া যে উপায়ে আমেরিকায় কৃতকার্য হইয়াছেন, তাহা সকলেরই প্রণিধানযােগ্য। গত দুইশত বৎসর যাবৎ আমেরিকাবাসী তাহাদের কষ্টার্জিত অর্থের অধিকাংশ মদ্যবিক্রেতাদিগের হস্তে তুলিয়া দিতেছিল ; সঞ্চয় কাহাকে বলে তাহা তাহারা জানিত না। সুতরাং দরিদ্র শ্রেণীর লােকের কষ্টের আর সীমা ছিল না। “দিন আনে দিন খায়—এই ছিল তাহাদের অবস্থা। এই সকল হতভাগ্যদিগকে মদ্যপানের প্রলােভন হইতে রক্ষা করিবার জন্য পুসীফুট দৃঢ়সঙ্কল্প হইলেন। তিনি আরও কতিপয় সমাজহিতৈষী ব্যক্তির সাহায্যে স্থানে স্থানে মদ্যপাননিবারণী সভার প্রতিষ্ঠা করিলেন। তাহারা মদ্যপায়ীদিগকে মদের দোকান হইতে দূরে রাখিতে নানাভাবে চেষ্টা করিতে লাগিলেন। কিন্তু শীঘ্র তাহারা বুঝিতে পারিলেন যে, যে পর্যন্ত মদের দোকানগুলি বন্ধ করিয়া দেওয়া হয়, সে পর্যন্ত তাহাদের কোনও চেষ্ট। ফলবতী হইবে না। কাজেই আইনের সাহায্য ভিন্ন মদ্যপাননিবারণের চেষ্টা ব্যর্থ প্রয়াস মাত্র। দেশের আইনকে এরূপভাবে পরিবর্তিত করিতে হইবে যে, মদ্যবিক্রয় যেন বে-গাইনী কাৰ্য্যে পরিণত হয়। সুতরাং দেশের ব্যবস্থাপক সভার সভ্যগণের আশ্রয়গ্রহণ ভিন্ন অন্য উপায় ছিল না। ব্যবস্থাপক- পরিষদে সভ্যগণ তাহাদের কাতুর ক্রন্দনে কর্ণপাত করিল না ; মদ্য-বিক্রয় চরিত্র-চিত্র। নিষেধক আইন-প্রণয়নের প্রয়ােজনীয়তা তাহারা উপলব্ধি করিতে পারিল । কিন্তু সে দেশের লোেক জানে যে কি করিয়া এই সকল অকর্মণ্য ৪ উদাসীন ব্যবস্থাপকদিগের চৈতন্যের উদ্রেক করিতে হয়। যখন নূতন নিৰ্বাচনের সময় আসিল, তখন দেশের লােক ঐ সকল ব্যবস্থাপকদিগকে তাহাদের নিজ নিজ গৃহের ব্যবস্থা-'প্রণয়নে মনােনিবেশ করিতে উপদেশ প্রদান করিয়া, তাহাদের নিজ নিজ দলভুক্ত লােক ব্যবস্থাপক সভায় প্রেরণ করিল। এই সকল নব-নির্বাচিত প্রতিনিধির প্রধান ব্রত হইল দেশে আইনের সাহায্যে মদবিক্রয় নিষেধ করা। কাজেই যখন আবার ব্যবস্থাপক সভায় সুরাপাননিবারণের কথা উঠিল, তখন সৰ্বসাধারণের প্রতিনিধিগণ মদ্য-বিক্রয়নিষেধক আইন বিধিবদ্ধ করাইয়া লইলেন। এইরূপে দেশের লােক নিজেদের উদ্ধারের পথ নিজেরাই বাহির করিলেন। আমেরিকায় যুক্তরাজ্যের এক প্রান্ত হইতে অপর প্রান্ত পৰ্যন্ত সুরারাক্ষসীর যে সকল অসংখ্য প্রমােদ-ভবন ছিল, সে সকল অচিরে ধ্বংসমুখে পতিত হইল। পুসীফুট জনের দৃঢ় সঙ্কল্প, জীবনব্যাপী সাধনা, অটল বিশ্বাস ও অপূৰ্ব স্বার্থত্যাগের নিকট ক্ষুদ্র বাধাবিপ্ন কোথায় ভাসিয়া গেল। ভক্তের জীবনব্রত উদ্যাপিত হইল ; ধর্মের জয়বার্তা দেশবিদেশে বিঘােযিত হইল। সমাপ্ত।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.