Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Swapnodhon Natok
Front matter
No text on this page.
স্বপ্নধন নাটক।
শ্ৰীযুক্ত রামনারায়ণ তর্করত্ন
প্রণীত।
সিমুলিয়া বঙ্গ রঙ্গভুমি হইতে
প্রকাশিত।
DESCRIP
BE।
স
SYERY
ECUTE
WEATLY
নূতন বাঙ্গালা যন্ত্র
কাতা,—সিমুলিয়া, মাণিকতলা ষ্ট্রীট নং ১৪৮।
সধং ১৯৩০।
রিদাপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় কর্তৃক মুদ্রিত।
বিজ্ঞাপন। স্বপ্নধন নাটক মুদ্রিত হইয়া প্রচারিত হইল।—সুপ্রসিদ্ধ নাট্যকার শ্ৰীযুক্ত পণ্ডিত রামনারায়ণ তর্করত্ন মহাশয় এইখানি রচনা করেন। বঙ্গ রঙ্গভূমিতে ইহার অভিনয় হয়, তিনি এইরূপ ইচ্ছা প্রকাশ করিলে আমরা তাহাকে উপযুক্ত পারিতােষিক প্রদান করিয়া এই নাটকের আদর্শ-স্বত্ব (কাপী-রাইট) গ্রহণ করিয়াছি। ইহার স্বত্ব, অধিকার ও সম্পর্ক, সকলই বঙ্গ রঙ্গভূমির, গ্রন্থকারের সহিত কোনও সম্বন্ধ নাই। আমরা রাজব্যবস্থা অনু- সারে এই স্বত্বাধিকার রেজিষ্টরি করিয়া লই- লাম। বঙ্গ রঙ্গভূমে ইহার অভিনয় হইতেছে। - বঙ্গ রঙ্গভূমি সম্পাদক। সিমুলিয়া কার্তিক-১২৮০।
No text on this page.
• ৮২
নাট্যোল্লিখিত ব্যক্তিগণ।
পুরুষ।
।
কেরলদেশাধিপতি।
মন্ত্রী।
মতিমান
যােগী।
বিদর্ভদেশের রাজকুমার
০ .
* * *
সদাগর।
বিপ্রশৰ্মা
ভট্টাচার্য।
ব্রহ্মচারী
ছদ্মবেশী মতিমা।
ব্রাহ্মণ
ছদ্মবেশী সদাগর।
রাজপরিষদ, পুরােহিত, বন্দী, গ্রাম্যয়,.
দ্বারবান ইত্যাদি।
बी
৮ । । ।
০ ০ ০
কুসুমলতা
কেরল-রাজকুমারী
রাজকন্যার সহচরী।
লবঙ্গল
ly
ভােলার মা ..
রাজবাড়ীর দাসী
মাধবী
পরিচারিকা।
শাম্ভবী
বিপ্রকন্যা
ছদ্মবেশী মতিমা
মধুকরী, বিষধরী, বেত্রবতী, চুতলতা, তরুলতা,
বিনতা, বিশাখা প্রভৃতি।
স্বপ্নধন
প্রথমাঙ্ক।
নিবিড় অরণ্যমধ্যে বটবৃক্ষের তলা।
(এক জন পথিক শয়ান।)
নেপথ্যে সঙ্গীত।
জয় জগদীশ পরেশ পরাৎপর
শমন দমন মদনারে।
জটাজুট পুট বদ্ধ সমুদ্ধত
রয় সুরতটিনী বারে।
ভূতি বিভূষিত, ভােগি-বিরাজিত,
দুত্তর ভব সংসারে।
ভক্ত জনাশ্ৰয় দীন দয়াময়
কুরু করুণাং ত্রিপুরারে।
স্বপ্নধন।
(যােগীর প্রবেশ)
যােগী। (দেখিয়া স্বগত) এই যে রাত্রি শেষ হয়ে
এলাে,-গগনে তারকাগুলি পরিশুষ্ক কুসুমের ন্যায় কান্তি
বিহীন হয়ে আসছে,—পূৰ্ব্বদিমুখ ঈষৎ পাণ্ডুবর্ণ, তবে
ব্রাহ্ম মুহুৰ্ত্তই যে প্রায় উপস্থিত ; স্নানে যাই, আর বিলম্ব
কি? (দ্বিত্রিপদ গমনপূর্বক সম্মুখে দেখিয়া কিঞ্চিৎ
স্তভাবে দণ্ডায়মান) ও কি? আঁা? ওটা কি? কোন
শ্বপদ জন্তু নাকি ?-হবে,—আটক কি? তা হলেই বা,
মনে হিংসাবৃত্তি না থাকলে হিংস্র জন্তুও প্রতিহিংসা
করে না, সুতরাং আমার ওতে আশঙ্কা কি? আমাকে
কিছুই বলবে না। (পুনর্দর্শন করিয়া) না, জন্তু কেন, দেখা
যাচ্চে বস্ত্রাবৃত শরীর না? কে এখানে শয়ন করে আছে
দেখি দেখি। (অগ্রে গিয়া প্রকাশে) কে ও? ওহে!
কে তুমি এখানে শয়ন করে আছ ?
কৈ, উত্তর দেয় না।
যে ; মৃত শরীর নাকি ? না, নড়চে ঐ যে। (উচ্চৈঃস্বরে),
কেহে তুমি? ডাকছি, উত্তর দেও না কেন?
মতি। (পূৰ্ব্বার্ধে উঠিয়া) আমি এক জন পথিক।
দেখিয়া) মহর্ষি ! প্রণাম করি।.(প্রণিপাত )
যােগী। অভিলাষ পূর্ণ হোক।
?
স্বপ্নধন।
মতি। আপনকার আশীৰ্বাদ আমি বরস্বরূপেই
শিরােধার্য্য কোল্লেম।
যােগী। হাঁ, তা করাে, আমিও ঈশ্বরের কাছে
প্রার্থনা করি, তােমার মনােভিলষিত সম্পূর্ণরূপেই সিদ্ধ
হোক। তা তুমি কে?
* মতি। আমি এক জন পথিক।
যােগী। পথিক ? এখানে এসেছ কেন? এ তাে পথ
নয়, এ অতি ভয়ানক অরণ্য, অনেক হিংস্র জন্তুর আবাস,
এমন ভয়ঙ্কর স্থানে শয়ন করে ছিলে? যা হোক, ধর্মে ধর্মে
জীবন রক্ষা হয়েছে, এই যথেষ্ট, এখন রাত্রি আর নাই,
এস্থানে আর থেকো না।
মতি। মহর্ষি! আমি এ পল্লবশয্যা আর পরিত্যাগ
কবাে । এস্থানে এক অমূল্য রত্ন হারিয়েছি, পেলেম
, সুতরাং মরণই আমার শরণ।
যােগী। সে কি ? এমন রত্ন এখানে কি হারালে যে
তার নিমিত্ত আত্মঘাতী হতে উদ্যত হয়েছ ? হুঃ ! কোন
কোন মূর্থের এইরূপ মনােবৃত্তিই বটে! সামান্য বস্তুকে
অসামান্য বােধ করে তার নিমিত্ত আত্মহত্যা মহাপাপে
লিপ্ত হয় ! এটা বিবেচনা করে না যে, আত্মা অপেক্ষা প্রিয়
জগতে কিছুই নাই। তা সে যা হোক, তুমি কে? কোন্
স্বপ্নধন।
t
দেশে নিবাস ? কি নিমিত্ত এখানে এসেছ? কোথায় রত্ন
হারালে? বিশেষ করে সকল বৃত্তান্ত বল দেখি শুনি।
মতি। আজ্ঞে বলি, আমার নাম মতিমান্, আমি
বিদর্ভদেশের রাজপুত্র।
যােগী। রাজপুত্র? তবে একাকী যান বাহন নাই,
কিছু নাই, এ দুর্গম বনমধ্যে কি করে এসেছ ? আর
কেনই বা এসেছ?
মতি। মৃগয়া কতে এসেছিলেম।
যােগী। বটে! তবে সৈন্য সামন্ত কেউ সঙ্গে নাই
কেন ?
মতি। মহর্ষি! আমি বড় বিপদে পড়েছি, বলি
শুনুন। সৈন্য সামন্ত সকলি শিবিরে আছে, আমি
স্বেচ্ছাপূর্বক একাই অশ্বারূঢ় হয়ে বন ভ্রমণ কচ্ছিলেম,
কাল্ বেলা দ্বিপ্রহরের সময় হঠাৎ একটী চিত্রাঙ্গ হরিণ
অামার নয়নপথে পড়লাে। পড়লে, আমি সেই হরিণের
পশ্চাৎ ধাবিত হলেম।
যােগী। তা তাে হবেই, যারা অজিতেন্দ্রিয়, তাদের মন
ইন্দ্রিয়েরই পশ্চাৎ অনুসরণ করে, তারাও আবার মনের
একান্ত বশীভূত। এতেই তাদের পরিণামে বিপদ ঘটে।
মতি। আজ্ঞে, আমারি তাই ঘটেছে।
স্বপ্নধন। যােগী। কি হয়েছে বলাে দেখি। মতি। আজ্ঞে বলি। তার পর হরিণটী দ্রুতবেগে পলায়ন কতে লাগলাে, আমি অশ্বে অনবরত কষাঘাত কতে লাগলেম, অশ্বও বায়ুবেগে দৌড়িতে লাগলাে, কিন্তু হরিণটীকে কিছুতেই ধরূতে পারুলেম না; এই ধরি ধরি, আবার পরক্ষণেই অদৃশ্য হয়ে পড়ে ; কখনো অতি দূরে, কখনাে বা নিতান্ত নিকটে, কখনো পার্শ্বে, কখনাে বা পশ্চাদ্ভাগে সেই চিত্রাঙ্গ হরিণ বিচিত্র গমনে যেন খেলা করে বেড়াতে লাগলাে। কয়েক বার তার প্রতি অস্ত্র ক্ষেপও করা গেল, কিন্তু অন্ত্র লক্ষ্য স্থলে না পৌছিতে পৌছিতেই হরিণ অতি দূরে দৃষ্ট হয় ; আমিও আবার অশ্বে কষাঘাত করি, এইরূপে ক্রমেই এই মহারণ্যমধ্যে এসে পড়লেম। যােগী। হবেই তাে, সেই জন্যেই শাস্ত্রকারেরা মৃগ- য়াকে ব্যসন কহেন; লােকে মৃগয়াতে আসক্ত হলে এই রূপ দুর্গতিই ঘটে থাকে। মতি। সে যথার্থ কথা, আমি ঐ কাৰ্য্যে এমনি আসক্ত হয়েছিলেম, কোথা যাই, কি করে আবার ফিরে আসবো, কিছুরই উদ্বোধ নাই! এমন কি, আকাশ অত্যন্ত মেঘা- ছন্ন হয়ে এসেছে, তাও অনুভব হলাে না। যােগী। তার পর ? •
স্বপ্নধন।
ক
মতি। তার পর আমার আশাচ্ছেদ করে মৃগ একে-
বারেই অদৃশ্য হয়ে পড়লো,--আর কেবল মৃগই কেন,
মেঘে এমনি অন্ধকার করে নিয়ে এলাে, অরণ্যমধ্যে সকল
বস্তুই অদৃশ্য হলো; আর কিছুই দেখা যায় না; আমিও
সেই সময় আবার দিভ্রান্ত হয়ে পড়লেন।
যােগী। কান্ সন্ধ্যার পূর্বে অত্যন্ত মেঘাগম হয়ে-
ছিল বটে; ঝাড়বৃষ্টিও বিলক্ষণ হয়ে গেছে, সে সময়
কোথা ছিলে ?
মতি। একটা বৃহৎ বৃক্ষতলায়। ঝড়বৃষ্টি কিন্তু অধিক ।
ক্ষণ ছিল না, মেঘান্ধকারটা বিলক্ষণ থাকলাে। আমি
ভাচি কোথা যাই, এ দিকে উন্মত্তের চৈতন্যের ন্যায়
সূৰ্য্যও আর অধিক কাল থাকলেন না, দরিদ্রের অভিলাষের
মত অমনি অস্তে গেলেন। বােধ হলাে, সেই মেঘান্ধকারের
সাহায্য করূতেই রাত্রি এসে উপস্থিত হল। মহর্ষি !
এমন অন্ধকার দেখি নাই। যেন কজ্জলরাশিতেই জগৎ
মার্জন করূলে, ভূতল যেন পাতালেই প্রবিষ্ট হলো,
গগনের নীলিমাই যে এসে বনরাজি লিপ্ত কলে,
অসজ্জনের উপাসনার ন্যায় নয়ন নিতান্ত নিষ্ফল হয়ে
পড়লাে, খলের অন্তঃকরণ যেমন দুর্গম, অরণ্য-ভূভাগও
তাই হলো। সেখানে থেকে কি করি, সেই অন্ধকারেই
স্বপ্নধন।
৭
;
বেরুলেম ; কিন্তু যে দিকেই অশ্ব চালাই, আরাে ভয়ানক
অরণ্য বােধ হয় ; সুতরাং গমনে ক্ষান্ত হয়ে, অশ্ব থেকে
নামলেম্ ; অশ্বটীকে একটী বৃক্ষে বেঁধে আপনি সেই
বৃক্ষে উঠলে, বলি কোন রূপে জীবন রক্ষা করি। এমন
সময় একটা বিকটাকার শব্দ হলো ; বুঝলেম, কোন ভয়া-
নক হিংস্র জন্তু এসে আমার অশ্বটীকে লয়ে গেল! বৃক্ষে
রাত্রি যাপন করবে, তাও ঘটলো না, সেই বৃক্ষে ভালু
কের কণ্ঠধ্বনি শুনতে পেলেম, সুতরাং নামতে হলাে।
যােগী। (সবিস্ময়ে ) রাজপুত্র ! তােমার বিপদের
কথা শুনে মন যেমন ব্যাকুল হচ্চে, সাহসের কথাতেও
তেমনি সন্তোষ জন্মাচ্চে। বেশ, বড় আহঙ্গাদের বিষয়।
এমন না হলে কি পুরুষ। তা অস্ত্র হাতে ছিল ?
মতি। আজ্ঞে, সেই সাহসের কারণ। তা অস্ত্র থেকেই
বা কি হবে? নয়নাস্ত্র না থাকায় ওতে ভরসা কি ? মহর্ষি!
আমার জ্ঞানােদয় হওয়া অবধি কখন ভয় পাই নাই, কিন্তু
সেই সময় ভয় এসে অন্তঃকরণে একাধিপত্য করতে
লাগলো। তখন তৃণগাছটা নড়লেও শরীর লােমাঞ্চিত
হয়েছিল। ভাবলেম, আর নিস্তার নাই, মৃত্যুই অবধারণ
কলেম-করে একটু অগ্রে এই বটবৃক্ষতলে এসে
পল্লবে শয্যা প্রস্তুত করে অমনি শয়ন কলেম।
স্বপ্নধন। যােগী। তা কৈ, রত্ন হারালে বছিলে না ? মতি। অজে বলি, অজ্ঞে বলি, শয়ন কবুলেম, কিন্তু ভারি অসুখ বােধ হতে লাগলো, উচু নীচু স্থানে পল্লবের শয্যা গায়ে ফুটতে লাগলো, মশারও বিলক্ষণ দৌরাত্ম; নিদ্রা হবে, এমন সম্ভাবনা ছিল না, কিন্তু অতিশয় পরিশ্রমে ক্ষণকাল মধ্যেই নিদ্রা এসে উপস্থিত হলাে। নিদ্রা,—গাঢ় নিদ্রা।—বহুক্ষণ পরে তখনও নিদ্রা নয়নে আছে, চৈতন্য হয় নাই, হঠাৎ অনুভব হলে যেন আমি কোন অপূর্ব স্থানে উত্তম শয্যায় শয়ন করে আছি, শরীরে অত্যন্ত মুখস্পর্শ হলো, চক্ষুরুন্মীলন করে দেখলেম, অট্টালিকা পুরী, চতু- র্দিকে আলােকমালা, সুগন্ধ দ্রব্যের আঘ্রাণে মন প্রফুল হয়ে উঠলো। এ কি! কোথায় এলেম ! ভাচি আর চতু দ্দিক নিরীক্ষণ কচ্চি। বােধ হলো সেটা সঙ্গীতশালা,সঙ্গীত- যন্ত্র অনেকগুলি দেখলেম, কয়েকটী রমণী নিদ্রা যাচ্চে, পরে আমার বামদিকে দেখি, একটী কনকলতার ন্যায় কম- নীয় কন্যা শয়ন করে নিদ্রিত আছে, প্রভু! এমন রূপ কখন দেখি নাই! হঠাৎ মনে উদয় হলাে, এ কি নির্মল শশাঙ্করেখা?-অথবা বিদ্যুল্লতা? কে এ? ঐ কন্যাটীর ললাটে চিবুকে ঘর্মবিন্দুগুলি মুখমণ্ডলে কি আশ্চৰ্য্য শােভাই করেছে! বােধ হলাে দেবকন্যাই হবে। t *
স্বপ্নধন।
;
যােগী। না, দেবকন্যা নয়, দেবতাদিগের ঘর্ম হয়
, নিদ্রাও নাই।
মতি। না, নিড্রাই যে, এমন নিশ্চয় বােধ হলাে না।
সে যাই হোক, নিদ্ৰাই হোক, লজ্জাই হোক, ভয়ই হোক,
আর বিস্ময়ই হোক, কে যেন তার শরীর সঙ্কোচ করে
রেখেছে ; শরীরটী যেন লােমাঞ্চিত ; কেন, তা বিশেষ
বলতে পারি না। আমি তার সেই অসামান্য রূপরাশি
আর অপূৰ্ব্ব ভাব সন্দর্শন করে কত ভাবতে লাগলেন,
কতই মনে হতে লাগলো, আপনার নিকটে আর সে সব
কথার প্রয়ােজন নাই; পরে যা হলো, তাই বলি। আমার
দুরদৃষ্টক্রমেই হোক, আর বিধাতার বিড়ম্বনাতেই হোক,
ঐ ভাবতে ভাবতে আমার নিদ্রা এসে উপস্থিত হলো।
আবার পূর্ববৎ গাঢ় নিদ্রা। সেই নিদ্রা ভঙ্গ হলে পুনৰ্ব্বার
দেখি, সেই এই বটবৃক্ষতলা, এই সেই অরণ্যভূমি, সেই
এই পল্লবশয্যা, সে সকলি অবিকল রয়েছে, সবই অবিকল
সত্য, কিন্তু মহর্ষি ! তদবধি কেবল আমিই যেন আমি নই,
যেন সাগরসিঞ্চিত মহামূল্য রত্ন কোথায় হারিয়েছি, যেন
প্রাণ ধারণের সমুদয় প্রয়ােজন বিসর্জন দিয়েছি, শরীরে
যেন কোন মহাপাতক স্পর্শ করেছে, কারু নিকটে যেন
কত অপরাধী হয়েছি, কি হয়েছে, অন্তঃকরণ কেমন কচ্চে,
।
স্বপ্নধন কিছুই বুঝতে পাচিনে। কেন এমন স্বপ্ন হলো! সে যাই হোক, লজ্জা খেয়ে আপনার কাছে আর অধিক কি বল্বো, সেই অনুপম রূপরাশিই বলু, আমার চপল মনই বলু, দুষ্ট মদনই বলুন, দুর্ধর্ষ নবযৌবনই বলুন, কে যেন আমাকে তদবধি পরাধীন করেছে। যােগী। অদৃষ্টে অমন ঘটেও থাকে, নলরাজা দম- যুন্তীকে ঐরূপে স্বপ্নে দেখেছিলেন। মতি। (সানুনয়ে) আজ্ঞে, নল তাে সেই দময়ন্তীকে পেয়েছিলেন, তা আমার অদৃষ্টে কি তা ঘটবে? যােগী। অসম্ভাবনা কি ? মতি। সে লাভালাভ দূরে থাক, ঐ কন্যার যদি পরি- চয় পাই, কি কোন্ দেশে আছেন, এ জানতে পারি, তা হলেও আমি কৃতকাৰ্য বােধে তৎপ্রাপ্তি চেষ্টায় জীবন- কাল ক্ষেপণ করি ; নতুবা এই পল্লবশয্যাই আমার চরম শয্যা স্থির করেছি। যােগী। উঃ! এত দূর মনের আগ্রহ! (কিঞ্চিৎকাল চিন্তা করিয়া) ভাল, বল দেখি, সেই কন্যার কোন্ অঙ্গ সর্বোৎকৃষ্ট ? মতি। সে সৰ্বাঙ্গসুন্দরীর সকল অঙ্গপ্রত্যঙ্গই মনােহর।
স্বপ্নধন।
যােগী। তবু বিশেষতঃ ?
মতি। বিশেষতঃ কি ? (চিন্তা করিয়া। বিশেষতঃ
গণ্ডদেশই সাতিশয় মনােরম দেখলেম।
যােগী। • তবে পরিচয় দিই শােন। “ কেৱলীনাং
কপােলে ” কবিরা বর্ণন করেন, কেরল দেশীয় স্ত্রীজাতির
কপােলদেশে কন্দর্প বাস করেন ; তাদের কপােলই
অতি মনােহর, সুতরাং ও কন্যাটী কেরল দেশীয় ; আর
তুমি তার যেরূপ গৃহপরিচ্ছদ বর্ণন করলে, এতেই অনুভব
হচ্চে, সে কেরল দেশীয় রাজকন্যাই হবে।
মতি। (সসন্তোষে উঠিয়া সবিনয়ে) মহর্ষি! প্রণাম
করি।—আপনি আমার বিস্তর উপকার করলেন ; যখন
দেশ নির্ণয় হলো, তখন আপনার আশীর্বাদে উপায়ও
করে নিতে পাবো।
যােগী। হাঁ, আমি আশীৰ্বাদ কচ্চি, তােমার অভি-
লাষ পূর্ণ হবে। আর এখানে থেকো না, আমিও মানে
যাই, মানবেলা উপস্থিত হয়েছে।
.[ যােগীর প্রস্থান।
মতি। আমিও উপায় চেষ্টায় যাই।-(কিঞ্চিৎ গিয়া
দেখিয়া সবিষাদে) এ কি! একটী অতিবৃদ্ধ মনুষ্যকে সিংহে
আক্রমণ করেছে। ইঃ! পালাতেও পারুলে, না গা!
স্বপ্নধন।
আহাহাহা! কি করি !–উঃ! যা হোক,শক্তিত্বে উপেক্ষা
করা, আর স্বহস্তে বধ করা, তুল্য পাপ;রক্ষা করূতে
হলো।
[ সাবষ্টম্ভে করবাল নিষ্কোয়িত
করিয়া সত্বর প্রস্থান।
দ্বিতীয়
অঙ্ক।
বিজয়পুর ।
উদ্যানের পথ।
(গ্রাম্যদ্বয়ের প্রবেশ)
প্রথম। হাঁ, বৃত্তান্ত কি বল দেখি শুনি। সদাগর
নাকি বড় বিপদে পড়েছিলেন ?
দ্বিতীয়। বিপদ কেমন! জীবন রক্ষা হয়েছে, এই যথেষ্ট।
প্রথম। হয়েছিল কি?
দ্বিতীয়। এই গত মাসে এক দিন অপরাহ্নে মেঘা-
গম হয়, আমাদের এখানেও একটা ঝড় উঠেছিল, সমুদ্রে
নাকি ঐ ঝড় অত্যন্ত প্রবল হয়েছিল। সদাগরের জাহাজ
ঐ ঝড়ে পড়ে।
স্বপ্নধন।
প্রথম। (সভয়ে) তার পর ?
দ্বিতীয়। একে তাে সমুদ্রের তরঙ্গ স্বভাবতই ভয়া-
নক, তাতে আবার প্রবল ঝড় ! উন্মত্তকে যেন মদ্যপান
ফরাণাে হলাে আর কি! সমুদ্র কি আকার ধারণ করলেন,
বুঝতেই পাচ্ছেন। জাহাজ অমনি কোথায় নিয়ে গে
ফেলে ;—ফেলে একটা চড়ায় ঠেকিয়ে জলমগ্ন করে
দিলে ।
প্রথম। জাহাজ মারা পড়লাে? সদাগরের জীবন
রক্ষা কি করে হলাে ?
দ্বিতীয়। আয়ুর্যোগ আছে কি না, একখানা বৃহৎ
কাষ্ঠ জলে ভাসছিলাে, তাই আশ্রয় করে জলে সারা-
রাত্রিই ভেসে ছিলেন, ক্রমে প্রবাহবেগে তীরে গিয়ে
লাগলেন। তখন রাত্রি শেষ হয়েছে ; তা হলে কি হবে,
সদাগরের চৈতন্য ছিল না। সমুদ্রের তটে বালীর উপরে
অনেকক্ষণ পড়ে থাকলেন, তার পর চৈতন্য হলাে,-হলে
'দেখলেন, নিবিড় অরণ্য, দরিদ্রের বন্ধুবান্ধবের মত কেউ
কোথাও নাই, কি করেন, তীরে উঠে জীবন প্রত্যাশায়
আশ্রয় অন্বেষণ করে বেড়াচ্চেন, পূৰ্ব্বদিকও ক্রমে ফরসা
হতে লাগলাে, এমন সময় বিপদের কথা শুনুন্, হঠাৎ
একটা সিংহ ক্রমে তাকে আবার আক্রমণ করলে।
স্বপ্নধন।
প্রথম। (শিহরিয়া) বলল কি ? উ। আবার এ কি
বিপদ! কে রক্ষা করলে?
দ্বিতীয়। জগদীশ্বর ভিন্ন রক্ষাকর্তা কে আছে ? কে
একজন অস্ত্রধারী পথিক, বোধ হয় সেই জগদীশ্বরেরই
প্রেরিত হবেন, তিনি কোথা থেকে এসে অমনি সিংহের
প্রতি অস্ত্রাঘাত করলেন। সিংহ সদাগরকে ছেড়ে দিয়ে
তঁারি উপর গে পড়লো;—পড়লে সেই বীরপুরুষটীর
সাহস দেখুন, হাতে একখানা যে সুতীক্ষ্ণ অস্ত্র ছিল, তাই
সিংহের উদরে প্রবেশ করিয়ে দিলেন, সিংহ অমনি উল্টে
পড়লাে; তিনি তার কোলের ভিতর হতে বেরিয়ে আরো
দুই তিন আঘাতে সিংহটাকে খণ্ড খণ্ড করে ফেললেন ।
প্রথম। (আশ্চর্যান্বিত হইয়া) সিংহ বধ করলে?
অ্যা। কি অসাধারণ পরাক্রম। তার পর তার পর?
দ্বিতীয়। সদাগর তখন অচৈতন্য হয়ে পড়ে ছিলেন,
সেই সাহসিক পুরুষ সিংহ বধ করে নানা শুশ্রুষা দ্বারা
সদাগরের জীবন রক্ষা করেছেন।
প্রথম। তার পর কি করে বাড়ীতে এলেন?
দ্বিতীয়। তা বিশেষ শুনি নাই, সেই সাহসিক
পুরুষটী মিনি প্রাণ রক্ষা করেছেন, তাকেও সঙ্গে করে
এনেছেন।
স্বপ্নধন।
প্রথম। তঁাকে তুমি দেখেছ? লােকটা কেমন?
দ্বিতীয়। দেখিচি, অল্প বয়স, অত্যন্ত রূপবান, যেন
সাক্ষাৎ কপ। সদাগর তাকে প্রাণাপেক্ষা ভাল বাসেন।
( দেখিয়া )• ঐ যে তাকে সঙ্গে করে সদাগর আচেন,
বাগানে বেড়াতে এসেছেন বুঝি।
প্রথম। ( দেখিয়া ) , তাই তো। তবে আমি
এখন গৃহে যাই, এ অপরাহ্নে আর সাক্ষাৎ করবো না।
দ্বিতীয়। হাঁ, আমিও যাই, আমার একটু কৰ্মান্তর
ঘাছে।
[ উভয়ের প্রস্থান।
(মতিমানের সহিত সদাগরের প্রবেশ)
সদা। মিত্র ! আপনি পরিচয় দিচ্ছেন না, কিন্তু দেথুন্,
হীরক মণির উজ্জ্বলতা কে গােপন কতে পারে? আপনার
আশ্চৰ্য্য দয়া, অসাধারণ ক্ষমতা, অসমসাহস, অপরিমিত
বলবীৰ্য্য, এই যে গুণগুলি প্রকাশ হয়েছে, এতে আপনি
যে মহা কুলপ্রসূত, সে পরিচয় আমি বিলক্ষণ পেয়েছি।
মতি। সে যা হোক, আপনি আমাকে মিত্র সম্বোধন
কচেন, এতে আমি লজ্জিত হই।
সদা। কেন ?
মতি। সমকক্ষ হলে কেহ কাহার মিত্র হয় না।
স্বপ্নধন।
আপনি ঐশ্বর্যশালী, দেশমান্য, বিশেষতঃ প্রাচীন, আমি
কোনরূপেই আপনার মিত্রের যােগ্য নহি।
সদা। সে কি, সে কথা বরং আমিই বলতে পারি।
বয়সেই আমি বড় বটে, কার্যে নহি। দেখুন, আপনি
আমার প্রাণ রক্ষা করেছেন, কিন্তু আপনার কোনরূপ
প্রত্যুপকার আমা হতে আজও হলাে না। কোন প্রকার
পারিতােষিকও আপনি গ্রহণ করলেন না, এতে আমি
আপনার কাছে অত্যন্ত কুণ্ঠিত আছি।
মতি। পারিতােষিকের সময় আছে।
সদা। কি বলেন? আপনি কি আমার কাছে
কখনাে কিছু গ্রহণ করূবেন? আমি ধর্ম সাক্ষী করে বলচি,
আপনি আমাকে যখন যে আজ্ঞা করবেন, আমি তখনি
তাই কবাে; এমন কি, অধিক কথা কি, যে প্রাণ আপনি
রক্ষা করেছেন, এ প্রাণ প্রদান করলে যদি আপনার
কোন প্রত্যুপকার হয়, তাতেও আমি প্রস্তুত।
(কিয়দরে বিপ্ৰশৰ্ম্মার প্রবেশ)
বি। (স্বগত) সন্ধ্যা আহ্নিক এই বাগানের
পুষ্করিণীতে সেরে, পরে গিয়ে সদাগরের সঙ্গে সাক্ষাৎ
কবাে। ( আগমন )
সদ।। (দেখিয়া ) ভট্টাচাৰ্য মশাই আছেন।
স্বপ্নধন।
মতি। উনি কে ?
সদা। উনি অতি জ্ঞানী পণ্ডিত, এই দেশেই নিবাস,
বহু দিন কেরল রাজ্যে ছিলেন, সম্প্রতি এসেছেন।
মতি। •কেরল রাজ্যে ছিলেন, রাজার নিকট।
সদা। হা,– বিপ্ৰশৰ্মার প্রতি) অস্ত আক্তে
হোক, আসুন।
মতি। (স্বগত) তবে তাে এর নিকটে অনেক
সম্বাদ পেতে পাবো। হলো ভাল।
বি। (হাস্য বদনে) অমি এই মনে কচ্চি, রাত্রে
এসে সাক্ষাৎ করবে, তা এর মধ্যে সাক্ষাৎ হলো এই যে,
আছেন ভাল? আপনার বিপদের কথা সকল শুনেছি,
জগদীশ্বর রক্ষা করেছেন।“ ধর্মে। রক্ষতি ধার্মিক
সদা। আতে আজ্ঞা হোক, প্রণাম করি। (প্রণি-
পাত) আসুন্ এখানেই বসা যাউক। (সকলের
উপবেশন )
মতি। প্রণাম করি। (প্রণিপাত )
বি। কল্যাণ হোক। আপনার নিবাস কোথায় ?
সদা। উনি আমার সেই প্রাণদাতা মিত্র।
বিপ্র। (সানন্দিত চিত্তে) এই ইনি, ইনি সিংহ
‘বিনাশ করে আপনাকে রক্ষা করেছেন?
স্বপ্নধন।
মতি। জগদীশ্বরই রক্ষা করেছেন, আমি নিমিত্ত
*
{
মাত্র।
বি। আপনার এরূপ সৌজন্যগুণই আবার অন্যান্য
eণকে অলঙ্কত কচ্চে। এই নবীন বয়সে, কার্যে এত
প্রবীণ।। আপনার যশে বিজয়পুর পরিপূর্ণ হয়েছে।
আপনি কেবল সদাগরকে রক্ষা করেন নাই, আমাদের
বিজয়পুরই রক্ষা করেছেন।
মতি। অাপনি কি কেরল রাজ্যে ছিলেন ?
বিপ্ন। ।। রাজবাটীতেই ছিলেম।
মতি। কি কৰ্ম্ম কতেন ?
বি। সভাসদ অধ্যাপক ছিলেম, কৰ্ম্ম এমন কিছুই
কতে হতো না।
মতি। মহারাজের কটী পুত্র ?
বিপ্ৰ। পুত্ৰ কৈ ? হু! বিধাতা কি সকলকে সকল
সম্পত্তি দেন? একটী মাত্র কন্যা। ভাল কথা মনে হলাে;
সদাগর মহাশয় ! আপনার এই বাগানে যে সেই চটুল
মৃগশাবকটী ছিল, রাজকন্যাকে দেখলেই আমার তাকে
স্মরণ হতো, সেই মৃগশাবকের চক্ষের মত রাজকন্যার
দুটা চক্ষু।
সদা। রাজকন্যাটা খুব সুন্দরী তবে?
স্বপ্নধন।
১।
বি। সুন্দরী। তার সৌন্দর্যের কথা কি বলবো
এমন রূপ, এমন সুগঠন, মর্ত্যলােকে দুর্লভ। এখন আর
দেখতে পেতেন না, বড় হয়েছেন কিনা, তখন নিতান্ত শিশু
ছিলেন, রাজসভাতে প্রায়ই আনা হতাে, আহা! এমনি
কোয়ল শরীর, শিরীষ কুসুমও তার নিকটে কঠিন বস্তু।
অর্ধ পরিস্ফুট সুমধুর বাক্যগুলি আমাদের কর্ণে যেন
অমৃত বর্ষণ করতাে। সভাতে আলে তাকে আর মৃত্তিকা
স্পর্শ করতে হতাে না, সকলের কোলে কোলেই বেড়াতেন।
সদা। রাজকন্যাটা এখন বড় হয়েছেন, লেখা পড়া
কিছু হচ্ছে?
বিপ্র। না, তা বিশেষ বলতে পারিনে, শুনেছি সঙ্গীত
শিক্ষা হচ্চে, আর চিত্রবিদ্যাতেও নাকি বিলক্ষণ হয়েছেন।
যা একবার দেখেন, অমনি অবিকল তার প্রতিমূৰ্তি লিখতে
পারেন।
সদা। কন্যাটীর বিবাহ হয়েছে ?
বিপ্ৰ। আজ্ঞে না, বিবাহযোগ্য হয়েছেন।
মতি। (স্বগত) স্বপ্নে ইনিই কি আমার মনােহর।
করেছেন? (প্রকাশ্যে ) মহাশয়! কেরল রাজ্য এখান
থেকে কত দূর?
বি। না, এমন অধিক দূর নয়, পাঁচ ছয় দিনে যাওয়া
স্বপ্নধন। যায়। আমাদিগের এই বিজয়পুর কেরল রাজেরই অধি- কার। কেন, আপনি কি যাবেন ইচ্ছা আছে ? মতি। একবার মহারাজের সঙ্গে সময়ে সাক্ষাৎ করবে। গিয়ে। বি। তা যাবেন, স্বচ্ছন্দে, মহারাজ অতি ধর্মিষ্ঠ, বিলক্ষণ দাতা, গেলেই আপনার মনােভিলাষ পূর্ণ হবে, কিন্তু এখন যাবেন না। মতি। কেন ? বি। এক্ষণে মহারাজ কিঞ্চিৎ বিমনা আছেন, তাঁর আর সন্তান সন্ততি নাই, কেবল সেই একটা মাত্র কন্যা, সেটা পীড়িত হয়েছে, তাতেই ব্যাকুল। মতি। (চকিতভাবে ) কি পীড়া ? বিপ্ৰ। কি পীড়া, অদ্যাবধি কোন চিকিৎসকেই তার নির্ণয় করতে পারে নাই, অনেক চেষ্টা হচ্চে,অনেক চিকিৎ- সক দৈচে, কিন্তু কিছুতেই উপশম হচ্ছে না, মানসিক পীড়া, ওতো অঙ্গপীড়া নয়। মতি। (স্বগত) অঙ্গপীড়া নয়, তবে কি অনঙ্গপীড়া? ভগবান অনঙ্গ আমার মত কি তাকেও ক্লেশ দিনে ? আমি যেমন তাকে স্বপ্নে দেখেছি, তিনিও কি আমাকে স্বপ্ন দেখেছেন?-না না,সেও কি হয় ? এমন
স্বপ্নধন।
সম্ভাবনা কি? যা হোক, আমাকে এক বার সেখানে
যেতে হলো।
(নেপথ্যে সন্ধ্যাসূচক সঙ্গীত )
বি। সদাগর মহাশয়। সন্ধ্যা আহ্নিক করে আসি,
রাত্রে গে এখন সাক্ষাৎ করবে, সকল সম্বাদ বিশেষ করে
শুতে হবে।
সদা।
যে আজেও। প্রাতঃ প্রণাম।
মতি। প্রাতঃপ্রণাম।
।
( উভয়ের প্রণিপাত।)
বিপ্র। প্রাতর্জয়স্তু।
[ উঠিয়া প্রস্থান।
সদা। মিত্র! বাগানের ভিতর কি যাবেন ?
মতি। না, সন্ধ্যা হলো, আর যাবো না।
সদা। তবে চলুন বাড়ীতে যাই।
মতি।
চলুন
যাই, একটা কথা আপনাকে নিবেদন
করি।
সদা। আজ্ঞা করুন্।
মতি। (কিঞ্চিৎ ভাবিয়া) মহাশয়, উপকার করে
প্রত্যুপকারের স্পৃহা করাটা মহতের কাৰ্য্য নয়, কিন্তু যদি
স্বপ্নধন।
।
?
আমাকে করতে হয়, তা আপনি কোন বিষয়ে আমার
সাহায্য করবেন কি?
সদা। সে কি কথা, আজ্ঞা করুন, যা বলবেন, আমি
তাে পূৰ্বেই প্রতিজ্ঞা করেছি, আপনার অজ্ঞা প্রতি
পালনে প্রাণ পণ করবাে।
মতি। তা পরে বলব। এক্ষণে কল্য প্রত্যুষেই
আমি কোন স্থানান্তরে যাবো এসে বলবাে।
সদা। না মিত্র, এখন কিছু দিন আমি আপনাকে
কোথাও যেতে দিব না, আপনার সেবা আগে আমি কিছু
করি।
মতি। তা হবে। আমি মানস করেছি, এ সময়
আপনি প্রতিবন্ধক হবেন না, অামি দশ বারাে দিনের
মধ্যেই পুনৰ্ব্বার এখানে আচি।
সদা। যে আজ্ঞে, আপনার যেরূপ অভিলাষ হয়।
তবে চলুন রাত্রি হলো গৃহে যাওয়া যাউক।
মতি। আজ্ঞে চলুন।
[উঠিয়া উভয়ের প্রস্থান।
স্বপ্নধন। তৃতীয় অঙ্ক। কেরল দেশ। পুষ্করিণীর তট, -শিবালয়ের সমীপ। (ব্রহ্মচারী বেশে মতিমানের প্রবেশ) মতি। (স্বগত) এই তাে কেরল রাজ্য পৰ্যন্তও এলেন। (দেখিয়া) ঐ যে রাজবাটী দেখা যাচ্চে না ; এ দিকটী বাটীর অন্দরের দিক বােধ হয়। তা যাহোক,আসা তো গেল, এখন কি করি, এই রাজনন্দিনীই যে আমার স্বপ্নের ধন, এটা কি করে সন্ধান পাবো, তাঁর দর্শনের তত সম্ভাবনা নাই। এত ক্লেশ স্বীকার করে এলেম , কেনই বা এলেম, যে পথ, উঃ! অত্যন্ত পরিশ্রান্ত হয়ে পড়েছি; এই স্থানে একটু বিশ্রাম করি।(উপবেশন) অহাহাহা! কি ধাতাস এখানে! শরীর সুশীতল কচ্চে। একটু শয়ন করি। ( শয়ন) আহা! কি সুক্ষণেই সে দিন অরণ্যমধ্যে বট- বৃক্ষের তলায় শয়ন করেছিলেন। সেটী অতি বিপদের দিন সত্য, কিন্তু আমার সেই স্বপ্নধনের সেই লােকাতীত রূপ- লাবণ্য সন্দর্শন পাওয়ায় সে দিনটীকে সম্পদের দিনই ২৪ স্বপ্নধন। * অবধারণ করে রেখেছি, সেই অবধি নয়নেতেও তত আর নিদ্রা নাই, যে আবার স্বপ্নে দেখবাে, শয়নেই বা কি হবে, তা বরং চিত্তবিনােদনের নিমিত্ত প্রেয়সীর যে প্রতিমূর্তি প্রস্তুত করেছি, তাই ক্ষণ কাল শুয়ে শুয়ে দেখি। ( উঠিয়া চিত্রপট বাহির করিয়া পুনঃ শয়ন করত তাহা দর্শন) হুঃ! প্রিয়ে, তুমি কেবল চিত্তগত। আর চিত্রগতা থাকলে, একবার নেত্রগত করতে পালেম না !! (ছবি দেখিতে দেখিতে নিদ্রার আকর্ষণ) (নেপথ্যে) ভােলার মা! তুই ওখানে থাক্, আমি একবার পুকুরটো দেখে আসি। (লবঙ্গলতার প্রবেশ) লবঙ্গ। (দেখিয়া) দিব্য পুকুরটী,—এই যে, আহাহাহা! প্রণয়ী জনের মনের মত কেমন নির্মল জলটুক অমনি ঢল চল কচ্চে। এ পুকুর আমার কখন দেখা হয় নাই,“উঃ! পাড়টা কত উচ্চ, যেন কামী লােকের আশা। এতে থেকে পতন হলে আর কি কেউ বাচে। ওখানে ও একজন কে শুয়ে রয়েছে না? না গাে,ওদিকে একা যাবে না, ভয় করে। দাড়ী গোঁফ, খেরো কাপড় পরা, তবে ব্রহ্মচারী হবে। (নিরীক্ষণ করিয়া) ব্রহ্মচারীর কি অতত রূপ ?-এমন রূপ- ৰান ৰহ্মচারী তাে আমি কখন দেখি নাই, বােধ হয়
স্বপ্নধন।
কল্পই যেন রতিকে হারিয়ে ব্রহ্মচারী বেশ ধারণ করেছেন।
হাতে ওখানি কি? ছবি নয় ? নিকটে গিয়ে দেখি না, সাধু
লােক, তায় ভয়ই বা কি? (কিঞ্চিৎ গিয়া) ব্রহ্মচারী ঠাকুর
ঘুমুচ্চেন না কি ? ই। তাে। (সবিষাদে) ঐ যা! বাতাসে
ছবিখানি উড়িয়ে নে চলে। ঐ গেল গেল ! পুকুরের
জলে পড়ে যায় যে,“ধরবাে গে,ধতে হলো। (সত্বর গিয়া
ধারণ) (দেখিয়া) বাঃ! দিব্য ছবিখানি! একটী কন্যা ঘুমন্ত
লেখা রয়েছে! ঘুমন্ত ছবি আর আমি দেখি নাই,একবার
রাজকন্যার হাতে একখানি ঘুমন্ত পুরুষের ছবি দেখে-
ছিলেম। এখানি কার প্রতিমূৰ্ত্তি ? আমাদের রাজকন্যার
মত বােধ হয়,-না, তা হবে কেমন করে? তঁাকে তো
কেউ কখন দেখতে পায় নাই। এখানি আর কারু হবে,
কিন্তু দিব্যি লিখেছে।
( মতিমানের চৈতন্য ও গাত্র ভঙ্গ)
মতি। (নয়ন মাৰ্জন করিয়া) ইঃ। এর মধ্যে নিদ্রার
আকর্ষণ হয়েছিল। (সচকিতে) কৈ, প্রতিমূর্তিখানি?
(উঠিয়া ইতস্তত,অন্বেষণ।)
লবঙ্গ। (ছবি গোপন করিয়া প্রকাশে) ও ব্রহ্মচারী
ঠাকুর! কি খুজছো ?
মতি। একখানি ছবি।
!
-
স্বপ্নধন। লবঙ্গ। ছবি কোথায় হারালে? আর কোথাও ফেলে এসেছ বুঝি। মতি। না, আর কোথা ফেলবাে? হাতে ছিল। লবঙ্গ। তবে ঘুমিয়ে ছিলে, কে হাত থেকে চক্ষুদান দেছে। তুমি কেমন ব্রহ্মচারী গাে? ব্রহ্মচারীর কি দিনে ঘুমুতে আছে ? মতি। না, আমি তাে ঘুমুই নি। লবঙ্গ। না, ঘুমােন নি, চোদ্দ পােয়া হয়ে পদ্মনাভ ভছিলে, নাকের ডাক পৰ্যন্ত আমি শুনতে পেয়েছি। তা এই নেও তােমার ছবি, বাতাসে উড়ে গে জলে পড়- ছিলাে, আমি কত করে ধরে রেখেছি, এই নেও। (চিত্র- পট অর্পণ) তা তুমি ব্রহ্মচারী মানুষ, মেয়ে মাষের ছবি নিয়ে কি করবে, ওখানি অামাকে দেও না। মতি। তুমিই বা মেয়ে মাষের ছবি নিয়ে কি করবে? লবঙ্গ। আমি রাজকন্যাকে দিব। মতি। কোন্ রাজকন্যা?—তুমি কে? লবঙ্গ। এই দেশের রাজকন্যা। আমি রাজকন্যার সহচরী। হে দেখ, আমাদের রাজকন্যার ছবির বড় বাই। তিনি কত প্রকার ছবি লিখেছেন, একবার যাকে দেখেন, তারি ছবি লিখতে পারেন।
স্বপ্নধন।
মতি। তিনি যদি লিখতে পারেন, তবে আর নিয়ে
কি করবেন ?
লবঙ্গ। এখন আর লেখেন না, তার বড় ব্যামাে
হয়েছে।
মতি। কি ব্যামাে ?
লবঙ্গ। ব্যামাে কি, তা কেউ স্থির করতে আজিও
পারে নি। সৰ্ব্বদাই যােদন করেন, খান্ না দান না, ক্রমেই
কাহিল হয়ে যাচেন। ভারি পীড়া শান্তির মানসে আমরা
এই ত্রিলােকনাথ মহাদেবের পূজা দিতে এখানে এসেছি।
মতি। হঠাৎ তার এমন পীড়াটা হলাে কেন?
লবঙ্গ। (দীর্ঘ নিশ্বাস ) কি বলতে পারি ঠাকুর।
এক দিন স্বপ্নে দেখে কেঁদে উঠেছিলেন, সেই ওর সূত্র।
মতি। সে কত দিন হলাে ?
লবঙ্গ। বড় অধিক দিন নয়, এই চৈত্র মাসের
কৃষ্ণ চতুর্দশীর দিন রাত্রে সঙ্গীতশালায় গান বাজনা
হয়ে গেল, তার পর সেইখানে অমনি শুয়ে ঘুমিয়ে পড়লেন,
আমরাও সকলে ঘুমুলু, রাজকন্যা ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে হঠাৎ
কেঁদে উঠলেন। সেই অবধিই ঐ ভাব।
মতি। (আহ্বাদে স্বগত) এ কি কথা শুনি! আমার
'আশা যে অঙ্কুরিত হলাে ! .
২৮ স্বপ্নধন। লবঙ্গ। তাই বলচি, তার মা কেমন হয়েছে, যদি এই ছবিখানি দেখে মনে ধরে, তা অমনি নেবেন না, তা হলে এর মূল্য এখন এনে দেবাে, আর তা না হলে তােমার ছবি তােমাকেই এনে ফিরিয়ে দিব এখন। বিশ্বাস হয় না কি? মতি। তা হবে না কেন? তাকে দেবে ? ভাল,নেও, মুড়ে দিই, কাকেও দেখিও না। (চিত্রপট অর্পণ) ল বঙ্গ। কাকে আবার দেখাবাে ? ( গ্রহণ করিয়া) -ও ভােলার মা!—তুই ওখানে একটু থাক্, আমি শীঘ্র আচি। [ প্রস্থান। মতিঃ (স্বগত) এ কি আশ্চর্য ঘটনা ! আঁ? আমার নয় রাজকন্যারও সেই অবস্থা ঘটেছে। তবে ইনিই যে আমার চিত্তমােহিনী, ইনিই যে আমার স্বপ্নের ধন! আমি যে পরিশ্রম করে এখানে এসেছি, তার সার্থক হলাে! মৃগয়াতে আসা সফল হলো! সেই ভয়ানক বিপদের দিন এখন সম্পদ হয়ে উঠলো! চিত্রপট পাঠিয়ে দেওয়া মন্দ হয় নাই, ভাল হয়েছে, সহচরী ফিরে এলেই এখন সন্দেহ দূর হবে। তা সে কতক্ষণে আসবে? রাজ- বাটী তে বিস্তর দূর নয়, ঐ দেখা যায়, এতক্ষণ কি সে স্বপ্নধন। পঁহুছিতে পারে নাই? ই,এতক্ষণ গিয়ে পঁহুছেছে, এতক্ষণ চিত্রপট দেখাচ্চে। প্রিয় চিত্রপট দেখে কি বুঝবেন না যে, তার মত আমিও তাকে স্বপ্নে দেখে তার প্রতিমূর্তি লিখিছি, তাকে পাবাে বলে এখানে এসে পঁহুছিছি, অবশ্যই বুঝতে পারবেন বৈ কি, তিনি বুদ্ধিমতী হবেন তার সন্দেহ কি, অমন রূপ কখন গুণ-বিরহিত হয় না, হয় তো এতক্ষণ ব্যাকুল ভাবে সহচরীকে বলছেন, তাকে শীঘ্র এনে দেও। (চকিত ভাবে) ও কি শব্দ হলাে ! সহ- চরীর নূপুরধ্বনি ?-না, ও সারস পক্ষীর শ্রেণী যাচ্ছে, তারি শব্দ, যা হোক, সারস দর্শনও শুভসূচক বটে, আমার দক্ষিণ বাহুটোও স্পন্দিত হচ্ছে, এই ত্রিলােক- নাথের নিকটে এসে শরণাগত হয়েছি, আমার মনােভি- লাষ উনি কৈ পূর্ণ করলেন না ? সহচরী এখনও আছেন কেন ? হু, অপেক্ষা করে বসে থাকলে কাৰ্য্য সিদ্ধি অনেক বিলম্বে হয় বােধ হয়। (দেখিয়া আদে) ঐ যে সহ- চরী আসচে। ( শঙ্কিত ভাবে) চিত্রপটখানি আবার ফিরিয়ে আনচে যে। তবেই তাে ! (লবঙ্গলতার পুনঃ প্রবেশ) লবঙ্গ। ও ব্রহ্মচারী ঠাকুর ! এই তােমার ছবি নেও। তার মনে দােলােনা।
৩০
স্বপ্নধন।
মতি। (শঙ্কিত ভাবে) কেন, কি বললেন ?
লবঙ্গ। আমি গে ছবিখানি দে বলেন, দেখুন দেখি
ছবি, কেমন কন্যাটী লেখা আছে, কেমন রূপ! তা তিনি
আমার হাত থেকে নে দেখে বলেন, এর আবার রূপ
কি? আমি যে সামগ্রী লিখেছি,তার কাছে কি এ? বলে কি
ভালেন, পরে শয়নগৃহে গে বেরিয়ে এসে সেই তােমার
যেমন মােড়া ছিল, তেমনি করে এনে আমাকে বলেন,
যার কাছে পেয়েছ, তাকেই দিয়ে এস। তা আমি অমনি
নিয়ে এসেছি। বলি ব্রহ্মচারী ঠাকুর বিশ্বেস করে দেছেন,
এতক্ষণ কত ভাবছেন, তার সামগ্রী তাঁকে দিই গে। তাই
নিয়ে এলেম। এই নেও, তােমার ধন তুমি পেলে, আমি
খালাস। (চিত্রপট প্রদান)
(নেপথ্যে) ওগো দিদি ঠাকরুণ! যাও তাে এস,
আমরা চলেম।
লবঙ্গ। যাইরে যাই। (ব্রহ্মচারীর প্রতি) ঠাকুর।
প্রণাম করি। কিছু মনে টোনে করাে না, আমি চলেম।
মতি। (দীর্ঘ নিশ্বাসে স্বগত) এ কি হলো?
আমার সে সকল কল্পনা কল্পনামাত্রই হলাে! হু! তা
হবে বৈ কি? অমন অঘটন ঘটনের সম্ভাবনা কি?
আমার স্বপ্নের ধন ইনি নন, ইনি হয় তত আর কি স্বপ্নে
স্বপ্নধন
দেখেছেন, তাইতে অন্য কি পীড়া হয়ে থাকবে। আমি যা
মনে করেছিলেম, তা নয়। তা হলে এ তত তঁারি প্রতি
মূৰ্ত্তি, অমন অনাদর করে ফিরে দেবেন কেন? হুঃ! আমার
দুরাশা পূর্ণ হবার নয়, মিথ্যা আকিঞ্চন করি।(অনেকক্ষণ
চিন্তা করিয়া) তবে এ পর্যন্ত এসেও যদি মনােবাঞ্ছা
পূর্ণ করতে পারলেন না, তবে আর এ জীবন ভার বহনে
প্রয়ােজন কি? আমার তাে প্রতিজ্ঞাই আছে। তবে এই
ত্রিলােকনাথ আশুতােষের নিকটে এই পুষ্করিণী আছে,
এতেই জীবন বিসর্জন দিই, সেই ভাল। আর প্রাণধারণ
করে অন্তরাত্মাকে কেবল দগ্ধ করা বৈ ত নয়, প্রাণত্যাগ
কৰ্ত্তব্য। তবে আমার মনােমােহিনীর প্রতিমূৰ্ত্তিটা বরং
বক্ষস্থলে ধারণ করে জলে পড়ি। (চিত্রপট গ্রহণ ও
দর্শন) এ কি? এ তাে সেখানি নয়। (থুলিয়া দর্শন করত)
না, আর একখানি দেখচি। এ যে নিদ্রিত কোন
পুরুষের প্রতিমূর্তি। (সবিশেষ নিরীক্ষণ করিয়া)
এ কি আমার প্রতিমূর্তি! (পরমাহলাদে) তবে যে
আমার মনােবাঞ্ছা পূর্ণ হয়েছে। (ক্ষণকাল নিস্তব্ধ
থাকিয়া) আমি যাকে স্বপ্নে দেখেছি, তিনি আমাকেই
স্বপ্নে দেখছেন, আমি অনুরক্ত হয়ে যার প্রতিমূর্তি
লিখিছি, তিনিও
অনুরক্ত হয়ে আমার প্রতিমূর্তি
স্বপ্নধন।
লিখেছেন, তবে তার পীড়ারও কারণ আমি। তবে তো
সকল মনােরথই পূর্ণ হলাে, তবে নিরাশ হয়ে প্রাণত্যাগ
করতে উদ্যত হয়েছি কেন? আমি কি মূখ ! সহচরী বলে
গেল, রাজকন্যা বলেছেন, আমি যে সামগ্রী লিখিছি, তার
কাছে কি এ ? একথার গূঢ় ভাব আছে, এতে আপনাকে
নিকৃষ্ট বােধ করে আমার প্রতি মনের আগ্রহই জানান
হয়েছে। তাই বটে, এর আর সন্দেহ কি, আমার আশা-
নতাই যে ফলবতী হয়েছে। যা হোক, কামী জন আর
ন্মত্ত, এদের উভয়েরই মনােবৃত্তি তুল্য। শরৎকালীন
গগনমণ্ডলের ন্যায় ক্ষণে ক্ষণে কত ভাব ধারণ করে।
প্রতিমূৰ্ত্তি পরিবর্ত করাতে বােধ হচ্চে, সহচরীর নিকটেও
গােপন করা তাঁর অভিপ্রেত। তবে এক্ষণে কি করা
কৰ্ত্তব্য। (কিঞ্চিৎ চিন্তা করিয়া) সেই পরামর্শই সৎপরামর্শ,
তবে যাই, বিজয়পুরে গিয়ে সদাগরকে সঙ্গে করে আনি,
দেখি কি হয়, সেই ভাল। (কৃতাঞ্জলি পূৰ্ব্বক প্রণিপাত
করিয়া) হে ত্রিলােকনাথ ! তােমার প্রসাদেই আমার
আশা যেন পূর্ণ হয়, আমি এক্ষণে চলেম।
[প্রস্থান।
স্বপ্নধন।
চতুর্থ অঙ্ক।
কেরল রাজধানী।
রাজসভা।
( অমাত্য সহ রাজা উপবিষ্ট,
বন্দীর স্তুতিপাঠ।)
মন্ত্রী। ( কৃতাঞ্জলি। মহারাজ! রাজকন্যা এক্ষণে
কিঞ্চিৎ বিশেষ হয়েছেন কি ?
রাজা। কৈ মন্ত্রিবর, বিশেষ কিছুই বােধ হচ্ছে না।
মন্ত্রী। তবেই তো, অনেক দিন হতে গেল।
রাজা। হাঁ, তা বটে, তবে কিনা, এ রােগ যে নিতান্ত
মারাত্মকই, তা বােধ হয় না, ঐ আন্তরিক একটু, ওটুকু
কিছুতেই সারছে না। আমাদের দেশে তাে তেমন চিকিং-
সক নাই, এক ভৈষজ্য রত্নাকর আর কণ্ঠাভরণ ধন্বন্তরি,
তা ওঁরাও বিজ্ঞ বটে, কিন্তু কি জাননা, অত্যন্ত প্রাচীন
হয়েছেন, কিছুই করে উঠতে পাচ্ছেন না, ফলে এ রােগের
উপযুক্ত এরা নন, এঁরা যে সকল ঔষধ দিলেন, তাতে
ততা কিছুই হলাে না, যার যা, তার তা না হলে খাইবেই
৩৪
স্বপ্নধন।
বা কেন? এখন বিদেশ থেকে এক প্রকার মকরধ্বজের
আকার আনান হচ্চে, তারি দুই এক রতি প্রয়ােগ করলে
উপশম হতে পারে, সম্ভাবনা বটে। এখন ঈশ্বরেচ্ছা এলে
হয়।
F
(দ্বারবানের প্রবেশ)
দ্বার। মহারাজের জয় হোক। মহারাজ! রাজদর্শন
মানসে এক প্রাচীন ব্রাহ্মণ একটী কন্যা সঙ্গে করে এসে
দ্বারে দণ্ডায়মান।
রাজা। কন্যা?—আচ্ছা আম্তে বলল।
দ্বার। যে আজ্ঞা মহারাজ!
[ প্রস্থান।
রাজা। মন্ত্রিবর! কন্যাকে রাজসভায় আছে কেন?
কি বােধ হয় ?
মন্ত্রী। বােধ হয় ব্রাহ্মণ কোন বিপদে পড়ে থাকবেন,
নতুবা রাজসভায় স্ত্রীলােক আবেন কেন ?
( কন্যাবেশী মতিমানের সহিত বিপ্রবেশে
সদাগরের প্রবেশ)
সদা। (শ্বাস পরিত্যাগ করিতে করিতে হস্ত তুলিয়া)
ম-ম-ম-মহারাজের জয় হোক।
রাজা। প্রণাম করি। (প্রণিপাত )
স্বপ্নধন।
সদা। ম-ম-মহারাজের জয় হোক। আ—আমি
শ-শরণাগত।
মন্ত্রী। ঠাকুর! একটু স্থির হও, প্রাচীন শরীর, পরি-
শ্রান্ত হয়ে এসেছ, অল্পে অল্পে বলো কি হয়েছে।
সদা। আমি বড় বিপদাপন্ন, যদি মহারাজ আশ্রয়
দেন, তা হলেই জাতিকুল রক্ষা হয়।
রাজা। কি, হয়েছে কি ?
সদা। (কৃতাঞ্জলি) আজ্ঞে, নিবেদন করি। আমার
আর কেউ নাই, এই কন্যাটা মাত্র, আমার ব্রাহ্মণী এই
কন্যাটীকে প্ৰসৰ করেই পরলােক গমন করেন, আমি
সব কর্ম ত্যাগ করে এটীকে প্রতিপালন করেছি, তিন
বৎসর গত হলাে, একটী সৎকুলােদ্ভব পাত্রের সহিত
কন্যার সম্বন্ধ করা হয়, বিবাহ দিতেও উদ্যত হওয়া
গেছিল, কিন্তু সে পাত্র তখন বিবাহ কতে সম্মত হলেন
না,—বলেন, সম্বন্ধ স্থির থাক্লাে, আমি আর কিছু পড়ে
মাসি, যােগশাস্ত্র পড়া আমার বাকী আছে, আপনি
এক বৎসর কাল আর অপেক্ষা করুন্, আগামী বৎসর
এসে বিবাহ করবে। এই কথা বলে তিনি গেলেন, কোন্
দেশে পড়তে গেলেন, বলে গেলেন না,তিন বৎসর অতীত
হলো, অদ্যাপি এলেন না, মেয়েটা ঐ দেখুন বড় হয়েছে,
স্বপ্নধন।
আর তাে রাখা যায় না, সম্বন্ধ করা গেছে, অন্যথা করতেও
পারিনে, আর লজ্জা খেয়ে আপনার কাছে বলতেই কি,
আমার কন্যারও অভিলাষ, সেই বরে বিবাহ হয়। এখন
কি করি, কেউ নাই, কাকে পাঠাবাে, আপনাকেই যেতে
হলো, কিন্তু কি করে যাই, কুটুম্ব নাই, আত্মীয় নাই, বন্ধু
বান্ধব কেউ নাই, এখনকার কাল, এই বয়স্থা কন্যা কার
কাছে বিশ্বাস করে রেখে যাই।
রাজা। বটেই তাে, তা কি করূবেন স্থির করেছেন ?
সদা। আর কি কবাে, বিশ্বাস আর কাকে হয়, ধন
প্রাণ জাত্ কুল মান সন্ত্রম সকলেরই রক্ষাকর্তা মহারাজ,
মহারাজই সকল রাখতে পারেন, নষ্টও
কতে পারেন,
অতএব মহারাজ অনুগ্রহ করে আমার প্রতি কটাক্ষ করুন,
অাপনার দয়া হলেই আমার সব রক্ষা হয়, দয়া করে এই
কন্যাটীকে যদি দিন কত রাজবাটীতে রাখেন, আমি তা
হলে জামাইটীকে অন্বেষণ করে আনতে পারি, আমার
এই প্রার্থনা।
রাজা। উত্তম। তার আর অশ্চৰ্য্য কি?
সদা। আমি কৃতার্থ হলেম! জয় হৌক মহারাজের।
রাজা। আর এক কর্ম কলে হয় না?
.
সদা। আজ্ঞা করুন।
স্বপ্নধন।
৩৭.
রাজা। আপনি একখানি পত্র লিখে দি, আমি
লোক দিচ্চি, যেখানে আপনার জামাতা আছেন, অন্বে-
ষণ করে আনুকু গে।
সদা।, আজ্ঞে না, তা হবে না, তাঁকে কেউ চিনে
আতে পাবে না, তিনিও তা হলে আবেন না,
আমাকেই যেতে হয়েছে।-কেন, মহারাজ আমার
কন্যাকে কিছু দিন রাখতে কি অমত কচ্চেন ?
রাজা। না না, আমি তা বল্চি না, আপনার প্রাচীন
শরীর, কষ্ট হবে, তাই বচি। যদি আপনি যেতে পারেন,
তাতে আমার আপত্তি কি, কন্যাটী আমার অন্তঃপুরে
স্বচ্ছন্দে থাকুন গে, তার হানি কি? দ্বারবান! একজন
দাসীকে ডেকে দেও তো।
(নেপথ্যে) যে আজ্ঞে।
সদা। বাঁচুলেম, মহারাজ দীর্ঘজীবী হোন। আপনার
যশে জগৎ ব্যাপ্ত হৌক, লক্ষ্মী স্থির থাকুন, আমাকে
আপনি কৃতার্থ করলেন, আমি এখন স্বচ্ছন্দে নির্ভাবনায়
গিয়ে জামাইটীকে অন্বেষণ করে আনি।
এ কন্যাট
পাত্রস্থ করে, মহারাজ, আর আমি সংসারে থাকবে না।
যা কিছু বিষয় আছে, বিক্রয় করে গিয়ে কাশীবাস
কবাে।
স্বপ্নধন।
রাজা। ভাল, তাই করবেন, প্রাচীন হয়েছেন, আর
সংসারশৃঙ্খলে বদ্ধ থাকার প্রয়ােজন কি।
( দাসী সহ দ্বারবানের প্রবেশ )
দ্বার। মহারাজ! এই ভােলার মা এসেছে।
রাজা। ওরে ভােলার মা! তুই এই মেয়েটাকে
সঙ্গে করে অন্তঃপুরে নিয়ে যা, আমার কুসুমলতার কাছে
দি। বলি, আমি ইটীকে তার হস্তে সমর্পণ কলেম,
এটা ব্রাহ্মণকন্যা, ভগিনীর ন্যায় এঁকে তিনি যেন প্রতি-
পালন করেন।
ভােলার মা। যে আজ্ঞে। এসাে গো বাছা এস।
রাজা। যাও মা যাও, ওর সঙ্গে যাও।
সদা। যাও না মা, যাও, আর কেন দাড়িয়ে থাকলে,
যাও, রাজকন্যার কাছে পরম সুখে থাকবে, তার ভাবনা
কি ?(সদাগরের কণ্ঠ ধরিয়া কন্যার রােদন )
সদা। কেন, কাঁচো কেন, আমার অধিক বিলম্ব
হবে না, যাও লক্ষ্মী সােণামণি বাও ! আমি কত সামগ্রী
তােমার নিমিত্ত আহ্বাে, ভাল কাপড় আবাে, অলঙ্কার
প্রতিকার আবাে, যাও।
ভােলার মা। এসসা না গাে বাছা, আমি আর দাড়াতে
পারিনে, এখনাে রাজকন্যার পুজোর যাে হয় নাই।
স্বপ্নধন।
৩৯
রাজা। কেন, রােদন কচ্চেন কেন ? কেন গো মা,
আমার অন্তঃপুরে আমার কুসুমলতার সঙ্গে একত্র থাকবে,
তােমার ভাবনা কি, কোন ক্লেশ পাবে না, দেখ, ব্রাহ্মণ
যেমন তােমার পিতা, আমিও তাে তেমনি।
মন্ত্রী। আঃ!—এতো গুণ আশ্র কার শরীরে
আছে।
সদা। রাজা বাপ পেলে বাছা তুমি, তবু আবার
কাদো ?
রাজা। ফলে সে কথা যথার্থ, আমার কন্যার যেমন
আকৃতি প্রকৃতি, উটীরও সেইরূপ দেখচি। যাও, দুজনে
একত্র থাকবে, একত্র খেলা কবে।
সদা। যাও মা যাও। (কন্যার অত্যন্ত রােদন )
মন্ত্রী। ব্রাহ্মণ ঠাকুর! আপনি এখানে যতক্ষণ
থাকবেন, ততক্ষণই উনি রােদন করবেন। তা আপনার
তত রাখা হলাে, আপনি এক্ষণে বিদায় হোন।
সদা। আজ্ঞে, আপনি ভাল বলেছেন, তবে আমি
চল্লেম, মহারাজের মনােবাঞ্ছা পূর্ণ হোক।
[ রাজার প্রণাম এবং
সজল নয়নে চাহিতে চাহিতে
সদাগরের প্রস্থান।
S০ স্বপ্নধন। সদাগরের গমন অবলােকন করিতে করিতে অল্পে অল্পে দাসীসহ কন্যার অন্তঃপুরে প্রবেশ) রাজা। আঃ! কন্যাসন্তানটা এমনি ৫ মায়াবিনী বটে! পিতৃবিচ্ছেদে অত্যন্ত কাতরা হয়েছে। মন্ত্রী। তা হতেই তাে হয়, আর তাে কেউ নাই, ঐ পিতাই প্রতিপালন করেছে, পিতা ছাড়া তাে আর জানে । সে যা হোক, ব্রাহ্মণটী বিলক্ষণ বুদ্ধিমান, বেশ মন্ত্রণ। করে মেয়েটাকে কেমন উত্তম স্থানে এনে রেখে গেলো। কোন আশঙ্কা নাই, কোন চিন্তাই নাই, উত্তম বুদ্ধির কাজ করেছে। রাজা। কেবল বুদ্ধিমানই কেন, ব্রাহ্মণটীকে দেখে আমার ভক্তি হয়েছে। দিব্য ব্রাহ্মণটী! দেখেছ, যেন সাক্ষাৎ বুহ্মণ্যদেব, তেজঃপুঞ্জ শরীর- ' (নেপথ্যে মাধ্যাহ্নিক সংগীত।) রাজা। তবে আজ ওঠা যাউক, বেলা হয়েছে। মন্ত্রী। যে আজ্ঞে। (সভাভঙ্গ, সকলের গাত্রোত্থান) [ সকলের প্রস্থান।
স্বপ্নধন।
৪১
পঞ্চম অঙ্ক।
(সংগীতশালা সমীপে মধুকরী দণ্ডায়মানা,
বিষধরীর প্রবেশ )
বিষ। ও মধু! ভাল আছি তত গাে?
মধু। হ মা ! ভাল আছি, তুমি কোথা যাচ্য?
বিষ। ভটচায্যি মােশাই রাজকন্যার নিমিত্ত আশী-
ব্রাদী ফুল পাঠিয়ে দিলেন, তাই রাজমহিষীর হাতে দিতে
যাচ্ছি। তা তুমি এখানে দাঁড়িয়ে কি করছো?
মধু। মহারাজের চিড়িয়েখানাতে কত রকম পাখী
কত প্রকার শব্দ কচ্চে, তাই শুচি।
বিষ। আজ যে বড় নিশ্চিন্ত ?
মধু। না মা, নিশ্চিন্ত নয়, রাজকন্যা একটু ভাল
আছেন।
বিষ। ভাল আছেন ?
মধু। হাঁ গাে হা, ৪/৫ দিন হলো কতক ভাল বােধ
হচ্চে, এই ৫৬ মাস ভারি অসুখ হয়েছিল, এক দণ্ড কি
আমরা কোথায় যেতে পেতেম? সৰ্ব্বদা বাতাস করাে,
গায় হাত বুলােও, এখন আর ততটা নাই।
৪২
স্বপ্নধন
বিষ। কাছে থাকতে হয় তাে?
মধু। ঘঁ, হয়, ততটা নয়, আবার সম্প্রতি দিন ১০/১২
হলাে একটা ব্রাহ্মণের মেয়ে এসেছেন, তিনিই সর্বদা
কাছে আছেন, আমরা একটু ছাড়ান পেয়েছি।
বিষ। হাঁ হাঁ, পরশু দেখলেম বটে, সে ব্রাহ্মণের
মেয়েটা তত ভাল, একে মা, ওকে মাসী, তাকে খুড়ী, যেন
কত কালের পরিচয়। বেশ মেয়েটী, অহঙ্কার নাই, দেমাক
নাই, বেশ, আমি ঐ রকম ভালবাসি ; কে কত দিন
বাঁচতে এসেছে বলে।
মধু। হাঁ গো, বেশ মানুষটী,
রূপে গুণে দেখতে
শুতে অতি উত্তম। আহা, কথাবার্তাগুলি এমনি মিষ্টি,
শুলে কাণ জুড়ােয়। কত দেশের কত কথা, কত শ্লোক
সিদ্ধান্ত, কত কাব্যরস, মেয়েটা এততাও জানে গাে, আবার
স্বভাবটা এমনি,আমাদের কাছেও কখনো মাথার কাপােড়
খােলা নাই, রাজকন্য। তঁাকে বড় ভাল বাসেন।
বিষ। ভাল বাবেন না, এমনট কথা,বলে আ ভাল
তো জগৎ ভাল। যে নিজে ভাল,তাকে কে না ভালবাসে।
তা বাছা, আমি যাই, রাজমহিষীর মহলে যেতে হবে।
মধু। । মা এসাে, আমিও যাই।—( কিঞ্চিৎ গিয়া
দেখিয়া) ঐ যে রাজকন্যা সেই ব্রাহ্মণকন্যাকে সঙ্গে করে
1
স্বপ্নধন।
৪৩
৩
সংগীতশালায় অচেন। কান্ বলে ছিলেন, সংগীতশালা
ওঁকে দেখাবেন, তাই সঙ্গে করে আছেন।
বিষ। ( যাইতে যাইতে দেখিয়া) । তাই তাে
দেখেছ, কেমন লজ্জা, অধােবদন, উচ্চ দৃষ্টি নাই, বেশ
মেয়েট, ওটার বিয়ে হয়েছে কি ?
মধু। না, হয় নাই, ওঁর বাপ ওঁকে এখানে রেখে
জামাই অতে গেছে ।
[ উভয়ের প্রস্থান।
( কুসুমলতা এবং কন্যা-বেশী
মতিমানের প্রবেশ)
কন্যা। ( দেখিয়া স্বগত) এই যে সেই সঙ্গীতশাল।
দেচি! কি আশ্চর্য্য! ঠিক সেই বােধ হচ্চে। (প্রকাশ্যে )
রাজকন্যে ! তােমার এমন সকল যন্ত্র ! আহাহাহা! আমরা
এমন কখনাে চক্ষেও দেখি নাই। তােমার তো সঙ্গীতে
থুন্ স আছে দেখছি, কিন্তু আমিও তো এই ১০১২
দিন এসেছি, গাওনা টাওনা তাে দেখতে পাইনে।
কুম। আমার পীড়া হওয়া অবধি আর কিছুই
কন্যা। (দেখিয়া) আহা! কি সুন্দর এরাজটী! কত
৪৪
স্বপ্নধন।
বড়ো সেতার! উঃ! আলাপচারি করূতে এইরূপ যন্ত্র বড়
ভাল ।
কুসুম। তুমি কি গাইতে পারাে ?
কন্যা। না রাজকন্যে, আমরা গৃহস্থ ঘরের মেয়ে,
আমরা গবে ? ছি! লজ্জার কথা।
কুসুম। তােমার এত লজ্জা কেন ভাই? এখানে কে
আছে ?
কন্যা। কেন রাজকন্যে ! তুমি তো আছ, আমি কি
লজ্জা খেয়ে তােমার কাছে গাইতে পারি ?
কুসুম। আমার কাছে তুমি এত লজ্জা কর কেন?
তোমাকে ভাই একটী গাইতেই হবে। আমি কোন কথা
শুনবাে না।
কন্যা। তবে অাগে তুমি একটা গাও।
কুসুম।
অবশ্য, তা না গাইলেই বা গাবে কেন?
এক মুটো ভিক্ষে ঘরে থেকে না নিয়ে গেলে পরে ভিক্ষে
দেয় না, তবে আমি গচ্চি। কিন্তু তুমি ভাই ঐ তবলাটী
নিয়ে তালি দেও।
কন্যা। আমাদের এ বানে তাল কি খাবে?
কোথায় দিতে কোথায় দিব !
কুসুম। (সহাস্য বদনে। কেন ভাই, তুমি তাে আর
স্বপ্নধন।
৪ ৫
তালকাণা নও; নেও,নেও, আর রঙ্গে কাজ নাই। (তাহার
হস্তে তবলা দিয়া স্বয়ং তানপুরা লইয়া সঙ্গীত করিলেন )
কন্যা। (হাস্যবদনে) আহাহাহা! বেশ! উত্তম
গেয়েছ, আর, একটী গাও।
কুসুম। তুমি আগে একটী গাও। (কন্যার হস্তে
তানপুরা দিয়া স্বয়ং তবলা গ্রহণ )
কন্যা। আমি গাবো?
কুসুম। আর রঙ্গে কাজ নাই, এত লজ্জা কিসের ?
গাও গাও।
কন্যা।
তবে গাই, ছাড়লে না দেখচি।( অনুচ্চস্বরে
গান )
কুসুম। (আশ্চর্যান্বিতা) আহাহাহা! এ কি! অ্যা
কি সুমিষ্ট গলা! এমন তত কখন শুনি নাই! আহা! কি
রাগরাগিণী বােধ! বলি বিধাতা যাকে গুণ দেন, তাকে কি
সব গুণই দে থাকেন! কি আশ্চৰ্য্য । (কন্যার চিবুক
ধরিয়া) ভাই, তােমার এই রূপ, এমন স্বভাব, এত নম্রতা,
এতদূর সুশীলতা, একাধারে এত গুণ তো সম্ভবে না। যা
হোক ভাই, তােমার বাপ জামাই আন্তে গেছেন, এলেই
তুমি যাবে—উঃ! মনে করূলে প্রাণ কেমন করে! তুমি
ভাই আমাকে কি করূলে? তােমার প্রতি আমার মন
৪৬
স্বপ্নধন।
এমন হলাে কেন? তুমি ভাই বিবেচনা করে দেখ, তুমি
ভিন্ন জাতি, ভিন্ন দেশী, ক দিন বা তােমার সঙ্গে আলাপ
হয়েছে, আমার তাে এত সখী আছে, কারু প্রতি তাে
আমার মন এমন হয় নাই।
কন্যা। (হাস্যবদনে) সে ভাই আমার অদৃষ্ট আর
তােমার অনুগ্রহ।
কুসুম। না, সত্য বলচি, তুমি ভাই আমার যেন
জন্মান্তরে কে ছিলে, কি কি ক্ষণ-লগ্নে দেখা হয়েছে
বলতে পারিনে।
কন্যা। রাজকন্যে ! তােমার এতদূর অনুগ্রহ আমার
প্রতি হবে, এত প্রত্যাশা তাে আমি করি নাই, তুমি হলে
রাজকন্যে, আমি হলেম তােমার একজন প্রজার মেয়ে
কুসুম। ও ভাই কি কথা বললা, প্রণয়ে আবার রাজা
প্রজা এলো কেন? ও কথা তুমি রেখে দেও, আর একটা
গাও শুনি, একটু বড় করে গাও।
কন্যা। না ভাই আমি বড় করে গাইতে পাবাে না,
আমার লজ্জা করে।
কুসুম।
এত লজ্জাই কি তােমার? তুমি সর্বদাই
আমার কাছে মাথায় কাপােড় দিয়ে থাক কেন? আমি
এই তােমার কাপােড় খুলে দিই।
স্বপ্নধন।
৪৭
কন্যা। না রাজকন্যে, মাথার কাপােড় খুলে দিও না,
উটি আমার স্বভাব, আরো এক কথা, যার সঙ্গে মন খােলা
খুলি নাই, তার কাছে কি মাথার কাপােড় খােল উচিত ?
এই কথাটী তুমিই বিবেচনা করে।
কুসুম। কেন, মন খােলাখুলি কিসে নাই ভাই,
তুমি আমার মন কেড়ে নেছ একেবারে।
কন্যা। আর ভাই অত দূর আমাকে বাড়াতে হবে
। আমি তােমার মন কেড়ে নিছি ? তা যদি নিতেম,
তা হলে মনের কথাও পেতেম।
কুসুম। মনের কথা পেতে কি বাকী আছে ?
কন্যা। অনেক বাকী।
কুসুম। কি বাকী বলো।
কন্যা। বল্বব? আচ্ছা ভাই, তােমার যে পীড়া
হয়েছে, ওটী কি পীড়া?
কুসুম। কি করে বল্বাে ? বৈদ্যে স্থির করভে
পাটে না।
কন্যা। বৈদ্যে তত সকল বােঝে। তারা পরের
নাড়ী টিপে বেড়ায়, কিন্তু নিজে আনাড়ি। শরীর পাণ্ডুবর্ণ,
ক্ষণে ক্ষণে দীর্ঘ নিশ্বাস, ভালে ডাক্ শােনােনা, এক
কথায় আর উত্তর করাে, এ কি তােমার পীড়া,এ পীড়া কি
৪৪
স্বপ্নধন।
বৈদ্যে স্থির কতে পারে ? আমার কাছে তুমি গোপন
কষ্টো, অথচ আমাকে বলছো তুমি আমার মনের মানুষ,
তা। যে যার মনের মানুষ হয়, তার কাছে কি কোন কথা
গোপন রাখতে আছে ? যদি সুখ দুঃখের ভাগ না দেবে,
তবে একটা প্রণয় কি ?
কুসুম। (স্বগত) ব্রাহ্মণকন্যাটী আমার যথার্থ
প্রণয়ের পাত্রী। বিলক্ষণ বুদ্ধিমতীও বটে, তবে সে কথা
এর কাছে বলায় প্রকাশ হবে না। (প্রকাশে) হাঁ, কিছু
গােপন আছে বটে, বলতে লজ্জা করে।
কন্যা। তবে দেখ দেখি রাজকন্যে, তোমার লজ্জা
অধিক কি আমার লজ্জা অধিক ?
কুসুম। না, আর তােমার নিকটে কিছুই অপ্রকাশ
রাখবাে না। ওরে, কে আছে এখানে?
(বেত্রবতীর প্রবেশ)
বেত্র। আজ্ঞে ?
কুসুম। বেত্রবতি! তুমি দ্বারে গিয়ে থাক, অন্য কেউ
যেন এখন সঙ্গীতশালায় না আসে।
বেত্র। যে আজ্ঞে। সখীদেরও আসতে বারণ
কবো ? "
কুসুম। ই, কেউ যেন না আসে।
স্বপ্নধন।
৯
বেত্র। ভাল, তবে চলুলেম।
[ প্রস্থান।
কুসুম। এই শোন ভাই, একটা কথা তােমাকে বলি,
৫/৬ মাস হলো, এক দিন রাত্রে এখানে গাওনা বাজনা
অনেক হলো, পরে আমার বড় ঘুম পেলে, এখানেই অমনি
ঘুমুচ্চি, সখীরেও সকলে ঘুমুচ্চে,হঠাৎ কি হলাে ভাই,বলতে
এখনো আমার শরীর লোমাঞ্চিত হয়, একটী নবীন যুবা
পুরুষ—এমন রূপ কখন দেখি নাই, আমার দক্ষিণ পার্শ্বে
দেখি শুয়ে নিদ্রা যাচ্চে।
কন্যা। (স্বগত) কি আশ্চর্য্য ! আমার যা, এরও
অবিকল তাই! ( প্রকাশে) কি, স্বপ্নে দেলে নাকি ?
কুসুম। স্বপ্নই বটে, কিন্তু বােধ হয় আমি তখন
জেগে ছিলেম।
কন্যা। যদি জেগে ছিলে, তবে এমন রত্ন পেয়ে কে
ভাই পরিত্যাগ করে তা বল। (ঈষৎ হাস্য)
কুসুম। না ভাই তামাসা নয়, আমি ঐ রূপ, দেখে
অমনি শিউরে উলেম; বলি একি, ঘরের সকল দ্বার
দেওয়া আছে, জবার আভা যেন ফটিকে প্রবেশ করে,
তেমনি ইনি কোথা দে প্রবেশ করলেন? ইন্ িকে, দেবতা,
• কি গন্ধৰ্ব্ব, আমার ভাই লজ্জা ভয় বিস্ময় সকলগুলি এসে
,
স্বপ্নধন।
উপস্থিত। অধিক কথা বলব কি, আমার শরীর যেন
অস্পন্দ হয়ে উলে, সখীদের ডাকবাে, কি কিছু বলবাে,
কিছুই পারুলেম না, আমার কণ্ঠ অবরােধ হলাে, কিন্তু মনের
ততা অবরােধ নাই, নয়নেরও নিষেধ নাই, নয়ন সেই মনাে-
নীত নবনীত-কোমল মধুর মূৰ্ত্তিতে নিমগ্ন হলাে, মনও মনে
মনে তাঁকেই দেহ মন প্রাণ জীবন যৌবন সকলি সমর্পণ
করে বসলো। কিন্তু ক্ষণকালের মধ্যে আবার এমনি ঘুমিয়ে
পড়লেম যে, চৈতন্য মাত্র নাই ! নিদ্রাভঙ্গ হলে দেখি, আমি
যেমন একা শুয়ে ছিলেন, তেমনি আছি, আর কেউ কোথা
নাই, ভারি দুঃখ হলো; অনেক রােদন করলেম, কিন্তু
কাকেও কিছু বল্লেম না, সেই অবধিই আমার এই দশা
হয়েছে। অন্যে বলে পীড়া হয়েছে, তা আমার পীড়াও
এই, সবই এই! এই সকলি তােমার সাক্ষাতে বললেম,
কিন্তু আমার মাথা খাও, এ কথা যেন প্রকাশ না হয়।
কন্যা। (হাস্য বদনে। না না, দিব্য দিও না, প্রকাশ
করবাে কেন?
কুসুম। আমার অন্তঃকরণ সেই অবধি বড়ই ব্যাকুল
হয়েছে, কোনরূপেই প্রবােধ মানে না। এত প্রবােধ দিচ্ছি,
বলি স্বপ্নের ধন কি কেউ কোথা পায়? মন কেন এমন চঞ্চল
হলে? তা শােনে না, চতুর্দিক যেন তন্ময় হয়েছে, যে দিকে
স্বপ্নধন।
p
চাই, সেই দিকেরই যেন সেই মূর্তি! কি করি, মনকে স্থির
করবার জন্যে ভারি সেই ঘুমন্ত মূৰ্ত্তির ছবি একেঁছি। যখন
মন বড় ব্যাকুল হয়, তখন সেই ছবিখানি একা বসে
দেখি আর রােদন করি।
কন্যা।
সে ছবিখানি কৈ?
কুসুম। সে কথাও বলি শােন। যদি স্বপ্নই হতো,
তবে এমন ঘটনা কেন হলো? একদিন আমার সহচরী
লবঙ্গলতা-ত্রিলোকনাথ মহাদেব ঐ সাগরদীঘীর ঘাটে
আছেন,তাকে পূজা দিতে গিছিল, এসে আমার হাতে
একখানি ছবি দিয়ে বললে, একটী ব্রহ্মচারীর কাছে এখনি
পেয়েছি। আমি দেখি, আমারই প্রতিমূৰ্ত্তি, আমি যেমন
সেই স্বপ্নধন পুরুষরত্নের ঘুমন্ত প্রতিমূৰ্তি লিখিছি, সে-
খানিও সেইরূপ আমার ঘুমন্ত প্রতিমূর্তি। দেখে আমার
আরাে আশা বৃদ্ধি হলে, বলি তবে বুঝি ত্রিলােকনাথ
আমার মনােবাঞ্ছা পূর্ণ কলেন, তিনিও আমাকে স্বপ্নে
দেখে আমার ছবি লিখেছেন,আর আমাকে পারেন বলে
এখানে এসেছেন। তবে আমি কি করি, আমার অভিপ্রায়
তে দিতে হবে, কিন্তু কাকে বলা হবে না, অনেক ভেবে
চিন্তে আহ্মার লেখা সেই ছবিখানি পরিবর্তৃ করে পাঠিয়ে
দিলেম, কিন্তু তার পর এত অনুসন্ধান করলেম, সে ব্রহ্মচারী
স্বপ্নধন।
কোথায় গেলেন, আর দেখা দিলেন না। তাতে আরাে
ব্যাকুল হয়েছি। এই তো ভাই তােমার সাক্ষাতে সব খুলে
বলেম।
কন্যা। রাজকন্যে। তুমি আমাকে যথার্থ ভাল
বাসো, মনের সকল কথা আমাকে বলে, আমি ভারি তুষ্ট
হলেম। তোমাকে কিছু পারিতোষিক দিব।
কুসুম। কি পারিতােষিক ?
কন্যা। একটী রত্ন দিব।
কুসুম। কি রত্ন । আমার সেই স্বপ্নে পাওয়া যে
রত্ন, তাই কি দিবে ?
কন্যা। তাই দিব।
কুসুম। আর মিছে রঙ্গে কাজ নাই ভাই, সে সামগ্রী
তুমি পেলে অমনি চাপাফুল করে মাথায় পােরে বসবে।
কন্যা। কেন ভাই, পরের ধন নেবাে কেন?
কুসুম। তা তুমি কি করে পাবে যে দেবে ?
কন্যা। উষা অনিরুদ্ধকে স্বপ্নে দেখে ব্যাকুল হয়ে -
ছিলেন, তার সহচরী চিত্রলেখা কি করে অনিরুদ্ধকে এনে
দিয়েছিলেন?
কুসুম।
সে যোগে।
কন্যা। আমিও বিস্তর যােগ শিখে এখানে এসেছি।
স্বপ্নধন।
কুসুম। তবে কৈ দেও দেখি এনে।
কন্যা। যদি এনে দিতে পারি?
কুসুম। তােমার চরণে চিরদিন দাসী হয়ে থাকবে।
কন্যা। না ভাই, অতো বাড়াবাড়িতে কাজ নাই।
আমার চরণে কেন, রি চরণে দাসী হয়ে থেকো।
কুসুম। তা তো হবেই।
কন্যা। আচ্ছা রাজকন্যে, প্রতিজ্ঞা করাে দেখি,
তিনি হঠাৎ এলে তুমি লজ্জা কবে না।
কুসুম। লজ্জা কি? যে আমার মন হরণ করেছে,
যাকে মনে মনে সব সমৰ্পণ করিছি, তার কাছে আর
লজ্জা? কুল শীল ভয় লজ্জা সব একেবারে বিসর্জন দিব,
দিয়ে তার চরণ সেবা করবাে।
কন্যা। এই তাে প্রতিজ্ঞা ?
কুসুম। এই প্রতিজ্ঞা।
কন্যা। তবে আমি চললেম, এই আনি। (গাত্রো-
থান) আচ্ছা রাজকন্যে, তুমি কি পরিচ্ছদে কে স্বপ্নে
দেখেছিলে ?
কুসুম। বীর পরিচ্ছদে।
কন্যা। সেই পরিচ্ছদ একটী দিতে পারে ?
কুসুম। পারি, আমি একটী সেইরূপ পােক
স্বপ্নধন।
প্রস্তুত করিছি, আমার সহচরী হেমলতকে মধ্যে মধ্যে
সেই পােষাক পরিয়ে দেখতেম, সেটী ঐ পাশের ঘরে
আছে।
কন্যা। তবে আমি যাই, ঐ ঘরে থেকে সেই
পােষাকটী পরিয়ে তাকে আনি গে, কিন্তু ভাই তুমি যেয়ে
না, তা হলে যােগ খাটবে না।
কুসুম। ভাল, আমি এখানে থাকলেম, কৈ আনে।
গে দেখি।
কন্যা। আচি। ( গৃহান্তরে গমন)
কুসুম। (স্বগত) এ ব্রাহ্মণের কন্যাটী কি পাগল ?
তাকে আতে চলল ! খেপেছে নাকি? আবার
আমিও এর সঙ্গে থেকে থেকে আধ খেপা আধ খেপা
হয়ে উঠেছি, আমি আবার সেই অপেক্ষায় বসে আছি।
হ! কি দুরাশা! ( তানপুরা লইয়া দুরাশা বিষয়ে
সঙ্গীত ): গৃহান্তর হইতে) রাজকন্যে! ব্যাকুল হয়াে না,
আমি এই যাচ্চি।
কুসুম। (চকিত ভাবে স্বগত) কে কথা কৈলে ?
এ সেই ব্রাক্ষণকন্যারই স্বর বোধ হলো। (প্রকাশে)
আর ভাই তােমার আন্তে হবে না, তুমি এখানে
এসো।
স্বপ্নধন। ৫৫ (মতিমানের প্রবেশ) মতি। এই যে রাজকন্যে, আমি এলেম। কুসুম। ( দেখিয়া শিহরিয়া) এ কে ? (সভয়ে সলজ্জায় ও সবিস্ময়ে অধােবদন) মতি। ও কি রাজকন্যে? তুমি ,প্রতিজ্ঞা করেছ, লজ্জা করবে না, এখন অধােবদন হলে কেন ? ও কি রাজ- কন্যে ? বলি একটা লােক নিকটে এলে তাকে অভ্যর্থনা কতে হয়, তাও যে কচ্চো না? এ কেমন ব্যবহার তোমার ? । কুসুম। (অথােবদনে) সখীরে এখানে নাই, ব্রাহ্মণ- কন্যা কোথা গেলেন ? অপরিচিত পুরুষের সঙ্গে আমি কি করে আলাপ করুবাে ? মতি। প্রিয়ে। আমি তােমার অপরিচিত নই। তথাপি পরিচয় দিই শােন, আমি বিদর্ভ দেশের রাজপুত্র, আমাকে তুমি স্বপ্নে দেখেছিলে, অনুরাগে আমারি প্রতি মূৰ্ত্তি লিখেছিলে, আমি মৃগয়াতে এসে বনমধ্যে বৃক্ষতলে শয়ন করে সেই দিন সেই ক্ষণে তােমাকে স্বপ্নে দেখে- ছিলাম, অনুসন্ধানে পরিচয় পেয়ে কি করে তােমাকে পাই, তাই ব্রাহ্মণকন্যার বেশ ধারণ করে তােমার নিকটে এসে রয়েছি, তবু কি আমি তােমার অপরিচিত ?
স্বপ্নধন।
কুসুম। আমার বিশ্বাস হচ্ছে না।
মতি। বিশ্বাস হচ্ছে না? এই দেখ। (চিত্রপট অর্পণ)
মধ্যে ব্রহ্মচারী বেশে তোমার অনুসন্ধান নিতে এ দেশে
এসেছিলেম, তুমি ছবি পরিবর্ত করেছিলে, দেখ, এই
তােমার লিখিত সেই ছবি।
কুসুম। দেখছি, তাও সত্য, কিন্তু কিছুতেই আমার
বিশ্বাস হচ্ছে না।
মতি। কেন? এত অবিশ্বাস কিসে?
কুসুম। আমার অদৃষ্টেতেই অবিশ্বাস। আমার
কপালে কি এতদূর ঘটবে? এটাও বােধ হয় আমার
স্বপ্নান্তর। এখন বােধ হচ্চে আমি নিদ্রিত আছি, জাগলে
আরাে যাতনা বৃদ্ধি হবে।
মতি।
প্রিয়ে, আর যাতনা হবে না, আমি বহুরূপ
ধারণ করতে পারি, এই দেখ ব্রাহ্মণকন্যার বেশ এনে
দেখাই। (সেই বেশ আনয়ন)
কুসুম। ( দেখিয়া অতীব আশ্চর্য্য ও আহলাদে ),
এ যে সত্যই দেখি! তবে কি বিধাতা আমার মনােবা।
পূর্ণ করলেন! যা হৌক মাথ, আমাকে পাবার নিমিত্ত
তােমাকে এতদুর করতে হয়েছে ? আমি ধন্য, আর অধিক
কি বলবো। আমার আজ কি শুভ দিন উপস্থিত, আজাদে
স্বপ্নধন।
আমার মন এমন হয়ে উঠেছে যে, আমি কি বচি, কি
বলতে হয়, কি করূলে তােমার মন তুষ্ট হবে, আমি কিছুই
বুঝতে পাচিনে; তবে এই এক কথা বলি, তােমাকে
সামান্য ব্রাহ্মণকন্যা বােধ করি ছি, সখী ভাবে তুমি কতে
আমার পরিচর্যা করেছ, তাতে আমার বিস্তর অপরাধ
হয়েছে, এক্ষণে কৃতাঞ্জলিপুটে প্রার্থনা করি, তুমি সে
সকল দোষ ক্ষমা কর। (হস্ত ধারণ)
মতি। হাঁ, সে সব ক্ষমা করতে পারি, আমার যদি
আশা পূর্ণ হয়।
কুসুম। তা তাে হয়েইছে। (চতুর্দিক নিরীক্ষণ
করিয়া) উঃ! সখীরে যে কেউ এখানে নাই, থাকলে
কুসুমের মালা এনে দিত, আমি এখুনি তােমার গলায়
দিয়ে বহুদিনের মনােরথ পূর্ণ করূতেম।
মতি। কিসের মালা ?
কুসুম। কুসুমের মালা।
৮ মতি। প্রিয়ে, কুসুমের মালায় প্রয়ােজন কি ? কুসু-
মের বাহুলতা তাে আছে, তাই আমার গলদেশে দেও।
কুসুম। ( ঈষৎ হাস্য বদনে) তাতেই সন্তুষ্ট হবে ?
তবে এই দিলেম। (কণ্ঠে বাহুলতা প্রদান, নেপথ্যে শঙ্খ
• ধ্বনি)
স্বপ্নধন।
মতি। শাক বাজালে কে ?
কুসুম।
ও ঠাকুরবাড়ীতে সন্ধ্যাকালে বেজে থাকে।
মতি। তা হলো ভালাে, আমাদেরও মাঙ্গলিক
কৰ্মটা হয়ে গেল। সন্ধ্যা কি উপস্থিত হয়েছে নাকি?
কুসুম। হাঁ নাথ, আর এস্থানে থাকা উচিত নয়, চল
আমরা মহলে যাই।
মতি। চলাে।
কুসুম। কিন্তু ঐ বেশটী পরিত্যাগ করা হবে না।
এ বিষয় সখীদের নিকটেও যেন প্রকাশ না হয়। তােমাকে
ঐ ব্রাহ্মণকন্যার বেশ পরেই থাকতে হবে। আমার যখন
ইচ্ছা হবে, বীরবেশ পাবাে।
মতি। আচ্ছা, তােমার যেমন অভিরুচি।
কুসুম। এমতীর মান ভঙ্গের নিমিত্ত শ্ৰীকৃষ্ণও তত
মোহিনীমূর্তি ধারণ করেছিলেন। তা নাথ, এতে কিছু মনে
করো না।
মতি। না, তাতে আর মনে কি করূবে ? তুমি ।
অনুমতি কবে, তাই করূবো ।
কুসুম। (হাস্য বদনে) পুরুষে না পারে এমন
নকৰ্ম্ম
নাই! স্ত্রীলােকের নিমিত্তে স্ত্রীলােক সাজতে হয়েছে।
ভাই, এততাও জানাে তুমি !
স্বপ্নধন।
মতি। না জানলে কি তােমাকে পেতেম? (হাস্য)
তবে কি বেশ পরিবর্তন করবাে?
কুসুম। ঐ ঘরে গিয়ে বেশ পরিবর্তন করে ঐ পথ
দিয়ে অমনি চলে যাই।
মতি। ক্ষতি কি, তাই চলো।
[ বেশ ও চিত্রপট লইয়া
উভয়ের প্রস্থান।
ষষ্ঠ অঙ্ক।
প্রথম গর্ভাঙ্ক।
রাজবাটীর সান্নিধ্য সামান্য পথ ।
(এক দিকে পুরােহিত অপর দিকে ,
ভােলার মার প্রবেশ)
পুরাে। ( দেখিয়া) কে গাে ভােলার মা? আছ
তো ভাল?
ভােলা। হাঁ বাবাঠাকুর, তােমার আশীর্বাদে এক
প্রকার আছি।
স্বপ্নধন। পুরে। কোথা গিছিলে ? ভােলা। তােমর বাড়ীতে গিছিলেম, তুমি আজ এসেছ শুনে রাজমহিষী জলখাবার দিলেন, দুধ দিলেন, তাই গে দিয়ে এলেম। বাবাঠাকুর ! এত দিন দেখিনি, আপনি কোথা গিছিলেন ? পুরাে। আমি একটু কৰ্ম্মান্তরে ১৫/১৬ দিন বাড়ী ছাড়া। ই ভােলার মা, তােমাকে একটা কথা জিজ্ঞাসা করি, এর মধ্যে রাজবাটীতে কি বিপদ নাকি হয়ে গেছে ? স্নান করূতে গে শুছিলেম। ভােলা। হাঁ বাবাঠাকুর, ভারি বিপদ ! এই আর শনিবার গাে আর শনিবার ! আমাদের আর রান্না খাওয়া হয় নাই। পুরাে। কেন? কি হয়েছিল কি ? ভােলা। বাবাঠাকুর, তুমি দেখনি, সেই যে রাজ- কন্যার কাছে একটী বামুনের মেয়ে এসে ৩৪ মাস ছিলেন, আহা! ঐ মেয়েটাকে তার বাপ এখানে রেখে নাকি জামাই আতে গেছেন, আহা! রাজকন্যা সেইটাকে কেমন ভাল বাতেন, একত্রে খাওয়া, একত্রে শেয়া, কত হাসি, কত কথা, দুটীতে মাণিকজোড় গো মাণিক- জোড়।
স্বপ্নধন। ; পুরাে। হাঁ হাঁ, রাজকন্যার ব্রতের দিন সেটাকে দেখেছিলেম বটে! বেশ মেয়েটী ; তা তার কি হয়েছে ? ভােলা। আর কি হয়েছে বাবাঠাকুর, সেই মেয়েটী জলে ডুবে মারা গেছে ! পুরাে। বলল কি ? জলে ডুবলো কি করে? ভােলা। রাজকন্যার সঙ্গে সাগরদীঘীতে স্নান করূতে গিছিলেন। পুরে। সাগরদীঘীতে রাজকন্যা স্নান করূতে গেলেন? ভােলা। , ইচ্ছে হলো, তাই মহারাজকে বলেন, অমনি চৌকী পাহারা বসে গেল, পুরুষ টুরুষ সব তফাত করে দেওয়া হলাে, সখীরে সকলে গেল, আমরাও কাপপাড় গামচা নিয়ে গিছিলেম। পুরাে। তা ডুবে গেলেন কেমন করে ? ভােলা। কিছুই আমরা বুঝতে পারলেন না, রাজ- কন্যা সখীদের নিয়ে তাকে নিয়ে জলে সাঁতার দিচ্ছিলেন, আহা, বামুণের মেয়েটী কত রকম সাঁতার দিতে লাগলেন, সাঁতার দিতে দিতে অমনি তলিয়ে গেলেন! পুরে। বলে কি! কেউ তুলতে পারলে না? ভােলা। কৈ আর পালে! যারা যারা সাঁতার জানে, অমনি গে পড়লাে, কেউ তুলতে পারলে না। ০
স্বপ্নধন।
পুরাে। মৃত শরীরও পাওয়া যায় নাই ?
ভােলা। না। মহারাজকে পর্যন্ত সংবাদ দেওয়া
গেল, কত লোক জন পাঠিয়ে দিলেন, কত জেলে মালা
এলাে, কিছুই হলো না। বােধ হয় কুমীরে টুমীরে খেয়ে
ফেলে থাক্বে।
পুরা। সাগরদীঘী অতি ভয়ানক পুষ্করিণী, ওতে
স্নান করুতে কেন গেলেন ?
ভােলা। ওগগা নিয়ত গাে নিয়ত। দিন যায় তাে
ক্ষণ যায় না! তা আর দাঁড়াব না, যাই, অনেক কর্ম
আছে।
পুরাে। বাছা, এসাে গে, আমিও রাজবাটীতে
যাই। এখনাে রাজসভা ভঙ্গ হয় নাই বােধ হয়।
ভোলা। না, এখনাে অনেক লােক জন রয়েছে
দেখে এসেছি, আমি এই পথ দিয়ে যাই।
[ উভয়ের প্রস্থান।
স্বপ্নধন।
দ্বিতীয় গর্ভাঙ্ক।
রাজসভা।
( অমাত্যগণ সহ রাজা উপবিষ্ট )
রাজা। মন্ত্রিবর! আজ আর কি কোন কর্ম কাজ
নাই ?
মন্ত্রী। আজ্ঞে না।
রাজা। যতক্ষণ কোন কার্যে ব্যাপৃত থাকি, এক
প্রকার অন্যমনস্ক থাকা হয়, নতুবা মন অত্যন্ত ব্যাকুল ,
হয়ে উঠে। আহা! ব্রাহ্মণের কন্যাটা হঠাৎ মারা গেল,
ভারি দুঃখের বিষয়! পীড়া হয়ে মারা পড়ে, সে এক
স্বতন্ত্র কথা।
মন্ত্রী। আজ্ঞে, তা বটেই তত। তা হলে পাঁচ দিন
দেখতে শুতেও পাওয়া যায়, চেষ্টাও করা যায়, এরূপ
মৃত্যু ভারি মনস্তাপের কারণ।
রাজা। আর বিশেষত ব্রাহ্মণের কন্যাটী অতি
ভাল ছিল। আহা! লজ্জা, নম্রতা, সুশীলতা এসকল গুণগুলি
দূর ছিল যে, এই দুই তিন মাস বৈ তাে আসেন নাই, ঐ
সকল গুণে রাজসংসারের সকলেই তঁাকে ভাল বাসততা ;
বিশেষত আমার কুসুমলতা। কুসুমলঐ মেয়েটার দুর্ঘটনা
৬৪
হওয়াতে এখন অত্যন্ত কাতর হয়েছেন, দিবা রাত্র
একত্রে থাকায় সহােদর ভগিনীর ন্যায় স্নেহ হয়েছিল
কি না।
মন্ত্রী। তা হতেই তাে পারে।
রাজা। কুসুমলতা আমার এক প্রকার আরােগ্য হয়ে-
ছিলেন। মহিষীর কাছে শুনিছি, সেই মেয়েটার জন্যে
সৰ্ব্বদা বােদন করেন, সময়ে আহার করেন না, সময়ে নিদ্রা
যান না, এই সকল অনিয়মে আবার সেই রােগের সঞ্চার
হয়েছে।
মন্ত্রী। সেটা অন্যায় হচ্চে। এত করে সারাণ গেল।
তার এত শােকই বা কি
?
রাজা। না না, ছেলেমানুষ কি না, তত দূর কি বোধ
আছে? তা সে যা হােক, ব্রাহ্মণ মেয়েটা আমার বাড়ীতে
রেখে গিয়েছেন, এসে উপস্থিত হলে কি বলবাে কে ?
শুনে পাছে আমাকে ব্ৰহ্মশাপ দেন, তাই ভাবছি।
মন্ত্রী। কেন, মহারাজের দোষ কি? ও আকস্মিক
ঘটনা, মহারাজ কি কবেন ?
রাজা। না, করূববা কি, তা নয়, তবে কি জানাে,
ব্রাহ্মণের আর নাই, এ বজ্ৰপাততুল্য সম্বাদ, এটী বড়
সহজ নয়।
বড় লাগবে।
মন্ত্রী। স্থা, সে কথা সত্য, ঐ কন্যামাত্রই নাকি তার
জীবন নিবন্ধন,
শােকটা
রাজা। কন্যাটী ভরি মায়াবী ছিল। দেখেছ তাে,
ব্রাহ্মণ যখন রেখে যা, এমনি রােদন করতে লাগলাে,
একেবারে অস্থির।
মন্ত্রী। ব্রাহ্মণও কি যেতে পারেন, আমি কত বলতে
কৈতে, না গেলে নয়, অমনি রোদন করতে করতে বেরু-
লেন। তাই বচি, অত্যন্ত শােকটা লাগবে। শােকে
প্রাণত্যাগই বা হয়।
রাজা। তা হলেই তো সৰ্ব্বনাশ! ব্রহ্মহত্যা আমারি
ঘটবে। (ক্ষণকাল স্তব্ধ প্রায় সকলের অবস্থান )
(দ্বারবানের প্রবেশ)
দ্বার। মহারাজের জয় হোক। দ্বারে দুইটা ব্রাহ্মণ
দণ্ডায়মান।
রাজা। (স্বগত সাশঙ্ক) ব্রাহ্মণ ? তিনি তাে নন?
আর হলেই বা কি করূতে পারি ? { প্রকাশে) ভাল,
আসতে বলে।
{ দ্বার। যে আজ্ঞা মহারাজ।
[ প্রস্থান।
রাজা। মন্ত্রিবর! যদি সে ব্রাহ্মণ হয়, তােমরা যা হয়
বােলল, আমি বলতে পাবাে না।
স্বধন।
মন্ত্রী।
যে আজ্ঞে, যা হয়েছে, তা ববাে, তার
আটক কি।
(ব্রাহ্মণ-বেশী সদাগরের সহিত,
মতিমানের প্রবেশ )
ব্রাহ্মণ। (হস্ত উত্তােলন করিয়া) মহারাজের জয়
হৌক। মহারাজ, আপনার কল্যাণে আমার মনােবাঞ্ছা
পূর্ণ হলাে। আপনি না আশ্রয় দিলে হতাে না। আমি
যদি না যেতেম, ওঁকে আনা দুষ্কর হােতো। এই দেখুন,
ইনি আমার জামাতা, শাস্ত্রে বিলক্ষণ পারদর্শী হয়েছেন,
সম্প্রতি কাশীতে এক দীর নিকটে যােগশাস্ত্র পড়-
ছিলেন।যাও তাে বাবা ! অগ্রে গিয়া মহারাজকে আশা-
দি করাে।
মতি। (অগ্রে গিয়া ) রাজত্যুদয়ােহস্ত।
রাজা। (মৌনভাবে প্রণাম)
মতি। সমীহিত সিদ্ধিরস্তু।
ব্রাহ্মণ। মহারাজ, অত্যন্ত পরিশ্রান্ত হয়ে এসেছি,
এখনাে স্নানাদি কিছুই হয় নাই,-কন্যাটী আনিয়ে দিন,
লয়ে যাই।
রাজা। (স্বগত) ভয়ানক বিপদ উপস্থিত! কি বলি
এখন ?
স্বপ্নধন।
ব্রাহ্মণ। কন্যা এই পাত্রে গে সমর্পণ করি,—করে
মহারাজ, যা নিবেদন করেছি, যা কিছু আমার আছে, এই
রাজসংসারেই সমস্ত বিক্রয় করে আমি এই মাসেই
কাশী যাত্রা করবাে। তা আর বিলম্ব করবেন না, কাউকে
অনুমতি করুন। আজ উত্তম দিন আছে, এই নিকটে
এক গৃহস্থের বাটীতে বাস করা হয়েছে, আজি বিবাহ
দিব।--কেন, মহারাজ কোন উত্তর কচ্চেন না কেন ?
মহারাজের শারীরিক কোন অসুখ তাে হয় নাই ?
রাজা। না, শারীরিক অসুখ নয়, মানসিক অসুখ
হয়েছে।
ব্রাহ্মণ। তা আশীর্বাদ কচি, জগদীশ্বর মঙ্গল
করুন। যিনি আশ্রয়দাতা, শরণাগত-প্রতিপালক, জগতের
বিশ্বাসভাজন, তার মানসিক পীড়া কখনই থাকবে না।
মহারাজ, আর অধিক বিলম্ব করতে পারিনে, অনুমতি
করুন।
মন্ত্রী। মহারাজ কাকে আন্তে অনুমতি করবেন ?
ব্রাহ্মণ। কেন, দাসদাসীর অপ্রতুল কি ? যাকে
অনুমতি করবেন, সেই আবে?
মন্ত্রী। আমি তা বচিনে, আপনার কন্যা কি
আছেন?
স্বপ্নধন।
ব্রাহ্মণ। কেন, আপনি কি সে দিন এখানে ছিলেন
না? আমি মহারাজের নিকটে রেখে গিছি।
মন্ত্রী। হাঁ, তা তত দেখিছি।
ব্রাহ্মণ। তবে অমন কথা বলেন যে ?
মন্ত্রী। ব্রাহ্মণ ঠাকুর! কি বলব অদৃষ্টের কথা !
তােমার সে কন্যাটীর লােকান্তর হয়েছে।
ব্রাহ্মণ। ( সক্রোধে) তােমার সপরিবারের লােকা-
ন্তর হৌক!—তুমি কে হে!--আমার কন্যাকে গালি
দেও?
মন্ত্রী। মহাশয়, আপনি রাগ করেন কি, আমি কি
গালি দিচ্চি ? আপনার কন্যার দেহাতিপাত হয়েছে
যথার্থ।
ব্ৰহ্মণ। মহারাজ!
এ আবার কি কথা বল্তে
লাগলাে ?
মন্ত্রী। আমি যা বলচি, শুনুন না। রাজকন্যার সঙ্গে
সে মেয়েটী পুষ্করিণীতে স্নান করূতে গেছিলেন, জলে ডুবে
মারা পড়েছেন।
ব্রাহ্মণ। সকলি অসম্ভব কথা ! রাজকন্যার সঙ্গে
সঙ্গে
পুষ্করিণীতে স্নানের সম্ভাবনা কি ? তােমার এ বিষয়ে
কথা কবার প্রয়ােজন কি হা ? আমি মহারাজের নিকটে
স্বপ্নধন।
রেখে গিছি, মহারাজের নিকটে চাচ্চি, মহারাজ কিছু
বলেচন , তুমি কে?
রাজা। ও কথা মিথ্যা নয়, যথার্থই ঐ দুর্ঘটনা
হয়েছে।
ব্রাহ্মণ। মহারাজ! অমন কথা আপনি বলবেন না !
ও কি কথা? ওতে যে আপনার অপযশ হবে, ছি ছি ছি !
আপনি রাজা, ধন প্রাণ জাতি কুল সকলেরই রক্ষাকর্তা,
অমন কথা আপনি বলেন, ছিঃ !
রাজা। আমি কি মিথ্যা বল্চি ?
ব্রাহ্মণ। না না, মিথ্যা কথা বল্বেন কেন, ও রহস্য
কচেন, আমার কন্যার অমঙ্গল কখনই হয় নাই। (নেপথ্যে
টিকটীকী) ঐ শুনুন, আমার কন্যার অমঙ্গল কেন হবে?
আমি যে স্থানে রেখে গিছি, সে পরম সুখেই কালক্ষেপ
করছে। দিন্ মহারাজ, কন্যাটী এনে দি।
রাজা। কি বিপদ! আপনি যে বিশ্বাস কচ্চেন না ;
আমি কি রহস্য কচ্চি?
ব্রাহ্মণ। রহস্য কচ্চেন না, তবে ভূয়োভূয় ও কি বলছেন!
এই
ভামধ্যে সহস্র লােকের সংক্ষে আমি কন্যা রেখে
গিছি, আপনি যদি এখন অমন কথা বলেন, তবে তাে আমি
রেখে গে ভাল করি নি;—মহারাজ! আমার কন্যা রূপবতী
স্বপ্নধন।
র
যুবতী বটে, কিন্তু সে আপনার দাসীরও যােগ্য নয়, তার
প্রতি আপনার মনোবৃত্তি ! ছি ছি ছি ! কি নীচ প্রবৃত্তি
আপনার !
রাজা। (সক্রোধে) কি? অকারণে আমাকে যা ইচ্ছা
তাই বলছেন?
সভ্যগণ। তাই তাে, তাইতাে ! তুমি বলাে কি?
তােমার কন্যা মরেছে, আমরা সকলে জানি।
ব্রাহ্মণ। আপনারা এই সভাশুদ্ধ সকলেই জানেন ?
সভ্যগণ। হা , সকলেই জানে বৈ কি? এ কি
মিথ্যা কথা ?
ব্রাহ্মণ। (সবিষাদে) যথার্থই আমার কন্যা নাই।
আমার সর্বনাশ হয়েছে! (ভূতলে পতন ও মূচ্ছ।)
রাজা। (এস্তভাবে ) দেখ, দেখ, দেখ! ধরাে ধরাে,
ও কি হলো! ও কি হলাে!
মন্ত্রী। (সভয়ে) তাই তাে, তাই তাে ! এ কি ? এ কি
হলাে!—জল নিয়েসস, জল নিয়েসে ! ( সকলে শশব্যস্ত
হইয়া ব্রাহ্মণের শুশ্রুষা করিতে লাগিল।
( পুরােহিতের প্রবেশ )
পুরাে। এ কি! এ কি !
রাজা। আপনি শােনেন নাই কিছু কি?
-
স্বপ্নধন। ৭১ পুরাে। আজ্ঞে হাঁ, সব শোেনা হয়েছে। এখন এ কি ! এ যে সৰ্ব্বনাশ উপস্থিত। রাজসভাতে এ কি! কি সৰ্ব্ব- নাশ উপস্থিত ? মন্ত্রী। তাই তাে, এখন কি করা যায় ? সভ্যগণ। বাতাস করাে, বাতাস করাে। পুরাে। বাতাস করাে কি? আরে এ যে ব্রহ্মহত্যা হয়। রাজা। কি কবাে বলুন, আমাকে যা বলবেন, আমি তাতেই প্রস্তুত আছি। পুরাে। এখন শুশ্রুষায় কিছু হবে না, ওঁকে সান্ত্বনা করুন্। দেখছেন না, উনি নিশ্বাস অবরােধ করেছেন। রাজা। সান্ত্বনা আমাদের সাধ্য নয়। (মতিমানের প্রতি) মহাশয়! আপনি অনুগ্রহ করে ব্রাহ্মণকে শান্ত করুন। মতি। মহারাজ! আমি কি শান্ত কবে? উনি প্রাণ পরিত্যাগে উদ্যত হয়েছেন। এ ব্ৰহ্মহত্যা পাপ আপনার যৈমন ঘটবে, অামারও সেইরূপ। অতএব ব্রহ্মহত্যা স্পর্শ না হতে হতে আমি অগ্রে যােগে প্রাণত্যাগ করি। সেই ভাল, আমি এই প্রায়ােপবেশন কোল্লেম। (প্রায়ােপ- বেশনারম্ভ প্রদর্শন) পুর। কি সর্বনাশ! কি সর্বনাশ! কি ঘটলাে এs
१२
স্বপ্নধন।
রাজসভাতে দুটী ব্ৰহ্মহত্যা উপস্থিত ! এ পাপে দেশ
উৎস হবে, রাজ্য ছারখার হবে, কুল নির্মূল হবে !
মহারাজ উপায় করুন্।
রাজা। (ব্যাকুল ভাবে) আমি কি করূবব বলুন,
আমাকে যা বলবেন, তাতেই প্রস্তুত আছি। রাজ্য প্রদান
কলে হয়, দেহ প্রদান করলে হয়, আমার কন্যা আছে,
প্রদান করূলে হয়, যাতে এ বিপদ হতে উত্তীর্ণ হতে পারি,
তাই করবে; আজ্ঞা করুন্।
মতি। (স্বগত) আমারও সেই ইচ্ছা।
পুরে। (মতিমানের প্রতি) আপনি পণ্ডিত, আমরা
আপনার শরণাগত, আপনি ক্ষমা করুন।
মতি। আমাকে আপনারা ভূয়াে ভূয় অনুরােধ
কচেন,আমি কি করি? শরণাগত রক্ষা অতীব কর্তব্য সত্য,
কিন্তু আমি বলে কি উনি শুনবেন ? ভাল, এক বার বলে
দেখি। (ব্রাহ্মণের প্রতি) মহাশয়! মহারাজের দোষ নাই,
আপনার কন্যার যথার্থই অপমৃত্যু হয়েছে। “নিয়তি কে
বাধ্যতে” তার শােকে দেহ ত্যাগ কৰেন না, করলে
অমঙ্গল হয়।
ব্রাহ্মণ।' বৎস! আমি শশাকে প্রাণত্যাগ কফিনে,
তোমার সঙ্গে কন্যার বিবাহ দিব, কাশীতে স্বীকার করে
স্বপ্নধন। :
তােমাকে আশ্ৰমচ্যুত করিয়ে এনেছি, বিবাহ দিতে পাল্লেম
, সেই ক্ষোভেই আমি প্রাণত্যাগ করি।
রাজা। তা আজ্ঞা করুন, উত্তম কন্যা আমি যেখানে
পাই, এনে দিই।
ব্রাহ্মণ। তা আমি কি বলবাে, যদি তাতে উনি তুষ্ট
হন, আমার আপত্তি নাই।
মতি। না মহারাজ, আমি অন্য কোন কন্যা বিবাহ
করতে অভিলাষী নই।
রাজা। ভাল, আমার কন্যা আছে, আমি প্রদান কচ্চি।
(লজ্জায় মতিমানের অধােবদন ভাব)
ব্রাহ্মণ। কি বললা বাপু! তুমি যদি রাজকন্যাকে
গ্রহণ করে সন্তুষ্ট হও, বলল।
মতি। (অধােমুখে ) কি বলি, বিষম বিপদে পড়-
লেম। ভাল, তাই করুন্ অার কি হবে।
ব্রাহ্মণ। কেমন মহারাজ, আপনার কন্যা দিবেন
স্বীকার কলেন ?
রাজা।
এক্ষণে আমি সন্তোষপূৰ্ব্বক স্বীকার কষ্টি।
ব্রাহ্মণ। (গাত্ৰোথান করিয়া) তুবে আমার আর
শােক কি? মহারাজ দিন করুন, আপনি কন্যা প্রদান
করলেও আমার কন্যা প্রদান করা হলাে।
৭৪
'স্বপ্নধন।
রাজা। পুরোহিত মহাশয় ! বিবাহের দিন
কবে
আছে ?
পুরাে। আজি দিন আছে। কালি বৃহস্পতি অতি
চারী হবেন। আগামী বৎসরে লুপ্ত সম্বৎসর।
রাজা। আজি দিন ?
পুরো। আজ্ঞে, আজিই গােধূলীতে।
রাজা। (মন্ত্রীর প্রতি ) তবে সত্বর তােমরা সকল
অয়োজন করাে। আমি অন্তঃপুরে চললেম।
মন্ত্রী। যে আজ্ঞা।
(গাত্রোত্থান ও সভাভঙ্গ)
[ সকলের প্রস্থান।
সপ্তম অঙ্ক।
বাসরগৃহ সমীপে।
(মাধবী দণ্ডায়মানা সত্বর শাম্ভবীর
প্রবেশ)
মাধবী। ও শান্তবি? দাড়া না ভাই, এত তাড়াতাড়ি
কোথা যাচ্যিস্?
স্বপ্নধন।
শাম্ভবী। দাড়াবাে কি দিদি, রাজমহিষী বলেন,
বরকন্যে বাসরে গেছেন, সখীদের শীঘ্র সেখানে পাঠিয়ে
দিয়ে আসি।
মাধবী। আর ভাই তাের যেতে হবে না, আমি বলে
এসেছি, তারা এই অচেন।
শাম্ভবী। তুই গিছিলি?
মাধবী। হাঁ, সে সব হয়েছে। তোকে একটা কথা
জিজ্ঞাসা করি, হরে, জামাই রাজমহিষীর মনস্থ হয়েছে ?
শাম্ভবী। মনস্থ হবে না এমনটা কথা ? বর রাজপুত্র
নন বটে, কিন্তু ভাই যে রূপ, রাজপুত্র কোথা লাগে ? মহা-
রাজ আবার উত্তম পােশাক পরিচ্ছদ দেছেন ; দেখে
এলেম, বাসর আলাে করে বসেছেন। আর কথাবার্তাগুলি
যে গাে, আহা! এমন মিষ্টি, শুলে কাণ জুড়ােয় ।
মাধবী। তা সব দিকেই যদি ভাল, তবে রাজকন্যার
মনে ধরে নাই কেন ?
শাম্ভবী। সে কি ? রাজকন্যার মনে ধরে নি তুই কি
শুনেছিস্?
মাধবী। শুনেছি বৈ কি।
শাম্ভবী। কৈ, আমি তো দিদি কিছু শুনিনি। আমি
তত্ত্ব নিয়ে গিছিলেম, এখানে ছিলেম না, এসে শুয়ে,
স্বপ্নধন।
এর মধ্যে বে থা সব চুকে বুকে গেছে। তা রাজকন্যা কি
তুষ্ট হন নাই ?
মাধবী। না দিদি,কার কেমন মন, কে বলতে পারে?
ওটী ভারি বিপদের কথা।—মহারাজ যখন অন্দরে এসে
বিয়ের কথা বলেন, সেই অবধিই রাজকন্যার কান্না
আরম্ভ হলাে, কোন রূপেই বে করতে সম্মত নন, ধােরে
ভদ্র ঘটানাে হয়েছে। মহারাজ সভামধ্যে স্বীকার করে
এসেছেন, অন্যথা করূতে পারেন না, তাই কতো ভুলিয়ে
ভালিয়ে ও কর্ম হয়েছে। (দেখিয়া ) ঐ যে সকল সখীরে
এলেন। চল আমরা পানসেজে আনিগে।
শাম্ভবী। চল যাই।
[ উভয়ের প্রস্থান।
বাসর গৃহ।
( পৰ্যঙ্কে মতিমান উপবিষ্ট, এক ধারে
অপােবদনে কুসুমলতার অবস্থান
সখীগণের প্রবেশ)
মতি।
এস সখীগণ! তােমরা সকলে এস দেখি,-
তােমাদের রাজকন্যার এ কিরূপ ব্যবহার ? আমি এত
আকিঞ্চন কষ্টি, কোনরূপেই তো আমার সঙ্গে কথা
কনে না।
স্বপ্নধন। ৭৭ তরুলতা। আপনার যে দেখি গাছে না উঠতেই এক কাদি। চুতলতা। তাই তাে, ঐযে লােকে বলে, বিয়ে কলে ঘর চলে না, জামাই বাবুর তাই যে দেখি, এর মধ্যে ওঁর সঙ্গে কথা কন্ নাই, কাছে এসেন নাই, এ তো রাজ- কন্যার ভারি অন্যায় হয়েছে। মতি। বাঃ! ভাল লােককে মধ্যস্থ করেছি! ওরা সকলেই দেচি রাজকন্যার দিকে। বিনত। তা ভাই, যার খাই, তারি গাই। রাজকন্যার দিকে টাবাে না, তবে কি তােমার দিকে টাবাে ? মতি। তা বটেই তো, আমি তােমাদের অপরিচিত, আমার পক্ষে হবে কেন ? তা আমি বল্চিনে, বলি আমি কত অনুনয় বিনয় কলেম, পায় পর্যন্ত ধরূতে গেলেম, আমার কাছে এত লজ্জাই কি ? চুতলতা। আমরাও তো তাই বচি, বিয়ে হতে না হত রাজকন্যা অমনি লজ্জা খেয়ে তোমার সঙ্গে কথা কবেন! সতি। কবেন না কেন? যাকে দেহ মন প্রাণ জীবন যৌবন য়ব সমর্পণ হলাে, তার কাছে আবার লজ্জা কি ? কুসুম। (স্বগত) দেহ মন প্রাণ জীবন যৌন
৭৮
স্বপ্নধন।
যাকে দিবার তাকেই দিছি। আমি এখান হতে উঠে যাই,
এ সকল কথা আমার কর্ণশূল, সহ্য করূতে পারিনে।
বিশাখা। এর মধ্যে বুঝি না বুঝি ভাই, আমি একটী
কথা বলি। রাজকন্যা কথা কন্ না কেন, এর মধ্যস্থ
আমরা কি কবুবাে ? তোমার সামগ্রী ভাই, তােমার যদি
গুণ থাকে, আপনিই কথা কবেন।
মতি। তা এই দেখ সখি! আমি তােমাদের সমক্ষেই
হাতে ধচ্চি।(উঠিয়া কর ধারণে উদ্যোগ )
কুসুম। (বিরক্তভাবে স্বগত) এখনিই গে আমি
প্রাণ পরিত্যাগ করি, আর কেন ? ( উঠিয়া বাসর হইতে
বহির্গমন চেষ্টা।
সখীগণ! ( শশব্যস্তভাবে ধরিয়া টানাটানি) ও কি
ভাই! বাসর ঘর থেকে কি আজ যেতে আছে ? এ যে
রাজকন্যা তোমার ভারি অন্যায়।
মতি। আমি বুঝিছি, রাজকন্যা আমার প্রতি সন্তুষ্ট
হন নাই।
সখীগণ
(শিহরিয়া) সে কি ? সে কি ?
মতি। সেই কথাই সত্য, তার কারণও আছে।
সখীগণ। কি কারণ?
মতি। আমি এই গৃহে প্রবিষ্ট হয়ে ঐ আলমারীতে
স্বপ্নধন।
বৈয়ের ভিতর এই ছবিখানি ছিল, বাহির কলেম।
করে দেখি,-এই দেখনা তােমরা,-পুরুষের ছবি এখানি,
সুতরাং বােধ হচ্চে, তােমাদের রাজকন্যা অন্য কোন পুরুষে
আসক্তচিত্ত, তবে আর আমার প্রতি তুষ্ট হবেন কেন ?
সখীগণ। (দেখিয়া) না না, ও কিসের ছবি ?
আপনি অমন কথা বলবেন না।
মতি। আর ববব না! হুঃ! আমার বিবাহ করা
অন্যায় হয়েছে। জালে কতেন না।
কুসুম। (সভয়ে স্বগত) কি সর্বনাশ! অদৃষ্টে কলঙ্কও
ঘটলাে !—আমি যদি এখন কোথাও গিয়ে প্রাণত্যাগ করি,
আমি অনন্য আসক্তচিত্ত, এত প্রকাশই হবে, কিন্তু যাকে
দেহ সমর্পণ করিছি, তাকেই করেছি, প্রাণ সত্ত্বে অন্য
পুরুষ গায় হাত দিবে, এ তাে কখনাে হবে না। তবে কি
করি ? (ব্যাকুলভাবে অপােবদন)
মতি। ( ঈষৎ হাস্য করিয়া) না, আর তোমাদের
'ক্লেশ দেওয়া উচিত নয়। একটা কথা বলি শােন। মহা-
রাজ ব্ৰহ্মহত্যার ভয়ে আমাকে কন্যা প্রদান করেছেন,
কোন রাজপুত্রে কন্যা প্রদত্ত হােলো না বলে তাঁর মনে
সন্তোষ হয় নাই, রাজকন্যা সন্তুষ্ট হন নাই দেখচি,
এ ভাব দেখে তােমাদেরও তেমন আহ্মাদ হচ্চে না তা
৮০
স্বপ্নধন।
আমি একটা কথা বলি, তােমরা সকলে মনােযােগ করে
শােনো। এই কথা তােমরা কেউ গিয়ে মহারাজকে বলো,
সকলেই সন্তুষ্ট হবেন।
বিশাখা। সকলে সন্তুষ্ট হবেন, এমন কথা কি বল
দেখি শুনি।
মতি। এই যে বচি। রাজকন্যে! এক বার কর্ণপাত
করে। আমি বিদর্ভদেশের রাজপুত্র।
কুসুম। (চকিতভাবে ) কি কথা বলেন ইনি!
তরুলতা। আমরা যে কিছু বুঝতে পারুলেম না ।
মতি। তােমাদের রাজকন্যা বুঝেছেন। রাজকন্যে!
আমি তােমার স্বপ্নধন! আমাকেই তুমি স্বপ্নে দেখে অনু-
রক্ত হয়ে আমার প্রতিমূৰ্তি লিখেছিলে, সেই প্রতিমূর্তি
ঐ। ও অপর পুরুষের ছবি নয়। আমিও মৃগয়াতে এসে
বনমধ্যে তােমাকে স্বপ্নে দেখে তােমার প্রতিমূৰ্ত্তি লিখে-
ছিলেম, পরে নানা অনুসন্ধানে ব্রহ্মচারীবেশে এই
কেরল রাজ্যে এসে তােমারই সখীদ্বারা তোমার সেই
প্রতিমূর্তি পাঠিয়েছিলেম। তুমি, সখীরাও না জানতে পারে,
এই অভিপ্রায়ে প্রতিমূৰ্ত্তি পরিবর্ত করে আমারই প্রতি
মূর্তি পাঠিয়েছিলে। কেমন রাজকন্যে! সত্য কি না?
তরুলতা। এর মধ্যে তােমাদের এতকাণ্ড হয়ে গেছে?
স্বপ্নধন। কুসুম। (চকিতভাবে ) ইনি এ সকল কথা আবার কোথা পেলেন? ইনিই কি তিনি? তবে ব্রাহ্মণকন্যা কে ? মতি। তাতে আমি অন্য কোন উপায় না করতে পেরে ব্রাহ্মণকন্যার বেশে এখানে এসে ৩৪ মাস ছিলেম। কেমন, চিন্তে পারাে আমাকে ? (অল্প অল্প কুসুম- লতার কটাক্ষপাত) সখী। ( সকলেই স্তভাবে ) সে কি! সে কি ? তুমিই ব্রাহ্মণকন্যা হয়ে এসেছিলে ? বলো কি? না, এমন হবে না! সে কি ! সে কি! মতি। স্থির হও, বচি। রাজকন্যে ! সেই সময়ে এক বার পরিচয় দেওয়াতে সন্তুষ্টচিত্তে গান্ধৰ্ব্ববিবাহ করে- ছিলে, কিন্তু সখীরে তা কেহই জানে নাই। আমি ভালেম, মহারাজের কন্যা, মহারাজ এ বিবাহে সম্মতি দিলে পরদ্রব্য অপহরণ পাপে আমাকে পাপী হতে হয়, তাই সাগর দীঘীতে স্নান করতে যাওয়ার অনুরােধ করেছিলেম,—গিয়ে জলক্রীড়া করতে করূতে অলক্ষিত- রূপে পলায়ন করি। তােমরা মনে ককূলে, জলে ডুবে মরিছি। আমি মরি নাই, সেই আমিই আবার ব্রাহ্মণের জামাই হয়ে এসে তােমাকে প্রকাশ্যরূপে বিবাহ করলেম। অতএব রাজকন্যে! আমি অন্য পুরুষ নই, পাতিব্ৰত্ন স্বপ্নধন। --" ভঙ্গের আশঙ্কা করে না, এখানে এস, তােমারই স্বপ্নের সামগ্রী আমি। এক বার ভাল করে চেয়ে দেখ, চিন্তে পাবে এখন। * কুসুম। (পরম সন্তোষে হাস্যবদনে, কটাক্ষপাত করত) এতােও জাননা তুমি ! ( নিকটে আসিয়া উপ- বেশন) বলি, পুরুষে এত দূর, না জানি মেয়ে হলে কতই কতে। সে যাই হোক নাথ! আমার আজ কি শুভ দিন! বিধাতা সকলু মুনােরথ পূর্ণ কল্লেন, আহাদ শরীরে ধরে না। সখীরে, তােমরা সকলে আনন্দ মহােৎসব করাে।-(সখীগণের আমােদ প্রমােদ নৃত্য গীত ) (সত্বর অন্য সখীর প্রবেশ) অন্য সখী।-আমি গে মহারাজকে সকল সম্বাদ বলেম। মহারাজ শুনে আশ্চর্যান্বিত হয়েছেন। অত্যন্ত সন্তোষ প্রকাশ করলেন,বলেন, আমার কুসুমলতা সৎপাত্রেই পতিত হয়েছে, যা আমার চিরদিনের মানস, বিদর্ভদেশাধিপতিপুত্রকেই কন্যা প্রদান করা হয়েছে। ৬ আমার এখন যৌতুক দেওয়া হয় নাই, আমার এই রাজ্যই তাহার যৌতুক। আমি কাল প্রত্যুষেই তাঁহাকে রাজ- সিংহাসন প্রদান করবে। ;-বলে কত সন্তোষ প্রকাশ কবুলেন। {
স্বপ্নধন।
মকি। তবে আর কি, সৎপাত্রে কন্যা প্রদত্ত হয়েছে
বলে মিহারাজ সন্তুষ্ট হয়েছেন, স্বপ্নধন লাভ হয়েছে,
সুতরাং রাজকন্যা সন্তুষ্ট হয়েছেন; সখীরে ! তােমরাও
সকলে সন্তুষ্ট হয়ে থাকবে, এখন সভ্যগণ! এই স্বপ্নধন
নাট দর্শনে আপনারা যদি সন্তুষ্ট হয়ে থাকেন, গ্রন্থকর্তার
হাতশ আর আমার অদৃষ্ট।
+
যবনিকা পতন।
winted at the New Bengal Press, 148, Manicktolah Street, Calcuta.
No text on this page.
No text on this page.